অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

'তুমি সাপ গাছ জানো?'
ছেলেটার সঙ্গে আমার আরেকটা নতুন দিন শুরু হল৷ বাঁ-হাত সব সময় মুঠো করে রাখে, যেন কিছু লুকিয়ে রেখেছে৷ গায়ে একটা ঢলঢলে গেঞ্জি, নীল রঙের হাফ প্যান্ট, প্রায় হাঁটু পর্যন্ত কালো রবারের ওয়াটারপ্রুফ জুতো৷
নদীর পাড়ে আমি বাঁধ দিতে ব্যস্ত৷ মুখ তোলার সময় পাইনি৷
'তুমি সাপ গাছ জানো?' বলেই আগের মতো আমার উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে সে বাঁ-হাতের মুঠো খুলে কীসের একটা টুকরো বার করে ডান হাতে নিল৷ বাঁধের কাঁচা মাটিতে উবু হয়ে বসে মাটির ওপর সেটা দিয়ে ছবি এঁকে আমাকে দেখাল-'এই দেখো, সাপ গাছ৷'
এই নাকি সেই গাছের ছবি! বললাম, 'এরকম গাছ তুমি নিজে দেখেছ?'
'না হলে আঁকলাম কী করে?'
'কোথায় দেখেছ?'
ছেলেটা উত্তর দিল না৷ চুপ করে ভাবছে৷
এই আষাঢ়ের শুরুতেই সুন্দরবনের নদীগুলো জলে ফুলছে৷ নদীর পাড়ে ভোর থেকে আমি গ্রামবাসীদের সঙ্গে মাটির বাঁধের ফাটল মেরামতির কাজে হাত লাগিয়েছি৷
ছেলেটা হঠাৎ আসে, হঠাৎ চলে যায়৷ কোথায় থাকে, পাশের গ্রামে, না নদীর ওপারের কোনো গ্রামে, তাও জানি না৷ গ্রামের মেয়ে-বউরা যারা সারাদিন এককোমর জলে দাঁড়িয়ে নদী থেকে চিংড়ির মীন ধরে, তাদের একজন বলে বাঁশের ভেলায় চড়ে তাকে এদিকে আসতে দেখেছে৷ জঙ্গলে যারা মৌচাক ভেঙে মধু আনতে যায়, তাদের কে-একজন নাকি একদিন দেখেছে ছেলেটা মহিষের পিঠের ওপর দাঁড়িয়ে বনের ধার দিয়ে গ্রামের দিকে আসছে৷
নদীপাড় উঁচু করে না বাঁধালে এক দিন দু-দিনের টানা বৃষ্টিতে গ্রাম ভেসে যাবে৷ সবাই হাতে হাতে মাটি বয়ে আনছে, ঝপাঝপ নদীর পাড় বরাবর চাপাচ্ছে, আমার কাজ মাটির স্তূপ ঠিকমতো সাজিয়ে নেওয়া৷ ফাটলগুলো বুজিয়ে দেওয়া৷ এ কাজে গ্রামের নানা বয়সের মেয়েরাও আমার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে৷ সারি সারি তারা কোমর ভেঙে কাদামাটি সমান করছে৷
ছেলেটা যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোচ্ছিল, এবার জেগে উঠে নীচু স্বরে বলল, 'একটা দ্বীপ আছে৷ তার চারদিক কুয়াশায় ঢাকা৷ সেই দ্বীপে আমি সাপ গাছ দেখেছি৷ ভোর বেলা গাছটা নানা রঙের পাখির কিচিরমিচিরে যেন বাজনা বাজায়৷ সাপ গাছটা কিন্তু কোনোদিন কোনো পাখিকে ছোবল দেয়নি৷ সাপ গাছে ফুল হয় না কিন্তু খুব সুন্দর একটা ফুলের গন্ধ তোমার নাকে লাগবেই৷'
'ফুল হয় না, তাহলে ছবিতে বড়ো বড়ো ওগুলো কী? ফুলের মতোই তো দেখাচ্ছে৷'
'ওগুলোই গাছটার পাতা৷'
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল, 'কিন্তু দ্বীপটা যে কবে দেখেছি, কোথায় দেখেছি তা আর মনে পড়ে না৷ হয়তো কয়েক-শো বছর আগে দেখেছি৷ বা হয়তো কয়েক হাজার বছর আগে৷ হয়তো অনেক আগের কোনো জন্মে দেখেছি দ্বীপটা৷ আমি কী করে গিয়েছিলাম, চেষ্টা করেও মনে করতে পারি না৷'

ছেলেটা কি তবে জাতিস্মর, না কি মানুষই না, আমার সামনে এ কি তবে জিন বা ভূত? সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, 'কয়েক-শো বছর বা কয়েক হাজার বছর আগের কথা কি কেউ মনে করতে পারে? ওরকম হয় নাকি?'
'হতে পারে না? কারও জীবনেই হতে পারে না?'
'অসম্ভব৷'
বিকেল শেষ হয়ে আকাশে পাতলা সন্ধ্যে নামছে, সন্ধ্যাতারাও ততক্ষণে ফুটে গেছে, সেদিকে আঙুল তুলে ছেলেটা বলল, 'এই তারাটা লক্ষ-কোটি বছর ধরে আছে তো? অথচ আজও একইরকম দেখতে পাই৷ আমার সেই দ্বীপও এই ভাবেই কোথাও কোনো মহাসাগরের বুকে জেগে আছে, যখন আমার সব মনে পড়বে তখন ঠিক আমি দেখতে পাব৷ পাব না? এই দেখো, আমার বুক দুরুদুরু করছে৷' বলেই নদীপাড়ের কাদার ওপর দিয়ে সে দূরে কোথাও চলে গেল৷
ছেলেটা এরকম হঠাৎ কখনো আসে, হঠাৎ চলে যায়৷ রোজ কথা বলে না৷ যেদিন বলে সেদিন তার ভারি অদ্ভুত সব কথা না শুনে পারি না৷
একদিন অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, 'গাছ, পাখি, নদী আর আকাশের তারা ছাড়া মানুষ বাঁচে না জানো তো?'
কথাটা বলেই কিছুক্ষণ কী ভাবল৷ তারপর আবার বলল, 'যে দেশে নদী নেই সে দেশের বড়ো দুঃখ৷ আমি দেখেছি৷ জানো তো, নদী মানুষের মায়ের মতো৷'
হাতের কাজ থামিয়ে দাঁড়িয়ে আছি দেখে যুধিষ্ঠিরদাদা পিছন থেকে হাঁক পাড়ল, 'ঘটনাটা কী ঘটল রে অমেরতো? ছোঁড়াটা আজ আবার কী চায়?' আমার ভালো নাম অমর্ত্য৷ গ্রামের বয়স্করা আমাকে অমেরতো বলে ডাকে৷


ছেলেটা ক-দিন ধরে প্রায়ই আমার কাছে আসছে বটে, কিন্তু কোনো দিন কিছু তো চায়নি৷ শুধু চারদিক দেখে৷ কখনো কিছু মনে এলে, বলে আমাকে৷ একদিন যেমন আমার কাছে জানতে চেয়েছিল আমি স্বপ্ন দেখি কি না৷

আরেক দিন, সেদিন শেষ রাত থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়ে বিকেলের দিকে আকাশ আলো করে সবে নদীর জলে শান্তি নেমেছে, পশ্চিমে দূর বনের মাথায় কমলা রঙের ছোপ ধরেছে, ছেলেটা কোথা থেকে এসে আমাকে বলল, 'কাল রাতে কী স্বপ্ন দেখেছ, বলো৷'
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম৷ বললাম, 'কই কিছু তো দেখিনি৷'
'দেখেছ৷ মনে করতে পারছ না৷' একটু পরে আবার বলল, 'আমি রোজ স্বপ্ন দেখি৷ মা বলত, স্বপ্ন দেখার সময় আমার মুখ নীল হয়ে যায়৷ আমার নামও তাই স্বপ্ননীল৷ তুমি আমাকে দুরুদুরুও বলতে পারো৷'

'তোমার নাম স্বপ্ননীল হলে তোমাকে দুরুদুরু বলব কেন?'
'আমার বুকটা মাঝে মাঝেই দুরুদুরু করে৷'
'ডাক্তার দেখাও না? এ জন্য ওষুধ খাওনি কখনো?'
'বা রে, ওষুধ খাব কী করে? সাপ গাছের তিন পাতার এক-একটা গুচ্ছের একটা পাতাই এর ওষুধ৷ কিন্তু আমি তো গাছের পাতা ছিঁড়তে পারি না৷'
সুন্দরবনের এই বানভাসি গ্রামে আমার পুরো ছয় ঋতু কেটে গেছে৷ এক বৈশাখে এসেছি, আরেক বৈশাখ পার হয়ে জ্যৈষ্ঠও শেষ হয়ে গেল৷ এসেছি স্কুলে পড়াবার কাজ নিয়ে৷ বানভাসির একমাত্র স্কুল এটা৷ নদীর নোনা জল ঠেলে সরিয়ে বাঁধ দিয়ে তার ওপর এই মাটির স্কুলবাড়ি বানিয়েছে গ্রামের মানুষ৷ মাটির দেওয়াল, টালির চালা৷ ছিল প্রাইমারি স্কুল৷ এ বছরই দশ ক্লাসের হয়েছে৷ আমিও সদ্য ছাত্রজীবন শেষ করে শিক্ষকতার কাজ শুরু করেছি৷ স্কুলে পড়াবার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের নানা কাজেও হাত লাগাতে হয়৷ নদীর পাড় ভাঙা ঠেকাতে বনকাঁটা গাছ বহুদূর অবধি শিকড় ছড়িয়ে মাটিকে শক্ত করে বেঁধে রাখে৷ তার ডাল কেটে গাছগুলোর মধ্যে মধ্যে লাগানোও একটা কাজ৷ সে কাজেও যখন যতটুকু পারি সাহায্য করি৷ গ্রামের সবার সুখদুঃখের শরিক হতে না পারলে বাইরের কাউকে গ্রামবাসীরাই বা বিশ্বাস করবে কেন!
একদিন বিকেলের দিকে ছেলেটা এল৷ এসেই বলল, 'সাপ গাছের কাছে তোমাকে নিয়ে যেতে পারব না, সেই দ্বীপের রাস্তাটা মনে করতে পারছি না তো৷'

ছাত্রদের বার্ষিক পরীক্ষার খাতা দেখায় ব্যস্ত ছিলাম, একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, 'বেশ তো, যেদিন দ্বীপের রাস্তা মনে পড়বে সেদিনই নাহয় নিয়ে যেয়ো!'
গলার স্বরে রুক্ষ ভাব সে ঠিকই বুঝেছে৷ না হলে সে বলবে কেন, 'আমার কথায় রাগ করবার মতো কিছু ছিল বুঝি?'
এতক্ষণ খাতায় চোখ রেখে তার কথা শুনছিলাম, উত্তরও দিয়েছিলাম সেভাবেই৷ এবার মুখ তুলে অবাক হলাম৷ কোথায় তার গায়ে সেই ঢলঢলে গেঞ্জি! তার বদলে এ তো দেখছি যেন কোন অরণ্যরাজ্যের ছেলে৷ গায়ে মরা ডালপালায় জড়ানো শুকনো লতা-পাতার লম্বা জোব্বা, মাথায় পাখির পালকের টুপি৷ পালকও নানা রঙের!
আমার আশ্চর্য হওয়া তার চোখেই পড়ল না৷ বরং আমাকে আরও আশ্চর্য করে বলল, 'সাপ গাছের দ্বীপে তো নিয়ে যেতে পারব না, কিন্তু তোমাকে আমি পঞ্ছীপেড় গ্রামে যাবার পথ বলে দেব৷ পঞ্ছীপেড় বুঝেছ? পাখি গাছ৷ গ্রামের নামও পঞ্ছীপেড়৷ পাখি গ্রামও বলতে পারো৷ ঘন জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের দেশে সেই গ্রাম৷ যাবে তুমি? যে মাসে সারাদিন আকাশে সূর্য রেগে থাকে, নীচে আগুন ঝরায়, মাটি শুকিয়ে ফাটা ফাটা হয়ে যায়, সেই মাসে আসব আমি৷'

প্রথমে বলেছিল সাপ গাছের কথা৷ এখন আবার বলছে পাখি গাছের কথা৷ একটা কুয়াশাঘেরা দ্বীপে, আরেকটা জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ে, কথাগুলো বিশ্বাসও হয় না, আবার একেবারে উড়িয়েও দিতে পারি না৷

মে মাসের মাঝামাঝি স্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি পড়তেই ছেলেটাকে নদীর ফাটল ধরা পাড় ধরে হেঁটে আসতে দেখে মনে পড়ল, তাই তো, এখনই তো সারাদিন সূর্য আগুন ঝরায়৷
টুকটুকে লাল পাকা করমচার মতো থোকা থোকা ফলভরা একটা গাছের ছবি আমাকে দেখিয়ে বলল, 'এই সেই পঞ্ছীপেড়৷ পাখি গাছ৷ পঞ্ছীপেড় গ্রামে এরকম অনেক পাখি গাছ৷ এ গ্রামে সকাল থেকে সন্ধ্যে মানুষের গলার আওয়াজ পাবে না, কাছে-দূরে শুধু পাখির সুরেলা স্বরের অবিরাম কথা বলাবলি৷ পাহাড় জঙ্গল সুরে ভরিয়ে পাখিরা সারাদিন যা-যা বলে সেসব যদি তুমি বোঝো তো অবাক হয়ে যাবে৷'
ছেলেটার কথায় মন না দিয়ে আর থাকা যায় না৷ আমি বলে ফেললাম, 'জঙ্গলে সেই পাখিরা কী বলে? আমাকে শোনাতে পারো দু-একটা?'
'পাখি গাছের নীচে সারাদিন চুপ করে বসে থাকলেই তুমি পাখিদের অনেক কথা শুনতে পাবে৷ ও-গাছের লাল টুকটুকে ফল পাখিদের খুব প্রিয়৷'
'যদি যেতে চাই যাব কী করে? তুমি কি আমাকে নিয়ে যাবে?'
'না, আমি তোমাকে পথ বলে দেব৷ একলাই যেতে হবে তোমাকে৷'
একদিন ভোর বেলা এসে সে আমাকে পঞ্ছীপেড় গ্রামের পথ বোঝাল৷
গরমের ছুটিটা কলকাতায় স্কুল সার্ভিসের পরীক্ষার জন্য তৈরি হতেই কেটে গেল৷ এরপর স্কুলে সুন্দরীমেলার ষোলো দিনের ছুটি পড়তেই আমি বেরিয়ে পড়ার তোড়জোড় করতে লাগলাম৷ সুন্দরবনের এই মেলা তিন-শো বছর ধরে চলছে৷ বনের সুন্দরী গাছের নামে মেলার নামও সুন্দরীমেলা৷
মেলার তৃতীয় দিনে আমি বেরিয়ে পড়লাম৷ কিন্তু দুরুদুরুর বলে দেওয়া রাস্তা আমার কাজে লাগল না৷
একটা নদী থেকেই পঞ্ছীপেড় গ্রামে যাবার পথ বুঝিয়ে দিয়েছিল দুরুদুরু৷ সেই নদীতীর থেকে ধ্রুবতারা নাকি খুব উজ্জ্বল দেখায়৷
হাওড়া, শেওড়াফুলি, শ্বেত আকন্দপুর, বর্ধমান, বিষ্ণুপুর, যেখানে যাকেই জিজ্ঞেস করি সেই পঞ্ছীপেড় গ্রামে যাবার পাহাড়ি নদীর পথ দেখানো দূরের কথা, নামই শোনেনি৷

ওদিকে শিয়ালদা, শিলিগুড়ি বা সাতমন্দিরতলা ইস্টিশানে যাকে পেলাম তাকেই জিজ্ঞেস করি৷ ও নামের কোনো গ্রাম বা ধ্রুবতারা উজ্জ্বল দেখানো নদী যে কোথাও আছে, কেউ বিশ্বাস করে না বা জানে না৷
এদিকে বাস, লরি, শেয়ারের ভাড়াগাড়ি বদলে বদলে এদিক-সেদিক ঘুরতে ঘুরতে সুন্দরীমেলার ছুটি ফুরিয়ে গেল৷ ক্লান্ত হয়ে গায়ে-মাথায় ধুলো মেখে শেষ পর্যন্ত সুন্দরবনে আমাদের গ্রামে ফিরে এলাম৷
পরদিন ভোরে বিদ্যাধরী নদীর ফুটিফাটা নতুন বাঁধের ওপর দিয়ে হাঁটছি, রাতে ভালো ঘুম হয়নি, নদীর ঠান্ডা হাওয়ায় ঘুম পেয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ ছেলেটা কোত্থেকে এসেই বলতে শুরু করল, 'পাহাড়, শুধু পাহাড়৷ শুধু পাহাড়ের সারি৷ তার পিছনে আবার পাহাড় সারি, তারও পরে আরও পাহাড়ের সারি৷ একটা সারির পিছনে মাথা তুলে আছে আরেকটা সারি৷ সব পাহাড়ই ঘন জঙ্গলে ঢাকা৷ যেদিকে দেখবে শুধু পাহাড়ের গায়ে যেন কোটি কোটি সবুজ পশম ঢাকা ভেড়ার পাল অনন্তকাল ধরে গা ঘেষাঘেঁষি দাঁড়িয়ে আছে৷ সকালে-বিকেলে নীচ থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসে সাদা মেঘ৷ পাহাড়ের কোলে যে যেখানে জায়গা পায় শুয়ে পড়ে৷ পঞ্ছীপেড় গ্রামে থোকা থোকা লাল ফুলের অনেকগুলো গাছ৷ ওগুলোই পঞ্ছীপেড়, পাখি গাছ৷ গাছগুলো খুব বড়ো না, এক-একটা গাছ একটা ঝোপের মতো৷ মাঝে মাঝে এক-একটা শুধু দশ-বারো ফুট লম্বা৷ লম্বা গাছের মাথায় পাখির ভিড় সবচেয়ে বেশি৷ সারাদিন পাখি আসার বিরাম নেই৷ অনেক পাখি আবার লাল টুকটুকে ফল খাওয়া শেষ করেই উড়ে যায়৷ ছোটো গাছগুলোতেও পাখির আসা-যাওয়া চলছেই৷'

'তুমি গিয়েছিলে সেখানে? নিজের চোখে দেখেছ সেই পাখি গাছ?'
'আমি তো মাঝে মাঝেই যাই৷ পঞ্ছীপেড় গ্রামটা তো আমার দাদুর গ্রাম৷'
'তোমার দাদুর বাড়ি সেই গ্রামে?'
'পুরো গ্রামটাই তো দাদুর৷'
'তার মানে তোমার দাদু গ্রামের মোড়ল?'
'না, না, মালিক৷'
'গ্রামের আবার মালিক হয় না কি?'
ছেলেটা নদীর জলে ভোরের চকমকিতে চোখ রেখে কিছু ভাবতে লাগল৷ কাছেই গরান গাছটায় একটা পাখি এসে থেমে থেমে শিস দিচ্ছে৷
'বুঝতে পারছ?' ছেলেটা নদী থেকে আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে এনে বলল, 'পাখি কী বলছে, বুঝতে পারছ?'
'এ তো দোয়েল৷ শিস দিচ্ছে৷ দোয়েল তো সব সময় শিসই দেয়৷'
'না, না৷ নিজের মনের কথা বলছে৷ আমি জানি ও কী বলছে৷ যে জানে না, সে জানে না৷'
দোয়েল বরাবরের মতো শুধু শিসই দিচ্ছে, এর মধ্যে কথা-টথা আমি তো কিছুই বুঝলাম না৷ এবার অধৈর্য হয়ে বললাম, 'কোনো গ্রামের কারও মালিক হওয়ার ব্যাপারটা কী? সে কি শুধু তুমিই বোঝো? তুমিই জানো? আর কেউ তা জানতেও পারে না, বুঝতেও পারে না?' আমার গলার স্বরে বিরক্তি ও অবিশ্বাস চাপা গেল না৷
ছেলেটা এবারও বোধ হয় দোয়েলের শিস শুনতে শুনতে কিছু ভাবছিল, হঠাৎই আমার কাছে এসে মুঠো করা বাঁ-হাতসুদ্ধই দু-হাতে আমার দু-হাত ধরে বলল, 'তুমি হবে পঞ্ছীপেড় গ্রামের মালিক?'
'তুমি কি পাগল হলে নাকি?'
'পঞ্ছীপেড়ই আমাকে পাগল করে ছাড়বে! সারাদিন সে-গ্রামের পাখিদের কথা শুনতে শুনতে আমার পাগল হবারই দশা৷ তুমিও যদি পাখিদের সেসব কথা বুঝতে পারো, সারাদিন শুধু তা নিয়েই ভাববে৷'
ছেলেটা সত্যিই পাগল নাকি! কখন কী বলে বোঝার উপায় নেই৷ তা ছাড়া ওর এইসব পাগলামির কথা শুনে নষ্ট করার মতো সময়ই-বা আমাকে কে দেয়!
'হবে তুমি পঞ্ছীপেড় গ্রামের মালিক? আমাকে এবার পঞ্ছীপেড় ছেড়ে যেতে হবে৷ সাপ গাছের দ্বীপে যেতে হবে৷ দাদুও আর বেশি দিন পৃথিবীতে থাকবে না৷ এই দেখো, আমার বুক বড্ড দুরদুর করছে৷'
বাঁ-হাতে বুক চেপে রেখেই কথাটা শেষ করল-'একজন কাউকে তো গ্রামের পাখিদের কথা শুনতে হবে!'
ওর কথাটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে দেখি কাছেই নদীর পাড়ে একটা নৌকো এসে কাদায় লগি পুঁতেছে৷ নৌকোর যাত্রীরা বেশির ভাগই আমার স্কুলের ছাত্র৷ এতটুকু নৌকোয় একসঙ্গে এত জনকে দেখে ভয়ের সঙ্গে রাগও হয়৷ এদিককার নদীতে এভাবে প্রায়ই নৌকোডুবি হয়ে প্রাণ হারায় অনেকে৷



ডাঙায় ওঠা ছাত্রদের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ছেলেটাকে বললাম, 'শোনো, এখন আর সময় নেই আমার৷ আমি তো একজন শিক্ষক, স্কুলের সময় হয়ে গেছে আমার৷'
'তুমি শিক্ষক? তুমি জানো, পঞ্ছীপেড়ের পাখিরা কত কী শেখায়? যাবে তুমি পঞ্ছীপেড় গ্রামে?'
ভোর থেকে ছেলেটার কথা শুনতে শুনতে কখন বেলা হয়ে গেছে খেয়ালই করিনি, স্কুলেরও দেরি হয়ে যাচ্ছে, তার ওপর ওর এই প্রশ্ন শুনে আমার রাগ হয়ে গেল৷ আমিও এবার প্রশ্ন করলাম, 'তুমি কী কী বই পড়েছ বলো তো?'

বানভাসি গ্রামে আসার কিছু দিন পরই দেখেছি, গ্রামের একেবারে উত্তর কিনারে একটা জায়গা খালি পড়ে আছে৷ বেশ বড়ো জায়গা৷ সেখানে চাষ হয় না, কেউ বাসও করে না৷ অনেক কালই নাকি এরকম৷ গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, বিরাট ওই পোড়ো জমিতে ভূতেদের বাস৷
আমাকে ক-দিনের জন্য কলকাতায় যেতে হয়েছিল৷ তিন দিন পর নৌকো থেকে নেমেই দূর থেকে দুরুদুরুর সঙ্গে দেখা৷ বরাবরেরর মতো সে নদীপাড় ধরে আসছিল না, এল গ্রামের উত্তর দিক থেকে৷ তা নিয়ে আমার চোখে হয়তো বিস্ময় বা সংশয় বা কৌতূহল ফুটে উঠেছিল, সেটা লক্ষ করে দুরুদুরু কিছুটা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল, 'গ্রামের পোড়ো জমিতে পঞ্ছীপেড়ের চারা পুঁতে এলাম৷'
এও তার একটা পাগলামি৷ পাহাড়ের দেশের গাছ এখানে হয় নাকি! এখানে তো সব নোনা জলের নদী৷
মুখে বলবার আগেই আমার মনের কথা বুঝে নিয়ে দুরুদুরু কিছুটা যেন দুঃখের গলায় বলল, 'জানি অসম্ভব৷ কিন্তু কাউকে না কাউকে চেষ্টা তো করতে হবে৷'
ধান খেতের আল ধরে স্কুলের দিকে দু-জনে হেঁটে যাচ্ছি, বেশ কিছুক্ষণ কারও মুখে কথা নেই৷ কী একটা পাখি ডাকতে ডাকতে আকাশের একদিক থেকে আরেক দিকে উড়ে যাচ্ছে দেখে দুরুদুরু নিজের মনেই বলল, 'হায়! পাখি, গাছ, নদী না থাকলে মানুষও থাকবে না!' তারপর হঠাৎই যেন আমার উপস্থিতি টের পেয়ে আমাকে বলল, 'তুমি নিশ্চয়ই এটা জানো?'
ঠিক এভাবে বলা যায় কি? এত জোর দিয়ে? বললাম, 'ঠিক জানি না৷'
'সে কী, কেন? তুমি তো শিক্ষক!'
'একজন শিক্ষককে স্কুলে শুধু একটা বিষয়ই পড়াতে হয়, যে বিষয়টা সে নিজে ভালো করে পড়েছে৷'

'একটা বিষয়? সাগর, পাহাড়, পাখি, গাছপালা, আকাশ, বাতাস, পৃথিবী, একটা মাত্র বিষয়ে এত কিছু ধরবে কী করে!'
একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, 'তিন দিন ছিলাম না, স্কুল কামাই হয়েছে, সিলেবাস এখনও অনেকটা বাকি!'
'সিলেবাস কী?'
স্কুল এসে গেছে, এই স্কুলবাড়ির একটা ঘরেই আমার থাকার ব্যবস্থা৷ সেখানে হাতের ব্যাগটা নামিয়ে রেখেই ক্লাসে ঢুকতে হবে৷ বললাম, 'সে তুমি বুঝবে না৷ আমি এবার স্কুলে ঢুকব৷'
'সিলেবাস কি সাপ গাছের দ্বীপের কুয়াশার চেয়েও দুর্ভেদ্য? ভেতরে ঢোকা খুব শক্ত?'
এবার তো দাঁড়াতেই হয়৷ বললাম, 'সারা বছর কোন বইয়ের কী কী পড়তে হবে, বছরের প্রথমেই তার একটা ফর্দ বানানো হয়৷ সেই ফর্দটাই সিলেবাস, তুমি ঠিক বুঝবে না৷'
দুরুদুরু ভারি অবাক হয়ে বলল, 'তাতে পঞ্ছীপেড়ের কথা থাকে? সাপ গাছের পাতার কথা থাকে? সেই পাতার দোলায় তৈরি হাওয়ার কথা থাকে-যে হাওয়া গায়ে লাগলে মানুষ আর কোনো মন্দ কাজ করে না?'
ঢং ঢং করে স্কুলের ঘণ্টা পড়তেই আমি দুরুদুরুর উদ্ভট সব ভাবনার কথা শোনায় ক্ষান্তি দেবার সুযোগ পেয়ে গেলাম৷
'ক্লাস শুরু হচ্ছে, আমি যাচ্ছি৷' বলে সোজা স্কুলে ঢুকে পড়লাম৷
এরপর অনেকদিন দুরুদুরুর সঙ্গে আর দেখা হয়নি৷ একজন মউলির মুখে শুনলাম সে একদিন ভোর বেলা ছেলেটাকে উত্তর কিনারের পোড়ো জমির দিকে যেতে দেখেছে৷ আবার সেদিনই বিকেলে বন থেকে মধু নিয়ে ফেরার সময় তাকে ফিরতেও দেখেছে৷
গ্রামে এল, সারাদিন পোড়ো জমিতে কাটাল, অথচ আমার সঙ্গে দেখা হল না, মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল৷
কার্তিক মাসে ধান কাটা শেষ হবার পর একদিন আমি আল ধরে হেঁটে আমার এক অসুস্থ ছাত্রের বাড়ি যাচ্ছি, দেখি দুরুদুরু আমার দিকেই আসছে৷ ছাত্রটির বাবা চাষি, বাবার সঙ্গে ছেলেও গত ক-দিন ধান খেতেই কাটিয়েছে৷ দুপুরের রোদ আর সকাল-সন্ধ্যের শিশির মাথায় লেগে তার জ্বর হয়েছিল৷ স্কুলে আসেনি৷
তাদের মাটির বাড়িটা যখন প্রায় এসে গেছে, তখনও দুরুদুরু আমার দিকেই হেঁটে আসছে৷ তার দিকে ফিরে চেঁচিয়ে বললাম, 'তুমি কিছুক্ষণ ধান খেতের আলপথেই হেঁটে বেড়াও, একটু পরে আসছি আমি৷' আমাকে হনহন করে হেঁটে যেতে দেখে ধান খেতের পাখির ঝাঁক উড়ে গেল৷
এ গ্রামে কোনো ডাক্তার নেই, ওষুধও পাওয়া যায় না৷ তবু বিনা চিকিৎসায় ছেলেটি অনেকটাই সেরে উঠেছে দেখে নিশ্চিন্ত হলাম৷ কাল স্কুল যাবারও ইচ্ছে তার৷

বাইরে এসে দেখি দূরে দুরুদুরু খেতের পাখিগুলোর খুব কাছে বসে তাদের দেখছে৷ ধান কেটে নেবার পর ধানখেতে যেসব ধান পড়ে থাকে, গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে সেগুলো ইঁদুরে খায় আর দূর থেকে উড়ে এসে পাখিরা খেয়ে যায়৷ দুরুদুরু একমনে পাখিদের দেখছে৷ আমি তার কাছে এসে দাঁড়াতে সে ইশারায় আমাকে তার পাশে নীচু হয়ে বসতে বলল৷ তার নজর পাখিদের ওপর৷ ছাত্রের বাড়ি যাবার সময় পাখিরা উড়ে গিয়েছিল, এখন দেখছি দিব্যি ফিরে এসে খুঁটে খুঁটে ধান খাচ্ছে৷ ধান গাছের স্যাঁতসেঁতে গোড়ায় ঝাঁক ঝাঁক ধানচড়াইয়ের ভিড়৷
এমনিতেই খেতের বেশিরভাগ আমাদের চেনা পাখি, দু-তিনটে পাখি শুধু অচেনা৷ ওরকম একটা অচেনা পাখি দেখিয়ে দুরুদুরু আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, 'পঞ্ছীপেড়ের পাখি৷'
'তোমার পঞ্ছীপেড়ের চারা এর মধ্যেই বড়ো হয়ে গেল নাকি?'
আমার গলার আওয়াজেই সব পাখি একসঙ্গে উড়ে গেল৷
দুরুদুরু উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল, 'তুমি ধৈর্য শেখোনি৷'
ধৈর্যের কথা বলল কেন? আমার কথার শব্দে পাখি উড়ে গেল বলে? না কি পঞ্ছীপেড়ের চারার কথা জিজ্ঞেস করেছি তাই? আমি তো ভেবেছিলাম ওর সেই চারাগাছ বড়ো হয়েছে বলেই তার টানে পঞ্ছীপেড়ের পাখি এ গ্রামে এসেছে!
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে সে আবার বলল, 'পঞ্ছীপেড় গ্রামে যাবে তুমি?'
'যেতে খুব ইচ্ছে করে৷ গাছটা একদিন স্বপ্নেও দেখেছি৷'
'সে আমি জানতাম৷ কিন্তু স্কুল ছেড়ে, এই গ্রাম ছেড়ে, নিজের বাড়ি ছেড়ে যেতে পারবে?'
'রাস্তা চিনব কী করে?'
'দেখি, যদি পারি আমিই নিয়ে যাব৷'
'একটু ভাবি৷ বাড়িতে কথা বলি৷ স্কুলের হেডমাস্টার মশাইয়ের অনুমতিও নিতে হবে৷'
দুরুদুরু আমার চোখের সামনেই দূরে গিয়ে মিলিয়ে গেল৷

অনেকদিন তাকে আর দেখা যায়নি৷ একদিন দুপুরে হঠাৎ এসে হাজির৷ মুখ দেখে বোঝা যায় তার মন দুঃখে ভরে আছে৷ বেশ খানিকক্ষণ নীরব থেকে আপন মনে কথা বলার মতো বলতে থাকল, 'সাপ গাছের একটা পাতা এ মাসেই ঝরে পড়বে৷'


'বাঃ! এবার তাহলে তোমার বুক দুরুদুরুও সেরে যাবে!'
'না, তা কী করে হয়! ও গাছের একটা পাতা ঝরে পড়লে গাছটার আয়ুও তো এক-শো বছর কমে যাবে৷'
'তোমার তো কিছু করার নেই৷ গাছের পাতা তুমি গজাতেও পারো না, ঝরাও আটকাতে পারো না৷'
'গজাতে পারি না ঠিকই, কিন্তু ঝরাও কি আটকাতে পারি না? পারতে হবে আমাকে৷ চেষ্টা করে দেখতে তো পারি৷'


'তোমার বুকের কষ্ট সারাতে যে গাছের একটা পাতা তুমি ছিঁড়তে চাও না, যে গাছের একটা ঝরা পাতা পেলেই তোমার অসুখ সেরে যাবে, সেই পাতাটাও ঝরতে দিতে চাও না কেন? ঝরার সময় হলে গাছের পাতা তো আপনা-আপনিই ঝরে যায়৷'
মনে হল জোর করে ও চোখের জল আটকে রেখেছে, কথাও বলছে না, দু-চোখ বুজতেই তার গাল বেয়ে দু-ফোঁটা জল নামল৷
ওর চোখ খোলার অপেক্ষায় শুধু মুখের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারি আমি? এভাবেই আরও কিছুক্ষণ নিষ্ফল চলে যাবার পর দুরুদুরু মুখ খুলল৷ যেন খুব দূর থেকে কথা বলছে এমনভাবে বলল, 'একটা পাতা ঝরে গেলে পৃথিবীর মানুষ তো আরও দোষ করতে থাকবে৷ যা করা উচিত নয়, তা-ই করতে চাইবে৷'
দুরুদুরু বাঁ-হাতে বুক চেপে ধরে থেকে কিছুক্ষণ পরে বেশ কষ্ট করে কথাটা শেষ করল, 'সবাই তখন মিথ্যে কথা বলবে!'
ওর কষ্ট হচ্ছে দেখেও না বলে পারলাম না, 'সাপ গাছের একটা পাতা ঝরলেই এমন হয় নাকি?'
'সাত-শো বছর আগে একটা পাতা ঝরার পর থেকেই মানুষের মিথ্যে কথা বলার শুরু৷'
আকাশ কালো৷ বাতাস থম মেরে আছে৷ গুমোট গরম৷ ঝড় উঠবে মনে হয়৷ ঝড়ে সুন্দরবনের এই সব গ্রামের অনেক ক্ষতি৷ আমাদের স্কুলবাড়ির চালা উড়ে যাবে না তো?
দুরুদুরু তখনও বুক চেপে দাঁড়িয়ে৷ মনে হয় আরও কিছু বলবে৷
'পঞ্ছীপেড়ের পাখি সেই কোন আদি যুগে সাপ গাছের একটা ঝরা পাতা মাটিতে পড়বার আগেই ঠোঁটে করে নিয়ে এসেছিল বলে পাখিরা মিথ্যে বলতে জানে না৷ বনের হরিণ, কাঠবিড়ালি, ঝিঁঝিপোকা এরা কেউ মিথ্যে বলে না৷ জঙ্গলে সারারাত কতরকম কীটপতঙ্গ নিজেদের মধ্যে কত কথা বলে, কতরকম তার আওয়াজ, কেউ একটাও মিথ্যে আওয়াজ করবে না৷ এরা সবাই পাখির বয়ে-আনা পাতার হাওয়ার ছোঁয়া পেয়েছিল৷'
কথাটা আমার বিশ্বাস হল না৷
আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে দুরুদুরু বলল, 'বিশ্বাস দিয়ে পৃথিবীর কতটুকুই বা জানা যায় বলো! একসময় তো মানুষের বিশ্বাস ছিল পৃথিবীটাই দাঁড়িয়ে আছে, সূর্যই তার চারপাশে ঘুরছে৷'
কথাটা বলেই সে যাবার জন্য পা বাড়াতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে বললাম, 'সে দ্বীপ তুমি খুঁজে পাবে কী করে?'
'পঞ্ছীপেড়ের পাখি আমাকে পথ দেখাবে৷'
'অত দূরের পথ, পাখি চিনবে কী করে?'
'বরফের দেশের পাখিরা হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে তোমাদের দেশে আসে না?'
দুরুদুরু আর দাঁড়াল না৷ নদীর ধার বরাবর বহু দূর অবধি হাঁটতে লাগল৷ ক্রমশ ছোটো হতে হতে একেবারে মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তার চলে যাওয়ার দিকে আমি শুধু চেয়ে রইলাম৷ স্কুলে ফেরার তাড়া না থাকলে হয়তো ছুটতে ছুটতে গিয়ে ওকে ফিরিয়ে আনতাম৷

ওর কথাগুলো মানি না-মানি, আমার মন থেকে কিছুতেই মোছা যাচ্ছে না৷ নিজের কাজে যখন ব্যস্ত, তখনও তার কোনো-না-কোনো কথা মনে ভেসে উঠছে৷
কিছুক্ষণ পরই চোখে পড়ল, দুরুদুরু ফিরে আসছে৷ কাছে এসে বুকে হাত চেপে বলল, 'গ্রামের উত্তরে পাখি গাছে নতুন শাখা বেরিয়েছে৷ যত্ন নিয়ো৷ গাছের ডালপালা যত বাড়বে, পাখিদের আনাগোনাও ততই বাড়বে৷ নীচে বসে তুমি তাদের কথা শুনো৷ তারাই একদিন তোমাকে পাহাড় ঘেরা পাখিগ্রামের পথ বলে দেবে৷'
কথা বলতে তার কষ্ট হচ্ছিল৷ সে চুপ করে গেল৷ হয়তো দম নেবার জন্য৷ তার মুখ নীল হয়ে উঠছে৷ দু-চোখ বোজা৷ হয়তো স্বপ্ন দেখছে৷ হয়তো আরও কিছু বলতে চায় আমাকে৷

আমি এসব সময় যেমন থাকি, চুপ করে আছি৷ দুরুদুরু হঠাৎ চোখ খুলে তাকাল৷ নদীর দিক থেকে ঝড় ঝাঁপিয়ে আসছে দেখে বলে উঠল, 'আমার আর সময় নেই! পাতাঝরা আমাকে আটকাতে হবে৷'
ঝড় তো নয়, এ তো নদী-ওড়ানো ঝড়! তার মুঠো করা বাঁ-হাতটা ধরে বললাম, 'ঝড়ের মধ্যে এখনই যেয়ো না৷'
দুরুদুরু কিছু বলল না৷ হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ঝড়ের মধ্যে সে হারিয়ে গেল৷ মনে হয় যেন উড়ে গেল৷
এরপর তাকে আর কেউ দেখেনি৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন