ঔরস

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

আপনারা সকলে নিশ্চয়ই আমার মতোই, কিংবা আমার চাইতেও বেশি, গান ভালবাসেন। আচ্ছা একটা প্রশ্ন যদি করি, এমন কোন গান আছে যেটা শুনলেই আপনার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে? আপনারা কোন গানের কথা বলবেন জানি না, আমি যে-গানটার কথা বলব, সেটা হল, ‘হৃদমাঝারে রাখব, ছেড়ে দেব না।’ যে-ট্রেনে উঠি, যে-স্টেশনে নামি, বীরভূমের দিকে গেলে তো কথাই নেই, ওই এক গান সারাক্ষণ… কে যে কাকে, কেন, রাখছে, হৃদয় যে কার কোথায়, তাই বোঝা যাচ্ছে না। শুনলে, মাইরি বলছি, মরে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মরা তো আর সত্যি সত্যি যায় না, তাই যাবতীয় জঞ্জাল মাথার এককোণে সরিয়ে, ঘরে ফিরে আসি৷

আমি মশাই খুব রোম্যান্টিক মানুষ নই। প্রেমের জোয়ারে ভেসে গিয়ে অজানা উপকূলে মুখ তুলব, সেরকম সুযোগ জীবন আমাকে দেয়নি। তার জন্য আমার কোনও অভিযোগও নেই। কিন্তু হৃদয় বলুন, মন বলুন, আর পাঁচজনের মতো আমারও ছিল, আমারও আছে। সেই জায়গা থেকে কখনও কাউকে ভাল লাগেনি তা তো হতে পারে না। লেগেছে ভাল; আগেও যেমন, পরেও তেমন।

তবে সিরিয়াস প্রেমের কথা যদি বলতেই হয়, তা হলে শুভাঞ্জনার কথা বলতে হবে। জীবনের প্রথম সরকারি চাকরি পাওয়ার পরপরই ওর সঙ্গে আলাপ আমার। মরিয়া হয়ে চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছিলাম, তাই হয়তো ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল। কেন্দ্রীয় সরকারি আন্ডারটেকিংয়ে প্রোবেশনারি অফিসার হিসেবে জয়েন করার চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ আমার বিশ্বাস হয়নি অন্ধকারে এতটা আলো জ্বলাও সম্ভব! কিন্তু অন্ধকারে অভ্যস্ত হতে যতটা সময় লাগে, আলোতে ততটা লাগে না বলেই, ব্যাপারটা গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল তাড়াতাড়ি।

আমাদের অফিসেই নিজের কোম্পানির নানা প্রোডাক্ট সাপ্লাই করতেন শুভাঞ্জনার জামাইবাবু অদ্রীশ রায়। নিজ ব্যবসার স্বার্থেই অফিসারদের সঙ্গে খাতির বজায় রাখতেন ভদ্রলোক। আমি যদিও পারচেজ়ে ছিলাম না, তবু অদ্রীশদার নজর আমার উপরেও পড়েছিল। বলতে গেলে, একরকম যেচেই আলাপ করেছিলেন। অফিসের সোশ্যালে যে মেয়েটি গান গাইছে সে যে ওঁর শালি, সেটাও অদ্রীশদার মুখ থেকেই শুনেছিলাম।

“ভেবো না আমি এখানে কারবার করি বলে আমার রেফারেন্সে নাম পাস করিয়ে নিয়েছি। একবার গলাটা শুনলেই বুঝতে পারবে, কী জিনিস।” অদ্রীশদা আমার থেকে একটা সিগারেট নিয়ে টান দিতে দিতে বলেছিলেন।

‘জিনিস’ কেমন তা অবশ্য আমি বুঝতে পারিনি। বুঝতে যাইওনি। দেখছিলাম, চশমা পরা, একটু লম্বার দিকে একটা মেয়ে গান গাইছে। কিন্তু ‘কী’ গাইছে রে বাবা! শব্দগুলো বুকে এসে বিঁধছে না, উলটে কসাইয়ের ছুরির মতো হৃৎপিণ্ডটাকে ফালাফালা করছে। গানের সমঝদার না হলেও, গান যে খুব ভালবাসি সে তো জানেনই আর তাই হয়তো টালমাটাল হয়ে গেলাম একদম। আমার মন থেকে আমার অতীত, আমার স্ট্রাগল, সব কীরকম মুছে যাচ্ছিল। লঞ্চ যেরকম জল কেটে কেটে যায়, সুরটা সেরকম বাতাস কেটে এগিয়ে যাচ্ছিল। শীতের আমেজ ছিল। কিন্তু আমার শুধু শরীর নয়, মনটাও কাঁপছিল।

ব্যাপারটা এখানেই থেমে যেতে পারত। কারণ ভাল-মন্দ যাই লাগুক, মেয়েদের সঙ্গে নিজে থেকে গিয়ে আলাপ করার ধক আমার ছিল না। শুভাঞ্জনার সঙ্গেও কথা বলতে যাইনি, কেবল ক্যান্টিনের রঘুদার হিসেবের খাতার একটা পাতার অর্ধেকটা ছিঁড়ে নিয়ে, অটোগ্রাফ নেব বলে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। অটোগ্রাফ দেবার সময় শুভাঞ্জনা একটু অবাক চোখে তাকিয়েছিল আমার দিকে। আমি সেই তাকানোর কোনও অর্থ খুঁজে পাইনি। পরে জেনেছিলাম, অফিস সোশ্যালে গান শুনে কেউ ওর অটোগ্রাফ চাইছে, এটা খুব আপ্লুত করেছিল ওকে। ওর জামাইবাবুর মুখে কথাটা শুনে আমি অবশ্য বলতে পারিনি যে, ঘরে ফিরে আমি ওই অটোগ্রাফের কাগজটায় বেশ কয়েকটা চুমু খেয়েছি। কী করব? গলাটা মাথায় ধাক্কা মারছিল যে।

তখনও মোবাইল ব্যাপারটা বাজারে আসেনি ঠিকঠাক। দু’-একজনের কাছে আছে, কিন্তু সে ওই দু’-একজনই। কেউ কেউ ‘পেজার’ বলে একটা জিনিস ব্যবহার করছে যেটা কোমরে থাকে আর সময়ে-অসময়ে বেজে উঠে মেসেজ দেয়। কিন্তু শুভাঞ্জনার জামাইবাবু যখন আমার থেকে একশো টাকা নিয়ে আমায় শিশির মঞ্চে শালির রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার একটা কার্ড দিয়ে বললেন পাঞ্জাবি-পাজামা পরে যেতে, আমার মাথার ভিতরে যেন পেজারই বেজে উঠল। জলতরঙ্গের মতো।

“এমনি, প্যান্ট-শার্ট পরে যাওয়া যাবে না?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“যাবে না কেন? যাবে। কিন্তু কালচারাল প্রোগ্রাম তো। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে এলেই ভাল,” অদ্রীশদা বললেন।

যেভাবে বড় হয়েছি, যেসব ঘটনার ভিতর দিয়ে গেছি তাতে ‘কালচার’ শব্দটা অনেক দূরের একটা গ্রহ, যাকে রাত্রিবেলা ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকালে মাঝেমধ্যে দেখা যায়। কিন্তু তার বাইরে কালচার ঠিক কী?

গান শেষ হয়ে যাওয়ার পর শিশির মঞ্চের বাইরে বেরিয়ে লেবু-চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমি সেই কথাটাই ভাবছিলাম, আর শুভাঞ্জনার গান শুনতে আসব বলে কেনা পাজামা-পাঞ্জাবিতে হাত বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম, কালচারের জন্য আমি ঠিক কতদূর যেতে পারি?

“আরে এখানে দাঁড়িয়ে কেন, গ্রিনরুমে গিয়ে গায়িকার সঙ্গে দেখা করে এসো,” আমার পাশ দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যাবার সময় অদ্রীশদা বললেন।

“আপনি নিয়ে চলুন।”

“আমি এখন দুটো ট্যাক্সির সন্ধানে বেরিয়েছি রে ভাই। তুমি যাও, দেখা করে এসো।”

পাসপোর্টে ভিসার ছাপ পড়ে গেছে ভেবে আমি গেলাম গ্রিনরুমে আর আমাকে দেখেই মিষ্টি করে হেসে শুভাঞ্জনা বলল, “খুব ভাল লাগল আপনি এসেছেন দেখে।”

“আপনার গান, আর আমি আসব না?” বোকার মতোই বলে ফেললাম। শুভাঞ্জনা একবারও আমায় ফাঁপরে ফেলে জিজ্ঞেস করল না যে, ওর গান হলে আমায় কেন যেতেই হবে। উলটে হাসল, “ফোন করবেন।”

ফোন করব? কোথায় ফোন করব? জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে, ফোনটা করব কোথায়? মেট্রোয় উঠে, মেট্রো থেকে নেমে অটোয় উঠতে উঠতে সারাক্ষণ শুধু ভাবতে লাগলাম একটাই কথা, ফোন করতে হবে। তখন পৃথিবী এত স্পিডে চলত না। না ছিল ফেসবুক, না হোয়াটসঅ্যাপ। আর ফোন বলতেও সেই ল্যান্ডলাইনে করতে হবে। মনে পড়ছিল, হায়ার সেকেন্ডারির আগে চিত্রাকে ফোন করতে গিয়ে কী কেস খেয়েছিল পুলকেশ। চিত্রার বাবা স্কুলে এসে চেঁচাচ্ছিলেন, “তুমি যখন ফোন করেছিলে, তখন রাত্রি ক’টা বাজে?”

আমার ক্ষেত্রে অবশ্য কেউ চেঁচায়নি। বরং অদ্রীশদা হপ্তাখানেক পরে অফিসে দেখা করে যে-ফোন নম্বর দিয়ে গিয়েছিলেন, দিন দুয়েক শক্তি সঞ্চয়ের পর সেটায় ফোন করতে শুভাঞ্জনা নিজেই ধরল ফোনটা।

ঘড়িতে তখন রাত্রি আটটা বেজে পঁচিশ। শুভাঞ্জনা আমার প্রায় মিউট হয়ে যাওয়া গলার পিছনের লোকটাকে আবিষ্কার করতে তিরিশ সেকেন্ড মতো নিল তাই। তারপর বলল, “ওহ আপনি। বলুন কী খবর?”

“আপনার জামাইবাবুর থেকে নম্বরটা পেলাম। ব্যস্ত ছিলেন?”

“কই, না তো। গান নিয়ে ভাবছিলাম।”

“গান তো গায়। গান নিয়ে ভাবতেও হয়?”

“ভাবতে হয় বই কী। কোন গানটা কীভাবে গাইলে ভাল লাগবে শ্রোতার, ভাবতে হবে না?”

কায়দাকানুন করে কথা বলতে শিখিনি বলে, এখানে একটা লোপ্পা বল দিয়ে ফেললাম, “আমার কথা কিছু ভাবলেন?”

“আপনার কথা? কী ভাবব বলুন তো?”

আমার মুখ দিয়ে আর কথা সরল না। সাহস করে এত বড় একটা কথা বলে ফেলেছি, এর পর আবার কোন কথা বলতে যাব রে বাবা? “ঠিক আছে, আমি আবার পরে ফোন করব,” বলে চুপ করে গেলাম।

আর ফোন করার সাহস হয়নি। কিন্তু দিনসাতেক পরে আমার অফিসে একটা ফোন এল। তখন ওই জিনিসগুলো ছিল, অফিসে ফোন আসা, ডেকে দেওয়া ইত্যাদি। শুভাঞ্জনার বুদ্ধি প্রখর, ফোনটা করিয়েছিল একটা ছেলেকে দিয়ে। নইলে বুড়ো ক্যাশিয়ার আবার নাক গলাত কে ফোন করেছে তাই নিয়ে। আমি ফোনটা গিয়ে ধরতেই ওপাশের ছেলেটা বলল, “এই নিন, আপনার সঙ্গে কথা বলবে।”

“কী ব্যাপার? আপনি তো আর ফোনই করলেন না। কী সব ভাবনার কথা বলছিলেন?” শুভাঞ্জনা লাইনে এল।

আমি রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, “না, মানে, হ্যাঁ। বলেছিলাম। আসলে জানতে চাইছিলাম, সামনে কোথাও কি আবার আপনার প্রোগ্রাম-ট্রোগ্রাম আছে?”

“কেন, প্রোগ্রাম না থাকলে দেখা হতে পারে না?”

“নিশ্চয়ই হতে পারে, কিন্তু আপনার তো গান নিয়ে ব্যস্ততা…”

“শুধু গান নিয়েই তো জীবন কাটে না। গানের বাইরেও অনেক কিছু আছে। আপনি সময় করতে পারলে বলুন।”

আমি সময় করব? শুভাঞ্জনার জন্য? আমার তো পুরো চব্বিশ ঘণ্টা, সাত দিন, বারো মাস, তিনশো পঁয়ষট্টি দিনই ফাঁকা। যেদিন, যখন, যেখানে বলবে।

দু’দিন পর পার্ক স্ট্রিটের একটা রেস্তোরাঁয় মিট করলাম আমরা। আমি একটু বেশিই অর্ডার দিলাম শুভাঞ্জনাকে ইমপ্রেস করার জন্য। এবং আমার উলটোদিকে বসে, শুভাঞ্জনা নরম করে নিজের জীবনের কথা বলতে লাগল। গানের কথা অল্পই বলছিল, বদলাতে থাকা সমাজ আর পৃথিবীর কথাই বেশি। ফাঁকেফোকরে আমার অফিসের কথাও ঢুকিয়ে দিচ্ছিল। দেখলাম যে, ভালই খবর রাখে। হয়তো জামাইবাবুর থেকেই।

আমি কথা বেশি বলছিলাম না, ওর কথাই শুনছিলাম। কারণ, কখন কী বলে ফেলব ভুলভাল। এরকম অভিজ্ঞতা তো জীবনে আগে হয়নি। পাশের টেবিলে কার একটা জন্মদিন সেলিব্রেট হচ্ছিল। কেকের ওপর মোমবাতি জ্বালিয়ে সবাই গান গাইছে, সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ কেঁদে উঠল শুভাঞ্জনা।

“কী হল?” আমি চমকে গেলাম।

শুভাঞ্জনা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “ভাববেন না। আগুন দেখলে আমার ওরকম কান্না পায়।”

“কেন? আগুনে পুড়ে কারও…”

“না, না, সেসব কিছু নয়। আগুন দেখলে আমার অগ্নিপ্রভর কথা মনে পড়ে যায়।”

পরের একঘণ্টায় জানলাম যে অগ্নিপ্রভ ছিল শুভাঞ্জনার প্রথম প্রেমিক। প্রথম এবং একমাত্র প্রেম। এখনও পর্যন্ত। শুভাঞ্জনাকে এই গানের জগতে নিয়ে আসার পিছনে অগ্নিপ্রভরই সবচেয়ে বড় ভূমিকা।

শুভাঞ্জনা বলল, “জানেন আর সব ছেলে মাথা ধরলে অম্রুতাঞ্জন লাগাত, কিন্তু অগ্নিপ্রভ সেরকম নয়। রবীন্দ্রসংগীত শুনলে ওর মাথা ধরা সেরে যেত। সেখান থেকেই তো আমার গান গাওয়ার শুরু। কিন্তু আমাকে ছেড়ে অগ্নি চলে গেল।”

“কোথায়? অন্য কারও কাছে?”

“না। মহাপৃথিবীতে।”

আমি তখন এমনই বলদ, কথাটার মানেও প্রথমে বুঝতে পারিনি। ভাবলাম, নিশ্চয়ই কোনও একটা জায়গা আছে যার নাম, ‘মহাপৃথিবী’। বললাম, “হয়তো সেখানে কোনও কাজে আছেন। আপনি চিঠি লিখুন। ফোন করুন। ফিরে আসবেন অবশ্যই।”

“সেখানে কেউ বলেও যায় না, আর সেখান থেকে ফেরাও যায় না।”

“আই অ্যাম সরি। উনি মারা গেছেন?”

“প্লিজ, ওটা বলবেন না। আমি সহ্য করতে পারি না। আমার কাছে ও এখনও আছে, সবসময় থাকবে। চিরজাগরণে। তাই আমি বলি যে, অগ্নি মহাপৃথিবীর অংশ হয়ে গেছে।”

তারপরও আরও কী সব বলে গেল শুভাঞ্জনা, পুরোটা আমার মাথায় ঢুকল না। আমি শুধু ফেরার সময় ভাবতে লাগলাম, আমি, চয়ন বসু, এই পৃথিবীর অংশ আর অগ্নিপ্রভ হচ্ছে মহাপৃথিবীর অংশ। পৃথিবী-মহাপৃথিবী, রবীন্দ্র সংগীত-লারেলাপ্পা, গায়িকা শুভাঞ্জনা আর হতে-পারে প্রেমিকা শুভাঞ্জনার মধ্যে একেবারে হাবুডুবু খেতে থাকলাম। হাবুডুবু খেতে খেতে ডুবেই গেলাম যেদিন শুভাঞ্জনা আমাকে ওর বাড়িতে চা খাওয়ার নেমন্তন্ন করল।

বাড়ি অবশ্য তেমন কিছু নয়, দীর্ঘদিন ভাড়া থাকার পর, পুরনো বাড়ির একটা অংশ কিনে নিয়ে খানিকটা কলি ফেরানো হয়েছে। সেই অংশটুকুই এখন শুভাঞ্জনাদের বাড়ি। আমি ওর জামাইবাবুর থেকেই শুনেছিলাম এসব। কিন্তু যা শুনিনি আর যার জন্য প্রস্তুতও ছিলাম না, তা হল, শুভাঞ্জনার নিজের ঘরে ঢোকার আমন্ত্রণ এবং ঢুকেই খাটের উপর খান তিনেক ছেলেদের শার্ট আর একটা জিনসের প্যান্টের, সদর্প উপস্থিতি, দেখতে পাওয়া। আমি শার্ট-প্যান্ট সরিয়ে বিছানাতেই বসতে গেলাম।

“ওগুলোতে হাত দেবেন না প্লিজ়। ওগুলো ওরকমভাবেই থাকে। আপনি চেয়ারে বসুন।”

অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম। তারপর বিছানা লাগোয়া চেয়ার খুঁজতে লাগলাম।

চেয়ারের উপর থেকে বইগুলো সরিয়ে আমার বসার জায়গা করে দিয়ে একটা লজ্জার হাসি হাসল শুভাঞ্জনা। একটু থেমে থেমে বলল, “এই শার্টগুলো আর ওই প্যান্টটা আসলে অগ্নিপ্রভ আমার পছন্দের কথা মাথায় রেখে কিনেছিল। ও চলে যাওয়ার পর এগুলো আমি নিজের কাছে এনে রেখেছি। এগুলো দেখলে মনে হয় ও আছে, আমার কাছেই আছে।”

কথাগুলো শুনতে শুনতে আমি যেন এক মহামানবীকে সামনে দেখতে পেলাম। সে তো সাধারণ মেয়ে নয়, যে এইরকমভাবে নিজের মৃত প্রেমের স্মৃতিকে জাগ্রত করে রেখেছে! চলে আসার আগে বললাম, “ওই শার্টগুলোয় একবার হাত দিতে পারি?”

“হ্যাঁ, দিন। স্পর্শ করুন অগ্নির ঔজ্জ্বল্যকে।”

হাত দিয়ে অবশ্য বিশেষ কিছুই বুঝতে পারলাম না। কেবল খরখরে একটা ভাবই উঠে এল জামাগুলো থেকে। তবু শুভাঞ্জনাদের বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে মনে হতে থাকল, কীভাবে প্রেমিক মরে যাওয়ার পরও প্রেমিকা তার শার্ট-প্যান্টের মধ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই প্রেমকে। না, এর তুলনীয় কিছু জীবনে এর আগে দেখেছি বলে মনে পড়ল না। আমার শুধু মনে হতে থাকল শুভাঞ্জনার নতুন প্রেমিক হতে গেলে পরে কথার পাশাপাশি গান, পৃথিবীর পাশাপাশি মহাপৃথিবীকে বুঝতেই হবে।

হয়তো বুঝেও ফেলতাম, একদিন। কিন্তু তার আগেই ধূমকেতুর মতো ঝুমা এসে আছড়ে পড়ল আমার কক্ষপথে।

ঝুমাকে প্রথম দিন দেখে অত্যন্ত আনকালচার্ড বলে মনে হয়েছিল। তখন আমি শুভাঞ্জনার সৌজন্যে একটা সংস্কৃতির মহাসমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছি, তার ভিতরে ঝুমার আবির্ভাব ঘটল এক মূর্তিমতী রুচিহীনা হিসেবে।

আমাদের সজলদা, বিয়ে করবে না করবে না করে, তেতাল্লিশ বছরে এসে বিয়ে করল একটা ছাব্বিশ বছরের মেয়েকে। মেয়ের বাড়ি থেকে দিত না কিন্তু মেয়েটা সামান্য ট্যারা, আবার একটা পা একটু টেনে হাঁটে। অতএব তেতাল্লিশ বছরের সজলদাই সই। তখনও কলকাতার শহরতলিগুলোয় কেটারিং-এর এমন রমরমা হয়নি। সজলদার বউভাতেও পাড়ার ছেলেরাই কোমরে গামছা বেঁধে পরিবেশন করছিল। আর আমি ছিলাম সুপারভাইজ়রির দায়িত্বে। শীতের রাত্রি। বেশ ধারালো বাতাস বয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ করে সামনের কলাবাগানের ভিতর দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে এল একটা মেয়ে আর পুরো রাস্তাটা বৃত্তাকারে ঘুরে তার পিছনে এসে থামল একটা অটো।

“অটোটাকে এখানে দাঁড় করানো যাবে তো?” মেয়েটা একটু সাইডে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে থাকা আমাকে জিজ্ঞেস করল।

“কোথায় অটো দাঁড় করানো যাবে আমি তো জানি না।” একটা বড় টান মেরে বললাম। আর বলার সময় খেয়াল করলাম মেয়েটাকে দেখতে বেশ মিষ্টি।

“বিয়েবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকছেন, আর এখানে অটো দাঁড় করানো যাবে কি না, জানেন না? জানেন কী তবে?”

“সে কৈফিয়ত আপনাকে দেওয়ার কোনও প্রয়োজন দেখছি না।” বলেই মুখ ঘুরিয়ে নিলাম আমি।

মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল মেয়েটার কথা শুনে। কথা বলাও যে শিখতে হয়, সেই বোধ এদের হয়নি।

সিগারেটটা শেষ করে ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলাম। মাংসটা একটু শক্ত হয়েছে রিপোর্ট আসায়, আর একটু সেদ্ধ করার জন্য উনুনে দেওয়া হয়েছে, মেয়েটা হঠাৎ করে পরদা ঠেলে রান্নার জায়গায় ঢুকে পড়ল। আর মরবি তো মর, আমি তখন সেখানেই দাঁড়িয়ে আছি।

“শুনুন না, আমার খাওয়া হয়ে গেছে, এবার ফিরব। আমাকে আর একজনের খাবার প্যাকেট করে দিতে পারেন, তাড়াতাড়ি?”

“আমি তো প্যাকেট বিলি করার অধিকারী নই। যাদের অনুষ্ঠান, আপনি তাদের কারও অনুমতি নিয়ে আসুন।

“অনুমতির কী আছে? অটোওয়ালাটা শীতের মধ্যে নিয়ে এসেছে, দাঁড়িয়ে আছে; আবার এই ঠান্ডায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। ওর জন্য এক প্যাকেট খাবার নিয়ে যাওয়া উচিত বলে মনে হয় না আপনার? তা হলে আপনি সেটুকুর ব্যবস্থা করে দিতে পারছেন না কেন? শুনুন, আটশো টাকার শাড়ি গিফ্ট দিয়েছি, আর এই কেটারিং-এর প্লেট আড়াইশো টাকার বেশি নয়।”

কথাটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কোনও মেয়ে যে এত নির্লজ্জ হতে পারে আমি ভাবতে পারিনি। কেটারিংয়ের প্লেটের দাম হিসেব করতে গিয়ে কত টাকার শাড়ি দিয়েছে, সেটাও গলা তুলে বলে দিল? আমার ইচ্ছে হল ওকে একটা ধাক্কা দিয়ে ওখান থেকে বের করে দিই। কিন্তু সেটা করা যায় না বলে দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, “আপনি কত টাকার শাড়ি দিয়েছেন আমার জানার দরকার নেই। দরকার হলে, যাকে দিয়েছেন তার থেকে ফেরতও নিয়ে যেতে পারেন আপনার গিফ্ট, কিন্তু আমার পক্ষে নিয়ম ভেঙে আপনাকে কিছু প্যাক করে দেওয়া সম্ভব নয়।”

আমার কথা শেষ হবার আগেই সজলদার ভাই এসে খাবার প্যাক করে দিতে বলল মেয়েটাকে। আমি ঘোর বিরক্তির সঙ্গে পাড়ারই জুনিয়র ছেলে অলোককে সেই দায়িত্ব দিয়ে সরে গেলাম সামনে থেকে। কিন্তু দশ মিনিট পর গেটের সামনে সেই ওর সঙ্গে আবার দেখা হয়েই গেল। একটা গা-জ্বালানি হাসি দিয়ে হাতের প্লাস্টিক দোলাতে দোলাতে আমার সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল মেয়েটা।

সজলদার অষ্টমঙ্গলায় যেতে হয়েছিল একরকম উপরোধের ঠেলায়। কিন্তু গিয়ে ওই মহাশয়াকে দেখতে হবে জানলে, যাওয়ার আগে পাঁচবার ভাবতাম।

একটা বটল গ্রিন শাড়িতে প্রজাপতির মতো উড়তে উড়তে আমার সামনে এসে মহিলা বলল, “ব্যাপার না বুঝে রেগে যাওয়া খুব খারাপ লক্ষণ।”

“তাই? তা কার বাণী এটা?” আমি চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম।

“আমার বাণী, আমার। সুনয়না দত্ত, বাট ফেমাস অ্যাজ ঝুমা দত্ত। মনে রাখবেন নামটা। কেমন?”

থোড়াই মনে রাখতাম ওই নাম, চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলা একটা অসভ্য মেয়ের নাম মনে রেখে হবেটা কী? কিন্তু মানুষ যা চায়, হয় তার উলটো। শীতটা সেবছর গিয়েও ফিরে ফিরে আসছিল; ঠান্ডা ঠান্ডা করছিল বলে সন্ধে গড়াতেই আমি সঙ্গে থাকা সোয়েটারটা গায়ে গলাতে গেলাম। যেখানে গলাচ্ছিলাম, সেটা সজলদার শ্বশুরবাড়িরই আর একটা ঘর, তার মধ্যে গাদা লোক; সোয়েটারটার ভিতর মাথা ঢুকিয়ে হাতটা তুলেছি হঠাৎ একটা প্রচণ্ড চিৎকার আর আমার হাতের পাঞ্জায় একটা ধাক্কা।

আমি খানিকটা হতভম্ব হয়ে সোয়েটারটার ভিতর থেকে মাথা বের করে দেখি, আমার সামনে দাঁড়িয়ে ঝুমা হাঁপাচ্ছে।

ঝুমা নরম করেই বলল, “আঙুলটা কাটা যেত তো? সোয়েটারটা পরার সময় হাতটা উঁচুতে তুললেন যখন, খেয়াল করেননি ফ্যান চলছে? অন্ধ নাকি?”

আমি রাগে অন্ধ হয়েই বললাম, “শীতের সন্ধ্যায় ফ্যান চালিয়ে রেখেছিল কোন ইডিয়ট?”

“একটা ঘরের মধ্যে এতগুলো লোক, ফ্যান না চালালে সাফোকেশন হয়ে সব মরবে তো! আপনি দেখেননি কেন?”

“আমার তো দেখবার কথা নয়, তাই না?”

আমাদের উত্তর-প্রত্যুত্তরের মধ্যেই এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা আমাকে বললেন, “তুমি আর তর্ক কোরো না বাবা, বরং এই মেয়েটাকে একটা প্রণাম করো। ও যদি লাফ দিয়ে উঠে ফ্যানের সুইচটা বন্ধ না করত, তোমার আঙুলটা কাটা যেত আজকে।”

না, ঝুমাকে প্রণাম আমি করিনি কিন্তু চুপ করে গিয়েছিলাম কথাটা শুনে। আস্তে আস্তে বেরিয়ে এসেছিলাম ঘরের বাইরে। তাকিয়েছিলাম নিজের তর্জনীটার দিকে। আর ঘোর বিস্ময়ে টের পেয়েছিলাম যে, তর্জনীটা আয়না হয়ে গেছে। সেখানে অন্য কারও নয়, ঝুমারই মুখ।

ওইদিন, ওখান থেকেই যে ঝুমার সঙ্গে আমার কিছু হয়েছিল তা নয়। কিন্তু ঘটনাটা ঘটার ঘণ্টাখানেক পরে আবার ঝুমার সঙ্গে দেখা হতে আমি মাথা নিচু করে ফেলেছিলাম, লজ্জায়।

ঝুমা অবশ্য আমার লজ্জা-ফজ্জার ধার ধারেনি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলেছিল, “আরে এত কুণ্ঠিত হওয়ার কী আছে? যে-কোনও মানুষই অন্যের জন্য এটুকু করত।”

“না করতেও পারত।” আমি খুব নিচু গলায় বললাম।

“আমি মেয়েটা খারাপ নই, বুঝলেন তো? সেদিন অটোওয়ালাটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা খাচ্ছিল, তাই ওর জন্য খাবার চেয়েছিলাম। আর আপনি কীরকম হাঁই-মাই করে উঠলেন।”

উত্তরে আমি কিছু বলতে পারলাম না। ‘সরি’, ‘ক্ষমা করবেন’, ইত্যাদি কিচ্ছু নয়। কথা আসলে কালচার্ড লোকের সামনে বলা যায়, যে প্রাণ দিয়ে কিছু করেছে তার জন্য তো প্রাণ দিয়ে কিছু করে দেখাতে হয়। কথায় চিঁড়ে ভেজে না সেখানে।

ভেজে না বলেই, চুপ করে রইলাম। কিন্তু ঝুমা নিজেই একদিন আমার আস্তানায় চলে এল। মাকে প্রণাম করে আলাপ টালাপ করে গেল। এর আগে কোনও মেয়ে কখনও আমার খোঁজে আসেনি বলে খানিকটা অবাকই হয়েছিল মা। তাতে অবশ্য আদর-আপ্যায়নের ত্রুটি হয়নি কিছু।

মা একবার বলতেই আমাদের সঙ্গে খেতে বসে গেল ঝুমা, সেই রবিবারের দুপুরে। আর যাওয়ার আগে বলল, চাকরির পরীক্ষার ব্যাপারে কিছু টিপস নিতে ও আমার কাছে আসবে মাঝে মাঝে। আমাকে, ওকে সাহায্য করতে হবে সরকারি চাকরি পাওয়ার ব্যাপারে।

ঝুমার কথা শুনতে শুনতেই আমি টের পাচ্ছিলাম, সজলদার বউয়ের থেকে শুনে, চাকরি পাওয়ার গাইডেন্স নিতে ও আসেনি। নিজের মুখে পাঁচবার করে বললেও, এই গল্পটা একেবারেই বানানো। সজলদার বউ হয়তো আদৌ জানেই না ওর এখানে আসার কথা। খুব যদি ভুল না হই তা হলে ঝুমা এসেছে অন্য কোনও স্বপ্ন নিয়ে, অন্য কোনও সম্পর্কের আশায়। যেটা স্থায়ী হলেও, চাকরি নয়।

ইতিমধ্যে গানের দলের সঙ্গে দিল্লি-হরিদ্বারে প্রোগ্রাম করে, নৈনিতাল ঘুরে শুভাঞ্জনা ফিরে এসেছে। পার্ক স্ট্রিটের পশ কোনও হোটেল ছাড়া শুভাঞ্জনা ঠিক স্বস্তি বোধ করত না বলে, আবারও ওখানেই একদিন নিয়ে গিয়েছিলাম ওকে। আর যাওয়ার সময় ভাবছিলাম, ‘ঝুমা’ নামের একটা সাধারণ মেয়ের আমার প্রতি যে-অনুভূতি জাগ্রত হচ্ছে বলে বুঝছি, সেই কথা শুভাঞ্জনার কাছে বলব নাকি?

কিন্তু শুভাঞ্জনা সেদিন এমন অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করল যে, আমার মাথা থেকে ‘ঝুমা-ফুমা’ সব হাওয়া হয়ে গেল। অ্যাসপারাগাস স্যুপে চামচ ডুবিয়ে জানতে চাইল, “চয়ন, আপনার জীবনে আমি গেলে আমাকে আশ্রয় দিতে পারবেন তা জানি। কিন্তু যদি না যাই, তা হলেও আশ্রয় দিতে পারবেন?”

আমি একদম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। যদি খাই তা হলে খিদে মিটবে সেটা বুঝি, না খেলে খিদে কী করে মিটতে পারে?

“আসলে আপনাকে আমার জীবনে প্রয়োজন। আপনি থাকুন। কিন্তু আমি অগ্নিপ্রভর জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে পারব না। আচ্ছা, এমন হতে পারে না, অগ্নিপ্রভ আমার জীবনে সেই মোমবাতিটা যা জ্বলছে তো জ্বলছেই; আর আপনি তার চারপাশে একটা পতঙ্গের মতো ঘুরছেন?”

“হ্যাঁ, হতেই পারে কিন্তু পতঙ্গ কি শুধু ঘোরে? সে তো আগুনে ঝাঁপও দেয়।”

“ঝাঁপ আপনি দেননি?” শুভাঞ্জনা আমার দিকে তাকাল।

ঝাঁপ তো দিয়েছি। ওই কণ্ঠস্বরের সামনে, ওই সা নি ধা পা মা’র চরাচরে, ওই কাজল টানা চোখ, ওই লম্বা বেণি, ওই মৃত প্রেমিকের শার্ট— সবকিছু মিলিয়ে আমাকে শুধু ঝাঁপ দেওয়ায়নি, ডুবসাঁতার দেওয়াচ্ছে। আর দেওয়াচ্ছে বলেই বুঝতে পারছি, আমি পারব। জ্বলন্ত মোমবাতিকে ঘিরে ঘুরতে পারব।

শুভাঞ্জনা যেন থট-রিডারের মতো আমার মনটাকে পড়ে ফেলে বলে উঠল, “সবাই তো নিজের কেরিয়ার, নিজের স্বপ্নের পিছনেই দৌড়োয়। আপনি, শিল্প আর শিল্পীকে উৎসর্গ করতে পারবেন না জীবনটা, আপনার?”

আমি আবারও কেস খেয়ে চুপ করে গেলাম। তারপর বললাম, “কিন্তু যে নেই তাকে এভাবে কতক্ষণ…”

“নেই বলবেন না। আছে। আকাশের তারা যেমন দিনের আলোর গভীরে থাকে, সেভাবেই আছে। এটা অবসেশন মনে হতে পারে কারও কারও। কিন্তু মানুষ তো না খেতে পেয়ে পাগল হয় না। অবসেশন থেকে হয়। সেই অবসেশন থেকে শিল্পীও হয় লোকে। সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে দুটো লোকের মনে হয়েছিল হাওয়ার থেকে ভারী কিছুকে হাওয়ায় ওড়ানো যায়। তাই না আমরা এরোপ্লেন পেলাম। তেমন করেই আমারও মনে হয় যে, স্মৃতিকে জীবন্ত করে রাখার মধ্যে দিয়ে আমরা ‘শরীর নেই’ এমন একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব। আমার আর আপনার মধ্যে, আমার আর আপনার উদ্দেশ্যহীন পথ চলায়, ধ্রুবতারা হয়ে আলো দিতে পারবে না, অগ্নিপ্রভ?”

শুভাঞ্জনার প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলেও, আমি সেই আলো, সেই টর্চ, সেই হারিকেন, সেই হ্যাজাক, সেই জোনাকি মাথার ভিতর নিয়ে আধপাগল হয়ে ঘরে ফিরে এলাম।

দু’সপ্তাহ পরে ঝুমা যখন আবারও একটা রোববার সকালে আমার কাছে এল, আমি একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, ও ‘জিকে’ জানতে আসেনি। আঙুল বাঁচানোর অধিকারে আমার হাতটা সারা জীবনের মতো ধরতে এসেছে।

আমি ওকে চা আর সুজির হালুয়া শেষ করতে দিয়ে বললাম, “ঝুমা আমার কিছু বলার আছে।”

ঝুমা ওর বড় বড় দুটো চোখ মেলে তাকাল আমার দিকে।

আমি ধীরে ধীরে যতটা পারলাম, শুভাঞ্জনার কথা, গানের কথা, অগ্নিপ্রভর কথা, স্মৃতির ভিতর শুভাঞ্জনার নিজের প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখার কথা, সবটাই বললাম।

আমার কথা শেষ হওয়ামাত্র ঝুমা হাসতে শুরু করল। হাসতেই থাকল।

আমি সেই ওর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার দিনটার মতো তিতিবিরক্ত হয়ে বললাম, “এটা কি হাসার মতো কোনও বিষয়? হোয়াই আর ইউ লাফিং?”

ঝুমা হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে নেমে সিমেন্টের মেঝেয় বসে পড়ে বলল, “আপনি চুমুটুমু খেয়েছেন মেয়েটাকে? আদর-টাদর করেছেন?”

“অসভ্যের মতো কথা বলছ কেন? তুমি সামনে থেকে শুভাঞ্জনাকে দেখলে বুঝতে পারতে, কতটা ডিগনিফায়েড একটা মানুষ হতে পারে।” রাগের চোটে ‘তুমি’ বলে ফেললাম ঝুমাকে।

ঝুমা আমার কথার উত্তরে অন্য কিছু না বলে, শুভাঞ্জনার বাড়ির নম্বর চাইল।

“তুমি কী চাও বলো তো? আমি তো তোমাকে বললামই আমি অন্য একজনের কথা ভাবি। তাকে পাব কি পাব না, জীবন শেষ হয়ে যাবে না থাকবে, এসব প্র্যাকটিকাল কথা আমার মাথায় ঢুকবে না এখন। প্রত্যেকটা লোক প্র্যাকটিকাল হলে পরে কেউ বাঘাযতীন হত না, ক্ষুদিরামও হত না। আমি প্র্যাকটিকাল নই। আমি শুভাঞ্জনার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছি, এবার ওর ইচ্ছেমতোই আমার জীবন চলবে।”

“বেশ করেছ। ভাল করেছ তো। আমি কনগ্রাচুলেট করছি। এবার আমার সঙ্গে বাইরে বেরোবে চলো। আমায় একটা কোল্ড ড্রিঙ্ক খাওয়াবে। প্লিজ়।”

ঝুমা ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে নেমে এমন নাছোড়বান্দা হয়ে গেল যে, ওই রোববারের দুপুরে ওকে নিয়ে বেরোতেই হল আমায়। পাড়ার মধ্যে অচেনা মেয়ে পাশে নিয়ে ইয়ারকি চলে না, আমি তাই বেরিয়েই একটা রিকশায় উঠে পড়লাম ঝুমাকে সঙ্গে নিয়ে। রিকশাটা যখন গলিঘুঁজি পেরিয়ে খানিকটা দূরে এসেছে তখন পথের মধ্যে একটা পাবলিক ফোন বুথ দেখতে পেয়ে ঝুমা একদম আকুলিবিকুলি করে উঠল।

“প্লিজ়, নাম্বারটা দাও। আমি কথা দিচ্ছি কোনও বিড়ম্বনায় ফেলব না তোমাকে। যদি ফেলি, জুতো মেরে তাড়িয়ে দিয়ো আমাকে।”

আমি ঝুমার সঙ্গে আর পেরে না উঠে শুভাঞ্জনার ল্যান্ডলাইন নম্বরটা দিলাম। কিন্তু বুথের ভিতর ঢুকলামও ওর সঙ্গে।

“তুমিই ডায়াল করো।” ঝুমা বলল।

আমি নম্বরটা ডায়াল করতেই, হাত থেকে রিসিভারটা কেড়ে নিয়ে কানে চেপে ধরল ঝুমা আর দশ সেকেন্ড পর বলে উঠল, “শুভাঞ্জনা আছেন?”

ধক করে উঠল আমার বুকটা। ঝুমার মুখে ওই নামটা শুনে।

আমার পাশে দাঁড়িয়ে ঝুমা অবলীলায় বলতে লাগল, “আপনাকে ফোন করেছি কারণ, আমার দেওর আপনার গান শুনে এবং আপনাকে দেখেও, পাগল হয়ে গেছে একেবারে। ও মেক্যানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। নিউ ইয়র্কে থাকে। কলকাতায় এসেছে কয়েকদিনের জন্য। এবার ও যেহেতু আপনাকেই বিয়ে করতে চায়, তাই আপনার আপত্তি না থাকলে, আপনার বাবা-মা’র সঙ্গে একটু কথা বলতাম আমরা।”

আমি পুরো বোবা হয়ে গেলাম, ঝুমার দিনে ডাকাতি দেখে। কিন্তু ঝুমা নিজের বাতেলা চালিয়েই গেল।

“কোত্থেকে ফোন নাম্বার পেয়েছি সেটা বড় কথা নয়। আপনারা শিল্পী মানুষ, আপনাদের নাম্বার পেতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমি বলছিলাম, আমার দেওর কিন্তু একদম দেরি করতে চাইছে না। ও আবার আমেরিকায় ফিরে যাবে তো এর মধ্যেই। যদি আপনি রাজি না থাকেন, তা হলে আর একবারও বিরক্ত করব না আপনাকে। কেবলমাত্র আপনি রাজি থাকলেই…”

কথা বলতে বলতেই দুম করে ঝুমা ফোনটা আমার কানে চেপে ধরল।

আমি জানি না হিরোশিমায় যখন অ্যাটম বোমা পড়েছিল, তখন হিরোশিমার মাটির কীরকম লেগেছিল। আমার যেন খানিকটা তেমনই হল যখন ওপাশ থেকে শুভাঞ্জনার গলা শুনলাম।

শুভাঞ্জনা জিজ্ঞেস করছিল, “উনি কি আমেরিকাতেই থাকবেন নাকি আবার ফিরে আসবেন? যদি ইউএসএ-তেই পাকাপাকিভাবে সেটল করেন, তা হলে আমাদের আপত্তি নেই। আপনি ফোন করবেন বাবাকে, সন্ধ্যায়।”

যখন ঝুমাকে ফোনটা ফিরিয়ে দিচ্ছি তখন আমার ‘আমি’ ছাই হয়ে গেছে, পুরো।

ঝুমা ফোনটা নিয়ে, “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি নিশ্চয়ই ফোন করব, নমস্কার,” বলে ফোনটা রেখেই একটা চার অক্ষরের গালি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “হল? স্মৃতি, ভবিষ্যৎ, মোমবাতি, শার্ট, আরও আরও কী যেন?”

আমি মাটিতে বসে পড়লাম ওই টেলিফোন বুথের ভিতরেই। মাথাটা বনবন করে ঘুরছিল। বাপ রে! এত নাটক? এতটা মিথ্যা?

আমাকে চমকে দিয়ে ঝুমা বলে উঠল, “আরে বাবা কালচার জিনিসটাই তো এই মিথ্যে দিয়ে তৈরি সবটা। আমাদের পাশের বাড়িতে এক অভিনেতা থাকত। বউকে লেঙ্গি মেরে একটা কচি অভিনেত্রীকে বিয়ে করেছিল, তাকে দেখে সেই ছোটবেলাতেই বুঝে গিয়েছিলাম। স্বাভাবিক জীবনে একটা মানুষ ঘুম থেকে ওঠে, দাঁত মাজে, পায়খানা যায়, স্নান করে, অফিসে ছোটে, রোজগার করে আনে, বিয়ে করে বউয়ের সাথে শোয়; ছেলেমেয়ে হলে তাদের খাওয়ায়-দাওয়ায়, মানুষ করে। এই কাজগুলোর মধ্যে সংস্কৃতি-ফংস্কৃতি কোত্থেকে আসে বলো তো? বানিয়ে যা করতে হয়, সেটাই কালচার, তাই না? সেটার মধ্যে যারা একেবারে ডুবে যায়, তারা সেটাতেই সব দেয়। এবার যে-গোয়ালা দুধের সরের আলাদা বিজনেস করে, তার দেওয়া দুধ তো ট্যালট্যালে হবেই। সরটা তো সে আলাদা দামে, আলাদা জায়গায় বেচে। এরাও তেমন, ইমোশনটা কালচারে দেয়; সংসারে কী করে দেবে?”

ঝুমা এত সহজভাবে কথাগুলো বলছিল, যেন পৃথিবীর চিরসত্য উচ্চারণ করছে। কিন্তু তাই বলে কেবল ‘আমেরিকা’র উচ্চারণমাত্র তাজমহল ধূলিসাৎ হয়ে গেল?

“আচ্ছা, আমেরিকাতেও কি ওই তিনটে শার্ট নিয়ে যাবে শুভাঞ্জনা?” আমি প্রশ্নটা করে ফেললাম ঝুমাকে।

আমাকে চমকে দিয়ে ঝুমা বলল, “শুভাঞ্জনা কোন শার্ট নিয়ে যাবে জানি না। তবে তোমার আজ এত বড় উপকার করলাম, তারপর আমায় বিয়ে করো না করো একটা শাড়ি অন্তত কিনে দিতেই হবে।”

কথাটা শুনে হেসে ফেললাম। কিন্তু সেই হাসির ভিতর অনেক কান্না, অনেকটা উপলব্ধি মিশে ছিল। যেভাবে কালীপুজোর রাতে হাওয়ায় রকেটটা উড়ে যাওয়ার পর বোতল একসময় আবিষ্কার করে তার কোথাও ওড়ার ক্ষমতা নেই, রকেটটা ভিতরে ছিল বলেই সে ভাবছিল সে নিজেও বোধহয় আকাশে উড়ে যাওয়ার শক্তি রাখে, আমারও হয়েছিল সেই দশা। আসলে যে আমি একটা বোতল মাত্র, ছাদে কিংবা সিঁড়ির কোণেই যার পড়ে থাকার কথা, সেটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ঝুমার প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠছিল মন।

ফোনবুথের বাইরে বেরোতে বেরোতে, অতীত-বর্তমান-চাকরি-পি এফ-গ্র্যাচুইটি সব ফিরে এল মাথার মধ্যে। একেবারে নিঃসংশয় হয়ে গেলাম ওইসব শিল্প-ফিল্প নয়, আমার চাই, শান্তির একটা জীবন।

“তুমি কি আমার উপর রাগ করলে?” রাস্তায় পা দিয়ে খানিকটা ভয়ে ভয়েই ঝুমা জিজ্ঞেস করল।

আমি ঝুমার হাতটা আমার হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম, “শাড়ি যখন কিনে দিতেই হবে, বেনারসিটাই দিই?”

না, সেদিন ঝুমাকে বেনারসি কিনে দেওয়া হয়নি। কিন্তু ঝুমার সঙ্গে জীবনটা জড়িয়ে গেল সেই সন্ধ্যা থেকেই। শুভাঞ্জনাকে করা ফোনটা একটা ব্যতিক্রম, এমনিতে ঝুমা সাজিয়ে-গুছিয়ে কথা বলতে পারত না। কিন্তু ওর কথাগুলো একদম মাটির পাঁচশো ফিট গভীর থেকে উঠে আসা বিশুদ্ধ পানীয় জলের মতো মনে হত। তার মধ্যে কোথাও কোনও লুকোচুরি নেই, কোনও ভড়ং নেই।

সেদিনের সেই ফোনের পর শুভাঞ্জনার সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখিনি। রাখার সাহস পাইনি। ওই বিশ্বাসহীনতার মধ্যে যাওয়ার শক্তি ছিল না আমার। মনে হচ্ছিল, আমি যেন সেই রাজা যার অভ্যর্থনার জন্য এমন মঞ্চ শুভাঞ্জনা বেঁধেছে, উঠে দাঁড়ানো মাত্র যা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে।

সরে ছিলাম। কিন্তু আমার সরে থাকায় শুভাঞ্জনার হয়তো অস্বস্তি হচ্ছিল কোথাও। নইলে জামাইবাবুকে দিয়ে খবর পাঠিয়ে যখন লাভ হল না কিছু তখন নিজেই একদিন অফিসে চলে আসবে কেন?

“না বলে-কয়ে অফিসে হঠাৎ?” খানিকটা বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞেস করলাম।

“আপনি না বলে-কয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন কেন?”

“চাপ যাচ্ছে। তা ছাড়া, শিল্পের আমি ঠিক সমঝদার নই। আর শিল্পকে যে বোঝে না, সে শিল্পীকে কী বুঝবে? আপনার শিল্পের অনেক সমঝদার আমেরিকায়, ইংল্যান্ডে অপেক্ষা করে আছে। আমার মতো তুচ্ছ লোকের একটু দূরে থাকাই ভাল।”

“ফোনটা তার মানে, আপনিই করিয়েছিলেন?” আমার সঙ্গে পায়ে পায়ে অফিসের বাইরে বেরিয়ে শুভাঞ্জনা জিজ্ঞেস করল।

“কোন ফোনের কথা বলছেন?”

“একদম ন্যাকামি করবেন না। সোনাগাছির একটা বেশ্যাকে দিয়ে আমায় ফোন করানো হয়েছিল কেন?”

মাথাটা আগুন হয়ে গেলেও আমি পায়ের নখ নিজের জুতোয় ঘষতে ঘষতে ঠান্ডা রাখলাম মাথা। কোনও কথা না বলে তাকিয়ে রইলাম শুভাঞ্জনার দিকে।

“কী হল, উত্তর দিচ্ছেন না কেন? ওই মাগিটা কার রক্ষিতা?”

“শিল্পীর মুখের ভাষা শুনে কথা বেরোচ্ছে না মুখ দিয়ে।”

“মুখের ভাষা এখনও কিছুই শোনাইনি। আর শুধু মুখের ভাষা নয়…”

“হাত চালানোর মতো গুন্ডাও আছে? তা হলে তো আমাকেও নান্টু আর ভজুকে খবর দিতে হয়।” আমি শুভঞ্জনাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম।

শুভাঞ্জনা কেমন চুপসে গেল কথাটা শুনে, “কেন করলেন আমার সঙ্গে ওরকম?”

“ঠিক কী করেছি আমি, একটু বলবেন?”

“আমি মানছি যে, হঠাৎ করে আমেরিকার কথা শুনে আমি একটু এক্সাইটেড হয়ে গিয়েছিলাম, তবে সিরিয়াসলি কিছুই বলিনি। সেগুলোর ভিত্তিতে এভাবে আমায় ছেড়ে…”

“আপনি ভুল করছেন শুভাঞ্জনা, আমি অগ্নিপ্রভ নই। আমার আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না কারণ, আমি আপনার জীবনে যেতেই পারিনি। আর একটু তলিয়ে ভেবে বুঝতে পেরেছি, কোনওদিন পারবও না। আমি সাধারণ, খুব সাধারণ, আপনার অনুগ্রহেরও যোগ্য নই। আপনি বুঝতে পারেননি প্রথমটা।”

কথা বলতে বলতে দুটো চা নিয়েছিলাম, রাস্তার দোকানে। শুভাঞ্জনা ওভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খাবে ভাবা যায় না, তবুও।

সেই চায়ের ভাঁড় মাটিতে ফেলে দিয়ে দ্রুত পায়ে আমাকে ফেলে এগিয়ে যেতে যেতে শুভাঞ্জনা ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “আপনিও বুঝতে পারেননি আমাকে। একজন শিল্পীর জীবনের সত্যি-মিথ্যা যে আর পাঁচজনের মতো হয় না, বুঝতে পারেননি একদম।”

ঝুমাকে বোঝা খুব সহজ ছিল। প্রতিটা মুহূর্তেই ও কুড়ি বছর এগিয়ে ভাবত বলে, একটু পয়সা খরচ হবে এমন কোনও হোটেলে ঢুকতে ভীষণ আপত্তি ছিল ওর। অটোওয়ালা, বাস কনডাকটর, ড্রাইভাররা খায়, এরকম কোনও জায়গায় খেতে খুব স্বস্তি বোধ করত ঝুমা।

সেরকমই একটা জায়গায় বসে, শুভাঞ্জনার আমার অফিসে আসার গল্পটা করলাম ওকে।

শুনতে শুনতে খাওয়া চালিয়ে গেল ঝুমা। তারপর একটা তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলল, “তুমি না অনেকটা রাহুর মতো।”

“কী বলতে চাইছ, তোমার জীবনে আমি রাহু?”

“আমার জীবনের কথা বলিনি। তোমার স্বভাবটা রাহুর মতো। রাহু কী করে, বলো তো? চাঁদকে গিলে খেতে চায়। কিন্তু রাহুর তো গলার নীচে আর কিছু নেই। তাই চাঁদ আবার গলে বেরিয়ে যায়। তুমিও ওই শিল্প-শিল্পীকে গিলে খেতে চাও। কিন্তু হজম করতে পারো না। তাই বলছিলাম যে, কাঁচকলা দিয়ে রাঁধা মাগুর মাছ খেয়ে ভাল থাকো; শাহি কোর্মার দুরাশা ত্যাগ করো।”

“মাগুর মাছের দাম তো শাহি কোর্মার থেকে বেশি।” আমি কেমন একটু অন্যমনস্কভাবে বললাম।

ঝুমা হো হো করে হেসে উঠল, “এই তো বুদ্ধি খুলছে। এবার একটু প্র্যাকটিক্যাল হও তো।”

“ঠিকই বলেছ, প্র্যাকটিক্যাল হতে হবে। তা নইলে দু’ বছরের মধ্যে তোমার দায়িত্ব নেব কীভাবে?

“দু’বছর? একটা পিতৃহীন মেয়েকে দু’বছর বসিয়ে রাখবে, তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? আমি আর ছ’মাসও টিকতে পারব না ওখানে। বউদি যাচ্ছেতাই বলেছে আমাকে।”

“কেন?”

“বাবানকে মশা কামড়েছে।”

“তোমার দাদার ছেলেকে মশা কামড়েছে তার জন্য তোমাকে যাচ্ছেতাই শুনতে হবে কেন?”

“আমি ঘর থেকে বেরোবার আগে মশার কয়েল জ্বালাতে ভুলে গিয়েছিলাম। এবার বাচ্চাটাকে নাকি কামড়ে দাগড়া দাগড়া করে দিয়েছে।”

“সেটা ভাল কিছু হয়নি, কিন্তু মশার কয়েল জ্বালালে বাচ্চাটার শ্বাসকষ্ট হতে পারত। সেদিক দিয়ে ভালই করেছ।”

“তুমি এই কথাটা আমার বউদির সামনে গিয়ে বলো দেখি একবার। তোমার মুখে নুড়ো ঝ্যাঁটার বাড়ি মারবে। কী জিনিস চেনো না তো। জীবন দুর্বিষহ করে দিতে ওস্তাদ একদম।”

“খেতে টেতে দেয় তো?”

“তা দেয় এখনও। কিন্তু আরও দু’বছর দেবে না, আমি শিয়োর। তুমি যত শিগগির সম্ভব আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলো।”

“তোমার বাবার পেনশন পাও না তোমরা?”

“বাবার পেনশনের টাকা মা নেয়, মায়েরই প্রাপ্য ওটা। আর বাবা কী এমন প্রেসিডেন্টের চাকরি করত যে, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পেনশন পাবে? ছ’হাজার সামথিং পায়। মায়ের ওযুধের খরচই তো আড়াই হাজার মাসে। আমি টিউশন করে নিজেরটুকু চালিয়ে নিই, কিন্তু অনন্তকাল কি এভাবে চলা সম্ভব? তা ছাড়া তোমার সঙ্গে আমাকে একদিন দেখেও ফেলেছে দাদার এক বন্ধু।”

আমি জানি, এগুলো পুরনো টেকনিক। মেয়েরা বিয়েতে রাজি করানোর জন্য এই গল্পগুলো বলে। কিন্তু ঝুমার মুখ থেকে শোনার সময় মিথ্যে ভাবতে ইচ্ছে করল না। আরও দু’বছর সময় পেলে নিশ্চয়ই ভাল হয় আমার, কিন্তু ঝুমার সুবিধার জন্য যদি একটু আগেই করতে হয় বিয়েটা, তাতেই বা কী এমন ক্ষতি?

আমরা একটা পার্কে ঢুকে বসেছিলাম।

ঝুমা পার্কের বাচ্চাগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “ওই বাচ্চাদের নিয়ে মায়েরা বিকেল হতে না হতেই পার্কে কেন চলে আসে বলো তো? বাড়িতে ওদের রাখতে পারে না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের ভেতরেও একটা বাচ্চা থাকে যে, বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়, একটা বয়সের পর। সে গিয়ে প্রত্যেকটা মেয়েকে বলে, ‘মা হও। আমাকে বাইরে বের করো।’ আমার খুব ইচ্ছে করে আমার বাচ্চাও খেলে বেড়াক আর সব বাচ্চার সঙ্গে। আচ্ছা, তুমি ঝুলন সাজিয়েছ কোনওদিন?”

আমি ঝুমার দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়লাম।

“আমি খুব ভাল ঝুলন সাজাতে পারতাম জানো। আমাকে অনেকে নিয়ে যেতে চাইত নিজেদের বাড়িতে ঝুলন সাজানোর জন্য। আমাদের পাড়াটা তখন আরও বেশি গ্রাম-গ্রাম ছিল আর নিয়োগী পুকুরের ঠিক পাশেই ছিল এলাকার সবচেয়ে বড় বাড়ি, সাহাদের। তারপরের বাড়িটা মিত্রদের। ওরা আমাদের কীরকম যেন আত্মীয় হত। ওই মিত্রদের বাড়িতে ঝুলন সাজাতে দেখেই আমাকে একবার সাহাবাড়ির এক ভদ্রমহিলা টাকা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, ওদের বাড়ির ঝুলন সাজাতে। সেই আমার জীবনের প্রথম রোজগার। লোকে কতকিছু করে রোজগার করে আর আমি ইটের গুঁড়ো, সুরকি দিয়ে নদী তৈরি করে, বালি দিয়ে রাস্তা গড়ে কড়কড়ে একটা একশো টাকার নোট পেয়েছিলাম। কিন্তু টাকা পেয়ে আমার যে খুব আনন্দ হয়েছিল তা নয়। খালি মনে হচ্ছিল, কবে আমার নিজের বাড়িতে এরকম একটা বারান্দা থাকবে, যেখানে আমি নিজের খুশিমতো ঝুলন সাজাতে পারব।”

আমার মনে পড়ে গেল, কোন ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে গিয়ে ছ’গোলে হারছি। আমাদের পি.টি টিচার হাফ-টাইমে আমার কান মলে দিয়ে বলেছিলেন, “তুমি ডিফেন্সে দাঁড়িয়ে আছ না ঝুলনের পুতুল হয়ে দুলছ? তোমাকে কাটিয়ে খালি গোল করে যাচ্ছে?” ঝুমার কথাগুলোও যেন আমাকে ঝুলনের পুতুল বানিয়ে দিল, এমন একটা পুতুল, যার কোনও শক্তি নেই, যে কেবলই এদিক থেকে ওদিক দুলছে।

“কী ভাবছ? এই মেয়েটা তারকাটা, তাই না?”

আমি কোনও উত্তর দিতে পারলাম না ঝুমাকে। কিন্তু ঝুমা যদি আমার বুকে মাথা রাখত তখনই, তা হলে শুনতে পেত আমার হৃৎস্পন্দনে কেউ একটা বলছে যে, পৃথিবীতে গান-বাজনা-কবিতা-শিল্প এসব কিছু করার জন্য অনেক লোক আছে; আমার ঝুমাকে এমন একটা বারান্দা দিতে হবে যেখানে বালি দিয়ে পাহাড়, ইট দিয়ে ট্রেন লাইন তৈরি করা যায়, যেখানে যে কোনও ছোট্ট দুটো পুতুলকে প্রেমিক-প্রেমিকার মতোই লাগে।

আমি সেই চেষ্টাতেই মন লাগিয়ে নেমে পড়লাম। দিন দশেক পরে আবার যেদিন ঝুমার সঙ্গে দেখা হল, মধ্যের একটা ডেট মিস করে, সেদিন কতটা কী অগ্রগতি হয়েছে জানানোর জন্য উদগ্রীব হয়েছিলাম। ঝুমাও নির্ঘাত ছটফট করছিল।

কিন্তু সেদিনই গন্ডগোলটা হল। বিবেকানন্দ পার্ক থেকে একটু এগিয়ে গিয়ে ডানদিকে ঘুরলেই যে সস্তায় পুষ্টিকর খাবারের দোকানটা, সেখানেই আমাকে হাত ধরে নিয়ে গেল ঝুমা। আর অর্ডার দিল রুটি ঘুগনি।

রান্না খুব ভাল এই দোকানটার। আমরা আগেও খেয়েছি। কিন্তু কোনও একটা কারণে, সেদিন রুটিগুলোয় পোড়া লেগে গিয়েছিল, ঘুগনিও ঠিক স্বাদে-গন্ধে ‘এ’ ক্লাস হয়নি। আমি কোথায় কোথায় ফ্ল্যাট দেখেছি, কত টাকা লোন পাওয়া যাবে, ইত্যাদি নিয়ে সিরিয়াস আলোচনার মুডে ছিলাম কিন্তু ঝুমা বারবার রুটি কেন পুড়ে গেছে, সেই প্রসঙ্গ তুলছিল। একবার গলা তুলে এমন বলতে শুরু করল যে, দোকানের মালিকের ছেলেটা সামনে এসে দুঃখপ্রকাশ করে জানিয়ে গেল, রুটি করার নিয়মিত লোকটা আজকে নেই। অন্য একজনকে দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে।

“আরে ছাড়ো না, আমরা কি ফাইভ স্টারে খেতে এসেছি নাকি?” আমার বিরক্ত লাগল।

“যে-স্টারই হোক, পয়সা দিয়ে খাচ্ছি যখন বাজে জিনিস খাব কেন?” ঝুমা পালটা দিল।

তারপর টেবিল থেকে উঠে গিয়ে দরজার পাশেই গনগনে উনুনের পাশে বসে থাকা দেহাতি ভদ্রমহিলাকে কড়া কথা শোনাতে শুরু করল।

আমার অসহ্য লাগছিল। আমি টেবিলে রুটি ঘুগনি ফেলে রেখে এগিয়ে গিয়ে ঝুমার হাতটা ধরে বললাম, “তোমাকে এখানে নিয়ে আসাই ভুল হয়েছে। চলো একটা ভাল জায়গায় বসব।”

“কোথাও যাব না। কেন পোড়া রুটি দিয়েছে আমাদের? নতুন করে আবার ভাল রুটি করে দিতে হবে।”

“একজন গরিব, বৃদ্ধা, নাহয় পারেইনি ঠিকমতো রুটি করতে। তুমি বাওয়াল করছ কেন তাই নিয়ে?”

“করব নাই বা কেন? ওই বুড়ি কে আমার?”

“ওই অটোওয়ালা তোমার কে ছিল?”

“অটোওয়ালা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল, আমার কাজে লেগেছিল। এ কী করেছে?”

“ধরে নাও, কিছু করেনি। তবু তো তোমার মায়ের বয়সি। হয়তো চোখে ছানি পড়েছে, অপারেশন করাতে পারেনি, তাই রুটিগুলো পুড়ে যাচ্ছে।”

“কে কার বয়সি আমার জানার দরকার নেই। নিজের কাজটা ঠিকঠাক করতে পারছে না যখন, মরুক গে যাক।”

ঝুমার কথাটা কানে যাবার পর থেকে পনেরো সেকেন্ড নিশ্চয়ই কাণ্ডজ্ঞান লুপ্ত হয়েছিল আমার। নয়তো একটা মেয়ের গালে চড় মারলাম কী করে? তাও একেবারে প্রকাশ্যে? ভাগ্যিস দোকানে বিশেষ খরিদ্দার ছিল না সেই সময়ে, তাও তিন-চার জোড়া চোখ আমাদের দিকে ঘুরে গেল পলকে। গুঞ্জনও শুরু হল।

অন্য কোনও মেয়ে হলে হয়তো আমার সঙ্গে সমস্ত সংস্রব ত্যাগ করত সেই মুহূর্তে, কিন্তু ঝুমা আধমিনিটের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে আমাকে প্রায় ঠেলা দিয়ে বের করে আনল দোকান থেকে। বেরোনর আগে নিজের পার্স খুলে একটা একশো টাকা রেখে দিল মালিকের টেবিলে। তারপর যে-হাতটা দিয়ে ওকে চড় মেরেছি সেটা ধরেই হনহনিয়ে হাঁটল পাঁচ-সাত মিনিট। অবশেষে লেকের একটা বেঞ্চিতে আমায় নিয়েই বসে পড়ে বলল, “চাইলে আর একটা চড় মারতে পারো। মারবে?”

আমি নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। অনেকদিন পর কেঁদে উঠলাম।

“কী হয়েছে তোমার? আমি বুঝতে পেরেছি কিছু একটা হয়েছে। আমি কিছু মনে করিনি, বিশ্বাস করো। আমি তো তোমারই। তুমি মারতে ধরতে যা খুশি করতে পারো আমায়। ঘরে, ফুটপাথে, রাস্তায়, যেখানে খুশি সেখানে। কিন্তু শুধু বলো, তোমার কী হয়েছে?” ঝুমা আমার পিঠে হাত রাখল।

ওই হাতটাই বোধহয় সব মৃত্যুপথযাত্রীকে জীবনের দিকে ফিরিয়ে আনে। আমার কান্না থেমে গেল, ওই হাতের ছোঁয়ায়। আমি ঝুমাকে বলতে থাকলাম, কেন ওর গালে চড় মেরেছি আমি। আমার মা যে লোকের বাড়িতে রুটি বেলত। রুটি গোল না হলে, ফুলে না উঠলে, আমার মাকে যে গঞ্জনা সহ্য করতে হত। আমি নিজে তার সাক্ষী বলেই তো ওই বুড়িটার অপমান সহ্য করতে পারছিলাম না।

আপনারা কতজন পারেন জানি না, কিন্তু আমি খুব ভাল উনুন সাজাতে পারি। বেশিদিন আগের কথা নয়, আজ থেকে বছর তিরিশ আগের ঘটনা। তখন হয় উনুন আর নয় স্টোভে রান্না হত সব মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত বাড়িতে। আমি ভাল উনুন সাজাতে পারতাম বলে মা সকাল সকাল আমাকে ঠেলে তুলে দিত। শীতকালে একটু কষ্ট হত, কিন্তু বাকি দিনগুলো ব্যাপারটা বেশ উপভোগই করতাম। কয়লাগুলো গোল করে সাজিয়ে নিয়ে ঘুঁটেগুলো একটু তেরছা করে রাখতে হত। একটা খবরের কাগজ আড়াআড়ি ছুঁয়ে থাকত দুটো প্রান্তকে। আর কেরোসিনটা ঢালতে হত খুব কায়দা করে। যাতে কয়লাগুলোর গায়ে ছিটে লাগে কিন্তু ওরা পুরোপুরি ভিজে না যায়। সাজানোর কায়দার উপর নির্ভর করত কত দ্রুত আগুন ধরবে উনুনে।

এই ব্যাপারটা আজকের শহুরে প্রজন্ম বুঝতেই পারবে না। যেমন তারা বুঝবে না যে, একটা ভাল মুদি কিংবা স্টেশনারি দোকানের কী গুরুত্ব ছিল যখন ‘শপিং মল’ খায় না মাথায় দেয়, জানতাম না আমরা কেউ। এখন যখন শপিং মলে যাই মনে হয় সেটা যেন একটা বিরাট দৈত্য যার প্রচুর ক্ষমতা, কিন্তু একটুও স্বাধীনতা নেই। পাঁচ হাজার টাকার জিনিস কিনলেও কোনও দোকান থেকে ফ্রি-তে একটা লজেন্সও এগিয়ে দেওয়া হবে না। ওদিকে আমার বাবা, পঞ্চাশ টাকার সওদা করা লোকটার সঙ্গেও একটা বাচ্চা থাকলে, বাচ্চাটার হাতে তিন-চারটে টফি তুলে দিত সবসময়। বাবার দোকানে আমি যখন বসতাম, তখনই দেখতাম।

মার্কেটের ভিতর, আমাদের সেই ‘বোস স্টেশনারি’তে কতরকম জিনিস যে ছিল… মিল্ক পাউডার থেকে ব্যাটারি, আটা-ময়দা থেকে তেল-সাবান, পুরনো চাল থেকে বাজারে নতুন আসা সয়াবিনের প্যাকেট। দোকানটা আয়তনে হয়তো বারো বাই চোদ্দো ফুট, কিন্তু তার ভিতরের পৃথিবীটা আমার চোখে আজও যে কোনও পুজো প্যান্ডেলের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল।

দোকানটা পুড়ে গেল একদিন। শর্টসার্কিট না কীসে বাজারের দুই তৃতীয়াংশ পুড়ল, আর তার মধ্যে থাকা আমাদের দোকানটাও গেল ভস্ম হয়ে। সেই সময়টা এমন ছিল যে, বিমা টিমা অত করিয়ে রাখত না কেউ। বাবা কিছু একটা করিয়েছিল, সেখান থেকে বছর দেড়েক পরে হাজার দুয়েক টাকা পাওয়া গেল। আর সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণ পাওয়া গিয়েছিল হাজার পাঁচেক মতো। কিন্তু তাই দিয়ে আর দোকানটাকে নতুন করে চালু করতে পারল না বাবা। বলা ভাল, চাইল না। যে-বাবা একাই অন্তত একশোটা বাড়িতে মাসের মাল দিয়ে আসত নিজের স্কুটারে চেপে, মাসকাবারি খাতায় হিসেব রাখত তিন-চারশো পরিবারের জিরে-হলুদ থেকে বিস্কুট-সিমুইয়ের, সেই বাবাই সন্ধ্যা থেকে রাত্রি অবধি তাস পিটে, একগলা মদ খেয়ে বাড়ি ফিরতে শুরু করল। বাড়ি ফিরেই চিৎকার করতে থাকল মা আর আমার উপর। দোকান পুড়ে যাওয়ার আগের বাবা আর পুড়ে যাওয়ার পরের বাবা যেন পুরো উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু। যে মানুষটা বাড়ি ফিরে আমাকে জিজ্ঞেস করত পড়াশোনা করেছি কি না, সেই মানুষটা আমার এবং মায়ের সম্বন্ধে, একেবারে উদাসীন হয়ে গেল। আর কীরকম অল্পে রেগে যেতে শুরু করল আমার ছোট্ট বোনটার উপর। যখন বাড়ি ফিরত টলতে টলতে ফিরত, যখন বেরোত তখন কী সব বিড়বিড় করতে করতে বেরোত। টাকা ফুরিয়ে আসছিল কারণ শেষ অবধি ছিলাম তো আমরা একটা স্টেশনারি দোকানের মালিক। কত টাকা আর জমানো ছিল যে, অনন্তকাল রোজগার না হলে বসে খাওয়া যাবে?

বাজারের প্রায় পুরোটাই ভেঙে ফেলা হল একদিন। নতুন করে তৈরি করা হবে বলে। কিন্তু সেসব তৈরি হয়ে হাতে পেতে পেতে প্রায় দু’বছর লেগে গেল। যখন আবার পাওয়া গেল জায়গাটা, ততদিনে বাবা জুয়া আর মদে উড়িয়ে দিয়েছে ক্ষতিপূরণের প্রায় সব টাকাই। যেটুকু বাকি ছিল তা দিয়ে মালপত্র তো দূর, শেলফ আর বয়াম কেনাও সম্ভব ছিল না। মা নিজের শেষ দুটো সোনার চুড়ি বিক্রি করে বেশ খানিকটা টাকা তুলে দিল বাবার হাতে। কিন্তু কোনও কিছু থেকে একবার মন উঠে গেলে, সেখানে আবার মন বসানো খুব কঠিন কাজ।

নতুন দোকানে আগের দোকানের চারভাগের একভাগ জিনিসও ছিল না। তবুও হয়তো আস্তে আস্তে দাঁড়াত ব্যবসাটা, যদি দোকানের মেঝেতেই নতুন স্যাঙাতদের সঙ্গে নিয়ে জুয়া খেলা শুরু না করত বাবা। বাজারেরই অন্য দোকানদারদের থেকে খবরটা পেয়ে মা রুখে দাঁড়িয়েছিল।

কিন্তু বাবা প্রতিটা প্রশ্নের উত্তরে বলত, ভাগ্য যেভাবে সব কেড়ে নিয়েছে, ভাগ্যই হঠাৎ করে সব ফিরিয়ে দেবে না কি একদিন? শুধু নেবে? বলতে বলতে চিৎকার করে উঠত।

সেই চিৎকার এমনই যে, তার সামনে চুপ করে যেতে বাধ্য হতাম আমরা। কিন্তু চুপ করে গেলেই উলটোদিকের অভদ্র লোকটা ভদ্র হয়ে যায় না। বাবাও গেল না। বরং মায়ের গায়ে হাত তুলতে শুরু করল। সবচেয়ে খারাপ যেটা হল, আমার বোন তুলির প্রতি বাবার প্রবল বিরাগ জন্মাল। জন্মানো ইস্তক যাকে লক্ষ্মী হিসেবে দেখেছিল বাবা, সে হঠাৎ করে হয়ে গেল সব দুর্ভাগ্যের মূল।

ঘরে ঢুকেই বাবা চিৎকার করা শুরু করে দিত, “অলক্ষ্মীটা কোথায়? ঘুমিয়ে পড়েছে? তুলে দাও ওকে। রাস্তায় বের করে দাও। যবে থেকে এসেছে, অশান্তি এসেছে সংসারে।”

বাবার সব কথা বুঝতে না পারলেও বোন ভয়ে থরথর করে কাঁপত। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতাম। তুলি আমার চোখের দিকে চোখ মেলে তাকাত। তারপর চোখ নামিয়ে নিত। আমি দেখতাম, ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।

“ঠিক হয়ে যাবে, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই কাঁদিস না বাবু।” আমি ওর গালে-কপালে চুমু খেয়ে বলতাম।

“আমি অলক্ষ্মী দাদা?” তুলি জিজ্ঞেস করত।

আমি কোনও জবাব দিতে পারতাম না কথাটার। চুপ করে ওর মাথাটা নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরতাম।

মা বাধা দিত, যতবার বাবা গালাগালি দিত বোনকে।

“তুমি কি মানুষ না রাক্ষস? নিজের মেয়েকে কেউ এই ভাবে গাল দিতে পারে, মানুষ হলে?”

“হ্যাঁ, আমি রাক্ষস। তোদের সবাইকে খাব। রক্ত খাব, মাংস খাব, পুড়িয়ে খেয়ে শেষ করব।” বাবা জবাব দিত।

সংসারে টাকার জোগান একদম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেলাই শুরু করল মা। এর-তার বাড়ি থেকে শাড়ি নিয়ে আসত, পিকো করার জন্য, ফল্‌স লাগানোর জন্য। মায়ের কাজের পরে আমিই গিয়ে সেগুলো বাড়ি বাড়ি দিয়ে আসতাম। অনেকে ছিল যারা ধারবাকিতে খেত আমাদের থেকে, মাসকাবারি হিসেবে, কিন্তু মাসের শেষে টাকা দিতে না পেরে পালিয়ে বেড়াত। এখন তারাই আমায় দেখলে, “সেই কবে তোর মাকে শাড়ি দিয়েছি, এখনও হয়নি?” বলে, দু’কথা শুনিয়ে যেত। শুনতে শুনতে আমার আর গায়ে লাগত না। পুড়তে পুড়তে কয়লা যেমন অঙ্গার হয়ে যায়, আমিও তেমন করেই পালটে যাচ্ছিলাম। মা যখন সেলাইয়ের কাজ ধরার জন্য বাড়ি বাড়ি যেত, তখন বোনকে কোলে বসিয়ে পড়াশোনা করতাম। সেই ছোট্টবেলায় আমাকে যে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলটায় ভরতি করে দেওয়া হয়েছিল সেখান থেকে ছাড়িয়ে এনে স্থানীয় একটা বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ভরতি করে দেওয়া হয়েছিল আগের বছর। আমি প্রাণপণ চেষ্টায় বাংলায় জীবনবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান বোঝার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এতদিন ইংরেজিতে পড়ে এসেছি বলে ক্লাস এইটে উঠে চট করে বাংলায় ‘সালোকসংশ্লেষ’ কিংবা ‘তড়িৎ প্রবাহ’ বুঝতে পারতাম না। তবু বিপদে পড়লে মানুষ কী না করে! আর এ তো সামান্য ভাষা পরিবর্তন।

“জানিস, ওই দীপনদের গ্রুপটা তোর নাম দিয়েছে, ভিখিরি ইংরেজ।” স্কুল থেকে ফেরার পথে সৌম্য একদিন জানাল আমাকে। অনেকদিন আমাদের দোকান থেকে ধারে খেয়েছে বলে, সৌম্যর হয়তো কিছুটা কৃতজ্ঞতা ছিল আমার প্রতি।

স্কুলের কেউ কেউ আড়ালে আমাকে টিটকিরি দিত আমি জানতাম, কিন্তু পাত্তা দিতাম না। তাও দীপনের মুখে আমার নতুন নাম শুনে জানতে চাইলাম, “মানে?”

“তোর বাবার দোকান পুড়ে গেছে, তোর মা সেলাই করে সংসার চালায়, তোরা এখন খেতে পাস কি না ঠিক নেই, কিন্তু তুই ইংলিশ মিডিয়ামে পড়তি বলে ক্লাসে দুমদাম ইংরেজিতে কথা বলে ফেলিস, বাংলায় এখনও সড়গড় হতে পারিসনি, তাই…”

আমি হেসে ফেলেছিলাম কথাটা শুনে। প্রত্যেকটা অপমানের সামনে হেসে ফেলাই যে সবচেয়ে বড় ওষুধ, এই বোধ ততদিনে আমার হয়ে গেছে। নতুন বই কিনতে পারতাম না বলে উঁচু ক্লাসের ছেলেদের বাড়ি গিয়ে বই ভিক্ষে করতাম। কারও কারও মায়া জাগত; আজেবাজে কথা শোনাত অনেকেই। কিন্তু আমি তখন বিকাশের মায়ের কথা ভাবতাম। বিকাশ আমার বাবার দোকানে কাজ করত, যখন দোকানটা দোকানের মতো চলত। বোধহয় ক্লাস থ্রি-ফোর অবধি পড়ে থাকবে। কিন্তু বুদ্ধিতে চৌখস ছিল। দোকানে আগুন লাগার পরদিন, ওই পোড়া ধ্বংসস্তূপের ভিতরে ঢুকে অনেক জিনিস উদ্ধার করেছিল বিকাশ। তারপর সেগুলো একটা গাঁটরিতে বেঁধে চম্পট দিয়েছিল। হয়তো আগেই টের পেয়ে গিয়েছিল, কী হতে চলেছে ভবিষ্যতে।

“শালার ছেলে বলল যে, বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে জিনিসগুলো।” বাবা রেগে গেলে বলত মাঝে মাঝে।

“বাড়িতেই তো নিয়ে গিয়েছে। নিজের বাড়িতে।” মা জবাব দিত।

বাবা চুপ করে যেত।

আমার শুধু মনে পড়ত, বাবার দোকান রমরমিয়ে চলার দিনগুলোয় বিকাশ আমাদের বসার ঘরের চৌকিটা ছেড়ে আমার বিছানায় এসে শুত এক-একদিন রাতে। আমার বইগুলোর পাতা উলটোত। ইংরেজি না পড়তে পারলেও এক-একটা ছবির দিকে তাকিয়ে থাকত অনেকক্ষণ।

বিকাশের মা প্রত্যেক মাসের প্রথমে আমাদের বাড়িতে এসে বিকাশের মাইনে নিয়ে যেত। আর প্রতিবার একই গল্প করত। কীভাবে নৌকায় নদী পেরিয়ে, তারপর অনেকটা রাস্তা পায়ে হেঁটে ঘন জঙ্গলের ভিতরে ঢোকে ওরা মধু সংগ্রহ করতে। ঢোকার আগে প্রত্যেকেই মাথার পিছনে একটা বাঘের মুখোশ পরে নেয়। বাঘ যাতে মনে করে যে, আর একটা বাঘই ওর দিকে এগিয়ে আসছে বা পিছিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাঘকে বিভ্রান্ত করার এই কৌশল কাজে দেয় না সবসময়। অনেক লোককে খেয়ে নেয় বাঘ, হাত-পা হারিয়ে বেঁচে থাকে কেউ কেউ। আর যারা সুস্থভাবে ফেরে তারা আবার কয়েকদিন পরেই জঙ্গলে ঢোকে মধুর খোঁজে।

“ভয় করে না?” মা জিজ্ঞেস করত।

“করবে না কেন, খুব করে। মধুর নেশায় ভয়টা ভুলে থাকি।”

কথাটা মাঝে মাঝেই মনে পড়ত আমার, আমিও যে জীবনে ভাল রেজাল্ট করে প্রতিষ্ঠিত হবার নেশায় সব ভয় ভুলে বাঁচতে চেষ্টা করছি তখন। কিন্তু ভয় ভুলে থাকা একরকম ব্যাপার, আর ভয়টা সত্যি হয়ে ঘাড়ের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লে সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। যখন বোনের জ্বর তিন-চারদিন পেরিয়ে গিয়েও কমল না, আর মা বাবার কাছ থেকে ডাক্তার দেখানোর টাকা চেয়ে চেয়ে হদ্দ হয়ে গিয়ে শেষ সম্বল গলার সরু সোনার চেনটা বিক্রি করে দিয়ে এল মৃণাল জুয়েলার্সে, তখনও বিপদের চেহারাটা স্পষ্ট হয়নি আমার কাছে। কিন্তু সেলাইয়ের বাড়িগুলো থেকে বকেয়া টাকা আদায়ে বেরিয়ে বাড়িতে ফিরে মা যখন দেরাজে হাত ঢুকিয়ে টাকাটা না পেয়ে চিৎকার করে উঠল, আমি বিপদের মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম। নামও জেনে গেলাম তার। সে চপল বসু। আমার বাবা। নিজের দোকান পুড়ে যাবার পর যে এখন লোকের দোকানে কাজ করে। কাজ করে, কাজ ছাড়ে, আবার অন্য দোকান ধরে। কিন্তু কর্মকার স্টোর্স থেকে দুপুরের ভাত খেতে বাড়িতে এসে বাবা একেবারে আমাদের হৃৎপিণ্ডটা ধরে টান দিয়েছে। শিকড় সমেত উপড়ে যেতে না চাইলে লোকটাকে আটকাতে হবেই আমাদের।

“তুমি টাকাটা ফিরিয়ে দাও, এক্ষুনি ফিরিয়ে দাও। আমি তুলিকে হাসপাতালে ভরতি করব।” মা চাপা গলায় বলল।

বাবা একটা হোমিওপ্যাথির শিশি মায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ভাল হলে এতেই হয়ে যাবে, অ্যালোপ্যাথি মানুষ মারার ওষুধ। ওতে কেউ বাঁচে নাকি?”

মা, বাবার হাত থেকে ওষুধের শিশিটা নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, “আমার মেয়েকে আমি অ্যালোপ্যাথি ডাক্তারই দেখাব। সেই কারণেই আজ ছেলেকে না পাঠিয়ে নিজে গিয়েছিলাম টাকা আনতে। যাতে পাওনা টাকার পাশাপাশি চেয়েচিন্তে আরও কিছু পেতে পারি।”

“তা হলে তো ভালই মাল কামিয়েছিস সবাইকে পটিয়ে। আবার আমার কাছে হাত পাতছিস কেন?”

“হাত পাতছি না। নিজের গয়না বেচা টাকার পাইপয়সা ফেরত চাইছি। তুমি ফেরত দাও।”

“তোর আবার টাকা কীসের? ওই হার কি তোকে তোর বাপ দিয়েছিল? দিয়েছিলাম তো আমি। এখন বিক্রির টাকাও আমি নেব। তোর টাকার দরকার থাকলে তোর মরা বাবাকে ডেকে আন। আবার ট্রেনে ট্রেনে হকারি করে তোকে নতুন হার গড়িয়ে দিতে বল!”

“আমার বাবা কোনওদিন ট্রেনে হকারি করেনি। স্টেশনে আমার বাবার দোকান ছিল।”

“দোকান না ছাই! সে দোকান কি আমার দোকানের মতো?”

“সে দোকান টিকে তো আছে। মেজদার সংসার ওই দোকানের উপর ভর করে চলে। তোমার দোকানের মতো অবস্থা তো তার হয়নি।”

“আমার দোকান পুড়ে ছাই হয়েছে, তোদের মতো অলক্ষ্মীর জন্য। তুই আর তোর মেয়ে, দু’জনই অলক্ষ্মী। তোদের জন্য ধ্বংস হয়ে গেছে সমস্ত।”

মা কান্নাটাকে গলায় চেপে বলে উঠল, “মেয়েটার জ্বর, এখন ওইসব বোলো না।”

“বেশ করব, বলব। হাজারবার বলব। অলক্ষ্মী, অলক্ষ্মী, অলক্ষ্মী। মর তুই, মরুক তোর মেয়ে।”

শেষ কথাটা সহ্য করতে না পেরে মা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল বাবার উপর। আঁচড়ে-কামড়ে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে চাইল একটা অমানুষকে, যে নিজের অসুস্থ মেয়ের মৃত্যুকামনা পর্যন্ত করতে পারে। সেই ধাক্কায় সাময়িকভাবে হতভম্ব হয়ে গেলেও, শিগগিরই আমার দুবলা-পাতলা মায়ের উপর নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেল বাবা আর তারপর নির্মমভাবে মায়ের মাথাটা ঠুকে দিল ঘরের দেওয়ালে। একবার-দু’বার-তিনবার। ঘরের দেওয়াল বেয়ে একটা রক্তস্রোত কোনও শীর্ণ নদীর ধারার মতো গড়িয়ে নামতে লাগল। ভূগোল ক্লাসে অসীম স্যার চক দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে যেরকম ধারা সৃষ্টি করেন। শুধু এই ধারাটার রং ঘন লাল।

আমার ইচ্ছে করছিল একটা আধলা ইট তুলে ছুড়ে মারি লোকটাকে। কে বাবা? কীসের বাবা? আমি তার কয়েকদিন আগেই জেনেছি ছেলেরা কেমন করে বাবা হয়। কীভাবে মা হয় মেয়েরা। কিন্তু এখন আমার ঘেন্নায় গা গুলিয়ে উঠছিল ওই লোকটার থেকে আমার জন্ম হয়েছে ভেবে। কেমন যেন স্থবির হয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি।

পরদিন পাড়ার ছেলেদের সাহায্যে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও শেষরক্ষা হল না, আমার ফুলের মতো বোনটা মারা গেল একবেলা হাসপাতালে থেকেই। আর আমি যে-মুখে বিস্কুট, চকোলেট, মাছের ডিম, মাংসের মেটে গুঁজে দিয়েছি কতবার, সেই মুখেই আগুন ছোঁয়ালাম, ছুঁইয়ে রাখলাম।

ওই আগুনের আঁচেই হয়তো আমার সব জড়তা বাতাসে বাষ্পের মতো মিশে গেল। যে-তুলি একটা ডল-পুতুলের মতো আমার কোলে বসে থাকত, ঘুরে ঘুরে নেচে দেখাত, আধোআধো করে বলত, “গায়ে ডোরা ডোরা দাগ, রাগে চোখ জ্বলছে, গর্জন করে দেখো বাঘ ওই চলছে,’’ সেই তুলি কুড়িমিনিটে ধোঁয়া হয়ে মিশে গেল বাতাসে, আমি মানতে পারছিলাম না।

ওর চিতাভস্ম গঙ্গায় ভাসিয়ে দিতে দিতে আমার মনে হচ্ছিল, গঙ্গা শুধু গঙ্গা নয়, গঙ্গা দেওয়াল বেয়ে নামা একটা রক্তস্রোত, যার বদলা নেবার জন্যই আমার ভিতরে এই লাভাটা জন্মাচ্ছে।

সেই লাভার উচ্ছ্বাসই আমাকে আর আমাদের বাড়িতে থাকতে দিল না। মা প্রথমে ভয় পাচ্ছিল, সব হারিয়ে ফেলবার পরও অভ্যেসের বাইরে যাওয়ার ভয়। কিন্তু যে ঘরে তুলি বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছে, সেখানে থাকতেও মন করছিল না মায়ের। শেষমেশ আমার জেদের কাছেই হার মানল মা। ওই অন্ধকূপ ছেড়ে একদিন দুপুরে বেরিয়ে এলাম আমরা। শয়তান লোকটা তুলির মৃত্যুর খবর পেয়ে শ্মশানে গিয়েছিল, কিন্তু নিজের মেয়ের মৃতদেহের মুখোমুখি হওয়ার সাহস পায়নি। ওইটুকু মেয়েকে না পুড়িয়ে কবর দেওয়ার কথা বলেছিল অনেকে, কিন্তু কবর দেওয়ার জন্য অনেক বেশি টাকা লাগত, আর আমাদের তো কানাকড়িও ছিল না।

চপল বসুর একসময়ের বন্ধু অধীরকাকা, আমাদের পঞ্চাননতলা বস্তির একটা ঘর দেখে দিয়েছিল। সেখানে কমন বাথরুম-পায়খানা, একটু বেলা বাড়লে গন্ধের চোটে যাওয়া যায় না। ঘরের উপরে টালি, আর এমনই গলির ভিতরে ঘর যে, আলো ঢোকে না একছিটে, তবু যেন মনে হচ্ছিল মুক্তির বাতাস লাগছে গায়ে, কংসের কারাগার থেকে বেরিয়ে কৃষ্ণের যেমন লেগেছিল।

মা লোকের বাড়ি রান্নার কাজ নিল। যে মায়ের সরষে ইলিশ, ভাপা ইলিশ কিংবা ভেটকি পাতুরির জন্য আত্মীয়মহলে বিরাট খ্যাতি ছিল, সেই মা মাস গেলে ক’টা পয়সার বিনিময়ে লোকের বাড়িতে রাঁধতে গেল। নিজের সংসার যার ভাঙে, সেই তো অন্যের সংসার গুছোতে যায়। নিজের ঘর বলে কিছু থাকে না যার, পৃথিবীটাই তার ঘর হয়ে ওঠে। মায়ের সঙ্গে সঙ্গে আমারও তাই হল। কিন্তু ওই বস্তির একটা ঘরে থেকেও আমি পড়াশোনা ছাড়িনি। আমি যে পড়াশোনা অন্ত প্রাণ ছিলাম তা নয়, কিন্তু আমি বুঝতে পেরে গিয়েছিলাম, বইয়ের অক্ষরগুলোই আমার নরক থেকে মুক্তির একমাত্র রাস্তা। যত কষ্ট আসুক, ওই রাস্তা ছাড়া চলবে না। ততদিনে বস্তির ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়ানোর ব্যাপারে আমার বেশ নাম হয়েছে। স্কুল থেকে ফিরে প্রায় কুড়ি-পঁচিশটা বাচ্চাকে নিয়ে বসতাম আমি। যে যা পারত পয়সা দিত, কেউ কেউ দিতও না। কিন্তু ওই বয়সেই, ‘মাস্টার’ বলে বেশ একটা খ্যাতি হয়েছিল আমার। সেই খ্যাতির দাপটে আরও নতুন ছাত্র-ছাত্রী আসতে শুরু করেছিল আমার কাছে, কিন্তু ঠিক সেই সময়টাতেই যোধপুর পার্কে সান্যালদের বাড়িতে সবসময়ের লোক হিসেবে কাজের প্রস্তাব পেল মা। কাজ বলতে দু’বেলার রান্নার সঙ্গে শয্যাশায়ী সান্যাল গিন্নির দেখাশোনা।

অতগুলো বাড়ির চাপের থেকে একটা বাড়িই ভাল। আমার মনে হয়েছিল। কিন্তু মা আমাকে ছেড়ে যেতে চাইছিল না। এইসময় সান্যালবাবু একদিন মায়ের মুখ থেকে আমার কথা শুনে, আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। আমি আমার ক্লাস নাইন থেকে টেনে ওঠার রেজাল্টটা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম।

সেই রেজ়াল্ট দেখেই সঞ্জীব সান্যাল বললেন, “তুমিও তোমার মায়ের সঙ্গে আমার বাড়িতেই চলে এসো। ছেলে আমেরিকায়, ওর ঘরটা তো বছরে সাড়ে এগারোমাস ফাঁকা থাকে। ওটাই তোমার পড়ার ঘর হবে। তুমি ওই বস্তিতে থাকলে এই রেজ়াল্ট ধরে রাখতে পারবে না। চলে এসো বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে, মায়ের সঙ্গে।”

আমি চলে যাচ্ছি জেনে বস্তির বাচ্চাগুলো যখন আমায় জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল, ওদেরকে নিজের থেকে ছাড়ানোর সময় মনে হচ্ছিল, আমি কীই বা ধরে রাখতে পেরেছি? বস্তির ঘরের ষাট ওয়াট বাল্‌বের নীচে যে-বালাপোশটা গায়ে জড়িয়ে আমি পড়তাম রাত জেগে, মা’র ঘুমোতে কষ্ট হচ্ছে জেনেও, সেই বালাপোশটা বস্তির ঘরেই ফেলে এলাম। যদি অন্য কারও কাজে লাগে।

সঞ্জীব সান্যালের বাড়ির বাথরুমে লাল বাতিজ্বলা গিজ়ার দেখে প্রথমটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মেশিনটা কীসের তাই তো জানতাম না। কিন্তু ওই মেশিনটা চালু থাকলে যখন শাওয়ার দিয়ে উষ্ণ জল ঝরে পড়ত, নীচে দাঁড়িয়ে আমি টের পেতাম, শীতলতা মানুষকে যতটা কুঁকড়ে দেয়, গরম জল ঠিক ততটাই উদ্দীপিত করে। আমি গা-মাথা মুছে প্রতিদিন ঘরের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াতাম স্রেফ এটুকু বোঝার জন্য যে, আমার পিছনে অন্তত একটা দেওয়ালের সাপোর্ট আছে। আমি মহাশূন্যে তলিয়ে যাচ্ছি না। তলিয়ে যাব না আর কখনওই।

আমাদের স্কুলের ইতিহাসের মাস্টারমশাই সুধন্যবাবু মারতেন-ধরতেন না। বকাবকি করার সময় একটাই কথা বারবার বলতেন, যার যেমন বীজে ধর্ম, তার তেমন কুলধর্ম।

কথাটা শুনে তখন হাসলেও পরে ভেবেছি, বীজই কি সব? যেরকম বীজ থেকে যার জন্ম, তাকে সেরকম হতেই হবে? আমার বাবার জেরক্স হওয়াটাই আমার ভবিতব্য? পড়ে থাকা ফলের ভিতর থেকে বীজটা বার করে মাটিতে পুঁতলে যে-গাছ বেরোবে, তার ঠিক অবিকল এক ফল হবে? অদ্ভুত এই পৃথিবীর নিয়ম তো! আমি চাইলেও আমার বাবার মতো না হয়ে, আলাদা হতে পারব না?

আমার এক সহপাঠী তন্ময়, সান্যালজেঠুর বাড়িতে আসত আমার কাছ থেকে বই নিতে বা আমায় বই দিতে। ততদিনে জেঠুর কৃপায় আমাকে আর বই ভিক্ষে করে পড়তে হয় না। সেই তন্ময় একদিন নানা কথার ভিড়ে, সান্যালজেঠুর সঙ্গে আমার মায়ের আসল সম্পর্কটা কী, জিজ্ঞেস করে বসল। কথাটা শুনে কান-মাথা গরম হয়ে উঠল আমার। কিন্তু কিছু জবাব দিতে পারলাম না মুখে মুখে।

জেঠিমার জন্য একজন আয়া আসত সকালে। কিন্তু জেঠিমার দেখভাল, রান্নাবান্না, বাড়ির সবার খাওয়াদাওয়া মা নিজেই দেখত; বলতে গেলে, পুরো বাড়িটাই একা হাতে সামলাত। সান্যালজেঠু মজা করে বলতেন, ‘আমার ম্যানেজার’। সেই ‘ম্যানেজার’ সম্বন্ধে তন্ময়ের ওই কথাটা আমি নিতে পারিনি একদম। কিন্তু ওর সঙ্গে ঝগড়া করলে কথাটা গুজবের চেহারা নিয়ে পল্লবিত হবে এই দুশ্চিন্তা থেকে চুপ করে গিয়েছিলাম।

আশ্চর্য মানুষের মন, কথাটা শুনে ঘৃণার পাশাপাশি একটা সংশয়ও জেগে উঠেছিল আমার। যে-বাবাকে আমি ঘৃণা করতাম মনপ্রাণ দিয়ে, যার প্রতি অনন্ত বিদ্বেষ ছিল আমার, মায়ের উপর সেই বাবার অধিকার আমার মনে একটা নীল টিক পেয়ে যেত। ওই একই মন জানতে চাইত, মায়ের সঙ্গে সান্যালজেঠুর আদপেই কিছু নেই তো? অবচেতনের সেই প্রশ্ন থেকেই হয়তো আমি কিছু না বলে একটু নজর রাখতে শুরু করেছিলাম মায়ের উপর। কখন মা জেঠুর ঘরে ঢুকছে, কখন বেরোচ্ছে…

মা টের পেয়ে গিয়েছিল ব্যাপারটা। ঠাস করে একদিন একটা চড় বসিয়ে দিয়েছিল আমার গালে। তারপর কেঁদে উঠেছিল নিঃশব্দে।

“তোর জন্য এখানে এসেছি। শুধু তোর জন্য। যাতে তুই ছাদের তলায় বসে, ফ্যানের হাওয়া খেয়ে পড়াশোনা করতে পারিস। নইলে লোকের বাড়ি বাড়ি ঝি খেটে বেড়ালেই বা আমার ক্ষতি কী হত? আর তুই কিনা শেষে আমাকে সন্দেহ করছিস?”

“না মা, সন্দেহ নয়। আমি তোমাকে রক্ষা করার কথা ভাবছিলাম।”

“আমাকে রক্ষা করতে হবে না তোকে। ভগবান থেকে থাকলে, তিনি আমায় রক্ষা করবেন। তা ছাড়া ভগবানের দয়াতেই আমি এমন একজন মানুষের বাড়িতে এসেছি। ভাগ্য মানুষের থেকে সব কাড়ে না, কিছু ফিরিয়েও দেয়। তাই এখানে আশ্রয় পেয়েছি। এরকম একটা মানুষকে অশ্রদ্ধা করিস না, আমাকে সন্দেহ করতে গিয়ে।”

মা’র সঙ্গে সেদিন একটা মস্ত ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেল আমার। মাকে তন্ময়ের কথা বলব বলব করেও বলতে পারিনি, মা আরও আঘাত পাবে ভেবে। তাই বোঝাতেও পারিনি যে, কোথাও কেউ যেন মাকে নিয়ে কোনও খারাপ কথা না বলে, মায়ের সম্মানে এতটুকু আঁচড় যাতে না লাগে, সেটা ভেবেই আমি যা করার তা করছিলাম।

মানুষ কতদূর করতে পারে? অর্ধেক সময়েই সে তো নিয়তির হাতের পুতুল। কিন্তু কিছু না করেও থাকতে পারে না সে। অন্য কাউকে বিরক্ত করবে না বলে যে-মানুষ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তার নিজের অস্তিত্বই যখন বিরক্ত করে তাকে, তখন?

বয়স হলেও চেহারায় জোয়ান ছিলেন সান্যালজেঠু। দেখলে বোঝা যেত না পঁয়ষট্টি পেরিয়েছে। বহুদিন যাবৎ জেঠিমা ওরকম শয্যাশায়ী। আলমোড়া না হৃষীকেশ, কোথায় একটা বেড়াতে গিয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে সেই যে বিছানা নিয়েছেন, উঠতে পারেননি আর। কিন্তু জেঠুর ভিতরেও তো একটা ঘোড়া থাকতে পারে। সেও হয়তো ছুটতে চায়, লাফাতে চায়। না পেরে অসহ্য যন্ত্রণায় ভোগে। তার কথা কোনওদিন ভাবিনি তো। সেই বয়সে ভাবার বা বোঝার মতো বোধই তৈরি হয়নি। তখনকার সামাজিক পরিস্থিতিও ওই বোধ তৈরির সপক্ষে ছিল না।

কিন্তু সমাজের বাইরে একটা ঘর থাকে। আর ঘরের ভিতরে, ভিতর-ঘর। আমার জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার আগের দিন রাতে আমি প্রথম সেই ভিতর-ঘরের সন্ধান পাই। মায়ের জ্বর বলে, জেঠু রাতে যে একগ্লাস হালকা গরম দুধ খেতেন সেটা হাতে করে আমিই গিয়েছিলাম ওঁর ঘরে। জেঠুর নির্দেশ ছিল, দরজায় নক করে ঢোকার, কিন্তু আমি দু-তিনবার ধাক্কা দিয়েও কোনও আওয়াজ না পাওয়ায় দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকি আর দেখি ভিসিআরে একটা সিনেমা চলছে যেটায় একজন পুরুষ আর একজন মহিলা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে ওইসব করছে, যার কথা আমি স্কুলে শুনেছিলাম।

বিছানায় শুয়ে জেঠু সেই দৃশ্য দেখছে, কিন্তু দেখছে কি আদৌ? চোখ দুটো গোল হয়ে বেরিয়ে আসছে যেন, আর মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে জেঠুর। পাজামার সেই জায়গাটাই ভেজা, যে-জায়গাটা আমারও ভিজে থাকে অনেকদিন সকালে। লোকটা মরে যাচ্ছে ভেবে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু সেই মুহূর্তে চোখ ফেরাতেও পারছিলাম না টিভি থেকে। ওই প্রবল দৃশ্যের সামনে শত শত আগামী মৃত্যুও তুচ্ছ। অন্তত সেই সময়ের আমার কাছে। এখন ভাবলে অপরাধবোধে মনটা ভরে ওঠে, কিন্তু তখন নড়তে পারিনি টিভির সামনে থেকে। বহুক্ষণ আমি নীচে না নামায় মা-ই উঠে এসেছিল দোতলায়। মাকে দেখে খানিকটা সংবিৎ ফিরে পেয়েছিলাম আমি। জেঠুর দিকে আঙুল দেখিয়ে ইশারায় বোঝাতে চেয়েছিলাম জেঠু ঠিক স্বাভাবিক অবস্থায় নেই।

“কতক্ষণ ধরে এরকম করছে? তুই আগেই নীচে নেমে ডাক্তার ডাকতে যাসনি কেন?” মা তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল আমার দিকে।

আমি কোনও উত্তর দিতে না পেরে, আমতা আমতা করতে লাগলাম।

মা আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই টিভিটার দিকে একবার তাকিয়ে চোখটা সরিয়ে নিল। তারপর জেঠুর দিকে এগিয়ে গেল। জেঠুর মাথাটা কাত হয়ে ছিল। মা একটা চাদর এনে জেঠুর গায়ে দিয়ে টিভিটা বন্ধ করে দিল। তারপর বলল, “নতুন একটা পাজামা দিয়ে যা তুই আমায়। তারপর চেম্বারে গিয়ে পলাশ ডাক্তারকে ডেকে আন। ও অনেক রাত অবধি রুগি দেখে। আর এখানে যা দেখলি সেই কথা যেন সারাজীবন শুধু তোর আর আমার মধ্যেই থাকে। অন্য কেউ না জানে। মনে রাখিস এই মানুষটার সম্মান অনেক দামি। উনি না থাকলে…”

মা কথাটা শেষ না করে চুপ করে গেল।

আমি বলে উঠলাম, “কিন্তু জেঠু…”

মা আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, “মানুষ ভগবান নয়।”

জানি না মা কীভাবে সেদিন পরিষ্কার করে দিয়েছিল সান্যালজেঠুকে। কিন্তু ডাক্তার নিয়ে এসে একদম ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা জেঠুকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখেছিলাম।

ডাক্তারের অবশ্য দেখাই সার হল। আধঘণ্টার ভিতর হাসপাতালে নিয়ে গেলেও জেঠু ওই সেরিব্রাল অ্যাটাকের ধাক্কা সামলাতে পারলেন না। পনেরো বছরের উপর বিছানায় পড়ে থাকা বউ বেঁচে রইলেন আর স্বামী পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেলেন। আমার জয়েন্ট দেওয়া হল না বলাই বাহুল্য। দিলেও অবশ্য বিশেষ কিছু হত না। মাথার মধ্যে জেঠুর ভিজে পাজামা আর চুল্লির জ্বলন্ত আগুন জায়গা বদল করে খেলছিল।

তারপর অনেকদিন আমার মনে প্রবল রাগ ছিল সান্যালজেঠুর উপর। কেন ওরকম আচমকা মারা গেলেন? যৌন উত্তেজনার জন্য? বেশি বয়সে ওই ক্ষরণের ধাক্কা শরীর নিতে পারল না, তাই? মা না বললেও আমি সেই রাতের কথা কাউকেই বলতাম না কিন্তু ভিতরে ভিতরে যে গুমরোচ্ছিলাম, তার কী করা? কী দরকার ছিল জেঠুর ওই সিনেমা দেখার? কিংবা ওই সিনেমাটা হয়তো উপলক্ষ মাত্র। জেঠুর শরীরের সব কলকবজা নড়ে গিয়েছিল। আচ্ছা ওরকম একটা উদার, মহানুভব লোক, তিনি কেন ওই ছবি দেখছিলেন? আমার মনের মধ্যেই উত্তরটা তৈরি হচ্ছিল। যেভাবে মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। মহানুভব মানুষ বলেই তো কাউকে বিরক্ত করেননি। কারও দিকে হাত বাড়াননি। নিজেকে নিয়ে নিজে থাকতেন। একা একা নিজের বেগ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা উপায় ভেবেছিলেন।

তা হলে মানুষ কি এই বেগের অধীন প্রাকৃতিকভাবেই? সান্যালজেঠু আমাকে প্রায়ই বলতেন, “ভেবো না তুমি একটা খারাপ লোকের ঔরসজাত বলে তোমার মধ্যেও তার চরিত্রই থাকবে। তুমি তোমার নিজের মতো হতেই পারো।”

আচ্ছা, ঔরসজাত বলে লোকে, বীর্যজাত বলে না কেন? দুটোর মধ্যে তফাত কী? বীর্যশালী বললে তো বীরত্বের একটা ধারণা আসে, ঔরসের মধ্যে কেবলই ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে চাওয়া শুক্রাণুর তেজ। তবু বীর্যপাতই হয়, ঔরসপাত নয়। তার গায়ে কোথায় যেন একটা ওজন, একটা গাম্ভীর্য। আর বীর্য কেবলই এক তরল, যাকে উত্তেজনার মুহূর্তে ধরে রাখা যায় না, বয়ে যেতে দিতে হয়। সেখানে কোনও কর্তব্য নেই, কেবলই প্রবৃত্তি।

জেঠুর শরীর সেই প্রবৃত্তিতে মাখামাখি হয়ে ছিল। মা কাউকে কিছু জানতে না দিয়ে, তাকে ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছিল। যেভাবে নার্স একজন রুগিকে মুক্তি দেয়, মেয়ে একজন বাবাকে দেয়, মা ছেলেকে দেয়। আমার মায়ের প্রতি শ্রদ্ধায় চোখ জলে ভরে এল।

আবার হয়তো বস্তিতে গিয়েই উঠতে হত। কিন্তু জেঠুর ছেলে আমেরিকা থেকে আসার দিন দুয়েকের মাথায় আমাদের জানাল যে, জেঠু আমাকে নিজের একটা এলআইসি পলিসির নমিনি করে গেছে। আমি প্রায় আড়াই লাখ টাকা পাব। শরীরের শুধুমাত্র ক্রিয়া। কাজ তো করে যায় মন। জেঠুর ওই একটা কাজ আমার মনে ওঁকে আবার সেই ঈশ্বরের জায়গায় তুলে দিল, যেখানে উনি ছিলেন। একটা বৃদ্ধাশ্রমে জেঠিমার বিশেষ ব্যবস্থা করে জেঠুর ছেলে ফিরে গেল আমেরিকায়। বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেল প্রোমোটারের কাছে। সে আমাদের মাস ছয়েক থাকতে দিল। কিন্তু সেই বাড়ি থেকে মাকে নিয়ে আর বস্তিতে ফিরে যাব না একথাটা ভাবার সময় ভেবে দেখিনি যে, জায়গাটা কলকাতার যোধপুর পার্ক। এখানে ভাড়া দিয়ে থাকা আমাদের মতো নিঃসম্বল লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। ওই একটা এলআইসি-র টাকা পেলেও নয়।

গড়িয়া আর সোনারপুরের মাঝামাঝি গড়ে ওঠা এক নতুন মহল্লার একটা বাড়ির একতলার দুটো ঘর ভাড়া নিয়ে উঠে এলাম আমরা। সান্যালজেঠুর বাড়ির তুলনায় নরক, আবার পঞ্চাননতলা বস্তির তুলনায় স্বর্গ, জায়গাটা। দুনিয়ায় সবকিছুর সঙ্গেই দ্রুত মানিয়ে নিতে হয়, এই শিক্ষা অল্পবয়সেই হয়ে যাচ্ছিল আমার।।

সেই বাড়িতে ওঠার পরে মা আবার নতুন করে কাজ ধরল। নইলে ওই টাকায় চলবে কী করে? কাছাকাছি রেলের অফিসারদের আর কলেজের অধ্যাপকদের দুটো বড় বড় আবাসন তৈরি হয়েছিল বলে, কাজের অভাব হয়নি মায়ের। আর এখানে কাজ পাওয়া যাবে সেই ভরসাতেই মা আমাকে নাইট কলেজে পড়তে দিল না কিছুতেই।

ডে কলেজেই ভরতি হলাম। জয়েন্ট না দিতে পারার আপশোস মনের মধ্যে নিয়েই কলেজ যেতে থাকলাম। টিউশনিও শুরু করেছিলাম কয়েকটা। দু’-তিনটে বছর এভাবেই কাটল। মায়ের শরীর ভাঙছিল। বাড়তি মুশকিল হল, জেঠুর বাড়িতে থাকার সময়ই আমাকে নিয়ে বিরাট সব স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল মা। হয়তো জেঠুর কথা শুনে শুনেই। দুর্ভাগ্য ইত্যাদির কথা বাদই দিলাম, যার বাবার স্টেশনে দোকান আর স্বামীর ছিল বাজারের ভিতরে একটা স্টেশনারি, তার এত বৃহৎ স্বপ্ন কেন, ভেবে কোনও কূলকিনারা পেতাম না। জিজ্ঞেস করলে মা জবাবও দিত না ভাল করে। খালি বলত যে, খুব ভাল করতে হবে আমায়।

আমি চেষ্টা করছিলাম। আমার মতো করে সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। মায়ের মুখের ওই এমএসসি, পিএইচডি-র ঘোরে তলিয়ে না গিয়ে চুপচাপ পরীক্ষা দিচ্ছিলাম, পার্ট ওয়ান কমপ্লিট হওয়ার পর থেকেই। এমএসসি-তে ভরতি হওয়ার আগেই একটা বেশ নামী কেন্দ্রীয় সরকারি আন্ডারটেকিং যখন ইন্টারভিউয়ে ডাকল, আমি গেলাম। কিন্তু ইন্টারভিউতে সফল হওয়ার খবর পেয়ে যখন আনন্দোচ্ছাসে ভেসে যাওয়ার অবস্থা, তখনই মায়ের ওই বড় স্বপ্নগুলো তাড়া করতে শুরু করল। মাথার ভিতর একটা পোকা নড়ে নড়ে বলতে লাগল, মাস্টার্স, পিএইচডি, গবেষণার কথা। চাকরিটা পাওয়ার পর খুশির পাশাপাশি যে-প্রবল দ্বিধা জন্ম নিয়েছিল, তা নিয়ে মায়ের সঙ্গে আলোচনাও করতে পারছিলাম না। কথা তুলতে গেলেই তো ‘তুই এখন শুধু পড়াশোনা কর’ বলে, দাবড়ে চুপ করিয়ে দেবে আমাকে।

জানি না কী করতাম, কিন্তু প্রায় পাঁচবছর পরে আমাদের মা-ব্যাটার একসঙ্গে সিনেমা দেখার একটা পরিকল্পনাই আমাকে দিয়ে সিদ্ধান্তটা নেওয়াল। মা কামাই করতে চাইছিল না বলে ঠিক করেছিলাম বিকেলে যে-বাড়িতে রান্না করতে যায় মা সেখানেই সন্ধেবেলা আমি পৌঁছে যাব। সেইমতো ওই বাড়িটার সামনে গিয়ে কড়া নাড়তেই একটা বাচ্চা মেয়ে এসে দরজা খুলে দিল। সেই মেয়েটার পিছপিছ বাড়ির রান্নাঘর অবধি চলে এসে আমি হতবাক হয়ে দেখলাম, আমার মাকে যাচ্ছেতাই ভাষায় অপমান করছেন একটু মোটা চেহারার এক মহিলা।

মায়ের বোধহয় হাতটা একটু কাঁপছিল। রুটিগুলো গোল হচ্ছিল না। আর সেই মহিলা বলছিলেন, “পারো না তো নাচতে নামো কেন? বয়স হয়েছে যখন, আর রান্নাবান্না করার দরকার কী? এসব পোড়া রুটি দেখে লোকে টাকা দেবে? কাজ করার মুরোদ নেই, কাজ করতে এসেছে।”

মা নীরবে শুনছিল। কিচ্ছুটি না বলে।

সেদিন আমরা সিনেমা যাব বলে, একটা ভাল শাড়ি পরে গিয়েছিল মা। তাই নিয়েও ব্যঙ্গ করছিলেন সেই মহিলা।

“আবার সেজেগুজে এসেছ, চকচকে শাড়ি পরে। তা সেজেগুজে রং মেখে রাস্তায় দাঁড়ালেই পারো। রুটি করতে আসার কী দরকার?”

মা শিউরে উঠে তাকাল মহিলার দিকে। আর তাকাতেই ঠিক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমাকে চোখে পড়ল। মহিলা পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন বলে ওঁর চোখে পড়িনি আমি।

আমাকে দেখেই মায়ের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘তুই’?

শব্দটা শুনেই ভদ্রমহিলা আমার দিকে ঘুরে তাকালেন, “কী ব্যাপার? গৃহস্থ বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকে এসেছ একেবারে?”

“আমি আমার মাকে নিয়ে যেতে এসেছি।”

“মা কাজ করছে। তুমি রাস্তায় গিয়ে অপেক্ষা করো।”

“আপনি মাকে কী বলছিলেন?”

“যা বলছিলাম ঠিকই বলছিলাম। এমনি তো রাখিনি, মাইনে দিয়ে রেখেছি।”

“মাইনে দিয়ে কী রেখেছেন? ক্রীতদাসী?”

“একদম বড় বড় কথা বলবে না। ঝিয়ের ছেলে ঝিয়ের ছেলের মতো থাকবে।”

“একটা ঠাটিয়ে চড় মারব, কথা বলা বন্ধ হয়ে যাবে।” আমি চিৎকার করে উঠলাম।

আমার নিজেকে খুব অচেনা লাগছিল। মা ছুটে এসে আমাকে প্রায় জড়িয়ে ধরে চুপ করাবার চেষ্টা করল।

কিন্তু আমি মাথা ঠান্ডা রাখতে পারছিলাম না। ঘর থেকে, তারপর ওই বাড়িটা থেকে বেরিয়ে গিয়ে সামনের ক্লাবে বসে থাকা ছেলেগুলোকে জানালাম, কী ভাষায় মাকে অপমান করা হচ্ছিল।

“লোকের বাড়িতে রান্না করে বলে কি মানুষটার একদিন একটা সিনেমা দেখতে যাবার অধিকার নেই? একটা ভাল শাড়ি পরার এক্তিয়ার নেই?” আমি ছেলেগুলোর কাছে বাস্ট করলাম।

ছেলেগুলো ‘মাসিমা-মাসিমা’ করে পাগল হয়ে উঠল। তারপর দল বেঁধে ওই বাড়িতে চড়াও হয়ে, বাড়ির মহিলাকে বাধ্য করল মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে।

“তুই যা করলি তারপর আমি আর ওই বাড়িতে কাজ করতে যেতে পারব কোনওদিন?” মা রাতের বেলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আমায় জিজ্ঞেস করল।

আমি মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ে বললাম, “যেতে হবে না। আর কোথাও কোনও বাড়িতে রান্না করতে যেতে হবে না কখনও। আমি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের চাকরিতে জয়েন করছি। অনেক মাস্টার্স, অনেক পিএইচডি হয়েছে। যার মাকে আলতু ফালতু লোক অপমান করার সুযোগ পায়, তার এইসব মানায় না।”

সেদিন বোধহয় পূর্ণিমা। বাইরে চাঁদটা একটা গোল থালার মতো জ্বলজ্বল করছিল। রূপোর থালা। কিন্তু রূপোর রং তো সাদা। রূপো কি এরকম ঘিয়ে রঙের হয়? এ যেন পরোটার মতো অনেকটা।

মাকে কথাটা বলতেই মা বলে উঠল, “পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।” জানলা দিয়ে চাঁদটার দিকে তাকিয়ে।

“তুমি জানো এই কবিতা?”

“জানব না কেন? সুকান্তর লেখা। ছোটবেলায় স্কুলে থাকতে শুনেছি তো।” আমাকে সামান্য অবাক করে দিয়ে মা বলল।

আমি মায়ের মুখের দিকে তাকালাম। একসময় ওই চাঁদের মতোই ছিল মায়ের মুখটাও। কিন্তু এখন দুঃখে, কষ্টে, পরিশ্রমে লাবণ্যটা পুড়ে গিয়েছে। ওই মুখটা দেখতে দেখতেই আকাশের চাঁদটার দিকে তাকালাম আমি আবার। না, ঝলসানো রুটির সঙ্গে চাঁদের কোনও তুলনা হয় না। খুব গরিবের কাছেও নয়। ঝলসানো রুটি তার নিজের জায়গায়। তাকে তৈরি করে তুলতে হয়। চাঁদটা চাঁদের জায়গায়। তাকে তৈরি করে তোলা যায় না।

মনে হচ্ছিল, আমাকে এমনই একটা জোছনার পৃথিবীতে মাকে নিয়ে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, জোছনা আসে এমন একটা ঘরে মাকে রাখতে হবে যেখানে রুটি পুড়ে গেলে আর কেউ দোষারোপ করতে পারবে না। রাস্তায় রং মেখে দাঁড়াতে বলতে পারবে না। আমি পূর্ণিমার চাঁদ থেকে রুটিকে, অকথ্য অপমান থেকে আমার মাকে, একটা চলতে থাকা যন্ত্রণার ইতিহাস থেকে আমাদের জীবনকে আলাদা করব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।।

নিজের সবচেয়ে ভাল শার্টটা গায়ে দিয়ে, অফিসে গিয়ে দাঁড়ালাম। পরদিন।

ভুলে গিয়েছিলাম সমস্ত কিছু। ঝুমার কথায় আবার পুরনো কথাগুলো মনে পড়ে গেল। যে-চড়টা ওই ভদ্রমহিলার গালে সেদিন মারার কথা ছিল সেই চড়টা ঝুমাকে মেরে দিয়েছি। তাই পুরো গল্পটা শেষ করে জড়িয়ে ধরলাম ওকে। কেবল প্রায়শ্চিত্ত নয়, প্রেমেও, ওর গোটা মুখে, গালে, ঠোঁটে দশটা-কুড়িটা পঞ্চাশটা চুমু খেলাম।

ঝুমা আমার হাত দুটো ধরে বলল, “তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।”

“ক্ষমা তো তোমার কাছে আমায় চাইতে হবে।”

“ক্ষমা চাওয়ার মতো তুমি কিছু করোনি। আমি করেছি। আমি বুঝতে পারিনি তোমার হাত ধরার সময়, তুমি অনেক উঁচু দরের মানুষ।”

“না ঝুমা, আমি উঁচু কিংবা মহৎ কিচ্ছু নই। আমি একটা মানুষ যার ভিতরে অনেক ক্ষত আছে। হঠাৎ করে হাত লেগে গেলে ব্যথা লাগে। কোত্থেকে যে রক্ত বেরোয়, কোত্থেকে যে কান্না, কিছুই বুঝতে পারি না।” বলতে বলতে গলা বুজে গেল আমার।

ঝুমা নিজের রুমালটা বের করে আমার চোখ দুটো মুছিয়ে দিল। আমি রুমালটার মধ্যে একটা সেন্টের গন্ধ পেলাম। কোনও একটা সস্তা সেন্ট।

ঝুমার হাত লেগেছিল বলেই ওই রুমালের মসৃণতা পৃথিবীর সব নরম রুটির মসৃণতাকে ছাপিয়ে গেল। ওই সেন্টের গন্ধ আমার পৃথিবী থেকে খিদের গন্ধ মুছে দিয়ে ভালবাসার গন্ধকে জাগিয়ে তুলল।

“এমন কোনও ব্যাপার আছে যেটাতে তুমি বলতে পারো আমার বউয়ের মতো আর কেউ এটা করতে পারবে না?” ঝুমা জিজ্ঞেস করেছিল একদিন।

আমি তৎক্ষণাৎ কিছু খুঁজে না পেয়ে বলেছিলাম, “আগে তো বউ হও। তারপর ভেবে বলছি।”

ব্যাপারটার মধ্যে যে একটা এড়িয়ে যাওয়া আছে, ঝুমা হয়তো বুঝেছিল। বলেছিল, “তুমি বলতে চাইলে না। আসলে আমার তো কোনও গুণই নেই।”

ব্যাপারটা তা নয়। অনেক গুণ ছিল ঝুমার। সবচেয়ে বড় গুণ, ঝুমা নিজেকে বিলীন করে দিতে পারত আমার সুখে, আমার সুবিধেয়। আমি অফিসে বেরোব, আমি ট্যুরে যাচ্ছি, আমার জামাটা দরকার, আমার সোয়েটারটা পাওয়া যাচ্ছে না, আমার মোজাটা কোথায়, সব কিছুতে ঝুমাই ভরসা হয়ে উঠল। আমি ছোটবেলা থেকেই স্বাবলম্বী, তবু ঝুমা আমাকে সেই কমফর্টটা দেওয়ার চেষ্টা করত যে কমফর্ট যুগ যুগ ধরে পুরুষ তার নারীর কাছ থেকে পেয়ে এসেছে। তারপর একসময় নারী বিদ্রোহ করেছে। সে পুরুষের সেবাদাসী হয়ে থাকতে চায়নি জীবনভর। কেনই বা থাকবে?

আমি অনেক অফিস পার্টিতে দেখেছি একজনের বউ আর একজনের বউকে বলছে, “সকালে যে মাসি এসে রান্না করে, সে পার ডে হিসেবে দেড়শো টাকা নিয়ে যায় আর দিনরাত আমার খাটনির টাকা কে দেবে?”

আমার কলিগ গৌতমদা বলত, “নিজের সংসারে খাটনির জন্য টাকা দিতে হবে? তা হলে সেই মহিলার স্বামী সংসারে ফিরবে কেন? কেন সে অন্য কোথাও চলে যাবে না যেখানে টাকা দিলেই ফুর্তি করা যায়?”

এখন এসব কথা বলতে গেলে ‘অ্যান্টি ফেমিনিস্ট’ বলে দাগিয়ে দেয় এলিটরা। কিন্তু মুশকিল হল মুখে যে বিরাট সমানাধিকারে বিশ্বাসী, বাস্তবে সেই লোকটাও চায় কেউ তাকে একটু যত্ন করুক।

আমাকে অবশ্য এসব দোটানায় পড়তে হয়নি কারণ বিয়ের পর থেকেই আমি অনুভব করতাম যে, ঝুমার জগৎ জুড়ে আমিই আছি। বিয়ের দিন সাতেকের মধ্যেই ঝুমা এমন নিজের কন্ট্রোলে নিয়ে নিল সবটা, যেন ও এই বাড়িতে সাতজন্ম ধরে আছে। নতুন একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলাম। তাও যেটা নেওয়ার ইচ্ছে ছিল ঝুমা নিতে দেয়নি সেটা। ওর ওই এক যুক্তি, খরচ বাড়ানোর দরকার নেই।

আমি ইচ্ছে করে ওর কাছে তর্কে হেরে যেতাম। যে ভালবাসে তার কাছে হারতেও ভাল লাগে তো।

আমাদের বিয়ের পরপরই মায়ের একটা অ্যাক্সিডেন্ট হল। পড়ে গিয়ে ফিমার বোন ভাঙল। সেই সময়টা দু-তিন মাস ঝুমা যা করল, মায়ের নিজের মেয়ে থাকলেও বোধহয় করত না। কিংবা কে জানে, মা হয়তো নিজের মেয়েকেই ফিরে পেয়েছিল ঝুমার মধ্যে। মাঝেমধ্যে আমি অবাক হয়ে যেতাম। ঝুমা আমাকে ভালবেসেছে, বিয়ে করেছে, কিন্তু আমার মায়ের উপর ওর এত কনসার্ন কোত্থেকে এল? প্রতিনিয়ত কী অপরিসীম নিষ্ঠায় মাকে খাওয়াত, স্নান করাত, বেডপ্যান দিত ঝুমা, ভাবা যায় না। আমি অনেক বললেও আয়া রাখতে দেয়নি আমাকে। বলেছিল, ওই টাকাটা জমিয়ে রাখতে, পরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া যাবে।

বেড়াতে আর যাব কী? তখন আমার নিজের বাড়িটাই সবচেয়ে বড় টুরিস্ট স্পট আমার কাছে। যেখানে ঝুমার মতো একজন আশ্চর্য মানুষকে আমি প্রতিদিন আবিষ্কার করছি।

একদিন রাতে শুভাঞ্জনাকে স্বপ্নে দেখলাম। দেখলাম শুভাঞ্জনা তর্জনী তুলে খুব শাসাচ্ছে। কিন্তু কেন তা বুঝলাম না। স্বপ্নটা সাইলেন্ট মোডে ছিল।

ঝুমাকে স্বপ্নটার কথা বলতেই ঝুমা মুচকি হেসে বলল, আমি তো তোমার চাষাভুষো বউ। আমাকে কি তোমার কোনওদিনই ভাল লেগেছে? মন রাখতে আদর করো আমি জানি। আসলে ভালবাসো ওই ওদেরই। তাই স্বপ্নে আমি আসি না, ওরা আসে।

আমি আদরের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিয়ে ঝুমাকে আমার শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে লাগলাম, যেভাবে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে নামতে থাকা একটা ট্রাকের চাকা ঢেলাগুলোকে গুঁড়ো করতে করতে মাটিতে মিশিয়ে দিতে থাকে। মনে হল ঝুমা সেই চাষি যাকে ল্যাবরেটরির বিকারে চোখ রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরীক্ষা করে বলতে হয় না কোথায় কী ফসল হবে। ঝুমা আমার মনের মাটিটাকে মুঠোয় তুলে নিয়ে বলে দিতে পারে, কোথায় ডাল হবে, কোথায় আলু হবে। ভালবাসার ভিতরে যে-ক্ষরণ থাকে তা শুধু শারীরিক নয়, আত্মিকও। ঝুমার আর আমার প্রবল সঙ্গমের মধ্যে কখনও কখনও আমার চোখের জল ঝুমার মুখের উপর গিয়ে পড়ত। আশ্লেষ আর প্রেম একাকার হয়ে যেত মিলেমিশে।

আমাদের বিয়ে খুব সাধারণভাবে হয়েছিল, অল্প কিছু লোককে নেমন্তন্ন করে। বউভাতের দুপুরের একটা দৃশ্য এখনও আমার মনে আছে। সব জায়গাতেই কিছু কুচুটে লোক থাকে। তাদেরই একজন বাবার প্রসঙ্গ তুলছিল ওইদিন ওখানে। তোলার একটা ছুতোও অবশ্য ছিল। মা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেও শাঁখা-সিঁদুর পরাটা ছাড়তে পারেনি। ওটা কোথাও একটা মায়ের অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। আমি দু-একবার ছাড়াতে চাইলেও জোর করিনি কোনও। করিনি তো করিনি। নিজেদের জীবন নিজেদের মতো করে বেঁচেছি আমরা।

যে সেজমামা ওই প্রশ্ন তুলে একটু ঘেঁটে দিতে চাইছিল পরিবেশটা, যখন আমরা বস্তিতে থাকতাম সে তখন দেখাও করত না আমাদের সঙ্গে, টাকা দিতে হবে এই ভয়ে। আমি উত্তেজিত হয়ে কিছু বলে ফেলতাম হয়তো, কিন্তু ঝুমা কী চমৎকার হ্যান্ডল করল ব্যাপারটা।

ঝুমা বলল, “আমি তো বিয়ে করছি আপনাদের ছেলেটাকে। এবার আমার শ্বশুরমশাই বিয়েতে এসেছেন নাকি হরিদ্বারে বেড়াতে গিয়েছেন, তা নিয়ে আমি কী করব বলুন।”

নতুন বউয়ের মুখ থেকে ওরকম একটি সপাট জবাব পেয়ে অনেকেরই আক্কেল গুডুম। যাদের সামান্য জলঘোলা করার ইচ্ছে ছিল, সব পলকে হাওয়া হয়ে গেল।

রাত্রিবেলা ঝুমাকে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম, “কীভাবে অমন চমৎকার কায়দায় থামিয়ে দিলে সেজমামাদের?”

ঝুমা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তো ওভাবেই কথা বলি।”

ঝুমার উত্তরটা তারপর কতদিন যে আমার কানে বেজেছে তার ইয়ত্তা নেই। ঝুমা যেন সেই আখগাছের মতো যে নিজের দৃঢ়তাকে চেনে, মিষ্টতাকে চেনে না। আর ওর ওই আপনভোলা ব্যাপারটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানত। তাই বলে বুদ্ধি কম ছিল না ঝুমার। ওর দাদা-বউদি সেইসময় প্রায়ই আমাদের ফ্ল্যাটে আসত। ঝুমাদের পৈতৃক বাড়িটা ভেঙে ফ্ল্যাট হচ্ছিল। ঝুমার দাদা শৌভিক আর বউদি চন্দ্রা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অনুরোধ করত যাতে ঝুমা নিজের ভাগটা ছেড়ে দেয়।

ঝুমা একদিন আমার সামনেই ওদের বলল, “তোরা অনর্থক পরিশ্রম করছিস। আমি আমার বাবার বাড়ির ভাগ ছাড়ব না। ফ্ল্যাট হলে আমাকেও সমান ভাগ দিতে হবে।”

গজগজ করতে করতে ঝুমার দাদা আর বউদি বেরিয়ে গেল। আত্মীয়স্বজন মহলে চশমখোর বলে সুনাম রটতে লাগল ঝুমার।

“এরকমভাবে বলার কোনও দরকার ছিল? ওদের তো দুটো বাচ্চা। বেশি জায়গা লাগতেই পারে।”

“আমাদেরও দুটো হতে পারে।” ঝুমা খুব ক্যাজ়ুয়ালি উত্তর দিল।

আমাদের হানিমুন সেভাবে হয়নি। বিয়ের পরেই মায়ের অ্যাকসিডেন্টের জন্য ভাবারও সময় পাইনি ওই নিয়ে। প্রায় অ্যানিভার্সারির আগে আমরা দু’জনে একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ পেলাম। ঝুমা নিজের এক বিধবা পিসিকে ম্যানেজ করে মায়ের কাছে রেখে গেল ক’দিনের জন্য, যাতে আমাদের মধুচন্দ্রিমার আকাশে দুশ্চিন্তার কোনও মেঘ উড়ে আসতে না পারে।

আমরা গিয়েছিলাম ভাইজ়্যাগে, যেখানে সমুদ্র পাহাড়ের গায়ে এসে ধাক্কা মারে। ওখানে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল ওই পাহাড়টাই যেন দাম্পত্য আর ভালবাসা সমুদ্র। ক্রমাগত ধাক্কায় পাহাড়টা ক্ষয়ে যেতে থাকে। কিন্তু সমুদ্র যদি চুপ হয়ে যায় তা হলে পাহাড়টার থাকারই আর কোনও মানে থাকে না। ওই নিশ্চল পাহাড়, সচল সমুদ্রের কারণেই নিজের মানে খুঁজে পায়।

একটা খুব অনাড়ম্বর ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল হচ্ছিল তখন ওই ছোট্ট শহরটায়। সম্ভবত পর্যটকদের জন্যই। আমরা ঘুরতে ঘুরতে সেখানে গিয়ে একটা জাপানি সিনেমা দেখতে ঢুকে পড়লাম একদিন।

সিনেমাটায় মা অন্ধ। আর অন্ধ বলেই মা চাইছে মেয়েও বিয়ে করুক একটা অন্ধ ছেলেকে। কারণ চোখ আছে এরকম পুরুষকে সহ্য করতে পারত না মা। মায়ের মন রাখতেই মেয়ে একটা অন্ধ ছেলেকে বিয়ে করে। সেই ছেলেটা একদিন মেয়েটাকে ছেড়ে চলে যায়। তারপর মাকে ভাল রাখতে গণিকাবৃত্তিতে নাম লেখায় মেয়ে। কিন্তু নিয়ম করে দেয় যে, তার প্রত্যেকটা খরিদ্দারকে হতে হবে অন্ধ। কারণ কেবলমাত্র অন্ধ মানুষের থেকে নেওয়া পয়সাতেই অন্ধ মায়ের সেবা করবে মেয়ে।

অদ্ভুত সিনেমা। অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম যত দেখছিলাম। ঘরে ফেরার পথে মনে হচ্ছিল আমিও তো অন্ধ। স্মৃতিতে অন্ধ, ক্ষোভে অন্ধ, হিংসায় অন্ধ, ঝুমার প্রতি ভালবাসাতেও অন্ধ। প্রত্যেকটা মানুষই হয়তো তাই। যে যার নিজের মতো অন্ধতা ভিতরে নিয়ে চোখ খুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কলেজের ক্লাসে টিকেসি বলতেন, আমাদের ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হয় যেহেতু আমাদের জিনগুলো পুনরাবৃত্ত হয়। জিনের অভ্যন্তরেই তো সব রহস্য। যার ঠাকুরদা ডাকাত, সেও ডাকাত হয়। নিজের ইচ্ছেয় নয়, জিনের প্রতাপে।

কথাটা মনে পড়ল। তা হলে কি এই প্রবহমান জিন আমার ভিতর দিয়েও আমার বাবাকে কথা বলাবে?

কেমন একটা ঠান্ডা ভয়ের স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। ঘরে ফেরার পরও ভয়টা লেপটে রইল আমার সঙ্গে। ভয়টাকে সরিয়ে দেব বলেই ঝুমাকে কাছে টানলাম।

হোটেলের ঘরের ওই মায়াবী আলোয় ঝুমাকে অন্যরকম লাগছিল। ঘিঞ্জি গলির ভাড়াবাড়ির ছাদ থেকে আকাশের তারাকে যেরকম লাগে, সমুদ্রের ধারে শুয়ে তাকে তো সেরকম লাগে না!

ঝুমা একটা স্লিভলেস নাইটি পরেছিল। এতদিন তো শুধু খুলেছি, আজ মনে হল উন্মোচন করি। পুরনো ঝুমাকে নতুন করে পাই। ওই একটু লম্বাটে মুখ, টিকলো নাক, টানা টানা চোখ, একটু পাতলা ঠোঁট, ঝুমা শুধু আমার ভরসার জায়গা নয়, আমার আকর্ষণেরও কেন্দ্রবিন্দু। আমি মুখটা নামিয়ে এনে ওর বুকের বৃন্তে ঠোঁট ছোঁয়ালাম। এক-এক করে দুটো বৃন্ততেই আমার জিভ, আমার ঠেটি, আমার দাঁতের স্পর্শে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করলাম। ঝুমা অস্ফুটে কী একটা বলল। আমি বুঝতে না পেরে বললাম, “কী বলছ?”

“আমাকে একটা ছোট তুমি দাও।”

“এক্ষুনি? এত তাড়াতাড়ি?”

ঝুমা যেন লজ্জা পেয়ে গেল। মুখটা গুঁজে দিল আমার বুকে।

চাইছিল কি ঝুমা একা? আমিও তো চাইছিলাম, বাবা হতে। যে-বাবাকে আমি দেখেছি সেরকম বাবা নয়। যে-বাবা সন্তানকে আঁকড়ে থাকে, পথ দেখায়, মানুষ করে, তেমন কোনও বাবা হতে। যাতে ‘বাবা’ বললেই মনের মধ্যে খুশির বুদবুদ ওঠে।

আমি ঝুমার ভিতরে নিজের সবটা দিতে দিতে, সেই সন্তানের কল্পনা কেবল নয়, সেই বাবার কল্পনা করতে লাগলাম, যে এই পৃথিবীর আশ্রয়।

প্রাণীজগতে বাবার ভূমিকা তো খুব বেশি নয়। মা-কুকুর নিজের সন্তানকে পালন করে কিন্তু বাবা ঘেউ ঘেউ করে তাকে দেখলেই। হুলো বেড়াল তার নিজের বাচ্চাকে খেতে যায়। কিন্তু প্রত্যেকেই তো পিতার ঔরসজাত। সবারই তো পিতৃদত্ত প্রাণ। তবু পিতার সঙ্গে সম্পর্ক শুধু মানুষের। পিতার হৃদয় দিয়ে কি কেবলমাত্র মানুষকেই পাঠিয়েছেন ঈশ্বর?

ঘামের সঙ্গে ঘাম, লালার সঙ্গে লালা, আকর্ষণের সঙ্গে আকর্ষণ মিশে গেলেও প্রশ্নগুলো জেগে রইল শজারুর কাঁটার মতো। আমরা সেই পৃথিবীতে থাকি যেটা কেবল প্রশ্নের মালায় ঘেরা, যেখানে কোনও উত্তর পাওয়া যায় না। অনেক প্রশ্ন ভিতরে নিয়েই এক-একটা মুহূর্ত সমুদ্রের ফসফরাসের মতো জ্বলে ওঠে।

হানিমুন থেকে ফিরে আসার পর ঝুমা ওর বাপের বাড়িতে থাকতে গেল কয়েকদিন। মুখে যাই বলুক, শেষমেশ ফ্ল্যাটটা ওর দাদার তুলনায় ছোট নিয়েছিল বলে ওর খাতিরও বেড়েছিল সেখানে। কিন্তু তিনদিন থাকবে বলে গিয়ে দেড়দিনের মাথায় আবার ফিরে এল। ওর নাকি শরীর ভাল লাগছে না।

শরীর ভাল লাগছে না? কেন?

উত্তরহীনতার এই জগতে একটা ছোট্ট উত্তর আমার চোখ ভিজিয়ে দিল কয়েকদিন পর। ঝুমা প্রেগন্যান্ট। আমি বাবা হতে চলেছি।

অনেকটা উল্লাস এসে মানুষকে স্থবির করে দেয়। সে রসের গামলায় পড়ে যাওয়া মাছির মতো হাঁকপাঁক করতে থাকে। আমারও প্রাথমিকভাবে সেই অভিজ্ঞতাই হল। আমি তো জন্মের ভিতর দিয়ে যাইনি জীবনে। বোনের জন্ম আমার মনে পড়ে না। কিন্তু বোনের মৃত্যু, জেঠুর মৃত্যু, এরকম অনেক মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে আবারও সূর্য উঠবে এই বোধটা আমার গুলিয়ে গিয়েছিল। আমি প্রত্যেকদিন কান পাততাম ঝুমার পেটে। বুঝতে চেষ্টা করতাম নতুন কেউ আসছে, আমাদের মধ্যে আসছে। আমারই ঔরসজাত কেউ। সে একটা ধারা। সে প্রথম কবে এসেছিল, জানি না। এই দেশেরই কি ছিলাম আমি, নাকি হিন্দুকুশ পর্বত পেরিয়ে আমার পূর্বপুরুষ কোথাও থেকে এসেছিল? এখানে এসে নতুন একটা সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। তার ভিতরে কত জটিলতা, কতরকম বৈপরীত্য, তবু সব মিলিয়ে টলমল করতে করতে দেশটা চলছে। ঠিক যেমন পেটের মধ্যে ওই বাচ্চাটা। মা যা খাচ্ছে তার থেকেই খাচ্ছে; নিজের গতিপথ জানে না, ভবিষ্যৎ জানে না, তবু এক বিপুল ভরসায় ক্রমাগত বড় হয়ে উঠছে, মায়ের গর্ভে।

ঝুমা খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে অবহেলা করত, এটা ছিল ওর একটা বড় দোষ। মা এই নিয়ে ওকে খুব বকাঝকা করত। শুধু বকাঝকা করেই শান্ত হত না, ঝুমাকে সকাল-বিকেল যখনই পারত কখনও দুধ, কখনও ফল খাওয়ানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠত।

ঝুমা মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে উঠত, “উফ খাইয়ে মেরে ফেলবে আমাকে, এই রাক্ষসটার জন্য।”

আমি কখনও শুনলে বলতাম, “না খেলে পরে রাক্ষস দেবতা হবে কী করে?”

ঝুমার মাসতুতো দিদি সুধা আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন এই সময়টা। ভদ্রমহিলা প্রায় দিন পনেরো থেকে গেলেন। পরে এসে আবার পনেরো দিন থাকবেন বলে গেলেন। অসম্ভব কষ্টের জীবন এই সুধাদির। ঝুমার মেসোমশাইয়ের ক্যানসার হয়েছিল অল্প বয়সে। মাসি একটা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষিকার কাজ নিয়ে, মেয়েকে মানুষ করে তুলেছিলেন। সুধাদির বিয়ে হয় জামশেদপুরে। একটি মেয়ে হয় কিন্তু সেই মেয়েটি সাতদিনের জ্বরে মারা যায়। তারপর ছেলে হয় সুধাদির। কিন্তু সেই ছেলেটাকে ভ্যাক্সিনেশনের সময় হাসপাতালের কোনও অপদার্থ স্টাফ একটা ডেট পেরিয়ে যাওয়া ভ্যাকসিন ইনজেকশন পুশ করে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যায় ছেলেটা।

“মামলা করোনি? খুনের মামলা? ওর তো ফাঁসিতে ঝোলা উচিত।” ঝুমা উত্তেজিত হয়ে উঠত।

আমি বুঝতে পারতাম ঝুমার পক্ষে উত্তেজনাটা এই সময়ে খারাপ। কিন্তু আমি নিজেই তো উত্তেজিত হয়ে যেতাম সুধাদির কথার সামনে। কেঁপে কেঁপে উঠতাম। একটা ছোট বাচ্চা, তাকে ইনজেকশন দেওয়ার আগে ডেটটা পরীক্ষা করবে না? এই আমার দেশ?

সুধাদি খুব শান্তভাবে বলেছিল, “ওই লোকটা কাজ পেয়েছিল পয়সা দিয়ে, ইংরেজি অক্ষর বা সংখ্যার সঙ্গে কোনও পরিচয় ছিল না তার। ভ্যাকসিনের গায়ে কবেকার তারিখ, সে দেখেওনি, দেওয়ার আগে দেখতে যে হয় তাই জানত না।”

আমি চুপ করে ভাবতাম, এরকম ইতর, অশিক্ষিত বসে আছে ভারতবর্ষের জায়গায় জায়গায়। ডেট পেরিয়ে যাওয়া ভ্যাকসিন যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিনছে, যে ওই লোকটাকে অ্যাপয়েন্ট করছে ঘুষ খেয়ে, প্রত্যেকে দায়ী সুধাদির ছেলের খুনের জন্য। কিন্তু শাস্তি পাবে কে?

কেউ না। হাসি-আনন্দে যাদের জীবন চলছে, তারা পাত্তাও দেবে না ঘটনাটাকে। কিন্তু সুধাদির জীবনটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে আর ধ্বংসস্তূপই থাকবে। পরপর দুই সন্তানের মৃত্যুর পর, সুধাদির বর সুধাদিকে ছেড়ে আবার একটা বিয়ে করেছে। তার একটা ছেলেও হয়েছে নতুন বিয়ে থেকে।

“পুরুষের ভালবাসা অনেক আলগা তো। বেদনাটা নিতে পারে না,” সুধাদি বলত।

আমি ভাবতাম, কেবলমাত্র নারীই তার গর্ভস্থ ভ্রূণের যন্ত্রণা বা সুখের সঙ্গে আজীবন সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়? এ কেমন দুর্ভেদ্য নিয়ম। আমাকে অন্যরকম হতেই হবে। এমন একজন বাবা হতে হবে যার সঙ্গে সন্তানের নিবিড়তম যোগাযোগ গড়ে উঠবে, যে একইসঙ্গে বাবা এবং মা দুটোই হতে পারবে। পৃথিবীতে পুরুষের বিরুদ্ধে ওঠা যত অভিযোগ, অবহেলার-স্বার্থপরতার-নিষ্ঠুরতার, সবকিছুকে কোথাও একটা মিথ্যে প্রমাণ করতে হবে।

“সবটা পারবে না, এত এত কাণ্ড করে রেখেছে পুরুষজাতি। তুমি একা যতই ভাল হও, সবটা খারাপ মোছার সাধ্য তোমার নেই,” ঝুমা হেসে উঠত।

সেই হাসির ভিতর থেকে সত্যিটা এসে পিন ফোটাত আমার সর্বাঙ্গে। মেয়েদের মধ্যে কুটিলতা, জটিলতা, হিংসে, পরস্পরকে সহ্য করতে না পারা, এমন কত দোষের কথা বলে থাকে লোকে। কিন্তু কখনও তো পৃথিবীর ইতিহাসে এমন হয়নি যে, একসঙ্গে এক হাজার মেয়ে বেরিয়েছে অন্য মেয়েদের বাড়িতে আগুন দেবে বলে। লাখ লাখ মানুষকে খুন করার কৃতিত্ব সবসময়ই পুরুষের; শহরের পর শহর, হাতি-ঘোড়ার পা কিংবা ট্যাঙ্কের চাকার নীচে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব পুরুষেরই; লাইব্রেরি পোড়ানো, তলোয়ারের কোপে মানুষের মাথা নামিয়ে দেওয়ার গৌরব, পুরুষ ভিন্ন আর কেউ নিতেই পারবে না। আচ্ছা, কী করে এই নৃশংসতার উত্তরাধিকার পুরুষ একাই পেল? একই ঔরস থেকে তো জন্ম পুরুষ এবং নারীর। মায়ের পেটেও দেওয়াল তোলা থাকে না কোথাও। এক্স+এক্স কিংবা এক্স+ওয়াই কম্বিনেশন যাই হোক, ‘এক্স’ তো থাকছে দু’জনের মধ্যেই। গায়েগতরে খুনে তা হলে পুরুষ একাই হয়ে উঠল কেন?

“গৌতম বুদ্ধ কি পুরুষ নন? রামকৃষ্ণ পরমহংস পুরুষ নন? চৈতন্যদেব পুরুষ ছিলেন না?” ঝুমা আমার ভাবনার কথা শুনতে শুনতে বলত।

“নিশ্চয়ই পুরুষ। কিন্তু এই লক্ষ বছরের ব্যাপ্ত হিংসার যে-ইতিহাস, সেখানে তাঁদের রিচ কতটুকু, কতজন শুনেছে তাঁদের কথা? বিদ্বেষবিষ নাশ করতে কতজন এগিয়ে এসেছে? ভালবেসেছে কতজন? হিংসাই তো চালিকাশক্তি, প্রায় প্রত্যেকের।”

বলতে বলতে থেমে যেতাম আমি। ‘প্রায় প্রত্যেকের’ মধ্যে আমিও তো আছি। নিজের বাবার প্রতি বিদ্বেষ আমাকেও দিনের পর দিন দৌড় করিয়ে বেড়িয়েছে। আজ আমি খুব গদগদ প্রেমিক হয়ে উঠলেই আমার সেই আগের ইতিহাস চাপা তো পড়ে না। জেগেই থাকে।

জেগে থাকে বলেই বোধহয় হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে, মা যখন ওই লোকটা বেঁচে আছে না মরে গেছে জানতে চাইল, আমি কেঁপে গেলাম পুরো। সেই তুমুল বৃষ্টির রাতটা আমার ভিতরে কোত্থেকে যেন জাগ্রত হল আবার। আমি তাড়াতাড়ি তাকে মাথা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় মাকে অন্য কথা বলতে শুরু করলাম। মায়ের বিড়বিড়ানির মধ্যে তবু দু’-তিনবার ফিরে এল সেই লোকটা, যাকে বায়োলজিক্যালি বাবা বলতে আমি বাধ্য।

অফিস থেকে ফেরার পথে ঝুমার ডাক্তারের কাছে একাই গিয়েছিলাম একদিন। দু’-একটা সিম্পটমের কথা বলে সতর্ক করলেন, যেগুলো থেকে পরে কমপ্লিকেশন দেখা দিতে পারে। তারপর ঝুমার ভরতির ডেট এবং কত কী খরচ হতে পারে তাই নিয়ে কথা হল। ডাক্তারবাবুর নিজেরই নার্সিংহোম, তবু আমি এক পয়সাও কমানোর অনুরোধ না করে যে-বার্তা দিয়ে এলাম তা হল, দশ-কুড়ি হাজার টাকা বেশি বিল হলে হোক কিন্তু ঝুমা যেন একেবারে রানির মতো মা হতে পারে।

ঝুমা সঙ্গে থাকলে এই কথাগুলো বলা সম্ভব হত না। ও আমার পাশে বসে পেটে চিমটি কাটত, কনুই দিয়ে ঠেলা দিত, পা মাড়িয়ে দিত, চাই কি জিভ থেকে একটু থুতু বের করে আঙুল দিয়ে লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত আমার ঘাড়ে, গলায়, যাতে চুপ করে যাই। ঝুমার পোক্তাই মত হল, কাউকে কখনও ‘টাকার কথা ভাববেন না’ বলতে নেই। বললেই নাকি সে দিনে ডাকাতি আরম্ভ করে দেবে। ওকে কে বোঝাবে যে, নিজের সবকিছু দিয়েও এক-একসময় উদ্বেগহীন হতে চায় মানুষ।

ফিরতি পথে ট্যাক্সির জানলা দিয়েই রাস্তায় শুভাঞ্জনাকে দেখলাম। চেহারা বেশ খানিকটা ভেঙে গেছে। বাসের অপেক্ষাতেই সম্ভবত দাঁড়িয়ে আছে।

বাসের অপেক্ষায়? শুভাঞ্জনা? বিয়ে হয়ে গেছে এমন একটা কানাঘুষো শুনেছিলাম যে অফিসে! ওর জামাইবাবু অবশ্য বেশ অনেকদিন আসেননি অফিসে, তাই শুভাঞ্জনার সংবাদ পাওয়া হয়ে ওঠেনি আর। কিছুটা কৌতূহল, কিছুটা সৌজন্য আর সামান্য একটু অপরাধবোধ থেকে আমি ট্যাক্সিটা ঘুরিয়ে নিয়ে গেলাম শুভাঞ্জনার কাছে।

বেশি কিছু অনুরোধ-উপরোধ করতে হল না। আমি ডাক দেওয়ার পর আমার দিকে তাকিয়ে পাঁচ সেকেন্ড মতো চুপ করে রইল শুভাঞ্জনা। তারপর উঠে এল ট্যাক্সিতে।

“অনেকদিন আপনার জামাইবাবুর দেখা পাইনি তাই…”

“জামাইবাবুর স্ট্রোক হয়েছিল, বাঁদিকটা প্যারালাইজ়ড। জানি না কতদিন এভাবে পড়ে পড়ে কষ্ট পাবে।”

“কী বলছেন? অফিসে কিছু শুনিনি তো।”

“আমার জামাইবাবু আপনাদের অফিসে নিজের কোম্পানির মাল বিক্রি করতেন। একজন মাল সাপ্লায়ার বেঁচে আছে কি মরে গেছে সেটা অফিসারদের খেয়াল রাখা সম্ভব নয়।”

‘অফিসারদের’ শব্দটা একটু ঠেস দিয়ে উচ্চারণ করল বলেই হয়তো আমি আলটপকা বলে ফেললাম, “কিন্তু আপনার বিয়ের খবর পেয়েছিলাম যে?”

“মেয়েদের ব্যাপারে ইন্টারেস্ট বেশি থাকে লোকের। বিশেষ করে, আমি তখন গান-ফান গাইতাম।”

শুভাঞ্জনার মুখে, ‘গান ফান’ শুনে আমি রীতিমতো ধাক্কা খেলাম।।

“চুপ করে কী ভাবছেন? এখন আর গাই কি না? না, গাই না। বিয়েটাও টিকল না। টিকবে না জেনেই করেছিলাম অবশ্য, কিন্তু তারপর ডিভোর্স টিভোর্সের এত ঝামেলা পোয়াতে হল যে, গানটা হাওয়ার মতো উড়ে গেছে লাইফ থেকে।”

“বিয়েটা টিকল না কেন?”

“আমেরিকায় হয়নি বলে।” হেসে উঠল শুভাঞ্জনা।

আমিও সেই হাসিতে যোগ দিয়ে ফেললাম, বোকার মতোই।

“আপনি বিয়ে করেছেন?”

“আজ্ঞে।”

“কাকে করলেন? সেই যাকে দিয়ে ফোন করিয়েছিলেন তাকেই?”

মিথ্যে বলতে ইচ্ছেই করল না, “হ্যাঁ তাকেই। তবে সে সোনাগাছির বেশ্যা নয়।”

“আই অ্যাম সরি। আমার সেদিন ওইভাবে বলা উচিত হয়নি। আসলে কেউ আমায় ঠকাচ্ছে, এটাও মেনে নিতে পারি না একদম।”

“আমি অন্তত ঠকাইনি। আর ফোনটা আমি করাইওনি। হ্যাঁ, আমার কাছ থেকে ফোন নম্বরটা নিয়ে একরকম জোর করেই ঝুমা ফোনটা করেছিল আপনাকে…”

“আর ওই চিত্রনাট্যটা কার লেখা ছিল?”

“বাদ দিন না, এতদিন পরে দেখা হল, ওইসব আলোচনা করে লাভ আছে কিছু?”

“অবশ্যই আছে। কারণ আমার জীবনের অনেকগুলো ভুল ডিসিশনের পিছনে ওই ফোনটার একটা ভূমিকা আছে। তাই আমার জানা দরকার…”

“না, চিত্রনাট্য আমার লেখা নয়।”

“আপনার এখনকার স্ত্রী-ই মুখে মুখে তৈরি করেছিল ওটা? এত বুদ্ধি? বিশ্বাস করতে পারলাম না ঠিক।”

রাগ চড়ে গেল আমার মাথায়, “অবিশ্বাস করতেই পারেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে আপনার ভণ্ডামি এক্সপোজ় না করলে, ঝুমার পক্ষে আমার অ্যাটেনশন পাওয়া সম্ভব ছিল না কারণ, আমি একদম ডুবে ছিলাম আপনার চিন্তায়।”

“এখন আর একেবারেই ভাবেন না আমার কথা, তাই না?”

এই প্রশ্নটার জন্য তৈরি ছিলাম না বলে উত্তর দেওয়া সম্ভব হল না।

“ভালই করেন না ভেবে। আর আমার সঙ্গে যে বিয়ে হয়নি আপনার, সেও একরকম ভালই হয়েছে। সম্ভব নয়, কারও পক্ষেই আমার সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়।”

“কেন এইসব বলছেন?”

“আসলে কী জানেন, রূপ নয়, গুণ নয়, টাকা নয়, আমরা যারা শিল্পী তারা শিল্পটাকে খুব ভালবাসি। আপনি দেখবেন, অনেক বড় বড় শিল্পী আছে যাদের বউ বা সঙ্গিনী খুব খারাপ দেখতে একটা মেয়ে। উলটোটাও হয়, অসামান্যা অভিনেত্রী কিন্তু বিয়ে করেছে একটা কুৎসিত দেখতে লোককে। কেন করে বলুন তো?”

“শিল্পী নই তো। কীভাবে বলব?”

“আমিই বলছি। শিল্পটার প্রতি ভালবাসা মানুষের প্রতি ভালবাসার থেকে অনেক বেশি বলে, শিল্পীরা সেই লোকটাকে খোঁজে যে তার শিল্পের জন্য পাগল। সেই মানুষটাকে জীবনে পেলে শিল্পীর ভাল লাগে। একজন গায়িকা তাই তাকেই চায় যে তার গান শুনে ঝরঝর করে কাঁদবে। যে লোকটা সেই গায়িকাকে জাপটে ধরে থেকে তিন বাচ্চার মা করে দিতে চাইবে, তাকে জীবনে নিয়ে মরবে নাকি?”

“শিল্পীর সঙ্গে থাকতে গেলে দর্শক হিসেবে থাকতে হবে তবে?”

“তা তো কিছুটা থাকতেই হবে। শিল্পের জন্য শিল্পীকে স্পেস দিতে হবে না?”

আমি আর একটু সরে বসলাম। ভাগ্যে অনেক আগে থেকেই অনেক ‘স্পেস’ দিয়েছি শুভাঞ্জনাকে।

“তা আপনার বউ হঠাৎ করে আমার কথা জানল কী করে?”

“আপনার ওই বিছানায় মৃত প্রেমিকের শার্ট-প্যান্ট রেখে দেওয়ার ব্যাপারটা এত হন্ট করত যে, বলে ফেলেছিলাম। তখন অবশ্য ওকে নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবনাও ছিল না। শুনতে শুনতে আমার স্ত্রীর মনে হয় ব্যাপারটার মধ্যে অনেক ফাঁকিবাজি আছে।”

“গোদা লোকেদের পক্ষে যে-কোনও কল্পনাই একরকম ফাঁকি।” শুভাঞ্জনা রেগে গিয়েছে বুঝতে পারলাম।

হালকা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল বলে রাস্তার পিচগুলো আরও কালো দেখাচ্ছিল। শুভাঞ্জনাকে কোথায় নামালে সুবিধে হবে জেনে নিয়ে আমি জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বসে ছিলাম।

“আপনার গোদা বউকে নিয়ে আপনি খুশি? অবশ্য আপনিও তো গোদাই।” শুভাঞ্জনা আমার দিকে না তাকিয়ে বলল।

“খুশি না হয়ে উপায় আছে? নতুন গোদা-র জন্ম হতে চলেছে তো।” আমি হেসে ফেললাম।

এবার শুভাঞ্জনাও যোগ দিল হাসিতে। মানুষ তো ঘৃণা বেশিক্ষণ বহন করতে পারে না। ঘৃণার ভিতরেও কোথাও একটা ভালবাসার ফল্গুস্রোত বইতে থাকে। আমাকে আমার অফিসেরই এক দিদি বলেছিল একবার, ওথেলো আর ডেসডিমোনাকে যদি স্বর্গে বা নরকে নিয়ে গিয়ে পাশাপাশি বসিয়ে দেওয়া হত, ওথেলো আবার খুন করতে যেত না। ডেসডিমোনাও অভিযোগ জানাত না কোনও। ওরা নিজেদের ভালবাসাটাকেই রোমন্থন করত। কারণ যেখানে ভালবাসাই নেই, সেখানে ঘৃণাই বা কতক্ষণ থাকতে পারে?

শুভাঞ্জনাকে প্রায় ওর বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে বললাম, “গানটা ছাড়বেন না। ভাল থাকবেন।”

“আপনিও ভাল থাকবেন। নতুন মানুষের জন্য আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে গেলাম। কে জানে, আপনার স্ত্রী হতাম যদি তা হলে হয়তো ডিভোর্সের দিকে যেত না ব্যাপারটা।” বলেই আর পিছনে না তাকিয়ে এগিয়ে গেল।

আমার ইচ্ছে হল ওর পিছন পিছন ওই বাড়িতে গিয়ে দেখি এখনও সেই শার্টগুলো বিছানার উপর রাখা আছে নাকি! হতে পারে ওগুলো ওর ভড়ং, হতে পারে ভড়ং নয়। যে-সাধু ছাই মেখে ‘মরা মরা’ বলতে বলতে ‘রাম’ বলেছিল সেও তো নিজেকে একটা উচ্চতায় তুলে নিয়ে যেতে চাইছিল। মানুষ নিজের দৈনন্দিন চাল-ডাল-তেল-সাবানের বাইরের একটা চেহারা যদি পৃথিবীকে দেখাতে চায় তার মধ্যে খুব কি অন্যায় আছে? শুভাঞ্জনা হয়তো ওর যাপনের রথটাকে মাটির চার আঙুল উপর দিয়ে চালাতে চায়। পারুক, না পারুক, চেষ্টায় দোষ কী?

ভাবতে ভাবতে ঝুমার কাছে ফিরলাম। আর ঠিক দু’দিন পরেই, ভোর হওয়ার আগে আগে অসহ্য ব্যথা শুরু হল ঝুমার। মৃত্যু যেমন বহুবার ফল্‌স অ্যালার্ম দিয়ে যায় তেমনই জীবনও। কিন্তু ঝুমার ব্যথার রকম দেখে মা এবং সুধাদি দু’জনই নিশ্চিত হয়ে গেল যে, এ ব্যথা নতুন মক্কেলের পৃথিবীতে আসার নোটিস।

তখনও অ্যাম্বুল্যান্স এত হুট বলতে ছুট পাওয়া যেত না। আমি বাইরে বেরিয়ে অনেক কসরত করে একটা ট্যাক্সি জোগাড় করলাম, ডবল ভাড়া দিতে রাজি হয়ে। সুধাদি ততক্ষণে ঝুমাকে প্রায় পাঁজাকোলা করে দোতলা থেকে একতলায় নামিয়ে এনেছেন।

“ভাগ্যিস আপনি গতকাল এলেন।” আমি ট্যাক্সিতে ঝুমাকে তুলতে পারার পর ওর মাথাটা কোলে টেনে নেওয়া সুধাদিকে এই একটা কথাই বলতে পারলাম।

“আমার কেমন যেন মনে হচ্ছিল, দু’-একদিনের মধ্যেই ঝুমার লেবার পেন হবে।”

“কিন্তু ডেট তো প্রায় তিন সপ্তাহ পরে।”

“সে তো ডাক্তারের দেওয়া ডেট ভাই। বাচ্চা তো ভগবানের দেওয়া ডেটে আসবে, তাই না?”

আমি চুপ করে গেলাম। নিজের দু’-দুটো সদ্যোজাত বাচ্চাকে হারাবার পরও যে মানুষটা ভগবানে ভরসা করছে তার কথার উত্তরে কী বলা যায়?

একটা কিংবা অনেকগুলো আশ্চর্য কারণে বাংলার ডাক্তাররা সিজ়ার ছাড়া নর্মাল ডেলিভারি করানো ছেড়ে দিয়েছেন। গত পনেরো-কুড়ি বছর ধরেই হাসপাতাল কিংবা নার্সিংহোমে শতকরা পঁচানব্বইটা ডেলিভারি সিজ়ারিয়ান। প্রশ্ন করলেই, হাজার ‘নেই’-এর খতিয়ান। বেড নেই, ব্যবস্থা নেই, সর্বোপরি, সময় নেই। কিন্তু ধরে নিতে হবে যে, সব পেশেন্টেরই প্রচুর টাকা আছে। এবার টাকার ‘ফ্লো’ সবটাই নিয়ন্ত্রণ করে বলে, কাঁচি ছাড়া জন্ম প্রায় নিষিদ্ধ এখানে। বিদেশে প্রায় সবার ‘নর্মাল’ হয় কী করে প্রশ্ন করলে শুনতে হবে, এটা কি বিদেশ? এখানে বারোঘণ্টা লেবার পেনের সুপারভাইজ়রি করবে কোন ডাক্তার? ততক্ষণে আরও চারটে ডেলিভারি হয়ে যাবে।

কোনদিকে যাচ্ছে সমাজ সেই প্রশ্ন করবে কে? পালটা প্রশ্ন উঠবে, নিচুমানের কাঁচামাল দিয়ে নির্মাণ করে না ইঞ্জিনিয়াররা? বাস থামিয়ে ঘুষ নেয় না পুলিশ? ক্লাসে না দিয়ে কোচিং-এ আসল নোটসগুলো দেয় না শিক্ষক-অধ্যাপকরা? কে কাকে সততা নিয়ে প্রশ্ন করবে? কার হিম্মত আছে?

তবু তার মধ্যেও অনেক ডাক্তার রয়েছেন যাঁরা সুযোগ পেলে নর্মাল ডেলিভারিই করাতেন, কিন্তু আমাদের ‘সিস্টেম’ সেই সুযোগটা দেয় না তাঁদের। আর সেই সিস্টেমের ভিতর ঢুকে বাঁচতে হলে কারই বা অন্যরকম কিছু করার থাকে?

দুপুর একটা চল্লিশ নাগাদ অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার আর আমার ছেলে হওয়ার খবরটা যেন দুটো ঠোঁট হাওয়াকে বলল, হাওয়া জলকে বলল, জল গিয়ে বলল নৌকাকে, যে যাত্রা শুরু করার আগে থমকে ছিল।

এটা অস্বীকার করব না, ঝুমা কনসিভ করার মুহূর্ত থেকেই আমি মনে মনে মেয়ে চাইতাম। ঝুমার প্রবল বাসনা ছিল, ছেলে হবে, তাই মুখে কিছু বলতাম না। কিন্তু আজ আমার সন্তান জন্ম নিয়েছে খবরটা পেয়ে, ওইসব ইচ্ছে টিচ্ছে কোথায় তলিয়ে গেল। মনে হল, যে এসেছে সেই আমার সাত রাজার ধন এক মানিক। তা নইলে তাকে দূর থেকে দেখেই এরকম শিরশির করে উঠছে কেন সর্বশরীর?

একজন সিস্টার আর একজনকে জিজ্ঞেস করছিলেন, বাচ্চা কেঁদেছে কি না। মা নিজে তো নিজের বাচ্চাকে কাঁদাতে পারে না, চাপড় মেরে কাঁদানোর কাজটা একজন নার্সকেই করতে হয়।

সুধাদি আমার পাশেই ছিলেন। আধো অচেতন ঝুমার পাশে ওই রক্তমাংসের পুঁটুলিটাকে একদৃষ্টে বেশ খানিকক্ষণ দেখে বলে উঠলেন, “তোমার ছেলের চোখের মণি নীল। এ কোন নীলকর সাহেব এল বলো তো?”

আমি হেসে ফেললাম। কিন্তু হাসতে গিয়েই মনে হল, যে ভদ্রমহিলার পাশে দাঁড়িয়ে হাসছি, তিনি নিজের দুই সন্তানকে হারিয়েছেন। পরক্ষণেই মনে হল, সেই মৃত্যুগুলোর জন্য আমি তো দায়ী নই কোনওভাবে। নিজের আনন্দের মুহূর্তে অন্যের যন্ত্রণা স্মরণ করে গোমড়া মুখে বসে থাকতে পারে কে?

নার্সিংহোম থেকে রাস্তায় বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। ধরাতেই মাথার ভিতর একটা ঘন্টি বেজে উঠল যে, এবার ছেলের জন্য এই সাধের বস্তুটিকে ছাড়তে হবে। অন্তত ঘরে তো বটেই। তবু আরামসে দু’টান দিয়ে সেই জাপানি সিনেমাটার কথা মনে পড়ে গেল, যেটায় অন্ধ মায়ের সেবার পয়সা জোগাতে মেয়ের কাছে অন্ধ সব পুরুষেরা এসেছে। সেই মুহূর্তে ঘৃণা-ভালবাসা সব তুচ্ছ করে অন্ধ বাৎসল্য আমায় গ্রাস করল। আমি চোখ বুজেও কালো দেখতে পেলাম না বন্ধ চোখের পরদায়। নীল। সবটাই নীল।

১০

‘নীলাদ্রি’ ‘নীলাকাশ’ ‘নিলয়’ ভাবতে ভাবতে শেষ অবধি আমাদের ছেলের নাম হল, নীলাব্জ। আমি আর একটু খোঁজার পক্ষপাতী ছিলাম, কিন্তু ঝুমার এই নামটাই পছন্দ হয়ে যাওয়ায় রাজি হয়ে গেলাম। অন্যরকম বাবা হওয়ার যে প্রতিশ্রুতি নিজেই নিজেকে দিয়েছিলাম, নাম রাখার ব্যাপারে ঝুমার মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া সেটারই প্রথম ধাপ। ডাকনাম অনেকগুলো উঠে এসেছিল, তার মধ্যে মুখে মুখে সবচেয়ে বেশি ঘুরতে লাগল, কুটুস।

পরিবর্তন যেটা হল সেটা এই যে, ছেলেকে নিয়ে ঘরে ফেরার পর থেকেই ছেলে ছাড়া জগৎসংসার সম্পর্কে উদাসীন হয়ে গেল ঝুমা। কুটুসের জন্মের পর প্রায় দু’মাস আমাদের সঙ্গেই ছিলেন সুধাদি। উনি থাকায় বিরাট সুবিধা হয়েছিল আমাদের, কিন্তু ওঁরও তো নিজের ঘরবাড়ি আছে। তবু আমার অনুরোধে হয়তো আরও কিছুদিন উনি থেকে যেতেন। কিন্তু সব হারানোর অভিজ্ঞতায় সুধাদি বুঝতে পেরেছিলেন ছেলের উপর প্রবল অধিকারবোধ থেকে ঝুমা খুব শিগগির ওঁকেও ভুল বুঝবে। যখনই কুটুসের ব্যাপারে ঝুমার কোনও একটা সিদ্ধান্তকে মানতে পারবেন না উনি, তখনই ঝুমার মনে হবে নিজের বাচ্চারা মারা গিয়েছে বলে ঝুমাদি জ্যান্ত বাচ্চার মায়ের প্রতি ঈর্ষাকাতর।

“বাচ্চা তো আরও অনেকেরই হয়। কিন্তু সবাই তো ঝুমার মতো রাগী হয়ে যায় না। কুটুস জন্মানোর পর থেকেই ঝুমার ভিতরে এত রাগ এল কোত্থেকে?” একটা ছুটির দিনে আমি সুধাদিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

ঝুম ধারেকাছে নেই, নিশ্চিত হয়ে সুধাদি জবাব দিলেন, “যখন কাউকে ভীষণ ভালবাসতে শুরু করি আমরা, সেই সময় তার প্রতি সমস্ত মনোযোগটা গিয়ে পড়ে। আর তখন তার সঙ্গে সম্পর্কের নিবিড়তার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে এমন কিছুর উৎপত্তি হলেই সেটার উপর প্রচণ্ড রাগ জন্মায়। অতএব রাগ যে সবসময় খারাপ কিছু তা নয়। ভালবাসা থেকেও রাগ হয়। আমি আমার দেশটাকে ভালবাসি, এবার সেই দেশটাকে কেউ ধ্বংস করতে চাইছে আমার তখন রাগ হবে না? সত্যিকারের প্রেমিক বা প্রেমিকা অধিকাংশ সময় মিষ্টি নয়, একটু বদরাগীও বটে। ভালবাসার অভিঘাতটাই রাগ হয়ে ফুটে বেরোয়।”

“কিন্তু আমরা তো আর কুটুসকে ধ্বংস বা নষ্ট করতে চাইছি না কেউ।” আমি হতাশ গলায় বললাম।

সুধাদি উত্তরে কিছু একটা বলতেন হয়তো। কিন্তু ঝুমা ততক্ষণে স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে।

সুধাদি, ঝুমার প্রতি অসম্ভব স্নেহে চুপ করে গেলেও, সবাই তো আর অত সংবেদনশীল হবে না। কুটুসের অন্নপ্রাশনের আগে ওকে আর ঝুমাকে নিয়ে যে-অফিস পার্টিটায় গিয়েছিলাম, সেখানেই কাজিয়া বাধল তাই।

আমার কলিগ কৌশিকের বউ প্রেরণা একরকম অপমানই করল ঝুমাকে, “এরকম প্যানিক করছ কেন? আমারও তো বাচ্চারা ছোট ছিল। আর আমার সময় নির্দিষ্ট করা ছিল তখন যে, দিনে ওই তিনবারই তারা খাবে। যখনই বাচ্চা চিৎকার করল তখনই ছুটে গেলাম লোকজনের মধ্যে ব্লাউজ় খুলে দুধ খাওয়াতে, দেখলেই অসহ্য লাগে আমার। আমি তো আমার বাচ্চাদের একবছর হয়ে গেলেই আলাদা শোওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।”

“বাচ্চা কি কলের পুতুল যে, তার খাওয়াটা কোথাও কোনও সুপার কম্পিউটারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে?” ঝুমা আগুন চোখে তাকাল প্রেরণার দিকে।

“আরে বাবা, বাচ্চার মা নিজেই তো একটা সুপার কম্পিউটার। সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না? আমার বাচ্চারাও কেঁদেছে, কিন্তু কাঁদতে কাঁদতে সাতদিন পরে বুঝে গেছে কেঁদেকেটে কোনও লাভ হবে না। যখন পাওয়ার তখনই পাবে। এটা আসলে নির্ভর করে মায়ের উপর। মাকে প্রথম থেকেই শিক্ষাটা দিতে হয়। বাচ্চা যদি বুঝে যায় সে কাঁদলে পরেই তাকে কোলে নিয়ে আদর করা হবে, তা হলে মুশকিল।”

“মুশকিল হলে আমার মুশকিল। তুমি দুশ্চিন্তা করছ কেন? আমার বাচ্চাকে আমি এভাবেই মানুষ করব। আমার, ইন ফ্যাক্ট, এত যৌন খিদে নেই যে, বাচ্চা জন্মানোর ছ’মাসের মধ্যে তাকে আলাদা বিছানায় শুইয়ে রেখে কপোত আর কপোতী মিলে একসঙ্গে শুতে হবে,” ঝুমা বার্স্ট করল।

কথাটা যেন আগুন ধরিয়ে দিল ঘরটায়।

প্রেরণা চিৎকার করে উঠল, “যৌন খিদে মানে? তোমার এতবড় স্পর্ধা যে, আমাকে অপমান করছ তুমি? তোমার বাচ্চাটা কীভাবে তোমার পেটে এসেছে শুনি? চয়নের সাথে কিছু করতে হয়নি তোমায়? নাকি, বাচ্চা দেওয়ার অন্য লোক ছিল?”

প্রেরণার সাথে অফিসেরই এক বসের পরকীয়া নিয়ে বাজার সরগরম ছিল কিছুদিন। সেই গল্প ঝুমাকেও করেছিলাম তখন। ভেবেছিলাম ভুলে গিয়েছে, কিন্তু প্রেরণার বাজে কথার উত্তর দিতে গিয়ে ঝুমা সেই প্রসঙ্গ তুলল।

কৌশিক মদ খেয়ে পুরো আউট ছিল বলে ঝগড়ার ভিতরেই ঢুকতে পারেনি; আমি ঝগড়াটা থামাব বলে ঝুমার হাত ধরে টেনে ওকে ওই ঘরটার বাইরে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। প্রেরণা তখনই আবার বোমা ফাটাল।

“ওই বছর বছর বাচ্চা দেবে আর বাচ্চাকে দুধ খাইয়ে ঝোলা বুক নিয়ে ঘুরবে ফিরবে। এই হচ্ছে গিয়ে এদের জীবনের অ্যাম্বিশন।”

মরবি তো মর কথাটা সেই ঝুমার কানেই গেল। ঝুমা আবারও চিৎকার করে উঠল, “বাচ্চাকে দুধ খাইয়ে বুক ঝুলে গেলে আমার কোনও প্রবলেম নেই। আমার বুক তো হেরিটেজ সাইট নয় যে, অনেকে টিকিট কেটে দেখতে আসবে।”

ব্যাপারটা আরও নোংরামির দিকে যাওয়ার আগে আমি একরকম জোর করেই ঝুমা আর কুটুসকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম।

রাস্তায় বেরিয়ে ঝুমা কাঁদতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে কুটুসের মুখটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল, “বাচ্চা যখন চাইবে তখনই তাকে খাওয়ানো একজন মায়ের তাপরাধ? বুক যাতে না ঝুলে যায় সেটা দেখাই কি একটা মেয়ের প্রাথমিক কর্তব্য? ওরা ওগুলো কী বলছিল?”

“বাদ দাও না, অত ধরতে নেই।” আমি ভাড়া করা গাড়িটার দিকে এগোতে এগোতে বললাম।

“আমি তো ধরতে চাইনি। আমি তো আমার ছেলেকে নিয়ে দারুণ আছি। তুমি কেন এখানে, এদের মধ্যে নিয়ে এলে আমাকে?”

আমি ঝুমার অভিযোগের মুখে চুপ করে গেলাম। জলপ্রপাতের উচ্ছ্বাস যুক্তি দিয়ে থামানো যায় না। ঝুমার ভিতরে আবেগের যে সুনামি, তার সামনে দাঁড়াবে এমন সাধ্য কার?

ঝুমার কাছে কুটুস যেন এভারেস্টের চূড়া। কিংবা মধ্যরাতের সূর্য। বাকি পৃথিবীর কাছে তো নয়। যে পৃথিবীতে রাস্তায়, ফুটপাথে, ব্রিজের নীচে, বস্তিতে, শরণার্থী শিবিরে প্রতিদিন অসংখ্য বাচ্চা জন্মাচ্ছে, বেড়ে উঠছে, ভ্যাকসিন পাচ্ছে বা পাচ্ছে না, বেবি ফুড খাচ্ছে কিংবা মাটিতে বসে নিজের বিষ্ঠা নিজেই খুঁটছে সেই পৃথিবীতে একটা নতুন বাচ্চার জন্ম নিয়ে কেউ ভাবিত নয়। কুটুস আমাদের কোহিনুর হতে পারে কিন্তু অন্যের কাছে সে কী? তারা ওকে নিয়ে ব্যস্ত হবে কেন?

কিন্তু ঝুমা তো আমার কাছে স্ট্যাটিস্টিক্সের ক্লাস করতে চাইছিল না, মা হওয়ার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি চাইছিল। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বসে থেকে বুঝছিলাম, কীভাবে মাতৃত্ব পালটে দেয় একটা মেয়েকে।

হয়তো সেটাই স্বাভাবিক। বাথরুমে, বিছানায়, প্যান্টে, পাজামায় যা ঝরে পড়ে, নষ্ট হয়, তাকেই ভিতরে নিয়ে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্ত-মাংস দিয়ে লালন করে একটা মেয়ে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস।

জন্মের পরও সেই ছোট্ট পুতুলটা মায়ের থেকেই শুষে নেয় নিজের জীবনধারা। সমস্ত মৃত্যুর মধ্যেও সেই ধারা কখনও শুকোয় না। পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরও তৃষ্ণার সেই বন্ধন ছেঁড়ে না, যা বাচ্চাকে নিয়ে যায় মায়ের বুকে।

“প্রেরণা কী বলল না বলল, তাই নিয়ে সত্যিই এত ভাবার দরকার আছে কি? ও কে যে, এত পাত্তা দিচ্ছ?”

“ওকে পাত্তা দিচ্ছি না। ভাবছি পৃথিবীটা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, পাঁচ মাসের ছেলের জন্যেও জবাবদিহি করতে হবে!”

ঝুমার কথার ভিতরেই কুটুস কেঁদে উঠল। ঝুমা অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় কুটুসকে তুলে নিয়ে নিজের বুকে আঁকড়ে ধরল, যেভাবে রাতের আকাশ আঁকড়ে ধরে তারাকে। মা আর সন্তানের সেই দৃশ্যের সামনে বসে আমার শুভাঞ্জনার কথা মনে পড়ল।

মনে হল, শুভাঞ্জনাকে এই ছবিটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করি, পৃথিবী কিংবা মহাপৃথিবীতে এর চাইতে বড় শিল্প হয়?

১১

মা জবুথবু হয়ে পড়েছিল কিন্তু কুটুস আসার পরে যেন নতুন একটা শক্তি এসে ভর করল মায়ের মধ্যে। ছেলেটা কখন খাবে, কখন স্নান করবে, কাশি হলে কী ওষুধ, পেটের ব্যথায় কোনটা, মা একেবারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল। উলটোদিকে ঝুমা, কুটুসের প্রতিদিনকার খাবারে কতটা ভিটামিন, কতখানি মিনারেল তার চুলচেরা হিসেবে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দু’দিক থেকে দু’জন আমার মাথা চিবিয়ে খেতে শুরু করল এমনভাবে যে, মাঝে মাঝে মনে হত, উফ কী কুক্ষণে বাবা হতে গেলাম!

ঝুমার আর আমার সেক্স-লাইফ বলে বিশেষ কিছু অবশিষ্ট ছিল না। কখনও দু’-চারটে চুমুর পর আর একটু ঘনিষ্ঠতার দিকে এগোতে যেতাম না তা নয়, কিন্তু মাঝপথেই কুটুস কেঁদে উঠত কিংবা বমি করত অথবা একটা সাইক্লোন-ফাইক্লোন আসত পৃথিবীতে, আমি আর ঝুমা পরস্পরের থেকে অনেকটা দূরত্বে ছিটকে যেতাম; আবারও।

“আমাদের জীবন এখন আর আমরা চালাই না। আমাদের বাচ্চাটা চালায়। জানি না কতদিন এভাবে চলবে।” আমি সন্দীপদাকে বলেছিলাম।

“এটা এখন থেকে চলতেই থাকবে। সময়টা আর আমরা যেরকম দেখেছিলাম, সেরকম নেই, বদলে গেছে পুরোপুরি। এখন বাচ্চারা চালায় পরিবারকে। কী রঙের ফ্রিজ কেনা হবে থেকে শুরু করে কোন মডেলের গাড়ি, সব বাচ্চারাই ঠিক করে, বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত পরিবারে। সেই কারণে দেখবে এখন সব ভোগ্যপণ্যের বিজ্ঞাপনে, বাচ্চাদের কত বেশি বেশি করে দেখা যায়।”

“কিন্তু তার ফল কি খুব একটা ভাল হয়?” আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম সন্দীপদাকে।

“ফল নিয়ে কে ভাবছে ভায়া! ফুল তুলতে তুলতেই সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে যাচ্ছে।” সন্দীপদা জোরে হেসে উঠেছিলেন।

আমাদেরই অফিসের একটা পিকনিকে সন্দীপদার সঙ্গে আলাপ, যদিও সন্দীপদা চাকরি করতেন অন্য একটা সংস্থায়। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যাদের সংস্থা, পদমর্যাদা কিংবা প্রোটোকল দিয়ে বাঁধা যায় না, সন্দীপদা তাদেরই দলে। আলাপ হওয়ার মাসখানেক পরে আমায় একদিন রাস্তা থেকে ডেকে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়েছিলেন সন্দীপদা। বাড়ির কাছাকাছি নামিয়ে দিয়েছিলেন।

“আপনি বাড়ি না ফিরে কোথায় চললেন এখন?” আমি গাড়ি থেকে নেমে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

“আমার কি আর বাড়ি ফেরার উপায় আছে ভাই? কল্লোলের বউ কুহু গায়ে কেরোসিন ঢেলে বসে আছে, কল্লোলের উপর রাগ করে। এখন আমাকে মহারানির মেজাজ ঠান্ডা করতে হবে বুঝিয়ে বাঝিয়ে। নইলে কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে যায়!”

“এরকম কাণ্ড করেছেন সেই ভদ্রমহিলা আপনি জানলেন কী করে?”

“আমাকে ফোন করে জানাল তো। এখন এই নতুন যন্ত্রটি এসেছে না! যখন যাকে চাই, হাতের নাগালে।” সন্দীপদা বুকপকেট থেকে বের করে নিজের মোবাইল ফোনটা দেখালেন।

ক’দিন আগে আমিও একটা ফোন কিনেছি, ঝুমার তাড়নায়। ঝুমা নিজে একটা ফোন কেনার পাশাপাশি আমাকে দিয়েও কিনিয়েছে যাতে দিনে বারোবার আমাকে ফোন করে জানাতে পারে, কুটুস গোলাপি পায়খানা করেছে নাকি সবুজ।

“আপনার কপাল সত্যিই চৌখস সন্দীপদা। বন্ধুর বউ ভেজা গায়ে, সিক্ত বসনে আপনাকে কল করছে। উফ ভাবলেই রোমাঞ্চ হচ্ছে। বাই দ্য ওয়ে, এই ভদ্রমহিলা আপনার প্রেমিকা নাকি?”

“না রে, ভাই। প্রেমিকা হলে কি গায়ে কেরোসিন ঢেলে ডাকে? ময়েশ্চারাইজার মেখে টেখে…”

“কেন, কেরোসিনের গন্ধই বা খারাপ কী? আপনি গাড়ি ঘুরিয়ে যান তাড়াতাড়ি। বেশি দেরি হলে আবার ডিজেল, পেট্রোল না ঢেলে নেয়।”

“সেই ভয়েই তো মহুয়াকে যেতে বললাম কুহুর কাছে। মহুয়া একটু ঠান্ডা করুক কুহুকে। আমি পৌঁছচ্ছি তারপর।”

“মহুয়াটা আবার কে? আপনার জীবনে তো দেখছি নারীর ছড়াছড়ি।”

“আরে, মহুয়া তোমার বউদি, আই মিন আমার বউয়ের নাম। ওর সঙ্গে কনসাল্ট না করে পরোপকার করতে যাই না আমি।”

“ধুস! আপনি একদম বোগাস সন্দীপদা। শেষে বউদিকে সঙ্গে নিয়ে অন্য এক অভিমানিনীকে উদ্ধার করতে যাচ্ছেন? কী হবে আপনার দ্বারা?”

“যা হয়েছে, তাই এনাফ। এখন ছেলেটা তোমাদের আশীর্বাদে ঠিকঠাক মানুষ হয়ে গেলেই আমরা বুড়ো-বুড়ি ঝাড়া হাত-পা। তোমার হয়তো মনে হবে যে, আমি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছি কেন? ব্যাপারটা কী জানো? প্রত্যেকটা মানুষই অনেক ক্ষোভ, যন্ত্রণা, রাগ বয়ে বেড়াচ্ছে। আর এই সব সে রিলিজ় করতে চায়। কিন্তু উলটোদিকের মানুষটাকে সে দেখছে কালা হয়ে ঘুরে বেড়াতে। এমনই বদ্ধ কালা যে কোনও কান্না, কোনও আর্তনাদ শুনতে পায় না।

“আপনি যে শুনতে পান তাতে কষ্ট বাড়ে না আপনার?”

“হয়তো বাড়ে। কিন্তু সেই বাড়াটা তাৎক্ষণিক। যে-মুহূর্তে অন্য কারও একটু কাজে আসি, এমন একটা স্বর্গীয় আনন্দ হয়, বলে বোঝাতে পারব না। আসলে শুধু নিজের জন্য, নিজের ফ্যামিলির জন্য বাঁচা এমন কষ্টকর, গ্লানি ছাড়া আর কিছুই বাড়ে না তাতে।”

মহুয়া বউদি আর ওদের ছেলে বিভাবকে নিয়ে একদিন কুটুসকে দেখতেও এসেছিলেন সন্দীপদা। ঝুমার ‘ছেলে-ছেলে’, মায়ের ‘নাতি-নাতি’ করে আতিশয্য বুঝে নিয়েছিলেন দশ মিনিটের মধ্যে।

ডিনারের পর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়ে আমাকে বললেন, “বাচ্চার ছোট থেকে বড় হওয়ার সময়টা হাতের তালুতে জলের মতো। কখন যে জলটা গলে পড়ে যাবে আঙুলের ফাঁক দিয়ে, তুমি টেরটিও পাবে না। তাই যতদিন জলটা হাতে লেগে আছে ততদিন এই সামান্য বাড়াবাড়িটুকু এনজয় করো।”

বাড়াবাড়ি অবশ্য প্রকৃতির নিয়মেই কমে যায় একদিন। ঝুমার মায়ের ক্যানসার ধরা পড়তে যখন ওঁকে নিয়ে আমি মুম্বই গেলাম, ঝুমা কলকাতা থেকে মিনিটে মিনিটে ফোন করত। কিন্তু কলকাতায় ফিরে আসার পনেরো দিনের মধ্যে যখন মারা গেলেন আমার শাশুড়ি, ব্যাপারটা এত শান্তভাবে অ্যাকসেপ্ট করল যে, অবাক হয়ে গেলাম আমি নিজে।

“মানুষ একবার ‘বডি’ হয়ে গেলে আর কিছু করার নেই। যতক্ষণ সে বডি হচ্ছে না, লড়াই ততক্ষণ।” ঝুমা গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে বলেছিল আমাকে। ওর দাদা তখন ওদের মায়ের অস্থি ভাসিয়ে দিচ্ছে জলে।

সহজভাবে নিতে পারলেই যে একটা মৃত্যুর অভিঘাত কিছু কম হবে তা নয়। বরং বেশিও হতে পারে। ঝুমার সময়ে সময়ে চুপ করে যাওয়া, ঘুমের ভিতরে কেঁদে ওঠা আমাকে একটা সংকেত দিয়ে যেত। আমি সেই সংকেতটাকে মান্যতা দিয়েই দার্জিলিং গেলাম ঝুমা আর কুটুসকে নিয়ে। বাড়িতে সবসময়ের কাউকে ঝুমা নিজেই রাখেনি। ওর বক্তব্য ছিল, বাড়ি হলে তাও হত, কিন্তু একটা ফ্ল্যাটে পরিবারের বাইরের কেউ থাকলে প্রাইভেসি বলে কিছু থাকে না আর। কুটুস আসার পর কাজ অনেক বেড়ে গেলেও ঝুমা নিজের অবস্থান থেকে নড়েনি।

আমি প্রথম প্রথম খুব তর্ক করতাম ঝুমার সঙ্গে এটা নিয়ে।

ঝুমা হঠাৎ একদিন কেঁদে ফেলল, “আমি কি তোমার অফিসে তুমি কী করবে তাই নিয়ে কিছু বলতে যাই? তুমি এই ফ্ল্যাটটুকুর ভিতরে আমার নিয়মই চলতে দাও না!”

লজ্জা পেয়ে গিয়েছিলাম আমি। রাতে ওর ঘুম ভাঙিয়ে বলেছিলাম, “আই অ্যাম সরি। এই ফ্ল্যাটের চৌহদ্দির মধ্যে তুমি যে-নিয়ম চাইবে সেই নিয়মই চলবে।”

সকালে এসে সন্ধে অবধি থাকত যে-দু’জন, তাদের ভিতরেই একজনকে ঝুমা দায়িত্ব দিয়ে গেল মায়ের দেখভালের। আর দার্জিলিং পৌঁছনো ইস্তক ফোনে খবর নিত, দিনে তিনবার-চারবার।

কুয়াশার জন্য কাঞ্চনজঙ্ঘা যে খুব বেশি দেখতে পাচ্ছিলাম, তা নয়। কিন্তু ঝুমার ইচ্ছেমতো ম্যালটাকে পাক দিয়ে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত হাঁটতাম। খুব হাঁটতে ভালবাসত ঝুমা। ওর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে মনে হত, পৃথিবীর সব অসুখ, সমস্ত কষ্ট মানুষ যেন হেঁটে হেঁটেই পার হয়ে যেতে পারে।

অনেক হাঁটাহাঁটির ভিতরে একদিন বুদ্ধমন্দিরে ধ্যান করতে বসেছিলাম ঘণ্টাখানেক। ধ্যান মানে চোখ বন্ধ করে বসে থাকা। সামনের দিকে তাকানো চোখদুটোকে বন্ধ করে পিছনের পথটা কীভাবে পাড়ি দিয়েছি তার একটা খতিয়ান পাওয়া। কিন্তু অল্প একটু সময়ের জন্য শান্ত হয়ে বসে থাকতে দিল না কুটুস। লাফালাফি আর চিৎকার করে পুরো নরক গুলজার করে তুলল। আশেপাশে বসে যাঁরা ধ্যান করছিলেন, অসুবিধে হচ্ছিল তাঁদের। আমি ওকে নিয়ে বেরিয়ে যাব বলে, হতাশ হয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

“বাচ্চাকে বাচ্চার মতো যা খুশি করতে দাও না। কুটুস কী করছে না করছে, তাই নিয়ে তুমি এত বদারড হচ্ছ কেন?” ঝুমা জিজ্ঞেস করল।

“দ্যাখো ঝুমা, আমাদের বাচ্চার জন্য অন্য দশজনের যদি প্রবলেম হয়, তা হলে তার দায়িত্ব আমাদেরই। এটা মানুষের মেডিটেশন করার জায়গা। এখানে কেউ যদি বাঁদরের মতো নাচে আর শেয়ালের মতো চেঁচায় তা হলে সেটা অন্যায়। এবার অন্যায়টা আমার ছেলে করলেই তো আর সব দোষ স্খালন হয়ে যায় না।”

“তুমি এত ভদ্রলোক, তোমার ছেলের ভিতরে এমন বাঁদরের স্বভাব, শেয়ালের মর্জি কোত্থেকে এল, ভগবান জানে।” ঝুমা ব্যঙ্গ করল নাকি মন থেকে বলল, বুঝতে পারলাম না।

ঝুমার সেই কথাটাই যেন শতগুণ জোরে আমার কাছে ফিরে এল যখন মা একদিন বহু পুরনো একটা সাদা-কালো ছবি আমার মুখের সামনে ধরে বলল, “তোর বাবার বাচ্চা-বয়সের ছবি। ট্রাঙ্কের ভিতর থেকে গিয়েছিল, কাল খুঁজে পেলাম। কুটুসের সঙ্গে মুখের কী মিল দ্যাখ!”

প্রায় ষটবছর আগেকার একেবারে ধূসর হয়ে যাওয়া একটা ছবি। পাটপাট করে চুল আঁচড়ানো একটা বাচ্চার ওই ছবির সঙ্গে সত্যিই কি কোনও মিল আছে আজকের কুটুসের? ছবিতে বাচ্চাটার যা বয়স কুটুসেরও এখন প্রায় তাই, এটা ছাড়া আর তেমন কোনও মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। জায়গায় জায়গায় ছোপ ধরা ওই ছবিটা দেখে বিশেষ কিছু বোঝাই যায় না। তবু ক্রমাগত বলে গেলে গল্পের ঠাকুরমশাইও যেমন মেনে নেন যে, তাঁর কাঁধে ছাগল নয় কুকুর রয়েছে, আমারও তেমনই মনে হতে শুরু করল সত্যিই অনেক মিল, আমাকে জন্ম দেওয়া লোকটার সঙ্গে আমার ছেলের। পিতৃহৃদয় থাকুক না থাকুক, বাবা তো বাবাই। আর আমার বাবা, আমার ছেলের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হবে না তো কার মধ্যে দিয়ে হবে?

“কে জানে বেঁচে আছে কি না লোকটা? থাকলে কেমন আছে?” মা বিড়বিড় করল।

প্রশ্নটা আমার ভিতরে একটা গহ্বর খুঁড়ে ফেলল সহসা। সেই ঘটনা-দুর্ঘটনা পেরিয়ে আদৌ কি বেঁচে রয়েছে লোকটা? কিন্তু মরার খবরও তো পাইনি। এতদিন পর না বেঁচে থাকার সম্ভাবনাই প্রবল, কিন্তু বেঁচে যদি থাকে তবে কোথায় আছে?

সেই প্রশ্নের ঠেলায় আমি বহু-বহুদিন পর আমার শৈশবের পাড়ায় ফিরে গেলাম, স্রেফ একটা খবরের জন্য। আছে?

সময় নিজে প্রবলভাবে থাকে বলেই, বাকি সব ‘থাকা’গুলো ‘নেই’ হয়ে যায় পলকে। আমাদের বাড়িটাকেই তাই খুঁজে পেলাম না আর। কিন্তু গেল কোথায়? ওই তো সেই বটগাছটা যার নীচে আমিও ঘুমিয়েছি। একটা বেদি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে এখন গাছটাকে ঘিরে। একটু এগোলেই যে জোড়া কৃষ্ণচূড়া ছিল, তারা অবশ্য উধাও। ডানদিকে বাঁক নিলেই একটা নবগ্রহ মন্দির ছিল মঞ্জুমাসিমাদের একতলায়, কিন্তু সেই বাড়িটা এখন পাঁচতলা ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। চার পা এগোলে একটা হনুমান মন্দির হয়েছে, এটা নতুন। মঙ্গলবার বলেই হয়তো প্রচুর ভিড় তার সামনে। সেই ভিড়ের একজনকেই আমি আমার বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞেস করলাম। সে কিছু বলতে না পারায়, একটু বয়স্ক একজন লোককে।

“বোসদের পুরো ফ্যামিলিটাই কীরকম কপ্পুরের মতো ভ্যানিশ করে গেল৷” লোকটা আমার বাবার নাম শুনে বলল।

“ফ্যামিলির সবাই? কেউ থাকত না বাড়িতে?”

“বউ আর ছেলেটা কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিল। মরে ফরে গেসল বোধহয়। লোকটা আবার বিয়েও করেছিল শুনেছি। কিন্তু সেই বউকে দেখিনি। আর কেউ দেখেছে বলেও শুনিনি। যাকেই জিজ্ঞেস করতাম, সেই বলত যে শুনেছে। ঘর থেকে গভীর রাতে চপল বোসেরই আওয়াজ ভেসে আসত। তারপর একদিন বন্ধ হয়ে গেল আওয়াজটা কোথায় যে বিবাগী হয়ে গেল চপল বোস…”

আমি ততক্ষণে জয়রাম রক্ষিতকে চিনে ফেলেছি। অনেক পেয়ারা চুরি করেছি ওর বাড়ির বাগান থেকে। একবার ধরা পড়ে কানমলাও খেয়েছিলাম। অথচ এখন আমার সামনে দাঁড়িয়েও আমাকে চিনতে পারছে না বুড়ো।

আমিও নিজের বাড়ির সামনে দিয়ে দু’বার ঘুরে গেলেও বাড়িটা চিনতে পারিনি। কীভাবে পারব? আমাদের পাশের দাশগুপ্তদের বাড়ি আর আমাদেরটা মিলিয়ে বেশ একটা পেল্লাই চারতলা ফ্ল্যাট হয়েছে, আর তার গ্রাউন্ড ফ্লোরের সামনের অংশটা নিয়ে একটা চাইনিজ় হোটেল।

চাইনিজ় হোটেল? এই গলির ভিতরে? ভিতরে ঢুকে স্যুপ আর এক প্লেট চিলি ফিশ অর্ডার করে কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম, দোকানটা চলে কি না।

“সন্ধে সাতটা তো এখন, আর একঘণ্টা পরে এলে বসার চেয়ার পাবেন না হয়তো।” যে-ছেলেটা অর্ডার নিল, সেই সার্ভ করতে করতে বলল।

মাছটা ভাল হলেও, স্যুপটা জমাতে পারেনি। বেশি ঝাল। খারাপ লাগছিল না আমার অবশ্য। জিভে ঘোরাচ্ছিলাম, গিলে ফেলবার আগে। ঘোরাচ্ছিলাম বাঁধাকপির পাতা, লেটুস, লঙ্কার গুঁড়ো, তুলি আর আমার শৈশবের লাল সিমেন্টের মেঝে, রাতে খেতে বসার জন্য মায়ের ডাক।

হারিয়ে যা যায়, একেবারেই যায়?

১২

সরকারি অফিসের গয়ংগচ্ছ পরিবেশের মধ্যে কাজ করতে গিয়েও না করতে পেরে ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। আসলে সেই ছোট থেকে পরিশ্রমের ভিতরেই মুক্তি খুঁজে নিয়েছি বলে নতুন নতুন কাজে হাত দিতে, তারপর সেগুলো সম্পূর্ণ করতে খুব ভাল লাগত। মুশকিল হল, লাল ফিতের ফাঁস এমনই একটা জিনিস যে, তার ভিতরে পড়ে গেলে নতুন রাস্তা বের করা খুব মুশকিল। কানাগলির অন্য প্রান্তে যেতে যেতেই জীবন কেটে যায়।

ঠিক সেইসময়ই প্রসন্ন বরদারাজনের সঙ্গে একটা সাক্ষাৎ আমার জীবনের দিশা পালটে দিল। প্রসন্নর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল চেন্নাইয়ে একটা সেমিনারে গিয়ে। আমাকে আমার অফিস থেকে পাঠানো হয়েছিল, প্রসন্ন এসেছিল ওর সংস্থার হয়ে। সাধারণত দক্ষিণ ভারতীয়রা সদ্য পরিচিত লোকেদের সঙ্গে বিশেষ কথা বলে না; সে যদি ভিন্ন সংস্কৃতির হয় তা হলে তো আরওই নয়, কিন্তু প্রসন্ন সেদিক থেকে ব্যতিক্রমী। হোটেলের লাউঞ্জে কেবল নয়, মেরিনা সি বিচেও হাঁটতে হাঁটতে অনেক গল্প হয়েছিল ওর সঙ্গে।

প্রসন্নর দেওয়া ঠিকানা ফিকানা সংবলিত কার্ড অবশ্য হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি। ফোন নম্বরও সেভ করে রাখতে ভুলে গিয়েছিলাম। তাই সেদিন দুপুরে ‘ভিজ়িটর’ এসেছে শুনেও খুব কিছু গা করিনি। কোনও একটা কাজে ছিলাম বলে ভুলেই গিয়েছিলাম একপ্রকার। আবারও ফোন আসায়, একটু বিরক্ত হয়েই নীচে নেমে দেখি প্রসন্ন বসে আছে রিসেপশনে। মাথার সামনের চুলগুলো আর একটু হালকা হয়ে গেছে বলে, ওকে চিনতে এক সেকেন্ড বেশি লাগল আমার। তারপর সমুদ্রের একটা ঢেউই যেন নিয়ে গিয়ে ফেলল, সেই সি-বিচে, সেইসব বন্ধুতায়।

সেদিন রাতেই চেন্নাই ফিরে যাওয়া বলে প্রসন্নকে সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে আসতে পারলাম না, ছিমছাম একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসলাম আমরা।

“সাউথ ইন্ডিয়ান খাবারদাবারের সবচেয়ে ভাল দিকটা হচ্ছে, যতই খাও বেশি পয়সা খরচ হবে না। আর দ্বিতীয় যে-জিনিসটা আমার পছন্দের তা হল, এই স্টিলের গ্লাসে কফি।” আয়েশ করে বসতে বসতে বলেছিলাম আমি।

প্রসন্ন হাসতে হাসতে বলেছিল, “তুমি কি পয়সা কম লাগবে বলেই আমাকে এখানে নিয়ে এলে?”

আমি একটু লজ্জা পেয়ে বলেছিলাম, “মোটেই তা নয়। কিন্তু তোমার মতো কঠোর নিরামিষাশীকে তো বাঙালি হোটেলে মাছ-মাংস খাওয়াতেও নিয়ে যেতে পারি না।”

“বাঙালিদের অনেক এক্সেলেন্ট নিরামিষ পদ আছে। আমি যে-বাড়িটায় ছিলাম গত দু’দিন, তারা বৈষ্ণব। ফুললি ভেজিটেরিয়ান। অ্যান্ড ইউ নো, আই অ্যাম ইন লাভ উইথ মোচার ঘণ্ট অ্যান্ড ছানার ডালনা।”

“পরের বার যখন আসবে, আমি আমার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ওইসব খাওয়াব তোমাকে। প্লাস, কাঁচকলার কোপ্তা আর ধোকা বলে দুটো প্রিপারেশন খুব ভাল রাঁধে আমার বউ। তুমি খেলে বুঝবে।”

“দুঃখের ব্যাপার এটাই যে, আমি চেন্নাইতে এসবের একটাও পাব না।”

“বাঙালি ডেলিকেসি টেস্ট করার জন্য তো বাংলায় আসতে হবে বন্ধু।”

“বাট হোয়াই? জ্যোৎস্না উপভোগ করার জন্য কি চাঁদে যেতে হয়? আমি যদি কলকাতার সর্বত্র ইডলি-দোসা-সম্বর-উপমা পাই, শুধু দোকানে নয়, রাস্তায় গাড়ি ঠেলে লোকে এগুলো বিক্রি করে দেখলাম, তা হলে কেন চেন্নাইয়ের রাস্তায় মোচার তরকারি কিংবা রসগোল্লা বিক্রি হবে না?”

“আসলে যে-কোনও ব্যবসাতেই ক্যাপিটাল লাগে তো…”

প্রসন্ন আমায় থামিয়ে দিয়ে বলল, “পুঁজির সমস্যাটা সমস্যাই নয়। আজকের দুনিয়ায় ক্রাউড ফান্ডিং খুব পপুলার। ঝামেলাটা হচ্ছে, তোমরা বাঙালিরা ‘রিচ আউট’ করতে চাও না। কিন্তু এই গ্লোবালাইজ়েশনের যুগে রিচ আউট না করলে হবে কী করে? আর শুধু এখনই নয়, ইন এভরি এজ, যে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে, সেই সারভাইভ করেছে। ভাস্কো দা গামা আর কলম্বাস না থাকলে কোথাও কোনও কলোনি তৈরি হত না পাশ্চাত্যের।”

“ঠিকই বলেছ, এটা আমাদের বাঙালিদের একটা দোষ…”

“আজকের বাঙালিদের দোষ বলো। স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ কি ছড়িয়ে দেননি নিজেদের? না দিলে নোবেল প্রাইজ আসত? মিশন হত? ইউ নো, তামিলরা সাধারণত নিজেদের বাইরে কাউকে অ্যাকসেপ্ট করে না। ভারতের একটা অঙ্গরাজ্য হয়েও তামিলনাডু যেন একটা পৃথিবী। কিন্তু তামিল নয় এমন একজনকে তামিলরা অন্তরে গ্রহণ করেছিল। আর তিনি হলেন স্বামী বিবেকানন্দ। চেন্নাইয়ের রাস্তায় যে-পোস্টারগুলো বিক্রি হয় ফুটপাথে, তার মধ্যে তামিল না হয়েও ওই একজন থাকেন, তিনি বিবেকানন্দ। তোমরা তারপরও কেন যে…”

আমি প্রসন্নকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “কিন্তু লাস্ট তিরিশ বছর তামিলরা আর একজন অ-তামিলকে অন্তরে গ্রহণ করেছেন। এবং তিনি এমনই এক প্রতিভা যাঁর তুলনা গত দু’হাজার বছরের ইতিহাসে নেই।”

“কার কথা বলছ?” প্রসন্ন অবাক চোখে তাকাল।

আমি একটু থেমে বললাম, “দ্য গ্রেট রজনীকান্ত।”

পরের তিরিশ সেকেন্ড, আমাদের হাসির শব্দে চমকে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল ওয়েটাররাও।

প্রসন্ন কেবল আড্ডা দিতে নয়, আমাকে একটা প্রস্তাব দিতে এসেছিল। ও যে বিশ্বখ্যাত অটোমোবাইল সংস্থার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে আছে, তার সেলসে আমি জয়েন করি, প্রসন্ন চাইছিল।

‘সরকারি চাকরি ছেড়ে প্রাইভেটে? কেউ যায়?”

“মাইনে প্রায় ডবল হলে যায়। বিশেষ করে তারা, যারা পচে মরতে চায় না, যাদের ভিতরে শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হওয়ার বিপুল বাসনা। আর আমি এই উদাহরণটা কেন দিলাম বলো তো? আমরা প্রজাপতি নিয়েই কাজ করছি এখন। ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধা হবে যদি মন দিয়ে আমাদের গাড়ির কালারগুলো দ্যাখো।”

“অসামান্য লাগছে। এই নীল আর ওই পার্পলটা একদম চোখে এসে ধাক্কা মারছে। নতুন লঞ্চ হল এই মডেলগুলো?” আমি প্রসন্নর ল্যাপটপে ছবিগুলো দেখতে দেখতে বললাম।

“এই প্রডাক্টগুলো আগামী দশবছরের মধ্যে লঞ্চ করতে চাইছি আমরা। হোপফুলি পেরে যাব।”

“ওহ! এগুলো ভবিষ্যৎ! কিন্তু রং ছাড়া স্পেশাল কী?”

“রংটাই স্পেশাল। গাড়ির গায়ে থাকলে পরের পঁচিশ বছর আর রং করাতে হবে না গাড়ি। এই যে আমার ল্যাপিতে, প্রজাপতির ছবিগুলো দ্যাখো। প্রজাপতির ডানার রংটা যে-মৌল দিয়ে তৈরি, সেটা দিয়েই রংটা তৈরি করতে চাইছি।”

“কিন্তু রংটা পাবে কী করে? প্রজাপতির থেকে?”

“প্রজাপতির রং যে তন্তু দিয়ে তৈরি সেটাকেই আমরা আর্টিফিশিয়ালি তৈরি করব। ‘মৌল’টা একই থাকবে কিন্তু মৌলের উপাদান যাবে বদলে। দেবাশিস বলে একটি বাঙালি ছেলেও আছে আমাদের এই রিসার্চ টিমে। আমরা তোমাকেও চাইছি।”

আমি অবাক হয়ে গেলাম। কীভাবে এরা একটা গাড়িতে, একটা জড়বস্তুর মধ্যে, একটা উড়ন্ত পতঙ্গকে ধারণ করতে চাইছে ভেবে।

প্রসন্ন বলল যে, ওরা ব্যবসা স্প্রেড করতে চাইছে। কলকাতা থেকে মায়ানমার, ব্যাঙ্কক, সিঙ্গাপুর। প্রজাপতি যেভাবে তার পাখনা মেলে দেয়।

“আমি কলকাতা ছাড়তে পারব না, তাই…”

“তোমাকে কলকাতা ছাড়তে বলছে কে? তোমাকে তো ইস্টার্ন জোনের ডেপুটি হেড হিসেবেই চাইছি। অফ কোর্স ট্যুর থাকবে। বাট তোমার প্লেসমেন্ট কলকাতাতেই হবে।”

প্রসন্নর আহ্বানে সাড়া দেব কিনা ভাবতে ভাবতে ছোট্ট একটা ছুটিতে মাকে সঙ্গে নিয়েই পুরী গেলাম। কুটুস পেটে আসা ইস্তক জগন্নাথদেবের কাছে যেতে চাইছিল ঝুমা। কুটুসের হাত ধরে রাতের আধো-অন্ধকার বালির ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি অনেকগুলো ঝিনুক কুড়িয়ে এনেছিলাম। তাদের একটার ভিতরেও মুক্তো ছিল না কিন্তু ঝিনুক নিজেই এত সুন্দর যে, ভিতরে মুক্তো না থাকলেও কিছু যায় আসে না।

জীবনও তো তেমনই। তবুও সন্দীপদার ছেলে গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেল কেন?

পুরী থেকে ফেরার পরপরই খবরটা পেয়ে একদম ধসে গিয়েছিলাম আমি। এদিক-ওদিক থেকে শুনছিলাম অনেক কথা। কেউ বলছিল ছেলেটা নাকি নেশাভাঙ করত। কেউ বলছিল, দোষ সন্দীপদা আর ওর বউয়ের। ওরা জীবনে বাচ্চার মন বোঝার চেষ্টাই করেনি। কিন্তু পরিস্থিতি যাই হয়ে থাক, সাড়ে সতেরোর একটা ছেলে ওভাবে ঝুলে পড়বে কেন?

“ওর মা বকেছিল পিকলুকে একটু। সামনে জয়েন্ট, পড়াশোনায় ফাঁকি দিচ্ছিল বলে, যেরকম ক্যাজ়ুয়ালি বকে থাকে বাবা-মায়েরা। সেটা কি এমন বিরাট কিছু যার জন্য ওকে আমাদের এভাবে ছেড়ে চলে যেতে হল?” সন্দীপদা কাঁদতে কাঁদতে বললেন আমায়।

“একটু শক্ত হোন সন্দীপদা। বউদিকে বাঁচানোর জন্য এইটুকু আপনাকে হতেই হবে।”

“মহুয়া বাঁচবে? কীভাবে বাঁচবে? লোকজন তো ঘুরিয়ে ওকেই অ্যাকিউজ় করে যাবে, বাকি জীবন। কেমন করে কাউন্টার করব, ভেবেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ফ্রিজ আমার ছেলের পছন্দমতো, গাড়ি ওর কথামতো… ইস, ছোটবেলায় একটা ভাই কিংবা বোন চেয়েছিল, তখন যদি নিজেদের আরামের কথা না ভেবে আর একটা ইস্যু নিতাম, আজ এই সর্বনাশ দেখতে হত না। অন্তত ছোটটার থেকে খবর পেতাম, বড়টা কী ভাবছে।” সন্দীপদার কথা অসংলগ্ন হয়ে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে।

শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছিল, অবুঝ, ইনসেনসিটিভ প্রাণী তৈরি হচ্ছে প্রত্যেকটা ওয়ান-চাইল্ড ফ্যামিলিতে। সর্বনাশের সীমায় এসে দাঁড়িয়েছি আমরা, এরপর শুধু একটা বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়ার অপেক্ষা।

যে-স্বার্থপরতার বীজ আমরা সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে ভরে দিচ্ছি সন্তানের মধ্যে, সেই বীজই মহীরুহ হয়ে টলিয়ে দিচ্ছে বাবা-মা’র সম্পূর্ণ পৃথিবী। আমাদের একক বাচ্চারা ফ্রাংকেনস্টাইন হয়ে আমাদেরই আক্রমণ করতে ছুটে আসছে।

“আর একটা বাচ্চা চাইই আমাদের ঝুমা। ওই ‘ওয়ান চাইল্ড’-এর বিলাসিতাই ‘নো চাইল্ড’-এর সর্বনাশ নিয়ে আসে।”

ঝুমা শুধু বলল, “অফিসে তোমার এত চাপ, তোমার একার চাকরি…”

আমি ঝুমার মুখটা হাত দিয়ে চাপা দিয়ে বললাম, “চিন্তা কোরো না ঝুমা। টাকার চিন্তা কোরো না।”

“কোত্থেকে আসবে টাকা?” ঝুমা সরলভাবে জিজ্ঞেস করল।

আমি চুমুতে চুমুতে ওকে কাহিল করে দিতে দিতে বললাম, “লাগলে পরে, টাকা প্রজাপতি দেবে।”

১৩

আমি যে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রাইভেট কোম্পানিতে যোগ দিলাম সেটা ঝুমা কিংবা আমার মা কেউই ভালভাবে নেয়নি। মা অবশ্য অতটা ভয় পেত না, ঝুমা না পাওয়ালে। আসলে ওরা দু’জনেই খুব আতঙ্কিত হয়ে গিয়েছিল। যে নিরাপত্তায় অভ্যস্ত, তা হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছিল। আচ্ছা, বিমান যখন আকাশে ওড়ে তখন কোনও নিরাপত্তা থাকে? তবু প্লেনে চড়ে এদিক-ওদিক যাওয়ার সময় আমি দেখেছি, ছত্রিশ হাজার ফুট উপরেও, কম্বলটা কেন একটু ময়লা, স্যান্ডউইচ কেন তত ফ্রেশ নয় তাই নিয়ে এয়ার হোস্টেসের সঙ্গে তর্ক করছে লোক। মানুষ হয়তো জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের জন্য আরও একটু সুরক্ষিত কিছুর কল্পনা করে চলে। কিন্তু জীবনটা তো ঝুঁকি নেওয়ার মধ্যেই। ঘোড়ার পিঠে বসে যে-জকি জন্তুটাকে দৌড় করায়, ঘোড়াটা যখন লাফ দেয়, তখন সে ছিটকেও যেতে পারে ট্রাক থেকে, আবার প্রথমও হতে পারে। আমি সেই ঝুঁকিটা নিতে চাইছিলাম। কী হবে না হবে সে অনেক পরের কথা।

যে-কোম্পানিতে জয়েন করলাম সেখানে একদম টপ বস পর্যন্ত সবাইকে নাম ধরে ডাকা যায়। কোনও ‘হেঁ হেঁ স্যার একটু দেখবেন, আপনার জুতোটা পালিশ করে দিতেই পারি চাইলে’ সিস্টেম নেই। কাজই একমাত্র বিচার্য বিষয়, কাজের পরিণামেই বাঁচা কিংবা মরা। কাজ ভালবাসি বলে আমার এই ধরতাইটা পছন্দ হয়ে গেল। দিনরাত কাজ শুধু কাজ, পিএনপিসি-র অবকাশ নেই, ফাঁকিবাজির সুযোগ নেই, এমন একটা পরিবেশই তো চাইছিলাম আমি। হ্যাঁ, সরকারি চাকরির আরামটা বেসরকারি সংস্থায় নেই। কিন্তু কাজ করতে এসে যারা আরাম খোঁজে, আমি তো তাদের দলে ছিলাম না কখনও।

প্রত্যেকটা জায়গায় উঁচু সিঁড়িটায় দাঁড়িয়ে আছে যে-লোকটা, সে নিচু সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। আর তারপর মানবিকতার কথা বলে ফাটিয়ে দেয়। খুব খারাপ অবস্থা থেকে উঠে এসেছি বলেই আমি এই লোকগুলোকে ঘেন্না করি, একটু মানুষের মতো মিশতে চেষ্টা করি মানুষের সঙ্গে। কেউ সরে আছে দেখলে সরে থাকার কারণটা বুঝতে চেষ্টা করি। গোপার ক্ষেত্রেও করলাম। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে খেয়াল করলাম আমায় দেখেই মুখ নামিয়ে উলটোদিকের গলিতে ঢুকে যাচ্ছে মেয়েটা। একটু পা চালিয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি।

“কী হয়েছে গোপা? অমন পালিয়ে যাচ্ছ কেন আমায় দেখে?”

আমার প্রশ্নের উত্তরে কিছু বলবে বলে মুখ তুলেও গোপা কিছু বলতে পারল না। কেঁদে ফেলল।

“আরে হয়েছেটা কী, বলবে তো?”

“বউদি আমাকে অকারণে অপমান করলেন দাদা। আমি কিন্তু অন্যায় কিছু করিনি।” গোপা চোখের জল মুছতে মুছতে বলল।

গোপার বাবা স্থানীয় একটা মন্দিরে পুজো করতেন। বার দুয়েক আমার বাড়িতেও পুজো করে গেছেন ভদ্রলোক। একবার কোজাগরী লক্ষ্মীর আর একবার, ঝুমার মানত পূর্ণ করতে, সত্যনারায়ণের। দ্বিতীয়বার গোপা এসেই সব সাজিয়ে-গুছিয়ে ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। সেদিনই ভাল করে আলাপ হয় মা-মরা মেয়েটার সঙ্গে, বাচ্চাদের আঁকা শিখিয়ে সংসারটা যে সামলে রেখেছে। বাবা, পঙ্গু ভাই, অবিবাহিত কাকা সকলের রান্না নিজের হাতে করেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।

মূলত আমার আগ্রহেই ঝুমা কুটুসকে আঁকা শিখতে পাঠিয়েছিল গোপার কাছে। তারপর আমি আর সাত ঝামেলায় খবর রাখতে পারিনি। হঠাৎ হল কী? জানব বলেই আমি গোপাকে নিয়ে দশ পা দূরে নতুন গজিয়ে ওঠা কফিশপটায় গিয়ে বসলাম।

গোপা খুব কুণ্ঠার সঙ্গে কফিতে প্রথম চুমুক দিয়ে বলল, “আমি কীভাবে আপনাকে বোঝাব জানি না কিন্তু কুটুস রেগুলার একটা বদমাইশি করছিল। আপনাদের ছেলে বলে প্রথম প্রথম আমি ইগনোর করছিলাম, কিন্তু তারপর দেখলাম এতে ওরই ক্ষতি হচ্ছে।”

“একটু খুলে বলো।”

“আমি আপনাকে বোঝাচ্ছি। ধরুন আমি সাদা পাতায় গাছ হোক, বাড়ি হোক ড্রয়িং করে দিই। সেটা দেখে ছাত্রছাত্রীদের আঁকতে বলি। এক- একজনের খাতায় এক-একটা জিনিস এঁকে দিই। বোর্ডে আঁকলে হয়তো খাটনি কম হত আমার, কিন্তু বাচ্চারা ওই পারসোনাল টাচটা পেত না।”

“আই অ্যাপ্রিশিয়েট গোপা। তোমার মতো সিনসিয়ার একটা মেয়েই এভাবে ভাবতে পারে।”

“থ্যাঙ্কস দাদা, আপনি বুঝলেন। এবার কুটুস করছিল কী, আমার আঁকাটা দেখে নিজে আঁকছিল না। উলটে আমার আঁকাটার উপর বারবার করে দাগা বোলাচ্ছিল। বোলাতে বোলাতে পরের পাতায় ছাপ ফেলে দিচ্ছিল। তারপর সেটার উপরে পেনসিল চালিয়ে আমার কাছে নিয়ে আসছিল। কোনও কোনওদিন রং করেও আনছিল। এই ফাঁকিবাজিটা দিনের পর দিন করে গেলে, ও কী শিখবে বলুন?”

আমি কিছু বলতে না পেরে চুপ করে গেলাম। একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা এমন দু’নম্বরি শিখে নিয়েছে? এতটা চিটিংবাজ? আমার ছেলে!

“আমি ওকে বকেছিলাম তাই। কুটুস চুপ করে বকাটা খেল। তারপর বাড়ি গিয়ে কী বলেছে, আমি জানি না। কিন্তু পরদিন বউদি এসে যাচ্ছেতাই অপমান করলেন আমাকে। আমি নাকি শেখাতে পারি না বলে আজেবাজে কথা বলি। কুটুস কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তার দায় আমার। এবার কুটুসের আরও শরীর খারাপ হলে উনি আমায় জেলে দেবেন…”

“জেলে দেবে এটাও বলেছে!”

গোপা কথা বলতে না পেরে ঘাড় নাড়ল। আমি দেখলাম, ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা।

মাথার মধ্যে একটা আগুন জ্বলে উঠল যেন। এই কি ঝুমার স্বভাব নাকি? অসহায় মানুষকে অপমান করা?

“তুমি বাড়ি যাও, আমি যা করার করছি। শুধু একটাই কথা বলব, কুটুস আবার তোমার কাছে শিখতে গেলে তুমি যেন রিফিউজ় কোরো না ওকে।”

“আমার কি রিফিউজ় করার ক্ষমতা আছে দাদা? আমি তো গরিব!”

গোপার শেষ কথাটা যেন সহস্র পেরেকের মতো বিঁধল আমায়। আমি ঘরে ঢুকে জুতো ছাড়তে ছাড়তে গলা তুললাম, “তুমি গোপাকে ঠিক কী বলেছ ঝুমা?”

“যা উচিত মনে করেছি, তাই বলেছি। আর তাই নিয়ে কাউকে কোনও জবাবদিহি করব না। ওর কত সাহস যে, তোমায় নালিশ করেছে? কী ভেবেছে? তোমায় বললেই তুমি ওর প্রেমে গলে যাবে? আর তোমাকেও বলিহারি! নালিশ শুনছিলে তুমি? আমার বিরুদ্ধে? এত দরদ যুবতী মেয়েদের প্রতি? তাও যদি দেখতে সুন্দর হত!”

“আমার কী ইচ্ছে করছে বলো তো ঝুমা? সেই রুটির দোকানে যেমন থাপ্পড় মেরেছিলাম, সেরকম আট-দশটা থাপ্পড় মারি, তোমাকে আর তোমার ছেলেকে। এত বছর আমার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে তোমার, তুমি কি আমাকে অন্য কোনও মেয়ের সঙ্গে রসের কথা বলতে শুনেছ, নাকি দেখেছ কখনও?”

“বলবে কী করে? তুমি তো কাঠখোট্টা, রসকষবিহীন একটা লোক। ভাবছি ওই গোপা কোন মন্ত্রে তোমার…”

“কোনও মন্ত্রে নয়। মন্ত্র তো দেবতাদের জন্য। কিন্তু একটা স্ট্রাগলিং মেয়েকে অকারণে অপমান করতে বাধল না তোমার?”

“মোটেই অকারণে নয়। ও কুটুসকে…”

“কুটুস কী করেছে আমরা জানি। তুমিও জানো, আমিও জানি।”

“কিন্তু ওইটুকু একটা বাচ্চাকে ও ‘চোর’ বলবে কেন?”

“যদি বলে থাকে, ঠিক করেছে। ভবিষ্যতে চোর হবার হাত থেকে বাঁচিয়েছে। প্লিজ় ঝুমা বখিয়ে দিও না বাচ্চাটাকে। মানুষ করো। তুমি ‘সরি’ বলে আসবে গোপাকে। কুটুসকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে।”

“আমার দায় পড়েছে ওই পুরুতের মেয়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ার।”

“তুমি ক্ষমা না চাইলে আমি কিন্তু বেরিয়ে যাব এই ফ্ল্যাট ছেড়ে।”

“অন্য কোথাও কেউ জুটেছে নাকি?”

“লাগলে জুটিয়ে নেব কাউকে। যে অন্তত ভদ্র হবে তোমার চেয়ে।”

“ইচ্ছে হলে চলে যাও। আমার মতো অভদ্রর সঙ্গে থাকতে হবে না। দায়িত্ব-কর্তব্যগুলো পালন কোরো, তা হলেই হবে।” ঝুমা একটা ভঙ্গি করল আঙুল দিয়ে।

ঝুমা যদি একটু নিজের ভুল বুঝত তা হলে ব্যাপারটা গড়াতই না এতদূর। কিন্তু আমি প্রশ্ন করামাত্র ও এমন কুৎসিতভাবে জবাব দিতে থাকল যে, আগুন নেভার বদলে জ্বলে উঠল দাউদাউ করে।

শুধু জুতোটা ছেড়েছিলাম, মোজাটা পরা ছিল। ঝুমাকে কিচেনে ঢুকতে দেখে জুতোটা গলিয়ে অ্যাটাচিটা নিয়ে বেরিয়ে এলাম। গায়ে হাত তুলে অন্যায় করেছিলাম; সেই অন্যায় জীবনে দ্বিতীয়বার আর করব না। তাই বলে এমন নারকীয়তা মুখ বুজে মানতেও পারব না। রাস্তায় নেমে কয়েক পা হাঁটতেই একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম। সেটাতে উঠেই মোবাইলটা বন্ধ করে দিলাম প্রথমে। শিক্ষা পাক। একটু শিক্ষা পাওয়া প্রয়োজন।

সঙ্গে আইডেন্টিটি কার্ড কিছু ছিল না বলে অসুবিধে হতে পারত। কিন্তু ক্যামাক স্ট্রিটের যে-হোটেলে গিয়েছিলাম সেখানে মাঝেমধ্যে আমাদের অফিসের কনফারেন্স হয় বলে মালিক আমার চেনা।

“বাড়িতে একটা সমস্যা হয়েছে, দিন-দুয়েক থাকতে হবে। আইডেন্টিটি প্রুফ বলতে একটা ইলেকট্রিক বিল আর ভোটার আই ডি-র একটা জেরক্স পকেটে আছে। চলবে?”

হোটেলের সর্দারজি মালিক পরিষ্কার বাংলায় বললেন, “ওগুলো ছাড়াও চলবে। আপনি তো পরিচিত, অপরিচিতদের ক্ষেত্রেও অত চেক করতে হলে, ব্যবসা লাটে উঠবে।”

চারতলার একটা ঘরে ঢুকে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রাতের কলকাতাকে দেখলাম দশ মিনিট ধরে। সিগারেট শেষ না হওয়া পর্যন্ত। কত কত গাড়ি কী দ্রুতগতিতেই না ছুটে চলেছে। অথচ কোথাও জীবন দাঁড়িয়ে আছে থম ধরে। জামাকাপড় তো কিছু সঙ্গে ছিল না, কিন্তু অ্যাটাচিতে কীভাবে যেন একটা টি-শার্ট থেকে গিয়েছিল। হয়তো আগের ট্যুরের। স্নান করে উঠে তোয়ালে জড়িয়ে বসে ওটাই গায়ে চাপালাম। ওই আমার বৈরাগ্যের পোশাক।

টিভিটা চালিয়ে এই চ্যানেল থেকে ওই চ্যানেল যেতে যেতে একটু ড্রিঙ্কস অর্ডার করলাম। কোনওদিনই কোনও আসক্তি নেই মদের প্রতি, তবে মাথাটা দপদপ করলে শান্ত হতে সাহায্য করে, সেটুকু মানি। সমস্যা হল, অভ্যেস নেই বলেই হয়তো, দু’-তিন পেগ খেলেই আমার খিদে মরে যায় একেবারে। আজও গেল। নয়তো বাড়ি থেকে যখন বেরিয়ে আসছি তখন প্রচণ্ড খিদে পেটে।

পরোটা সবজি আর একপ্লেট মাংস দিতে বলেছিলাম। তাও খেতে পারলাম না পুরোটা। রুম সার্ভিসের ছেলেটা প্লেট নিয়ে যেতে, ব্যালকনিতে গিয়ে আর একটা সিগারেট ধরিয়ে মোবাইলটা চালু করলাম। তিন মিনিটের মধ্যে ঝুমার মোবাইল থেকে ফোন এল। ধরলাম না যখন, বাড়ির ল্যান্ডলাইন থেকে ফোন চলে এল।

ফোনটা ধরে দেখি, ওপাশে মা।

“মা তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমি একদম ঠিক আছি। কাল নয়তো পরশু বাড়ি চলে আসব।”

“ঝুমা না খেয়ে বসে আছে, তুই আজ এখনই ফিরে আয়।” মা কীরকম একটু জড়ানো গলায় বলল।

আমি উত্তরে কিছু বলার আগেই মায়ের কাছ থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে ঝুমা কাঁদতে শুরু করল, “আমার অন্যায় হয়েছে। ক্ষমা চাইছি। তুমি প্লিজ় ফিরে এসো। অন্য কারও কাছে থেকো না রাতে।”

আমি ঝুমার কথার উত্তর দিতে গিয়ে ভেবলে গেলাম। ঝুমা অপরাধবোধ থেকে কাঁদছে না ততটা, ঝুমা কাঁদছে ভয়ে। আমি অন্য কারও কাছে চলে গিয়েছি সেই ভয়ে।

“যাকে মানুষ এত বছর ধরে চেনে, যার সঙ্গে থাকে, তাকে নিয়েও এতটা ইনসিকিয়োরিটি?”

“তুমি বুঝবে না, তুমি তো চাকরি করো। আমি তো চাকরি করি না।” ঝুমা ধরা গলায় বলল।

খুব লজ্জা পেলাম ঝুমার কথাটা শুনে। যে-জায়গা থেকে গোপা অসহায়, সেই জায়গা থেকে ঝুমাও কি অসহায়? অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া কি একটা মেয়ে স্বামীর ঝি হয়ে যায়? কথাটা তো সত্যি নয়। আর কথাটা যে মিথ্যে সেটা প্রমাণ করার দায়িত্ব আমারই।

এসেছিলাম ভীষণ রাগ করে, কিন্তু এখন একটা খারাপ লাগা তৈরি হল মনের মধ্যে। অত রাতে আবারও প্যান্ট-শার্ট পরে নীচে নেমে এলাম। ভাবছিলাম একটা ট্যাক্সি পেলে ফিরে যাব। রাত্রি বারোটার সময় ক্যামাক স্ট্রিটে ট্যাক্সি মেলে না তা নয়, কিন্তু সেদিন যেন সবদিক দিয়েই আলাদা। গেটের বাইরে একটাও ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে নেই।

ওই ট্যাক্সির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই, কলেজে আমার সহপাঠী অভিষেককে দেখলাম একটা মেয়ের গলা জড়িয়ে হোটেলের ভিতর ঢুকছে। অভিষেক পরেছে একটা বারমুডা আর মেয়েটা একটা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট আর স্লিভলেস টি-শার্ট পরা। মুখটা এককালে মিষ্টি ছিল বোঝা যায়, এখন উগ্র লাগছে। অভিষেক তো বিয়ে করেছিল সুস্মিতাকে। সেই বিয়েটা কি আছে না গেছে? অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে টলতে টলতে হোটেলে ঢুকছে, পোশাক আশাক দেখে মনে হচ্ছে এই হোটেলে বেশ গুছিয়ে বসেছে, কে জানে কী ব্যাপার!

অবশ্য আমার জানারই বা কী দরকার। চোখটা ঘুরিয়ে নিলাম অন্যদিকে।

অভিষেক নিজেই ফিরে এল পাঁচ পা এগিয়ে গিয়ে। আমাকে বেশ ভাল করে জরিপ করে বলল, “কী গুরু? তুমিও এখানে মজা লুটতে এসেছ? আমি ভাবছিলাম আমি একাই বোধহয় লাইনে আছি।”

“বাজে বকিস না। আমি অফিসের একটা সেমিনারে এসেছি।”

“অফিস থেকে মেয়েছেলে দেয়নি? রাত কাটানোর জন্য? তাই ফিরে যাচ্ছিস?”

“এই তুই ফোট তো সামনে থেকে। সবাইকে নিজের ক্যাটেগরিতে ফেলিস না।” মাথা গরম হয়ে গেল আমার।

“চটছিস কেন? আমার পার্টনার জাহ্নবীকে দেখলি তো! ভাল না?”

“খেয়াল করিনি।”

“ঠিকই খেয়াল করেছ গুরু। একটা মেয়ে তার ওরকম ভারী পাছা, ভরাট বুক, আর সেটা কোনও ছেলে খেয়াল করবে না, এরকমটা হলে পৃথিবী আর সূর্যের চারদিকে ঘুরত না। থেমে যেত।”

“সুস্মিতা কোথায়? ডিভোর্স করে দিয়েছিস?”

“ডিভোর্স কেন করব? তবে দশ বছরের পুরনো বউ, বুঝিসই তো।”

“না, আমি বুঝি না। তুই যা এখন।”

“রেগে যাচ্ছিস কেন? আমার কার্ড রাখ। আমি ইন্টিরিয়র ডেকরেশনের বিজ়নেস করি এখন। কোনও কাজ থাকলে বলিস।”

অভিষেক ওর একটা কার্ড আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। মেয়েটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, অভিষেক যেতেই এ ওর কাঁধে হাত দিয়ে লিফ্‌টের দিকে এগিয়ে গেল। যেতে যেতে মেয়েটা আমার দিকে তাকাল একবার ঘাড় ঘুরিয়ে।

“কোয়াইট অ্যাট্রাকটিভ।” আমি স্বগতোক্তি করলাম।

সেদিন রাতে ট্যাক্সি পাওয়াই গেল না আর। বাড়ি ফিরতে ফিরতে পরদিন সকালই হল। ফিরেই ঝুমার আর একদফা কান্নার সামনে অসহায় হয়ে সেদিন অফিস ডুব দেওয়াই মনস্থ করলাম।

আর সেই ডুব দেওয়ার জন্যই হোক বা গতরাতের ঝগড়ার পরিণতি, সেই বিয়ের পরে যেমন কয়েকবার হয়েছিল, বহুদিন পর দিনের বেলায় মিলিত হলাম আমরা। মা ঘুমোচ্ছিল পাশের ঘরে, কুটুস স্কুলে, আমার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে ‘মিলন’ ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। ওই টেনে দেওয়া পরদার ফাঁক দিয়ে যেমন আলো এসে পড়ছে ঘরে, সমস্ত অভ্যাসের ভিতর দিয়ে তেমনই এসে পড়ছে বাসনা, জেগে উঠছে প্রেম। স্পর্শ, আদরে রূপান্তরিত হল। চাল-ডাল-তেল-নুনের দৈনন্দিনতায় নগ্নতা তার রাজকীয়তা নিয়ে স্থায়ী হল, একটা বিছানায়, নরনারীর আলিঙ্গনে।

দিন দুয়েক পরে গোপা আমায় ফোন করল, “দাদা, বউদি কুটুসকে নিয়ে বাড়ি বয়ে এসে আমায় ‘সরি’ বলে গিয়েছে। আর একটা দারুণ শাড়ি গিফট করেছে আমাকে। বউদির চোখে জল দেখে খুব লজ্জা লাগছিল। আমার হয়তো আপনাকে অতকিছু বলা ঠিক হয়নি। কী করব, তখন আমিও এত যন্ত্রণায় ছিলাম। আপনি যেন আর কিছু বলবেন না বউদিকে। আমি যাব এর মধ্যেই আপনাদের বাড়িতে। বউদি যেতে বলেছে।”

“শাড়িও দিয়েছে? আমি কিন্তু শাড়ি দিতে বলিনি।” হেসে উঠলাম আমি ফোনের এই প্রান্ত থেকে।

“আমাকে খুশি করতে তুমি শাড়ি দিয়েছ গোপাকে?” রাতে ঝুমাকে জিজ্ঞেস করলাম।

“গোপা তাই বলল?”

“না গো। ও তো আপ্লুত তোমার ব্যবহারে। খুব প্রশংসা করছিল। শুনতে শুনতে মনে হল, শাড়ি দেওয়ার বাড়াবাড়ি করলে কেন?”

“দিয়েছি, দিয়েছি। তুমি একটা কাঞ্জিভরম দিয়ে আমাকে।”

“কাল কিনে আনব?”

“একদম না। আমি আবার কনসিভ করলে তখন দেবে। আর আমি যাব তোমার সঙ্গে কিনতে।” বলতে বলতে ঝুমা ওর হাতদুটো বাড়িয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরল। সেই বিয়ের পরপর যেমন ধরত।

নতুন অফিসে জয়েন করার পর বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছিল, তবে তা নিয়ে আমার বা ঝুমার তেমন কোনও সমস্যা হচ্ছিল না। টাকা যখন বেড়েছে চাপ বাড়বেই। আর সেটা উপভোগই করছিলাম। অন্য একটা ব্যাপারে আমরা ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলাম। তিনমাস, ছ’মাস, একবছরের চেষ্টাতেও ঝুমা কনসিভ করতে না পারায়।

পুরুষের ঔরসের কোনও দাম নেই যতক্ষণ না নারীর গর্ভ তাকে ধারণ করতে পারে। ভোরের শিশিরের মতো ঝরে যায় সে, যতক্ষণ না গর্ভের আশ্রয় তাকে প্রাণতরঙ্গের ঠিকাদার করে তোলে। মাটিতে পুঁতে দেওয়া বীজ যেরকম অঙ্কুরোদগম হওয়ার আগে অবধি ফলের উচ্ছিষ্ট মাত্র, বীর্যও তাই। তার ভিতরের প্রাণের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে পারে কেবল একজন নারীই।

কিন্তু ঝুমা পারছিল না। অনেক চেষ্টার পরেও না। এখন ‘বন্ধ্যাত্ব নিরাময়’-এর নাম নিয়ে অনেক ক্লিনিক ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে শহর জুড়ে। কিন্তু তাদের দশজনের মধ্যে আটজনেরই কাজ গাঁ-গঞ্জ কিংবা মেগাসিটি থেকে আসা পেশেন্টদের মাথায় কাঁঠাল ভাঙা। প্রথম দলের ক্ষেত্রে রাহাজানিটা সরাসরি হয়, দ্বিতীয় দলের ক্ষেত্রে একটু কায়দা করে। সেরকম দু’-একটা ক্লিনিকেও যে আক্কেল সেলামি দিলাম না, তা নয়। শেষমেশ আমার আগের অফিসের এক কলিগের পরামর্শ অনুযায়ী একজন সত্যিকারের দক্ষ এবং স্নেহপ্রবণ গায়নোকলজিস্টের খোঁজ পাওয়া গেল। ষাটের কাছাকাছি বয়স হলেও ভদ্রমহিলা ভীষণই আপ-টু-ডেট। তাই অচিরেই ধরে ফেললেন সমস্যাটা কোথায়। ওঁর পরামর্শ অনুযায়ী কিছু টেস্ট করে দেখা গেল ঝুমার ইউটেরাসের অবস্থা ভাল নয়। সে প্রায় ধারণশক্তি রহিত। কুটুস হওয়ার বছর দুয়েক পর ফাইব্রয়েডের সমস্যা দেখা দিয়েছিল ঝুমার। সেই ফাইব্রয়েডের অপারেশনের সময়ই জরায়ুর যারপরনাই ক্ষতি হয়েছে।

“তা হলে কি আমার স্ত্রী আর প্রেগন্যান্ট হতেই পারবে না কোনওদিন?” আমি মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

“পারবেনই না বলে কোনও কথা মেডিক্যাল সায়েন্সে বলা হয় না চট করে। পারতেও পারেন। কিন্তু তা পারলেও ন’মাস টানতে পারবেন কি? সেটাই প্রশ্ন।” ডাক্তার ম্যাডাম জবাব দিয়েছিলেন।

তা হলে উপায় কী? সারোগেসি? কিন্তু আমাদের তো কোটি কোটি টাকা নেই ফিল্মস্টারদের মতো। কে আমাদের গর্ভ ভাড়া দেবে কম পয়সায়? আর তা ছাড়া সারোগেসির ক্ষেত্রে ঝুমা নিজেই সায় পাচ্ছিল না মন থেকে।

“একজন জন্ম দেবে আর বাচ্চাটা অন্যের হবে, কেমন যেন লাগে। তার চাইতে কুটুস আছে ওই থাক। কী করা যাবে, সবার কপালে তো দুটো বাচ্চা থাকে না,” ঝুমা ডাক্তারের চেম্বার থেকে বাড়ি ফেরার পথে বলল একদিন।

আমি যেন কেমন দৈববাণীর মতো শুনলাম, হবে না, মেয়ে হবে না রে তোর। তোর প্রবল ইচ্ছা, প্রবলতর স্বপ্নকে এবার কবর দেবার সময় এসে গেছে। ভোল, ভুলে যা।

আমার একারই ইচ্ছা? একারই স্বপ্ন? আমি অস্ফুটে বলে উঠলাম। আর কেউ শুনতে পেল না।

১৪

জীবন দৌড়োয়, থেমে থাকে না। থেমে থাকা সম্ভব নয় জীবনের পক্ষে। এমনকী যখন তার ভিতরে দুম করে মৃত্যু এসে আছড়ে পড়ে, তখনও নয়। কিন্তু দু’দণ্ড চুপ করে যায়। বিস্ময়ে, আতঙ্কে।

মাসখানেক পর অফিস থেকে ফিরে আমিও বোবা হয়ে গিয়েছিলাম কিছুক্ষণের জন্য। টিভির পরদায় লাগাতার ‘শান্তিনিকেতনে অশান্তির খুন’ দেখে নয়, অভিষেক আর হোটেলে ওর সঙ্গে থাকা মেয়েটির মুখের ক্লোজআপ দেখে। একবার, বারবার।

ঝুমা একদম সেঁটে ছিল টিভির সঙ্গে। আমি ওকে একটা ধমক দিয়ে বললাম, “করছটা কী? যাও না গিয়ে কুটুসকে পড়াও।”

“রোজই তো পড়াই। আজ একটু এটা দেখতে দাও। কীভাবে নিজের বউকে মার্ডার করেছে লোকটা, প্রেমিকার সঙ্গে হাত মিলিয়ে,” ঝুমা টিভির সামনে থেকে উঠে কিচেনে চলে গেল, আমার জন্য চা করতে।

“আমি এই খুনিকে চিনি, জানো তো?” আমি গলা তুলে বললাম।

“মানে?” ঝুমা রান্নাঘর থেকেই জানতে চাইল।

“অভিষেক আমার ক্লাসমেট ছিল, কলেজে।”

“তুমি ওর সঙ্গের ওই মেয়েটাকেও চেনো নাকি?”

আমি হোটেলে দেখা হওয়ার ঘটনাটা চেপে গেলাম, “তাকে কীভাবে চিনব? তবে অভিষেকের বউ সুস্মিতাকে চিনি। আমাদের এক ব্যাচ জুনিয়র ছিল।”

“ওদের একটা মেয়েও আছে জানো।”

“কাদের? অভিষেক আর সুস্মিতার?”

“আরে না, ওই ডাইনিটার সঙ্গে তোমার বন্ধুর একটা মেয়ে আছে। বাচ্চাটাকে দেখাচ্ছিল টিভিতে। কাঁদছিল বেচারি।”

“বাচ্চাটাকেও ছাড়েনি টিভি ক্যামেরাঃ টিআরপি বাড়ানোর জন্য তাকেও টেনে এনেছে?”

“ওকে না দেখালে তো রহস্যটা ক্লিয়ার হচ্ছে না।”

আমি ওর কথার জবাব না দিয়ে চুপচাপ ভাবতে থাকলাম, যে-মেয়েটার সঙ্গে অভিষেককে ‘হোটেল সানশাইন’-এ দেখলাম, সে আসলে অভিষেকের বাচ্চার মা? তা হলে অভিষেক তার সঙ্গে না থেকে সুস্মিতার সঙ্গে থাকতই বা কেন? সেদিন যখন ওরা হোটেলে মস্তি করছে তখন বাচ্চাটা কোথায় ছিল?

দিনতিনেক পরে পাড়ার একজনের বউভাতে গিয়ে আমার আর এক ক্লাসমেট অত্রির সঙ্গে দেখা। অত্রি গ্র্যাজুয়েশন করে ল’ পড়তে চলে গিয়েছিল। এখন আলিপুরে প্র্যাকটিস করে। এগিয়ে এসে আমার হাতটা ধরল। তারপর ঝুমার দিকে তাকিয়ে অনুযোগ করল, ওকে বিয়েতে নেমন্তন্ন করা হয়নি বলে।

“তোর বিয়েতে আমায় বলেছিলি? তখন তো মোবাইল হাতের পাঁচ হয়নি ভাই।” আমি জবাব দিলাম।

“আমি তো বিয়েই করিনি। আরে, উকিলের পসার জমতে জমতে চল্লিশ পেরিয়ে যায়। যখন জমে তখন আর বিয়ের বয়স থাকে না।”

“ছেলেরা চাইলেই বিয়ে করতে পারে। বয়স ফয়স আবার কী?” ঝুমা বলল।

“সে পারে, কিন্তু আমার বয়সে আপনার মতো সুন্দরী তো আর মিলবে না ম্যাডাম। খেঁদি পেঁচি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।”

কথাটা শুনে ঝুমা বেশ খুশি হয়ে হেসে উঠল। আর ওর ওই আহ্লাদ দেখে মাথাটা একটু গরম হল আমার।

“মারব এক থাবড়া। ‘খেঁদি পেঁচি’ আবার কী রে? যে-মেয়েটা তোকে ভালবেসে বিয়ে করবে সেই ঊর্বশী তোর কাছে। তাকেই সম্মান দিয়ে ঘর করবি।”

“বাব্বা! চয়ন তো একদম গুরুঠাকুরদের মতো লেকচার দিতে শিখেছে। আমাদের অভিষেকও এরকম লেকচার দিত। এখন জেলে বসে কাওয়ালি গাইছে।”

“তুই শেষে অভিষেকের সঙ্গে আমার তুলনা করলি? ছি ছি!”

“তুলনা কই করলাম, জাস্ট বললাম। আর তা ছাড়া অভিষেক ছেলেটাও খুব খারাপ নয়, কপালদোষে ফেঁসে গিয়েছে।”

“বউকে যে খুন করেছে সেই লোকটা খারাপ নয়? কী বলছেন? না, আপনার বিয়ে না করাই ভাল।” ঝুমা রেগে গেল এবার।

“আপনারা দু’জনেই ভুল বুঝছেন আমায়। আমরা ওকালতি করি, আমাদের অনেক গভীরে গিয়ে দেখতে হয় ব্যাপারটা। অভিষেক তো আর খুন করতে চায়নি সুস্মিতাকে।”

“বউ থাকতেও অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে জড়াল কেন?”

“আসলে অভিষেকের বাবা হওয়ার শখ ছিল খুব, আর সুস্মিতা যেহেতু ওকে একটা বাচ্চা দিতে পারেনি…”

“বাচ্চা দিতে পারেনি মানে? মেয়েরা কি গোরু যে, বাচ্চার জন্ম দিতেই হবে? কোন মান্ধাতার যুগে পড়ে আছেন আপনারা?”

অত্রি ঘাবড়ে গেল, “রাগ করবেন না ম্যাডাম। তা বলতে চাইনি। আইন ভাঙিয়ে খাই, এক্সট্রা-ম্যারিটাল থেকে প্রচুর অশান্তি-খুনোখুনি রোজ দেখছি। কিন্তু অভিষেকের ওই পার্টনার প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলে অভিষেক বাচ্চাটা অ্যাবর্ট করাতে পারেনি কারণ…”

“আপনাদের বন্ধু বাবা হতে চাইছিল। আর বাবা হতে চেয়ে একজন পুরুষ যা খুশি তাই করতে পারে। তার সাতখুন মাফ। সত্যি, সমাজ বটে একটা।”

“ঝুমা, তোমার এত উত্তেজিত হওয়ার মতো কিছু হয়নি। অত্রি তুই বল তো, খুনটা কেন হল? টিভিতে দেখে ঠিক ক্লিয়ার হয়নি আমার।”

“টিভিতে আলোচনা করতে আসা লোকগুলো এ ওকে হারাবে বলে এমন বাজে বকতে থাকে যে, পুরো ব্যাপারটা গুলিয়ে যায়। আসলে কিন্তু কেসটা একদমই জটিল নয়।”

“শুনি সেটা।” ঝুমাই বলল।

“ব্যাপার আর কী? অভিষেক শান্তিনিকেতনে গেছে, সুস্মিতাকে নিয়ে। ওদিক থেকে জাহ্নবীও এসেছে। অভিষেক আর জাহ্নবীর মেয়েকে নিয়ে। দোলের দিনগুলো এইভাবেই বাবা-মেয়ের দেখা হবে, এরকম একটা কিছু প্ল্যান করেছিল হয়তো। এবার জাহ্নবী আর বাচ্চাটাকে নিয়ে একটা ওপেন-এয়ার রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়েছিল অভিষেক। বুঝতে পারেনি সুস্মিতা ওখানে চলে আসবে। আর সুস্মিতা যখন এসেছে তখন অভিষেক বাচ্চাটাকে নিজের হাতে খাওয়াচ্ছে। সুস্মিতা এগিয়ে গিয়ে চার্জ করে অভিষেককে। অভিষেক তখনকার মতো ধামাচাপা দেওয়া চেষ্টা করে, আল ফাল বকে। কিন্তু সফল হয় না। তারপর যা জেনেছি, সুস্মিতা ফর্ক কিংবা চাকু দিয়ে অ্যাটাক করে ওদের। অভিষেক আত্মরক্ষার্থেই ওকে ঠেলা দেয় আর তিনতলা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পেয়ে মৃত্যু হয় সুস্মিতার।”

“বাবা, আপনি তো একদম ওই খুনিটার উকিলের মতো কথা বলছেন!” ঝুমা ব্যঙ্গের গলায় বলল।

অত্রি হাসল, “আমি তো উকিলই ম্যাডাম। তবে অভিষেকের নই। যদি হতাম তা হলে অভিষেককে এতবড় অ্যাডভেঞ্চার করতে বারণ করতাম। সুস্মিতাকে লুকিয়েই যখন চালাচ্ছিল, তখন দু’জনকে একই জায়গায় নিয়ে যাওয়ার দরকার কী ছিল?”

“দু’জন বলছেন কেন? তিনজন বলুন। ওই জারজ বাচ্চাটাও তো গিয়েছিল।”

“ঝুমা, জারজ হলেও বাচ্চাটা বাচ্চাই। সেটা ভুলে যেয়ো না।” আমি আর না বলে পারলাম না।

ঝুমা তখনকার মতো চুপ করে গেলেও, কথাটা ওর মনোমতো হয়নি সেটা বোঝাই যাচ্ছিল।

আমাদের অভ্যন্তরীণ টেনশন অবশ্য অত্রি বুঝতে পারল না। ও বলে চলল, “এখন তো অভিষেক জেলে আর জাহ্নবীও জামিন পায়নি। সবচেয়ে ঝামেলা হয়েছে ওই তিনবছরের মেয়েটার। সমাজের চাপে কোনও আত্মীয়স্বজনও ওকে নিজের বাড়িতে রাখতে চাইছে না। কোথায় কোন অরফানেজে আছে বলে শুনেছি। জানি না, কেসের ফলাফল কী দাঁড়াবে আলটিমেটলি। যাই দাঁড়াক, বেশ কয়েক বছরের ব্যাপার। ততদিন বা তারপরও, মেয়েটার যে কী হবে!”

“কী আবার হবে? জামিন পেয়ে গেলে দেবা-দেবী দু’জন মিলে সংসার করবে ওই অবৈধ বাচ্চাটাকে নিয়ে। আর আপনাদের মতো উকিলরা যখন আছেন তখন সুস্মিতার খুনটাকে অ্যাক্সিডেন্ট হিসেবে প্রমাণ করে দেওয়া কতক্ষণের ব্যাপার?” ঝুমা বলে উঠল।

ঝুমার কথাটা কানে লাগছিল, বিশেষ করে যে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ও একটা তিন বছরের বাচ্চা সম্বন্ধে মন্তব্য করছিল। কিন্তু সুস্মিতার সঙ্গে একাত্ম বোধ করার ওর নিজস্ব কিছু কারণ আছে, সেটা না বোঝার মতো গাম্বাট আমি ছিলাম না। একবার ভাবলাম ওকে বলি যে, কুটুস আর ওকে নিয়ে আমি খুব সুখী। একটা মেয়ের ইচ্ছা ছিল কিন্তু এরকম কত ইচ্ছাই তো মানুষের থাকে, সব কি পূরণ হয় নাকি? কিন্তু বললাম না কারণ, বোঝাতে গিয়ে হয়তো বা ঝুমার একটা অপারগতাই ঝুমার কাছে নগ্ন করে দেব বলে মনে হচ্ছিল আমার। প্রলেপ দিতে গিয়ে রক্তক্ষরণ হবে আবার। কী দরকার?

অভিষেকের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কোনও দরকার ছিল না সেভাবে। কিন্তু ওই তিন বছরের মেয়েটার কী হচ্ছে ভেবে ভেবে, আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। কেউ নয়, কিছু নয়, তবু মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না ওই না-দেখা মুখটাকে।

পারছিলাম না বলেই অত্রির সাহায্যে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে দেখা করার অনুমতি জোগাড় করলাম, আমার সহপাঠী অভিষেক পালিতের সঙ্গে। কিন্তু আমাকে দেখেই খচে গেল অভিষেক।

“কেন এসেছিস চয়ন? মজা দেখতে?”

“না। মজা দেখতে হলে অন্য অনেক জিনিস আছে দুনিয়ায়। আমি এসেছি, আমার খারাপ লাগছে বলে। কেন করলি বল তো এরকম?”

“করতাম না তো কী করতাম? তিন বছরের একটা বাচ্চার বুকে চাকু বসাতে আসছিল সুস্মিতা, বসাতে দিতাম? তুই আমার জায়গায় থাকলে কী করতি? নিজের বাচ্চাকে বাঁচাতি না?”

“বাঁচাতে গিয়েই হল? নাকি তুই জেনেবুঝে ধাক্কাটা দিয়েছিলি?”

“না, দিইনি। আমি অনেক দিন ধরেই একটা মিটমাটের কথা ভাবছিলাম। মানুষ তো সাবমেরিন নয় যে, জলের তলায় সারাজীবন লুকিয়ে থাকবে। আমি কোথাও একটা সমঝোতায় আসতে চাইছিলাম। যাতে শান্তিতে বাঁচতে পারে সবাই।”

“এইরকম একটা কেসে সমঝোতা হয়? তুই কি পাগল?”

“কেন হবে না বল তো? নিশাকে যদি অ্যাকসেপ্ট করে নিত সুস্মিতা, আমার আর জাহ্নবীর সম্পর্কটা মেনে নিত, কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত? নিজে মরল, আমাকেও মেরে গেল। আর ধ্বংস করে গেল আমার বাচ্চাটার জীবনটা। উফ! এত অসহিষ্ণু কেন মানুষ? অন্যের যা, সেটাকে কোথাও নিজের বলে মেনে নেওয়া যায় না?”

“তুই তিনশো বছর আগেকার একটা পৃথিবী থেকে কথা বলছিস। পৃথিবীটা এখন আর ওরকম নেই। তুই সাঁইত্রিশটা বিয়ে করা কুলীন বামুন নোস, আর সুস্মিতাও মোগল হারেমের একশোটা বাঁদির একজন নয়। এটা টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি অভিষেক।”

“থার্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি অবধি যদি পৃথিবী টেকে তা হলে সেদিনও সন্তান হওয়াটা বিয়ের একটা আবশ্যিক শর্তই থাকবে। তুই নিজে বাবা হয়েছিস, তুই বুঝিস না, বাবা হতে না পারলে কত লোকের দৃষ্টিতে নপুংসক হয়ে বেঁচে থাকতে হয়?”

“তাই বলে তুই যা করলি…”

“জ্ঞান দিস না তো। যা করেছি, বেশ করেছি। তার জন্য যদি ফাঁসিতে ঝুলতে হয় ঝুলব। তুই বিদেয় হ।”

“সে আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু আমি আজ তোর জন্য আসিনি রে। আমি এসেছিলাম তোর মেয়েটার জন্য। আসলে আমি নিজেও একটা মেয়ের বাবা হতে চেয়েছিলাম। পারিনি। তাই অত্রির মুখে তোর বাচ্চাটার দুর্দশা শুনে আর থাকতে পারিনি।”

আমার কথার ভিতরেই হাউহাউ করে কেঁদে উঠল অভিষেক, “একবার আমার মেয়েটাকে দেখলে তুই চোখ ফেরাতে পারবি না। সেদিন যখন হোটেলে তুই আমাকে আর জানুকে দেখলি, নিশা তখন ঘরে ঘুমোচ্ছে।”

“মেয়েকেও নিয়ে গিয়েছিলি ওই হোটেলে?”

“আমরা ওভাবেই সংসার করতাম রে। সুস্মিতাকে ফাঁকি দিয়ে, দুনিয়াকে লুকিয়ে ওই দু’-তিনমাসে দু’-চারদিন। ভাগ্যে সেটুকুও সইল না। কিন্তু তুই একটু দেখ না ভাই। তোর মেয়ের শখ বলছিলি, আমার মেয়েটাকেই নিয়ে গিয়ে মানুষ কর না। আমি জেল থেকে কবে বেরোব, দশ না পনেরো কতবছর লাগবে, কোনও ঠিক আছে? বেরোলেও ফিরিয়ে আনতে যাব না। ও মানুষ হচ্ছে, সেটুকুই শান্তি। নে না ভাই।”

“ওর মা এখন কোথায়?”

“জামিন পেয়েছে। কিন্তু যে-কোম্পানিতে চাকরি করত সেটা তো গেছে। খাবে কী? বাঁচবে কী করে, মেয়েকে নিয়ে?”

“তা হোক, তবু মায়ের থেকে মেয়েকে আলাদা করা উচিত নয়। আমি দেখছি যদি ভদ্রমহিলার জন্য কিছু করতে পারি।”

“প্লিজ় ভাই। আমি জানি তুই অন্যরকম ছেলে। তুই সুযোগ নিবি না। প্লিজ় একটু দেখ। তা হলে জানু মেয়েটাকে নিয়ে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারবে অ্যাটলিস্ট।”

আমি অভিষেকের হাতে আমার কার্ডটা দিয়ে বললাম, “তোর সঙ্গে যেদিন দেখা করতে আসবে সেদিন জাহ্নবীকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলিস। একটা কথা শুধু বলে যাচ্ছি, আমি বেঁচে থাকতে তোর মেয়ে খেতে পাবে না, এটা হবে না।”

“আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব তোর কাছে। আর সব চুলোয় যাক, আমার মেয়েটাকে বাঁচা। উকিল তো বলছে, অ্যাক্সিডেন্ট হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে আমি তিনবছরের মধ্যে ছাড়া পেয়ে যাব। ততদিন তুই নিশাকে একটু দেখে দে। আর প্রমাণ করা যাবে না কেন? ব্যাপারটা তো অ্যাক্সিডেন্টই, বল?”

“দুনিয়ায় যেখানে যখন যা ঘটে, সবটাই অ্যাক্সিডেন্ট রে। আমরা বোকার মতো প্ল্যানিং করি।” আমি বেরিয়ে আসার আগে বললাম।

বেরিয়ে এসে ভাবছিলাম, মাকে প্রসবযন্ত্রণার ভিতর দিয়ে যেতে হয়, মা আর বাচ্চার অচ্ছেদ্য বন্ধনটা বোঝা যায়। কিন্তু কী আছে এই ঔরসের মধ্যে যে, জেলে বসে থাকা লোকটাও নিজের প্রতিভূর জন্য পাগল হয়ে ওঠে? অভিষেকের মেয়ে আর তার মা যাতে মানুষের মতো বাঁচতে পারে তার জন্য আমি আমার সাধ্যের ভিতরে যা আছে সব করব। কিন্তু একইসঙ্গে আমি এই ফর্মুলাটাকেও জীবনের ধ্রুবসত্য বলে স্বীকার করব না। একজন কুমোর যদি গঙ্গার ধারের মাটি নিয়ে এসে মা দুর্গার মূর্তি গড়তে পারে আর অগণিত মানুষ অঞ্জলির সময় সেই মূর্তিকেই দেবী ভাবতে পারে, তা হলে আমি কোনও অরফ্যানেজ থেকে নিয়ে আসা একটা ডলপুতুলকে নিজের মেয়ে ভাবতে পারব না কেন?

বাড়ি ফিরে দেখলাম ঝুমা ঘুমিয়ে পড়েছে। এই অসময়ে ঘুমোচ্ছে কেন ভাবতে ভাবতে আমি ওর পাশে বসে নিচু হয়ে ওর দুটো চোখে চুমু দিলাম আলতো করে।

ঝুমা ধড়ফড় করে উঠে বসল, “ও তুমি! কখন এলে?”

আমি কোনও জবাব না দিয়ে ঝুমাকে আমার অনেকটা কাছে টেনে নিয়ে বললাম, “ঝুমা আমরা একটা মেয়ে অ্যাডপ্ট করতে পারি না?”

১৫

আমার নতুন বস ব্রিজলাল সাক্সেনা রসিক মানুষ। অত্যন্ত দক্ষ আর অসম্ভব কাজেরও মানুষ, নইলে কোম্পানি ছেষট্টি বছর বয়স অবধি রাখত না ওঁকে। তবে এই সবকিছুর সঙ্গে ব্রিজলালের সেন্স অফ হিউমার এত তীব্র আর তীক্ষ্ণ যে, তার সামনে কথা বন্ধ হয়ে যায়।

“তোমরা বাঙালিরা এই যে সারাক্ষণ ‘খোট্টা’, ‘জাঠ’ ‘কাউ-বেল্ট’ এসব বলো; কী বোঝাও কথাগুলো বলে? ইউপি, দিল্লি, রাজস্থানের লোকগুলো খুব গোদা, বুদ্ধিহীন, এটাই তো?”

সেলস প্রোগ্রেস রিপোর্ট নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম। এই প্রশ্নের কোনও উত্তর জোগাল না মুখে।

“আচ্ছা তোমার মনে হয়, মথুরায় জন্মানো কৃষ্ণ খুব বোকা একটা লোক ছিলেন? বা হারিয়ানভি অর্জুন একদম মাথামোটা?” ব্রিজলাল ভুরু নাচালেন।

“এসব আসলে হাজার হাজার বছর আগেকার কথা তাই…”

“ওকে, লেটস কাম টু দ্য প্রেজ়েন্ট। রাজস্থান থেকে যে-লোকগুলো লোটা-কম্বল সঙ্গে করে কলকাতায় এসে আজ কলকাতার প্রায় আশিভাগ প্রাইম প্রপার্টির মালিক, তাদের একদম আকাট বলে মনে করো তুমি?”

“নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালির যা অবদান বা শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে, তার কাছাকাছি অন্য কেউ আসে না।”

ব্রিজলাল ইলেকট্রনিক সিগারেট ঠোঁটের ফাকে নিয়ে বললেন, “আই এগ্রি। কিন্তু নিজেকে যে-জাতি বাঁচাতে পারবে না, সে নিজের ইতিহাসকে বাঁচাবে কী করে? আমার বাবা বলতেন, বাংলা না শিখলে পরে ভারতে ‘এলিট’ হওয়া যায় না। আমাকে তাই বাড়িতে মাস্টার রেখে বাংলা শেখানো হয়েছিল রীতিমতো। বঙ্কিম পড়তে গিয়ে দাঁত ভেঙে যেত, শরৎচন্দ্র এনজয় করতাম, পরে শরদিন্দুও। আমার ছেলেমেয়েরা কেউ বাংলা না শিখলেও আমার নাতি বেশ গড়গড়িয়ে বাংলা বলতে পারে। কারণ কী জানো?”

“আপনি শিখিয়েছেন?”

“মোটেই না। আমার সঙ্গে তো দেখাই হয় ন’মাসে ছ’মাসে এক-আধবার। ওরা বাংলা শিখেছে বাড়ির কাজের লোকেদের থেকে। দিল্লি এবং সংলগ্ন অঞ্চলে এখন ‘ডোমেস্টিক হেল্প’দের প্রায় নব্বই শতাংশ বাংলাভাষী। বঙ্গ গরিমা একেবারে ফুল সার্কল কমপ্লিট করে ফেলেছে।” হেসে উঠতেন সাক্সেনা।

আমার সেই হাসির আওয়াজটা খারাপ লাগলেও ওঁর কথার পিছনের যুক্তি খণ্ডাতে পারতাম না।

মাঝেমধ্যে আমাকে নিয়ে পার্ক স্ট্রিট বা চাঁদনিতে ড্রিঙ্ক করতেও যেতেন ব্রিজলাল। আর দু-তিন পেগের পরই ওঁর ভিতরের যন্ত্রণাটা উথলে উঠত। মাঝবয়সে এক অধ্যাপিকার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে নিজের পরিবারের কাছে ব্রাত্য হয়ে যান ব্রিজলাল। সেই সম্পর্ক থেকে কোনও সন্তান আসেনি পৃথিবীতে, কিন্তু বছর দুয়েক একসঙ্গে ছিলেন সেই ভদ্রমহিলার সঙ্গে। এই ঘটনার অল্প কিছুদিন আগেই ওঁর স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন। নিঃসঙ্গ ব্রিজলালের কাছে সেইসময় মনস্বিতা ভার্মা একটা মরূদ্যান হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি সেই সম্পর্ক, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরা সৈনিক যেমন নিজের শরীরের বুলেটটাকে অনন্তকাল ভিতরে বহন করে, ব্রিজলালও মনস্বিতার স্মৃতি সেভাবে বহন করতেন।

গ্লাসে চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ব্রিজলাল বলতেন, “নৌকাটাকে একবার ভাসিয়ে দিলে সে তো ভেসেই যাবে তাই না, যতক্ষণ না ডুবে যাচ্ছে! পুরুষের জীবনও তেমনই। সে বাই নেচার অ্যাডভেঞ্চারিস্ট। একটা সিংহ কি গোরুর জীবন যাপন করতে পারে?”

বুঝতে পারতাম, প্রেমে ব্যর্থ ব্রিজলাল ওই আগ্রাসনটাকেই সেলসের কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন।

একটা বিশেষ বারে বসে আমাকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন, “তুমি তোমার সাংসারিক জীবনে সন্তুষ্ট?”

“হ্যাঁ, অসুবিধে তো কিছু নেই।”

“সুবিধে-অসুবিধের কথা জিজ্ঞেস করিনি। জিজ্ঞেস করেছি, সন্তুষ্ট কি না।”

চুপ করে থাকতাম। কী উত্তর দেব? হেসে ‘হ্যাঁ’ বলে চলে আসতাম। কুটুস হবার পর থেকেই ঝুমা ওকে নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত। সেটাই হয়তো স্বাভাবিক, বিশেষ করে আমি যখন কাজের চাপে সেরকম খোঁজখবরই রাখতে পারি না। কিন্তু আমার আর ঝুমার নৈকট্য যে বালির তলা দিয়ে বইতে থাকা নদীর মতো অদৃশ্য হয়ে গেল প্রায়, তাই নিয়ে অভিযোগ জানাব কাকে? কুটুস যখন দু’বছরের তখন আমি একবার ঝুমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, ও অত ঝুলন সাজাতে ভালবাসত কিন্তু বিয়ের পর একবারও ঝুলন সাজাল না কেন, ফ্ল্যাটের বারান্দায়? হোক না ভাড়ার ফ্ল্যাট, তবু তো নিজেদেরই।

“আসলে জ্যান্ত পুতুল আর আসল সংসার পেয়ে গিয়েছি তো, এখন ওইসব ইট-বালির নকল পৃথিবী আর প্লাস্টিকের পুতুল ঘাঁটাঘাঁটি করতে মন চায় না।” কুটুসকে জড়িয়ে ধরে ঝুমা জবাব দিয়েছিল।

আমি সেই কথার উত্তরে বিড় বিড় করে বলেছিলাম, “জ্যান্ত পুতুলের কিন্তু কিছু চাহিদা থাকে। শুধু ছোট পুতুলদের নয়, বড় পুতুলদেরও।”

ঝুমা শুনতে পায়নি।

তবে অভিষেকের ঘটনাটার পর খানিকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল ঝুমা। সাক্সেনা সাহেবের সাহায্যেই আমি যে জাহ্নবীর একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছি, মেয়েটাকে নিজের কাছে নিয়ে একজন মা যে বাঁচতে পারছে, ঘুণাক্ষরেও সেসব বলিনি ঝুমাকে। বললে পরে ও খামোখা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। পদে পদে সন্দেহ করত যে, আমি এখন হয়তো অভিষেকের বিপন্ন প্রেমিকার সঙ্গে মেলামেশা করছি, অভিষেকের মেয়ের হয়তো বা বকলমে আমিই বাবা এখন। একদিন রাত্রে, যখন আমার নিশ্বাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ওর নিশ্বাস, আমার জিভের লালার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ওর লালা, ওর কপালের চুল এসে ঢেকে দিচ্ছে আমার চোখ, একটা গোটা পৃথিবী যেন অন্ধকার হয়ে গিয়েই আলোতে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে, তখন ঝুমা আমায় জিজ্ঞেস করেছিল ও আবার মা হতে পারল না বলে আমি ওকেও ছেড়ে যাব কি না!

সেই রাত্রির পর থেকেই আমি অনেক মেপে কথা বলা শুরু করি ঝুমার সঙ্গে। স্থিতিস্থাপকতা হারিয়ে ফেলেছে যার মন, তাকে কথা দিয়ে এদিক-ওদিক টানা একরকম অত্যাচার করাই। দ্বিতীয় যে-কাজটা জোরকদমে শুরু করে দিই তা হল বাচ্চা দত্তক নেওয়ার চেষ্টা।

কিন্তু সেটাই কি খুব সহজ? চোদ্দোরকম কাগজপত্র জমা করে, রোজগারপাতির অকাট্য প্রমাণ দিয়ে, আরও হাজারদফা, ‘কী চাইছি’, ‘কেন চাইছি’র উত্তর দিয়েও অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হল শুধু। বোঝাতেই পারছিলাম না একটি ছেলে থাকা সত্ত্বেও, কেন আমরা আর একটি সন্তান, একটি মেয়ে, নেব। প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠে আসছিল। ভারতে যেখানে লাখো বাচ্চা ফুটপাথে মরছে, শিশুশ্রমিক হয়ে কাজ করছে চায়ের দোকানে, কয়লা খাদানে, সেখানে একটা বাচ্চাকে আমরা ভালবাসায়, মমতায় বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইছি, মানুষ করতে চাইছি, এটাই কি যথেষ্ট নয়?

নিজের সন্তানের মতো করে নয়, নিজের সন্তান ভেবেই মানুষ করব, একটু সংবেদনশীলতা থাকলেই উলটোদিকের লোকটার সেটা বোঝার কথা, কিন্তু এই দেশে একটা চেয়ারে বসলেই বোধহয় মানুষের মানুষকে হ্যারাস করার ইচ্ছা জন্মায়। সরকারি সেট-আপ হলে সেই ইচ্ছেটা চতুর্গুণ বৃদ্ধি পায়, সেটা নিজে যখন সরকারি চাকরি করতাম তখনও বুঝেছি, এখনও বুঝছিলাম।

ওই বিশেষ বারটাতে যেদিনগুলো যেতাম আমরা, ব্রিজলাল বার-সিঙ্গারদের টাকা দিতেন। জঘন্য একটা নিয়ম ছিল বারটার। পাঁচশো টাকার নোট একবারে কেউ দিলে সে গায়িকার ব্লাউজের ভিতর হাত ঢুকিয়ে টাকাটা ভরে দিতে পারত।

“ঠিক সেই কারণেই আমি একশো টাকার দশটা নোট আলাদা আলাদা করে দিই, একসঙ্গে পাঁচশো টাকা দেওয়ার ছলে একজন শিল্পীর ব্লাউজ়ের ভিতরে হাত ভরে তাকে অপমান করি না।”

শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হয়ে গেল, ইচ্ছে করল মানুষটাকে প্রণাম করি। মাথা নামিয়ে ফেলেছিলাম, যখন তুললাম, সাক্সেনা আমার চোখ দেখেই বুঝতে পারলেন আমার ভিতরে একটা তোলপাড় চলছে।”

“আমাকে কিন্তু মহৎ ভেবো না চয়ন। আমি আমার রিলেটিভদের মধ্যে খুব নিন্দিত একটা লোক যে বউ মারা যাওয়ার পর, পঞ্চান্ন বছর বয়সে এক মধ্য চল্লিশের মহিলার সঙ্গে লিভ-টুগেদার করেছে।”

“সেটা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। আমি সেটা মানতে রাজি নই।”

“আসলে কী জানো চয়ন, মধ্যে মধ্যে দিল্লি-মুম্বই করলেও জীবনের একটা বড় অংশ কলকাতায় কাটিয়েছি তো, অনেককিছুই দেখেছি সামনে থেকে, তাই অনেক বাঙালি ভণ্ডামি আর বাঙালি সূক্ষ্মতা আমার মধ্যে মিশে গিয়েছে।”

“গল্প বলুন। শুনি। আজ তো শনিবারের সন্ধ্যা, তাড়া কিছু নেই।” আমি একটা চুমুক দিলাম গ্লাসে।

ব্রিজলাল যেন আমার সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় ছিলেন। নস্টালজিয়ায় ডুব দিলেন, “চাকরিজীবনের প্রথমদিকে ক্রিক রো-র একটা বাড়ির একটা ঘর নিয়ে ভাড়া থাকতাম। আমার পাশের ঘরের ভাড়াটে নির্মলদা আমাকে এই বারে নিয়ে এসেছিল প্রথম। চুপিচুপি। এখানে তখন নির্মলদার বউ সুমিতাবউদি গান গাইত।”

“সেই সময়? বাঙালিবাড়ির বউ? বারে?”

“উপায় কী? দাদার কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তো। মোটামুটি ভাল পোস্টেই চাকরি করত লোকটা। হঠাৎ করে স্ট্রাইক শুরু হল কারখানায়, মজুরি বাড়ানোর দাবিতে। মালিকরা আশি টাকা অবধি রোজ দিতে চাইছিল কিন্তু শ্রমিক নেতৃত্ব একশো দশের নীচে নামতে রাজি হল না কিছুতেই।”

“কিন্তু এই আন্দোলনটাকে আপনি অন্যায় বলতে পারেন না।”

“আরে ভাই, আমি ন্যায়-অন্যায় বলার কে? নিশ্চয়ই মজুরিবৃদ্ধির দাবি যুক্তিসংগতই ছিল। আমার অবাক লেগেছিল এটা দেখে যে, আন্দোলনটার নেতৃত্বে ছিলেন শিক্ষক, অধ্যাপক, সরকারি চাকরি করা বাবুরা। কিন্তু কারখানা তো আর রবীন্দ্রসংগীত শোনা লোকেদের জায়গা নয়, তারা কী করল জানো? যেখানে আশির বদলে ষাট টাকা রোজে কাজ করাতে পারবে সেই মুলুকে শিফট করিয়ে দিল যন্ত্রপাতি, আর বড় বড় কয়েকটা তালা ঝুলে গেল কারখানার গেটে। যেদিন কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেল তার তিন-চারদিন পর থেকেই ওই টিচার, প্রফেসর, বাবুরা সরে গেলেন আন্দোলন থেকে। শ্রমিকরা কেউ তাঁদের ঘরে একবেলা একথালা ভাত পেল না; ওদের বাচ্চাগুলো শীতে কাতরে মরলেও সোয়েটার পেল না একখানা, কেবল ‘তোমাদের মনের জোর রেখে লড়ে যেতে হবে’ এর বাইরে কোনও বাণী ভেসে এল না বিপ্লবের বুলি আওড়ানো ব্রাউন সাহিবদের কাছ থেকে।”

“মালিকরা শোষণ করছিল সেটা যেমন সত্যি…”

ব্রিজলাল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “মালিকরা তো মুনাফা করতেই এসেছে, চ্যারিটি নয়। তুমি তাদের পঞ্চাশ টাকা রেভিনিউ এনে দিলে, তারা তোমাকে পাঁচ টাকা দেবে। সেটাকে যদি খারাপও বলি তবু এটা তো সত্যি যে, রক্তশোষণ করার জন্য অন্তত ‘পান্তাভাত’ খাওয়াতে হবে। এবার তুমি বলতে পারো শ্রমিকরা আজীবন ‘পান্তাভাত খাবেই বা কেন?”

“যাই বলি, তার উত্তর আছে তো আপনার কাছে।”

“অবশ্যই আছে, কারণ আমি স্পটেই ছিলাম, সেই সময়টার মধ্যে ছিলাম। তাই ‘পোলাও খাওয়াব’ বলে যারা ভাতটাও বন্ধ করে দিয়েছে তাদের ক্ষমা করতে পারি না কিছুতেই।”

“নির্মলদার বউয়ের গল্পটা শেষ করুন।”

“বউদির দারুণ গানের গলা ছিল। তখন তো এইসব টিভি চ্যানেল হয়নি, ফাংশনে চান্স পাওয়াও কঠিন ছিল, বউদি এই বারে গান গাইতে আসত। আর নির্মলদা আমাকে সঙ্গে নিয়ে আসত বউদিকে পাহারা দিতে। অবাক করা কাণ্ড কী জানো, তখনও এই ব্লাউজের ভিতর টাকা ভরে দেওয়ার ব্যাপারটা চালু ছিল। একশো টাকা লাগত সেই সময় সিঙ্গারের বুকে হাত দেওয়ার জন্য। বউদির বুকের দিকে কেউ হাত বাড়াচ্ছে দেখলেই নির্মলদা অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে নিত। তারপর আমায় জিজ্ঞেস করত, ক’টা নোট জমা পড়ল।”

“আপনি কিছু বলতেন না?”

“কী বলব, বউদি ওই কাজটা না করলে দুটো বাচ্চা সমেত পরিবারটা না-খেয়ে মরত তো। নির্মলদা আর কোনও কাজেরই উপযুক্ত ছিল না। খালি গবেষণা করত যে, আদর্শ কপচিয়ে মাথাটা খেয়ে ফেলার পরও মানুষের খিদে পায় কেন।”

“আচ্ছা স্যার, ওই নির্মলদার জায়গায় কোনও বিহারি বা মাড়োয়াড়ি কিংবা ইউপি-র লোক হলে কী করত বলে মনে হয় আপনার?”

“ইউপি-র কায়স্থ হলে কী করত বলতে পারি না, তবে বিহারি হলে ছাতু বেচত, সর্দারজি হলে ট্যাক্সি চালাত, ওড়িয়া হলে প্লাম্বিং মিস্ত্রি বা জল-দেওয়া ভারী হত আর মাড়োয়াড়ি শ্রমিক হয় না, মালিক হয়, তাই এই সিচুয়েশনেই পড়ত না।”

“একমাত্র বাঙালিই তা হলে বিপদে পড়লে বউকে সামনে ঠেলে দেয়?”

“মে বি, নারী-পুরুষের সমানাধিকারে বিশ্বাস করে তাই। নির্মলদা যেমন বলত যে, বাচ্চাদের খাইয়ে রাখার দায়িত্ব ওর যতটা, বউদিরও ততখানি। কিন্তু আবার সেই লোকটাই গলা নামিয়ে আমাকে বলত ব্লাউজের ভিতর যতগুলো নোট যায় বউদি নাকি ততগুলোর কথা বাড়িতে ডিক্লেয়ার করে না। কম করে বলে।”

লেট সিক্সটিজ়-আর্লি সেভেন্টিজ়, নকশালবাড়ি, ভাড়াবাড়ি, ইউপি-র ব্রিজলাল, বাংলার সুমিতাবউদি, ব্লাউজ়ের ভিতর খুঁজে দেওয়া টাকা আর তার সংখ্যা নিয়ে দ্বন্দ্ব, সব কীরকম ককটেল হয়ে ধাক্কা মারছিল মাথায়। আর তার ভিতরে গমগম করছিল গান।

“একটা জিনিস দেখেছ? নন-বেঙ্গলিরা কেউ হিন্দি গান শুনতে চাইছে না। সন্ধ্যা-লতা-আরতি শুনতে চাইছে। কেন বলো তো?”

“কেন?” আমি প্রতিপ্রশ্ন করলাম।

“বাংলা গানের মিঠাসটা চাইছে লাইফে। বাংলা সুর, বাংলা কথা, বাংলা নখরাও এত মিষ্টি যে, অল ইন্ডিয়ার লোক পাগল হয়ে যায়। এই সুইটনেস যে বুঝবে না, তাকে দিয়ে বাঙালির দোষ-গুণের বিচার হবে?”

“হবে না।” আমি হালকা নেশার ঘোরে বললাম।

“রাইট ইউ আর। তাই তো রুদ্রাশিসের কেসটা তোমাকেই হ্যান্ডল করতে হবে।”

“মানে?”

ব্রিজলাল শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, “ডোন্ট ওরি। তোমার সঙ্গে আর একজনকে দেব।”

১৬

রুদ্রাশিস আমাদের কোম্পানিতেই পারচেজ়ে ছিল। আমার সঙ্গে খুবই সামান্য পরিচয়। দু’-চারদিন দেখা হয়েছে। অফিসের সোশ্যালে সামান্য কথা।

“রুদ্রাশিস কী করেছে?” জিজ্ঞেস করেছিলাম ব্রিজলালকে।

“রুদ্রাশিসের নামে কমপ্লেন আছে। ও ঘুষ তো খেয়েইছে। আমাদের অ্যাসেম্বলিং প্ল্যান্টের কিছু র’ মেটিরিয়ালও নাকি পাচার করে দিয়েছে। আমার উপরে দায়িত্ব পড়েছে শাস্তি দেওয়ার, কিন্তু একটা তদন্ত কমিটি না বসিয়ে আমি তো ওকে ছেঁটে ফেলতে পারি না। ইন ফ্যাক্ট চাইও না।”

“সেই দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে?”

“হ্যাঁ, তোমাকেই নিতে হবে। আমি চাইলে কলমের খোঁচায় ব্যাপারটা ডান করে দিতে পারি। কিন্তু আমরা কি শুধু সুবিচার চেয়েই যাব, নিজেদের কোর্টে বল এলে নিজেরাও ফেয়ার হব না? তোমাকে বড় কোথাও না নিয়ে গিয়ে এখানে নিয়ে আসি কেন? আমি চাই এই স্ট্রাগল আবার ফিল করতে। মদ খাওয়ার উদ্দেশ্য এই নয় যে, সব যন্ত্রণাকে ভুলে যেতে হবে, মদ খেয়ে যেন কাঁটাটাকেও গোলাপ ভেবে হাতে নিতে পারি।”

ব্রিজলালের নেশা হয়ে গিয়েছিল, বুঝতে পেরে কথা আর বাড়াইনি। তবে দু’দিন পর চেম্বারে ডেকে বস যখন শতভিষা রায়ের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলেন, হালকা একটু নেশা আমারও হতে পারত। কারণ বিরাট কিছু সুন্দরী না হয়েও যারা অসম্ভব অ্যাপিলিং, শতভিষা তাদেরই দলে। কোম্পানির এইচ আর-এ ভাল পোস্টে আছে এবং কথাবার্তা শুনে যেটুকু বুঝলাম, আরও অনেকদূর উঠবে।

শতভিষা আর আমাকে একত্রে রুদ্রাশিসের কেসটা দেখার দায়িত্ব দিলেন ব্রিজলাল। আমি এইচ আর-এর লোক নই, শতভিষা ওর ডিপার্টমেন্টের অন্য কাউকে নিতেই পারত সঙ্গে, কিন্তু ব্রিজলাল চাইছিলেন আমি জড়িত থাকি তদন্তে।

কী করব জড়িত থেকে? রুদ্রাশিস দোষী প্রমাণিত হলে ওর শাস্তির সুপারিশ? আমি নিজে কি একদম পারফেক্ট যে, অন্যকে শাস্তি দেব? সব প্রশ্ন সবসময় করা যায় না তাই মনের কথা মনে চেপেই আমি একদিন শতভিষার সঙ্গে বসলাম, রুদ্রাশিসের ব্যাপারটা নিয়ে।

“রুদ্রাশিস যে কোম্পানির বেশ খানিকটা ক্ষতি করেছে সেটা বোঝার জন্য শার্লক হোমস হওয়ার দরকার নেই, দু’-চারটে ফাইল ঘাঁটাই যথেষ্ট। সাব-স্ট্যান্ডার্ড মাল কেনা থেকে শুরু করে টেন্ডারের কোটেশন দালালদের কাছে ফাঁস করে দেওয়া, যা যা করেছে তাতে চাকরি থাকার কোনও সিন নেই, জেলে না যেতে হলেই অনেক।”

“কিন্তু রুদ্রাশিসের মতো লোক, যে বারো-তেরো বছর সুনামের সঙ্গে কোম্পানিতে কাজ করছে, ইতিমধ্যেই দুটো প্রোমোশন হয়েছে যার, এরকমটা করতে গেল কেন? কীসের তাড়নায়?”

“সেই খোঁজ নেওয়া কি খুব জরুরি? প্রত্যেকটা চোরেরই তো কিছু না কিছু অ্যালিবাই থাকে।” শতভিষা বলেছিল।

সেদিন শতভিষা পরে এসেছে, অক্স-ব্লাড রেড সিল্কের শাড়ির সঙ্গে কালো স্লিভলেস ব্লাউজ়। ঠিক স্লিভলেসও নয়, হল্টার-নেক। যখন উঠে দাঁড়াল তখন একটা রূপোর চাকতির মতো নাভিটা চোখে পড়ল। ওইরকম একটা হ্রদেই বোধহয় দুর্যোধন যুদ্ধে হেরে গিয়ে লুকিয়ে ছিল। আমি চোখ তুলে ওর দিকে তাকাতেই দেখালাম বাচ্চা সাদা হাতির শুঁড়ের মতো দুটো অনাবৃত হাত, ঠিক ততটা সাদা নয় বলে, আরও মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

শতভিষার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে মনে মনে বললাম, সব কাপুরুষেরই কোনও না কোনও অজুহাত আছেই৷

আমার একটু তলিয়ে দেখার ইচ্ছায় অবশ্য শেষ অবধি বাধা দিল না শতভিষা। হয়তো এইচ আর-এর কাজ দেখাবার জন্য এরকম কিছু ছানবিন জরুরি বলে ওরও মনে হয়েছিল। সাক্ষ্যপ্রমাণ সবসময় মেলে না, বিশেষ করে যখন চূড়ান্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে কাজ করতে হয়। তাও শেষমেশ একটা-দুটো সোর্স কাজে লাগিয়ে আবিষ্কার করলাম যে, সেলসের কুশল পাল খুব ঘনিষ্ঠ রুদ্রাশিসের।

“সব জানো, কোথায় কী হচ্ছে, অথচ কোম্পানিকে জানানোর প্রয়োজন মনে করোনি? কী ভেবেছিলে, আমরা কিছু জানতে পারব না? এখন এই চোরের স্যাঙাত হবার অপরাধে তোমার চাকরিটিও যদি যায়, কে খাওয়াবে তোমায়? রুদ্রাশিস বিশ্বাস?”

“আমি নিজে তো কোনও অন্যায় করিনি স্যার। তারপরও চাকরি গেলে যাবে। রাস্তায় বসে আলু বেচব।”

“অথচ যে-কোম্পানি তোমায় খাওয়ায়-পরায়, সেই কোম্পানির ক্ষতি যে করছে তার বিরুদ্ধে মুখ খুলবে না? এই তোমাদের সততা?” কুশলের চ্যাটাং চ্যাটাং উত্তরে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল আমার।

“সততার চেয়ে মনুষ্যত্ব বড় স্যার। রুদ্রাশিসদা চুরি করেছে কি না জানি না, কিন্তু করে থাকলেও ওকে দোষ দিতে পারব না। বউদিকে বাঁচানোর জন্য ও শুধু সূর্যকে পশ্চিমদিকে ওঠাতে বাকি রেখেছিল।”

“কী হয়েছে রুদ্রাশিসের স্ত্রী-র?”

“আপনারা ওর বিরুদ্ধে তদন্ত করছেন আর এইটাই জানেন না? ব্রেস্ট ক্যানসার সেকেন্ড স্টেজে ধরা পড়েছে। এখনও পর্যন্ত বাইশটা কেমো নিতে হয়েছে সুজয়া বউদিকে।”

“স্ত্রীর এত বড় অসুখ, অথচ তুমি ছাড়া অফিসের কোনও কলিগকে জানায়নি কেন? কেন অথরিটির কাছে সাহায্য চেয়ে চিঠি লেখেনি?”

“আসলে নিজের লড়াইটা নিজেই লড়তে চাইছিল।”

“একদম মিথ্যে বলবে না কুশল। নিজের লড়াই নিজে লড়তে চেয়েছিল না হাতি! রুদ্রাশিস অফিসের কারওকে জানায়নি কারণ, অফিস রুলস মেনে যত টাকা সাহায্য ওকে করা যেত তাতে ওর পোষাত না। তাই ও সবার কাছ থেকে বিষয়টাকে লুকিয়ে প্রায় পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকার দুর্নীতিতে জড়িয়েছে।

“আমি ঠিক বলতে পারব না স্যার। আমি জানি না।”

“তুমি সব জানো। আর বলতেও তোমাকে হবেই। নইলে শো-কজ় নোটিশ ধরানো হবে তোমায় কালকেই। রাস্তায় বসে আলু বেচার কথা বলা যতটা সহজ, রাস্তায় বসে বিক্রি করাটা কিন্তু তত সহজ নয়। এই যে আমি বসে আছি, আমি নিজেই মুদি দোকানির ছেলে। আমি জানি কে কী বিক্রি করতে পারে। তোমার ছেলে যে-স্কুলে পড়ে তার মাসমাইনে কত? উঠবে টাকাটা আলু বেচে?”

কুশল ভেঙে পড়ল, “সরি স্যার, আমায় ক্ষমা করে দিন। আমি তখন বুঝতে পারিনি, কিন্তু আপনি ঠিকই বলছেন, রুদ্রাশিসদা অন্যায় করেছে। যে-কোম্পানি আমাদের মায়ের মতো, তার সঙ্গে এরকম বেইমানি করা ঠিক নয়।”

“কথাগুলো রুদ্রাশিসকে বলোনি কেন?”

“আসলে স্যার, তখন যা অবস্থা তাতে কথাগুলো বলা যেত না। বউদিকে নিয়ে ও একবার মুম্বই, একবার চেন্নাই যাচ্ছে; জলের মতো টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে চারদিক দিয়ে, আমি নিজেও পঞ্চাশ হাজার ধার দিয়েছি রুদ্রাশিসদাকে। শোধ চাইনি।”

“অফিস কী করে সেটা তো একবার দেখতে পারত?”

“সেটাই ঠিক কাজ হত। মাথা কাজ করেনি তখন।”

“আবার সাফাই দিচ্ছ?”

“সাফাই নয় স্যার, তখনকার পরিস্থিতি চোখে দেখা যায় না। সুজয়া বউদি একটা কঙ্কালের মতো হয়ে গেছে। মাথাটা পুরো ন্যাড়া, ওজন হার্ডলি বেয়াল্লিশ-চুয়াল্লিশ কিলো, বিছানার সঙ্গে লেপটে মিশে আছে যেন। ওদিকে ওদের ক্লাস সেভেনে পড়া মেয়েটা গ্যাসে জল গরম করতে গিয়ে বাটি উলটে হাতে-পায়ে ফোসকা নিয়ে ঘুরছে, ভয়াবহ অবস্থা স্যার। আপনি দেখলে বুঝতেন।”

“নিশ্চয়ই বুঝতাম। শুনেও বুঝছি না তা নয়। এমনটা যেন কারও না হয়, এই প্রার্থনা। কিন্তু কুশল, ওই অবস্থাতেও রুদ্রাশিস ঠান্ডা মাথায় চুরি-ডাকাতিগুলো চালিয়ে গেছে। অফিসেরই কম্পিউটার থেকে তথ্য চুরি করে, টেন্ডারে কে কী কোট দিয়েছে সেটা জানিয়েছে অখিল শরাফের সংস্থাকে, যারা এইরকম দালালির কাজগুলো করে থাকে।”

“কোথাও একটা ভুল হচ্ছে স্যার। কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড তো ওর কাছে থাকার কথা নয়।”

“কোনও ভুল হচ্ছে না। পাসওয়ার্ড ওর কাছে ছিল না, কিন্তু পারচেজ়ের একজন মাথা হিসেবে ওর অ্যাকসেস ছিল কম্পিউটারটায়। শরাফের হয়ে কাজ করা একটা হ্যাকারকে পাশে বসিয়ে ও কম্পিউটার থেকে ডেটা বের করে নেয়। আর রিসেপশনে তার পরিচয় দেয় নিজের শালা হিসেবে। যেদিন ঘটনাটা ঘটে সেই দিনটার তারিখ জানতে চাও? ষোলোই মার্চ। এই যে তার সমস্ত প্রমাণ। তোমাকে দেখাব, না পুলিশকে?”

“যা ভাল বুঝবেন, স্যার। আমার সত্যিই আর কিছু বলার নেই। কিন্তু ষোলোই মার্চ কি রুদ্রদা কলকাতায় ছিল? বাইপাসের ধারের ওই হাসপাতাল থেকে বউদিকে রিলিজ করিয়ে মুম্বই গেল কবে, তবে? সতেরো তারিখ?”

কুশলের বলা কথাগুলোর সূত্র ধরে আমি একাই গেলাম, বাইপাসের ওই প্রাইভেট হাসপাতালে। এখানে ফোড়া কিংবা অর্শ নিয়ে ভরতি হলেও দেড়লাখ টাকা বিল ধরিয়ে দেয় হাতে। অফিস থেকে আগেই যোগাযোগ করা হয়েছিল বলে আমার সঙ্গে অবশ্য ভালই ব্যবহার করল ওরা। সুজয়া বিশ্বাসের চিকিৎসার খরচ এবং সেই সংক্রান্ত বিল আমাকে কম্পিউটারে দেখিয়ে দিল ওদের বিলিং সেকশনের একটি মেয়ে। চাওয়ামাত্র, প্রিন্ট-আউটও পেয়ে গেলাম প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।

না, ঠিকই বলেছিল কুশল। এই তো, প্রথম দফাতেই দশদিন থাকার জন্য এগারো লাখ টাকার বিল দেখছি। দ্বিতীয়বার আঠেরোদিন থাকা এবং চোদ্দো লাখ টাকার বিল। তারপর আবার ন’দিনের জন্য ছ’লাখ। প্রথমবার কনসেশন দেওয়া হয়েছে, ষাট হাজার টাকা, দ্বিতীয়বার দেড় লাখ টাকা এবং তৃতীয়বার চল্লিশ হাজার। অর্থাৎ মোট বিল একত্রিশ লাখ টাকা আর কনসেশন আড়াই লাখ। খরচ সাড়ে আঠাশ লাখ। এর সঙ্গে মুম্বই যাওয়া-আসা, থাকা এবং সেখানকার বিপুল ব্যয়। তারপর আবার চেন্নাইয়ে যাওয়া, যেখানকার খরচ আরও বেশি। পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকার দুর্নীতিতে জড়ানো রুদ্রাশিসের স্ত্রীর চিকিৎসা বাবদ খরচ, সাদা চোখেই ষাট-বাষট্টি লাখের বেশি। এর কিছুটা নিশ্চয়ই মেডিক্লেম থেকে পেয়েছে লোকটা। কিন্তু সেটা আর কত টাকা?

“এখনও পর্যন্ত বাহাত্তর লাখ টাকা খরচ হয়েছে স্যার, দিদিকে বাঁচাতে। জামাইবাবুর ফ্ল্যাট, একটা জমি ছিল সেটা, সব বিক্রি হয়ে গিয়েছে, সব। আপনি দরকারে ওর ব্যাঙ্কের বইগুলো পরীক্ষা করুন।” লোকটা বাজারের মধ্যেই বলল আমাকে।

কুটুস আর ঝুমা দু’জনেই ভালবাসে বলে বড় সাইজের কই মাছ পেয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। সাধারণত আজকালকার ছোট বাচ্চারা মাছ খেতেই অনিচ্ছুক, বিশেষ করে কাঁটাওয়ালা মাছ, কিন্তু কুটুস এই ব্যাপারে সত্যিই ব্যতিক্রম। অনেক ছোট বয়স থেকে ছেলেটা মায়ের সাহায্য ছাড়াই কাঁটা বেছে মাছ খেতে পারে। ইলিশের ক্ষেত্রে হয়তো একটু হেল্‌প লাগে, কিন্তু সেটাও আর বেশিদিন লাগবে না, আমি নিশ্চিত। ব্যাপারটা নিয়ে আমি রীতিমতো উচ্ছ্বসিত ছিলাম যতক্ষণ না মা আমায় মনে করিয়ে দিয়েছিল যে, আমি না পারলে কী হবে, আমার বাবাও কাঁটা তুচ্ছ করে ছোট মাছ খাওয়ায় এক্সপার্ট ছিল।

“শুনুন, আমি এই ব্যাপারে কিছু করতে পারব না, যা হবে তা অফিসের নিয়ম অনুযায়ী। আমি জানি না আপনার কেন এই ধারণা হয়েছে যে, আমার হাতে আপনার জামাইবাবুর বাঁচা-মরা। কিন্তু ধারণাটা ঠিক নয়।”

“স্যার, অলকেন্দ্র সাহা খবর না নিয়ে কোনও কাজ করে না। আমি জানি যে…”

আমি লোকটাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “আপনি কী জানেন না জানেন তাতে আমার কিছু এসে যায় না। আমি শুধু জানি যে, আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারব না। ক্যান ইউ প্লিজ় এক্সকিউজ়?”

সামনে থেকে সরে গেলেও লোকটা যে একটু পিছনেই কোথাও অপেক্ষা করছিল আমায় আবার ধরবার জন্য, সেটা বুঝেও অগ্রাহ্য করলাম। কই মাছ কাটাতে একটা অন্তহীন সময় লাগে, তাই চূড়ান্ত বিরক্ত হলেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া সেই সময় অন্য রাস্তা ছিল না। মাছটা নিয়ে বাজারের বাইরে বেরিয়ে ভাবছি নিষ্কৃতি পেলাম, লোকটা ফের পায়ের সামনে ঝাঁপ খেয়ে পড়ল। আমি আঁতকে উঠলাম। সামলে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, “প্লিজ় সিনক্রিয়েট করবেন না। হিতে বিপরীত হবে আরও।”

“এক মিনিট স্যার। আমি কোনও সিনক্রিয়েট করতে আসিনি। আমি শুধু আপনাকে এই কাগজগুলো দিতে এসেছি যেগুলো আপনারই তদন্তের কাজে লাগবে। এত খরচের পরও দিদি বাঁচবে কি না জানি না। এবং জামাইবাবু হয়তো দোষী সাব্যস্ত হবে, কারণ ও জালিয়াতি করেছে। জেলও হতে পারে ওর। কিন্তু যদি জেলও হয়, রুদ্রাশিস বিশ্বাস চিরকাল আমাদের কাছে সুপারম্যান আর সুপারহিরোই থেকে যাবে। অনেক হাজ়ব্যান্ডকে তো দেখেছি, স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে আবার বিয়ে করে নেয়। সেখানে আমার দিদির এই সেকেন্ড স্টেজ ক্যানসারে যে-লড়াইটা ও দিয়েছে, যাতে দিদির মেটাস্টিসিস না হয়, দিদি যাতে বেঁচে থাকে, তা ভোলার নয়। দিদি যদি বেঁচে যায় স্যার, তা হলে কৃতিত্ব ভগবানের নয়, জামাইবাবুর। লোকটাকে দেখে কী মনে হয় জানেন? লোকটা যেন যম আর আমার দিদির মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে। আর ও বিশ্বাস করে যে, ও বেঁচে থাকতে দিদি মরতে পারে না। ছোট মুখে বড় কথা হয়ে যাবে তাও বলছি স্যার, আমাদের সমাজে ঘেন্না, অবিশ্বাস, ভালবাসতে না-পারার ক্যানসারটাও ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ মানুষকে আপন ভাবতে ভুলে গেছে। কিন্তু ওই রুদ্রাশিসের মতো লোকগুলো বেঁচে আছে বলেই, সমাজটা এখনও ঘুণ ধরে শেষ হয়ে যায়নি। মেটাস্টিসিস হয়নি, ক্যানসার ব্রেস্ট থেকে ফুসফুস পর্যন্ত ছড়াতে পারেনি। থমকে গিয়েছে। কথাটা ভেবে দেখবেন স্যার, একবার।” বলতে বলতে প্রায় কেঁদে ফেলল অলকেন্দু।

আমার খুব ইচ্ছে করছিল সান্ত্বনা দিই। কিন্তু সেটা দেওয়ার পর আমি আর তদন্ত করার জায়গায় থাকি না বলে, চুপচাপ রিকশায় উঠলাম।

অসহায় অলকেন্দু রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল, অসহায় আমাকে নিয়ে এগিয়ে গেল রিকশা।

১৭

“ইদানীং সবাই খুব ডায়ালগ দেয়, সকলেই দার্শনিক কথাবার্তা বলে। আপনি একবার খোঁজ নিয়ে দেখুন, এই লোকটা হয়তো কবিতাও লেখে।” অলকেন্দু আমাকে রাস্তায় ধরে কী বলেছে, সেই গল্প শোনাতেই শতভিষা বলে উঠল।

ফুলহাতা মেরুন শার্ট এবং ব্লু ট্রাউজ়ার্সে, একেবারে খাঁটি করপোরেট ওম্যান লাগছিল শতভিষাকে। খুব নিরিবিলি এবং গলাকাটা দাম নেয় এমন একটা বার কাম রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়েছিল ও আমাকে। আমার বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল।

এমন নয় যে, একদিন অনেকটা বিল হলে দিতে পারব না কিন্তু আমার কৈশোর আর যৌবন কোথাও একটা লাগাম টেনে ধরে অতিরিক্ত খরচ করতে গেলেই। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে কিপটে ঝুমার সঙ্গে এতদিন থাকার কুফল। প্রেমিকা হিসেবে ও রুটি-তড়কার খোঁজ করত। এখন বউ হয়েও তিন কিলোর বদলে সাড়ে তিন কিলো সরষের তেল খরচ হয়ে গেলে গজগজ করে।

“আরতি মাসি যে রান্না করে, বুলটি সব কাজকম্মো করে, ওদের খেতে দাও তো ঠিক করে, নাকি প্রাণে ধরে দিতে পারো না?”

“ওদেরই জিজ্ঞেস করে দেখো একদিন।” ঝুমা জবাব দিয়েছিল।

“তোমার ঘরে, তোমার সামনে, ওরা কি সত্যি উত্তর দিতে পারবে?”

“তা হলে আমি দাদার কাছ থেকে ঘুরে আসি দু’দিন। উত্তর পছন্দ হলে, আবার ডেকে নিয়ো।”

“উত্তর তো আমি প্রথমদিনই পেয়ে গেছি। যেদিন অটোওয়ালার জন্য প্যাকেট চেয়ে কুরুক্ষেত্র বাধিয়েছিলে তুমি।”

কুটুস সোফায় বসে কার্টুন দেখছিল, মায়ের ঘরের দরজাও খোলা, তাও ঝুমা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল আমায়। আমার বুকে মুখ ঘষে জানাল ও হাড়কেপ্পন নয়, শুধু অপচয় পছন্দ করে না। আমি ওর গালে একটা চুমু দিয়ে ঠেলা মেরে সরিয়ে দিলাম।

ঝুমা কাতর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আর একটা।”

আমি মুখটা গম্ভীর করে বললাম, “অপচয় পছন্দ করি না।”

শতভিষা একটু দ্রুতই চুমুক দিচ্ছিল গ্লাসে। আধঘণ্টার ভিতর দুটো লার্জ পেগ গলা দিয়ে নেমে গেল ওর।

“কিছু খেতে খেতে খান।” আমি বললাম।

“খাচ্ছি তো, ওই নাগেটসগুলো।”

“শুধু নাগেটসেই হবে?”

“বেশি খেলে ড্রিঙ্ক করার মজাটা চলে যায়।”

“তবুও, কিছু না খেলে…”

“আমার হাজ়ব্যান্ড কী বলে জানেন, পাথর জলের গতি রুদ্ধ করে কিন্তু পাথর ছাড়া জলপ্রপাতও হয় না।”

“আপনার হাজ়ব্যান্ডও তো কবি দেখছি।”

“পুরুষমাত্রই কবি, কোনও না কোনওভাবে। কবিতা না বললে মেয়েগুলোকে পটাবে কীভাবে?” হেসে উঠল শতভিযা।

আমিও হাসলাম, “আমি কবি নই। তবে কবিতা পড়ি ম্যাগাজ়িন ট্যাগাজ়িনে। বুঝতে পারলে মন্দ লাগে না। অবশ্য আমার বউ হাইস্কুল পেরোবার পর এক লাইন কবিতাও পড়েছে কি না সন্দেহ!”

“আপনি আপনার ম্যারিটাল লাইফে সুখী চয়ন?”

ব্রিজলালের প্রশ্ন শতভিষাও করছে দেখে আমি অবাকই হলাম। আমার বিবাহিত জীবন নিয়ে সবার এত কৌতূহল কীসের?

“হ্যাপি হলে, এই প্রশ্নটার উত্তরে এরকম চুপ করে থাকতেন না। স্বতঃস্ফুর্ত একটা উত্তর দিতেন। নিশ্চয়ই কোথাও কোনও ভয়েড আছে, কোনও জ্বালায় জ্বলছেন আপনিও।”

“জ্বালা কার থাকে না? শূন্যতা কার নেই? কিন্তু হঠাৎ এই প্রসঙ্গ উঠল কেন, বুঝতে পারছি না।”

“উঠল কারণ, আমি হ্যাপি নই। আমার হাজব্যান্ড আমার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে দিল্লিতে থাকে। সেখানে তার একজন লিভ-ইন পার্টনার আছে। আমি কলকাতায় একা থাকি, আমার ফ্ল্যাটে।”

“স্ট্রেঞ্জ! আপনার ছেলে মিস করে না আপনাকে? কত বয়স তার?”

“সাত বছর।”

“ওহ, আমার ছেলের থেকে বছর দুয়েকের বড়। কিন্তু এই বয়সের বাচ্চারা মাকে ছাড়া খুব কমফর্টেবল তো নয়।”

“আমার ছেলে অন্য ধাঁচের। তা ছাড়া তার বাবা দিনরাত্রি হ্যামারিং করে তার মাথায় গুঁজে দিতে পেরেছে যে, মা ভাল নয়, মা উড়নচণ্ডী, ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই আমার ছেলে বাবার বান্ধবীকে নিয়ে কুল, কিন্তু আমার প্রতি উদাসীন। বছরে দু’-তিনবার আসে, দশদিন, বারোদিন থেকে যায়; আগেরবার সামার ভ্যাকেশনের সময় তিন সপ্তাহ থাকবে বলে এসেছিল, ওকে নিয়ে নর্থ সিকিম ঘুরে এলাম সাতদিন কিন্তু কলকাতায় ফিরেই বাবু দিল্লির গরম মিস করতে শুরু করলেন, তাই ট্রিপ ছেঁটে ছোট করে দিল্লি ফিরে গেলেন। ভাবুন একবার!”

“ভাবার কিছু নেই। এখনকার বাচ্চাদের বোঝা আমাদের কম্মো নয়।”

“তাই যদি হয়, তবে আমরাই বা আমাদের জীবনটা বাচ্চাদের সেবায় ব্যয় করব কেন? আমি কারও মা, কারও বউ পরিচয়ে বেঁচে থাকতে রাজি নই আর। আই অ্যাম আ ফ্রি বার্ড!”

“আপনার হাজ়ব্যান্ড আপনাকে ছেড়ে অন্য কারও কাছে গেলেন কেন? ইউ আর ভেরি অ্যাট্রাক্টিভ।”

“ইউ মিন, সেক্সি?” জোরে হেসে উঠল শতভিষা।

আমি হিসেব করতে শুরু করলাম, ওর ক’পেগ হল।

“থ্যাঙ্কস ফর দ্য কমপ্লিমেন্ট, চয়ন। আমি জানি আমি সেক্সি, ডিজ়ায়ারেবল। ছোট থেকে কত পুরুষ পিছনে পড়ে থাকত আমার, কিন্তু একবার সামনে এসে বললেই তারা খেলো হয়ে যেত আমার চোখে। আমি পুরুষকে প্রায় হামাগুড়ি দিতে দেখেছি, আই হ্যাভ সিন দেম, ক্রলিং ফর মি।” শতভিষা উঠে দাঁড়াল টয়লেটে যাবে বলে।

আমি ওর যাওয়ার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ঝুমাকে টুক করে একটা এসএমএস পাঠালাম, ‘অনেক আদর আমার বউটাকে’।

ঝুমা তৎক্ষণাৎ জবাব দিল, ‘হঠাৎ এত প্রেমের কারণ?’

আমি লিখলাম, ‘তুমি সুপার সেক্সি নও, আমার ঘরোয়া বউ, তাই৷’

ঝুমা লিখল, ‘অপমান, অপমান।’

আমি লিখলাম, ‘ভালবাসা, ভালবাসা।’

শতভিষা ফিরে এসে আগের জায়গা থেকেই শুরু করল, “আমার হাজ়ব্যান্ডকে যদি দেখেন তা হলে আপনিও মানবেন হি ইজ় রিয়্যালি হ্যান্ডসাম। কিন্তু পল্লবও তো আমায় দেখে আট্র্যাক্টেড হয়েছিল, জাস্ট অ্যাজ় আই ওয়জ় অ্যাট্রাকটেড টু হিম। এবার যখন আমার শরীরটা চেনা হয়ে গেল, অভ্যস্ত হয়ে গেল আমাতে, হি লস্ট ইন্টারেস্ট।”

“তবে তো এই নতুন মেয়েটার সঙ্গে সম্পর্কের আয়ুও বেশিদিন নয়।”

“সে আমি জানি না। রাধিকা দিল্লির মেয়ে তো, কড়োয়া চৌথ-ফৌথ করে পল্লবের জন্য। আরে লিগ্যালি ম্যারেড হ, তারপর ওসব ন্যাকামি করবি। আর পল্লবেরও তো ওইসব যাত্রা পছন্দ! আমায় ভাল লাগবে কেন? আমি তো ফ্রি অ্যান্ড ফ্র্যাঙ্ক, তাই না? একটা সিগারেট হবে আপনার কাছে?”

“হবে, কিন্তু দেব না। মদের সঙ্গে সিগারেট খাওয়া খুব খারাপ শরীরের পক্ষে। পার্টিকুলারলি মেয়েদের জন্য। একজন ডাক্তারই বলেছিলেন আমায়।”

“খারাপ তো খারাপ। ভাল থেকে কী হবে?”

“আপনার নেশা হয়েছে। কাজের কথা বোধহয় আর হল না।”

“না হোক গিয়ে। আপনার খারাপ লাগছে আমার সান্নিধ্য?”

“তা কেন লাগবে? আমি কি তাই বললাম?”

“বলতেই পারেন। আপনারা ছেলেরা কীরকম জানেন তো, একটাই মেয়ের মধ্যে জিনাত আমন আর ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল দু’জনকেই খোঁজেন। কিন্তু দুটো তো একসঙ্গে পাওয়া যায় না স্যার। আইদার ইউ গেট দ্য সেক্স অফ জিনাত আমন অর ইউ গেট দ্য সেবা অফ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। সেক্স আর সেবা দুটোই একপাত্রে, নট পসিবল। ঊর্বশী কি চাইলেই নিরূপা রায় হতে পারে?”

“উফ, আবার আত্মপ্রশংসা শুরু হল,” আমি নিঃশব্দে বললাম।

“আমার হাজ়ব্যান্ড, আই মিন এস্ট্রেঞ্জড হাজ়ব্যান্ড, পল্লবের মা নেই। পল্লবের বাবা প্যারালাইজ়ড, যদিও ভদ্রলোকের দেখভাল করার জন্য দু’জন আয়া আছে। উনি ঘরেই পটি করেন, আজ প্রায় দশ বছর। একদিন সকালের আয়া আসেনি, বিকল্প ব্যবস্থাও করা যায়নি, পল্লব জানায় আমাকেই পরিষ্কার করতে হবে ওর বাবাকে। আমি মুখের উপর রিফিউজ় করে দিয়েছিলাম।।

“কিন্তু আপনার নিজের বাবা হলে কাজটা করতেন না?”

“প্রথমত, আমার বাবা ছিলেন আর্মি-ম্যান। বেঁচে থাকলে অন্যকে দিয়ে ওই সব করানোর আগে গুলি করতেন নিজের মাথায়। দ্বিতীয়ত, আমার নিজের মায়ের ক্ষেত্রেও আমি ওইসব করতে পারিনি বিকজ় ঘেন্না লাগে। অ্যাজ় সিম্পল অ্যাজ় দ্যাট।”

“কিন্তু আমরাও তো একদিন বৃদ্ধ হব শতভিষা?”

“তখন দরকার হলে, প্রফেশনাল হেল্‌প নেব। আমি নিশ্চয়ই চাইব না আমার ছেলে আমার জন্য বেডপ্যান হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকুক, ইভন ইফ আই নিড ইট। আমি উদ্দামভাবে বাঁচতে চেয়েছি; চেয়েছি ভালবাসা আর যৌনতা দুটোই; পাইনি সেটা আলাদা কথা। কিন্তু আমার ওই প্যানপ্যানানি, ঘ্যানঘ্যানানি, পতিসেবা, পত্নীসেবা জাস্ট পোষায় না। আমি মরলে কেউ দেখতে আসবে না। আমার সেবা করার জন্য তো কেউ নেই। তা হলে যে ওই সেবা করতে গিয়ে জোচ্চুরি করেছে, কোম্পানির টাকা মেরেছে, আমি তাকে রেয়াত করতে যাব কেন? আই অ্যাম নট অন দ্য সেম প্লেন উইথ দ্যাট রুদ্রাশিস। আমি ওর জন্য রুলসের বাইরে যাব না।”

আমি রুদ্রাশিসকে কীভাবে কতটা বাঁচানো যায় তার ছকই কষছিলাম। কিন্তু শতভিষার হাবভাব দেখে বুঝলাম ডাল গলবে না। অবশ্য আজ ও অনেকটা নেশা করেছে। দু’-তিনদিন পর আবার একবার অ্যাপ্রোচ করতে হবে মেয়েটাকে। আর এবার অফিসেই।

“আমি যে ডাকলাম আর আপনি এলেন, তার জন্য কি আফশোস হচ্ছে আপনার?”

“কী আশ্চর্য! আফশোস হবে কেন? আমার ভাল লেগেছে। কিন্তু আপনি টলছেন কেন?”

“আমার জীবনই আমাকে টলমল করিয়ে দিচ্ছে। আমি আর কী করব? আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরিয়ে দিতে পারো, আমি আমার গাড়িটা আনিনি। রাজারহাটে আমার ফ্ল্যাট।”

ডবল ভাড়া দিতে চাইলে, ট্যাক্সি যে পাওয়া যাবে না তা নয়। কিন্তু মাতাল মেয়েকে রাত সাড়ে ন’টায় ট্যাক্সিতে একা ছেড়ে দিতে আমার মন চাইল না। এই পরশু না তরশুই একটা রেপের ঘটনা পড়ছিলাম। হাসপাতালে থাকা স্বামীকে দেখে চিৎপুরের ‘কলকাতা’ স্টেশনের দিকে যাওয়ার সময় স্ত্রী ধর্ষিতা। কোন এক পিশাচ ট্যাক্সি থামিয়ে গাড়িতে উঠে খালপাড়ে, বন্ধ গাড়ির ভিতরেই রেপ করেছে ভদ্রমহিলাকে। ড্রাইভারের সঙ্গে আগে থেকেই সাঁটগাঁট ছিল বোধহয়। শতভিষাকেও যদি সেরকম কিছু করে?

না, দরকার নেই। বিশেষ করে আমার নিজেরই গাড়ি আছে যখন। আমিই পৌঁছে দিয়ে আসব ওকে। একটু নয় দেরিই হবে ঘরে ফিরতে। ঝুমাকে শুধু বলতে পারব না, কী কারণে দেরি। খুব বুঝিয়ে বললেও ও ভুল বুঝবে, কষ্ট পাবে। সৎভাবে বাঁচার স্বাধীনতা নেই আমাদের কারও, কোথাও। রুদ্রাশিস অসৎ হয়েই বা কোন অন্যায় করেছে?

“আচ্ছা আমি যদি তোমাকে, ‘তুমি’ করে বলি তোমার আপত্তি হবে?” গাড়িতে আমার পাশে বসে জিজ্ঞেস করল শতভিষা।

“না। তবে অফিসে আপনি বলাই ভাল।”

“তুমি না খুব ভিতু চয়ন!” হেসে উঠল শতভিষা।

“যা মনে হয় তোমার।”

“আচ্ছা, এত সাবধানে বাঁচতে ভাল লাগে?”

“বাঁচতে শিখেছি। খুব গরিব ছিলাম তো। সকালে খেলে বিকেলে কী খাব ঠিক ছিল না।”

“ইস, সেই গরিব আবার আমার খাওয়ার পিছনে কত টাকা খরচ করে ফেলল আজ!”

“খেলে না তো প্রায় কিছুই। শুধু গিললে।” আমিও তুমি করে বললাম শতভিষাকে।

“রাজারহাটে প্রচুর রজনীগন্ধার চাষ হয়েছে জানো। এইদিকটা তো অনেকটাই গ্রাম এখনও। ভোরে মর্নিং ওয়াক করতে বেরোই যখন, গ্রামের মেয়েদের রজনীগন্ধার বাঞ্চ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। আমি কিনেছি দু’-একদিন। কিন্তু ওদের গায়ে রজনীগন্ধার রংটাই আছে, ভিতরে রজনীগন্ধার গন্ধটা নেই। রূপ আর গন্ধ দুটো একসঙ্গে বোধহয় কোথাওই পাওয়া যায় না।”

আমি হাসলাম একটু। কিছু বললাম না।

“একটা কথা বলো তো। তুমি গরিব বলেই কি ড্রাইভার রাখোনি?”

চিংড়িহাটা থেকে ব্রিজের উপরে উঠে গিয়েছিলাম। স্পিডোমিটারের কাঁটা সত্তর ছুঁইছুঁই। শতভিষার প্রশ্নটা শুনে বললাম, “ঠিক তা নয়।”

“বলো না সত্যি করে। সেক্ষেত্রে ড্রাইভার করে রাখব তোমায়।”

“সে রাখতেই পারো। কিন্তু আমি ড্রাইভার রাখিনি কারণ আমি গাড়ি চালানোটা এনজয় করি। ছোটবেলায় এক সময় আমার এক বন্ধু রিকশা চালাবার প্রস্তাব দিয়েছিল। ওর বাবার রিকশা। সেই লোকটা যখন মদ খেয়ে উলটে থাকবে তখন যদি আমি চালাই। পাঁচ টাকা করে চেয়েছিল প্রতি সন্ধ্যার জন্য। মা খুব ধাতানি না দিলে, আমি হয়তো চালাতামও। ওই অবস্থা থেকে উঠে এসেছি বলেই গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে নিলে বেশ একটা কিক পাই।”

“তুমি না দারুণ গল্প বানাতে পারো। গল্প তৈরি করতে ইচ্ছে হয় না তোমার?”

“মানে?”

গাড়িটা রাজারহাটে ঢুকে পড়েছিল একরকম। চারপাশে দৈত্যের মতো বড় বড় সব অফিস-বিল্ডিং, ইতিউতি সম্পূর্ণ-অসম্পূর্ণ পাঁচতলা, ছ’তলা আপ্যার্টমেন্ট। কিন্তু কোথাও একটা লোকের দেখা নেই।

“এরকম একটা ভূতুড়ে জায়গায় থাকো কী করে?”

“আমি নিজে পেতনি বলে। আ আ আ…”।

শতভিষার আর্তনাদ শুনে চমকে গিয়ে আমি একটা বাঁকের মুখে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে দিলাম, “কী হল?”

“আমার স্পাইনাল কর্ডে একটা যন্ত্রণা আছে। ফিরে এসেছে।”

“মাই গুডনেস। তোমাকে কি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে? তা হলে আমি গাড়ি ঘোরাচ্ছি।”

“কোথাও নিয়ে যেতে হবে না। এই তো এখানেই আমার ডাক্তার।”

বলতে বলতে শতভিষা আমার মাথার পিছনের চুলগুলো ডানহাতের মুঠোর মধ্যে ধরে নিজের মুখটা নামিয়ে আনল আমার মুখে। আমার সামনের পুরো পৃথিবী ঝাপসা হয়ে গেল। শুধু উইন্ডস্ক্রিনের উপর যেভাবে তুমুল বৃষ্টি আছড়ে পড়ে সেভাবে ওর অগুনতি চুমু আছড়ে পড়তে লাগল, আমার ঠোঁটে, গালে, গলায়, চোখে, কানে। একইসঙ্গে অন্ধ, বোবা আর কালা তিনটেই হয়ে যেতে যেতে নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না আমি। ভেসে গেলাম।

আমার হাতটা তখন শতভিষা নিজের শার্ট খুলে, শার্টের ভিতরে থাকা ব্রা আলগা করে একেবারে নিজের বুকে চেপে ধরেছে; চাইছে মেঘ থেকে নিংড়ে আনি বৃষ্টি, ভাসিয়ে দিই মহাবিশ্ব, যাতে নোয়ার নৌকায় আমরা দু’জন ছাড়া আর কেউ না থাকে।

শতভিষা বলছিল, “সবসময় শুধু একটা ছেলেই একটা মেয়েকে চাইতে পারে, নিজের খুশিমতো ব্যবহার করার জন্য, একটা মেয়ে একটা ছেলেকে চাইতে পারে না প্রবলভাবে? ওই কেসটায়, তুমি যেখানে বলবে সেখানে সই করে দেব কিন্তু আজ এখন এই গাড়ির ভিতর, এই এত এত গাছের চোখের সামনে, প্লিজ়, প্লিজ় মি।”

সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায়, ঢেউয়ের উপরে উঠে গেলে, মানুষটাই ঢেউয়ের চেয়ে উঁচু হয়ে যায়। রাজারহাটের ওই রাত্রিটা আমার জীবনের চেয়ে উঁচু হয়ে উঠছিল। কিন্তু প্যান্টের পকেটে মোবাইলটা দপদপ করেই যাচ্ছিল। ঝুমাই ফোন করছে বোধহয়।।

ও কি বুঝতে পারছে না আমার দেরি হবে? অনেক দেরি?

১৮

সেদিন হয়তো শতভিষা যা চাইছিল, যতটা চাইছিল সবটাই হয়ে যেত। আমি ঠেকাতে পারতাম না কারণ আমি মানুষ এটা যেমন সত্যি, আমি একজন পুরুষ এটাও ততটাই সত্যি। আর কে না জানে, পুরুষ ভালনারেবল। নারীর চেয়ে অনেক বেশি ভঙ্গুর সে, মানসিকভাবে। কিন্তু ঘটনাটা ঘটতে গিয়েও ঘটল না শতভিষার একটা কথার জন্য। আমি যখন ওর জোয়ার সামলিয়ে নিজের জোয়ারের আগমনী শুনতে পাচ্ছি, তখনই কথাটা বলে উঠল ও।।

“ডোন্ট হেজ়িটেট ডিয়ার, প্লিজ় ডোন্ট। প্রোটেকশন সঙ্গে নেই বলে পিছিয়ে যেয়ো না। কী হবে প্রোটেকশন না থাকলে? প্রেগন্যান্ট হয়ে যাব? ডাজ়ন্ট ম্যাটার। আই উইল ড্রপ দ্য বেবি।”

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম একেবারে। কোনও কারণ ছিল না অবশ্য আমার ওরকম হয়ে যাওয়ার। শতভিষার সঙ্গে আমার প্রেম ছিল না, সম্পর্কও নয়। তা ছাড়া সংসারী মানুষের জীবনে, বিয়ের বাইরে বাচ্চা নেওয়া মুখের কথা নাকি? তবু ওই শব্দগুলো, ওইসময়…

“কী হল, থেমে গেলে কেন?”

“আমি পারছি না, পারব না। সরি।”

“ইউ কান্ট লিভ মি লাইক দিস। এতটা ক্রুয়েল হয়ো না প্লিজ়।”

আমি বুঝতে পারছিলাম, বউ-সংসার-মর্যালিটি ইত্যাদি কথা তুললে শতভিষা আমাকে গালাগাল দিয়ে ধুইয়ে দেবে একেবারে। ওই রাস্তাতেই গেলাম না। ওর ফুলে ওঠা নাকের পাটা, জ্বলতে থাকা চোখ, মুখের উপর এসে পড়া উদ্ধত গাছের নতুন পাতার মতো চুলের গুচ্ছ, হাপরের মতো ওঠানামা করতে থাকা বুক, আরও যা যা নিয়ে কবিতা-গান-নাটক-সিনেমা হয়, সব অগ্রাহ্য করে বললাম, “থাকতে পারলে থাকতাম। কিন্তু পারব না। আমার মা মৃত্যুশয্যায়।”

“হোয়াট? হোয়েন?”

“এক্ষুনি মেসেজ পেলাম। প্লিজ় ফরগিভ মি। তোমায় কোথায় নামিয়ে দিতে হবে বলো।”

মানুষের জন্মানোর একটা এক্সপেকটেড ডেট থাকে, তার একমাস আগে কিংবা সাতদিন পরেও পৃথিবীতে আসে মানুষ; কিন্তু মানুষের মারা যাওয়ার দিনটা কেউ বলতে পারে না। আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই সেটা ক্যালেন্ডারের পাতায় থাকে, তারপর হঠাৎ করে একটা বোমার মতো ফেটে পড়ে। যখন ফাটে তখন কিছু করার থাকে না, চোখ চেয়ে দেখা ছাড়া। আমরাও তাকিয়েই রইলাম। মা চলে গেল।

শরীরটা খারাপ যাচ্ছিল ক’দিন ধরেই। কিন্তু গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় সেই ‘খারাপ’টা গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল। খারাপ হত শরীর, আবার ভাল হত, চলতে থাকত। সেদিন রাতে খাবার পর হঠাৎ করে বমি করল।

“কী হল মা?” জিজ্ঞেস করার ফাঁকে আমি একটু হজমের ওষুধ খাইয়ে দিলাম।

কিন্তু সেটাও বমি হয়ে গেল খানিকক্ষণ পর।

এখন ডাকামাত্র বাড়িতে আসার জন্য ডাক্তার পাওয়া যায় না। চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক বেশি হাসপাতালকেন্দ্রিক। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তর জন্য প্রাইভেট, নিম্নবিত্ত আর দরিদ্রদের জন্য সরকারি।

“মনে হচ্ছে গলায় কিছু আটকে গিয়েছে। তুমি একবার এই টর্চটা দিয়ে একটু দেখো। তারপর না হয় অ্যাম্বুল্যান্স ডাকছি।”

ঝুমার এগিয়ে দেওয়া টর্চটা হাতে নিয়ে স্থবির হয়ে গেলাম আমি। এইরকম, না, এইরকম নয়, একটা বড় স্টিলের টর্চ হাতে নিয়ে সেই তুমুল বৃষ্টির রাতে আমি লোকটাকে ফলো করেছিলাম। কেউ ছিল না রাস্তায়, পাঁচ হাত দূরের দৃশ্যও দেখা যাচ্ছিল না কিন্তু আমি স্পষ্ট দেখছিলাম, আমার বোনের খুনি, আমার মায়ের মাথা ফাটিয়ে রক্ত বের করে দেওয়া শয়তানটা শিস দিতে দিতে হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে।

তখন আমরা বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছি প্রায় একবছর, কানাঘুষোয় শুনতে পাই আবার বিয়েও করেছে লোকটা, তবে বউটাকে নাকি লুকিয়ে রাখে।

এইরকম লোককে লুকিয়েই শায়েস্তা করতে হয়। আমি তাই ওর উপর নজর রেখেছি যতটা পেরেছি, আর আজ এতদিনে সুযোগ মিলেছে। ভাগ্যিস রেশনে চাল মিলছে না গত দু’সপ্তাহ, ভাগ্যে মা আমায় এই স্টিলের টর্চটা বিক্রি করে দু’-তিন কিলো চাল কিনতে পাঠাল, ভাগ্যে এত জোরে বৃষ্টি নামল।

ভাগ্য সেদিন আমার সঙ্গে ছিল। নয়তো লোকটার হঠাৎ পা মচকাবে কেন? কেন বসে পড়বে রাস্তায়? নাকি মদ পেটে হাঁটতে পারছিল না? যাই হোক, আমার সুবিধা হয়ে গেল কারণ লোকটা হাঁটতে থাকলে পিছন থেকে ওর মাথার নাগাল পেতাম না। ও হাঁটু গেড়ে বসে পড়ায় আমিও ওর কাছাকাছি চলে গিয়ে টর্চ সমেত দুটো হাত আকাশে তুলতে পারলাম।

লোকটা তখনই ঘাড় ঘোরাল। কিন্তু ঘোলাটে চোখে ব্যাপারটা বুঝতে যে-কয়েক সেকেন্ড নিল, তার মধ্যেই আমি সর্বশক্তি দিয়ে টর্চটা বসিয়ে দিতে পেরেছি ওর মাথায়। মাথাটা ঘুরিয়েছিল বলে বাড়িটা বোধহয় সাইডেই পড়েছিল, পিছনে নয়। কিংবা কোথায়, এখন ঠিক মনে পড়ে না আমার। চোখ বুজে সেই মুহূর্তটায় ফিরে গেলে শুধু দেখতে পাই, রক্তের ধারা গড়িয়ে নামছে লোকটার কপাল বেয়ে। ঠিক যেমন মায়ের কপাল বেয়ে নেমেছিল।

লোকটা চিৎকার করে উঠেছিল আমার মনে পড়ে। কিন্তু সেটা টর্চের বাড়ি খাবার আগে না পরে, তা আর খেয়াল নেই। একটাই শব্দ ছিল সেই চিৎকারে। ‘বাবা’!

সেটা কি আমায় চিনতে পেরে? নাকি বিপদের মুখে মানুষের মুখ থেকে ছিটকে বেরোনো স্বাভাবিকতম দুটো শব্দের একটা হিসেবে বেরিয়েছিল শব্দটা?

জানি না। টর্চটা বৃষ্টির জলে ধুয়ে নিয়েছিলাম। বিক্রি করে দিয়েছিলাম পরদিনই। আর লোকটার কোনও খবরই পাইনি সেদিনের পর থেকে। ফ্ল্যাশব্যাক থেকে ফিরে এসে আমি মাকে বললাম, “মুখটা খোলো, একটু দেখতে দাও।”

মায়ের স্থির হয়ে যাওয়া চোখের মণি আমার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল যেন।

সেদিন রাতে ওই লোকটা যত জোরে চেঁচিয়ে উঠেছিল, আমি ফিরে এসে তার থেকেও বেশি জোরে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘মা’ বলে!

ঝুমা পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরল আমায়।

কুটুস ওর ঘর থেকে বেরিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

মা সাড়া দিল না।

সবকিছু গুলিয়ে ফেলতে ফেলতে, আমি টর্চটা হাতে ধরেই ঝুমাকে বললাম, “বেরোতে হবে আমায়। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে?”

১৯

কেউ অন্যায় করলে তাকে মানুষ শাসন করে। কিন্তু আমি বোধহয় আমার বাবার পুরনো ছবির সঙ্গে কুটুসের কত মিল সেই কথা শুনে, কুটুসের রেগে গেলে কাপ-বাটি ছুড়ে ফেলা কীরকম বাবারও অভ্যাস ছিল তা জেনে , ও অন্যায় করতেও পারে এই সম্ভাবনাতেই শাসন করে বসতাম বাচ্চাটাকে। মা খুব কষ্ট পেত, ক্ষুব্ধ হত আমার আচরণে, কিন্তু বুঝতে পারত না যে, আমার ভিতরের ভয়টাকে চাগিয়ে দেওয়ার পিছনে মায়ের নিজের ভূমিকাই অপরিসীম। ঝুমাও যে অসন্তুষ্ট হত না তা নয়, তবে ও খুব প্রয়োজন না বুঝলে আমার আর কুটুসের ভিতরে আসত না। এর ফলে কুটুসের কাছে ও নিজে ভাল থাকত, আর আমি হয়ে যেতাম খারাপ।

ব্যাপারটা প্রথম বুঝতে পেরেছিল সন্দীপদা। বিভাব, সন্দীপদার ছেলে চলে যাবার মাসছয়েক পর একদিন আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম।

নানা কথার পর সন্দীপদা বলেছিল, “তোমার ছেলে কিন্তু একটা ব্ল্যাকবোর্ড নয় যেখানে তুমি তোমার ইচ্ছেমতো লিখবে। আমি যে আমারটাকে হারিয়েছি তার পিছনে কিন্তু আমারও কিছু দোষ আছে। আগে বুঝিনি, এখন বুঝি। আর আমি ভুল করেছি বলেই চাই না সেই একই ভুল তুমি করো।”

“কী করতে পারি? আমি কুটুসকে কোলে নিলেও ও স্টিফ হয়ে থাকে। আমি চারটে কথার পর আর এগোতে পারি না।”

“আমি একটা কথা বলব? ওকে নিয়ে কোথাও একটু বেড়াতে যাও।”

“আমিও এটা ভেবেছি। অনেকদিন আমি ঝুমা আর কুটুস মিলে…”

“না, ঝুমাকে সঙ্গে নিয়ো না। যাবে শুধু তুমি আর তোমার ছেলে। রবীন্দ্রনাথের বাবা যেমন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যেতেন, সেইরকম কোনও নিরিবিলি জায়গায় যাও ছেলেটার সঙ্গে। ছ’-সাতদিন থাকো।”

“লাভ হবে?”

“নিশ্চয়ই। ভেবে দেখো, ওখানে কুটুস চাইলেও একছুটে মায়ের কাছে যেতে পারবে না। ওকে ওর ভাললাগা, মন্দলাগা সবটা বাবার সঙ্গে শেয়ার করতে হবেই। আর সেই শেয়ার করার ভিতর দিয়েই বাপ আর ছেলের সম্পর্কটা দানা বাঁধবে।”

সন্দীপদার কথাটা আমার মনে ধরেছিল। কিন্তু কোনও প্ল্যান মনে ধরলেই তো আর এক্সিকিউট করা যায় না। ইতিমধ্যে সন্দীপদাও কলকাতার পাট চুকিয়ে উপকূলবর্তী কর্নাটকের একটা প্রত্যন্ত জায়গায় ট্রান্সফার নিয়ে চলে গেল।

কারণ জিজ্ঞেস করায় বলল যে, বউদিকে বাঁচাতে এ ছাড়া পথ নেই।

“কিন্তু অতদূরে, একদম একা, মানুষটা তো পুরনো কথা ভেবে আরও পাগল হয়ে যাবে।”

“সমুদ্র সামনেই। দরকার হলে ঢেউকে বলবে নিজের সব কথা। ঢেউ তো পালটা জিজ্ঞেস করবে না বিভাবের আত্মহত্যার জন্য আমি দায়ী না মহুয়া দায়ী।”

আমি চুপ করে গেলাম। পরোপকারী সন্দীপদা, মানুষের ভাল না করে একটা দিন থাকতে না পারা সন্দীপদা কীভাবে পালিয়ে যাচ্ছে চেনা জগৎ থেকে, ভেবে কূল পেলাম না। জীবন কাকে কখন কোন মোড়ে নিয়ে গিয়ে যে দাঁড় করায়!

সন্দীপদা কলকাতা ছেড়ে চলে গেলেও ওর বলা কথাটা ভুলিনি আমি। শুধু অফিসের ঝামেলা নয়, মধ্যে কুটুসের ডেঙ্গি হওয়ায় যখন বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছি আমি আর ঝুমা, তখনও প্রবল কষ্টের মধ্যে কুটুসের ‘মা মা’ ডাক আমাকে ঠাকুরের কথা মনে করায়নি, কষ্টই দিয়েছিল। কেন একবারও ‘বাবা’ বলে ডাকছিল না কুটুস?

অসুখটা অ্যাকিউট হয়নি বলে হাসপাতালে দিতে হয়নি কুটুসকে, কিন্তু ও সেরে ওঠার পর আরও বেশি করে সেই প্রাকৃতিক হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলাম আমি, যেখানে বাপ আর ছেলের একসঙ্গে যাওয়া দরকার।

এসবের মধ্যেই মা চলে গেল। আমার অজস্র লড়াইয়ের সাক্ষী আর শরিক আমার মা চলে গেল। কে জানে, কোন ভুবনের পারে।

শেষদিন অবধি শাঁখা পরত, সিঁথিতে সিঁদুর ছোঁয়াত মা। আর কেন পরছে, সেটা বোঝাতে গিয়ে বলত যে, ঘরের দক্ষিণদিকে দাঁড়ানো লোকটা ভুল করেছে মানেই উত্তরদিকে দাঁড়ানো লোকটাকেও ভুল করতেই হবে, এমন কথা নেই।

আমি সেই ছোটবেলার মতো আর তর্ক করতাম না এসব নিয়ে। ছেড়ে আসার পরও কেউ যদি চিহ্নটা ধরে থাকতে চায় তাকে বারণ করার অর্থ হয় না।

মায়ের অস্থি গঙ্গায় ভাসিয়ে আমি কাছা নিলাম। যে মেনেছে, তার জন্য মানতে হয়, মানা উচিত।

বেসরকারি সংস্থায় ওরকম ঢালাও ছুটির ব্যবস্থা থাকে না। আর অনেক কাজ জমে ছিল বলে আমাকে যেতেই হচ্ছিল। যাচ্ছিলাম। একদিন অন্তর একদিন। কাছা পরেই। কোমরে আসন নিয়ে।

রুদ্রাশিসের রিপোর্টের একটা খসড়া তৈরি করে শতভিষাকে পাঠিয়েছিলাম। ওর অপরাধ যতটা সম্ভব লঘু করে দেখিয়ে। অশৌচের মধ্যেই একদিন শতভিষা আমার চেম্বারে এসে বলল, “আমি রিপোর্টটা তৈরি করেছি। আপনি কি একবার দেখবেন? ভয় নেই, ক্রিমিনাল করে দেখাইনি রুদ্রাশিসকে। ওর চাকরিটা না থাকলেও শাস্তি কিছু হবে না।”

“যে যা অন্যায় করবে তাকে তার শাস্তি পেতেই হবে। তুমি-আমি চাইলেও বাঁচাতে পারব না কাউকে।”

“আমার অন্যায়ের যে-শাস্তি দেবে তুমি, আমি নিতে প্রস্তুত। আই অ্যাম সরি ফর হোয়াট হ্যাপেন্ড দ্যাট নাইট। আসলে আমার এমন প্রবল ডিজ়ায়ার জেগে উঠেছিল যে, আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি।” শতভিষা থেমে থেমে বলল।

“যা হয়েছে দু’জনের জন্যই হয়েছে। ডিজ়ায়ার আমারও জাগেনি তা নয়।”

“না, তুমি শুধু রেসপন্ড করছিলে। ইনিশিয়েট আমিই করেছি। আর তার জন্য আমি কিন্তু লজ্জিত নই।”

কাছা পরে এইসব আলোচনা করতে একছিটেও ইচ্ছে করছিল না। তাই একটু গম্ভীর হয়েই বললাম, “এগুলো নিয়ে যত কম কথা হয়, ততই ভাল। ওগুলো এক-একটা মুহূর্ত। আসে, চলে যায়।”

“ঠিক বলেছ, জাস্ট একটা মুহূর্ত। তুমি এখন যার ভিতর দিয়ে যাচ্ছ, সেটাও একটা মুহূর্ত। আই হোপ, খুব তাড়াতাড়ি সেটা কেটে যাবে। তুমি আবার নর্মাল লাইফে ফিরে আসবে।”

“হ্যাঁ, আমাদের তেরোদিনে কাজ। তারপর আবার শার্ট আর ট্রাউজ়ার্সে ফিরে যাব। এই ক’দিনের জন্য করপোরেট যে কাছা অ্যালাও করেছে, আমি কৃতজ্ঞ।”

“আমিও কৃতজ্ঞ তোমার কাছে, চয়ন। ওই একটা সন্ধ্যার জন্য। একটা ড্রাইভ-এর জন্য। ওই গাছগুলোর ভিতরে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য। ওই কয়েকটা মিনিটের জন্য আর ওই আদরটুকুর জন্যেও। সবটাই আমার লাইফ-লং ট্রেজ়ার হয়ে থাকবে। আর হ্যাঁ, আমি এই চাকরিটা ছেড়ে দিচ্ছি। গুরগাঁওতে একটা ভাল অফার আছে, ছেলের কাছাকাছিও হবে; ভাবছি সেখানেই…”

“ভাল অফার পেলে নিশ্চয়ই যাবে…”

“খারাপ অফার পেলেও যেতাম। সেদিন সন্ধ্যার পর, তোমার আর আমার একই অফিসে থাকা বোধহয়…”

“কিন্তু কেন শতভিষা? কেউ তো দেখেনি। আমার প্রাণ থাকতে কেউ জানবেও না।”

“আমাদের ঘিরে রেখেছিল যে-গাছেরা, সেই গাছগুলোয় থাকা পাখিরা তো দেখেছে চয়ন। ওরা তো জানে।” শতভিষার গলাটা ধরে এল।

“আমার একটা শেষ প্রশ্ন আছে তোমার কাছে।”

“বলো।”

“সেদিন তুমি আমাকে তোমার ফ্ল্যাটে যেতে বললে না কেন? কেন রাস্তাতেই ওভাবে?”

“অন্য সময় হলে বলতাম, রাস্তাটাই বেশি রোম্যান্টিক। কিন্তু তোমার এই অবস্থায় তোমাকে মিথ্যে বলতে ইচ্ছে করছে না।”

“সত্যিটাই বলো।”

“আমার ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকারকে আমার ছেলের বাবা টাকা খাইয়ে রেখেছে। তোমাকে নিয়ে ঘরে ঢুকলে তৎক্ষণাৎ খবরটা দিল্লিতে পৌঁছে যেত।”

“তাতে কী হত? সেও তো অন্য একজনের সঙ্গেই থাকে…”

“সেই থাকাটা আমার ছেলে কর্তৃক অনুমোদিত চয়ন। কিন্তু আমার ছেলে মায়ের ‘বয়ফ্রেন্ড’ সহ্য করবে না। কিছুতেই না।”

“রিডিকুলাস। একটা চড় মেরে সাইজ করে দিতে হয়।”

“আমরা চড় মারার জায়গায় নেই, চড় খাওয়ার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। আর সেদিন যে কথা প্রসঙ্গে তোমায় বলছিলাম, আমার ছেলে কিংবা বর কে কী করল আমার তাতে কিছু যায় আসে না, সেই কথাটা মিথ্যে। আমি আমার ছেলের ক্রীতদাস। হয়তো তুমিও তোমার ছেলের। আর সমস্যাটা কখন হয় বলো তো? ক্রীতদাস যখন মালিককে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসতে শুরু করে। আমিও তো মা চয়ন, তোমার মায়ের মতো ভাল মা না হলেও, আমিও তো মা।”

শতভিষা একটা উদ্যত কান্নাকে গিলে নিতে নিতে আমার চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল।

আমি ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর দিয়ে যাওয়া রিপোর্টটায় সই করে দিলাম। এক পাতাও না পড়ে।

কসৌলিতে পাঁচদিন ছিলাম কুটুসের সঙ্গে, আমার একবারও নিজেকে ওর ক্রীতদাস মনে হয়নি। বাবা মনে হয়েছে, বন্ধুও।

কোম্পানির একটা পুরনো মডেলের জিপ ছিল, পাহাড়ি রাস্তায় চালানোর জন্য। টপ ম্যানেজমেন্ট চাইছিল, গাড়িটা এবার সমতলেও প্রোমোট করা হোক। সেই লক্ষ্য নিয়ে ভারত জুড়ে সেলস ম্যানেজার এবং এক্সিকিউটিভদের একটা হ্যাংআউট অর্গানাইজ় করা হয়েছিল। কনফারেন্স, সেমিনার, ডিসকাশন মিলিয়ে দু’দিন, আমি তার সঙ্গে আরও তিনদিন জুড়ে নিয়েছিলাম।

“কিন্তু যে-সময়টা আমি ব্যস্ত থাকব, তখন কুটুস কী করবে?” আমি ঝুমাকে রাজি করানোর চেষ্টায় বললাম।

“নিজের মতো থাকবে, টিভি দেখবে, খেলবে। তুমি কাউকে একটা দায়িত্ব দিয়ে যাবে।”

“তবু তুমি যাবে না?”

“আমি গেলে তো যে-উদ্দেশ্যে যাওয়া সেটাই মাটি হয়ে যাবে। যাও না একবার ছেলেকে নিয়ে, ক’টা দিন দায়িত্ব নিয়ে দেখো না, কেমন লাগে!”

“আমাকে প্যাঁচে ফেলতে পারলে দারুণ মজা পাও তুমি, তাই না?” সন্দীপদার পরামর্শ ঝুমার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মাশুল গুনতে গুনতে বললাম আমি।

“এতে প্যাঁচে পড়ার কিছু নেই। আরে বাবা, কুটুস তো ছবি আঁকতে ভালবাসে। হোটেলের বারান্দায় খাতা পেনসিল হাতে বসিয়ে দেবে, সিনসিনারির ছবি আঁকবে বসে।”

“এইটা ভাল বলেছ। আচ্ছা গোপাকে একবার বলে দেখব যদি আমাদের সঙ্গে যায়? কুটুসের ড্রয়িং-এরও উন্নতি হবে।”

ঝুমা একটুও রাগল না, “বলে দেখতে পারো। কিন্তু গোপার তো বিয়ে সামনের মাসের গোড়াতেই। কার্ড দিয়ে নেমন্তন্ন করে গেছে নিজে এসে। তোমায় খুঁজছিল।”

“কেন?”

“হয়তো কী গিফ্‌ট চায়, কানে কানে বলত তোমায়।”

“বউদি শাড়িটাড়ি দিয়েছে, এখন বউদিই ফেভারিট। আমাকে বলে লাভ হবে না।”

“ইয়ারকি ছাড়ো। ওখানে ভাল শালফাল সস্তায় পেলে নিয়ে এসো।”

“সস্তার শাল নিয়ে আমি গোপার বিয়েতে যেতে পারব না ঝুমা। তুমি তোমার পছন্দমতো একটা শাড়ি কিনো।”

“শাড়িও আমি সস্তারই কিনব। কারণ আমি জানি আমাকে লুকিয়ে তুমি ওর বাবাকে কিছু টাকা দেবেই মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে।”

“তা হয়তো দেব। কিন্তু তোমাকে লুকিয়ে কেন দেব? তোমাকে লুকিয়ে কবে কী করেছি সোনা?”

কথাটা বলতেই একটা কোকিল, জানি না কোন গাছের আড়াল থেকে, ডেকে উঠল। দু’বার-তিনবার।

আমি আঁতকে উঠলাম। এই কোকিলটা কি সেই রাত্রে রাজারহাটে ছিল? ভাবতেই একটা কষ্ট দলা পাকিয়ে উঠল গলায়।

বাথরুমে গিয়ে কলটা চালু করে দিলাম জোরে।

কসৌলি গিয়ে অবশ্য একটা জিনিস টের পেলাম যা আগে কখনও ভাবিনি। পাখিরা শেষরাতে উঠে পড়ে আর সন্ধে হতে না হতেই ঘুমিয়ে যায়। খুব হেলদি লাইফস্টাইল পাখিদের। তবু এত কম দিন বাঁচে কেন কে জানে?

আমাদের রেখেছিল ‘নাইন পাইন্স’ বলে একটা বুটিক প্রপার্টিতে, কনফারেন্স হচ্ছিল একটু দূরের একটা বড় হোটেলে। আমি কুটুসকে সঙ্গে করেই নিয়ে যেতাম। সারাদিন ও ওখানে টেবিল টেনিস খেলত, টিভি দেখত, লাঞ্চ করত আমার সঙ্গেই, ঘুমিয়েও নিত খানিকটা। আমাদের এক বিগ বস ওকে আর আমাকে একদিন ডিনার করাতে নিয়ে গেলেন। সেখানেই শুনলাম ব্রিজলাল ইস্তফা দেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন আর সেক্ষেত্রে ইস্টার্ন জোনের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং-এর গুরুদায়িত্ব আমার কাঁধেই চাপবে।

প্রোমোশনের কথায় কার না মন ভাল হয়, কনফারেন্স শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তাই হালকা একটা খুশির ছোঁয়া লেগে থাকল আমার মনে। কুটুসও খুব আনন্দেই ছিল, বিশেষ করে নতুন তিনজন বন্ধু পেয়ে। তারা ওই নাইন পাইন্স-এর চিরস্থায়ী বাসিন্দা তিনটি পাহাড়ি কুকুর, আলু, লওকি আর ভিন্ডি নাম। মাঝে মাঝে আমার ভয় লাগত কিন্তু কুটুস অবলীলায় ওদের লেজ ধরে টানত, পিঠে চেপে বসত। নরম রোদের নীচে যখন আমরা বাপ-ব্যাটা ব্রেকফাস্ট করতে বসতাম, তখন আমাদের খাবারে যে ওদেরও অধিকার আছে সেই দাবিতে সামনে এসে দাঁড়াত তিনজনই এবং ভাগ পাওয়ার পরে আনন্দিত মনে লেজ নাড়িয়ে ধন্যবাদ জানাত।

কসৌলির রাস্তা ধরে হাঁটতে বেরিয়েও বুঝতাম যে পৃথিবীটা শুধু মানুষের নয়, গাছপালা, পশুপাখিদেরও। আঁকাবাকা রাস্তা ধরে, ব্রিটিশদের তৈরি করে যাওয়া পেল্লায় সব বাংলো দেখতে দেখতে ‘সানরাইজ’ আর ‘সানসেট পয়েন্ট’-এ যাওয়ার পাশাপাশি ‘মাঙ্কি পয়েন্ট’-এও গেলাম আসার আগের দিন। খুব খাড়াই পাহাড় আর চতুর্দিকে নাকি হিংস্র সব ক্ষুধার্ত হনুমান। কিন্তু আমি ছোলা ছিটোতে ছিটোতে উঠলাম কুটুসকে নিয়ে, নামার সময় বিস্কুট আর পাঁচটা কলা ভেঙে ছুড়তে ছুড়তে নামলাম। একটা হনুমানও আক্রমণ করল না আমাদের। কোনও ট্যুরিস্টকেই নয়। পৃথিবীতে ‘আক্রমণ’ শব্দটা হয়তো মানুষেরই আবিষ্কার। পশুরা শিকার করে, লড়াই করে, আক্রমণ নয়। মনে হচ্ছিল আমার।

চড়াই বেয়ে মাঙ্কি পয়েন্টের উপরে ওঠা রীতিমতো কষ্টসাধ্য। অনেকেই মাঝপথে বসে হাঁপাচ্ছিল। কিন্তু একবার উপরে উঠতে পারলে চোখ জুড়িয়ে যায়, ভরে যায় মন। আদিগন্ত ছড়িয়ে থাকা শিবালিক পর্বতমালা, পাইন আর দেবদারু অধ্যুষিত উপত্যকা, খরস্রোতা শতদ্রু নদী, স্বর্গের মতোই একটা দৃশ্যপট রচনা করে যেন। কথিত আছে, হিমালয় থেকে বিশল্যকরণী নিয়ে ফেরার পথে বজরংগবলী এই কসৌলিরই সর্বোচ্চ বিন্দুতে পা রেখেছিলেন। সত্যি না গল্প, কে জানে!

কুটুসের হাত ধরে নামার সময় হঠাৎ মনে হল, আমার বাবার থেকেও কি কোনওদিন আদর পাইনি আমি? কেবল কি গালাগালি, মার আর রক্তস্রোতের স্মৃতিই জড়িত বাবার সঙ্গে? কোথাও কোনও বিশল্যকরণী নেই? একসময় বাবাও তো আমার হাত ধরে চিড়িয়াখানায় নিয়ে গিয়েছে, বাবার কোলে চেপে পুরীর সমুদ্রের ধার ধরে কত ঘুরেছি। অ্যাসিড ছুড়ে খুনিরা যেমন পুড়িয়ে দেয় মুখ, নিয়তিও কি খারাপ অভিজ্ঞতা দিয়ে ভুলিয়ে দিতে পারে ভালবাসার সমস্ত স্মৃতি?

কথা রোজই দু-বার তিনবার করে হত ঝুমার সঙ্গে। বাইরে ঘুরতে আসার সুবাদে কুটুস বেশ সড়গড় হয়ে গেল মোবাইলে, যেটা একদমই চাইছিলাম না আমি। কিন্তু কী করার?

ফেরার আগের দিন রাতে ঝুমা ফোনে জানাল, হোম থেকে ফোন এসেছিল। আমাদের নম্বর এসে গেছে। এবার একদিন গিয়ে ‘মেয়ে’ চয়েস করতে হবে।

“এ কি খেলার পুতুল কিনছি যে, চয়েস করব? গিয়ে যার দিকে প্রথম চোখ পড়বে, সেই আমাদের সন্তান হবে।”

“সে মেয়ে কি না সেটা দেখে নেবে না?”

ঝুমা মজা করেই বলল কিন্তু আমার মনে হল যেন ব্যঙ্গ।

“ওসব তুমি দেখো। তোমার ডিপার্টমেন্ট ওটা।” ফোন রেখে দেওয়ার আগে বললাম আমি।

মদ্যপান করার একটা সুবিধা হল, জটিল প্রশ্ন বেশিক্ষণ জটিল থাকে না। এটা কলকাতায় যেমন সত্যি, কসৌলিতেও। কিন্তু কসৌলি ছেড়ে আসার ভোরটা একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দিয়ে গেল আমাকে। দেখলাম, বাগানের ভিতরে একটা আরামকেদারায় আমি বসে আছি। আর আমাকে ঘিরে বসে আছে অজস্র বাচ্চা। সবাই মেয়ে। আর সকলেই ফুল ছাপ ফ্রক পরা। ঝুমা, শুভাঞ্জনা, শতভিষা, জাহ্নবী চারজনই মিষ্টি আর আবির থালায় নিয়ে ঘুরছে বাচ্চাদের মধ্যে। কিন্তু একটা বাচ্চারও মুখ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। ওই যে প্যারাস্যুটে করে কে একটা নামছে। ওর জন্য সবাই হাততালি দিচ্ছে কেন? নামছে, নামছে, বাচ্চাটা মাটিতে নেমে হাতজোড় করে প্রণাম করল সবাইকে। স্বপ্নটা জুম-ইন করল ওর মুখে। আমি দেখলাম, তুলি।

ফিরতি পথে প্লেনে বসে একটুও ভয় পেল না কুটুস। বরং নিজে নিজেই বেঁধে ফেলল সিট-বেল্ট। টেক অফ-এর সময় আমার হাতটা চেপে ধরল যদিও।

প্লেন আকাশে স্থিত হতে উইন্ডো সিটে বসা কুটুস আর জানলার ওপারের মেঘগুলোকে দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, তুলি যদি মেঘগুলোর ভিতরেই থেকে থাকে ও কি আমাদের দেখতে পাচ্ছে? নাকি জন্মান্তর সত্যি? তুলি আবার জন্মেছে! সেই জন্মানোটা কি কয়েকদিন আগেই হয়েছে? তুলি কি বাস্তবেও আমাকে চিনে আমার কাছে ফিরবে? স্বপ্নে যেমন ফিরল?

স্বপ্ন স্বপ্নই। কিন্তু বাস্তবের একটা প্রস্তুতি লাগে।

“তোমার নতুন খেলার সঙ্গী আসছে, জানো তো কুটুস?”

“আমার খেলার অনেক সঙ্গী আছে তো স্কুলে। লটস অফ প্লেমেটস।” কুটুস জবাব দিল।

“সে থাক। কিন্তু তারা কেউ তোমার বোন হবে না।”

“আমার বোন আসছে?”

“ইয়েস। তোমার মা তোমাকে কিছু বলেনি?”

“বলেছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করিনি।”

“কেন?” অবাক হয়ে গেলাম আমি।

“কী করে করব? অভ্রদীপের বোন হল, দেখলাম।”

“কে অভ্রদীপ? তোমার ক্লাসমেট?”

“ইয়েস। ওর বোন হয়েছে, জাস্ট ওয়ান মান্থ ব্যাক।”

“ভাল কথা। কিন্তু তুমি মায়ের কথা বিশ্বাস করছ না কেন?”

“অভ্রদীপের বোন হওয়ার আগে ওর মায়ের পেট একদম ফুলে গিয়েছিল। শি হ্যাড এ বিগ বেলি। অভ্রদীপকে স্কুল থেকে নিতে আসত যখন, তখন দেখতাম। আমার মায়ের পেট তো একটুও ফোলেনি। তা হলে নতুন বেবিটা আছে কোথায়?”

আমি কুটুসের প্রশ্নের সামনে একেবারে ক্লিন বোল্ড হয়ে গেলাম।

এই জেন এক্স-ওয়াই-জেড বাচ্চাদের সঙ্গে কীভাবে ‘ডিল’ করব আমরা, যারা ছোটবেলায় সত্যি সত্যি বিশ্বাস করতাম যে, পরিরা বাচ্চা দিয়ে যায়?

এয়ারহোস্টেসের দেওয়া স্যান্ডউইচ খেয়ে ফুট জুসে মুখ ডুবিয়ে কুটুস আরও মারাত্মক একটা কথা বলল, “তা ছাড়া বোন এলে অভ্রদীপ, রিলিনারা আমায় চেপে ধরবে, আমি কোনও রিপ্লাই দিতে পারব না।”

“চেপে ধরবে কেন? তুমি কী করেছ?”

“ওদের একজনের বোন হল, আর একজনের ভাই। এবার ভাই-বোন হবার আগে ‘সাধ’ হয় না? ওরা ওদের মায়ের সাধের মিষ্টি, চকোলেট, কেক সব স্কুলে নিয়ে এসে আমাদের গ্রুপটার মধ্যে ডিস্ট্রিবিউট করেছে। এখন আমার বোন আসার খবর দিলে ওরা যদি আমায় চার্জ করে যে, আমি কেন কিছু খাওয়াইনি? তখন কী বলব আমি? আমার মায়ের ‘সাধ’ই হয়নি বললে কি কেউ বিশ্বাস করবে? তুমিই বলো?”

আমার সত্যিই বলার কিছু ছিল না। এবং একবিন্দু হাসিও পাচ্ছিল না। বরং রীতিমতো আতঙ্ক হচ্ছিল। মেয়ের বাপ হওয়ার আগেই।

২০

কলকাতা ফিরেই মেয়েকে বাড়িতে আনার প্রক্রিয়ায় বেশ খানিকটা দৌড়োদৌড়ি হল আমার। ঝুমা অবশ্য পাশে ছিল, প্রায় সারাক্ষণ। দু’-তিনটে পরিবারের সঙ্গে আলাপ হল এই মেয়েকে ঘরে নেওয়ার সূত্রে। প্রত্যেকেই একটি সন্তান দত্তক নিতে চায়। এক-একটি দম্পতির একেকরকম সমস্যা। কিন্তু স্বপ্ন সবারই এক।

একজন মা এসেছে যার সন্তান মারা গেছে হৃৎপিণ্ডে ফুটো ছিল বলে। সে প্রত্যেকটি বাচ্চার কাছে গিয়ে নিজের স্বামীকে জিজ্ঞেস করছে, “এই বাচ্চাটার হার্টে ফুটো নেই তো?” এবং স্বামী নিরুত্তর থাকলে, অফিশিয়াল কাজকর্ম যারা করছে তাদের প্রশ্ন করে অতিষ্ঠ করছে। এক-দুই মাসের একটা বাচ্চাকে উপর উপর দেখে যে আদৌ বলা সম্ভব নয় তার হার্ট একদম ঠিকঠাক কি না, সেই মাকে একথা বোঝায় কে? এক অবাঙালি দম্পতির সঙ্গেও পরিচয় হল। তারা দত্তক নেওয়া বাচ্চাটাকে লুকিয়ে রাখতে চায় এখন। যেহেতু তাদের পরিবারে নিজের সন্তান না হওয়া বিরাট লজ্জার ব্যাপার, তাই তারা বাচ্চাটাকে নিয়ে বিদেশ চলে যাবে আপাতত। এক-দেড় বছর পর ফিরে এসে ঘোষণা করবে বাচ্চার কথা। যাতে একদম এক-দু’জন ছাড়া আর কেউ জানতে না পারে বাচ্চাটাকে দত্তক নেওয়ার কথা।

আমাদের এত সব সমস্যা ছিল না। তবু অন্যের অসুবিধে, তা সে যত অযৌক্তিকই হোক, এক মুহূর্তের জন্য থমকে দেয়। নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়। সংস্থার নার্স যখন ‘নয়নতারা’কে আমার কোলে তুলে দিল, তখনই ওর নামটাও ঘাই মারল আমার মাথায়। অন্য কী নামে আমি ডাকতে পারি, আমার মেয়েকে?

সমস্ত প্রসিডিয়র শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে পিছনের সিটে মেয়ে কোলে বসে থাকা ঝুমা বলল, “ডাকনামটা কিন্তু আমিই রাখব।”

আমি ঘাড় না ঘুরিয়েই জিজ্ঞেস করলাম, “কিছু ভেবেছ?”

“হ্যাঁ। হিয়া।” ঝুমা বলল।

আমি ড্রাইভ করতে করতে গাড়ির আয়নায় দেখলাম, ছোট্ট ডলটাকে। হৃদয়ের টুকরো, হৃদয়ের অংশ। ঝুমা বহুদিন আগে একবার কথায় কথায় জানতে চেয়েছিল, ভিতরের শূন্যতা বাইরের কিছুতে ভরে কি না। আমি সেদিন কোনও জবাব দিতে পারিনি।

আজ বললাম, ভিতরের ফুসফুস যেমন বাইরের হাওয়ায় ভরে যায়, ভিতরের শূন্যতাও বাইরের মানুষ দিয়েই ভরে।

“বাইরের মানুষ কে?” ঝুমা জিজ্ঞেস করল।

প্রশ্নের মধ্যেই উত্তরটা ছিল। উত্তরটা ভাল লাগল আমার।

পরবর্তী দু’বছরে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেল আমাদের জীবনে, আমার জীবনে। দুই বাচ্চাকে নিয়ে চূড়ান্ত ব্যস্ত হয়ে গেল ঝুমা। সবসময়ের সাহায্যের জন্য একটি মেয়েকে রাখতেই হল। ঝুমার বউদিই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। ঝুমার প্রথমে ইচ্ছা ছিল, সুধাদিকে আবার নিয়ে আসবে। কিন্তু খবর নিয়ে জানা গেল, সুধাদি হরিদ্বারের একটি সন্ন্যাসিনীদের আশ্রমে থাকেন এখন। আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত কারও সঙ্গেই যোগাযোগ রাখেন না আর।

“ভালই করেন। সংসার থেকে যিনি কেবলমাত্র কষ্টই পেয়েছেন, সংসার ছেড়ে যাওয়ার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে তাঁর।”

“আমার বাড়িতে থাকাকালীন সুধাদি কষ্ট পেয়েছেন বলে তোমার মনে হয়?”

“হয়তো পাননি। হয়তো পেয়েছেন। কে বলতে পারে? আর তা ছাড়া যদি খুব ভালও থেকে থাকেন, তবু এই বাড়িতে সুধাদির পরিচয়টা কী ছিল? গ্লোরিফাইড কাজের লোক ছাড়া অন্য কিছু তো নয়?”

“বাজে বোকো না। মোটেই কাজের লোক হিসেবে আমি দেখিনি সুধাদিকে। আসলে এম এ পাশ বলে একটু অহংকার আছে সুধাদির। এটা আমি আগেও খেয়াল করেছি।”

“থাকতেই পারে। তুমি এম এ পাশ করোনি তো? ইন ফ্যাক্ট, তোমার কিংবা আমার কারওরই মাস্টার ডিগ্রি নেই। থাকলে হয়তো আমাদেরও অহংকার থাকত।”

“তোমার যত কড়া কড়া কথা!”

“সত্যি কথা, ঝুমা। একটা পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া মানুষ, সংসার থেকে ভেগে গিয়ে মঠ-মিশন-আশ্রম যে চুলোয় ইচ্ছে সেখানে মাথা গুঁজে একটু শান্তি যদি পায়, আমাদের সেই লোকটার ডিসিশনটাকে সম্মান জানানো উচিত। নিজের মেয়ের বেবিসিটার হিসেবে তাকে কেন পাচ্ছি না, তাই নিয়ে অভিযোগ করা উচিত নয়।”

“মেয়েটাও আমার নিজের নয় স্যার। তোমার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য আমি মাথায় সিন্দবাদের বোঝা চাপিয়ে অচেনা-অজানা একটা বাচ্চাকে আপন করে নিয়েছি। বড় বড় সত্যি যখন বলবে তখন পুরো সত্যিটা বলার হিম্মত রাখো।”

ঝুমা যেন আমার তলপেটে একটা লাথি মেরে সরে গেল সামনে থেকে। কোনও জবাব দিতে না পেরে একেবারে মূক হয়ে রইলাম আমি। অফিস যেতে যেতে শুধু ঠিক করলাম, বড় কিংবা ছোট কোনও সত্যিই আর গলা তুলে বলব না।

কিন্তু যে-‘সত্যিগুলো’ বলে ফেলেছি তারা যে ফেউয়ের মতো পিছনে লেগে যাবে তা জানা ছিল না। ব্রিজলাল সাক্সেনা চাকরি ছেড়ে দিতেই আমার বদলে হরিশ মেহতা বলে একজনকে ইস্টার্ন জোনের সেলস হেড করে আমার মাথার উপর চাপিয়ে দিল মুম্বইয়ের হেডঅফিস। লোকটা অতিশয় ধূর্ত এবং পলকে ‘না’কে ‘হ্যাঁ’ করতে পারে। অল্প কয়েকদিনেই বুঝে গেলাম, এ আমাকে টিকতে দেবে না এই অফিসে।

ইয়োরোপ টুরে গিয়েছিলেন ব্রিজলাল। উনি ফিরতেই আমি বেশ বিপন্ন হয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করলাম একদিন।

“মেহতা আসলে তোমার পোটেনশিয়ালকে ভয় পায়। প্লাস ও এটাও জানে, ও যে-পোস্টে বসে আছে সেটায় তোমার বসার কথা।”

“বসার যদি কথা, আমি বসলাম না কেন?”

“হয়তো কোনও কারণে বাঙালিকে একদম টপ পজ়িশনগুলোয় বসাতে ভয় পায় কর্তৃপক্ষ।”

“আপনিও শেষে বাঙালির প্রিয় ষড়যন্ত্র থিয়োরিতে বিশ্বাস করতে শুরু করলেন? শুনুন, করপোরেট যার থেকে ব্যবসা পাবে তাকেই মাথায় তুলবে। সে বাঙালি নাকি এসকিমো তাই নিয়ে এক বিন্দু মাথা ঘামাবে না।”

“তোমার ক্ষেত্রেও হয়তো ঘামাত না। কিন্তু তোমার বিরুদ্ধে যে কাঠি শুরু হল, এখান থেকে। কে জানে, আমিই হয়তো না বুঝে ক্ষতি করে গিয়েছি তোমার।”

“ধ্যাত! কীসব বলছেন?”

“ঠিকই বলছি। রুদ্রাশিসের কেসটা যেভাবে হ্যান্ডল করা হয়েছে তাতে ম্যানেজমেন্টের একটা অংশের মনে হয়েছে তোমরা কোম্পানির স্বার্থ না দেখে লোকটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছ। শতভিষাকে তো রীতিমতো মেল করে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে, যার জন্য মেয়েটা চাকরিই ছেড়ে দিল; তোমার ক্ষেত্রে অতটা করা হয়নি কারণ তোমার পারফরম্যান্স ভাল, কিন্তু কোথাও তো একটা ব্ল্যাক স্পট পড়েইছে।

“শতভিষাকে শোকজ করা হয়েছিল?”

“সর্ট অফ।”

“কিন্তু ও যে বলল, দিল্লিতে অনেক ভাল অফার পেয়েছে বলে চলে যাচ্ছে…”

“হয়তো লজ্জায় বলতে পারেনি তোমায়।”

আমি চুপ করে গেলাম। ব্রিজলালকে কীভাবে বলতাম যে, লজ্জায় নয়, আমার উপর মানসিক চাপ পড়ুক চায়নি বলেই শতভিষা ব্যাপারটা ঘুণাক্ষরে জানায়নি আমায়। কারণ ওর ওই চিঠি পাওয়ার পিছনে দায়ী তো আমি। আমার ইচ্ছার মর্যাদা রাখতেই ও নরম করে কেস সাজিয়েছিল।

“চুপ করে বসে থেকে কোনও লাভ নেই চয়ন। আমি একটা সাজেশন দিচ্ছি। এখন যেহেতু তুমি অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রির আগাপাশতলা জানো, তুমি নিজে স্বাধীনভাবে একটা ডিলারশিপ নাও। সেল কার্‌স। একটা রিপেয়ারিং ইউনিটও রাখো। ব্যবসা জমবে।”

“ইনিশিয়াল ইনভেস্টমেন্টই প্রায় কোটি টাকার কাছাকাছি হবে। আপনি মনে করেন যে অত টাকা…”।

ব্রিজলাল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি জানি যে অত টাকা তোমার নেই। কিন্তু আমি আছি।”

“আপনি দেবেন?”

“আমি পার্টনার হব তোমার। অবশ্যই নন-ওয়ার্কিং পার্টনার। কাজকম্মো সব তুমি দেখবে।” ব্রিজলাল হেসে উঠলেন।

“কিন্তু…”

“কীসের কিন্তু চয়ন? আমার দ্বারা কি শুধু ক্ষতিই হবে তোমার? লাভ হতে পারে না একটুও?”

অফিসে রেজ়িগনেশন দিয়ে ব্যবসাটায় নেমে পড়লাম। যেখানে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে সেখানে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার চেষ্টা কাজে দেয় না। সময় ঘুরতে ঘুরতে ওভার শেষ হয়ে যায়। আস্কিং রেট বেড়ে যায়। তখন হাতে উইকেট থাকলেও দশ ওভারে একশো দশ রান তোলা যায় না। তার চেয়ে এই ভাল। টেকনিকাল দিকটা বুঝে নিয়েছিলাম বলে জানতাম যে, গাড়ি কেনাটা একটা মুহূর্তের ব্যাপার কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ সারাজীবনের। তাই যার সার্ভিস উইং যত স্ট্রং, সে ডিলার হিসেবে তত সফল। কলকাতার একটা জমজমাট লোকেশনে অফিস-শোরুম এবং গ্যারাজের জায়গা পাওয়া প্রায় লটারি পাওয়ার শামিল। আমি একই স্পটে না পেলেও, দু’কিলোমিটারের ডিসট্যান্সে শোরুম আর গ্যারেজ পেলাম কেবল ব্রিজলালের হাতযশে। অফিসটা গ্যারেজ সংলগ্নই করলাম কারণ গাড়ি বিক্রি হবে ব্র্যান্ডের নামে, সার্ভিসিং বাজে হলে নাম ডুববে আমার। হ্যাঁ, কোম্পানির গাড়ির সার্ভিসিং কোম্পানিই দেয়, কিন্তু সেটা ক’বছর? পাঁচ বছরের একটা গাড়িকে কোম্পানির চাইতে কম রেটে যদি কোনও ডিলার সারিয়ে দেয় তার বিক্রি বাড়বেই।

ঝুমাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কিছু বলিনি, কারণ ও হাইপার হয়ে যেত। যখন বললাম তখন একেবারে চুপ করে গেল। হিয়া আসার পর থেকেই জানি না কেন, একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল আমাদের মধ্যে। হয়তো আমি নিজেও দায়ী তার জন্য। আসলে তখন ব্যবসা দাঁড় করানোর জন্য এমন উদয়াস্ত দৌড়োতে হচ্ছে, এলাকার ডন থেকে রাজনৈতিক নেতা এত লোকের সঙ্গে রফা করতে হচ্ছে দিনরাত, মাথাটা গরম হয়ে থাকত।

কাজের মেয়েটা ছুটি নিয়ে দেশে গিয়েছিল, বাড়ির রুটিন লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল একদম। একদিন বাড়িতে এসে দেখলাম, হিয়া বিছানায় শুয়ে কাঁদছে আর ঝুমা কুটুসের হোমওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত।

“তুমি কি কালা হয়ে গিয়েছ? বাচ্চাটা কাঁদছে আর এখানে ধেবড়ে বসে আছ?”।

“আমি একটা কাজ করছি। কুটুসের হোমওয়ার্কটাও জরুরি।”

“চুলোয় যাক হোমওয়ার্ক।” আমি কুটুসের খাতাটা টেনে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলাম মেঝেয়।

কুটুস অবাক হয়ে তাকাল আমার দিকে, তারপর দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

“এটা কী করলে তুমি?” ঝুমা খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।

“একজন বাবা হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে যা করা উচিত।”

“ছেলের হোমওয়ার্কের খাতা ছুড়ে ফেলে দিয়ে মানুষের মতো কাজ করলে?”

“হ্যাঁ। তুমি অমানুষ হয়ে গেছ বলে বুঝতে পারছ না।”

“আমি অমানুষ হইনি। আমি শুধু ভাবছি সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে একটা অবসেশনের পাল্লায় পড়ে উন্মাদ হয়ে যায়।”

“আমি উন্মাদ?”

“না। কিন্তু তোমার জিনটা উন্মাদের জিন। সেদিন বিবিসিতে একটা প্রোগ্রাম দেখছিলাম…”

“তুমি আজকাল বিবিসি-ও দেখছ? রিমার্কেল ইমপ্রুভমেন্ট হয়েছে সুনয়না দত্তর, মানতেই হবে!” বহুবছর পরে ঝুমার ভাল নাম ধরে ডাকলাম ওকে।

“তুমি যত খুশি টন্ট করতে পারে। কিন্তু আমি তোমার মতো ঘরজ্বালানি পরঢলানি নই। ছেলেকে পড়াতে গেলে বা যে-টিউটর ওকে পড়ায় তার পড়ানোটা বুঝতে গেলে আমাকে একটু ইংরেজি শিখতেই হবে। তার জন্য যতটা পারি ইংলিশ চ্যানেলগুলো দেখি, কানে শব্দগুলো নিয়ে মনে রাখার চেষ্টা করি।”

“তা কী দেখলে বিবিসি-তে?”

“আফ্রিকার কোনও একটা দেশের উপর ডকুমেন্টরি। নামটা মনে করতে পারছি না। সেই দেশটা বহুবার পাশের দেশের আক্রমণে ছারখার হয়ে গেছে, তার গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে গেছে। লাখো লোক মরেছে, অন্তত পাঁচ লাখ মহিলা রেল্ড হয়েছে।”

“এই গল্প শুনে আমি কী করব?”

“শোনার দরকার আছে বলেই বলছি। সেই যে পাঁচ লাখের বেশি ধর্ষিতা মহিলা তাদের মধ্যে অনেকেই, অ্যাবর্শনের সুযোগ বা উপায় ছিল না বলে, ধর্ষকের সন্তানের জন্ম দিয়েছে। ওভার দ্য ইয়ার্স। কেউ কেউ এক ধর্ষকের সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর ফের অন্য ধর্ষকের দ্বারা ধর্ষিতা হয়ে আবারও সন্তানের জন্ম দিয়েছে।”

“উফফ, হরিবল।”

“বাকি আছে এখনও। সেই যে বাচ্চাগুলো, তাদের অনেকেই যুবক এখন। এবং এই দুই দেশের লড়াইটাও চলছে। তা সেই লড়াইতে এই সদ্য যুবকেরা বাবার দেশের হয়ে লড়তে চাইছে।”

“মানে?”

“খুব সিম্পল। ওরা নিজেদের রেড় মা নয়, রেপিস্ট বাবার পক্ষ নিচ্ছে।”

“রক্ত, রক্তই কথা বলে।”

“কীসের রক্ত চয়ন বোসঃ গর্ভস্থ বাচ্চা তো মায়ের রক্ত শুষেই বড় হয়। ওই রক্ত থেকেই পুষ্টি পায়। তা হলে তার আচারে-ব্যবহারে বাবার রক্তই কথা বলে কেন? কেন আমার স্কুলমাস্টার দাদা লুকিয়ে আমার বাবার মতোই জুয়া খেলে টাকা ওড়ায়? কেন তুমি নিজের বাবাকে ঘেন্না করার কথা বলতে বলতে সেই বাবার মতোই ব্যবসা করতে যাও?”

“জানি না, উত্তর নেই। শুধু জানি যে, আমার মেয়েটার খিদে পেয়েছে। আর তুমি সেটা বুঝতে পারছ না।”

“বুঝতে পারলেও আমার কিছু করার নেই। ওকে আমি পেটে ধরিনি। ও কাঁদলেই দুধ আসে না আমার বুকে। আমি কী করব?” ঝুমা পরে থাকা নাইটিটার বুকের কাছে টান দিয়ে বোতামগুলো ছিঁড়ে ফেলল। এত জোর ছিল সেই টানে যে, নাইটিটার অনেকটা ছিঁড়ে গেল।

আমি ঝুমার বুকের দিকে তাকিয়ে বললাম, “যাত্রা আরম্ভ করলে কেন?”

“যাত্রা করছি না রে রাসকেল। নিজের অসহায়তার কথা বলছি।” বলতে বলতে এগিয়ে এসে ঠাস করে আমার গালে একটা চড় মারল ঝুমা। আমি ওর হাতটা ধরতে গিয়েও ধরতে পারলাম না। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে। রইলাম।

নয়নতারা থেমে গিয়েছিল। আবার প্রবল বেগে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল।

আমি ঠিকই করে নিয়েছিলাম যে হিয়াকে আবার ওই অরফানেজেই ফেরত দিয়ে আসব। কিংবা কোনও একটা ক্ৰেশে রেখে আসব, যতদিন না ও বোর্ডিং স্কুলে যাওয়ার মতো বড় হয়। আমি একাই যখন স্বপ্ন দেখেছিলাম, তখন গুনাগারও আমি একাই দেব।

কিন্তু হঠাৎ একটা ঘটনা পরিস্থিতি একশো আশি ডিগ্রি পালটে দিল।

শীত শেষ হয়ে আসছে এরকম একদিন দুপুরে, ঝুমা বিকেলবেলা নীচে নেমেছে। হিয়াকে নিয়ে পার্কে যাবে বলে আমাদের সবসময়ের হেল্‌পিং হ্যান্ড কুসুমও নেমেছে ঝুমার পিছুপিছু। তখনই একটা সিনেমা দেখে গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকেছেন তিনতলার দেবমিতা সিনহা। কুটুসের স্কুলবাস পাড়ার মোড়ে আসতে সামান্য কিছু দেরি ছিল বলে, ঝুমা আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজে দাঁড়িয়ে মিসেস সিনহার সঙ্গে গুলতানি করছিল। সেই সময়ই চিল চিৎকার দিয়ে ওঠে হিয়া। দিতেই থাকে। বিরক্ত ঝুমা মিসেস সিনহাকে দাঁড় করিয়ে গ্যারেজের তান্যদিকে কুসুমের কোলে কাঁদতে থাকা হিয়ার দিকে এগিয়ে যায়। আর ঠিক তখনই বড় একটা চাঙড় ভেঙে পড়ে মিসেস সিনহার মাথায়।

হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই মৃত্যু হয় ভদ্রমহিলার। টিভিতে বারবার দেখাতে থাকে গ্যারেজের ওই অংশটা, যেখান থেকে চাঙড়টা ভেঙে পড়েছে। তিন-চারটে চ্যানেল থেকে ঝুমার বাইট নেওয়া হয়। একটাতে তো রীতিমতো ইন্টারভিউ। উত্তেজিত ঝুমা, সন্ত্রস্ত ঝুমা, ভাগ্যের প্রতি নতুন করে বিশ্বাস ফিরে পাওয়া ঝম সবক্ষেত্রেই বলে, ও নিজের মেয়ের জন্যই বেঁচে গিয়েছে। মেয়ে ওইসময় কেঁদে না উঠলে একশো শতাংশ দেবমিতার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকত ও।

কলকাতার প্রতিটা হাইরাইজ় কী অসম্ভব বিপজ্জনক তাই নিয়ে তরজা বসে যায় চ্যানেলে চ্যানেলে। পরদিন বিকেলেই গ্রেফতার হয় প্রোমোটার, আবার জামিনও পেয়ে যায় কুড়িদিনের মাথায়। ব্যাপারটা থিতিয়ে যায়, চ্যানেলগুলোয় নতুন নতুন বিষয়ের আমদানি ঘটতে থাকে; সান্ধ্য তরজার পারদ চড়তে থাকে ঘটনা নির্বিশেষে।

কেবল ঝুমা, হিয়াকে আমাদের দু’জনের মধ্যে শুইয়ে ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে আর ঘুম থেকে উঠেও বলতে থাকে, “মেয়ের জন্যই আমাকে ফিরে পেলে। নইলে নিজের বাড়ি নিজের বাড়ি করে পাগল হয়ে যে-ফ্ল্যাট তুমি কিনেছিলে ওই ফ্রড প্রোমোটারের কাছ থেকে, সেই ফ্ল্যাটে আমি আর থাকতাম না। সেদিন বিকেলে দেবমিতাদির সঙ্গেই পটল তুলতাম।”

“হুমম।” একই কথা বারংবার শুনতে শুনতে ক্লান্ত আমি পাশ ফিরি।

“তুমি মনে হয় খুশি হওনি আমি বেঁচে যাওয়ায়। তোমার নতুন করে টোপর পরার প্ল্যানটা ভেস্তে দিলাম বলে আমার উপর খুব রেগে গেছ নাকি গো?” ঝুমা একটা ঠেলা দিল আমায়।

আমি পাশ ফিরে ঘুমন্ত হিয়াকে মাঝখানে রেখেই ঝুমাকে আদর করতে করতে বলি, “তা হয়তো একটু রেগেছি; কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্যি যে, আমি খুব খুশি হয়েছি তোমার কথা শুনে।”

“তোমার খুশি হওয়ার মতো কিছু বলেছি?”

“ওই যে বারবার বলছিলে তুমি তোমার মেয়ের জন্যই বেঁচে গেছ। আমি তো ভেবেছিলাম, হিয়াকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয়ই দেবে না তুমি। ‘ওই বাচ্চাটা আমার বরের একটা খেয়াল’, ‘এমনি আমাদের বাড়িতে থাকে, ব্লাড রিলেশন নেই’, এরকম একটা কিছু বলে কাটিয়ে দেবে।”

ঝুমা কেঁদে ফেলল আমার কথার ভিতরেই, “লজ্জা দিয়ো না গো, আর লজ্জা দিয়ো না।”

আমি অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে থম মেরে রইলাম একটু, তারপর আবার ওকে আদর করতে শুরু করলাম।

সেই আদরের মাঝখানে ঝুমা অস্ফুটে বলে উঠল, “আমাকে একবার ক্ষমা করে আর একটা সুযোগ দাও, আমি হিয়ার মা হয়ে দেখাব।”

“তুমিই তো হিয়ার মা’ই।” বলতে বলতে গলা ধরে এল আমারও।

চোখও ভিজে গেল, যখন হিয়াকে দেখাবে বলেই সে বছর আমাদের ফ্ল্যাটের বারান্দায় খুব যত্ন করে ঝুলন সাজাল ঝুমা। ইট-সুরকি-বালি- সিমেন্ট দিয়ে। বহু বছরের অনভ্যাস, তাও ঝুমার হাতের কাজ মুগ্ধ করল আমায়। কিংবা কে জানে, দুটো পার কাছাকাছি চলে আসায়, ওই নকল নদীকেই আসল বলে মনে হচ্ছিল।

২১

হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে গেল কারণ, সেলসের অভিজ্ঞতা আমায় শিখিয়েছিল ডিলাররা কোম্পানির কাছ থেকে কী চায় এবং মার্কেট সার্ভে করে আমি সম্যক জানতাম ভারতে গাড়ি যারা কেনে তাদের বেসিক চাহিদাটা ঠিক কী। গ্রামে যে-লোকটা গাড়ি কিনছে, গাড়ি তার কাছে নিজের এবং আশেপাশের তিনটে গ্রামের সামনে স্টেটাস বাড়ানোর অমোঘ অস্ত্র, ‘দেখনে’ এবং ‘দিখানে কা চিজ়’; শহরে দেড়খানা ঘরে ভাড়া থেকেও যে-দম্পতি বা লিভ-ইন পার্টনাররা গাড়ি কিনছে, তারা ধস্ত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের মধ্যে একটুকরো ঝামেলাহীন পৃথিবী নির্মাণ করে নিতে চাইছে নিজেদের জন্য।

দু’জনের চাহিদা আলাদা বলে চয়েসও আলাদা হবে। একজন এমন গাড়ি চাইবে যা বহুলোকের উৎপাত সহ্য করতে পারে, আর একজন এমন গাড়ির খোঁজে থাকবে যেটা অল্প লোকের জন্যেই তৈরি হয়েছে। তারপরও যে যেরকম চাইছে সে ঠিক সেরকমটাই পাবে না কারণ, গাড়ি মাছের ঝোল নয় যে, চাররকমভাবে তৈরি করে দেওয়া যাবে চারজনের জন্য। তার উপর বাজেটের ব্যাপারটাও অনেকের অনেক স্বপ্নকে সাইজ় করে দেবে। আর সবকিছু মিলে গেলেও যা সমাধান করা দুঃসাধ্য তা হল, গাড়ি কিনলেও গাড়ি রাখার জায়গা মিলবে না। কলকাতা শহর এবং আশেপাশে দেশভাগের পর গড়ে ওঠা উদ্বাস্তু কলোনিগুলোতে অনেকেই এখন গাড়ি কেনার সামর্থ্য রাখেন। কিন্তু মুশকিল হল, যাদবপুর, বাঘাযতীন, বিজয়গড় কিংবা ওদিকে দমদম, বেলঘরিয়া, সোদপুরের বড় বড় কলোনিগুলোতে এমন অনেক গলি আছে যেখানে রিকশা অবধি ঢুকতে পারে না। একই সমস্যা বরানগর, হাতিবাগান বা বাগবাজারের অনেক পুরনো পাড়াতেও। অতএব, নিজের গাড়ি করে সেজেগুজে বিয়েবাড়িতে গেলেও, যাওয়া এবং আসার সময় গাড়ি কোনও ভাড়া করা গ্যারেজে রেখে আধ কিলোমিটার হেঁটে আসতেই হবে, শাড়ি-গয়না পরিহিতা নতুন বউটিকেও।

অন্য উপায় নেই। বড় বড় বাড়ি তৈরির সময় দু’দিকের দুটো বাড়ির মধ্যের গলিটাকে চওড়া করার কথা ভাবেনি উত্তর কলকাতা; কী দরকার, টানা রিকশা ঢুকতে পারছে তো! অন্যদিকে দরমার বেড়া আর টালির চালের ঘরগুলো তিন-চারতলা পায়রার খোপে পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে শিগগিরই, তাই রাস্তাটাও বড় চাই, এমনটা ভাবেনি দক্ষিণের প্রান্ত। সব মিলিয়ে জগাখিচুড়ি অবস্থা তাই।

তবু তার ভিতরেই লোকে গাড়ি কেনে। গাড়ি কিনে যায়। গাড়ি তৈরির মহাতীর্থ ছিল যে-শহর, হাজার হাজার লোক যেখানে ‘জেনারেল মোটরস’ কিংবা ‘ফোর্ড’-এর কারখানায় কাজ করত সেই ডেট্রয়েট আজ ধুঁকছে। কারখানাগুলো রুগ্ণ। অথচ গাড়ি কেনার হিড়িক বেড়েছে দুনিয়া জুড়েই। কারা তৈরি করছে এত গাড়ি? কোথায় তৈরি করছে?

“জাপানিরা সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়ে ভাবতে পারে বলেই গাড়ি ব্যবসার সিংহভাগ আজ ওরাই নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু ওদেরও বুঝতে হবে যে, গাড়ি থেকেই সভ্যতার সবচেয়ে বড় সংকট আজ। ইয়োরোপ-আমেরিকার বিভিণ্ণ শহরেও যে-পথ পাড়ি দিতে আধঘণ্টা লাগত, সেই রাস্তা যেতে দেড়ঘণ্টা লাগছে। কত ফ্লাইওভার বানাতে পারে একটা দেশের সরকার? শুধু ফ্লাইওভার তৈরি করাটাই তার কাজ?” সাক্সেনা সাহেব আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে বললেন একদিন।

“কিন্তু গাড়ি ছাড়া চলবেই বা কী করে?”

“চালাতে হবে চয়ন। সাইকেল চড়তে হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত পনেরোটা শহরের মধ্যে সম্ভবত চোদ্দোটা ভারতে। এই ব্যাপারটাকে কোনও রাজনৈতিক দল কোনওদিন নির্বাচনে ইস্যু করেছে দেখেছ? করবে না। কারণ ক্ষমতায় এলে প্রত্যেকেই সাতটা গাড়ির কনভয় নিয়ে ঘোরার খোয়াইশ রাখে। আমার কথাগুলোর মানে এই নয় যে, গাড়ি ব্যান করতে হবে। সেটা সম্ভব নাকি? কিন্তু একই গাড়ি অনেকের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হবে। ভোরবেলা গাড়িটা থাক গার্লস কলেজের অধ্যাপিকার জন্য, সকালে কোনও আমলার জন্য, দুপুরে হয়ে যাক সাংবাদিকের। দিস ইজ় দ্য ওয়ে। পৃথিবীর অনেক দেশে এই ব্যবস্থা চালু হয়ে গেছে।”

“খেয়েছে! তার মধ্যে আপনি আমাকে গাড়ির ডিলারশিপে নামালেন। আর নিজেও ইনভেস্ট করলেন। ডুবব তো।”

“একটুও ডুববে না। আমি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি এই দেশের লোকের মালিকানা নিয়ে একটা অবসেশন আছে। স্টেনলেস স্টিলের বাটি থেকে পাঁচিলের ধার ঘেঁষে বেড়ে ওঠা পেয়ারা গাছটাকেও সে নিজের বলে ক্লেম করতে ভালবাসে। অতএব রেস্ট অ্যাশিওরড, তোমার বিক্রি কমবে না।”

আমি কথা না বলে তাকিয়ে রইলাম সাক্সেনা সাহেবের দিকে। মাথার ভিতর দুটো সিনেমার দৃশ্য ভাসছিল। একটা ‘সোনার কেল্লা’য় লালমোহনবাবুর বলা সেই অমর সংলাপ, ‘এটা আমার’। আর দ্বিতীয়টা একটা হলিউড মুভির সিন। সেখানে একটা সুস্থসবল লোক পঙ্গুর জীবন যাপন করতে এতটাই বদ্ধপরিকর যে, নিজের একটা পা ডিপ ফ্রিজে ঢুকিয়ে বসে থাকে দীর্ঘক্ষণ, যাতে অ্যামপিউট করতেই হয় পা-টাকে; হাঁটুর নীচ থেকে।

“কী ভাবছ?”

ভাবছিলাম, আমি নিজেও কি অবসেস্ড নই? কখনও বাবার নিরিখে, কখনও সন্তানের নিরিখে পৃথিবীটাকে মেপে চলেছি সারাক্ষণ! মুখে বললাম, “কই কিছু নয়।”

“খাজুরাহো বেড়াতে যাবে বলছিলে?”

“হ্যাঁ। প্রায় দু’বছর কোথাও যাওয়া হয়নি তো।”

“ফিরে এসে যদি পারো, আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ো তো৷”

“বলুন।”

“হাজার হাজার বছর ধরে কী অপূর্ব প্রেমে একটা পাথর আর একটা পাথরকে জড়িয়ে ধরে রাখে। কোনওদিন ফুরোয় না সেই আলিঙ্গন। মানুষ কেন মানুষকে জড়িয়ে ধরে থাকতে পারে না ওরকম? কেন সব ভালবাসারই নিয়তি বিচ্ছেদ? পাথরের জন্য যা জায়েজ়, মানুষের জন্য নয়?”

খাজুরাহো থেকে ফিরে ওঁকে ওঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে যেতে পারিনি। উনি তার আগেই একটা সাডেন হার্ট অ্যাটাকে চলে গেছেন। আমি খবরও পাইনি ঘুরতে থাকাকালীন।

অনেকটা টাকা ইনভেস্ট করলেও ভদ্রলোক খাতায়-কলমে কিছুতেই অংশীদার হননি আমার ব্যবসার। বলেছিলেন, “তোমার থেকে ডিভিডেন্ড নেওয়ার জন্য আমার সাক্ষীসাবুদ লাগবে না।”

আর কারওকে সাক্ষী না রেখে তিনি চলে গেলেন।

“এই আমি সত্যিকার পিতৃহীন হলাম ঝুমা।” কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম ঝুমাকে তখন।

তার কয়েকদিন পরেই একটি অচেনা ছেলে এসে আমাকে একটা ঘড়ি আর একটি ডায়েরি দিয়ে গিয়েছিল। জানিয়েছিল, প্রায় অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে যাওয়ার সময় ব্রিজলাল এই দুটো জিনিস আমায় দেওয়ার কথা বলে গিয়েছিলেন।

“আপনি?”

“উনি যে-ফ্ল্যাটে থাকতেন, আমি সেখানকার কেয়ারটেকার।”

আমি বুরবকের মতো ছেলেটিকে একশো টাকা দিতে যাই। ছেলেটি হাতজোড় করে রিফিউজ় করে চলে যায়।

সেই ডায়েরিতে অনেক টুকরো টুকরো ইংরেজি লেখা। ব্রিজলাল যে- কথাগুলো বলতেন, আর যেগুলো বলতেন না, অনেকগুলোই ছোট ছোট করে লিখে গেছেন। আমি সেই ডায়েরিটা একজন প্রকাশককে দিয়ে প্রকাশ করাই। ‘র‍্যানডম থটস’ নাম নিয়ে বইটা বেরোয়।

একটা ছোট্ট অনুষ্ঠানও করেছিলাম। অনেক খুঁজে পেতে ওঁর বাড়ির লোকের সন্ধান পেয়েছিলাম। আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম ওঁদেরও। কেউ আসেননি অবশ্য। সে না আসুন। বইটার তাতে কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি।

খাজুরাহো নিয়ে ওঁর ওই প্রশ্নটাই ছিল বইয়ের প্রথম লেখা। আমি ঝুমাকে খুব পড়ে শোনাতাম সেই সময়। আর ওঁর ব্যবহৃত ঘড়িটা রাতে শোওয়ার সময়ও পরে থাকতাম হাতে।

“ঘড়ি পরে কেউ ঘুমোয়?” ঝুমা বিরক্ত হত।

“ঘুমোবার কথা নয়। কিন্তু পাথর তো পাথরকে ছাড়ে না। ছাড়তে পারে না ঝুমা।” বলতে বলতে আমার গলা চোক করে যেত।

ব্রিজলাল সাক্সেনা চলে যাওয়ার আট বছর পরে, একদিন ঝুমা আমাকে ওঁর ওই কথাগুলো বলে বলল, “পাথর হয়ে সংসারে বাঁচা যায় না। ফ্লেক্সিবল হতে হয়। ফ্লেক্সিবল হতে শেখো।”

“ফ্লেক্সিবল না হলে কলকাতা শহরে ব্যবসা করে খেতে পারতাম না, তোমাদের খাওয়াতেও পারতাম না।”

“থেমে গেলে কেন, পরপর বলে যাও। সাইকেল না থাকা অবস্থা থেকে উঠে এসে তিনটে গাড়ির মালিক হতে পারতে না, বাইপাসের ধারে সাড়ে তিনকাঠা জমির উপর পেল্লাই দোতলা বাড়ি হাঁকাতে পারতে না, প্রতিবছর এলাহি খরচ করে ট্যুরে নিয়ে যেতে পারতে না, অ্যানিভারসারিতে হিরের দুল দিতে পারতে না। বলার কথা তো কম নেই তোমার।”

“আমি বলার চাইতে কাজে করে দেখাতে পছন্দ করি। কিন্তু যখন কেউ বুঝবে না বলে জেদ ধরে থাকে, তখন বলতেই হয়।”

“তুমি অন্যের দিকটা বোঝো?”

“চেষ্টা করি। সবসময়।”

“না, করো না। আমাদের কথা বাদ দাও, ওই যে তোমার ভগবান, সাক্সেনা সাহেব, তাঁর ফ্যামিলির সঙ্গেও কি তুমি ঠিকঠাক ব্যবহার করেছ?”

“ভুলটা কী করেছি, ধরিয়ে দাও। যখন স্যারের বইপ্রকাশ করছি, কমপ্লিটলি নিজের উদ্যোগে, তখন হাজারবার ডাকলেও ওঁর ফ্যামিলির কেউ আসেননি। আর পাঁচবছর পর ওঁর নাতি কলকাতায় পড়তে আসবে জেনেই ওঁদের আমার কথা মনে পড়ে গেল। সাক্সেনা আমার সম্পর্কে এই বলেছেন, ওই বলেছেন, কত মধু! অ্যাকচুয়ালি ওই ছেলেটার সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপাতে চাইছিল।”

“দায়িত্ব যদি নিতেই, কী ক্ষতি হত? সাক্সেনা সাহেবের পয়সা ছাড়া তোমার বিজ়নেস দাঁড়াত? আমাকে তো কিপটে বলে কত কথা শুনিয়েছ জীবনভর, নিজে একটু দিলদরিয়া হয়ে দেখাতে!”

“দিলদরিয়া তাদের জন্যই হওয়া যায়, যাদের দিল আছে। যারা সেদিন ওই অনুষ্ঠানে আসার ভদ্রতাটুকুও দেখায়নি…”।

“ফাটা রেকর্ড বাজিয়ো না তো। বই উদ্বোধন হবে বলে ফ্লাইটে দিল্লি থেকে কলকাতা আসবে?”

“ট্রেনেও আসতে পারত। ফ্লাইটে আসার মাথার দিব্যি দেয়নি কেউ। কিন্তু অনুষ্ঠানটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”

“হিয়ার দশ বছর হচ্ছে বলে যে-সেলিব্রেশনের প্ল্যান করেছ ছ’মাস ধরে, সেটা ইম্পর্ট্যান্ট নয়?”।

“গুরুত্বপূর্ণ বলেই তো ক্যানসেল করে দিতে চাইছি। এই বাড়িতে যা ঘটে গেছে, যা আমি নিজের চোখে দেখেছি, তারপর আর ওই নাচা-গানা-খানা-পিনা কনটিনিউ করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। তোমার মন চাইলে তুমি কোনও হোটেলে পার্টি দাও। হিয়ার বন্ধুবান্ধব, তোমার বন্ধুদের ডাকো। যা খরচা হয় সব দিয়ে দেব।”

“টাকা দিয়ে দিলেই দায়িত্ব পালন হয়ে যায় না চয়ন বোস। ছেলেমেয়েকে বড় করা একটা দায়িত্ব। তুমি সেটা সারাজীবন এড়িয়ে গেছ।”

“ঠিকই বলেছ। আমি এড়িয়ে গিয়েছি বলেই তো তুমি দায়িত্ব নিয়ে এমন চমৎকার ছেলে তৈরি করেছ। সুনয়না ম্যাডামের নয়নের অন্তরালে না জানি সে আরও কত কীর্তি করে।”

“সারাক্ষণ নিজের ছেলের নিন্দে করতে খারাপ লাগে না তোমার? কেমন বাবা গো তুমি?”

“অপদার্থ বাবা। নইলে ওই ছেলে হয়।”

“তুমি বাড়িয়ে বলছ। অত কিছুই হয়নি। আর হলেও ও বুঝে করেনি।”

“বুঝে করেনি মানে? কুটুসের প্রায় ষোলো বছর বয়স।”

“আরে বাবা, আজকালকার বাচ্চারা ওগুলো অত সিরিয়াসলি নেয় না। ওদের কাছে এসব জলভাত। তুমি এত রিঅ্যাক্ট করছ কেন?”

“করছি কারণ, আমি আজকালকার লোক নই। আমার চোখদুটো গলে। যাচ্ছিল ওই দৃশ্য দেখে।”

“আবার বাড়াবাড়ি করছ…”

“তুমি কোরো না। তুমি সুপার-আধুনিকা হও। কে বারণ করেছে? এরপর ছেলে বেশ্যাখানায় যেতে চাইলে তার হাতে টাকা গুঁজে দিও।”

“এই কথাটা বলতে পারলে?”

“আমি যার ভিতর দিয়ে যাচ্ছি, তাতে আরও অনেক কিছুই বলে ফেলব হয়তো। তুমি চুপ করে যাও। কথা বাড়িয়ে না প্লিজ়।”

“যে-গাড়ি বেচো সেই গাড়ির পাইপ হয়ে গেছ তুমি। সারাক্ষণ কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে।”

ঝুমাকে যদি বোঝাতে পারতাম শুধু মুখ দিয়ে নয়, আমার সারা শরীর দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আমি নিজেই ধোঁয়া হয়ে গেছি।

দিনসাতেক আগে ঝুমা পার্লার থেকে ফোন করেছিল আমাকে, ওর ফিরতে একটু দেরি হবে জানিয়ে। আমি আধমিনিট কথা বলেই ফোন রেখে দিয়েছিলাম। ডিস্টার্বড ছিলাম।

গাড়ির লাইনে অনেক ফ্রড থাকে কারণ গাড়িটা মানুষের পালিয়ে যাওয়ার একটা হাতিয়ার। কত অপরাধী গাড়ি চুরি করে পালিয়ে নিজেদের অপরাধ থেকে বাঁচতে চেয়েছে, ইয়ত্তা নেই তার। সেদিনও এক ফেরেব্বাজ একটা গাড়ি টেস্ট ড্রাইভ করার নাম করে পালাতে চাইছিল। ধরা পড়ে যায়। তারপর তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া ইত্যাদি কাজ সেরে বাড়ি ফিরছি, ঝুমার ফোন এল।

বাড়িতে ঢুকে বেল দিতে হয়নি, গাড়ির শব্দ পেয়ে পিন্টু দরজা খুলে দিয়েছিল। আমি ঘরে ঢোকার আগে জানিয়েছিল যে, খুব ভাল গোলাপ ফুটিয়েছে, কাল সকালে দেখাবে।

পিন্টুর ওই একটা কথায় মন ভাল হয়ে গেল আমার। আলিপুরদুয়ার থেকে কলকাতায় কাজ করতে আসা ছেলেটা ভারী ভাল মালি। কালিঝুলি মেখে গ্যারেজে কাজ করে নিজেকে ক্ষইয়ে ফেলছিল। আমার অফিসের সামনের এক চিলতে জায়গায় ওর ফোটানো ফুলের চেহারা দেখে আমি ওকে বাড়িতে নিয়ে আসি। সারাদিন আমার বাড়িতেই থাকে, ফুল ফোটানো ছাড়া আরও হাজারটা কাজ করে। কাছেই একটা বাড়ি দেখে দিয়েছি, রাতে সেখানে চলে যায়। আমি এখানেই থেকে যেতে বলেছিলাম, একতলায় অতগুলো ফাঁকা ঘর, কিন্তু পিন্টু মাথা নিচু করে জানিয়েছিল যে, সদ্য বিয়ে করেছে।

সদ্য বিয়ে তো সদ্য ফোটা গোলাপের চাইতেও সুন্দর, আমি তাই দালাল মারফত কাছাকাছিই একটা দু’-কামরার ঘরে ওর ভাড়া থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। কলকাতার সব প্রাইম লোকেশন থেকে কাছে হলেও, এই অঞ্চলে এখনও বাড়িভাড়া মারাত্মক নয়।

রান্নার মাসি চলে গিয়েছে, একতলার বৈঠকখানা আধো-অন্ধকার, আমি পিন্টুকে জিজ্ঞেস করলাম, “হিয়া আর কুটুস কোথায়?”

পিন্টু আঙুল দিয়ে দোতলা দেখিয়ে দিল।

অন্যদিন হিয়া যেখানেই থাকুক ছুটে এসে একবার জড়িয়ে ধরবেই, আজ সাড়াশব্দ পাচ্ছি না কেন? পড়াশোনায় ব্যস্ত?

জুতো-মোজা ছেড়ে স্লিপারটা পায়ে গলিয়ে আমি দোতলায় উঠে আমাদের ঘরে যাওয়ার আগে হিয়ার ঘরে উঁকি দিলাম। ঘরটা ফাঁকা, একটা নীল আলো জ্বলছে। গেল কোথায় মেয়েটা?

কুটুসের ঘরের দরজা বন্ধ। কিন্তু ভিতর থেকে প্রবল বেগে গানের শব্দ আসছে। ছ’মাস পরে বোর্ড এগ্‌জ্যম, বাবু গান চালিয়ে নাচছে নাকি? আর দরজাটাই বা বন্ধ কেন? বিরক্ত হয়ে বাইরের নবটা ঘোরাতেই অল্প একটু আওয়াজ করে খুলে গেল দরজা।

আমার নরকদর্শন শুরু হল।

একদম উদোম গায়ে, শুধু একটা বারমুডা পরা আমার ছেলে, আমার মেয়েটাকে ঘাড়ে পিঠে গলায় চুমু খাচ্ছে। আমার দশ না-হওয়া মেয়েটা কীরকম দুটো হাত তুলে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। কুটুস ঠিক সেভাবেই চুমু খাচ্ছে হিয়াকে, যেভাবে কামতাড়িত পুরুষ, নারীকে খায়। ওই আবার জাপটে ধরল, আমার একরত্তি মেয়েটাকে।

আমার মনে হচ্ছিল হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে তখনই। মনে হচ্ছিল, আমি যেন মুম্বই, দিল্লি, হায়দরাবাদে সন্ত্রাসী হামলার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। বোমা পড়ছে আমার শরীরে, অহরহ বোমা পড়ছে। ওই আমার পা, ওই আমার হাত, আমার যকৃৎ, ফুসফুস সব ফেটে বেরিয়ে যাচ্ছে শরীর ছেড়ে।

হিয়া হাসতে হাসতেই (কিন্তু ও হাসছিল কেন!) বলছে, “নো দাদাই নো।”

কুটুস হাসতে হাসতেই (এত অধঃপতন হয়েছে?) জবাব দিচ্ছে, “কাছে আয়, তোর মজা দেখাচ্ছি।”

আমার মনে হচ্ছিল আর একটু হলেই, প্রাণ আমার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। আমি সেই অবস্থায় নিজের সর্বশক্তি জড়ো করে চিৎকার দিলাম, “স্টপ ইট!”

কুটুস চমকে তাকাল।

হিয়াও একটা ভয় পাওয়া দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে।

আমি ঘরের ভিতর ঢুকে, স্পিকারটা বন্ধ করলাম প্রথমে। তারপর আমার স্লিপারটা খুলে হাতে নিয়ে ধাঁই-ধপাস চার-পাঁচটা বাড়ি বসিয়ে দিলাম কুটুসের ঘাড়ে, পিঠে, পাছায়।

হিয়া কাঁদতে শুরু করল।

তখনই হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে ঝুমা চেঁচিয়ে উঠল, “হচ্ছেটা কী?”

“আমি বোনুর সঙ্গে খেলছিলাম। বাবা বিনা কারণে আমায় মারছে।”

আমার মাথা দপদপ করছিল। আমি একটা চড় চালিয়ে দিলাম কুটুসের গাল লক্ষ করে।

কুটুস ঝট করে সরে যাওয়ায় চড়টা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল।

“কী করছ কী তুমি?” ঝুমা এগিয়ে এসে আমার হাত চেপে ধরল।

“তোমার গুণধর ছেলেকে জিজ্ঞেস করো, কী করছিল ও। কী রে হারামজাদা, বোনকে জাপটে ধরে কী হচ্ছিল?”

“উই ওয়্যার জাস্ট কিসিং ইচ আদার। একটা নিউ অনলাইন গেম ডাউনলোড করেছি, সেটার রুলস ফলো করে খেলছিলাম।”

“একদম মিথ্যে কথা বলবি না। হিয়া পালাতে চাইছিল তোর থেকে। তুই ওকে আটকে রেখেছিলি।”

“আরে, তুমি চুপ করো না। আমাকে হ্যান্ডল করতে দাও। কুটুস সোনা কী করছিলে তুমি?”

“নাথিং মাচ, মা। তুমি বোনুকে জিজ্ঞেস করো।”

হিয়া কাঁদছিল। আমি ওকে কোলে তুলে নিয়ে বললাম, “তোমার ন্যাকামিগুলো বন্ধ করো ঝুমা। ‘মাসি, তুমিই আমার ফাঁসির কারণ’ হয়ো না। আর কুটুস, তোকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি, তুই বোনের ধারেকাছে আসবি না একদম। আর কোনওদিন যদি আজ যা করছিলি তার দশভাগের একভাগও তোকে করতে দেখি, মেরে তক্তা করে দেব।” বলতে বলতে হিয়াকে কোলে নিয়েই এগিয়ে গিয়ে আমি তিন-চারটে এলোপাথাড়ি চড় চালালাম। মাত্র দুটোই ওর গায়ে লাগল।

ঝুমা চেঁচাতে লাগল, “বন্ধ করো, বন্ধ করো।”

কুটুস খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, “অন্যায় কিছুই করিনি। হোয়াটস দ্য হার্ম ইন কিসিং? আর তা ছাড়া বোনু কি আমার নিজের বোন নাকি যে, ওর সঙ্গে কিছু করা যাবে না?”

আমার মাথাটা ঘুরতে লাগল কথাটা শুনে। নেহাত হিয়া কোলে, নইলে ওখানেই ধপ করে বসে পড়তাম। কুটুসের ঘরের বাইরে বেরিয়ে হিয়াকে নিজের ঘরে ঢুকিয়ে, একতলায় নেমে এসে আবার দোতলায় উঠে গিয়ে শেলফের ভিতর থেকে একটা স্কচের বোতল নিয়ে নেমে এলাম। কিন্তু প্রায় র’ দু’-তিন পেগ মেরেও পালস বিট কমল না।

কেবল ভাবছিলাম, কীভাবে বাঁচাব আমার মেয়েটাকে? কেমন করে সামলাব পাগল ঘোড়াটাকে, যে, কেউ পিঠে বসলেই উলটে দেবে?

ঝুমা অনেকক্ষণ ধরে দরজা নক করছিল। খুলে দিতেই অনেক কথা আরম্ভ করল।

তার একটাও কান দিয়ে মাথায় ঢুকল না আমার। আরও এক পেগ গলায়। নিতে নিতে আমি শুধু বললাম, “হিয়া তো কুটুসের নিজের বোন নয়। তুমি আমার নিজের বউ তো ঝুমা?”

ওই ঘটনার পর মেয়ের দশ বছরের জন্মদিন উপলক্ষে মেগা ইভেন্ট করতে আমার মন তৈরি ছিল না। তবু ঝুমার জোরাজুরিতে বাধ্য হলাম একরকম। বাড়িতে অশান্তি, কান্নাকাটির পরও ঝুমা বাড়িতেই থাকে, আমাকে রোজ রাক্ষুসে একটা পৃথিবীর মোকাবিলা করতে হয়।

আমি মেনে নিলাম বলেই অনুষ্ঠান হল, কিন্তু সেই প্রাণটা কোথাও পাওয়া গেল না। হিয়া স্টিফ হয়ে রইল, কুটুস খানিকক্ষণ থেকে আবার নিজের ঘরে চলে গেল, এক ঝুমা প্রাণপণ চেষ্টায় তালে তাল দিয়ে গেল যতক্ষণ পারল। আমি ঠিকঠাক সংগত করতে না পারায়, সে চেষ্টাও মাঠে মারা গেল।

জন্মদিনে নিমন্ত্রিতদের প্রায় ওয়ান-থার্ড অ্যাবসেন্ট। “তোমার যাদের বলার কথা ছিল মূলত তাদের মধ্যে থেকেই আসেনি। তুমি বলোনি ঠিক করে?” ঝুমা খর চোখে তাকাল আমার দিকে।

“কে জানে!”

“আদৌ বলেছিলে?”

“তাও গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারব না।”

“একেবারে বরবাদ হয়ে যাচ্ছ। নিজেকে একটু সামলাও।” ঝুমা অসীম বিরক্তিতে বলে উঠল।

“বরবাদ হয়ে যাওয়ার থাকলে, হবই। বাড়ির পাঁচিল দিয়ে তো সুনামি আটকানো যায় না।”

ঝুমা বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে।

পিন্টু এসে দাঁড়াল দরজার সামনে।

“কী ব্যাপার পিন্টু?”

“স্যার, অনেক খাবার বেঁচে গেছে।”

“তুমি বাড়ি নিয়ে যাও। তোমরা খেয়ো।”

“তারপরও অনেক থাকবে, নষ্ট হবে।”

“কী করা যায় তা হলে?”

“আমি বলছিলাম কী, গড়িয়াহাটে ফ্লাইওভারের নীচে যারা থাকে তাদের মধ্যে বিলি করে দিলে ভাল হত না? ওরা পেট ভরে খেত আর হিয়ারানিকে অনেক আশীর্বাদ করত।”

মা বলত, “যখনই পারবি, ভিখিরিদের খাওয়াবি ভাল করে। অনেক পুণ্য হয়।” কথাটা মনে পড়তেই লাফিয়ে উঠলাম আমি। আমার সংসারে এখন অনেক পুণ্যবলের দরকার।

তিনটে গাড়ির কথা ঝুমা বলে বটে, কিন্তু একটা গাড়ি পুরোপুরি অফিসের কাজেই ব্যবহৃত হয়। সেটায় আমি ছাড়া অন্যরাও চাপে প্রয়োজনে। বাড়ির গাড়ি দুটো, বড় গাড়িটা সবাই মিলে বেরোবার জন্য। আর একটা ছোট।

বড় গাড়িটার পিছনে যতটা সম্ভব খাবার আর প্লাস্টিকের প্লেট তুলে, আমি পিন্টুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় বেরিয়ে মনে হল, খেতে খেতে হেঁচকি উঠলে লোকগুলো জলের জন্য ছুটবে কোথায়?

আমার নির্দেশে, পিন্টু চারটে দু’লিটারের মিনারেল ওয়াটারের বোতল আর কতগুলো প্লাস্টিকের গ্লাস কিনে আনল, সবাইকে জল খাওয়াবার জন্য।

গড়িয়াহাটের ফ্লাইওভারের কাছে গাড়িটাকে সাইড করে, দুটো গামলা নামাতেই, কুকুরেরা তেড়ে এল। কিন্তু ততক্ষণে পিন্টুর হাঁকডাকে এদিক ওদিক থেকে তিরিশ-চল্লিশজন ফুটপাথবাসী এগিয়ে এসেছে। মানুষের খিদের সঙ্গে লড়াইয়ে কুকুরের খিদে জিততে পারবে কী করে? ওরা সরে গেল। আমি পিন্টুকে চোখের ইশারায় বললাম, কুকুরগুলোও যেন অভুক্ত না থাকে, আজকের রাতটা। ওদের শুভেচ্ছারও প্রয়োজন আছে আমার মেয়েটার।

সার বেঁধে বসে পড়া মানুষগুলোকে পরিবেশন করতে ভারী ভাল লাগছিল। যারা খেতে চায় না তাদের খাইয়ে কী আনন্দ? আনন্দ তো যারা খেতে পায় না, তাদের খাইয়ে!

এদের ভিতরের নেটওয়ার্ক স্ট্রং। খবর পেয়ে নতুন নতুন ফুটপাথবাসী চলে আসছিল। আসুক। যতক্ষণ খাবার থাকবে, খাইয়ে যাব।

একেবারে চাঁচাপোছা গামলাগুলো যখন আবার গাড়িতে তুলছি, তখন এক বৃদ্ধ এসে হাজির। পাকানো দড়ির মতো চেহারা লোকটার। বয়স সত্তরও হতে পারে, আশিও হতে পারে।

“খাবার সব ফিনিশ?” লোকটা জিজ্ঞেস করল।

পিন্টু দুটো লাড্ডু এগিয়ে দিল লোকটার দিকে।

লোকটা সেই লাড্ডু প্রত্যাখ্যান করে বলে উঠল, “ধুস, খেতে এলাম ফ্রায়েড রাইস, মাংস, লাড্ডু ধরিয়ে দিচ্ছে হাতে!”

“চ্যাম্পিয়ন দাদু আজকে রানার্স। ফ্রায়েড রাইস আর মাংসটা তোফা হয়েছিল, তোমার কপালে নেই।” একটা লোেক বলতে বলতে চলে গেল।

আমি একশো টাকার একটা নোট এগিয়ে দিলাম লোকটার দিকে।

লোকটা নিল না, “ধুর মশাই, আমি ভিখিরি নই, আমি বিজ়নেসম্যান। ওই উলটোদিকের ফুটপাথেই বসি।”

“তবুও আপনি খাবেন। আমার মেয়েকে আশীর্বাদ করবেন।”

“আশীর্বাদ করতেই পারি, কিন্তু এত রাতে এই টাকা দিলেও কি কিছু মিলবে? তা ছাড়া দোকানের রিচ খাবার খাই না, সহ্য হয় না। বাড়ির মাংস, ফ্রায়েড রাইস শুনে খেতে এসেছিলাম।”

“আমার সত্যিই খুব খারাপ লাগছে।”

“খারাপ লাগলেই বা কী করবেন? বাদ দিন, বোসদের শালা চিরকালের ব্যাডলাক। জগদীশ বোস, সত্যেন বোস পাওয়া নোবেল পেল না। নেতাজি সুভাষ আর রাসবিহারী বোস প্রেসিডেন্ট, প্রাইম মিনিস্টার হতে পারল না। আর আজ দেখুন, আপনি এখানকার সবাইকে খাওয়ালেন, কিন্তু চপল বোস খেতে পেল না। যাকগে, একটা সিগারেট হবে?” লোকটা হাত বাড়াল।

আমি নিজেই ততক্ষণে একটা সিগারেট হয়ে গিয়েছি, জীবন যার দু’দিকেই আগুন লাগিয়েছে। যন্ত্রচালিতের মতো সাতটা সিগারেট থাকা প্যাকেটটাই এগিয়ে দিলাম।

চপল বোস নিয়ে নিল।

২২

জীবন থেকে যে-ডাকটা হারিয়ে গিয়েছে সেই ডাকটা জীবনে ফিরিয়ে আনা যে কত কঠিন, আমি নিজেই তার প্রমাণ। ইচ্ছে যে হয়নি তা নয়, কিন্তু ইচ্ছে হলেও লোকটাকে ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারিনি। ডাকটা গলার ভিতরেই আটকে ছিল।

ঝুমা ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমি ঝুমার পাশে জেগে ভাবছিলাম, যার দেওয়া ক্ষত আজও দগদগে, তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকার ইচ্ছেই বা হল কেন আমার। ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের ভিতরে উত্তরটা পেলাম, শেষরাতে। আমি আসলে আমার ‘নির্দোষ’ সত্তাটাকে ডাক দিয়ে ফিরিয়ে আনতে চাইছিলাম। খুনি নই, আমি খুনি নই। চপল বোসের মাথায় টর্চ দিয়ে মেরে থাকলেও নয়।

‘যিস রাত কি সুবাহ নহি’ নামে একটা সিনেমা দেখেছিলাম। বিষয় বা গল্প কী ছিল, ভুলে গেছি কিন্তু নামটা মনে রয়ে গেছে। তবে বাস্তবে প্রতিটা রাতেরই ভোর হয়, ঘড়ির কাঁটা তো থেমে থাকে না। কুটুসকে হিয়ার সঙ্গে ওইসব করতে দেখার পরও তাই। সূর্য উঠল, বাজার বসল, লোকজন যে যার নিজের কাজে বেরোল, জন্মাল অনেকে, মারাও গেল নিশ্চয়ই কেউ কেউ। শুধু আমার মনের শান্তিটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল।

তবু, যেখানে বোমাবর্ষণ হয় সেখানেও যেমন ঘাস জন্মায়, ভয়াবহতার অভিঘাতও কমে আসে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। ঘটনাটার সাতদিন পরও কুটুসকে দেখলেই যেমন আগুন জ্বলে উঠত মাথায়, হিয়ার ধারেকাছে ওকে দেখলেই একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যেত শিরদাঁড়া দিয়ে, দু’মাস-তিন মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর ব্যাপারটা আর তেমন রইল না। এমনকী অফিস থেকে পিন্টুকে ফোন করে কৌশলে হিয়া আর কুটুস আলাদা আলাদা আছে কিনা জেনে নেওয়ার অথবা বাড়ি ফিরেই ওদের দু’জনের ঘরে উঁকি দেওয়ার যে বদভ্যেস গড়ে উঠেছিল, সেটায় ভাটা পড়ল।

কুটুস আর হিয়া একসঙ্গে ফুচকা খেতে গেছে শুনে বাড়িতে ফিরেই রাস্তায় ছুটে গিয়েছিল যে লোকটা, তিন মাস পরে সেই কুটুস হিয়াকে নিয়ে মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখতে গেছে শুনেও বউকে সামান্য বকাঝকা ছাড়া কিছুই করল না আর। হয়তো ভিতরে ভিতরে বিশ্বাস জন্মেছিল যে সব রাত্রিরই ভোর হয়, হতে বাধ্য।

সেই অসতর্কতার চরম মূল্যই কি দিলাম তা হলে? চোরাবালিকে রাস্তা ভেবে হাঁটার দাম লেগে গেল এতটা?

ছ’-সাত মাস পরের একটা সন্ধেয়, অফিস মিটিং-এর মধ্যে খবরটা পেয়েই যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে পৌঁছে যখন জানলাম যে সর্বনাশই হয়েছে, তখন এই কথাটাই মনে হচ্ছিল শুধু, আর নিজেকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছিল সবচেয়ে আগে। কিন্তু গাড়ির চাকায় মাথা থেঁতলে যাওয়া আমার ফুলের মতো মেয়েটার কাটাকুটি করা শরীর মর্গ থেকে বুঝে নিতে নিতে মনে হল, কৈশোরে একটা খুন করে উঠতে না পারলেও আজ এই মধ্যবয়সে পৌঁছে একটা খুন আমাকে করতেই হবে। ‘বাবা’কে মারতে পারিনি কিন্তু ‘বাবা’ হয়ে মারতেই হবে। চপল বসু বেঁচে গিয়েছে, নীলাজ বসু বাঁচবে না, বাঁচা উচিত নয়।

যেখানে ঘটেছিল ঘটনাটা সেখানে ফিরে গিয়েছিলাম, সেদিন রাতেই। চোখে পড়েছিল, রাস্তার একদিকে অনেকখানি জমাট রক্তের দাগ। পরদিন ফিরে এসে দেখেছিলাম, দাগটা থাকলেও অনেকখানি হালকা হয়ে গিয়েছে, আর পরদিন থেকে কোনও চিহ্নই ছিল না পিচে।

রাস্তা কত সহজে মুছে দিতে পারে, মানুষকে যা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। কিন্তু আমি কেবল বয়েই বেড়াব না, আমি প্রতিশোধ নেব।

আমার বাড়ির এক কিলোমিটারের মধ্যে একটা মাঠে মস্ত মেলা হয় প্রতিবছর ফেব্রুয়ারির শেষ, মার্চের শুরুতে। নানারকম দোকান, নানা খেলার আয়োজন, প্রাইজেরও ছড়াছড়ি। ক্লাস টেনের বোর্ড এগ্‌জ়াম হয়ে যাওয়ার পর একেবারে ঝাড়া হাত-পা কুটুস, সেখানে রোজই যাচ্ছিল। সেই শনিবার হিয়াকেও সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল।

“হিয়া টিউশন সেরে বাড়ি ফিরল, তারপর আবার বেরোল মেলায় যাবে বলে?”

“বাড়ি ফেরেনি। কুটুস ওকে টিউটোরিয়াল থেকেই নিয়ে গিয়েছিল মেলার মাঠে।” ঝুমা উত্তর দিল।

“ওহ, আচ্ছা। মানে, হিয়াকে সেদিন মেলার মাঠে নিয়ে যাবে বলে ঠিক করেই রেখেছিল কুটুস। তাই ড্রাইভারকে যেতে না দিয়ে, নিজেই হিয়ার টিউটোরিয়াল অবধি চলে গিয়েছিল।” আমার ভিতরের ধারণা বিশ্বাসে বদলে যাচ্ছিল।

“সেদিন আসলে দারুণ কয়েকটা ইভেন্ট ছিল মেলায়। ভাবলাম বোনুকে নিয়ে যাই। মজা পাবে।” কুটুস বলত।

“কী ইভেন্ট রে? সেই তুই যেরকম পিছন থেকে জাপটে ধরেছিলি হিয়াকে, সেরকম কিছু?”

কুটুস কোনও উত্তর না দিয়ে সরে যেত আমার সামনে থেকে। প্রশ্নটা করলেই।

হিয়ার জন্য ঝুমা চাঙড়ের হাত থেকে বাঁচলেও, হিয়ার মৃত্যুতে ঝুমার অকল্পনীয় কোনও শোক হয়নি। ও হাত তুলে দিয়েছিল, নিয়তি বলে। আত্মীয়স্বজনদের মতোই বিশ্বাস করে নিয়েছিল যে, মেলা থেকে বেরোবার সময় কুটুসের হাত ছাড়িয়ে হিয়া ছুটে যাচ্ছিল আইসক্রিমওয়ালার কাছে, আর ওদিক থেকে ছুটে আসা একটা রাক্ষুসে গাড়ি, ব্রেক কষতে না পেরে পিষে দিয়েছে মেয়েটাকে। কুটুস গাড়িটার নম্বর মুখস্থ বলতে পারায় পুলিশের পক্ষে ড্রাইভারটাকে দু’দিনের মধ্যে লকআপে নিয়ে নেওয়া খুব সহজ হয়। অবাঙালি এক রিয়াল-এস্টেট কারবারির অনেক গাড়ির একটা ওটা। ড্রাইভারটাকে যখন কোর্টে তোলা হয়েছিল, গাড়ির সেই মালিক আমাকে একটা ভাল অ্যামাউন্টের টাকা অফার করেছিলেন। ক্ষতিপূরণ হিসেবে।

আমি প্রত্যাখ্যান করার সময় বলেছিলাম, “গাড়িটা কয়েকদিনের জন্য আটক থাকতে পারে আপনার। এর বাইরে, যা বুঝতে পারছি, আমি আপনার একটা চুলও ছিঁড়তে পারব না। খামোখা পয়সা নষ্ট করবেন কেন? মেয়ে তো আমার গেছে।”

গাড়ির মালিক চুপ করে গিয়েছিল।

কুটুস কিন্তু চুপ করে রইল না। হিয়া চলে যাবার পর যখন দু’-তিনবার পুলিশ এসেছে আমার বাড়িতে, তখন খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে হ্যান্ডেল করেছে পুলিশকে। জবাব দিয়েছে, সমস্ত প্রশ্নের। ‘অনিচ্ছাকৃত খুন’-এর মামলায় ড্রাইভারটার বেশ কয়েক বছর জেল হয়ে যাবে শুনে জিজ্ঞেস করেছে, ফাঁসি হয় না শয়তানটার?

ওর ওই সহজ স্বাভাবিকতায় হিয়ার মৃত্যুকে গ্রহণ করতে পারা আমাকে আরও হিংস্র করে তুলছিল। মনে হচ্ছিল, আমি যার ঔরসজাত আর যে আমার ঔরসজাত, দু’জনই কীভাবে আমার জীবনের প্রিয়তম দু’জনকে কেড়ে নিয়েছে। প্রথমজনকে এখন শাস্তি দেওয়া না দেওয়া সমান। কিন্তু দ্বিতীয়জনকে শাস্তি পেতেই হবে। তবে তার আগে আমারও চাই প্রমাণ। যদিও আমার মন আমাকে আমার মেয়ের ‘খুনি’ চিনিয়েই দিয়েছে। তবু…

সেই ‘তবু’টাকে নিকেশ করার জন্যই আমি এখানে-ওখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য ডাক দিতে শুরু করলাম কুটুসকে। ঝুমা ভাবত যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত আমি বোধহয় কুটুসকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছি। একটা সেতু চাইছি, বাপ আর ছেলের।

মধ্যে দু’দিন বাড়ি ফেরার পথে গড়িয়াহাটে নেমে চপল বোসের সন্ধান করেছি আমি। প্রথমদিন দেখতে পাইনি, পরদিন পেয়েছি। চট বিছিয়ে কয়েকটা খেলনা নিয়ে বসে আছে। দশ হাত দূরের একটা দোকানে চা খেতে খেতে জানলাম, লোকটা আসলে বড় একটা খেলনার দোকান থেকে কিছু খেলনা নিয়ে ফুটপাথে বসে থাকে। বিক্রি হলে, নিজের একটা পার্সেন্টেজ রেখে টাকাটা দোকানে দিয়ে দিতে হয় ওকে। সামনের ফুটপাথ দখল হয়ে ব্যবসা চৌপাট হয়ে যেতে বসায় আসল দোকানগুলো এখন নিজেদের মাল ফুটপাথ থেকে বিক্রি করিয়ে টিকে থাকতে চাইছে। আমি যেমন কুটুস নামের জেরক্স কপিটাকে সরিয়ে দিয়ে চপল বসু নামের অরিজিনালটাকেই মুছে দিতে চাইছি।

একসঙ্গে জগিং সেরে ফেরার পথে আমি ইচ্ছে করে একটু পিছিয়ে গেলাম একদিন। তারপর স্পিড নিয়ে এগিয়ে এসে সজোরে ধাক্কা মারলাম, কুটুসকে। ও ফুটপাথের ঘাস থেকে ছিটকে পড়ে গেল রাস্তায়। কিন্তু কোনওদিক থেকে কোনও চাকা এগিয়ে আসছিল না তখন।

কনুইটা কেটে গেছে, রক্ত ঝরছে, কুটুস উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল। আমায় ধাক্কা মারলে কেন?

“কে তোকে ধাক্কা মারবে? তুই কি হ্যালুসিনেশনে ভুগছিস নাকি? ধাক্কা কেন মারবে তোকে কেউ?”

কুটুস উঠে দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে তফাত রেখে চলতে লাগল। আমি দ্রুতপায়ে হেঁটে ওকে ধরে ফেললাম। তারপর রাস্তার কলের সামনে নিয়ে গিয়ে কনুইয়ের কাছটা ধুইয়ে দিলাম। পকেটে তুলোও রেখে দিয়েছিলাম আগে থেকে। একদম প্রফেশনাল খুনে হয়ে যাচ্ছি ভেবে মুহূর্তের জন্য একটু বিষণ্ণ হলাম। তারপরই সব গ্লানি ঠেলে ফেলে জিজ্ঞেস করলাম, “হিয়াও কি এরকম নিজে থেকেই উলটে পড়েছিল? নাকি কেউ ধাক্কা মেরেছিল ওকে?”

“বোনু তো গাড়ির ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল। তার আগে আমার হাত ধরেই হাঁটছিল।”

“তোর হাত ছাড়িয়ে ছুটে গেল কেন? সেদিনের মতো কিছু করেছিলি? জাস্ট কিসিং অ্যান্ড আদার থিংস?”

“না। রাস্তায় ওসব করতে যাব কেন?”

“করতেই পারিস। নতুন কোনও অনলাইন গেম দেখে নতুন নতুন কিসিং, হাগিং শিখেছিস হয়তো।”

“ওরকম কিছুই হয়নি। বোনু আইসক্রিম খাবে বলে আমার হাত ছাড়িয়ে ছুটে গিয়েছিল।”

“ওকে একটা আইসক্রিম তুই নিজেই কিনে দিসনি কেন?”

“তুমি সব ভুলে যাও। দু’মাস আগেই ও টনসিলের ব্যথায় কত সাফার করল না? আবার আইসক্রিম খেলে মরত তো!”

“সেই তো মরেই গেল। বাঁচল তো না।”

“প্রচণ্ড স্পিডে আসা শয়তান গাড়িটা ধাক্কা মারল বলে।”

“তুই জানতিস যে, ওই গাড়িটাই ধাক্কা মারবে?”

“আমি কী করে জানব!”

“তা হলে ওই গাড়িটারই নাম্বার টুকে নিলি কী করে?”

“ধাক্কা মারার পর একটু স্লো-ডাউন করেছিল গাড়িটা।”

“আর তখন তুই হিয়ার কী হয়েছে না দেখে, গাড়ির নাম্বার টুকতে ব্যস্ত হয়ে পড়লি?”

“আমি ওই ড্রাইভারটাকে পানিশ করতে চাইছিলাম।”

“কেন? কার জন্য? হিয়া তো তোর নিজের বোন নয়! কোথাকার কে, রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছিলাম আমি আর তোর মা…”

“স্টপ ইট! ও আমার নিজেরই বোন।” কুটুস চিৎকার করে বলল।

আমার কোনও ভাবান্তর হল না।

২৩

ঘটনাটার কথা জানতে পেরে ঝুমা প্রবল অশান্তি শুরু করল, “তুমি কি কুটুসকে সন্দেহ করছ? তা নইলে ওকে ধাক্কা মেরেছ কেন?”

“কেউ কুটুসকে ধাক্কা মারেনি ঝুমা। হিয়ার ব্যাপারটা যদি অ্যাক্সিডেন্ট হয়, তা হলে এটাও অ্যাক্সিডেন্ট।”

“তোমাকে একটুও বিশ্বাস হচ্ছে না। আবার সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যেতে হবে তোমায়।”

কুটুস যখন হিয়ার সঙ্গে ওইরকম করেছিল আর আমি প্রতিক্রিয়ায় কুটুসকে চড়-থাপ্পড় মেরেছিলাম, তখন কোনও এক আশ্চর্য কারণে, কুটুসকে বাদ দিয়ে, ঝুমা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে।

ভদ্রমহিলা, আমার এবং ঝুমার মুখ থেকে আলাদা আলাদা করে এবং একসঙ্গে ঘটনাটার কথা শুনলেন। তারপর বললেন, “অ্যাডোলেসেন্সের সময়টায় মেয়েদের প্রতি ছেলেদের একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ জন্মাবেই।”

“তাই বলে নিজের বোনের প্রতি?” আমি চেঁচিয়ে উঠেছিলাম।

“নিজের বোন যে নয়, তা তো আপনাদের ছেলে অনেক আগে থেকেই জানে।” আমাকে শান্ত হতে বলে, ম্যাডাম উত্তর দিয়েছিলেন।

“এখন কী করার তা হলে?” ঝুমা জিজ্ঞেস করেছিল।

“ওইদিনের ঘটনাটা ভুলিয়ে দিতে হবে। তা ছাড়া দু’জনকে আলাদা রাখলে নিষিদ্ধর প্রতি আকর্ষণ আরও বাড়বে। বরং দু’জনকে মিশতে দিতে হবে, একে অন্যের সঙ্গে বেরোতে এনকারেজ করতে হবে…”

ভদ্রমহিলার কথা মোটে ভাল লাগছিল না আমার। বললাম, “একসঙ্গে ছাড়লে আবার সেদিনের ঘটনার রিপিটেশন দেখব না, তার কী গ্যারান্টি?”

“এই দুনিয়ায়, কেউই কোনওকিছুর গ্যারান্টি দিতে পারে না। তবে বিচ্ছিন্ন করে রাখলে লাভের বদলে ক্ষতিই হবে। বরং ওদের পাশাপাশি বসিয়ে চিরকালের ভাইবোনের গল্পগুলো শোনান, কাজে দেবে। সাত ভাই চম্পার গল্প কিংবা জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার গল্পগুলো বলুন। এমনকী ভাইবোনের প্রেক্ষিত থেকে একটা নেগেটিভ চরিত্রকেও পজ়িটিভ করে তুলুন। রাবণ যদি খারাপও হয় তবু সে তার বোন শূর্পণখার সঙ্গে ঘটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল, রামায়ণের ইন্টারপ্রিটেশন এইভাবে করুন। দেখবেন পাশাপাশি বসে শুনতে শুনতে দু’জনের মধ্যে একটা বন্ডিং তৈরি হচ্ছে।”

সাইকিয়াট্রিস্ট ভদ্রমহিলা অদক্ষ নন, কিন্তু উনি যেভাবে কুটুস আর হিয়াকে একই দাঁড়িপাল্লার দু’দিকে বসিয়ে সমান ট্রিটমেন্ট দিচ্ছিলেন, সেটা হাস্যকর মনে হচ্ছিল আমার। কুটুস যদি দেড় কিলো হয়, হিয়া তবে চারশো গ্রাম; যে-কোনও সিচুয়েশনে প্রথমজন অ্যাকটিভ হলে দ্বিতীয়জন প্যাসিভ হতে বাধ্য। ওরা কি একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছয় নাকি? দু’জন কাছাকাছি থাকলে কুটুস যা করে হিয়া তাই মেনে নেয়।

এইসব বলেছিলাম তখন। ঝুমাকে। এখন শুধু চরম অবজ্ঞায় মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বললাম, “অনেক তো হল নৌটংকি, এবার ক্ষমা দাও।”

ঝুমা ক্ষমা দিল না, আমি সাইকিয়াট্রিস্ট ম্যাডামের কাছে আবারও যেতে একপ্রকার বাধ্যই হলাম। উনি বললেন, “খুঁড়ে কোনও লাভ হয় না। শুধু সাপ বেরিয়ে আসে কেঁচোর গর্ত থেকে।”

“কিন্তু কেউটে যদি সত্যিই থেকে থাকে কেঁচোর বদলে, তা হলে একই গর্তে তাকে নিয়ে থাকাও তো মুশকিল।” রাতে বিছানায় শুয়ে বললাম।

ঝুমা একদৃষ্টে আমার দিকে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “তুমি কি কুটুসের কোনও ক্ষতি করবে নাকি?”

আমি কোনও উত্তর না দিয়ে ঝুমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকগুলো চুমু খেলাম। চুমু খেতে খেতে ওকে পেড়ে ফেললাম বিছানায়। তারপর এমনভাবে পিষতে লাগলাম যেন খাজুরাহোর সেই পাথরের মূর্তিগুলো পরস্পরকে আলিঙ্গনের ভিতরেই জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

ঝুমার ব্যথা লাগছিল। ঝুমা হাঁসফাঁস করছিল। যৌবন পেরিয়ে আসা ঝুমা যেন সেই বৃষ্টিহীন চৈত্রের জমি, যেখানে অজস্র কর্ষণেও বীজ পোঁতা যাবে না। সেটাই ভাল। আর ভাল বলে, ঠিক যেমন পাথরে মাথা ঠোকে লোক, আমি ঝুমা-তে নিজেকে ঠুকতে লাগলাম। মিনিটের পর মিনিট। তারপর নিঃশেষ হয়ে পড়ে রইলাম মরা সাপের মতো।

অনেকদিন পর প্রবল শরীর হওয়ায় নিস্তেজ ঝুমা একসময় বলে উঠল, “কুটুসের কোনও ক্ষতি করার আগে আমায় জানিয়ো, আমি ঘুমের ওষুধ খেয়ে মরে যাব।”

“ঘুমের ওষুধ ফুলপ্রুফ নয় ঝুমা। সাতদিন ঘুমিয়ে থেকে আবার জেগে ওঠে লোক। তুমি গলায় দড়ি দিতে পারবে না?”

“ইয়ারকি কোরো না গো। ভয় লাগে। এখন তো একটাই বাচ্চা আমাদের। তাই আরও বেশি ভয় লাগে।”

“তোমার তো চিরকালই একটা বাচ্চা ঝুমা।”

“না, না, না। আমি হিয়াকেও ভালবেসেছি। মেয়ে মনে করেই বেসেছি।” ঝুমা কেঁদে উঠল।

আমি আমার বুকের ব্যথাটা আরও একবার টের পেয়ে চুপ করে যেতে যেতে বললাম, “কুটুস কার কাছ থেকে জানল যে হিয়া ওর নিজের বোন নয়? তুমি-আমি তো বলিনি।”

“এসব কথা চাপা থাকে না। যাদের জানার ঠিক জেনে যায়।” ঝুমা বলল।

না জানলে কোনও লোকসান হয়? আমি নিজেকেই জিজ্ঞেস করলাম।

২৪

ঝুমা যখন কাঁদছিল তখন ওকে শান্ত করার জন্য বলেছিলাম, “আমি এই জীবনে নিজের ছাড়া আর কারও ক্ষতি করিনি এখনও পর্যন্ত।”

ঝুমা কথাটা শুনেছিল, কথার ভিতরের ‘এখনও পর্যন্ত’টা খেয়াল করেনি।

তবে পরে যাই হোক, ‘এখনও পর্যন্ত’ কথাটা মিথ্যে বলিনি আমি। যদি না সেই বৃষ্টির রাতের টর্চের বাড়ি হিসেবে আনা হয়।

অফিসে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার পর, ইসিজি, ইকো, অ্যাঞ্জিওগ্রাম সবই হল। খানিকটা ব্লকও ধরা পড়ল। স্বাভাবিকই। পৃথিবীতে নিষ্ঠুর, নির্মমদের তো কোনও অসুখ হয় না। অসুখ আসলে, ‘অনুভব করার’ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। জিনের ভিতরেই হয়তো তার রূপরেখা লেখা থাকে। যে যত সেনসিটিভ, সে তত বেশি অসুস্থ। সোজা হিসেব।

ঝুমা একদিন টাকার খোঁজে আমার নিজস্ব কাবার্ড হাতড়াতে গিয়ে পরীক্ষার রিপোর্টগুলো পেয়ে গেল। রাতে আমি ফিরতে আমার সামনে এক এক করে ওগুলো মাটিতে ছুড়ে ফেলে জানতে চাইল, “ব্যাপারটা কী?”

আমি হেসে উত্তর দিলাম, “প্রেমপত্র খুঁজে পেলে বেশি খুশি হতে?”

ঝুমা কেঁদে উঠল, “আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”

“আমি তো কাউকেই হারাতে চাইনি।”

“এত ধকল কীভাবে নেবে এখন? শরীরের এই অবস্থায়?”

“নেব না। শোরুম, গ্যারেজ সব বিক্রি করে দেব। যে-টাকাটা পাওয়া যাবে, ফিক্সড করে রাখলে যেটুকু সুদ মিলবে তাতেই চলে যাবে কষ্টেসৃষ্টে। আর না চললে, এই বাড়িটা বেচে একটা ফ্ল্যাটে চলে যাব। যেরকম ফ্ল্যাটে ছিলাম।”

“এত কষ্টে দাঁড় করানো বিজনেস এরকম দুম করে ছেড়ে দেবে?” এক মুহূর্ত আগেই আমার শরীর নিয়ে প্রবল চিন্তিত ঝুমা, আমার সিদ্ধান্তের কথা শুনে খুশি হয়নি বোঝাই গেল।

“গাড়ির চাকা আমার হিয়ার মাথাটা থেঁতলে দিয়ে গেছে, ধ্বংস করে দিয়ে গেছে আমার সামনের দিকে তাকাবার কারণগুলো। আমি হয়তো আবার একটা স্টেশনারি দোকান দিতে পারি; দাঁড়িপাল্লায় ওজন করতে পারি, লাভ-ক্ষতি, আনন্দ-বেদনা, স্মৃতি-বিস্মৃতি, মুগ ডাল বা পোস্ত কিন্তু আমি কীভাবে আর চাকার গুণাগুণ বুঝিয়ে, গাড়ি বেচি বলো তো?” কান্না শুরু হল আমার। নিঃশব্দে।

ঝুমা সেই কান্নার বিন্দুমাত্র আভাস পেল না। জিজ্ঞেস করল, “কবে নাগাদ বিক্রি করবে কিছু ঠিক করলে?”

“সামনের শুক্রবার। হিয়ার জন্মদিনের দিন।”

আমি ঝুমার দিকে না তাকিয়ে বললাম।

ঝুমা আমার দিকে না তাকিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

২৫

কয়েকদিন আগে হৃৎপিণ্ড কুরে কুরে খাওয়া যন্ত্রণাকে সাময়িকভাবে দূরে ঠেলে দিয়েছিল সেই তীব্র সঙ্গম। আমি তার ভিতরেই ঝুমাকে বলে দিয়েছিলাম, শতভিষার সঙ্গে আমার কী হয়েছিল, কতটা হয়েছিল, কোথায়, কীভাবে হয়েছিল। নিজের ঘাড়ে দোষ চাপাইনি, নিজেকে আড়ালও করিনি।

ঝুমা, কুটুসের ব্যাপারে আমায় অবিশ্বাস করতে শুরু করলেও, ওই ঘটনাটার কথা শুনে মেজাজ বা বিশ্বাস দুটোর কোনওটাই হারায়নি।

দু’-তিনদিন পর সকালের চা খেতে খেতে আমি বললাম, “তুমি রিঅ্যাক্ট করলে না তো শতভিষার কথা শুনে?”

“রিঅ্যাক্ট করার মতো কিছু নয়।” ঝুমা বলল।

আমি অনেকটা ভাললাগা নিয়ে তাকালাম ঝুমার দিকে।

ঝুমা শান্ত গলায় বলল, “জীবনে বাঁচতে গেলে, এগুলো হয়, হয়ে যায়। আমার যেমন বিটুর সঙ্গে হয়েছিল।”

“কী হয়েছিল?” আমি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

“তখনও তোমার সঙ্গে আলাপ হয়নি। পুজোর ভিতরে একদিন, সপ্তমী না অষ্টমী ঠিক মনে নেই, বিট্টু আমাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতে চাইল। ছেলেটার মামাবাড়ি ছিল আমাদের পাড়ায়, মাঝে মাঝে আসত; আমি জানতাম যে, রিংকির সঙ্গে ওর ইন্টুবিন্টু হয়েছিল, ওরা নাকি কোন ঝোপের ধারে ধরাও পড়েছিল পাড়ার দাদাদের হাতে, কিন্তু এসব জেনেও নিজেকে রেজ়িস্ট করতে পারিনি সেদিন।”

“কেন?” তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করলাম আমি।

“কারণ প্রতিবার পুজোয় আমার বান্ধবীদের সবার প্রেমিক জুটত, কেবলমাত্র আমার ছাড়া। হয়তো সেই প্রেমগুলোর প্রায় সবকটারই ভ্যালিডিটি ওই পুজোর ক’দিন, কিন্তু সেবছর আমার মনে হচ্ছিল, আমি খুব কুচ্ছিত আর ওরা দারুণ সুন্দরী, তা তো নয়। তা হলে সবাই অফার পেলেও আমি পাই না কেন!

“গেলে সিনেমায়?”

“গেলাম।”

“সিনেমা দেখলে?”

“যতটা পারলাম। বিট্টু উত্যক্ত করছিল, কিস করার চেষ্টা করছিল, বুকে হাত দিচ্ছিল, ছেলেরা যেরকম করে আর কী।”

“জেনারালাইজ় কোরো না। আমি ওরকম করেছি কোনওদিন যখন বেরোতাম বিয়ের আগে?”

“তুমি তো ভদ্রলোক। নো ডাউট। কিন্তু আমার মন যে সেদিন একটা লুম্পেনের সঙ্গে হলেও একটু বেরোতে চেয়েছিল, সবাইকে দেখাতে চেয়েছিল ‘দেখ, আমারও আছে’, সেটা ভেবে অবাক হয়ে যাই মাঝে মাঝে।”

“বিট্টু কি শুধু চেষ্টাই করেছিল?”

“না। দু’-তিনটে চুমু তো খেয়েছিলই। যতদূর মনে পড়ে। তবে আমি ঠোঁট চেপে বন্ধ করে রেখেছিলাম। সব ওপর ওপর।”

“সেই ছেলেটা কোথায় এখন?”

“জানি না। ভ্যানিশ করে গেল একদম। ভারতের কোথাও কোনও কল-কারখানায় কাজ করে হয়তো। পেটে বিদ্যে তো ছিল না মৃন্ময়দার মতো।”

“মৃন্ময় সেন? তোমার দাদার শালা?”

“জ্যাঠতুতো শালা। নিজের দাদা হলে তো বউদি ঢাক বাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় বলতে বেরোত, ক্লাস ওয়ান গেজ়েটেড অফিসার ওর মায়ের পেটের দাদা।”

“কুটুস হওয়ার পর মৃন্ময়দা তো একবার আমাদের গড়ফার ফ্ল্যাটেও এসেছিলেন, স্ত্রীকে নিয়ে। কিন্তু হঠাৎ ওই ভদ্রলোকের কথা তুললে কেন?”

“মৃন্ময়দা যখন একটা চুমু খেতে চেয়েছিল আমায়, আমি ঠোঁট বন্ধ করে রাখতে পারিনি গো। তিরিশ সেকেন্ড আমার মাথাটা ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গিয়েছিল। হয়তো অতটাও নয়, কুড়ি সেকেন্ড। কিন্তু হয়েছিল।”

“মৃন্ময়দা? চুমু? তোমায়?”

“শকড্‌ হোয়ো না। মৃন্ময়দার ওয়াইফও গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছিল, দুটো বাসের রেষারেষির মধ্যে পড়ে তিন-চার টুকরো হয়ে গিয়েছিল একদম, তোমার খেয়াল নেই হয়তো। তখন একদিন বউদির সঙ্গে আমিও ওঁর সঙ্গে গিয়ে দেখা করে আসব, কথা হয়েছিল। কিন্তু আমি ওঁর বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি তখন বউদি ফোন করে বলে যে, ছেলের জ্বর হয়েছে, ও আসতে পারবে না।”

“তুমি একাই চলে গেলে তখন? আর তোমাকে পেয়েই…”

“ওরকম জলমাখা ছাতুর মতো সহজসরল নয় ব্যাপারটা। অতটা রাস্তা চলে এসেছিলাম বলে আমি ফিরে না এসে গেলাম তো বটেই, কিন্তু দেখলাম মৃন্ময়দার হাতে ধরা চায়ের কাপটা কাঁপছে।”

“নাটক!”

“না, নাটক নয়। পুরো অস্তিত্বটাই কাঁপছিল লোকটার, কেবলই বলছিল যে, চোখ বন্ধ করলেই ওই পরস্পরকে টপকে যাওয়ার জন্য ছুটতে থাকা দুটো বাস আর ছন্দা বউদির ছিন্নভিন্ন দেহটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমি প্রায় একঘণ্টা কথা বলেছিলাম লোকটার সঙ্গে। বেরিয়ে আসার আগে কাছে গিয়ে ওঁর হাত দুটো ধরে বললাম, দুটো মেয়ে আপনার। তাদের কাছে এখন আপনিই বাবা, আপনিই মা। আপনাকে স্ট্রং থাকতেই হবে।”

“তখনই জাপটে ধরল তোমায়?”

“না ধরেনি। মৃন্ময়দা, সিনেমার প্রেম চোপড়া কিংবা শক্তি কাপুর নয়। হাতটাও ধরে থাকেনি। কেবল একটা কথা বলেছিল।”

“কী কথা?”

“বলেছিল, ‘আমার চোখে শুধু ছন্দার শরীরের টুকরোগুলো আছে। কোনও সতীপীঠ নেই। তুমিও তো নারী। আমায় একবার, এক মুহূর্তের জন্য জীবনে ফিরবার মতো একটা সতীপীঠ দিতে পারো?’ কথাটার সামনে আমার সব প্রতিরোধ ধসে গিয়েছিল। আমি নিজেকে আটকাতে পারিনি। ক্ষমা কোরো।”

“শুধু চুমুই হয়েছিল?”

“আমি কিন্তু তোমায় এই প্রশ্নটা করিনি, শতভিষার কাহিনি শুনে। কিন্তু তুমি করতেই পারো। আমি তো চাকরি করি না।”

“চাকরি না করলেও, এই বাড়িটা তোমার নামে। তুমিই আমাকে তাড়িয়ে দিত পারো চাইলে।”

“মন থেকে তাড়াতে পারব? মরে গেলেও?” ঝুমা কেঁদে ফেলল।

কান্নাটা একদম জেনুইন।

অনেকটা রাগ ভিতরে নিয়েও, আমি বুঝতে পারলাম।

২৬

ব্যবসাটা বিক্রি করছিলাম দুই বন্ধুকে। সুমিত শ্রীবাস্তব আর অতনু লাহা। একই স্কুলে, একবছর উপরে-নীচে পড়াশোনা করেছে বলে, দারুণ বন্ডিং ওদের মধ্যে। সাক্সেনা-বোস থেকে শ্রীবাস্তব-লাহা, সমীকরণ একই রইল ভেবে হেসে ফেলেছিলাম মনে মনে।

চাইলে সবই নিয়ে যেতে পারতাম কিন্তু আমার ইচ্ছে করছিল, ঘুরতে গিয়ে কিনে আনা ছোট-বড় কিউরিয়োগুলো অফিসেই থাক। যে প্রতিষ্ঠান নিজের হাতেই গড়ে তুলেছি, সেখানে আমার কোনও চিহ্নই থাকবে না?

অতনু আর সুমিত অবশ্য খুশিই হয়েছিল আমার প্রস্তাবে। বলেছিল চাইলে আমি হিয়ার ছবিটাও রেখে যেতে পারি, চেম্বারে। ওটা ওভাবেই থাকবে।

“না। ওটা আমি নিয়ে যাব।” বলেই ভাবলাম, কোন বাড়িতে নিয়ে যাব ওটা? যেখানে কুটুস থাকে?

সুমিতরা চলে যাবার পর অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি৷ বান্ধবগড়ের সাফারি লজে তোলা ছবিটা। খয়েরি একটা পুলওভার পরা হিয়াকে অপূর্ব লাগছে।

মনে আছে, ওই বান্ধবগড়েই বাঘের পায়ের ছাপওয়ালা মাটি হাতে করে তুলে এনেছিল হিয়া। সেই মাটিটা বহুদিন যত্নে রাখা ছিল বাড়িতে। এখন কোথায়? খোঁজ রাখার কথা মনেও নেই আর। হারিয়ে গেছে?

পরক্ষণেই মনে হল, আমার হৃদয়টাই তো সেই মাটি, নখ দিয়ে যেটাকে ফালাফালা করতে করতে বাঘ এগিয়ে গিয়েছে।

কে জানে কোথায়?

পুরো ক্লিন স্লেটেই ব্যবসা হস্তান্তর হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু এত জট চারদিকে যে, কথাটা ভাবা সহজ হলেও করা কঠিন। তাও যতটা পারি ক্লিয়ার করে যাই ভেবে ধুলাগড়ের একটু আগে যে-বড় সার্ভিস ইউনিট আছে কোম্পানির, সেখানে গিয়েছিলাম।

কাজটা সম্পূর্ণ হতে একঘণ্টাও লাগেনি কিন্তু ফিরতি পথে আটকে গেলাম দ্বিতীয় হুগলি সেতুর কাছাকাছি এসে। একটা গাড়ি এগোচ্ছিল না কারণ প্রতিটা লরি থেকে তোলা আদায়ের প্রক্রিয়া চলছিল বলে জ্যাম দীর্ঘস্থায়ী ছিল।

এক-একবার মনে হচ্ছিল ভালই হয়েছে। বাড়ি ফিরে কারও জন্মদিনের কেক তো আর কাটতে হবে না। পরক্ষণেই আগের বছর এই দিনটার কথা মনে পড়ছিল। আচ্ছা সেদিন যদি চপল বসুর ভাগ্যে কিছু খাবার জুটত তা হলে কি হিয়া বেঁচে যেত? নিজের বাচ্চা মেয়ের মৃত্যুর জন্য যে দায়ী, তার আশীর্বাদে আর একটা ছোট মেয়ে বাঁচত?

নাকি আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের মৃত্যুর জন্য দায়ী? আমি ঝুমার, ঝুমা আমার, আমরা সবাই হিয়ার? প্রত্যেকেই প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কাজ করে চলেছি জেনে বা না-জেনে।

ক’দিন আগেই যেমন হিয়ার জন্মদিন এগিয়ে আসছে বলে আমার ছটফটানি বাড়তে দেখে ঝুমা বলেছিল, “এটা তো আর হিয়ার আসল জন্মদিন নয়। আমরা ওর এই জন্মদিনের তারিখটা ঠিক করেছিলাম। তোমার মনে নেই?”

আমি একগাল হেসে ঝুমাকে বলেছিলাম, “আমি এত ভুলো হয়েছি যে, সব ভুলে যাই। ভাগ্যিস তুমি মনে করিয়ে দিলে। একটা অরফানেজ থেকে আনা মেয়ের আবার জন্মদিন কী? যার জন্মের ঠিক নেই, তার জন্মদিন হয়?”

ঝুমা মুখে হাত চাপা দিয়ে ছিটকে সরে গিয়েছিল।

শরীর বেজুত হওয়ায় একজন ড্রাইভারকে রাখতে হয়েছিল। সেই ড্রাইভারের নাম সুবচন হলেও সে কথা খুবই কম বলত।

আজ বলল, “প্রত্যেকটা লরি জানে পুলিশ এমনিতেও টাকা নেবে, ওমনিতেও। তাই প্রত্যেকেই ওভারলোডেড হয়েই আসে।”

“ভালই করে। ঘুষ যখন দেবেই, তখন আইন ভাঙার সুবিধাটাও নিয়ে নিক যতটা পারে।

সুবচন আবার চুপ করে গেল। দাঁড়িয়ে রইল গাড়ি। আর একটা ওভারলোডেড পৃথিবীতে ফেঁসে রইল অসংখ্য মানুষ যারা প্রেম, ঘৃণা, হিংসা, বিদ্বেষ, স্বপ্ন, উচ্চাশা, অসুখে, লোডেড। ওভারলোডেড।

২৭

বাড়িতে ঢোকার মুখেই দেখলাম, গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঝুমা।

“কুটুস সেই কোন বিকেলে বেরিয়েছে, এখনও ফেরেনি।” কুটুসের মা বলল।

আমার মাথায় প্রথম যে-জবাবটা এল তা হচ্ছে, ‘হিয়ার মৃত্যু সেলিব্রেট করতে গেছে হয়তো, কিন্তু আমি সেটা গিলে ফেললাম। ব্যক্তিগত মনখারাপ যত বেশিই হোক, মায়ের উদ্বেগকে ব্যঙ্গ করা নীচতা। আমি দু’-একবার করে ফেলেছি, আর করতে চাই না।

“তুমি কি একটু দেখবে? ওর মোবাইলটাও বন্ধ আসলে…”

“তুমি টেনশন না করে ঘরে যাও। আমি দেখছি।” বলে সুবচনকে ছেড়ে দিয়ে নিজেই বেরোলাম গাড়ি নিয়ে। একবার বাথরুমে যাওয়ার দরকার ছিল কিন্তু থাক…

প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট আর অনেক গলিঘুঁজি পেরিয়েও কোনও হদিশ না পেয়ে যখন পুলিশের কাছে যাব ভাবছি, তখনই একজনের দেখানো রাস্তায় এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা প্যান্ডেল। উপরে থার্মোকল কেটে বড় করে লেখা, ‘নয়নতারা ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প।’

“রক্ত দিয়েছে কম সে কম দু’শো লোক। আড়াইশোর উপরে লোক খেয়েছে, আরও অনেকে প্যাকেট নিয়ে গিয়েছে, একদম এলাহি কাণ্ড স্যার। সব আপনার ছেলের জন্য সম্ভব হল।” একটা মাঝবয়সি লোক এগিয়ে এসে বলল।

‘আপনার ছেলের জন্য’ কথাটা আমার কানে বাজছিল। আর আমার চোখ যেন বিশ্বরূপ দর্শন করছিল। মঞ্চের উপরে চেয়ারে হিয়ার সেই গোলাপি ফ্রক পরা ছবিটা। উটির কফি-বাগানে তোলা। আমার চোখ ফেটে জল নামছিল, দেখেই। আচ্ছা, স্মৃতিরও কি কোনও সুগন্ধ থাকে? মশালা কফির মতো?

“তুই এতসব করবার কথা ভাবলি কবে?” কুটুসকে নিয়ে ফেরার পথে আমি জানতে চাইলাম। তার আগে নিশ্চিত্ত করার জন্য ফোন করে দিয়েছি ঝুমাকে।

“অনেকদিন। বোনুর শরীর থেকে রক্ত বেরিয়ে সারা রাস্তাটা ভিজিয়ে দিয়েছে, আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম। তাই ভেবেছিলাম এমন কিছু করি যাতে অনেকের বডিতে ব্লাড যাওয়ার একটা ব্যবস্থা হয়। এই এনজিও-টা খুব ভাল। ওরাই দায়িত্ব নিয়ে সব করেছে। লোকাল কয়েকজন ছেলেও খুব হেলপ্‌ করেছে। কেউ খারাপ নয়, জানো তো বাবা, আলটিমেটলি কেউই খারাপ নয়।”

সেই ছোটবেলায় জোর করে ‘বাবা’ ডাকতে শিখিয়েছিলাম আমি। বলেছিলাম, কিছুতেই ‘ড্যাডি’ নয়, ‘বাবা’ বলবে। আজ সেই ডাকটাই আমার হৃদয়ের ভিতরকার সব অভাব, রক্ত দিয়ে পূর্ণ করে দিচ্ছিল। আর কোনও অসুখ অনুভব করছিলাম না আমি। কেন করব? পৃথিবীতে কেউই তো আলটিমেটলি খারাপ নয়। যে-ছেলেটা ক্লাস ইলেভেনে ভরতি হওয়ার সময় আমি স্কুলে যাইনি একদিনও, তাকে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে কোথাও একটু আটকাচ্ছিল। তাও জানতে চাইলাম, “তুই টাকা পেলি কোথায়? মা দিয়েছিল?”

“মা জানে না তো৷”

“তা হলে!”

“আমার পকেটমানি থেকে বাঁচাই তো আমি।”

“শুধু তাই দিয়েই?”

“হাতের ব্রেসলেটটা বিক্রি করে দিয়েছি।”

“কী বলছিস?”

“কী হবে বাবা গোল্ড দিয়ে? হিয়া ছিল আমাদের ফ্যামিলির সত্যিকার গোল্ড। থাকল? কেন আমি বাঁচাতে পারলাম না বলো তো ওকে? কানে তার ছিল, আমি শুনতে পাইনি জাস্ট একটু আগেই ও কী বলেছে, কিন্তু গাড়িতে ধাক্কা খেয়ে ওর ওই চিৎকারটা… আমি ভুলতে পারব না কোনও দিন। বোনু আমাদের ছেড়ে কেন চলে গেল বাবা? কেন?” একটা কান্নার টর্নেডোকে ভিতর থেকে বাইরে বের করে দিতে দিতে নিজের মাথাটা ড্যাশবোর্ডে জোরে জোরে ঠুকতে থাকল কুটুস।

আমি ওকে থামালাম না। টেনে ধরলাম না। কাঁদুক। ঔরসের ধর্ম ছাপিয়ে ভালবাসা, অনাত্মীয়তা মুছে দিয়ে আত্মীয়তার ধর্ম জেগে উঠুক পৃথিবীতে। আর যতক্ষণ না জাগছে জমে থাকা লাভা কান্না হয়ে গলুক। ভাবতে ভাবতে আমিও কখন যেন কাঁদতে শুরু করলাম কুটুসের মতোই।

একটা তারার জন্য। যে-তারাটা আর নেই।

২৮

সেদিন রাতে আর ঝুমাকে কিছু বলার মতো শক্তি ছিল না। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরদিন সকালে বললাম সবটা। শুনতে শুনতে ঝুমাও কাঁদল।

পৃথিবীতে কান্না এত বেশি যে, সুখের মুহূর্তেও চলেই আসে৷ এড়ানো যায় না।

কোথাও বেরোইনি সারাদিন। অন্যের জিম্মায় চলে যাওয়া অফিস থেকে হিয়ার যে-ছবিটা নিয়ে এসেছিলাম, সেটাই বাপ-ব্যাটা মিলে লাগালাম একতলার হলঘরটায়। যাতে বাড়ির ভিতর ঢুকলেই চোখে পড়ে।

“থাক বেটি। আসল স্বর্গ আছে না নেই জানি না, এই কাচের স্বর্গে থাক।” ছবি টাঙানো শেষ হলে বললাম।

দুপুরে মাংস ভাত খাওয়া হল জমিয়ে।

“রেড মিট খাচ্ছ, ক্ষতি হবে না তো?”

“হিয়ার বিলেটেড জন্মদিনটা সেলিব্রেট না করলে আরও বেশি ক্ষতি হবে। রাতে চাইনিজ় খাব। হিয়া ভালবাসত না?”

“এবার হিয়াই তোমায় স্বপ্নে এসে বকে দিয়ে যাবে। মিলিয়ে নিয়ো।” ঝুমা হাসতে হাসতে বলল।

কান্না তো আছেই। কতদিন পর একটু হাসির শব্দও শোনা গেল বাড়িটায়।

দুপুরে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলাম, কী একটা নতুন ব্যবসা করছি।

স্বপ্নে ব্যবসা এল, হিয়া আসবে না?

কাল রাতেই ঠিক করে রেখেছিলাম; কিন্তু কাউকে বলিনি। সন্ধ্যায় যখন কুটুসকে নিয়ে বেরোচ্ছি, ঝুমা টেরিয়ে তাকাল।

“কমল মিত্র আর উত্তমকুমার কোথায় যাচ্ছেন, একসঙ্গে?”

ঝুমার প্রশ্নের উত্তরে আমি চোখ নাচিয়ে বললাম, “আমাদের গল্প আরও বেশি ইন্টারেস্টিং। নেহাত সাধারণ লোকজনদের লাইফস্টোরি নিয়ে সিনেমা তৈরি করতে চায় না কেউ।”

লোকটা যেখানে বসে তার একটু দূরেই একটা সিনেমা হল ছিল। বন্ধ হয়ে গিয়েছে এখন।

কিন্তু হল বন্ধ হলেও যেহেতু ছায়া আর ছবি দুটোই থাকে, নিজে একটু পিছনে দাঁড়িয়ে আমি কুটুসকে এগিয়ে দিলাম, লোকটার থেকে একটা খেলনা কিনতে।

তার আগে শপিং মলের ফুড-কোর্টে বসে আমি কুটুসকে লোকটার সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা বলেছি। না, একেবারে বাস্তবটাই বলিনি। বাস্তবটাকে সিনেমা করে বলেছি।

আর তারপর সিনেমার ক্লাইম্যাক্সটাকে বাস্তবে বসিয়ে জানতে চেয়েছি, “এমন হলে কেমন হয় রে কুটুস?”

কুটুস নিজের হাতের সঙ্গে আমার হাত মিলিয়ে, ‘হাই ফাইভ’ করে জবাব দিয়েছে, “গ্রেট’’!

কিন্তু এখন কুটুস ধ্যাড়াচ্ছে। খেলনা দুর করছে। ওরে বাচ্চা, জীবনটা হাতের মুঠোয় নেওয়ার জন্য, দরাদরির জন্য নয়।

বোধহয় কুটুস একটু নার্ভাস। স্বাভাবিক।

বোধহয় আমার এগিয়ে যাওয়াই উচিত এখন।

“কুটুস তুই যে-মার্কার পেনটা খুঁজছিলি, সেটা ওই বাঁদিকের দোকানটায় আছে।”

কুটুস সরে যেতেই লোকটা হতাশ গলায় বলল, “নিলেন না কেন? আমি কম করেই দিতাম।”

“একত্রিশ বছর আগে যে ছেলেটা তোমার মাথায় টর্চের বাড়ি মেরেছিল, তার নামও কি কম করে পুলিশে দিয়েছিলে? নইলে পুলিশ ধরল না কেন তাকে? নাকি দাওইনি?”

লোকটা চমকে উঠল, “কে বলছেন আপনি?”

“আমি একটা ছেলে বলছি, যার মা এখন আকাশে; আর মা যার আকাশে, সে কি বাবাকে ফুটপাথে বসে থাকতে দিতে পারে?”

“তোর মা আর সত্যিই নেই?”

“তুমি তো আছ।” বলতে বলতে হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিলাম লোকটাকে।

“আস্তে, বুতান আস্তে।” লোকটা বলে উঠল।

আমার বুকটা মোচড় দিতে শুরু করল। এই নামটা ধরে শুধু একজনই ডাকত আমায়। আর আজ প্রায় বত্রিশ বছর পর নামটা শুনলাম আমি। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “ওই ছেলেটা তোমার নাতি, বাবা। অনেকদিন তো হয়ে গেল, এবার ফিরবে চলো।”

বাবা আমার কনুইয়ের কাছটা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার ওই ঝাপসা হয়ে আসা চোখে আমার দিকে তাকাল।

মানুষ যেভাবে আয়নার দিকে তাকায়।

__________

অধ্যায় ১ / ১

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%