কাশ্মীর সুন্দরী

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

আকাশ এখানে ঘন নীল। ঠিক যেন সমুদ্রের মতো। আর তার ঠিক নীচেই দাঁড়িয়ে আছে সার সার পর্বতমালা। তাদের শিখরগুলো যেন তর্জনীর মতো, স্পর্শ করতে চায় আকাশকে। বছরের অধিকাংশ সময় শুভ্র তুষারের আবরণে ঢেকে থাকে পর্বত কিরীটগুলো। এ পর্বতমালার নাম পীর। যা বৃত্তাকার প্রাকারের মতো আবৃত করে রেখেছে নীচের ওই উপত্যকাকে। হয়তো বা বিচ্ছিন্নও করে রেখেছে নন্দনকানন সদৃশ উপত্যকাকে। হ্যাঁ, নন্দনকানন! কেউ কেউ একে ভূস্বর্গ বলেও আখ্যায়িত করেন।

জ্যৈষ্ঠে এখানে দাবদাহ হয় না। শ্রাবণেও বারি ধারা বহে না। ঋতু বলতে এখানে কেবলমাত্র দুটো,—শীত ও বসন্ত। বৈশাখ থেকে কার্তিক মাস এখানে বসন্তকাল। সে সময় ফুলের সমারোহে সেজে ওঠে এ উপত্যকা। হরিদ্রাভ বর্ণের বেদমুষ্ক থেকে আকাশের মতো নীলবর্ণের দ্যুলোক পুষ্প—জেসমিন। যৌবনভারে নুইয়ে পড়া যুবতীর মতনই এ সময় নুইয়ে পড়ে সোনালি-রক্তিম পালেবত ফলপূর্ণ বৃক্ষ শাখা। ফুল ও ফলের মন মাতানো গন্ধে, ভ্রমরের গুঞ্জনে উপত্যকা ভরে ওঠে। সে এক স্বর্গীয় আঘ্রান।

পীর পর্বতের শৃঙ্গগুলোর ভিন্ন ভিন্ন নাম আছে। তন্মধ্যে অন্যতম বৈরনাগ। বৈরনাগ পর্বত সংলগ্ন তিনটি হিমবাহ আছে। তাদের ডাকা হয় বিৎবিসর বা বিতস নামে। হিমবাহগুলির থেকে উৎপন্ন জলস্রোতের নাম বিতস্তা বা বিহং। এই তটিনী নৃত্যশীলা রমণীর মতো আপন খেয়ালে আপন ছন্দে পর্বত শিখর থেকে মন্দ্র গতিতে নাচতে নাচতে নিম্নে উপত্যকাকে বিভাজিত করে প্রবাহিত হয়েছে। তারই জলপ্রবাহ উপত্যকার বুকে সৃষ্টি করেছে বহু কাকচক্ষু হ্রদ, সরোবর প্রস্রবন। আর এই সব হ্রদ-সরোবরের তীরেই অবস্থান করছে নানা তপোবন, উপবন। বছরের সাত মাস বসন্ত বিরাজ করে।

পাখির কুজনে মথিত বিতস্তার তটবর্তী ওই তপোবনগুলো। কেউ কেউ বলেন বিধাতা পুরুষ নাকি প্রথম প্রাণ সৃষ্টি করেছিলেন পুষ্পমণ্ডিত এই শান্ত স্নিগ্ধ তপোবনগুলোতে। আদি প্রাণের বাসভূমি নাকি বিতস্তার তপোবন। তারপর তা নদীর বারিপ্রবাহের মতো বিকশিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আরও নিম্নে সমতল ভূখণ্ডে। এ বক্তব্যর সত্য-মিথ্যা তেমন জানা না থাকলেও মানবকূলের অন্যতম প্রাচীন বাসভূমি পীর পর্বতবেষ্টিত এই উপত্যকা। পুরাণেও এর উল্লেখ আছে। ঋষি-মুনিরা তাদের সাধনক্ষেত্র হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন শান্ত নিভৃত এই সব তপোবনগুলিকে। জনশ্রুতি এই তপোবনগুলির কোনো একটিতে মহর্ষি কশ্যপের আশ্রম ছিল। আর তাঁরই নাম অনুসারে এ উপত্যকার নাম কাশ্মীর! ভূস্বর্গ কাশ্মীর।

উপত্যকায় চারটি বৃহৎ হ্রদ আছে। তার মধ্যে একটি হল কাকচক্ষু মহাসরিৎ হ্রদ। এই হ্রদ ও তার তীরবর্তী অঞ্চল নিয়ে অবস্থান করছে কাশ্মীর দেশের প্রধান জনপদ ও প্রাচীন রাজধানী সূর্যনগর বা শ্রীনগর। হ্যাঁ, এ নগরী শুধু স্থলে নয় জলেও বিদ্যমান। নগরীর স্থলভাগে যেমন কাষ্ঠ ও প্রস্তর নির্মিত প্রাসাদ বিদ্যমান, তেমনই মহাসরিৎ হ্রদের জলেও বহু ভাসমান প্রাসাদ বা গৃহ আছে। ধীর গতিতে সঞ্চরণশীল এই ভাসমান গৃহগুলোকে বলে ডুঙ্গা। কয়েক সহস্র নাগরিক দল ভাসমান গৃহতে বসবাস করে থাকে। তাই মহাসরিৎ হ্রদ ‘দল হ্রদ’ ও ‘নাগরিক হ্রদ’ নামেও পরিচিত।

মহারাজ ললিতাপীড়ের বেশ কয়েকটি ভাসমান প্রাসাদ রয়েছে মহাসরিৎ হ্রদ বা দল হ্রদের জলে। কাষ্ঠ নির্মিত বেশ কয়েকটি সেতুও রয়েছে ভূভাগ থেকে হ্রদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার জন্য। তবে শীতকালে কয়েকমাস ওই সেতুগুলি ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। কারণ শীতকালে উপত্যকার অন্য হ্রদগুলির মতো দল হ্রদের জলও বরফে পরিণত হয়। ভাসমান গৃহগুলোরও তখন সঞ্চরণের কোনো উপায় থাকে না। সে সময় দল হ্রদের বাসিন্দারা সেই শক্ত বরফের ওপর দিয়ে পদব্রজেই মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতে পারে।

তবে ওই শীতের কয়েকমাস বড় কঠিন সময় ভূস্বর্গের বাসিন্দাদের কাছে। বিশেষত পৌষ আর মাঘ মাসে। এই দুই মাস অনেক সময় দীর্ঘকাল উপত্যকার আকাশে সূর্য দেখা যায় না। অবিরাম তুষারপাত হতে শুরু করে। শ্রাবণে বৃষ্টি না নামলেও এসময় তুষারপাতের সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাতও হয়। তাতে শীতলতা আরও বৃদ্ধি পায়। সারা উপত্যকা, শ্রীনগরের জল-স্থল ঢেকে যায় শুভ্র তুষারের আড়ালে। বিশেষ প্রয়োজন না হলে এ সময় কেউ স্থল অথবা দল গৃহের বাইরে যায় না।

রাজ পার্ষদ যুবক উচ্ছল যে স্থানে দণ্ডায়মান হয়ে ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছিল, সেই স্থানের নাম পুষ্পপথ। শ্রীনগর থেকে বেশ খানিকটা ওপরে এই গিরিবর্ত্ম। বসন্তে এই গিরিবর্ত্ম বিচিত্র সব পুষ্পশোভিত হয়ে ওঠে বলে এ স্থানের নাম এই পুষ্পপথ।

বসন্ত সমাগত। বৈশাখের প্রারম্ভ। আর কিছুদিন পর থেকেই ফুল ফুটতে শুরু করবে। প্রথমে হরিদ্রাভ বর্ণের বেদমুষ্ক ফুল, তারপর ধীরে ধীরে অন্য ফুল। তাদের বাহারে ছেয়ে যাবে পুষ্পপথ। সে সৌন্দর্য বর্ণনারোহিত।

চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই বরফ গলতে শুরু করেছে। নীচের নগরী, দল হ্রদ ইতিমধ্যে অনেকখানি বরফমুক্ত হলেও, এই পুষ্পপথ বেশ খানিকটা উচ্চস্থানে অবস্থান করাতে এ অঞ্চলের বরফ এখনও বিদ্যমান। তবে তা ধীরে ধীরে গলতে শুরু করেছে।

এসময় এ স্থান বেশ খানিকটা বিপজ্জনক। কারণ পথপার্শ্বে পাহাড়ের ঢালের গায়ে ঝুলতে থাকা বিশালাকৃতির বরফের ঝুলন্ত চাঙড়গুলোর নিম্নাংশগুলো গলে যাওয়ার কারণে অনেক সময় তারা নিজেদের ধরে রাখতে পারে না। ভীমবেগে সেই সব বিশালাকৃতির বরফখণ্ড ওপর থেকে নেমে এসে সামনে যা কিছু পায় তাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে খণ্ডবিখণ্ড হতে হতে ঢাল বেয়ে নীচের দিকে নেমে যায়। নীচের নগরী থেকেও শোনা যায়, হিমশৈল পতনের সেই বজ্রনির্ঘোষ। গতরাতেও দল হ্রদে নিজের ডুঙ্গায় বসে সে শব্দ শুনতে পেয়েছিল উচ্ছল।

তবুও উচ্ছলকে আজ আসতে হয়েছে এই বিপজ্জনক পুষ্পপথে। আসতে হয়েছে কাশ্মীররাজ ললিতাপীড়ের নির্দেশে। এই গিরিবর্ত্ম বছরে চার-পাঁচ মাস তুষারাবৃত থাকলেও কতিপয় জীবের বাসস্থান। যে সব জীবের মধ্যে একটি প্রাণী হল কস্তুরী মৃগ।

বসন্তকালে পুষ্পরাজি প্রস্ফুটিত হলে পর্বত সংলগ্ন চারণ ভূমিতে ঘুরে বেড়ায় কস্তুরী মৃগের দল। আর শীতের সময়টুকু তারা অতিরিক্ত ঠান্ডা আর তুষারপাতের থেকে রক্ষা পেতে দিবা-রাত্রি আশ্রয় নিয়ে থাকে পার্বত্য গুহায়। মহারাজের নির্দেশে তাদেরই সন্ধানে মৃগ নাভি বা সুগন্ধী কস্তুরী আহরণে এসেছিল উচ্ছল। বেশ কিছু সময় ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে এক গুহায় বেশ কয়েকটি কস্তুরী মৃগের সন্ধানও পেয়েছিল উচ্ছল ও তার অনুগত শিকারিরা।

কস্তুরী পাওয়া যায় পুরুষ হরিণের নাভিতে। গুহামধ্যে যেক’টি পুরুষ হরিণ পাওয়া গেছিল, তাদের হত্যা করে, নাভি বা কস্তুরী আহরণ করা হয়েছে। তবে সদ্য আহরিত কস্তুরীর গন্ধ এত তীব্র যে তা সুগন্ধী হলেও সেই ঝাঁঝালো গন্ধে শ্বাসরোধ হয়ে আসে। যে কারণে কোনো কোনো সময় কস্তুরী আহরণকারীদের মৃত্যুও ঘটে। তবে দেবতার আশীর্বাদে এ যাত্রায় উচ্ছলের সঙ্গীদের তেমন কোনো দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়নি। নিরাপদেই মৃগনাভি ছেদনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তারপর সেগুলোকে রেশমের বস্ত্র খণ্ডে জড়িয়ে বায়ু নিরোধক ধাতব পাত্রে ভরা হয়েছে। এবার কার্য সমাপ্ত করে নীচে ঘরে ফেরার পালা। তার আগে উচ্ছল আর তার সঙ্গীরা কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিচ্ছিল মধ্যাহ্নের রৌদ্রকরোজ্জল পুষ্পপথের এক স্থানে।

উচ্ছল যে জায়গায় দাঁড়িয়েছিল, সেখান থেকে নীচের শ্রীনগর শহর স্পষ্ট দৃশ্যমান। ওপর থেকে চারপাশে হ্রদে ঘেরা নগরীকে দেখতে লাগছিল ঠিক ভাসমান দ্বীপের মতো। সদ্য তুষার মুক্ত নগরীর বড় বড় প্রাসাদ-অট্টালিকার দু-পাশে ঢাল সমৃদ্ধ সোনালি ছাদগুলো ঝলমল করছে সূর্যকিরণে। আর দল হ্রদে অসংখ্য ভাসমান গৃহগুলোকে ওপর থেকে দেখে মনে হচ্ছে যে ঝাঁকে ঝাঁকে মৎস যেন ভেসে আছে হ্রদের জলে। আর হ্রদের গায়ে ঋজু বৃক্ষগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে যে তারা যেন সারবদ্ধ সৈনিকের মতো পাহারা দিচ্ছে হ্রদটিকে। ওপর থেকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে জল-স্থল আবৃত নগরীকে।

ফেরার জন্য যাত্রা শুরু করার আগে সেদিকেই তাকিয়ে ছিল উচ্ছল। ওই যে দল হ্রদে অসংখ্য মৎসের ন্যায় নৌকা ভাসছে, তারই মধ্যে একটিতে উচ্ছলের বাসস্থান। দল হ্রদেই তার গৃহ। এত ওপর থেকে অবশ্য সে গৃহ চিহ্নিত করা দুষ্কর।

কার্য উদ্ধার হলেও উচ্ছলের মন বেশ ভারাক্রান্তই লাগছিল। আসলে নিরীহ মৃগগুলোকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করতে মন চায় না উচ্ছলের। তার সঙ্গীরা যখন পুরুষ হরিণগুলোকে হত্যা করে কস্তুরী ছেদন করছিল, তখন স্ত্রী হরিণগুলো কী করুণ ভাবে চেয়েছিল তাদের দিকে। মানুষ না হলেও এক অব্যক্ত যন্ত্রণা ফুটে উঠেছিল তাদের চোখে-মুখে! হরিণীগুলোর দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল উচ্ছল। কিন্তু সে নিরুপায়। রাজনির্দেশ তাকে পালন করতেই হতো। বিশেষত রাজার নাম যখন ললিতাপীড়, তখন তাঁর নির্দেশ পালন না করলে কস্তুরী মৃগদের চেয়েও নির্মম শাস্তির সম্ভাবনা রয়েছে।

কিছু সময় সেখানে বিশ্রাম নেওয়ার পর সঙ্গীদের নিয়ে হাঁটতে শুরু করল উচ্ছল। পুষ্পপথের কিছু নীচে ঢালের গায়ে তাদের ঘোড়াগুলো বাঁধা আছে। সে পর্যন্ত পৌঁছে অশ্বপৃষ্ঠে নগরীতে নামবে তারা। সে অভিলাষেই হাঁটছিল। কিছুটা পথ এগোবার পর যুবক উচ্ছল সঙ্গীদের নিয়ে তাদের অশ্বগুলো যেখানে বাঁধা আছে সেখানে যাবার জন্য একটা সংক্ষিপ্ত পথ ধরল।

সংক্ষিপ্ত হলেও কিছুটা এগোবার পর তারা বুঝতে পারল এ পথে তাদের এগোনো উচিত হয়নি। আশেপাশে ছড়িয়ে আছে তুষার ধসের চিহ্ন। গতরাতে নীচ থেকে যে তুষার ধসের শব্দ শোনা গেছিল তা সম্ভবত এখানেই হয়েছিল। খণ্ড খণ্ড বরফের টুকরো ছড়িয়ে আছে চারপাশে। পথের গায়ে ঢালের মাথা থেকে ঝুলছে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বরফের চাঁই। বাতাসে সামান্য কম্পন অনুভূত হলেই তারা ওপর থেকে নেমে এসে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে উচ্ছলদের ক্ষুদ্র দলটাকে। রাশি রাশি বরফের নীচে চাপা পড়ে থাকবে তাদের দেহগুলো। যে কারণে নিজেদের মধ্যে কোনো কথাবার্তা না বলে অতি সাবধানে সে জায়গা পার হল তারা।

হঠাৎ মৃদু টান পড়ল উচ্ছলের পরনে ভেড়ার লোমের আংরাখার হাতায়। দাঁড়িয়ে পড়ল উচ্ছল। যে ব্যক্তি তার পোশাকে টান দিয়েছিল উচ্ছল তার দিকে তাকাতেই সে অঙ্গুলি নির্দেশ করল কিছুটা তফাতে এক জায়গাতে। আকাশি রঙের একখণ্ড বস্তু যেন সেখানে মৃদু মৃদু আন্দোলিত হচ্ছে! দ্যুলোক পুষ্প তো এখনও ফোটার সময় হয়নি। তবে ওই নীলবর্ণের বস্তুটা কী? ভালো করে সেদিকে তাকাবার পর উচ্ছল বুঝতে পারল সেটা আসলে বরফের তলা থেকে বেরিয়ে থাকা একটা বস্ত্রখণ্ড। আর সেটাই হিমেল বাতাসে মৃদু মৃদু নড়ছে। এখানে বস্ত্রখণ্ড এল কীভাবে? সঙ্গীদের সঙ্গে একবার দৃষ্টি বিনিময় করে কৌতূহলবশত এগোল সেদিকে। অনেক সময় তস্করের দল কাপড়ে মুড়ে পাথর বা সম্পদ বরফের আড়ালে লুকিয়ে রেখে যায়, তেমন কিছু নয়তো?

কিন্তু সেখানে পৌঁছেই উচ্ছল আর তার সঙ্গীরা অবাক হয়ে গেল। তারা স্পষ্ট বুঝতে পারল বরফের আড়ালে একটা দেহ চাপা পড়ে আছে। আর তার শরীর থেকেই বস্ত্রখণ্ডটা বরফের তলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। বস্ত্রখণ্ডটা আসলে একটা নীল উড়নি। এ কার দেহ? উচ্ছলের ইঙ্গিতে উবু হয়ে বসে তার সঙ্গীরা ধীরে ধীরে সে স্থানের বরফ সরাতে লাগল, আর তার সঙ্গে সঙ্গে আত্মপ্রকাশ করতে লাগল একটা দেহ, নারী দেহ!

এক সময় সম্পূর্ণভাবে বরফ সরিয়ে ফেলা হল তার দেহ থেকে। উচ্ছলদের সামনে শুয়ে আছে এক সুন্দরী যুবতী। তার পরনে পশমের পোশাক, উড়নিটা কোমরবন্ধর মতো করে কোমরে জড়ানো, পায়ে পাতা ঢাকা চর্মজ পাদুকা, গলায় অর্ধচন্দ্রাকৃতি রঙিন পাথরের অলঙ্কারও আছে। তার পোশাক, পাদুকা আর অলঙ্কার দেখে কোনো মাড়ব রাজ্যের কন্যা বলেই মনে হল উচ্ছলের। বিতস্তার উৎসমুখগুলির ওপর দিকে পাহাড়ের ওপাশে যে সব জনপদ আছে তাদের মাড়ব রাজ্য বলে। মাড়ব রাজ্যগুলোও কাশ্মীর মহারাজের রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত। শ্রীনগরের বাসিন্দারা পর্বত শিখর অতিক্রম করে পাহাড়ের ওপাশে খুব একটা না গেলেও মাঝে মাঝে ওই উচ্চভূমির লোকেরা পাহাড় ডিঙিয়ে শ্রীনগরে আসে। মাড়ব রাজ্যের পাহাড়ের ঢালে নানান প্রকারের ঔষধি বৃক্ষ, লতা গুল্ম জন্মায়। যেগুলি বিক্রি করতেই তারা আসে।

বরফের তলায় চাপা পড়ে থাকার কারণে যুবতীর শুভ্র মুখমণ্ডল, হস্ত, বরফের ন্যায় আরও শুভ্র বর্ণ ধারণ করেছে। নিশ্চল তার দেহ। এ যুবতী জীবিত না মৃত? অনেক সময় হিমানীর নীচে চাপা পড়ে থাকা মৃতদেহ দীর্ঘদিন অবিকৃত অবস্থায় থাকে। দেখে বোঝাই যায় না বহুকাল আগে তার মৃত্যু হয়েছে।

এ দেহে প্রাণ আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য উচ্ছলের সঙ্গীদের মধ্যে একজন বৃদ্ধ শিকারি প্রথমে সেই যুবতীর একটা হাত তুলে ধরল। বরফের মতোই কঠিন হিমশীতল সেই হাত। কোনো স্পন্দন নেই সেই হাতে। তবুও আরও একবার তাকে পরীক্ষা করার জন্য সেই বৃদ্ধ ঝুঁকে পড়ে কান চেপে ধরল তার বুকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল বৃদ্ধের চোখ। বুক থেকে মাথা তুলে উচ্ছলের দিকে চেয়ে বলল, ‘এখনও ক্ষীণ প্রাণ আছে শরীরে। মরেনি মেয়েটা!’

বিস্মিত উচ্ছল বলে উঠল, ‘প্রাণ আছে! দেখো বাঁচাতে পারো কিনা মেয়েটাকে?’

বৃদ্ধ বলল, ‘এই বরফের রাজ্য থেকে নীচে নামিয়ে নিয়ে যেতে পারলে হয়তো যুবতী বেঁচে যাবে। কিন্তু তার আগে ওর চেতনা ফেরানো দরকার।’

সঙ্গে সঙ্গে কাজে নেমে পড়ল উচ্ছলের অন্য সঙ্গীরাও। যুবতীকে বরফের চাদরের ওপর থেকে তুলে সঙ্গে আনা শুষ্ক বস্ত্রখণ্ডের ওপর প্রথমে শুইয়ে দেওয়া হল। নিচ থেকে বরফের রাজ্যে উঠে এসেছে বলে উচ্ছল আর তার সঙ্গীদের প্রত্যেকের বুকের কাছেই কাঠকয়লার আঁচপূর্ণ পাত্র কাঁকড়ি ঝুলছিল। উচ্ছল নিজের গলা থেকে তার কাঁকড়িটা খুলে এগিয়ে দিল তার এক সঙ্গীর দিকে। সে সেটা স্থাপন করল রমণীর বুকে, আর অন্যরা তার হাত-পা ডলতে শুরু করল।

এই প্রচেষ্টায় কাজ হল। উষ্ণ স্পর্শে ধীরে ধীরে রক্ত সঞ্চালন শুরু হল যুবতীর শরীরে। মৃত্যুশীতল শুভ্রতা মুছে গিয়ে তার শরীরে রক্তিম আভা ফুটে উঠতে লাগল। মৃদু ওঠা নামা করতে লাগল তার বুক। কিন্তু তার জ্ঞান ফিরল না। শেষ পর্যন্ত যুবতীর জ্ঞান ফেরাবার জন্য এক কৌশল অবলম্বন করল বৃদ্ধ শিকারি। সদ্য কর্তিত মৃগনাভিপূর্ণ একটা পাত্র সে মুহূর্তের জন্য উন্মোচিত করল যুবতীর মুখের সামনে। কস্তুরীর তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। আর তারপরই থর থর করে কেঁপে উঠল রমণীর শরীর। কস্তুরীর ঝাঁঝালো গন্ধ নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করাতে চোখ মেলল সে। উচ্ছল তার ওপর ঝুঁকে পড়ে তাকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কে? কোথা থেকে এখানে এলে?’

চোখ মেললেও যুবতীর দৃষ্টি তন্দ্রাচ্ছন্ন। উচ্ছল তাকে কয়েক বার প্রশ্নটা করার পর মেয়েটা ঠোঁট নেড়ে কী যেন বলার চেষ্টা করল। কিন্তু ঠান্ডায় জমাটবাঁধা নারী কণ্ঠ থেকে কোনো স্বর বেরোল না। প্রচণ্ড দুর্বলতায়, ক্লান্তিতে আবার তার চোখে বুজে গেল।

বৃদ্ধ শিকারি উচ্ছলকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘একবার যখন জ্ঞান ফিরেছে, তখন মেয়েটা বেঁচে যাবে। কিন্তু এখন আমাদের এ স্থান ত্যাগ করা দরকার। দীর্ঘক্ষণ আমরা এখানে আছি, কথা-বার্তার শব্দও করেছি, দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।’

উচ্ছলের দলের মধ্যে যে সব থেকে বলশালী লোক ছিল, সে এরপর বস্ত্রখণ্ড জড়িয়ে যুবতীর অচৈতন্য দেহটা কাঁধে তুলে নিল, তারপর পূর্বের ন্যায় সকলে আবার ফেরার পথ ধরল। তুষারমণ্ডিত সেই বিপদসঙ্কুল পথ অতিক্রম করে এক সময় তারা উপস্থিত হল ঢালের গায়ে ক্ষুদ্রাকৃতি সমতল স্থানে। যেখানে তাদের ঘোড়াগুলো বাঁধা ছিল সেখানে। একটা ঘোড়ার পিঠে তুলে যুবতীর অচৈতন্য দেহটাকে ভালোভাবে রজ্জুবদ্ধ করা হল। অতঃপর পুষ্পপথ নামক স্থান ত্যাগ করে সবাই নামতে শুরু করল নগরীর দিকে। ক্রমশ তাদের চোখের সামনে আরও ভালো ভাবে ধরা দিতে লাগল কাশ্মীররাজের প্রাসাদের স্বর্ণমণ্ডিত শীর্ষদেশ, নগরীর রাজপথ, জনপথ, পিপীলিকার মতো মানুষজন, দল হ্রদের জলে সন্তরণশীল ক্ষুদ্রাকৃতি শিকারা নৌকাগুলোও।

উচ্ছল যখন তার সঙ্গীদের নিয়ে নীচে নেমে এল, তখনও যুবতীর হুঁশ ফেরেনি। সামনের পথ দুটো ভাগে বিভক্ত। একটা গেছে স্থলভাগে অবস্থিত নগরীর দিকে, আর অপরটা গেছে দল হ্রদের দিকে। মহারাজের পার্ষদ হিসাবে তাঁর প্রাসাদের কাছাকাছি উচ্ছলের একটা বাটিকাও আছে। রাজসভার স্থায়ী সদস্যদের জন্য সরকারি বাসস্থান।

নীচে নামার পর উচ্ছল ভাবল এ নারীকে কোথায় নিয়ে যাওয়া যায়? উচ্ছল প্রথমে একবার ভাবল স্থলভাগস্থিত সেই গৃহেই নিয়ে যায় তাকে। কিন্তু এর পরক্ষণেই তার মনে হল সে স্থানে এ নারীকে নিয়ে গেলেই রাজকর্মচারীদের চোখে পড়বে সে। মহারাজের কাছেও হয়তো দ্রুত পৌঁছে যাবে যুবতীর আগমন বার্তা। তখন অনর্থ ঘটতে কতক্ষণ? সর্বাগ্রে যুবতীকে সুস্থ করে তোলা দরকার, তার নাম পরিচয় জানা প্রয়োজন, তারপর সে তার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

হ্রদের জলে উচ্ছলের ভাসমান গৃহতে গুঞ্জা নামের এক বৃদ্ধা পরিচারিকা আছে। অভিজ্ঞ সেই বৃদ্ধা এই কন্যার শুশ্রূষার ভার নিতে পারবে। এ কথা ভেবে নিয়ে যুবক উচ্ছল শেষ পর্যন্ত সেই অনামী, সংজ্ঞাহীন যুবতীকে নিয়ে মহাসরিৎ হ্রদ বা দল হ্রদের পথ ধরল।

ভূস্বর্গ কাশ্মীর দেশের রাজধানী শ্রীনগর বা সূর্যনগর বহু সহস্র বছরের প্রাচীন নগরী। পুরাণ কথিত, কশ্যপ মুনির আশ্রমের সময়কাল থেকেই মহাসরিৎ হ্রদ সংলগ্ন এ নগরীর উল্লেখ মেলে। তবে এ নগরীর পরিবর্ধন সাধিত হয় সম্রাট অশোকের আমলে। জম্বুদ্বীপের শীর্ষস্থানে অবস্থানকারী হ্রদ, তপোবন, উপবন, শুভ্র কিরীট সমৃদ্ধ পর্বতময় এ দেশ সে সময় তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অশোক অনুরাগী কাশ্মীররাজ সে সময় বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারের জন্য এ দেশে শুধু মঠ, বিহার, চৈত্য নির্মাণ করাননি, সূর্যনগরে দশ সহস্র বাটিকা নির্মাণ করে নগরের শ্রী ও পরিধি বৃদ্ধিও ঘটান। অদ্যাবধি বহু রাজবংশ শাসন করেছে মর্তের এই স্বর্গভূমিকে। সে সব রাজবংশের মধ্যে যেমন ছিলেন গোনন্দ, লব, কুশ, রাবণ, ইন্দ্রজিৎ, বিভীষণ, নরেন্দ্রদিত্য প্রমুখ পুরাণ কথিত নৃপতিরা। তেমনই ছিলেন প্রতাপাদিত্য, তৃঞ্জিন, মেঘবাহন, প্রবরসেনের মতো প্রজাবৎসল নরপতিরা। এই রাজবংশ ও রাজাদের মধ্যে কেউ ছিলেন শৈব ধর্মের অনুরাগী আবার কেউ বা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুরক্ত।

মহারাজ জৌলক যেমন ছিলেন শৈব ধর্মের উগ্র সমর্থক, তেমনই আবার মহারাজ তুঙজিনা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রবল সমর্থক। তাঁর রাজত্বের শেষ ভাগেই এ স্থানে বৌদ্ধ সংগীতি বা ধর্মমহাসভা অনুষ্ঠিত হয়।

প্রথম নরপতি গোনন্দর সময়কাল থেকে অদ্যাবধি প্রায় সত্তরজন নৃপতি-সম্রাট প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শাসন করেছেন এই পুষ্পমণ্ডিত দেশকে। তাদের মধ্যে অনেক নামই মহাকালের প্রতাপে বিতস্তার বুকে হারিয়ে গেছে। তবে যে নৃপতিদের নাম জানা যায়, তাদের রাজ্যশাসন সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তাতে তারা দোষে-গুণে মানুষ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবাই যে প্রজাবৎসল নৃপতি ছিলেন এমন বললে সত্যের অপলাপ করা হবে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ভোগী ছিলেন, আবার কেউ বা শৈব ও বৌদ্ধধর্মের সংঘাতে বিধর্মীদের নগরী থেকে বিতাড়ন বা নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছিলেন। প্রাজ্ঞজনের মুখ থেকে এমনই অন্তত শুনেছে যুবক উচ্ছল।

এ দেশের সিংহাসনে বর্তমানে যিনি অধিষ্ঠান করছেন তাঁর নাম মহারাজ ললিতাপীড়। তাঁর অপর নাম বজ্রদিত্য। তাঁর মাতা মহারানি চক্রমর্দিকা। পূর্বতন মহারাজ জয়পীড়ের মৃত্যুর পর ললিতাপীড় তাঁর সৎভ্রাতা, কুবলয়পীড়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সিংহাসন দখল করেন। এক বৎসরকাল যুগ্মভাবে রাজ্যশাসন করার পর কুবলয়পীড় সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করলে একাই সিংহাসনের অধীশ্বর হন ললিতাপীড়। সেই অবধি বিগত সপ্তবর্ষকাল ধরে এ দেশ শাসন করে চলেছেন, বজ্রদিত্য ললিতাপীড়।

তবে মহারাজ ললিতাপীড়ের শাসনকে প্রবল দুঃশাসন বলাই শ্রেয়। তাঁর পূর্ববর্তী রাজা জয়পীড় যে খুব একজন প্রজাবৎসল রাজা ছিলেন তা বলা যায় না। ভোগী, প্রজাপীড়ক। কয়েকজন রাজাকে ইতিপূর্বে উপত্যকাবাসী দেখেছে। কিন্তু বর্তমান মহারাজের ভোগ, লালসা, লাম্পট্য, নিষ্ঠুরতা, প্রজা উৎপীড়ন ছাপিয়ে গেছে সব কিছুকে। বিশেষত তাঁর মতো নারীলোভী রাজা কোনো দিন কাশ্মীরের সিংহাসনে আবির্ভূত হননি। মহারাজের বিবাহিত স্ত্রীর সংখ্যা পাঁচজন। উপপত্নি বা অবরুদ্ধার সংখ্যা অন্তত তিরিশ, কিন্তু তাতে তিনি তৃপ্ত হন না, সব সময় বেশ্যাকূল পরিবৃত হয়ে থাকেন তিনি। এমনকী মহারাজ তাঁর রাজসভাতে তিন বেশ্যাকে মন্ত্রী পরিষদ ও পার্ষদদের সঙ্গে আসন প্রদানও করেছেন, যা কাশ্মীরের রাজসভায় ইতিপূর্বে ঘটেনি। ওই বেশ্যত্রয়ী বর্তমানে মহারাজ ললিতাপীড়ের প্রধান পরামর্শদাতা।

মন্ত্রী ও পারিষদদেরও মাথা ঝোঁকাতে হয় তাদের সামনে। সবাই জানে এর প্রতিবাদ করলে তাদেরও অবস্থা হবে মন্ত্রী সুষেনের মতো। প্রধান মন্ত্রী সুষেন শ্রীনগরে এসেছিলেন পাহাড়ের ওপারের এক মাড়ব রাজ্য থেকে। তিনি আসলে ছিলেন ভেষজ চিকিৎসক। মহারাজ জয়পীড়কে একবার তিনি কঠিন অসুখ থেকে সারিয়ে তোলেন।

তার পুরস্কার স্বরূপ জয়পীড় তাঁকে তাঁর মন্ত্রীপরিষদে স্থান দেন ও রাজা ও তাঁর পার্ষদদের চিকিৎসক রূপে নিয়োজিত করেন। অর্থাৎ মহারাজ ললিতাপীড়ের সিংহাসন আরোহণের পূর্ব থেকেই রাজসভায় চিকিৎসার কাজে নিয়োজিত ছিলেন রাজবৈদ্য মন্ত্রী সুষেন। রাজসভার রাজনীতিতে আগ্রহ ছিল না সুষেনের। তবে নিজের কার্য তিনি অত্যন্ত দায়িত্ব সহকারে করতেন। আর সেটাই তাঁর জীবনের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছিল।

মহারাজ ললিতাপীড় যে তিন বেশ্যারত্নকে তাঁর রাজসভায় স্থান দিয়েছেন তাদের মধ্যে একজন হল মুক্তবেণী। একদিন যখন মুক্তবেণী রাজসভাতে মহারাজ ললিতাপীড়কে অতিরিক্ত পরিমাণ মদ্য পরিবেশন করছিল তখন মহারাজের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে সুষেন উঠে দাঁড়িয়ে এ ঘটনার প্রতিবাদ করে মুক্তবেণীকে তিরস্কার করেন। মুক্তবেণী এ ঘটনায় অপমানিত বোধ করে পরদিন থেকে রাজসভায় আসা বন্ধ করে। মুক্তবেণীর অনুপস্থিতিতে ব্যাকুল হয়ে পড়েন কামুক মহারাজ ললিতাপীড়। তিনি তাঁর প্রিয়াকে রাজসভায় ফিরে আসার অনুরোধ জানালে বেশ্যা তাঁকে জানায় যে যতদিন না মহারাজ তার অপমানের প্রতিবিধান করছেন ততদিন সে রাজসভায় আসবে না। মন্ত্রী সুষেনের শাস্তির দাবি জানায় সে। মহারাজ ললিতাপীড় ততদিনে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য, বেশ্যা করতলগত এক অমানুষে পরিণত হয়েছেন। প্রিয় বেশ্যার মানভঞ্জনের জন্য তিনি এরপর ভরা রাজসভায় এসে প্রৌড় রাজবৈদ্য, মন্ত্রী সুষেনের প্রতি নির্দেশ দিলেন, মুক্তবেণী যখন আগামী কয়েকদিনের মধ্যে রজঃস্বলা হবে তখন তার রক্তাক্ত অন্তর্বাস মস্তক বন্ধনী হিসাবে ধারণ করতে হবে প্রধান মন্ত্রীকে! মহারাজ ললিতাপীড়ের এই নির্দেশে হতবাক হয়ে গেছিল রাজসভা ও রাজ্যবাসী। কিন্তু এ ঘটনার প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি কেউ। মহারাজের নির্দেশ শুনে মাথা নিচু করে রাজসভা ত্যাগ করেছিলেন রাজবৈদ্য সুষেন। তবে এ অপমানের হাত থেকে মুক্তি পেতে গৃহে ফিরে গিয়ে বিষপান করে আত্মহত্যা করেন তিনি।

মাড়ব রাজ্য থেকে সুষেন তাঁর পরিবারকে সঙ্গে করে আনেননি। মন্ত্রী সুষেনের দেহ সৎকারের জন্য অর্থ ব্যয় করতেও রাজি ছিলেন না মহারাজ। পাছে মহারাজের কোপ দৃষ্টি বর্ষিত হয় সে ভয়ে রাজসভার অন্য কেউও তাঁর দাহকার্যে এগিয়ে আসেননি। ডোমের দল মৃতদেহের মুখে একটুকরো জ্বলন্ত অঙ্গার গুঁজে দিয়ে এক পর্বত কন্দরে মৃতদেহ নিক্ষেপ করে মন্ত্রী সুষেনের অন্তিম সংস্কার করে। শুধু প্রিয় বেশ্যার মানভঞ্জনই নয়, মহারাজ ললিতাপীড় তাঁর ওই নির্দেশের মাধ্যমে হয়তো রাজ্যসভা ও নগরবাসীকে এ কথাও বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলেন যে তাঁর বেশ্যাপ্রীতি, বেশ্য সংসর্গে কেউ ব্যাঘাত সৃষ্টি করলে তার পরিণতিও মন্ত্রী সুষেনের মতো হতে পারে।

নারী মাংসলোভী, নৃশংস, প্রজাপীড়ক নৃপতি ললিতাপীড়-বজ্রদিত্য। ফুলের দেশ এই কাশ্মীর উপত্যকা। কিন্তু পুষ্পর সৌন্দর্যের মধ্যে যেমন অনেক সময় প্রাণঘাতী বক্রকীট অবস্থান করে, ঠিক তেমনই এই পুষ্পমণ্ডিত দেশে বজ্রকীটের মতো মহারাজ বজ্রদিত্য, ললিতাপীড়।

পুষ্পপথ থেকে মৃগনাভি আহরণ ও সেই কন্যাকে উদ্ধারের পরদিন যখন কয়েকটি কাজ সমাধা করে উচ্ছল যখন রাজসভাতে প্রবেশ করল, তখন মহারাজের সভাতে প্রবেশ করার সময় হয়ে এসেছে। বিশাল এই সভাকক্ষ অতি প্রাচীন। কাষ্ঠনির্মিত গালিচা বিছানো মেঝে, কক্ষের দেওয়াল, স্তম্ভ সব কিছুই কারুকার্যমণ্ডিত, সূক্ষ্ম কাঠের নকশা করা। তার ওপর আবার গালার প্রলেপ দেওয়া।

সভা গৃহের শেষ প্রান্তে কাষ্ঠ ও রৌপ্য নির্মিত বেদির ওপর সর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত কাশ্মীররাজের স্বর্ণ সিংহাসন। আর তার মাথার ওপর সোনার সুতোয় বোনা চন্দ্রাতপ। কক্ষের মাথার ওপরের ছাদও কাষ্ঠ নির্মিত ও একই রকম কারুকাজমণ্ডিত। ছাদ থেকে ঝুলছে লৌহ রজ্জুবদ্ধ তামার তৈরি কাঁকড়ি বা পাত্র। কাঠ কয়লার গনগনে আঁচ জ্বলছে তাতে। একই সঙ্গে ওই অঙ্গারপূর্ণ পাত্রগুলো কক্ষের উত্তাপ বজায় রাখছে ও রাজসভাতে আলোর ব্যবস্থা করছে।

রাজসভাতে বেশ কিছু বিশালাকৃতির তমোরি বা গবাক্ষ আছে। তবে বর্তমানে তা আর রাজনির্দেশে উন্মুক্ত হয় না। অন্ধকারপ্রেমী মহারাজের নাকি সূর্যালোকে চোখে জ্বালা ধরে, সিংহাসন বেদির ঠিক নীচেই এক বৃত্তাকার স্থান। আর তাকে ঘিরে মন্ত্রী, সেনাপতি, সভাসদ, পার্ষদদের বসার জন্য দারুকাঠ নির্মিত সার সার আসন বসেছে। সেই আসন শ্রেণীর প্রথম স্তবকে সম্রাটের সামনের ডান পাশের তিনটি আসন, মহামন্ত্রী, কম্পনধিপতি ও তোষাধ্যক্ষ মন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত। আর তাঁদের কিছুটা তফাতে বামদিকের তিনটি আসন যা ভূতপূর্ব মহারাজদের আমলে রাজবৈদ্য-সহ প্রধান মন্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত ছিল তা বর্তমান মহারাজের নির্দেশে তাঁর প্রিয় তিন বেশ্যারমণীর জন্য নির্ধারিত। বর্তমানে ডানপাশ অপেক্ষা বামপাশের ওই তিনটি আসনই রাজসভার ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। মহারাজের সিংহাসনের সামনে প্রথম স্তবকে ওই ছয়টি আসনের পিছনের আসনগুলোতে বসেন অন্য সভাসদরা।

উচ্ছল যখন সভাকক্ষে প্রবেশ করল তখন মহারাজের আগমনের প্রত্যাশায় সেসব আসন প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পার্ষদ উচ্ছল সভাকক্ষে প্রবেশ করে তৃতীয় স্তবকে তার জন্য নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করল। অস্বাভাবিক রকম নিস্তব্ধ সভাকক্ষ। আনন্দ, প্রাণস্পন্দন বহুকাল হল বিদায় নিয়েছে কাশ্মীর রাজের সভা থেকে। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় বাক্যালাপ করলেও তা করছে অত্যন্ত চাপাস্বরে। কারো কারো চোখে-মুখে জেগে আছে স্পষ্ট উৎকণ্ঠার ভাব! মহারাজ আজ সভায় পদার্পণ করে কার প্রতি কী নির্দেশ প্রদান করেন কে জানে? এমনই উৎকণ্ঠা নিয়ে তার সভাসদরা রাজসভায় আসেন ও ফিরে যান। তাদের কারো মুখমণ্ডলে সে উৎকণ্ঠা ধরা পড়ে, কারো বা পড়ে না। কিন্তু নিজেদের ভাগ্য নিয়ে সংশয় থাকেন সবাই।

আসনে বসার পর উচ্ছল যেমন ভাবতে লাগল মহারাজ এবার তাকে আরও কোনো অপ্রীতিকর কার্য সম্পাদনের নির্দেশ দেবেন কিনা সে ব্যাপারে।

কিছু সময়ের মধ্যেই ঝাঁঝর ও চর্ম নির্মিত বাদ্য যন্ত্রের শব্দে তার আগমন বার্তা ধ্বনিত হল। মহারাজের সিংহাসন বেদির একপাশে মখমলের পর্দা আচ্ছাদিত যে দ্বার আছে তা উন্মুক্ত করা হল। তাঁকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য নিজেদের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন সভার উপস্থিত ব্যক্তিরা।

প্রথমে সভায় প্রবেশ করল উন্মুক্ত তলোয়ারধারী একদল সৈন্য। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তারা সভার চারপাশ নিরীক্ষণ করার পর ছড়িয়ে পড়ল সভাকক্ষের নানান প্রান্তে। এরপর সভায় প্রবেশ করল একদল সুবেশী ভৃত্য। তাদের কারো হাতে মদিরা পাত্র, তাম্বুল পাত্র, খাদ্যদ্রব্যের পাত্র অথবা চামর। তারাও বেদি ও বেদির সন্নিকটে তাদের জন্য নির্ধারিত স্থানে দণ্ডায়মান হল। অতঃপর রাজসভায় কয়েকজন অঙ্গরক্ষক পরিবৃত হয়ে প্রবেশ করলেন মহারাজ ললিতাপীড়। এবং তাঁর পশ্চাতবর্তী আরও চারজন—মহারাজের তিন প্রিয় বেশ্যা বিটপী, মুক্তবেণী, রতিমালা ও ভাঁড় কূপমণ্ডূক।

বেশ্যা দলের পরনে মখমলের আলখাল্লা থাকলেও তার সম্মুখ ভাগ প্রায় উন্মুক্তই বলা চলে। স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত বেশ্যাত্রয়ীর বক্ষ বিভাজিকা, নাভি, উরু সবই প্রকটভাবে দৃশ্যমান। লজ্জাহীনা তারা। মহারাজ ললিতাপীড় বেদিতে উঠে সিংহাসনে বসার আগে কয়েক মুহূর্তের জন্য তাঁর সভাসদদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়ালেন। ভাঁড় কূপমণ্ডূক জয়ধ্বনি করে উঠল; জয় মহারাজ বাপ্পায়িক, বজ্রদিত্য ললিতাপীড়ের জয়!’

সভার সবাই বলে উঠল, ‘জয়, প্রজাপালক কাশ্মীর মহারাজের জয়!’

সম্মিলিত এই জয়ধ্বনিতে সব থেকে তীব্র কণ্ঠস্বর শোনা গেল সেই তিন বেশ্যার। তিনবার তাঁর নামে জয়ধ্বনি সমাপ্ত হলে সিংহাসনে বসলেন মহারাজ ললিতাপীড়। আর তাঁর অনুগত তিন বেশ্যাও তাদের নিজেদের আসনে গিয়ে বসল। দামি চামর দোলাতে শুরু করল মহারাজের গায়ে।

মহারাজ ললিতাপীড়ের চোখ ঈষৎ রক্তাভ। রাত্রি জাগরণের চিহ্ন সে-চোখে স্পষ্ট। তার কোটরাগত চোখ, ঝুলে পড়া ওষ্ঠাধার প্রবল মদ্যপান ও তাঁর লাম্পট্যময় জীবনের স্পষ্ট চিহ্ন বহন করছে। তাঁর বয়ক্রম এখনও পঞ্চাশ অতিক্রম করেনি। কিন্তু এরই মধ্যে তার হনুর হাড় যেন ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, বাহুর শিরা-উপশিরাগুলো চামড়ার বাইরে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। অনিয়ন্ত্রিত কামোন্মাদ জীবন যাত্রার জন্য যেন অকাল জরা ইতিমধ্যেই গ্রাস করতে শুরু করেছে মহারাজকে। তবু তাঁর জীবনযাত্রার কোনো পরিবর্তন নেই। তাঁর কোটরাগত চোখগুলোতে জেগে আছে তীব্র ভোগেচ্ছা।

সভাস্থলের একস্থান নির্ধারিত আছে মহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা প্রজাদের জন্য। সে স্থানের দিকে একবার তাকালেন তিনি। সে স্থান শূন্য। এক সময় নগরবাসীরা তাদের বিভিন্ন অভাব অভিযোগ বা সাহায্য প্রার্থনায় এ রাজসভায় আসতেন ঠিকই, কিন্তু এখন আর কেউ আসে না। কারণ, তাতে হিতে-বিপরীত হবার সম্ভবনা প্রবল। তাই সে স্থান আজ শূন্য।

সেই শূন্য স্থানের দিকে চেয়ে মনে মনে যেন খুশিই হলেন নৃপতি। মনোরঞ্জনের কাজ ব্যতীত ওইসব অভাব-অভিযোগ শোনার কাজ আজকাল আর তার ভালো লাগে না। সেদিকে দৃষ্টিপাত করার পর তিনি তাঁর সামনে বসা সভাসদদের মুখমণ্ডলের দিকে তাকাতে শুরু করলেন। মহারাজ ললিতাপীড়ের দৃষ্টি এসে স্থির হয়ে গেল যুবক উচ্ছলের মুখের ওপর। চোখের ইশারায় কাশ্মীররাজ তাঁর নির্দেশ প্রতিপালিত হয়েছে কিনা তা জানতে চাইলেন। যুবক উচ্ছল তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে মহারাজের উদ্দেশে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, ‘মহারাজের নির্দেশ পালিত হয়েছে। আপনার নির্দেশ মতো পুষ্পপথ থেকে কস্তুরী সংগ্রহ করে আনা হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে আমি তা আপনার অঙ্গরাগের দায়িত্বে থাকা প্রধান ভৃত্যের কাছে সমর্পণ করেছি।’

কথাটা শুনে মহারাজ ললিতাপীড় প্রশ্ন করলেন, ‘সে কস্তুরীর সুবাস কেমন?’

উচ্ছল জবাব দিল, উপত্যকার যে-কোনো পুষ্প বা সুগন্ধীর চেয়ে উত্তম তার সুবাস। চন্দন কাষ্ঠের ঘ্রাণও অতিম্লান কস্তুরীর কাছে।’

এবার তাঁর কথা শুনে ভাঁড় কূপমণ্ডূক তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কস্তুরীর সুগন্ধ যতই হোক না কেন তা মহারাজের ঘর্মের সুগন্ধের থেকে অধিক হতে পারে না।’ এ সব কথা বলে সব সময় সম্রাটের মনোরঞ্জন করাই কূপমণ্ডূকের কাজ। নিজের কর্তব্য পালন করল সে, তার কথা শুনে খিলখিল করে হেসে তাকে সমর্থন জানাল তিন বেশ্যা। মহারাজ ললিতাপীড়ও যেন খুশি হলেন ভাঁড়ের তোষামদী শুনে। এরপর তিনি মহামন্ত্রী যশঙ্করের দিকে দৃষ্টি নিয়োগ করে বললেন, ‘পার্ষদ ডমরু কি ললিতাপুর থেকে ফিরে এসেছে?’

ললিতাপুর স্থানটি বিতস্তা নদীর নিম্নভাগে অবস্থিত। সম্রাট আলেকজান্ডারের আক্রমণের পরে তাঁর কিছু সেনাপতি অনুচররা এদেশেই রয়ে গেছিল। তাদেরই একদল বংশধরকে উপত্যকার পাদদেশে থাকার অনুমতি দিয়েছেন কাশ্মীররাজ ললিতাপীড়। সেই বিধর্মী ম্লেচ্ছ জাতির সঙ্গে এক চুক্তি স্থাপন করেছেন মহারাজা। সেই চুক্তি অনুসারে মহারাজের রাজত্বে থাকার জন্য তাদের কোনো অর্থ দিতে হবে না। তবে প্রতি বসন্তে মহারাজের মনোরঞ্জনের জন্য তিনজন ম্লেচ্ছ যুবতীকে পাঠাতে হবে শ্রীনগরে।

স্বর্ণাভ কেশ যুক্ত ওই সব ম্লেচ্ছ নারীদের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করেন কামুক নৃপতি ললিতাপীড়। মহারাজের প্রশ্ন শুনে বৃদ্ধ মহামন্ত্রী যশঙ্কর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হ্যাঁ, তিনি ফিরে এসেছেন। পার্ষদ ডমরু, অপনি এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য মহারাজকে নিবেদন করুন। ছোটখাটো চেহারার পার্ষদ ডমরু রাজসভার পিছনের সারিতে বসেছিলেন। মহারাজ তাই তাঁকে খেয়াল করে উঠতে পারেননি। তিনি এবার উঠে দাঁড়িয়ে মহারাজের প্রতি মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানিয়ে বললেন, ‘আমি সে স্থানে গিয়ে আর্থিক দলপতি মার্কাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। সে আমাকে জানিয়েছে, মহারাজের সেবার জন্য তিনজন অষ্টাদশী কন্যাকে উপযুক্তভাবে শিক্ষাদানের কাজ শুরু হয়ে গেছে। বসন্তের মধ্যবর্তী সময় প্রতিবারের মতো এবারও তারা সেই তিন নারীকে মহারাজের সেবায় প্রেরণ করবে। মহারাজ এ ব্যাপারে সংশয় মুক্ত থাকতে পারেন।’

বসন্ত বা এই শীতের রাজ্যের গ্রীষ্মের মধ্যবর্তী সময় মানে আরও প্রায় তিনমাস। মহারাজ ললিতাপীড় যেন একবার বিড় বিড় করে বললেন ‘বসন্তের মধ্যবর্তী সময়!’ যেন আর তাঁর তর সইছে না শেতাঙ্গনারী সম্ভোগের জন্য!

সভায় মহারাজের রাজকার্য বলতে এটুকুই ছিল, বিলাসব্যসন ও তাঁর সম্ভোগের উপকরণ সম্পর্কে খবর নেওয়া। আর কোনো কাজ তাঁর নেই। এরপর কাশ্মীররাজ বললেন, ‘মন্ত্রিক কোথায়? তাকে ডাকো। অনেক দিন সাপের নাচ দেখিনি আমি।’ তাঁর কথা শুনে বেশ্যাদল উৎফুল্লভাবে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, মন্ত্রিককে ডাকো, মহারাজ সাপের নাচন দেখবেন।’

মহারাজ ললিতাপীড় এরপর মাথা থেকে তাঁর রাজমুকুটটা খুলে পাশে দাঁড়ানো ভৃত্যের হাতে ধরা মখমলের আসনের ওপর রাখলেন। তাঁর কেশগুলো এলিয়ে পড়ল কাঁধে। এর ইঙ্গিতটা ধরতে পারল বেশ্যার দল। মহারাজ ললিতাপীড় এবার আরাম করতে করতে সাপের খেলা দেখতে চান। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তিন বেশ্যা নিজেদের আসন ছেড়ে বেদির ওপর উঠে মহারাজের সিংহাসন ঘিরে দাঁড়াল। পানপাত্র যার সোমরস নিয়ে প্রস্তুতই ছিল দাসীদের দল। রতিমালা তাদের হাত থেকে স্ফটিকের পানপাত্র নিল। আর মুক্তবেণী সেই পানপাত্রে স্বর্ণাভ মদিরা ঢেলে তা তুলে দিল মহারাজের হাতে। তৃতীয় বেশ্যা বিটপী প্রকাশ্য রাজসভাতেই মর্দন করতে শুরু করল মহারাজের বৃষস্কন্ধ। বেশ্যা পরিবৃত মহারাজ তাঁর পানপাত্রে চুমুক দিতে শুরু করলেন।

রাজসভা যখন চলে তখন বাজিকর, নর্তকী বা মন্ত্রিকের মতো লোকেরা সভাগৃহের বাইরেই উপস্থিত থাকে মহারাজের মনোরঞ্জনের জন্য।

মহারাজের ডাক পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সভায় প্রবেশ করল মন্ত্রিক বা সাপুড়ে। লোকটা বৃদ্ধ, এক মুখ সাদা দাড়ি, মাথায় কালো পাগড়ি আর একই রঙের নোংরা আলখাল্লা। নানান রঙের একরাশ পাথরের মালা আর তাবিজ, কবজ ঝুলছে তার গলা আর বাহু থেকে। লোকটা এক হাতে বেশ কয়েকটা ঘাসে বোনা সাপের ঝাঁপি আগলে রেখেছে বুকের কাছে। আর লোকটার অন্য হাতে ধরা আছে পেট ফোলা বিন বা সাপ নাচাবার বাঁশি।

সাপ সাধারণত এই শীতের দেশে বড় একটা পাওয়া যায় না। বিশেষত বড় বিষধর সাপ। লোকটা সাপ সংগ্রহ করে আনে নীচের জঙ্গল থেকে। সাপুড়ের নাম নকুল। এ লোককে উচ্ছল বিশেষ ভাবে চেনে। কারণ, লোকটা দল হ্রদেই এক নৌকা বাটিকার বাসিন্দা। এক অর্থে তাকে উচ্ছলের প্রতিবেশীও বলা যায়। মাঝে মাঝেই এই বৃদ্ধ মন্ত্রিকের সঙ্গে দেখা হয় উচ্ছলের।

বেদির ঠিক নীচে যে ফাঁকা জায়গা আছে, সে জায়গায় উপস্থিত হয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে মহারাজকে প্রথমে প্রণাম জানাল মন্ত্রিক। তারপর উবু হয়ে বসে তার ঝাঁপি আর বিনটা মেঝেতে নামাল। সবাই তাকিয়ে তার দিকে।

প্রথমে একটা ঝাঁপি খুলল মন্ত্রিক। আর সেটা খুলতেই তার ভিতর থেকে মাথা তুলে দাঁড়াল দুটো সাপ। গোখরো নাগ। বিশাল তাদের ফণা, তাতে খড়ম আঁকা। এ সাপের ছোবল মানেই সাক্ষাৎ মৃত্যু। বাতাসে কয়েকবার তারা তাদের চেরা জিভ ছুড়ে দিল। সাপুড়ে নকুল এরপর তার বিনটা মাটি থেকে তুলে নিতে যাচ্ছিল তার খেলা শুরু করার জন্য। ঠিক এই সময় মহারাজ ললিতাপীড় বলে উঠলেন, ‘নর্তকী আনো?’

কথাটা শুনেই চমকে উঠল উচ্ছল-সহ রাজসভার অনেকেই। মহারাজ ললিতাপীড় বিষধর সাপের সঙ্গে নর্তকীর নাচ দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন! ইতিপূর্বে মহারাজের ইচ্ছায় বেশ কয়েকবার এ ধরনের সর্প নাচ প্রদর্শিত হয়েছে রাজসভাতে। এবং সে অভিজ্ঞতা ভালো নয় অনেকেরই কাছে।

মহারাজের দ্বিতীয় ইচ্ছাও অনতিবিলম্বে পালিত হল। দুজন সৈনিক একজন স্কন্দবসনা যুবতী নর্তকীকে নিয়ে হাজির করল মহারাজের সামনে।

নাচ দেখিয়ে মহারাজের কৃপালাভের আশায় বেশ উৎফুল্লভাবেই রাজসভাতে প্রবেশ করেছিল সেই নর্তকী। অন্তত তার মুখমণ্ডলে জেগে থাকা হাসি, অঙ্গ সঞ্চালন সে কথাই বলছিল। কিন্তু মহারাজকে প্রণাম জানাবার পর মন্ত্রিক নকুল আর তার সাপের ঝাঁপির ওপর দৃষ্টিপাত করতেই নর্তকীর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। ব্যাপারটা অনুমান করে থর থর করে কেঁপে উঠল নর্তকীর শরীর। নকুল তার বিনটা তুলে নিল। রতিমালা নর্তকীকে বলল, ‘নাচ শুরু হোক। মহারাজ খুশি হলে তোকে একশো স্বর্ণ মুদ্রা দান করা হবে।’

এ কথার সঙ্গে সঙ্গে বিন বাজাতে শুরু করল মন্ত্রিক। কিন্তু তবুও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল আতঙ্কিত নর্তকী। তা দেখে অপর বেশ্যা মুক্তবেণী ধমকে উঠে নর্তকীকে বলল, ‘তোর এত ধৃষ্টতা যে মহারাজের ইচ্ছা পূরণে বিলম্ব ঘটাচ্ছিস। আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করলে তোকে ভয়ঙ্কর শাস্তি পেতে হবে। শুরু কর—।’

মহারাজ ললিতাপীড়ের শাস্তি যে সর্পদংশনে মৃত্যুর থেকেও ভয়ঙ্কর হতে পারে তা মনে হয় অনুমান করতে পারল নর্তকী। ভাগ্য সহায় হলে সে সর্পদংশনের থেকে মুক্তি পেতে পারে, কিন্তু ললিতাপীড় কুপিত হলে তাঁর হাত থেকে পরিত্রানের পথ নেই। এ সত্য অনুধাবন করে এরপর ধীরে ধীরে বাঁশির তালে নাচতে শুরু করল সেই যুবতী। মাথা দোলাতে লাগল সাপ দুটোও। আর এরপর এক এক করে সাপ দুটোকে ঝাঁপির বাইরে বার করে যুবতীর দিকে মেঝেতে ছুঁড়ে দিল মন্ত্রিক। তা দেখে নৃত্যরত অবস্থাতেই কিছুটা সরে এল নর্তকী। তবে তার নাচ থামল না। মন্ত্রিক নকুল আরও দ্রুত লয়ে বাজাতে শুরু করল তার বাঁশি। সে শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নর্তকীর নাচের গতিও বৃদ্ধি পেল।

মদিরার পাত্রে চুমুক দিতে দিতে সাপের সঙ্গে মানবীর নাচ দেখতে লাগলেন মহারাজ ললিতাপীড়। রাজসভার অন্য সবার দৃষ্টিও সেই নৃত্যের দিকেই নিবদ্ধ। আবারও একটা ঝাঁপি খুলল মন্ত্রিক নকুল। সে ঝাঁপি থেকে মাথা তুলল আবারও দুটো ফণা তোলা সাপ। গাল ফুলিয়ে এক হাতে বাশি ধরে বাজাতে বাজাতেই মন্ত্রিক এক এক করে সাপ দুটোকে ছুড়ে দিল নর্তকীর পায়ের দিকে। আগের দুটো সাপ যেখানে ফণা তুলে নাচছে তার ঠিক বিপরীত দিকে।

দুপাশে দুজোড়া ফণা তোলা সাপের মধ্যে বন্দি হয়ে গেল সেই যুবতী। তবু এবারও সে নৃত্য থামাল না। সবাই বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে রইল সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যর দিকে। শুধু আমোদ ফুটে উঠতে লাগল মহারাজ ললিতাপীড় আর সেই তিন বেশ্যার মুখে। যেন কোনো মজার খেলা দেখছে তারা। সর্পকূলের মধ্যে নেচে চলতে লাগল নর্তকী। সাপগুলোও মাথা দোলাচ্ছে, কখনও বা তাদের চেরা জিভ বার করছে মুখের বাইরে। নর্তকীর হাঁটু সমান তাদের ফণার উচ্চতা। নর্তকী নাচতে নাচতে কখনও কখনও সাপগুলোর কাছে এসে পড়ছে ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই আবার নিজেকে সামলে নিয়ে তাদের উদ্যত ফণা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে।

চলতে থাকল বিনের শব্দ আর নাচ। অনেকেই মনে মনে কামনা করতে লাগল এই ভয়ঙ্কর নৃত যেন সুষ্ঠু ভাবে শেষ হয়। একই কামনা করতে লাগল উচ্ছলও। একের পর এক পান পাত্র শেষ করে চলেছেন ললিতাপীড়। কোটোরগত চোখ দুটো আরও রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে, আর তাতে ফুটে উঠতে শুরু করেছে হিংস্রতা। বেশ্যা বিটপী এরপর নকুলের উদ্দেশে বলল, ‘ঝাঁপি খোল।’

মন্ত্রিক নকুল তা শুনে এবার তার শেষ ঝাঁপিটা খুলল। আর তার ভিতর থেকেও মাথা তুলল দুটো হিলহিলে সরু লম্বা সাপ। কুচকুচে কালো রঙ তাদের শরীরে। দুটো কালনাগিনী! কী হিংস্র, ক্রুর তাদেরকে দেখতে! বাঁশির শব্দ ছাপিয়ে যেন শোনা যেতে লাগল তাদের ক্রুদ্ধ ফোঁস ফোঁস শব্দ! সাপ দুটোকে দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠল বেশ্যাত্রয়ী। মহারাজ লতিতাপীড় নিজের জানুতে চাপড় মেরে নিজের হিংস্র উৎফুল্লতা প্রকাশ করলেন।

বিটপী ইশারা করল মন্ত্রিককে। তা দেখে মন্ত্রিক আগের মতোই এক এক করে কালনাগিনী দুটোকে ছুড়ে ছিল নর্তকীর দিকে। তবে এবার তফাতে নয়, একদম তার পায়ের সামনে। তারপর সে আরও উচ্চস্বরে তার বিন বাজাতে লাগল।

সর্প পরিবেষ্টিত নর্তকীর কোথাও পালাবার উপায় নেই, থামারও উপায় নেই। সাপগুলোর থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নাচার চেষ্টা করতে লাগল সে। কিন্তু হঠাৎ যেন একটা কালনাগিনী ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল নর্তকীর দিকে। ব্যাপারটা হয়তো বা সেই হতভাগ্য রমণী খেয়াল করেনি। অথবা খেয়াল করলেও হয়তো বা তার সরে আসার উপায় ছিল না। তার পায়ের চারপাশেই তো সাপ! আর এর পরই হঠাৎ সে পা দিয়ে ফেলল সেই কালনাগিনীর লেজে। আর এর পরমুহূর্তেই সেই কালনাগিনী ফনা তুলে লাফিয়ে উঠে বিদ্যুৎগতিতে ছোবল বসিয়ে দিল নর্তকীর উন্মুক্ত উরুতে! আর্তনাদ করে উঠল সেই রমণী! তা দেখে খিল খিল করে হেসে উঠল কুটিল বেশ্যার দল। যুবক উচ্ছল অবশ্য এরপর যেই বীভৎস দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। চোখ ফিরিয়ে মাথা নিচু করল সে।

শুধু উচ্ছল নয়, আরও অনেকেই চোখ সরিয়ে নিল সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করবে না বলে। এমনকী ভাঁড় কূপমণ্ডূকও! সাপের দংশনে আর্ত চিৎকার করে ছিটকে পড়ল সেই নর্তকী। কিছুক্ষণের জন্য মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করল সেই নারী। তারপর কাশ্মীর রাজ ললিতাপীড়ের শাসন থেকে মুক্তিলাভ করল সে।

আমোদ শেষ হল। রাজসভা ভেঙে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন মহারাজ। তারপর তিনি যে পথে রাজসভাতে প্রবেশ করেছিলেন, সে পথেই রক্ষী আর বেশ্যা পরিবৃত হয়ে রাজসভা ত্যাগ করলেন।

মহারাজ সভাকক্ষ ত্যাগ করার পর তাঁর পার্ষদরাও নিস্তব্ধ ভাবে সভা ত্যাগ করতে লাগলেন। সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যর অভিঘাত কাটিয়ে ওঠার জন্য আরও কিছুক্ষণ নিশ্চুপ ভাবে নিজের আসনে বসে রইল উচ্ছল। তারপর সে যখন আসন ছেড়ে কক্ষ ত্যাগের জন্য উদ্যত হল, তখন প্রায় সবাই কক্ষ ত্যাগ করেছে। মন্ত্রিক তার সাপগুলোকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। নর্তকীর দেহটা শুধু এখনও মহারাজের সিংহাসন বেদির নীচে পড়ে আছে ডোমেদের তুলে নিয়ে যাবার অপেক্ষায়।

যুবক উচ্ছল নিজের আসন থেকে উঠে দ্বারের দিকে এগোতেই মুখোমুখি হয়ে গেল বৃদ্ধ মহামন্ত্রী যশঙ্করের। যুবকের উদ্দেশে তিনি বলে উঠলেন, ‘এ দৃশ্য যে আপনার ভালো লাগেনি তা আপনার মুখমণ্ডল দেখেই বুঝতে পেরেছি। আমি খেয়াল করেছি যে ওই কালনাগিনী নর্তকীকে দংশন করার পরমুহূর্তেই সে দৃশ্য থেকে চোখ সরিয়ে নিয়েছিলেন আপনি।’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনার কেমন লাগল?’

মহামন্ত্রী যশঙ্কর বললেন, ‘আমার অনুভূতিও আপনারই মতো। সহ্য করতে হয় তাই করলাম।’ বিষণ্ণতা ফুটে উঠল মহামন্ত্রীর কণ্ঠস্বরে। তা স্পষ্ট অনুধাবন করল উচ্ছল। সে এরপর মহামন্ত্রীর উদ্দেশে বলে উঠল, ‘এমন নৃশংশ ঘটনা তো ঘটেই চলেছে! এ সব দৃশ্য থেকে কি মুক্তি নেই? কাল মহারাজের নির্দেশে হরিণগুলোকে হত্যা করার জন্য আমার মন এমনিই ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। তার ওপর আজ আবার এই দৃশ্য! এর কি কোনো প্রতিবিধান নেই?’

বৃদ্ধ মহামন্ত্রী কয়েকমুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে উচ্ছলের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করল, সত্যি আপনিও মুক্তি চান এই দুর্বিপাক থেকে?’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, এ সব দৃশ্য আর সহ্য করা যায় না।’

তার কথা শুনে মহামন্ত্রী যশঙ্কর আবারও কয়েক মুহূর্ত তার দিকে চেয়ে থাকার পর চাপাস্বরে বললেন, ‘আপনি যদি সত্যি তা চান, তবে আগামী কৃষ্ণপক্ষের রাত্রি প্রথম যামে চন্দ্রপর্বতের গুহা মুখের সামনে উপস্থিত হবেন। অর্থাৎ আর সাত দিবস পরে। আপনাকে বিশ্বাস করে আহ্বান জানালাম। সেখানে সে রাত্রিতে আপনি উপস্থিত হন বা না হন, একথা সবার থেকে গোপন রাখবেন। নচেৎ মহারাজের কানে গেলে আমার মৃত্যুদণ্ড হবে।’ এ কথা বলে মহামন্ত্রী যশঙ্কর আর দাঁড়ালেন না। দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করলেন তিনি। আর উচ্ছলও সেই অভিশপ্ত কক্ষ ত্যাগ করে ফেরার পথ ধরল।

দল হ্রদ, যার প্রাচীন নাম মহাসরিৎ হ্রদ। শ্রীনগরের ভাসমান জনবসতি। চুঁটফল প্রণালীর মাধ্যমে এই হ্রদ মহারাজ ললিতাপীড়ের প্রাসাদের সঙ্গে যুক্ত। গ্রীষ্মকালে স্বীয় ইচ্ছানুসারে মহারাজ তরণী সহযোগে এ পথেই দল হ্রদে প্রমোদ বিহারে আসেন। দল হ্রদ দৈর্ঘ্যে তিন ক্রোশ আর প্রস্থে দেড় ক্রোশ। উত্তর-পশ্চিম দিকের পর্বত মালা থেকে হিমবাহ সৃষ্ট জলধারা নেমে এসে পুষ্ট করেছে তপোবন-উপবন বেষ্টিত এই হ্রদকে। কাকচক্ষু এই হ্রদের গভীরতা স্থান বিশেষে ছয় হাত থেকে দশ হাত গভীর।

প্রচুর মৎসের বাসস্থান দল হ্রদ। তবে হ্রদের জলে কোনো হিংস্র জলজন্তু নেই। শীতকালে যখন হ্রদের জল প্রবল ঠান্ডায় জমে বরফে পরিণত হয়, তখনও হ্রদের মৎস্যকুল আশ্চর্য কৌশলে তার তলে জীবন ধারণ করে। শীতের অবসানে বসন্ত বা গ্রীষ্মে যখন বরফ গলে গিয়ে আবার হ্রদ তার নিজস্ব রূপ ধারণ করে, তখন জলতল থেকে গর্বিত ভঙ্গিতে সূর্যালোকের দিকে মাথা তুলে দাঁড়ায় পদ্মপাতা।

হ্রদবাসীরা অনেকে ওই পদ্মপাতাকে খাদ্যপাত্র হিসাবেও ব্যবহার করে। বহু জলজ লতা-গুল্মও জন্মায় হ্রদে। তাদের মধ্যে এক ধরনের জলজ উদ্ভিদ ত্রিভুজ আকৃতির, প্রান্তসীমা কণ্টক বিশিষ্ট একধরনের শাঁসালো ফল ধারণ করে। তার স্বাদ অতি সুমিষ্ট।

এ হ্রদের অন্য একটা বৈশিষ্ট্য আছে যা অন্য কোনো হ্রদে দেখা যায় না। তা হল ভাসমান ক্ষেত্র। ক্ষেত্রগুলো কোনো কোনোটা দৈর্ঘ্যে দুইশত হস্ত, প্রস্থে অনধিক একশত হস্ত। হ্রদের বাসিন্দাদের কেউ কেউ ওই সব ভাসমান ক্ষেত্রগুলোতে চাষাবাদও করে থাকে।

অজস্র ভাসমান গৃহ বা ডুঙ্গা বর্তমান দল হ্রদের জলে। ক্ষেত্র বিশেষে এরা সত্তর হস্ত পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। বহু সংখ্যক লোক একসঙ্গে হৃদয় আকৃতি বিশিট চাপ্পা বা দাঁড় চালিয়ে হ্রদের এক অংশ থেকে অন্য অংশে এই সব ভাসমান গৃহকে নিয়ে যেতে পারে। হ্রদের জলে কোনো স্রোত না থাকায় এই ভাসমান গৃহগুলো সাধারণত একই
স্থানে অবস্থান করে। আর আছে ছিপ নৌকার মতো দেখতে সরু-লম্বা আকৃতির নৌকা-শিকারা। দৈর্ঘ্যে তারা পঁচিশ হস্ত, প্রস্থে দুই হস্ত। তবে এই সব জলযানের মধ্যবর্তী স্থানে মাথায় হোগলা পাতার ছাউনি দেওয়া থাকে। দল হ্রদের জলে মৎস্যের সংখ্যা নাকি শিকারার সংখ্যা অধিক তা বলা কঠিন।

বৃহৎ নৌকাগৃহ থেকে অপর গৃহে যাওয়া-আসা, ভূ-ভাগের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, হ্রদ বসতিতে ঘুরে ঘুরে নানান সামগ্রী বিক্রয় করা, নানান প্রকার প্রমোদদান ইত্যাদি বহুবিধ কাজে নিয়োজিত থাকে শিকারা নৌকা। শিকারা বিনা দল হ্রদের বাসিন্দাদের জীবন যাত্রা, অচল। বৃহৎ ভাসমান গৃহগুলোর নিজস্ব এক বা একাধিক শিকারা থাকে। উচ্ছলেরও একটি শিকারা আছে।

মহারাজ ললিতাপীড়ের পার্ষদ উচ্ছলের ভাসমান গৃহটি হ্রদের ঠিক কেন্দ্র স্থলে অবস্থান করে। আকৃতি বিশেষে আবার এই গৃহগুলোকে নানান নামে ডাকা হয়। যেমন পক্ষী, চকোয়ারি বা চতুষ্কোণ, বাগনী বা গাড়ি।

আকার অনুসারে উচ্ছলের বাসগৃহটি চকোয়ারি। তার ভাসমান গৃহটি দৈর্ঘ্যে চল্লিশ হাত লম্বা। তার মধ্যবর্তী স্থানে দারুকাষ্ঠ নির্মিত, গবাক্ষ সম্মিলিত বেশ কয়েকটি কক্ষ আছে। কক্ষের ছাদগুলিও কাষ্ঠনির্মিত। কক্ষগুলির দেওয়াল ছাদ সবই কারুকাজমণ্ডিত। কক্ষগুলির অভ্যন্তরে এক পাশে একটা করে বড় তামার পাত্র স্থাপন করা আছে। তাতে আঁচ জ্বালানো হয়। সেই পাত্র থেকে ধাতব প্রণালীর মাধ্যমে কক্ষের বাইরে ধূম নির্গমনের ব্যবস্থা আছে।

এই বাসস্থান উচ্ছলের পৈত্রিক সূত্রে লাভ করা। ঠিক যেমন মহারাজের রাজসভাতে পার্ষদের আসন। ললিতাপীড় সিংহাসন দখল করার কিছুদিনের মধ্যেই উচ্ছলের পিতা তাঁর দায়িত্ব ও এই জলগৃহ তার একমাত্র পুত্র যুবক উচ্ছলকে সমর্পণ করে উচ্ছলের মাতাকে নিয়ে শ্রীনগর ত্যাগ করে বৈষ্ণদেবীতে তাদের বার্ধক্যের শেষ ক’টাদিন অতিবাহিত করতে চলে গেছেন।

এ উপত্যকার পাদদেশে বৈষ্ণদেবী পর্বত। সেখানে মাতা বৈষ্ণদেবীর মন্দির আছে। দেবীর চরণতলে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলে নাকি স্বর্গলাভ হয়। তাই অনেকেই শেষ বয়সে উপত্যকা থেকে নেমে সে স্থানে গমন করেন। উচ্ছলের পিতা-মাতা আর শ্রীনগরে ফিরবেন না। এই পাঁচ বৎসরের মধ্যে তাঁদের কারোর বৈষ্ণদেবীর কৃপায় স্বর্গলাভ হয়েছে কিনা সে সংবাদও উচ্ছলের জানা নেই।

এই জলযানে একাই বাস করে যুবক উচ্ছল। আর তার পরিচারক, পরিচারিকা বলতে একমাত্র ওই বৃদ্ধা গুঞ্জা। সে-ও এই গৃহে বাস করে। উচ্ছলের জন্মের সময়কাল থেকেই সে এই গৃহে আছে এবং আজ অবধি উচ্ছলের দায়িত্ব বহন করে চলেছে।

রাজসভা সমাপ্ত হলে সেখান থেকে দল হ্রদস্থিত তার এই বাসগৃহে ফিরে আসতে দ্বিপ্রহর গড়িয়ে গিয়েছিল উচ্ছলের। তারপর কিছুটা অবসাদ আর ক্লান্তিতে শয়ন কক্ষে প্রবেশ করা মাত্রই ঘুম নেমে এসেছিল তার চোখে। উচ্ছলের যখন নিদ্রাভঙ্গ হল তখন বিকাল হয়ে গেছে। ঘুমভেঙে শয্যায় উঠে বসে উন্মুক্ত গবাক্ষ দিয়ে সে চেয়েছিল বাইরের দিকে। বসন্তের সূচনা হলেও দল এখনও সম্পূর্ণ বরফ মুক্ত হয়নি। স্থানে স্থানে রাজহংসীর মতো তখনও খণ্ড খণ্ড বরফের স্তর ভেসে আছে। হ্রদ সম্পূর্ণ বরফমুক্ত হতে শীতের পর মাসখানেক সময় লেগে যায়। উন্মুক্ত গবাক্ষ দিয়ে উচ্ছলের চোখে পড়ছিল আশেপাশের ভাসমান গৃহগুলো আর তাদের ঘিরে বেলা শেষে শিকারার আনাগোনা। বেশ খানিকটা দূরে মহারাজ ললিতাপীড়ের প্রমোদ প্রাসাদপক্ষীরও কিছু অংশ অন্য জলগৃহের মাথার ওপর দিয়ে চোখে পড়ছে উচ্ছলের। বিশালাকৃতির সেই ভাসমান প্রাসাদের মাথায় মহারাজের নিশান উড়ছে। বিকালের আলোতে সেই ভাসমান প্রাসাদের সোনালি রঙের প্রলেপ দেওয়া শীর্ষভাগ ঝলমল করছে।

এই ঐশ্বর্যমণ্ডিত হ্রদ উপত্যকার পরিবেশ বাইরে থেকে দেখতে কত উজ্জ্বল! অথচ তার মধ্যে লুকিয়ে আছে কী গাঢ় অন্ধকার! বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে কথাই মনে হল উচ্ছলের। আর এরপরই তার মহামন্ত্রীর কথা মনে পড়ল। যশঙ্কর তাকে চন্দ্র পর্বতে উপস্থিত হতে বললেন কেন? তাঁর কথা শুনে উচ্ছল এটুকু অনুমান করতে পেরেছে কোনো গোপন ব্যাপার সংগঠিত হবে বা হতে চলেছে সেখানে, কিন্তু কী তা?

নানান কথা ভাবছিল উচ্ছল। ঠিক এই সময় তার শয়ন কক্ষে প্রবেশ করল গুঞ্জা। তার হাতে কাঠকয়লার পাত্র। বসন্তের প্রারম্ভ হলেও শীত এখনও পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। সূর্য ডোবার পর শীতলতা অনুভূত হয়। তাম্র পাত্রে কাঠকয়লার আঁচ জ্বালানোর প্রয়োজন হয় এখনও। তারই ব্যবস্থা করতে এসেছে গুঞ্জা। তার পরনে সুতোর ফুলকারির লম্বা ঝুলের পোশাক। শুভ্র বর্ণের সেই পোশাকের সঙ্গে মাথার শুভ্র কেশ মিলে মিশে গেছে। তাকে হঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন পোশাকেরই উড়নি দিয়ে মস্তক আবৃত করে রেখেছে সে। বলিরেখাময় মুখমণ্ডল তার। বয়সের ভারে কিছুটা ন্যুব্জ হয়েও পড়েছে, ঝুঁকে হাঁটে।

গুঞ্জা কক্ষে প্রবেশ করতেই সেই মেয়েটির কথা মনে পড়ে গেল উচ্ছলের। গতকাল তাকে নিয়ে যখন এই ভাসমান গৃহে উচ্ছল ফিরে এসেছিল, তখন শেষ বিকেল। তাকে শিকারা থেকে ধরাধরি করে এ গৃহে তুলে এনে এক কক্ষে শোয়ানো হয়েছিল। তারপরই চোখ মেলেছিল সেই যুবতী। কিন্তু বাকশক্তি রহিত ছিল সে। তবে তার মৃত্যুযোগ যে এ যাত্রায় কেটে গেছে তা অনুমান করতে পেরেছিল সবাই।

উচ্ছল তাকে গুঞ্জার কাছেই সমর্পন করেছিল তার শুশ্রূষার জন্য। তারপর রাত্রি নেমেছিল।

এদিন সকালে গুঞ্জার মুখ থেকে উচ্ছল জানতে পেরেছিল ধীরে ধীরে সেই যুবতীর অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। সে নাকি উঠেও বসেছে। তবে তখন উচ্ছলের নগরীর অভ্যন্তরে যাত্রার ব্যস্ততা ছিল। তাই সে আর সে যুবতীকে চাক্ষুস করতে পারেনি। তারপর আজ রাজসভাতে যে ঘটনা ঘটল তা এই চকোয়ারি গৃহে ফিরে আসার পরও আচ্ছন্ন করে রেখেছিল উচ্ছলের মনকে। সে নারীর খবর নেওয়া তার আর হয়নি।

বৃদ্ধা গুঞ্জা তার হাতের কাঠকয়লা কাষ্ঠ পাত্র থেকে তাম্র পাত্রে ঢেলে দেবার পর উচ্ছল তাকে প্রশ্ন করল, ‘সে রমণী কেমন আছে এখন?’

বৃদ্ধা পরিচারিকা জবাব দিল, ‘সে আসার পর থেকে বারংবার আরক মিশ্রিত গরম তেল তার শরীরে মর্দন করাতে ফল মিলেছে। সে অনেকটাই সুস্থ এখন। দ্বিপ্রহরে করন্ড ভক্ষণও করেছে। কিছু বাক্যালাপও হয়েছে আমার সঙ্গে।’

গুঞ্জার কথা শুনে আগ্রহ ভরে উচ্ছল জানতে চাইল, ‘কী বাক্যালাপ?’

গুঞ্জা জবাব দিল, সে আমাকে জিগ্যেস করছিল, ‘এ কোন জায়গা? এ কোন দেশ? সে কীভাবে এখানে এল? কিছুটা ভীত সন্ত্রস্তও মনে হল তাকে। আমি তাকে তার প্রশ্নের জবাব দিয়েছি এবং এও বলেছি তার উদ্ধার কর্তার দিক থেকে ক্ষতির কোনো কারণ নেই।’ বৃদ্ধা গুঞ্জা সে কথা বলে সেই যুবতীকে আশস্ত করেছে, তার মধ্যে সত্য নিহিত আছে। উচ্ছল নারীলোভী নয়, এমনকী তার যুবা বয়স হলেও কোনোদিন নারীসঙ্গ গ্রহণ করেনি। যদিও তার যে সুযোগ ছিল প্রচুর। এই দল হ্রদের এক অংশেই তো ভাসামান বেশ্যাগৃহ আছে। উচ্ছলের সমবয়সি যুবকরা সেখানে নিয়মিতভাবে গমন করলেও উচ্ছলের সে স্থানে যাবার প্রবৃত্তি হয়নি কখনও।

মহারাজ ললিতাপীড়ের পার্ষদদের বেশ্যা সংসর্গের জন্য বিশেষ সুবিধা আছে। মহারাজ ললিতাপীড় প্রথম রজঃস্বলা কন্যাদের সম্ভোগ করার পর তাদের অনেক সময় তাঁর পার্ষদদের হাতে পুরস্কার স্বরূপ তুলে দেন। সে সুযোগ বেশ কয়েক বার উচ্ছলের সামনেও এসেছিল, কিন্তু সে তা গ্রহণ করেনি। অপরিচিত যুবতীকে সে পুষ্পপথ থেকে উদ্ধার করে এনেছে কেবল মাত্র তার জীবন রক্ষার স্বার্থে। অন্য কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে নয়।

গুঞ্জার কথা শোনার পর উচ্ছল বলল, ‘সে তার নাম পরিচয় কী জানাল? কোথা থেকে সে এসে উপস্থিত হল এই তুষারাবৃত পুষ্পপথে? সুস্থ হয়ে উঠলে তাকে তার গৃহে ফিরিয়ে দেওয়া প্রযোজন।’

উচ্ছলের কথা শুনে বৃদ্ধা বলল, ‘আমি তাকে এ সব প্রশ্ন করেছিলাম। কিন্তু সে আমার প্রশ্নের জবাব দেয়নি। আপনি একবার তার সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন। সে জাগ্রতই আছে।’

উচ্ছল বলল, ‘চলো তবে সে কক্ষে যাওয়া যাক।’

নিজের পালঙ্ক ত্যাগ করে উঠে পড়ল উচ্ছল। সেই যুবতী যেখানে আছে সে কক্ষ এই ভাসমান গৃহের পশ্চাদ্ভাগে অবস্থিত। পরিচারিকা গুঞ্জার সঙ্গে বেশ কয়েকটা কক্ষ অতিক্রম করে উচ্ছল গিয়ে উপস্থিত হল সে কক্ষের সামনে। এ বাসগৃহের প্রতিটা কক্ষের দ্বারেই মখমলের ভারী পর্দা টাঙানো। পর্দা সরিয়ে গুঞ্জার পিছন পিছন উচ্ছল প্রবেশ করল কক্ষে।

পালঙ্কে বসে উন্মুক্ত গবাক্ষ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল সেই যুবতী। পদশব্দ শুনে সে ফিরে তাকাল। তারপর উচ্ছলের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই পালঙ্ক ছেড়ে দ্রুত নীচে নেমে মাথা নত করে দাঁড়াল সে। শরীর কাঁপতে শুরু করল রমণীর। তা দেখে উচ্ছল রমণীর উদ্দেশে বলল, ‘তোমার শঙ্কার কোনো কারণ নেই। কী নাম তোমার?’

প্রশ্ন শুনে যুবতী একই ভাবে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল।

উচ্ছল আবারও তাকে জিগ্যেস করল, ‘তোমার নাম কী?’

সেই কন্যা এবার মৃদু স্বরে জবাব দিল, ‘জানি না।’

জবাব শুনে বিস্মিত ভাবে উচ্ছল জিগ্যেস করল, ‘জানি না মানে?’

যুবতী উত্তর দিল, ‘নাম, পরিচয় কিছুই মনে পড়ছে না আমার।’

উচ্ছল বলে উঠল, ‘কিছুই মনে পড়ছে না! পুষ্পপথে তুমি কোথা থেকে কী ভাবে উপস্থিত হলে? তোমার পোশাক দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি পাহাড়ের ওপারে কোনো মাড়ব রাজ্যের বাসিন্দা। কিছুই কি মনে নেই তোমার?’

মেয়েটি ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘না, আমার নাম, পরিচয় কিছুই স্মরণে আসছে না। আমার শুধু মনে আছে একদল লোকের সঙ্গে আমি পর্বত পথ অতিক্রম করছিলাম চন্দ্রালোকে। তারপর হঠাৎই প্রচণ্ড শব্দ করে মাথার ওপর থেকে বরফ খণ্ড নেমে আসতে লাগল। আমি তার নীচে চাপা পড়লাম। এ ঘটনা ব্যতীত আমি আর কিছু স্মরণ করতে পারছি না।’

শেষ কথাগুলো বলে হয়তো বা সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা স্মরণ করেই থর থর করে কেঁপে উঠল মেয়েটা।

আকস্মিক কোনো প্রচণ্ড দুর্ঘটনায় অনেক সময় কারো কারো স্মৃতিবিভ্রম হয় বলে শুনেছে উচ্ছল! কিন্তু এযাবৎকাল তেমন কাউকে উচ্ছল চাক্ষুষ করেনি। মেয়েটার কণ্ঠস্বর শুনে তার মনে হল সে মিথ্যা বলছে না। কিন্তু এই কন্যার পরিচয় জানা তো প্রয়োজন। তা অনুমান করার জন্য উচ্ছল ভালো ভাবে নিরীক্ষণ করতে লাগল নতশির যুবতীকে।

তার পোশাকের ধরন নিঃসন্দেহে মাড়ব দেশের বাসিন্দাদের মতো। তবে যে বনচারী বেদে রমণীরা পাহাড়ের ওপার থেকে জড়িবুটি ভেষজ ঔষধি বিক্রয় করতে এখানে আসে, তাদের মতো সস্তা ও অপরিচ্ছন্ন নন। সুতোর সূক্ষ্ম অলঙ্করণ রয়েছে তার বুকের কাছে আর পোশাকের হাতায়। তাছাড়া ওপারের বনাচারী রমণীরা উড়নি ব্যবহার করে না। ভালো করে তার দিকে কিয়ৎক্ষণ তাকাবার পর উচ্ছল অনুধাবন করল এ নারীর অঙ্গ সৌষ্ঠব, মুখমণ্ডল যথেষ্ট সুন্দরও বটে। মৃণাল কাণ্ডের মতো যুবতীর মেদহীন শরীর, বুকের দু-পাশ তার উন্নত হয়ে সদ্য যৌবনের সাক্ষ্য বহন করছে, মাথায় কুঞ্চিত কেশদাম, যা সচরাচর উপত্যকার রমণীদের মধ্যে দেখা যায় না। ধনুকের মতো কৃষ্ণ ভ্রুযুগল, ঘন অক্ষি পল্লব, টিকালো নাসা। উষ্ণ তৈল মর্দনের ফলে ইতিমধ্যে তার স্বাভাবিক গাত্রবর্ণ ফিরে এসেছে। যুবতীর ওষ্ঠাধার আর কপোলদ্বয়ে পালেবত ফলের ন্যায় রক্তিম আভা ফুটে উঠেছে।

এই প্রথম কোনো যুবতীকে এমন তীক্ষ্ণ ভাবে পর্যবেক্ষণ করল উচ্ছল। তবে তাকে গভীর ভাবে নিরীক্ষণ করে কোনো কামভাব জাগ্রত হল না তাঁর মনে। তাকে দেখে দুটি বিষয় মনে হল তার। প্রথমত এ নারী কোনো বনচারী গোষ্ঠীর নারী নয়। তার পোশাক, দাঁড়াবার ভঙ্গিমা, স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলা, এ সব কিছুর মধ্যে কোথায় যেন একটা রুচিশীল ভাব বর্তমান। আর দ্বিতীয়ত উচ্ছল নারী সৌন্দর্যের বিশেষজ্ঞ না হলেও তাকে যথেষ্ট সুন্দরী বলেই মনে হল তার। অন্তত মহারাজ ললিতাপীড় যে সকল বেশ্যাদল পরিবৃত হয়ে থাকেন, তাদের অপেক্ষা যেন এই সদ্য যুবতী অধিক সুন্দরী হিসাবেই ধরা দিল উচ্ছলের চোখে।

তার দিকেই তাকিয়ে ছিল উচ্ছল। যুবতী নতশিরে ভূমির দিকে তাকিয়ে থাকলেও হয়তো সে অনুমান করল উচ্ছল এক দৃষ্টে চেয়ে আছে তার দিকে। তবে সে উচ্ছলের মনোভাব পাঠ করতে সক্ষম হল না। ধীরে ধীরে সে তার হাত দুটো বুকের কাছে জড়ো করল। তারপর কাতর কণ্ঠে বলল, ‘আপনি আমার জীবনদাতা। কিন্তু দোহাই আপনার, দয়া করে আমাকে এখনই আপনার আশ্রয় থেকে বিতাড়িত করবেন না। সত্যি আমি কিছু স্মরণে আনতে পারছি না, চারপাশের সব কিছু আমার পরিচিত বোধ হচ্ছে।’

রমণীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তার কাতর নিবেদন শুনে উচ্ছল তাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, যত দিন না তুমি তোমার স্মৃতিশক্তি ফিরে পাচ্ছ ততদিন তুমি তোমার ইচ্ছানুসারে এখানেই থাকতে পারো। কেউ তোমাকে বিতারিত করবে না। আশা করি তুমি দ্রুত তোমার স্মৃতিশক্তি ফিরে পাবে। তারপর তোমার বাসস্থানে ফিরে যেতে সাহায্য করব আমি।’

উচ্ছলের আশ্বাসবাণী শুনে ধীরে ধীরে সেই নারী শরীরের কম্পন স্তিমিত হয়ে এল। মাথাটা সে আরও আনত করে করজোড়ে উচ্ছলের উদ্দেশ্য বলল, আপনার অশেষ দয়া।’

আত্মপরিচয়ে ভ্রষ্ট এই নারীর সঙ্গে আর তেমন বাক্যালাপের প্রয়োজন উচ্ছল আর এ সময় অনুভব করল না। তবে সে যুবতীর উদ্দেশে বলল, ‘কিন্তু তুমি যখন এ স্থানে আছ তখন তো কোনো একটা নামে তোমাকে ডাকা প্রয়োজন হবে। কী নামে তোমাকে ডাকা যায় বলো তো?’ প্রশ্ন শুনে নিরুত্তর রইল রমণী। মনে হয় সে বুঝে উঠতে পারল না কী জবাব দেবে?

উন্মুক্ত গবাক্ষ দিয়ে পাহাড়ের ফাঁক গলে বেলা শেষের আলো এসে পড়েছে যুবতীর মুখে। সেই রাঙা আলোতে যুবতীর গণ্ডদেশ আরও রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। তা ঠিক যেন পক্ক পালেবত ফলের বর্ণের মতো। তা দেখে হঠাৎ একটা নাম মাথায় এল উচ্ছলের। সে যুবতীর উদ্দেশে বলল, ‘তুমি পালেবত ফল চেনো? এ অঞ্চলে তা প্রচুর পাওয়া যায়। আমি তোমার নাম করণ করলাম—পালেবত।’

উচ্ছলের মনে হল তার এই নামকরণ শুনে মুহূর্তের জন্য যেন একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল বিষণ্ণ নারীর ওষ্ঠাধারে। উচ্ছল এরপর পালেবতের কক্ষ ত্যাগ করল।

আরও কয়েকটা দিন একই ভাবে কেটে গেল। একই গৃহে থাকলেও পালেবতের সঙ্গে আর সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেনি উচ্ছল। তবে গুঞ্জার কাছ থেকে উচ্ছল প্রত্যহ একবার পালেবতের সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহ করে। বৃদ্ধা পরিচারিকা তাকে জানিয়েছে, তার তত্ত্বাবধানে যুবতীকে তখন শারীরিক ভাবে সম্পূর্ণ সুস্থই বলা যায়। অপরিচিত পরিবেশে তার মনের আতঙ্ক অনেকটাই দূরীভূত হয়েছে, তবে তার স্মৃতি ফেরেনি। উচ্ছল গুঞ্জাকে বলেছে পালাবতের স্মৃতি ফিরলেই সঙ্গে সঙ্গে যেন জানানো হয় তাকে। মেয়েটির ঘরে ফেরার ব্যবস্থা করতে হবে। তার পরিবার পরিজন নিশ্চয়ই প্রবল দুশ্চিন্তায় আছে তার অনুপস্থিতিতে।

উচ্ছলকে রাজপার্ষদ হিসাবে প্রত্যহ উপস্থিত থাকতে হয় রাজসভাতে। মহারাজ ললিতাপীড় নিজে বর্তমানে প্রজাপালন সম্পর্কিত রাজকার্য থেকে দূরে থাকেন। আমোদ, ভোগবিলাস, বেশ্যা সংসর্গের অবসরে দুটো কাজ অবশ্য তিনি নিয়মিত করে থাকেন। তবে, প্রত্যহ কম্পনধিপতি অর্থাৎ সেনাপতি গরুড়ের কাছ থেকে সেনাবাহিনী সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া আর গুপ্তচর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জয়দ্রথের থেকেও রাজ্যের কোথাও কোন ষড়যন্ত্র হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে সংবাদ গ্রহণ করা। বলাবাহুল্য এ কাজ দুটো তিনি করে থাকেন স্বীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই। কারণ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নৃপতিকে সিংহাসন থেকে উৎখাত এ দেশে বেশ কয়েকবার ঘটেছে। ললিতাপীড় নিজেইতো পূর্বতন কাশ্মীররাজকে তাঁর শাসনকার্যে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সিংহাসন থেকে উৎখাত করেন।

মহারাজ কুবলপীড়ের রাজত্বে শাসন ব্যবস্থা বলতে যে ক্ষীণ অংশটুকু বর্তমান তা ধরে রেখেছেন মহামন্ত্রী যশঙ্কর আর উচ্ছলের মতো কিছু পার্ষদরা। যার মাধ্যমে এই উপত্যকাবাসী যতটুকু সম্ভব উপকৃত হয়। তাছাড়া মহারাজের অপরিসীম বিলাস-বাসনের জোগানের জন্য, সেনাদলের ভরণপোষণের জন্য যে প্রভূত পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয় তারও জোগানের ব্যবস্থা করতে হয় তার মন্ত্রী-পার্ষদদেরই। কারণ, এ কাজে ত্রুটি হলে মহারাজের নিষ্ঠুরতম দণ্ডাদেশ নেমে আসতে পারে তাঁর যে কোনো মন্ত্রী বা পারিষদ-সভাসদের ওপর। তাই উচ্ছলকেও কিছু কাজে নিয়োজিত থাকতে হয়।

কৃষিকাজ, ফুল-ফলের চাষ, দল হ্রদ-সহ অন্য হ্রদগুলির জলে মৎস্যশিকার, গবাদি পশুপালন ছাড়াও উপত্যকাবাসীর অন্যতম জীবিকা হল কাঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ নির্মিত সামগ্রী ও পশমের শাল প্রস্তুত করা। বসন্তকালে সমতলের নানান দেশের বণিকরা যে সব জিনিস সংগ্রহ করতে উপত্যকায় এসে উপস্থিত হয়, তাদের থেকে রাজকোষে বহু পরিমান শুল্ক আদায় হয়। তাই বণিককুলকে যত্নে রাখতে হয়। উপত্যকায় থাকার সময় তাদের বাসস্থান ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হয়। যে জন্য একটি দপ্তরও আছে। সে দপ্তরের তত্ত্বাবধায়কের কাজও করতে হয় উচ্ছলকে।

বিশেষত এই বসন্তকালে যখন বণিকদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়, তখন নিয়মিতই সেখানে যেতে হয় পার্ষদ উচ্ছলকে। এ ব্যতীত মহারাজ ললিতাপীড় তাঁর ইচ্ছা অনুসারে তাঁর পার্ষদদের যখন যে কাজের নির্দেশ দেন, অন্যদের মতো সে কাজও করতে হয় উচ্ছলকে। যেমন কদিন আগেই মহারাজের ইচ্ছানুসারে তাকে মৃগনাভি আহরণের জন্য যেতে হয়েছিল।

উচ্ছল এ ক’দিনও নিয়মিত হাজির হয়েছিল কাশ্মীররাজ ললিতাপীড়ের রাজসভাতে। সে সভায় এ ক’দিনের মধ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ঘটার কথাও নয়। সেখানে সেই একই বেশ্যাকুলের অশ্লীল কলহাস্য, ভাঁড়ের ভাড়ামি, স্বল্পবসনা নর্তকীদের শরীরী নৃত্য প্রদর্শন। এ ব্যতিরেকে অন্য কোনো রাজকার্য অনুষ্ঠিত হয়নি সেখানে। রাজসভাতে বেশ কয়েকবার মহামন্ত্রী যশঙ্করের মুখোমুখি পড়েছে উচ্ছল। কিন্তু তিনি আগামী নৈশ অভিসার প্রসঙ্গে আর কোনো বাক্যালাপ করেননি উচ্ছলের সঙ্গে। হয়তো বা তা করেননি গোপনীয়তা-নিরাপত্তার স্বার্থেই। মহারাজের চর তো সর্বত্রই ঘুরে বেড়ায়। এমনকী পার্ষদদের মধ্যেও কে মহারাজের চরবৃত্তি করে তা বোঝা দুষ্কর।

এ দিবসে প্রথম উচ্ছল রাজসভায় উপস্থিত হয়েছিল। তারপর রাজসভা ভঙ্গ হলে সে গেছিল তার কার্যালয়ে। বসন্ত ঋতু শুরু হয়ে গেছে। ঢালের বরফ আর কদিনের মধ্যে সম্পূর্ণ রূপে গলে গেলেই আসতে শুরু করবে বণিকের দল। তাদেরই দেখাশোনার প্রস্তুতির কাজে দপ্তরে গিয়েছিল উচ্ছল। সেখানে তার কাজ যখন সম্পন্ন হল তখন দ্বিপ্রহর গড়িয়ে গেছে। অশ্বপৃষ্ঠে ফেরার পথ ধরল উচ্ছল। দল হ্রদের তীরে অশ্বশালা আছে। সেখান থেকে অশ্বপৃষ্ঠে নগরীর অভ্যন্তরে আসা যাওয়া করে সে।

রাজপ্রাসাদ ও তার দপ্তর সংলগ্ন রাজপথ অতিক্রম করে সংক্ষেপে দল হ্রদের তীরে ফেরার জন্য দুপাশে চিনার গাছের ছাওয়া একটা পল্লীপথ ধরল সে। পথের দুপাশে ছোট-বড় কাষ্ঠ প্রস্তর নির্মিত গৃহ। তাদের ঢাল ছাদ, কিছুদিনের মধ্যেই এই ছাদগুলো হরিৎবর্ণ ধারণ করবে। কারণ, শীতের সমাপ্তিতে এই ছাদগুলিকে মাচার মতো ব্যবহার করে তুম্বী ইত্যাদি শাক-সবজির চাষ করা হয়। কেউ কেউ ডাঙা ফলেরও চাষ করে থাকে।

কাষ্ঠ শিল্পের প্রাচুর্য এ স্থানে বর্তমান বলে প্রায় প্রতিটা গৃহের তোরণ, তমোরি, ছাদের কার্নিশ কাষ্ঠের কারুকাজমণ্ডিত ও নানান রঙে রঞ্জিত। বরফ খসে গিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে তারা। এ দেশের গৃহ, পথ, ঘাট, নদী, হ্রদ, পাহাড়, উপত্যকা সবই সুন্দর, কিন্তু কোন পরিহাসের কারণে সে বিধাতাপুরুষ ললিতাপীড়ের মতো একজন কদর্য ব্যক্তিকে এদেশের সিংহাসনে বসিয়েছেন তা কারো জানা নেই।

নিজের মনেই দুলকি চালে সেই পল্লীগ্রামেই আসছিল উচ্ছল। হঠাৎই একটা কণ্ঠস্বর কানে গেল তার, ‘আরে! মহারাজের পার্ষদ যে! এ স্থানে কোথায় এসেছেন?’ রাস্তার পাশ থেকেই কণ্ঠস্বরটা ভেসে এল। তা কানে যেতেই ঘোড়ার লাগম টেনে দাঁড়িয়ে পড়ল উচ্ছল। কাছেই একটা গৃহের সামনে সে যাকে দেখতে পেল, তাকে দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল না উচ্ছল। লোকটা হল মহারাজ ললিতাপীড়ের অনুগত ভাঁড় কূপমণ্ডূক! লোকটাকে দেখতে বড় অদ্ভুত। ঢ্যাঙা লম্বা, রাজসভাতে সবার মাথার ওপর তার মাথা জেগে থাকে। তবে তার শরীরের কোথাও এক রত্তি মাংস নেই। রং-বেরঙের কাপড়ের টুকরো দিয়ে তৈরি তার পরনের আলখাল্লাটা যেন এক খণ্ড লাঠির গায়ে জড়ানো থাকে। লোকটার চোয়ালটা শৃগালের মতো ছুঁচলো ধরনের, আর তার কপালের ঠিক মাঝখানে ডিম্বাকৃতির একটা আব আছে। মাথায় একটা একহাত লম্বা উচ্চতার পাগড়ি পরে সে, আর পায়ে বিশেষভাবে নির্মিত একহাত লম্বা শুঁড়তোলা জুতো। কাঠির মতো লম্বাটে আঙুলগুলোতে নানান রঙের পাথর বসানো আংটি। কখনও কখনও নিজের ঠোঁট আর গণ্ডদেশ নানা বর্ণে রঞ্জিত করে সে। তার এই অদ্ভূত চেহারা আর পোশাকের জন্যই সে অনেকের চোখে হাসির উদ্রেক ঘটায়।

কূপমণ্ডূকের মাথায় অদ্ভুত সেই পাগড়ি আর পায়ে সেই কিম্ভূত পাদুকা না থাকলেও তাকে চিনতে অসুবিধা হল না উচ্ছলের। রাজসভায় একসঙ্গে থাকে বলে এই ভাঁড়ের সঙ্গে উচ্ছলের পরিচয় আছে ঠিকই, তবে ঘনিষ্ঠতা নেই। কেউ কেউ বলেন ভাঁড় কূপমণ্ডূক নাকি মহারাজ ললিতাপীড়ের হয়ে চরবৃত্তিও করে। তাই অনেকেই তার সঙ্গ এড়িয়ে চলে। কূপমণ্ডূককে দেখে উচ্ছল জবাব দিল, ‘রাজকার্য সমাপ্ত করে গৃহের উদ্দেশে রওনা হয়েছি। সংক্ষেপে যাওয়ার জন্য আজ এ পথ ধরেছি।’

জবাব শুনে কূপমণ্ডূক কান এঁটো করা হাসি হেসে বলল, ‘কী সৌভাগ্য আমার গৃহের সামনে দিয়ে যাচ্ছেন। অনুগ্রহ করে আপনি একবার আমার গৃহে পদার্পণ করে আমাকে অতিথি আপ্যায়নের সুযোগ দিন। আপনার মুখমণ্ডল দেখে মনে হচ্ছে আপনি ক্লান্ত।’

কূপমণ্ডূকের অনুমান মিথ্যা নয়। রাজসভা হয়ে দপ্তরে গিয়ে বেশ অনেকক্ষণ কাজ করতে হয়েছে তাকে। অদ্যাবধি মধ্যাহ্নভোজনও সম্পন্ন হয়নি তার। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই উচ্ছল কিছুটা ক্লান্তি বোধ করছে। তবে ভাঁড়ের প্রশ্নের জবাবে তার কী করা উচিত তা প্রথমে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না উচ্ছল। সে চেয়ে রইল তার দিকে।

তাকে নিশ্চুপ ভাবে চেয়ে থাকতে দেখে কূপমণ্ডূক বলল, ‘আসুন না, একপাত্র জল পান করে যান অন্তত। আমি খুশি হব তাতে। এই আমার বাসস্থান।’—এ কথা বলে সে তার পশ্চাদবর্ত্তী গৃহটা দেখাল।

কূপমণ্ডূক লোকটাকে উচ্ছল বিশেষ পছন্দ না করলেও সে মহারাজ ললিতাপীড়ের প্রিয় পাত্র। তার আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করলে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যার উদ্রেক হতে পারে। হয়তো বা ভাঁড় তার সম্পর্কে মহারাজের মনে বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া দ্বার প্রান্তে দাঁড়ানো গৃহীর আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা শোভন নয়। এ কথা ভেবে নিয়ে উচ্ছল, ভাঁড় কূপমণ্ডূকের আমন্ত্রণ রক্ষা করার জন্য ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ল।

হাসি ফুটে উঠল কূপমণ্ডূকের মুখে। তবে সে হাসি ভাঁড়ের কৃত্রিম হাসি নয় বলেই মনে হল উচ্ছলের। ঘোড়ার লাগামটা একটা খোঁটায় বেঁধে কূপমণ্ডূকের পিছন পিছন তার গৃহে প্রবেশ করল উচ্ছল।

মধ্যম আকৃতি কাষ্ঠনির্মিত গৃহ। মেঝে, ছাদ, দেওয়াল সবই কাঠের তৈরি। উচ্ছলকে সাদর আমন্ত্রণের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে উপস্থিত হল এক কক্ষে। সেটা তার অতিথি আপ্যায়ন কক্ষ। মেঝেতে লাল গালিচা পাতা। কাঠের কারুকাজ করা বসার আসনের ওপর সুতোর কাজ করা ফুলের সাদা রেশম বস্ত্রের আচ্ছাদন। দেওয়ালের গায়ে প্রদর্শিত হচ্ছে নানা নৈসর্গিক ছবি। সব মিলিয়ে কক্ষের সর্বত্র একটা রুচিশীলতার ছাপ বর্তমান। যা ঠিক ভাঁড় কূপমণ্ডূকের সঙ্গে মেলে না। তারা কক্ষে প্রবেশ করে আসন গ্রহণের পর কূপমণ্ডূক বলল, ‘আপনার জন্য মধ্যাহ্ন ভোজের ব্যবস্থা করতে বলি?’

উচ্ছল বলে উঠল, ‘না, না, তার আবশ্যিকতা নেই। এক পাত্র জল দিলেই হবে। ইতিমধ্যে এক দাসী এসে দাঁড়িয়েছে কক্ষের দ্বারে। উচ্ছলের কথা শুনে কূপমণ্ডূক দাসীকে জল আনার ইঙ্গিত করল।

পাথরের পাত্রে জল এল। আর তার সঙ্গে একটা পাত্রে নানান ধরনের পিষ্টক। কূপমণ্ডূক তা দেখিয়ে বলল, এটুকু অন্তত গ্রহণ করতে হবে আপনাকে।’

উচ্ছল আর আপত্তি করল না। পিষ্টক ভক্ষণ শুরু করল সে। তার দিকে তাকিয়ে কূপমণ্ডূক বলল, ‘বড় আনন্দিত হলাম, আপনি আমার গৃহে পদার্পণ করাতে। আমার গৃহে তো আর আপনার মতো সভাসদরা আসেন না। মহামন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন পার্ষদকে নানান সময় আমি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তাঁরা ব্যস্ততার অজুহাতে আসেননি।’

মহামন্ত্রী সহ সভাসদদের এ গৃহে পদার্পণ না করার কারণ উচ্ছলের বুঝতে অসুবিধা হল না। মহারাজ ললিতাপীড়ের চাটুকার এই ভাঁড় কূপমণ্ডূককে কেউই বিশেষ পছন্দ করেন না। কূপমণ্ডূক এরপর যেন কিছুটা স্বগোতক্তির স্বরেই বলল, ‘কী আর করব, আমার অন্য কোনো কাজ আর জানা নেই। তাছাড়া এ চেহারা নিয়ে অন্য কোনো কাজ করা সম্ভব নয়, তাই ভাঁড়ামির কাজটাই করি।’ এই বলে ভাঁড়ের মতো হো হো করে হেসে উঠল।

পিষ্টক ভক্ষণ করতে করতে উচ্ছলও মৃদু হাসল। লোকটা এরপর বলল, ‘তবে আমি রাজসভার সবার খোঁজ রাখি, সব ব্যাপারেই নজর রাখি। এই যেমন কদিন আগে রাজসভা ভঙ্গ হবার পর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে মহামন্ত্রী আপনার সঙ্গে নিভৃতে বাক্যালাপ করছিলেন। কী বলছিলেন তিনি?’

ভাঁড়ের প্রশ্ন শুনে মৃদু চমকে উঠল উচ্ছল। তবে কি এ সংবাদ সংগ্রহ করার জন্যই সে তার গৃহে উচ্ছলকে আমন্ত্রণ জানাল? সত্যি কি সে মহারাজের চরবৃত্তি করে? উচ্ছল মুহূর্তের মধ্যে ভেবে নিয়ে বাধ্য হয়েই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলল, ‘বসন্ত এসে গেছে। বনিকরা কবে থেকে আসতে শুরু করবে সে ব্যাপারেই খোঁজখবর নিচ্ছিলেন উনি। জানেন নিশ্চয়ই যে ওই বণিকদের থেকে প্রাপ্ত কর রাজত্বের আয়ের একটা বড় উৎস।’

কূপমণ্ডূক বলল, ‘মার্জনা করবেন, নিছকই কৌতূহলবশত প্রশ্নটা করে ফেলেছিলাম আপনাকে? সতর্ক উচ্ছল এরপর পাল্টা প্রশ্ন করল তাকে, ‘আপনি আমার সম্পর্কে কী কী সংবাদ রাখেন বলুন তো?’

ভাঁড় কূপমণ্ডূক হেসে বললেন, এই যেমন আপনি একজন সচ্চরিত্রের যুবক। মদ্যপান করেন না। পাশা জুয়া খেলেন না, অবিবাহিত হলেও বেশ্যা সংসর্গ করেন না। যে নারী আপনাকে বিবাহ করবে সে অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী হবে। তবে একটা ব্যাপারে আপনার সম্পর্কে অনুযোগ আছে?’ এ কথা বলে থামল কূপমণ্ডূক।

উচ্ছল প্রশ্ন করল, ‘কী অনুযোগ?’

ভাঁড় বলল, ‘আপনাকে তেমন উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলে মনে হয় না। মহারাজকে খুশি করার জন্য স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে কত উপঢৌকন দেন, মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করেন, আপনাকে সে সব কাজ করতে দেখিনি কখনও। কয়েকজন সভাসদ তো এভাবেই মন্ত্রীপদে উন্নীত হয়েছেন বা উচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্ব লাভ করেছেন।’

উচ্ছল কথাটা শুনে হেসে বলল, ‘সত্যিই আমার তেমন কোনো উচ্চাভিলাষ নেই। আমি যেমন আছি তাতেই সন্তুষ্ট।

উচ্ছলের খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, সে আর রাজসভা প্রসঙ্গে কূপমণ্ডূকের সঙ্গে বাক্যালাপে গেল না। দেওয়ালে যে চিত্রগুলো আঁকা আছে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। নানান রঙে রঞ্জিত চিত্রগুলো সত্যিই খুব সুন্দর। তা দেখে উচ্ছল জানতে চাইল, ‘এসব চিত্র কোথা থেকে সংগ্রহ করছেন?’

কথাটা শুনে ভাঁড় কূপমণ্ডূকের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, ‘সংগ্রহ করা নয়, এ সব চিত্র, আচ্ছাদনের সূচিকর্ম সবই আমার কন্যা রূপবতীর নিজের হাতে সৃষ্ট।’

উচ্ছল কথাটা শুনে বলল, ‘আপনার কন্যা তো বেশ গুণবতী দেখছি!

ভাঁড় কূপমণ্ডূকের মুখমণ্ডল এবার স্পষ্টতই খুশিতে ভরে উঠল। সে বলল, ‘নিজের কন্যা বলে বলছি না। সত্যি সে বড় গুণবতী। এ সব কাজ ছাড়া গৃহস্থালির সব কাজে পারদর্শী সে। আর সে আমার মতো কুরূপাও নয়। ওর যখন শৈশব তখনই আমার পত্নী বিয়োগ হয়। আমি আর দ্বার পরিগ্রহণ করিনি। আমিই তাকে বড় করে তুলেছি। রূপবতী এখন সপ্তদশ বর্ষীয়া। বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠেছে। তাকে একবার ডাকি?’

উচ্ছল সৌজন্যর খাতিরে বলল, ‘হ্যাঁ, ডাকুন।’

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দাসীকে কূপমণ্ডূক বলল তার কন্যাকে উপস্থিত করার জন্য। কিছু সময়ের মধ্যেই কক্ষে পদার্পণ করল সে। হাত দুটো উচ্ছলের উদ্দেশে প্রণামের ভঙ্গিতে বুকের কাছে জড়ো করে নত মস্তকে দাঁড়াল। সত্যি ভাঁড় কূপমণ্ডূকের চেহারার সঙ্গে তার কোনো মিলই নেই। স্বাস্থ্যবতী এক কন্যা, সদ্য যৌবনের সব চিহ্নই তার শরীরে পরিস্ফুট। মুখমণ্ডলেও লালিমা আছে। সুন্দরীই বলা যায় তাকে। মেয়েটির দাঁড়াবার ভঙ্গি দেখে উচ্ছলের হঠাৎ পালেবতের কথা মনে পড়ে গেল। সেদিন সে-ও ঠিক ওভাবেই দাঁড়িয়েছিল। যদিও কূপমন্ডূক তার কন্যার নাম জানিয়েছে তবুও উচ্ছল মেয়েটিকে প্রশ্ন করল, ‘কী নাম তোমার?’

সে জবাব দিল, ‘রূপবতী।’

উচ্ছল বলল, ‘শুনলাম এই চিত্রগুলি তুমি এঁকেছ। অতীব সুন্দর।’

প্রশংসা শুনে সেই সপ্তদশী কন্যার মুখমণ্ডলে একটা লজ্জার ভাব ফুটে উঠল। উচ্ছল তাকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি লিখতে পড়তে জানো?’

রূপবতী মৃদু কণ্ঠে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’

এরপর তাকে আর কী প্রশ্ন করবে তা বুঝে উঠতে পারল না উচ্ছল। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার তেমন অভ্যাস নেই। সে চুপ করে গেল। কূপমণ্ডূকও সম্ভবত বুঝতে পারল উচ্ছলের আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই। তাই সে কন্যার উদ্দেশে বলল, ‘তুমি এবার ভিতরে যাও মা।’ পিতার নির্দেশ মেনে ধীর পায়ে কক্ষ ত্যাগ করল রূপবতী।

সে চলে যাওয়ার পর কূপমণ্ডূক বলল, ‘আপনাকে আমি মিথ্যা বলব না। মহারাজের কৃপায় আমি বেশ কিছু অর্থ সঞ্চয় করতে পেরেছি। আমার যাবতীয় অর্থ সম্পদের উত্তরাধিকারিণী রূপবতী। আমি একজন সৎপাত্রের সন্ধানে আছি। যার হাতে আমি রূপবতী আর আমার সমস্ত সম্পদ সমর্পণ করে নিশ্চিত হতে পারি।

উচ্ছলের পিষ্টক আহার সমাপ্ত হয়ে গেছিল। সে এরপর জলপাত্র একচুমুকে শেষ করে বলল, ‘এবার আমি উঠি। নচেৎ ফিরতে বিলম্ব হয়ে যাব।’

উচ্ছল কূপমণ্ডূকের সঙ্গে সে কক্ষ, গৃহ ত্যাগ করে বাইরে উপস্থিত হল। সে যখন অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করতে যাচ্ছে তখন ভাঁড় কূপমণ্ডূক হঠাৎ প্রশ্ন করল, ‘কেমন দেখলেন আমার কন্যাকে?’ মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে উচ্ছল জবাব দিল, ‘উত্তম।’

হাসি ফুটে উঠল ভাঁড় কূপমণ্ডূকের মুখে। না ভাঁড়ের ভণ্ড হাসি নয়, সন্তানের প্রশংসা শুনে পিতার হাসি। সে বলল, ‘প্রয়োজনবোধ হলে এ পথ দিয়ে যাওয়া বা আসার সময় আমার গৃহে বিশ্রাম নিয়ে যাবেন। কোনো সংকোচ বোধ করবেন না।’

ভাঁড় কূপমণ্ডূকের থেকে বিদায় নিয়ে ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়ল উচ্ছল। তারপর রওনা হল দল হ্রদের পাড়ে ফেরার জন্য। সে পথে যেতে যেতে উচ্ছল ভাবতে লাগল, তাকে নিজ গৃহে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যাওয়ার পিছনে কূপমণ্ডূকের কি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল? সে কি উচ্ছলের সঙ্গে মহামন্ত্রী যশঙ্করের কী বাক্যালাপ হয়েছিল তা জানার অন্য আমন্ত্রণ জানাল? অথবা তার বিবাহযোগ্যা কন্যাকে উচ্ছলের সামনে উপস্থিত করার জন্য? বিবাহের পাত্র হিসাবে যে সে মন্দ নয় তা নিজেও জানে উচ্ছল। ইতিপূর্বে বেশ কিছু কন্যার পিতা বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে উপস্থিত হয়েছে উচ্ছলের কাছে। নাকি এসব কিছুই নয়, নিছকই সৌজন্যের খাতিরে তাকে নিজ গৃহে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গেল মহারাজ ললিতাপীড়ের প্রিয় ভাঁড় কূপমণ্ডূক। এ সব নানান কথা ভাবতে ভাবতে দল হ্রদের তীরে এসে উপস্থিত হল সে। তারপর অশ্বশালায় অশ্ব রেখে উচ্ছল তার ব্যক্তিগত শিকারা নিয়ে ভেসে পড়ল দল হ্রদের জলে।

সেদিন কূপমণ্ডূকের গৃহ থেকে আতিথেয়তা গ্রহণ করে ফিরে আসার পর আরও কয়েক দিবস সময়ের নিয়মেই অতিবাহিত হল। এ ক’টা দিনও রাজসভায় উপস্থিত হয়েছিল উচ্ছল। তারপর নিজের দপ্তরের কাজ সাঙ্গ করে সূর্যাস্তের পূর্বে নিজের ডুঙ্গায় ফিরে এসেছিল। পালেবতের সঙ্গে আর সাক্ষাৎ হয়নি তার। অবশেষে কৃষ্ণপক্ষ এসে উপস্থিত হল।

এদিনও যথা নিয়মে রাজসভায় উপস্থিত ছিল উচ্ছল। মহারাজ ললিতাপীড়ের উপস্থিতিতে বেশ্যা আর মদিরা লাঞ্ছিত সভা সমাপ্ত হওয়ার পর যখন উচ্ছল সভাগৃহ ত্যাগ করতে যাচ্ছে তখন চকিতের জন্য তার সামনে আবির্ভূত হলেন মহামন্ত্রী যশঙ্কর। নিচু স্বরে তিনি বললেন, ‘আজ কৃষ্ণপক্ষ, আপনার স্মরণে আছে তো?’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’

যশঙ্কর বললেন, ‘পাকদণ্ডী বেয়ে ওঠার সময় পাগড়ির কাপড়ে ভালো করে আপনার মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত করে রাখবেন। যাতে কেউ আপনাকে দেখতে পেলে সনাক্ত করতে না পারে।’

উচ্ছল মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি প্রকাশ করল তার কথায়। যশঙ্কর এরপর আর তার কাছে দাঁড়ালেন না। দ্রুত পায়ে অন্যত্র সরে গেলেন। উচ্ছল এরপর কক্ষ ত্যাগ করার জন্য পা বাড়াতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় তার চোখে পড়ল একজনকে। মহারাজ ললিতাপীড় সভাগৃহ ত্যাগ করলেও সে তখনও বর্তমান। সভাগৃহের এক কোণে দাঁড়িয়ে ভাঁড় কূপমণ্ডূক এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে উচ্ছলের দিকে। অর্থাৎ মহামন্ত্রী যশঙ্করের সঙ্গে উচ্ছলের কথোপকথন চোখে পড়েছে তার। সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছলের মনে পড়ে গেল যশঙ্কর আর তার মধ্যে আলোচনার ব্যাপারে কূপমণ্ডূকের প্রশ্নের কথা। কূপমণ্ডূক কি তবে চরবৃত্তি করছে তার ওপর? উচ্ছলের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই হাসল কূপমণ্ডূক। মনে যাই থাকুক না কেন সে হাসতেই সৌজন্যবশত উচ্ছলও মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল তার দিকে চেয়ে। হাতের ইশারাতে এরপর সে এগিয়ে এসে উচ্ছলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আজ যদি কার্য শেষে একবার আমার গৃহে পদার্পণ করেন তবে বাধিত হই। আমার কন্যা অতি উত্তম মধুজারিত কুক্কুটের মাংস প্রস্তুত করেছে। সঙ্গে নানা প্রকার পিষ্টকও। আপনি তো ও পথেই ফিরবেন। আমি গৃহে উপস্থিত থাকব।’

প্রস্তাব শুনে উচ্ছল বলল, ‘আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমার আজ দপ্তরে বিশেষ কাজ আছে। তাছাড়া আমি অন্য পথে ফিরব। কাজেই আপনার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ আজ আর সম্ভব হবে না।’

উচ্ছলের জবাব শুনে মৃদু হতাশার ভাব ফুটে উঠল ভাঁড় কূপমণ্ডূকের মুখে। এরপর সে বলল, ‘এলে আনন্দিত হতাম। তবে আপনি যখন আজ ব্যস্ত তখন আর কী করা যাবে। তবে কখনও ইচ্ছা জাগলে আমার গৃহে যেতে সঙ্কোচ বোধ করবেন না?’ এ কথা বলে উচ্ছলকে বিদায় জানিয়ে কূপমণ্ডূক অন্য দিকে গমন করল। আর উচ্ছলও রাজসভা ত্যাগ করল।

মহারাজের প্রিয় পাত্র কূপমণ্ডূক তার সম্পর্কে হঠাৎ এত আগ্রহ প্রকাশ করছে কেন এ কথা ভাবতে ভাবতে উচ্ছল হাজির হল তার কার্যালয়ে। সেখানকার কার্য সম্পাদন করে প্রতিদিনের মতোই ফেরার পথ ধরল। দ্বিপ্রহরের কিছু সময় পর ফিরে এল তার ভাসমান গৃহে। তারপর আহার গ্রহণ করে নিদ্রামগ্ন হল।

উচ্ছলের যখন ঘুম ভাঙল তখন বিকাল হয়ে গেছে। অন্ধকার নামলেই তার মহামন্ত্রীর আমন্ত্রণে চন্দ্র পর্বতে যাবার কথা। পালঙ্কে শুয়ে সে একবার ভাবার চেষ্টা করল যশঙ্করের অনুরোধ সাড়া দিয়ে সে স্থানে যাওয়া তার পক্ষে উচিত হবে কিনা? দরবারে যে রাজনীতির খেলা চলে, ক্ষমতা আহরণের খেলা চলে, তাতে কোনোদিনই নিজেকে সংযুক্ত করেনি উচ্ছল। কারণ, ক্ষমতা বা আরও সম্পদ আহরণের কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তার মধ্য নেই। তবে শেষ পর্যন্ত নিজের পূর্ব সিদ্ধান্তেই অটল রইল উচ্ছল। সে স্থানে সে যাবে। কারণ, রাজ্য শাসনের নামে এ রাজ্যে যা ঘটছে তা সহ্যের সীমা অতিক্রম করে চলেছে। এ পরিস্থিতি থেকে সত্যিই মুক্তিলাভ করা প্রয়োজন। দেখাই যাক না সে স্থানে গিয়ে কী বলেন মহামন্ত্রী? লোকটাকে উচ্ছলের ভরসাযোগ্য বলেই মনে হয়।

বিকাল যত গড়াতে লাগল, অন্ধকার নামার সময় এগিয়ে আসতে লাগল, তত যেন উত্তেজিত বোধ করতে লাগল উচ্ছল। কী আলোচনা হবে সেখানে? ভবিষ্যতে তার জন্য কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হবে না তো? উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য এক সময় পালঙ্ক থেকে নীচে নেমে সে কক্ষের বাইরে বেরিয়ে এল।

চন্দ্র পর্বত দেখা যাচ্ছে। সেটা আসলে একটা অনুচ্চ পাহাড়। দল হ্রদের যে দিকে শ্রীনগরের স্থল ভাগের অবস্থান, তার ঠিক বিপরীত দিকের পাহাড় শ্রেণীর মধ্যে তার অবস্থান। স্থানটি প্রাচীন হলেও সে স্থানে কোনো জনবসতি নেই। কারণ, চন্দ্র পর্বত ও তৎসংলগ্ন পাহাড়গুলি থেকেই গলিত হিমবাহগুলো নদীরূপে নেমে এসে দল হ্রদে মেশে। বসন্ত অর্থাৎ এ দেশের গ্রীষ্মকালে ওই জলপ্রবাহগুলো বিপজ্জনক রূপ ধারণ করে।

সূর্য প্রায় ডুবতে চলেছে। পাহাড় শ্রেণীর ফাঁক গলে বেলা শেষের আলো এসে পড়ে দল হ্রদ আর ভাসমান গৃহগুলোর ওপর। উচ্ছলের ভাসমান গৃহের চারপাশে কোমর সমান উচ্চতার কাঠের গাম্ভারি দেওয়া সংকীর্ণ পরিসর আছে। প্রতিটি কক্ষই একটি দরজা দ্বারা সেই অলিন্দের সঙ্গে যুক্ত।

উচ্ছল এসে দাঁড়াল সেখানেই। আর এরপরই সে চারপাশে তাকাতেই দেখতে পেল পালেবতকে। নিজ কক্ষের বাইরে এসে সেও দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে পুরোনো পোশাকের পরিবর্তে স্থানীয় রমণীদের মতোই পোশাক। উচ্ছল অনুমান করল রক্তিম বর্ণের সে পোশাক নিশ্চয়ই গুঞ্জাই তাকে দিয়েছে। পালেবত চেয়ে আছে দল হ্রদে ভাসমান জলযানগুলোর দিকে। হয়তো বা উচ্ছলের উপস্থিতি টের পেয়ে ফিরে তাকাল তার দিকে। মুহূর্তের জন্য পরস্পরের দৃষ্টি বিনিময় হল, আর তার পরেই সে বুকের কাছে দু-হাত জড়ো করে প্রণাম জানাল উচ্ছলের প্রতি।

উচ্ছল বাক্যালাপের জন্য। পালেবতের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর তাকে প্রশ্ন করল, ‘এ স্থান তোমার কেমন লাগছে?’

পালেবত জবাব দিল, ‘খুব সুন্দর, মনোরম।’ উচ্ছল তাকে দ্বিতীয় প্রশ্ন করল। ‘তোমার স্মরণে এল কিছু?’

পালেবত উত্তর দিল, ‘না।’

‘তোমার নাম, বাসস্থান কোনো একটিও নয়?’

মেয়েটি আবারও জবাব দিল, ‘না, কোনো কিছুই নয়।’ এ কথা বলে সে তাকাল হ্রদের দিকে। তারা দুজন ভাসমান গৃহের যে স্থানে দাঁড়িয়ে আছে সে স্থান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মহারাজ ললিতাপীড়ের বিশাল ভাসমান প্রাসাদটি। বেলা শেষের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সে প্রাসাদের সোনালি গাত্রবর্ণ। তার মাথায় উঠছে মহারাজের নিশান। যে কোনো মানুষেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে কারুকাজমণ্ডিত সেই ভাসমান প্রাসাদ।

হঠাৎ সেই প্রাসাদ তরণীর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে পালেবত কৌতূহল ভরে জানতে চাইল, ‘ওই বিপুল, সৌন্দর্যমণ্ডিত তরণীটা কার?’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘কাশ্মীর মহারাজ ললিতাপীড়ের তরণী। এই বসন্ত ঋতুতে তিনি কোনো কোনো সময় ওই পক্ষী নামক ভাসান গৃহে অবস্থান করেন।’

উচ্ছলের জবাব শুনে কিয়ৎক্ষণ চুপ করে থেকে পালেবত হঠাৎ প্রশ্ন করল, ‘এ দেশের মহারাজ কেমন মানুষ? এ দেশের মতোই সুন্দর নিশ্চয়ই?’ আকস্মিক এ প্রশ্ন শুনে জবাব দেবার আগে থমকে গেল উচ্ছল। পালেবত বর্তমানে তার আশ্রিতা হলেও তার পরিচয় জানা নেই উচ্ছলের। তাকে অপরিচিতাই বলা চলে। এমন একজন নারীর কাছে মহারাজের স্বরূপ উন্মোচন কি সমীচীন হবে? এ কথা ভেবে নিয়ে উচ্ছল কৌশলে জবাব দিল, রাজা যেমন হন। তাঁর প্রাসাদ, সিংহাসন সবই অত্যন্ত সুন্দর দেখতে।’ এ প্রসঙ্গে যুবতী আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে এরপর উচ্ছলের উদ্দেশে বলল, ‘আপনি আমার ভরণ-পোষণের ব্যয়ভার গ্রহণ করছেন। আমি বর্তমানে শারীরিক ভাবে সুস্থ। আমাকে যদি কোনো কার্য সম্পাদন করতে হয় তবে নির্দেশ দেবেন।’

পালেবতের কথা শুনে উচ্ছল হেসে বলল, ‘বর্তমানে তার আবশ্যিকতা নেই। তোমার স্মৃতি দ্রুত ফিরে আসুক, এটাই কামনা করি।’

উচ্ছলের বক্তব্যে পালেবত কৃতজ্ঞচিত্তে মাথা ঝুঁকিয়ে আবারও তাকে প্রণাম জানাল। তার সঙ্গে এর অধিক বাক্যালাপের প্রয়োজন অনুভব করল না উচ্ছল। এরপর সে স্থান ত্যাগ করে ফিরে এসে দাঁড়াল তার কক্ষের সামনে। তবে নিজের অজান্তেই মাঝে মাঝে তার দৃষ্টি চলে যেতে লাগল পালেবতের দিকে।

হ্রদের দিকে চেয়ে আছে সেই নারী। সূর্যের শেষ আলোক ছটা তার মুখে এসে পড়েছে। তাকে দেখে বেশ মায়াই হল উচ্ছলের। নিশ্চয় মেয়েটার বাড়ির লোক তার অনুপস্থিতিতে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে, অথবা হয়তো বা দুর্ঘটনার কথা জানা নেই তাদের। তারা নিশ্চিন্তেই আছে। যেদিন জানবে সেদিন চমকিত হবে। আপাত দৃষ্টিতে এ রমণীকে শান্ত মনে হলেও নিশ্চয়ই আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়ায় প্রবল বেদনা সঞ্চারিত হচ্ছে যুবতীর মনে।

এরপর কিছু সময়ের মধ্যেই দিনের শেষ আলো ছড়িয়ে পাহাড় শ্রেণীর আড়ালে মুখ লোকাতে শুরু করলেন সূর্যদেব। ধীরে ধীরে আঁধার নামতে শুরু করল দল হ্রদের বুকে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে শীতলতাও। উচ্ছল দেখল নিজের কক্ষে ফিরে গেল পালেবত। গুঞ্জা এসে উচ্ছলের কক্ষে তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। বাইরে আঁধার নামার পর উচ্ছলও নিজ কক্ষে প্রবেশ করে বেশ বদল করল। জরিদার পোশাক নয়, যে অভিসারে সে যাচ্ছে তাতে গোপনীতার প্রয়োজন আছে তা অনুভব করে গাঢ় রঙের অতি সাধারণ আলখাল্লা পরিধান করল সে। মাথায় বাঁধল দীর্ঘ কাপড়ের বন্ধনী। যাতে তার শেষ প্রান্ত দিয়ে মুখমণ্ডল আবৃত করা যায়। তলোয়ারের বদলে সে কোমর বন্ধনীর আড়ালে ধারণ করল ক্ষুদ্র অথচ ধারালো ছুরিকা। তার পরিধান যখন সম্পন্ন হল তখন দল হ্রদে অন্ধকার নেমে গেছে।

উচ্ছল এরপর কিছু সময়ের মধ্যেই তার ভাসমান গৃহত্যাগ করে শিকারা নিয়ে ভেসে পড়ল দল হ্রদের বুকে। দল হ্রদের অধিবাসীরা সাধারণত সূর্যোদয়ের মুহূর্তেই নিদ্রাভঙ্গ হয়ে দৈনন্দিন কাজকর্ম শুরু করেন, আর অন্ধকার নামলেই আহার গ্রহণ করে নিদ্রার প্রস্তুতি শুরু করে। কারণ, রাত্রিকালে তাদের কোনো কাজ বা নিতান্ত প্রয়োজন বিনা কোথাও যাওয়ার থাকে না এই উপত্যকাতে।

বসন্ত বা গ্রীষ্মকালেও রাত্রি নামার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড শীত অনুভূত হয় দল হ্রদের বুকে। তাই অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গেই হ্রদের বুকে ভাসমান শিকারা নৌকোগুলো স্তব্ধ হয়ে গেছে। তারা কেউ আশ্রয় নিয়েছে হ্রদের পাড়ে অথবা ভাসমান গৃহগুলোর গায়ে।

অন্ধকারে নিমজ্জিত দল হ্রদ। কয়েকটা গৃহে শুধু বিন্দু বিন্দু আলো জ্বলছে। উচ্ছল আজন্মকাল ধরে বাস করে এই হ্রদের বুকে। এ হ্রদের প্রতিটা বাঁক, প্রতিটা ভাসমান বাগিচা, বাঁকের অবস্থান, সে স্থানে জলের গভীরতা সবই তার নখদর্পণে। তাই এই চন্দ্রবিহীন রাত্রিতেও তার শিকারা বাইতে তেমন সমস্যা হল না। জলে চাপ্পার মৃদু আঘাত করতে করতে উচ্ছল পৌঁছে গেল হ্রদের পাড়ে।

জনবসতিহীন নতিদীর্ঘ পর্বতমালা। কৃষ্ণপক্ষের রাত্রি হলেও অগণিত তারা যেন আকাশে ফুটে উঠতে শুরু করেছে। তাদের সম্মিলিত আলোতে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে চন্দ্র পর্বত। দল হ্রদের বাসিন্দা হওয়ার কারণে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ পর্বতগুলো বিশেষ ভাবে পরিচিত উচ্ছলের কাছে।

শিকারা থেকে পাড়ে নেমে একবার পশ্চাদ্‌ভাগে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল উচ্ছল। না, কেউ কোথাও নেই। পাহাড় আর দল হ্রদের মধ্যবর্তী স্থানে বেশ কয়েকটা খাত আছে, যা দিয়ে হিমবাহ থেকে সৃষ্ট বারিধারা এসে হ্রদে মেশে। আর কয়েকমাস পর থেকে এই জলখাতগুলো ধীরে ধীরে খরস্রোতা রূপ ধারণ করলেও বর্তমানে এই বসন্তের প্রারাম্ভে তা শুষ্ক।

শুভ্র প্রস্তর বিছানো সেই খাতগুলোকে অতিক্রম করতে খুব বেশি বেগ পেতে হল না উচ্ছলের। তা অতিক্রম করে পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে পাকদণ্ডী বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল সে। সে পথের দুপাশেও সারবদ্ধ সৈনিকের মতো ঋজু বৃক্ষের দল দাঁড়িয়ে আছে। তারা যেন জীবন্ত মানুষের মতো চেয়ে আছে উচ্ছলের দিকে। উচ্ছল যত ওপরে উঠতে লাগল, মেঘ মুক্ত আকাশের তারাগুলো তত যেন কাছে নেমে আসতে লাগল। আলো ফুটে উঠতে লাগল চারপাশে। উচ্ছল তার মাথার কাপড়ের পাগড়ির প্রান্ত দিয়ে মুখমণ্ডল আরও ভালো করে আচ্ছাদিত করে নিল। এক সময় সে উঠে এল নির্দিষ্ট স্থানে।

পাহাড়ের ঢালের গায়ে তিন দিক গাছে ছাওয়া একটা উন্মুক্ত জায়গা। আর চতুর্থ পাশে একটা বিশাল প্রাচীন গুহামুখ। এ গুহা সম্পর্কে এক প্রাচীন প্রবাদ প্রচলিত আছে। মহারাজ কণিষ্ক যখন কাশ্মীরের শাসক, তখন বৌদ্ধ সম্প্রদায়গুলির মধ্যে ধর্ম আসঞ্জন ও বিধি পালন সম্পর্কে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়। মহারাজ কণিষ্ক সেই সমস্যা নিরসনের জন্য শ্রীনগরে বৌদ্ধ মহাধর্ম সভা বা চতুর্থ বৌদ্ধ মহাসংগীত আহ্বান করেন বৌদ্ধ পণ্ডিত বসুমিত্রর সভাপতিত্বে। সভায় উপস্থিত কয়েকশো প্রতিনিধির মধ্যে যখন তুমুল বিতর্ক-বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়, তখন বসুমিত্র তা নিরসনের জন্য একটা শেষ চেষ্টা করেন। সভাকক্ষের বিবাদমান থেরবাদী ও সঙ্ঘের কিছু প্রতিনিধিকে নিয়ে চন্দ্রপর্বতের এই গুহায় এসে উপস্থিত হন আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভুত বিতর্কগুলির সুষ্ঠ সমাধানের জন্য। তিন দিন তিন রাত এ গুহাতে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত সেই সব বৌদ্ধ গোষ্ঠীপতি ও সঙ্ঘ প্রধানদের মধ্যে আলোচনা চলে। সম্রাট অশোক কনিষ্কের পূর্বে তৃতীয় বৌদ্ধসংগীতিতে বিবাদমান পথগুলির মধ্যে মীমাংসা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক ও তার প্রতিনিধি বসুমিত্র এই শেষ চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বিতর্কের সমাধান না হওয়াতে দুই পক্ষ দু’দলে বিভক্ত হয়ে গুহা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েন। দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে বৌদ্ধ ধর্ম।

নীচে নেমে ওই দুই গোষ্ঠী হীনযান ও মহাযান নামে ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীর বুকে। আর এর পরই নাকি মহাযান বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নেতৃত্বে বুদ্ধ মূর্তি পুজোর প্রচলন হয়। অনেক কাশ্মীরবাসীর মতো চন্দ্র পর্বতের এ কাহিনির কথা উচ্ছলও শুনেছে। যদিও এ ঘটনা সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা জানা নেই তার। তবে এই প্রাচীন গুহামুখের দিকে তাকিয়ে উচ্ছলের সে কাহিনির কথা মনে পড়ে গেল। গুহার ভেতর খেলা করছে নিকষ কালো অন্ধকার।

চারপাশে তাকাতে লাগল উচ্ছল। কিন্তু কেউ কোথাও চোখে পড়ল না তার। মহামন্ত্রী যশঙ্কর তো বলেছিলেন উপস্থিত থাকবেন এ স্থানে। কিন্তু কোথায় গেলেন তিনি? তারা ঘেরা আকাশের চাঁদোয়ার নীচে বেশ কিছুক্ষণ একলা দাঁড়িয়ে রইল উচ্ছল। এক সময় তার মনে হল অনিবার্য কারণবশত যশঙ্কর কি তাঁর পরিকল্পনা বাতিল করলেন?

গুহামুখের সামনে পদচারণা করল সে। ঠিক এ সময় গুহার অন্ধকারের ভেতর থেকে হঠাৎই আবির্ভূত হন একজন। তারও মুখমণ্ডল পাগড়ির কাপড়ে আবৃত। পরনে ঘোড়ার সহিসদের মতো খাটো ঝুলের পোশাক, হাঁটু পর্যন্ত আচ্ছাদিত চর্ম পাদুকা আর কোমরে গোঁজা আছে ঘোড়া চালনার জন্য একটা ছোট চাবুক। প্রথম দর্শনে তাকে অশ্বপরিচালক মনে হলেও তার কণ্ঠস্বরে তাঁকে চিনতে পারল উচ্ছল। তিনিই মহামন্ত্রী যশঙ্কর। ছদ্মবেশ ধারণ করে রয়েছেন। তিনি তাঁকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়া উচ্ছলের উদ্দেশে বললেন, ‘সভাসদ উচ্ছল, বিলম্বের জন্য মার্জনা করবেন। আসলে আমি গুহার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আপনাকে প্রত্যক্ষ করছিলাম। চলাফেরা দেখে আপনার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরই আত্মপ্রকাশ করলাম। মহারাজের চরের দল তো সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে তাই এই সাবধানতা অবলম্বন।’

এ কথার পর তিনি বললেন, ‘আসুন এবার গুহার অভ্যন্তরে প্রবেশ করি।’ উচ্ছল এরপর তাঁর পিছন পিছন গুহার ভিতর প্রবেশ করল। তারার আলো সেখানে প্রবেশ করছে না, গাঢ় অন্ধকার বিরাজমান। তা প্রত্যক্ষ করে উচ্ছল বলল, ‘চলব কী ভাবে। কিছুই তো দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না! কী ভীষণ অন্ধকার আর শীতলতা চারপাশে!

উচ্ছলের কথা শুনে মহামন্ত্রী বললেন, ‘অন্ধকারই অনেক সময় আলোর জন্ম দেয়। সে জন্যই এ স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। আপনি ডান পার্শ্বের দেওয়াল স্পর্শ করে আসুন।’

যশঙ্করের নির্দেশ পালন করে সেই দেওয়াল স্পর্শ করে আর অগ্রবর্তীকে অনুসরণ করে বেশ কয়েকটা বাঁক অতিক্রম করার পর ক্ষীণ একটা আলোক শিখা চোখে পড়ল তার। কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল সেই আলো। গুহার অভ্যন্তরে একটু প্রশস্ত স্থানে এসে থামল তারা। গুহা অবশ্য আরও গভীরে চলে গেছে। সে স্থানে একটি ছোট অগ্নিকুণ্ড ঘিরে বসেছিল বেশ কয়েকজন লোক। যশঙ্করের সঙ্গে অন্ধকারের গর্ভ থেকে উচ্ছল সে স্থানে আবির্ভূত হতেই তাদের পদশব্দে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল লোকগুলো। মুহূর্তের মধ্যে তাদের হাত চলে গেল নিজেদের কোমরবন্ধে অস্ত্রের খোঁজে। যশঙ্কর ঠিক সেই মুহূর্তে তার অবগুণ্ঠন সরিয়ে ফেললেন। তাকে চিনতে পেরে লোকগুলো আশ্বস্ত হয়ে আবার যে যার স্থানে উপবেশন করল।

মহামন্ত্রীর সঙ্গে উচ্ছল এসে দাঁড়াল অগ্নিকুণ্ডর সামনে। তারপর তার ইঙ্গিতে একটা প্রস্তর খণ্ডের ওপর বসল। সে স্থানে বসতেই তার দৃষ্টি গেল মাথার ওপরে ছাদের দিকে। বিন্দু বিন্দু আলো জ্বলছে! তবে কি এ স্থানের মাথার ওপরটা উন্মুক্ত? আকাশে তারার আলো? কিন্তু এরপরই সে ভালো করে তাকিয়ে বুঝতে পারল আলোক বিন্দুগুলো আকাশের তারা নয়, বিশাল বিশাল ডানাঅলা শৃগাল পক্ষী ঝুলছে ছাদ থেকে। অগ্নিকুণ্ডের আলো তাদের চোখে পড়ে অমন আলোক বিন্দুর সৃষ্টি হয়েছে। তাদের বাসস্থানে হঠাৎ উপস্থিত হবার কারণে চেয়ে আছে তারা। যদিও পালকহীন চর্ম ডানাঅলা চঞ্চুবিহীন এই শৃগাল পক্ষীরা গাছের ফল ভক্ষণ করে, তবুও কেউ কেউ এই প্রাণীদের রক্তপায়ী বলে মনে করে। তাদের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর উচ্ছল দৃষ্টিপাত করল অগ্নিকুণ্ড ঘিরে বসে থাকা লোকগুলোর দিকে। তাদের কারো পরনে কৃষকের পোশাক, কারো সহিস বা মেষপালকের মতো, কর্ণিরথ বা ডুলি বাহকের মতো, কারো পোশাক আবার শিকারার পণ্যদ্রব্য বিক্রতাদের মতো। তবে তাদের সকলের মুখমণ্ডলই উচ্ছলের নিজের মুখমণ্ডলের মতোই পাগড়ির কাপড় বা অন্য কোনো আবরণ দ্বারা আচ্ছাদিত। পাগড়ির আড়াল থেকে শুধু তাদের সতর্ক চোখগুলো জেগে আছে। তারা চেয়ে আছে মহামন্ত্রীর দিকে।

যদিও যশঙ্করের নিজের মুখের আচ্ছাদন উন্মুক্ত, তবুও সভা শুরুর আগে তিনি বললেন, ‘আপনাদের কারো মুখমণ্ডল উন্মোচনের প্রয়োজন নেই, আপাতত আপনারা পরস্পরের কাছে অপরিচিতই থাকুন। কাউকে অবিশ্বাস নয়, কিন্তু নিজেদের নিরাপত্তার জন্যই এই প্রাথমিক অবস্থায় আমাদের কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। বর্তমানে একমাত্র আমিই আপনাদের পরিচয় সম্পর্কে অবগত থাকি। আর আপনারা আমার সম্পর্কে। ভবিষ্যতে এক সঙ্গে এই কঠিন পথে চলতে চলতে যখন আপনাদের মধ্যে পারস্পারিক বিশ্বাস আর নির্ভরতা প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন আর আপনাদের এই অবগুণ্ঠন আর ছদ্মবেশ ধারণের প্রয়োজন হবে না নিজেদের মধ্যে।’

তার কথা শুনে অবগুণ্ঠনধারীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করল। শুধু তাদের মধ্যে একজন প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু আপনি যে অবগুণ্ঠনহীন।’

কথাটা শুনে মহামন্ত্রী যশঙ্কর মৃদু হেসে বললেন, ‘যে কাজের জন্য আমরা সমবেত হয়েছি, সে কাজের জন্য কোনো একজনকে তো বাড়তি ঝুঁকি নিতেই হবে। নইলে সে অন্যদের একত্রিত করবে কীভাবে। তাছাড়া আমি বৃদ্ধ হয়েছি, পরিবার বলতেও আমার তেমন কেউ নেই। আজ আর আমি মৃত্যুভয় বা কোনো কঠিন দণ্ডলাভের ভয় করি না। আমার চিন্তার বিষয় আপনাদের নিরাপত্তা বিধান করা। এবার তবে সভার কাজ শুরু করা যাক?’

উপস্থিত ব্যক্তিরা বললেন, ‘হ্যাঁ, শুরু করুন।’

কিছু সময়ের নিস্তব্ধতা। তারপর মহামন্ত্রী যশঙ্কর বলতে শুরু করলেন, আপনারা সকলেই হয়তো জানেন বা অনুমান করতে পারছেন আমরা কেন এই অমানিশীথে মিলিত হয়েছি। কারণ অমানিশীর অন্ধকারের মতোই অন্ধকার আজ গ্রাস করেছে আমাদের এই ফুলে ঘেরা উপত্যকা, ভূস্বর্গ এই দেশকে। এ স্বৰ্গ আজ মহারাজ ললিতাপীড়ের দুঃশাসনে নরকে পরিণত হয়েছে। ভূস্বর্গ নয়, ভূনরক! কাশ্মীরে অতীতে ধনলোভী, মদ্যপেয়ী বা বেশ্যা সংশ্রবকারী নৃপতি ইতিপূর্বেও কেউ কেউ এসেছেন। আমরা তোরামনের মতো ক্ষমতালোভী নৃপতির কাহিনি শুনেছি, দুর্লববর্ধনের মতো কামাতুর নৃপতির গল্প শুনেছি, আমরা বয়ঃবৃদ্ধরা কেউ কেউ মহারাজ মুক্তাপীড়ের ক্রোধ, হিংস্রতাও প্রত্যক্ষ করেছি। পূর্বতন মহারাজও যে রিপুর প্রভাব মুক্ত ছিলেন তা কখনোই নয়। কিন্তু এরা প্রত্যেকেই দোষে গুনে মানুষ ছিলেন। সিংহাসন আরোহনের পর এঁরা যেমন তাদের ভোগ-লালসা চরিতার্থ করেছেন, তেমনই রাজ্য শাসন বা প্রজাদের দিকে তাদের কিঞ্চিৎ হলেও দৃষ্টি ছিল এবং তাদের আচার-আচরণে একটা সীমারেখা ছিল। তারা মদিরাবিলাসী ছিলেন, কিন্তু মদিরার প্রভাব সব সময় তাদের নিয়ন্ত্রণ করত না। তাহলে মদ্যপেয়সী মুক্তাপীড় তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পারতেন না। নৃপতি তোরামন একাধারে ছিলেন সম্পদলোভী আবার প্রজাপালকও। দুর্লববর্ধনেরও বেশ্যাপ্রীতি ছিল, কিন্তু তিনি কখনোই তাদের কাউকে তাঁর রাজসভায় আসন দেননি বা রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হতে দেননি। কিন্তু বর্তমান মহারাজ সব কিছুর সীমা লঙ্ঘন করে ফেলেছেন। তিনি এবং তাঁর গণিকাত্রয়ীর হাতে আমাদের সবার সম্মানই লাঞ্ছিত। সর্বোপরি কাশ্মীরের জন সাধারণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত।

মহারাজের ইচ্ছাপূরণের জন্য যে কোনো মানুষের জীবনে যে কোনো দুর্বিপাক, যে কোনো সময় নেমে আসতে পারে। ধনী বা নির্ধন, শৈব কি বৌদ্ধ, সভাসদ কি সাধারণ নাগরিক সবার জীবন আজ প্রবল দুর্যোগের মধ্যে। আর নারী হলে তো কথাই নেই। আমাদের সকলের স্ত্রী-কন্যা-ভগিনীরা মহারাজের নাম শুনলেই মুর্চ্ছিতা হয়ে পড়েন, কখনো তাঁর ভোগ লালসার শিকার হতে হবে বলে! চারপাশে শুধু ব্যভিচার, হিংস্রতা আর এই গুহার থেকেও গাঢ় অন্ধকার বিরাজমান। আমরা সবাই এই দমবন্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাই, তাই তো?’

একটানা কথাগুলো বলে সমবেত অবগুণ্ঠনধারীদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে থামলেন মহামন্ত্রী। সবাই মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি প্রকাশ করে বলল, ‘হ্যাঁ, চাই।’ উচ্ছলও মৃদুস্বরে একই কথা বলল।

উপস্থিত একজন এরপর বললেন, ‘হ্যাঁ, সে জন্যেই তো আপনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ স্থানে উপস্থিত হয়েছি বিপদের সম্ভাবনা মাথায় নিয়েও। এই কাশ্মীরের বুকে একদা জন্ম নিয়েছিলেন তাঞ্জিন-এর মতো প্রজা হিতৈষী নৃপতি। যিনি দুর্ভিক্ষের সময় নিজের সব কিছু প্রজাদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার পরও ক্ষুধার্তদের ক্রন্দনধ্বনি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন!

এ দেশেই জন্ম নিয়েছিলেন তৎপূর্বে জলৌকার মতো প্রজাপালক নৃপতি। যিনি প্রজাদের অভাব-অভিযোগ অনুসন্ধান ও তার সমাধানের জন্য ছদ্মবেশ ধারণ করে ঘুরে বেড়াতেন।

এ দেশের সিংহাসনেই একদিন অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন মহারাজ প্রবর সেন, যিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে গড়ে তুলেছিলেন হর্ম্য প্রাসাদকানন শোভিত এই প্রবরপুর বা শ্রীনগর। মৃগরাও যেখানে নিশ্চিন্তে বিচরণ করতে পারত! ভাবতে বিস্ময় লাগে, সেই কাশ্মীরের সিংহাসনে কী ভাবে আরোহণ করলেন বর্তমান মহারাজের মতো রাক্ষস সদৃশ নৃপতি? এই ভয়ঙ্কর নরমেধ শাসনের অবসান ঘটাতে হবে আমাদের। প্রতিষ্ঠিত করতে হবে কাশ্মীরবাসীর নিরাপত্তা।’ লোকটার কণ্ঠস্বর শ্রবণ করে তা যেন কিছুটা পরিচিত মনে হল উচ্ছলের। সে অনুমান করল, এই বক্তা হয়তো তারই মতো মহারাজের কোনো সভাসদ বা মন্ত্রী হতে পারেন! তার কথাতেও একই ভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল উপস্থিত ব্যক্তিবর্গরা।

এর পর একজন বললেন, ‘রাজসভাতে, মন্ত্রীপরিষদে এমনকী কেউ নেই যিনি মহারাজকে সৎ কার্যে নিয়োজিত করতে পারেন? আর যদি তা নাও পারেন তবে অন্তত তাঁর নিষ্ঠুরতা, প্রজা নিপীড়ন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন? যাতে তিনি প্রজাপালনে মনোযোগী না হলেও অন্তত প্রজাদের উৎপীড়ন না করেন?’

এ ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে অপর একজন বললেন, ‘তেমন কেউ এ দেশে থাকেন বলে মনে হয় না। ললিতাপীড় এখন সর্বপ্রকার শুভ চিন্তার ঊর্ধ্বে। সুরা আর বেশ্যারা গ্রাস করে নিয়েছে তাঁর সমস্ত চিন্তাভাবনাকে। তিনি এখন চেতনারহিত এক ব্যক্তি। বেশ্যারাই তাঁর মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রক। নইলে মন্ত্রী সুষেনকে অমন নির্দেশ তিনি দিতে পারতেন না। ঘটনাটা যখনই মনে পড়ে তখনই সারা শরীর যেন ঘৃণা, আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। মহারাজকে কেউ যদি তাঁর বর্তমান আচরণ থেকে নিভৃত করার চেষ্টা করেন তবে তার পরিণাম মন্ত্রী সুষেনের মতো অথবা তার থেকেও ভয়ঙ্কর কিছু হবে বলে মনে হয়। তাই সে চেষ্টা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।’

‘যদি আমরা সম্মিলিতভাবে তাঁর কাছে গিয়ে আমাদের মনোভাবের কথা জানাই? তাঁকে রাজধর্ম পালনের কথা বলি?’ প্রশ্ন করলেন আর একজন।

মহামন্ত্রী যশঙ্কর আবারও মুখ খুললেন। তিনি বললেন, ‘বর্তমানে যে পরিস্থিতি তাতে সে প্রচেষ্টায় কাজ হবে বলে মনে হয় না। বরং মহারাজ চিহ্নিত করে ফেলবেন কারা তাঁর মতের বিরুদ্ধাচরণ করছেন। আমাদের এতজনকে এক সঙ্গে হয়তো তিনি দণ্ড দেবেন না। কিন্তু গুপ্তচর বা গুপ্তঘাতক নিয়োজিত করা হবে আমাদের পিছনে। নানান কৌশলে এক এক করে হত্যা করা হবে আমাদের। ভবিষ্যতে সমস্ত পরিকল্পনা রচনার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।’

‘তবে এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ লাভের উপায় কী?’ প্রশ্ন করলেন একজন।

কয়েক মুহূর্তর নিস্তব্ধতা। তারপর মহামন্ত্রী যশঙ্কর জবাব দিলেন, ‘সিংহাসনচ্যুত করতে হবে, হত্যা করতে হবে ললিতাপীড়কে।’

তার এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই মাথার ওপর হঠাৎই প্রচণ্ড চটপট শব্দ শুরু হল। সেই শব্দ আর যশঙ্করের বক্তব্য শুনে চমকে উঠল উচ্ছল! শৃগালপক্ষীর ডানা ঝাপটানোর শব্দ! গুহার ছাদ থেকে হঠাৎই তারা নেমে এসে অগ্নিকুণ্ড ঘিরে বসে থাকা উচ্ছলের মাথার ওপর উড়তে শুরু করল। পালকহীন চামড়ার কী বিশাল বিশাল ডানা তাদের। সবাই চেয়ে রইল তাদের দিকে। কিছু সময় ধরে উচ্ছলদের মাথার ওপর প্রাণীগুলো ওড়াউড়ি করে, শেষ পর্যন্ত সে স্থান ত্যাগ করে বাইরে যাওয়ার সুড়ঙ্গের দিকে মিলিয়ে গেল।

এ ঘটনার ফলে কিছু সময় ছেদ পড়ল আলোচনায়। তারপর মহামন্ত্রী যশঙ্কর আবার শান্ত স্বরে বললেন, হ্যাঁ, আমি ভেবে দেখেছি, এ ব্যতীত বিকল্প কোনো পথ নেই। হত্যা করতে হবে মহারাজকে।’

যশঙ্করের কথা শুনে একজন বলে উঠলেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, তাঁকে হত্যাই একমাত্র পথ। তবেই অভিশাপমুক্ত হবে এই উপত্যকা।’

উপস্থিত আরও কয়েকজন বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, হত্যা করতে হবে মহারাজকে, নচেৎ ভবিষ্যতে আমাদের প্রত্যেকেরই জীবন সংশয় হবে।’

উচ্ছল অনুমান করল সভায় উপস্থিত অধিকাংশ ব্যক্তিই মহামন্ত্রীর মতোই সমর্থক। উচ্ছলকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে যশঙ্কর বললেন, ‘আপনার বক্তব্য কী?’

উচ্ছল শুধু বলল, ‘আমি চাই এ রাজ্যের শান্তি ফিরুক। সমস্ত অপশাসনের অবসান হোক।’ যশঙ্কর এরপর সভার উদ্দেশে বললেন, ‘তাহলে তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্তই গ্রহণ করলাম আমরা।’ সমবেত অবগুণ্ঠনধারীরা বললেন, ‘হ্যাঁ, এই সিদ্ধান্তই গৃহীত হল।’

এরপর একজন বললেন, ‘কিন্তু কী কৌশলে আমাদের সঙ্কল্প পূরণ হবে? মহারাজ তো সব সময় তাঁর দেহরক্ষী পরিবৃত হয়ে থাকেন। আর তাঁর অন্দরমহলে তো ওই তিন বেশ্যার অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা যায় না। সব থেকে বড় কথা, সে স্থানে দৈবাৎ প্রবেশের অনুমতি মিললেও অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। দ্বার রক্ষীরা পোশাক-পরিচ্ছদ অনুসন্ধান করে।’

কথাটা শুনে অপর একজন বললেন, ‘যদি গুপ্ত হত্যা করা যায়? এই যেমন বিষ প্রয়োগ করে হত্যা।’

এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম যে বক্তার গলা উচ্ছ্বলের পরিচিত মনে হয়েছিল, তিনি বললেন, ‘বিষ প্রয়োগ করে তাঁকে হত্যা করা কঠিন। তাঁর রন্ধন ক্রিয়া তত্ত্বাবধান করে বিটপী। তবুও ধরা যাক কোনো ভাবে রন্ধনশালাতে প্রবেশ করে তাঁর খাদ্যে অথবা তাঁর সোমরসের ভাণ্ডারে প্রবেশ করে তাতে বিষ প্রয়োগ করা হল। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ, মহারাজাকে খাদ্য বা পানীয় পরিবেশন করার আগে তা দাসীদের দিয়ে ভক্ষণ করানো হয়।’

এরপর কেউ প্রস্তাব দিলেন, ‘ললিতাপীড়কে তির নিক্ষেপ করে হত্যার কথা। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন, সেই তির যদি মহারাজের বক্ষ বিদীর্ণ না করতে পারে তবে কী হবে? দ্বিতীয় বার শর নিক্ষেপের সুযোগ তো পাওয়া যাবে না।

মহারাজকে হত্যার কৌশলের ব্যাপারে নানান জন নানান প্রস্তাব দিতে লাগল, কিন্তু সভার কাছে কোন প্রস্তাবই গ্রহণযোগ্য বা নিরাপদ বলে মনে হল না। বেশ কিছুক্ষণ ধরে নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা হলো, তারপর মহামন্ত্রী বললেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা সফল করার জন্য কোন হঠকারী সিদ্ধান্ত আমরা নেব না। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে গেলে পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মহারাজের নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে যারা থাকেন, যারা তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মধ্যে অবস্থান করেন, তাদের সঙ্গে সখ্য বাড়াতে হবে আমাদের। প্রয়োজনে তাদেরকে উৎকোচ বা অন্যকিছুর লোভ দেখিয়ে বশীভূত করতে হবে। তারপর তাঁদেরই মাধ্যমে ললিতাপীড়ের নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে কোথায় ছিদ্র আছে তার অনুসন্ধান করে সেই ছিদ্রপথে প্রবেশ করে আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে হবে। আর এর জন্য আমাদের ধৈর্য, সতর্কতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন। আশাকরি আপনাদের সকলের মধ্যেই এ গুণাবলী আছে।’

‘তাহলে আপাতত আমরা লৌহ বাসরঘরে ছিদ্রান্বেষণের কাজে অবতীর্ণ হই?’

মহামন্ত্রী যশঙ্কর বললেন, ‘ঠিক তাই। এটাই আপাতত আমাদের কাজ। আমি যোগাযোগ রক্ষা করব আপনাদের সঙ্গে। কোনো আলোর দিশা মিললে আমরা আবার একত্রিত হয়ে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করব।’ এ কথা বলে এদিনের মতো গুপ্ত বৈঠক সমাপ্ত করলেন মহামন্ত্রী যশঙ্কর।

চন্দ্র পর্বতের সেই নৈশ অভিযানের পর দেখতে দেখতে আরও দুই পক্ষকাল অর্থাৎ এক মাস সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। সময় যত বসন্ত বা গ্রীষ্মের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে লাগল ততই ধীরে ধীরে আবার উন্মোচিত হতে শুরু করল ভূস্বর্গের বাহ্যিক সৌন্দর্য। দল হ্রদের জল সম্পূর্ণ বরফ মুক্ত হয়ে তার তলদেশকে স্বচ্ছ করে তুলল, দেখা যেতে লাগল সন্তরণশীল মৎস্যকুল, পদ্মপাতারা শুরু করেছে আত্ম প্রকাশ। পাহাড়ের গায়ের হিমবাহগুলোও গলতে শুরু করেছে। যা আর কিছুদিনের মধ্যেই ওপর থেকে নেমে আসবে উচ্ছল ঝরনা হয়ে। নীচে নেমে যা রূপ নেবে স্রোতস্বিনীতে। পুষ্পপথ সহ পাহাড়ের উপর আত্ম প্রকাশ করতে শুরু করেছে বেদমুঙ্ক ফুলও।

উপত্যকায় বসন্তকালে বহু বৃক্ষেই আগে পুষ্প সঞ্চারিত হয় তারপর পত্র। তেমনই বরফযুক্ত বহু পত্রহীন বৃক্ষেই আত্মপ্রকাশ করছে ফুলের কুঁড়িরা। সব মিলিয়ে অতি মনোরম পরিবেশ দৃশ্যমান। দীর্ঘ দিন ধরে এই উপত্যকাতে বসন্ত সমাগমে বেশ কিছু উৎসবও পালিত হয়ে আসছে। তারও প্রস্তুতি শুরু করেছেন কেউ কেউ। তবে চারপাশের এই স্বর্গীয় পরিবেশ নগরবাসীর মনের আতঙ্ক বা মহারাজ ললিতাপীড়ের কালিমাকে দূর করতে পারেনি। তিনি সুরা-সম্ভোগে ব্যাপৃত। এই সময়কালের মধ্যে এক শ্রেষ্ঠীর সুন্দরী তনয়া অন্তর্হিত হয়েছে। অনেকের ধারণা তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ললিতাপীড়ের ‘স্বর্ণ সেবিকা’ বা স্বেচ্ছা সেবিকাদের প্রাকার বেষ্টিত বাসস্থানে, সাধারণের প্রবেশ সেখানে নিষিদ্ধ।

‘স্বর্ণ সেবিকা’ হওয়া কাশ্মীরের প্রাচীন রীতি। যে কুমারী কন্যা মহারাজকে দেবতাজ্ঞানে ভক্তি করে সংসার ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় মহারাজের সেবায় আত্মনিয়োগ করে তাদের বলা হয় স্বেচ্ছা সেবিকা।

মহারাজ প্রবর সেনের আমলে, তাঞ্জিন প্রমুখ প্রজাহিতৈষী নৃপতিদের সময়কালে সত্যি অনেক নারী তাঁদের দেবতাজ্ঞানে ভক্তি করে তাঁদের পাদপদ্মে নিজেদের সমর্পন করতেন। আর সেই সব প্রজাবৎসল নরপতিরাও তাদেরকে নিজেদের ভোগ্যবস্তু মনে না করে নানান ধরনের জনসেবায়, জনহিতকর কাজে নিয়োজিত করতেন। কারণ, প্রবর সেন বা তাঞ্জিনের মতো মহৎ নৃপতিরা মনে করতেন কেউ যদি জনসেবা করে তবে সেটাই হল প্রকৃতপক্ষে তাঁদেরকে সেবা করা। যে সময় নারীরা নিজেদের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অস্বীকার করে, মহারাজের নামে নিজেকে উৎসর্গ করে উপত্যকাবাসীর সেবা করার মহান কাজে নিয়োজিত থাকতেন বলে তাদের বলা হতো ‘স্বর্ণ সেবিকা’।

স্বর্ণের মতোই উজ্জ্বল, কলঙ্কময় ছিল তাঁদের জীবন। কিন্তু মহারাজ ললিতাপীড়ের আমলে স্বর্ণ সেবিকাদের অর্থ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তারা কেউ আর উপত্যকাবাসীর শুশ্রূষার কাজে নিয়োজিত হয় না। তারা হয়ে ওঠে মহারাজ ললিতাপীড়ের যৌন ক্ষুধা মেটাবার উপকরণ। এ হেন মহারাজের জন্য কোনো যুবতী যে স্বর্ণ সেবিকা হতে চাইবে না সেটাইতো স্বাভাবিক। কিন্তু ললিতাপীড় আর তাঁর অনুচররা স্বর্ণ সেবিকা সংগ্রহের জন্য এক কৌশল অবলম্বন করেন। গোপনে অপহরণ করে তাদের প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় স্বর্ণ সেবিকাদের জন্য নির্ধারিত বাসস্থানে। যে স্থানে মহারাজ ও তাঁর কতিপয় অনুচররা ব্যতিরেকে অন্য কারো প্রবেশের অধিকার নেই। সে স্থানে নিয়ে যাবার পর নানান প্রকার প্রলোভন বা ভীতি প্রদর্শন করা হয় ওই সব অপহৃতদের। প্রথা অনুসারে স্বর্ণ সেবিকাদের রাজসভাতে উপস্থিত হয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হয় যে তারা স্বেচ্ছায় মহারাজের চরণে নিজেকে সমর্পণ করে ‘স্বর্ণ সেবিকা’ হচ্ছে। প্রলোভনে না হলেও ভীতি প্রদর্শনের ফলে ওই সব অপহৃত হতভাগ্য নারীরা এরপর রাজসভায় দাঁড়িয়ে স্বীকার করতে বাধ্য হয় ‘মিথ্যা সত্য’। তাদের পরবর্তীকালে আর দেখা মেলে না। স্বর্ণ সেবিকাদের সুউচ্চ প্রাকার বেষ্টিত আবাসস্থানের অন্ধকারে ললিতাপীড়ের বিকৃত লালসার শিকার হয় বর্তমানে স্বর্ণ সেবিকারা। তাই সেই শ্রেষ্ঠী কন্যার অদৃশ্য হবার ঘটনাতে এ ধারণাই সঞ্চারিত হয়েছে অনেকের মনে।

শীতের সমাপ্তিতে প্রত্যাশা মতোই ভিনদেশী বণিকের দল নানাবিধ পণ্য সংগ্রহের আশাতে উপত্যকায় উপস্থিত হতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি বণিক দল এসে হাজির হয়েছে শ্রীনগরে। সঙ্গে তাদের অশ্ব, ভারবাহী অশ্বতর, গর্ধব ও অন্য জন্তু। যে কারণে উচ্ছলের কাজের পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজসভা সাঙ্গ করে প্রত্যহ তাকে কার্যালয়ে যেতে হয়। রাজকর্মচারীদের মাধ্যমে আগত বণিকদের বাসস্থান, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ইত্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। প্রত্যহ সকালে আহার গ্রহণ করার পর উচ্ছল তার হ্রদস্থিত গৃহ ত্যাগ করে নগরীর স্থলভাগে এসে উপস্থিত হয়। সব কাজ সম্পন্ন করে গৃহে ফিরতে কোনো কোনো দিন সূর্য ডুবে যায়। এ সময়কালের মধ্যে ডুঙ্গাতেই পালেবত বেশ কয়েকবার তার মুখোমুখি হয়েছে।

অতি সামান্যই বাক্যালাপ হয়েছে তাদের দুজনের মধ্যে। যে বাক্যালাপকে কুশল বিনিময়ই বলা যেতে পারে। মাসাধিক কাল অতিক্রান্ত হলেও এখনও স্মৃতি ফেরেনি তার। সময় এত দ্রুত অতিক্রান্ত হয়ে চলেছে যে পালেবতকে উদ্ধারের পর যে এতটা দিন অতিক্রান্ত হয়েছে তা খেয়ালও করেনি উচ্ছল। মহামন্ত্রী যশঙ্করের সঙ্গে উচ্ছলের প্রত্যহই রাজসভাতে দেখা হয়। কয়েকদিন তাঁর সঙ্গে কথাও হয়েছে উচ্ছলের। কিন্তু তা সবই রাজকার্য সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে। তার মধ্যে গোপনীয়তা কিছু ছিল না। মহামন্ত্রী তার সংকল্পর দিকে কতখানি অগ্রসর হয়েছেন তা জানা নেই উচ্ছলের। তবে যখনই তার সেই চন্দ্র পর্বতের গোপন সভার কথা মনে পড়ে তখনই উচ্ছল উত্তেজনা বোধ করে।

ভাঁড় কূপমণ্ডূকের সঙ্গেও রাজসভায় সাক্ষাৎ হয়েছে উচ্ছলের। সে নিজেই এসে হাজির হয়েছে উচ্ছলের কাছে এবং পূর্বের ন্যায় উচ্ছলকে তার গৃহে পদার্পণের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। উচ্ছলও নানান আছিলাতে সে সব আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করেছে। অর্থাৎ বলা যেতে পারে যে উচ্ছলের ব্যস্ততা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও তার চারপাশের সবকিছু পূর্বের মতোই আবর্তিত হচ্ছে।

মহারাজ ললিতাপীড় নিজের স্বার্থ সংক্রান্ত বিষয়ের বাইরে রাজ্যশাসন সংক্রান্ত বিষয়ে আগ্রহী নন। কিন্তু হঠাৎই তিনি একদিন মহামন্ত্রীকে বললেন, ‘শুনতে পাচ্ছি কয়েকটি দপ্তরে নাকি যথাযথভাবে রাজকর বা শুল্ক আদায় হচ্ছে না। ব্যয়েরও আধিক্য ঘটছে?’

মহামন্ত্রী যশঙ্করের কাছে এ ধরনের কোনো সংবাদ ছিল না। কোনো ক্ষেত্রে ব্যয়ের যদি আধিক্য ঘটে থাকে, তবে তা ঘটছে মহারাজের বিলাসব্যসন ও সেবায় নিয়োজিত দপ্তরের ক্ষেত্রেই। যা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করেন মহারাজ ললিতাপীড় বা তার তিন বেশ্যা। বিভিন্ন দপ্তর থেকে সে দপ্তরে নিয়মিত ভাবে অর্থ সরবারহ করা হয়ে থাকে। মহারাজের নিজস্ব ব্যয় তো বটেই, তার অবরুদ্ধদের, তিন প্রিয় বেশ্যা ও বেশ্যাকুলের, স্বর্ণ সেবিকাদের ভরণপোষনের ব্যয় নির্বাহ হয় মহারাজের সেবায় নিয়োজিত সেই ‘রাজা ও রাজপ্রাসাদ সম্বন্ধীয়’ এ দপ্তর থেকেই।

এ দপ্তরের ব্যয়ই সর্বাধিক, অথচ কোনো আয় নেই এই দপ্তরের। কিন্তু এ কথা তো মহারাজের মুখের ওপর স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায় না। তাতে নিশ্চিত বিপত্তির আশঙ্কা। কাজেই মহামন্ত্রী যশঙ্কর বললেন, ‘মহারাজের কাছে যখন সংবাদ পৌঁছেছে তখন তিনি নির্দেশ দিলে আমি বিভিন্ন দপ্তর বিভাগে এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাতে পারি।’

কাশ্মীর রাজ ললিতাপীড় বললেন, ‘হ্যাঁ, তাই করুন। দেখুন কোথাও কেউ রাজকর বা শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছে কিনা? কোথাও তা বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে কিনা তা খতিয়ে দেখুন। প্রয়োজনে বণিকদের শুল্ক বৃদ্ধি করুন। কোনো দপ্তরের এ কাজে যেন বিন্দুমাত্র শিথিলতা না থাকে।’

এ কথা শোনার পর বেশ্যা রতিমালা নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এ কাজে যদি কেউ শিথিলতা দেখায় বা রাজকর ফাঁকি দেয়, তবে তাকে কঠিন দণ্ড দেবেন মহারাজ।’

তার কথা শেষ হতেই ভাঁড় কূপমণ্ডূক মাথা নাচিয়ে ভাঁড়ামি করে ছড়া কেটে বলে উঠল, ‘কর ফাঁকি দিলে হবে দণ্ড, আলাদা হবে ধড়-মুণ্ড!’

উপস্থিত সভাসদদের মধ্যে অন্য কেউ ভাঁড়ের ভাঁড়ামিতে আমোদ উপভোগ না করলেও বেশ্যার দল হেসে উঠে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক ঠিক, আলাদা হবে ধড়-মুণ্ড!’

মহারাজ ললিতাপীড় এরপর তাঁর রাজকার্য সম্পর্কিত বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার পিছনে আসল উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলেন। তিনি বললেন, ‘আমি পুষ্পপথে একটি কানন সমৃদ্ধ প্রমোদ প্রাসাদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বসন্তে-গ্রীষ্মে, পুষ্পপথের মতো সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান এ দেশে দ্বিতীয় কোথাও নেই! বসন্তে আমি যেমন দল হ্রদে জলপ্রাসাদে কিছু কালের জন্য বিশ্রাম লাভ করতে যাই, তেমনই সে পর্বত প্রাসাদেও বসন্ত অতিবাহিত করব। ওই প্রাসাদ নির্মাণের জন্য প্রভূত পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে এবং তার জোগান যেন অব্যাহত থাকে। কিছু কালের মধ্যেই আমি ওই প্রাসাদ নির্মাণের কাজ আরম্ভ করাব।’

মহারাজ ললিতাপীড়ের কথা শুনে বেশ্যা মুক্তবেণী কপট আবেদনের ছলে বলল, ‘আমাকে ওই প্রমোদ প্রাসাদের এক কোণে স্থান দেবেন প্রভু?’

ও প্রমোদ প্রাসাদ তো মহারাজ নির্মাণ করতে চলেছেন সম্ভোগের জন্যই। সেখানে কি মুক্তবেণী ও তার অন্য দুই সহচরীকে স্থান না দিলে চলে? মুক্তবেণীর কথাতে হাসি ফুটে উঠল কামুক নৃপতি ললিতাপীড়ের ঠোঁটের কোণে।

ভাঁড় কূপমণ্ডূক আবার ছড়া কেটে বলে উঠল, ‘মহারাজের মনোরথে, প্রাসাদ হবে পুষ্পপথে। সাধু! সাধু!’

মহারাজ চেয়ে থাকেন তাদের মুখের দিকে। তাই অগ্রবর্তী আসনে উপস্থিত কিছু সভাসদকেও গলা মেলাতে হল, সাধু! সাধু! রবে।

মহামন্ত্রী যশঙ্কর মহারাজের উদ্দেশে বললেন, ‘আপনার অনুমতিক্রমে প্রতিটি বিভাগ দপ্তরকে জানিয়ে দিচ্ছি আমি কবে কোথায় পরিদর্শনে যাব।’

মহারাজ মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলেন তাঁর কথায়। এরপর তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন নৃত্যগীত দর্শনে।

সেদিন সভা শেষে মহামন্ত্রী প্রত্যেক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, সভাসদদের জানিয়ে দিলেন কবে কোন কার্যালয় পরিদর্শনে যাবেন তিনি। স্থির হল দুই দিবস পর তিনি উচ্ছলের কার্যালয়ে উপস্থিত হবেন। অন্যান্য দপ্তর-প্রধানদের মতো উচ্ছলকেও প্রকাশ্যে এ কথা জানিয়ে দিয়ে মহামন্ত্রী তাকে নির্দেশ দিলেন দপ্তরের হিসাব সংক্রান্ত নথিপত্র প্রস্তুত রাখার জন্য।

নির্দিষ্ট দিনে অশ্বপৃষ্ঠে কয়েকজন রক্ষী ও রাজকর্মচারীকে সঙ্গে নিয়ে উচ্ছলের কার্যালয়ে এসে উপস্থিত হলেন মহামন্ত্রী যশঙ্কর। উচ্ছল প্রস্তুত হয়েই ছিল। সে আর তার অধস্তন কর্মচারীরা পরিদর্শক ও তাঁর সঙ্গীদের যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করে দপ্তরে নিয়ে প্রবেশ করল। বেশ অনেকক্ষণ সময় ধরে মহামন্ত্রী ও তাঁর সঙ্গীরা প্রয়োজনীয় দলিল-দস্তাবেজ ও আয়-ব্যয়ের নথি পরীক্ষা করলেন ও সে সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বাক্যালাপও করলেন। এরপর মহামন্ত্রী দপ্তর প্রধান উচ্ছলের সঙ্গে নিভৃত বাক্যালাপের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন প্রয়োজনীয় সরকারি নির্দেশ প্রদানের জন্য। অতঃপর অন্য সব কর্মচারীরা সে কক্ষ ত্যাগ করলেন। রুদ্ধদ্বার কক্ষে মুখোমুখি বসল উচ্ছল আর মহামন্ত্রী।

উচ্ছলের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর মহামন্ত্রী চাপাস্বরে বললেন, ‘রাজসভাতে নিভৃতে বাক্যালাপের সুযোগ হয় না। গুপ্তচরের দল সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়, আমাকে অনুসরণ করে। আমার অনুমান চরবৃত্তির প্রকোপ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি নিশ্চিত, এই যে আমি আজ নিয়ে তিনদিন বিভিন্ন দপ্তর পরিদর্শন করে বেড়াছি, এক্ষেত্রেও আমার সঙ্গে আগত সঙ্গীদের মধ্যে কেউ না কেউ চরবৃত্তি করছে। আমি ইচ্ছাকৃত ভাবেই প্রত্যেক দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকদের সঙ্গে পরিদর্শন শেষে নিভৃতে কথা বলছি, যাতে আপনার মতো কারো সঙ্গে একান্তে কথা বললে চরেদের মনে সন্দেহ না জাগে। মহাজাতককে ধন্যবাদ তিনি এই সুযোগ করে দিলেন বলে।’ এ কথা বলে মৃদু হাসলেন বৃদ্ধ মহামন্ত্রী।

উচ্ছল একটু ইতস্তত করে এরপর তাকে প্রশ্ন করল, ‘ওই বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হল?’ যশঙ্কর বললেন, ‘চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে এখনও তেমন কিছু অগ্রগতি হয়নি। প্রধান সেনাপতি গড়ুর সহ বেশ কয়েকজন মহারাজ ঘনিষ্ঠর সঙ্গে কার্যোপলক্ষে সাক্ষাৎকালে কথা প্রসঙ্গে কৌশলে তাদের মনোভাব জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু মহারাজের প্রসঙ্গে কোনো কথা উঠলেই তাঁর থেকে প্রাপ্ত সুবিধার লোভ বশত বা ভয়ের কারণে সবাই নিশ্চুপ থাকছেন। সেদিনের সভাতে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরাও অনেকে চেষ্টা চালাচ্ছেন মহারাজ ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের। কিন্তু সেক্ষেত্রে এখনও তেমন কোনো আশার আলো মেলেনি। তবে আমাদের হাল ছাড়লে চলবে না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।’

এ কথা বলে যশঙ্কর তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার কাছে কোনো গূঢ় সংবাদ আছে নাকি?’

উচ্ছল বলল, ‘না, নেই। আপনি তো জানেনই আমি কিছুটা অন্তর্মুখী মানুষ। নিজে থেকে এগিয়ে এসে বাক্যালাপ না করলে আমার কথা বলতে কেমন যেন সংকোচ বোধহয় মন্ত্রী-সভাসদদের সঙ্গে। তা ছাড়া আমি মহারাজের সভাতে সম্ভবত কনিষ্ঠতম পার্ষদ। এই যে বিভাগের দায়িত্ব সামলাচ্ছি, একে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরও বলা যায় না। কাজেই নিতান্ত প্রয়োজন না হলে মন্ত্রী বা প্রধান সভাসদরা আমার সঙ্গে বাক্যালাপ করেন না।’

উচ্ছলের জবাব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর যশঙ্কর বললেন, ‘তা বটে। আচ্ছা, ভাঁড় কূপমণ্ডূককে দেখি মাঝে মাঝে আপনার সঙ্গে বাক্যালাপ করতে। ব্যাপারটা কী? কারো কারো অনুমান কূপমণ্ডূক নেহাতই ভাঁড় নয়, সে নাকি গুপ্তচরবৃত্তিও করে।

প্রশ্ন শুনে উচ্ছল এবার তার সম্পর্কে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলল মহামন্ত্রীকে। সে যে আকস্মিকভাবে কূপমণ্ডূকের গৃহে স্বল্প সময়ের জন্য আতিথ্য গ্রহণ করেছিল, কূপমণ্ডূক যে উচ্ছলের সঙ্গে মহামন্ত্রীর একান্তে বাক্যালাপের কারণ জানতে চেয়েছিল, সে যে বারংবার উচ্ছলকে তার গৃহে পুনর্বার যাবার জন্য অনুরোধ জানায়—এ সব কথাই উচ্ছল বিবৃত করল যশঙ্করের কাছে।

মহামন্ত্রী যশঙ্কর কথাগুলো শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘ভাঁড় কূপমণ্ডূক মহারাজের চর হোক বা না হোক এটা স্পষ্ট যে কূপমণ্ডূক আপনার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করছে। হতে পারে সে আপনার মাধ্যমে খবর সংগ্রহের চেষ্টায় আছে। আবার এও হতে পারে যে আপনার সঙ্গে তার কন্যার বিবাহ দিতে ইচ্ছুক। অনেকেই তাকে ঘৃণার চোখে দেখেন। তাছাড়া লোকটার কোনো বংশ কৌলিন্য নেই। স্বাভাবিক ভাবেই এ কারণে রাজসভার কোনো অভিজাত ব্যক্তি তার কন্যাকে স্ত্রী রূপে গ্রহণ করবে না। কূপমণ্ডূক যদি আপনাকে জামাতা রূপে পায় তবে তার পক্ষে এর চাইতে ভালো কিছু হবে না। তবে আপনাকে বারংবার নিজ গৃহে আমন্ত্রণ জানাবার পিছনে তার উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন সে মহারাজ ললিতাপীড়ের প্রিয় পাত্রদের মধ্যে একজন। ওই তিন বেশ্যাও তাকে বিশেষ ভাবে পছন্দ করে।

কূপমণ্ডূকের কাছে এমন অনেক তথ্য থাকতে পারে অথবা সে সংগ্রহ করতে পারে, যা সে অসতর্ক মুহূর্তে বলে ফেললে তা আমাদের কাজে আসতে পারে। অতএব...।’

যশঙ্করের না বলা কথাটা অনুমান করে উচ্ছল বলল, ‘অতএব কী? আপনি কি আমাকে চরের পিছনে চরবৃত্তি করার কথা বলছেন?’

প্রাজ্ঞ মহামন্ত্রী তাঁর শুভ্র শশ্রুমণ্ডিত গালে হাত বুলিয়ে বললেন; ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। তার সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠতা আমাদের কাজে আসতে পারে ভবিষ্যতে। আপনি কূপমণ্ডূকের আমন্ত্রণ গ্রহণ করুন।’

মহামন্ত্রীর কথা শুনে চুপ করে রইল উচ্ছল। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে যেন মৃদু উৎকণ্ঠা ফুটে উঠল যশঙ্করের মুখে। তিনি এরপর বললেন, ‘তবে আপনি যদি আমাদের পরিকল্পনা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চান তা রাখতে পারেন। একটাই শুধু অনুরোধ, সেদিন রাতে চন্দ্রপর্বতের সভার কথা কারো কাছে ব্যক্ত করবেন না। তাতে অনেকের প্রাণ সংশয় হবে। আমরা কেউই ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এই প্রচেষ্টায় সামিল হইনি। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য কাশ্মীর দেশের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেওয়া।’

মহামন্ত্রীর কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছল বলে উঠল, ‘না, না, ওসব চিন্তা আমি করছি না। করলে আপনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমি চন্দ্র পর্বতে উপস্থিত হতাম না। আমি শুধু ভাবছি কূপমণ্ডূক যদি স্পষ্টভাবে তার কন্যার সঙ্গে আমার বিবাহ প্রস্তাব দেয় তবে সে ক্ষেত্রে আমি তাকে কী জবাব দেব?’

উচ্ছলের জবাব শুনে যশঙ্করের মনের মৃদু শঙ্কা দূর হয়ে গেল। হাসি ফুটে উঠল বৃদ্ধের মুখে। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ সে সম্ভাবনা আছে। তেমন হলে আপনি তাকে কোনো জবাব দেবেন না। বলবেন যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আপনার কিছুটা সময় লাগবে।’

উচ্ছল বলল, ‘ঠিক আছে তবে তাই বলব।’

যশঙ্কর বললেন, ‘লোকটার বিশ্বাস অর্জনের জন্য প্রয়োজনে আপনি তার কাছে সম্রাট সম্পর্কে স্তুতি বাক্য বলবেন। তবে যে কথাই বলবেন তা সতর্কতার সঙ্গে বলবেন।’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘হ্যাঁ তাই করব। আমি আর দুই-একদিনের মধ্যেই কার্যালয় থেকে ফেরার সময় তার গৃহে গিয়ে উপস্থিত হব।’

মহামন্ত্রী এরপর বললেন, ‘আমি সুযোগ মতো এ সম্পর্কে আপনার থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে নেব। তবে এ কক্ষে এখন আর নিভৃত বাক্যালাপ উচিত হবে না। চরেদের মনে সন্দেহ জাগতে পারে। আর হ্যাঁ, আমি চলে যাওয়ার পর আপনি আপনাদের অধস্তন কর্মচারীদের নির্দেশ দেবেন যে কোনো ভাবে আপনার দপ্তরের আয় বৃদ্ধি করা যায় কিনা তা খতিয়ে দেখতে। আর যতদিন না বিদেশী বণিকদের কার্যকলাপ সমাপ্ত না হয় ততদিন যেন তারা কেউ কার্যালয়ে একদিনের জন্যও অনুপস্থিত না থাকে। যাতে তাদের ধারণা হয় এই নিভৃত আলোচনায় আমাদের দুজনের মধ্যে যত বাক্যালাপই হয়েছে তা সবই দপ্তর সংক্রান্ত বিষয়।’ এ কথা বলে কক্ষ ত্যাগ করার জন্য উঠে দাঁড়ালেন মহামন্ত্রী যশঙ্কর।

দল হ্রদের ভাসমান গৃহের নিভৃত কক্ষেই একটা একটা করে দিন কেটে চলেছে পালেবতের। কত দিন হল সে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। ব্যস্ততার কারণে উচ্ছল তার হিসাব না রাখলেও সে হিসাব পালেবতের কাছে আছে।

বসন্ত এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ আরও সুন্দরী আরও কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে দল হ্রদ। গবাক্ষ দিয়ে অথবা কক্ষর বাইরে গিয়ে দাঁড়ালে তার চোখে পড়ে হ্রদের বুকে জীবনের চাঞ্চল্য। নানা পণ্য নিয়ে শিকারা নৌকাগুলো ঘুরে বেড়ায় বড় বড় ভাসমান গৃহ ডুঙ্গা, চকোয়ারি বা বাগানের চারপাশে। উচ্ছলের জলগৃহতেও আসে তারা। কখনও আসে ফুল নিয়ে, কখনও ফল বা অন্য সামগ্রী নিয়ে। প্রয়োজনে তাদের থেকে সে সব বস্তু ক্রয় করে বৃদ্ধা গুঞ্জা। মাসের প্রারাম্ভে তার হাতে অর্থ তুলে দেয় উচ্ছল। তা দিয়ে গুঞ্জা নিত্য নৈমিত্তিক কার্য সম্পাদন করে।

পালেবত কখনও কখনও তমোরি দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখতে পায় শিকারা নিয়ে দল হ্রদের বুকে প্রমোদ বিহাররত তারই বয়সি তরুণীদের। কলহাস্যে মুখরিত হয়ে দলবদ্ধ ভাবে রাজহংসীদের মতো ভেসে বেড়ায় তারা।

কখনও কখনও তারা পালেবতকে দেখতে পেয়ে তার উদ্দেশে হস্ত উত্থিত করে। পালেবতও একই ভাবে প্রত্যুত্তর দেয় তাদের। কিন্তু তার সমবয়সি এই সব যুবতীদের দেখে বড় একা লাগে পালেবতের। মনে হয় সে-ও যদি ওই সব নারীদের মতো ভেসে যেতে পারত, কলহাস্যে যোগ দিতে পারত, তবে বড় ভালো হতো। কিন্তু এ স্থানে তার কেউ পরিচিত নেই, এমনকী কথা বলারও লোক নেই একমাত্র গুঞ্জা ছাড়া। এক এক সময় পালেবতের মনে হয়, সে গিয়ে বাক্যালাপ করে তার আশ্রয়দাতার সঙ্গে। কিন্তু সঙ্কোচ জাগে পাছে তিনি বিরক্ত হন। তাই কক্ষের বাইরে কখনও যদি উচ্ছলের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়, তবে শুধু সে তফাতে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানায় তার আশ্রয়দাতাকে। দুজনের কোনো বাক্যালাপ হয় না। এ ভাবেই একটার পর একটা দিন অতিবাহিত হচ্ছে পালেবতের।

উচ্ছলের বৃদ্ধ পরিচারিকা গুঞ্জা প্রায় নিয়ম করেই প্রতিদিন পালেবতের কাছে জানতে চায় তার স্মৃতিশক্তি ফিরেছে কিনা? আর পালেবত প্রত্যেকদিনই একই জবাব দেয়, ‘না, ফেরেনি।’ জবাব শুনে মুহূর্তের জন্য যেন বৃদ্ধার বলিরেখায়ময় মুখমণ্ডলের কুঞ্চন বৃদ্ধি পায়। অবশ্য এরপরই বৃদ্ধা হাসিমুখে প্রশ্ন করে, এ স্থানে থাকতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা? আর এ ক্ষেত্রে পালেবত রোজ একই জবাব দেয়, না, হচ্ছে না। তবে একটা একটা করে দিন যত এগোচ্ছে ততই পালেবতের মনে একটা শঙ্কা হচ্ছে—তিন পক্ষকাল সময় অতিবাহিত হয়ে গেল সে এখানে আছে। থাকা মানে তো শুধু আশ্রয়দান নয় পালেবতের আহার, বসনের ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে তার আশ্রয়দাতাকে। এদিকে পালেবতের স্মৃতিশক্তি ফিরছে না। এবার উচ্ছল তাকে তার এই গৃহ ত্যাগ করতে বলবেন না তো? তেমন হলে পালেবত এই অপরিচিত স্থানে কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবে?

কিছু সময় পূর্বে সূর্যোদয় হয়েছে। পাহাড়ের মাথা থেকে ভোরের প্রথম আলো এসে ছড়িয়ে পড়েছে দল হ্রদের বুকে। আর তার স্পর্শে জেগে উঠেছে হ্রদের বাসিন্দারা। ভ্রমরের গুঞ্জনের মতো মৃদু কোলাহল ভেসে আসছে তরণীগুলো থেকে। শিকারা নৌকাগুলোও কেউ ভাসতে শুরু করেছে পণ্য নিয়ে, আবার কেউ কার্য উপলক্ষ্যে রওনা হয়েছে তার ক্ষুদ্র জলযান নিয়ে।

এই সরোবর শুধু মানুষ নয়, রাজহংস ইত্যাদি জলপক্ষীদেরও বাসস্থান। রাত্রিকালে তারা আশ্রয় নেয় কোনো পরিত্যক্ত ভাসমান গৃহতে অথবা হ্রদের পাড়ের ঝোপে ঝাড়ে, গাছে। আর আলো ফুটলেই তারা হ্রদের বুকে ভেসে বেড়ায় খাদ্য অন্বেষণে। নিদ্রাভঙ্গ হওয়ার পর পালেবত পালঙ্কে উঠে বসে উন্মুক্ত তমোরি দিয়ে চেয়েছিল দিনের প্রথম আলোতে উদ্ভাসিত হ্রদের দিকে।

একদল রাজহংস তাদের গৃহের প্রায় গা ঘেঁষেই কলরব করতে করতে অন্য দিকে চলে গেল। তাদের দেখে ভারি ভালো লাগল পালেবতের। কিন্তু এর পরক্ষণেই তার মনে হল এই গৃহে আরও একটা দিন পিছনে ফেলে এল সে। তার আশ্রয়দাতা আর কতদিন এভাবে তাকে আশ্রয় দেবেন কে জানে? এ কথা মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটা উৎকণ্ঠা গ্রাস করতে শুরু করল পালেবতের মনকে। সে ভাবতে লাগল তার দেখা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে।

কিছু সময় পর গুঞ্জা তার কক্ষে প্রবেশ করল প্রাতরাশের পাত্র নিয়ে। রোজই সে আসে তা নিয়ে। তাকে দেখে বিছানা থেকে গাত্রত্থান করে নেমে দাঁড়াল পালেবত। বৃদ্ধা যথাস্থানে খাদ্যের পাত্রটা রেখে পালেবতের দিকে তাকাল। পালেবতের মনে হল বৃদ্ধা এবার তাকে তার স্মৃতিশক্তি ফিরেছে কিনা সে ব্যাপারে জানতে চাইবে। কারণ, সাধারণত সে এ সময়ই প্রশ্নটা করে থাকে তাকে।

তবে কিন্তু গুঞ্জা তাকে আজ এই প্রশ্ন করল না। সে বলল, ‘আজ তোমাকে বেশ কিছু সময়ের জন্য একলা থাকতে হবে এ গৃহে।’

মৃদু বিস্মিত হয়ে জানতে চাইল, ‘কেন?’

বৃদ্ধ বলল, ‘এ গৃহের অধিকারী, মহারাজের পার্ষদ প্রতিদিনের মতো কার্যোপলক্ষে এ গৃহ ত্যাগ করার কিছু পরে আমাকেও ভূ-ভাগের দিকেই যেতে হবে। ওদিকের বিপণী থেকে তৈজসপত্রসহ কিছু সামগ্রী ক্রয় করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।’

বৃদ্ধাকে ইতিপূর্বে কোনো দিন এই ভাসমান গৃহ ত্যাগ করতে দেখেনি পালেবত। মৃদু বিস্মিত হয়ে সে জানতে চাইল, ‘তুমি সে স্থানে যাবে কী ভাবে?’

বৃদ্ধা জবাব দিল, ‘আগে তো নিজেই শিকারা নিয়ে পাড়ে যাওয়া-আসা করতাম। কিন্তু এখন বয়স বাড়ছে। জলে চাপপা মারতে হাঁফ ধরে যায়। একটা শিকারাকে আসতে বলেছি। মুদ্রার বিনিময়ে সেই আমাকে পাড়ে পৌঁছে দেবে।’

এ কথা বলে গুঞ্জা কক্ষ ত্যাগ করতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় পালেবত নিজের অজান্তেই যেন বলে ফেলল, ‘আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে চলো না?’

বৃদ্ধা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ‘কেউ আমার সঙ্গে গেলে তো ভালোই হয়। কিন্তু এ গৃহের অধিকারির অনুমতি বিনা আমি তো তোমাকে কোথাও নিয়ে যেতে পারব না।’

‘তিনি কি অনুমতি দেবেন?’ প্রশ্ন করল পালেবত।

‘তা আমি জানি না।’ এ কথা বলে ধীর পায়ে কক্ষ ত্যাগ করল বৃদ্ধা পরিচারিকা গুঞ্জা।

চারপাশে শুধু জল আর জল! তা যতই সুন্দর হোক না কেন তা যেন আর ভালো লাগছে না পালেবতের। তার মনে হল, কতদিন হয়ে গেল পা রাখেনি শক্ত মাটিতে! বেশ কিছু সময় সে কক্ষেই রইল, তারপর প্রাতরাশ সাঙ্গ করে কক্ষের বাইরে এসে দাঁড়াল।

ঠিক সেই সময় উচ্ছলও নিজের কক্ষ ত্যাগ করে কক্ষগুলোকে আবৃত করে থাকা অলিন্দে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। মহামন্ত্রী যশঙ্করের পরামর্শ মতো উচ্ছল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে আজ কার্যালয় থেকে ফেরার সময় ভাঁড় কূপমণ্ডূকের গৃহে গমন করবে। দেখা যাক লোকটা কী কথা বলে? এ কথা ভাবার সঙ্গে সঙ্গে জলের দিকে তাকিয়ে সে ভাবছিল, মহামন্ত্রী যশঙ্কর যে দুরূহ কাজ সম্পাদন করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছেন, তার শেষ পরিণতি কী? সত্যি কি তিনি ভূস্বর্গের বাসিন্দাদের মহারাজের লালসা থেকে মুক্ত করতে পারবেন? নাকি মহারাজের রোষানলে ভষ্মীভূত হবেন? এ ক্ষেত্রে উচ্ছলেরও বিপদের সম্ভাবনা যথেষ্ট।

কক্ষের বাইরে এসে পালেবতও তাকিয়ে ছিল জলের দিকে। হঠাৎ সে খেয়াল করল অলিন্দের শেষ প্রান্তে তারই মতো জলের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছেন রাজপার্ষদ। তাকে দেখেই পালেবতের মনে হল, যদি তিনি অনুমতি দেন তাকে গুঞ্জার সঙ্গে বাইরে যাবার জন্য? দেখাই যাক না তাঁর কাছে একবার আবেদন করে? এ কথা ভাবার পর সাহসে ভর করে উচ্ছলের সঙ্গে বাক্যালাপের জন্য তার দিকে এগোল পালেবত।

পালেবতের পদশব্দ শুনে ফিরে তাকাল উচ্ছল। সে তাকাতেই পালেবত তার কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে পড়ে বুকের কাছে হাত জোড় করে তাকে নমস্কার জানাল।

সকালের ঝলমলে আলো এসে পড়েছে পালেবতের মুখে। সেই আলোতে পালেবতের গণ্ডদেশ পালেবত ফলের মতোই উজ্জ্বল রক্তিম দেখাচ্ছে। সেই শান্ত-স্নিগ্ধ মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে তাকে দেখে ভালো লাগল উচ্ছলের। সে তাকে আগের মতোই প্রশ্ন করল,

‘কিছু স্মরণে এল তোমার?’

পালেবত জবাব দিল, ‘না, কিছুই স্মরণে আসছে না আমার।’

উচ্ছল এরপর তার কাছে জানতে চাইল, ‘তুমি এ গৃহে কতদিন বসবাস করছ বলো তো?’

একটু চুপ করে থেকে পালেবত জবাব দিল, ‘তিন পক্ষকাল অতিক্রম হয়েছে।’

এতটা সময় যে পালেবত তার এখানে রয়েছে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি উচ্ছল। স্বগোতক্তির স্বরে সে বলে উঠল, ‘তিন পক্ষকাল! তোমাকে নিয়ে আমি কী করি বলো তো!’

কথাটা শুনে পালেবত শঙ্কিত হয়ে বলে উঠল, ‘আমাকে আপনি আপনার আশ্রয় থেকে এখনই বিতাড়িত করবেন না। এ স্থান আমার সম্পূর্ণ অচেনা। আমি চেষ্টা করছি আমার স্মৃতিশক্তি ফিরিয়ে আনার। তা এলেই আমি চলে যাব।’

পালেবতের কথা শুনে তাকে আশ্বস্ত করে উচ্ছল বলল, ‘না, আমি তোমাকে বিতাড়নের কথা ভাবছি না। এত দিন হয়ে গেল! আমি ভাবছি তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার পরিজনেরা নিশ্চয়ই ভীষণ চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে পড়েছেন। কোনো ভাবে যদি তোমাকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যেত...’

গৃহকর্তার কথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করে পালেবত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার দিকে তাকিয়ে উচ্ছল ভাবতে লাগল, এ যুবতীর স্মৃতিশক্তি ফিরিয়ে আনার অন্য কোন উপায় আছে কি? রাজবৈদ্য সুষেন যদি আজ জীবিত থাকতেন তবে তিনি হয়তো এই নারীর স্মৃতি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারতেন। সর্ব রোগের চিকিৎসা জানা ছিল ওই ভেষজ চিকিৎসকের। এমনকী একবার কালনাগিনী দংশনে নিশ্চিত মৃত্যুপথ যাত্রীকেও তিনি বাঁচিয়ে তুলেছিলেন। এরপর এ প্রসঙ্গে আরও একজনের কথা মনে পড়ল উচ্ছলের। তাঁরও নাকি নানান গুপ্তবিদ্যা জানা আছে। তবে সে চিকিৎসক নয় যাদুকরী বা খর্খোদ। নাম মাতঙ্গী। পাহাড়ের এক গুহাতে বাস করে। লোকে বলে সে নাকি প্রেত সিদ্ধা! হস্তরেখা বিচার করে সে মানুষের অতীত, ভবিষ্যৎ বলতে পারে, মানুষকে বশ মানাতে পারে, নানান রোগের চিকিৎসা করতে পারে।

কামরূপ দেশ থেকে আগত এই যাদুকরীর ওপর মহারাজ ললিতাপীড়ও খুব আস্থাবান। শোনা যায় ললিতাপীড় যে কাশ্মীরের সিংহাসনে বসবেন তা নাকি তার হস্তরেখা বিচার করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল ওই যাদুকরী! তবে তার নামে নানান অপকথনও শোনা যায়। সে নাকি খর্খোদ বিদ্যা অর্থাৎ ডাকিনী বিদ্যার সাহায্যে মানুষের ক্ষতি করে, সুন্দরী যুবতীদের বশ করে মহারাজের কাছে ভেট পাঠায়। এ হেন খর্খোদ যাদুকরীর কাছে পালেবতকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া অথবা তার অতীত জানার জন্য উপস্থিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট বিপদের ঝুঁকি আছে বলেই মনে হয় উচ্ছলের।

এ সব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎই উচ্ছলের মনে হল, বাক্যালাপ শেষ হলেও পালেবত তখনও তার সামনে একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন? তাই সে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি আর কিছু বলবে?’

প্রশ্ন শুনে মুহূর্ত খানেক চুপ করে থেকে পালেবত বলল, ‘গুঞ্জামাতা কিছু সামগ্রী ক্রয় করার জন্য নগরীর অভ্যন্তরে যাবে। আপনি অনুমতি দিলে আমি তার সঙ্গে যেতে পারি।’

এ আবেদন শুনে উচ্ছলের প্রথমে মনে হল এই যুবতীর এ গৃহ ত্যাগ না করাই ভালো। তার কোনো পরিচিতি নেই নগরীতে। মহারাজের অনুচরেরা তো যুবতী নারী সংগ্ৰহের জন্য ঘুরে বেড়ায় চার দিকে। সুযোগ পেলেই সুন্দরী নারীদের অপহরণ করে বা ভুলিয়ে নিয়ে যায় স্বর্ণ সেবিকা হওয়ার জন্য। এ কথা ভাবার পর উচ্ছলের আবার অন্য ভাবনাও মাথায় এল, স্থান পরিবর্তন করলে কি পালেবতের স্মৃতিশক্তি ফিরতে পারে? হয়তো পরিচিত এমন কিছু সে দেখতে পেল যাতে তার স্মৃতিশক্তি ফিরে এল? স্মৃতি ভ্রষ্টাদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটে বলে কোথায় যেন একবার শুনেছিল উচ্ছল। এরপর আরও একটা কথা মনে হল তার—বসন্ত ঋতু শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেমন ভিনদেশি বণিকরা উপত্যকায় উঠে আসে, ঠিক তেমনই পর্বতমালার ওপার থেকে ভেষজ লতা ও বিক্রেতারাও পর্বত অতিক্রম করে নীচে নেমে আসে। হয়তো তাদের মধ্যে কেউ চিনতে পারল পালেবতকে। অথবা পালেবত তাদেরকে? এমনকী এও হতে পারে যে পালেবতের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হওয়া সঙ্গীরা সেই তুষার ধসে মৃত্যু লাভ করেনি। তারা বিপর্যয় অতিক্রম করে নগরীতে এসেই আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেল পালেবতের? এ সব কথা চিন্তা করে কী জবাব দেবে তা নিয়ে দোলাচালের সৃষ্টি হল উচ্ছলের মনে।

পালেবত অপলক দৃষ্টিতে উচ্ছলের দিকে চেয়ে থাকে তার উত্তরের প্রত্যাশায়। আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত এই সুন্দর সকালে পালেবতের সুন্দর মুখমণ্ডলকে মলিন দেখার ইচ্ছা হল না উচ্ছলের। সে বলল, ‘ঠিক আছে তুমি যাও। তবে কোন অবস্থাতেই গুঞ্জার সঙ্গ ত্যাগ করবে না। এ নগরী তোমার কাছে অপরিচিত। গুঞ্জার সঙ্গ ত্যাগে তোমার বিপদের সম্ভাবনা আছে।’

উচ্ছলের কথা শুনে হাসি ফুটে উঠল পালেবতের মুখে। এই প্রথম তাকে হাসতে দেখল উচ্ছল। হাসি মুখে আরও যেন সুন্দর হয়ে উঠল তার মুখমণ্ডল। রক্ষাকর্তাকে আবারও প্রণাম জানিয়ে পালেবত দ্রুত এগোল সংবাদটা গুঞ্জাকে জানাবার জন্য। আর উচ্ছলও এরপর নিজের কক্ষে ফিরে প্রস্তুত হতে শুরু করল বহির্গমনের জন্য। কিছু সময়ের মধ্যেই সে জলগৃহ ত্যাগ করে শিকারা নিয়ে রওনা হয়ে গেল পাড়ের দিকে।

উচ্ছল প্রতিদিনের মতোই এদিনও নির্দিষ্ট সময়ে রাজসভাতে প্রবেশ করল। কিন্তু সেখানে প্রবেশ করেই চারপাশে সে শৈথিল্যের ভাব লক্ষ করল। কারণটাও এরপর জানতে পারল সে। মহারাজের নিদ্রাভঙ্গ হয়নি। তাঁর আরও বিশ্রামের প্রয়োজন। সে হেতু তিনি আজ রাজসভাতে পদার্পণ করবেন না।

এমন মাঝে মাঝে হয়। অপরিমেয় সম্ভোগের জন্য রাত্রি জাগরণের ফলে অথবা অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে ললিতাপীড়ের মধ্যাহ্নের পূর্বে নিদ্রাভঙ্গ হয় না, রাজসভা বসে না। কিছুক্ষণ আগেই এ সংবাদ এসে পৌঁছেছে সভাকক্ষে এবং তা শ্রবণ করে অনেকের মুখমণ্ডলেই স্বস্তির ভাব জেগে উঠেছে।

উচ্ছলও এ সংবাদ শুনে খুশি হল। তাহলে সে দ্রুত তার কার্যালয়ে পৌঁছতে পারবে। তারপর সেখানকার প্রয়োজনীয় কর্তব্য সম্পন্ন করে কূপমণ্ডূকের গৃহের উদ্দেশে রওনা হতে পারবে।

সে একবার চারদিকে তাকিয়ে কূপমণ্ডূককে দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু তার দর্শন মিলল না। সাধারণত সে মহারাজের পিছন পিছনই সভায় প্রবেশ করে, মহারাজ সভাতে উপস্থিত না হলে সে-ও উপস্থিত হয় না।

তবে রাজসভাতেই মহামন্ত্রী যশঙ্করের সঙ্গে একবার উচ্ছলের দৃষ্টি বিনিময় হল। উচ্ছল চোখের ইশারায় তাকে বুঝিয়ে দিল তাঁর ইচ্ছানুসারেই সে কার্য সম্পাদন করতে চলেছে। উচ্ছল এরপর সভাগৃহ ত্যাগ করে প্রতিদিনের মতোই অশ্বপৃষ্ঠে রওনা হল তার কার্যালয়ের দিকে।

ঠিক এই সময়ই এক শিকারা নৌকা এসে উপস্থিত হল উচ্ছলের বাসস্থানের গায়ে। এক যুবতী নিয়ে এসেছে সেই তরণী। তার পরনে রঙিন ঝলমলে পোশাক। কপালে টায়রা, হস্তে বাজুবন্ধ, কণ্ঠে সোনার সুতোয় গাঁথা নানা রঙের উজ্জ্বল পাথরের মালা, ইত্যাদি বহুবিধ অলঙ্কারে শোভিতা সে।

উচ্ছলের বৃদ্ধা পরিচারিকা গুঞ্জা আর পালেবত প্রস্তুত হয়েই ছিল। সেই রমণী বাসগৃহের গায়ে নৌকা লাগতেই তাতে নেমে পড়ল তারা। তরণী বাহিকা ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার এই ভাসমান গৃহে এসেছে গুঞ্জাকে পারাপার করানোর জন্য। কিন্তু ইতিপূর্বে পালেবত বা অন্য কোনো রমণীকে সে এ গৃহে দেখেনি। তাই তাকে দেখে বেশ কৌতূহলী হল সে।

শিকারার মধ্যভাগে গুঞ্জার সঙ্গে পালেবত উপবেশন করার পর জলে চাপপা মারতে লাগল সেই রমণী। জল কেটে এগিয়ে যেতে শুরু করল তার নৌকা।

পালেবত যেদিন শিকারা করে ভাসমান গৃহে উপস্থিত হয়েছিল, সেদিন সে ছিল প্রায় অচৈতন্য অবস্থায়। দল হ্রদের সৌন্দর্য চাক্ষুষ করা তার হয়নি। ভাসমান গৃহ থেকে চারপাশের দৃশ্য প্রথমে কিছুদিন তার ভালো লেগেছিল ঠিকই, কিন্তু একই দৃশ্য প্রতিদিন দেখতে দেখতে তার মনে যে একঘেয়েমির সৃষ্টি করেছিল, শিকারাতে ওঠার পর তা যেন উধাও হয়ে গেল। দল হ্রদের সৌন্দর্যকে নতুন ভাবে উপভোগ করতে লাগল সে।

তার চারপাশে কত ধরনের নতুন নতুন ভাসমান গৃহ, কত ধরনের তরণি, তার মধ্যে দিয়ে চাপপার আঘাতে ভেসে চলেছে তাদের শিকারা। হ্রদের জল যেন স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ! হ্রদের একদম তলদেশ পর্যন্ত দৃশ্যমান। কত ধরনের জলজ গুল্ম আন্দোলিত হচ্ছে সেখানে। আর তার মধ্যে খেলে বেড়াচ্ছে নানান আকৃতির নানান বর্ণের মৎস্যকুল।

শিকারা বাহিকা কৌতূহলবশত তাকে এক সময় প্রশ্ন করল, ‘তোমার নাম কী? তোমাকে তো আগে দেখিনি!’

সে জবাব দিল, ‘আমার নাম পালেবত।’

দীর্ঘদিন ধরে উচ্ছলের মাতৃসমা, বৃদ্ধা গুঞ্জা তার ভালো-মন্দ সব কিছুরই খেয়াল রাখে। যুবতী এক নারীকে অবিবাহিত যুবক উচ্ছল পথ থেকে তুলে এনে মানবিকতা বোধের কারণে তার গৃহে নিঃস্বার্থ ভাবে স্থান দিয়েছে। পালেবত তার সত্য পরিচয় দান করলে তটিনী বাহিকা পালেবতকে রাজার সভাসদের রক্ষিতা বলে ভেবে নেয়, পাছে উচ্ছলের কোনো মর্যাদাহানী হয় তাই গুঞ্জা এরপর সেই যুবতীর উদ্দেশে বলল, ‘পালেবত আমার ভগ্নী কন্যা। পাহাড়ের এক গ্রামে থাকে। দেশের রাজধানী শ্রীনগর আর দল হ্রদ দর্শন করবে বলে আমার কাছে এসেছে।’

বৃদ্ধার কথা শুনে পালেবতও অনুমান করল, এসময় অন্য লোকের সামনে নিজের বর্তমান পরিচয় দেওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।

গুঞ্জার কথার জবাবে তটিনী বাহিকা বলল, ‘প্রয়োজন বোধ করলে আমিই ওকে সঙ্গে করে নগরী দর্শন করাতে পারি। দল হ্রদ শুধু নয়, রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রাসাদ, মন্দির, উদ্যান, মৃগদ্বার সবই আমি চিনি। ও যখন আমাদের নগরীতে অতিথি, তখন আমাকে কোনো পারিশ্রমিক দিতে হবে না ভ্রমণ করাবার জন্য।’

বৃদ্ধা গুঞ্জা এ কথা শুনে কোনো মন্তব্য না করলেও সমবয়সি এই যুবতীর কথা শুনে ভালো লাগল পালেবতের। সে তাকে প্রশ্ন করল, ‘তোমার নাম কী?’ যুবতী হেসে জবাব দিল, আমার নাম বাঁদরী। আমি বাঁদরীর মতো চঞ্চল বলে আমার এই নাম। সবাই আমাকে চেনে। মহারাজের রাজসভার অনেকেই বাঁদরীর এই শিকারাতে ওঠে। এমনকী...।’ এরপর কী যেন একটা কথা বলতে গিয়েও থেমে গেল বাঁদরী নামের যুবতী।

চাপপা নামের এই দাঁড়ের ফলাগুলো গঠনগত ভাবে দেখতে বেশ সুন্দর হয়। অনেকটা স্ফীত করতলের মতো। কেউ কেউ আবার একে হৃদয় আকৃতিরও বলে থাকে। বাঁদরীর শিকারা নৌকার চাপপার ফলাটা রক্তিম বর্ণে রঞ্জিত। অর্থাৎ পালেবত ফলের মতো রং তার। ভেজা দাঁড়টা যখন জলের বাইরে উঠে আসছে তখন তার রক্তিম ফলাটা ঝলমলিয়ে উঠছে। দেখতে খুব সুন্দর লাগছে জলের বুকে চাপ্পার আন্দোলন। সেদিকে তাকিয়ে পালেবত এক সময় বলল, ‘তোমার চাপ্পাটা খুব সুন্দর দেখতে তো!’

বাঁদরী হেসে বলল, ‘আমার শিকারাতে সবকিছুই সুন্দর। তুমি কোনোদিন শিকারা চালিয়েছ? চাপ্পা ঠেলেছ জলে?’

পালেবত জবাব দিল, ‘না, চালাইনি।’

উত্তর শুনে বাঁদরী বলল, ‘তোমার চাপ্পা বাইতে ইচ্ছা করছে? এই দেখো আমি কেমন ভাবে ঘা দিচ্ছি জলে?’

বাঁদরীর শিকারা চালানো দেখে, জলে চাপ্পার ঘা দেওয়া দেখে পালেবতেরও মনের মধ্যে ইচ্ছা জাগছিল এমন ভাবে জলের বুকে চাপ্পার ঘা দেবার। শুধু বাঁদরীই নয়, পুরুষ শিকারা চালকরা তো আছেই আশেপাশে বেশ কিছু, নানান বয়সি নারীও বাঁদরীর মতনই চাপ্পাবাইছে। আর তা দেখেই চাপ্পা বাইবার ইচ্ছা হচ্ছিল পালেবতের মনেও। বাঁদরীর প্রস্তাব শুনে তবুও সে একটু ইতস্তত করতে লাগল। বাঁদরী এরপর সম্ভবত পালেবতের মনের ভাব বুঝতে পেরে নিজের স্থান ছেড়ে
কিছুটা সরে এসে চাপ্পাটা পালেবতের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘নাও চালাও। ভয় নেই আমি পাশে আছি। আর শিকারা নৌকা সহজে ডোবে না।’

এতক্ষণ ধরে বাঁদরী নামের যুবতী যেভাবে চাপ্পা দিয়ে জলের বুকে আঘাত হানছিল তা অনুসরণ করে পালেবতও চাপ্পার ঘা দিতে শুরু করল জলে। পালেবত অপটু হাতে চাপ্পার ঘা দিলেও কয়েক মুহূর্ত পর সে বুঝতে পারল বাঁদরীর মতো দ্রুত গতিতে না হলেও তার চাপপার আঘাতেও ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে শিকারা।

ব্যাপারটাতে বেশ আমোদ উপভোগ করল পালেবত। তার চাপ্পা বাওয়া দেখে হাসছে বাঁদরী। এই সমবয়সি নারীর আচরণে তাকেও বেশ ভালো লেগে গেল পালেবতের। হঠাৎ সে খেয়াল করল গুঞ্জা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। পালাবতের এই চপলতা তাকে রুষ্ট করে তুলছে কিনা বুঝে উঠতে পারল না সে। পালেবত এরপর চাপ্পাটা ফিরিয়ে দিল বাঁদরীর হাতে। নিজের জায়গাতে ফিরে গিয়ে আবার দাঁড় বাইতে শুরু করল বাঁদরী। এরপর হঠাৎ সে পালেবতের উদ্দেশে কিছু দূরে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওই দেখো মহারাজের প্রাসাদ।’

বাঁদরীর দৃষ্টি অনুসরণ করে পালেবত দেখতে পেল কিছুটা দূরে বিশালাকৃতির এক জলযান বা গৃহকে। অপরূপ কারুকার্যমণ্ডিত সোনালি বর্ণে রঞ্জিত ত্রিতল এক ভাসমান গৃহ। হঠাৎ তার দিকে তাকালে মনে হবে স্তম্ভ, খিলান, অলিন্দ সমৃদ্ধ একটা সত্যিকারের প্রাসাদই জেগে উঠেছে হ্রদের বুক থেকে। নানান ধরনের বেশ কিছু নৌকাও রয়েছে সেই ভাসমান প্রাসাদের গায়ে। প্রাসাদের অলিন্দে কয়েকজন অস্ত্রধারীও দণ্ডায়মান। নিশান উড়ছে জল প্রাসাদের মাথায়। সেই নিশান আর প্রাসাদের আকৃতি দেখে পালেবতও বুঝতে পারল, মহারাজের এ প্রাসাদেরই কিয়দংশ তাদের বাসস্থান থেকে দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে।

সেদিকে তাকিয়ে পালেবত বিস্মিতভাবে বলে উঠল ‘কী বিশাল জল প্রাসাদ!’

চাপ্পা চালাতে চালাতে বাঁদরী বলল, ‘হ্যাঁ, ওর ভিতর সভাকক্ষ, নৃত্যকক্ষ, মহারাজ ও তাঁর রানিদের কক্ষ, সেবিকাদের কক্ষ সব কিছুই আছে। সৈনিকরা ওই প্রাসাদের কাছে অন্য কোনো নৌকাকে ঘেঁষতে দেয় না। যে নৌকাগুলো ওর গায়ে লাগানো আছে, সেগুলো সব মহারাজ বা রাজকর্মচারীদের নৌকা। তবে আমি ওই প্রাসাদের কাছে যাই। সৈনিকরা আমাকে কিছু বলে না। এমনকী আমি কয়েকবার ওই প্রাসাদের ভিতরেও ঢুকেছি।’

পালেবত জানতে চাইল, ‘কাউকে যখন ওই প্রাসাদের কাছে যেতে দেয় না তখন তুমি ও স্থানে যাও কী ভাবে? প্রাসাদে প্রবেশ করো কী ভাবে?’

বাঁদরী জবাব দিল, ‘ওই যে বললাম না, মহারাজের সভায় যাঁরা থাকেন তাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। এই শিকারা করে তাদের অনেককেই ওখানে পৌঁছে দিয়েছি। তাদেরই একজনের সঙ্গে ওই প্রাসাদে প্রবেশ করেছিলাম আমি।’

চারপাশের জলযান, ভাসমান গৃহের মধ্যে দিয়ে বাঁদরীর শিকারা এরপর সোজা এগিয়ে চলল পাড়ের দিকে। সার সার ঋজু চিনার বৃক্ষ দাঁড়িয়ে থাকে পাড়ের গায়ে। নৌকা যত সেদিকে এগোতে লাগল তত সেই গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে পালেবতের চোখে পড়তে লাগল নগরীর মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাসাদ, দেবালয় ইত্যাদি। হ্রদের কিনারে প্রচুর জনসমাগম। অগুণতি শিকারা ও অন্যান্য জলযান দাঁড়িয়ে রয়েছে সেখানে।

মানুষের কোলাহল আর অশ্বের চিৎকার ভেসে আসছে পাড় থেকে। যে স্থানে অন্য শিকারা নৌকাগুলো অবস্থান করছে, হ্রদের কিনারা ঘেঁষে সেদিকেই এগোতে লাগল বাঁদরীর নৌকা। ওটাই শিকারা রাখার স্থান ও পাড়ে ওঠার পথ। হঠাৎ পালেবতের নাসারন্ধ্রে সুগন্ধ প্রবেশ করল। সে চেয়ে দেখল পাড়ের যে কিনারা ঘেঁষে শিকারা এগোচ্ছে সেস্থানে পাড়ের গায়ে থরে থরে উজ্জ্বল হলুদ, লাল, বেগুনি বর্ণের পুষ্প ফুটে আছে। কয়েকজন রমণী ঘাসে বোনা ঝুড়ি কাঁখে পুষ্প চয়নও করছে। ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে সে স্থান থেকেই। পালেবত বলল, ‘ওই পুষ্পর কী নাম? খুব সুন্দর সুবাস তো!’

বাঁদরী জবাব দিল, ‘এই হ্রদের নামেই ওদের নাম—দল। এ পুষ্প একমাত্র এই দল হ্রদের কিনারেই জন্মায়। পুষ্প সংগ্রহ করা হচ্ছে বিক্রয়ের জন্য।’

এ কথা বলার পর একটু থেমে সে বলল, ‘তোমরা যখন বিপণীতে ক্রয় করতে যাবে, তখন আমি তোমার জন্য এ স্থানে এসে কিছু পুষ্প সংগ্রহ করে রাখব।’

পালেবত খুশি হল তার কথা শুনে।

বাঁদরীর শিকারা এসে পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট স্থানে। নৌকা ত্যাগ করে কাঠের সাঁকো বেয়ে গুঞ্জাকে অনুসরণ করে পালেবতও পাড়ে উঠে পড়ল। চারিপাশে প্রচুর লোকজন। নৌকা বাহক, অশ্বচালক থেকে শুরু করে ফুল-ফল বিক্রেতা। হ্রদের কিনারা থেকে সড়ক এগিয়েছে নগরীর অভ্যন্তরে। অশ্ব, ডুলি, কাষ্ঠ শকট চলাচল করছে সে পথে। গুঞ্জা, পালেবতকে সতর্ক করে দিয়ে বলল, ‘আমার সঙ্গে সঙ্গে চলবে। একবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আমাকে আর খুঁজে পাবে না। তখন ফিরতে পারবে না।’

পালেবত বলল, ‘আচ্ছা। আমি সতর্ক থাকব।’

এরপর তারা দুজন রওনা হল নগরীর অভ্যন্তরে বিপণীশ্রেণির উদ্দেশে।

রওনা হল উচ্ছলও। কার্যালয়ে কিছু সময় অতিবাহিত করার পর অশ্বপৃষ্ঠে রওনা হল সে। তার প্রাথমিক গন্তব্য ভাঁড় কূপমণ্ডূকের গৃহ। সেস্থানে কিছু সময় অতিবাহিত করে তারপর সে গৃহে ফিরবে এমনই তার ইচ্ছা।

নগরীর জনকোলাহলময় পথ ত্যাগ করে সে সেই গাছে ঘেরা পল্লীপথ ধরল। সূর্য ঠিক যখন মাথার ওপর তখন সে উপস্থিত হল ভাঁড় কূপমণ্ডূকের গৃহের সামনে। গৃহের দ্বার বন্ধ থাকলেও গৃহের পশ্চাৎভাগ থেকে ভেসে আসা হ্রেষা রব শুনে উচ্ছল অনুমান করল গৃহকর্তা গৃহেই অবস্থান করছেন। ঘোড়া থেকে নেমে তার লাগাম গৃহের সামনে খোঁটায় বেঁধে সে ঘা দিল কপাটে।

কয়েকবার আঘাত হানার পরই দ্বার উন্মোচিত হল। উচ্ছলকে সামনে দেখে মুহূর্তের জন্য যেন বিস্ময় ভাব ফুটে উঠল ভাঁড়ের চোখেমুখে। তারপরই সে নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘আসুন, আসুন। ভিতরে প্রবেশ করুন। আমার কী সৌভাগ্য মহারাজের সভাসদ আমার গৃহে এসে উপস্থিত হয়েছেন।’

উচ্ছলও মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘আজ তো মহারাজ রাজসভায় উপস্থিত হলেন না। সভা হল না। আমি তাই দ্রুত আমার কার্যালয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম। সেখানে কাজ সম্পন্ন হবার পর এ পথ দিয়ে ফেরার সময় আমার মনে হল আপনি বারংবার আপনার গৃহে আসার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানান, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে আপনার আমন্ত্রণ রক্ষা সম্ভব হয় না। কিন্তু আজ যখন কিছুটা সময় পাওয়া গেল তখন একবার আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যাই। এমন আচম্বিতে উপস্থিত হওয়াতে আপনাকে বিব্রত করছি না তো?’

কূপমণ্ডূক কথাটা শোনামাত্রই বলে উঠল, ‘না, না, আপনি এ কী কথা বলছেন! এ গৃহকে আপনি নিজের গৃহই মনে করবেন। কোনো সংকোচ বোধ করবেন না। দয়া করে গৃহে প্রবেশ করুন।’

কূপমণ্ডূকের গৃহে প্রবেশ করে তাকে অনুসরণ করে উচ্ছল গিয়ে উপস্থিত হল আগের দিনের সেই অতিথি আপ্যায়ন কক্ষে। এ কক্ষ যেন আজ আরও সুন্দর ভাবে সাজানো মনে হল। অসাধারণ সুন্দর সুতোর কাজ করা আচ্ছাদন দিয়ে আবৃত করা হয়েছে বসার আসন ও চৌপায়গুলোকে। গালিচা বিছানো হয়েছে মেঝেতে। দেওয়ালের গায়ে টাঙানো হয়েছে বেশ কয়েকটা ফুলের স্তবক, তাদের সৌরভ ছড়িয়ে আছে সারা কক্ষে। বেশ কয়েকটি নতুন নৈস্বর্গিক চিত্রও এনে রাখা হয়েছে কক্ষের নানান স্থানে।

উচ্ছল আর গৃহকর্তা দুজনেই সে কক্ষে মুখোমুখি উপবেশন করার পর চারপাশে তাকিয়ে উচ্ছল বলে উঠল, ‘অপূর্ব কক্ষ সজ্জা!’

কথাটা শুনে কূপমণ্ডূক বলল, ‘সবই রূপবতী করেছে। গৃহসজ্জা ওর হাতেই করা। গৃহের প্রতিটা ব্যাপারেই তীক্ষ্ম দৃষ্টি ওর। সব কাজই ও নিজ হাতে সুচারু ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। বিবাহের পর আমার কন্যা যে গৃহে গমন করবে সে গৃহও এমন সাজিয়ে রাখবে সে। গৃহস্বামীর তার সম্পর্কে কোনো অভিযোগ থাকবে না।’ উচ্ছল বলল, ‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়। আপনার কন্যা সত্যিই গুণবতী।’

আবারও হাসি ফুটে উঠল ভাঁড় কূপমণ্ডূকের মুখে। তবে এ হাসি অন্যকে হাসাবার জন্য ভাঁড়ের কৃত্রিম হাসি নয়, কন্যার প্রশংসা শুনে পিতার মুখের নির্মল আনন্দের হাসি। উচ্ছলের অন্তত সেটাই মনে হল তাকে দেখে।

কূপমণ্ডূক এরপর বলল, ‘আপনি যখন মধ্যাহ্নে এসে উপস্থিত হয়েছেন তখন কিন্তু আজ আপনাকে এ গৃহে মধ্যাহ্ন ভোজ সাঙ্গ করেই যেতে হবে। আমি অবিবাহিত কন্যা নিয়ে বাস করি। মধ্যাহ্নে কোনো অতিথি তণ্ডুল গ্রহণ না করলে গৃহের অকল্যাণ হয়। আপনার চিন্তার কোনো কারণ নেই, ইতিমধ্যেই রূপবতী রন্ধনের কাজ সম্পন্ন করে ফেলেছে।

কূপমণ্ডূকের কথা শুনে উচ্ছল একটু ইতস্তত করে বলল, ‘আচ্ছা তাই হবে।’

দাসী এসে দাঁড়িয়ে ছিল দ্বার প্রান্তে। কূপমণ্ডূক তাকে নির্দেশ দিল অতিথি সৎকারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে।

এর পর কথা শুরু হল উচ্ছল আর কূপমণ্ডূকের মধ্যে। অতি সাধারণ সব কথোপকথন। কূপমণ্ডূক যেমন বলল তার অতীত জীবন নিয়ে। তার জন্ম হয়েছিল বৈষ্ণদেবী পর্বতের এক গ্রামে। বাল্যকালে সে পিতামাতা হারিয়ে এক অনাথালয়ে স্থান পায়। কিন্তু তার এই কদর্য চেহারার জন্য তাকে যারপরনাই নির্যাতন করত।

শেষ পর্যন্ত সে আশ্রয় নেয়, বৈষ্ণদেবী মন্দিরে। সেখানেই সে ভিক্ষাবৃত্তি করত, কখনও কখনও নানান রকম বিকৃত মুখভঙ্গি করে, বানরের মতো লম্ফঝম্ফ করে তীর্থযাত্রীদের মনোরঞ্জন করত। একদিন সেখানে তার পরিচয় হয় শ্রীনগর থেকে আগত এক বাজিকরের সঙ্গে। রাজসভাতে সে খেলা দেখাত। সে লোকের তখন একজন সহকারীর প্রয়োজন ছিল। অনাথ বালককে মনে ধরে তার। সেই বাজিকরের সঙ্গী হয়েই সে শ্রীনগরে এসে উপস্থিত হয়। মহারাজ ললিতাপীড়ের পূর্বতন মহারাজের আমলে প্রথম সে রাজসভায় প্রবেশ করে ভাঁড়ামি করে সভাসদদের মনোরঞ্জনে সমর্থ হয়। তারপর ললিতাপীড় যখন সিংহাসনে বসেন তখন তিনি কূপমণ্ডূককে ভাঁড় হিসাবে স্থায়ী ভাবে রাজসভাতে নিয়োগ করেন। বড় কষ্টে কেটেছে তার অতীত। মহারাজ ললিতাপীড় তার গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বলে কূপমণ্ডূক তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।

উচ্ছলও তাকে জানাল তার বাল্যকালের কথা। কী ভাবে উচ্ছল আর তার সঙ্গীরা মিলে দল হ্রদের জলে রাজহংসের পিছু ধাওয়া করত, পর্বত কন্দরে আত্মগোপনের ক্রীড়ায় রত হতো এসব গল্প। বসন্ত ঋতু সমাগমে উপত্যকার পরিবেশ নিয়ে আর তাকে কেন্দ্র করে আগামী দিনে যে সব উৎসব হতে চলেছে তা নিয়েও কিছু সময় আলোচনা হল তাদের দুজনের মধ্যে। তারপর এক সময় উচ্ছল তাকে বলল, ‘মহারাজের স্বাস্থ্য ঠিক আছে তো? আজ তো তিনি সভায় এলেন না। তিনিইতো আমাদের অবিভাবক। প্রজাদের রক্ষাকর্তা, অন্নদাতা। তাই তাঁকে সভায় উপস্থিত না হতে দেখলে কখনও কখনও মনে শঙ্কা জাগে।’

উচ্ছলের মুখে মহারাজের প্রশংসা শুনে খুশি হল কূপমণ্ডূক। সে বলল, ‘ঠিক বলেছেন, তিনি আমাদের অন্নদাতা, রক্ষাকর্তা। মহারাজ এমনিতে সুস্থই আছেন। কাল রাত্রি জাগরণের কারণে আজ তাঁর নিদ্রাভঙ্গ হয়নি। তবে...’ কী যেন একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল কূপমণ্ডূক।

উচ্ছল প্রশ্ন করল, ‘তবে কী?’

কূপমণ্ডূক বলল, ‘মহারাজ কদিন হল একটু চিন্তায় আছেন।

উচ্ছল এ কথা শুনে একটু বিস্মিত ভাবে বলল, ‘মহারাজের চিন্তার কারণ কী? সারা দেশে তাঁর শাসনে শান্তির পরিবেশ বিরাজ করছে। সীমানাও সুরক্ষিত। কোথাও বহিঃশত্রু হানার খবর নেই। আমার, আপনার মতো মহারাজের সেবকরা তাঁর জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। বসন্তও এসে গেছে, তবুও মহারাজের ভাবনার কারণ?’

কূপমণ্ডূক বলল, ‘কারণ আছে।’

‘কী কারণ?’ আবার প্রশ্ন করল উচ্ছল।

কয়েক মূহূর্ত চূপ করে থেকে ভাঁড় কূপমণ্ডূক গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, কারণ আছে। আপনাকে বিশ্বাস করে বলছি কথাটা। তবে এ গোপন কথাটা কাউকে জানাবেন না। তাতে আমার বিপদ হতে পারে। কারণ, মহারাজ আর সেনাপতি যখন ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করছিলেন তখন আমি তাঁদের নিকটেই ছিলাম।’

উচ্ছল বলল, ‘আপনি নিশ্চিতে থাকতে পারেন। আপনার কথা বাইরে প্রকাশ পাবে না।’

উচ্ছলের কথা শুনে কূপমণ্ডূক আশ্বস্ত হয়ে তার গলার স্বর আরও খাদে নামিয়ে বললেন, ‘মহারাজের আশঙ্কা, তাকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে থাকতে পারে।’

‘ষড়যন্ত্র! কেন? কারা করছে?’

কূপমণ্ডূক বলল, চন্দ্র পর্বতে একটা গুহা আছে জানেন তো? সেই গুহার ভিতর কারা যেন অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়েছিল। অর্থাৎ গোপনে মিলিত হয়েছিল! মহারাজের চরেরা নানা স্থানে, বিশেষত যে সব জায়গাতে কোনো মানুষের আত্মগোপনের সম্ভাবনা, সে সব স্থানে মাঝে মাঝে অনুসন্ধান চালায়। তেমনই একজন লোক ওই গুহার মধ্যে প্রবেশ করে নিভে যাওয়া অগ্নিকুণ্ডের সন্ধান পেয়েছে। চারপাশের ধুলোতে অনেক পায়ের ছাপও ছিল...।’

এ পর্যন্ত শুনেই মনে মনে চমকে উঠল উচ্ছল। সে বলে উঠল; ‘এতে চিন্তিত হওয়ার কী আছে? মেষ পালকরা তো অনেক সময়ই শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য পাহাড়ের গুহার ভেতরে আশ্রয় নেয়, অগ্নিকুণ্ড জ্বালায়। তারাই তো ওই অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে থাকতে পারে?’

ভাঁড় বলল, ‘ব্যাপারটা অত সহজ নয়। যে সব পাদুকার ছাপ সেখানে পাওয়া গেছে, তা মেষ পালকরা ব্যবহার করে না, ভদ্রজন ব্যবহার করে। তাছাড়া সেখান থেকে একটা স্বর্ণ কণ্টকও পাওয়া গেছে, যা মস্তক বন্ধনীতে ব্যবহার করা হয়। যেমন আপনার মস্তক বন্ধনীতেও আছে। ওই স্বর্ণ কণ্টক গরিব মেষ পালকরা পাবে কী ভাবে? সব কিছু দেখে চরেদের অনুমান, যারা ওই গুহাতে সমবেত হয়েছিল তারা অর্থবান ব্যক্তিই হবে। আর এর থেকেই শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। কী উদ্দেশ্য নিয়ে একদল অভিজাত ব্যক্তি মিলিত হয়েছিল সেখানে? মহারাজের বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্ত করার জন্য নয়তো?’

কূপমণ্ডূকের কথা শুনে উচ্ছল বুঝতে পারল অসাবধানতাবশত ওই স্বর্ণ কণ্টক নিশ্চয়ই খসে পড়েছিল তাদের কারো পোশাক থেকে। আর ছদ্মবেশ ধারণ করলেও পাদুকা পরিবর্তনের ব্যাপারটা কারো মাথাতেই আসেনি। ভাঁড়ের কথা শোনার পর সে বলল, ‘তাহলে তো সত্যিই চিন্তার বিষয়! গোপনে কী আলোচনা করছিল তারা?’ কুপমণ্ডূক বলল, ‘হ্যাঁ, চিন্তার বিষয় তো বটেই। এমনও হতে পারে মহারাজের কোনো সভাসদও ছিলেন সেই গোপন সভাতে। কিছুই অসম্ভব নয়। এ ধরনের ষড়যন্ত্র তো সাধারণত বিত্তশালী ব্যক্তি বা রাজ্যসভার সদস্যদের নেতৃত্বেই ঘটে থাকে। সাধারণ নাগরিকরা সচরাচর মহারাজদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যোগ দিতে সাহস পায় না।’

উচ্ছল জানতে চাইল, ‘মহারাজ বা তাঁর চরেরা এ ব্যাপারে কোনো মন্ত্রী বা সভাসদকে সন্দেহ করছেন কি?’

কূপমণ্ডূক বলল, ‘না, এখনও কারো বিরুদ্ধে সেই গোপন সভাতে উপস্থিত থাকার প্রমাণ মেলেনি। তবে চরের দল রাজসভা ও অন্যস্থানে মন্ত্রী ও সভাসদদের ওপর নজর রেখে চলেছে।’

উচ্ছল প্রশ্ন করল, ‘আমার ওপরেও কি?’

কূপমণ্ডূক হেসে বলল, ‘হতে পারে। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তমোরির বাইরে তাকিয়ে দেখুন—ওই যে কিছু দূরে গাছের নীচে দাঁড়িয়ে এক অশ্বারোহী এ গৃহের দিকে চেয়ে আছে। বলা যায় না, ও লোকটা গুপ্তচরও হতে পারে।’

কূপমণ্ডূকের দৃষ্টি অনুসরণ করে উচ্ছল গবাক্ষের বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেল সেই অপরিচিত অশ্বারোহীকে। দূর থেকে সে চেয়ে আছে এ গৃহের দিকে।

উচ্ছল এরপর তার কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ ফুটিয়ে বলল, ‘আপনি তো মহারাজের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। রাজসভাতে দীর্ঘদিন ধরে আছেন। নানান কিছু দেখেছেন, শুনেছেন। এই পরিস্থিতিতে আমার কী করণীয় বলুন তো? আপনার পরামর্শ আমার প্রয়োজন।’

উচ্ছল তার ওপর ভরসা রাখছে দেখে ভাঁড় কূপমণ্ডূক খুশি হল। সে বলল, ‘আপনার শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সবাই আপনাকে নির্বিবাদী, উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন, লোভহীন মানুষ হিসাবেই জানে। মহারাজও সম্ভবত একই ধারণা পোষণ করেন আপনার সম্পর্কে। তাছাড়া আমিতো আপনার পাশে আছিই। তবে রাজসভাতে বা কার্যক্ষেত্রে চোখ-কান একটু খোলা রাখবেন। কারো কথাবার্তা বা আচারণ সন্দেহজনক মনে হলে তা আমাকে জানাবেন। আমি প্রয়োজনে সে কথা মহারাজকে জানাব। চিন্তার কোনো কারণ নেই, আপনার নাম গোপন থাকবে। হয়তো বা আপনার দেওয়া সংবাদে মহারাজ খুশি হলে আপনার ভাগ্যে পুরস্কারও জুটতে পারে।’

কূপমণ্ডূকের একথা শুনে উচ্ছলের মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, ‘আপনিও তবে কি...।’

উচ্ছল বাক্যটা সমাপ্ত না করলেও তার কথা বুঝতে অসুবিধা হল না ভাঁড়ের। সে বলল, ‘আমিও মহারাজের হয়ে চরবৃত্তি করি কিনা জানতে চাইছেন? না, সে অর্থে আমি মহারাজের চরবৃত্তি করি না। কিন্তু তাঁর কোনো অমঙ্গল হোক আমি তা চাই না। কিন্তু তিনি আমার অন্নদাতা। এই গৃহসহ আমার যা স্থাবর-অস্থাবর সম্পতি আছে সবই তাঁর দান। এমনকী আমার অশ্বটা পর্যন্ত উপহার দিয়েছেন আমাকে। তাই অন্নদাতার যাতে কোনো ক্ষতি না হয় আমি সে চেষ্টা করি। করা উচিত নয় কি?’

উচ্ছল এবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘অবশ্যই, অবশ্যই। অন্নদাতাকে সর্বপ্রকার বিপদ থেকে রক্ষা করাই তো আমাদের কাজ।’

বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাদের দুজনের মধ্যে এ পর্যন্ত বাক্যালাপ হওয়ার পর দাসী এসে হাজির হল দরজার সামনে। তাকে দেখে কূপমণ্ডূক বলল, ‘আহার প্রস্তুত। চলুন এবার আমরা ভোজন কক্ষে যাই?’

কূপমণ্ডূকের পিছন পিছন সে কক্ষত্যাগ করে ভোজন কক্ষে গিয়ে উপস্থিত হল উচ্ছল। সে কক্ষও অতি উত্তম রূপে সাজানো। দেওয়ালের গায়ে চিত্র টাঙানো, বেশ কিছু হস্তশিল্পও রাখা আছে কক্ষের নানান স্থানে। কক্ষের কেন্দ্রস্থলে কারুকার্যমণ্ডিত কাঠের বিশাল এক ভোজন চৌপায়া। তাকে ঘিরে বসার আসনগুলোও কারুকাজ খচিত, মখমল আচ্ছাদিত। চৌপায়ার ওপর রাখা আছে তামা ও রুপোর পাত্রে নানা বিধ খাদ্যদ্রব্য। সুবাস ছড়াচ্ছে সেই পাত্রগুলো থেকে। সেই চৌপায়ারই কিছুটা তফাতে কূপমণ্ডূকের কন্যা রূপবতী দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরনে রুচিসম্মত পোশাক, বক্ষে উড়নি। উচ্ছল খেয়াল করল আজ সে স্বর্ণালঙ্কারে সজ্জিতা। কবরী বন্ধনীতেও স্বর্ণ কণ্টক। যেন অতিথি আপ্যায়নের জন্যই বিশেষ ভাবে সজ্জিত হয়েছে সে। কিন্তু উচ্ছল যে আজ এ গৃহে পদার্পণ করবে তা তো তার জানার কথা নয়। তবে?

উচ্ছল কক্ষে প্রবেশ করার পর হাত জোড় করে নত মস্তকে তাকে প্রণাম জানাল গুণবতী কন্যা রূপবতী। উচ্ছল ও মাথা নেড়ে তার প্রণাম গ্রহণ করল।

কূপমণ্ডূক, উচ্ছলকে নিয়ে গিয়ে বসাল চৌপায়ার সামনে এক আসনে। রূপবতী এবার এগিয়ে এসে উচ্ছলের সামনে একটি রুপোর থালা চৌপায়ার ওপর স্থাপন করল। একটি থালা দেখে উচ্ছল, কূপমণ্ডূককে বলল, ‘আপনি আহার গ্রহণ করবেন না?’

সে জবাব দিল, ‘আমি বিলম্বে আহার গ্রহণ করব।’

উচ্ছলের সামনেই থরে থরে খাদ্য দ্রব্য সাজানো। তাদের ঘ্রাণে উচ্ছলের ক্ষুধার উদ্রেক হতে শুরু হল। তাই আর সে বাক্যালাপ না করে ভোজন শুরু করল। রূপবতী আর দাসী তাকে আহার পরিবেশন করতে লাগল। কত রকমের যে খাদ্যদ্রব্য তা খেয়ে শেষ করা যাবে না। মৃগ মাংস থেকে শুরু করে মেষ, কুক্কুট মাংসের নানান পদ। তার সঙ্গে রয়েছে কয়েক প্রকার মৎস্য, ঘৃত আর শুষ্ক ফল সমৃদ্ধ বেশ কয়েক ধরনের সিদ্ধ তণ্ডুল। এছাড়া আয়োজনের মধ্যে রয়েছে পরমান্ন, বিভিন্ন ধরনের পিষ্টক। আর প্রত্যেকটা খাদ্যই স্বাদে চমৎকার। যেন রাজকীয় খাদ্যের ব্যবস্থা। আহার গ্রহণ করতে করতে উচ্ছল এক সময় বলে উঠল; ‘অপূর্ব রন্ধন!’

এ কথা শুনে কূপমণ্ডূক বলল, ‘এ সবই রূপবতী স্বহস্তে প্রস্তুত করেছে।’

উচ্ছল আবারও বলল, ‘প্রতিটি স্বাদই অতুলনীয়।’ অতিথির মুখে তার রন্ধন শিল্পের প্রশংসা শুনে লজ্জায় ঈষৎ মাথা নত করল রূপবতী।

একসময় ভোজন সাঙ্গ হল উচ্ছলের। দাসী জলপূর্ণ তামার পাত্র উচ্ছলের সামনে এনে ধরল হস্ত প্রক্ষালনের জন্য। সেই উষ্ণ জলে হস্ত প্রক্ষালন করতে করতে উচ্ছল বলল, ‘অতি উত্তম আহার গ্রহণ করলাম। এত রকম পদ কি আপনার গৃহে প্রতিদিন রন্ধন করা হয়? এ তো রাজকীয় আয়োজন!’

কথাটা শুনে কূপমণ্ডূক বলল, প্রতিদিনই বেশ কিছু পদ রন্ধন করে রূপবতী। তবে আজ আপনারই মতো এক রাজকীয় অতিথির এ গৃহে পদার্পণ করার কথা। সে কারণে কিছু অধিক প্রকারের খাদ্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’

‘রাজকীয় অতিথি!’ নিজের অজান্তেই যেন উচ্ছল প্রশ্ন করে বসল, ‘তিনি কে?’

কূপমণ্ডূক জবাব দিল, ‘তিনি মহারাজের সেবিকা মুক্তবেণী।’

মুক্তবেণী নামটা শুনেই চমকে উঠেন উচ্ছল। ব্যাপারটা সম্ভবত খেয়াল করল কূপমণ্ডূক।

মহারাজের অন্যতম প্রিয় গণিকার এ গৃহে পদার্পণ সম্পর্কে এরপর কূপমণ্ডূক ব্যাখ্যা করে বলল, ‘না তিনি কোন কর্মোপলক্ষ্যে এ গৃহে আসছেন না। কথা প্রসঙ্গে আমি একবার তাকে বলেছিলাম যে আমার কন্যা রন্ধন শিল্পে নিপুণা। এ কথা শুনে তিনি আগ্রহ বোধ করায় আমি তাকে এ গৃহে নিমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলাম। সেই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতেই তিনি আসছেন। হয়তো বা আর কিছু সময়ের মধ্যেই তিনি এসে পড়বেন।’

উচ্ছল উঠে পড়ল আসন ত্যাগ করে। বেশ্যা মুক্তাবেণীর মুখোমুখি হওয়ার কোনো অভিলাষ উচ্ছলের নেই। তাই সে এরপর কূপমণ্ডূকের উদ্দেশে বলল, এবার আমাকে গৃহে ফেরার জন্য রওনা হতে হবে। বেশ অনেকটা সময় আনন্দের সঙ্গে অতিবাহিত হল এখানে।’

কূপমণ্ডূক এরপর আর উচ্ছলকে তার বাসস্থানে ভোজনান্তে বিশ্রাম গ্রহণের অনুরোধ জানাল না। হয়তো বা সেই রাজকীয় অতিথিনীর আগমনের সময় হয়ে গেছে বলেই। উচ্ছলকে নিয়ে ভোজনকক্ষ ত্যাগ করে সে এগোল তাকে বিদায় জানাবার জন্য ও আর একটা গুরুত্বপূৰ্ণ কথা বলার জন্য। গৃহের বাইরে এসে দাঁড়াল তারা দুজন। বিদায় মুহূর্তে কূপমণ্ডূক উচ্ছলকে বলল, ‘আপনাকে আমার একটা কথা বলার ছিল।’ উচ্ছল বলল, ‘কী?’

কূপমণ্ডূক বলল, ‘আমার কন্যাকে তো আপনি দুদিন দেখলেন। যদিও বংশ মর্যাদায় বা পদমর্যাদায় আমরা আপনার সমতুল্য নই, তবুও গুণাবলীর বিচারে তাকে কি আপনি গ্রহণ করতে পারেন না? আমি নিশ্চিত, স্ত্রী হিসাবে সে আপনাকে সুখী করবে। আপনার যাবতীয় কষ্ট লাঘব করবে। মহারাজের সভাগৃহতে আমার কার্যকলাপ যদি আপনার পক্ষে সম্মানহানীকর হয় তবে আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যে বিবাহের পরদিনই আমি শ্রীনগর ত্যাগ করে দূরে কোথাও চলে যাব। যেখানে কেউ আর আমার খোঁজ পাবে না। আাপনি কি আমার কন্যাকে গ্রহণ করবেন?’ ভাঁড়ের হাসি নয়, কন্যাদায়গ্রস্থ এক পিতার কাতর আবেদন যেন বেরিয়ে এল ভাঁড় কূপমণ্ডূকের কণ্ঠ থেকে।

যদিও কূপমণ্ডূকের দিক থেকে এ ধরনের প্রস্তাব আসতে পারে এ ব্যাপারে উচ্ছল কিছুটা প্রস্তুত হয়েই ছিল, তবুও সে মুহূর্তের জন্য থমকে গেল কূপমণ্ডূকের কণ্ঠস্বর শুনে। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে বলল, ‘ইতিপূর্বে আমি আমার বিবাহ সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে কোনোদিন চিন্তা করিনি। তবে আপনার প্রস্তাব আমি ভেবে দেখব।’

কথাটা শুনেই কূপমণ্ডূকের মুখ কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে এবার হয়তো আরও কিছু কথা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক সেই সময় একটা অস্পষ্ট শব্দ ভেসে এল দূর থেকে। শব্দটা কানে যেতেই তারা দুজন সেদিকে তাকিয়ে দেখতে পেল দূর থেকে একটা কার্নিরথ বহন করে আসছে বেহারার দল। কয়েকজন অশ্বারোহী সৈনিকও আসছে কার্নিরথের পিছনে। তা দেখে তারা দুজনেই অনুমান করল মুক্তবেণী আসছে! উচ্ছল এরপর আর দাঁড়াল না। দ্রুত ঘোড়ার লাগাম খুলে নিয়ে তার পিঠে চড়ে রওনা হয়ে গেল সে স্থান ত্যাগ করার জন্য। আর ভাঁড় কূপমণ্ডূকও যে পথ ধরে তারা আসছে সেদিকে রওনা হল রাজকীয় সেবিকাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিজ গৃহে আনয়নের জন্য।

অশ্বপৃষ্ঠে দল হ্রদের দিকে ফিরতে ফিরতে উচ্ছল মনে মনে ভেবে নিল কোনো আছিলায় মহামন্ত্রী যশঙ্করের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চরেরা যে চন্দ্র পর্বতে তাদের বৈঠকের ব্যাপারে অনুমান করেছে সে সংবাদ দিয়ে তাঁকে সতর্ক করে দিতে হবে। এর সঙ্গে সঙ্গে কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা কূপমণ্ডূকের কথা ভেবে তার ও তার কন্যার প্রতিও কেমন যেন একটা মমত্ববোধ সঞ্চারিত হল উচ্ছলের মনে। প্রজাপীড়ক মহারাজ ললিতাপীড়ের চাটুকার আর কন্যার দায়িত্বশীল পিতা—এ দুটো সত্তাই অবস্থান করছে কূপমণ্ডূকের মধ্যে।

বিকাল হওয়ার বেশ কিছু সময় আগেই উচ্ছল দল হ্রদে তার বাসগৃহে ফিরে এল। বৃদ্ধা গুঞ্জা আর পালেবতও ততক্ষণে ফিরে এসেছে। নিজ কক্ষে প্রবেশ করতেই ফুলের সৌরভ এসে প্রবেশ করল তার নাসারন্ধ্রে। উচ্ছলের প্রথমে মনে হল, কূপমণ্ডূকের গৃহের সেই ফুলের গন্ধই হয়তো বা এখনও নাকে লেগে আছে তার। কিন্তু এরপরই কক্ষের এক কোণে রাখা চৌপায়ার ওপর দৃষ্টি পড়ল তার। চৌপায়ার ওপর রাখা আছে একটা জলপূর্ণ তামার পাত্র। আর তার মধ্যে থেকে মাথা তুলে আছে একগুচ্ছ নানান বর্ণের দল পুষ্প! উন্মুক্ত তমোরি দিয়ে আসা সূর্যের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে আছে সেই পুষ্পগুচ্ছ। আর সুগন্ধ আসছে ওই দল ফুলের গুচ্ছ থেকেই। তার সৌরভে সারা কক্ষ আমোদিত। উচ্ছল বেশ অবাক হয়ে গেল সেই পুষ্পগুচ্ছ দেখে। মনে মনে সে ভাবল, পরিচারিকা গুঞ্জা তো ইতিপূর্বে কোনোদিন পুষ্পগুচ্ছ রেখে যায়নি তার কক্ষে।

শ্রীনগরের ভূভাগের কেন্দ্রস্থলে বাগিচা শোভিত কাষ্ঠ ও প্রস্তর নির্মিত কাশ্মীর রাজের বিশাল প্রাসাদ। এ প্রাসাদ অবশ্য মহারাজ ললিতাপীড় নির্মাণ করেননি, করেছিলেন বর্তমান মহারাজের পূর্বসূরী নৃপতিরা। মহারাজ ললিতাপীড় অবশ্য নিজের সুবিধার্থে প্রাসাদকে প্রাকার দিয়ে কয়েকটা অংশে বিভক্ত করে নিয়েছেন।

এ প্রাসাদের তিনটি অংশ—একটি অংশ মহারাজ ও তার ভার্যাদের জন্য নির্দিষ্ট, অর্থাৎ এটিই প্রাসাদের কেন্দ্রীয় অংশ। তার পরের অংশে থাকেন মহারাজের অবরুদ্ধা অর্থাৎ উপপত্নীরা, আর প্রাসাদের পশ্চাদ্ভাগে মহারাজের প্রমোদ ভবন, সে স্থানেই অধিক সময় অতিবাহিত করেন মহারাজ ললিতাপীড়।

প্রাসাদের তিনটি অংশই প্রাকার দিয়ে পৃথক করা। তবে তাদের গায়ে তোরণ বসানো আছে। রক্ষী নিয়ন্ত্রিত সেই তোরণগুলো শুধুমাত্র মহারাজ ও তাঁর ঘনিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য উন্মোচিত হয় যারা প্রাসাদের সর্বত্র গমনের অধিকারি। প্রাসাদের অন্য বাসিন্দাদের তাদের জন্য নির্দিষ্ট অংশ ত্যাগ করে অন্য অংশে যাবার নিয়ম নেই। মহারাজের রানি এবং অবরুদ্ধাদের প্রাসাদের বাইরে যাওয়ার নিয়ম নেই। তাদের বিলাসব্যসনের ক্ষেত্রে মহারাজ কার্পণ্য করেন না ঠিকই, তবে তাদের গৃহবন্দি থাকতে হয়। তাদের মনোরঞ্জনের উপায় বলতে পাশা খেলা আর দাসীদের মুখ থেকে গল্প শোনা। অধিকাংশ সময়ই ওই সব কাহিনি আদিরসাত্মক, কামোদ্দীপক হয়ে থাকে। ভাগ্য প্রসন্ন থাকলে মহারাজ কখনও কখনও তাদের নিজ কক্ষে ডেকে পাঠান সম্ভোগের জন্য। তবে পত্নী, অবরুদ্ধা অপেক্ষা নতুন নারী শরীরের ওপরই মহারাজের আগ্রহ বেশি। বিশেষত সে কন্যা যদি কুমারী হয়। কখনও স্বর্ণসেবিকা রূপে, কখনও বা অন্য কোন ভাবে মহারাজের প্রাসাদ ভবনে তাদেরকে উপস্থিত করে ওই বেশ্যাত্রয়ী।

রাজপ্রাসাদের বাইরে ও ভিতরে, সর্বত্র বিচরণের অধিকারিণী ওই তিন গণিকা। শুধু রাত্রিকালে নয়, বর্তমানে দিনের অধিকাংশ সময়ও মহারাজ তাঁর প্রমোদ ভবনেই অতিবাহিত করেন। তাকে সাহচর্য দেয় বিটপী, রতিমালা, মুক্তবেণী। বর্তমানে তারা মহারাজের সর্বপ্রকার পরামর্শদাত্রীও বটে। প্রমোদ ভবনে মহারাজ ললিতাপীড় অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন বলে এ স্থান বর্তমানে তাঁর গোপন শলাপরামর্শ স্থান রূপেও ব্যবহৃত হয়। কম্পনাধিপতি গড়ুর এখানেই মহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন, গুপ্তচরের দল এ স্থানে এসেই মহারাজকে প্রয়োজনীয় সংবাদ জানিয়ে যায়। ঠিক যেমন কিছুদিন আগে এসে তারা মহারাজকে জানিয়েছে, চন্দ্রপর্বতের গুহায় অজ্ঞাত পরিচয়, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সমবেত হওয়ার কথা। আর সে কথা শোনার পর থেকেই মহারাজ সত্যিই মনে মনে বিচলিত বোধ করছেন। কারণ, মহারাজ ললিতাপীড় নিজেই তো একদিন এই গুপ্ত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই পূর্বতন মহারাজকে সিংহাসনচ্যুত করে কাশ্মীরের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। মহারাজ ললিতাপীড় তাই জানেন বহিঃশত্রু থেকে গৃহশত্রু অনেক বেশি মারাত্মক। কারণ বহিশক্রকে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে সেনাদল দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করা যায় কিন্তু গৃহশত্রুরা অদৃশ্য থাকে, আচম্বিতে তারা মারণাঘাত হানে যেমন তিনি নিজেও একদা হেনেছিলেন সিংহাসন দখলের জন্য।

মধ্যাহ্নে তিন গণিকা পরিবৃত হয়ে প্রমোদ ভবনেরই এক কক্ষে বিশেষ একজনের আগমনের প্রতীক্ষা করছিলেন মহারাজ ললিতাপীড়। যাঁকে তিনি ডেকে পাঠিয়েছেন তাঁর কথায় বিশেষ আস্থা রাখেন, বিশ্বাস রাখেন মহারাজ। তাই চন্দ্র পর্বতের গোপন সভার সংবাদ প্রাপ্তির পর তার বক্তব্য জানার জন্য তাকে আহ্বান জানিয়েছেন ললিতাপীড়।

প্রতীক্ষার অবসান হল এক সময়। দ্বারী এসে খবর দিল সে এসেছে। মহারাজ তাঁর অনুচ্চ তাকিয়াতে সোজা হয়ে বসলেন তার আগমন বার্তা পেয়ে। বিটপী মহারাজের স্কন্ধ মর্দন করছিল। মহারাজের অঙ্গ থেকে হাত সরিয়ে নিল সে। তিন বেশ্যা সার বেঁধে দাঁড়াল মহারাজ একপাশে। কারণ যে প্রবেশ করতে চলেছে তাকে অনেকের মতোই এই তিন বেশ্যাও মনে মনে ভয় পায়।

কক্ষের ভিতর প্রবেশ করল সেই নারী। তবে তার বয়স অনুমান করা কঠিন। দুই কুড়ি হতে পারে আবার তিন কুড়িও হতে পারে। নারী সুলভ কোনো কোমলতা নেই তার শরীরে। বিচিত্র সাজ পোশাক তার। পরনে কৃষ্ণবর্ণের আলখাল্লার মতো পোশাক। কোমরের কাছটা রজ্জুবদ্ধ। আর তাতে গোঁজা আছে একটা মানুষের হাড়। গলাতে অসংখ্য নানান বর্ণের পাথর আর হাড়ের টুকরো দিয়ে গাঁথা মালা।

সব থেকে বিচিত্র তার মস্তক আবরণী। বিশাল দুটো সিং সহ একটা ভেড়ার মাথার খুলি শিরস্ত্রানের মতো করে মাথায় পরা যাছে। ধূম্রবর্ণের দীর্ঘ কেশরাশি তার কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে। তারই সমুখ ভাগ দিয়ে মুখমণ্ডলও প্রায় আবৃত। তার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে তীক্ষ্ণ এক জোড়া চোখ আর রক্তিম ওষ্ঠাধার। সে ওষ্ঠাধার কামনার উদ্রেক ঘটায় না, বরং তাতে জেগে আছে অদ্ভুত এক কাঠিন্য, যা মনে ভীতি জাগায়। এই অদ্ভুত দর্শন মহিলার সঙ্গে ছাগলের চামড়ার একটা থলেও আছে। সেটাও তার পোশাকের মতো কৃষ্ণবর্ণের। খার্খদ—জাদুকারী মাতঙ্গী।

মহারাজের কক্ষে প্রবেশ করেই সে একবার চারপাশে তাকিয়ে নিল। মহারাজ তার উদ্দেশে বললেন, ‘এসো, আমি তোমার জন্যই প্রতীক্ষা করছিলাম।’

খার্খদ বলল; ‘আমি জানতাম মহারাজ আমাকে ডেকে পাঠাবেন।’ রুক্ষ ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠস্বর তার।

মৃদু বিস্মিত হয়ে ললিতাপীড় প্রশ্ন করল, ‘তুমি কী ভাবে জানলে?’

তন্ত্রসাধিকা জাদুকারী মাতঙ্গী মহারাজের কথার স্পষ্ট জবাব না দিয়ে বলল, ‘আমি অনেক কিছু আগে থেকে জানতে পারি, বুঝতে পারি।’

মহারাজ ললিতাপীড় বললেন, ‘সে জন্যেই তো তোমাকে ডাকা। তুমি গুণে বলো তো আমার কোনো বিপদ আসছে কিনা?’

মাতঙ্গী নাগ পর্বতের যে স্থানে বসবাস করে সেখানে অনেকেই মাতঙ্গীর কাছে ললাট লিখন জানতে অথবা নানান ব্যাধি নিরাময়ের জন্য যায়। কেউ কেউ তার কাছে গুপ্তবিদ্যা প্রয়োগের মাধ্যমে শত্রুনিধনের প্রত্যাশাতেও যায়। মাতঙ্গী ওই সব লোকেদের জন্য তার গুহার সামনে একটা ছাউনিযুক্ত কাষ্ঠ মণ্ডপ নির্মাণ করে দেবার অনুরোধ জানিয়ে রেখেছে মহারাজের কাছে। সুযোগ বুঝে সে মহারাজকে বলল; ‘মণ্ডপ নির্মাণের কাজ কবে হবে?’

ললিতাপীড় তাকে আশস্ত করে বললেন, ‘ও নিয়ে তুমি চিন্তা কোরো না। বসন্তকাল তো শুরু হল মাত্র। আমি প্রধান বাস্তুকারকে কালই ডেকে বলে দেব কাজ শুরু করার জন্য। এখন তুমি দেখে বলো আমার ভাগ্যে কোনো বিপদ আছে কিনা?’

খার্খদ মাতঙ্গী এরপর মহারাজের সঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে তার কাজ শুরু করল। কক্ষের মধ্যবর্তী স্থানে বসল সে। তারপর তার ঝুলি থেকে এক এক করে গণনা করার নানান জিনিস বার করতে লাগল। প্রথমে একটা কাঠকয়লার টুকরো দিয়ে মেঝেতে সে একটা ছক কাটল। তারপর সেই ছকের একস্থানে স্থাপন করল তার ঝোলা থেকে বার করা একটা নর করোটি। সেই করোটির সামনে ছকের মধ্যেই এরপর স্থাপন করা হল একটি তাম্রপাত্র। মাতঙ্গী তার সঙ্গে আনা মন্ত্রপূত জল দিয়ে পূর্ণ করল সেই পাত্র। তারপর সে নির্দেশ দিল কক্ষের দ্বার বন্ধ করার জন্য। জাদুকরীর নির্দেশ পালন করেন বিটপী। এ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সে নিজের কোমর থেকে সেই মনুষ্য অস্থিটা খুলে নিয়ে অদ্ভুত ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করল। অস্থিটাকে জলপূর্ণ পাত্রের চারপাশে ঘোরাতে ঘোরাতে মাঝে মাঝে সে তা দিয়ে আঘাত করতে লাগল করোটিতে।

মহারাজ আর তিন বেশ্যা তাকিয়ে দেখতে লাগল সেই দৃশ্য। কক্ষে বাইরের কোনো আলো নেই, শুধু একটা মশাল জ্বলছে। মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে করোটির ওপর হাড়ের আঘাত আনছে জাদুকরী। অদ্ভুত ঠক ঠক শব্দ হচ্ছে। কেমন যেন একটা অতিপ্রাকৃত পরিবেশ সৃষ্টি হল কক্ষের মধ্যে! বেশ কিছুক্ষণ ধরে মন্ত্রোচ্চারণ করে চলার পর থামল খার্খদ। তারপর স্থির দৃষ্টিতে তাকাল পাত্রর জলের দিকে। এরপর সে বলল, ‘দ্বার খোলো, আলো আসুক ঘরে।’

জাদুকরীর নির্দেশে পালিত হল। খুলে দেওয়া হল দরজা। মহারাজ ললিতাপীড় আর তিন বেশ্যা খেয়াল করল স্বচ্ছ জল কখন যেন রক্তবর্ণ ধারন করেছে। মাতঙ্গী স্থির দৃ্ষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল সেই জলের দিকে। তারপর মহারাজের উদ্দেশে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি দেখতে পাচ্ছি সামনেই বিপদ নেমে আসছে আপনার। ভয়ঙ্কর বিপদ। আপনার শত্রুদের দেখতে পাচ্ছি আমি। মুখ তাদের অবগুণ্ঠনে ঢাকা, অর্থাৎ তারা গুপ্তশত্রু।’

খার্খদের কথা শুনে গম্ভীর হয়ে গেল ললিতাপীড়ের মুখ। গুপ্ত শক্ররই তো আশঙ্কা করছেন তিনি। সেই রক্তবর্ণের তরলের মধ্যে মাতঙ্গী মহারাজের শত্রুদের দেখতে পাচ্ছেন শুনে তিন বেশ্যা এগিয়ে এসে শক্রদের দেখার আশায় ঝুঁকে পড়ল সেই পাত্রের ওপর। যদি পোশাক দেখে সেই শক্রদের সনাক্ত করা যায় সে জন্য। কিন্তু গাঢ় রক্তবর্ণের তরলের দিকে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেল না তারা। রতিমালা বলে ফেলল, ‘কই কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না! শক্ররা কই?’

তার কথা শুনে জাদুকরী কর্কশ কণ্ঠে ধমকে উঠে বলল, ‘চুপ কর মূর্খ বেশ্যা। আমি মাতঙ্গী যা দেখতে পাই তুই তা দেখবি কী ভাবে? তুই কি প্রেত সিদ্ধা?’ অন্য কেউ যদি মহারাজের এই প্রিয় বেশ্যাকে এ কথা বলতেন তবে সঙ্গে সঙ্গে তার জিহ্বা উৎপাটন করা হতো। কিন্তু মাতঙ্গী জাদুকরী। নানান অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা আছে তার। রতিমালাকে ধমক দেওয়াতেও তাকে কিছু বললেন না ললিতাপীড়। আর বেশ্যার দলও একটু ভয় পেয়ে পিছু হটে গেল। কারণ, তারাও ভাবল যে মাতঙ্গী ক্রুদ্ধ হলে তার ফল ভালো নাও হতে পারে। বিশেষত যখন এই জাদুকরীর বাণ মারা ইতাদি ক্ষতিকারক বিদ্যা জানা আছে। কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল কক্ষে, মহারাজ ললিতাপীড় এরপর মাতঙ্গীকে প্রশ্ন করলেন, ‘গুপ্তশত্রুদের দমন করার উপায় কী? তুমি কি তা করতে পারবে?’

মাতঙ্গী বলল, ‘হ্যাঁ, আছে। তবে সম্পূর্ণরূপে আপনার শত্রুনাশ করতে আমার বসন্তের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগবে। যজ্ঞ করতে হবে আমাকে। তার জন্য বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করতে হবে। যাদের মধ্যে আছে বেশ কিছু সামগ্রী যা মধ্য বসন্ত ছাড়া মেলে না। যেমন কৃষ্ণবর্ণের মেঘপক্ষীর ডিম্ব। মধ্য বসন্ত ছাড়া ডিম পাড়ে না তারা। এমনকী তেমন বুঝলে নরবলি দেওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে শত্রুনাশের জন্য। আর তার জন্য কোনো একজন মানুষকে আপনাকেই সংগ্রহ করে দিতে হবে। কিন্তু আপাতত আমার কাজ শুরু করার জন্য একশত মুদ্রার প্রয়োজন হবে।’

খার্খদ মাতঙ্গীর কথা শুনে মহারাজ ললিতাপীড় বললেন, ‘সে না হয় এখনই দিচ্ছি। প্রয়োজন হলে নরবলির জন্য আজ রাত্রেই রজ্জুবদ্ধ করে পাঠিয়ে দিতে পারি তোমার গুহাতে। কিন্তু বসন্ত তো সবে আরম্ভ হল, মধ্য বসন্ত আসতে এখনও অনেক দেরি। এর মধ্যে যদি গুপ্তশত্রুরা আমার অনিষ্ট করে?’

প্রশ্ন শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর খার্খদ বলল, ‘না, তা তারা পারবে না।’ এ কথা বলে সে তার ঝোলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটা অতি ক্ষুদ্র পেটিকা বার করে আনল। মাতঙ্গী সেই ক্ষুদ্র পেটিকা উন্মোচন করতেই দেখা গেল তার মধ্যে রয়েছে হাড়ের তৈরি একটা ছিদ্র যুক্ত গোলোক। যা অঙ্গুরীয়র মতো ব্যবহার করা যায়। সেটা হাতে নিয়ে জাদুকরী বলল, ‘এ হল শ্বেত গৃধিনীর হাড়ের তৈরি প্রাগজ্যোতিষপুরের মন্ত্রপূত অঙ্গুরীয়। এ অঙ্গুরীয় ধারণ করুন আপনি। আর এই রক্ততরল সিঞ্চন করবেন আপনার প্রাসাদের চারিপার্শ্বে। শত্রুরা আর তাহলে এই সময়কালের মধ্যে আপনার কোনো ক্ষতি সাধন করতে পারবে না।’ এ কথা বলে জাদুকরী উঠে দাঁড়িয়ে মহারাজের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘নিন আপনার বাম হস্ত প্রসারিত করুন।’

ললিতাপীড় তার কথামতো বামহস্ত প্রসারিত করলেন। মহারাজের হাতের প্রত্যেক অঙ্গুলিই স্বর্ণাঙ্গুরীয় শোভিত। মাতঙ্গী তাঁর তর্জনী থেকে অঙ্গুরীয় খুলে নিয়ে সেই অস্থির অঙ্গুরীয়টি পরিয়ে দিল, আর নিজের আঙ্গুলে ধারণ করল মহারাজের স্বর্ণাঙ্গুরীয়।

আপত্তি করলে না ললিতাপীড়। অমন সহস্র অঙ্গুরীয় আছে তাঁর। কাজ শেষ হল জাদুকরীর। এরপর সে করোটিটা পুরে ফেলল তার ঝুলিতে।

মহারাজ এরপর বিটপীকে স্বর্ণমুদ্রা আনার জন্য ইঙ্গিত করলেন। বিটপী কক্ষত্যাগ করে কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ফিরে এল রেশমের থলেতে একশত স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে। সে সেগুলো এনে তুলে দিল খার্খদের হাতে। কক্ষ ত্যাগের আগে এরপর দ্বারের দিকে এগিয়েও মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল মাতঙ্গী। তারপর তিন বেশ্যার দিকে তাকিয়ে কক্ষ ত্যাগের আগে মহারাজের উদ্দেশে বলল, ‘আর হ্যাঁ, যতদিন না আমার শত্রুনাশক যজ্ঞের কাজ সম্পন্ন হয় ততদিন নারীদের থেকে আপনি সতর্ক থাকবেন।’

জাদুকরী মাতঙ্গী এমনভাবে কথাগুলো বলে গেল যেন মহারাজের প্রিয় বেশ্যারাও জড়িত থাকবে তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্তে!

জাদুকরী মাতঙ্গী কক্ষ ত্যাগ করার পর বিটপী অভিমানী কণ্ঠে মহারাজের উদ্দেশে বলল, ‘আপনার কি মনে হয় আমরা আপনার ক্ষতি সাধন করতে পারি?’

ললিতাপীড় তাকে শান্ত করার জন্য বলল, ‘জাদুকরীর কথায় দুঃখ পেও না। জাদুকরী নিশ্চয়ই তোমাদের সম্পর্কে কথাগুলো বলেনি, অন্য নারীদের সম্পর্কে কথা বলে গেল। তোমাদের তিনজনের প্রতি আমি সর্বাপেক্ষা বেশি আস্থাশীল। তোমরা কেউ আমার বিন্দুমাত্র ক্ষতির কারণ হতে পারো তা আমি স্বপ্নেও ভাবি না।’

কাশ্মীর রাজের কথা শুনে রতিমালাও এরপর তার কণ্ঠস্বরে মৃদু অভিমান ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘আপনি যাই বলুন না কেন মহারাজ, খার্খদ মাতঙ্গীর আচরণ বড় কর্কশ।’

রতিমালার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৃতীয় বেশ্যা মুক্তবেণী তাকে সতর্ক করে দিয়ে বলল, ‘চুপ, চুপ, শুনেছি জাদুকরী নাকি তার সম্পর্কে কেউ কোনো কথা বললে তা বহুদূর থেকেও শুনতে পায়।’

মুক্তবেণীর কথা শুনে জাদুকরীর আলোচনা থামিয়ে দিল অপর দুই বেশ্যা। কক্ষের পরিস্থিতি কিছুটা গম্ভীর হয়ে উঠেছে দেখে ললিতাপীড় এরপর বললেন, ‘জাদুকরী যখন আমাকে অভয় দিয়ে গেল তখন আর তেমন কোনো দুশ্চিন্তার কারণ আছে বলে মনে হয় না। তবে একটু সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বসন্ত ঋতু তো শুরু হয়ে গেছে, আমাকে আনন্দদানের জন্য কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে তোমরা?’

মুক্তবেণী বলল, ‘মহারাজ যেমন ইচ্ছা প্রকাশ করবেন তেমনই হবে। আপনি কি, প্রতিবারের ন্যায় এবার দল হ্রদের জলপ্রাসাদে বসন্তের মধ্যবর্তী সময় অতিবাহিত করবেন বলে স্থির করেছেন?’

মহারাজ ললিতাপীড় বললেন, ‘হ্যাঁ, তেমনই ইচ্ছা।

অন্য স্থানে বাস করার ইচ্ছা হলেও উপায় কী। পুষ্পপথে প্রাসাদ নির্মাণ করতে নূন্যতম এক বৎসরকাল সময় লেগে যাবে বলে প্রধান বাস্তুকার আমাকে জানিয়েছে। তাই এ বৎসরও আমাকে বসন্ত-গ্রীষ্ম ওই প্রমোদ তরীতেই অতিবাহিত করতে হবে। তবে লক্ষ রাখবে, আমি যতদিন সে স্থানে কাটাব সে সময় যেন রাজকার্য সম্বন্ধীয় ব্যাপার নিয়ে আমাকে অযথা কেউ সেখানে বিরক্ত না করে। সেখানে গিয়ে আমি পূর্ণ বিশ্রাম আর আনন্দ লাভ করতে চাই।’

মহারাজ ললিতাপীড় এমন ভাবে কথাটা বললেন যেন তিনি রাজকার্য সামলাতে গিয়ে প্রচণ্ড রূপে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, তাই তার আমোদ আর বিশ্রামের প্রয়োজন! কিন্তু তাঁর কথায় সমর্থন জানিয়ে মুক্তবেণী বলে উঠল, হ্যাঁ, মহারাজের সে স্থানে উপস্থিত হয়ে কিছুদিনের জন্য পূর্ণাঙ্গ বিশ্রাম আর আমোদ লাভের প্রয়োজন, এবং সে স্থানে মহারাজকে যাতে কেউ অযথা বিব্রত না করে সে ব্যাপারে আমরা সজাগ থাকব।’

বিটপী বলল, ‘আমি তবে মহারাজ জলগৃহে গমন করার আগে সে স্থান পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব নিলাম, যাতে জলপ্রাসাদে মহারাজের জন্য আয়োজনের কোনো ত্রুটি না থাকে।’

মহারাজ এরপর জানতে চাইলেন, ‘এ বসন্তে স্বর্ণ সেবিকা হবার জন্য কন্যারা উপস্থিত হচ্ছে? তাদের সেবার বড় প্রয়োজন আমার ওই জলপ্রাসাদে।’ অর্থাৎ মহারাজের জন্য সুন্দরী কুমারী নারীদের সংগ্রহ করা হচ্ছে কিনা।

কামুক মহারাজ ললিতাপীড়ের কথা শুনে মুক্তবেণী বলল, ‘স্বর্ণ সেবিকা হবার অভিলাষে কয়েকজন সুন্দরী কন্যা ইতিমধ্যেই সে স্থানে উপস্থিত হয়েছে এবং আরও কয়েকজন হবে।’

ললিতাপীড় বললেন, ‘আমি জলপ্রাসাদে বাস করতে যাবার পূর্বেই রাজসভাতে তাদেরকে উপস্থিত করাতে হবে স্বর্ণ সেবিকা রূপে ঘোষণা করার জন্য।’

মুক্তবেণী বলল, ‘আপনি নিশ্চিত থাকুন মহারাজ, আপনার ইচ্ছা মতোই সে কাজও সম্পন্ন হবে। তবে একটা প্রশ্ন মহারাজ। এ ভাবে প্রতিবার স্বর্ণ সেবিকাদের রাজসভাতে হাজির করানো হয় কেন? কে স্বর্ণসেবিকা হবে সে ব্যাপারে রাজসভাকে জানাবার আবশ্যিকতাই বা কী আছে?’

ললিতাপীড় হেসে বললেন, ‘আবশ্যিকতা সে অর্থে তেমন নেই। তাদেরকে রাজসভাতে সভাসদদের সামনে উপস্থিত করানোর প্রথা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে তাই আর কী! এর একটা নিরাপদ দিকও আছে। পরবর্তী কালে কেউ আর এ দাবি করতে পারবে না যে, বলপূর্বক কাউকে স্বর্ণ সেবিকা বানানো হয়েছে।’

এ কথা বলতে বলতেই মহারাজ ললিতাপীড়ের মাথায় এল জাদুকরী মাতঙ্গীর বলে যাওয়া কথাটা। তিনি তার প্রিয়তমাদের উদ্দেশে বললেন; তবে থাক। যখন বলে গেল এখন কিছুদিন ভাবচ্ছি নারীদের থেকে আমার কিছুটা সতর্ক থাকা উচিত।’

কথাটা শুনেই বিটপী বলে উঠল, ‘মহারাজ কি তবে নবাগত নারীদের সেবা গ্রহণ করবেন না?’

কামুক নৃপতি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, না, না, তা কখনোই নয়। তাদের সেবা গ্রহণ না করলে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ব। তাদের সেবা গ্রহণ করব না তা কি হতে পারে? আমি বলছি সতর্ক থাকায় কথা। অতীতে কাশ্মীরের ইতিহাসে একবার এক নারীকে গুপ্ত ঘাতিকা রূপে পাঠানো হয়েছিল ছন্দক নামের কাশ্মীর রাজের কাছে। সে প্রায় তিনশো বছর আগের ঘটনা। সেই ঘাতিনী তার কবরীর মধ্যে একটা ক্ষুদ্রাকৃতি ধারালো ক্ষুর বহন করে নিয়ে গেছিল। তারপর রতিক্রিয়ার সময় সে ওই ক্ষুর দিয়ে মহারাজ ছন্দকের কণ্ঠদেশ ছিন্ন করে তাকে হত্যা করে।’

বিটপী মহারাজ ললিতাপীড়ের কথা শুনে বলল, ‘যে সব নারীকে মহারাজের সেবার জন্য উপস্থিত করা হয়, তাদের পোশাক তার আগে উপযুক্তভাবে পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া হয় যে তাতে কোনো কিছু লুক্কায়িত আছে কিনা? মহারাজ যখন আরও সতর্ক থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন, তখন আপনার কক্ষে তাদের উপস্থিত করার আগে শুধু পোশাক নয়, নগ্ন করে তাদের পরীক্ষা হবে। এ কাহিনি আমার জানা ছিল না। তাই এবার থেকে তাদের কবরীও উন্মুক্ত করে পরীক্ষা করা হবে, এমনকী যোনিও। যাতে ওই রূপ ক্ষুদ্রাকৃতির কোনো মারণাস্ত্র বহন করতে তারা সক্ষম না হয়।’

মাতঙ্গীর উপস্থিতি এবং তার পরবর্তীতে এই সব আলোচনাতে এবার ক্লান্তি বোধ হল ললিতাপীড়ের। আর কোনো কথা না বলে চক্ষু মুদলেন তিনি। তিন বেশ্যা মহারাজ তখন কী চাইছেন তা অনুমান করতে পারল। মহারাজের তাকিয়ার কাছে ঘনিষ্ট হয়ে নিজেদের গায়ের শাল খুলে ফেলল তিনজনই। শরীর তাদের প্রায় নগ্ন। কটিদেশে মাত্র একটা বস্ত্র খণ্ড। মহারাজের তাকিয়াতে বসে তাঁকে আলিঙ্গন করে তাঁর শরীর মর্দন করতে শুরু করল তিন বেশ্যা। আর ললিতাপীড় চক্ষু মুদে উপভোগ করতে লাগলেন সেই মর্দন আর বেশ্যা শরীরের স্পর্শ।

১০

পার্ষদ উচ্ছল সেদিন ভাঁড় কূপমণ্ডূকের গৃহ থেকে ফেরার পর দেখতে দেখতে আরও দুই পক্ষকাল অতিক্রান্ত হয়ে গেল। বসন্ত আরও এগিয়ে চলেছে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে দল হ্রদ আর উপত্যকাও প্রাকৃতিক নিয়মে আরও সুন্দরী হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সত্যিই ভূস্বর্গ হয়ে উঠতে যজ্ঞ করছে বসন্তের কাশ্মীর।

মহারাজ ললিতাপীড় ঘোষণা করেছেন বসন্তের মধ্যবর্তী কয়েকমাস যখন দল হ্রদের সৌন্দর্য সদ্য যৌবন প্রাপ্ত যুবতীর মতো বিকশিত হয়ে ওঠে তখন সেখানে কয়েকমাস বিগত বসন্তকালগুলোর মতোই অতিবাহিত করবেন। তার প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেছে। উচ্ছলের চোখে পড়েছে ইতিমধ্যেই মহারাজের জলপ্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রাপ্ত পার্ষদ, রাজকর্মচারীরা বিভিন্ন দ্রব্য নিয়ে যাওয়া-আসা শুরু করেছে ওই জলপ্রাসাদে।

কূপমণ্ডূকের গৃহ থেকে প্রত্যাগমনের তিন দিবসের মধ্যেই নিজের কার্যালয়ে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সংবাদ দেবার অজুহাতে, কিছু কাগজপত্র নিয়ে মহামন্ত্রীর দপ্তরে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে উচ্ছল। মহারাজ ললিতাপীড় যে চন্দ্রপর্বতের গোপন সভার ব্যাপারে সংবাদ পেয়েছেন সে কথা যশঙ্করকে সে জানিয়ে এসেছে। তবে উচ্ছল যাতে প্রয়োজনে মহামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে খবরাখবরের আদান-প্রদান করতে পারেন তাই তার দপ্তর থেকে একটি অতিরিক্ত দায়িত্ব উচ্ছলকে অর্পন করেছেন তিনি। এ মর্মে ঘোষণাপত্রও করা হয়েছে মহামন্ত্রীর কার্যালয় থেকে।

মহামন্ত্রীর কার্যালয় হল রাজকর্মচারীদের প্রধান কার্যালয়। তাই অন্য বিভাগের কোনো রাজকর্মচারীদের বা তার দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাসদকে অন্য কাজের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষমতা মহামন্ত্রীর আছে। যে কাজের দায়িত্ব মহামন্ত্রী এসব ক্ষেত্রে দিয়ে থাকেন, তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না হয়ে থাকলে মহারাজের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। আর মহারাজও তখন এসব ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী হন না।

উচ্ছল মহামন্ত্রীর দেওয়া দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সে কাজ বিশেষ বড় কিছু নয়। চক্র পুজো কাশ্মীরের অতি প্রাচীন রীতি। যুগ যুগ ধরে তা চলে আসছে। শ্রীনগরকে বেষ্টন করে যে অনুচ্চ পর্বত শ্রেণী আছে তার মধ্যে একটি হল শারিকা পর্বত। যেখানে প্রস্তর নির্মিত চন্দ্র শোভিত শারিকা দেবীর মন্দির বর্তমান। প্রতি বছর বসন্তকালে ফসল যাতে ভালোভাবে উৎপন্ন হয় সেজন্য চক্রপূর্ণিমা তিথিতে সে মন্দিরে চক্র পুজোর ব্যবস্থা করা হয়।

বৌদ্ধ, শৈব অথবা সনাতন ধর্মাবলম্বী সব ধর্মের মানুষই এই পুজোয় যোগ দেয়। পুজো উপলক্ষে শ্রীনগরবাসীরা তো বটেই দূর দুরান্তের পার্বত্য গ্রাম থেকে মানুষ গিয়ে উপস্থিত হয় সে স্থানে। বিশেষত নারীরা। সেখানে তারা বৃক্ষরোপণ করে। সে রীতিও বেশ প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে।

জনসমাগম উপলক্ষে সে স্থানে আরও বেশ কিছু মানুষও সেদিন জীবিকা নির্বাহের জন্য, অর্থলাভের আশায় শারিকা মন্দিরে উপস্থিত হয়। তারা হল বাজিকর, মন্ত্রিক, ভাঁড় এসব পেশার মানুষ। শারিকা পর্বতে পুজোর দিন এগিয়ে আসছে। মহামন্ত্রী যশঙ্কর উচ্ছলকে দায়িত্ব দিয়েছেন ওই উৎসব যাতে সুচারুভাবে সম্পন্ন হয় তা দেখার জন্য। এ দায়িত্ব বড় কোনো ব্যাপার নয়, তীর্থ যাত্রীদের আশ্রয় প্রদানের জন্য মন্দিরসংলগ্ন স্থানে কয়েকটি অস্থায়ী কুটির নির্মাণ করে দিতে হবে আর জলসত্র ব্যবস্থা করতে হবে।

মন্দিরে পুজোর দায়িত্ব পুরোহিত ও সেবায়েতদের ওপরই থাকে। তবে পুজোর দিন মহামন্ত্রীর দপ্তরের প্রতিনিধি রূপে উচ্ছলকে শারিকা পর্বতে উপস্থিত থাকতে হবে সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর দৃষ্টি রাখার জন্য। কারণ তীর্থযাত্রী ও অন্যান্য লোকজনের আধিক্য হেতু সে স্থানে অনেক সময় ক্ষুদ্র কিছু উপদ্রবের সৃষ্টি হয়। মহামন্ত্রীর নির্দেশ পালন করবার জন্য ইতিমধ্যেই উচ্ছল বেশ কয়েকদিন শারিকা পর্বত পরিদর্শন করে এসেছে। অস্থায়ী কুটির নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে।

দ্বিপ্রহরে নিজের কক্ষে বসে পালেবতও ভাবছিল সেই দিনটার কথা। যেদিন পালেবত এ বাসগৃহ ত্যাগ করে গুঞ্জার সঙ্গে নগরীর স্থলভাগে পণ্য ক্রয় করতে গিয়েছিল। বেশ কেটে ছিল দিনটা। চারপাশের দল হ্রদের আর নগরীর অভ্যন্তরে কত নতুন নতুন জিনিস মানুষজন দেখতে পেয়েছিল পালেবত, বিশেষত তার খুব ভালো লেগেছে শিকারা বাহিকা বাঁদরী নামের মেয়েটিকে। কী সুন্দর তার ব্যবহার! সত্যি সে পুষ্প চয়ন করে রেখেছিল পালেবতের জন্য।

জলগৃহে ফিরে আসার পর সেই সুগন্ধী পুষ্পগুলি কোথায় রাখা উচিত তা সঠিক বুঝে উঠতে না পেরে একটি জলপাত্র করে রেখে এসেছিল এ গৃহের অধিকারির কক্ষে। কাজ করার পর অবশ্য পালেবতের মনে শঙ্কা জেগেছিল এই কাজ করা সঠিক হয়েছে নাকি তা ভেবে। তবে তেমন কিছু হয়নি। গুঞ্জার মুখে পালেবত শুনেছে মহারাজের সভাসদ নাকি পুষ্পগুলি দেখে গুঞ্জার কাছে জানতে চেয়েছিলেন ওই পুষ্প কে আনায়ন করেছে? ভারি সুন্দর পুষ্প—এ কথাও নাকি তিনি বলেছেন তাঁর পরিচারিকাকে। গুঞ্জার মুখ থেকে একথা শুনে পালেবতের অনুমান হয়েছে তার আশ্রয়দাতা সম্ভবত খুশিই হয়েছেন ওই পুষ্পগুচ্ছ দেখে।

শুধু পুষ্প চয়ন করা নয়, ফেরার পথে বাঁদরী এই হ্রদ সম্পর্কে, এই নগরীর বিষয় নানান কথা জানিয়েছে পালেবতকে। শ্রীনগরী—দল হ্রদের দ্রষ্টব্য স্থানগুলি সে পালেবতকে ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে এ কথাও বারংবার বলেছে। তার মধুর ব্যবহারের জন্য ওই দিনের পর থেকে বাঁদরীর কথা মাঝে মাঝেই মনে পড়ে তার। আজও নির্জন দ্বিপ্রহরে তমোরি দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে পালেবত বাঁদরীর কথাই ভাবছিল। সে ভাবছিল, কী সুন্দর জীবন তার! শিকারা নিয়ে নিজের ইচ্ছামতো হ্রদের বুকে ভেসে বেড়ায়! নিজের ইচ্ছামতো সে কোনো স্থানে যেতে পারে! হয়তো বা পালেবতের নিজেরও এমন মুক্ত জীবন ছিল। কিন্তু অতীতের স্মৃতি কিছুতেই তার ফিরে আসছে না। কবে যে তার স্মৃতি ফিরে আসবে, কবে যে সে নিজের বাসস্থানে ফিরে গিয়ে মুক্তি লাভ করবে কে জানে!

সেদিনের ভ্রমণের ঘটনা, বাঁদরীর কথা ভাবতে ভাবতে শেষের এই কথাগুলো মনে আসতে মৃদু বিষণ্ণতাও গ্রাস করতে শুরু করল পালেবতকে।

সেই বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি লাভের জন্য তমোরির ঝাঁপ বন্ধ করে পালঙ্কে নিদ্রামগ্ন হতে যাচ্ছিল পালেবত। কিন্তু সে যখন ঝাঁপ নামাতে যাচ্ছে তখন কাকতালীয় ভাবে দেখতে পেল বাঁদরীকে। সে শিকারা নিয়ে আসছে! পালেবতদের জলগৃহের কাছাকাছি আসতেই পালেবত তমোরি দিয়ে হাত নাড়ল তার উদ্দেশে। বাঁদরীও হাত নাড়ল তাকে দেখতে পেয়ে। তারপর চাপ্পা চালিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল ভাসমান গৃহের দিকে।

বাঁদরী তাদের গৃহতেই আসছে দেখে পালেবত কক্ষ ত্যাগ করে বাইরে এসে দাঁড়াল। বাঁদরী এসে উপস্থিত হল জলগৃহের গায়ে। সে তার শিকারাটা জলগৃহের সঙ্গে রজ্জুবদ্ধ করে উঠে এল গৃহতে। পরনে তার আগের দিনের মতোই রঙিন ঝলমলে পোশাক, কণ্ঠে নানা বর্ণের পাথরের মালা, কবরীতে আজ আবার পুষ্পমালাও রয়েছে।

সে জলগৃহে উঠে আসার সঙ্গে সঙ্গেই পুষ্পের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। পালেবতের সামনে উপস্থিত হয়ে সে হেসে তাকে প্রশ্ন করল, ‘সব কুশল তো? শরীর স্বাস্থ্য ভালো আছে তো তোমার?’

পালেবত হেসে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, ভালো আছি। তুমি?’

বাঁদরীও হেসে জবাব দিল, ‘আমিও ভালো আছি। আমি সব সময় ভালো থাকি, আর অন্যকে ভালো রাখার চেষ্টা করি।’

পালেবত এরপর তার কাছে জানতে চাইল, ‘মাতা গুঞ্জা কি তোমাকে আসতে বলেছেন? কোথাও যাবেন তিনি?’

শিকারা বাহিকা বাঁদরী হেসে বলল, ‘না। তিনি আমাকে আসতে বলেননি। বলতে পারো আমি তোমার জন্যেই এলাম।’

‘আমার জন্য?’ পালেবত বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করল তাকে।

বাঁদরী বলল, ‘হ্যাঁ, তোমারই জন্য। আমার বেশ ভালো লেগেছে তোমাকে। বার বার তোমার কথা মনে পড়ছিল আমার। তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব বলে কদিন ধরেই ভাবছিলাম, কিন্তু হয়ে উঠছিল না। আজ আমার শিকারাতে কোনো যাত্রী নেই, তাই ভাবলাম তোমাদের এখানে আসি, তোমার দেখা পাওয়া যায় কিনা?’

পালেবত তার কথা শুনে খুশি হয়ে বলল, ‘ভালো করেছ। তোমাকেও আমার ভালো লেগেছে। কিয়ৎক্ষণ আগে আমি ওই দিনটা আর তোমার কথাই ভাবছিলাম, মাঝে সাঝেই ভাবি। আর কী আশ্চর্য তুমি এসে হাজির হলে!’

এ কথা বলে পালেবত একটু থামল। তারপর বলল, আমি আর যাব কোথায়? সব সময় এ স্থানেই থাকি। মাতা গুঞ্জা আর বাইরে যাননি, আর আমারও কোথাও যাওয়া হয়নি।’ এ কথা বলার সময় নিজের অজান্তেই যেন মৃদু বিষাদের সুর ধরা দিল পালেবতের কণ্ঠে। আর এ ব্যাপারটা যেন বাঁদরীও অনুমান করতে পারল। মুহূর্ত খানেক চুপ করে থেকে সে বলল, চলো তোমায় হ্রদে ঘুরিয়ে আনি। যাবে?’

পালেবত বলল, ‘যেতে পারলে তো অতি উত্তম হতো। কিন্তু গুঞ্জা মাতা আমাকে বাসগৃহ ত্যাগ করার অনুমতি দেবেন কিনা তা আমার জানা নেই। সব চেয়ে বড় কথা তোমাকে দেবার জন্য আমার কাছে কোনো মুদ্রা নেই।’

পালেবতের কথা শুনে বাঁদরী ঠোঁট উল্টে বলল, ‘মুদ্রা তোমার কাছে কে চেয়েছে? বান্ধবীকে ভ্রমণ করাতে নিয়ে গেলে কি কেউ তার থেকে মুদ্রা নেয়?’

বাঁদবীর কথা শুনে বড় ভালো লাগল পালেবতের। সে বলল, ‘কিন্তু গুঞ্জা মাতার অনুমতির তো প্রয়োজন...।’

ঠিক সেই সময় সম্ভবত তাদের কথোপকথন শুনে নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন বৃদ্ধা। বাঁদরীকে দেখে মৃদু বিস্ময় ফুটে উঠল তার মুখে। পালেবত তাঁকে কিছু বলার আগেই বাঁদরী এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল বৃদ্ধার সামনে। তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে প্রণাম জানিয়ে বলল, ‘আমি পালেবতকে কিছু সময়ের জন্য দল হ্রদে কাছাকাছি ভ্রমণ করিয়ে আনতে চাই। আমার বড় ভালো লেগেছে তোমার ভগ্নী কন্যাকে। বড় ভালো মেয়ে। না, না, তোমাকে তার জন্য কোনো মুদ্রা ব্যয় করতে হবে না। তুমি শুধু অনুমতি দিলেই হবে। বেশি সময় লাগবে না। শ্রীঘ্রই ওকে পৌঁছে দিয়ে যাব চারপাশটা একটু দেখিয়ে।’

পরিচিত শিকারা বাহিকার কথা শুনে গুঞ্জা তাকাল পালেবতের দিকে। পালেবত কোনো কথা না বললেও তার মুখের দিকে চেয়ে বৃদ্ধা বুঝতে পারল পালেবতেরও ইচ্ছা আছে ভ্রমণের। আর সেটাইতো স্বাভাবিক। দিন-রাত প্রায় গৃহবন্দি হয়ে থাকে। পালেবতের সঙ্গে প্রয়োজন ভিন্ন বেশি কথা না বললেও এতদিন মেয়েটাকে দেখতে দেখতে তার প্রতি বেশ মায়াও পড়ে গেছে গুঞ্জার।

বাঁদরীর কথা শুনে সে ভাবতে লাগল পালেবতকে দল হ্রদে ভ্রমণের অনুমতি দেবে কিনা? সভাসদ উচ্ছল গৃহে নেই। তার অনুমতি বিনা মেয়েটিকে শিকারাতে নামতে দেওয়া ঠিক হবে কিনা? যদিও তিনি আজ ফিরে আসার আগেই পালেবতকে নিশ্চয়ই ফিরিয়ে দিয়ে যাবে বাঁদরী। কারণ, গৃহকর্তা তার বাসস্থান ত্যাগ করার আগে গুঞ্জাকে জানিয়ে গেছেন যে রাজকার্য উপলক্ষ্যে তিনি আজ শারিকা পর্বতে যাবেন। তার ফিরতে সন্ধ্যা নামবে।

গুঞ্জাকে চুপ করে থাকতে দেখে পালেবত, বাঁদরীকে বলল, ‘থাক, তুমি ফিরেই যাও। আমি যেমন আছি তেমনই এ স্থানে থাকি।’ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মৃদু অভিমানও যেন ঝরে পড়ল তার কণ্ঠ থেকে।

বৃদ্ধা ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। বাঁদরী এরপর গুঞ্জার উদ্দেশে বলল, ‘তুমি কি ভাবছ পালেবতকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে আমি তার কোনো ক্ষতি করব? দল হ্রদে ডুবিয়ে মারব, নাকি দাসীর হাটে বিক্রি করব? এই বাঁদরী সামান্য শিকারা চালক হতে পারে, কিন্তু সে তেমন মেয়ে নয়। ঠিক আছে তুমি যখন আমার কথায় ভরসা করতে পারছ না তখন আমি চলি?’

অভিমান ঝরে পড়ল বাঁদরীর কথাতেও। বৃদ্ধা এবার দ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন। বাঁদরীর সঙ্গে তার দীর্ঘ দিনের পরিচয়। খবর পাঠালেই সে এ গৃহে হাজির হয়, যত্ন করে বৃদ্ধাকে হ্রদ পারাপার করায় সে। তার কথা শোনার পর কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বৃদ্ধা শেষ পর্যন্ত বলল, ‘আচ্ছা পালেবত যাক তোমার সঙ্গে। তবে বেশি সময়ের জন্য নয়। বিকাল হওয়ার আগেই তুমি ওকে ফিরিয়ে দিয়ে যাবে।’

বাঁদরী বলল, ‘তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। তাই হবে।’

গুঞ্জা এবার পালেবতকে বলল, ‘তুমি আমার কক্ষে এসো।’

নির্দেশ মেনে তার পিছন পিছন সে কক্ষে প্রবেশ করল পালেবত। তোরঙ্গ খুলল গুঞ্জা। একটা রেশমের থলি থেকে দুটো তামার মুদ্রা বার করে সে মুদ্রা দুটো পালেবতকে সমর্পণ করে বলল, ‘বাঁদরী যাই বলুক না কেন, ফেরার পথে তাকে মুদ্রা দুটো দেবে। যতই হোক শিকারা চালনা ওর পেশা। ও তোমার স্বল্প পরিচিত। অকারণে তার থেকে অনুগ্রহ লাভ করা সঠিক হবে না।’

মুদ্রা দুটো হাতে নেবার পর গুঞ্জার দিকে তাকিয়ে পালেবতের যেন তাকে ঠিক স্নেহশীলা মাতৃমূর্তি বলেই মনে হল। পালেবত বলল, ‘মুদ্রা তাকে দিয়ে দেব।’ এ কথা বলে সে তার পোশাকের মধ্যে মুদ্রা দুটো পুরে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। তারপর সে বাঁদরীর সঙ্গে তার শিকারাতে ভেসে পড়ল মুক্তির আনন্দে দল হ্রদের বুকে।

ধীর গতিতে চাপ্পা মারতে মারতে বাঁদরী তার নৌকাটাকে এগিয়ে নিয়ে চলল। মাথার ওপর মেঘমুক্ত নীল আকাশ, হ্রদের গায়ের পাহাড়গুলো তুষার মুক্ত হয়ে উঠেছে। তার প্রতিচ্ছবি পড়েছে কাকচক্ষু হ্রদে। কোথাও কোথাও হ্রদের বুক থেকে নানা বর্ণের জলজ পুষ্প মাথা তুলেছে। ভ্রমরের গুঞ্জন শুরু হয়েছে সে স্থানে। হ্রদে ভাসার পর বেশ কিছুক্ষণ ধরে পালেবত নিশ্চুপ ভাবে প্রত্যক্ষ করতে লাগল চারপাশের দৃশ্য।

চাপ্পা বাইতে বাইতে বাঁদরী এক সময় হেসে বলল তুমি কি সারাক্ষণ অমন অবাক হয়ে তাকিয়েই থাকবে? দেখছ কী? আর কিছু পক্ষকাল পরে আরও সুন্দর হয়ে উঠবে চারদিক। পাহাড়গুলোর ঢালে নানা রঙের ফুল ফুটবে। তখন সত্যি স্বর্গের রূপ নেবে এই হ্রদ, এই উপত্যকা।’

তার কথা শুনে পালেবত বলল, ‘সত্যিই তোমাদের এ স্থান বড় সুন্দর!’

পালেবত এরপর বাঁদরীকে বলল, ‘তুমি রাতে থাকো কোথায়? শিকারাতে নিশ্চয়ই নয়?’ বাঁদরী নৌকা চালাতে চালাতে হ্রদের এক দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওই যে পাহাড়টা দেখছ, ওর নীচেই হ্রদের পাড়ে আমার ঘর।’ এ কথা বলে সে পালেবতকে প্রশ্ন করল তোমার বাড়ি কোথায়, গ্রাম কোথায়?’

প্রশ্ন শুনে পালেবত একটু থতমত খেয়ে জবাব দিল, ‘ওই যে উত্তর দিকে মাথায় বরফ ঢাকা বড় বড় পাহাড় দেখা যাচ্ছে ওদিকেই অনেক দূরের এক গ্রামে আমার বাড়ি। সে গ্রাম তুমি চিনবে না।’

বাঁদরী বলল, ‘অত দূরের পাহাড়ে আমি যাইনি কখনো। তবে শ্রীনগরের চারপাশে যে পাহাড়গুলো দেখছ, এ সব পাহাড়গুলো আমি চিনি। এসব পাহাড়ের নাম জানো?’ পালেবত জবাব দিল, ‘না, জানি না। যাইওনি কখনও। আমি তো এই প্রথমবার শ্রীনগরে এসেছি।’

বাঁদরী এরপর পালেবতকে শ্রীনগরকে বৃত্তাকার ঘিরে থাকা অনুচ্চ পর্বতগুলোকে চিনিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগল, ‘ওই যে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টা দেখছ ওটা হল পুষ্পপথ। বসন্তে সব চেয়ে সুন্দর স্থান ওই পর্বত, আর ওই পর্বতটা হল স্বর্ণ পর্বত। ভোরের প্রথম আলো যখন ওর মাথায় এসে পড়ে, তখন মনে হয় ওর মাথাটা যেন সোনায় মোড়া। আর তার পাশেরটা হল চন্দ্র পর্বত। বিশাল একটা গুহা আছে ওই পর্বতে। ওর পাশেরটা হল হস্তি পর্বত। তার পরেরটা হল নাগ পর্বত। ওর শৃঙ্গটা দেখো, ঠিক যেন সাপের ফণার মতো! ওই নেড়া পাহাড়টাতে কোনো ফুল ফোটে না। খার্খদ থাকে ওখানে। কেউ কেউ তাই ওকে খার্খদ পাহাড় নামেও ডাকে।’

‘খার্খদ কী?’ বাঁদরীর কথার মধ্যেই প্রশ্ন করল পালেবত।

বাঁদরী বলল; ‘খার্খদ হল জাদুকরী। তার নাম মাতঙ্গী। নানান রকম ক্ষমতা আছে তার। দূর থেকেই সে মন্ত্র দিয়ে মানুষকে মেরে ফেলতে পারে। সবাই ভয় করে ওকে। আমি দেখেছি তাকে। ভয়ঙ্কর দেখতে। ওই পাহাড়ের ওপর থেকে সে শ্রীনগরের ওপর নজর রাখে। কোথায় কী হচ্ছে না হচ্ছে সব সে দেখতে পায়...।’

এই সুন্দর পরিবেশে ওই ভয়ঙ্করী নারীর কথা শোনার ইচ্ছা হল না পালেবতের। সে বলল, ‘তুমি পরের পর্বতের নাম বলো?’

বাঁদরী বলল, ‘ওর পরের পর্বতটার নাম হরিৎ পর্বত। বসন্তে ওখানে লোকে ফসল ফলাতে যায়। আর তার পাশের পর্বতটা হল শারিকা পর্বত বা চক্র পর্বত। ও স্থানে চন্দ্রমন্দির আছে।’

একথা বলে একটু থেমে বাঁদরী বলল, ‘আর কদিন পরেই চক্রপুজো হবে এই মন্দিরে। দূর-দূর থেকে বহু মানুষ আসে ওখানে পুজো দিতে। এই হ্রদ থেকেই দেখা যায় পিপীলিকার মতো সার সার মানুষ মন্দিরে উঠছে পুজো দেবার জন্য। তুমি যাবে সেখানে?’

পালেবত বলল, ‘যদি গুঞ্জা মাতা আমাকে সেখানে নিয়ে যান তবে তার সঙ্গে যাব। কিন্তু তিনি কি ওই পাহাড়ে উঠতে পারবেন?’

বাঁদরী বলল, ‘সে ওখানে প্রতিবার যায়। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য ডুলি-কার্ণিরথের ব্যবস্থা থাকে।’

এ কথা বলার পর বাঁদরী আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল শারিকা পর্বতের বিষয়ে। কথা বলতে বলতে তারা বেশ খানিকটা দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলেছে। হঠাৎ পালেবতের চোখে পড়ল মহারাজের সেই ভাসমান প্রাসাদটা। সেটা দেখামাত্রই পালেবত বলে উঠল, ‘ওই তো সেই রাজপ্রাসাদ!’ পালেবতের কথা শুনে বাঁদরী বলল, ‘হ্যাঁ, ওটাই মহারাজের প্রাসাদ। এত বড় আর সুন্দর প্রাসাদ আর দ্বিতীয়টি নেই এই দল হ্রদে। চলো তোমাকে ওর কাছ থেকে ঘুরিয়ে আনি?’ এ কথা বলে সে শিকারার মুখ ঘুরিয়ে এগোল সেই প্রাসাদের দিকে। ক্রমেই কাছে এগিয়ে আসতে লাগল সেই প্রাসাদ।

এক সময় সেই ভাসমান প্রাসাদের কাছে পৌঁছে গেল শিকারা। তার চারপাশে বেশ কয়েকটা নৌকা নিয়ে পাহারা দিচ্ছে সৈনিকের দল। তারা কেউ বাধা দিল না বাঁদরীর নৌকাকে। তাদের কারোর দিকে চেয়ে হাত নাড়ল বাঁদরী, কারো দিকে চেয়ে হাসল। পালেবত তা দেখে বুঝতে পারল সৈনিকেরা তাকে চেনে। দাঁড় টানতে টানতে বাঁদরী বলল, আর কিছুদিন পরই মহারাজ ললিতাপীড় এ প্রাসাদে এসে উপস্থিত হবেন দল হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য। তার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। ওই দেখো মজুরের দল প্রাসাদ গাত্র ধোয়া-মোছা করছে। গত কয়েক দিন আমি বেশ কিছু লোককে ও প্রাসাদ থেকে আনা নেওয়া করেছি। এই জলপ্রাসাদের বাইরেটা যেমন সোনালি রং করা তেমনই মহারাজ যে কক্ষে বাস করেন সে কক্ষও সত্যিকারের স্বর্ণমণ্ডিত। তাঁর প্রমোদ কক্ষও সোনায় মোড়া!’

পালেবত প্রশ্ন করল, ‘তুমি সে সব কক্ষে প্রবেশ করেছ?’

এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মুহূর্তের জন্য যেন থমকে গেল বাঁদরী। তারপর বলল, ‘জলপ্রাসাদে প্রবেশ করলেও আমি সে স্থানে যাইনি। তবে শুনেছি সে কথা।’

চক্রাকারে প্রাসাদটাকে ধীরে ধীরে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করল শিকারা নৌকা। আর পালেবত বিস্মিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সে প্রাসাদের দিকে। শুধু বিশালত্বের দিক থেকেই নয়, এমন কারুকার্যমণ্ডিত জলপ্রাসাদ আর দ্বিতীয়টি সত্যি নেই। ভাসমান প্রাসাদের বিশালাকৃতির দ্বার, তমোরি, ঝুল-বারান্দাগুলি সবই অপূর্ব!

এই উপত্যকা এমনিতেই কাষ্ঠশিল্পের জন্য সারা জগতে সমাদৃত। তার ওপর উপত্যকার শ্রেষ্ঠ কাষ্ঠ শিল্পীরা নির্মাণ করছে এই ভাসমান প্রাসাদ। এ জল প্রাসাদ শ্রেষ্ঠ তো হবেই। শিকারাতে উঠে দাঁড়িয়ে সেই জলপ্রাসাদের অভ্যন্তরটা দেখার চেষ্টা করতে লাগল পালেবত। যদি তার চোখে পড়ে স্বর্ণ নির্মিত কক্ষ বা তেমন কিছু! কিন্তু ভাসমান প্রাসাদের তোরণগুলো সব বন্ধ। বিশালাকৃতির তমোরিগুলোরও হয় ঝাঁপ বন্ধ, নচেৎ ভারী মখমলের পর্দা বাইরের কোনো দৃষ্টিকে প্রাসাদের ভিতর প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তা দেখে পালেবতের মনে হল, এ সব প্রাসাদ যেমন সৌন্দর্যমণ্ডিত তেমন যেন একটা ভীতিপ্রদ ভাবও লুকিয়ে আছে এ স্থানে। পালেবতের এ প্রাসাদ সম্পর্কে তেমন কোনো বিশেষ ব্যাপার জানা নেই, তবু কেন জানি তার এ কথাটাই মনে হল।

ভাসমান রাজপ্রাসাদ তখন প্রদক্ষিণ করা প্রায় শেষ হতে চলেছে, ঠিক সেই সময় হঠাৎই প্রাসাদের ভিতর থেকে দ্বিতলের অলিন্দে এসে দাঁড়াল এক নারী। তার গায়ে ব্যাঘ্র চর্মের শাল আর স্বর্ণালঙ্কার ঝলমল করছে সূর্যালোকে। তাকে দেখেই বোঝা যায় সে ধনবতী। তাকে দেখতে পেয়েই বাঁদরী শিকারা চালানো বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। সেই অলঙ্কার বেষ্টিতা নারীও ওপর থেকে চারপাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে করতে বাঁদরীর শিকারাটা দেখতে পেয়ে গেল। সে শিকারার দিকে তাকতেই বাঁদরী হাত জোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে প্রণাম জানাল। অলিন্দে দাঁড়ানো ব্যাঘ্র চর্মে জড়ানো সেই নারী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শিকারার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘ওই কোথায় চলেছিস?’

বাঁদরী বলল, কোথাও নয়। যাত্রী নেই তাই ঘুরতে ঘুরতে এখানে চলে এসেছি।’

অলিন্দে দাঁড়ানো নারী কর্কশ কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘যাত্রী নেইতো সঙ্গে ওটা কে? আমাকে দেখে প্রণাম জানাল না কেন?’

বাঁদরী বলল, ‘ও আমার সহচরী। এ স্থানে নতুন এসেছে। মার্জনা করবেন, ও আপনাকে চেনে না?’

পালেবত এবার বুঝতে পারল যে অলিন্দে দাঁড়িয়ে থাকা নারী কোনো প্রতাপশালী রমণী, যাঁকে দেখে সবাই মাথা নত করে। ব্যাপারটা অনুধাবন করবার সঙ্গে-সঙ্গেই বাঁদরীর মতোই দু-হাত জোড় করে প্রণাম জানাল তাকে।

কর্তৃত্বময়ী সেই রমণী এরপর বাঁদরীর উদ্দেশে বলল, ‘তুই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিস। আর কিছুদিন পর মহারাজ এখানে এসে উপস্থিত হবেন। তখন তোকেও কাজে লাগবে আমার।’ তার কথা শুনে বাঁদরী তাকে বলল, ‘নিশ্চয়ই। এ তো আমার পরম সৌভাগ্য।’ বাঁদরীর জবাবের পর সেই সুবেশী নারী আর কোনো কথা না বলে অলিন্দ ত্যাগ করে প্রাসাদের ভিতর অন্তর্হিত হল।

সে চলে যাওয়ার পর আবার বসে পড়ল বাঁদরী, চাপ্পা হাতে তুলে নিল। পালেবতও বসল। এগিয়ে চলতে লাগল শিকারা। সেই সুবর্ণ জলপ্রাসাদ থেকে কিছুটা দূরে সরে যাবার পর পালেবত জানতে চাইল, ‘কে উনি? কোনো রানি নাকি?’

চাপপা চালাতে চালাতে বাঁদরী বলল, ‘উনি কোনো রানি নন, তবে রানিদের থেকেও অনেক বেশি ক্ষমতার অধিকারিণী।’

‘অর্থাৎ?’ প্রশ্ন করল পালেবত।

বাঁদরী বলল, ‘মহারাজের তিনজন প্রধান সেবিকা আছেন। তার মধ্যে উনি একজন। নাম বিটপী। উনি শুধু সেবিকাই নন মহারাজের অন্যতম পরামর্শদাতা। মহারাজ ওঁকে রাজ্যসভাতেও স্থান দিয়েছেন। ওরই মতো আরও দুই প্রধান সেবিকাকেও দিয়েছেন। বিটপী আর তার দুই সঙ্গিনীর পরামর্শ ছাড়া এক পা-ও চলেন না মহারাজা। অন্য মন্ত্রী ও পার্ষদরাও সমীহ করে চলে ওঁকে। লোকে বলে বিটপীর ক্ষমতা নাকি মহামন্ত্রীর চেয়েও অনেক বেশি। বিটপী রুষ্ট হলে যে কোনো মন্ত্রীর পদচ্যুতি হতে পারে, এমনকী তাঁকে শাস্তির মুখেও পড়তে হতে পারে। এমনই ক্ষমতাধারিণী বিটপী আর দুই নারী।’ পালেবতের কাছে বিটপীর পরিচয় দান করার পর বাঁদরী আত্মশ্লাঘার সঙ্গে বলল, তবে সে আমাকে পছন্দ করে। আমার শিকারাতেও আগে উনি চড়েছেন। তখন অবশ্য মহারাজের প্রধান সেবিকা ছিলেন না। সবাই জানে আমার সঙ্গে ওঁর পরিচয় আছে। এই যে আমি হ্রদের মধ্যে একলা মেয়ে মানুষ ঘুরে বেড়াই তবু কেউ আমাকে বিরক্ত করতে সাহস পায় না তা ওঁর জন্যেই। আমি যদি একবার কারো নামে তার কাছে অভিযোগ জানাই, তবে সে লোকের অনিষ্ট হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা।’ এই বলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করে জলের মধ্যে চাপ্পার ঘা দিতে শুরু করল বাঁদরী।

পালেবত জানতে চাইল, ‘উনি মহারাজের এত ঘনিষ্ঠ হলেন কীভাবে?’

বাঁদরী জবাব দিল, ‘বেশ্যারা নানান ছলাকলা জানে।’

চাপ্পা ঘায়ে জলের ভিতর থেকে শব্দ ওঠার কারণে কথাটা অস্পষ্টভাবে কানে গেল পালেবতের।

সে বলল, ‘কি বললে তুমি?’

‘বেশ্যা’ শব্দটা হঠাৎই অসতর্কভাবে বেরিয়ে গেছিল বাঁদরীর মুখ থেকে। বিটপীর পরিচয় সবাই স্পষ্টভাবে জানলেও তার সম্পর্কে এ কথা সাধারণ নাগরিকরা কেউ ভয়ে প্রকাশ্যে উচ্চারণ করে না। যেমন করে না রতিমালা ও মুক্তবেণী সম্পর্কে। কারণ, এ কথা তাদের কানে গেলে মৃত্যুযোগও ঘটতে পারে। বাঁদরী তাই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘বলছিলাম, বিটপী নানান গুণের অধিকারিণী। তাই মহারাজের প্রধান সেবিকা আর সভাসদের পদ অলঙ্কৃত করেছেন।’

এর পর প্রসঙ্গ পাল্টে অন্য কথা বলতে শুরু করল বাঁদরী। তার সঙ্গে গল্প করতে করতে আর হ্রদের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল পালেবত। হ্রদের বুকে এক ভাসমান দ্বীপের কাছেও তাকে নিয়ে গেল বাঁদরীর নৌকা। নানান বর্ণের ফুল ফুটতে শুরু করেছে সেই ভাসমান দ্বীপে। সত্যিই আশ্চর্য স্থান এই দল হ্রদ। দ্বীপ যেখানে ভেসে বেড়ায়, একসময় তারা খেয়াল করল পাহাড়ের পিছনে সূর্য এগোতে শুরু করেছে। অর্থাৎ বিকাল হতে চলেছে। গুঞ্জাকে দেওয়া কথা পূরণের জন্য এরপর তার শিকারার মুখ ঘোরাল পালেবতকে তার বাসস্থানে পৌঁছে দেবার জন্য।

বিকাল হওয়ার আগেই পালেবত পৌঁছে গেল জলগৃহের সামনে। বৃদ্ধা গুঞ্জাকে বাইরে দেখতে পেল না তারা। পালেবত অনুমান করল সম্ভবত সে নিদ্রা গেছে। শিকারা ত্যাগ করে ভাসমান গৃহে ওঠার পূর্ব মুহূর্তে পালেবত, বাঁদরীর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তোমাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব জানি না। তুমি আমাকে একটা সুন্দর দিন উপহার দিলে।’

বাঁদরী হেসে বলল, ‘সখীকে কেউ ধনবাদ দেয় নাকি? তুমি তো আমার সখী।’ এই অপরিচিত উপত্যকা নগরীর হ্রদে পালেবত মাথার ওপর আশ্রয় আর নিরাপত্তা পেলেও সে অর্থে তার সঙ্গী বা সঙ্গিণী বলতে কেউ নেই। মনের কথা খুলে বলারও কেউ নেই। পালেবতের মনে হল এই বাঁদরী হয়তো তার সে অভাব পূরণ করতে পারবে। সে তাই বলল, ‘হ্যাঁ, তুমিও আমার সখী।’

এ কথা শোনার পর বাঁদরী তাকে কয়েক মুহূর্তের জন্য আবেগ মথিত ভাবে আলিঙ্গন করার পর বলল, ‘সময়, সুযোগ মতো আমি আবার আসব।’

পালেবত বলল, ‘আমি তোমার প্রতীক্ষায় থাকব।’

শিকারা ছেড়ে কাঠের ধাপ বেয়ে ভাসমান গৃহে উঠে পড়ল পালেবত। অন্যত্র যাবার জন্য শিকারা নিয়ে এগোল বাঁদরী। সে দিকে তাকিয়ে পালেবত ভাবতে লাগল এ স্থানে উপস্থিত হওয়ার পর সত্যিই তাকে একটা স্মরণীয় দিন উপহার দিল মেয়েটা। তার জন্যই সে আজ দল হ্রদের নানান স্থানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারল। ভাসমান দ্বীপ দেখতে পেল, কাছ থেকে দেখতে পেল মহারাজের ভাসমান প্রাসাদ, এমনকী সেই বিটপী নামের নারীকেও! কত নানান রকম কাহিনি শুনতে পেল সে বাঁদরীর মুখ থেকে! এ সব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ পালেবতের খেয়াল হল পয়সা দুটো তো বাঁদরীর হাতে দেওয়া হল না! বাঁদরী তখন তার শিকারা নিয়ে অনেকটা দূর এগিয়ে গেছে। কাজেই পালেবত আর তাকে ডাকল না। মনে মনে সে ভেবে নিল এরপর যেদিন বাঁদরী আসবে সেদিন সে পয়সা দুটো তাকে দেবার চেষ্টা করবে। যদিও সখী বাঁদরী তার থেকে পয়সা গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না। পালেবত এরপর একবার ভাবল সে গুঞ্জাকে জানিয়ে রাখবে বাঁদরীকে পয়সা দিতে ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটা। পরক্ষণেই তার মনে হল গুঞ্জা যদি অসন্তুষ্ট হন ব্যাপারটা জেনে? তাই সে আর ঘটনাটা তাকে জানাল না। পয়সা দুটো নিজের কাছেই রেখে দিল।

কয়েকদিনের মধ্যেই গুঞ্জা পালেবতকে জানাল শারিকা পর্বতে চক্রপুজো দিতে যাবে সে। তাকেও সে সঙ্গে নিয়ে যাবে। সভাসদ উচ্ছলের কাছ থেকে তাকে সে স্থানে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছেন তিনি। এ বাসগৃহের অধিপতি নিজেও নাকি সে স্থানে ওই দিন থাকবেন। ফল বিক্রেতা এক শিকারা চালকের মাধ্যমে ওই দিন বাঁদরীকে আসার জন্য গুঞ্জা খবর পাঠাবে।’ এ কথা শুনেই আনন্দে নেচে উঠল পালেবতের মন।

১১

দেখতে দেখতে চক্রপুজোর দিন এসে গেল। এ কদিন নানান পরিশ্রমের মধ্যে দিন অতিবাহিত করতে হয়েছে সভাসদ উচ্ছলকে। তার কার্যালয়ে কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে বণিকদের আগমন হেতু। তার ওপর আবার সংযুক্ত হয়েছে শারিকা পর্বতে পুজোর উৎসব উপলক্ষ্যে কর্মকাণ্ড। এ সব কাজের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য ব্যস্ত থাকতে হয়েছে উচ্ছলকে। প্রায়ই তার জলগৃহে ফিরতে সন্ধ্যা নেমে গেছে। এদিন ভোরের আলো ফোটার কিছুক্ষণ পরই উচ্ছল তার জলগৃহ ত্যাগ করে শারিকা পর্বতের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল কর্তব্য সম্পাদনের জন্য।

চক্রপুজোর জন্য উপাচার সংগ্রহ করে রেখেছিল গুঞ্জাও। পালেবতের নিদ্রাভঙ্গ হওয়ার পর তার হাতে একটা নতুন পোশাক তুলে দিল সে। কোথা থেকে সে তা সংগ্রহ করেছে পালেবতের তা জানা নেই। রেশমের ওপর সোনালি সুতোর কাজ করা বেশ ঝলমলে পোশাক আর একই রকমের উড়নি।

উচ্ছল ভাসমানগৃহ ছেড়ে রওনা হয়ে যাবার কিছু সময়ের মধ্যে একই স্থানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিল তারা দুজনও। বাঁদরীও নৌকা নিয়ে হাজির হল এরপর। তার পরনেও ঝলমলে রঙিন পোশাক, করবীতে, বাহুতে ফুলমালার বন্ধন। পালেবতকে দেখেই সকালের উজ্জ্বল সূর্য কিরণের মতোই হাসল সে। পুজোর উপাচার নিয়ে পালেবত আর গুঞ্জা নেমে এল শিকারাতে। ফুল-ফলের চুপড়িগুলো যত্ন করে রাখার পর গুঞ্জা বসল শিকারার মাথার আচ্ছাদনের ঠিক নীচে আর পালেবত বসল একটু এগিয়ে গিয়ে বাঁদরীর পাশে। বাঁদরী একটা ফুলের মালা পালেবতকে দিয়ে বলল, ‘তোমার জন্য এনেছি। কবরীতে বেঁধে নাও।’

মালাটা খোঁপায় বেঁধে নিল পালেবত। চলতে শুরু করল শিকারা। কিছুটা এগোবার পর পালেবত দেখতে পেল দল হ্রদের সব শিকারাগুলোই যেন আজ এগিয়ে চলেছে পাড়ের দিকে। তাদের যাত্রীরা অধিকাংশই নারী। তাদের সকলের পরনেই প্রায় নূতন বস্ত্র। সাধ্য মতো তারা সেজেছে সোনা-রূপার অলঙ্কার অথবা ফুলের সাজে। জলগৃহ ত্যাগ করে তারা সবাই চলেছে শারিকা পর্বতে পুজোর উৎসবে যোগদান করার জন্য। তবে এর আগের দিন পালেবতরা যে পাড়ের দিকে গিয়েছিল প্রয়োজনীয় তৈজস সামগ্রী ক্রয় করার জন্য, সেদিকে শারিকা পর্বতের অবস্থান নয়। এ পর্বতের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন দিকে। সেদিকেই এগোচ্ছে জলযানগুলো।

কিছু সময় সেদিকে চলার পর ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল সেই পর্বত গাত্র। বাঁদরী আঙুল তুলে সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাল পালেবতের। সে দেখতে পেল পাহাড়ের গায়ে পাকদণ্ডী বেয়ে জনস্রোত উঠে চলেছে ওপর দিকে। হ্রদের বুক থেকে তাদের দেখতে লাগছে ঠিক সারবদ্ধ পিপীলিকার মতো।

পালেবতদের শিকারার পাশ দিয়ে এগিয়ে চলে গেল একটা শিকারা। তাতে বসেছিল এক নারী। সর্বাঙ্গ তার স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কারে শোভিত। পালেবত তাকে দেখে বুঝেতে পারল সেও চলেছে শারিকা মন্দিরে পুজো দিতে। তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে রমণী বাঁদরীর উদ্দেশে হাত নেড়ে বুঝিয়ে দিল সে তার পরিচিত। নিছক কৌতূহলের বশে পালেবত, বাঁদরীকে প্রশ্ন করল, ‘এ রমণী কে? এও তোমার কোনো সখী নাকি?’

চাপ্পা দিয়ে জলে ঘা মারতে মারতে বাঁদরী জবাব দিল, ‘সখী
নয়, তবে পরিচিত। দল হ্রদেই বাস করে। মহারাজ যখন জলপ্রাসাদে বাস করেন তখন ও সেখানে দাসীর কাজ করে। আরও কয়েকজনও করে।’

পালেবত কথাটা শুনে বিস্মিত ভাবে বলল, ‘দাসীর অঙ্গে এত স্বর্ণালঙ্কার!’

বাঁদরী বলল, ‘হ্যাঁ। ওর চেয়েও বেশি অলঙ্কারও অনেকের আছে। আমি দল হ্রদে শিকারা চালিয়ে যা উপার্জন করি তার চাইতে এই দাসীরা অনেক বেশি উপার্জন করে। মহারাজ বা তার তিন প্রধান সেবিকার মন মতো কাজ করতে পারলে তারা নিজেদের ব্যবহৃত অলঙ্কার, স্বর্ণমুদ্রা দান করেন দাসীদের। আর কোনো ভাবে যদি তুমি মহারাজ আর ওই সেবিকা তিনজনের একান্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারো তবে তো কথাই নেই। নগরীর অভ্যন্তরে অট্টালিকা নির্মাণ করতে অথবা বৃহৎ ভাসমান গৃহ নির্মাণ করতে তোমার বেশিদিন সময় লাগবে না।’

পালেবত তাকে প্রশ্ন করল, ‘দাসীবৃত্তিতে যখন এত অর্থ তখন এত পরিশ্রমের কাজ ছেড়ে সেকাজ করতে তোমার ইচ্ছা জাগেনি? মহারাজের এক প্রধান সেবিকা তো পরিচিত?’

প্রশ্ন শুনে কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন থেমে গেল বাঁদরীর চাপ্পা। সে বলল, ‘কখনও কখনও সে সাধ জাগে না তা নয়। অনেক অর্থ লাভের সম্ভাবনা ওতে। তবে...’ থেমে গেল বাঁদরী।

‘তবে কী?’ বলে উঠল পালেবত।

বাঁদরী জবাব দিল, ‘তবে, তেমন কিছু না। আমি স্বাধীন আছি। এই বেশ ভালো আছি। যখন ইচ্ছা যেখানে খুশি যেতে পারি। মহারাজের ভাসমান প্রাসাদে দাসীর কাজে যোগ দিলে মহারাজ বা তাঁর প্রধান সেবিকাদের অনুমতি বিনা কোথাও এক-পাও যাওয়ার উপায় থাকবে না। আর একবার এ কাজে যোগ দিলে তা ছাড়ারও উপায় থাকে না। তেমন কাজ কেউ করার চেষ্টা করলে কঠিন দণ্ড নেমে আসে তার ওপর।’

এ কথা বলে আবার শিকারা এগিয়ে নিয়ে চলল সে।

পালেবতের এরপর হঠাৎ মনে পড়ে গেল বাঁদরীর প্রাপ্য মুদ্রা দুটোর কথা। বৃদ্ধা যাতে শুনতে না পায় তাই চাপাস্বরে সে বাঁদরীকে বলতেই সে বলল, ‘ও মুদ্রা আমি কিছুতেই নেব না। তবে আর দুজনের মধ্যে কীসের সম্পর্ক! তুমি গুঞ্জামাতাকে মুদ্রা দুটো ফিরিয়ে দাও।’

পালেবত বলল, ‘সে রুষ্ট হতে পারে ব্যাপারটাতে।’

এ কথা শুনে বাঁদরী একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘ধরো আমি পয়সা দুটো নিয়েছি। তারপর আবার তা তোমাকেই উপহার দিয়েছি। সখীকে তো কেউ উপহার দিতেই পারে তাই না? ও পয়সা এখন তোমার। পাহাড়ের ওপর কত রকম সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। আমার উপহার হিসাবে ওই পয়সা দুটো দিয়ে তুমি কিছু ক্রয় কোরো অথবা আমোদ কোরো।’

অপরিচিত এই পৃথিবীতে সদ্য পরিচিত এই হ্রদ কন্যার কথা শুনে পালেবতের মন তার প্রতি ভালোবাসায় ভরে উঠলেও মুখে সে বলল, ‘না, না, তা কীভাবে সম্ভব?

বাঁদরী এবার তার কণ্ঠস্বরে অভিমান ফুটিয়ে বলল, ‘আমি সামান্য শিকারা বাহিকা আর তুমি যতই হোক মহারাজের সভাসদের গৃহে বসবাস করো। বুঝতে পারছি আমি তোমার সখী হওয়ার উপযুক্ত নই। দাও মুদ্রা দুটো দাও। তবে ও পয়সা নিয়ে আমি জলে ফেলে দেব।’

বাঁদরীর মুখে এ কথা শোনার পর তাকে এ প্রসঙ্গে আর কিছু বলতে সাহস পেল না পালেবত। মনে মনে সে ভাবল, যদি কোনোদিন সুযোগ আসে তবে সে বাঁদরীকে এর প্রতিদান দেবে। চারপাশ দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল সে।

কিছু সময়ের মধ্যেই হ্রদের পাড়ে গিয়ে ভিড়ল বাঁদরীর শিকারা। পাড়ের কিছুটা তফাত থেকেই উঠে গেছে শারিকা পর্বতের পাকদণ্ডী। তীর্থ যাত্রী, দল হ্রদের বাসিন্দা, অশ্ব চালক, ডুলি-কার্ণিরথ বেহারা আর নানান ধরনের মানুষের সমাগমে কোলাহল পূর্ণ চারদিক। পর্বতের ওপর থেকেও জন সমাগমের শব্দ আর ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। পুজোর উপাচারগুলো নিয়ে বৃদ্ধার সঙ্গে পাড়ে নামার আগে পালেবত বাঁদরীকে বলল, ‘তুমি পুজো দিতে যাবে না?’

বাঁদরী বলল, ‘আমি বহুবার ওই স্থানে গেছি। আজ আমি যাব না। এ স্থানে যাওয়া-আসার জন্য অনেকেই আজ শিকারার সন্ধান করছে। তাই হ্রদে থাকলে আমার আজ বাড়তি উপার্জন হবে। তবে বিকালের আগেই আমি এ স্থানে তোমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য ফিরে আসব।’

পালেবতরা পাড়ে উঠতেই বৃদ্ধাকে দেখে ডুলি বাহকরা ঘিরে ধরল তাদেরকে। সুবিধা মতো একটা ডুলি নির্বাচন করে তাতে উঠে বসল গুঞ্জা। বাহকরা ডুলি কাঁধে নিয়ে পাকদণ্ডী বেয়ে উঠতে শুরু করল। আর তার সঙ্গে চলল পালেবত।

পাকদণ্ডী লোকজনে পরিপূর্ণ। তবে নারীদের আধিক্যই বর্তমান। তারা কেউ দলবদ্ধ ভাবে কলহাস্যে মুখরিত হয়ে পদব্রজে বা অশ্বপৃষ্ঠে ওপর দিকে চলেছে। আর গুঞ্জার মতো বৃদ্ধারা তাদের ক্ষমতা অনুসারে কেউ চলেছে ঝালরের আচ্ছাদন দেওয়া কারুকাজ খচিত হাতির দাঁতের শিবিকায়, সুদৃশ্য গলিচা বিছানো কার্ণিরথে, ডুলিতে। এমনকী বয়সের ভারে লুব্ধ হয়ে যাওয়া কেউ কেউ বাহকের পিঠে ঝুলতে থাকা রজ্জুবন্ধনীর মধ্যেও বসে আছে। পুণ্যলাভের আশায় সবারই গন্তব্য চক্র মন্দির। বিশাল অজগর সর্পের মতো জনস্রোত ধেয়ে চলেছে পাহাড়ের মাথার অভিমুখে।

এক সময় শারিকা পর্বতের ওপর পৌঁছে গেল পালেবত। পর্বত শৃঙ্গের কিছুটা নীচে একটা সমতল অংশ বৃত্তাকারে আবৃত করে আছে পাহাড়টাকে। ওই সমতল অংশেই পাহাড়ের তৈরি অতি প্রাচীন চক্রমন্দির। তার গায়ে চক্র খোদিত।

মন্দির প্রাঙ্গণে তিল ধারণের জায়গা নেই। অজস্র নারীদের ভিড়। জনসমাগম উপলক্ষ্যে কোথাও নির্মিত হয়েছে অস্থায়ী কুটীর, কোথাও বা বিপণী, পুজোর জন্য সব প্রয়োজনীয় দ্রব্য তো বটেই, অন্যান্য নানান সামগ্রী বিক্রয় হচ্ছে সেখানে। মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, সমবেত জনতার দেবীর নামে জয়ধ্বনি, বাদ্যযন্ত্রের শব্দ, সব মিলিয়ে মিশিয়ে মহা শোরগোল চতুর্দিকে। ওপর থেকে তাকালেই পাদদেশে দলহ্রদ দেখা যাচ্ছে। অগুনতি বাসগৃহ আর সন্তরণশীল শিকারা চোখে পড়ছে। মহারাজের বিশাল প্রমোদ তরণী বা ভাসমান প্রাসাদকে চিনতে অসুবিধা হল না পালেবতের। কারণ, অমন বিশাল তরণী হ্রদে আর দ্বিতীয়টি নেই। তার গাত্রবর্ণ সোনালি হওয়াতে সূর্যের আলোতে ওপর থেকে তাকে স্বর্ণনির্মিত বলেই মনে হচ্ছে! পালেবত একবার খুঁজে দেখার চেষ্টা করল তাদের ভাসমান গৃহটা। কিন্তু অমন গৃহ হ্রদের বুকে অনেকই আছে। তাদের ভিড়ের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেই গৃহ।

সারবদ্ধ ভাবে এগোতে এগোতে মন্দিরে পুজো দিচ্ছে ভক্তরা। পালেবত উপাচারের ঝুড়িটা মাথায় তুলে নিয়ে গুঞ্জার সঙ্গে সেই ভক্তদের অনুসরণ করল। বেশ অনেকটা সময় তাদের অতিবাহিত হয়ে গেল পুজো দিয়ে বিগ্রহ দর্শন করতে। এ কাজ যখন সমাপ্ত হল তখন সূর্য ঠিক তাদের মাথার ওপর দণ্ডায়মান। দীর্ঘক্ষণ ধরে দণ্ডায়মান থাকার কারণে ক্লান্ত বোধ করছিল বৃদ্ধা গুঞ্জা। পুণ্যার্থীদের বিশ্রামের জন্য বেশ কয়েকটা ছাউনি নির্মিত হয়েছে। গুঞ্জা তারই একটার তলায় উপবেশন করে পালেবতের হাতে দুটো মুদ্রা তুলে দিয়ে বলল, ‘আমি এখানে বিশ্রাম নিই। তুমি পাহাড়ের চারপাশটা দেখে এসো। মুদ্রা দুটো দিয়ে প্রয়োজনে কোনো খাদ্য সামগ্রী বা অন্য কিছু ক্রয় কোরো। তবে কারো সঙ্গী হয়ে কোথাও যাবে না। আর অপরিচিত কোনো পুরুষের সঙ্গে অপ্রয়োজনে বাক্যালাপ করবে না। আমাদের গৃহস্বামী এ স্থানেই আশেপাশে কোথাও আছেন। হয়তো বা তাঁর সঙ্গেও তোমার সাক্ষাৎ হয়ে যেতে পারে।’

গুঞ্জা সে স্থানেই বসে রইল আর পালেবত চারপাশ দেখতে দেখতে সে স্থান ছেড়ে এগোতে শুরু করল। পথ আর চত্বর পর্বত শৃঙ্গকে সাপের মতো বেষ্টন করে এগিয়েছে। সর্বত্রই লোকজনের ভিড়। নানবিধ অস্থায়ী বিপণীতে পণ্য সম্ভারও বিক্রি হচ্ছে। পাহাড়ের অলঙ্কার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ক্রীড়নক, গৃহস্থালীর সামগ্রী। আর পিষ্টক ইত্যাদি খাদ্য দ্রব্যর বিপণী তো আছেই। এছাড়া আমোদ-প্রমোদেরও নানান উপকরণ রয়েছে। কোথাও বাজিকর শূন্যে স্থাপিত রজ্জুর ওপর কোনো অবলম্বন ছাড়াই হেঁটে চলেছে, কোথাও ভালুক নাচ বা বাঁদর নাচ হচ্ছে, মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করে কথা বলছে তোতা পাখি, কোথাও বা ভাঁড়ের দল নানান রকম মুখভঙ্গি আর চটুল কথা বলে দর্শকদের মনোরঞ্জন করছে, আবার কোনো স্থানে মান্দ্রিক বাঁশি বাজিয়ে সাপের খেলা দেখাচ্ছে। এ সব দৃশ্যাবলী প্রত্যক্ষ করতে করতে মনের আনন্দে এগিয়ে চলল পালেবত।

পালেবত চলতে চলতে আরও বেশ কিছুটা এগোবার পর এক স্থানে এসে দাঁড়াল। সার সার অস্থায়ী বিপণী সে স্থানে। তার নীচে বসে বয়স্কা রমণীরা নবোদ্ভিন্ন বিক্রি করছে। নারীর দল সেই নবোদ্গত গাছগুলো ক্রয় করছে। ধাপ সমন্বিত পাহাড়ের ঢাল যে স্থান থেকে নীচে নেমেছে, রমণীর দল নীচে নেমে সেই ধাপগুলোতে চারাবৃক্ষ রোপণ করছে। একটা বিপনীর সামনে উপস্থিত হয়ে সে বৃদ্ধা বিক্রেতাকে প্রশ্ন করল, ‘এ কোন গাছের চারা?’

বৃদ্ধা হেসে বলল, ‘তুমি কোন দেশের মেয়ে? পালেবতের চারা চেনো না?’ এরপর সে একজোড়া শিশু গাছ হাতে উঠিয়ে দিয়ে বলল, ‘আজ চক্র পুজোর দিনে নারীরা এখানে দুটি শিশুগাছ রোপণ করে। একটা নিজের মঙ্গল কামনাতে, আর অন্যটা অপর কারো মঙ্গল কামনাতে।’ এ কথা সবাই যেমন জানে, তেমন তুমিও জানো নিশ্চয়ই? নিয়ে যাও। দুটো গাছের দাম এক মুদ্রা। খুব ভালো চারা, শীতে এ গাছ মরবে না। যেখানে সাধারণ পালেবত বৃক্ষে ফুল-ফল আসতে তিন বসন্ত ঋতু সময় লাগে, সেখানে সামনের বসন্তেই এ গাছে ফুল-ফল ধরবে। আর ফুল-ফল ধরলেই শারিকা দেবী আশীর্বাদ দেন যাদের নামে বৃক্ষরোপণ করা হয় তাদেরকে। নিয়ে যাও...।’ এ কথা বলে সে গাছদুটো পালেবতের হাতে ধরিয়ে দিল।

বৃদ্ধা বিক্রেতা এমন ভাবে পালেবতের হাতে গাছ দুটো তুলে দিল যে, পালেবত গাছ দুটো নিতে অস্বীকার করতে পারল না। এক মুদ্রার বিনিময়ে গাছ দুটো ক্রয় করল সে, তারপর অন্য নারীদের অনুসরণ করে ঢাল বেয়ে নীচে নেমে একটা ধাপে গিয়ে দাঁড়াল। সেই স্থান থেকে ভীষণ রকম স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে শ্রীনগর। তার জল ভাগ, স্থল ভাগ দুই-ই।

আশেপাশে সব রমণীরা ধাপের মধ্যে নানান ধরনের বৃক্ষরোপণ করছে। এ হেতু মৃত্তিকা ছেদনের জন্য লৌহশলাকা তারা গৃহ থেকে সঙ্গে করেই এনেছে। পালেবতের সঙ্গে সে সব কিছু না থাকলেও একজন রমণীর থেকে সে বৃক্ষ রোপণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্ৰহ করল। প্রথম চাপা গাছ রোপণ করার পর দ্বিতীয় গাছ রোপণের সময় সে ভাবল কার মঙ্গল কামনায় রোপণ করা যায় এ গাছ? সে স্মৃতি ভ্রষ্ট। তার এ মুহূর্তে জানা নেই তার কোনো নিকটজন কোথাও আছে কিনা? আর এ স্থানে তার পরিচিত বলতে তিনজন। তার রক্ষাকর্তা রাজ সভাসদ, গুঞ্জা মাতা আর নব পরিচিতা বাঁদরী। পালেবতের তাই মনে হল এ তিনজনের কারো মঙ্গল কামনাতেই তাকে চারা গাছ রোপণ করতে হবে। কিন্তু কার মঙ্গল কামনায়। কিছুক্ষণ ভাবার পর পালেবতের মনে হল, রাজ সভাসদ তার জীবন দান করেছেন, আশ্রয় দান করেছেন, তাই তার মঙ্গল কামনাতেই দ্বিতীয় চারাগাছ রোপণ করা উচিত।

উচ্ছল তার দায়িত্ব পালন করার জন্য ভোরের আলো ফোটার পর যথাসম্ভব দ্রুত শারিকা পর্বতে এসে উপস্থিত হয়েছিল। তারপর সে অশ্বপৃষ্ঠে বেশ কয়েকবার চারদিক প্রদক্ষিণ করেছে। তার সঙ্গে কয়েক জন অধস্তন রাজকর্মচারীও আছে। সময় যত এগিয়েছে তত জনসমাগম বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যাহ্নে যখন পর্বত চত্বর পুণ্যার্থী নারীদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল তখন উচ্ছল, তার সঙ্গীদের উদ্দেশে বলল, ‘আমরা একত্রে না থেকে নানান স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পরিক্রমা করি। তাহলে কোথাও কোনো শান্তি ভঙ্গের সমস্যা হলে তা দ্রুত আমাদের কারো না কারো দৃষ্টিগোচর হবে।’

উচ্ছলের নির্দেশ পালন করে তার সঙ্গীরা এরপর ভিন্ন ভিন্ন ভাবে নানান দিকে বিচরণের জন্য এগোল। কেউ চলল মন্দির চত্বরের দিকে কেউ গিয়ে দাঁড়াল বিপণীগুলোর ভিড়ের মাঝে। আবার কেউ গিয়ে উপস্থিত হল, যে স্থানে নানান ধরনের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা সে স্থানে অথবা পুণ্যার্থীদের অস্থায়ী আবাস স্থলে। আর উচ্ছল একলা অশ্বপৃষ্ঠে পরিভ্রমণ করতে লাগল। এক সময় সে এসে উপস্থিত হল সেই স্থানে, যেখানে চারাগাছের বিপণী রয়েছে। এ স্থান রমণীদের সমাগমে পরিপূর্ণ। সে স্থানে কিয়ৎক্ষণ অবস্থান করে চারপাশে দৃষ্টি দিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সম্ভাবনা আছে বলে উচ্ছলের মনে হল না। সব কিছুই স্বাভাবিক। রমণীরা শিশু-বৃক্ষ ক্রয় করছে তারপর ঢাল বেয়ে নীচে নেমে বৃক্ষরোপণ করছে।

অস্বাভাবিক কিছু দৃষ্টি গোচর না হওয়াতে উচ্ছল এরপর অন্যদিকে এগোতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় ঢাল বেয়ে উঠে এসে তার ঘোড়ার সামনে দাঁড়াল পালেবত। ঘটনাটা আকস্মিক। ইতিপূর্বে তারা কেউ কাউকে দেখতে পায়নি। উচ্ছলের সঙ্গে পালেবতের দৃষ্টি বিনিময় হতেই পালেবত ঘোড়ার সামনে থেকে কয়েক পা পিছু হঠে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল তার আশ্রয়দাতাকে। তাকে দেখে ঘোড়ার লাগাম টেনে দাঁড়িয়ে পড়ল উচ্ছলও। এস্থানে হঠাৎ তাকে একলা এমন ভাবে দেখে উচ্ছল মৃদু বিস্মিত হল। সে তাকে প্রশ্ন করল, ‘গুঞ্জা কই? তুমি এস্থানে কী করছ?’

পালেবত প্রথমে জবাব দিল, ‘গুঞ্জা মাতা মন্দির চত্বরে অবস্থান করছেন।’ একথা বলার পর একটু থেমে যেখান থেকে সে উঠে এল, সেদিকে দেখিয়ে বলল, ‘আমি ওখানে বৃক্ষরোপণ করতে গেছিলাম।’ পালেবতের কথা শুনে উচ্ছলের হঠাৎ মনে হল, তবে কি শারিকা দেবীর আশীর্বাদে পালেবতের স্মৃতি ফিরে এল? তাই কি সে তার প্রিয়জনের মঙ্গল কামনায় বৃক্ষ রোপন করে এল?’ একথা মাথায় আসতেই উচ্ছল তাকে প্রশ্ন করল, ‘কার কার মঙ্গল কামনাতে বৃক্ষরোপণ করলে তুমি?’

পালেবত বলল, ‘প্রথম বৃক্ষ আমার জন্য, আর দ্বিতীয়...।’

পালেবত কথা শেষ না করাতে উচ্ছল মৃদু উত্তেজিত ভাবে বলল, ‘দ্বিতীয়টা কার মঙ্গল কামনায় রোপণ করলে তুমি?’

উচ্ছলকে অবাক করে দিয়ে পালেবত বলল, ‘না, আমার স্মৃতি ফেরেনি। আপনার মঙ্গল কামনায় সে চারাগাছ রোপণ করেছি আমি।’

উচ্ছল তার কথা শুনে বেশ অস্বস্তি বোধ করল। কারণ, সাধারণত কুমারী কন্যারা তাদের প্রেমিক বা যে পুরুষের সঙ্গে তার বিবাহ স্থির হয়ে আছে, অথবা তার কাঙ্ক্ষিত পুরুষের মঙ্গল কামনাতে এ স্থানে বৃক্ষরোপণ করে থাকে। পালেবত কি জানে সে কথা?

উচ্ছল এ প্রসঙ্গে আর কোনো কথা বলল না তাকে। তবে অপরিচিত স্থানে এভাবে একলা ঘুরে বেড়ানো পালেবতের পক্ষে বিপদের কারণ হতে পারে। তাই উচ্ছল এরপর তার উদ্দেশে বলল, ‘মন্দির চত্বর থেকে তুমি অনেকটা দূর চলে এসেছ, এবার তুমি গুঞ্জার কাছে ফিরে যাও, তাকে জানিও আমার গৃহে পদার্পণ করতে অন্ধকার নেমে যাবে। কারণ শেষ তীর্থযাত্রী যতক্ষণ না পুজো সম্পন্ন করে পর্বত ত্যাগ করবে তক্ষন আমাকে এ স্থানেই উপস্থিত থাকতে হবে।’

উচ্ছলের কথা শুনে তার আদেশ পালন করতে পালেবত এগোল মন্দির প্রাঙ্গণের দিকে, আর উচ্ছলও পূর্ববৎ নানান দিকে ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।

সময় এগিয়ে চলতে লাগল। দ্বিপ্রহরে এত জনসমাগম হল যে
তা দেখে উচ্ছলের মনে হচ্ছিল, এত মানুষের পদভারে এই না পাহাড়টাই ধ্বসে পড়ে! তবে কোথাও কোনো অশান্তির সৃষ্টি হল না শেষ পর্যন্ত।

স্বাভাবিক নিয়মেই সব কিছু পরিচালিত হল। বিকাল যখন হয়ে এল তখন পুজো-পাঠ সম্পন্ন করে রমণীরা শারিকা পর্বত ত্যাগ করে নীচে নামতে শুরু করল ঘরে ফেরার জন্য। উচ্ছল আর অন্য রাজকর্মচারীরা মন্দির চত্বরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করতে লাগল সেই দৃশ্য। সে স্থানে গুঞ্জা বা পালেবতকে চোখে পড়ল না উচ্ছলের। সে অনুমান করল তারা ঘরে ফিরে গেছে। পুণ্যার্থী রমণীদের শেষ দলটা নীচের দিকে রওনা হওয়ার পর মন্দির প্রাঙ্গণও শূন্য হয়ে গেল। বিক্রেতারাও এরপর তাদের অস্থায়ী বিপণীগুলো উঠিয়ে নিয়ে ফেরার পথ ধরল।

উচ্ছল আর তার সঙ্গীরা সকাল থেকে এ স্থানে অতিবাহিত করলেও নিজেদের দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত ছিল বলে বিগ্রহ দর্শনের সুযোগ তাদের হয়নি। এবার তারা মন্দিরে প্রবেশ করল। শারিকাদেবীকে দর্শন করে তাকে প্রণাম জানাবার পর পুরোহিতের দেওয়া প্রসাদ গ্রহণ করল উচ্ছল আর তার সঙ্গীরা। তাদের দায়িত্ব পালন শেষ হয়েছে। এবার তাদের ফিরতে হবে।

উচ্ছল মন্দির ত্যাগ করার পূর্বে মাথার ওপর ঝুলন্ত ঘণ্টাটা একবার হাত দিয়ে বাজাল। ঘণ্টার শব্দ মন্দিরে বাইরে বেরিয়ে বেশ কিছু সময় ধরে চারপাশের পাহাড়গুলোতে প্রতিধ্বনিত হল। উচ্ছল ও তার সঙ্গীরা এরপর যখন মন্দির ত্যাগ করে নিজেদের ঘোড়াতে উঠে বসল, তখন সূর্যদেব পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছেন। গোধূলির আলো ক্রমশ আবছা হতে শুরু করেছে। উচ্ছল আর অন্য রাজকর্মচারীরা দ্রুত নামতে শুরু করল পাকদণ্ডী বেয়ে।

উচ্ছল যখন নীচে নেমে এল তখন চারপাশ আধো অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। একজন রাজকর্মচারী ঘোড়ার সহিসদের নিয়ে যেখানে দাঁড়িয়েছিল ঘোড়াগুলোকে যথাস্থানে নিয়ে যাবে বলে, ঘোড়া থেকে নেমে তাদের হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরিয়ে অধস্তন সঙ্গীদের থেকে বিদায় নিয়ে উচ্ছল এগোল হ্রদের কিনারে রাখা তার শিকারার দিকে।

কাষ্ঠ শলাকা থেকে শিকারার রজ্জুবন্ধন মুক্ত করে সে যখন শিকারাতে উঠতে যাচ্ছে ঠিক সেই সময় কয়েক হাত তফাতে হ্রদের কিনারে আর একজনকে হঠাৎ দেখতে পেল সে। পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে সে যেন কী দেখার চেষ্টা করছে। যে ব্যক্তির অবয়ব দেখে মুহূর্তের মধ্যে তাকে উচ্ছল সনাক্ত করল। ভাঁড় কূপমণ্ডূক! আর এরপর কূপমণ্ডূকও মুখ ফিরিয়ে উচ্ছলকে দেখতে পেয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

উচ্ছল তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি আজ এখানে হাস্যরস পরিবেশন করতে এসেছিলেন নাকি? কয়েকজন ভাঁড়কে আজ আমি ওপরে দেখেছি, কিন্তু আপনাকে দেখিনি।’

প্রশ্নের উত্তরে কূপমণ্ডূক বলল, ‘না, আমি সেজন্য এ স্থানে আসিনি। মাত্র কিছু সময় হল এখানে এসেছি। মন্দির প্রাঙ্গণে কি এখনও লোক সমাগম আছে?’

উচ্ছল বলল, ‘না, কেউ নেই। শেষ পুণ্যার্থী নীচে নামার পর আমি নীচে নামলাম। আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?

কূপমণ্ডূক একটু ইতস্তত করে জবাব দিল। ‘আমি কন্যা রূপবতীর সন্ধানে এসেছি। সকাল বেলা সে গৃহত্যাগ করে চক্রমন্দিরে পুজো দেওয়ার জন্য বেরিয়ে ছিল। দ্বিপ্রহরে তার গৃহে ফেরার কথা। কিন্তু বিকাল হওয়ার পরও সে ফেরেনি। তাই তাকে খুঁজতে হ্রদ পেরিয়ে এখানে এলাম। আপনি তাকে আজ দেখেছেন?’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘না তাকে আমি দেখিনি। তবে আজ প্রচণ্ড রকম জনসমাবেশ হয়েছিল। আকস্মিক ভাবে কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ না হয়ে গেলে অত জনসমাগমের মধ্যে পৃথক ভাবে কাউকে চোখে না পড়াটাই স্বাভাবিক! কাদের সঙ্গে সে এসেছিল এখানে?’

কূপমণ্ডূক জবাব দিল, একাই এসেছিল। প্রতিবার একাই আসে। তার কোনো সখী নেই।’ এ কথা বলার পর একটু ভেবে নিয়ে কূপমণ্ডূক বলল, ‘এখানে যখন কেউ নেই, তখন আমি গৃহে ফিরে যাই। দেখি, আমি এখানে আসার জন্য রওনা হওয়ার পর সে গৃহে ফিরেছে কিনা।’

উচ্ছল আর এ প্রসঙ্গে কূপমণ্ডূকের সঙ্গে বাক্যালাপ করল না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চক্রপর্বতে থাকার ফলে বেশ ক্লান্ত বোধ করছে সে। নিজের শিকারাতে উঠে বসে উচ্ছল রওনা হয়ে গেল তার জলগৃহের দিকে। অন্ধকার নেমে এল দল হ্রদের বুকে।

১২

ক্রমশই ফুল সাজে ভরে উঠছে উপত্যকা। একদা তুষারমণ্ডিত উপত্যকা সেই ভয়ঙ্কর শৈত প্রবাহের দিনগুলোকে ক্রমশ পিছনে ফেলে অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে। বসন্ত ঋতু এগোচ্ছে তার পূর্ণ যৌবনের দিকে। দল হ্রদের বুকে মহারাজ ললিতাপীড়ের ভাসমান প্রাসাদও সেজে উঠেছে নতুন রঞ্জকের প্রলেপে। ব্যস্ততা চলছে তার চারপাশে। আর কিছুকাল পরই মহারাজ অবসর যাপনের জন্য পদার্পণ করবেন সেখানে। বাইরের প্রকৃতির সৌন্দর্য যতই সুন্দর হোক না কেন রাজসভার কদর্যতা একই ভাবে বহমান। মহারাজের লাম্পট্য আর বেশ্যাদের উদ্ধত পদচারণা একইভাবে চলছে।

রাজকার্যের আছিলাতে ইতিমধ্যে কয়েকবার মহামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে উচ্ছল। তবে তার পরিকল্পনার তেমন অগ্রগতি হয়নি। আসলে তিনি যে কাজ করতে উদ্যত হয়েছেন তাকে বাস্তবায়িত করার জন্য মহারাজের ঘনিষ্ঠ বৃত্তর মধ্যে প্রবেশ করা প্রয়োজন। কিন্তু কাশ্মীররাজ ললিতাপীড় আর তাঁর অনুরাগিণী তিন বেশ্যা অর্থ আর নারীর প্রলোভন দেখিয়ে মহারাজের চারপাশের নিরাপত্তা বলয়কে তখন শক্ত করে রেখেছেন, তা ভেদ করা সম্ভব হচ্ছে না যশঙ্করের পক্ষে।

তিনি উচ্ছলকে অনুরোধ জানিয়েছেন একবার কূপমণ্ডূকের গৃহে যেতে। যদি তার থেকে কোনো তথ্য সংগ্রহ করা যায় সে জন্য। চক্র পুজোর দিন সন্ধ্যায় কূপমণ্ডূকের সঙ্গে সেই সামান্য কথাবার্তার পর তার সঙ্গে আর কথা হয়নি উচ্ছলের। রাজসভাতেও দুজনের মধ্যে কথা বলার সুযোগ ঘটেনি। কারণ, মহারাজের সঙ্গেই প্রবেশ ও প্রস্থান করেছে সে। মহামন্ত্রীর পরামর্শ মতো একবার কূপমণ্ডূকের গৃহে যেতে হবে তাকে। এ কথাই বাসগৃহের অলিন্দে দাঁড়িয়ে ভাবছিল উচ্ছল।

সকালের রোদ ঝিকিমিকি ভাবে খেলা করছে। হঠাৎ পদশব্দ শুনে উচ্ছল দেখল পালেবত তার কক্ষের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। উচ্ছলের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই সে প্রতিবারের মতোই নতমস্তকে প্রণাম জানাল। উচ্ছল তাকে আজও প্রশ্ন করল, ‘কিছু মনে পড়ল তোমার?’

পালেবত প্রতিবারের মতোই জবাব দিল, ‘না, কিছুই স্মরণে আসছে না আমার।’

উচ্ছল আর কোনো বাক্যবিনিময় করল না তার সঙ্গে। জলের দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে লাগল কী করা যায় এই নারীকে নিয়ে? দীর্ঘদিন তো হয়ে গেল, অথচ তার স্মৃতি এখনও ফিরল না। কিন্তু একজন পরিচয়হীন সুন্দরী যুবতীকেও তো দিনের পর দিন এভাবে নিজের আশ্রয়ে রাখা যায় না। আবার তাকে আশ্রয়হীন করলেও সেই বা কোথায় যাবে? বিশেষত যখন সুন্দরী নারীদের জন্য এ নগরীতে বিপদ ওৎ পেতে থাকে।

পালেবতকে নিয়ে কী করা যায় এ ব্যাপারে বেশ কিছুক্ষণ ধরে চিন্তা করার পর উচ্ছল শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিল এ ব্যাপারে সে পরামর্শ করবে যশঙ্করের সঙ্গে। দেখা যাক এ ব্যাপারে তিনি কোনো পথ নির্ধারণ করতে পারেন কিনা? এ কথা ভাবার পর উচ্ছল যখন নিজের কক্ষের দিকে পা বাড়াল, ততক্ষণে পালেবত অন্তর্হিত হয়েছে তার কক্ষে। এরপর কিছু সময়ের মধ্যেই প্রতিদিনের মতোই সে জলগৃহ ত্যাগ করে রওনা হল রাজসভাতে যোগদানের জন্য। কিন্তু পথ চলতে চলতে উচ্ছলের ভাবনাতে ফিরে আসতে লাগল পালেবতের কথা। কী করা যায় তাকে নিয়ে?

উচ্ছল নির্দিষ্ট সময়তেই নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হল। মহারাজ ললিতাপীড়ও রতিমালা ও মুক্তবেণীকে নিয়ে প্রবেশ করলেন সভাগৃহে। তৃতীয় বেশ্যা দল হ্রদে মহারাজের বিশ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার কাজে নিয়োজিত থাকায় কিছুদিন হল সভায় আসছে না। যথারীতি তাদের অনুসরণ করে ভাঁড় কূপমণ্ডূক সভাকক্ষে প্রবেশ করল। তাকে দেখে উচ্ছলের মনে পড়ল মহামন্ত্রী যশঙ্করের নির্দেশ। সে সিদ্ধান্ত নিল সভা ভঙ্গ হলেই সে গিয়ে সাক্ষাৎ করবে কূপমণ্ডূকের সঙ্গে। সে নিশ্চয়ই তাকে আমন্ত্রণ জানাবে তার নিজ গৃহে যাওয়ার জন্য। আর সেই সুযোগ গ্রহণ করবে উচ্ছল।

মহারাজ ললিতাপীড় সিংহাসনে আরোহণ করার পর একবার জানতে চাইলেন কোনো সাক্ষাৎ প্রার্থী আছে কিনা? যথারীতি কেউই উপস্থিত হয়নি তার সাক্ষাৎ করার জন্য। এর পর তিনি মহামন্ত্রী যশঙ্করকে বললেন, ‘আপনি রাজপুরোহিতকে বলুন দ্রুত একটি শুভদিন নির্ধারিত করতে। বেশ কয়েকজন রমণী স্বর্ণ সেবিকা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছে। তাদেরকে সেবিকা রূপে গ্রহণ করতে হবে।’

মহারাজের কথা শুনে নিরুপায় মহামন্ত্রী যশঙ্কর উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বললেন, ‘আপনার নির্দেশ জানাব তাকে।’

তাঁর জবাব শোনার পর নিজের আসনে বসে বেশ্যা রতিমালা অনেকটা যেন নির্দেশের ভঙ্গিতেই বলল, ‘স্বর্ণ সেবিকাদের মহারাজের চরণে আশ্রয়ের দিনক্ষণ যেন আর দুই পক্ষকালের মধ্যেই নির্ধারিত করা হয়। কারণ, তার পর তিনি প্রাসাদ ত্যাগ করে দল হ্রদে বিশ্রাম লাভ করতে যাবেন।’

মহারাজ মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলেন রতিমালার কথাতে। যশঙ্কর অবশ্য বেশ্যার কথার কোনো প্রত্যুত্তর দিলেন না। মাথা নিচু করে নিজের আসনে বসে পড়লেন। তার দিকে তাকিয়ে উচ্ছল অনুমান করতে পারল তাঁর অসহায়তার কথা, কতটা যন্ত্রণা এ মুহূর্তে ভোগ করছেন বৃদ্ধ মহামন্ত্রী।

মহারাজ ললিতাপীড়ের রাজকার্য বলতে এ টুকুই ছিল। এরপর তিনি ইশারা করলেন নৃত্য পরিবেশনের জন্য। নর্তকীরা বাইরে প্রতীক্ষারত ছিল। তারা কক্ষে প্রবেশ করল। স্বল্প বসনা নর্তকী তারা। কটি দেশে নামমাত্র লজ্জানিবারণের জন্য পোশাক আর বক্ষদেশে সামান্য এক ফালি রেশমের বক্ষবন্ধনী।

এই সব নর্তকীদের জীবন কাহিনিও অত্যন্ত করুণ। এদের প্রায়শই মহারাজের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের ভোগ লালসার শিকার হতে হয়। তবে তার চেয়েও তাদের জীবনের নিষ্ঠুর ঘটনা হল, শীতের দেশ কাশ্মীর, শীতে তো অবশ্যই কিন্তু বসন্তকালে বা অন্য যে কোনো সময়েই শীতল থাকে এ স্থানের জলবায়ু। সে কারণে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ও দেশে সকল মানুষ দেহ আবৃত করা পোশাক পরিধান করে। কিন্তু শীত হোক বা বসন্ত, এই হতভাগ্য রমণীদের এরূপ অর্ধ উলঙ্গ হয়েই নৃত্য পরিবেশন করতে হয় প্রচণ্ড যন্ত্রণা সহ্য করে। কোনোক্রমে সে যন্ত্রণা সহ্য করলেও শীতের প্রকোপে তাদের ত্বকে ঘা-জন্মাতে শুরু করে, রূপ হারিয়ে ফেলে তারা। তখন আর কেউ তাদের গ্রহণ করে না।

অনেকেই শরীর এবং মনের ঘা থেকে কোনোদিন মুক্তি পায় না। নগরীর মন্দিরগুলির সামনে তারা ভিক্ষা বৃত্তি করে, আবার কেউ বা কোন পর্বত গাত্র থেকে লম্ফপ্রদান করে আত্মহনন করে মুক্তির পথ খোঁজে। মহারাজের প্রিয় তিন বেশ্যা কোনো কোনো সময় তাঁকে আনন্দদানের জন্য শরীর প্রদর্শন করে ঠিকই, কিন্তু তাদের শরীরে শঙ্খ ও স্বর্ণ চূর্ণ মিশ্রিত প্রাচীন ঘৃতের আরক লেপন করা থাকে। যা তাদের দেহের উত্তাপ বজায় রাখে। কিন্তু তারা আর সাধারণ নর্তকীরা তো এক নয়। তাই অপরিসীম জীবন যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় নর্তকীদের। শীতের সময় এমন ঘটনাও বেশ কয়েকবার ঘটেছে যে প্রায় নগ্ন অবস্থাতেই রাজসভাতে নৃত্য পরিবেশনের সময় শীতের দংশনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটেছে তাদের। ঠিক যেমন কোনো কোনো সময় নৃত্যরত অবস্থায় সর্পদংশনে মৃত্যু হয়।

কিছু সময় ধরে নৃত্য চলার পর জৃম্ভণ করতে শুরু করলেন মহারাজা। রাত্রি জাগরণের ফলে তার নিদ্রা আসছে। কয়েকবার জৃম্ভণের পর তিনি তার দুই করতল সংযুক্ত করার পর তা দু-পাশে প্রসারিত করে বুঝিয়ে দিলেন সভা শেষ। থেমে গেল নিক্কণের শব্দ। উঠে দাঁড়ালেন সবাই।

কাশ্মীর রাজসিংহাসন থেকে অবতরণ করার পর তাঁর সঙ্গে সভাগৃহ ত্যাগ করল দুই বেশ্যা ও তার একান্ত ঘনিষ্ঠ অনুচররা। উচ্ছল দেখল যে দলের সবার পিছনে কক্ষত্যাগ করল কূপমণ্ডূক। ভাঁড় নিশ্চয়ই রাজপ্রাসাদে মহারাজের সঙ্গী হবে না। এ কথা ভেবে নিয়ে উচ্ছলও দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য।

রাজসভাগৃহের বাইরে কাছেই যে স্থানে সভাসদদের অশ্ব রাখার ব্যবস্থা সে স্থানে গিয়েই উচ্ছল সাক্ষাৎ পেয়ে গেল ভাঁড় কূপমণ্ডূকের। নিজের ঘোড়ার লাগাম টেনে সে তখন প্রাণীটাকে বাইরে নিয়ে আসছিল। উচ্ছলের মুখোমুখি হয়ে সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। উচ্ছলই তাকে প্রথমে প্রশ্ন করল, ‘মহাশয় কুশল তো?’

কূপমণ্ডূক জবাব দিল, ‘মহারাজের কৃপায় ভালোই আছি। আপনি?’

উচ্ছল বলল, হ্যাঁ, আমিও মহারাজের কৃপায় ভালোই আছি। সেদিন সন্ধ্যা হ্রদের তীরে সাক্ষাৎ হওয়ার পর আর আমাদের মধ্যে বাক্যালাপের সুযোগ ঘটেনি।’

কূপমণ্ডূক সে কথা শুনে বলল, ‘হ্যাঁ কারণ, সভা ভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে আমি কক্ষ ত্যাগ করে গৃহের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাই। তাই বাক্যালাপ হয়নি। আপনি এখন কোথায় গমন করবেন?’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘কার্যালয়ে যাব একবার। আজ অবশ্য সে স্থানে সামান্যই কাজ আছে। তারপর সে স্থান ত্যাগ করে গৃহ অভিমুখে রওনা হব।’

উচ্ছল ভেবেছিল তার এ কথা শোনার পর কূপমণ্ডূক তাকে তার গৃহে আমন্ত্রণ জানাবে। কিন্তু তেমন ঘটনা ঘটল না। কূপমণ্ডূক বলল, ‘এবার তবে আমি যাই। ফিরে গিয়ে গৃহকর্মে নিয়োজিত হতে হবে।’

উচ্ছল বলল, ‘হ্যাঁ, আপনি যাত্রা শুরু করুন। আর আমিও আমার গন্তব্যের দিকে এগোই।’

কূপমণ্ডূক আর কোনো বাক্যালাপ না করে ঘোড়ার পিঠে উঠে রওনা হয়ে গেল। আর উচ্ছলও কিছু সময়ের মধ্যে রওনা দিল তার কার্যালয়ের দিকে। কিন্তু কূপমণ্ডূকের এ হেন আচরণে এক প্রশ্নের উদয় হল উচ্ছলের মনে। তবে কি কন্যার জন্য তার চেয়েও কোনো সুপাত্রের সন্ধান মিলেছে কূপমণ্ডূকের? নাকি তার মনে কোনো সন্দেহ জেগেছে যে মহারাজের বিরুদ্ধে কোনো গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে উচ্ছল? নইলে যে লোক তার নিজ কন্যার সঙ্গে উচ্ছলকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছে, তার আচরণ হঠাৎ এমন হবে কেন? আর এ সব কথা ভাবতে ভাবতেই উচ্ছলের মনে এক তৃতীয় সম্ভাবনার উদয় হল। কূপমণ্ডূক কি উচ্ছলের গৃহে পালেবতের অবস্থানের কথা জানতে পেরেছে? তা জানা অবশ্য এমন দুরূহ ব্যাপার নয়।

পালেবতকে যখন সে তুষারমণ্ডিত পর্বত থেকে উদ্ধার করে আনে তখন অনেকেই সাক্ষী ছিল সে ঘটনার। হ্রদে ভ্রাম্যমান পণ্য বিক্রেতারা অনেকেই তাদের পণ্যবাহী শিকারা নিয়ে উচ্ছলের জলগৃহে আসে। তারাও সেখানে দেখতে পায় পালেবতকে। গুঞ্জার সঙ্গে সে গৃহ ছেড়ে বাইরেও বেরিয়েছে। এমন কোনো সূত্র ধরে কূপমণ্ডূক শুনে থাকতে পারে পালেবতের কথা। আর তা শুনে হয়তো কূপমণ্ডূকের অনুমান হয়েছে যে পালেবত হল উচ্ছলের শয্যাসঙ্গিনী বা রক্ষিতা। তাই কূপমণ্ডূক তার ভাবনা থেকে সরে আসতে চাইছে। এ কথা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই উচ্ছল আবার ভাবতে শুরু করল পালেবতকে তার গৃহে রাখা কি উচিত কাজ হচ্ছে? দ্রুত এ-বিষয়ে মহামন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করা প্রয়োজন।

১৩

উচ্ছলের কার্যালয়ে এদিন বিশেষ কাজ ছিল না। কিন্তু সে সেখানে উপস্থিত হওয়ার পরই সেখানে এসে উপস্থিত হলেন শুল্ক বিভাগের দায়িত্ব প্রাপ্ত অভিমন্যু নামের সভাসদ। তিনি উচ্ছলকে জানালেন দল হ্রদের তীরস্থ স্বর্ণ পর্বতের পাদদেশে একদল বণিক এসে উপস্থিত হয়েছে সুদূর মগধ থেকে। স্বর্ণ পর্বত থেকে দুর্মূল্য জাফরান পুষ্প সংগ্রহ করতে এসেছে তারা। এই ধনী মাগধী ব্যবসায়ীদের থেকে বৃহৎ অঙ্কের শুল্ক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু ওই সুগন্ধী পুষ্প প্রস্ফুটিত হতে এবং তা স্থানীয় অধিবাসীদের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে বণিকদলের আরও বেশ কয়েক পক্ষকাল সময় লাগবে। অতএব এই সময়কাল এ স্থানেই অতিবাহিত করবে তারা। এই বণিক দলটি এই প্রথম এ দেশে পদার্পণ করেছে।

দল হ্রদের সৌন্দর্য দেখে তারা মোহিত। অভিমন্যু ইতিমধ্যে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসেছেন। উচ্ছল যেন তাদের জন্য জলগৃহে থাকার ব্যবস্থা করে ও মাগধী বণিক দলপতি গ্রহনন্দ নামক ব্যক্তিকে দল হ্রদে থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে আসে। মহারাজ ললিতাপীড়ের নির্দেশ, যথা সম্ভব অধিক শুল্ক এবার উদ্ধার করতে হবে বণিকদের থেকে। তাই এদেশে অবস্থান কালে তাদের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের দিকে দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।

কাশ্মীর দেশের রাজধানী শ্রীনগর নির্মিত হয়েছে স্থলভাগ ও জলভাগ নিয়ে। মহারাজ ললিতাপীরের প্রাসাদ যেমন জল ও স্থল উভয় স্থানেই বর্তমান, তেমনই প্রতিটি সরকারি বিভাগেরই উভয়স্থানেই কার্যালয় আছে। উচ্ছলেরও একটি ভাসমান কার্যালয় আছে দল হ্রদে। প্রয়োজনবোধে তা ব্যবহার করা হয়। আপাতত সেই জলগৃহতে কেউ অবস্থান করছে না। স্থলভাগের এই কার্যালয় থেকেই সব কার্য পরিচালিত হচ্ছে। কাজেই সে স্থানে অনায়াসেই বণিকদলের রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করা যায়। কাজেই উচ্ছল শুল্ক দফতরের ভারপ্রাপ্ত অভিমন্যুকে জানিয়ে দিল, ‘এ দায়িত্ব সম্পাদন করতে তার কোনো অসুবিধা হবে না।’

‘উচ্ছলের কথা শুনে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কার্যালয় ত্যাগ করার আগে অভিমন্যু বললেন, ‘এবার যেকোনোভাবেই আমাদের অন্য বৎসরগুলোর তুলনায় অধিক শুল্ক উদ্ধার করতে হবে। নইলে পুষ্প পর্বতে প্রাসাদ নির্মাণে ব্যাঘাত ঘটবে। প্রজাপালক মহারাজের এই সামান্য আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করার জন্য আমাদের প্রত্যেকেরই সচেষ্ট থাকা উচিত।’ এ কথাটা অভিমন্যু বললেন ঠিকই, কিন্তু উচ্ছলের মুহূর্তের জন্য যেন মনে হল সভাসদের বাচনভঙ্গির মধ্যে কোথাও যেন একটা বিদ্রুপ লুকিয়ে আছে!

দল হ্রদের গায়ে যে দিকে স্বর্ণ পর্বত অবস্থিত, সে পাড়ের অবস্থান উচ্ছলের বাসগৃহ থেকে নিকটেই বলা যায়। সভাসদ অভিমন্যু ফিরে যাওয়ার পর উচ্ছল সিদ্ধান্ত নিল গৃহে প্রত্যাবর্তনের আগে সে আজই গিয়ে সাক্ষাৎ করবে সেই বণিকদলের সঙ্গে। তার অধস্তন রাজকর্মচারীদের ডেকে দল হ্রদে অবস্থিত তাদের বিভাগীয় দপ্তরটি যাতে বণিকদের সাময়িক বাসগৃহের রূপ দেওয়া যায় তার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু নির্দেশ দিল উচ্ছল। তারপর কার্যালয় ত্যাগ করে রওনা হল দল হ্রদের দিকে।

মধ্যাহ্নের সূচনালগ্নে গুঞ্জা আর পালেবত এক সঙ্গে আহার সাঙ্গ করে। তারপর নিজের কক্ষে কিছু সময়ের জন্য নিদ্রা যায় গুঞ্জা। বিকাল হওয়ার কিছু পূর্বে তার নিদ্রাভঙ্গ হয়। কারণ, ওই সময় উচ্ছল গৃহে ফিরে আসে।

পালেবতের দ্বিপ্রহরে নিদ্রা আসে না। এসময়টা যেন বড় শূন্য মনে হয় তার। কখনো সে কক্ষে শুয়ে চেষ্টা করে তার স্মৃতি পুনরুদ্ধারের। কিন্তু কিছুই তার মনে পড়ে না। আবার কখনও সে কক্ষ ত্যাগ করে অলিন্দে দাঁড়িয়ে দল হ্রদের সন্তরণশীল জীবন প্রবাহ দেখে সময়কাল অতিবাহিত করে। এদিনও সে তেমনই দাঁড়িয়ে ছিল অলিন্দে। হ্রদের বুকে ভাসমান শিকারা নৌকাগুলো দেখে পালেবতের মনে এল বাঁদরীর কথা।

শারিকা পর্বত থেকে ফেরার পর বেশ কয়েকটা দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। বাঁদরীর সঙ্গে তারপর আর তার দেখা হয়নি। অবশ্য বাঁদরী বলে গেছে সে আসবে তার কাছে। পালেবত ভাবছিল, এই রৌদ্রকরোজ্জ্বল দ্বিপ্রহরে যদি বাঁদরীর সঙ্গে হ্রদের বুকে ভেসে বেড়ানো যেত তবে বেশ হতো।

বসন্ত ঋতু যত সময়ের গভীরে প্রবেশ করছে তত চারপাশের দৃশ্য আরও সুন্দর রূপ ধারণ করছে, যার কিছুটা এই জলগৃহ থেকেই প্রত্যক্ষ করা যায়। যেমন শ্রীনগরকে বেষ্টন করে থাকা পর্বতশ্রেণীগুলোর নিম্নভাগের উপত্যকার ঢালগুলো বহুবিধ পুষ্পরঞ্জিত হয়ে নানান বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। কোনো স্থান রক্তিম বর্ণ, কোনো স্থান উজ্জ্বল হরিদ্রাভ, আবার কোনো স্থান আকাশের মতো নীল বর্ণ ধারণ করেছে। আর তাদের ছবি দল হ্রদের বুকে পতিত হয়ে হ্রদকেও বিভিন্ন বর্ণে রাঙিয়ে তুলেছে। এছাড়া দল হ্রদের কিনারে অথবা ভাসমান দ্বীপগুলোতে তো নিজস্ব সমারোহ আছেই।

বাঁদরীর কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ কাকতালীয় ভাবে সে দেখতে পেল বাঁদরীকে। তবে সে পালেবতের ভাসমান গৃহের দিকে আসছে না। এ গৃহ থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে গৃহের সমান্তরালে সে ভেসে চলেছে পাড়ের দিকে। তাকে দেখতে পেয়েই পালেবতের হৃদয় আনন্দে নেচে উঠল। প্রথমে ভাবল চিৎকার করে সে বাঁদরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হল তাতে গুঞ্জার নিদ্রাভঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা। আর তাতে বিরক্ত হতে পারে সে। কাজেই সে বাঁদরীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তার উদ্দেশে হস্ত সঞ্চালন করতে লাগল। আর বাঁদরীও এবার এই জলগৃহের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে পেল পালেবতকে। শিকারার গতিপথ বদলে সে এগিয়ে আসতে লাগল জলগৃহের দিকে।

পালেবত কাষ্ঠ সোপানের ধাপ বেয়ে নেমে এসে দাঁড়াল জলের কিনারে, যে স্থান থেকে জলে বা জলযানে ওঠা নামা করা হয় সেখানে।

বাঁদরীর তরণী এসে উপস্থিত হল তার গায়ে। সে কিন্তু তার শিকারা থেকে নামল না, পালেবত তাকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি কোথায় চলেছিলে?’

নিকটবর্তী কুলের দিকে হাত তুলে দেখিয়ে বাঁদরী বলল, ‘ওই যে ওখানে, হ্রদের পাড়ে স্বর্ণ পর্বতের কাছে।’

বাঁদরীর জবাব শুনে পালেবত অভিমানী কণ্ঠে বলল, ‘তুমি যে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এদিকে আসনি তা তোমার চলন দেখেই বুঝতে পেরেছি। আমার কাছে বুঝি আসতে নেই?’

পালেবতের কণ্ঠে অভিমান বুঝতে পেরে বাঁদরী হেসে বলল, ‘আমি কিছু সময় পরই তোমার সঙ্গে নিশ্চিত সাক্ষাৎ করতে আসতাম। ভেবেছিলাম আগে কাজটা সম্পন্ন করে আসি তারপর এখানে এসে নিশ্চিন্তে বাক্যালাপ করব তোমার সঙ্গে, অথবা হ্রদে তোমাকে ভ্রমণ করাব।’

পর্বতটার দিকে তাকাল পালেবত। তার নিম্নভাগের ঢাল আকাশের মতো নীল বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে কিছুদিন হল। কিন্তু কোনো পুষ্প সমারোহে পর্বতগাত্র ওই রূপ নীলবর্ণ ধারণ করেছে পালেবতের তা অবশ্য জানা নেই। নীলাভ সেই উপত্যকার দিকে তাকিয়ে পালেবত তাকে প্রশ্ন করল, ‘ওই স্থানে তোমার কী কাজ?’

বাঁদরী বলল, ‘ওই যে পর্বতগাত্র নীল-বেগনি বর্ণ ধারণ করেছে ওগুলো আসলে জাফরান ফুল। ওর পরাগদণ্ডগুলো গাঢ় রক্তিম বর্ণ হয়, যাকে বলে জাফরান। ওই জাফরান স্বর্ণ মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। সে কারণেও এই পর্বতকে স্বর্ণ পর্বত নামে ডাকা হয়ে থাকে। রাজা-মহারাজাদের খাদ্য দ্রব্যে সুগন্ধী ও রঞ্জক রূপে ব্যবহার করা হয় জাফরান। আর তা সংগ্রহ করতে দূর দেশ থেকে বণিকের দল বসন্ত ঋতুতে এখানে এসে উপস্থিত হয়। তেমনই এক বণিকের দল ওই স্থানে এসে উপস্থিত হয়েছে। তাদের নিশ্চয়ই দলহ্রদ পারাপারের জন্য, ভ্রমণের জন্য শিকারার প্রয়োজন হচ্ছে বা হবে, তাই তাদের সঙ্গে বাক্যালাপ করতে যাচ্ছি। এই সব বিদেশি ধনাঢ্য বনিকদের থেকে অধিক পরিমাণ অর্থ প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকে।’

পালেবতকে এ কথা জানিয়ে এরপর সে বলল, ‘তুমি যাবে আমার সঙ্গে? চলো যাই? পালেবত বলল, যেতে তো ইচ্ছা করে। কিন্তু গুঞ্জা মাতা এখন নিদ্রা গেছে। তার নিদ্রাভঙ্গ হতে প্রায় বিকাল হয়ে যাবে। সে বৃদ্ধা মানুষ। সকাল থেকে পরিশ্রম করার পর সে নিদ্রা গেছে। তার নিদ্রাভঙ্গ করা সমীচীন হবে না। তাকে না জানিয়ে আমি কী ভাবে তোমার সঙ্গে যাই?’

বাঁদবী বলল, বিকাল হয়ে যাবে? তাহলে তো অনেক সময় লাগবে। তুমি বরং, আমার সঙ্গে চলো। তার নিদ্রাভঙ্গ হওয়ার আগেই আমরা ফিরে আসব। তাকে জানাবার দরকার নেই।’

পালেবত বলল, ‘কিন্তু সে কাজ কি উচিত হবে?’

বাঁদবী বলল, ‘আমরা তো আর কোনো দুষ্কর্ম করতে যাচ্ছি না। পাড়ে গিয়ে উঠব। বণিকদের সঙ্গে সামান্য কয়েকটা বাক্যালাপ করেই ফিরে আসব। আর তুমিও কিছু সময়ের জন্য এই বদ্ধ জীবন থেকে মুক্তি পাবে। তিনিও নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেন যে এভাবে একস্থানে থাকতে তোমার ভালো লাগে না, না ভেবে চলে এসো।’

বাঁদরীর কণ্ঠস্বরের মধ্যে এমন একটা আহ্বান ছিল যেটা পালেবত এবার আর প্রত্যাখান করতে পারল না। তাছাড়া তার হৃদয়ও তো এই বদ্ধ পরিবেশ থেকে অন্তত কিছু সময়ের জন্য মুক্তি খুঁজছে, কাজেই এরপর পালেবত উঠে বসল বাঁদরীর শিকারাতে। বাঁদরীর উদ্দেশে সে শুধু বলল, ‘যথা যম্ভব দ্রুত আমাদের ফিরে আসতে হবে কিন্তু।’

বাঁদরী বলল, ‘তুমি এ ব্যাপারে নিশ্চিন্তে থাকো।’ এ কথা বলে সে দ্রুত চাপ্পা চালাতে লাগল জলে।

পালেবতদের ভাসমান গৃহ ছেড়ে কিছুটা সরে আসার পরই চারপাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পালেবতের মনের শঙ্কা যেন মুছে গেল। বিভোর হয়ে সে দেখতে লাগল দল হ্রদ ও তা চারপাশের পর্বতমালার সৌন্দর্য। এক সময় সে স্বগোতক্তির স্বরে বলল, ‘কী সুন্দর লাগছে পর্বতগাত্রগুলো! যেন কেউ নানান রঙের বস্ত্র বিছিয়ে দিয়েছে পাহাড়ের গায়ে!’

বাঁদরী হেসে বলল, ‘দল হ্রদের বুক থেকে দেখলে চারপাশের পুষ্পসজ্জিত পর্বতগুলোকে যেমন সুন্দর লাগছে ঠিক তেমনই ওই পাহাড়গুলোর ওপর থেকে দেখলেও বরফযুক্ত দল হ্রদকে যেন আরও বেশি সুন্দর মনে হয়। শিকারাগুলোকে দেখলে মনে হয় যেন হ্রদের জলে সন্তরণশীল মৎস্য! আর জলগৃহগুলোকে দেখে মনে হয় ভাসমান হংস।’

পালেবত বলল, ‘হ্যাঁ, ওই দিন শারিকা পর্বতের ওপর থেকে আমি তা কিছুটা প্রত্যক্ষ করেছি।’

বাঁদরী বলল, ‘সেদিন তো নানান দ্রব্য ওই স্থানে বিক্রয় হয়। তুমি, কিছু ক্রয় করেছিলে কিনা তা জানা হয়নি।’

পালেবত জবাব দিল, ‘না, গৃহে নিয়ে যাবার মতো কোনো দ্রব্য ক্রয় করিনি। তবে একস্থানে গিয়ে দেখলাম যে নারীর দল শিশু বৃক্ষ ক্রয় করছে রোপণ করার জন্য। তাদের দেখে আমিও দুটো শিশু পালেবত বৃক্ষ কিনে তা রোপণ করেছি।’

বাঁদরী বলল, ‘একটা বৃক্ষ তো তুমি রোপণ করেছ তোমার নিজের জন্য। দ্বিতীয় বৃক্ষটি তুমি কার কথা স্মরণ করে রোপণ করেছ শুনি?’

পালেবত সত্য কথাই বলল, ‘সে বৃক্ষ আমি রোপণ করেছি আমাদের গৃহের অধিকারী রাজ সভাসদের কথা স্মরণ করে।’

পালেবতের জবাব শুনেই চাপ্পা চালানো বন্ধ হয়ে গেল। বিস্মিতভাবে যে বলে উঠল, ‘সভাসদ উচ্ছলের সঙ্গে তোমার বিবাহ স্থির হয়েছে, এ কথা তুমি আমাকে আগে বলোনি তো।’

বাঁদরীর কথা শুনে পালেবত বলল, ‘তাঁর সঙ্গে তো আমার বিবাহ স্থির হয়নি।’

বাঁদরী বলল, ‘তবে তুমি কি তাকে প্রেমিক রূপে কামনা করো? নারীরা তো শারিকা পর্বতে দ্বিতীয় বৃক্ষ রোপণ করে তার স্বামী, প্রেমিক বা কাঙ্ক্ষিত পুরুষের মঙ্গল কামনাতে।’

পালেবত বলল, ‘আমার এ ব্যাপারটা জানা ছিল না। যে বৃদ্ধা বিক্রেতার থেকে আমি পালেবত বৃক্ষ দুটো ক্রয় করেছিলাম, সে শুধু আমাকে বলেছিল যে, দ্বিতীয় শিশু বৃক্ষ অপর কোনো একজনের মঙ্গল কামনাতে রোপণ করতে হয়। সভাসদের গৃহে, তার অন্নে বর্তমানে আমি প্রতিপালিত হচ্ছি। তাই তার মঙ্গল কামনাতেই সে বৃক্ষ রোপণ করেছি আমি।’

পালেবতের কথাতে ব্যাপারটা এবার পরিষ্কার হল বাঁদরীর কাছে। আবার সে জলে চাপ্পার আঘাত দিয়ে এগিয়ে চলতে চলতে এরপর ভালো ভাবে বলল, ‘তেমন ব্যাপার ঘটলে কিন্তু খুব আনন্দের। তুমি তবে এ স্থানেই রয়ে যেতে পারবে।’

পালেবত লজ্জিতভাবে বলল, ‘তা কী ভাবে সম্ভব? তিনি একজন রাজপুরুষ আর আমি একজন সামান্য নারী মাত্র।’

বাঁদরী বলল, ‘তাতে কী হয়েছে? পুরুষের কখন কোন নারীর প্রতি ভালোবাসা জন্মায় তা বলা যায় না। আর নারীদের ক্ষেত্রেও এ ব্যাপারটা একই রকম সত্যি। তুমি সুন্দরী যুবতী, আর সভাসদও একজন সুন্দর অবিবাহিত যুবা পুরুষ। তোমাদের দুজনের মধ্যে যে কোনো মুহূর্ত থেকে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।’

পালেবত এ প্রসঙ্গে আর কোনো কথা বলল না তার সঙ্গে। আর এরপরই পালেবতের আরও একটি কথা স্মরণে আসাতে প্রগাঢ় লজ্জা এবং আশঙ্কা অনুভূত হল। পালেবত সেদিন সভাসদকে জানিয়েছিল যে তার উদ্দেশেই সে বৃক্ষরোপণ করেছে। সভাসদ নিশ্চয়ই জানেন যে কার উদ্দেশে নারীরা ওই বৃক্ষরোপণ করে থাকে। পালেবতের কথা শুনে তার প্রতি কী ধারণা পোষণ করছেন সভাসদ? লজ্জিতভাবে ও সব কথা ভাবতে লাগল পালেবত। আর তার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসতে লাগল স্থলভূমি, বেগুনি-নীল ফুলের গালিচা আবৃত স্বর্ণ পর্বত।

উচ্ছল দল হ্রদ অতিক্রম করে স্বর্ণ পর্বতের পাদদেশ পা রাখতেই দেখতে পেল সেই বণিকদলকে। হ্রদের কিনারা আর পাহাড়ের ঢালের মধ্যবর্তী শূন্য জমির এক স্থানে পশু চর্মের পর্দা দিয়ে কয়েকটি অস্থায়ী কক্ষ নির্মাণ করছে তারা। উচ্ছল এগোল সেদিকে। আর তাকেও দেখতে পেয়ে বণিকের দল তাদের চর্মাবৃত কক্ষের বাইরে এসে দাঁড়াল। মাগধী বণিকদের সামনে পৌঁছে তাদের কণ্ঠে ও মস্তকবন্ধনীতে মুক্তাহারের আধিক্য দেখে উচ্ছল বুঝতে পারল আগন্তুকরা অতি ধনী শ্রেণির বণিক। আর তা না হলে তারা স্বর্ণমূল্যের জাফরান সংগ্রহ করতে আসবেই বা কেন?

বণিকদলের মধ্যে শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত বয়জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিটি সম্ভবত উচ্ছলের পোশাক দেখেও অনুমান করল সে একজন স্থানীয় রাজপুরুষ হবে। লোকটি উচ্ছলকে নিজের পরিচয় দান করে বলল, সেই হল বণিকদের দলপতি গ্রহনন্দ। সুদূর সমতলের মগধ থেকে তারা এ স্থানে এসে উপস্থিত হয়েছে।

উচ্ছলও নিজের পরিচয় দান করে, শুল্ক-বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সভাসদ অভিমন্যুর কথা উল্লেখ করে তার সাক্ষাতের কারণ বিস্তৃত করল মাগধী বণিক দলপতির কাছে। উচ্ছল তাকে বলল, পরদিন থেকেই দল হ্রদে তাদের রাত্রিবাসের ব্যবস্থাসহ অন্য সব আয়োজন সম্পন্ন করা হবে। বণিকদলকে এইস্থান থেকে জলগৃহে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরদিনই একদল রাজকর্মচারীকে এই খানে পাঠাবে সে। উচ্ছলের মুখে এ সংবাদ শুনে প্রীত হল বণিক দলপতি। শ্রীনগরে এই প্রথম এসেছে তারা। তাই এই নগরী সম্পর্কে তাদের প্রয়োজনীয় নানান সংবাদ এরপর উচ্ছলের থেকে সংগ্রহ করতে শুরু করল তারা। উচ্ছল তার সাধ্যমতো বণিক দলপতি ও তার সঙ্গীদের নানান কৌতূহলের উত্তর দিল যেতে লাগল।

বেশ খানিকক্ষণ সময় ধরে বণিক দলের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তাদের সন্তুষ্ট করার পর তাদের থেকে বিদায় নিয়ে উচ্ছল এগোল হ্রদের কিনারা যেখানে দণ্ডায়মান কয়েকটা চিনার বৃক্ষের কাছে তার শিকারা জলে ভাসছে।

পর্বতের ঢালের নীচে যে স্থানে বণিকরা তাদের অস্থায়ী কুটীর নির্মাণ করেছে সে স্থান থেকে হ্রদের কিনারের দূরত্ব আনুমানিক চারশত পদচিহ্ন। বণিকদের সঙ্গ ত্যাগ করে পঞ্চাশ পা এগোবার পরই হঠাৎ উচ্ছলের মনে হল তার পাদুটো যেন একটু টলে উঠল। ঠিক তখনই উচ্ছল দেখতে পেল অন্য একটা শিকারা নৌকা এসে দাঁড়াল একই স্থানে অর্থাৎ সেই চিনার গাছগুলোর কাছে।

উচ্ছল দেখার চেষ্টা করতে যাচ্ছিল শিকারার আরোহীদের। মুহূর্তের জন্য যেন তার মনে হল শিকারার আরোহীরা রমণী। কিন্তু এরপর আর তাদের দিকে তাকাবার অবকাশ পেল না উচ্ছল। তার পায়ের নীচের জমি থরথর করে কাঁপতে শুরু করল, আর একই সঙ্গে তার পিছন থেকে ভেসে এল বণিকদের ভয়ার্ত চিৎকার। মুহূর্তের মধ্যে উচ্ছল বুঝতে পারল ব্যাপারটা কী ঘটছে। ভূকম্পন!

অবশ্য ভূকম্পন ব্যাপারটা কাশ্মীরবাসীর কাছে অজানা কিছু নয়। উচ্ছলও তার জীবনে ইতিপূর্বে অনেকবারই এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। উচ্ছল থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বণিকদের দিকে ফিরে দাঁড়াল তাদের আতঙ্ক মুক্ত করার জন্য। সে বণিকদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে যাচ্ছিল, ‘তোমরা আতঙ্কিত হয়ো না। এ কম্পন এখনই সমাপ্ত হবে।’

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখ পড়ল স্বর্ণ পর্বতের উপরিভাগের এক স্থানে। বিশালাকৃতির এক প্রস্তর খণ্ড দীর্ঘ দিন ধরে ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল। ভূকম্পনের ফলে তা পর্বতগাত্র থেকে বিছিন্ন হওয়ার জন্য দুলতে শুরু করেছে! আর এর পরমুহূর্তেই যা ঘটার তাই ঘটল। শেষবারের জন্য একবার প্রচণ্ড ভাবে দুলে উঠল চারপাশের পৃথিবী। আর ভূকম্পনের সেই দংশন সহ্য করতে না পেরে বজ্রপাতের মতো শব্দ করে পাহাড়ের গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সেই দানবীয় প্রস্তর। তারপর তা ঢাল বেয়ে ভীমগতিতে নীচের দিকে নামতে শুরু করল হ্রদ আর পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে আছড়ে পড়ার জন্য!

ভূকম্পন আর হল না ঠিকই, কিন্তু ওই বিশাল প্রস্তরখণ্ডের অভিঘাতে অন্য এক প্রচণ্ড বিপদের সৃষ্টি হল। ঢালের গায়ে যেখানে যত ছোট-বড় প্রস্তর ছিল তারা সবাই যেন একসঙ্গে জেগে উঠে তুমুল আলোড়ন তুলে ধেয়ে আসতে লাগল নীচের দিকে। সমগ্র ঘটনাটা ঘটতে মাত্র কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। উচ্ছল বুঝতে পারল এই উন্মুক্ত স্থানে দাঁড়িয়ে থাকলে ওপর থেকে ধেয়ে আসা প্রস্তরখণ্ডের আঘাতে মৃত্যু অনিবার্য। বাঁচার একমাত্র উপায় হল হ্রদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা চিনার গাছগুলোর গুঁড়ির আড়ালে আশ্রয় নেওয়া অথবা হ্রদের জলে ঝাঁপ দিয়ে দূরে সরে যাওয়া।

উচ্ছল বণিকদের উদ্দেশে চেঁচিয়ে বলল, ‘ওপর থেকে প্রস্তরখণ্ড নেমে আসছে। এদিকে পলায়ন করে হ্রদের জলে আশ্রয় নাও, নইলে প্রাণে বাঁচবে না।’এ কথা বলে উচ্ছল ছুটতে শুরু করল হ্রদের দিকে। আর বণিকরাও প্রাণ রক্ষার্থে একই কাজ করল।

কিন্তু একটু এগিয়েই উচ্ছল হঠাৎই ভূপতিত হল! উঠে দাঁড়াতে যেতেই তার পতনের কারণটা অনুধাবন করল সে। ভূমি ভাগে একটি ক্ষুদ্র অথচ গভীর গহ্বরের মধ্যে প্রবেশ করেছে তার একটি পা! উচ্ছল সেই গহ্বর থেকে তার পা টেনে তোলার চেষ্টা করতে যেতেই কী কারণে যেন তার মধ্যে আটকে গেল সেই পা। উচ্ছল সেই গহ্বর থেকে নিজের পাকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। ওদিকে তখন পর্বতগাত্র বেয়ে নামতে শুরু করেছে রাশি রাশি প্রস্তরখণ্ড। যে বিশাল প্রস্তর খণ্ডটি প্রথমে স্থানচ্যুত হয়েছিল, নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তে পড়তে সেটিও এবার শত খণ্ডে বিভক্ত হতে শুরু করেছে! তার ফলে পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। উঠে দাঁড়াতে ব্যর্থ হওয়াতে উচ্ছল হ্রদের দিকে ছুটে আসা বণিকদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘আমাকে সাহায্য করো। আমার পা গহ্বরে আটকে গেছে। আমার পা গহ্বর থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করো তোমরা।’

কিন্তু সাক্ষাৎ মৃত্যু যখন পিছু ধাওয়া করে আসছে তখন প্রথম লক্ষ্য হল নিজের জীবন রক্ষা করা, তাই আর কেউ তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এল না। উচ্ছলের কথায় কর্ণপাত না করে তার পাশ দিয়েই তাকে অতিক্রম করে ধাবিত হল হ্রদের দিকে।

আর এরপরই বৃষ্টির মতো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে আছড়ে পড়তে লাগল নানান আকৃতির প্রস্তর খণ্ড। তারা মাটিতে নেমে ধেয়ে আসতে লাগল উচ্ছলের দিকে! মাটিতে শুয়ে পড়লে যদি কোনোক্রমে নিজের জীবন রক্ষা করা যায় এ কথা ভেবে নিয়ে উচ্ছল মাটিতে শুয়ে পড়ল উপুড় হয়ে। সেই অবস্থাতেই সে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই প্রত্যক্ষ করল ছোট-বড় নানান আকৃতির প্রস্তরখণ্ড বিদ্যুৎ গতিতে তার দু পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে! উচ্ছলের মনে হল ধাবমান প্রস্তর খণ্ডের আঘাতে তার মৃত্যু যেন আর মাত্র কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা।

তেমনই কোনো নির্মম মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল উচ্ছল। আর এর পরই কী যেন একটা ভারী বস্তু এসে আছড়ে পড়ল উচ্ছলের শরীরের ওপর। প্রস্তরখণ্ডই তার ওপর আঘাত হেনেছে মনে করে মৃত্যু আশঙ্কায়, আতঙ্কে মুহূর্তের জন্য চোখ মুদে ফেলল উচ্ছল। কিন্তু তারপরই সে চোখ খুলে দেখতে পেল সে জীবিত আছে। মৃত্যুদূতেরা তখনও প্রচণ্ড শব্দ তুলে ছুটে চলেছে তার চারপাশ দিয়ে। তাহলে তার শরীরের ওপর কী রয়েছে? আরও কয়েক মুহূর্তের চেষ্টাতে উচ্ছল বুঝতে পারল ব্যাপারটা। একটা মানবদেহ আচ্ছাদনের মতো আবৃত করে রেখেছে তার শরীর। তবে কি কোনো বণিকের দেহ প্রস্তর খণ্ডের আঘাতে আছড়ে পড়েছে তার শরীরের ওপর? উচ্ছল বুঝতে পারল যে তার শরীরের ওপর জীবত বা মৃত যে দেহই থাকুক না কেন তা বর্মর মতো কাজ করছে। উচ্ছলের অনুমানই সত্যি, কারণ এরপর বার কয়েক কেঁপে উঠল উচ্ছলের শরীরকে আবৃত করে থাকা দেহটা। প্রস্তর খণ্ড এসে পড়ছে সে দেহের ওপর। তবে তা উচ্ছলের শরীরকে স্পর্শ করতে পারছে না।

সব ঘটনা, দুর্ঘটনারই পরিসমাপ্তি ঘটে। তাই ধীরে ধীরে পাথর বৃষ্টি থেমে গেল এক সময়। কিন্তু উচ্ছলের তখন ওঠার ক্ষমতা হল না, তার এক পা আটকে আছে গহ্বরের মধ্যে, আর শরীরের ওপর রয়েছে একটা মানুষের দেহ। তবে এর কিছুক্ষণের মধ্যে উচ্ছল দেখতে পেল, বণিকেরা যারা প্রাণ রক্ষার্থে হ্রদের পাড়ে গাছের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছিল তারা এবার তার দিকে ছুটে আসছে। আর তাদের সঙ্গে একজন নারীও আছে!

লোকগুলো উচ্ছলের কাছ উপস্থিত হয়ে প্রথমে তার শরীরের ওপরে থাকা নরদেহের ভার মুক্ত করল। তারপর তারা উচ্ছলের পা ধরে আকর্ষণ করতেই তা মুক্ত হয়ে গেল গহ্বর থেকে। উচ্ছল উঠে বসল ভূমিতে। প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয় পাশ ফিরে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল। তার কিছুটা তফাতে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছে এক রক্তাক্ত নারী! আর অন্য একজন নারী তার শরীরটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে সংজ্ঞা ফেরাবার চেষ্টা করছে। উচ্ছলের বুঝতে অসুবিধা হল না যে ভূপতিত ওই নারীদেহই তার শরীরের ওপর বর্মের মতো কাজ করছিল। পাথরের যাবতীয় আঘাত সেই গ্রহণ করেছে।

ঝাঁকুনির ফলে সে নারীর মুখমণ্ডল উচ্ছলের দিকে ফিরল। আর সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল উচ্ছল। এ যে পালেবত! সে এ স্থানে কী ভাবে এল?

বিস্মিত উচ্ছল সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ে পালেবতের কাছে পৌঁছে গেল। তারপর ঝুঁকে পড়ল পালেবতের দেহের ওপর তার অবস্থা ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করার জন্য। উচ্ছল দেখল পালেবতের বক্ষদেশ ওঠা-নামা করছে। অর্থাৎ সে জীবিত আছে। তবে পাথরের আঘাতে তার মাথার পিছনে একটা ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। রক্তপাত হচ্ছে সে স্থান থেকে। যে রমণী পালেবতের সংজ্ঞা ফেরাবার চেষ্টা করছিল উচ্ছল তাকাল তার দিকে।

উচ্ছল কিছু জানতে চাইবার আগেই সে ভীতভাবে বলল, ‘আমি বাঁদরী, শিকারা বাহিকা। হ্রদ পারাপার করার সময় আমাদের মধ্যে সখ্য গড়ে উঠেছে। পালেবত এখানে আসতে চায়নি। আমিই তাকে ভ্রমণের লোভ দেখিয়ে এ স্থানে এনেছি। পাড়ে নামতেই ভূকম্পন, পাথর বৃষ্টি শুরু হল। সঙ্গে সঙ্গে আমরা পলায়ন করতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ঠিক সেই সময় পালেবত আপনাকে ভূপতিত অবস্থায় দেখতে পেল। আর তা দেখে আমার নিষেধ অগ্রাহ্য করে আপনার প্রাণ রক্ষার্থে ছুটে এসে আপনার শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর তারপর... ।’ বাঁদরী তার কথা শেষ করতে পারল না। ঘটনার অভিঘাতের আতঙ্কে সে কাঁপতে শুরু করল।

বাঁদরীর কথা শুনে হতবাক হয়ে গেল উচ্ছল। কিন্তু এই মুহূর্তে উচ্ছলের আশু কর্তব্য হল পালেবতের জীবন রক্ষা করা, তাকে সুস্থ করে তোলা। পালেবতের মাথা থেকে রক্তপাত হচ্ছে! উচ্ছল একজন বণিককে জল আনার অনুরোধ করে বাঁদরীকে সে বলল পালেবতের মাথাটা তুলে ধরার জন্য। বাঁদরী সে কাজ করতেই উচ্ছল নিজের মস্তকবন্ধনী খুলে তা দিয়ে আবৃত করতে লাগল পালেবতের ক্ষতস্থান। রক্তপাত বন্ধ হয়ে গেল।

বণিকদের একজন একটা পাত্রে জল নিয়ে উপস্থিত হল। উচ্ছল সেই শীতল জল দিয়ে ধীরে ধীরে ধৌত করতে লাগল পালেবতের মুখমণ্ডল। এই সময় সেই শীতলতার স্পর্শেই কেঁপে উঠল পালেবতের শরীর। তারপর চোখ মেলল সে। প্রথমে কিছুক্ষণ যেন সে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইল, তারপর বাঁদরীর সাহায্যে ধীরে ধীরে উঠে বসল। উচ্ছল আর বাঁদরী তো আছেই, পালেবতের চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে মাগধী বণিকের দল। চারপাশে তাকিয়ে পালেবত যেন কিছুটা তন্দ্রাছন্নভাবে বলল, ‘এ আমি কোথায়? তোমরা কারা?’

উচ্ছল পাশ থেকে বলল, ‘তোমার কোনো ভয় নেই পালেবত। তুমি নিরাপদেই আছ। আমাকে রক্ষা করতে গিয়ে পাথর বৃষ্টিতে সামান্য আহত হয়েছ তুমি। তবে দুর্যোগ কেটে গেছে। আর কোনো ভয় নেই।’

পালেবতকে ভরসা দেওয়ার জন্য বাঁদরী তাকে আলিঙ্গন করে বলল, ‘হ্যাঁ, বিপদ কেটে গেছে।’

বাঁদরীর আলিঙ্গনবদ্ধ অবস্থায় পালেবত স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে বইল উচ্ছলের দিকে। অদ্ভুত এক দৃষ্টি! কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সে দৃষ্টি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল, যেন হুঁশ ফিরে পেল পালেবত। উচ্ছলের উদ্দেশে হাত জোড় করে প্রণাম জানিয়ে সে উঠে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু পারল না।

রক্তপাত না হলেও তার শরীরের বেশ কিছু স্থানে আঘাত লেগেছে। তাকে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য আরও কিছুক্ষণ সময় দিল উচ্ছল। তারপর এক সময় পালেবত বাঁদরীর কাঁধে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে সমর্থ হল। বণিকদের থেকে বিদায় নিয়ে পালেবত আর বাঁদরীকে সঙ্গে নিয়ে উচ্ছল রওনা হল জলগৃহে ফেরার জন্য। সারাটা পথ আর একটাও কোনো কথা বলল না পালেবত। শিকারার হাঁটনির দণ্ড আলিঙ্গন করে নিশ্চুপ ভাবে যেন গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে সে চেয়ে রইল জলের দিকে।

উচ্ছল যখন তার জলগৃহতে তাদের নিয়ে ফিরে এল ততক্ষণে গুঞ্জার নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে। সে ভেবেছিল পালেবত নিজের কক্ষেই আছে। কিন্তু উচ্ছলদের এভাবে একসঙ্গে ফিরে আসতে দেখে বিস্মিত হয়ে গেল গুঞ্জা। শিকারা থেকে জলগৃহে উঠল তারা তিনজন। উচ্ছল, গুঞ্জা আর বাঁদরীর উদ্দেশে বলল, ‘তোমরা পালেবতের শুশ্রূষার ব্যবস্থা করো। ওর মাথার ক্ষতস্থানে আরক লেপন করে পুনরায় আবার তা বস্ত্রখণ্ডে আবৃত করো। শরীরের আবৃত স্থানে আঘাত থাকলে সে সব স্থানেও আরক লেপন করো। প্রয়োজনে আমি একজন চিকিৎসককেও আহ্বান করতে পারি।’

উচ্ছলের এ কথার পর বাঁদরী আর গুঞ্জা মিলে পালেবতকে আলিঙ্গন করে তার কক্ষের দিকে এগোতে যাচ্ছিল। কিন্তু কয়েকপা এগিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে উচ্ছলের দিকে তাকাল পালেবত। উচ্ছলের মনে হল পালেবত তার উদ্দেশে কিছু বলবে। তার দিকে তাকিয়ে পালেবতের ঠোঁট দুটো মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল ঠিকই, কিন্তু সে কিছু বলল না। মুখ ফিরিয়ে মাথা নিচু করে এগোল তার কক্ষের দিকে। তারপর অন্য দুজনের সঙ্গে সে তার কক্ষে প্রবেশ করল।

উচ্ছল দাঁড়িয়ে রইল জলগৃহের অলিন্দে, যদি তাকে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয় সেজন্য। তার জলগৃহের কাছেই এক জলগৃহতে একজন চিকিৎসক বাস করেন। অলিন্দে দাঁড়িয়ে উচ্ছল ভাবতে লাগল পুরো ঘটনার কথা। যা ঘটল তা যুগপৎ রোমাঞ্চ আর বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে উচ্ছলের মনে।

নিশ্চিতভাবে আজ পুনর্জন্ম লাভ করল উচ্ছল। সে যখন একাকী মাটিতে পড়েছিল তখন যে-কোনো একটি প্রস্তর খণ্ডের আঘাতে তার ভবলীলা সাঙ্গ হতে পারত। এ কথাটা যখনই মনে পড়ছে তখনই শিহরন খেলে যাচ্ছে তার শরীরে। আর পালেবতের ঘটনাটাও কম বিস্ময়কর নয়। গুঞ্জাকে না জানিয়ে পালেবত জলগৃহ ত্যাগ করে উচিত কাজ করেনি ঠিকই, কিন্তু নিজের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে সে যেভাবে উচ্ছলের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছে তা সত্যিই বিস্ময়কর!

বেশ খানিকটা সময়ের পর বাঁদরী, পালেবতের কক্ষ ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে এসে উচ্ছলের সামনে কিছুটা অপরাধীর ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে দাঁড়াল।

উচ্ছল তাকে প্রশ্ন করল, ‘এখন কেমন আছে সে?’

বাঁদরী জবাব দিল, তার ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে তাতে আরকের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। শরীরের যে সব স্থানে আঘাত লেগেছে সে সব স্থানের শুশ্রূষা করা হয়েছে। সে বিপদমুক্ত কিন্তু নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়েছে।’ এ কথা বলে একই ভাবে মাথা নিচু করে সে দাঁড়িয়ে রইল।

বাঁদরী হয়তো ভেবেছিল পালেবতকে সে স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে এবার সভাসদের ভর্ৎসনার সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু উচ্ছল তা করল না। পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণ করে তার বুঝতে অসুবিধা হল না যে, এ স্থানে থাকলেও পালেবত প্রবল একাকীত্ব বোধ করে। আর তা দূর করার জন্যই সে এই শিকারা বাহিকাকে তার সখী হিসাবে নির্বাচন করেছে এবং তার আহ্বানে সাড়া দিয়েই তার সঙ্গী হয়েছিল। উচ্ছল বাঁদরীর নাম আর বাসস্থান কোথায় তা জানতে চাইল। বাঁদরী সে প্রশ্নের জবাব দিল।

অনেক আগেই বিকাল হয়ে গেছে। সূর্য দ্রুত ঢলতে শুরু করেছে পাহাড়ের আড়ালে। বাঁদরীকে ভর্ৎসনার পরিবর্তে উচ্ছল এরপর তাকে বলল, ‘তুমি যখন ইচ্ছা হবে তখন এসে সাক্ষাৎ করে যেও পালেবতের সঙ্গে। তার যদি ভ্রমণের ইচ্ছে হয় তবে গুঞ্জাকে জানিয়ে তাকে বাইরে নিয়ে যেও। তবে বেশি দূরে নিয়ে যেও না। এ স্থান তার অচেনা। কোনো কারণে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে বিপদ ঘটতে পারে।’

বাঁদরী উচ্ছলের কথা শোনার পর বলল, ‘আপনার নির্দেশ মেনে চলব আমি।’

উচ্ছল বলল, ‘এবার তুমি ফিরে যাও। সন্ধ্যা নামতে চলেছে।’

বাঁদরী হাতজোড় করে প্রণাম জানাল উচ্ছলকে। তার পর অলিন্দ ত্যাগ করে নীচে নেমে উঠে বসল তার শিকারাতে। সে রওনা হয়ে গেল তার ঘরে ফেরার জন্য।

উচ্ছলও তার কক্ষে প্রবেশ করল। পোশাক পরিবর্তন করে পালঙ্কে শুয়ে পড়ল সে।

কিন্তু তার মনে আবর্তিত হতে লাগল স্বর্ণ পর্বতের পাদদেশের ঘটনাটার কথা। বিশেষত পালেবতের কথা। বাইরে সূর্য ডুবে গিয়ে অন্ধকার নামল। দল হ্রদের বাসিন্দারা রাত্রি নামার পর নৈশাহার গ্রহণ করতে বেশি বিলম্ব করে না। তেমনই অন্ধকার নামার কিছু সময় পর গুঞ্জা উপস্থিত হল নৈশাহার নিয়ে। উচ্ছল তাকে জিগ্যেস করে জানতে পারল যে পালেবতের নিদ্রাভঙ্গ হয়নি।

ব্যাপারটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আঘাতপ্রাপ্ত মানুষের শরীরে বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। উচ্ছল এরপর নৈশাহার সাঙ্গ করে আবার শুয়ে পড়ল। উচ্ছল নিজে আহত না হলেও তার ওপর দিয়েও উত্তেজনার ঝড় বয়ে গেছে। আজ সে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হল সেই ঘটনার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুম নেমে এল তার চোখে।

১৪

পরদিন উচ্ছলের যখন নিদ্রাভঙ্গ হল তখন ভোরের প্রথম আলো
ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে দল হ্রদের বুকে। রাজহংসরা আলোর স্পর্শে জেগে উঠে শরবন ত্যাগ করে জলে ভাসার প্রস্তুতি শুরু করেছে। উচ্ছলের ঘুম ভাঙতেই মনে পড়ে গেল গত দিনের ঘটনাটার কথা, পালেবতের কথা। নিদ্রাভঙ্গ হলে পালঙ্কে শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগে না উচ্ছলের। কক্ষ ত্যাগ করে সে জলগৃহের অলিন্দে এসে দাঁড়াল।

মনোরম পরিবেশ চারপাশে। সূর্যদেব সবেমাত্র আত্মপ্রকাশ করেছেন। ধীরে ধীরে কুজ্ঝটিকার আবরণ মুক্ত হচ্ছে পর্বতশৃঙ্গগুলো, দৃশ্যমান হয়ে উঠছে কাছে-দূরে পুষ্প আচ্ছাদিত পাহাড়ের ঢালগুলো। জেগে উঠছে দল হ্রদও। ইতিমধ্যেই কয়েকটা শিকারা নৌকা এখানে ওখানে ভাসতে শুরু করেছে। একদল রাজহংসও ইতিমধ্যে নেমে পড়েছে জলে। জলগৃহের বাসিন্দাদের নিদ্রাভঙ্গ করার জন্যই যেন কলরব করছে তারা।

এ স্থানে একধরনের পক্ষী দেখতে পাওয়া যায়, যারা মৎস্য শিকার করে। বহুবর্ণের সেই পক্ষীকুলও ভোরের আলো ফোটার পর ওড়াউড়ি শুরু করেছে। এসব দেখতে দেখতে উচ্ছল পদচারণা করতে শুরু করল অলিন্দে। হঠাৎ একবার পালেবতের কক্ষের সামনে উপস্থিত হতেই উচ্ছলের মনে হল পালেবত কেমন আছে? তার কি নিদ্রাভঙ্গ হল? যেভাবে সে তার জীবন রক্ষা করেছে তা সত্যিই উচ্ছলকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করেছে।

উচ্ছল দেখল পালেবতের কক্ষের কপাট খোলা। সম্ভবত সে আঘাতপ্রাপ্ত বলেই কপাট বন্ধ করা হয়নি, অথবা ভোরের আলো ফোটার পর সেই কপাট উন্মোচন করেছে বলে উচ্ছলের ধারণা হল। কপাট উন্মোচিত থাকলেও একটা পশমের পর্দা ঝুলছিল সেখানে। পালেবত কেমন আছে তা দেখার জন্য পর্দা সরিয়ে উচ্ছল প্রবেশ করল তার কক্ষে।

পালঙ্কে নিদ্রামগ্ন ছিল পালেবত। পর্দা সরাতেই আলো এসে পড়ল তার শরীরের ওপর। উচ্ছল প্রথমে তাকাল তার মুখমণ্ডলের দিকে। পালেবতের চক্ষুপল্লব মুদ্রিত, কিন্তু এক আশ্চর্য সুন্দর লালিমা জেগে আছে তার মুখমণ্ডলে। সে সৌন্দর্য ভোরের আলোর মতোই কোমল, মাধুর্যময়। নিজের অজান্তেই যেন উচ্ছল চেয়ে রইল সেই মুখমণ্ডলের দিকে। ইতিপূর্বে সে এমনভাবে চায়নি কোনো নারীর মুখের দিকে। এরপর সে তাকাল তার শরীরের দিকে, কোথাও কোন আঘাতের চিহ্ন আছে কিনা তা দেখার জন্য। কিন্তু তা দেখতে গিয়েই উচ্ছলের চোখ আটকে গেল পালেবতের শরীরে নির্দিষ্ট স্থানে। পালেবতের শরীরে অন্তর্বাসহীন মসৃণ রেশমের পোশাক। যে পোশাকের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছে তার অঙ্গসৌষ্ঠব, শরীরী ছন্দ। উচ্ছলের চোখ আটকে গেল মসৃণ পোশাকের আড়াল থেকে ভেসে ওঠা পালেবতের সুডৌল স্তন যুগলের ওপর। দল হ্রদের কমল কুঁড়ি যেমন উদ্ধত ভঙ্গিতে জলের ভিতর থেকে সূর্যের দিকে মাথা তোলে, ঠিক তেমনই যেন পালেবতের পিনোন্নত বক্ষযুগল নিদ্রিত পালেবতের রেশম বস্তুর ভিতর থেকে চেয়ে আছে উচ্ছলের দিকে। অয়স্কান্ত মনির মতো তা আকর্ষণ করছে উচ্ছলের চোখকে। স্তব্ধ হয়ে উচ্ছল চেয়ে রইল সেই বক্ষ যুগলের দিকে। উচ্ছল নারী সঙ্গ করে না। কিন্তু সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হয়তো বা প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই যেন উচ্ছলের মনের মধ্যে জেগে উঠল অন্য এক পুরুষ। সেই পুরুষ যেন বলে উঠল, ‘কী অতীব সুন্দর এই নারী।’

উচ্ছলের শরীরে দ্রুত রক্ত সঞ্চালন শুরু হল। এক অজানা অনুভূতি যেন ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করতে শুরু করল তাকে। কিন্তু এরপরই যেন সম্বিত ফিরে পেয়ে লজ্জাবোধ করে পালেবতের শরীর থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল উচ্ছল। তার মনে হল পালেবত যদি হঠাৎ চোখ মেলে অথবা গুঞ্জা এ কক্ষে প্রবেশ করে তবে তাদের কী ধারণা হবে তার সম্পর্কে? উচ্ছল তাই আর এক মুহূর্ত সে কক্ষে না থেকে বাইরে বেরিয়ে নিজ কক্ষে প্রবেশ করল। তখনও যেন সে অনুভব করতে পারছে শরীরের উষ্ণ রক্ত প্রবাহ। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই সুডৌল, পিনোন্নত পালেবতের বক্ষ যুগল!

কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সূর্যালোক যখন উপত্যকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে বসন্তকে প্রস্ফূটিত করে তুলল, তখন প্রাতরাশ নিয়ে উচ্ছলের কক্ষে প্রবেশ করল গুঞ্জা। উচ্ছল একটু ইতস্তত করে তাকে প্রশ্ন করল, ‘পালেবত কেমন আছে?’

গুঞ্জা জবাব দিল, ‘ভালো, নিদ্রাভঙ্গ করে পালঙ্কে উঠে বসেছে সে।’

তার কথা শুনে উচ্ছল মনে মনে ভাবল, সে যখন পালেবতের বক্ষ যুগলের দিকে চেয়ে ছিল তখন ভাগ্যিস নিদ্রাভঙ্গ হয়নি তার। তাহলে উচ্ছলকে প্রবল লজ্জা আর বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হতো।

কিছু সময়ের মধ্যেই স্নানাহার সম্পন্ন করে জলগৃহ ত্যাগ করে দৈনন্দিন কার্য সম্পাদনের জন্য রওনা হয়ে গেল উচ্ছল। কিন্তু শিকারা বেয়ে দল হ্রদ অতিক্রম করতে করতে বা অশ্বপৃষ্ঠে রাজসভার দিকে অগ্রসর হতে হতে বার বার তার মনে পড়তে লাগল সেই দৃশ্যের কথা। নিদ্রামগ্ন এক অপরূপার কথা!

সভাগৃহে এসে উচ্ছল এদিনও জানতে পারল মহারাজ ললিতাপীড় এদিনও সভাকে সম্বর্ধিত করবেন না। রাজকার্যের পরিশ্রম হেতু তিনি নাকি ভীষণ রকম ক্লান্তি অনুভব করছেন। ক্লান্তির আসল কারণ অবশ্য সকলের কাছেই অনুমেয়। কাশ্মীর রাজ সারা রাত্রি ব্যাপী হয় মদ্যপান, নয় নারী সম্ভোগের কাজে লিপ্ত ছিলেন। অবশ্য তিনি রাজসভাতে পদার্পণ না করলে অনেকেই খুশি হন। কারণ, তিনি রাজসভাতে উপস্থিত হয়ে কী নির্দেশ দেন তা নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত থাকেন।

উচ্ছলও আনন্দিত হল এ সংবাদ শুনে। সে সিদ্ধান্ত নিল, সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে। নিজের কার্যালয় হয়ে সে কাজের আছিলায় মহামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবে। পালেবতের বিষয়টা নিয়ে সে তার সঙ্গে আলোচন করবে।

নিজের সিদ্ধান্ত মতোই রাজসভা ত্যাগ করে প্রথমে নিজের কার্যালয়ে গিয়ে উপস্থিত হল উচ্ছল। অধস্তন কর্মচারীরা তাকে জানাল মাগধী বণিকদের রাত্রিবাসের জন্য জলগৃহতে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। উচ্ছল তাদের নির্দেশ দিলেন সেই বণিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদেরকে সেই জলগৃহতে পৌঁছে দেবার জন্য। তাদেরকে এ নির্দেশ প্রদান করে সে রওনা হল মহামন্ত্রীর কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য।

মহামন্ত্রী যশঙ্করের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে উচ্ছল জানতে পারল তিনি এখনো সেখানে উপস্থিত হননি। মহারাজ তাকে প্রাসাদে ডেকে পাঠিয়েছেন। তিনি রাজসভা থেকে সে স্থানে গেছেন। এ কথা জানার পর উচ্ছল মহামন্ত্রীর কক্ষের বাইরে তাঁর জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগলেন।

কিছু সময় পর সেখানে এসে উপস্থিত হলেন শুল্ক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সভাসদ অভিমন্যু। তিনিও সাক্ষাৎ করতে এসেছেন মহামন্ত্রীর সঙ্গে। উচ্ছলের পক্ষে ব্যাপারটা উত্তমই হল। সে মাগধী বণিকদের সঙ্গে তার সাক্ষাতের ব্যাপার আর দল হ্রদে তাদের বাসস্থান যে নিশ্চিত করা হয়েছে সে সম্পর্কে অবগত করল তাকে। আর ভূকম্পনটা যে সেই সময়ই হয়েছিল সে কথাও জানাল তাকে। তবে তাতে যে তার নিজের প্রাণ সংশয় হয়েছিল, এবং কী ভাবে পালেবত তাকে রক্ষা করেছে সে কথা অবশ্য অপ্রাসঙ্গিক মনে হওয়াতে বলল না। অভিমন্যু বললেন, ‘দেবতা সহায় যে ওই ভূকম্পনের ফলে আপনার বা বণিকদলের কোনো ক্ষতি হয়নি। বণিকদল যদি প্রস্তর খণ্ডের আঘাতে মৃত্যুমুখে পতিত হতো তবে শুল্ক সংগ্রহে বড় ক্ষতি হত।’

উচ্ছল আর অভিমন্যু, দুই সভাসদ এরপর আলোচনা শুরু করল ভূকম্পন নিয়ে। অভিমন্যুর কাছে উচ্ছল জানতে পারল যে ভূকম্পনের ফলে বেশ কিছু দরিদ্র মানুষের বাসস্থানের ক্ষতি সাধন হয়েছে। তবে কোনো মানুষের জীবনহানি হয়নি। তাঁর একথা শুনে উচ্ছল মনে মনে ভাবল, দরিদ্র মানুষের পর্ণ কুটিরে অপেক্ষা যদি মহারাজের প্রাসাদটা ধ্বসে পড়ত তবে ভবিষ্যতে অনেক মানুষ জীবনহানি থেকে রক্ষা পেত।

বেশ খানিক সময় ধরে কাষ্ঠাসনে বসে দুজনে ভূকম্পন ও নানান বিষয় নিয়ে আলোচনার পর তারা গবাক্ষ দিয়ে দেখতে পেল মহামন্ত্রী তাঁর কার্যালয়ে প্রবেশ করছেন। তা দেখে অভিমন্যু বললেন, ‘আপনি আগে ওঁর সঙ্গে বাক্যালাপ সেরে নিন তারপর আমি বাক্যালাপ
করব।’

কার্যালয়ে প্রবেশ করে, মহামন্ত্রী সোজা এসে উপস্থিত হলেন তার কক্ষের সামনে। তাঁর মুখমণ্ডল বেশ চিন্তাক্লিষ্ট। কপালের বলিরেখাগুলো যেন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। তিনি উপস্থিত হতেই তার কক্ষের বাইরে অপেক্ষমান দুই সভাসদ তাদের আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রথামাফিক মাথা ঝুঁকিয়ে মহামন্ত্রীর উদ্দেশে প্রণাম জানালেন।

ঠিক এই সময় এক ঘটনা ঘটল। মাথা ঝোঁকাতে গিয়ে সভাসদ অভিমন্যুর বন্ধনীর একটা অংশ খুলে গেল। ব্যাপারটাতে বেশ বিব্রতবোধ করে অভিমন্যু তা আবার বাঁধতে বাঁধতে বলে উঠলেন, ‘বন্ধনীর স্বর্ণ কণ্টকটা কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছি! নতুন একটা কণ্টক ক্রয়ের প্রয়োজন। কিন্তু কাজের চাপে স্বর্ণকার গৃহে যাওয়া হচ্ছে না।’

এ কথা শুনেই উচ্ছলের মনে পড়ে গেল ভাঁড় কূপমণ্ডূকের মুখ থেকে শোনা সেই কথা—চন্দ্রপর্বত থেকে উদ্ধার হয়েছে একটা স্বর্ণকণ্টক! তবে কি সভাসদ অভিমন্যুও উপস্থিত ছিলেন ওই সভায়? তিনিও রাজদ্রোহী!

উচ্ছলের দৃষ্টি বিনিময় হল মহামন্ত্রী সঙ্গে। সম্ভবত তিনি অনুমান করতে পারলেন যে উচ্ছল চিহ্নিত করতে পেরেছে অভিমন্যুকে। তিনি তাদের দুজনের উদ্দেশে বললেন, ‘আপনারা দুজনেই কক্ষে প্রবেশ করুন।’

সকলে কক্ষে প্রবেশ করার পর দ্বার বন্ধ করলেন তিনি। কক্ষে রাখা চৌপায়াকে ঘিরে উপবেশন করল তারা তিনজন।

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর মহামন্ত্রী যশঙ্কর অভিমন্যুর উদ্দেশে বললেন, ‘আপনার মস্তক বন্ধনীর কণ্টকটিই যে স্থানচ্যুত হয়েছে তা আমার অজানা ছিল। এ কথা যদি আপনি রাজসভায় সর্বসমক্ষে উল্লেখ করতেন তবে হয়তো বা এতদিনে আপনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে যেত। গুপ্তচরের দল তো সর্বত্রই আছে।’

মহামন্ত্রীর কথা শুনে উচ্ছল বুঝতে পারল তার অনুমানই ঠিক। কিন্তু ব্যাপারটা ধরতে না পেরে বিস্মিত অপর সভাসদ প্রশ্ন করলেন, ‘কণ্টক নিখোঁজ হলে মৃত্যুদণ্ড হবে কেন?’

অভিমন্যুর কথার জবাবে যশঙ্কর খুলে বললেন উচ্ছলের শোনা কূপমণ্ডূকের কথাগুলো। তা শুনে অভিমন্যু বেশ কিছু মুহূর্ত অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন উচ্ছলের দিকে। তারা দুজনেই বুঝতে পারল তাদের দুজনের পরিচয় একে অপরের কাছ থেকে আর গোপন রইল না। তারা দুজনেই যে সেই গোপন সভায় উপস্থিত ছিল তা তারা বুঝতে পারল।

মহামন্ত্রী যশঙ্কর এরপর বললেন, ‘আমি আপনাদের দুজনকে পরস্পরের কাছে চিহ্নিত করালাম এ কারণে, আপনাদের দুজনকেই আমার ভরসাযোগ্য ব্যক্তি বলে মনে হয়। হঠাৎ যদি আমি কারারুদ্ধ হই, এ দেশে থেকে বিতাড়িত হই অথবা কোনো গুপ্ত ঘাতক দিয়ে আমাকে হত্যা করা হয়, তখন যেন আমাদের পরিকল্পনা স্থগিত না হয়ে যায়। কাশ্মীরবাসীকে অত্যাচারীর শাসন থেকে মুক্ত করার জন্য আপনারা যেন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। যে ভাবেই হোক এই উপত্যকাকে ওই নররাক্ষস ও তার বেশ্যাকুলের হাত থেকে আপনাদের মুক্ত করতে হবে। সম্ভবত আরও দুর্যোগ ঘনিয়ে আসতে চলেছে এ রাজ্যে।’

মহামন্ত্রী যশঙ্করের কথা শুনে উচ্ছল বলল, ‘আরও নতুন কোন দুর্যোগ নেমে আসতে চলেছে? আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি নিজেও নিরাপত্তার অভাববোধ করছেন?’ একটু চুপ করে থেকে মহামন্ত্রী বললেন, ‘আমি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ চিন্তিত নই, তবে যা ঘটতে চলেছে তাতে উপত্যকাবাসীর জীবন ও সম্পদের কোনো নিরাপত্তাই যে থাকবে না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। মহারাজ আমাকে সে জন্যই তার প্রাসাদে ডেকেছিলেন। তিনি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি যেদিন সভায় উপস্থিত থাকবেন না, সেদিন সভা পরিচালনার জন্য মহারাজের প্রতিনিধিত্ব করবে তার তিন প্রধান প্রেয়সীর মধ্যে কোনো একজন। তার বসার জন্য সম্রাটের সিংহাসন বেদির নিম্ন ধাপে একটি রৌপ্য আসন স্থাপন করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ওই তিন বেশ্যা এবার পরিপূর্ণ ভাবে এ রাজ্যের শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নিতে অগ্রসর হয়েছে। ওই তিন বেশ্যা জানে যে আমি তাদের কৃপা প্রার্থী নই, আমি তাদের দেখে মাথা ঝোঁকাই না, অতি প্রয়োজন ভিন্ন তাদের সঙ্গে বাক্যালাপ পর্যন্ত করি না। আমি তাদের যাত্রা পথে, লক্ষ্য পুরণের পথে কণ্টক স্বরূপ। তাই হয়তো এরপর তারা তাদের অনুগত কোনো ব্যক্তিকে মহামন্ত্রীর আসনে বসাবার জন্য আমাকে পদচ্যুত করবে, কোনো অভিযোগে কারারুদ্ধ করবে, এমনকী হত্যাও করতে পারে।’

উচ্ছল আর অভিমন্যু অবাক হয়ে গেল মহারাজ ললিতাপীড়ের এই নতুন নির্দেশের কথা শুনে। ব্যাপারটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে অসুবিধা হল না তাদের। উচ্ছল বলে উঠল, ‘সত্যিই কি বেশ্যাদের জন্য মহারাজের সিংহাসন বেদিতে মন্ত্রীসভাসদদের আসনের ঊর্ধ্বে আসন স্থাপিত হবে?’

কাশ্মীর দেশের মহামন্ত্রী যশঙ্কর কাষ্ঠ হেসে বললেন, ‘মহারাজের নির্দেশ পালন না করে উপায় কী বলুন। তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করলে তিনি সহজেই আমাদের তাঁর বিরোধী বলে চিহ্নিত করে ফেলবেন। তাতে আমাদের পরিকল্পনা ব্যাহত হবে।’

এ কথা বলে তিনি সভাসদ অভিমন্যুর কাছে জানতে চাইলেন, ‘আপনার কাছে কোনো নতুন সংবাদ আছে কি? যা আমাদের পরিকল্পনার সহায়ক?’

রাজপার্ষদ অভিমন্যু বললেন, ‘না, তেমন কোনো অগ্রগতির খবর নেই। তবে মন্ত্রী বিদূর আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কম্পনধিপতি গড়ুরের সঙ্গে বাক্যালাপ করেছিলেন মহারাজের সম্পর্কে তাঁর ও তাঞ্জিনদের মনোভাব জানার জন্য। কিন্তু তাতে বিশেষ কাজ হয়নি। মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন কম্পনধিপতি। তবে কয়েকজন তাঞ্জিন বা সৈন্যের কথা বলে বিদুর জেনেছেন, তারা অনেকে নাকি মহারাজের ওপর ক্ষুব্ধ। তিন সহচরীর দেহরক্ষী সৈনিকদের সঙ্গে সাধারণ সৈনিকদের সুযোগ-সুবিধা ও বেতনের প্রভূত বৈষম্যের জন্য।’

রাজপার্ষদের এ কথা শুনে মহামন্ত্রী বললেন, ‘আমার অঙ্গরক্ষক সৈন্যদের মধ্যে একজন একবার আকার ইঙ্গিতে তাদের এই ক্ষোভের কথা জানিয়েছিল আমাকে। তাঞ্জিনদের যদি আমরা আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারতাম তবে আমাদের কাজটা এত কঠিন হত না। তাদের নিয়ে অস্ত্রের সাহায্যে আমরা সিংহাসনচ্যুত করতে পারতাম প্রজাপীড়ক কাশ্মীর রাজকে। কিন্তু সমস্যা হল সৈনিকরা তাদের সর্বাধিনায়কের নির্দেশ পালন করে চলে। এটাই তাদের রীতি ও কর্মপদ্ধতি। কাজেই ক্ষোভ থাকলেও তারা কম্পনধিপতির নির্দেশ মতোই পরিচালিত হবে।।

যশঙ্করের কথা শুনে সভাসদ অভিমন্যু বললেন, ‘হ্যাঁ, একই কথা কৃষিমন্ত্রীও আমাকে বললেন।’

মহামন্ত্রী আর অপর সভাসদদের কথা শুনে উচ্ছল বুঝতে পারল মহামন্ত্রী যশঙ্করের পরিকল্পনার সঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বিদুরও যুক্ত। হয়তো বা তিনিও উপস্থিত ছিলেন চন্দ্র পর্বতের সভাতে।

পার্ষদ এরপর মহামন্ত্রীকে বললেন, ‘আপনাকে যা জানাতে এসেছি তা হল গতকাল রাজসভা সাঙ্গ হওয়ার পর সভাগৃহের অলিন্দে আমি হঠাৎ রতিমালার মুখোমুখি হয়ে যাই। সে আমাকে বলল, সে নাকি রাজ নির্দেশ জানাবার জন্য আমারই অনুসন্ধান করছিল। সেই নির্দেশ হল, এ বৎসর আমাকে গত বৎসরের তুলনায় দ্বিগুণ রাজস্ব আদায় করে দিতে হবে। কারণ, পুষ্প পর্বতে মহারাজের বসন্ত প্রাসাদ নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। সে এ কথাও আমাকে জানিয়ে গেছে যে যদি আমি মহারাজের নির্দেশ মতো কর্তব্য সম্পাদন না করতে পারি তবে ভবিষ্যতে আমাকে এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। অর্থাৎ পদচ্যুত করা হবে! আমি কীভাবে দ্বিগুণ শুল্ক আহরণ করব বলুন? তবে তো আমাকে বণিকদের যাবতীয় সম্পদ লুণ্ঠন করতে হয়!’

তার এ কথা শুনে মহামন্ত্রী আক্ষেপের স্বরে বললেন, ‘আমাদের চারপাশে সর্বত্রই প্রগাঢ় অন্ধকার নেমে আসছে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া, আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িক করতে চেষ্টা করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই আমাদের সামনে।’

এ কথা বলার পর তিনি উচ্ছলকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার কী বলার আছে বলুন?’

উচ্ছল তার প্রশ্ন শুনে প্রথমে ভাঁড় কূপমণ্ডূকের আচরণ ব্যক্ত করল তার কাছে। মহামন্ত্রী তা শুনে বললেন, ‘ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত তো। আপনার প্রতি তার আচরণের হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন? সে তার গৃহে আপনাকে আমন্ত্রণ না জানালেও আপনি একবার তার গৃহে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে আজই একবার যান। কারণ, সে হল মহারাজের সম্পর্কে গোপন তথ্য সংগ্রহের মাধ্যম।’

উচ্ছল বলল, ‘আমি আজই গৃহে ফেরার পথে কূপমণ্ডূকের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করব।’

কিন্তু এরপর সে সভাসদ অভিমন্যু উপস্থিত থাকার কারণে নিজের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ সম্পর্কে মহামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে একটু ইতস্তত বোধ করতে লাগল। কিন্তু সমস্যার সমাধান কিছু সময়ের মধ্যেই হয়ে গেল। মহামন্ত্রীকে যা সংবাদ দেওয়ার তা জানানো সমাপ্ত হয়ে গেছিল পার্ষদ অভিমন্যুর। মহামন্ত্রীর সঙ্গে আর সামান্য কিছু বাক্যালাপের পর অভিমন্যু বললেন, ‘এবার আমাকে যাওয়ার আজ্ঞা দিন, নচেৎ মহারাজের চরদের সন্দেহের উদ্রেক ঘটতে পারে।’

যশঙ্কর বললেন, ‘হ্যাঁ, যান। তবে প্রয়োজনে আপনারা দু’জন পরস্পরের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে চলবেন।’

উচ্ছল আর অভিমন্যু সম্মতিসূচক ভাবে মাথা নাড়ল মহামন্ত্রীর কথাতে। রাজ পার্ষদ অভিমন্যু কক্ষ ত্যাগ করার পর একটু ইতস্তত করে শেষ পর্যন্ত মহামন্ত্রীর কাছে তাঁর ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ উত্থাপন করল উচ্ছল। সে বলল, ‘একটি ব্যক্তিগত বিষয়ে আমি আপনার পরামর্শ চাইছি। বিষয়টি নারী সংক্রান্ত...।’

সকলে জানে যে এই একটি বিষয় থেকে নিজেকে সবসময় দূরে সরিয়ে রাখে উচ্ছল। মহামন্ত্রীও একথা জানেন। তাই উচ্ছলের কথা শুনে বিস্মিতভাবে তিনি বললেন, ‘আপনি আর নারী সংক্রান্ত ব্যাপার! কে সেই নারী?’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, এক অজ্ঞাত পরিচয় সুন্দরী যুবতী নারী। কিছুকাল হল আমি তাকে আমার গৃহে আশ্রয় দিয়েছি।’

এ কথা বলার পর উচ্ছল মহামন্ত্রীর কাছে ব্যক্ত করল পালেবত সম্পর্কে সব কথা। এমনকী গতদিনের ভয়ঙ্কর ঘটনাতে পালেবতের ভূমিকা পর্যন্ত।

মন দিয়ে তার কথা শোনার পর মহামন্ত্রী বললেন, ‘বড় আশ্চর্য ঘটনা। তাকে উদ্ধার করার পর আপনি যদি তাকে আশ্রয় না দিতেন তবে সে এতদিনে নিশ্চিত কোনো পুরুষের ভোগ লালসার শিকার হতো। নারী সংগ্রহের জন্যে তো ওই তিন বেশ্যার অনুগত লোকেরা চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। হয়তো বা সুন্দরী যুবতী দেখে তারা তাকে পৌঁছে দিত স্বর্ণ সেবিকাদের বাসস্থানে অথবা কোনো বেশ্যা গৃহে। মানবিক কাজ করেছেন আপনি।’

উচ্ছল বলল, ‘কিন্তু পালেবত সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় বলুন তো? আমার গৃহে তার উপস্থিতির কথা ধীরে ধীরে সবার কাছে নিশ্চয়ই ছড়িয়ে পড়বে। সবাই ভাবতে শুরু করবে যে পালেবত আমার রক্ষিতা বা শয্যা সঙ্গিনী। সে বড় বিড়ম্বনার ব্যাপার হবে আমার কাছে।’

মহামন্ত্রী বললেন, ‘আপনি যদি এখন তাকে গৃহ থেকে বিতাড়িত করেন তবে সে কোনো নিরাপদ বাসস্থান খুঁজে পাবে বলে মনে হয় না। তার বিপদ নেমে আসবে। আপনি আমাকে ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাববার সময় দিন।’

এ কথা বলে একটু চুপ করে থেকে বহুদর্শী মহামন্ত্রী মৃদু হেসে বললেন, ‘আপনাকে একটা কথা বলি। যে নারী এমন ভাবে অন্যের জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে, এমন নারীই যে কোনো পুরুষের জীবনে কাম্য। ব্যাপারটা আপনি ভেবে দেখতে পারেন। নারীর রূপ, অর্থ এসবের তুলনায় তার বিশ্বস্ততা, বিপদে পাশে থাকার অঙ্গীকার একজন পুরুষের অধিক প্রয়োজন।’

প্রাজ্ঞ মহামন্ত্রী যশঙ্কর কথাগুলো কৌতুকের ছলে বললেন কিনা তা ঠিক বুঝতে পারল না উচ্ছল। তবে তাঁর কথা শুনে মৃদু লজ্জাবোধ করল সে। মহামন্ত্রীকে যা সে জানাতে এসেছিল তা জানানো হয়ে গেছে। তাছাড়া বেশ অনেকটা সময় সে অতিবাহিত করছে তার সঙ্গে। গুপ্তচরদের সন্দেহের উদ্রেক ঘটানো কাঙ্ক্ষিত নয়। তাই সে এরপর বিদায় নেওয়ার জন্য আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বিদায় মুহূর্তে যশঙ্কর তাকে বললেন, ‘মহারাজ তো দল হ্রদে কিছু দিনের মধ্যেই আপনার প্রতিবেশী হতে যাচ্ছেন। একটু সজাগ থাকবেন।’

উচ্ছল হেসে জবাব দিল, ‘পিঙ্গলচক্ষু যদি সরোবরে অবস্থান করে তবে মৎস্যকুলকে তো সজাগ থাকতেই হবে। খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক যে।’

মহামন্ত্রীর কার্যালয় ত্যাগ করে উচ্ছল অশ্বপৃষ্ঠে রওনা হয়ে গেল তার গন্তব্যের দিকে। সে দল হ্রদের দিকে এগোল ঠিকই, কিন্তু তা ভাঁড় কূপমণ্ডূকের গৃহের পথ ধরে।

কিছু সময়ের মধ্যেই সে পৌঁছে গেল কূপমণ্ডূকের গৃহের সামনে। নির্জন দ্বিপ্রহর। চারপাশটা এদিন যেন কেমন থমথমে বলে মনে হল তার। কোথাও কোনো পাখির স্বর পর্যন্ত নেই। গৃহের সামনের পথ থেকেই কূপমণ্ডূকের গৃহের পশ্চাদ্ভাগে অশ্ব রাখার স্থানের কিয়দংশ দেখা যায়। উচ্ছল দেখতে পেল, সেখানে কূপমণ্ডূকের অশ্ব দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ কূপমণ্ডূক তার গৃহেই অবস্থান করছে। উচ্ছল তার গৃহের সামনে ঘোড়া থেকে নেমে আঘাত করল তার বন্ধ কপাটে।

বেশ কয়েকবার শব্দ করার পর দ্বার উন্মোচিত হল। তা উন্মোচন করল স্বয়ং কূপমণ্ডূকই। তার পরনে গৃহের পোশাক। উচ্ছলের তাকে দেখে মনে হল সে নিদ্রা যাচ্ছিল। উচ্ছলকে দেখে মৃদু বিস্ময়ের স্বরে সে বলল, ‘আপনি!’

উচ্ছল বলল, ‘হ্যাঁ। জানেনই তো আজ মহারাজ সভায় আসেননি। আমার কাজ-কর্মও আজ বিশেষ কিছু ছিল না। তাই ভাবলাম গৃহে ফেরার পথে একবার আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যাই।’

উচ্ছলের কথা শুনে হাসল কূপমণ্ডূক। কিন্তু তার হাসিটা যেন আজ কৃত্রিম মনে হল উচ্ছলের।

কূপমণ্ডূক বলল, ‘আপনি যে আমার কথা স্মরণে রাখেন তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’

উচ্ছল ভেবেছিল কূপমণ্ডূক তারপর তাকে গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার জন্য আহ্বান জানাবেন। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর কূপমণ্ডূক এরপর বলল, ‘আমি বড় লজ্জিত আমাকে এখনই বিশেষ প্রয়োজন হেতু রাজপ্রাসাদের দিকে যেতে হবে। আর রূপবতী ক’দিন ধরে অসুস্থ বোধ করছে। সে নিদ্রা যাচ্ছে।’

কূপমণ্ডূকের কথা শুনে উচ্ছল স্পষ্ট বুঝতে পারল, কূপমণ্ডূকের এ সময় অতিথি সৎকারের কোনো বাসনা নেই। অথবা সে তার গৃহে উচ্ছলের উপস্থিতি আর চাইছে না। কাজেই উচ্ছল তাকে বলল, ‘না, না, আপনার বিব্রত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সর্বাগ্রে রাজকার্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। আপনার কন্যার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। পরে কোনোদিন আবার আসব।’

উচ্ছলের কথার কোনো জবাব না দিয়ে আবার যেন তার মুখমণ্ডলে কৃত্তিম হাসি ফুটিয়ে তুলল কূপমণ্ডূক। তারপর দ্বার বন্ধ করে দিল সে। উচ্ছলও উঠে বসল তার অশ্বপৃষ্ঠে। কূপমণ্ডূকের আচরণে উচ্ছল অনুমান করল, যে কোনো কারণেই হোক সে আর উচ্ছলের সংশ্রব পছন্দ করছে না। হঠাৎ তার এ হেন মত পরিবর্তনের পিছনে কী কারণ থাকতে পারে তা ভাবতে ভাবতে দল হ্রদের দিকে এগিয়ে চলল।

উচ্ছল যখন তার জলগৃহতে প্রবেশ করল তখন জলগৃহের অলিন্দে পালেবত বা গুঞ্জা কারোরই দর্শন পেল না। সে অনুমান করল তারা নিদ্রামগ্ন আছে। নিজের কক্ষে প্রবেশ করে পোশাক পরিবর্তন করার পর পালঙ্কে উপবেশন করল সে। অপরাহ্ন শেষ হতে তখনও বেশ কিছুটা সময় বাকি আছে।

এ সময়টা কিছুটা নির্জন হয়ে পড়ে দল হ্রদ। শিকারা চলাচল, কোলাহল কিছুটা কম থাকে। শিকারা বাহকরা এ সময় খাদ্য গ্রহণ করে, কেউ বা বিশ্রাম নেয়। তাদের কর্ম চাঞ্চল্য আবার শুরু হয় বিকাল হলে। কারণ তখন অনেকে হ্রদের বুকে ভ্রমণ করে, কেউ বা দিন শেষে জনগৃহে ফেরে। তাদের আনয়ন করে শিকারা বাহক, বাহিকারা।

তমোরি দিয়ে দল হ্রদের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই কেন জানি উচ্ছলের আবার মনে পড়ল সকালের সেই দৃশ্যের কথা—নিদ্রায় পালেবতের সুন্দর মুখমণ্ডল, তার উদ্ধত বক্ষ! সে দৃশ্য উচ্ছল-যতবার মন থেকে সরাবার চেষ্টা করতে লাগল ততবারই কোনো অজ্ঞাত কারণে সে দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল তার চোখের সামনে। এগিয়ে চলল সময়। বিকাল হল এক সময়। গুঞ্জা বৈকালিক আহার নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল। তা গ্রহণ করল উচ্ছল। আরও বেশ কিছুক্ষণ নিজ কক্ষেই অবস্থান করার পর বাইরে অলিন্দে এসে দাঁড়াল।

বেলা শেষের আলো ছড়িয়ে পড়েছে দল হ্রদের বুকে। শিকারা নৌকাগুলো আবার চলাচল শুরু করেছে। রাজহংসের ঝাঁক দিন শেষে, শেষবারের মতো চক্রাকারে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করেছে হ্রদকে। এ পর্বত থেকে সে পর্বতে দিন শেষে ফিরে যাচ্ছে কলরবরত পাখির ঝাঁক। এমনকী কঠিন, নিষ্প্রাণ খার্খদ পর্বতকেও যেন কোমল মনে হচ্ছে বেলা শেষের আলোতে।

চারপাশে তাকিয়ে দেখতে দেখতে উচ্ছল মনে মনে বলল, ‘এই হ্রদ! এই উপত্যকা! এই পাহাড়! আমাদের দেশটা বড় সুন্দর! কিন্তু এই পরই একটা দৃশ্য দেখে উচ্ছলের সব মুগ্ধতা কেটে গেল। সে দেখতে পেল বিশাল আকৃতির, কারুকাজমণ্ডিত এক প্রমোদ তরী ভেসে চলেছে হ্রদের বুকে। আর তাকে ঘিরে চলেছে সৈন্যবাহী বেশ কয়েকটা শিকারা নৌকা। রেশমের পর্দা আচ্ছাদিত প্রমোদ তরীর ভিতর দূর থেকে কাউকে না দেখা গেলেও সে তরণী যে বেশ্যা বিটপীর তা বুঝতে অসুবিধা হল না উচ্ছলের। সম্ভবত বিটপী বৈকালিক ভ্রমণ সেরে মহারাজের জলপ্রাসাদের দিকে ফিরছে। উচ্ছলের মনে পড়ে গেল মহামন্ত্রীর মুখে সদ্য শোনা কথাটা। মহারাজ ললিতাপীড়ের অবর্তমানে বিটপী ও অন্য দুই বেশ্যা রাজসভা পরিচালনা করবে। এ কথা ভাবতেই যেন উচ্ছলের মনে বিবমিষা জাগ্রত হল। মুহূর্তের মধ্যে তার মন থেকে মুছে গেল চারপাশের সৌন্দর্য। সে ভাবতে লাগল এই রাক্ষসীদের থেকে কি কোনোদিন মুক্ত হবে না এ দেশ?

বিটপীর প্রমোদ তরী এক সময় অদৃশ্য হয়ে গেল মহারাজের জলপ্রাসাদ অভিমুখে। আর এরপরই পিছনে পদশব্দ শুনে উচ্ছল ফিরে তাকিয়ে দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে পালেবত!

উচ্ছল পালেবতের দিকে ফিরে তাকাতেই সে হাত জোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল তার আশ্রয়দাতাকে।

পালেবতের মাথায় এখনও বস্ত্রখণ্ড বাঁধা। উচ্ছল তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি এখন কেমন বোধ করছ?’

পালেবত জবাব দিল, ‘সুস্থ হয়ে উঠছি।’

এ কথা বলার পর মৃদু চুপ করে থেকে সে বলল, ‘আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। গুঞ্জা মাতাকে না জানিয়ে আমার এ গৃহ ত্যাগ করা উচিত হয়নি।’

উচ্ছল বলল, ‘তা হয়নি ঠিকই। তবে আমার জীবন রক্ষার্থে তুমি যা করেছ তাতে আমি অত্যন্ত বিস্মিত। ওভাবে নিজের জীবন বিপন্ন করতে তোমার ভয় করল না?’

পালেবত উত্তর দিল, ‘না, করেনি। আমরা শিকারা থেকে মাটিতে নামতেই দেখলাম ভূমি কাঁপছে, প্রস্তর খণ্ড নেমে আসছে ওপর থেকে। প্রাণ বাঁচাবার জন্য লোকজন পলায়ন করছে। আমরাও আবার শিকারাতে উঠে পলায়ন করতে যাচ্ছিলাম। ঠিক সেই সময় আপনাকে দেখলাম। আর তারপর...।’ উচ্ছল বলল, ‘যদি পাথরের আঘাতে তোমার মৃত্যু ঘটত?’

পালেবত জবাব দিল, ‘আমার মৃত্যু তো অনেকদিন আগেই ঘটার কথা ছিল যদি না আপনি আমাকে পুষ্প পর্বত থেকে উদ্ধার করতেন। আপনি আমার জীবন দাতা। তাই নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও আপনার জীবনরক্ষার চেষ্টা করা আমার কর্তব্য। আমি সে কাজ করারই চেষ্টা করেছিলাম।’ এ কথা বলে থেমে গেল সে।

বিকালের রাঙা আলো এসে পড়েছে পালেবতের মুখে। শান্ত, স্নিগ্ধ, সৌন্দর্যমণ্ডিত সেই মুখমণ্ডল। উচ্ছল বেশ কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল পালেবতের মুখের দিকে। তারপর বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি এভাবে এ স্থানে বান্ধবহীন অবস্থায় একলা দিন যাপন করতে ভালো লাগে না, সেটাই স্বাভাবিক। আমি বাঁদরী নামের ওই শিকারা বাহিকাকে বলেছি যে তোমাকে প্রয়োজনে দল হ্রদ ভ্রমণ করাবে।’

এ কথা শুনে পালেবতের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল। চোখে জেগে উঠল উচ্ছলের প্রতি কৃতজ্ঞতা ভাব। আরও সুন্দর হয়ে উঠল তার মুখমণ্ডল। উচ্ছল এরপর মৃদু হেসে তার উদ্দেশে বলল, ‘যে কারণেই হোক তুমি নিজের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে আমার প্রাণ রক্ষায় সচেষ্ট হয়েছিলে। সেজন্য তোমাকে আমি পুরস্কৃত করতে চাই। তুমি কি চাও বলো?’

পালেবত একটু চুপ করে থেকে ভেবে নিয়ে বলল, ‘আপনাদের এ নগরী বড় সুন্দর। কিন্তু আমি শারিকা পর্বত আর এই দল হ্রদ ছাড়া কিছুই দেখিনি। শুনেছি স্থলভাগের নগরীও খুব সুন্দর। সে স্থানে শুনেছি সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ, মন্দির আছে। আপনি তো নিত্যদিন সে স্থানে যান। একদিন আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন? আমি রাজপ্রাসাদ দেখতে চাই, রাজসভা দেখতে চাই, রাজাকে দেখতে চাই।

পালেবতের আকাঙ্ক্ষা কথা শুনে মনে মনে চমকে উঠল উচ্ছল। তার ইচ্ছা হল যে তাকে বলে, ‘তোমার এ ইচ্ছা পূরণের অর্থ হল ভয়ঙ্কর বিপদকে আমন্ত্রণ করা। আমাদের রাজা একজন মানুষরূপী নারী মাংসভোজী দানব। তোমার মতো কোনো সুন্দরী নারীকে তিনি দেখলে তোমার সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা।’

কিন্তু সঙ্গত কারণেই এখন এ কথা পালেবতকে যে উচিত বলে মনে করল না। কথাটা এড়িয়ে গিয়ে পালেবতকে সে বলল, ‘তুমি আগে পরিপূর্ণ রূপে সুস্থ হয়ে ওঠো, তারপর এ নিয়ে একদিন তোমার সঙ্গে বাক্যালাপ করব। এবার তুমি বিশ্রাম নাও। যতদিন না তোমার মাথার ক্ষত সম্পূর্ণ রূপে নিরাময় হচ্ছে তদিন তোমার যথা সম্ভব বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন।’

উচ্ছলের কথা শুনে আবারও তাকে প্রণাম জানিয়ে ধীর পায়ে নিজের কক্ষের দিকে ফিরে গেল পালেবত। আর উচ্ছলও কিছু সময় সে স্থানে দাঁড়িয়ে থাকার পর নিজের কক্ষে ফিরে গেল। এগিয়ে চলল সময়। পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ডুবে গেল। রাত্রি নামল দল হ্রদের বুকে। নির্দিষ্ট সময় নৈশাহার দিয়ে গেল গুঞ্জা। আহার সম্পন্ন করে পালঙ্কে শয্যা গ্রহণ করল উচ্ছল। কিন্তু এরপর হঠাৎ তার চোখে ফুটে উঠল সেই দৃশ্য—নিদ্রামগ্ন পালেবতের ছবি। তার স্নিগ্ধ মুখমণ্ডল, শরীরে জেগে থাকা উদ্ধত যৌবনের চিহ্ন। পালেবতের কথা ভাবতে ভাবতেই এক সময় নিদ্রামগ্ন হল উচ্ছল।

১৫

সেই ভূকম্পনের পর বেশ কয়েকটা দিবস অতিবাহিত হয়ে গেছে। আঘাতের অভিঘাত কাটিয়ে পালেবত সুস্থ হয়ে উঠেছে। মাঝের এ কয়েকটা দিন তার সঙ্গে নিয়মিত ভাবেই সাক্ষাৎ করতে এসেছে বাঁদরী। সাধারণত সে দ্বিপ্রহরে বা অপরাহ্নে আসে। সে সময়টা তার অবসর। দল হ্রদে শিকারার যাত্রী মেলে না। এদিনও সে এল। পালেবত এদিন তার মাথার বন্ধনটা সরিয়ে ফেলেছে তার আর প্রয়োজন নেই বলে। ক্ষতস্থানে ব্যথা-বেদনা যা ছিল তা সবই অন্তর্হিত হয়েছে। বাঁদরী তার ক্ষতস্থানটা পরীক্ষা করে নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, ‘ঘা, সম্পূর্ণরূপে শুকিয়ে গেছে। আর তোমার চিন্তার কোনো কারণ নেই।’

এরপর কিছুক্ষণ তারা বাক্যালাপ করার পর বাঁদরী তাকে বলল, আজ আমার বিশেষ ব্যস্ততা নেই। চলো তোমাকে হ্রদে ভ্রমণ করিয়ে আনি? কত নতুন নতুন ফুল ফুটেছে হ্রদে!’

বাঁদরীর কথা শুনে পালেবত সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘আমারও যে ইচ্ছা করছে। চলো তবে।’

এ গৃহের অধিকারী তাদের ভ্রমণের অনুমতি দিয়ে রেখেছেন। উচ্ছলের নির্দেশ পালন করে গুঞ্জাকে জানিয়ে তারা দুজন ভেসে পড়ল শিকারা নিয়ে।

পালবতকে নিয়ে বাঁদরী প্রথমে এগোল হ্রদের কিনারে। তারপর হ্রদের পাড় ঘেঁষে শিকারা বেয়ে চলতে থাকল। সত্যিই কত নতুন রকম ফুল ফুটেছে হ্রদের কিনারের জ্বলে! হরিদ্রাভ, রক্তিম, আকাশের মতো নীল, তুষারের মতো ধবল, কত রকমের বাহার তাদের! বসন্ত যেন উজাড় করে ঢেলে দিতে চলেছে তার।

হঠাৎই তারা দেখতে পেল এক শিকারাবাহিকা নারীকে। তাদের শিকারার পাশ বেয়েই নৌকা বাইছিল। সে সম্ভবত পাড়ের কোনো স্থানে যাওয়ার জন্য। তার শরীরের স্বর্ণালঙ্কার সূর্যের আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে। তবে তার মুখমণ্ডলে আভিজাত্যের তেমন ছাপ নেই। তাকে দেখে বাঁদরী জানতে চাইল, ‘কোথায় যাচ্ছ তুমি?’

সে নারী জবাব দিল, ‘রাজপ্রাসাদে যাচ্ছি, দেবী বিটপীর বার্তা বহন করে।’

জবাব দিয়ে সে এগিয়ে যাওয়ার পর পালেবত বাঁদরীকে প্রশ্ন করল, ‘কে ও?’

বাঁদরী জবাব দিল, ‘ওর নাম হংসী। দেবী বিটপীর একজন বিশ্বস্ত ভৃত্যা। ওই জলপ্রাসাদেই দেবী বিটপীর সঙ্গে থাকে।’

পালেবত বলল, ‘এর আগেও এমন স্বর্ণালঙ্কার ভূষিতা ভৃত্যাকে দেখেছিলাম। তোমাদের মহারাজ আর তার প্রধান সেবিকারা দানশীল, তাই না? নচেৎ তাদের দাসীরা এমন স্বর্ণমণ্ডিত থাকে?’

তার এ প্রশ্ন শুনে বাঁদরী হেসে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, তা বলতে পারো।’

পালেবত এবার বাঁদরীকে প্রশ্ন করল, ‘মহারাজের নাম কী?’

বাঁদবী বলল, ‘যে দেশে আছ সে দেশের মহারাজের নাম জানো না! তাঁর নাম মহারাজ ললিতাপীড়।’

জলের দিকে চেয়ে বসে রইল পালেবত। বাঁদরী চাপ্পা বাইতে লাগল। এক সময় বাঁদরী তাকে প্রশ্ন করল, ‘পার্ষদ উচ্ছলের কাছ থেকে ইতিপূর্বে তুমি মহারাজের কথা কোনোদিন শোননি?’

পালেবত বলল, ‘না, তার সঙ্গে আমার মহারাজের প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। অন্য কোনো বিষয় নিয়েও তেমন বাক্যালাপ বিশেষ হয় না। তবে কদিন আগে তিনি আমাকে পুরস্কার দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আমি তাঁর জীবন রক্ষার চেষ্টা করেছিলাম বলে। সেই সুযোগে আমি তাকে জানিয়েছি যে আমি মহারাজ, তার সভাগৃহ, রাজপ্রাসাদ দেখতে চাই।’

বাঁদরী বলল, ‘তিনি দেখাবেন বলেছেন?’

পালেবত জবাব দিল, ‘তিনি ‘‘হ্যাঁ’’ বা ‘‘না’’ কোনো কিছুই জানাননি। বলেছেন, আমি সুস্থ হলে তিনি এ প্রসঙ্গে আলোচনা করবেন।’ একথা বলে আবার চুপ করে জলের দিকে চেয়ে রইল পালেবত। বাঁদরীর তাকে দেখে মনে হল সে যেন কিছু একটা ভাবছে। বিকাল হতে চলেছে। বাঁদরী একসময় তাকে বলল, ‘আমি তোমাকে রাজপ্রাসাদ দেখাতে না পারলেও চলো মহারাজের জলপ্রাসাদটা একবার দেখিয়ে আনি? মহারাজ আসবেন বলে জলপ্রাসাদ একেবারে ঝলমল করছে!’

এ কথা শুনেই পালেবত উৎসাহভরে বলল, ‘হ্যাঁ, চলো আমরা সেখানে যাই।’

বাঁদরী শিকারার মুখ ফিরিয়ে রওনা হল সেদিকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঁদরীর নৌকা পৌঁছে গেল মহারাজের জলপ্রাসাদের কাছাকাছি। কিছুটা তফাত থেকেই পালেবত বুঝতে পারল নতুন রঙের প্রলেপ লাগিয়ে আরও উজ্জ্বল করে তোলা হয়েছে মহারাজের এই প্রমোদ প্রাসাদকে। বিকালের আলোতে সোনার মতো ঝলমল করছে সোনালি রঙ আর রজনের প্রলেপ দেওয়া প্রাসাদ গাত্র।

বাঁদরী বলল, ‘আমি এরমধ্যে একদিন এসেছিলাম দেবী বিটপীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। মহারাজ যখন এ প্রাসাদে থাকবেন তখন আমাকে প্রত্যহ একবার করে এ স্থানে আসতে হবে। তিনি এখানে উপস্থিত থাকলে তার সেবার জন্য বহু সংখ্যক ছোট-বড় জলযান এখানে অবস্থান করে। মহারাজের কখন কী ইচ্ছা জাগে বলা তো যায় না। তাই দেবী বিটপী আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন মহারাজের অবস্থানকালে প্রত্যহ একবার এ স্থানে উপস্থিত হতে।’

মহারাজের প্রমোদ প্রাসাদের আরও কাছে উপস্থিত হতেই তার গায়ে ঘিরে থাকা জলযানগুলোর মধ্যে একটি সুদৃশ্য বৃহৎ আকৃতির তরণী দেখতে পেল পালেবত। সে তরণীর কক্ষগুলির তমোরিগুলিও মখমলের আচ্ছাদনে ঢাকা। তার কাছাকাছি পৌঁছতেই একটা মিষ্টি সুবাস পালেবতের নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করল। সেই সুগন্ধ গ্রহণ করার জন্য জোরে জোরে বেশ কয়েকবার শ্বাস নিল পালেবত।

বাঁদরী সেই তরণীটা দেখিয়ে বলল, ‘ও তরণী চন্দনকাঠ নির্মিত। ওই প্রমোদ তরী থেকেই বাতাসে সুগন্ধ ছড়াচ্ছে।’

পালেবত কথাটা শুনে বিস্মিতভাবে বলল, ‘এ তরণী নিশ্চয়ই মহারাজের?’

বাঁদবী বলল, ‘হ্যাঁ, তাঁরই বলা যায়। তবে এই প্রমোদ তরী তিনি উপহার দিয়েছেন দেবী বিটপীকে। মহারাজ যখন জলপ্রাসাদে অবস্থান করেন তখন কোনো কোনো সময় চাঁদনীরাতে মহারাজের দল হ্রদ ভ্রমণের ইচ্ছা জাগে। তখন তিনি এই তরীতেই দল হ্রদে জল ভ্রমণ করেন তার সঙ্গিনীদের নিয়ে।’

কথাটা জেনে পালেবত আরও উৎসাহবোধ করে বলল, ‘সম্ভব হলে তুমি আমাকে ওর আরও কাছে নিয়ে চলো। ভালো করে দেখি।’

পালেবতের ইচ্ছা পূরণের জন্য চন্দনকাঠ নির্মিত সেই তরণীর আরও কাছে পৌঁছে গেল বাঁদরীর শিকারা। দেবী বিটপীর সেই জলযানের
দু-পাশে প্রহরারত সৈনিকদের আরও দুটি শিকারা নৌকা ছিল। বাঁদরী তাঁদের পরিচিত বলে অথবা শিকারার আরোহী দুজন নারী বলে তারা তাঁদের বাধা দিল না। বাঁদরীর শিকারা পৌঁছে গেল সেই প্রমোদ তরীর একদম গায়ে।

চন্দনকাঠ নির্মিত এ প্রমোদ তরী পক্ষী গোত্রের। অর্থাৎ পক্ষীর মতো গড়ন। সম্মুখ ভাগে পক্ষীর মতো মাথা ও পশ্চাদ্ভাগে লেজের মতো অংশ আছে। তটিনীর মাথার ছাদের দু-পাশের কার্নিশ, তমোরির মাথার ওপরের আচ্ছাদন, চারপাশের ঘেরা, সবই কাঠের সূক্ষ্ম কারুকাজমণ্ডিত। পালেবত দেখতে লাগল সে-সব কিছু।

ঠিক এমন সময় হঠাৎ সেই প্রমোদ তরীর পর্দা সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল দুজন দাসী। তারা দুজনও স্বর্ণালঙ্কার ভূষিতা। আর তারপর তাদের পিছনে প্রকাশ করল স্বয়ং দেবী বিটপী! প্রমোদ তরীর ঘেরার সামনে এসে দাঁড়াল দেবী বিটপী।

সূর্যের আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে তার হীরকখচিত নথ, বহুমূল্য কণ্ঠহার, স্বর্ণাঙ্গুরীয়গুলো। তবে কেউ যদি খুব ভালো করে তার মুখমণ্ডলের দিকে তাকায় তবে সে বুঝতে পারবে এ নারীর অঞ্জন লেপিত চোখ ও তাম্বুল রঞ্জিত ওষ্ঠাধারের কোণে কোথাও যেন একটা ধূর্ত ভাব লুকিয়ে আছে। যদিও তার দিকে অমনভাবে তাকিয়ে থাকার লোক এ নগরীতে তেমন কেউ নেই। তার সামনে দাঁড়িয়ে সকলে মাথা নত করেই কথা বলে, এমনকী রাজ পার্ষদরা পর্যন্ত সমীহ করে চলে তাকে।

দেবী বিটপী যে প্রমোদ গৃহের পরিবর্তে কোনো কর্ম উপলক্ষ্যে তার প্রমোদ তরণীতে অবস্থান করছিল তা জানা ছিল না। বিটপী ঘেরার ধারে দাঁড়াতেই দেখতে পেল কিছুটা তফাতে শিকারাতে বসা বাঁদরী আর পালেবতকে। তাকে দেখামাত্রই বাঁদরী চাপ্পা থামিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে জোড় হাত করে মাথা ঝুঁকিয়ে দেবীকে প্রণাম জানাল। তার দেখাদেখি পালেবতও একই কাজ করল। স্বৈরিণী নারী স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ পালেবতের দিকে তাকিয়ে থাকার পর বাঁদরীর উদ্দেশে প্রশ্ন করল, ‘তোর শিকারাতে গতদিন এই মেয়েটিকেই দেখেছিলাম না?’

বাঁদরী জবাব দিল, ‘আজ্ঞে, এ সেই।’

জবাব শুনে দেবী বিটপী এরপর পালেবতকে প্রশ্ন করল, ‘তোর নাম কী? কোথায় থাকিস?’ সে জবাব দিল, ‘আমার নাম পালেবত। এই হ্রদেই থাকি।’

তার দিকে আবার প্রশ্ন ছুটে এল, ‘তুই কী কাজ করিস?’

এ প্রশ্নের জবাবে কী উত্তর দেবে তা বুঝতে পারল না পালেবত।

বিটপী আবার প্রশ্ন করল, ‘চুপ করে আছিস কেন? জবাব দে?’

বাঁদরী এবার তাড়াতাড়ি বলল, ‘এখানে এক জলগৃহতে ওর মায়ের সহোদরা পরিচারিকার কাজ করে। দূর গ্রাম থেকে তার কাছেই এসেছে ও।’

বাঁদরীর কাছে পালেবতের পরিচয় শুনে আবারও কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বিটপী। তারপর সে পালেবতের উদ্দেশে বলল, ‘মহারাজ যখন এখানে অবস্থান করবেন তখন আরও কিছু দাসীর প্রয়োজন হতে পারে আমার। তুই কাজ করবি?’

আচম্বিতে এই প্রস্তাব শুনে চুপ করে রইল পালেবত। এবারও তার হয়ে বাঁদরী বলে উঠল, ‘তখন যদি ও এ স্থানে থাকে তবে নিশ্চয়ই মহারাজের সেবায় নিয়োজিত হবে। এ তো পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার।’

দেবী বিটপী বলল, ‘হ্যাঁ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে মহারাজের সেবায় নিয়োজিত হলে শুধু যে অর্থপ্রাপ্তি হবে তাই নয়, পুণ্যও সঞ্চয় হয়।’

এ কথা বলার পর বিটপী বাঁদরীর উদ্দেশে বলল, ‘তোকে কিন্তু প্রত্যহ সে সময় উপস্থিত থাকতে হবে। মনে আছে তো? মহারাজ যখন এ স্থানে আসবে তখন তাঁর অঙ্গরক্ষকরা জলপ্রাসাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে। তোকে আমি একটা রৌপ্য পাঞ্জা দেব। সে পাঞ্জা ভিন্ন কোনো শিকারাকে তারা জলপ্রাসাদের কাছে আসতে দেবে না, কোনো নৌকার আরোহীকে জলযানে উঠতে দেবে না। তুই সে পাঞ্জা এসে আমার থেকে নিয়ে যাস।’

দেবী বিটপী এরপর হাতের ইশারাতে তার চোখের সামনে থেকে সরে যেতে বলল বাঁদরীকে।

আবারও তাকে প্রণাম জানিয়ে শিকারাতে বসে চাপ্পা বাইতে শুরু করল বাঁদরী। পালেবতের মনে হল তাদের শিকারাটা যতক্ষণ না বিটপীর দৃষ্টি পথের বাইরে চলে গেল ততক্ষণ পর্যন্ত যেন কাষ্ঠ নির্মিত ঘেরার সামনে দাঁড়িয়ে তার দিকেই তাকিয়ে রইল দেবী বিটপী।

সেই চন্দন নির্মিত প্রমোদ তরী থেকে বেশ কিছুটা দূরে সরে আসার পর বাঁদরী পালেবতকে বলল, ‘আমি যে বিটপী দেবীকে বললাম তুমি তার কাজে যোগ দেবে, এ নিয়ে কিছু মনে কোরো না। তুমি কাজে যোগ দাও বা না দাও কথাটা আপাতত ওকে বলার দরকার ছিল। কারণ, তোমাকে ওর এ প্রশ্ন আসলে নির্দেশই বলা চলে। তুমি ওর মুখের ওপর কাজ করবে না জানালে দেবী বিটপী ক্রুদ্ধ হতে পারত। সেটা কাম্য নয়। তাই তুমি দেবীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই আমি বললাম, তুমি কাজ করবে। সে যদি তোমাকে কাজে নিয়োগ করার জন্য এরপর খোঁজ করে, তবে আমি তাকে জানিয়ে দেব তুমি ভীষণ রকম অসুস্থ। সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’ একটানা কথাগুলো বলে থামল বাঁদরী।

তার কথা শুনে পালেবত হেসে বলল, ‘বুঝলাম তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে। কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে আমি মহারাজের সেবা কার্যে সত্যি নিয়োজিত হলাম।’

বাঁদরী যেন পালেবতের কথা শুনে মৃদু চমকে উঠল। তবে এ প্রসঙ্গে সে আর কোনো কথা বলল না। আপন মনে চাপ্পা বাইতে লাগল। পালেবতও আর কোনো কথা বলল না এ প্রসঙ্গে। জলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সে। বাঁদরীর তাকে দেখে মনে হল চারপাশের সৌন্দর্যের কথা ভুলে গিয়ে গভীর ভাবে কী যেন চিন্তা করছে পালেবত। তার ভাবনার আর ব্যাঘাত ঘটাল না বাঁদরী।

বিকাল হয়ে গেছে। চাপ্পা বাইতে বাইতে কিছু সময় পরই পালেবতকে তার বাসস্থানে পৌঁছে দিল বাঁদরী। দুজনের বিদায় মুহূর্তে বাঁদরী পালেবতকে বলল, ‘ফেরার পথে তো আমাদের দুজনের কোনো বাক্যালাপই হল না। জলের দিকে চেয়ে কী ভাবছিলে তুমি?’

প্রশ্নের জবাবে পালেবত হেসে বলল, ‘তুমি আমার সহচরী। কী ভাবছিলাম তা যথা সময়ে বলব তোমাকে।’ এ কথা বলার পর সখী সুলভ আলিঙ্গনবদ্ধ হল তারা দুজন। তারপর শিকারা ছেড়ে জলগৃহতে উঠে পড়ল পালেবত। বাঁদরীও রওনা হল নিজ গৃহে ফেরার জন্য।

পালেবত জলগৃহতে ফিরে আসার কিছু সময়ের মধ্যেই সে গৃহের অধিপতিও গৃহে প্রত্যাবর্তন করল। পালেবতের কক্ষে দেখা সে দৃশ্য কিন্তু উচ্ছলের পিছু ছাড়েনি। নানান কাজের অবসরে মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে সেই দৃশ্যের কথা। আরও একটা ব্যাপার উপলব্ধি করত শুরু করেছে, যে ইতিপূর্বে জলগৃহতে ফিরে আসার জন্য কোনো সময় অধিক আকর্ষণ অনুভব করতে না সে। কাজ যখন যেভাবে সম্পন্ন হতো, তখন সেভাবে গৃহে ফিরে আসত সে। কিন্তু কদিন ধরে তার যেন কর্মক্ষেত্রে গিয়ে মনে হচ্ছে, কখন তার কাজ শেষ হবে! কখন সে গৃহে ফিরে যাবে! নিজ গৃহের প্রতি হঠাৎ এই আকর্ষণের কারণ ঠিক বুঝেও যেন বুঝে উঠতে পারছে না উচ্ছল।

শিকারা থেকে নেমে জলগৃহতে উঠে আসার পরই উচ্ছলের চোখ চলে গেল পালেবতের কক্ষের দিকে। গৃহে ফেরার পর আজকাল তার নিজের অজান্তেই যেন ঘটনাটা প্রত্যহ ঘটছে! ঠিক যেমন রোজ প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গ হওয়ার পর অলিন্দে এসে দাঁড়ালে একই ঘটনা ঘটছে! সেদিন বিকালে, বাক্যালাপের পর পালেবতের সঙ্গে উচ্ছলের আর সাক্ষাৎ হয়নি। উচ্ছল দেখল পালেবতের কক্ষের দ্বার বন্ধ। অতঃপর নিজের কক্ষে প্রবেশ করল সে।

উচ্ছল এদিন বেশ কিছুটা তিক্ত মন নিয়েই গৃহে ফিরেছে। কাশ্মীরের রাজসভার ইতিহাসে এদিন থেকে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা হল। মহারাজ ললিতাপীড় আজ সভাগৃহে আসেননি। তিনি তার পরিবর্তে তার প্রতিনিধি হিসাবে সভায় পাঠিয়েছিলেন বেশ্যা মুক্তবেণীকে। মহারাজের নির্দেশ মতো তাঁর সিংহাসন বেদির নিম্নধাপে।

সভাসদদের আসনের উচ্চধাপে রৌপ্য আসনের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন মহামন্ত্রী যশঙ্কর। মুক্তবেণী যখন সেই আসনে এসে বসল, মহারাজ ও বেশ্যাত্রয়ীর একান্ত অনুগত কয়েকজন রাজপার্ষদ যখন ‘মাতা মুক্তবেণীর জয়’ বলে নির্লজ্জের মতো তাকে অভিবাদন জানাল ঠিক সেই মুহূর্তে উচ্ছল একবার তাকিয়েছিল মহামন্ত্রী যশঙ্করের দিকে। এক অদ্ভুত ভাব সে সময় ফুটে উঠেছিল মহামন্ত্রীর মুখে। তা কি নিদারুণ অপমান, অসহায়তার, নাকি কঠিন সংকল্পবদ্ধ মুখচ্ছবি তা সেই মুহূর্তে বুঝে উঠতে পারেনি উচ্ছল। এমনও হতে পারে অপমান আর সংকল্প—এ দুই ভাবনাই মিলেমিশে মহামন্ত্রীর মুখমণ্ডলে ওই অদ্ভুত ভাব ফুটিয়ে তুলেছিল।

এই সেই বেশ্যা মুক্তবেণী, যার মানভঞ্জনের জন্য মহারাজা ললিতাপীড় কদর্য এক নির্দেশ দিয়েছিলেন রাজবৈদ্য, প্রধানমন্ত্রী সুষেনকে। আত্মহনন করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। অবশ্য আজ যখন বেশ্যা মুক্তবেণী রাজসভাতে সেই রৌপ্য আসনে অধিষ্ঠান করছিল তখন তা দেখে উচ্ছলের মনে হাচ্ছিল আত্মহত্যা করে হয়তো বা বেঁচে গেছেন তিনি, তাই তাঁকে আর এমন দৃশ্য দেখতে হল না। উচ্ছলদের এমন কত কদর্য দৃশ্য ভবিষ্যতে দেখতে হবে কে জানে!

মুক্তবেণীকে দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন কাশ্মীর দেশের অধিশ্বরী! এমনই তার বসার ভঙ্গিমা। আজ সে সভায় জানিয়েছে অর্থদপ্তর, শুল্ক দপ্তর সহ প্রতিটি দপ্তরের আয় এ বৎসর দ্বিগুণ পরিমান বৃদ্ধি করতে হবে। তাছাড়া রাজ পুরোহিত ব্রহ্মদেবকেও আজ সভাতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল। তিনি এখনও শুভদিন নির্বাচন করতে পারেননি মহারাজের পদতলে স্বর্ণসেবিকাদের সমর্পণ করার জন্য।

প্রধান পুরোহিতের কথা বলে মুক্তবেণী বলেছে যে ভাবেই হোক মহারাজ দল হ্রদে বিশ্রাম লাভ করতে আসার আগেই সেই দিনক্ষণ স্থির করতে হবে ব্রহ্মদেবকে। তা জানাবার জন্য সাতদিন সময় দেওয়া হয়েছে তাকে।

নচেৎ মহারাজ আর তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরাই সেই শুভদিন নির্বাচন করবে বলে আজ পুরোহিত আর রাজসভাকে জানিয়ে দিয়েছে মুক্তবেণী। সভায় উপস্থিত তার অপর সহচরী রতিমালাও সমর্থন জানিয়েছে তার বক্তব্যকে। অর্থাৎ শুধু শাসন ক্ষমতার দিকে নয়, ধর্ম-শাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, পরিবর্তন করার জন্যও হস্ত প্রসারিত করেছে বেশ্যারা! এমনই তাদের অশিক্ষা, ঔদ্ধত্ব! বুঝতে অসুবিধা নেই যে এই কাশ্মীর দেশে কোথাও কোনো আলোক বিন্দু যদি আজও জেগে থাকে তা অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে চলেছে।

মহারাজের প্রতিনিধি হিসাবে প্রথম দিনই রাজসভাতে উপস্থিত হয়ে বেশ্যা মুক্তবেণী যে বক্তব্য উপস্থিত করেছে তা প্রমাণ করছে মহামন্ত্রী যশঙ্করের ভবিষ্যদ্বাণী অচিরেই সত্য বলে প্রমাণিত হতে চলেছে। যদি না তাঁর গোপন পরিকল্পনা সফলতা লাভ করে।

নিজের কক্ষে ফিরে এদিনের রাজসভার ঘটনা আর এ দেশের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে ভাবতেই বিষণ্ণ মন নিয়ে পালঙ্কে শুয়ে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল উচ্ছল। বাইরে এক সময় সূর্যাস্ত হল, তারপর রাত্রি নামল। গুঞ্জা যখন নৈশাহার নিয়ে তার কক্ষে প্রবেশ করল তখন নিদ্রাভঙ্গ হল তার।

নৈশাহার সাঙ্গ করে কক্ষ থেকে বাইরের হ্রদের দিকে চেয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইল সে। নানান ভাবনা ভিড় করে আসতে লাগল তার মনে। রাজসভাতে যা শুরু হয়েছে তাতে তার নিজের ওপরও যে কোনো দিন কোনো ঘৃণ্য কাজের জন্য নির্দেশ নেমে আসতে পারে। বিশেষত যে সময়কাল ললিতাপীড় দল হ্রদে অবস্থান করবেন সে সময়টা উচ্ছলের পক্ষে বেশ বিপজ্জনক। কারণ, মহারাজ সে সময় উচ্ছলের নিকটেই অবস্থান করবেন। তিনি যখন দল হ্রদে অবস্থান করেন তখন এ স্থানে অবস্থানকারী রাজ পার্ষদদের ওপর অনেক সময়ই নানান নির্দেশ আরোপিত হয়। যদিও ইতিপূর্বে উচ্ছলকে তেমন কোনো নির্দেশ পালন করতে হয়নি। কিন্তু এবার নির্দেশ তো আসতেই পারে!

এসব নানান কথা ভাবতে ভাবতে পালঙ্কে শুয়ে পড়ল উচ্ছল। এরপর চেষ্টা করতে লাগল নিদ্রামগ্ন হওয়ার। কিন্তু কিছুটা সময় তন্দ্রামগ্ন অবস্থাতে থাকলেও নিদ্রা এল না তার। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে, অন্যদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানান চিন্তা তার নিদ্রার প্রচেষ্টাকে বার বার ব্যাহত করতে লাগল। বাইরে বেড়ে চলল রাত্রি। ঘুমিয়ে পড়ল দল হ্রদের ভাসমান বাসগৃহগুলো। দীর্ঘক্ষণের চেষ্টাতেও ঘুম না আসাতে অস্বস্তিবোধ করাতে এক সময় পালঙ্কে উঠে বসল উচ্ছল। তার মনে হল কিছু সময় জলগৃহের অলিন্দে পদচারণা করলে হয়তো বা তার চোখে নিদ্রা নামতে পারে। এ কথা ভেবে সে একটা শাল জড়িয়ে পালঙ্ক থেকে নীচে নামল।

কপাট উন্মোচন করে জলগৃহের অলিন্দে পদার্পণ করল উচ্ছল। ঘুমন্ত দল হ্রদ। কোথাও কোনো শব্দ নেই। মাথার ওপর থেকে চাঁদ আলো ছড়াচ্ছে হ্রদের বুকে, সেই আলোর নীচে চারপাশে কাছে দূরে ঘুমিয়ে আছে নানান প্রকৃতির জলগৃহগুলো।

হ্রদের দিকে তাকাবার পর উচ্ছলের চোখ চলে গেল পালেবতের কক্ষের দিকে। উচ্ছল দেখল কক্ষের কপাট উন্মুক্ত! ব্যাপারটা দেখে বেশ আশ্চর্য বোধ করল সে। পালেবতের কক্ষের দ্বার উন্মুক্ত কেন? আর এরপর চারপাশে ভালো করে তাকাতেই তার প্রশ্নের উত্তর মিলে গেল। অলিন্দ থেকে বেশ কয়েক ধাপ কাঠের সোপান নেমে গিয়ে থেমেছে জলের কিনারে। সে সোপান বেয়ে শিকারাতে ওঠা নামা করা হয়। কক্ষ ত্যাগ করে অলিন্দ থেকে নীচে নেমে সোপানের কিনারে গিয়ে বসে আছে পালেবত!

চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার মুখে। গভীর চিন্তামগ্ন ভাবে সে চেয়ে আছে জলের দিকে। কোনো শীত বস্ত্র নেই তার পরনে! যেন শীত অনুভূত হচ্ছে না তার! সে এই মধ্য রাতে এ স্থানে এভাবে বসে আছে কেন? উচ্ছল বুঝে উঠতে পারল না ব্যাপারটা। বেশ কিছুক্ষণ ধরে উচ্ছল নিরীক্ষণ করল তাকে। কিন্তু একই ভাবে সেখানে বসে রইল পালেবত।

এ দৃশ্য দেখার পর উচ্ছল আর পদচারণা করল না। নিজের কক্ষে ফিরে এসে পালঙ্কে শুয়ে ভাবতে লাগল সদ্য দেখা দৃশ্যের কথা। তার চোখে এরপর ভেসে উঠল সেই নিদ্রামগ্ন পালেবতের ছবিও। তার মনে বার বার ভেসে উঠতে লাগল পালেবতের মুখশ্রী। মন থেকে মুছে গেল অন্য সব চিন্তা, আশঙ্কার কথা। পালেবতের মুখচ্ছবি যেন আচ্ছন্ন করে ফেলল তাকে।

১৬

প্রতিদিনের মতো এদিনও ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ল দল হ্রদের বুকে। জলে নেমে পড়ল সরালের দল। তাদের একটা ঝাঁক কলরব তুলে জলগৃহের কাছে উপস্থিত হয়েছে। আর সেই শব্দেই ঘুম ভাঙল উচ্ছলের। পালঙ্কে চোখ মেলে তার প্রথমেই মনে পড়ল পালেবতের কথা। তার কথা ভাবতে ভাবতে উচ্ছল নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙার পরও তার ভাবনার আবেশ কাটেনি। তাই তার মনে পড়ল পালেবতের কথা। চাঁদের আলোতে জলের কিনারে একাকী বসে আছে পালেবত। অমন ভাবে কেন বসেছিল সে? ভাবার চেষ্টা করেও উত্তর পেল না উচ্ছল। পালঙ্ক ছেড়ে নেমে বাইরের অলিন্দে এসে দাঁড়াল। পালেবতের কক্ষের দ্বার বন্ধ। গত রাতে সে যেখানে বসে ছিল ঠিক সেখানেই এসে উপস্থিত হয়েছে রাজহংসের দল। খাদ্যের প্রত্যাশায় মাঝে মাঝেই তারা জলগৃহগুলোর সামনে এসে উপস্থিত হয়। তেমনই এদিন উচ্ছলের গৃহের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে তারা। একটা-দুটো করে শিকারা নৌকাগুলোও ভাসতে শুরু করেছে দল হ্রদের বুকে। ঠিক সেভাবে এক এক করে পাহাড়ের ঢালগুলো নবীন আলোকস্পর্শে নিজেদের পুষ্প সমারোহকে উন্মোচিত করছে। রাজহংসের ডাকাডাকি শুনে গুঞ্জা তাদের জন্য শস্যপাত্র নিয়ে বেরিয়ে এল।

উচ্ছল তাকে বলল, ‘দাও, আমি ওদের খাবার খাওয়াই।’ উচ্ছলের হাতে পাত্র দিয়ে ফিরে গেল গুঞ্জা। অলিন্দে দাঁড়িয়ে উচ্ছল ধীরে ধীরে শস্য দানা নিক্ষেপ করতে লাগল হংস দলের দিকে।

উচ্ছলের কেন জানি মনে হতে লাগল এই সুন্দর সকালে পালেবত যদি একবার এসে দাঁড়াত তবে বেশ হতো। উচ্ছলের হাতের শস্য পাত্র রিক্ত হয়ে গেল, কিন্তু পালেবত কক্ষের বাইরে বেরিয়ে এল না। আহার গ্রহণ করে ফিরে গেল হংসকুল। উচ্ছল ফিরে এল নিজ কক্ষে। যথা সময় প্রাতরাশ নিয়ে উপস্থিত হল গুঞ্জা।

উচ্ছল তাকে জিগ্যেস করে বসল, ‘পালেবতের নিদ্রাভঙ্গ হল?’

গুঞ্জা জবাব দিল, ‘না, আজ এখনও তার কক্ষের দ্বার বন্ধ। সম্ভবত সে নিদ্রামগ্ন আছে। আপনি চাইলে আমি তাকে ডেকে দিতে পারি।’

গত রাতের ঘটনাটা উচ্ছলের মস্তিষ্কে বিচরণ করছে বলে সে প্রশ্নটা করে বসেছিল গুঞ্জাকে। তার কথার জবাবে উচ্ছল বলল, ‘না, তার প্রয়োজন নেই।’

প্রতিদিনের মতো এদিনও নির্দিষ্ট সময় রাজসভায় উপস্থিত হবার জন্য জলগৃহ ছেড়ে নিজের শিকারাতে উঠে বসল উচ্ছল। চাপ্পা তুলে নিয়ে জলে ঘা দেওয়ার আগে একবার তাকাল পালেবতের কক্ষের দিকে। সে কক্ষের দ্বার তখনও বন্ধ! তবে কি পালেবত সারা রাতই জলের কিনারে জেগে ছিল? মনে মনে ভাবল উচ্ছল। সে রওনা হয়ে গেল হ্রদ অতিক্রম করার জন্য।

আগের দিন অনুপস্থিত থাকলেও এদিন রাজসভায় এসে উপস্থিত হলেন মহারাজ ললিতাপীড়। তবে গত রাতের লাম্পট্যের চিহ্ন স্পষ্ট ফুটে আছে তাঁর মুখমণ্ডলে। রক্তাভ চক্ষু, ওষ্ঠাধার ঝুলে পড়েছে। মদিরার নেশাও তাঁর সম্পূর্ণ রূপে কাটেনি। মুক্তবেণী আর রতিমালার কাঁধে ভর দিয়ে তাঁকে সিংহাসন বেদির সোপান শ্রেণী অতিক্রম করে সিংহাসনে বসতে হল।

মহারাজ অভিবাদন গ্রহণ করার পর অভ্যাস মতো জানতে চাইলেন যে কোনো সাক্ষাৎপ্রার্থী আছে কিনা? যথারীতি দাঁড়ি জানাল যে কোনো সাক্ষাৎ প্রার্থী নেই। কথাটা শুনে নেশাতুর মহারাজ এদিন হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, ‘কোনো সাক্ষাৎ প্রার্থী আসে না কেন?’

তাঁর প্রশ্ন শুনে মুক্তবেণী তার আসন থেকে বলল, ‘মহারাজের সুশাসনে সর্বত্রই সুখ-শান্তি বর্তমান। কারও কোনো অভাব-অভিযোগ নেই। তাই সাক্ষাৎ প্রার্থীও আসে না?’

প্রিয় বেশ্যার এ কথা শুনে মহারাজ ললিতাপীড়ের মদিরা সিক্ত ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। তিনি সেনাপতি গরুড়ের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, ‘এ ব্যাপারে কম্পনধিপতি তোমার মতামত কী?’

সেনাপতি গরুড় জবাব দিল, ‘সভা সদস্যা মুক্তবেণী সঠিক কথাই বলেছেন মহারাজ। এ নগরীর সর্বত্রই শান্তি বিরাজমান। সেনাদল সর্বত্র সতর্ক থাকে যাতে কোথাও শান্তি বিঘ্নিত না হয় সে ব্যাপারে। কোনো অভিযোগ নেই, তাই অভিযোগকারীরাও রাজসভাতে আসে না।’

কম্পনধিপতির এ কথা মাথা নেড়ে সমর্থন করলেন তাঁর ও বেশ্যাদের একান্ত অনুগত কয়েকজন সভাসদ। মহারাজের তারপর হঠাৎই দৃষ্টি পড়ল মাথা নিচু করে বসে থাকা যশঙ্করের ওপর। ললিতাপীড় তাঁর উদ্দেশে বললেন, ‘মহামন্ত্রী আপনি চুপ করে আছেন কেন? কী ভাবছেন?’

মহামন্ত্রী উঠে দাঁড়ালেন। মহারাজের রাজসভাতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে কেন কেউ আসে না, এ ব্যাপারে সত্যি কথা বললে যে সমূহ ক্ষতি নিশ্চিত তা মহামন্ত্রী সব থেকে ভালো করে জানেন। তিনি বুদ্ধিমান। কী জবাব দেবেন তিনি তা মুহূর্তের মধ্যে ঠিক করে নিয়ে মূল প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে বললেন, ‘পুষ্পপথে মহারাজের প্রাসাদ নির্মাণের জন্য আরও কী কী ভাবে রাজকোষের আয় বৃদ্ধি করা যায় সে সম্পর্কেই ভাবছিলাম আমি।’

মহামন্ত্রীর কথা শুনে মহারাজের ভাবনাও অন্য দিকে পরিচালিত হয়ে গেল। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, সেই প্রাসাদ নির্মাণের কাজ দ্রুত আরম্ভ আর শেষ করতে হবে। যাতে আগামী বসন্তকাল আমি সে স্থানে বিশ্রাম লাভ করতে পারি।’

ললিতাপীড় এরপর মহামন্ত্রীর উদ্দেশে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আবারও দ্বার উন্মোচিত হল, সভায় প্রবেশ করল বিটপী। তার পোশাক দেখে উচ্ছল অনুমান করল, দল হ্রদ থেকেই আসছে সে। তার কবরীতে শোভা পাছে দল পুষ্প, মহারাজকে অভিবাদন জানিয়ে অন্য দুই বেশ্যার পাশে সে আসন গ্রহণ করল। তাকে দেখে উজ্জ্বল হয়ে উঠল চোখ দুটো। তিনি বিটপীকে প্রশ্ন করলেন, ‘জলপ্রাসাদ আমার বাসযোগ্য হয়েছে কি?’

বেশ্যা বিটপী উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি মহারাজ আর সভাসদদের অবগত করতে চাই যে মহারাজের আগমনের জন্য সম্পূর্ণ ভাবে প্রস্তুত হয়ে আছে জলপ্রাসাদ। আমি নিজে সবকিছুর তত্ত্বাবধান করেছি। মহারাজ যখন খুশি সেখানে গমন করতে পারেন। আমি মহারাজকে স্বাগত জানাবার জন্য সেস্থানে প্রস্তুত আছি।’

বিটপীর কথা শুনে মহারাজের মুখে হাসি ফুটে উঠল। তিনি বিটপীর উদ্দেশে বললেন, ‘তুমি যে আমার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে সর্বদা দৃষ্টি রাখো তা আমি জানি। তবে আর দেরি কেন? আমি আগামীকালই জলপ্রাসাদে রওনা হব বিশ্রাম লাভের জন্য।’

মহারাজের কথা শুনে মুক্তবেণী উঠে দাঁড়িয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মহারাজকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলল, ‘এখনও আপনার পদতলে স্বর্ণ সেবিকারা নিজেদের সমর্পণ করেনি। সেই শুভদিন নির্বাচনের জন্য কুলপুরোহিতকে সাতদিন সময় দেওয়া হয়েছে।’

মুক্তবেণী শুধু এটুকু কথা বললেও তার না বলা কথাটা বুঝতে অসুবিধা হল না মহারাজ ললিতাপীড় সহ অন্য অনেকেরই। মুক্তবেণী আসলে বলতে চাইল, ওই নবাগত স্বর্ণ সেবিকারাই তো জলপ্রাসাদে সেবাদান করবে মহারাজকে, মহারাজের কামনাকে পরিপূর্ণ করবে। যতক্ষণ না সেই নারীরা মহারাজের চরণে সর্ব সমক্ষে নিজেদের সমর্পণ করছে ততক্ষণ মহারাজ জলপ্রাসাদে কী ভাবে যাবেন?’

কথাটা শুনে কুঞ্চন দেখা দিল মহারাজের ললাটে। তবে তো তাঁকে আরও বেশ কিছুদিন অবস্থান করতে হবে রাজপ্রাসাদে। তার উপস্থিতি ব্যতিরেকে তো সেই নারীরা নিজেদেরকে সমর্পন করতে পারবে না।

মহারাজের এই সমস্যার কিছুটা সমাধান করে দিল বিটপী। সে সভার উদ্দেশে বলল, ‘মহারাজকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজকার্য পরিচালনা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। অবিলম্বে মহারাজের বিশ্রাম লাভের প্রয়োজন। রাজপুরোহিত কবে সেই শুভদিন নির্বাচন করবেন তার জন্য অপেক্ষা করা যাবে না। আর ছয়দিন পর পূর্ণিমা তিথি। পূর্ণিমা মাত্রই শুভ দিন। ওই দিনই যারা স্বর্ণ সেবিকা হবার জন্য প্রতীক্ষা করছে, তারা মহারাজের চরণে নিজেকে সমর্পন করবে। দিবার প্রথম ভাগে এ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ওই শুভদিনেই মহারাজ তাঁর জলপ্রাসাদে বিশ্রাম লাভের জন্য গমন করবেন।’

বেশ্যা বিটপীর বক্তব্য মহারাজের মনে ধরল। মাথা নেড়ে এ কথার সম্মতি প্রকাশ করলেন তিনি। বিটপী এরপর সভাসদদের উদ্দেশে বলল, ‘এ প্রস্তাবে আপনাদের কারো কোনো আপত্তি থাকলে বলুন?’

বিশেষত সে এ কথাটা যেন বলল, মহামন্ত্রী যশঙ্করের দিকে তাকিয়েই। একে বিটপীর প্রস্তাব, তার ওপর মহারাজ প্রস্তাবের সঙ্গে সন্মত। কারো আপত্তি করার মতো প্রশ্নই ওঠে না। কাজেই সভাসদরা, মাথা নেড়ে এ প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করলেন।

বেশ্যা মুক্তবেণী বলল, ‘স্বর্ণ সেবিকাদের এই সভাস্থলে সেদিন উপস্থিত করার দায়িত্ব আমি ও দেবী রতিমালা গ্রহণ করলাম। আর সমর্পণ অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব থাকবেন মহামন্ত্রী।’

বলা বাহুল্য, মুক্তবেণীর প্রস্তাবও একই ভাবে সভায় গৃহীত হল। ভাঁড় কূপমণ্ডূক উঠে দাঁড়িয়ে ভাঁড়ামি করে হাততালি দিয়ে বলল, অতি উত্তম! অতি উত্তম! উৎসব হবে, পিষ্টক ভক্ষণ হবে।’ এ কথা বলে সে মুখমণ্ডলে কপট বেদনা ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘আমি নারী নই। তাই স্বর্ণমালা লাভে বঞ্চিত হব।’ স্বর্ণ সেবিকারা যখন মহারাজের চরণে নিজেদের সমর্পণ করে তখন তাদের প্রত্যেককে একটি করে স্বর্ণমালা উপহার দেওয়া হয়। সেই স্বর্ণমালার কথাই বলল কূপমণ্ডূক।

ভাঁড়ের কথা শুনে খিলখিল করে হাসতে হাসতে বেশ্যা তিনজন ঢলে পড়ল। আরও কেউ কেউ হাসল কূপমণ্ডূকের কথা শুনে। মহারাজ ললিতাপীড়ও আমোদ পেলেন প্রিয় ভাঁড়ের কথা শুনে। তিনি তাঁর প্রিয় বেশ্যাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কূপমণ্ডূকের কষ্ট লাঘবের জন্য কি তাকে একটি স্বর্ণাহার উপহার দেওয়া যায় না?’

রতিমালা বলল, ‘অবশ্যই দেওয়া যায়, যদি সে ওই দিন নারীদের মতো পোশাক পরে আসে।’

মুক্তবেণী বলল, ‘কিন্তু নারীর পোশাকে তাকে দেখে যদি কারো কামনার উদ্রেক ঘটে, তখন?’

মুক্তবেণীর কথা শুনে হেসে উঠল তার দুই সঙ্গিনী। আরও বেশ খানিকক্ষণ কূপমণ্ডূককে কেন্দ্র করে অম্লীল ইঙ্গিত পূর্ণ কথার্বাতা চলল তিন বেশ্যার মধ্যে। অর্ধ নিমীলিত চক্ষে মহারাজ ললিতাপীড় যেন উপভোগ করতে লাগলেন সেই চটুল কথাবার্তা। মাথা নিচু করে নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন মহামন্ত্রী যশঙ্কর। তাঁর মুখমণ্ডল দেখে উচ্ছলের মনে হল তিন বেশ্যার কথোপকথন যেন তার কর্ণকুহরে লৌহ শলাকা প্রবেশ করাচ্ছে।

প্রধান সেনাপতি গরুড় এরপর উঠে দাঁড়িয়ে মহারাজ ললিতাপীড়ের উদ্দেশে বললেন, ‘মহারাজ যে কদিন জলপ্রাসাদে বিশ্রাম লাভ করবেন, সে কদিন কি রাজসভার কাজ স্থগিত থাকবে? আমাকে মার্জনা করবেন, রাজসভা চলার সময় নিরাপত্তার স্বার্থে আমাকে এ স্থানে সৈন্য মোতায়ন করতে হয়, তাই এ বিষয়ে অবগত হতে চাই?’

প্রশ্ন শুনে ললিতাপীড় তাকালেন তিন বেশ্যার দিকে। বিটপী উঠে দাঁড়িয়ে সভাকে উদ্দেশে করে বলল, ‘জলপ্রাসাদে মহারাজের পূর্ণাঙ্গ বিশ্রাম লাভের প্রয়োজন। রাজকার্যের প্রয়োজনে সেখানে গিয়ে মহারাজকে বিব্রত না করাই বাঞ্ছনীয়। বরং রাজসভা বসুক। প্রতিদিন না হলেও দুই দিবস অন্তর। যাতে তেমন কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটলে সভাসদরা রাজসভায় উপস্থিত হয়ে তা নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন।’

প্রিয় বেশ্যার এ বক্তব্যও মনে ধরল মহারাজের। ললিতাপীড় বললেন, ‘হ্যাঁ, সভাতে আমার অনুপস্থিতি জনিত কারণে রাজকার্যে অবহেলা করা যাবে না। দুই দিবস অন্তর রাজসভা বসবে। পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুসারে সভায় আমার হয়ে পর্যাক্রমে প্রতিনিধিত্ব করবে সভা সদস্যা রতিমালা ও মুক্তবেণী।

ভাঁড় কূপমণ্ডূক আবার তালি দিয়ে বলে উঠল, ‘কী আনন্দ! কী আনন্দ! রাজসভা বসবে!’

ভাঁড়ের হাততালি দেওয়া সমাপ্ত হলে রতিমালা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘মহারাজ যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা অবশ্যই পালন করব আমরা। তবে আমার একটি নিবেদন আছে। মহারাজ সভায় অনুপস্থিত থাকলেও সভায় উপস্থিত মন্ত্রী ও সভাসদদের নিরাপত্তার কথা ভেবে সভা চলার সময় কিছু সংখ্যক সেনা যেন এখানে মোতায়েন রাখা হয়।’

মন্ত্রী, সভাসদদের কথা উল্লেখ করলেও রতিমালা যে তার আর মুক্তবেণীর নিরাপত্তার স্বার্থেই এ কথা বলল তা অনুমান করতে অসুবিধা হল না উচ্ছলের। রতিমালার বক্তব্য শুনে ললিতাপীড়, কম্পনধিপতিকে নির্দেশ দিলেন; ‘আমার অনুপস্থতিতে সভা চলাকালীন এ স্থানে অর্ধেক সংখ্যক সেনা মোতায়ন থাকবে।’

এরপর এদিন আর সভার কাজ আর কিছু রইল না। মহারাজের মনোরঞ্জনের জন্য একদল স্বল্পবেশী নর্তকীকে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য সভায় প্রবেশ করানো হল। তাদের নৃত্য দেখতে দেখতে চোখ বন্ধ হয়ে আসতে লাগল মহারাজের। কিছুক্ষণের মধ্যেই সভা ভঙ্গ করে তাঁর অনুগতা বেশ্যাত্রয়ী, ভাঁড়, দাসদাসীদের নিয়ে সভা থেকে অন্তর্হিত হলেন।

একে একে সভাগৃহ ত্যাগ করতে শুরু করলেন সভাসদরা। কূপমণ্ডূকের বিষয়ে মহামন্ত্রীকে সংবাদটা দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বার বার তার কার্যালয়ে উপস্থিত হলে তা অন্যদের সন্দেহের উদ্রেক ঘটাতে পারে। আর এ স্থানেও নিশ্চয়ই তার ওপর দৃষ্টি রেখে চলেছে গুপ্তচরেরা। তাই তার কাছে সংবাদ প্রেরণের জন্য উচ্ছল অন্য পন্থা নিল। সে দেখল সভাসদ অভিমন্যু কক্ষত্যাগ করতে চলেছেন। তার দিকে এগোল উচ্ছল। রাজ্যসভা থেকে বেরিয়ে তাদের দুজনেরই গন্তব্য হল অনতিদূরে যেখানে সভাসদদের অশ্ব রাখা থাকে সেই স্থান। সভাগৃহ ত্যাগ করে অভিমন্যুর সঙ্গে সে স্থানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে উচ্ছল চাপাস্বরে তাকে বলল, ‘কাল কূপমণ্ডূকের গৃহে গেছিলাম। অন্যত্র যাওয়ার আছিলাতে সে আমাকে তার গৃহে প্রবেশ করতে দেয়নি। সামান্য দুই একটা কথার পরই দ্বার বন্ধ করে দিল। আমার সঙ্গে বাক্যালাপে সে আর আগ্রহী নয়। এ সংবাদ মহামন্ত্রীকে জানিয়ে দেবেন।’

উচ্ছলের কথা শুনে অভিমন্যু বললেন, ‘জানিয়ে দেব।’

এরপর তিনি হতাশ ভাবে বললেন, ‘পুরোহিত ব্রহ্মদেবকে দিয়ে আমরা চেষ্টা চালিয়েছিলাম, কৌশলে স্বর্ণ সেবিকাদের সমর্পণের ব্যাপারটা রদ করার জন্য। সে জন্যই তিনি শুভদিন নির্ধারণ করছিলেন না। কিন্তু বেশ্যারা নিজেরাই দিন নির্দিষ্ট করে ফেলল।’

উচ্ছল তাঁকে প্রশ্ন করে বসল, ‘রাজপুরোহিত কি সেদিন চন্দ্র পর্বতে উপস্থিত ছিলেন?’

অভিমন্যু বললেন, ‘হ্যাঁ, তিনিও ছিলেন। প্রবীণ ও বৃদ্ধ মানুষেরা অধিকাংশই আর এ ব্যভিচার সহ্য করতে পারছেন না।’

এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘আমার মনে হয় আমরা যাঁরা সমমনোভাবাপন্ন তাঁদের আরও একদিন একত্রিত হওয়া প্রয়োজন। সবাই মিলে আলোচনা করলে যদি কোনো সমাধান সূত্র মেলে? মহামন্ত্রীকে আবারও একদিন সভা আহ্বানের জন্য অনুরোধ জানাব।’

এ কথা বলার পর তিনি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ধরা দিল যে রাজসভার এক ভৃত্য তাদের পশ্চাত ধাবন করে কাছাকাছি চলে এসেছে। সে যেন শোনার চেষ্টা করছে তাদের কথোপকথন। লোকটা গুপ্তচর হতে পারে। অভিমন্যু তাই সঙ্গে সঙ্গে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলতে শুরু করলেন, ‘দল হ্রদে এ বৎসর যা পুষ্প সমারোহ তা নাকি ইতিপূর্বে কোনো দিন হয়নি।’

দুজনেই এরপর পৌছে গেল নির্দিষ্ট স্থানে। তারপর যে যার অশ্ব নিয়ে রওনা হল নিজেদের কার্যালয়ের দিকে।

উচ্ছলের কার্যালয়ে সেদিন বিশেষ কাজ ছিল না আগের দিনের মতোই। নানা দেশ থেকে আসা বণিকদের জন্য নানান স্থানে বাসস্থানের ব্যবস্থা করার কাজটা ইতিমধ্যেই সম্পন্ন করে ফেলেছে উচ্ছলের অধীনস্থ কর্মীরা। নতুন কোনো বণিকদলের উপস্থিত হওয়ার সম্ভবনাও তেমন নেই। একলা কক্ষে কিছু সময় অতিবাহিত করার পরই উচ্ছলের আবার মনে পড়তে লাগল পালেবতের কথা। কখনও তার চোখে ভেসে উঠতে লাগল গত রাতে চন্দ্রালোকে দেখা পালেবতের মুখচ্ছবি, আবার কখনও বা তার ঘুমন্ত মুখ, তার শরীর।

পালেবতের কথা ভাবতে ভাবতে কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে লাগল সে। এর পর এক সময় তার মনে হতে লাগল—গৃহে ফিরে যাই। নিজের জলগৃহের প্রতি যেন এক প্রবল আকর্ষণ অনুভব করতে লাগল সে। আর সেই আকর্ষণের কারণেই এরপর কার্যালয় ত্যাগ করে গৃহে ফেরার জন্য রওনা হল। একই ভাবে পালেবতের কথা ভাবতে ভাবতেই কার্যালয় থেকে দল হ্রদ পর্যন্ত দূরত্ব অতিক্রম করল সে। এক এক সময় সে নিজেই বেশ আশ্চর্যবোধ করতে লাগল পালেবত তাকে এমন ভাবে আকর্ষণ করছে কেন, এ কথা ভেবে।

দল হ্রদের কিনারে যে স্থানে অভিজাত ব্যক্তিদের জন্য অশ্বশালা আছে সে স্থান থেকে যে স্থানে উচ্ছলের শিকারাসহ অন্য রাজকর্মচারীদের জলযানগুলো অবস্থান করে সে স্থান কিছুটা দূরত্বে। আর সর্বসাধারণের শিকারা ইত্যাদি জলযান রাখার স্থান অন্যত্র।

উচ্ছলের শিকারা যেখানে আছে সেখানে জলের কিনারে ওঠা-নামার সুবিধার জন্য পাড় বরাবর বেশ খানিকটা অংশে কাঠের পাঠাতন বিছানো আছে। অশ্বশালাতে অশ্ব রাখার পর উচ্ছল পদব্রজে এগোল সেদিকে। সে স্থানের কাছাকাছি পৌঁছতেই তার চোখে পড়ল এক প্রমোদ তরণী। পাটাতনের কিনারে একটা বড় অংশ নিয়ে সে তরণী অবস্থান করছে। জলযানটা কার তা বুঝতে পারল উচ্ছল। জলপ্রাসাদ থেকে ওই তরণীতেই বিটপী পাড়ে এসেছে মহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। উচ্ছল জলের পাড়ে সেই পাটাতনের কাছে পৌঁছে এগোতে যাচ্ছিল তার শিকারাতে উঠে নিজের বাসস্থানে রওনা হওয়ার জন্য। কিন্তু একেই মনে হয় ভবিতব্য বলে, ঠিক সেই সময় একদল সৈন্য পরিবৃত হয়ে বিটপীর কর্ণিরথ এসে থামল সেখানে। বিটপী কর্ণিরথ থেকে নামতেই তার মুখোমুখি পড়ে গেল উচ্ছল। বিটপী দেখতে পেয়ে গেল তাকে। দাঁড়িয়ে পড়তে হল তাকে। ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বিটপী তাকে বলল, ‘সভাসদ, চললেন কোথায়, হ্রদ ভ্রমণে?’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘গৃহে ফিরছি। দল হ্রদেই আমার বাসস্থান।’

জবাব শুনে বিটপী বলল, ‘হ্যাঁ, তাইতো। এ কথা আমার স্মরণেই ছিল না।’

অনেক সময় ভবিষ্যতের বিপদ আগাম মানুষের মনে এসে জানান দিয়ে যায়। উচ্ছল গতদিনই ভাবছিল যে দল হ্রদে মহারাজের অবস্থান হেতু কোনো কাজের দায়িত্ব তার ওপর এসে পড়ার সম্ভাবনা আছে। তার এই আশঙ্কা যেন সত্যে পরিণত হতে চলল।

বিটপী এরপর বলল, ‘আপনি তো আজ সভাতে জেনেইছেন যে সাত দিন পর মহারাজ প্রাসাদে উপস্থিত হচ্ছেন। যদিও মহারাজ এ সময় কোনো রাজকার্যে যুক্ত হবেন না। কিন্তু তার স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থার জন্য কোনো প্রয়োজন হতে পারে আপনাকে। আপনি যেহেতু হ্রদেই থাকেন তাই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে আমার সুবিধে হবে। মহারাজ যেদিন দল হ্রদে এসে উপস্থিত হবেন তার পরদিন আপনি জল প্রাসাদে আসবেন। কোনো প্রয়োজন থাকলে আমি আপনাকে জানাব।’

অনেকটা যেন নির্দেশের ভঙ্গিতেই কথাগুলো বলল বিটপী। তার কথার জবাবে উচ্ছলকে বাধ্য হয়েই বলতে হল, ‘হ্যাঁ।’

বিটপী এরপর আর বাক্যালাপ না করে সোজা এগিয়ে গিয়ে তার প্রমোদতরীর পর্দার আড়ালে অন্তর্হিত হল। সেই প্রমোদতরীর দ্বার বাহকরা প্রস্তুত হয়েই ছিল। দাঁড় বাইতে শুরু করল তারা। মহারাজের প্রিয়তমার তরণি বেশ কিছুটা এগিয়ে চলার পর উচ্ছলও তার শিকারা নিয়ে রওনা হল গৃহে ফেরার জন্য।

সে যখন গৃহে ফিরল তখন দ্বিপ্রহর অতিক্রান্ত হয়নি। শিকারা থেকে জলগৃহতে উঠে সে তাকাল পালেবতের কক্ষের দিকে। কক্ষের দ্বার বন্ধ। বিটপীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর আবার তিক্ত হয়ে উঠল উচ্ছলের মন। গৃহে ফিরে নিজ কক্ষে পালঙ্কে শুয়ে উচ্ছল ভাবতে লাগল মহারাজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তাকে কী কী ধরনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হতে পারে? স্বর্ণ সেবিকাদের জলপ্রাসাদে আনায়নের দায়িত্ব নয়তো?

নানান কথা ভাবতে ভাবতে বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠল তার মন। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল। দীর্ঘক্ষণ কক্ষে থাকার পর উচ্ছল বাইরের অলিন্দে এসে দাঁড়াল মুক্তবায়ু সেবনের জন্য। সে দেখতে পেল অলিন্দের কাষ্ঠ নির্মিত ঘেরা ধরে দাঁড়িয়ে আছে পালেবত। উন্নত তার চিবুক। সে তাকিয়ে আছে দূরের দিকে।

পালেবত কী দেখছে তা বোঝার চেষ্টা করল উচ্ছল। সামনের ছোটবড় জলগৃহের মাথার ওপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে মহারাজের জল প্রাসাদের শীর্ষদেশ। নতুন রঞ্জকের প্রভাবে সূর্যালোকে ঝলমল করছে। যা দূর থেকেও সহজেই চোখে পড়ছে। উচ্ছলের মনে হল সেদিকেই যেন চেয়ে আছে পালেবত। আর এরপরই সেদিক থেকে উচ্ছলের দিকে ফিরে তাকাল পালেবত। দৃষ্টি বিনিময় হল তাদের দুজনের মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে পালেবত হাত জোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল উচ্ছলকে। তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।

উচ্ছল তাকে প্রশ্ন করল, ‘শরীর কেমন আছে? ক্ষত পরিপূর্ণভাবে নিরাময় হয়েছে?’

পালেবত জবাব দিল ‘হ্যাঁ।’

উচ্ছল অনেকটা স্বগোতক্তির স্বরেই বলল, ‘ক্ষত নিরাময়ের মতো যদি স্মৃতিশক্তিও ফিরে আসত তবে বড় ভালো হত।’

কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে পালেবত বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি এ ভাবে দিনের পর দিন আপনার গলগ্রহ রূপে আমার এখানে থাকা উচিত হচ্ছে না। আপনি অত্যন্ত দয়াবান ব্যক্তি বলে আমাকে আপনার গৃহতে আশ্রয় দিয়েছেন। আমার স্মৃতি কবে ফিরবে আমার জানা নেই। কত দিন আর আমি এভাবে আপনার অন্ন ধ্বংস করব? আপনি দয়া করে আমাকে আর কিছুদিন সময় দিন। আমি তারই মধ্যে নিজের গ্রাসাচ্ছাদনের উপায় খুঁজে নেবার চেষ্টা করছি।’ অনুনয়ের ভঙ্গিতে শেষ কথাগুলো বলে পালেবত।

উচ্ছল তার কথা শুনে বলল, ‘তোমার শঙ্কার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি তোমাকে এখনই কোথাও চলে যেতে বলছি না। তোমার জন্য আমার অতি সামান্যই ব্যয় হয়। আর তুমি যে ভাবে ওই দিন আমার প্রাণ রক্ষা করেছ তাতে এটুকু করা আমার কর্তব্য। তাছাড়া এই অপরিচিত স্থানে তুমি কোথায়ই বা যাবে? আর কোথা থেকেই বা উপার্জন করবে? আমি তোমার স্মৃতি ফিরে আসুক এই কামনা করছি। কারণ তোমার নিকটাত্মীয়রা নিশ্চয়ই ভীষণ রকম চিন্তা করছেন তোমার অনুপস্থিতিজনিত কারণে। তোমার স্মৃতি ফিরে এলে তাদের উৎকণ্ঠার অবসান হত। আর এমনওতো হতে পারে তুমি অত্যন্ত কোনো ধনাঢ্য, অভিজাত কন্যা। স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে বলে বাহুল্য বর্জিত অতি সাধারণ জীবন যাপন করতে হচ্ছে তোমাকে।’ একটানা কথাগুলো বলে থামল উচ্ছল।

পালেবত তার কথা শুনে বলল, ‘এ স্থানে আমার জীবন যাত্রার বাহুল্য না থাকলেও একজন অজ্ঞাতকুলশীল নারীকে আপনি আপনার গৃহে আশ্রয় দিয়েছেন, নিরাপত্তা দিয়েছেন, এ বড় প্রাপ্তি।’

কথাটা অবশ্য ঠিকই বলল পালেবত। তার জীবন রক্ষার পর উচ্ছল যদি তাকে নিজ গৃহে আশ্রয় না দিত তবে এ স্থানে পালেবত নিশ্চয়ই কোনো না কোনো পুরুষ বা একাধিক পুরুষের ভোগ লালসার শিকার হত। এমনকী তার মৃত্যু ঘটাও অসম্ভব ছিলনা।

পালেবতের কথা শুনে খুশি হল উচ্ছল। সে এরপর পালেবতকে বলল, ‘তোমাকে যখন পুষ্পপথে বরফের আস্তরণ থেকে উদ্ধার করা হয় তখন তোমার পরনে যে পোশাক-পরিচ্ছদ, অলঙ্কার ছিল তা দেখে আমার স্থির বিশ্বাস তুমি পাহাড়ের ওপারের মাড়ব রাজ্যের বাসিন্দা। এ সময় একজন যদি জীবিত থাকতেন তবে তিনি হয়তো আমাদের কোনো ভাবে সাহায্য করতে পারতেন তোমার পরিচয় উদ্ধারের জন্য। কারণ, তিনি বৎসরান্তে মাড়ব রাজ্যে যেতেন। তাঁর গৃহ ছিল সেখানেই।’

‘কে তিনি?’ প্রশ্ন করল পালেবত।

উচ্ছল জবাব দিল, ‘রাজবৈদ্য সুষেন। মন্ত্রী পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। সুষেন ছিলেন ভেষজ চিকিৎসক। বিশেষত তিনি ছিলেন একজন বিষ বৈদ্য। অর্থাৎ বিষক্রিয়া জনিত অসুস্থতা নিরাময়ে সক্ষম ছিলেন তিনি। তা খাদ্য বিষক্রিয়াই হোক বা বৃশ্চিক অথবা সর্প দংশন। একবার খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে পূর্বতন মহারাজ জয়পীড়ের জীবন সংশয় হয়। তখন মাড়ব রাজ্য থেকে আগত ভেষজ চিকিৎসক তাঁর চিকিৎসায় মহারাজকে সুস্থ করে তোলেন। অতঃপর মহারাজ তাঁকে রাজবৈদ্য ও মন্ত্রী পরিষদের সদস্য করেন।’

উচ্ছল মন্ত্রী সুষেনের সম্পর্কে পালেবতকে বলার পর পালেবত প্রশ্ন করল, ‘তিনি এখন কোথায়?’

এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে একটু থামল উচ্ছল। তাঁর মৃত্যুর পিছনের কদর্য কারণটা পালেবতের সামনে উল্লেখ করতে ইচ্ছা হল না উচ্ছলের। একটু চুপ করে থেকে সে শুধু বিষণ্ণভাবে বলল, ‘বিষ বৈদ্য নিজে বিষ পান করে আত্মহননের পথ বেঁছে নেন।’ পালেবত মৃদু চমকে উঠে প্রশ্ন করল, ‘তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন কেন?’ এ প্রশ্ন শুনে উচ্ছল এবার বলতে বাধ্য হল, ‘মহারাজ ললিতাপীড়ের নির্দেশে তাঁকে প্রবল অপমানিত হতে হত। তার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন মন্ত্রী সুষেণ।’

উচ্ছলের কথা শোনার পর পালেবত এ প্রসঙ্গে আর কোনো প্রশ্ন করল না, নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। বেলা পড়ে আসছে। পাহাড়ের আড়ালে মুখ লুকোতে শুরু করেছে সূর্য। সেই পড়ন্ত বিকালের আলোতে যেন বিষণ্ণতা ফুটে উঠেছে পালেবতের মুখমণ্ডলে। হয়তো বা অসহায়তার ছাপও।

উচ্ছলের মনে কেমন যেন একটা মায়ার উদ্রেক ঘটল পালেবতের মুখমণ্ডলের দিকে চেয়ে। অসহায় এক যুবতী দাঁড়িয়ে আছে উচ্ছলের সামনে। সে কোথা থেকে এ দেশে এল তা তার বা কারো জানা নেই। আর এরপর সে কোথায় যাবে তা একমাত্র ভবিষ্যতই বলতে পারবে! অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এই নারী।

তবে একটা ব্যাপার উচ্ছল অনুভব করছে যে এ নারী যেকোনো কারণেই হোক তার প্রতি আকর্ষিত করে তুলছে উচ্ছলকে। উচ্ছলের মনে হানা দিচ্ছে সে কোনো কোনো সময়, আচ্ছন্ন করে ফেলছে উচ্ছলের মনকে। এ মুহূর্তে পালেবতের সঙ্গে বাক্যালাপের জন্য তেমন কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে উচ্ছল শেষ পর্যন্ত পালেবতকে আশ্বস্ত করে হেসে বলল, ‘তুমি নিশ্চিন্ত থাকো তোমাকে আমি এখন এ স্থান থেকে বিতাড়িত করব না। তোমার অন্য কোনো আবেদন থাকলে আমাকে নিঃসঙ্কোচে বলতে পারো।’

উচ্ছলের আশ্বাসবাণী শুনে বিষণ্ণতা কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল পালেবতের মুখমণ্ডল। মুহূর্তখানেক চুপ করে ভেবে নিয়ে পালেবত উচ্ছলকে বলল, আপনি আমাকে বলেছিলেন যে আমি সুস্থ হয়ে ওঠার পর আপনি রাজপ্রাসাদ ও মহারাজকে দর্শন করাবার বিষয় কথা বলবেন।’

পালেবতের মুখমণ্ডল উচ্ছলের আশ্বাসবাণী শুনে স্বাভাবিক হয়ে উঠলেও, তার কথা শুনে কিন্তু গম্ভীর হয়ে উঠল উচ্ছলের মুখ। সে বলল, ‘মহারাজ সাতদিন পর এই দল হ্রদে তাঁর জলপ্রাসাদে বিশ্রাম লাভের জন্য আসছেন। সে সময় কোনো দর্শনার্থীর তাঁকে দর্শন করার সুযোগ মিলবে না। আর তিনি রাজপ্রাসাদে অবস্থান করবেন না বলে রাজসভাও নিয়মিত বসবে না। তাই আপাতত রাজসভা বা রাজদর্শনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে।’

উচ্ছল এমন গম্ভীরভাবে এ কথাগুলো পালেবতকে জানাল যে পালেবত বুঝতে পারল, এ প্রসঙ্গে উচ্ছলের সঙ্গে বাক্যালাপ করা তার উচিত হবে না। হয়তো সেও আর অন্য কোনো কথা খুঁজে পেল না তার আশ্রয়দাতার সঙ্গে বাক্যালাপের জন্য। পালেবত উচ্ছলের উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে ধীর পায়ে ফিরে গিয়ে প্রবেশ করল তার কক্ষে। সূর্য দ্রুত অদৃশ্য হতে শুরু করেছে পাহাড়ের আড়ালে। উচ্ছলও তাই ফিরে এল তার কক্ষে।

সন্ধ্যা হল। তারপর রাত্রিও নামল এক সময়। নৈশাহার সাঙ্গ করে পালঙ্কে বসে পড়ল উচ্ছল। কিন্তু গত রাতের মতোই নিদ্রা আসতে চাইল না তার। কোনো সময় তার মনে হতে লাগল রাজসভার কথা, কখনও বা বিটপীর সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা, আবার কখনও পালেবতের কথা, তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা।

তখন মধ্যরাত্রি। দল হ্রদ ঘুমিয়ে পড়লেও ঘুম আসেনি উচ্ছলের চোখে। হঠাৎ একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনতে পেল উচ্ছল। কেউ যেন হেঁটে গেল তার কক্ষের সামনে দিয়ে। অলিন্দের কাঠের পাটাতন শব্দ করে উঠল তার পদভারে। সে শব্দ শুনে উচ্ছল ভাবল কোনো তস্কর উঠে আসেনি তো তার জলগৃহে? কথাটা মনে হতেই পালঙ্ক ছেড়ে উঠে পড়ল উচ্ছল। দেওয়ালের গায়েই তার তলোয়ারটা ঝোলানো ছিল। রাজসভাতে কোনো উৎসব-সমারোহ থাকলে উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী বা সভাসদ হিসাবে ওই তলোয়ার ধারণ করতে হয় তাকে।

পালঙ্ক থেকে নেমে সেই তলোয়ার কোষ মুক্ত করে অতি সন্তর্পনে দ্বার উন্মোচন করে বাইরে তাকাল উচ্ছল। আর সাত দিন পরই পূর্ণিমা। আকাশের চাঁদের আলো তাই স্পষ্ট। সে আলো ছড়িয়ে আছে অলিন্দে। সেই আলোতে অলিন্দের দু-পাশে তাকিয়ে সে কোনো তস্কর বা অন্য কাউকে দেখতে পেল না। তারপর সে একজনকে দেখতে পেল। সে পালেবত! আগের দিনের মতোই জলের কিনারে গিয়ে বসেছে! এবং আগের দিনের মতোই তার শরীরে রাত পোশাক ছাড়া কোনো শীত বস্ত্র নেই। এমনকী যে রাত পোশাক আছে তার পরনে তার কোনো হাতা নেই। কাঁধ থেকে তার দুই বাহু সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। চাঁদের আলো যেন তার কাঁধ থেকে পিছলে পড়ছে সেই উন্মুক্ত বাহু বেয়ে।

গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে পালেবত চেয়ে আছে জলের দিকে। সে এতটাই চিন্তামগ্ন যে শীত যেন তাকে স্পর্শ করছেন না। বসন্ত ঋতু হলেও এই শীতের দেশে রাত্রিকালে যথেষ্ট ঠান্ডা অনুভূত হয়। তা যেন অনুভব করছে না পালেবত।

দ্বার প্রান্তে দাঁড়িয়ে উচ্ছল অবাক হয়ে চেয়ে রইল পালেবতের দিকে। সে ভাবতে লাগল পরপর দুই রাত পালেবতের এই অদ্ভুত আচরণের কারণ কী? এত গভীর ভাবে কী ভেবে চলেছে পালেবত? উচ্ছল তো তাকে আজও আশ্বস্ত করেছে যে সে তাকে বিতাড়িত করবে না। তবে?

উচ্ছল চেয়ে রইল তার দিকে। কিছুক্ষণ পর উচ্ছলের মনে হতে লাগল পালেবতের বাহু দুটো যেন আকৃষ্ট করতে শুরু করেছে তাকে। কী মসৃণ সুন্দর ওই বাহু যুগল! যদি ওই হাতের স্পর্শ পাওয়া যেত, ওই মৃণাল বাহু দুটো যদি আলিঙ্গন করত তাকে!

উচ্ছলের শরীরে বেয়ে যেন উষ্ণ রক্তের স্রোত প্রবাহিত হতে শুরু করল, শীতল রাত্রিতেও যেন ঘর্ম জেগে উঠল তার শরীরে। কিন্তু পালেবত নিশ্চল। একই ভাবে পাথরের মূর্তির মতো গভীর চিন্তামগ্ন ভাবে সে চেয়ে আছে জলের দিকে। উচ্ছলের এরপর মনে হল যে পালেবতের বাহু দুটো এমন প্রবল ভাবে তাকে আকর্ষণ করছে যে তার আকর্ষণে হয়তো বা সে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াবে পালেবতের কাছে। দু-হাত দিয়ে স্পর্শ করবে তার বাহুযুগল। তখন হয়তো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, সৃষ্টি হবে। তাই এক সময় নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এনে ফেলল উচ্ছল। নিঃশব্দে কপাট বন্ধ করে তলোয়ারটা যথাস্থানে রেখে সে আবার শুয়ে পড়ল পালঙ্কে।

১৭

পালেবত, বাঁদরীর জন্য রোজ প্রতীক্ষা করে থাকলেও তিন দিন সে এল না। চতুর্থ দিন সে যখন এসে উপস্থিত হল তখন তার কিছু সময় আগেই উচ্ছল রাজসভাতে যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছে তার জলগৃহ ত্যাগ করে। কর্মচঞ্চল দল হ্রদ।

শিকারা থেকে জলগৃহতে উঠে পালেবতের কপাট ধাক্কা দিল বাঁদরী। কপাটে বেশ কয়েকবার আঘাত হানার পর দ্বার উন্মোচন করল পালেবত। চোখ কচলে সে তাকাল বাঁদরীর দিকে। বাঁদরীকে সে এ সময় আশা করেনি। কারণ, বাঁদরীর আসার সময় হল দ্বিপ্রহর বা বিকাল। বাঁদরীকে দেখে পালেবতের মুখে হাসি ফুটে উঠল। মৃদু অভিমানের স্বরে সে বলল, ‘তুমি যে দেখছি আমাকে ভুলেই গেছ!’

বাঁদরী কক্ষে প্রবেশ করে তাকে আলিঙ্গন করে হেসে বলল, ‘সখীকে আমি ভুলতে পারি? তুমি হয়তো শুনেছ যে মহারাজ আর তিন দিন পর জলপ্রাসাদে এসে উপস্থিত হবেন। মহারাজের সঙ্গে বেশকিছু লোকজনও আসবে। তাঁর ভৃত্য, দাস-দাসী, পাচক, নর্তকী, বাদ্যকার এধরনের লোক। তাদের সবার স্থান সঙ্কুলান জলপ্রাসাদে হবে না। তাই প্রাসাদের কাছাকাছি কয়েকটি জলগৃহ ওই সব লোকদের থাকার জন্য ব্যবহৃত হবে। আর সে সব গৃহের বাসিন্দারা থাকবে দূরবর্তী কিছু জলগৃহতে। তেমনই কিছু বাসিন্দাদের তৈজসপত্র অন্য গৃহতে পৌছে দেওয়ার কাজে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত ছিলাম এই তিনদিন।’

পালেবত বলল, ‘তুমি এ সময় এলে? আজ তোমার কাজ নেই?’

বাঁদরী জবাব দিল, ‘তিনদিন অত্যন্ত পরিশ্রম গেছে। হাতে বেশ কিছু মুদ্রাও এসেছে। তাই আজ আর কোনো যাত্রী তুলব না নৌকায়। তাছাড়া দেবী বিটপীর কাছ থেকে মহারাজের নামাঙ্কিত পাঞ্জাটাও আনতে যেতে হবে।’

এ কথা বলার পর বাঁদরী প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু এত বেলা পর্যন্ত তুমি নিদ্রা যাচ্ছিলে কেন? শরীর সুস্থ তো?’ পালেবত বলল, ‘হ্যাঁ, সম্পূর্ণ সুস্থ। তুমি সে পাঞ্জা আনতে কখন যাবে?’

বাঁদরী জবাব দিল; ‘মধ্যাহ্নের আগেই।’

পালেবত বলল, ‘তবে আমিও যাব তোমার সঙ্গে।’

বাঁদরী একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘নিয়ে যাব। তুমি তো দেখছি জলপ্রাসাদের ব্যাপারে বড় বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছ!’

পালেবত বলল, ‘হ্যাঁ, বিশেষ কারণও আছে তার পিছনে।’

‘কী কারণ?’ প্রশ্ন করল বাঁদরী।

পালেবত বলল, ‘আমি ভাবছি এ স্থানে রয়ে যাব। কিন্তু কতদিন আর অন্যের অন্ন ধ্বংস করা যায় বলো? আমার উপার্জনের প্রয়োজন। যাতে আপাতত নিজের গ্রাসাচ্ছাদনের উপায় করতে পারি। আমি তোমার কথা শুনে এটুকু বুঝতে পেরেছি যে ওই জলপ্রাসাদের কাজে নিয়োজিত হতে পারলে আমার অর্থ প্রাপ্তি ঘটবে। এমনকী ভবিষ্যতে আমার স্থায়ী উপার্জনের রাস্তাও উন্মুক্ত হতে পারে। দেবী বিটপী যখন নিজেই আমাকে কাজে নিয়োগ করার সম্ভাবনার কথা বলেছেন তখন তা প্রত্যাখ্যান করা উচিত হবে না। তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করা উচিত। এ ব্যতীত...।’ এ পর্যন্ত বলে থেমে গেল পালেবতে।

‘এ ব্যতীত কি?’ জানতে চাইল বাঁদরী।

পালেবত কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হেসে বলল, ‘আমি মহারাজকে দেখতে চাই। আমি কোনোদিন রাজাকে দেখিনি। জলপ্রাসাদে কোনো কাজে নিয়োজিত হলে হয়তো বা তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ মিলবে। শুনেছি দেব দর্শনের মতো রাজ দর্শনেও নাকি পুণ্য লাভ হয়।’

পালেবতের এ ইচ্ছার কথা শুনে মৃদু চমকে উঠল বাঁদরী। সে যেন পালেবতকে কিছু বলতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সংযত করে নিল। পালেবত ব্যাপারটা লক্ষ করে বাঁদরীকে বলল, ‘কী বলতে চাইছ তুমি?’

বাঁদরী এবার বলল, ‘তেমন কিছু নয়। তোমার এ সব বাসনার কথা দেবী গুঞ্জা বা রাজ সভাসদ জানেন?’

পালেবত উত্তর দিল, ‘জলগৃহের কাজে নিয়োজিত হতে ইচ্ছুক এ কথা জানাইনি কাউকে। তবে রাজ দর্শনে ইচ্ছুক সে কথা জানিয়ে ছিলাম রাজ সভাসদকে। তিনি বললেন, মহারাজ আর কদিনের মধ্যেই রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে জলপ্রাসাদে এসে উপস্থিত হবেন বিশ্রাম গ্রহণের জন্য। এ সময় দর্শনার্থীরা সেখানে প্রবেশ করতে পারবে না।’

বাঁদরী বলল, ‘সভাসদ সঠিক কথাই বলেছেন। মহারাজের জলপ্রাসাদে সে সময় নাকি দেবী বিটপীর অনুমতি ছাড়া মন্ত্রী-সভাসদদেরও প্রবেশ নিষেধ বলে শুনেছি।’ এরপর আরও কিছুক্ষণ দুজনের কথা হওয়ার পর বাঁদরী বলল, ‘চলো এবার তবে যাওয়া যাক?’

সামান্য কিছু সময়ের মধ্যেই পোশাক পরিবর্তন করে গুঞ্জাকে জানিয়ে পালেবত বাঁদরীর শিকারাতে ভেসে পড়ল। কর্মচঞ্চল দল হ্রদ, চারপাশে অন্য শিকারা নৌকার যাওয়া আসা। নানাবিধ অন্য জলযানও ভেসে বেড়াচ্ছে দল হ্রদে।

সূর্যের আলোক রশ্মি জলের উপরিভাগ ভেদ করে অনেক গভীরে প্রবেশ করছে। দেখা যাচ্ছে অনেক নীচের ভূ-ভাগ, আন্দোলনরত শৈবাল, জলজ উদ্ভিদ আর তার মধ্যে নানান বর্ণের মৎস্যকুলকে। উপত্যকাকে ঘিরে থাকা পর্বতগুলোর শীর্ষবিন্দুগুলো সারা বৎসরই তুষারাবৃত থাকে। সূর্যের আলোতে তা অগ্নিবর্ণের রূপ নিয়েছে। যেন কেউ অগ্নিসংযোগ করেছে তাদের কিরীটে। পাহাড়ের ঢালগুলোতে রামধনুর সমারোহ। ফুটে আছে নানা বর্ণের ফুল। যৌবনবতী বসন্ত আবির্ভূতা কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে। জলগৃহ ত্যাগ করে কিছুটা এগোবার পর পালেবত বলল, ‘দাও। চাপ্পাটা আমাকে দাও?’ বাঁদরী তার কথা শুনে চাপ্পাটা তার হাতে দিয়ে হেসে বলল, ‘তুমিও আমার মতো শিকারা বাহিকা হবে নাকি?’

পালেবত বলল, ‘হয়তো হতেও পারি। তবে তা না হলেও দল হ্রদে যখন বাস করছি তখন শিকারা চালানোটা শিখে রাখা প্রয়োজন। আজ আর গত দিনের মতো শখে নয়, জলপ্রাসাদে যাওয়া আসার পথে তোমার থেকে নৌকা বাইবার শিক্ষা নেব আমি।’

বাঁদরী হেসে সম্মতি প্রকাশ করল তার কথায়। জলে চাপ্পা ফেলল পালেবত। তার পাশে বসে বাঁদরী কখনও একই সঙ্গে পালেবতের হাতের ওপর হাত রেখে, কখনও বা নির্দেশ দিয়ে তাকে বুঝিয়ে দিতে লাগল শিকারা নৌকা চালাবার বিভিন্ন কৌশল, কীভাবে নৌকার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কীভাবে বাঁক নিতে হয় ইত্যাদি।

দল হ্রদের জল অচঞ্চল। স্রোতস্বিনী নদীতে যেমন নৌকা বাইতে কঠিন অনুশীলনের প্রয়োজন হয় এখানে তেমন হয় না। এ ব্যতীত শিকারা নৌকার গঠন তন্বী নারীর মতো নির্মেদ ও ভারী না হওয়াতে সহজেই তা চালনার উপযোগী। কাজেই বাঁদরীর তত্ত্বাবধানে কিছু সময় শিকারা চালনার পর তার কলা কৌশল বেগ খানিকটা ধাতস্থ করে নিল।

বেশ কিছু সময় ধরে পালেবতকে শিকারা নৌকা চালানোর শিক্ষা দেওয়ার পর বাঁদরী বলল, ‘চলো এবার জল প্রাসাদের দিকে যাওয়া যাক।’ পালেবত, বাঁদরীর হাতে চাপ্পা সমর্পণ করল। শিকারা এগিয়ে চলল জল প্রাসাদের দিকে।

এ দিনও প্রাসাদ ঘিরে রয়েছে সেনাদের শিকারা নৌকাগুলি। মূল প্রাসাদের গায়েই অবস্থান করছে চন্দন সুরভিত সেই সুদৃশ্য তটিনী। তা দেখে তারা বুঝতে পারল দেবী বিটপী জলপ্রাসাদে বা ওই তটিনীর কোনো একটিতে অবস্থান করছেন। জলপ্রাসাদের কাছে উপস্থিত হয়ে বাঁদরী প্রহরারত এক সৈনিককে জিগ্যেস করল, ‘দেবী বিটপী আমাকে সাক্ষাতের জন্য আসতে বলেছেন।’

রক্ষী জানতে চাইল, ‘কী নাম তোমার? কোথা থেকে আসছ?’

বাঁদরী তার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পর সে বলল, ‘এ স্থানে অপেক্ষা করো। আমি তার কাছে তোমার আগমন বার্তা পাঠাচ্ছি।’

জলগৃহের অলিন্দের প্রবেশ মুখে দুজন রক্ষী প্রহরায় ছিল। যে সৈনিকের সঙ্গে বাঁদরীর বাক্যালাপ হল, সে তার শিকারা থেকে সোপান বেয়ে ওপরে উঠে প্রহরারত সেই দুই রক্ষীকে জানাল বাঁদরীর কথা। সে কথা শুনে একজন রক্ষী প্রাসাদের ভিতর প্রবেশ করল। বেশ খানিকটা সময় অতিবাহিত হবার পর সে অলিন্দে বেরিয়ে এল। আর তার সঙ্গে বেরিয়ে এল আরও একজন। ইতিপূর্বে তাকে দেখেছে পালেবত। যে হল দেবী বিটপীর প্রিয় ভৃত্যা হংসী। ওপর থেকে সে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল বাঁদরীর শিকারার দিকে, তারপর হাত নেড়ে শিকারা নৌকায় ওঠার জন্য ইঙ্গিত জানাল। বাঁদরী তার শিকারা নৌকাটা নিয়ে গিয়ে রাখল জলপ্রাসাদে ওঠা পাটাতনের গায়ে। তারপর চোখের ইঙ্গিতে পালেবতকে তাকে অনুসরণ করতে বলে শিকারা থেকে নেমে কাঠের পাটাতন বেয়ে উঠতে শুরু করল প্রাসাদের সমুখ ভাগের অলিন্দের দিকে। জলতল থেকে তার উচ্চতা দ্বিতল গৃহের সমান হবে। পালেবত একটু ভয়ে ভয়ে অনুসরণ করল বাঁদরীকে। তবে রক্ষীরা তাকে বাধা দিল না। বাঁদরীর সঙ্গে পালেবত পদার্পণ করল মহারাজ ললীতাপীড়ের জলপ্রাসাদে।

দেবী বিটপীর প্রধান ভৃত্যা হাসল বাঁদরীর দিকে চেয়ে। তার দেহের স্বর্ণালঙ্কারের মতোই উজ্জ্বল গর্বের হাসি। যেন সে বলতে চাইছে, ‘আমাকে দেখো।’

তবে তাকে কাছ থেকে দেখে পালেবত বুঝতে পারল তার মুখমণ্ডল বা শরীরের শোভা খুব একটা নেই। চামড়া শিথিল, খসখসে। বেশ স্ফীত নাসারন্ধ্র, দাঁতের পাটিও ছিদ্রযুক্ত। আর স্বর্ণালঙ্কার দিয়ে সে এসবই যেন ঢাকার চেষ্টা করছে। তবুও সে সর্ব ক্ষমতার অধিকারিণী দেবী বিটপীর প্রধান ভৃত্যা বলে কথা, তাই তাকে খুশি করার জন্য বাঁদরী তাকে বলল, ‘এই বসন্তে তোমার রূপ যৌবন যেন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।’

হংসী তার কথা শুনে খুশি হল। সে বলল, ‘তুমি এসেছ জেনেই আমি দেবী বিটপীকে সংবাদটা দিলাম। অন্য কেউ হলে দিতাম না। কারণ, দেবীর স্নানে যাওয়ার সময় হয়েছে। আমার সঙ্গে এসো। তবে তার বেশি সময় নষ্ট কোরো না।’

বাঁদরী আর অযথা বাক্যালাপ না করে তাকে অনুসরণ করল। আর তার সঙ্গে পালেবতও। জলপ্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল তারা। কক্ষগুলির দ্বার তমোরি মখমলের গালিচা সমৃদ্ধ হবার কারণে বাইরের সূর্যালোকের গতিপথ রুদ্ধ করলেও তারা প্রদীপের আলোক সমৃদ্ধ। প্রতি কক্ষেই প্রদীপ দণ্ডে প্রদীপ জ্বলছে। তাদের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে কারুকাজমণ্ডিত, স্তম্ভ, দেওয়ালে। কোনো কক্ষে দণ্ডায়মান আছে মর্মর পাথরের তৈরি পূর্ণাবয়ব নারী মূর্তি। অর্ধ নগ্ন সেই মূর্তিগুলোর গড়ন এত নিখুঁত যে তাদের দেখলে জীবন্ত বলে ভ্রম হয়। আবার কোনো কক্ষে রয়েছে রুপোর কারুকাজ করা বিশালাকৃতির চৌপায়া, তার পাত্রে রাখা ফুলের সমাহার, কোথাও বা ঝুলন্ত পিঞ্জরে শুক পাখি। পায়ের নীচে কাষ্ঠ নির্মিত মেঝে এত মসৃণ যে অসতর্ক হলেই পিছলে পড়ার সম্ভাবনা। অবাক দৃষ্টিতে জল প্রাসাদের বৈভব দেখতে দেখতে দাসী হংসীকে অনুসরণ করে বেশ কয়েকটা কক্ষ অলিন্দ অতিক্রম করে এক কক্ষের বিশাল দ্বারের সামনে এসে হাজির হল তারা। দ্বার প্রান্তে দুজন ভৃত্যা দণ্ডায়মান ছিল। পর্দা সরিয়ে দ্বার উন্মোচন করল তারা। হংসীর সঙ্গে বাঁদরী আর পালেবত প্রবেশ করল সেই কক্ষে।

গালিচা বিছানো বিশালাকৃতি এক কক্ষ। স্তম্ভ, দেওয়াল ছাদ সবই কারুকাজমণ্ডিত। ঘরের কোণে রাখা প্রদীপ দণ্ডগুলি থেকে আলো ছড়াচ্ছে। ঘরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে বিশেষভাবে নির্মিত রৌপ সিংহাসনে আধ শোয়া অবস্থায় শুয়ে আছেন দেবী বিটপী। কিন্তু পালেবত নারী হলেও দেবী বিটপীকে দেখে লজ্জাবোধ করল সে। দেবী বিটপীকে নগ্নই বলা চলে। সামান্য একটি বস্ত্রখণ্ড দ্বারা আচ্ছাদিত দেবী বিটপীর বক্ষদেশের নিম্নাংশ। ঊর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ উন্মোচিত তার। বহু ব্যবহারে স্খলিত স্তন যুগল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। দেবী বিটপীয় দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। তাদের পোশাক চুলের গড়ন নারীদের মতো হলেও তাদের মুখমণ্ডল ও বাহু দেখে সে দুজনকে পালেবতের নপুংসক বলেই মনে হল। তারা দুজন তৈলমর্দন করছে বিটপীর স্তনে, শরীরে। কক্ষের দিকে আরও একটি প্রবেশ পথ আছে। তার পাশে নানান ধরনের তৈল, সুগন্ধীর পাত্র, দেবী বিটপীর পরিধেয় পোশাক, হীরক অলংকরণ ইত্যাদি নিয়ে সারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একদল ভৃত্য। তারাও অলংকার শোভিতা।

পালেবতরা লজ্জাবোধ করলেও বিটপী কিন্তু লজ্জাবোধ করল না। তীক্ষ্ণদৃটিতে তাদের দুজনকে দেখার পর বিটপী তার শরীরে যে দুজন তৈলমর্দন করছিল তাদেরকে ইশারাতে আসতে বলে পালেবতদের উদ্দেশে বলল, ‘কাছে আয়?’

বাঁদরী আর পালেবত বিটপীর পায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াবার পর হাত জোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল।

বিটপী বাঁদরীকে প্রশ্ন করল, ‘তুই কী কারণে এসেছিস?’

বাঁদরী জবাব দিল, ‘মহারাজের পাঞ্জার ছাপ নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনি আমাকে আসতে বলেছিলেন।’ বিটপীর সম্ভবত খেয়াল ছিল না কথাটা। বাঁদরীর কথা শোনার পর বিটপী বলল, ‘ও, কিন্তু তুই আসার আর সময় পেলি না! আমি এখন স্নানে যাব।’

তার কথা শুনে বাঁদরী বলল, ‘আমাকে মার্জনা করবেন দেবী। আমি তবে বিলম্বে আসব।’

বিটপী বলল, ‘এসেছিস যখন তখন নিয়েই যা।’

এ কথা বলে সে হংসীর উদ্দেশে বলল, ‘ওরে, ওকে একটা পাঞ্জা এনেদে।’

বিটপীর নির্দেশ পালন করার জন্য হংসী সে কক্ষের অপর দ্বার উন্মোচন করে তার ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।

মহারাজের প্রিয় সঙ্গিনী এরপর পালেবতের দিকে চেয়ে বলল, ‘তোকে তো ডাকিনি। তুই আজ কেন এসেছিস?’

পালেবত কিছু জবাব দেওয়ার আগেই বাঁদরী জবাব দিল, ‘ও আপনাদের সেবা করতে চায়। মহারাজের প্রাসাদ, মহারাজকে দর্শন করতে খুব আগ্রহী। তাই সঙ্গে এনেছি।’

এ কথাটা বলেই বাঁদরী থেমে গেল। হয়তো তার মনে হল যে শেষ কথাটা সে না বললেই পারত। কিন্তু তার সেই শেষ কথাটাই ধরল বিটপী, পালেবতের দিকে আরও একবার তাকিয়ে নিয়ে সে জানতে চাইল, ‘তুই মহারাজের দর্শন চাস কেন?’ মৃদু সন্দিগ্ধ ভাব যেন ফুটে উঠল বেশ্যা রমণীর কণ্ঠে।

পালেবত মাথা নিচু করে জবাব দিল, ‘শুনেছি দেব বিগ্রহ দর্শনের মতো প্রজাপালক মহারাজ দর্শনেও পুণ্য লাভ হয়, তাই। মহারাজ তো দেবতাই হন।’

পালেবতের কথা শুনে হাসি ফুটে উঠল বেশ্যা বিটপীর ঠোঁটের কোণে। সে বলল, ‘তুই ঠিকই বলেছিস। মহারাজ ললিতাপীড় বাপ্পয়িক দেবতারই আর এক নাম। কিন্তু দেব দর্শনের জন্যে তো পুণ্য সঞ্চয় করতে হয়, সে কাজ পারবি তো?’

পালেবত বলল, ‘কী কাজ বলুন?’

বেশ্যারানি বিটপী বলল, ‘এমন কোনো কাজ, যা মহারাজকে কোনো ভাবে সন্তুষ্ট করতে পারে, আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারে।’

পালেবত বলে উঠল, ‘যদি তেমন কাজ পারি তবে মহারাজের দর্শন মিলবে?’

তার এ কথা শুনে বিটপী মৃদু ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, ‘আমি কে তা তুই জানিস? আমার দেওয়া কথা মিথ্যা হয় না। সে জন্যেই তো রাজসভার কত মন্ত্রী, সভাসদরা আমার কৃপা ভিক্ষা করে। তুই যদি সত্যি তেমন কোনো কাজ করতে পারিস তবে মহারাজের সামনে আমি তোকে নিজে উপস্থিত করাব।’

ঠিক এই সময় ভৃত্যা হংসী আবার সে কক্ষে উপস্থিত হল মহারাজের পাঞ্জা নিয়ে। বিটপীর নির্দেশে সে সেটা তুলে দিল বাঁদরীর হাতে। বিটপী এরপর তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে পালেবতদের উদ্দেশে বলল, ‘এবার তোরা যা।’

দেবী বিটপীর দু-পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নপুংসক দুজন আবার তেল মর্দন করতে শুরু করল বিটপীর স্তন যুগলে। বাঁদরী আর পালেবত আবার তাকে প্রণাম জানিয়ে সে কক্ষ ত্যাগ করে হংসীর সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল। জল প্রাসাদের অলিন্দে পৌঁছে হংসী তাদের বলল, ‘তোমরা যা উপার্জন করবে তার থেকে একটা করে মুদ্রা আমাকে দেবে। মনে রাখবে দেবী বিটপীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হলে আমার মাধ্যমেই তাঁর কাছে সংবাদ পৌঁছবে।’

বাঁদরী তাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। তোমার প্রাপ্য তুমি পাবে।’

জলপ্রাসাদ থেকে নীচে নেমে এরপর শিকারাতে উঠে বসল
তারা দুজন। পালেবত, বাঁদরীর হাত থেকে পাঞ্জাটা নিয়ে একবার দেখল। করতল আকৃতির একটা রৌপ্য ফলক। তাতে মহারাজের চিহ্ন খোদিত আছে। সেটাই হল জলপ্রাসাদের কাছে পৌঁছবার, প্রাসাদে প্রবেশ করার ছাড়পত্র। পাঞ্জাটা দেখে বাঁদরীকে ফেরত দেওয়ার পর সে সেটা শিকারার ছইয়ের একস্থানে যত্ন করে রাখল। তারপর চাপ্পা চালাতে শুরু করল।

ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল মহারাজের জলপ্রাসাদ। সে স্থান থেকে বেশ কিছুটা দূরে সরে আসার পর বাঁদরী পালেবতকে জিগ্যেস করল, ‘সত্যিই তুমি মহারাজের দর্শন পেতে যেকোনো কঠিন কাজ করতে রাজি?’

পালেবত এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তুমি মহারাজকে কাছ থেকে কোনো দিন দেখেছ?’

বাঁদরী জবাব দিল, ‘দেখেছি তবে দূর থেকে। কাছে যাওয়ার ইচ্ছা হয়নি।’

‘কেন?’ জানতে চাইল পালেবত।

বাঁদরী একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘তুমি আমার সখী। তোমাকে আমি বিশ্বাস করি, ভালোবাসি তাই তোমাকে কথাটা সাহস করে বলছি। আমি এ কথা কাউকে বলেছি এটা যদি বিটপীর কানে যায়, তবে সে আমার জিভ ছিঁড়ে নেবে বা আরও ভয়ংকর কিছু হবে। মহারাজ ললিতাপীড় হলেন অত্যন্ত কামুক প্রকৃতির মানুষ। কোনো নারীই তার সামনে নিরাপদ নয়, বিশেষত তোমার মতো সুন্দরী নারীরা তো নয়ই। তোমাকে আমার পরামর্শ, অর্থ লাভের জন্য বিটপী বললে কাজ কোরো ঠিকই, কিন্তু মহারাজের সামনে যেও না। তা ঝুঁকিপূর্ণ হবে।’

একটানা কথাগুলো বলে থামল বাঁদরী। পালেবত যেন তার কথায় তেমন গুরুত্ব না দিয়ে হেসে বলল, ‘ঝুঁকি না নিলে হংসীর মতো স্বর্ণালঙ্কার পাব কোথায়?’

বাঁদরীও এবার পালেবতের কথা শুনে হেসে বলল, ‘তা অবশ্য ঠিক। অমন স্বর্ণালঙ্কার ধারণ তুমি ঝুঁকি না নিলে করতে পারবে না। নইলে তোমাকে আমার মতো চাপ্পা চালিয়েই দিন কাটাতে হবে।’

পালেবত বলল, ‘দাও চাপ্পাটা। আপাতত চাপ্পা চালানোটাই শিখে রাখি।’ বাঁদরী চাপ্পা তুলে দিল পালেবতের হাতে। সে শিক্ষানবিশের মতো বাঁদরীর নির্দেশে চাপ্পা চালাতে লাগল।

বাঁদরী এক সময় তাকে বলল, ‘তুমি তো সুন্দরী, যুবতী। রাজ সভাসদ উচ্ছলও সুপুরুষ, তোমরা এতদিন একই স্থানে আছ। তিনি তোমার প্রতি কোনো আকর্ষণ অনুভব করেন না?’

পালেবত জবাব দিল, ‘জানি না। আমি তার আশ্রিতা মাত্র। আর তিনি অভিজাত ব্যক্তি।’

‘আর তুমি? তুমি কোনো আকর্ষণ বোধ করো না তাঁর প্রতি?’ আবারও প্রশ্ন করল বাঁদরী। কিন্তু এ প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না পালেবত।

পালেবত না জানলেও উচ্ছল কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারছে পালেবতের প্রতি তীব্র ভাবে আকর্ষিত হয়ে পড়ছে সে। সারা দিন নানান কাজের ফাঁকে যখনই অবসর মেলে তখনই তার মনে পড়ে ওই সুন্দরী যুবতীর কথা। তার মুখমণ্ডল, উন্মুক্ত বাহু, পিনোন্নত বক্ষ ফুটে ওঠে তার চোখে। উচ্ছল অনুভব করতে পারছে তার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা এক পুরুষ ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করেছে। সে ভালোবাসা দিতে চায়, ভালোবাসা পেতে চায়, নারী শরীরের স্পর্শ পেতে চায়।

শুধু দুই রাত নয়, গত রাতেও সে একই ভাবে বসে থাকতে দেখেছে পালেবতকে। চাঁদের আলো পিছলে নামছিল তার শরীর বেয়ে। উচ্ছল তার অগোচরে দীর্ঘক্ষণ চেয়েছিল তার দিকে। তারপর পালঙ্কে ফিরে এসে তার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

গত কদিন ধরেই এমন ঘটনা ঘটছে। পালঙ্কে শুয়ে ঘুম আসতে চায় না উচ্ছলের। সে প্রতীক্ষা করে থাকে কখন অলিন্দে পালেবতের পায়ের ক্ষীণ শব্দ শুনতে পাবে সেজন্য। তারপর সে পালঙ্ক ছেড়ে উঠে নিঃশব্দে কপাট খুলে চেয়ে থাকে পালেবতের দিকে। উচ্ছলের মুহূর্তের পর মুহূর্ত কেটে যায় তার দিকে চেয়ে। তারপর এক সময় সে দ্বার বন্ধ করে পালঙ্কে ফিরে আসে।

এ রাতেও সে ঘটনার ব্যতিক্রম হল না। উচ্ছল এদিন জলগৃহে ফিরে এসেছিল, পালেবত জলপ্রাসাদ থেকে ফিরে আসার কিছু
পরেই। হয়তো বা পালেবতের যদি দেখা মেলে সে আকর্ষণেই। কিন্তু বৈকালে দীর্ঘ সময় অলিন্দে দাঁড়িয়ে থাকার পরও পালেবতের সাক্ষাৎ পায়নি উচ্ছল। তারপর অন্ধকার নামল, রাতও হল। পালঙ্কে শুয়ে পড়ল উচ্ছল।

পালঙ্কে শোওয়ার পর উচ্ছল প্রথমে অন্য একটি কথা নিয়ে ভাবছিল। এই উপত্যকা নগরীতে দুটি স্থানকে মানুষেরা এড়িয়ে চলে। তার একটি হল যে পর্বতে খার্খদ মাতঙ্গী থাকে। আর অপর স্থানটি হচ্ছে এই দল হ্রদের দক্ষিণ অংশে মশান ভূমি, যে স্থানে যুগ যুগ ধরে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তিদের দণ্ড কার্যকর করে আসে জল্লাদরা। বিশেষত এ দুই স্থানের ধারে-কাছে রাত্রিকালে কেউ যায় না।

আগামীকাল রাতে সেই মশান ভূমিতেই যেতে হবে উচ্ছলকে। কারণ, মহামন্ত্রী সে স্থানে গোপন সভা আহ্বান করেছেন। এদিন রাজসভা ভঙ্গ হওয়ার পর সভাসদ অভিমন্যু এ বার্তা পৌছে দিয়েছে উচ্ছলের কাছে। এ ব্যাপারটা নিয়েই অন্ধকার কক্ষে শুয়ে প্রথমে ভাবছিল সে। কিন্তু রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে এ ভাবনা তার মন থেকে ধীরে ধীরে মুছে গিয়ে মনে হতে লাগল পালেবতের কথা। কখন শোনা যাবে তার পদশব্দ? প্রতীক্ষা করতে লাগল উচ্ছল।

তারপর এক সময় সত্যিই এক লঘু পদশব্দ শোনা গেল অলিন্দে। তা শুনে পালঙ্কে উঠে বসল উচ্ছল। সামান্য কিছু সময় অতিবাহিত করল সে পালেবত যাতে যথাস্থানে গিয়ে বসে সেজন্য। তারপর সে উঠে গিয়ে সন্তর্পণে দ্বার উন্মোচন করে বাইরে বেরোল। হ্যাঁ, পালেবত জলের কিনারে গিয়ে বসেছে। তবে আজ সে সোপানের বিপরীত দিকে বসেছে।

উচ্ছলের দ্বার প্রান্ত থেকে তার শুধু পদযুগলই চোখে পড়ছে। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর পালেবতের মুখ মণ্ডল প্রত্যক্ষ করার জন্য উচ্ছল পা বাড়াল তার দ্বারের এক পাশে। এবার তার উন্মুক্ত বাহু দুটো দৃশ্যমান হল মুখশ্রী নয়। চন্দ্রালোকে পালেবতের মুখমণ্ডল দেখার আকর্ষণে আরও কিছুটা সরে দাঁড়াতে গেল উচ্ছল। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটল। নৈশাহার সাঙ্গ হবার পর পাত্রগুলো কক্ষের বাইরে সে স্থানে রাখা ছিল আর অসাবধানতা বসত তার উপরেই পা পড়ে গেল উচ্ছলের। ঝনঝন শব্দে বেজে উঠল পাত্রগুলো। সেই শব্দে চমকে উঠে ফিরে তাকাল পালেবত। সে দেখতে পেল উচ্ছলকে অথবা তার ছায়াকে। সঙ্গে সঙ্গে সে দ্রুত উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল, কিন্তু দ্রুত উঠতে গিয়ে কীভাবে যেন তার পদস্থলন হয়ে গেল। সোপানের কিনার থেকে সে ছিটকে পড়ল জলে!

উচ্ছল ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না সে মুহূর্তে তার কী করা উচিত! সে কি কক্ষে প্রবেশ করবে? কিন্তু এর পরই সে দেখতে পেল জল ছেড়ে পালেবত ওপরে উঠতে পারছে না। এর কারণটা অবশ্য উচ্ছল বুঝতে পারল না। সে দেখল পালেবত পাটাতনের কিনার আঁকড়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছে। পালেবত যে স্থানে জলের ভিতরে যদিও সে স্থানে জলের গভীরতা এক মানুষের বেশি নয়, তবুও উচ্ছলের মনে হল পালেবতকে যদি জল থেকে উদ্ধার করা না যায় তবে বিপদ হতে পারে।

উচ্ছল মুহূর্তের মধ্যে তার কর্তব্য স্থির করে নিল। মনের সব দ্বিধা-দন্দ্ব কাটিয়ে সে দ্রুত এগোল সেদিকে। পালেবত এখন আপ্রাণ চেষ্টা করছে যাতে সে জলে তলিয়ে না যায় সে জন্য। সোপান বেয়ে নীচে জলের কিনারে নেমে বার কয়েকের চেষ্টাতে উচ্ছল আঁকড়ে ধরতে সক্ষম হল পালেবতের হাত। তারপর তাকে টেনে তুলল ওপরে।

অলিন্দে উঠে এল তারা দুজন। তারপর মুখোমুখি দাঁড়াল। পালেবতের শরীর সম্পূর্ণ জলে ভেজা। জল ঝরছে তার শরীর বেয়ে। মাথা নিচু করে দাঁড়াল সে। তাকে কী কথা বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না উচ্ছল। হঠাৎই উচ্ছলের দৃষ্টি পড়ল পালেবতের শরীরের ওপর। সিক্ত মসৃণ রেশমবস্ত্র লেপ্টে আছে তার শরীরের সঙ্গে। স্পষ্ট হয়ে আছে তার বিম্ব ফলের মতো বর্তুলাকার স্তন যুগল। তাদের শীর্ষে জেগে থাকা পদ্মকুঁড়ির মতো তীক্ষ্ণ স্তন বৃন্ত, বুকের আরও খানিকটা নীচে গভীর নাভিকূপ! ভেজা পোশাকের নিম্নভাগের একটা অংশ অবিন্যস্ত ভাবে কিছুটা ওপরে উঠে এসেছে। তার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে পালেবতের শুভ্র বাম উরু। চাঁদের আলোতে পালেবতের শরীরের প্রতিটা বাঁকই যেন দৃশ্যমান। কাশ্মীর সুন্দরীর সিক্ত শরীরের দিকে চেয়ে উচ্ছলের মনে হতে লাগল তার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে যেন কোনো সাধারণ নারী নয়।

গল্পগাথায় লোকে বলে দল হ্রদে নাকি জলপরীরা থাকে! চাঁদনি রাতে তারা জল থেকে উঠে আসে। উচ্ছলের মনে হল জ্যোৎস্না মেখে সিক্ত দেহে তার সামনে কোনো জলপরী দাঁড়িয়ে আছে। পালেবতের থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারল না সে। পালেবত একই রকম নিশ্চুপ ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। তার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে উচ্ছলের মনের ভিতর ঘুমিয়ে থাকা আরও এক উচ্ছল এরপর জেগে উঠতে শুরু করল।

উচ্ছলের মনে হতে লাগল পালেবতের ওই উন্মুক্ত বাহু যুগল, উদ্ভিন্ন স্তনযুগল, সিক্ত শুভ্র উরু—এ সবই যেন আহ্বান জানাচ্ছে তাকে পালেবতের শরীরটাকে আলিঙ্গন করার জন্য। উচ্ছলের ধমনী বেয়ে দুর্বার গতিতে ছুটতে শুরু করেছে উষ্ণ রক্ত প্রবাহ। যাকে অস্বীকার করা এই মুহূর্তে কঠিন। রক্তের আহ্বান। যে আদিম আহ্বান পুরুষ নারীর মিলন ঘটায়।

১৮

উচ্ছল পরদিন যখন তার জলগৃহ ত্যাগ করে রাজসভার উদ্দেশে রওনা হল তখনও পালেবতের কক্ষের দ্বার বন্ধ। ভোরবেলা ঘুম ভাঙার পর থেকেই উচ্ছল কখনও বিস্ময় বোধ করেছে আবার কখনও লজ্জা বোধ করেছে গতরাতের ঘটনাটা ভেবেই। এক এক সময় তার মনে হচ্ছে ঘটনাটা সত্যি নয়, পুরোটাই একটা সুন্দর স্বপ্ন অথবা দুঃস্বপ্ন।

সর্বক্ষণ আগের রাতের ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে উচ্ছল রাজসভা গৃহতে এসে জানতে পারল সভা বসবে না। মহারাজের নিদ্রা ভঙ্গ হয়নি আর তার প্রতিনিধি দুই দেবী ব্যস্ত রয়েছেন মহারাজের দল হ্রদ যাত্রা সংক্রান্ত নানান কাজে। মহারাজ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাবেন বলে কথা! তার প্রস্তুতি তো কম নয়। নানান ধরনের উপকরণ যাবে মহারাজের সঙ্গে যাতে তাঁর স্বাচ্ছন্দ্যের কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।

সভাগৃহ ত্যাগ করে যখন উচ্ছল অস্ত্র রাখার স্থানের দিকে এগোচ্ছিল তখন তার পাশ দিয়ে যাবার সময় সভাসদ অভিমন্যু এদিন রাতের নৈশ অভিযানের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য বলে গেলেন, ‘সাক্ষাৎ হবে।’

পালেবত উচ্ছলের মনকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে উচ্ছল যেন শুনতেই পেল না তার কথা। কোনো প্রত্যুত্তর দিল না সে।

একই কথা ভাবতে ভাবতে সে স্থান ত্যাগ করে অশ্বপৃষ্ঠে উচ্ছল রওনা হল তার কার্যালয়ের দিকে। কার্যালয়ে এদিনও বিশেষ কোনো কাজ ছিল না। একলা কক্ষে বসে ভাবতে ভাবতে গত রাতের ঘটনাটা যেন আরও বেশি আচ্ছন্ন করে ফেলল তাকে। চোখ বন্ধ করলেই সে দেখতে পেতে লাগল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সিক্ত বসনা কাশ্মীর সুন্দরী পালেবত! মনে হতে লাগল নারী শরীর স্পর্শর সেই আশ্চর্য সুন্দর অনুভূতি যেন সে এখনও অনুভব করতে পারছে।

উচ্ছলের ভিতর ঘুমিয়ে থাকা পুরুষের ঘুম ভেঙে গেছে। সে পুরুষ সকল জীবন প্রবাহের উৎস, সৃষ্টির উৎস। এ অনুভূতি এভাবে যখন উচ্ছলের মনকে প্লাবিত করতে লাগল তখন যেন এক আশ্চর্য ভালোলাগা ঘিরে ধরতে লাগল তাকে। তার মন এখন তাকে বলতে লাগল, যা ঘটেছে তা তো স্বাভাবিক, তাইতো ঘটার ছিল। কিন্তু এরপরই আবার তার মাথায় অন্য একটা ভাবনা আসায় সে সংকুচিত, লজ্জিত বোধ করতে লাগল। সে সময় তার মনে হতে লাগল তার আচরণে কী ধারণা হয়েছে পালেবতের? উচ্ছল একজন কামুক, লম্পট? অসহায় এক নারীকে একলা পেয়ে সে তাকে ধর্ষণ করতে উদ্যত হয়েছিল? আশ্রয়হীন এক নারীকে আশ্রয় দানের আড়ালে আসলে কি উচ্ছলের মনে তাকে সম্ভোগ করার বাসনাই বর্তমান? সব ভাবনা মিলেমিশে এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করতে লাগল উচ্ছলের মনে।

সময় এগিয়ে চলল। একবার তার মনে হল সে গৃহে ফিরে যাবে, কিন্তু পরক্ষণে তার মনে হল, গৃহে ফিরে যদি সে পালেবতের মুখোমুখি হয়ে যায়! সে যদি গত রাতে তার আচরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করে তবে উচ্ছল কী জবাব দেবে তাকে? তার জন্য তো জবাব প্রস্তুত করতে হবে তাকে। কাজেই উচ্ছল গৃহের উদ্দেশে রওনা হল না। সময় যেন অদ্ভুতভাবে অতিবাহিত হয়ে চলল। মধ্যাহ্ন, অপরাহ্ন অতিক্রান্ত হল।

উচ্ছলের কক্ষের গবাক্ষ দিয়ে বাইরের বেশ অনেকটা অংশ চোখে পড়ে। তার কার্যালয়ের চারপাশে আরও বেশ কিছু কার্যালয় আছে। হঠাৎ সে দেখতে পেল মহামন্ত্রী যশঙ্করকে। অশ্বপৃষ্ঠে কয়েকজন দেহরক্ষী পরিবৃত হয়ে কোনো কর্মপোলক্ষে তিনি কোনো কার্যালয়ে যাচ্ছেন। তাকে দেখে উচ্ছলের মনে পড়ল রাত নামলে তার আহ্বানে আজ তাকে সেখানে যেতে হবে। সে সিদ্ধান্ত নিল সেই গোপন আলোচনা সম্পূর্ণ করেই সে গৃহে প্রত্যাবর্তন করবে। তবে তার মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত থাকলেও তার নতুন পোশাক পরিধান করার প্রয়োজন নইলে কোনো বিপত্তি ঘটতে পারে। এ সমস্যা দূর করার উপায়ও সে ভেবে নিল। সূর্য যখন পাহাড়ের আড়ালে মুখ লুকানো শুরু করল তখন উচ্ছল কার্যালয় ত্যাগ করে রওনা হল দল হ্রদের দিকে।

দল হ্রদের কাছেই এক স্থানে বিপনির সমারোহ আছে। প্রথমে সে স্থানে পৌঁছে এক বস্ত্র বিপনি থেকে সারা শরীর আচ্ছাদিত হয় এমন এক পোশাক ক্রয় করল সে। মুখমণ্ডল আবৃত করার জন্য উড়নিও ক্রয় করল। এ কাজ শেষ করার পর সে দল হ্রদের তীরে অস্ত্রশালাতে অস্ত্র রেখে যখন জলের কিনারে এসে দাঁড়াল ঠিক তখনই অন্ধকার নামতে শুরু করল হ্রদের বুকে। সে স্থানে দাঁড়িয়ে সে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল অন্ধকার আরও গাঢ় হবার জন্য।

পালেবতের ভাবনা কিন্তু তার পিছু ছাড়েনি। বারবার তার মনে হতে লাগল সারাদিন ধরে ভেবে চলা কথাগুলো। বিন্দু বিন্দু আলো জ্বলে উঠতে শুরু করল দল হ্রদের ভাসমান জলগৃহগুলিতে। যদিও তাদের আয়ু বেশিক্ষণের নয়, অন্ধকার নামার পর নিদ্রা যেতে বেশি সময় নেন না দলহ্রদের বাসিন্দারা। উচ্ছল তার শিকারা নিয়ে ভেসে পড়ল দল হ্রদে। তার গন্তব্য হ্রদের অপর পাড়েই সেই বধ্যভূমি।

জলে নামার পর খানিক সময় ধরে ইচ্ছাকৃত ভাবেই দল হ্রদের এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ালো উচ্ছল। যাতে কোনো গুপ্তচর অনুসরণ করলে সে বিভ্রান্ত হয়। বিন্দু বিন্দু আলো জ্বলছে জলগৃহগুলিতে। তবে দূর থেকে হ্রদের এক অংশ আলোকিত দেখাচ্ছে। যে স্থানে মহারাজের জলপ্রাসাদ অবস্থান করছে। অনেকগুলো মশাল জ্বালানো হয়েছে তার শীর্ষদেশে। ও তারই আলো। একসময় যখন ধীরে ধীরে চাঁদ উঠতে শুরু করল তখন উচ্ছল রওনা হল হ্রদের এক কিনারে অবস্থিত মশানের দিকে। স্থান মাহত্ম্যের কারণে হ্রদের এ কিনারের আশেপাশে কোনো জলগৃহ নেই। চিনার গাছের দল শ্মশান ও হ্রদের মধ্যে একটা বিভাজন রেখা তৈরি করেছে। স্থলপথেও এ স্থানে আসা যায়, কিন্তু তা আসতে হলে অন্তত দশ ক্রোশ পথ অর্ধবৃত্তাকারে হ্রদকে অতিক্রম করে আসতে হয়।

পাড়ের কাছে পৌঁছে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে রাখা বেশ কয়েকটা শিকারা নৌকা দেখতে পেলও উচ্ছল। অর্থাৎ ইতিমধ্যেই কেউ কেউ এসে উপস্থিত হয়েছেন এখানে। উচ্ছল প্রথমে পাড়ের কিছুটা তফাতে দাঁড়াল। নিজের পোশাকের ওপরই নতুন কেনা পোশাক পরে নিল সে। উড়নি দিয়ে মাথা-মুখও ভালোভাবে আচ্ছাদিত করে নিল। তারপর নৌকা পাড়ে ভিড়িয়ে তা থেকে নেমে মশানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার জন্য এগোল সে। ঠিক সেই সময়ই কাছেই কোথা থেকে যেন একদল শৃগাল ডেকে উঠল। তারা যেন এই অশুভ স্থানে অভ্যর্থনা জানাল উচ্ছলকে।

কিছুটা এগোবার পরই চারপাশে চিনার গাছে ঘেরা এক উন্মুক্ত স্থানে এসে উপস্থিত হল উচ্ছল। সেটাই মশান-বধ্যভূমি। রাজ নির্দেশে যুগ যুগ ধরে এ স্থানে কত মানুষের যে মুন্ডুচ্ছেদ করা হয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। এমনকী বেশকিছু রাজাকেও এ স্থানে নতুন রাজার নির্দেশে মুণ্ডুচ্ছেদ করা হয়েছিল তাঁরা সিংহাসনচ্যুত হওয়ার পর।

চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে মশানে। শূন্য ভূমির কেন্দ্রস্থলে একটা উঁচু পাথরের বেদি আছে, যার ওপর ঘাতক দন্ডাদেশ কার্যকর করে। চাঁদের আলোতে উচ্ছল দেখতে পেল সেই বেদির ওপর কয়েকজন লোককে। এ স্থানে আচম্বিতে উপস্থিত হয়ে কেউ যদি তাদের দেখে তবে নিশ্চিত ভাবে প্রেতাত্মা বলে মনে করবে। সম্ভবত এ কারণেও এ স্থান আলোচনা করার জন্য নির্ধারণ করেছেন মহামন্ত্রী। উচ্ছল এগোল সেই বেদির দিকে। বেদির কাছে পৌঁছতেই উপর থেকে যশঙ্করের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘ওপরে উঠে আসুন।’

সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে ওপরে উঠে এল উচ্ছল। মহামন্ত্রী ছাড়াও আরও তিনজন লোক ইতিমধ্যেই সে স্থানে এসে উপস্থিত হয়েছে। বেদির ওপরে উঠে তাদের সঙ্গে উপবেশন করার পর হঠাৎই কিছুটা তফাতে একপাশে বেশ কিছু নরকরোটি দেখতে পেল উচ্ছল। চাঁদের আলোতে তারা শূন্য অক্ষিকোটর নিয়ে যেন তাকিয়ে আছে উচ্ছলদের দিকে। উচ্ছলের দৃষ্টি সেই করোটিগুলোর ওপর পড়েছে দেখে মহামন্ত্রী বললেন, ‘ওই করোটিগুলোর মধ্যে সেই পাঁচ বৌদ্ধ শ্রমনের মুন্ডুও আছে। যাদের রাজদ্রোহী বলে মিথ্যা সন্দেহবশত ললিতাপীড় মুন্ডুচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওখানেই আছে নিরপরাধ খাজাঞ্চি সেই কুবেরের মুন্ডু—রাজকোষ থেকে বিটপীর চুরি করা স্বর্ণর দায় যার ওপর বর্তেছিল। ওর মধ্যে একটা হল সেই নিরপরাধ ভিনদেশি সুপুরুষ যুবকের করোটি। যে মুক্তবেণীর কামের আগুনে নিজেকে সমর্পণ না করাতে মিথ্যা অপবাদে এই বধ্যভূমিতে এসে উপস্থিত হয়।’

তীব্র ক্ষোভের কথাগুলি বললেন মহামন্ত্রী। এরপর আরও কিছুক্ষণ সময় নিশ্চুপভাবে বসে রইল সবাই। এই বধ্যভূমিতে বসেও উচ্ছলের মনে পড়তে লাগল পালেবতের কথা। এমনই উচ্ছলকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে গত রাতের ঘটনা। এরপর আরও দুজন আবির্ভূত হলেন মশানে। হ্রদের উল্টো দিক থেকে একজন এলেন অশ্বপৃষ্ঠে, অন্যজন পদব্রজে। তারা দুজন বেদিতে এসে উপবেশন করার পর মহামন্ত্রী বললেন, ‘আজ আর আপনাদের নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার প্রয়োজন বোধ করছি না। কারণ ইতিমধ্যেই কেউ কেউ অন্য কারোর পরিচয় জেনে গেছেন। তাছাড়া আমার মনে হচ্ছে আজ সকলের সঙ্গেই সকলের পরিচয় হওয়া প্রয়োজন। তাতে আমাদের সংবাদ আদান-প্রদানে সুবিধা হবে। চন্দ্র পর্বতের সভার পর ইতিমধ্যেই বেশ কিছুকাল অতিক্রান্ত হয়ে গেছে আর ইতিমধ্যেই আমি আপনাদের প্রত্যেকের সঙ্গে পৃথক পৃথক ভাবে বাক্যালাপ করেছি। আর তাতে আমার এ বিশ্বাস জেগেছে যে আমরা আজ যারা এখানে উপস্থিত হয়েছি, আমাদের একে অপরকে অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।

দলপতির কথা শোনার পর একে একে প্রত্যেকেই তাদের মুখমণ্ডল উন্মোচন করলেন। উচ্ছলও করল। সে দেখল তার পাশে বসে আছেন মন্ত্রী বিদুরদেব, সভাসদ অভিমন্যু, বৃদ্ধ রাজপুরোহিত ব্রহ্মদেব ও আরও দুজন অপরিচিত ব্যক্তি। সে দুজনের মধ্যে একজনের মুন্ডিত মস্তক দেখে উচ্ছল অনুমান করল যে ব্যক্তিটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হবেন। মুখমণ্ডল উন্মোচনের পর মহামন্ত্রী সভার অন্যদের সঙ্গে শেষোক্ত দুই ব্যক্তির পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাদের একজনের নাম মুষিক। সে রাজপ্রসাদের ভৃত্যর কাজ করে। তার পিতা ছিলেন একজন ডামর বা সম্পন্ন কৃষক। ফসল উৎপাদনের জন্য অনেক সময় ডামরেরা রাজকোষ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। ফসল উৎপাদনের পর তা দ্বিগুণ পরিমাণে ফেরত দেয়। তেমন ঋণ গ্রহণ করেছিল মুষিকের পিতা। কিন্তু সেবার হঠাৎ বসন্তেও তুষারপাতের ফলে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি সেই ডামর, এবং তার মৃত্যু ঘটে।

দুর্ভিক্ষের সময় অথবা তুষারপাতের ফলে ফসল উৎপাদিত না হলে ইতিপূর্বে কাশ্মীরের মহারাজরা কৃষকদের ঋণ মুকুব করতেন কিন্তু মহারাজ ললিতাপীড়ের রাজত্বে সে প্রথার অবলুপ্তি ঘটানো হয়েছে। তাই বর্তমান মহারাজের নির্দেশে পিতৃঋণ পরিশোধের জন্য মুষিককে বিনা বেতনে গত পাঁচ বৎসর যাবত রাজপ্রাসাদে ভৃত্যর কাজ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ বর্তমানে সে ক্রীতদাসের জীবন যাপন করছে। আর উচ্ছলের অনুমানই ঠিক। মুন্ডিত মস্তক ব্যক্তিটি হলেন এক বৌদ্ধ শ্রমন নাম স্কন্ধদত্ত। ললিতাপীড়ের নির্দেশে যে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হত্যা করা হয় তিনি হলেন সেই দলের একমাত্র জীবিত সদস্য। মহারাজের সেনাদল যখন বৌদ্ধ মঠে অগ্নি সংযোগ ও শ্রমনদের এই বদ্ধভূমিতে নিয়ে আসার জন্য মঠে উপস্থিত হয়েছিল, তখন তাদের হাত থেকে কোনো উপায়ে পালিয়ে আসেন। নিজের জীবন রক্ষা করেন স্কন্ধদত্ত। বর্তমানে তিনি অজ্ঞাতবাসে আছেন। তাঁর আশ্রয়স্থলের কথা একমাত্র জানেন মহামন্ত্রী।

মুষিক ও স্কন্ধদত্তের পরিচয় দানের পর সভার কাজ শুরু হল মহামন্ত্রী যশঙ্করের সভাপতিত্বে। তিনি সবার উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন, ‘মহারাজ তো জলপ্রাসাদে গমন করতে চলেছেন। আপনাদের কারও কাছে এ প্রসঙ্গে কোনো সংবাদ আছে কি?’

মুষিকই প্রথম মুখ খুলল। সে বলল, ‘মহারাজ দল হ্রদে যাবেন বলে সারা প্রাসাদে নানান প্রস্তুতি শুরু হয়েছে তবে অধিক সংখ্যাতে ভৃত্য-পরিচারিকারা মহারাজের সেবার জন্য জলপ্রাসাদে যাবে না। কারণ সেখানে স্থান সীমিত। জলপ্রাসাদে ভৃত্য-ভৃত্যাদের যাতে অভাব না ঘটে সেজন্য বিটপী দল হ্রদে স্থানীয় কিছু বাসিন্দাদের নিয়োগ করবে বলে শুনেছি। যারা নতুন স্বর্ণ সেবিকা হতে চলেছে তাদেরও নাকি জলপ্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের অবশ্য একটাই কাজের জন্য নিয়োজিত করা হবে। আমার সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য যে আমাকেও রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে মহারাজের জলপ্রাসাদে যেতে হবে।’

এ কথা জানিয়ে হাসল সে। উচ্ছল বলল, ‘বিটপী যেদিন রাজসভায় এসেছিল সেদিন আমি গৃহে ফেরার পথে হ্রদের তীরে হঠাৎই তার মুখোমুখি হয়ে পড়েছিলাম। সে তখন কর্নিরথে সে স্থানে উপস্থিত হয়েছিল জলপ্রাসাদে ফেরার জন্য। সে আমাকে বলল, হ্রদেই আমার গৃহ বলে মহারাজ জলপ্রাসাদে অবস্থানকালে আমাকে তার প্রয়োজন হতে পারে। মহারাজ যেদিন জলপ্রসাদে যাবেন, তারপর দিন আমি যেন সে স্থানে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি।’

যশঙ্ককর জানতে চাইলেন, ‘আপনি কী জবাব দিলেন?’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘ইচ্ছা না থাকলেও যাব বলেছি। না বলার কোনো পথ আছে বলে তো মনে হয় না।’

মহামন্ত্রী বললেন, ‘ভালো করেছেন, কারণ আপনার আর মুষিকের মাধ্যমে জলপ্রাসাদে কী ঘটছে তা জানার সম্ভাবনা তৈরি হল। আমাদের তো সেই স্থানে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে আপনাকেও ওরা প্রাসাদে প্রবেশ করতে দেবে কি না সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে।’

মন্ত্রী বিদুরদেব বললেন, ‘হ্যাঁ মহারাজ ও তাঁর বেশ্যাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া কাউকে নাকি জলপ্রাসাদে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। যারা প্রাসাদে প্রবেশের অধিকারী তাদের মধ্যে দুজনের কথা আমি শুনেছি—কম্পনধিপতি গরুড় ও ভাঁড় কূপমণ্ডূক। আমি চেষ্টা করেছিলাম মহারাজ সম্পর্কে তার মনোভাব জানতে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। সেনাপতি শুধু রাজ সিংহাসন চেনে। সিংহাসনে যে থাকবে সে তারই আজ্ঞাবহ। আগে ছিল পূর্বতন মহারাজের, এখন বর্তমানের আর ভবিষ্যতে যদি অন্য কেউ সিংহাসনে বসেন তখন তাঁরই নির্দেশ পালন করবেন তিনি। দেখুন যদি কূপমূণ্ডকের মাধ্যমে প্রাসাদের অভ্যন্তরের কোনো খবর সংগ্রহ করা করতে পারেন আপনারা।’

কথাটা শুনে উচ্ছল বলল, ‘সে সম্ভাবনা আর আছে বলে মনে হয় না। যেকোনো কারণেই হোক সে আর আমার সম্পর্কে আগ্রহী নয়। জানি না তার পেছনে কারণ কী।’

যশঙ্কর এরপর রাজপুরোহিত ব্রহ্মদেবের উদ্দেশে বললেন, ‘আপনি বয়ঃজ্যেষ্ঠ। আপনার কোনো পরামর্শ থাকলে বলুন।’

বৃদ্ধ বললেন, ‘আপনার অনুরোধ মতো আমি চেষ্টা করেছিলাম ওই অসহায় নারীদের মহারাজার হাত থেকে রক্ষা করার কিন্তু দেখলেন তো ওই শয়তানি নারী বিটপী নিজেই স্বর্ণ সেবিকাদের সমর্পণের দিন ঘোষণা করে দিল। প্রথা অনুসারে আমাকেই ওইদিন রমণীদের শপথ বাক্য পাঠ করাতে হবে। আপনারা নির্দেশ দিলে আমি ওই দিন অসুস্থতার অভিনয় করে রাজসভাতে অনুপস্থিত থাকতে পারি। আর সহ্য হচ্ছে না। আমি বৃদ্ধ হয়েছি। আপনাদের সবার কাছে আমার একটাই অনুরোধ, মৃত্যুর আগে আমি যেন দেখে যেতে পারি এই পাপাচারী ললিতাপীড় আর তাঁর বেশ্যাকুল ধ্বংস হয়েছে। তার জন্য আমাকে যা করতে হবে তা বলবেন।

রাজ পুরোহিতের কথা শুনে মন্ত্রী বিদুরদেব বললেন, ‘আপনার অনুপস্থিতিতে স্বর্ণ সেবিকাদের সমর্পণের কাজ স্তব্ধ হয়ে যাবে বলে মনে হয় না। ওই বেশ্যারাই তাদেরকে শপথ বাক্য পাঠ করাবে। বরং আপনি অনুপস্থিত থাকলে মহারাজ ও তাঁর অনুচরদের মনে আপনার প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। তাতে আমাদের সমস্যা বাড়বে বই কমবে না।’

মন্ত্রী বিদুরদেবের কথায় মাথা নেড়ে সমর্থন জানালেন মহামন্ত্রী।

মুন্ডিত মস্তক শ্রমন ততক্ষণ নিশ্চুপভাবে তাকিয়ে ছিলেন কিছুটা তফাতে স্তূপাকৃত হয়ে থাকা তার হতভাগ্য সঙ্গীদের করোটিগুলোর দিকে। তিনি এবার মুখ খুললেন। শ্রমন স্কন্ধদত্ত বললেন, ‘আমরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা অহিংসার পূজারী। এই পবিত্র ভূমিতে হাজার বছর ধরে আমরা বৌদ্ধরা আপনাদের শৈবদের পাশাপাশি থেকে আমাদের ধর্ম প্রচার করেছি, ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করেছি। আমরাও কাশ্মীর রাজ্যের প্রজা বলে কোনো কোনো মহারাজারা নিজেরা শৈব ধর্মাবলম্বী হয়েও আমাদের জন্য মঠ-চৈত্য নির্মাণ করে দিয়েছিলেন, ধর্ম মহাসভার আয়োজন করে দিয়েছিলেন। কোনো কোনো সময় যে দুই ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়নি এমনটা নয়, হয়তো কোনো সময় রক্তপাত ঘটেছে, কিন্তু মহারাজ ললিতাপীড়ের মতো কেউ বিনা কারণে কোনো সংঘাতের বাতাবরণ ছাড়াই নির্বিচারে বৌদ্ধ শ্রমণদের হত্যা করেনি। শুধু আমরা বৌদ্ধরাই নয়, স্বধর্মের লোকেদেরও নির্বিচারে হত্যার আদেশ দিয়েছেন ললিতাপীড়। ওই স্তূপাকৃত নরমুন্ডুগুলোই তার প্রমাণ। জাতক কাহিনিতে আছে নিরপরাধ মানুষ পশু পাখি রক্ষার জন্য স্বয়ং ভগবানকেও পূর্ব জন্মে অস্ত্র ধারণ করতে হয়েছিল। তাই হন্তারক ললিতাপীড়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতেও আমার আপত্তি নেই। আপনারা যদি কোনো ভাবে আমাকে অস্ত্রসহ তার কাছেও উপস্থিত হবার ব্যবস্থা করতে পারেন তবে আমি তাঁকে হত্যা করতে পারি।’

সভাসদ অভিমন্যু এতক্ষণ ধরে সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। এবার তিনি বললেন, ‘আপনারা কিন্তু কেউই বললেন না, কী কৌশলে তাঁর কাছে হত্যাকারী পৌঁছবে বা তাঁকে হত্যা করবে। আপনাদের মতো আমারও ঠিক এই মুহূর্তে জানা নেই তাঁকে হত্যা করার পন্থা। তবে এই কাজ আমাদের সম্পন্ন করতে হলে দল হ্রদই হল প্রাসাদ অপেক্ষা সুবিধাজনক স্থান। কারণ, যতই হোক স্থলভাগ বা রাজপ্রাসাদের মতো নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনের ব্যবস্থা জলভাগে করা সম্ভব নয়। আর চূড়ান্ত লাম্পট্য স্রোতে অবগাহন করার জন্য মহারাজ কিছুটা অসতর্কও থাকবেন জলপ্রাসাদে অবস্থানকালে। তিন বেশ্যার মধ্যে দুই বেশ্যা কখনও কখনও দল হ্রদে মহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেও তারা স্থলভাগেই অবস্থান করবে। কাজেই তাদের দুজনের শ্যেনদৃষ্টি থেকে জলপ্রাসাদ মুক্ত থাকবে। আমাদের মহারাজকে আর জলপ্রাসাদ থেকে ফিরতে দেওয়া যাবে না। যা করতে হবে আমাদের এখানেই করতে হবে।’

মন্ত্রী বিদুরদেব বললেন, ‘কোনোভাবে যদি রাতের অন্ধকারে জলপ্রাসাদে অগ্নিসংযোগ করা যায় তবে প্রাসাদ সহ মহারাজের সলিল সমাধি ঘটানো যেতে পারে। রজন-গালার নতুন প্রলেপ পড়েছে প্রাসাদে। সহজেই তা জ্বলে উঠবে।’

কীভাবে তা করা যেতে পারে প্রশ্ন করলেন মহামন্ত্রী। মন্ত্রী বিদুর জবাব দিলেন, ‘দূর থেকে জ্বলন্ত শর নিক্ষেপ করা যেতে পারে।’

ব্রহ্মদেব বললেন, ‘শুনেছি মহারাজ নাকি কোনো কোনো সময় জলপ্রাসাদ ত্যাগ করে বিটপীর প্রমোদ তরীতে ভ্রমণ করেন। সে তরীতে নারীদের সম্ভোগ করেন। সেসময় তাঁর নিরাপত্তা আরও কিছুটা হ্রাস পাবে। ওই সময় একযোগে হানা দিয়ে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা যেতে পারে।’

উচ্ছল ছাড়া সভায় উপস্থিত অন্য সবাই এরপর মহারাজকে হত্যার কৌশল সম্পর্কে নিজের চিন্তা অনুসারে মতামত দেবার চেষ্টা করতে লাগলেন। প্রস্তাবের সাফল্য ব্যর্থতার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা শুরু হল কিন্তু তারই মাঝে উচ্ছলের মনে আবারও ভেসে উঠতে লাগল পালেবতের মুখচ্ছবি। আবার সে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল পালেবতের ভাবনায়, গত রাতের ঘটনা সংক্রান্ত ভাবনায়। তার কান থেকে যেন মুছে গেল অন্য সকলের কথাবার্তা।

দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করার পরও ঠিক কীভাবে ললিতাপীড়কে হত্যা করা যাবে তার পরিকল্পনা রচনা করা সম্ভব হল না। তবে সভায় উপস্থিত অন্য সবাই এ বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছাল যে, যা করার তা এই দল হ্রদেই সংঘটিত করতে হবে। প্রহর গোনা শৃগালের দল একসময় ডেকে উঠল। তাই মহামন্ত্রী যশঙ্কর এ দিনের মতো সভা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সভা শেষ করার আগে তিনি বললেন, ‘আমরা মহারাজকে হত্যা করার জন্য যে পন্থাই গ্রহণ করি না কেন তার জন্য মুষিক এবং সভাসদ উচ্ছলকে প্রাথমিকভাবে অন্যদের তুলনায় কিছুটা অধিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। কারণ আপনারাই জলপ্রাসাদ সংক্রান্ত মহারাজের অবস্থান ও গতিবিধির খবর পৌঁছে দিতে পারবেন আমাদের কাছে। বহুক্ষণ পর উচ্ছলের কর্ণকুহরে নিজের নাম প্রবেশ করাতে এবার চিন্তা জাল ছিন্ন হল উচ্ছলের। তবে তার কানে নিজের নামটাই শুধু প্রবেশ করেছে অন্য কথা প্রবেশ করেনি। একটু অপ্রস্তুতভাবে সে মহামন্ত্রীকে প্রশ্ন করল, ‘আমাকে কিছু বললেন?’

মহামন্ত্রী আবার পুনরাবৃত্তি করলেন তাঁর বক্তব্য। তারপর তিনি সভা ভঙ্গ করে বললেন, ‘এবার আপনারা একে একে সবাই প্রস্থান করুন। একযোগে কেউ যাবেন না। তাতে চরেদের নজরে পড়ে যেতে পারেন। সবার শেষে আমি স্থান ত্যাগ করব।’

যশঙ্করের নির্দেশমতো একে একে অন্যরা মশান ত্যাগ করতে শুরু করল। উচ্ছল বসে রইল সেখানে। কারণ তার গৃহ দল হ্রদেই। গৃহে ফিরতে তার বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। অন্যরা সবাই মশান ছেড়ে চলে যাবার পর যশঙ্কর নর করোটিগুলোর দিকে তাকিয়ে উচ্ছলকে বললেন, ‘আমরা যদি পরিকল্পনা রূপায়ণ করতে গিয়ে ব্যর্থ হই তবে হয়তো আমাদের মুন্ডুগুলোর স্থান ওখানেই হবে। চলুন এবার ফেরা যাক?’

বধ্যবেদি থেকে নেমে দুজনে এরপর হ্রদের দিকে হাঁটতে শুরু করল। নিশ্চুপভাবেই হেঁটে চলল উচ্ছল। হ্রদের কাছাকাছি পৌঁছে মহামন্ত্রী একসময় বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না এ প্রশ্ন করছি বলে, আপনাকে যেন আজ কোনো ব্যাপারে বড় চিন্তাক্লিষ্ট মনে হচ্ছে। আপত্তি না থাকলে আপনি আমাকে কথাটা বলতে পারেন। আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি কোনোভাবে আপনার ভাবনা লাঘব করা যায় কিনা?’

যশঙ্করের কথা শুনে একটু ইতস্তত করে উচ্ছল সত্যি কথাটা বলে ফেলল তাঁকে। সে বলল, ‘পালেবতের কথা তো আমি আপনাকে বলেইছি। কিন্তু ক’দিন ধরে সে যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছে আমার মনকে। সবসময় তারই কথা মনে পড়ে আমার। অন্য কোনো কাজে মনোনিবেশ করতে পারছি না।’

উচ্ছলের কথা শুনে মহামন্ত্রী জানতে চাইলেন, ‘আপনার সম্পর্কে তারও কি একই মনোভাব?’

‘জানি না’ জবাব দিল উচ্ছল।

যশঙ্কর একটু ভেবে নিয়ে এরপর বললেন, ‘আপনার মুখ থেকে তার সম্পর্কে যতটুকু ইতিপূর্বে শুনেছি তাতে সে আপনার সম্পর্কে যথেষ্ট যত্নবান বলেই মনে হয়েছে। নইলে ওভাবে কেউ আপনার জীবন রক্ষা করতে যেত না। তবে তা আপনার প্রতি তার প্রেমের বহিঃপ্রকাশ কি না তা আমার জানা নেই। তবে সেদিন যে কথাটা আপনাকে একটু মজার ছলে বলেছিলাম, সে কথাটা আজ আপনাকে সত্যিকারের পরামর্শ হিসেবে দিতে চাই। যদি আপনার মন হয়ে থাকে আর বিবাহ সংক্রান্ত ব্যাপারে কোনো আপত্তি না থাকে তবে আপনি তাকে একবার জিগ্যেস করে দেখতে পারেন যে সে আপনাকে বিবাহ করতে আগ্রহী কি না! এতে তার বক্তব্য স্পষ্ট হবে আপনার কাছে। আপনি পরবর্তীতে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। পালেবতের কথা শুনে আমার মনে হয়েছে যে, সে গৃহিণী হবার যোগ্যতা সম্পন্না। ব্যাপারটা আপনি ভেবে দেখতে পারেন।’

মহামন্ত্রী যশঙ্কর আর এরপর এ বিষয়ে কোনো কথা বললেন না। হ্রদের কিনারে পৌঁছে গেল তারা দুজন। পরস্পরের থেকে বিদায় নিয়ে নিজেদের শিকারাতে উঠে ভিন্ন অভিমুখে রওনা হয়ে গেল তারা। দল হ্রদের বাসিন্দারা তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। জলগৃহগুলোতে প্রদীপের আলো নিভে গিয়েছে। এমনকী, মহারাজের জলপ্রাসাদের আকাশে আলো দেখা যাচ্ছে না। তবে চাঁদের আলো আজ অনেকটাই স্পষ্ট। দুদিন পরেই তো পূর্ণিমা। মহামন্ত্রী যশঙ্কর তাকে যে পরামর্শ দিল তা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই জল কেটে এগোতে লাগল উচ্ছল। তার মনে হল সে যে সময় ফিরছে তাতে পালেবতের মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা নেই। রাত অনেকটাই বেড়েছে ঠিকই কিন্তু পালেবত কক্ষ ত্যাগ করে বাইরে আসে আরও অনেক গভীর রাতে। ঘুমন্ত জলগৃহগুলো অতিক্রম করে একসময় উচ্ছল পৌঁছে গেল তার জলগৃহের দিকে। শিকারা থেকে জলগৃহের অলিন্দে উঠতেই এসে দেখল সামনে অলিন্দর আলো আঁধারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে পালেবত! আচম্বীতে তাকে সামনে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার দিকে চেয়ে আছে পালেবত। উচ্ছল একটু ইতস্তত করে তাকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি আমায় কিছু বলতে চাও?’

পালেবত জবাব দিল, ‘না কিছু না। আপনার আজ ফিরতে বিলম্ব হচ্ছে দেখে চিন্তিত ছিলাম। তাই এ স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলাম।’ একথা বলে আর দাঁড়াল না পালেবত। উচ্ছলকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে পিছু ফিরে সে প্রবেশ করল তার কক্ষে। কপাট বন্ধ হয়ে গেল।

উচ্ছলও নিজের কক্ষে প্রবেশ করল, তারপর কিন্তু তার কানে বাজতে লাগল সদ্য শোনা কথাগুলো। তাহলে তার জন্যও প্রতীক্ষা করে থাকে কেউ! সে ফেরার কিছু সময়ের মধ্যে নৈশাহার দিয়ে গেল গুঞ্জা। আহার সাঙ্গ করে পালঙ্কে শোবার পরও পালেবতের বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে তার প্রতি ধীরে ধীরে এক আশ্চর্য অনুভূতির সৃষ্টি হতে লাগল উচ্ছলের মনে। না সে অনুভূতি যৌনতার অনুভূতি নয়, আদি অকৃত্রিম ভালোলাগার, ভালোবাসার অনুভূতি। উচ্ছল পালেবতের কথা ভাবতে ভাবতে প্রতীক্ষা করতে লাগল কখন তার পদশব্দ শোনা যায় সেজন্য। কিন্তু সে শব্দ মিলল না। পাছে যদি পালেবত কক্ষের বাইরে এসে থাকে এ কথা ভেবে একবার পালঙ্ক ছেড়ে উঠে সন্তর্পনে দাঁড় উন্মোচন করল উচ্ছল। কিন্তু পালেবতকে দেখতে পেল না সে। চাঁদের আলো শুধু খেলা করছে জলের কিনারের শূন্য শ্রেণীতে।

পরের দুটো দিন বড় দ্রুততার সঙ্গে কেটে গেল উচ্ছলের। পালেবতের ভাবনা যেন আরও গাঢ়ভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলল উচ্ছলের মনকে। তাকে একবার দেখার বাসনা তীব্রতর হয়ে উঠতে লাগল উচ্ছলের মনে। নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই সে দুদিন ঘরে ফিরে এল। সারাটা বিকাল অলিন্দে দাঁড়িয়ে তার প্রতীক্ষা করল, মধ্যরাতেও করল, সূর্যোদয়ের ভোরেও করল। কিন্তু তার উপস্থিতিতে পালেবত কক্ষ ত্যাগ করল না। তবে পালেবত যে সুস্থই আছে তা দ্বিতীয় দিন নৈশাহারের সময় গুঞ্জাকে প্রশ্ন করে জানতে পারলে উচ্ছল। গুঞ্জা তাকে জানাল পালেবত এদিন উচ্ছল গৃহ ত্যাগ করার পর বাঁদরীর সঙ্গে জল ভ্রমণে বেরিয়েছিল। সেদিন রাতে পালেবতের কথা ভাবতে ভাবতে উচ্ছল শেষ পর্যন্ত একটা সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল।

১৯

ভোরের আলো এদিন যথাসময়েই স্পর্শ করল উপত্যকা ঘেরা নগরীতে। সরালের দল নতুন প্রভাতকে স্বাগত জানিয়ে কলরব করতে করতে নেমে পড়ল দল হ্রদে সন্তরনের জন্য। হরিদ্রাভ বর্ণের উজ্জ্বল জলজ পুষ্পরা মাথার তুলতে লাগল আকাশের দিকে চেয়ে। কক্ষ ত্যাগ করে অলিন্দে বেরিয়ে এল উচ্ছল। পালেবতের কক্ষের দ্বার বন্ধ, তবে উচ্ছলের মনে হল তার মনের চাপ যেন অনেকটা কেটে গেছে। কারণ, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে। অলিন্দে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দল হ্রদের শোভা নিরীক্ষণ করার পর উচ্ছলের খেয়াল হল এদিন একটি বিশেষ দিন। এদিন রাজসভায় স্বর্ণ সেবিকারা নিজেদের সমর্পণ করবে মহারাজের চরণে আর সেই অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে মহারাজ এদিনই স্থলপ্রাসাদ ত্যাগ করে জলপ্রাসাদে পদার্পণ করবেন। ভোরবেলা কিছু সময় অলিন্দে অবস্থান করার পর গুঞ্জা যখন প্রাতরাশ নিয়ে উপস্থিত হল তখন উচ্ছল তাকে বলল, ‘পালেবতকে জানিও, আমি ফিরে আসার পর সে যেন সাক্ষাৎ করে আমার সঙ্গে।’

গুঞ্জা বলল সে জানিয়ে দেবে কথাটা।

এদিন কিছু পূর্বেই রাজসভায় প্রবেশ করতে হবে উচ্ছলকে। প্রাতরাশ সাঙ্গ করার পর এদিনের রাজসভায় উপস্থিত হবার জন্য সে প্রস্তুত হতে লাগল। রাজসভাতে এই বিশেষ অনুষ্ঠানের দিনগুলোতে রাজপুরুষ, সভাসদদের জমকালো পোশাক, কাশ্মীর মহারাজের চিহ্ন সমন্বিত মস্তক বন্ধনী ধারণ করার রীতি। অস্ত্র ধারণও করতে হয়। তেমনি পোশাকে সজ্জিত হয়ে কোমরবদ্ধে তলোয়ার নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে রওনা হবার জন্য কক্ষের বাইরে বেরিয়ে এল উচ্ছল। আর এরপরই সে চমকে উঠল। কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে আছে পালেবত! তাকে দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য উচ্ছলও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। এই রাজকীয় পোশাকে ইতিপূর্বে তাকে দেখেনি পালেবত।

পালেবতের চোখের দৃষ্টি দেখে উচ্ছলের মনে হল যেন বিস্মিত ভাবে চেয়ে আছে তার দিকে। একরাশ মুগ্ধতা যেন ঝরে পড়ছে পালেবতের চোখ থেকে। এরপরই অবশ্য পালেবত তার সম্বিত ফিরে পেয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল তার আশ্রয়দাতাকে। উচ্ছল মৃদু হাসল তার প্রণাম গ্রহণ করে। তবে উচ্ছল এ সময় কোনো বাক্যালাপ করবে না তার সঙ্গে। সে আজ যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা ফিরে এসেই জানাবে। তাকে এখন দ্রুত রওনা হতে হবে রাজসভাতে যাবার জন্য। কাজেই উচ্ছল আর বিলম্ব না করে রওনা হয়ে গেল গন্তব্যে।

এদিন দল হ্রদে নৌকার সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের মধ্যে কিছু কিছু জলযান মহারাজের আগমনের শেষ প্রস্তুতিতে নিমজ্জিত। ফুল ইত্যাদি বহন করে নিয়ে চলেছে জলপ্রাসাদের দিকে। সৈন্যবাহী কিছু শিকারা নৌকাও দল হ্রদে ঘুরে বেড়াচ্ছে মহারাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। এসব দেখতে দেখতে এক সময় হ্রদের কিনারে পৌঁছে গেল। পাড়ের কিনারে কাঠের পাটাতন যে স্থানের ওপরে উঠতে হয়, সে স্থান থেকে প্রধান সড়ক এগিয়েছে মহারাজের প্রাসাদের দিকে। শিকারা ভেড়াবার কাষ্ঠ নির্মিত স্থান অন্যদিন সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও মহারাজের আগমন উপলক্ষ্যে এদিন সে স্থানে সাধারণ নাগরিকদের চলাচল নিষিদ্ধ হয়েছে। বিটপীর প্রমোদ তরী সহ আরও বেশ কিছু জলযান অবস্থান করছে যে স্থানে। জল ও স্থানে তাদের ঘিরে অবস্থান করছে সৈনিকরা। উচ্ছল অনুমান করল বিটপীর ওই প্রমোদ তরীতেই জলপ্রাসাদে যাত্রা করবেন মহারাজ ললিতাপীড়।

উচ্ছলের পরনের ঝলমলে পোশাক আর মহারাজের চিহ্ন অঙ্কিত মস্তক বন্ধনী দেখে তার পরিচয় বুঝতে পেরে তাকে বাঁধা দিল না সৈনিকরা। দু-একজন সৈনিক তার উদ্দেশে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাল। বিটপীর প্রমোদ তরী আর অন্য জলযানগুলোর থেকে কিছুটা দূরত্বে নিজের শিকারা রেখে জল ছেড়ে কাঠের পাটাতন রেখে ওপরে উঠে পড়ল উচ্ছল। তারপর অশ্বশালা থেকে তার অশ্ব সংগ্রহ করে রওনা হয়ে গেল রাজপথ ধরে। রাজপথের স্থানে স্থানে আজ মহারাজকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য সুদৃশ্য তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানে স্থানে সৈন্য মোতায়েন করাও হয়েছে। তাদের দেখে উচ্ছল বুঝতে পারল মহারাজের নিরাপত্তার ব্যাপারে যথেষ্ট দৃষ্টি রেখেছে তিন বেশ্যা আর মহারাজের অনুচরেরা। এক সময় সে পথ অতিক্রম করে উচ্ছল পৌঁছে গেল যথাস্থানে। সে প্রবেশ করল রাজসভাতে।

সভাস্থল আজ নানান বর্ণের পুষ্প সজ্জিত, মশালের আলোতে আলোকিত। অন্য দিনের তুলনায় সভাসদদের উপস্থিতিও বেশি। মহারাজের সভায় এমন কিছু অতি প্রাচীন সভাসদ আছেন যাঁরা বয়সের ভারে আক্রান্ত হবার কারণে সভায় উপস্থিত থাকেন না। তারাও আজ সভায় এসে উপস্থিত হয়েছেন স্বর্ণ সেবিকাদের সমর্পণ অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করার জন্য। সভায় উপস্থিত সকলেরই পরনে ঝলমলে পোশাক। মস্তকে মহারাজের চিহ্ন আর অলঙ্কার শোভিত বন্ধনী। সার সার মশালের আলোতে ঝলমল করছে সভাকক্ষ।

ভাঁড় কূপমণ্ডূকেও দেখতে পেল উচ্ছল। এদিন আগেই সভাকক্ষে প্রবেশ করেছে সে। তার পরনে আজ অন্য দিনের চেয়ে আরও ঝলমলে পোশাক। নানা বর্ণের খণ্ড খণ্ড বস্ত্রখণ্ড দিয়ে সে পোশাক রচনা করা হয়েছে। তার পায়ে পায়ের আকৃতির চেয়ে দ্বিগুণ আকৃতির শুঁড় তোলা পাদুকা। মাথায় এক হাত প্রমাণ উঁচু মস্তক বন্ধনী। তার মাথায় আবার ক্ষুদ্রাকৃতির ঘণ্টা বাঁধা আছে। মাথা দোলালে সেটা টুং-টুং শব্দে বাজছে। হাতে একটা পুষ্পস্তবক নিয়ে নানা জনের আসনের কাছে গিয়ে মাথা নেড়ে ঘণ্টার শব্দ করে সে ভাঁড়ামো করছে। তার আনন্দ আর যেন ধরে না! তবে উচ্ছলের আসনের দিকে সে এল না। একবার তার দিকে দৃষ্টিপাত করে না দেখার ভান করে অন্য দিকে মাথা নাচাতে নাচাতে চলে গেল। নিজের আসনে বসে সব কিছু লক্ষ করতে লাগল উচ্ছল। অতিবৃদ্ধ সভাসদরা কেউ কেউ সমবয়সীদের সঙ্গে তাদের অতীতের সোনালি যৌবন নিয়ে আলোচনা করছেন, তালুক সভাসদদের মস্তকে হাত রেখে আশীর্বাদ করছেন, আবার নবীন সভাসদ মন্ত্রীরা কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে তামাশায় রত।

আপাত দৃষ্টি যারা সভাস্থলে বিরাজ করছে এক আনন্দঘন উৎসবের পরিবেশ। কিন্ত আসলে এই উৎসব দিবস যে একদল হতভাগ্য নারীদের জীবনে গাঢ় অন্ধকার নামিয়ে আনতে চলেছে, সে কথাও কোনো মুহূর্তেই ভুলছেন না কেউ কেউ। যেমন মহামন্ত্রী যশঙ্কর সবার সঙ্গে বাক্যালাপ করলেও মাঝে মাঝেই যে তার মুখ গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে তা স্পষ্ট বুঝতে পারল উচ্ছল। মুখমণ্ডলের একই অবস্থা মন্ত্রী বিদুরদেবেরও । মহারাজের সিংহাসন বেদির নীচে এক কোণে কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে রাজপুরোহিত ব্রহ্মদেব ফুল, মালা, গন্ধ দ্রব্য ইত্যাদি প্রস্তুত করে রাখছেন সমর্পণ অনুষ্ঠানের জন্য। বৃদ্ধ পুরোহিতের মুখমণ্ডলের বলিরেখাগুলো আজ অনেক বেশি গভীর। তা যেন জানিয়ে দিচ্ছে নিজের প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও এ কাজ সম্পাদন করতে হচ্ছে তাকে। সময় অতিবাহিত হতে লাগল। তারপর এক সময় তুরী-ভেরী, ঝাঁঝর ইত্যাদি বাদ্য যন্ত্রের শব্দে কাশ্মীররাজ ললিতাপীড়ের আগমন বার্তা ধ্বনিত হল। মহারাজকে অভিবাদন জানাবার জন্য নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন সবাই।

তোরণ উন্মোচিত হল। ভৃত্য-ভৃত্যা, দেহরক্ষী আর বেশ্যা বিটপীকে নিয়ে রাজসভাতে প্রবেশ করলেন মহারাজ ললিতাপীড়। তাঁর সর্বাঙ্গ আজ স্বর্ণ ভূষনে সজ্জিত। সভাসদরা মহারাজের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানালেন তাঁকে। সিংহাসন বেদিতে উঠলেন কাশ্মীররাজ। স্বর্ণ সিংহাসনে বসার আগে তিনি হাতের ইশারাতে সভাসদদের বসার অনুমতি দিলেন। দেহরক্ষীরা অন্য দিনের তুলনায় অনেকটা ঘনিষ্ঠ ভাবেই ঘিরে দাঁড়াল মহারাজের সিংহাসন বেদি। হয়তো এদিন অনেকেই অস্ত্র সাজে সজ্জিত হয়ে সভায় প্রবেশ করেছে বলেই। তবে মহারাজকে দেখে উচ্ছলের মনে হল তিনি এদিন মদ্যপানের পর অথবা রাত্রি জাগরণের পর সভায় আসেননি।

আজ তাঁর চোখের দৃষ্টি অত্যন্ত তীক্ষ্ম। তার ঘুর্ণায়মান অক্ষিগোলক সভার সর্বত্র দৃষ্টিপাত করছে। যদিও দীর্ঘদিনের অসংযমী জীবন যাপন করার ফলে যে সব লাম্পট্যের চিহ্ন আর তার মুখমণ্ডল থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। কোটরগত চোখের নীচে কালিমা, ভাঙ্গা হনু, ঝুলে পড়া ওষ্ঠাধার প্রকট ভাবেই সায় দিচ্ছে ললিতাপীড়ের অন্ধকার জীবন যাত্রার। মহারাজ সিংহাসনে বসার পর এদিনের রীতি অনুসারে রাজপুরোহিত ব্রহ্মদেব সিংহাসন বেদিতে উঠে মহারাজের ললাটে রাজতিলক অঙ্কন করে ফিরে এলেন। এরপর ভাঁড় কূপমণ্ডূক মহারাজকে পুষ্পগুচ্ছ দেবার জন্য বেদির দিকে এগোল। মহারাজের হাতে পুষ্প স্তবক দিয়ে বেদির থেকে নীচে নামার সময় সে পদস্খলনের এমন অভিনয় করল যে তার ভাঁড়ামী দেখে কেউ কেউ হেসে উঠল! মহারাজ সেই পুষ্পগুচ্ছ এক ভৃত্যের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মহামন্ত্রী আর রাজপুরোহিত আপনারা কি প্রস্তুত? সব আয়োজন প্রস্তুত?’

দুজনেই অনুচ্চ কণ্ঠে বললেন, ‘হ্যাঁ, মহারাজ।’

উত্তর শুনে ললিতাপীড় বিটপীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তবে আর বিলম্ব করে লাভ কি? সভার কাজ শুরু হোক।’

মহারাজ যে দ্বার দিয়ে সভায় প্রবেশ করলেন তার বিপরীত দিকের দ্বার রক্ষীকে বিটপী চোখের ইশারা করল। দ্বার উন্মোচিত হল। এবার সভায় আবিভূর্ত হল অপর দুই বেশ্যা রতিমালা ও মুক্তবেণী। তাদের সঙ্গে রক্ষী বেষ্টিত পাঁচজন নারী। যাদের এদিন সমর্পণ করা হবে মহারাজ ললিতাপীড়ের চরণে। তাদের সার বেঁধে দাঁড় করানো হল মহারাজের সিংহাসন বেদির সামনে। তাদের দিকে চেয়ে যেন লোলুপ দৃষ্টি ফুটে উঠল। যদিও এই কুমারীদের প্রত্যেকেই প্রথা মতো অবগুণ্ঠনধারী। শুধু তাদের হাত আর পায়ের পাতাই দৃশ্যমান। যাতে তাদের ওপর ভরা রাজসভাতে কোনো পুরুষের দৃষ্টি না পড়ে তাই তাদের অবগুণ্ঠন প্রথা দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে। প্রাচীন কালে মহারাজ কৌনকের সময় যখন প্রথম স্বর্ণ সেবিকা প্রথা শুরু হয় তখন সে সময়ের নৃপতিরা স্বর্ণ সেবিকাদের রক্ষকই ছিলেন, ললিতাপীড়ের মতো ভক্ষক ছিলেন না। পূর্বতন রাজারা অনেকেই মাতৃজ্ঞানে অথবা কন্যারূপে দেখতেন স্বর্ণ সেবিকাদের। তবে সে সব এখন অতীত। যারা স্বর্ণ সেবিকা হতে চলেছে তারা অবগুণ্ঠনের আড়ালে থাকলেও কামুক ললিতাপীড় যেন তাদের অবয়ব দেখে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন পোশাকের আড়ালে তাদের শরীরের গঠন এবং কে তা দিয়ে কেমন তৃপ্তি দিতে সক্ষম হবে মহারাজকে।

সারবদ্ধ ভাবে তাদের দাঁড় করাবার পর মহামন্ত্রী নিজের আসন ছেড়ে একটু এগিয়ে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর রীতি অনুসারে তাদের প্রশ্ন করলেন। ‘আপনার সবাই স্বেচ্ছায় স্বর্ণ সেবিকার দায়িত্ব গ্রহণ করতে প্রস্তুত তো। মহারাজের সেবায়, কাশ্মীর রাজার সেবায় নিজেদের পরিবার পরিজনকে ত্যাগ করতে, আজীবন কুমারী থাকতে প্রস্তুত তো?’

মহামন্ত্রী যশঙ্করের এ প্রশ্নর পরে কয়েক মুহূর্তের জন্য অখণ্ড নীরবতা নিয়ে এল রাজসভাতে। যে সময় উচ্ছলের মনে হল, কোনো নারী বা নারীর দল এই বুঝি সমবেত ভাবে বলে ওঠে ‘না ইচ্ছুক নই। আমাকে বলপূর্বক উপস্থিত করা হয়েছে এ স্থানে। আমি ফিরে যেতে চাই আমার পিতার আশ্রয়ে, আমার প্রেমিকের কাছে...।’

কিন্তু না। তেমন কিছু ঘটল না। তিন বেশ্যা হিংস্র বাঘিনীর মতো চেয়ে আছে পাঁচ কন্যার দিকে। যেন অন্যথা হলেই সেই মুহূর্তে তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে তাদের ওপর। সর্বোপরি মহারাজ ললিতাপীড় হিমশীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছেন তাদের দিকে। যে কোনো মুহূর্তেই তিনি ঘাতকের হাতে তুলে দিতে পারেন অবাধ্য নারীকে, তাদের পরিবার-পরিজনকে। মহারাজ ললিতাপীড় আর তিন বেশ্যার ভয়ঙ্কর চোখগুলোকে অতিক্রম করার স্পর্ধা দেখাতে পারল না নারীরা। এক যোগে তারা মাথা ঝুঁকিয়ে জানান দিল তারা স্বেচ্ছায় স্বর্ণ সেবিকা হবার জন্য উপস্থিত হয়েছে। হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটের কোণে। মহামন্ত্রী যশঙ্করের আর কিছু করার নেই। তিনি সভার উদ্দেশে বললেন, ‘রাজপুরোহিত ব্রহ্মদেব এবার শাস্ত্র মতে স্বর্ণ সেবিকাদের মহারাজকে সমর্পণ করবেন।’

যশঙ্করের কথা শুনে ভাঁড় কূপমণ্ডূক তালি দিয়ে উঠল। মহামন্ত্রী স্থান ত্যাগ করে মাথা নত করে তাঁর আসন গ্রহণ করলেন। শাস্ত্র মতে শৈব নৃপতিদের শিবেরই প্রতিরূপ কল্পনা করে তাঁর কাছে সমর্পণ করা হয় স্বর্ণ সেবিকাদের। রাজপুরোহিত শিব স্ত্রোত্র পাঠ করতে শুরু করলেন। বেশ কিছুক্ষণ সেই স্ত্রোত্র পাঠ করার পর তিনি সেই নারীদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি যা বলছি, তোমরা তা বলো।

বৃদ্ধ রাজপুরোহিত ব্রহ্মদেব ধীরে ধীরে ভেঙ্গে ভেঙ্গে বলতে লাগলেন, ‘আমি এই মূহূর্ত হতে কাশ্মীর অধিপতি মহারাজ ললিতাপীড় ব্রজদিত্য বাপ্পায়িকের পদতলে স্বর্ণ সেবিকা রূপে স্বেচ্ছায় নিজেকে সমর্পণ করলাম…কাশ্মীর রাজ্যের সেবার জন্য, নাগরিকদের সেবার জন্য মহারাজ আমাকে যে নির্দেশ প্রদান করবেন তা কায়মনোবাক্যে পালন করব আমি। কাশ্মীর রাজ্যের সেবা করার জন্য আমি আমার পূর্ব জীবনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছেদ করলাম। আজ থেকে আমার একমাত্র পরিচয় স্বর্ণ সেবিকা।’

পুরোহিত ব্রহ্মদেবের বলার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে অবগুণ্ঠন ধারীদের কণ্ঠ থেকেও উচ্চারিত হল একই কথা। শপথ গ্রহণ পর্ব শেষ হল। পুরোহিত এবার তাঁর শেষ কাজটি করলেন। তাঁর এক সহযোগী একটি মখমল বিছানো চন্দন কাঠের পাত্র মহারাজের চিহ্ন শোভিত স্বর্ণ হার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ব্রহ্মদেব একটা একটা করে সেই স্বর্ণ হার তাদের হাতে তুলে দিয়ে কণ্ঠে ধারণ করতে বললেন। তার নির্দেশ নিশ্চুপভাবে পালন করল সেই নারীরা।

পুরোহিত নারীদের উদ্দেশে বললেন, ‘স্বর্ণ সেবিকা রূপে তোমাদের মহারাজের পদতলে আত্ম নিবেদনের কাজ সম্পূর্ণ হল। তোমরা এবার শিবরূপী মহারাজের উদ্দেশে ভূমিষ্ঠ হয়ে তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা কর।’

স্বর্ণ সেবিকারা মহারাজের সিংহাসন বেদি তলে ভূমিষ্ঠ হয়ে তার উদ্দেশে প্রণাম জানাল। মহারাজ ললিতাপীড় আশীর্বাদের ভঙ্গিতে তাদের উদ্দেশে হস্ত উত্থাপিত করলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণ হাসি, চোখে কামনার আগুন৷ যেন ওদেরকে এখনই তাঁর শয্যাতে টেনে নিয়ে যেতে পারলে ভালো হয়৷ সমাপ্ত হল স্বর্ণসেবিকাদের সমর্পণের কাজ৷ কয়েকজন সভাসদ জয়ধ্বনি করলেন মহারাজের নামে৷ রতিমালা রক্ষী প্রধানকে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিল স্বর্ণ সেবিকাদের আর রাজসভাতে থাকার আবশ্যিকতা নেই৷ রক্ষীরা এরপর সেই পাঁচ নারীকে নিয়ে অন্তর্হিত হল তাদের বাসস্থানে নিয়ে যাবার জন্য৷ বলা ভালো, অন্ধকার নরকে নিয়ে যাবার জন্য৷

কাজের সমাপ্তিতে সভায় আনন্দ অনুষ্ঠান শুরু হল এরপর৷ নর্তকীরা এসে উপস্থিত হল সভাতে৷ বাদ্যযন্ত্রের তালে শুরু হল নৃত্য পরিবেশন৷ মহারাজ ও সভাসদদের একাংশ উপভোগ করতে লাগল স্বল্পবসনা তরুণীদের নৃত্য৷ নৃত্যের ছন্দে অনেক সময়ই উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে নর্তকীদের বক্ষ দেশ৷ তা দেখে ঠোঁট চাটছেন লজ্জাহীন ললিতাপীড়৷ একের পর এক নর্তকীর দল নেচে চলেছে৷ তারা যেন নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগীতায় নেমেছে যে, কে কতটা শরীর প্রদর্শন করে মহারাজকে তৃপ্ত করতে পারে৷ উচ্ছল দেখল নিজের আসনে মাথা নিচু করে বসে আছেন মহামন্ত্রী যশঙ্কর৷ তিনি যেন এ পরিবেশ সহ্য করতে পারছেন না৷ দীর্ঘক্ষণ নৃত্য গীত চলার পর এক সময় তা শেষ হল৷ আকাশে ঠিক মাথার ওপর তখন সূর্যদেব অবস্থান করছেন৷ মহারাজ সভার পরিসমাপ্তি ঘোষণা করে সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ প্রাসাদে ফিরে মধ্যাহ্নভোজ গ্রহণ করে তিনি রওনা হবেন জলপ্রাসাদে যাবার জন্য৷ মহারাজের স্বর্ণ শকট প্রস্তুত হয়ে আছে৷

দেহরক্ষী ও তিন বেশ্যাকে সঙ্গী করে সভাকক্ষ থেকে অন্তর্হিত হলেন মহারাজ৷ এদিন স্বর্ণ সেবিকাদের সমর্পণ উৎসব উপলক্ষ্যে সভাসদদের জন্য খাদ্য-পানীয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ কিন্তা তা গ্রহণ করতে রুচি হল না উচ্ছলের৷ রাজসভা ত্যাগ করে নির্দিষ্ট স্থান থেকে অশ্ব সংগ্রহ করে রওনা হল জলগৃহে ফেরার জন্য৷ কিছুটা এগোবার পর উচ্ছল দেখতে পেল একজনকে—সে খার্খদ মাতঙ্গী! তাঁকে দেখে উচ্ছলের মনে হল সে রাজপ্রাসাদের দিকেই চলেছে! এর কারণটা কী? খার্খদ কি জলপ্রাসাদে মহারাজের সঙ্গী হতে চলেছে? ভাবল উচ্ছল৷ তবে মাতঙ্গী বা অন্য কোনো ভাবনা দীর্ঘস্থায়ী হল না উচ্ছলের মনে৷ তার মনে ভেসে উঠতে লাগল অন্য এক জনের মুখ৷ পালেবতের কথা ভাবতে ভাবতে সে এগোল দল হ্রদের দিকে৷

হ্যাঁ, খার্খদ মাতঙ্গীর গন্তব্য ছিল রাজপ্রাসাদই৷ সে জেনেছে মহারাজ ললিতাপীড় তাঁর প্রাসাদ ত্যাগ করে এদিনই দল হ্রদে গমন করতে চলেছে৷ মহারাজ একবার সে স্থানে গমন করলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা খার্খদের পক্ষেও অসুবিধা জনক হয়ে ওঠে৷ কারণ, তাঁকে দূর থেকে জলের দিকে আসতে দেখলেই শিকারা বাহকরা দূরে সরে যায়৷ কারণ, তার সংস্পর্শে আসতে ভয় পায় অনেকেই৷ তাছাড়া খার্খদ সাঁতার জানে না৷ জলে বড় ভয় তার৷ খার্খদের আসার উদ্দেশ্য মহারাজের থেকে আরও কিছু অর্থ সংগ্রহ করা৷ আর তার জন্য ভীতি প্রদর্শন করতে হবে মহারাজকে৷

খার্খদ যখন রাজপ্রাসাদের সামনে এসে উপস্থিত হল তখন সে প্রচুর জন সমাগম দেখতে পেল সে স্থানে৷ মহারাজ ললিতাপীড়ের দ্বাদশ অশ্ব সমন্বিত স্বর্ণ রথ তো আছেই তার সঙ্গে রয়েছে আরও অনেক কার্ণিরথ, অশ্ব শকট প্রভৃতি৷ আর কোনটিতে রাখা আছে মহারাজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যর জন্য নানান সামগ্রী, আবার কোনোটিতে ইতিমধ্যেই আরোহণ করেছে জলপ্রাসাদে যারা মহারাজের সঙ্গী হবে তারা৷ খার্খদ দেখল কয়েকজন সৈন্য একদল অবগুণ্ঠনবতী নারীকে পর্দায় আচ্ছাদিত এক কার্ণিরথের দিকে নিয়ে চলেছে৷ সে নারীদের দেখে তাদের পরিচয় বুঝতে অসুবিধা হল না মাতঙ্গীর৷ ইতিমধ্যেই সে সংবাদ সংগ্রহ করেছে যে এদিন একদল রমণীকে স্বর্ণসেবিকা রূপে মহারাজের কাছে সমর্পণ করার কথা৷ তবুও একজন রক্ষীকে জিগ্যেস করে খার্খদ নিশ্চিত হল তাদের পরিচয় সম্পর্কে৷ মুহূর্তর মধ্যে সে ভেবে নিল কীভাবে সে মহারাজের কাছে থেকে অর্থ সংগ্রহ করবে৷ খার্খদেকে সৈনিকরাও ভয় পায়৷ যদি সে কোনো অভিশাপ দিয়ে বসে, বাণ মারে? তাই তাকে এই পরিস্থিতিতেও প্রাসাদে প্রবেশ করতে বাঁধা দিল না কেউ৷

রাজসভা থেকে ফিরে মধ্যাহ্নভোজ সেরে প্রাসাদ ত্যাগ করার আগে মহারাজ ললিতাপীড়, মুক্তবেণী, ও রতিমালার সঙ্গে শেষ মুহূর্তর কিছু আলোচনা সেরে নিচ্ছিলেন। তাঁর অবর্তমানে কীভাবে দুই বেশ্যা সভার কাজ পরিচালনা করবে সে ব্যাপারে৷ তিনি বলছিলেন, ‘মনে রাখবে তোমরা আমার প্রতিনিধি৷ যদি দেখো আমার অবর্তমানে, আমার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে রাজসভা বা নগরীর অন্যত্র কেউ কোথাও তোমাদেরকে অসহযোগিতা করছে অথবা রাজদ্রোহের কাজে লিপ্ত, সঙ্গে সঙ্গে তাকে কারাবদ্ধ করবে৷ চিন্তার কোনো কারণ নেই, কম্পনাধিপতি ও সৈন্যরা তো এখানেই থাকছে৷ আমি সেনাপতিকে নির্দেশ দিয়েছি তোমাদের নির্দেশ পালন করার জন্য...৷’

এ কথা শুনে রতিমালা কিছু বলতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় দ্বারী মৃদু শব্দ করল কপাটে৷ বিটপী কপাট উন্মুক্ত করতেই দেখল দ্বারীর সঙ্গে এক ভৃত্য দাঁড়িয়ে আছে৷ ভৃত্য তাকে মাথা ঝুঁকিয়ে জানাল, ‘খার্খদ মাতঙ্গী মহারাজের সাক্ষাৎ প্রার্থী৷ বলছেন তাঁর সাক্ষাতের অত্যন্ত প্রয়োজন৷’

খার্খদ মাতঙ্গী হঠাৎ এ সময় উপস্থিত হল কেন? একই সঙ্গে শঙ্কা আর কৌতূহলের উদ্রেক হল মহারাজ ও তিন বেশ্যার মনে৷ মহারাজের অনুমতিক্রমে বিটপী খার্খদকে সে কক্ষ পর্যন্ত নিয়ে আসার জন্য ভৃত্যকে নির্দেশ দিল৷

মাতঙ্গী এসে উপস্থিত হল৷ সে কক্ষে প্রবেশ করতেই বিটপী কপাট বন্ধ করে দিল৷ মহারাজের সামনে এসে দাঁড়াল সে৷

মহারাজ তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘এ সময় কী প্রয়োজন? আমি এখনই জলপ্রাসাদের উদ্দেশে যাত্রা করব৷’

মহারাজের কথা শুনে তাঁকে আর তিন বেশ্যাকে চমকে দিয়ে খার্খদ বলল, ‘এ যাত্রা ভয়ঙ্কর অশুভ৷’

কথাটা শুনেই সোজা হয়ে বসলেন মহরাজ৷ তিন বেশ্যা ঘিরে দাঁড়াল খার্খদকে৷ ললিতাপীড় প্রশ্ন করলেন, ‘অশুভ কেন?’

খার্খদ বলল, ‘গত সাত রাত্রি ধরে আমি মহারাজের মঙ্গল কামনায় শত্রু নিধন যজ্ঞ করেছি৷ গতরাতে সেই ধূমাগ্নি থেকে আবির্ভূত হল এক প্রেতিনী৷ সে আমাকে জানিয়েছে জলপ্রাসাদে আপনার চূড়ান্ত অনিষ্ট হবার সম্ভাবনা৷’

মহারাজ ললিতাপীড়ের জন্য জলপ্রাসাদে যাবতীয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে বিটপী৷ তাই সে ব্যাগ্র ভাবে জানতে চাইল, ‘কী প্রকার অনিষ্ট? কে করবে সে কাজ?’

খার্খদ মাতঙ্গী মানুষের মনের ভাব পাঠ করতে সক্ষম৷ এটা তার পেশার অঙ্গ৷ সে জানে যে ললিতাপীড়ের মতো পাপাচারী ব্যক্তিদের মনে সব সময় মৃত্যু ভয় লুকিয়ে থাকে৷ সে আতঙ্কই দেখাতে হবে তাঁকে এবং তা উপস্থিত করতে হবে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে৷ বিটপীর প্রশ্নর জবাবে সে কৌশলই অবলম্বন করল খার্খদ৷ সে বলল, জলপ্রাসাদে মহারাজের মৃত্যু যোগ ঘটতে পারে৷ আর তা ঘটবে জলপ্রাসাদে যারা মহারাজের সঙ্গী হতে চলেছে তাদের কারণে৷’

মহারাজ চমকে উঠে বললেন, ‘সঙ্গী হতে চলেছে! কারা তারা?’

খার্খদ মাতঙ্গী বলল, ‘ওই নবাগত স্বর্ণ সেবিকারা৷ তাদের মধ্যে এমন কেউ আছে যে, মহারাজের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে৷ বিপদ আসবে ঘোর বিপদ!’ এ কথাগুলো বলতে বলতে খার্খদ তার মুখমণ্ডলে অদ্ভুত ভীতিপ্রদ ভাব ফুটিয়ে তুলল!

এ কথা শুনে ললিতাপীড় শঙ্কিত স্বরে বললেন, ‘তবে কি তুমি আমাকে জলপ্রাসাদে যাত্রা স্থগিত করার কথা বলছ?’

মহারাজের প্রশ্ন শুনে তাঁর থেকেও বেশি শঙ্কা বোধ করল বিটপী৷ কারণ মহারাজ জলপ্রাসাদে অবস্থানকালে বিটপীর নানান ভাবে প্রচুর পরিমাণে অর্থ লাভের সম্ভবনা রয়েছে৷ এই শেষ মুহূর্তে খার্খদের কথা শুনে মহারাজ যদি তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন তাহলে বিটপীর প্রভূত ক্ষতি হবে৷ তাই সে খার্খদকে বলল, ‘এই সামান্য নারীদের মধ্যে কেউ কীভাবে মহারাজের প্রাণ সংশয় ঘটাবে? প্রত্যেক নারীর শরীর উত্তম রূপে পরীক্ষা করা হয় মহারাজের কক্ষে প্রবেশ করানোর পূর্বে৷ তাছাড়া জলপ্রাসাদ ও তাকে ঘিরে পর্যাপ্ত রক্ষী-সৈনিকের ব্যবস্থা করা হয়েছে মহারাজের নিরাপত্তার জন্য৷’

বিটপীর কণ্ঠে অবিশ্বাসের সুর ধরতে পেরে জাদুকরী তাকে ধমকে উঠে বলল, ‘চুপ কর মূর্খ মাগী৷ তুই নিজের স্বার্থের জন্য মহারাজকে মারতে চাস নাকি? মানুষের প্রাণ কি শুধু অস্ত্রাঘাতে যায়? কত রকম ভাবে যায়৷ এমনও হতে পারে জলপ্রাসাদে ওই নারীর অবস্থানের ফলে প্রাসাদে বজ্রপাত হল, আগুন লাগল, প্রাসাদ হ্রদের জলে ডুবে গেল, এমন কী আস্ত একটা পাহাড় হয়তো ভূকম্পনের ফলে হদ্রের ওপর উপুড় হয়ে পড়ল৷ কত রকম ভাবেই তো মানুষের মৃত্যু নেমে আসতে পারে৷ আমার যা জানাবার তা জানিয়ে গেলাম৷ এবার তোরা যা ইচ্ছা হয় কর৷’ এই বলে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে খার্খদ মাতঙ্গী পা বাড়াতে যাচ্ছিল কক্ষ ত্যাগের জন্য৷ ঠিক সেই সময় মহারাজ বললেন, ‘তুমি ক্রুদ্ধ হয়ো না৷ কেউ তোমার কথা অবিশ্বাস করছি না৷ তুমি বললে আমি যাত্রা স্থগিত ঘোষণা করব৷ কিন্তু এর বিকল্প কোনো পথই কি খোলা নেই?’

খার্খদ মাতঙ্গী একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আছে৷ মহরাজের সঙ্গে স্বর্ণ সেবিকাদের যাত্রা স্থগিত রাখতে হবে৷ আমি প্রাগজ্যোতিষপুর গিয়ে কামাখ্যা মন্দির থেকে তাবিজ সংগ্রহ করে আনব৷ সেই মন্ত্রপূত তাবিজ ধারণ করলে মহারাজ সব বিপদ থেকে মুক্তি পাবেন৷ কিন্তু সে স্থানে উড়ে গিয়ে ফিরে আসতে আমার এক পক্ষকাল সময় লাগবে৷ এ সময় কালের মধ্যে কোনো স্বর্ণ সেবিকার সেবা গ্রহণ করা যাবে না৷ তাবিজ ধারণ করার পর অবশ্য তাদের সেবা গ্রহণে কোনো অসুবিধা হবে না৷’

ওই স্বর্ণ সেবিকাদের সেবা গ্রহণের জন্যই আকুল হয়ে আছেন মহারাজ৷ তিনি বলে উঠলেন, ‘এক পক্ষকাল! সে তো অনেক সময়!’

খার্খদ বলল, ‘হ্যাঁ, এটুকু সময় তো লাগবেই৷ মহারাজের প্রাণের চাইতে এ সময় দামি নয়৷ সময় দেখতে দেখতে কেটে যাবে৷ তারপর তো স্বর্ণ সেবিকারা রইলই৷ তাদের জলপ্রাসাদে যেতে কোনো বাঁধা থাকবে না৷’

মহারাজ ললিতাপীড় সব কিছু বিচার বিশ্লেষণ করে শেষ পর্যন্ত বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমার কথা মতোই কাজ হবে৷ তবে চেষ্টা কোরো আরও শীঘ্র ফিরে আসার জন্য। জানোই তো রাজকার্য সংক্রান্ত পরিশ্রমের ফলে আমি ভীষণ রকম ক্লান্ত৷ ক্লান্তি দূর করার জন্য স্বর্ণ সেবিকাদের সেবা গ্রহণ আমার বিশেষ ভাবে প্রয়োজন৷’

খার্খদ হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, জানি৷ মহারাজ যাতে ভবিষ্যতে ইচ্ছামতো তাদের সেবা গ্রহণ করতে পারেন সে ব্যবস্থা আমি করব৷’

এ কথা বলার পর মাতঙ্গী আসল কথাটা পাড়ল৷ সে বলল, ‘মহারাজের জন্য আমি যে মন্ত্রপূত কবচ আনব তা অতি দুর্মূল্য৷ তার জন্য নানাবিধ যাগ-যঞ্জ, এমনকী কামাখ্যা মন্দিরে নরবলিও প্রদান করতে হবে৷ এ হেতু আমি মহারাজের থেকে এক সহস্র স্বর্ণ মুদ্রা প্রার্থনা করছি৷’

‘এক সহস্র! সে তো অনেক!’ স্বগতোক্তির স্বরে একবার বলে উঠলেন ললিতাপীড়৷

খার্খদ মাতঙ্গী হেসে বলল, ‘স্বর্ণ সেবিকাদের সেবা নেওয়া অপেক্ষা, মহারাজের জীবনরক্ষা অপেক্ষা সহস্র স্বর্ণমুদ্রা বেশি দামি নয়৷’

মহারাজকে এবার রওনা হতে হবে জলপ্রাসাদে যাবার জন্য৷ বাইরে সবাই অপেক্ষা করছে তার জন্য৷ কাজেই তিনি আর এরপর খার্খদের সঙ্গে বাক্যালাপে সময় নষ্ট করলেন না৷ রতিমালাকে তিনি বললেন, মুদ্রা আনার জন্য৷ মুক্তবেণী বাইরে নির্দেশ পাঠালেন স্বর্ণ সেবিকাদের যাত্রা স্থগিত করে যথাস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য৷ মুক্তবেণী স্বর্ণ মুদ্রা এনে তুলে দিল খার্খদের হাতে৷ মুদ্রা নিয়ে খার্খদ মাতঙ্গী যাত্রা শুরু করল আপন গন্তব্যে৷ এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মহারাজ ললিতাপীড়ও প্রাসাদ ত্যাগ করে বাদ্যযন্ত্র, শোভাযাত্রা সহকারে রওনা দিলেন দল হ্রদের দিকে৷

২০

রাজসভা থেকে দ্বিপ্রহরেই জলগৃহে ফিরে এসেছিল উচ্ছল৷ পালেবতের কক্ষর কপাট তখন বন্ধ ছিল৷ মধ্যাহ্নভোজ সাঙ্গ করে পালেবতের কথাই ভাবতে ভাবতে নিদ্রা এসে গেছিল তার৷ হঠাৎই একটা দূরাগত অস্পষ্ট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তার৷ এক যোগে বেজে চলা বহু বাদ্যযন্ত্রের শব্দ৷ তা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পাহাড়ের গায়ে৷ ব্যাপারটা অনুমান করে পালঙ্ক থেকে নেমে অলিন্দে এসে দাঁড়াল উচ্ছল৷ বিকাল হয়ে এসেছে৷ হ্রদের পাড়ে এসে উপস্থিত হয়েছেন মহারাজ ললিতাপীড়৷ ওই বাদ্যের মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানানো হচ্ছে৷ বাদ্য বাজানো হচ্ছে মহারাজের জলপ্রাসাদ থেকে৷ ক্রমশ তীব্র হতে থাকল বাদ্য নিনাদ৷ তারপর এক সময় দূর থেকে উচ্ছলের চোখে পড়ল এক সঙ্গে বহু সংখ্যক জলযান৷ তার মধ্যে একটি হল বিটপীর সেই প্রমোদ তরী৷ আর তার চারপাশ ঘিরে ছোট বড় অজস্র নৌকার সমাহার৷ পক্ষী, বাগলী, শিকারা, নানান ধরনের, নানান আকৃতির জলযান সব৷

প্রমোদতরীর মাথায় পতাকাদণ্ডে, কাশ্মীর রাজ্যের পতাকা উড়ছে৷ অর্থাৎ ওই জলযানেই অবস্থান করছেন মহারাজ ললিতাপীড়৷ দল হ্রদে উপস্থিত হয়ে তিনি চলেছেন তাঁর প্রাসাদের দিকে৷ উচ্ছল জলগৃহর অলিন্দে দাঁড়িয়ে চেয়ে রইল মহারাজের যাত্রা পথের দিকে৷ মহারাজের তটিনীর সমারোহ যখন উচ্ছলের চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল তখন সে আবার কক্ষে পদার্পণের জন্য এগোতে যেতেই দেখতে পেল কখন যেন, সম্ভবত বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনে অলিন্দে এসে দাঁড়িয়েছে পালেবত৷ উচ্ছলের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই পালেবত তাকে প্রণাম জানাল৷ তারপর সে উচ্ছলকে বলল, ‘মহারাজ এসে উপস্থিত হয়েছেন তাই না?’

‘হ্যাঁ?’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল উচ্ছল৷

উচ্ছল এবার ভাবল, যা বলার সে কথা কি সে এখনই বলবে? নাকি মনের মধ্যে শব্দগুলোকে গুছিয়ে নিয়ে সে কথাটা উপস্থাপিত করবে পালেবতের কাছে? কিন্তু সে পালেবতকে কিছু বলার আগেই পালেবত তাকে বলল, ‘আপনার কাছে আমার একটা নিবেদন আছে৷’

‘কি নিবেদন?’ আগ্রহের সঙ্গে প্রশ্ন করল উচ্ছল৷

পালেবত বলল, ‘আপনি কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে আসার পর আমি কি আপনার শিকারা নৌকোটা ভ্রমণের জন্য ব্যবহার করতে পারি?’

পালেবতের কথা শুনে উচ্ছল অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি শিকারা বাইতে পারো নাকি?’

পালেবত জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, বাঁদরী শিখিয়েছে, আপনি যদি আপনার নৌকাটা দেন তবে আমি আরও ভালো করে সে শিক্ষা রপ্ত করতে পারি৷’

উচ্ছল বলল, ‘কিন্তু যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে? তুমি কি সাঁতার জানো? জল থেকে তো পাটাতনে উঠতে পারছিলে না!’

পালেবত উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, জানি৷ আমার একটা পা জলজ লতা গুল্মে আটকে গেছিল তাই ওপরে উঠতে পারছিলাম না৷ আমি আপনার শিকারা নিয়ে বিকালের পরই ভ্রমণে বেরোব৷ তখন অন্য নৌকার চলাচল কমে আসে৷ দুর্ঘটনা ঘটবে না৷ তাছাড়া এখন কদিন অন্ধকার নামলেও চাঁদের আলো থাকবে৷’

পালেবতের কথা শুনে উচ্ছল একটু ইতস্তত করে বলল, ‘ঠিক আছে নিও৷ কিন্তু কখনওই এই গৃহ ছেড়ে বেশি দূরে যাবে না৷ ও স্থান তোমার পরিচিত নয়৷ অন্য কোনো বিপদ আসতে পারে৷’

অনুমতি পেয়ে হাসি ফুটে উঠল পালেবতের ঠোঁটের কোণে৷ সে বলল, ‘আচ্ছা৷’

উচ্ছলের মনে হল এবার সে তাকে বলেই দেয় কথাটা৷ সে বলল, ‘তোমাকে একটা জরুরি কথা বলার ছিল৷’

পালেবত জবাব দিল, ‘বলুন?’

পালেবতকে কথা বলার আগে বাক্যটা মনের মধ্যে গুছিয়ে নেবার জন্য তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে সামনে তাকাল উচ্ছল৷ আর তখনই সে দেখতে পেল বাঁদরী তার শিকারা নিয়ে জল কেটে এগিয়ে আসছে! জলগৃহর প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে সে!

উচ্ছল, পালেবতকে যে কথাটা বলতে চলেছে তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ৷ তাদের দুজনের কথার মাঝেই বাঁদরী এসে উপস্থিত হলে সে আলোচনায় বিঘ্ন ঘটবে। কাজেই তাকে দেখামাত্র উচ্ছল তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বলল, ‘তোমার সহচরী আসছে৷ আজ তুমি আমার সঙ্গে অন্য কোনো সময় সাক্ষাৎ কোরো৷ তবে আজই কোরো৷’

পালেবত বলল, ‘আচ্ছা৷’

বাঁদরী এসে পড়ল৷ শিকারা থেকে জলগৃহতে উঠে উচ্ছলকে দেখতে পেয়েই বাঁদরী মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল তাকে৷ বাঁদরীর অভিবাদন গ্রহণ করার পর উচ্ছল সে স্থানে না দাঁড়িয়ে কক্ষে ফিরে এল৷

পালেবত, বাঁদরীকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে নিজ কক্ষে প্রবেশ করল৷ তারা দুজন মুখোমুখি উপবেশন করার পর বাঁদরী কৌতূকের সঙ্গে প্রশ্ন করল, ‘সভাসদের সঙ্গে কী কথা হচ্ছিল? প্রেমালাপ নাকি?’

পালেবত বলল, ‘না, তেমন কোনো কথা নয়৷ মহারাজ প্রমোদতরী করে জল প্রাসাদের দিকে গেলেন, সেটাই আমরা দাঁড়িয়ে দেখছিলাম৷’

বাঁদরী কথাটা শুনে বলল, ‘আমি তো ওদিক থেকেই এলাম৷ কত লোকজন! কত নৌকা!’ পালেবত বলল, ‘তুমি দেখতে পেলে নাকি মহারাজকে?’

বাঁদরী জবাব দিল, ‘না, পাইনি৷ তিনি তো দেবী বিটপীর প্রমোদ তরীর ভিতরে ছিলেন৷ তাছাড়া মহারাজের যাত্রাপথের কাছাকাছি যেতে দেওয়া হয়নি কাউকে৷ আমিও দূর থেকেই দেখলাম৷

তবে কাল থেকে তো আমি দেবী বিটপীর নির্দেশ মতো জলপ্রাসাদের কাছেই থাকব৷ হয়তো কোনো সময় মহারাজের দর্শন পেয়ে যেতে পারি৷’

পালেবত কথা শুনে বলল, ‘জানি না আমার সে সুযোগ হবে কি না? আচ্ছা আমি যদি সত্যিই, এমন কোনো কাজ করি যা মহারাজ ও দেবী বিটপীকে খুশি করে, তবে কি সত্যিই মহারাজের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবে?’

বাঁদরী জাবাব দিল, ‘দেবী বিটপী তো তাই বললেন, সে ধূর্ত বেশ্যা হলেও শুনেছি তার কথার দাম আছে৷ যাকে সে যা পাইয়ে দেবে বলে তা পাইয়ে দেয়৷ এটাই নাকি তার চরিত্রের এক মাত্র গুণ৷’

পালেবত এরপর বাঁদরীকে বলল, ‘আরও একটা ব্যাপারে তোমার সাহায্যর প্রয়োজন আছে৷ আমার পছন্দ মতো পোশাক৷ আমি যে পোশাকগুলো পরিধান করি, সবই গুঞ্জা মাতার কিনে দেওয়া তাঁর পছন্দের পোশাক৷ তাঁর কাছে আমার মনোমত পোশাক চাইতে সঙ্কোচ বোধ হচ্ছে৷ আমার কাছে অতি সামান্য কিছু অলঙ্কার আছে৷ তুমি যদি, আমাকে কোনো স্থান থেকে স্বর্ণালঙ্কারের বিনিময়ে মনমতো কিছু পোশাক কিনে দাও তবে বড় ভালো হয়৷ তাছাড়া দেবী বিটপী যদি আমাকে সত্যি ভৃত্যর কাজে নিয়োজিত করেন তবে আমার কিছু ভালো পোশাকের প্রয়োজন হবে৷ জলপ্রাসাদে গিয়ে তো দেখলাম ভৃত্যারা কত রকম অলঙ্কারে, ঝলমলে পোশাকে সজ্জিতা৷ তাদের মতো আমার অলঙ্কার না থাকুক জলপ্রাসাদে কাজে নিয়োজিত হলে তো অন্তত আমার ঝলমলে পোশাকের প্রয়োজন হবে৷ সে ব্যবস্থা আমি করে রাখতে চাই৷’

পালেবতের কথা শুনে বাঁদরী বলল, ‘হ্যাঁ, সে ব্যবস্থা আমি করে দিতে পারি, কিন্তু তবে এখনই আমার সঙ্গে যেতে হবে৷ কাল থেকে তো আমাকে জলপ্রাসাদের কাজে থাকতে হবে, কখন পোশাক কিনে দেবার সুযোগ পাব জানি না৷’

বাঁদরীর প্রস্তাব শুনে পালেবত বলল, ‘কিন্তু এখন তো বিকাল হয়ে গেছে৷ আর সভাসদ গৃহেই আছেন৷ পোশাক কিনে ফিরে আসতে অন্ধকার নেমে যাবে৷’

বাঁদরী বলল, ‘না, অন্ধকার নামবে না৷ কাছেই এক ভাসমান পোশাক বিপনী আছে৷ সে স্থানে গিয়ে পোশাক কিনে অন্ধকার নামার আগেই ফিরে আসব৷’

পালেবত বলল, ‘আচ্ছা চলো তবে৷’

পালেবতকে যখন পুষ্পপথ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল তখন তার শরীরে কয়েকটি স্বর্ণালঙ্কার ছিল তার একটা সঙ্গে নিয়ে গুঞ্জামাতাকে ভ্রমণ করতে যাচ্ছে বলে বাঁদরীর সঙ্গে রওনা হয়ে গেল৷ উচ্ছলও পালঙ্কে শুয়ে উন্মুক্ত তমোরি দিয়ে দেখতে পেল তাদের৷ সে ভাবল পালেবত বৈকালিক ভ্রমণে গেল৷

উচ্ছলের জলগৃহ থেকে সেই ভাসমান বিপনী বেশি দূর নয়৷ সে স্থানে পৌঁছে গেল পালেবত৷ বাঁদরীর পরিচিতি বস্ত্র ব্যবসায়ী স্বর্ণর যে মূল্য নির্ধারণ করল তাতে বস্ত্র কেনার পরও বেশ কিছু অর্থ হাতে থাকবে পালেবতের৷ কিছু বস্ত্র কিনল পালেবত৷ তার একটা বস্ত্র দেখে বাঁদরী মৃদু বিস্মিত হয়ে বলল, ‘এই বস্ত্র তুমি পরবে!’

পালেবত হেসে জবাব দিল, ‘কেন? আমার সব রকম পোশাক পরতে ইচ্ছা হয় না বুঝি?’ ফেরার পথে পালেবতই চাপপা বাইতে শুরু করল৷ সূর্যাস্তের পূর্বেই উচ্ছল আবার দেখতে পেল পালেবত ফিরে আসছে৷ চাপ্পা চালাচ্ছে পালেবত৷ ভালোই নৌকা বাইছে সে৷ তা দেখে উচ্ছল বেশ আশ্বস্ত হল নিজের শিকারা পালেবতের হাতে তুলে দেবার ব্যাপারে৷ বাঁদরী যে পালেবতকে গৃহে পৌঁছে দিয়ে ফিরে গেল উচ্ছল তাও দেখতে পেল৷ দল হ্রদে সন্ধ্যা নামল এরপর, উচ্ছল অপেক্ষা করতে লাগল কখন পালেবত এসে উপস্থিত হয় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।

পালেবত কিন্তু অন্ধকার নামার পরও এল না৷ গুঞ্জা নৈশাহার দিয়ে গেল৷ তা সাঙ্গ করার পর কিছু সময়ের জন্য উচ্ছল দাঁড়াল৷ আশেপাশের জলগৃহর প্রদীপগুলো তখন প্রায় সবই নিভে গেছে৷ তবে মহারাজের জলপ্রাসাদের মাথার আকাশটা মশালের আলোতে উজ্জ্বল৷ ললিতাপীড় অবস্থান করছেন তার জলপ্রাসাদে৷ কিন্তু সে তখনও এল না৷ নিজ কক্ষে ফিরে এসে উচ্ছল ভাবতে লাগল, ‘তবে কি রাত্রিকালে সে আর তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রাজি নয়? সে কি আগের সেই রাত্রির ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে ওই আশঙ্কায় শঙ্কিত?

অন্ধকার কক্ষে শুয়ে বিনিদ্র রজনী যাপন করতে করতে ও সব কথা ভাবতে ভাবতে বিচলিত হচ্ছিল উচ্ছল৷ কিন্তু তার আশঙ্কা অমূলক প্রমাণ করে দিয়ে পালেবত এক সময় উপস্থিত হল৷ তখন বেশ রাত৷ মৃদু করাঘাত হল উচ্ছলের দরজার কপাটে৷

সে কপাট খুলতেই পালেবত কিছু পিছু হটে অলিন্দের ঘেরার কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ উচ্ছলও অলিন্দে এসে দাঁড়াল, তবে পালেবতের থেকে বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখে যাতে সে শঙ্কা বোধ না করে সেজন্য৷ উচ্ছল বাইরে এসে দাঁড়াতেই পালেবত বলল, ‘আপনাকে প্রতীক্ষা করিয়ে রাখার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী৷ আসলে গুঞ্জা মাতা কিছু সময় আগে পর্যন্ত তার কক্ষের সামনে অলিন্দে দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ তিনি দ্বার বন্ধ করে নিদ্রা যাবার পর আমি বাইরে এলাম৷’

পালেবতের কথা শুনে উচ্ছল বুঝতে পারল যে পালেবতও অনুমান করেছে যে তাদের কথোপকথন গোপনীয়, সে সময় তৃতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি বাঞ্ছনীয় নয়৷

পূর্ণিমা তিথি৷ দল হ্রদের আকাশে স্বর্ণ থালার মতো গোল চাঁদ৷ তার প্রতিবিম্ব এসে ধরা দিয়েছে দল হ্রদের জলে৷ তা দেখে মনে হচ্ছে একটি নয়, ওপর-নীচে দুটো চাঁদ যেন আবির্ভূত হয়েছে উপত্যকার বুকে৷ আর তাদের আলো এসে পড়েছে উচ্ছলের জলগৃহর অলিন্দে, পালেবতের রক্তিম ওষ্ঠাধারে ও শুভ্র সুন্দর মুখমণ্ডলে৷ উচ্ছল তাকে কী বলবে তারই প্রত্যাশায় সে চেয়ে আছে উচ্ছলের দিকে৷ উচ্ছল এরপর আর বিলম্ব করল না৷ সে সরাসরি পালেবতকে বলল, ‘শোন পালেবত, তোমার যদি আপত্তি না থাকে তবে আমি তোমাকে আমার জীবন সঙ্গীর মর্যাদা দিতে রাজি৷ আমি তোমাকে বিবাহ করতে প্রস্তুত৷’ এ কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে পালেবতের প্রতিক্রিয়া শোনার জন্য উচ্ছল চেয়ে রইল তার দিকে৷

উচ্ছলের কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল পালেবত৷ তার ঠোঁট দুটো প্রথমে একটু কেঁপে উঠল৷ তার পর সে বলল, ‘আপনি আমাকে যে প্রস্তাব দিলেন তাতে আমার বিস্ময়ের সীমা নেই৷ কী ভাবে যে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাব, তাও আমার জানা নেই৷ কিন্তু আপনি রাজপুরুষ, রাজ সভাসদ, এ দেশের একজন সম্মানীয় মানুষ৷ আর আমি এমন একজন নারী, যে অজ্ঞাতকুলশীল৷ যার কোনো পরিচয় আপনার জানা নেই...৷’ এ কথা বলে থেমে গেল পালেবত৷ মাথা নিচু করে দাঁড়াল সে৷

উচ্ছল তার কথা শুনে বলল, ‘তোমার বংশ পরিচয়, বংশ গরিমা জেনে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে চাই না আমি৷ তার কোনো প্রয়োজন বোধ করছি না৷ আমি তোমাকে যতটুকু জেনেছি, যতটুকু চিনেছি তাতে তুমি একজন সৎচরিত্রা, নির্লোভ নারী৷ যে আমার জন্য জীবনও দিতে পারে৷ তোমার এটুকু পরিচয়ই আমার কাছে যথেষ্ট৷ তুমি সম্মত থাকলে ভবিষ্যতে আমার পরিচয়েই পরিচিত লাভ করবে তুমি৷ এ বিষয়ে আমি তোমার মতামত জানতে আগ্রহী৷’

পালেবত আবারও মুখ তুলে তাকাল উচ্ছলের দিকে৷ আর ঠিক এই সময় উচ্ছল খেয়াল করল পালেবতের গন্ডদেশে অশ্রু বিন্দু চিক চিক করছে৷ তবে সে অশ্রু আনন্দের নাকি তার স্মৃতিহীনতার বেদনার তা বুঝে উঠতে পারল না৷ নিশ্চুপ ভাবে দাঁড়িয়ে রইল পালেবত৷

উচ্ছলের এবার মনে হল তার কাছ থেকে হঠাৎ এই প্রস্তাব পেয়ে তার জবাবে কী বলবে তা বুঝে উঠতে পারছে না পালেবত৷ তাই সে পালেবতকে বলল, ‘ঠিক আছে তুমি এখন যাও৷ আমি তোমার উত্তরের প্রত্যাশায় রইলাম৷’

উচ্ছলের কথা শোনার পর আবার মাথা নিচু করে ধীর পায়ে নিজের কক্ষে ফিরে গেল পালেবত৷ আর উচ্ছলও নিজের কক্ষে ফিরে এল৷ চাঁদের আলোতে দেখা পালেবতের অশ্রুসিক্ত সেই সুন্দর মুখমণ্ডলের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল উচ্ছল৷

পরদিন ভোরবেলা উচ্ছলের ঘুম ভাঙতেই তার মনে পড়ল গত রাত্রির ঘটনার কথা৷ তবে উচ্ছল যেন একটু হালকা বোধ করল পালেবতের সঙ্গে তার কথোপকথন স্মরণ করে৷ সে তার বক্তব্য জানিয়ে দিয়েছে, এবার পালেবতের উত্তর দেবার পালা৷ যদিও উচ্ছলের মনে হয় না তাকে প্রত্যাখ্যান করার মতো কোনো কারণ আছে পালেবতের কাছে৷ উচ্ছল একজন যুবা পুরুষ, সে সৎ-কর্মঠ৷ সব থেকে বড় কথা সে একজন চরিত্রবান পুরুষ৷ তার কাছে প্রেম, আশ্রয়, নিরাপত্তা, সামাজিক পরিচিতি সবই পাবে পরিচয়হীন পালেবত৷ একজন পুরুষের কাছে তার এর থেকে বেশি চাইবার কি আছে?

পালেবতের কথা ভাবতে ভাবতে এরপর হঠাৎই একটা অপ্রিয় কাজের কথা মনে পড়ে গেল উচ্ছলের৷ তার খেয়াল হল মহারাজ এসে উপস্থিত হয়েছেন জলপ্রাসাদে৷ এদিন বিটপী তাকে জলপ্রাসাদে উপস্থিত হতে বলেছে৷ কথাটা ভাবতেই প্রথমে তিক্ত হয়ে গেল উচ্ছলের মন৷ কিন্তু তার পরই উচ্ছলের মনে পড়ল মহামন্ত্রী যশঙ্করের কথা৷ হয়তো সে স্থানে গেলে তাঁকে দেবার মতো কোনো সংবাদ পাওয়া যেতে পারে? দু-দিন রাজসভা বসবে না তা আগাম জানিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ তবে কার্যালয়ে যেতে হবে উচ্ছলকে৷ সে সিদ্ধান্ত নিল যে সেই স্থানে যাবার আগে জলপ্রাসাদে যাবে বিটপীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য৷

সকালের দৈনন্দিন কাজ মিটিয়ে এক সময় জলগৃহ ছেড়ে শিকারাতে নেমে পড়ল উচ্ছল৷ চাপ্পা তুলে নেবার আগে সে একবার পালেবতের কক্ষর দিকে তাকাল৷ সে মনে মনে ভাবল, হয়তো বা পালেবত তার কথাই ভাবছে, অথবা নিদ্রিত অবস্থায় তারই স্বপ্ন দেখছে? কথাটা ভেবে বেশ ভালো লাগল উচ্ছলের৷ চাপ্পা বাইতে শুরু করল সে৷ হয়তো বা মহারাজ দল হ্রদে এসে উপস্থিত হয়েছেন বলেই এদিন হ্রদের বুকে সন্তরণশীল নৌকার আধিক্য একটু বেশি। কিছুটা ব্যস্ত ভাবেই বেশ কিছু নৌকা যাওয়া আসা করছে৷ সে সব দেখতে দেখতে এক সময় জলপ্রাসাদের কাছে পৌঁছে গেল উচ্ছল৷

জলপ্রাসাদকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের নৌকোর সংখ্যা আজ আরও বেশি৷ বিটপীর প্রমোদ তরী তো আছেই, তার সঙ্গে আছে আরও নানান ধরনের জলযান৷ তার কোনোটি বয়ে এনেছে মহারাজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যর জন্য নানান উপকরণ, রন্ধন সামগ্রী৷ আবার কোনটিতে মহারাজের একান্ত সেবক বা অঙ্গরক্ষীরা৷ সৈন্যবাহী শিকারার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে৷ মহরাজের জলপ্রাসাদ ও তার সংলগ্ন বেশ কিছু জলযানকে ঘিরে শিকারা নৌকোর সাহায্যে রজ্জুবেষ্টনী রচনা করা হয়েছে৷ যাতে কোনো সময় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি মহারাজের জলপ্রাসাদের কাছে পৌঁছতে না পারে সে জন্য৷ সেই রজ্জুবেষ্টনীর কাছে পৌঁছে থামতে হল উচ্ছলকে। কয়েকজন সৈন্য নিয়ে একজন নিম্ন পর্যায়ের সেনা নায়ক সেখানে উপস্থিত ছিল৷ উচ্ছল তাকে বলল, ‘আমি রাজ সভার সদস্যা বিটপীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছি৷’

উচ্ছলের পরনের পোশাক আর তার শিকারার রৌপ্য সজ্জিত দণ্ড দেখে সে যে একজন অভিজাত তা বুঝতে অসুবিধা হল না সেনাধ্যক্ষর৷ তবে সাক্ষাৎ প্রার্থী যেই হোক না কেন তাকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে৷ তাই সে বলল, অনুগ্রহ করে আপনি মহারাজের পাঞ্জাটা প্রদর্শন করুন৷’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘পাঞ্জা তো আমার কাছে নেই৷’

সেনাধ্যক্ষ বলল, ‘আমাকে মার্জনা করবেন মহাশয়৷ পাঞ্জা প্রদর্শন না করলে জলপ্রাসাদের কাছে উপস্থিত হওয়া যাবে না৷ দেবী বিটপীর এমনই নির্দেশ৷’

উচ্ছল বলল, ‘কিন্তু সভা সদস্যা বিটপীই আজ আমাকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসতে বলেছিলেন৷ সম্ভবত প্রয়োজনটা তারই৷ আমি ফিরে গেলে তার উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে৷’

উচ্ছলের কথা শুনে উভয় সঙ্কটে পড়ে গেল সেই সেনাধ্যক্ষ৷ দেবী বিটপীর নির্দেশ পালন না করে বিনা পাঞ্জাতে এই ব্যক্তিকে প্রবেশ করতে দিলে যেমন তার ওপর শাস্তির খাড়া নেমে আসতে পারে, তেমনই এ লোকটা যখন বলছে যে প্রয়োজনটা দেবী বিটপীরই তখন ওকে প্রবেশ করতে না দিলেও ভবিষ্যতে সমস্যা দেখা যেতে পারে৷ তাই সে ভাবতে লাগল কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়?

সেনাধ্যক্ষকে চুপ থাকতে দেখে উচ্ছল ক্ষুদ্ধ ভাবে বলল, ‘আমি তবে ফিরে যাচ্ছি? আপনি শুধু অনুগ্রহ করে রাজসভার মাননীয়া সদস্যাকে জানিয়ে দেবেন যে তার আমন্ত্রণে সভাসদ উচ্ছলদেব তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন, কিন্তু তার কাছে মহারাজের পাঞ্জা না থাকায় আপনি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন৷’

ঠিক এই সময় আর একটি নারী কণ্ঠস্বর শোনা গেল কাছ থেকে, ‘আমিও ওনাকে চিনি, উনি সত্যিই রাজ্ সভাসদ৷ ওনাকে প্রবেশ করতে না দিলে দেবী বিটপী কুপিত হতে পারেন৷’

উচ্ছল কথাটা শুনে পাশে তাকাতেই যাকে দেখতে পেল তাতে খুব অবাক হয়ে গেল৷ কখন যেন তার পাশে তার শিকারা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে বাঁদরী৷ উচ্ছলের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই তার উদ্দেশে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাল বাঁদরী৷ তারপর সেনাধ্যক্ষর উদ্দেশে বলল, ‘আমার পাঞ্জাটা তবে আমি ওনাকে দিচ্ছি৷ আপনি ওনাকে ভিতরে প্রবেশ করতে দিন?’

বাঁদরীর কথা শুনে উচ্ছল বেশ অবাক হয়ে গেল৷ বাঁদরী জলপ্রাসাদে প্রবেশের ছাড়পত্র পেল কীভাবে? বাঁদরীর কথা শোনার পর ব্যাপারটার গুরুত্ব অনুধাবন করে সেনাধ্যক্ষ উচ্ছলকে বলল, ‘আপনি দয়া করে এস্থানে একটু অপেক্ষা করুন৷ আপনার আগমন সম্পর্কে আমি দেবী বিটপীকে সংবাদ পাঠাচ্ছি৷’

এ কথা বলে তার নৌকা নিয়ে এগোল জলপ্রসাদের দিকে৷

লোকটা অন্তর্হিত হবার পর উচ্ছল বাঁদরীকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি এ স্থানে কি করো? তোমার কাছে পাঞ্জা এলে কীভাবে?’

বাঁদরী জবাব দিল, ‘মহারাজ যখন এ স্থানে অবস্থান করেন তখন দেবী বিটপী স্থানীয় কয়েকটি শিকারাকে প্রাসাদের বাইরে নানান কাজের জন্য নিয়োজিত করেন৷ আমিও আজ থেকে সে কাজে নিয়োজিত হয়েছি, দেবী বিটপীই আমাকে পাঞ্জা দিয়েছেন৷’

বাঁদরীর কথা শুনে মৃদু হাসল উচ্ছল৷ তবে এ প্রসঙ্গে বাঁদরীকে আর কিছু জিগ্যেস করল না৷ কিছু সময়ের মধ্যেই ফিরে এল সেই সেনাধ্যক্ষ৷ তারপর সে উচ্ছলকে বলল, ‘দেবী বিটপী আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সম্মত হয়েছেন৷ আপনি প্রাসাদে যান৷ আমাকে মার্জনা করবেন৷ আমি সামান্য অধস্তন সেনাধ্যক্ষ৷ কর্তব্য পালনের স্বার্থে আমাকে আপনার গতিরোধ করতে হয়েছিল৷’ রজ্জু বেষ্টনী ওপরে ওঠনো হল৷ তার নিচ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল উচ্ছলের শিকারা৷ আর তার পিছন পিছন পাঞ্জা দেখিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল বাঁদরী৷ কিছু দূরে এক স্থানে বেশ কিছু শিকারা নৌকা দাঁড়িয়ে আছে৷ স্থানীয়দের প্রয়োজন উপলক্ষ্যে দেবী বিটপী আজ থেকে এ স্থানে উপস্থিত হতে বলেছেন সে সব অস্থায়ী শিকারা গুলিকে৷ সে স্থানের উদ্দেশে অঙ্গুলী নির্দেশ করে বাঁদরী, উচ্ছলকে বলল, ‘আমি ওই স্থানে রইলাম৷ কোনো প্রয়োজন মনে হলে আমাকে বলবেন৷’ এ কথা বলে বাঁদরী রওনা হল সেদিকে৷ আর উচ্ছল রওনা হল সোজা জলপ্রাসাদের দিকে৷ তাকে ঘিরেও পাহারা দিচ্ছে বেশ কিছু সৈন্যবাহী শিকারা৷ অলিন্দে, প্রাসাদের ওপরও দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু সৈনিক৷ এ সব দেখে উচ্ছলের মনে হল, যশঙ্কর সহ অনেকেই তাঁদের পরিকল্পনা রূপায়ণের ক্ষেত্রে রাজ প্রাসাদ অপেক্ষা এ স্থান সুবিধাজনক মনে করলেও আসলে তা নয়৷ সর্বত্রই তো রক্ষী পরিবৃত৷

উচ্ছল জলপ্রাসাদের গায়ে নৌকো ভেড়াতেই একজন সৈনিক এগিয়ে এল তার কাছে৷ উচ্ছলের পরিচয় জানার পর সে তাকে নিয়ে ওপরে অলিন্দে উঠে তাকে সমর্পণ করল অলিন্দে প্রহরারত এক রক্ষীর কাছে৷ উচ্ছল এরপর সেই রক্ষীকে অনুসরণ করে উপস্থিত হল এক কক্ষের কাছে৷ রক্ষী কপাটে ঘা দিতেই সে কপাট খুলল তাকে উচ্ছল চিনতে পারল৷ সে সেই ভৃত্য মুষিক! অবশ্য সঙ্গত কারণেই তারা যে পরস্পরের পূর্ব পরিচিত তা প্রকাশ করল না৷ সে শুধু বলল, ‘দেবী বিটপী সাক্ষাৎ কক্ষে আছেন৷ আপনি আমাকে অনুসরণ করুন৷’

উচ্ছল প্রবেশ করল জলপ্রাসাদের অভ্যন্তরে৷ কেমন যেন এক অদ্ভুত শীতলতা বিরাজ করছে জলপ্রাসাদের ভিতর৷ বাতাসের শীতলতা নয়৷ বাইরের বাতাস প্রবেশ করছে না ভিতরে৷

জলপ্রাসাদের ভিতর কক্ষগুলোর উত্তাপ বজায় রাখার জন্য মাথার ওপর ঝুলন্ত পাত্র থেকে কাঠকয়লার আঁচও জ্বলছে৷ যে শীতলতা জলপ্রাসাদের অভ্যন্তরে বিরাজ করছে তা হল বিশেষ কারোর এ প্রাসাদে অবস্থানের কারণে নীরবতার শীতলতা, সতর্কতার শীতলতা, তটস্থ হয়ে থাকার, আশঙ্কার শীতলতা কারণ, ও প্রাসাদেরই কোনো এক কক্ষে বর্তমানে অবস্থান করছে কাশ্মীরবাসীর ভাগ্য নিয়ন্ত্রক মহারাজ ললিতাপীড়!

বেশ কয়েকটা কক্ষ অতিক্রম করে উচ্ছল এসে উপস্থিত হল সাক্ষাৎ প্রার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষের সামনে৷ সে স্থানেও দাঁড়িয়ে ছিল দুজন রক্ষী৷ উচ্ছলের পরিচয় জানার পর কপাট উন্মুক্ত করল তারা৷ উচ্ছল প্রবেশ করল কক্ষের ভিতর৷ মশালের আলোতে উজ্জ্বল কক্ষ৷ তার কেন্দ্রস্থলে এক রৌপ্য আসনে বসে আছে বিটপী৷ তার গায়ে বাঘ ছালের উজ্জ্বল শাল জড়ানো৷ কণ্ঠের হীরকমালা মশালের আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে৷ কিছু দূরে তার অনুগত কয়েকজন ভৃত্যা দাঁড়িয়ে আছে পান পাত্র সহ নানান পাত্র হাতে৷ তারাও স্বর্ণালঙ্কারে সজ্জিতা৷ উচ্ছল কক্ষে প্রবেশ করতেই বিটপী তাকে আহ্বান জানিয়ে বলল, ‘আসুন সভাসদ, আসন গ্রহণ করুন৷’

দর্শনার্থী, সাক্ষাৎপ্রার্থীদের উপবেশনের জন্য বিটপীর আসনে মখমল আচ্ছাদিত কয়েকটা সুদৃশ্য কাষ্ঠাসন রয়েছে৷ উচ্ছল এগিয়ে গিয়ে তারই একটাতে বিটপীর মুখোমুখি বসল৷ তারা কয়েক মুহূর্তর জন্য পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল৷ উচ্ছলের কেন জানি মনে হল, বেশ্যা বিটপীর মুখমণ্ডলে কোথায় যেন একটা চিন্তার ছায়া লুকিয়ে আছে!

বিটপী এরপর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে ভৃত্যাদের উদ্দেশে বলল ‘অতিথিকে সোমরস পরিবেশন কর৷’

বিটপীর নির্দেশ মেনে কয়েকজন ভৃত্যা পান পাত্র আর সোমরস ইত্যাদি নিয়ে এগিয়ে আসতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই উচ্ছল বলল, ‘আমি মদ্যপান করি না৷’

উচ্ছলের কথা শুনে বিটপী হাতের ইশারায় থেমে যেতে বলল ভৃত্যাদের৷ তারপর উচ্ছলের উদ্দেশে বলল, ‘হ্যাঁ, একবার ভাঁড় কূপমণ্ডূকের মুখে আপনার প্রশংসা শুনেছিলাম৷ সে বলেছিল বটে আপনি মদ্যপান করেন না৷’

এ কথা বলার পর সে বলল, ‘আর কূপমণ্ডূক আমাদের এ কথা বলেছিল যে আপনি একজন রাজভক্ত৷ তাই আপনার মতো মানুষকেই আমার বিশেষ প্রয়োজন৷ অনেকেই আমার সঙ্গে রাজপ্রাসাদে সাক্ষাৎ করতে আসেন, কিন্তু আপনি কোনোদিন আসেননি তাই এভাবে বাক্যালাপের সুযোগ হয়নি আপনার সঙ্গে৷’

উচ্ছল ভেবে নিল এই চতুর বেশ্যার সঙ্গে প্রতিটা কথা কৌশলে বলতে হবে৷ যাতে তার প্রতি বিটপীর কোনো সন্দেহের সৃষ্টি না হয়৷ তাই বিটপীর কথা শুনে উচ্ছল বলল, ‘আমি সভাসদ, রাজ অন্নে প্রতিপালিত হই৷ রাজাকে ভক্তি করা আমার কর্তব্য৷ আমি সেটাই করি৷ আর আপনি প্রতিনিয়ত মহারাজের সেবায় ও নানান রাজকার্যে ব্যস্ত থাকেন৷ তাই অযথা আপনার কাছে উপস্থিত হয়ে আপনার সময় নষ্ট করতে চাই না৷’

উচ্ছলের মনে হল তার কথা শুনে বিটপী খুশি হল৷ কারণ সে বলল, ‘এবার থেকে আসবেন৷ কারণ সুষ্ঠ ভাবে রাজ্য শাসন করতে গেলে আপনার মতো রাজভক্ত লোককেই মহারাজের প্রয়োজন৷ আমি তার প্রতিনিধি হিসাবে আপনার সঙ্গে বাক্যালাপ করব৷’

উচ্ছল বলল, ‘আচ্ছা৷’

বিটপীর এরপর উচ্ছলকে প্রশ্ন করল, ‘এই দল হ্রদে আপনি কত বৎসর ধরে বসবাস করেন?’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘আজন্মকাল ধরে আমি দল হ্রদের বাসিন্দা৷ জলগৃহতেই আমার জন্ম৷’ বিটপী জানতে চাইল, ‘কে কে আছেন আপনার গৃহতে? যতটুকু শুনেছি আপনি বিবাহ করেননি৷’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘আমি আর এক বৃদ্ধা পরিচারিকা। সে শৈশব থেকে আমাকে বড় করেছে৷’

পাছে পালেবতের কথা বললে কোনো প্রশ্নর উদয় হয় তাই তার উপস্থিতির কথা এড়িয়ে গেল উচ্ছল৷

কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবার পর বিটপী প্রশ্ন করল, ‘তার মানে এই দল হ্রদের সব কিছুই আপনার নখদর্পণে তাই তো? জলগৃহ ভাসমান দ্বীপ, লোকজন?’

উচ্ছল উত্তর দিল, ‘অনেকটা তাই বলতে পারেন৷’

বিটপী বলল, ‘এ স্থানে মহারাজের অবস্থান কালে যদি কোথাও কোনো সন্দেহজনক ব্যাপার আপনার চোখে পড়ে তবে সঙ্গে সঙ্গে তা আমাকে জানাবেন৷’

কথাটা শুনে উচ্ছল জানতে চাইল, ‘সন্দেহজনক ব্যাপার মানে?’

উচ্ছলের প্রশ্ন শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকে জরিপ করে নেওয়ার পর বিটপী যা বলল তা শুনে মনে মনে চমকে উঠল উচ্ছল৷ বিটপী বলল, ‘আমি যে কথা আপনাকে বলছি তা আপনি অন্যদের থেকে গোপন রাখবেন৷ আমার অনুমান কেউ বা কারা মহারাজের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে৷ তার কিছু অস্পষ্ট প্রমাণও আমরা গুপ্তচরের কাছ থেকে পেয়েছি৷ এমনও হতে পারে রাজসভার কোনো লোক, কোনো মন্ত্রী বা সভাসদও যুক্ত থাকতে পারেন সেই চক্রান্তের সঙ্গে...৷’

বিটপী এ পর্যন্ত কথাটা বলতেই উচ্ছল তার মুখে কৃত্রিম বিস্ময় ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘রাজ সভাসদ মহারাজের বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত হবেন এও কি সম্ভব?’

বিটপী গম্ভীর ভাবে বলল, ‘অসম্ভবের কিছু নেই, কেউ থাকতেই পারেন৷ তাই পরিচিত হোক বা অপরিচিত হোক, সভাসদ বা সাধারণ মানুষকে যদি হ্রদে সন্দেহজনক ভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখেন, মিলিত হতে দেখেন তবে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে খবর দেবেন৷ দিন হোক বা রাত, যে কোনো সময়, আমি সব সময় মহারাজের সেবার জন্য জাগ্রত থাকি৷ আপনার বর্তমানে এটাই দায়িত্ব যে এই হ্রদের ওপর দৃষ্টি রাখা৷’

উচ্ছল বলল, ‘আচ্ছা রাখব৷ কিন্তু আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আজ আমাকে অনেক সময় ব্যয় করতে হয়েছে৷ রক্ষীরা এ স্থানে আমাকে প্রবেশ করতে দিচ্ছিল না আমার কাছে মহারাজের পাঞ্জা না থাকাতে৷’

কথাটা শুনে বিটপী বলল, ‘অবাঞ্ছিত মানুষদের গতিরোধও মহারাজের নিরাপত্তার স্বার্থেই এবার এ ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ পাঞ্জা আমি আপনাকে এখনই দিচ্ছি৷’ এ কথা বলে সে এক ভৃত্যাকে নির্দেশ দিল একটি ‘বৃহৎ পাঞ্জা’ আনার জন্য৷’

তার নির্দেশ পালিত হল, ভৃত্যা একটি রূপোর তৈরী বৃহৎ পাঞ্জা এনে দিল উচ্ছলকে৷ উচ্ছল সেটা গ্রহণ করার পর বিটপী তাকে বলল, ‘অন্য যাদের পাঞ্জা দেওয়া হয়েছে তার থেকে এ পাঞ্জা মূল্যবান৷ এ পাঞ্জাতে মহারাজের হস্তের পূর্ণাঙ্গ ছাপ খোদিত আছে৷ দিন অথবা রাত, ও পাঞ্জা নিয়ে যে কেউ জলপ্রাসাদে প্রবেশ করতে পারে৷ আমার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে পারে৷ অন্য কেউ তাকে কোনো প্রশ্ন করবে না৷’

বিটপী এরপর বলল, ‘শুনুন সভাসদ৷ মহারাজ কিছু দিনের মধ্যেই কিছু অকর্মন্য মন্ত্রীদের পদচ্যুত করে নতুন মন্ত্রী নিয়োগ করবেন৷ আপনার কাজে যদি মহারাজ খুশি হন তবে আপনি মন্ত্রীসভাতে স্থান পেতে পারেন৷ তাতে আপনার পদমর্যাদা ও আর্থিক সামর্থ্য, স্বাচ্ছন্দ্য সবই বৃদ্ধি পাবে৷ নতুন মন্ত্রীদের তালিকা নির্মাণের জন্য মহারাজ আমার পরামর্শ চেয়েছেন৷ মনে রাখবেন, আমি যদি কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিই তবে তার অন্যথা হয় না৷ আপনার ক্ষেত্রেও হবে না৷’ এ কথা বলার পর বিটপী আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় এক রূপসী ভৃত্যা সে কক্ষে প্রবেশ করে বিটপীর কাছে এসে প্রণাম জানাল৷ বিটপী তার দিকে তাকাতেই সে বলল, ‘মহারাজের নিদ্রা ভঙ্গ হয়েছে৷ তিনি আপনাকে ডাকছেন৷’

মহারাজের আহ্বান শুনে বিটপী আর উচ্ছলের সঙ্গে বাক্যালাপে সময় নষ্ট করল না৷ সে উঠে দাঁড়িয়ে উচ্ছলকে বলল, ‘এবার আপনি যান৷ যা বললাম সে কথাগুলো মনে রাখবেন৷ আর আপনার কোনো প্রয়োজন হলে আপনি নিঃসঙ্কোচে জানাবেন৷ বিটপী মহারাজের সেবকদের ইচ্ছা সব সময় পূরণ করে থাকে৷’

এ কথা বলে বিটপী এগোল মহারাজের সেবায় নিয়োজিত হবার জন্য আর উচ্ছলও কক্ষ ত্যাগ করল৷ কক্ষের বাইরে তাকে অলিন্দ পর্যন্ত পৌঁছে দেবার জন্য উপস্থিত ছিল মুষিক৷ সে উচ্ছলকে নিয়ে বাইরের দিকে এগোতে এগোতে চাপা স্বরে বলল, ‘দেবী বিটপী আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন৷ অলিন্দ থেকে সাক্ষাৎ প্রার্থীদের এ কক্ষ পর্যন্ত আনা-নেওয়ার দায়িত্ব৷ কারা কারা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসছে সে খবর আমি জানতে পারব৷’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘আমাকে মাঝে মাঝে জলপ্রাসাদে এসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলল সে৷’ মুষিক তাকে অলিন্দ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেল৷ জলপ্রাসাদ থেকে নেমে নিজের শিকারাতে উঠে সে স্থান ত্যাগ করার জন্য রওনা হল উচ্ছল৷ সে দেখল বাঁদরী শিকারা নিয়ে একই স্থানে রয়েছে৷ রজ্জু ঘেরা সীমানার বাইরে বেরিয়ে এল উচ্ছল৷ সে জলপ্রাসাদ থেকে যতদূরে সরে যেতে লাগল ততই তার মনে ধীরে ধীরে আবার ভেসে উঠতে লাগল পালেবতের কথা৷ তার ভাবনাতেই বিভোর হয়ে হ্রদের কিনারে পৌঁছে গেল উচ্ছল৷

২১

রাজসভা ছিল না এদিন৷ কার্যালয়ের কার্য সমাপন করে হাতে সময় থাকায় ও তার বেশ কিছু সামগ্রী ক্রয় করা প্রয়োজন থাকায় কার্যালয় থেকে বেরিয়ে সে প্রথমে গিয়ে উপস্থিত হল যে স্থানে বিপনী শ্রেনী অবস্থান করছে সে স্থানে৷ প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী ক্রয় করার পর সে দেখতে পেল এক বিপনীতে উত্তম মানের অশ্বসাজ অর্থাৎ অশ্বারোহীর আসন, পা-দান, বল্গা ইত্যাদি বিক্রয় হচ্ছে৷ উচ্ছলের অশ্বসাজ বহু ব্যবহারে প্রাচীন হয়ে এসেছে৷ তা পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সময়াভাবে তা করা হয়ে উঠছিল না৷ উচ্ছল এবার সুযোগটা কাজে লাগাল৷ দ্বিপ্রহর অতিক্রান্ত হয়ে গেল৷ উচ্ছল যখন শিকারাতে উঠে গৃহে ফেরার জন্য রওনা হল তখন বিকাল হয়ে এসেছে৷

জলগৃহর কাছাকাছি পৌঁছে দূর থেকেই সে দেখতে পেল পালেবত অলিন্দে দাঁড়িয়ে আছে৷ সে কি তবে উচ্ছলের গৃহে ফেরার জন্যই প্রতীক্ষা করছে? আগের দিনও তো সে উচ্ছলের প্রতীক্ষায় অলিন্দে দাঁড়িয়ে ছিল৷ এ কথাটা ভেবে ভালোলাগায় ভরে উঠল উচ্ছলের মন৷ দ্রুত চাপ্পার ঘা মারতে মারতে গৃহের দিকে এগোতে লাগল সে৷

জলগৃহর গায়ে শিকারা বেঁধে এক হাতে দ্রব্য সামগ্রীর থলে আর অন্য হাতে বিটপীর দেওয়া রৌপ্য পাঞ্জাটা নিয়ে উচ্ছল ওপরে উঠে এল৷ ঠিক সেই সময় কোনো কারণবশত গুঞ্জাও অলিন্দে বেরিয়ে এল৷ উচ্ছল তার হাতে দ্রব্য সামগ্রীগুলো তুলে দিতেই সে সেগুলো নিয়ে প্রস্থান করল৷ উচ্ছল তাকাল পালেবতের দিকে৷ পালেবতের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল উচ্ছলের দিকে তাকিয়ে৷ পালেবতের সেই হাসি আর অলিন্দের দণ্ড আলিঙ্গন করে তার দাঁড়াবার ভঙ্গিমা দেখে উচ্ছলের মনে হল তার সামনে উপস্থিত হলে পালেবতের মধ্যে যে আড়ষ্টতা থাকে তা যেন আজ আর নেই! হয়তো তা গতরাত্রির কথোপকথনের ফল৷ উচ্ছলের ভালো লাগল ব্যাপারটা দেখে৷ সে হেসে পালেবতকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কেন? নাকি কারও প্রতীক্ষা করছিলেন?’

পালেবত হেসে জবাব দিল, ‘দুটোই৷’

উচ্ছল তাকে প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল, ‘কার জন্য অপেক্ষা করছিলে?’

কিন্তু তার আগেই পালেবত তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনার হাতে ওটা কী? মহারাজার পাঞ্জা?’

উচ্ছল মৃদু বিস্মিত ভাবে বলল, ‘হ্যাঁ৷ কিন্তু তুমি চিনলে কীভাবে?’

পালেবত জবাব দিল, ‘অনুমান করলাম৷ এর থেকে আকারে ক্ষুদ্রাকৃতি একটা পাঞ্জা আমি বাঁদরীর কাছে দেখেছি৷’

এ কথা শুনে উচ্ছল বলল, ‘আজ আমার সঙ্গে মহারাজের জলপ্রাসাদের কাছে বাঁদরীর সাক্ষাৎ হয়েছিল৷ সে বলল ওই স্থানে কর্মে নিয়োজিত হয়েছে৷’

কথাটা শুনেই পালেবত বলে উঠল, ‘আপনি জলপ্রাসাদে গেছিলেন! মহারাজকে দেখলেন?’

উচ্ছল বলল, ‘না, আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাইনি৷ রাজসভার সদস্যা বিটপী আমাকে সাক্ষাৎ করতে বলেছিল তাই গেছিলাম৷ সেই আমাকে পাঞ্জাটা দিল৷ যাতে আমি যে কোনো সময় জলপ্রাসাদে প্রবেশ করতে পারি৷’

উচ্ছলের কথা শুনে পালেবত কিছুটা স্বগোতক্তির স্বরে বলে উঠল, ‘মহারাজের প্রাসাদে সাধারণ দাসী-ভৃত্যাদের দেহেও কত স্বর্ণালঙ্কার! আপনি তো রাজ সভাসদ, আপনার নিশ্চয়ই তবে তাদের থেকেও বেশি অলঙ্কার৷ সে সব আপনি ধারণ করেন না কেন?’

উচ্ছল কথাটা শুনে বলল, ‘না, ওই ভৃত্যাদের মতো অত পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার আমার নেই৷ যদিও আমার অলঙ্কার ধারণে তেমন কোনো আগ্রহ নেই৷ কর্ণ কুন্তল আর এক ছড়া মুক্তা হারই আমার পক্ষে যথেষ্ট৷’

ও কথা বলেই উচ্ছল তাকে প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু মহারাজের ভৃত্যারা যে স্বর্ণালঙ্কার ভূষিতা তুমি তা জানলে কীভাবে?’

আচম্বিতে এ প্রশ্ন শুনে পালেবত সত্যি কথাটাই বলে ফেলল৷ সে বলল, ‘বাঁদরী যেদিন তার পাঞ্জা সংগ্রহর জন্য জলপ্রাসাদে গেছিল, সেদিন আমি তাঁর সঙ্গে গেছিলাম৷’

উচ্ছল কথাটা শুনে চমকে উঠল৷ সে প্রশ্ন করল, ‘বিটপীর সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হয়েছিল নাকি?’

পালেবত জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, তিনিই তো বাঁদরীকে পাঞ্জাটা দিলেন৷’

নিজের অজান্তেই যেন উচ্ছলের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল৷ সে বলল, ‘তুমি যে আমার গৃহে থাকো এ কথা বিটপীকে বলেছ?’

পালেবত জবাব দিল, ‘আমি তাঁকে একথা জানাইনি৷’

পালেবতের জবাবে উচ্ছল কিছুটা আশ্বস্ত হলেও সে বলল, ‘সে স্থানে যাওয়া তোমার উচিত হয়নি৷’

‘উচিত হয়নি কেন?’ প্রশ্ন করল পালেবত৷

উচ্ছল এবার আর তার বক্তব্য সম্বরণ করতে পারল না৷ সে উত্তেজিত ভাবে বলল, ‘কারণ, বিটপীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তোমার প্রবল ক্ষতির সম্ভাবনা৷ তাঁর প্রকৃত পরিচয় সে একজন বেশ্যা৷ সে আর অপর দুই বেশ্যা রতিমালা ও মুক্তবেণী এই তিনজন মিলে কামুক মহারাজা ললিতাপীড়কে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেছে৷ কোনো নারী ওই তিন বেশ্যার কাছে নিরাপদ নয়৷ তোমার মতো কুমারী-যুবতীরা তো নয়ই৷ কারণ তারা অর্থ বা অলঙ্কারের লোভ দেখিয়ে, অথবা কোনো সময় বলপূর্বক নারীদের মহারাজের হাতে তুলে দেয় মহারাজের শয্যা সঙ্গিণী হবার জন্য, মহারাজের কাম লালসা চরিতার্থ করবার জন্য৷ ওই তিন বেশ্যা মহরাজকে এতটাই বশীভূত করে রেখেছে যে মহারাজ শুধু তাদের মেনেই চলেন৷ সর্বদা ওই তিন বেশ্যাকে আনন্দে রাখার চেষ্টা করেন৷ শুধু নারীরাই নয়, রাজ বৈদ্য সুষেণের মতো কত পুরুষও যে ওই তিন নারীর জন্য আত্মহনন করতে বাধ্য হয়েছে অথবা তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে তা গুনে শেষ করা যাবে না৷ বাইরে থেকে দেখে কিছু বোঝা না গেলেও মহরাজ আর ওই তিন বেশ্যা মিলে এই সুন্দর দেশটাকে শ্মশানে পরিণত করতে চলেছে৷ আমি রাজপরিষদ রাজকর্মচারী তাই প্রয়োজনে আমাকে এই সব কদর্য মানুষদের সংস্পর্শ থাকতে হয়৷ কিন্তু আমি চাই না যে তুমি কোনো ভাবে তাদের সংস্পর্শে আসো৷ জলপ্রাসাদে আমাকে না জানিয়ে গিয়ে তুমি উচিত কাজ করোনি৷’ এ কথাগুলো পালেবতের উদ্দেশে বলে এরপর নিজের কক্ষর দিকে এগোল উচ্ছল৷ ম্লান মুখে কিছু সময় অলিন্দে দাঁড়িয়ে রইল পালেবত৷ তারপর সেও কক্ষে ফিরে গেল৷ অন্ধকার নামল দল হ্রদের বুকে৷

নিজ কক্ষে ফেরার পর আর অলিন্দে যায়নি উচ্ছল৷ পালেবতের সঙ্গে বাক্যালাপ করতে করতে যথেষ্ট পরিমাণ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে৷ আসলে বিটপীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর পালেবতের ভাগ্যে কী ঘটতে পারত বা ঘটার সম্ভাবনা আছে তা ভেবেই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে৷ কক্ষে ফিরেও সে উত্তেজনা প্রশমিত হতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল তার৷

নৈশাহার সাঙ্গ করার পর ঘুম এল না উচ্ছলের৷ পালঙ্কে শুয়ে সে এরপর ভাবতে লাগল, পালেবতকে সে এত রুক্ষ ভাবে কথাগুলো না বললেই পারত৷ পালেবত তো আর বিটপীর ব্যাপারে সম্যকধারণা ছিল না৷ থাকলে নিশ্চয়ই যেত না৷ হয়তো বা পালেবত দুঃখ পেয়েছে তার কঠিন আচরণে? বেড়ে চলল রাত৷

হঠাৎই এক সময় বাইরের অলিন্দে ক্ষীণ পদশব্দ শুনতে পেল উচ্ছল৷ সে পদশব্দ যতই ক্ষীণ হোক না কেন তা চিনতে ভুল হল না উচ্ছলের৷ সঙ্গে সঙ্গে সে পালঙ্ক থেকে নেমে নিশব্দে কপাট খুলে বাইরে তাকাল৷ সে দেখতে পেল পালেবতকে৷ সোজা শ্রেনী বেয়ে সে নীচে নামছে৷ তবে সে কিন্তু নীচের পাটাতনের কিনারে এ রাতে বসল না৷ উঠে পড়ল পাটাতনের অন্য কিনারে রাখা উচ্ছলের শিকারাতে৷ তারপর রজ্জুবন্ধন থেকে শিকারাকে মুক্ত করে চাপ্পা হাতে তুলে নিল! এত রাতে কোথায় যাচ্ছে পালেবত? এ প্রশ্নটাই প্রথমে মাথায় এল উচ্ছলের৷ শঙ্কা সৃষ্টি হল তার মনে৷ বিস্মিত ভাবে সে চেয়ে রইল পালেবতের দিকে৷ কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যেই তার মনের শঙ্কা দূর হয়ে গেল৷ পালেবত শিকারা নিয়ে কোথাও গেল না৷ শিকারা নিয়ে যে বৃত্তাকারে ভ্রমণ করতে লাগল উচ্ছলের জলগৃহর চারপাশে৷ তা দেখে উচ্ছলের ধারণা হল পালেবত শিকারা চালনা অনুশীলন করছে৷ উচ্ছলই তো তাকে এ অনুমতি দিয়েছে৷ নিশ্চিন্ত হল সে৷ শিকারা নিয়ে ভ্রমণরত পালেবতকে দেখতে দেখতে এক সময় ঘুম নেমে আসতে লাগল উচ্ছলের চোখে৷ দ্বার বন্ধ করে পালঙ্কে শুয়ে পড়ল সে৷

এর পর দু-রাতেও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটল৷ সারা দিন উচ্ছলের মন পালেবতের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকলেও দিনের বেলা সে তার দেখা পেল না৷ তবে দু’রাতেই সে পালেবতের পদশব্দ পেল৷ তারপর দরজা খুলে দেখল পালেবত তার শিকারা নৌকো নিয়ে নিস্তব্ধ দল হ্রদে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷

এর পর দিন ভোরে উঠে উচ্ছলের মনে হল সেদিন বিকালে পালেবতের সঙ্গে কঠিন ব্যবহার করার জন্য সম্ভবত পালেবত তার ওপর অভিমান করেছে৷ তাই কদিন ধরে দিনের বেলা তার সাক্ষাৎ মিলছে না৷ উচ্ছল ভেবে নিল পালেবতের এ অভিমান ভাঙা প্রয়োজন৷ তার সঙ্গে বাক্যালাপ না করতে পেরে বড় কষ্ট বোধ হচ্ছে তার৷ আজ সারাদিন যদি পালেবতের সঙ্গে তার বাক্যালাপের সুযোগ না ঘটে তবে পালেবত যখন রাত্রে শিকারা বাইতে বেরোবে তখন উচ্ছল নিজে থেকেই তার সঙ্গে বাক্যালাপের চেষ্টা করবে৷

উচ্ছল সকাল বেলা বেশ কিছু সময় অলিন্দে দাঁড়িয়ে রইল পালেবতের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতীক্ষাতে৷ কিন্তু পালেবত কক্ষের বাইরে এল না৷ প্রতিদিনের মতো উচ্ছল যখন জলগৃহ ত্যাগ করে তার কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা হল তখনও সে দেখতে পেল পালেবতের কক্ষের দরজা বন্ধ৷ উচ্ছল অনুমান করল তাকে রাত্রির জন্যই প্রতীক্ষা করতে হবে৷

চার রাত হয়ে গেল মহারাজ তাঁর জলপ্রাসাদে অবস্থান করছেন৷ মহারাজের নির্দেশ মতো গতকালই তাঁর প্রতিনিধিদের সভা আহ্বান করার কথা ছিল৷ কিন্তু মহারাজের অদর্শনে তাঁর দুই প্রেয়সী নাকি এতটাই কাতর হয়ে পড়েছে যে তারা নাকি গত দিনও সভায় উপস্থিত হতে পারত না৷ তাই গত দিনের পরিবর্তে এদিন সভা আহ্বান করেছে৷

পালবতের কথা ভাবতে ভাবতেই উচ্ছল রাজসভাতে উপস্থিত হল৷ সে দেখল সভাতে এদিন সভাসদদের উপস্থিতি তেমন নেই৷ হয়তো বা মহরাজ সভায় উপস্থিত হবেন না বলেই তাঁরা সভায় উপস্থিত হননি৷

এমনকী মহামন্ত্রী যশঙ্করকেও সভাতে দেখতে পেল না উচ্ছল৷ হয়তো বা তিনি বিতৃষ্ণা জনিত কারণেই উপস্থিত হননি৷ তবে উচ্ছল আরও একটা ব্যাপার খেয়াল করল, সভায় উপস্থিত অনেকের মুখমণ্ডলেই একটা স্বস্তির ভাব এবং তা যে মহারাজের অনুপস্থিতির কারণেই তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ অর্থাৎ মহারাজকে মন থেকে এ সভার অনেকেই পছন্দ করে না৷

এক সময় কয়েকজন রক্ষী পরিবৃত হয়ে দুই বেশ্যা রতিমালা ও মুক্তবেণী সভায় প্রবেশ করল৷ অলঙ্কারে ঝলমল করছে তাদের দেহ৷ শুধু যেন রাজমুকুটটাই তাদের পরা বাকি! এদিন সভা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করল রতিমালা৷ মহারাজের সিংহাসনের কিছুটা নিচেই যে রৌপ্য আসন রাখা আছে, তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে৷ সেই আসনে বসার আগে একবার ঘাড় তুলে মহারাজের সিংহাসনের দিকে তাকাল সে৷ যেন ওই সিংহাসনে বসতে পারলেই ভালো হত৷ ললিতাপীড়ের প্রতিনিধি রূপে আসন গ্রহণ করল রতিমালা৷ বেশ্যাদের অনুগত কয়েকজন তার নামে জয়ধ্বনি করল৷ রতিমালা যে মহরাজের অদর্শনে গভীর ভাবে আহত তা কিন্তু তাঁর মুখমণ্ডল দেখে মনে হল না উচ্ছলের৷ বরং মনে হল রতিমালা যেন তার ওই ক্ষমতা গভীর ভাবে উপভোগ করছে৷

সভার কাজ শুরু হল৷ রতিমালা মহারাজের অনুকরণেই প্রশ্ন করল, ‘কোনো সাক্ষাৎপ্রার্থী আছে?’

দ্বারী একই জবাব দিল, ‘না, নেই৷’

রতিমালা এরপর সভাস্থলের চারদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মহামন্ত্রীর শূন্য সন দেখে জানতে চাইল ‘মহামন্ত্রী কোথায়?’

রতিমালার এই কৌতূহলের জবাবে কম্পনধিপতি গরুড় বললেন, ‘মহামন্ত্রী আমাকে বার্তা পাঠিয়েছেন যে তিনি শূল বেদনায় পীড়িত৷ তাই তিনি সভায় উপস্থিত হতে পারছেন না৷’

এ কথা শুনে উৎকণ্ঠিত হবার বদলে যেন খুশিই হল রতিমালা৷ সে বলল, ‘তাঁকে জানাবেন অসুস্থতা নিয়ে সভায় আসার প্রয়োজন নেই৷ রোগ মুক্তির পরই যেন তিনি সভায় আসেন৷ তাঁর অনু্পস্থিতিতে সভা পরিচালনা করতে সমস্যা হবে না৷ তবে আপনি কিন্তু নিয়মিত ভাবে সভায় উপস্থিত থাকবেন৷’

রতিমালার কথাতে সম্মতি প্রকাশ করলেন প্রধান সেনাপতি গরুড়৷ রতিমালার এরপর দৃষ্টি পড়ল সভার এক কোণে বসে থাকা কূপমণ্ডূকের ওপর৷ এতক্ষণ তার উপস্থিতি কেউ যেন টেরই পায়নি৷ রতিমালা তার উদ্দেশে বলল, ‘কূপমণ্ডূক, তুমি এমন বিষণ্ণ ভাবে বসে আছ কেন?’

কূপমণ্ডূক উঠে দাঁড়াল৷ উচ্ছল দেখল সত্যিই তার মুখমণ্ডলে যেন বিষণ্ণতার ছাপ৷ তবে সেটা তার অভিনয় হতে পারে৷ উঠে দাঁড়িয়ে কূপমণ্ডূক বলল, ‘মহারাজের অদর্শনে বড়ই বেদনা বোধ হচ্ছে৷ হাসি মুছে গেছে আমার৷’

তার কথা শুনে রতিমালা বলল, ‘হ্যাঁ, মহারাজের অদর্শনে পরম রাজভক্তর মনে এমন বেদনার ভাব হওয়াই স্বাভাবিক৷ তোমার রাজভক্তি সভার কাছে শিক্ষনীয়৷’

ঠিক এই সময় অপর বেশ্যা মুক্তবেণী উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তবে তোমার জন্য একটা সুসংবাদ আছে কূপমণ্ডূক৷’

রতিমালা তার সহচরীকে বলল, ‘সে সংবাদ তুমি সভার সামনে ব্যক্ত করো৷’

মুক্তবেণী বললেন, ‘মহারাজ অনুমান করেছেন যে তাঁর পরম ভক্ত কূপমণ্ডূক তাঁর অদর্শনে চরম মনোকষ্টে ভুগছে৷ তাই তিনি কূপমণ্ডূককে জলপ্রাসাদে দর্শন দেবেন৷ রাজভক্তর জন্য পাঞ্জা পাঠিয়েছেন তিনি৷ কূপমণ্ডূক, রাজসভা ভঙ্গ হলে তুমি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ কোরো৷’ মুক্তবেণীর কাছ থেকে এ সংবাদ পেয়ে হাসি ফুটে উঠল ভাঁড়ের মুখে৷ সে বলে উঠল, ‘জয় মহারাজের জয়৷’

রতিমালা এরপর সভাকে বলল, ‘মহারাজের নির্দেশ সব বিভাগের রাজস্ব বৃদ্ধি করতে হবে৷ এর জন্য অর্থ বিভাগ সহ অন্য বিভাগ আগামী এক পক্ষকালের নিজেদের পরিকল্পনা সভাকে জানাবেন, এ কথা জানাবার জন্যই আজকের এই সভা আহ্বান করা হয়েছিল৷’

বেশ্যা রতিমালার যা জানানোর ছিল তা জানানো হয়ে গেল৷ এরপর তার ইঙ্গিতে একদল নর্তকী সভায় প্রবেশ করে নৃত্য প্রদর্শন করল৷ তারপর সভা ভেঙে গেল৷

সভাস্থল ত্যাগ করার সময় উচ্ছলের সাক্ষাৎ হয়ে গেল মন্ত্রী বিদুরের সঙ্গে৷ উচ্ছল চাপা স্বরে জানতে চাইল, ‘মহামন্ত্রী কি সত্যিই অসুস্থ?’

বিদুরও চাপা স্বরে জবাব দিলেন, ‘মনে হয় না৷ সম্ভবত তিনি ইচ্ছাকৃত ভাবেই অনুপস্থিত হয়েছেন৷’ রাজসভা ত্যাগ করে এদিন উচ্ছলের কার্যালয়ে যেতে আর মন চাইল না৷ সে রওনা হল গৃহে ফেরার জন্য৷ অনেকদিন পর সে মধ্যাহ্নে তার গৃহে ফিরে এল৷ অবশ্য সে কক্ষের বাইরে দেখতে পেল না পালেবতকে৷

উচ্ছল নিজকক্ষে প্রবেশ করার পর মধ্যাহ্ন ভোজের জন্য খাদ্য দ্রব্য নিয়ে প্রবেশ করল গুঞ্জা৷ বিরাট একটা কাঠের বারকোষের মধ্যে নানান পাত্রে সাজানো পরমান্ন সহ নানবিধ খাদ্য দ্রব্য! তাদের সুবাসে ভরে উঠল কক্ষের বাতাস৷ এত ধরনের খাদ্য দ্রব্য দেখে উচ্ছল জানতে চাইল, ‘আজ কি কোনো পূজা-পার্বণ, উৎসব নাকি?’

প্রশ্ন শুনে গুঞ্জা হেসে জবাব দিল, ‘না, পূজা-পার্বণ নয়৷ আজ আপনার জন্ম তিথি৷ আপনার স্মরণে না থাকলেও আমার থাকে তাই এই আয়োজন৷’

হ্যাঁ, প্রতিদিন এ দিনটি গুঞ্জাই মনে করিয়ে দেয় উচ্ছলকে৷ জন্ম থেকে সে মানুষ করেছে তাকে৷ উচ্ছলের জন্মতিথিতে সে পরমান্ন রন্ধন করে৷ তবে এদিন অন্য জন্মতিথির তুলনায় খাদ্যের বৈচিত্র্য অনেক বেশি৷

গুঞ্জার কথা শুনে উচ্ছল হেসে বলল, ‘ধন্যবাদ তোমাকে৷ কিন্তু এত খাদ্য দ্রব্যর প্রয়োজন কি ছিল? পরমান্নই তো যথেষ্ট৷ এত পরিশ্রম কেন করতে গেলে তুমি?’

গুঞ্জা হেসে জবাব দিল, ‘আমি পালেবতকে জানিয়েছিলাম আজ আপনার জন্মতিথি৷ এসব রন্ধন সেই করেছে৷’ এ কথা বলে সে চৌঞ্চপায়াতে খাদ্য দ্রব্যগুলো সাজিয়ে রেখে কক্ষ ত্যাগ করল৷

গুঞ্জার মুখ থেকে শোনা কথাতে সত্যিই এক অনাস্বাদিত আনন্দে ভরে উঠল উচ্ছলের মন৷ পালেবত এত যত্ন করে রেঁধেছে তার জন্য! এর চেয়ে জন্মতিথিতে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?

পালেবতের প্রতি ভালোবাসায় ভরে উঠল তার মন৷ উচ্ছল আহার গ্রহণ করতে বসল৷ বিভিন্ন পদ মুখে তুলেই উচ্ছল বুঝতে পারল পালেবত সত্যিই সর্বগুণ সম্পন্না৷ এমন কিছু পদ রন্ধন করা হয়েছে যা উচ্ছল ইতিপূর্বে কোনো দিন খায়নি৷ স্বাদে অতুলনীয় সে সব পদ৷ সে অনুমান করল সেই পদগুলো সম্ভবত অন্য স্থানের৷ হয়তো বা পালেবত যে স্থানের বাসিন্দা ছিল৷ মুহূর্তর জন্য উচ্ছলের একবার মনে হল স্মৃতিশক্তি হারালেও রন্ধনশিল্প একবার কেউ রপ্ত করলে সন্তরণের মতো তা আর কেউ ভোলে না! নইলে পালেবত এ সব খাদ্য দ্রব্য রন্ধন করল কীভাবে? অবশ্য এ প্রশ্ন তার মনে মুহূর্তর বেশি সময় স্থায়ী হল না৷ পালেবতের প্রস্তুত করা খাদ্য গ্রহণে লিপ্ত হল সে৷ পুরো খাদ্য দ্রব্যই উদরস্থ করে ফেলল ধীরে ধীরে৷

বিকাল হল এক সময়৷ উচ্ছল অলিন্দে এসে দাঁড়াল৷ কিন্তু পালেবতের সাক্ষাৎ সে পেল না৷ তবে সে আশাহত হল না৷ উচ্ছল জানে কখন সে নিশ্চিত ভাবে অলিন্দে আসবে, কখন উচ্ছল সাক্ষাৎ করবে তার সঙ্গে৷ পালেবতের প্রতি ভালোবাসায় বিভোর হয়ে আছে উচ্ছলের মন৷ এক জোড়া রাজ হংস-হংসী কেন জানি তাদের ঝাঁকের থেকে আলাদা হয়ে উচ্ছলের জলগৃহর কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ এই বসন্ত ঋতুতে তারা বাসা বাঁধে কোনো কোনো জলগৃহের নীচে পাটাতনে৷ হয়তো বা তার জন্যই এ ভাবে ঘুরে বেড়ায় তারা৷ সেই সন্তরণশীল হংসমিথুনের দিকে চেয়ে রইল উচ্ছল৷ হংসমিথুনদের মনে করা হয় ভালোবাসার প্রতীক, প্রেমের প্রতীক। উচ্ছলের মনে হল ওই হংসমিথুনের মতো সে আর পালেবতও একদিন দল হ্রদের বুকে এমনই আনন্দে ভেসে বেড়াবে৷ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই এক সময় পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ডুবে গেল৷ রাত্রি নামল দল হ্রদে৷

নির্দিষ্ট সময়ই এ রাত্রে নৈশাহার নিয়ে উপস্থিত হল গুঞ্জা৷ কিন্তু দ্বিপ্রহরে উচ্ছল এত খাদ্য উদরস্থ করেছে যে নৈশাহার গ্রহণে রুচি হল না তার৷ সে ফিরিয়ে দিল গুঞ্জাকে৷ তারপর পালঙ্কে শুয়ে রাত্রি গভীর হবার জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগল৷ ঘুমিয়ে পড়ল দল হ্রদ৷ তবে উচ্ছলের দল গৃহর বাইরে থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসতে লাগল সেই হংসমিথুনের ডাক৷ জলকেলি করে চলেছে তারা৷ তাদের সেই শব্দ যেন বাড়িয়ে তুলতে লাগল পালেবতের সঙ্গে তার মিলনের ইচ্ছাকে৷ শেষ পর্যন্ত এক সময় অলিন্দে পদশব্দ শুনতে পেল
উচ্ছল৷

উচ্ছল যখন অলিন্দে এসে দাঁড়াল তখন পালেবত অলিন্দ ছেড়ে নীচে নেমে শিকারা নৌকাটাকে রজ্জু বন্ধন থেকে মুক্ত করছে৷ তাকে বাঁধা দিল না উচ্ছল৷ ভ্রমণ শেষে সে তো এক সময় ফিরে আসবেই, তখন সে নিশিন্তে তার সঙ্গে বাক্যালাপ করবে৷ এমনই ভেবে নিল উচ্ছল৷ জলে ভেসে পড়ল পালেবত৷ উচ্ছল, অলিন্দের একটা স্তম্ভের কাছে ঘেরা ধরে দাঁড়াল৷ মাত্র ক’দিন আগেই পূর্ণিমা তিথি গেছে৷ চাঁদের আলো এখনও যথেষ্ট উজ্জ্বল৷ চন্দ্রালোকে সরোবরে নৌকা বেয়ে চলল পালেবত৷ সেই হংসমিথুনও জলকেলি করে বেড়াচ্ছে উচ্ছলের গৃহর কাছেই৷ পালেবতকে দেখে উচ্ছলের মনে হল সেই যেন আসল এক রাজহংসী!

বেশ কিছু সময় আপন মনে শিকারা নৌকা বাইল পালেবত৷ তারপর সে ফিরে আসতে লাগল জলগৃহর দিকে৷ উচ্ছল একই স্থানে দাঁড়িয়ে রইল৷ শিকারা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে অলিন্দে উঠে এল পালেবত৷ কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত দীর্ঘ শাল দিয়ে আবৃত তার৷ অলিন্দে উঠে কয়েক পা এগিয়েই যে উচ্ছলকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। তবে উচ্ছলের মনে হল তাকে দেখে পালেবতও আশ্চর্য হল না। সে যেন জানতই যে উচ্ছল তাঁর প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। এরপর পালেবতের কথা শুনে উচ্ছল বুঝতে পারল তার অনুমানই সত্যি। পালেবত ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে প্রশ্ন করল, ‘এতক্ষণ ধরে অলিন্দের ঘেরা ধরে দাঁড়িয়ে কী দেখছিলেন সভাসদ?’

উচ্ছল হেসে জবাব দিল, ‘তোমাকে। চাঁদের আলোতে বেশ ভালো লাগছিল তোমাকে। তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্যই প্রতীক্ষা করছি আমি।’

তার কথা শুনে পালেবতও বলল, ‘আমি কি সত্যিই সুন্দরী? আমাকে দেখতে সত্যি ভালো লাগে?’

উচ্ছল আবেগ তাড়িত কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ। তুমি সুন্দরী। কাশ্মীর সুন্দরী।’

মৃদু হাসির ঝিলিক খেলে গেল পালেবতের ঠোঁটে। ঠিক সেই মুহূর্তে উল্লাসধ্বনি করে উঠল সেই হংসমিথুন। সে শব্দ শুনে উচ্ছল আর পালেবত দুজনেই তাকাল তাদের দিকে। তারা দেখল চন্দ্রালোকে জলের মধ্যেই মিলিত হচ্ছে সেই হংসমিথুন! মিলনের, সঙ্গম সুখের আনন্দে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ডাকছে তারা। ঠিক যেমন মানব-মানবীর মিলনে শীৎকার নির্গত হয় তেমনই যেন সেই হংসধ্বনি! মূহূর্ত খানেক সেই মিলন দৃশ্যর দিকে তাকিয়ে আবার পরস্পরের দিকে তাকাল উচ্ছল আর পালেবত। উচ্ছলের মনে হল না সেই মিলন দৃশ্য দেখে পালেবত কোনো লজ্জাবোধ করছে। বরং তার ঠোঁটের কোণে জেগে থাকা হাসি যেন আরও স্পষ্ট হল। উচ্ছলের দিকে তাকিয়ে পালেবত বলল ‘দেখুন তো এবার আমাকে আরও সুন্দরী দেখাচ্ছে কিনা?’

এ কথা বলে পালেবত যা করল, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না উচ্ছল। দু-হাত দিয়ে শালের দু-প্রান্ত ধরে পাখির ডানার মতো শালটাকে তার শরীরের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলল। উন্মুক্ত হল পালেবতের শরীরের সম্মুখ ভাগ। পালেবতের শরীরে মৎস্য আহরণের জালের মতো একটা পোশাক! যে পোশাক সাধারণত নর্তকীরা কোনো কোনো সময় পরিধান করে থাকে শরীর প্রদর্শনের জন্য। নামেই একে শুধু পোশাক বলে, পুরো শরীরটাই দৃশ্যমান থাকে ও পোশাকে। পালেবতের পোশাকের ক্ষেত্রেও এ ব্যাপারের ব্যতিক্রম ঘটল না। উচ্ছলের চোখের সামনে চাঁদের আলোতে স্পষ্ট দৃশ্যমান হল পালেবতের পুরো শরীরটাই। পালেবতের নিটোল স্তন যুগল, উদ্ধত স্তন বৃন্ত, ক্ষীণ কটিদেশের মধ্যবর্তী স্থানে পর্বত গুহার মতো গভীর নাভিকূপ, মসৃণ দুই উরু। আর তার সংযোগ স্থলে...

কয়েক মূহূর্ত নিষ্পলক দৃষ্টিতে পালেবতের শরীরের দিকে চেয়ে রইল উচ্ছল। তারপর তার মনে হল পালেবত কি আজ তাকে তাঁর সর্বস্ব নিবেদন করতে এসেছে? নইলে সে আজ এ পোশাকে কেন? কেনই বা সে আজ এভাবে তার শরীর উন্মোচিত করে আছে তার সামনে? কথাটা মনে হতেই উষ্ণ রক্তস্রোত প্রবাহিত শুরু করল উচ্ছলের শরীরে। সৃষ্টির আদি কাল থেকে নারী শরীরের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য যে রক্ত স্রোত প্রবাহিত হয়। পুরুষের শরীরের সেই রক্ত স্রোত! একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে পালেবত। তার শরীর যেন আহ্বান জানাচ্ছে উচ্ছলকে। ঠিক এই সময় মিলনের আনন্দে আবার ও চিৎকার করে উঠল সেই হংসমিথুন। তাদের সেই ডাক যেন প্ররোচিত করল উচ্ছলকে পালেবতের শরীরের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য। আর বিলম্ব না করে এগিয়ে গিয়ে পালেবতকে দু-হাতে আলিঙ্গন করল উচ্ছল। কী নরম পালেবতের শরীর! সেই শরীরের স্পর্শ উচ্ছলের মনে জাগিয়ে তুলল তীব্র কামনার আগুন। উচ্ছলের হাতের আঙুল গুলো স্পর্শ করে চলল পালেবতের শরীরের সর্বত্র। তার স্তন, নিতম্ব, নাভি, যোনি। পুরুষের স্পর্শে জেগে উঠতে লাগল পালেবতের শরীরও। কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল সে। পালেবতের শরীরের সঙ্গে নিজের শরীরেকে মিলিত করার আগে উচ্ছল তার ঠোঁট নামিয়ে আনল পালেবতের ঠোঁট স্পর্শ করবে বলে। আর তার পরই উচ্ছলকে প্রচণ্ড বিস্মিত করে আগের দিনের পুনরাবৃত্তি ঘটাল পালেবত। মুখ অন্য দিকে সরিয়ে নিয়ে উচ্ছলকে তার শরীর থেকে ঠেলে সরাবার চেষ্টা করল। কিন্ত কাজটা এদিন এত সহজ হল না। উচ্ছল শক্ত হাতে আলিঙ্গন করে রেখেছে তাকে। সেই বন্ধন থেকে মুক্ত হবার জন্য পালেবত মাছের মতো ছটফট করতে লাগল।

কিন্তু পালেবত তারপর উচ্ছলের বাহু বন্ধন থেকে মুক্ত হবার জন্য অন্য কৌশল অবলম্বন করল। তার দু-হাতের সর্ব শক্তি দিয়ে উচ্ছলের কণ্ঠ নিষ্পেষন শুরু করল। হুঁশ ফিরল উচ্ছলের।

সে বুঝতে পারল পালেবত সত্যিই মুক্ত হতে চাইছে তার থেকে। তার এই নিষ্পেষণ কামানা বাসনার আলিঙ্গন নয়, এ নিষ্পেষণ তার নিজেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা। সঙ্গে সঙ্গে পালেবতের বন্ধন মুক্ত করে দিল সে। আর পালেবত মুক্ত তিরের মতো ছুটে গিয়ে নিজের কক্ষে প্রবেশ করে বেশ শব্দ করে কপাট বন্ধ করে দিল! অলিন্দে হতভম্ব ভাবে দাঁড়িয়ে রইল উচ্ছল। আর এরপরই আরও একটা শব্দ শোনা গেল। পালেবতের কপাট বন্ধের শব্দে ঘুম ভেঙে অলিন্দে বেরিয়ে এল বৃদ্ধা গুঞ্জা। তাকে দেখে বেশ বিব্রত বোধ করল উচ্ছল। গুঞ্জা তাকে প্রশ্ন করল, ‘কিছু কি হয়েছে?’

উচ্ছল জবাব দিল, ‘না, কিছু নয়। তুমি শয়ন করো।’ এ কথা বলে সে নিজেও অলিন্দ ছেড়ে কক্ষে প্রবেশ করল।

এ রাতে আর ঘুম এল না উচ্ছলের। সে ভাবতে লাগল, পালেবতের এমন আচরণের কারণ কী? কেন সে উচ্ছলকে এমনভাবে প্রলুব্ধ করেও শেষ মূহূর্তে নিজেকে সরিয়ে নিল? প্রত্যাখ্যান করল উচ্ছলের ভালোবাসা, পৌরুষত্বকে? সে কি তবে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না যে উচ্ছল তাকে সত্যি বিবাহ করবে? তাই কি এই প্রত্যাখ্যান? প্রত্যাখ্যানের সঠিক কারণ বুঝতে না পারলেও পালেবতের নিষ্পেষণের ফলে তার কণ্ঠে বেদনা হতে শুরু করল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে পালেবতের ওপর একটা ক্ষোভ, অভিমান বোধও যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করল উচ্ছলের মনে।

পরদিন আর জলগৃহ ত্যাগ করে কার্যালয়ে গেল না উচ্ছল। রাত্রি জাগরণের ফলে ও মানসিক উত্তেজনার কারণে বেশ ক্লান্তি বোধ হল তার। কখনও নিদ্রা গিয়ে আবার কখনও গতরাতের ঘটনার কথা ভাবতে ভাবতে নিজের কক্ষে পালঙ্কে শুয়ে সারাটা দিন অতিবাহিত করল সে। তারপর রাত নামল। এক সময় পালেবতের পদ শব্দও শুনতে পেল সে।

কিন্তু সেই শব্দ শুনে অন্য দিনের মতো কক্ষ ত্যাগ করল না। পালেবতের প্রতি অভিমানে ক্ষোভে সে সিদ্ধান্ত নিল যতদিন না পালেবত নিজে থেকে তার কাছে এসে ধরা দিচ্ছে ততদিন উচ্ছল তার সামনে তার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করবে না। এভাবেই আরও একটা দিন রাত্রি কেটে গেল।

২২

বহু ভেবেও পালেবতের এরূপ আচরণের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হল না উচ্ছলের পক্ষে। এক দিন নিজ কক্ষে অতিবাহিত করার কারণে তার শরীর বিশ্রাম পেলেও তার মন কিন্তু একই রকম অশান্ত রইল৷ সেই মন নিয়েই পর দিন সে জলগৃহ ত্যাগ করে রওনা হল তার কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশে৷ হ্রদ পেরিয়ে অশ্বশালা থেকে অশ্ব সংগ্রহ করে সে একই কথা ভাবতে ভাবতে যখন তার কার্যালয়ের সামনে এসে উপস্থিত হল, ঠিক তখনই এক অশ্বারোহী রাজকর্মচারী এসে উপস্থিত হল তার সামনে৷ উচ্ছলকে সে অভিবাদন জানিয়ে বলল, ‘আমি মহামন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আসেছি৷ মহামন্ত্রী আপনাকে আপনার কার্যালয়ের কাগজাদি নিয়ে সত্ত্বর তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের নির্দেশ দিয়েছেন৷’

বার্তাবাহকের কথা শুনে উচ্ছলের মনে হল কাগজাদির ব্যাপারটা অছিলা মাত্র৷ মহামন্ত্রী নিশ্চিত তার সঙ্গে কোনো আলোচনা করতে চান৷ সে বার্তাবাহককে বলল, ‘আপনি তাঁকে গিয়ে জানান যে আমি যথা সম্ভব দ্রুত প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে
যাচ্ছি৷’

বার্তাবাহক চলে যাবার পর কার্যালয়ে প্রবেশ করে কিছু সময় সে স্থানে অধিষ্ঠান করল উচ্ছল৷ তার পর কারো মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক না ঘটে সে জন্য দপ্তরের কিছু নথিপত্রর বোঝা নিয়ে এরপর সে রওনা হয়ে গেল মহামন্ত্রী যশঙ্করের কার্যালয়ের উদ্দেশে৷ মহামন্ত্রীর দপ্তরের কাছাকাছি পৌঁছতেই হঠাৎই একজন রাজ পার্ষদ উচ্ছলের ঘোড়ার সামনে এসে দাঁড়াল৷ লোকটার নাম এম্বক৷ যে তাকে জিগ্যেস করল, ‘এত কাগজাদি নিয়ে চললেন কোথায়?’

এম্বক নামের এই সভাসদ তিন বেশ্যার প্রিয় পাত্র বলে পরিচিত৷ উচ্ছল জবাব দিল, ‘মহামন্ত্রী আমার কার্যালয়ের আয়-ব্যয় সংক্রান্ত নথি নিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের নির্দেশ দিয়েছেন৷ মহারাজা আজ্ঞা দিয়েছেন সব বিভাগের আয় বৃদ্ধি করতে হবে৷ সম্ভবত সে কারণেই মহামন্ত্রী ডেকে পাঠিয়েছেন৷’

জবাব শুনে এম্বক বলল, ‘আচ্ছা৷ হ্যাঁ, আয় বৃদ্ধি প্রয়োজন৷ পুষ্পপথে মহারাজার প্রাসাদ নির্মাণের জন্য বহুল পরিমাণ অর্থর প্রয়োজন৷’

উচ্ছল এবার তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি চললেন কোথায়?’

প্রশ্ন শুনে যেন একটু থতমতো খেয়ে সেই সভাসদ বললেন, ‘আজ আমার বিশেষ কাজকর্ম নেই৷ তাই নগরী পরিভ্রমণ করতে বেরিয়েছি৷’ এ কথা বলে সে রওনা হল অন্য দিকে৷ আর উচ্ছলও এগোল মহামন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রবেশ করার জন্য৷

মহামন্ত্রী যশঙ্কর উচ্ছলের জন্য প্রতীক্ষা করছিলেন৷ উচ্ছল কাগজাদি নিয়ে তাঁর কক্ষে প্রবেশ করতেই তিনি দ্বার বন্ধ করে দিলেন৷ তাঁরা দুজন উপবেশন করার পর উচ্ছল তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘কোনো বিশেষ সংবাদ আছে নাকি?’

মহামন্ত্রী বললেন, ‘আপনি বলুন জলপ্রাসাদের কোনো সংবাদ আছে কিনা?’

উচ্ছল বলল, ‘আমি দু-দিন আগে বিটপীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে জলপ্রাসাদে গেছিলাম৷ সে স্থানে নিরপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর৷ বহু সৈনিক মোতায়েন আছে৷ মহারাজের পাঞ্জা না থাকলে কাউকে জলপ্রাসাদের কাছে পৌঁছতে দেওয়া হচ্ছে না৷’ এ কথা বলে এরপর উচ্ছল সেদিন বিটপীর সঙ্গে তার কথোপকথন বিবৃত করল যশঙ্করের কাছে৷

উচ্ছলের কথা শুনে যশঙ্কর বললেন, ‘আপনি যে বিটপীর সন্দেহভাজন নন, এটা আমাদের পক্ষে সুবিধার ব্যাপার৷ রতিমালা ও মুক্তবেণী স্থলভাগে চরের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে৷ সর্বত্র তারা খবর সংগ্রহের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে৷’

উচ্ছল বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়৷ কিছু আগেই আমার সঙ্গে সভাসদ এম্বকের সাক্ষাৎ হল৷৷

সে আমার কাছে জানতে চাচ্ছিল, আমি কোথায় যাচ্ছি? কেন যাচ্ছি?’

মহামন্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, সেও চরবৃত্তির কাজ করছে৷ হয়তো বা তাকেও আপনার মতোই মন্ত্রী পরিষদে স্থান দেবার প্রলোভন দেখিয়েছে বেশ্যারা৷’

এ কথা বলে যশঙ্কর বলল, ‘আমি যে কারণে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলাম সে কথাটা আপনাকে বলি। আজ অত্যন্ত জরুরী বৈঠকের প্রয়োজন আছে৷ যে বৈঠক আমাদের দ্রুত লক্ষ্য পূরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে৷ কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যেভাবে গুপ্তচরেরা স্থলভাগের সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে তাতে কোনো স্থানই বৈঠকের পক্ষে নিরাপদ মনে করছি না৷ তুলনায় জলভাগ অনেকটা নিরাপদ৷ তাই আজ রাতে আমি আপনার গৃহে সভা করতে চাই যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে?’

উচ্ছল একটু ইতস্তত করে বলল, ‘না, আপত্তির কোনো বিষয় নেই৷ কিন্তু আমার একটিমাত্র কক্ষ৷ বাকি তিনটি কক্ষ পালেবত, গুঞ্জার শয়ন কক্ষ ও রন্ধনশালা হিসাবে ব্যবহৃত হয়৷ একটি কক্ষে এতজন মানুষের স্থান সঙ্কুলান হবে কি?’

যশঙ্কর বললেন, ‘অনেক নয়, আমরা মাত্র তিন জন মানুষ যাব৷ বেশি মানুষ একত্রিত হলে কারো চোখে পড়ে যাবার সম্ভাবনা৷’

উচ্ছল বলল, ‘তিনজন মানুষের স্থান সঙ্কুলান অবশ্যই হবে৷ আপনারা কখন উপস্থিত হবেন?’ মহামন্ত্রী জবাব দিলেন, ‘অন্ধকার একটু গাঢ় হবার পর৷’

কাজের কথা হয়ে গেল৷ কিছু সময়ের মধ্যেই নথিপত্র সঙ্গে নিয়ে উচ্ছল তার কার্যালয়ে ফেরার পথ ধরল৷

উচ্ছল বিকালের কিছু পূর্বেই গৃহে ফিরে এল৷ গৃহে ফিরে নিজ কক্ষে প্রবেশ করার পর অতিথিদের জন্য কক্ষটা কিছু সজ্জিত করল সে৷ তারপর পালঙ্কে বসে নানা কথা বিক্ষিপ্ত ভাবে ভাবতে লাগল সে, কখনও পালেবতের কথা, আবার কখনওবা মহামন্ত্রীর পরিকল্পনার কথা৷ এ সব ভাবতে ভাবতেই বাইরে বিকাল হল৷ তারপর সন্ধ্যা নামল৷ অন্ধকার নামার পর উচ্ছল কক্ষ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল৷ গুঞ্জাকে ডেকে সে জানাল কয়েকজন অতিথি আসবে তার গৃহে৷ তারা যতক্ষণ কক্ষে থাকবে ততক্ষণ গুঞ্জা যেন কক্ষে প্রবেশ না করে৷ একটা বড় তৈল প্রদীপও জ্বালিয়ে দিতে বলল সে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই গুঞ্জা প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে গেল৷ অন্ধকার নামার পরই বিন্দু বিন্দু আলো জ্বলে উঠল আশেপাশের জলগৃহগুলোতে৷

মহারাজ ললিতাপীড়ের জলপ্রাসাদের মাথার ওপরটা মশালের আলোতে উজ্জ্বল৷ অলিন্দে দাঁড়িয়ে উচ্ছল প্রতীক্ষা করতে লাগল তার অতিথিদের আগমনের জন্য৷ যে অবস্থাতে নিজের অজান্তেই মাঝে মাঝে উচ্ছলের চোখ চলে যেতে লাগল পালেবতের কক্ষর দিকে৷ সে কক্ষর দ্বার বন্ধ৷ সময় এগিয়ে চলল৷ বেড়ে চলল রাত৷ এরপর ধীরে ধীরে এক এক করে আশেপাশের জলগৃহর প্রদীপগুলো নিভে যেতে লাগল৷ তবে আকাশে চাঁদের আলো আছে৷ সেই আলোতেই উচ্ছল এক সময় দেখতে পেল একটা শিকারা নৌকা জল কেটে এগিয়ে আসছে৷

শিকারা নৌকো এসে ভিড়ল উচ্ছলের জলগৃহর গায়ে৷ আরোহী নৌকো থেকে অলিন্দে উঠে তার অবগুণ্ঠন খুলে ফেললেন৷ তিনি সভাসদ অভিমন্যু৷ তিনি উচ্ছলকে বললেন, ‘কিছু সময়ের মধ্যেই মহামন্ত্রী ও আর একজন উপস্থিত হবেন৷’

উচ্ছল, সভাসদকে যত্ন সহকারে তার কক্ষে প্রবেশ করিয়ে আবার অলিন্দে এসে দাঁড়াল৷ অভিমন্যুর কথা মতো কিছু সময় পরই উচ্ছল দু-দিক থেকে দুটো শিকারা নৌকো আসতে দেখল৷ অন্য জলগৃহর আলোগুলো এখন নিভে গেছে৷ এবার প্রথম যে নৌকাটি জলগৃহতে এসে উপস্থিত হল তা মহামন্ত্রী যশঙ্করের৷ তিনি ওপরে উঠে এলেন৷ তারপর উচ্ছলের সঙ্গে মৃদু কুশল বিনিময় করে প্রতীক্ষা করতে লাগলেন তৃতীয় নৌকোর আগমনের জন্য৷ সে শিকারাও এসে উপস্থিত হল উচ্ছলের জলগৃহর গায়ে৷ তার চালকের উদ্দেশে যশঙ্কর ওপর থেকে চাপা স্বরে বললেন, ‘ওপরে উঠে এসো৷ আমরা এখানে৷’

শিকারা থেকে অলিন্দে উঠে এল সে লোকটাও৷ যদিও তার মুখমণ্ডল ও দেহ কালো পোশাকে আচ্ছাদিত তবু তার অবয়বটা উচ্ছলের যেন বিশেষ পরিচিত মনে হল! অতিথিদের দুজনকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল উচ্ছল৷ সবাই উপেবেশন করার পর যশঙ্কর সেই তৃতীয় ব্যক্তির উদ্দেশে বলল, ‘তোমার আর মুখমণ্ডল আবৃত করে রাখার প্রযোজন নেই৷’

মহামন্ত্রীর কথা শুনে যে লোকটা তার মুখমণ্ডল থেকে পাগড়ির কাপড়টা সরিয়ে নিল৷

উচ্ছল অবাক হয়ে দেখল তার সামনে বসে আছে মহারাজ ললিতাপীড়ের প্রিয় ভাঁড় কূপমণ্ডূক! তার মুখে পরিচিত সেই হাসি নেই৷ বরং যেন হতাশা-যন্ত্রণার চিহ্ন ফুটে আছে ভাঁড়ের মুখে!

কিছু সময়ের জন্য নীরবতা নেমে এল কক্ষে৷ মহামন্ত্রী এরপর কূপমণ্ডূককে বললেন, ‘আমাকে যা জানিয়েছে তা তুমি আমার সঙ্গীদের জানাও৷ সভাসদ উচ্ছলের ব্যাপারটা বিশেষ ভাবে জানা প্রয়োজন৷ কারণ, তুমি তার সঙ্গে তোমার কন্যার বিবাহর প্রস্তাব দিয়েছিলে৷’

ভাঁড় কূপমণ্ডূক এরপর উচ্ছলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি আমার কন্যা রূপবতীর সঙ্গে আপনাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলাম৷ কিন্তু বিশ্বাস করুন তার মধ্যে আমার অন্য কোনো দুরভিসন্ধি ছিল না৷ আমি শুধু কায়মনবাক্যে চেয়েছিলাম আপনার মতো সুপাত্রের সঙ্গে বিবাহ করে আমার কন্যা সুখী হোক৷ আর আমি আমার এই পরিহাসময় জীবন থেকে মুক্ত পেয়ে কিছুটা আনন্দলাভ করতে পারি, কন্যার সুখ দেখে সত্যিকারের হাসি হাসতে পারি৷ কিন্তু তা আমার কপালে জুটল না৷ আপনি নিশ্চয়ই বিস্মিত হয়েছিলেন যে আপনাকে আমার কন্যার সঙ্গে বিবাহর প্রস্তাব দেবার পর হঠাৎই একদিন আপনার প্রতি আমার ব্যবহারের পরিবর্তন দেখে৷ তার পিছনে কারণ ছিল৷ চরক পুজোর দিন পুজো দিতে গিয়ে আর ঘরে ফিরল না আমার কন্যা৷ আপনাকে আমি আমার গৃহ থেকে এক অশ্বারোহী যুবককে দেখিয়েছিলাম মনে আছে? আসলে ওই যুবক গুপ্তচর ছিল না৷ রূপবতী নিখোঁজ হবার পর আমি আমার গৃহ পরিচারিকার মুখ থেকে খবর পেলাম ওই যুবক নাকি ছিল আমার কন্যার পাণীপ্রার্থী৷ আমার অবর্তমানে সে নাকি কখনও সখনও গবাক্ষ দিয়ে রূপবতীর সঙ্গে বাক্যালাপও করত৷ আমি পরিচারিকার কথা শুনে অনুমান করলাম রূপবতী ওই যুবকের সঙ্গে পলায়ন করেছে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবার জন্য৷ কিন্তু ওই কলঙ্কর কথা আমি আপনাকে কীভাবে জানাই! তাই আমি আপনার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে লাগলাম, আপনাকে সেদিন মিথ্যা কথা বলে ফিরিয়ে দিলাম আমার গৃহ থেকে৷ কিন্তু তার পরদিনই সেই যুবক আমার গৃহে এসে আমার কাছে জানতে চাইল যে আমি রূপবতীকে কোথায় রেখে এসেছি?

ওই যুবক বিবাহ করতে চায় রূপবতীকে৷ তার সঙ্গে কথা বলার পর আমি বুঝতে পারলাম আমার অনুমান মিথ্যা ছিল৷ তবে কোথায় গেল আমার কন্যা? আমি তার খোঁজ পাবার চেষ্টা করতে লাগলাম৷ তারপর কয়েক দিনের মধ্যেই আমি দেখা পেলাম তার৷’

এ পর্যন্ত কথাগুলো বলেই থেমে গেল কূপমণ্ডূক৷ লোককে হাসানো ভাঁড়ের চোখ বেয়ে ঝরনার মতো অশ্রু নির্গত হতে লাগল!

কূপমূণ্ডকের কথা শুনে উচ্ছল আর অভিমন্যু এক সঙ্গে প্রশ্ন করে উঠল, ‘কোথায় দেখা পেলে তার?’

নিজেকে একটু সামলে নিয়ে চোখের জল মুছে কূপমণ্ডূক উচ্ছলদের অবাক করে দিয়ে বলল, ‘সেদিন রাজসভাতে৷ স্বর্ণসেবিকাদের মধ্যে৷’

কথাটা শুনে উচ্ছল বিস্মিত ভাবে জানতে চাইল, ‘তুমি নিশ্চিত যে সে তাদের মধ্যে ছিল? কী ভাবে চিনলে তাকে?’

কূপমণ্ডূক বলল, ‘যতই সে অবগুণ্ঠনের আড়ালে থাকুক, নিজ কন্যাকে চিনতে কি কোনো পিতার ভুল হয়? তাছাড়া শপথ গ্রহণের সময় আমি তার কণ্ঠস্বরও শুনেছি৷ আমার চিনতে ভুল হয়নি তাকে৷ সে তাদের মধ্যেই ছিল৷’

শেষ বাক্যটা বেশ দৃঢ় ভাবে বলল কূপমণ্ডূক৷ অভিমন্যু তাকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি যে তাকে চিনতে পেরেছ সে কথা তুমি মহারাজকে জানিয়েছিলে? তার সঙ্গীনিদের জানিয়েছিলে?’

কূপমণ্ডূক জবাব দিল, ‘না, জানাইনি৷ কারণ জানালে কোনো লাভ হবে না বলে৷ বরং এ কথা জানলে হয়তো ঘটনাটা লুকিয়ে ফেলার জন্য তারা আমার কন্যাকে হত্যা করবে৷ কেউ তার খোঁজ যাতে আর কোনোদিন না পায় সে জন্য৷ আমি শুধু গতকাল মহামন্ত্রীকেই কথাটা জানিয়েছি কন্যাকে ফিরে পাবার আশাতে৷ আর তার অনুরোধে আজ এখন আপনাদের জানালাম৷ দোষ আমারই৷ যেদিন আমি মুক্তবেণীকে আমার গৃহে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম সেদিনই আমি কন্যার জীবনে দুর্ভাগ্য রচনা করে দিয়েছিলাম৷ আমি ভাবিনি ওই বেশ্যারা এতটা নিচ, এতটা হিংস্র যে তারা আমার কন্যাকেও স্বর্ণসেবিকা বানাবার জন্য হরণ করে নিয়ে যাবে৷ দোহাই আপনাদের৷ যে ভাবেই হোক আমার কন্যাকে আপনারাই মুক্ত করার ব্যবস্থা করুন৷ তাকে মহারাজের লালসার শিকার হতে দেবেন না৷ এর জন্য যে কোনো কাজ করতে আমি রাজি৷’

আবার কিছুক্ষণের জন্য কক্ষে নিস্তব্ধতা নেমে এল৷ মহামন্ত্রী যশঙ্কর তারপর কূপমণ্ডূককে বললেন, ‘তোমার কন্যাকে মুক্ত করার জন্য তুমি যে কোনো কাজ করতে প্রস্তুত?’

কূপমণ্ডূক বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ তারজন্য আমি নিজের জীবন দিতে অথবা অন্য কারো জীবন নিতেও প্রস্তুত৷’ দৃঢ়তা ফুটে উঠল কূপমণ্ডূকের কণ্ঠে৷

মহামন্ত্রী যশঙ্কর বললেন, ‘তবে সে কাজই হয়তো করতে হবে তোমাকে৷ তোমার কন্যাকে মুক্ত করার একমাত্র পথ ওই ধর্ষক মহারাজকে হত্যা করে তার শাসনের সমাপ্তি ঘটানো৷ তবেই আমরা মুক্ত হতে পারব৷ আবার জীবন দিতে পারব রূপবতী সহ অন্য নারীদের৷ এ ব্যতীত অন্য কোনো পথ খোলা নেই আমাদের সামনে৷ পারবে তুমি মহারাজকে হত্যা করে তার ভোগ লালসা থেকে তোমার একমাত্র কন্যার জীবন রক্ষা করতে?’

মহারাজ তার কন্যাকে ধর্ষন করছেন এ কথা ভেবেই কূপমণ্ডূকের চোখ দুটো যেন তাঁর প্রতি তীব্র ঘৃণায় জ্বলে উঠল৷ সে বলে উঠল, ‘নিশ্চয়ই পারব৷ আপনারা শুধু বলুন কী কৌশলে হত্যা করব তাঁকে?’

একটু ভেবে নিয়ে যশঙ্কর বললেন, ‘মহারাজ তো তোমাকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলেছেন? তাঁর সঙ্গে যখন তুমি সাক্ষাৎ করো তখন পূর্বে কি তোমার পোশাক, শরীর পরীক্ষা করা হয়?’ ভাঁড় জবাব দিল, ‘না, করা হয় না৷ আগামী পরশু সূর্যাস্তের পর জলপ্রাসাদে মহারাজের মনোরঞ্জনের কিছু আয়োজন করা হয়েছে৷ সে সময়েই আমাকে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে৷’

মহামন্ত্রী যশঙ্কর বললেন, ‘আমি যদি একটা তীক্ষ্ম কিরিচ তোমাকে দিই তবে তুমি পারবে সেই লৌহ শলাকা মহারাজের বুকে বিদ্ধ করতে? যদিও এ কাজ করার পর মুহূর্তে রক্ষীদের হাতে তোমার নিহত হবার প্রবল সম্ভাবনা৷ তবে যদি তারা তোমাকে হত্যা না করে গ্রেপ্তার করে তবে ভবিষ্যতে তোমার মুক্তি ঘটবে৷ কারণ, মহারাজ নিহত হয়েছে এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লেই তাঁর শাসন কাঠামো ভেঙে পড়তে এক প্রহরও সময় লাগবে না৷ ওই তিন বেশ্যার ক্ষমতা নেই যে তারা অন্যথা কিছু করে৷ সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে কবে মহারাজের মৃত্যু হয় সে জন্য৷ কিন্তু তাঁর জীবিত অবস্থায় কেউ তাঁর বিরুদ্ধাচারণে সাহস পাচ্ছে না৷

তবে আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, যদি মহারাজকে হত্যা করার পর তোমার মৃত্যু ঘটে, তবে তার পরবর্তীকালে তোমার কন্যাকে, আমার কন্যাসম প্রতিপালনের দায়িত্ব আমার৷ পারবে তুমি ললিতাপীড়কে হত্যা করতে?’

ভাঁড় কূপমণ্ডূক কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল৷ তারপর ধীরে ধীরে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখ দুটো জ্বলে উঠল৷ সে বলে উঠল, ‘রূপবতীর জীবন রক্ষার যখন এই একমাত্র পথ তখন নিশ্চিত ভাবে কাজটা করব আমি৷ মহারাজের জন্য যে পুষ্প স্তবক বহন করে নিয়ে যাব তার মধ্যেই লুক্কায়িত থাকবে ওই লৌহ শলাকা৷

আমি মহারাজের চরণ স্পর্শ করে তার হাতে পুষ্প স্তবক তুলে দেবার মুহূর্তে আচম্বিতে ওই লৌহ শলাকা বসিয়ে দেব মহারাজের বুকে৷ আমাকে ওই শলাকা দিন?’

মহামন্ত্রী যশঙ্কর এরপর উচ্ছল আর অভিমন্যুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী, আপনারা এই পরিকল্পনার সঙ্গে সহমত তো?’

অভিমন্যু বললেন, ‘হ্যাঁ, সহমত৷ এ ছাড়া বিকল্প কোনো পথও তো আমাদের সামনে খোলা নেই৷’

উচ্ছল বলল, ‘আপনারা যখন সবাই সম্মত তখন আমিও সম্মতি দিলাম৷ জলপ্রাসাদে গিয়ে আমি মহারাজের নিরাপত্তার জন্য যে ব্যবস্থা চাক্ষুস করেছি, তাতে অন্য কেউ মহারাজের কাছে পৌঁছতে পারবে বলে মনে হয় না৷ আর অস্ত্র নিয়ে তো কখনই নয়৷’

মহামন্ত্রী যশঙ্করের পরিকল্পনা সভায় গৃহীত হয়ে গেল৷ মহামন্ত্রী বললেন, ‘এ পরিকল্পনার কথা যেন কাকপক্ষীতেও টের না পায়৷ আর কূপমণ্ডূক তুমি শপথ করো যে তুমি যদি ব্যর্থ হও তবে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমাদের কারো নাম প্রকাশ করবে না৷ কারণ আমরা জীবিত থাকলে তোমার কন্যার মুক্তির সম্ভাবনাও জীবিত থাকবে। ভবিষ্যতে আমরা পুনর্বার চেষ্টা করব সফল হবার জন্য।’ মহামন্ত্রী যশঙ্করের কথা শুনে কূপমণ্ডূক বলল, ‘আমি আমার আরাধ্য দেবতা শিবের নামে, আমার কন্যা রূপবতীর নামে শপথ করে বলছি আমি আমৃত্যু আপনাদের নাম কারো কাছে প্রকাশ করব না।’ যশঙ্কর এরপর কূপমণ্ডূকের উদ্দেশে বলল, ‘তুমি এবার যাও৷ দেবতার আশীর্বাদ বর্ষিত হোক তোমার ওপর৷ ওই লৌহ শলাকা যথা সময় তোমার কাছে পৌঁছে যাবে৷’

কক্ষ ত্যাগ করার জন্য আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল কূপমণ্ডূক৷ উচ্ছল ও উঠে দাঁড়াল তাকে তার শিকারা নৌকা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসার জন্য৷ ঠিক সেই সময় দ্বারের দিকে দৃষ্টি পড়ল তার৷ সে দেখল চকিতে একটা ছায়া সরে গেল পর্দার আড়াল থেকে!

কূপমণ্ডূককে নিয়ে অলিন্দে বেরিয়ে এল উচ্ছল৷ অলিন্দে কেউ নেই৷ তবে সে দেখল পালেবতের কক্ষের কপাট খোলা পর্দাটাও যেন দুলে উঠল৷ যেন পর্দা সরিয়ে ঠিক সেই মুহূর্তে কেউ সেই কক্ষে প্রবেশ করল! অলিন্দ থেকে নিচের পাটাতন পর্যন্ত কূপমণ্ডূকের সঙ্গে নামল উচ্ছল৷ শিকারাতে উঠে বসার আগে আবেগপ্রবণ কণ্ঠে উচ্ছলের হাত দুটো স্পর্শ করে বলল, ‘মহারাজকে হত্যা করার দায়িত্ব আমি নিলাম, আর আমার কন্যাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমি আপনাদের হাতে সঁপলাম৷ তাকে রক্ষা করবেন আপনারা৷ রূপবতী যে আমার একমাত্র কন্যা৷’

এ কথা বলে শিকারাতে উঠে বসল৷ তারপর সে রওনা হয়ে গেল আপন গন্তব্যে।

কূপমণ্ডূককে বিদায় জানিয়ে আবার কক্ষে ফিরে এল উচ্ছল, মহামন্ত্রী বললেন, ‘কূপমণ্ডূক যেদিন সন্ধ্যায় জলপ্রাসাদে যাবে সেদিন সন্ধ্যায় আমাদের আবার একত্রিত হতে হবে৷ কূপমণ্ডূক শেষ পর্যন্ত সফল হবে নাকি ব্যর্থ হবে তা আমাদের জানা নেই৷ স্থান নির্বাচন আমি করে ফেলেছি৷ খার্খদ পাহাড়৷ দিনে বা রাতে ওই স্থানে কেউ যায় না৷ তাই ও জায়গা মিলনের পক্ষে নিরাপদ৷ ওই স্থানে মিলিত হব আমরা৷ তারপর পরিস্থিতি বুঝে আলোচনা করে পরববর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করব৷’

উচ্ছল বলল, ‘কিন্তু ওই পাহাড়ে তো খার্খদ মাতঙ্গীর গুহা!’

যশঙ্কর বললেন, ‘হ্যাঁ৷ মাতঙ্গীর গুহা ঠিকই৷ তবে মাতঙ্গী সেখানে নেই৷ তার দর্শনাথীদের সে জানিয়ে গেছে যে সে কামাখ্যা মন্দির গেছে৷ খার্খদ পর্বতে আরও একটি গুহা আছে। ভিন্ন পথে যেতে হয় সেই গুহাতে৷ সেখানেই আমরা মিলিত হব৷ খার্খদ পাহাড়ের সেই গুহা থেকে ওই দল হ্রদও স্পষ্ট দেখা যায়৷ জলপ্রাসাদে কিছু ঘটলে হ্রদে যে চঞ্চলতার সৃষ্টি হবে তা ওপর থেকে আমরা বুঝতে পারব৷ তাছাড়া ওই পাহাড় থেকে এই উপত্যকার বাইরে যাবারও পথ আছে৷ প্রয়োজনে সে পথ ব্যবহার করতে পারব আমরা৷’

এ কথা বলার পর যশঙ্কর তাদের দুজনকে জানিয়ে দিলেন কীভাবে উপস্থিত হতে হবে খার্খদ পর্বতের সেই গুহাতে৷ সব শেষে তিনি স্মরণ করিয়ে দিলেন, ‘ওই দিন রাজসভা বসবে৷ আমরা সবাই উপস্থিত থাকব৷ আমাদের কারো আচরণে যেন কোনো উত্তেজনা প্রকাশ না পায়৷ কারো মনে যেন সন্দেহের উদ্রেক না ঘটে৷ আমরা ওই দিন পৃথক পৃথক ভাবে উপস্থিত হব খার্খদ পর্বতে৷’

সংক্ষিপ্ত সভার সমাপ্তি ঘোষণা হয়ে গেল৷ অতিথিরা কক্ষ ত্যাগ করলেন৷ তারপর রওনা হয়ে গেলেন যে যার বাসস্থানে ফেরার জন্য৷ তাদের বিদায় জানিয়ে নিজের কক্ষে ফিরে আসার সময় উচ্ছল খেয়াল করল পালেবতের কক্ষের কপাট বন্ধ হয়ে গেছে৷

কিছু সময়ের মধ্যে নৈশাহার নিয়ে প্রবেশ করল গুঞ্জা৷ উচ্ছল তাকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি ইতিপূর্বে আমার কক্ষের সামনে এসেছিলে?’

গুঞ্জা জবাব দিল, ‘না, আসিনি৷’

নৈশাহার সাঙ্গ করে প্রদীপ নিভিয়ে শুয়ে পড়ল উচ্ছল৷ গুঞ্জার জবাব শুনে উচ্ছলের ধারণা হল পালেবতই তবে এসেছিল তার কক্ষের সামনে৷ তবে সে কি তার আচরণের জন্য মার্জনা চাইতে এসেছিল? এ কথা ভাবতে লাগল উচ্ছল৷ সে কি আবার আসবে? অন্ধকার কক্ষে শুয়ে পালেবতের জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগল সে৷ তবে সে তার নিজের সিদ্ধান্তেই অটল রইল৷ যদি পালেবত নিজে থেকে তার কাছে না আসে তবে তার সঙ্গে বাক্যালাপ করবে না উচ্ছল৷ রাত্রে নির্দিষ্ট সময় অলিন্দে পালেবতের পায়ের শব্দ পেল উচ্ছল৷ কিন্তু সে বুঝল যে শব্দ তার দরজার সামনে থামল না৷ জলে ভাসার জন্য এগিয়ে গেল৷ পালেবতের প্রতি অভিমান নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল সে৷

উচ্ছল পরদিন যথারীতি তার কার্যালয়ে গেল এবং ফিরেও এল৷ সারাটা দিন কখনও পালেবতের ভাবনা আবার কখনও বা আগামী দিনে যে ঘটনা ঘটতে চলেছে তা আচ্ছন্ন করে রাখল তার মনকে৷ কিন্তু জলগৃহতে ফিরে আসার পর পালেবতের ভাবনা অপেক্ষা পরদিন জলপ্রাসাদে কী কী ঘটতে পারে সে চিন্তাই বেশি ভাবিত করে তুলল উচ্ছলের মনকে৷ কূপমণ্ডূক কি পারবে আগামীকাল উপত্যকাবাসীকে নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে? সফল হবে কি তাদের সকলের গোপন প্রচেষ্টা? এ কথা ভাবতে সে রাতে উচ্ছল এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল৷ পালেবত তার কপাটে ঘা দিল না৷

২৩

প্রতিদিনের মতো উপত্যকার বুকে এদিনও সূর্যোদয় হল৷ নতুন আলোর স্পর্শ পেয়ে সূর্যর দিকে তাকাল রঙবেরঙের ফুলেরা৷ জল হ্রদে জলকেলি করতে নামল রাজহংসীরা৷ একটু দেরিতেই ঘুম ভাঙল উচ্ছলের৷ ঘুম ভাঙতেই তার মনে পড়ল পালেবতের কথা৷ গতরাতে সে কিছুটা দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছিল৷ সে শুনতে পায়নি পালেবতের পদশব্দ৷ সে কি এসেছিল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে? এ কথা ভাবতে ভাবতে উঠে বসল উচ্ছল৷ ঠিক এই সময় একটা জিনিস ঝিলিক দিয়ে উঠল! কক্ষের এক স্থানে চৌপায়ার ওপর রাখা আছে মহারাজ ললিতাপীড়ের সেই পাঞ্জাটা৷ সূর্যর আলো পড়ে তা চকচক করছে৷ আর সেটা দেখা মাত্রই উচ্ছলের মনে পড়ে গেল ওদিন কী ঘটতে চলেছে৷ উচ্ছল মনে মনে তার এদিনের পরিকল্পনা রচনা করে নিল৷ যে প্রথমে রাজসভায় যাবে৷ তারপর কার্যালয় হয়ে বিকালে গৃহে ফিরে আবার সূর্য ডোবার মুহূর্তে রওনা হবে খার্খদ পাহাড়ের উদ্দেশে৷ পালেবতের চিন্তা যেন কিছুটা দূরে সরে গেল তার মন থেকে৷ তাদের পরিকল্পনার সফলতা নিয়েই ভাবতে লাগল উচ্ছল৷ কূপমণ্ডূকের আজকের সফলতার ওপরই যে নির্ভর করছে কাশ্মীরবাসীর ভাগ্য৷ হয়তো বা তারও ভবিষ্যৎ৷

উচ্ছল তার পরিকল্পনা মতো নির্দিষ্ট সময় বেরিয়ে পড়ল তার জলগৃহ ছেড়ে৷ সে শিকারাতে উঠে বসার পর একবার তাকাল পালেবতের কক্ষের দিকে৷ কক্ষের দ্বার বন্ধ৷

উচ্ছলের মনে আবারও প্রশ্ন জেগে উঠল, ‘সে কি গতরাতে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিল? এ কথা ভাবতে ভাবতে চাপ্পা চালাতে শুরু করল সে৷

নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে পালেবত সামান্য কিছু সময় পরই উচ্ছলের কক্ষর সামনে এসে দাঁড়াল৷ উচ্ছল তখন তার জলগৃহের দৃষ্টিপথের আড়লে চলে গেছে৷ একটু ইতস্তত করে দ্বারের পর্দা সরিয়ে ভিতরে উঁকি দিল পালেবত৷ সে দেখল উচ্ছল কক্ষে নেই৷ ঠিক এই সময়ই পাড়ের দিকে এগোতে এগোতে উচ্ছল জলপথের মধ্যবর্তী স্থানে দেখতে পেল একজনকে৷ বাঁদরী তার শিকারা নৌকা নিয়ে আসছে৷ দুটো শিকারা মুখোমুখি হতেই বাঁদরী উচ্ছলের উদ্দেশে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাল৷ তারপর উচ্ছলের পাশ কাটিয়ে এগোল৷ কৌতূহলবশত আরও কিছুটা এগোবার পর উচ্ছল পিছন ফিরে তাকাল৷ বাঁদরীর শিকারাটার গতিপথ দেখে উচ্ছলের মনে হল সে যেন তার গৃহর উদ্দেশেই যাচ্ছে!

বাঁদরী যখন এসে উপস্থিত হল তখন পালেবত তার নিজের কক্ষে ফিরে এসেছে৷ অলিন্দে উঠে সোজা কপাট ঠেলে পালেবতের কক্ষে প্রবেশ করল বাঁদরী৷ পালেবতকে দেখে বাঁদরীর মনে হল যেন তার মুখমণ্ডলে চিন্তার ছাপ ফুটে আছে৷ অবশ্য বাঁদরীকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল৷ বাঁদরী তার উদ্দেশে বলল, ‘কদিন ধরে তো জলপ্রাসাদে থাকার কারণে তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না৷ তাই ভাবলাম আজ সেখানে যাবার আগে তোমার সঙ্গে দেখা করে যাই৷’ পালেবত বলল, ‘তুমি না এলে আমি যে ভাবেই হোক তোমাকে আজ খুঁজতে যেতাম৷’ বাঁদরী বলল, ‘বিটপী কিন্তু এখনও তোমার খোঁজ করেনি৷’ পালেবত বলল, ‘না, সে জন্য নয়৷ তুমি আমাকে একটা শিকারা জোগাড় করে দিতে পারবে? প্রয়োজনে আমি শুল্ক দেব৷ সেদিন স্বর্ণ বিক্রয় করে বস্ত্র কেনার পর বেশ কিছু অর্থ আমার কাছে আছে৷ তাই দেব৷’

বাঁদরী তার কথা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘হ্যাঁ, শুল্কর বিনিময়ে শিকারা পাওয়া যায়৷ তবে শিকারা দিয়ে তুমি কি করবে?’

পালেবত একটু চুপ করে থেকে বাঁদরীর হাত দুটো স্পর্শ করল৷ তারপর বলল, ‘আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো৷ আমিও তোমাকে ভালোবাসি, বিশ্বাস করি৷ তাই তোমাকে আজ কিছু কথা জানাব৷’

এ কথার পর আবারও কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। পালেবত তারপর বলতে শুরু করল তার কথা৷ পালেবতের কথা শুনতে শুনতে বিস্ময় ফুটে উঠল বাঁদরীর চোখে৷ ওদিকে তখন পাড়ের কাছে পৌঁছে গেছে উচ্ছল৷

উচ্ছল সভাগৃহতে পৌঁছে দেখল মহামন্ত্রী যশঙ্কর, মন্ত্রী বিদূর, সভাসদ অভিমন্যু সবাই এদিন সভায় উপস্থিত হয়েছে৷ ভাঁড় কূপমণ্ডূকের দেখা পেল সে৷ তার মুখমণ্ডলে দুঃখ কষ্টর কোনো চিহ্ন নেই৷ বরং অন্য দিনের চাইতে আরও বেশি রঙচঙে পোশাক, হাস্যের উদ্রেক জাগানো কিম্ভূত মস্তক বন্ধনী, আর পাদুকায় সেজেছে সে৷ নাচতে নাচতে এর ওর আসনের সামনে গিয়ে ভাঁড়ামি করছে৷ উচ্ছল বুঝতে পারল যে তার প্রতি যাতে কারো মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক না ঘটে তাই বুকের কষ্ট লুকিয়ে রেখে অভিনয় করে চলেছে লোকটা৷ তাকে দেখে মনের ভিতর বড় কষ্ট হল উচ্ছলের৷ এমনও হতে পারে লোকটা আজ জীবনে শেষ বারের মতো রাজসভায় এল৷ আজ রাতে শেষ পর্যন্ত কী হবে তা তো বলা যায় না! সভাস্থলে চারপাশের লোকজনকে ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করতে লাগল উচ্ছল৷ সব কিছুই তার স্বাভাবিক বলে মনে হল৷

নির্ধারিত সময় সভাকক্ষে প্রবেশ করল দুই বেশ্যা৷ তাদের সঙ্গে কিছু দেহরক্ষী৷ তারা সভাকক্ষে প্রবেশ করতেই তাদের অনুগত সেবকরা তাদের নামে, মহারাজার নামে জয়ধ্বনি করে উঠল৷ সবার গলা ছাপিয়ে শোনা গেল কূপমণ্ডূকের কণ্ঠস্বর৷ রতিমালার পর এদিন মহারাজের প্রতিনিধি হিসাবে সভা পরিচালনার দায়িত্ব মুক্তবেণীর৷ রৌপ্য সিংহাসনে গিয়ে বসল সে৷ মুক্তবেণী তার আসনে বসার সঙ্গে সঙ্গেই ভাঁড় কূপমণ্ডূক একটা ফুল হাতে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে তার হাতে ফুলটা তুলে দিয়ে বলল, ‘আপনি যেদিন ওপরের আসনটায় বসবেন সেদিন কিন্তু আমাকে ওপরে উঠতে দেবেন৷ নইলে বড় কষ্ট পাব৷’

এই সেই বেশ্যা মুক্তবেণী৷ যার জন্যই আজ কূপমণ্ডূক সন্তান হারা৷ অথচ তার সঙ্গে কী নিখুঁত অভিনয় করছে ভাঁড় কূপমণ্ডূক! তার দিকে চেয়ে উচ্ছল মনে মনে বলল, ‘আজ যেন তুমি সফল হও, তোমার সন্তানকে ফিরে পাও এই কামনাই করি৷’

‘ওপরের আসন’ বলতে কূপমণ্ডূক মহারাজের সিংহাসনের কথাই বলল। মুক্তবেণী কিন্তু ওই চাটুকারিতার প্রতিবাদ না করে কূপমণ্ডূকের কথাটা উপভোগই করল৷ সে বলল, ‘নিশ্চয়ই৷ আমি ওপরে উঠলে তুমিও ওপরে উঠবে৷ তোমাকে যে আজ বড় খুশি দেখাচ্ছে!’

কূপমণ্ডূক বলল, ‘খুশি তো হবই৷ আজ যে আমি মহারাজের দর্শন পাব! কী আনন্দ! কী আনন্দ!’ এ কথা বলে হাত তালি দিতে দিতে নিজের আসনের দিকে এগোল সে৷

সভার কাজ শুরু হল৷ কোনো সাক্ষাৎ প্রার্থী আছে কিনা তা জানতে চাইল মুক্তবেণী৷ যথারীতি কোনো সাক্ষাৎপ্রার্থী নেই৷ মুক্তবেণী এরপর সভার চারপাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করার পর মহামন্ত্রীকে দেখতে পেয়ে বলল, ‘মহামন্ত্রী আজ সভায় উপস্থিত দেখছি! আপনি এত দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠলেন!’

কথাগুলো বলার সময় মৃদু ব্যঙ্গের সুর ফুটে উঠল তার কণ্ঠে৷ মহামন্ত্রী কিন্তু ব্যাপারটাকে গায়ে মাখলেন না৷ তিনি উঠে দাঁড়িয়ে হাসি মুখে বললেন, ‘মহারাজ আর দেবতাদের আশীর্বাদে আর আপনাদের শুভ কামনায় আরোগ্য লাভ করেছি৷ তাছাড়া কর্মস্থলে এখন অনুপস্থিত থাকা সমীচিন নয়৷ মহারাজ এ বৎসর দ্বিগুণ রাজস্ব আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন৷ মহামন্ত্রী রূপে সে কাজ সুষ্ঠ ভাবে সম্পন্ন করার দায়িত্ব তো আমারই৷’

মুক্তবেণী বলল, ‘হ্যাঁ, যে ভাবেই হোক মহারাজের সে নির্দেশ সবাইকে পালন করতে হবে৷ কেউ এর অন্যাথা করলে মহারাজ তাকে শাস্তি দেবেন৷’

মুক্তবেণী এরপর যশঙ্করের সঙ্গে রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত কিছু বাক্যালাপ করে প্রধান সেনাপতি গরুড়কে প্রশ্ন করলেন, ‘দেশের শান্তি শৃঙ্খলার কি সংবাদ?’

কম্পনধিপতি গরুড় তাকে আশস্ত করে জবাব দিলেন, ‘মহারাজের আশীর্বাদে সর্বত্রই শান্তি-শৃঙ্খলা বিরাজমান৷ আমার তাঞ্জিন ও অশ্বারোহী সৈনিকরা সর্বক্ষণ, সর্বত্র দৃষ্টি রেখে চেলেছে৷ তাই কোথাও কোনো শান্তিভঙ্গর আশঙ্কা নেই৷’

রতিমালা বলল, হ্যাঁ, ‘আপনারা বাহিনীকে সর্বদা এমনই সজাগ থাকতে বলবেন যাতে কোথাও কোনো বিশৃ্ঙ্খলা না হয়, মহারাজের সুশাসনে বিশৃঙ্খলা করার অর্থ হল রাষ্ট্রদ্রোহীতা৷ আর তার সাজা হল মৃত্যুদণ্ড, এ কথা যেন উপত্যকাবাসীর স্মরণে থাকে৷’

মহারাজের প্রতিনিধির আসনে বসে রতিমালা এরপর মহারাজের অনুগত সভাসদের সঙ্গে কিছু বাক্যালাপ করলেন৷ যদিও তার মধ্যে নাগরিকদের বা দেশের মঙ্গলের জন্য কোনো আলোচনা ছিল না৷ তারপর এক সময় রতিমালা সভা ভঙ্গর জন্য ইঙ্গিত করল মুক্তবেণীকে৷

মুক্তবেণী সভায় বলল, ‘আজ জলপ্রাসাদে মহারাজের অবস্থানের সাত দিবস পূর্ণ হচ্ছে৷ সেই উপলক্ষ্যে সন্ধ্যায় সে স্থানে মহারাজের মনোরঞ্জনের জন্য আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে৷ আমাকে আর সভাসদস্য রতিমালাকে সে স্থানে যেতে হবে৷ তার জন্য প্রস্তুত হতে হবে৷ তাই সভার কাজ আজ এখানেই সমাপ্ত হল৷’

তার কথা সাঙ্গ হবার সঙ্গে সঙ্গেই ভাঁড় কূপমণ্ডূক বলে উঠল, ‘জয় মহারাজ ললিতাপীড়ের জয়! দেবী মুক্তবেণীর জয়! দেবী রতিমালার জয়! দেবী বিটপীর জয়!’

এই প্রথমবার বেশ্যাদের নামে জয়ধ্বনিতে গলা মেলালেন মহামন্ত্রী যশঙ্কর৷ ব্যাপারটা খেয়াল করে কক্ষ ত্যাগের সময় মুক্তবেণী হেসে রতিমালাকে বলল, ‘শেষ পর্যন্ত মহামন্ত্রীও আমাদের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হলেন৷’

সভা ভেঙে গেল৷ উচ্ছল তার পরিকল্পনা মতো অশ্বশালা থেকে অশ্ব নিয়ে উপস্থিত হল তার কার্যালয়ে৷ সে স্থানে নিজের কক্ষে বসে পালেবতের কথা সে কিছুক্ষণ ভাবল ঠিকই কিন্তু সময় অতিবাহিত হবার সঙ্গে সঙ্গে আসন্ন রাত্রির কথা তার মনকে গ্রাস করতে লাগল৷ প্রচণ্ড উত্তেজনা বোধ করতে লাগল উচ্ছল৷ আজই তো সেই সন্ধ্যা-রাত, যা হয়তো ঠিক করে দেবে কাশ্মীরবাসীর ভাগ্য, উপত্যকার বহু নারীর ভবিষ্যত, কূপমণ্ডূক-কন্যা রূপবতীর ভবিষ্যৎ৷ সময় এগিয়ে চলল, আর তার সঙ্গে বেড়ে চলল আজকের পরিকল্পনা নিয়ে উচ্ছলের মনের উত্তেজনাও৷ শেষ দুপুরে উচ্ছল তার কার্যালয় ত্যাগ করে রওনা হল তার জলগৃহর উদ্দেশে৷

হ্রদের পাড়ে পৌঁছে সে দেখল একটা বাগলী অর্থাৎ শকট আকৃতির জলযান অবস্থান করছে সে স্থানে৷ কয়েকজন সৈনিক আছে সেখানে৷ সুদৃশ্য বাগলীটা দেখে উচ্ছল বুঝতে পারল ওই বাগলীতেই জলপ্রাসাদে সান্ধ্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাবে দুই বেশ্যা৷ বাগলী আর সৈনিকরা অপেক্ষা করছে তাদেরই জন্য৷ বাগলীর দিকে দৃষ্টিপাত করার পর শিকারা নিয়ে জলে ভেসে পড়ল উচ্ছল৷ নিজের গৃহর দিকে এগোতে এগোতে ফুল ভর্তি আরও বেশ কিছু নৌকো চোখে পড়ল উচ্ছলের৷ নৌকাগুলো এগোচ্ছে এদিনের সন্ধ্যায় মহারাজ ললিতাপীড়ের প্রাসাদকে পুষ্প সজ্জিত করার জন্য৷ উচ্ছলের মনে পড়ল কূপমণ্ডূকের ওই ফুলের মধ্যেই অস্ত্র বহন করে নিয়ে যাবার কথা৷ সে কি শেষ পর্যন্ত সফল হবে তার কাজে? এ সব ভাবতে ভাবতে উচ্ছল পৌঁছে গেল তার জলগৃহতে৷ ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল আর একটা শিকারাও রয়েছে তার জলগৃহর সামনে! ও কার শিকারা? বাঁদরীর নাকি? এ কথা ভাবতে ভাবতে অলিন্দে উঠে পালেবতের কক্ষর দিতে তাকাল উচ্ছল৷ কক্ষর কপাট বন্ধ৷ উচ্ছল নিজের কক্ষে প্রবেশ করল৷ কিছু সময় পর খাদ্য দ্রব্য নিয়ে তার কক্ষে প্রবেশ করল গুঞ্জা৷ উচ্ছল তাকে প্রশ্ন করল, ‘শিকারাটা কার?’

গুঞ্জা জবাব দিল, ‘বাঁদরী এসে ওই শিকারাটা রেখে গেছে পালেবতের জন্য৷’

উচ্ছল কথাটা শুনল ঠিকই৷ কিন্তু সে ব্যাপারটা নিয়ে মনোনিবেশ করল না৷ বিকাল হয়ে গেছে, সন্ধ্যা নামার আগেই তাকে রওনা হতে হবে খার্খদ পাহাড়ের উদ্দেশে৷ সময় যত এগোচ্ছে মনের ভিতর প্রচণ্ড উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার৷

খাদ্য গ্রহণ করার পর সামান্য কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম নেবার চেষ্টা করল উচ্ছল৷ উত্তেজনার বসে তার মনে হতে লাগল এদিন বিকাল যেন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে৷ এক সময় পালঙ্ক ত্যাগ করে উঠে পড়ল উচ্ছল৷ বাইরে এখন সত্যিই বিকাল ফুরিয়ে আসছে৷ পোশাক পরিবর্তন করে নিল সে৷ তারপর ইষ্ট নাম স্মরণ করে কক্ষ থেকে বাইরে বেরিয়ে এল রওনা হবার জন্য৷

কিন্তু বাইরে বেরিয়েই উচ্ছল দেখতে পেল কিছুটা তফাতেই পালেবত দাঁড়িয়ে আছে৷ তাকে দেখে উচ্ছলের মনে হল পালেবত যেন তার প্রতীক্ষাতেই ছিল৷ তাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল উচ্ছল৷ পালেবত ধীরে ধীরে উচ্ছলের কাছে এগিয়ে এল৷ তারপর উচ্ছলকে অবাক করে দিয়ে তার পাদস্পর্শ করে প্রণাম জানিয়ে উঠে দাঁড়াল৷ সূর্য পাহাড়ের আড়ালে মুখ লোকাবার ঠিক আগের মুহূর্তে তার রশ্মি যেন ছড়িয়ে দিয়েছে পালেবতের মুখমণ্ডলে৷ সেই মায়াবী আলোতে আশ্চর্য সুন্দর দেখাচ্ছে পালেবতের মুখমণ্ডল৷ উচ্ছলের মনে হল এত সুন্দরী নারী সে ইতিপূর্বে কখনও দেখেনি৷ পালেবত যেন সত্যিই এই উপত্যকার শ্রেষ্ঠ সুন্দরী! সরোবর সুন্দরী—কাশ্মীর সুন্দরী!

তার দিকে চেয়ে উচ্ছলের এরপর মনে হল, পালেবত নিশ্চয়ই তার ভুল বুঝতে পেরেছে৷ সে জন্যই পাদস্পর্শ করে মার্জনা চাইতে এসেছে তার কাছে৷ গত রাতেও সে একই কারণে এসে দাঁড়িয়েছিল তার কক্ষের পর্দার আড়ালে৷ পালেবতের উদ্দেশে এরপর হয়তো কিছু বলতে যাচ্ছিল উচ্ছল৷ কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্ত পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ডুবে গেল৷ আলো সরে গেল পালেবতের মুখমণ্ডল থেকে৷ আর তা দেখে উচ্ছলের খেয়াল হল এখন আর তার বাক্যালাপের সময় নেই৷ সে শুধু পালেবতের উদ্দেশে বলল, ‘আজ রাত্রিতে তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবে৷’ এ কথা বলে অলিন্দ ছেড়ে নিচে নেমে উচ্ছল তার শিকারাতে উঠে বসল৷ জল কেটে সে রওনা হল নির্দিষ্ট দিকে৷ যতক্ষণ না উচ্ছল তার দৃষ্টি পথের বাইরে চলে গেল ততক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল পালেবত।

২৪

উচ্ছল যখন হ্রদ অতিক্রম করে পাড়ে এসে পৌঁছাল তখন অন্ধকার নামতে শুরু করেছে চারপাশে৷ হ্রদের কিনারা থেকেই শুরু হয়েছে খার্খদ পর্বত৷ ওপরে ওঠার পাকদণ্ডী৷ যে পথ গিয়ে শেষ হয়েছে ওপরে সেই নির্দিষ্ট গুহার সামনে৷ পাকদণ্ডীতে উঠতে যেতে উচ্ছল এক ছায়ামূর্তিকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ পর মুহূর্তেই সেই ছায়ামূর্তি উচ্ছলকে আশস্ত করে বলল, ‘আমি অভিমন্যু৷ মহামন্ত্রী আমাকে এ স্থানেই থাকতে বলেছেন৷ জলপ্রাসাদে কোনো ঘটনা ঘটলে ভৃত্য মুষিক সে বার্তা বহন করে আনবে এখানে৷ আমি সে খবর ওপরে আপনাদেরকে পৌঁছে দেব৷ আপনি ওপরে যান৷ মহামন্ত্রী ইতিমধ্যেই সে স্থানে উপস্থিত হয়েছেন৷’

উচ্ছল তার কথা শুনে বলল, ‘আশা করি আমাদের জন্য আপনি সুসংবাদ বহন করে আনবেন৷ মহাদেব আমাদের সহায় হন৷’ এ কথা বলে উচ্ছল পাকদণ্ডী বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল৷

কিছু সময়ের মধ্যেই উচ্ছল পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট স্থানে৷ নেড়া পর্বতের গায়ে একটা সংকীর্ণ গুহা মুখ৷ একটা বিশালাকৃতির পাথরও আছে সে গুহার সামনে৷ সম্ভবত ওই পাথর দিয়ে গুহামুখ বন্ধও করা যায়৷ গুহা মুখের সামনেই একটা চত্ত্বর৷ সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মহামন্ত্রী৷ শুধু তিনিই নয়, তাঁর সঙ্গে মন্ত্রী বিদুর, বৌদ্ধ শ্রমন স্কদ্ধদত্ত এমনকী বৃদ্ধ রাজপুরোহিত ব্রহ্মদেবও৷ সবাই আজ এ স্থানে এসে উপস্থিত হয়েছেন মহারাজ ললিতাপীড়ের শেষ পরিণতি জানার জন্য৷ উচ্ছলও তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়ল৷ মহামন্ত্রী যশঙ্কর উচ্ছলের উদ্দেশে মৃদু মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে স্বাগত জানাল৷ গুহামুখের ভিতর খেলা করছে নির্দিষ্ট অন্ধকার৷ সেদিকে তাকিয়ে উচ্ছল মহামন্ত্রীকে প্রশ্ন করল, ‘এ গুহা পথ বেয়ে অন্য কোথাও যাবার রাস্তা আছে নাকি?’

মহামন্ত্রী বললেন, ‘তা আমার জানা নেই, একদল তস্কর এক সময় এই গুহাতে আত্মগোপন করত৷ মুখ বন্ধ করার জন্য পাথরটা তাদেরই আনা৷ ওই তস্করদল ধৃত হবার পর তাদের থেকে আমি এ গুহার অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারি৷ তবে খার্খদ মাতঙ্গী এ পর্বতে আশ্রয় গ্রহণ করার পর থেকে তার ভয়ে কেউ আর এ স্থানে আসে না৷’ এ কথা বলে তিনি তাকালেন পাহাড়ের পাদদেশে দল হ্রদের দিকে৷ অন্য সবাইও চেয়ে আছে সেদিকেই৷ তাদের সকলের দৃষ্টি অনুসরণ করে উচ্ছলও নিচের দিকে তাকাল৷ হ্রদের বুকে অন্ধকার নেমেছে ঠিকই কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে মহারাজের জলপ্রাসাদে মশালের আলোগুলোও জ্বলে উঠতে শুরু করেছে৷ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে প্রাসাদটাকে৷ যে স্থানে হয়তো বা আর কিছু সময়ের মধ্যেই রচিত হবে কাশ্মীর দেশের ভাগ্য৷

উচ্ছলও চেয়ে রইল সে দিকে৷ এক সময় মশাল আর প্রদীপের আলোয় সত্যিই উদ্ভাসিত হয়ে উঠল কাশ্মীর রাজের প্রমোদ প্রাসাদ৷ শুধু প্রাসাদই নয় তার চারপাশের বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে বৃত্তাকারে ছড়িয়ে পড়ল সেই আলো৷ উচ্ছলের চোখে পড়ল বিটপীর প্রমোদ তরী আর সেই বাগলীটা৷ অর্থাৎ অন্য দুই বেশ্যাও এসে উপস্থিত হয়েছে জলপ্রাসাদে৷ সবাই নিশ্চুপ ভাবে চেয়ে রইল। উচ্ছল অনুমান করল তারই মতো অন্য সবাইও প্রচণ্ড উত্তেজনা বোধ করছেন৷ তাই কারো মুখে কোনো কথা নেই৷ এক সময় মহারাজের জলপ্রাসাদ থেকে বাদ্য যন্ত্রের অস্পষ্ট শব্দও যেন ওপরে ভেসে আসতে লাগল৷ অর্থাৎ ললিতাপীড়ের মনোরঞ্জনের জন্য সান্ধ্য অনুষ্ঠানও শুরু হয়েছে৷ সবাই একদৃষ্টে প্রাসাদের দিকে চেয়ে রইল প্রাসাদ বা তার আশেপাশের কোনো চাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হয় কিনা তার জন্য৷ চাঁদ উঠতে শুরু করল আকাশে৷ সময়ও এগিয়ে চলল৷ প্রতিমুহূর্তেই আবার মনে হতে লাগল এই বুঝি কোনো অস্থিরতা দেখা যায় হ্রদের বুকে! কিন্তু তেমন কিছুই প্রত্যক্ষ করতে পারল না কেউ৷

এক সময় কোনো এক পাহাড়ের জঙ্গল থেকে প্রহর গোনা শৃগালের দল ডেকে উঠল৷ সেই শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল আশেপাশের পাহাড়গুলোতে৷ যেন বেশ কিছুক্ষণ ধরে ডেকেই চলল শৃগালেরা৷ সেই শব্দ স্তব্ধ হবার পর মহামন্ত্রী যশঙ্কর অধৈর্য ভাবে বললেন, ‘প্রহর তো অতিক্রান্ত হয়ে গেল, কিন্তু কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না! কোনো সংবাদ এল না কেন? কূপমণ্ডূক কি তবে...৷’

যশঙ্করের কথা সমাপ্ত হবার আগেই পাকদণ্ডী বেয়ে ছুটতে ছুটতে ওপরে উঠে এলেন সভাসদ অভিমন্যু৷ তিনি হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, ‘এই মাত্র ভূত্য মুষিক এসে বার্তা দিয়ে ফিরে গেল!’

‘কী বার্তা?’ উত্তেজিত ভাবে সবাই ঘিরে দাঁড়াল তাকে৷

অভিমন্যু বললেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে৷ কৃপমণ্ডূকের পুষ্প স্তবক থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে কিরিচ, কাল সূর্যোদয় হলেই তাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হবে৷’

কথাটা শুনে মহামন্ত্রী বললেন, ‘কিন্তু কূপমণ্ডূক যে বলেছিল তাকে কোনরূপ পরীক্ষা করা হয় না? তবে?’

অভিমন্যু বলল, ‘সে ঠিকই বলেছিল৷ তাকে পরীক্ষা করা হোত না যদি না আমাদের মধ্যে কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে ধরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করত৷’

কথাটা শুনেই মন্ত্রী বিদুর বলে উঠলেন, ‘বিশ্বাসঘাতকতা করে কূপমণ্ডূককে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে! কে সেই বিশ্বাসঘাতক?’

অভিমন্যু ফিরে দাঁড়াল উচ্ছলের দিকে৷ তারপর আঙুল তুলে তাকে দেখিয়ে বলল, ‘এই সেই বিশ্বাসঘাতক৷ এই উচ্ছল তার প্রেয়সী পালেবত নামের নারীকে আজ সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান শুরুর প্রাক মুহূর্তে মহারাজের পাঞ্জা দিয়ে পাঠিয়েছিল বিটপীর কাছে৷ পালেবতই বিটপীকে জানিয়ে দেয় কূপমণ্ডূকের পুষ্প স্তবকে মহারাজকে হত্যা করার জন্য কিরিচ লুকানো আছে!’

উচ্ছল, অভিমন্যুর বলা এই অদ্ভুত কথা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল৷ সবাই এবার ফিরে দাঁড়াল উচ্ছলের দিকে৷ মহামন্ত্রী যশঙ্কর বিস্মিত ভাবে উচ্ছলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘এ কথা সত্যি নাকি? বিশ্বাস করতে যে কষ্ট হচ্ছে!’

হতভম্ব উচ্ছল কোনোক্রমে বলে উঠল, ‘না, এ ঘটনা সত্যি নয়৷ আমি কিছুই জানি না৷’

অভিমন্যু বলে উঠলেন, ‘আপনি মিথ্যা বলছেন৷ মুষিক বলল, সে নিজে দেখেছে পালেবতকে জলপ্রাসাদে উঠে বাক্যালাপ করতে৷ আর তারপরই কূপমণ্ডূককে পরীক্ষার নির্দেশ দেয় বিটপী৷ পালেবত বর্তমানে জলপ্রাসাদের অতিথিশালায় বিশ্রাম লাভ করছে৷’

উচ্ছল এ কথা শোনার পরও বলার চেষ্টা করল যে সে কিছুই জানে না৷ কিন্তু বিদুর বললেন, ‘তবে আপনাকে দেওয়া মহারাজের পাঞ্জা নিয়ে সে জলপ্রাসাদে প্রবেশ করল কী ভাবে? সর্বোপরি সে কীভাবে জানল কূপমণ্ডূকের পুষ্প স্তবকে অস্ত্র রাখার কথা? নিশ্চয়ই আপনিই জানিয়েছেন তাকে সে কথা?’

মহামন্ত্রী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘ছিঃ, সামান্য অর্থের লোভে, মন্ত্রী হবার লোভে এমন বিশ্বাসঘাতকা করতে পারলেন আপনি!’

বৃদ্ধ রাজপুরোহিত নিজের উপবীত স্পর্শ করে উচ্ছলকে বললেন, ‘আমি আপনাকে ব্রহ্মশাপ দিচ্ছি৷ প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে আপনি যে ক্ষতি করলেন তার জন্য আপনার অনন্ত নরকবাস হবে৷’ উচ্ছলকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোনো কথাই আর বলতে দিলেন না কেউ৷ সকলের তীব্র ঘৃণা আর অভিসম্পাত তার ওপর বর্ষিত হতে শুরু হল৷ হঠাৎ এক সময় বৌদ্ধ শ্রমন স্কন্ধদত্ত বললেন, ‘আমাদের এ স্থানে আর থাকা উচিত হবে না৷ হয়তো বা ওই পাপিষ্ঠা রমনী এস্থানে আমাদের অবস্থানের কথাও বিটপীকে জানিয়েছে৷ আর এই ধূর্ত নরাধম আমাদের সঙ্গে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে এক সঙ্গে আমাদের সবাইকে সৈন্যদের হাতে তুলে দিয়ে কৃতিত্ব লাভ করার জন্য৷ আমাদের এ স্থান ত্যাগ করা প্রয়োজন৷’

তাঁর কথা শুনে অভিমন্যু বললেন, ‘হ্যাঁ, সৈন্যরা এসে পড়ার আগেই এ স্থান ত্যাগ করব আমরা৷ তবে তার আগে এই নরাধমকেও বধ করে যাব৷’ এ কথা বলে সে তলোয়ার উন্মুক্ত করতে যাচ্ছিল কিন্তু রাজপুরোহিত তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই পাষণ্ডর রক্তে আপনার তলোয়ার কলঙ্কিত করার দরকার নেই৷ ওকে আরও বড় শাস্তি দেওয়া হোক৷ এই অন্ধকার গুহাতে আমরা ওকে নিক্ষেপ করি৷ এখানে ও অন্ধকারের মধ্যে ক্ষুধা-তৃষ্ণাতে কাতর হয়ে ধীরে ধীরে আরও যন্ত্রণা লাভ করে মৃত্যু বরণ করুক৷ সেটাই হবে ওর উচিত শাস্তি৷’

ব্রহ্মদেবের কথা মনে ধরল অন্যদের৷ সবাই সমস্বরে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, উত্তম প্রস্তাব৷ তাই করা হোক৷’

এরপর সবাই উচ্ছলকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেল গুহা মুখের সামনে৷ তারপর তাকে ধাক্কা দিয়ে অন্ধকার গুহাতে নিক্ষেপ করে, সকলে মিলে পাথর ঠেলে গুহামুখ বন্ধ করে দিল৷ উচ্ছল শুনতে পেল তাদের পদশব্দ দূরে মিলিয়ে গেল!

গুহার ভিতর এতটাই অন্ধকার যে নিজের বাহু পর্যন্ত দৃশ্যমান হয় না৷ যা ঘটল তার থেকে সম্বিত ফিরে পেতে বেশ খানিকটা সময় লাগল উচ্ছলের৷ ধীরে ধীরে উঠে বসল সে৷ উচ্ছলের মনে হল মুষিক নিশ্চয়ই মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করে যায়নি৷ তা করে কী লাভ তার৷ গত রাতে পালেবত পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের পরিকল্পনার কথা শুনেছিল৷ তারপর উচ্ছলের অবর্তমানে তার কক্ষে রাখা পাঞ্জাটা নিয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ করেছে বিটপীর সঙ্গে৷ তাকে জানিয়ে দিয়েছে পরিকল্পনার কথা৷ উচ্ছল ভাবতে লাগল কেন এমন করল পালেবত? তার মনে পড়ল, জলপ্রাসাদের ভৃত্যদের অলঙ্কারের কথা বলার সময় কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল তার চোখ মুখ! তাহলে কি লোভের আগুনই লুকিয়ে ছিল পালেবতের চোখে? সে জন্যই সে ওভাবে দু-রাতে প্রত্যাখ্যান করেছিল উচ্ছলকে? পালেবত বার বার তার কাছে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে মহারাজকে দর্শন লাভের৷ উচ্ছল তো শেষ পর্যন্ত তাকে জানিয়েও ছিল মহারাজের দানবীয় কাম লালসার কথা, তাকে বলেছিল, সতর্ক করেছিল মহারাজ আর বেশ্যা বিটপীর সম্পর্কে৷ তবুও কেন এমন কাজ করল পালেবত? সে কি তবে ওই তিন বেশ্যার মতো প্রভূত ধন সম্পদের অধিকারিনী হতে চায়? যা তাকে দেওয়া উচ্ছলের পক্ষে কোনো দিন সম্ভব হত না৷ নিশ্চয়ই তাই হবে৷ উচ্ছল তাকে চিনতে পারেনি৷ তার অভিনয়ে তাকে চিনতে ভুল করেছিল উচ্ছল৷ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হবার পর কখনও পালেবতের প্রতি, কখনও নিজের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা বোধ করতে লাগল সে৷

বেশ অনেকক্ষণ সময় ধরে এসব কথা ভাবার পর উচ্ছলের মনে হল, তাকে একবার বাঁচার চেষ্টা করতে হবে৷ দেখতে হবে কোনো ভাবে এই অন্ধকূপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় কিনা? খার্খদ পাথরের সেই অন্ধকার গুহার মধ্যে বাঁচার পথ খোঁজার জন্য উঠে দাঁড়াল
উচ্ছল৷

ঠিক সেই সময় জলপ্রাসাদের এক আলোকজ্জ্বল কক্ষে মখমলের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল পালেবতও৷ সে কক্ষে প্রবেশ করল বিটপী৷ পালেবতের উদ্দেশে সে বলল, ‘মনোরঞ্জনের অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়ে গেছে৷ মহারাজ তাঁর বিশ্রাম কক্ষে ফিরে গেছেন৷ তিনি তোর ওপর খুশি হয়েছেন৷ তোর জন্যই প্রাণ রক্ষা হল মহারাজের৷ কিন্তু কূপমণ্ডূক যে অস্ত্র বহন করে আনবে সে কথা তুই কীভাবে জানলি বল?’

পালেবত জবাব দিল, ‘গতকাল আমি পুষ্পপথে পুষ্প চয়ন করতে গেছিলাম৷ সেখানেই এক পাথরের আড়ালে বসে কথা বলছিল কূপমণ্ডূক আর ষড়যন্ত্রকারীরা৷ অন্যদের অবশ্য আমি চিনি না৷ আমি আড়াল থেকে তাদের কথোপথন শুনলাম, আর তারপর...৷’

বিটপী প্রশ্ন করল, ‘তুই যে সভাসদ উচ্ছলের পাঞ্জা নিয়ে এখানে এলি, তিনি জানেন ব্যাপারটা?’

পালেবত জবাব দিল, ‘না, তাকে আমি কোনো কথাই জানাইনি৷’

বিটপী এর পর জানতে চাইল, ‘কূপমণ্ডূক ছাড়া অন্য যে সব ষড়যন্ত্রকারী সেখানে ছিল তাদেরকে দেখলে তুই সনাক্ত করতে পারবি?’

পালেবত বলল, ‘হ্যাঁ, নিশ্চই পারব৷’

তার কথা শুনে খুশি হল বিটপী৷ সে হাসল, ‘আমি তোকে রাজসভাতে নিয়ে যাব৷ আমার ধারণা তুই সেখানে ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করতে পারবি?’

পালেবত এরপর বলল, ‘এবার তবে আপনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুন, আমি মহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য অধৈর্য হয়ে উঠেছি৷’

বিটপী তার কথা শুনে হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করি৷ তবে তোর শরীরও আমাকে পরীক্ষা করতে হবে৷ যা ঘটতে চলেছিল তার পরে আর কোনো ব্যক্তিকেই তার দেহ পরীক্ষা না করে মহারাজের সামনে উপস্থিত হতে দেওয়া যাবে না৷ আমিই তোর শরীর পরীক্ষা করছি৷’

পালেবত হেসে বলল, ‘পরীক্ষা করুন৷’

পালেবতের কাছে এসে দাঁড়াল বিটপী৷ গায়ের শাল খুলে ফেলল পালেবত৷ বিটপী তার কেশ উন্মুক্ত করতে বলল৷ নিদের্শ পালন করল পালেবত৷ বিটপী তার কেশ সহ সর্বাঙ্গে হস্ত সঞ্চালন করে দেখতে লাগল তার শরীরে কোনো গোপন অস্ত্র রক্ষিত আছে কিনা। সব শেষে বেশ্যা বিটপী নিজের অঙ্গুলী দিয়ে পরীক্ষা করল পালেবতের যোনি৷ সে স্থানেও কিছু পেল না সে৷ নিশ্চিন্ত হয়ে বিটপী এরপর তাকে বলল, ‘চল এবার তোকে মহারাজের কক্ষে নিয়ে যাচ্ছি৷’

শালটা আবার গায়ে জড়িয়ে নিয়ে এরপর বিটপীকে অনুসরণ করল পালেবত৷ বেশ কয়েকটা কক্ষ অতিক্রম করে বিটপী তাকে নিয়ে প্রবেশ করল মহারাজের কক্ষে৷ বাইরে রাত তখন গভীর৷ দল হ্রদ ঘুমিয়ে পড়েছে৷ জলপ্রাসাদে যারা মহারাজের মনোরঞ্জনের জন্য এসেছিল তারা বিদায় নেবার পর প্রাসাদের মশাল আর প্রদীপের আলোগুলোও নিভু নিভু হয়ে এসেছে৷ তবে মহারাজের স্বর্ণমণ্ডিত কক্ষ তখনও আলোকোজ্জ্বল৷ মাথার ওপর থেকে নেমে আসা শিকলবদ্ধ কোঠরির কাঠ কয়লার আগুন আলো ও উত্তাপ ছড়াচ্ছে কক্ষে৷ স্বর্ণ পালঙ্কে মখমলের আচ্ছাদনের ওপর অর্ধ উলঙ্গ ভাবে শুয়ে ছিলেন কাশ্মীর রাজ ললিতাপীড়৷ কক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নেই৷ পালেবতকে নিয়ে তাঁর পালঙ্কের সামনে এসে দাঁড়াল বিটপী৷ সে পালেবতকে নির্দেশ দিল, ‘মহারাজকে প্রণাম কর৷’

দু-হাত বুকের কাছে জড়ো করে মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে প্রণাম জানাল পালেবত৷

মহারাজ ললিতাপীড় পালেবতের ওপর দৃষ্টি রেখে বিটপীর কাছে জানতে চাইলেন, ‘এই সেই রমণী যে আজ ঘাতকের অস্ত্র থেকে রক্ষা করেছে আমাকে?’

বেশ্যা বিটপী জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, মহারাজ, এই সেই রমণী, ওর নাম পালেবত।’

মহারাজ ললিতাপীড় এরপর পালেবতকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুই আমার থেকে কী পুরস্কার চাস বল?’

পালেবত বলল, ‘অন্য কোনো পুরস্কার নয়, আমি শুধু মহারাজকে সেবা করার সুযোগ পেতে চাই৷’ কথাটা শুনে হাসি ফুটে উঠল মহারাজের ঠোঁটের কোণে৷ তিনি বললেন, ‘করবি৷’

বিটপী হয়তো এরপর সেই কক্ষ থেকে পালেবতকে ফিরিয়ে নিতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে অবাক করে দিয়ে পালেবত একটা কাজ করল৷ সে তার গায়ের শালটা খুলে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিল৷ পালেবতের পরনে মাছের জালিকার মতো সেই উন্মুক্ত পোশাক৷ শরীরের সর্বাঙ্গ দৃশ্যমান তার৷ ললিতাপীড়ের চোখের সামনে ফুটে উঠল পালেবতের সুডৌল স্তন যুগল, গভীর নাভি, যোনিদেশ। মহারাজ চেয়ে রইলেন সেই নারী শরীরের দিকে৷

সাত দিন হয়ে গেল মহারাজ বঞ্চিত নারী শরীরের স্পর্শ থেকে৷ যে শরীর উচ্ছলের মতো মহৎ চরিত্রের পুরুষকেও আকর্ষিত করেছিল সে শরীর কি লম্পট কামুক ললিতাপীড়কে আকর্ষণ না করে পারে? পালেবতের অনুমানই ঠিক হল৷ রক্তচঞ্চল হয়ে উঠল ললিতাপীড়ের৷ বিটপী প্রমাদ গুনে মাটি থেকে শালটা তুলে পালেবতের অঙ্গ আবৃত করতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু তার আগেই ললিতাপীড় ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের মতো পালঙ্ক থেকে লাফিয়ে উঠে আলিঙ্গণ করল পালেবতকে৷ তারপর তাকে পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে আনল পালঙ্কে৷ বিটপী বুঝতে পারল এ অবস্থায় তার পক্ষে কোনো ভাবেই মহারাজকে নিবৃত্ত করা সম্ভব নয়৷ তবে পালেবত তো আর স্বর্ণ সেবিকা নয়, তাই তার থেকে বিপদের সম্ভাবনা নেই৷ বিটপী আর সে স্থানে দাঁড়াল না৷ কক্ষ ত্যাগ করল সে৷ সম্ভোগে মেতে উঠলেন মহারাজ ললিতাপীড়৷ তার কক্ষর আলোগুলোও এক সময় নিভতে শুরু করল৷

২৫

উচ্ছল ঠিক এই সময়ে অন্ধকার গুহা থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা করতে লাগল৷ প্রথমে সে গুহামুখের পাথরটা ঠেলে সরাবার চেষ্টা করল৷ কিন্তু ব্যর্থ হল তার চেষ্টা৷ সেই জগদ্দল পাথর কারো একার পক্ষে ঠেলে সরানো সম্ভব নয়৷ এরপর সে দেওয়াল হাতড়াতে হাতড়াতে এগোতে লাগল বাইরে বেরোবার জন্য কোনো ছিদ্র আছে কিনা তা অনুসন্ধানের জন্য৷ কিন্তু কোথাও কোনো ছিদ্র নেই৷ সর্বত্রই শুধু কঠিন পাথরের দেওয়ালের স্পর্শ পেতে লাগল সে৷ অন্ধকারের মধ্যে সে কোন দিকে গুহা কত গভীরে প্রবেশ করছে তাও বুঝে উঠতে পারল না উচ্ছল৷ দীর্ঘক্ষণ পথ খোঁজার চেষ্টা করার পর ব্যর্থ হয়ে এক সময় অবসন্ন হয়ে বসে পড়ল উচ্ছল৷ এরপর আতঙ্ক পেয়ে বসতে শুরু করল তাকে। উচ্ছলের মনে হল তার বাঁচার আশা সত্যি আর নেই৷ বাইরে রাত আরও এগোতে থাকল।

অর্ধমৃত অবস্থাতেই বসে তার অদৃষ্টর কথা, আসন্ন মৃত্যুর কথা ভাবছিল উচ্ছল৷ হঠাৎই একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে সেদিকে তাকাল সে৷ উচ্ছলের চোখে পড়ল একটা আলোর বিন্দু৷ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল সে৷ ধীরে ধীরে সেই আলো প্রবেশ করল গুহার মধ্যে৷ আলোকিত হয়ে উঠল গুহার কিছু অংশ৷ প্রদীপ হাতে যে গুহাতে প্রবেশ করল তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল উচ্ছল৷ সে খার্খদ মাতঙ্গী! খার্খদ তবে কোথাও যায়নি! এ পাহাড়ের গুহাতে ছিল! কোনো কারণে সে মিথ্যা প্রচার করেছিল লোকজনের কাছে৷ ব্যাপারটা অনুমান করল উচ্ছল৷ উচ্ছল যে স্থানে দাঁড়িয়ে সে স্থানে প্রদীপের আলো পৌঁছাচ্ছে না৷ খার্খদ তাকে দেখতে পেল না৷ মাতঙ্গীর মুখমণ্ডল দেখে উচ্ছলের মনে হল সে যেন কোনো কারণে শঙ্কিত৷ গুহায় প্রবেশ করার পর সে সোজা এগিয়ে বিপরীত দিকের দেওয়ালের সামনে গিয়ে বসল৷ মেঝে থেকে ছোট ছোট পাথরের টুকরো সরিয়ে সে বেশ বড় একটা থলে বার করে আনল৷ ঝনঝন করে বেজে উঠল থলেটা৷ উচ্ছল তা শুনে বুঝতে পারল অলঙ্কার বা মুদ্রা ধরণের কোনো জিনিস আছে সেখানে৷ সম্ভবত এ গুহা মাতঙ্গীর সম্পদ লুকিয়ে রাখার স্থান৷ থলেটা বার করার পর মাতঙ্গী সেটা পিঠে নিয়ে উঠে দাঁড়াল৷ তারপর সেটা নিয়ে দ্রুত এগোল বাইরে যাবার জন্য৷

মাতঙ্গী চলে যাবার পর সামান্য কিছু সময় অপেক্ষা করে উচ্ছল পৌঁছে গেল যেই গুহামুখের সামনে৷ তারপর বাইরে উন্মুক্ত আকাশের নীচে এসে দাঁড়াল৷ উচ্ছল বুঝতে পারল দেবতার অসীম করুণায় সে রক্ষা পেয়েছে৷ বাইরে বেরিয়ে সে খার্খদ বা অন্য কাউকে দেখতে পেল না৷ নীচে তাকিয়ে দেখতে পেল চাঁদের আলোতে দল হ্রদকে৷ তবে মহারাজের জলপ্রাসাদের আলো নিভে গেছে৷ কুয়াশার আবরণে নীচের সব কিছু অস্পষ্ট দেখাচ্ছে৷ সেই গুহামুখের সামনে থেকে উচ্ছল নীচে নামার কোনো রাস্তা দেখল না৷ অতঃপর পাহাড়ের বাঁক বেয়ে নীচে নামতে শুরু করল সে৷ দেবতা এবারও তাকে সাহায্য করলেন৷ নির্বিঘ্নেই নীচে পৌঁছে গেল সে৷ হ্রদের কিনারে পৌঁছে সে দেখতে পেল তার শিকারা নৌকোটা তখনওই সেখানেই বাঁধা৷ উচ্ছল সিদ্ধান্ত নিল সে গৃহে ফিরবে৷ তারপর ভোরের আলো ফুটলে যা সিদ্ধান্ত নেবার তা নেবে৷ তার শরীর-মন দুটোই ক্লান্ত-বিদ্ধস্ত৷ তাই গৃহে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই তার সামনে৷ তাই শিকারাতে উঠে বসল উচ্ছল৷

সে রওনা হয়ে গেল তার জলগৃহতে ফেরার জন্য৷ কুয়াশাময় রাত্রি৷ চারপাশে স্পষ্ট কিছু দেখা যাচ্ছে না৷ কিন্তু জলগৃহর দিকে এগোতে এগোতে উচ্ছলের যেন মনে হতে লাগল এই গভীর রাত্রে দল হ্রদের বুকে কেমন একটা চঞ্চলতা শুরু হয়েছে৷ মধ্যরাতে হঠাৎই ঘুম ভেঙে যেন ছোটাছুটি করছে বেশ কিছু জল যান-শিকারা নৌকা৷ উচ্ছল শেষ পর্যন্ত এসে উপস্থিত হল তার বাসস্থানে৷ সে দেখল অন্য কোনো শিকারা নৌকা নেই সে স্থানে৷ অলিন্দে উঠে নিজের কক্ষে প্রবেশ করার আগে নিজের অজান্তেই পালেবতের কক্ষের দিকে চোখ গেল উচ্ছলের৷ কপাট দুটো সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রয়েছে৷ ঠিক সেই মুহূর্তে গুঞ্জা নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল উচ্ছলের পায়ের শব্দ শুনে৷ সে ঘুমায়নি৷ উচ্ছলের উদ্দেশে সে উৎকণ্ঠিত ভাবে বলল, ‘আপনি কোথায় ছিলেন? আপনি রওনা হবার পরই পালেবতও শিকারা নিয়ে জলে ভাসল৷ রাত শেষ হতে চলল, সেও এখনও ফিরল না!’

গুঞ্জার কথা শুনে উচ্ছল কোনোক্রমে জবাব দিল, ‘পালেবত আর ফিরবে না৷’ এ কথা বলে নিজ কক্ষে প্রবেশ করল সে৷ ক্লান্ত, বিদ্ধস্ত শরীরটাকে কোনোক্রমে বিছানায় এলিয়ে দিয়ে সে ভাবতে লাগল এরপর তার কী করণীয়? রাজা এবং রাজদ্রোহী, দুপক্ষ থেকেই তার বিপদের সম্ভাবনা প্রবল৷ কী করবে সে? ভোরের আলো ফুটলেই কোনো পর্বতের পথ ধরে শ্রীনগর ছেড়ে পলায়নের চেষ্টা করবে? নাকি গৃহেই থেকে তার ভবিতব্যের জন্য প্রতীক্ষা করবে? আর এ সব কথা ভাবতে ভাবতে যখনই তার পালেবতের কথা মনে হতে লাগল তখনই তার প্রতি ক্ষোভে, ঘৃণায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে লাগল উচ্ছলের মন৷ রাত্রি শেষ প্রহরে পদার্পণ করেছে৷

হঠাৎই এরপর উন্মুক্ত গবাক্ষর দিকে চোখ গেল উচ্ছলের৷ তার মনে হল আকাশ যেন আলোকিত হতে শুরু করেছে৷ তবে কি সূর্যোদয় হচ্ছে? উচ্ছলকে তবে এবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে সে কী করবে?

পালঙ্কে সোজা হয়ে বসে ভালো করে বাইরের দিকে তাকাল উচ্ছল৷ ঠিক সেই মুহূর্তে আরও একটা জিনিস চোখে পড়ল তার৷ কুয়াশার আবরণ ভেদ করে একটা শিকারা নৌকা সোজা এগিয়ে আসছে তার জলগৃহর দিকে! ও কার শিকারা? মহারাজের সৈন্যদের? নাকি রাজদ্রোহীরা আবার এসে উপস্থিত হল তাকে শাস্তি দেবার জন্য? সঙ্গে সঙ্গে শয্যা ত্যাগ করল উচ্ছল৷ নিজের জীবন রক্ষার চেষ্টার কথা ভেবে দেওয়ালে টাঙানো কোষবদ্ধ তলোয়ারটা হাতে নিয়ে সে অলিন্দে বেরিয়ে এল৷

হ্যাঁ, আকাশটা লাল হয়ে উঠতে শুরু করেছে, তবে পুবের আকাশ নয়, মহারাজের জলপ্রাসাদটা যে স্থানে অবস্থান করছে তার মাথার ওপরের আকাশটা৷ তা দেখে উচ্ছল ভাবল শেষ রাতে কোনো কারণবশত মহারাজের প্রাসাদ আবার আলোকিত করা হচ্ছে৷ আর এরপরই কুয়াশা ভেদ করে উচ্ছলের জলগৃহতে এসে ভিড়ল সেই শিকারা নৌকা৷ আর তার থেকে যে নামল তাকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল উচ্ছল৷

সোপান বেয়ে অলিন্দে উঠে এল পালেবত৷ প্রাথমিক অবস্থায় তাকে দেখে উলঙ্গ মনে হলেও তার পরনে রয়েছে নর্তকীদের সেই পোশাক৷ চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার মুখমণ্ডলে৷ কুমকুম আর কাজলে লাঞ্ছিত, বিদ্ধস্ত, তার মুখমণ্ডল৷ দিনের আলোতে উচ্ছল তাকে দেখলে বুঝতে পারল পালেবতের সারা শরীরে জেগে আছে এক কামার্ত পশুর নখরাঘাতের চিহ্ন! হতবাক হয়ে উচ্ছল বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইল পালেবতের দিকে৷ তারপর উচ্ছলের মনে হল এ পোশাকে পালেবত তাকে কোনো কারণে প্রলুব্ধ করতে এসেছে৷ যে শরীর সে উচ্ছলকে প্রদর্শন করছে সেই শরীর সে হয়তো কিছু সময় আগেই দিয়ে এসেছে মহারাজ ললিতাপীড়কে৷ কথাটা ভেবেই পালেবতের প্রতি তীব্র ঘৃণায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল উচ্ছলের মন৷ সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘পাপিষ্ঠা, তুমি আবার এখানে এসেছ কেন?’

পালেবত বলল, ‘ক্ষমা চাইতে৷’

উচ্ছল বলে উঠল, ‘তোমার মতো নিচ, অর্থলোভী, বিশ্বাসঘাতিনীকে ক্ষমা করার কোনো প্রশ্নই নেই৷’

উচ্ছলের এ কথা শোনার পর পালেবতের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল৷ হয়তো সে হাসিতে বিষাদ ছিল৷ কিন্তু সে মুহূর্তে ক্রুদ্ধ উচ্ছলের চোখে তা ধরা দিল না৷ তাকে হাসতে দেখে উচ্ছল আর নিজের ক্রোধকে সম্বরণ করতে পারল না৷ তলোয়ারের আঘাত করল পালেবতের মস্তক লক্ষ্য করে৷ তলোয়ার যদি কোষবদ্ধ না থাকত তবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যেত পালেবতের মস্তক৷ তবে কোষবদ্ধ হলেও তার আঘাতে পালেবতের কপালে ক্ষত চিহ্নর সৃষ্টি হল৷ ফোঁটা ফোঁটা রক্ত চুঁইয়ে পড়তে শুরু করল তার থেকে৷ উচ্ছল দেখল তবুও পালেবতের ঠোঁটের কোণে সেই অদ্ভুত হাসি জেগে আছে৷ তা দেখে একটু থমকে গেল উচ্ছল৷ জীবনে সে কোনোদিন কোনো নারীকে আঘাত করেনি ইতিপূর্বে৷ পাছে সে সত্যিই এরপর পালেবতকে হত্যা করে বসে সে জন্য উচ্ছল এরপর তাকে বলল, ‘তুমি এখনই দূর হও এখান থেকে৷ নইলে আমি তোমাকে হত্যা করব৷’

পালেবত বলল, ‘তার আর প্রয়োজন হবে না৷ যাবার জন্য আমি এখানে এসেছিলাম৷ তবে যাবার আগে আমি আপনাকে জানিয়ে যাই শরীর আমি ললিতাপীড়কে দিলেও মন আমি আপনাকেই দিয়েছি৷ তাই আমি আপনাকে প্রত্যাখান করেছি৷ আমি নিরুপায় ছিলাম, আমাকে মার্জনা করবেন৷’

পালেবতের এই অদ্ভুত কথা বোঝার সামর্থ্য হল না উচ্ছলের। সে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ তুমি এখনই আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও পাপিষ্ঠা৷’

পালেবত আর কোনো কথা বলল না৷ হাত জোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে শেষ বারের মতো প্রণাম জানাল তার জীবন রক্ষাকারী, আশ্রয়দাতা, ব্যর্থ প্রেমিককে৷ তারপর ধীর পায়ে নীচে নেমে উঠে বসল তার শিকারাতে৷ ধীরে ধীরে তার শিকারা হারিয়ে গেল দল হ্রদের কুয়াশার আড়ালে৷ ললিতাপীড়ের জলপ্রাসাদের মাথার ওপরের আকাশটা তখন আরও লাল হতে শুরু করেছে৷ সেদিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরটাকে নিয়ে কোনোক্রমে উচ্ছল আবার নিজের কক্ষে প্রবেশ করল৷

২৬

ভোরের আলো ফুটল এক সময় উপত্যকার বুকে৷ কুয়াশা কেটে গেল৷ নানান বর্ণের পুষ্পর দল মাথা তুলল সূর্যর দিকে চেয়ে৷ সরালের দল হ্রদের বুকে নেমে পড়ল কলরব করতে করতে৷ শুধু কলরবই নয়, দল হ্রদের নানান স্থান থেকে ভেসে আসতে লাগল নানা প্রকার বাদ্য যন্ত্রর শব্দ, মানুষের কোলাহল৷ তবে সে সব কোনো শব্দই প্রবেশ করছিল না উচ্ছলের কর্ণকুহরে৷

উচ্ছলের শরীর মন এতটাই তখন ক্লান্ত, অবসন্ন যে প্রতিমুহূর্তে তার মনে হচ্ছিল এই বুঝি সে জ্ঞান হারাবে৷ আসন ছেড়ে উঠে শয্যা গ্রহণের সামর্থ্যও সে এখন হারিয়ে ফেলেছে৷

হঠাৎই বেশ কয়েকটা পদশব্দ উঠে এল উচ্ছলের জলগৃহতে৷ এমনকী উচ্ছলের কানে সে শব্দটুকুও প্রবেশ করল না৷ তার কক্ষে আবিভূর্ত হলেন মহামন্ত্রী সহ গতরাতে খার্খদ পাহাড়ে উপস্থিত সকলেই৷ উঠে দাঁড়াবার সামর্থ্য নেই উচ্ছলের৷ মুখ তুল সে তাকাল তাদের দিকে৷ যশঙ্কর বললেন, ‘আমরা খার্খদ পাহাড়ের সে গুহায় আপনাকে না পেয়ে এখানে এসে উপস্থিত হলাম৷’

উচ্ছল বিষণ্ণ হেসে বলল, ‘আমাকে হত্যা করতে এসেছেন? করুন৷’

তার কথা শুনে সভাসদ অভিমন্যু বললেন, ‘আপনি আমাদের আর লজ্জা দেবেন না৷ আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করতে এসেছি আপনার কাছে৷ অত্যাচারীর শাসনের অবসান হয়েছে৷ নিহত হয়েছে মহারাজ ললিতাপীড়৷ তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে উন্মুক্ত, উন্মত্ত নাগরিকরা জলপ্রাসাদে লুণ্ঠন করে তাতে অগ্নি সংযোগ করে৷ তাতে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে এই তিন বেশ্যার৷ কূপমণ্ডূককে মুক্ত করা হয়েছে৷ ভেঙে ফেলা হয়েছে স্বর্ণ সেবিকাদের আবাস স্থলের প্রাসাদ৷ সবাই আজ মুক্ত৷ ওই শুনুন বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি শোনা যাছে৷ সারা উপত্যকা আজ মেতে উঠেছে আনন্দ উৎসবে৷ আর এ সবই সম্ভব হল আপনার জন্য৷’ একটানা কথাগুলো বলে থামলেন অভিমন্যু৷

তার কথা শুনে কিছুটা সম্বিত ফিরে পেল উচ্ছল৷ সে প্রশ্ন করল, ‘কে হত্যা করল তাকে?’

যশঙ্কর বললেন, ‘যাকে আপনি আপনার গৃহে আশ্রয় দিয়েছিলেন সেই পালেবত৷ কিন্তু আপনিই তাকে মহারাজকে হত্যা করার জন্য ওভাবে প্রস্তুত করেছিলেন, নাকি সে নিজেই প্রস্তুত হয়ে এসেছিল? তার আসল পরিচয় কি? আপনি তা জানেন?’

বিস্মিত উচ্ছল বলল, ‘আমি তার পরিচয় যতটুকু জেনেছি তা সবই আপনাকে ইতিপূর্বে বলেছি, তার বেশি আমি আর কিছুই জানি না?’

ঠিক সেই সময় আরও একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘আমি তার পরিচয় জানি৷ গতকাল সে আমাকে জানিয়েছে সে কথা৷’

উচ্ছল তাকিয়ে দেখল বাঁদরী এসে প্রবেশ করেছে তার কক্ষে৷ তার কথা শুনে মহামন্ত্রী যশঙ্কর বিস্মিত ভাবে বললেন, ‘তুমি জানো তার পরিচয়?’

বাঁদরী বলল, ‘হ্যাঁ, সে আমাকে কিছুটা জানিয়েছিল তার পরিচয়৷ যেদিন ভূকম্পন হয় সেদিন সভাসদকে রক্ষা করতে গিয়ে পাথরের আঘাত লেগেছিল তার মস্তকে৷ তার পরই স্মৃতি শক্তি ধীরে ধীরে ফিরে পেয়েছিল সে৷ পালেবতও আমাকে বলেছে তার পিতার নাম ছিল সুষেণ৷ বিষ বৈদ্য ছিলেন তিনি৷ তাঁর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতেই সে এখানে আসছিল৷ পথে তুষারখণ্ডর আঘাতে তার স্মৃতি শক্তি লোপ পায়৷ তবে কী ভাবে কার ওপর প্রতিশোধ নেবে সে কথা অবশ্য সে জানায়নি৷’

বাঁদরীর কথা শুনে অবাক হয়ে গেল সবাই৷ উচ্ছল উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে মহামন্ত্রীকে প্রশ্ন করল, ‘পালেবত কীভাবে হত্যা করল ললিতাপীড়কে?’

একটু চুপ করে থেকে যশঙ্কর বললেন, ‘বিষ বৈদ্য পিতার থেকে নিশ্চয়ই সে জেনেছিল সে কৌশল৷ তারপর পিতার মৃত্যু প্রতিশোধে নেবার জন্য সে সেইভাবে নিজেকে তৈরি করেছিল৷ সে এখন কোথায়? সে যে বিষকন্যা৷ তার চুম্বনে, মিলনে মৃত্যু হয় পুরুষের৷’

অস্পষ্ট কণ্ঠে উচ্ছল জবাব দিল, ‘সে চলে গেছে৷’

ঠিক এই সময় পুষ্পপথে একাকী হেঁটে চলেছিল এক নারী৷ মাথার ওপর নীল আকাশ৷ চারপাশে অজস্র ফুলের সমারোহ৷ এ পথ যেন এত সুন্দর ভাবে কোনো দিন সাজেনি৷ বসন্ত তার সৌন্দর্য্যের শেষ বিন্দুটুকু যেন ঢেলে দিয়েছে এ পথে! গিরিবর্তে প্রবেশের মুখে শেষ বারের জন্য সে একবার পিছু ফিরে তাকাল নীচের দল হ্রদের দিকে৷ অগুনতি জলগৃহ, শিকারা নৌকা উজ্জ্বল স্বর্ণ কিরণে ভাসছে সেখানে৷ যে কাজের জন্য সে উপত্যাকা ঘেরা ওই নগরীতে এসেছিল সে কাজে সফল হয়েছে সে৷ তবুও একবার সে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল, সেই গৃহটাকে দেখা যায় কিনা৷ যে গৃহে সে ছেড়ে রেখে যাচ্ছে তার প্রেম, তার ভালোবাসার মানুষকে৷ দু-ফোঁটা চোখের জল মুক্ত বিন্দুর মতো গড়িয়ে পড়ল তার চোখ বেয়ে৷ কিন্তু তার যে মিলন সম্ভব নয় উচ্ছলের সঙ্গে৷ চোখের জল মুছে নিয়ে সে আবার হাঁটতে শুরু করল অজানার উদ্দেশে৷ গিরিবত্মের গভীরে হারিয়ে গেল উচ্ছলের পালেবত—কাশ্মীর সুন্দরী৷

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%