শান্তনু বসু

অন্ধকারে ভয়৷ ভয়টা আসলে ভূতের৷ আঁধার নামলেই গজপতির গা ছমছম করে৷ তার শিরদাঁড়া বেয়ে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ঘোরাফেরা করতে থাকে৷ কাদের যেন ফিসফাস কথাবার্তা শুনতে পায় সে৷ থেকে থেকেই তার মনে হয়, এই বুঝি কোনো অতৃপ্ত আত্মা তার ঘাড় মটকে দিল৷ কোনো অশরীরী মাটি ফুঁড়ে হঠাৎ হাজির হল৷ পিছন থেকে কেউ খোনা গলায় বলে উঠল বলল, 'কেঁ ওঁখানে? গঁজপতি নাঁকি?'
এসব শুনলে অনেকে বলবে ছেলেমানুষি৷ হাসাহাসিও হয়তো করবে কেউ কেউ৷ তাই লজ্জার মাথা খেয়ে ভূতের ভয়ের কথাটা কারও কাছে বলে না গজপতি৷ তা বলে তার ভয়টা তো আর মিথ্যে নয়, এই ভয় সঙ্গে নিয়েই রোজ রাতে গজপতিকে কাজে বেরোতে হয়৷ এ তার রুজিরোজগারের সওয়াল৷
খাঁদু মল্লিকের একটা চালের গুদামে রাতপাহারার কাজ করে গজপতি৷ গুদাম ঘরটা পুরোনো আমলের৷ নির্জন, নিরিবিলি একটেরে জায়গায়৷ আশেপাশে বড়ো বড়ো গাছপালা আছে৷ ঝোপঝাড় আছে৷ কাছাকাছি জনবসতি কম৷ চোর-ডাকাতের পক্ষে এখানে হানা দেওয়া খুবই সহজ৷
তবে চোর-ডাকাত নিয়ে গজপতি মোটেই চিন্তিত নয়৷ মুগুর ভাজা মজবুত চেহারা তার, সে পাকা লেঠেল৷ লাঠি চালিয়ে অনায়াসে দশজনকে ঘায়েল করতে পারে৷ কিন্তু ভূতের ক্ষেত্রে লাঠি বা ঘুসোঘুসি চলে না৷ ভূত যদি সত্যিই হানা দেয় তখন কী হবে? একরাশ দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়েই রোজ রাতে খাঁদু মল্লিকের গুদাম ঘরের চারিদিকে গজপতি চৌকি দিয়ে বেড়ায়৷
তা প্রায় বছর দুয়েক হয়ে গেল গজপতি এই কাজ করছে৷ আজ পর্যন্ত অবশ্য সে ভূতের দেখা পায়নি৷ তা বলে ভূত যে কোনোদিনও দেখা দেবে না তার ঠিক কি? ভয় কাটাতে গুনগুন করে রামায়ণ গান করে গজপতি৷ আজও সে তাই করছিল৷ হঠাৎ পিছন থেকে কেউ একজন বলে উঠল, 'মাখন নস্করের বাড়িটা কোথায়?' মোটেও খোনা গলা নয়৷ গলার শব্দ ভারী ও গমগমে৷
বেজায় চমকে গিয়ে ঘুরে তাকিয়ে গজপতির রক্ত হিম হয়ে গেল৷ ধড়াম ধড়াম শব্দ হতে লাগল বুকের মধ্যে৷ গুদাম ঘরের বাইরে জ্বলতে থাকা টিমটিমে আলোয় সে স্পষ্ট দেখতে পেল, অদূরে দাঁড়িয়ে আছে বেশ লম্বা-চওড়া চেহারার একটা লোক৷
লোকটার পরনে খুব জমকালো পোশাক৷ পা অবধি লম্বা আলখাল্লার গায়ে জরির কাজ ম্লান আলোতেও ঝকমক করছে৷ লোকটার মাথায় উষ্ণীষ৷ মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি৷ কোমর থেকে ঝুলছে একটা তরবারি৷ গলায় হাড়ের মালা৷ মালার গায়ে লকেট হয়ে দুলছে মড়ার খুলি৷ খুলির চোখের কোটর থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে একটা নীল আলো৷ লোকটার মুখের রং সাদা৷ সাদা মুখে জ্বলজ্বল করছে কালো দুই চোখ৷ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে গজপতিকে লোকটা যেন এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে৷
নির্ঘাত ভূত৷ না হলে মাঝরাতে এমন উদ্ভট পোশাক পরে, গলায় হাড়ের মালা ঝুলিয়ে, তরোয়াল নিয়ে ঘুরে বেড়াবে কে? মানুষের গায়ের রং অমন সাদাই বা হয় কী করে?
চেঁচানোর সাহস হল না গজপতির৷ বিস্ফারিত চোখে, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট গলায় সে বলল, 'ভূ-উ-উ-ত৷' সেই সঙ্গে তার হাতের লাঠিটা মাটিতে পড়ে গেল৷
ভূতটা বলল, 'ঠিক ধরেছিস৷ মরা মানুষ ভূত ছাড়া আর কী হবে?'
প্রাণপণে রাম নাম করতে গিয়ে গজপতি দেখল, মাথা ঘুলিয়ে গিয়েছে৷ রামের নাম কিছুতেই মনে পড়ছে না৷ গজপতি ধরেই নিল মৃত্যু আসন্ন৷ এবারে ভূতে তার ঘাড় মটকাবে৷ মৃত্যুর আগে বাঁচার আশায় মানুষ বেপরোয়া হয়ে ওঠে৷ তাই রামের নাম ভুলে গেলেও ভূতকে ভয় দেখানোর জন্য গজপতি বলে উঠল, 'দশরথের বড়ো ছেলের নাম জানি কিন্তু৷'
হা-হা করে হেসে উঠে ভূতটা বলল, 'ভাবছিস কি রাম নাম করলে ছুটে পালাব৷ ওরে আহাম্মক এই তোর কাণ্ডজ্ঞান? কলিকালের ভূত রাম নামে ভয় পায় না৷ এ খবর রাখিস?'
গজপতির পিলে চমকে গেল৷ বাপরে! এ যে সাংঘাতিক ভূত! নিজেই রামের নাম নিচ্ছে৷ জীবনের আশা একেবারে শেষ৷ গজপতি হাউমাউ করে উঠে বলল, 'দোহাই আপনার৷ আমি কিছু করিনি৷'

ভূতটা বলল, 'তুই নিরীহ লোক৷ দেখলেই বোঝা যায়৷ ভয় নেই৷'
'ভূতের সঙ্গে কথা কইছি৷ ভয় পাব না? আমি যে এমনিতেই খুব ভীতু৷'
ভূতটা ফের প্রশ্ন করল, 'মাখন নস্করের বাড়িটা কোথায়?'
'ও নামে কাউকে আমি চিনি না৷'
ধমকের সুরে ভূত বলল, 'সত্যি চিনিস না? না মাখন নস্করকে আড়াল করতে চাইছিস?'
গজপতি হাতজোড় করে বলল, 'আপনাকে মিথ্যে বলব? এত দুঃসাহস আমার নেই৷ আমি সত্যিই বলছি মাখন নস্কর নামে এ তল্লাটে কেউ থাকে বলে শুনিনি কখনো৷ তবে মাখন রায় বলে একজন লোক আছেন৷'
ভূতটা জোর দিয়ে বলল, 'উঁহু মাখন রায় নয়, মাখন নস্কর৷ নসিবপুরেই তো মাখন নস্করের বাড়ি বলে শুনেছি৷'
গজপতি দুম করে প্রশ্ন করে বসল, 'আপনি কে?'
'শ্যাম রায়৷'
এখনও ভূত ঘাড় মটকায়নি দেখে খানিকটা সাহসী হয়ে উঠল গজপতি৷ সে বলে বসল, 'নাম আর পদবি গোলাচ্ছে না তো? নসিবপুরে কিন্তু শ্যাম নস্কর নামেও একজন লোক আছে৷'
'মারব এক থাপ্পড়! ডেঁপো ছোকরা কোথাকার৷'
গজপতি ভয়ে দু-হাত পিছিয়ে এল৷ ভূতের হাতে থাপ্পড় খেলে কী হতে পারে ভাবতে গিয়ে গজপতির ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হল৷ সেই সঙ্গে তার মনে একটা খটকাও লাগল৷ সে শুনে এসেছে ভূত খোনা গলায়, নাকি সুরে কথা বলে৷ কিন্তু এ যে গম্ভীর গলায় আর পাঁচটা মানুষের মতোই কথা কইছে৷ গজপতি সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন করল, 'আপনি ভূ-উ-তই তো?'
'মানে?'
'কথা কইছেন কেমন যেন মানুষের মতো৷ ভূত সেজে ধোঁকা দিচ্ছেন না তো?'
'ভূত কেমন ভাবে কথা বলে তুই জানিস? ভূতের ব্যাপারে কী বুঝিস রে একরত্তি ছেলে? ভূতের কথায় প্রত্যয় হয় না? মুণ্ডুটা ছিড়ে নেব না কি?' দাঁত খিঁচিয়ে ধমক দেয় শ্যাম রায়৷
ঘাবড়ে গিয়ে কান পাকড়ে ধরে গজপতি বলে, 'না না না৷ আপনি নিশ্চয়ই ভূত৷ যারা আপনাকে অন্য কিছু ভাবে তারা মহাপাতক৷'
ভূত এবারে এগিয়ে এসে গজপতির চিবুক ছুঁয়ে বলল, 'মনে রাখিস আমার নাম শ্যাম রায়৷ কুড়ি বছর আগে আমি মারা গিয়েছি৷ আমাকে খুন করেছিল মাখন নস্কর৷ এবারে মাখন নস্কর ভো-গা-ম্বা৷' এই বলে হা-হা করে বিশ্রীরকম হেসে উঠল ভূতটা৷
মানুষের সহ্যের একটা সীমা থাকে৷ গজপতি এমনিতেই ভূতের ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপে৷ এতক্ষণ সে যে ভূতের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়েছে, এই তার পক্ষে অনেক৷ ভূতে তার চিবুক ছুঁয়ে কথা বলার পরেও সে কী করে অবিচল থাকে!
'আঃ আঃ' করতে করতে কাটা কলা গাছের মতো মাটিতে পড়ে মূর্ছা গেল গজপতি৷ অন্ধকারে দ্রুত মিলিয়ে গেল শ্যাম রায়৷
সকালে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে কোনো কিছুতে ঠোক্কর খেয়ে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন 'তাজা সমাচার' দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক শিবেন গুহ৷ ঠোক্করের উৎসটা খুঁজতে গিয়ে শিবেনবাবুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল৷ ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আছে দুটো পা৷
'খু-উ-ন, খু-উ-ন!' বলে ছুটতে লাগলেন শিবেন গুহ৷ তার চিৎকার চেঁচামেচিতে সাড়া পড়ে গেল চারিদিকে৷ নসিবপুরের লোকজন ঝপাঝপ বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল৷ খাট থেকে দ্রুত নামতে গিয়ে মশারি পেঁচিয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ল কেউ কেউ৷
শিবেন গুহ হাত দুটো দু-পাশে প্রসারিত করে উড়ে যাওয়ার ভঙ্গিমায় ছুটেই চললেন৷ ফুটবল খেলায় গোল দেওয়ার পর অনেক সময় খেলোয়াড়েরা এভাবে ছুটে উল্লাস প্রকাশ করে৷
বাস্তবিকই শিবেন গুহ সেদিন সকালে গোল দিলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী 'গ্রামের খবর' দৈনিকের সাংবাদিক সাত্যকি সোমকে৷ ছোটার ফাঁকে শিবেন গুহ দেখে নিয়েছেন নিজের বাড়ির সামনে ইটে ভর দিয়ে হাইহুই করে বুকডন দিচ্ছে সাত্যকি৷
সাত্যকি সোম বয়সে শিবেনবাবুর চেয়ে ছোটো, সাংবাদিকতা পেশায় নবীন হলে কী হবে, একেবারে ধানিলঙ্কা৷ নসিবপুরের অনেক গোপন খবরের হদিশ শিবেনবাবু জানতেই পারেন না৷ ওদিকে ফলাও করে 'গ্রামের খবর' দৈনিকে সে সব লিখে দেয় সাত্যকি৷ সেই নিয়ে 'তাজা সমাচার' পত্রিকার সম্পাদক শিবেনবাবুর উপর খুবই অসন্তুষ্ট৷
শিবেনবাবু ভাবলেন, সাত্যকি নিশ্চয়ই খুনের খবরটি পায়নি৷ তাহলে অকুস্থলে হাজির না হয়ে এত নিশ্চিন্তে বুকডন দিতে পারত? গাঁয়ের অনেকে বলে সাত্যকি সোমের কাছে শিবেন গুহ এলেবেলে দুদুভাতু৷ সেই লোকগুলোকেও মুখের উপর জবাব দেওয়া গেল৷ লোকে দেখুক শিবেন গুহও কম যান না৷ কাকভোরে একটা রোমহর্ষক খুন আবিষ্কার করেছেন তিনি, অথচ সাত্যকি সেই খবরই রাখে না৷
'খু-উ-ন, খু-উ-ন' শুনে শিবেন গুহর পিছন পিছন ছুটছিল গাঁয়ের অনেকে৷ সাত্যকি সোমও বুকডন ছেড়ে ছুটতে লাগল৷ গোটা গ্রামটা একচক্কর ঘুরে এসে খাঁদু মল্লিকের চালের গুদাম ঘরের কাছে থেমে কোমরে হাত দিয়ে হ্যা-হ্যা করে হাঁপাতে লাগলেন শিবেন গুহ৷
একজন বললেন, 'দুর মশায় তখন থেকে তো শুধু দৌড়ে যাচ্ছি৷ কোথায় খুন? কে খুন হল?'
আরেকজন বলল, 'লাশ নেই, রক্ত নেই, অহেতুক হুড়োহুড়ি, দৌড়োদৌড়ি৷'
তৃতীয় একজন বলে উঠল, 'শিবেন গুহ রিউমার ছড়াচ্ছেন৷'
দৌড়ের ধকলে শিবেন গুহর এমন হাঁপ ধরেছে যে তার কথা বলার মতো অবস্থা নেই৷ তিনি আঙুল দেখিয়ে কোনোরকমে বললেন, 'ওই যে৷ গুজব না সত্যি নিজেরাই যাচাই করে দেখুন৷'
এবার অনেকের চোখে পড়ল দৃশ্যটা৷ চোখ কপালে উঠে গেল সবার৷ ঝোপের আড়াল থেকে দুটো পা বেরিয়ে আছে৷ লাশ দেখার জন্য হামলে পড়ল জনতা৷ গুদাম ঘরের পাশে মড়ার মতো পড়ে আছে গজপতি৷ এবারে গুঞ্জন শুরু হল৷ নানারকম কথাবার্তা ভেসে আসতে লাগল৷
'উরিঃ বাপ! এ যে দেখি গজপতি৷ খাঁদু মল্লিকের লোক৷'
'বলেন কী? এ যে গোবরে পদ্মফুল, কচুবনে মুক্তোর চাষ, অমাবস্যায় চন্দ্রোদয়, খাঁদু মল্লিকের লোকের গায়ে হাত?'
'হাত মানে? এ কি মামুলি ঘুসোঘুসির ব্যাপার মশায়? একেবারে খুন৷ নসিবপুরে এবারে রক্তগঙ্গা বইবে৷ অরাজকতার এই শুরু৷'
'তা লাশ প্রথম দেখল কে?'
'শিবেনবাবু দেখেছেন৷ উনিই তো খুন খুন বলে চেঁচাচ্ছিলেন৷'
'পুলিশ এলে আপনিই কথা বলবেন শিবেনবাবু৷ লাশ তো আপনিই প্রথমে দেখেছেন৷'
এবারে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন শিবেন গুহ৷ সাত্যকি সোমকে হারানোর আনন্দে তিনি মশগুল হয়েছিলেন৷ এখন ভেবে দেখলেন, লাশ প্রথম দেখা খুব ঝঞ্ঝাটের ব্যাপার৷ পুলিশ তাঁকে নিয়ে বিস্তর টানাহ্যাঁচড়া করবে৷ জেরায় জেরায় জেরবার হতে হবে৷ শিবেনবাবু বলে উঠলেন, 'আমি লাশ দেখিনি৷'
ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন ঝেঁকে উঠে বলল, 'দেখেননি মানে? আপনিই তো খুন খুন বলে পাড়া মাথায় করলেন৷ লাশ দেখানোর জন্য গোটা গাঁয়ের লোককে ডেকে আনলেন৷ এখন দেখিনি বললে হবে?'
লোকের তেড়িয়া মেজাজ দেখে দমে গিয়ে শিবেনবাবু মাথা চুলকোতে লাগলেন৷ জনৈক ব্যক্তি ফুট কাটল, 'লাশ না দেখেই গজপতি খুন হয়েছে জানলেন কী করে মশায়?'
কেউ একজন ফিক করে হেসে বলল, 'ডাল মে কুছ কালা হ্যায়৷'
সাত্যকি সোম বলল, 'বেড়ে বললেন তো কথাটা৷ এটাই খবরের হেডলাইন হবে৷ ডাল মে কুছ কালা হ্যায়?' খসখস করে নোটবুকে নোট নিতে লাগল সাত্যকি৷
শিবেন গুহর ব্রহ্মতালু ঘেমে গেল৷ তিনি ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, 'লাশ নয়, আমি লাশের পা দেখেছি৷'
এইসব কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎ একজন চেঁচিয়ে উঠল, 'পা নড়ছে! পা নড়ছে! লাশের পা নড়ছে৷' ব্যাস! সঙ্গে সঙ্গে আবার একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল৷ ভৌতিক কাণ্ড ভেবে দৌড়ে পালাতে গিয়ে উলটে পড়ল কয়েকজন৷
এদিকে জ্ঞান ফিরে পেয়ে চোখ খুলে মুখের উপর ঝুঁকে পড়া একগাদা লোক দেখে ধড়ফড় করে উঠে বসে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল গজপতি৷
গোল গোল চোখ করে শিবেন গুহ দু-পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, 'এ যে দেখছি মোটেই খুনজখমের ব্যাপার নয়৷'
একজন বলে উঠল, 'আমি আগেই বলেছি শিবেন গুহ রিউমার ছড়াচ্ছেন৷'
সাত্যকি ঝুঁকে পড়ে প্রশ্ন করল, 'ব্যাপার কী রে গজপতি?'
গজপতি কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, 'ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম দাদা৷'
'ভয়ে? কীসের ভয়? রাতে ভূতপ্রেত দেখলি না কি?'
হু-হু করে কেঁদে উঠে গজপতি বলল, 'ঠিক ধরেছ গো দাদা, ভূত৷ শ্যাম রায়ের ভূত৷'
সাত্যকি প্রশ্ন করল, 'শ্যাম রায়ের ভূত? কে শ্যাম রায়?'
'তা ছাই আমি কি জানি? তবে শ্যাম রায় মারা গেছেন কুড়ি বছর আগে৷'
'একথা আবার জানলি কোথা থেকে?'
'ভূতটা বলছিল৷'
সাত্যকি ধমক দিয়ে বলল, 'ভূতে গল্প করছিল তোর সঙ্গে? রাতে নেশা ভাং করিসনি তো?'
গজপতি বলল, 'মা কালীর দিব্যি বলছি৷ আমার তিন পুরুষের কেউ নেশার জিনিস ছোঁয়নি৷ আমিও ছুঁই না৷ ভূতের কথাটা মিথ্যে নয়৷ শ্যাম রায়ের ভূত মাখন নস্করকে খুঁজে বেড়াচ্ছে৷ এতে কোনো ভুল নেই৷'
শিবেন গুহ বলল, 'অ্যাঁ? মাখন নস্কর? সে আবার কে? নসিবপুরে তো মাখন নস্কর বলে কেউ থাকে না৷'
হঠাৎ ভটভট ভটাভট শব্দে একটা মোটরবাইক এসে থামল৷ এ গাড়ির শব্দ সবাই চেনে৷ এমন বিদঘুটে আওয়াজওয়ালা মোটরবাইক নসিবপুরে দু-খানা নেই৷ এই মোটরবাইক নিয়ে নসিবপুরে দাপিয়ে বেড়ায় হরতন ও রুইতন৷ দুটোই পাকা গুন্ডা৷ দু-জনেরই দৈত্যের মতো চেহারা৷ দেখলে মনে হয় এক ঘুসিতে মানুষ মেরে ফেলতে পারে৷
হরতন হাঁক ছাড়ল, 'এখানে কী হয়েছে অ্যাঁ? সাতসকালে গুলতানি কীসের? খুনের গুজব ছড়াল কে?' হরতনের হাঁকডাকে সব গুঞ্জন থেমে গেল৷
হরতন-রুইতনকে দেখলেই শিবেন গুহর পেটের ভিতরটা গুড়গুড় করে৷ তিনি অনেকের মাথার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেললেন৷ দুঃখের কথা হল, এই হরতন ও রুইতনের ব্যাপারেও তাঁকে টেক্কা দিয়েছে সাত্যকি সোম৷
বড়ো একটা জলা ভরাটের মতলব করছিল হরতন ও রুইতন৷ সাত্যকি সোম ব্যাপারটা ফলাও করে কাগজে লিখে দেয়৷ লেখাটা আদালতের জাজ সাহেবের নজরে পড়ে৷ তিনি এমন একখানা কড়া অর্ডার লিখে দেন যে, কাজটা বন্ধ করতে বাধ্য হয় দুই গুন্ডা৷ সাত্যকি সোম তারিফ পায় অনেকের৷
জলা ভরাটের বিষয়টা অনেক আগে জানতে পারলেও হরতন ও রুইতনের ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে 'তাজা সমাচার' কাগজে এক লাইনও লেখেননি শিবেন গুহ৷ এ নিয়ে সম্পাদকের কাছে তাঁকে কম ধাতানি খেতে হয়নি৷
হরতন ও রুইতনকে দেখে সাত্যকি সোম একগাল হেসে বলল, 'কী খবর? সব ভালো তো?' জলা ভরাট ভেস্তে যাওয়ায় সাত্যকির উপর দু-জনের বেজায় রাগ৷ কোনো কথা না বলে কড়া চোখে তারা সাত্যকিকে একবার জরিপ করে৷
সাত্যকি হেসে বলে, 'কাজ আছে আসি৷ পরে কথা হবে৷'
হরতন ও রুইতন এসে পড়ায় আমজনতার ভিড় নিমেষে পাতলা হয়ে গেল৷ নসিবপুরের বেশিরভাগ মানুষই এই দু-জনকে ভয় পায়, এড়িয়ে চলে৷
রুইতন চোখ পাকিয়ে ধমকের সুরে গজপতিকে বলল, 'তুই কী করছিস এখানে? সাতসকালে ভূতের কেত্তন হচ্ছে?' এই বলে একরকম গ্রেপ্তার করে মোটরবাইকে চাপিয়ে গজপতিকে নিয়ে চলে গেল হরতন ও রুইতন৷
নসিবপুরের লোকজন ভারি ধন্দে পড়ে গেল৷ গজপতি সহজ সরল মানুষ৷ পেটের দায়ে সে পাহারাদারের কাজ করে, আর অবসর সময়ে ঠাকুর-দেবতার নাম করে, পুজোআচ্চাও করে৷ মিথ্যে গুজব ছড়ানোর ছেলে সে নয়৷ গজপতি নিশ্চয়ই ভূত দেখেছে৷ না হলে অজ্ঞান হয়ে সে পথে পড়ে থাকবে কেন?
ভূতে যাদের বিশ্বাস কম, তাদের কাছে গজপতির কথাবার্তা কেমন যেন আষাঢ়ে শোনাল৷ তারা অন্য রহস্যের গন্ধ পেল৷ তবে, কে শ্যাম রায়? আর কেই-বা মাখন নস্কর, এ নিয়ে ভেবে কেউই কুলকিনারা করতে পারল না৷ তবে লোকের মুখে মুখে কথাটা ছড়িয়ে পড়ল তামাম নসিবপুরে—গজপতি ভূত দেখেছে, আর শ্যাম রায়ের ভূত মাখন নস্করকে খুঁজে বেড়াচ্ছে৷
খাঁদু মল্লিক মস্ত বড়ো লোক৷ নসিবপুরের এক প্রান্তে নিরিবিলি জায়গায় তার তিনমহলা বাড়ি৷ বাড়ির নাম মল্লিক প্যালেস৷ চারপাশে উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা৷ বিরাট বড়ো গেটটা লোহার পাতে মোড়া৷ বাইরে থেকে বাড়ির ভিতরটা একেবারেই দেখা যায় না৷ বাড়িতে আছে চারটে বাঘা কুকুর৷ সদর দরজার মুখে পাহারা দেয় দুই ভয়ংকর দর্শন পালোয়ান, ভীম সিং ও বুদ্ধু সিং৷ অপরিচিত কারও পক্ষে এ বাড়ির অন্দরে প্রবেশ করা খুবই কঠিন৷
গোটা নসিবপুর জুড়ে ছড়ানো রয়েছে খাঁদু মল্লিকের অঢেল সম্পত্তি৷ পাঁচটা চালের গুদাম, দুটো চালকল, একটা কাঠ চেরাই কল, আর নামে বেনামে অনেক জমি, বাগান, পুকুর৷
জনসমক্ষে খাঁদু মল্লিককে বড়ো একটা দেখা যায় না৷ কালো কাচে ঢাকা, কালো রঙের বিলিতি গাড়িতে চড়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিঃশব্দে চলাফেরা করেন তিনি৷ কালেভদ্রে কোনো কোনো সামাজিক উৎসব, অনুষ্ঠানে তিনি হাজির হন৷
নসিবপুরে দুর্গাপুজো, বসন্ত উৎসব, গণেশ চতুর্থী সবই ধুমধাম করে হয়৷ এসবে খাঁদু মল্লিক মোটা টাকা চাঁদা দেন, শীতের সময় শয় শয় গরিব দুঃখীকে কম্বল বিতরণ করেন৷ নসিবপুরে বছরে একবার ঘটা করে হরিসংকীর্তনের আসর বসে৷ কয়েক হাজার মানুষের পাত পড়ে৷ এর কড়ি জোগান খাঁদু মল্লিক৷ এই সময় তিনি অন্য মানুষ হয়ে যান৷ হরিবোল হরিবোল বলে উদলা গায়ে ধেইধেই করে নাচেন৷ ধুলোয় গড়াগড়ি খান৷ খাঁদুবাবুর নামে গরিবগুরবোরা জয়ধ্বনি দেয়-জয় খাঁদুরাজার জয়৷
সত্যি সত্যিই নসিবপুরের অনেকে খাঁদুবাবুকে রাজা বলে মানে৷ তারা বলে, 'খাঁদুরাজা আছে বলে নসিবপুরে অখণ্ড শান্তি আছে৷ ছেলেপুলে ঘরসংসার নিয়ে সুখে আছি৷' অনেকে আবার খাঁদু মল্লিককে পছন্দ করে না৷
পয়সা হলে বদনাম হয়৷ বাজারে খাঁদুবাবুরও বদনাম কম নেই৷ কানাকানি, ফিসফাসে শোনা যায় খাঁদু মল্লিক নাকি নানারকম গোলমেলে কারবারের সঙ্গে যুক্ত৷ কেউ কেউ বলে নসিবপুরে খাঁদু মল্লিককে নজরানা না দিয়ে জমি বাড়ি কেনাবেচা করা যায় না৷ ব্যবসায়ীদের মাসে মাসে মোটা টাকা তোলা দিতে হয়৷ হরতন রুইতনের হাত ঘুরে নাকি সেসব টাকা খাঁদুবাবুর পকেটে যায়৷ এর অবশ্য কোনো প্রমাণ নেই৷
এইসব কথা যে খাঁদুবাবুর কানে একেবারে যায় না, তা নয়৷ এ নিয়ে তিনি বড়ো একটা মাথা ঘামান না৷ অক্ষম, দুর্বল, হিংসুটে লোকেরা তাঁর নামে তো কুৎসা রটাবেই৷ এ আর নতুন কি?
আজ সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে এক শালিক দেখে খাঁদু মল্লিকের মেজাজ বিগড়ে গেল৷ তার উপরে বাম চোখের উপরটা লাফাচ্ছে৷ এসব অশুভ সংকেত৷ এর মধ্যে বুদ্ধু সিং এসে জানাল গজপতি নাকি ভূত দেখেছে৷ শ্যাম রায়ের ভূত মাখন নস্করকে খুঁজে বেড়াচ্ছে৷ কথাটা শুনে খাঁদু মল্লিক কেমন যেন চমকে উঠলেন৷ বাম চোখের উপরটা বাড়াবাড়ি রকমের লাফালাফি শুরু করে দিল৷ ঘটনাটা গজপতির মুখ থেকে শোনা দরকার৷ গজপতিকে ডেকে পাঠালেন খাঁদু মল্লিক৷
গজপতি এসে সেলাম ঠুকতেই খাঁদুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, 'হ্যাঁ রে তুই নাকি আজকাল ভূত-টুত দেখছিস?'
মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে হাতজোড় করে গজপতি বলল, 'দেখেছি বই কী কর্তাবাবু, এখনও আমার গা কাঁপছে৷'
ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিলেন খাঁদু মল্লিক৷ হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে কড়া চোখে গজপতির দিকে চেয়ে বললেন, 'ভূত দেখা কি ভালো কাজ?'
খাঁদু মল্লিকের চোখের কড়া দৃষ্টি দেখে সংকুচিত হয়ে গজপতি বলল, 'তিনিই তো দেখা দিলেন৷ আমি কি তারে ডেকে এনেছি? ভূতে আমি বড্ড ভয় পাই৷ আপনি তো জানেন৷'
'ভূতটাকে দেখতে কেমন?'
'ইয়া তাগড়াই চেহারা৷ পরনে ঝকমকে পোশাক৷'
'ঠিক দেখেছিলি?' খাঁদু মল্লিকের গলায় সন্দেহ৷
কাঁদো-কাঁদো গলায় গজপতি বলে, 'মিথ্যে কইব কেন? ঝকমকে পোশাক, মাথায় উষ্ণীষ, কোমরে তরবারি৷'
হঠাৎ ঘর ফাটিয়ে হা-হা করে হেসে ওঠেন খাঁদু মল্লিক৷ হাসির দমকে গজপতি ভীষণ চমকে যায়৷ হাসির রেশ ধরে রেখে খাঁদু মল্লিক বলে, 'ভূতের মাথায় পাগড়ি?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ৷'
'কোমরে তরবারি?'
'বিলক্ষণ ঠিক৷'
'এ ভূত? না যাত্রা পার্টির লোক? গুল মারার জায়গা পাসনি? আমাকে বেকুব পেয়েছিস?' ধমকে ওঠেন খাঁদু মল্লিক৷
'আপনি অন্নদাতা৷ আপনাকে মিছে কথা বললে পাপ হবে না? আমি কি কখনো আপনাকে মিছে কথা বলেছি?'
খাঁদু মল্লিক কড়া গলায় প্রশ্ন করেন, 'ভূত? না কি কোনো সেয়ানা বদমাশ ভূত সেজে ভয় দেখাতে চায়?'
গোল গোল চোখ করে এদিক ওদিক চেয়ে একটু ভেবে নিয়ে গজপতি বলে, 'না না ভূতই বটে৷ অমন উদ্ভট পোশাক পরে কোনো লোক মাঝরাতে পথে ঘুরবে কেন? শ্যাম রায় ভূত হয়ে মাখন নস্করের বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছিল৷ ভোগাম্বা মানে কী কর্তাবাবু?'
'কী বললি?'
'ভূতটা বলছিল, মাখন নস্কর ভোগাম্বা৷'
'আমাকে ভূতের ভয় দেখাচ্ছিস?' গজপতির দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন খাঁদু মল্লিক৷
মনিবের চোখের খুনে দৃষ্টি দেখে ভয় পেয়ে একেবারে কুঁকড়ে গেল গজপতি৷ খাঁদু মল্লিক ফের প্রশ্ন করলেন, 'শ্যাম রায় কে জানিস?' দু-দিকে মাথা নাড়ে গজপতি৷
'শ্যাম রায় একটা মন্দ লোক৷ সাক্ষাৎ ডাকাত৷'
'আপনি চিনতেন?' প্রশ্ন করে গজপতি৷

চমকে উঠে খাঁদু মল্লিক বললেন, 'অ্যাঁ? কে বললে আমি চিনতাম?'
'এই যে বললেন শ্যাম রায় মন্দ লোক৷'
হেসে উঠে হালকা মেজাজে খাঁদু মল্লিক বললেন, 'বললাম বুঝি? শ্যাম রায় নামটা শুনলেই মনে হয় লোকটা পাজি নচ্ছার৷'
মাথা চুলকে গজপতি বলে, 'ভূত যে বললে মাখন নস্কর লোক ভালো নয়৷'
'ভুল ভুল৷ ভুল বলেছে৷ ভূতটা মোটেই ভূত নয়৷ একটা ডাকাত৷ শ্যাম রায়ের স্যাঙাত৷ তোকে গাড়োল পেয়ে ভূত বলে চালিয়েছে৷ মাখন নস্করের মতো ভালো লোক হয় না৷ মাখন নস্করকে তুই কতটুকু চিনিস?'
গজপতি বলে, 'আজ্ঞে মোটেই চিনি না৷ আপনি চেনেন বুঝি?'
'অ্যাঁ? আমি চিনি? তা আবার কখন বললাম?'
'এই যে বললেন মাখন নস্করের মতো ভালো লোক হয় না৷'
'বলেছি নাকি?' কথাটা বলে দেওয়ালে ঝোলানো খাঁড়াটা চকিতে হাতে নিয়ে গজপতির দিকে এগিয়ে আসে খাঁদু মল্লিক৷
গজপতি ভয় পেয়ে বলে ওঠে, 'কর্তা করছেন কী?'
খাঁড়াটা গজপতির কাধে ঠেকিয়ে খাদু মল্লিক বললেন, 'তোকে যতটা গাড়োল ভেবেছিলাম তা দেখছি তুই নোস৷ একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ, শ্যাম রায় অতি পাজি লোক৷ মাখন নস্করের মতো ভালো মানুষ হয় না৷ ফের যদি উলটো কথা বলেছিস, তাহলে তোর মুণ্ডু নামিয়ে দেব৷ মনে থাকে যেন কথাটা৷'
ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে গজপতি বলে, 'ভূতের কথা মিথ্যে ধরলে তিনি যদি কূপিত হন?'
পায়ের এক ধাক্কায় হাঁটু মুড়ে বসে থাকা অবস্থা থেকে গজপতিকে চিত করে ফেলে দিয়ে খাঁড়া উচিয়ে খাঁদু মল্লিক কড়া গলায় বললেন, 'অন্য কাজ খুঁজে নে৷ রাতপাহারার কাজ থেকে তোর ছুটি৷'
খাঁদু মল্লিকের অদ্ভুত আচরণ দেখে গজাপতির গলা ভয়ে ও আতঙ্কে শুকিয়ে কাঠ৷ কোনোরকমে সে বললে, 'যে আজ্ঞে কর্তা৷'
নসিবপুরে ট্রেন থামতেই হুড়মুড় করে ব্যাগপত্তর নামিয়ে ফেলল ভোম্বল৷ সিগন্যাল সবুজ হয়ে আছে৷ এইরকম ছোটো স্টেশনে গাড়ি বেশিক্ষণ দাঁড়ায় না৷ দরজার সামনের ভিড় ঠেলে, ধুতি সামলে, জনাকয়েক লোককে ধাক্কা দিয়ে মোটাসোটা শরীরটা নিয়ে গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে কাশীবাবু গলদঘর্ম হয়ে গেলেন৷ তিনি প্ল্যাটফর্মে পা দিতে-না-দিতেই ট্রেন ছেড়ে দিল৷
চারিদিকে দ্রুত একবার চোখ বুলিয়ে ভোম্বল বুঝল এ একেবারে ধাপধাড়া গ্রাম৷ চোখে পড়ছে অসমতল কাঁকুরে জমি, কিছু দূরে মাথা উঁচু করে আছে একটা টিলা, এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে আছে নানারকম গাছপালা৷ এর মধ্যে তাল গাছই বেশি৷ ঘরবাড়ি চোখে যা পড়ছে তা সামান্যই৷
ভোম্বল আপাদমস্তক শহুরে ছেলে৷ গ্রাম সে বড়ো একটা দেখেনি৷ ম্যাড়ম্যাড়ে গ্রাম তার ভালোও লাগে না৷ উত্তর কলকাতা ছেড়ে উত্তরপাড়ায় মাসির বাড়ি গেলেই সে হাঁপিয়ে ওঠে৷ মামা কেন যে এই অজ পাড়াগাঁয়ে দুম করে একটা বাড়ি কিনে ফেললেন, তা কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছে না৷
ছেলেবেলায় মাকে হারানোর পর থেকে ভোম্বল মামা ও মামির কাছে মানুষ৷ মামা, কাশীনাথ দত্তের ছেলেপুলে নেই৷ ভোম্বল মামা ও মামির বড়ো আদরের ধন৷ হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার পর শহরের মজা, রংতামাশা ছেড়ে এই অজ পাড়াগাঁয়ে আসার ইচ্ছে ভোম্বলের একেবারেই ছিল না৷ কিন্তু মামার হুকুম৷ কিছু করার নেই৷
জায়গাটা ভোম্বলের পছন্দ না হলেও নসিবপুরের মাটিতে পা রেখেই কাশীবাবুর মনটা খুশিতে ভরে গেল৷ এত দিনে তাঁর বাগানসহ একখানা বনেদি বাড়ির শখ পূরণ হতে চলেছে৷ বড়ো লোকেরা এখানে ওখানে ইচ্ছেমতো বাগানবাড়ি হাঁকায়৷ কাশীনাথ দত্ত কি কম বড়ো লোক? তিনি ছোটোখাটো একজন শিল্পপতি৷ ডালডা, ঘি, সরষের তেলের বিরাট কারবার তাঁর৷ বড়োবাজারে অফিস আছে৷ ফ্যাক্টরি পৈলানে৷ তাঁর কারবারে কত লোকের ভরণপোষণ হয়৷ সেই কাশী দত্তের একখানা বাগানবাড়ি থাকবে না?
ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে একবার নসিবপুরে এসেছিলেন৷ সেই থেকে নসিবপুর তাঁর খুব প্রিয় জায়গা৷ ভাগনের উদ্দেশে খুশি খুশি গলায় কাশীবাবু বললেন, 'দেখেছিস ভোম্বল? নসিবপুরের প্রাকৃতিক দৃশ্য কী চমৎকার!'
গরমকাল৷ ভরদুপুর৷ মাথার উপর চাঁদিফাটা রোদ্দুর৷ গরম বাতাস যেন ছ্যাঁকা দিচ্ছে গায়ে৷ ভোম্বল ঘেমেনেয়ে একেবারে হেদিয়ে পড়েছে৷ বেজার মুখে সে বললে, 'চমৎকার আর কী? এ যে একেবারে অজ পাড়াগাঁ৷ ঢ্যাঙা ঢ্যাঙা তাল গাছ আর কাঁকুরে জমি ছাড়া তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না মামা৷'
'তাল, আম, জাম, কাঁঠাল, রকমারি পাখি, সব পাবি৷ সবুর কর৷ সবে তো এলি৷ এমন খাসা জায়গা আর ক-টা আছে? আগেকার সব বনেদি বড়োলোকেরই নসিবপুরে একখানা করে বাগানবাড়ি থাকত, তা জানিস?'
'সে না হয় বুঝলাম মামা৷ কিন্তু বাড়িটা তো তুমি চোখেও দেখলে না, দুম করে কিনে ফেলা কি ঠিক হল?'
কাশীবাবু একটু বিরক্ত হলেন৷ এভাবে বাড়ি বায়না করে ফেলাটা মোটেই গিন্নি নয়নতারার পছন্দ হয়নি৷ সেই নিয়ে কম গঞ্জনা শুনতে হয়নি কাশীবাবুকে৷
সেসব কথা মনে পড়ে যাওয়ায় ঝাঁঝের সঙ্গে কাশীবাবু বললেন, 'বাড়ি অত দেখাদেখির কী আছে? এ কি তোর মামির শাড়ি কেনা? নসিবপুরে বাগান সমেত বনেদি বাড়ি বলে কথা৷ এমন বাড়ির জন্য কত লোক ওত পেতে থাকে, সে খবর রাখিস? গড়িমসি করলে বাড়িটা ফসকে যেত৷' আর কথা বাড়াল না ভোম্বল৷ নসিবপুরের কোনো সমালোচনা মামা শুনতে চান না৷ তেষ্টায় ছাতি ফাটছে ভোম্বলের৷ বোতল খুলে সে ঢকঢক করে খানিকট জল গলায় ঢেলে দিল৷
কাশীবাবু বললেন, 'দেখ তো ভোম্বল একটা কুলি-টুলি পাওয়া যায় কি না?'
ভোম্বল হতাশ গলায় বলল, 'কুলি কোথায় মামা-আধখানা লোকও তো চোখে পড়ছে না৷'
এদিকে-ওদিকে চোখ চালিয়ে কুলি খোঁজার খানিকটা বৃথা চেষ্টা করে কাশীবাবু বললেন, 'তা আর কী করা যাবে? চল হাতে হাতে জিনিসগুলো নিয়ে যাই৷ বাইরে নিশ্চয়ই গাড়ি-টাড়ি পাওয়া যাবে৷'
লটবহর বড়ো একটা কম নয়৷ দুটো হোল্ডঅল, দুটো স্যুটকেস, এ ছাড়া কাঁধের ব্যাগ, জলের বোতল এসব তো আছেই৷ গ্রামে আসছেন৷ তাই সম্প্রতি বড়োসড়ো একটা টর্চ কিনেছেন কাশীবাবু৷ সেটা বন্দুকের মতো ঝোলানো রয়েছে কাঁধে৷
কাশীনাথ দত্ত বড়ো ব্যস্তবাগীশ লোক৷ কোনো কিছুতেই গড়িমসি তাঁর ধাতে নেই৷ পুরোনো বাড়ি কিনেছেন৷ টুকটাক মেরামতি, রং-টং করার দরকার হতে পারে৷ মিস্তিরি লাগিয়ে এবারেই দ্রুত সেসব কাজ সেরে নেবেন, এমনই তাঁর ইচ্ছে৷ সেই পরিকল্পনা মতো বেশ কিছুদিন থাকার প্রস্তুতি নিয়েই ভাগনেকে বগলদাবা করে নসিবপুরে এসে হাজির হয়েছেন তিনি৷ ব্যাবসা নিয়ে চিন্তা নেই৷ ম্যানেজার পরিতোষ খুব করিৎকর্মা ছেলে৷ কিছুদিন ঠিক সামলে নেবে৷
'বাড়িটা স্টেশন থেকে কদ্দুর মামা?' ভোম্বল শুধোল৷
'কাছেপিঠেই হবে৷ আশু মিত্তির তো বলেছিল স্টেশনে নেমে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই মিত্তিরভিলা দেখিয়ে দেবে৷ কাউকে জিজ্ঞেস কর না৷'
'শুধোব কাকে? একটা লোককেও তো দেখছি না৷ তুমি যাই বল মামা, এ কেমন যেন ভূতুড়ে জায়গা৷'
'ভূতুড়ে? ভূতুড়ের কী দেখলি? তোর সব কিছুতেই খুঁত ধরা বাতিক৷ লোকজন নেই, বললেই হল? ওই তো একজন বেঞ্চিতে শুয়ে ঘুমোচ্ছে৷'
ভোম্বল দেখল সত্যিই টিকিটঘরের পাশে একটা ঝাকড়া গাছের নীচে সিমেন্টের বেঞ্চিতে একটা লোক ঘুমোচ্ছে৷ গামছা আর একটা ময়লা থলে রাখা রয়েছে মাথার নীচে৷ লোকটার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি৷ গায়ে একটা হালকা নীল রঙের জামা ও ডোরাকাটা লুঙ্গি৷ এগিয়ে গিয়ে লোকটাকে খোঁচা মেরে ভোম্বল শুধোল, 'ও মশাই শুনছেন? ও মশাই?'
কয়েকবার খোঁচানোর পর লোকটা ধড়ফড় করে উঠে বসল, 'কে? কে? কে? শ্যাম রায়ের স্যাঙাত না কি?'
'শ্যাম রায়ের স্যাঙাত? কী বলছেন মশায়? আমার নাম ভোম্বল সরকার৷'
ভোম্বলকে একবার আপাদমস্তক দেখে লোকটা বলল, 'তাই বল৷ শ্যাম রায়ের স্যাঙাতের পরনে তো ঝকমকে পোশাক থাকার কথা৷ মাথায় উষ্ণীষ, কোমরে তরবারি৷ চেহারাটা চোখা৷ চোখ-মুখ টানাটানা৷ তোমার মতো ড্যাবড্যাবে বোকাটে টাইপের নয়৷ তোমার ওই ভোম্বল সর্দার নামই ঠিক আছে৷'
লোকটার কথাবার্তার ধরনধারণ ভোম্বলের মোটেও ভালো লাগল না৷ সে বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, 'আমার নাম ভোম্বল সর্দার নয়৷ ভোম্বল সরকার৷'
'ওই একই হল৷ সর্দারও যা সরকারও তা৷' লোকটা এবারে একটা পেল্লায় হাই তুলে নিজের ঘাড় চুলকে বলল, 'মাখন নস্কর কে জানো?'
ভোম্বল এবার কোমরে হাত দিয়ে প্রবল বিরক্তির সঙ্গে বলল, 'না জানি না৷ জানার ইচ্ছেও নেই৷'
'নসিবপুর ঢুঁড়ে শ্যাম রায়ের ভূত যে মাখন নস্করকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সে খবর রাখ?'
এই সব উদ্ভট কথাবার্তা শুনে মামা ও ভাগনে দু-জনেরই মনে হল, লোকটা বদ্ধ পাগল৷ কাশীবাবু প্রশ্ন করলেন, 'মিত্তিরভিলা কতদূর?'
পাগলাটে লোকটা এবারে কাশীবাবুকে জরিপ করে বলল, 'এ তল্লাটে নতুন বলে মনে হচ্ছে?'
কাশীবাবু অসহিষ্ণু গলায় বললেন, 'হ্যাঁ নতুন৷ এই এলাম৷'
'মিত্তিরভিলার খোঁজে কী দরকার?'
ভোম্বল বলল, 'কী দরকার মানে? মিত্তিরভিলা কিনেছেন আমার মামা কাশীনাথ দত্ত৷ এরপর থেকে লোকে ও বাড়িকে বলবে দত্তভিলা৷'
লোকটা চমকে উঠে বলল, 'অ্যাঁ? মিত্তিরভিলা কিনেছেন? পয়সা দিয়ে?'
কাশীবাবু গলা চড়িয়ে বললেন, 'হ্যাঁ মশায় পয়সা দিয়ে, যাকে বলে একেবারে গাঁটের কড়ি খরচ করে বাড়িটা কিনেছি৷ তাতে আপনার কী?'
ভোম্বল ও কাশীবাবুকে চমকে দিয়ে লোকটা খিলখিল করে এমন বিশ্রীভাবে হেসে উঠল, যেন মনে হল মিত্তিরভিলা কিনে কাশীবাবু বড্ড আহাম্মকির কাজ করেছেন৷
ভোম্বল প্রশ্ন করল, 'হাসছেন যে?'
'হাসির কথা শুনলে হাসব না?' এই বলে লোকটা আবার ব্যাগ মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়ল৷
ভোম্বলের মনে একটা খটকা লাগল৷ কাশীবাবু কেমন যেন ঘাবড়ে গেলেন৷ তাঁর বাড়ি কেনাটা হাসির বিষয় হয় কী করে? কাশীবাবু চাপা গলায় ভাগনেকে বললেন, 'লোকটা বদ্ধ পাগল৷'
মামা ও ভাগনে স্টেশন ছেড়ে যেতেই একটা ভবঘুরে গোছের লোক গুটিগুটি এসে গাছের নীচে বেঞ্চির এক কোণায় বসে পড়ল৷ লোকটার কাঁধে একটা বেড়াতে যাওয়ার ব্যাগ৷ পায়ে হাওয়াই চটি৷ পরনে হালকা রঙের ময়লা জামা ও কালো ফুলপ্যান্ট৷ লোকটা আপনমনেই একটু উঁচু গলায় বলল, 'খোকা বাড়ি যাবে৷'
কথাটা শুনেই বেঞ্চে শুয়ে থাকা লুঙ্গিপরা লোকটা তড়াক করে উঠে বসে বলল, 'বটে? সত্যি যাবে?'
প্যান্টজামাপরা লোকটা 'জরুর যাবে' বলে কাঁধের ব্যাগটা লুঙ্গিপরা লোকটার হাতে চালান করে দিল৷ লুঙ্গিপরা লোকটা এবারে তার ময়লা থলেটা ধরিয়ে দিল ভবঘুরে লোকটির হাতে৷
মামা-ভাগনে স্টেশনের বাইরে এসে দেখে একটা টাঙা দাঁড়িয়ে আছে৷ রোগা হাড়জিরজিরে ঘোড়াটা গরমে কাহিল হয়ে ধুকছে৷ আর কোনো গাড়িঘোড়ার চিহ্ন নেই৷ স্টেশনের বাইরে বেশ কিছু দোকানপাট আছে৷ দু-একটা খোলা৷ বেশিরভাগই বন্ধ৷
গলদঘর্ম কাশীবাবু ও ভোম্বলকে দেখে ছোকরা টাঙাওয়ালা বলল, 'আসেন বাবু, আসেন৷ আশু মিত্তিরের বাড়ি যাবেন তো?'
কাশীবাবু প্রশ্নটা শুনে বোকার মতো একটু হাসলেন৷ ভোম্বল চমকে উঠল৷ ওরা যে আশু মিত্তিরের বাড়ি যাবে, লোকটা জানল কেমন করে? প্রবল গরমে হাফ সিদ্ধ মামা ও ভাগনে কারোরই এই মুহূর্তে টাঙাওয়ালার কথা নিয়ে গবেষণা করার ইচ্ছে হল না৷ লটবহর নিয়ে দু-জনে দ্রুত গাড়িতে চেপে বসল৷ কাঁকুরে পথ ধরে ছুটতে লাগল টাঙা৷
কাশীবাবু রুমাল ভিজিয়ে ঘাড়ে মাথায় বোলাতে বোলাতে প্রশ্ন করলেন, 'কী করে বুঝলে ভাই, আমরা মিত্তিরভিলায় যাব?'
টাঙাওয়ালা বেশ চালিয়াতি ভঙ্গিতে বলল, 'অ্যাদ্দিন হয়ে গেল, নসিবপুরে টাঙা চালাচ্ছি৷ লোক দেখে যদি বুঝতে না পারি কে কোথায় যাবে, তা হলে আর করলামটা কী?'
কাশীবাবু খোশ মেজাজে বললেন, 'বাঃ তোমার মাথায় দেখছি খুব বুদ্ধি৷ কী নাম ভাই?'
'মোহনলাল৷'
ভাগনের উদ্দেশে কাশীবাবু বললেন, 'দেখলি ভোম্বল, গ্রামের লোক কেমন ইন্টেলিজেন্ট হয়৷ তোরা ভাবিস বুদ্ধিসুদ্ধি কেবল শহরের লোকেরই আছে৷'
ভোম্বল জিজ্ঞেস করল, 'মিত্তিরবাড়িটা কদ্দূর ভাই?'
'তা ধরেন ঘণ্টা খানেক যেতে হবে৷'
ভোম্বল চোখ কপালে তুলে বলল, 'বাপরে ঘণ্টা খানেক৷ মামা, তুমি যে বলেছিলে বাড়িটা স্টেশনের কাছে৷'
'কাছেই তো৷ এক ঘণ্টার পথ আর এমন কী দূর?'
'রাস্তার যা অবস্থা, ঝাঁকুনি খেতে খেতে যে প্রাণ বেরিয়ে যাবে মামা৷'
'একটু কষ্ট করতে শেখ৷ এই তো কষ্ট করার বয়স৷'
'এ জায়গাটা আমার মোটেই ভালো লাগছে না৷ বিচ্ছিরি গরম৷'
'তোর সব কিছুতেই খুঁতখুঁতুনি৷ চুপ করে বস দেখি৷'
মোহনলাল বলল, 'ছোটোবাবু দেখছি একটু অস্থির লোক৷ গ্রাম দেখতে দেখতে এক ঘণ্টার পথ গড়গড়িয়ে চলে যাবেন৷ নসিবপুরের মতো খাসা জায়গা পাবেন কোথায়?'
কাশীবাবু উৎসাহিত হয়ে বললেন, 'শোন ভোম্বল, ভালো করে শোন৷'
মোহনলাল বকবক করতে লাগল, 'নসিবপুরের হাওয়া-বাতাস সব খাঁটি৷ ভেজাল এতটুকু নেই৷ থেকে থেকে খিদে পাবে৷ তাতে অসুবিধা নেই৷ খাঁটি দুধ, খাঁটি ঘি, খাঁটি ছানা, রসগোল্লা, লেডিকেনি, নির্ভেজাল দেশি মুরগি-সব পাবেন৷ সঙ্গে ফাউ হিসেবে ভূতও পাবেন৷'
ভোম্বল কৌতূহলের সঙ্গে শুধোল, 'ভূত পাব মানে?'
'নসিবপুরের ভূত বিখ্যাত৷ সাহেব ভূত, দেশি ভূত সবই পাবেন৷'
ভোম্বল বলল, 'স্টেশনে একজন বলছিল শ্যাম রায়ের ভূত মাখন নস্করকে খুঁজে বেড়াচ্ছে৷'
'তবে? মোহনলাল কি মিছে কথা বলার লোক?'
কাশীবাবু প্রশ্ন করেন, 'শ্যাম রায় কে?'
'তা তো জানি না৷'
'আর মাখন নস্কর?' প্রশ্ন করে ভোম্বল৷
'তাও জানা নেই৷ শ্যাম রায়ের ভূত দেখেছে গজপতি, যে রাত্তিরে খাঁদু মল্লিকের গুদাম ঘর পাহারা দেয়৷' হঠাৎ পিছন দিকে মুখ ঘুরিয়ে মামা ও ভাগনেকে একবার দেখে নিয়ে সামনে তাকিয়ে মোহনলাল ফের বলে, 'আপনাদের বরাত ভালো৷ হালে ভূত দেখা দিচ্ছে৷ আসাটা বিফলে যাবে না৷ মশার ধূপ, ব্যাটারি এসব সঙ্গে আছে তো? মিত্তিরভিলার ধারে কাছে কিন্তু দোকান পাবেন না৷ সামনে একটা বাজার পড়বে৷ কিনে নিতে পারেন৷'
কাশীবাবু বললেন, 'তুমি তো বেশ হুশিয়ার লোক৷ মশার ধূপ সঙ্গে আছে৷ টর্চের ব্যাটারিটাও নতুন৷' সুইচ টিপে গলা থেকে ঝোলানো আটসেলের টর্চটা একবার পরীক্ষা করে নিলেন কাশীবাবু৷
ভোম্বল প্রশ্ন করল, 'এ তল্লাটে বুঝি খুব মশা?'
'দিনমানে তেমন টের পাবেন না৷ রাতে উৎপাত করবে বই কী৷ আপনাদের তো আবার রাত জাগার কারবার৷'
ভোম্বল বলল, 'কী বললে? আমাদের রাত জাগার কারবার৷ তার মানে?'
'মানে আপনারা নিজেরাই ভালো করে জানেন৷ আপনাদের দেখেই বুঝেছি৷'
কাশীবাবু কৌতূহলের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, 'কী বুঝেছ?'
মোহনলাল বলল, 'আপনারা শহরের লোক৷ আমাদের বড্ড বোকাহাবা ভাবেন৷ বড়োবাবুর গলায় ঝোলানো টর্চলাইট দেখেই বুঝেছি আপনারা হলেন ভূতের কারবারি৷'
ভোম্বল চড়া গলায় বলল, 'আমরা ভূতের কারবারি? তার মানে?'
'মিত্তিরভিলায় ভূত খুঁজতে এসেছেন তো?'
ভোম্বল ও কাশীবাবু মুখ চাওয়াচাওয়ি করল৷ কাশীবাবু একটু ঘাবড়ে যাওয়া গলায় বললেন, 'ও বাড়িতে ভূত আছে বুঝি?'
'ভূতুড়ে বাড়িতে ভূত থাকবে না তো কী থাকবে? অনেকেই ভূত দেখার জন্য ও বাড়িতে এসে দু-রাত তিন-রাত কাটায়৷ আমি নিজেই তো তিন-চার পার্টিকে পৌঁছে দিয়েছি৷ লোকে মিত্তিরভিলাকে বলে হানাবাড়ি৷'
কাশীবাবুর বুকে যেন শেল বিঁধল৷ মুখটা হাঁ হয়ে গিয়ে কাঁধ ঝুলে পড়ল৷ কথা বলতে গিয়ে হোঁচট খেল ভোম্বল৷ সে বলল, 'ক-কী যা-তা বলছ? হানাবাড়ি হতে যাবে কেন? বাড়িটা কিনেছেন আমার মামা৷'
মোহনলাল বেজায় চমকে গিয়ে বলল, 'অ্যাঁ? ওই লজঝড়ে বাড়ি কিনেছেন বড়োবাবু?'
কাশীবাবুর মুখের হাঁ-টা তখনও বন্ধ হয়নি৷ তিনি শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে চেয়ে আছেন৷ ভোম্বল জিজ্ঞেস করল, 'লজঝড়ে বাড়ি মানে?'
'দেখলেই বুঝতে পারবেন৷ এসে তো প্রায় গেলাম৷'
'তার মানে কি বলতে চাও, ও বাড়ি থাকার উপযুক্ত নয়?'
'তাই বা বলি কী করে? আমি তো আর ভিতরে ঢুকে দেখিনি৷' বলল মোহনলাল৷
ফের প্রশ্ন করল ভোম্বল, 'তাহলে লজঝড়ে বলছ কেন?'
'বাইরে থেকে দেখলে তো সেরকমই মালুম হয়৷'
কাশীবাবুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ভোম্বল বলল, 'এসব কী বলছে মামা? আশু মিত্তির যে তোমাকে ডাহা ঠকা ঠকিয়েছে৷'
ঝুঁকে পড়ে ভোম্বলের কানের কাছে মুখ নিয়ে শুকনো গলায় কাশীবাবু বললেন, 'গাঁয়ের লোক অনেক সময় তিলকে তাল করে৷ সব কথা ধরিস নে৷'
মোহনলাল শুধোল, 'কিছু বললেন?'
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাশীবাবু বললেন, 'না৷ আর কতদূর হে?'
'এই এলাম বলে৷ তা বাড়ি কেনার আগে ভালো করে খোঁজখবর নেননি?'
মোহনলালের প্রশ্নের ধরনটা দেখে কাশী দত্তর গা-পিত্তি জ্বলে গেল৷ তিনি একজন ঝানু ব্যবসায়ী৷ হতে পারে মিত্তিরভিলা কেনার সিদ্ধান্তটা সঠিক হয়নি৷ তা বলে ছোকরা টাঙাওয়ালা তাঁকে উপদেশ দেবে? খানিকটা বিরক্তির সঙ্গে তিনি বললেন, 'তা অবশ্যি নেওয়া হয়নি৷ একটু তাড়াহুড়ো ছিল৷'
'বাড়ি ঘরদোর কেনাকাটির ব্যাপারে কখনো হুড়োতাড়া করতে নেই বাবু৷ বাড়ি তো আর বারবার কিনবেন না? কেনার আগে ভালো করে দেখেশুনে নেওয়া উচিত ছিল৷'
মোহনলালের এই জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা শুনতে ভোম্বল বা কাশীবাবু কারওরই ভালো লাগছিল না৷ মোহনলাল ফের প্রশ্ন করল, 'বায়নাপত্তর লেখাপড়া কি একেবারে পাকা করে ফেলেছেন?'
ভোম্বল ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, 'তোমার এত খোঁজে দরকার কী?'
'আমার আর কী দরকার থাকবে? বলছিলাম, সুযোগ থাকলে এখনও বায়নাটা বাতিল করে দিলে পারেন৷ আমার কথা বিশ্বাস না হলে খানিকবাদে নিজের চোখেই দেখবেন৷'
'এই, তুমি চুপ করো তো? বাড়ি মামার কেনা হয়ে গেছে৷' বলল ভোম্বল৷
'মূল্য কত নিল?'
কাশীবাবু বললেন, 'চার লাখ৷' আসলে খসেছে পাঁচ লাখ৷ মোহনলাল যদি আবার ট্যারাবাঁকা জ্ঞান দিতে আসে সেই ভেবে দামটা এক লাখ কমিয়েই বললেন কাশীবাবু৷
চার লাখ শুনে খিলখিলিয়ে হেসে উঠে মোহনলাল বলল, 'কত বললেন?'
মোহনলালের ফিচেল হাসি দেখে কাশীবাবুর মাথায় খুন চড়ে গেল৷ ধমকের সুরে বললেন, 'চার লাখ৷ তা অমন বোকার মতো হাসছ কেন?'
মোহনলাল হালকা মেজাজেই শুধোল, 'আপনার অনেক টাকা না?'
কাশীবাবু এবার রাগে ফেটে পড়ে বললেন, 'হ্যাঁ আমার অনেক টাকা৷'
ভোম্বল মুখের সামনে তর্জনী রেখে 'মামা মামা' বলে কাশীবাবুকে থামানোর চেষ্টা করল৷ কাশীবাবু সে সবের তোয়াক্কা না করে বোমার মতো ফেটে পড়ে বললেন, 'তুমি তো দেখছি মহা ডেঁপো৷ তখন থেকে জ্যাঠামো করে যাচ্ছ? আমি কে তা জানো? আমার কত টাকার কারবার তা তুমি জানো? কত লোক আমার কারবারে খাটে তা জানো? চার লাখ টাকা জলে ফেলে দিলেও যে আমার কিছু যায় আসে না, সে খবর রাখো?'
এসব কথার তোড়ে মোহনলাল অবশ্য মোটেই ঘাবড়াল না৷ ফিক করে হেসে উঠে সে বলল, 'ওই ভূতুড়ে ভাঙাচোরা বাড়িটা চার লাখ টাকায় কিনলেন? আপনি দেখছি বড়োবাবু পয়লা নম্বরের ভোম্বলরাম৷'

কাশীবাবু গর্জন করে উঠলেন, 'কী বললে?'
'ওই যে আপনার বাড়ি দেখা যাচ্ছে৷'
বাড়ির হাল দেখে মামা ও ভাগনে দু-জনেরই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ার উপক্রম হল৷ ভোম্বল বলল, 'মোহনলাল তো খুব একটা খারাপ কথা বলেনি মামা৷ এ দেখছি সত্যিই ভূতের বাড়ি৷'
কাশীবাবু শুকনো মুখ করে বাড়ির দিকে চেয়ে রইলেন৷ বাড়ির চৌহদ্দিটা বিরাট বড়ো৷ বেশির ভাগ জায়গায় আগাছায় ও শুকনো পাতায় ভরা৷ ঝোপঝাড়ের ভিতর থেকে জেগে আছে কপিকলসহ একটা কুয়ো৷
আউট হাউসের শ্যাওলা ধরা দেওয়াল বেয়ে উঠেছে লতানে গাছ৷ ঘরগুলো বহুদিন ধরে পরিত্যক্ত বলেই মনে হচ্ছে৷ দোতলা বসত বাড়িটার বাইরের দেওয়ালে পলেস্তারা প্রায় নেই বললেই চলে৷ ইটের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে বট-অশ্বত্থের চারা৷ একতলায় দুটো জানালা৷ তাতে গরাদ বা পাল্লা কিছুই নেই৷
বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢোকার লোহার বড়ো গেটটায় জং পড়ে খুবই বেহাল দশা৷ মিত্তিরভিলার পাশেই আরেকটা পুরোনো বাংলো আছে৷ সেটার অবস্থাও তথৈবচ৷ দুই বাড়ির মধ্যেকার পাঁচিলের একটা অংশে ইট খসে গিয়ে বড়োসড়ো একটা ফোকরের সৃষ্টি হয়েছে৷ তার ফাঁক দিয়ে সহজেই এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যাতায়াত করা যায়৷
পাঁচিলের পাশে একটা টিউবওয়েল৷ একটা বাচ্চা ছেলে উদলা গায়ে টিউবওয়েল টিপে জল খাচ্ছিল৷ ভোম্বল ও কাশীবাবুকে দেখেই পাঁচিলের ফোকর গলে ছুটে পালাল৷
জং ধরা লোহার গেটটা ঠেলতেই ক্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ-চ করে পিলে চমকে দেওয়া বিশ্রী রকমের একটা শব্দ হল৷ মামা ও ভাগনে ঢুকে পড়ল বাড়ির চত্বরে৷ লোহার গেট থেকে গাড়িবারান্দা পর্যন্ত মোরাম বিছানো পথ ঢাকা পড়েছে জংলি ঘাসে৷ দীর্ঘদিনের অযত্নের ছাপ রয়েছে বাগানের চারিদিকে৷ এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশ কিছু শাল, সেগুন, শিমুল, পলাশ গাছ৷
গাড়িবারান্দা থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠলে সদর দরজা৷ দরজাটা মজবুত কাঠের৷ আংটায় বাঁধা আছে দড়ি৷ ভোম্বল চিন্তিত গলায় বলল, 'এ বাড়িতে কি থাকা যাবে মামা?'
'আগে ভিতরে ঢুকে ঘরদোরের অবস্থা কেমন দেখি, তারপরে ভাবা যাবে৷'
হঠাৎ সিলিংয়ের দিকে চেয়ে ভোম্বলের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল৷ একজোড়া কালো থলে ঝুলছে সিলিং থেকে৷ মানুষের সাড়াশব্দ পেয়েই বোধ হয় থলেগুলো ডানা ঝাপটে উড়তে শুরু করল৷
'মামা বাদুড়! বাদুড়!' বলে ভয়ার্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠল ভোম্বল৷
কাশীবাবু বিরক্তির সঙ্গে বললেন, 'আদিখ্যেতা করিস নে তো৷ গাঁয়ে অমন দু-চারখানা বাদুড় সব বাড়িতেই পাবি৷'
ঠিক এই সময় কে যেন বলে উঠল, 'ভাম বেরিয়েছে না কি? ভাম এ তল্লাটে অনেক পাবেন৷ ভাম ছাড়া ভূতের বাড়ি জমে না কি দাদা?'
চমকে ঘুরে তাকিয়ে কাশীবাবু দেখলেন, শুকনো পাতার উপর খচমচ শব্দ তুলে ফতুয়া আর খাটো ধুতি পরা একটা সিড়িঙ্গে লোক হাসি হাসি মুখে এগিয়ে আসছে৷ হাতে একটা নোটবই৷
নাকের ডগার উপর ঝুলে পড়া চশমার উপর দিয়ে জুলজুলে দুই চোখে লোকটাকে ভালো করে জরিপ করে কাশীবাবু বললেন, 'কে আপনি?'
'আমার নাম সনাতন ঘোড়ুই৷ কাছেই থাকি৷ তা দাদা এই এলেন বুঝি?'
কাশীবাবু দায়সারা ভাবে জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ৷'
'ভৈরববাবু নিশ্চয়ই আমার কথা বলেছেন৷'
কাশীবাবু অবাক হওয়া গলায় প্রশ্ন করলেন, 'ভৈরববাবু কে?'
'কেন? ভৈরব পৈতুন্ডী৷ ওই যে ভূত পর্যটন নিয়ে কাগজে লেখেন৷ ভূত নিয়ে কালচার করেন৷ উনি একবার এখানে ঘুরে যাওয়ার পর থেকেই তো ভূতের বাড়ি বলে নসিবপুরের এই মিত্তিরভিলার কপাল খুলল৷ অনেকে ভূত খুঁজতে আসে এ বাড়িতে৷ ভৈরববাবুই তাদের আমার কথা বলে দেন৷'
এই লোকটার গায়ে পড়া বকবকানি একেবারেই ভালো লাগছে না ভোম্বলের৷ একে সে গরমে ঘেমেনেয়ে বিধ্বস্ত, তার উপরে খিদের চোটে তার পেটের ভিতর কয়েক-শো ছুঁচো সমানে ডনবৈঠক দিয়ে যাচ্ছে৷
টিফিন ক্যারিয়ারে পরোটা, আলুর দম, মাখা সন্দেশ বোঝাই করে দিয়েছিলেন মামি, ট্রেনে সেসব উড়ে গিয়েছে কখন৷ রাতে কোথায় খাওয়া জুটবে তার ঠিক নেই৷ তারপরে এই বাদুড়ঠাসা হানাবাড়িতে রাত্রিবাস৷ সব মিলিয়ে ভোম্বলের মনে অশান্তি কম নেই৷ এর মধ্যে আবার কোথা থেকে সনাতন ঘোড়ুই এসে কোনো এক ভৈরব পৈতুন্ডীর গল্প জুড়েছে৷ কোমরে হাত রেখে রুক্ষ মেজাজে ভোম্বল বলল, 'দেখুন ভৈরব পৈতুন্ডী বলে কাউকে আমরা চিনি না৷'
সনাতন ঘোড়ুই বলল, 'না চিনলেও ক্ষতি নেই৷ এখানে যত্নের কোনো ত্রুটি হবে না৷ সব পার্টিই আমার কাছে সমান৷'
'আপনার মতলবটা কী বলুন তো?'
'রাতে কী খাবেন? ডিমের ঝোল না দেশি মুরগি?'
খিদের মুখে ডিম ও মুরগির নাম শুনে মামা ও ভাগনে দু-জনেরই চোখেই খুশি ঝিলিক দিয়ে উঠল৷ সনাতন ঘোড়ুই বলল, 'এখানে যারা আসে আমিই তাদের তিন বেলা খাওয়ার জোগাই৷ জিনিস খাঁটি৷ দাম কম৷'
ভোম্বল খুশি গলায় বলল, 'তাই বলুন৷'
'এবেলা মাছ পাবেন না৷ কাল হাটবার৷ ঝরনার কুচো মাছ খাওয়াব৷ ব্রেকফাস্টে পুরি-তরকারি লাড্ডু৷ আজ রাতে ডিম না মুরগি?'
কাশীবাবু বললেন, 'রাতে ডিমই ভালো, কী বলিস ভোম্বল?'
সনাতন ঘোড়ুই কানে গুঁজে রাখা পেনসিলটা হাতে নিয়ে নোটবইয়ে লিখতে লিখতে বলল, 'বেশ তো ডিমের কারি৷ কয় প্লেট?'
ভোম্বল বলে উঠল, 'না মামা, মুরগি৷'
ডিম না মুরগি, কিছুতেই দু-জনে ঠিক করতে পারল না, শেষে ভোম্বলের দিকে চেয়ে সনাতন বলে উঠল, 'তার চেয়ে বরং এক কাজ করি৷ মামাবাবুর ডিম, আপনার মুরগি৷'
হ্যা-হ্যা করে খানিকটা হেসে কাশীবাবু বললেন, 'এইটা ঠিক বলেছ!'
সনাতন খুশি হয়ে বলল, 'ভাতই করে দিই রাতে?'
কাশীবাবু বললেন, 'তাই হোক৷' খাতা বন্ধ করে পেনসিলটা ফের কানে গুঁজে সনাতন বলল, 'এখন তাহলে চায়ের সঙ্গে মুড়ি আর তেলেভাজা পাঠিয়ে দিচ্ছি৷'
ভোম্বল বলল, 'চমৎকার৷ এ যে দেখছি খাসা ব্যবস্থা৷'
'খাসা মানে? সনাতন ঘোড়ুইয়ের কাজে কোনো খুঁত পাবেন না৷'
কাশীবাবু প্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা সনাতন, এ বাড়িতে সত্যিই কি ভূত আছে?'
'তা বলা শক্ত৷'
'যারা থেকেছে তারা কিছু বলেনি?'
'যারা থেকে গেছে তারা তো বলে আছে৷'
ভোম্বল বলল, 'ভূত এবারে পালাবে৷ এ বাড়ি কয়েকদিনের মধ্যেই সারাই-টারাই হয়ে ঝাঁ চকচকে হয়ে যাবে৷ আমার মামা শ্রীযুক্ত কাশীনাথ দত্ত এই বাড়িটা কিনেছেন৷ দোহাই এটাকে আর ভূতের বাড়ি বলবেন না৷'
সনাতন ঘোড়ুই এবার চমকে গিয়ে বলল, 'অ্যাঁ? এই বাড়ি আপনি কিনেছেন দাদা?'
কাশীবাবু বলেন, 'কেন অসুবিধে আছে কিছু?'
'না না অসুবিধের আর কী? বলছিলাম ভূতুড়ে বাড়ি কেনা কি ঠিক হল? কেনার আগে খোঁজ করেননি?'
ভোম্বল বলল, 'বললাম তো, এবারে ভূত পালাবে৷'
মোসাহেবের মতো হেঁ-হেঁ করে হেসে সনাতন বলল, 'সে তো খুব ভালো কথা৷ ভূত-প্রেত কি ভালো জিনিস? ওসব ঝাড়েবংশে বিদেয় হওয়াই ভালো৷'
কাশীবাবু কুয়োর দিকে চেয়ে বললেন, 'বুঝলি ভোম্বল, কুয়োটা প্রথমেই বুজিয়ে ফেলতে হবে৷ বাগানের মধ্যে এমন একটা কুয়ো থাকা ভালো কথা নয়৷ কুয়োর পাঁচিলটাও নীচু৷ তোর তো কাণ্ডজ্ঞান কম৷ হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে কখন টুপ করে নীচে পড়ে যাবি একটা কেলেঙ্কারি হবে৷ ওই তো ওখানে দেখছি একগাদা ইটপাটকেল ঢিবি হয়ে আছে৷ ওগুলো কুয়োয় ফেলে দিলেই কাজ হয়ে যাবে৷ শুধু কিছু লেবার দরকার৷'
সনাতন বলল, 'আমি এখন আসি৷ একটু বাদে চা দিয়ে যাচ্ছি৷'
সনাতন চলে যাওয়ার পর সদর দরজার দড়ি খুলে দুরুদুরু বুকে ভিতরে ঢুকে পড়ল মামা ও ভাগনে৷ নীচ তলাটা বড্ড নোংরা৷ ঘুলঘুলিতে পায়রার বাসা৷ নিরিবিলি নির্জন বাড়িতে সহসা মানুষের প্রবেশে আতঙ্কিত হয়ে তারা ঝটাপটি শুরু করে দিল৷
সিঁড়িটা ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ কাশীবাবুর টর্চটা দিনের বেলাতেই কাজে লেগে গেল৷ দোতলায় পশ্চিমমুখো একটা ঘর পাওয়া গেল৷ মোটামুটি চলনসই৷ ঘরের ভিতরের দেওয়ালের রংচং ফ্যাকাশে৷ কয়েক জায়গায় পলেস্তারা চটে দাঁত বের করেছে ইট৷ ছাতের কাছে দেওয়ালের গায়ে বেশ বড়োসড়ো একটা ফাটল৷
জানালার পাল্লায় অর্ধেক কাচ, অর্ধেক কাঠ৷ জানালার ফ্রেম কাঠের৷ তবে রোদ জল খেয়ে পাল্লার কাঠ বেঁকেচুরে গিয়েছে৷ ছিটকিনি নেই৷ পাল্লার গায়ে আংটা আছে৷ দড়ি দিয়ে বাঁধা যাবে৷ কপাল ভালো, ঘরের মধ্যে দুটো চৌকি রয়েছে৷ হাওয়া বালিশ সঙ্গে আছে৷ চৌকির উপর শতরঞ্চি বিছিয়ে নিলে রাতে শোওয়ার ব্যবস্থাটা একরকম হয়ে যাবে৷
ভোম্বল বলল, 'এ বাড়ি মেরামত করতে তোমার ভালো টাকা খসবে মামা৷'
'খসলে কী আর করা যাবে৷ আশু মিত্তির ঠিকই করে রেখেছিল বাড়ি বেচবে৷ বেচবেই যখন, সে কি আর গাঁটের কড়ি খরচ করে বাড়ি সারিয়ে আমার জন্য সাজিয়ে রাখবে?'
'তা দাম তো কিছু কম নিল না৷'
'বেশিই বা কী নিয়েছে? এতখানি জমিসহ বাড়ি এর চেয়ে সস্তায় হয়? দেখ না, এই বাড়িকে কেমন সাজিয়ে গুছিয়ে তুলি৷'
স্যুটকেস থেকে জিনিসপত্র বের করতে করতে ভোম্বল বলল, 'আচ্ছা তোমার কি আক্কেল বলো তো মামা?'
'কেন রে কোথায় কী গুবলেট করলাম?'
'করলে না? তুমি যে অনেক টাকার মালিক সেটা টাঙাওয়ালার কাছে ফলাও করে বলার কোনো দরকার ছিল?'
পাঞ্জাবির বোতাম খুলতে খুলতে হেঁ-হেঁ করে হেসে কাশীবাবু বললেন, 'ওঃ এই কথা!'
'হাসছ? নতুন জায়গা৷ আশপাশের লোকজন কেমন জানা নেই৷ যদি ডাকাত-টাকাত পড়ে?'
ঘরের মধ্যে বীরদর্পে পদচারণা করতে করতে কাশীবাবু বলেন, 'কী যে বলিস? ডাকাত কাবু করবে কাশী দত্তকে? দোনলা বন্দুকটা কি সঙ্গে নিয়ে এসেছি এমনি এমনি? চোর-ডাকাত-বদমাশ যেই হোক ট্যান্ডাইম্যান্ডাই করলে খুলি উড়িয়ে দেব না?'

নীচু হয়ে স্যুটকেসটা একটা চৌকির তলায় রাখতে গিয়ে ভোম্বল চেঁচিয়ে উঠল, 'মামা! মড়ার খুলি৷'
'অ্যাঁ কই? কোথায়?' বলে কাশীবাবু ব্যস্তসমস্ত হয়ে খাটের তলায় উঁকি দিলেন৷
খাটের নীচ থেকে মড়ার খুলিটা বের করে এনে ভোম্বল বলল, 'কোনো ভূতরসিক বোধ হয় ফেলে গেছে মামা৷'
খুলিটা দেখে কাশীবাবু আঁতকে উঠে ভাগনের উদ্দেশে বললেন, 'ফেলে দে ভোম্বল, ফেলে দে৷'
'ফেলব কেন? এটা সঙ্গে নিয়ে যাব মামা৷ বায়োলজি স্যারকে প্রেজেন্ট করব৷ স্যার খুব খুশি হবেন৷'
চা মুড়ি তেলেভাজা নিয়ে ঘরে ঢুকতে গিয়ে ভোম্বলের হাতে মড়ার খুলি দেখে ছানাবড়া চোখে সনাতন বলে উঠল, 'দেখো কাণ্ড! এরই মধ্যে ভূতে উৎপাত শুরু করল না কি?'
ভোম্বল বলল, 'চৌকির তলায় ছিল৷' এই বলে মড়ার খুলিটা শূন্যে ছুড়ে দিয়ে ফের ক্যাচ ধরার মতো করে ধরে নিলে ভোম্বল৷
'অ্যাঁ? ক-দিন আগে ভূত দেখবে বলে এক তান্ত্রিক এসেছিলেন এ বাড়িতে! তিনিই বোধ হয় ভুল করে ফেলে গেছেন৷ ভূত দেখার জন্য লোকেদের কেন যে এত আঁকুপাঁকু বুঝি না৷ ভূত দেখা কি ভালো কথা?' কেটলি থেকে গেলাসে চা ঢালতে ঢালতে বলল সনাতন৷
কাশীবাবু বললেন, 'তোমাদের এখানে কি ভূতের চাষ হয়? স্টেশনে নেমেই শুনলাম, কোন এক শ্যাম রায়ের ভূত নাকি মাখন নস্করকে খুঁজে বেড়াচ্ছে৷'
'এর মধ্যে সে কথাও জেনে ফেলেছেন? লোকে বলাবলি করছে, শ্যাম রায়ের ভূত নাকি এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে৷ খাঁদু মল্লিকের পাহারাদার গজপতি দেখেছে৷ আরও দু-চারজন লোক দেখেছে৷ তবে মাঝরাতে ভূতের হুংকার অনেকেই শুনেছে৷'
কাশীবাবু বললেন, 'বোঝো কাণ্ড! এদিককার লোক দেখছি কুসংস্কারের ডিপো৷'
চলে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সনাতন৷ কাশীবাবু শুধোন, 'কিছু বলবে? ও হো তোমাকে তো অ্যাডভান্স পয়সাকড়ি কিছু দেওয়া হল না৷'
সনাতন সংকুচিত হয়ে বলে, 'টাকা পরে দিলেও চলবে৷ আমার কথাটা একটু ভাববেন দাদা৷'
কাশীবাবু প্রশ্ন করলেন, 'কী কথা?'
'আপনি তো বাড়ি সারাবেন৷ মাঝে মধ্যে এসে থাকবেন৷ কাজের একটা লোক চাই তো?'
কাশীবাবু হেসে বললেন, 'সে হবেখন৷ আগে তো বাড়ি সারিয়ে গুছিয়ে বসি৷'
'সে তো একরকম বসেই পড়েছেন৷'
'না হে৷ সময় লাগবে৷ অনেক কাজ বাকি৷ এ বাড়ি মেরামত করতে সময় লাগবে৷ দেখো না এই বাড়িকে আমি কেমন সুন্দর করে তুলি৷ মেঝেতে মার্বেল লাগাব৷ ঘরে ঘরে ঠান্ডা মেশিন৷ বাগানে সবুজ গালিচার মতো ঘাস৷ মাঝে লিলি পুল৷ রংচং করে বাড়িটাকে একেবারে খাসা করে তুলব৷'
মাথা চুলকে সনাতন বলে, 'এ তো অনেক টাকার ধাক্কা৷'
'টাকা কি কাশী দত্তের কম আছে ভেবেছ?'
সনাতন জিভ কেটে বলে, 'না না তা মোটেই না৷ দেখেই বুঝেছি আপনি রাজাবাদশা লোক৷'
'রাজাবাদশা? মন্দ বলনি৷ শহরের অনেকে এই কথাই বলে৷'
ভোম্বল বিরক্ত হয়৷ আবার কাশীবাবু গ্যালগ্যাল করে নিজের টাকাপয়সার কথা বলতে শুরু করেছেন৷ 'মামা' বলে কাশীবাবুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইশারায় তাঁকে নিরস্ত করার চেষ্টা করে ভোম্বল৷ কাশীবাবু সে সব উপেক্ষা করে বলতে থাকেন, 'আমার কারবারে কত লোক কাজ করে তা জানো? আমার তিনখানা গাড়ি৷ একখানা বিলিতি৷ বাড়ি চার-চারটে৷'
গোল্লা গোল্লা চোখ করে সনাতন বলে, 'আপনি দেখছি কোটি টাকার মালিক৷'
কাশীবাবু হেঁ-হেঁ করে হেসে বলেন, 'আমার যে ঠিক কত টাকা আছে, তা আমি নিজেই জানি না৷'
জুলজুলে চোখে সনাতন প্রশ্ন করে, 'আপনার কারবারটা কীসের?'
ভোম্বল এবার কোমরে হাত দিয়ে সনাতনের সামনে এসে বলে, 'বন্দুকের৷'
বন্দুকের কথা শুনে সনাতন কেমন যেন চমকে ওঠে৷ ভোম্বল বলে, 'মামা নিজে খুব ভালো বন্দুক চালান৷ একবার ট্রিগার টিপতে শুরু করলে ছররার মতো গুলি বেরোতে থাকে৷ একটাও লক্ষ্য ফসকায় না৷'
সনাতন বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে বলে, 'আমি এখন আসি৷'
সনাতন চলে যেতেই কাশীবাবু বললেন, 'ধ্যাত? কী আবোলতাবোল বললি তুই? সনাতন কী ভাবল কে জানে?'
'তুমি যে ভাবে ছুটতে শুরু করেছিলে বন্দুক ছাড়া তোমাকে থামানো যেত? ফের আনকা লোকের কাছে তুমি টাকাপয়সার গল্প শুরু করেছিলে?'
'আমি কি আর লোক চিনি না? সনাতন মানুষ ভালো৷'
'পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তুমি বুঝে গেলে লোকটা ভালো? তুমি দেখছি ডাকাত না ডেকে ছাড়বে না৷ সাধে কি মামি তোমার উপর রেগে যায়?'
'হ্যাঁ হ্যাঁ তোর মামির কথা আর বলিস না৷ শুধু ভরি ভরি গয়না গড়িয়ে বাড়িতে মজুত করছে৷ বাড়িতে যদি কোনোদিন ডাকাত পড়ে তো তোর মামির জন্যই পড়বে৷' কাশীবাবু এবারে ভাগনের হাতে একটা চামড়ার ব্যাগ ধরিয়ে বললেন, 'এটা সাবধান করে রাখিস৷'
'কী আছে এতে? তোমার দোনলা বন্দুকের গুলি?'
'লাখ দুয়েক টাকা৷'
ভোম্বল চোখ কপালে তুলে বলে, 'লাখ দুয়েক? এত টাকা তুমি সঙ্গে নিয়ে এসেছ?'
'বাড়িটা মেরামত করতে হবে না? মালপত্তর কিনতে হবে৷ মিস্তিরি লাগাতে হবে৷ খরচ কত জানিস? বাজারদরের খোঁজ রাখিস? তা ছাড়া বিদেশবিভুঁই৷ কখন কোন কাজে টাকা লাগে তার ঠিক কী?'
'বোঝো কাণ্ড৷ চেকবইটা আনলেই তো হত৷'
কাশীবাবু এবার একটু বিরক্ত হয়েই বলেন, 'তোর অত কথায় দরকার কী? টাকাটা সাবধান মতো রেখে দিবি তাহলেই হল৷'
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টাকার ব্যাগটা হাতে নিয়ে স্যুটকেসের মধ্যে চালান করে দেয় ভোম্বল৷
নসিবপুরে ভূতের ভয়টা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে৷ রোজ রাতে কেউ না কেউ শ্যাম রায়ের ভূত দেখছে৷ ভূতের ভয়ে অনেকেই এই দাপুটে গরমের মধ্যেও আঁটোসাঁটো করে জানালা আটকে ঘুমোচ্ছে৷ বদ্ধ ঘরে বসে রাম নাম জপতে জপতে সিদ্ধ হচ্ছে৷ গজপতি যে-রাতে ভূত দেখেছিল, তার পরের রাতে শিবেন গুহর বাড়ির জানালায় একটা ঢ্যালা এসে পড়ে৷
ঘুম ভেঙে উঠে বসতেই বাইরে কার যেন হুংকার শুনতে পেলেন শিবেন গুহ৷ এক অর্থহীন শব্দবন্ধ৷ 'ভো-গা-ম্বা৷' হুংকারের এমনই তেজ যেন মনে হল বোমা পড়ল জানালার ঠিক বাইরে৷ ভয়ে শিবেন গুহর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল৷
আবার একটা ঢ্যালা এসে পড়ল জানালায়৷ মনে অনেক সাহস জড়ো করে শিবেন গুহ এবারে ভাবলেন জানালা খুলে দেখাই যাক না ব্যাপারটা কী? সত্যিই যদি ভূতের দেখা পান এবং ভূত যদি তার ঘাড় না মটকায় তাহলে জব্বর স্টোরি হবে৷ আর ভূতের হাতে যদি মৃত্যু হয় তাহলেও শিবেনবাবু একরকম বেঁচে যাবেন৷ কাগজের সম্পাদকের বাক্যবাণে আর বিদ্ধ হতে হবে না৷
বন্ধ জানালাটা খুলে বাইরে তাকিয়ে শিবেন গুহর পিলে চমকে গেল৷ শূন্যে পেন্ডুলামের মতো দুলছে একটা মড়ার খুলি৷ মড়ার খুলির চোখের কোটরে জ্বলছে নীল আলো৷ 'ভূ-উ-ত! ভূ-উ-ত!' বলে চেঁচিয়ে উঠে শিবেনবাবু ধড়াম করে জানালার পাল্লাটা বন্ধ করে দিলেন৷
'মাখন নস্কর ভো-গা-ম্বা' বলে ফের চেঁচিয়ে উঠল কেউ৷ কথাটা শুনে শিবেন গুহর মনে আর কোনো সন্দেহ রইল না, স্পষ্টই বুঝতে পারলেন শ্যাম রায়ের ভূত হানা দিয়েছে তাঁর বাড়িতে৷ ঘুম বরবাদ হয়ে গেল শিবেনবাবুর, বিছানায় বসে কাঁপতে লাগলেন সারারাত৷
পরের দিন 'তাজা সমাচার' কাগজে 'নসিবপুরের ভূত' শিরোনাম দিয়ে ফলাও করে লিখলেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা৷ কাগজ বিক্রি হল মুড়িমুড়কির মতো৷ এতদিনে শিবেনবাবুর উপর খানিকটা তুষ্ট হলেন সম্পাদক মশায়৷
গজপতির কাহিনি মুখে মুখে ছড়িয়েছিল৷ ভূতের বিষয়টা প্রথমে আজগুবি ব্যাপার বলে উড়িয়ে দিয়েছিল অনেকেই৷ কিন্তু কাগজে শিবেন গুহর লেখা পড়ে অনেকেই এবারে ভূতের ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে শুরু করল৷
চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল নসিবপুরের অলিতে গলিতে৷ এখন কী করা উচিত সেই নিয়ে আলেচনা বসল নিধি গুপ্তর বাড়ির বৈঠকখানায়৷ নিধি গুপ্ত, নসিবপুরের একজন গণ্যমান্য লোক, একসময় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন৷ তিনি সহৃদয়, অজাতশত্রু মানুষ৷ তাঁর বৈঠকখানা উপচে পড়ল লোকে৷
বাঁকা হাসি হেসে যুক্তিবাদী সমিতির প্রেসিডেন্ট তরঙ্গ রক্ষিত বললেন, 'এ মোটেই ভৌতিক ব্যাপার নয়৷ কোনো এক বদলোক বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে ভয় দেখাচ্ছে৷ লোকটাকে হাতেনাতে ধরতে হবে৷ 'তাজা সমাচার' সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য ভূতের কথা প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে৷'
তরঙ্গ রক্ষিতের এই কথায় আগুনে ঘি পড়ল৷ ভয়ানক গোলযোগ বেঁধে গেল সভায়৷ ভূত বিশ্বাসী ও ভূত অবিশ্বাসী দুই দলের মধ্যে হাতাহাতির উপক্রম হল৷
শেষে 'অর্ডার অর্ডার' বলে সবাইকে শান্ত করে নিধি গুপ্ত বললেন, 'এভাবে গৃহযুদ্ধ করলে সমস্যার কোনে সমাধান হবে না৷ বিষয়টা ভৌতিক, আধাভৌতিক, লৌকিক-অলৌকিক, নৈতিক-অনৈতিক যাই হোক না কেন সবাইকে একজোট হয়ে থাকতে হবে৷ আগে কতকগুলো প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার৷ প্রথমেই বলি, 'ভো-গা-ম্বা শব্দের অর্থ কী?'
শিবেন গুহ বললেন, 'শুধু ভোগাম্বা নয়, মাখন নস্কর ভোগাম্বা৷'
বিজ্ঞানের শিক্ষক ভবেশ ঘোষাল বললেন, 'এটা মনে হচ্ছে কোড ল্যাঙ্গুয়েজ৷ আপনারা যাকে বলছেন ভূত, আসলে সে হল অ্যালিয়েন৷ অ্যালিয়েন কিন্তু ভূতের চেয়েও ডেঞ্জারাস হতে পারে৷'
গোমাতা লালন সমিতির প্রাণপুরুষ নবযুগ বৈদ্য বললেন, 'আরে দূর মশায়৷ এ মোটেই বিজ্ঞানের ব্যাপার নয়৷ কল্পবিজ্ঞানের গল্প পড়ে পড়ে আপনার মাথাটা গিয়েছে৷ সব কিছুর মধ্যেই আপনি অ্যালিয়েন খোঁজেন৷'
নবযুগবাবুর কথাটা মিথ্যে নয়৷ মাঝেমধ্যেই ভবেশ ঘোষালকে দেখা যায় একটা আতশ কাঁচ হাতে আদাড়েবাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে৷ ইউএফও নাকি ওসব জায়গাতেই নেমে থাকে৷
নবযুগ বৈদ্য বললেন, 'এ হল দৈববাণী৷ মাখন নস্করকে ভগবান বলছেন, গোমাতার সেবা কর৷ তাই কথাটা মোটেই ভোগাম্বা নয়, কথাটা হবে ভোগ-হাম্বা৷ হাম্বা অর্থাৎ গোমাতাকে ভোগ দাও৷
নিধি গুপ্ত চিন্তিত হয়ে বললেন, 'তাই কী? আমার তো মনে হয় মাখন নস্করের আম্বা কম নয়৷ তিনি শুধু ভোগ করতে চান৷ তাই মাখন নস্কর ভোগাম্বা৷ মাখন নস্কর ভোগ ছাড়া কিছু বোঝেন না৷ সেই কারণে মাখন নস্করের উপর কুপিত শ্যাম রায়৷
এইসব নানারকম মতামতে 'ভোগাম্বা' শব্দের অর্থ সবার কাছেই আরও দুর্বোধ্য হয়ে উঠল৷ গজপতি এতক্ষণ চুপচাপ বসে বিভিন্ন লোকের কথা শুনছিল৷ এবারে সে বলে উঠল, 'আমার মনে হয় ভূতটা পদবিতে গুবলেট করেছে৷ শ্যাম রায়ের ভূত মাখন নস্করকে খুঁজছে, ব্যাপারটা তা নয়, আসলে শ্যাম নস্কর বলে কোনো লোকের অতৃপ্ত আত্মা মাখন রায়কে খুঁজে বেড়াচ্ছে৷'
শ্যাম নস্কর সটান উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, 'এই সভায় জীবিত লোককে ভূত বলে চালানোটা কিন্তু অন্যায্য হচ্ছে৷'
গজপতি বলল, 'আপনার কথা হচ্ছে না মশায়৷ দেশে গাঁয়ে কি শ্যাম নস্কর বলে আরেকটা লোক থাকতে পারে না? তিনি কি মরে ভূত হতে পারেন না?'
সবাই বলল, 'ঠিক ঠিক৷'
মাখন রায় হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, 'হরিবোল, আমি তো কিছু করি নাই৷ এত লোক থাকতে বেছে বেছে আমার উপর ভূতের উৎপাত কেন?'
মাখন রায় সত্যিই নিরীহ লোক৷ তার বাতাসার কারবার৷ সারাদিন তিনি গুনগুন করে হরিনাম করেন আর গুড় থেকে বাতাসা তৈরি করেন৷
তরঙ্গ রক্ষিত এবারে জোর দিয়ে বলে উঠলেন, 'আহা আপনারা বিষয়টাকে বড্ড জটিল করে ভাবছেন৷ ব্যাপারটা মোটেই ভৌতিক নয়৷' ফের সভায় একটা গোলমাল বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হল৷
কিন্তু আলোচনা বেশি দূরে এগোল না৷ শ্যাম রায়, মাখন নস্কর, ভোগাম্বা এসব রহস্যই থেকে গেল৷ নিধি গুপ্তর বাড়ির গ্র্যান্ডফাদার ক্লকে ঢং ঢং করে ন-টা বাজতে সভা ভাঙল৷ রাত ন-টা মানে নসিবপুরে অনেক রাত৷ তার উপরে ভূত বেরোচ্ছে রাতে৷ সকলে দুদ্দাড় করে বাড়ির পথ ধরল৷
লাঠিগাছা শক্ত হাতে ধরে নিধি গুপ্তর বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল গজপতি৷ খাঁদু মল্লিকের চালের গুদামের চৌকিদারির চাকরি যাওয়ার পর থেকে তার মনটা বেশ হালকা হয়ে গিয়েছে৷ রাতের অন্ধকার ভেদ করে হনহনিয়ে হাঁটতে লাগল সে৷
আগে অন্ধকারে একলা পথ চলতে গজপতির ভয় করত৷ শ্যাম রায়ের ভূত দেখার পর থেকে তার ভূতের ভয়টা চলে গিয়েছে৷ এবারে সে ভূতকে ছেড়ে কথা কইবে না৷ ফের ভূতের দেখা পেলে শ্যাম রায়-মাখন নস্কর কে, ভোগাম্বা কথার মানে কী, এসব জেনে ছাড়বে সে৷
শ্যাম রায়ের ভূতের কথা ভেবে আনমনা হয়ে হাঁটতে হাঁটতে মাধবডিহির জঙ্গলে এসে পড়ল গজপতি৷ মাঝখান দিয়ে চলে গিয়েছে পিচ রাস্তা৷ দু-পাশে শাল সেগুনের ঘন জঙ্গল৷ তীব্র একটানা ঝিঁঝির ডাকের শব্দ, মৃদু হাওয়ায় গাছের পাতার খসখস আওয়াজ, জ্যোৎস্নার মায়াবী আলো, সব মিলিয়ে একটা গা-ছমছমে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে৷ হঠাৎ জঙ্গলের মধ্যে একটা চকচকে বস্তুতে চোখ আটকে গেল গজপতির৷ আর ঠিক তখনই মোটরবাইকের শব্দ শুনতে পেল সে৷
ভটভট ভটাভট, ভট-ভট-ভট-ভট- বিশ্রী শব্দ করে ছুটে আসছে মোটরবাইকটা৷ এই সাইলেন্সার ফাটা মোটরবাইকের শব্দ নসিবপুরে সবাই চেনে৷ এ শব্দ শুনলেই অনেকের পিলে চমকে ওঠে৷
গজপতি ভাবল, এই রাতে আবার কার সর্বনাশ করতে যাচ্ছে দুই যমদূত কে জানে!
আসুরিক শব্দ করে তির বেগে এগিয়ে আসছে মোটরবাইকটা৷ হরতন গাড়ি চালাচ্ছিল৷ ঘাড় ঘুরিয়ে রুইতনকে কিছু একটা বলতে গেল৷ ঠিক তখনই রুইতন চেঁচিয়ে উঠল, 'সাবধান!' তারপরই বিকট শব্দে মাঝরাস্তায় গাড়িটা উলটে গেল৷ গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ল হরতন ও রুইতন৷
চোট তেমন গুরুতর নয়৷ খোঁড়াতে খোঁড়াতে উঠে দাঁড়াল দু-জনে৷ মোটরবাইকের হেডলাইটটা ভেঙে চুরমার৷ ঘটনার আকস্মিকতায় হরতন ও রুইতন বেজায় ঘাবড়ে গেল৷ ওরা বেশ বুঝতে পারছে রাস্তায় আড়াআড়ি দড়ি ধরে কেউ উলটে দিয়েছে তাদের বাইক৷ নসিবপুরে এত সাহস কার হবে? সামান্য হলেও একটু ভয় ধরল হরতন ও রুইতনের মনে৷ হাত লাগিয়ে দ্রুত গাড়িটাকে খাড়া করার কাজে লেগে পড়ল দু-জন৷
সহসা রাতের স্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে রক্তজল করা অট্টহাসি হেসে উঠল কেউ৷ চমকে শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়ে হরতন ও রুইতনের হাড় হিম হয়ে গেল৷ রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে বেশ লম্বা-চওড়া এক পুরুষ৷ চাঁদের আলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, লোকটার পরনে জরির কাজ করা ঝকমকে পোশাক৷ মাথায় উষ্ণীষ৷ হাতে খোলা তলোয়ার৷ মুখের রং সাদা, রক্তশূন্য৷ গলায় হাড়ের মালায় লকেটের মতো ঝুলছে মড়ার খুলি৷ খুলির চোখের কোটর থেকে বেরোচ্ছে নীল ভূতুড়ে আলো৷

ঝোপের আড়ালে বসে রুদ্ধশ্বাসে দৃশ্যটা দেখছিল গজপতি৷ কোনো সন্দেহ নেই, এ সেই শ্যাম রায়ের ভূত৷ শ্যাম রায় হুংকার দিয়ে উঠল, 'মাখন নস্কর ভোগাম্বা!' তারপরে 'হা-হা-হা-হা!' আবার সেই রক্তজল করা অট্টহাসি৷
'ভূ-উ-উ-ত! ভূ-উ-উ-ত! ভূ-উ-উ-ত!' বলে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাল হরতন ও রুইতন৷ গজপতি বেরিয়ে এল বুনো ঝোপের আড়াল থেকে৷ শ্যাম রায়ের ভূত মোটরবাইকটাকে মাটি থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে৷ গজপতি এগিয়ে এল তার দিকে৷
'কালই সন্দেহ হয়েছিল মশায় আপনি ভূত নন৷' গজপতির কথা শুনে চমকে ঘুরে তাকাল শ্যাম রায়ের ভূত৷
'আড়াআড়ি দড়ি ফেলে ভালো শিক্ষা দিলেন মশায় দুই বদমাশকে৷ কিন্তু ব্যাপার কী বলুন তো? ভূতের ভেক ধরেছেন কেন? মাখন নস্কর কে? ভোগাম্বা মানে কী? আপনার নাম সত্যিই কি শ্যাম রায়? নিবাস কোথায়?'
শ্যাম রায়ের ভূত কটমট করে গজপতির মুখের দিকে চেয়ে রইল৷ এইসময় পিছন থেকে কেউ হাত রাখল গজপতির কাঁধে৷ বেজায় ঘাবড়ে 'ক-কে?' বলে ঘুরে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল গজপতি৷ বিস্ময়ে চোখ বিস্ফারিত করে বলল, 'আ-প-নি?'
সনাতনের হাতের রান্নাটা চমৎকার৷ রাত সাড়ে ন-টার মধ্যে খাওয়াদাওয়ার পাট চুকে গেল৷
ভোম্বল বলল, 'দেশি মুরগিটা খেলে না মামা, বেড়ে বানিয়েছে কিন্তু৷'
'কাল খাওয়া যাবে৷ পেট ভরেছে তোর?'
'ভরেছে মানে? খাওয়া একটু বেশিই হয়ে গেল মামা৷ এবার একটু হাঁটাহাঁটি দরকার৷'
'বেশ তো৷ আশপাশটা তো দেখাই হল না৷ রাত এমন কিছু হয়নি৷'
জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি মেরে ভোম্বল বলে, 'মনে হচ্ছে পূর্ণিমা৷'
'চাঁদনি রাতে নসিবপুরের প্রাকৃতিক রূপ নাকি দারুণ খোলে৷'
ঘরে তালা দিয়ে, কাঁধে আট সেলের টর্চটা বন্দুকের মতো ঝুলিয়ে ভাগনেকে সঙ্গে নিয়ে নসিবপুরের রাত্রিকালীন রূপ উপভোগ করতে বেরিয়ে পড়লেন কাশীবাবু৷ বাইরে ফুরফুরে হাওয়া৷ নাকে আসছে বুনো ফুলের গন্ধ৷ আকাশে রুপোর থালার মতো গোল চাঁদ৷
ভোম্বল বলল, 'তোমার বন্দুকটা সঙ্গে নিলে না মামা?'
কাশীবাবু বললেন, 'দূরের টিলাটা দেখ৷ চাঁদের আলোয় কী অপূর্ব দেখাচ্ছে৷ চারিদিকে একেবারে পদ্যের মেজাজ৷ বন্দুক দিয়ে কী হবে রে ভোম্বল?'
ভোম্বল বলল, 'অচেনা জায়গা, পদ্যের মাঝে গদ্য হিসেবে মন্দ লোকজন তো হাজির হতে পারে৷ এমনিতেই তো এখানে ভূত-টূত রোজ বেরোচ্ছে৷'
কাশীবাবু বললেন, 'ছাড় তো যত আজগুবি কথা৷ কালই খোঁজখবর করে মিস্তিরি জোগাড় করে ফেলতে হবে৷ পরশু থেকে বাড়ি সারানোর কাজে লোক লাগিয়ে দেব৷'
ভোম্বল প্রশ্ন করে, 'এত তাড়াহুড়োর কী দরকার মামা? বাড়ি তো দেখা হয়ে গেল৷ কাল ফিরে গেলে হয় না?'
'দেখ ভোম্বল, কোনো কাজে ঢিলেমি আমার সহ্য হয় না৷ বাড়ি সারাতে হবে৷ ঝটাপট সারিয়ে ফেললেই হল৷'
'তার আগে বাড়িটা কোনো ইঞ্জিনিয়ারকে দেখিয়ে নিলে পারতে৷ ভিতটিত সব পোক্ত আছে কি না দেখা দরকার তো?'
'অত দেখার কিছু নেই৷ এ হল পুরোনো আমলের বাড়ি৷ মজবুত মালমশলা দিয়ে তৈরি৷ কামান দেগেও ভাঙা যাবে না৷'
বাড়ি সারানোর জন্য এই অজপাড়াগাঁয়ে দীর্ঘদিন পড়ে থাকার ইচ্ছে ভোম্বলের মোটেও নেই৷ মামার মুখের উপর কথাটা সে বলতে পারছে না৷ ইঞ্জিনিয়ারের কথায় কাজ না হওয়ায় সে বলল, 'মামি তো বাড়িটা দেখলেনই না, এ যাত্রা ফিরে গিয়ে পরে মামিকে সঙ্গে এনে পুজো-টুজো দিয়ে ধীরে সুস্থে বাড়ির কাজ শুরু করলে ভালো হয় না?'
কাশীবাবু আঁতকে উঠলেন, 'খেপেছিস না কি? তোর মামি এসে বাড়ির এই অবস্থা দেখলে তো রক্ষে নেই৷ তারপরে যদি শোনে ভূতের বাড়ি, কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে ছাড়বে৷ তার চেয়ে বাড়িটা একেবারে ঝাঁ-চকচকে করে তোর মামিকে নিয়ে আসব৷ তখন ঘটা করে পুজো-টুজো দেওয়া যাবে৷'
ভোম্বল বুঝল মামা যা ঠিক করেছেন, তা থেকে কিছুতেই তাঁকে নিরস্ত করা যাবে না৷ অগত্যা কিছু করার নেই৷ পড়ে থাকতে হবে এই অজ পাড়াগাঁয়ে৷ রকের আড্ডা, সিনেমা, থিয়েটার, ফুটবল সব গেল৷ মুষড়ে পড়ল ভোম্বল৷
কাশীবাবু এবারে বললেন, 'এখন থেকে মাঝেমধ্যে এ বাড়িতে এসে থাকব রে ভোম্বল৷ তোর কলেজের পড়া হয়ে গেলে কলকাতার ব্যাবসা-বাণিজ্য তুইই দেখবি৷ তখন আমি আর তোর মামি পাকাপাকি ভাবে নসিবপুরে এসে থাকব৷ তুই মাঝে মধ্যে আসবি৷ বুড়োবুড়িকে দেখে যাবি৷ জীবনে একটা শখ ছিল বুঝলি, পদ্য লিখব৷ ব্যাবসা করতে গিয়ে তা আর হল না৷ ঘি ডালডা আর সরষের তেলে ডুব মেরে কত কাল কেটে গেল৷ ভাবছি নসিবপুরে থেকে পদ্য লিখে অবসর জীবনটা কাটাব৷'
ভোম্বল হেসে ফেলল৷
'হাসছিস যে? আমি বুঝি পদ্য লিখতে পারি না? কলেজে পড়ার সময় দেওয়াল পত্রিকায় দু-দুটো পদ্য লিখেছিলাম৷ তুই জানিস?'
'তুমি তো একটা খবরের কাগজ ছাপাতে পার মামা৷'
'কাগজ ছাপাব মানে?'
'বিনা পয়সায় ঘি, ডালডা সরষের তেলের বিজ্ঞাপন হয়ে যাবে৷ তা ছাড়া রোববারের পাতায় প্রাণভরে পদ্য লিখতে পারবে৷ আমার সাংবাদিক হতে ইচ্ছে করে মামা৷'
'আমি ও ব্যাবসার তো কিছু বুঝি না৷ এই বয়সে কি নতুন করে পারব? ঠিক আছে তুই আগে কলেজের পড়া শেষ কর৷ পরে ভাবা যাবে৷ অনেক হাঁটাহাঁটি হল৷ চল, এবারে ফেরা যাক৷'
বাড়ি ফিরে মামা ও ভাগনে দু-জনেরই আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেল৷ সদর দরজার তালা ভাঙা৷ কাশীবাবু ঘাবড়ে যাওয়া গলায় বললেন, 'ব্যাপার মনে হচ্ছে গুরুতর রে ভোম্বল৷'
'তোমার টাকা?'
'তুই তো স্যুটকেসে রেখেছিলি৷'
ভোম্বল বলল, 'সর্বনাশ৷'
টর্চ জ্বেলে শশব্যস্ত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন কাশীবাবু৷ পিছনে ভোম্বল৷ হঠাৎ মামা ও ভাগনে দু-জনকে চমকে দিয়ে উপর থেকে হুড়মুড় করে নেমে এল দুই ছায়ামূর্তি৷ আচমকা ধাক্কা খেয়ে বেসামাল হয়ে গেল মামা ও ভাগনে৷
কাশীবাবুর হাত থেকে টর্চ ছিটকে গেল৷ কাশীবাবু নিজেও পড়ে যাচ্ছিলেন, ভোম্বল মামাকে জড়িয়ে ধরে সামাল দিল৷ না হলে একটা বড়ো দুর্ঘটনা ঘটে যেত৷ দুই ছায়ামূর্তি পালিয়ে গেল নিমেষে৷ বাইরে বেরিয়ে এসে বাগানে টর্চ হাতে বেশ কিছুক্ষণ ছোটাছুটি করে মামা ও ভাগনে লোক দুটোর কোনো হদিশ পেল না৷ কাশীবাবু রাগে গজরাতে লাগলেন৷ উপরে উঠে এসে দেখলেন, স্যুটকেস খোলা৷ জামাকাপড় সব হাটকেমাটকে মেঝেতে ফেলে রাখা৷
ভোম্বল জিনিসপত্র হাতড়ে টাকার ব্যাগটা খুঁজে না পেয়ে বলল, 'মামা ব্যাগটা গেছে৷ দু-লাখ টাকা গেল৷'
কাশীবাবু হতাশ গলায় বললেন, 'বন্দুকটাও গেছে রে ভোম্বল!'
ভোম্বল এবার প্রবল বিরক্তির সঙ্গে বলল, 'তোমার নসিবপুর একেবারে অখাদ্য জায়গা মামা৷ চোর, খুনে, ভূত সব এখানে আছে৷ কাল সকালেই আমরা ফিরে যাব৷ এ বাড়ি বেচে দাও মামা৷ এখানে থাকলে তুমি সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে৷ প্রাণটাও যেতে পারে৷'
কাশীবাবু এতক্ষণ ভিতরে ভিতরে ফুঁসছিলেন৷ এবারে গর্জে উঠে বললেন, 'কাশী দত্ত অত সহজে ভেঙে পড়ে না৷ সামান্য বিপদ দেখলে ল্যাজ গুটিয়ে পালায় না৷ গায়ে আঘাত লাগলে কাশী দত্ত বাঘের চেয়েও ভয়ংকর৷ কপর্দক শূন্য অবস্থা থেকে এত বড়ো ব্যাবসা গড়ে তুলেছি৷ চোর ছ্যাঁচোড় বদমাশদের কী করে ঢিট করতে হয় আমি জানি৷ এ বাড়ি সারিয়ে তবে আমি নসিবপুর থেকে ফিরব৷'
'বাড়ি সারাবে যে টাকা কোথায়? মিস্তিরি তো রোজ নগদ মজুরি চাইবে৷'
'পরিতোষকে ফোন করে দেব৷ চেকবই নিয়ে চলে আসবে৷'
ভোম্বল বলল, 'তোমাকে নসিবপুরের ভূতে পেয়েছে মামা৷ মামি ছাড়া কেউ তোমাকে সামলাতে পারবে না৷ আমি ফোন করছি মামিকে৷'
কাশীবাবু ঘাবড়ে গেলেন একথা শুনে৷ সব বীরত্ব নিমেষের মধ্যে ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেল৷ একে গিন্নিকে না জানিয়ে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে নসিবপুরে হানাবাড়ি কিনেছেন, তার উপরে নগদ দু-লাখ টাকা খুইয়েছেন চোরের উপদ্রবে, একথা শুনলে নয়নতারা নির্ঘাত রণংদেহী মূর্তি ধারণ করবে৷ ম্যানেজার পরিতোষকে সঙ্গে নিয়ে হয়তো গাড়ি নিয়ে হানা দেবে এখানে৷ তারপরে কী হবে, আর ভাবতে পারলেন না কাশীবাবু৷ কানের ভিতরে যুদ্ধের দামামা শুনতে পেলেন৷
'শোন ভোম্বল শোন৷ খবরদার এসব কথা বাড়িতে বলিসনে যেন! জানিস তো তোর মামি হাইপ্রেসারের রোগী৷ যদি চোরের কথা শুনে এখন-তখন কিছু একটা হয়ে যায়৷'
ভোম্বল ঘাড় চুলকে বলল, 'এদিকটা তো ভেবে দেখিনি মামা৷'
কাশীবাবু মুচকি হেসে বললেন, 'সেই জন্য তো বলি পাঁচদিক ভেবে কাজ করতে হয়৷ তুইও মাথা ঠান্ডা করে ভাব৷ সামান্য একটা গেঁয়ো চোরের ভয়ে যদি আমরা বাড়ি ছেড়ে পালাই তাহলে, চোরের দল আড়াল থেকে হাসবে না? এই অপমান সহ্য হবে তোর? তুই না উত্তর কলকাতার ছেলে৷'
হুংকার ছেড়ে ভোম্বল বলল, 'পুঁতে ফেলতাম মামা৷ চোরটাকে ধরতে পারলে মাটিতে পুঁতে ফেলতাম৷'
কাশীবাবু বললেন, 'এই তো পুরুষসিংহের মতো কথা৷ চোর এ তল্লাটেরই কেউ হবে৷ ঠিক ধরে ফেলব৷ রাত হয়েছে৷ চল মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা জিনিসপত্রগুলো গোছগাছ করে শুয়ে পড়া যাক৷'
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই চমকে উঠল ভোম্বল৷ কাশীবাবু তখনও ঘুমোচ্ছেন৷ ভোম্বল ধাক্কা দিয়ে ডেকে তুলল মামাকে৷ কাণ্ড দেখে কাশীবাবুর চক্ষু চড়কগাছ৷ চোখ কচলে ভালো করে দেখলেন৷ না স্বপ্ন নয় সত্যি৷ দরজার পাশে পড়ে রয়েছে কাল রাতে চুরি যাওয়া বন্দুক ও টাকার ব্যাগ৷ ব্যাগের ভিতর দু-লাখ টাকাও রয়েছে৷ দু-বার গুনে দেখলেন কাশীবাবু৷
ভোম্বল গোল্লা গোল্লা চোখে বলল, 'এ যে দেখছি চোরের উপর বাটপাড়ি মামা৷'
'বাটপাড়ের ব্যাপার নয় রে ভোম্বল, এ নির্ঘাত ভূতের কীর্তি৷ ভূত! ভূত! নসিবপুরের ভূত! না হলে খোয়া যাওয়া টাকা কখনো ফিরে আসে এভাবে?'
ভোম্বল আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, 'জয়বাবা ভূতনাথ, যুগ যুগ জিও৷'
পয়সা হলে লোকের দুশ্চিন্তা বাড়ে৷ দুশ্চিন্তা থেকে নানারকম রোগ বাসা বাঁধে শরীরে৷ খাঁদু মল্লিকেরও সুগার ও প্রেসার তো আছেই৷ তার উপর কোলেস্টেরল হাই৷ ইদানীং গাঁটের ব্যাথা শুরু হয়েছে, মাথাটাও মাঝে মধ্যে চক্কর দিয়ে উঠছে৷
খেতে খুব ভালোবাসেন খাঁদু মল্লিক৷ অ্যালোপ্যাথ ডাক্তার মাছ, মাংস, পান্তুয়া, রসগোল্লা, লুচি, মোগলাই পরোটা, কোরমা, কালিয়া, শিঙাড়া, কচুরি সব কিছুতেই ঢ্যাঁড়া মেরে দিয়েছে৷ তাই বিরক্ত হয়ে খাঁদু মল্লিক আয়ুর্বেদ ধরেছেন৷
কবিরাজের হুকুমমতো সকালে ঘুম থেকে উঠেই খাঁদু মল্লিককে পাঁচ-সাত রকমের পাঁচন খেতে হয়৷ এসময় তিনি তাঁর বিলাসবহুল ড্রয়িংরুমের খোলা জানালার পাশে আরামকেদারায় বসে থাকেন৷ সামনে শ্বেতপাথরের নীচু টেবিলের উপর সাজানো তাকে পাঁচনের গেলাস৷ ভৃত্য ফুকড়ে জানালার পাশে জোড়া শালিকের জন্য গমের দানা ছড়িয়ে দিয়ে যায়৷ এভাবে দিন শুরু হয় মল্লিক প্যালেসে৷
আজও খাঁদু মল্লিক ঘুম থেকে উঠে পাটভাঙা ফরাসডাঙার ধুতি ও শান্তিপুরের পাঞ্জাবি পরে আরামকেদারায় বসেছেন৷ বাইরের বাগান থেকে ভেসে আসছে আরেক ভৃত্য বাঁশির গলার আওয়াজ৷ 'আয়! আয়! আয়! আয়!'
বাগানের শালিক পাখিদের ডাকাডাকি করে খাঁদু মল্লিকের জানালার কাছে পাঠানোর চেষ্টা করে চলেছে বাঁশি৷ যাতে অন্তত একজোড়া শালিক খাঁদু মল্লিক আরামকেদারায় বসে দেখতে পান৷ একজোড়া, দু-জোড়া, তিনজোড়া যাই হোক না কেন, শালিকের জোড় দেখতে না পেলে খাঁদু মল্লিকের মেজাজ সপ্তমে চড়ে যায়৷
এক শালিক উড়ে এসে বসলে আর রক্ষে নেই৷ সেদিন বাঁশিকে উত্তম-মধ্যম গালিগালাজ শুনতে হয়৷ অন্যান্য ভৃত্যরা অকারণে বকা খায়৷ এক শালিক দেখলেই খাঁদু মল্লিক চোখ বুজে ফেলে চেঁচাতে থাকেন, 'তাড়া তাড়া তাড়া৷ দিনটা মাটি হয়ে গেল৷' তখন বড়ো একটা লাঠি হাতে 'পালা পালা পালা, হুস হুস, ভাগ ভাগ' বলে বিস্তর লম্ফঝম্প করতে থাকে বাঁশি৷ বাকিরাও নিজের নিজের কাজ ছেড়ে বাগানে এসে 'হুস হুস, যা যা' করতে থাকে৷ গোটা মল্লিকপ্যালেসে শোরগোল পড়ে যায়৷
জোড়া শালিকের দেখা পাওয়ার আশায় বাইরের দিকে গভীর আগ্রহের সঙ্গে চেয়েছিলেন খাঁদু মল্লিক৷ ঝপ করে একটা পাখি উড়ে এসে বসল জানালায়৷ এক শালিক ভেবে খাঁদু মল্লিক চোখ প্রায় বুজে ফেলেছিলেন৷ হঠাৎ তার খেয়াল হল, পাখিটার গায়ের রং খয়েরি নয় সবজে৷ আরে এ যে শালিক নয়, চমৎকার একটা টিয়া পাখি৷
খাঁদু মল্লিককে ছেলেমানুষিতে পেয়ে বসল৷ হাতছানি দিয়ে পাখিটাকে ডাকলেন, 'আয় আয়'৷
টিয়া পাখিটা এবারে ঘাড় ঘুরিয়ে কটমটিয়ে খাঁদু মল্লিকের দিকে চেয়ে বলে উঠল, 'মাখন নস্কর ভোগাম্বা৷'
আঁতকে উঠে খাঁদু মল্লিক বললেন, 'কী?'
পাখি আবার বলল, 'মাখন নস্কর ভোগাম্বা৷'
খাঁদু মল্লিক উত্তেজিত হয়ে হাত বাড়িয়ে খপাত করে টিয়া পাখিটাকে ধরতে গেলেন৷ পাখিটা ফুড়ুৎ করে উড়ে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল৷ এদিকে পাখি ধরতে গিয়ে টেবিলের কোনায় গুঁতো খেয়ে হাঁটু চেপে ধরে ব্যথায় ককিয়ে উঠলেন খাঁদু মল্লিক৷ জানালার আলসেতে পাখিটাকে দেখতে না পেয়ে ভাবলেন, যাক আপদ বিদায় হয়েছে৷
সিলিংয়ের কাছ থেকে টিয়া পাখিটা এবারে বলে উঠল, 'সুপ্রভাত খাঁদুবাবু৷'
চমকে গিয়ে উপরের দিকে তাকালেন খাঁদু মল্লিক৷ পাখিটা বসেছে ঝাড়বাতির উপরে৷ টিয়া পাখির টুকটুকে লাল ঠোঁট দেখে তাঁর মনে হল যেন পাখিটার ঠোঁটে রক্ত লেগে আছে৷ খাঁদু মল্লিকের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল৷ শূন্যে হাত ছুড়ে তিনি বলতে লাগলেন, 'হুশ! হুশ! যাঃ! যাঃ!'
বেয়াড়া পাখিটার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই৷ আবার সে বলে উঠল, 'মাখন নস্কর ভোগাম্বা৷' পাখির বেয়াড়াপনা আর সহ্য হল না খাঁদু মল্লিকের৷ সিন্দুক খুলে রিভলবার বের করলেন৷ পাখির দিকে বন্দুক তাক করে বললেন, 'ফের একবার বাজে কথা বললে গুলি চালিয়ে দেব কিন্তু৷'
টিয়া পাখিটা আবার বলে উঠল, 'মাখন নস্কর ভোগাম্বা৷'
সঙ্গেসঙ্গে গুড়ুম৷ গুলি ছুটে গেল৷ সিলিঙের আংটা থেকে সরু চেন দিয়ে ঝোলা ঝাড়বাতিটা খসে গিয়ে সশব্দে মাটিতে পড়ল৷ ঝনঝন শব্দে কাচ ভাঙল৷ দ্রুত সরে না গেলে বাতিটা খাঁদু মল্লিকের মাথায় পড়ে কেলেঙ্কারি হত৷ পাখিটা খুঁজে পাওয়া গেল না৷ আগেই পালিয়েছে৷
খাঁদু মল্লিককে বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ছিটকে পালাতে যাচ্ছিল সনাতন৷ খাঁদু মল্লিক ভারী গলায় ডাকলেন, 'সনাতন৷'
গুটিগুটি পায়ে ঘরে ঢুকে মেঝেতে পড়ে থাকা ভেঙে চুরমার ঝাড়বাতিটার দিকে বিস্মিত চোখে চেয়ে রইল সনাতন৷
'ও কিছু না৷ বাতিটা সিলিং থেকে খসে পড়েছে৷' বলে রিভলবারটা দ্রুত পাঞ্জাবির পকেটে চালান করে দিলেন খাঁদু মল্লিক৷
সনাতন বলল, 'আলগা ভাবে লাগানো ছিল বুঝি?'
খাঁদু মল্লিক বললেন, 'হুঁ৷ মিত্তিরভিলায় নতুন লোক এসেছে শুনলাম৷'
'ঠিকই শুনেছেন৷ ব্যাপার সাংঘাতিক৷'
'কীরকম?'
'লোকটার নাম কাশী দত্ত৷ সঙ্গে আছে এক ছোকরা৷ লোকটার ভাগনে৷ প্রথমে ভাবলাম শহুরে লোকের ভূত দেখার হুজুগে এসেছে৷ রাত পোহালে কেটে পড়বে৷ পরে শুনি, ও বাড়ি কিনে ফেলেছে৷ কাশী দত্ত কলকাতার রইস আদমি৷ কোটি টাকার মালিক৷ বন্দুকের কারবার৷'
খাঁদু মল্লিক চমকে উঠে বলেন, 'বন্দুকের কারবার?'
'তাই তো বললে৷ সঙ্গে একখানা দোনলা বন্দুকও এনেছে৷'
'হঠাৎ ওই ভাঙাচোরা বাড়ি কিনল যে?'

'বাবুর বাগানবাড়ির শখ৷ ও বাড়ি সারিয়ে নেবে৷ বলে কিনা কুয়ো বুজিয়ে ফেলবে৷'
খাঁদু মল্লিক উত্তেজিত হয়ে বললেন, 'অ্যাঁ? কুয়ো বুজিয়ে ফেলবে? সর্বনাশ৷ খোকাদের কী হবে? কাশী না বাঁশি কী নাম বললি, লোকটাকে ভয় দেখিয়ে তাড়াতে পারলি না৷ তোদের পুষে আমার লাভ কী? মাসে মাসে শুধু টাকা গচ্চা যাচ্ছে৷'
সনাতন হতাশ গলায় বলে, 'চেষ্টা কি আর করিনি খাঁদুবাবু? ভূতের বাড়ির গপ্পো করলাম৷ জানালা দিয়ে মড়ার খুলি ঘরে ঢুকিয়ে দিলাম৷ ভয় পেল না মোটে৷ ভাগনেটা ডানপিটে৷ মড়ার খুলি নিয়ে লোফালুফি খেলছিল৷'
'হুম এসব লোক সুবিধের নয়৷ ধাত অন্যরকম৷' দু-হাত পিছনে রেখে বাঘের মতো ঘরে পায়চারি করতে করতে কথাটা বললেন খাঁদু মল্লিক৷
সনাতন এবারে উৎসাহের সঙ্গে বলল, 'তবে ভাববেন না৷ ওষুধ দিয়ে দিয়েছি কাল রাতে৷ ভূতের ভয় না পাক, চোরের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাবে৷ ভাগনেকে নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছিল৷ সেই ফাঁকে ঘরে ঢুকে ঝেড়ে দিয়েছি৷ আদায় মন্দ হয়নি৷ দু-লাখ টাকা৷'
খাঁদু মল্লিকের চোখ চকচক করে ওঠে, 'কত বললি?'
'দু-লাখ৷'
'পার্টি তো সরেস৷'
'বললাম তো কোটি টাকার মালিক৷ পাকা খবর৷ আরেকটা কথা আছে খাঁদুবাবু৷ বন্দুকখানাও সরিয়ে ফেলেছি৷ বিলিতি মাল৷'
খাঁদু মল্লিক হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠে বলেন, 'শাবাশ৷ তোকে হামি খেতে ইচ্ছে করছে রে সনাতন৷'
'গাল তো বাড়িয়েই রেখেছি৷ কত হামি খাবেন খান না৷ শুধু শুধু গালমন্দ করেন৷ সনাতন কখনো বেইমানি করেছে আপনার সঙ্গে?'
খাঁদু মল্লিক জিজ্ঞেস করেন, 'টাকা আর বন্দুক কোথায়?'
'চোরাই মাল ঘরে রাখব? শেষে বাটপাড়ি হোক আর কি৷ মিত্তিরভিলা থেকে যখন ফিরছি, পিছন থেকে বাইক চালিয়ে এসে দাঁড়াল হরতন ও রুইতন৷ টাকার ব্যাগ ও বন্দুক ওদের কাছে দিয়ে দিয়েছি৷ ওরাই তো আপনার সবকিছুর জিম্মাদার৷'
পিছন থেকে কেউ বলে উঠল, 'ডাহা মিথ্যে কথা খাঁদুবাবু৷ সনাতন মিথ্যে বলছে৷'
ঘরে এসে ঢুকেছে হরতন ও রুইতন৷ কথাটা বলেছে হরতন৷ রুইতনের বাঁ-হাতের কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত ব্যান্ডেজ বাঁধা৷ হরতনের কপালে স্টিকিং প্লাস্টার৷ এদের এই অবস্থা দেখে চমকে যায় সনাতন৷ সে চোখ বিস্ফারিত করে বলে, 'আপনাদের এ হাল হল কী করে?'
সনাতনের কথার জবাব না দিয়ে রুইতন গর্জে ওঠে৷ বলে, 'আমাদের নামে সনাতন মিথ্যে লাগাচ্ছে আপনার কাছে৷ টাকার ব্যাগ আর বন্দুকের ব্যাপারে আমরা কিছু জানি না৷'
'তোদের হাতে কপালে পুলটিস হল কী করে?' হরতন ও রুইতনকে জরিপ করে প্রশ্ন করলেন খাঁদু মল্লিক৷
হরতন বলল, 'গাড়ি উলটে গিয়েছিল মাধবডিহির জঙ্গলে৷ আপনি তো জানেন, কাল রাতে রসিক গোলদারকে কড়কে দেওয়ার জন্য আমাদের নবাবহাটে যাওয়ার কথা ছিল৷ মিত্তিরভিলা তো উলটোদিকের পথ৷ ওদিকে আমরা যাইনি৷ সনাতনের সঙ্গে আমাদের দেখাই হয়নি৷ ফালতু আমাদের নামে আপনার কাছে চুকলি করছে৷'
'এরা তো ভুল কথা বলছে না রে সনাতন৷ ব্যাপার কী?' খাঁদু মল্লিক ধমক দিয়ে ওঠেন৷
'স্পষ্ট যে মোটরবাইকটা আমার পাশে এসে থামল, সে গাড়ির শব্দ তো নসিবপুরে সবাই চেনে৷ ভুল হওয়ার তো কথা নয়৷ কাবুল শেখকে ডেকে জিজ্ঞেস করুন, সেও তো আমার সঙ্গে ছিল৷ রাত তখন সাড়ে এগারোটা হবে৷'
খাঁদু মল্লিক ধন্দে পড়ে যান৷ একবার সনাতনের দিকে আরেকবার হরতন ও রুইতনের দিকে চাইতে থাকেন৷
রুইতন বলে, 'সাড়ে এগারোটা?' মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হরতন ও রুইতন৷ এবারে হরতন বলে, 'দুর্ঘটনা তো ঘটে তার আগে৷ তারপরে মোটরবাইক ছিনতাই হয়ে যায়৷'
'মোটরবাইক ছিনতাই? আমাকে কি ছোটোখোকা পেয়েছিস? যা খুশি তাই বোঝাবি? তোদের মতো দুটো দামড়ার কাছ থেকে মোটরবাইক কেড়ে নিল কেউ, এ কথা আমাকে বিশ্বাস করতে বলিস?'
হরতন ও রুইতন ফাঁপরে পড়েছে দেখে সনাতন কৌতূকপূর্ণ গলায় প্রশ্ন করে, 'তা মোটরবাইক ছিনতাই করল কে?'
ঢোক গিলে হরতন বলে, 'আমরা উলটে পড়ে গাড়ি ফেলে পালিয়ে গিয়েছিলাম৷'
খাঁদু মল্লিক চমকে উঠে বলেন, 'পালিয়ে গিয়েছিলি? কেন?'
রুইতন ভয়ে ভয়ে বলে, 'শ্যাম রায়ের ভূ-উ-ত৷'
পাঞ্জাবির পকেট থেকে দ্রুত রিভলবারটা হাতে নিয়ে খাঁদু মল্লিক গর্জে ওঠেন, 'তোরাও ওই গাড়োল গজপতির মতো ভূত দেখছিস নাকি আজকাল?'
হরতন কাঁদো-কাঁদো গলায় বলে, 'আমরা মোটেই মিছে কথা বলছি না খাঁদুবাবু৷'
প্রায় ঘর ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠেন খাঁদু মল্লিক, 'দু-লাখ টাকা আর বন্দুক আমার চাই৷ না হলে তোদের সবকটার মাথায় দানা ভরে দেব৷'
ফ্যালফ্যাল করে খাঁদু মল্লিকের দিকে চেয়ে মাথা চুলকোতে থাকে সনাতন৷ হরতন ও রুইতনের ভাবভঙ্গি দেখে তার মনে হল, খুব একটা মিছে কথা কইছে না তারা৷ কাল রাতের ঘটনাটা ফের একবার ভাবতে লাগল সনাতন৷
পিছন থেকে ভটভট-ভটাভট শব্দে মোটরবাইক ঘ্যাঁচ করে এসে ব্রেক করল তার পাশে৷ সনাতনই আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, 'হরতনবাবু-রুইতনবাবু নাকি?'
মোটরবাইক আরোহী বলল, 'হুঁ৷'
সনাতন বলেছিল, 'ভালো দাঁও মেরেছি৷ নতুন লোক এসেছে মিত্তিরভিলায়৷ রইস আদমি৷ ঘর থেকে মাল ঝেড়ে দিয়েছি৷ এই ব্যাগে দু-লাখ টাকা আছে৷ আর এই যে বন্দুক৷ আপনাদের কাছে গচ্ছিত রাখুন৷ খাঁদুবাবুকে দিয়ে দেবেন৷'
তারপরেই চাদরের ভিতর থেকে একটা হাত বেরিয়ে এসে টাকার ব্যাগ আর বন্দুকটা প্রায় ছিনিয়ে নিল সনাতনের হাত থেকে৷ মোটরবাইকটা নিমেষের মধ্যে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে৷
চাদরের তলা থেকে বেরিয়ে আসা হাতটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে সনাতনের মাথাটা হঠাৎ বনবন করে ঘুরতে লাগল৷ তাই তো? চুরির উত্তেজনায় তখন খেয়াল হয়নি, এই গরমে হরতন ও রুইতন চাদরে গা-মাথা পেঁচিয়ে রাখবে কেন? ব্যাপার যে ভীষণ গোলমেলে৷
গরমের অলস দুপুর৷ কাশীবাবু বিশ্রাম নিচ্ছেন দোতলার ঘরে৷ দুপুরে শোওয়ার অভ্যেস নেই ভোম্বলের৷ সে মিত্তিরভিলার বাগানে এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ মনটা অস্থির৷ মামার টাকা ও বন্দুক ফিরিয়ে দিল কে? এ তো রীতিমতো ভৌতিক ব্যাপার! সত্যিই কি তবে ভূত আছে নসিবপুরে?
হাঁটতে হাঁটতে কুয়োতলায় এসে দাঁড়াল ভোম্বল৷ কুয়োতলার পাশে রয়েছে একটা ঝাঁকড়া শিমুল গাছ৷ কুয়োটা গাছের ছায়ায় ঢাকা থাকে সারাদিন৷ ঝুঁকে পড়ে ভোম্বল দেখল, কুয়ো খুব গভীর, তলদেশ ঘন অন্ধকারে ঢাকা৷ নীচেটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না৷
জল আছে কি না বোঝার জন্য একটা ইটের ঢ্যালা নীচে ফেলল ভোম্বল৷ ঠুং করে একটা শব্দ ভেসে এল৷ এ মোটেই জলে ইট পড়ার শব্দ নয়৷ এবারে আর একটু বড়ো আকারের ঢ্যালা নীচে ফেলল ভোম্বল৷ এবারে 'থ্যাপ' করে একটা ভোঁতা শব্দ হল৷ ঢ্যালাটা যেন গেঁথে গেল মাটিতে৷ মনে হচ্ছে কুয়োটা জলশূন্য৷
ভোম্বল ফের একবার বড়োসড়ো একটা ইটের ঢ্যালা নীচে ফেলতে ঠং করে জোরালো একটা ধাতব শব্দটা প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল উপরে৷ ভোম্বলের ভুরু কুঁচকে গেল৷ কী আছে কুয়োর নীচে?
নীচে নামার জন্য ধাপে ধাপে আংটা উপর থেকে নীচ পর্যন্ত নেমে গিয়েছে৷ ভিতরের দেওয়ালের গায়ে শুকিয়ে রয়েছে শ্যাওলা৷ ভোম্বল এবারে আশ্চর্য হয়ে গেল৷ কুয়োর ভিতরের দেওয়ালের গায়ে কয়েক জায়গায় দেখা যাচ্ছে কাদামাখা হাতের পাঁচ আঙুলের স্পষ্ট ছাপ৷ হাতের ছাপ দেখে বোঝা যাচ্ছে সম্প্রতি কেউ নেমেছিল কুয়োর ভিতরে৷ কিন্তু কেন?
অদম্য কৌতূহল পেয়ে বসল ভোম্বলকে৷ তাকে কিছুতেই মামা নামতে দেবেন না কুয়োর নীচে৷ এখন মামা ঘুমোচ্ছেন৷ ভোম্বল ভেবে দেখল, মিনিট কুড়ির মধ্যে আংটা ধরে ধরে নীচে নেমে আবার সে উপরে উঠে আসতে পারবে৷ মামা জানতেও পারবেন না৷
ভোম্বল নীচে নামার উদ্যোগ নিতেই পিছন থেকে কেউ একজন বলে উঠল, 'কী হচ্ছে এখানে?'
নির্জন বাগানে হঠাৎ মানুষের গলা শুনে চমকে গেল ভোম্বল৷ দেখল পাঁচিলের ফোকর গলে দুটো লোক মিত্তিরভিলার চৌহদ্দিতে ঢুকেছে৷ তারা কড়া দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে৷ এদেরই কেউ একজন বলেছে কথাটা৷
আগন্তুক দু-জনকে দেখে ভোম্বলের মোটেই ভালো লাগল না৷ দুটোরই যমদূতের মতো চেহারা৷ মাথায় বাবরি চুল৷ লম্বা ঝুলপি৷ মোটা গোঁফ, হাতে বালা৷ পরনে টিশার্ট ও গায়ের সঙ্গে সেঁটে বসা জিনসের প্যান্ট৷ একজনের বাঁ-হাতের কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত ব্যান্ডেজ বাধা৷ আরেকজনের কপালে আটকানো আছে স্টিকিং প্লাস্টার৷ লোক দুটো হল রুইতন ও হরতন৷
হরতন ধমকের সুরে ফের বলল, 'কী হচ্ছে এখানে, অ্যাঁ?'
ভয় না পেয়ে ভোম্বল খুব স্বাভাবিক ভাবে জবাব দিল, 'কুয়োর জল মাপছি৷'
রুইতন বলল, 'তুই তো দুধের খোকা৷ তোর মামা কোথায়?'
ভোম্বল এবার বিরক্তির সঙ্গে প্রশ্ন করল, 'আপনারা কারা?'
ভোম্বলের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে হরতন বলল, 'এ বাড়ি মেরামত হবে শুনলাম?'
ভোম্বল বলল, 'ঠিকই শুনেছেন৷ আপনারা নিশ্চয়ই রাজমিস্ত্রি৷ মামা ঘুমোচ্ছেন৷ একটু অপেক্ষা করুন৷ মামা উঠলে কথা বলে যাবেন৷'
হরতনের দিকে চেয়ে রুইতন বলল, 'আমাদের মিস্তিরি ভেবেছে৷'
হরতন ধমকে উঠল৷ 'ফাজলামি হচ্ছে?'
'ফাজলামির কী দেখলেন? বাড়ি মেরামতের ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছেন, তাই ভাবলাম আপনারা রাজমিস্ত্রিই হবেন৷'
রেগে আগুন হয়ে দাঁত কিড়মিড় করে রুইতন বলল, 'এ বাড়ি মেরামত করা যাবে না, মালিকানা নিয়ে ডিসপুট আছে৷'
ভোম্বল ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, 'কীসের ডিসপিউট?'
'কোর্টের স্টে অর্ডার আছে৷ আশু মিত্তিরের সঙ্গে তার ভাইয়ের মামলা চলছে৷'
'মামা তো এসব জানেন না৷ অর্ডারের কপি আছে আপনাদের কাছে?'
হরতন বলল, 'তোর তো সাহস কম নয় রে ছোকরা৷ কাদের সঙ্গে কথা বলছিস জানিস?'
'পরিচয় তো দেননি৷ জানব কেমন করে? নসিবপুরে নতুন এসেছি৷'
হরতন বলল, 'বেশ তাহলে শুনে রাখ, আমি হরতন আর এর নাম রুইতন৷ এটাও জেনে রাখ, নসিবপুরের কেউ হরতন-রুইতনের মুখের উপর কথা বলে না৷'
ভোম্বল হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল৷ হরতন ও রুইতন চমকে গেল৷ এই ছেলেটা মোটেও তাদের ভয় পাচ্ছে না৷ রুইতন পেল্লায় একটা ধমক দিয়ে উঠল, 'হাসছিস যে?'
হাসির রেশ ধরে রেখে ভোম্বল বলল, 'আপনাদের নাম তো খুব মজার৷ হরতন-রুইতন-চিড়িতন-ইস্কাবন৷ শুনলেই তাসের কথা মনে পড়ে৷'
রাগে হরতন ও রুইতনের গা জ্বলে গেল৷ চোখ দিয়ে ভোম্বলকে প্রায় ভস্ম করে হরতন বলল, 'বাজে কথা ছাড়৷ তোর মামা কোথায়?'
'বললাম তো ঘুমোচ্ছেন৷'
'ডেকে নিয়ে আয়৷'
'বাড়ির কাজ বন্ধ করার কথা শুনলে মামা কিন্তু খুব রেগে যাবেন৷ এমনিতেই মামার মাথায় ছিট আছে৷ কখন কী করে বসেন তার ঠিক নেই৷ হঠাৎ হঠাৎ যার তার উপর বন্দুক নিয়ে হামলে পড়েন৷'
ছানাবড়া চোখ করে হরতন প্রশ্ন করল, 'বন্দুক?'
'পাগলের খেয়াল৷ একবার আমাকেই বন্দুক বাগিয়ে তাড়া করেছিলেন৷'
ভোম্বলের কথা শুনে হরতন ও রুইতন একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করল৷ কথাটা তাদের ঠিক বিশ্বাস হল না৷ ভোম্বল ফের বলল, 'আপনারাই বলুন না পাগল না হলে গাঁটের কড়ি খরচ করে কেউ এই ভূতুড়ে বাড়ি কেনে?'
গেঞ্জি উপরে তুলে কপালের ঘাম মুছে হরতন বলল, 'পাগলামি সারানোর দাওয়াই আমরা জানি৷ তোর মামাকে আসতে বল৷'
ভোম্বলের চোখে পড়ল হরতনের কোমরে গোজা রয়েছে একটা ল্যাজা৷ মুখ মোছার উদ্দেশ্য যে ল্যাজাটা দেখানো, এটা বুঝতে অসুবিধা হল না ভোম্বলের৷ এরা ভয় দেখাতে চাইছে৷ ভোম্বল কিন্তু মোটেও ভয় পেল না৷ সে বলল, 'দেখুন আমি কিন্তু বাজে কথা কইছি না৷ পাগল লোক যত ঘুমিয়ে থাকে, তত ভালো৷ খামোখা তাকে খুঁচিয়ে তুললে একটা বিপত্তি না হয়৷'
হরতন ও রুইতন ফের একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করল৷
ভোম্বল বলল, 'এখানে আসার পর থেকে মামার মাথার গোলমালটা আবার বেড়ে গিয়েছে৷ এসেই বাড়ি সারানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন৷ যতই বলছি এ লজঝড়ে বাড়ি সারিয়ে লাভ নেই৷ টাকা জলে যাবে৷ শুনছেন না কিছুতেই৷'
'না শুনলে তো চলবে না৷ কোর্টের অর্ডার৷' বলল রুইতন৷
ভোম্বল কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, 'পাগল মানুষ কি কোর্ট-পুলিশ-দারোগা এসব বোঝে? দেখুন না বাড়ি সারানো তো তাও একরকম, তার উপরে আবার বায়না ধরেছেন কালই কুয়োটা বুজিয়ে ফেলবেন৷'
কথাটা শুনে দারুণ চমকে উঠল দু-জন৷ রুইতন বলল, 'কী? কুয়ো বোজাবে? মামার বাড়ি? কুয়ো যে বোজানো যায় না তা জানিস?'
হরতন বলল, 'কুয়ো মানে জলাভূমি৷'
ভোম্বল চমকে গিয়ে বলল, 'অ্যাঁ?'
'কুয়োয় জল থাকে তাই জলাভূমি৷ ডেঁপো ছোকরা কোথাকার৷ জলাভূমি বোজানো যায় না৷ আইন আছে৷ এসব জানিস?'
ভোম্বল বলল, 'জানি৷ জানি৷ মামাকে কি আর বলিনি সে কথা? কিন্তু আমার কথা শুনলে তো? পাগলকে আইন বোঝানো কী সোজা কাজ?'
'ডাক তোর মামাকে, পাগলামি জন্মের মতো ঘুচিয়ে দিচ্ছি৷'
'ঠিক আছে৷ তবে, আগেই কিন্তু বলে রাখছি, কোনো বিপদ হলে দুষবেন না যেন আমায়৷' এই বলে ভোম্বল এক ছুটে বাড়ির ভিতরে চলে গেল৷ কুয়োর ধারে এসে কুয়োর ভিতরে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল হরতন ও রুইতন৷
খানিকবাদে বাড়ির ভিতর থেকে শোনা গেল এক ভয়ানক চিৎকার৷ 'হতচ্ছাড়া বদমাশ ছেলে৷ খুন করে ফেলব একেবারে৷ আমার বাড়ি সারানোর কাজে ব্যাগড়া দেওয়া হচ্ছে?'
নিঝুম বাড়ির ভিতর থেকে হঠাৎ এই চিৎকার ভেসে আসায় পিলে চমকে গেল হরতন ও রুইতনের৷ এবারে শোনা গেল ভোম্বলের আর্তনাদ, 'বাঁচাও বাঁচাও! মেরে ফেললে৷'
ছুটতে ছুটতে বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এল ভোম্বল৷ প্রাণ ভয়ে ছুটছে সে৷ পিছনে বন্দুক হাতে কাশীবাবু তাড়া করেছে তাকে৷ ভোম্বল ছুটে গিয়ে হরতনের পিছনে লুকিয়ে পড়ে বলল, 'খবরদার বন্দুকের ঘোড়া টিপে দিয়ো না যেন মামা, তোমার তো মাথার ঠিক নেই, বন্দুকে গুলি আছে কিন্তু৷' কাশীবাবুর এই নাটকীয় আবির্ভাব ও ভোম্বলের প্রতিক্রিয়া দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল হরতন ও রুইতন৷
কাশীবাবু মারমুখী মেজাজে হরতন ও রুইতনের দিকে বন্দুক তাক করে বললেন, 'বাড়ি সারানো যাবে না, কুয়ো বোজানো যাবে না৷ মামার বাড়ির আবদার পেয়েছিস সব?'
ভোম্বল বলল, 'এ আমার কথা নয় মামা, এনারা বলছিলেন৷ দোহাই মামা ট্রিগারে চাপ দিয়ো না৷' কী করা উচিত বুঝে উঠতে পারছে না হরতন ও রুইতন৷
কাশী দত্ত হুংকার ছেড়ে বললেন, 'খুলি উড়িয়ে দেব৷ কাশী দত্তের কাজে বাধা দেওয়া হচ্ছে? হ্যান্ডস আপ৷ হাত উপরে৷'
হতভম্ব হয়ে হাত তুলে চৈতন্য হয়ে দাঁড়াল হরতন ও রুইতন৷ হরতন শুকনো গলায় বলল, 'কেস যে ঘুরে গেল দেখছি৷'
ভোম্বল বলল, 'মামা এরা বলছিলেন, বাড়ি সারানো যাবে না কোর্টের অর্ডার আছে৷'
'কোর্ট? কাশী দত্তকে কোর্ট দেখানো হচ্ছে? মুণ্ডু উড়িয়ে দেব৷ এই দিলাম ঘোড়া টিপে৷' ট্রিগারে হাত রাখেন কাশীবাবু৷
হাউমাউ করে উঠল হরতন ও রুইতন৷ হরতন হাতজোড় করে বলল, 'ভুল বলেছি মামাবাবু৷ এ যাত্রা ছেড়ে দিন৷'
'বটে? পথে এসো বাছাধনেরা৷ ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দেখনি৷ দিনে ডাকাতি করতে আসা হয়েছে? কান ধরে ওঠবোস কর৷'
কাঁদো-কাঁদো গলায় রুইতন বলল, 'এই দিনের আলোয়? পেস্টিজ পানচার হয়ে যাবে স্যার৷ কথা দিচ্ছি রাতে এসে ওঠবোস করে দিয়ে যাব৷'
'কী?' বলে শূন্যে দুম করে একটা গুলি ছুড়লেন কাশীবাবু৷
হরতন বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে বলে উঠল, 'দোহাই স্যার ইয়ে মামাবাবু৷ প্রাণে মারবেন না৷' এবারে রুইতনের দিকে চেয়ে হরতন দাঁত কিড়মিড় করে বলে, 'দেখছিস তো পাগলাটে লোক, গুলি খেয়ে মরবি না কি? যা বলছে তাই কর না?'
দ্রুত কান ধরে ওঠবোস শুরু করল হরতন আর রুইতন৷
'কামাল করে দিলেন মশায়৷' কেউ একজন বলে উঠল কথাটা৷ বন্দুক নিয়ে দুম করে ঘুরে গিয়ে কাশীবাবু বললেন, 'কোন শয়তান এল আবার?'
হাত উপরে তুলে সাত্যকি সোম বলল, 'স্যারেন্ডার৷ গুলি চালিয়ে দেবেন না যেন৷ আমি সাত্যকি সোম, পেশায় সাংবাদিক৷ চোর-ডাকাত নই৷' কাশীবাবু আবার বন্দুক বাগিয়ে হরতন ও রুইতনের দিকে ঘুরে গেলেন৷
ক্যামেরা দিয়ে পটপট করে হরতন ও রুইতনের কান ধরে ওঠবোস করার কয়েকটা ছবি তুলে ফেলে সাত্যকি সোম বলল, 'নসিবপুরের মাটিতে হরতন-রুইতন কান ধরে ওঠবোস করছে৷ এ যে মিরাকেল৷ কাল ফ্রন্ট পেজ নিউজ হবে৷' ফ্রন্ট পেজ নিউজের কথা শুনে হরতন ও রুইতন ডুকরে কেঁদে উঠল৷
কাশীবাবু বললেন, 'যা আজকের মতো কাজ হয়ে গিয়েছে৷ এবার পালা৷ ফের যদি মিত্তিরভিলায় ঢুকেছিস সত্যিই কিন্তু খুলি উড়িয়ে দেব৷'
হরতন-রুইতনের উদ্দেশে ভোম্বল বলে উঠল, 'মনে থাকে যেন, কুয়ো হল জলাভূমি৷'
ছাড়া পেয়েই হরতন ও রুইতন ঝড়ের গতিতে পাঁচিলের ফোকর গলে পালাল৷
সাত্যকি সোম বলল, 'কাশীবাবু, আপনি আমাকে বোধ হয় ঠিক চিনতে পারছেন না৷ আমি আপনাকে চিনি৷ বছর দশেক আগে নতুন উদ্যোগপতি হিসেবে আপনার ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিলাম৷'
কাশীবাবু একটু ভেবে বললেন, 'বছর দশেক আগে? ও হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে৷'
সাত্যকি সোম বলল, 'আমি তখন কলকাতায় মাস কমিউনিকেশন নিয়ে লেখাপড়া করতাম৷'
'বাড়ি এখানে?'
'হ্যাঁ৷ এখন 'গ্রামের খবর' পত্রিকার লোকাল করেসপন্ডেন্ট৷ এককালে নসিবপুরে অনেক লোক বেড়াতে আসত৷ বড়ো খারাপ লাগে, আজকাল কেউ আর আসতে চায় না৷ কারণ হল তোলাবাজি, রাহাজানি, গুণ্ডামি, বদমাশদের দাপাদাপি৷ হরতন-রুইতন এ ব্যাপারে কুখ্যাত৷'
কাশীবাবু হেসে বললেন, 'এই চামচিকে দুটো?'
'চামচিকে? ভালো বলেছেন৷ আসলে সমস্যা হল মানুষের ভয়৷ রুখে দাঁড়ালে যে এরা চামচিকে, এটা কেউ বুঝতে চায় না৷ হরতন-রুইতনের ভয়ে নসিবপুর তটস্থ৷ অনেকদিন ধরে কাগজে এদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করছি৷ এবার মনে হচ্ছে নসিবপুরের সুদিন আসছে৷ ব্যাপারটা ঠিক কী হল বলুন তো?'
কাশীবাবু বললেন, 'এরা এসেছিল হুমকি দিতে বাড়ি সারানো যাবে না৷'
'বাড়ি সারানো মানে? এই বাড়ি কিনেছেন না কি?' প্রশ্ন করে সাত্যকি সোম৷
কাশীবাবু বলেন, 'ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে একবার এসেছিলাম৷ সেই থেকে নসিবপুর আমার খুব প্রিয় জায়গা৷ পরিচিত একজন বলল, তাদের নসিবপুরের বাড়ি বিক্রি করতে চায়৷ দুম করে কিনে ফেললাম৷'
'বাঃ এ তো দারুণ ব্যাপার! সত্যিই আজ নসিবপুরের পোড়ো বাংলোগুলো দেখলে কষ্ট হয়৷ একসময় কী রমরমা ছিল আমাদের এই ছোট্ট জায়গাটার৷ যাই হোক, হরতন-রুইতনকে এভাবে জব্দ করলেন কী করে?'
কাশীবাবু বললেন, 'ক্রেডিটটা আমার ভাগনে ভোম্বলের৷ ও বলল, মামা পাগল সাজতে হবে৷'
'ব্রিলিয়ান্ট৷ তাই বুঝি অমন বন্দুক হাতে হামলে পড়লেন?'
'ঠিক তাই৷'
'অ্যাক্টিং কিন্তু অনবদ্য হয়েছে মামা৷' বলল ভোম্বল৷
সাত্যকি সোম ক্যামেরাটা ব্যাগে ভরে কাশীবাবুর উদ্দেশ্যে বলল, 'আপনি মশায় সত্যিই বাহাদুর লোক৷ চলি৷ কপি লিখতে হবে৷ জবর খবর হবে কাল৷ পরে আবার আসব৷ আসি ভোম্বল৷ সাবধানে থেকো৷'
রাত কত হল কে জানে৷ কাশীবাবু অঘোরে ঘুমোচ্ছেন৷ বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে ভোম্বল৷ তার ঘুম আসছে না৷ কুয়োর নীচ থেকে আসা ধাতব শব্দটা তাকে ভাবিয়ে তুলেছে৷
কুয়ো ভরাটের কথা শুনে রুইতন ও হরতন অত চমকে উঠল কেন? রহস্যটা কী? কোনো কিছু কি লুকোনো রয়েছে কুয়োর নীচে? আজ সন্ধ্যে বেলা একজন এসে কুয়ো বোজানোর বরাত নিয়ে গেছে৷ কাল থেকে যদি কাজ শুরু হয়ে যায়, তাহলে রহস্যটার আর সমাধান হবে না৷
বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল ভোম্বল৷ মামার টর্চটা কাঁধে ঝুলিয়ে সন্তর্পণে নেমে এল নীচে৷ আস্তে সদর দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে দরজাটাকে সাবধানে বন্ধ করে দিল৷
গতকাল পূর্ণিমা ছিল৷ বড়ো বড়ো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো পড়ে মিত্তিরভিলার বাগানে আলোছায়ায় মোড়া একটা আধাভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে৷
পা টিপেটিপে কুয়োর দিকে এগিয়ে গেল ভোম্বল৷ কুয়োতলায় এসে থমকে দাঁড়াল৷ হঠাৎ তার চোখে পড়ল বাড়ির উপর এসে পড়েছে একটা পেনসিল টর্চের আলো৷ আলোটা ভোম্বলদের ঘরের উপর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে নিভে গেল৷
এবারে শুকনো পাতার উপর পায়ের শব্দ শুনে শিমুল গাছের কাছেই ঘন হয়ে থাকা বুনো ঝোপের আড়ালে নিজেকে দ্রুত লুকিয়ে ফেলল ভোম্বল৷ আড়াল থেকে কুয়োতলাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার ফুঁড়ে ভূতের মতো দুই ছায়ামূর্তি এসে হাজির হল সেখানে৷
পেনসিল টর্চের আলো আবার জ্বলে উঠল৷ আলোটা বাগানে এদিকে-ওদিকে ঘুরল কিছুক্ষণ৷ শ্বাস প্রায় বন্ধ করে বসে রইল ভোম্বল৷ হঠাৎ শিমুল গাছ থেকে ঝোপের মধ্যে লাফ দিয়ে পড়ল একটা বুনো জন্তু৷ খুব সম্ভবত ভাম৷ দুলে উঠল ঝোপ৷ সঙ্গে সঙ্গে টর্চের আলো এসে পড়ল ঝোপের উপর৷
আঁতকে উঠল ভোম্বল৷ ধরা পড়ে যাবে নাকি? ঝোপের দিকে এগিয়ে এল একজন৷ ভোম্বলের স্নায়ু টানটান হয়ে উঠল৷ তখনই ঝোপ থেকে বেরিয়ে জন্তুটা দৌড়ে চলে গেল উলটো দিকে৷ এবারে টর্চের আলো ঘুরে গেল৷ লোকটাও ফিরে গেল কুয়োতলার দিকে৷ নিশ্চিন্ত হল ভোম্বল, যাক, এরা তাকে দেখতে পায়নি৷
দুই আগন্তুক এবার নিজেদের কাজে মন দিল৷ একজন একটা মোটা দড়ি নামিয়ে দিল কুয়োর ভিতরে৷ দড়ির মাথায় লাগানো আছে বড়ো একটা লোহার হুক৷ দড়িটা গিয়ে পড়ল নীচে, ঠুং করে একটা ধাতব শব্দ হল৷ দ্বিতীয় লোকটা পেনসিল টর্চ কোমরে গুঁজে কুয়োর ভিতর ঢুকে পড়ল৷ ভোম্বলের চোখের পলক পড়ছে না৷
খানিক বাদে প্রথমজন দড়িটাকে টানতে লাগল উপরের দিকে৷ মনে হচ্ছে খুব ভারী কিছু টেনে তুলছে৷ দড়ির টানে এবারে বস্তুটা উপরে উঠে আসল৷ ভোম্বল বুঝতে পারল একটা মাঝারি সাইজের ট্রাঙ্ক টেনে তোলা হল কুয়োর তলা থেকে৷ প্রথম লোকটা এবার টর্চ জ্বালল৷ টর্চের আলোয় ভোম্বল স্পষ্ট দেখতে পেল, দড়ির মাথায় আটকানো হুকের সঙ্গে ট্রাঙ্কের হাতল আটকে ট্রাঙ্কটাকে টেনে তোলা হয়েছে৷
বাক্সটাকে হুকের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে প্রথম লোকটা আবার দড়িটা ছেড়ে দিল কুয়োর ভিতর৷ খানিকবাদে আরেকটা ট্রাঙ্ক উঠে আসল৷ নিশ্চয়ই দুর্মূল্য কিছু আছে বাক্সের ভিতরে৷ না হলে এভাবে কুয়োর তলায় বাক্স লুকিয়ে রাখবে কেন এরা? কী আছে? গুপ্তধন? ভোম্বলের কৌতূহলের পারদ চড়ছে৷
কিছুক্ষণ পর কুয়োর ভেতর থেকে অন্য লোকটি উঠে আসল উপরে৷

বাড়ির দোতলা থেকে হঠাৎ কাশীবাবুর গলা শোনা গেল, 'ভোম্বল, ভোম্বল! গেলি কোথায়?'
কাশীবাবুর সাড়া পেয়ে লোক দুটো যেন কিছুটা ত্রস্ত হয়ে পড়ল৷ পেনসিল টর্চের আলোটা নিভে গেল৷
'ভোম্বল! ভোম্বল!' কাশীবাবু নেমে এসেছেন নীচে৷
এবারে টর্চ জ্বালল ভোম্বল৷ জোরালো আলো গিয়ে পড়ল লোক দুটোর মুখে৷ দু-জনকেই চিনতে পারল ভোম্বল, তবে একজনকে দেখে রীতিমতো চমকে উঠল সে৷
টর্চের আলো দেখে কাশীবাবু চিৎকার করে উঠলেন, 'বাগানে কে? কে ওখানে?'
ভোম্বলকে দারুণ চমকে দিয়ে এবারে কদম গাছের উপর থেকে লোক দুটোর উপর ঝাপিয়ে পড়ল তৃতীয় এক ব্যক্তি৷ বোঝা গেল মারপিটের কায়দায় সে অত্যন্ত দক্ষ৷ অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের ধরাশায়ী করে দিল সে৷
টর্চ হাতে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে কুয়োতলার দিকে ছুটে গেল ভোম্বল৷ দু-হাতে দু-জনের গলা টিপে ধরেছে যে লোকটা, একেবারে ব্যায়ামবীরের মতো তার চেহারা৷ খালি গা৷ পরনে খাটো ধুতি৷ আক্রান্তদের অবস্থা ইঁদুরকলে পড়া ইঁদুরের মতো৷ তারা গোঁ গোঁ করে কিছু বলার চেষ্টা করছে কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তি এমনভাবে তাদের গলা টিপে রেখেছে যে তাদের মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না৷
ভোম্বল হেঁকে বলল, 'মামা এদিকে এসো৷ দুই বদমাশ ধরা পড়েছে৷' নিমেষের মধ্যে বন্দুক হাতে ছুটে এলেন কাশীবাবু৷
বিস্মিত গলায় ভোম্বলের উদ্দেশে তিনি বললেন, 'ব্যাপার কী?'
ভোম্বল বলল, 'মাঝরাতে বাগানে না এলে এই নাটকটা দেখতে পেতাম না মামা৷'
তৃতীয় ব্যক্তি এবারে লোক দুটোকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল৷ বাকি দু-জন তখন পালোয়ান লোকটার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে উঠে বসে হাঁপাচ্ছে৷ কাশীবাবু চমকে উঠে বলল, 'এ কী? সনাতন? মাঝরাতে কী করছিলে এখানে?'
'এরা কুয়োর ভিতর থেকে বাক্স উদ্ধারে এসেছিল মামা,' বলল ভোম্বল৷
'কীসের বাক্স?'
ভোম্বল বলল, 'গুপ্তধন৷'
কাশীবাবু বিস্ফারিত চোখে বললেন, 'অ্যাঁ? বলিস কী? মিত্তিরভিলায় গুপ্তধন?'
'সেরকমই তো মনে হচ্ছে৷ আরেকজনকে চিনতে পারছ মামা?'
কাশীবাবু চোখ কুঁচকে বললেন, 'কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকছে৷'
'সেই লোকটা৷ নসিবপুর স্টেশনে নেমে যাকে মিত্তিরভিলার কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম৷ আমাকে বলেছিল ভোম্বল সর্দার৷'
লোকটা হাতজোড় করে মিনমিনে বলল, 'ছেড়ে দেন বাবু৷ আমার নাম কাবুল শেখ৷'
পালোয়ান লোকটার দিকে চেয়ে কাশীবাবু প্রশ্ন করলেন, 'তুমি কে ভাই?'
'আমার নাম গজপতি৷ নসিবপুরেই বাড়ি৷ এরা ভালো করেই চেনে আমাকে৷ খাঁদু মল্লিকের চালের গুদামে রাতপাহারার কাজ করতাম৷ দিনকয়েক আগে সে কাজ গেছে৷ সাত্যকিবাবু বলেছিলেন, আজ রাতে আপনাদের বাগানে চৌকি দিতে৷'
ভোম্বল প্রশ্ন করল, 'সাত্যকিবাবু মানে? সাংবাদিক সাত্যকি সোম?'
'হ্যাঁ বলেছিলেন রাতে মিত্তিরভিলায় নাকি কোনো গোলমাল হতে পারে৷ হেঁ-হেঁ কথাটাতো ঠিকই বলেছিলেন৷ এরা গোলমাল পাকাতেই তো এসেছিল৷ দিয়েছি ঢিট করে৷'
কাশীবাবু প্রশ্ন করলেন, 'বাক্সে কী আছে?'
নিমেষে বাক্স খুলে ফেলল গজপতি৷ টর্চের আলো ফেলে কাশীবাবু ও ভোম্বল চমকে উঠল৷ বাক্সের মধ্যে ঠাসা রয়েছে অত্যাধুনিক বন্দুক৷ কাশীবাবু আঁতকে উঠে বললেন, 'কী সাংঘাতিক! এ যে দেখছি অস্ত্রাগার!'
এবারে হুংকার ছেড়ে কাশীবাবু বললেন, 'সনাতন! তাহলে এই হল ব্যাপার! ভেবেছিলাম তুমি লোক ভালো৷ কলিকালে দেখছি মানুষ চেনাই দায়৷'
সনাতন হাতজোড় করে বলল, 'মাফ করে দেন বাবু৷ যা করেছি পেটের দায়ে৷ অস্ত্রের কারবার খাঁদুবাবুর৷ আমরা চুনোপুটি৷ আপনি কুয়ো বুজিয়ে ফেলবেন শুনে খাঁদু মল্লিক খোকাদের কুয়ো থেকে তুলে নেওয়ার হুকুম দিয়েছিলেন৷'
কাশীবাবু প্রবল বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, 'খোকা?'
'খাঁদু মল্লিক বন্দুককে খোকা বলেন৷ নসিবপুরের আরও কয়েকটা পোড়ো বাড়িতে খোকা লুকিয়ে রেখেছেন খাঁদুবাবু৷ বললে দেখিয়ে দিতে পারি৷ আমার শাস্তিটা যেন কম হয় দেখবেন বাবু৷'
ভোম্বল প্রশ্ন করল, 'এই অস্ত্র কারবারের ব্যাপারে আর কী জানো?'
সনাতন বলল, 'খাঁদু মল্লিকের চালের গুদামগুলো তল্লাস করলেও অনেক খোকা পাওয়া যাবে৷ চালের বস্তার ভিতর ঢুকিয়ে খোকা হাতবদল হয়৷'
কাশীবাবু চোখ কপালে তুলে বললেন, 'কী সাংঘাতিক!'
ভোম্বল বলল, 'এবার বলো তো গতকাল রাতে আমাদের ঘর থেকে টাকা আর বন্দুক সরিয়েছিল কে? কে তালা ভেঙে ঘরে ঢুকেছিল?'
সনাতন মাথা নীচু করে চুপ করে থাকে৷
গজপতি বলে, 'এই দু-জনেই বাবু৷'
ভেউ ভেউ করে কেঁদে ওঠে সনাতন ও কাবুল শেখ৷
কাশীবাবু অবাক হয়ে গজপতিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি জানলে কী করে এই কথা?'
'সে অনেক লম্বা কাহিনি৷ পরে শুনবেন৷ এদের কাছ থেকে আপনাদের টাকা ও বন্দুক উদ্ধার করেন শ্যাম রায়৷ আমিও ছিলাম তাঁর সঙ্গে৷'
শ্যাম রায়ের নাম শুনেই সনাতন ভয়ে বলে উঠল, 'ভূ-উ-উ-ত!'
কাশীবাবু ও ভোম্বল হতবাক৷ গজপতি বলল, 'শ্যাম রায় মোটেই ভূত নন৷ রক্ত মাংসের মানুষ৷ ভালো মানুষ৷'
এবারে কথাবার্তায় ছেদ পড়ল৷ পুলিশের গাড়ি এসে থামল মিত্তিরভিলার গেটে৷ জোরালো হর্নের সঙ্গে শোনা গেল সাত্যকি সোমের কথা, 'সব ঠিক আছে তো রে গজপতি?'
কাবুল শেখ ও সনাতনকে সঙ্গে নিয়ে সে রাতে পুলিশ হানা দিল বিভিন্ন জায়গায়৷ নসিবপুরের বেশ কয়েকটা পোড়ো বাংলো ও খাঁদু মল্লিকের গুদামগুলো থেকে পাওয়া গেল প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র৷ নানারকমের বন্দুক ও গুলি৷ একটা চালের গুদাম থেকে বন্দুক সরিয়ে ফেলতে গিয়ে ধরা পড়ল হরতন ও রুইতন৷
রাতেই এই খবর ছড়িয়ে পড়ল নসিবপুরের সর্বত্র৷ লোকজন বেরিয়ে এল ঘর থেকে৷ খাঁদু মল্লিকের বাড়িতে হানা দিয়ে পুলিশের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল৷ বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ডে রীতিমতো অস্ত্র তৈরির কারখানা৷
উদ্ধার হল লোহার পাইপ, করাত, কাঠের টুকরো, বাটালি, বুলেট, লেদ মেশিন, ড্রিল মেশিন ও অস্ত্রসস্ত্র তৈরির আরও হরেকরকম যন্ত্রপাতি৷ তবে খাঁদু মল্লিকের বাড়িতে কাউকে পাওয়া গেল না৷ মল্লিক প্যালেস পোড়োবাড়ির মতোই পরিত্যক্ত৷
অনেক খোঁজাখুঁজির পর গ্যারেজ ঘরের পিছনে পাওয়া গেল খাঁদু মল্লিকের ড্রাইভার ফুকড়েকে৷ সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে৷ হাত দুটো পিছমোড়া করে বাঁধা৷
এক অনুচর মারফত খবর যথাসময়ে এসেছিল খাঁদু মল্লিকের কানে৷ মিত্তিরভিলায় বমাল সমেত ধরা পড়েছে সনাতন ও কাবুল শেখ৷ এরা খাঁদু মল্লিকের সব গোপন ডেরার কথা কবুল করেছে পুলিশের কাছে৷ শাগরেদদের এলাকা ছেড়ে সরে পড়ার নির্দেশ দিয়ে দুটো বড়ো বড়ো স্যুটকেস-ভরতি টাকাপয়সা ও কয়েকখানা বন্দুক নিয়ে খাঁদু মল্লিক চেপে বসলেন গাড়িতে৷ ড্রাইভারের উদ্দেশে বললেন, 'ফুকড়ে জোরসে চালা৷'
'যে আজ্ঞে৷'
রাতের অন্ধকারে ছুটতে লাগল খাঁদু মল্লিকের বিলিতি গাড়ি৷
খাঁদু মল্লিক খোশ মেজাজে স্বগতোক্তির মতো বললেন, 'হু খাঁদু মল্লিককে ধরবে? অত সোজা? খাঁদু মল্লিক কী যন্তর, দারোগা পুলিশের বাপেরও অনুমান করার ক্ষমতা নেই৷'
চালক বলল, 'এতদিন ধরে তো দেখছি৷ আপনি জব্বর ঘোড়েল লোক৷'
'ঠিক বলেছিস ফুকড়ে৷ দিনকে রাত করতে পারে খাঁদু মল্লিক৷ সে খবর ক-জন রাখে বল৷ জোরসে চালা ফুকড়ে৷ আরও জোরে৷'
'যে আজ্ঞে!'
বিলিতি গাড়ির আরামদায়ক সিটে গা এলিয়ে বসে আছেন খাঁদু মল্লিক৷ চোখে-মুখে চিন্তাভাবনার কোনো ছাপ নেই৷ একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের দিকে দেখলেন৷
চালক বলল, 'পুলিশ নাগাল পাবে না৷'
খাঁদু মল্লিক বেশ খুশির মেজাজে বললেন, 'ওরে ফুকড়ে, অনেকদিন ধরে পুরোনো কথা চেপে রেখে রেখে আমার পেট ফুলে উঠেছে৷ বলা হয়নি কাউকে৷ তুই আমার বিশ্বস্ত শাগরেদ৷ আজ তোকে বলতে পারি৷ তবে কথাটা পাঁচ কান করিস নে যেন৷ আর করলেই বা কী? বেইমানি করলে খাঁদু মল্লিক কী করে তা তো তুই জানিস৷'
'বডি হাপিস করে দেয়৷'

'সনাতন ও কাবুল শেখ যে বেইমানি করল, ওরা কি বাঁচবে?'
'বাঁচা অনুচিত৷'
'এই জন্যই তো তোকে এত ভালো লাগে রে ফুকড়ে, আমার মনের কথা সব বুঝতে পারিস৷ তা মাথাটা চাদর দিয়ে অমন পেঁচিয়েছিস কেন?'
'কানে বাতাস লাগে৷'
'পান চিবোচ্ছিস নাকি?'
'হুঁ! না হলে ঘুম পাবে৷'
'চিন্তা নেই তোর৷ কথা বলে তোকে জাগিয়ে রাখব৷'
'গোপন কথাটা?'
'শ্যাম রায় কে জানিস?'
'ভূত৷'
'ঠিক বলেছিস মরে ভূত৷'
'মরল কী করে?'
'ট্রেন থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলাম৷'
'অ্যাঁ? বলেন কী?'
'সে অনেককাল আগের কথা রে ফুকড়ে৷ তখন সেই আমি কি এই আমি ছিলাম? ট্রেনে দলবল নিয়ে ছিনতাই রাহাজানি করে বেড়াই৷ আপ মামুদপুর লোকাল৷ লাস্ট ট্রেন৷ যাত্রী কম৷ বিয়েবাড়ি থেকে ফিরছিল একদল লোক৷ মহিলাদের গা ভরতি গয়না৷ দলবল নিয়ে চড়াও হলাম৷ সেই কামরায় ছিল শ্যাম রায়৷ আমার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল৷ কলার চেপে ধরে এক ধাক্কা দিলাম৷ শ্যাম রায় ভোগাম্বা হয়ে গেল৷'
'ভোগাম্বা মানে?'
'মানে নেই৷ ও একটা কথার কথা৷ মনে জোশ আনতে বলতাম৷ মানুষ খুন কি আর সহজ কাজ রে? লাশ নামাতে শাহি মেজাজ লাগে৷ শাহি মেজাজে শাহি বুলির খই ফোটে মুখে৷ ভোগাম্বা হল ওইরকম একটা শাহি বুলি৷'
চালক প্রশ্ন করে, 'তা শ্যাম রায়ের ভূত আপনাকে না খুঁজে মাখন নস্করকে খোঁজে কেন?'
'তুইও কি ভূতের ব্যাপারটা সত্যি বলে ভাবলি?' পালটা প্রশ্ন করেন খাঁদু মল্লিক৷
'সত্যি নয়?'
'ওরে ভূত-টূত সব ফালতু৷ কোনো বদমাশ নিশ্চয়ই আমার অতীত কাহিনি জানে৷ ভূত সেজে আমায় ব্ল্যাকমেল করতে চায়৷'
'আপনাকে ব্ল্যাকমেল করবে কেন? মাখন নস্কর তো অন্য লোক৷'
এবারে হেসে উঠে খাঁদু মল্লিক বললেন, 'এই বুঝলি তুই? আমি আর মাখন নস্কর কি আলাদা? শ্যাম রায় মারা যাওয়ার পর পুলিশ অনেক খোঁজ করেছিল আমার৷ তবে আমার টিকিটিরও হদিশ পায়নি৷ গা ঢাকা দিতে অনেক মেহনত করতে হয়েছিল৷ আমার শাগরেদদের দু-একজন ধরা পড়েছিল, গাড়োলগুলো এখন জেল খাটছে৷' বলে হা-হা করে হেসে ওঠেন খাঁদু মল্লিক৷
চালক প্রশ্ন করে, 'তারপর?'
'তারপর আর কী? আমাকে খুঁজতে খুঁজতে হেদিয়ে পড়ল পুলিশ৷ কিছুদিন পরে ব্যাপারটা থিতিয়ে গেল৷ মামুদপুর থেকে তিনশো মাইল দূরে নসিবপুরে এসে নাম বদলে নিলাম৷ আগে একমুখ গোঁফ দাড়ি ছিল৷ নসিবপুরে এসে মাকুন্দ হয়ে গেলাম রে ফুকড়ে৷ চুলের কায়দাও পালটে দিলাম৷ মাখন নস্কর দিব্যি খাঁদু মল্লিক হয়ে গেল৷ এবারেও কি ভেবেছিস পুলিশ আমার টিকি ছুঁতে পারবে? কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে ফের নাম বদলে নেব৷'
'নতুন নাম ঠিক করে ফেলেছেন?'
'করিনি আবার? জাল ভোটার কার্ড, জাল আধার কার্ড সব বানিয়ে ফেলেছি৷'
'কী নাম নিলেন?'
'দুঃশাসন গড়গড়ি৷'
'জব্বর নাম হয়েছে৷ তবে একটা কথা, নাকের পাশে বড়ো আঁচিল ও কপালের কাটা দাগ এ দুটো বোধ হয় মাখন নস্করের আমল থেকে বহন করে চলেছেন৷'
'অ্যাঁ?' নাকের আঁচিল ও কপালের কাটা দাগে হাত বোলান খাঁদু মল্লিক৷
'ডাক্তারের কাছে গিয়ে এবারে এই পুরোনো চিহ্ন দুটো হাপিস করে নিলেই তো হয়৷ তাহলে মাখন নস্কর আর খাঁদু মল্লিকের আঁশটুকুও দুঃশাসন গড়গড়ির গায়ে থাকবে না৷'
খাঁদু মল্লিক উৎসাহের সঙ্গে বলেন, 'কেয়াবাত ফুকড়ে৷ বেড়ে বলেছিস তো? এ কথাটা তো মনে হয়নি কখনো৷ এত বুদ্ধি তোর? তুই যে আমায় অবাক করে দিলি৷ হামি খাব নাকি একটা তোকে?'
'পরে খাবেন৷' এই বলে চালক সামনে ঝুঁকে পড়ে পায়ের কাছে রাখা একটা ছোট্ট বেতের ঝুড়ির ঢাকা সরিয়ে দেয়৷
বাইরের দিকে তাকিয়ে সিটের উপর সোজা হয়ে বসে খাঁদু মল্লিক বলেন, 'কী ব্যাপার বলত ফুকড়ে? কখন থেকে গাড়ি চলছে, এখনও মনে হচ্ছে নসিবপুর ছাড়াতে পারলাম না৷ অন্ধকারে পথ ভুল করলি নাকি?'
'ভুল একটু হয়েছে৷' বলে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল চালক৷
খাঁদু মল্লিক ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, 'ওরে এ থামালি কোথায়? সামনে যে থানা৷'
হঠাৎ কী একটা যেন গাড়ির মধ্যে ডানা ঝটপটিয়ে উঠল৷ খাঁদু মল্লিক ত্রস্ত হয়ে বললেন, 'গাড়িতে কী ঢুকল রে ফুকড়ে৷ চামচিকে না কি? আলোটা জ্বাল শিগগির৷'
চালক এবার হাত বাড়িয়ে গাড়ির ভিতরের আলোটা জ্বেলে দিল৷ খাঁদু মল্লিক আঁতকে উঠলেন৷ 'অ্যাঁ? গাড়ির মধ্যে টিয়া পাখি?'
টিয়া পাখি বলে উঠল, 'মাখন নস্কর ভোগাম্বা৷'
'সেই হতচ্ছাড়া পাখিটা! গাড়িতে ঢুকল কী করে?' চেঁচিয়ে উঠলেন খাঁদু মল্লিক৷
সহসা মুখের চাদর সরিয়ে খাঁদু মল্লিকের দিকে ঘুরে অট্টহাসি হেসে উঠল চালক৷ খাঁদু মল্লিকের সারা শরীর ঘেমে উঠল৷ অস্ফুট গলায় বললেন, 'ক-কে?'
'চিনতে পারছেন না খাঁদুবাবু? আমি শ্যাম রায়৷ ভালো করে দেখুন তো? অনেক কালের পরিচয়৷ কুড়ি বছর৷ আপ মামুদপুর লোকাল৷ লাস্ট ট্রেন৷ শ্যাম রায় ভোগাম্বা৷ মরা মানুষ ভূত হয়ে ফিরে এসেছে যে৷'
'এ অসম্ভব, এ অসম্ভব, ভূ-উ-উ-ত!' আর্তনাদ করে উঠলেন খাঁদু মল্লিক৷ তারপর জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লেন বিলিতি গাড়ির নরম গদির উপর৷
গাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াল শ্যাম রায়ের ভূত৷ টিয়া পাখিটা উড়ে এসে বসল তার কাঁধে৷ উলটো দিক থেকে শোনা যাচ্ছে একগাদা মানুষের পায়ের শব্দ৷ চোখে পড়ছে অনেক টর্চের আলো৷ মানুষের ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এল সাত্যকি সোম৷ উৎকন্ঠার সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, 'সব ঠিক আছে তো নবারুণ?'
টিয়া পাখি বলে উঠল, 'মাখন নস্কর ভোগাম্বা৷'
নবারুণ দুই আঙুল তুলে বিজয়সূচক চিহ্ন দেখিয়ে বলল, 'খেল খতম৷'
মিত্তিরভিলার বাগানে বৈঠক বসল বিকেলে৷ নসিবপুরের অনেক মানুষ এসে হাজির হল৷ সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু বছর পঁচিশের একটি ছেলে, নাম নবারুণ রায়৷ সবার সঙ্গে তার আলাপ করিয়ে দিল সাত্যকি৷
সবাইকে নমস্কার জানিয়ে নবারুণ বলতে শুরু করল তার জীবনের গল্প৷ 'আমার নাম নবারুণ রায়৷ পিতা স্বর্গত শ্যাম রায়৷ পাঁচ বছর বয়সে আমি বাবাকে হারাই৷ আমার বাবা ছিলেন সাহসী মানুষ৷ আজ থেকে কুড়ি বছর আগে একদিন কাজে বেরিয়ে বাবা আর ফিরলেন না বাড়িতে৷
'পরের দিন পুলিশ এসে খবর দিল, চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে হাসপাতালে ভরতি আছেন বাবা৷ অবস্থা গুরুতর৷ আমাকে সঙ্গে নিয়ে মা ছুটে গেলেন হাসপাতালে৷ মারা যাওয়ার আগে বাবা এই কথাটা শুধু বলতে পেরেছিলেন যে, মাখন নস্কর বলে একজন কেউ তাঁকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে চলন্ত ট্রেন থেকে৷
'পুলিশের তদন্ত থেকে জানা যায়, মাখন নস্কর বলে এক দুষ্কৃতি ছিনতাই, রাহাজানি, ডাকাতি করে বেড়ায় বিভিন্ন ট্রেনে৷ সেই রাতে আপ মামুদপুর লোকালে বিয়েবাড়ির নেমন্তন্ন সেরে বাড়ি ফিরছিল একদল লোক৷ মহিলাদের গায়ে ছিল অনেক গয়নাগাটি৷ তাদের উপর দলবল নিয়ে হামলা করে মাখন নস্কর৷
'বাবা ছিলেন ওই কামরায়৷ তিনি প্রতিবাদ করায় মাখন নস্করের লোকেরা তাকে টেনেহিঁচড়ে দরজার কাছে টেনে নিয়ে গিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় চলন্ত ট্রেন থেকে৷ বাবাকে ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার সময় মাখন নস্কর বলেছিল, "মাখন নস্করের সঙ্গে পাঙ্গা নেওয়া? যা ভোগাম্বা হয়ে যা৷" এ প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান৷ কোর্টে শুনেছি৷ মাখন নস্করের দুই শাগরেদ ধরা পড়েছিল৷ তাদের জেল হল৷ কিন্তু মাখন নস্করের নাগাল পেল না পুলিশ৷ ধীরে ধীরে ব্যাপারটা থিতিয়ে গেল৷
'বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মা খুব কাঁদতেন, এ দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারতাম না৷ আমার মনে তখন থেকে জেদ চেপে যায়, মাখন নস্করকে খুঁজে বের করতেই হবে৷ আমার বাবাকে যে হত্যা করল তার শাস্তি হবে না? একজনকে খুন করেও পার পেয়ে যাবে একটা শয়তান?'
এই বলে চোখের কোণা মুছল নবারুণ৷ সবাই চুপ৷ একটু থেমে নবারুণ ফের বলতে শুরু করল, 'আমি 'দৈনিক প্রভাত' পত্রিকায় কাজ করতাম৷ পেশায় সাংবাদিক৷ কাগজের রিপোর্টারদের অনেক জায়গাতেই অবাধ গতিবিধি থাকে৷ সেই সূত্রে অন্ধকার জগতের সঙ্গে যুক্ত অনেকের কাছেই আমি মাখন নস্করের খোঁজ করি৷ কিন্তু কেউ তার হদিশ দিতে পারেনি৷
'থানায় দাগী দুষ্কৃতীদের ছবি থাকে৷ পুলিশের কাছ থেকে মাখন নস্করের একটা ছবি আমি পেয়েছিলাম৷ তার চেহারাটা আমার মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল৷ নাকের ডানপাশে বড়ো একটা আঁচিল৷ কপালে স্পষ্ট একটা কাটা দাগ৷ দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেও মাখন নস্করের খোঁজ না পেয়ে আমি হতাশ হয়ে পড়লাম৷ এইসময় মা পড়লেন কঠিন রোগে৷ সবসময় আমার মন খারাপ হয়ে থাকত৷
'হঠাৎই একদিন আমার নজরে এল 'গ্রামের খবর' দৈনিকের একটি রিপোর্ট৷ লিখেছেন সাত্যকি সোম৷ রিপোর্টের সঙ্গে একটা ছবিও ছাপা হয়েছিল৷ নসিবপুরে একটি অনুষ্ঠানে বস্ত্র বিতরণ করছেন জনৈক ব্যবসায়ী খাঁদু মল্লিক৷
'ছবিটা দেখে আমি চমকে উঠি৷ লোকটার মুখের আদলের সঙ্গে মাখন নস্করের মুখের দারুণ মিল৷ আমি নসিবপুরে আসি৷ সাত্যকিদার সঙ্গে আলাপ হয়৷ তাঁকে খুলে বলি সব কথা৷
'সাত্যকিদার কাছ থেকেই জানতে পারি, খাঁদু মল্লিক লোকটি গোলমেলে৷ এছাড়াও সাত্যকিদা বলেন, খাঁদু মল্লিক নসিবপুরের আদি বাসিন্দা নয়৷ বছর কুড়ি আগে কোনো এক জায়গা থেকে এখানে এসে রাতারাতি বিরাট ব্যাবসা গড়ে তুলেছে৷
'এর পরে একদিন একটা গানের জলসায় আমাকে নিয়ে গেলেন সাত্যকিদা৷ প্রধান অতিথি হিসেবে সেখানে হাজির ছিলেন খাঁদু মল্লিক৷ সেখানে খুব কাছ থেকে খাঁদু মল্লিককে দেখলাম৷ মাখন নস্করের সঙ্গে মুখের আদলের বড্ড মিল৷ গোঁফ দাড়ি কামিয়ে ফেললেও সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে৷ সেই সঙ্গে মিলে গেল নাকের ডানপাশের আঁচিল ও কপালের কাটা দাগ৷ খাঁদু মল্লিকের আড়ালে লুকিয়ে আছে মাখন নস্কর৷ আমি নিশ্চিত হলাম৷
'হঠাৎ করে কুড়ি বছর বাদে খাঁদু মল্লিককে মাখন নস্কর বলে চিহ্নিত করা কঠিন৷ তা ছাড়া মাখন নস্করের কথা নসিবপুরের কেউ জানে না৷ পুলিশের কাছে গিয়ে সরাসরি অভিযোগ করলে সবাই আমাকে পাগল ঠাওরাবে৷ অতএব কী করা যায়? বুদ্ধিটা দিলেন সাত্যকিদা৷ বাকি কথা উনিই ভালো বলতে পারবেন৷'
সাত্যকি সোমের মুখ থেকে শোনা গেল এ কাহিনির বাকি অংশ৷ সাত্যকি বলতে লাগল, 'নবারুণকে দেখে ও তার অতীত কাহিনি শুনে আমার খুব কষ্ট হয়৷ সত্যিই তো, অপরাধ করে দাগিরা সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে? কোনো বিচার হবে না?
'নবারুণের সঙ্গে সবসময় থাকে তার বাবার ছবি৷ একদিন সেই ছবি দেখে আমি চমকে উঠি৷ শ্যাম রায়ের মুখের সঙ্গে নবারুণের মুখের দারুণ মিল৷ কেউ না বলে দিলে ছবিটা যে নবারুণের নয়, এটা বিশ্বাস করা কঠিন৷
'তখনই আমার মাথায় বুদ্ধিটা আসে৷ শ্যাম রায়ের ভূত সেজে নসিবপুরে আবির্ভূত হওয়ার পরামর্শ দিই তাকে৷ উদ্দেশ্য খাঁদু মল্লিকের উপর মানসিক চাপ বাড়ানো৷ দিনের বেলায় আমার বাড়িতে লুকিয়ে থাকত নবারুণ৷ রাতে মুখে সাদা রং মেখে জমকালো পোশাক পরে শ্যাম রায়ের ভূত সেজে সে ঘুরে বেড়াত নসিবপুরের পথে৷
'প্রথম ভূত দেখল গজপতি৷ কথাটা ছড়িয়ে পড়ল-শ্যাম রায়ের ভূত মাখন নস্করকে খুঁজে বেড়াচ্ছে৷ ভয় পেলেন খাঁদু মল্লিক৷ বহু বছর পর গজপতির মুখে শ্যাম রায়ের নাম শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন তিনি৷ গজপতির চাকরি গেল৷
'গজপতি ভূত দেখেছে৷ এ কথা প্রথমে নসিবপুরের অনেকেরই বিশ্বাস হয়নি৷ আমার মনে হল, খাঁদু মল্লিককে ভূতের ভয় পাওয়াতে হলে ভূতের তত্ত্বটা আরও জোরালা হওয়া দরকার৷
'এবারে ভূত দেখলেন শিবেন গুহ৷ নিজের অভিজ্ঞতার কথা এমন রোমহর্ষক ঢঙে খবরের কাগজে লিখলেন যে, চারিদিকে সাড়া পড়ে গেল৷ অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করল সত্যি সত্যিই শ্যাম রায় নামে কোনো ব্যক্তির ভূত নসিবপুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷'
শিবেন গুহ বলে উঠলেন, 'একটা কথা ভাই, তুমি ও নবারুণ ভয় দেখিয়ে কিন্তু আমার উপকারই করেছ৷ ওই রিপোর্ট লেখার পর থেকে পত্রিকার ছোকরা সম্পাদক আমায় বেশ সমীহ করছে৷'
সাত্যকি বলল, 'লেখাটা সত্যিই দারুণ লিখেছিলেন শিবেনদা৷'
কাশীবাবু অধৈর্য হয়ে বলে উঠলেন, 'আহা কাহিনিটা যে ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে৷'
সাত্যকি সোম বলল, 'ঠিক কথা৷ এবার গল্পটা শেষ করা দরকার৷ খাঁদু মল্লিককে এত সহজে বমাল সমেত ধরা যেত না, যদি না কাশীনাথ দত্ত ও তার ভাগনে ভোম্বল হঠাৎ এসে হাজির হতেন নসিবপুরে৷
'মিত্তিরভিলায় ভূত আছে৷ এ কথা ইচ্ছে করেই চাউর করেছিল খাঁদু মল্লিকের স্যাঙাতরা, যাতে এ বাড়ির দিকে বড়ো একটা কেউ না আসে৷ কারণ, মিত্তিরভিলার পরিত্যক্ত কুয়োর ভিতরে গোলা, গুলি, বন্দুক লুকিয়ে রাখে খাঁদু মল্লিক ও তার অনুচরেরা৷
'মিত্তিরভিলা ভূতের বাড়ি-একথাটা চাউর হওয়ায় মাঝেমধ্যে কিছু ভূতরসিকের দল এই বাড়িতে আসত ভূতের খোঁজে৷ এদের নিয়ে অসুবিধা নেই৷ এরা একরাত থাকে, ভয়-টয় পেয়ে চলে যায়৷ এদের সামনে ইচ্ছে করেই কোনো একটা ভৌতিক কাণ্ড ঘটাত, কাবুল শেখ ও সনাতন৷ সেসব সত্যিই ভূতের কাণ্ড ভেবে ফলাও করে প্রচার করত ভূত রসিকেরা৷ নসিবপুরের লোকজন এসব শুনে সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করল মিত্তিরভিলায় ভূত আছে, তাই এদিকে তারা খুব একটা আসত না৷
'কাশীনাথ দত্ত এসে এই হিসেব উলটে দিলেন৷ তাঁর বাগানবাড়ির শখ৷ দুম করে মিত্তিরভিলা কিনে ফেললেন৷ ঠিক করলেন এই বাড়ি সারিয়ে ঝাঁ চকচকে করে তুলবেন৷ সেই সঙ্গে পরিত্যক্ত কুয়োটা বুজিয়ে ফেলবেন৷
'মাথায় বাজ পড়ল খাঁদু মল্লিক ও তার লোকেদের৷ কুয়োর ভিতরে ট্রাঙ্কবন্দি করে রাখা আছে অনেক অত্যাধুনিক বন্দুক৷ মরিয়া হয়ে কুয়োর ভিতর থেকে সেসব উদ্ধার করতে গিয়ে ধরা পড়ল সনাতন ও কাবুল শেখ৷ এর পরের কাহিনি সবটাই আপনারা জানেন৷
'তবে সব শেষে গজপতির কথা একটু বলতে হয়৷ নবারুণকে দেখে প্রথমে ভূত ভেবেছিল গজপতি৷ আমি ছাড়া নসিবপুরের মানুষদের মধ্যে সেই প্রথম জানতে পারে নবারুণের আসল পরিচয়৷ এই খেলায় গজপতি আমাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল৷'
বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসছে৷ মিত্তিরভিলায় লোকের ভিড় অনেক হালকা হয়ে গিয়েছে৷ দু-চোখ দিয়ে জল ঝরছিল নবারুণের৷ সে নিঃশব্দে কাঁদছে৷
সাত্যকি তার পিঠে হাত রেখে বলল, 'তুমি তো এবারে মামুদপুরে ফিরবে নবারুণ?'
'ওখানে আর যাব না সাত্যকিদা৷ আপনি তো জানেন মা গত হয়েছেন মাস খানেক আগে৷ মা চলে যাওয়ায় মামুদপুরের সঙ্গে আমার নাড়ির যোগও ছিন্ন হয়ে গেছে৷ সেখানে আর ফেরার ইচ্ছে নেই৷'
সাত্যকি বলল, 'তোমার কাগজের চাকরি?'
'নসিবপুরে আসতে হবে বলে ছুটি চেয়েছিলাম৷ ছুটি মেলেনি৷ কাগজের চাকরি আমি ছেড়ে দিয়েছি৷'
'বেশ তো আমার কাছেই থেকে যাও৷' বলল সাত্যকি৷
'এভাবে কী করে থাকি সাত্যকিদা, একটা কাজ তো দরকার৷ ইচ্ছে করে একটা দৈনিক কাগজ চালু করি৷ যেখানেই অন্যায় দেখব, লিখে প্রতিবাদ করব৷'
কাশীবাবু বললেন, 'বাঃ, এ তো খুব ভালো কথা৷ ছাপাও না কাগজ৷ কে বারণ করেছে৷'
নবারুণ বলল, 'ইচ্ছে করলেই কি একটা কাগজ করা যায়? অনেক টাকা লাগে৷'
কাশীবাবু বললেন, 'কাশী দত্ত থাকতে টাকার চিন্তা কী?' ভোম্বল অবাক হয়ে মামার দিকে তাকাল৷
'আপনি দেবেন টাকা?' অবাক হওয়া গলায় প্রশ্ন করে নবারুণ৷ সাত্যকিও কৌতূহলী চোখে কাশীবাবুর মুখপানে চাইল৷
'ধরো নাহয় দিলাম৷ তুমি আছ, সাত্যকি আছে, শিবেনবাবু আছেন৷ ঠেলেগুঁতিয়ে একটা কাগজকে খাড়া করতে পারবে না? কলেজের পড়া সেরে ভোম্বলও নাহয় যোগ দেবে তোমাদের সঙ্গে৷ ও তো সাংবাদিকই হতে চায়৷ আমি বাপু কাগজের ব্যাবসার কিছু বুঝি না৷ ঘি, ডালডা, সরষের তেল নিয়ে আমার কারবার৷ আমি শুধু টাকা দেব৷ কাগজের ভালোমন্দ তোমরাই বুঝে নিয়ো৷'
সাত্যকি উৎসাহিত হয়ে বলে, 'সত্যি বলছেন? আমাদের নিজেদের একটা কাগজ হবে?'
'বললাম তো হবে৷ কাগজের নাম রেখো 'সত্যান্বেষী'৷ শুধু মাঝে মধ্যে আমার দু-একটা পদ্য ছাপতে হবে কিন্তু৷'
শিবেন গুহ বললেন, 'প্রস্তাব মন্দ নয়৷ সম্পাদক কে হবেন?'
সাত্যকি মুচকি হেসে বলল, 'আপনি বয়োঃজ্যেষ্ঠ৷ ও দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে৷'
সবাইকে চমকে দিয়ে হ্যা-হ্যা করে হেসে উঠে শিবেন গুহ বললেন, 'শেষ পর্যন্ত দিলাম তো মুখে ঝামা ঘষে৷'
সবাই এ-ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগল৷ শিবেন গুহ কার মুখে ঝামা ঘষলেন বুঝে উঠতে পারছে না কেউ৷ ব্যাপারটা শিবেনবাবু নিজেই খোলসা করে দিলেন৷ 'তাজা সমাচারের ছোকরা সম্পাদক বড়ো ট্যাঁকট্যাঁক করে কথা শোনাত৷ একদিন মুখের উপর বলেছিলাম, বেশি সম্পাদকগিরি ফলাবেন না৷ নসিবে থাকলে এই নসিবপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমিও একদিন সম্পাদক হয়ে দেখিয়ে দেব৷ তা খাটল কি না কথাটা?' শিবেনবাবুর কথা শুনে হেসে উঠল সবাই৷
নবারুণ বলল, 'কিন্তু পত্রিকার অফিস করতে গেলে তো একটা বাড়ি চাই৷'
কাশীবাবু বললেন, 'মিত্তিরভিলা আছে৷ বাড়ির চিন্তা কী?'
সাত্যকি বিস্মিত হয়ে বলল, 'মানে? এ তো আপনার শখের বাগানবাড়ি!'
কাশীবাবু বললেন, 'আরেকটা বাগানবাড়ি আমি খুঁজে নেব৷ কাশী দত্তের কি টাকার অভাব আছে? আমার ব্যাঙ্ক ব্যালান্স কত জান? কত লোক আমার কারবারে খাটে তা অনুমান করতে পার? আমার ক-খানা বাড়ি, ক-খানা গাড়ি . . .'
কাশীবাবুকে বাধা দিয়ে 'মামা!' বলে হেসে উঠল ভোম্বল৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন