পাখির বাসা

উল্লাস মল্লিক

ঠিক চার মাস সতেরো দিন পর জেল থেকে বেরিয়ে বিজু দেখল আকাশটা নীল। আর ভীষণ ঝকঝকে। এত ঝকমকে যে এক টুকরো ভেঙে নিয়ে আয়নার মতো সামনে ধরলে মুখ দেখা যাবে।

মেয়াদ শেষ করে বাইরে এসে বেশ ফুরফুরে লাগছে বিজুর। অনেকক্ষণ ঘাড় হেঁট করে সেলুনে চুল কাটার পর বাইরে এলে যেমন লাগে।

আবার আকাশের দিকে তাকাল বিজু। জেলে থাকতে আকাশ দেখত বেশি। চারদিকে বিধিনিষেধের বাউন্ডারি, শুধু ওপরটা অগাধ—কোনও বাধা নেই; তাই সময়ে-অসময়ে ঘাড় তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত সে। তখন আকাশ জুড়ে কালো আর পাঁশুটে মেঘের হুল্লোড়—নীলের দেখা মেলা ভার। ছুটির খবরটা শোনার পর থেকে আর আকাশ দেখা হয়নি—মনটা বুঝি তখন পাঁচিল টপকে বাইরে চলে এসেছিল। ফাঁকতালে কখন যেন চোখ ঝলসানো নীল রঙের হয়ে গেছে আকাশটা। দু-একটা ফুলবাবু টাইপের সাদা মেঘ নীলের গায়ে এদিক-ওদিক আলগা হয়ে ঠেকে আছে বটে; কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় মন তাদের উড়ুউড়ু—যে-কোনও সময় ভ্যানিশ হয়ে যাবে।

জেল গেটের উলটোদিকের দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনল বিজু। জেলের রোজগার। দোকানের ঘড়িটা দেখল—দশটা দশ। পুজোর বোধহয় আর ক'টাদিন মাত্র বাকি। কোন একটা সংগঠনের পক্ষ থেকে পুজোয় কয়েদিদের নতুন জামাকাপড় দেবার কথা চলছিল। আর ক'টাদিন পরে ছাড়া পেলে এক সেট নতুন জামা-প্যান্ট হত। ভেবে নিজেরই একটু হাসি পেল বিজুর।

সিগারেট টানতে টানতে মোড়ের মাথায় চলে এল বিজু। সেই চেনাজানা অফিস টাইমের হাওড়া ময়দান—সাড়ে চার মাসে বদলায়নি কিছু। সেই জ্যামে জড়িয়ে মড়িয়ে একশা জিটি রোড। বাস লরি ম্যাটাডোর ট্যাক্সি সব সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ভুসভুস করে কালো ধোঁয়া ওগলাচ্ছে আর মাঝে মাঝেই বিরক্তি প্রকাশ করছে হর্ন দিয়ে। ফাঁকফোকর দেখলেই সাইকেল বাইক মানুষ যে যার সুবিধেমতো নিজেকে গুঁজে দিয়ে জ্যামটাকে পাকিয়ে তুলছে আরও। মোড়ের মাথায় খৈনির দোকানটা আগের মতোই আছে—দোকানদার লোকটা বদলে গেছে শুধু। পাকা গোঁফওলা বুড়ো লোকটার বদলে শক্তসমর্থ চেহারার কমবয়সি একটা ছেলে। জেলে থাকতে দু-একবার খৈনি খেয়েছিল বিজু—খুব একটা জুত লাগেনি। ব্যান্ডেলের কানাই মণ্ডল বানিয়ে দিয়েছিল খৈনি। কানাই ডাকাতির আসামি, এটা নিয়ে ওর থার্ড টাইম জেল। চার বছর টানতে হবে এই খেপে। খৈনির জোর নেশা কানাইয়ের। দু:খ করে বলেছিল, এই খৈনিই কাল হল বুঝলি, নেশার জন্যেই ধরা পড়ে গেলুম।

শুনে বেশ আশ্চর্য লেগেছিল বিজুর।

ঠোঁট ফাঁক করে খৈনি গুঁজে দিতে দিতে কানাই বলেছিল, এমন ঘাপটি মেরে ছিলুম, পুলিশের বাপের সাধ্যি ছিল না ধরে। সন্ধের পর শুধু একবার বের হতুম নেশা কিনতে। শালা কী করে যে খবর রটে গেল—একদিন খৈনি কিনছি, অমনি পুলিশ এসে ক্যাঁক!

কানাইয়ের এখনও প্রায় বছরখানেক বাকি। কথাটা মনে হতেই কালো ধোঁয়া-ধুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে বড় একটা শ্বাস টানে বিজু। জেলে অবশ্য বেশ মেজাজেই থাকে কানাই। শক্তপোক্ত চেহারা, নতুন কেউ ঢুকলে ক'দিন সেবাযত্ন নেয় আর রেপ কেসের আসামি এলে উদোম পেটায়। কানাই ভেবে রেখেছে, এবার খালাস পেলে পুরোনো লাইনে আর যাবে না; আহমেদাবাদে তার কে এক পরিচিত কাজের সন্ধান দিয়েছে—মন দিয়ে সেটাই করবে। তবে তার আগে একটা কাজ বাকি—একটা খুন করতে হবে তাকে। নিজের বউকেই করতে হবে খুনটা। জেলে ঢোকার কিছুদিন পর দুটো খবর পায় কানাই। একটা ভালো খবর—বড় মেয়েটা তার এক লরির খালাসিকে বিয়ে করে সুখে ঘরসংসার করছে। আর খারাপটা হল বউ মদন নামে পাড়ার একটা ছোঁড়ার সঙ্গে ভেগেছে; যাবার সময় ছোট মেয়েটাকেও নিয়ে গেছে সঙ্গে। ফলে দেশে আর পিছুটান রইল না তার। তাই দেশ ছেড়ে আহমেদাবাদে চলে যাবে কানাই; আর যাবার আগে বউকে খুনটা করে দিয়ে যাবে। কারণ সব সহ্য করা যায়, শুধু নেমকহারামিটা নয়। যদি বাড়িতে থাকার সময় বউ পালাত তবে এত রাগ হত না; বুঝত মেয়েমানুষ ধরে রাখার মুরোদ নেই তার। কিন্তু আমি যখন জেলে তুই পালালি কোন বিবেচনায়! এ তো গদ্দারি—পেছন থেকে ছুরি মারার মতো গদ্দারি। তাই ভেবেচিন্তে বিশ বছরের পুরোনো বউকে খুন করার সিদ্ধান্তটা নিয়েছে সে। মদনকে অবশ্য মার্ডার করবে না। শুধু তার বিচিটা কেটে নেবে—নে শালা থাক খোজা হয়ে সারাজীবন! কানাই বিজুকে বলত, মার্ডার-টার্ডার করেছিস না কি?

না, এখনও করিনি।

যাহ শালা, এখনও মার্ডার করিসনি, তবে কেমন দরের মস্তান তুই—!

বিজু হাসত।

কানাই বলত, তোদের লাইনে মার্ডারটাই তো আসল রে; যতগুলো মার্ডার তত হিট মস্তান! রেপ-টেপ—।'

নাহ!

এইটা ভালো, মেয়েদের ইজ্জত দিবি বুঝলি, মেয়েরা হচ্ছে মায়ের জাত। আমি এত কেস করেছি, কোনও দিন কোনও মেয়েকে বেইজ্জত করিনি। মেয়েদের সবসময় মা বলে ডেকেছি।

একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায় বিজু। 'মা' শব্দটা মনে পড়তেই একটা বউয়ের মুখ ভেসে ওঠে চোখে। খুব অসহায় চোখ মুখ তার—বিজু ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে তাকে। সে পড়ে আছে, উঠছে না, আরও জড়সড়ো হয়ে গেছে যেন—বাবা এসে দাঁড়িয়েছে পাশে, সে-ও অবাক হয়ে দেখছে বিজুকে, বলতে পারছে না কিছু, শুধু ঠোঁট নড়ছে বিড়বিড় করে। এই দৃশ্য বারবার বড় অস্থির করে তোলে বিজুকে—খুব অসহায় লাগে তখন।

কোথায় যাবে ঠিক নেই। কিছু না ভেবেই রাস্তা ধরে আনতাবড়ি কিছুটা হাঁটল বিজু।

একটা বাইক গায়ের ওপর প্রায় হামলে পড়ল। ছিটকে সরে এল বিজু। একটা অল্পবয়সি মেয়ে—জিন্স আর গেঞ্জি পরা, ভালো করে চালানো শেখেনি বোধহয়; ভিড়ে বেসামাল হয়ে গেছে। একটু অপ্রস্তুত গলায় মেয়েটা বলে, সরি!

কিছু বলে না বিজু, পাত্তা না দেবার ভঙ্গিতে এগোয় সামনে। ঠিক তখনই ডাকটা শুনতে পায় সে।

বিজুদা, এই শালা বিজুদা!

বিজু অবাক হয়ে পেছনে তাকায়।

এই যে—এখানে!

এবার দেখতে পায় বিজু। স্যাম্পেল। সৎকার সমিতির ডেড বডি-ভ্যান নিয়ে লম্বা জ্যামে দাঁড়িয়ে আছে।

স্যাম্পেলের দিকে এগিয়ে গেল বিজু। ভেতর থেকে গাড়ির দরজাটা খুলে দিয়ে স্যাম্পেল বলে, কবে ছাড়া পেলে মাইরি?

এই তো, একটু আগে...।

উরিশালা! একেবারে টাটকা কয়েদি। হেভি জিনিস মাইরি! আনন্দের চোটেই বোধহয় জোরে দুবার হর্ন বাজিয়ে দিল স্যাম্পেল।

স্যাম্পেলের পাশে বসল বিজু। সামনে পাঁচ-সাত হাত রাস্তা ফাঁকা হয়েছিল। একটা অটো তাল করছিল সেই ফাঁকে ঢুকে যাবার। স্যাম্পেল বেমক্কা অ্যাক্সিলেটারে চাপ দিয়ে চেপে দিল অটোটাকে। অটো ড্রাইভার কিছু বলতে চোখা খিস্তি দিল একটা। তারপর বিজুর হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে মস্ত একটা সুখটান দিয়ে বলল, কেউ আসেনি নিতে তোমায়?

বিজু বলে, নাহ।

যা: শালা, কেউ এল না!

কে আর আসবে!

আমি জানলে যেতাম। স্যাম্পেল সিগারেটটা বিজুর হাতে দিতে দিতে বলে, অসিত জানত আজ তুমি খালাস হবে?

কী জানি! ছোট একটা টান দিয়ে বলে বিজু।

তোমার সঙ্গে জেলে দেখা করত না অসিত?

নাহ!

এইগুলো শালা হড়কানবাজি! তোমাকে সেভ করা উচিত ছিল ওর; উকিল টুকিল দিয়েছিল?

নাহ!

এই হড়কানবাজিগুলো শালা আমার একদম সহ্য হয় না...ওর হয়ে কাজ করতে গিয়েই কিন্তু তুমি ফাঁসলে!

কী আর করা যাবে। বিজু গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে, তুই গিয়েছিলি কোথায়?

আমার শালা যা কাজ! ফের সিগারেটটা বিজুর হাত থেকে নিয়ে স্যাম্পেল বলে, বডি ফেলতে শিবপুর ঘাটে...আরে দেখো না, কখন কেস মিটে যায়, শালা বাড়ি থেকে বডি বের করতেই বহুত লেট...বুড়োর চার-পাঁচটা মেয়ে, এক পাল নাতি-নাতনি, এ একবার বুকে পড়ে কাঁদে তো ও একবার ফিট হয়ে যায়, শা-ল-লা যত সব...মাঝখান থেকে আমি ফেঁসে গেলাম জ্যামে!

ও দিকের খবর কী?

কোন দিকের?

এলাকার!

অসিত একাই কাঁপাচ্ছে; এই তো ক'দিন আগে রাঘব মিত্র রোডে বেধড়ক বোমাবাজি হল, ভাইলালের সঙ্গে লেগেছিল অসিতের—শুনছি তো ভাইলালের দুটো ছেলে ভালো ঝাড় খেয়েছে!

ভাইলালের সঙ্গে দখলবাজি নিয়ে অসিতের বহুকালের খারাখারি। মাঝেমধ্যেই লাগে। ভাইলাল ঝাড় খেয়েছে মানে, বিজুর ভালো খবর। কিন্তু তেমন কিছু বোধ হয় না তার। সে বলে, পুলিশ তোলেনি কাউকে?

নাহ। বড়বাবু এসেছিল, দেখেশুনে গম্ভীর মুখে চলে গেল, তার পর সব চুপচাপ—। এই বড়বাবুটার দ্বারা কিছু হবে না, মেজোবাবুর হাতে কেসটা থাকলে কিছু একটা হত এতদিনে।

মেজোবাবু বলতেই চোখের সামনে সেই চেহারাটা ভেসে ওঠে বিজুর। শ্যামবর্ণ, মাঝারি উচ্চতা, খুব নিরীহ ধরনের একটা গোঁফ, আর কেমন যেন একটা ভো-কাট্টা ঘুড়ির মতো চালচলন। দেখেই বোঝা যায়, পুলিশি ধমক চমক ব্যাপারটা এর সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না। সত্যি বলতে কী, খাঁকি জামা-প্যান্ট আর টুপি না থাকলে একটা বাচ্চা ছেলেও একে দেখে ঘাবড়াবে না। তবে একটা জিনিস, লোকটার হাত দুটো শরীর আন্দাজে বেশ লম্বা। অ্যারেস্টের সময় বিজুকে যখন মাটি থেকে টেনে তুলছিল, তখনই হঠাৎ ব্যাপারটা চোখে পড়ে তার। পরেও দেখেছে—হ্যাঁ সত্যি, হাত দুটো লোকটার একটু যেন বেশি লম্বা। যাদের হাত বেশি লম্বা, প্রায় হাঁটু পর্যন্ত, তাদের ভালো একটা বাংলা আছে—কী যেন একটা বলে...ভাববার চেষ্টা করে বিজু—মনে পড়ছে না কিছুতেই—।

জ্যাম একটু কেটেছে। সামনে একটা তেমাথার মোড়। মোড়ে গিয়ে বাঁ দিকে টার্ন নিল স্যাম্পেল। এই রাস্তাটায় আর জ্যাম নেই; তাই রাস্তায় ঢুকে একটু স্পিড নেয় গাড়ি।

বিজু বলে, যাদের হাত খুব বড় বড় হয় তাদের কী বলে জানিস?

হাত বড় হয় মানে! স্যাম্পেল একটু অবাক দৃষ্টিতে বিজুর দিকে একবার তাকিয়ে বলে, মানুষ, না কোনও জন্তু-টন্তুর...?

ধুস, মানুষের!

মানুষের হাত বড় মানে, সব মানুষের হাতই তো সমান, মানে তার বডির সাইজ যেরকম, হাতও সেই মাপের, তাই তো জানি আমি!

না রে, কারও কারও হাত একটু বেশি লম্বা হয়, ব্যাকরণ বইয়ে পড়েছিলাম ইস্কুলে।

স্যাম্পেল বলে, ধুর শালা, তুমিও যেমন—ব্যাকরণের কথা আমায় বলছ, আমার দৌড় তো ফোর অবধি, তারপর তো শালা হলুদ বই ছাড়া জীবনে আর কিছু পড়িনি।

মেজোবাবুর হাতগুলো বুঝলি, খুব লম্বা লম্বা। একটু অন্যমনস্ক গলায় বলে বিজু।

অ্যাঁ! তাই নাকি!

হ্যাঁ।

কিন্তু লম্বা হাত নিয়ে ফায়দা কী বল, ঘুস তো হাত পেতে নেয় না মালটা!

বিজু স্যাম্পেলের দিকে তাকিয়ে বলে, কে বলল?

সবাই জানে। বড়বাবুটা যেমন দু-হাতে নেয়, মেজোবাবুটা আবার উলটো, পুলিশ লাইনের কলঙ্ক আর কি!

একটু হেসে ফেলে বিজু।

স্যাম্পেল বলে, তোমাকে তো মেজোবাবুই ধরেছিল?

হ্যাঁ।

শালা, পালাতে পারলে না?

ছুটেছিলাম; কিন্তু দমে কুলোতে পারিনি, তারপর কাদায় পা পিছলে পড়ে গেলাম—লোকটার শালা বুকে বহুত দম, হাঁপায় না।

কেলিয়েছিল নাকি?

না তো।

চ্যাঙ্কিকে নাকি বহুত কেলিয়েছিল।

তাই! একটু অবাক হয় বিজু। মেজোবাবু লোকটার সঙ্গে যেন মারধর ব্যাপারটা কিছুতেই খাপ খায় না।

স্যাম্পেল বলে, চ্যাঙ্কি এখনও খুঁড়িয়ে হাঁটে, মাথার একদিকের একগোছা চুল ওপড়ানো।

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল বিজু। হঠাৎ রাস্তার ধারে চোখ যেতেই থমকে যায়। অসিত। বাবুলির চায়ের দোকানে বেঞ্চিতে বসে। এক হাতে সিগারেট, অন্য হাতে চায়ের ভাঁড়।

দাঁড়া।

ব্রেক কষে একটু অবাক চোখে বিজুর দিকে তাকায় স্যাম্পেল।

বিজু বলে, নেমে যাচ্ছি।

এখানে?

হ্যাঁ। চোখের ইশারায় অসিতকে দেখায় বিজু। তারপর বলে, অসিতদার সঙ্গে একটু দরকার আছে।

দেরি হবে কি তোমার? আমার একটা বডি তোলার ছিল...,

দরজার লক খুলে নামতে নামতে বিজু বলে, তুই চলে যা।

সশব্দে দরজা বন্ধ করেই গাড়ি ছেড়ে দেয় স্যাম্পেল।

রাস্তা পেরিয়ে বাবুলির দোকানের সামনে চলে আসে বিজু।

চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে যাচ্ছিল অসিত। বিজুকে দেখে একটু থমকাল। কিন্তু সে মুহূর্তের ভগ্নাংশ। তারপর লম্বা চুমুকে চা শেষ করে ভাঁড়টা ছুড়ে দিয়ে বলল, কী রে, কী খবর?

এই তো।

কবে বেরোলি?

আজই।

নীল জিনস আর কমলা টপ পরে একটা মেয়ে গটমটিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল সামনে দিয়ে। সেদিকে তাকিয়ে অসিত বলে, অ। চা খাবি নাকি?

না। গলাটা একবার ঝেড়ে নিয়ে বিজু বলে, তোমার সঙ্গে একটা কথা ছিল।

সর্দি হয়েছে নাকি তোর?

না তো! একটু অবাক হয় বিজু।

কাশছিস দেখছি। সিগারেটে একটা টান দিয়ে অসিত বলে, বল কী কথা।

কিছু টাকা দিতে হবে।

টাকা!

হ্যাঁ।

আঙুলের টোকায় সিগারেটের ছাইটা ঝেড়ে অসিত বলে, কত?

আপাতত হাজার খানেক।

এ-ক হাজার! তাও আবার আপাতত। ভুরুর মাঝখানে ভাঁজ পড়ে অসিতের।

হাঁ।—এক।

হবে না; মার্কেট খুব খারাপ।

আমারও খুব দরকার কিন্তু।

ভুরুতে ভাঁজ নিয়েই অসিত বলে, টাকার কার না দরকার, বল! দশ-বিশ হলে দিতে পারি।

আমি কি ভিখিরি নাকি! সামান্য উত্তেজিত হয়ে বলে বিজু।

আমারও তো ট্যাঁকশাল নেই। খুব শান্ত ভঙ্গিতে বলে সিগারেটে একটা টান দেয় অসিত।

কিন্তু তোমার জন্যেই তো ফাঁসলাম।

আমার জন্য?

তোমার কাজ করতে গিয়েই তো ধরা পড়েছি। বিজুর গলায় এখনও উত্তেজনা।

আমি কি তোর অ্যাঁড়ে তেল দিয়ে ডেকে এনেছিলাম! একটু চড়া গলায় অসিত বলে, বরং তোর জন্যে আমি ফেঁসে গেছি, তুই আমাদের ফাঁসিয়েছিস।

আমার জন্যে! এবার বিজুর গলায় বিস্ময়।

তবে নয়তো কী—দু-ঘা ক্যালানি সহ্য করার মতো টেংরির জোর নেই, আসিস কেন এ সব কাজ করতে! শালা গদ্দার!

কী বাজে বকছ! কিছুটা চিৎকার করেই বলে বিজু।

আস্তে, আস্তে! অসিত গলা নামিয়ে বেশ কঠিন গলায় বলে, তুই লিক করিসনি?

আমি!

তবে কোন শালা...মধু বিশ্বাস লেনের ঠেকটা পুলিশ জানল কী করে?

সেটা আমি কী করে বলব!

শোন বিজু! কঠিন শান্ত গলায় অসিত বলে, তুই তো বেশ কিছুদিন আমাকে দেখছিস—আমাকে কি তোর খুব ক্যালানে মনে হয়? তোকে যেদিন তুলল, তার পরদিনই অমনি মধু বিশ্বাস লেনে পুলিশ রেড করল—আমি ক্যালানে আছি...অ্যাঁ..!

বিজু বলে, যা: শা-লা!

...পলাশ আর একটু হলেই ধরা পড়ত—মাঝখান থেকে দুটো মেশিন আর অতগুলো দানা বেরিয়ে গেল—শালা আমি ক্যালানে আছি—একটা মেশিন ছিল টপ ক্লাস, দামি জিনিস—আমাকে কী ভাবিস অ্যাঁ...ক্যালেনে...!

বিজু একটু নরম গলায় বলে, মাইরি বলছি, আমি কিন্তু একটা কিচ্ছু লিক করিনি, বড়বাবু জিগ্যেস করেছিল, আমি মুখ খুলিনি।

চ্যাল শালা, শুয়ার! ঢপবাজি অন্য জায়গায় মারাবি, ফোট এখান থেকে।

বিজু স্থির চোখে তাকাল অসিতের দিকে। একটা গরম গোলা বুক থেকে ড্রপ খেয়ে উঠে এল মাথায়। তারপর ফেটে গেল গোলাটা। মাথার মধ্যে গলগলে গরম লাভার মতো কিছু একটা ছড়িয়ে পড়ছে, কান দিয়ে নাক দিয়ে যেন বেরিয়ে আসছে অ্যাসিড ধোঁয়া, প্রচণ্ড মুঠো হয়ে উঠছে ডানহাতটা।

বিজুর চোখের দিকে তাকিয়ে একটু থমকাল অসিত। বিজুর এমন ধকধকে চোখ সম্ভবত আগে দেখেনি সে। কিন্তু সে-ও এলাকার শের। এমন চোখকে পাত্তা দেবে কেন সে? সিগারেটের ধোঁয়াটা সোজা বিজুর দিকেই ছুড়ে দিয়ে বলল, ফোট শালা এখান থেকে!

কথাটা ভালো করে শেষ করতে পারল না অসিত। তার আগেই বিজুর ডান হাতের ঘুসিটা রাগী কেউটে সাপের মতো ছোবল মারল মুখে। বেঞ্চি থেকে উলটে পড়ল অসিত। পাশেই জলভরতি লোহার বালতি ছিল একটা। মাথাটা ঠক করে লাগল বালতিতে, উলটে গেল বালতিটা।

বিজু আক্রোশভরা চোখে দেখল দৃশ্যটা; ছিটকে গেছে অসিতের মুখের সিগারেট, বালতির জলে ভিজে গেছে; পাশে শুয়ে থাকা কালো কুকুরটা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ছে।

বিজু দেখল খুব দ্রুত মাটিতে গড়িয়েই উঠে বসেছে অসিত। ফুটবলে লাথি মারার মতো সজোরে একটা লাথি বিজু মারল অসিতের বুকে। আবার কাত হয়ে পড়ল অসিত। শুয়ে শুয়েই প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাবার চেষ্টা করছে।

একটু থমকাল বিজু। মেশিন ছাড়া কখনও বাইরে আসে না অসিত। ছ'ঘড়ার একটা মেশিন সব সময় পকেটে থাকে ওর। হ্যাঁ, পকেটে হাত ঢোকাচ্ছে অসিত।

দৃশ্যটা একটু ঝাঁকুনি দিল বিজুকে। সঙ্গে সঙ্গে একটা লাফ দিয়ে সে ঢুকে পড়ল পাশের রাস্তায়। সামনেই একটা বাঁক। বাঁকটা বেঁকতেই পেছনে একটা শব্দ শুনল বিজু। খুব চেনা শব্দ। তার মানে, অসিত আসছে।

চকিতে একবার পিছনে তাকিয়ে বিজু দেখল, খোলা মেশিন নিয়েই ছুটে আসছে অসিত। অসিতের টিপ অব্যর্থ। সাধারণত একটা টার্গেট দুবার মিস হয় না তার।

ছোটার গতি বাড়িয়ে দিল বিজু। সরু একটা গলিতে ঢুকে পড়ল সে।

সকালে উজ্জ্বলের ঘুম ভাঙল শরীর-ভেজা একটা অনুভূতি নিয়ে। শরীরের এই চপচপে ভিজে ভাবটাকে বড় ভয় পায় উজ্জ্বল। যেদিন এমন হয়, দিনটা বড় কষ্টে, বড় দোটানায় কাটে তার।

মনে হয়, কেউ যেন ঠেলে পুকুরে ফেলে দিয়েছিল তাকে, হাবুডুবু খেতে খেতে কোনওরকমে উঠে পড়েছে পাড়ে, নাক দিয়ে মুখ দিয়ে জল ঢুকে গেছে, জলে একটা গন্ধ, মনখারাপ মনখারাপ গন্ধ গোলা, সেই গন্ধ তার বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাকে অবশ করে দিচ্ছে একটু একটু করে। চারপাশের পৃথিবী ভয়াভয়, ধূসর আর বিস্বাদ, কেবলই মনে হচ্ছে বেঁচে থাকার কোনও অর্থই হয় না। এই জীবন বড় যন্ত্রণার, ভীষণ একঘেয়ে এই সকাল-দুপুর-সন্ধে, চূড়ান্ত দিশাহীন রোজ এই ঘুমিয়ে পড়া আর জেগে ওঠা। এই অর্থহীন আর ক্লান্তিকর জীবন থেকে তার ছুটি করে নেওয়া উচিত। শুধু একটু মনের জোর দরকার। তাই সার্ভিস রিভলভারটা নিয়ে একা একা নাড়াচাড়া করে উজ্জ্বল। ট্রিগারে আঙুল দিয়ে মাথায় ঠেকায়, অনেকক্ষণ ঠেকিয়ে রাখে, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নামিয়ে রাখে পাশে।

কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি। একটা ইভটিজিং কেস ছিল। গিটার স্কুলের মেয়েদের পিছনে লেগেছিল ক'টা ছেলে। একটা ছেলে আবার লোকাল নেতার। তাই ঝামেলা পাকিয়ে উঠতে দেরি হল না। গ্রুপটাকে ধরেছিল উজ্জ্বল। কিন্তু ম্যাজিকের মতো কোথা থেকে একদল লোক এসে ঘিরে ধরল গাড়ি। দাবি—ছেড়ে দিতে হবে সবাইকে। বেশ কষ্ট করেই সবাইকে হটিয়ে ছেলেগুলোকে থানায় নিয়ে এল উজ্জ্বল। প্রত্যাশামতোই সেই নেতা হাজির প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। গন্ধ শুঁকে মিডিয়াও। মিডিয়া না এলে হয়তো বড়বাবু নেতার সঙ্গে একটা রফায় চলে আসত। মিডিয়ার ভয়ে হালকা-পলকামতো একটা কেস দিতেই হল। সব মিটিয়ে উজ্জ্বল কোয়ার্টারে ফিরল তখন বাজে প্রায় বারোটা। খিদে মরে গেছে। খাবার গরম করার ইচ্ছেটাও নেই। কোনওরকমে ইউনিফর্ম ছেড়ে শুয়ে পড়েছিল। ঘুম আসছিল না কিছুতেই। ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ল। আর ঘুমের মধ্যে ঝাঁক ঝাঁক আজগুবি স্বপ্ন ছেঁকে ধরল তাকে। লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে বড়বাবু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বিরক্ত করছে মেয়েদের। গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলানো সার্ভিস রিভলভার, সেটা হুইসলের মতো বাজাচ্ছে মাঝে মাঝে। উজ্জ্বল গেছে বড়বাবুকে অ্যারেস্ট করতে। সঙ্গে কনস্টেবল বাপি। বাপির হাতে বন্দুক নেই, একটা কোদাল। বাপি বলছে, এটা সোনার কোদাল স্যার, চব্বিশ ক্যারাট সোনার। কোদাল দিয়ে বড়বাবুর চারদিকে মাটি কোপাচ্ছে বাপি। আবার দেখল ওই গিটার স্কুলে গিটার শিখতে যাচ্ছে ঈশিতা। রাস্তায় দেখা হয়ে গেল ঈশিতার সঙ্গে। উজ্জ্বল এগিয়ে গেল ঈশিতার দিকে। বলল, ঈশিতা তোমার বর কোথায়?

ঈশিতা বলল, বর আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।

সে কী! কোথায়?

আন্দামানে।

কেন?

একটা জংলি জারোয়া মেয়েকে বিয়ে করেছে। সুখে আছে ওরা।

উজ্জ্বল বলল, তাহলে তো তোমার খুব কষ্ট।

ঈশিতা বলল, সে তো বটেই; সেইজন্যেই তো আমি গিটার বাজাই; যখন কষ্ট হয় তখনই গিটার বাজাই; গিটার বাজালে আর কষ্ট থাকে না।

ও মা, তাই নাকি!

হ্যাঁ; সেইজন্যেই সব দু:খী মানুষের উচিত একটা করে গিটার কেনা।

উজ্জ্বল বলল, আমার তো গিটার নেই।

সেই জন্যেই তোমার এত কষ্ট; এবার একটা গিটার কেনো; ধার করে হলেও কিনে ফেলো...

উজ্জ্বল বলে, আমাকে বরং তুমি বিয়ে করো ঈশিতা।

সেই পুরোনো দিনের মতো ভুরু তুলে অবাক গলায় ঈশিতা বলে, ও মা! তোমাকে বিয়ে করব কেন!

উজ্জ্বল বলে, সেরকমই তো কথা ছিল আমাদের। তখন আমার চাকরি ছিল না বলে বিয়েটা ভেস্তে গেল। তুমি অন্য ছেলেকে বিয়ে করলে।

ঈশিতা বলে, তোমাকে কত করে বলেছিলাম—ভালো করে চাকরির পরীক্ষা দাও, মন দিয়ে জিকে মুখস্থ করো; তা নয়, তুমি কেবল পায়রা পুষতে, কুকুর পুষতে, ঘুড়ি ওড়াতে, আর আমাকে লম্বা লম্বা চিঠি লিখতে। এসব করে কি চাকরি পাওয়া যায়—তোমায় কিন্তু আমি সময় দিয়েছিলাম, বলো, দিইনি...?

তা অবশ্য ঠিক...। উজ্জ্বল বলে, কিন্তু এখন তো আমি চাকরি করি, এখন তুমি আমাকে চোখ বুজে বিয়ে করতে পারো ঈশিতা। বিয়ের পর তোমাকে নিয়ে সাঁতরাগাছি হানিমুন করতে যাব।

সাঁতরাগাছি!

হ্যাঁ, সাঁতরাগাছি একটা চমৎকার জায়গা, আমার ছোটমাসির বাড়ি, আমি কয়েকবার গেছি, হানিমুনের পক্ষে একবারে আদর্শ জায়গা; সেখানে রেললাইন আছে, আর রেললাইনের ধারে ধারে কত শিংওয়ালা হরিণ ঘুরে বেড়ায়, তারা মানুষের গলায় কথা বলে, তোমার খুব ভালো লাগবে—যাবে তো তুমি...!

হাতের কবজি তুলে ঘড়ি দেখে ঈশিতা। তারপর বলে, না। এখন আর বিয়ে করা সম্ভব নয়...আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে...।

কেন নয়, ঈশিতা...?

পুলিশরা লোক ভালো হয় না—তারা গুলি ছোড়ে, মানুষকে মেরে ফেলে।

উজ্জ্বল খুব কাতর গলায় বলে, আমি কিন্তু আজ পর্যন্ত একটাও মানুষ মারিনি ঈশিতা, বিশ্বাস করো,...গুলি অবশ্য ছুড়েছি; কিন্তু তাতে কেউ মারা যায়নি...।

সে তো তোমার টিপ ভালো নয় বলে। গম্ভীর গলায় ঈশিতা বলে, তার মানে তুমি বন্দুক চালানোটাও ভালো করে শেখোনি; ট্রেনিংয়ে ফাঁকি দিয়েছিলে, এই হচ্ছে তোমার চরিত্রের দোষ, কোনও কিছুই মন দিয়ে শিখতে পারো না; পুলিশ হয়েছ অথচ আনাড়ির মতো বন্দুক চালাও—খুব বাজে তুমি।

উজ্জ্বল বলল, ঠিক আছে এবার রোজ সকালে উঠে মন দিয়ে বন্দুক চালানো প্র্যাকটিস করব, একটা অপরাধীরও আর নিস্তার নেই আমার হাত থেকে, এই দেখো চোখ ছুঁয়ে বলছি; এবার তাহলে আমাকে বিয়ে করবে তো ঈশিতা?

না, তাহলেও করব না। জোরে জোরে মাথা নাড়ে ঈশিতা; একগোছা দলছুট চুল কপালে টিকটিকির ল্যাজের মতো নড়েচড়ে।

তাহলে কেন নয় ঈশিতা?

কারণ পুলিশকে বাচ্চারা খুব ভয় পায়! এই ব্যাপারটা আমার একদম পছন্দ নয়। ভাবো তো, আমাদের যে ছেলে হবে সে তোমাকে কত ভয় পাবে...

উজ্জ্বল বলে, সে তো আমার ছেলে, আমি তো ওর বাবা, আমাকে তাহলে ভয় পাবে কেন?

পুলিশ পুলিশ-ই। ঈশিতা ঠোঁট উলটে বলল, পুলিশ কখনও বাবা হতে পারে না।

উজ্জ্বল একটু করুণভাবে বলে, প্লিজ ঈশিতা ভেবে দেখো একটু, প্লিজ...।

ভাবার কিছু নেই। ঈশিতা বলে, আমার ডিসিশান হয়ে গেছে; আমি ওই গিটার স্কুলের টিচারকে বিয়ে করব।

তখন তাড়াতাড়ি বুকের কাছে হাত দুটো জোড় করে উজ্জ্বল বলতে লাগল, প্লিজ, ঈশিতা প্লিজ...।

ঈশিতার চোখে প্রচণ্ড আতঙ্ক ফুটে উঠল। বলল, তুমি কি আমাকে মারতে চাও, তুমি ওভাবে রিভলভার তুলেছ কেন...?

উজ্জ্বলের খেয়াল হয় তাড়াহুড়োর মাথায় রিভলভারটা হাতে নিয়েই হাতজোড় করে ফেলেছে, আর ঈশিতা ভয় পেয়ে ছুটে পালাচ্ছে...

ঘুম ভেঙে গেল উজ্জ্বলের। শরীরে সেই ভেজা বিচ্ছিরি অনুভূতি। সেইসঙ্গে বিশাল বপু হাতির মতো একটা অবসাদ চেপে আছে শরীরে। বিষণ্ণতার সেই গন্ধ অবশ করে দিচ্ছে ভেতরটা। নিস্তার নেই তার। সারাদিন এই গন্ধ লেগে থাকবে গায়ে। খুব অন্যমনস্ক থাকবে সে; কাজে ভুল হবে বারবার।

টেবিলের ওপর রিভলভার। ভেতরে ছ'-ছ'টা মৃত্যুবাণ। মাথার মধ্যে একটা নিয়ে নিতে পারলেই শান্তি। তখন সেই বিষাদ গন্ধের আতঙ্কে কাঁটা হয়ে থাকতে হবে না। ধূসর মন নিয়ে ডিউটিতে যেতে হবে না। মাঝে মাঝেই ঈশিতা হানা দিয়ে বুকের ভেতর আঁচড়ে চলে যেতে পারবে না। ঘুমহীন লম্বা রাতগুলোয় বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে হবে না। শান্তি, শুধু শান্তি—নিটোল শান্তি। পূর্ণিমার রাতে মাখন রঙের চাঁদের আলো যেমন লেপে দেয় চরাচর তেমনি মোলায়েম আর অগাধ শান্তি।

মায়ের মুখটা একবার ভেসে উঠল মনে। মা তার কাঁদতে কাঁদতে কুটনো কুটছে। কেন এই দৃশ্যটা ভেসে উঠল কে জানে! বুকের ভেতরে কী যেন একটা খামচে ধরল। সে মরে গেলে, আর কেউ না কাঁদুক, মা কাঁদবে। খুব কাঁদবে তার জন্যে। কেঁদে কেঁদে হয়তো খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেবে। মায়ের জন্যে এই কষ্টটুকু নিয়েই তাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। এ ছাড়া আর কোনও দু:খ নেই তার। সত্যিই নেই। কোনও কিছুর জন্যেই তার কোনও পিছুটান নেই।

তখনই উজ্জ্বল শুনল সেই গলা। সেই অমোঘ কণ্ঠস্বর। এই গলায় রাগ নেই, বিরক্তি নেই, বিতৃষ্ণা নেই—ভালোবাসাও নেই। এত নির্মম নিস্পৃহ গলা, এত ভয়াভয় উদাসীন বলার ভঙ্গি, শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা দৃশ্য—অতিকায় একটা পাথর গড়িয়ে যাচ্ছে, বিশাল গোল বহুতল বাড়ির মতো উঁচু পাথরটা—গড়িয়ে যাচ্ছে একটানা, গড়িয়েই যাচ্ছে খুব ধীরে ধীরে, যা কিছু সামনে পড়ছে—বাড়িঘর গাছপালা মানুষ—সব গুঁড়িয়ে পিষে মিশিয়ে দিচ্ছে মাটির সঙ্গে, এতটুকু চিহ্ন থাকছে না তার। একই গতিতে খুব ধীরে ধীরে গড়াচ্ছে, কিন্তু দেখেই বোঝা যায়, কোনওদিন থামবে না, অনন্ত অনাদিকাল গড়িয়েই যাবে, যা কিছু সামনে পাবে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে যাবে।

এই নিষ্ঠুর উদাসীন গলার সঙ্গে কথা বলার সময়, কেন কে জানে, চোখ বন্ধ হয়ে যায় উজ্জ্বলের!

ঠিক বলছ কি তুমি উজ্জ্বল, কোনও পিছুটান নেই?

গলা শুনেই উজ্জ্বলের মনে হল বুকের ভেতর ভারী কিছু একটা গড়িয়ে গেল। সে চোখ বন্ধ করে খুব মৃদু গলায় বলল, হ্যাঁ ঠিক।

আরও একটু ভেবে বলো।

আর ভাবার কিছু নেই।

কিছু ভালো লাগে না তোমার?

না, কিচ্ছু না। জোরে মাথা নাড়ল উজ্জ্বল।

ভেবে বলছ?

হ্যাঁ। টাকা পয়সা, দামি পোশাক, হইহুল্লোড় কিচ্ছু ভালো লাগে না আমার—এসব পেলে এতটুকু আনন্দ হয় না আমার, সত্যি বলছি, ভেবেই বলছি।

দুর; ওসব ফালতু জিনিস নিয়ে আমোদ শুধু গবেটরাই করে, পেলেই দু-হাত তুলে নৃত্য করে। ওসব ছাড়াও আরও তো কত কিছু আছে—আনন্দের আরও কত শত টুকরো ছড়িয়ে আছে চারপাশে, যাদের চোখ আছে তারা ঠিক খুঁজে নেয়।

উজ্জ্বল ফিসফিস করে বলে ওঠে, সেসব কিছু নেই, কিচ্ছু নেই...কোনও কিছুতেই আমার মোহ নেই।

এই তো কিছুদিন আগে একজন অন্ধ ভিখারিকে তার বাচ্চা মেয়েটা হাত ধরে রাস্তা পার করাচ্ছে—তুমি গোগ্রাসে গিললে দৃশ্যটা, যতক্ষণ দেখা যায় দেখলে, দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক হয়ে তুমি নিজেই প্রায় লরির তলায় চলে যাচ্ছিলে—সত্যি করে বলো এই ফালতু দৃশ্যটায় অমন দেখার কী ছিল? এটা কি ভালো লাগা নয়?—সত্যি করে বলবে কিন্তু...।

চুপ করে থাকে উজ্জ্বল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

তারপর আর একদিন—সেই যে একটা সাদা কুকুর চারটে বাচ্চা দিয়েছিল থানা কম্পাউন্ডে, চারটে উলের বলের মতো সাদা সাদা বাচ্চা হুটোপাটি করত, ধুলো মাখত, একদিন রাতে হঠাৎ একটা বাচ্চা গর্তে পড়ে গেল, ভেতর থেকে কী মর্মান্তিক কেঁউ কেঁউ চিৎকার করছিল বাচ্চাটা, বাইরে থেকে মা-টা আকুলি-বিকুলি করছিল, অসহায় আর্তনাদ করছিল ওপর দিকে চোয়ালে তুলে—মনে করতে পারো তুমি...?

হ্যাঁ, মনে পড়েছে।

তাহলে তুমি সেদিন ঘুমোতে পারছিলে না কেন...কেন ছটফট করছিলে বিছানায় শুয়ে...?

উজ্জ্বল বলল, কানের কাছে ওই প্রচণ্ড চিৎকারে কেউ ঘুমোতে পারে না।

তাহলে সকাল হতেই যখন উদ্ধার করা হল বাচ্চাটাকে, বাচ্চাটা হামলে পড়ে দুধ খাচ্ছিল মায়ের, ওর মা ডুবডুব স্নেহ-মমতায় চেটে দিচ্ছিল গা—দৃশ্যটার মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে যাচ্ছিলে তুমি, মা-কুকুরের চেয়েও যেন বেশি, এক পুকুর দরদ জমেছিল তোমার চোখে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উজ্জ্বল বলল, সবই সত্যি, কিন্তু এসব ঘটনা এত গুটিকয় মাত্র ঘটে, আর তুলনায় জীবনটা এত বেশি লম্বা, সময় এমন বিপুল ভারী হয়ে চেপে ধরে, যে কোথায় হারিয়ে যায় সেসব টুকরো-টাকরা ভালোগুলো—মনেও পড়তে চায় না আর...। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছি আমি—চলে যাব...।

আচ্ছা, ঈশিতার কথা ভাবো না তুমি, দু:খ হয় না তার জন্যে...?

নাহ, ঈশিতা এখন অতীত, ঘোর অতীত আমার কাছে।

এটা তুমি বড্ড মিথ্যে বললে!

মিথ্যে বলব কেন; একদম সত্যি কথা।

অত সহজ নয় উজ্জ্বল; ঈশিতাকে ভোলা অত সহজ নয়।

ভুলে গেছি, অন গড, ঈশিতার মুখটা ভালো করে আজকাল মনেও পড়ে না আমার।

হাসালে।

কিছু বলে না উজ্জ্বল। বড় একটা দীর্ঘশ্বাস অজান্তেই যেন বেরিয়ে আসে বুকের ভেতর থেকে।

তুমি এখনও ঈশিতার মতো ভুরু তুলে কোনও মেয়েকে তাকাতে দেখলে চমকে ওঠো, ঈশিতার মতো কেউ ঘাড় ঘোরালে দুবার ফিরে তাকাও, আর বলছ, ঈশিতাকে ভুলে গেছ...। আসলে সত্যি বলছ না বলেই তুমি আমার কাছে আসতে পারছ না; যেদিন সব সত্যিগুলো ঠিকঠাক নিজের কাছে বলতে পারবে, সেদিন আমি তোমাকে আমার কাছে নিয়ে নেব—খুব গভীরভাবে সৎ না হলে আমাকে জড়িয়ে ধরা যায় না। সেইজন্যেই তো মৃত্যুকালীন জবানবন্দি মিথ্যে হতে পারে না—একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে তুমি তো জানো, ডাইং স্টেটমেন্টের গুরুত্ব কতটা। ভাবো; আরও গভীরে অবগাহন করে দেখো, আমি তোমার কাছাকাছিই আছি—যেই দেখব তুমি খুব আন্তরিকভাবে চাইছ আমায়, আমি কোলে তুলে নেব তোমাকে—কিন্তু তার আগে সব সত্যি করে বলতে হবে, গোপন কিছু থাকবে না তোমার-আমার মধ্যে...।

উজ্জ্বল বলল, ঠিক আছে, এই মুহূর্ত থেকে আমি ঈশিতাকে একেবারে মুছে ফেলছি মন থেকে; মনের অলিগলি কোথাও ঈশিতার ছায়াটুকু থাকবে না।

তখন মোবাইলটা বেজে উঠল। বড়বাবুর ফোন; জরুরি তলব।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়ল উজ্জ্বল। ব্যাজার মুখে ইউনিফর্ম পরল। মাঝপথেই ভেস্তে গেল বোঝাপড়া।

মনখারাপ যখনই হয় এইভাবেই একটা মীমাংসা খোঁজে উজ্জ্বল; বোঝাপড়ায় আসতে চায় প্রতিপক্ষের সঙ্গে। যুক্তি-তর্ক চাপান-উতোর। বার বার প্রতিপক্ষের অমোঘ যুক্তিজালে জড়িয়ে যায় সে, তার মিথ্যেটা বেআব্রু হয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষ তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তার দুর্দম আসক্তিগুলো, তার অমোঘ পিছুটানগুলো, মাথা হেঁট করে তাই ফিরে আসতে হয় তাকে। আবার বিপুল ভারী দিনগুলো পিঠে তুলে নিতে হয় তাকে—আবার ক্রীতদাসের মতো কুঁজো হয়ে, লম্বা জিভ বের করে, হাঁপাতে হাঁপাতে, পা টেনে টেনে চলতে হয়।

দুবার, মাত্র দুবার, প্রতিপক্ষকে কাবু করে দিয়েছিল উজ্জ্বল। তার শাণিত যুক্তি ফালাফালা করে দিয়েছিল প্রতিপক্ষের সব অজুহাত। যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে সে বুঝিয়ে দিয়েছিল এই পৃথিবীতে আর একটা মুহূর্তও থাকার ইচ্ছে নেই তার; সব গ্রন্থি, সব বাঁধন খুলে ফেলেছে সে—মাথা নামিয়ে ফিরে গিয়েছিল প্রতিপক্ষ। প্রথমটা হয়েছিল বাগনান থানায়, প্রতিপক্ষকে কাবু করে যখন জয়ের আনন্দে সে বুঁদ, মনে হচ্ছে, এবার শুধু শান্তি, অগাধ অতল শান্তি, শুধু উঠে গিয়ে রিভলভারটা তুলে নেওয়া, তারপর মাথায় ঠেকিয়ে ট্রিগারে চাপ, ব্যস! তখনই দৌড়ে তার ঘরে ঢুকল এক কনস্টেবল, এক্ষুনি চলুন স্যার, বিরাট গন্ডগোল, থানা ঘেরাও হয়েছে...।

সেবার আশ্চর্য এক কাণ্ড করেছিল উজ্জ্বল। থানায় গিয়ে দেখল জনা পঞ্চাশ লোকের একটা মব জড়ো হয়েছে গেটের সামনে। একটু একটু করে ভায়োলেন্ট হয়ে উঠেছে মন। যে-কোনও সময় মারাত্মক কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। বড়বাবু বেশ নার্ভাস। সাব ডিভিশন কন্ট্রোলে ফোন করে একস্ট্রা ফোর্স চাওয়া হয়েছে। কিন্তু সবাই আতঙ্কিত—তার আগেই না কিছু একটা হয়ে যায়। উজ্জ্বল গেটের কাছে গিয়ে শান্তভাবে দাঁড়াল। লোকগুলো হাত-পা ছুড়ে, দাঁত মুখ খিঁচিয়ে কী সব বলছে। দু-একটা ইটের টুকরো উড়ে এল তার দিকে। কে যেন পেছন থেকে বলল—স্যার চলে আসুন! চলে আসার কথা উঠছে কেন উজ্জ্বল বুঝতে পারল না। ওই লোকগুলোর তো বরং এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। এসব হইহল্লার মানে কী! উজ্জ্বলের হাতে শুধু একটা লাঠি; হেলমেট নেই, ঢাল নেই, লেগ গার্ড নেই—সেই চূড়ান্ত অরক্ষিত অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়ল, এলোপাথাড়ি লাঠি চার্জ শুরু করল উজ্জ্বল। তাকে ওভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে থানার আরও ক'জন লাঠি চার্জ শুরু করে দিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড একটা হইচই, ঠেলাগুঁতো, একটু পরেই জায়গাটা একেবারে ফাঁকা; শুধু ইতস্তত পড়ে আছে কয়েকটা চটি আর ইটের টুকরো এবং আশ্চর্যের ব্যাপার, উজ্জ্বলের কোনও চোট লাগেনি। কে যেন একজন এগিয়ে এসে বলল, স্যার খুব বড় রিস্কে গিয়েছেন কিন্তু, ফোর্স তো এসেই যাচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে...।

এতক্ষণ পর এই কথাটা ঠিকমতো মাথায় বসল তার। তখন মনে হল, হ্যাঁ, কাজটা একটু ঝুঁকির হয়ে গেছে; কিন্তু একই সঙ্গে খুব আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করল আত্মহত্যার সেই তীব্র ইচ্ছেটা আর নেই; বরং বেশ চনমনে লাগছে; অকেজো হয়ে যাওয়া অনুভূতি, বোদা হয়ে যাওয়া মন, যেন ফের হাত-পা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে।

দ্বিতীয়টা এখানেই। ক-মাস মাত্র আগের কথা। দুপুরে ডিউটি ছিল। সেদিন একেবারে ঝুটঝামেলাহীন ছিল দুপুরটা। প্রচণ্ড গরম, বাইরের পৃথিবী ঝাঁ-ঝাঁ করছে রোদে। মানুষের লোভ ক্রোধ লালসা সব যেন ঝলসে গেছে রোদের মাঝে। পাহারাদার কনস্টেবলটা নতমুখী বন্দুকের বাঁটে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে। লক আপে দুটো আসামি। একটা মার্কামারা। চ্যাঙ্কি। আগের দিন রাতে সিনেমা হলে গন্ডগোল করার জন্যে তুলে আনা হয়েছে। অন্যটা অল্পবয়সি একটা ছেলে। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে প্রেমিকার গলা টিপে ধরেছিল প্রকাশ্য রাস্তায়। মেয়েটার বাবা খুব ইনফ্লুয়েনশিয়াল। সঙ্গে সঙ্গেই তুলে আনা হয়েছে ছেলেটাকে। দেখে ভদ্রঘরের ছেলে বলেই মনে হয়। দুজনেই ঘেঁষাঘেঁষি করে শুয়েছিল লক আপের দরজার একেবারে সামনে। গ্রিলের গেটের বাইরে একটা টেবিল ফ্যান, প্রচণ্ড গরম বলে উজ্জ্বলই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল; দুজনেই ভাগাভাগি করে হাওয়া পেতে চাইছিল।

সেই ঝিমঝিমে দুপুরে, নির্জন থানায় একা বসে বসে নিজের সঙ্গে সমঝোতা করে ফেলল উজ্জ্বল। পরাজয় স্বীকার করে মাথা নামিয়ে চলে গেছে তার সেই প্রতিপক্ষ। ভারী যেন একটা স্বস্তি বোধ করছে উজ্জ্বল, এবার শান্তি, অনন্ত শান্তি...। শেষ কাজটুকু শুধু বাকি। তখনই লক আপের ভেতর থেকে চিৎকার। ফ্যানের হাওয়া নিয়ে দুজনের গন্ডগোল লেগেছে। চ্যাঙ্কি প্রচণ্ড একটা লাথি মারল ছেলেটার পেটে। ছেলেটা ঝটকাচ্ছে লক আপের মধ্যে। আবার একটা লাথি মারতে যাচ্ছে চ্যাঙ্কি। উজ্জ্বল ধমক দিল; কিন্তু তাকে এতটুকু গ্রাহ্য না করে লাথিটা বসিয়েই দিল চ্যাঙ্কি। আঁক করে একটা শব্দ বেরিয়ে এল ছেলেটার মুখ দিয়ে।

এক মুহূর্ত দেরি করেনি উজ্জ্বল। লক আপে ঢুকে চুলের মুঠি ধরল চ্যাঙ্কির। তারপর এলোপাথাড়ি মার। শান্তশিষ্ট উজ্জ্বলের এমন টগবগে রাগ কেউ দেখেনি আগে। চ্যাঙ্কি চিৎকার করছে, ক্ষমা চাইছে; কিন্তু উজ্জ্বলের মার থামছে না। কয়েকজন দৌড়ে এসে থামাল উজ্জ্বলকে; না হলে চ্যাঙ্কি হয়তো শেষ হয়ে যেত সেদিন। ধোপা-কাচন ঠ্যাঙানি খেয়ে চ্যাঙ্কি একেবারে ভেবলে গেছে। চোখেমুখে প্রচণ্ড আতঙ্ক। সবাই যখন লক আপের বাইরে টেনে নিয়ে এল উজ্জ্বলকে, তখন সে হাঁফাচ্ছে, হাতের মুঠোতে চ্যাঙ্কির মাথার গোছা চুল।

কী আশ্চর্য! এরপর আত্মহত্যার কথাটা আর মনেই রইল না উজ্জ্বলের। ধীরে ধীরে খুব শান্ত হয়ে গেল মন। খুব স্থিরভাবে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল সে। একটা ফাইল টেনে নিয়ে মন দিল কাজে।

খুবই অন্যমনস্কভাবে থানায় এল উজ্জ্বল। বড়বাবুর ঘরে ঢোকার আগে খেয়াল পড়ল রিভলভারটা আনা হয়নি সঙ্গে। ঘরে ঢুকতেই বড়বাবু একটু বিরক্তির সঙ্গেই যেন বললেন, ফোন ধরতে এত দেরি করেন কেন। দুবার রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল। উজ্জ্বল ভুলটা বুঝতে পারে, চিন্তার মধ্যে এত ডুবেছিল যে প্রথম রিংগুলো শুনতে পায়নি। একটু ক্লান্ত গলায় সে বলে, বাথরুমে ছিলাম স্যার।

তাড়াতাড়ি যান, পার্বতী সিনেমার কাছে ঝামেলা হচ্ছে—অসিত ঝামেলা পাকিয়েছে।

অসিত। নামটা শোনা উজ্জ্বলের। এখানে আসার পর অনেকবার শুনেছে। এর গ্রুপের একটা ছেলেকে কিছুদিন আগে ধরেছে সে। জেল হয়েছে ছেলেটার। কী যেন নাম ছেলেটার...কী যেন নাম...মনে পড়েছে। বিজু।

রানু ভাবে, কবে যে বুড়ি হবে সে—কুঁচকে যাওয়া গায়ের চামড়া, তুবড়ে যাওয়া মুখ, ঝুলে যাওয়া বুকের থুত্থুরি বুড়ি। সে খুব চায়, তার বার্ধক্য রাস্তাটাকে ছোট করে নিয়ে তাড়াতাড়ি এসে জমিয়ে সংসার পাতুক শরীরে। বড় ধিক্কার, বড় ঘেন্না।

একলা মেয়ে, যৌবনের মেয়ে দেখলেই তামাম পুরুষকুল যেন হামলে পড়ে হাকলাসের মতো। বেশরম অমানুষ সব। কত যে মুখ তাদের। কেউ বেড়ালের মতো ছোঁক ছোঁক করে, কেউ নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, কেউ আবার কুকুরের মতো ল্যাজ নাড়ে সামনে এসে, উপকারী বন্ধু হতে চায়, তারপর একটু সুযোগেই বের করে লালাঝরা লকলকে জিভ। চলতে ফিরতে রাস্তাঘাটে সর্বদা আতঙ্ক যেন!

কাল রাতে ঘুম হয়নি ভালো। ডিউটি থেকে ফিরে দেখল দরজার সামনে ভবেশ। দেখেই মেজাজ তিতকুটে হয়ে গেল। তারপর আবার বুঝতে পারল, ভবেশ গিলেও এসেছে কিছুটা।

একটু কাঠ কাঠ গলায় রানু বলল, কী ব্যাপার।

ছোট একটা হাই তুলে ভবেশ বলল, খুব তেষ্টা পাচ্ছে, একটু জল দেবে...।

জল খেতেই এখানে এলে...?

আর কিছু থাকলে দাও না, খিদে পেয়েছে মাইরি!

কথা বাড়াল না রানু। গম্ভীর মুখে দরজা খুলে জলের বোতল একটা নিয়ে বাইরে এল; তারপর ভবেশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, খেয়ে বিদেয় হও।

বোতলটা নিতে নিতে ভবেশ বলল, যা: শালা, দোরগোড়া থেকেই বিদেয় করে দেবে...!

কিছু বলল না রানু। চোখ-মুখ কঠিন করে দাঁড়িয়ে রইল।

রানুর দিকে তাকিয়ে ভবেশ বলল, তুমি মাইরিটা দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছ...কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি, পাগুলো ধরে গেল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে...।

বাড়ি যাও, তোমার লোক আছে, টিপে দেবে।

নিজের লোকই তাড়িয়ে দিচ্ছ...কে আর পা টিপে দেবে আমার...। তোমার আজ এত দেরি হল কেন গো...?

আমি তোমার নিজের লোক হতে যাব কোন দু:খে! কঠিন গলায় রানু বলে, তাড়াতাড়ি জলটা খেয়ে তুমি এসো—আমার অনেক কাজ আছে।

সত্যিই তাড়িয়ে দেবে! একটু কাতর গলায় ভবেশ বলল, আমি তো আজ এখানে থেকে যাব ভেবেছিলাম।

না। গলা আরও কঠিন করে বলে রানু।

না কেন...?

না বলেছি, তাই—না! কারণ আমি অতশত ব্যাখ্যা করতে পারব না এখন।

যাহ শালা, নিজের বউয়ের কাছে স্বামী থাকবে, তাতে 'না' কেন...আশ্চর্য মাইরি।

কিছু বলে না রানু। চুপ করে থাকে।

কী অসুবিধে বলো, আমি থাকলে...?

অসুবিধে আছে।—বলে খুব জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ভবেশের দিকে একবার তাকায় রানু। লোকটার রোমকূপে রোমকূপে শয়তানি। বিয়ের পর থেকে প্রত্যেক দিনই এই শয়তান দেখে এসেছে সে। বিয়ের কিছুদিন পরেই রানু বুঝল বউদি ভেড়া বানিয়ে রেখেছে লোকটাকে। দাদাটা হাবাগোবা জড়বস্তু। তার সামনেই দেওর-বউদির লীলা চলে। এতটুকু শরম লজ্জা নেই এদের, দয়ামায়া নেই এক ছটাকও। শাশুড়ি আর ননদও তেমনি—চোখ থেকেও অন্ধ, কান থেকেও বধির। মদ খেয়ে ভবেশ যখন রানুকে লন্ডভন্ড মার দিত, কেউ কোনওদিন এগিয়ে আসেনি, থামায়নি ভবেশকে। ওদের চোখের সামনে, ওদের বিকারহীন হাজিরাতেই মার হজম করত রানু। মার খেয়ে চিৎকার চেঁচামেচির ধাত কোনওদিনই ছিল না তার। গরুর মতো স্থির আর বোবা হয়ে মারগুলো হজম করে নিত সে।

একদিন শুধু চিৎকার করেছিল রানু। সজোরে প্রতিবাদ করেছিল, বাধা দিয়েছিল হাত-পা ছুড়ে। সেদিন বেশ জ্বর গায়ে। শুয়েছিল বিছানায়। একটা জামা খুঁজে পাচ্ছিল না ভবেশ। রানুকে জিগ্যেস করল। উঠতে ইচ্ছে করছিল না রানুর; তাই শুয়ে শুয়েই বলল—জানি না। ব্যস; বিছানা থেকে হিঁচড়ে টেনে রানুকে তুলে আনল ভবেশ। মাগি তুই জানিস না তো জানে কে, তোর কোন ভাতার জানে বল, না কি জামার ঠ্যাং গজাল...বুক পকেটের টাকাগুলো কোথায় বল আগে...। বিকট চিৎকার করছিল ভবেশ, আর শিলাবৃষ্টির মতো কিল-চড়-লাথি মারছিল তাকে। সে দিন আর সইতে পারেনি রানু। নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করছিল, চিৎকার করছিল, এমনকী আগে যা করেনি কোনওদিন সে, অন্ধের মতো, বেপরোয়ার মতো হাত-পা পর্যন্ত ছুড়ছিল। মনে হচ্ছিল, খুন করে ফেলে লোকটাকে।

তখন সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল ওর ননদ পায়েল। যে ফোনগুলো এলে সিঁড়ির নীচে চলে যায় ও সেগুলো সাধারণত লম্বা ফোন হয়। ফোনের ও-প্রান্ত বোধহয় জানতে চাইল হট্টগোলের উৎস। পায়েল আড় চোখে একবার দেখে নিয়ে খুব বিরক্তির সঙ্গে বলল, কুকুরের খেয়োখেয়ি চলছে! সেদিন ফোন ছাড়ার পর ভীষণই ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল পায়েল, তোমাদের জ্বালায় আর বাড়িতে থাকা যাবে না, যা আরম্ভ করেছ...।

ভবেশের হাত থেকে কোনওরকমে নিজেকে মুক্ত করে রানু বলেছিল, আমাকে বলছ কেন, তোমার দাদাকে দেখছ না...!

সবই তো দেখছি। পায়েল গজগজ করতে করতে বলল, দোষ কিন্তু তোমারই।

আমার দোষ?

নয়তো কী...জানো তো দাদার একটু মাথা গরম, যা বলে একটু মেনে নাও না কেন—মুখে মুখে শুধু তোমার চোপা...। আর তোকেও বলি দাদা, যে ঢ্যাটা তাকে কি মারধোর করে সিধে করা যায়...!

সেদিনই আবার কুটনো কুটতে কুটতে হাত কেটে ফেলেছিল শাশুড়ি। তারও দায় ওই রানুর। কানের কাছে অমন ষাঁড়ের মতো চেল্লালে কি মাথা ঠিক থাকে,...হাত তো কাটবেই—বলি, পুরুষমানুষ রাগ একটু-আধটু করবেই, মানিয়ে গুনিয়ে নিতে হয়, তা নয় মেয়েছেলে হয়ে তুমি হাত তুলবে...!

রানু অবাক—আমি মারলাম কোথায়...!

নিজের চোখেই তো দেখেছি বউমা...। শাশুড়ি মুখ থোম্বা করে বলে, চোখের মাথা তো খাইনি, তুমিই তো ছুটে গিয়ে ওকে লাথি মারলে।

প্রতিবাদ করতে গিয়েও চুপ করে যায় রানু। মনে হয়, ভবেশ একা নয়, সবাই মিলে কিল-চড়-লাথিগুলো মারল তাকে। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে। বাবার দেওয়া গয়না আর সামান্য কিছু জামাকাপড় নিয়ে জ্বর গায়েই বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে। উঠল নবগ্রামে বাপের বাড়ি।

নবগ্রামে বেশিদিন থাকা যাবে না জানত রানু। সেখানে প্রায় পরদিন থেকেই দু-বউদি পাল্লা দিয়ে দুর্ব্যবহার করত। মস্ত অসুবিধে ঘরের। মা যে ঘরটায় থাকে সেটা এত ছোট যে হাত-পা মেলে দিলেই দেওয়ালে ঠেকে যায়। বাক্সর মতো সেই ঘরে হাত-পা মুড়ে ঘাড় গুঁজে গুটিপোকার মতো ক'টাদিন কাটিয়ে দিল রানু। খুব সন্ধান করছিল একটা ভদ্রসভ্য কাজ আর আলাদা বাসার। স্কুলের বন্ধু মিতালির বিয়ে হয়েছিল হাওড়ার খুরুটে। সে-ই আয়ার কাজ আর এই বাসাটার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বাসা মানে, টালি ছাওয়া, ফাটাফুটি নোনা ধরা দেওয়াল আর স্যাঁতসেতে মেঝের খুপরি একটা। বাথরুম অন্য ভাড়াটেদের সঙ্গে কমন। তবে জায়গা হিসেবে খারাপ নয়। নেতাজি সুভাষ রোড হেঁটে মিনিট তিনেক। আয়া সেন্টার 'সেবায়ন' কাছেই। খুরুট, কালীবাবুর বাজার, হাওড়া ময়দান, কদমতলা এই সব জায়গাতেই বেশিরভাগ পার্টির বাড়ি। তাই হেঁটেই চলে যায়, বেঁচে যায় গাড়ি ভাড়া।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই রানুর এই বাসাটার কথা জেনে যায় ভবেশ। খুঁজে খুঁজে ঠিক হাজির হয় এখানে। তারপর থেকে মাঝেমধ্যে এসে আঙবাঙ বকে। কখনও বলে—ফিরে চলো; কখনও বলে—আমি এখানে থাকব। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝামেলা-ঝগড়া হতেই পারে, তার জন্যে আলাদা থাকতে হবে কেন! কিন্তু রানু অটল। সে জানে, ফিরে যাওয়া মানে নরকের দরজার দিকে জেনে বুঝে পা বাড়ানো।

একটা হেঁচকি তুলে ভবেশ বলে, তুমি কি বলতে চাও আমি তোমার স্বামী নই...?

তোমার সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই; আমি রাখতেও চাই না—। গলা আরও কঠিন করে রানু।

যা: শা—লা। তাহলে শাঁখা সিঁদুর পরো কার জন্যে? আবার বিয়ে-টিয়ে করেছ নাকি...?

বাজে কথা ছাড়ো। রানু বলে, জল খাবে তো খাও, না হলে চলে যাও!

বিশ্বাস করো; আজ থাকব বলেই এসেছি।

অবিশ্বাস তো করছি না; কিন্তু এখানে থাকা হবে না তোমার।

কেন গো, তোমার এখানে অন্য কেউ থাকে নাকি? একটু শয়তানির হাসি হেসে বলে ভবেশ।

দাঁতে দাঁতে চেপে রানু বলল, শয়তান, ছোটলোক!

রানু ভালো বুঝতে পারছে জানোয়ারটার মতলব খারাপ। আর একদিনও এইরকম হয়েছিল। তখন নবগ্রামে রানু। সন্ধেবেলা হঠাৎ ভবেশ হাজির। এসেই মায়ের পা ধরে খুব এক প্রস্থ কান্নাকাটি হল—বড় অপরাধ করে ফেলেছে সে, মরমে মরে যাচ্ছে, মা যেন তাকে ক্ষমা করে দেয়। তারপর বলল, রাতে থাকব। সে নাকি অন্য বাসার সন্ধান করছে, ব্যবস্থা হয়ে যাবে দু-চার দিনের মধ্যেই, সেখানে নিয়ে যাবে রানুকে, অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়...ইত্যাদি। রানু বুঝতে পারছিল সব ধাপ্পা, অন্য মতলব আছে শয়তানটার, চোখ মুখই বলছে খারাপ ধান্দা নিয়ে এসেছে লোকটা। সে সোজা বিদেয় করে দিতে চেয়েছিল। মা নারাজ—আহা তা কি হয়, জামাইয়ের মতি ফিরেছে যা হোক—মানুষ তো ভুল করেই...। মা তাই জামাই আদর করল; নিজে ঘর ছেড়ে বাইরে শুল। আর সারারাত ধরে রানুকে উস্তম খুস্তম করে দলেছিল ভবেশ, পশুর মতো ভোগ করেছিল। মা দরজার বাইরেই শুয়ে, তাই বেশি তর্কবিতর্ক, বাধা-আপত্তি করতে পারছিল না রানু। কাঠ হয়ে শুয়ে থেকে সইয়ে নিচ্ছিল ভবেশের অত্যাচার। কী খিটখিটে গ্লানি যে হয়েছিল সেদিন। তারপর বেশ ক'দিন খুব অশুচি লাগছিল নিজের শরীরটাকে।

আজও রানু বুঝতে পারছে তেমনই কিছু কু-ইচ্ছে আছে লোকটার। ওর চোখ মুখ তেমনই বলছে, তাই সে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনওরকম প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না লোকটাকে।

ভবেশ আবার বলে, থাকে না কি অন্য লোক...?

আমি কিন্তু চিৎকার করব এবার! রানু একটু ফুঁসে ওঠে।

শয়তানি হাসিটা মুখে ধরে রেখেই ভবেশ বলে, এটা কিন্তু তোমার অন্যায়—আমার নামে শাঁখা সিঁদুরটা চালাবে, আর অন্যজনের সঙ্গে পিরিত করবে—তা কী করে হয়...?

রানু বলে, তুমি নোংরা, তাই তোমার মনও নোংরা!

তাই সই। হলুদ দাঁতের হাসি হেসে ভবেশ বলে, গোটা পঞ্চাশ টাকা দাও, কেটে পড়ি।

টাকা! খুব অবাক গলায় বলে রানু।

হ্যাঁ রে বাবা, টাকা!

তুমি আমার থেকে টাকা চাইছ?

বিশ্বাস করো, মাইরি বলছি, খুব দরকার—এ মাসে মাইনে পাইনি।

কেন, মাইনে পাওনি কেন?

কোম্পানি সাসপেন্ড করেছে—আমাদের চারজনকে এ মাস থেকে...।

কী কীর্তি করেছ?

একটু চুপ করে থাকে ভবেশ। তারপর বলে, সে অনেক কথা, পরে বলব'খন...।

আমার শোনার দরকার নেই! রানু বলে, টাকা আমি দিতে পারব না, পাব কোথায় টাকা!

সত্যি বলছি, মাইরি বিশ্বাস করো। একটু কাতর গলায় বলে ভবেশ।

তুমি কি জলটা খাবে?

হ্যাঁ হ্যাঁ খাব।

বোতলের ছিপি খুলে আলগোছে জল খাচ্ছিল ভবেশ। হাত কাঁপছে। জল চলকে পড়ছে গলায় বুকে। হঠাৎ বিষম খেল। সেইসঙ্গে প্রচণ্ড কাশির দমক। কাশতে কাশতে বসে পড়ল। কপালের শিরা ফুলে উঠেছে, চোখগুলো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে মণিকোঠা থেকে।

ব্যাগটা তাড়াতাড়ি পাশে রেখে ভবেশকে ধরল রানু। হড়হড় করে বমি করে দিল ভবেশ। পাশের ঘর থেকে মাঝবয়সি বউটা বেরিয়ে এসেছে; অবাক হয়ে দেখছে দৃশ্যটা।

বমি হবার পর কাশিটা থামল। চোখ মুখ লাল ভবেশের। নেতিয়ে পড়েছে যেন। ঘরের সামনেই শুয়ে পড়তে যাচ্ছিল। রানু তাড়াতাড়ি দরজা খুলে ঘরে শুইয়ে দিল ভবেশকে।

নিজেকে একটু সামলে নিয়ে কাল চলে গেছে ভবেশ। তবে যাবার আগে কুড়িটা টাকা আদায় করে নিয়ে গেছে। তার সঙ্গে নাকি ফেরার গাড়ি ভাড়াটাও নেই।

বমি-টমি পরিষ্কার করে শুতে রাত হল কাল। ঘুম হল না ভালো। নানা চিন্তা মাথার মধ্যে টিকিস টিকিস করছে। কাজটা গেছে ভবেশের। এখন টাকার ধান্দায় যখন-তখন হানা দিলেই তো মুশকিল। লোকটার আটকায় না কিছু।

আজ ডিউটিতে যায়নি। গুচ্ছের কাজ—কাচাকুচি ঘর ঝাড়া বাজার দোকান—সব জমে জমে ছোটখাটো পাহাড় একখানা। মাথার মধ্যে চিন্তার টিকটিকিনি নিয়েই দোকান বাজার করেছে। ক'দিন পরেই পুজো। বাজার যেন আগুন। ওর মধ্যেই বিস্তর ঘোরাঘুরি করে দামদস্তুরের পর কেনাকাটা করতে হয়েছে। আর তার মধ্যেই ছ্যাঁকা খেতে হয়েছে পুরুষমানুষের লোভ লালসার। এক জায়গায় কচু বিক্রি হচ্ছিল। কচুগুলো ভালো, দামও কম। বেশ ভিড় জায়গাটা। ভিড়ের মধ্যে একটা হাত ছুঁয়ে যাচ্ছিল রানুর বুক। ভিড়ের জন্যে খুব বেশি সরে দাঁড়াবার উপায় নেই, লোকটার সাহসও বাড়ছে, আড়চোখে রানুর দিকে তাকিয়ে মৃদু ইঙ্গিতও ছুড়ল একটা। বিরক্ত রানু কচু না কিনেই চলে এল সেখান থেকে।

তারপর রাস্তায় আর একজন। এ লোকটার বয়েস হয়েছে বেশ—চুলটুল সব সাদা। রাস্তার এক জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে—ভয়ানক এবড়োখেবড়ো জায়গাটা। অন্যমনস্ক রানু হোঁচট খেল। বাঁ-হাতের ব্যাগটা ছিটকে পড়ল রাস্তায়—আলু ছিল ব্যাগে—সব রাস্তায় গড়াগড়ি। আহা-আহা করে এগিয়ে এল বুড়ো লোকটা। ব্যাগটা নিয়ে তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে দিল আলুগুলো। তারপর মাথায় হাত রেখে নাম কী, বাড়ি কোথায়...এইসব। মাথার হাত পিঠে নামল একটু পরেই, আর পরক্ষণেই রানু বুঝতে পারল হাতটা নোংরামি শুরু করে দিয়েছে। লালা চকচকে জিভ বের করে ফেলেছে বুড়ো। মনে হল, বুড়োর চোখ দুটো গেলে দেয় আঙুল গুঁজে। ব্যাগটা ছিনিয়ে নেবার মতো করে নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে এল রানু।

দু-হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটছে রানু। যেন বাইরের এই আব্রুহীন জগৎ, এই লোভ-লালসার গনগনে আঁচ থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাতে হবে তাকে। হাঁটছে আর ধিক্কার দিচ্ছে তার এই নারীজন্মটাকে। ভাবছে কতদিন—আর কতদিন শরীরের এই বাহুল্যগুলো—এই টানটান ত্বক এই ভরাট বুক বয়ে বেড়াতে হবে তাকে! কতদিন ছ্যাঁকা খেতে হবে পুরুষের লালসার!

নিজের ঘরের সামনে এসে থামে রানু। ব্যাগগুলো হাত থেকে নামিয়ে দম নেয়। খুব জোরে হেঁটেছে, ঘাম হচ্ছে দরদরিয়ে। পাশের ঘর দুটো তালা দেওয়া। মাঝবয়সি স্বামী-স্ত্রী দুটো দশ-বারো বছরের মেয়ে নিয়ে থাকে। এখনও তেমন আলাপ পরিচয় হয়নি। কাল যখন ভবেশ বমি করছিল উঁকি দিয়ে দেখছিল বউটা। চোখে-মুখে থকথকে হয়ে জমে আছে কৌতূহল। এই সব কৌতূহলকে বড় ভয় পায় রানু। আজ সকালেও বউটা আর মেয়েদুটো বার বার দেখছিল তাকে। রানু জানে, আলাপ জমাবার জন্যে এদের প্রাণ একেবারে আনচান করছে। রানু কোনও সুযোগ দেয়নি। চোখে চোখ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিয়েছে। একটু গম্ভীর করে নিয়েছে মুখটা।

ঘরে তালা খোলে রানু। দরজা দুটো ঠেলে।

তখনই প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খায় পিছনে। কেউ যেন ঠেলে ঘরে ঢুকিয়ে দেয় তাকে, তারপর কঠিন হাতে চেপে ধরে মুখ।

ছটফট করে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করে রানু। শরীরের যত শক্তি সব এক করে একটা ধাক্কা দেবার চেষ্টা করে সে। হাত দিয়ে টেনে মুখের হাতটাকে সরাতে চায়। কিন্তু হাতের মালিক প্রবল রকমের শক্তিমান। আরও কঠিনভাবে চেপে ধরে তাকে। এতটুকু নড়াচড়া করার ক্ষমতা থাকে না রানুর।

এবার প্রচণ্ড ভয় পায় সে। ভয়ের ঠান্ডা একটা স্রোত শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে আসে। পেটের মধ্যে থেকে কিছু একটা মোচড় দিয়ে উঠে আসে বুকে। সে ধর্ষিত হতে যাচ্ছে। উহ ভগবান, এই ছিল তার কপালে, তার আগে মৃত্যু হল না কেন তার?

তবু শেষ একটা মর্মান্তিক চেষ্টা করে সে। পা ছুড়ে লাথি মারার চেষ্টা করে পেছনের লোকটাকে। তখন কানের কাছে হিসহিস করে ওঠে একটা গলা—চুপ, একদম চুপ, খুন করে ফেলব কিন্তু!

অসহায় রানুর চোখে ভেসে ওঠে একটা ছবি। তাদের বাড়ির পাশে থাকত নন্দিতা। একসঙ্গে খেলত তারা। তখন ক্লাস ফোর কি ফাইভ হবে, হঠাৎ একদিন নন্দিতা নিখোঁজ। চারদিকে খোঁজ খোঁজ—কোথাও পাওয়া গেল না তাকে। পরদিন সকালে ঘোষালদের বাঁশবাগানে পাওয়া গেল নন্দিতাকে। নগ্ন পড়ে আছে, প্রাণ নেই শরীরে, মাথাটা একদিকে হেলা, সারা শরীরে আচড় কামড়ের চিহ্ন। এখন হঠাৎ সেই ছবিটা ভেসে ওঠে চোখে। সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ঘুরে যায় তার। পা দুটো কেমন হালকা হয়ে এল।

ধীরে ধীরে কঠোর আলিঙ্গনের মধ্যেই নেতিয়ে গেল রানু।

মাটি না মাখলে লোকটার গা কুটকুট করে। তাই রোজদিন সকাল-বিকাল মাটি মাখা। খেতে গিয়ে গাছগুলোকে না দেখলে, উদোম মাঠে রোদ জলে গা না ভেজালে চোখের পাতা বুজতে চায় না রাতে।

রাতভর শুধু বিছানায় শুয়ে আনচান আর যত বাউন্ডুলে চিন্তা—ওই যা:, বেগুনে বুঝি পোকা এল—খুব পোকা লাগছে এদিক-ওদিক এখন...দুপুরের দিকে একটু ঝটকা বাতাস দিল যেন...ঝিঙে মাচাটা শুয়ে না পড়ে মাটিতে...।

তিন মেয়ে তার; বিয়ে হয়ে গেছে সবার; তারা খুব বলে—বাবা, দুটো দিন থেকে যাও না কেন আমার বাড়ি...। যায় সে; কিন্তু মন টেঁকে না কোথাও। টিকবে কী করে—শোভা মাগিটার দশ-বারোটা ছাগল মিলে একেবারে জ্বালাতনে কাণ্ড যে ওদিকে—টঙটঙ ঘুরছে সারাদিন, এর খেতের বেড়া ভাঙছে, ওর খেতে মুখ দিচ্ছে...মাগি ছাগল বাঁধবে না তবু—এই তো সেবার আলুগাছগুলো একেবারে মুড়িয়ে খেয়ে নিল! তাই কোনও প্রকারে একটা রাত কাটিয়ে কাকভোরে বেরিয়ে পড়ে সে, মাঠে যায় আগে, সব কিছু নিজের চোখে দেখে তবে শান্তি!

লোকটা মানে রুইদাস মণ্ডল। পাক্কা সাড়ে তিন হাত লম্বা শরীর, ফরসা রং রোদ-জলে ঝান খেয়ে গিয়ে তামাটে। বয়স তিন কুড়ি পেরিয়েও সারা গায়ে টইটুম্বুর পেশি এমন শক্ত ডেলা ডেলা হয়ে আছে যে কাটারির কোপ বসে না যেন। চোখগুলো একটু গর্তে ঢোকা, নাকটা চাপা, চোয়াল ভাঙা, আর হাঁ-মুখ এত বড় যে খেতে বসে গোটাগুটি একখানা রুটি একেবারে ঢুকিয়ে দেয়। আবছা আঁধারে আচটকা দেখলে পেল্লাই দৈত্য মনে হয় মানুষটাকে।

আলধারে বসে বিড়ি টানতে টানতে ওই যে রুইদাস দুটো কথা বলছে পাঁচু বদ্দির সঙ্গে। নদীর ওপারে সুয্যিটা নেমে গেল একটু আগেই। যাওয়ার সময় সাদা সাদা কোপানো মেঘগুলোতে যেন মেটে সিঁদুর গুলে দিয়ে গেছে। সামনের সবুজ ধানখেতে ওষুধ স্প্রে করার মতো কে যেন একটু একটু করে ভুসো কালি স্প্রে করে দিচ্ছে। কালি মিশে আরও গাঢ় হচ্ছে সবুজ। বিড়ির আগুনটা বেশ লালচে হয়ে উঠছে টান দিলে।

পাঁচু বদ্দির ধানটা এবার মার খেয়ে গেছে একটু। রোয়ার পর জল পেল না ভালো, পোকা এসে গেল ধানে। পাঁচু একটু মরা গলায় বলে, খুড়ো, তোমার আর চিন্তা কী...!

একটু ধোঁয়া ছেড়ে রুইদাস বলে—অ্যাঁ!

বলছি গাছের জেল্লা যা দিয়েছে তোমার, শিষ এলে একেবারে লুটোপুটি খাবে যে!

একটু গর্বের চোখে খেতের দিকে তাকিয়ে রুইদাস বলে, বলছিস তুই...!

মিলিয়ে নিয়ো আমার কথা; তখন গিয়ে বোলো আমায়...।

দেখি! বিড়িতে একটা সুখটান দিয়ে বলে রুইদাস। মনটা তার ক'দিন বড় দম চাপ হয়ে আছে। ছটফটাচ্ছে দিন-রাত। পাপ, পাপ! বড় পাপ! পাপের ঝাঁকা চেপে বসছে মাথায়। পুণ্যি আর হল না এ জন্মে। দিন দিন ভারী হয়ে যাচ্ছে ঝাঁকা। কথাটা রুইদাস বলেই ফেলে এখন পাঁচুকে।

বুঝলি পাঁচু।

হুঁ, বলো।

আমার মা-টাকে দেখেছিস তো...?

দেখেছি তো, দেখব না কেন...!

কবেটা করে দেখলি?

এই তো ক'দিন আগে—বাবলাদের বাগানে দেখি কলাপাতা কাটছে।

কলাপাতা কাটছে দেখলি?

হ্যাঁ, তাই তো দেখলুম।

বল তাহলে, নিজের চোখে দেখলি তো...কী করি বল!

পাঁচু রুইদাসের দিকে একটু অবাক দৃষ্টিতে তাকায়।

রুইদাস আবার বলে, কী করি বল দিকিন...?

পাঁচু বলে, কী আবার করবে!

কেমন ডাঁটো পোক্ত দেখেছিস তো?

হ্যাঁ, তা বটে।

চার কুড়ি বয়েস হয়ে গেল, তবু দেখ ঠিক ভোরবেলা উঠবে, ঝাঁটপাট দেবে, ঠকঠক করে পাড়াময় ঘুরবে, কাঠ কুড়োবে—এসব কী বলতো...!

হ্যাঁ। পাঁচু বলে, বয়েস আন্দাজে তোমার মা-টা দেখি বেশ খরখরে আছে—আমার মা তো সেই কবেই চিতায় উঠল।

সেই তো চিন্তার কথা রে...!

পাঁচু রুইদাসের সমস্যাটা বুঝতে পারে না ঠিক; তাই একটু অবাক চোখে তাকিয়ে বলে, চিন্তার কেন হবে খুড়ো...?

আমার বয়েস তো ইদিকে বসে নেই বাপ, বেশ বুঝতে পারি শরীর ভাঙছে রে...

কোথায় খুড়ো, তোমার শরীর তো দিব্বি আছে!

না রে, শরীরে যেন জন্মের আলিস্যি, তাকত কমছে, বেশ বুঝি আমি—আগেতে এক-একটা আলুর বস্তা মাথায় নিয়ে এক দমে বাড়ি যেতুম, এখন হাঁপটান লাগে, এক টানে কতটা কুপিয়ে ফেলতুম, এখন আর হয় না, শরীরের জোর-বলে ভাটা পড়েছে রে, খুব বুঝি...।

ও কিছু নয় খুড়ো। পাঁচু বলে, সারের দামটা কেমন লাফ দিল দেখলে তো? দুটো পয়সা যে ঘরে তুলবে তার গিরিন্টি নেই।

সারের দাম নিয়ে এখন একেবারেই ভাবিত নয় রুইদাস। সে বলে, কাজটা তো বলতে গেলে পাপেরই হল...পাপেই ভাঙছে শরীর...বুড়ো-হাবড়া বয়েসে বিয়েতে বসলুম—কাজটা পাপেরই হল, কী বলিস...?

পাঁচু আড়চোখে তাকায় রুইদাসের দিকে। রুইদাসের বউ মরল এই ক-বছর আগে, অকালেই চলে গেল বউটা, তারপর হঠাৎ এক কাণ্ড করল রুইদাস, মাইতি পাড়ার মৃত্যুঞ্জয়ের ছোট বোনটাকে বিয়ে করে বসল। অকালবিধবা মালতী ভায়ের সংসারে ভালো ছিল না মোটেই—তাকে একদিন ঘরে তুলল রুইদাস।

পাড়াময় হইচই; বাড়িতে কত অশান্তি। ছ্যা: ছ্যা:, এই বয়সে! রুইদাস বলে, কী করি...ভাতের জলে চোখের জলে বেঁচে ছিল, কবে না কবে গলায় দড়ি দেয়—আহা কুকুর-বেড়ালও তো খিদেয় কাঁদে—না হয় এঁটোকাঁটা কুড়িয়েই খাবে'খন...। মেয়েরা যা-ও বা মেনে নিল, ছেলে বিজু কিন্তু খুব নারাজ। নিত্যদিন চেঁচামেচি ঝগড়া বিবাদ—তারপর একদিন বাড়ি ছেড়ে পালিয়েই গেল বিজু।

পাঁচু বলে, পাপ হতে যাবে কেন—তোমার এখনও শরীর আছে, ভাত কাপড় জোগান দেওয়ার ক্ষমতা আছে, পাপ আবার কী কথা...বাদ দাও ওসব।

চুপ করে বসে থাকে রুইদাস। ফুকফুক করে বিড়ি টানে।

পাঁচু বলে, ওই তো দখিনবাড়ির গণেশ দাস, তোমার চেয়েও বেশি বয়েস—বিয়ে করল, ছেলেও হয়েছে একটা শুনছি—দিব্বি আছে।

রুইদাস মাথা নাড়ে—না রে পাপ হয়েছে ঠিক, পাপেই শরীর ভাঙছে...আর একটু যে পুণ্যি করব... কিন্তু মা আমার এত ডাঁটো....

পাঁচু একটু অবাক গলায় বলে, এ তো ভালো কথা...।

না রে, মায়ের গু-মুত না ফেললে পুণ্যি হয় না, মা যদি বিছানায় পড়ে থাকত, তবে সেবাযত্ন করতুম, গু-মুত ফেলতুম—কিন্তু ভাগ্য আমার দেখ, মা আমার এখনও সবল, বিছানা নেওয়ার নাম নেই, আর আমার ইদিকে শরীর যাচ্ছে, কদিন পর আমাকেই বিছানা নিতে হবে—পুণ্যি আর ভাগ্যে নেই আমার...।

পাঁচু হেসে বলে, মায়ের গু-মুত না ঘাঁটলে পুণ্যি নেই কে বলে খুড়ো...আমার মা তো এসটোক হয়ে পড়ল আর ম'ল—আমারও তাহলে পুণ্যি নেই বলো...।

ফের মাথা নাড়ে রুইদাস, আবার বলে, না রে, মায়ের গু-মুত ঘাঁটতেই হয়—ওপরে কী জবাবদিহি হবে কে জানে...বড় পাপ রে... পাপেই আমার ছেলেটা বয়ে গেল বুঝি আমি...।

পাঁচু একটু গলা নামিয়ে বলে, বিজুর খবর কী?

খবর আর কী হবে...। একটু হতাশ গলায় রুইদাস বলে, সে তো জেলে—সবই পাপ আমার...।

ছাড়া পাবে কবে?

সাড়ে চার মাসের মেয়াদ শুনেছিলুম—শেষ হয়ে এল যেন...এই আশ্বিনেই তো ছাড়া পাবে—তেমনই যেন শুনেছিলুম তখন...।

কোন জেলে আছে যেন?

মল্লিকফটক।

ও বাবা, সে তো অনেক দূর!

হ্যাঁ, দূর আছে, সে হাওড়া—যেতে একটা বেলা কাবার হয়ে যায়।

যাও না তুমি দেখা-সাক্ষাৎ করতে?

একটু চুপ থেকে রুইদাস বলে, যেতুম তো আগে—আর যাই না অনেক দিন—ছেলে কথা কয় না, দেখাই দেয় না—তাই আর...।

আশ্বিন তো যায় যায় খুড়ো।

হুঁ।

বলি কী, যাও একবার, ছাড়া পেল কি দেখো, নিয়ে এসো সঙ্গে করে—বদ পাল্লায় বেলাইন হয়ে গেছে তোমার ছেলে—বুঝিয়ে তাকে নিয়ে এসো এখানে...।

হুঁ।

না হলে, ফের বিগড়ে যাবে ছেলে কিন্তু তোমার।

নতুন একটা বিড়ি ধরিয়ে রুইদাস বলে, আজ যেন আশ্বিনের কত তারিখ হল?

বিশে আশ্বিন আজ।

বিশে আশ্বিন...বিশে আশ্বিন...। ঘন ঘন বিড়িতে টান দেয় সে। বলে, বিশে আশ্বিন ঠিক...?

হ্যাঁ গো খুড়ো।

কথা আজকাল মনে থাকে না যেন...মালতী গাঁট গুনে বলেছিল তখন...ক্যালেন্ডার দেখে হিসেব কষেছিল—কত বলেছিল যেন...বিশে আশ্বিন কি...সব যেন তালগোল পাকিয়ে যায়...।

রুইদাস বলে, বিশে আশ্বিনই যেন বলেছিল...বিজু ছাড়া পাবে সেদিন—বলেছিল যেন...।

পাঁচু বলে, তোমার কি এখন সন-তারিখ সব গুলিয়ে যাচ্ছে খুড়ো...?

যায় রে...। একটু আনমনে রুইদাস বলে, ঘেঁটেমেটে যায় সব—খালি যে পাপের ভাবনা মাথায় আসে, ঘোর লেগে যায় সব...।

বিড়িটা ফেলে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় রুইদাস।

পাঁচু বলে, চললে তাহলে...?

হ্যাঁ, যাই গিয়ে—মালতীকে জিগ্যেস করি, বিশে আশ্বিনই যেন...।

বিড় বিড় করতে করতে অপরিচ্ছন্ন পদক্ষেপে আলপথ দিয়ে মস্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে চলে রুইদাস। যেতে যেতে পাপের কথা ভাবে। তার পাপেই তো গেল ছেলেটা...পাপই তো...না হলে, এত বয়স হল মায়ের, তবু কেমন ঠকঠকে...এ পাপ কি সহ্য হয়...হবে না...হবে না কিছুতেই...

'গোপাল বড় সুবোধ। তার বাপ-মা যখন যা বলেন, তাই করে, যা পায় তাই খায়...'

কেউ একটা পড়ছে। কচি গলা। চিলেকোঠার গুমটি ঘরটা থেকে শুনতে পাচ্ছে বিজু। প্লাসটিকের ছেঁড়া মাদুরে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে সে। ছোট্ট ঘর, ভাঙাচোরা জিনিসে ঠাসা। ইলেকট্রিক লাইন পর্যন্ত নেই। দুপুরের দিকে গরম হচ্ছিল বেশ। ঘামে ভিজে পিছলে যাচ্ছিল মাদুর। হাতপাখাও নেই। এক টুকরো পিচবোর্ড দিয়ে ঝাপটে ঝাপটে গায়ের ঘাম শুকোবার চেষ্টা করছিল বিজু। বিকেলের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল যখন—সন্ধে।

স্যাম্পেলদের বাড়িটা মহেঞ্জোদরো-হরপ্পা যুগের। অনেকগুলো শরিক। দেখে বোঝা যায়, এককালে স্যাম্পেলের পূর্বপুরুষ মালদার ছিল। বেশ খেলিয়ে ফেঁদেছিল বাড়িখানা। তারপর গুষ্টিবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আনতাবড়ি গজিয়ে উঠেছে ঘর-দালান। এখন এজমালি একটা তিনকোনা উঠোন ঘিরে নানা ডিজাইনের ঘরসংসার। কোনও শরিকের অবস্থাই পাতে দেবার মতো নয়। একটার দিকে দেওয়ালে ফাটল তো অন্যটার কার্নিশে গাট্টাগোট্টা তেজি বটগাছ। কোথাও আবার বারান্দার ছাদ ভেঙে হুমড়ি খেয়ে নেমে এসেছে। বাড়িটা ঘিরে বিশ-বাইশটা মামলা কয়েক যুগ ধরে চলছে। কার সঙ্গে কার কোন বিষয়ে মামলা শরিকরাও বোধহয় চট করে খেয়াল করতে পারে না। স্যাম্পেল তো বলে, উকিলের পেছনে আমরা সবাই যা পয়সা ঢেলেছি তাতে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড তাজমহল হয়ে যায়। আমাদের গুষ্টির বাচ্চারা মামলা মাথায় নিয়েই জন্মায় আর বুড়োরা মামলা নিয়েই চুল্লিতে ঢোকে। স্যাম্পেলদের দখলে আপাতত সিন্দুকের বড়সড়ো সাইজের চিলেকোঠার এই ঘরটা আছে।

আজ দুপুর থেকে এখানেই ঢুকে গেছে বিজু। অসিতের তাড়া খেয়ে ঢুকে পড়েছিল গলির মধ্যে একটা বাড়িতে। মেয়েটা বাইরে থেকে এসে সবেমাত্র দরজা খুলছিল ঘরের। একটু মারধর করা ছাড়া উপায় ছিল না বিজুর। বাঁচার জন্যেই করতে হয়েছিল! মুখ আর হাতগুলো বেঁধে ফেলেছিল মেয়েটার। তার আগেই অবশ্য মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে গেল। মেয়েটাকে এক কোণে ফেলে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিল বিজু। চুপচাপ অপেক্ষা করছিল আর লক্ষ রাখছিল মেয়েটাকে। বাইরের হইচই কানে আসছে। দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অসিত—খ্যাপা কুকুরের মতো খুঁজছে তাকে। কাজটা হাই-রিস্কের হয়ে গেছে। আসলে 'শুয়ারের বাচ্চা' কানে যেতেই মাথার মধ্যে কী যেন একটা আছড়ে পড়ে ফেটে গেল। অ্যাসিড বালবের মতো কিছু একটা। ফাটার পর আগুন-গোলা পাতলা মতো কিছু একটা ছড়িয়ে যাচ্ছিল গোটা মাথায়। প্রথমে অসাড় অনুভূতি। তারপরই কী ভীষণ জ্বালা! সেই জ্বালাধরা ভাবের মধ্যে একটা মানুষের ঝাপসা মূর্তি ভেসে উঠল চোখের সামনে। সারা গায়ে মাটি মাখা দৈত্যের মতো লোকটা। গুছিয়ে কিছু বলতে পারে না, কথা সহজে বুঝতে পারে না, চোখে সব সময় একটা ভয়-ভয় দৃষ্টি। এলোমেলো পায়ে হাঁটে, গোগ্রাসে প্রচুর খায়। আর বেদম মাটি মাখতে পারে লোকটা। মাঠে গিয়ে অসুরের মতো খাটনি দেয়। কাঁধে চাপিয়ে মেলায় নিয়ে যায় বিজুকে; ঝাল ঝাল আলুর দম কিনে দেয়। যাত্রা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লে কোলে তুলে বাড়ি নিয়ে আসে লোকটা। সেই লোকটা খুব অবাক চোখে দেখছে তাকে। বিজু ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে তার বউকে। তার বিয়ে করা বউ—দ্বিতীয়পক্ষ তার। বিজুর সৎ মা। তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে বিজু। একটা তফাতে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। অপরাধ আর ব্যথা কাদামাটির মতো মাখামাখি হয়ে আছে মুখে। বিজুর মাথার মধ্যে ভলকে ওঠা আগুনজ্বালাই ঘুসিটা বসিয়ে দিয়েছিল অসিতের মুখে। ভুলে গিয়েছিল, মেশিন ছাড়া বাইরে বেরোয় না অসিত।

মেয়েটার জ্ঞান ফিরল কিছুক্ষণ পর। ক্ষীণ একটা গোঙানির শব্দ করছিল। বুকের কাপড়টা সরে গেছে। ভরন্ত বুক দুটো ওঠা-নামা করছে নি:শ্বাসের সঙ্গে। চোখে ভয় আর কাতর একটা আকুতি। বিপদে পড়া অসহায় মেয়েদের চোখে এমন আকুতি থাকে। চুপ করে বসে ফ্যাকাসে বালবের আলোয় মেয়েটাকে ভালো করে দেখছিল বিজু—শ্যামবর্ণ, মাথার চুলগুলো কোঁকড়ানো। এই চূড়ান্ত টেনশনের সময়ও বার বার চোখ পড়ে যাচ্ছিল ভরন্ত বুক দুটোয়। মেয়েটা তাকে পরিষ্কার ভয় পাচ্ছে। প্রাণের চেয়েও অন্য একটা ভয়। আরও কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল বিজু। মেয়েটা এবার চোখের ইশারায় জলের বোতল দেখাচ্ছে। জল চাইছে। চাক গে যাক। বাইরের হট্টগোল শোনা যাচ্ছে না যদিও। অসিত চলে গেছে মনে হয়। অন্য কোথাও গিয়ে খুঁজছে তাকে। তবু সাবধানের মার নেই। আরও একটু দেখা দরকার। জানলাটা একটু ফাঁক করে দেখে বিজু।

মেয়েটার শরীর বেঁকে যাচ্ছে। বার বার দেখাচ্ছে জলের বোতলটা। চোখে খাঁ খাঁ তৃষ্ণা। জল দিতে গেলে মুখের বাঁধনটা খুলতে হয়। হাই-রিস্কের কাজ হয়ে যাবে। চিৎকার শুরু করে দিতে পারে। অসিত যদি কাছেপিঠেই থাকে, ফুটো হয়ে যাওয়া বিজুর বডি পড়ে থাকবে মর্গে।

পিছনের জানলাটা আর একটু খোলে বিজু। এখান থেকে রাস্তা দেখা যাচ্ছে। জায়গাটার নার্ভ বোঝার চেষ্টা করে সে। একটা বুড়ো ছাতা মাথায় দিয়ে টুকটুক করে হেঁটে যাচ্ছে। স্কুল-ড্রেস পরা বাচ্চা আঙুল তুলে কী যেন দেখাচ্ছে তার মাকে। অল্পবয়সি দুটো ছেলে-মেয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কথা বলছে—ছেলেটা মোবাইল দেখাচ্ছে মেয়েটাকে।

তার মানে পাড়া ঠান্ডা। আশপাশে কোথাও কোনও গন্ডগোল নেই। মেয়েটার দিকে তাকায় বিজু। মেঝেতে বেঁকে-চুরে শুয়ে আছে মেয়েটা। চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। কন্ডিশন খারাপ। দেরি হলে টেঁসে যেতে পারে। যাক গে শালা! কপালে ওর মরণ আছে। কী করবে বিজু!

জানলাটা বন্ধ করে দেয় বিজু। একটু যেন গুঙিয়ে ওঠে মেয়েটা। থেঁতলে যাওয়া বিছের মতো তিরতির করে কাঁপছে। শালা মরেই যাবে। ভরন্ত বুকে বারবার চোখ পড়ে যাচ্ছে বিজুর।

একটু চিন্তা করে বিজু। ঘরের কোণ থেকে বঁটিটা নিয়ে আসে। মেয়েটার চোখ দুটো এমন ভয়ঙ্কর ঠিকরে এসেছে যে, বঁটি দেখে বেশি-কিছু ভয় পেয়েছে কি না বোঝা যচ্ছে না। তবু বঁটি পাশে রেখে ইশারায় একবার দেখায়; তারপর আস্তে করে মুখের বাঁধন খোলে মেয়েটার। ধরে বসিয়ে দেয়। বুকের দিকে চোখ চলে যায় একবার। ব্লাউজের একটা বোতাম খুলে অনেকটা খাঁজ দেখা যাচ্ছে বুকের।

বিজু জলের বোতলটা ধরে মেয়েটার মুখে।

এভাবে জল খাওয়া বড় কঠিন। খেতে পারছে না মেয়েটা। জল মুখে যত না যাচ্ছে, বেশিটাই গড়িয়ে পড়ছে, ভিজিয়ে দিচ্ছে বুক ব্লাউজ।

নাহ, এভাবে হবে না। জল দেওয়া যাবে না এভাবে। হাত দুটো খুলে দিতে হবে। রিস্কের কাজ হয়ে যাবে কি? একটু চিন্তা করে বিজু। মাথা কাজ করছে না ভালো। অসিতটা শালা সব ঘেঁটে পাকিয়ে দিল। বাপ তুলে গালাগালি দিল বিজুকে। মাথাটা গরম হয়ে গেল ফট করে। সেই দানবের মতো লোকটা ব্যথার চোখে দেখছিল তাকে। সেই জড়সড়ো বউটাও তাকিয়ে ছিল—চোখে অগাধ আতঙ্ক।

বোতলটা পাশে নামিয়ে রাখে বিজু।

মেয়েটা খুব কাতর চোখে তাকিয়ে আছে বোতলের দিকে। পারলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বোতলের ওপর। বিজু বঁটিটা হাতে নিয়ে ইশারা করে—অর্থাৎ গন্ডগোল করলেই এক কোপে নামিয়ে দেব গলা।

হাত দুটো খুলে দেয় বিজু।

হাত দুটো মুক্ত হতেই তাড়াতাড়ি আগে বুকের কাপড়টা গুছিয়ে নেয় মেয়েটা। তারপর ছোঁ মারার মতো বোতলটা নিয়ে জল খায়। আধ বোতলের মতো জল ছিল। এক দমে খেয়ে নেয় সবটা।

এবার মুখটা বেঁধে দিতে হবে ফের। গামছাটা নিতেই মেয়েটা একটু ধরা গলায় বলে, আর নয়, সত্যি বলছি...!

কী, ঘুমিয়েছিলে নাকি?

বিজু ঘাড় ঘোরায়। স্যাম্পেল। দরজাটা এত ছোট যে ঘাড় হেঁট করে ঢুকতে হচ্ছে।

বিজু উঠে বসে। বলে, ক'টা বাজে রে?

সাতটার মতো; খাবি কিছু?

বেশ খিদে টের পাচ্ছে বিজু। বলে, খাব। কে পড়ছে রে?

সান্টু; জ্ঞাতি জ্যাঠার নাতি। জ্যাঠাটা বহুত হারামি, তবে ছেলেটা ভালো, ওর খুব ইচ্ছে বড় হয়ে জাহাজ চালাবে।

আমিও ছোটবেলায় এই বইটা পড়েছি। তুই-ও মনে হয় পড়েছিস।

কী জানি শালা! বিজু বলে, পড়েছি হয়তো, দু-চারটে ভালো কথা কি পড়িনি লাইফে! কী খাবে বলো।

চল বাইরে গিয়ে কিছু খেয়ে আসি।

স্যাম্পেল বলে, না, এখন বাইরে গেলে তোমার রিস্ক হয়ে যাবে।

বিজু একটু অবাক চোখে তাকায় স্যাম্পেলের দিকে।

স্যাম্পেল বলে, একটু আগেও ভোঁদাই আর কোচন ঘোরাঘুরি করছিল—আমি বরং কিছু কিনে নিয়ে আসি।

একটু চিন্তার ভাঁজ পড়ে বিজুর কপালে।

এগরোল খাবে?

সে না হয় খাব। বিজু বলে, কিন্তু...।

কিন্তু কী...?

এখানে আর কতক্ষণ থাকব?

আরে থাকো না একটা-দুটো দিন; তারপর না হয় উপায় যা হোক করা যাবে।

শালা তোদের বাড়ি এত লোক—খবর হয়ে যাবে না?

চান্স কম। স্যাম্পেল বলে, আমাদের শালা হট্টগোলের বাড়ি, কেউ কারও ধান্দা রাখে না—শুধু ফুটে গেলে খবর হয়। আমি কিন্তু সিওর, তোমার পাত্তা লাগাতেই ভোঁদাইরা ঘুরছে।

একটু গম্ভীর হয়ে যায় বিজু।

স্যাম্পেল বলে, অসিত শালা এখন খুব খতরনক হয়ে গেছে—যা ইচ্ছে তাই করছে, আর প্রসূন হাজরা ফুল শেল্টার দিচ্ছে শালাকে—এই তো ওর ছেলেরা পলাশকে বাড়ি থেকে টেনে এনে উদোম ক্যালাল...।

পলাশ! একটু অবাক হয়ে বিজু বলে, পলাশ তো ওর কাছেই ছিল!

সে তো ছিল! কিন্তু ভোঁদাইটা শালা পলাশের বোনের সঙ্গে ফল্টুবাজি মারাচ্ছিল, পলাশ প্রথমে ভোঁদাইকে সাবধান করল, তারপর অসিতকেও বলল, কোনও অ্যাকশন নেই দেখে একদিন র‌্যাম্পাট প্যাঁদাল ভোঁদাইকে—আর পরদিনই চার-পাঁচটা ছেলে নিয়ে বাড়ি থেকে পলাশকেও টেনে বের করল ভোঁদাই।

অসিত কিছু বলেনি!

অসিত কী বলবে...। স্যাম্পেল বলে, অসিতের ফুল সাপোর্ট খেয়েই তো ভোঁদাই বাড়ছে—সেখানে আবার শালা অন্য ফিলিম—অসিত হাপসাচ্ছে ভোঁদাইয়ের বউকে...শা-ললা, যাবে কোথায় তুমি!...

পলাশ তাহলে কোথায়?

দল ছেড়ে দিয়েছে; ইলেকট্রিক লাইনে কাজ করে—। তাই বলছি, তুমি বরং ভোরের দিকে বেরিয়ে এখান থেকে কাট দাও; দেশের বাড়ি-টারি গিয়ে থাকো ক'টা দিন।

কিছু বলে না বিজু। গম্ভীর মুখে বসে থাকে।

যেমন ঢুকেছিল তেমনই দরজার কাছে মাথা হেঁট করে বেরিয়ে যায় স্যাম্পেল।

...সে তার আপন ভ্রাতা-ভগিনীগুলিকে বড় ভালোবাসে...।

মাটির দাওয়ায় বসে দুলে দুলে পড়ছে বিজু। পাশে বসে বাবা। খুব উদাস চোখে মাঝে মাঝে দেখছে তাকে। ঠাকমা উঠোনের একদিকে বসে চাঁদের আলোয় নারকোল পাতা চেঁছে কাঠি বের করছে। মা কাঠের উনুনে রান্না করছে। রান্না করতে করতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে বিজুকে। কেমন গর্ব-ডগমগে চোখ-মুখ। তাদের এই নিটোল সংসারে আর একজন যেন ঢুকে পড়ছে মাঝে মাঝে। একে সহ্য হয় না তার। এর মুখটা দেখতে চায় না সে। এর সঙ্গে কথা বলতে চায় না। এই বিষগরল মেয়েছেলেটার পাল্লায় পড়ল বাবা।

গোপাল যেমন ভালো রাখাল তেমন নয়...

ওই মেয়েছেলেটা জানত বিজুর পছন্দ নয় তাকে। তাই সবসময় সিঁটিয়ে থাকত; সরে থাকত দূরে-দূরে। খুব চুপচাপ থাকত। চুপচাপ বিজুর জামাকাপড় কেচে দিত, ঘর মুছে দিত, থালায় পরিপাটি ভাত বেড়ে দিয়ে সরে থাকত একটু তফাতে। সময় পেলে চুপ করে বসে গান শুনত রেডিয়ো চালিয়ে, খুব আস্তে ভলিউম করে শুনত। আশ্চর্যের ব্যাপার, বিজুকে দেখলেই বন্ধ করে দিত রেডিয়ো।

এসব দেখে বিজুর রাগ দ্বিগুণ হয়ে দাপিয়ে বেড়াত। লন্ডভন্ড করে দিত ভেতরটা। ডালে নুন হয়েছে...তরকারিতে ঝাল বেশি—বিজু উলটে দিল ভাতের থালা, জামার দাগ ওঠেনি—বিজু আছড়ে ফেলল কাচা জামা।

তারপর সেই দিনের ঘটনা। মনে পড়লে এখনও রাগে গা রি রি করে ওঠে বিজুর। দুপুর রোদ মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরেছে সে। বাবা ভাত খাচ্ছিল। খেয়েদেয়ে উঠে পড়ল বাবা। হঠাৎ কপাল কুঁচকে গেল বিজুর। কোন আসনটা পেতে খেতে দিয়েছে বাবাকে! মরে যাবার আগে মা করত আসনটা। শেষ করে যায়নি। সেই আসনটা পাতা!

বিজু চিৎকার করল, আসন বের করেছে কে?

ও তখন জড়সড়ো হয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।

কে বের করল আসন? বিজুর গলায় বাঘের গর্জন।

আমি। খুব আস্তে শোনাচ্ছে গলাটা।

কেন হাত দেবে—কে বলেছে বের করতে?

আসলে আসনগুলো সব কেচে দিয়েছি, ভিজে, এখনও, তাই...। কাঁপছে গলাটা।

বিজু আগুনঝরা চোখে তাকিয়েছিল।

ও তখন তাড়াতাড়ি গিয়ে তুলতে গেল আসনটা। আর সহ্য হল না বিজুর। প্রচণ্ড একটা ধাক্কা দিল। ও ছিটকে পড়ল মেঝেতে। ককিয়ে উঠল একটু।

বাবা এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। দৈত্যের মতো বড়সড়ো লোকটা কেমন হ্যাবলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না যেন।

বিজু আর দাঁড়ায়নি। বেরিয়ে এসেছিল বাড়ি থেকে।

মাথার ওপর খুনে সূর্য। চোখ-মুখ-কান সব ঝলসে যাচ্ছে আগুনে। পরোয়া করছে না বিজু। সে কেবল হাঁটছে হন হন করে।

হাঁটতে হাঁটতে কখন নদীর ধারে চলে এসেছে বিজু। নদীর পাড়ে লরি দাঁড়িয়ে একটা। লরি ঘিরে একটা বচসা। প্রভাত গায়েনের লরি। বালি মাফিয়া প্রভাত গায়েন। নদীর বালি বেচে লাল হয়ে গেছে লোকটা। যতটা পারমিট নেয়, কাটে তার তিনগুণ। পাড় ধসে যায়, বাঁধ ভেঙে যায়। গেল বর্ষায় চকগণেশপুরে কতটা জমি ধসে গেল নদীতে! বিজু দাঁড়িয়ে পড়ল। এখানেও বেশি বালি কাটছে। লরি ঘিরে ধরেছে কয়েকজন। বালি কাটতে দেবে না। বিজু দেখল শান্তি খুব তড়পাচ্ছে। প্রভাত গায়েনের ডানহাত শান্তি। কিছুদিন আগে শান্তি দলবল নিয়ে চড়াও হয়েছিল রুইদাসের ওপর। নদীর চরে রুইদাসের কপি আর সরষে খেত দিয়ে বালির লরি ঢুকিয়েছিল শান্তি। রুইদাস বলতে যেতেই শান্তি নাকি হুমকে এসেছিল, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল রুইদাসকে। কথাটা শুনেছিল বিজু পানুর চায়ের দোকানে। তখন মনে হয়েছিল, ঠিক হয়েছে শালা, বুড়ো ভাম, বিয়ে করবি...শালা টেঁসে গেলি না কেন...কিন্তু এখন শান্তিকে দেখে তার গনগনে রাগে কে যেন হাপরের বাতাস দিল। দপ করে ওঠে আগুন। এই শুয়ারটা তার বাবাকে মেরেছিল। কেন মারবি শালা...লোকটা শান্ত চুপচাপ বলে মারবি নাকি...। লোকটা গুছিয়ে কিছু বলতে পারে না বলে মারবি তাকে! বিজু সোজা গিয়ে কলার ধরল শান্তির। এমন আচমকা আক্রমণ সম্ভবত ভাবতেও পারেনি শান্তি। সে প্রভাত গায়েনের খাস লোক, তার গায়ে হাত! তাই যেন একটু হকচকিয়ে গেছে। তবু ফুঁসে উঠে বলল, এই হারামজাদা, ছেড়ে দে বলছি...। বিজুর মুখে একটা ঘুষি পড়ল। শান্তির কোনও ছেলে মারল বোধহয়। গ্রাহ্য করল না বিজু। তার ব্যথাও লাগল না তেমন। সে খুব গনগনে চোখে শান্তির দিকে তাকিয়ে বলল, কী বললি, বল একবার। শান্তি ফের বলল, হারামজাদা, শেষ করে দেব কিন্তু...। বিজুর পেটে লাথি মারল কেউ। ব্যথা টের পেল সে। কিন্তু খুব একটা ভারী ঘুসি বিজু বসিয়ে দিল শান্তির মুখে। পরপর দুটো। চোখ উলটে পড়ে গেল শান্তি। পড়ে নিথর হয়ে গেল একেবারে। নাক দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিল গলগল করে।

ওই প্রচণ্ড রক্ত দেখে অসাড় হয়ে থাকা মনটা একটু যেন কেঁপে উঠল। কেউ একজন বলল, পালাও বিজুদা, শালার হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।

বিজু ছুটল। এবার ভয় লাগছে। শান্তি মরে গেলে বহুত ঝামেলা। ছুটতে ছুটতে সুকান্ত পার্ক মোড়ে চলে এল। জামা ভিজে গেছে ঘামে। আগুন বেরোচ্ছে সারা গা দিয়ে। সামনেই একটা বাস পেয়ে গেল। ভাবনা-চিন্তা না করেই উঠে পড়ল বাসে।

হাওড়া-স্টেশনে নামল বিজু। নামতে হল, কারণ, বাস আর যাবে না। অচেনা জায়গা। নেমে খানিক ভুলভাল ঘুরল এদিক-ওদিক। পকেটে টাকা-পয়সা নেই তেমন। খিদেও পেয়েছে। বেশ অসহায় বোধ করল সে। দাঙ্গাবাজ বলতে যা বোঝায় বিজু কোনওদিনই নয়। বয়সের দোষে এক সময় কিছু মারামারি করেছে এই পর্যন্ত। তবে তার ব্যথাবোধ চিরকালই কিছু কম। জামগাছ থেকে পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে গেছে, রক্তে ভিজে যাচ্ছে জামা, সে খুব স্থিতভাবে বন্ধুদের বলছে, দেখ তো কতটা গেছে। কিন্তু এখন যেন কিছুটা বিপন্ন বোধ করছে সে। শান্তি কাটা কলাগাছের মতো যেভাবে পড়ল, যেমন ভলকে ভলকে রক্ত বেরোচ্ছিল, মরে গেছে ঠিক। শান্তি মরে গেলে খুব ঝামেলা; প্রভাত গায়েন সহজ লোক নয়, ছেড়ে কথা বলবে না। তাই এদিক মাড়ানো যাবে না এখন। এই অচেনা শহরও কিন্তু খুব নিরাপদ জায়গা নয়। হাঁটতে হাঁটতে হাওড়া ময়দানে চলে এল বিজু। খিদের চোটে নাড়িভুঁড়ি ওলতোল হচ্ছে। স্থির হয়ে ভাবতে পারছে না কিছু। সন্ধে নেমে আসছে। ফাঁসিতলার মোড়ে এসে দাঁড়াল বিজু। ফুটপাথের ফলের দোকানে ছড়া কলা ঝুলছে। দামদস্তুর করে কলা কিনল ক'টা। তারপর সামনের রাস্তাটা ধরল।

হাঁটতে হাঁটতে একটা কলা খেয়েছে সবে, বিকট শব্দ হল পেছনে। পর পর তিনটে। এত কাছে বোমগুলো ফাটল যে শব্দের ধাক্কা আর আগুনের হলকা টের পেল বিজু। পায়ে তীব্র গরম ধারালো কিছু একটা যেন ঢুকে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে বিজু দেখল মাত্র কয়েক হাত দূরে একটা লোক রাস্তায় শুয়ে ছটকাচ্ছে। লোকজন পাগলের মতো দৌড়োচ্ছে। ঝপাঝপ শাটার পড়ছে দোকানে। বিজুও ছুটল। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না। সামনে আবার একটা বোম পড়ল। দুটো ছেলে খোলা রিভলভার হাতে দৌড়ে আসছে। মরিয়া বিজু বাঁ-দিকে সরু একটা গলিতে ঢুকে গেল। গলির মুখেও প্রচণ্ড শব্দ হল একটা। ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োল বিজু। তারপর এ-গলি সে-গলি দিয়ে অন্ধের মতো ছুটল কিছুক্ষণ। রাস্তা শেষ হয়ে গেল এক সময়। সামনে টিনের চালের লম্বা একটা ঘর। বিজু ঢুকে পড়ল ঘরে।

সেই প্রথম অসিতকে দেখল বিজু। সারা ঘর জুড়ে ছড়ানো লোহার টুকরো, বস্তা, ভাঙাচোরা বড় বড় মেশিন। ঘরের এক কোণে খুব অল্প পাওয়ারের আলোয় একটা দাড়িওয়ালা লোক বাঘবন্দি খেলছে। দুদিক থেকে দুটো ছেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধরেছে বিজুকে। ধরে আছে শক্ত করে।

তারপর দীর্ঘ জেরা। কয়েকটা চড়-থাপ্পড়। বিজু লক্ষ করল, এসবের মধ্যেও খুব মন দিয়ে বাঘবন্দি খেলে যাচ্ছে লোকটা। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, খেলছে একটা মহিলার সঙ্গে। এসব হইচই, মারধর এতটুকু টলাতে পারছে না তার মনোযোগ। মেয়েটা বরং কয়েকবার তাকাতে ধমকে উঠল, এই খানকি, খেলতে হয় খেল, না হলে ফোট।

পায়ে সপ্লিনটার ঢুকেছিল বিজুর। ওখান থেকে বাইকে করে দুটো ছেলে তাকে নিয়ে এল অন্য একটা ডেরায়। আসার সময় একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখেছিল বিজু। বাঘবন্দি খেলা শেষ হতে, লোকটা সটান শুয়ে পড়ল মেয়েটার কোলে। সবাই বেরিয়ে এল ঘর থেকে।

রাতের দিকে একটা ডাক্তার এসে ব্যান্ডেজ করে দিল বিজুর ক্ষত। রুটি-তরকারি এনে দিল একটা ছেলে।

আশ্রয় জুটে গেল বিজুর। হাওড়া শহরের নতুন একদল ছেলের মধ্যে মিশে গেল বিজু।

স্যাম্পেল ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে এগরোলের গন্ধ পেল বিজু। খিদেটা যেন সঙ্গে সঙ্গে হেঁকে উঠল পেটের ভেতর। গোগ্রাসে দুটো এগরোল খেয়ে নিল বিজু।

সিগারেট ধরিয়ে স্যাম্পেল বলল, কিন্তু বস, মিনি একটা কেলো হয়ে গেছে যে!

কী? সতর্ক গলায় বলে বিজু।

তুমি এদিকেই কোথাও আছ—আঁচ পেয়েছে অসিত।

তাই নাকি!

হ্যাঁ। স্যাম্পেল বলে, এই মাত্র ভোঁদাইয়ের সঙ্গে দেখা হল, তোমার কথা জিগ্যেস করছিল।

সিগারেট ধরাতে যাচ্ছিল বিজু। থেমে গেল।

আমি শালা একটা চাল খেলেছি। বলেছি, তুমি ভাইলালের ডেরায়।

কী বলল শুনে?

খেয়েছে বলেই মনে হল—বলেছি পিলখানার কাছে তোমাকে দেখা গেছে, সঙ্গে ভাইলালের লোক।

খেয়ে গেল?

গেল; কারণ ওদের আন্দাজ ভাইলালের সাপোর্ট খেয়েই তুমি কাজটা করেছ—না হলে, তোমার এত ধক হবে না।

হুঁ। গম্ভীর মুখে বলে বিজু।

এখন একটু টাইম পাওয়া যেতে পারে। স্যাম্পেল বলে, তার আগেই তোমাকে কাটতে হবে কিন্তু...।

এতক্ষণ হাতে ধরে থাকা সিগারেটটা ধরায় বিজু।

স্যাম্পেল বলে, ভোঁদাই শালা আবার ওই মেয়েটার কাছে গিয়ে হুড়ুমবাজি করে এসেছে।

কোন মেয়েটা?

আরে, তাড়া খেয়ে যে মেয়েটার ঘরে ঢুকেছিল তুমি—বিনোদ মল্লিক লেনের কাছে যে মেয়েটা ভাড়া থাকে।

খুব অবাক হয়ে বিজু বলে, ওর কাছে কেন?

ওদের আইডিয়া মেয়েটা তোমার চেনা, জেনেবুঝেই তোমাকে শেলটার দিয়েছিল। আমার মনে হয় তুমি দেশের বাড়ি চলে যাও, অসিত অতদূর পাত্তা করতে পারবে না।

চুপ করে বসে থাকে বিজু। সিগারেটে টান দেয় একটা। সেই বাড়ি ছেড়েছিল, তারপর আর যাওয়া হয়নি। জেল হয়েছে খবর পেয়ে বাবা দেখা করতে এসেছিল জেলে। বিজু কথা বলেনি। এখন বাড়ির দিকে কোনও বিপদ নেই। শান্তি শালা মরেনি। একবেলা হসপিটালে থেকে দিব্যি ফিট হয়ে যায়। তার ওপর প্রভাত গায়েন একেবারে ধস খেয়ে গেছে। সেরকমই খবর পেয়েছে সে। পুলিশ রেড হয়েছিল প্রভাতের বাড়ি। প্রচুর গাঁজা পাওয়া গেছে। প্রভাত ফেরার। বালির কারবারও বন্ধ। শান্তি রোডের ধারে পান-বিড়ির দোকান দিয়েছে। সুতরাং, ওদিকে গেলে কোনও বিপদ নেই।

বস, মেয়েটা কি একদম অচেনা তোমার?

বিজু তাকায় স্যাম্পেলের দিকে। বলে, কী মনে হয় তোর?

না, একদম আনকা একটা মেয়ের ঘরে এতক্ষণ ছিলে—তাই বলছি...।

মেয়েটার কথা মনে পড়ে যায় বিজুর। মেয়েটা বলতে গেলে কিছু উপকারই করেছে তার। হয়তো ভয়েই করেছে। খুব কাকুতি-মিনতি করছিল মেয়েটা। বলছিল, মরে যাবে; মুখ বাঁধলে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে... নি:শ্বাস নিতে পারছে না। মেয়েটাকে তাই আর বাঁধেনি বিজু। আরও বেশ কিছুক্ষণ ছিল সে মেয়েটার ঘরে। খুব বাধ্য মেয়ের মতো চুপ করে বসে ছিল মেয়েটা। জড়সড় হয়ে বসে ছিল। চোখ-মুখে প্রবল আতঙ্ক। চলে আসার সময় বিজু আবার বাঁধতে গেল মেয়েটাকে। মেয়েটা কান্নাকাটি শুরু করল। বিজু বলল, কিন্তু আমি বেরিয়ে গেলেই তো চিৎকার করবে?

না। মাথা নেড়ে জানিয়েছিল মেয়েটা।

চেঁচামেচি করলে কিন্তু বহুত খারাপ হয়ে যাবে...।

মেয়েটা ঘাড় নেড়েছিল।

তোমায় বাইরে যেতে হবে; তখন কিন্তু ছাড়ব না।

মেয়েটা চুপ করে তাকিয়েছিল শুধু। বিজু ভাবল, এখন বাঁধতে গেলে যদি চিৎকার করে তবে বিপদ। তার চেয়ে রিস্ক নেওয়া যাক। আরও একপ্রস্ত হুমকি দিয়ে চলে এসেছিল বিজু।

মেয়েটা চিৎকার করেনি। হয়তো ভয়েই করেনি। বিজুর হঠাৎ মনে হল, চিৎকার করলে হয়তো মেয়েটা নতুন ঝামেলায় পড়ত না। চিৎকার করেনি বলেই ভোঁদাই হুজ্জুতি করেছে ওর কাছে। ভাবছে, জেনে বুঝেই শেলটার দিয়েছে বিজুকে। না হলে, চলে যাবার পরই নিশ্চিত চিৎকার চেঁচামেচি করার কথা।

অসিত জানল কী করে, আমি ওখানে ঢুকেছিলাম?

স্যাম্পেল বলে, কেউ মনে হয় তোমাকে বেরোতে দেখেছে, খবর হয়ে গেছে তারপর।

হুঁ।—বলে আবার চুপচাপ সিগারেটে টান দেয় বিজু। মেয়েটা কথা রেখেছে। হয়তো ভয়েই রেখেছে। কেউ ঠিক দেখেছে বিজু নির্বিবাদে চলে গেল মেয়েটার ঘর থেকে। কোনও চিৎকার-চেঁচামেচি হল না। তাই নতুন করে বিপদে পড়েছে মেয়েটা। অসিতের নৃশংসতা খুব ভালো করে জানে বিজু। মেয়ে দেখলে চকচক করে ওঠে চোখ। মেয়েটাকে দেখতে মন্দ নয়। ভোঁদাই গেছে মেয়েটার কাছে। আবার যাবে। অসিতও যাবে হয়তো। মেয়েটা বাঁচবে না। চিৎকার করলে কিন্তু বিপদে পড়ত না মেয়েটা। হয়তো ভয়েই করেনি। তবু করেনি তো! বাঁচবে না বেচারি। ভোঁদাই-অসিত বাঁচতে দেবে না ওকে।

পলাশ এখন থাকে কোথায়? স্যাম্পেলের দিকে তাকিয়ে বলে বিজু।

যেখানে থাকত—মেলাপাড়ায়। কেন?

না, এমনি।

অন্য কিছু ধান্দা করছ নাকি?

না, তেমন কিছু নয়।

স্যাম্পেল বলে, আমার মনে হয় এখন তোমার এলাকা থেকে কেটে যাওয়া ভালো,—অসিত হারামির বাচ্চাটা সব পারে।

জানে বিজু। আর জানে বলেই মনে হচ্ছে এখানে তার থাকা দরকার। খুব দরকার।

তখন প্রায় মধ্যরাত। দাশনগর স্টেশন লাগোয়া বস্তিতে চুপিসারে ঢুকল একটা লোক। গোটা এলাকা ঘুমিয়ে কাদার তাল হয়ে আছে। একটা মাতাল শুধু রাস্তার পাশে উপুড় হয়ে পড়ে বিড়বিড় করছে। কয়েকটা কুকুর চিৎকার করে প্রতিবাদ করল লোকটার অনধিকার প্রবেশের বিরুদ্ধে।

খুব দ্রুত আর লঘু পায়ে এগিয়ে গেল লোকটা। এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটা ঘরের সামনে দাঁড়াল। তারপর এগিয়ে গিয়ে ধাক্কা দিল দরজায়।

সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে কেউ একজন চিৎকার করে বলল, কে!

পলাশ, আমি রে! চাপা গলায় লোকটা বলল, দরজা খোল, কথা আছে।

হ্যাঁ বলুন, কী যেন বলছিলেন!

ওই তো, লোকটা প্রথম যেদিন এল সেদিনই খুব মুখ খারাপ করছিল...খারাপ খারাপ গালাগালি...।

লোকটার নাম কী?

ভোঁদাই।

হুঁ—ভোদাই কী করে জানালেন?

নিজেই তো বলছিল।

হুঁ—ভালো নাম কী?

তা তো জানি না।

হুঁ—দেখতে কেমন?

দেখতে—? এই ধরুন; কীরকম বলব—!

যা: বাবা, দেখেছেন তো আপনি, দিনের আলোয় স্পষ্ট দেখেছেন, আপনাকেই তো বলতে হবে কীরকম দেখতে, আপনারা পুলিশের কাছে আসবেন, অথচ ঠিকঠাক ইনফরমেশন দিতে পারবেন না, তারপর বলবেন—পুলিশগুলো সব হারামির বাচ্চা...!

এবার মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল রানু। ভয়ঙ্কর বিরক্ত। এখন মনে হচ্ছে থানায় না এলেই ভালো হত। খুব রাগের মাথায় চলে এসেছে। প্রথম দিনেই বেশ রাগ হয়েছিল। তবু কিছু করেনি সে; সহ্য করে নিয়েছিল। আসলে সকালের ওই ঘটনার পর ভেতর ভেতর এতটাই অগোছালো হয়ে গিয়েছিল, এমন ঘেঁটে গিয়েছিল মাথা যে ঠিকমতো বিচারবুদ্ধি কাজ করছিল না তখন। তার ওপর ভোঁদাই এল বিকেলের দিকে। রানু তখন স্টোভে চায়ের জল বসিয়েছে। ওই ছেলেটা চলে যাবার পর থম হয়ে বসেছিল সে। চোখের সামনে বারবার সেই দৃশ্য ভেসে উঠছে। পিঠে ব্যথা, এখানেই ধাক্কা মেরেছিল ছেলেটা। জোরেই মেরেছিল। রানু হুমড়ি খেয়ে পড়তেই চেপে ধরেছিল মুখ। কী লোহার মতো শক্ত হাতগুলো। গায়েও প্রচণ্ড শক্তি। একটুকু নড়তে পারেনি রানু। অজ্ঞান হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। জ্ঞান আসার পর দেখল ঘরের এক কোণে পড়ে আছে সে—হাত বাঁধা, মুখ বাঁধা। ছেলেটা বসে আছে সামনে। তাকিয়ে দেখছে তার দিকে। কেঁপে উঠল রানু। খেয়াল হল, বুকের কাপড় সরে গেছে। সামনেই বসে আছে ছেলেটা। কিন্তু কিছু করার নেই। আশা ছেড়ে দিয়েছিল রানু। অপেক্ষা করছিল কখন নেকড়ের মতো ছেলেটা ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর। খাবলে খুবলে খাবে তাকে। নন্দিতার মতো দশা হবে তার। হাত-পা কাঁপছিল, শুকিয়ে কাঠ গলা। কান্না আসছিল খুব। দম বন্ধ হয়ে আসছিল যেন। সে প্রার্থনা করছিল, ছেলেটা কিছু করার আগেই যেন মরে যায় সে। চোখ বুজে প্রাণপণে মৃত্যুকে ডাকছিল রানু।

কিন্তু মরণ তো হল না তার। এবং আশ্চর্য কাণ্ড! কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ল না তার ওপর। অপেক্ষা করে করে এক সময় চোখ খুলল সে। জল চাইল ইশারা করে। বাঁধন খুলে জল খেতে দিল ছেলেটা। তাই নয়, একবার বলতেই আর বাঁধল না তাকে। যতক্ষণ ছিল খুবই উদবেগের মধ্যে ছিল ছেলেটা। বারবার জানলা খুলে বাইরেটা দেখছিল। আতঙ্কের মধ্যে ছিল রানুও। মনে হচ্ছিল যে-কোনও সময়ই ও ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর, ছিঁড়ে খুবলে শেষ করে দেবে। তার পর ছেলেটা যখন চলে গেল, সত্যিই চলে গেল, তখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না রানু। বিস্ময়ের ধাক্কা এত প্রবল ছিল যে, চিৎকার চেঁচামেচি করার কথা মাথায় আসেনি। রানু পরে ভেবে দেখেছে, ভয় অথবা ছেলেটার প্রতি কৃতজ্ঞতা—তার মেয়েমানুষিকে দলে-পিষে না দেবার কৃতজ্ঞতা—কোনওটাই নয়; সে চিৎকার করেনি শুধুমাত্র বিস্ময়ের দমকে। অগাধ বিস্ময়। সে তখন শুধু একটা কথাই ভাবছিল; ভাবছিল, একেই কি ভাগ্য বলে, এই কি ঈশ্বরের করুণা! ঠাকুর-ঈশ্বরে ভক্তি-ভয় তার কোনওদিনই নেই। বরং শাশুড়ি আর জায়ের নিত্য পুজোপাঠ দেখে, নানা আচার-বিচার দেখে, তার মনে বিক্ষোভই ছিল শুধু এতদিন। মনে হয়েছে, এই তো ভক্তের ছিরি! এই তো তাদের চরিত্র। কী হয় অমন পুজো-অর্চনায়! কিন্তু এখন, এই অলৌকিক নিস্তার পাবার পর, তার চোখে জল আসছিল শুধু। খুব চেষ্টা করেও রোধ করতে পারছিল না সে। হায়, স্মরণ তো করি না তোমায়; বরং যখন-তখন ক্ষোভ অভিযোগের ঝাঁপি উপুড় করে দিই; তুমি বোধহয় শুধু স্মিত হাসি হেসে, সুন্দর চোখে তাকিয়ে থাকো, তাকিয়ে থাকো আর ক্ষমা করে দাও...।

তাই চিৎকার করেনি রানু, শুধু আঁচলে চোখ মুছছিল বার বার। শেষ কান্না কবে কেঁদেছে তার নিজেরই মনে পড়ে না আজ। সে তখন নি:শব্দে কাঁদছিল।

কিন্তু কী করে যেন রটে গেল সব। একজন আশ্রয় নিয়েছে তার কাছে, তারপর অনেকক্ষণ থেকে চলে গেছে।

বিকেলের দিকে সেই লোকটা এল। কালো, মাঝারি উচ্চতা, বড় বড় চুল, চোখ, চোখগুলো খুব ধূর্ত আর লোভী। এই চোখ দেখলে গা শিউরে ওঠে যেন। লোকটা ঘরে ঢুকেই চারদিকে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল একবার; তারপর রানুকে দেখতে লাগল—দেখা মানে, শরীরের কাপড়-চোপড় সরিয়ে তল্লাশি করার মতো দেখা। খুব অস্বস্তি হচ্ছিল রানুর। আঁচল টেনে তাড়াতাড়ি ঢেকেঢুকে নিচ্ছিল নিজেকে। একটু সামলে নিয়েই রানু বলল, আপনি কে?

কোনও উত্তর না দিয়ে রানুকে মেপেই যেতে লাগল লোকটা।

একেবারে ঘরে ঢুকে এলেন যে! গলায় একটু জোর আনার চেষ্টা করল রানু।

এতটুকু পাত্তা না দিয়ে বিছানায় ঝপ করে বসে পড়ল লোকটা।

এবার একটু গলা চড়াল রানু—আমি কিন্তু লোক ডাকব...বলা-কওয়া নেই, একেবারে সোজা ঘরে...!

লোকটা খুব সরু দৃষ্টিতে তাকাল রানুর দিকে। সেই দৃষ্টির সামনে একটু কুঁচকে গেল রানু। তবু গলার জোর ধরে রেখেই বলল, বেরিয়ে যাবেন, না কি—?

ওহ কী গরম আজ—বলে হঠাৎ লোকটা গেঞ্জিটা টেনে তুলে দিল বুকের ওপর। সে দিকে তাকাতেই স্থির হয়ে গেল রানু। ভীষণ ঠান্ডা গুঁড়ি গুঁড়ি লোহার বল যেন গড়িয়ে পড়তে লাগল শরীর দিয়ে। লোকটার কোমরে একটা রিভলভার গোঁজা।

লোকটা খুব শান্ত গলায় বলল, একটু চা হবে না, এই সময়টা একটু চা খাই আমি।

রানুর মাথায় আর কিছু ঢুকছে না। সে শুধু বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে ওই কালো অস্ত্রটার দিকে।

বিজু কে হয়?

রানু একটু অবাক হয়ে তাকাল লোকটার দিকে। তার দৃষ্টি থেকেই পরিষ্কার প্রশ্নটা বুঝতে পারেনি সে।

কে হয় বিজু? এবার একটু ধমকের গলায় বলল লোকটা।

বিজু বলে আমি কাউকে চিনি না। বলতে বলতে রানু বুঝল গলা শুকিয়ে যাচ্ছে তার।

তাই নাকি, উরিশশালা...!

চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল রানু। চায়ের জল টগবগ করে ফুটছে। স্টোভটা নিভিয়ে দিল সে।

কী হল, চা হবে না? কোমরে গোঁজা রিভলভারটা টেনে বের করতে করতে লোকটা বলল, তুই কি লাইনের মেয়েছেলে নাকি মাগি, যাকে-তাকে ঘরে ঢোকাস...!

কী আজেবাজে কথা বলছেন! খুব জোরে বলতে চাইল রানু। কিন্তু জোর এল না গলায়।

আজেবাজে কথা! লোকটা চাপা অথচ হিংস্র গলায় বলল, দুপুরে সে খানকির ছেলেটা তাহলে এসেছিল কেন এখানে?

গলার হিংস্রতায় একটু শিউরে উঠল রানু। অসহায় চোখে দরজার দিকে তাকাল। পাশের ঘরের বউটা রাস্তার কল থেকে বালতি ভরতি জল নিয়ে ফিরল। যাবার সময় আড়চোখে তাকিয়ে গেল ঘরের দিকে।

বউটাকে দেখে কিছুটা যেন সাহস পেল রানু। গলায় একটু জোর এনে বলল, আমার কাছে দুপুরে কেউ আসেনি।

আবার মিথ্যে কথা! জোরে ধমক দিয়ে লোকটা বলল, তাহলে এটা খেয়েছে কে?

মেঝেতে পড়ে থাকা একটা সিগারেটের টুকরো কুড়িয়ে রানুর মুখের সামনে ধরল লোকটা।

রানু চুপ করে তাকিয়ে থাকল সিগারেটের টুকরোটার দিকে। যাবার আগে একটা সিগারেট ধরিয়েছিল সেই ছেলেটা। এটা তারই অবশেষ। খুব অব্যর্থ প্রমাণ তুলে ধরেছে লোকটা।

কী হল, কী ভাবছিস—? লোকটার ঠোঁটের কোণে যেন শ্লেষের মৃদু হাসি।

রানু একটু বেপরোয়াভাবে বলল, আমার স্বামী কাল এসেছিল, খেয়েছে।

মাগি তোর মরার শখ হয়েছে দেখছি! ফের হিসহিস করে উঠল লোকটা—আমাকে চিনিস না, তুলে নিয়ে গিয়ে তোকে গ্যাং রেপ খাওয়াব, তার পর লঙ্কাবাটা ভরে দেব, তোর স্বামীর সঙ্গে কোনও রিলেশন নেই জানি আমি, আমাদের কাছে সব খবর আছে—দশ গুনব, তার মধ্যে বলবি কি, বিজু কে—?

এবার ভেঙে পড়ল রানু। সকালের ঘটনাটা আদ্যোপান্ত বলে দিল লোকটার কাছে। ভালো বুঝতে পারছিল এ লোকটা সেই ছেলেটার মতো নয়; যে-কোনও কাজ, খুন হোক বা রেপ, হাই তুলতে তুলতে করে ফেলতে পারে; রানু সম্পর্কে অনেক কিছু জানে লোকটা; এর কাছে গোপন করলে ফল ভালো হবে না।

তবু লোকটার সন্দেহ যায় না। বলে, অচেনা বলছিস যদি, তবে চলে যাবার পর চিৎকার করিসনি কেন—আর্মস কিছু ছিল সঙ্গে...?

অ্যাঁ! রানু একটু অবাক হয়ে বলে।

সঙ্গে মেশিন-টেশিন ছিল, এই আমার মতো? নিজের রিভলভারটা দেখায় লোকটা।

না, দেখিনি তো!

ঠিক বলছিস?

রানু ঘাড় নাড়ে—হ্যাঁ।

কী যেন একটু চিন্তা করে লোকটা। তার পর টপ করে উঠে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।

তার পরের ঘটনাটা ঘটল গতকাল রাতে।

ডিউটি থেকে ফিরে রান্না বসিয়েছে রানু। হঠাৎ আবার সেই লোকটা। আগের দিন ছিল খোঁচা খোঁচা দাড়ি। এখন একেবারে পরিষ্কার গাল। প্যান্টের ওপর একটা লাল পাঞ্জাবি। মদ খেয়েছে মনে হয়—চোখগুলো লাল, গন্ধও ছাড়ছে অল্প। বিছানায় পা তুলে বসল লোকটা; সিগারেট ধরিয়ে বেশ মৌজ করে টান দিয়ে বলল, কী রান্না হচ্ছে আজ?

রানু খুব বিরক্তির সঙ্গে বলল, দেখুন আমি তো আপনাকে যা বলার বলে দিয়েছি, সত্যি কথাই বলেছি সব, কেন তবু বারবার—!

লোকটা মাঝপথে বলে উঠল, জানি তো, আমি কি বলেছি তুমি মিথ্যে কথা বলছ; সে শালার ট্রেস আমরা করে ফেলেছি, ফিনিশ হয়ে যাবে শালা দু-এক দিনের মধ্যেই; ও কেস মিটে গেছে।

তাহলে আর কী জানতে চান?

সিগারেটে লম্বা একটা টান দেয় লোকটা। তারপর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে, জানতে আর কী চাইব; তেমন কিছু জানার নেই—কই বললে না তো কী রান্না করছ আজ!

লোকটার দিকে ভালো করে একবার তাকায় রানু। লোকটা লোভীর মতো গিলছে তাকে। খুব নিস্পৃহ গলায় রানু বলে, ডাল, ভাত আর ডিমসেদ্ধ।

বাহ! কী ডাল?

মুসুর।

আমার অবশ্য মুগ ডাল ভালো লাগে।

চুপ করে থাকে রানু। চুপচাপ ডালটা হাতা দিয়ে একটু নেড়ে দেয়।

সকালে কী রান্না করলে? একটু দেঁতো হাসি হেসে বলে লোকটা।

সকালে রান্না করি না আমি।

সে কী, খাও কী তাহলে।

আবার চুপ করে থাকে রানু। ডাল ঘাঁটে।

সারাদিন উপোস নাকি?

চুপচাপ ডাল ঘাঁটতেই থাকে রানু।

যাহ শালা! লোকটা যেন একটু হতাশ গলায় বলে ওঠে, কথা বলবে না নাকি আমার সঙ্গে, আমি কিন্তু আজ খারাপ কিছু ব্যবহার করেছি, বলতে পারবে না—সেদিন অবশ্য একটু মুখ খারাপ করে ফেলেছি—আসলে মটকা সেদিন বহুত তেতে ছিল, বিজু শালাটা অসিতদার গায়ে হাত তুলেছে—ফিনিশ হয়ে যাবে শালা, আজ নয় কাল, শালা নেমকহারাম; অসিতদাই একদিন শেলটার দিয়েছিল কুত্তাটাকে—মাইরি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আজ; সেদিনের কথা আর মনে রেখো না।

রানু ডাল নাড়তে নাড়তেই বলে, ঠিক আছে, আপনি আসুন এবার, আমার অনেক কাজ।

করো না তোমার কাজ। লোকটা ফের দেঁতো হাসি হেসে বলে, আমি কি তোমায় ডিস্টাব করেছি!

সে তো একটু করছেন! কিছুটা রুক্ষভাবে রানু বলে, দেখছেন, একটাই ঘর আমার, নিজেরই নড়াচড়া করার জায়গা নেই—তারপর এই রাত্তিরবেলা—লোকে দেখলে কী বলবে বলুন?

আর লোকে কিছু বলবে না। মুখে হাসিটা ধরে রেখেই লোকটা বলে, ভোঁদাইকে এখানে সবাই চেনে, জানে ভোঁদাই মেয়েদের হেবি ভক্তি-শ্রদ্ধা করে—ভোঁদাইয়ের ক্যারেকটারে ফল্ট কিছু নেই—। বলছি, পুজোয় কী করছ তুমি—?

বেশ বিরক্তি নিয়েই রানু বলে, কী আবার করব, ডিউটি করব!

বাবা, পুজোয় ডিউটি, ছুটি নেই!

আমাদের আয়ার কাজে ছুটি থাকে না।

তুমি তো 'সেবায়ন' সেন্টারে কাজ করো?

একটু অবাক চোখে লোকটার দিকে তাকাল রানু। এত সব খবর লোকটা জানল কী করে! মনে পড়ে গেল, লোকটা বলেছিল বটে,—আমাদের কাছে সব খবর থাকে; এমনকী স্বামীর সঙ্গে যে রানুর সম্পর্ক নেই সেটাও জানে লোকটা।

রানু ডালটা স্টোভ থেকে নামিয়ে বলল, হ্যাঁ।

আরে একটা দিন ছুটি নাও না; বলো তো আমি ব্যবস্থা করে দিই, সেবায়নে আমার চেনাজানা আছে—।

রানু ব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে, না না। কিছু বলতে হবে না কোথাও!

লোকটা বলে, কাজ তো সারাজীবনই আছে, পুজোর ক'টা দিন—চলো একদিন দুজনে মিলে ঠাকুর দেখে আসি।

খুব কঠিন স্বরে রানু বলে, না।

কেন নয়, আমাকে কি বিশ্বাস হয় না তোমার—মানুষকে পেটের জন্য অনেক কাজ করতে হয়, সেদিন মাইরি মটকা বহুত তেতে ছিল—ওসব মনে রাখলে হয় না।

রানু সোজা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি যাবেন, না হলে কিন্তু খুব খারাপ হবে বলে দিচ্ছি—এক্ষুনি বেরিয়ে যান।

কথার প্রচণ্ড ঝাপটে লোকটা একটু যেন থমকে যায়। কিন্তু সে মাত্র মুহূর্তের জন্যে। তারপরেই অশ্লীল একটা হাসি হেসে বলে, রেগে গেলে কিন্তু তোমার গলাটা হেবি সেক্সি লাগে!

কেরোসিন ভেজা কাপড় যেমন দপ করে জ্বলে ওঠে তেমনই কিছু একটা জ্বলে ওঠে রানুর মাথার মধ্যে। সেই আগুনের হলকা পুড়িয়ে দেয় চোখ-মুখ-কান। ভীষণ জ্বালা! কিছু একটা করা দরকার। বড্ড বাড়াবাড়ি করছে লোকটা। আর বাড়তে দিলে বিপদ। তার আগেই কিছু একটা করতে হবে। কী করবে লোকটা! গুলি চালাবে, মেরে ফেলবে? মারুক। মরেই তো আছে সে। কতবার তো মরতে চেয়েছে। এভাবে ঘেন্নার জীব হওয়ার চেয়ে মরণ হোক।

তাই চিৎকার করে ওঠে রানু—এক্ষুনি চলে যান, বেরিয়ে যান—বেরিয়ে যান বলছি—আমি কিন্তু চেঁচাব!

প্রথমে একটু অবিশ্বাস ফুটে ওঠে লোকটার চোখে। তারপর ক্রোধ। চাপা গলায় বলে, চুপ কর খানকি, টুঁটি ছিঁড়ে নেব।

এবার আরও জোরে চিৎকার করে রানু। সোজা উঠে দাঁড়ায়; তারপর হাতের হাতাটা ছুড়ে মারে লোকটার দিকে। বুকে গিয়ে লাগে হাতাটা।

লোকটার চোখে-মুখে তখন দগদগে ক্রোধ। ঘাড় শক্ত হয়ে উঠেছে তার। প্রচণ্ড মুঠো পাকাচ্ছে দুহাতে, এগিয়ে আসতে চায় লোকটা। কিন্তু এই রানু, কোণঠাসা বেপরোয়া রানু, চকিতে ফুটন্ত ডালের কড়াটা তুলে ছুড়ে দেয় সামনে। লোকটা দ্রুত সরে যায়। কিন্তু পুরোপুরি এড়াতে পারে না। কিছুটা গরম ডাল ছিটকে পড়ে গায়ে।

রানু চিৎকার করে, কুত্তা, কুত্তার বাচ্চা—মেরে ফেলব...

একটু যেন যন্ত্রণা ফুটে ওঠে লোকটার মুখে। ভয়ও।

পাশের ঘরের লোকটা আর বউটা দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আরও কাদের যেন গলা পাওয়া যাচ্ছে জানলার বাইরে।

এদিক-ওদিক তাকায় লোকটা। গরম ডালে ভেজা নিজের জামাটা দেখে। তারপর চাপা গলায় গালাগালি করতে করতে দৌড়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।

থরথর করে কাঁপছে রানু। পাদু-টো কেমন অবশ হয়ে আসছে। ঘরময় পাতলা ডাল। গরম ডালের গন্ধ আসছে। ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ে রানু।

তারপর সারারাত টেনশনের মধ্যে কেটেছে। বড় রাস্তার ওপরে যে পুজো হয় সেই পুজো কমিটির ছেলেগুলো চাঁদা চাইতে এসেছিল। ভাগ্যিস এসেছিল সময়মতো! না হলে হয়তো খুনই হয়ে যেত সে। তারা বলেছিল, থানায় যেতে। কিন্তু তখন ঠিক মাথা কাজ করছিল না রানুর। সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সে। জেগে কাটিয়েছে সারা রাত। তক্তোপোশটা ঠেলে দরজার সঙ্গে সেঁটে নিয়েছিল। ভেতর থেকে একটা তালাও লাগিয়ে দিয়েছিল দরজায়। হাতের কাছে বঁটিটা রেখে সারারাত জেগে বসেছিল। কেবলই মনে হয়েছে, এই বুঝি এল লোকটা। সামান্য শব্দে চমকে চমকে উঠেছে। যদিও পুজো কমিটির ছেলেগুলো বলেছিল, চিন্তা করবেন না, আমরা আছি। সারারাত নাকি প্যান্ডেলের কাজ হবে। কিন্তু এখান থেকে বড় রাস্তা বেশ দূরে; গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও শোনা যাবে না।

সকালে উঠে ব্রাশ করছিল রানু। চোখ দুটো জ্বালা করছে। ডান হাতের চেটোতে টসটসে একটা ফোসকা। গরম কড়াটা চেপে ধরেছিল কাল—রাগের মাথায় খেয়াল ছিল না কড়াটা গরম। পাশের ঘরের বউটা এগিয়ে এল। বলল, কাল আর কিছু হয়নি তো রাতে?

না।

আমরা তো খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম—কী জানি একা মানুষ, কখন কী হয়—থানায় যাবে নাকি?

রানু বলল ভাবছি।

গেলেও লাভ হবে না কিছু; এদের সব থানাতেও যোগসাজশ থাকে। বরং উলটে বিপদ বাড়বে।

কিছু বলল না রানু। কথা বলতে ভালো লাগছিল না তার।

বউটা ফের বলল, তোমার দাদা বলছিল, থানা-পুলিশ হলে আমরা কিন্তু সাক্ষী-টাক্ষি দিতে পারব না, লোকটা খুব ডেনজারাস।

একটু বিরক্তির সঙ্গে রানু বলল, না, না, আপনাদের সাক্ষী দিতে হবে না।

বউটা যেন একটু স্বস্তি পেল। বলল, এ কি তোমার চেনাজানা কেউ?

রানু অবাক হয়ে বলল, না তো—কেন?

না, আগের দিন দেখলাম তোমার ঘরে বসে গল্প করছে, তাই...।

গল্প করছে! বেশ বিরক্তির সঙ্গে রানু বলে, গল্প করবে কেন, সেদিনই অসভ্যতা করছিল।

ও। কাউকে বলোনি তো সেদিন, তাই...।

বউটা চলে গেল। ভাবভঙ্গি থেকে পরিষ্কার রানুর কথা বিশ্বাস করেনি।

রানু সিদ্ধান্ত নেয় থানায় যাবে। হোক বিপদ, তবু যাবে। এখনও সেদিনের কথা ভাবলে গা রি-রি করে ওঠে; ঘেন্নায় কুঁকড়ে যায় ভেতরটা।

কিন্তু যত সহজ ভেবেছিল, থানা জায়গাটা সহজ নয়। বড়বাবু জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত। মেজবাবু কোথায় যেন গেছেন। ছোটবাবুর ঘরে মেছো বাজারের মতো ভিড়। বন্দুকধারী একটা পুলিশ বাইরের বেঞ্চে অপেক্ষা করতে বলল। বসে বসে পায়ে ঝিনঝিনে ধরে গেল রানুর; তবু ডাক আর আসে না। মাঝখান থেকে ডিউটি কামাই হল। ফোন করে জানিয়ে দিতে হল, আজ যেতে পারবে না। একদিনের টাকা কাটা গেল। এসব যত ভাবছিল রাগটা মাথার মধ্যে পাকিয়ে উঠছিল তত। শেষে ডাক যখন পড়ল তখন খিদে তেষ্টা আর রাত জাগার ক্লান্তি তাকে বেশ কাহিল করে দিয়েছে। তার ওপর মধ্যবয়সি এই পুলিশ অফিসারের ট্যারাবাঁকা কথা, অশ্লীল মন্তব্য।

তবু মেজাজ শান্ত রেখে রানু বলল, দেখুন, তখন আমি এত ভয় পেয়ে গেছি যে ঠিক খুঁটিয়ে লক্ষ করা হয়নি, যেটুকু মনে আছে বলছি।

বলুন।—বলে, রানুর বুকের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা সিগারেট ধরাল পুলিশ অফিসার।

রানু এখন এখান থেকে যেতে পারলে বাঁচে। তাই যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি লোকটার বর্ণনা দিল। কিন্তু পুলিশ অফিসার আর সহজে ছাড়তে চাইছে না, হাজার প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করে মারছে তাকে। বাপের বাড়ি কোথায়...স্বামী কী করে...একা থাকেন কেন...শ্বশুরবাড়িতে আর কে কে আছে...ওই ছেলেটাকে আগে থেকে চিনতেন কি না...ঠিক করে বলুন...মনে হচ্ছে আপনি কিছু গোপন করে যাচ্ছেন...পুলিশের কাছে গোপন করলে ফল কিন্তু ভালো হয় না, তখন বড় বিপদে পড়বেন...ছেলেটাকে চিনতেন না বলছেন, তাহলে ও চলে যাওয়ার পর চিৎকার চেঁচামেচি করেননি কেন; বিশেষ করে সঙ্গে যখন কোনও অস্ত্র ছিল না...এইখানেই তো আপনার কথা একটু গন্ডগোলে মনে হচ্ছে...পুলিশের কাছে কিন্তু সব খবর চলে আসে...ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

বিরক্তি চেপে যত সংক্ষেপে সম্ভব প্রশ্নগুলোর উত্তর দিল রানু। চলে আসার সময় অফিসারটা গম্ভীর গলায় বলল, ঠিক আছে, সাবধানে থাকবেন, আর কিছু নজরে পড়লেই আমাদের জানাবেন।

বাইরে বেরিয়ে হাঁপ ছাড়ল রানু। থানা এত ভয়ানক জায়গা জানা ছিল না। সবচেয়ে বিরক্তিকর ওই অফিসারটা। সেদিনের ওই নোংরা লোকটার সঙ্গে বেশি কিছু তফাত নেই এর। মুখের ভাষা, চোখের দৃষ্টি, কোনও কিছুর মধ্যেই ভরসা করার মতো কিছু নেই। বরং ভয়ের যথেষ্ট কারণ আছে।

প্রচণ্ড খিদে পেটের মধ্যে দাপাদাপি করছে। বাড়ি গিয়ে রান্না চড়াতে হবে। খেতে এখনও অনেক দেরি। একটুও ইচ্ছে করছে না রান্না করতে। রাস্তার পাশে একটা দোকান থেকে হাফ পাউন্ড পাঁউরুটি কিনল সে। এটাতে ও চালিয়ে দেবে আজকের দিনটা।

বুকের মধ্যে চাপা কষ্ট হচ্ছে একটা। অন্যমনস্ক রানু হাঁটতে হাঁটতে গলির মধ্যে ঢুকে পড়ল। বড় নোংরা গলি। একপাশে ভটভটে ড্রেন। প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। পলেস্তারা খসা কালচে উঁচু দেওয়াল দুদিকে। রোদ-হাওয়া ঢোকে না একদম। এই গলিটায় ঢুকলে কেন কে জানে ভবেশের কথা মনে পড়ে যায় তার। শ্বশুরবাড়ির ঘিনঘিনে স্মৃতি জেগে ওঠে। যত তাড়াতাড়ি পারে গলিটা পেরিয়ে যেতে চায় সে। আজও তাই হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল রানু।

বাঁকের মুখে চমকে উঠল রানু। এত জোরে চমকাল যে হৃৎপিণ্ডের ধকধক শব্দ এলোমেলো হয়ে গেল তার। কয়েক মুহূর্তের জন্যে থেমে গিয়ে তারপর বিপুল বেগে ছুটতে শুরু করেছে তার হৃৎপিণ্ড।

এখান থেকে তার ঘরের দরজাটা দেখা যায়। দরজার সামনে সেই ছেলেটা। প্রথম দিনের সেই ছেলেটা। কী যেন নাম? বিজু। তেমনই বলেছিল লোকটা। থমকে দাঁড়ায় রানু। ভালো করে দেখে। হ্যাঁ, সেই ছেলেটাই। সোজা এদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ পড়ে গেছে রানুর চোখে। ডান হাতটা প্যান্টের পকেটে। সচকিত চোখে চারদিকে নজর রাখছে ছেলেটা। লম্বা পা ফেলে এগিয়ে এল রানুর দিকে—

ভোঁদাই খুব হুজ্জুতি করছে?

প্রশ্নটা শুনে শুধু বড় বড় চোখ করে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে রানু। কথা বলতে পারে না একটাও।

ছেলেটা বলে, আমার জন্যেই আপনার এত ঝুটঝামেলা হচ্ছে।

এবারও কথা বলে না রানু। সামলে নেয় নিজেকে। ভেতরে ভেতরে শক্ত হয়। ভাবে, চিৎকার করবে, যা থাকে কপালে, বাঁচতে ঘেন্না ধরে যাচ্ছে তার।

ছেলেটা খুব নরম গলায় ফের বলে, আসলে সেদিন খুব বিপদে পড়েই...আপনি থানায় গিয়েছিলেন নাকি—?

ছেলেটার ওইরকম নরম করে বলার মধ্যে কিছু একটা ছিল। একটা আন্তরিক অনুশোচনা। চিৎকার করতে গিয়েও থেমে যায় রানু।

থানায় গিয়ে লাভ নেই, ওরা কিছু করবে না...। চুপচাপ ছেলেটার পাশ দিয়ে এগোতে যায় রানু। ছেলেটা একটু সরে দাঁড়ায়। তারপর বলে, ওটাকে শালা আমি সাইজ করে দেব, আপনার কোনও চিন্তা নেই, আর বিরক্ত করবে না আপনাকে।

রানু একবার তাকায় ছেলেটার দিকে। তারপর গলায় বেশ ঝাঁঝ নিয়ে বলে, কেন আমাকে বিরক্ত করছেন, আপনার যা ইচ্ছে করুন, আমাকে জড়াবেন না...!

একটু অবাক চোখে রানুর দিকে তাকিয়ে থাকে ছেলেটা। তারপর বলে, ঠিক আছে। সরি!

বলেই খুব দ্রুত পায়ে গলির বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যায়।

বড় একটা শ্বাস ফেলে দরজার দিকে এগোয় রানু। জীবন এত ঘেন্নার হয়! বেঁচে থাকা কি এতই নরকযন্ত্রণা! মরে যায় না কেন সে! কেন মরে না যে! ওহ ভগবান...!

মেন রোডের ওপরেই ঘটনাটা ঘটল। রাত বারোটার কিছু পর। সোনাগাছি থেকে ফিরছিল ভোঁদাই। এখন কাজরির কাছে ঘন ঘন যায় সে। রাতটা কাজরির ঘরে কাটাবার ইচ্ছে ছিল।

কিন্তু কাজরি আজ ব্যস্ততা দেখাল। সারারাতের কনট্রাক্টে রাজি নয়। সেই নিয়ে কাজরির সঙ্গে লাগল কিচাইন। রাগের মাথায় দু-একটা চড়চাপড় চালায় ভোঁদাই। তখন হইচই। নেশা আর মেজাজ দুটোই বিগড়ে গেল তার। 'ধুত্তোর' বলে বেরিয়ে এসেছিল ওখান থেকে। মেজাজ বিগড়ে ছিল বলেই বোধহয় হাঁটার সময় অসাবধান হয়ে পড়েছিল একটু। দুটো লোক যে নি:শব্দে ফলো করছে তাকে খেয়াল করেনি। ছোট মন্দিরটার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল আরও দুজন। একদম সামনে দু-হাতের মধ্যে এসে দাঁড়াল তারা। এবার চমকে উঠল ভোঁদাই। স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় ডান হাত চলে গেল পকেটে। কিন্তু হাত বের করার সুযোগ পেল না। পরপর দুটো গুলি বুকের বাঁদিকে আর পেটে। হুমড়ি খেয়ে পড়ল রাস্তার ওপর। দুটো কুকুর শুয়ে ছিল মন্দিরটার পেছনে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করল তারা। ফাঁকা রাস্তায় বাইক চালিয়ে আসছিল একটা ছেলে। ব্রেক কষে দাঁড়াল সে, তারপরেই উলটোদিকে পালিয়ে গেল প্রচণ্ড স্পিডে। একজন এগিয়ে এসে সামনে থেকে মাথা লক্ষ করে একটা গুলি চালাল। তারপরেই চারজন দৌড়ে ঢুকে গেল গলির মধ্যে। কুকুর দুটো চিৎকার করতে করতে একটু একটু করে এগিয়ে গেল রাস্তায় পড়ে থাকা শরীরটার দিকে। এদিক-ওদিক থেকে আরও কয়েকটা কুকুর ডেকে উঠল। আশপাশের দু-একটা ফ্ল্যাটের জানলা খুলেই বন্ধ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। লাল রক্তের ধারা গড়িয়ে গেল রাস্তার পাশের ড্রেনের দিকে।

পুলিশি অভিজ্ঞতায় উজ্জ্বল দেখেছে পলিটিকাল পার্সন খুন হলে চাপ সবচেয়ে বেশি। কেষ্ট-বিষ্টুর দরকার নেই, নিতান্ত খুচরো নেতা বা চ্যালা-চামুণ্ডা গোছের কারও বডি পড়লেই হল —জগৎ সংসার একেবারে রে-রে-রে-রে করে ঝাঁপিয়ে পড়বে পুলিশ প্রশাসনের ওপর। তার দলের লোকেরা বলবে—বিরোধীদের কাজ; আর বিরোধীরা বলবে—দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব। দু-পক্ষই অবশ্য নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাবে। তারপর আছে মিডিয়া। গোদের ওপর বিষফোঁড়া। দলে দলে এসে একই প্রশ্ন, বোকা বোকা প্রশ্ন, বারবার করবে, তারপর যে যার মতো করে লিখে দেবে।

আর ঠিক উলটো মস্তানদের বেলায়। বিষয়-সম্পত্তি রেখে যাওয়া দরের মস্তান হলে একরকম, না হলে ছুটকো মস্তানের বেলায় অনেক সময় বডি ক্লেম করার লোক পাওয়া যায় না। বড়জোর খুনখুনে বুড়ি মা কিংবা ক্ষয়াটে চেহারার বউ এসে বসে থাকে। সাধারণত দেখা যায়, যে মহিলার সঙ্গে থাকত তাকে আইনমাফিক বিয়ে করেনি, আর যাকে একসময় বিয়ে করেছিল তার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই।

কত সময় সেই লোকটা, যে একদিন বোমা-পিস্তল হাতে দাপিয়ে বেড়াত পাড়া, তার বডি বড় হতভাগ্যের মতো পড়ে থাকে মর্গে। পিঁপড়ে ধরে, ইঁদুর খাবলায়। তবে বেশির ভাগ সময়ই একটা ব্যাপার প্রায় অবধারিত থাকে। দু-চারদিনের মধ্যেই পালটা একটা লাশ পড়ে। প্রথমটার বদলা।

ভোঁদাইয়ের বেলায় অবশ্য দস্তুরমতো দাবিদার পাওয়া গেছে। ভোঁদাইয়ের দাদা কয়েকজন লোক নিয়ে এসে বডি নিয়ে গেল। যাবার সময় সোজা অভিযোগ করল বিজুর বিরুদ্ধে। বিজু নাকি জেল থেকে বেরিয়ে নিজে দল করেছে। তারই কাজ। একটা মেয়ে নাকি আছে এর মূলে, ওই মেয়েটাকে নিয়েই দুজনের গন্ডগোল।

বিজু ছেলেটাকে মনে করার চেষ্টা করল উজ্জ্বল। একটা ডাকাতির কেসে ধরেছিল ছেলেটাকে। লম্বা ছিপছিপে চেহারা। ভাবভঙ্গি ঠিক মস্তানসুলভ নয়। চোখ-মুখে কঠিন একটা জেদের ছাপ আছে শুধু। সেই বিজু জেল থেকে বেরিয়ে দল করেছে। দেখা যাচ্ছে দল করাটা খুব জল-ভাত হয়ে গেছে এখন।

নতুন দল তৈরি হলে পুলিশের একটু চিন্তার কথা। পাত্তা লাগাল উজ্জ্বল। খবর পেয়েও গেল। বিজু নয়, দলটা তৈরি করেছে পলাশ নামে একটা ছেলে। এই ছেলেটাও একসময় অসিতের হয়ে কাজ করত; পরে ঝামেলার জন্যে বেরিয়ে যায়। মেলাপাড়া বস্তির নতুন কয়েকটা ছেলে, আর ভাইলালের দল ভেঙে চলে আসা ক'টা ছেলেকে নিয়ে তৈরি করেছে দলটা। বিজু আছে সেই দলে।

ভোঁদাইয়ের ব্যাপারটা আরও একটু গড়াল। একদিন সাতসকালেই লোকাল কাউন্সিলার প্রসূন হাজরা হাজির থানায়। সঙ্গে একটা অল্পবয়সি ছেলে। লোকটা ঘনঘন দল পালটায় এবং প্রতিবারই ঠিক একটা পদ বাগিয়ে নেয়। এমন একটা হাবভাব যেন মনে করলেই দেশের প্রধানমন্ত্রী, শচীন তেন্ডুলকর বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো কিছু একটা হয়ে যাওয়া তার কাছে কঠিন কিছু নয়। প্রসূনকে দেখেই মনে পড়ে গেল অসিত এখন প্রসূনের খাস লোক। লাস্ট ইলেকশনে ফুল ম্যান পাওয়ার দিয়ে প্রসূনকে জিতিয়েছিল অসিত। অসিত ইদানীং প্রাোমোটারি লাইন ধরেছে। সমাজসেবা সংস্কৃতি এইসব করে ভদ্রলোক হয়ে গেল বলে। কিছুদিন আগেই প্রসূন একটা রক্তদান শিবির আর সঙ্গে গানবাজনার আসর বসাল। তার মূল পান্ডা অসিত। দুজনে শেয়ারে একটা বারও খুলেছে কোনা এক্সপ্রেসওয়ের ওপর। তাই প্রসূনকে থানায় দেখেই সরল পাটিগণিতের এইসব স্টেপগুলো পর পর মনে পড়ে গেল উজ্জ্বলের।

বড়বাবু নেই—ছুটিতে। থানার দায়িত্ব এখন উজ্জ্বলের ওপর। অফিসে কাজ করছিল উজ্জ্বল। আজ সকাল থেকে টানাপোড়েনের মধ্যে আছে সে। সেই অসহ্য টানাপোড়েন। কোনও মানে হয় না এইভাবে দিনগুলো টেনে নিয়ে যাবার। শুধু একটু মনের জোর দরকার। একটা মাত্র গুলি কপালের ঠিকঠাক জায়গায়। ব্যস, অপার শান্তি। অফিসে কাজ করতে করতে সেই প্রবল প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে চাইছিল সে। যুক্তি, পালটা যুক্তি। সেই সময় ঘরে ঢুকেই হড়াস করে চেয়ার টেনে বসে পড়ল প্রসূন। প্রসূনের ভঙ্গিটাই এই রকম—হেড মাস্টারের মতো হাবভাব। বিরক্ত হল উজ্জ্বল এবং বিরক্তিটা চাপা দেবার চেষ্টা না করেই ভুরু কুঁচকে বলল—কী ব্যাপার!

প্রসূন একটু রুক্ষ স্বরে বলল, কোশ্চেনটা তো আমারও, কী ব্যাপার কী!

কেন? হাতের পেনটা বন্ধ করে বলল উজ্জ্বল।

কেন মানে; কী করছেন কী আপনারা?

দেখতেই তো পাচ্ছেন।

দেখতে পাচ্ছি না বলেই তো আসতে হল এখানে।

উজ্জ্বল শান্ত গলায় বলে, আমাদের যা কাজ তাই করছি—সোসাইটির নোংরা পরিষ্কার।

করছেন আর কোথায়, নোংরামি তো বেড়েই যাচ্ছে।

আসলে ম্যানপাওয়ার কম আমাদের...আর এদিকে নোংরা লোক বাড়ছে দিন দিন...তার ওপর পুজো গেল; পুজোর সময় অন্য চাপ থাকে আমাদের। পাত্তা না দেবার ভঙ্গিতে বলল উজ্জ্বল।

প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে দাঁতে চাপে প্রসূন। তারপর ধরিয়ে বলে, আজ ক'দিন হল?

বিরক্তি বাড়ছে উজ্জ্বলের। সে তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে নেমেছিল। তার মধ্যে এই ফালতু লোকটার উপস্থিতি খুব অসহ্য মনে হচ্ছে। সে-ও তাই একটু রুক্ষ স্বরে বলল, কীসের ক'দিন?

ভোঁদাই মার্ডার হয়েছে?

হিসেব করে রাখিনি, আমি অ্যাকাউন্ট্যান্ট নই।

উজ্জ্বলের রুক্ষতায় একটু যেন থমকাল প্রসূন। তারপরই, একটু গলা চড়িয়ে বলল, হিসেব রাখিনি মানে...! কে হিসেব রাখবে!

আপনার দরকার হলে, আপনি রাখুন।

এবার বেশ অবাক হয়ে গেছে প্রসূন। লোকাল থানার কোনও পুলিশ অফিসার যে তার সঙ্গে এ ভাবে কথা বলবে, সে ভাবতেও পারে না। তাই আরও বিকট চিৎকার শুরু করল সে, কী ভেবেছেন কী আপনি! কত টাকা খেয়েছেন। বলুন...তার চেয়েও বেশি টাকা আমি আপনাকে দেব—কিন্তু কালপ্রিটকে ধরে দিতে হবে—বলুন, কত টাকা চাই আপনার...?

প্রসূনের চোখে চোখ রাখল উজ্জ্বল। শীতল কঠিন দৃষ্টি। আর পেছনে তাকানোর দরকার নেই। পেছনে তাকালেই তার সেই প্রতিপক্ষ যুক্তিজালে জড়িয়ে দেবে। জোর কমিয়ে দেবে মনের। মাথায় ঠেকিয়েও নামিয়ে রাখতে হবে রিভলভার। তার চেয়ে সোজা এগিয়ে যাওয়া। থামবে না, থমকাবে না, তাকাবে না কোনও দিকে। রিভলভারের ছ'টা গুলি। ভাগাভাগি করে নেবে প্রসূন হাজরার সঙ্গে। তিনটে প্রসূনের, তিনটে তার।

উজ্জ্বল ঝট করে উঠে দাঁড়ায়। চিৎকার করে—শাট আপ! খুলি উড়িয়ে দেব শালার!

দুজন কনস্টেবল দৌড়ে আসে। সুকুমার জড়িয়ে ধরে উজ্জ্বলকে। আর একজন বুঝিয়ে শুনিয়ে বাইরে নিয়ে যায় প্রসূনকে।

কোয়ার্টারে ফিরে চুপ করে বসে থাকে উজ্জ্বল। কিছুক্ষণ তড়পে চলে গেছে প্রসূন। শাসিয়ে গেছে। মজার কথা, সকালের সেই দমচাপা কষ্টটা আর নেই। হাঁসফাঁস করা মনটা এখন বুক ভরে অক্সিজেন নিচ্ছে। রিভলভারটা খাপের মধ্যে দেওয়ালে টাঙানো। সেই প্রতিপক্ষ ভারী ম্রিয়মান। গলায় পরাজয়ের গ্লানি। খুব বিষণ্ণ গলায় জিগ্যেস করল, কী ঠিক করলে তাহলে উজ্জ্বল?

মৃদু হেসে উজ্জ্বল বলল, বিজুকে ধরব।

খুব ভালো কথা, কিন্তু তারপর...? তারপর তো সেই একঘেয়ে জীবন। তার চেয়ে...।

উজ্জ্বল বলে, তখন দেখা যাবে, এখন এসো তুমি।

কিন্তু একটু আগেই তো আমাকে ডাকছিলে, খুব ডাকছিলে, কী এমন হল হঠাৎ!

প্রসূন এসে গেল যে!

এখন তো সে চলে গেছে।

হ্যাঁ, রেঞ্জের বাইরে চলে গেছে, একটু দেরি হয়ে গেল যে! আমার সেই চিরকালের দ্বিধা—মাথাটা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ছিল—দিতামও—সুকুমার এসে জড়িয়ে না ধরলে, ঠিক দিতাম।

যাক, আর তো কিছু করার নেই—কিন্তু গুলিগুলো এখনও তোমার কাছে আছে।

উজ্জ্বল বলে, তুমি তো আচ্ছা আজব লোক, যখন যেতে চাই তোমার কাছে, খুব ইচ্ছে করে যেতে, তখন তুমি কত বাহানা দেখাও; আর এখন আমার ইচ্ছে নেই, দিব্যি ভালো আছি, তুমি কেবল ডাকছ, লোভ দেখাচ্ছ—কেমন লোক তুমি!

সে বলল, এটাই তো মস্ত রহস্য—আমাকে বুঝে ওঠা! আমাকে কেউ বুঝতে পারে না বলেই যত গন্ডগোল, আমাকে বুঝে ফেললে দুনিয়া তো একেবারে সহজ-সরল হয়ে যেত।

আমার দরকার নেই বুঝে, উজ্জ্বল বলে, তুমি এখন এসো!

ভেবে বলছ তো, গুলিগুলো কিন্তু রয়েই গেল।

থাক, ওগুলো প্রসূনের জন্যে থাক। বিজুকে ধরব, আর তারপর প্রসূনকে রেঞ্জের মধ্যে পেতে হবে আমায়, আজ দেরি হয়ে গেল, সেদিন আর হবে না।

কিন্তু একটা প্রসূন গেলে, পরদিনই পাঁচটা প্রসূন হবে।

সে তখন দেখা যাবে, তাদের জন্যে হয়তো অন্য উজ্জ্বলরা আসবে, আরও পাঁচজন উজ্জ্বল, এখন তুমি এসো।

মাথা নামিয়ে চলে যায় সে।

উজ্জ্বল উঠে পড়ে। অনেক কাজ এখন তার।

১৩নং বিনোদ মল্লিক বাই লেনের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল উজ্জ্বল। রাত প্রায় নটা। সিভিল ড্রেস উজ্জ্বলের। বিকেলে এসডিপিও-র ফোন এসেছিল। কেসটার তাড়াতাড়ি রেজাল্ট চাইছেন এসডিপিও সাহেব। প্রসূন হাজরা ঘুঁটি চালাচালি শুরু করে দিয়েছে। মনে মনে হাসে উজ্জ্বল। একটু দেরি হয়ে গেল আজ। প্রসূন তোমার এখন মর্গে শুয়ে থাকার কথা। আর একবার রেঞ্জের মধ্যে পাই তোমায়...ছ'টা গুলি ভাগাভাগি হবে তোমার-আমার মধ্যে।

ঘরের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছে। পুরুষ আর মহিলা কণ্ঠ। চুপ করে দরজার সামনে দাঁড়াল উজ্জ্বল। কান খাড়া।

লোকটা টাকার দাবি করছে। মহিলাটি নারাজ। গালমন্দ করছে লোকটা। ঝগড়া কিছুক্ষণ শুনে উজ্জ্বল বুঝল সেই চিরাচরিত বিষ দাম্পত্যের কাহিনি। স্ত্রী রোজগেরে। অপোগণ্ড স্বামী। প্রায়ই এসব ঝামেলা মেটাতে হয় উজ্জ্বলদের।

ঠেলতেই খুলে গেল দরজাটা। দুজনেই খুব অবাক চোখে তাকাল উজ্জ্বলের দিকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লোকটা একটু তেড়িয়া গলায় বলল, কী চাই?

উত্তর দিল না উজ্জ্বল। শান্তভাবে ঘরে ঢুকল। ভালো করে আপাদমস্তক দেখল লোকটাকে। একেবারে মার্কামারা চেহারা। সারা শরীরে বেহিসেবি জীবনযাপনের স্পষ্ট ছাপ। চোখ দুটো অসম্ভব ধূর্ত। মদ্যপান করেছে। মুখে পানমশলা জাতীয় কিছু আছে; তবু সস্তা মদের গন্ধ ঢাকা পড়েনি। বিছানায় বালিশ কোলে বেশ বাবুয়ানি চালে বসে আছে লোকটা।

কী চাই কী? এবার প্রায় তেড়ে এল লোকটা।

থানা থেকে আসছি। খুব কঠোর দৃষ্টিতে লোকটার দিকে সোজা তাকিয়ে বলল উজ্জ্বল। কঠিন করে নিল মুখের পেশিগুলো। খুব বেশিক্ষণ চোখ-মুখে এই ভাব ধরে রাখলে নার্ভের ওপর চাপ পড়ে। তবু পেশার জন্যে মাঝেমধ্যে এমন রূপ ধারণ করতে হয় তাকে। পুলিশি কর্কশতা এখানেও কাজ দিল সঙ্গে সঙ্গে। চমকাল লোকটা। মুখে ভয়ের ছায়া নামল একটু।

থানা থেকে...কেন স্যার!

দরকার আছে। আরও কঠিন উজ্জ্বলের গলা।

কী-কী দরকার? লোকটা তোতলাচ্ছে।

থানায় গেলেই বুঝবে।

আ-আমি তো কিছু করিনি স্যার।

সেটা দেখতে পাবে...। উজ্জ্বল বলে, নাম কী?

ভবেশ—স্যার।

ভবেশ—কী? ধমকে ওঠে উজ্জ্বল।

ভবেশ দাস।

কী করো?

চাকরি স্যার...!

এখানে কী করছ?

ও তো স্যার রানু—মানে আমার ওয়াইফ।

সে তো বুঝলাম...চিৎকার চেঁচামেচি করছিলে কেন?

চেঁচামেচি নয় তো স্যার—ওই ওয়াইফের সঙ্গে একটু আলোচনা আর কি।

মুখ খারাপ করছিলে কেন?

না তো স্যার—মুখ খারাপ তো নয়...।

মদ খেয়েছ কেন?

না-না তো স্যার...বিশ্বাস করুন!

আবার মিথ্যে কথা! জোরে ধমক দিয়ে ওঠে উজ্জ্বল।

ভুল হয়ে গেছে স্যার—আর হবে না কোনওদিন...।

কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল বউয়ের সঙ্গে?

তেমন কিছু নয় স্যার—ওই আর কি...।

টাকা চাইছিলে—তাই তো?

না স্যার, মানে ঠিক টাকা নয়...।

আবার মিথ্যে কথা...মারব এক থাপ্পড়!

এবার চুপ করে যায় লোকটা। ভয়ে যেন আধসেদ্ধ হয়ে গেছে।

লজ্জা করে না—বউকে খাওয়াবার মুরোদ নেই, আবার টাকা চাইছ!

আসলে স্যার বাজারে অনেক দেনা...খুব প্রবলেম।

দেনা কেন—মদ খেয়ে?

না না স্যার...। লোকটা এবার হাতজোড় করে ফেলে।

তাহলে দেনা কেন—বউকে তো খাওয়াতে হয় না!

আসলে স্যার কাজটা চলে গেছে।

কী করে গেল?

ওই আর কি স্যার...ফ্যাক্টরির অবস্থা ভালো নয়।

তোমার মতো লেবার থাকলে ফ্যাক্টরির অবস্থা ভালো হওয়া মুশকিল।

আর কিছু বলে না লোকটা। ভয়ে সাদা হয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে বসে থাকে।

শোনো। খুব গম্ভীর গলায় উজ্জ্বল বলে, আর কোনওদিন মদ খাবে না।

হ্যাঁ স্যার।

কোনওদিন একটা পয়সাও চাইবে না—ঠিক আছে?

খুব বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় কাত করে লোকটা।

স্ত্রীকে কোনওরকম হ্যারাস করবে না।

ঠিক আছে স্যার।

আমি কিন্তু খোঁজ নেব এবার—একটু গন্ডগোল করলেই ঝুলিয়ে পিটব। পুলিশের পিটুনি খেয়েছ কোনওদিন?

না স্যার।

খাবার ইচ্ছে আছে?

জোরে জোরে মাথা নাড়ে লোকটা।

উজ্জ্বল এবার তাকায় মহিলার দিকে। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। একটু কঠিন চোখ-মুখ। ভয়ের ছাপ নেই কোথাও।

শান্ত গলায় উজ্জ্বল বলে, আপনার নাম রানু দাস?

হ্যাঁ।

আপনার ওপর কি এরকম ঝামেলা রোজ করে?

কিছু বলে না রানু। শুধু তাকায় ভবেশের দিকে।

স্যার, পেচ্ছাপ পেয়েছে স্যার, করে আসব?

উজ্জ্বল তাকায় লোকটার দিকে। চোখে-মুখে করুণ আর্তি। হাতজোড় করেছে আবার।

গম্ভীর গলায় উজ্জ্বল বলে, ঠিক বলছ?

হ্যাঁ স্যার।

ঠিক আছে, যাও।

সঙ্গে সঙ্গে লোকটা তড়াক করে নামে তক্তোপোশ থেকে। তারপর যেন পড়ি-মরি করে বেরিয়ে যায়।

আপনার সঙ্গে কথা ছিল একটু। ঘরের চারদিক খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বলে উজ্জ্বল।

বলুন। একটু যেন কাঠ কাঠ রানুর গলা।

কয়েকদিন আগে একটা ছেলে মার্ডার হয়েছে, শুনেছেন?

না; কোথায়?

নেতাজি সুভাষ রোডে; ছোট শিবমন্দিরটা নতুন হয়েছে যেখানে।

না, শুনিনি কিছু।

ঠিক করে বলুন।

ঠিকই বলছি।

আপনি তো 'সেবায়ন' আয়া সেন্টারে কাজ করেন?

হ্যাঁ।

জয়ন্ত হাজরার বাড়িতে ডিউটি করছেন এখন?

হ্যাঁ।

ওর বাবা প্যারালাইজড—তারই দেখাশোনা করেন—ঠিক বলছি তো?

হ্যাঁ।

দেখছেন তো আমাদের কাছে সব ইনফরমেশনই থাকে; কিছু গোপন করবেন না; লাভ হবে না; তার চেয়ে যা জানেন ঠিক ঠিক বলে দিন।

বললাম তো, আমি কিছু জানি না। খুব নীরস রানুর গলা।

ঠিক আছে—ভোঁদাইকে চেনেন?

একটু চুপ করে থাকে রানু। তারপর বলে, চিনি মানে দুদিন দেখেছি।

আগে থেকে পরিচয় ছিল না?

না।

ঠিক বলছেন?

হ্যাঁ।

আপনি এফআইআর করেছিলেন থানায়?

হ্যাঁ।

ভোঁদাই বিরক্ত করত আপনাকে?

হ্যাঁ।

কে বলেছিল ডায়েরি করতে?

কেউ বলেনি, আমি নিজেই করেছিলাম।

ভোঁদাই মার্ডার হয়ে গেছে, শুনেছেন?

না।

বিজুকে কতদিন চেনেন?

কে বিজু—আমি চিনি না।

কিন্তু আমাদের কাছে খবর আছে—চেনেন।

আমি কিছুদিন এখানে এসেছি, কাউকেই চিনি না এখানকার।

তাহলে ওকে শেল্টার দিয়েছিলেন কেন?

একটু চুপ করে থাকে রানু। তারপর বলে, আমি তো সবই বলে এসেছি থানায়, ও জোর করে ঢুকে পড়েছিল।

কিন্তু আমার কাছে খবর আছে বিজু তারপরেও এসেছিল আপনার কাছে।

একটু যেন চমকে ওঠে রানু। তারপর বেশ জোর গলায় বলে, একদম বাজে কথা, আসেনি।

রানুর সামান্য চমকে যাওয়াটা নজর এড়ায় না উজ্জ্বলের। সে তাই একটু গম্ভীর গলায় বলে, কেন মিথ্যে কথা বলছেন, দেখছেন তো, আমাদের কাছে কোনও খবরই গোপন থাকে না, তার চেয়ে সত্যিটা বলে দিন।

রানু জোরে ঘাড় নাড়ে, কিছু গোপন করছি না আমি।

চুপচাপ ঘরের চারদিকটা আবার খুঁটিয়ে দেখতে থাকে উজ্জ্বল। এই চালটা সে আন্দাজেই দিয়েছিল। কিন্তু মেয়েটা যেন চমকে গেল একটু। চমকাবে কেন...? গলাটা গম্ভীর করেই সে বলে, ভোঁদাই মার্ডারে আপনি কিন্তু একটা সাসপেক্ট।

আমি! ভীষণ অবাক গলায় বলে রানু।

হ্যাঁ, আপনি।

আমি মানুষ খুন করেছি...! একটু ভেঙে যায় রানুর গলা।

নিজের হাতে না করলেও, করিয়েছেন কাউকে দিয়ে।

কিছু বলে না রানু। প্রচণ্ড ভয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে উজ্জ্বলের দিকে। ঠোঁট দুটো থিরথির করে কাঁপছে। চোখ দুটো একটু ভিজে উঠেছে যেন।

একটু মায়া হয় উজ্জ্বলের। তবু গলাটা কঠিন রেখেই সে বলে, ভোঁদাইয়ের ফ্যামিলির লোক আপনাকে সন্দেহ করছে।

আমাকে...!

হ্যাঁ, আপনাকে, আপনাকে নিয়ে দুজনের একটা টানাটানি ছিল, তাই বিজু খুন করেছে ভোঁদাইকে।

এবার ভেঙে পড়ে রানু। কান্নাভাঙা গলায় বলে, বিশ্বাস করুন, আমি কিছু জানি না—ওদের কাউকেই চিনি না আমি...ছি: ছি:, আমার স্বামী শুনলে কী বলবে বলুন।

ভয় নেই। উজ্জ্বল বলে, আপনার স্বামী কিছু শুনছে না, সে আশপাশে কোথাও নেই।

আঁচলে চোখ মোছে রানু।

আপনি বাইরে গিয়ে দেখে আসতে পারেন—সে পালিয়েছে।

নাক টানে রানু।

আপনার বীরপুরুষ স্বামী আর মনে হয় ডিসটার্ব করবে না আপনাকে...যদি করে, একবার শুধু বলবেন—ব্যবস্থা করে দেব।

কিছু বলে না রানু। নীচের দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

পুলিশকে আপনারা যতটা খারাপ ভাবেন, ততটা খারাপ নয় তারা।

দু:খের মধ্যেও মৃদু একটা শ্লেষের হাসি ফুটে ওঠে রানুর মুখে।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আপনারা দরকারের সময় পুলিশকে হেল্প করেন না—কেন করেন না বলুন তো?

রানু মৃদু গলায় বলে, আমি যা যা জানি সবই তো বলেছি আপনাকে—কিন্তু আপনি শুধু শুধু আমার নামে মিথ্যে অপবাদ...।

উজ্জ্বল বলে, আমি অপবাদ কোথায় দিলাম—ভোঁদাইয়ের ফ্যামিলি থেকে অভিযোগ করা হয়েছে—এবার প্রমাণ করার দায়িত্ব আপনার।

কী ভাবে প্রমাণ করা যায়, বলুন।

আপাতত আমাদের সঙ্গে ঠিকঠাক কো-অপারেট করুন।

করছি তো—কিন্তু যা জানি না সেটা বলব কী করে...! আমার খুব ভুল হয়েছিল...।

উজ্জ্বল একটু অবাক হয়ে তাকায়। বলে, কী ভুল...?

থানায় যাওয়াটাই ভুল হয়েছিল—আমি আমার সব অভিযোগ তুলে নিচ্ছি। তার জন্যে কী করতে হবে বলুন।

উজ্জ্বল বলে, ওহ সব মানুষই যদি আপনার মতো হত—বেঁচে যেতাম। মানুষ কেবলই অভিযোগ জানায়—উঠতে বসতে নড়তে চড়তে মানুষের অভিযোগ, অভিযোগের আর শেষ নেই...।

এবার কেউ মেরে কেটে ফেললেও পুলিশকে বলতে যাব না।

এবার আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আসলে, আমাদের কাজটাই এমন—সব মানুষকে খারাপ ভাবতে শেখায়...।

উজ্জ্বল হাসে। অনেকক্ষণ চোখ-মুখ কঠিন করে রেখেছিল। হাসতে পেরে ভারি একটা স্বস্তিবোধ করে সে। দেখে রানু তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখে ঘোর বিস্ময়। সম্ভবত, কোনও পুলিশকে আগে সে এভাবে হাসতে দেখেনি।

রানু অন্যদিকে তাকিয়ে বলে, সেদিন থানায় গেলাম, গিয়ে মনে হল খুব অপরাধ করে ফেলেছি—এমন ভাব করা হল, যেন দোষটা আমার...তাহলে বলুন, তারপর এমন বদনাম...ছি: ছি:!

উজ্জ্বল বলে, খুব সরি...আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন...।

ঘর থেকে বেরিয়ে যায় উজ্জ্বল। তারপর আবার ঘরে ঢোকে। বলে, আমার নাম্বারটা রেখে দিন—কোনও সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন।

জোরে ঘাড় নাড়তে নাড়তে রানু বলে, আমার লাগবে না—মরে যাই সেও ভালো...তবু থানায় আর নয়...দরকার নেই আমার...!

বলি, মা, শরীরগতিক আজ কেমন?

মন? কার মন বাপ? আমার? খারাপ তো নয়—ভালোই আছে। ক্যান র‌্যা?

রানিবালাকে নিয়ে এই মুশকিল। কানটা একেবারেই গেছে। শুধু কানটাই গেছে। শরীরের আর সব কলকবজা কিন্তু খুব তেজি। দিনরাত খুটুরখুটুর ঘোরাঘুরি করছে। সুচে সুতো পরিয়ে দিব্যি কাঁথাখানি সেলাই করছে খালি চোখে, ভাত খেতে বসে এই এত্ত ডাঁটা চিবিয়ে ছিবড়ে করে ফেলছে, দু-চার গাছা ছাড়া মাথার চুল সব ভুসিকালো। শুধু শোনার সময় বেতাল।

দুপুরবেলা খেয়েদেয়ে উঠোনের ছাওয়ায় বসে বিড়ি খাচ্ছে রুইদাস। কুমড়ো গাছের গোড়াটা কাস্তে দিয়ে খুসকে দিচ্ছে রানিবালা। তেজ হয়েছে বটে গাছটার। রান্নাঘরের চালে উঠে ছেয়ে ফেলেছে চালখানা। একঝলক তাকালে চালের টালি নজরে আসে না—শুধু নধর ডাঁটা পাতা। মুখ থেকে বিড়িটা সরিয়ে রুইদাস একটু গলা তুলে বলে, মন নয়, মন নয়—শরীরটা তোর ভালো আছে কি...?

হাতের কাজ থামিয়ে রানিবালা বলে, খারাপ আর কী এমন—শরীল আমার ভালোই...।

সকালে দুবার বাগান সারতে গেলি—প্যাট খারাপ নাকি গো...?

ফের হাতের কাস্তে চালাতে চালাতে রানিবালা বলে, প্যাট কিছু খারাপ নয়কো আমার।

বলি, বুকে কফ জমেছে নাকি?

চপ? হ্যাঁ, নিয়ে আসিস আলুর চপ দুটো, খাব'খন—প্যাট আমার ঠিকই আছে।

বলি, চপ নয়—কফ। বুকে তোর কফ জমেছে, কাশছিলি কাল রাতে খুব তো!

কাশছিলাম কাল রাতে! রানিবালা একটু অবাক গলায় বলে, কাশিনি তো...তোর কান দুটো দেখি যে একেবেরেই গেছে, তোর বাপের তাই ছিল, এক কথা বিশবার বললে তবে কানে ঢুকত।

ঘাড় নেড়ে বিড়িতে একটা টান দেয় রুইদাস। বলে, বলি কী, শীতের দিন তো এল ফের?

সে তো এল। হাত চালাতে চালাতেই রানিবালা বলে, ভাবছিলুম কী, এবার সামনেটায় দুটো পালং বুনব, আর ধনেপাতা; দিস তো এনে আমায়...।

রুইদাস বলে, সে দেব'খন, এবার কিন্তুক শীত পড়বে খুব, এখনই ভোরের দিকে কেমন জার লাগে দেখেছিস?

রানিবালা বলে, ভালো ভালো, জারকালে জার পড়াই তো চাই, আর বোছর জারই তো পড়লুইনি...।

এবার কিন্তুক খুব পড়বে—তোকে বলি শোন কথা, সকালবেলা বাগান সারতে বাইরে যাবিনি...আমি মাটির শরা আনি, তুই শরাতে করিস।

বরাতে যা লেখা আছে তাই হবে, সে তো সবাই জানে বাপ...পটল মুখুজ্জে দেখ, কত বড়লোক...মরল কিনা কুকুর-ছাগলের অধম...আর নন্তু তেলি দেখ...

রাইদাস একটু গলা তুলে বলে, বরাতে নয় শরাতে—মাটির শরাতে! বলি, সকালবেলাতে ঘরে বসে শরাতে বাহ্যে করবি এবার।

অ্যা! রানিবালা আঁতকে ওঠে, শরাতে ঘরের ভেতর...ম্যাগো আর কি...ছ্যা ছ্যা...

কেন করবিনি? রুইদাস একটু রাগের গলায় বলে, বুড়োমানুষ হলে সবাই তাই করে—তুই করবিনি কেন...!

আমি কি অথব্ব হয়ে গেছি র‌্যা বাপ...তবে কেন ঘরেতে করব...?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুইদাস। বিড়বিড় করে বলে, আর কবে অথব্ব হবি তুই...এবার আমি যে হয়ে যাই! পাপ যে আমার বড় হল কিনা...!

রানিবালা বলে, পালং দানা দুটো দিবি কিন্তুক বাপ, ধারে ধারে ধনে ছড়িয়ে দেব চাট্টি...বিজেটা আমার ধনেপাতার পোকা ছ্যালো...হ্যাঁ বাপ, বিজে ঘরে ফিরবে কবে?

রুইদাস আনমনে বলে, কী জানি!

ওকে বলেকয়ে ঘরেতে আন, না তো আবার মারপিট করে বসে...আবার জেল জরিমানা...মাথা গরম ছেলেটা বড়...তোর বাপের ছিল ওইরকম...রেগে গেল তো একেবারে চণ্ডাল...।

রুইদাস একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। ছেলেটা তার বড় চিন্তার কথা। মা-মরা ছেলে। বিয়েটা পাপেরই হয়ে গেল। ছেলেটা বয়ে গেল তার। বদসঙ্গে পড়ল; জেল হল। তার পাপেই ছেলেটা গেল। এই তো কদিন আগে এল হঠাৎ। পুজোর মুখটায় এল। বিশে আশ্বিনই তা হলে ছাড়ান পেয়েছিল কি হিসেবমতো! এল তার ক'টা দিন পর—পুজোর মুখটায়—পঞ্চুমি বুঝি সে দিন...।

রুইদাস ভাবল, যাক বাবা, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে, রাগ পড়েছে। মালতীকে আড়ালে বলেছিল মাফ চেয়ে নিতে। কাজটা সেদিন মালতীর অন্যায় কাজই হয়েছিল। ওর মায়ের হাতের আসন—রাগ হওয়ারই কথা বটে। মা-মরা ছেলে—বড় মাথা গরম ছেলে। খুব সকালে ছেলেটা এল। চোখ দুটো লাল, চুল উসকোখুসকো। আহা, জেলের ভেতর কত না কষ্ট! তার পাপেই সব হল। বড় পাপ যে! ঘরের দরজা বন্ধ করে ছেলেটা পড়ে পড়ে ঘুমোল সারাদিন। সন্ধের মুখে উঠল। মালতী চা করে দিয়ে এল। খেল চুপচাপ। মালতী মাফ চেয়ে নিল। সত্যিই তো—অন্যায় কাজ করেছিল মালতী। একবার বলতেই মালতী মাফ চেয়ে নিল। বিজু বলল না কিছু। চুপচাপ দেখল মালতীকে। মালতীর নাকি খুব ভয় পাচ্ছিল তখন। মা-মরা ছেলে, রাগী ছেলে যা হোক...।

দুটো দিন ছিল বাড়িতে। বাইরে বেরোত না বড় একটা। কথাও বলত না বিশেষ। রানিবালার সঙ্গে যা দু-চারটে কথা শুধু। রানিবালা একটা কথাই বলত বারবার। বিজে বে কর এবার; নাতবউ দেখি...।

শুনে মৃদু একটু হাসত শুধু।

একদিন খুব ভোর-ভোর উঠল বিজু। মালতী তখন পুজোর ফুল তুলছিল। যাওয়ার সময় শুধু বলল, যাচ্ছি।

মালতী সাহস করে তবু বলেছিল, কোথায় যাওয়া হবে এত সকালে?

কাজ আছে।

চা করে দিই?

না।

কখন ফেরা হবে?

জানি না।

আর কিছু বলেনি বিজু।

রুইদাস খুব আশা করেছিল ছেলেটা ফিরবে। ফিরল না! এখনও রোজই সকালে উঠে মনে হয়, আজ ঠিক আসবে।

ধরেবেঁধে বে দিয়ে দে দিকিন..।

অ্যাঁ! রুইদাস তাকায় রানিবালার দিকে।

বিজেটার বুঝলি...আনা করা আগে...বে দিয়ে দে...ঘরে বউ হলেই মতি হবে—চণ্ডাল রাগ যে বড়...ওই দেখ, কারা আসে আবার—ইদিকেই আসছে যেন...

রুইদাস তাকায় দরজার দিকে। চমকে ওঠে খুব। পুলিশ! তিন-চারটে পুলিশ! তাড়াতাড়ি মুখ থেকে বিড়িটা নামিয়ে ভালো করে নজর করে। পুলিশই বটে! খাকি জামাপ্যান্ট, মাথায় টুপি। পেছন পেছন একটু তফাত রেখে একপাল মানুষ। গ্রামেরই লোক সব।

পুলিশগুলো উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে। ভিড়টা থেমে গেছে দরজার সামনে।

রুইদাস মণ্ডল কে? টুপি মাথায় মাঝারি চেহারার একটা পুলিশ প্রশ্ন করে রুইদাসের দিকে তাকিয়ে।

উজ্জ্বল মাথার টুপিটা ঠিক করে বসিয়ে নিল। তারপর পুলিশি চোখে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল চারপাশ। রোয়াকের একদিকে ধানের বস্তা কতগুলো। উঠোনে পাঁচমিশেলি সবজির চাষ। নধর একটা লাউ গাছ উঠে গেছে ঘরের চালে।

রুইদাস মণ্ডল কে আছে? ফের গম্ভীর গলায় বলে উজ্জ্বল।

রুইদাস তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলে, আজ্ঞে আমি...

উজ্জ্বল ভালো করে দেখে রুইদাসকে। তারপর বলে, বিজু মণ্ডল কে হয়?

ছেলে আজ্ঞে।

কোথায় সে?

নেই তো...।

ঠিক করে বলুন। ধমকে ওঠে উজ্জ্বল।

আর কথা বেরোয় না রুইদাসের মুখ থেকে। পা-দুটো কাঁপছে তার। গলা শুকিয়ে কাঠ। শুধু অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে।

কী হল বলুন, কোথায় বিজু?

মাথা নাড়ে রুইদাস, সত্যি কথা বলছি।

উজ্জ্বল ঘর চেক করতে বলে। দুজন কনস্টেবল ঢুকে যায় ঘরে।

মালতী ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে। ভয়ে মুখ সাদা। উজ্জ্বল এগিয়ে যায়—আপনি কে?

আমি...আমি...! বিড়বিড় করে থেমে যায় মালতী।

হ্যাঁ, আপনি।

আমি মানে—ওর মা—মানে...।

মা! বিজুর মা! একটু অবাক গলায় বলে উজ্জ্বল।

মালতী ঘাড় নাড়ে।

একবার মালতীর দিকে আর একবার রুইদাসের দিকে তাকায় উজ্জ্বল। এরা স্বামী-স্ত্রী—ঠিক মেলাতে পারছে না সে।

কনস্টেবল দুটো সার্চ করছে ঘর। মালতী ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে সেদিকে।

উনি কে? রানিবালাকে দেখিয়ে বলে উজ্জ্বল।

আমার মা হয়। রুইদাস বলে।

রানিবালা এগিয়ে এসেছে রুইদাসের সামনে। হাতে কাস্তে। বলে, কী হল র‌্যা—এরা সব কারা?

কিছু বলে না রুইদাস।

কনস্টেবল দুটো বেরিয়ে এসে বলল, না স্যার—নেই।

উজ্জ্বল একটু নরম গলায় বলে, ঠাকমা, নাতি কোথায়?

জানিনি তো বাপ, সে এল, ফের চলে গেল—কেন গা বাপ—ফের মারপিট করেছে বুঝি; মাথা গরম ছেলে বাপ—মা-মরা ছেলে তো...।

এবার বুঝতে পারে উজ্জ্বল। রুইদাসের দিকে তাকিয়ে বলে—আপনার দ্বিতীয় পক্ষ?

অ্যাঁ—হ্যাঁ স্যার। মাথা নিচু করে বলে রুইদাস। হঠাৎ বুঝি তার মনে পড়ে গেছে পুলিশকে স্যার বলাই দস্তুর।

একজন কনস্টেবল রানিবালার কাছে গিয়ে বলে, ও দিদা, ঠিক করে বলো, কোথায় নাতি তোমার?

মোতি কামার! বুড়ি বলে, তাকে এখানে কোথায় পাবে, সে তো সেই কামারপাড়ায়। হ্যাঁ, বয়েসকালে সে ডাকাতদলে ভিড়েছিল বটে।

কনস্টেবলের মুখে একটু বিরক্তির ছাপ পড়ে। গলা আর একটু তুলে বলে, মোতি কামার-টামার নয়—তোমার নাতি—বিজু; কোথায় সে?

ও বিজু, সে তো এল একদিন, তারপর আর তো দেখি না; ওর বাপকে তাই বলছিলুম, বে দিয়ে দে ছেলের, তবে যদি...।

উজ্জ্বল এবার রুইদাসের দিকে তাকিয়ে কড়া ধমক দিয়ে বলে, কবে এসেছিল বিজু?

রুইদাস ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে।

ফাঁকা রাস্তা দিয়ে ছুটছে গাড়িটা। দুদিকে ধানখেত। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ। সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। হেলে পড়া সূর্যের আলোয় ভীষণ সতেজ দেখাচ্ছে গাছগুলো। সেদিকে তাকিয়ে ভাবছিল উজ্জ্বল। বিজুকে পাওয়া গেল না। এসেছিল, কিন্তু চলেও গেছে। বাবাটা নেহাতই সরল সাদা লোক। মিথ্যে বলছে না, উজ্জ্বল নিশ্চিত। হিসেব করে উজ্জ্বল দেখল, ভোঁদাই মার্ডারের পরই এসেছিল এখানে। কয়েকদিন থেকে চলে গেছে। বুঝেছিল বদলা আসতে পারে অসিতের কাছ থেকে। তারা এতদূর পৌঁছোতে পারবে না। পুলিশ পারে আসতে; কিন্তু পাতি একটা মস্তান-মার্ডার নিয়ে অত কাঠখড় পোড়াবে না তারা। বিজুর অনুমান একদম ঠিক ছিল। সত্যিই পুলিশ তখন মাথা ঘামায়নি। এখন প্রসূনের চাপে ঘামাতে হচ্ছে। বুড়োটাকে জেরা করে বিজুর বেলাইন চলে যাওয়ার কারণটা জানার চেষ্টা করেছিল উজ্জ্বল। স্পটে কিছু বুঝতে পারেনি। লোকটা কেবল বিড়বিড় করছিল—পাপ, খুব পাপ আমার...। লোকটা সরলই বটে। আর গাছপালা ভালোবাসে খুব। কনস্টেবল সুকুমারের একবার সন্দেহ হল, চালের টালির নীচে মাট গুদামের ওপর ঘাপটি মেরে বসে আছে বিজু। চালে উঠে টালি সরিয়ে সরিয়ে দেখছিল তারা। তখনই খুব যেন হানটান করছিল লোকটা—কেমন একটা অস্থির ভাব। দেখে সন্দেহ আরও প্রবল হয় উজ্জ্বলের। তারপর বোঝা গেল চালের কুমড়ো গাছটার জন্যে যত উদবেগ। দলে-পিষে যাচ্ছে গাছটা। আশ্চর্য! এমন গাছ-অন্ত প্রাণ সরল লোকের ছেলে ক্রিমিনাল হয় কী করে!

স্যাম্পেলের সঙ্গে আগেও খেয়েছে বিজু। স্যাম্পেল ভালো টানতে পারে। কিন্তু বেচাল করে না কখনও। বিজু দেখেছে, দু-পেগ পর্যন্ত বেশ খুশ মুডে গল্প করতে করতে খায় স্যাম্পেল; তারপর থেকে একটু একটু করে গম্ভীর হয়ে যায়। পাঁচটা ওর লিমিট। হাজার অনুরোধেও পাঁচ পেগের বেশি খেতে চায় না। পাঁচ পেগ শেষ করেই শোওয়ার জায়গার ধান্দা করে, আর শুলেই অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ে। আজ বিজু লক্ষ করল, দু-পেগের পর থেকেই স্যাম্পেল যেন ক্রমশ দার্শনিক হয়ে উঠছে—বহুত উচ্চমার্গের কথাবার্তা বলছে।

আজ একটা হেভি খ্যাঁচা-কেস ভালোভাবে উতরে গেছে। প্রাোমোটার প্রদীপ শর্মা। কচলাকচলিতে যায়নি লোকটা; বিজুরা প্রথম চোটেই যা দাবি করেছিল, দিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার একটাই সিগনাল—অল্প দিনের মধ্যেই বিজুদের নামটা ফেটেছে ভালো। পলাশ অসিতের দল ছাড়লেও ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছিল। রাগে ফুঁসছিল ও। মেলাপাড়া বস্তির ক'টা নতুন ছেলেকে টেনে নিয়েছিল। ভাইলালের ভাঙা দলের ক'টা ছেলেকেও পেল। বিজু দলে ঢোকার পর আর দেরি করেনি। অ্যাকশন। ওর পয়লা টার্গেট ছিল ভোঁদাই। ভোঁদাইকে দিয়েই বউনিটা করল। বিজু শুধু কড়কে দিতে চেয়েছিল। বেশ ভালোরকম কড়কে। কিন্তু পলাশের মত অন্য—শত্রুর শেষ রাখতে নেই; তা ছাড়া দু-একটা বডি ফেললে তবে তাড়াতাড়ি প্যানিক ছড়াবে। ভোঁদাইয়ের লাশ পড়ার পর অসিত খ্যাপা ষাঁড়ের মতো ক'দিন দাপিয়ে বেড়াল এলাকায়। এরকমই হওয়ার কথা। বিজুরা সবাই তাই সটকে গিয়েছিল এলাকা ছেড়ে। তিনদিন পর ফিরে ফের অ্যাকশন—ফোরশোর রোডে দুটো গোডাউন ফাঁকা করে দিল। খুব রেলার সঙ্গে করল কাজটা। পরপর পেটো চার্জ করে, ফায়ার করে, হাঁকডাক করেই করল। ভালো ঝাঁক্কি খেল অসিত। ওর পাকা মাথা বোধ হয় বুঝতে পারছিল, বিজুরা ভালো তৈরি। তাই আর নিজে হুজ্জুতি করার দিকে গেল না। পার্টি লাইনে গেল। প্রসূন হাজরাকে দিয়ে পুলিশকে চাপ দিচ্ছে এখন। বিজুদের তাই অ্যালার্ট থাকতে হচ্ছে; ঠেক বদলাতে হচ্ছে ঘন ঘন। প্রদীপ শর্মার কেসটা যখন জানবে, ফের ঝাঁক্কি খাবে অসিত। অসিতের খোদ এলাকায় ফ্ল্যাট তুলছে প্রদীপ শর্মা; মেটিরিয়াল সাপ্লাই দিচ্ছে কালু সামন্ত, সামন্তের বিজনেসে অসিতের শেয়ার আছে; সেই প্রদীপকে চমকে টাকা খেঁচে আনা সিংহের গুহায় ঢুকে আহার ছিনিয়ে আনার মতো ব্যাপার একটা। খবর পেয়ে অসিতের এবড়োখেবড়ো মুখটা আরও কঠিন, আরও থমথমে হয়ে যাবে। মুখটা মনে করে গ্লাসে লম্বা একটা চুমুক দেয় বিজু।

হাই রোডের ধারে এই ধাবাটা সন্ধের পর বেশ জমজম করে। আগে বেশ কয়েকবার এখানে এসেছে বিজু। মালের চেয়ে এদের তড়কাটা বেশি ভালো লাগে। স্যাম্পেল বলল, এই কদিনে তোমরা যেসব একটার পর একটা হিট ছবি নামাচ্ছ, তাতে শাহরুখ খানের মতো ফেমাস হয়ে যাবে, তখন পাত্তা পাব না; তার আগেই একদিন ভরপেট মাল খাইয়ে দাও মাইরি।

স্যাম্পেল গ্লাসে ছোট একটা চুমুক দিয়ে বলে, তোমার কিন্তু এটা ঠিক লাইন নয়, বুঝলে বিজুদা।

বিজু একটু অবাক হয়ে বলে, কী লাইন...?

এই যে, ঝাড়পিট—খুনখারাপি...।

কী করে বুঝলি?

বুঝি। স্যাম্পেল মুখ কুঁচকে ছোট একটা ঢেকুর তুলে বলে, শালা মড়ার গাড়ি চালাই বলে কি কিছু বুঝি না! তোমার ধাত অন্য।

তাই নাকি?

হ্যাঁ; ঠিকঠাক ক্রিমিনাল হতে গেলে হারামি লগ্নে জন্মাতে হয়, অসিতটা যেমন—একেবারে চব্বিশ ক্যারেট হারামির বাচ্চা... ওর সঙ্গে তোমার এঁটে চলা মুশকিল।

বিজু কিছু বলে না। শুধু ছোট একটা চুমুক দেয় গ্লাসে।

স্যাম্পেল বলে, তুমি এসব ছেড়েছুড়ে দিয়ে দেশে ফিরে যাও, বুঝলে।

হুঁ।

গেলে তো দেশে একবার—কী হল, চলে এলে কেন?

সে অনেক ফ্যাচাং।

লাইফটাই তো একটা ফ্যাচাং—ঠিক কি না বলো?

হুঁ। অন্যমনস্কভাবে বলে বিজু।

শালা ঘেন্না ধরে গেল।

হুঁ।

শালা যত দেখছি, তত ঘেন্না ধরে যাচ্ছে।

দেখিস কেন এত; চোখ বুজে থাকবি।

এবার শালা তাই থাকব। স্যাম্পেল ছোট একটা চুমুক দিয়ে বলে, কে যেন এক মহাপুরুষ নিজেই নিজের চোখ গেলে দিয়েছিল না...?

তা হবে।

হ্যাঁ গো...সত্যি দিয়েছিল, রামপ্রসাদ না রামকৃষ্ণ কেউ একটা হবে, আমার আবার দুটো খুব গুলিয়ে যায়, দুটোরই দাড়ি আছে তো।

ভ্যাট শালা; এদের কেউ নয়...।

তা হলে অন্য কেউ হবে...পরে মনে পড়লে তোমায় বলব...আর একটা বলো না মাইরি...।

আর খাবি?

খাব, খাব...খাওয়াচ্ছ যখন মন খুলে খাওয়াও... লাইফে তো শালা এই একটাই মস্তি...আর তো সব ফালতু...শালা ঘেন্না ধরে গেল...বললে, বিশ্বাস করবে না, পাঁচ-পাঁচটা ছেলে—সব ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, হাইফাই ব্যাপার, বাপ-মা-র খোঁজ নেয় না কেউ...আর মরে যাওয়ার পর বুক চাপড়ে কান্না, শালা ধান্দাবাজি বুঝি না!

হুঁ।

শালাদের এত ফাঁট, গাড়ি-বাড়ি, কিন্তু বাপ-মা কত দামি জিনিস বোঝে না।

কিছু বলে না বিজু। একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে দৈত্যের মতো বড়সড়ো একটা মানুষ, খুব ভ্যাবাচ্যাকা চোখে তাকিয়ে থাকে, একটু এলোমেলো পায়ে হাঁটে; আর গায়ে শাড়ি জড়ানো জড়সড় চেহারার এক মহিলা—বিজুর সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে হুকুম তামিল করার জন্যে। বিজুকে দেখলেই রেডিয়ো বন্ধ করে দেয়।

এই দুটো মানুষের সামনে থেকে পালাতে চায় বিজু। পারছে না; পা দুটো যেন আটকে গেছে তার...। গ্লাসে বড় একটা চুমুক দেয়, বুকটা একটু জ্বলে, মাথায় ঝাঁক্কি লাগে।

শালা কী বলব! একটু নাক টেনে স্যাম্পেল বলে, বডি তুলতে গেছি, বউটা খাটের পায়া জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, বডি তুলতে দেবে না কিছুতেই...কান্নাকাটি দেখে দেখে আমাদের মন-টন, সব ঝামা হয়ে গেছে...তবু শালা যেন মেজাজটায় খিঁচ ধরে—আহা রে, বড্ড শোক লেগেছে বউটার—ও বাবা, তারপর দেখি দুটো মাস যেতে না যেতেই অন্য লোকের সঙ্গে ঢলাচ্ছে... কী বলব মাইরি...।

কিছু বলে না বিজু। এক চুমুকে গ্লাসের বাকিটা গলায় ঢেলে ইশারায় বেয়ারাকে ডাকে।

স্যাম্পেল বলে, আমিও শালা ভাবছি এই লাইন ছেড়ে দেব—একটা প্রাইভেট গাড়ি যদি পাই, এই শালা মড়ার গাড়ি আর ভালো লাগে না!

বিজু একটু মলিন হেসে বলে, সওয়ারি হিসেবে মরা মানুষ অনেক ভালো জানবি, জ্যান্তদের নিয়ে বহুত ফ্যাচাং...

সে জানি, তবু শালা এই গাড়ি ভালো লাগে না।

ভূতের ভয় পাস নাকি...?

ধুসস...! ভূত-ফুত আবার কী—আসলে গাড়ি চালাতে চালাতে মাঝে মাঝেই মনে হয় পেছনে কাচের বাক্সে মুনমুন শুয়ে আছে—তখন শালা এত ফালতু লাগে, যেন মনে হয়...।

মুনমুনটা আবার কে রে? একটু ঝুঁকে পড়ে বিজু বলে, লাইন করেছিলি নাকি?

বেয়ারা গ্লাসে মদ ঢালে, জল মেশায়। একটু ঢুলুঢুলু চোখে গ্লাসের তরলটার দিকে তাকিয়ে থাকে স্যাম্পেল। তারপর বলে, নাহ, লাইন আর করলুম কোথায়—হেভি দেখতে ছিল মেয়েটা, জানো।

তাই নাকি?

হ্যাঁ, মেয়েদের ইশকুলের পেছনে ওই যে লাল বাড়িটা—ওই বাড়িটার মেয়ে...। বিশ্বাস করো, ওকে দেখলেই আমার কেমন হত, কলেজ যেত যখন, দাঁড়িয়ে থাকতুম রাস্তার ধারে, একবার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল, আর আমি সাইকেলে যেতে যেতে সেদিকে তাকিয়ে কেলিয়ে পড়লুম ড্রেনে...তারপর থেকে আমাকে দেখলেই মুখ টিপে হাসত। হাসলে গালে টোল পড়ত, তখন আরও হেভি লাগত দেখতে...।

গ্লাসে ছোট একটা চুমুক দিয়ে বিজু বলে, হ্যাঁ।

আমার শালা ঘুমটুম মাথায় উঠল, সবসময় ওর মুখ, মেয়েটার মধ্যে কীরকম একটা ঠান্ডা-শান্ত ভাব ছিল, অনেকটা লক্ষ্মী ঠাকুরের মতো—মনে হত ফুল দিয়ে পুজো করি...বিশ্বাস করো...ভেবো না মাল খেয়ে ভুলভাল বকছি। ওকে যে বিয়ে-ফিয়ে করব, সে চিন্তা করতুম না—শুধু মনে হত চুপচাপ ওর কাছে গিয়ে বসে থাকি, মাইরি বলছি...।

চুপচাপ গ্লাসে একটা চুমুক দেয় বিজু।

ফের একবার নাক টেনে স্যাম্পেল বলে, মাইরি, কত রাত যে ঘুমোতে পারিনি।

বিজু বলে, মরল কী করে?

সুইসাইড। ঘুমের বড়ি খেয়েছিল...। কেন খেয়েছিল কে জানে, কেউ বলে লাইন, কেউ বলে বাপ-মা-র সঙ্গে ঝামেলা—কে জানে শালা কেন; আর এমনই বরাত, আমাকেই সেদিন গাড়িতে করে বডি নিয়ে যেতে হল—চালাতে চালাতে মনে হচ্ছিল, গাড়িতে স্পিড দিয়ে বেরিয়ে যাই, ওকে নিয়ে চলে যাই, শ্মশানে পুড়িয়ে দিতে মন চাইছিল না, মনে হচ্ছিল হোল লাইফ ওকে গাড়িতে নিয়ে ঘুরি...গাড়ি থামাব না কোনওদিন—মাইরি বলছি, বিশ্বাস করো, হোল লাইফ ওকে গাড়িতে নিয়ে ঘুরব।

খুব অবাক দৃষ্টিতে স্যাম্পেলের দিকে তাকিয়ে থাকে বিজু। স্যাম্পেল পকেট থেকে রুমাল বের করে ফোঁত করে নাক ঝাড়ে একবার। তারপর বলে, ভাবছ তো মালের ঘোরে ভুলভাল বকছি—কিন্তু বিশ্বাস করো, এখনও গাড়ি চালাতে চালাতে মনে হয় ফুলে ঢাকা মুনমুন শুয়ে আছে পেছনে...।

বিজু বলে, চ, এবার উঠি।

আরে বসো, বোসো না; বাড়ি তো যাবই, বাড়ি তো শালা রোজ যাই।

বিজু মৃদু হেসে বলে, এরপর তোকে নিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।

স্যাম্পেল বলে, গুরু, বলছি—তোমার কেউ নেই?

আমার! খুব অবাক হয়ে বলে বিজু।

হ্যাঁ বস তোমার।

ফোট।

না মানে, কেউ ছিল না, তোমার দেশের বাড়িতে, মাইরি সত্যি বলো না, জানতে ইচ্ছে করছে।

না না।

তোমার মাইরি এই লম্বা ফিগার—ফেস কাটিং এত ভালো, মেয়েরা কিন্তু হেভি চাইবে। আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয়, এই যে তুমি দেশের বাড়ি যেতে চাও না, এটা শালা কোনও লাভ কেস...ঠিক কি না...?

ফোট। একটু বিরক্তির সঙ্গে বিজু বলে, ওসব কিছু নয়।

তুমি শালা মনে হচ্ছে চেপে যাচ্ছ, আরে বলো না গুরু, বলে দিলে মন হালকা হয়...।

বিজু বলে, ওঠ এবার, আমার কাজ আছে।

দাঁড়াও বস, এটা আগে শেষ করি। গ্লাসের দিকে তাকিয়ে স্যাম্পেল বলে, এত দামি মাল খাওয়াচ্ছ, তোমার দিলটা খুব বড়...আমি তো সবাইকে বলি...

বিজু একটু উদাস মুখে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। মাথার মধ্যে কুয়াশা জমছে একটু একটু করে। সেই কুয়াশার মধ্যে আবছা একটা মুখ ভেসে ওঠে। সেই মেয়েটার মুখ। মেয়েটা তার আলিঙ্গনের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে আছে। ঘাড়টা কাত হয়ে কেতরে আছে একদিকে। চোখ দুটো বোজা। তারপর থেকে মাঝে মাঝেই এই ছবিটা ভেসে ওঠে। কেন ওঠে কে জানে! আর মনে হয় মেয়েটা সেদিন চিৎকার করেনি। চিৎকার করেনি বলেই অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে মেয়েটাকে, ভোঁদাই গিয়ে হুজ্জুতি করেছে। ভোঁদাই মার্ডার হওয়ার পর আবার একদিন গিয়েছিল বিজু। কিছু না ভেবেই গিয়েছিল। এবার আর তাকে দেখে চমকাল না মেয়েটা। যেন জানতই সে আসবে। চুপচাপ মন দিয়ে হাতের কাজ সারতে লাগল। কথা খুঁজে পাচ্ছিল না বিজু। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল, একটু জল দেবে? মেয়েটা চুপচাপ স্টিলের গ্লাসে জল দিল তাকে। জলটা খেয়ে বিজু বলল, বাহ, খুব ঠান্ডা। বলেই বুঝতে পারল, এই কথাটা ঠিক বলতে চায়নি সে, ভুলভাল মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। কিছু বলল না মেয়েটা। বিজু তারপর বলল, আসছি আমি, ভোঁদাই আর বিরক্ত করবে না, ব্যবস্থা হয়ে গেছে। তখনও কিছু বলল না মেয়েটা। এবার কাছে গিয়ে বলল, তোমার নাম তো রানু। এতক্ষণ পর মেয়েটা তার দিকে সোজা তাকাল। খুব মৃদু গলায় বলল, হ্যাঁ।

স্যাম্পেল বলে, আমার খুব ঘুম পাচ্ছে বস, মনে হচ্ছে, এখানেই শুয়ে পড়ি।

তুই শো তা হলে, আমি চলি।

সত্যি বলছি বস, নেশা জমে গেলে আর হাঁটাহাঁটি পোষায় না।

আমিও তো খেয়েছি।

তুমি আর খেলে কোথায়! স্যাম্পেল বিজুর গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বলে, তিন নম্বরটাই শেষ হল না...না খাও তো আমাকে দিয়ে দাও...।

বিজু বলে, তোকে আর এক ফোঁটাও নয়, ওঠ তো এখন।

এত দামি মাল ফেলা যাবে? তুমি তো খাবে না মনে হচ্ছে...।

বিজু কিছু বলার আগেই স্যাম্পেল বিজুর গ্লাসটা টেনে নেয়। বেশ কিছুটা আছে গ্লাসে।

বিজু বলে, স্যাম্পেল ওই মেয়েটা কেমন রে?

কোন মেয়েটা? স্যাম্পেল চুমুক দিয়ে বলে।

ওই যে রে...আয়া সেন্টারে কাজ করে...যার ঘরে আমি ঢুকে পড়েছিলাম সেদিন...?

কেমন আবার! ভালোও বলতে পারো, মন্দও বলতে পারো।

যাহ শালা; এ আবার কী কথা!

আমার তো শালা মুনমুন ছাড়া সব মেয়েকেই একইরকম মনে হয়। কেন বস, কী দরকার...?

না, কিছু নয়। একটু অন্যমনস্কভাবে বিজু বলে, নে তো, ওঠ এবার।

লাইন মারলে মারতে পারো—এই স্যাম্পেল শালা ফুল হেল্প দেবে—কিন্তু মুনমুনের মতো মেয়ে তুমি কিছুতেই পাবে না...একটা ফটোও নেই যে দেখাব তোমাকে...।

ওঠ...ওঠ...। বিজু তাড়া দেয় আবার। কিন্তু নিজে বসেই থাকে। কুয়াশা আরও ঘন হয়ে জমছে মাথায়। মেয়েটা জল দিল তাকে...অজ্ঞান মেয়েটা ঢলে পড়েছিল...ঢলে পড়েছিল তার বুকে...।

১০

রানু খুব অবাক হয়ে যাচ্ছে—একটা মানুষ এত জল খেতে পারে! এত অল্প সময়ে কাউকে এত বেশি জল খেতে দেখেনি রানু। এই নিয়ে পাঁচ গ্লাস! চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে পাঁচ গ্লাস জল খেল বিজু।

আজ কাজে যায়নি রানু। শরীরটা ভালো নেই—মাথা টিপটিপ করছে; গা-হাত-পায়ে ব্যথা। সকাল থেকে ঘরের মধ্যে শুয়ে বসেই কাটিয়ে দিয়েছে। ভেবেছিল ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাবে। কিন্তু বাইরে বেরোতেই ইচ্ছে করছে না। শীত শীত করছে। গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে বসেছিল ঘরে। টিভি নেই তার। ছোট একটা রেডিয়ো-সেট আছে। এফএম স্টেশনে গান শুনছিল বসে বসে।

খুব তাড়াতাড়ি সন্ধে হচ্ছে এখন। দুপুরের পরই রোদটা কেমন তাপ-উত্তাপ হারিয়ে ভসভসে হয়ে যায়। বিকেলটা যেন দায়সারা মতো হাজিরা দিয়েই সরে পড়ে। অন্ধকার নেমে আসে ঝুপ করে।

সন্ধে উতরে যেতেই সেই ছেলেটা এল। বিজু। খুবই কুণ্ঠিত পায়ে ঘরে ঢুকল। প্লাস্টিকের টুলটা টেনে বসল। কিছু বলল না রানু। তার রাগ হচ্ছে না তেমন, বিরক্তিও নয়। মাথার মধ্যে টিপটিপে ব্যথা। একে প্রশ্ন করার, ঘর ছেড়ে চলে যেতে বলার শক্তিটুকুও যেন নেই। রেডিয়ো বন্ধ করে দিল শুধু। ক'দিন আগেও একবার এসেছিল ছেলেটা। একটু অস্থির, কী করবে যেন ঠিক করতে পারছে না। রানু কথা বলেনি। জল চাইল। দিল রানু। খেয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় হঠাৎ বলল—তোমার নাম তো রানু?

আজ ডিউটি নেই? খুব মৃদু গলায় বলল বিজু।

কিছু বলল না রানু। বিজুর দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল।

শরীর খারাপ নাকি?

এবারও কিছু বলল না রানু।

তাই বলি। বিজু একটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, রোজ সকালে যেতে দেখি, আজ দেখলাম না। কী হয়েছে?

কী জানি!

জ্বর-টর নাকি?

জানি না।

ওষুধ খেয়েছ?

রানু মাথা নেড়ে বলে—না। চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নেয় গায়ে। হঠাৎ তার মনে খটকা লাগে একটু। রোজ সকালে তাকে যেতে দেখে বিজু। তার চোখে তো কোনওদিন পড়েনি। তাহলে কি আড়াল থেকে তাকে লক্ষ রাখে ছেলেটা? ভাবতেই গা-টা একটু শিউরে ওঠে যেন। এই ছেলেটার আলিঙ্গনের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সে। তখন কেউ ছিল না ঘরে! শুধু সে আর এই ছেলেটা। এই ছেলেটা চাইলে তার চরম সর্বনাশ করতে পারত। পারত খুন করতেও। কেউ বাধা দেওয়ার ছিল না সেদিন। কিন্তু কিছু করেনি ছেলেটা। এই ঘটনা সে পরে যতবার ভেবেছে চোখে জল এসে গেছে তার। বার বার প্রণাম জানিয়েছে ঈশ্বরকে। তার মতো হতভাগ্যের মাথায় করুণাময় যে এভাবে হাত রাখবে—এ তার খুব দূর কল্পনাতেও আসে না যে!

আবার সেই কথাটা মনে পড়ে যায় রানুর। চোখের সামনে ভেসে ওঠে দৃশ্যটা। রানু অজ্ঞান হয়ে গেছে। চোখ বোজা। এলিয়ে পড়ে আছে ছেলেটার দুহাতের বেড়ের মধ্যে। ভাবতে ভাবতেই যেন আরও শীত পেয়ে যায় তার।

বিজু বলল, ওষুধ না খেলে জ্বর তো সারবে না।

ঠিক সেরে যাবে। অন্যদিকে তাকিয়ে বলল রানু।

বড় রাস্তার মুখে একটা ডাক্তার বসে; খুব কম পয়সায় রোগী দেখে, ওকে একবার দেখাতে পারো।

এবার গলাটা একটু কঠিন করে রানু বলে, কিছু বলার আছে আপনার? না থাকলে চলে যান, আমার কাজ আছে।

খুব অপ্রস্তুত একটা হাসি হাসে বিজু। বলে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলে যাব...এক গ্লাস জল দেবে...?

রানু উঠে গ্লাসে করে জল দেয় বিজুকে। এক নি:শ্বাসে জলটা খেয়ে নেয় বিজু। তারপর বলে, আর এক গ্লাস...!

তারপর থেকে পাঁচ গ্লাস জল খেয়ে ফেলল ছেলেটা। একটু সময় নিয়ে খাচ্ছে এখন। জল চাইলে তো আর মানুষকে 'না' বলা যায় না। তাই রানু অপেক্ষা করছে, আর অবাক হয়ে যাচ্ছে—একটা মানুষ এত অল্প সময়ে এত জল খেতে পারে!

পঞ্চম গ্লাসটা যেন বেশি সময় ধরে খাচ্ছে ছেলেটা। খুব স্বাভাবিক। পেটে আর জায়গা থাকলে তো খাবে! রানু বলেই ফেলল, এত জল খাচ্ছেন কেন?

বিজু বলল, খুব তেষ্টা পাচ্ছে যে!

এবার বমি হয়ে যাবে।

না না, বমি হবে না। একটু ব্যস্তভাবে বিজু বলে, তোমার বোধহয় সব জল খেয়ে শেষ করে দিলাম...।

সেটা কোনও কথা নয়...। রানু নির্লিপ্ত গলায় বলে, তেষ্টা পেলে নিশ্চয়ই খাবেন, কিন্তু...।

জল বোধহয় তোমার অনেক দূর থেকে আনতে হয়?

না, অনেক দূর আর কোথায়, এই তো গলির মুখটায়।

এই জ্বর গায়েও সব কাজ করতে হচ্ছে?

আমার এসব অভ্যেস আছে।

তা অবশ্য ঠিক। বিজু বলে, কিন্তু কষ্ট তো হচ্ছে...?

আপনি করে দেবেন নাকি আমার কাজগুলো?

না না, সে কথা নয়...। একটু যেন অপ্রস্তুত বিজু।

আপনি কি আর জল খাবেন? গলাটা আবার কঠিন হয় রানুর।

না, না, এটাই এখনও শেষ হয়নি। গ্লাসে ছোট একটা চুমুক দিয়ে বলে বিজু।

আপনার কি সত্যি তেষ্টা পাচ্ছে?

পাচ্ছে তো। ফের ছোট একটু চুমুক দেয় বিজু।

তাহলে চায়ের মতো একটু একটু করে খাচ্ছেন কেন, যার তেষ্টা পাবে...রানু বিরক্তির সঙ্গে বলে, আপনার জন্যে আমার ঝামেলা হচ্ছে।

জানি আমি। বিজু অন্যদিকে তাকিয়ে বলে, সেদিন আমি যাওয়ার পর তুমি যদি চিৎকার করতে তাহলে তোমার এত ফ্যাচাং হত না, তবে ভোঁদাই আর কিছু করতে পারবে না—শুনেছ বোধহয়, ভোঁদাই...।

ভোঁদাই নয়, এবার থানা থেকে ঝামেলা করছে।

থানা থেকে! একটু অবাক গলায় বিজু বলে, থানা আবার কী করছে?

আপনি যে এখানে আসেন সে খবর চলে গেছে সেখানে।

একটু চুপ করে থাকে বিজু। হাতের গ্লাসটা এক মনে দেখে। তারপর বলে, এরকম কিছু একটা যে হতে পারে, মনে হয়েছিল আমার...।

আর আমাকে তার জন্যে জবাবদিহি করতে হচ্ছে! এবার চরম বিরক্তি রানুর গলায়।

সরি; আসলে চারদিকে ওদের সোর্স থাকে। তবে এবার সেরকম ভয় আর নেই। বেশ আত্মবিশ্বাসের গলায় বিজু বলে, এবার কারও বাপের ক্ষমতা নেই, বুঝতে পারে।

কিছু বলে না রানু। চোখে মুখে বিরক্তি ফুটে থাকে শুধু।

আমি যে রুটে এসেছি, কেউ ধারণা করতে পারবে না, সেই রুটেই চলে যাব—তোমার কোনও ভয় নেই।

একটু বিস্ময় ফুটে ওঠে রানুর চোখে। কোন রুটে এসেছে রে বাবা! এখানে আসার তো একটাই রাস্তা!

আমি সামনে দিয়ে আসিনি, ভয় নেই তোমার; কেউ দেখতে পাবে না—পেছন দিয়ে এসেছি, ওদিক দিয়েই চলে যাব।

পেছন দিয়ে এসেছে ছেলেটা! বিস্ময় চরমে ওঠে রানুর। পেছন দিকে আসার পথ কোথা! ওদিকে তো একটা এঁদো ডোবা—নোংরা আবর্জনা ভরতি, তারপর উঁচু পাঁচিল ঘেরা একটা পোড়ো বাড়ি—তাহলে এল কোথা দিয়ে?

রানুর চোখ মুখের বিস্ময়টা লক্ষ করেই বোধহয় বিজু বলে—সবসময় সোজা রুটে চলাফেরা করলে আমাদের চলে না।

রানু ভাবে, মরুক গে যাক...যারা মানুষ খুন করে তাদের কাছে কিছুই অসম্ভব নয়! সে বলে, হল জল খাওয়া।

হ্যাঁ, এই যে আর একটুখানি। গ্লাসে একটু চুমুক দিয়ে বিজু বলে, কী জিগ্যেস করল পুলিশ?

কী আবার...বললাম তো!

তুমি কী বললে?

বললাম, না কেউ আসেনি আমার কাছে। আমার কিন্তু ভীষণ শরীর খারাপ লাগছে—আপনি দয়া করে আসুন এবার!

টপ করে উঠে পড়ে বিজু। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে, মিথ্যে বললে কেন—সত্যিটা বলে দিতে পারতে!

এবার বলব। বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বলে রানু।

একটু হেসে ফেলে বিজু। চুপচাপ এক চুমুক জল খায়।

রানু রাগের চোখে দেখে। রাগের মধ্যেও তার মনে হয়, হাসলে ছেলেটাকে ঠিক খুনির মতো দেখায় না। আবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই ছবিটা—অসহায় রানু অজ্ঞান হয়ে আছে এই ছেলেটার দু-হাতের মধ্যে।

সে চোখ ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে।

বিজু বলে, আর কী বলবে...?

রানু একটু অবাক হয়ে বলে, আর কী—মানে?

পুলিশকে আর কী বলবে? এই যে জল খেতে দিলে, বলবে এটা? তাহলে কিন্তু পুলিশ তোমাকেও সন্দেহ করবে।

করুক।

বলেই যখন দেবে, তবে আর এক গ্লাস জল দাও। একটু হেসে বলে বিজু।

আবার হাসিটা দেখে রানু। এবার আর চোখ সরায় না। ভালো করে লক্ষ করে বিজুকে।

কী হল—দেবে না? জল চাইলে না বলতে নেই কিন্তু, আমার মাকে বলতে শুনেছি কথাটা।

রানু ওঠে। চুপচাপ বোতল থেকে জল ঢালে গ্লাসে। তারপর বাড়িয়ে ধরে বিজুর দিকে।

বিজু হাত বাড়ায়। কিন্তু দরজার দিকে তাকিয়ে একটু সচকিত হয়ে ওঠে সে। একটা ছায়া দরজার বাইরে। একটু যেন ফিসফিসানি।

সঙ্গে সঙ্গে টানটান হয়ে ওঠে বিজুর শরীরটা। সে গন্ধ পায়। বিপদ।

রানু দেখে চকিতে পকেট থেকে ছোট কালো কিছু একটা বের করে বিজু। এরকমই একটা জিনিস সে আগে দেখেছে ভোঁদাইয়ের হাতে। বাইরে থেকে কেউ একটা সিটি দেয় যেন। বিজুর হাতের অস্ত্রটা আলো ঝলকে গর্জন করে ওঠে।

ভয়ে চোখ বুজে ফেলে রানু। হাত-পা কাঁপছে তার। ভরতি গ্লাস থেকে জল ছলকে পড়ছে।

বাইরে প্রচণ্ড জোরে একটা শব্দ হয়। বোমার শব্দ। বাড়িটা যেন কেঁপে ওঠে। রানু বসে পড়ে বিছানায়। দেখে, বিজুর হাতের অস্ত্র ফের গর্জন করে ওঠে। চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় বিজু বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।

বাইরে বোমা-গুলির শব্দ হয় পর পর। গ্লাসের জল চলকে হাতটা ভিজে গেছে রানুর। গ্লাসটা সে নামিয়ে রাখে পাশে।

১১

বাড়ি এলে প্রতিবারই এই সমস্যাটা হয় উজ্জ্বলের। ডিউটিতে ফিরে যেতে আর ইচ্ছে করে না। যত ছুটি ফুরিয়ে আসে তত মনে হয়—কেউ একটা তাকে অপহরণ করে না কেন! অপহরণ করে কোনও গোপন ডেরায় লুকিয়ে রাখুক, সরকারের কাছে কোনও বন্দিমুক্তির দাবি জানাক, দীর্ঘ কথাবার্তা টালবাহানা চলুক—আর সে দিব্যি শুয়ে বসে গড়িয়ে কাটিয়ে দেবে সময়টা। কিন্তু কিছুই হয় না তেমন। ছুটির দিনগুলো কেমন যেন হুসহাস করে হাউইয়ের মতো মিলিয়ে যায়। তারপর আবার সেই থানা, কোমরে রিভলভার ঝুলিয়ে ডিউটি, লোকজন নিয়ে গাড়ি করে অপরাধী তাড়িয়ে বেড়ানো...। ভালো লাগে না আর। মনে হয়, ছেড়ে দিই চাকরিটা।

এবার অনেকদিন পর বাড়ি এল উজ্জ্বল। অতি কষ্টে পাঁচ দিনের ছুটি ম্যানেজ হয়েছে। দিন দিন থানায় চাপ বাড়ছে। পলাশের দলটা খুব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে চারদিকে। অসিত অবশ্য কিছুটা কোণঠাসা। আর কোণঠাসা বলেই নানা মহল থেকে চাপ দেওয়াচ্ছে। প্রসূন হাজরা একদিন থানার সামনে লোকলশকর নিয়ে চোঙা ফুঁকে পুলিশকে গালমন্দ করল খুব। মোদ্দা দাবি, পুলিশের প্রশ্রয়েই সমাজবিরোধীদের বাড়বাড়ন্ত, পুলিশ ইচ্ছে করেই ধরছে না তাদের।

বড়বাবু একটু ক্ষোভের গলায় উজ্জ্বলকে বলল, দেখছেন তো, কী ঝামেলা!

পুলিশ লাইনে এসব ঝামেলা বড় কোনও ব্যাপার নয়, হামেশাই হয়ে থাকে এমন। তবু বড়বাবু কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করল উজ্জ্বলের কাছে। বলল, তখনই বলেছিলাম ওই মেয়েটাকে একটা কেস দিয়ে দেওয়া হোক, বিজুর সঙ্গে ওর যোগাযোগ একেবারে ক্লিয়ার। মেয়েটাকে তুলে আনলে লোকে ভাবত কিছু একটা করছি, ক্ষোভবিক্ষোভ এত বাড়ত না।

রানুকে তুলে আনাই যেত। খুব স্পষ্ট যে, বিজু সেদিন ওর ঘরেই ছিল। অসিতরা সুযোগটা নেয়; ওখানেই অ্যাটাক করে। অল্পের জন্যে বেঁচে গেছে বিজু। প্রচুর বোমাগুলি চলে। মাঝখান থেকে একটা নিরীহ লোক জখম হয়। ফোর্স নিয়ে উজ্জ্বল যখন পৌঁছোল, বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছিল রানুকে। প্রাইমারি ইন্টারোগেশান করে থানায় ফেরে উজ্জ্বল। শুনেই বড়বাবু বললেন, একটা ফলস কেস দিয়ে তুলে আনুন মেয়েটাকে, তারপর চাপ দিয়ে কথা বের করুন। একটু রাত করে উজ্জ্বল আবার গেল রানুর কাছে। কনস্টেবলদের বাইরে রেখে সে একা ঢুকল ঘরে। রানু জেগেছিল। তখনও চোখমুখ ভয়ে সাদা। উজ্জ্বলকে দেখে মাথা নিচু করে বসে রইল। এখন এই মেয়েটার ঘরে দুটো পেটো রেখে ফাঁসিয়ে দেওয়া যায় সহজে। বড়বাবুর তেমনই নির্দেশ।

উজ্জ্বল সোজা রানুর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে কিন্তু আমি বিশ্বাস করেছিলাম। আপনি কিন্তু বিট্রে করলেন আমার সঙ্গে!

খুব ভীত চোখে উজ্জ্বলের দিকে একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল রানু।

...তার মানে ভোঁদাইয়ের বাড়ির লোকের কথাই ঠিক। উজ্জ্বল গম্ভীর গলায় বলল, আপনার জন্যেই মার্ডার হয়েছে ভোঁদাই।

না না, বিশ্বাস করুন...। ফাঁকা গলায় বলে রানু।

কী বিশ্বাস করব? উজ্জ্বল আরও কঠিন গলায় বলে, কোনও রিলেশান না থাকলে, ও শুধু শুধু আপনার কাছে আসে—আমাদের আপনি এত বোকা বলতে চান...?

বিশ্বাস করুন। রানু বলে, হঠাৎই এসেছিল, আমি কিছু জানতাম না...।

এসে কী বলছিল?

জল চাইল।

জল...! খুব অবাক হয়ে উজ্জ্বল।

হ্যাঁ।

বেশ। ভালো কথা। তারপর কী বলল?

তারপর আবার জল চাইল।

অ্যাঁ!

হ্যাঁ, পরপর চার-পাঁচ গ্লাস জল খেল।

তাই নাকি...?

আমি প্রতিবারই ভাবছিলাম এই জলটা খেয়ে চলে যাবে, ও মা, সেটা শেষ করে, আবার চাইছে...!

আশ্চর্য!

হ্যাঁ। জল চাইলে না দিয়ে তাড়িয়ে দেব, বলুন?

সে তো বটেই।—অন্যমনস্কভাবে বলে উজ্জ্বল। এমন অদ্ভুত কাণ্ড সে কোনওদিন শোনেনি। একটা হার্ডকোর ক্রিমিনাল ঝুঁকি নিয়ে এসেছে এমন একটা জায়গায়, যেখানে যে-কোনও সময়ে বিপদে পড়তে পারে সে। এসে মেয়েটাকে বিরক্ত করছে না, ভয় দেখাচ্ছে না। শুধু গ্লাসের পর গ্লাস জল খেয়ে যাচ্ছে—কী কারণ হতে পারে...কী কারণ...বড় অদ্ভুত ব্যাপার...!

আমি তাও বলেছি, তাড়াতাড়ি জল খেয়ে চলে যান। আমার কাজ আছে।

শুনে কী বলল?

বলল যে, এই গ্লাসটা খেয়েই চলে যাব; কিন্তু তারপর আবার চাইছে—চায়ের মতো একটু একটু করে খাচ্ছে জলটা!

তার মানে, খুব তেষ্টা ছিল না?

তাই মনে হয়। রানু বলে, খুব তেষ্টা থাকলে ওভাবে একটু একটু করে জল খাবে কেন?

হঠাৎ উজ্জ্বল বলে, এইবার বুঝেছি।

কী?

আমার মনে হয়, ও আবার আপনার কাছে আসবে।

খুব অসহায়ভাবে রানু বলে, তার জন্যে আমি কী করি বলুন, লোকটার সঙ্গে সবসময় রিভলভার থাকে। আজ তো গন্ডগোল হতেই রিভলভার বের করল!

খুব শান্ত গলায় উজ্জ্বল বলে, আপনাকে কিছু করতে হবে না, আপনি শুধু একটা মিসড কল দেবেন আমার ফোনে, চুপিচুপি দিয়ে দেবেন।

একটু আতঙ্কিত গলায় রানু বলে, কিন্তু জানতে পারলে...।

কিচ্ছু জানবে না। উজ্জ্বল গম্ভীর গলায় বলে, এ ছাড়া কিন্তু আপনার বাঁচার উপায় নেই, না হলে আপনাকে অ্যারেস্ট করা হবে। লক-আপ কিন্তু খুব ভালো জায়গা নয়—এবার আপনি ভেবে দেখুন...। তা ছাড়া আরও একটা ব্যাপার, এবার কিন্তু আপনি অসিতদের গ্রুপের টার্গেট হয়ে গেছেন, ওরাও আপনার ওপর রিভেঞ্জ নিতে পারে। অসিত এমন একটা ক্রিমিনাল, যার কোনও কাজ করতেই আটকায় না, আপনি মহিলা, একা থাকেন —বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা...?

একটু কেঁপে ওঠে রানু। কাঁপা গলায় বলে, আচ্ছা।

এখনও পর্যন্ত রানুর কাছ থেকে কোনও খবর পায়নি উজ্জ্বল। সে নিজে কয়েকবার ফোন করেছে রানুকে। মেয়েটার সঙ্গে কথাবার্তা বলে মনে হচ্ছে মেয়েটা চায় বিজু ধরা পড়ুক। কিন্তু বিজু আর ওদিক মাড়াচ্ছে না। ছুটিতে আসার আগের দিন একটা খবর পাওয়া গেল। বিজু এলাকায় নেই। সেদিন হাঙ্গামার সময় কিছুটা ইনজিওরড হয়েছে। তারপর থেকেই হাওয়া! কোথায় আছে, সে খবর অবশ্য সোর্স দিতে পারেনি। দেশের বাড়িতেও যায়নি। এরকম অবস্থায় দেশের বাড়ি গিয়ে লুকিয়ে থাকার মতো বোকা নয় বিজু। তবু লোকাল থানাকে অ্যালার্ট করে রেখেছে উজ্জ্বল।

ছুটিতে আসার আগের দিন রানুর কাছে গিয়েছিল সে। সেদিন ছুটি ছিল রানুর। বিছানায় বসে কিছু একটা সেলাই করছিল। জানলা দিয়ে শেষ বিকেলের পড়ন্ত রোদ পড়েছিল মেয়েটার মুখে। পিঠের ওপর একঢাল খোলা চুল। বেশ দেখাচ্ছিল মেয়েটাকে। এর আগে কয়েকবারই মেয়েটার মুখোমুখি হয়েছে সে, প্রত্যেকবারই খুব উদবেগ আর আতঙ্কের মধ্যে ছিল মেয়েটা। চাপের মধ্যে ছিল উজ্জ্বলও। ধমক-চমক করতে হয়েছিল মেয়েটাকে। ফলে সেভাবে লক্ষ করা হয়নি। আজ দেখল ভালো করে; এবং দেখেই মনে হল, বাহ, বেশ দেখতে তো! তখনই মনে হল, বিজু কি ওর প্রেমে পড়েছে? কে জানে বাবা! প্রেম ভালোবাসা ব্যাপারটা তার কাছে বড় গোলমেলে লাগে। ঈশিতা কী সব সাংঘাতিক সাংঘাতিক কথা বলত তখন। বলত, উজ্জ্বলকে না পেলে সে নাকি বিষ খাবে। যতদূর খবর পেয়েছে, বিষ-টিস এখনও কিছু খায়নি সে; বরং দিব্যি সুখে সংসার করছে। উজ্জ্বলেরই বরং মাঝে মাঝে মরে যেতে খুব ইচ্ছে করে।

উজ্জ্বলকে দেখেই ব্যস্তভাবে উঠে দাঁড়াল রানু। বসতে বলল। বিছানায় বসতে বসতে একটা মিষ্টি গন্ধ পেল উজ্জ্বল। মেয়েটার যা আর্থিক সামর্থ্য তাতে খুব দামি কিছু প্রসাধন ব্যবহার করা সম্ভব নয়। এটা হয়তো মেয়েটার নিজস্ব গন্ধ। কোনও কোনও মেয়ের একেবারে নিজের একটা গন্ধ থাকে; আর কোনও গন্ধের সঙ্গে মেলে না সেটা। ঈশিতার ছিল। এখনও চোখ বন্ধ করে নাক টানলে সেই গন্ধটা পায় উজ্জ্বল।

চুপিচুপি গন্ধটা একবার টেনে নিয়ে উজ্জ্বল বলল, কী করছিলেন?

তেমন কিছু নয়, একটু সেলাই করছিলাম আর কি...ওই ছেলেটা আর আসেনি, এলেই আপনাকে জানাব, মিসড কল দেব। একটু ব্যস্তভাবেই বলে রানু।

ও এখানে নেই।

তাই নাকি...। একটু অবাক গলায় রানু বলে, কোথায় তাহলে...?

সেটা ঠিক এখনও জানতে পারিনি, তবে এলাকায় নেই, সম্ভবত সেদিন চোট পেয়েছে, হয়তো কোথাও গিয়ে ট্রিটমেন্ট করাচ্ছে।

সেদিনের প্রসঙ্গটা উঠতেই বোধ হয় একটু যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল রানুর মুখ। চোখ বুজে বলল, বাবা:!

উজ্জ্বল বলল, আপনি কেমন আছেন?

আমাদের আর থাকা...! একটু মলিন হেসে বলল রানু।

মলিন হাসিতেও বেশ দেখায় মেয়েটাকে। চুরি করে একবার দেখে নিয়ে উজ্জ্বল বলল, না মানে, আপনার হাজব্যান্ড কি আর উৎপাত করছে?

না। ঘাড় নেড়ে বলে রানু।

করলেই আমাকে বলবেন কিন্তু।

রানু বলে, এর মধ্যে একদিন এসেছিল, কারখানার ঝামেলা মিটে গেছে, আবার কাজ করছে।

তাই নাকি! বাহ ভালো...।

আমাকে ফিরে যেতে বলছে।

তাই নাকি! উজ্জ্বল একটু কৌতূহলের সঙ্গে বলে, তাহলে চলে যাচ্ছেন...?

এখনও কিছু ঠিক করিনি! একটা শ্বাস ছেড়ে রানু বলে, ওর এই ভালোমানুষিটা বিশ্বাস করা শক্ত। এখন নিয়ে যাচ্ছে, দুদিন পর আবার অত্যাচার শুরু করে দেবে!

তাহলে...? খুব কৌতূহল নিয়ে রানুর দিকে তাকিয়ে থাকে উজ্জ্বল।

কিন্তু এখানেও তো আমাকে এই বিপদ আপদের মধ্যে থাকতে হচ্ছে—তাই ভাবছি...কোনওদিন হয়তো এখানে খুনই হয়ে যাব আমি।

উজ্জ্বল একটু ব্যস্তভাবে বলে ওঠে, না না, সে ভয় পাবেন না, আমরা আছি কী করতে?

আবার একটু মলিন হেসে রানু বলে, দেখি...!

চুরি করে হাসিটা আবার দেখে নেয় উজ্জ্বল। তারপর বলে, একটু জল খাওয়াবেন?

হ্যাঁ হ্যাঁ! ব্যস্তভাবে বলে ওঠে রানু।

স্টিলের গ্লাসে জল দেয় উজ্জ্বলকে।

জলটা খেতে খেতে উজ্জ্বলের হঠাৎ মনে হয় এই গ্লাসটা করেই হয়তো বিজুকে জল দিয়েছিল রানু।

জল শেষ হতেই রানু বলল, আর দেব?

শুনে বড় আনন্দ হল উজ্জ্বলের। পিপাসা মিটে গিয়েছিল তার। তবু বলল, দিন, আর এক গ্লাস।

গ্লাস ভরতি করে জল দিল রানু। গ্লাসটা হাতে নিয়ে উজ্জ্বলের মনে হল সেদিন পরপর পাঁচ-ছ'গ্লাস জল খেয়েছিল বিজু। চায়ে চুমুক দেওয়ার মতো করে জল খাচ্ছিল। নিশ্চিত যে পিপাসা ছিল না তার, শুধু রানুর কাছে থাকবে বলেই বারবার জল চাইছিল, সেদিনও কি রানু এমন মলিন হাসি হেসেছিল? চুরি করে সেই হাসি দেখছিল বিজু, সেদিনও কি এই মিষ্টি গন্ধটা ছাড়ছিল, বিজু কি পাচ্ছিল সেই গন্ধ...ভাবতে ভাবতে বিজুর চেহারাটা ভেসে ওঠে চোখে।

এক চুমুক জল খেয়ে উজ্জ্বল বলে, আমি ক'দিনের জন্যে ছুটিতে যাচ্ছি।

ও। ছোট করে বলে রানু।

ফোন নাম্বার তো রইল আপনার কাছে, তেমন কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করবেন।

আচ্ছা।

একদম হেজিটেট করবেন না।

ঠিক আছে।

জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে রানু। গ্লাসে আর একটা চুমুক দেয় উজ্জ্বল। মাঝে মাঝে বড় চুপ হয়ে যায় মেয়েটা; কথা এত কম বলে যে ওর কাছে বসে থাকলে ঝপ করে নির্জনতা নেমে আসে চারপাশে। তখন গ্লাসের পর গ্লাস জল খেয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।

জলে ছোট একটা চুমুক দিয়ে উজ্জ্বল বলে, অনেক দিন বাড়ি যাইনি।

উজ্জ্বলের দিকে একবার তাকিয়ে রানু বলে, ও।

আমাদের লাইনে ছুটি পাওয়া খুব কঠিন ব্যাপার।

ও।

মা এত করে বলে, কিন্তু যাওয়ার উপায় থাকে না।

বাড়িতে কে কে আছে? প্রশ্নটা করে উজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে থাকে রানু।

এই সামান্য কথাগুলোয় সেই মিষ্টি গন্ধটা আরও যেন ঘন হয়ে জড়িয়ে ধরল উজ্জ্বলকে। গভীর একটা শ্বাস টেনে সে বলল, মা।

আর কেউ নেই?

না, আর কেউ নেই।

ও। তাহলে তো মায়ের মন খারাপ হবেই।

গভীর একটা শ্বাস ফেলে উজ্জ্বল। ছোট একটা চুমুক দেয় গ্লাসে।

দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর নিজের ঘরে শুয়ে ছিল উজ্জ্বল। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। জানলার পাশে একফালি জমিতে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটা ছিল। এত ফুল ফুটত, এত ফুল ঝরে থাকত নীচে যে, গাছতলার আলোবাতাসটা পর্যন্ত যেন লালচে হয়ে যেত। এই গাছতলাতেই তখন ঈশিতার সঙ্গে দেখা হত উজ্জ্বলের। কথা বলতে বলতে ফুল কুড়িয়ে পাপড়িগুলো ছিঁড়ত ঈশিতা। গাছটা নেই। কাটা পড়েছে। কেমন যেন অসহায় বিধবার মতো দেখাচ্ছে জায়গাটা। উজ্জ্বল অবাক হয়ে দেখল, গাছটার গোড়া থেকে অনেকগুলো নতুন ডালপালা বেরিয়েছে আবার। ওগুলো বড় হবে, আবার ফুল ধরবে, আবার লালচে করে দেবে চারপাশ।

চারটে দিন কোথা দিয়ে যেন কেটে গেল। কাল চলে যেতে হবে। ওদিকের কী খবর কে জানে! বিজু কি ফিরল এলাকায়? আবার কি এসেছিল রানুর কাছে? ভাবতে ভাবতেই রানুকে ফোনটা করে উজ্জ্বল।

অনেকক্ষণ রিং হবার পর উজ্জ্বল শুনল—হ্যালো! ভীষণ ক্লান্ত শোনাল গলাটা।

আমি উজ্জ্বল বলছি।

বুঝতে পেরেছি।

কেমন আছেন?

ওই আর কি! খুব ক্ষীণ গলায় রানু বলল, আমার মনে আছে, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন...। ঠিক মিসড কল পাবেন।

না না, সে জন্যে ফোন করিনি। একটু ব্যস্তভাবে বলে উজ্জ্বল।

ও।

আসলে ভাবছিলাম, কেমন আছেন...?

ও।

আর কোনও প্রবলেম হয়নি তো?

একটু চুপ করে রানু বলল—না।

ভাবলাম ওখানেই আছেন, না কি হাজব্যান্ডের কাছে চলে গেছেন...।

কিছু বলল না রানু। একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল।

আপনার হাজব্যান্ড আর এসেছিলেন নাকি...?

আবার চুপ রানু।

হ্যালো...হ্যালো...।

ওর একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল কারখানায়। মারা গেছে। এবার দীর্ঘশ্বাসের স্পষ্ট শব্দ পেল উজ্জ্বল।

চুপ করে থাকে উজ্জ্বল। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না সে। এই রকম অবস্থায় কী বলতে হয় জানা নেই তার। কিছুক্ষণ পর সে খুব আস্তে করে বলল, কবে?

গতকাল।

জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল উজ্জ্বল। কৃষ্ণচূড়া গাছটা নেই। কেমন যেন হাহাকার করছে জায়গাটা। তাকে স্বস্তি দিয়েই ফোনটা কেটে গেল একসময়।

১২

'হ্যালো' শুনেই কেটে দিল বিজু। এই নিয়ে তিনবার। প্রত্যেকবারই সে আশা করছে অন্য কেউ ফোন ধরবে। অন্য কেউ বলতে বাবা। ঠাকুমা কানে শোনে না কিছু—ফোন ধরার প্রশ্ন নেই।

অবশ্য বাবা ফোন ধরলে কী বলবে ভেবে উঠতে পারেনি এখনও। আসলে কেন ফোনটা করছে সেটাই ঠিক জানে না সে। মাসখানেক সুন্দরবনের পাখিরালয়ে একটা বাড়িতে আছে বিজু। পলাশের ব্যবস্থা। চোট পাবার পর ক্যানিং-এ পালিয়ে এসেছিল বিজু। ডাক্তার অনেক চেষ্টা করেও হাতটা রাখতে পারেনি। কবজি থেকে বাদ গেছে। নিজের নুলো হাতটার দিকে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সে। কেমন অসহায় লাগে নিজেকে। পলাশ কতদিন আর দেখবে তাকে। তারপর তো নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে। পলাশ অবশ্য বার বার বলছে, ভালো হয়ে নিয়ে তুই চলে আয়, সব ঠিক হয়ে যাবে।

বিজু বলেছিল, কিন্তু একটা হাত তো চলে গেল। তাও আবার ডান হাত।

তাতে কী? এইবার তোর নাম ফাটবে বেশি। শালা নুলো বিজু—জানবি নুলো-খোঁড়া-কানাগুলো বেশি খতরনাক হয়। পুলিশের কাছে তোকে হাতকড়া পরানো বহুত টাফ হয়ে গেল।

কিন্তু মেশিন ধরব কী করে?

আরে শালা বাঁ-হাত কি ফ্যালনা নাকি? আমরা হচ্ছি সোসাইটির বাঁ-হাত, ময়লা ঘাঁটার হাত—কিন্তু এটাও ডানহাতের সঙ্গে একই দিনে জন্মেছে, একইসঙ্গে বড় হয়েছে। তবু শালা লোকে নিচু নজরে কেন দেখে বল তো!

পারব মেশিন ধরতে?

খুব বেশি হলে একটা মাস, তারপর দেখবি ডান হাতের থেকে বাঁ-হাতে টিপ বেশি।

তবুও মাঝে মাঝে খুব অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে সে নুলো হাতটার দিকে। তখনই মনে পড়ে যায় মেয়েটার কথা। রানু। মেয়েটা খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল সেদিন। সে যত জল খাচ্ছিল তত অবাক হচ্ছিল মেয়েটা। মজা লাগছিল বিজুর। উঠে যাবার জন্যে তাগাদা দিচ্ছে, আবার জলও দিচ্ছে। এখনও আফশোস হয় বিজুর। আর একটু আগে উঠলেই অসিতদের মুখে পড়তে হত না। কিন্তু কেন যে থাকতে ইচ্ছে করছিল!

সেদিন ফোন করেছিল স্যাম্পেলকে। ফোন পেয়েই স্যাম্পেল ভয়ানক উত্তেজিত—গুরু, কোথায় তুমি?

জাহান্নমে।

এটা তো তোমার নম্বর নয়, কার এটা?

যমরাজ্যের।

নিয়ে যাবে গুরু?

কোথায়?

ওই যে বললে—জাহান্নমে।

পাসপোর্ট লাগবে। আছে?

করিয়ে নেব গুরু। কাকে কত খাওয়াতে হবে বলো। যমরাজকে, নাকি ওর ওই যে কেরানি, চন্দ্রগুপ্ত না ইন্দ্রগুপ্ত, সেই লোকটাকে?

বিজু বলে, এসে কী করবি?

ওখানে আমার কত চেনাজানা আছে জানো, কত লোককে গাড়ি করে পৌঁছে দিয়েছি, আমি মাল গেলে ঠিক জামাইআদর পাব।

জামাই আদর—! ক্যালানি খেয়ে জান যাবে তোর।

কেন গুরু?

যাদের এনেছিস সবাই ব্যাপক খচে আছে। বলছে স্যাম্পেল শালা টুপি টাপা পরিয়ে এখানে দিয়ে গেছে আমাদের, একবার পাই, হিসেব উসুল করে নেব।

ক্যালানি তো এখানেও খাচ্ছি গুরু। দাদারা ক্যালাচ্ছে, চ্যালারা ক্যালাচ্ছে, পুলিশ ক্যালাচ্ছে। ওখানে মাল টাল পাওয়া যায় কি বলো, তা হলেই হবে।

একটু হেসে ফেলে বিজু।

দিশি না বিলেতি?

মালের খোঁজ জানি না। বিজু বলে, তবে তোর মুনমুন আছে।

যা:। এইটা কিন্তু ঢপ দিলে গুরু।

কেন?

মুনমুন নরকে যেতেই পারে না, বড় পবিত্র মেয়ে, ও ঠিক স্বর্গে গেছে, গিয়ে মা সরস্বতীর কাছে গিটার শিখছে।

তাহলে আর এখানে এসে কী করবি? স্বর্গেই চলে যা।

সে কী আর নসিবে আছে বস, এত পাপ করেছি, আর তা ছাড়া গেলেও মুনমুন আমাকে পাত্তা দেবে কেন—আচ্ছা আচ্ছা দেবতা ওর সঙ্গে লাইন করার জন্যে ঘুরঘুর করবে; মুনমুনকে দেখোনি তাই, দেখলে বুঝতে পারতে।

একটু চুপ করে থাকে বিজু। মুনমুন নামে একটা পবিত্র মেয়েকে কল্পনা করার চেষ্টা করে, যে হেঁটে গেলে পায়ের চিহ্ন থেকে যায় মাটিতে, যার মাথায় গোল চাঁদের মতো আলো আছে—ভাবতে ভাবতে অন্য একটা মুখ ভেসে ওঠে চোখে—শীর্ণ ক্লান্ত একটা মুখ, চোখে ভীষণ আতঙ্ক—

গলাটা একবার ঝেড়ে নিয়ে বিজু বলে, ওদিকের খবর কী?

স্যাম্পেল বলে, খবর আর কী—ভাইলাল আবার নতুন করে দম খেয়ে লেগেছে, সলিড ব্যাকিং আছে পার্টির, এই তো পরশুই, পলাশের সঙ্গে লাগল, পলাশের একটা ছেলেকে ঝেড়ে দিয়েছে।

খুব অবাক হয়ে যায় বিজু। বলে, সে কী রে, কী নাম?

বুলটিন।

বুলটিনকে ঝেড়ে দিল! শুনিনি তো।

হ্যাঁ। খেলটা হল, পুলিশ ভাইলালকে ছেড়ে পলাশের দুটো ছেলেকে তুলেছে। পার্টিতে বড় কারও ব্যাকিং খাচ্ছে ভাইলাল, খুব তেজ ধরেছে এখন।

একটু চুপ করে থাকে বিজু। খবরটা বেশ ধাক্কা দেবার মতো, ক'দিন আগেই তো পলাশের সঙ্গে কথা হল, কিছু তো বলেনি। বুলটিন ছেলেটা পলাশের ডান হাত। চোখা ছেলে। সেই বুলটিন নেই মানে ব্যাপক ঝাড়।

স্যাম্পেল যেন একটু সতর্ক গলায় বলে, ভালো কথা বলছি বস, লাইন ছেড়ে দাও, অন্য ধান্দা করো, কে যে এখন কার দিকে ঝুঁকছে, কে কখন ঝাড় খেয়ে যাচ্ছে ঠিক নেই।

হু।

তাই বলছি কেটে পড়ো, তোমার দেশের বাড়িতে চলে যাও।

আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে বিজু। তারপর বলে, আচ্ছা, ওই মেয়েটার খবর কী রে?

কোন মেয়েটা?

আরে ওই যে রে—রানু।

কেন বলো তো গুরু! স্যাম্পেল বলে, আমার কিন্তু কেসটায় গন্ধ-গন্ধ লাগছে।

গন্ধ মানে?

সে তুমিই ভালো বলবে, কী মারাতে ওই মেয়েটার কাছে গিয়েছিল বলো তো সেদিন?

একটু থিতিয়ে যায় বিজু। বিশ্বাসযোগ্য একটা কারণ ভেবে বের করার চেষ্টা করে। পলাশও সেদিন তাকে জিগ্যেস করেছিল—তুই আবার ওই মেয়েছেলেটার কাছে কেন গিয়েছিলি, লাভ কেস আছে নাকি!

স্যাম্পেল বলে, বরাতজোরে সেদিন সেভ হয়ে গেছ কিন্তু, শুনে থেকেই আমার মনটা খচখচ করছে, তারপর আমি ভালো করে মেয়েটাকে দেখেছি, দেখতে খারাপ নয়, কিন্তু মুনমুনের পাশে দাঁড়াবে না।

সকালেই মাল-ফাল খেয়েছিস নাকি স্যাম্পেল?

কেন বস?

ভাট বকছিস।

অমনি ভাট হয়ে গেল! স্যাম্পেল বলে, লাইন কি খারাপ জিনিস বস, সবার কপালে কি জোটে—তুমি না বলতে চাইলে শুনব না, আসলে কেউ লাইন করছে শুনলেই মনটা একটু ভালো হয়ে যায় আমার, মুনমুনের কথা খুব মনে পড়ে—

এবার একটু ধমকের সুরে বিজু বলে, বাজে কথা ছাড়, কেউ আর হুজ্জুতি কিছু করেছে নাকি ওর ঘরে?

শুনিনি তো। স্যাম্পেল বলে, করলে তো কানে আসত, তবে এখন আর কেউ ওখানে খ্যাঁচাবে না, পুলিশের নজর আছে।

পুলিশ! একটু অবাক হয়ে যায় বিজু।

হ্যাঁ। পুলিশ যাতায়াত করছে মেয়েটার কাছে।

কেন রে!

সে কি আর আমাকে বলেছে, নিশ্চয়ই গালগপ্প করতে আসে না, ওর ঘরে অত বড় একটা লাফড়া হয়ে গেল, পুলিশ তো আসবেই।

এইটাই আশঙ্কা ছিল বিজুর। মেয়েটাকে আরও বড় ঝামেলার দিকে ঠেলে দিয়েছে সে, ফালতু ফালতু দিয়েছে।

ফোনেই গুনগুন করে গান ধরে স্যাম্পেল—ফুলকলি রে ফুলকলি, বল তো এটা কোন গলি?

বিজু একটু সিরিয়াস গলায় বলে একটা কাজ করতে পারবি? মেয়েটার নম্বর জোগাড় করে দিতে পারবি?

এই গলিতে যদি কেউ একবারও আসে—চেষ্টা করে দেখব গুরু—সেই তো ফাঁসে—

পরদিনই স্যাম্পেল ফোন করেছিল। ফোন নম্বর জোগাড় করতে পারেনি। তবে দুটো তথ্য দিয়েছে। এক, রানুর স্বামী নাকি মারা গেছে। রানু নেই, ঘর বন্ধ। আর দু-নম্বর—ও আবার প্রেমে পড়েছে, বিজু এলে দেখাবে মেয়েটাকে।

ক'দিন ধরেই মনটা টানছিল। রানু নেই শুনে যাবার ইচ্ছেটুকু দপ করে নিভে গেল। রানু কি বরাবরের জন্যে চলে গেল? নাকি ফিরে আসবে আবার? রানুর স্বামীকে ভাবতে চেষ্টা করে বিজু। কেমন ছিল লোকটা? কী হয়েছিল, মরল কেন? একাই বা থাকত কেন রানু?

নিজের নুলো হাতটার দিকে তাকিয়ে থাকে বিজু। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই হাতেই রানুর মুখ চেপে ধরেছিল। এই হাতেই অসিতকে ঝেড়েছিল। এই হাতেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল মালতীকে। সেই লোকটার ছবি ভেসে ওঠে চোখে। লম্বা চওড়া সেই লোকটা, কেমন ছন্নছাড়া পায়ে হাঁটে, ভ্যাবাচ্যাকা চোখে সব কিছু দেখে। লোকটাকে দেখতে ইচ্ছে করে একবার। কিছু না ভেবেই ফোন করেছিল বাড়িতে। মালতী ধরল। কেটে দিল বিজু। যতবারই করছে মালতী ধরছে।

হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে চলে এল বিজু। বেশ চওড়া নদী। ওপারে ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের বাঘ মাঝে মাঝে নদী সাঁতরে এ পাড়ে চলে আসে। মুখে করে বাছুর ছাগল নিয়ে চলে যায়। ক'দিন আগেই রাতে এসেছিল একটা। দুটো লোককে জখম করে চলে গেছে।

সন্ধে হয়ে গেছে একটু আগে। দিনের বেলা বাইরে বড় একটা বেরোয় না বিজু। নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা এগিয়ে গেল সে। নদীতে জেলেদের নৌকো। নদী-নালা দিয়ে জঙ্গলের অনেক ভেতরে চলে যাবে ওরা। মাছ-কাঁকড়া ধরবে। ফিরবে দু-তিন দিন পর। দু-একজন হয়তো ফিরবেও না। চলে যাবে বাঘের পেটে।

রানুর কথা মনে পড়ে। একা থাকে মেয়েটা। ভোঁদাই ফিনিশ হয়ে গেছে; কিন্তু আরও কত আছে। এখন কেমন আছে রানু কে জানে!

একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আবার ফোন করে বিজু। এবারও মালতী ধরল। না কেটে ফোনটা ধরেই থাকে বিজু। মালতী 'হ্যালো' 'হ্যাঁলো' করছে। গানের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। মালতী রেডিয়োতে গান শুনছে ঠিক। সময় পেলেই রেডিয়োতে গান শোনে মালতী। বিজু কাছেপিঠে থাকলে বন্ধ করে দেয়।

বিজু বলে, হ্যালো!

হ্যালো! কে?

আমি বিজু।

বিজু—ও!—বলে চুপ করে যায় মালতী।

গান বন্ধ হয়ে যায় ওদিকে।

কোথায় এখন?

অনেক দূরে। বিজু বলে, বাবা কোথায়?

এই তো ফিরল মাঠ থেকে; দিচ্ছি দাঁড়াও।

না না, থাক। বিজু তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ঠিক আছে তো—?

তোমার কথা বড্ড বলে—খালি বলে দিনরাত।

ও। বলে চুপ করে যায় বিজু।

একদিন পুলিশ এসেছিল বাড়িতে।

একটু থমকে যায় বিজু। তারপর বলে, কবে?

সেই যে তুমি বাড়ি এসেছিলে, তার ক'দিন পর।

কী বলছিল?

তোমার খোঁজ করছিল।

হুঁ। গম্ভীর হয়ে বিজু বলে, ক-জন এসেছিল?

চার-পাঁচজন; আমি তো ভয়ে—।

এই ক-দিনের মধ্যে আসেনি?

না তো।

একটু চুপ করে থাকে বিজু। হিসেব মেলাবার চেষ্টা করে। তার মানে ভোঁদাইয়ের কেসটার ক'দিন পরে গিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু তারপর আর যায়নি। যায়নি; কিন্তু নজর নিশ্চয়ই আছে। নজর রাখছে আড়াল থেকে।

মালতী বলে, তারপর থেকে খুব চিন্তা করছে।

কিছু বলে না বিজু।

আর একটা চিন্তা ওর হয়েছে এখন। মালতী বলে, মা কেন এখনও শক্ত, কেন এখনও বাগান সারতে বাইরে যায়, শুধু বোঝায় ঘরের মধ্যে সব করতে, মা-ও রাজি নয়—মায়ের গু-মুত পরিষ্কার করলে তবে নাকি পুণ্যি হয়—। ওর নাকি অনেক পাপ হয়েছে।

বিজু অবাক গলায় বলে, কী পাপ?

কী জানি। বলে চুপ করে যায় মালতী।

চুপ করে থাকে বিজুও। পাপ-পুণ্যের ভাবনা তার নেই। তবু তার মায়ের কথা মনে পড়ে যায় হঠাৎ। কতদিন হয়ে গেল মা মরেছে তার। মায়ের মুখটা মনে করার চেষ্টা করে বিজু। কিছুতেই মনে পড়ছে না, বড় আবছা হয়ে গেছে যেন। অন্য একটা মুখ ভেসে উঠছে বার বার। এ কেবল আস্তে করে গান শোনে রেডিয়োতে আর বিজুকে দেখলেই বন্ধ করে দেয়। এই মুখটাকেই একদম সহ্য হয় না তার। আর এইটাই ভেসে উঠছে মনে—যত মোছার চেষ্টা করে তত দগদগে হয়ে ফুটে ওঠে। রাগ হয়, গরম হয়ে ওঠে মাথা—রাগের চোটে নুলো হাতটা ঝাঁকায়।

বাড়ি আসবে না তুমি? মৃদু গলায় বলে মালতী।

দপ করে জ্বলে ওঠে মাথা। দাঁতে দাঁত চেপে বিজু বলে—কেন যাব? কেন যাব তোমাদের ওই রঙ্গ দেখতে? লজ্জা করে না তোমাদের? শালা লজ্জা করে না!

১৩

ডিউটি থেকে ফিরছিল রানু। গলির মুখটায় হঠাৎ ঝপ করে অন্ধকার নেমে এল। শীত যাই যাই করছে। এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে লোডশেডিং। এই গলিটা বড় খারাপ লাগে তার। নোংরা, দুর্গন্ধময়, স্যাঁতসেতে! ভবেশের কথা মনে পড়ে যায়। ভবেশ আর নেই। তবু এই গলিটায় ঢুকলে মনে পড়ে যায়।

হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেলে নিজেকে কেমন পরিত্যক্ত আর প্রতিরোধহীন মনে হয়। গা ছমছম করে। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় রানু। বাড়ির কাছে এসে চমকে ওঠে। দরজার সামনে অন্ধকারে কেউ একজন দাঁড়িয়ে।

থমকে দাঁড়ায় রানু। বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটার শব্দ হয়।

অন্ধকারে মোবাইল জ্বলে ওঠে। বলে—আমি।

চিনতে পারে রানু। মেজোবাবু। সে বলে, কখন এলেন?

এইমাত্র, ফিরে যাচ্ছিলাম।

ও।

কেমন আছেন?

ওই আর কি!

চুপচাপ ঘরের তালা খোলে রানু। ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালে। বুঝতে পারে, মেজোবাবু দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। এখন মাঝেমধ্যেই আসে মেজোবাবু। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ অফিসারের মতো আসে। বিজুর খোঁজখবর নেয়। একই কথা। রোজ বলে, এলেই আমাকে একটা মিসড কল দেবেন। তারপর বলে, এক গ্লাস জল দেবেন...? রানু জল দেয়। একটু একটু করে জল খায় মেজোবাবু। অনেকটা সময় নিয়ে খায়। খায় আর এটা-সেটা কথা বলে। ঠিক পুলিশি তদন্তের মতো মনে হয় না রানুর। একদিন জিগ্যেস করল, আপনি পায়রা পুষতেন? মেজোবাবুর নাকি অনেক পায়রা ছিল, সবার আলাদা আলাদা নাম—টনি মিনি জনি—এইসব। রানু তো অবাক। হাসিও পায়। আবার ভাবে, হতেও পারে, সে কতটুকুই বা বোঝে...এইসব সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেই হয়তো কোথাও লুকিয়ে থাকে গোপন সূত্র, অপরাধীর কাছে পৌঁছে যাবার হালহকিকত। না হলে, তার কাছে শুধু শুধু কথার ঝাঁপি খুলে বসবে কেন অমন একজন পুলিশ অফিসার। একটু আফশোস হয় রানুর। সেই মস্তান ছেলেটা—বিজু—তাকে যদি একবারও আর দেখতে পায় সঙ্গে সঙ্গে খবর দেবে মেজোবাবুকে। একটু অন্তত উপকারে লাগবে মেজোবাবুর।

বাতিটা ঘরের মেঝেতে বসিয়ে রানু বলে, আসুন। ঘরে ঢোকে উজ্জ্বল। দেওয়াল জুড়ে ছায়া পড়ে। টুলটা টেনে নিয়ে বসে পড়ে সে।

চা খাবেন? আজ একটু সাহস করে বলে ফেলে রানু।

চা...? কিছুটা যেন অবাক হয়ে রানুর দিকে তাকায় উজ্জ্বল।

হ্যাঁ। রানু বলে, আমার অবশ্য দানা চা—আপনার বোধহয় ভালো লাগবে না।

একটু চুপ করে বসে থাকে উজ্জ্বল। তারপর বলে, সেজন্যে নয়, আমি বেশি চা খাই না।

আর কিছু বলে না রানু। তাকিয়ে থাকে উজ্জ্বলের দিকে। খুবই যেন অন্যমনস্ক লোকটা।

আমাকে বরং একটু জল দিন। জলের গ্লাসটা হাতে নিয়ে উজ্জ্বল বলে, আপনার ওদিকের কী খবর?

কোনদিকে?

শ্বশুরবাড়ির।

বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রানু বলে, শাশুড়ি এখনও আমার চোদ্দো পুরুষ উদ্ধার করছে।

আপনার...কেন...!

ওর ছেলের মৃত্যুর জন্যে আমি দায়ী...।

সে কী! খুব অবাক হয়ে বলে উজ্জ্বল।

আমি ওর ছেলেকে ঠিক রাখতে পারিনি, আমার জন্যেই নাকি সে বিপথে গিয়েছিল...।

আশ্চর্য।

একটু মলিন হাসে রানু।

আপনি কি ফিরে যাবেন—ভেবেছেন কিছু...?

কোথায়?

শ্বশুরবাড়ি...?

নাহ, সেখানে গিয়ে কী করব?

বাপের বাড়িতেও তো যাওয়া যাবে না।

মাথা নেড়ে রানু বলে—না।

এখানেই কি থাকবেন তাহলে...এইভাবে...?

তা ছাড়া আর উপায় কী?

না, আসলে...একা একটা মেয়ের এভাবে থাকা...আসলে দিনকাল তো ভালো নয়...।

আমার কিছু হবে না...। রানু বলে, আমি নিজেও তো ভালো নই—আমার আর কী খারাপ হবে...।

আপনি খারাপ হতে যাবেন কেন...! তাড়াতাড়ি বলে ওঠে উজ্জ্বল।

আমি গুন্ডা-মস্তানদের আশ্রয় দিই—খারাপ নয়তো কী...।

একটু অপ্রস্তুত গলায় উজ্জ্বল বলে, এ আবার কেমন কথা!

ঠিকই।

সে তো নেহাতই বাধ্য হয়ে...।

কে বলে বাধ্য হয়ে? সত্যি হয়তো যোগাযোগ আছে। না হলে আমার কাছে পরের বারই বা আসবে কেন...! আপনি তো সেই আশাতেই যখন-তখন আসেন এখানে, যদি পাওয়া যায় তাকে—তাইতো...? রানু সোজা তাকায় উজ্জ্বলের দিকে।

না না, তা নয়...। এখনও অপ্রস্তুত উজ্জ্বলের গলা।

আপনি হয়তো ভদ্রতা করে বলছেন না সামনে, কিন্তু আমাকে নিয়ে আপনার ঘোর অবিশ্বাস আছে—ঠিক কিনা বলুন...? এই তো দেখুন না, আমার নামে চুরির অভিযোগ উঠেছে।

চুরি...? একটু অবাক হয়ে বলে উজ্জ্বল।

হ্যাঁ, একটা পার্টির বাড়ি থেকে সেন্টারে বলা হয়েছে, আমি নাকি তাদের মোবাইল, ঘড়ি এইসব চুরি করেছি।

সে কী!

কিছু বলে না রানু। চুপচাপ আঁচলের খুঁট পাকায় বসে বসে। মুখে কোল্ডক্রিমের মতো মাখা অভিমানের হাসি। উজ্জ্বল বলে, ছি: ছি:, ছেড়ে দিন কাজটা।

ম্লান হাসিটা মুখে নিয়েই রানু বলে, ছেড়ে দিয়ে কোথায় যাব? নতুন জায়গায় আবার কেউ বেড়াতে যাবার, সিনেমা দেখার প্রস্তাব দেবে আড়ালে একা পেলেই। আর রাজি না হলে বলবে চোর...।

হতবাক হয়ে রানুর মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে উজ্জ্বল।

থাক গে ছাড়ুন। রানু বলে, এখন তাড়াতাড়ি বুড়ি হয়ে গেলে বাঁচি।

অ্যাঁ! খুব অবাক গলায় উজ্জ্বল বলে, কে বুড়ি হবে?

আমি।

আপনি বুড়ি হতে যাবেন কেন?

বুড়ি হলে অন্তত চোর অপবাদ শুনতে হবে না।

খুব অসহায় বোধ করে উজ্জ্বল। চূড়ান্ত অপ্রস্তুত গলায় বলে, কী যা-তা বলছেন!

সত্যি বলছি! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রানু বলে, আমি রোজ ঠাকুরকে বলি,—তাড়াতাড়ি আমাকে বুড়ি করে দাও, একেবারে বুড়ি, মুখ তুবড়ে যাবে, গায়ের চামড়া ঝুলে যাবে, কেউ ফিরেও তাকাবে না আমার দিকে।

এত অদ্ভুত কথা সম্ভবত আগে কোনওদিন শোনেনি উজ্জ্বল। উদভ্রান্তের মতো বলে উঠে, বিশ্বাস করুন, বিশ্বাস করুন—আমি আপনাকে...সত্যি বলছি...!

মোটেই সত্যি বলছেন না আপনি। সোজা উজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে বলে রানু।

দাগি অপরাধীর মতোই উজ্জ্বল চোখ সরিয়ে নেয় রানুর চোখ থেকে। অন্যদিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলে, বিশ্বাস করুন, আপনাকে নয়, আমার সন্দেহ হয় ওকে।

কাকে?

ওই যে ওই ছেলেটা—বিজু।

বিজুকে।

হ্যাঁ।

কী সন্দেহ হয়?

একটু ইতস্তত করে উজ্জ্বল বলে, না মানে...।

বড় বড় চোখ করে উজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে থাকে রানু। বলে, বলুন না, কী সন্দেহ হয়?

না, আসলে ছেলেটা ক্রিমিনাল ঠিকই, কিন্তু একটু কেমন যেন, অন্য ধরনের; না হলে বলুন না, আপনাকে তো একাই পেয়েছিল—অন্য কেউ হলে একা একটা মেয়েকে এভাবে অসহায় অবস্থায়...মানে...।

একটু যেন শিউরে ওঠে রানু। চোখের সামনে সেই দৃশ্যটা ভেসে ওঠে—অজ্ঞান রানু এলিয়ে পড়ে আছে সেই ছেলেটার বুকের মধ্যে, ওইরকম একটা দাগি আসামী, সেদিন চলে যাবার পর কেঁদেছিল রানু। জীবনে সেই প্রথম তার মনে হয়েছিল, সে বড় ভাগ্যবান। ভাবলে আজও চোখে জল আসে তার।

একটু গলা ঝেড়ে উজ্জ্বল বলে, তাই আমার খালি মনে হয়, আজ হোক বা কাল, ও ঠিক আসবে, এসে জল চাইবে, একটু একটু করে খাবে জলটা, যেমন আগের দিন করেছিল, করতে গিয়ে বিপদে পড়েছিল, কেন কে জানে, আমার বারবার মনে হয়...।

মাথা নামিয়ে বসে থাকে রানু। কী বলবে সে? তারও তো কেমন যেন মনে হয়, মাঝে মাঝে সত্যি মনে হয়—একদিন আবার আসবে সেই ছেলেটা, হঠাৎ অকারণেই আসবে, এসে আবার জল চাইবে, জল খাবে একটু একটু করে। মেজোবাবুও যে ঠিক তেমনই ভাবে...বড় লজ্জা! এত লজ্জা নিয়ে সে তাকাবে কী করে মেজোবাবুর দিকে। মেজোবাবু যে সব জেনে গেছে! ছি: ছি:!

রানুকে অস্বস্তির হাত থেকে বাঁচাতেই বোধহয় উজ্জ্বলের বুক পকেটে মোবাইল বেজে ওঠে পিঁক পিঁক করে। একটু যেন বিরক্তি নিয়েই কানে মোবাইলটা ধরে মেজোবাবু।

রানু দেখে দু-একটা কথা বলেই উঠে দাঁড়িয়েছে উজ্জ্বল। জলের গ্লাসটা নামিয়ে রেখেছে পাশে। মুখে উদবেগ।

কথা বলতে বলতেই দরজার দিকে এগিয়ে যায় উজ্জ্বল। রানু একটু সাহস করে বলে, কিছু হয়েছে?

ফোনটা পকেটে রেখে উজ্জ্বল বলে, আসছি আমি।

রানু বলে, কী হয়েছে?

উজ্জ্বল বলে, আমাদের যা কাজ, গন্ডগোল বোমাবাজি।

জলটা যে একটুও খেলেন না?

মৃদু হেসে উজ্জ্বল বলে, আজ সময় নেই, অন্যদিন আসব।

বড় বড় পা ফেলে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় উজ্জ্বল। তাড়াতাড়ি দরজার সামনে আসে রানু। অন্ধকারকে লক্ষ করেই বলে, সাবধানে যাবেন।

১৪

বিজু দৌড়োচ্ছে। প্রাণান্তকর দৌড়। একটা হাত নিয়ে ছোটা খুব ঝামেলার। বারবার বেটাল হয়ে যাচ্ছে, হুমড়ি খেয়ে পড়ার মতো হচ্ছে। দমও হালকা হয়ে আসছে তার।

বুকে টান লাগছে। ভারী হয়ে যাচ্ছে পা-দুটো। তবু থামতে পারছে না বিজু। পেছনে কেউ আসছে—হয়তো অসিত, কিংবা পলাশ, খোলা রিভলভার হাতে মেজোবাবুও হতে পারে। মেজোবাবুর বুকে পাগলাটে দম। হাঁপায় না শালা লোকটা। সেবার মেজোবাবুই ধরেছিল তাকে। কেমন মেশিনের মতো দৌড়োয় লোকটা। থামার পর বড় বড় করে শ্বাস ফেলে না, একটুও ওঠানামা করে না বুক; যেন মনে হয় দৌড়োয়নি, হাওয়ায় ভেসে ভেসে চলে এসেছে।

এমন গান্ডু-মার্কা পুলিশও আগে দেখেনি বিজু। আজ কী করতে চাইছিল মেজোবাবু? এ তো একরকম সুইসাইড!

বিজু খবরটা পেল লাস্ট মোমেন্টে। এত বোমকে গিয়েছিল যে প্রথমে পালাবার কথা মাথায় আসেনি। ফোনের ওদিকে স্যাম্পেল উত্তেজিত গলায় বলছে, কী ক্যালানের মতো 'ভ্যাট' 'ভ্যাট' করছ, আগে কেটে পড়ো...।

পলাশ নাকি বিজুকে সরাতে চাইছে। হ্যাঁ, বিজুকে। পলাশের অবস্থা ভালো নয়। বুলটিন বডি। ভাইলালের যে ছেলেগুলোকে পলাশ টেনেছিল তারা আবার ভাইলালের কাছে চলে গেছে। ভাইলাল নিজে শার্প শুটার; আরও একস্ট্রা দুটোকে জোগাড় করেছে। প্রসূন হাজরার অ্যান্টি গ্রুপ পেছনে আছে ভাইলালের। হাতে প্রচুর আর্মস। পুরো এলাকার কন্ট্রোল চাইছে। অসিতকেও ব্যাপক ঝাড় দিয়েছে কদিন আগে। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার, অসিতের গড-ফাদার প্রসূন হাজরার অবস্থা ভালো নয়। পার্টিতে একদম কোণঠাসা। পার্টির ওপর লেভেল থেকে কড়কে দিয়েছে। সম্পত্তির হিসেব-নিকেশ করে দেখছে। একদম গুটিয়ে গেছে প্রসূন। কোনও ঝামেলায় যেতে চাইছে না। অসিত তাই পলাশের সঙ্গে জুড়তে চাইছে। পুরোনো খারাখারি ভুলে ফের একসঙ্গে কাজ করবে। শুধু একটাই শর্ত—বিজুকে চাই। বিজুর ওপর ঝাল তার এখনও যায়নি। যে বিজুকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছিল, সেই বিজুই তার গায়ে হাত দিয়েছে। বিজুকে তাই সরাতেই হবে। পলাশ টাইম নিয়েছিল। এখন রাজি হয়ে গেছে।

শুনে একদম উড়িয়ে দিয়েছিল বিজু—ভ্যাট শালা, সন্ধেবেলাতেই মাল টেনেছিস।

স্যাম্পেল আরও উত্তেজিত—তোমার পায়ে পড়ছি, এক্ষুনি কেটে পড়ো, না হলে কিন্তু আর সময় পাবে না।

বিজু তবু বলে, তুই কী করে জানলি?

জেনেছি, আমি সাত ঘাটে ঘোরা ছেলে। সোর্স বলা যাবে না—বাঁচতে চাও তো এক্ষুনি কেটে পড়ো।

সুন্দরবনের ডেরা থেকে বিজু ফিরেছে সবে গতকাল। ফিরে নির্মল ঘোষ রোডের পুরোনো এই ডেরাটায় ঢুকে গেছে। পলাশের সঙ্গে দেখা হয়নি। একবার ফোন করেছিল বিজুকে। বুলটিনকে নিয়ে কথা হল। হেক্কো আর জয়কে পুলিশ তুলেছে, সে-কথাও বলল, বিজুকে বারবার সাবধান করল—একদম বাইরে বেরোবি না এখন, বহুত চাপ চারদিকে, তুই মার্কড হয়ে গেছিস, সবাই চিনে ফেলবে। দৌড়ঝাঁপ করতে পারবি না ভালো করে। ঝাড় খেয়ে যাবি। তাই বিজু ভাবতেও পারছে না পলাশ তাকে সরাতে চাইছে।

হঠাৎ যেমন ফোন করেছিল তেমনই কথার মাঝপথেই যেন ছেড়ে দিল স্যাম্পেল। তারপরও বেশ কিছুক্ষণ থম হয়ে বসে থাকল বিজু। অন্ধকার ঘরে মোবাইল স্ক্রিনের আলোটুকু মাত্র ছিল। স্যাম্পেল ফোন ছাড়ার পর জ্বলছিল স্ক্রিনটা। একটু পরেই নিভে যেতে ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল ঘরটা। সঙ্গে সঙ্গে বিজুর ভেতরের সাহসটুকুও যেন নিভে গেল। পালাতে হবে। শুধু এই কথাটাই মনে হল তখন। সে এখন একা। একদম একা। মেশিনটা আছে সঙ্গে। চারটে মাত্র দানা আছে। খুব যত্ন করে এতদিন রেখে দিয়েছে সে। মেশিনটা মাঝে মাঝে বাঁ-হাতে ধরেছে, ঘোড়া টেনে ফাঁকা ফায়ার করেছে। খ্যাট করে আওয়াজ হয়েছে শুধু। কিন্তু দানা থাকলে যে ঝাঁকুনি হয় বাঁ-হাত সেটা নিতে পারবে কি না কে জানে!

মেশিনটা কোমরে গুঁজে নেয় বিজু। দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসে। এদিক-ওদিক তাকায়। পালাতে হবে। কোথায় জানে না। শুধু জানে পালাতে হবে।

গলিটা ফাঁকা। সাইকেলে করে দু-একজন যাওয়া-আসা করছে শুধু। একটা ম্যাটাডোর দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। স্টার্ট বন্ধ, আলো নেভা। বিজুর মনে হল কেউ যেন দেখছে তাকে। ওই ম্যাটাডোরটার আড়ালেই আছে হয়তো। বা অন্য কোথাও। বিজুর ভেতর থেকে কেউ যেন বলে দেয় ম্যাটাডোরটার দিকে নয়, উলটোদিকে দৌড়োও।

দৌড়ে বড় রাস্তার মোড়ে আসতেই একটা শব্দ শুনল বিজু। কে যেন লাঠি দিয়ে ল্যাম্পপোস্ট পেটাল। খুবই নিরীহ শব্দ। কিন্তু বিজুর মনে হল কেউ কিছু বলতে চাইছে।

শব্দ এল যে দিক থেকে তার উলটোদিকে দৌড়োল বিজু। আবার হল শব্দটা। চকিতে পিছনে তাকিয়ে দেখল বিজু। বাপ্পা। আজ দুপুরেও তাকে ডেরায় ভাত পৌঁছে দিয়ে গেছে বাপ্পা। কিন্তু বাপ্পার সঙ্গে এখন লাটিম। অসিতের ছেলে। এই দৃশ্যই এক ধাক্কায় স্পিড বাড়িয়ে দিল বিজুর।

বড় রাস্তায় মোটামুটি ভিড়। কেউ কেউ অবাক হয়ে দেখছে বিজুকে। পেছনে ছুটে আসছে ওরা। রেঞ্জের মধ্যে পেতে চাইছে বিজুকে। একটাই সুবিধে বিজুর, ভিড়ের মধ্যে ঝট করে মেশিন চালাবে না, চালাবার আগে দুবার ভাববে।

বোম পড়ল পরপর দুটো। ওরা চমকাতে চাইছে পাবলিককে। বলতে চাইছে, তোমরা কেটে পড়ো এখন, বাড়িতে ঢুকে যাও, রাস্তা ফাঁকা করে দাও, কিছুক্ষণের জন্যে এলাকার দখল নেব আমরা।

আতঙ্কগ্রস্ত লোকজন ছোটাছুটি করছে। এর মধ্যেই বিজু দেখতে পেল সামনের মোড়ে ছাতু আর রবিন। এদিকেই তাকিয়ে সিগারেট টানছে। বিজু থামকাল একটু। শুধু সিগারেট টানার জন্যে নিশ্চয়ই ওরা ওখানে দাঁড়িয়ে নেই।

ডান দিকে নতুন বাড়ি উঠছে একটা। সামনে একটু ফাঁকা জায়গা। ইটের গাছি সাজানো। মেশিনটা কোমর থেকে টেনে বের করল বিজু। বেশি ভাবার সময় নেই। ইটের গাছি টপকে বাড়িটার সামনে চলে এল সে। সামনের একটা ঘরে বালব ঝুলিয়ে ক'টা লোক তাস পেটাচ্ছিল। বিজুকে দেখেই উঠে পড়ল ঝেড়েমেড়ে। মেশিনটা উঁচিয়েই তরতর করে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে লাগল বিজু। বালির বস্তা, স্টোনচিপস, ইটকাঠ টপকে উঠতে হচ্ছিল তাকে।

একদম ছাদে এসে থামল বিজু। হাঁপাচ্ছে। শ্বাস পড়ছে বড় বড়। এখান থেকে সামনের বড় রাস্তাটুকু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বাপ্পারা দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকার আধ-খ্যাঁচড়া বাড়িটার দিকে দেখছে তাকিয়ে।

চারটে মাত্র দানা সম্বল। তবু রিস্ক নিতে হবে। ওদের বুঝিয়ে দিতে হবে তার কাছেও মাল আছে। বাঁ-হাতে শক্ত করে ধরে ট্রিগার টিপল বিজু। প্রচণ্ড ঝাঁকুনি। অনভ্যস্ত হাত নিতে পারল না ঝাঁকুনিটা। নড়ে গেল। গুলিটা মিলিয়ে গেল হাওয়ায়।

আওয়াজে কাজটা হল। সামনে থেকে সট করে সরে গেল ওরা। পানগুমটির আড়ালে গা-ঢাকা দিল। ওখান থেকেই বাড়িটার সামনে চার্জ করল পর পর দুটো। তিনদিকের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে শব্দের এফেক্টটা হল মারাত্মক। কেঁপে উঠল জায়গাটা। ঝপাঝপ বন্ধ হয়ে গেল আশপাশের বাড়ির জানলা। আলো নিভে গেল।

অন্ধকার ছাদে বসে তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল বিজু। স্ট্রিট লাইটের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সামনের রাস্তা। ওরা বুঝে গেছে বিজুর কাছেও মাল আছে। সামনে দিয়ে ঝট করে আসার রিস্ক নেবে না। কিন্তু পেছন দিয়ে যদি অ্যাটাক করে? তিনটে মোটে দানা সম্বল। কতক্ষণ ঠেকিয়ে রাখা যাবে ওদের?

উঠে দাঁড়ায় বিজু। ওপর থেকে চারদিকটা দ্রুত দেখে নেয়। ক'তলা বাড়ি এটা? চার, নাকি পাঁচ? পাশের বাড়ির ছাদটা বেশ কিছুটা দূরে। দুটো হাত থাকলে ঠিক লাফ দিয়ে চলে যাওয়া যেত। এক হাতে ব্যালেন্স রাখা যাবে না। স্লিপ করে একবার নীচে পড়লেই ফিনিশ।

আবার দুটো বোম পড়ল পরপর। এবার পেছনে দিকে। এরকমই আশঙ্কা ছিল বিজুর। পেছন দিক থেকে অ্যাটাক আসছে। সবচেয়ে ভয়ের কথা, পেছনের গলিটা অন্ধকার। ঘাপটি মেরে কেউ এলে দেখা যাবে না।

তিনটে গুলি আছে আর। বিজু পেছন দিকের গলি লক্ষ করে একটা চালায়। ঝনাৎ করে একটা শব্দ হয়। কোথাও টিনের গায়ে লেগেছে মনে হয়।

আবার চুপচাপ। খুব সাবধানে নীচে নামতে থাকে বিজু। দোতলায় এসে থামে। খোলা একটা জানলার কাছে আসে। এখানে একটু বেঁকে গেছে বাড়িটা। কাছেই পাঁচিল ঘেঁষে একটা ছোট ছাদ। পাশের বাড়িটার আউট হাউস বা পাম্প ঘরটর হবে। অন্ধকারে আন্দাজ করে বিজু। এখান থেকে লাফ দিলে পেয়ে যাবে ছাদটা।

বিজু লাফ দেয়। কিন্তু এক হাতে ব্যালেন্সটা ঠিক রাখতে পারে না। হুমড়ি খেয়ে পড়ে ছাদে। ধপ করে আওয়াজ ওঠে একটা। বুঝতে পারে, হাঁটু দুটো ধাক্কা খেয়েছে প্রচণ্ড। অসহ্য যন্ত্রণা।

দাঁত চেপে বিজু উঠে দাঁড়ায়। ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নামে পাশের কম্পাউন্ডে। তারপর গেট দিয়ে বেরিয়ে ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে পেছনে তাকায় একবার। নাহ। শেষ পর্যন্ত হল না মনে হচ্ছে। আসছে ওরা; টের পেয়ে গেছে বিজু পালাচ্ছে এটা দিয়ে।

হঠাৎ প্রচণ্ড চমকে যায় বিজু। সামনে একটু দূরেই পুলিশের গাড়ি। মেজোবাবু দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির সামনে।

ডানদিকের গলিটায় ঢুকে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না বিজুর। কিন্তু ঢুকেই বুঝতে পারল, মরণকূপ। কানা গলি একটা।

হাল ছেড়ে দেয় বিজু। গলিটাতে পুলিশ আগে ঢুকলে অ্যারেস্ট হবে সে। কিন্তু তার আগেই যদি ওরা গলিটার দখল নেয়, ফিনিশ করে দেবে তাকে। বেপরোয়া বিজু আর-একটা ফায়ার করে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গলির মুখে চার্জ হয় একটা।

মরিয়ার মতো শেষ চেষ্টা করে বিজু। মেশিনটা শক্ত করে ধরে গলি থেকে বেরোবার চেষ্টা করে। হঠাৎ দেখে গলির মুখে প্রায় পৌঁছে গেছে মেজোবাবু। একা। হাতে খোলা রিভলভার। ঠিক তখনই একটা চার্জ হল মেজোবাবুর সামনে। ধোঁয়া আর আগুনের কুন্ডলী ঘুলিয়ে দিল জায়গাটা। আর তার মধ্যেই কেমন যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ল মেজোবাবু।

পুলিশকে পড়তে দেখলে যত বড় শের-ই হোক ঠিক থমকে দাঁড়ায়। পুলিশের কাছে সব আবদার চলে, কিন্তু নিজেদের গায়ে হাত পড়লে ডেনজারাস। তখন কাউকে রেহাই দেয় না। ওরা তাই বোধহয় থমকাল। পুলিশের গাড়িটাও এগিয়ে আসছে স্পিড তুলে।

কয়েক মুহূর্ত থমকাল বিজুও। হুমড়ি খেয়ে পড়ে মেজোবাবুর দিকে তাকাল একবার। উলটো দিকে আর একটা গলি। খুব সরু। লাফ দিয়ে গলিটায় ঢুকে গেল সে।

ছুটতে-ছুটতে বুঝতে পারছিল বড় বাঁচান বেঁচে গেছে আজ। এতক্ষণে তার ঝাঁঝরা হয়ে পড়ে থাকার কথা। মেজোবাবু ওভাবে দৌড়ে না এলে...কিন্তু কী করতে চাইছিল লোকটা? সাহস দেখাতে, নাকি বিজুকে ধরতে, অমন গুলি-বোমার মধ্যে কেউ ওভাবে দৌড়ে আসে? যতই সাহস থাক—একদম একা, সঙ্গে কেউ নেই...এমন পাগলাটে সাহসের মানে হয় না কোনও!

কী হল মেজোবাবুর কে জানে! মরে গেলে কিন্তু কেলো হয়ে যাবে। পুলিশ মরলে বহুত ঝাড়। তখন বিজু, পলাশ, অসিত কেউ বাঁচবে না। ইঁদুরের গর্তে ঢুকলেও ঠিক টেনে বের করবে।

বিজু যাচ্ছে কোথায়? পালাবার তো আর জায়গা নেই। পলাশ তাকে সরিয়ে দিতে চাইছে। কোন আশ্রয়ে যাবে সে? বাড়িতে? সেখানেও কি বাঁচবে? পুলিশ ঠিক পৌঁছে যাবে। হুজ্জুতি করবে সবার ওপর। সেই লোকটার ছবি মনের মধ্যে ভেসে ওঠে বিজুর। মাটিমাখা সেই লোকটা। আতঙ্কে কাঁটা হয়ে থাকা সেই বউটার ছবিও দেখতে পায়। দৈত্যের মতো বড়সড় লোকটার মনে খুব কষ্ট—মা তার এখনও বড় সবল, মায়ের সেবা করতে পারছে না। বিজুর কথা নাকি খুব বলে লোকটা। আর ওই বউটা! কেমন জড়সড় ভয়ে। কেমন পালিয়ে বেড়ায়—বিজুর সামনে থেকে পালায়। একা বসে রেডিয়োতে গান শোনে, বিজু এলেই বন্ধ করে দেয়। বিজু তো ধাক্কা দিয়েছিল। পড়ে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল। বিজুর রাগ হয় খুব। এত ভয় কেন তোমার? কেন রেডিয়ো বন্ধ করে দেবে তুমি, কেন পালিয়ে যাবে সামনে থেকে, কীসের ভয় এত তোমার...?

আর পারছে না বিজু। মাথা টলছে। দাঁড়িয়ে পড়ে সে। হাঁটু দুটো গেছে মনে হয়। অসহ্য যন্ত্রণা। দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে খুব।

লোকজন খুব কম এই রাস্তায়। এগলি-সেগলি দিয়ে পা টেনে টেনে হাঁটতে থাকে বিজু। ঘামে ভিজে গেছে জামা। তার এতক্ষণ হয়ে যেত! মেজোবাবু ওভাবে পড়ে না গেলে হয়ে যেত। এখনও কি পড়ে আছে, নাকি উঠে পড়েছে? লোকটা শালা কেমন যেন—লম্বা লম্বা হাত, মেশিনের মতো দৌড়োয়। অঢেল দম বুকে। তাকে তাড়া করে একদিন ধরে ফেলেছিল লোকটা। আজও কি তাকে ধরতেই ওভাবে ছুটে আসছিল। ওইরকম চার্জ হচ্ছে যখন, তখন কেউ ওভাবে দৌড়ে আসে! মানেটা কী...। বিজুর তো কিছু করার ছিল না; কানা গলিতে ঢুকে পড়েছিল সে। কানা গলিতে ঢুকলে ফিনিশ হয়ে যেতেই হয়।

পেছনে কে যেন দৌড়ে আসছে। চমকে তাকায় বিজু। দেখতে পাচ্ছে না কাউকে। কিন্তু কেউ একটা আসছে ঠিক। মেজোবাবু নয়তো? না কি অসিত? পলাশও হতে পারে।

আর পালাবার চেষ্টা করে না বিজু। পালাবার কোনও মানে হয় না। দিনরাত শুধু টেনশন। ধরা পড়ার ভয়, মার খাবার ভয়। কোথাও গিয়ে রেহাই নেই।

নিজের নুলো হাতটার দিকে তাকায় বিজু। এই হাতেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল বউটাকে। বউটা ভয়ে ভয়ে সরে থাকে সবসময়। বিজুকে দেখলেই রেডিয়ো বন্ধ করে দেয়।

খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে বিজু। একটা অন্ধকার গলির মুখে থমকে দাঁড়ায়। চেনা চেনা লাগছে। অসিতের তাড়া খেয়ে এই গলিটাতেই ঢুকে পড়েছিল একদিন। তখন দুটো হাতই ছিল তার। দু-হাত দিয়ে চেপে ধরেছিল মেয়েটাকে। তার বুকের মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল মেয়েটা। অজ্ঞান মানুষকে বড় অসহায় লাগে। তবু বিজু বেঁধে ফেলেছিল মেয়েটাকে।

এই অন্ধকার গলির মধ্যে যেন নিজেকে খুব নিরাপদ লাগে বিজুর। বড় করে দম নেয়। এই গলিতে ঢুকে একদিন বেঁচে গিয়েছিল বিজু। গলির শেষে সেই ঘরটা। আজ স্যাম্পেল তাকে বাঁচিয়ে দিল। না হলে এতক্ষণে স্যাম্পেলের গাড়ির প্যাসেঞ্জার হয়ে যায় সে। স্যাম্পেল আবার লাইন করছে। ডিটো নাকি মুনমুনের মতো দেখতে। চুলের ঢালটা আর একটু বেশি হলেই কে বলবে মুনমুন নয়। ঘন চুল হবার একটা তেল কিনে দিয়েছে স্যাম্পেল। এখন শুধু দিনরাত ভালো তেলের সন্ধানে থাকে ও। বিয়ে করবে শিগগিরি। মেয়েটার মড়ার গাড়ি চালানো পছন্দ নয়। অন্য কাজ খুঁজছে এখন স্যাম্পেল।

হঠাৎ মনে হয় বিজুর, স্যাম্পেল জানল কী করে সব? বিজু প্রথমে উড়িয়ে দিয়েছিল—যাহ, তা আবার হয় নাকি! কিন্তু স্যাম্পেল জানল কী করে? ও কি পুলিশের সোর্স হয়ে গেছে। কে জানে, হতেও পারে।

একটু বসতে ইচ্ছে করছে। পালিয়ে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। একটু নিশ্চিন্তে বসতে ইচ্ছে করছে। ঘুমোতে ইচ্ছে করছে শান্তিতে। এই গলির শেষেই সেই ঘরটা। মেয়েটার স্বামী নাকি মরে গেছে। ফিরেছে কি সে? ওই ঘরে গেলে নিশ্চিন্তে বসতে পারে একটু...গলির শেষেই তো ওই ঘরটা।

১৫

খুব ক্ষীণ একটা ডাক কানে আসছে উজ্জ্বলের। কেউ নাম ধরে ডাকছে তাকে। সতর্ক হয়ে শোনে সে। খুব চেনা লাগছে গলাটা। চোখ খোলার চেষ্টা করে উজ্জ্বল। দু-চোখে অনন্ত ক্লান্তি। আবার চোখ বুজে ফেলে সে। চোখ বুজে গলাটা চেনার চেষ্টা করে।

উজ্জ্বল, শুনতে পাচ্ছ?

কে ঈশিতা?

যাক। চিনতে পেরেছ তাহলে!

তোমার গলা কি ভোলা যায়!

থাক, মিথ্যে করে আর বলতে হবে না! আমি জানি, আমাকে ভুলে গেছ তুমি!

না না, ভুলিনি...।

বাজে কথা, এখন তুমি কেবল ওই মেয়েটাকে ভাবো।

কোন মেয়েটা?

ওই যে, রানু!

কী যে বলো! একদম ঠিক নয়।

ঠিক নয়? তাহলে ছুতোনাতায় ওর কাছে যাও কেন?

সে তো ইনভেস্টিগেশনের জন্যে। আমাদের কাজটাই এইরকম, সবসময় চোখ-কান খোলা রাখতে হয়...

ইনভেস্টিগেশন। হাসালে! তাহলে রোজ জল খাও কেন?

পিপাসা পায় যে...।

বাজে কথা। পিপাসা থাকলে কেউ ওইটুকু করে জল খায় না। তুমি আসলে অন্য কারণে মেয়েটার কাছে যাও, আমার কাছে ফাঁকিবাজি চলবে না, বুঝলে, তোমাকে আমি খুব ভালো করে চিনি...। পিপাসা না ছাই!

সত্যি পিপাসা! উজ্জ্বল একটু জোরে বলার চেষ্টা করে—ওই যে ছেলেটা, যাকে ধরতে আমি রানুর কাছে যাই, সেই ছেলেটাও তো একটু একটু করে জল খায়...আসলে রানু মেয়েটা এমন একটা মেয়ে যে ওর সামনে চোঁ চোঁ করে জল খাওয়া যায় না, একটু একটু করে খেতে হয়...।

খুব অবাক গলায় ঈশিতা বলে, তোমার পাগলামিগুলো একদম আগের মতোই রয়ে গেছে দেখছি...এসব অদ্ভুত-অদ্ভুত পাগলামি আগেও ছিল। তোমার ধারণা ছিল ফটফটে চাঁদের আলোয় সাদা পোশাক পরে থাকলে জ্যোৎস্নার গন্ধ পাওয়া যায়। জ্যোৎস্না রাতে সাদা পোশাক পরে অনেক রাত পর্যন্ত ছাদে ঘুরতে তুমি, আর ঠান্ডা লাগিয়ে জ্বর সর্দি বাধাতে—এ সব বদ্ধ পাগলামি নয়তো কী...!

ঈশিতা তুমি সেই আগের মতনই রাগী রয়ে গেছ দেখছি—সেইরকমই রেগে গিয়ে ঝড়ের মতো কথা বলো, দম দেবার জন্যে বিরতি পর্যন্ত নাও না।

তোমার এই পাগলামিগুলো দেখলে যে-কোনও মানুষেরই মাথা গরম হয়ে যাবে। সবেতেই পাগলামি আর বাহাদুরি, সস্তা হাততালি পাবার চেষ্টা শুধু!

হাততালি আমি কোনওদিন পাইনি ঈশিতা। কেবল 'দুয়ো' পেয়ে গেছি সারাজীবন...আমি জানি, সবাই আমাকে 'দুয়ো' দেয়, এমনকী থানার কনস্টেবলগুলো পর্যন্ত আমাকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করে; এতদিন কাজ করেও নাকি ঠিকঠাক পুলিশ হয়ে উঠতে পারিনি আমি!

সস্তা বাহাদুরি নয়...! কী দরকার ছিল ওই গোলাগুলি-বোমাবাজির মধ্যে যাবার...?

এটা তো আমার ডিউটি ঈশিতা। সরকার এর জন্যে আমাকে খাওয়া-পরা দেয়।

আবার বাজে কথা! আরও তো অনেকেই ছিল, কেউ তো ওইরকম উন্মাদের মতো ছুটে যায়নি। তারাও তো পুলিশ; ইনফ্যাক্ট, তোমার সহকর্মীরাই তোমাকে নিষেধ করেছিল যেতে। কারও কথা শোনোনি তুমি।

আমি না গেলে ওরা ওকে মেরে দিত।

কাকে?

বিজুকে। তাড়া খেয়ে বিজু ঢুকে পড়েছিল গলিতে, ওটা ব্লাইন্ড লেন ছিল ঈশিতা...অসিতের ওই ছেলেরা ওকে শেষ করে দেবার জন্যেই ঢুকছিল গলিটায়...আমি না গেলে শেষ করে দিত ওকে।

দিত, দিত...একটা অ্যান্টিসোশ্যালের হাতে আর-একটা অ্যান্টিসোশ্যাল খুন হত। এরকম তো কতই হয়।

কিন্তু বিজু আমার কাছে মোস্ট ওয়ান্টেড...ওকে আমার জ্যান্ত চাই।

কী করবে?

ওর থেকে অনেক কথা আদায় করতে হবে।

কী কথা?

গোপন কথা সব, পেটের কথা; ভালো কথায় না হলে মেরে ধরে আদায় করব...জানি, সহজে মুখ খুলবে না ও...তবু কথা আমার চাই।

আরও বড় চাঁইদের ধরতে চাও ওকে জেরা করে, তাই তো? কিন্তু তুমি তো খুব ভালো করেই জানো তা অসম্ভব, চারদিক থেকে বাধা আসবে, সরকার-বিরোধী পক্ষ, তোমার বড়কর্তা সবাই তোমাকে বাধা দেবে, টানবে পেছন থেকে। দুর্নীতিতে ভরে গেছে আমাদের সমাজটা।

দুর, দুর...দুর্নীতি-টুর্নীতি নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই, এতদিন পুলিশে থেকে এটুকু বুঝে গেছি, ওসব মানুষের বড় কিছু সঙ্কট নয়, মানুষের সঙ্কট অন্য জায়গায়। সেই সঙ্কটের জন্যেই মানুষ অ্যান্টিসোশ্যাল হয়, সেই সঙ্কটের জন্যেই মানুষ প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে জল খেতে আসে। পিপাসা না থাকলেও আসে, আর একটু একটু করে জল খায়...এসব তুমি ঠিক বুঝবে না ঈশিতা...মাথায় এত রাগ থাকলে এসব বোঝা যায় না।

বুঝেছি, বুঝেছি! ঈশিতা বলে, তুমি আমাকে আর একদম সহ্য করতে পারো না, আমার সব কথাই তোমার খারাপ লাগে। ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি আমি।

প্লিজ, যেও না।

কী করব তোমার আবোলতাবোল বকবকানি শুনে।

প্লিজ, একটু বোঝার চেষ্টা করো।

উন্মাদের কথা বোঝার কী আছে বলো তো। উন্মাদ না হলে কেউ যায় ওই মেয়েটার কাছে? কী আছে মেয়েটার! রং আমার চেয়ে অনেক চাপা, ফিগার আমার অনেক ভালো ওর চেয়ে, চোখ-মুখ তো অতি সাধারণ...শুধু চুলটা একটু বেশি, কপালের চুলগুলো কোঁকড়ানো...মনে করবে আমিও ওইরকম কোঁকড়ানো চুল করে নিতে পারি; দুটো দিন পার্লারে যেতে হবে শুধু...তুমি যদি বলো, কালই যাব পার্লারে।

চুল কোঁকড়ানো! একটু অবাক গলায় উজ্জ্বল বলে, কই খেয়াল করিনি তো।

খেয়াল করোনি! একটু উচ্ছ্বাসের গলায় ঈশিতা বলে, আসলে তেমন বেশি কোঁকড়ানো তো নয়; মনে হয় পার্লারে গিয়ে করিয়েছিল কোনও সময়, এখন আবার সোজা হয়ে গেছে—রংটা কিন্তু বেশ চাপা।

তা হবে।

একদম আর যাবে না ওর কাছে।

কিন্তু বিজুকে তাহলে ধরব কী করে, ওকে তো আমার চাই...জ্যান্ত চাই। মেরে ধরে ওর থেকে কথা আদায় করব আমি। রানু বলেছে, ওকে ধরিয়ে দেবে।

ওহ! আবার সেই রানু। মেয়েটা কী করে বশ করল তোমায় বলো তো, ও মনে হয় ঠিক তুকতাক জানে। সাবধান কিন্তু... মেয়েটা ভালো নয়...দেখলে না, সংসার করতে পারল না।

সে তো ওর স্বামীর জন্যে...ওর বরটা ভালো মানুষ ছিল না।

খুব যে দরদ দেখছি! ঈশিতা একটু ফুঁসে ওঠে—মেয়েদের একটু মানিয়ে চলতে হয়।

ও খুব চেষ্টা করেছিল।

চেষ্টা না ছাই! স্বামী মরে গেছে, তবু সাজগোজের কী ঘটা! মন্দ মেয়ে, খুব মন্দ মেয়ে একটা!

সাজগোজের ঘটা দেখলে কোথায়! একটাই তো শাড়ি রোজ পরে দেখি।

বা বা, তোমার তো খুব উন্নতি দেখছি। কে কেমন শাড়ি পরে তা-ও মনে রাখছ! আগে তো এ সব খেয়ালই করতে না, কত ভালো ভালো শাড়ি-চুড়িদার পরে তোমার কাছে গেছি, কোনওদিন তো বলতে শুনিনি!

আসলে কী জানো, ভালো ভালো পোশাক, দামি পোশাক সব একরকম মনে হয় আমার। মনে হয় একই মেশিন থেকে বেরিয়ে, একই ধান্দায় পৃথিবীতে এসেছে। সেই তুলনায় সস্তা পোশাক, ছেঁড়া-তালিমারা পোশাকের টিকে থাকার নিরন্তর লড়াইকে অনেক যেন বর্ণময় মনে হয়।

ওহ, তোমার পাগলামি কী যে ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে সেটা তুমি বুঝতে পারছ না। তোমার চিকিৎসা দরকার। না হলে...না হলে...।

বলতে বলতে ক্ষীণ হয়ে আসে ঈশিতার গলা।

খুব কষ্ট করে চোখ খোলে উজ্জ্বল। এদিক-ওদিক তাকায়। কোথাও নেই ঈশিতা। ছোট একটা ঘরে শুয়ে আছে সে। সাদা বিছানা। ঝোলানো রক্তের পাউচ থেকে ড্রিপ নামছে একটু একটু করে। ঢুকে যাচ্ছে শরীরে। পেটে অসম্ভব যন্ত্রণা। গলা শুকিয়ে কাঠ।

সাদা পোশাক পরা সিস্টার এগিয়ে আসে তার দিকে। হাতে ইনজেকশানের সিরিঞ্জ।

ধীরে ধীরে আবার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে উজ্জ্বলের।

১৬

খুব জোরে চমকাল রানু। এত জোরে যে গ্লাসের জল চলকে হাতে পড়ল কিছুটা। মেজোবাবু চলে যাবার পর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ বসেছিল সে।

মানুষটা জল চাইল, কিন্তু খেতে পেল না। দৌড়ে বেরিয়ে গেল। বিপদের মধ্যে দৌড়ে যেতে হল। অন্যমনস্ক হয়ে সামনে তাকিয়ে ছিল রানু। দরজার বাইরে ঘন অন্ধকারের দিকে তাকিয়েছিল। এখনও কারেন্ট এল না। বাতিটা ক্ষয়ে ক্ষয়ে ছোট্ট হয়ে গেছে একেবারে। বাতি ফুরিয়েছে। খেয়াল ছিল না। কাল আনতে হবে বাতি।

জলের গ্লাসটা মেঝেতে বসানো। বাতির আলোয় বড়সড় একটা ছায়া পড়েছে গ্লাসের। ক্ষয়ে ক্ষয়ে একেবারে মেঝের সঙ্গে মিশে গেছে বাতিটা। শুধু সলতেটুকু জ্বলছে। নিভে গেল বলে। জলের গ্লাসটা মেঝে থেকে তুলে নেয় রানু। দরজার কাছে শব্দ হয় একটু। তাকিয়ে চমকে ওঠে সে। গ্লাসের জল চলকে হাতে পড়ে।

আর তখনই দপ করে জোরে জ্বলে উঠে নিভে যায় বাতি।

ঘোর মিশমিশে অন্ধকারে কাঠের মতো বসে থাকে রানু। বুঝতে পারে ঘরের মধ্যে ঢুকেছে সে। ঘামের গন্ধ পায় রানু। বড় বড় শ্বাস টানার শব্দ শোনে।

বাতিটা নিভে গেল! সামনের অন্ধকার থেকে ভেসে আসে কথাগুলো।

রানু বুঝতে পারে ঘরের ভেতর ঢুকে এসেছে সে। গলা যেন বড় ক্লান্ত। শ্বাস বন্ধ করে বসে থাকে রানু।

আর বাতি নেই?

রানু খুব মৃদু গলায় বলে, না।

ট্রান্সফরমারে গন্ডগোল মনে হয়।

কিছু বলে না রানু। অন্ধকারে বসে নিজের বুকের ধুকধুক শব্দ শোনে।

একটু বসি...? খুব ক্লান্ত গলায় বলে সে।

অন্ধকারের মধ্যেই জলের গ্লাসটা সাবধানে নামিয়ে রাখে রানু। ভিজে হাতটা মুছে নেয় শাড়ির আঁচলে। একটু একটু করে কমে আসছে বুকের মধ্যে খ্যাপাটে ইঞ্জিনের শব্দ। বসতে চাইছে সে। কতক্ষণ বসবে? তার মধ্যে কি ফোন করে খবর দেওয়া যাবে না মেজোবাবুকে?

অনেকদিন বাইরে ছিলাম আমি। লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল আমায়...অনেক দূরে লুকিয়ে ছিলাম...।

ফোনটা কোথায়? একটা মিসড কল দিতে হবে মেজোবাবুকে। অন্ধকারে বসে মেঝেটা হাতড়ে হাতড়ে দেখতে থাকে রানু।

কেমন আছ তুমি?

মেঝেতে নেই ফোনটা। গেল কোথায়? একটু অধৈর্য হয়ে পড়ে রানু। দেরি হয়ে যাচ্ছে। কতক্ষণ আর বসবে সে? তার আগেই খবরটা দিতে হবে মেজোবাবুকে। কথায় কথায় বসিয়ে রাখতে হবে একে।

রানু বলে, ভালো...ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

নিজের কানেই নিজের প্রশ্নটা কেমন বেখাপ্পা লাগে রানুর।

কিছু বলে না সে। ঘোর অন্ধকারে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়।

ফোনটা মনে হয় বিছানায়। দেশলাইটা জ্বালতে হবে। হাতড়ে হাতড়ে দেশলাই খোঁজে রানু। খুঁজতে খুঁজতে বলে, আপনার বাড়ি যেন কোথায়?

অনেক দূর।

একটা নাম আছে তো?

প্রশ্নগুলো নিজের কানে তত বেখাপ্পা লাগে না আর রানুর।

কী হবে জেনে তোমার; আমিই তো ভুলে গেছি। গলায় আবার ক্লান্তি নেমে এসেছে তার।

দেশলাইটা মনে হয় স্টোভের পাশে। স্টোভের দিকে একটু একটু করে সরে যায় রানু। অন্ধকারে মেঝেতে ঘষে ঘষে সরতে থাকে। বলে, বাড়িতে কে আছে?

ঠাকুমা, বাবা, আর...।

আর কে?

আমার মা। ক্লান্ত গলায় সে বলে, কিছু কি খুঁজছ তুমি?

হ্যাঁ। দেশলাইটা। আছে নাকি দেশলাই?

না তো, দেশলাই নেই...তবে মোবাইল আছে...জ্বালব...?

রানু তাড়াতাড়ি বলে, হ্যাঁ, হ্যাঁ।

মোবাইলের মৃদু আলো জ্বলে ওঠে। সেই আলোয় রানু দেখে কোণের দিকে পড়ে আছে দেশলাইটা। তাড়াতাড়ি গিয়ে তুলে নেয় রানু। একটা কাঠি জ্বালে।

অন্ধকারটা সরে গিয়ে ঘরের কোণে কোণে জড়ো হয়। অল্প আলোয় রানু দেখে ভিজে চপচপ করছে মুখ, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখের কোণে কালি, একটু রোগা হয়ে গেছে যেন।

আগুনের তাত লাগছে আঙুলে। রানু তাড়াতাড়ি বিছানাটা দেখে। না, নেই তো!

টুক করে নিভে যায় কাঠিটা। লাল আঙরা ছিটিয়ে পড়ে মেঝেতে। রানু ভাবে, কত সময় তো হঠাৎ হঠাৎ অকারণ ফোন আসে, মোবাইল কোম্পানির ফোন, এখন যদি একটা আসে তেমন! মোবাইলটা খুঁজে পায় তাহলে।

কিছু খুঁজছ?

মোবাইলটা যে কোথায় গেল...। বলতে বলতে আর একটা কাঠি জ্বালে রানু।

এবার দেখতে পায় মোবাইল। জানলার খাঁজে। তাড়াতাড়ি মোবাইলটা তুলে নেয় রানু।

এবার একটা মিসড কল শুধু।

তখনই চড়াৎ করে জ্বলে ওঠে ঘরের আলো। চোখ ধাঁধিয়ে যায় যেন।

এ কে, সামনে দাঁড়িয়ে...! সেই ছেলেটা...! হ্যাঁ, সেই ছেলেটাই তো...। একটু রোগা হয়ে গেছে শুধু। আর ভীষণ ক্লান্ত যেন। মনে হচ্ছে, এক্ষুনি ঘুমিয়ে পড়বে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঘুমিয়ে পড়বে হয়তো। খুব কষ্ট করে তাকিয়ে আছে রানুর দিকে। কিন্তু...!

এখনও কি আলো-আঁধারির ঘোর কাটেনি রানুর? ঠিক দেখছে তো সে! খুব দ্রুত চোখ দুটো একবার বুজে আবার তাকায় রানু। সেই ছেলেটাই; কিন্তু ডান হাতটা...! ডান হাতটা কবজি পর্যন্ত নেমে এসে কী নিদারুণভাবে ফুরিয়ে গেছে। কেমন অসহায় আর একা হয়ে ঝুলে আছে হাতটা।

ক্লান্ত চোখ মেলে ছেলেটাও দেখছে রানুকে। ঠোঁটের কোণে মলিন হাসি যেন একটু।

একটু জল দেবে...?

রানু তাড়াতাড়ি গ্লাসটা মেঝে থেকে তুলে নেয়। হাত আবার কাঁপছে। বলে, ভালো জল, একটু আগেই ঢেলেছি। বাঁ-হাতটা এগিয়ে দেয় ছেলেটা। একটু নড়ে ওঠে কাটা হাতটা। যেন ব্যর্থ হয়ে মাথা ঝাঁকায়।

একটু এগিয়ে গিয়ে গ্লাসটা হাতে দেয় রানু।

ছেলেটা এক নি:শ্বাসে খেয়ে নেয় সব জল।

আর দেব...?

নাহ, চলে যাব আমি...। ক্লান্ত গলায় সে বলে, চলে যাব আমি...এখনই চলে যাব...একটু বসি...? রানু শুধু অল্প ঘাড় নাড়ে। ঘাড় নেড়ে বলে—হ্যাঁ।

মোবাইলটা ধরাই থাকে হাতে, তালুর ঘামে ভিজে ওঠে মোবাইলটা।

১৭

লাইন দিয়ে সবাই আসে। একজনের পর আর একজন। কখনও জড়াজড়ি হয়, এ-ওর গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বড়বাবু তার দেশের বাড়িতে গেছে; গিয়ে উঠেছে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটায়। একটার পর একটা ফুল ছিঁড়ে কচমচ করে খাচ্ছে। নীচে দাঁড়িয়ে উজ্জ্বল বলছে, আর খাবেন না স্যার, এ ফুল বেশি খেলে পেট ব্যথা হয়। তারপর দেখল, পকেটমার গোবিন্দ লুডো খেলছে ঈশিতার সঙ্গে। নিখুঁত চোট্টামি করে জিতছে ঈশিতা। উজ্জ্বল পাশে দাঁড়িয়ে গোবিন্দকে সাবধান করছে; কিন্তু শুনতে পাচ্ছে না গোবিন্দ। জোরে চিৎকার করছে উজ্জ্বল, কিন্তু মুখ দিয়ে কেবল স্টিম ইঞ্জিনের মতো ভসভস করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। এদিকে আবার পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো ডানা লাগানো বাইকে চেপে সাঁই সাঁই করে উড়ছে প্রসূন হাজরা, পিছনের সিটে কোমর জড়িয়ে ভোঁদাই, উজ্জ্বল রিভলভার থেকে পর পর গুলি ছুড়ছে, একটাও লাগছে না; ঠিক পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে প্রসূন; কৃষ্ণচূড়া গাছের মগডাল থেকে বড়বাবু চিৎকার করছে ঊর্ধ্বমুখে, এ চাইনিজ মাল দাদা, সাবধানে চালাবেন, কোনও গ্যারান্টি নেই। হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল ঈশিতা। হাতে মস্ত লুডো। বলল, খেলবে?

উজ্জ্বল বলল, গোবিন্দর কী হল?

পালিয়েছে।

পালাল কেন?

হেরে ভূত হয়ে যাচ্ছিল।

দু-একবার ওকে জিততে দিলে না কেন?

আমি কী করব; খেলতে না পারলে তো হারবেই।

কিন্তু তুমি তো হুড়কে করছিলে।

বাজে কথা; একদম বাজে কথা! তুমি তো আমার ভালো কিছু দেখো না। তুমি নিজে চোর, তাই সবাইকে চোর বলো। ঝাউ ঝাউ করে ওঠে ঈশিতা।

আমি চোর!

চোর নয়তো কী; আমার একটা চুলের ক্লিপ চুরি করেছিলে, মনে নেই?

তোমার চুলের ক্লিপ! কবে?

ভেবে দেখো, সেই একদিন দুপুরে তোমার কাছে গিয়েছিলাম, খুলে পড়ে গিয়েছিল ক্লিপটা, কালো ক্লিপ একটা।

ওটা চুরি হল!

হল তো, পরের দ্রব্য না বলে নিলে চুরি করা হয়।

কিন্তু তোমাকে তো বলে দিয়েছিলাম; বলেই রেখেছিলাম নিজের কাছে; ওই ক্লিপটায় তোমার চুলের গন্ধ ছিল।

একটু যেন থমকে গেল ঈশিতা। তারপর আরও জোরে বলে উঠল, তুমি তাহলে ডাকাত; পরের দ্রব্য বলে নিলে ডাকাতি করা হয়; তুমি আস্ত ডাকাত; তোমার নামে আমি লালবাজারে ডায়েরি করব।

প্লিজ ঈশিতা!

তাহলে ক্লিপটা দিয়ে দাও আমায়।

আচ্ছা, দিয়ে দেব।

না, তুমি দিতে পারবে না; আমি জানি, কারণ তুমি ওটা রানুকে দিয়ে দিয়েছ।

রানুকে?

হ্যাঁ, আমার চারদিকে চর আছে; রানু আর তোমাকে ওটা ফেরত দেবে না, আমি এখনই যাচ্ছি থানায়...।

প্লিজ...প্লিজ! হাত বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি ঈশিতাকে ধরতে যায় উজ্জ্বল।

ঘুম ভেঙে যায়।

সামনে একটা মেয়ে। বেডের পাশে একটু জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে। মেয়েটা ঈশিতা নয়। খুব চেনা চেনা লাগছে মেয়েটাকে। ভালো করে দেখে উজ্জ্বল। চিনতে পারে। একটু যেন রোগা হয়ে গেছে রানু।

উজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে রানু বলে, কেমন আছেন?

ভালো। উজ্জ্বল বলে, তুমি খবর পেলে কোথায়?

রানু বলে পেয়েছি; সবাই তো বলছে, মেজোবাবু খুব সাহসী। কোথায় লেগেছে?

কী জানি; চারদিকেই তো ব্যান্ডেজ।

কবে ছাড়বে?

তাও জানি না।

হঠাৎ উজ্জ্বলের চোখে পড়ে গেল রানুর চুলে একটা কালো ক্লিপ। অনেকটা যেন ঈশিতার ক্লিপের মতো। উজ্জ্বল খুব মন দিয়ে দেখতে থাকে ক্লিপটা।

উজ্জ্বলের অমন অপলক দৃষ্টির সামনে একটু যেন লজ্জা পেয়ে গেল রানু। মুখ নামিয়ে নিল।

উজ্জ্বলের মনে হল, লজ্জা পেলে মেয়েটাকে একটু বেশি ভালো দেখতে হয়ে যায়। চোরের মতো সেই উপরি ভালোটুকু দেখে নেয় উজ্জ্বল। তারপর বলে, জানো তো, বিজু ধরা পড়েছে।

জানি।

সেই যে গন্ডগোল শুনে তোমার ওখান থেকে বেরিয়ে গেলাম, সেদিনই ধরা পড়েছে। তোমাদের ওই গলির মুখটা থেকেই ধরেছে পুলিশ।

যাক বাবা, বাঁচা গেছে।

কেমন এলোমেলো ঘুরছিল। পুলিশ দেখেও নাকি পালাবার চেষ্টা করেনি।

একটু যেন অস্বস্তির মধ্যে পড়ে রানু। আঁচলটা ভালো করে টেনে নেয় গায়ে। বলে, আপনি কিন্তু সাবধানে থাকবেন।

উজ্জ্বল বলে, আমাদের যা চাকরি...!

কী দরকার অমন চাকরি করার, ছেড়ে দিন...কত বড় একটা বিপদ গেল বলুন তো!

আমিও মাঝে মাঝে ভাবি ছেড়ে দেব, কিন্তু একটা কাজ যে এখনও বাকি থেকে গেল আমার।

কী কাজ?

বিজু ধরা পড়েছে; এবার ওর পেট থেকে কথা বের করতে হবে।

সে না হয় অন্য লোক করবে...আপনাকে অত ভাবতে হবে না।

ওরা পারবে না; যে ক্রিমিনাল ঝুঁকি নিয়ে জল খেতে আসে, একটু একটু করে জল খায়, তার পেট থেকে কথা বের করা অত সহজ নয়...আমি ছাড়া কেউ পারবে না।

একটু যেন কেঁপে ওঠে রানু। মেজোবাবুকে খুব দুঁদে পুলিশ অফিসার মনে হচ্ছে এখন। এমন একজন, যে অপরাধীর কাছ থেকে সব কথা আদায় করে নিতে পারে। জেরার পর জেরা করে মনের সব আনাচকানাচ সার্চলাইট ফেলে দেখে নেয়। এর কাছে থাকতে কেমন ভয় ভয় করে।

রানু বলে, আসি আমি।

চলে যাবে? হঠাৎ উজ্জ্বল হাত বাড়িয়ে রানুর একটা হাত ধরে বলে, আর একটু...

দাঁড়িয়ে থাকে রানু। চোখ বুজে বড় একটা শ্বাস নেয়।

ধীরে ধীরে রানুর হাতটা ছেড়ে দেয় উজ্জ্বল।

রানু বলে, ওর তো জেল হবে আবার?

হবে হয়তো।

কত দিন?

হয়তো পাঁচ বছর, হয়তো দশ বছর—যাবজ্জীবনও হতে পারে।

যাবজ্জীবন!

কিন্তু কোনও লাভ নেই। যে ক্রিমিনাল একটু একটু করে জল খায়, যে পুলিশ দেখলেও পালায় না, তাকে হাতকড়া পরাতে নেই, তাকে সারাজীবন জেলে রেখেও লাভ হয় না কিছু। আবার মুশকিল কী জানো, বাইরেও তারা নিরাপদ নয়। পদে পদে বিপদ—পুলিশ চেজ করে, অ্যান্টিগ্রুপ টার্গেট করে, নিজের গ্যাং বলির পাঁঠা বানায়। তারা কেবল ছুটে বেড়ায় তখন।

রানু চুপ করে থাকে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিজু ছুটছে, তাড়া খেয়ে ঢুকে পড়েছে রানুর ঘরে...সে অজ্ঞান হয়ে এলিয়ে পড়ে আছে বিজুর বুকের মধ্যে; ভারি মমতায় তার মুখটা দেখছে বিজু।

উজ্জ্বল বলে, রানু তুমি চলে যাও।

কোথায়?

এখান থেকে অন্য কোথাও। এখানে তোমার অনেক বিপদ, তুমি টার্গেট হয়ে গেছ।

জানে রানু। চুপ করে থাকে সে।

উজ্জ্বল বলে, সেরে উঠলে আমিও হয়তো এখানে থাকব না আর।

সিস্টার এগিয়ে আসে। বলে, ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ।

বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রানু। বলে, আমি আসি।

চলে যাবে!

সময় নেই যে।

আর হয়তো দেখা হবে না। তোমাকে কী যেন একটা জিগ্যেস করব ভেবেছিলাম।

কী?

সেটাই তো মনে পড়ছে না।

একটু দাঁড়িয়ে থাকে রানু। তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে।

রানু চলে যাবার পরই মনে পড়ে যায় উজ্জ্বলের। সেই কথাটা, যা বলবে ভেবেছিল রানুকে। একদিন রানু তাকে বলেছিল, তার নাকি কেবল বুড়ি হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। এখনও কি রানু তাই চায়? দিনরাত কেবল বুড়ি হয়ে যেতে চায়?

চলে গেছে রানু। আর তো দেখা হবে না। জানতে পারলে বড় ভালো হত।

হঠাৎ মৃদু একটা হাসি ফুটে ওঠে উজ্জ্বলের ঠোঁটের কোণে। উত্তরটা পেয়ে গেছে সে। একটু আগে একবার রানুর হাতটা ধরেছিল। কিছু কিছু হাত একবারই ধরা হয় জীবনে; তারপর ছেড়ে দিতে হয়। খুব যেন গরম ছিল রানুর হাতটা। বুড়ি হতে চাওয়া হাত কখনও এত গরম হয় না।

ভারি স্বস্তি বোধ করে উজ্জ্বল। এত স্বস্তি যে আবার ঘুম পাচ্ছে তার। ঘুমোবে। ঘুমোলেই ঈশিতা আসবে। ঝগড়া করবে। রাগ দেখাবে। কাঁদবে। ঈশিতার এই রাগ, দু:খ, এই কান্না থেকে মুক্তি নেই তার। ঈশিতা তাকে ছাড়বে না। সারা জীবন ঝগড়া করতে হবে ঈশিতার সঙ্গে।

রানু হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছে কেউ লক্ষ রাখছে তাকে। ফলো করছে। হয়তো অসিত, হয়তো পলাশ, থানার সেই অফিসারটা, ভোঁদাই হয়তো, কিংবা ভবেশ। হয়তো এরা সবাই। চিতাবাঘের মতো গুঁড়ি মেরে ফলো করছে তাকে। সুযোগ পেলেই...।

মেজোবাবু এখান থেকে চলে যেতে বলছে তাকে। কিন্তু কোথায় যাবে? বিজু যখন ছাড়া পাবে তখন সবাই তাড়া করবে বিজুকে। তখন কোথায় লুকোবে বিজু? সে না থাকলে কার ঘরে ঢুকে লুকিয়ে পড়বে?

তাই এখানেই থাকতে হবে তাকে। যতদিন না ছাড়া পায় বিজু। পাঁচ বছর, দশ বছর...বা হয়তো যাবজ্জীবন। জীবন আর ক'টাদিন? সে তো বুড়ি হয়ে ফুরিয়ে ফেলতে চায় জীবনকে। বুড়ি হওয়ার জন্যেই না হয় অপেক্ষা করবে বাকি ক'টাদিন।

___

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%