সোমজা দাস
তিলোত্তমা তার আলোকোজ্জ্বল রাজপথ, আকাশচুম্বী অট্টালিকা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাজার, ছবিঘর, মহার্ঘ পপকর্ন, হাসি, গান, আকাশ ঢেকে ফেলা হোর্ডিং ছাড়িয়ে যেখানে এসে সাজপোশাক খুলে চানঘরে কলের নীচে দাঁড়ায়, প্রসাধন ধুয়ে ফেলে মাটির গন্ধ বুকে ভরে নেয়, অথচ তবু শরীর থেকে শহুরে উগ্র সুরভি মুছে ফেলতে পারে না পুরোপুরি, ঠিক তেমনই কোনো এক স্থানে জাতীয় সড়কের ওপর এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে একটি ওয়াগন ট্রাক। সময়টা মধ্যরাত। ড্রাইভার রাস্তায় নেমে এসেছে নিজের আসন ছেড়ে। সঙ্গে আর একজন লোক দাঁড়িয়ে, মোবাইল ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলে চলেছে। মন দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, দু-জনেরই শরীরী ভাষায় স্পষ্ট উত্তেজনা।
ফোনটা অফ করতেই অপরজন জিজ্ঞাসা করল, 'কী হল? কী বলল বস?'
ফোন হাতে লোকটা খিঁচিয়ে উঠল, 'শালা, হাগতে যাওয়ার সময় পাস না? এখন যত হুজ্জোত আমার!'
অপরজন, যে কি না এই ওয়াগনের ড্রাইভার, খসখসে স্বরে বলে, 'হাগা পেলে কী করব? তুই কেন লক চেক করিসনি?'
'কে বলল লক চেক করিনি? আমাকে দোষ দিবি না, কেটে ফেলব শালা!' লোকটার কণ্ঠস্বরে বিরক্তি ঝরে পড়ছে।
'তাহলে মালদুটো পালাল কী করে?'
'সেটাই তো বুঝতে পারছি না। কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ দেওয়া ছিল। বাকিগুলো তো অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ওই দুটো জাগল কেমন করে, কেমন করেই বা পালাল, কিছুই মাথায় ঢুকছে না। বুড়োটা তো প্রায় মরো-মরো ছিল, শালা ট্রাকে তোলার সময় মনে হচ্ছিল রাস্তাতেই টেঁসে যাবে। ধুঁকছিল দেখেছি...' চিন্তিত শোনাল লোকটার গলা।
'তাহলে এখন?'
খেঁকিয়ে উঠল লোকটা এবার, 'এখন আবার কী? খুঁজতে হবে মালদুটোকে! পায়ে হেঁটে কত দূর যাবে? মাটির তলা থেকে হলেও খুঁজে বের করতে হবে! কাটা মাল ছুটে গেলে বস শালা খাল খিঁচে নেবে।'
অন্য লোকটা একটি অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করে বলল, 'এই জন্য চালানের ডিউটি নিতে চাই না আমি। কাটা মাল বাঁচিয়ে রাখার দরকার কী? যত ঢং! শালা ওপরওয়ালারা কাটা মাল বারবার কাটবে। মরাধরা ঘেঁটে আমাদের জীবন যায়। কোনদিন পুলিশের হাতে পড়লে ওপরওয়ালারা স্রেফ কেটে যাবে, মরব আমরা।'
'হুহ, ওসব আমরা বুঝব না শালা। কাটা মালও বিক্কিরি হয়। এখন মুখ বন্ধ করে খোঁজা শুরু কর। গোনা মাল ডেলিভারি দিতে না পারলে বস আমাদেরও ছাড়বে না!' বলতে বলতে হাতে ছয় ব্যাটারির জোরালো টর্চ হাতে এগোল লোকটা।
'আশেপাশের ঝোপজঙ্গলগুলো দেখ ভালো করে। কাঁচা কাটা, কত দূরে যাবে পালিয়ে?'
লোকদুটো এবার আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে শুরু করে। দু-জনের হাতেই দুটো জোরালো আলোর টর্চ জ্বলছে। ওয়াগনের ভেতরে এখনও তেরোটা 'কাটা মাল' অঘোরে ঘুমোচ্ছে। এদের মধ্যে দু-তিনজনের অবস্থা বেশ সঙিন। ডেলিভারির আগে রাস্তাতেই মরে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। আসলে এদের খোলসটাই আছে, ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। মাল ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব লোকদুটোর। এই ব্যাবসায় ভুলের কোনো ক্ষমা নেই। এখানে ভুলের অর্থ হল মৃত্যু, তা ভালো করেই জানে দু-জন। ভয়ে বুকের ভেতরে ঢিপঢিপ করে তাদের। বের করতেই হবে, যেমন করে হোক খুঁজে বের করতেই হবে। না হলে...
বেশিক্ষণ সময় লাগল না। লোক দু-জন এই লাইনে অনেকদিন আছে। অভিজ্ঞতা সব সময়েই কাজে দেয়। লোকটা ঠিকই বলেছিল, 'কাটা মাল' বেশি দূরে যেতে পারবে না। হাইওয়ের পাশ দিয়ে ঢালু হয়ে যেখানটা ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে অন্ধকারে মিশেছে, সেখানেই ছেলেটাকে পাওয়া গেল। গুটিসুটি মেরে বসে ঝোপের আড়ালে নিজেকে লুকোনোর ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। ছেলেটার বয়স চোদ্দো-পনেরো হবে। মুখখানা ভয়ে শুকিয়ে গেছে। টেনে তুলতে গিয়ে বোঝা গেল ব্যাপারটা। ওয়াগন থেকে লাফিয়ে নামতে গিয়ে পা-টা মচকেছে ছেলেটার।
'আর একটা কোথায়? বল শালা!' ছেলেটার চুলের মুঠি ধরে সজোরে ঝাঁকাল ওয়াগনের ড্রাইভারটা।
ভয়ে, ব্যথায় চিৎকার করে উঠল ছেলেটা। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল তারপর।
'তুই ট্রাকে তোল এটাকে, আমি দেখছি অন্যটাকে', বলে অন্ধকারের মধ্যে ছুটে গেল অন্য লোকটা।
ড্রাইভার ছেলেটার জামার কলার ধরে টেনে তুলল। পায়ের যন্ত্রণায় খুড়িয়ে হাঁটছে। লোকটা পাঁজাকোলা করে তুলে নিল রোগা ছেলেটাকে। তারপর রাস্তার দিকে এগোল।
ট্রাকের কাছে পৌঁছোনোর আগেই গুলির শব্দ শোনা গেল, পরপর দুটো।
চিবুকের রেখা কঠিন হয়ে উঠল লোকটার। মাথাগরম মূর্খটাকে সঙ্গে আনাই উচিত হয়নি।
'এই নিয়ে গত ছয় মাসে পরপর তিনবার হল!' বললেন কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার অনন্তবিজয় সেনশর্মা।
লালবাজারে কলকাতা পুলিশের হেড কোয়ার্টারের একটি কনফারেন্স রুমে এই মুহূর্তে জরুরি মিটিং চলছে। ঠিক উনিশ ঘণ্টা আগে জোকা এক্সপ্রেসওয়ের ধারে ঝোপের মধ্যে এক অজ্ঞাতপরিচয় প্রৌঢ়ের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পাওয়া গেছে। পেটে কাঁচা সেলাই। কেসটা অবশ্য নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় থানাতেই গেছিল প্রথমে, কিন্তু পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট আসতেই দৃশ্যটা একশো আশি ডিগ্রি বদলে গেল। প্রৌঢ়ের শরীরে একটিও কিডনি নেই। অটোপসি সার্জেন জানিয়েছেন, লোকটির দুটো কিডনিই অপারেট করে বের করা হয়েছে। জোড়াতালি দিয়ে পেটে একটা সেলাই করা হয়েছিল। অটোপসি সার্জেনের মতে তিরিশ ঘণ্টার বেশি হয়নি অপারেশনের। ক্ষত তাজা ছিল, সেটা থেকে অনেকটা রক্তক্ষরণ হয়েছিল। পেটের ব্যান্ডেজ রক্তে লাল হয়ে গেছিল। পিঠের পেছনে দেড় ইঞ্চির দূরত্বে পরপর দুটো গুলি করা হয়েছে লোকটাকে। গুলি লাগার সময় লোকটি বেঁচে ছিল। যদিও সার্জেন বলছেন, গুলি না লাগলেও আর বেশিক্ষণ বাঁচার সম্ভাবনা ছিল না।
গোয়েন্দা বিভাগের ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল বললে, 'স্যার, অটোপসি রিপোর্ট হাতে আসার পর কেসটা আর সাধারণ খুনের ব্যাপার থাকছে না। একটা কিডনি গায়েব হলেও অন্য কিছু ভাবার অবকাশ থাকত। দুটো কিডনিই যখন নেই, সেক্ষেত্রে এটা কোনো অরগ্যান ট্র্যাফিকিং র্যাকেটের কাজ।'
'আমি ভাবছি অন্য কথা। একটা লোক, যার শরীরে একটাও কিডনি নেই, সে মধ্যরাতে ওই জঙ্গলের মধ্যে গেল কীভাবে? অবশ্য যদি মেরে এনে ফেলা হয়, তাহলে অন্য কথা। তাহলেও প্রশ্ন ওঠে, ওরকম খোলা জায়গায় বডি কেন ফেলা হবে? প্রশ্ন অনেক, উত্তর নেই। যাই হোক, লোকটার আইডেন্টিফিকেশন হয়েছে?' জয়েন্ট কমিশনারসাহেব চিন্তিত মুখে জিজ্ঞাসা করলেন।
সৌরভ সান্যাল মাথা নাড়লেন। পাশে চেয়ারে বসা অফিসারের দিকে ইঙ্গিত করতে তরুণ অফিসারটি মাথা নাড়ল। অর্জুন রায় কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের একজন তরুণ তুর্কি। এর আগেও বিভিন্ন কেসে নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে সে। ঠান্ডা মাথা, বুদ্ধিমান ও পরিশ্রমী অফিসার এই অর্জুন রায়। ডিসিডিডি নিজে তার ওপর যথেষ্ট ভরসা করেন।
জয়েন্ট কমিশনারের দিকে তাকিয়ে অর্জুন বলল, 'স্যার, আমরা ভিকটিমের ফোটো কলকাতা ও আশেপাশের সব থানায় পাঠিয়ে দিয়েছি। এছাড়া আমাদের সব সোর্সদেরও কাজে লাগিয়ে দিয়েছি। আশা করছি খুব শিগগিরই একটা কিছু ব্রেক থ্রু পাব।'
'বেটার ইট বি সুন', গম্ভীর মুখে বললেন জয়েন্ট কমিশনার, 'আমাকেও ওপরে জবাবদিহি করতে হয়। এই নিয়ে এরকম তিনটে কেস এল লাস্ট ছয় মাসে। প্রেস, মিডিয়া চুপ থাকবে না। প্রথমবার যেটা ছিল ভেতরের পাতার বাঁ দিকে কলামের ছোট্ট একটা নিউজ, দ্বিতীয়বার সেটাই তৃতীয় পাতায় বড়ো আকারে উঠে এসেছে। এবার অলরেডি প্রতিটা চ্যানেলে খবরটা টেলিকাস্ট করা শুরু করে গেছে। কালকের পেপারে ফ্রন্ট পেজ নিউজ হতে যাচ্ছে সন্দেহ নেই।'
সৌরভ সান্যাল বললেন, 'আমাদের টিম সাধ্যমতো চেষ্টা করছে স্যার। আগের কেসদুটোর মধ্যে একটাতে ভিকটিমের আইডেন্টিফিকেশন সম্ভব হয়নি। অপরটিতে তার সম্পর্কে জানতে পারা গেছে। মহিলা নরেন্দ্রপুরের দিকে থাকত। বয়স চল্লিশের ওপরে, নাম রত্না দাস। কয়েকটি বাড়িতে গৃহ পরিচারিকার কাজ করত, স্বামী পরিত্যক্তা, একাই থাকত। এক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছিল অনেক আগেই। মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। মহিলা নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দেড় মাস পরে সুন্দরবনের দিকে একটা খাঁড়িতে তার মৃতদেহ ভেসে আসে। কুমিরে খেয়ে নিয়েছিল কোমরের নীচটা, সেখানকার লোকেরা পুলিশে খবর দিলে পুলিশ গিয়ে দেহ উদ্ধার করে। প্রথমে ভাবা হয়েছিল, কুমিরে মারার কেস। শরীর পুরো পচে গেছিল বলে স্টিচের দাগ চোখে পড়েনি। পরে অটোপসিতে জানা যায়, মহিলার শরীরে হার্ট ছিল না।'
'হুম, মনে আছে আমার। আর সেই প্রথম কেসটা তো আরও খারাপ ছিল, ইট ওয়াজ ব্রুট ইন রিয়াল সেন্স।' বললেন মিস্টার সেনশর্মা।
'ইয়েস স্যার!' ডিসিডিডি বললেন, ''সতেরো-আঠারো বছরের ছেলেটার শরীর থেকে ট্র্যান্সপ্লান্টেবল সমস্ত অরগ্যান বের করে নেওয়া হয়েছিল। ইট ওয়াজ প্যাথেটিক। বডিটা সেবারও ডায়মন্ড হারবারের কাছে ভেসে উঠেছিল। স্যার, এগুলো এক বা একাধিক অরগ্যান ট্র্যাফিকিং র্যাকেটের কাজ। রিপোর্ট অনুসারে এই মুহূর্তে দেশে বেঙ্গল, রাজস্থান আর গুজরাট হিউম্যান ট্র্যাফিকিং-এর লিড করছে। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। কলকাতা পুলিশ ও ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও এই পাচার আটকাতে পারছে না।'
'হুম', চিন্তিত মুখে মাথা নাড়লেন জয়েন্ট কমিশনার, 'এখন গা ঘামাতে হবে বয়েজ। আর ফেলে রাখা যাচ্ছে না। এইরকম ব্যাপার বারবার হলে পলিটিক্যাল টার্বিউলেন্স তৈরি হয়। সিএম নিজে ফোন করে খবরাখবর নিয়েছেন কেসটার ব্যাপারে। আমি চাই তোমরা একটা সুনির্দিষ্ট ওয়ার্ক প্ল্যান তৈরি করো। ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট করবে আমাকে। সেই রিপোর্টে টিমে কারা কারা থাকবে, সেটা স্পষ্ট করে উল্লেখ থাকে যেন। আমার স্পষ্ট একটা ভিশন চাই।'
অর্জুন এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার বলল, 'স্যার, এই ব্যাপারে আমার বক্তব্য আছে।'
সকলে অর্জুনের মুখের দিকে তাকাল।
অর্জুন বলতে শুরু করল, 'অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর ট্র্যাপ সারা দেশ জুড়ে বিছানো। কিন্তু অন্যান্য সমস্ত স্মাগলিং বা ট্র্যাফিকিং-এর সঙ্গে অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর একটা পার্থক্য আছে। অরগ্যান হাইলি পেরিশেবল অবজেক্ট, সহজেই নষ্ট হয়। কোনো অরগ্যান এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের সীমা ধরে রাখতে হয়, অনেক টেকনিক্যালিটিসের দিকে নজর রাখতে হয়। তাই পুলিশ, কাস্টমস, স্টেট বর্ডারে মোতায়েন পুলিশের নজর এড়িয়ে ট্র্যাফিকিং খুব সহজ নয়। হচ্ছে না যে তা বলব না। আমার ধারণা, কলকাতার ভেতরে ট্র্যাফিকারদের নিজস্ব কিছু বেস আছে।'
জয়েন্ট কমিশনার বললেন, 'খুলে বলো কী বলতে চাইছ!'
অর্জুন একবার সৌরভ সান্যালের মুখের দিকে তাকাল। তিনি সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। অর্জুন এবার বলল, 'মাস দেড়েক আগে একটা খবর পেয়ে আমরা একটা ইললিগাল ক্লিনিক রেইড করেছিলাম। নর্থ কলকাতায় গলির ভেতর একটা দোতলা বাড়ি, বাইরে থেকে দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। ভীষণ শ্যাবি আর অন্ধকার। নীচের তলায় একটা মেস চলে। ওপরে ইললিগ্যাল অ্যাবোর্শন সহ আরও বেশ কিছু ছোটোখাটো সার্জারি হত। ক্লিনিকটির কোনো রেজিস্ট্রেশন ছিল না।
'সেখান থেকে আমরা তিনজনকে অ্যারেস্ট করেছিলাম। তারা সকলেই ওখানকার এমপ্লয়ি, কেউ বিশেষ কিছু ইনফরমেশন দিতে পারেনি। কিন্তু সেখানে আমরা আর একটা জিনিস পেয়েছিলাম।'
অর্জুন একটু থামল। সকলের দৃষ্টি তার দিকেই নিবদ্ধ। একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে সে বলল, 'দুটো কারটন ভরতি সেলসিয়রের পাউচ উদ্ধার হয়েছিল সেখান থেকে।'
'সেলসিয়র?' ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার।
'হ্যাঁ স্যার। সেলসিয়র অরগ্যান প্রিজার্ভ করার কাজে ব্যবহার করা হয়। আমরা সেই ক্লিনিকের মালিকের খোঁজ শুরু করি। জানা যায়, ওই বাড়ির ওপরের তলাটা ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। ভাড়াটের নথি যা দিয়েছিল, সব ভুয়ো। ওখানকার যে এমপ্লয়িদের অ্যারেস্ট করা হয়েছিল, তারাও তাদের এমপ্লয়ারের সম্পর্কে কোনো আলোকপাত করতে পারেনি। তিনজন ভিজিটিং ডক্টর নাকি ছিলেন। তাদের ডিটেলস নিয়ে দেখা গেল সেগুলোও ভুয়ো। তবু আমরা চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সেরকম কিছুই ব্রেক-থ্রু আমাদের হাতে আসেনি আর। অবশ্য আমাদের ওই এলাকার সোর্সরা এখনও চেষ্টা করছে।'
সৌরভ সান্যাল বললেন, 'এই ধরনের আনরেজিস্টার্ড ক্লিনিক শহরে অনেক আছে। সেগুলিতে সব যে লিগাল কাজকর্ম হয়, তাও নয়। এর আগেও আমরা এরকম অনেক ক্লিনিকে রেইড করেছি, ধরপাকড় করেছি। কিন্তু সেগুলো বড়ো ব্যাপার কিছু নয়। এই ক্লিনিকটার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল। আপনার মনে আছে কি না জানি না, কয়েক বছর আগে এই শহরের একজন ডক্টর নিজের বাড়ি থেকে রাতে বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি। বাড়িতে বলে বেরিয়েছিলেন, হঠাৎ করেই একটা সার্জারির জন্য ডাক এসেছে, বাড়ি ফিরে রাতের খাবার খাবেন। কিন্তু আর ফিরে আসেননি। সেই সময়েও আমরা অনেকগুলো ক্লিনিকে রেইড করেছিলাম। কলকাতার বে-আইনি ক্লিনিকগুলোতে কী কী হয় দেখে চমকে উঠেছিলাম।
'তারপর থেকেই মাঝেমধ্যেই এরকম রেইড চালাই আমরা। রেজিস্ট্রেশন না থাকার কারণে, অথবা বে-আইনি সার্জারির জন্য আমরা অনেক ক্লিনিক বন্ধ করে দিয়েছি। কিন্তু অর্গান ট্র্যাফিকিং-এর কোনো সূত্র পাইনি। তবে আমার ধারণা, এই ক্লিনিকগুলোর আড়ালে অনেক বড়ো র্যাকেট চলে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও আমাদের হাতে কিছু আসেনি। কোনো পোক্ত প্রমাণ জোগাড় করতে পারিনি আমরা। তবে চেষ্টা চালাচ্ছি।''
জয়েন্ট কমিশনার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। গভীরভাবে কিছু যেন ভাবছেন তিনি। তারপর বললেন, 'এই ধরনের ক্লিনিকগুলোর ওপর নজর রাখুন। তা বলে শহরের নামজাদা হাসপাতাল, ক্লিনিকগুলোকেও হিসেবের বাইরে রাখবেন না। ছোটো ক্লিনিকগুলো হয়তো ব্যাক-আপ বা ইমার্জেন্সি বেস হিসেবে ইউজ হতে পারে, অথবা ওয়ারহাউস হিসেবে, কিন্তু অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর বিজনেস চালাতে হলে ইনফ্রা-স্ট্রাকচার দরকার হয়। দক্ষ ডাক্তার দরকার হয়। সেগুলো বড়ো হসপিটাল ছাড়া সম্ভব নয়। আজ কিছুক্ষণ আগে হেলথ সেক্রেটারি অদ্বৈত মুখার্জি আমায় ফোন করেছিলেন। খবরটা তাঁর কানেও পৌঁছেছে। আমার কাছে রিপোর্ট চেয়েছেন তিনি। তিনি নিজেও যথেষ্ট চিন্তিত।'
সৌরভ সান্যাল বললেন, 'আমরা চেষ্টা করছি স্যার। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনি রিপোর্ট পেয়ে যাবেন।'
রাত গভীর হলে গাড়িটা এসে দাঁড়ায় গেটের সামনে। আজ প্রথম নয়, বরাবরই আসছে। যবে থেকে লালন এখানে এসেছে, তখন থেকেই দেখছে ব্যাপারটা। রোজ অবশ্য নয়, তিন-চার মাস পরপর আসে। কখনও আবার অনেকদিন আসে না। কিন্তু গাড়িটাকে বড্ড ভয় পায় লালন।
মা-কে লালনের মনেও পড়ে না। জ্ঞান হওয়া ইস্তক একটা পাগলাটে, মাতাল, হিংস্র, বুড়োটে লোককে বাবা হিসেবে জেনেছে। লোকটা সারাদিন কোথায় থাকত কে জানে! কোনোদিন মাঝরাতে, কখনো ভোররাতে তাদের বস্তির দরমার ঘরে টলতে টলতে ফিরে আসত। লালন ঘাপটি মেরে বিছানায় মুখ গুঁজে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকত। কারণ জেগে থাকলেই কপালে জুটত বেদম মার। ঘরে ঢুকেই চিৎকার করতে থাকত, নর্দমার জলের মতো খিস্তি-খেউড়ের বান ডাকত। লালন টের পেত সব। আরও বেশি করে বিছানার মধ্যে মুখ গুঁজে থাকত। কিছুতেই চোখ খুলত না। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই এক-একদিন টের পেত লোকটা ঘরের মধ্যেই গলগল করে বমি করছে। দুর্গন্ধে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে যেত। লালন নড়ত না তবু।
সেইসব দিনগুলো ছিল নরকের চেয়েও ভয়ংকর। তারপর একদিন আর বাবা বাড়ি ফিরল না। দু-দিন, তিনদিন করে সপ্তাহখানেক কেটে গেল। স্টেশনে ভিক্ষা করে নিজের পেট চালাতে শুরু করল লালন। বাবার অনুপস্থিতির জন্য কোনো দুঃখবোধ ছিল না। বরং স্টেশন চত্বরে কিছু বন্ধু জুটেছিল তার। ভালোই ছিল। প্রথম প্রথম সামান্য দ্বিধা থাকলেও ধীরে ধীরে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে বিড়িতে সুখটান দিতে শিখেছিল। আরও হয়তো অনেক কিছু শিখত, কিন্তু তার আগেই দাদামণির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
দমদম, বিধাননগর স্টেশনের সব বাচ্চাদের কাছে উত্তীয় সোম তাদের দাদামণি। উত্তীয় সোম পেশায় অধ্যাপক, নেশায় সমাজসেবী। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল ছাত্র উত্তীয় পিএইচডি করার পর সেখানেই লেকচারার হিসেবে জয়েন করে। বয়স তিরিশ, দীর্ঘদেহী এই সুদর্শন যুবকটি সেই কলেজে পড়ার সময় থেকেই পথশিশুদের নিয়ে কাজ করে চলেছে। শুরুতে সঙ্গে বেশ কিছু বন্ধুবান্ধবও ছিল। তারপর যা হয়, প্রারম্ভিক উত্তেজনা কেটে গেলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে তারা খসে পড়েছে। কিন্তু উত্তীয় সোম কিন্তু এই বাচ্চাগুলোকে ছেড়ে যায়নি। স্টেশন চত্বরের এই ঘরহারা, বয়ে যাওয়া বাচ্চাগুলোর জন্য উত্তীয় সোমই তাদের আপনজন, তাদের সকলের দাদামণি।
লালনের সঙ্গে দাদামণির পরিচয়ের প্রথম দিনটা কোনোদিন ভুলবে না লালন। তখন খোঁড়া শম্ভু হপ্তায় একবার আসত টাকা নিতে। লালন সেই বয়সেই জেনে গেছিল, এই দুনিয়ায় বিনামূল্যে কিছু মেলে না। সরকারের তৈরি স্টেশন চত্বরে মাথা গোঁজার জন্যও মূল্য দিতে হয় বই কি! সরকারকে না হোক, খোঁড়া শম্ভুকে দিতে হয়। নগদে দিতে না পারলে গতর দিয়ে দাম চোকাতে হয়। তা সে টাকা দিয়ে হোক, বা রাতের অন্ধকারে শরীরী খেলায়। সেলামি মাফ হলে পেটটা একটু বেশি ভরে।
লালন ভেবে নিয়েছিল, এভাবে আর চলছে না। এবার খোঁড়া শম্ভুর কাজ শিখেই নেবে। ছোটোখাটো চুরি, পকেট কাটা বই তো নয়! শিখতে শুরুও করেছিল ভোলা, শিবু, রববানিদের থেকে। ভিড়ের মধ্যে পার্স, মোবাইল ফোন নিঃশব্দে উঠিয়ে নিতে পারছিল লালন। আরও ক-দিন লেগে থাকতে পারলে সেলামিটা পুরোপুরি মাফ করিয়ে নিতে পারত সে। কিন্তু তার আগেই দাদামণি এলেন। সব ওলটপালট হয়ে গেল লালনের। জন্মাবধি ভালোবাসা কোনো চিড়িয়ার নাম না-জানা লালনের মনের ভেতর প্রথমবার বিস্ফোরণ ঘটে গেছিল। এতদিনের চেনা পৃথিবীটাকে অন্যরকমভাবে দেখতে শিখিয়েছিল লালনদের দাদামণি। প্রথমবারের জন্য লালনের মনে হয়েছিল, সব খারাপ নয়, সবাই খারাপ নয়। অন্তত ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মূল্য দিতে হয় না।
লালন দেখেছিল, ওর বন্ধুরা দাদামণিকে এড়িয়ে চলে। কারণ খোঁড়া শম্ভু দাদামণিকে পছন্দ করে না। বন্ধুরা সাবধান করে দেয় লালনকে। ওরা দাদামণির থেকে সাহায্য নেয়, আবার দাদামণি বেরিয়ে গেলেই নিজের স্বরূপে ফিরে আসে।
ভালো লাগত না লালনের। এই স্টেশন চত্বর, এই অপরাধের জগৎ, অন্ধকার হলেই খোঁড়া শম্ভুর ভয়ে লুকিয়ে থাকার জীবন বিষ লাগতে শুরু করেছিল তার। ইচ্ছে হচ্ছিল এই পরিবেশ থেকে দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে। লেখাপড়া শিখে সুস্থ জীবনে ফেরার একটা অসম্ভব ইচ্ছে উঁকি দিচ্ছিল লালনের মনে।
ইচ্ছে, শুধুই ইচ্ছে। সেই ইচ্ছে যে সফল হতে পারে, এমন সুদূরপরাহত স্বপ্ন লালনের মতো মাটিতে মুখ গুঁজে বড়ো হওয়া ছেলেরা দেখে না। লালনও দেখেনি কোনোদিন। কিন্তু সেটাই ঘটিয়ে বসল দাদামণি। কী জানি কী দেখেছিল সে লালনের মধ্যে, জিজ্ঞাসা করল একদিন, 'এখান থেকে বেরোতে চাস, লালন?'
লালন অবাক হয়ে দাদামণির মুখের দিকে তাকিয়েছিল। ঠোঁট কাঁপছিল তার। মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছিল না। গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকাচ্ছিল। বারবার ঢোক গিলেও যাচ্ছিল না কিছুতেই।
দাদামণি লালনের পিঠে হাত রেখে বলেছিল, 'আমি তোর জন্য সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি লালন। আগামী সোমবার এখান থেকে বেরিয়ে উল্টোডাঙা ফ্লাই-ওভারের ঠিক পাশের গলিতে নিতুর দোকানে দাঁড়াবি বেলা বারোটায়। ভুলেও যেন বলবি না কাউকে। পুলিশ নিয়ে এসে তোকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যেতে পারতাম, কিন্তু তাহলে আমি এখানে আর কাজ করতে আসতে পারতাম না। শম্ভু আমাকে এখানে কাজ করতে দিত না। তুই বুঝতে পারছিস তো?'
টক করে এক পাশে ঘাড় কাত করেছিল লালন। কাউকে কিচ্ছু বলেনি সে। রাতে ঘুমোতে পারেনি উত্তেজনায়। প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত অতি দীর্ঘ বলে মনে হয়েছে। শুধু সময় গুনেছে লালন, কবে আসবে সোমবার, কখন বাজবে বারোটা! যদি এখান থেকে বেরোতে না পারে! বন্ধুরা 'কোথায় যাচ্ছিস' জিজ্ঞাসা করলে কী বলবে সে! যদিও লালন ভালো করেই জানে দিনের বেলা এই চত্বরে সকলেই পেটের ধান্দায় ঘোরে, কেউ কারও খোঁজ রাখতে যায় না। তবু যদি! এই 'তবু যদি...!'-তে রাত কেটে গেছে। প্রশ্নের পর প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে, নানান পরিস্থিতি কল্পনা করে ঘেমে-নেয়ে উঠে বসেছে।
তারপর এক সময় সোমবার দুপুর হয়েছে। দাদামণি নিজের কথা রেখেছে। ঠিক বারোটার সময় একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়িয়েছিল সেদিন নিতুদার দোকানের সামনে। দরজা খুলতেই পেছনের সিটে গিয়ে উঠে বসেছিল লালন। সামনে ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে হেসেছিল দাদামণি। নরম গলায় জিজ্ঞাসা করেছিল, 'খুব চিন্তা করছিলি নাকি?'
দু-দিকে সজোরে মাথা নেড়েছিল লালন। দাঁত বের করে হেসেছিল সে-ও। তারপর জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে চোখ রেখেছিল রাস্তায়। জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়েছিল সে। খোলা জানলা দিয়ে ধুলো-ধোঁয়া মাখা মহানগরের দূষিত হাওয়া তার মুখে আদরের পরশ বুলিয়ে যাচ্ছিল। সব কিছু ভালো লাগছিল লালনের। মনে হচ্ছিল, এত আলো, এত বাতাস সে এ জীবনে দেখেনি।
সেইদিন প্রথম দাদামণির সঙ্গে লালন পা রেখেছিল এই নব দিগন্ত সেবাশ্রমে। নামে অনাথ আশ্রম, তা বলে সকলে যে এখানে পিতৃমাতৃহীন, তা নয়। অনেকের বাবা-মা থেকেও নেই। সন্তান প্রতিপালন করার সামর্থ্য নেই, কিন্তু জন্ম দিয়ে গেছে অকাতরে। স্বাভাবিকভাবেই সেইসব অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানদের ঠাঁই হয়েছে এই হোমে।
সেদিনের পর থেকে লালন এখানেই আছে। মাঝেমধ্যে দাদামণি আসে তার সঙ্গে দেখা করতে। এখানে খাওয়া-পরার কষ্ট নেই। লেখাপড়াও শেখানো হয় তাদের। মাসে দু-বার নিয়ম করে ডাক্তারবাবু আসেন তাদের পরীক্ষা করতে। এখানে ছেলেদের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে লালনের।
দাদামণি জিজ্ঞাসা করে, 'কেমন আছিস? এখানে ভালো লাগছে তো?'
কী বলবে লালন? দাদামণির জন্যই এমন একটা নিশ্চিন্ত জীবন পেয়েছে সে। কৃতজ্ঞতায় গলা বুজে আসে তার। চোখ ছলছল করে। দাদামণি পিঠ চাপড়ে হেসে বলে, 'ধুর পাগল, কাঁদিস কেন? মন দিয়ে লেখাপড়া করবি। অনেক বড়ো হতে হবে কিন্তু তোকে। কেমন?'
লালন ঘাড় নাড়ে। সে জানে, অনেক বড়ো হতে হবে তাকে, অনেক। দাদামণি বলেছে যে!
গাড়িটাকে প্রথমবার দেখে কিছু ভাবেনি লালন। সারাদিন কত গাড়িই তো আসে। তাতে কী? যে রাতে গাড়িটা এল, তার পরদিনই সৌরভ বলে ঢ্যাঙামতো ছেলেটাকে আর পাওয়া গেল না হোমে। যথা নিয়মে পুলিশে ডায়েরি করা হল। হোমে পুলিশ এল, সকলে জিজ্ঞাসাবাদ করল। প্রথম প্রথম ঘন ঘন এল, তারপর কিছুদিন পরপর। তারও পর আস্তে আস্তে থিতিয়ে পড়ল ব্যাপারটা।
প্রায় মাস পাঁচেক পরে আবার এক রাতে এল গাড়িটা। চলেও গেল। পর দিন কিছু হল না। তার পর দিন ডাক্তারবাবু এলেন। সবার পরীক্ষা করলেন। তারপর চলে গেলেন তিনি নিয়ম মতো। এর ঠিক দুই দিন পর একদিন সকালে লিয়াকতকে আর হোমে খুঁজে পাওয়া গেল না। আবার পুলিশ এল, তদন্ত হল। শিশু সুরক্ষা কমিটির প্রতিনিধিরা এলেন। হোম পরিদর্শন করে সন্তুষ্ট হয়ে সার্টিফিকেট দিলেন। বাচ্চাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সাধ্যমতো দেখা হয় এখানে। কোনো ছেলে কোনো অভিযোগ জানায়নি। খাবারের মান ভালো, সুপার ও অন্যান্য কর্মীদের ব্যবহার ভালো। বাচ্চাদের যথেষ্ট যত্ন নেওয়া হয়। তাদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার ব্যাপারে খেয়াল রাখা হয়। হোমের পরিবেশ বেশ পরিচ্ছন্ন। আর কী চাই!
তখনও লালন ব্যাপারটা ঠিক খেয়াল করেনি। কিন্তু এর পরের ঘটনাটা ঘটল, ঠিক তিন মাসের মাথায়। ছেলেটা নতুন এসেছিল। সরকারি খাতায় এন্ট্রিও হয়নি। তার আগেই গায়েব হয়ে গেল। এবার আর পুলিশ এল না। কেউ কোনো কথা বলল না। দু-একজন জিজ্ঞাসা করেছিল। তারা জানল, ছেলেটার বাড়ির লোক ওকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে, যদিও তাকে হোম থেকে নিয়ে যেতে কাউকে কেউ দেখেনি। কিন্তু লালন দেখেছে, দু-দিন আগেই গাড়িটা এসেছিল।
তার পরেও কয়েক বার এসেছে গাড়িটা। প্রতিবারই কাউকে না কাউকে তারপর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। লালন অনেকবার ভেবেছে দাদামণিকে সব খুলে বলবে। কিন্তু বলতে পারেনি। দাদামণি তাকে রাস্তা থেকে তুলে এনে এখানে রেখেছে। নিজের বিপদের সম্ভাবনা অগ্রাহ্য করেও নরক জীবন থেকে বাঁচিয়েছে তাকে। আর ওখানে ফিরে যেতে চায় না লালন। সে এখানেই থাকবে। এখানে অন্তত তিন বেলা ভর পেট খাবার তো জুটছে!
কাল রাতে আবার এসেছিল গাড়িটা। লালনের চৌকি একদম জানলার পাশে। এখান থেকে সামনের রাস্তা, গেট পরিষ্কার দেখা যায়। কে এল, কে বেরোল সব দেখতে পায় লালন। এখন সে অনেক কিছু জানে। কিন্তু এসব কথা কাকে বলবে সে? দাদামণিকে? বলা কি উচিত হবে? ভাবতে থাকে লালন। এই কম বয়সেই অনেকটা জীবন দেখে ফেলেছে লালন। দাদামণিকে পেয়েছে। অথচ কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারে না সে। দাদামণির দুশ্চিন্তা সে বাড়াতে চায় না। তাই দাদামণি যখন জিজ্ঞাসা করে, 'কেমন আছিস? সব ঠিক আছে তো?' তখন লালন হাসিমুখে মাথা নাড়ে। কিন্তু তার ভাবনাটা যায় না। সে ভাবতেই থাকে, এবার তাহলে কার পালা!
তবে একজনকে সে বলেছে তার ভয়ের, সন্দেহের কথা। নব দিগন্ত হোমে মালির কাজ করে জসীমচাচা। স্থায়ী কর্মী নয়, দিনমজুর। লালনকে খুব ভালোবাসে জসীমচাচা। মাটিতে খুরপি চালাতে চালাতে বিড়বিড় করতে থাকে দিনভর। চাচা বলেছেন, লালনের কোনো ক্ষতি হতে দেবে না।
মা-বাবা হানিমুনে গেছে। যদিও এই কথাটা ওদের সামনে বলতে গিয়ে মায়ের কাছে ধমক খেয়েছি। বাবা অবশ্য খুব স্পোর্টিংলি নিয়েছে। একগাল হেসে বলল, 'তা বলতেই পারিস। বিয়ের সময় জয়েন্ট ফ্যামিলিতে থাকতাম। বিয়ের এক বছর পরে পুরীতে বেড়াতে যাওয়া হয়েছিল বটে, তবে সেটা তেরোজন মিলে। আমার বাবা কিছুতেই হোটেলে অজাত-কুজাতের হাতের রান্না খাবেন না। তাই তোর মাকে সেখানে গিয়েও রান্নাবান্না করতে হয়েছিল। তার পরবর্তীকালে অনেক জায়গায় বেড়াতে যাওয়া হয়েছে অবশ্য, কিন্তু তোর মায়ের দুঃখটা আজও গেল না।'
এসব গল্প আমার অনেক আগে থেকেই মায়ের মুখে বহুবার শোনা। আমি ছোটো থাকতে যেখানেই যাওয়া হত, আমাকে সঙ্গে করেই যেত। তারপর ওদেরও বয়স হল। শরীর ভালো যায় না বলে মা আজকাল আর কোথাও যেতেই চায় না। বাড়িতে বসে থেকে কেমন যেন খিটখিটে হয়ে গেছে। আমাকে নিয়ে খুব চিন্তা করে।
দিন পনেরো আগে আমিই টিকিটটা বুক করেছিলাম। তারপর অনলাইনে হোটেল বুক করে ওদের জানিয়ে দিয়েছিলাম, 'তোমরা হানিমুনে যাচ্ছ।'
'মানে? কোথায়?' চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞাসা করেছিল বাবা।
'মানে, যা বললাম তাই। আর যাচ্ছ গোয়াতে', মুচকি হেসে বলেছিলাম আমি।
'গোয়াতে? এই বয়সে গোয়াতে? ফাজলামো হচ্ছে?' মা আর্তনাদ করে উঠেছিল প্রায়।
আমি মুখ গম্ভীর করে উত্তর দিলাম, 'কেন নয়? বয়স-টয়েস আবার কী? আমি তো তোমার জন্য টু পিস সুইম স্যুটও অর্ডার করে দিয়েছি।'
কথাটা শেষ করার আগেই মায়ের মুখ দেখে হেসে ফেলেছিলাম। মা বুঝে গেছিল, আমি ইয়ার্কি মারছি। মুখ গম্ভীর করে বলেছিল, 'বাহ বাহ, ওই শিখেছ। মা-বাবার সঙ্গে ফাজলামো করছ!'
বাবা তাড়াতাড়ি আসরে নেমেছিল তখন। বলেছিল, 'আরে তাতে কী? ছেলে-মেয়ে বড়ো হলে বন্ধু হয়ে যায়, জানো না? যাক গে, তুই তোর মায়ের কথা ছাড় তো! আমার জন্য দুটো জংলা ছাপ হাওয়াই শার্ট অর্ডার করেছিস তো? আর শোন, কাল সাউথ সিটিতে গিয়ে দুটো রে-ব্যানের সানগ্লাস কিনতে হবে, আর সঙ্গে স্ট্র-এর টুপি।'
আমি চোখ পাকিয়ে বললাম, 'শখ মন্দ নয়। কোনো গোয়া-ফোয়া যাওয়া হবে না। তীর্থ করার বয়সে গোয়া যাওয়ার শখ, না?'
বাবা কাঁধ নাচিয়ে বলল, 'তীর্থে তুই যা। আমি তো গোয়াতেই যাব।'
হেসেছিলাম। বাবার চোখের খুশিটা দেখতে খুব ভালো লাগছিল। টিকিট দুটো আর হোটেল বুকিং-এর কাগজপত্র বাবার হাতে দিয়েছিলাম। চোখ বুলিয়ে দেখে বাবার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। গোয়া নয়, পনেরো দিনের কেরালা টুর। হোটেলে, হাউসবোটে থাকা, কুন্নুর, কোদাইকানাল, ত্রিবান্দ্রম সহ অন্যান্য জায়গায় ঘোরার পুরো ট্যুর প্ল্যানটা ছকে দিয়েছিলাম। গত এক মাস ধরে প্ল্যানটা করেছি আমি।
সব দেখে-শুনে মা বলেছিল, 'তুই যাবি না?'
'হ্যাঁ মা, তা আবার যাব না?' হেসে বলেছিলাম, 'তুমি আমার হয়ে আমার প্রোজেক্ট ম্যানেজারকে একটু বলো না আমাকে পনেরো দিনের ছুটি দিতে। তবে তারপর যদি আমার চাকরিটা আর না থাকে, তবে কিন্তু তোমাদের যাওয়াও ক্যানসেল হয়ে যাবে, সেটা ভেবে যা করার ক'রো।'
'যত্তসব বাজে চাকরি। বেড়ানোর জন্য ছুটি দেবে না?'
'ঠিক বলেছ মা জননী, যাচ্ছেতাই চাকরি! তবে স্যালারিটা মাস শুরুর আগেই দিয়ে দেয় কি না, নেহাত সেই লোভটা কাটাতে পারছি না বলে চাকরিটাও ছাড়তে পারছি না। যেদিন মোহমুক্ত হতে পারব, সেদিনই রেজিগনেশন লেটারটা ম্যানেজারের মুখে ছুড়ে দিয়ে মায়ের মেয়ে মায়ের কোলে ফিরে আসব।'
'আসল কথাটা বল তো? আবার টাপুরের কোনো কেস এসেছে, না? সেই জন্য আমাকে আর তোর বাবাকে এখান থেকে তাড়াতে চাইছিস?' ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করেছিল মা।
আমি নাটুকে ভঙ্গিতে গলা ছুঁয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে গলা কাঁপিয়ে বলেছিলাম, 'মাক্কালী, আয়ি শপথ! ছি ছি মা, তুমি আমায় সন্দেহ করছ? একমাত্র মেয়েকে সন্দেহ? কী দিনকাল এসে গেল, মাইরি! এ জীবন রেখে আমি কী করব?'
'চোপ', হেসে ফেলেছিল মা, 'কীসব গাঁইয়াদের মতো ভাষা হচ্ছে তোমার, মিতুল? খুব নাটক শিখেছ, না? টিকিট যখন কেটে ফেলেছ, যাব'খন। কিন্তু তুমি টাপুরের সঙ্গে টইটই করে চোর গুন্ডা-বদমাশ ধরতে বেরোবে না, বলে দিলাম।'
'একদম না। কক্ষনো না। নেভার', জোর দিয়ে বলেছিলাম আমি।
বাবা এতক্ষণ নীরব শ্রোতা হয়ে বসে ছিল। আমার আর মায়ের বাকবিতণ্ডা মন দিয়ে শুনছিল আর মুচকি মুচকি হাসছিল। এবার বলল, 'ব্লাফ দিও না মামণি। যা করবে, বুক চিতিয়ে বীরের মতো করো। মা-কে বলে দাও যে, আমরা বাড়ি থেকে বেরোনো মাত্র তুমিও গাড়ি বের করে টাপুরের ফ্ল্যাটে রওনা হবে।'
চোখ কটমট করে বাবার দিকে তাকালাম।
তারপর মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বললাম, 'অত ভয় পাও কেন মা? তোমার মেয়ে দিনের শেষে তোমার কাছেই ফিরবে। আজ অবধি টাপুরদি আমার কোনো ক্ষতি হতে দিয়েছে কখনো, মনে করে বলো তো?'
'আমার ভয় করে', গোঁয়ার বাচ্চার মতো বলেছিল মা।
আমিও মায়ের গালে চকাস করে চুমু খেয়ে বলেছিলাম, 'ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমার মেয়ে মরবে না। যাও তো, সুটকেস গোছানো শুরু করো, শপিং-টপিং যা যা করতে হবে লিস্ট করে রেখো, উইকএন্ডে কিনে ফেলা যাবে।'
বাবার কথাটা সেদিন ভুল ছিল না। বাবা-মা-কে এয়ারপোর্টে ছেড়ে বাড়ি ফিরছি, এমন সময়ে টাপুরদির ফোনটা এসেছিল, 'ফ্রি আছিস?'
ব্লুটুথ স্পিকার অন করে উত্তর দিয়েছিলাম, 'হুম, ভিআইপি রোডে অফিস আওয়ারে ড্রাইভ করাকে যদি ফ্রি থাকা বলা যায়!'
'কাকু-কাকিমাকে রওনা করিয়ে দিয়েছিস?'
'হ্যাঁ, এয়ারপোর্টে ঢুকিয়েই ফিরছি।' বললাম আমি।
'চলে আয়।' ওদিক থেকে বলল টাপুরদি।
'কেস?' উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'জানি না এখনও। একজন দেখা করতে আসছে', বলল টাপুরদি।
'কে গো? কী কেস?' জিজ্ঞাসা করলাম।
'কী কেস জানি না, কিন্তু মানুষটাকে চিনি। ওর নাম উত্তীয় সোম, আমার সঙ্গে কলেজে পড়ত।'
'তোমার এক্স?' ফিক করে হেসে জিজ্ঞাসা করলাম।
'মারব এক থাপ্পড়!' কপট রাগত স্বরে বলল টাপুরদি, 'চলে আয় তাড়াতাড়ি।'
ভিআইপি রোডের ট্র্যাফিক ঠেলে টাপুরদির বাড়ি পৌঁছোতে সাড়ে দশটা বাজল। দরজা খুলে হাসি মুখে অভ্যর্থনা করল টাপুরদি, 'আয়, ভেতরে আয়।'
আটপৌরে সুতির চুড়িদার পরেছে টাপুরদি। গোলাপির ওপর সাদা চিকনের কাজ। ভেজা চুল পিঠে ছড়ানো। এই সকালে কী তরতাজা লাগছে টাপুরদিকে! মাঝে একটু ওজন বেড়েছিল, যোগাসনের সময় বাড়িয়ে বাড়তি মেদ ঝরিয়ে ফেলেছে এক মাসেই। এখন টাপুরদিকে আরও ফিট দেখাচ্ছে; আরও বেশি ঝকঝকে সুন্দর।
'কী সুন্দর লাগছে তোমাকে!' কাঁধের ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে দিয়ে বললাম।
'তোর চা ডাইনিং টেবিলের ওপর ঢাকা আছে। এখনই বানালাম। নিয়ে নে।'
'কখন আসবে তোমার ক্লায়েন্ট, আই মিন তোমার বন্ধু কাম এক্স?' চায়ের কাপটা নিয়ে এসে সোফায় বসে জানতে চাইলাম আমি।
'আবার?' চোখ পাকিয়ে বলল টাপুরদি।
'আচ্ছা বাবা আচ্ছা, তোমার বন্ধু। কখন আসবে?'
'ফোনে বলল, জরুরি দরকার। ফোনে বলতে পারবে না। তাই আজ সকালে বাড়িতে আসতে বলেছি। এখনই আসার কথা', ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল টাপুরদি।
চায়ের কাপে দ্বিতীয় চুমুক দেওয়ার আগেই কলিং বেলটা বেজে উঠল। টাপুরদি উঠে গিয়ে দরজা খুলল। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলাম বেশ লম্বা চেহারার এক ভদ্রলোক ভেতরে এলেন। পরনে জিনসের ওপর মরচে রঙের খাদির পাঞ্জাবি। মাথার চুল উশকোখুশকো, চোখে চশমা। সম্ভবত ইনিই উত্তীয় সোম। ভদ্রলোক দুর্দান্ত রকমের সুদর্শন, সেটা না মেনে উপায় নেই। অনেকটা যৌবনের গুরু দত্তের মতো দেখতে। এখন রোদে পুড়ে বাদামি ছোপ পড়লেও দেখে বোঝা যায় ভদ্রলোকের গায়ের রং বেশ ফর্সা। বয়স টাপুরদির মতোই, ত্রিশের আশেপাশে হবে। তবে দেখে মনে হল কোনো কারণে তিনি যথেষ্ট উদবেগের মধ্যে আছেন।
টাপুরদির দিকে তাকিয়ে উত্তীয় সোম মুখে হাসি টেনে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কেমন আছিস সঙ্ঘমিত্রা?'
টাপুরদি হাসিমুখে মাথা নাড়ল। বলল, 'আমি ভালো আছি। তুই আগে বোস, তারপর সব কথা হবে।'
বাইরে যথেষ্ট গরম। বেশ ঘামছেন উত্তীয় সোম। টাপুরদি রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস জল এনে সামনে রাখল। ঢকঢক করে পুরো জলটাই খেয়ে নিলেন। তারপর হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুখ মুছে বললেন, 'একটা ছেলে হারিয়ে গেছে। মানে, একজনের বেশিও হতে পারে। অনেকে হতে পারে। ক-জন জানি না আমি।'
টাপুরদি স্থির দৃষ্টিতে ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকাল। তারপর বলল, 'আমার মনে হচ্ছে তুই খুব ডিসটার্বড আছিস। মন শান্ত কর। আমাকে পুরো ঘটনাটা খুলে বলতে হবে। নইলে বুঝব কী করে?'
উত্তীয় সোম কেমন অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন টাপুরদির মুখের দিকে। তারপর বললেন, 'খুব বড়ো বিপদ হয়ে গেছে রে সঙ্ঘমিত্রা! সব আমার জন্য হল। আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। খুব খারাপ মানসিক অবস্থায় আছি আমি। গত প্রায় এক সপ্তাহ সারা শহরে পাগলের মতো ঘুরেছি। সর্বত্র খুঁজেছি, লালনকে কোথাও খুঁজে পাইনি।'
উত্তীয় সোমের কথা বিন্দুমাত্র বুঝতে পারছি না। তবু এবার টাপুরদি আর কিছু বলল না। উত্তীয়বাবুকে বলতে দিল। উত্তীয় সোম বলে চললেন, 'তোকে সব কথা বলব বলেই আজ এসেছি। কিন্তু ঠিক কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না।
'এক শহরে থেকেও অনেকদিন তোর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। যাদবপুরে তুই ছিলি ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। আমি কম্পারেটিভ লিটারেচারে। ডিগ্রি নিয়ে তোরা পাশ করে বেরিয়ে গেলি। আমি ওখান থেকে মাস্টার্স করেছি। তারপর পিএইচডি। এখন আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপারেটিভ লিটারেচার বিভাগে অধ্যাপনা করি। এটা ছাড়াও আর একটা কাজ করি আমি। সেটা অবশ্য আমার পেশা নয়। টুকটাক সামাজিক কাজ, ধর স্ট্রিট চাইল্ডদের জন্য, হোমলেস বয়স্ক মানুষদের জন্য কাজ করে থাকি। এদের পথ থেকে তুলে এনে একটা সুস্থ জীবন দেওয়াই আমার লক্ষ্য। গত প্রায় দশ বছর ধরে কাজ করি আমি।
'তুই হয়তো জানিস, আমি নিজে অনাথ। খুব ছোটোবেলায় বাবা-মা দু-জনকেই হারিয়েছি। দাদুর কাছে বড়ো হয়েছি। আমার যখন সতেরো বছর বয়স, তখন দাদুও চলে গেলেন। মাথার ওপর ছাদ না-থাকা, স্নেহের ছায়া না-থাকার কষ্ট আমি বুঝি। তাই পথশিশুদের নিয়ে কাজ করে শান্তি পাই। আমি জানি না তুই পথশিশুদের সম্পর্কে কতটা জানিস, কিন্তু বিশ্বাস কর আমরা নিউজপেপার, টিভি দেখে যেটুকু ধারণা করতে পারি, সেটা আসলে হিমশৈলের চুড়ো। ওদের জীবন আসলে নরকের চেয়েও খারাপ। কচি বয়স থেকে ওরা চরম দারিদ্র্য, খিদে, অত্যাচার, অপমান সয়ে বড়ো হতে থাকে। খোলা আকাশের তলায় কোনো নিরাপত্তা থাকে না। দিনের পর দিন সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স চলে ওদের ওপর। ধীরে ধীরে ওদের মধ্যেকার সুকুমার প্রবৃত্তিগুলো মরে যায়। চারপাশের পৃথিবী, এই সমাজ ও মানুষকে ঘৃণা করতে শেখে ওরা। এদের থেকে বেশিরভাগই হয় সমাজবিরোধী তৈরি হয় আর কলজের জোর না থাকলে ভিক্ষা করে খায়। আমার লড়াই এই এদের জন্যই। এদের একটু সুস্থ জীবন দেওয়ার জন্যই এতদিন ধরে লড়াইটা চালিয়ে এসেছি।'
এই পর্যন্ত বলে উত্তীয় সোম একটু থামলেন। আমরা এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা শুনছিলাম। এবার বললাম, 'আপনার কাজটা খুব ইন্টারেস্টিং, উত্তীয়বাবু!'
উত্তীয় সোম হাসলেন। বললেন, 'আমাকে বাবু-টাবু ডাকবেন না, অস্বস্তি হয় খুব। আর ওই আপনিটাও বাদ দিলে ভালো হয়। কথা বলতে সুবিধে হয়। আসলে আমার নিজের মুখেও 'আপনি', 'আজ্ঞে'টা ঠিক আসে না। আমার কলেজের ছাত্ররাও আমাকে স্যার নয়, উত্তীয়দা বলে ডাকে।'
আমি ঝট করে বলে ফেললাম, 'সেই ভালো। আমিও আপনাকে উত্তীয়দা বলেই ডাকব। বাই দ্য ওয়ে, আমার নাম মৈথিলী সেন।'
উত্তীয়দা হাসল। বলল, 'সে আমি দেখেই বুঝেছি যে তুমি মিতুল। সঙ্ঘমিত্রার রহস্যোদঘাটন নিয়ে তোমার লেখা কাহিনিগুলি আমি আগেই পড়েছি। ওকে আমি সেই কলেজ থেকে চিনি। অথচ জানতামই না ওর মধ্যে এমন প্রতিভাও আছে। তোমার লেখাগুলো পড়ে তো আমি অবাক। সত্যি বলতে কী, সেগুলি পড়েই আমার মনে হয়েছিল আমাকে ও-ই হেল্প করতে পারে।'
'বেশ।' হাসল টাপুরদি, 'হেল্প করতে হলে, আগে সমস্যাটা তো জানতে হবে। তাই আগে তোর সমস্যাটা শুনি। তোকে খুব ডিস্টার্বড দেখাচ্ছে।'
উত্তীয়দা এবার উত্তেজিত স্বরে বলল, 'আমি ডিসটার্বড সঙ্ঘমিত্রা, আমি সত্যিই ভীষণভাবে ডিসটার্বড। ঘটনাটা খুলে বলি। আমি যখন কাজ শুরু করেছিলাম, তখন আমার সঙ্গে বেশ কিছু বন্ধুবান্ধব ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমি কিন্তু কাজটা চালিয়ে গেছি। আমার ছাত্রছাত্রীরা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সাহায্য করে, পাশে থাকে।
'কাজ শুরু করেছিলাম শেয়ালদা স্টেশন থেকে। তারপর দমদম, বিধাননগর আরও কিছু জায়গায় বাচ্চাদের নিয়ে কাজটা চালাচ্ছি। কাজটা সহজ নয়। সমাজবিরোধী, লোকাল মস্তান, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিরোধও ফেস করতে হয়েছে আমাকে। মারও খেয়েছি, একাধিকবার অ্যাটাক হয়েছে আমার ওপর। বছর দুয়েক আগের কথা। বিধাননগর স্টেশন থেকে একটা ছেলেকে রেসকিউ করেছিলাম। ছেলেটা অনাথ, নাম লালন। খেয়াল করেছিলাম, বাকিদের মতো ওর মনটা পুরোপুরি দূষিত হয়ে যায়নি। মনে হয়েছিল, ওই পরিবেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া গেলে ছেলেটাকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা যাবে। মায়াও পড়ে গেছিল ওর ওপর।
'একটি এনজিও-র সঙ্গে যোগাযোগ করি। ওদের সাহায্যেই ওকে তুলে আনি। কয়েকটা হোমে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু সেসব জায়গা আমার পছন্দ হচ্ছিল না। বেশিরভাগ হোমেই চূড়ান্ত অব্যবস্থা। বাচ্চাদের পুষ্টির দিকে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখা হয় না। কোথাও কোথাও তো রীতিমতো মারধরও করা হয়। বেশ কয়েক জায়গায় ঘুরে সোনারপুরের দিকে নব দিগন্ত সেবাশ্রমে জায়গা পাওয়া গেল। সব ব্যবস্থা দেখে-শুনে বেশ পছন্দ হল আমার। খুব বেশি বাচ্চা রাখে না ওরা। বেশ কড়া নিরাপত্তা; হোমের চারপাশে উঁচু দেয়াল। খাওয়া-দাওয়া ভালো। বাচ্চাদের হেলথ, হাইজিন মেনটেইন করা হয়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে লালনের থাকার ব্যবস্থা সেখানেই করা গেল।'
'কাঠখড় পোড়ানো বলতে কী বোঝাচ্ছিস?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
উত্তীয়দা থামল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'দেখ, এই কাজগুলো ওপর থেকে যতটা মনে হয়, ততটা সহজ নয়। পুলিশের সূত্রে বাচ্চা নিয়ে গেলে ব্যাপারটা সহজ হয়। কিন্তু আমরা নিজেরা যারা কাজ করি, আমাদের পক্ষে অনেক ধরাধরি, রেফারেন্স ছাড়া হোমে বাচ্চা রাখা সহজ হয় না। এদেশে অনাথ বাচ্চাদের তো অভাব নেই। সেই তুলনায় ক-টাই বা হোম আছে?
'আমার ইউনিভার্সিটির একজন প্রফেসর রুলিং পার্টি নেতাদের কাছের মানুষ। তাঁকে ধরেই ব্যবস্থা করেছিলাম। ভদ্রলোক আমার কাজকম্মো সম্পর্কে জানেন। তাই সাহায্য করতে আপত্তি করেননি। আমাদের কাজে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক মেনটেইন করে চলতেই হয়। নইলে কাজ করা মুশকিল। প্রথম প্রথম বুঝতাম না। পার্টির লোকাল কমিটির ছেলেপিলেরা ভাবত, আমি তাদের সরকারকে নিচু দেখাতে, ইমেজ নষ্ট করতে এসব করছি। মারধরও খেয়েছি। এখন আর এই ভুল করি না।' কথা শেষ করে ম্লান হাসল উত্তীয়দা।
টাপুরদি বলল, 'আচ্ছা, তারপর বল।'
'তারপর লালনকে নব-দিগন্ত হোমে রেখে এলাম। মাঝে মাঝে যেতাম ওর সঙ্গে দেখা করতে। খুশিই ছিল ও। লেখাপড়া শিখতে শুরু করেছিল। চেহারায় ঔজ্জ্বল্য এসেছিল। ওকে দেখে ভালো লাগত আমার। আমরা যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই, এরকম একটা সাফল্যও আমাদের বুস্ট করে; আরও অনেক বাচ্চাকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার ইচ্ছেটা বাড়িয়ে দেয়।'
'সে তো বটেই!' বলল টাপুরদি।
উত্তীয়দা বলল, 'প্রথম বছর কাটল। সব কিছু ভালোই চলছিল। আমিও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। লালন ভালোই ছিল। ওখানে বেশ মানিয়ে নিয়েছিল। আমারও আর ঘন ঘন যাওয়ার দরকার পড়ত না ওখানে। একদিন পেপারে পড়লাম নব দিগন্ত থেকে একটা ছেলে নাকি মিসিং।
'সত্যি বলতে কী, প্রথম প্রথম আমি ব্যাপারটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাইনি। সেটা আমার দোষ। আসলে হোম থেকে ছেলে পালানো খুব কমন ব্যাপার। স্ট্রিট চাইল্ডরা জন্ম থেকে একা একা বড়ো হয় স্বাধীনভাবে। অনেকেরই খুব কম বয়স থেকে নানান রকম নেশা করার অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়। সেই বাধাবন্ধনহীন মুক্ত জীবন থেকে এসে হোমের চার দেয়ালের মধ্যে অনেক ছেলেই মানিয়ে নিতে পারে না। নেশার অভাবে অস্থির হয়ে পড়ে। অসুস্থও হয়ে পড়ে কেউ কেউ। হোম ছেড়ে পালানোর ব্যাপার প্রায়ই ঘটে। তা ছাড়া আমি নিজে নব দিগন্তর ভেতরকার সুব্যবস্থা নিজের চোখে দেখে এসেছি। তাই বিশেষ চিন্তা করিনি।'
'তারপর?'
'তারপর চিন্তা করতে হল। পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে আরও দুটো ছেলে গায়েব হল নব দিগন্ত থেকে। সব খবর বাইরে আসে না। সংখ্যাটা বেশিও হতে পারে। পুলিশ রুটিন এনকোয়ারি করে জানিয়ে দেয়, এখানকার কড়া শাসনের জন্য বাচ্চারা পালাচ্ছে। কিন্তু আমি লালনের মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া দেখেছিলাম। ও আমাকে কিছু বলত না। হয়তো আমাকে টেনশন দিতে চাইত না ও। আমি কিন্তু ওকে বার বার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, 'সব ঠিক আছে তো?'
'ও প্রতিবারই মাথা নাড়ত। সব ঠিক ছিল। তারপর একদিন লালন হারিয়ে গেল। হোম থেকে ফোন পেয়ে ছুটে গেছিলাম। থানা, পুলিশ সব করেছি। কিন্তু ওকে ফিরে পেলাম না। আমাকে জানানো হল, ও নাকি নেশার অভাবে হোমের মধ্যে অশান্তি করত। আগেও নাকি পালানোর চেষ্টা করেছে। এরকম অনেক কথা শুনলাম, যেগুলো আগে কোনোদিন হোম কর্তৃপক্ষ আমাকে বলেনি। আমিও চার্জ করেছিলাম। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, 'তাহলে এতদিন বলেননি কেন আমাকে?'
'ওরা বলল, এসব ওদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। ওরা জানে কীভাবে হ্যান্ডল করতে হয়।
'আমি রেগে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, 'জানেন যখন, তবে হ্যান্ডল করতে পারলেন না কেন শুনি?'
'ওরা বলল, সব হোমেই এরকম দু-চারটা কেস হয়। এটা অস্বাভাবিক কিছু না।
'আমি চেষ্টা করেছিলাম, বিশ্বাস কর সঙ্ঘমিত্রা। ওকে খুঁজে বের করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। ছেলেটা যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। আমার জন্য এসব হল। ওকে যদি স্টেশন থেকে তুলে না আনতাম, তাহলে আজ অন্তত ছেলেটা হারিয়ে যেত না। সব আমার দোষে হল। বুঝতে পারছি হোম কর্তৃপক্ষ মিথ্যে বলছে। লালন নেশা করত না। সব জেনেও কিছু করতে পারছি না।'
কথা শেষ করে হাত দিয়ে নিজের মাথার চুল খামচে ধরল উত্তীয়দা। তাকে এই মুহূর্তে একজন ভেঙে পড়া মানুষ বলে মনে হচ্ছে।
'তুই আমার থেকে কী চাস?' নিরুত্তাপ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
একটু অবাক হয়ে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। একটা চোদ্দো-পনেরো বছরের বাচ্চা ছেলে হারিয়ে গেছে, টাপুরদি তার পরেও এত শান্ত থাকছে কী করে? উত্তীয়দাও বোধ হয় একটু আহত হল। যখন কথা বলল, তার কণ্ঠস্বরে সেই অভিমান আমার শ্রুতি এড়াল না।
উত্তীয়দা বলল, 'আমি হয়তো তোর সময় নষ্ট করছি, সঙ্ঘমিত্রা। আর আমার কেসটাকেও ঠিক কেস বলা যায় কি না আমি জানি না। আর তা ছাড়া তোর কাছে এসেছি বটে, কিন্তু তোর ফিজ কত, আদৌ আমার সামর্থ্যের মধ্যে কি না সেটাও জানি না। আসলে ছেলেটা হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে আয়নায় নিজের সঙ্গে দৃষ্টি মেলাতে পারছিলাম না। রাতে ঘুমোতে পারি না। শুধু মনে হয়, আমার জন্যই এসব হল। নিজেকে বেশি মহান ভেবে বসেছিলাম আমি। ছেলেটার জীবন বদলাতে যাচ্ছিলাম। আর দ্যাখ, হল কী? উলটে ওর জীবনটা উলটেপালটে দিলাম। লালন এখন কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে, বা আদৌ বেঁচে আছে কি না কিছুই জানি না। তাই আর থাকতে না পেরে সাত-পাঁচ না ভেবেই ছুটে এসেছিলাম তোর কাছে।'
টাপুরদি কিছুক্ষণ চেয়ে রইল উত্তীয়দার মুখের দিকে। তারপর মুচকি হেসে বলল, 'তুই এখনও সেই আগের মতোই আবেগপ্রবণ আছিস!'
উত্তীয়দাও ম্লান হাসল এবার। বলল, 'তা হয়তো আছি। সে যাক, তুই বল, তুই কি কোনো সাহায্য করতে পারবি এই ক্ষেত্রে?'
টাপুরদি কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, 'লালন সম্পর্কে আমার সব ডিটেলস চাই। কোনো ছবি আছে ওর?'
'হ্যাঁ, আছে।' বলে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করল উত্তীয়দা। গ্যালারি খুলে একটা ছবি বের করে ফোনটা টাপুরদির হাতে দিল।
'এই ছবিটা ওকে হোমে ভরতি করানোর সময় ফর্ম ফিলআপের জন্য তুলেছিলাম।'
টাপুরদি মন দিয়ে দেখছে ছবিটা। আমিও মাথা বাড়িয়ে দেখলাম। শ্যামলা তরতরে চেহারার এক কিশোরের ছবি। মুখের গড়ন লম্বাটে। চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে। চোখদুটি উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত, ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি।
টাপুরদি ছবিটা নিজের হোয়াটসঅ্যাপে ফরোয়ার্ড করে নিল। তারপর মোবাইলটা উত্তীয়দাকে ফেরত দিয়ে বলল, 'আগের প্রশ্নটাই আবার করছি, হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট মি টু ডু নাও? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কীভাবে এগোব, বা আমার ঠিক কী করা উচিত এক্ষেত্রে!'
উত্তীয়দা এবার আর রাগ করল না। একটু ভেবে বলল, 'তোর কাজের স্টাইল বা এক্তিয়ার কোনোটাই আমি জানি না। আদৌ তুই কোনো সাহায্য করতে পারবি কি না সেটাও জানি না। কিন্তু'...
টাপুরদি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, 'নব দিগন্ত সেবাশ্রম সম্পর্কে যা জানিস আমায় বল। ছোটোখাটো কোনো বিষয়ও বাদ দিবি না। আর হ্যাঁ, তার আগে বল, চা খাবি না কফি?'
উত্তীয়দা হাসল। বলল, 'কফিই দে বরং। আর শোন, আমার ওই ব্ল্যাক কফি চলে না। বেশি করে দুধ-চিনি দিয়ে বানাবি।'
টাপুরদি হেসে উঠে রান্নাঘরে গেল।
উত্তীয়দা আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, 'চাকরি সামলে টাপুরের সঙ্গে রহস্য সমাধান করে বেড়াচ্ছ কী করে?'
আমি হেসে বললাম, 'ঠিক যেমন করে তুমি চাকরি সামলে পথশিশুদের জন্য এত কিছু করছ।'
'হ্যাঁ, সে তো বুঝলাম!' বলল উত্তীয়দা, 'কিন্তু কর্পোরেট জব তো অনেক বেশি ডিমান্ডিং, তাই না! আমার অনেক বন্ধুরা আইটি সেক্টরে আছে। ওদের দিন-রাত বলে কিছু নেই দেখি। সারাদিনই কাজ।'
আমি মাথা নাড়লাম। বললাম, 'আমার ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট তো! সারাদিন সময় দেওয়ার দরকার পড়ে না। নিজের কাজটা ঠিক করে ডেলিভার করে দিলেই হল। তা ছাড়া আমাদের কম্পানিতে ওয়ার্ক ফ্রম হোমেরও সুবিধে আছে।'
'এটা একটা বেশ ভালো সুবিধে। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। আইটি ইন্ডাস্ট্রি এই নতুন সংস্কৃতিটা এনেছে। আমার বেশ লাগে। নিজের কমফোর্ট জোনে থেকে সুবিধে মতো কাজ করে যাও।'
ট্রে-তে তিন কাপ কফি আর প্লেটে কুকিজ সাজিয়ে টাপুরদি ঘরে ঢুকল। কাপ-প্লেটগুলো সেন্টার টেবিলে সাজিয়ে রেখে বলল, 'তারপর কন্টিনিউ কর। যা জিজ্ঞাসা করলাম ডিটেলে বল।'
চেয়ারে বসল টাপুরদি। উত্তীয়দাও বলতে শুরু করল, 'নবদিগন্ত সম্পর্কে খুব বেশি কিছু আমিও জানি না রে! স্ট্রিট চাইল্ডদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কলকাতা ও আশেপাশে অঞ্চলের সবগুলো হোমের একটা লিস্ট বানিয়েছিলাম গুগল থেকে। তার মধ্যে নবদিগন্তের নাম ছিল। লালনের জন্য যখন হোমের খোঁজ নেওয়ার দরকার পড়ল, তখন বেশ কয়েকটা হোমের সঙ্গে এই হোমটা ভিজিট করেছিলাম আমি। তখনই কিছুটা জানতে পারি। সেটুকুই বলছি তোকে।
'নবদিগন্ত সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয় আজ থেকে প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে, উনিশশো পঁচানব্বই সালে। এখন যেখানে ওই হোম, সেটা আসলে ছিল বিনয়কৃষ্ণ ভট্টাচার্য নামে এক বিশাল ধনী ব্যবসায়ীর বাগানবাড়ি। ভদ্রলোক জীবদ্দশাতেই অনাথ আশ্রমের ভবনটি তৈরি করেন। তিনি মারা যাওয়ার সময় উইলে তাঁর এই বাড়িটি ও নিজের সম্পত্তির কিছু অংশ অনাথ শিশুদের জন্য দান করে যান। সেই মতো তাঁর ছেলেরা একটা ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে এখানে একটি অনাথ আশ্রম গড়ে তোলেন। তখন এর নাম ছিল 'বিনয়কৃষ্ণ ভট্টাচার্য মেমোরিয়াল অরফ্যানেজ।'
'দুইহাজার বারো সাল পর্যন্ত তাঁরাই চালাচ্ছিলেন হোমটা বিনয়কৃষ্ণ ট্রাস্টের খরচে। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম হোম নিয়ে আগ্রহী ছিল না, সম্ভবত হোমের পেছনে পৈতৃক সম্পত্তি নষ্ট করতে ইচ্ছুকও ছিল না। বারো সালের অক্টোবরে হোমের মালিকানা বদল হয়। 'নবদিগন্ত' নামের একটি এনজিও হোমটা টেক ওভার করে। রীতিমতো কাগজে-কলমে হোমের হ্যান্ড-ওভার হয়।'
'এই এনজিও-টা এখন কে পরিচালনা করেন?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
'রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল নবদিগন্ত পরিচালন কমিটির নামে। সেরকমভাবে ব্যক্তিগত মালিকানা কারও একার নয়। অন্তত আমাকে সেরকমই জানানো হয়েছে।'
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'একটা ব্যাপার আমাকে একটু বুঝিয়ে বলো। এই যে অনাথ আশ্রম, বা বৃদ্ধাশ্রম, এগুলো তো নন-প্রফিট অর্গানাইজেশন। সাধারণত সরকারি সাহায্য বা লোকজনের থেকে আর্থিক সাহায্য নিয়ে চলে। তাহলে এর আবার মালিকানা কীসের?'
'খুব ভালো প্রশ্ন করেছ মিতুল!' বলল উত্তীয়দা, 'সাধারণত এইসব হোমগুলি তিন রকম হয়। প্রথমত, সরকারি। এক্ষেত্রে এগুলি পুরোপুরিভাবে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। বিভিন্ন জুভেনাইল হোম, যেগুলিতে শিশু-কিশোর অপরাধীদের রাখা হয়, সেগুলি এই ক্যাটাগরিতে পড়ে।
'তারপর হল বেসরকারি হোম। এক্ষেত্রে ব্যাপারটা বেশ জটিল। অরফ্যানেজ তৈরি করা সহজ নয়। অনেক রকম হার্ডল পেরোতে হয় একটা হোম তৈরি করার জন্য। একটা ট্রাস্টি বোর্ড তৈরি করে 'কেয়ার অ্যান্ড প্রোটেকশন অব চিলড্রেন অ্যাক্ট আন্ডার জুভেনাইল জাস্টিস'-এর আন্ডারে তার রেজিস্ট্রেশন করাতে হয়। ফরেন কনট্রিবিউশনের রাস্তা খোলা রাখার জন্য এফসিআরএ রেজিস্ট্রেশন করাতে হয়। লোকাল থানা থেকে, মিউনিসিপ্যালিটি থেকে পারমিশন নিতে হয়। আরও এরকম হাজারটা ফর্মালিটিস থাকে। এক্ষেত্রে পুরোটাই ব্যক্তিগত সাহায্যের ওপর নির্ভর করে ফান্ড কালেকশন হয়।
'আর তিন নম্বর হল, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত হোম। সেগুলির ফান্ড ব্যক্তিগত সাহায্যের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি অনুদানও পায়।
'এবার মনে করো তুমি একটি হোম তৈরি করতে চাও। কিন্তু সেটা তোমার একার নামে রেজিস্টার হবে না। তোমাকে একটা ট্রাস্টি কমিটি তৈরি করতে হবে। কমিটিতে থাকবে বোর্ড অব ডিরেক্টর্সরা। হোমের রেজিস্ট্রেশন হবে সেই কমিটির নামে। তবে সবের পেছনে মালিক একজন হয়তো থাকে। তার একার নামে রেজিস্ট্রেশন না হলেও থাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।'
'বুঝলাম', বললাম আমি।
উত্তীয়দা আবার বলতে শুরু করল, 'যা বলছিলাম, নবদিগন্ত সেবাশ্রমের হাতবদল হল। নতুন কমিটি তৈরি হল। কিছু কিছু ফরেন ফান্ডিং আসতে লাগল। কয়েক বছর পর থেকে সরকারি সাবসিডি মেলাও শুরু হল। এত বছর ধরে ঝিমিয়ে চলা অরফ্যানেজের খোলনলচে বদলে ফেলা হল। চারদিকে উঠল উঁচু দেয়াল। সিকিওরিটির জন্য আলাদা টিম তৈরি হল। বাচ্চাগুলোরও অবস্থা বদলাল। তাদের পাতে ভালো খাবার এল। পরিবেশ ভালো হল। মোট কথা, নবদিগন্তে গেলে তোমাদের ভালো লাগতে বাধ্য। খুব সুন্দর ব্যবস্থা ওখানে। আমারও ভালো লেগেছিল। কিন্তু তারপর শুরু হল বাচ্চা গায়েব হওয়া। অবশ্য শুরু হল বলা যাবে না। আমি বিশ্বস্ত সূত্র থেকে খবর নিয়ে জেনেছি, গত দুই বছরে অফিশিয়ালি ছয়জন বাচ্চা নব দিগন্ত থেকে মিসিং। তার আগে আরও কত কী হয়েছে জানি না। আন-অফিশিয়ালি সংখ্যাটা সম্ভবত আরও অনেক বেশি!'
টাপুরদি এবার বলল, 'এই ব্যাপারে আমার সেরকম পরিষ্কার ধারণা নেই। একটা কথা জানতে চাই। নন-প্রফিট তো বুঝলাম। কিন্তু সত্যিই কি তাই হয়? হোমগুলো থেকে ট্রাস্টের কোনো প্রফিট হয় না?'
উত্তীয়দা একটুক্ষণ টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তেতো হেসে বলল, 'প্রফিট করতে চাইলে সুযোগের অভাব নেই। তবে নবদিগন্ত সেই পথে হাঁটছে কি না বলতে পারব না। বিভিন্ন হোমের নামে বিভিন্ন সময়ে মোটা টাকার বিনিময়ে ইললিগালি বাচ্চা অ্যাডপশনে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জানি না, এখানেও তেমন কিছু চলছে কিনা! নাকি আরও খারাপ কিছু! আমি আর ভাবতে পারছি না।'
'কেসটা তুমি নেবে, টাপুরদি?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
দুপুরে খেতে বসেছি। উত্তীয়দা যাওয়ার পর থেকে টাপুরদিকে একটু অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। কাজ করছে, কথাও বলছে। কিন্তু পুরো সময়টাই গভীরভাবে কিছু যেন ভেবে চলেছে। আমার প্রশ্নে চোখ তুলে বলল, 'হুম, কী বললি?'
'জানতে চাইছি, কেসটা নেবে কি না!' বললাম আমি।
টাপুরদি চিন্তিত মুখে বলল, 'কেসটা কী, তাইই তো বুঝতে পারছি না রে! তুই যে-কোনো হোমে যা, ছেলে-মেয়েরা সব হোম থেকেই পালায়। এটা খুব কমন প্র্যাকটিস, স্ট্রিট চাইল্ডদের সাধারণ প্রবণতা। তুই ওদের দেখে আহা-উহু করতে পারিস, সাহিত্যে, শিল্পে ওদের জন্য চোখের জল ফেলতেই পারিস, ওদের ভাগ্য ওদের পথে এনে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ওদের পথ থেকে তুলে সুস্থ জীবনে ফেরাতে চেষ্টা করলেই সকলে ফিরতে চাইবে। কেউ কেউ হয়তো চায়, ফেরেও; কিন্তু সকলে নয় রে! উত্তীয়কে আমি চিনি। ও ভীষণ ইমোশনাল ছেলে। লালন নামের ছেলেটাকে ও ভালোবাসত। তাই হয়তো মেনে নিতে পারছে না ওর চলে যাওয়াটা।'
'এই দিকটা কিন্তু আমি ভেবে দেখিনি। সত্যিই তো, এরকম তো হতেই পারে।' বললাম আমি।
'আবার না-ও হতে পারে', বলল টাপুরদি, 'ও যদি সত্যিই পালায়, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে দু-বছর পরে কেন? আরও আগে নয় কেন? মানে সেক্ষেত্রে তো ও আরও আগে চেষ্টা করত। সেটা হলে উত্তীয়কে নিশ্চয়ই জানাত হোম কর্তৃপক্ষ!'
'উফফ, এবার কিন্তু তুমি আমাকে কনফিউজ করছ টাপুরদি!' বললাম আমি।
টাপুরদি হাসল। বলল, 'দুটো পসিবিলিটিই তো ভেবে দেখতে হবে, নইলে এগোব কী করে?'
'তাহলে? কী করবে ঠিক করলে?'
টাপুরদি চুপচাপ খেতে লাগল। একটু পরে বলল, 'কী করব সেটাই ভাবছি রে! কী করি বল তো? কেসটা নিতে হলে হোমে ঢুকে তদন্ত করতে হবে। কিন্তু ঢুকব কেমন করে? ধর যদি বা ঢুকলাম, তবু অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ওরা সাবধান হয়ে যাবে। উত্তীয়র কথা সত্যি বলে মানতে হলে আমাদের ধরে নিতে হবে হারিয়ে যাওয়ার আগে লালন কোনো কারণে দুশ্চিন্তায় ছিল। কেন? আরও অনেক অনেক প্রশ্ন আছে।'
টাপুরদির মুখ দেখে বুঝলাম, টাপুরদি ভাবছে কেসটা নিয়ে। আজকাল টাপুরদির খ্যাতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজের চাপ বেড়েছে। তবে সব কেস নেয় না টাপুরদি। যেখানে বোঝে তার করার কিছু নেই, সোজাসুজি ক্লায়েন্টকে বলে দেয়, 'এটা আমার এক্তিয়ারে পড়ে না। আপনি বরং পুলিশের কাছে যান' কিংবা 'কেসটা আমার কাছে ক্লিয়ার হচ্ছে না। আমার মনে হয় না এই ব্যাপারে আমি আপনাকে কোনো সাহায্য করতে পারব।'
অর্জুনদা মজা করে বলে, 'তোমার দিদি হল গিয়ে এখন সেলিব্রিটি সত্যান্বেষী।'
কথাটা মিথ্যে নয়। ইদানীং টাপুরদির বেশ নামডাক হয়েছে। আমারও অফিসে কাজের চাপ বেড়েছে। তাই সব কেসে আমি সঙ্গে থাকতে পারি না। কিন্তু সব কেসেরই খবর রাখি বিশদে। টাপুরদি পুলিশের কাজেও টুকটাক সাহায্য করে। তবে খুব প্রয়োজন ছাড়া পুলিশ কেসে মাথা গলাতে টাপুরদি পছন্দ করে না, সেটা আমি জানি।
টাপুরদির মোবাইল ফোনটা বাজছে। ফোনের স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে ফোনটা রিসিভ করল টাপুরদি। আমি টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ও-প্রান্তের কথা শুনে টাপুরদির মুখের অভিব্যক্তি বদলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। 'আচ্ছা, আমি দেখছি' বলে ফোনটা রেখে দিয়ে উঠে টিভিটা চালাল।
কলকাতার একটি বাংলা নিউজ চ্যানেলে খবরটা দেখাচ্ছে। কোনা এক্সপ্রেসওয়ের কাছে জলা জমিতে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মৃতদেহ পাওয়া গেছে। মৃতের বয়স পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্নর মধ্যে হবে। পিঠে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। কেউ যদি মৃতের পরিচয় জেনে থাকেন, তাহলে লালবাজারে জানাতে অনুরোধ করা হচ্ছে।
'কী হল, টাপুরদি? কার ফোন ছিল?' জিজ্ঞাসা করলাম।
'উত্তীয়র', টিভির পর্দায় চোখ রেখে টাপুরদি সংক্ষিপ্ত জবাব দিল।
'কী বলল উত্তীয়দা?'
'বলল এই লোকটিকে সে নব দিগন্ত হোমে দেখেছে।'
'তাহলে পুলিশকে বলছে না কেন?'
'কীভাবে প্রমাণ করবে? হোম কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করলে প্রমাণ করা যাবে না', টাপুরদি চিন্তিত স্বরে বলল।
জিজ্ঞাসা করলাম, 'টাপুরদি, নবদিগন্ততে শিওর কিছু চলছে জেনেও তুমি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে?'
টাপুরদি আমার মুখের দিকে তাকাল, তাকিয়েই রইল। বুঝলাম টাপুরদির দৃষ্টি আমার দিকে হলেও মন অন্য কোথাও বিচরণ করছে। বেশ কিছুক্ষণ কাটল। তারপর টাপুরদি মোবাইল ফোনটা হাতে তুলে নিল। নম্বর ডায়াল করে ফোনটা কানে ছোঁয়াল। কয়েক মুহূর্ত কাটল। রিং হচ্ছে ওদিকে।
'হ্যালো অর্জুন!'
চোখ না খুলেই লালন টের পেল ওর খুব খিদে পেয়েছে। পেটের ভেতর যন্ত্রণা হচ্ছে। জ্ঞান ফিরে এসেছে কিছুক্ষণ হল। চোখ খুলতে ইচ্ছে করছে না ওর। সারা শরীর জুড়ে তার চটচটে অবসাদ; শরীর ভীষণ দুর্বল লাগছে।
চোখ না খুলেও লালন বোঝে এই জায়গাটা সম্পূর্ণ অন্ধকার। আশেপাশে নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এই শব্দের সঙ্গে সে এখন পরিচিত। গত কয়েক দিনে এভাবেই খামারের গোরু-বাছুরের মতো গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে তাদের। মানুষ আছে এখানে, অনেক মানুষ, জীবিত, ওদের ভাষায় 'কাটা মাল'। কিন্তু তবু যেন মৃত্যুর শীতলতা ছেয়ে আছে গোটা জায়গাটাতে। লালন জানে, এখানে সকলেই তার মতো মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। কেউ আগে যাবে, কেউ পরে। কারও কারও ক্ষত বিষিয়ে উঠেছে। পচা গন্ধ ছাড়ছে। রোজই একটা-দুটো করে 'কাটা মাল' বাদ পড়ে হিসেব থেকে। চালান হওয়ার ধকল সইতে সইতে পৃথিবীর ওপারে চালানের টিকিট কাটিয়ে নেয় তারা। শান্তি!
চোখ বন্ধ করেই লালন পেটের এক পাশে কাটা জায়গাটাতে হাত বোলায়। কড়া ঘুমের ওষুধের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয় তাদের। তবু যন্ত্রণায় ঘুম আসতে চায় না সবসময়। খুব কাছেই কেউ বমি করছে। পচা টক গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে ঘরের বাতাস। প্রথম প্রথম গন্ধে গা গুলিয়ে উঠত লালনের। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। এখানে সকলেরই এরকম হয়। বমি, পেটে অসহ্য যন্ত্রণা। জ্ঞান থাকলে কাটা পাঁঠার মতো দাপায়, চিৎকার করে, কাঁদে। তারপর আবার ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়। কে জানে, এভাবে আর কতদিন চলবে!
মুক্তির স্বপ্ন আর দেখে না লালন। দেখেছিল একবার। জসীমচাচা তখনও বেঁচে ছিল। লালনের ভরসা ছিল, পালাতে পারবে সে। নব দিগন্ত সেবাশ্রমে কাজ করতে আসত জসীমচাচা। কমপাউন্ডের ভেতরে যে বাগান ছিল, তারই দেখা-শোনা করত। লালন বসে বসে দেখত চাচার হাতের কাজ। কত মমতায় একটা একটা করে গাছকে বাঁচিয়ে রাখত চাচা; তাদের যত্ন করত নিজের সন্তানের মতো করে। কাজ করতে করতে চাচার মুখ চলতে থাকত। অনেক গল্প করত লালনের সঙ্গে। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি ছিল চাচার। একটা পরিবার ছিল, একটা গাই-গোরু, একটা বকনা বাছুর ছিল। তারপর আয়লার টানে একদিন ভেসে গেল স্ত্রী-পুত্র, ঘর-বাড়ি, গাই-বকনা, সব। জসীমচাচা এখন এই শহরে থাকে। সঙ্গে কেউ নেই, কিছু নেই। সব 'নেই'-এর মাঝে চাচা গাছ নিয়ে থাকে, গাছে ডুবে থাকে।
লালনের খুব মায়া হত। তার এই অনতিদীর্ঘ জীবনে ভালোবাসা বড়ো কম পেয়েছে সে। দাদামণি তার জীবনে না এলে হয়তো সে ভেসে যেত, বয়ে যেত। আর ছিল জসীমচাচা। আদর করে বুকে টেনে নিয়েছিল অনাথ ছেলেটাকে। কেন কে জানে, সেই রাতে রোজকার মতো বস্তিতে ফিরে না গিয়ে হোমেই থেকে গেছিল জসীমচাচা। লালনকে যখন গাড়িতে তোলা হচ্ছিল, প্রাণপণে বাধা দিতে ছুটে এসেছিল প্রৌঢ় মানুষটা। খালি হাতে লড়ে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল লালনকে। ওরা খুব মেরেছিল চাচাকে। তারপর তুলে নিয়েছিল গাড়িতে। একটা সূ�চ বেঁধার অনুভূতি টের পেয়েছিল লালন। আর কিছু মনে নেই তার।
অন্ধকারে চোখ বুজে লালন টের পাচ্ছে তার চোখের কোণ ভিজে উঠেছে। জসীমচাচার সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিল তার। ততদিনে বেশ কয়েক বার জায়গা বদল হয়েছে। পেট কাটার অপারেশনও হয়ে গেছে। হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল আর এক জায়গায়। কোন জায়গা, জানে না লালন। ঘোরের মধ্যে প্রায় কিছুই টের পায়নি। জ্ঞান ফিরতে দেখেছিল, এরকমই আর একটা ঘরে মেঝে জুড়ে পাতা খড়ের বিছানার ওপর শুয়ে ছিল সে। পেটে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছিল। সেভাবেই কেটেছিল একটা সপ্তাহ। রোজ নতুন লোক আসত, পুরোনোরা চালান হত, বা বাতিল। তারপর একদিন ঘরের টিমটিমে আলোতে এদিক-ওদিক দৃষ্টি বোলাতেই দেখতে পেয়েছিল জসীমচাচাকে। অবশ্য জসীমচাচা তাকে দেখতে পায়নি তখন। কারণ সেই মানুষটাও অজ্ঞান অবস্থায় সেখানে পড়ে ছিল। সেদিনই নিয়ে আসা হয়েছিল চাচাকে ওই ঘরে।
সেই ঘরটাতে কোনো জানলা ছিল না। দিনের আলো বা রাতের আকাশ কোনোটাই দেখা যেত না ঘর থেকে। দিনে দু-বার খাবার আসত, যদি তরল, গলা সেই জাউটাকে খাদ্য বলা যায়। ততদিনে একটু একটু করে উঠে বসতে পারছিল লালন। জসীমচাচার জ্ঞান ফিরতে তার গলা জড়িয়ে খুব কেঁদেছিল। লালনের বয়স কম, বাইরের ক্ষত শুকিয়ে আসছিল। কিন্তু জসীমচাচার ভাগ্য ততটাও ভালো ছিল না। কাটা পেটের সেলাই ছিল দগদকে। ব্যান্ডেজ ভেদ করে পুঁজ-রক্ত বেরোচ্ছিল, সারাদিন বমি হচ্ছিল। ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়ছিল জসীমচাচা। চব্বিশ ঘণ্টা তখনও কাটেনি। লালনের বয়স কম হলেও জীবনের অভিজ্ঞতা কম নয়। মৃত্যু সে অনেকবার প্রত্যক্ষ করেছে। জসীমচাচার চোখের দিকে তাকিয়ে সে মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছিল।
জসীমচাচা নিজেও বুঝেছিল, সে আর বেশি সময় নেই। ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে থাকত, লালনের কথা শুনত। আর লালন? সে তখন পালানোর ছক কষে চলেছিল।
একটা সুযোগ এসেছিল বই কি! জীবন সবাইকেই অন্তত একটা সুযোগ দেয়। কিন্তু সেই সুযোগটাও কাজে লাগাতে পারল না লালনরা। ওয়াগন থেকে নামতে গিয়ে পা-টা যদি না মচকে যেত, তাহলে নিশ্চয়ই অনেক দূরে পালিয়ে যেতে পারত তারা। তবু জসীমচাচা চেষ্টা করেছিল। তার শরীরের অবশিষ্ট অঙ্গ ক'টাও খুলে নেওয়ার জন্য হয়তো তাকে আবারও ওয়াগনে তোলা হয়েছিল সেদিনই, হয়তো শেষবারের মতো। চলার মতো অবস্থা ছিল না তার। তবু লালনকে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল। নিজে অন্ধকারে সেদিন পালায়নি জসীমচাচা, বরং ওদের দৃষ্টিটাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে লালনকে বাঁচিয়ে দিতে চেয়েছিল। দুটো গুলির শব্দ শুনতে পেয়েছিল লালন। কিন্তু এত করেও তো শেষরক্ষা হল না। ধরা পড়ে গেল লালন। আবার তাকে ছুড়ে ফেলা হল ওয়াগনের পেটের ভেতর।
এখানে দু-দিন হল এসেছে ওরা। এখন ওদের নিয়ে কী করা হবে জানে না ওরা কেউ। ওদের মধ্যে অনেকেই বলছে যে কাউকেই আর বাঁচিয়ে রাখা হবে না। সেটা লালনের বিশ্বাস হয় না। মারার হলে তো অপারেশন টেবিলেই মেরে ফেলতে পারত। সেটা যখন করেনি, তখন পরিস্থিতি জটিল করার জন্য এখানে এনে মারার যুক্তিটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য ঠেকছে না। হয়তো অবশিষ্ট অঙ্গগুলিও একে একে খুলে নেওয়া হবে তাদের শরীর থেকে।
লালন জানে না, তার শরীরে ঠিক কীসের অপারেশন করা হয়েছে! অন্যমনস্কভাবে নিজের পেটের কাটা দাগে হাত বোলায়। গতকাল একজন ডাক্তার এসেছিল ওদের দেখতে। লোকটাকে দেখলে ডাক্তার বলে ভক্তি হয় না। রোগা চিমড়ে মতো চেহারা। চোখদুটো কোটরের ভেতরে গর্তে ঢোকানো। ঘরে ঢুকে জুলজুল করে তাকিয়ে দেখেছিল চারপাশে। তারপর নির্লিপ্ত মুখে একে একে সকলকে পরীক্ষা করে যন্ত্রের মতো বেরিয়ে গেছিল। একটা কথাও খরচ করেনি।
লালন জানে না তার কপালে কী আছে! ভাবতে ভাবতে তার চোয়াল শক্ত হয়; ঘন হয় শ্বাস-প্রশ্বাস। জন্মাবধি ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই করেছে লালন। সেই যুদ্ধ ছিল ভীষণ রকম একতরফা। বারবার হারতে হারতে আজ তার হারার ভয় নেই। এর চেয়ে আর বেশি কী হারাবে সে! তাই একবার শেষ চেষ্টা করবে। বাঁচার আরও একটা সুযোগ ভগবান নিশ্চয়ই দেবেন তাকে। বিনা যুদ্ধে নিয়তির হাতে আত্মসমর্পণ করলে জসীমচাচার আত্মত্যাগ মিথ্যে হয়ে যাবে যে। সেটা লালন এত সহজে হতে দিতে পারে না।
'উত্তীয় বলছে লোকটাকে ও নবদিগন্ত সেবাশ্রমে দেখেছে।' বলল টাপুরদি।
'নবদিগন্ত সেবাশ্রম? সেটা কোথায়? কোনো আশ্রম-টাশ্রম, গুরু-মহারাজ গোছের ব্যাপার নাকি? তাহলেই চিত্তির!' বলল অর্জুন।
'না না, ধর্মকর্মের আশ্রম-টাশ্রম নয় রে বাবা। এটা অনাথ ছেলেদের জন্য একটা হোম, সোনারপুরের দিকে।' টাপুরদি বলল, 'উত্তীয়র রেসকিউ করা ছেলেটা ওখানেই ছিল।'
'তাও ভালো। আজকাল গুরু, আশ্রম এসব শুনলেই ভয় লাগে। যা অবস্থা চারিদিকে! যাই হোক, অনাথ আশ্রম তাও মন্দের ভালো। আমার খবরি মারফতও খবর পেয়েছি লোকটা সোনারপুরের দিকে একটা বস্তিতে ঘর ভাড়া করে একা থাকত। তবে কী কাজ করত বলতে পারেনি। নামও জানে না। সেটা জেনে নিতে অসুবিধে হবে না অবশ্য। তা তোমার বন্ধু শিওর যে লোকটাকে ওখানে দেখেছিল সে?' জানতে চাইল অর্জুন।
'তাইতো বলল।'
'হুম, কবে দেখেছিল মনে আছে?'
টাপুরদি মাথা নাড়ল, 'উত্তীয় বলল শেষ যেবার লালনকে দেখতে হোমে গেছিল, সেবারই লোকটাকে দেখেছিল ও। লালন সামনে লনে বসে লোকটার সঙ্গে গল্প করছিল। উত্তীয়কে দেখে ছুটে এসেছিল। তখনই উত্তীয় দেখেছিল লোকটাকে। লালন ওকে জসীমচাচা বলে ডাকছিল।'
'হুম, তার মানে লোকটা যে কোনোভাবে নবদিগন্তর সঙ্গে যুক্ত ছিল। সোনারপুর লোকেশনটাও মিলে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের সন্দেহ যদি ঠিক হয়, নবদিগন্তর ভেতর কিছু তো চলছে। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়। কিন্তু ওরা স্বাভাবিকভাবেই স্বীকার করবে না কিছু। এমনকি লোকটা সেখানে কাজ করত, সেটাও স্বীকার না করারই চান্স বেশি। কোনো প্রমাণ ছাড়া সার্চ ওয়ারেন্টও বের করা যাবে না।'
'না।' দু-দিকে মাথা নাড়ল টাপুরদি, 'ওভাবে হবে না। প্রমাণ জোগাড় করতে হবে আগে।'
'তা তো হবেই।' অর্জুনদা বলল, 'কিন্তু কীভাবে?'
টাপুরদি বলল, 'নব দিগন্তের ভেতরে না ঢুকে প্রমাণ মিলবে না। ভেতরে ঢুকতেই হবে।'
'ওরা কেন উটকো লোককে ঢুকতে দেবে?'
'দেবে, দেবে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে অর্জুন। এছাড়া আর কোনো পথ নেই।'
'সবই তো বুঝলাম, কিন্তু সেটা হবে কী করে, কিছু ভেবেছ?' জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
ল্যাপটপটা সামনে খোলা ছিল। আজ সারাদিন টাপুরদি ল্যাপটপে মুখ গুঁজে থেকেছে। এখন মুচকি হেসে একটা উইন্ডো খুলে ল্যাপটপটা অর্জুনদার দিকে ঠেলে দিল। অর্জুনদা সেটা নিয়ে চোখ বুলিয়ে কঠিন কণ্ঠে বলল, 'না, একদম না। তোমার অনেক পাগলামো আমি দেখেছি। কিন্তু জেনেশুনে বাঘের গুহায় ঢুকবে না তুমি!'
ল্যাপটপটা আমি এবার নিজের দিকে টেনে নিলাম। এখানে নবদিগন্তের ওয়েবসাইট খোলা আছে। বেশ কয়েকটা ভ্যাকেন্সি পোস্ট আছে দেখা গেল। আমি মুখ তুলে একবার টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম, একবার অর্জুনদার মুখের দিকে। দু-জনের মুখই ভীষণরকম সিরিয়াস।
জিজ্ঞাসা করলাম, 'টাপুরদি, সিরিয়াসলি?'
টাপুরদি কাঁধ ঝাঁকাল। অর্জুনদা বলল, 'একদম ওসব বাজে আইডিয়া মাথা থেকে বের করো টাপুর। তুমি এখন যথেষ্ট পরিচিত মুখ। যারা হোমের আড়ালে অনৈতিক কাজকর্ম করছে, তারা সহজ মানুষ নয়। এদের মাথায় এমন কোনো চাঁইয়ের হাত থাকে যে বা যারা সমাজের ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। ধরা পড়লে তোমাকে ওরা বাঁচিয়ে রাখবে না, মনে রেখো।'
টাপুরদি বলল, 'তুমি বুঝতে পারছ না অর্জুন। এই কেসে ঢোকার এটাই একমাত্র পথ। আমি আজ সারাদিন অনেক ভেবেছি। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। বিশ্বাস করো, ছেলেটার ছবি দেখেছি আমি। অমন একটা তরতাজা ব্রাইট ছেলে জাস্ট হারিয়ে গেল, এটা আমি মন থেকে মেনে নিতে পারছি না।'
'আমি বুঝতে পারছি তোমার কথা। সেক্ষেত্রে উত্তীয়কে বলো, লোকাল থানায় যে কমপ্লেন করেছে, তার আইডি আমায় দিতে। আমি লোকাল থানার সঙ্গে কনট্যাক্ট করে দেখছি কী করা যায়।'
'সেটা তো তোমাকে করতেই হবে অর্জুন। এই কেসে তোমার সাহায্য ছাড়া আমি এক পা-ও এগোতে পারব না। কিন্তু আমি এই মুহূর্তে চাইছি না যে লোকাল পুলিশ কেসটা নিয়ে মুভ করুক। ডোন্ট মাইন্ড অর্জুন, কিন্তু ভেবে দেখো, নবদিগন্ত যদি সত্যিই কোনো অবৈধ কাজে লিপ্ত থাকে, সেটাও এত দীর্ঘ সময় ধরে, তাহলে মেনে নিতে হবে পুলিশকে ওরা হাতে রেখেই এগিয়েছে। তুমি নিজে সিস্টেমের মধ্যে আছ; আমার চেয়ে তুমি ভালো জানো যে সব পুলিশ যে দারুণ সৎ, এমন তো নয়। সুতরাং পুলিশ এখন হঠাৎ করে মুভ করলে ওরা সাবধান হয়ে যাবে। ওদের হাতেনাতে ধরাটা কঠিন হয়ে যাবে আরও।'
অর্জুনদা গম্ভীর মুখে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, 'ঠিক কী করতে চাইছ তুমি?'
টাপুরদি বলল, 'জানি না। কোনো প্ল্যান নেই আপাতত। ওখানে না ঢুকলে বুঝতে পারব না কীভাবে এগোতে হবে।''
অর্জুনদা ঠোঁটের কোণে হাসল। বলল, 'আর সেটা খুব সহজ হবে বলে তোমার মনে হচ্ছে, টাপুর? লাস্ট কয়েকটা কেসের সূত্রে তুমি এখন যথেষ্ট পরিচিত মুখ। খবরের কাগজে তোমার ছবি অনেকেই দেখেছে। এক মুহূর্তে ধরা পড়ে যাবে তুমি।'
'হয়তো!' চিন্তিত মুখে বলল টাপুরদি, 'কিন্তু এই রিস্কটা আমাকে নিতেই হবে অর্জুন। নবদিগন্ত সেবাশ্রমের ভেতরে কী চলছে না জানা পর্যন্ত কিছু করা যাবে না।'
অর্জুনদা এবার একটু বিরক্ত মুখে বলল, 'তুমি কি এর রিস্কটা বুঝতে পারছ না, নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করছ? এনি ওয়ে, তুমি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছ, তখন আমার আর কিছু বলার নেই।'
টাপুরদি এবার নরম গলায় বলল, 'রাগ ক'রো না অর্জুন। আর কোনো উপায় নেই। আমাকে ওরা আজ না হয় কাল চিনে ফেলবে। তার আগেই আমাকে ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এছাড়া আর কোনো অলটারনেটিভ চয়েস নেই আমাদের হাতে।''
'আছে', আমি বললাম।
দু-জনেই ঘুরে আমার মুখের দিকে তাকাল। দৃষ্টিতে জিজ্ঞাসা।
'মানে?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
আমি হাসলাম। বললাম, 'তোমাকে ওরা হয়তো চেনে বা চিনে ফেলার চান্স আছে। কিন্তু আমাকে কেউ চিনবে না। আমি যাব নবদিগন্ত সেবাশ্রমে।'
'ব্যস!' কড়া গলায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠল অর্জুনদা, 'নবদিগন্তে যাওয়া নিয়ে আর একটা কথা হবে না। টাপুর, তুমি যদি অন্য কোনোভাবে কেসটা সমাধান করতে পারো, করো। নইলে কেস ছেড়ে দাও। পুলিশ নিজেদের মতো করে দেখে নেবে। তুমি বা মিতুল কেউ ওখানে যাচ্ছ না, ব্যস।'
টাপুরদির মুখের রেখা কঠিন হল এবার। বলল, 'একটা বাচ্চা ছেলে হারিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, আমাদের সন্দেহ যদি ঠিক হয়, সেক্ষেত্রে ওখানকার বাকি বাচ্চারাও সেফ নয়। ওদের বাঁচানোর জন্য যে-কোনো রিস্ক আমি নিতে প্রস্তুত।'
অর্জুনদা যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। খর দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল টাপুরদির মুখের দিকে। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, 'ডু হোয়াটএভার ইউ উইশ!'
পায়ে জুতো গলিয়ে গটগট করে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল অর্জুনদা।
আসমুদ্র হিমাচল বঙ্গভূমের রাজধানী এই ত্রিশতবর্ষীয়া অতিবৃদ্ধা নগরী যখন নাগরিক প্রসাধন ও আলোকমালায় যৌবনবতী সাজে, তখন সেই চাকচিক্যে সাধারণের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সাজের আড়ালে তার গলিত জীর্ণ রূপ চোখে পড়ে না সহসা। কিন্তু এই প্রসাধনের খাঁজ-আড়ালেই লুকিয়ে আরও এক লোলচর্ম দীর্ণ গলিত রাজধানী, যেখানে মানুষের দারিদ্র্য, খিদে, রোগ, মৃত্যুর সঙ্গে নিত্য সহবাস। নগরের সেই অংশে একবার পাঠককে ঘুরিয়ে আনতে চাই।
হে পাঠক, পকেট থেকে রুমাল বের করে আপনার নাকে চাপা দিন। এখানকার পূতিগন্ধময় পরিবেশে আপনার পরিশীলিত রুচি শিউরে উঠতে পারে। রাস্তার পাশে আবর্জনা, ভাঙা মদের বোতল, পচা খাবার, ব্যবহৃত জন্মনিরোধক ও ছিন্ন স্যানিটরি ন্যাপকিন আর তার মাঝেই পথ-কুকুরের আতুর দেখে আপনার গা-ঘিনঘিন করলেও কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দয়া করে এটুকু সয়ে নিন। রাস্তার এক পাশ ঘেঁষে যথাসম্ভব দৃষ্টি অন্যত্র ঘুরিয়ে চলতে থাকুন। বাঁ দিকে গলিটা ঘুরলেই একটা পলেস্তারাহীন বাড়ি দেখতে পাচ্ছেন, যার দেয়ালে ক্যাটকেটে সবুজ রং-চটা দরজাগুলি যেন বাড়িটির জীর্ণ অঙ্গসৌষ্ঠবকে মশকরা করছে, সেই বাড়িটিই আপাতত আমাদের গন্তব্য। লেখক-পাঠক তো কল্পদর্শী, তাই আমাদের গৃহকর্তার অনুমতির প্রয়োজন নেই।
বাড়ির ভেতরে ঢুকে চমকে গেলেন তো? জানি, চমকানোই স্বাভাবিক। এমন ভাঙা-চোরা বাড়ির ভেতর এ হেন গৃহসজ্জা আশা করেননি আপনি, জানি। ঘরের ভেতরে হালকা নরম আলো জ্বলছে। ভারী পর্দা ঝোলানো দরজা-জানলায়। বাইরে প্রচণ্ড গরমের দাবদাহ পেরিয়ে এই ঘরে ঢুকলে শরীর জুড়িয়ে যায়। শীতাতপ-নিয়ন্ত্রকের যান্ত্রিক শীতলতা এই ঘরকে নরম আদরের মতো ঘিরে আছে।
ঘরের মাঝখানে একটি বড়ো টেবিল পাতা। সেখানে বসে আছে পাঁচজন মানুষ। আরও তিনজন পাশেই দারুব্রহ্মের মতো ভাবলেশহীন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বসে থাকা পাঁচজনের মুখ গম্ভীর। কথাবার্তা হচ্ছে যথাসম্ভব নিচুস্বরে। যদিও তার প্রয়োজন ছিল না। কারণ, বাড়িটি বাইরে থেকে দেখতে যেমনই হোক, ভেতর থেকে এই ঘরটি পুরোপুরি শব্দ-নিরোধক। টেবিলের ওপর প্রত্যেকের সামনে একটি করে ফাইল রয়েছে। মুখ আঁটা মিনারেল ওয়াটারের বোতল, গ্লাসে মহার্ঘ পানীয় সবই সাজানো আছে, ঠিক যেমন জরুরি মিটিং-এ থাকে।
ক্ষমা করবেন পাঠক, এই মুহূর্তে কাহিনির প্রয়োজনে এই ঘরে উপস্থিত ব্যক্তিদের পরিচিতি উদঘাটন করতে পারছি না। আজকের এই মিটিং-এর উদ্যোক্তা এখানে উপস্থিত দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যক্তি। বাকি তিনজন এই শহরে এসেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। তিনজনেরই যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যক্তির প্রতি। রয়েছে এক রাশ বিরক্তি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যক্তি সেটা জানেন ভালো করেই। তাদের সমস্যার সমাধানের জন্যই আজকের মিটিং-এর অবতারণা। আচ্ছা এভাবে বললে ঠিক বুঝতে পারবেন না পাঠকেরা, তার চেয়ে বরং ওঁদের আলোচনা একটু শোনার চেষ্টা করা যাক।
চতুর্থ ব্যক্তি: দিস ইস রিডিকুলাস। এত কেয়ারলেস কীভাবে কেউ হতে পারে? বুড়োটাকে গুলি করে ওখানেই ফেলে আসার মানে কী?
দ্বিতীয় ব্যক্তি: এটা একটা ব্লান্ডার হয়েছে, স্বীকার করছি। হওয়া উচিত ছিল না, তবু হয়েছে। ওই রাস্তায় পুলিশ পেট্রলিং চলে রাতে। ওরা তাই লাশ তুলে আনার সাহস পায়নি। এর জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
পঞ্চম ব্যক্তি: আপনার ক্ষমা চাওয়া, না-চাওয়াতে কিছু এসে যায় না। আপনার লোকেরা গাফিলতি করেছে। এরকম ভুলের পরেও যদি ওদের মাফ করে দেওয়া হয়, ভবিষ্যতে ওরা বা অন্য কেউ আবার এরকম করবে। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি সিরিয়াস পানিশমেন্টের প্রস্তাব রাখছি।
দ্বিতীয় ব্যক্তি: অফ কোর্স, দে উড ফেস দ্য কনসেকুয়েন্সেস। এরকম একটা ভুল আমাদের সমস্ত অপারেশনকে অনেকটা পিছিয়ে দেয়। পুলিশ অ্যালার্ট হয়ে গেছে। এখন কিছুদিন মুভমেন্ট বন্ধ রাখাই ভালো।
প্রথম ব্যক্তি এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তাঁর মুখের রেখায় বিরক্তি ক্রমশ প্রকট হচ্ছিল। এবার তিনি মুখ খুললেন।
প্রথম ব্যক্তি: হোয়াট রাবিশ? এসব ননসেন্স শোনার জন্য দিল্লি থেকে কলকাতায় এসেছি আমি? একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য বিজনেস বন্ধ রাখতে হবে? এদিকে নেক্সট উইকে আমার হাসপাতালে চারটে অপারেশন শিডিউল করা হয়েছে। তার মধ্যে দু-জন পেশেন্ট ক্রিটিক্যাল। এক সেন্ট্রyল মিনিস্টারের শ্যালিকার কিডনি দরকার। পেমেন্ট নিয়ে বসে আছি। দু-সপ্তাহের মধ্যে ট্রান্সপ্লান্ট হবে কথা দিয়েছি। এখানে এসব ফালতু কথা শুনতে আমি আসিনি। আমাদের বিজনেসে কথার দাম একজন মানুষের প্রাণ, আমার হাসপাতালের রেপুটেশন। আমার হাসপাতালের বদনাম হলে আপনাদেরও ছাড়ব না আমি।
দ্বিতীয় ব্যক্তি: অপারেশন রি-শিডিউল করুন। যা করতে হয় করুন। এখানে আপনার রেপুটেশন বাঁচানোর জন্য আমার পুরো নেটওয়ার্ককে বিপদের মুখে ফেলা যাবে না।
প্রথম ব্যক্তি: ভুলে যাবেন না, আমি আপনাদের অ্যাডভান্স পেমেন্ট করেছি। বরাবরই করে আসছি।
দ্বিতীয় ব্যক্তি: তার পরিবর্তে আমাদের কাছ থেকেও আপনি বরাবর ভিআইপি ক্লায়েন্টের ট্রিটমেন্ট পেয়েছেন। সেটা আপনি অস্বীকার করতে পারেন না।
প্রথম ব্যক্তি: আমাদের পুরো বিজনেসটা বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আপনি জানেন, দিল্লির প্রথম সারির হাসপাতালগুলোর মধ্যে কী পরিমাণ প্রতিযোগিতা চলে! গত তিন বছর ধরে আমি গ্রেড ওয়ান সার্ভিস দিয়ে আসছি। এই এক নম্বর জায়গাটা ধরে রাখতে হলে কতটা পরিশ্রম করতে হয়, কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, কোনো আইডিয়া আছে আপনার? আমি কিন্তু চাইলে অন্য কোনো সাপ্লায়ারের কাছে যেতে পারতাম। যাইনি, কারণ আমি লং-টার্ম বিজনেস রিলেশনশিপে বিশ্বাসী। আমার ধারণা ছিল আপনারাও তাই। আজ দেখলাম আমি ভুল ছিলাম। আপনাদের কোনো এথিকসই নেই।
দ্বিতীয় ব্যক্তিকে স্পষ্টতই উত্তেজিত দেখাল। ক্রুদ্ধস্বরে বললেন, 'আমাদের এথিক্সের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখুন। আজ পর্যন্ত কোনোদিন কোনো অভিযোগের অবকাশ দিয়েছি আপনাদের! মুখ থেকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাল ডেলিভার করিনি? এমনকি অ্যাডভান্স পেমেন্ট ছাড়াই আপনার ইমার্জেন্সি কেসের জন্য রাতারাতি মাল ডেসপ্যাচ করেছি, ভুলে গেছেন সব? আর আপনারা কী করেছেন? ছোটো হাসপাতালগুলো যাতে মাথা তুলতে না পারে, সেই জন্য তাদের অর্ডার আটকে দিয়েছেন। দেননি? আমাদের থ্রেট দেননি যে ওদের মাল ডেলিভারি করলে আপনি আমাদের সঙ্গে বিজনেস করবেন না? মানছি আপনারা বিগ হাউস, কিন্তু আপনাদের সঙ্গে বিজনেস করার জন্য আমাদের অনেক বিজনেস ছাড়তে হয়েছে। যথেষ্ট কম্প্রোমাইজ করেছি আমরা। এভাবে বারবার চাপ সৃষ্টি করলে আপনাদের সঙ্গে আর কাজ করাই চলে না।'
চতুর্থ ব্যক্তি: বুলশিট! আপনারা কীসের বিজনেস করবেন না, আমরাই করব না আপনাদের সঙ্গে। এই দেশে সাপ্লায়ারের অভাব নেই। আমাদেরও অলরেডি একটা অপারেশন ক্যানসেল করতে হয়েছে। আপনাদের যা অবস্থা, তাতে কতদিনে আপনারা আবার আগের ফর্মে ফিরতে পারবেন তার কোনো ঠিক নেই। উনি আজ দিল্লি থেকে এখানে এসেছেন, আমি চণ্ডীগড় থেকে এসেছি। ভেবেছিলাম মুখোমুখি বসে কথা বললে একটা ওয়ে আউট ঠিকই বেরোবে। কিন্তু আপনাদের যা অ্যাটিটিউড দেখছি, তাতে ভবিষ্যতেও আপনাদের সঙ্গে ফারদার বিজনেস রিলেশনশিপ কনটিনিউ করব কি না ভাবতে হবে। দোষ করল আপনাদের লোকেরা, এর ফল কেন আমাদের ভুগতে হবে? আপনাদের আর কী? ক-দিনের জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড হবেন। তারপর সব ঠান্ডা হলে আবার কাজ শুরু করবেন। কিছু টাকার ক্ষতি হবে আপনাদের। আর আমাদের? টাকার কথা তো ছেড়েই দিন, রেপুটেশন, ক্লায়েন্টদের বিশ্বাস তো যাবেই, মার্কেটে কী পরিমাণ বদনাম হবে ভাবুন!
পঞ্চম ব্যক্তি: এক্স্যাক্টলি! এরকম চলতে পারে না।
দ্বিতীয় ব্যক্তি: আমি সবই বুঝতে পারছি। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে কিছুদিন কাজ বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় নেই।
এঁদের মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। উভয় পক্ষের কথা মন দিয়ে শুনছিলেন। তাঁর মুখ পাথরের মতো শক্ত, অভিব্যক্তি বোঝা যায় না। এবার তিনি মুখ খুললেন।
তৃতীয় ব্যক্তি: সাইলেন্ট প্লিজ! আমাকে বলতে দিন।
সকলে কথা থামিয়ে তৃতীয় ব্যক্তির মুখের দিকে ঘুরলেন।
তৃতীয় ব্যক্তি: যা চলছিল, যেমন চলছিল, সেরকমই চলবে।
দ্বিতীয় ব্যক্তি: কিন্তু স্যার!
হাত তুলে দ্বিতীয় ব্যক্তিকে থামতে ইশারা করলেন তৃতীয় ব্যক্তি। তারপর বললেন, 'পুলিশের ব্যাপারটা সামলাতে হবে। একটু সময় লাগবে, তবে ম্যানেজ হয়ে যাবে। একটা কেস ধরে বসে থাকার মতো সময় কলকাতা পুলিশের নেই। তবে আমাদের আর কোনো ভুল করা চলবে না। প্রতিটা স্টেপ খুব সাবধানে ফেলতে হবে। আমাদের বিজনেসে একটা সামান্য ভুলের মাশুলও অনেক ভারী হয়, এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝেছেন আপনারা। ততদিন খুব সাবধানে থাকতে হবে। যে অর্ডারগুলোর পেমেন্ট অলরেডি নেওয়া হয়ে গেছে, সেগুলো ডেসপ্যাচ করে দেব আমরা। এটা আমাদের কমিটমেন্ট। আর আপনাদেরও বলছি, আমরা আমাদের কমিটমেন্ট পূরণ করছি। আপনারাও একটু কো-অপারেট করুন। এত বছর ধরে এক সঙ্গে বিজনেস করেছি আমরা। সেই সম্পর্কের খাতিরে এটা রিকোয়েস্ট বলেই ধরে নিন। এখন মাসখানেক অপারেশন একটু কম রাখবেন, মানে যেটুকু না হলেই নয় আর কী! আমি যেমন চাইব না আপনাদের বিজনেসের ক্ষতি হোক, আপনারাও নিশ্চয়ই আমাদের ক্ষতি চাইবেন না। আর আমরা কিন্তু মুদ্রার এ-পিঠ আর ও-পিঠ। আমরা, বা আমাদের লোক যদি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, আপনারাও কি আর সেফ থাকবেন? পুলিশের ইন্টারোগেশনে, টর্চারে যে সে আপনাদের নাম বলে দেবে না, তার কোনো গ্যারান্টি আছে? সে জন্যই...'
প্রথম ব্যক্তি গলা দিয়ে ঘোঁতঘোঁত শব্দ করে বললেন, 'আমি তো বলছি সেটাই... আমাদের বিজনেস...'
তৃতীয় ব্যক্তি হাসলেন। বরাবরই এরকমই হয়ে আসছে। শেষ হাসিটা তিনিই হাসেন। তিনি জানেন কেমন করে পরিস্থিতিকে নিজের সপক্ষে ঘোরাতে হয়। এই খেলায় তিনি পুরোনো খেলুড়ে। মৃদু হেসে বললেন, 'তাহলে সেই কথাই রইল। ব্যস আর কোনো কথা নয়। আপনাদের জন্য আজ রাতে সাউথ আরবান হোটেলে প্রেসিডেনশিয়াল সুইটে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে প্রতিবারের মতো। খাদ্য-পানীয়র ঢালাও আয়োজন আছে। তাহলে ওঠা যাক?'
চতুর্থ ব্যক্তি: (মৃদু হেসে) শুধু খাদ্য আর পানীয়?
তৃতীয় ব্যক্তি তাকালেন দ্বিতীয় ব্যক্তির দিকে। দ্বিতীয় ব্যক্তি মাথা নাড়লেন। বললেন, 'সেটাও আছে। ঠিক সময়ে পৌঁছে যাবে।'
চতুর্থ ব্যক্তি: কাটা মাল নয় তো?
দ্বিতীয় ব্যক্তি: না, একদম ফ্রেশ। আপনাদের 'খাতিরদারি'তে কোনো কমতি হয়েছে আজ পর্যন্ত? আপনারা শুধু আমাদের সঙ্গে একটু কো-অপারেট করুন, ব্যস! আপনারা আমাদের স্বার্থটা দেখুন, আপনাদেরটা আমরা দেখব।
অতিথিরা বেরিয়ে গেলেন, সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন লোকও। তারাই অতিথিদের হোটেলে পৌঁছে দেবে। আতিথেয়তার সব দায়িত্বও তাদেরই ওপর। সকলকে বিদায় জানিয়ে ঘরে রয়ে গেলেন দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যক্তি। দু-জনের কপালেই ভাঁজ।
দ্বিতীয় ব্যক্তি: স্যার, বলে তো দিলেন, কিন্তু হবে কী করে? এমনিতেই পুলিশ অ্যালার্ট হয়ে গেছে...
তৃতীয় ব্যক্তি: জানি। কিন্তু এছাড়া আর কোনো পথ ছিল কি? ভেবে দ্যাখো, আমরা মাল না পাঠালে ওরা নিজেদের বিজনেস বন্ধ করবে না। বরং অন্য কারও কাছ থেকে মাল নেবে। মাঝখান থেকে বাঁধা ক্লায়েন্ট আমাদের হাত থেকে বেরিয়ে যাবে।
দ্বিতীয়: জানি স্যার। এদিকে আর এক কাণ্ড হয়েছে। যে মালটা বুড়োটার সঙ্গে পালাচ্ছিল, তাকে নবদিগন্ত থেকে তোলা হয়েছিল। যাদবপুরের একজন লেকচারার ওকে সেখানে রেখেছিল। ছেলেটা মিসিং দেখে লোকটা খেপে গেছে।
তৃতীয়: (বিরক্ত মুখে) এখন কি এসব ব্যাপারেও আমাকে মাথা ঘামাতে হবে? রাবিশ! এটুকু যদি সামলাতে না পারো তো ব্যাবসা বন্ধ করে দাও।
দ্বিতীয়: সরি স্যার। আসলে লোকটা একটু নাছোড়বান্দা গোছের। পুলিশের কাছেও গেছিল। লোকাল পুলিশ ওকে এনটারটেইন করেনি। তবু নবদিগন্তে গিয়ে ঝামেলা করছে।
তৃতীয়: এরকম চলতে থাকলে কী করতে হবে সেটা নিশ্চয়ই এতদিন পর তোমাকে বলে দিতে হবে না!
'ইয়েস স্যার!' মাথা নাড়ল দ্বিতীয় লোকটা।
আমাকে আর বাড়িতে ফিরতে দেয়নি টাপুরদি। বাবা-মা না ফেরা পর্যন্ত আপাতত আমি টাপুরদির বাড়িতে ঘাঁটি গেড়েছি। আজ সারাদিন টাপুরদি বাড়িতে ছিল না। কোথায় বেরোচ্ছে বলেনি, আমিও বেরোনোর মুখে আর জানতে চাইনি। আমি সারাদিন বাড়ি থেকেই অফিস সামলেছি। সন্ধের পর টাপুরদি বাড়ি ফিরে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। স্নান করে বেরিয়ে এসে বলল, 'একটু চা কর না রে মিতুল। খুব টায়ার্ড লাগছে।'
'তুমি বলার আগেই বসিয়ে দিয়েছি।' বললাম আমি।
'গুড গার্ল!' বলে হেসে সোফায় গা এলিয়ে দিল টাপুরদি।
'সারাদিন ছিলে কোথায়?' জিজ্ঞাসা করলাম এখন।
টাপুরদি চোখ বুজেই বলল, 'অনেক জায়গায়। নবদিগন্তের ঠিকুজি-কুষ্ঠি বের করতে গেছিলাম।'
'পেলে?' জানতে চাইলাম আমি।
'সব না হলেও কিছুটা পেয়েছি।'
আমি উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, 'দাঁড়াও, চা-টা নিয়ে আসি। তারপর শুনব।'
রান্নাঘরে ঢুকে দু-টি কাপে চা ঢাললাম। প্লেটে কুকিজ আর ড্রাইফ্রুটস সাজিয়ে নিয়ে বসার ঘরে এলাম। সেন্টার টেবিলের ওপর ট্রে-টা রেখে গুছিয়ে বসলাম আমি। বললাম, 'এবার বলো।'
চায়ের কাপটা তুলে এক চুমুক দিয়ে টাপুরদি বলল, 'বেড়ে বানিয়েছিস! হুম, যা বলছিলাম, নবদিগন্ত হ্যান্ড-ওভার হয় বারো সালের অক্টোবরে। যেহেতু কাগজে-কলমে নন-প্রফিট অর্গানাইজেশন, তাই আর্থিক লেনদেনের কোনো উল্লেখ নেই। সেই সময়ে নতুন কমিটিতে ছিল মোট ছয়জন। এর মধ্যে একজন হলেন ওখানকার লোকাল এমএলএ সত্যব্রত মল্লিক। বিনয়কৃষ্ণ ভট্টাচার্যের পরিবারের একজন সদস্যও আছেন। তার নাম দেবাশিস মিত্র। ভদ্রলোক পেশায় ডাক্তার, দক্ষিণ কলকাতার একটি নামি হাসপাতালে গ্যাস্ট্রো-এন্টোরোলজি বিভাগের সার্জেন। যত দূর জানতে পেরেছি, পুরো ডিলটা এই ডাক্তারবাবুর মাধ্যমেই হয়েছিল। তিনি আগে থেকেই বিনয়কৃষ্ণ মেমোরিয়ালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।'
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'তাহলে যে উত্তীয়দা বলল বিনয়কৃষ্ণবাবু পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম হোমের ব্যাপারে ইন্টেরেস্টেড ছিল না?'
'হুম', বলল টাপুরদি, 'এখানে ব্যাপারটা একটু জটিল। তাহলে তোকে বিনয়কৃষ্ণ ভট্টাচার্যের পারিবারিক ইতিহাস একটু বলতে হয়। বিনয়কৃষ্ণবাবু আদতে ওই পরিবারের কেউ নন। তাঁকে দত্তক নিয়েছিলেন তাঁর বাবা অনাদিভূষণ ভট্টাচার্য। অনাদিভূষণের একটিমাত্র মেয়ে ছিল। বিনয়কৃষ্ণ ছিলেন অনাদিভূষণের এক কর্মচারীর ছেলে। একটি দুর্ঘটনায় পুরো পরিবারকে হারান বিনয়কৃষ্ণ, এসে পড়েন অনাদিভূষণের আশ্রয়ে। লেখাপড়ায় ভালো বুদ্ধিমান ছেলেটিকে দত্তক নেন অপুত্রক অনাদিভূষণ। এই ভট্টাচার্য পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম বলতে উত্তীয় এই বিনয়কৃষ্ণর উত্তরাধিকারীদেরই বুঝিয়েছে।
'এদিকে অনাদিভূষণের মেয়ে কুন্তলা দেবীর ছেলে হলেন দেবাশিসবাবু। কুন্তলা দেবী নিজের পছন্দে বিয়ে করেন বলে অনাদিভূষণ জীবদ্দশায় তাঁর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেননি। সেটা অকারণ নয় অবশ্য। কুন্তলার স্বামী ছিলেন পলিটিকাল গুন্ডা। তোলাবাজি থেকে শুরু করে কিডন্যাপিং, খুন সবেরই চার্জ ছিল তাঁর ওপরে। দলীয় কোন্দলে গোলাগুলি চলে। গুলি লেগে মারা যান তিনি। কুন্তলা দেবীর বাবা তাঁকে ফিরিয়ে না নিলেও তাঁর মৃত্যুর পর বিনয়কৃষ্ণবাবু ভাগনেটিকে নিজের কাছে টেনে নেন। বরাবরই তুখোড় ছাত্র ছিলেন দেবাশিসবাবু। তাঁর উচ্চশিক্ষার খরচও চালান বিনয়কৃষ্ণবাবু।
'বিনয়কৃষ্ণবাবুর নিজের দুই ছেলেই খুব কম বয়সে মারা গেছেন। দুই ছেলের ঘরের তিন নাতি ও এক নাতনি দেশের বাইরে সেটলড। তাঁরা এখানকার হোম নিয়ে একেবারেই ইন্টারেস্টেড ছিলেন না। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভাগনেই তাঁর কাছে ছিলেন। বিনয়কৃষ্ণবাবু নিজের সম্পত্তির কিছু অংশ ভাগনেকে দিয়েছেন। তিনি নিজে ছিলেন অনাথ। হয়তো সেই কারণেই একটি অনাথ আশ্রম স্থাপন করতে চেয়েছিলেন, করেওছিলেন। তাঁর ছেলেরা যতদিন বেঁচে ছিলেন, তাঁরাও আশ্রমটা চালিয়েছেন। তাঁদের মৃত্যুর পর দেবাশিসবাবুর পরামর্শেই বিনয়কৃষ্ণবাবুর নাতিরা নবদিগন্তের হাতে তাদের হোমটা তুলে দেন।'
'আচ্ছা, বুঝলাম।' বললাম আমি, 'তা তুমি এসব গল্প কোত্থেকে কালেক্ট করলে?'
মুচকি হাসল টাপুরদি। বলল, 'সারাদিন কি এমনি এমনি ঘুরে বেড়ালাম মামণি? কত জায়গায় গেছি জানিস! এসব খবর, বিনয়কৃষ্ণবাবুর ইতিহাস পেতে অবশ্য বেশি গা ঘামাতে হয়নি। এই কাজটা উত্তীয়ই করে রেখেছিল। তবে নবদিগন্তের ট্রাস্টি কমিটির ফাউন্ডার মেম্বারদের হালহকিকত বের করতে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছে। ভাগ্যক্রমে এফসিআরএ রেজিস্ট্রেশন অফিসে আমার এক বন্ধুর দাদা কাজ করেন। তিনিই আমার অনুরোধে নব দিগন্তের রেজিস্ট্রেশনের কাগজ বের করে দিলেন।'
'আচ্ছা, দু-জন তো হল। বাকি চারজন কারা?' জানতে চাইলাম আমি।
টাপুরদি বলল, 'নবদিগন্ত এনজিও-র প্রতিষ্ঠাতা শিউলি মজুমদার, তাঁর ভাই সাগর দাশগুপ্ত। দু-জনেই আছেন কমিটিতে। এখানে দুটো কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। শিউলি মজুমদারের হাজব্যান্ড শেখর মজুমদার একজন রিটায়ার্ড আইপিএস। তিনি মারা গেছেন ২০২০-তে। সাগরবাবু দিল্লিতে থাকেন। তিনি একটি ফার্মা কোম্পানির মালিক।'
'আর রইল বাকি দুই', বললাম আমি।
'ঠিক।' হাসল টাপুরদি, 'একজন শোভন সেন। বিনয়কৃষ্ণবাবুর ছোটো ছেলের বন্ধু। নবদিগন্ত টেক-ওভারের আগে থেকেই কমিটিতে ছিলেন তিনি। বিনয়কৃষ্ণর ছেলেদের সঙ্গে মিলে অনাথ আশ্রমটিকে হাতে করে দাঁড় করিয়েছিলেন। বছর দু-এক আগেই একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন ভদ্রলোক। আর শেষজন রাঘব সামন্ত। এই রাঘব সামন্ত একটি পিকিউলিয়ার ক্যারেক্টার। এঁর সম্পর্কে কোনো তথ্য জোগাড় করে উঠতে পারিনি এখনও। নবদিগন্ত সেবাশ্রমের সঙ্গে তাঁর কী সম্পর্ক, তাই বুঝে উঠতে পারছি না।'
'কেমন?'
টাপুরদি একটু থামল। তারপর বলল, 'এই রাঘব সামন্ত সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যাচ্ছে না। লোকটা কে, কোথা থেকে এসেছে, বিনয়কৃষ্ণবাবু বা এই হোমের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত কিছুই তথ্য নেই আমাদের কাছে।'
'কেন?'
'জানি না।' বলল টাপুরদি, 'এই নবদিগন্তের সব কিছুই কেমন ঘোরালো। সব জট পাকিয়ে আছে। আর এই রাঘব সামন্ত হলেন মিস্টার এক্স। তিনি কে, কোথায় থাকেন, আদৌ এক্সিস্ট করেন কি না, করলেও বেঁচে আছেন কি না, নবদিগন্তের সঙ্গে কী সম্পর্ক কিছুই জানি না!'
'কেন? রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটে ডিটেলস তো থাকার কথা!''
টাপুরদিকে একটু অন্যমনস্ক দেখাল। বলল, 'থাকার কথা তো ছিল। কিন্তু নেই।'
'নেই মানে?' বিস্মিত স্বরে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'নেই মানে, নেই। কেউ সরিয়ে দিয়েছে সব ডেটা। আজ আমি গিয়ে খোঁজ করতে চুরিটা ধরা পড়ল।'
'বলো কী? যাই হোক, কমিটির অন্যান্যরা তো দেখেছেন তাঁকে। তাঁরা নিশ্চয়ই চেনেন। আর রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটের কপি নিশ্চয়ই নব দিগন্তের অফিসেও থাকবে। সেখানে ছবিও পাওয়া যাবে, অন্যান্য নথিও।'
টাপুরদি মাথা নাড়ল। বলল, 'ভেবে দ্যাখ মিতুল। এই রাঘব সামন্ত যদি রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ফোটো সরাতে পারেন, তাহলে নবদিগন্তের অফিস থেকে সরানো তো তাঁর বাঁ হাতের খেলা, যেখানে তিনি নিজেই কমিটি মেম্বার।'
আমি বললাম, 'কিন্তু টাপুরদি! এমনও তো হতে পারে যে নথিটা রেজিস্ট্রি অফিস থেকে কেউ চুরি করেনি। পুরোনো জিনিস, কোথাও হারিয়ে গেছে।'
টাপুরদি চোখ কটমট করে আমার দিকে তাকাল। বলল, 'বুদ্ধিটা কোথায় বন্ধক দিয়ে এসেছিস? আজকাল সরকারি অফিসে সব নথি কম্পিউটারাইজড করা হয়। সেখানকার ডেটাবেস থেকেই গায়েব হয়েছে ছবিটা।'
'তাহলে এখন কী হবে? নবদিগন্তের কাছে যে কপি আছে, তাতে রাঘব সামন্তর ছবি আছে কি না জানতে হলে তো নবদিগন্তে ঢোকা ছাড়া উপায় নেই টাপুরদি।' বললাম আমি।
টাপুরদি বলল, 'এই কেসটা এক আশ্চর্য গোলকধাঁধা রে মিতুল! যেদিক দিয়েই এগোতে যাচ্ছি, সব রাস্তা ঘুরে ফিরে নবদিগন্তে এসে থেমে যাচ্ছে। অর্জুন শুনলেই আবার রে রে করে উঠবে জানি, কিন্তু নবদিগন্তের ভেতরে না ঢুকে এই কেস সলভ করা কঠিন।'
কাল সারাটা রাত দু-চোখের পাতা এক করতে পারেনি লালন। এক রাতের মধ্যে চোখের সামনে দিয়ে দু দু-টি মৃত্যু প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে তাদের। এই ঘর থেকে কাল দু-টি মৃতদেহ বেরিয়েছে। এই ঘর যেন এখন সাক্ষাৎ নরক। মৃত্যু এখানকার অধিবাসীদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। মৃত্যু দেখে দেখে এ ঘরের দেয়াল, ইট, কড়ি-বরগাও যেন আজকাল নিস্পৃহ।
ভিড় কমে আসছে। বাকিদের আজকাল একটু হাত-পা ছড়িয়ে শোয়ার জায়গা জোটে। এখানে কেউ কারও সঙ্গে আর কথা বলে না। যেটুকু সময় জেগে থাকে, শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে, কেউ কেউ নিজের মনে বিড়বিড় করে। এরা জেনে গেছে, মৃত্যু অমোঘ। মৃত্যুর পরে আর কিছু নেই। এই পৃথিবীতে মৃতেরা কখনো ফেরে না, তারা কোথাও নেই। এখানে মানুষ মেনে নিয়েছে একজন সরে গেলে অন্যদের একটু বেশি জায়গা সংকুলান হয়। তবু সেই অতিরিক্ত স্থানটুকুও চিরসত্য নয়। তাও ছেড়ে দিতে হয় একদিন, জীবিত বা মৃত অবস্থায়।
হ্যাঁ, জীবিত অবস্থাতেও বেরোয় বই কি! কোথায় নিয়ে যাওয়া হয় তাদের, কেউ জানে না। এখন আর কেউ জানার চেষ্টাও করে না। মাঝে মাঝে লালনের মনে হয় এটা একটা গুদামঘর। পচা আলুর মতো মৃতদেহগুলিকে বের করে ফেলে দেওয়া হয়, কোথায় কে জানে! আর যারা বেঁচে আছে, তারা কাজে লাগে। তাদের শরীরের প্রতিটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খুব দামি। এতদিনে এই ঘরের সকলে এই সারসত্যটা জেনে গেছে। অপারেশনের ধকল সয়ে যারা বেঁচে যাচ্ছে, তাদের আবার কোনো না কোনোদিন অপারেশন টেবিলে শুতে হবে। এভাবেই চলবে, যতদিন না সেই টেবিলেই তাদের মৃত্যু হয়, অথবা শরীরের সব অঙ্গ দান করে ফেলার পর বাইরের খোলসটা পচে ফুলে উঠে শেষ হয়ে যায় ধুঁকে ধুঁকে।
লালন এখন জানে, তার একটা কিডনি বের করে নেওয়া হয়েছে। পথের ছেলে সে। জীবনের রূঢ়তাকে খুব কাছ থেকে অনুভব করেছে। এসব বুঝতে তার অসুবিধে হয় না। এটাও লালন ভালো করেই জানে, এখনও তার অনেক কিছু আছে দেওয়ার। এখনও এই বাজারে তার দাম আছে। তাই তাকে দেখতে ডাক্তারবাবু আসেন। তাকে ওরা ঠিক মতো খাবার-দাবার দেয়। যতদিন না ওর শরীর থেকে শেষ অঙ্গটি ওরা খুলে নেবে, ততদিনই ও খুব মূল্যবান। জসীমচাচার দুটো কিডনিই বের করে নিয়েছিল ওরা। খুব দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছিল জসীমচাচা। সে যে কী কষ্ট, চোখে দেখা যায় না। তাই হয়তো নিজের প্রাণটা দিয়ে লালনকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। নাকি ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে গুলি খেয়ে মরাটা সহজ বলে মনে হয়েছিল তার!
চোয়াল শক্ত হয়ে আসে লালনের। হাতের তালু মুঠি হয়। দ্রুত নিশ্বাস পড়তে থাকে। একবার, অন্তত আরও একবার চেষ্টা না করে মৃত্যুর হাতে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে রাজি নয় সে। মরতে তো হবেই। তাহলে পালাতে গিয়ে যদি জসীমচাচার মতো গুলি খেয়েও মরে, তাতে কী যায়-আসে? কতজনই তো কতভাবে মরে? মৃত্যুর চেয়ে সত্যি আর কী আছে? চিন্তাটা লালনকে স্থির থাকতে দেয় না। এই ঘরের বাইরে কী আছে, পাহারায় কতজন আছে, এই জায়গাটা কোথায় কিছুই জানে না সে। এখান থেকে বেরোতে পারলে জেনে নিতে কতক্ষণ! কিন্তু কীভাবে বেরোবে?
এই ঘরের দরজা সারাদিনে তিনবার খোলে। সকালে, দুপুরে ও রাতে ওদের খেতে দেওয়া হয়। ঘরের সঙ্গেই অ্যাটাচড বাথরুম আছে। টানা বাথরুমে দু-টি চান করবার জায়গা এবং তিনটি আলাদা খুপরিতে কমোড রয়েছে। মুখ-হাত ধোয়ার বেসিন আছে একটা। তার ঠিক পাশে ওপরের দিকে একটা বড়ো মাপের ঘুলঘুলি আছে, যেটা চারটে কাঠের তক্তা দিয়ে পেরেক ঠুকে আটকানো আছে। তক্তাগুলির ফাঁক দিয়ে সরু আলোর রেখা এসে ঢোকে অন্ধকার বাথরুমে। এই আলোটুকুই বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে এই ঘরে ক্ষীণ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।
এমনিতে ভীষণ অপরিচ্ছন্ন এই বাথরুমে ঢুকলে দুর্গন্ধে পেটের ভেতরটা গুলিয়ে ওঠে। কিন্তু কিছুদিন ধরে লালন এখানে অনেকটা সময় কাটাচ্ছে। এই ঘরের বেশিরভাগ অধিবাসী কড়া ঘুমের ওষুধের ঘোরে থাকে। লালনও ছিল। ইদানীং অপারেশনের ব্যথা কমে আসায় এবং হয়তো সেও কিছুটা বাধ্য ছেলে হয়ে থাকায় তার ইঞ্জেকশন বন্ধ করা হয়েছে। তার পরিবর্তে খাওয়ার ওষুধ দেওয়া হচ্ছে তাকে। লালন চিনে নিয়েছে, ছোটো ছোটো সাদা রঙের গোল ট্যাবলেটগুলোই ঘুমের ওষুধ। ক-দিন ধরে ওষুধগুলো লুকিয়ে ফেলে দিচ্ছে সে। রাতে যখন এই ঘরের মানুষগুলো গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে, তখন তার কাজ শুরু হয়।
কাজটা সামান্যই;কয়েকটা পেরেক খোলা। কিন্তু খালি হাতে কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়া সেই সামান্য কাজটাই দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। তার ওপর ঘুলঘুলির নাগাল পেতে হলে বেসিনের ওপর উঠে দাঁড়াতে হয়। সেটিও খুব একটা শক্তপোক্ত নয়। লালন উঠে দাঁড়াতে গেলে নীচ থেকে ঘটঘট শব্দ করে নড়ে। ভয় হয়, কোনোদিন না পুরোটা খুলে লালনকে নিয়ে নীচে পড়ে!
তবু লালন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দু-দিন আগে একটা তক্তা খুলতে গিয়ে আঙুলে কেটে গেছিল। যে লোকটা খাবার দিতে আসে, সে বাকিদের মতো অত নিষ্ঠুর নয়। সম্ভবত এদের দলের লোকও নয়। লালন তার কাটা হাত দেখিয়ে একটা চামচ চেয়েছিল। লোকটা ভেবে দেখলে বুঝতে পারত, এই বন্ধ ঘরে হাত কাটার কোনো কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু সে মাথা ঘামায়নি। পরের দিন একটা চামচ এনে দিয়েছিল লালনকে। তার পরের দিনও। দু-তিনদিন পরে একদিন লালন আর সেটা ফেরত দেয়নি। লোকটাও চায়নি, কেন কে জানে!
চামচটা পেতে একটু সুবিধে হয়েছিল। প্রায় বারোদিন ধরে সারারাত পরিশ্রম করে চারটের মধ্যে তিনটে তক্তা খুলে ফেলতে পেরেছে লালন। কিন্তু সেইটুকু ফাঁক দিয়ে একটি পনেরো-ষোলো বছরের ছেলের বেরোনোর পক্ষে যথেষ্ট নয়। ঘুলঘুলি থেকে উঁকি মেরে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করেও অন্ধকারে কিছুই দৃষ্টিগোচর হয়নি। যদি ঘরটা দোতলা, বা তিনতলা বা আরও উঁচুতে হয়, তাহলে হয়তো লালনের পরিশ্রমটুকু জলে যাবে।
তবু লালন হাল ছাড়ে না। শেষ তক্তাটা খুলে ফেলতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। যদিও তারপরও এখান থেকে বেরোনোটা সহজ হবে না। কারণ বেসিনের ওপর উঠে দাঁড়ালেও ঘুলঘুলিটা লালনের মাথা সমান উঁচুতে পড়ে। সেখান দিয়ে বের হওয়া খুবই কঠিন। কিন্তু লালন আপাতত সে নিয়ে ভাবছে না। আগে তক্তাগুলো খোলা হোক, তারপর দেখা যাবে। খোলা তিনটে তক্তা সে আলগা করে পেরেক দিয়ে কোনোমতে লাগিয়ে রেখেছে যাতে কেউ বুঝতে না পারে।
হাতে আর বেশি সময় নেই বুঝতে পারছে লালন। আজ সকালে ডাক্তারবাবু এসেছিলেন তাকে দেখতে। পরীক্ষা করে দেখে সঙ্গে ষণ্ডা মতোন লোকটার দিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে ইশারা লালনের নজর এড়ায়নি। অর্থাৎ সে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ আছে, হয়তো আর একটি অঙ্গ শরীর থেকে খুলে দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আর সময় নেই। যা করার খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে। আর একবার অপারেশন টেবিলে শুতে হলে হয়তো আর কোনোদিনই ফিরে যেতে পারবে না লালন। এতদিন ধরে চোখের সামনে এত মৃত্যু দেখে মৃত্যুকে আর ভয় করছে না তার। কিন্তু বাঁচার ইচ্ছেটাও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাই শেষ চেষ্টাটা করবে সে।
অফিসে পৌঁছোতেই পিয়োন রমেনদা জানিয়ে গেল, ডিসিডিডি স্যার অর্জুনকে তলব করেছেন। সেই যে স্যারের ঘরে ঢুকল অর্জুন, এখনও বেরোতে পারেনি। ঘরে ঢুকতেই সৌরভ সান্যাল চোখ পাকিয়ে বললেন, 'কী ব্যাপার অর্জুন? কোনো রিপোর্ট পাচ্ছি না কেন?'
হঠাৎ ধমকে অর্জুন থতমত খেয়ে বলল, 'চেষ্টা করছি স্যার।'
'চেষ্টা করছ যে, সেটা বুঝব কী করে? এদিকে উপরমহলে জবাব দিতে গিয়ে আমার প্রাণান্তকর অবস্থা। বডিটার আইডেন্টিটি জানা গেল কিছু?'
অর্জুন বলল, 'একটা ইনফরমেশন আছে। তবে সোর্সের অথেন্টিসিটি সম্পর্কে শিওর নই।'
'কীরকম?' জানতে চাইলেন সৌরভ সান্যাল।
অর্জুন উত্তরটা মনের মধ্যে একটু গুছিয়ে নিল। তারপর ইতস্তত করে বলল, 'বসব, স্যার? বুঝিয়ে বলতে সময় লাগবে।'
এর পর অর্জুন ডিসিডিডি স্যারকে উত্তীয় সোম, নবদিগন্ত হোম, লালনের নিরুদ্দেশ হওয়ার প্রসঙ্গ, সেখানে মৃত লোকটির উপস্থিতি, সর্বোপরি নিজের সোর্সের কাছে পাওয়া তথ্যগুলো সবই খুলে বলল। তারপর বলল, 'স্যার, তবে আমি নিজে উত্তীয় সোমের সঙ্গে কথা বলিনি এখনও। তাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না যে, উত্তীয় সত্যিই নবদিগন্ত হোমে লোকটাকে দেখেছে।'
সৌরভ সান্যাল মন দিয়ে সবটুকু শুনলেন। তারপর বললেন, 'হোমের নামটা কী বললে?'
'নবদিগন্ত সেবাশ্রম স্যার, হোমটা ওই সোনারপুরের দিকে।' বলল অর্জুন।
সৌরভবাবু ভুরু কুঁচকে কিছু ভাবলেন। তারপর বললেন, 'নামটা চেনা চেনা লাগছে। ঠিক মনে করতে পারছি না। উত্তীয় সোম লোকাল থানায় এফআইআর করেছে?'
'শুনলাম তো করেছে। কিন্তু সেখানে পুলিশ নাকি তাকে এন্টারটেন করেনি। উলটো 'হোম থেকে ছেলেরা অমন পালায়ই' বলে নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নিতে বলেছে।'
'ইডিয়টস!' দাঁতে দাঁত চেপে বললেন সৌরভ সান্যাল, 'এক কাজ করো অর্জুন। এই উত্তীয় সোমকে আজই ডাকো এখানে। তুমি নিজে ইন্টারোগেট করো। দেখো, লোকটা কী কী জানে! হি ক্যান বি আ ইউজফুল সোর্স ইন দিস কেস। কিন্তু সাবধানে হ্যান্ডল ক'রো, লোকটা যাদবপুরের লেকচারার। পান থেকে চুন খসলে ক্যাওস বাধিয়ে দেবে ছাত্র-ছাত্রীরা মিলে। সে অভিজ্ঞতা আমার খুব একটা সুখকর নয়।'
হেসে ফেলল অর্জুন। যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীদের কথা উঠতে টাপুরের মুখটা মনে পড়ে গেল। বলল, 'এদের হ্যান্ডল করা সত্যিই শক্ত।'
সৌরভ সান্যাল কী বুঝলেন কে জানে! গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বললেন, 'তা এই উত্তীয় সোমকে তুমি পেলে কোথা থেকে?'
অর্জুন বলল, 'ঠিক আমি পাইনি স্যার। পেয়েছে অন্য একজন। তার কাছেই জেনেছি উত্তীয় সোমের ব্যাপারে।'
'কে সে? তোমার সোর্স?'
হাসল অর্জুন। বলল, 'না। ঠিক সোর্স নয়। আপনিও চেনেন তাকে।'
'কে বলো তো!' জিজ্ঞাসা করলেন ডিসিডিডি।
'সঙ্ঘমিত্রা। ডিটেকটিভ সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি।' বলল অর্জুন।
'বলো কী! সে কী করছে এই কেসে, ব্যাপারটা খুলে বলবে আমাকে?'
অর্জুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর একটু ব্যাজার মুখে বলল, 'এই উত্তীয় সোম সঙ্ঘমিত্রার ক্লায়েন্ট। ওই যে ছেলেটি, লালন, তাকে খোঁজার জন্য উত্তীয় সোম সঙ্ঘমিত্রার হেল্প নিচ্ছেন। অ্যাজ সাচ, এইসব ইনফরমেশন সঙ্ঘমিত্রার সূত্রেই পেয়েছি।'
'বোঝো! লোকটার আইডেন্টিটি কিছু জানা গেল?'
অর্জুন বলল, 'উত্তীয় সোম জানিয়েছেন, একবারই লোকটিকে তিনি নব দিগন্তে দেখেছিলেন। লালন তাকে জসীমচাচা বলে ডাকছিল। উত্তীয় নিউজ দেখে নবদিগন্তে গিয়েও ছিলেন। তাঁকে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। জসীমকে নিয়ে চার্জ করলে নবদিগন্তের লোকেরা জসীমকে চিনতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। আমি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সোনারপুরের বস্তিতে গিয়েছিলাম, যেখানে লোকটা থাকত বলে জেনেছিলাম। যার ঘরে লোকটা ভাড়া থাকত সে বিশেষ কিছু বলতে পারেনি। তবে কনফার্ম করেছে যে লোকটার নাম জসীমুদ্দিন শেখ।'
'তার মানে এখন আমরা মৃতের নাম জানি। এও জানি যে সে নবদিগন্ত সেবাশ্রমে কাজ করত। কিন্তু এখন নবদিগন্ত সেটা অস্বীকার করছে। তাতে অসুবিধে নেই। উত্তীয় সোমের সামনে অস্বীকার করলেও পুলিশের সামনে করতে পারবে না। কিন্তু নবদিগন্তের ব্যাপার-স্যাপার ফিশি লাগছে। একটু খোঁজ নাও অর্জুন। আর শোনো, এইসব কেস কিন্তু ভীষণ রিস্কি হয়। যারা এই ধরনের বিজনেস করে, তারা বাধা পড়লে একটা মেয়েকে সরিয়ে দিতে এক সেকেন্ডও ভাববে না। যদিও আমরা এখনও জানি না সত্যিই নবদিগন্ত সেবাশ্রমের সঙ্গে জসীম বা অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর সত্যিই কোনো যোগ আছে কি না, তবু বলব সঙ্ঘমিত্রা এর থেকে দূরে থাকলেই ভালো করবেন। এই ধরনের কেস প্রাইভেট ডিটেকটিভের এক্তিয়ারের মধ্যেও পড়ে না।'
অর্জুন একটা দীর্ঘ নিশ্বাস চাপল। টাপুর যদি সত্যিই তার কথা শুনত, তাহলে তো এত সমস্যাই হত না। কিন্তু সে মেয়ে অন্য ধাতুতে গড়া। নিজের এক্তিয়ারের পরোয়া কবেই বা করেছে সে?
'বাই দ্য ওয়ে, তোমার সঙ্গে সঙ্ঘমিত্রার যোগাযোগ আছে?' জানতে চাইলেন সৌরভ সান্যাল।
অর্জুন একটু তুতলিয়ে বলল, 'হ্যাঁ মানে, ওই আর কী!'
'বেশ।' একটু ভেবে বললেন সৌরভ সান্যাল, 'তাহলে ওঁকে বুঝিয়ে ব'লো।'
অর্জুন মাথা নাড়ল। মনে মনে ভাবল, টাপুরকে বোঝানোর চেয়ে প্রত্যঙ্গ- ব্যবসায়ীদের ব্যাবসা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বোঝানো বেশি সহজ হবে। কিন্তু সে-কথা ডিসিডিডি স্যারকে বলা যায় না। অতএব ঘাড় নাড়ল সে। সৌরভ সান্যাল চুপচাপ ভাবলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, 'অর্জুন, এই কেসটা সবদিক থেকেই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের ওপরমহল থেকে চাপ আসছে। অরগ্যান ট্র্যাফিকিং, শুধু এ-দেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই রমরমিয়ে চলছে। পৃথিবীর কয়েকটি দেশে মরণোত্তর দেহদান, অঙ্গদান বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই আইনটা সর্বত্র প্রয়োজন। আমাদের দেশে তো খুবই দরকার। না হলে অরগ্যান ট্র্যাফিকিং বন্ধ করা যাবে না।
'কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সেটা করবে কে? রাজনৈতিক জটিলতা আছে, ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস আছে। 'কুর্সিকা কিসসা' সর্বত্রই। সব দলই জনমোহিনী রাজনীতিতে বিশ্বাসী। বোঝে না, রোগ সারাতে গেলে মাঝে মাঝে তেতো পাচন গেলাতে হয়। তাই সরকার বদলেছে একাধিকবার। কিন্তু স্বাধীনতার চুয়াত্তর বছর পরেও আজ পর্যন্ত কেউই এই বিষয়ে ভাবেনি। ফলস্বরূপ অরগ্যান ট্র্যাফিকিং দেশ জুড়ে একটা লাভজনক ব্যাবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা একটা বিষাক্ত ক্ষতের মতো দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। শুনেছি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইবি-ও এই ব্যাপারে তদন্ত করছে। তাদের একটা দল কলকাতায় আসতে পারে বলে একটা কানাঘুষো শুনছি। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে মুখ্য সচিব খবর পাঠিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীকে যেন এই কেসের প্রতিটি মাইনিউট ডিটেইলস ইনফর্ম করা হয়।'
'স্যার, আপনি তো জানেন এই ধরনের কেসে তাড়াহুড়ো করে কিছু রেজাল্ট পাওয়া সম্ভব নয়। এখানে আমরা একজন অপরাধীকে খুঁজছি না। একটা চক্রকে প্রমাণসহ ধরতে হলে একটু সময় তো লাগবেই', বলল অর্জুন।
সৌরভ সান্যাল মাথা নেড়ে বললেন, 'সময়টাই তো আমাদের হাতে নেই, অর্জুন। প্রেস, মিডিয়া থেকে গভর্নমেন্ট সকলেই মাথার ওপর ডানা মেলে উড়ছে। সামান্য গাফিলতির গন্ধ পেলেই ঝাপট মারবে। আমাদের এই কেসটা তাই কতটা গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ তুমি? আমাদের দেখতে হবে আইবি-র সামনে যেন কলকাতা পুলিশের মুখরক্ষা হয়। তাই আমি নিজেই কেসটা লিড করব। আমরা এই কেসে কাজ করব অ্যাজ আ টিম। কৌশিক আমাদের সঙ্গে থাকবে। সাইবারে উই নিড শুভম অ্যাজ হি ইজ দ্য বেস্ট। ফরেনসিকে ডক্টর পান্ডার টিম অলরেডি কাজ করছে। তিনি সবদিক দিয়েই অভিজ্ঞ ডাক্তার। তাই তিনিই থাকুন। তুমি সকলের সঙ্গে ফলো আপ করো। উত্তীয় সোমের সঙ্গে কথা বলে আমাকে জানাবে। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় আমরা পুরো টিম মিট করব। সেখানে পরবর্তী কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যাবে।'
'ওকে স্যার!' বলে স্যালুট ঠুকল অর্জুন।
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, পেছন থেকে সৌরভ সান্যাল ডাকলেন তাকে। অর্জুন ঘুরে দাঁড়াল। ডিসিডিডি বললেন, 'সঙ্ঘমিত্রাকে এই কেস থেকে দূরে থাকতে ব'লো। জানি, মেয়েটা রেবেল। কিন্তু ও বিপদে পড়ুক আমি চাই না। এবারের কেসটা ওর জন্য নয়।'
'ইয়েস স্যার', বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল অর্জুন।
।। চোদ্দো।।
'আমরা কোথায় যাচ্ছি বলবে একটু প্লিজ?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি আজ বেশ খোশমেজাজে আছে। সকালে গুনগুন করে গান গাইছিল। আমায় বলল, 'একটা জায়গায় যাব, যাবি?'
'কোথায়?' জানতে চেয়েছিলাম।
মুচকি হেসে স্নান করতে বাথরুমে ঢুকে পড়ল। তখনই বুঝেছিলাম, জবাব পাব না এত সহজে। এখন আমরা চলেছি মা ফ্লাইওভার ধরে। এখনও জানি না গন্তব্যটা ঠিক কোথায়। এফএমে গান বাজছে নচিকেতার 'চল যাব তোকে নিয়ে এই নরকের অনেক দূরে।' টাপুরদির এই হেঁয়ালিগুলো আমাকে বিরক্ত করে জানে টাপুরদি। তবু করবেই। তবে এবার বোধহয় তার দয়া হল। বলল, 'ডাক্তারের কাছে।'
'ডাক্তারের কাছে!' অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, 'কেন? কী হয়েছে?'
'অ্যাপেনডিক্স, বা গল ব্লাডার স্টোন, কিংবা ধর ওভারিতে সিস্ট, না ওভারি সিস্ট চলবে না, ওটা গাইনির ডিপার্টমেন্ট। উমম লিভারে সিস্ট হতে পারে, কিংবা...'
'ওয়েট!' বললাম আমি, 'মানেটা কী? কীসব বলে যাচ্ছ?'
হাসল টাপুরদি। বলল, 'এতগুলো রোগ বললাম, একটাও পছন্দ হল না?'
'ঝেড়ে কাশবে প্লিজ?' রাগত স্বরে বললাম আমি।
'ঝেড়ে আবার কী কাশব? কাশি হয়ইনি আমার। কাশির জন্য তো ইএনটি দেখাতে হত। কিন্তু এখন আমরা তো ইএনটি-র কাছে যাচ্ছি না। আমরা যাচ্ছি গ্যাস্ট্রো-সার্জেনের কাছে।'
'সার্জেন?' এক মুহূর্ত থমকালাম। তারপরেই উৎফুল্ল গলায় বললাম, ''আমরা ডক্টর দেবাশিস মিত্রের কাছে যাচ্ছি। রাইট?'
টাপুরদি মুচকি হাসল। উত্তর দিল না।
'কিন্তু তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন কেন?' জিজ্ঞাসা করলাম।
'বলবেন না ধরে নিয়েই যাচ্ছি। বললে সেটা অতিরিক্ত পাওনা।' টাপুরদি বলল।
'কিন্তু টাপুরদি, ওরা তো জেনে যাবে যে তুমি এই কেসে কাজ করছ। তাতে ওরা আরও বেশি সাবধান হয়ে যাবে না?'
'সতর্ক ওরা আগে থেকেই হয়ে গেছে। ডেডবডিটা পাওয়া যাওয়ার পর থেকে পুলিশ-প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। সেটা ওরাও ভালো করেই জানে। আর জানে বলেই এখন ওরা সাবধান হয়েছে। আমি তো ওদের কিডন্যাপিং-এর ব্যাপারে জানতে যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি ডাক্তারবাবুকে জানতে।' বলল টাপুরদি।
'তুমি কী বলছ, কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না আমার।' আমি বললাম।
'চেষ্টা করিস না। চুপচাপ গান শোন।' টাপুরদি হেসে বলল। তারপর নিজেই এফ এমের সঙ্গে গলা মিলিয়ে 'চল যাব তোকে নিয়ে' গুনগুন করতে শুরু করল। আমি মুচকি হেসে বললাম, 'নরকের অনেক দূরে? আর ইউ শিয়োর?'
টাপুরদি ঠোঁট টিপে হাসল। আমিও আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ জানলা দিয়ে রাস্তায় চোখ রাখলাম।
হেলথলাইন হসপিটালে পৌঁছে দেখা গেল ডাক্তারবাবু ওয়ার্ড ভিজিট করতে গেছেন। পেশেন্টের লিস্টে নিজের নাম লেখাল টাপুরদি। তারপর ওয়েটিং এরিয়ায় গিয়ে বসলাম দু-জনে। ঝাঁ-চকচকে এই হাসপাতালটি বছর পনেরো পুরোনো। তবে এর মধ্যেই বেশ নাম করেছে। বেশ কিছু কঠিন সার্জারি করে জনপ্রিয়তা ও পরিষেবার বিচারে প্রথম সারির হাসপাতালগুলির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। অন্যান্য রাজ্য, প্রতিবেশী দেশ থেকেও রোগীরা এখানে চিকিৎসার জন্য আসে।
ডক্টর দেবাশিস মিত্র ভিজিট সেরে এসে পৌঁছোলেন আরও পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে। আমাদের আগে আরও প্রায় দশ-বারোজন রোগী ছিল। তাদের দেখা শেষ হতে হতে দুপুর একটা বেজে গেল। তালিকায় শেষ নাম টাপুরদির। গম্ভীর সেক্রেটারি কড়া গলায় বললেন, 'সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি কে আছেন? এই পেশেন্ট বেরোলে আপনি যাবেন।'
আমরা দু-জন উঠে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ালাম। পরের রোগী বেরোতে আমরা ঢুকতে যাব, হঠাৎ কোত্থেকে একজন লম্বা-চওড়া মুশকো চেহারার লোক হন্তদন্ত হয়ে টাপুরদিকে ধাক্কা দিয়ে চেম্বারের ভেতরে ঢুকে গেল। এমন অসভ্যের মতো ব্যবহার দেখে রাগটা চড়াৎ করে চড়ে গেল। পেছন থেকে চ্যাঁচাতে যাব, টাপুরদি আমার হাত টেনে ধরল। আমি টাপুরদির দিকে তাকালাম, সে আমায় ইশারায় চুপ করে দাঁড়াতে বলল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম, সেক্রেটারি ভদ্রমহিলা ধারেকাছে নেই। আমাকে হাত ধরে একটু সরিয়ে নিল টাপুরদি। নিজে দরজার পরদার পাশে ঘেঁষে দাঁড়াল।
ভেতর থেকে উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্কের শব্দ ভেসে আসছে।
একটি উত্তেজিত ক্রুদ্ধ কণ্ঠ বলে উঠল, 'আপনি, মানে আপনি ভেবেছেনটা কী? নবদিগন্ত আপনার বাপের সম্পত্তি? যা খুশি করতে পারেন?'
অপর একটি শান্ত, বয়স্ক কণ্ঠ উত্তর দিল, 'বাপের না হলেও মায়ের সম্পত্তি তো বটেই। নেহাত সেই সময় মা আইন-আদালত করেননি। সে যাই হোক, হয়েছেটা কী?'
'আপনি কী অর্ডার দিয়েছেন? এভাবে হয় নাকি? হোমে কাজ তো আমাদের করতে হয়। এমনিতেই রোজ পুলিশ হুজ্জোত করছে, হোমের পেছনে ফেউ লেগেছে, তার ওপর আপনারা ওপরে বসে কিচাইন করছেন। আমাদের ভুগতে হচ্ছে। শালা!' রাগি গলা বলল।
বয়স্ক কণ্ঠ চাপা ধমক লাগিয়ে বলল, 'আহ আস্তে কথা বলো। এই হোম নবদিগন্তর হাতে আমি দিয়েছি। আমি যা বলব তাই হবে।'
'আপনি তো বলেই খালাস!' বলল রাগি কণ্ঠ, 'খরচ কত বেড়ে গেছে এদিকে। সবার তেল বেড়ে গেছে। এদের নিয়ে কাজ হয়? আপনি বসের সঙ্গে কথা বলুন। অর্ডার আছে, কাজ বন্ধ করা যাবে না। বাইরে থেকে...'
'কথা বাড়িয়ো না,' বয়স্ক কণ্ঠ বলল, 'এখানে শেষ কথা আমি বলব। 'সব হোম থেকেই আবাসিকরা পালায়', 'পুলিশ কী করবে?' এসব যুক্তি দিয়ে চলবে না আর। একজন ধরা পড়লে সবাই মরবে। লোভের সীমা থাকা উচিত। যাই হোক, এখন এখান থেকে যাও। বাইরে পেশেন্টরা আছে। অনেকবার বলেছি, এটা আমার কাজের জায়গা। এরকম হুটহাট এখানে আসবে না।'
'যাচ্ছি। কিন্তু আপনারা এক-একবার এক-একজন এক-এক রকম অর্ডার দিলে কাজ করতে পারব না বলে দিচ্ছি। বারবার অর্ডার পালটাবেন না' বলে হুড়মুড় করে ষণ্ডা লোকটা পরদা সরিয়ে বেরিয়ে এল। টাপুরদি তার আগেই চট করে সরে এসেছে। একদৃষ্টিতে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এই মুহূর্তে ঘড়ি দেখার চেয়ে জগৎ-সংসারে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ কিছু নেই। লোকটা অবশ্য কোনোদিকে না তাকিয়ে হনহন করে যেমন এসেছিল, তেমনই বেরিয়ে গেল।
'নেক্সট?' ভেতর থেকে ডাক এল।
আমি টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম।
টাপুরদি বলল, 'চল। তুই কোনো কথা বলবি না। যা বলার আমি বলব।'
আমি বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়লাম।
ডক্টর দেবাশিস মিত্রর বয়স ষাটের আশেপাশে হবে। শুভ্র কেশ, গায়ের রং টকটকে ফর্সা। আমরা ঘরে ঢুকতে একবার চোখ তুলে তাকালেন। টাপুরদির মুখের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ একটু দীর্ঘ হল মনে হল। তারপর হাতের প্রেসক্রিপশনে চোখ রেখে বললেন, 'সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি! বসুন।'
চমকে উঠলাম। তবে কি ভদ্রলোক আগে থেকেই টাপুরদিকে চেনেন? পরক্ষণেই ভুল ভাঙল। বিলিং কাউন্টারে নাম লিখে বিল পেমেন্ট করার পর সেখান থেকেই প্রেসক্রিপশন প্যাডে রোগীর নাম, বয়স লিখে ডাক্তারের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাঁর হাতে ধরা প্রেসক্রিপশনে স্পষ্ট হরফে নাম লেখা আছে 'সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি', বয়স উনত্রিশ প্লাস।
ডাক্তারের টেবিলের সামনে রাখা দু-টি চেয়ারে আমরা দু-জন বসলাম।
'কী সমস্যা?' ডক্টর মিত্র টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞাসা করলেন।
টাপুরদি বলল, 'ক-দিন ধরে পেটে খুব ব্যথা হচ্ছে।'
'কোন দিকে?'
'ডান দিকে নীচের দিকটাতে', অম্লানবদনে বলল টাপুরদি।
ডাক্তার কোনো কথা না বলে প্রেসক্রিপশনের বাঁ দিকে লিখলেন 'পেইন ইন রাইট লোয়ার অ্যাবডোমেন।'
'আর কিছু?' জিজ্ঞাসা করলেন ডাক্তার মিত্র।
টাপুরদি বলল, 'খিদে হচ্ছে না। মাঝে মাঝে ব্যথাটা খুব তীব্র হয়ে উঠছে।'
ডাক্তার উঠে দাঁড়ালেন। টাপুরদির দিকে তাকিয়ে পাশের সরু বেডের দিকে দেখিয়ে বললেন, 'শুয়ে পড়ুন।'
আমি একবার টাপুরদি মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। টাপুরদি ভাবলেশহীন মুখে গিয়ে বেডে শুয়ে পড়ল। ডাক্তার বেশ কিছুক্ষণ পেটে টিপেটুপে দেখে বললেন, 'উঠে আসুন।'
টাপুরদি উঠে এসে চেয়ারে বসল। ডক্টর মিত্র মাথা নিচু করে খসখস করে কিছু লিখছেন প্রেসক্রিপশনে। টাপুরদি এবার বলল, 'আপনার রেফারেন্স আমাকে আমার এক বন্ধু দিয়েছে। আপনি চিনবেন হয়তো। নাম উত্তীয় সোম, যাদবপুরে কমপ্যারেটিভ লিটারেচার পড়ায়। ও-ই বলল, দেখাতে হলে আপনাকেই দেখানো উচিত। আপনি এই শহরের বেস্ট সার্জেন।'
ডক্টর মিত্রর কলম মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার পরমুহূর্তেই আবার লিখতে শুরু করলেন। লেখা শেষ হলে প্রেসক্রিপশনটা টাপুরদির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'আমি খালি হাতে পরীক্ষা করে কিছু সমস্যা বুঝলাম না। একটা আলট্রাসাউন্ড লিখে দিলাম। ওটা করে নিয়ে এসে দেখিয়ে যাবেন। আপাতত কোনো ওষুধ দিচ্ছি না। শুধু একটা ট্যাবলেট লিখে দিয়েছি। বেশি ব্যথা হলে খাবেন, নইলে নয়।'
টাপুরদি হাত বাড়িয়ে প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে বলল, 'উত্তীয় আপনার খুব প্রশংসা করছিল। চেনেন তো ওকে?'
একটু বিরক্ত মুখে মাথা নাড়লেন ডক্টর মিত্র। বললেন, 'না, মনে পড়ছে না।'
টাপুরদি যেন আজ পণ করেই এসেছে যে ডক্টর মিত্রকে মনে করিয়েই ছাড়বে। উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বলল, 'আরে, উত্তীয়কে চিনলেন না? ও স্ট্রিট চাইল্ডদের নিয়ে কাজ করে। আপনাদের নবদিগন্ত হোমে একটা ছেলেকে রেখেছিল ও। ছেলেটার নাম লালন। মুশকিল হল, ছেলেটা আবার ক-দিন আগে হোম থেকে নাকি হারিয়ে গেছে। আচ্ছা, আপনাদের হোমে সিকিওরিটি তো খুব টাইট শুনেছি। তাহলে বারবার এমন করে কী করে বাচ্চা হারিয়ে যায়, বলুন তো?'
ডক্টর মিত্র এবার পেনের ঢাকনাটা ধীরে-সুস্থে বন্ধ করলেন। তারপর নিজের রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালেন। তারপর মুচকি হেসে টেনে টেনে বললেন, 'সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি। প্রাইভেট ডিটেকটিভ। অমিয় চক্রবর্তীর কেসটাতে পুলিশের সঙ্গে আপনিও ছিলেন তাই তো?'
টাপুরদির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা। এ যেন সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি। কোনো উত্তর দিল না টাপুরদি।
ডক্টর মিত্র বললেন, 'ভাবছেন ভেতরের কথা আমি জানলাম কী করে? জেনে গেলাম! এরকম অনেক কথাই আমি এমনি এমনিই জেনে যাই। আপনি এখানে ঢোকার সময়েই আপনাকে চিনেছি। যাই হোক, বলুন, কী জানতে চান?'
টাপুরদি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে টেবিলের দিকে ঝুঁকে বসল। ডক্টর মিত্রর চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করল, 'নবদিগন্তের ভেতর কী চলছে সেটা আপনাকে জিজ্ঞাসা করব না। কারণ জিজ্ঞাসা করলেও আপনি বলবেন না জানি। আমি অন্য একটা কথা জানতে এসেছি।'
'আগে আপনি বলুন, আপনার প্রশ্নের জবাব আমি কেন দেব?' জিজ্ঞাসা করলেন ডক্টর মিত্র।
'দিতে না চাইলে দেবেন না।' হেসে বলল টাপুরদি, 'আপনার ইচ্ছে সেটা। কিন্তু বললে ভালো করতেন। যাই হোক, আমি জানতে চাইছি রাঘব সামন্ত কে? নামটা নিশ্চয়ই অচেনা ঠেকছে না। আপনাদের নবদিগন্ত হোমের ফাউন্ডার মেম্বারদের মধ্যে একজন তিনি। রেজিস্ট্রেশন ফর্মেও তার নাম আছে।'
ডক্টর মিত্র বললেন, 'এত কিছু যখন জেনেই গেছেন, তখন বাকিটাও নিজেই জেনে নিন।'
টাপুরদি বলল, 'তা জেনে নেব। আপনি বলে দিলে কিছুটা সময় বাঁচত আর কী! যাই হোক, একটা খবর আপনাকে দিয়ে যাই। আমার ধারণা, খবরটা আপনি এখনও জানেন না। নবদিগন্ত সেবাশ্রমের রেজিস্ট্রেশনের নথি থেকে রাঘব সামন্তর সমস্ত ডিটেলস কে বা কারা সরিয়ে দিয়েছে। আপনি নিশ্চয়ই চেনেন রাঘব সামন্তকে?'
এবার ডক্টর মিত্রের মুখের রেখার বিস্ময় আর চাপা রইল না। বললেন, 'মানে?'
'মানে, যা বললাম তাই।' কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল টাপুরদি, 'এর আর একটা মানে আছে। ফাঁসলে আপনারা ফাঁসবেন। রাঘব সামন্তকে কেউ ছুঁতে পারবে না। তিনি ঠিক পিছলে যাবেন।'
'হোয়াট ননসেন্স!' ডক্টর মিত্রের উত্তেজনা আর চাপা থাকছে না।
টাপুরদি উঠে দাঁড়াল। বলল, 'আপনি না বললেও রাঘব সামন্তকে আমি নিজের মতো করে চিনে নেব, ডক্টর মিত্র! আপনি আমাকে চেনেন, ভালোই হল। এর পর থেকে আর মিথ্যে রোগের অভিনয় করতে হবে না। একটা কথা বলে যাই, আপনাদের নবদিগন্ত হোমে আপনারা যা যা করছেন, সেগুলো ঠিক করছেন না। একটা বাচ্চা ছেলের জীবনের প্রশ্ন, আমি এত সহজে হাল ছাড়ব না। আপনাদের ওই রাঘব সামন্ত, সেই তো বোধহয় আপনাদের বস, তাই না? তাঁকে বলে দেবেন।'
'আপনি কি আমাকে থ্রেট করছেন?' কঠিন স্বরে প্রশ্ন করলেন ডক্টর মিত্র।
'না, সাবধান করে দিচ্ছি।' একপেশে হাসি হেসে বলল টাপুরদি, 'জসীমকে মেরে আপনাদের লোকেরা কাঁচা কাজ করে ফেলেছে। আমার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। কিন্তু পুলিশ ছাড়বে না আপনাদের। সকলকে জেলে ঢোকালে তখনও রাঘব সামন্তকে আড়াল করবেন তো?'
ডক্টর মিত্রর চোয়াল শক্ত হল। কেটে কেটে বললেন, 'তাহলে পুলিশের কাজটা তাদেরই করতে দিন। আপনি মাথা নাই বা গলালেন।'
'সেটা না হয় আমিই বুঝে নেব ডক্টর মিত্র। আজ আসি।' বলল টাপুরদি।
'এভাবে ডক্টর মিত্রর কাছে চলে গেলে তুমি?' অর্জুনদা চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞাসা করল।
বেচারা অর্জুনদা! যখনই ভাবে যে টাপুরদিকে নিয়ে বিস্মিত হওয়া বুঝি তার শেষ হয়ে গেছে, তখনই টাপুরদি এমন কিছু করে বসে যে অর্জুনদা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।
'কী হল? অমন মুখ করে আছ কেন? চা-টা খাও। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।' বলল টাপুরদি।
অর্জুনদা চায়ের কাপটা হাতে তুলে চুমুক দিল। তারপর বলল, 'ডিসিডিডি স্যার তোমাকে জানাতে বলেছেন যে এই কেসটা যথেষ্ট রিস্কি। তাই তোমার এতে জড়ানো ঠিক হবে না।'
'আমি পুলিশে চাকরি করি না। পুলিশি ব্যাপারে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। তোমার ডিসিডিডি স্যারের উপদেশ মানার কোনো দায় আমার নেই।' নির্লিপ্ত মুখে বলল টাপুরদি।
'সে কি আমি আর জানি না?' চায়ের কাপে আর একটা চুমুক দিয়ে বলল অর্জুনদা, 'বাই দ্য ওয়ে, এই চা-পাতাটা কোত্থেকে জুটিয়েছ? তোমায় পচা জিনিস গছিয়েছে।'
'চোপরাও!' ছদ্ম গর্জন করে বলল টাপুরদি, 'প্রিমিয়াম মাসকাটেল সেকেন্ড ফ্লাশ চা। এটা তোমার পচা বলে মনে হল?'
'সে তোমার হেড-টেল যাই হোক না কেন, পচাকে আমি পচাই বলি। সস্তার বিড়ির মতো গন্ধ ছাড়ছে। এক কাঁড়ি টাকা ঢেলে পচা জিনিস গিলে উহু-আহা করতে পারব না। মিতুল, অ্যাম আই রাইট?'
আমিও বললাম, 'সত্যিই টাপুরদি, এবারের চা-টা ভালো দেয়নি গো। কেমন যেন একটা উগ্র সোঁদা গন্ধ। পুরোনো বোধ হয়, নইলে সিল খোলা ছিল।'
টাপুরদি চায়ে চুমুক দিয়ে ব্যোম হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, 'কালই দোকানে গিয়ে ধরছি দাঁড়া। সে যাক গে যাক, অর্জুন, তোমাদের তরফ থেকে কেস কত দূর?'
অর্জুনদা চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বলল, 'মিতুল, তোমার দিদির হেড-টেল চা তোমার দিদিকে খাওয়াও। আমাকে একটু কড়া করে কফি খাওয়াতে পারো বোনটি?'
আমি হেসে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, 'করে দিচ্ছি দাঁড়াও। টাপুরদি তুমি খাবে?'
টাপুরদি কিছু বলার আগেই অর্জুনদা বলল, 'না না, তোমার দিদি সেকেন্ড ফ্লাশ প্রিমিয়াম মাসকাটেল ফ্লেভার চা খাবে। তুমি তোমার আর আমার জন্য বানাও।'
'না রে মিতুল!' টাপুরদি গলা চড়াল, 'তুই বানাবি? তাহলে আমার জন্যও বানা। তুই কফিটা আজকাল বেশ ভালো করিস।'
আমি বললাম, 'সবার জন্যই করছি।'
এই ঘরের হাওয়া থেকে থেকেই ভারী হয়ে ওঠে। টাপুরদি ও অর্জুনদার মধ্যে সম্পর্কটা কোথায় যেন মাঝে মাঝে তাল কেটে যায়। হয়তো ওদের দু-জনের পেশাটাই এর কারণ। অথচ, দু-জন দু-জনের ওপর মানসিকভাবে কতটা নির্ভরশীল তা আর কেউ না জানুক আমি জানি। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, টাপুরদি কমিটমেন্ট ফোবিয়ায় ভুগছে। ভালোবাসা, নির্ভরতা সবই আছে। কিন্তু তবুও বিশ্বাসের জায়গাটা বোধহয় এখনও তেমন পোক্ত হয়নি।
টাপুরদিকে আমি অনেক বছর ধরে চিনি। সে আদ্যন্ত একজন স্বাধীনচেতা মানুষ। নিউ জার্সিতে কর্পোরেটে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছেড়ে কলকাতায় ফিরে এসেছে শুধু নিজের ভালোলাগাকে নিয়ে কাজ করার জন্য। টাপুরদির বাবা-মা মেয়ের এই অধঃপতন মানতে না পেরে বিরক্তিতে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন টাপুরদির থেকে। হাওড়াতে থেকেও কলকাতাতে টাপুরদির ফ্ল্যাটে আসেন না তাঁরা। টাপুরদিও অদম্য অভিমানে নিজে থেকে এগোয় না। ফলে সম্পর্কটা শুধুই ফর্মালিটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যোগাযোগ তলানিতে এসে ঠেকেছে।
অর্জুনদা টাপুরদিকে কতটা ভালোবাসে, তা টাপুরদি নিজেও খুব ভালো করে জানে। তবু ভয় পায়, যদি অর্জুনদা ওর 'প্যাশন'টাকে না বোঝে! আর অর্জুনদাটাও এমন বোকা, বারবার ওকে বাধা দিয়ে ওর ভয়টাকেই সত্যি করে তোলে। আমি জানি, অর্জুনদা নিজের জন্য ভয় পায় না। কিন্তু মানুষ যাকে ভালোবাসে, তাকে সব বিপদ থেকে দূরে রাখতে চায়। কিন্তু এক্ষেত্রে অপরদিকের মানুষটা যে টাপুরদি। সে তো বিপদে ঝাঁপাবেই। বিপদ নিয়ে খেলবে বলে যে মানুষ সব ছেড়েছে, তাকে কি এভাবে দমিয়ে রাখা যায়! এই সামান্য ব্যাপারটা যদি বুঝত অর্জুনদা, তাহলে আর কোনো সমস্যাই থাকত না। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি অর্জুনদাকে বুঝিয়ে বলি। তারপর মনে হয়, না, অর্জুনদা ঠেকে শিখুক। নিজে থেকে টাপুরদিকে বুঝুক। ওর প্যাশনকে বুঝুক। হয়তো সময় লাগবে, কিন্তু তাতে ওদের সম্পর্কটা মজবুত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। আমি জানি, টাপুরদি অপেক্ষা করবে।
কফি বানিয়ে তিনটে কাপ ট্রে-তে সাজিয়ে বসার ঘরে এলাম।
অর্জুনদা একটা কাপ তুলে নিয়ে চুমুক দিয়ে বলল, 'টাপুর, তোমার ওই পচা হেড-টেল চা-এর থেকে মিতুলের এই কফি ঢের ভালো। মিতুল, এই কফির জন্য তোমাকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া উচিত।'
টাপুরদি ঠোঁট বাকিয়ে বলল, 'ঠিক আছে। খাও। এবার যেটা জিজ্ঞাসা করলাম সেটার উত্তর দাও।'
'কেন বলব? তুমিই তো বললে পুলিশি ব্যাপারে তোমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।' মুচকি হেসে বলল অর্জুনদা।
টাপুরদি চোখ বড়ো বড়ো করে তাকাল। অর্জুনদা হেসে ফেলল। বলল, 'তোমার বন্ধুকে আজ লালবাজারে ডাকা হয়েছিল।'
'কাকে? উত্তীয়কে?' অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
'হ্যাঁ।' বলল অর্জুনদা।
'কেন?'
'জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। মোর প্রিসাইজলি, নবদিগন্ত সম্পর্কে জানার জন্য। স্ট্রিট চাইল্ডদের নিয়ে উত্তীয় অনেক দিন ধরে কাজ করছে। এই কেসে ওকে কাজে লাগানো যেতে পারে।'
'উত্তীয়কে? মানে? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। কেমন করে?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
অর্জুনদা কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল, 'আচ্ছা, ভেবে বলো, অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর ক্ষেত্রে সাধারণত টার্গেট কারা হয়?'
টাপুরদি কিছু বলার আগেই আমি বললাম, 'স্ট্রিট চাইল্ডরা?'
অর্জুনদা বলল, 'কিছুটা ঠিক বলেছ। সাধারণত নিম্নবিত্তের লোকজন, যাদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই, বা আপন বলতে তেমন কেউ নেই, যে কি না তাদের খোঁজখবর করতে পারবে, করলেও লড়াই করার ক্ষমতা নেই, এরাই আসল টার্গেট। এর বাইরেও যে হয় না তা বলছি না। প্রচুর মানুষ অভাবের কারণে নিজেরাই অরগ্যান বিক্রি করে।'
অর্জুনদার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, 'আরে হ্যাঁ, কিছুদিন আগে পেপারে পড়েছিলাম আইফোন কেনার জন্য চিনে একটি ছেলে নিজের কিডনি বেচে দিয়েছে।'
অর্জুনদা মাথা নাড়ল। বলল, 'এরকম অনেক কাণ্ড আছে। চিনের কথাই যখন বললে, তখন চিনেরই আর একটা ঘটনা বলি। চিনের শিনজিয়াং প্রদেশে বন্দিশিবিরে আনুমানিক কুড়ি লক্ষ উইঘুর মুসলিমকে বন্দি করে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন যাবৎ। এদের ওপর নৃশংস অত্যাচার করা হয়। খুন, ধর্ষণ তো ছেড়েই দিলাম, বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য এদের গিনিপিগ করা হচ্ছে লাগাতার। তার চেয়েও খারাপ কথা হল, এইসব বন্দিদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নিয়ে আন্তর্জাতিক চোরবাজারে বিক্রি করে চিন কোটি কোটি ডলারের এক ভয়ংকর ব্যাবসা ফেঁদে বসেছে।'
'কী সাংঘাতিক!' বললাম আমি, 'কেউ প্রতিবাদ করে না?'
'করে', বলল অর্জুনদা, 'কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশন প্রতিবাদ করেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশন উদবেগ প্রকাশ করেছে। কিন্তু চিনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সোজাসুজি হস্তক্ষেপ করা যায় না ওভাবে। ফলে ব্যাপারটা চলছেই।
'যাই হোক, এ তো গেল চিনের কথা। আমাদের কেসের কথায় ফিরি। যেটা বলছিলাম, এদেশে অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর যে চক্রগুলো কাজ করছে, তাদের লক্ষ্য হল এইসব গৃহহীন, হতদরিদ্র বা অনাথ মানুষেরা। আর উত্তীয় এদের নিয়ে বহুদিন কাজ করার সুবাদে এদের চেনে, জানে। ও কলকাতা পুলিশকে এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে। ডিসিডিডি স্যার নিজে ওর সঙ্গে কথা বলেছেন। উত্তীয় রাজি হয়েছে। তা ছাড়া ও একটা শক্তিশালী চক্রের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছে। ও এখন সেফ নয়। আমরা উত্তীয়কে পুলিশ প্রোটেকশন দিতে চেয়েছিলাম। সেই উদ্দেশ্যে কথা বলার জন্যেও ডেকেছিলাম। ও রাজি হয়নি। '
'হুম।' বলে চুপ করে গেল টাপুরদি। একটু অন্যমনস্ক দেখাল ওকে।
'কী হল টাপুরদি? কী ভাবছ তখন থেকে?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
এখন রাত এগারোটা বাজে। অর্জুনদা চলে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে টাপুরদির ফ্ল্যাটের দক্ষিণমুখী ব্যালকনিটাতে বসেছি দু-জনে। ইচ্ছে করেই আলো জ্বালায়নি টাপুরদি। অন্ধকারের একটা আলাদা আরাম আছে, বিশেষ করে যখন মন আড়াল চায়।
টাপুরদি বলল, 'ভাবছি, আবার ভাবছিও না। সত্যি বলতে কি, এখন আমার আর ভাবার কিছু নেই এই কেসে।'
বুঝলাম, উত্তীয়দাকে পুলিশ ব্যবহার করছে, এই ব্যাপারটা টাপুরদির খুব একটা ভালো লাগেনি। কখনো-কখনো মন ও মস্তিষ্ক সম্মুখসমরে নামে। টাপুরদির এখন তাই চলছে। সে খুব ভালো করে জানে যে কেসটা সলভ হওয়া জরুরি, লালনকে খুঁজে পাওয়াটা বেশি দরকার। কেসটা টাপুরদি সলভ করল, না পুলিশ সেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়।
কিন্তু মন সব সময় যুক্তি মানে না। কেসটা নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করেছিল টাপুরদি। খাটাখাটনিও করছিল। আবার এটাও বুঝতে পারছিল যে এই কেসে ওর খুব বেশি কিছু করার নেই। সারা দেশব্যাপী ছড়ানো এই অপরাধচক্রকে ধরার কাজ পুলিশের, কোনো প্রাইভেট ডিটেকটিভের নয়। তবু ওই যে, সব বুঝেও মনখারাপটা যায় না। তবে আশা করি খুব শিগগির টাপুরদি অন্য কোনো কেসে জড়িয়ে যাবে। আবার তাতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এই কেসের জন্য মন খারাপটা মুছে যেতে সময় লাগবে না।
তাই বললাম, 'এই-ই ভালো হল টাপুরদি। এই কেসে তোমার তেমন কিছু করার ছিল না। পুলিশ এটা অনেক বেটার হ্যান্ডল করতে পারবে। কলকাতা পুলিশ ইজ দ্য বেস্ট। পলিটিক্যাল প্রেশার না থাকলে কলকাতা পুলিশ অসাধ্যসাধন করতে পারে, তুমিই বলেছ আমাকে অনেকবার।'
'হুম' বলল টাপুরদি। তারপর একটু থেমে বলল, 'কিন্ত এই রাঘব সামন্তটা কে বল তো? কাঁটাটা মনের মধ্যে খচখচ করছে রে মিতুল। যত ভাবছি, আর ভাবব না ছাই, কিছুতেই মাথা থেকে বের করতে পারছি না।'
মনে মনে হাসলাম। আমার পক্ষে টাপুরদিকে কেসের কথা ভুলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া সহজ। কিন্তু টাপুরদি অন্য ধাতুতে গড়া। যে প্রশ্ন তার মনে একবার জেগেছে, তার উত্তর খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত শান্তি পাবে না ও। বললাম, 'আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে রাঘব সামন্ত বলে কেউ এক্সিস্টই করে না। জাস্ট একটা আই-ওয়াশ।'
টাপুরদি বলল, 'হতে পারে না বলছি না। কিন্তু কেন? কেন এরকম একটা কাল্পনিক চরিত্রের দরকার পড়বে?'
'ধরো, এমনও তো হতে পারে যে নবদিগন্ত সেবাশ্রমের ট্রাস্টি মেম্বাররা আগেই জানত যে এই হোমের আড়ে তারা কিছু বে-আইনি কাজকর্ম চালাবে। সেই কারণে একটি কাল্পনিক চরিত্রকে কমিটিতে রেখেছিল। যাতে পরে ধরা পড়লেও তার ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করা যায়', বললাম আমি।
টাপুরদি আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, 'শাবাশ তোপসে! এই সন্দেহটা কিন্তু আমার মাথাতেও আসেনি। ব্র্যাভো! তার মানে তুই বলতে চাইছিস, রাঘব সামন্ত বলে আদতে কেউ নেই-ই? কিন্তু ডক্টর মিত্রর চেম্বারে যখন আমি বললাম যে রাঘব সামন্তর ছবি রেজিস্ট্রেশনের নথি থেকে মিসিং, তখন ভদ্রলোকের অভিব্যক্তিটা তোর মনে আছে?'
'হুম, খুব অবাক হয়েছিল। কিন্তু সেটা তো অভিনয়ও হতে পারে টাপুরদি, পারে না?'
'পারে। অবশ্যই পারে। তবে সেক্ষেত্রে বলতে হবে ডক্টর মিত্র বেশ উচু দরের অভিনেতা। যাই হোক, এই নতুন অ্যাঙ্গলটা নিয়ে একটু ভাবা দরকার, বুঝলি?'
হাসলাম আমি। বললাম, 'তার মানে তুমি এই কেসটাকে মাথা থেকে বের করছ না?'
'অভিয়াসলি নট!' চোখ বড়ো বড়ো করে বলল টাপুরদি, 'তুই কী ভেবেছিলি? কেসটা নিয়ে ফিল্ডে নেমে কাজ না করতে পারি, মাথা খাটাতে তো দোষ নেই। আশা করি অর্জুনের ডিসিডিডি স্যার তাতে আপত্তি করবেন না!'
'না, তা করবেন না বটে,' বললাম আমি, 'কিন্তু তুমি কি আর ঘরে বসে মাথা খাটিয়ে খুশি থাকবে? সে যাক গে, এবার বলো তো তোমার মাথায় কী চলছে?'
টাপুরদি এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। একটা লম্বা নিশ্বাস ছেড়ে বলল, 'অনেক কিছু। পুরো ব্যাপারটা ফিশি। দাঁড়া। আগে প্রথম থেকে একটু সাজিয়ে নেওয়া যাক। লালন নামে একজন স্ট্রিট চাইল্ডকে বিধাননগর স্টেশন থেকে উদ্ধার করে উত্তীয়। তাকে সে নবদিগন্ত সেবাশ্রমে রাখার ব্যবস্থা করল। সেখানে লালন ছিল দুই বছর প্রায়। তারপর একদিন সেখান থেকে হারিয়ে গেল সে। থানায় লালনের মিসিং রিপোর্ট লেখাতে গেলে লোকাল থানায় পুলিশ ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং বলে অনাথ আশ্রম থেকে বাচ্চারা পালায়ই। এটা নর্মাল।'
'হুম!'
'এবার এই ঘটনার ক-দিন পরে কোনা এক্সপ্রেসওয়েতে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেল। পিঠে গুলি লেগে মৃত্যু হয়েছে লোকটির। অটোপসিতে জানা গেল লোকটির শরীর থেকে অপারেশন করে দু-টি কিডনিই বের করে নেওয়া হয়েছিল। গুলি খেয়ে না মরলে দু-একদিনের মধ্যে এমনিই মরত লোকটা। টিভি নিউজে লোকটা ছবি দেখে উত্তীয় আইডেন্টিফাই করল লোকটাকে। ওর মতে লোকটার নাম জসীম, তাকে উত্তীয় নবদিগন্ত সেবাশ্রমে দেখেছিল লালনের সঙ্গে। পুলিশের সোর্সও সেই আইডেন্টিটি কনফার্ম করল, জানাল যে লোকটা সোনারপুরের একটা বস্তিতে থাকত। তার মানে উত্তীয় তাকে চিনতে ভুল করেনি।
'ঠিক এখানে এসে কেসটা অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর সঙ্গে জড়িয়ে গেল। গত কয়েক মাসের মধ্যে এরকম আরও দু-টি মৃতদেহ কলকাতার আশেপাশের অঞ্চলে পাওয়া গেছে, যেগুলিতে অরগ্যান মিসিং ছিল। কলকাতা পুলিশ পুরো ব্যাপারটাকে অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে দেখছে। তাদের কাছে লালনের মিসিং রিপোর্টটা ততটা জরুরি নয়। তারা অনেকটা ব্রড অ্যাসপেক্ট থেকে কেসটাকে দেখছে।
'আর ঠিক এখানেই আমার আপত্তি আছে। তাঁরা তাঁদের কাজ করছে। সে নিয়ে আমার কিছু বলার নেই মিতুল। কিন্তু আমার চিন্তাটা লালনকে নিয়ে। যদি সত্যিই এটা অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর কেস হয়, সেক্ষেত্রে আমরা ধরে নিতেই পারি, লালন একদল সাংঘাতিক ক্রিমিনালের হাতে পড়েছে। ভেবে বল তো মিতুল, পুলিশ কি আদৌ ওর কথা আলাদা করে ভাবছে?'
এই দেশে প্রতিদিন শয়ে শয়ে রাস্তার ছেলে হারিয়ে যায়। ওরা যেন হারিয়ে যাওয়ার জন্যই জন্মায়। দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, কখনো-বা অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের ফলশ্রুতি ওরা। ওরা এক বিশাল ভারতবর্ষ, যাদের পরিচয় কোনো খাতায় ওঠে না, কোনো পরিচয়পত্র তৈরি হয় না। সরকারি যোজনা, রূপকথার স্বপ্ন তাদের জন্য নয়। নর-নারীর জৈবিক তাগিদের ফলস্বরূপ এই ভারতবর্ষ বেঁচে থাকে। এদের জন্ম, মৃত্যু, হারিয়ে যাওয়া নিয়ে সরকার, জনগণ, পুলিশ-প্রশাসন কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। মরে গেলে ক-দিন মর্গে পচে। তারপর অজ্ঞাত পরিচয় মৃতদেহ হিসেবে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তাই টাপুরদির প্রশ্নের জবাবটা এক্ষেত্রে খুব সহজ ছিল আমার কাছে। মাথা নাড়লাম আমি, 'না, ভাবছে না।'
'ঠিক, আমার চিন্তাটা এখানেই।' বলল টাপুরদি, 'আর ভয়টাও। আমার সত্যিই ভয় হচ্ছে বড়ো ব্যাপার সামলাতে গিয়ে পুলিশ লালনের ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিতে ভুলে না যায়। আমরা জানি না আদৌ ছেলেটা এখনও বেঁচে আছে কি না। কিন্তু যদি বেঁচে থাকে তবে তাকে বাঁচানোর চেষ্টাটুকু ছেড়ে দিয়ে জাস্ট হাত গুটিয়ে বসে থাকব?'
'তুমি ঠিক কী চাইছ, টাপুরদি?' জানতে চাইলাম আমি।
''জানি না রে! কী চাইছি, কিংবা কীভাবে এগোব কিচ্ছু জানি না। মাথার ভেতরটা পুরো ব্ল্যাংক হয়ে আছে। আমি জানি, অর্জুনের ভয়টা অমূলক নয়। এই কেসে প্রচুর রিস্ক আছে। যারা হিউম্যান অরগ্যানস নিয়ে ব্যাবসা করে তারা সাধারণ ক্রিমিনাল নয়। সব জানি। তবু হাত গুটিয়ে বসে থাকতে মন থেকে সায় পাচ্ছি না। পরে যদি জানতে পারি লালন এখনও বেঁচে আছে, শুধু আমি হাত তুলে নিয়েছি বলে ছেলেটাকে যদি বাঁচানো না যায়, নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব না।'
একটু থেমে টাপুরদি বলল, 'মিতুল, এই কেসটা আর পাঁচটা খুন, চুরি, কিডন্যাপিং-এর মতো কেস নয়। তুই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস এতে রিস্ক ঠিক কতটা? আমি এটা ছাড়তে পারব না। কিন্তু তোকে এতে জড়াতেও পারব না। তুই এই কেসে আমার সঙ্গে কাজ করছিস না।'
আমি উঠে দাঁড়ালাম। টাপুরদির চোখে চোখ রেখে বললাম, 'আমি শুতে যাচ্ছি টাপুরদি। খুব ঘুম পাচ্ছে। শুধু যাওয়ার আগে একটা কথা বলে যাই। এই কেসে তুমি কাজ করবে, আমিও করব। লালনকে আমরা খুঁজে বের করব, একসঙ্গে। তুমিও শুয়ে পড়ো। রাত ক'রো না। কাল থেকে নতুন করে কাজ শুরু করা যাবে।'
'পাগলামো করিস না মিতুল', কঠিন গলায় বলল টাপুরদি।
'গুড নাইট!'
টাপুরদিকে আর একটা কথাও না বলতে দিয়ে ঘরে চলে এলাম আমি।
'কেউ কোথাও নড়বেন না।' বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলল অর্জুন, 'বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। ইট'স আ রেইড।'
উপস্থিত কারও মুখে তেমন ভাব-বৈলক্ষণ্য দেখা গেল না। শুধু এক বয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন, 'আমাদের ম্যাডাম, মানে এই হোমের যিনি ওয়ার্কিং কমিটির সেক্রেটারি, তাকে একটা ফোন করা যাবে?'
'না', বলল অর্জুন, 'কাউকে কোনো ফোন করবেন না। সকলে ভালো করে শুনে নিন। এখানে কেউ কাউকে কোনোরকম ফোন করবেন না। আমাদের কাছে সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। আমরা এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে কেউ এখান থেকে কোথাও যাবেন না, কাউকে ফোন করা বা কোনো ফোন রিসিভ করা চলবে না। আমাদের কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে লিগালি মুভ করতে বাধ্য হব। কৌশিক, তুমি, সন্দীপ আর অনিমেষদা ভেতরটা দ্যাখো। আমি এদিকটা দেখছি।'
আপাতত এই ঘরে বয়স্ক ভদ্রলোক ছাড়াও আর একজন কমবয়সি লোক বসে আছে একটি পুরোনো আমলের ডেস্কটপ কম্পিউটারের সামনে। আর একজন মধ্যবয়সি মহিলা একটি টেবিলে বসে একটা মোটা খাতায় কিছু হিসেব দেখছেন।
অর্জুন কবজি উলটে ঘড়ি দেখল। সকাল এগারোটা বাজতে এখনও পাঁচ মিনিট বাকি। তাকে কী করতে হবে সে জানে। কাগজপত্র ঘেঁটে তথ্য-প্রমাণ খুঁজে দেখতে সময় লাগবে। তাই কৌশিকদের বলে দিয়েছে সময় নিয়ে ভেতরটা খুঁজতে। বাচ্চাদের সঙ্গেও আলাদা করে কথা বলা দরকার।
'আপনারা তিনজনে ওদিকের সোফায় গিয়ে বসুন।' বলল অর্জুন।
তিনজনই দ্বিরুক্তি না করে বাঁ দিকের দেয়ালে লাগানো সোফায় গিয়ে বসল। অর্জুন দুটো বড়ো সেক্রেটারিয়েট টেবিলের সবকটা ড্রয়ার খুলে ফেলল। বেশ কিছু মোটা জাবদা খাতা, ফাইল, খাম পাওয়া গেল। শুভম এতক্ষণ একদিকে দাঁড়িয়ে ইতিউতি চাইছিল। এবার অর্জুনের ইশারায় কম্পিউটারের সামনে গিয়ে বসল সে-ও।
'আলমারির চাবি দিন।' বয়স্ক ভদ্রলোককে বলল অর্জুন।
'চাবি ম্যাডামের কাছে থাকে।' ভদ্রলোক উত্তর দিলেন।
'আপনার নাম কী? কী কাজ করেন এখানে?' জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
লোকটার বয়স পঞ্চান্ন-ষাট হবে। মুখ দেখে গোবেচারা গোছের সরল-সাদাসিধে মানুষ বলে মনে হয়। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে অর্জুন জানে, অন্ধকার জগতে মুখ দেখে ভেতরের মানুষকে চেনা সম্ভব নয়। ভীতু মুখে ভদ্রলোক বললেন, 'আমার নাম স্বরূপ পাঠক। আমি এই হোমের ম্যানেজার।'
'আপনি ছাড়া এই হোমে আর কতজন কাজ করে, তারা কে কী কাজ করে তার ডিটেলস চাই আমার। একটা কাগজ-কলম নিন। এখানে বসে চুপচাপ লিস্ট বানান। প্রত্যেকের ফোন নম্বর দেবেন', বলল অর্জুন।
'স্যার!' কাঁচুমাচু মুখে বললেন স্বরূপ পাঠক, 'এখানে যারা কিচেনে, বাগানে, বাচ্চাদের দেখাশোনার কাজে সাহায্য করে তারা বেশিরভাগই আশেপাশের গ্রাম থেকে আসে। সকলের তো ফোন নেই।'
'যাদের আছে, তাদের নম্বর লিখুন।' অর্জুন বলল, 'কারও নাম যেন বাদ না পড়ে। আর হ্যাঁ, আপনাদের এখানে জসীমুদ্দিন শেখ নামে কেউ কাজ করে, বা করত?'
'জসীম?' মনে করার চেষ্টা করলেন স্বরূপ পাঠক, 'না তো স্যার, এই নামে কেউ এই হোমে কাজ করে বলে তো মনে পড়ছে না।'
'করে নয়, করত। মনে করুন।' জোর দিয়ে বলল অর্জুন।
'না স্যার!' মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক, 'আমি এই হোমে ছয় বছর ধরে কাজ করছি। জসীম নামে কেউ এই সময়ের মধ্যে এখানে কাজ করলে আমি নিশ্চয়ই জানতাম।'
কথাটা বলে সোফায় বসা আরও দু-জনের দিকে তাকালেন স্বরূপ পাঠক। বললেন, 'তোমরা কেউ এখানে জসীম নামে কাউকে চেনো? এই হোমে এই নামে কাউকে দেখেছ কোনোদিন?'
দু-জনেই সজোরে মাথা নাড়ল। ওদের মাথা নাড়া দেখে মনে হল, এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে তাদের জানাই ছিল। উত্তর দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েই ছিল। দিয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। মনে মনে হাসল অর্জুন। অভিনয়টা সকলে ঠিকঠাক করতে পারে না। মাত্রাজ্ঞান ঠিক না থাকলে ঠিক জায়গায় ঠিক মতো ডেলিভারি করা মুশকিল।
'এই হোমে মোট কতজন কাজ করে স্বরূপবাবু?' জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
স্বরূপবাবু অর্জুনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর বললেন, 'ফ্রন্ট অফিস, হোম, বাচ্চাদের দেখাশোনা, কমিউনিটি কিচেন, মেইন্টেনেন্স সব মিলে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট জন তো হবেই। তবে সবাই পার্মানেন্ট কর্মী নয়। অনেকেই ডেইলি ওয়েজের বদলে লেবার দেয়।'
'এদের সকলের নাম জানেন আপনি?'
স্বরূপবাবুকে একটু অপ্রস্তুত দেখাল। বললেন, 'হ্যাঁ, তা মোটামুটি মানে ডেইলি ওয়েজারদের অত মনে থাকে না। তবে...'
'তবে আপনি শিওর যে জসীমুদ্দিন শেখ নামে এখানে কেউ কোনোদিন কাজ করেননি। কীভাবে? মানে এত শিওর হলেন কীভাবে?'
স্বরূপবাবু মাথা নেড়ে বললেন, 'না, আসলে ওই নামে কাউকে মনে পড়ছে না। তাই...'
মুখে 'হুম' বলে সোফায় জড়সড়ো হয়ে বসে থাকা মহিলার দিকে তাকাল অর্জুন। মহিলার বয়স চল্লিশের একটু বেশি হবে সম্ভবত। তবে এই বয়সেও শরীরের বাঁধুনি টানটান। চেহারায় আলগা চটক আছে। অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, 'আপনার নাম কী?'
মহিলা ভীত মুখে জিবাব দিল, 'সবিতা সাহা।'
'কী কাজ করেন এখানে?' জানতে চাইল অর্জুন।
সবিতা সাহার মুখ শুকিয়ে গেছে। বললেন, 'আমি অ্যাকাউন্টসের হিসেব রাখি।'
'কত দিন কাজ করছেন?'
'দুই বছর।'
অর্জুন লক্ষ করল, ভদ্রমহিলা কথা বলতে বলতে স্বরূপ পাঠকের মুখের দিকে বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছেন। সে জিজ্ঞাসা করল, 'আপনাদের ওয়েবসাইটে তো দেখলাম, কম্পিউটার জানা অ্যাকাউন্টসের লোক চাওয়া হচ্ছে। তাহলে আপনার চাকরি যাচ্ছে বুঝি?'
ভদ্রমহিলার মুখের রেখার প্রথমে বিস্ময় ও বেদনার যুগলবন্দি খেলে গেল অতি দ্রুত। পরক্ষণেই চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তারপর যখন কথা বললেন, তখন আর স্বরূপবাবুর মুখের দিকে তাকালেন না। সরাসরি অর্জুনের মুখের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, 'সে আমি কী করে বলব বলুন? আমি এখানে চাকরি করি। মালিক রাখলে কাজ করব, না রাখলে চলে যাব। অন্য কোথাও কাজ খুঁজব। তবে আমাকে দিয়ে আর কাজ চলছে না, সেটা আমার জানা ছিল না।'
অর্জুন কিছু বলার আগে স্বরূপ পাঠক প্রবোধ দেওয়ার স্বরে বললেন, 'আরে না না, তোমার কাজ কেন যাবে? আসলে জমানা বদলেছে। কাজের চাপ বাড়ছে। তাই মালিক চান কম্পিউটারে হিসেব-নিকেশ রাখার একজন লোক থাকুক। আরে আমি তো আছি, নাকি? তুমি তোমার মতো কাজ করবে। সব হিসেব তো আর কম্পিউটারে থাকবে না!'
অর্জুন লুফে নিল কথাটা। সবিতা সাহার সঙ্গে সম্ভবত স্বরূপ পাঠকের একটা নরমসরম সম্পর্ক আছে। পুলিশে চাকরি করতে করতে মুখের রেখা দেখে মানুষের মনের চলন কিছুটা বোঝার একটা প্রতিভা বোধ হয় সব পুলিশেরই তৈরি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই ধারণাগুলি সঠিক হয়। এক্ষেত্রে সবিতার মান ভাঙানোর জন্য একটা আলটপকা মন্তব্য করে ফেলেছেন স্বরূপ পাঠক। সেটাকে মাটিতে পড়তে না দিয়ে অর্জুন বলল, 'কোন কোন হিসেব কম্পিউটারে থাকবে না স্বরূপবাবু?'
স্বরূপবাবুর মুখে কিছুক্ষণ আগেকার গোবেচারা অভিব্যক্তিটা আবার ফুটে উঠল, 'কোন হিসেব স্যার? আমি তো জানি না, ম্যাডামকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করব?'
'আপনি সবই জানেন স্বরূপবাবু। বলতে না চাইলে মুখ খোলাতে আমরাও জানি। নিজে থেকে মুখ খুললে কষ্ট কম হবে। ভেবে দেখবেন।'
স্বরূপবাবু বোকা-বোকা মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। কোনো উত্তর দিলেন না। অর্জুনের বুঝতে অসুবিধে হল না, ইনি গভীর জলের মাছ। একে জোর করার আগে কিছুটা খেলানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে, যাতে ইনি নিজের তাগিদেই সব ওগড়ান।
কৌশিক ভেতর থেকে বাইরের ঘরে এল। নীরবে অর্জুনের দিকে তাকিয়ে আলগোছে মাথা নাড়ল সে। অর্থাৎ সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। অবশ্য সেটা যে যাবে না, সেটা ভেবেই এসেছিল তারা এখানে। পুলিশ যে অ্যালার্ট হয়ে গেছে, সেই খবর এদের কাছে এসে পৌঁছেছে ইতোমধ্যে। এরা পুলিশের জন্য প্রমাণ যে সাজিয়ে রাখবে না, সে তো জানা কথাই।
'এইসব খাতাপত্র, ফাইল, লেটারস আমরা সিজ করছি। সব ঠিক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে ফেরত পেয়ে যাবেন।' বলল অর্জুন, 'শুভম, তোমার কত দূর?'
'হয়ে গেছে অর্জুনদা!' বলেই জিভ কাটল শুভম। অর্জুন মুচকি হাসল। এই ছেলেটা কবে যে প্রফেশনাল এটিকেটগুলো বুঝবে, কে জানে!
অর্জুন এবার স্বরূপ পাঠকের কাছে এগিয়ে গেল। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার চোখে চোখ রেখে বলল, 'জসীমুদ্দিন শেখকে আপনি খুব ভালো করে চেনেন স্বরূপবাবু। আমি তো আপনার কাছে জসীমুদ্দিন শেখকে চেনেন কি না জানতে চেয়েছিলাম। আপনি তাড়াহুড়োয় 'জসীম'কে চেনেন না বলে দিলেন। আপনার দোষ নেই। পুলিশের সামনে অনেক দাগি অপরাধীও নার্ভ হারায়। তবে কী জানেন? নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। আপনি না বুঝলে আপনারই ক্ষতি।'
সব কাজ গুছিয়ে তুলেছিল লালন। পাঁচটা তক্তা, একটা রাস্তা। এখান থেকে পালাতেই হবে যেভাবে হোক। রাতের অন্ধকারে ওয়াশ বেসিনের ওপর পা রেখে দেয়ালের তক্তা সরানো ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে বাইরে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিল সে। বাইরে আকাশ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়েনি। এই ঘরটা ঠিক কত তলায়? বেশি উঁচুতে হলে বাইরে নামবে কী করে সেই চিন্তাটাই মাথায় ঘুরছিল। আর যদি বাইরে পাহারা থাকে? যদি ওরা ধরে ফেলে লালনকে? একবার পালাতে গিয়ে ধরা পড়েছে সে। জসীমচাচাকে প্রাণ দিতে হয়েছে তার জন্য। এবার ধরা পড়লে আর বাঁচিয়ে রাখবে না। অবশ্য এমনিতেও বাঁচবে না সে। আজ না হয় কাল তাকে আবার অপারেশন টেবিলে শুতেই হবে। তার আগেই পালাবে লালন, এরকমই ভেবে রেখেছিল।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। অন্তত লালনের মতো অভাগাদের ক্ষেত্রে সেটাই হয়, বরাবর দেখে এসেছে সে। কাজ শেষ করে ফেলেছিল, ছিল শুধু পালানোর অপেক্ষা। কিন্তু তার আগেই ওয়াশ বেসিনের ওপরের একটা তক্তা খসে পড়ল। আর সেটাও পড়ল যে লোকটা খাবার দিতে আসে তার সামনে।
লোকটাকে এ ক-দিনে কিছুটা হলেও বুঝেছে লালন। মনে হত, এই লোকটা বাকিদের থেকে একটু অন্যরকম। মনটা অন্যদের থেকে নরম। ওদের খেতে দিতে এসে লোকটার হাতে প্যাকেট ছিঁড়ে গলা খাবার চলকে পড়েছিল সেদিন। বিড়বিড় করে দুটো কাঁচা খিস্তি মেরে উঠে বাথরুমে গিয়েছিল হাতটা ধুয়ে নিতে। আর ঠিক তখনই ঘটেছিল কাণ্ডটা। বেসিনের নীচে জল পড়ে ছিল অনেকটা। লোকটা পিছলে পড়তে পড়তে নিজেকে বাঁচানোর জন্য দেয়ালে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে ধাক্কা মেরেছিল নিজেকে সামলাতে। আর সেই ধাক্কাতেই ওপর থেকে তক্তাগুলো খসে পড়ল লোকটার সামনে।
লোকটা কিছুক্ষণ হাঁ হয়ে তাকিয়েছিল ওপরে ঘুলঘুলির দিকে। তারপর কী মনে করে সোজা বাথরুম থেকে বেরিয়ে আর কোনোদিকে না তাকিয়ে লালনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। চোখদুটো জ্বলছিল লোকটার। ঠাস করে একটা চড় কষিয়েছিল লালনের গালে।
লালন ভীষণ অবাক হয়েছিল সেই মুহূর্তে। লোকটা কী করে বুঝল তক্তাগুলো লালনই খুলেছে? গালে চড় খেয়ে, কিংবা হয়তো এতদিনের রাতজাগা পরিশ্রম ব্যর্থ হওয়ায় হঠাৎ করে মাথা গরম হয়ে গেছিল লালনের। ফুঁসে উঠে সিড়িঙ্গে বুড়োটে লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সে। এলোপাতাড়ি কিল-চড়-ঘুসি মারতে শুরু করেছিল। ঘরের অন্যান্য লোকেরা নীরবে তাকিয়ে ছিল তাদের দিকে। কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেনি, কেউ এগিয়েও আসেনি। বাঁচার জন্য লড়াই করা নাকি মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু এই অবস্থায় তাদের দেখে সেটা মনে হচ্ছিল না। ওরা বিস্মিত হতে ভুলে গেছে, ওরা হাল ছেড়ে দিয়েছে।
কিন্তু লালন ছাড়েনি হাল, ছাড়বেও না। লালন শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবে। লালনের আক্রমণের প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে লোকটা লালনের হাতের কবজি চেপে ধরেছিল। রোগা লোকটার হাতে কী ভীষণ জোর! লালন হাত মুচড়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে চলেছিল। লোকটা নির্বিকারমুখে লালনের সেই অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে বিশ্রী নোংরা দাঁত বের করে হাসছিল। লালন সাহায্যের আশায় আশেপাশে তাকিয়েছিল। কেউ ওর দিকে তাকিয়েও দেখেনি। মাথায় আগুন জ্বলছিল তার, চোখে জল আসছিল। জলটাকে চোখের বাঁধের ভেতর বেঁধে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করছিল সে। লোকটা হ্যাঁচকা টান মারতে হুমড়ি খেয়ে লোকটার বুকের ওপর পড়তেই লোকটা ফিশফিশ করে বলল, ''মাইর্যা ফ্যালাইব তরে চাইরদিকে চুখ-কান বাঁচবা না বাপ।'
লালন নিজেকে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল লোকটার মুখের দিকে। লোকটা আর দাঁড়ায়নি। হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেছিল ঘর থেকে।
অবসন্ন শরীর ও মনে ধপ করে মেঝের ওপরেই বসে পড়েছিল লালন। ঘরের টিমটিমে আলোয় এই ঘরের মানুষগুলিকে যেন মানুষ বলে আর মনে হচ্ছিল না তার। মনে হচ্ছিল কয়েকটি মৃতদেহের সঙ্গে এই বন্দিশালায় বাস করছে সে। এরা সবাই মৃত। হঠাৎই শরীরটা শিরশির করে উঠেছিল লালনের। মেঝেতে পাতা বিছানায় শুয়ে পড়েছিল গুটিশুটি মেরে। চব্বিশটা ঘণ্টা চোখ খুলে তাকায়নি সে। লোকটা রাতেও এসেছিল খাবার দিতে। খাবার ছুঁয়েও দেখেনি। প্রচণ্ড তাপে গা পুড়ছিল লালনের। সারা শরীরে কী অসহ্য দাহ! চোখ জ্বলে যাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে বাঁচার শেষ আশাটাও ধীরে ধীরে মুছে যেতে দেখেছিল সে।
আজ দুপুরের খাবারটাও পাশে পড়ে ছিল। লোকটা খাবার দিয়ে রাতে অভুক্ত খাবার তুলে নেওয়ার সময় বিড়বিড় করে বলেছিল, 'না খাইলে বাঁচবা কেমনে? প্যাট ঠান্ডা তো মাথা ঠান্ডা!'
দুপুরের খাবারের থালাটা বিছানার পাশে বসিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল লোকটা।
কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে উঠে বসল লালন। আর তখনই টের পেল, ভীষণ খিদে পেয়েছে তার। প্যাকেটে গলা ভাত আর ঘ্যাঁট সবজি রাখা আছে একটুখানি। সেটুকুই চেটেপুটে খেল সে। সত্যিই তো, বাঁচার চেষ্টা করতে হলেও আগে বেঁচে থাকতে হবে। খাবারটা পেটে যেতেই পেটটা শান্ত হল, ঠান্ডা হল মাথাটাও। বাথরুমে গিয়ে বেসিন হাত ধুল সে। বেসিনের ওপরে ফাঁকা জায়গাটা লোকটা তক্তাগুলো ঠ্যাকনা দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে কোনোমতে। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল লালন। এখান থেকে বেরোনো যাবে না, বুঝে গেছে সে। সম্ভবত এদিকে কোনো রাস্তাই নেই, অথবা শক্ত পাহারা আছে। নতুন করে ভাবতে হবে। আবার চেষ্টা করবে লালন।
।। কুড়ি।।
মধ্যরাতে আমার প্রোজেক্ট ম্যানেজারের কল এসেছিল। একটা বড়োসড়ো এস্কেলেশনের জেরে ভোররাত পর্যন্ত কাজ করে তারপর ঘুমোতে গেছি। ঘুম ভেঙে দেখলাম বেলা দশটা বেজে গেছে। ঘর ছেড়ে বাইরে এসে দেখলাম টাপুরদি সোফায় বসে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। আমি বাথরুমে ঢুকলাম।
বেরিয়ে দেখলাম টাপুরদি কিচেনে কিছু করছে আর গুনগুন করে গান গাইছে। কিচেনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, 'খবর কী? বেশ খুশি খুশি লাগছে!'
টাপুরদি দুটো প্লেটে চিঁড়ের পোলাও সার্ভ করতে করতে বলল, 'তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট করে রেডি হয়ে নে। বেরোতে হবে।'
'কোথায় যাবে?' জানতে চাইলাম আমি।
'অম্লানবাবুর সঙ্গে দেখা করতে', মুচকি হেসে বলল টাপুরদি।
'অম্লানবাবু? মানে অম্লান চক্রবর্তী? মুখ্যমন্ত্রী?' চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞাসা করলাম।
'ইয়েস!' মাথা নেড়ে বলল টাপুরদি।
'বাপ রে! তোমার ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা। তা কীসের জন্য যাওয়া হচ্ছে?'
টাপুরদি ট্রে-তে দুটো চিঁড়ের পোলাওয়ের প্লেট আর দু কাপ চা দিয়ে আমাকে বলল, 'এগুলো নিয়ে গিয়ে টেবিলে রাখ।'
হাত বাড়িয়ে ট্রে-টা নিলাম। বসার ঘরে ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রাখলাম খাবারগুলো। অম্লানবাবুর বাবা অমিয় চক্রবর্তীকে মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আগের দিন সন্ধেবেলায় পার্টি অফিসে নিজের কেবিনে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছিল। অনেক বাধাবিপত্তি মাথায় নিয়ে সেই হত্যারহস্যের সমাধান করেছিল টাপুরদি। অমিয়বাবুর মৃত্যুর পর পার্টির সিদ্ধান্ত অনুসারে অম্লান চক্রবর্তীকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অম্লানবাবু টাপুরদিকে পার্টির অভ্যন্তরীণ বিশেষ নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন। টাপুরদি সেটা সেই সময়ে সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু অম্লানবাবু বলেছিলেন, যে-কোনো প্রয়োজনে তাঁকে জানাতে। তিনি চেষ্টা করবেন যথাসাধ্য সাহায্য করতে। তবে কি আজ সত্যিই তাঁকে প্রয়োজন পড়েছে টাপুরদির?
টাপুরদি দ্রুত হাতে রান্নাঘর পরিষ্কার করে বসার ঘরে এল। ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসে বলল, 'আমাদের বর্তমান কেসটার জন্য যাচ্ছি একটা শেষ চেষ্টা করতে। পুলিশ আমাকে এই কেসে ঢুকতে দেবে না। কিন্তু লালনকে খুঁজে বের করতে হলে এর ভেতরে আমাকে ঢুকতেই হবে। তাই অম্লানবাবুর সাহায্য দরকার। তিনি যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমি এগোতে পারব। নতুবা, আমার তরফ থেকে এই কেসের এখানেই ইতি।'
বুঝতে পারলাম, আমার ধারণাই ঠিক। আজ অম্লানবাবুর সাহায্য টাপুরদির প্রয়োজন। খুব দ্রুত খাওয়া শেষ করলাম আমরা। স্নান সেরে তৈরি হয়ে বেরোতে আরও আধ ঘণ্টা লাগল। বারোটার আগেই মুখ্যমন্ত্রীর অফিসে পৌঁছে গেলাম। রিসেপশনে আমাদের পরিচয় জানাল টাপুরদি। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে, সেটাও জানাল। রিসেপশনিস্ট ভাবলেশহীন মুখে নাম লিখে নিয়ে বসতে বললেন আমাদের। মুখ্যমন্ত্রী জরুরি মিটিং-এ আছেন।
প্রায় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর ভেতর থেকে ডাক এল। আমরা ভেতরে পৌঁছোতে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী অম্লান চক্রবর্তী। আমরাও হাত জোড় করে নমস্কার জানালাম। টেবিলের অন্য প্রান্তে বসে থাকা আর এক ভদ্রলোককেও ভালো করেই চিনি। ইনি মুখ্যসচিব সুদর্শন গাঙ্গুলি। গত প্রায় দশ বছর ধরে ইনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগের সরকারের আমলেও মুখ্যমন্ত্রী বিনয় বোস সুদর্শনবাবুর ওপর যথেষ্ট নির্ভর করতেন, এখন অম্লানবাবুও করেন। দীর্ঘদেহী, গৌরবর্ণ, প্রৌঢ় মানুষটিকে দর্শনেই শ্রদ্ধা জাগে।
'বসুন মিস ব্যানার্জি, মিস সেন', বললেন অম্লানবাবু।
সুদর্শনবাবুর পাশে রাখা খালি চেয়ারে বসলাম আমরা।
অম্লানবাবু চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। বললেন, 'আজ সকালে আপনার ফোনের কথা বলল আমার পার্সোনাল সেক্রেটারি। তখনই বুঝেছি, আবার কোনো কেস নিয়ে লড়তে নেমেছেন। বলুন, কীভাবে সাহায্য করতে পারি?'
টাপুরদি দেখলাম ভূমিকা-টুমিকার ধার দিয়েও গেল না। সরাসরি বলল, 'আমি অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর কেসটা নিয়ে ইন্টারেস্টেড। কোনোভাবে এই কেসে আমার কাজ করা কি সম্ভব?'
অম্লানবাবু ও সুদর্শনবাবু নীরবে দৃষ্টি বিনিময় করলেন দেখলাম। তারপর গলা খাঁকরে অম্লানবাবু বললেন, 'দেখুন মিস ব্যানার্জি, এই কেসটা নিয়ে আমরা যথেষ্ট চিন্তিত। আপনাকে বলতে বাধা নেই, আপনি আসার আগে এটা নিয়েই মিটিং চলছিল আমাদের। এটা এখন আর পাঁচটা সাধারণ কেসের মতো নিছক একটা কেসে আবদ্ধ নেই। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে সামনে লোকসভা নির্বাচনে আমাদের দলের বিরুদ্ধে প্রচারে নামবে। সুতরাং প্রচার শুরু হওয়ার আগেই আমাদের এই কেসকে ক্র্যাক করতে হবে।
'আপনি জানেন, কলকাতা পুলিশ যথেষ্ট এফিসিয়েন্টলি হ্যান্ডল করছে কেসটা। যদিও এখনও চোখে পড়ার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি, তবু আশা করছি খুব শিগরিরই কিছু ফল পাব আমরা। এই কেসের গুরুত্ব যেমন বেশি, রিস্কও প্রচুর। কিছু মনে করবেন না, আমি আপনার এফিশিয়েন্সিকে সন্দেহ করছি না। আপনাকে অসম্মান করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি জানি, আপনি নিজের কাজে কতটা কমিটেড। কিন্তু এই কেসে আপনার আদৌ কিছু করার আছে কি না, সেই বিষয়ে আমি ঠিক নিঃসন্দেহ নই।'
টাপুরদি বলল, 'আশা করি, লাস্ট যে বডিটা পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় নবদিগন্ত সেবাশ্রম নামের একটি হোমের কানেকশনের খবর আপনার কানে পৌঁছেছে। ওই হোম থেকে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু বাচ্চা মিসিং হয়েছে। উত্তীয় সোম নামে একজন অধ্যাপক লালন নামে একটি অনাথ বাচ্চাকে ওই হোমে রেখেছিল। বাচ্চাটা নিখোঁজ। উত্তীয় সোমের বক্তব্য, যেই লোকটির ডেডবডি পাওয়া গেছে, সেই লোকটিকে নবদিগন্ত সেবাশ্রমে দেখেছিলেন। তাঁর মতে লোকটির নাম জসীমুদ্দিন শেখ।'
'আপনি কেসটা নিয়ে অনেকটাই এগিয়েছেন দেখছি', বলে হাসলেন অম্লানবাবু। বললেন, 'সবই ঠিকই বলেছেন। কিন্তু দু-দিন আগে পুলিশ নব দিগন্তে রেড করেছিল। ওদের সব কাগজপত্র, ডেটা সিজ করে নিয়ে এসেছে। এখন পর্যন্ত যতটা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে, তাতে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। সব ডেটা ক্লিন আছে। বাচ্চাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। কেউ কোনো অভিযোগ জানায়নি। বরং উলটোটাই জানা গেছে। ওই হোমে বাচ্চাদের যথেষ্ট যত্ন করা হয়। তাই কোনো সলিড প্রমাণ ছাড়া নবদিগন্ত সেবাশ্রমের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো অ্যাকশন নিতে পারে না, সে নিশ্চয়ই আপনার অজানা নয়।'
'না', মাথা নাড়ল টাপুরদি। বলল, 'সেই প্রমাণ জোগাড়ের কাজটা যদি আমি করি?'
অম্লানবাবু বিস্মিত মুখে টাপুরদির দিকে তাকালেন। বললেন, 'কীভাবে?'
টাপুরদি একটু ভাবল। তারপর বলল, 'এই কেসে রিস্ক আছে আমিও জানি, স্যার। আপাতত আমি নবদিগন্তের সঙ্গে যুক্ত লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে চাই। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই। আমি চাই, এই ব্যাপারে আপনি আমায় স্পেশাল পারমিশন দিন।'
অম্লানবাবু কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হো হো করে হেসে উঠলেন। একটু পরে হাসি থামিয়ে সুদর্শনবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, 'দেখলেন তো, আপনাকে বলেছিলাম না, মিস ব্যানার্জি এভাবেই নিজের মতামত ব্যক্ত করেন। অনুরোধ-উপরোধের ব্যাপার নেই, সোজা 'আমি চাই', 'আপনি দিন'। আর এই সোজাসাপটা ব্যাপারটাই আমি পছন্দ করি। যাই হোক, এই ব্যাপারে আমি একা সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। আপনি বলুন সুদর্শনবাবু, কী করা উচিত আমাদের? শুধু আমলা হিসেবে আপনার মতামত চাইছি না কিন্তু। আপনার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। নির্বাচন সামনে। এই কেসটা একটা হেডেক হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
সুদর্শনবাবু এতক্ষণ চুপ করে উভয় পক্ষের কথা শুনছিলেন। এবার বললেন, 'এই কেসের জাল গোটা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ বা কলকাতা পুলিশ কতটা কী করতে পারবে আমি জানি না। কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছে করলেই এই কেসটা সিবিআই-এর হাতে দিতে পারত, কিংবা তদন্তে সাহায্য করতে পারত। কিন্তু সেটা যখন করছে না তখন ধরে নেওয়া যেতেই পারে অপোজিশন এই কেস দিয়ে রাজ্য সরকার, বা বলা ভালো রাজ্যে রুলিং পার্টিকে প্যাঁচে ফেলার চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আপনি আইনের বাইরে না গিয়ে সব রকম চেষ্টা করতেই পারেন।'
অম্লানবাবু একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, 'কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আমি কোন পদাধিকারে মিস ব্যানার্জিকে এই তদন্তে শামিল করব? বাই চান্স এই খবরটা বাইরে গেলে আমার দিকে, কলকাতা পুলিশের দিকে আঙুল উঠবে।'
সুদর্শন গাঙ্গুলির কপালে ভাঁজ পড়ল। হাতে থুতনি গুঁজে অল্প সময় ভাবলেন তিনি। তারপর বললেন, 'মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আপনি হয়তো পারেন না। কিন্তু উত্তীয় সোম মিস ব্যানার্জিকে অলরেডি অ্যাজ আ ডিটেকটিভ অ্যাপয়েন্ট করেছেন। সুতরাং মিস ব্যানার্জি তাঁর ক্লায়েন্টের হয়ে তো কাজ করতেই পারে। আপনি পুলিশমন্ত্রীও। আইজি-কে জানিয়ে রাখুন, মিস ব্যানার্জিকে যেন ভেতরে ভেতরে কো-অপারেট করা হয়, আন-অফিসিয়ালি আর কী! মিস ব্যানার্জি তার ফাইন্ডিংস আপনাকে রিপোর্ট করবেন।'
'কিন্তু পুলিশের ভেতরেও সকলে তো আর আমাদের সমর্থক নয়। বিরোধীদের কানে উঠতেই পারে', বললেন অম্লানবাবু, 'তখন সে নিয়ে আবার জলঘোলা হবে। আমিও আগামী দিন সাতেক কলকাতায় থাকছি না, দিল্লি যেতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে...'
সুদর্শনবাবু বললেন, 'সেক্ষেত্রে আপনার বিশ্বস্ত কারও কাছে রিপোর্ট করতে পারেন মিস ব্যানার্জি। তবে বেশি বাড়াবাড়ি করা, বা লোকের চোখে পড়াটা বুদ্ধির কাজ হবে না।'
অম্লানবাবু কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, 'এই মুহূর্তে আপনার থেকে বেশি বিশ্বস্ত আমি আর কাউকে দেখছি না। আমি যে ক-দিন থাকছি না, মিস ব্যানার্জি আপনাকে রিপোর্ট করবেন। আপনার আপত্তি নেই তো?'
সুদর্শনবাবু মাথা নাড়লেন।
অম্লানবাবু এবার টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'কিন্তু মিস ব্যানার্জি, আপনাকেও কথা দিতে হবে যে আপনি যা করার, সেটা লিমিটে থেকে করবেন। বিন্দুমাত্র রিস্ক বুঝলে আর এগোবেন না। আপনার প্রতিটি স্টেপের খবর আমার কাছে, এবং আমার অনুপস্থিতিতে সুদর্শনবাবুর কাছে থাকতে হবে। কাউকে সন্দেহ হলে আমাদের জানাতে হবে। আর সবচেয়ে বড়ো শর্ত হল, এই তদন্তের গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। আমি, সুদর্শনবাবু, আইজিসাহেব, ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল ও আপনারা দু-জন ছাড়া আর কেউ জানবে না।'
আমি টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। আমরা তদন্ত করব, অথচ সেটা অর্জুনদা জানবে না, এই ব্যাপারটা আমার তেমন মনঃপূত হল না। টাপুরদি চিন্তিতমুখে মাথা নাড়ল। বলল, 'সবই তো বুঝলাম স্যার, কিন্তু এত গোপনীয়তা রেখে তদন্তটা করব কেমন করে? আমি জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে সাসপেক্টরা আমাকে এন্টারটেইন করবে কেন?'
অম্লানবাবু সুদর্শনবাবুর মুখের দিকে তাকালেন। সুদর্শনবাবু বললেন, 'সেটা ঠিকই বলেছেন আপনি। কিন্তু এ ছাড়া আর কোনো পথও নেই। বড়ো জোর, আপনাকে আমরা কোনো নিউজ পেপারের জার্নালিস্ট আইকার্ড ও প্রেস ক্লাবের মেম্বারশিপ প্রোভাইড করার ব্যবস্থা করে দিতে পারি।'
অম্লানবাবু বললেন, 'সেটা কী করে হবে সুদর্শনবাবু? মিস ব্যানার্জিকে অনেকেই চেনে। মিথ্যে পরিচয়ে তদন্ত করলে ধরা পড়ে যাবেন।'
টাপুরদিও মাথা নাড়লেন।
সুদর্শনবাবু চিন্তিত মুখে বললেন, 'আমি তো আর কোনো উপায় দেখছি না স্যার।'
অম্লানবাবু বললেন, 'আমি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ওঁকে অ্যাপয়েন্ট করতে পারি না। কিন্তু যদি স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে একটা স্পেশাল অর্ডার বের করা যায়, সেক্ষেত্রে ব্যাপারটাতে সুবিধে হতে পারে কি? স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিমল দে বয়স্ক মানুষ। তাঁর পলিটিক্যাল ইমেজ ক্লিন, বিরোধীরাও শ্রদ্ধা করে। রাজনৈতিক সৌজন্য বজায় রেখে চলেন। তাঁর বিরুদ্ধে কাদা-ঘাঁটাঘাঁটি কম হবে বলেই আমার ধারণা। আমি কথা বলে দেখি বিমলবাবুর সঙ্গে। আশা করি রাজি হয়ে যাবেন। আপনি স্বাস্থ্য দপ্তরের সেক্রেটারি অদ্বৈত মুখার্জির সঙ্গে কথা বলুন। এভাবে পারমিশন বের করার ব্যাপারে আইনি জটিলতা আপনারা আমলারা মিলে সামলান। আমার মনে হয়, এটাই বেস্ট ওয়ে-আউট।'
সুদর্শনবাবু মাথা নাড়লেন। বললেন, 'আমি দেখছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি।'
টাপুরদি বলল, 'আচ্ছা, তাহলে তাই-ই দেখুন। পারমিশনটা পেয়ে গেলে আমি আমার কাজ শুরু করতে পারি।'
'গুড!' বললেন মুখ্যমন্ত্রী অম্লান চক্রবর্তী, 'তাহলে সেরকমই কথা রইল। মিস ব্যানার্জি, আপনি সুদর্শনবাবুর নম্বর নিয়ে রাখুন। নেক্সট কয়েক দিন আমাকে হয়তো সব সময় ফোনে পাবেন না। সব আপডেট ওঁকে জানাবেন।'
দু-জনকে বিদায় জানিয়ে আমরা বেরিয়ে আসছি, পেছন থেকে ডাকলেন অম্লানবাবু। আমরা পেছন ফিরে তাকালাম। অম্লানবাবু বললেন, 'আপনাদের একটা খারাপ খবর দিই। মৃণালজেঠুর ক্যানসার ধরা পড়েছে। চিকিৎসা চলছে। কিন্তু বয়সও হয়েছে। পারলে একবার দেখা করে আসবেন। জেঠুর ভালো লাগবে।'
বিশেষ অনুমতিপত্রটা হাতে এল চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই। বেশ কয়েক দিন পর আজ আবার টাপুরদির মুখে আলো জ্বলতে দেখলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, 'সত্যিই কি তুমি অর্জুনদাকে কিছু জানাবে না?'
টাপুরদি চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। দেখলাম ওর মুখের রেখায় অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব, 'হ্যাঁ' ও 'না'-এরা আসা-যাওয়া করছে। একটু সময় পর কঠিন স্বরে বলল, 'আপাতত নয়।'
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার মনের ভাব বোধহয় বুঝতে পারল টাপুরদি। পরিস্থিতিটা হালকা করার জন্য হেসে বলল, 'মনে কর না, আমরা সিক্রেট এজেন্ট। কোনো সিক্রেট মিশনে কাজ করছি, যা আর কাউকে জানানো বারণ। ভেবে দ্যাখ, ব্যাপারটায় একটা থ্রিল আছে কিন্তু যাই বলিস!'
আমি মুখ ভেংচে বললাম, 'সিক্রেট এজেন্ট? 'বন্ড, জেমস বন্ড' টাইপ? হুহ ছাই থ্রিল! অর্জুনদার কাছ থেকে লুকোনোর ব্যাপারটা আমার একদম ভালো লাগছে না।'
টাপুরদি একটা লম্বা নিশ্বাস ছেড়ে বলল, 'ভেবে দেখ মিতুল, আজ যদি কর্তব্যের খাতিরে অর্জুনের আমার কাছ থেকে কিছু লুকোনোর দরকার হত, ও কী করত? লুকোত না?''
ভাবলাম, হয়তো ঠিকই বলছে টাপুরদি। প্রসঙ্গ বদলে বললাম, 'তাহলে এখন নেক্সট মুভ কী?'
'কথা বলতে হবে। নবদিগন্তের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বলা দরকার।'
'তারা যদি বা তোমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়, তবু ভেতরের গোপন তথ্য তোমার হাতে তুলে দেবে সেটা নিশ্চয়ই আশা করছ না?'
টাপুরদি মুচকি হাসল। বলল, 'আমি থোড়াই ওদের কাছে গোপন তথ্য জানতে যাচ্ছি?'
'তাহলে?' চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি এবার জোরে জোরে হাসল। বলল, 'তথ্য যেটুকু পাওয়া যায়, সেটা উপরি। আমিও জানি ওরা কেউ থালায় সাজিয়ে আমার হাতে তথ্য তুলে দেবে না। কিছু হয়তো মিলবে, কিন্তু সেটা এলিমেন্টারি, বুঝলে মাই ডিয়ার ওয়াটসন!'
'বাব্বা, অ্যাক্কেরে এলিমেন্টারি?' হেসে ফেলে বললাম আমি, ''এলিমেন্টারির জন্যই মুখ্যমন্ত্রীর চিঠিচাপাটি? তাহলে এই কেসে এগোতে কার পারমিশন লাগবে? প্রাইম মিনিস্টার না প্রেসিডেন্ট?'
টাপুরদি ভুরু নাচিয়ে বলল, 'ইয়েস, এক্কেবারে গোড়ার ব্যাপার সেটা। মনে কর এটা একটা বোর্ড গেম, প্রেফারেবলি চেজ। তারা তাদের চাল দিয়ে গেছে। তুই জানতেও পারিসনি কখন তোকে প্রায় চিত করে এনেছে। এবার তোর পালা। ওদের খেলাতে হবে। এবার থেকে ওরা দান তো দেবে, কিন্তু সেটা তোর ইচ্ছানুসারে। ওদের নেক্সট মুভ তুই ডিসাইড করবি।''
'মানে?' আমার মুখ প্রায় হাঁ হয়ে গেছে টাপুরদির কথা শুনে, ''ওরা আমার কথা মতো চলবে কেন?'
'চলবে না তো', বলল টাপুরদি, 'নিজের ইচ্ছেয় কোনোদিনই চলবে না। তোকে চালাতে হবে। সেই জন্যই তো বললাম এটা একটা গেম। ওরা ওদের মতো খেলছে। সতর্ক চাল দিচ্ছে। তোকে মাত করতে চাইছে। আমাদের উদ্দেশ্য হবে, ওদের আমাদের প্ল্যান মতো চালানো।'
'আর সেটা কীভাবে হবে?' জানতে চাইলাম আমি।
'কীভাবে হবে সেটা আমি এখনও জানি না। কিন্তু ভগবান ঘাড়ের ওপর একটা মাথা যখন দিয়েছেন, একটা প্ল্যান নিশ্চয়ই বের করে ফেলতে পারব।'
'এখনও প্ল্যান করোনি?' একটু হতাশ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
মাথা নাড়ল টাপুরদি। বলল, 'নাহ ভাবছি। তুইও ভাব।'
'আমি?' আঁতকে উঠে বললাম, 'আমি তোমার সেপাই। যা করতে বলবে করব। প্ল্যান-ট্যান আমাকে করতে ব'লো না।'
টাপুরদি মেঝের দিকে তাকিয়ে এক মনে পায়ের আঙুল দিয়ে মেঝে খুঁটছে দেখলাম। অর্থাৎ ওর মাথায় এখন কিছু চলছে। কলিং বেলটা বেজে উঠল। উঠে গিয়ে দরজা খুলতে গিয়ে অর্জুনদা ভেতরে ঢুকল। হাতে কতগুলো প্যাকেট।
'এগুলো কী?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'খাবার', গম্ভীরমুখে বলল অর্জুনদা।
টাপুরদি এবার বলল, 'এত খাবার কীসের? রাতের জন্য ভাত বসিয়ে দিয়েছি।'
'ভাত ফ্রিজে তুলে রাখো', একই রকম গম্ভীর মুখে বলল অর্জুনদা। প্যাকেটগুলো ডাইনিং টেবিলের ওপর রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'ক-দিন ধরে মনটা বিরিয়ানি-বিরিয়ানি করছে। তা তোমার দিদি তো ওসবের পাট তুলে দিয়েছে, তাই আর্সেলানই ভরসা।'
'খেতে ইচ্ছে হলে বললেই পারতে। বানাতাম। না বললে, কখন তোমার মন বিরিয়ানি-বিরিয়ানি করে, কখন পান্তা-পান্তা করে, আমি জানব কেমন করে?' ভুরু কুঁচকে বলল টাপুরদি।
'সেই তো!' সোফায় গা এলিয়ে বসে একটা ছদ্ম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল অর্জুনদা, 'মনের কথা বুঝতে তোমার বয়েই গেছে। রাজ্যের চোর-ডাকাত-খুনির ভাবনা থেকে ফুরসত পেলে না আমার ইচ্ছের কথা ভাববে?'
আমি ফিক করে হেসে বললাম, 'আহা রে, তোমার মনের কথা বুঝছে না টাপুরদি? তুমি শিওর?'
অর্জুনদা মুখটা করুণ করে নাটুকে স্বরে বলল, 'আর মন? পাষাণী, পাষাণী! তোমার দিদির দায় পড়েছে আমার মনের কথা ভাবতে।'
আমি এবার টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বললাম, 'টাপুরদি, এ কেমন অভিযোগ! তুমি এর জবাব দেবে না?'
টাপুরদি টেবিল থেকে খাবারের প্যাকেটগুলো নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোতে এগোতে বলল, 'ওসব ন্যাকামোর জবাব দেওয়ার আমার মুড নেই।'
'ন্যাকামো?' বড়ো বড়ো চোখ করে বলল অর্জুনদা, 'দেখলে সখী, আমার সত্যিকারের আবেগ, মানে ট্রু ফিলিং-কে ন্যাকামো বলছে তোমার দিদি। এর প্রতিবাদে আমি বিরিয়ানি বয়কট কচ্ছি।'
টাপুরদি প্লেটে করে বিরিয়ানি, আচারি চিকেন আর একটা ছোটো বাটিতে রায়তা এনে টেবিলে রাখল। বলল, 'করো বয়কট। চল মিতুল, তুই আর আমি খেয়ে নিই। খুব খিদে পেয়েছে।'
জাফরান আর গরম মশলার গন্ধে ঘরের বাতাস ম-ম করছে। জোরে নিশ্বাস টানল অর্জুনদা। তারপর প্লেটটা টেনে নিয়ে বলল, 'আচ্ছা, কাল থেকে প্রতিবাদ করব। আজ খেয়ে নিই। সেই সকালে এক কাপ চা ছাড়া সারাদিনে কিছু জোটেনি। খালি পেটে প্রতিবাদ সইবে না।'
টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, 'কেন? খাওনি কেন সারাদিন?'
'ওরে বাপ রে, এই কেসটা একেবারে জান কয়লা করে দিল মাইরি! সারাদিন শহরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ছুটে যাচ্ছি। দম ফেলার ফুরসত নেই। খাব কখন?' খেতে খেতেই বলল অর্জুনদা।
টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। ওর চোখে বেদনার ছায়া আমার নজর এড়াল না। মনে মনে বললাম, এত ভালোবাসো টাপুরদি, তবু ধরা দিতে কীসের এত দ্বিধা? রান্নাঘর থেকে গ্লাসে করে জল এনে অর্জুনদার পাশে রাখলাম। তারপর আমার বিরিয়ানির প্লেটটা হাতে নিয়ে বললাম, 'আমার অফিসের একটা কল আসবে এখন। তোমরা কথা বলো।'
শোবার ঘরে চলে এলাম। ওদের নিজেদের জন্য একটু আলাদা সময় দরকার।
কাল রাতেই ফোন করে শিউলি মজুমদারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রেখেছিল টাপুরদি। নবদিগন্তের রেজিস্ট্রেশন ডকুমেন্ট অনুসারে মিসেস মজুমদারের বয়স আটচল্লিশ। তবে দামি প্রসাধন এবং সম্ভবত ডাক্তারের ছুরি-কাঁচির বদান্যতায় চেহারাটাকে ত্রিশের কোঠায় ধরে রেখেছেন। তাঁর বাড়িতে সকাল দশটায় পৌঁছে দেখা গেল এর মধ্যেই তিনি দামি শাড়ি পরে, উগ্র প্রসাধিতা হয়ে আমাদের অপেক্ষায় বসে আছেন। ভীষণ সরু ব্লাউজের স্লিভের নীচ থেকে তাঁর ধবধবে ফর্সা হাতের দিকে দৃষ্টি চলে যায় বারবার। এই বয়সেও এমন মাখনের মতো ত্বক যে-কোনো তরুণীর কাছেও ঈর্ষণীয়, সন্দেহ নেই। আমাদের দেখে উঠে দাঁড়ালেন। হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন। গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসছে জেনে এত খুশি হতে কাউকে দেখিনি।
কারণটা অচিরেই বুঝতে পারলাম। হাত জোড় করে নমস্কার জানালেন মিসেস মজুমদার। হাসিমুখে বললেন, 'আপনার ফোন পেয়ে অবাক হয়েছিলাম। আমার কাছে পুলিশ কেন আসবে সেটাই ভেবে পাচ্ছিলাম না। যাই হোক, বসুন। বলুন কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?'
মিসেস মজুমদার আমাদের পুলিশের লোক বলে মনে করেছেন। টাপুরদিও ভুল ভাঙাল না। আমরা সোফায় বসলাম। মাঝারি মাপের বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি, গৃহসজ্জায় গৃহস্বামিনীর রুচির ছাপ স্পষ্ট। শৌখিন ও মহার্ঘ আসবাবে সাজানো বসার এই ঘরটি, বিদেশি ওয়ালপেপার লাগানো, দেয়ালে ছাপ্পান্ন ইঞ্চির স্মার্ট টিভি এই ঘরের মালিকের রুচির সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক সঙ্গতিরও সাক্ষ্য দেয়। ছাদ থেকে ঝুলছে একটি মাঝারি আকারের ছিমছাম ঝাড়বাতি। সেটিরও দাম নেহাত কম হবে না।
'আপনারা চা খাবেন, না কফি?' জিজ্ঞাসা করলেন মিসেস মজুমদার।
'আপাতত কিছুই খাব না।' মৃদু হেসে বলল টাপুরদি, 'কিছু কথা জানার আছে আপনার কাছ থেকে। সেটুকু জেনেই চলে যাব।'
মিসেস মজুমদার সামনের চেয়ারে গুছিয়ে বসলেন। বললেন, 'বলুন, কী জানতে চান?'
'নবদিগন্ত সেবাশ্রমের মালিক তো আপনি?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
শিউলি মজুমদার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, 'না, ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়। আমি নবদিগন্ত সেবাশ্রমের বোর্ডের মেম্বার, কিন্তু মালিক নই। নন-প্রফিট অর্গানাইজেশনের ওভাবে ব্যক্তিগত মালিকানা হয় না।'
মাথা নাড়ল টাপুরদি। বলল, 'কিন্তু নবদিগন্ত এনজিও তো আপনার নামে ছিল।'
'ছিল', ওপর-নীচে মাথা নাড়লেন মিসেস মজুমদার। তারপর একটু স্বগতোক্তির ঢঙে বললেন, 'উনিশে বিয়ে, কুড়িতে মা হলাম। ছেলে একটু বড়ো হতেই বাড়িতে আমার বিশেষ কাজ থাকত না। সমাজসেবার কাজ করতাম টুকটাক। আমার হাজব্যান্ড বললেন, এভাবে বসে না থেকে একটা এনজিও তৈরি করতে পারি আমি। কথাটা আমারও মনে ধরল। ছেলেকে দেখাশোনার জন্য আমাকে দরকার ছিল না। শাশুড়ি বেঁচে ছিলেন তখন, আয়া ছিল। সেই আজ থেকে বাইশ বছর আগে নবদিগন্ত এনজিও তৈরি করি।'
'এনজিও তৈরি করা তো মুখের কথা নয়। যতদূর জানি নানানরকম আইনি জটিলতা থাকে। আপনি বললেন, বাইরের দুনিয়া তেমন কিছু চিনতেন না। সেরকম অবস্থায় এনজিও তৈরি করে ফেললেন?' জানতে চাইল টাপুরদি।
শিউলি মজুমদার বললেন, 'আমি সেরকমভাবে কিছু জানতাম না। আমার স্বামী ও ভাই সব ঝামেলা মিটিয়েছে। আমাকে যেখানে যেখানে সাইন করতে বলা হয়েছিল করে দিয়েছি।'
'কী কাজ করত আপনাদের এনজিও?'
শিউলি মজুমদার বললেন, 'শুরুর দিকে আমরা ক-জন মিলে কাজ করতাম। বিভিন্ন বস্তিতে গিয়ে বাচ্চাদের বই-খাতা দেওয়া, রাস্তায় স্টেশনে বাচ্চাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা এসবই করতাম। পরে দেখলাম, এতে বিশেষ কিছু লাভ হয় না। বইপত্র বেচে ওরা নেশা করে। ওদের রিহ্যাবিটেট করাটা প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল। সেই সময়ই হোমের কথাটা কানে এল। আমরা আলোচনা করলাম, আমাদের এনজিও যদি হোমটা টেক ওভার করে, তাহলে বাচ্চাগুলোর জন্য একটা স্থায়ী আস্তানা বানানো যেতে পারে। এই চিন্তা থেকেই মার্জারটা হয় বারো সালে।'
'এই হোম যখন নতুন করে নবদিগন্ত সেবাশ্রম নামে রেজিস্টার হল, তখন এর কমিটির ফাউন্ডার মেম্বার হিসেবে মোট ছ-জন ছিলেন। তাঁরা...'
'আমি ওইসব ব্যাপারে কিছুই জানি না।' টাপুরদির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন শিউলি মজুমদার, 'আপনাকে তো আগেই বললাম, সবরকম জটিলতা আমার হাজব্যান্ড সামলেছিলেন। আমি শুধু সই করেছিলাম।'
'এটা কি ঠিক বিশ্বাসযোগ্য, ম্যাডাম? আপনার নামে এনজিও, অথচ আপনি জানেন না যে হোমের কমিটিতে কারা কারা ছিলেন! আচ্ছা মানলাম, তখন না হয় আপনি জানতেন না, এতদিনেও জানেননি? ন-বছর ধরে নব দিগন্ত সেবাশ্রম আপনাদের আন্ডারে রয়েছে। এখনও আপনি জানেন না বললে কেউ বিশ্বাস করবে কেন?'
'বিশ্বাস করা না-করা আপনাদের ব্যাপার।' নির্লিপ্ত মুখে বললেন শিউলি মজুমদার, 'নবদিগন্ত হ্যান্ড-ওভার হওয়ার পর থেকে খুব বেশি আমি ওই হোমের সঙ্গে নিজেকে জড়াইনি। আমার হাজব্যান্ড যতদিন বেঁচে ছিলেন, তিনিই সবটা দেখাশোনা করতেন। ওঁর হার্টের সমস্যা ছিল। রিটায়ারমেন্টের অনেক আগেই উনি ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে নিয়েছিলেন। তার পর থেকে হোমে খানিকটা সময় দিতেন। তারপর তো...'
'আচ্ছা।' বলল টাপুরদি, 'আপনার ভাইও নবদিগন্তের কমিটি মেম্বার। সেটা নিশ্চয়ই জানেন?'
শিউলি বললেন, 'জানি। ওর নামটা এমনিই রাখা হয়েছিল জাস্ট। সেই সময়ে হ্যান্ড-ওভার প্রসেসের জন্য খুব দ্রুত একটা কমিটি ফর্ম করা দরকার হয়ে পড়েছিল। আমার হাজব্যান্ডই ভাইকে অ্যাপ্রোচ করেন। ও একটু দোনোমনা করে রাজি হয়েছিল। তবে বলে দিয়েছিল, ওর নামটাই থাকবে। হোমের ব্যাপারে ও মাথা গলাবে না। তা ছাড়া ওর সময়ই বা কোথায়? ও দিল্লিতে নিজের কোম্পানির কাজের চাপে কলকাতায় আসারই সময় পায় না। নবদিগন্তের সঙ্গে খাতাকলমের বাইরে ওর কোনো যোগাযোগ নেই।''
'কিন্তু আমার কাছে তো অন্যরকম তথ্য আছে, মিসেস মজুমদার!' ঠান্ডা গলায় বলল টাপুরদি।
শিউলি মজুমদার ভুরু কুঁচকে তাকালেন টাপুরদির মুখের দিকে।
টাপুরদি বলল, 'আপনার ভাই, মিস্টার সাগর দাশগুপ্ত, দিন পাঁচেক আগেই কলকাতায় এসেছিলেন। জসীমের ডেডবডি পাওয়া যাওয়ার পরেই তিনি এসেছিলেন। কী, ঠিক বলছি তো?'
শিউলি মজুমদার গম্ভীর মুখে বললেন, 'সেটা ও ওর নিজের ব্যাবসার কাজে এসেছিল। কয়েকটি হাসপাতালের ডক্টরদের সঙ্গে ওর এখানে মিটিং ছিল, তাই...'
'সব কি কলকাতার হাসপাতাল?'
শিউলি মজুমদার ঢোক গিলে বললেন, 'আমি অত সব জানি না। ও শুধু এক রাতের জন্য এসেছিল। ওর কোম্পানির একটা ফ্যাক্টরি কলকাতায় শুরু করা হবে। তার কাজ চলছে। সেটাও দেখতে এসেছিল ও।'
কথার মাঝখানেই টাপুরদির ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে চোখ রেখে উঠে দাঁড়াল টাপুরদি। বলল, 'এক মিনিট। ফোনটা ধরতে হবে।'
রিং হতে থাকা ফোনটা হাতে নিয়ে বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল টাপুরদি। আমি ভেতর থেকে দেখতে পাচ্ছি, ফোনে কারও কথা শুনে মাথা নাড়ছে টাপুরদি। তারপর কিছু বলে ফোনটা কেটে পকেটে ঢোকাল। ঘরে ফিরে এসে আবার সোফায় বসল।
শিউলি মজুমদার আবার বললেন, 'আপনারা কফি খাবেন তো?'
'না।' টাপুরদি বলল, 'ধন্যবাদ। কিন্তু এখন আর কিছু খাব না। তার চেয়ে বরং কথা বলা যাক।'
মিসেস মজুমদার মাথা নাড়লেন।
টাপুরদি বলল, 'আমার যদি খুব ভুল না হয়, সাগর দাশগুপ্তের কোম্পানি ডিজি ফার্মার এগেন্সটে লো কোয়ালিটির কাঁচামাল ব্যবহারের অভিযোগে একটা ল-স্যুট হয়েছিল চার বছর আগে। ওই কোম্পানির একটি পেইন কিলারে অনুমোদিত পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ মরফিন ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছিল। এছাড়াও আমাদের দেশে ব্যানড কিছু ওষুধ অবৈধভাবে তৈরি ও বিভিন্ন হাসপাতালে সেগুলি ব্যবহারের জন্য ডাক্তারদের সঙ্গে একটি অশুভ আঁতাত তৈরি করে হাজার হাজার রোগীর প্রাণ বিপন্ন করার অভিযোগ ছিল। সেই সময় তিনি মাস তিনেকের জন্য ফেরারও ছিলেন।'
'বাজে কথা। সে-সব ভাইয়ের এগেনস্টে কনস্পিরেসি ছিল। এই হেলথকেয়ার ইন্ডাস্ট্রিতে কতটা কমপিটিশন, আপনাদের কোনো আইডিয়া নেই। ওর কোম্পানির বদনাম করার জন্য অন্য কোম্পানি এসব রটিয়েছিল। কোর্টে কিচ্ছু প্রমাণ করতে পারেনি।' গম্ভীর মুখে বললেন শিউলি মজুমদার।
'বেশ', একপেশে হেসে বলল টাপুরদি, 'কিন্তু আমি এও জেনেছি সরকারের তরফের সাক্ষী ছিল ডিজি ফার্মার একজন জুনিয়ার ম্যানেজার। যাকে কেস চলাকালীন নিজের বেডরুমে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। ভুল বলছি না তো?'
শিউলি মজুমদারের চোখ যেন মুহূর্তের জন্য ধক করে জ্বলে উঠল। তারপর হেসে বললেন, 'আপনাদের ইনফরমেশন সোর্স খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যাই হোক, এতটাই যখন জেনেছেন তাহলে এটাও জেনে রাখুন, সেই লোকটির বডির পাশে সুইসাইড নোট ছিল। স্ত্রীর অবৈধ সম্পর্কের জেরে আত্মহত্যা করেছিল লোকটা। এর সঙ্গে ডিজি ফার্মার কোনো সম্পর্ক নেই।'
টাপুরদি উঠে দাঁড়াল, সঙ্গে আমিও উঠলাম। টাপুরদি বলল, 'আমি ইনফরমেশন না নিয়ে কিছু বলি না মিসেস মজুমদার। আমি এও জানি, ডিজি ফার্মাতে আপনারও অংশীদারিত্ব আছে। যাই হোক, আর একটা শেষ প্রশ্ন করতে চাই। জানি না বলবেন না প্লিজ। রাঘব সামন্ত কে?'
শিউলি মজুমদারের ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। বললেন, 'জানব না কেন? অবশ্যই জানি। রাঘব সামন্ত নবদিগন্তের একজন কমিটি মেম্বার।'
'যাক, অন্তত কিছু তো জানেন আপনি!' বলল টাপুরদি, 'তা এই রাঘব সামন্ত কে? কোথায় থাকেন?'
শিউলি মজুমদার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, 'আমি জানি না। ভদ্রলোককে আমি কখনো চোখেই দেখিনি।'
'আপনাদের কমিটি মেম্বার, অথচ আপনি চেনেন না?'
'না।' বললেন শিউলি মজুমদার, 'আপনি বিশ্বাস করবেন কি না সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু ওঁর সমস্ত সইসাবুদ শেখর, মানে আমার হাজব্যান্ড নিয়েছিল। ওঁকে শেখর চিনত।'
'তার মানে বলতে চাইছেন আপনার হাজব্যান্ড ছাড়া নবদিগন্তের কোর কমিটি মেম্বারদের কেউ রাঘব সামন্তকে চিনতেন না?' জানতে চাইল টাপুরদি।
'বাকিদের কথা আমি বলতে পারব না। আমি চিনি না সেটুকু জানি।' বললেন শিউলি মজুমদার।
বেরিয়ে আসার সময় মিসেস মজুমদারও আমাদের সঙ্গে গেট পর্যন্ত এলেন। তারপর বললেন, 'আপনারা পুলিশের স্পেশাল ইনভেস্টিগেটিভ টিম, তাই তো?'
টাপুরদি উত্তর দিল না। শুধু মুচকি হাসল, যার অর্থ হ্যাঁ-ও হতে পারে, না-ও হতে পারে।
মিসেস মজুমদার বললেন, 'আমাদের হোমেও পুলিশ রেইড করেছে। কিন্তু কিছু পায়নি। পাবেও না। আমাদের হোমে বে-আইনি কিছু হয় না।'
বেরিয়ে আসতে আসতে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, 'আপনার ছেলে কোথায়?'
মিসেস মজুমদারের চোখে চকিতে বেদনার ছায়া পড়ল। বললেন, 'ও তো গত পাঁচ বছর ধরেই ইউকে-তে সেটলড, ওখানেই জব করে।'
'দেশে আসেন না?'
'খুব চাপ ওর কাজের। ঘনঘন আসতে পারে না। শেষবার এসে কিছুদিন থেকেছিল তিন বছর আগে।'
'আর শেখরবাবুর মৃত্যুর পর?' বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
মিসেস মজুমদার বিষণ্ণ মুখে বললেন, 'দুইদিনের জন্য এসেছিল শুধু শ্রাদ্ধ করতে। তবে আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছে অনেকবার। আমিই যাইনি। এই শহর, নবদিগন্ত ছেড়ে কোথাও গিয়ে শান্তি পাব না।'
'কী বুঝলে টাপুরদি?' মিসেস মজুমদারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে টাপুরদিকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি চুপচাপ ড্রাইভ করছিল। আমার প্রশ্নের উত্তরে রাস্তায় চোখ রেখেই বলল, 'গভীর জলের মাছ। তিনি ভালো করেই জানেন, এখন পুলিশ আসবে তাঁর কাছে, জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তাই উত্তর ঠোঁটের আগায় সাজিয়ে বসে আছেন। আমার ধারণা যদি খুব ভুল না হয়, তাহলে কমিটির বাকিরাও এই একই মুখস্থ বুলি আওড়াবেন।'
'মানে তুমি বলতে চাইছ, ওঁরা সকলে প্ল্যান করেই এই উত্তরগুলো দিচ্ছেন?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'হুম।' বলল টাপুরদি, 'একদম তাই-ই বলতে চাইছি। নবদিগন্তে যা হচ্ছে, সম্ভবত এরা সকলেই তা জানে। সকলে মিলে নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে অথবা অন্য কারও শেখানো বয়ান দিচ্ছে।'
'তাহলে এবার কী করবে?'
'ভাবছি। তবে একটা কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই কেসটা ক্রমেই আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাচ্ছে। তবে আমি এনজয় করছি। এই কেসটা আমার আগের সব কেসের চেয়ে একদম আলাদা। আর সেটাই এর বিউটি।'
'বিউটি?' চোখ বড়ো বড়ো করে বললাম আমি।
টাপুরদি হাসল, 'ফ্ললেস ক্রাইম ইজ লাইক আ স্টেট অব আর্ট, বুঝলি মিতুল। এরকম কম্প্যাক্ট ক্রাইম দেখলে বেশ এক্সাইটেড লাগে। যাই হোক, শিউলি মজুমদার জানতেন না আমি পুলিশের লোক নই। কিন্তু বাকিদের ক্ষেত্রে সেটা হবে না। মিসেস মজুমদারের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎকারের কথাটা ওদের দলে বাকিরা এতক্ষণে জেনে গেছেন। এটাও জেনে যেতে সময় লাগবে না যে আমি পুলিশের লোক নই। তাই তাঁরা এত সহজে মুখ খুলবেন না।'
'তাহলে?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'জানি না।' বলল টাপুরদি, 'চিন্তাভাবনা করে একটা পথ বের করতে হবে। তার আগে এখন আমরা বাইরে কোথাও লাঞ্চটা সেরে নিই চল।'
'বাইরে? কেন বাড়ি ফিরবে না?'
ড্রাইভ করতে করতেই মাথা নাড়ল টাপুরদি। বলল, 'ডিসিডিডি দেখা করতে চান। দুপুরে লালবাজারে যেতে হবে।'
'ও মা, এটা বলোনি তো!' বললাম আমি।
'কখন বলব?' টাপুরদি বলল, 'মিসেস মজুমদারের বাড়িতে থাকতেই ফোন এসেছিল। সেজন্যই তো বাইরে গেলাম।'
আমি বললাম, 'কিন্তু টাপুরদি, লালবাজারে গেলে তো অর্জুনদা জেনে যাবে।'
হাসল টাপুরদি। বলল, 'জানলে জানবে। আমি তো জানাচ্ছি না আর।'
'সত্যি কথা বলো তো টাপুরদি, তুমিও মনে মনে চাইছ যে অর্জুনদা জানুক। অর্জুনদাকে অন্ধকারে রেখে তুমিও স্বস্তি পাচ্ছ না, তাই না?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি খানিকক্ষণ কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ গাড়ি চালাল। তারপর বলল, 'ওর সঙ্গে কাজ করাটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে।'
'আচ্ছা!' মুচকি হেসে বললাম আমি, 'শুধু কাজ করাটাই অভ্যেস? আমার তো ধারণা, আস্ত মানুষটাই তোমার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। শুধু সেটা মুখে স্বীকার করতেই তোমার যত অনীহা।'
টাপুরদি উত্তর দিল না। ওর মুখে একটা আলো মাখা হাসির রশ্মি খেলে বেড়াচ্ছে। ভালো লাগল আমার। জানি টাপুরদি অর্জুনদার মতো মনের কথা বলে ফেলতে পারেনি আজও। হয়তো এখনও দ্বিধা আছে, উত্তর না জানা প্রশ্নদের ভিড় আছে। তবু ভালোবাসাটাও আছে ঠিক, এ আমি নিশ্চিত জানি। একদিন ঠিক টাপুরদির সব দ্বিধার অবসান হবে। হবেই।
বাইপাসের ধারে একটা শপিং মলের তিনতলায় ফুড কোর্টে ঢুকলাম আমরা। কাজের মধ্যে থাকলে টাপুরদি কখনোই ভরপেট খায় না। আমার অবশ্য সেই দায় নেই। আমি ছোলে ভাটুরের প্লেট নিলাম, সঙ্গে ক্যাফে কফি ডে থেকে ক্যাপুচিনো। টাপুরদি ওখান থেকে সল্টেড ক্যারামেল আইস ফ্র্যাপ কফি নিল নিজের জন্য।
খেতে খেতে বললাম, 'ডক্টর মিত্র আর শিউলি মজুমদারের সঙ্গে কথা হল। এখনও বাকি চার। এর মধ্যে রাঘব সামন্ত ইজ মিসিং। বাকি তিনজনের ক্ষেত্রে কীভাবে এগোবে ঠিক করেছ কিছু?'
টাপুরদি হাতের স্ট্র দিয়ে ফ্র্যাপের ওপরের ফেনা নাড়তে নাড়তে একটু অন্যমনস্ক কণ্ঠে বলল, 'কথা তো বলতেই হবে। কিন্তু শুধু কথা বলে ওদের ভাঙা যাবে না। সবাই মুখস্থ বুলি আওড়াবে।'
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'সাগর দাশগুপ্তের ব্যাপারে যা যা বললে, সব সত্যি? তুমি জানলে কোত্থেকে?'
টাপুরদি বলল, 'সেটা কোনো কঠিন ব্যাপার নয়। গুগলে ডিজি ফার্মা দিয়ে সার্চ করলে তুইও জানতে পারতি। তবে সত্যি কী মিথ্যে সেটা কী করে বলি, বল? আমাদের দেশের আইন অনুসারে একজন অভিযুক্ত ততক্ষণ 'নট গিলটি', যতক্ষণ না দেশের আদালত তাকে 'গিলটি' ঘোষণা করে।'
'অর্থাৎ সাগর দাশগুপ্ত 'নট গিলটি', যেহেতু সরকার পক্ষের আইনজীবী আদালতে তার কোনো দোষ প্রমাণ করতে পারেনি?''
'তাই দাঁড়াচ্ছে।' ফ্র্যাপেতে চুমুক দিয়ে বলল টাপুরদি।
'আচ্ছা টাপুরদি, মিসেস মজুমদার তো দেখলাম সব প্রশ্নের উত্তরে মৃত মানুষটার কোর্টে বল ঠেলে গেল।'
টাপুরদি হাসল। বলল, 'সেটাই সবচেয়ে সহজ গেমপ্ল্যান। মৃতেরা প্রতিবাদ করে না।'
'শেখর মজুমদার তো আইপিএস ছিলেন। কীভাবে মারা যান তিনি, জানো কিছু?' জানতে চাইলাম আমি।
টাপুরদি বলল, 'শুনেছি হার্ট অ্যাটাক। এখানে যা সব ব্যাপার-স্যাপার দেখছি তাতে অ্যাটাকটা ভেতরের না বাইরে থেকে হয়েছিল, সেটা একটু খতিয়ে দেখা দরকার।'
লালবাজারে পৌঁছে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল আমাদের নিজের কেবিনে ডেকে নিলেন। ঘরে ঢুকে দেখলাম তিনি ল্যাপটপে কিছু টাইপ করছেন। ইশারায় আমাদের বসতে বললেন তিনি। মিনিট খানেকের মধ্যে টাইপ করা শেষ করে মুখ তুলে তাকলেন। একটু হেসে বললেন, 'কেসটা তাহলে হাতে নিয়েই নিলেন, সঙ্ঘমিত্রা?'
টাপুরদি সজোরে মাথা নেড়ে বলল, 'না না, এভাবে বলবেন না। আমি শুধু নিজের মতো করে একটু মাথা ঘামাতে চাইছিলাম। পুলিশের কাজে ইন্টারফেয়ার করার কোনো উদ্দেশ্য আমার নেই।'
সৌরভবাবু মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, 'আপনি ব্রিলিয়ান্ট ডিটেকটিভ সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পুলিশে চাকরি করলে আপনি ডিপার্টমেন্টের অ্যাসেট হতে পারতেন। কিন্তু আপনার খারাপ লাগলেও আমি বলব, আমাদের পুলিশের হাতে কিছু অতিরিক্ত সুবিধা থাকে। আমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা সরকার করে। আপনার কাছে এই সুবিধেগুলো নেই।'
উপর-নীচে মাথা নাড়ল টাপুরদি। বলল, 'আই নো স্যার।'
সৌরভবাবু বললেন, 'আমি চাইনি আপনি এই কেসে কোনোভাবে ইনভলভ হ'ন।'
টাপুরদি ডিসিডিডির মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কোনো জবাব দিল না।
সৌরভবাবু বললেন, 'আমাকে আপনি ভুল বুঝতেই পারেন। কিন্তু এই কেসটা ভীষণ রিস্কি। এখানে আমরা কোনো খুনি, চোর, রেপিস্টকে খুঁজছি না। এই কেসে আমাদের লড়াই এমন একটি অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে, যাদের জাল সারা দেশে বিছানো। যারা নির্দ্বিধায় মানুষের শরীর থেকে প্রত্যঙ্গ খুলে নেয়, তারা কতটা নিষ্ঠুর নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আপনি?'
টাপুরদি নীরবে মাথা নাড়ল।
সৌরভবাবু বললেন, 'আওয়ার ফাইনেস্ট অফিসার্স আর ওয়ার্কিং অন দিস কেস, মিস ব্যানার্জি! স্টিল উই আর গ্রোপিং ইন দ্য ডার্ক। এরা কতটা চালাক আপনি ভাবতেও পারবেন না। এদের নেটওয়ার্ক ভীষণ স্ট্রং। এরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখে ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে। পুরো নেটওয়ার্কটা গত কয়েক বছর ধরে সারা ভারতবর্ষের পুলিশের নাকের ডগায় বসে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো রাজ্যের পুলিশ, আইবি তাদের ধরতে পারেনি। ইট ইজ লাইক আ ওয়ার এগেন্সট সাম ভেরি পাওয়ারফুল অপোনেন্টস। অ্যাজ পার মাই ভিশন, দেয়ার ইজ নাথিং টু স্টর্ম ইয়োর ব্রেইন ইন। এই কেসে আপনি ঠিক কী করবেন আমি বুঝতে পারছি না, ঠিক যেমন আপনি বুঝতে পারছেন না এই কেসের গুরুত্ব কতটা?'
টাপুরদি চুপ করে রইল।
সৌরভবাবু একটু অস্থিরভাবে মাথা নেড়ে বললেন, 'না মিস ব্যানার্জি, আপনি বুঝতে পারছেন না। বুঝতে পারলে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করে এই কেসে ইনভলভ হওয়ার মতো ভুল করতেন না। এটা শুধু ভুল নয়, দিস ইজ লাইক আ সুইসাইড।'
টাপুরদি একটা বড়ো নিশ্বাস ছাড়ল। তারপর শান্ত গলায় বলল, 'স্যার, আপনি না চাইলে আমি এই মুহূর্তে এই কেস থেকে বেরিয়ে যাব। পুলিশের সাহায্য ছাড়া আমি কিছুই নই। আমি জানি, গল্প-উপন্যাসের মতো শুধু মগজাস্ত্রে শান দিয়ে বাস্তবে কেস সলভ হয় না, অপরাধী ধরা যায় না। আমি লাকি যে আমার জীবনের প্রতিটি কেসে পুলিশের সাহায্য পেয়েছি। বরং বলা ভালো, আমি পুলিশকে সামান্য সাহায্য করেছি। তার বেশি আর কিছু নয়। এই ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হবে না। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা অরগ্যান ট্র্যাফিকিং নেটওয়ার্ককে ধরার ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু নব দিগন্ত সেবাশ্রম থেকে হারিয়ে যাওয়া লালন নামের ছেলেটিকে খুঁজছি। শুধু সেটুকু অনুমতিই আমি চেয়েছি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে।'
সৌরভবাবু মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, 'ইউ আর ভেরি স্মার্ট মিস ব্যানার্জি! এনিওয়ে, আমি সরকারের চাকর। ওপর থেকে যা অর্ডার আসবে আমাকে পালন করতেই হবে। আপনি আপনার কাজ করুন। আমার কাছে অর্ডার আছে আপনার ইনভলভমেন্ট গোপন রাখার জন্য। সুতরাং এটা আমাকে করতেই হবে। অর্ডার না থাকলেও আপনার সিকিওরিটির কথা ভেবেই করতাম। আমি জানি, আপনি আপনার ফাইন্ডিংস আমার কাছে রিপোর্ট করবেন না। তবে যদি প্রয়োজন বোধ করেন, বা এমন কোনো সিচুয়েশন অ্যারাইজ করে যাতে পুলিশের সাহায্য আপনার প্রয়োজন হয়, জানাবেন আমাকে। আর আমাকে না পেলে অর্জুনকে জানাবেন। ওকে আমার ইনস্ট্রাকশন দেওয়া আছে।'
টাপুরদি একটু দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বলল, 'অফিসার অর্জুন জানেন আমি এই কেসে কাজ করছি, বা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার কথা?'
সৌরভবাবু বললেন, 'জানেন। যদিও এটা গোপন রাখতে বলা হয়েছে আমায়, কিন্তু আপনার সুরক্ষার কথা ভেবেই আমি অর্জুনকে জানিয়েছি। এই কেসে ও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ও খুব এফিশিয়েন্ট অফিসার, সর্বোপরি আপনার সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় আছে ওর। সুতরাং আমার ধারণা ওর সঙ্গে কাজ করতে আপনার অসুবিধে হবে না।'
টাপুরদি একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, 'একটা কথা ছিল, স্যার।'
'বলুন!' বললেন সৌরভ সান্যাল।
টাপুরদি আজ শিউলি মজুমদারের সাক্ষাৎকারের বিষয়ে খুলে বলল সৌরভবাবুকে। তারপর বলল, 'কিন্তু ওদের কমিটির বাকিরা এতক্ষণে আমার আসল পরিচয় জেনে গেছে। একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের সামনে মুখ খুলতে বাধ্য নয় তাঁরা কেউই। তবে আমি জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাব। সেটা সমস্যা নয়। সমস্যা হল, আমার সামনে ওরা হয়তো তেমন করে মুখ খুলবে না, যেভাবে পুলিশের সামনে খুলবে।'
'বেশ, তাতে অসুবিধে কী? মানে কীভাবে সাহায্য চাইছেন আপনি?'
টাপুরদি বলল, 'সেটা আমি এখনও ভাবিনি। কিন্তু সেরকম পরিস্থিতি যদি তৈরি হয়, তাহলে পুলিশের সাহায্য পাব আশা রাখছি।'
সৌরভবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। চুপ করে সেভাবেই বসে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর বললেন, 'আপনার সঙ্গে পুলিশ কো-অপারেট করবে। আমার ওপর সেরকমই ইনস্ট্রাকশন আছে। কিন্তু আমি আপনাকে আবারও বলব, যা করবেন চিন্তা-ভাবনা করে করবেন। এর আগে অমিয় চক্রবর্তী মার্ডার কেসে আমাদের ওপর পলিটিকাল প্রেসার ছিল। তবু আমি নিজেই আপনাকে ওই কেসে ইনভলভ হতে বলেছিলাম। কিন্তু এই কেসে আমি যখন বাধা দিচ্ছি, সেরকম কারণ আছে বলেই দিচ্ছি। যাই হোক, অল দ্য বেস্ট।'
'একটা কথা জানতে চাইছি, যদি কিছু মনে না করেন!' বলল টাপুরদি।
'বলুন!'
'লালন বলে যে ছেলেটা নবদিগন্ত থেকে নিরুদ্দেশ, সেই কেসটা নিয়ে পুলিশ কি কিছু করেছে? মানে সেটা নিয়ে কোনোরকম তদন্ত হয়েছে কি?'
সৌরভবাবু বললেন, 'ওপর থেকে মুভ করার পর লোকাল থানা কেসটা নিয়েছে। কতটা এগিয়েছে আমি ঠিক জানি না। আমি অর্জুনকে বলে দেব। ও খোঁজ নিয়ে আপনাকে জানিয়ে দেব। আর কিছু?'
টাপুরদি উঠে দাঁড়াল। বলল, 'আর কিছু নয়। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।'
সৌরভবাবুর কেবিন থেকে বেরিয়ে টাপুরদিকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'অর্জুনদাকে একটা ফোন করবে? এখানে এসে দেখা করবে না একবার?'
টাপুরদি দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরল। বলল, 'ও আমার ওপর নিশ্চয়ই ভীষণ রেগে আছে। ওকে ফেস করার সাহস আমার নেই। এখানে সিন ক্রিয়েট করতে চাইছি না।'
আমি হাসলাম। বললাম, 'জানো টাপুরদি, মাঝে মাঝে আমার মনে হয় অর্জুনদাকে তোমার চেয়ে আমি বেশি ভালো বুঝি। তোমার সত্যিই মনে হয় অর্জুনদা পাবলিক প্লেসে সিন ক্রিয়েট করার মানুষ? হ্যাঁ মানছি, অর্জুনদা একটু অভিমানী, তোমার ব্যাপারে প্রোটেকটিভ, কিন্তু সে একজন আদ্যন্ত প্রফেশনাল পুলিশ অফিসার। তোমার কাজকে অর্জুনদা শ্রদ্ধা করে। যাই হোক, চলো যাওয়া যাক।'
গাড়িতে বসে টাপুরদিকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'রাঘব সামন্তর ব্যাপারটা সৌরভবাবুকে জানালে না কেন? পুলিশ তো তদন্ত করে দেখতে পারত। রাঘব সামন্তের মিসিং ডকুমেন্টস পুলিশ খুঁজলে হয়তো পাওয়াটা সহজ হত।'
'তা হত', বলল টাপুরদি, 'আবার উলটোটাও হতে পারত। ওরা জানে আমি রাঘব সামন্তকে খুঁজছি। আমাকে ওরা পাত্তা দিচ্ছে না বিশেষ। কারণ ওরা জানে আমার লিমিটেশনস আছে। এদিকে পুলিশ লালনের মিসিং কেস বা নবদিগন্ত নিয়ে খোঁজখবর করলেও খুব বেশি মাথা ঘামাচ্ছে না। তাই ওরা সাবধান হলেও সেটা বাড়াবাড়ি রকমের কিছু নয়। কিন্তু পুলিশ খোঁজাখুঁজি শুরু করলে সেই খবর ওদের কাছে সহজেই পৌঁছে যাবে। এর ফলে ওরা আরও বেশি করে সাবধান হয়ে যাবে। নবদিগন্তের এগেনস্টে যা কিছু তথ্য-প্রমাণ এখনও পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেটা আর পাওয়া যাবে না।'
টাপুরদির ফোনটা বাজছে। ড্রাইভ করাকালীন টাপুরদি ফোন ধরে না। আমাকে বলল, 'দ্যাখ তো কে!'
টাপুরদির ফোনের স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে বললাম, 'সুদর্শনবাবুর ফোন।'
টাপুরদি গাড়িটাকে রাস্তার এক পাশে দাঁড় করাল। তারপর ফোনটা আমার হাত থেকে নিয়ে রিং ব্যাক করল টাপুরদি। ওপাশ থেকে সুদর্শনবাবু কী বললেন শুনতে পেলাম না। টাপুরদি বলল, 'লালবাজার থেকেই আসছি আমি। ডিসিডিডি-র সঙ্গে কথা হয়েছে। কোনো অসুবিধে নেই।'
এর পর দীর্ঘ নীরবতা। ওপ্রান্তে সুদর্শনবাবু কিছু বলছেন। শুনতে শুনতে টাপুরদির ভুরুতে ভাঁজ পড়ছে দেখলাম। বেশ কিছুক্ষণ শোনার পর টাপুরদি বলল, 'ঠিক আছে স্যার। কিন্তু ব্যাপারটা কি পুলিশ জানে?'
আবার নীরবতা। কথা শোনার পর টাপুরদি বলল, 'দেখছি আমি। এটা তো হওয়ারই ছিল। কেউ না কেউ সিস্টেমের ভেতরের লোক না থাকলে এতদিন ধরে এরকম একটা বিজনেস এমন স্মুদলি চলতে পারে না। আমি আজ শিউলি মজুমদারের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি শিওর, তিনি সব শেখানো বুলি আওড়াচ্ছেন। নেক্সট যাব এমএলএ মশাইয়ের কাছে। আপনি চিন্তা করবেন না। ব্যাপারটা গোপন থাকবে। আমার পক্ষে যেটুকু সম্ভব আমি করছি।'
টাপুরদি ফোনটা রাখতে জিজ্ঞাসা করলাম, 'কী বললেন সুদর্শনবাবু?'
'সৌরভবাবুর সঙ্গে কথা বলে নিয়েছি কি না জানতে চাইলেন। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে, যে-কোনো সমস্যা হলে তাঁকে জানাতে বললেন', গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বলল টাপুরদি।
'আর?'
'আর বললেন, তিনি সন্দেহ করছেন এই চক্র সারা দেশে যেভাবে নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছে, তাতে সিস্টেমের ভেতরের এক বা একাধিক ব্যক্তির মদত নিশ্চয়ই আছে।'
'সিস্টেমের ভেতরের ব্যক্তি বলতে?'
'সিস্টেম, রাষ্ট্রযন্ত্র', বাঁকা হেসে বলল টাপুরদি, 'সে বা তারা সেই যন্ত্রের যে-কোনো পার্ট হতে পারে। পুলিশ হতে পারে, প্রশাসন হতে পারে, নেতা-মন্ত্রী হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। যে কেউ হতে পারে এই চক্রের মাথা, এনিবডি।'
'সত্যব্রত মল্লিক?'
'হতেই পারে, অন্য কেউও হতে পারে।' টাপুরদি বলল।
'সেক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপারটা আমরা যতটা ভাবছি তার থেকেও অনেক বেশি জটিল', বললাম আমি।
'হুম', মাথা নেড়ে বলল টাপুরদি, 'ভেবে দ্যাখ মিতুল, আমি এই মুহূর্তে যদিও নবদিগন্তের বাইরে ভাবছি না, তবু এত বড়ো একটা চক্র এত মসৃণভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে। এমন কী করে হয় যে এত বছরে একবারও পুলিশ ওদের কাউকে ধরতে পারল না?'
জিজ্ঞাসা করলাম, 'আচ্ছা টাপুরদি, তুমি কি শিওর নবদিগন্ত আর অরগ্যান ট্র্যাফিকিং কেস এক সূত্রে গাঁথা?'
'মোটামুটি শিওর।' বলল টাপুরদি।
আমি চুপ করে রইলাম। সৌরভবাবু টাপুরদিকে সাবধান করতে চাইছিলেন। কেসটা সত্যিই ভীষণ বিপজ্জনক। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার নীরবতা লক্ষ করে টাপুরদি বলল, 'কী ভাবছিস মিতুল?'
মনের কথাটাই বললাম, 'কেসটা ক্রিটিক্যাল দিকে বাঁক নিচ্ছে টাপুরদি।'
'তুই কি ভয় পাচ্ছিস?' টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।
একটু চুপ করে থেকে বললাম, 'মিথ্যে বলব না। তা পাচ্ছি।'
টাপুরদি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'তোকে এই কেসে ইনভলভ করা আমার উচিত হয়নি।'
আমি বললাম, 'তুমি তো আমাকে ইনভলভ করোনি। আমি নিজে হয়েছি। ভয় পাচ্ছি সেটা যেমন সত্যি, আবার এই কেসে আমি তোমার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত আছি, এই নিয়েও তুমি কোনো সন্দেহ রেখো না।'
টাপুরদি বলল, 'ভেবে দ্যাখ মিতুল, এখনও...'
বাধা দিয়ে বললাম আমি, 'এ নিয়ে আর ভাবনা-চিন্তার কোনো অবকাশ নেই। যাই হোক, তোমার নেক্সট প্ল্যান কী?'
টাপুরদি বলল, 'এমএলএ সত্যব্রত মল্লিকের সঙ্গে কাল সকালে দেখা করব।'
'তিনি কি তোমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হবেন?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'হবেন', বলল টাপুরদি, 'কারণ, আমার কাছে খোদ হেলথ মিনিস্ট্রি থেকে পারমিশন আছে। আর সত্যব্রত মল্লিক রুলিং পার্টির এমএলএ। সুতরাং কথা তাঁকে বলতেই হবে। জানি সত্যি কথা তিনিও বলবেন না। কিন্তু মিথ্যের মধ্য থেকে দু-এক দানা সত্যি যদি বেরিয়ে আসে, সেই ভরসাতেই যাওয়া।'
হাসলাম আমি। বললাম, 'পলিটিশিয়ান, তায় এমএলএ, এরা রাতে ঘুমিয়ে স্বপ্নের মধ্যেও সত্যি বলে না।'
'রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে তোর ধারণা বেশ উচ্চমানের সন্দেহ নেই', হেসে বলল টাপুরদিও।
আমার ফোনটা বাজছে। ফোনের স্ক্রিনে অর্জুনদার নাম দেখে একবার আড়চোখে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। তারপর ফোনটা রিসিভ করে কানে ঠেকালাম।
'হ্যাঁ অর্জুনদা, বলো!'
'কোথায় আছ তোমরা?' অর্জুনদার কণ্ঠস্বরটা বেশ গম্ভীর শোনাল।
'রাস্তায়', বললাম আমি।
'তোমরা একবার লালবাজারে আসতে পারবে এখন?'
'এখনই? আমরা তো লালবাজার থেকেই এলাম।' বলেই মনে মনে জিভ কাটলাম আমি।
'জানি', গম্ভীর গলায় বলল অর্জুনদা, 'ডিসিডিডি স্যার তোমাদের খবর দিতে বলেছেন। নবদিগন্ত থেকে ওদের কম্পিউটার তুলে এনেছিলাম আমরা। সেখানে কিছু ই-মেল পাওয়া গেছে। টাপুর যদি দেখতে চায়, তাহলে আসতে পারে।'
'কিছু সূত্র পাওয়া গেল?' উত্তেজিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'না', সংক্ষেপে উত্তর দিল অর্জুনদা।
টাপুরদি আমাদের কথোপকথন শুনছিল এতক্ষণ। আমি কিছু বলার আগেই সামনে রোড ক্রসিং থেকে গাড়ি ঘোরাল। আমি ফোনে অর্জুনদাকে বললাম, 'আমরা আসছি।'
ঠিক পঞ্চান্ন মিনিটের মধ্যে ফের লালবাজারে পৌঁছোলাম আমরা। গেটের সামনে থেকেই অর্জুনদার ফোনে ফোন করলাম আমি। মিনিট পাঁচেক অপেক্ষার পর অর্জুনদা বেরিয়ে এল। মুখটা থমথম করছে। আমাদের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, 'চলো!'
অর্জুনদার পিছু পিছু হেঁটে লম্বা করিডোর পার করে একটা ছোটো ঘরে এলাম। এখানে একটা মাঝারি আকারের টেবিল পাতা, সম্ভবত ছোটোখাটো মিটিং, আলোচনা হয় এখানে। আপাতত এই ঘরে চেয়ারে একজন তেইশ-চব্বিশ বছরের ছেলে বসে সামনে খোলা ল্যাপটপে ডুবে আছে। এতটাই কাজে মগ্ন যে আমাদের পায়ের শব্দেও চোখ তুলে তাকাল না।
অর্জুনদা এগিয়ে গিয়ে ছেলেটির কাঁধে হাত রাখল। বলল, 'কত দূর, শুভম?'
এতক্ষণে ছেলেটি চোখ তুলে তাকাল। কোঁকড়ানো মাথার চুল, ফর্সা ধারালো মুখ, ভীষণ উজ্জ্বল দু-টি চোখ। অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে বলল, 'অর্জুনদা, মাইরি বলছি, যে এনক্রিপশনগুলো করেছে না মাইরি, সামনে পেলে হাত দুটোতে চুমু খাব।'
অর্জুনদা চাপা গলায় বলল, 'হুম, এবার তুমি কত দূর এগোলে সেটা বলো।'
শুভম এবার আমাকে আর টাপুরদিকে দেখেছে। অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল, 'একটুও না।'
টাপুরদি এবার এগিয়ে গেল। অর্জুনদার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে বলল, 'কী ব্যাপার?'
অর্জুনদা শুভমের ল্যাপটপের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বলল, 'নব দিগন্তের মেলবক্স ওপেন করেছে শুভম। বাই দ্য ওয়ে, এ হল শুভম, আমাদের কলকাতা পুলিশের ওয়ান অব দ্য বেস্ট অফিসার ফ্রম সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট। হি ইজ অ্যান এথিক্যাল হ্যাকার, অ্যান্ড হি ইজ আ জিনিয়াস।'
শুভম হাত তুলে হাসিমুখে 'হাই' করল। বাঁ হাতের আঙুল এখনও কি-বোর্ডে ছুটে চলেছে।
অর্জুনদা আমাদের দেখিয়ে বলল, 'শুভম, এঁরা হলেন সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি আর মৈথিলী সেন।'
অর্জুনদার কথা শেষ করতে না দিয়ে শুভম বলল, 'টাপুরদি আর মিতুল। জানি আমি। বাই দ্য ওয়ে, অমিয় চক্রবর্তী মার্ডার কেসে আমিও সামান্য একটু ভূমিকা পালন করেছিলাম। সুতরাং না চেনার কারণ নেই।'
টাপুরদি বলল, 'একটু নয়, অনেক বড়ো ভূমিকা ছিল। যাই হোক, মেলে কিছু পাওয়া গেল কি?'
'হুম।' মাথা নেড়ে বলল শুভম, 'মোট চারটা সাসপিশাস মেল পাওয়া গেছে। প্রতিটা মেলে একটা বা দুটো করে এনক্রিপ্টেড ফাইল আছে। মেল সার্ভার ফাইল টাইপ আইডেন্টিফাই করতে পারেনি। তার ওপর সেন্ডারের আইডেন্টিটি ক্লিয়ার নয়। তাই স্বাভাবিকভাবে মেলগুলি স্প্যামে চলে গেছে।'
টাপুরদি কিছু জিজ্ঞাসা করতে গেল। তার আগেই তাকে থামিয়ে দিয়ে শুভম বলল, 'ফাইলগুলো মাল্টিপল লেয়ারে এনক্রিপ্টেড করা আছে। কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্ন, বিশেষ কোনো অ্যালগোরিদম ফলো করলে তবেই এগুলোকে খোলা যাবে। কিন্তু সেটা আমরা জানি না।'
'কোথা থেকে, মানে কার কাছ থেকে এসেছে মেলগুলো?' অর্জুনদা জানতে চাইল।
শুভম বলল, 'এখানে বেশ একটা মজার ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলেছে এরা। মেল এসেছে একটি ক্রিপ্টো-কারেন্সি কেনা-বেচার সংস্থার নিজস্ব আইডি থেকে। আমি পরীক্ষা করে দেখেছি, আইডিটা অথেন্টিক। আমার ধারণা, এটা হ্যাক করা হয়েছে।'
'কেন এরকম মনে হল তোমার? আমি যতদূর জানি এসব ক্রিপ্টো-কারেন্সি লেনদেন যেসব সংস্থার মাধ্যমে হয়, সেগুলির সাইট হাইলি প্রোটেক্টেড থাকে', অর্জুনদা বলল।
শুভম হাসল। বলল, 'একদম ঠিক বলেছ তুমি। আর ঠিক সেই কারণেই ওদের সাইট ইউজ করছে এরা। কারণ তাতে ওদের সিকিওরিটি ফায়ারওয়ালের হেল্প পাচ্ছে নিজেদের আইডেন্টিটি হাইড করার জন্য। উপরন্তু তার ওপর নিজেরা নিজেদের ডেটা এনক্রিপ্ট করছে মাল্টিপল লেয়ারে।'
'আইপি অ্যাড্রেস?'
হ্যা হ্যা করে হাসল শুভম। খানিক হেসে নিয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলল, 'এ অর্জুনদা, কোন জমানায় পড়ে আছ তুমি? যারা এমন সব দুর্দান্ত কাজ করছে, তারা তোমার জন্য আইপি অ্যাড্রেস সাজিয়ে বসে আছে? কিন্তু বস, যে বা যারা করেছে, তারা ডার্ক ওয়েব গুলে খেয়েছে। স্পুফিং ওদের কাছে বাঁয়ে হাত কা খেল, বুঝলে বস? ওদের ধরতে পারলে আমার সঙ্গে দেখা করিও প্লিজ!'
অর্জুনদা মুচকি হাসল।
'এটা খুলতে কত সময় লাগবে, শুভম?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
'নো আইডিয়া!' বলল শুভম, 'যে রেটে লেয়ার দিচ্ছে, তাতে আদৌ এটা এভাবে খোলা যাবে কি না তাও জানি না। তবে একটা ইনফরমেশন দিতে পারি।'
আমরা তিনজনে তাকালাম শুভমের মুখের দিকে।
'এই অ্যাটাচমেন্টগুলো এখান থেকে কেউ খোলেইনি কখনো', বলল শুভম।
'সে কী?' ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা, 'তাহলে কী করে বুঝছ যে এগুলি সত্যিই কোনো স্প্যাম নয়, আদৌ ইম্পর্ট্যান্ট কিছু?'
শুভম বলল, 'কারণ আছে অর্জুনদা। এই অ্যাটাচমেন্টগুলো কেউ খোলেনি বটে, তবে ফরোয়ার্ড করেছে।'
'কাকে?' টাপুরদি ও অর্জুনদা একসঙ্গে বলে উঠল।
শুভম ল্যাপটপটা এগিয়ে দিল।
মেল আইডির নামটা দেখে চমকে উঠলাম আমি। অস্ফুটে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, 'রাঘব সামন্ত! মাই গড!'
শুভম বলল, 'লাস্ট মেলটা চালাচালি হয়েছে এক বছরেরও বেশি আগে। তার পর থেকে এই মেল আইডি থেকে রাঘব সামন্তের কাছে আর কোনো মেল যায়নি।'
'টাপুরদি!' মৃদু কণ্ঠে বললাম আমি, 'লাস্ট ডেটটা দেখো। শেখর মজুমদারও মারা যান ওই সময়েই। তার মানে কি শেখর মজুমদারই রাঘব সামন্ত? সেই কারণেই সব কিছু ব্যবস্থাপনা নিজের হাতে করেও কমিটিতে তিনি নেই? আসলে তিনি কমিটিতে ছিলেন, কিন্তু বেনামে। হতেই পারে, বলো?'
অর্জুনদা বলল, 'তোমাদের আর একটা ইনফর্মেশন দিই। আমরা নব দিগন্তের আর ওখানকার ম্যানেজার স্বরূপ পাঠকের কল রেকর্ড তুলেছিলাম। সেরকম কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া না গেলেও নবদিগন্তের ল্যান্ডফোনে গত পাঁচ মাসে হবে তিনবার হলদিয়া থেকে কল এসেছে। নম্বরগুলোর লোকেশন হলদিয়া হলেও সবগুলিই কলকাতার সিম। কিন্তু সেটা ব্যাপার নয়। আসল ব্যাপারটা হল সেই সিমগুলো সব চোরাই। মানে আনরেজিস্টার্ড। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, প্রতিটি কলের পর থেকে সিমগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।'
'ম্যানেজারকে জেরা করেছ এই ব্যাপারে?' টাপুরদি বলল।
'হুম, জেরা করা হয়েছে। এখনও চলছে। সে বলছে, সে কিছু জানে না। ওই ফোনে অনেকের ফোন আসে। এমনকি বোর্ডিং-এর বাসিন্দাদেরও আত্মীয়-পরিজনরা ওই নম্বরেই ফোন করে। ফলে তার পক্ষে জানা সম্ভব নয় কে কোথা থেকে ফোন করে।'
'হুম', চিন্তিতমুখে মাথা নাড়ল টাপুরদি।
'তাহলে?'
অর্জুনদা বলল, 'আমাদের হলদিয়ার সোর্সদের অ্যালার্ট করে দেওয়া হয়েছে। দেখা যাক, কী জানা যায়!'
পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে অর্জুনদা বলল, 'আর একটা খবর দিই। নবদিগন্ত থেকে আমরা যেসব ফাইলপত্র বাজেয়াপ্ত করেছিলাম, তাতে নবদিগন্তের রেজিস্ট্রেশন ডকুমেন্টের কপি ছিল। সেখানেও রাঘব সামন্তের কোনো নথি পাওয়া যায়নি। ছবিও না। লোকটা জাস্ট কর্পূরের মতো উবে গেছে।'
ঘড়ির সবচেয়ে ছোটো কাঁটাটি যখন মধ্যরাত্রি পার করে আরও দুই ঘর অগ্রসর হয়ে খানিক জিরোচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে এই মহানগরীর বুকে নিদ্রাচ্ছন্ন লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে একজনের মোবাইল ফোনটি বেজে উঠল। এই মানুষটি অবশ্য গভীর নিদ্রাচ্ছন্ন ছিল না। বরং তন্দ্রার একটা ঘোর এসে সবেমাত্র তার চোখের পাতা ছুঁয়েছিল। তবু তাঁর মস্তিষ্ক ছিল সচেতন। লোকটি জানত এখনই আসবে ফোনটা। বিছানায় উঠে বসে স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করতে থাকা প্রাইভেট নম্বর লেখাটি দেখে তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। এ নম্বর কলকাতা পুলিশ সারা জীবন ধরে চেষ্টা করলেও ট্র্যাক করতে পারবে না। গত প্রায় দশ বছর ধরে ধীরে ধীরে এই দুর্ভেদ্য চক্রব্যূহ রচনা করেছে সে। সেদিন তাদের দু-জন লোকের সামান্য একটা ভুলে সেই চক্রব্যূহের প্রাচীরে একটা ধাক্কা লেগেছে বটে, কিন্তু একে ভেদ করা অত সহজ নয়।
'হ্যালো!'
'সব রেডি বস।' ফোনের ও-প্রান্তের কণ্ঠস্বর তার উত্তেজনা লুকোতে পারছে না।
'হুম, কনসাইনমেন্ট কে নিয়ে যাবে? গতবারের মতো ভুল যেন না হয়!' বলল লোকটা।
'না বস, হবে না। এবার গজপতি আর রাজু যাবে। রাজু সঙ্গে থাকলে কেউ সন্দেহ করবে না। আর করলেও ও সামলে নেবে।'
'হুম।'
লোকটা একটু ভাবল। রাজু সিস্টেমের ভেতরের লোক, কলকাতা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর। সে অবশ্যই ছোটোখাটো সমস্যা সামলে নিতে পারবে। তা ছাড়া তাদের কাজে রিস্ক তো সবসময়েই থাকে। ভেবেচিন্তে বলল, 'দেখো, এমনিতেই পরিস্থিতি তেতে আছে। ওদের ভালো করে বুঝিয়ে দেবে, যাতে করে কোনোরকম ফালতু রিস্ক না নেয়। এটা গেলে আর ক-টা কনসাইনমেন্ট বাকি থাকছে?'
'আরও দুটো, বস। একটা দিল্লি আর একটা ত্রিভান্দ্রাম। তাহলেই আপাতত এখনকার মতো কিছুদিন শান্তি।'
'হুম, মাল রেডি আছে তো আমাদের স্টকে?' জিজ্ঞাসা করল লোকটা।
'হ্যাঁ বস। মাল তো রেডিই আছে। পাঠানোটাই সমস্যা। টোলে পাহারা জোরদার হয়েছে। আগের রেটে আর মানছে না।'
'এখন টাকা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। বিজনেসে সবসময় একই রকম লাভ পাওয়া যায় না। রেপুটেশনটা ধরে রাখতে পারলে আবার বড়ো বিজনেস হবে। ও নিয়ে ভেবো না। মনে রেখো, আমাদের ব্যাবসায় কনসাইনমেন্ট ফেল করলে তার দাম কিছু পেশেন্টকে নিজেদের জীবন দিয়ে চোকাতে হবে। এখন শুধু যাতে করে কনসাইনমেন্টগুলো ঠিকঠাক পৌঁছোয় সেটা দেখো।' গম্ভীর গলায় বলল লোকটা।
'আরেকটা কথা বস!' ওদিকের কণ্ঠস্বর বলল, 'পুলিশের ভেতরের খবর আমরা কম-বেশি পেয়ে যাব, সে নিয়ে ভাবছি না। কিন্তু ওই যে মেয়ে গোয়েন্দা, কী যেন নাম, হ্যাঁ, সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি, সে একটু বেশিই নাক গলাচ্ছে। ও কিন্তু ঝামেলা বাঁধাতে পারে।'
লোকটা একটু ভাবল। তারপর বলল, 'জানি। আমি দেখছি ও দিকটা। ও নিয়ে ভেবো না।'
'ইয়েস বস!' বলে ফোন রেখে দিল ও-প্রান্তের ব্যক্তি।
লোকটি অন্ধকারে বিছানায় বসে রইল কিছুক্ষণ। এই খেলায় পুরোন খেলুড়ে সে। এতগুলো বছর ধরে খেলাটা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ-প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে। কেউ সন্দেহ করেনি তাকে, কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। সরকারের খাতায়-কলমে তার অস্তিত্বই নেই কোনো। তবু সে আছে, ভীষণভাবে আছে। ধীরে ধীরে সময় নিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে এক অদৃশ্য জাল। নিজেকে মাঝে মাঝে তার ঈশ্বর বলে মনে হয়। কত মানুষ বেঁচে যাচ্ছে, প্রাণ ফিরে পাচ্ছে তার দাক্ষিণ্যে। মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর আত্মীয়স্বজনের মুখে হাসি ফুটছে।
তাই এ নিয়ে কোনো অপরাধবোধ নেই লোকটার। কেন থাকবে? এই সওয়াশো কোটির দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণের পরোয়া না করে রোজ রোজ কীটপতঙ্গের মতো মানুষ জন্মাচ্ছে। রাস্তাঘাট, বাজারহাটে থিকথিক করছে নোংরা, খুঁটে খাওয়া মানুষের দল। এদের মরা বা বেঁচে থাকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ঘৃণ্য পোকার মতো মানুষগুলো কিন্তু তা বলে নেহাত অবহেলার বস্তু নয়। এদের শরীরেও রয়েছে ভীষণ দামি সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। লোকটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার তাদেরই আছে, যারা জীবনটাকে ক্রয় করার সামর্থ্য রাখে। বাকিদের হারিয়ে যাওয়া, মুছে যাওয়াই নিয়তি। লোকটা এই কাজটাই করে। এই পৃথিবীর বোঝা কমিয়ে তাদের হাতে জীবন তুলে দেয়, যারা জীবনের মূল্য দিতে পারে। এই-ই নিয়ম। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। যোগ্যতমের উদবর্তন একেই তো বলে। লোকটার বাবা, মা, বোন, স্ত্রী সকলে চলে গেছে একে একে, জীবনের মূল্য চোকাতে পারেনি তারা। তারা আজ কোথায়? মৃত্যুর পর আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, জানে লোকটা। কিচ্ছু নয়।
ফোন রেখে অন্ধকারে বসে বসে নিজের মনেই দুলে দুলে হাসতে থাকে লোকটা। তারপর ভরাট কণ্ঠে আবৃত্তি করতে থাকে,
'পৃথিবীতে সুদ খাটে: সকলের জন্য নয়।
অনির্বচনীয় হুন্ডি একজন দু-জনের হাতে।
পৃথিবীর সব উঁচু লোকদের দাবি এসে
সবই নেয়, নারীকেও নিয়ে যায়।
বাকি সব মানুষেরা অন্ধকারে হেমন্তের অবিরল পাতার মতন
কোথাও নদীর পানে উড়ে যেতে চায়,
অথবা মাটির দিকে-পৃথিবীর কোনো পুনঃপ্রবাহের বীজের ভিতরে
মিশে গিয়ে। পৃথিবীতে ঢের জন্ম নষ্ট হ'য়ে গেছে জেনে, তবু
আবার সূর্যের গন্ধে ফিরে এসে ধুলো ঘাস কুসুমের অমৃতত্বে কবে
পরিচিত জল, আলো, আধো অধিকারিণীকে অধিকার ক'রে
নিতে হবে:
ভেবে অন্ধকারে লীন হ'য়ে যায়।'
গলা কাঁপছে লোকটার। অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না। তবু তার কন্ঠস্বরের বেদনার বাষ্প ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। ঢোক গেলে লোকটা। একটু চুপ করে থাকে। তারপর কম্পিত মন্দ্র কণ্ঠে ধীর লয়ে আবার ধরে,
'লীন হ'য়ে গেলে তারা তো—মৃত।
মৃতেরা এ পৃথিবীতে ফেরে না কখনো।
মৃতেরা কোথাও নেই; আছে?
কোনো-কোনো অঘ্রানের পথে পায়চারি করা শান্ত মানুষের
হৃদয়ের পথে ছাড়া...'
আর পারে না। গলা বুজে আসে লোকটার। অনেকগুলো মুহূর্ত কেটে যায় নৈঃশব্দ্যের মধ্য দিয়ে। তারপর অন্ধকারে ডুবে হা হা করে অট্টহাসি হেসে ওঠে লোকটা, যার নাম হয়তো রাঘব সামন্ত, অথবা...
প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেই কিছু এমন কর্মী থাকেন, যারা দলের কাছে বোঝাস্বরূপ। এক সময় হয়তো তাঁরা দলের কাজে এসেছেন, নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। তার পর থেকে স্রেফ দলবদলের খেলা খেলে সিঁড়ি ভেঙে চলেছেন। একটা সময়ের পর কী রুলিং, কী অপোজিশন সব দলই বুঝে যায়, এই ধরনের লোকেরা কারও আপন হয় না। দলের ওপরমহল তাঁদের এড়িয়ে চলতে শুরু করে। এঁদের রাজনৈতিক উচ্চাশা কম। সেই কারণে নিজের কেন্দ্রে সিংহাসনটুকু ধরে রাখতে পারলেই খুশি থাকেন। আর সেটা পেরেও যান, কারণ বহুদিন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাদে নিজের এলাকার নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে এঁদের আধিপত্য হয় অপরিসীম। আর ঠিক সেই কারণেই চাইলেও এঁদের ঝেড়ে ফেলা যায় না, কোনো দলই পারে না।
সত্যব্রত মল্লিক ঠিক এরকমই একজন নেতা। এর আগের সরকারের সময়কালে অল্প সময়ের জন্য মন্ত্রীও হয়েছিলেন তিনি। তারপর হাওয়া বদলের গন্ধ পেয়েই দল বদলে ফেলেছিলেন। অম্লান চক্রবর্তীর মন্ত্রীসভায় তিনি না থাকলেও তাঁর নিজের এলাকায় তিনি প্রবল জনপ্রিয়। রাজনীতিতে তিনি যে দারুণ দক্ষ তেমন নয়। তবে ভদ্রলোকের প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা অসাধারণ। অল্পবয়সে স্ত্রী-বিয়োগের পর আর সংসার করেননি। ক্ষমতার রশি হাতে নিয়ে নিজের সাম্রাজ্যে সিংহাসনে বসে আছেন। তাঁর এলাকায় তিনিই শেষ কথা। স্বাভাবিক কারণেই তাঁর সমর্থন ছাড়া নবদিগন্ত সেবাশ্রম তৈরি সম্ভব ছিল না। নবদিগন্তের প্রাথমিক কমিটির ছয়জনের মধ্যে তাই সত্যব্রত মল্লিক ছিলেন অন্যতম মুখ।
ফোনে সত্যব্রত মল্লিকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েই এসেছিলাম আমরা। বড়ো রাস্তার ওপরেই এমএলএ সাহেবের মর্মর প্রাসাদ, দুই মানুষ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ভেতরে বিস্তীর্ণ লনে সার সার বেঞ্চ পাতা। সম্ভবত এখানে এমএলএ সাহায্যপ্রার্থী ও দর্শনাভিলাষীদের দর্শন দেন। এখন এই সকাল ন-টাতেও এখানে বেশ কিছু লোকজন রয়েছে দেখা গেল। এছাড়া নিচুতলার পার্টিকর্মীরাও আসা-যাওয়া করছে অনবরতই।
চারিদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে আমি টাপুরদিকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাম, 'ইনি তো টাকার পাহাড়ে বসে আছেন বলে মনে হচ্ছে। তা এঁর সোর্স অব ইনকামটা কী?'
টাপুরদি গলা নামিয়ে বলল, 'চেপে যা। এমএলএ-মন্ত্রীদের সোর্স অব ইনকাম জিজ্ঞাসা করতে নেই।'
আমি বললাম, 'সে না হয় চেপে গেলাম। কিন্তু সেটা অরগ্যান বেচার টাকা নয় তো?'
অমিয় চক্রবর্তী মার্ডার কেসে সনাতন বিশ্বাসের সঙ্গে সেই এক রাতের সাক্ষাৎকারের স্মৃতি আমার মনে দগদগে ঘায়ের মতো জেগে আছে। তাই এই নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করার কথা হলেই হৃদকম্প উপস্থিত হয়। কে জানে এখানে আবার কী অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করে আছে!
সত্যব্রত মল্লিক আমাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করালেন না। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই যিনি ঘরে ঢুকলেন তাঁকে টিভির পর্দায় অনেকবার দেখেছি। টিভিতে তাঁকে যতটা দীর্ঘদেহী মনে হয়, বাস্তবে তার চেয়েও লম্বা ভদ্রলোক। টিভিতে যেটা বোঝা যায় না সেটা হল তাঁর চোখের দৃষ্টি। সেই দৃষ্টিতে সাবধানতা, চাতুরী, কপটতা, সন্দেহ সব মিলেমিশে আছে। এমএলএ সাহেবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মনে হল, ভদ্রলোক ভেতরে ভেতরে কোনো কারণে অস্থির হয়ে আছেন।
আমাদের সামনে এসে কোনো ভূমিকা না করেই বললেন, 'ব্যাপারটা কী বলুন তো, আমার কাছে ওপরমহল থেকে ফোন এসেছিল আপনাদের কো-অপারেট করার জন্য। আপনারা কি পুলিশ, না আইবি, না কি সিবিআই?'
টাপুরদি হাত জোড় করে নমস্কার করল। তারপর হেসে বলল, 'এর কোনোটাই নই। আমি খুব সামান্য একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। নবদিগন্ত সেবাশ্রমের ব্যাপারে একটু খোঁজখবর করছি আর কী!'
'ডিটেকটিভ?' ভুরু কুঁচকে বললেন সত্যব্রতবাবু, 'আমার কাছে ডিটেকটিভের কী প্রয়োজন? আর নবদিগন্তের ব্যাপারেই বা নতুন করে কী জানার আছে?' কথাটা বলে নিজেই হা হা করে হাসলেন ভদ্রলোক। তারপর বললেন, 'দেখুন ম্যাডাম। সত্যব্রত মল্লিক হল বইয়ের খোলা পাতার মতো। এই জায়গা থেকে টানা ছ'বার ভোটে লড়ে জিতেছি। এখানকার লোক আমাকে ইন অ্যান্ড আউট চেনে, জানে। যে কাউকে ধরে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেই আপনার সব উত্তর পেয়ে যাবেন। সত্যব্রত মল্লিকের কাছে আপনাকে সাহায্যের জন্য কোনো সিক্রেট নেই।'
টাপুরদি হাসল। বলল, 'কিছু কথা অবশ্যই আছে, যা সকলে জানে না। এরকম কিছু কথা সকলের থাকে। আমি অবশ্য সেইসব খবরে আগ্রহী নই। আপাতত নবদিগন্ত সম্পর্কে জানতে পারলেই আমার চলবে।'
সত্যব্রত মল্লিক এবার গম্ভীর মুখে বললেন, 'বলুন, কী জানতে চান!'
টাপুরদি বলল, 'আপনি তো নব দিগন্ত সেবাশ্রমের ট্রাস্টি মেম্বারদের মধ্যে একজন।'
সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন সত্যব্রত মল্লিক।
টাপুরদি বলল, 'আপনি নিশ্চয়ই জানেন নবদিগন্ত থেকে গত দুই বছরে বেশ কিছু ছেলে নিরুদ্দেশ হয়েছে!'
'জানি। শুনেছি। আমি ওদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তো আমাকে বলল, ছেলেগুলো মাদকাসক্ত ছিল। হোমে মানিয়ে নিতে পারছিল না। তাই পালিয়েছে। এরকম তো হয়ই ম্যাডাম। এ নিয়ে এত বেশি জলঘোলা কেন হচ্ছে বুঝতে পারছি না আমি।'
'বা রে!' হেসে বলল টাপুরদি, 'আপনি হোমের ফাউন্ডার মেম্বার। এখন 'এরকম তো হয়ই' বলে দায় ঝেড়ে ফেললে চলবে কেন?'
সত্যব্রত মল্লিক বললেন, 'দেখুন এই হোমটা কিন্তু আগে থেকেই ছিল। যখন নবদিগন্ত এটা টেক ওভার করল, তখন শেখর মজুমদার আমার কাছে ট্রাস্টি মেম্বার হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল।'
'কেন, আপনার কাছে কেন?'
মুচকি হাসলেন সত্যব্রত মল্লিক। বললেন, 'এই চত্বরে আমার পারমিশন ছাড়া কেউ কিছু করে না ম্যাডাম। তা বলে কিন্তু ভাববেন না আমি কাউকে বাধা দিই, বা ভয় দেখিয়ে রাখি। আসলে কী জানেন তো, এই এলাকার মানুষেরা আমাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। আমি মানা করলেও শোনে না। বলে, 'আপনি হলেন আমাদের গার্জেন। আপনার অনুমতি ছাড়া আমরা কিছু করতে পারি?' ভাবুন তো, আমি তো বলি, 'ওরে, আমি হলাম নেতা, তোদের সেবক। তা ওরা বলে, 'আপনি বাপ-মা। আপনি মাথার উপর আছেন, তাই আমরাও নিশ্চিন্তে আছি।' আমি কখনো কাউকে বলিনি আমার অনুমতি না নিলে কাজ করতে দেব না। কিন্তু একটা বড়ো কাজ করা তো আর চাড্ডিখানি ব্যাপার নয়, তাই না? কত দিকে কত ঝামেলা হয়। কাজ মাঝপথে আটকে যায়। আমার কেন্দ্রে কিন্তু তেমন হয় না। আমি যার মাথায় হাত রাখব, আমার দলের ছেলেরা নিজেদের কাজ মনে করে তার কাজ উতরে দেবে।'
'আচ্ছা, সে না হয় বুঝলাম', বলল টাপুরদি, 'কিন্তু নব দিগন্তের কোর কমিটিতে আপনাকে রাখার লজিকটা এখনও পরিষ্কার হল না।'
নেতামশাই বললেন, 'তাহলে শুনুন। শেখর মজুমদার আমার পারমিশন নিতে এসেছিলেন। তিনি নিজে থেকেই বললেন, 'এই এলাকায় একটা ভালো উদ্যোগ শুরু হতে যাচ্ছে। আপনি তো জনসেবক। আপনি সঙ্গে থাকলে মানুষ ভরসা পাবে।' আমিও ভাবলাম, প্রস্তাবটা মন্দ নয়। আমাকে কিছু করতে হচ্ছে না। শুধু নামটা থাকবে। তাতে আমার ইমেজও ভালো হবে। একটা সামাজিক কাজ বলে কথা! তাই রাজি হয়ে গেলাম।'
'হুম।' মাথা নেড়ে বলল টাপুরদি, 'আচ্ছা অন্য একটা কথা জানতে চাইছি। নব দিগন্তে মোট ছয়জন ফাউন্ডার মেম্বার ছিলেন। সকলকে আপনি চেনেন?'
দুই দিকে মাথা নাড়লেন সত্যব্রত মল্লিক। বললেন, 'নাহ শেখর আমার বাড়িতে উকিল নিয়ে এসে আমাকে দিয়ে কাগজপত্রে সই করিয়ে নিয়ে গেছিল।'
'কাউকে চেনেন না?' বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
সত্যব্রত মল্লিক বললেন, 'শেখরের বউকে চিনি। নবদিগন্ত তৈরির সময় কিছু জটিলতা মেটাতে হেল্প করেছিলাম আমি। তাই আমাকে ওদের বাড়িতে নেমন্তন্ন করেছিল। সেদিন ওখানে কমিটির আরও তিন-জন ছিল।'
'কে?'
'একজন তো শেখর মজুমদারের শালা, দিল্লিতে থাকে। আর একজনকে চিনতাম না আমি। হোমে আগে যারা মালিক ছিলেন, তাদেরই বন্ধু-টন্ধু হয় লোকটা। নামটা মনে নেই। পরে শুনেছি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে।' বললেন সত্যব্রতবাবু।
'শোভন সেন?'
'হ্যাঁ হ্যাঁ, শোভন সেন নাম ছিল।'
'শোভনবাবুর সম্পর্কে আর কিছু জানেন আপনি?' জানতে চাইল টাপুরদি।
'নাহ, আর দেখা হয়নি কখনো।'
'আচ্ছা, আরেকজন কে?'
সত্যব্রতবাবু মুচকি হেসে বললেন, 'ডাক্তার। মানে দেবাশিস মিত্র। চেনেন নিশ্চয়ই?'
মাথা নাড়ল টাপুরদি।
'চিনি। আচ্ছা, ভালো কথা! আপনি রাঘব সামন্তকে চেনেন তো?'
'রাঘব সামন্ত? সে আবার কে?' খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন সত্যব্রত মল্লিক।
'কে কী?' বলল টাপুরদি, 'নব দিগন্তের ফাউন্ডার ট্রাস্টি মেম্বার হয়ে কমিটির আরেকজন মেম্বারের নামই জানেন না?'
'রাঘব সামন্ত? বাপের জন্মে অমন নাম শুনিনি। ধুর, ও নামে ট্রাস্টি বোর্ডে কেউ কোনোদিন ছিল না। আমরা কজনই তো ছিলাম বলে জানি।'
টাপুরদি ভুরু কুঁচকে বলল, 'তা কী করে হয়? কাগজপত্রে নাম তো আছে।'
'কাগজপত্র আছে? তাহলে তো হয়েই গেল। অসুবিধা কোথায়? তবে আমি জানতাম না আর কেউ ছিল', বললেন এমএলএ মশাই।
টাপুরদি বলল, 'না, শুধু নামটাই পাওয়া গেছে। রাঘব সামন্তর কোনও কাগজপত্র পাওয়া যায়নি।'
সত্যব্রত মল্লিক এবার খিক খিক করে হাসলেন। বললেন, 'আপনাদের গোয়েন্দা কে বানিয়েছে মাইরি! এটুকুও জানেন না, এরকম কমিটিতে আইন বাঁচিয়ে ফ্যান্টম আইডেন্টিটি ক্রিয়েট করা হয়?'
'মানে?' টাপুরদি ভীষণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
''মানেটা খুব সোজা। এরকম কমিটিতে যাদের যাদের নাম থাকে, তারা অনেকেই বাস্তবে এক্সিস্টই করে না হে গোয়েন্দা ম্যাডাম! যদিও আমি জানি না যে এটাও সেরকমই কেউ কি না! আমি এই নামটা আগে অন্তত শুনিনি, চেনা তো অনেক দূরের কথা!'
'সেটা কী করে সম্ভব?'
'তা আমি কীভাবে বলব? শেখরের বউকে জিজ্ঞাসা করুন, ওর আশিককে জিজ্ঞাসা করুন।' মুচকি হেসে বললেন সত্যব্রত মল্লিক।
'শিউলি দেবীর আশিক! সে আবার কে?'
হো হো করে হাসলে সত্যব্রত মল্লিক। বললেন, 'আপনার দ্বারা হবে না। এটুকু খবর না নিয়ে আপনি টিকটিকিগিরি করতে নেমেছেন? দুর মশাই! বলছি শুনুন। আমার কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে লাভ হবে না। ডাক্তারবাবুর কাছে যান। খবর নিন শেখর মজুমদার কেমন করে মরল!'
'মানে আপনি বলতে চাইছেন, ডক্টর দেবাশিস মিত্র শিউলি দেবীর প্রেমিক? তিনিই শেখর মজুমদারকে মেরেছেন?' টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।
'যাত্তারা! এ আবার কখন বললাম আমি? বলেছি নাকি? বয়স হচ্ছে তো, কখন কী বলি, মনে-টনে থাকে না। আপনি বরং এখন আসুন। আমাকে এখন এলাকার লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে। সবার যত অভাব-অভিযোগ, সব তো আমারই কাছে। ওদের কথা আমি ছাড়া তো আর কেউ ভাবে না, তাই ওদের কাছে আমি ভগবান, বুঝলেন কি না?' কথাটা বলে উঠে দাঁড়ালেন এমএলএসাহেব। ইঙ্গিত স্পষ্ট। আর আমাদের সঙ্গে তিনি কথা বলবেন না। অগত্যা আমরাও উঠলাম। টাপুরদি মিষ্টি করে হেসে বলল, 'অনেক ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য। দরকার পড়লে আবার জ্বালাতে আসব কিন্তু!'
বেরিয়ে আসার সময় দেখলাম লনের সেই বসার জায়গায় ইতোমধ্যে অনেক দর্শনার্থী জমে গেছে। আমাদের সঙ্গে সত্যব্রতবাবু বাইরে বেরোতেই সকলে হাত জোড় করে উঠে দাঁড়াল। বুঝলাম, নিজের দেবত্ব নিয়ে সত্যব্রতবাবু অত্যুক্তি করেননি।
গাড়িতে উঠে জিজ্ঞাসা করলাম, 'কী মনে হল টাপুরদি?'
টাপুরদি আমার কথার উত্তর না দিয়ে বলল, 'গাড়িটা তুই ড্রাইভ কর তো মিতুল। ভাবার জন্য আমার একটু সময় প্রয়োজন।'
।। আটাশ।।
লালবাজারের প্রাচীন পুলিশ হেড কোয়ার্টার বিল্ডিংটি কত স্মৃতি, কত কাহিনি বুকে করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় আড়াই শতক ধরে। কত ইতিহাসের জন্ম হয়েছে এখানে। কলকাতা তথা সারা বাংলার সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এখান থেকে। সামাজিক, রাজনৈতিক কত পালাবদল প্রত্যক্ষ করেও আজও এই অট্টালিকা স্থিতধী বৃদ্ধের মতো দাঁড়িয়ে আছে অগাধ নির্লিপ্তি নিয়ে। কত গুরুতর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এই জায়গায়, রূপ দেওয়া হয়েছে কত গোপন রুদ্ধদ্বার পরিকল্পনাকে, যা বঙ্গ রাজনীতির অভিমুখ নিয়ন্ত্রণ করেছে একাধিকবার।
আজও এই সুবিশাল অট্টালিকার কোনো এক কক্ষে চলছিল এমনই এক গোপন আলোচনা। সেই আলোচনার বিষয়বস্তু এতটাই গোপন যাতে করে ঘরের দেওয়ালগুলিকেই বুঝি সন্দেহ হয়। ঘরের ভেতর যে গুটিকয় মানুষ রয়েছেন তাঁরা মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিয়েই এ-ঘরে ঢুকেছেন। ভেতরের কথা বাইরের কাকপক্ষীতে জানবে না।
কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার অনন্তবিজয় সেনশর্মা বললেন, 'তদন্তটা যেন ডেডলক হয়ে গেছে। এভাবে চললে আমরা এগোতে পারব না।'
সৌরভ সান্যাল বললেন, 'স্যার, গত সপ্তাহে আমরা নবদিগন্তে রেইড করেছি। ওদের কম্পিউটার, খাতাপত্র সব তুলে এলেছি। আমাদের সাইবার সেলের ছেলেরা রাতদিন খাটছে...'
সৌরভবাবুকে থামিয়ে দিয়ে জয়েন্ট কমিশনার বললেন, 'আপনাদের কি মনে হয় না যে সেটা যথেষ্ট নয়? কলকাতা ও তার আশেপাশের অঞ্চল জুড়ে এরকম অনেক হোম আছে। হাওড়া, লিলুয়া, কলকাতার শহরতলিতে হোমগুলিতে অনেক রকম অবৈধ কাজকর্ম হয় আমরা সকলেই জানি। একটা হোমে তালা লাগালে পরদিন আর একটা গজিয়ে ওঠে। নর্থ বেঙ্গলেও বছর দু-এক আগে হোম থেকে শিশু পাচারের অভিযোগ ছিল। খবর নিলে দেখতে পাবেন এই হোমগুলির প্রতিটির ওপর রুলিং বা অপোজিশনের কোনও না কোনও নেতা-মন্ত্রীদের আশীর্বাদ রয়েছে, যাদের দয়ায় এরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এদের অ্যারেস্ট করতে গেলে ওপর থেকে ফোন এসে যায়। টিভিতে নিউজ চ্যানেল চালালেই শিশু পাচার, নারী পাচারের খবর দেখতে হয়। পুলিশের দিকে আঙুল উঠছে। এই রাজ্য দিনে দিনে ট্র্যাফিকিং-এর স্বর্গ হয়ে উঠছে। আর আমরা নিজেদের প্রবোধ দিচ্ছি এই বলে যে আমরা চেষ্টা করছি।'
অনন্তবিজয়বাবুর কথাগুলি তেতো হলেও অসত্য নয়। তবু খারাপ লাগল সৌরভবাবুর। কেসটা এতটাই প্যাঁচালো হয়ে গেছে যে চেষ্টা করেও ভেতরে ঢোকা যাচ্ছে না।
তিনি বললেন, 'স্যার, আপনি পরিস্থিতিটা জানেন। এই চক্রগুলির সঙ্গে অনেক বড়ো মানুষেরা ভেতরে ভেতরে জড়িয়ে আছে। আমাদের সাবধানে এগোতে হচ্ছে। সিস্টেমের মধ্যে থেকে সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়া সহজ নয়। আমরা তবু চেষ্টা করছি। শহরের বিভিন্ন বড়ো হাসপাতাল ও প্রাইভেট নার্সিং হোমে নিজেদের সোর্স সেট করা আছে। নবদিগন্তের আশেপাশেও সাদা পোশাকের পুলিশ রয়েছে। ওখানে কারা ঢুকছে, কারা বেরোচ্ছে সব নজরে রাখা হচ্ছে।'
অনন্তবিজয়বাবু অস্থিরভাবে হাত নেড়ে বললেন, 'হবে না, ওভাবে হবে না। ইট ইজ নট এনাফ। শুধু নবদিগন্ত নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। এই চক্রের কিং পিন কে বা কারা, আমাদের খুঁজে বের করতেই হবে। চিফ মিনিস্টার দিল্লি গেছেন। আগামী সপ্তাহে ফিরে এসেই রিপোর্ট চাইবেন। আমি কী বলব তাঁকে? আমরা এখনও একই জায়গায় গোল গোল ঘুরছি, তাই বলব? সেই চেষ্টার দাম কী সৌরভ, যদি তাতে কোনো ফলই না পাওয়া যায়? প্রেস, মিডিয়া আমাদের উঠতে-বসতে ধুয়ে দিচ্ছে। উই ওয়ান্ট রেজাল্ট, রাইট? উই ওয়ান্ট সামথিং বিগ টু শাট দেয়ার মাউথ।'
এতক্ষণ অর্জুন চুপ করে ছিল। এবার বলল, 'স্যার, আমি একটা কথা বলতে চাই।'
অনন্তবিজয়বাবু তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'বলো।'
অর্জুন বলল, 'স্যার, আমরা টোলগুলোতে অ্যালার্ট করেছি। প্রতিটা ট্রাক চেক করা হচ্ছে। এর ফলে হাইওয়েতে রাতের বেলায় যানজট তৈরি হচ্ছে, ট্র্যাফিক স্লো হয়ে বিশাল লম্বা লাইন পড়ছে। এভাবে বেশি দিন চলবে না। এদিকে কোনো হসপিটাল থেকেও সেরকম প্রয়োজনীয় তথ্য এখনও পাইনি আমরা। মানে আমাদের সোর্সরা এখনও আমাদের কোনো খবর দিতে পারেনি। আমার ধারণা, এবার আমাদের একটু শক্ত হাতে হাল ধরা উচিত।'
'কেমন? কী বলতে চাইছ খুলে বলো।' বললেন জয়েন্ট কমিশনার।
অর্জুন বলল, 'শহরের ছোটো-বড়ো হাসপাতালগুলোতে র্যানডম রেইড, ডাক্তারদের, বিশেষ করে সার্জেনদের ইতিহাস-ভূগোল ঘেঁটে দেখা, সর্বোপরি নেতা-মন্ত্রীদের মধ্য থেকে যাদের নামে এর আগে কোনোরকম অভিযোগ এসেছে কিংবা এই ধরনের ব্যাপারে সন্দেহের আঙুল উঠেছে সকলের পেছনে লোক লাগানো। একটা আলোড়ন তৈরি করতে পারলে কিছুটা সময় পেয়ে যাব। আর প্রেস-মিডিয়ারও মুখ বন্ধ হয়ে যাবে আপাতত।'
'রাবিশ!' খুব বিরক্ত মুখে বললেন অনন্তবিজয়বাবু, 'তোমার প্ল্যানে কোনো সারবত্তা নেই অফিসার। তুমি যাদের কথা বলছ, তারা কোনো আন্ডারওয়ার্ড ডন নন। শহরের রেসপেক্টেবল চিকিৎসক, নেতা-মন্ত্রী। তোমার কথা মতো সিস্টেমের সব রাঘব-বোয়ালদের পেছনে একসঙ্গে লাগলে তাঁরা আমাদের ছেড়ে দেবে? আমাদের জবাব দিতে হবে না?'
অর্জুন বলল, 'কতদিন স্যার? আমরা সকলেই জানি যাদের হাতে রাজ্যের রাশ, তারা বেশিরভাগই ধোয়া তুলসীপাতা নয়। আমাদের সংবিধান অনুসারে কারও এগেন্সটে একাধিক কেস থাকলেও তার ভোটে দাঁড়াতে বাধা নেই। যারা ভোটে জিতে এমএলএ, এমপি, মন্ত্রী হচ্ছেন বেশিরভাগের এগেন্সটে গুচ্ছের কেস ঝুলছে। সব মোটেও রাজনৈতিক কেস নয়, ক্রিমিনাল কেসও আছে। তবু তাদের ওপর সন্দেহের বশে অ্যাকশন নেওয়া যাবে না। কারণ তারা জন-প্রতিনিধি। আবার উলটো দিকে মানুষ পুলিশের দিকে আঙুল তুলবে। কেন আমরা একটা মাস মুভমেন্ট করতে পারি না, ঠিক যেভাবে মুম্বাই পুলিশ নয়ের দশকে মুম্বাই থেকে আন্ডার ওয়ার্ল্ডকে ঝেড়ে সাফ করে দিয়েছিল? পুলিশে চাকরি নিয়েছি সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। সব ক্ষেত্রে ওপরমহলে জবাবদিহির জুজু দেখিয়ে পুলিশের হাত বেঁধে দিলে কাজ করব কী করে আমরা?'
কথা বলতে বলতে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল অর্জুন। অনন্তবিজয়বাবু তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। তারপর সৌরভবাবুর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন। সৌরভবাবুর গোঁফের নীচে মৃদু হাসির রেখা দেখা গেল। তিনি বললেন, 'অর্জুন, তুমি বোধহয় জানো না স্যার নিজেও সেই সময়ে মুম্বাই পুলিশে কর্মরত ছিলেন। তাঁরও তখন তোমার মতোই বয়স ছিল, এরকমই গরম রক্ত ছিল। মুম্বাইকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাবমুক্ত করার লড়াইয়ে তিনিও সৈনিক ছিলেন।'
অনন্তবিজয়বাবু এবার নরম কণ্ঠে বললেন, 'তোমার কথায় ভুল নেই অফিসার। কিন্তু সেই সময়ে আমরা জানতাম লড়াইটা কার বা কাদের বিরুদ্ধে, প্রতিপক্ষের মুখগুলো কারা। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা এখনও অন্ধকারে। সিস্টেমের সবাই তো খারাপ নয়। তুমি নিজেও এই সিস্টেমেরই অংশ। সুতরাং আমাদের এই কেসের আরও ভেতরে ঢুকতে হবে। বৃত্তটাকে ছোটো করে আনতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে এই ব্যাপারটা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত। রাজ্যের সমস্ত মেডিকেল কলেজগুলিকে অ্যালার্ট করা আছে এরকম কোনো পেশেন্ট, যার বা যাদের বাইরে প্রাইভেটে কোথাও অরগ্যান ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারি হয়েছে, তাদের থেকে লিগাল ট্রান্সপ্লান্টের সমস্ত রিপোর্ট কলেক্ট করতে হবে। কিংবা যাদের শরীরের কোনো অরগ্যান মিসিং এরকম পেশেন্ট পেলে পুলিশ ও হেলথ মিনিস্ট্রিকে ইমিডিয়েটলি ইনফর্ম করতে হবে। এই পুরো ব্যাপারটা হেলথ সেক্রেটারি অদ্বৈত মুখার্জি নিজে পরিচালনা করছেন। পুলিশকেও আরও বেশি প্রো-অ্যাকটিভ হতে হবে। তবে সেটা করতে হবে সিস্টেমকে যথাসম্ভব অবিচলিত রেখে। উই ক্যান'ট অ্যাফোর্ড টু ক্রিয়েট এনি আনরেস্ট ইন দ্য সিস্টেম অ্যাট দিস মোমেন্ট, বয়! হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড।'
অর্জুন বিমর্ষমুখে মাথা নাড়ল।
সৌরভবাবু এবার বললেন, 'আমরা এখন আমাদের কাজ চালিয়ে যাব। এই বিজনেসের কতগুলি চক্র এই মুহূর্তে কলকাতায় সক্রিয় আছে জানি না আমরা। সারা রাজ্যের ব্যাপারে মাথা ঘামানোর পরিস্থিতি নয় এখন। আপাতত কলকাতার ঘটনাগুলো আমাদের আর একটু খতিয়ে দেখতে হবে। সেই বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করছি। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের পরবর্তী কর্মসূচির ব্যাপারে। এ-বিষয়ে তোমাদের কারও কিছু বক্তব্য আছে?' কথাগুলো বলে নিজের টিমের দিকে তাকালেন ডিসিডিডি।
অর্জুন বলল, 'আমরা সন্দেহভাজন ক্ষমতাশালী লোকেদের একটা লিস্ট তৈরি করে তাদের ওপর নজর রাখতে পারি।'
শুভম বলল, 'তাদের ফোন, মেল হ্যাক করা যায়।'
'না না', বলে উঠলেন সৌরভবাবু, ''এটা করা যাবে না শুভম। পুলিশ এভাবে ইললিগ্যালি এসব করতে পারে না।'
অর্জুন আবার বলল, 'আরেকটা কথা স্যার। ডাক্তারদের নিজস্ব ইউনিয়ন আছে। সেই ইউনিয়নের লিডার অখিল মিদ্যা নিজে একজন এমবিবিএস ডাক্তার, যদিও প্র্যাকটিস করেন না। তিনি রুলিং পার্টির এমএলএও। মেডিকেল কলেজগুলির ভেতর দালাল চক্র নিয়ে এমনিতেই পুলিশ জেরবার। কলেজ হাসপাতালগুলির ভেতর নানান অবৈধ চক্র দিনে দিনে সক্রিয় হয়ে উঠছে। তার ওপর আবার এইসব রাজনীতিকদের অত্যাচার। আমার ধারণা যারা অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর সঙ্গে জড়িত, তারা কোনোভাবে মেডিকেল কলেজগুলির ডেটাবেসের অ্যাক্সেস পেয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে পোটেনশিয়াল অরগ্যান বায়ারদের এই চক্রের ক্লায়েন্ট হসপিটালগুলির কাছে পাঠাচ্ছে দালালরা। প্রিয়জনের জীবন বাঁচানোর জন্য শেষ কপর্দক দিয়েও ইললিগ্যালি অর্গান কিনছে এই মানুষগুলো। ফলে এই ব্যাবসাও ফুলে ফেঁপে উঠছে।
'স্যার, মেডিকেল কলেজগুলির ভেতরের কর্মীরা জড়িত না থাকলে এ অসম্ভব। কিন্তু মেডিকেল কলেজে ঢুকে তদন্ত করতে গেলে অখিল মিদ্যার দলের ছেলেরা ঝামেলা বাধায়। এঁর নামে অনেক অভিযোগ আছে, একাধিক কেসও চলছে। এঁর ওপর নজর রাখার জন্য আমি একজন সোর্সকে লাগিয়ে রেখেছি। দেখা যাক, কিছু পাওয়া যায় কি না।'
অনন্তবিজয়বাবু চিন্তিত মুখে মাথা নাড়লেন। বললেন, 'সাবধান অফিসার। এসব খুব গোপনে চালাতে হবে। কোনোভাবে আমাদের সন্দেহের কথা বাইরে লিক হয়ে গেলে পার্টির লোকেরা ইন্টেনশনালি এমন অশান্তি তৈরি করবে, যাতে করে তদন্ত করাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। আর শুধু রুলিং পার্টি বলে নয়, রুলিং, অপোজিশন সব দলেরই কিছু কিছু অসৎ ব্যক্তি এই ব্যাবসার সঙ্গে যুক্ত। যা হলে এত বছর ধরে এত স্মুদলি ব্যাবসা চালাতে পারত না। সব দলই এই ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটে আছে। চোখের সামনে সব দেখেও কেউ এ নিয়ে টুঁ শব্দ করছে না। কারণ, সকলের কাছেই লভ্যাংশের ভাগ পৌঁছোচ্ছে। যাই হোক, এভাবে খড়ের গাদায় সূচ খুঁজতে হলে ঠক বাঁছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া দরকার এই চক্রের কিং পিনকে ধরা। ফোকাসটা ঠিক রেখে সে দিকে এগোতে হবে। যাই হোক, আর কিছু থ্রেড পেয়েছ?'
অর্জুন বলল, 'হোমের ল্যান্ডলাইনে হলদিয়া থেকে বেশ কিছু ফোন এসেছে। আমরা কোনো সূত্রই ছাড়তে রাজি নই। ওখানে আমাদের সোর্স অ্যালার্ট করা আছে। সন্দেহজনক কিছু দেখলে আমাদের জানাবে।'
'এভাবে হবে না রে মিতুল!' বলল টাপুরদি, 'আমার ধারণাই ঠিক। সকলে শেখানো বুলি আওড়াচ্ছে। নইলে এটা কীভাবে সম্ভব যে ছয়জনের কমিটি থেকে একজনকে বাকি পাঁচজন চেনে না?'
'বাকিরা কেউ চেনে না কী করে বুঝলে? মনে আছে, আমরা যখন ডক্টর মিত্রর চেম্বারে গেছিলাম, তিনি কিন্তু একবারও বলেননি যে তিনি রাঘব সামন্তকে চেনেন না। বরং তুমি যখন তাঁকে জানিয়েছিলেন যে রেজিস্ট্রেশন ডকুমেন্ট থেকে রাঘব সামন্তের নথি মিসিং, শুনে তিনি খুব অবাক হয়েছিলেন।'
'তখন তিনি আমাকে সিরিয়াসলি নেননি। কিন্তু এতদিনে তিনি জেনে গেছেন যে আমি সরকারি তরফে নবদিগন্ত কেসের তদন্ত করছি। সুতরাং এখন তিনি কতটা মুখ খুলবেন সে-বিষয়ে সন্দেহ আছে আমার।' বলল টাপুরদি।
'তাহলে কী করবে এখন?'
'আবার কথা বলব। এবার আর কোনো রাখঢাকের প্রয়োজন নেই। সোজাসুজিই যা বলার বলব। দাঁড়া, আগে ফোন করি', বলে ফোন থেকে ডক্টরের নম্বরটা খুঁজে বের করল টাপুরদি। বার দুয়েক রিং করার পর ওদিক থেকে কেউ ফোন রিসিভ করল। আমি এখানে বসে শুনতে পাচ্ছি, বেশ উত্তপ্ত কথাবার্তা, তর্ক চলছে। মিনিট পাঁচেক কথার পরে ফোনটা রেখে টাপুরদি সোফায় এসে বসল।
'কী হল?' জিজ্ঞাসা করলাম।
'ডক্টর মিত্র কথা বলবেন না', টাপুরদি বলল।
'মানে?'
'একজন ভদ্রমহিলা ফোন ধরেছিলেন। তিনি বললেন, ডক্টর মিত্র অসুস্থ। তিনি কারও সঙ্গে কথা বলবেন না। আমি বললাম, বেশি সময় নেব না। জাস্ট পাঁচ মিনিট সময় দিলেই হবে। ভদ্রমহিলা মুখের ওপর মানা করে দিলেন। বললেন, আর ফোন করে তাঁকে বিরক্ত না করতে', বলল টাপুরদি।
'এ কী অভদ্রতা!'
'অভদ্রতা নয় রে মিতুল!' চিন্তিত মুখে টাপুরদি বলল, 'ভদ্রমহিলাকে কেমন যেন টেনসড লাগছিল। ডক্টর মিত্রর কোনো বিপদ হল না তো?'
'বিপদ?' খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আমি, 'তোমার একথা কেন মনে হল যে ডক্টর মিত্রর কোনো বিপদ হতে পারে?'
টাপুরদি বলল, 'ভেবে দেখ, ধরে নিলাম, নবদিগন্তে ইললিগ্যাল কিছু চলছে। হোমের ফাউন্ডার মেম্বার ছয়জন। এদের মধ্যে একজন মারা গেছে রোড অ্যাক্সিডেন্টে। স্বাভাবিক মৃত্যু নয় কিন্তু। রইল বাকি পাঁচ। শিউলি মজুমদার আর সত্যব্রত মল্লিক বললেন তাঁরা রাঘব সামন্তকে চেনেন না। সত্যব্রত মল্লিক তো এও বলছেন আদতে রাঘব সামন্ত বলে কেউই নেই। বাকি রইল সাগর দাশগুপ্ত। তিনি দিল্লিতে থাকেন। ফার্মা কোম্পানির মালিক। ভদ্রলোকের সততা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে। তিনি রাঘব সামন্তকে চেনেন কি না আমরা জানি না এখনও। কিন্তু শিউলি দেবীর মতে সাগর দাশগুপ্ত হোমের কোনো ব্যাপারে নেই। তাহলে বাকি রইলেন ডক্টর মিত্র। সেদিন রাঘব সামন্তের নামের উল্লেখে তিনি চমকে উঠেছিলেন। তাই ধরে নিতে পারি তিনি রাঘব সামন্তকে চেনেন। রাঘব সামন্ত যদি কিং পিন হন, তাহলে ডক্টর মিত্রর সূত্র ধরে তাঁর কাছে পৌঁছোনো সম্ভব। ঠিক কি না?'
মাথা নাড়লাম আমি।
'সেদিন আমরা যখন ডক্টর মিত্রর চেম্বারে গেছিলাম, একজন লোক আমাদের আগে ভেতরে ঢুকেছিল, তোর নিশ্চয়ই মনে আছে?'
'হ্যাঁ, আছে।' বললাম আমি।
'লোকটা ডক্টর মিত্রকে রীতিমতো ধমকধামক দিচ্ছিল। আমার এখন মনে হচ্ছে, কোনো কারণে ডক্টর মিত্রের সঙ্গে দলের দূরত্ব তৈরি হয়েছে, বা তিনি ভয় পেয়ে সরে আসতে চাইছেন। সেই কারণেই এখন যখন পুলিশ-প্রশাসন একসঙ্গে এই চক্র ভাঙার চেষ্টা করছে, রাঘব সামন্ত চেষ্টা করবে ডক্টর মিত্রকে সরিয়ে দিতে, তাই না?' টাপুরদি বলল।
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম আমি। বললাম, 'তাহলে কী করবে?'
টাপুরদি একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, 'চল দেখি, একবার চেষ্টা করে দেখা যাক!'
'কীসের চেষ্টা করবে?' জানতে চাইলাম।
'ডক্টর মিত্রর সঙ্গে দেখা করার', বলল টাপুরদি, 'আমি কোনো বড়ো বিপদের গন্ধ পাচ্ছি।'
দশ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে রাস্তায় নামলাম। টাপুরদি আগেই খবর নিয়ে জেনেছে, ডক্টর মিত্র অসুস্থতার জন্য হেলথলাইন হসপিটালে যাচ্ছেন না গত দু-দিন। তাঁর বাড়ি গলফ গ্রিনে। সেখানে পৌঁছে দেখলাম বাড়ির বড়ো কালো লোহার গেট ভেতর থেকে বন্ধ। বাইরে গেটের পাশে কালো গ্রাফাইট পাথরের স্ল্যাবের ওপর সোনালি রঙে লেখা ডক্টর মিত্রর নাম ও ডিগ্রির লম্বা তালিকা। তার পাশে কলিং বেলের সুইচ বারবার টিপেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া মিলল না। টাপুরদিকে হতাশ দেখাচ্ছে। চলে আসব বলে রাস্তার দিকে পা বাড়াচ্ছি, ভেতর থেকে গেটটা খুলে গেল। একজন মধ্যবয়সি মহিলা গেট খুলে সামান্য মুখ বাড়িয়ে বাইরে উঁকি মারলেন।
'আপনারা?' জিজ্ঞাসা করলেন ভদ্রমহিলা।
'ডক্টর মিত্র আছেন? ওঁর সঙ্গে একটু দেখা করতে এসেছি।' বলল টাপুরদি।
'না। স্যার পেশেন্ট দেখছেন না এখন। পরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসবেন।' রুক্ষ স্বরে বললেন ভদ্রমহিলা।
'আমরা চিকিৎসা করাতে আসিনি। ডক্টর মিত্রর সঙ্গে দেখা করাটা খুব জরুরি। ওঁকে গিয়ে বলুন সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি এসেছে।'
ভদ্রমহিলা এবার কিছুটা শঙ্কিত মুখে বেশ উচ্চস্বরে বললেন, 'বললাম না, দেখা হবে না? আপনিই তো একটু আগে ফোন করেছিলেন, তাই না? না বলে দিলাম, তবুও এসেছেন কেন এখানে? প্লিজ যান এখান থেকে। স্যার অসুস্থ, কারও সঙ্গে দেখা করবেন না তিনি।'
টাপুরদি নীরবে তাকিয়ে রইল ভদ্রমহিলার মুখের দিকে। তারপর বলল, 'বেশ, আসব না। আপনি ওঁকে বলে দেবেন, আমরা ওঁকে সাহায্য করতে এসেছিলাম। আর এটাও বলবেন, রাঘব সামন্তকে আমি খুঁজে বের করবই।'
ভদ্রমহিলার উত্তরের অপেক্ষা না করে টাপুরদি রাস্তার দিকে হাঁটতে লাগল। আমি একবার তাকালাম মহিলার মুখের দিকে। কেমন অসহায় দৃষ্টিতে টাপুরদির দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। একবার আমার দিকে তাকালেন। তারপর গেটটা বন্ধ করে দিলেন।
নীরবে গাড়ি চালাচ্ছে টাপুরদি। মুখটা থমথম করছে।
'এখন কী, টাপুরদি? কী করবে?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি বলল, 'ডক্টর মিত্র যথেষ্ট বিপদে আছেন। তাঁকে বাঁচাতে হবে মিতুল।'
'সে তো বুঝলাম। কিন্তু কীভাবে?'
'এক কাজ কর। আমার পকেট থেকে ফোনটা বের করে সুদর্শনবাবুকে কল কর। ফোন স্পিকারে রাখ।' বলল টাপুরদি।
টাপুরদির কথা মতো কাজ করলাম। কিন্তু ফোন রিং হয়ে যাচ্ছে। কেউ কল রিসিভ করছেন না।
টাপুরদি বলল, 'সুদর্শনবাবু সম্ভবত ব্যস্ত আছেন। তুই সৌরভবাবুর নম্বর ডায়াল কর।'
তাই করলাম।
সৌরভবাবু ফোন ধরলেন। টাপুরদি যতটা সম্ভব সংক্ষেপে জানাল ঘটনাটা। সৌরভবাবু মন দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, 'আপনি কোথায় আছেন সঙ্ঘমিত্রা?'
'গাড়ি ড্রাইভ করছি। রাস্তায় আছি।'
'লালবাজারে চলে আসুন। আমি দেখছি কী করা যায়।' বললেন সৌরভ সান্যাল।
গলফ গ্রিন থেকে লালবাজার পৌঁছোতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লাগল। সোজা সৌরভ সান্যালের কেবিনে গেলাম আমরা। তিনিও আমাদের অপেক্ষাতেই ছিলেন। আমাদের দেখে বললেন, 'আমাদের টিম দেবাশিসবাবুর বাড়িতে পৌঁছে গেছে। অর্জুন ফোনে এইমাত্র জানাল, ভদ্রলোক সত্যিই অসুস্থ। অত্যন্ত বেশি স্ট্রেসে ছিলেন তিনি। তিনি পুলিশ দেখে অদ্ভুতভাবে রিঅ্যাক্ট করছিলেন। মানসিকভাবে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় ছিলেন ভদ্রলোক। ভাগ্যক্রমে হেলথ সেক্রেটারি অদ্বৈত মুখার্জি সেই সময়ে লালবাজারে একটা কাজে এসেছিলেন। তিনিই পরামর্শ দিলেন ভদ্রলোককে মেগাসিটি মেডিকেল কলেজে ট্রমাকেয়ারে ভর্তি করে দিতে। এর ফলে তাঁর চিকিৎসাও হবে। সেখানে তিনি সুরক্ষিতও থাকবেন।'
টাপুরদি একটু ভাবল। তারপর বলল, 'ডক্টর মিত্রর স্ট্রং সিকিওরিটির ব্যবস্থা করবেন, স্যার। প্লিজ, হি ইজ ইন ডেঞ্জার।'
'ডেঞ্জার?' সৌরভবাবু ঝুঁকে বসে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন।
'হ্যাঁ স্যার!' বলল টাপুরদি, 'নবদিগন্ত হোমের ফাউন্ডার মেম্বারদের সঙ্গে আমি কথা বলছি। আমার মনে হয়েছে কিছু কথা এঁরা প্রত্যেকেই গোপন করছেন। দেবাশিসবাবু নবদিগন্তের কমিটিতে ছিলেন। বিনয়কৃষ্ণ ভট্টাচার্যের নামাঙ্কিত হোম তাঁর মধ্যস্থতাতেই নবদিগন্ত এনজিও-র হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ে কমিটিতে যারা ছিলেন, তার মধ্যে একজন হলেন রাঘব সামন্ত, যাঁর সম্পর্কে কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
'আমার ইন্টারোগেশনে নবদিগন্তের অন্যান্য মেম্বাররা জানাচ্ছেন, তাঁরা নাকি জানেনই না এই রাঘব সামন্ত কে? তাদের বক্তব্য নবদিগন্ত এনজিও-র ওনার শিউলি মজুমদারের স্বামী শেখর মজুমদার শুধু চিনতেন তাঁকে। সেই শেখর মজুমদারও এখন মৃত। সাগর দাশগুপ্ত দিল্লিতে থাকেন। আমার ফোন তিনি ধরেননি। তাই আমিও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে উঠতে পারিনি এখনও পর্যন্ত। এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে তাঁরা কেউ রাঘব সামন্তকে চেনেন না বা কোনোদিন দেখেননি। কিন্তু আমার ধারণা দেবাশিসবাবু অবশ্যই জানেন, কে এই রাঘব সামন্ত। সেই কারণেই বলছি তিনি এখন বিপদের মধ্যে আছেন। রাঘব সামন্ত যদি এই চক্রের কিং পিন হন, তাহলে তিনি কখনোই চাইবেন না যে দেবাশিসবাবু বেঁচে থাকুন।'
সৌরভবাবু বিরক্তমুখে বললেন, 'এসব কথা আপনি আমাকে আগে জানাননি কেন?'
টাপুরদিও এবার কঠিন কণ্ঠে বলল, 'আপনি আমায় বলার সুযোগটাই বা দিলেন কোথায়? প্রথম থেকেই পুলিশ চায়নি আমি এই কেসে ইনভলভ হই। যাই হোক, এখন বলছি। প্লিজ, দেবাশিসবাবু এই কেসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। তিনি সুস্থ হয়ে মুখ খুললে আমরা সম্ভবত একটা বড়ো ব্রেক থ্রু পেতে পারি।'
দুঃসংবাদটা রাতের মধ্যেই এসে পৌঁছোল। ডক্টর দেবাশিস মিত্র মারা গেছেন। সাডেন মেজর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, চিকিৎসা করার সময়ই পাওয়া যায়নি। ফোনে খবরটা শুনে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল টাপুরদি। আমি গিয়ে পাশে বসলাম। টাপুরদির কাঁধে হাত রেখে বললাম, 'ওঠো টাপুরদি, উঠে ব'সো।'
আমার দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকাল টাপুরদি। তার পরমুহূর্তেই হাউহাউ করে কেঁদে উঠল, 'আমার জন্য হল। আমার জন্য মরতে হল মানুষটাকে!'
ওর এরকম প্রতিক্রিয়ায় আমিও ক্ষণিকের জন্য বিহ্বল হয়ে গেলাম। তারপর টাপুরদির মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে বললাম, 'এরকম ক'রো না, লক্ষ্মী দিদি আমার! তুমি তো চেষ্টা করেছিলে।'
টাপুরদি ফোঁপাতে ফোঁপাতেই বলল, 'চেষ্টা করাটা যথেষ্ট ছিল না মিতুল, তুই বুঝতে পারছিস না। আমার বোঝা উচিত ছিল, যারা এসব করছে তারা কতটা বিপজ্জনক লোক। তারা কিছুতেই ডক্টর মিত্রকে বাঁচিয়ে রাখবে না বুঝেই তিনি নিজেকে গৃহবন্দি রেখেছিলেন। আমি বুঝতে পারিনি নিজের বাড়িতে তিনি বেশি সেফ ছিলেন। বুঝিনি মেগাসিটি-মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অত ভিড়ের মধ্যে তার কাছে আততায়ীর পৌঁছোনো অনেক সহজ হবে, তাকে হত্যা করা সহজ হবে। আমি বুঝিনি যারা এত বড়ো একটা ব্যাবসা এতদিন ধরে পুলিশের নজর এড়িয়ে চালাচ্ছে, তাদের পক্ষে একজন প্রৌঢ়কে মেরে ফেলা কোনো বড়ো সমস্যা হবে না। আমি বুঝতে পারিনি রে মিতুল! আমার দোষে এসব হল।'
টেবিল থেকে জলের বোতল নিয়ে এলাম আমি। মুখ খুলে টাপুরদির হাতে দিলাম। বললাম, 'জল খাও। চোখ মোছো। মেডিকেল কলেজে ডক্টর মিত্রকে তুমি পাঠাওনি টাপুরদি। সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সৌরভবাবু ও হেলথ সেক্রেটারি। তুমি তো শুধু ওঁদের তোমার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলে।'
'না মিতুল, আমায় তুই সান্ত্বনা দিস না। আমার ভুলে একটা মানুষের প্রাণ গেল। আমি এই কেসে আর কাজ করব না, কিছুতেই না। পুলিশ যা পারে করুক। পুলিশ তো আমার সাহায্য চায়নি। আমি যেচে পড়ে গেছিলাম ওদের কাছে', বলতে বলতে নিজের মোবাইলটা নিয়ে কাউকে ডায়াল করতে শুরু করল টাপুরদি।
'কাকে ফোন করছ তুমি? টাপুরদি, কী করছ?' বলে উঠলাম আমি। ততক্ষণে টাপুরদি ফোনের ও-প্রান্তের ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছে।
কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রাখল টাপুরদি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'কী বললেন সুদর্শনবাবু?'
'আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।' একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল টাপুরদি, 'আমাকে তাঁর বাড়িতে যেতে বললেন।'
'চলো, আমিও যাব।' বললাম আমি।
সল্টলেক সেক্টর টু-এ ছিমছাম দোতলা বাড়িটি বাইরে থেকে দেখলেই গৃহকর্তার রুচির পরিচয় মেলে। সুদর্শনবাবু বাড়িতেই ছিলেন। কলিং বেল টিপতে নিজের দরজা খুললেন তিনি।
'এসো, ভেতরে এসো তোমরা। বাড়ি চিনতে অসুবিধে হয়নি তো?' জিজ্ঞাসা করলেন তিনি।
আমি মাথা নাড়লাম।
'যাক, সাধারণত সল্টলেকের বাইরের লোকের কাছে সল্টলেক গোলকধাঁধার চেয়ে কিছু কম নয়। তাই জিজ্ঞাসা করলাম।' বললেন তিনি।
আমি বললাম, 'আমি জিপিএস ধরে ড্রাইভ করে এসেছি। তাই অসুবিধে হয়নি।'
'আচ্ছা, আচ্ছা। আজকাল এসব সুবিধে হয়েছে। আমি বুড়ো মানুষ, এসব টেকনোলজি-টজি ভালো বুঝি না। রাস্তা হারালে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে করে ঠিক পৌঁছে যাই।' হাসিমুখে বললেন সুদর্শনবাবু।
টাপুরদি এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি। কেঁদেকেটে চোখ ফুলে উঠেছে ওর।
বসার ঘরটা বেশ বড়ো। ঘরের একটা দেয়াল জোড়া বুকসেলফে প্রচুর বই। সুন্দর চামড়ায় বাঁধানো সোফায় বসলাম আমরা। সুদর্শনবাবু আমাদের মুখোমুখি বসলেন। বললেন, 'চা খাবে, না কফি? তোমরা অনেক ছোটো, তাই 'তুমি'ই বলছি, কেমন?'
আমি টাপুরদির দিকে তাকালাম। তারপর বললাম, 'একদম 'তুমি' বলুন। এখন কিছু খাব না স্যার। আসলে ডক্টর মিত্রর সাডেন ডেথটা'...
আমাকে থামিয়ে দিয়ে সুদর্শনবাবু টাপুরদির দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, 'তোমাদের বয়স কম। এই বয়সে আঘাতের অভিঘাত অনেক বেশি হয়, বুঝি। আমার বয়স হয়েছে। এই চাকরি উপলক্ষ্যে কম তো দেখলাম না। কিন্তু যাই হোক না কেন, যে দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছ তা তো এত সহজে নামিয়ে দেওয়া যায় না। কষ্টটা কমে এলে তখন এভাবে মাঝপথে যুদ্ধ ছেড়ে পালানোর জন্য নিজের সঙ্গেই দৃষ্টি মেলাতে পারবে না তুমি।'
টাপুরদি মুখ তুলে বলল, 'কী করব? আমি নিজেকেই ক্ষমা করতে পারছি না। বারবার মনে হচ্ছে আমার জন্যই এসব হল।'
সুদর্শনবাবু বললেন, 'আমি সব শুনেছি। তোমার এখানে কোনো দোষ নেই। ভুল যদি কারও থেকে থাকে তা সৌরভ ও অদ্বৈতর। তাদের সিদ্ধান্তে ভুল ছিল। ভুলও বলব না, তারাও বোঝেনি পরিস্থিতির গুরুত্বটা। যদিও ডক্টর স্বাভাবিক মৃত্যুই সার্টিফাই করেছে, তবু অটোপসি তো করতেই হবে। তুমি আর এ নিয়ে ভেবো না। যে কাজের দায়িত্ব নিয়েছ সেটা করো।'
'ডক্টর মিত্রর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি আপনাকেই আগে ফোন করেছিলাম। আপনি তখন ফোন ধরেননি স্যার!' বলল টাপুরদি।
সুদর্শনবাবু বললেন, 'আমি একটা জরুরি মিটিং-এ ছিলাম। ফোন সাইলেন্ট ছিল। পরে মিটিং থেকে বেরিয়ে এসে তোমার মিসড কল দেখে কল করতে যাব, তার আগেই অদ্বৈত খবরটা দিল। সত্যি কথা বলতে কী, তখন ওই মুহূর্তে আমারও অদ্বৈতর সিদ্ধান্তই ঠিক বলে মনে হয়েছিল। আমিও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারিনি। তুমি যদি এই ঘটনার জন্য নিজেকে দোষী করো, তাহলে আমিও একই অপরাধে অপরাধী।'
টাপুরদি বলল, 'আমার কী করা উচিত বুঝে উঠতে পারছি না!'
'আগে এক কাপ গরম গরম কফি খাওয়া উচিত', হেসে বললেন সুদর্শনবাবু, 'তারপর এ-বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করা যাবে, কেমন?' বলে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন তিনি। মিনিট দুয়েকের মধ্যে আবার ফিরে এসে বসলেন। সম্ভবত ভেতরে কাউকে কফির জন্য বলে এলেন।
'দেখো সঙ্ঘমিত্রা, তুমি যদি কাজটা করতে না চাও সেক্ষেত্রে তোমাকে কেউ জোর করতে পারবে না, আমি বা সিএম কেউই নয়। কাজটা তুমি নিজে করতে চেয়েছিলে, তাই না? এখন ভেবে দেখো তো, কেন করতে চেয়েছিলে? একটা ছোটো ছেলেকে খুঁজে বের করার জন্য, তাই না?'
মাথা নাড়ল টাপুরদি।
'তাকে কি পেয়ে গেছ তুমি? সে কেমন আছে, কী অবস্থায় আছে জানো কি? নাকি তাকে খোঁজার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে? শুধু সে নয়, হয়তো তার মতো আরও অনেক মানুষকে তুমি বাঁচাতে পারো। এত সহজে হাল ছেড়ে দিলে চলবে?'
টাপুরদি ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, 'ডক্টর মিত্রর মৃত্যুটা আমার আত্মবিশ্বাসের ভিতটা নাড়িয়ে দিয়েছে। আমি নিজের ওপর ভরসা রাখতে পারছি না আর।''
হাসলেন সুদর্শনবাবু। তারপর বললেন, 'তোমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছি আমি। জানো, আমি যেদিন সিভিল সার্ভিসের জন্য পরীক্ষা দিতে গেছিলাম, আমার বাবা মৃত্যুশয্যায়। পরীক্ষা দিচ্ছি আর ভাবছি ফিরে গিয়ে বাবাকে হয়তো আর দেখতে পাব না। ভাবছি, কেন এলাম পরীক্ষা দিতে! ফিরে গিয়ে দেখলাম আমার আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। বাবা আর নেই। মৃত্যুর আগে আমাকে দেখতে চেয়েছিল বাবা। সেই অপরাধবোধ আমাকে কুরে কুরে খেয়েছে অনেকদিন। একটা সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যে পরীক্ষার জন্য বাবাকে শেষ দেখাটা দেখতে পেলাম না, সেই চাকরি আর করব না। তারপর মনে হল, কেন করব না? এই কাজ করে হয়তো আরও অনেক মানুষকে বাঁচাতে পারব। সমাজের মঙ্গলের জন্য আরও অনেক কাজ করতে পারব। সেদিন আমি আবেগের চেয়ে কর্তব্যকে আগে স্থান দিয়েছিলাম। এবার বল তোমার কোর্টে। তুমি কী করবে সেই সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে।'
পর্দা সরিয়ে একজন বয়স্কা মহিলা ঢুকলেন। কেমন যেন ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি। আমাদের দিকে না তাকিয়ে সোজা সুদর্শনবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন ধরা গলায় বললেন, 'আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।'
সুদর্শনবাবু কেমন অপ্রস্তুত মুখে বললেন, 'তুমি বাইরে এলে কেন? মালতী কোথায়? মালতী মালতী!'
একজন মোটাসোটা পরিচারিকা ঘরে এল হাতে ট্রে-তে কফির কাপ ও কুকিজ সাজিয়ে।
'বউদিকে দেখো মালতী, ভেতরে নিয়ে যাও। ঘুম পেয়েছে বলছে, ঘুম পাড়িয়ে দাও।'
মালতী বলল, 'ঘুম পাড়াচ্ছিলাম তো। কফি করতে গেলাম, সেই ফাঁকে উঠে এসেছে।'
'ওরা কে?' আমাদের দিকে আঙুল তুলে জিজ্ঞাসা করলেন ভদ্রমহিলা।
'ওরা আমার কাছে কাজে এসেছে, মণিকা। ওদের নাম সঙ্ঘমিত্রা আর মৈথিলী।'
এবার আমাদের দিকে তাকিয়ে সুদর্শনবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন, 'আমার স্ত্রী, মণিকা।'
আমরা নমস্কার করলাম। ভদ্রমহিলা আমাদের প্রত্যুত্তর করলেন না। সুদর্শনবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমার খিদে পেয়েছে। আমি খাব না?'
সুদর্শনবাবু নরম গলায় বললেন, 'তুমি তো একটু আগেই ডিনার করেছ, মণিকা। আমিই তো খাইয়ে দিলাম তোমায়। যাও, এখন ঘুমিয়ে পড়ো, মালতী তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে।'
বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে পর্দা সরিয়ে ভেতরে চলে গেলেন মণিকা দেবী। সুদর্শনবাবু সেদিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন, 'মণিকা অ্যালজাইমার্সের পেশেন্ট। অনেকদিন ধরেই এই অবস্থা, ধীরে ধীরে আরও খারাপ হচ্ছে।'
মনটা খারাপ হয়ে গেল। হাসিখুশি, পরোপকারী মানুষটিকে দেখলে বোঝাই যায় না তার ব্যক্তিগত জীবনে এমন জটিলতা আছে। কফিতে চুমুক দিতে দিতেই একটা ফোন এল সুদর্শনবাবুর মোবাইলে। তিনি 'হ্যাঁ অদ্বৈত, বলুন!' বলে উঠে গেলেন। একটু পরে ফিরে এসে বললেন, 'একটা খবর আছে তোমার জন্য সঙ্ঘমিত্রা। ডক্টর মিত্রর অটোপসি হয়ে গেছে। যদিও অফিশিয়াল রিপোর্ট এখনও হাতে আসেনি, তবু মৃত্যুটাকে নর্মাল বলেই মনে হচ্ছে। ডক্টর মিত্রর হার্টের সমস্যা ছিল, প্রায় নাইনটি পার্সেন্ট ব্লকেজ ছিল আর্টারিতে। হয়তো বেশি টেনশনে ছিলেন তিনি। অরগ্যানস ভিসেরার জন্য পাঠানো হয়েছে। সেই রিপোর্ট আসতে ক-দিন লাগবে আরও।'
টাপুরদি সুদর্শনবাবুর মুখের দিকে তাকাল। সুদর্শনবাবু তার মাথায় হাত রেখে বললেন, 'এত ভেঙে পড়লে চলবে কেন? তোমার সম্পর্কে অম্লানের কাছে অনেক শুনেছি। তুমি তো অমন দুর্বল মেয়ে নও। নাউ বি স্ট্রং, অ্যান্ড ফাসন ইয়োর সিটবেল্ট। যে দায়িত্ব নিয়েছ, সেটা সম্পূর্ণ করো।'
সেদিনের পর থেকে অর্জুনদা আর আসেনি। টাপুরদির ইগোও তো কম নয়। কষ্ট পাবে, তবু নিজে থেকে একবার কল করবে না। অর্জুনদার অভিমানটা আমি বুঝতে পারি, কিন্তু টাপুরদির এই অকারণে কষ্ট পাওয়ার অর্থ খুঁজে পাই না। আজ তাই আমি নিজেই ফোন করেছিলাম অর্জুনদাকে। ডক্টর মিত্রর মৃত্যুর খবর আমাদের আগে অর্জুনদা পেয়েছে। কিন্তু টাপুরদির মনের খবরটা আমাকেই দিতে হল। জানতাম টাপুরদি ভালো নেই জানলে অর্জুনদা অভিমান ভুলে ছুটে না এসে থাকতে পারবে না।
ঘরে ঢুকে জুতো খুলতে খুলতে হাঁক ছেড়ে বলেছিল অর্জুনদা, 'যা আছে খেতে দাও শিগগির। পেটের নাড়িভুঁড়ি সব জ্বলে গেল।'
ওই একটা কথাতেই ঘরের বাতাস হালকা হয়ে গেছিল। আমি তাড়াতাড়ি জল এনে দিয়েছিলাম। টাপুরদি মন-খারাপ ভুলে রান্নাঘরে ছুটেছিল কিছু খাবার বানাতে। গ্লাসে জল এনে অর্জুনদার সামনে টেবিলে রাখলাম। অর্জুনদা ইশারায় জানতে চাইল টাপুরদি কেমন আছে? মৃদু মাথা নাড়লাম, ভালো নেই টাপুরদি। অর্জুনদা একটুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইল। জলের গ্লাসটা তুলে জলটা খেল। তারপর উঠে রান্নাঘরের দিকে এগোল। আমিও সেখান থেকে সরে বেডরুমে চলে এলাম। অনেক মান-অভিমান জমে আছে। সেটা নিঃশেষে মুছে ফেলার জন্য ওদের এখন খানিকটা একান্ত প্রয়োজন।
ঘরে এসে ল্যাপটপটা নিয়ে বসলাম। টাপুরদি নবদিগন্তের রেজিস্ট্রেশনের নথিগুলির সফটকপি নিয়ে এসেছিল। সেগুলো আমিও আমার ল্যাপটপে সেভ করেছিলাম। সেই ফাইলটা খুলে নথিগুলি দেখতে লাগলাম। পাঁচজনের ডকুমেন্টস ও ছবি রয়েছে এখানে। এদের মধ্যে শোভন সেন, ডক্টর মিত্র এখন আর বেঁচে নেই। এই হোমের উদ্যোক্তা, শিউলি মজুমদারের স্বামী শেখর মজুমদারও মারা গেছেন। রাঘব সামন্তের সম্পর্কে কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। তার মানে কি কেউ বা কারা সুনিপুণভাবে কমিটি মেম্বারদের একে একে সরিয়ে দিচ্ছে! যদিও প্রত্যেকটা মৃত্যুই স্বাভাবিক। শোভনবাবু রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা সেটাকে সাধারণ দুর্ঘটনা বলেই মত দিয়েছেন। কিন্তু দুর্ঘটনা তো পরিকল্পনামাফিক ঘটানোও যায়! তাই যদি হয়, এর মানে তো দাঁড়াচ্ছে যে জীবিত বাকি তিনজনও সুরক্ষিত নন। এই অ্যাঙ্গল থেকে আগে তো ভেবে দেখিনি!
কথাটা মাথায় আসা মাত্র লাফিয়ে উঠলাম। বসার ঘরে গিয়ে দেখলাম টাপুরদি প্লেটে করে চাউমিন নিয়ে টেবিলে সাজাচ্ছে। পেছনে অর্জুনদা ট্রে-তে তিন কাপ চা নিয়ে আসছে। আমি ঘরে ঢুকতে টাপুরদি আমার দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসল। লড়াকু মেয়ের মুখে এই লজ্জার অরুণাভাটুকু ভারি ভালো লাগে। যাক, মেঘ কেটে গেছে। অতএব নিশ্চিন্তি!
'টাপুরদি, একটা কথা মাথায় এল!' তড়িঘড়ি বললাম আমি।
'বলে ফেল!'
'এখন পর্যন্ত নবদিগন্তের সঙ্গে জড়িত তিনজন মারা গেছেন। একজন নিরুদ্দেশ। এটা ভেবে দেখেছ?'
'এটা ফ্যাক্ট। এতে ভাবার কী আছে?' পেছন থেকে অর্জুনদা বলল।
'তোমাদের এটা অস্বাভাবিক লাগছে না?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি বলল, 'পুরো কেসটাই অস্বাভাবিক!'
'তাহলে কী ঠিক করলে?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি, 'কেসটা নিয়ে এগোবে, না এখানেই ছাড়বে?'
টাপুরদি লাজুক মুখে অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে বলল, ''জানি না কতটুকু পারব। তবু দেখি চেষ্টা করে।''
আমি কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে অর্জুনদার দিকে তাকালাম। অর্জুনদা মুচকি হেসে চোখ টিপল। অর্জুনদাই পারে। টাপুরদির সব ক্ষতের মলম ওর কাছে থাকে। অর্জুনদা নিজের চাউমিনের প্লেটটা নিয়ে সোফায় বসল। আমি বললাম, 'আচ্ছা টাপুরদি, সত্যব্রত মল্লিক একটা অদ্ভুত ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন, মনে আছে? যার অর্থ দাঁড়ায় রাঘব সামন্ত বলে আসলে কেউ নেই। এটা কি হতে পারে বলে মনে হয় তোমাদের?'
টাপুরদি বলল, 'এই রাঘব সামন্তকে নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। তিনটে সম্ভাবনা আমার মাথায় এসেছে। প্রথম, রাঘব সামন্ত বলে আদৌ কেউ নেই। সেক্ষেত্রে কমিটি ফর্মেশনের সময় একজন ফ্যান্টম মেম্বারকে কেন রাখা হয়েছিল সেটার কারণ আমাদের ভাবতে হবে। তার মানে কি প্রথম থেকেই কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই হোম শুরু হয়েছিল এবং রাঘব সামন্ত নামটি সেই কারণেই ইনক্লুড করা হয়েছিল যাতে বিপদে পড়লে তার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করা যায়!
'দ্বিতীয় আর একটি সম্ভাবনা আমার মাথায় আসছে। এই হোম তৈরির পেছনে সবচেয়ে বেশি যার নাম উঠে আসছে তিনি হলেন শেখর মজুমদার। নবদিগন্ত হোমের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে কমিটির সকলের সঙ্গে সিংক্রোনাইজ করা, রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা সব তিনি করেছেন। তাহলে এখন প্রশ্ন আসে, কমিটিতে তিনি নেই কেন? স্ত্রী কমিটিতে থাকলে তিনি থাকতে পারবেন না, এমন তো কোনো ব্যাপার নেই! তাহলে? তাহলে কি শেখর মজুমদার নিজেই বকলমে রাঘব সামন্ত? এমনও হতে পারে যে তিনি সরকারি চাকুরে ছিলেন বলে অন্য কোনো ভেঞ্চারে নিজেকে খাতায় কলমে জড়াতে চাননি।
'তৃতীয় সম্ভাবনা হল, রাঘব সামন্ত আছেন। ভীষণভাবে আছেন। হয় এই কমিটির ছয়জনের মধ্যে একজন, বা এই কমিটির বাইরের কেউ তিনি। শেখর মজুমদারের সঙ্গে প্ল্যান করে এই হোম টেক ওভার করেন রাঘব সামন্ত। তারা দু-জনে সম্ভবত প্রথম থেকেই জানতেন এই হোমের আড়ালে আসলে কী হতে যাচ্ছে। তাই শেখর মজুমদার নিজেও রইলেন না কমিটিতে, স্ত্রীকে রাখলেন। পরবর্তীতে হয়তো বাকিরাও জানতে পেরেছে। যাঁরা মেনে নিয়েছেন, তাঁরা বেঁচে আছেন, যাঁরা মানেননি তাঁদের মরতে হয়েছে।'
অর্জুনদা খাওয়া থামিয়ে বলল, 'নবদিগন্তে যা যা চলছিল, সেসব নতুন কিছু নয়। প্রথম থেকেই এসব চলছে। শুভমের কথা মেনে নিলে ওদের ডেটাবেস থেকে অনেক ডেটা বিভিন্ন সময়ে ডিলিট করা হয়েছে। সুতরাং, বাকি কমিটি মেম্বাররা কেউ কিছু জানে না, এটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু আমাদের হাতে কোনো প্রমাণ নেই। এর পেছনে যে মাথা কাজ করছে, সে প্রথম থেকেই অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে সুচারু পরিকল্পনা করে এগিয়েছে। পেছনে এক ফোঁটা প্রমাণও ফেলে রাখেনি। গত দুই বছরে বেশ কিছু বাচ্চা মিসিং হয়েছে যেটা নজরে এসেছে। কিন্তু আমার ধারণা এর আগেও অনেক বাচ্চা এখান থেকে গেছে। তাদের ডেটা ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে, অথবা এনট্রিই করা হয়নি কখনো। নবদিগন্ত সেবাশ্রম আসলে ট্র্যাফিকিং বিজনেসের ওয়ারহাউস হয়ে উঠেছিল। সব জেনেও আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে।'
আমার খুব রাগ হল শুনে। বললাম, 'তোমরা পুলিশেরা তো অনেকভাবে পেট থেকে কথা বার করতে পারো। হোম কমিটি মেম্বারদের তুলে এনে থার্ড ডিগ্রি দিলেই সব বলে দেব।'
অর্জুনদা হাসল। বলল, 'অত সহজও নয় সখী। মেম্বাররা সব সমাজের প্রভাবশালী লোকজন। অত সহজে প্রমাণ ছাড়া ওঁদের গায়ে হাত লাগালে মিডিয়া, হিউম্যান রাইটস সব ছিঁড়ে খাবে পুলিশকে। উলটে আমাদের ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারির মুখে পড়তে হবে, বুঝলে? চাকরি যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়।'
আমি টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বললাম, 'এই ব্যাপারটা সুদর্শনবাবুকে বললে হয় না?'
টাপুরদি বলল, 'কাঁদুনে বাচ্চার মতো সব সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে যাওয়াটা ঠিক হবে না রে মিতুল। একটা কাজের দায়িত্ব নিজে চেয়ে নিয়েছি। সেটা এক্সিকিউট করার উপায়ও আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে। খুব প্রয়োজন পড়লে তাঁর সাহায্য তো নিতেই হবে। আগে নিজেরা চেষ্টা করে দেখি।'
অর্জুনদা বলল, 'একটা ব্যাপার নিয়ে মনের মধ্যে একটু খচখচ করছে।'
'কী?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
অর্জুনদা একটু চুপ করে থেকে বলল, 'ডক্টর মিত্রর মৃত্যুটা অটোপসি রিপোর্ট অনুসারে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবেই বলা হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, তাঁকে মেডিকেল কলেজে আনা হল কেন? তাঁর লাইফ থ্রেট থাকলে তাঁকে পুলিশ প্রোটেকশন দিয়ে বাড়িতে রাখাই তো উচিত ছিল। আমি আমার ডিপার্টমেন্টের হায়ার অথরিটিকে প্রশ্ন করতে পারি না। কিন্তু যতটুকু শুনেছি, তাতে ডক্টর মিত্রকে মেডিকেল কলেজে অ্যাডমিট করার প্রস্তাবটা হেলথ সেক্রেটারি অদ্বৈত মুখার্জি দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন দিলেন?'
'কেন দিলেন?' জিজ্ঞাসা করলাম আমিও।
'সেটাই তো ভাবছি মিতুল। কেন দিলেন?' বলল অর্জুনদা, 'যেখানে আমরা জানি মেগাসিটি মেডিকেল কলেজের ভেতরে নানানরকম দালাল চক্র সক্রিয়, এদের মাধ্যমে বিভিন্ন সমাজবিরোধী কাজকর্ম হয়, সবচেয়ে বড়ো কথা এই চক্রের লোকেরা সহজেই মেডিকেল কলেজের ভেতরে ডক্টর মিত্র অবধি পৌঁছোতে পারবে জানা সত্ত্বেও কেন তাঁকে রাখা হল ওখানে?'
আমি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'তোমার মাথায় কী চলছে অর্জুনদা?'
তাকিয়ে দেখলাম টাপুরদিও নীরবে অর্জুনদার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
অর্জুনদা আমাদের দু-জনের মুখের দিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে বলল, 'ডিসিডিডি স্যার কোনোরকম সন্দেহের ঊর্ধ্বে। ইন ফ্যাক্ট, ডক্টর মিত্রর মৃত্যুটা নিয়ে তিনি নিজেও অনুশোচনা করছেন। কিন্তু'...
'কিন্তু?' ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
'জানি না। তবে যেখানে এই অপরাধ চক্রে পুলিশ-প্রশাসন সবই জড়িয়ে আছে, সেখানে আমি কোনো পসিবিলিটিই ছাড়তে রাজি নই টাপুর, তুমিও ছেড়ো না।' গম্ভীর মুখে বলল অর্জুনদা।
'না, ছাড়ছি না।' টাপুরদি বলল।
ঘরের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। সকলে একই কথা ভেবে চলেছি, কে আছে এই সব কিছুর পেছনে?
এবার নৈঃশব্দ্য ভেঙে টাপুরদি বলল, 'আমাকে ডক্টর মিত্রর অটোপসি রিপোর্টের একটা কপি এনে দিতে পারবে অর্জুন?'
অটোপসি রিপোর্টে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। ডক্টর মিত্রকে ট্রমা কেয়ারে রাখা হয়েছিল। অতিরিক্ত স্নায়বিক উত্তেজনা ও অবসাদের চিকিৎসা চলছিল। রক্তে কড়া ডোজের মের্টাজপিন জাতীয় ওষুধ পাওয়া গেছে। এটি একটি খুব সাধারণ অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি মেডিসিন। আমার মা এক সময়ে নিত, তাই জানা আছে আমার। টাপুরদি মোবাইলের স্ক্রিনে অটোপসি রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল।
'কী ভাবছ টাপুরদি?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'কোথাও কিছু একটা ভুল হচ্ছে মিতুল!' ভুরু কুঁচকে বলল টাপুরদি। বুঝলাম ডক্টর মিত্রর স্বাভাবিক মৃত্যুর রিপোর্টটা মেনে নিতে পারছে না ও।
'কী করবে এখন?' জানতে চাইলাম।
'দাঁড়া', বলে টাপুরদি কাজে যেন একটা ফোন করল অন্য ঘরে গিয়ে। তারপর বেরিয়ে এসে বলল, 'ডক্টর মিত্রর বাড়িতে যাব। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।'
সোফায় বসে অর্জুনদার নম্বর ডায়াল করল টাপুরদি।
ঘণ্টা তিনেক পরে গলফ গ্রিনে ডক্টর মিত্রর বাড়ির সামনে হাজির হলাম আমরা তিনজন, টাপুরদি, অর্জুনদা ও আমি। কলিং বেল বাজিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আগের দিনের ভদ্রমহিলা গেট খুললেন। আমাদের দেখে বললেন, 'কাকে চাই?'
'পুলিশ। দরজা খুলুন।' বলল অর্জুনদা।
ভদ্রমহিলার দৃষ্টিতে ভয়ের ছায়া খেলে গেল। গেটটা পুরো খুলে বললেন, 'আসুন।'
'আপনি ডক্টর মিত্রর কে হন?' অর্জুনদা জিজ্ঞাসা করল।
ভদ্রমহিলা মাথা নীচু করে বললেন, 'আমি স্যারের দেখাশোনা করতাম। ঘরের কাজ, রান্নাবান্না, স্যারের খেয়াল রাখা, সব। বয়স হয়েছিল তো মানুষটার, তার ওপর শরীরও ভালো যেত না। একা থাকতে পারতেন না। তাই আমি এ-বাড়িতেই থাকতাম।'
'কী নাম আপনার?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
'অনিতা সাহা।'
'হুম', বলে অর্জুনদা বাড়ির ভেতরে ঢুকল। পেছনে পেছনে আমরাও ঢুকলাম। বাংলো প্যাটার্নের দোতলা বাড়ি, সামনে বড়ো ছড়ানো ইংরেজির এল অক্ষরের মতো বারান্দা। সেখানে রাখা ডেক চেয়ার ও ছোট্ট একটা গোল টেবিল। বসার ঘরটা প্রায় পুরো একতলাটা জুড়ে, মেঝেতে কাঠের টালি বসানো, দেয়ালে বাঁশ ও ডোকরার ওয়াল হ্যাঙ্গিং ঝোলানো। পেছন দিকে রান্নাঘর ও খাওয়ার জায়গা রয়েছে। ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে বুঝলাম গৃহকর্তা যথেষ্ট শৌখিন মানুষ ছিলেন। একদিকের দেয়ালে দুইজন বয়স্ক মানুষের ছবিতে মালা ঝোলানো রয়েছে দেখলাম। একজন নারী, অপর জন পুরুষ। টাপুরদি এগিয়ে গেল সেদিকে। পেছন থেকে ভদ্রমহিলা বললেন, 'স্যারের মা আর মামা।'
বুঝলাম ইনিই বিনয়কৃষ্ণ ভট্টাচার্য। দেবাশিসবাবুর নিজের মামা ছিলেন না ইনি, বরং দেবাশিসবাবুর দাদু দত্তক নিয়েছিলেন বিনয়কৃষ্ণ ভট্টাচার্যকে। নিজের মেয়েকে বঞ্চিত করে পালিত পুত্রকে সম্পত্তির ওয়ারিশ করেন তিনি। তবু দেবাশিসবাবু নিজের মায়ের ছবির পাশে বিনয়কৃষ্ণবাবুর ছবি শ্রদ্ধার সঙ্গে সাজিয়ে রেখেছেন। অর্থাৎ মামার প্রতি তাঁর রাগ ছিল না বা শ্রদ্ধার অভাব ছিল না।
বসার ঘরের একদিক দিয়ে ঘোরানো সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। এখানে মাত্র তিনটি ঘর রয়েছে। অন্য ঘরগুলি দেখে দেবাশিসবাবুর বেডরুমে ঢুকলাম আমরা। ঘরে ঢুকেই টানা পর্দাটা সরিয়ে দিল টাপুরদি। দিনের আলো ঝাঁপিয়ে এসে ঢুকল ঘরের ভেতরে। এই ঘরটাই দোতলায় সবচেয়ে বড়ো। ঘরের মাঝখানে বিছানায় টানটান করে চাদর পাতা। এই ঘরের মালিক দু-দিন আগেও এই ঘরে থেকেছেন, এই বিছানায় শুয়েছেন। আজ তিনি কোথাও নেই। তবু এই ঘরের, এই বাড়ির কোনায় কোনায় রয়ে গেছেন তিনি। মনটা ভারী হয়ে গেল।
টাপুরদি সারা ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওকে কেমন যেন অস্থির লাগছে আজ। আমি টাপুরদির সঙ্গে এতগুলো কেসে থেকেছি, ওর মধ্যে এমন অস্থিরতা আগে দেখিনি। চুরি, ব্ল্যাকমেল বা খুনের কেস একরকম, কিন্তু একটা এত বড়ো চক্রের সঙ্গে লড়াই করা একেবারেই অন্যরকম ব্যাপার। এতে বিপদ বেশি, জটিলতা বেশি, তার চেয়েও বড়ো কথা এই ধরনের কেসে প্রাইভেট ডিটেকটিভের করার মতো বিশেষ কোনো কাজ থাকে না। এ অনেকটা বুনোহাঁসের পেছনে ছোটার মতো ব্যাপার। এখানে মগজাস্ত্র তেমন কাজে দেয় না। বরং বড়ো ফোর্স, টেকনিক্যাল সাপোর্ট ছাড়া এদের ধরা কার্যত অসম্ভব, যা টাপুরদির কাছে নেই। আমি তেমন আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না।
খাটের উলটো দিকে একটা বড়ো কাঠের আলমারি রয়েছে। টাপুরদি হাতল ধরে টেনে দেখল, দরজায় তালা লাগানো আছে। বলল, 'এটা খোলার ব্যবস্থা করা দরকার, অর্জুন।'
'হুম!' বলল অর্জুনদা।
বিছানার পাশে একটা ছোট্ট দেরাজ-ওয়ালা বেডসাইড টেবিল রয়েছে। তার ওপর একটা সুদৃশ্য টেবল ল্যাম্প রাখা। টাপুরদি উবু হয়ে বসে দেরাজটা ধরে টানতেই সেটা খুলে এল। ভেতরে একটা প্লাস্টিকের বাক্সে অনেকগুলি ট্যাবলেটের স্ট্রিপ রয়েছে।
পেছন থেকে অনিতা বললেন, 'এগুলো স্যারের ওষুধবিষুধ।'
টাপুরদি মেঝেতে বসে ওষুধগুলো মন দিয়ে উলটেপালটে দেখতে লাগল। অর্জুনদা ঘরের অন্যদিকে টেবিলের ওপর রাখা বইপত্র ঘেঁটে দেখছে।
'অর্জুন, এদিকে এসো', উত্তেজিত কণ্ঠে ডাকল টাপুরদি।
অর্জুনদা এদিকে এগিয়ে এল, 'কী হল?'
টাপুরদি একটা ট্যাবলেটের পাতা এগিয়ে দিল অর্জুনদার দিকে। অর্জুনদা সেটা উলটেপালটে দেখে বলল, 'কী এটা?'
'মন্টেলুকাস্ট লিভোসেট্রিজিন কম্পোজিশনের ওষুধ, অ্যান্টিহিস্টামিন।' বলল টাপুরদি।
'তাতে কী হল?' অর্জুনদা জিজ্ঞাসা করল।
টাপুরদি সে-কথার উত্তর না দিয়ে অনিতাকে জিজ্ঞাসা করল, 'ডক্টর মিত্রর কি অ্যালার্জির সমস্যা ছিল?'
অনিতা মাথা নাড়লেন। বললেন, 'খুব সমস্যা ছিল। অর্ধেক খাবার তো খেতেই পারতেন না। ধুলোবালি সহ্য হত না। ইনহেলার নিতে হত। ওষুধ ছাড়া চলত না। গায়ে চাকা চাকা হয়ে ফুলে উঠত, অল্পেই সর্দি লেগে শ্বাসকষ্ট শুরু হত, মাথাব্যথা...'
'ড্যাম!' টাপুরদি ডান হাত দিয়ে শূণ্যে হাওয়ায় ঘুসি মারল।
'কী হল বলবে তো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!' বিহ্বল স্বরে বলল অর্জুনদা।
টাপুরদি বলল, 'ডক্টর মিত্রর অ্যাংজাইটির চিকিৎসার জন্য মের্টজপিন জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। অটোপসি রিপোর্ট অনুসারে কড়া ডোজের মের্টজপিন ছিল দেবাশিসবাবুর রক্তে। মের্টজপিনের সাইড এফেক্ট আছে, সেটা হল অ্যালার্জি। ডক্টর মিত্র এমনিতেই অ্যালার্জি-প্রোন ছিলেন। তার ওপর এই ওষুধ পড়েছিল। বুঝতেই পারছ, যা হওয়ার তাই হয়েছে।'
অর্জুনদা চোখ বড়ো করে বলল, 'আমি এখনও বুঝতে পারছি না কিছু। অ্যালার্জি হলে কেউ মরে যায় নাকি?'
'আলবাত যায়!' বলল টাপুরদি, 'আজ তোমাকে ফোন করার আগেই আমার এক ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করেছিলাম। অটোপসি রিপোর্টে ব্লাডে মের্টজপিনের ট্রেস দেখে ওর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এর কোনো সাইড এফেক্ট আছে কি না! ওর কাছেই জানলাম এমনিতে সেরকম বাড়াবাড়ি কিছু নেই। তবে সিভিয়ার অ্যালার্জিতে অনেক পেশেন্ট অ্যানাফাইলেটিক শকের মধ্য দিয়ে যায়। ইনফ্লেমেশনের কারণে এয়ারওয়ে ব্লকেজ হয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে রোগীর। যে রোগীর অলরেডি হার্টের সমস্যা আছে, তাঁর ক্ষেত্রে এমত অবস্থায় হার্ট অ্যাটাক হওয়া খুব স্বাভাবিক!''
'তার মানে?' বললাম আমি।
'মার্ডার!' বলল টাপুরদি, 'সুপরিকল্পিত খুন মিতুল। ডক্টর মিত্র নিজে একজন নামকরা ডাক্তার, সার্জেন। তিনি চিকিৎসা শুরুর আগে তাঁর অসুখের হিস্ট্রি অবশ্যই ডক্টরকে জানিয়েছিলেন। সব জেনে-শুনে যদি ডাক্তার তাঁকে মের্টজপিন দিয়ে থাকেন, তাহলে একে মার্ডার ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।'
'কী বলছ? তাহলে ইমিডিয়েট সেই ডক্টরকে অ্যারেস্ট করা দরকার।' বলল অর্জুনদা।
টাপুরদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'করতে পারো। কিন্তু মনে হয় না তাতে লাভ কিছু হবে। কোনো ডাক্তারই এরকম বাজে একটা ভুল করবেন না, ইচ্ছে করেও নয়। কারণ তাতে তিনি অনায়াসে ধরা পড়ে যাবেন।'
'তাহলে?' আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
'তাহলে এর একটাই অর্থ দাঁড়াচ্ছে। মেডিকেল কলেজের ভেতরেই কেউ এই কর্মটি করেছে। হয়তো কম ডোজের ওষুধের বদলে বেশি ডোজের ওষুধ দিয়েছে, বা অন্য কোনো প্রেসক্রাইবড সেফ ওষুধের জায়গায় মের্টজপিন দিয়েছে। নার্স, ওয়ার্ড বয় বা অন্য যে কেউ হতে পারে। ভাড়াটে খুনি হতেও বাধা নেই। তুমি এক কাজ করো অর্জুন। মেগাসিটি মেডিকেল কলেজে গিয়ে ডক্টর মিত্রর প্রেসক্রিপশন, যে পাতা থেকে ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, সব সিজ করার ব্যবস্থা করো। কে তাঁকে ওষুধ দিয়েছিল, কে কে ওই কেবিনে ঢুকেছিল খবর নাও প্লিজ। এটা খুব জরুরি।'
পেছনে কান্নার শব্দ পেয়ে আমরা ঘুরে তাকালাম। অনিতা কাঁদছেন মুখে আঁচল চাপা দিয়ে। কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, 'স্যার সবসময় বলতেন, 'অ্যালার্জির জ্বালায় জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গেল। এই অ্যালার্জিতেই আমার মরণ লেখা আছে রে অনিতা'। স্যারকে কি সত্যিই কেউ মেরে ফেলেছে? সেদিন তিনি হাসপাতালে যেতে চাননি। ওরা জোর করে নিয়ে গেল। বাড়িতে থাকলে স্যার মরতেন না।'
টাপুরদি নরম গলায় বলল, 'আমরা এখনও জানি না কী হলে কী হত! তদন্ত চলছে।'
'আমি আর এখানে থেকে কী করব? আমি তবে বাড়ি চলে যাই? এই খালি বাড়িতে একা থাকতে কেমন ভয়-ভয় করছে আমার।' অনিতা বলল।
'আপনার বাড়ি কোথায়?' জানতে চাইল অর্জুনদা।
'বসিরহাটে', বললেন অনিতা।
একটু ভাবল অর্জুনদা। তারপর বলল, 'ডক্টর মিত্রর আত্মীয়স্বজন কেউ আছে?'
অনিতা দুইদিকে মাথা নাড়ল। বলল, 'কে থাকবে! বিয়ের পরপরই স্যারের বউ মারা যান। স্যার আর বিয়ে করেননি তো।'
'ঠিক আছে। বিনয়কৃষ্ণবাবুর নাতি-নাতনিদের খবর দেওয়া হবে তাহলে। আপনি এক কাজ করুন, একটা কাগজে আপনার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর পরিষ্কার করে লিখে আমাকে দিন। বাড়ি তালা দিয়ে চাবি থানায় জমা দিয়ে দিন। যে-কোনো প্রয়োজনে ডাকলেই লালবাজারে হাজিরা দিতে হবে। ঠিক আছে?'
অনিতা মাথা নাড়লেন।
টাপুরদির সন্দেহ মিথ্যে ছিল না, তার প্রমাণ মিলল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। দেখা গেল ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে দেবাশিসবাবুকে মাত্র পনেরো মিলিগ্রাম ডোজের মের্টোজপিন দেওয়া হয়েছিল। তিনি এও জানালেন, দেবাশিসবাবু তাঁকে অ্যালার্জির কথা জানিয়েছিলেন। তাই বেশি ডোজ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। অন্যদিকে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মতে তাঁকে অন্তত চল্লিশ মিলিগ্রাম ডোজ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তার বেশিও হতে পারে। রক্তে মের্টজপিনের কনসেন্ট্রেশন যথেষ্ট বেশি ছিল।
এদিকে কেবিনে কর্তব্যরত নার্স দেবাশিসবাবুকে মের্টজপিন দেওয়ার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য অনুসারে, এই ওষুধ রাতে ডিনারের পর দেওয়ার কথা। দিনের বেলা তিনি পেশেন্টকে মের্টজপিন দেনইনি। ওয়ার্ড বয় জানায়, সে একবারই ঢুকেছিল কেবিনে, সেটাও নার্স সেখানে থাকাকালীন। আর রোগীকে ওষুধ দেওয়া তার কাজ নয়। সবচেয়ে বড়ো কথা, দেবাশিসবাবু নিজে ডাক্তার, ওয়ার্ডবয়ের হাতে ভুল ওষুধ তিনি খাবেন কেন? ওই ইউনিটে সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। তাই জানার উপায় নেই কে বা কারা ডক্টর মিত্রকে ওষুধটা দিয়েছিল।
অর্জুনদা ফোনে সব কথা জানানোর পর সবার কথা মন দিয়ে শুনল টাপুরদি। তারপর বলল, 'অর্জুন একটা কাজ করতে পারবে?'
ও-প্রান্তে অর্জুনদা কী উত্তর দিল শোনা গেল না। টাপুরদি আবার বলল, ''শোভন সেন ও শেখর মজুমদারের মৃত্যু সম্বন্ধীয় সব রেকর্ড আমার খুব দরকার। মনে রেখো, এভরি মাইনিউট ডিটেলস কাউন্ট। জানি এতদিন পর কাজটা কঠিন। প্লিজ, আমাকে এই ব্যাপারে একটু হেল্প করতে পারবে তুমি?''
ফোন রাখার পর আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'তোমার মাথায় কী চলছে বলো তো, টাপুরদি!'
টাপুরদি বলল, 'তুই সেদিন বলছিলি না মিতুল, নবদিগন্ত সেবাশ্রমের সঙ্গে যুক্ত তিনজন এখন মৃত। এখন মনে হচ্ছে, ডক্টর মিত্রর মৃত্যুটা হত্যা হলে, বাকিগুলো হবে না কেন? আমরা জানি না আসলে কী ঘটেছিল। কিন্তু একটা মনগড়া কাহিনি তৈরি করতে পারি, যেটা ঠিকও হতে পারে, আবার ভুলও হতে পারে।'
আমি কোনো কথা বললাম না। তাকিয়ে রইলাম টাপুরদির মুখের দিকে।
টাপুরদি বলে চলেছে, 'ধরা যাক, শেখর মজুমদার জানতে পারলেন বিনয়কৃষ্ণ ভট্টাচার্য মেমোরিয়াল হোম হস্তান্তর হবে। সেটা তিনি জানালেন রাঘব সামন্তকে, কিংবা রাঘব সামন্ত জানালেন তাঁকে। তাঁরা দু-জনে মিলে ঠিক করলেন, নবদিগন্ত এনজিও হোমটিকে টেক ওভার করবে।'
'তুমি কী করে বলছ যে শেখর মজুমদারের সঙ্গে রাঘব সামন্ত শুরু থেকেই ছিল?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি বলল, 'এর পেছনে আমার বেশ কিছু লজিক আছে। কমিটির অন্যান্যদের বক্তব্য, রাঘব সামন্তকে শেখর মজুমদার ছাড়া আর কেউ চেনেন না। সেটা যদি সত্যি হয়, তাহলে রাঘব সামন্ত প্রথম থেকেই নিজেকে গোপন রেখেছিলেন। এখন প্রশ্ন ওঠে, কেন? একটা অনাথ আশ্রম তৈরি হলে সেটা তো একটা মহান কাজ। তার জন্য নিজেকে গোপন রাখার প্রয়োজনীয়তা কোথায়? কমিটির বাকিদের এই কথাটা সত্যি হলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, রাঘব সামন্তের নিজেকে আড়ালে রাখার উদ্দেশ্য খুব একটা মহান ছিল না। তিনি ও শেখর মজুমদার প্রথম থেকেই একটা অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই হোম শুরু করেন।'
'হুম, বলে যাও।' বললাম আমি।
'হোম তৈরির পর কয়েক বছর সব ঠিকঠাক চলল। দিনে দিনে হোমের আড়ালে ছেলে পাচারের ব্যাবসা ফুলেফেঁপে উঠতে লাগল। এর কারণ হিসেবে বলতে পারি, শেখর মজুমদার আইপিএস অফিসার হওয়া সত্ত্বেও চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ আর চাকরি থেকে প্রাপ্ত বেতনের দরকার তাঁর পড়ছিল না। তা ছাড়া শিউলি মজুমদারের বাড়ি দেখলি তো সেদিন। একজন আইপিএসের পক্ষে ওরকম বাড়ি করা সম্ভব বলে তোর মনে হয়?
'যাই হোক, এরকম সময়ে হয়তো শেখর মজুমদার ও রাঘব সামন্তর কোনো কারণে ঝামেলা বাধে। সেটা আর্থিক বা অন্য কোনো কারণ হতে পারে। রাঘব সামন্ত দেখলেন, বিপদ। পার্টনার ইন ক্রাইম বিগড়ে গেলে তাকে কোনোমতেই ছেড়ে দেওয়া চলে না। অগত্যা তাঁকে সরিয়ে দিলেন তিনি।'
'খুন?' ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'সম্ভবত', বলল টাপুরদি।
'আর শোভন সেন?'
'শোভন সেন!' বলে চুপ করে গেল টাপুরদি। একটু ভেবে বলল, 'এই শোভন সেন সম্পর্কে আমরা এখনও কিছুই জানি না। জানা দরকার। শোভন সেনের বাড়ির লোকদের সঙ্গে কথা বলা দরকার।'
'কখন যাবে?' জিজ্ঞাসা করলাম।
'কাল সকালেই যাব ভাবছি। দেরি করার সময় নেই।'
বললাম, 'কাল আর পরশু আমাকে অফিস যেতে হবে টাপুরদি। একটা মডিউল ডেলিভারি আছে। তাই অফিসে ফিজিক্যালি প্রেজেন্ট থাকতে হবে।'
টাপুরদি বলল, 'অসুবিধে নেই। তুই যা। চাকরিটা আগে। আমি সামলে নেব এদিকটা।'
'অফিস থেকে ফিরে কিন্তু পুরো ঘটনা ডিটেলে শুনব', বললাম আমি।
টাপুরদি হাসল। টাপুরদির ফোনটা বাজছে। অর্জুনদার ফোন। ফোনটা ধরে চুপচাপ টাপুরদি কথা শুনছে দেখলাম। বেশ কিছুক্ষণ শোনার পর বলল, 'ভদ্রলোকের প্রবলেমটা কী, অর্জুন? কী আশ্চর্য, ডক্টর মিত্রর মৃত্যুর জন্য উনিই দায়ী। তার পরেও সমানে সমস্যা সৃষ্টি করে যাচ্ছেন কেন?'
অর্জুনদা কী বলল শুনতে পেলাম না। আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ফোনটা রেখে দিল টাপুরদি।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'কী হল টাপুরদি? কী বলল অর্জুনদা?'
টাপুরদি বলল, 'মেডিকেল কলেজে তদন্ত করার এবং ডক্টর মিত্রর মৃত্যুটাকে হত্যা সন্দেহ করার জন্য হেলথ সেক্রেটারি অদ্বৈত মুখার্জি অর্জুনকে নিজের অফিসে ডেকে রীতিমতো অপমান করেছেন। তাঁর মতে, সরকারি মেডিকেল কলেজ সম্পর্কে এসব বললে, চিকিৎসার ভ্রান্তি বা খুনের অভিযোগ আনলে সরকারের প্রতিই আঙুল তোলা হয়। সরকারের বেতনভুক কর্মচারী হয়ে অর্জুন সেটা করতে পারে না।'
আমি বিস্মিত মুখে বললাম, 'সে কী? ব্যাপারটাকে এত প্যাঁচালো করছেন কেন উনি? মেডিকেল কলেজের ভেতর যদি কেউ খুন হয় সেটা সরকারের দিকে আঙুল তোলা হবে কেন? মেডিকেল কলেজে বাইরের লোকেদেরও অবাধ আনাগোনা চলে। তাদের মধ্যে যে কেউ কাজটা করতে পারে। এতে অদ্বৈত মুখার্জির এত রেগে যাওয়ার কারণটা কী?'
'সেটাই তো বুঝতে পারছি না!' অত্যন্ত বিরক্ত মুখে বলল টাপুরদি।
বুঝলাম অর্জুনদার অপমান টাপুরদিকে রাগিয়ে দিয়েছে। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। একটুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে তার বলল, 'শোভন সেনের বাড়ি পরে গেলেও চলবে। আগে এই অদ্বৈত মুখার্জির সঙ্গে মোলাকাত করা দরকার।'
'কবে যাবে?'
'কাল সকালেই', বলল টাপুরদি, 'আর শোন, অর্জুনকে এই ব্যাপারে খবরদার কিছু বলবি না। কথাটা মনে থাকে যেন।'
'হুম। কিন্তু আমি যাব তোমার সঙ্গে', বললাম আমি।
'তোর তো অফিস আছে। তুই কী করে যাবি?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
'যাব', বললাম আমি, 'ওখান থেকে অফিস চলে যাব। এমনিতেও আমার ইউএস ক্লায়েন্ট, দুপুরের আগে কাজ শুরু হবে না।'
'হ্যালো।'
'হুম, বলো!'
'বস, ফার্স্ট কনসাইনমেন্ট পৌঁছে গেছে। সেকেন্ড কনসাইনমেন্ট কাল রাতে ত্রিবান্দ্রাম রওনা হচ্ছে। রাজু আর শিবেন যাবে', ফোনের অপর প্রান্ত থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল। পরিচিত নয়, কারণ কোনোভাবে পুলিশ যদি এই হাইলি সিকিওর ফোন কল ট্যাপ করেও ফেলে, তাহলেও কণ্ঠস্বর শুনে চিনতে পারবে না কাউকে। ডেটা এনক্রিপশনের ফলে কন্ঠস্বর বদলে যায়। নিজেদের মধ্যে কণ্ঠস্বর শুনে পরিচিত হওয়ার দরকার পড়ে না। সেজন্য আলাদা কোড আছে।
'গুড!' এ-প্রান্তের ভরাট কণ্ঠ বলল, 'আমি টোলগুলোতে সেটিং করে রেখেছি। আটকানোর কথা নয়। তবে এই পরিস্থিতিতে কিছুই বলা যায় না। কোনোরকম রিস্ক বুঝলে যে ওরা ফিরে আসবে, সেরকম বুঝিয়ে রাখবে ওদের।'
'বলা আছে বস। আশা করি এবার আর কোনো ভুল হবে না।'
'ভুল না হলেই ভালো', বলল এ প্রান্ত, 'ভুল হলে কিন্তু তার চূড়ান্ত মূল্য চোকাতে হবে, সেটাও বলে দেবে ওদের। আমাদের বিজনেসে সেকেন্ড চান্স পাওয়া যায় না। বাই দ্য ওয়ে, একটা কথা ভাবছিলাম আমি। রাজু ঠিক আছে, কিন্তু এই শিবেন ছেলেটা কি বিশ্বাসযোগ্য? একদম নতুন ছেলের ওপর এতটা ভরসা করা ঠিক হচ্ছে?'
'হ্যাঁ বস!' ও প্রান্ত বলল, 'ও আমাদের যাদবের গ্রামের ছেলে। যাদব দেশে গেছে। কিন্তু এই শিবেন ছেলেটাও বেশ ডাকাবুকো, সাহস আছে। মাথাও ঠান্ডা। আগে কয়েকটা ছোটো কাজ করিয়ে বাজিয়ে দেখেছি। পারবে ও।'
এ-প্রান্ত অসহিষু� স্বরে বলল, 'পারা বা না-পারার কথা নয়, কতটা বিশ্বস্ত সেটা জানতে চাইছি। নেক্সট দুটো কনসাইনমেন্ট আমাদের জন্য কতটা ইম্পর্ট্যান্ট তুমি জানো। এভাবে একটা নতুন ছেলের ওপর নির্ভর করা একটু বেশি রিস্ক নেওয়া হয়ে যাচ্ছে না?'
ও-প্রান্ত একটু চুপ করে রইল। মনে হল, তার সিদ্ধান্তে ওপরওয়ালার এই সন্দেহপোষণ তার পছন্দ হল না। তারপর বলল, 'আপনি বললে ওকে বসিয়ে দিচ্ছি। আসলে কনসাইনমেন্টগুলো ইম্পর্ট্যান্ট বলেই ওকে দায়িত্ব দিতে চাইছিলাম। কারণ, আমাদের ড্রাইভাররা বেশিরভাগই পুলিশের খাতায় দাগি। পুলিশ আটকালে ওদের ওপর সহজেই সন্দেহ করবে। শিবেন ফ্রেশ মুখ। পুলিশ রেকর্ডও নেই।'
এ-প্রান্ত কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, 'সবই বুঝলাম। এক কাজ করো, এবারের মতো ওকে বসিয়ে দাও। এটা বড়ো কনসাইনমেন্ট। এতে নতুন কাউকে ঢোকাতে আমি ভরসা পাচ্ছি না। পরের দিল্লিরটা না হয় ও যাবে। ততদিন ওকে ভালো করে মাল ডেলিভারির ঘাঁতঘোঁত বুঝিয়ে দাও।'
'আপনি যেমন বলবেন', ও-প্রান্ত বলল।
'হুম, সেটাই করো।'
'তাহলে শিবেনের জায়গায় কাকে পাঠাব কাল? সব রেডি, এখন নতুন করে ক্যারিয়ার চেঞ্জ করাটা একটু সমস্যা হবে।' ও-প্রান্তের কণ্ঠস্বরে বিরক্তি চাপা থাকছে না।
এ-প্রান্ত ঠান্ডা গলায় বলল, 'সদাশিব যেতে পারে। মতি বা সঞ্জয়, যে কাউকে পাঠাতে পারো। ওদের অভিজ্ঞতা বেশি। বিপদ বুঝলে নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রয়োজনমতো স্টেপ নিতে পারবে ওরা।'
'সদাশিব যেতে পারবে না। ওর পায়ে সেবার যে গুলি লেগেছিল বিহারে, সেটা এখনও ভালো মতো সারেনি। খুঁড়িয়ে হাঁটে। সঞ্জয় আন্ডারগ্রাউণ্ড আছে। মতি মিঞা আছে। আবার তাহলে ওকেই পাঠাব?'
'হ্যাঁ, ওকে পাঠাও। আর শোনো, পরের দিল্লির কনসাইনমেন্টটা কবে যাচ্ছে যেন?'
ও প্রান্ত বলল, 'আরও পাঁচদিন পরে, বস।'
'ঠিক আছে। ওটার জন্য নতুন ছেলেটা, কী যেন নাম বললেন, হ্যাঁ শিবেন, ওকে রেডি করো।'
'ঠিক আছে বস! আর একটা কথা ছিল।'
'বলো!'
'আপনি বলেছিলেন ওই মেয়ে টিকটিকিটাকে আপনি সামলে নেবেন। কিন্তু ও বড়ো বেশি মাথা গলাচ্ছে। আপনার কথা মতো ডক্টর মিত্রকে আমার লোক স্মুদলি সরিয়ে দিয়েছিল। অটোপসিতেও কিছু ধরা পড়ত না, এভাবেই প্ল্যান করা হয়েছিল। ধরা পড়েওনি। কিন্তু শুনলাম, ওই মেয়ে টিকটিকিটা সব ধরে ফেলেছে। এখন পুলিশ আবার নড়েচড়ে বসেছে। মেয়েটা কিন্তু দিনে দিনে আমাদের সমস্যা বাড়িয়েই চলেছে। এখন ডক্টর মিত্রর ডেথটা নিয়ে ঝামেলা শুরু হলে মুশকিল হবে।'
এ-প্রান্ত অল্প সময় চুপ করে রইল। তারপর বলল, 'হুম, বুঝতে পারছি। তবে মেয়েটা তদন্তে থাকার কিছু সুবিধেও আছে, তাই একটু হেজিটেট করছিলাম। এখন মনে হচ্ছে ওর ক্ষমতাকে আন্ডারএস্টিমেট করা হয়ে গিয়েছিল। ওর রিচ অনেক ওপর অব্দি। তাই ওকে আটকানো একটু মুশকিল। আমারও তো একটা লিমিটেশন আছে।'
'বস, আপনি বললে আমাদের ছেলেদের দিয়ে একটু কড়কে দিতে পারি। বেশি কিছু নয়, ওই একটু-আধটু চড়-চাপড় আর কী! আশা করি তাতেই কাজ হবে।'
একটু ভাবল লোকটা। বলল, 'চেষ্টা করে দেখতে পারো। কতটা ভয় পাবে জানি না। মেয়েটা শুনেছি খুব ডাকাবুকো। দেখো তোমার ছেলেরা বাড়াবাড়ি যেন না করে। ওদের তো আবার মশা মারতে কামান দাগা স্বভাব।'
'ঠিক আছে বস, হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, এই দুটো কনসাইনমেন্ট গেলে আমাদের আবার রিস্টক করতে হবে কিন্তু!' বলল ও-প্রান্ত।
'তাতে অসুবিধে নেই। নেপাল থেকে একটা বড়ো কনসাইনমেন্ট এসে পৌঁছোবে আগামী মাসে। সুন্দরবন আর ঝাড়গ্রামের আমাদের অন্য ট্রাস্টের সেন্টারদুটোতেও কিছু মাল রেডি করা আছে। ওই ট্রাস্টের ওপর এখনও পুলিশের নজর পড়েনি। পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত নবদিগন্তকে আপাতত ছোঁয়া যাবে না।'
'তাতে অসুবিধে নেই। এমনিতেও বরাবরই নবদিগন্তকে আমরা জাস্ট ইমার্জেন্সি ব্যাক-আপ হিসেবেই ইউজ করি। এখন ওতে হাত দেওয়ার দরকার হবে না।'
'বেশ, কালকের কাজটা ভালো করে করো।'
'ওকে বস! রাখছি তাহলে। মাল ডেলিভারির পর আপনাকে আবার ফোন করছি।'
অদ্বৈত মুখার্জি লোকটাকে দেখেই কেমন একটা অস্বস্তি হয়। লম্বা তালঢ্যাঙা চেহারা, গায়ের রং ফর্সা না বলে রক্তশূন্য বললে বুঝি বেশি ভালো হয়। সামনের দিকে চুল পাতলা হয়ে এসেছে, তোবড়ানো গাল। চোখের মণি ধূসর। কিন্তু সে-জন্য নয়, তার দুই চোখের দৃষ্টি কেমন যেন সাপের মতো ঠান্ডা। চোখের পাতায় যেন কঠিন প্রাচীর দিয়েছেন তিনি। সেই প্রাচীর টপকে মনের কথা চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে না। অথচ শুনেছি ভদ্রলোক নাকি ছাত্র জীবনে স্কলার ছিলেন। নিজে তিনি ইউনিভার্সিটি গোল্ড মেডেলিস্ট হয়েও প্রশাসনিক পরীক্ষায় বসেন। একবারের চেষ্টাতেই প্রথম দিকে র্যাঙ্ক করে আইএএস-এর জন্য মনোনীত হন। আবার অন্যদিকে অদ্বৈত মুখার্জি কবিতা লেখেন। বড়ো পত্রিকাতে তাঁর কবিতা ছাপে। বেশ কিছু কবিতার বইও আছে তাঁর। এসব গল্প টাপুরদির মুখেই শোনা আমার।
বিরাট সেক্রেটারিয়েট টেবিলের অপর প্রান্তে চেয়ারে বসা মানুষটিকে প্রথম দৃষ্টিতে কেমন যেন রক্তশূন্য 'জম্বি'-র মতো লাগে। এত উচ্চপদাধিকারী একজন আমলার টেবিলের ওপরটা নিরাভরণ, ভদ্রলোকের চেহারার মতোই ম্যাড়মেড়ে। কম্পিউটার আর কয়েকটা ফাইল ছাড়া একটা বই রয়েছে সেখানে। বইটি ভীষণ চেনা, জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা। ভদ্রলোকের পাথরের মতো অভিব্যক্তিহীন মুখ দেখে এই মানুষটির মধ্যে কোনো আবেগ আছে বলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। বিশ্বাস হতে চায় না এই লোক কবিতা পড়েন। আমাদের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত মুখে বললেন তিনি, 'আপনাদের আমার কাছে কী প্রয়োজন, সেটা তো বুঝলাম না।'
টাপুরদি বলল, 'হেলথ মিনিস্ট্রি থেকে আমাকে এই কেসে কাজ করার পারমিশন দেওয়া হয়েছে। সুতরাং যে-কোনো প্রবলেমে আর কোথায় যাব এখানে ছাড়া?'
হেলথ সেক্রেটারি বললেন, 'আচ্ছা! তা সমস্যাটা কী?'
টাপুরদি বলল, 'একটা কথা জানার ছিল।'
অদ্বৈতবাবু কোনো কথার উত্তর দিলেন না। স্থির দৃষ্টিতে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
টাপুরদি বলল, 'ডক্টর মিত্রকে আপনি মেডিকেল কলেজে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন?'
'হ্যাঁ, দিয়েছিলাম', বললেন অদ্বৈতবাবু।
'সেটাই জানতে চাইছি। কেন দিয়েছিলেন? আপনাকে এভাবে জিজ্ঞাসা করার এক্তিয়ার হয়তো আমার নেই। তবু জানতে ইচ্ছে হচ্ছে।' বলল টাপুরদি।
অদ্বৈতবাবু এবার হাসলেন। চেয়ারে গা এলিয়ে হেলান দিয়ে বসে বললেন, 'জানতে ইচ্ছে হল, আর তাই সকাল সকাল হেলথ সেক্রেটারিকে জেরা করতে চলে এলেন? ভাবলেন আমি আপনার সামনে বসে বসে আপনার এসব আজেবাজে প্রশ্নের উত্তর দেব? ইউ আর সাচ অ্যান অ্যামবিশাস ইয়ং লেডি, আই মাস্ট সে। আই অ্যাম ইমপ্রেসড!'
টাপুরদি ঠান্ডা গলায় বলল, 'উত্তর দেবেন কী দেবেন না, সেটা আপনার ব্যাপার। আমি আপনাকে জোর অবশ্যই করতে পারি না। কিন্তু নেতা-মন্ত্রীরা যদি জনগণের সেবক হন, আমলারাও তাই। আপনার কোনো ভুল সিদ্ধান্তে যদি একজন মানুষেরও প্রাণ যায়, সেক্ষেত্রে আপনাকে জনতার কাছে জবাবদিহি করতে হবে বই কি! মনে করুন না, আমি সেই জনগণেরই তরফেই একজন, যে আপনার কাছে জানতে চাইছে এমন সিদ্ধান্ত আপনি কেন নিলেন?'
অদ্বৈতবাবু এবার ঝুঁকে টেবিলে ভর দিয়ে হিসহিসে কণ্ঠে বললেন, 'আমি আপনাকে জবাব দিতে রাজি নই, মিস ব্যানার্জি। আপনি যা ইচ্ছে করতে পারেন। আপনার তো আবার সিএম-এর সঙ্গে বেশ ভালো সম্পর্ক। চাইলে তাঁর কাছেও কমপ্লেইন করতে পারেন। মনে রাখবেন, আমি রাজ্য সরকারের নই, কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরে।'
'সে আপনি যে সরকারের থেকে বেতন পান না কেন, দায়িত্ব যখন এ রাজ্যে নিয়েছেন, তখন সেটা নিশ্চয়ই অস্বীকার করতে পারেন না। আর তা ছাড়া একটি মৃত্যুর তদন্ত বন্ধ করতে জোরও করতে পারেন না। পারেন কি?'
অদ্বৈতবাবু বললেন, 'অবশ্যই পারি। হেলথ ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব নিয়েছি আমি। তাই যাতে সেখানে কোনোরকম অশান্তি না হয়, যাতে কাজকর্মে অসুবিধে না হয়, সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদের। মেডিকেল কলেজে ঢুকে তদন্ত করার অর্থ হল সেখানকার কর্মীদের, ডাক্তারদের ওপর সন্দেহ করা। কাল এ নিয়ে আরও বড়ো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমি সেটা অ্যালাও করব না কিছুতেই, যেখানে অটোপসি রিপোর্টেও মৃত্যু স্বাভাবিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আপনি যেতে পারেন এখন।'
আমি টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। সরকারের উচ্চপদস্থ একজন আমলার মুখোমুখি বসে এভাবে প্রত্যয়ের সঙ্গে কথা বলতে বোধ হয় টাপুরদিই পারে। এখন এই মুহূর্তে ও অদ্বৈতবাবুর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কয়েক মুহূর্ত এভাবেই কাটল। তারপরেই হেসে উঠল টাপুরদি। হাসতে হাসতে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে কিছুক্ষণ সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে রইল। আমি অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম। এবার হাসতে হাসতেই বলল টাপুরদি, 'সবই তো বুঝলাম অদ্বৈতবাবু। কিন্তু আপনার চাকরির আর বছর দু-এক বোধ হয় বাকি, তাই না? আপনার ভুল সিদ্ধান্তে একজন লোক খুন হয়েছে এই কথাটা মিডিয়ায় লিক হলে সামাল দিতে পারবেন তো? জানেনই তো, মিডিয়া তিলকে তাল বানায়। খুব খারাপ স্বভাব ওদের। হয়তো বলেই বসল, আপনি ইচ্ছে করেই ডক্টর মিত্রকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে করে তাঁকে সরিয়ে ফেলা সহজ হয়। বলতেও তো পারে, বলুন!'
তাকিয়ে দেখলাম অদ্বৈত মুখার্জি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে টাপুরদির মুখে। টাপুরদি বলেই চলেছে।
'তারপর নিউজ পেপার, টেলিমিডিয়া, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সর্বত্র দেখবেন শুধু আপনাকে নিয়েই চর্চা হচ্ছে। আজকাল আবার জনগণ ভীষণ অসহিষু� হয়ে গেছে। তাদেরও দোষ নেই। তাদের কাছে চাকরি নেই, অর্থ নেই, স্বাস্থ্য নেই, শিক্ষা নেই, খাদ্যের সুরক্ষা নেই, গরিবের অনুকূলে আইন-প্রশাসন কিচ্ছু নেই। এই 'নেই'-এর দেশে জনতা-জনার্দন বড়ো সহজেই রেগে যায়। তার ওপর অরগ্যান ট্র্যাফিকিং কেসে আপনার নাম জড়ালে রাজ্য বা কেন্দ্র কেউ আপনার পাশে দাঁড়াবে বলে মনে হয় আপনার? আমার তো মনে হয় না। তখন ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারি বসবে। আপনাকে হয়তো সাসপেন্ড করা হবে। আপনার কোনো দোষ ছিল না বোঝাতে বোঝাতে আপনার রিটায়ারমেন্টের সময় চলে আসবে। আপনার অবসরকালীন সুবিধে, পেনশন সব আটকে দেওয়া হবে। আপনার স্ত্রী তো নেই জানি, কিন্তু ছেলে-মেয়েরা আপনার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাবে। হয়তো আপনাকে ঘৃণাও করতে পারে। আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে লোকে বলবে, ওই যে সেই খুনি আমলা। আরও যে কী কী হতে পারে, আপনি ভাবতেও পারছেন না বোধ হয়।'
অদ্বৈতবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তার সাদা রক্তহীন মুখে কোথা থেকে জানি এক রাশ রক্ত এসে জমেছে! মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠেছে। রাগে কাঁপছেন ভদ্রলোক। সোজা উঠে দাঁড়ালেন। আঙুল তুলে দরজার দিকে নির্দেশ করে বললেন, 'গেট আউট! জাস্ট গেট আউট আই সে!'
'শিওর!' বলে মুচকি হেসে উঠে দাঁড়াল টাপুরদি। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'চল মিতুল, যাওয়া যাক।'
আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে আমরা বেরিয়ে এলাম। এতক্ষণ ওই ঘরে যা নাটক হল, আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।
অফিস থেকে বেরিয়ে বললাম, 'এটা কী হল, টাপুরদি?'
টাপুরদির চোয়াল শক্ত হল, চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ন। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, 'লোকটার এত বড়ো সাহস অর্জুনকে অপমান করে! কী ভেবেছে কী? জাস্ট একটু আলতো করে রগড়ে দিয়ে এলাম।'
এবার বুঝলাম ব্যাপারটা। প্রেম কী বিচিত্র জিনিস! সামনে থাকলেই দু-জনে কথায় কথায় ঝগড়া করে। অথচ অর্জুনদাকে কেউ কিছু বললে টাপুরদি যে এমন রণরঙ্গিনী হয়ে উঠতে পারে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।
বললাম, 'তাহলে তুমি আদৌ কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে আসোইনি এখানে। তাই তো?'
'আমি জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলেও উনি আমাকে জবাব দিতেন বলে তোর মনে হয়?'
'তার মানে শুধু অর্জুনদার জন্য...'
টাপুরদি মুচকি হেসে কাঁধ ঝাকাল। তারপর আমার পিঠে চাপড় মেরে বলল, 'চল, তোকে অফিসে নামিয়ে দিই। তারপর শোভনবাবুর বাড়িতে যাব।'
রাতে বাড়ি ফিরতে সাড়ে ন-টা বাজল। টাপুরদি ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে ল্যাপটপে কিছু করছিল। আমায় ঢুকতে দেখে মুখ না তুলেই বলল, 'আজ রান্নাবান্না কিছু করিনি, সুইগি থেকে পিৎজা অর্ডার করে দিয়েছি। এখনই এসে যাবে। ফ্রেশ হয়ে নে চটপট।'
'তুমি পিৎজা খাবে? তুমি না ডায়েটে আছ?' হেসে বললাম আমি।
'আমার জন্য সিজার স্যালাড আর কফি', বলল টাপুরদি, 'পিৎজা তোর জন্য।'
'তাই বলো! আমার খুব খিদে পেয়েছে। তুমি খাও ঘাসপাতা আর সেদ্ধ চিকেন, আমি তো পিৎজাই খাব। এখুনি আসছি', বলে ব্যাগটা ঘরে রেখে তোয়ালে আর জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। বাথরুমে শাওয়ারের কল খুলে নীচে দাঁড়াতেই কলিং বেলের শব্দটা শুনতে পেলাম। পিৎজা এসে গেছে।
কিন্তু ভুল ভাঙল কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই। ঘরের মধ্যে থেকে জোরে জোরে একাধিক পুরুষকণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। কেউ আমার বাথরুমের দরজায় দুই-তিনবার ঘা দিল। শাওয়ারের কল বন্ধ করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি। বাইরের ঘরে ঝনঝন করে কিছু একটা ভাঙার শব্দ এল, সেই সঙ্গে টাপুরদির গলায় একটা তীক্ষ্ন আর্তনাদ শুনতে পেলাম।
ভগ্নাংশ সেকেন্ডের মধ্যে ভেজা গায়ে পোশাক চড়িয়ে বাথরুমের দরজার লক ঘোরালাম। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে থেকে টাপুরদির চিৎকার শুনলাম, 'দরজা খুলবি না মিতুল।'
আমি কিছু বোঝার আগেই কেউ আমার বাথরুমের দরজায় সজোরে লাথি কষাল। আমি ছিটকে সরে না এলে দরজার ধাক্কায় আহত হতাম। তবু লকটা এসে আমার কবজিতে লাগল। যন্ত্রণায় 'আহ করে উঠলাম আমি।
'বেরিয়ে আয় শালি!' ষণ্ডা চেহারার লোকটিকে দেখে চেনা মনে হল। পর মুহূর্তেই মনে পড়ল একে ডক্টর মিত্রর চেম্বারে দেখেছিলাম সেই প্রথম দিন।
পায়ে পায়ে বেরিয়ে এসে দেখলাম বসার ঘরে আরও একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। সে টাপুরদির মাথায় রিভলভার ধরে আছে। আমার পেছনে দাঁড়ানো লোকটা দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলল, 'বেশি তেল হয়েছে না তোর? শালি হারামজাদি আমাদের চিনিস না! তোদের দুটোকে গায়েব করে দিতে দুই মিনিটও লাগবে না। আর তোর ঐ পুলিশ আশিকটার কী অবস্থা করি শুধু দ্যাখ।'
টাপুরদির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর ঠোঁটে কোণে দু-ফোঁটা রক্ত রেগে আছে। বাথরুমে থাকতে আমি টাপুরদির গলায় যে আর্তনাদ শুনেছিলাম, সেটা এর জন্যই। অর্থাৎ এরা ওকে শারীরিকভাবে আঘাত করেছে। প্রাথমিকভাবে হঠাৎ আক্রমণে হতচকিত হয়ে পড়লেও এই মুহূর্তে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল ওর মাথা এখন বরফের মতো ঠান্ডা। কিন্তু আমার মাথার ভেতরটা জ্বলছে। টাপুরদির গায়ে হাত তোলার সাহস এদের হয় কী করে?
টাপুরদি হাতের তালুর উলটো পিঠ দিয়ে ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা রক্তটুকু মুছে নিল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, 'কী চান আপনারা?'
আমার পেছনে দাঁড়ানো লোকটা বলল, 'নব দিগন্ত নিয়ে তোর এত চুলকানি কীসের হারামজাদি? বেশি চুলকালে মলম আছে আমাদের কাছে। এমন এমন জায়গায়'...
লোকটার কথার মাঝখানে টাপুরদি কড়া গলায় বলল, 'ভদ্রভাবে কথা বলুন। দু-জন ভদ্রমহিলার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় কেউ শেখায়নি আপনাদের? আপনাদের বসকে গিয়ে বলবেন মেয়েদের কাছে পাঠাতে হলে আগে যেন ঠিক করে কথা বলা শিখিয়ে পাঠান।'
টাপুরদির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা এবার রিভলভারের বাঁট দিয়ে টাপুরদির মাথায় জোরে আঘাত করল। টাপুরদি যন্ত্রণায় 'আহ' করে উঠল। আমার আর সহ্য হল না। আড়চোখে আগেই দেখে নিয়েছি আমার পেছনে দাঁড়ানো লোকটার হাতে কোনো অস্ত্র নেই। ধীরে ধীরে এক পা-দু-পা করে পেছোচ্ছি আমি। টাপুরদি সেটা লক্ষ করেছে মনে হল। মাথা নিচু করে আমায় ইশারা করল কিছু না করতে। কিন্তু ওরা টাপুরদির গায়ে হাত দেবে, আর আমি এত সহজে ওদের ক্ষমা করিই বা কী করে?
পেছোতে গিয়ে ইচ্ছে করে পেছনের লোকটার পায়ে পা লাগিয়ে হোঁচট খেয়ে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়লাম আমি। লোকটা মুহূর্ত সময়ের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে নিচু হয়ে আমাকে দেখতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্ত হাঁটু দিয়ে তার দুই ঊরুর মাঝে সজোরে আঘাত করলাম। লোকটা 'আক' শব্দ করে দুই পায়ের মাঝখানটা চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল। আকস্মিক এই ঘটনায় টাপুরদির পেছনে দাঁড়ানো লোকটারও মনোযোগ বোধ হয় মুহূর্তের জন্য সরে গেছিল। সেই সুযোগে টাপুরদি তিরের মতো বেগে কোমর বাঁকিয়ে লোকটার রিভলভার ধরা হাতের কবজিটা চেপে ধরল। আমি দেখতে পাচ্ছি, লোকটার মুখটা ব্যথায় বেঁকে যাচ্ছে। টাপুরদিকে নরম কোমলাঙ্গী ভেবে বসার ভুল করেছিল লোকটা। জানে না, প্রয়োজন পড়লে টাপুরদির হাতের প্রতিটি পেশি লোহায় পরিণত হয়ে যেতে পারে। লোকটার হাত থেকে রিভলভারটা খসে পড়ল।
টাপুরদি এবার লোকটার হাতটা উলটো দিকে একটা মোক্ষম মোচড় দিল। আর্তনাদ করে মেঝের ওপর বসে পড়ল লোকটা। টাপুরদি ডান হাত দিয়ে ওর কাঁধে এক জব্বর রদ্দা মারল। লোকটা আবার কাঁউকাঁউ করে সদ্য ভূমিষ্ঠ মানবকের মতো মেঝের ওপর শুয়ে রীতিমতো শব্দ করে কেঁদে উঠল। টাপুরদি লোকটার শার্টের বুকের কাছটা মুঠোতে ধরে এক ঝটকায় তার হাত থেকে রিভলভারটা কেড়ে নিল।
আমার পেছনের লোকটা নিজের নিম্নাঙ্গ চেপে ধরে এতক্ষণ জুলজুল করে দেখছিল। এবার টাপুরদি তার দিকে অগ্রসর হতেই দুই হাত জোড় করে কুঁইকুঁই করে কী জানি বলতে লাগল। টাপুরদি এবার উবু হয়ে লোকটার মুখোমুখি হাঁটু গেড়ে বসল। লোকটার মাথায় রিভলভারটা ঠেকিয়ে বলল, 'চলে যান এখান থেকে। এর পর আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না নিয়ে এভাবে হুটহাট কোনো ভদ্রমহিলার ফ্ল্যাটে আসবেন না, কেমন? আর হ্যাঁ, আপনাদের বসকে বলে দেবেন, সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি মেয়ে হলেও অবলা-অসহায় মেয়ে নয়। এর পর কাউকে পাঠাতে হলে যেন বড়ো দল পাঠান। এভাবে আপনাদের মতো দু-জনকে হাসপাতালে পাঠাতে আমার মিনিট কয়েকের বেশি সময় লাগে না। ফলে খেলাটা ঠিক জমল না।'
বলে অন্য লোকটির কাছে গিয়ে দাঁড়াল টাপুরদি। হাতের রিভলভারটা তার সামনে নাড়িয়ে বলল, 'আপনার এই খেলনাটা আমি রাখছি। লালবাজারে জমা করে দেব। আপনার বসকে বলবেন খুব দরকার থাকলে গিয়ে ছাড়িয়ে আনতে। এবার আপনারা আসুন। আমাদের ডিনারের সময় হল।'
কথাটা বলে রিভলভার দিয়ে দরজার দিকে ইশারা করল টাপুরদি। ঠিক সেই মুহূর্তে কলিং বেলটা বেজে উঠল। আমি গিয়ে দরজা খুললাম। পিৎজা ডেলিভারি বয় দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। আমার কাঁধের ওপর দিয়ে ঘরের ভেতর দৃষ্টি বুলিয়ে ছেলেটার চোখে ভয়ের অভিব্যক্তি খেলে গেল চকিতে। টাপুরদির হাতের রিভলভারটাও নজর এড়ায়নি তার। আমি নির্লিপ্ত মুখে খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখলাম। টাপুরদি বলল, 'এই যে আপনারা, আপনারা এবার আসুন। আমরা খাওয়া-দাওয়া করব এখন। আপনাদের অফার করতে পারলাম না, কারণ দুজনের মতো করেই অর্ডার দেওয়া হয়েছে।'
লোকদুটি পড়িমরি করে বিস্ময়ে প্রায় স্তব্ধ হয়ে যাওয়া পিৎজা ডেলিভারি বয়ের পাশ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল। লিফট আসার অপেক্ষা না করে সিঁড়ি দিয়েই নীচে নেমে গেল ওরা।
দরজা বন্ধ করে এসে দেখি টাপুরদি একটা গোলাপি রং-এর কাগজের টুকরোতে চোখ বোলাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলাম, 'এটা আবার কী?'
টাপুরদি কাগজটা আমার হাতে দিল। দেখলাম একটা বিল, কোনো পাইস হোটেলের, নাম লেখা আছে খোকনদার হোটেল।
'এটা কোত্থেকে এল?'
'লোকটার পকেট থেকে পড়েছে। ঠিকানাটা দেখ', বলল টাপুরদি।
'হলদিয়ার!'
'হুম!' টাপুরদিকে একটু অন্যমনস্ক দেখাল। বলল, 'তোর মনে আছে মিতুল, অর্জুন বলছিল হলদিয়া থেকে নবদিগন্তে ফোন করা হয়েছিল অনেকবার। এই হলদিয়া কানেকশনটাকে আর অবহেলা করা যাচ্ছে না।'
আমি বললাম, 'সে না হয় হল। কিন্তু অর্জুনদাকে জানানো দরকার যে এভাবে বাড়ির মধ্যে...'
'খবরদার যদি অর্জুনকে কিছু বলেছিস, মিতুল, খুব খারাপ হয়ে যাবে বলছি!' হুংকার করে উঠল টাপুরদি।
'কেন, বললে কী হয়? তুমি কিন্তু আজকাল অর্জুনদার কাছ থেকে কথা লুকোচ্ছ', আমিও গোঁয়ারতুমি ভরা গলায় বললাম।
'হ্যাঁ তুমি ওকে বলো, আর ও আবার আমার এই কেসে কাজ করা বন্ধ করার জন্য ঝগড়া শুরু করুক আর কী! অনেক কষ্টে বাগে এনেছি ওকে।'
'কী কী কষ্ট করলে বাগে আনার জন্য, বলো না?' চোখ টিপে মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি লাজুক মুখে বলল, 'মারব এক থাপ্পর! ভাগ।'
এই মুহূর্তে টাপুরদির লজ্জারাঙা মুখ দেখলে কে বলবে একটু আগে এ-ঘরেই সে দু-জন ষণ্ডাগোছের গুন্ডাকে ঠ্যাঙাচ্ছিল। হাসলাম আমি। টাপুরদি এরকমই, তাইতো এত ভালোবাসি ওকে।
সকালে ঘুম ভেঙেই খারাপ খবরটা পেলাম। মেগাসিটি মেডিকেল কলেজে জুনিয়র ডাক্তাররা বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে ধর্মঘটে বসেছে। সিনিয়র অনেক ডাক্তারও তাদের এই ধর্মঘটকে সমর্থন করছেন। টাপুরদি অন্ধকার মুখে টিভির পর্দায় সেঁটে ছিল। জিজ্ঞাসা করলাম, 'এবার?'
টাপুরদি টিভির পর্দা থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, 'অদ্বৈত মুখার্জি তাঁর চাল দিলেন।'
'মানে? বুঝলাম না!' বললাম আমি।
টাপুরদি সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজল। কিছুক্ষণ সেভাবেই রইল। তারপর চোখ খুলে বলল, 'ডক্টর মিত্রর হত্যারহস্যের ফাইল আপাতত কালের গর্ভে ঢুকে গেল। পুলিশ এখন মেডিকেল কলেজে ঢুকতেই পারবে না।'
'কিন্তু টাপুরদি', একটু দ্বিধান্বিত স্বরে বললাম আমি, 'অদ্বৈত মুখার্জি একজন আমলা, কোনো নেতা বা মন্ত্রী তো নন। তাহলে তিনি কীভাবে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এমন একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলতে পারবেন? তাঁর কথা জুনিয়র ডক্টররা শুনবেই বা কেন?'
টাপুরদি কয়েক মুহূর্ত আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, 'তোর বোধ হয় ধারণা নেই, এই আমলারা কতটা পাওয়ারফুল হন। সরকারের যাবতীয় নীতি-নির্ধারণ কিন্তু আমলারাই করেন। সরকারের কাজ হল সেটাকে জনতার সামনে সাজিয়ে-গুছিয়ে ডেলিভার করা। আমাদের দেশের বেশিরভাগ নেতা-মন্ত্রীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখে তোর মনে হয় এত বড়ো একটা দেশের বিভিন্ন দপ্তরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বুদ্ধি তাঁদের আছে? সে-সব কাজই করেন এই আমলারা। মন্ত্রীরা পুরোপুরিভাবে তাঁদের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং এই আমলাদের ক্ষমতা কম বলে ভাবিস না। অনেক নেতা-মন্ত্রীদের টিকি বাঁধা থাকে আমলাদের ঘরের খুঁটে। রাজনীতির অনেক গোপনীয়তার শরিক এঁরা। জুনিয়র ডাক্তাররা একজন আমলার কথা শুনবে না হয়তো। কিন্তু এমন কেউ যদি তাদের প্রোভোক করে, যাঁর কথা তারা শোনে, তাহলে?'
'কে? কার কথা বলছ?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'অখিল মিদ্যা', বলল টাপুরদি।
'নামটা চেনা চেনা লাগছে। কে এই অখিল মিদ্যা?'
'এই জন্য বলি, একটু খবরের কাগজ-টাগজ পড়', টাপুরদি হাই তুলে বলল।
'পড়ি তো, অনলাইন পোর্টালে', হেসে বললাম আমি।
'হুম, জানি তো! কোন হিরো কাকে ডাম্প করছে, কার সঙ্গে তার অ্যাফেয়ার চলছে, কোন হিরোইন কত উত্তেজক পোশাক পরে ইনস্টাতে ছবি পোস্ট করেছে, কোন নেতা বউকে ছেড়ে অন্য সুন্দরীর সঙ্গে লিভ ইন করে সঙ্গিনীকে সম্পত্তি লিখে দিচ্ছেন, এসব পড়িস তুই', বলল টাপুরদি।
আমি বললাম, 'আরে, বলো না বাবা, কে এই অখিল মিদ্যা?'
'ডক্টর ইউনিয়নের নেতা', বলল টাপুরদি, 'একজন এমএলএ।'
'রুলিং না অপোজিশন?'
'রুলিং', বলল টাপুরদি।
'কী করে বুঝলে এই অখিল মিদ্যাই আছে ধর্মঘটের পেছনে?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি বলল, 'বকবক না করে নিউজটা দেখলে তুইও বুঝতে পারতি। বোস এখানে, নিউজ দেখ। আমি ব্রেকফাস্ট বানিয়ে আনি।'
টাপুরদি রান্নাঘরে গেল। আমি টিভির পর্দায় চোখ রাখলাম। মেডিকেল কলেজ চত্বরে প্ল্যাকার্ড, সাইনবোর্ড নিয়ে জুনিয়র ডাক্তাররা বসে রয়েছে। তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কেউ কাজ করবে না তারা। স্টুডিয়োতে সঞ্চালিকা পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে খুব সিরিয়াস মুখ করে ঘটনার বিবরণ দিচ্ছেন। তারপর বললেন, 'আমরা কথা বলে নেব ডক্টর অখিল মিদ্যার সঙ্গে, যিনি জুনিয়র ডাক্তারদের এই ধর্মঘটকে সমর্থন করছেন। অখিলবাবু, আপনি আমাদের দর্শকদের বলবেন, কেন এই হঠাৎ ধর্মঘট?'
অখিল মিদ্যাকে দেখলাম। ষাটের নীচেই বয়স হবে। বেশ মোটাসোটা, ঘাড়ে-গর্দানে চেহারা। ঠোঁটের ওপর মোটা গোঁফে রূপোলি আভাস। দুই গালে মেচেতার দাগ। রক্তাভ চোখের দৃষ্টি অসম্ভব ধূর্ত। গম্ভীর মুখে তিনি বললেন, 'জুনিয়র ডক্টরদের এই ক্ষোভ আজকের নয়। তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অন্যায় করা হয়ে আসছে। তাদের ডিউটি আওয়ার্সের কোনো বাঁধা-ধরা লিমিট নেই। কখনো-কখনো চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি টানা কাজ করে যেতে হয় তাদের। তার ওপর রোগীর আত্মীয়রা মুমূর্ষু রোগী নিয়ে এসে আশা করেন ডাক্তার জাদুবলে তাকে সুস্থ করে তুলবেন। ডাক্তাররাও মানুষ, তারা কোনো জাদুকর নয়। রোগীর মৃত্যু হলে ডাক্তারদের সঙ্গে বেড়াল-কুকুরের চেয়েও খারাপ ব্যবহার করা হয়। রোগীর আত্মীয়দের হাতে মার খাওয়া তো জুনিয়র ডাক্তারদের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে গেছে।'
সঞ্চালিকা জিজ্ঞাসা করলেন, 'অখিলবাবু, ডাক্তারি পেশার দায়িত্ব তো অনেক বেশি। জুনিয়র ডাক্তাররা এভাবে কাজ বন্ধ করে বসে থাকলে রোগীদের কত অসুবিধে হবে, ভাবতে পারছেন! চিকিৎসার অভাবে কত গরিব মানুষ বিপদে পড়বে। এই সমস্যার নিষ্পত্তি তো সামনাসামনি বসেও শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে হতে পারে।'
'আলোচনা, অনুরোধ-উপরোধের জায়গা আর নেই। সেসব অনেক হয়েছে। কেউ কর্ণপাত করেনি। যান তো, মেডিকেল কলেজ হস্টেলের ভেতরের অবস্থাটা গিয়ে দেখে আসুন। দেখুন ওরা কীভাবে থাকে। যারা দিন-রাত মানুষের সেবার জন্য দেহক্ষয় করছে, তাদের কি সামান্য সুযোগ- সুবিধেটুকু প্রাপ্য নয়? আমি তো জুনিয়র ডাক্তারদের বলব না এই ধর্মঘট প্রত্যাহার করতে। তারা নিজেরা সিদ্ধান্ত নেবে কী করবে!'
'আপনি নিজে সরকারে ক্ষমতাসীন দলের একজন এমএলএ। এভাবে সরকারের দিকে আঙুল তোলা কি আপনার উচিত হচ্ছে?'
অখিলবাবু হাসলেন। বললেন, 'এই অখিল মিদ্যা কাউকে ভয় পায় না। দলের জন্য নয়, মানুষের জন্য কাজ করব বলে রাজনীতিতে এসেছি। দলের যদি আমাকে প্রয়োজন না থাকে তো রইল ঝোলা চলল ভোলা। আমার কিচ্ছু যায়-আসে না।'
টাপুরদি কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। এবার পেছন থেকে বলল, 'তা আর যাবে-আসবে কেন? ক-দিন ধরেই ফিসফাস চলছে অখিল মিদ্যা অপোজিশনের সঙ্গে গোপন মিটিং করছেন। ক-দিন আগেই দিল্লি পর্যন্ত গেছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গোপন বৈঠক সেরে এসেছেন।'
'তার মানে বলতে চাইছ, এটা বিরোধীদের ষড়যন্ত্র! এরকম একটা আনরেস্ট তৈরি করে রুলিং পার্টিকে বদনাম করা?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি হাসল। বলল, 'বিরোধীদের ষড়যন্ত্র কি না তা এখনও জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। তবে, এতে অখিল মিদ্যার অ্যাডভান্টেজ যে ষোলো আনা সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই।'
'কীভাবে?' জানতে চাইলাম আমি।
'এক ঢিলে দুই পাখি মারার মানে বুঝিস?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি, 'একটা সিঙ্গল স্টেপে নিজেকে রুলিং পার্টির এগেনস্টে গিয়ে নিজেকে বিরোধীদের কাছের লোক করে তোলার মধ্যে দিয়ে পলিটিকাল আখেরও গোছানও হল, আবার অরগ্যান ট্র্যাফিকিং চক্রকে মদত দিয়ে আর্থিক একটা দাঁও-ও মারা গেল। নট ব্যাড, অখিল মিদ্যা।'
'কিন্তু অখিল মিদ্যা সেটা কেন করবে, টাপুরদি?' জানতে চাইলাম আমি।
টাপুরদি টিভির দিকে চোখ রেখেই বলল, 'বিধানসভায় জিতে মন্ত্রিত্ব পাননি। সেই সময় থেকেই ফাটল ধরেছিল। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবারও করেছিলেন। কিন্তু মেগাসিটি মেডিকেল কলেজ সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ সিএম-এর কানে এসেছিল। ফলে তিনি ব্যাপারটা সুচতুরভাবে এড়িয়ে গেছেন। ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ তো ছিলই। এই অবস্থায় বিরোধী শিবিরে যোগ দেওয়ার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। রাজ্যে না সই, লোকসভা ভোটের পর একটা কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব, নিদেনপক্ষে প্রতিমন্ত্রিত্ব জুটে গেলেও যেতে পারে।
'কিন্তু তাতে অসুবিধে ছিল না। রাজনীতিতে দলবদল জামাকাপড় বদলের মতোই স্বাভাবিক ঘটনা। আদর্শের জন্য রাজনীতি করেন ক-জন? সেটা বড়ো কথা নয়। সমস্যা অন্য জায়গায়। আমার মন বলছে, মেডিকেল কলেজে এই আনরেস্ট সিচুয়েশনটা তিনি এই মুহূর্তে ইচ্ছে করে করেছেন। কারণ, যেসব দাবির জন্য এই ধর্মঘট, জুনিয়র ডাক্তারদের সেইসব সমস্যা আজকের নয়। আজ হঠাৎ করে রাতারাতি হরতাল করতে বসে যাওয়ার কারণ নেই। অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে সব। তাদের আবেগকে সুপরিকল্পিতভাবে অন্য উদ্দেশ্যে একটা অভিমুখে চালিত করা হচ্ছে। আর আমার যদি খুব ভুল না হয় মিতুল, তবে উদ্দেশ্যটা হল ডক্টর মিত্রর মৃত্যুর তদন্ত বন্ধ করা। অখিলবাবুও এই ক্ষেত্রে শতরঞ্জের বোড়ে। তাকে আর্থিক বা অন্য কোনো প্রলোভন দিয়ে কাজে লাগাচ্ছে অন্য কোনো আরও পাকা মাথা।'
'অদ্বৈত মুখার্জি?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'হতেই পারে!' বলল টাপুরদি।
'বাপ রে, কী সাংঘাতিক!' বললাম আমি।
টাপুরদি মুচকি হাসল। বলল, 'খেলা জমে উঠেছে।'
সারাদিন অফিসে ছিলাম। ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাড়াতাড়ি। কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে বোঝার চেষ্টা করলাম ক-টা বাজে। ঘরের ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মোবাইলের স্ক্রিনে ডিজিট্যাল ঘড়িতে দেখলাম রাত দেড়টা। গতকালের অভিজ্ঞতার কথা মনে করে বুক কেঁপে উঠল।
উঠে বাইরের ঘরে পৌঁছুলাম। টাপুরদিও ঘুমজড়ানো চোখে বেরিয়ে এসেছে দেখলাম।
'কে এল এত রাতে?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'দেখি দাঁড়া!' বলে এগিয়ে গিয়ে টাপুরদি দরজার আই-হোলে চোখ রাখল। আমি পেছন থেকে 'দরজা খুলো না' বলতে বলতে দরজাটা খুলে দিল টাপুরদি। দেখলাম উদভ্রান্ত ঝোড়ো কাকের মতো চেহারায় অর্জুনদা ঘরে ঢুকল।
'কাল তোমাদের উপর অ্যাটাক হয়েছিল, জানাওনি কেন?' কঠিন স্বরে বলল অর্জুনদা।
'তোমাকে কে বলল?' টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।
'আমাকে কে বলল, সেটা বড়ো প্রশ্ন নয়। তুমি আমাকে কেন বলোনি, সেটা জানতে চাইছি আমি। টাপুর, তুমি তোমার মতো করে এই কেসে কাজ করতে চেয়েছ। আমি তোমার ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়েছি। কিন্তু তুমি আমার ওপর এতটুকু ভরসা করতে পারলে না? এত বড়ো একটা ঘটনা হয়ে গেল, আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না তুমি?'
অর্জুনদা অনেক কথা বলে যাচ্ছে। টাপুরদি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এবার আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, 'শান্ত হয়ে ব'সো অর্জুনদা। আমার কথা শোনো। লোকদুটো এসেছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের ফেরত পাঠাতে আমাদের খুব বেশি সময় লাগেনি। তোমার চিন্তা হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্বাস করো, দুশ্চিন্তা করার মতো কিছু তেমন হয়নি।'
অর্জুনদা অন্ধকার মুখে সোফায় বসে আছে। আমি টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। মনে হল, ও আদৌ অর্জুনদার ক্ষোভ নিয়ে চিন্তিত নয়। অন্যমনস্কভাবে কী যেন ভাবছে।
এবার অর্জুনদার সামনে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসল। অর্জুনদাকে বলল, 'তাকাও এদিকে। আমাকে একটু বলো, আমাদের ওপর অ্যাটাক হয়েছে এ খবর তোমাকে কে দিল?'
'সেটা কি খুব জরুরি, টাপুর?' বিরক্তমুখে জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
'হ্যাঁ, জরুরি', কঠিন গলায় টাপুরদি বলল, 'তুমি বুঝতে পারছ না অর্জুন। এসব ওরা ইচ্ছে করে করছে। ওরা তোমাকে আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চাইছে।'
'হোয়াট রাবিশ!' বলল অর্জুনদা, 'তুমি লোকাল থানায় রিভলভার জমা দিতে গেছিলে আজ সকালে। সেটা রাত ন-টা নাগাদ কেস ফাইল সমেত হেড কোয়ার্টারে পৌঁছেছে। আমি আজ রাত পর্যন্ত অফিসে ছিলাম তোমারই কাজে। সারাদিন অফিসের হাজারও কাজে সময় হয় না। রাতে শোভন সেনের অ্যাক্সিডেন্টের ফাইল খুঁজে বের করার জন্য থেকে গেছিলাম। তখনই জানতে পারলাম।'
'সেটাই তো জানতে চাইছি আমি', বলল টাপুরদি, 'কী করে জানতে পারলে? সারা শহরের সব থানায় সারাদিনে যত এফআইআর লজ হয়, সব জানতে পারো তুমি? পারো না তো? তাহলে এই খবরটা কে তোমার কানে তুলে দিল, একটু মনে করে বলো প্লিজ!'
অর্জুনদার চোয়াল শক্ত হল। বলল, 'এই রাতবিরেতে তোমাকে জবাবদিহি করার জন্য আমি এখানে ছুটে এসেছি বলে তোমার মনে হয় টাপুর? এনিওয়ে, রেকর্ডরুম থেকে কেউ ফোন করেছিল। কে করেছিল, মনে নেই।'
'রেকর্ডরুম থেকে? কেন?' টাপুরদির ভুরুতে ভাঁজ পড়ল। বলল, 'মাথা ঠান্ডা করে ভেবে দেখো অর্জুন। কেউ এত রাতে রেকর্ডরুম থেকে কেন তোমাকে ফোন করে জানাবে? আমার ওপর অ্যাটাক হয়েছে সেটা তোমাকে জানানো প্রয়োজন বলে কারও কেন মনে হল? তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে সেটা কে কে জানে?'
অর্জুনদা বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে রইল টাপুরদির মুখের দিকে। টাপুরদি বলল, 'যে বা যারা চায় যে আমি এই কেস থেকে সরে যাই, তারা প্রথমে এই বাড়িতে গুন্ডা পাঠিয়ে আমাকে আটকাতে চেষ্টা করেছে। তারপর সেটা না পেরে তোমাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চেষ্টা করছে এখন। এর অর্থ, আমি ঠিক দিকে যাচ্ছি।'
'কেস কেস করে তোমার মাথাটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে টাপুর। ইউ নিড আ ব্রেক।' বলল অর্জুনদা।
টাপুরদি হেসে বলল, 'ব্রেক নেব তো। আগে এই কেসটা সলভ করে নিই আমরা। তারপর কোথাও বেড়াতে যাব সবাই মিলে। যাবে তো?'
অর্জুনদার মুখেও হাসি ফুটল এতক্ষণে। বলল, 'কোথায় যাবে, শুনি?'
টাপুরদি বলল, 'দেখা যাক। আগে কেস শেষ হোক, তারপর বলব।'
আমিও হেসে বললাম, 'আগে থেকে ব'লো টাপুরদি। ছুটির জন্য অ্যাপ্লাই করতে হবে।'
টাপুরদি অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে বলল, 'রাতে ডিনার করেছ তো?'
'হুম।' বলল অর্জুনদা।
'মিতুল একটু চা বানাবি রে?' টাপুরদি বলল।
আমি রান্নাঘরের দিকে এগোলাম।
সসপ্যানে চায়ের জল বসিয়ে বসার ঘরে এলাম। শুনি টাপুরদি জিজ্ঞাসা করছ, 'শোভনবাবুর কেসফাইল থেকে কিছু পেলে?'
অর্জুনদা মাথা নেড়ে বলল, 'তেমন কিছু না। সকালে বাজারে যাবেন বলে বেরিয়েছিলেন তিনি। বাজারের কাছাকাছি আসতে একটা ছোটো ট্রাক, যেগুলোকে ছোটো হাতি বলে, তার ধাক্কায় ছিটকে পড়ে যান। ড্রাইভারকে অ্যারেস্ট করা হয়েছিল। তার মতে শোভনবাবু নিজেই ট্রাকের সামনে এসে পড়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদেরও একই মত। শোভনবাবু রাস্তা ধরে যেতে যেতে হঠাৎ করেই ছুটে ট্রাকের সামনে চলে যান। ট্রাক ড্রাইভার বয়স্ক সর্দারজি। তিনি নিজেই তাঁকে ট্রাকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেছিলেন। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি।'
'সুইসাইড!' বলল টাপুরদি।
'হতে পারে!' অর্জুনদা বলল।
টাপুরদি বলল, 'আজ সকালে আমি শোভনবাবুর বাড়িতে গেছিলাম। তাঁর ছেলে বাড়িতে ছিলেন না। পুত্রবধূ জানালেন, মারা যাওয়ার আগ দিকে কিছুদিন ধরে কোনো অজ্ঞাত কারণে শোভনবাবু খুব টেনশনে ছিলেন। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছিলেন না। রাতে ঘুমোতেন না। তাঁর পুত্রবধূ বললেন, মারা যাওয়ার আগের রাতে বাথরুমে যাওয়ার জন্য উঠে তিনি শ্বশুরমশাইকে নিজের ঘরে পায়চারি করতে দেখেছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, কী হয়েছে? তাতে শোভনবাবু জানান, খুব বড়ো ভুল হয়ে গেছে। আর ফেরার উপায় নেই। বিড়বিড় করে বলছিলেন, তার জন্য বাকি সকলকে মরতে দেবেন না তিনি। আরও অনেক কিছু বলছিলেন। তাঁর পুত্রবধূ ঠিক বুঝতে পারেননি। তবে তাঁকে মানসিকভাবে সুস্থ বলে মনে হচ্ছিল না।'
'তার মানে তিনি টেনশনে ছিলেন?' ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
'সেটাই তো আমিও জিজ্ঞাসা করছিলাম ভদ্রমহিলাকে।' টাপুরদি বলল।
'তা তিনি কী বললেন?'
'বললেন, তিনি জানেন না। পরদিন সকালে নাকি শোভনবাবুকে অনেক সুস্থ লাগছিল। শোভনবাবু নিজে বাজারে যেতেন না, বরং তাঁর ছেলেই যেতেন। কিন্তু সেদিন সকালে নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে পুত্রবধূর কাছে বাজারের ব্যাগ চান। ভদ্রমহিলা ভেবেছিলেন, একটু বাইরে গেলে, চারজনের সঙ্গে গল্পগুজব করলে হয়তো একটু ভালো থাকবেন তিনি। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি, শ্বশুরমশাইয়ের মৃতদেহ ফেরত আসবে।'
রান্নাঘরে চায়ের জল গরম হয়ে গেছে। গ্যাসের নব বন্ধ করে টি-পটে চা-পাতা দিয়ে তাতে গরম জল ঢেলে ঢাকনা বন্ধ করে দিলাম। এখন কয়েক মিনিট ভিজবে এটা। বসার ঘরে ফিরে এসে শুনলাম টাপুরদি বলছে, 'শোভনবাবু নবদিগন্তের কমিটিতে থাকলেও খুব বেশি যেতেন না সেখানে। এমনকি কমিটিতে নিজের নামও রাখতে চাননি। পরে নেহাত বন্ধুকৃত্য করতেই দেবাশিসবাবুর অনুরোধেই তিনি কমিটিতে নিজের নাম রাখতে রাজি হয়েছিলেন।'
চায়ের পাতা ভিজে হালকা লাল রং ধরেছে, সুন্দর গন্ধ ছাড়ছে। তিনটে কাপে চা ঢেলে বসার ঘরে এসে সেন্টার টেবিলের ওপর রাখলাম।
চায়ের কাপ তুলে তাতে চুমুক দিয়ে অর্জুনদা বলল, 'মাঝরাতে এসে তোমাদের জ্বালাচ্ছি। এই চা-টুকুর খুব দরকার ছিল। যাই হোক, শোভনবাবুর বাড়ি থেকে এর বেশি আর কিছু জানা গেল না, তাইতো?''
টাপুরদি মুচকি হেসে বলল, 'না, আরও কিছু আছে। মারা যাওয়ার দিন সাতেক আগে থেকেই শোভনবাবু অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তারপর আগের দিন একটা ফোন এসেছিল তাঁর কাছে। সেই ফোনটা পাওয়ার পর তিনি কয়েকজনকে পরপর ফোন করেন। ফোনে রীতিমতো চ্যাঁচামেচি করছিলেন তিনি। তারপরে ফোন রেখে একদম চুপ হয়ে গেছিলেন।'
'কার ফোন?'
টাপুরদি বলল, 'শোভনবাবুর বউমা তাঁকে চা দিতে সেই সময় ঘরে গেছিলেন। তিনি শুনেছিলেন, শোভনবাবু কাউকে বলছেন, 'বিনয়কৃষ্ণ মেমোরিয়ালকে নিজের হাতে তৈরি করেছিলাম আমি। দু-দিনের ছোকরা সাগর দাশগুপ্তের এত সাহস আমাকে হুমকি দেয়! সব ফাঁস করে দেব, সবাইকে জেলের ঘানি টানতে হবে।' ফোন রাখার পর তাঁর বউমা জানতে চেয়েছিলেন, কী হয়েছে? শোভনবাবু কোনো উত্তর না দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন।'
'তার মানে শোভনবাবু নবদিগন্ত সম্পর্কে কোনো গোপন কথা জানতে পেরেছিলেন, যা বাইরে এলে সবাইকে জেলে যেতে হত। সাগর দাশগুপ্ত তাঁকে থ্রেট দিয়েছিলেন। শোভনবাবুও পুলিশকে সব জানাবেন বলে কাউকে হুমকি দিয়েছিলেন। আর তারপরেই রোড অ্যাক্সিডেন্ট। তাহলে কি দুর্ঘটনা নয়, খুন?' নিজের মনেই বলল অর্জুনদা।
'আত্মহত্যাও হতে পারে!' বলল টাপুরদি, 'হয়তো শোভনবাবুর মনে অনুশোচনা বা ভয় দানা বেঁধেছিল। হয়তো মনে হয়েছিল, তাঁর কারণে তাঁর পরিবারের বিপদ হতে পারে। হয়তো তাঁকে সেরকমই থ্রেট দেওয়া হয়েছিল। আবার মনের মধ্যে গোপন কথাগুলো চেপে রাখার অপরাধবোধও আর সহ্য করতে পারছিলেন না। অগত্যা...'
'এসব কথা তো ওদের ফ্যামিলির লোকেরা পুলিশকে জানাননি। জানালে কেস ফাইলে লেখা থাকত।' বলল অর্জুনদা।
'জানিয়েছিলেন', টাপুরদি বলল, 'অন্তত ওঁরা আমাকে তাই-ই জানিয়েছেন। পুলিশের ফাইলে যদি না থাকে তাহলে ধরে নিতে হবে ফাইলও ম্যানিপুলেট করা হয়েছে।'
'লালবাজারে? ইমপসিবল!' জোর দিয়ে বলল অর্জুনদা।
'এভরিথিং ইজ পসিবল ইন দিস কেস, অর্জুন। ভুলে যেয়ো না এই কেসে সব রাঘব-বোয়ালরা জড়িয়ে আছে। আর শেখর মজুমদার নিজে একজন আইপিএস ছিলেন। শেখর মজুমদারের মৃত্যুর ব্যাপারে কিছু জানতে পারলে?'
সাগর দাশগুপ্তকে কলকাতা পুলিশের তরফ থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লালবাজারে ডেকে পাঠানো হয়েছে। পারমিশনটা অর্জুন অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বের করেছে। সকাল সাড়ে দশটায় তাঁকে পুলিশ হেড কোয়ার্টারে হাজির হতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি এলেন পৌনে বারোটায়। দামি স্যুট পরনে, মুখে চ্যান্সেলর কোম্পানির ট্রেজারার সিগারেট। পোলারাইজড রেব্যানের সানগ্লাসটা খুলে খুব বিরক্ত মুখে পুলিশ স্টেশনে ঢুকলেন তিনি। সঙ্গে কালো কোটে একজন গম্ভীরমুখো উকিল সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। সিগারেটটা ফেললেন না সাগরবাবু। মনে হল, এখানে আবির্ভূত হয়ে কলকাতা পুলিশকে দয়া করেছেন তিনি।
কথোপকথন শুরু হয়েছিল খুব স্বাভাবিকভাবেই। সময় যত গড়াতে থাকল, ইন্টারোগেশন রুমের উষ্ণতার পারদ ততই চড়তে লাগল।
'নবদিগন্ত সেবাশ্রমের আড়ালে ট্র্যাফিকিং চলছিল, সেটা জানতেন তো আপনি?'
'অল রাবিশ! কীসের ট্র্যাফিকিং? কোনো প্রমাণ আছে?' রূঢ়ভাবে বললেন সাগর দাশগুপ্ত।
'প্রমাণ যা দেওয়ার কোর্টে দেব। আগে আপনি বলুন, নবদিগন্তে কবে থেকে এসব চলছে। এর পেছনে কে কে আছে?' অর্জুন কঠিন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল।
সাগরবাবুর ল-ইয়ার বললেন, 'আমার ক্লায়েন্ট এই প্রশ্নের উত্তর দেবেন না।'
অর্জুন: বেশ! দেবেন না উত্তর। বরং অন্য কথা জিজ্ঞাসা করি। শেখর মজুমদার মারা গেলেন কেমন করে? সেই সময় তো আপনি কলকাতাতেই ছিলেন।
সাগর: ছিলাম। জামাইবাবুর হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। ডেথ সার্টিফিকেটে দেখতে পারেন।
অর্জুন: হেলথলাইন হাসপাতালের ডেথ সার্টিফিকেট, তাইতো? যেখানে দেবাশিস মিত্র কাজ করতেন। কিন্তু একটা কথা বলুন, কার্ডিওলজিস্টের বদলে একজন গ্যাস্ট্রো সার্জেন কেন ডেথ সার্টিফিকেট দিলেন?
সাগর: সেটা তাঁকেই জিজ্ঞাসা করুন।
অর্জুন: সেটা তো আর সম্ভব নয়। আর তা ছাড়া খোঁজ নিয়ে জেনেছি, আপনি হেলথলাইন হসপিটালের একটা বেশ বড়োসড়ো শেয়ার হোল্ড করছেন।
সাগর: তাতে আপনার আপত্তি আছে?
অর্জুন (হেসে): নাহ, আপত্তি কীসের? কিন্তু হেলথলাইনের এগেনস্টে অনেকগুলো চার্জ আছে। যেমন ধরুন, ইচ্ছে করে পেশেন্ট ধরে রেখে বিল বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় অপারেশন করা, মৃত ব্যক্তির অপারেশন করা, লো গ্রেডের ওষুধ দেওয়া, যেগুলি কি না আপনার কোম্পানির, তারপর ধরুন, ভুয়ো রিপোর্ট তৈরি করে পেশেন্টকে হাসপাতালে ভরতি রাখা আরও অনেক কিছু। আপনাদের হাত অনেক লম্বা জানি, কিন্তু পুলিশ যদি সবগুলো ফাইল খুলে একে একে কেস সাজানো শুরু করে আপনি কিন্তু বেশ কয়েক বছরের জন্য ভেতরে যাবেন।
ল-ইয়ার: আমার ক্লায়েন্ট এ-বিষয়ে কিছু জানেন না। সব অভিযোগ মিথ্যা। আপনারা কেস সাজাতে পারেন, কোর্টে দেখা হবে।
অর্জুন: বেশ, কোর্টে দেখা হলে আমার কোনো অসুবিধে নেই। চার্জশিট তৈরি করার মতো এনাফ এভিডেন্স আমার কাছে আছে। কিন্তু মিস্টার দাশগুপ্ত, আপনার দিদি যদি জানতে পারেন যে শেখর মজুমদারের মৃত্যুর পেছনে আপনার হাত আছে, তিনি আপনাকে ক্ষমা করতে পারবেন তো?
সাগর দাশগুপ্ত একটা কথাও বললেন না। স্থির দৃষ্টিতে অর্জুনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
অর্জুন: না কি, মিসেস মজুমদারও ছিলেন আপনার সঙ্গে! রাইট, মিসেস মজুমদারের সায় না থাকলে ডক্টর মিত্র নর্মাল ডেথের রিপোর্ট দিতেনই না। আপনার দিদির সঙ্গে ডক্টর মিত্রর তো একটা অন্যরকম সম্পর্ক ছিল, তাই না?
সাগর (দাঁতে দাঁত চেপে): বাজে কথা।
অর্জুন: না, বাজে কথা নয়। আমরা শেখর মজুমদারের ডেথটা নিয়ে নতুন করে কেস ফাইল ওপেন করছি। তদন্ত হবে। এতদিন পরে, তাই সাক্ষীসাবুদ জোটাতে অসুবিধে হয়তো হবে। কিন্তু হয়ে যাবে, শিউলি দেবী আছেন। শত হলেও নিজের স্বামী বলে কথা!
সাগর: দিদিকে ডিস্টার্ব করবেন না। ও এমনিতেই ডিপ্রেশনের রোগী। তার ওপর ইদানীং ওর সমস্যাটা আরও বেড়েছে। যা জিজ্ঞাসা করার আমাকে করুন।
অর্জুন: সেটাই তো স্বাভাবিক। ডক্টর মিত্রর মৃত্যুর পর শিউলি দেবী যে ডিপ্রেসড হয়ে যাবেন, সেটা খুব স্বাভাবিক। যাই হোক, এবার বলুন তো, শোভন সেন মারা যাওয়ার কদিন আগে আপনি তাকে ফোন করে থ্রেট দিয়েছিলেন। কেন?
সাগর (খুব অবাক হয়ে): থ্রেট! আমি কেন থ্রেট দিতে যাব?
অর্জুন: দিয়েছিলেন, দিয়েছিলেন। মনে করে দেখুন। শোভনবাবুর পুত্রবধূ ফোনে কথোপকথন শুনেছিলেন।
সাগর: মিথ্যে কথা, আমার ফোন রেকর্ড চেক করতে পারেন।
অর্জুন: লাভ নেই। শোভনবাবুর কাছে সেই রাতে যে ফোনটা এসেছিল, তার নম্বর এনক্রিপ্টেড। কিন্তু তারপরেই তিনি যে নম্বরে ফোন করেছিলেন, সেটা আমাদের কাছে আছে। সেই নম্বর দেবাশিস মিত্রর। তাঁকে ফোন করে শোভন সেন জানিয়েছিলেন যে আপনি তাঁকে থ্রেট করেছেন।
সাগর: আমি কোনো ফোন করিনি। সব মিথ্যে।
অর্জুন: আপনার ফ্যাক্টরিতে জাল ওষুধ তৈরি, সাক্ষীর রহস্যজনক মৃত্যু, একাধিক প্রাইভেট হাসপাতালের সঙ্গে আপনার বে-আইনি লেনদেন, সরকারি টেন্ডার পাওয়ার জন্য মন্ত্রীকে ঘুষ দেওয়া সেসবও মিথ্যে? কেস কোর্টে উঠলে কিন্তু বিজনেসের পাস্ট রেকর্ডের খাতা সবার সামনে খুলবে। কোর্ট কেস বছরের পর বছর গড়াবে। আপনার উকিল পকেটে টাকা ভরে বড়োলোক হবে। আর আপনার বদনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। মিডিয়া, প্রেস আপনাকে নিয়ে রসালো খবর করবে। আপনার কোম্পানির শেয়ার মূল্যে ধস নামবে। আপনার এতদিন ধরে গড়ে তোলা বিজনেস এম্পায়ার ধুলোয় মিশে যাবে।
ল-ইয়ার: আপনি আমার ক্লায়েন্টকে এভাবে থ্রেট করতে পারেন না।
অর্জুন (খুব রেগে গিয়ে): চুপ করুন। আমি সব করতে পারি। আরও এমন অনেক কিছু করতে পারি যা আপনি ভাবতেও পারেন না। সবার আগে পুলিশি তদন্তে বাধা দেওয়ার জন্য আপনাকে জেলে পুরতে পারি।
সাগর দাশগুপ্ত (গম্ভীর মুখে): কী জানতে চান বলুন?
অর্জুন: সবার আগে বলুন রাঘব সামন্ত কে?
'লোকটা কী বলল, রাঘব সামন্ত আসলে কে?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
অর্জুনদা মাথা নাড়ল। বলল, 'বলছে জানে না। সাগর দাশগুপ্তর বক্তব্য সত্যি বলে মানলে ধরে নিতে হয়, শেখর মজুমদার ছাড়া আর কেউ জানত না রাঘব সামন্ত আসলে কে? নবদিগন্ত ট্রাস্ট যখন বিনয়কৃষ্ণ মেমোরিয়াল হোমকে টেক ওভার করে, তখন পরিকল্পনা থেকে শুরু করে পুরো প্রসেসটাই শেখর মজুমদার একা হাতে সামলেছিলেন।'
টাপুরদি চিন্তিত মুখে বলল, 'হুম, কিন্তু তিনি নিজে কমিটিতে থাকলেন না। কেন?'
অর্জুনদা বলল, 'কে জানে! আচ্ছা, রাঘব সামন্ত নামে আদতে কেউ আছে তো? এমন তো নয় যে শেখর মজুমদার নিজেই রাঘব সামন্ত নাম নিয়ে সাইন করেছিল?'
টাপুরদি বলল, 'হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে অন্য একটা প্রশ্ন তৈরি হয়। শেখর মজুমদার মারা গেছেন দুই হাজার কুড়ি সালে। তাহলে তারপর নবদিগন্তের ভেতর থেকে কে এই অবৈধ ট্র্যাফিকিংকে অপারেট করছে? শোভনবাবু কিছু জানতে পেরেছিলেন। ডক্টর মিত্রকে হত্যা করার প্ল্যানটা কার? এখন ওই হোমের কমিটি মেম্বারদের মধ্যে বেঁচে আছেন তিনজন। এমএলএ মশাই, শিউলি মজুমদার ও সাগর দাশগুপ্ত। সত্যব্রত মল্লিকের কথা অনুসারে শিউলি মজুমদারের সঙ্গে ডক্টর মিত্রর অন্যরকম সম্পর্ক ছিল। সব কেমন ঘেঁটে যাচ্ছে, অর্জুন। তবে কেউ তো আছে। এমন কেউ নিশ্চয়ই আছে যে এইসব পরিচালনা করছে। নবদিগন্ত থেকে হিসেব মতো ছয়জন হারিয়েছে, গত ছ-মাসে তিনজন। আসল সংখ্যাটা হয়তো আরও অনেক বেশি। কিন্তু আমার ধারণা যদি ঠিক হয়, এই ব্যাবসাটা নবদিগন্তের বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়ানো। সেক্ষেত্রে আমার বেশি কিছু করার নেই। যা করার তোমাদেরই করতে হবে।'
অর্জুন মাথা নাড়ল। বলল, 'এই কেস যতটা কলকাতা পুলিশের কেস, ততটাই তোমারও। তুমি প্রথম থেকে এই কেসের সঙ্গে আছ। যে যাই বলুক, মাঝ পথে 'আমি নেই' বললে চলবে না।'
'বলছ?' টাপুরদি হেসে বলল।
'বলছি।' হাসল অর্জুনদাও।
টাপুরদি মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে বলল, 'দাঁড়াও, সুদর্শনবাবুকে একটা ফোন করি।'
ফোনটা স্পিকারে দিল টাপুরদি। বার দুয়েক রিং হওয়ার পরই ফোন ধরলেন সুদর্শনবাবু, 'বলো মিস ডিটেকটিভ, কী খবর? অদ্বৈতকে ঝেড়ে এসেছ শুনলাম। সে কিন্তু সিএম-এর কাছে তোমার নামে কমপ্লেইন করবে, তৈরি থেকো।'
হাসল টাপুরদি। বলল, 'সে আমি জানি। সেজন্যই আপনাকে ফোন করা। আমার ধারণা, ডক্টর মিত্রর ডেথটা নিয়ে তদন্ত বন্ধ করার জন্যই অদ্বৈতবাবু ভেতরে ভেতরে কলকাঠি নেড়ে জুনিয়র ডাক্তারদের ধর্মঘট করিয়েছে।'
'এ কথা তুমি কীভাবে বলতে পারো?' সুদর্শনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন।
টাপুরদি বলল, 'আমি শিওর নই স্যার। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে অখিল মিদ্যা আর অদ্বৈত মুখার্জির মধ্যে একটা অশুভ আঁতাত তৈরি হয়েছে। আমি এই ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখতে চাই।'
'ডোন্ট বি সো এক্সাইটেড ইয়ং লেডি', ফোনের অপর প্রান্ত থেকে মৃদু হাসির শব্দ শোনা গেল, 'তুমি কী বলছ, ভেবে বলছ? অদ্বৈত একটু রগচটা বটে, আগে যেসব জায়গায় পোস্টিং ছিল সেখানে রেকর্ড খুব একটা ক্লিয়ার নয়, তবু ও এই ধরনের বিজনেসে জড়াতে পারে আমার বিশ্বাস হয় না। এনিওয়ে, এমনিতেই পরিস্থিতি খুব উত্তপ্ত হয়ে আছে। যদি তোমার সন্দেহ সত্যিও হয়, সেক্ষেত্রেও আমাদের খুব সাবধানে এগোতে হবে। কারণ, তোমার ধারণা অনুসারে যারা এর পেছনে আছে, বেগতিক দেখলে তারা ঝামেলাটা আরও বেশি করে পাকিয়ে তুলবে যাতে করে তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়।'
'বুঝতে পারছি স্যার!' বলল টাপুরদি।
সুদর্শনবাবু বললেন, 'সিএম দিল্লি থেকে ফিরবে আর দু-দিন পর। এখানকার সব রিপোর্টই ওঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। মেডিকেল কলেজের ইস্যু নিয়েও সিএম খুব চিন্তিত। কিন্ত পরশু সকালে প্রধানমন্ত্রীর ডাকা একটা সর্বদলীয় বৈঠকে ওঁকে থাকতেই হবে। তাই ফিরতে পারছেন না। মিটিং শেষ করেই ফ্লাইট ধরবেন তিনি। জুনিয়র ডক্টরদের সঙ্গে নিজে কথা বলবেন। আজ সকালেই কথা হল। তিনি বলেছেন মেডিকেল কলেজে যে-কোনো মুহূর্তে বড়ো রকম অশান্তি হতে পারে। ওখানে হাই স্ট্রেংথের পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করতে হবে। তাই এই মুহূর্তে আমরা কোনোরকম রিস্ক নিতে পারব না। আপাতত মেডিকেল কলেজের অশান্তি রোখাই পুলিশের প্রায়োরিটি।'
টাপুরদি বলল, 'তাহলে আমাকে কি তদন্ত বন্ধ করে দিতে বলছেন?'
সুদর্শনবাবু একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, 'না, তোমার তদন্ত তুমি চালাও। মনে রেখো অদ্বৈত একজন উচ্চপদস্থ আমলা। তার এগেনস্টে স্ট্রং প্রূফ ছাড়া আমরা কোনো অ্যাকশন নিতে পারব না। সুতরাং তুমি প্রমাণ খুঁজে এনে দাও আমায়। আই প্রমিজ ইউ, দ্য ক্রিমিনাল উইল ফেস হিজ ওন ফেট। তবে যা করবে সাবধানে করবে। নিজের সেফটির দিকে খেয়াল রাখবে। টাইম টু টাইম আমাকে রিপোর্ট করবে। অ্যান্ড ডোন'ট হেজিটেট টু আস্ক ফর এনি হেল্প। ওকে?'
'ওকে স্যার', হেসে বলল টাপুরদি, 'থ্যাংক ইউ সো মাচ!'
ফোনটা রেখে আমাদের দিকে তাকাল টাপুরদি। অর্জুনদা বলল, 'তাহলে এখন কী করবে?'
টাপুরদি বলল, 'অনেক কাজ। হাতে সময় কম। একবার মৃণালবাবুর বাড়ি যাব আজ-কালের মধ্যে। অম্লানবাবুর মুখে শুনলাম মৃণালবাবু অসুস্থ, ক্যানসারের লাস্ট স্টেজ। তবে তার আগে আর-একবার শিউলি দেবীর সঙ্গে কথা বলতে হবে। ভদ্রমহিলা অনেক গোপন কথা হজম করে বসে আছেন। তুমি যাবে, অর্জুন?'
অর্জুনদা কবজি উলটে ঘড়ি দেখে বলল, 'যাওয়া যেতে পারে। হাতে দু-ঘণ্টা সময় আছে এখন।'
'চলো তবে। মিতুল, তুই যাবি?'
'অফিস আছে। তবে যাব, গাড়িতে যেতে যেতে একটা কল নিয়ে নিই বরং!'' বললাম আমি।
আগের দিন শিউলি মজুমদারকে যেমন দেখেছিলাম, আজ একদম অন্যরকম লাগল। তাঁকে দেখে খুব ক্লান্ত, অবসন্ন মনে হচ্ছিল। আজ মুখে একটুও প্রসাধন নেই। সাধারণ সুতির চুড়িদার পরে আছেন। আমাদের সঙ্গে ইউনিফর্মে অর্জুনদাকে দেখে চকিতে একটা আতঙ্কের অভিব্যক্তি খেলে গেল।
'আপনারা! বলেননি তো আসবেন?'
অর্জুনদা কিছু বলতে যাচ্ছিল, টাপুরদি তাকে থামিয়ে নরম কণ্ঠে বলল, 'হঠাৎই চলে এলাম। আপনাকে ফোন করার সময় পাইনি। কেমন আছেন?'
শিউলি দেবী চোখ নামিয়ে সংক্ষেপে বললেন, ''ভালোই তো!''
টাপুরদি রবাহূত হয়েই সোফায় গিয়ে বসল। দেখাদেখি আমরাও বসলাম। অগত্যা শিউলি দেবীও যেন কিছুটা অনিচ্ছা সহকারেই সামনের সোফা- চেয়ারটাতে বসলেন কোলের ওপর দুই হাত জড়ো করে।
টাপুরদি একটু গলা খাঁকরে বলল, 'আপনার কাছে কিছু কথা জানতে চাইব, মিসেস মজুমদার। উত্তর দেওয়া না দেওয়া আপনার মর্জি। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনি যথেষ্ট বিপদের মধ্যে আছেন। উত্তরগুলো দিলে আপনার আখেরে ভালোই হবে।''
শিউলি দেবী একবার চোখ তুলে আবার নামিয়ে নিলেন। বললেন না কিছু।
'ডক্টর মিত্রকে আপনি কবে থেকে চিনতেন?'
শিউলি দেবী বললেন, 'প্রায় কুড়ি বছর আগে থেকে। আমার একটা গল ব্লাডার স্টোনের অপারেশন করেছিলেন তিনি। সেই থেকে পরিচয়। পরবর্তীতে আমাদের পরিবারের সঙ্গে বেশ সখ্য গড়ে উঠেছিল।'
'নবদিগন্তের কথা তিনিই আপনাদের বলেছিলেন। তাই তো?'
সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন শিউলি দেবী।
'তারপরেই আপনারা হোমটা নিজেদের ট্রাস্টের আন্ডারে টেক ওভার করার কথা ভাবেন?''
'না', বললেন শিউলি দেবী, ''ডক্টর মিত্র ক্যাজুয়ালি বলেছিলেন। সেটা আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিল। কিন্তু দিন কয়েক পরে আমার হাজব্যান্ডই প্রস্তাবটা দিলেন। আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম। কারণ তার আগে পর্যন্ত আমার নবদিগন্ত এনজিও-র কাজ খুব কম পরিসরেই হত। নেহাত শখে করা বলতে পারেন। হঠাৎ হোম টেকওভারের কথা শুনে একটু অবাক হয়েছিলাম। কারণ সেটা অনেক খরচের ব্যাপার। শেখরকে জিজ্ঞাসা করতে ও বলেছিল, কোনো অসুবিধে হবে না। একজন ইনভেস্টর আছেন। তিনিই ইনভেস্ট করবেন।'
'আপনি জানতে চাননি যে কেন কেউ ইনভেস্ট করবেন? তাঁর স্বার্থ কী?' অর্জুনদা এবার জিজ্ঞাসা করল।
শিউলি দেবী মাথা নিচু করে বললেন, 'জানতে চেয়েছিলাম। ও বলল,সেসব নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে না। যিনি ইনভেস্ট করছেন, তিনি গভর্নমেন্ট গ্রান্ট পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন। গ্রান্টের টাকা আসতে শুরু করলেন হোমের রোজগার অনেক বেড়ে যাবে। তখন আর কোনো ইনভেস্টরের দরকার পড়বে না।'
'হোম তো আপনার নামে?' টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।
'হ্যাঁ, কারণ শেখর গভর্নমেন্ট এমপ্লয়ি ছিল। নিজের নাম হোমের সঙ্গে তাই ও অ্যাসোসিয়েট করতে চায়নি।'
টাপুরদি একটু ভাবল। তারপর বলল, 'এবার একটা অন্য প্রশ্ন করছি। ভেবে উত্তর দেবেন।'
শিউলি দেবী চোখ তুলে তাকালেন।
'শেখরবাবুর মৃত্যুটা কি স্বাভাবিক ছিল বলে মনে করেন আপনি?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
শিউলি দেবী অস্বাভাবিক জোর দিয়ে বললেন, 'অফকোর্স, রাতে খেয়ে উঠে শুয়েছিল ও। ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক হয়।'
'শেখরবাবুর কি আগে থেকেই হার্টের সমস্যা ছিল?'
'হ্যাঁ, ছিল। বেশ কয়েক বছর ধরেই ছিল সমস্যাটা। সে জন্য ও নিয়মিত ওষুধও খেত।' বললেন শিউলি দেবী।
'আচ্ছা, তারপর বলুন', টাপুরদি বলল।
'তারপর আর কী বলব। ওকে ওই অবস্থাতেই হাসপাতালে নিয়ে গেলাম তড়িঘড়ি। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরেও বেঁচে ছিল ও। ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। হার্ট পাম্প করা হয়। কিন্তু লাভ হয়নি। সেখানে ডাক্তার, নার্সদের চোখের সামনে মারা গেছে শেখর।'
'ডক্টর মিত্র, তাই তো?' ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
'হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে? কী বলতে চাইছেন আপনি?' রুক্ষস্বরে বললেন শিউলি দেবী।
টাপুরদি বলল, 'তেমন কিছু হয়নি। আপনার বাড়ি থেকে হেলথ লাইন হাসপাতালের দূরত্ব উনিশ কিলোমিটার। এর মাঝখানে আরও দুটো হাসপাতাল ছিল। আপনি তাঁকে সেখানে না নিয়ে অত দূরের হাসপাতালে নিয়ে গেছিলেন কেন?'
শিউলি দেবী চুপ করে রইলেন। মনে হল মনের মধ্যে উত্তর হাতড়াচ্ছেন তিনি। তারপর বললেন, 'হেলথ লাইন বড়ো প্রতিষ্ঠান। সেখানে ভালো ডাক্তাররা আছেন। আপনার বাড়িতে কারও শরীর খারাপ হলে আপনি তো তাকে বেস্ট ট্রিটমেন্টই দিতে চাইবেন, তাই না?'
টাপুরদি বলল, 'অবশ্যই চাইব। কিন্তু যখন প্রতিটা মুহূর্ত ইম্পর্ট্যান্ট, আমি প্রথমে তার প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করব। সে বিপন্মুক্ত হলে তারপর ভালো জায়গায় শিফট করব। সবাই সেটাই করে।'
'আমি সেই মুহূর্তে সেটা ভালো বুঝেছি সেটাই করেছি। ভুলে যাবেন না শেখর আমার হাসব্যান্ড ছিল। ওকে হারিয়ে সবচেয়ে ক্ষতি আমারই হয়েছে', তেরিয়া গলায় বললেন শিউলি দেবী।
অর্জুনদা বলল, 'ডক্টর মিত্রর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা আমাদের কানে এসেছে।'
আমাদের খুব অবাক করে অর্জুনদাকে থামিয়ে দিয়ে শিউলি দেবী সহজ কণ্ঠে বললেন, ''কী কথা? আমাদের মধ্যে প্রেম ছিল?''
আমরা তিনজনেই চুপ করে রইলাম। শিউলি দেবী বিষণ্ণ হাসলেন। বললেন, 'দেবাশিসদা আমার থেকে প্রায় বারো বছরের বড়ো ছিলেন। তবু অস্বীকার করব না, ওঁকে ভালো লাগত আমার। শেখর বলেছিল, হোমটা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত দেবাশিসদাকে একটু খাতির-যত্ন করতে। আমি আপত্তি করিনি। সেই সময়েই মানসিকভাবে কাছাকাছি এসেছিলাম দু-জনে। একে অন্যায় বললে অন্যায়। কিন্তু শেখর আমায় সময় দিতে পারত না। বয়সেরও অনেকটাই পার্থক্য ছিল আমাদের। দাম্পত্যে কোনো সমস্যা না থাকলেও রসায়নটা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। আমি ডিপ্রেশন আর একাকিত্বে তলিয়ে যাচ্ছিলাম। অথচ দেখুন, দেবাশিসদাও তো কত বড়ো ছিলেন আমার চেয়ে, তবু আমার দেবাশিসদাকে ভালো লাগত। সে-কথা নিজের মনের কাছে অস্বীকার করি কী করে, বলুন তো?'
'আর আপনার স্বামী? তিনি জানতেন?' টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।
'আমার স্বামী!' হাসলেন শিউলি মজুমদার, 'শেখর নিজের প্রয়োজনে আমাকে দেবাশিসদার দিকে ঠেলেছিল। তারপর যখন টের পেল আমি দেবাশিসদার প্রতি দুর্বল, আমার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছিল, জানেন? তখন নবদিগন্তের সইসাবুদ সব হয়ে গেছে। দেবাশিসদা, শোভনবাবু আর সত্যব্রতবাবুকে আমাদের বাড়িতে নেমন্তন্ন করলাম। রাঘব সামন্তর ব্যাপারেও জিজ্ঞাসা করলাম শেখরকে। ও বলল, তিনি আসবেন না। যাই হোক, তিনজন বাড়িতে এলেন। আমি রান্নাঘরে অতিথিদের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করছিলাম। দেবাশিসদা রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলছিলেন আমার সঙ্গে। শেখর অতিথিদের সকলের সামনে দেবাশিসদাকে অপমান করল, সঙ্গে আমাকেও। দেবাশিসদার মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। শেখর চিৎকার করে তাঁকে বলল নবদিগন্তের কমিটি থেকে রিজাইন করতে। দেবাশিসদা কোনো কথা না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছিলেন সেদিন। আমি বুঝলাম শেখরের কাছে দেবাশিসদার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এই হল আমার পরকীয়ার গল্প, যা আপনারা বাইরের লোকের মুখ থেকে শুনে এসেছেন। কাউকে ভালো লাগা নিশ্চয়ই দোষের নয়? শেখরের মৃত্যু নিয়ে দেবাশিসদাকে সন্দেহ করলে ভুল করবেন আপনি।'
'আগের দিন বলেছিলেন, নবদিগন্তের আড়ে চলা অবৈধ চোরাচালান সম্পর্কে জানতেন না আপনি। কিন্তু শেখরবাবুর অবর্তমানে আপনি কি নিজের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন?' টাপুরদি বলল।
শিউলি দেবীর চোয়াল শক্ত হল এবার। বললেন, 'আমি জানি না, আগেও বলেছি, এখনও বলছি। আমি বা আমার ভাই কেউ কিছু জানি না। শেখরের মৃত্যুর পর থেকে হোম সম্পর্কে আমার আর ইন্টারেস্ট ছিল না। দেবাশিসদা হোমের কাজকর্ম দেখত। তাঁর অবর্তমানে হোমের কী হবে আমি জানি না। চাইলে রাঘব সামন্তকে জিজ্ঞাসা করুন।'
'রাঘব সামন্ত নামে আদৌ কি কেউ আছেন?'
শিউলিদেবী মাথা নিচু করে বললেন, 'আমি জানি না। সাগরও জানে না।'
'আপনি আপনার কথা বলুন। আপনার ভাইকে যা জিজ্ঞাসা করার করা হয়েছে। প্রয়োজনে আবারও করা হবে। একবার প্রূফ হাতে পেলে আপনারা কেউ বাঁচবেন না। তাই বলব, পুলিশের সঙ্গে কো-অপারেট করুন।' বলল অর্জুনদা।
শিউলি দেবী অর্জুনদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, 'আমার শরীর ভালো নেই। আমি একটু বিশ্রাম নেব এখন। আপনাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে এখন আসুন।'
শিউলি দেবীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে অর্জুনদার গাড়িতে উঠলাম আমরা। অর্জুনদা ড্রাইভ করছে।
'কী মনে হল টাপুরদি? শিউলি দেবী তো বলছেন কিছুই জানেন না।' বললাম আমি।
টাপুরদি বলল, সবাই যে একেবারে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির, জিজ্ঞাসা করা মাত্রই গড়গড়িয়ে সব সত্যি কথা বলে দেবে, এমনটা না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।'
'মানে তিনি মিথ্যে বলছেন?'
'উনি জানতেন আমরা তাঁর ব্যাপারে অনেক কিছু জেনে এসেছি। সাগর দাশগুপ্তের ইন্টারোগেশন সম্পর্কেও জানেন। তাই হয়তো যেটুকু আমরা জানি, সেটুকুই আমাদের সামনে আর একটু সাজিয়ে-গুছিয়ে বলে ভিকটিম প্লে করলেন, যাতে আমরা বিশ্বাস করি যে তিনি সত্যিই কিছু জানতেন না; শেখর মজুমদার তাঁকে ব্যবহার করেছেন। তবে একটা ব্যাপারে আমার খটকা লাগছে', বলল টাপুরদি।
'কী ব্যাপার?'
'শিউলি দেবী বললেন তিনি দেবাশিসবাবুর প্রতি দুর্বল ছিলেন। কিন্তু কেন বললেন? এসব কি কাউকে বলার কথা?'
অর্জুনদা চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছিল। এবার মুচকি হেসে বলল, 'ও তুমি বুঝবে না।'
'কী বুঝব না?' ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
অর্জুনদা রাস্তায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করেই বলল, 'প্রেমের চরিত্রই এই যে সকলকে ডেকে বলতে মন চায়, দেখো আমি ভালোবাসি। এতদিন নিজের মনের মধ্যে কথাগুলো চেপে রেখেছিলেন শিউলি দেবী। এখন দেবাশিসবাবুর মৃত্যুর পরে হয়তো কষ্ট পাচ্ছেন। গোপনীয়তার ওজন কখনো কখনো খুব বেশি হয়। একা বইতে কষ্ট হয়। যাই হোক, মিতুলকে অফিসে নামিয়ে আমি অফিস যাব। তুমি বাড়ি যাবে তো টাপুর?'
টাপুরদি বাইরের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছিল। এবার অর্জুনদার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, 'তোমরা কেসটা নিয়ে কতটা এগোলে, অর্জুন?'
অর্জুনদা বলল, 'প্রতিটা টোলে অ্যালার্ট করা হয়েছে। সাগর দাশগুপ্তর ইন্টারোগেশনের ব্যাপারে তো তোমাকে আগেই বলেছি। তিনি জানিয়েছেন, হোমের ইনভেস্টরের নাম তিনি না জানলেও শেখর মজুমদার একদিন মদের ঘোরে বলেছিলেন যে রাঘব সামন্ত গভীর জলের মাছ। সাগর দাশগুপ্ত জানতে চেয়েছিলেন, তিনি যে হোমে ইনভেস্ট করছেন তাতে তাঁর স্বার্থ কী? তাতে শেখর মজুমদার বলেন, এরকম অনেক হোমের পেছনে টাকা ঢালেন রাঘব সামন্ত। আর কয়েক গুণ টাকা রিটার্ন পাবেন জেনেই ঢালেন। এই হোম থেকে তাঁরা নিজেরাও অনেক রোজগার করতে পারবেন। আর সেটাই সত্যি হয়েছিল। মাসে মাসে একটা মোটা অঙ্কের টাকা সাগর দাশগুপ্তের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যেত। তিনি অনেকবার জিজ্ঞাসাও করেছিলেন শেখরবাবুকে যে এই টাকা কোথা থেকে আসছে? তাতে শেখরবাবু বলেন, সাগরবাবু যেন লাভের গুড় খান, খেজুর গাছের খবর জানার চেষ্টা না করেন।'
টাপুরদি বলল, 'টাকা ভালোই রোজগার হচ্ছিল। শেখর মজুমদার প্রি-ভলান্টারি রিটায়ারমেন্টও নিয়ে নিয়েছিলেন।' কিন্তু ভোগ করতে পারলেন না। তিনি মারা গেলেন বা মেরে ফেলা হল।'
অর্জুনদা বলল, 'হুম।'
টাপুরদি বলল, 'শোভনবাবু কোনোভাবে সব জেনে গেছিলেন। তাকে থ্রেট দেওয়া হল। হত্যা করা হল, অথবা এমনভাবে ভয় দেখানো হল যে আত্মহত্যা করলেন তিনি। তারপর দেবাশিসবাবুকেও সরিয়ে দেওয়া হল। সেদিন হেলথলাইনে দেবাশিসবাবুর চেম্বারে লোকটা তাঁকে হুমকি দিচ্ছিল। সম্ভবত দেবাশিসবাবু সব জেনেও বেরিয়ে আসতে পারছিলেন না। মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারপর যখন তদন্ত শুরু হল, রাঘব সামন্ত ভয় পেল দেবাশিসবাবু সব বলে দিতে পারেন। তাঁকেও সরিয়ে দেওয়া হল।'
'তাহলে শিউলি দেবী, সাগর দাশগুপ্ত ও সত্যব্রত মল্লিক এখনও দিব্যি বেঁচেবর্তে আছেন কী করে?' জানতে চাইলাম আমি।
টাপুরদি বলল, 'এর দুটোই কারণ হতে পারে। এক, তাঁরা সত্যিই জানেন না রাঘব সামন্ত কে? দুই, রাঘব সামন্ত বলে সত্যিই কেউ নেই। এঁদের মধ্যে একজন এই চক্রের কিং পিন।'
আমি বললাম, 'সেটা হতেই পারে টাপুরদি। কারণ, শেখর মজুমদার মারা গেছেন এক বছর আগে। তার পরেও হোমের কাজকর্ম চলছে, ছেলে পাচারও চলছে। কেউ যদি হোমের ব্যাপারে কোনো খবরই না রাখে তাহলে এটা সম্ভব নয়। হোমের মধ্যেকার কেউ না কেউ তো জড়িত আছে এই চক্রে।'
'ঠিক বলেছিস।' বলল টাপুরদি।
ক্লাস শেষ করে বারান্দায় পা রাখতেই পকেটে মোবাইল ফোনের কাঁপুনি টের পেল উত্তীয়। আজকাল ঘন ঘন থ্রেটকল আসছে তার কাছে। দিন তিনেক আগে কয়েকজন গুন্ডা মতোন লোক ইউনিভার্সিটি চত্বরে এসেছিল শাসাতে। ওরা উত্তীয়র জনপ্রিয়তা সম্পর্কে আন্দাজ পায়নি। ছাত্ররা রে রে করে ছুটে আসায় ল্যাজ তুলে পালাতে বাধ্য হয়েছে। তবে ফোন আসা বন্ধ হয়নি। এসব কথা সঙ্ঘমিত্রাকে বলেনি উত্তীয়। দরকার কী! ও এমনিতেই অনেক করছে। আর নতুন করে ওকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চায় না।
ক্লাসে ফোন সাইলেন্ট করে ভাইব্রেশন মোড অন রাখে উত্তীয়। পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখল, স্ক্রিনের নম্বরটা অপরিচিত কোনো ল্যান্ডফোনের। ট্রুকলারে নাম দেখাচ্ছে 'খোকনদার হোটেল'। কে এই খোকনদা, কে জানে? ভুরু কুঁচকে ফোনটা রিসিভ করল উত্তীয়।
'হ্যালো!'
'হ্যালো, আপনি মাস্টার-দাদামণি?' অপর প্রান্তের কণ্ঠ চাপা, সাবধানি স্বরে বলল। মনে হল কোনো মধ্যবয়স পার করা পুরুষের গলা। বুকের ভেতরটা একটু লাফিয়ে উঠল উত্তীয়র। ও যে বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কাজ করে, তারা ওকে দাদামণি বলে। তবে কি কারও কিছু হল?
গলাটাকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলল উত্তীয়, 'হ্যাঁ, বলছি।'
লোকটা গলাটাকে আরও নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, 'লালনকে বাঁচান। অরে টেরাকে তোলা অইব পাঁচ তারিখ।'
লোকটার কথা শেষ না হতে কে যেন পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলল, 'অ্যাই বুড়া, কার লগে গুজুর গুজুর করো? রান্না হইছে? বাসাবাড়িতে দিয়া আসো গিয়া।'
লোকটা গলা চড়িয়ে প্রশ্নকর্তাকে বলল, 'না, তর লাইগ্যা বইস্যা আসি। আমি বুড়া মানুষ, একা পারি নাকি? তুই লগে লগে যাবি। জামাইয়ের লগে কথা কইতাসি। এট্টু খাড়ায় যা। তর ওই তিনতলা বাসাবাড়ির মরাগুলানের আবার খাওয়া! বলির আগে বিচালি খাওয়াইয়া অইব কীডা? খাইলেও মরব, না খাইলেও মরব।'
'হ্যালো হ্যালো!' উত্তীয় যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করল। ও-প্রান্ত থেকে লোকটা এবার উঁচু গলায় বলল, 'বাবাজীবন, আমাদের ভাতের হুটেল তো চিনো তুমি। ওই য্যা, হলদিয়ায় সুতাহাটা বাস স্ট্যান্ডে নাইম্যা...'
'হ্যালো, হ্যালো!'
কেটে গেল ফোনটা। অস্থির উত্তীয় আবার রিংব্যাক করল। লাইন কানেক্ট হচ্ছে না। ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল উত্তীয়। লোকটা কী বলল? ও জানে লালন কোথায় আছে। কোথায়? কী যেন বলল লোকটা? হলদিয়াতে সুতাহাটা বাসস্টপ? ভাতের হোটেল। তিনতলা বাড়ি। হলদিয়ার কিছুই চেনে না উত্তীয়। সুতাহাটা বাসস্টপ অবধি যদি পৌঁছোতেও পারে, সেখানে হোটেল আর তিনতলা বাড়ি নিশ্চয়ই কম থাকবে না। কোথায় খুঁজবে সে লালনকে? অন্যমনস্কভাবে মোবাইলটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটা নম্বর ডায়াল করল উত্তীয়।
'হ্যালো, সঙ্ঘমিত্রা!'
জয়েন্ট কমিশনার অনন্তবিজয় সেনশর্মা বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, 'এখন এত সমস্যা একসঙ্গে সামলানো যাচ্ছে না। মেডিকেল কলেজে আজ থেকে চারজন অনশনে বসেছে। চিকিৎসা পরিষেবা লাটে উঠেছে ওখানে। এমন অবস্থা, ইমার্জেন্সি পেশেন্টদের বের করে অ্যাম্বুলেন্সে অন্যত্র নিয়ে যাওয়াও যাচ্ছে না। শুনছি সিএম দিল্লির মিটিং ক্যানসেল করে আজই আসছেন। এই অবস্থায় এখন অন্য ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো অবস্থা নেই।'
অর্জুন বলল, 'স্যার, প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। আমাদের কাছে খবর আছে, পাঁচ তারিখ লালন নামে ছেলেটাকে পাচার করা হবে। আমরা ওদের রেড হ্যান্ডেড ধরতে পারি। প্লিজ আমাকে পারমিশন দিন স্যার।'
জয়েন্ট কমিশনার বললেন, 'কে খবর দিয়েছে তোমাকে? তোমার নিজের সোর্স?'
অর্জুন বলল, 'না স্যার, উত্তীয়বাবুকে ফোন করে কেউ জানিয়েছেন...'
'কে জানিয়েছে কিছুই জানো না। অজানা-অচেনা কার কাছে খবর পেয়ে এভাবে ফোর্স নিয়ে চলে যাবে? মনে রেখো, আমাকেও কোথাও জবাবদিহি করতে হয়। আর তা ছাড়া হলদিয়াতে তোমার সোর্সের কাছ থেকে খবর নিয়েছ? তারা কী বলছে?'
টাপুর হলদিয়ার খোকনদার পাইস হোটেলের যে বিলটা দেখিয়েছিল, সেটার কথা চেপে গেল অর্জুন। ওই বিলটা ছাড়া তিনতলা বাড়িটা এত তাড়াতাড়ি খুঁজে বের করা সম্ভব হত না। হলদিয়াতে ভাতের হোটেল বা তিনতলা বাড়ির সংখ্যাটা তো কম নয়। টাপুর নিজে ওই বিলে লেখা হোটেলের নামটা গুগল ম্যাপ থেকে জুম করে কাছে বাড়িটা বের করেছে। বাকি খবর অর্জুনের সোর্স করে দিয়েছে। টাপুরের সন্দেহ ভুল ছিল না। উত্তীয়র কাছে যে কলটা এসেছিল সেটা ট্রেস করে দেখা গেছে সেটা ওই অঞ্চল থেকেই এসেছিল। দুইয়ে দুইয়ে চার করতে অসুবিধে হয়নি আর। কিন্তু সেসব কথা জয়েন্ট কমিশনারকে বলতে মানা করেছেন ডিসিডিডি স্যার।
অর্জুন তাই বলল, 'খবরটা শোনা মাত্র আমি লোকাল সোর্সকে অ্যালার্ট করেছিলাম। তারা কনফার্ম করেছে সুতাহাটা বাসস্টপ থেকে খানিকটা দূরে বাজারের কাছে ওরকম একটা বাড়ি আছে। দরজা-জানলা সব বন্ধ থাকে। কাছেই একটা পাইস হোটেল থেকে তিনবেলা সেখানে অনেকটা পরিমাণ খাবার যায়। ভেতরে কী হয় কেউ জানে না। সোর্স চেষ্টা করছে। তারা সময় পেলে আরও ইনফর্মেশন দিতে পারবে।'
'তাহলে অপেক্ষা করো', বললেন জয়েন্ট কমিশনার।
'প্লিজ স্যার', অর্জুন বলল, 'অনেক দেরি হয়ে যাবে।'
এতক্ষণ সৌরভ সান্যাল চুপ করে ছিলেন। এবার তিনি বললেন, 'স্যার, যেতে চাইছে যাক। আমি টিমের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আপনাকে জবাব দিতে হবে না। মিশন ফেল করলে দায় আমি নেব।'
জয়েন্ট কমিশনার সেনশর্মা দু-জনের মুখের দিকে একে একে তাকালেন। তারপর বললেন, 'যা ইচ্ছে করো।'
অর্জুন কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে ডিসিডিডি স্যারের মুখের দিকে তাকাল।
জয়েন্ট কমিশনার স্যারের কেবিন থেকে বেরিয়ে লম্বা করিডর ধরে হাঁটতে হাঁটতে সৌরভ সান্যাল জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাহলে? এবার প্লান কী?'
অর্জুন বলল, 'আমি নিজে গিয়ে আগে হলদিয়ায় তিনতলা বাড়িটা ময়না করে আসব। দরকার হলে লোকাল থানা থেকে ওই বাড়ির আশেপাশে প্লেইন ড্রেস পুলিশ পাহারা বসাতে হবে। তারপর পাঁচ তারিখ যখন পাচার করার সময় হবে, তখন হাতেনাতে ধরব টিম নিয়ে গিয়ে।'
ডিসিডিডি মাথা নাড়লেন। বললেন, 'না, লোকাল থানাকে ইনভলভ করা ঠিক হবে না অর্জুন। বলতে খারাপ লাগলেও জানোই তো, আমাদের ডিপার্টমেন্টে সরষের মধ্যেকার ভূতের সংখ্যা নেহাত কম নয়। লোকাল থানার কারও কারও এই গ্যাং-এর সঙ্গে ইনভলভমেন্টের চান্স যথেষ্টই আছে। আমরা কোনো চান্স নিতে পারি না। এটাকে গোপন মিশন হিসেবেই এক্সিকিউট করতে হবে।'
'ঠিক আছে স্যার, আমি একাই যাব।' অর্জুন বলল।
'টিমের থেকে কাউকে সঙ্গে নিতে পারো', বললেন ডিসিডিডি।
'দরকার হবে না স্যার। এখন তো কোনো অ্যাকশনে যাচ্ছি না।'
সৌরভবাবু বললেন, 'যা হয়, আমাকে জানাবে। আর একা একা কোনোরকম বাহাদুরি দেখাতে যাবে না। কেমন? সেরকম প্রয়োজন বুঝলে আমাকে কল করবে। আমি ফোর্স পাঠাব।'
'ওকে স্যার!' বলল অর্জুন।
'অল দ্য বেস্ট!' বলে হাসলেন ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল।
'আমি যাব তোমার সঙ্গে', টাপুরদি বলল।
'নো ওয়ে, আমার ওপর স্ট্রিক্ট অর্ডার আছে একা যাওয়ার', বলল অর্জুনদা।
'আমি যেতে পারব না', মুখ কালো করে আমি বললাম, 'আজ সারারাত আমাকে সাপোর্ট দিতে হবে প্রোজেক্টের।'
'আমি পার্টি করতে যাচ্ছি না, একটা জরুরি মিশনে যাচ্ছি। তোমাদের কাউকেই আমি সঙ্গে নেব না।' কঠিন গলায় বলল অর্জুনদা।
টাপুরদি বলল, 'নিয়ো না। আমি নিজে ড্রাইভ করে যাব।'
'হোয়াট ননসেন্স!' অর্জুনদা বেশ রেগে উঠে বলল।
'যা খুশি বলতে পারো, আমি যাবই', বলল টাপুরদি।
মাথা নেড়ে কাঁধ ঝাঁকাল অর্জুনদা। টাপুরদির মুখে বিজয়িনীর হাসি।
আমি গম্ভীর মুখে বললাম, 'দেখো বাপু, রাত-বিরেতে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে নৈশভ্রমণ করতে যাচ্ছ। সাবধান!'
টাপুরদি হাত তুলে আমায় গাট্টা মারতে এগোল। বলল, 'তবে রে!'
আমি চট করে সরে এলাম। রাতের খাওয়া আটটার মধ্যে সেরে বেরোল ওরা দু-জনে। আমায় বলে গেছে, খুব প্রয়োজন না হলে ফোন না করতে। আমিও নিজের ডিনার সেরে কাজে মন দিলাম।
সকাল সাড়ে চারটা নাগাদ কাজ সেরে শুতে গেলাম। টাপুরদি ফিরলে নিজেই দরজা খুলে ঢুকতে পারবে। ওর কাছে চাবি আছে।
চেষ্টা করেও রাতে ভালো ঘুম হল না। অর্জুনদা আর টাপুরদিকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে। ছেঁড়া-ছেঁড়া ঘুমের মধ্যে নানানরকম স্বপ্ন দেখছি বারবার। ঘুম ভাঙল সকাল ন-টা নাগাদ। উঠে বাইরের ঘরে গেলাম। টাপুরদিরা ফেরেনি এখনও। দুশ্চিন্তাটা ঘুণপোকার মতো মনের ভেতরটা আঁচড়াচ্ছে। ওদের কোনো বিপদ হল না তো? টাপুরদি ফোন করতে মানা করে গেছে। কী করি এখন?
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্থিরতাটা বাড়তে লাগল। বার কয়েক ফোনটা হাতে নিয়ে টাপুরদির নম্বর ডায়াল করে আবার রেখে দিলাম পাশে। ব্রেকফাস্ট করার কথাও মনে থাকল না। বারবার গিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়াচ্ছি। মনে হচ্ছে, এর চেয়ে ওদের সঙ্গে গেলে ভালো হত। অন্তত বাড়িতে বসে এতটা দুশ্চিন্তায় তো কাটাতে হত না!
বেলা বারোটা বাজতে আর থাকতে পারলাম না। টাপুরদির নম্বর ডায়াল করলাম। ফোন সুইচ অফ বলছে। হে ভগবান! পরের ফোনটা করলাম অর্জুনদার নম্বরে। এটা রিং হচ্ছে। কিন্তু রিং হয়ে হয়ে এক সময়ে থেমে গেল ফোন। এবার আর অপেক্ষা করা যায় না। ওরা নিশ্চয়ই কোনো বিপদে পড়েছে। কাকে ফোন করব, কার কাছে সাহায্য চাইব এখন? ডিসিডিডি স্যারকে ফোন করা যায়। কিন্তু তাঁর নম্বর তো আমার কাছে নেই। কেন নিয়ে রাখলাম না! এখন আমি কী করি!
বিদ্যুতচমকের মতো মনে হল, সুদর্শনবাবুকে সব খুলে বললে নিশ্চয়ই তিনি সাহায্য করবেন। তাঁর নম্বরও আছে আমার কাছে। ঠিক আছে, তাঁকেই বলি। তিনি তো বলেইছেন যে-কোনো প্রয়োজনে ফোন করতে। কল লিস্ট ঘেটে সুদর্শনবাবুর নম্বরটা বের করলাম। ডায়াল করতেই যাব, দরজার ল্যাচ ঘোরানোর শব্দে চমকে উঠে তাকালাম। দরজা খুলে টাপুরদি ও অর্জুনদা ঢুকছে।
'কোথায় ছিলে তোমরা? আমি টেনশনে মরে যাচ্ছিলাম!' প্রায় চিৎকার করে উঠলাম আমি।
পরক্ষণে ওদের দু-জনের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে গেলাম। দুজনেই কেউ কোনো কথা বলছে না।
'কী হল টাপুরদি, অর্জুনদা?' একটু থমকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি একবার অর্জুনদার মুখের দিকে তাকাল, একবার আমার মুখের দিকে। তারপর ওরা দু-জনের ফিক করে হেসে দিল। টাপুরদি বলল, 'খুব টেনশন করছিলি, না?'
'করব না? তোমার ফোন সুইচ অফ!' রাগ-রাগ গলায় বললাম আমি।
'চার্জ শেষ হয়ে গেছিল রে!' ক্লান্ত গলায় টাপুরদি বলল। সোফায় বসে গা এলিয়ে দিল।
'সকাল থেকে পেটে দানাপানি কিছু পড়েছে?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
অর্জুনদা বলল, 'না। টানা ড্রাইভ করেছি।'
ওদের আর বললাম না যে আমিও কিছুই খাইনি। তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাস ওভেনের একদিকে সকলের জন্য ইন্সট্যান্ট নুডলস, আর এক দিকে চা বসালাম।
বাইরের ঘরে এসে বললাম, 'তোমাদের সিক্রেট মিশনের রেজাল্ট কী? তোমাদের দেরি দেখে আমার এত চিন্তা হচ্ছিল, আমি এখুনি সুদর্শনবাবুকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম।'
টাপুরদি সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল, 'ঠিক আছে। আমি পরে ফোন করে জানিয়ে দেব। লোকেশনটা খুঁজে বের করতেই অনেক সময় চলে গেছিল। অর্জুনের সোর্সদের ইন্সট্রাকশন ফলো করে একটা বাড়ি পেয়েছি। এটাই সেই বাড়ি কি না জানি না। অর্জুন সৌরভবাবুকে জানিয়ে দিয়েছে লোকেশন। কলকাতা থেকে দু-জন প্লেন ড্রেসের পুলিশ এতক্ষণে রওনা দিয়ে দিয়েছে হলদিয়ার দিকে। ওরা ওখানে থাকবে। এছাড়া অর্জুনের লোকাল সোর্সরাও অ্যালার্ট আছে। প্রতিটা মুভমেন্টের খবর পাব আমরা, মানে পুলিশ আর কী!''
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'উত্তীয়দাকে কে ফোন করেছিল জানতে পেরেছ?'
টাপুরদি মাথা নাড়ল। বলল, 'ল্যান্ডলাইন নম্বরটা জনৈক খোকন দাসের নামে রেজিস্টার করা। ওটা একটা পাইস হোটেলের নম্বর। সম্ভবত, ওই হোটেলরই কোনো কর্মী করেছে ফোনটা। এখন তাকে খোঁজার সময় নেই, খুব একটা প্রয়োজনই নেই। তাতে বরং লোকটার বিপদ হতে পারে।'
অর্জুনদা বলল, 'টাপুর, একটা কথা ভাবছিলাম। বলছি যে সুদর্শনবাবুকে এখনই কিছু জানানোর দরকার নেই। কারণ, তাতে অদ্বৈত মুখার্জির কাছে খবর পৌঁছে যেতে পারে। বলা তো যায় না। আমরা ওই লোকটাকে হাতেনাতে ধরতে চাইছি।'
আমি বললাম, 'তোমরা শিওর, এই সব কিছুর পেছনে অদ্বৈত মুখার্জিরই হাত আছে?'
অর্জুনদা কোনো উত্তর না দিয়ে আবার সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। টাপুরদি বলল, 'সন্দেহের সব তিরগুলো তো তাঁর দিকেই নির্দেশ করছে। পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আমাদের আরও প্রমাণ চাই। আপাতত প্রমাণ বলতে অদ্বৈত মুখার্জির কিছু পাস্ট রেকর্ড, যেগুলি বলছে এর আগে ভদ্রলোকের বিহার মিনিস্ট্রিতে পোস্টিং ছিল। সেখানে একজন সাবঅর্ডিনেটকে চড় মেরেছিলেন তিনি, যে কারণে তাঁর ওপর ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারি হয়। সেই সাবঅর্ডিনেট এবং আরও কয়েকজন তাঁর নামে একাধিক কোরাপশনের অভিযোগ এনেছিল এনকোয়ারির সময়, যদিও কিছু প্রমাণ হয়নি। কিন্তু ধোঁয়া উঠলে তার একটা উৎস তো থাকেই, তাই না?'
অর্জুনদা এবার চোখ খুলে সোজা হয়ে বসল। নাক কুঁচকে বলল, 'মিতুল, গ্যাসে কী বসিয়েছ? সব গেল।'
'সর্বনাশ!' বলে ছুটলাম আমি রান্নাঘরে। পেছন থেকে টাপুরদি হেসে উঠল।
বয়স বাড়ছে। রাতে আজকাল বেশ ক-বার উঠতে হয়। জলখালাস করে ফ্লাশ টানতেই ফোনের রিং শুনতে পেল লোকটা। এই সময়ে একজনই ফোন করে তাকে। ধীরে-সুস্থে বাইরে এল। বাথরুমের দরজাটা টেনে বন্ধ করে বিছানায় এসে বসল সে। ফোনটা রিসিভ করে কানে ঠেকাল, 'হ্যালো!'
'হ্যালো বস। কনসাইনমেন্ট ঠিকঠাক পৌঁছে গেছে।'
লোকটার ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠল। বলল, 'গ্রেট! পথে কোনো অসুবিধে হয়নি তো?'
'না স্যার। সেরকম কিছু নয়। স্টেট বর্ডারে টোলে আটকেছিল। ভাগ্যিস রাউন্ডে আমাদের চেনা অফিসার ছিল। কিছু খসাতে হয়েছে। ম্যানেজ হয়ে গেছে। ট্রাক বিহারে ঢোকার পর থেকে আর অসুবিধে হয়নি।'
'গুড!' হাসি ফুটল লোকটার মুখে। বলল, 'এর পর নেক্সটটা কবে যাচ্ছে?'
'পাঁচ তারিখ, স্যার। শিবেনকে সব বুঝিয়ে দিয়েছি।' ও-প্রান্ত বলল।
'বেশ, এটাই আপাতত শেষ। এর পর পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত কিছুদিন কাজ বন্ধ রাখতে হবে। আমাদের লোকেদের বলবে পাঁচ তারিখের পর আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে যেতে। কেউ কারও সঙ্গে যোগাযোগ করবে না। এই লাইন অফ করে দেবে তুমি। আমাদের সাইবার সেলের ছেলেদের দিয়ে নতুন সিকিওর লাইন তৈরি করবে। সব শান্ত হলে আবার কাজ শুরু হবে, ক্লিয়ার?'
'ইয়েস বস!' বলল ও-প্রান্তের লোকটা, 'কিন্তু অসুবিধে কিছু হত না। এই তো এই অবস্থাতেও তো মতি মিঞা মাল ডেলিভারি করে এল। পারল কেউ ধরতে? আমার লোকেদের ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারেন।'
এ-প্রান্ত বলল, 'না, ওভার কনফিডেন্স ভালো নয়। বেশি লাভের লোভে আমি কোনো রিস্ক নিতে চাইছি না। এখন কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকবে।''
'বস, নবদিগন্তের কী হবে? যেভাবে পুলিশ ওই হোমের পেছনে পড়েছে, তাতে ওখান থেকে আর কোনো লাভ পাওয়া যাবে মনে হয় না। শুধু শুধু এতগুলো ছেলে পোষা...'
'আপাতত কিছু নয়। সরকারি গ্রান্ট তো আসছে। খরচ চলেও লাভই থাকছে। সব ঠান্ডা হলে তখন ওটা নিয়ে ভাবব।'
'আর বস, ওই মেয়ে টিকটিকিটা...'
লোকটা একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, 'তোমার দুটো ছেলেকে মেরে-ধরে ফেরত পাঠিয়েছে বলে তোমার আঁতে লেগেছে বুঝতে পারছি। মেয়েটার দম আছে। ওকে বেশি ঘাঁটিও না আর। আর মাত্র কটা দিনের ব্যাপার। আর ঝামেলা চাইছি না আমি। কিন্তু যাই হোক, পাঁচ তারিখের কাজটা শেষ করে আমাকে ফোন করবে, কেমন?'
'ওকে বস, হয়ে যাবে। আপনি চিন্তা করবেন না। রাখছি।'
'রাখো। কাজটা যেন ঠিকমতো হয়, অনেকগুলো মানুষের বাঁচা-মরা নির্ভর করছে এর ওপর বুঝতেই পারছ। সরকার, রাষ্ট্র আমাদের কাজটাকে বে-আইনি বলে দেগে দিতেই পারে, কিন্তু সবসময় মনে রাখবে আমরা সত্যিকারের সমাজসেবা করছি। কিছু মৃত্যুপথযাত্রীকে জীবনে ফিরিয়ে দিচ্ছি। তুমি জানো, টাকাটা আমার কাছে কোনোদিনই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আমি শুধু চাই, আর কোনো পরিবারকে যেন শুধু অরগ্যানের অভাবে প্রিয়জনকে চোখের সামনে মরতে দেখতে না হয়।'
'জানি বস!' বলল ও প্রান্ত, 'আপনি এ কথা আমাকে অনেকবার বলেছেন।'
'সেটাই মনে রেখে চলো। সব ভালো হবে। মনে রেখো, আমরা কোনো অন্যায় করছি না। যাদের কেউ নেই, পরিবার নেই, বাড়ি ফিরে দেখার মতো হাসিমুখ নেই, তাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই। আমরা তাদের একাকিত্বের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিচ্ছি। তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সেইসব মানুষকে বাঁচাবে, যাদের বেঁচে থাকাটা আরও অনেকের কাছে জরুরি। এতে কোনো ভুল নেই, কোনো অন্যায় নেই।'
ও-প্রান্ত চুপ করে থাকে। সে জানে, বস এ কথাগুলি নিজেকেই বলছেন। আজ প্রথমবার তো নয়, এই কথা এর আগেও অনেকবার শুনেছে। মানুষটাকে বুঝে উঠতে পারে না সে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বেশি কিছু জানে না, কিন্তু মনে হয় সারা দেশের সব অসুস্থ মানুষের শরীরে প্রয়োজনীয় প্রত্যঙ্গ পৌঁছে দেওয়াই লোকটার জীবনের ব্রত।
ফোন রেখে অন্য প্রান্তের লোকটা ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবতে থাকে। আর একটা কনসাইনমেন্ট, তারপরেই ব্রেক। আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে হবে। কোথায় যাবে সে? বাড়ি ফেরার উপায় নেই, সেই পথ সে নিজে হাতে বন্ধ করে এসেছে। এভাবেই কি কাটবে তার বাকি জীবন? তারও তো বয়স কম হল না। শুরুতে যখন কাজটা শুরু করেছিল, তখন অঢেল অর্থ উপার্জনই মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। আগুপিছু না ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আজ সে বুঝেছে এই চক্রে জড়িয়ে গেছে সে। এখান থেকে এখন বেরোতে চাইলেও বেরোনোর উপায় নেই। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য প্রাইভেট হাসপাতালগুলির বেশিরভাগই এক-একটি পাপচক্র। এগুলির সঙ্গে ব্যাবসা শুরু করলে আর বেরিয়ে আসা যায় না। তারা অনেক গোপন পাপের ভাগীদার। তাই সরে আসতে চাইলে ওরাও ছেড়ে কথা বলবে না। হয়তো রাস্তায় বা আস্তাকুঁড়ে পড়ে থাকবে তাদের বেওয়ারিশ লাশ। পার্টনার ইন ক্রাইমকে কেউ বাঁচিয়ে রাখে না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে লোকটা। পাপের গোলকধাঁধায় সে স্বেচ্ছায় ঢুকেছে। এখান থেকে বেরোনোর পথ নেই আর।
'স্পটে কলকাতা পুলিশের দু-জন অলরেডি প্লেইন ড্রেসে আছে। যে-কোনোরকম মুভমেন্ট দেখলে আমাদের ইনফর্ম করবে ওরা। লোকাল থানাকে এখনই কিছু জানানো হয়নি সংগত কারণেই। প্রয়োজন পড়লে সেটা করা হবে। আপাতত যে প্ল্যান আছে সেটা হল চার তারিখ রাতে আমাদের একটা টিম প্লেন ড্রেসে স্পটে পৌঁছুব। গোপনে বাড়িটা ঘেরাও করা হবে। আর একটা টিম দুপুরের মধ্যে পৌঁছে যাবে। যারা বাজারের কাছে অপেক্ষা করবে। ওরা ট্রাকে লোড করা শুরু করলে আমরা ওদের রেড হ্যান্ডেড ধরব।' বললেন সৌরভ সান্যাল।
টাপুরদি বলল, 'স্যার, একটা কথা বলতে চাই। ওখানে পুলিশ ওদের দলের একটা অংশকে অ্যারেস্ট করবে। ঠিক আছে। কিন্তু অবশ্যই আমরা আশা করতে পারি না যে পুরো দলটা ওখানে থাকবে। এই অ্যারেস্টের খবর পাওয়া মাত্র দলের যারা মাথা তারা গা ঢাকা দেব। পুলিশ পরে দলের লোকেদের থার্ড ডিগ্রি দিয়ে ওদের চাঁইয়ের নাম বের করতে পারবেন না। কারণ এসব ক্ষেত্রে দলের নীচের তলার কর্মীরা সাধারণত মাথায় বসে থাকা কিং পিনের নাম জানে না, তাকে চেনেও না। তারা আবার নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে কাজ শুরু করবে ক-দিন পর। এসব অবশ্য আমার থেকে আপনি ভালো জানেন।'
মাথা নাড়লেন সৌরভ সান্যাল। বললেন, 'জানি। সেই কারণেই হিউম্যান ট্র্যাফিকিং, অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর ক্ষেত্রে পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে সাফল্যের মুখ দেখলেও এই চক্রগুলোকে পুরোপুরি রোখা যায়নি। বরং ওরা আরও বেশি সাহসী হয়ে উঠেছে।'
টাপুরদি বলল, 'স্যার, আপনাকে পরামর্শ দেওয়া আমার বাতুলতা। কিন্তু ওদের ধরার আগে ওদের দলের মাথাকে ধরা দরকার। অন্তত একসঙ্গে দু-দিকে দুটো অভিযান করা প্রয়োজন যাতে কেউ পালাতে না পারে।'
সৌরভ সান্যাল হাসলেন। বললেন, 'মিস ব্যানার্জি, আপনি বুদ্ধিমতী। আপনার প্রতিটি কথা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু আপনি কি জানতে পেরেছেন কে এই চক্রের কিং পিন?'
টাপুরদি অর্জুনদার দিকে তাকাল তেরছা দৃষ্টিতে। তারপর বলল, 'আমি শিওর বলতে পারব না। কিন্তু অদ্বৈত মুখার্জির ওপর আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।'
সৌরভ সান্যাল ভীষণ অবাক হয়ে বললেন, 'অদ্বৈত মুখার্জি, মানে হেলথ সেক্রেটারি? আর ইউ ক্রেজি, মিস ব্যানার্জি?'
টাপুরদি বলল, 'কেন নয়? তিনি পাওয়ারফুল, তাঁর পাস্ট রেকর্ড ক্লিন নয়, ডক্টর মিত্রর ডেথের ক্ষেত্রে তিনি ফোর্সফুলি তদন্ত বন্ধ করতে চেয়েছেন। এমনকি আমি তো এমনও খবর পেয়েছি যে মেডিকেল কলেজে স্ট্রাইকের আগের দিন রাতে অখিল মিদ্যা রাতের দিকে অদ্বৈত মুখার্জির বাড়ি গেছিলেন।'
'এ খবর কোথায় পেলেন?' জিজ্ঞাসা করলেন সৌরভ সান্যাল।
টাপুরদি মুচকি হেসে বলল, 'পুলিশ তো জানি নিজেদের সোর্স ডিজক্লোজ করে না, এমনকি নিজেদের কলিগের কাছেও নয়। আমাকে তাহলে আপনি কী করতে বলেন? মনে করুন, আমারও কিছু সোর্স আছে।'
সৌরভ সান্যাল মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন। বললেন, 'ভেরি স্মার্ট!'
আমরাও হাসলাম। সৌরভবাবু বললেন, 'কিন্তু মিস ব্যানার্জি, সলিড প্রূফ ছাড়া অদ্বৈত মুখার্জিকে ছোঁয়া যাবে না সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আপনি।'
টাপুরদি চুপ করে রইল। খুব মন দিয়ে কিছু চিন্তা করছে ও। তারপর মুখ তুলে বলল, 'আজ দুই তারিখ। আমাকে দুটো দিন সময় দিন প্লিজ। দেখছি কী করা যায়!'
ডিসিডিডি স্যারের কেবিন থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা। প্ল্যানের পরবর্তী অংশ নিয়ে আলোচনার জন্য অর্জুনদা ভেতরেই রয়ে গেল। লালবাজার থেকে বেরিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, 'অতঃ কিম?'
টাপুরদি বলল, 'আপাতত শুধু প্রমাণ খোঁজা। তবে তার আগে আর একটা কাজ আছে।'
'কী কাজ?' জানতে চাইলাম আমি।
টাপুরদি একটু বিষণ্ণ মুখে বলল, 'মৃণালবাবুর সঙ্গে দেখা করে আসি। কাল সুপর্ণাদিকে ফোন করেছিলাম। বললেন, মৃণালবাবু ভালো নেই। ডাক্তার কোনো আশা দিতে পারছেন না। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।'
মনটা খারাপ হয়ে গেল। অমিয় চক্রবর্তী মার্ডার কেসের সূত্রে এই বৃদ্ধ মানুষটির সঙ্গে পরিচয় আমাদের। কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা অল্প সময়েই খুব আপন হয়ে ওঠেন। যাঁদের হৃদয় উৎসারিত স্নেহের ফল্গুধারা সদ্যপরিচিত মানুষকেও ভিজিয়ে দিয়ে যায় অনায়াসে। জ্ঞানতপস্বী এই অসাধারণ মানুষটি বাংলার রাজনীতির অনেক উত্থান-পতনের সাক্ষী। বর্তমান সিএম অম্লান চক্রবর্তীর বাবা অমিয় চক্রবর্তীর রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ছিলেন মৃণাল দত্ত। তারপর একসময় স্বেচ্ছায় সরে এসেছিলেন, নিয়েছিলেন রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস। একমাত্র সন্তানহারা কন্যাটিকে অবলম্বন করে বেঁচে ছিলেন। মৃণালবাবুর কিছু হলে সুপর্ণাদি কী নিয়ে বাঁচবেন কে জানে?
বললাম, 'আমিও যাব তোমার সঙ্গে।'
মৃণালবাবুর বাড়ি পৌঁছোলাম যখন ঘড়ির কাঁটায় বিকেল পাঁচটা বাজে। কলিং বেল বাজতেই ভেতর থেকে সুপর্ণাদির গলা পাওয়া গেল, 'আসছি।' পরক্ষণেই দরজা খুলে উঁকি মারল পরিচিত মুখটি। আমাদের দেখে উল্লসিত হয়ে বলল, 'আরে, তোমরা?'
বছর খানেক পরে দেখা হল সুপর্ণাদির সঙ্গে। একটা অপরাধবোধ কাঁটা ফোটাচ্ছে মনের কোণে। নিজেদের প্রয়োজনে এই বাড়িতে এসেছিলাম একদিন। কই, তারপর প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতে আর তো আসিনি! মৃণালবাবু নিজে মাঝেমধ্যে ফোন করে খবরাখবর নিতেন। কবে যে ফোন আসা বন্ধ হয়েছে, খেয়ালই করিনি। জানতেও পারিনি যে তিনি এত অসুস্থ।
সুপর্ণাদি হেসে বলল, 'আরে, এসো এসো! বাবা তোমাদের দেখে খুব খুশি হবে। তোমাদের কথা প্রায়ই বলে বাবা।'
মনের ভেতর অন্ধকারটা গভীর হচ্ছে।
আমাদের নিয়ে ভেতরের ঘরের দিকে এগোল সুপর্ণাদি। ঢোকার আগে আমাদের হাতে একটা বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল, 'হাতটা একটু স্যানিটাইজ করে নাও প্লিজ। আসলে বাবার ইমিউনিটি বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই তো। অল্পেতেই ইনফেকশন হয়ে যায়। কেমো আর রে দিয়ে দিয়ে শরীরটা শেষ হয়ে গেছে।'
আমি আর টাপুরদি নীরবে হাত স্যানিটাইজ করলাম।
'বাবা, দেখো কারা এসেছে,' বলতে বলতে হাসিমুখে ঘরে ঢুকল সুপর্ণাদি। আমরা ঢুকলাম পেছনে পেছনে। ঢুকেই চমকে গেলাম। এ কাকে দেখছি? সেই দীর্ঘদেহী, ঋজু, সৌম্য বৃদ্ধের জায়গায় এই বিছানায় প্রায় মিশে যাওয়া, মুখে খোঁচা দাড়িগোঁফ-সম্বলিত, ন্যাড়া মাথা, ঘোলাটে দৃষ্টির এই বৃদ্ধ কে? এঁকে তো আমরা চিনি না! টাপুরদি এগিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়াল।
'চিনতে পারছেন আমাকে?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি। স্পষ্ট টের পেলাম, জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে ওর গলাটা কেঁপে গেল।
বলিরেখাকীর্ণ মুখে হাসি ফুটে উঠল। ভাঙা গলায় বললেন মৃণালবাবু, 'ওমা, চিনব না? তাও আবার হয় নাকি? সম্রাট অশোক দুহিতাকে ভোলা অতই সহজ?'
সুপর্ণাদি এগিয়ে গিয়ে বলল, 'বাবা, তুমি বসবে? বসিয়ে দেব?'
'দে তবে', বললেন বৃদ্ধ, 'একটু বসে কথা কই। সারাদিন তো শুয়েই থাকি।'
সুপর্ণাদি এগিয়ে গিয়ে মৃণালবাবুকে শিশুর মতো পাঁজাকোলা করে বিছানায় বসিয়ে দিল।
'এত সব কিছু হয়ে গেল, আমাদের জানাননি কেন?' এবার কেঁদেই ফেলল টাপুরদি। আমারও গলার কাছটা ব্যথা করছে।
সুপর্ণাদি ম্লান হাসল। বলল, 'কেঁদো না বোন। বাবা ওরকমই। সবার খবর নেবে, কিন্তু নিজের কথা কাউকে জানাবে না। আসলে রাজনীতি রক্তে কিনা! মন্ত্রগুপ্তি ভালোই আয়ত্ত করেছেন।'
'সুপু!' কাঁপা গলায় ডাকলেন মৃণালবাবু, 'তুই আবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার নিন্দে করতে লাগলি! যা না, ওদের জন্য চা-টা কী আছে নিয়ে আয়। আজ ওদের সামনে বসে খাওয়াই। কে জানে, আর সেই সুযোগ হবে কি না।'
সুপর্ণাদি আর একটা কথাও না বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল, চোখের জল লুকোতেই বুঝি-বা। টাপুরদি নিজেই একটা চেয়ার টেনে বসল। আমিও একটা প্লাস্টিকের টুলের ওপর বসলাম।
মৃণালবাবু বললেন, 'কেমন আছ তোমরা? কাজকর্ম কেমন চলছে?'
টাপুরদি মাথা নাড়ল।
মৃণালবাবু এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'মৈথিলী, তোমায় আর এক মৈথিলীর গল্প শোনাব বলেছিলাম, মনে আছে?'
উদগত কান্নাকে দমন করে ওপর-নীচে মাথা নাড়লাম আমি। তিনি বললেন, 'সে আর হল না। শরীর দেয় না এখন। বেশি কথা বললে হাঁফ ধরে। তবে মনে রেখো মা, মৈথিলী কিন্তু সামান্যা নারী নন। পুরো মহাকাব্যে তুমি অমন আর একটা চরিত্র খুঁজে পাবে না আর। পরবর্তীতে টীকাকার, অনুবাদকরা তাঁকে নরম-সরম দুর্বল করে এঁকেছেন। কিন্তু জেনো মা, মূল রামায়ণে মৈথিলী এক অসাধারণ তেজোদীপ্ত মহিয়সী, যাকে দশাননও স্পর্শ করতে পারেন না। এমন তেজ যাঁর, যার এত প্রখর আত্মসম্মানবোধ, তিনি কি সাধারণ হতে পারেন?'
কথা বলতে বলতে হাঁফাচ্ছেন মৃণালবাবু। টাপুরদি বলল, 'আপনি বেশি কথা বলবেন না। আপনার কষ্ট হচ্ছে।'
মৃণালবাবু হাসলেন। বললেন, 'ধূমপান ছেড়েছি সেই চল্লিশ বছর বয়সে। এতদিনে সেই ধোঁয়া প্রতিশোধ নিতে এসেছে। কখন যে এসে ফুসফুসে বাসা বেঁধেছে, টেরই পাইনি মা। যাই হোক, আমি বরং চুপ করি। তোমরা তোমাদের কাজের কথা বলো। কোন কেসে কাজ করছ এখন?'
'সরকার বাহাদুরের কেস', হেসে বলল টাপুরদি।
'বলো কী! আবার কী হল? অম্লান অ্যাপোয়েন্ট করেছে তোমাদের?'
টাপুরদি মাথা নাড়ল। বলল, 'হ্যাঁ, যদিও তিনি এখন দিল্লিতে আছেন। আমরা সুদর্শনবাবুকে রিপোর্ট করছি।'
'সুদর্শন, মানে মুখ্য সচিব?' জিজ্ঞাসা করলেন মৃণালবাবু।
'হ্যাঁ।' বলল টাপুরদি, 'চেনেন নাকি?'
হাসিমুখে মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। বললেন, 'হ্যাঁ, আজ না হয় রাজনীতি থেকে বহুদূরে, একদিন তো সে চত্বরে আনাগোনা ছিল। আমাদের থেকে অনেক ছোটো যদিও, তবে চিনি ওকে। স্কলার ছেলে, অসম্ভব বুদ্ধিমান, দুর্দান্ত জব প্রোফাইল, তার চেয়েও বড়ো কথা ভীষণ রকম হেল্পফুল। আমাদের টুবাই, মানে সুপুর ছেলে যখন খুব অসুস্থ, আমি দোরে দোরে সাহায্যের জন্য ঘুরছি, সুদর্শনই কিন্তু আমায় সাহায্য করেছিল। বড়ো বেসরকারি হাসপাতালে অনেক কম খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। ফোন করে করে খবর নিত। ব্লাডের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল ক'বার। ওর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা অসীম। সে যাই হোক, আমার অসুখের কথা তোমরা জানলে কী করে?'
'অম্লানবাবু বললেন', বলল টাপুরদি।
মৃণালবাবু মাথা নাড়লেন। বললেন, 'অম্লান আমার খবর নেয়। এসেওছিল মাসখানেক আগে একবার। খুব ব্যস্ত তো। একটা রাজ্য সামলানো মুখের কথা?'
কথাবার্তার মাঝখানেই সুপর্ণাদি ঘরে ঢুকলেন ট্রে-তে অনেক খাবারদাবার সাজিয়ে।
'কী আনলি রে?' জিজ্ঞাসা করলেন মৃণালবাবু।
সুপর্ণাদি হেসে বললেন, 'চিন্তা ক'রো না। তোমার অতিথিদের অযত্ন করছি না।'
খাওয়া-দাওয়া, আরও অনেক গল্পগুজব শেষে আরও ঘণ্টাখানেক পরে যখন ও-বাড়ি থেকে বেরোলাম, মহানগরীর রাজপথে তখন স্ট্রিট লাইটেরা একে একে জ্বলে উঠছে। দীর্ঘ দিনাবসানে তিলোত্তমা সেজে উঠছে আলোর মালায়। টাপুরদির গাড়িতে ওঠার পর থেকে আর কোনো কথা বলেনি। নিজের ভাবনাতেই ডুবে আছে ও। মৃণালবাবুকে এভাবে দেখার ধাক্কাটা হজম করা সহজ নয়। আমারও আজ আর কথা বলতে ভালো লাগছে না। একটা বটগাছের ছায়া সরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, মুছে যাচ্ছেন মৃণাল দত্ত একটু একটু করে। মৃত্যুর কাছে মানুষ বড়ো অসহায়।
পরের দিনটা সারাটা দিন টাপুরদির কোনো পাত্তা পেলাম না। আমারও অফিস ছিল। তাই টাপুরদির সঙ্গে থাকতে পারিনি। রাতে প্রায় এগারোটা নাগাদ ঝোড়ো কাকের মতো চেহারায় বাড়ি ফিরল টাপুরদি। হাতে মোটা মোটা ক-টা ফাইল। ওর মুখের অবস্থা দেখে কিছু জিজ্ঞাসা করতে সাহস হল না। চুপচাপ ডিনার সেরে বিনা বাক্যব্যয়ে আবার ফাইলগুলো নিয়ে বসে গেল। একবার শুধু আমার দিকে চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করল, 'নিউজ দেখেছিস?'
মাথা নাড়লাম আমি। দেখিনি।
'সিএম কলকাতায় ফিরেছেন। মেডিকেল কলেজে গেছিলেন। জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ওরা স্ট্রাইক তুলে নিচ্ছে।'
'যাক, ভালো খবর।'
ফাইলগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, 'এগুলো কীসের ফাইল গো?'
কাগজপত্র ছড়িয়ে বসে ছিল টাপুরদি। সেগুলো থেকে চোখ না তুলেই বলল, 'প্রমাণের।'
'মানে?' চোখ কপালে তুলে আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
'সব মানে পরে বোঝাব তোকে। এখন কথা বলার মতো সময় নেই। তুই শুতে যা।'
একটু রাগ হল আমার। এতদিন একসঙ্গে কাজ করে আজ টাপুরদি আমার কাছ থেকে কথা গোপন করছে। যাক গে, আমিও কথা না বাড়িয়ে শুতে চলে এলাম। বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ এ পাশ-ও পাশ করলাম। শরীরে ক্লান্তি, কিন্তু মস্তিষ্ক চঞ্চল হয়ে আছে। স্নায়ুর মধ্যে দিয়ে এক অসম্ভব অস্থিরতা সংবাহিত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, টাপুরদি কি পারবে এই জটিল রহস্যের সমাধান করতে, এই অঙ্গ পাচার-চক্রের চাঁই কে, কোথায় লুকিয়ে বসে আছে কে জানে! তাকে গর্ত থেকে বের করে আনতে কি পারবে টাপুরদি? ভাবতে ভাবতে চোখ জড়িয়ে আসে। প্রথমে হালকা ছেঁড়া-ছেঁড়া, তারপর গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই আমি।
ওদিকে অনেক দূরে কোথাও তখন এই নাটকের অন্য কোনো অধ্যায় অভিনীত হচ্ছিল, যা সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলাম। অন্ধকার রাস্তা দিয়ে টলতে টলতে হাঁটছে দু-জন মানুষ। দেখেই বোঝা যায় দু-জনেই নেশায় চুর হয়ে আছে। যার বয়স বেশি, সে হেঁড়ে গলায় বাজার-চলতি বাংলা সিনেমার গানের সুর ভাঁজছে। অপরজন রাস্তার গর্তে পড়তে পড়তে বাঁচল। বয়স্ক লোকটা গান থামিয়ে জড়ানো গলায় বলল, 'এ শালা শিবেন, শালা তুই মাতাল হোইছস।'
'কে মাতাল? কেন মাতাল?' নিজেকে সামলে নিয়ে অপেক্ষাকৃত কমবয়সি যুবকটি বলল।
'তুই মাতাল, শালা তুর বাপ মাতাল। মর শালা!' বয়স্ক লোকটা বলল।
'ও মতিমিঞা, তুমিই আমার বাপ, তুমিই আমার মা!' বলে শিবেন নামে ছেলেটা ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগল। মতি মিঞা তার মাথাটা নিজের বুকে টেনে সান্ত্বনা দিতে দিতে বলল, 'আরে কান্দোস ক্যান? তরে সব শিখায় দিমু আমি। এইবার একবার ঠিক কইর্যা মাল দিয়া আয় গিয়া, তারপর দেখবি মালিক তরেও কেমন মস্তকে বসায় রাখবে। তহন ট্যাহাই ট্যাহা। দ্যাশে ট্যাহা পাঠাইবি, দালান তুলবি, বিয়ায় বসবি। ট্যাহায় অনেক সুখ, বুঝলানি বাপ?'
'অনেক টাকা, মতিমিঞা? অনেক?' জড়ানো গলা জিজ্ঞাসা করে শিবেন।
'অনেক!' দুই পাশে হাত প্রসারিত করে দেখায় মতিমিঞা।
'অনেক টাকা, অনেক, আমার অনেক টাকা হবে!' টলতে টলতে বিড়বিড় করতে থাকে শিবেন।
মতিমিঞা এই খেলায় পুরোনো খেলোয়াড়। মাতাল হলেও মাথা কাজ করা বন্ধ করে না তার। একটা করোগেট টিনের বাড়ির সামনে এসে বলে, 'চল, বাড়িত গিয়া ঘুম দে ছ্যামরা। বড়ো কাজের আগে ভালো কইর্যা ঘুমান লাগে, বোঝলানি? কাজের সময় ঘুমাবার পাবা না। চক্ষে মরিচ ঘইষা জাইগ্যা থাকোন লাগব।'
বাড়িটার ভেতর ঢোকে দু-জন। শিবেন ধপ করে নিজের শরীরটাকে নোংরা তেলচিটে বিছানাটার ওপর ছুড়ে দেয়। তলিয়ে যায় গভীর ঘুমে। মতিমিঞা তার দিকে স্নেহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর টলতে টলতে পাশের ঘরে গিয়ে শোয়। দলের সঙ্গে দুটো ডাকাতি করে পালিয়ে এসেছিল এপারে মতিমিঞা প্রায় পনেরো বছর আগে। এদেশে এসে ভুয়ো কাগজপত্র বানিয়ে থেকে গেছে। প্রথমে টানা দশ বছর দেশে যেতে পারেনি। এখন অবশ্য যায় কখনো-সখনো। কিন্তু মন টেকে না। তবে নিয়মিত টাকা পাঠায়। দেশে নিজের বড়ো ছেলেটার কথা মনে হয় তার। এরকমই বয়স হবে, কাজকামাই কিছুই করে না। ছোটোমেয়েটার জন্য মতিমিঞার মন পোড়ে। তার খুব ন্যাওটা ছিল মেয়েটা। এখন তো সেও এক বাচ্চার মা। মতিমিঞার বউ শয্যাশায়ী। ছেলে অপদার্থ। তাই তো মতিমিঞাকে এই বয়সেই এই পাপকাজ করতে হচ্ছে। নইলে সকলে না খেয়ে মরবে?
আধ ঘণ্টা কাটে। মতি মিঞার নাক ডাকার শব্দ এই ঘর থেকেও শোনা যাচ্ছে। শিবেনের চোখ খুলে গেল। সন্তর্পণে বিছানায় উঠে বসল সে। বেড়ালের মতো পা ফেলে পাশের ঘরে উঁকি মারল। মতিমিঞার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। নিশ্বাসের তালে তালে বুকের ওঠানামা ছাড়া আর কোনো নড়াচড়া বোঝা যাচ্ছে না।
এতটুকু শব্দ না করে বেরিয়ে এল শিবেন। নিজের চৌকির তলা থেকে একটা ট্রাঙ্ক বের করল টেনে। পকেট থেকে চাবি বের করে তালাটা খুলে ফেলল। এই তালা সাধারণ দেখতে হলেও সাধারণ নয়। চাবি ঘুরিয়ে খোলার পরেও এতে লুকোনো নম্বরবারে নম্বর দিতে হয়। ঠিক নম্বর একবারই দেওয়া যায়। তা না হলে এই তালা বারো ঘণ্টার জন্য লক হয়ে যায়।
চাবি ঘুরিয়ে নম্বর দিল শিবেন। কট করে হালকা একটা শব্দ হল। ট্রাঙ্কের ডালা খুলে জামা-কাপড়ের নীচ থেকে একটা ছোট্ট ল্যাপটপ বের করে আনল। দ্রুত হাতে সেখানে কিছু বোতাম টিপে কানে একটা ব্লু-টুথ লাগিয়ে নিল। এই লাইন পুরোপুরি সুরক্ষিত এখন। কেউ এই ফ্রিকোয়েন্সিকে আইডেন্টিফাই করতে পারবে না।
'হ্যালো হ্যালো, এজেন্ট এমভি-জিরোসিক্স-ই রিপোর্টিং!'
'হ্যাঁ, এখানে সব ঠিক আছে। পাঁচ তারিখ কনসাইনমেন্ট যাবে। আমি তৈরি আছি। এক্স্যাক্ট টাইম এখনও আমাকে জানানো হয়নি। জানতে পারলেই জানিয়ে দিচ্ছি।'
'ইয়েস স্যার, ইয়েস স্যার আন্ডারস্টুড স্যার!'
'ওকে। অল ক্লিয়ার। মিশন ইস গোইং টু বি আ গ্র্যান্ড সাক্সেস।'
ব্লু-টুথটা কান থেকে খুলে ল্যাপটপের সঙ্গে ট্রাঙ্কে ঢোকাল শিবেন। তারপর ট্রাঙ্কে তালা লাগিয়ে ঠেলে চৌকির নীচে পাঠিয়ে দিল। পাশের ঘরের দরজায় দাঁড়াল কয়েক মুহূর্ত। মতিমিঞা অঘোরে ঘুমোচ্ছে এখনও। ফিরে এসে নিজের বিছানায় শুয়ে চোখ বুজল শিবেন। মতিমিঞা ঠিকই বলেছে। বড়ো কাজের আগে ভালো ঘুম দরকার।
সকালে ঘুমটা অন্যদিনের চেয়ে তাড়াতাড়িই ভেঙে গেল। টাপুরদি দেখলাম সোফার ওপর ছড়ানো কাগজপত্রের পাশে গুটিসুঁটি মেরে ঘুমোচ্ছে। মনটা নরম হয়ে এল। ঘর থেকে একটা পাতলা চাদর এনে ওর গায়ের উপর বিছিয়ে দিলাম। কেসটার জন্য খুব খাটছে টাপুরদি। কে জানে, আদৌ আসল অপরাধীর হদিস মিলবে কি না! রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের জল বসিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। কমপ্লেক্সের ভেতর একটা কামিনী ফুলের গাছ আছে। হয়তো বাড়ির পুরোনো মালিকের। বাড়ি ভেঙে কংক্রিটের কাঠামো ওঠার পরও মাড়োয়ারি প্রোমোটার কে জানে কোন অজ্ঞাত কারণে গাছটি কাটেনি। এখন গাছটি ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। মাটিতে ঝরে পড়া কামিনী ফুলে সাদা হয়ে আছে পুরো জায়গাটা। এখান থেকেও মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
কেন যে লোকে শরৎ বা বসন্ত নিয়ে এত আদিখ্যেতা করে কে জানে? আমার তো মনে হয় হেমন্তের মতো ঋতু হয় না। হেমন্ত আসে রাজার মতো। কত তার সম্পদ, কত সমারোহ! খেত হয় গর্ভিণী, কৃষকের উঠোন ম-ম করে নতুন ওঠা সোনালি শস্যের সৌরভে। গৃহস্থের ঘরে বাজে মঙ্গল শঙ্খ। দুই হাতে অকাতরে বিলোতে আসে হেমন্ত। যেন সে কোনো সন্ন্যাসী রাজা! পরনে তার গৈরিক। না আছে তার বসন্তের উচ্ছলতা, না আছে শরতের অহমিকা। নিজেকে রিক্ত করেই আনন্দ তার।
'মহারাজ এ কি সাজে এলে হৃদয়পুর মাঝে!
চরণতলে কোটি শশী সূর্য মরে লাজে।।
গর্ব সব টুটিয়া মূর্ছি পড়ে লুটিয়া,
সকল মম দেহ মন বীণাসম বাজে।।'
গুনগুন করতে করতে মন্থর পায়ে ঘরে ঢুকলাম। টাপুরদির ঘুম ভেঙেছে। সোফায় বসে আড়মোড়া ভাঙছে।
বললাম, 'গুড মর্নিং!'
উত্তর না দিয়ে টাপুরদি বলল, 'বেশ তো গাইছিলি। থামলি কেন? গা না।'
আমি হাসলাম। তারপর রান্নাঘরে চা ঢেলে এনে আবার ধরলাম,
'এ কি পুলকবেদনা বহিছে মধুবায়ে!
কাননে যত পুষ্প ছিল মিলিল তব পায়ে।'
টাপুরদিও এবার আমার সঙ্গে সুর মেলাল,
'পলক নাহি নয়নে, হেরি না কিছু ভুবনে--
নিরখি শুধু অন্তরে সুন্দর বিরাজে।।'
গরম চায়ে চুমুক দিয়ে চোখ বুজে বলল টাপুরদি, 'বেহাগ গাইবার একদম পারফেক্ট সময়। আহা, কী ভালো গাস রে তুই! মন ভরিয়ে দিলি।'
আমি বললাম, 'তুমিও কি কম ভালো গাও নাকি?'
'হয়েছে।' চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে উঠে দাঁড়াল টাপুরদি,বলল, 'আজকে অফিস যাবি, না ওয়ার্ক ফ্রম হোম?'
আমি বললাম, 'কোনোটাই নয়। আজ নির্ভেজাল ছুটি। প্রোজেক্টের কাজ নামিয়ে দিয়েছি। আজ আমার ডে অফ।'
টাপুরদি মিষ্টি করে হেসে বলল, 'তুই খুব খাটিস, মিতুল। কেস, অফিস সব কী সুন্দর সামলাচ্ছিস। তুই আক্ষরিক অর্থেই দশভূজা!'
অর্জুনদা এল দশটা নাগাদ। কাল মাঝরাতে ঘুমের ঘোরের মধ্যে শুনেছিলাম টাপুরদি ফোনে কথা বলছে। আজ অর্জুনদা ঢুকেই বলল, 'এখনই বেরোবে তো?'
টাপুরদি বলল, 'হ্যাঁ, দেরি করা ঠিক হবে না। শুভম কোনো আপডেট দিতে পারল?'
অর্জুনদা একটু বিমর্ষমুখে বলল, 'কলগুলো ফায়ারওয়াল ইউজ করে করা হচ্ছে। তাও চেষ্টা করছে ও।'
টাপুরদিকে এখন একটু অস্থির লাগছে। বলল, 'চেষ্টার আর সময় নেই অর্জুন। উই ওয়ান্ট রেজাল্ট, নাও অর নেভার।'
অর্জুনদা বলল, 'মনে রেখো, হি ইজ দ্য বেস্ট। ও না পারলে এ জিনিস আর কেউ পারবে না।'
'পারতে হবে অর্জুন!', বলল টাপুরদি, 'প্রমাণ ছাড়া আমরা অমন একজন ক্ষমতাশালী লোকের গায়ে আঙুলও ছোঁয়াতে পারব না।'
'জানি টাপুর!' টাপুরদির কাঁধে হাত রেখে বলল অর্জুনদা, 'আমরা সকলেই যথাসম্ভব চেষ্টা করছি। ব্যস্ত হ'য়ো না। সব ঠিক হবে।'
আমি এবার বললাম, 'এসব কী নিয়ে কথা হচ্ছে আমাকে কেউ বলবে কি?'
টাপুরদি জুতোয় পা গলাতে গলাতে বলল, 'সব বলব। তবে এখন সময় নেই। চটপট বেরোতে হবে।'
'কোথায়? আমরাও কি হলদিয়াতে যাব নাকি পুলিশের সঙ্গে?'
'না', বলল টাপুরদি, 'আমরা অন্যখানে যাব। এখন চল তো।'
কিছুই বুঝতে পারলাম না। এও জানি এখন জিজ্ঞাসা করলে উত্তর পাব না। তাই আর কথা না বাড়িয়ে রওনা হলাম। জানি না কেন আমার মন বলছে আজকের দিনটা আমাদের জন্য অনেক চমক নিয়ে অপেক্ষা করছে।
৪ তারিখ, বেলা ১১:৩০
স্থান: লালবাজার পুলিশ হেড কোয়ার্টার।
সৌরভ সান্যাল বললেন, 'হলদিয়াতে আমাদের লোকেরা জানিয়েছে বাড়িটার একতলার একটা ওষুধের দোকান আছে। দোতলা আর তিনতলার দরজা-জানলা সব বন্ধ। গত দুইদিনে ওই দুটো তলায় কোনো মুভমেন্ট চোখে পড়েনি। দিনে দু-বার একটা বুড়ো মতোন লোক খোকন দাসের হোটেল থেকে খাবার নিয়ে যায় ওই বাড়িতে। বাড়ির পেছন দিকে একটা সিঁড়ি আছে। সেটা দিয়ে উঠে যায়। সঙ্গে একটা বাইশ-তেইশ বছরের ছেলে থাকে। কাগজের বাক্সে করে খাবার যায়। মোটামুটি কুড়ি থেকে পঁচিশটার মতো বাক্স থাকে এক-একবারে।
'এছাড়া একজন লম্বা-চওড়া চেহারার লোক মাঝেমধ্যে সিগারেট কিনতে বেরোয়। লোকটা কারও সঙ্গে কথা বলে না তেমন। আরও দুই-একজন আসা-যাওয়া করে ওই বাড়িতে, সম্ভবত দলেরই লোক। নীচের ওষুধের দোকানে দু-জন ডাক্তার বসেন। তার মধ্যে সকালে যিনি বসেন, তিনি গত দু-দিনই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠেছিলেন। খবর নিয়ে জানা গেছে ডাক্তারের নাম অনিমেষ রায়। তাঁকেও নজরে রাখা হয়েছে।
'অর্জুন, তুমি আজকের টিমে যাচ্ছ না। কাল সকালে যাবে। আজ এখানে কিছু কাজ আছে। মিস ব্যানার্জি, এবার আপনি আপনার ফাইন্ডিংস বলুন।'
টাপুরদি কিছু বলার আগে অর্জুনদা বলল, 'কিন্তু স্যার, আমি আজ যেতে পারলে ভালো হত।'
সৌরভবাবু বললেন, 'ওরা কনসাইনমেন্ট পাঠাবে আগামীকাল। তোমার কাল গেলেই হবে। আজ মেগাসিটি মেডিকেল কলেজে মুখ্যমন্ত্রীর একটা সভা আছে, যেখানে তিনি জুনিয়র ডাক্তারদের অ্যাড্রেস করবেন। সেখানে পুলিশ প্রোটেকশনের জন্য তোমাকে চাই। হলদিয়াতে কাল আমি নিজে টিম লিড করব। আজ রাতটা বাকিরা সামলে নিতে পারবে। দরকার হলে লোকাল থানা তো রইলই ব্যাক আপ হিসেবে।'
অর্জুনদার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল কথাটা তার পছন্দ হয়নি। এই কেসটা নিয়ে প্রচুর খেটেছে অর্জুনদা। রাতের পর রাত বাড়ি ফেরারও সময় পায়নি। আজ এত কাছে এসে কেস থেকে দূরে থাকতে ইচ্ছে করছে না তার।
সৌরভদা টাপুরদির মুখের দিকে তাকালেন। বললেন, 'আপনি বলুন মিস ব্যানার্জি। আপনি বোধ হয় কিছু বলতে চান।'
টাপুরদি একটু চুপ করে থেকে বলল, 'জানি না, পুলিশের ইন্টারনাল ম্যাটারে নাক গলানো কতটা উচিত হচ্ছে আমার। তবু আপনি আমার ওপর ভরসা রেখেছেন বলে বলছি, আমার মনে হয় অর্জুনবাবু ঠিক কথাই বলেছেন। এরকম হাই প্রায়োরিটি মিশনে যে-কোনো সময় যা কিছু হতে পারে। শুধু লোকাল থানা আর ছোটো একটা টিম তখন সামলাতে পারবে কি? তার চেয়ে...'
সৌরভবাবু টাপুরদিকে শেষ করতে না দিয়েই বলল, 'না, অর্জুনকে এখানে প্রয়োজন। অর্জুন, তুমি একবার শুভমের কাছে যাও। কাল সারারাত বাড়ি যায়নি ও। কত দূর এগোল, দেখো একটু।'
অর্জুনদা 'ইয়েস স্যার' বলে বেরিয়ে গেল। বুঝলাম, একজন জুনিয়র অফিসারের সামনে প্রাইভেট ডিটেকটিভের সাহায্য নিতে কোথাও বাধছে ডিসিডিডি স্যারের।
'এবার বলুন। আপনাকে তো যা যা চেয়েছিলেন, সব ফাইলস দেওয়া হয়েছে। কী বুঝলেন?' জিজ্ঞাসা করলেন সৌরভবাবু।
টাপুরদি বলল, 'পুরোপুরি বুঝেছি বলব না। তবে কিছুটা বুঝেছি। বাকিটা হিসেব মিলিয়ে এগোতে হবে, এই আর কী!'
দুপুর ৩:০০
স্থান: পুলিশ হেড কোয়ার্টারের কাছে একটা ছোটো রেস্তোরাঁ।
'অর্জুনদাকে আজই হলদিয়া পাঠাতে চাইছ কেন, বলো তো? তোমার মাথায় কী চলছে?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
শেষমেশ টাপুরদি সৌরভবাবুকে রাজি করিয়েই ছেড়েছে। অর্জুনদা আজ রাতেই যাবে হলদিয়া। পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে বাইরে দুপুরের খাবার খেতে এসেছি। এটা একটা ছোটো চাইনিজ রেস্তোরাঁ। ছোটো হলেও বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে। আমি মিক্সড চাউমিন অর্ডার দিয়েছি, সঙ্গে সেজোয়ান চিকেন। টাপুরদি শুধু চিকেন স্যালাড আর মান চাও সুপ নিয়েছে নিজের জন্য।
আমার প্রশ্নের উত্তরে গরম স্যুপে চুমুক দিয়ে বলল, 'জানি না। মনে হল ওর থাকা উচিত।'
'আসল কথা হল, অর্জুনদা ওখানে থাকতে চেয়েছিল। তাই...'
টাপুরদি বলল, 'অর্জুনের থাকতে চাওয়ার কারণ ছিল। এত দূর এসে আর গাফিলতির কোনো জায়গা নেই।'
চাউমিনটা খুব ভালো বানিয়েছে। সেজোয়ানটা বেশ ঝাল হলেও দারুণ স্বাদ। খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করলাম, 'সিএম তো কলকাতায় ফিরে এসেছেন। কথা হয়েছে?'
'না, সময় হয়নি।' বলল টাপুরদি।
টাপুরদির ফোনটা বাজছে। ফোন রিসিভ করে কানে ঠেকাল টাপুরদি। দেখলাম দ্রুত ওর মুখের অভিব্যক্তি বদলে যাচ্ছে। চোয়াল শক্ত হয়ে যাচ্ছে। বলল, 'আমরা পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।'
বিকেল ৪:০০
স্থান : পুলিশ হেড কোয়ার্টার।
'কেন?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
সৌরভ সান্যাল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, 'কী করে বলব, সঙ্ঘমিত্রা? ওপর থেকে অর্ডার এসেছিল আপনাকে এই কেসে ইনভলভ করার জন্য। আমি করেছি। এখন হেলথ মিনিস্ট্রি থেকে বলা হয়েছে, আপনি এই কেসে ফারদার আর কাজ করবেন না। আমি তো সরকারের চাকুরে। যেহেতু পুরো ব্যাপারটাই আন-অফিশিয়াল, এক্ষেত্রে আমার আর কিছু করার নেই।'
টাপুরদি উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, 'করার নেই মানে? এতগুলো দিন আমি এই কেসে কাজ করেছি। অনেক তথ্য-প্রমাণ তুলে দিয়েছি পুলিশের হাতে। আজ এত কাছে এসে আমাকে সরে যেতে হবে? আপনি তো জানেন, এই কেসে ওপরমহলের অনেক রাঘব-বোয়ালরা জড়িয়ে আছে। তাঁদের ল্যাজে পা পড়েছে বলে আমাকে সরিয়ে দিতে চাইছে। তার মানে আমি ঠিক পথে এগোচ্ছি। প্লিজ আপনি কিছু করুন।'
টাপুরদিকে ভীষণ মরিয়া লাগছে, মনে হচ্ছে হঠাৎ এরকম একটা সংবাদে যথেষ্ট ভেঙে পড়েছে।
সৌরভবাবু বললেন, 'আমিও বলি কী মিস ব্যানার্জি, এই কেসে আপনার যতটা করার ছিল, আপনি করেছেন। আমি এবং আমার টিম আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। এখন আর আপনার তেমন কিছু কাজও নেই। এটা একটা পুলিশি অভিযান। পুলিশ ওদের লোকেশন জেনে গেছে। এখন শুধু হাতেনাতে ধরার অপেক্ষা। এখানে আপনি আর কী করবেন?'
টাপুরদি বাঁকা হাসল। বলল, 'তাই নাকি? শুধু এটুকুই বাকি? আপনারা কী ভাবছেন? পুরো দল আপনাদের ওয়েলকাম করার জন্য ওখানে বসে থাকবে? বড়োজোর কয়েকজন চুনোপুঁটিকে ধরবেন আপনারা। রাঘব-বোয়ালদের ছুঁতেও পারবেন না।'
সৌরভবাবুর চোয়াল শক্ত হল। বললেন, 'তাহলে এক কাজ করুন। আপনার তো ওপরমহলে ভালোই হোল্ড আছে। যেখান থেকে অর্ডার এসেছে, সেখানে গিয়েই বরং তদবির করুন। আমি এখানে কিছুই করতে পারব না।'
বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। অর্জুনদা হয়তো ব্যস্ত আছে। তাই তাকে আর বিরক্ত করা ঠিক হবে না।
টাপুরদি বলল, 'চল।'
'কোথায় যাবে?' জানতে চাইলাম আমি।
'সিএম-এর অফিসে।' টাপুরদি উত্তর দিল।
'অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া?'
'অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার সময় না থাকলে সেটা ছাড়াই দেখা করতে হবে', কঠিন গলায় বলল টাপুরদি।
সন্ধ্যা ৬:৪৫
এক ঘণ্টারও বেশি অপেক্ষা করার পর সিএম-এর দেখা পাওয়া গেল। জানালেন, জরুরি মিটিং-এ ব্যস্ত ছিলেন।
'বলুন, মিস ব্যানার্জি! কী সমস্যা?' স্বাভাবিক হেসে বললেন অম্লানবাবু, যেন কিছুই হয়নি।
টাপুরদি বলল, 'সমস্যা তেমন কিছু নয়। শুধু জানার ছিল, আমাকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দেওয়া হল কেন?'
অম্লানবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, 'দেখুন মিস ব্যানার্জি, আমি নিজে দায়িত্ব নিয়ে আপনাকে এই কেসে ইনভলভ করার পারমিশন ইস্যু করিয়েছিলাম। আমি নিজে পুলিশ মন্ত্রী। সুতরাং, এতে যে আমার নিজের ডিপার্টমেন্টের ওপর আমার অনাস্থাই প্রকাশ পায়, এ নিশ্চয়ই আপনাকে বলে দিতে হবে না। আপনি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। যা বলছি মন দিয়ে শুনুন। বুঝতে চেষ্টা করুন।
'আমার এই পারমিশনের জন্য হেলথ ও পুলিশ, দুই বিভাগেই যথেষ্ট কথা চালাচালি হচ্ছে, এ আমার কানে এসেছে। তার ওপর জুনিয়র ডাক্তারদের স্ট্রাইকটা নিয়ে হেলথ মিনিস্ট্রির ওপর যথেষ্ট চাপ আছে।
এই রকম অবস্থায় আপনি হেলথ সেক্রেটারিকে তাঁর অফিসে গিয়ে অপমান করে এসেছেন। আমাকে তো এঁদের নিয়েই কাজ করতে হয়, মিস ব্যানার্জি। উচ্চপদস্থ এই আমলারা কিন্তু সেন্ট্রালের এমপ্লয়ি। আর সেখানে আমাদের অপোজিশন পার্টি রয়েছে। আপনার এই স্টেপটা আমাদের সরকার ও পার্টির জন্য যথেষ্ট সমস্যা তৈরি করেছে। আপনি নিশ্চয়ই আমার কথা বুঝতে পারছেন? আমি সিএম হলেও যা খুশি সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমাকেও অনেক দিক সামলাতে হয়।'
'ভেতরে আসতে পারি?'
পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে তিনজনেই ফিরে দেখলাম সুদর্শনবাবু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
'আসুন সুদর্শনবাবু!' বললেন সিএম।
ভেতরে এসে আমাদের পাশের চেয়ারে বসলেন চিফ সেক্রেটারি। বললেন, 'কী ব্যাপার? এনি প্রবলেম?'
অম্লানবাবু বললেন, 'মিস ব্যানার্জি কেসটা থেকে তাকে উইথড্র করার অর্ডারের সম্পর্কে কথা বলতে এসেছেন।'
সুদর্শনবাবু বিষণ্ণ মুখে মাথা নাড়লেন। বললেন, 'অদ্বৈত খুব বিরক্ত তোমার ওপর। ও যদি এই নিয়ে সেন্ট্রাল মিনিস্ট্রির কাছে কমপ্লেইন করে, ব্যাপারটা অন্য দিকে টার্ন নেবে। অপোজিশন এটাকে ইস্যু করে পলিটিকাল ফায়দা তুলতে পারে।'
টাপুরদি বলল, 'আপনারা বুঝতে পারছেন না। এই কেসে আপনার প্রশাসনের উঁচু পদের লোকেরা জড়িয়ে আছে। তারা আমাকে এই কেস থেকে সরানোর চেষ্টা করবেই। কারণ তারা জানে আমি তাদের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। এখন আমি এই কেস থেকে সরে গেলে তাঁদেরই সুবিধে করে দেওয়া হবে। আমাকে অন্তত আর দুটো দিন সময় দিন। তার মধ্যে যদি আমি অপরাধীদের পুলিশের হাতে তুলে দিতে না পারি, আমি নিজেই সরে যাব এই কেস থেকে।'
অম্লানবাবু ও সুদর্শনবাবু মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। সুদর্শনবাবু বললেন, 'তোমার ওপর আমরা অনেক আশা রেখেছিলাম, বিশেষত আমি। কিন্তু তুমি যে কেন হেলথ সেক্রেটারিকে থ্রেট করার মতো একটা হঠকারী কাজ করে বসলে!'
তারপর সুদর্শনবাবু অম্লানবাবুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কিছু করা সম্ভব কি? কোনোভাবে মিস ব্যানার্জিকে পারমিশন দেওয়া যেতে পারে?'
অম্লানবাবু মাথা নেড়ে বললেন, 'নাহ, এখন এই পরিস্থিতিতে সম্ভব নয় আর। আই অ্যাম সরি মিস ব্যানার্জি। ভবিষ্যতে যে-কোনো প্রয়োজনে বলবেন আমাকে। আমি চেষ্টা করব আপনাকে যথাসম্ভব সাহায্য করতে। কিন্তু এই কেসে আমি আর কিছু করতে পারছি না। এখানে আপনাকে ইনভলভ করার রিস্ক আমি নিতে পারব না।'
'ধন্যবাদ!' বলে উঠে দাঁড়াল টাপুরদি। আর একটাও কথা না বলে সিএম-এর কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
বাইরে বেরিয়ে দেখি অর্জুনদা রাস্তায় দাঁড়িয়ে।
'তুমি এখানে? তুমিও আমাকে সান্ত্বনা দিতে এসেছ?' রুক্ষস্বরে বলল টাপুরদি।
'না। ডিসিডিডি স্যারের কাছে শুনলাম তুমি এখানে এসেছ। তাই এলাম। আমি হলদিয়া রওনা হচ্ছি টিম নিয়ে।' অর্জুনদা বলল।
টাপুরদি কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নাড়ল।
'সিএম স্যার কী বললেন?'
টাপুরদি নীরবে দু-দিকে মাথা নাড়ল। অর্জুনদা ওর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর হাত বাড়িয়ে টাপুরদির মুখের ওপর এসে পড়া চুলের গোছা সরিয়ে সযত্নে কানের পেছনে ঠেলে দিয়ে নরম গলায় বলল, 'টাপুর, আমি এখানে শুধু একটা কথা তোমায় বলতে এলাম। তুমি তো সরকারি চাকুরে নও। তুমি একজন স্বাধীন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। কাউকে কোনো জবাব দিতে হয় না তোমার। কই, অমিয় চক্রবর্তী মার্ডার কেসে লুকিয়ে অম্লানবাবুর বাড়িতে ঢোকার জন্য কারও অনুমতির তোয়াক্কা তো করোনি তুমি! আদপেই কারও কোনো অনুমতির প্রয়োজন আছে কি তোমার? কেউ চাইলেই তোমাকে এই কেস থেকে সরিয়ে দিতে পারে কি না ভেবে দেখো তো!'
টাপুরদি চকিতে মুখ তুলে অর্জুনদার মুখের দিকে সবিস্ময়ে তাকাল। মুচকি হেসে চোখ টিপল অর্জুনদা। তাকিয়ে দেখলাম, টাপুরদির আঁধার মুখে ফুটে উঠেছে একচিলতে হাসির আলো।
বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে স্নান সারলাম। সারাদিনে মনের মধ্যে যা গ্লানি জমেছিল, ধুয়ে গেল অনেকটাই। তারপর রাতে হালকা খাবার খেয়ে নিলাম। টাপুরদি কথা খুব কম বলছে। আমিও বেশি ঘাঁটাচ্ছি না। খেয়ে উঠে দেখি টাপুরদি জিনস টি-শার্টের ওপর পাতলা জ্যাকেট পরে তৈরি। সোফায় বসে স্নিকারের ফিতে বাঁধছে। জিজ্ঞাসা করলাম, 'কোথায় যাচ্ছি আমরা?'
টাপুরদি আমার সামনে সোফায় বসল। আমার চোখে চোখ রেখে বলল, 'আমি তোকে নিয়ে যাব, মিতুল, তবে এখন নয়। আমার কথা শোন। আমি এখন কয়েকটা জায়গায় যাব। তুই অবশ্যই জানবি। সব বলব তোকে। সব আমার প্ল্যানমাফিক হলে তারপর তোকে নিয়ে যাব। এখন জেদ করিস না লক্ষ্মী বোন আমার!'
আমি আর কথা বাড়ালাম না। মনখারাপ হলেও মেনে নিলাম। টাপুরদি বেরিয়ে যেতে দরজা বন্ধ করে টিভিতে নিউজ চ্যানেল চালিয়ে বসলাম। কিন্তু মন উচাটন। কিছুতেই মন বসছে না। অগত্যা ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে চোখ বুজলাম। সারাদিন শরীরের ওপর দিয়ে ধকল কম যায়নি। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি।
ঘুমের মধ্যে ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল, 'টাপুরদি?'
ঘড়ির দিকে তাকালাম। পৌনে একটা বাজে। টাপুরদি বলল, 'ঘুমিয়ে পড়েছিলি?'
'কী ব্যাপার বলো!' উত্তেজিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'তৈরি হয়ে নীচে আয়, ফাস্ট। দু-মিনিট সময় দিলাম। আমি পৌঁছোচ্ছি।'
ঠিক দুই মিনিটের মধ্যেই ফ্ল্যাটে তালা লাগিয়ে নীচে নামলাম আমি। কমপ্লেক্সের গেট দিয়ে বাইরে বেরোতেই টাপুরদির গাড়িটা প্রচণ্ড বেগে সামনে এসে ব্রেক কষল।
'উঠে আয়।' বলল টাপুরদি।
তাকিয়ে দেখি, টাপুরদি ড্রাইভ করছে। পাশের সিটে শুভম।
টাপুরদি গাড়ি চালাতে চালাতেই বলল, 'অর্জুন শুভমকে বলে গেছিল, যে-কোনো আপডেট আমাকে জানাতে, অবশ্যই আন-অফিশিয়ালি। আপাতত যেটুকু ইনফরমেশন আমাদের কাছে আছে, তাতে আমাদের খুব শিগগিরই হলদিয়া পৌঁছোতে হবে।'
'কেন?'
'শুভম একেবারেই অ্যাক্সিডেন্টালি একটা হাইলি সিকিওর লাইন হ্যাক করে ফেলেছে। নবদিগন্তের ডেটা থেকে ডক্টর মিত্রর ই-মেল অ্যাকাউন্ট পেয়েছিল ও। সেটা হ্যাক করে একটা লিংক পায়, অনেক ফায়ারওয়াল সেট করা একটা প্রাইভেট নেটওয়ার্কের হদিস খুঁজে পায় ও। একটা সিকিওর লাইন বিল্ড-আপ করা হয়েছে। সেই নেটওয়ার্ক পুরোটাই হ্যাক করেছে শুভম। দারুণ কাজ করেছে। যদিও কলগুলোর লোকেশন বা আইপি অ্যাড্রেস কিছুই জানা যায়নি।
'যাই হোক, সেখানে একটা কনভার্সেশন শোনা গেছে। গলার স্বর বোঝা না গেলেও এটা শিওর যে ওরা আগামীকালের বদলে আজই কনসাইনমেন্ট পাঠাবে। অথচ অর্জুনের ফোন লাগছে না। শুভমও ওদের টিমের কয়েক জনকে ট্রাই করল। ওই জায়গাটাতে বোধহয় সিগন্যালের সমস্যা আছে। কাউকেই ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। মেসেজ করে দিয়েছি। কিন্তু রিস্ক নেওয়া যাবে না। তাই আমি যাচ্ছি।'
'সৌরভবাবু জানেন?' জিজ্ঞাসা করলাম।
শুভম এর উত্তর দিল। বলল, 'স্যার সারাদিন অফিসেই ছিলেন। রাত দশটার পর বেরিয়েছেন। আজ স্যারের ছোটো শ্যালিকার বিয়ে। ফোন করেছি। স্যার ধরেননি। টিমকেও পেলাম না। তাই টাপুরদিকে ফোন করে সব জানালাম। তবে স্যারকেও মেসেজ করেছি। চেক করলে কলব্যাক করবেন নিশ্চয়ই।'
একটু চুপ করে রইলাম। তারপর হঠাৎ বিদ্যুতচ্চমকের মতন একটা কথা মনে হল। জিজ্ঞাসা করলাম, 'সত্যি করে বলো তো টাপুরদি, তুমি জানতে যে ওরা প্ল্যান চেঞ্জ করবে! তাই সৌরভবাবুকে বলে অর্জুনদাকে আজই পাঠালে?'
টাপুরদি একটু চুপ করে থেকে বলল, 'জানতাম বলব না, আন্দাজ করেছিলাম।'
শুভমের ফোন বাজছে। পকেট থেকে বের করে স্ক্রিনে চোখ রেখে বলল, 'অর্জুনদা।'
বুঝলাম অর্জুনদা শুভমের মেসেজ দেখেছে। শুভম পুরো ঘটনাটা বুঝিয়ে বলল ফোনে। ও-প্রান্ত থেকে অর্জুনদা কী বলল শোনা গেল না। ফোনটা রেখে ল্যাপটপ খুলে বসল শুভম। কি-বোর্ডের ওপর ওর আঙুল অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটতে লাগল। প্রায় আধ ঘণ্টা কেটে গেল নীরবে। তারপর হঠাৎই ল্যাপটপ থেকে পুরোনো অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর মতো ছেঁড়া ছেঁড়া ঘ্যারঘেরে শব্দ ভেসে আসতে লাগল। আমি পেছনের সিট থেকে উঁকি মারলাম। শুভম সোজা বসে বসেছে। ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছে উত্তেজনায়। দ্রুত হাতে কোনো ভয়েজ কল থেকে একের পর এক এনক্রিপশন লেয়ার সরিয়ে যাচ্ছে।
শব্দটা সামান্য পরিষ্কার হল। একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
'শিবেনের সঙ্গে মতি মিঞাকে রাখবে।'
আবার ঘ্যারঘ্যার।
'যা বলছি করো। মতিমিঞা যাবে সঙ্গে। আমি কোনো রিস্ক নেব না। প্রতি ঘণ্টায় তোমাকে স্ট্যাটাস ইনফর্ম করবে। রাত টিনটের মধ্যে'...
শব্দটা বাড়ছে। কণ্ঠস্বরটা ডুবে গেল। টাপুরদি বলল, 'গাড়ি থামাব, শুভম?'
শুভম মাথা নেড়ে বলল, 'লাভ নেই। আরও লেয়ার পড়ছে। আর কিছু পাওয়া যাবে না।'
কথাটা শুনে শিবেনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। হঠাৎ প্ল্যান চেঞ্জের কারণটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না সে। মতিমিঞা সঙ্গে যাবে। কেন? তাহলে কি কেউ কিছু সন্দেহ করছে? তার টিম কাল এসে পৌঁছোবে। এত কম সময়ের মধ্যে নতুন করে খবর দেওয়ারও উপায় নেই। মতিমিঞা সারাক্ষণ সঙ্গে সেঁটে আছে। শিবেন ভেবেছিল, কোনো রক্তক্ষয় ছাড়াই মসৃণভাবে কাজ হাসিল করে নেবে। কবে থেকে এই আজকের দিনের প্রতীক্ষা করেছে সে। নিজেকে তৈরি করেছে, বিশ্বাস অর্জন করেছে। তাহলে? মতিমিঞা মানুষটা সরল, শিবেনের প্রতি স্নেহপ্রবণ। কিন্তু সে বেইমান নয়। তাকে ভাঙা সহজ হবে না। উত্তেজনায় হাতের মুঠি বারবার খোলা-বন্ধ করতে থাকে শিবেন।
কাঁধে হাতের ছোঁয়া অনুভব করে চমকে পেছনে ফেরে শিবেন।
'কিতা করস, ছ্যামরা? কাজে যাওনের আগে বেশি ভাববার নাই, বুজলানি?'
ফিকে হেসে মাথা নাড়ে শিবেন। এই ক-দিনে এই প্রৌঢ় লোকটার ওপর কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে। কিন্তু কর্তব্যের চেয়ে বড়ো আর কিছু নেই। উঠে দাঁড়ায় শিবেন। বলেন, 'তুমি রেডি হয়েছ?'
মতিমিঞা ঘাড় নাড়ে।
'তিনটার মইধ্যে বাইরান লাগব। একটু শুইয়া ন্যাও বাপ।'
'নাহ এখন আর শুব না', শিবেন বলে।
মতিমিঞা একটা দেশি মদের বোতল খুলে বসে। নিজের মনেই বলতে থাকে, 'আইজ তুমার পত্থম কাইজ। মন লাগায়া কাইজ করবা। আমি সঙ্গে আসি, সব দেহায় বুঝাই দিমু। হাতে কইর্যা কত জনারে কাইজ শিখাইলাম। চক্ষু-কান খুলা রাখন লাগব সব্বদা, বুঝলা। আর মাথা ঠান্ডা রাখবা। ব্যস, তাইলেই হইব। আমাদের কাইজে কুনো প্যালেন হয় না জানবা। জ্যাহন জ্যামুন সামনে আসব, ত্যাহন ত্যামুন কইর্যা প্যালেন বানাইয়া লইতে লাগব।'
শিবেন ভাবে, ঠিক এই কথাগুলোই ট্রেনিং-এর প্রতিটা স্টেপে বেদবাক্যের মতো করে তাদের শেখানো হয়েছিল। কত মিল তাদের কাজের, অথচ...
লালন জানে আজ তাদের এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হবে। সকাল থেকেই সাজো সাজো রব উঠেছে। এর আগেও এই ঘর থেকে অনেকে গেছে। আজ লালন যাবে। সে আজকাল আর বেশি ভাবে না। বাথরুমের কাঠের পাটাতন খুলে পালাতে চেয়েও পারেনি। তারপরেও চেষ্টা করেছিল বেশ কয়েক বার। লালন বুঝতে পেরেছে, এই ঘরের বাইরে জোরদার পাহারা আছে। তারপর একদিন মরিয়া চেষ্টা করেছিল সে। বোধহয় পাগলই হয়ে গেছিল লালন সেদিন। খাবার দিতে আসা বুড়োটাকে ধাক্কা মেরে খোলা দরজা দিয়ে পালাতে চেষ্টা করেছিল। বেধড়ক মার খেয়েছিল। বুড়োটা না বাঁচালে বোধহয় ওরা লালনকে মেরেই ফেলত। কিংবা হয়তো মারত না। লালনের অনেক দাম, সেটা এখানে এসে বুঝেছে সে। তারপর থেকে ওকে কড়া ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। সারাদিন ঘুমোয় সে। খিদেও আর পায় না। শুধু ঘুম, ঘুম। এরই মধ্যে একদিন খাবার দিতে আসা বুড়োটা চুপিচুপি তার কাছে নম্বর চেয়েছিল ওর কোনো আপনজনের। আপনজন! ঘোর লাগা চোখে বুড়োটার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তড়িঘড়ি বুড়োটার হাতে ধরা একচিলতে কাগজে লিখে দিয়েছিল উত্তীয় দাদামণির নাম আর নাম্বার।
দাদামণি আসেনি তাকে বাঁচাতে। কী জানি বুড়োটা দাদামণিকে খবরটা আদৌ দিতে পেরেছে কি না! আর এসেও লাভ নেই। আজ লালনদের নিয়ে যাওয়া হবে এখান থেকে। গত দুইদিনে ডাক্তার দু-বেলা করে এসে ওদের পরীক্ষা করে গেছে। ওষুধ, ইঞ্জেকশন দিয়েছে। একটু পরেই তাদের ঘুমের ইঞ্জেকশন দেওয়া হবে। একবার পালাতে চেষ্টা করে জসীমচাচাকে হারিয়েছে লালন। সে জানে, আর চেষ্টা করে লাভ নেই। পাশ ফিরে শোয় সে। আজ কে জানে কেন মায়ের কথা মনে পড়ে তার। মাতাল বাপটার কথাও।
হলদিয়ায় ঢোকার মুখে শুভমের ফোনটা আবার বেজে উঠল। শুভম বলল, 'ডিসিডিডি স্যার!'
ফোন ধরে কথা সারল সে। শুভম, টাপুরদি ও আমার সঙ্গে হলদিয়া যাচ্ছে শুনে সৌরভবাবু বোধহয় কিছু বলছেন, শুনলাম শুভম বেশ আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল, 'আমার যাওয়াটা দরকার, স্যার। ওখানে আমাকে দরকার হবে।'
আরও কিছু কথা বলে ফোনটা টাপুরদির হাতে দিল শুভম। বলল, 'স্যার তোমার সঙ্গে কথা বলবেন।'
আমি একটু অবাক হয়ে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। কিন্তু টাপুরদিকে অবাক হতে দেখলাম না। গাড়ি রাস্তার একদিকে দাঁড় করিয়ে ফোন নিল। ফোনটা কানে লাগিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, 'হ্যাঁ, বলুন।'
ও-প্রান্ত থেকে কী কথা হল জানি না, টাপুরদি বলল, 'পুরোপুরি শিওর কি না বলতে পারছি না। সেটা হতে আর একটু সময় লাগবে। ততক্ষণ যেন পালাতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা আপনার দায়িত্ব। যত বেশি লোক সম্ভব পাহারায় রাখা দরকার। আমাদের টার্গেট অত্যন্ত চতুর। দরকার হলে প্লেইন ড্রেসের পুলিশ দিয়ে বাড়ি ঘিরে রাখুন।'
ফোন রেখে গাড়ি স্টার্ট করল টাপুরদি। বলল, 'সৌরভবাবু ওদিক থেকে ফোর্স নিয়ে রওনা দিয়েছেন।'
অন্ধকারের চাদর মুড়ে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াগন ট্রাকটা। জায়গাটা এমনিতেই বেশ অন্ধকার। নভেম্বরের শেষে হিম পড়তে শুরু করেছে। মধ্যরাতের পরে রাস্তায় লোক থাকে না। মাতালদেরও বাড়ি ফেরার সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। এই গলির ভেতরে ল্যাম্পপোস্ট ছিল একটা, যার বালবটা কে বা কারা খুলে নিয়েছে অনেক আগেই। অর্জুন জানে, যেসব জায়গায় সমাজবিরোধী কাজকম্ম হয়, সেখানে আলো থাকা চলে না।
এই হিমের রাতে সারা শহর যখন হালকা চাদরের ওম মেখে ঘুমোচ্ছে, কিছু মানুষ জেগে আছে তবু। তাদের সবার যদিও জেগে থাকার উদ্দেশ্য এক নয়, তবু উভয় পক্ষই সমান সচেতন। তারা জানে, সামান্য ভুলের জন্য চরম মূল্য দিতে হতে পারে।
অর্জুনের টিম ছড়িয়ে আছে পুরো জায়গাটা জুড়ে। বেড়ালের মতো পা টিপে চলাচল করছে অন্ধকারের আড়ালে, প্রয়োজনে ফিসফিস করে কথা বলছে, যার শব্দ ঘাসে শিশিরবিন্দুর পতনের চেয়েও মৃদু। অর্জুনের পকেটের ফোন ভাইব্রেট করছে। ভ্রূ কুঁচকে ফোনটা বের করে দেখল ডিসিডিডি স্যার। এক কোণে অন্ধকারে সরে গিয়ে ফোনটা কানে ঠেকাল অর্জুন।
'হ্যালো, স্যার!'
'সব ঠিক আছে? শুভমের মেসেজ পেয়েছ তো?'
'পেয়েছি স্যার। সব ঠিক আছে। রাত দুটোর পর একটা ওয়াগন ট্রাক একটু দূরে এসে দাঁড়িয়ে আছে। এখনও কোনো মুভমেন্ট নেই।' ফিসফিস করে বলল অর্জুন।
'আমি টিম নিয়ে আসছি। রেড হ্যান্ডেড অ্যারেস্ট করতে হবে অর্জুন। চেষ্টা করবে গ্যাংটার সকলকে জীবন্ত ধরতে। নইলে ওদের কিং পিন অবধি পৌঁছোনো যাবে না।'
'ওকে স্যার। আমাদের উদ্দেশ্য হল ওরা যখন ট্রাকে লোড করবে তখন ধরা। কারণ, ওই বাড়ির ভেতর কে কী অবস্থায় আছে আমরা জানি না। আশা করা যায় ওদের কাছে আর্মস আছে। ওখানে যাদের রাখা হয়েছে, তাদের লাইফের কোনোরকম রিস্ক নেওয়া যাবে না। তাই আমরা ভেতরে ঢুকছি না। আপাতত বাইরেই অপেক্ষা করছি। আপনারা আসুন। ততক্ষণ আমরা সামলে নেব', বলে ফোনটা রেখে দিল অর্জুন।
জীবন্ত ধরতে হবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। জীবন্ত ধরার সব দায় পুলিশের। নইলে মিডিয়া, হিউম্যান রাইটস চিবিয়ে খাবে তাদের। ক্রিমিনালদের এমন কোনো দায় নেই। ওরা সেদিক থেকে ভাগ্যবান। হাতের অস্ত্রকে সংবরণ করার কোনো নির্দেশ থাকে না তাদের ওপর।
কবজি উলটে ঘড়ি দেখল অর্জুন। রাত দুটো চল্লিশ বাজে। এখনও কেউ বেরোয়নি ওই বাড়ি থেকে। তবে কি শুভম ভুল শুনল? মন্থর পায়ে অন্ধকারে বাড়িটার দিকে এগোল অর্জুন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকারের বুক চিরে একটা বাইক এসে থামল বাড়িটার সামনে। দু-জন নামল বাইকটা থেকে। অন্ধকারে ভালো দেখা যাচ্ছে না। তবে দূর থেকে মনে হল, একজন দীর্ঘদেহী, কমবয়সি। অপর গাঁট্টাগোঁট্টা চেহারার টাক-মাথা মানুষটির বয়স বেশি। তারা নিঃশব্দে বাইকটাকে তুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে নিল। নিজেরাও সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল ওপরে।
ওরা ঢুকে যেতেই অর্জুন নিজের টিমকে নির্দেশ দিল কাছে এসে বাড়িটার চারপাশে ঘিরে থাকতে। ওদের এখনই কিছু টের পেতে দেওয়া চলবে না।
ঘড়ি ধরে মিনিট দশেক কাটল। আর কাউকে ঢুকতে বা বেরোতে দেখা গেল না। অর্জুন ও তার টিম নিশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটা মুহূর্ত এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এবার অন্ধকারে কিছু আন্দোলন দেখা গেল। কয়েকজন নেমে আসছে সিঁড়ি বেয়ে। বেঁটে লোকটা এগিয়ে গিয়ে ওয়াগন ট্রাকটার ড্রাইভিং সিটে বসল। তারপর সেটা ব্যাক করিয়ে এনে তিনতলা বাড়িটার সামনে থামল। নিজেও নেমে এল গাড়ি থেকে।
সিঁড়ি বেয়ে দু-জন মিলে ধরে ধরে পাঁজাকোলা করে কাউকে নামাচ্ছে। মৃত কী জীবিত বোঝা যায় না। দেহে কোনো সার নেই। তারপর আর একজনকে নামানো হল, আবার আর একজন। সারসার দেহ নামছে। সকলের মুখ-হাত বাঁধা। লোকগুলো বারবার সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করছে। হাঁফাচ্ছে। অর্জুন বোধ হয় নিশ্বাস ফেলতেও ভুলে গেছে। একের পর এক মৃতবৎ দেহগুলিকে যন্ত্রের মতো নিঃশব্দে ট্রাকে তোলা হচ্ছে। বোঝা যায় এরা এইসব কাজে যথেষ্ট দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে মার্জারপদে এগোচ্ছে অর্জুনের টিমও। হাতে সবার লোডেড সার্ভিস রিভলভার। সব মিলে ওদের দলে জনা আষ্টেকের বেশি হবে না। সম্ভবত অস্ত্রও আছে ওদের কাছে। সেটা থাকাই স্বাভাবিক।
একসময় শেষ মানুষটিকেও তোলা হয়ে গেল ওয়াগনের ভেতর। ঠিক সেই সময়ে ঘটল ঘটনাটা। ওয়াগনের খোলা শাটার দিয়ে একটা ছেলে পরিত্রাহি চিৎকার করে উঠল, 'বাঁচাও, কে আছ, বাঁচাও!'
গলা শুনে মনে হল বয়স চোদ্দো-পনেরো হবে। লাফিয়ে পড়ল ছেলেটা রাস্তায়। কোনোভাবে মুখের বাঁধন খুলে ফেলেছে ছেলেটা। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগে হাত বাঁধা অবস্থাতেই দিকবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করল। দু'জন ওর পেছনে ছুটছে ওকে ধরার জন্য। মুহূর্তে দুটো আগ্নেয়াস্ত্র শূন্যে গর্জে উঠল। বাচ্চাটা ততক্ষণে অন্ধকারে পথের অন্য প্রান্তে ছুট লাগিয়েছে। ওর গা-ঘেঁষে বেরিয়ে এল একটা গুলি। লোকটা আবার ফায়ার করতে যাওয়ার আগেই ওদের নিজের দলের থেকেই একজন ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার ওপর। ধ্বস্তাধ্বস্তির মাঝে লোকটার হাত থেকে রিভলভার কেড়ে নিল। আর তখনই মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে অর্জুনের টিম ঘিরে ফেলল ওদের।
অন্ধকারে কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশের লোকেরা ওদের গোটা দলটাকে কবজা করে ফেলল। কয়েকজন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল অবশ্য। তাতে সুবিধে করে উঠতে পারেনি। ওদের সকলের হাতে অস্ত্র ছিল না। এই পরিস্থিতির জন্য তৈরিও ছিল না ওরা। দীর্ঘদিন নিরুপদ্রবে কাজ চালিয়ে এসে হয়তো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে ভুগছিল। তা ছাড়া অর্জুনের টিম আজ অ্যাকশনের জন্য তৈরি হয়েই এসেছিল। লড়াইটা একপাক্ষিকই হল।
ওদের দলের ভেতর থেকে যে লোকটা নিজের দলের একজনকে অ্যাটাক করেছিল, সে এগিয়ে এসে অর্জুনের সামনে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে দিল।
'আমি শিবেন্দ্র কুলকর্নি, স্পেশাল আন্ডারকভার আইবি অফিসার', বলে হাত বাড়ালেন তিনি।
অর্জুন আই-কার্ডটা দেখে নিয়ে ফেরত দিল। বিস্ময়ের ভাবটা চেপে রেখে করমর্দনের জন্য হাত বাড়াল। সে শুনেছিল বটে, অরগ্যান ট্র্যাফিকিং কেসে আইবি কাজ করছে। কিন্তু তারা যে কলকাতা থেকে দূরে এই হলদিয়াতে পুলিশের আগেই পৌঁছে গেছে, ওদের দলে মিশে ওদের মিশন ফেল করানোর কাজ করে চলেছে জানা ছিল না অর্জুনের। মনটা একটু দমে গেল এই ভেবে যে, কলকাতা পুলিশের সব ক্রেডিট হয়তো আইবি নিয়ে যাবে।
কৌশিক এসে বলল, 'স্যার, ছেলেটা ঠিক আছে। গুলি লাগেনি। তবে কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। তাই খানিকটা ঘোরের মধ্যে আছে। নাম বলল'...
'লালন', কৌশিক শেষ করার আগেই বলল অর্জুন।
ঠিক তখনই অন্ধকার কেটে একটি চেনা গাড়ি এসে দাঁড়াল তাদের সামনে।
আমরা গাড়ি থেকে নামতে অর্জুনদা এগিয়ে এল আমাদের দিকে। টাপুরদির দিকে একবার চকিতে নরম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শুভমকে বলল, 'খুব ভালো হয়েছে তুমি নিজেই এসেছ। তোমাকে দরকার পড়তে পারে। এখানে মোবাইল সিগন্যাল খুব লো। বারবার ফোন করে যোগাযোগ করা হয়তো সম্ভব হত না।'
একজন লম্বা-চওড়া লোক অনেকক্ষণ ধরে ফোনে কথা বলছিলেন দূরে দাঁড়িয়ে। এবার ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে এগিয়ে এলেন আমাদের দিকে। অর্জুনদা আমাদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিল।
'এঁরা হলেন শুভম মিত্র, কলকাতা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের অফিসার, ইনি সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর আর ইনি তাঁর সহকারী, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার মৈথিলী সেন। আর ইনি হলেন আইবি আন্ডারকভার এজেন্ট শিবেন্দ্র কুলকার্নি।''
করমর্দন ও প্রাথমিক পরিচয়ের পালা সাঙ্গ হলে টাপুরদি বলল, 'আপনি বেশ বাংলা বলেন তো! শুনে অবাঙালি বলে মনেই হয় না।'
শিবেন্দ্র হেসে বললেন, 'আমার মা পুরোদস্তুর বাঙালি, তায় কাঠ-বাঙাল। তাই বাংলা আমার মাতৃভাষা।'
টাপুরদি বলল, 'আপনি কীভাবে এদের সঙ্গে মিলে, মানে আমি কিছু বুঝতে পারছি না।'
শিবেন্দ্র বলল, 'আমাদের কাছে খবর ছিল হলদিয়াতে ট্র্যাফিকিং-এর একটা বেস আছে। এর পর আমাদের টিম খোঁজখবর শুরু করতে এদের খোঁজ পাই। এদেরই একজনের থ্রু আমি এদের দলে ঢুকি। প্ল্যান ছিল হাতে নাতে ধরা। কিন্তু সেই সুযোগটাই হচ্ছিল না। এরা নতুন লোকের উপর বিশ্বাস করে না। আজও ঠিক লাস্ট আওয়ারে ডেট অ্যান্ড টাইম বদলে দেওয়ায় আমার টিম এসে পৌঁছোতে পারেনি। অনেক চেষ্টা করেও এদের মাথা কে, আমি জানতে পারিনি। আপনারা কিছু জেনেছেন কি?'
টাপুরদি আর অর্জুনদা মুহূর্তে চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। অর্জুনদা মাথা নেড়ে বলল, 'না, এদের মুখ খোলাতে পারলে হয়তো জানা যেতে পারে।'
অর্জুনদা কৌশিকের সঙ্গে কথা বলছিল একটু দূরে দাঁড়িয়ে। রেসকিউড মোট আঠারোজনকে ওপরে নিয়ে গিয়ে বসানো হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ডিসিডিডি স্যারকে সমস্ত আপডেট জানানো হয়েছে। তিনি প্রিজন ভ্যান ও অ্যামবুলেন্সের ব্যবস্থা করেছেন। যে-কোনো সময়েই এসে যাবে।
অর্জুনদা এবার এগিয়ে এসে বলল, 'অ্যারেস্টেড লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কেউ মুখ খুলতে রাজি নয়। এদের হায়ার অথরিটি সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।'
শিবেন্দ্র বললেন, 'চলুন, আমি যাচ্ছি।'
তিনতলায় যেখানে লোকগুলো এতদিন ধরে থাকছিল, জায়গাটাতে ঢুকতেই অসহ্য বোঁটকা গন্ধে বমি এসে গেল। চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা হচ্ছিল এদের। পাশের ঘরটাতে দলের লোকেদের হাতে দড়ি বেঁধে পাশাপাশি মেঝেতে বসানো হয়েছে। শিবেন্দ্র সোজা ঢুকে মতিমিঞার সামনে উবু হয়ে বসলেন। চোখে চোখ রেখে নরম গলায় বললেন, 'তোমার বস কে মতিমিঞা? তুমি আমাকে মিথ্যে বলবে না আমি জানি।'
মতিমিঞা কিছুক্ষণ শিবেন্দ্রর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ এক দলা থুথু ছুড়ে দিল তার মুখে।
শিবেন্দ্র ছিটকে সরে এল। জ্যাকেটের স্লিভ দিয়ে মুখ মুছে আবার এগিয়ে গিয়ে বসল মতিমিঞার সামনে। আবার একই কথা জিজ্ঞাসা করল, 'বলো মতিমিঞা, কে তোমাদের বস?'
মতিমিঞা শিবেন্দ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় মুখ বিকৃত করল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিল। এদিকে অর্জুনদা ও টিম সমানে বাকিদের ম্যারাথন জেরা করে চলেছে। ওরাও তোতার মতো একই কথা উগড়ে চলেছে, কে বস তারা কেউ জানে না।
শিবেন্দ্র এবার উঠে দাঁড়িয়ে অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করল। অর্জুনদা এদিকে সরে এলে শিবেন্দ্র নিজের ফোনটা বের করে বলল, 'আমার কাছে দু-বার মেসেজে অর্ডার এসেছিল একটা প্রাইভেট নম্বর থেকে। আপনার সাইবার ডিপার্টমেন্টের অফিসার এটা থেকে কিছু এক্সট্র্যাক্ট করতে পারেন কি না দেখুন। কারণ, আমি আমার ডিপার্টমেন্টেও পাঠিয়েছিলাম এই মেসেজ। কিন্তু ফরোয়ার্ড করা মাত্রই সেই মেসেজ এনক্রিপ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে কিছু জানা যায়নি।'
অর্জুনদা হাত বাঁড়িয়ে মোবাইলটা নিল। তারপর শুভমকে ডেকে বুঝিয়ে বলতেই শুভম সোজা হয়ে দাঁড়াল। উত্তেজনায় ওর চোখ জ্বলছে। এই মুহূর্তে ওকে দেখে আর তেইশ-চব্বিশ বছরে বাচ্চা ছেলে বলে মনে হচ্ছে না। বিশ্বাস করতে অসুবিধে হচ্ছে না যে সে কলকাতা পুলিশের একজন দায়িত্বশীল অফিসার। প্রায় ছুটে নীচে নেমে গেল সে। টাপুরদির গাড়ি রাস্তার একপাশে দাঁড় করানো ছিল। দ্রুত হাতে ডিকি খুলে ফেলল। ওপরে জানলা দিয়ে দেখলাম, সেখানে ঠাসা যন্ত্রপাতি। পরবর্তী মিনিট দশেকের মধ্যে শুভম তিনতলার ঘরে টেম্পোরারি সাইবার সেল বসিয়ে ফেলল।
টাপুরদি এগিয়ে গেল অর্জুনদার কাছে। বলল, 'আমি অন্য ঘরে আলাদা করে শুধু মতিমিঞার সঙ্গে কথা বলতে চাই।'
শিবেন্দ্র পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'লাভ হবে না। আমি মতিমিঞাকে চিনি। ও আর যাই করুক, বেইমানি করবে না।'
টাপুরদি বলল, 'আপনাদের আপত্তি না থাকলে আমি একবার চেষ্টা করে দেখতে চাই। শুধু মিতুল থাকবে আমার সঙ্গে। মতিমিঞার হাতের বাঁধন খুলে দিন।'
অর্জুনদা বলল, 'অসম্ভব! ভেতরে পুলিশ থাকবে। এরা হার্ডকোর ক্রিমিনাল। লোকটা তোমাদের অ্যাটাক করতে পারে। হাত কোনোমতেই খোলা যাবে না।'
টাপুরদি বলল, ''আমাকে একটা সুযোগ দাও অর্জুন। যা বলছি করো, প্লিজ। মতিমিঞার মুখ খোলাতেই হবে। চাইলে দরজার বাইরে পুলিশ রাখো যাতে ও পালাতে না পারে। কিন্তু ঘরের ভেতর নয়।'
অর্জুনদা টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর বলল, 'ওকে। অল দ্য বেস্ট!'
শিবেন্দ্র এবার বলল, 'মতিমিঞা বাংলাদেশের লোক। ঘরে ছেলে-মেয়ে আছে। বাড়ির লোকেদের মিস করে খুব। লোকটা ইমোশনাল, খুব সরলও। মনটা নরম। জানিয়ে রাখলাম আপনাকে, যদি কাজে লাগে!'
মাথা নাড়ল টাপুরদি। বলল, 'থ্যাঙ্ক ইউ!'
একটা ফাঁকা ঘরে চেয়ারে বসানো হয়েছে মতিমিঞাকে। হাতের বাঁধনও খুলে দেওয়া হয়েছে। দরজার বাইরে পুলিশ আছে জানি, তবু লোকটার দিকে তাকিয়ে কেমন ভয়-ভয় করছে আমার। গাঁট্টাগোট্টা বেঁটেখাটো চেহারা, মুখে সাদা দাড়ি বুক পর্যন্ত নেমেছে। গোঁফ চাঁছা, টাক মাথা। চোখদুটো আহত বাঘের মতো জ্বলছে।
টাপুরদি আমাকে এই ঘরে ঢোকার আগেই বলে রেখেছে দূরে থাকতে। আমি দরজার কাছেই দাঁড়ালাম। সত্যি বলতে কী খুব কাছে যেতে আমারও সাহস হচ্ছিল না।
টাপুরদি এগিয়ে গিয়ে মতিমিঞার মুখোমুখি বসল। তারপর নরম কণ্ঠে বলল, 'আপনি জানেন, আপনাদের বস কে, তাই তো?'
মতিমিঞা উত্তর দিল না। খরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। টাপুরদি এবার বলল, 'বেশ, আপনার ইচ্ছে না হলে আপনাকে উত্তর দিতে হবে না।'
একটু চুপ করে রইল টাপুরদি। তারপর বলল, 'জানেন আপনার সঙ্গে কেন কথা বলছি আমি?'
মতিমিঞা উত্তর দিল না। টাপুরদি নরম গলায় বলল, 'আমি যখন খুব ছোটো ছিলাম, সবে ছয় বছর বয়স, সেই সময়ে বাবাকে হারিয়েছি। বাবা আমাকে পিঠে চাপিয়ে ঘোড়া-ঘোড়া খেলত। আইসক্রিম কিনে দিত। খুব ভালোবাসত আমাকে। তারপর বাবা চাকরি করতে অনেক দূরে কোথাও চলে গেল। প্রতি পুজোয় অপেক্ষা করতাম কবে বাবা আসবে, আমাকে আবার কোলে করে নিয়ে ঠাকুর দেখতে যাবে, কাঠি আইসক্রিম কিনে দেবে। তারপর একদিন জানতে পারলাম, বাবা আর ফিরবে না। যে কোম্পানিতে বাবা কাজ করত, তারা নিজেদের দোষ ঢাকতে বাবাকে মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছে। আমার বাবা লজ্জায়, দুঃখে আত্মহত্যা করেছে।
'মতিমিঞা, জানেন, আপনাকে অনেকটা আমার বাবার মতো দেখতে। আপনাকে প্রথমবার দেখে চমকে উঠেছিলাম আমি। মনে হয়েছিল বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। নইলে এত মিল দু-জন মানুষের মধ্যে হয় কখনো?'
বলতে বলতে টাপুরদি খপ করে মতিমিঞার হাত চেপে ধরল। দেখলাম টাপুরদির চোখের কোলে জল টলটল করছে। গলা কাঁপছে। মতিমিঞার মুখের রেখাগুলি অনেকটা কোমল হয়ে এসেছে। এখন আর তাকে একজন খুনি অপরাধী বলে মনে হচ্ছে না। মনের মধ্যে একবার টাপুরদির বাবার ছবিটা ভেসে উঠল। দীর্ঘদেহী, সৌম্যদর্শন একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে মতিমিঞার কোথাও বিন্দুমাত্র মিল নেই। কাকু বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন যে শুধু তাই নয়, ছোটোমেয়ের কাছে বস্টন ঘুরতে গেছেন। কালকেও ফেসবুকে ছবি পোস্ট করেছেন দেখলাম।
হাত ধরা অবস্থাতেই টাপুরদি বলল, 'আমার বাবা ভুল করেছিল। আমার বাবা তার ওপরওয়ালাদের বিশ্বাস করেছিল। তার ফল বাবা জীবন দিয়ে ভুগেছে, আমরা সম্পূর্ণ পরিবার সারা জীবন দিয়ে ভুগেছি। বিশ্বাস করুন, যারা নিজেরা গর্তে লুকিয়ে অধস্তনদের বিপদে ফেলে, তারা কারও আপন হয় না। আমি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে শিখেছি। ওরা আপনার জন্য ভাববে না, আপনার পরিবারের কথা ভাববে না। ওরা নিজেরা নিরাপদ দূরত্বে বসে থেকে আপনাকে মরতে এগিয়ে দেবে।
'আমি জানি মতিমিঞা, মরতে আপনি ভয় পান না। আমার বাবাও পেত না। কিন্তু এখন মনে হয়, বাবা একটু ভয় পেলে সেদিন আমাদের পরিবারটা বেঁচে যেত। বাবা তার সত্যিকারের অপরাধীদের নামটা বলে দিলে আমাদের জীবনটা নরক হয়ে যেত না। না খেয়ে, আধপেটা খেয়ে বড়ো হয়েছি। অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা করাতে পারিনি। সব শেষ হয়ে গেছে আমাদের।'
'আপনার পরিবার আছে, মতিমিঞা?'
মতিমিঞা ওপর-নীচে মৃদু মাথা নাড়ল।
টাপুরদি বলল, 'জানি না, আপনারও আমার মতো কোনো মেয়ে আছে কি না! যদি থাকে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে অন্তত স্বার্থপর মালিকের জন্য প্রাণ দেবেন না। আমার মতো আপনার মেয়েকেও অনাথ করে দেবেন না। প্লিজ! আপনার যাতে শাস্তি না হয়, বা কম হয় সেই ব্যবস্থা করা হবে। সরকার থেকে সাহায্যও করা হবে। আপনি চাইলে আপনার পরিবারকেও এদেশে এসে থাকার জন্য সিটিজেনশিপের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। একটা সুস্থ জীবন পাবেন আপনি, আপনার পরিবার, যেটা আমরা কখনো পাইনি। আমার মতো আপনার সন্তানকেও অনাথ করে দেবেন না মতিমিঞা, দেবেন না প্লিজ।'
টাপুরদির এই গুণটার কথা জানা ছিল না। এ তো যাকে বলে অস্কার উইনিং পারফরমেন্স!
মতিমিঞা তাকিয়ে আছে টাপুরদির দিকে। চোখের দৃষ্টি এখন অনেকটা নরম। টাপুরদি বলল, 'আচ্ছা, নাম আপনাকে বলতে হবে না। আমি বলছি। আপনি শুধু বলুন আমার ধারণা ঠিক কি না!'
মতিমিঞা এবারও জবাব দিল না। টাপুরদি নিজের মুখ মতিমিঞার কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলল। মতিমিঞা একটু চমকে উঠে বিস্মিত মুখে তাকাল টাপুরদির মুখের দিকে। তারপর খাঁকরে গলাটাকে পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, 'কাগজ-কলম দ্যাও।'
টাপুরদি পেছন ফিরে আমার দিকে তাকাতে আমি তাড়াতাড়ি কাগজ-কলম এগিয়ে দিলাম। টাপুরদি সেটা মতিমিঞার হাতে দিল। মতিমিঞা খসখস করে কিছু লিখে টাপুরদির হাতে দিল। এক ঝলক সেই কাগজের দিকে তাকিয়ে টাপুরদির মুখে আলো জ্বলে উঠল দেখতে পেলাম। মতিমিঞার দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমি কথা দিলাম মতিমিঞা, আপনার শাস্তি কমানোর জন্য আমি চেষ্টা করব। আপনার উকিলের ব্যবস্থা আমি করব।'
আমরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসছি, মতিমিঞা পেছন থেকে ডাকল, 'একখান কথা জানি যাও। মরণ নিয়া মোদের কারবার। ফাঁসির রশিকে ভয় পায় না মতিমিঞা।'
টাপুরদি দাঁড়িয়ে মতিমিঞার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল শুধু।
ঘর থেকে বেরিয়ে টাপুরদিকে বললাম, 'কী পারফরমেন্স দিলে মাইরি! উফফ, দুর্দান্ত অভিনয় করলে!'
'অভিনয়!' কেমন বিষণ্ণ হাসল টাপুরদি।
আমি বললাম, 'তা নয়তো কী? তোমার বাবার সম্পর্কে যা নয় তাই বলে গেলে। ইশ, কাকু দেখতে অমন নাকি?'
টাপুরদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'সারা দুনিয়ার সব বাবারা একইরকম দেখতে রে!'
'সে যাই হোক, মতিমিঞাকে বুদ্ধু বানিয়ে দিয়েছ তুমি।' হেসে বললাম।
'তাই?' বলে হাতের কাগজটা আমার হাতে এগিয়ে দিল টাপুরদি। দেখলাম তাতে কাঁচা হস্তাক্ষরে লেখা, 'তুমি মিচা কথা কইতাছ আম্মা, আমি জানি। আমি তুমার আব্বার মতো দ্যাখতে না। কিন্তুক তুমি আমার বেটি আইষার মতন দ্যাখতে।'
নীচে একটা ঠিকানা লেখা, আর সেটা হলদিয়ারই।
।। বাহান্ন।।
কাগজটা অর্জুনদা হাতে তুলে দেওয়ার সময় থেকেই টাপুরদি কেমন যেন থম মেরে আছে। অন্যমনস্কভাবে কী যেন ভেবে যাচ্ছে। অর্জুনদা কাছে এসে বলল, 'আমরা তোমার দেওয়া ঠিকানায় যাচ্ছি। তুমি যাবে আমার সঙ্গে?'
টাপুরদি উত্তর দিল না। মুখ দেখে বুঝলাম ও কোনো অন্য চিন্তায় ডুবে আছে। আঙুল দিয়ে খোঁচা দিয়ে ডাকলাম, 'টাপুরদি!'
'হ্যাঁ!' চমকে তাকিয়ে বলে উঠল টাপুরদি।
'অর্জুনদা তোমায় কিছু জিজ্ঞাসা করছে', বললাম আমি।
টাপুরদি অর্জুনদার মুখের দিকে তাকাল। অর্জুনদা আবার একই কথা জিজ্ঞাসা করল।
টাপুরদি বলল, 'না, আমি যাব না। অর্জুন, মতিমিঞা তো পুলিশকে সাহায্য করেছে। চার্জশিটে ওর নামে বেশি চার্জ দেবে না তো?'
অর্জুনদা টাপুরদির কাঁধ হাত রেখে নরম গলায় বলল, 'সব কিছু আমার হাতে নেই, তুমি জানো। এখন এর মধ্যে আবার আইবিও ঢুকে গেছে। তবে আমি চেষ্টা করব। তুমি কী করবে এখন?'
টাপুরদি আশেপাশে তাকাল একবার। তারপর অর্জুনদাকে বলল, 'একটু বাইরে এসো। কিছু কথা আছে। এখানে বলা যাবে না। মিতুল, তুই শুভমকে জিজ্ঞাসা কর কিছু পেল কি না।'
আমি আর কথা না বাড়িয়ে শুভমের কাছে গেলাম। ও কানে হেডফোন লাগিয়ে খুব মন দিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। ভুরুতে গভীর ভাঁজ। আমি গিয়ে দাঁড়াতেও মুখ তুলল না।
মিনিট পাঁচেক পরে টাপুরদি আর অর্জুনদা ঘরে এসে ঢুকল। শিবেন্দ্র অর্জুনদার কাছে এসে বলল, 'আপনার টিমকে এখানেই রাখতে হবে এদের পাহারা দেওয়ার জন্য। তাহলে ওই ঠিকানায় যাবে কারা? শুধু আমি আর আপনি? যদি ওখানে ওদের দলবল থাকে?'
অর্জুনদা বলল, 'কলকাতা থেকে ফোর্স আসছে। তাদের অ্যাড্রেস মেসেজ করে দেওয়া হয়েছে। তারা সোজা ওখানে পৌঁছে যাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। আমি, আপনি আর কৌশিক এখান থেকে যাচ্ছি। শুভম, কিছু জানতে পারলে?'
হাসিমুখে মুখ তুলল শুভম। বলল, 'একটা হাইলি সিকিওর লাইনকে পার্শিয়ালি হ্যাক করেছিলাম এখানে আসার আগেই। সেখান থেকেই প্ল্যান চেঞ্জের মেসেজটা পেয়েছিলাম। এই মুহূর্তে ওই লাইনে কনস্ট্যান্ট ডেটা ট্রান্সফার হচ্ছে গত পাঁচ মিনিট ধরে। আইপি বদলে বদলে যাচ্ছে, স্পুফ করছে ওরা। তাই লোকেট করা সম্ভব নয়। তবে এর মধ্যে একটা লোকেশন অবশ্যই কাছাকাছি, বড়োজোর ফিফটিন কিলোমিটার টেরিটোরির মধ্যে।'
'অপরটা?' অর্জুনদা জিজ্ঞাসা করল।
'কাছাকাছি নয়', শুভম ল্যাপটপে চোখ রেখে বলল।
'কলকাতা হতে পারে?' জানতে চাইল টাপুরদি।
'হুম, হতে পারে।'
'আমি কলকাতা ফিরছি', টাপুরদি বলল।
'কলকাতা?' অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আমি, 'আমরা কলকাতা ফিরে যাব কেন?'
টাপুরদি বলল, 'যেতেই হবে। আসল মাথা তো সেখানে বসে আছে।'
'তাহলে এখানে কাকে ধরতে যাচ্ছে অর্জুনদারা? মতিমিঞা যে ঠিকানাটা দিল, সেটা কার?' বিস্মিতমুখে জিজ্ঞাসা করলাম।
হাসল টাপুরদি। বলল, 'সেকেন্ড কমান্ডার ইন চিফ বলতে পারিস।'
অর্জুনদা বলল, 'শুভম, আমাদের সঙ্গে যেতে হবে তোমায়।'
ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখেই থাম্বস আপ দেখাল শুভম।
দেরি না করে গাড়িতে কলকাতার দিকে রওনা দিলাম আমরা। গত কয়েক ঘণ্টায় এত কিছু ঘটে গেছে যে মাথা কাজ করছে না। টাপুরদি ড্রাইভ করতে করতেই বলল, 'একটু ঘুমিয়ে নে পারলে। আজ রাতে আর ঘুম হবে না। কলকাতা পৌঁছোতে পৌঁছোতে ভোর হয়ে যাবে।'
সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজলাম, যদিও জানি ড্রাইভারের পাশে বসে ঘুমোতে নেই। কিন্তু শরীর খুব ক্লান্ত লাগছে। কিন্তু মাথার ভেতর ভাবনাগুলো ঝড়ের বেগে ছোটাছুটি করছে। তাদের থামাই কীভাবে?
মিনিট দশেক এভাবেই কাটল। তারপর চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, 'টাপুরদি, মতিমিঞা তখন কী বলল?'
টাপুরদি বলল, 'তোর সামনেই তো বলল।'
'আমার কিছু মাথায় ঢোকেনি। তুমি বলো!' বললাম আমি।
টাপুরদি বলল, 'আর একটু ওয়েট কর। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই জেনে যাব আমার ধারণা কতটা ঠিক বা বেঠিক।'
'কে এই সেকেন্ড কমান্ডার ইন চিফ? আমাদের চেনা কেউ?' জানতে চাইলাম আমি।
'চেনা তো বটেই। প্রথম থেকেই আমাদের বোকা বানিয়ে এসেছেন তিনি', বলে জোরে জোরে হাসল টাপুরদি। বলল, 'আমি এমন বোকা, এই সম্ভাবনাটা আমার মাথাতেই আসেনি।'
টাপুরদি বোকা! আমি আমার এই পঁচিশ বছরের জীবনে টাপুরদির চেয়ে বুদ্ধিমতী কাউকে দেখিনি। কলকাতায় ঢোকার আগেই ফোনটা এল। সেকেন্ড কম্যান্ডার ইন চিফ অ্যারেস্ট হয়েছেন। এখন তাঁর বাড়ি সার্চ করা হচ্ছে। মতিমিঞা মিথ্যে বলেনি। সকলকে কলকাতায় নিয়ে আসা হবে।
টাপুরদির মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। কলকাতায় তখন ভোর হচ্ছে, এক নতুন আশার সকাল, জয়ের সকাল। আমি তখনও জানতাম না যে সব জয় আসলে আনন্দ দেয় না। জিত বা হার তো অনেক পরের কথা, আসল খেলাটা তখনও শুরুই হয়নি আমাদের।
জানত না অর্জুনও। যে মুহূর্তে জয়ের তৃপ্তি মনকে ফুরফুরে করে তুলেছিল, মনে হচ্ছিল গত কয়েক সপ্তাহের অমানুষিক পরিশ্রমের ফল তাদের হাতে এসে পৌঁছেছে, অপরাধীকে হাতকড়া পরানো হয়ে গেছে, তখনই ঘটল ঘটনাটা।
ভোররাতে দরজায় কলিং বেল বাজাতে হয়েছিল কয়েক বার। ধাক্কাধাক্কি, ডাকাডাকিতে আশেপাশের ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা খুলে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল বিরক্তমুখে, তখনই এই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা নির্লিপ্ত মুখে দরজা খুলে দিয়েছিল। অর্জুন আর শিবেন্দ্র লোকটাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকেছিল। এ ঘর-ও ঘর খুঁজেও আর কাউকে পাওয়া যায়নি। লোকটা অবশ্য কোথাও যায়নি, পালানোর চেষ্টাও করেনি। অর্জুনদের সঙ্গেই ঘরে ঢুকে সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিল।
তার হাত থেকে মোবাইল ফোনটা নিয়ে নিয়েছিল অর্জুন। হ্যান্ডকাফটা বের করে বলেছিল, 'আপনাকে আমরা অ্যারেস্ট করছি।'
লোকটা মৃদু হেসেছিল শুধু। কোনো প্রশ্ন না করে দুই হাত এগিয়ে দিয়েছিল।
অর্জুনের টিম ঘরে ঢুকে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে শুরু করেছিল। তখনই ভেতরের ঘরে খোলা ল্যাপটপটা চোখে পড়েছিল অর্জুনের।
'পাসওয়ার্ড?' চেঁচিয়ে বলেছিল অর্জুন।
লোকটা ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে পাসওয়ার্ড দিয়েছিল অগাধ নির্লিপ্তি নিয়ে।
শুভম প্রায় লাফিয়ে গিয়ে বসেছিল ল্যাপটপের সামনে চেয়ারে। শিবেন্দ্র ও অর্জুন তার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল। উত্তেজনায় জোরে জোরে নিশ্বাস পড়ছে তাদের।
ল্যাপটপের স্ক্রিনে ওয়েভ গ্রাফ ক্রমাগত বদলাচ্ছে। শুভম তাকিয়ে রইল সেদিকে কিছুক্ষণ। তারপর তার আঙুল কি-বোর্ডের ওপর যেন ঝড় বইয়ে দিল। এটা যদি এরকম উত্তেজনার মুহূর্ত না হত, অর্জুনের মনে হতে পারত শুভমের কাজটাও কোনো শিল্পের চেয়ে কম নয়। কিন্তু এখন মুগ্ধ হওয়ার মতো মানসিক অবস্থা নেই কারোরই। রেজাল্ট চাই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। বাইরে হ্যান্ডকাফ পরানো লোকটার কাছে টিমের দু-জন পাহারায় আছে। লোকটা বয়স কম নয়। দেখে মনে হচ্ছে তেমন সুস্থও নয়। জোরে জোরে শব্দ করে নিশ্বাস নিচ্ছে, কুঁজো হয়ে হাঁটছে।
নভেম্বরের শেষে এই ভোরের দিকে একটা শিরশিরে শীত কামড় বসাচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেও ঘামছে শুভম, দেখতে পাচ্ছে অর্জুন। ওর কপাল, রগ বেয়ে ঘামের বিন্দু গড়িয়ে নামছে।
'স্যার, এদিকে আসুন শিগগিরি!' বাইরে কৌশিকের গলায় প্রায় আর্তনাদের মতো চিৎকারটা অর্জুনদের বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল যে বাইরে সব কিছু ঠিক নেই। শিবেন্দ্র ও অর্জুন দৃষ্টি বিনিময় করেছিল সেই মুহূর্তে। তারপর তিরের বেগে ছুটে বেরিয়েছিল বাইরের ঘরে। সেখানে যে দৃশ্যটা দেখল তারা, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না।
সোফায় বসা প্রৌঢ়ের মুখ থেকে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে, চোখ উলটে গেছে। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে, যেন এক ফোঁটা শ্বাসবায়ুর জন্য সে কী মর্মান্তিক আকুতি! মেঝেতে উলটে পড়ে গেছে লোকটা। কৌশিক তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে।
'জল, একটু জল!' জড়ানো কণ্ঠে বলল লোকটা। শিবেন্দ্র ছুটে গেল পাশের কিচেনে। অর্জুন অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করছে। কৌশিক লোকটার গলার ভেতরে প্রায় পুরো হাতটাই ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে বমি করানোর চেষ্টা করছে। জল এনে মুখের ভেতর ফোঁটা ফোঁটা ঢালতে শুরু করল শিবেন্দ্র।
অর্জুন ছুটে এসে বলল, 'অ্যাম্বুলেন্স আসছে এখনই।'
শিবেন্দ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'তার আর দরকার হবে না অফিসার।'
লোকটার মুখে ঢালা জলটুকু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে মেঝেতে। চোখের তারা স্থির, ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি তবু ছুঁয়ে আছে আলতো করে। যেন বলছে, 'পারলে ধরতে আমাকে? মরা মানুষকে অ্যারেস্ট করা যায় না।'
দুনিয়ার চোখে শেখর মজুমদারের মৃত্যু হয়েছিল অনেক আগেই। তাই আজ সত্যিই তার মৃত্যুতে হয়তো নতুন করে কারও শোক হবে না শুধু তাঁর স্ত্রী ছাড়া, যিনি এতগুলো বছরে সধবা হয়েও বৈধব্য পালন করেছেন। শিউলি মজুমদার অবিশ্বাসিনী ছিলেন না। আজ তিনি সত্যিই বিধবা হলেন।
শিবেন্দ্র বললেন, 'আমরা এখানে আসার আগেই সম্ভবত বিষ খেয়েছিলেন। সেজন্যই অসুস্থ দেখাচ্ছিল। আমরা বুঝতে পারিনি।'
অর্জুন বিষণ্ণ মুখে মাথা নাড়ল, 'তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আমরা এখানে আসার আগেই শেখর মজুমদার বুঝে গেছিলেন যে তাঁর দল ধরা পড়ে গেছে। কিন্তু কীভাবে?'
শিবেন্দ্র বললেন, 'হয়তো দলের থেকে কেউ কিছু জানিয়েছিল।'
'না', মাথা নাড়ল অর্জুন, 'ওদের দলের সকলের হাত থেকে ফোন সঙ্গে সঙ্গেই কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কীভাবে খবর দেবে কেউ?'
শিবেন্দ্র ভুরু কুঁচকে বলল, 'আপনি যেটা বলছেন এর একটাই অর্থ হয়।'
'এর মানে ভেতরের কেউ', মাথা নেড়ে চিন্তিত মুখে বলল অর্জুন। পকেটে ফোনটা বাজছে তার। ফোন রিসিভ করে কানে ঠেকাল। তারপর বলল, 'অ্যারেস্ট করেছিলাম স্যার। কিন্তু অপরাধী সুইসাইড করেছে।'
ফোন রেখে শিবেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে অর্জুন বলল, 'ডিসিডিডি স্যার এসে পৌঁছেছেন টিম নিয়ে। সব অ্যারেঞ্জ করে কলকাতায় রওনা দিতে হবে। আপনি যাবেন তো?'
শিবেন্দ্র উত্তর দিতেই যাচ্ছিল, ভেতরের ঘর থেকে শুভম উচ্চস্বরে ডাকল, 'অর্জুনদা, এদিকে এসো তাড়াতাড়ি।'
সকলে ছুটে গেল ভেতরে। শুভমের ঠোঁটে কান এঁটো করা হাসি। বলল, 'হেব্বি কাজ অর্জুনদা! এ জিনিস যে বানিয়েছে তাকে খুঁজে কলকাতা পুলিশের সাইবার সেলে চাকরি দাও। আমার ওপর লোড কমে যাবে।'
অর্জুন বলল, 'আগে কী পেলে সেটা বলো।'
শুভম হেসে বলল, 'খবর হল আমরা এখানে আসার আগেই এখানে ফোন করা হয়েছিল।'
অর্জুন বলল, 'তার মানে কেউ ওঁকে ফোন করে জানিয়েছে যে দল ধরা পড়েছে?'
শিবেন্দ্র জিজ্ঞাসা করল, 'কে সে? এই গ্যাং-এর সুপ্রিমো? সে-ই বা জানল কী করে?'
অর্জুন জবাব দিল না কিছু। যাওয়ার আগে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে টাপুরের বলা কথাগুলো মনে পড়ে গেল। তবে কি টাপুরের সন্দেহই ঠিক? অবশ্য অর্জুন একে শুধু সন্দেহ বলে এখন আর ভাবতে পারছে না। টাপুর হাওয়ায় তির চালানোর মেয়ে নয়। এই ঠিকানায় এসে কাকে পাওয়া যাবে, সেই ব্যাপারে টাপুরের সন্দেহ যে সঠিক ছিল এখন তা জেনে গেছে অর্জুন। সুতরাং অপর সন্দেহটাও হয়তো ভুল নয়। সেরকম হলে মহা বিপর্যয় উপস্থিত হতে চলেছে।
'কী!' সজোরে ব্রেক কষল টাপুরদি, 'কীভাবে? মাই গড! তাহলে তোমরা ওঁর কাছ থেকে কোনো কথা ওগড়াতে পারোনি?'
ও-প্রান্ত থেকে অর্জুনদা কী উত্তর দিল শুনতে পেলাম না আমি। কিন্তু আগের ফোন আর এই ফোনের মাঝে যে গুরুতর কিছু ঘটে গিয়েছে সেই বিষয়ে সন্দেহ রইল না।
'কী হল টাপুরদি?' ফোন রাখলে জানতে চাইলাম আমি।
টাপুরদি গম্ভীর মুখে বলল, 'শেখর মজুমদার সুইসাইড করেছেন।'
'মানে?'
'মানে যা বুঝছিস তাই', বলল টাপুরদি, 'পুলিশ গিয়ে পৌঁছোনোর আগেই দলের ধরা পড়ার খবর পৌঁছে গেছিল শেখরবাবুর কাছে। তখনই বিষ খেয়েছিলেন। কী বিষ, ঠিক কখন খেলেন সেটা ভিসেরা টেস্ট না করলে জানা যাবে না।'
'তুমি আগে থেকেই জানতে শেখর মজুমদার বেঁচে আছেন?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
দু-দিকে মাথা নাড়ল টাপুরদি। বলল, 'আগে থেকে কী করে জানব? আমি কি ম্যাজিশিয়ান নাকি? তবে ডক্টর মিত্রর মৃত্যুর পর থেকে একটা সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।'
'কেন?' জানতে চাইলাম।
টাপুরদি রাস্তায় চোখ রেখেই বলল, 'সে অনেক গল্প। এখন বলতে গেলে গাড়ির স্পিড কমে যাবে। তবে আমার সন্দেহটা যে ঠিক সেটা মতিমিঞা কনফার্ম করেছিল। আমরা কলকাতায় ঢুকছি। আগে রাঘব সামন্তকে খাঁচা থেকে বের করে আনি, তারপর তোর সব প্রশ্নের জবাব দেব। অবশ্য, যদি তিনি এখনও বেঁচে থাকেন! শেখর মজুমদারের পরিণতি ভেবে ভয় হচ্ছে।'
'আবার সেই রাঘব সামন্ত? এ নামে সত্যি কেউ আছে?'
টাপুরদির চোয়াল শক্ত হল। বলল, 'রাঘব সামন্ত, এ কাহিনির মেঘনাদ। আড়াল থেকে পুরো খেলাটা তো তিনিই খেলছেন।'
'অদ্বৈত মুখার্জি, টাপুরদি?'
মুচকি হাসল টাপুরদি। উত্তর দিল না কিছু।
আরও প্রায় তিরিশ মিনিট পর আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছোলাম। টাপুরদির দিকে চেয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, 'এখানে?'
টাপুরদি কিছু বলল না। দেখলাম সৌরভবাবুর নম্বর ডায়াল করছে। বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম। বছর খানেক আগে এই বাড়িতেই এক চমকপ্রদ নাটকের অন্তিম দৃশ্য অভিনীত হয়েছিল। সেই রাতের কথা মনে করলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। এ বাড়ির মালিক এ রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী অম্লান চক্রবর্তী। কিন্তু এখানে কেন এল টাপুরদি। তবে কি...?
'স্যার, আমরা পৌঁছে গেছি। যেখানে বলেছিলাম আপনার টিম পাহারায় আছে তো?' জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
ফোনটা এখনও কানে ধরা। শুনলাম টাপুরদি বলল, 'আমার কথাটা প্লিজ শুনুন। অলরেডি শেখরবাবুকে আমরা হারিয়েছি। আর রিস্ক নেওয়া যাবে না। আমি আদৌ জানি না এখনও আমাদের রাঘব সামন্ত বেঁচে আছে কি না। যদি থাকে, তাকে জীবন্ত ও সুস্থ অবস্থায় অ্যারেস্ট করতে হবে। আপনি প্লিজ ব্যবস্থা করুন। আমিও দেখছি।'
সৌরভবাবু ওদিক থেকে কী বললেন শোনা গেল না। টাপুরদি বলল, 'এটুকু ভরসা তো আমার ওপর রাখতেই পারেন। ভরসার অযোগ্য যে নই, সে প্রমাণ এর আগেও দিয়েছি।'
ফোনটা রেখে গেটের পাশে লাগানো কলিং বেল টিপল টাপুরদি। বড়ো লোহার গেটের এক পাশে ছোট্ট এক টুকরো স্লাইডের মতো সরে গেল। এক মধ্যবয়স্ক সিকিওরিটি অফিসারের মুখ উঁকি মারল ভেতর থেকে।
'কাকে চাই?'
'সিএম-এর সঙ্গে দেখা করব। খুব জরুরি!' বলল টাপুরদি।
ভদ্রলোক বললেন, 'এখন এভাবে দেখা হবে না। পরে সিএম-এর সেক্রেটারির কাছ থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে অফিসে দেখা করবেন।'
টাপুরদি বলল, 'সেটা আমিও জানি। প্রয়োজনটা গুরুতর না হলে এভাবে এই সকালে এখানে ছুটে আসতাম না। সিএম-কে বলুন সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি দেখা করতে এসেছেন।
টাপুরদির কণ্ঠস্বরে কিছু ছিল যার জন্য ভদ্রলোক পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারলেন না। বললেন, 'এখানেই অপেক্ষা করুন।'
কয়েক মিনিট পরে দরজাটা খুলে গেল। ফিমেল গার্ড দিয়ে থরো বডি সার্চ করার পর আমাদের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল। বছরখানেক আগেও এই বাড়িতে এসেছি আমরা। সেদিন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। অম্লান চক্রবর্তী তখনও এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না। কিন্তু সেদিনও এরকমই দমবন্ধ করা উত্তেজনা ছিল।
ভেতরে বসার ঘরে পৌঁছে দেখলাম অম্লানবাবু সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে আসছেন। আমাদের দেখেই বোধ হয় সন্দেহ করলেন যে গুরুতর কিছু ঘটেছে।
তিনি কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই টাপুরদি বলল, 'শেখর মজুমদার সুইসাইড করেছেন। আপনি বোধ হয় খবরটা এখনও পাননি।'
'শেখর মজুমদার?' অম্লানবাবু সম্ভবত হঠাৎ করে মনে করতে পারলেন না যে কে এই শেখর মজুমদার!
টাপুরদি মনে করিয়ে দিল। বলল, 'নবদিগন্তের ফাউন্ডার মেম্বার শিউলি মজুমদারের স্বামী, প্রাক্তন আইপিএস অফিসার।'
এবার অম্লানবাবুর মনে পড়ল। ভীষণ বিস্মিত মুখে বললেন, 'সে কী? তিনি তো আগেই মারা গেছিলেন শুনেছিলাম। সৌরভবাবু আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে তাঁর টিম ওদের দলের একজনের দেওয়া ঠিকানা ধরে যাচ্ছে দলের যে মাথা তাকে অ্যারেস্ট করতে, কিন্তু সেখানে শেখর মজুমদার এলেন কী করে?'
টাপুরদি বলল, 'আসেননি, তিনি সেখানেই ছিলেন, একেবারে সশরীরে। একবার মারা গেলে তো আর দ্বিতীয়বার মরা যায় না স্যার। এর একটাই অর্থ হয়, আগে তিনি মারা যাননি। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। পুলিশ তাকে জেরা করার আগেই মারা গেছেন তিনি। সুতরাং, সামান্য কিছু সূত্র ছাড়া পুলিশের হাতে কোনো শক্তপোক্ত প্রমাণ নেই। এই মুহূর্তে আপনাকে একটা স্পেশাল পারমিশন দিতে হবে যাতে পুলিশ সন্দেহভাজনকে অ্যারেস্ট করে জেরা করতে পারে।'
অম্লানবাবুর ভুরুতে ভাঁজ পড়ল। একটু যেন অস্থির দেখাল তাঁকে, 'কাকে অ্যারেস্ট করবে পুলিশ? কার কথা বলছেন আপনি?' জিজ্ঞাসা করলেন তিনি।
টাপুরদি স্থির দৃষ্টিতে তাকাল অম্লানবাবুর মুখের দিকে।
ভিআইপি রোড ধরে ছুটছে পরপর তিনটে পুলিশের গাড়ি। টাপুরদির গাড়িতে আমরা দু-জনও চলেছি দলের সঙ্গে। এই টিমকে লিড করছে স্বয়ং জয়েন্ট কমিশনার অনন্তবিজয় সেনশর্মা। সকাল পৌনে আটটা বাজে। রাস্তায় অফিসযাত্রীদের ভিড় শুরু হয়ে গেছে। ভিআইপি রোডে তাই এখন গাড়ির গতির কাঁটা খুব বেশি উঁচুতে ওঠানো যাচ্ছে না। টাপুরদির মুখের প্রতিটি রেখায় অস্থিরতা স্পষ্ট। অর্জুনদা ফোন করেছিল। ওরা পুরো দলটাকে নিয়ে আসছে।
জানলা দিয়ে বাইরের দিকে চোখ রাখলাম। এই মুহূর্তে মাথার ভেতর অনেক প্রশ্ন ছোটাছুটি করছে। কী হচ্ছে এসব! আমাদের এই কেসটা শুরু হয়েছিল নবদিগন্ত হোম থেকে লালনের হারিয়ে যাওয়া দিয়ে। আজ এই মুহূর্তে আমরা জানি, লালনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তার সঙ্গে আরও সতেরো জনকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স রওনা দিয়েছে কলকাতার পথে। এদের বেশিরভাগই পুরোপুরি সুস্থ নয়। তাদের অনেকেরই শরীর থেকে এক বা একাধিক অঙ্গ বের করে নেওয়া হয়েছে অপারেশন করে। আবার তাদের পাঠানো হচ্ছিল নতুন কোনো গন্তব্যে, বাকি অঙ্গগুলোর জন্য। এর মধ্যেও লালন পালানোর চেষ্টা করেছিল, একটুর জন্য গুলি থেকে বেঁচেছে ছেলেটা।
গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি আমি। রাস্তায় কত মানুষ। এরা সকলে বেঁচে আছে, বেঁচে থাকার জন্য নিয়ত লড়াই করছে। আসলে মানুষ শেষ মুহূর্ত অবধি বেঁচে থাকার লড়াইটা চালিয়ে যায়। আর একটা অতিরিক্ত নিশ্বাসের জন্য সে কী ভীষণ আকুলতা! অথচ একজন মানুষের থাকা বা না-থাকা নিয়ে এই পৃথিবীর আহ্নিক বা বার্ষিক গতির কিছুমাত্র বিচলন হয় না। যে মানুষটা কাল অবধি ছিল, অথচ আজ নেই, তার জন্য কিছু থেমে যায় না কোথাও। হয়তো কিছু নিতান্ত আপনজনের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে তারা। কিন্তু কতদিন? স্মৃতি থাকে, শোক থাকে কি? বা শূন্যতা? মানুষের শোকের আয়ু কতদিন, কত বছর?
এই যে শেখর মজুমদার এতদিন বেঁচে ছিলেন। অথচ সত্যিই বেঁচে ছিলেন কি? পৃথিবীর থেকে নিজেকে লুকিয়ে, আপনজনের থেকে দূরে গিয়ে, পৃথিবীর রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে এই বেঁচে থাকার সত্যিই কি কোনো অর্থ আছে? হয়তো একটা ভুলের মাশুল গুনে চলেছিলেন তিনি এতগুলো দিন ধরে, ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলেন। অর্থ, সম্পদের লোভ, আরও আরও লোভ আসলে তাঁকে হয়তো পৌঁছে দিয়েছিল এক অসহনীয় একাকিত্বের শিখরে। অর্থ তো ছিল তাঁর কাছে, সেই অর্থ যা দিয়ে সব কিনে নেওয়া যায়। তবু সত্যিই কি যায়? শুনেছি পুলিশকে দরজা খুলে দিয়েছিলেন তিনি। বাধা দেননি, পালানোর চেষ্টাও করেননি। তিনি জানতেন খুব শিগগিরিই সত্যি সত্যি পালিয়ে যাবেন তিনি এমন এক দুনিয়ায়, যেখানে মৃত্যু সত্য, অমোঘ। সেখানে মৃত্যুর পর আর জীবনের দায় নেই, কিছু নেই।
যে-কোনো মৃত্যুই কষ্ট দেয়। তাই খবরটা পাওয়া ইস্তক মনটা ভারী হয়ে আছে। আজ অবধি টাপুরদির সঙ্গে যত কেসে কাজ করেছি, এই কেসটা বাকি সবগুলোর চেয়ে আলাদা। এখানে আমরা কোনো খুনি, ব্ল্যাকমেলার, অপরাধীর পেছনে ছুটছি না। এই লড়াইটা শুধু কিছু মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য নয়, বরং এ হল চিরন্তন শুভ ও অশুভের লড়াই। এ যুদ্ধ মৃত্যুর সঙ্গে জীবনের, পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষের বেঁচে থাকার সমান অধিকারের।
কিন্তু মুদ্রার আর একটি দিকের কথা অস্বীকার করতে পারি না আমরা চাইলেও। জিজ্ঞাসা করেছিলাম টাপুরদিকে, 'আচ্ছা টাপুরদি, এই যারা অরগ্যান নিয়ে ব্যাবসা করছে, তারা তো কিছু মানুষকে জীবন ফিরিয়েও দিচ্ছে, বলো?''
টাপুরদিকে কেমন যেন বিহ্বল দেখাচ্ছিল। ল্যাপটপে কিছু খুঁজে চলেছিল। আমার প্রশ্নে মুখ তুলে বলেছিল, 'অ্যাপারেন্টলি ঠিক। কিন্তু ওরা কোনো সমাজসেবা করছে না, ব্যাবসা করছে। কিছু মানুষকে হত্যা করে তাদের প্রাণের মূল্যে অপর আর একজনকে জীবন দিচ্ছে, সেটাও অর্থের পরিবর্তে।'
একটুক্ষণ চুপ করে ছিলাম আমি। কথাগুলো নিয়ে মনের ভেতরে নাড়াচাড়া করছিলাম। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, 'কিন্তু টাপুরদি, সেটা ওরা না করলেও কিছু মানুষকে মরতেই হত। যারা অসুস্থ, তারা অরগ্যানের অভাবে মারা যেত।'
'যেত!' ম্লান হেসে বলেছিল টাপুরদি, 'মৃত্যুকে কে কবে এড়াতে পেরেছে রে! মরতে তো সকলকেই হবে একদিন না হয় একদিন। প্রশ্নটা সেখানে নয়। আসলে আমাদের দেশে অরগ্যান ডোনেশন নিয়ে সচেতনতা ভীষণ কম। সরকারের তরফেও কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে অরগ্যান ডোনেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আরও অনেক দেশে সরকারের তরফে নানান প্রকল্প তৈরি করে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা হয়েছে, যাতে সেসব দেশে বেশিরভাগ মানুষ মরণোত্তর দেহদান ও অঙ্গদানের জন্য রেজিস্টার করে নিজেরাই। অথচ আমাদের দেশের জনসংখ্যা সোয়াশো কোটি ছাড়িয়েছে সেই কবে। মৃত্যুহারও অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। কিন্তু মানুষ এই বিষয়ে নির্বিকার।'
'আচ্ছা, একটা কথা বলো! এই যে ওরা এভাবে মানুষ চালান করে, তাতে তো ধরা পড়ে যাওয়ার চান্স বেশি। এর থেকে অরগ্যান কেটে চালান করলে তো সুবিধা হত, তাই না?' জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমি।
টাপুরদি হেসেছিল। মাথা নেড়ে বলেছিল, 'হত না। কারণ কারও দেহ থেকে অরগ্যান বের করে আনার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা জীবিত মানুষের দেহে প্রতিস্থাপন করতে হয়। নইলে সেই অরগ্যান আর কোনো কাজে লাগে না। এইসব নৃশংস জানোয়ারগুলো অনেক সময় জীবিত মানুষের থেকেও প্রত্যঙ্গ খুলে নেয়, জানিস? শরীরের ভেতর থেকে একে একে অরগ্যান বের করে নিতে থাকে যতক্ষণ না মানুষটা মরে যায়। তোর মনে আছে, জসীম শেখের শরীর থেকে দুটো কিডনিই মিসিং ছিল?'
'দুটো কিডনি বের করে দেওয়ার পরেও বেঁচে থাকে মানুষ?'
'থাকে না। বড়োজোর দুই-একদিন। জসীম শেখ এমনিতেও বাঁচত না। নিশ্চয়ই কোনো কারণে সেই অবস্থাতেও পালানোর চেষ্টা করেছিল। দলটাকে ইন্টারোগেট করলে কারণটা জানা যেতে পারে। আমাদের দেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপনে সমস্যা একটা নয়। কেউ মারা যাওয়ার পর সেই অঙ্গের গ্রহীতা হয়তো দেখা গেল অন্য রাজ্যে রয়েছে। এত বড়ো দেশে সফলভাবে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে অঙ্গ নিয়ে যাওয়াও একটা চ্যালেঞ্জ। আজকাল কিছু ক্ষেত্রে গ্রিন করিডোর করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু তার সংখ্যা নিতান্তই কম। তাই যারা মরণোত্তর দেহদানের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেও, এইসব ঝামেলায় তাদের অঙ্গ আসলে ব্যবহার করাই হয় না। পচে নষ্ট হয়ে যায়। সমস্যা অনেক রে মিতুল! মানুষ বাধ্য হয় এই অঙ্গ-দালালদের হাতে নিজেদের যাবতীয় সঞ্চয় তুলে দিতে। যে-কোনো মূল্যেই আপনজনকে বাঁচাতে চায় তো সকলেই, তাই না?'
'কিন্তু টাপুরদি, এরকম চলতে থাকলে তো'...
'এরকম চলতে থাকলে রাঘব সামন্তেরা সংখ্যায় ক্রমশই বাড়তে থাকবে। কতজনকে আটকাব আমরা? যদি আমরা নিজেরা সচেতন না হই, তাহলে একদিন হয়তো আমাদেরও প্রিয়জনের জীবন বাঁচাতে এই দুষ্টচক্রের সামনে হাত পেতে দাঁড়াতে হবে, অর্থের বিনিময়ে আরও একটি মানুষের জীবনের মূল্যে গোপনে কিনে নিতে হবে আমার আপনজনের প্রাণবায়ুটুকু।'
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের নতুন টার্মিনালের সামনে খাকি পোশাকের পুলিশে ছেয়ে আছে। এয়ারপোর্ট থানায় আগেই খবর দেওয়া হয়েছিল। কর্মী, অন্যান্য যাত্রীদের দৃষ্টিতে কৌতূহল, প্রশ্ন। কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার অনন্তবিজয় সেনশর্মার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আজ সংঘাতিক কিছু ঘটতে যাচ্ছে এখানে।
আমরা ঢুকতেই একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন জয়েন্ট কমিশনারের দিকে। বললেন, 'কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি স্যার। এই দেখুন, ভোর চারটের পর থেকে যতগুলো দিল্লির ফ্লাইট ছেড়েছে সেগুলোর প্যাসেঞ্জার লিস্ট। কোথাও নাম নেই।'
অনন্তবিজয়বাবু এগিয়ে গেলেন কাউন্টারের দিকে। এক মুহূর্ত চুপ করে ভেবে বললেন, 'শুধু দিল্লির নয়, আজ সকাল পাঁচটার পর থেকে যত ফ্লাইট ছেড়েছে, ডোমেস্টিক ও ইন্টারন্যাশনাল, সবের প্যাসেঞ্জার লিস্ট দিন। আরজেন্ট।'
ডেস্কের তরুণীকে মুহূর্তের জন্য বিহ্বল দেখাল। কিন্তু সে সামান্য কয়েক মুহূর্ত। তারপরেই সে ডেকে নিল পাশের ডেস্কের আর এক মধ্যবয়স্ক কর্মীকে। দু-জন মিলে পরবর্তী মিনিট দশেকের মধ্যে এক গোছা প্রিন্ট আউট বের করে এগিয়ে দিল।
অনন্তবিজয়বাবু ও আরও কয়েকজন পুলিশ মিলে দ্রুত একটার পর একটা কাগজে চোখ বোলাতে শুরু করল। কেটে গেল আরও প্রায় পনেরো মিনিট। শেষ প্রিন্টটাও দেখা শেষ হলে তাদের কার্যতই হতাশ দেখাল।
'আর কোনো ফ্লাইট যায়নি? আর ইউ শিওর?' জিজ্ঞাসা করলেন জয়েন্ট কমিশনার।
তরুণীটি মাথা নাড়ল। বলল, 'আই অ্যাম শিওর স্যার।'
'তবু প্লিজ আর একবার আপনাদের ডেটাবেসে চেক করুন', গম্ভীর কণ্ঠে বললেন জয়েন্ট কমিশনার। তবু তাঁর কণ্ঠস্বরে অনুনয়ের দুর্বল ভঙ্গিটুকু চাপা থাকছে না, 'প্যাসেঞ্জার'স নেম ইস মিস্টার সুদর্শন গাঙ্গুলি, দ্য চিফ সেক্রেটারি অব ওয়েস্ট বেঙ্গল গভর্নমেন্ট।'
মুখ্যমন্ত্রী অম্লান চক্রবর্তী জানিয়েছিলেন, আজ ভোরের ফ্লাইটে চিফ সেক্রেটারির দিল্লি যাওয়ার কথা। পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টায় শুধু দিল্লিই নয়, সারা দেশের সমস্ত এয়ারপোর্ট, রেলওয়ে, বাস ট্রান্সপোর্টের প্যাসেঞ্জার লিস্ট ওলটপালট করে ফেলা হল। কিন্তু সুদর্শন গাঙ্গুলির কোনো হদিস পাওয়া গেল না। লোকটা যেন বেমালুম উবে গেছে। তাঁর স্ত্রী মণিকা গাঙ্গুলিকে জেরা করার চেষ্টা করা হল। মহিলা মানসিক রোগী, অ্যালাজাইমার্সে ভুগছেন। কিছু মনে রাখতে পারেন না, প্রশ্নের উত্তরে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকেন, দু-একটা অসংলগ্ন কথা বলেন। বাড়িতে দেখাশোনার জন্য সর্বক্ষণের আয়া আছে। পুলিশের জেরার উত্তরে কিছু খাপছাড়া অর্থহীন কথা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলেন না তিনি। অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর কথা শুনে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। মানসিক চিকিৎসক সার্টিফাই করলেন, মিসেস গাঙ্গুলি সত্যিই অসুস্থ।
আরও জানা গেল, ইনি সুদর্শন গাঙ্গুলির দ্বিতীয়া স্ত্রী। তাঁর প্রথমা স্ত্রী বিয়ের দু-বছরের মধ্যে মারা যান। ভদ্রমহিলার হার্টের সমস্যা ছিল। ট্রান্সপ্লান্টের জন্য হার্ট পাওয়া যায়নি। সুদর্শনবাবুর বাবাও কিডনি ফেলিওর হয়ে মারা যান।
এর পর কানাডাতে তাঁর পরিচয় হয় মণিকা গাঙ্গুলির সঙ্গে। ভদ্রমহিলা প্রবাসী বাঙালি, জন্মসূত্রে কানাডার নাগরিক। সুদর্শনবাবু সেই সময় ডিপ্লোম্যাট হিসেবে কানাডায় ইন্ডিয়ান এম্বাসিতে কর্মরত ছিলেন কয়েক বছর। মণিকা গাঙ্গুলি কানাডাতে হার্ট সার্জেন ছিলেন। বিয়ের পরপরই রোড অ্যাক্সিডেন্টে প্রথম স্বামীকে হারান। তারপর পরিচয় থেকে প্রেম। দুজনেরই বয়স তখন চল্লিশ পেরিয়েছে। সেখানেই বিয়ে করে দেশে ফিরে আসেন সস্ত্রীক। এদেশে ফিরে সুদর্শনবাবুর স্ত্রী কলকাতায় বেশ কয়েকটি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দক্ষ সার্জন ছিলেন মিসেস গাঙ্গুলি। সন্তান হয়নি তাঁদের। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক অসুস্থতার জন্য কাজ থেকে সময়ের আগেই অবসর নেন। ফেরার হওয়ার কয়েক দিন আগেই সুদর্শন গাঙ্গুলি সল্টলেকের বাড়ি, ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট, বিভিন্ন ইনভেস্টমেন্ট সহ যাবতীয় বৈধ সম্পত্তি স্ত্রীর নামে স্থানান্তরিত করেছেন। অর্থাৎ তিনি জানতেন পালাতে হতে পারে। তাই আটঘাঁট বেঁধেই ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে তাঁর অনুপস্থিতিতে অসুস্থ স্ত্রীর অসুবিধে না হয়।
টাপুরদির বসার ঘরে সন্ধ্যাবেলায় উপস্থিত টাপুরদি, অর্জুনদা ও আমি। আসরটা অবশ্য আজ শুধু চায়ের নয়। উত্তীয়দাও আসবে লালনকে নিয়ে। আজ টাপুরদি বিরিয়ানি রেঁধেছে। রাতে জম্পেশ ভোজ হবে। অর্জুনদা সোজা অফিস থেকে এসেছে। আমিও অফিস গেছিলাম। আজ তাড়াতাড়ি ফিরেছি। এসে দেখলাম অর্জুনদা ইতোমধ্যে এসে গেছে। জিজ্ঞাসা করলাম, 'এত তাড়াতাড়ি! কাজে ফাঁকি দিচ্ছ?'
অর্জুনদা বলল, 'হুঁ, এই কেসটা শরীরের সব এনার্জি একেবারে নিংড়ে নিয়েছে। দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছি না। আর তোমার মনে হচ্ছে ফাঁকি দিচ্ছি?'
আমি হেসে বলল, 'তা নয়তো কী? এই তো কেমন কাজকর্ম ফেলে নিভৃতে প্রেম করতে চলে এসেছ। আমি ভুল সময়ে এন্ট্রি নিয়ে ফেললাম।'
অর্জুনদা ডানদিকে ভুরু তুলে বলল, ''প্রেম? ডিটেকটিভ ম্যাডামের সঙ্গে? ধুর, ধুর! আমি হলাম গে পাতি সরকারি চাকুরে। আর উনি হলেন সেলেব্রিটি ডিটেকটিভ। কী যে বলো মিতুল, তার ঠিক নেই।'
টাপুরদি পাশ থেকে বলল, 'যত্তসব ঢং!'
আমি বললাম, 'অর্জুনদা কিন্তু ভুল বলেনি টাপুরদি। তুমি বড়ো কঠোর-কঠিন হয়ে উঠছ দিনকে দিন। বেচারা অর্জুনদাকে পাত্তাই দিচ্ছ না। এটা কি ঠিক হচ্ছে?'
'অ্যাই তুই কার বোন রে?' ছদ্ম কোপ দেখিয়ে বলল টাপুরদি, 'ওর না আমার?'
'দু-জনেরই', বললাম আমি, 'কবে থেকে অপেক্ষা করে আছি তোমাদের বিয়ের জন্য। কত প্ল্যান একের পর এক জমে উঠছে। বিয়ের দিন শাড়ি পরব, রিসেপশনে ইন্দো-ওয়েস্টার্ন ফিউশন। দুর্দান্ত একটা কালেকশন দেখে এসেছি। বলো না কবে বিয়ে করবে তোমরা? ও টাপুরদি, বলো না, প্লিজ!'
'থামবি তুই?' রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেলল টাপুরদি।
আমি মুচকি হেসে অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে বললাম, 'যাক, টাপুরদি হেসেছে, অর্জুনদা। আমি ভেতরে যাচ্ছি চেঞ্জ করতে। মিনিট দশেক টাইম দিলাম। এর মধ্যে পটিয়ে ফেলো। আর সেটা না পারলে বুঝব তোমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না। তোমার চেয়ে টাপুরদির এক্স, মানে উত্তীয়দা বেটার। বেশ গুরু দত্তের মতো চেহারা কিন্তু।'
'এক্স!' কপালে ভুরু তুলে বলল অর্জুনদা।
'তা নয়তো কী? দেখোনি, টাপুরদির দিকে কেমন গভীর চোখে তাকায়? পুরেনো ব্যথা না থাকলে অমন দৃষ্টি আসে না', বলতে গিয়ে হেসে ফেললাম আমি।
'মিতুল!' চোখ পাকিয়ে ধমকে উঠল টাপুরদি।
অর্জুনদা সোফায় হেলান দিয়ে সিলিং-এর দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুর করে গেয়ে উঠল, 'জানে ও ক্যায়সে লোগ থে জিনকে প্যারকো প্যার মিলা। হামনে তো যব কলিয়া মাঙ্গি কাঁটো কা হার মিলা...'
'লেগে থাকো, তোমারও হবে!'
অর্জুনদা এবার বলল, 'সেই আশাতেই আছি। আমার কথা ছাড়ো, আমি একটা কথা তো বলতেই ভুলে গেছিলাম।'
টাপুরদি ভুরু কুঁচকে বলল, 'কী কথা?'
অর্জুনদা মুচকি হেসে বলল, 'শুভম মিতুলের নম্বর চেয়েছে। কী মিতুল, দেব?'
টাপুরদি জোরে জোরে হেসে উঠল। বলল, 'দাও দাও। এতে জিজ্ঞাসা করার কী আছে? কী ব্রাইট ছেলেটা, তেমনই কিউট দেখতে। তাই না রে মিতুল?'
আমি গম্ভীর মুখে বলল, 'যত্তসব বাজে কথা। বাচ্চা ছেলে, কাজে মন দিতে বলো!'
অর্জুনদা বলল, 'বাচ্চা আবার কীসের? চব্বিশ বছরের ছেলে বাচ্চা হয় নাকি? বড়ো জোর তোমার চেয়ে বছর দেড়েকের ছোটো হবে। তাতে কী? আপাদমস্তক বিচ্ছু ছেলে ও। আমি কিন্তু নম্বর দেব কথা দিয়েছি।'
রাগ হয়ে গেল আমার। বললাম, 'আমাকে জিজ্ঞাসা না করেই কথা দিয়েই ফেলেছ একেবারে? তাহলে আর কী?'
গটগট করে পা ফেলে ভেতরে চলে গেলাম। পেছন থেকে অর্জুনদা আর টাপুরদির সম্মিলিত হাসির আওয়াজ ভেসে এল।
মিনিট পনেরো পর স্নান সেরে বসার ঘরে ফিরলাম। নাহ, অর্জুনদাটার কিচ্ছু হবে না। গম্ভীর মুখে বসে বসে টাপুরদির সঙ্গে কেসের আলোচনা করছে। আমিও গুছিয়ে বসে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আমার সব কেমন ঘেঁটে যাচ্ছে। দাঁড়াও, একটু গোড়া থেকে শুনি। সত্যি করে বলো তো টাপুরদি, তুমি সত্যি কখন বুঝতে পেরেছিলে যে শেখর মজুমদার বেঁচে আছেন?'
টাপুরদি হাসল। বলল, 'যদি বলি বুঝতে পেরেছিলাম, তাহলে মিথ্যে বলা হবে। আগে বুঝতে পারলে তদন্তের গতিপ্রকৃতিই বদলে যেত। শেখর মজুমদার এভাবে সকলের হাতের বাইরে চলে যেতে পারতেন না। তবে শেষের দিকে একটা খটকা লেগেছিল।'
'কখন? কবে?' জানতে চাইলাম আমি।
'তোর মনে আছে, হলদিয়ায় যাওয়ার আগে আমি একা বেরিয়েছিলাম?'
'হ্যাঁ।' বললাম আমি।
'বেশ কয়েকটা জায়গায় গেছিলাম আমি। তার মধ্যে একটা হল বসিরহাটে, অনিতা সাহার বাড়ি।'
হঠাৎ করে মনে করতে পারলাম না কে এই অনিতা সাহা। তারপর মনে পড়ল, ডক্টর দেবাশিস মিত্রর বাড়ির কাজের মহিলা নিজের নাম অনিতা সাহা বলে জানিয়েছিলেন।
'কী জানতে পারলে?' জিজ্ঞাসা করলাম।
টাপুরদি বলল, 'নবদিগন্তের সঙ্গে যুক্ত সকলের ছবি দেখিয়েছিলাম ওঁকে। জানতে চেয়েছিলাম এঁদের মধ্যে কাউকে চেনে কি না, বা ডক্টর মৈত্রর সঙ্গে দেখেছেন কি না? ভদ্রমহিলা তখনই আমাকে অবাক করা এক তথ্য দিলেন। শিউলি মজুমদার এ-বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। সেটায় বিস্ময়ের কিছু ছিল না। শিউলি মজুমদার নিজেই বলেছিলেন দেবাশিসবাবুর প্রতি তাঁর অন্যরকম আকর্ষণ ছিল। কিন্তু শেখর মজুমদারের ছবি দেখে আইডেন্টিফাই করেন তিনি। বলেন, শেখরবাবুকে কয়েক মাস আগে এক রাতে এ-বাড়িতে দেখেছেন তিনি। আমি বারবার জিজ্ঞাসা করি, তিনি সত্যিই দেখেছিলেন কি না? কিন্তু অনিতা জানান তাঁর কোনো ভুল হচ্ছে না। তখনই বুঝতে পারি, অনিতার কথা সত্যি হলে শেখর মজুমদার বেঁচে আছেন।'
'তবে এই মৃত্যুর নাটক কেন?' অর্জুনদা জিজ্ঞাসা করল।
টাপুরদি বলল, 'শেখর মজুমদার ছিলেন আইপিএস অফিসার, পোস্টিং ছিল লালবাজারে। সেই সূত্রেই সম্ভবত সুদর্শন গাঙ্গুলির সঙ্গে তাঁর আলাপ। অর্জুনকে বলেছিলাম শেখর মজুমদারের সার্ভিস রেকর্ডের ফাইল আমায় বের করে দিতে। তাতেই দেখেছি ওর এগেনস্টে ডিপার্টমেন্টের মধ্যে কোরাপশনের চার্জে ইনভেস্টিগেশন চলছিল। সাসপেন্ডও ছিলেন কিছুদিন। ঘুষ নিয়ে চার্জশিট থেকে আসামির নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগও ছিল।
'এদিকে সুদর্শন ব্যানার্জিও তখন ব্যাবসায় বিশ্বস্ত পার্টনার খুঁজছেন। রতনে রতন চেনে। দু'জন দুজনকে চিনে নেন। এক সঙ্গে ব্যাবসা শুরু করার পরিকল্পনা করেন। দেবাশিসবাবুকে শেখর মজুমদার আগে থেকেই চিনতেন। তাঁর কাছ থেকেই জানতে পারেন অনাথ আশ্রমের কথা। নবদিগন্ত ট্রাস্টের আন্ডারে সেটা অধিগ্রহণ করেন তাঁরা। হোমের আড়ালে চলতে থাকে অবৈধ ব্যাবসা।
'সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নবদিগন্তের ব্যাবসা বাড়ছিল। হোমের ভেতরকার আসল রহস্য প্রাথমিকভাবে জানতেন মাত্র ক-জন। শেখর মজুমদার, শিউলি মজুমদার, দেবাশিস মৈত্র, সম্ভবত সাগর দাশগুপ্ত এবং পরে জেনেছিলেন শোভন সেন। সত্যব্রত মল্লিকের ব্যাপারে আমি এখনও শিওর নই। সেটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব পুলিশের। তবে আমার ধারণা তিনি জানতেন না। ওঁরা এমএলএ সাহেবকে কমিটিতে রেখেছিল প্রশাসনিক সুবিধে পাওয়ার জন্য। একটা হোম চালানো খুব মসৃণ প্রসেস তো নয়। আর সেই হোমের পেছনে অবৈধ চোরাচালান চালাতে হলে ব্যাপারটা আরও কঠিন হয়ে যায়। তাই একজন নেতা-মন্ত্রী গোছের কেউ হোমের সঙ্গে থাকলে একটা বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন তৈরি হয়, তেমনই সুযোগ-সুবিধেও কিছু অতিরিক্ত মেলে। সুদর্শনবাবু নিজে একজন পোড়খাওয়া আমলা, শেখরবাবু অভিজ্ঞ আইপিএস। এসব ব্যাপারগুলো দু-জনেই ভালোভাবে বোঝেন।'
'তুমি কী করে জানলে যে শিউলি মজুমদার বা ডক্টর মিত্র সব জানতেন?' আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
টাপুরদি হাসল। বলল, 'পুরুষ মানুষ সারা দুনিয়ার কাছে যতই নিজেকে লুকোন, স্ত্রীর কাছে খুব কম ব্যাপারই লুকোতে পারে। আর আমাদের এই কেসে ঘটনাক্রম যেভাবে এগিয়েছে, তাতে শিউলি মজুমদারকে না জানিয়ে এই প্ল্যান এগোনো সম্ভব ছিল না। এটা একক প্ল্যান নয়, একটা দল বেঁধে এক্সিকিউট করা দুর্দান্ত একটা প্রোজেক্ট। শেখর মজুমদার প্রথমেই হোমের কমিটি তৈরি করলেন। রাঘব সামন্ত কে তা কেউ জানে না। অন্তত বাইরের সকলেই জানল শেখর মজুমদার ছাড়া রাঘব সামন্তকে কেউ দেখেনি, চেনে না। কিন্তু শেখর মজুমদার তো চেনেন। ধরা পড়লে রাঘব সামন্তর ওপর দোষ চাপানো হবে। শেখর মজুমদারকে জেরা করলেই পুলিশ রাঘব সামন্ত অবধি পৌঁছে যাবে। কিন্তু শেখর মজুমদারই যদি বেঁচে না থাকেন। তাহলে?'
আমি বললাম, 'তাহলে শেখর মজুমদার বেঁচে না থাকলে রাঘব সামন্ত অবধি পৌঁছোনোর সব রাস্তা বন্ধ। তাই তো?'
'একদমই তাই', বলল টাপুরদি।
'সেই মতো শেখর মজুমদার ভিআরএস নিলেন। তারপর শুরু হল তাঁর মৃত্যুর প্ল্যানের এক্সেকিউশন। দেবাশিসবাবু যৌবনে স্ত্রীকে হারিয়ে আর বিয়ে করেননি। কিন্তু একাকিত্ব তো থাকেই, তা সে শারীরিক হোক, বা মানসিক। শিউলি মজুমদার নিজেকে এগিয়ে দিলেন ডক্টর মৈত্রর দিকে। অবশ্য আমার ধারণা ব্যাপারটা আরও অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। মানে ওই হোম টেক ওভারের সময় থেকেই। বুড়ো বয়সে দেবাশিসবাবু শিউলি মজুমদারের মতো আকর্ষণীয়া মহিলাকে এড়াতে পারেননি। প্রথম রিপুর দংশন, দ্য ইটারনাল লাস্ট স্টোরি। সব জেনেও হোমের অবৈধ কাজে নিজেকে জড়িয়েছিলেন। আমাদের ভুলে গেলে হবে না যে ডক্টর মৈত্রর বাবা একজন সমাজবিরোধী ছিলেন। রক্তের দোষ যাবে কোথায়?
'এর পর শেখর মজুমদারকে যখন দুনিয়ার চোখে মেরে ফেলার দরকার হল, তখন দেবাশিসবাবুর চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যভাবে সেটা আর কে করতে পারত? হার্ট অ্যাটাকের নাটক করা হল। সাগর দাশগুপ্তের পার্টনারশিপ আছে হেলথলাইন হসপিটালে। দেবাশিসবাবু সেখানে ডাক্তার। সুতরাং ওই হসপিটালের চেয়ে ভালো জায়গা আর কী হতে পারে?'
'কিন্তু কীভাবে? কেউ বেঁচে থাকতেই তাকে কীভাবে মৃত বলে সার্টিফাই করা যায়? যন্ত্রপাতিতে কারচুপি করা যায়। কিন্তু নার্স, ওয়ার্ড বয়দের তো সন্দেহ হবে। পালস চলবে, শ্বাস পড়বে যে রোগীর তাকে কীভাবে মৃত সাজানো যাবে?' আমি কৌতূহলী প্রশ্ন করলাম।
'কোনো উপায়েই কোনো জীবিত মানুষকে টেমপোরারিলি মৃত বানিয়ে দেওয়া যায় না। তবে কিছু ওষুধ আছে, যেগুলির সঠিক প্রয়োগে জীবনের লক্ষণ ফিকে হয়ে আসে। ধরা যাক অপিয়য়েডস। আফিম, মরফিন, বিভিন্ন সিন্থেটিক কম্পাউন্ডস দিয়ে অপিয়য়েডস তৈরি হয়। অল্প পরিমাণে ব্যবহার করলে পেইন কিলার হিসেবে খুব ভালো কাজ করে। নার্ভ শান্ত হয়, ঘুম ভালো হয়। বেশি পরিমাণে ব্যবহার করা হয়ে শ্বাসকষ্ট সহ বিভিন্ন সিম্পটমস দেখা দেয়, যাকে হার্ট অ্যাটাক বলে মনে হতে পারে অ্যাপারেন্টলি। ওভারডোজে মৃত্যু অবধি হতে পারে। শুধু একজন ডাক্তার জানেন, ঠিক কতটুকু ওষুধ ব্যবহারে শ্বাসের গতি কমে আসবে, পালস খুঁজে পেতে অসুবিধে হবে, জীবিত ব্যক্তির শরীরে মৃতের লক্ষণ ফুটে উঠবে। সেই সময়ে যন্ত্রে ম্যানিপুলেশন করে রোগীকে মৃত সাজালে কেউ কোনো সন্দেহ করবে না। বেশ কয়েক ঘণ্টা এই অবস্থা স্থায়ী হবে। তার মধ্যে হাসপাতাল থেকে ডেথ সার্টিফিকেট বের করে রোগীর আত্মীয়রা বডি বের করে নিয়ে চলে যাবে। আর হাসপাতালে যদি নিজেদের পার্টনারশিপ থাকে, তাহলে পুরো প্রসেসটা হবে আরও বেশি মসৃণ। আমার ধারণা এভাবেই জীবিত শেখর মজুমদারকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল দুনিয়ার সামনে। দেবাশিসবাবু প্রেমিকার জন্য এটুকু রিস্ক তো নিতেই পারেন, তাই না?'
'ও বাবা, এ তো দারুণ প্ল্যান!'
অর্জুনদা বলল, 'শিউলি মজুমদার, সাগর দাশগুপ্তকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে জবানবন্দি বের করার চেষ্টা চলছে। এখনও মুখ খোলেনি যদিও, দেখা যাক কতদিন চুপ করে থাকে!'
টাপুরদি বলল, 'দারুণ প্ল্যান তো বটেই। শেখর মজুমদার দুনিয়ার চোখে মারা গেলেন। রাঘব সামন্তও মুছে গেলেন। শোভন সেন কোনো ভাবে জেনে গেছিলেন সব কথা। হয় তাকে হত্যা করা হল, না হয় এমনভাবে ভয় দেখানো হল যাতে তিনি আত্মহত্যা করলেন। শেষ ছিলেন দেবাশিসবাবু। তাকে আর বাঁচিয়ে রাখার দরকার ছিল না। অদ্বৈতবাবুর একটা ভুল সিদ্ধান্ত কাজটা সহজ করে দিল। সুদর্শনবাবু জানতে পারলেন আমরা দেবাশিসবাবু অবধি পৌঁছোতে চেষ্টা করছি। আমরা তাঁর কাছে পৌঁছোনোর আগেই তাঁকেও সরিয়ে দেওয়া হল। এমন একটা রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হল, যাতে করে তাঁর মৃত্যু সম্পর্কিত তদন্তও থিতিয়ে গেল।'
'ঠিক এই জায়গাতেই এসে আমার সন্দেহ হল, এমন একজন কেউ এ- সবের পেছনে আছেন যিনি যথেষ্ট ক্ষমতাশালী। মেগাসিটি মেডিকেল কলেজে ডক্টর ইউনিয়নের সেক্রেটারি অখিল মিদ্যা জুনিয়র ডাক্তারদের তাতিয়েছিলেন। কিন্তু কার প্ররোচনায়? তাঁর কীসের স্বার্থ? প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল সত্যব্রত মল্লিককে। পরে মনে হল, যুক্তিটা দাঁড়াচ্ছে না। রাজনীতিতে বন্ধুত্বের কোনো জায়গা নেই। যদিও দু-জনেই একই পার্টির এমএলএ, রাজনৈতিক সতীর্থ, তবু একজনে জন্য অপরজন গলা জলে নামবেন, এতটা রিস্ক নেবেন, ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হল না। বরং উলটোটাই স্বাভাবিক। খবর পেলাম, অখিল মিদ্যার সঙ্গে রুলিং পার্টির দূরত্ব বেড়েছে। অপোজিশনের নেতাদের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে তাকে।
'খোঁজ নিতে শুরু করলাম অখিল মিদ্যার সম্পর্কে। জানতে পারলাম ইনি ভয়ানক দুর্নীতিপরায়ণ ও ক্ষমতালোভী। মেগাসিটি মেডিকেল কলেজে ইনি মুকুটহীন সম্রাট। প্রথমে অদ্বৈত মুখার্জিকে আমরা সকলেই সন্দেহ করেছিলাম। সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ ছিল। প্রথমত এ ভদ্রলোক বদরাগী মানুষ, খুব সহজে রিঅ্যাক্ট করেন। জানলাম তার সার্ভিস রেকর্ডও খুব একটা ক্লিন নয়। বিভিন্ন সময়ে সাবঅর্ডিনেটসদের সঙ্গে মিসবিহেভিয়র আর কোরাপশনের চার্জে ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারি হয়েছে তাঁর এগেনস্টে। এই তথ্যগুলো আমাকে সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত করেছিল। আমি তারপর অদ্বৈত মুখার্জির সার্ভিস সংক্রান্ত সমস্ত ফাইল জোগাড় করি। কীভাবে জানিস? সুদর্শনবাবুর কাছে চেয়েছিলাম। আর তিনিই আমায় দিয়েছিলেন। এখন বুঝতে পারছি, তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন অদ্বৈত মুখার্জিকে আমার সন্দেহের তালিকায় পাকাপোক্তভাবে প্রথম স্থানে বসাতে।
'কিন্তু ফল হল উলটো। অদ্বৈত মুখার্জির ফাইল ভালোভাবে উলটেপালটে দেখে বুঝলাম, ভদ্রলোক আর যাই হ'ন, অসাধু নন। অধৈর্য, বদরাগী স্বভাবের জন্য কাজের জায়গায় বরাবরই শত্রু তৈরি করেছেন। সেইসব শত্রুরাও যথাসম্ভব শত্রুতা করতে পিছু হটেনি। অদ্বৈত মুখার্জির নামে একের পর এক চার্জ, মিথ্যে চার্জ তৈরি হয়েছে। সব খুঁটিয়ে দেখে মনে হল আমরা ভুল পথে এগোচ্ছি। এত বছর ধরে সুনিপুণ জাল বুনে ঠান্ডা মাথায় একটা অপরাধ চক্র চালিয়ে যাওয়ার মতো ধৈর্য বা মানসিক গঠন, কোনোটাই অদ্বৈত মুখার্জির নেই।'
'কিন্তু তুমিই বলেছিলেন অখিল মিদ্যা অদ্বৈত মুখার্জির সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে গেছিলেন?' জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
'হ্যাঁ গেছিলেন। অদ্বৈতবাবু পুলিশকে জানিয়েছেন, মেডিকেল কলেজের স্ট্রাইক সংক্রান্ত ব্যাপারে আলোচনা করতে গেছিলেন তিনি। অখিল মিদ্যাই ডেকেছিলেন', বলল টাপুরদি।
'সুদর্শনবাবুর ওপর তোমার প্রথম সন্দেহ হল কবে?'
'সন্দেহ হতই না, যদি না সেদিন মৃণালবাবুর বাড়ি যেতাম। আসলে তুরুপের তাসটা মৃণালবাবুর আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন', টাপুরদি বলল।
'মৃণালবাবু?' আমি আর অর্জুনদা এক সঙ্গে বলে উঠলাম।
'হ্যাঁ!' আমার দিকে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে বলল টাপুরদি, 'এত অবাক হওয়ার কিছু নেই। তুইও আমার সঙ্গেই ছিলি। সন্দেহটা তোর মনেও জাগা উচিত ছিল।'
'কেন বলো তো? আমার কিছুই মাথায় ঢুকছে না।' বললাম আমি।
'এই জন্যই তো তোকে রোজ অঙ্ক করতে বলি', টাপুরদি হেসে বলল, 'তাহলে মাথাটা খুলত। সেদিন মৃণালবাবু সুদর্শন গাঙ্গুলি সম্পর্কে কী বলেছিলেন মনে আছে তোর?'
কী বলেছিলেন! মনে করার চেষ্টা করলাম। অর্জুনদা অবশ্য কিছুই জানে না।
টাপুরদিই বলতে শুরু করল, 'সুদর্শনবাবুর প্রশংসাই করেছিলেন মৃণালবাবু। বলেছিলেন, সুদর্শনবাবু খুব ভালো মানুষ। মৃণালবাবুর নাতি, মানে সুপর্ণাদির ছেলে থ্যালাসেমিয়ায় মারা গেছে। বাচ্চাটার চিকিৎসার সময় অসহায়ের মতো একটু সাহায্যের জন্য সকলের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছিলেন মৃণালবাবু। সেই সময়ে সুদর্শনবাবু তাঁকে সাহায্য করেন। মৃণালবাবুই আমাদের জানান, সুদর্শন গাঙ্গুলি মৃণালবাবুর নাতির জন্য ব্লাড জোগাড় করে দিয়েছিলেন। এছাড়া খুব কম খরচে কলকাতার একটি বড়ো প্রাইভেট হসপিটালে মৃণালবাবুর নাতির চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সেদিন আমি তাঁকে হাসপাতালের নাম জিজ্ঞাসা করিনি। মাথাতেও আসেনি। পরে বাড়ি ফিরে একটা খটকা লাগল। ফোন করে হাসপাতালের নাম জিজ্ঞাসা করলাম। কী জানতে পারলাম বল তো?'
আমি আর অর্জুনদা একসঙ্গে বলে উঠলাম, 'হেলথলাইন হসপিটাল?'
'একদম ঠিক।' টাপুরদি বলল, 'অদ্বৈত মুখার্জির থেকে আমার সন্দেহটা কিছুটা সরে যেতে ভাবতে শুরু করলাম, তিনি না হলে আর কে? কে এমন আছে যিনি শুরু থেকে এই কেসের সব মাইনিউট ডিটেলস জানতেন! কার কাছে এতটা ক্ষমতা আছে যে সমস্ত ব্যাপারটা ঘটিয়ে তুলতে পারেন!
'সুদর্শন গাঙ্গুলি আর হেলথলাইনের অ্যাসোসিয়েশনের ইঙ্গিত পেতে মাথায় হঠাৎই ক্লিক করল ব্যাপারটা! ভাবতে শুরু করলাম। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এই কেসের সঙ্গে ক্লোজলি অ্যাসোসিয়েটেড ছিলেন মিস্টার গাঙ্গুলি। কেসের প্রতিটি স্টেপের খবর ছিল তাঁর কাছে। মনে হল আমাকে এই কেসে রাখার পেছনে তাঁর নিজেরও স্বার্থ ছিল। তাঁর পদাধিকার তাঁকে বারবার পুলিশকে তাদের কাজের অগ্রগতি জানতে চাওয়ার অনুমতি দেয় না। তিনি সেটুকুই জানতে পারেন, যেটুকু অম্লান চক্রবর্তী তাঁকে জানান। আর সেটুকু যথেষ্ট নয়।
'সেই জন্যই তাঁর আমাকে দরকার হল। তিনি জানতেন আমি পুলিশের সঙ্গে মিলে কাজ করব। তিনি নিজেই অম্লানবাবুকে পরামর্শ দিলেন যাতে আমি অম্লানবাবুর অনুপস্থিতিতে এমন কাউকে রিপোর্ট করি যাঁকে সিএম বিশ্বাস করেন। তিনি জানতেন সিএম সেই দায়িত্ব তাঁকেই দেবেন। আমার সূত্র ধরে তিনি পুলিশি তদন্তের হাল-হকিকতের খবর পেতে লাগলেন এবং নিজের গেমও সেভাবে সাজাতে লাগলেন। কথাগুলো মনে হতেই সন্দেহটা জাঁকিয়ে বসল মাথায়। তবু নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। সেজন্য আর একটা কাজ করতে হল।'
'কী কাজ?' জিজ্ঞাসা করলাম।
'হলদিয়া যাওয়ার আগে আমি অনিতা সাহার বাড়ি ছাড়াও আরেক জায়গায় গেছিলাম।'
'কোথায়?'
'অদ্বৈত মুখার্জির বাড়ি, তাঁর সঙ্গে দেখা করে ক্ষমা চাইতে', বলল টাপুরদি।
'ক্ষমা চাইলে তুমি?' বিস্মিতমুখে জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
'হ্যাঁ, চাইলাম। কারণ আমিও ভুল করেছি তাঁকে সন্দেহ করে', টাপুরদি বলল।
আমি জানতে চাইলাম, 'ক্ষমা করলেন তিনি?'
'প্রথম প্রথম তো বাড়িতে ঢুকতেই দিচ্ছিলেন না', হেসে বলল টাপুরদি, 'প্রায় ঘাড়ধাক্কা যাকে বলে, তাই-ই দিচ্ছিলেন। তারপর আমার অনুরোধে ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। আমি ক্ষমা চাইলাম। সব খুলে বললেন তাঁকে। তিনি ঠান্ডা হলেন। নিজেও ক্ষমা চাইলেন আমার কাছে। বললেন, আমাকে এই কেস থেকে সরানোর জন্য তিনিই সিএমকে বলেছিলেন। আমার এগেনস্টে কমপ্লেন করেছিলেন। কারণ আমার ব্যবহারে খুব রেগে গেছিলেন তিনি। সুদর্শনবাবুকে ফোন করে সব জানান। তাতে সুদর্শনবাবুই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যাতে তিনি সিএমকে আমার এগেনস্টে কমপ্লেইন করে আমাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য জোর করেন। তিনিও রাগের মাথায় সে-কথা মেনে নিয়েছিলেন।'
'বোঝো!' বললাম আমি, 'আর সিএম-এর কেবিনে আমাদের সামনে সুদর্শনবাবু নাটক করে আমাকে কেসে রাখা যায় কিনা ভেবে দেখতে বললেন সিএমকে।'
'হুম।' বলল টাপুরদি, 'শুধু তাই নয়। দেবাশিস মিত্রকে হসপিটালে ট্রান্সফার করার আগে তিনি সুদর্শনবাবুকে ফোন করেছিলেন। তিনিই অদ্বৈতবাবুকে পরামর্শ দেন যে তিনি চাইলে দেবাশিস মিত্র মেডিকেল কলেজে অ্যাডমিট করাতে বলতে পারেন। ওখানে চিকিৎসাটা ভালো হবে।'
'কী সাংঘাতিক। অথচ এই কথাটা তিনি সকলের কাছে বেমালুম চেপে গেছিলেন। কিন্তু অদ্বৈত মুখার্জি যখন দেখলেন তাঁর ওপর সব দোষ এসে পড়ছে, তখন তিনি কেন এ-কথা কাউকে বলেননি?'
টাপুরদি বলল, 'আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি উত্তর দেননি। আমার মনে হয় ভদ্রলোকের ইগো ভীষণ বেশি। তিনি একজন আমলা হয়ে অপর একজন আমলার পরামর্শ নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটা মেনে নিতে তাঁর ইগো হার্ট হচ্ছিল। তার চেয়ে নিজের ঘাড়ে দোষ তুলে নেওয়া তাঁর সহজ মনে হয়েছিল।'
'উফ, সবটাই দুর্দান্ত স্ক্রিপ্টেড নাটক। সব সুতোর জট খুলতে শুরু করল ধীরে ধীরে। অবশ্য তার আগেই হেলথলাইন সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিলাম যে শুরুতে সাগর দাশগুপ্ত ওই হাসপাতালের সামান্য অংশের শেয়ার হোল্ডার ছিলেন। কিন্তু গত পাঁচ বছরে তিনি প্রায় ষাট পার্সেন্ট শেয়ার কিনে নিয়েছেন। অর্থাৎ এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে এখন সাগর দাশগুপ্ত এই হসপিটালের ওনার। গত বছর নিউটাউনে হেলথলাইনের নতুন ইউনিট উদবোধন করেছিলেন অখিল মিদ্যা। খুঁজে-পেতে সাগর দাশগুপ্তের সঙ্গে অখিল মিদ্যার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের আরও কিছু প্রমাণ পেলাম। দেখলাম হেলথলাইনের পনেরো পার্সেন্ট শেয়ার অখিল মিদ্যার মেয়ের নামে রয়েছে, যে ওই হাসপাতালেরই ইনটার্ন। এবার দুইয়ে দুইয়ে চার করতে অসুবিধে হল না। পুরোটাই টাকার খেলা।'
'তার মানে এই অখিল মিদ্যাও এসবের মধ্যে আছেন?' আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
অর্জুনদা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার বলল, 'থাকতেও পারেন, আবার সরাসরি জড়িত থাকতে না-ও পারেন। অবশ্য তাতে অপরাধ কিছু কম হয়ে যায় না। কিন্তু এইসব ব্যাপারে রাজনীতি সব সময়েই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইনভলভড থাকে। সারা পৃথিবীতে তাবড় তাবড় পলিটিশিয়ানরা বিভিন্ন সময়ে হরেক কিসিমের কেলেঙ্কারিতে ফেঁসেছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধরা পড়েন না, কারণ পুলিশ-প্রশাসন তাঁদের হাতে। আর ধরা পড়লেও বেস্ট ল-ইয়ার পান তাঁরা। জামিন পেয়ে বুক ফুলিয়ে ঘোরেন। রাজনীতিতে আরও পদোন্নতি হয়। কেস চলতে থাকে। সাক্ষীদের কিনে নেওয়া হয়, না নেওয়া গেলে নিঃশব্দে সরিয়ে দেওয়া হয়। কেস আর শেষ হয় না। তারপর একদিন বার্ধক্য আসে, স্বাভাবিক মৃত্যু আসে। খবরের কাগজের ফ্রন্ট পেজে শোকবার্তা ছাপা হয়, তাঁদের মহত্ত্বের গল্পে জনতার চোখে জল আসে। কেস ক্লোজ হয়ে যায়। আইনের দেবীর চোখ সত্যিই বাঁধা, মিতুল। যাদের হাতে টাকা আছে, ক্ষমতা আছে, তারা সব কিনে নিতে পারে, আইনও। পুলিশে চাকরি করি, আমরা আইনের রক্ষক। তবু স্বীকার করতে লজ্জা করে, আসলে আমরা নেতা-মন্ত্রীদের হাতের দম দেওয়া পুতুল। পলিটিশিয়ান অপরাধী হলে পুলিশের স্বাধীনভাবে চার্জশিট বানানোর উপায় পর্যন্ত নেই।'
'কিন্তু এমন তো নয় অর্জুনদা, যে নেতা-মন্ত্রীরা শাস্তি পায় না', আমি বললাম।
'পায়', অর্জুনদা বলল, 'খুব কম যদিও। সেটাও তখনই পায়, যদি সেই দলের সুপ্রিমো সেই নেতা বা মন্ত্রীকে ভোট-ব্যাংকের স্বার্থে উৎসর্গ করতে রাজি হন।'
আমি বললাম, 'অম্লানবাবু নিশ্চয়ই জানতেন না যে তার দলে এমএলএ এসবের সঙ্গে যুক্ত। জানলে নিশ্চয়ই প্রশ্রয় দিতেন না। অম্লানবাবু সৎ পলিটিশিয়ান, বলো টাপুরদি!'
টাপুরদি বিষণ্ণ হেসে বলল, 'রাজনীতিতে সততা খুঁজতে যাস না মিতুল। ভুল করবি। পলিটিশিয়ান সৎ বা অসৎ হয় না। পলিটিশিয়ান শুধু পলিটিশিয়ান হয়। এটা একটা বোর্ড গেম। খেলায় টিকে থাকতে গেলে নিজের চাল দিয়ে যেতে হয়। থামলে কী ছিটকে গেলে। কে কাকে টক্কর দিয়ে এগিয়ে যাবে, তার ওপরেই নির্ভর করছে কে টিকে থাকবে। এতে সত্যি-মিথ্যে, ন্যায়-অন্যায়, সততা-অসততার মূল্যায়ন করতে যাওয়া বৃথা।'
'আচ্ছা, তা না হয় হল, কিন্তু টাপুরদি, তুমি তো সুদর্শনবাবুকে আগেই সন্দেহ করেছিলে। তাহলে পাহারার ব্যবস্থা করোনি কেন?'
টাপুরদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে বলল, 'সৌরভবাবুকে রিকোয়েস্ট করেছিলাম আমি। তোর মনে আছে মিতুল, হলদিয়া যাওয়ার সময় সৌরভবাবু ফোন করেছিলেন শুভমের ফোনে! আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। তখন আমায় বললেন, সুদর্শনবাবুর বাড়ির আশেপাশে সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।'
'তাহলে পালালেন কী করে?' বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
এবার অর্জুনদা বলল, 'সন্ধের পর সুদর্শনবাবু অফিস থেকে বাড়ি ফেরেন। তাঁর গাড়ি বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিল। কিন্তু তারপর ওই বাড়ি থেকে তাঁকে বেরোতে কেউ দেখেনি। কেউ জানে না কীভাবে পালালেন ভদ্রলোক!'
'স্ট্রেঞ্জ!'
এবার অর্জুনদা বলল, 'স্ট্রেঞ্জ তো বটেই। বাড়িতে ওঁর স্ত্রী ছাড়াও স্ত্রীর আয়া ছিল। কেউ কিছু বলতে পারেনি। আয়া জানান, রাতে খেয়ে-দেয়ে নিজের ঘরে শুয়ে পড়েছিল সে-ও। আর কিছু টের পায়নি। পুলিশ যখন ওঁর বাড়িতে ঢোকে, তখন মিসেস গাঙ্গুলি ঘুমোচ্ছিলেন। ধাক্কাধাক্কি করেও ঘুম ভাঙেনি। আয়া উঠে দরজা খুলে দেয়। মণিকা দেবীকে হসপিটালে নিয়ে গিয়ে জানা যায়, তাঁকে কড়া ডোজের ঘুমের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছিল। ঘরের ডাস্টবিনে ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ পাওয়া গেছে। তাতে সুদর্শনবাবুর ফিঙ্গারপ্রিন্টও পাওয়া গেছে।'
'মাই গড! নিজের অসুস্থ স্ত্রীকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে পালালেন ভদ্রলোক! কিন্তু কীভাবে? কেউ কেন জানতে পারল না? একজন জলজ্যান্ত মানুষ বেমালুম উবে গেলেন নাকি?'
'সেটাই তো! তবে একটা কথা অস্বীকার করব না। নিজের বুদ্ধি নিয়ে ইদানীং আমার মনে একটু অহংকার তৈরি হয়েছিল। সেটা উনি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে গেছেন। সুদর্শন গাঙ্গুলি অসম্ভব বুদ্ধিমান, আমার চেয়ে অনেক বেশি। হয়তো সেই জন্যই তিনি এই রাজ্যের সর্বোচ্চ পদাধিকারী আমলা।''
'যাক গে! কত দূরে আর যাবে? পুলিশ খুঁজছে, আজ না হয় কাল ঠিক পেয়ে যাবে', টাপুরদিকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম।
কলিং বেলটা বাজছে। দরজা খুলে দেখলাম উত্তীয়দা আর লালন দাঁড়িয়ে আছে। সেদিন রাতে লালনকে খুব রোগা, অসুস্থ লাগছিল। এই ক-দিনেই যেন বদলে গেছে ছেলেটা। ভেতরের দীপ্তিতে ঝলমল করছে।
ওরা ভেতরে এসে বসল।
টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, 'কেমন আছ লালন?'
লালন হাসিমুখে ঘাড় নাড়ল।
উত্তীয়দা বলল, 'সঙ্ঘমিত্রা, তোকে কীভাবে যে ধন্যবাদ দেব জানি না। তোদের একটা খবর দিই। লালনকে আমি অফিশিয়ালি অ্যাডপ্ট করছি।'
আমরা সকলে হইহই করে উঠলাম। এ তো দারুণ খবর! সত্যিই এরকম খবর শুনলে মন ভালো হতে বাধ্য। টাপুরদি লালনের মাথার চুল নেড়ে দিয়ে বলল, 'খুব মন দিয়ে এবার থেকে লেখাপড়া করবে, কেমন?'
লালন মাথা নাড়ল আবার।
'বড় হয়ে দাদার মতো প্রফেসর হতে হবে কিন্তু', অর্জুনদা বলল।
'না', মাথা নাড়ল লালন। আমরা একটু অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম।
লালন অর্জুনের চোখে চোখে রেখে বলল, 'আমি তোমার মতো পুলিশ হব।'
উত্তীয়দার চোখে বেদনার ছায়া আমাদের দৃষ্টি এড়াল না। লালন প্রফেসর হতে চায় না সেজন্য নয়, বরং লালন যা হতে চায় সেটা হয়তো কখনোই হতে পারবে না সেজন্য। এত প্রাপ্তির মধ্যে বোধ হয় ছেলেটা ভুলেই গেছে যে ওর একটা কিডনি চোরেরা চুরি করে নিয়েছে। ও কখনোই আর পাঁচজনের মতো সব কিছু করতে পারবে না।
আজ এই আনন্দের মুহূর্তে ওর ভুলটা ভাঙিয়ে দিতে ইচ্ছে হল না। ধীরে ধীরে ও নিজেই বুঝে যাবে, হয়তো মেনেও নেবে।
উত্তীয়দা টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'সঙ্ঘমিত্রা, তোর কাছে যখন ছুটে এসেছিলাম তোর ফিজ জানতাম না। তুইও কিছু বলিসনি। এটা ধর।'
টাপুরদির দিকে একটা মোটা খাম এগিয়ে দিল উত্তীয়দা। টাপুরদি সেটা খুলে পাঁচশো টাকার একটা বেশ মোটা বান্ডিল বের করল। তারপর তার থেকে একটা মাত্র নোট বের করে টেবিলের ওপর রাখল। বাকি বান্ডিলটা খামে ঢুকিয়ে উত্তীয়দার হাতে দিয়ে বলল, 'আমার পারিশ্রমিক আমি নিলাম।'
'কিন্তু...'
উত্তীয়দাকে শেষ করতে না দিয়ে টাপুরদি বলল, 'চিন্তা করিস না। আমাকে রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্যদফতর থেকে অফিশিয়ালি এই কেসের জন্য হায়ার করেছিল। সেখান থেকে মোটা পারিশ্রমিক পাচ্ছি আমি। ওদের কিন্তু আমি মানা করিনি। করার প্রশ্নও নেই। তোরা বোস, আমি সবার জন্য একটু কফি করি। আজ বেশ ঠান্ডা পড়েছে।'
অর্জুনদা টেবিলের ওপর থেকে টিভির রিমোটটা তুলে টিভি চালাল। বাংলা নিউজ চ্যানেলে সংবাদ পাঠিকা খবর পড়ছেন। ফ্রেমের পর ফ্রেম বদলাচ্ছে। সারা পৃথিবীতে প্রতি মুহূর্তে কত খবর তৈরি হচ্ছে। নিজেদের মধ্যে গল্পগাছা করছিলাম আমরা। হঠাৎ করে টিভি স্ক্রিনে দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। মেগাসিটি মেডিকেল কলেজে একটি সভায় মুখ্যমন্ত্রী অম্লান চক্রবর্তী বক্তৃতা দিচ্ছেন। মেডিকেল কলেজে এক কিংবদন্তি বাঙালি ডাক্তারের নামে নতুন ভবন তৈরির ঘোষণা করছেন। পাশেই বসে আছেন অখিল মিদ্যা। অম্লান চক্রবর্তী অখিল মিদ্যার ভূয়সী প্রশংসা করে চলেছেন। বক্তৃতা শেষে মিদ্যামশাইকে জড়িয়ে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী।
টাপুরদি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে কখন এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। হাসির শব্দে তাকালাম। টাপুরদি খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, ''যাক, রাগ-অভিমান মিটে গেছে তাহলে। এখন দুজনারই ইমেজ রক্ষার দায়। ভোটব্যাংক বড়ো বালাই। তা ছাড়া হেলথলাইনের ভবিষ্যৎ এখন সরকারের হাতে। দু-জনেই গাড্ডায় পড়েছে। ঝগড়া না মিটিয়ে এখন উপায় কী?''
আমি অর্জুনদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'হেলথলাইনের ব্যাপারে পুলিশ কোনো অ্যাকশন নিচ্ছে, অর্জুনদা?'
অর্জুনদা বলল, 'আমাদের হাতে সলিড কোনো প্রূফ নেই হেলথলাইনের এগেনস্টে। তদন্ত চলছে এখনও। শহরের কিছু লো-প্রোফাইল ক্লিনিক, মেটারনিটি হোম হেলথলাইনের অবৈধ কাজেকম্মে মদত দেয়, গোপন সিস্টার কনসার্ন হিসেবে কাজ করে। দেখা যাচ্ছে গত কয়েক বছরে হেলথলাইনে অনেক বেশি পরিমাণ রোগীর বিভিন্ন অরগ্যান ট্র্যান্সপ্লান্ট হয়েছে। সাগর দাশগুপ্ত ও হেলথলাইনের সঙ্গে জড়িত সকলের ওপর পুলিশের ক্লোজ সার্ভিলেন্স রয়েছে।
'এছাড়াও সেদিন ওদের দলের যারা ধরা পড়েছে, তাদের ম্যারাথন জেরা করা হচ্ছে। অনেক তথ্য-প্রমাণ পুলিশের হাতে এসেছে। সেই প্রমাণ ধরে আরও কিছু লোককে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। দলের যারা আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে আছে বিভিন্ন রাজ্যে, সেসব রাজ্যের পুলিশের সঙ্গে মিলে কলকাতা পুলিশ বেশ কিছু অভিযান করে অনেককে ধরেছে। এই চক্রটা একদম গোড়া থেকে ভেঙে দেওয়া গেছে বলেই মনে হচ্ছে আপাতত।'
উত্তীয়দা বলল, 'এটা সত্যিই ভালো খবর।'
'আর হ্যাঁ মিতুল, আর একটা খবর তোমাকে দিতে ভুলে গেছি। কলকাতা পুলিশ ও আইবি মতিমিঞাকে সরকারি সাক্ষী হিসেবে চার্জশিটে তার নামে কোনো কেস দিচ্ছে না। শিবেন্দ্র তোমারই মতো মতিমিঞার ব্যাপারে একটু উইক দেখলাম। ও এ-ব্যাপারে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছে ওপরমহলে'', অর্জুনদা বলল।
টাপুরদির মুখে হাসি ফুটল। এটা ভালো খবর।
উত্তীয়দা বলল, 'কিন্তু সঙ্ঘমিত্রা, সুদর্শন গাঙ্গুলি ধরা পড়লেন না? এটা কিন্তু সত্যিই অদ্ভুত। যেভাবে সকলের নাকের ডগা দিয়ে পালালেন, ভাবাই যায় না। কেমন করে পালালেন, কে জানে?'
টাপুরদি কাঁধ ঝাঁকাল। বলল, 'আমি ডিটেকটিভ, জ্যোতিষী নই। সুদর্শনবাবু যখন পালালেন, তখন আমি ছিলাম না। তাই কী করে তিনি পুলিশের সামনে দিয়ে পালালেন আমি জানি না। তবে কারও সাহায্য ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে আমরা কিছু মিস করে যাচ্ছি। খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো সূত্র চোখের সামনে আছে, অথচ দেখতে পাচ্ছি না।'
'মানে? সবই তো হয়ে গেল, আবার কী মিস করছ?' আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
টাপুরদি একটু অন্যমনস্কভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, 'জানি না। তবে আমার মন বলছে, সবটা জানা হয়নি। হয়তো এখনও কোনো মেঘনাদ আছে, আড়ালে। আছেই বলছি না, তবে থাকলেও অবাক হব না। হয়তো আবার দেখা হবে। হয়তো হবে না। কিন্তু গেম ইজ নট ওভার ইয়েট।'
আমি এবার বললাম, 'ব্যস! আর ভালো লাগছে না এই কেসের কচকচি। এবার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হোক। আর টাপুরদি, আমাদের সেই বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যানের কী হল?'
টাপুরদি বলল, 'যাব তো। আমি তো বেকার মানুষ। তোদের ছুটিছাটার ব্যবস্থা কর।'
উত্তীয়দা বলল, 'বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান হচ্ছে নাকি?'
টাপুরদি হেসে বলল, 'হ্যাঁ, তুইও চল না!'
উত্তীয়দা বলল, 'না রে, আমার হবে না। সামনে ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। এছাড়া লালনকে অ্যাডপশনের ফর্মালিটিজ আছে। তোরা ঘুরে আয়।'
আমি অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে বললাম, 'অর্জুনদা, তুমি ছুটির ব্যবস্থা করতে পারবে তো?'
অর্জুনদা মাথা নাড়ল, 'হয়ে যাবে। কিন্তু যাব কোথায়?'
টাপুরদি হেসে বলল, 'আই হ্যাভ আ প্ল্যান!'
আমি আর অর্জুনদা সমস্বরে বললাম, 'কোথায়?'
টাপুরদি আমাদের দুজনের দিকে পর্যায়ক্রমে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, 'গোয়া। চলবে তো?'
'চলবে মানে? দৌড়োবে', হাত তালি দিয়ে বললাম আমি।
অর্জুনদাও হেসে বলল, 'পারফেক্ট!'
।। পরিশিষ্ট।।
গভীর রাতে ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল মণিকা গাঙ্গুলির। সুদর্শন পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে একাই শোন তিনি। পাশের ঘরে আয়া মালতী শোয়। বিছানা থেকে নামলেন তিনি। ধীর পায়ে হেঁটে পাশের ঘরের পরদা সরিয়ে দেখলেন। মালতী ঘুমোচ্ছে। দরজাটা টেনে দিয়ে এক মুহূর্ত সেখানেই দাঁড়ালেন। তারপর দৃপ্ত পায়ে হেঁটে বিছানা থেকে মোবাইল ফোনটা তুলে নিলেন হাতে। তিনি জানেন, পুলিশ তাঁর ফোনে আড়ি পাতছে। কিন্তু পুলিশের সাধ্য নেই এই কল ধরতে পারে।
'মোনা! মণিকা!'
ফোন রিসিভ করে কানে ঠেকিয়ে চাপা স্বরে হেসে উঠলেন মিসেস মণিকা গাঙ্গুলি। কিশোরীর মতো তরল গলায় বললেন, 'কী খবর, মিস্টার হাজব্যান্ড? মিস করছ আমায়?'
ও-প্রান্তের কণ্ঠ গাঢ় স্বরে বলল, 'না করে উপায় আছে? আমায় যে স্বখাত-সলিল থেকে তুমি টেনে তুলেছ, আমার জীবনকে একটা অর্থ দিয়েছ, তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই না, জানো তুমি! ভীষণ মিস করছি।'
মণিকা গাঙ্গুলিও যেন একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বলেন, 'যে যুদ্ধ আমি একা শুরু করেছিলাম, তুমি তার শরিক হয়েছিলে সুদর্শন। নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, অরগ্যানের অভাবে যেন কাউকে মরতে না হয় সেটা নিশ্চিত করব আমি। তুমি শুধু স্বামী হিসেবে নয়, সহযোদ্ধা হয়ে আমার বিশ্বাসে বিশ্বাস রেখেছ, সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ।'
'তুমিও তো কম ত্যাগ করোনি, মোনা!' ও-প্রান্তের কণ্ঠস্বর বলল, 'সারা পৃথিবীর সামনে তুমি নিজেকে পাগল সাজিয়ে রেখেছ, এ ত্যাগ কি কম? তা ছাড়া সেদিন সন্ধেবেলাতেই তুমি চুপি চুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমার পোশাক পরে আমার গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলে। পুলিশ ভেবেছে আমি বাড়িতে ফিরে এসেছি, সেখানেই আছি। সব প্ল্যান তো তোমারই ছিল।'
খিলখিল করে হেসে বললেন মিসেস গাঙ্গুলি, 'পুলিশ প্লেন ড্রেসে সারারাত আমাদের বাড়ি ঘিরে রেখেছিল। অথচ তুমি তখন ছিলে আমাদের গোপন ডেরায়। প্রতি কনসাইনমেন্ট ডেলিভারির দিন তুমি ওখানেই থাকো, সেটা ওরা কী করে জানবে? আমরা রিস্ক নিইনি কখনও। ডিসিডিডি ফোন করে সিএমকে জানিয়েছিল শেখরের বাড়িতে রেইড করছে ওরা। সিএম সরল বিশ্বাসে তোমাকে জানান তখনই। তুমি বললে আমাকে। আমি বুঝে গেছিলাম, এবার ওরা আমার বাড়িতে আসবে। এও বুঝে গেছিলাম, তুমি আর বাড়ি ফিরবে না।'
'তুমি যেভাবে পুলিশকে বোকা বানিয়েছ পদে পদে, সেটা সহজ ছিল না মোনা। রিস্ক যথেষ্টই ছিল। ইউ আর জাস্ট সুপার্ব! কেউ ভাবতেও পারবে না যে এই গেমের রাঘব সামন্ত অন্য কেউ নয়, তিনি মিসেস মণিকা গাঙ্গুলি।''
মণিকা গাঙ্গুলি চাপা কণ্ঠে হাসেন আবার। বলেন, 'আই নো দ্যাট আই অ্যাম সুপার্ব, মিস্টার হাজব্যান্ড, অ্যান্ড ইউ টু। অ্যান্ড অফ কোর্স, দ্যাট'স হোয়াই আই চোজ ইউ।'
'কষ্ট একটাই। আমরা তবু হেরে গেলাম। শেখরের মতো সৈনিককে হারালাম', একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন সুদর্শন গাঙ্গুলি।
মণিকা গাঙ্গুলির এতক্ষণের হাসিখুশি ভাবটা মুছে গেল। সামান্য কঠিন গলায় বললেন, 'যুদ্ধে সৈনিককে আত্মত্যাগ করতেই হয়। শেখরও করেছে। তুমি শেখরকে জানিয়েছিলে যে দল ধরা পড়েছে। শেখরও মতিমিঞার ফোন না পেয়ে সেটা আন্দাজ করেছিল। ও চাইলে পালাতে পারত। সেরকমই তো কথা ছিল আমাদের। কিন্তু ও পালায়নি। হয়তো ওর লড়াইয়ের ইচ্ছে শেষ হয়ে গেছিল। হারার আগেই দুর্বল হয়ে হেরে বসে ছিল। ফ্যামিলিকে মিস করতে শুরু করেছিল। আমাদের কাজে যোগ দেওয়ার জন্য অনুতাপ হচ্ছিল ওর। আমরা তো কত হারিয়েছি। কই, ভেঙে তো পড়িনি! দুর্বল লোককে নিয়ে যুদ্ধ হয় না সুদর্শন।'
একটু থামলেন মিসেস মণিকা গাঙ্গুলি। তারপর বললেন, 'সে যাই হোক, তুমি হারার কথা ব'লো না। মনে রেখো, আমাদের লড়াই এখনও শেষ হয়নি। আপাতত সব ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত গা ঢাকা দিয়েই থাকো।'
'আমাদের কবে দেখা হবে আবার?' গাঢ় গলায় জিজ্ঞাসা করলেন সুদর্শনবাবু।
মনিকা দেবী বললেন, 'একটু অপেক্ষা করো। সময়মতো আমি তোমার সঙ্গে যোগ দেব। তুমি আমাদের প্ল্যানমতো কাজ করো। এখান থেকে বেরোনোর আগে মালতীরও ব্যবস্থা করতে হবে।'
'কিন্তু মালতী তো সবসময় আমাদের সাহায্য করেছে মোনা। ওকে কেন...'
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মণিকা গাঙ্গুলি বললেন, 'আহ তোমার এই-ই প্রবলেম সুদর্শন। বড়ো বেশি ইমোশনাল তুমি। মনে রেখো যুদ্ধে আবেগের জায়গা নেই। মালতী আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল, কারণ তুমি ওর ছেলেকে কিডনির ব্যবস্থা করে প্রাণ বাঁচিয়েছিলে। কিন্তু তা বলে পুলিশের থার্ড ডিগ্রি সহ্য করার মতো নার্ভ নেই ওর।'
'তুমি যা ভালো বোঝো', মৃদুকণ্ঠে বললেন সুদর্শন গাঙ্গুলি।
মণিকা দেবী বললেন, 'যাই হোক, আমাদের কাজ আমরা আবার এগিয়ে নিয়ে যাব। যাবই। তার জন্য সময় চাই। আবার নতুন পরিকল্পনার সঙ্গে শুরু করতে হবে যাতে একটা সামান্য বাচ্চা মেয়ে, কোনো টিকটিকি আমাদের ধরে ফেলতে না পারে। আরও সতর্ক হতে হবে আমাদের। আরও সলিড প্ল্যান চাই,আর ওই মেয়েটির সঙ্গে সামান্য বোঝাপড়া বাকি আছে। কী যেন নাম ওর?'
'ওর নাম টাপুর', গম্ভীর গলায় বললেন সুদর্শন গাঙ্গুলি, 'ডিটেকটিভ সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি।'
একটু চুপ করে রইলেন মিসেস মণিকা গাঙ্গুলি। তারপর হিসহিসে স্বরে বললেন, 'উই উইল মিট হার আগেন ডার্লিং, সুনার ওর লেটার!'
———————
আরও কিছু কথা:
১) ২০০৫-এর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে প্রতি বছর গড়ে ৪৪০০০ শিশু নিরুদ্দেশ হয়, যার মধ্যে ১১০০০ শিশুর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। সেই রিপোর্টেই বলা হয়েছে এই শিশুদের একটি বড়ো অংশকে দেশব্যাপী ছড়ানো প্রত্যঙ্গ ব্যাবসায়ের জন্য ব্যবহার করা হয়।
২) নেপাল-ভারত বর্ডার দিয়ে এই চোরাচালানের একটা বড়ো অংশ নিয়ন্ত্রিত হয়। বর্তমানে শুধু উত্তরপ্রদেশেই ৩৫টি অ্যান্টি-অরগ্যান ট্র্যাফিকিং ইউনিট কাজ করছে। অরগ্যান-মাফিয়াদের কাছে শিশু ও নারীরা সহজ টার্গেট এবং এদের দ্বিমুখী লাভের জন্য ব্যবহার করা হয়। শরীর থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বের করে নেওয়ার পরেও জীবিত শিশু ও পূর্ণবয়স্কদের ভিক্ষা ও বেশ্যাবৃত্তির জন্য ব্যবহার করা হয়।
৩) ২০১৯-২০২১-এ কোভিড পরিস্থিতির কারণে অরগ্যান ট্র্যাফিকিং অনেক গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে যেমন কর্মহীনতা, অভাব এক শ্রেণির মানুষকে স্বেচ্ছায় নিজেদের প্রত্যঙ্গ এই ব্যবসায়ীদের বিক্রি করতে বাধ্য করছে, অপরদিকে কোভিডের কারণে বৈধ প্রত্যঙ্গ পরিবহন ও প্রতিস্থাপনে সমস্যা হওয়ায় অবৈধ প্রত্যঙ্গ ব্যাবসা বেড়েছে বহুগুণে।
টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার ২৮ জুলাই, ২০২১-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, “Given the misery of those suffering from end-stage organ failure, the hopelessness of India’s poor making them susceptible to being allured by promise of quick money and the willingness of a section of healthcare professionals to look away, the organ bazaar refuses to die down. Worryingly, the Covid-19 pandemic seems to have added fuel to the fire.
৫) ২০২০-তে ১১২০০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য অপেক্ষায় আছেন, সেখানে বৈধ ডোনারের সংখ্যা মাত্র এর 3%। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, মোট প্রতিস্থাপিত অঙ্গের 5% থেকে 42% অবৈধভাবে কেনা হয়ে থাকে। এই ব্যবসায়ীদের মূল লক্ষ্য শিশু, নারী ও দুর্বল পরিজনহীন মানুষেরা। এদের শরীর থেকে প্রয়োজনীয় অঙ্গ বের করে দেনওয়ার পর সামান্য সেলাই করা হয় শুধু। তার পরেও বেঁচে গেলে এদের আবার ব্যবহার করা হয়।
৬) নোবেল পিস প্রাইজ প্রাপক কৈলাস সত্যার্থির এন জি ও 'বচপন বাঁচাও আন্দোলন'-এর জাতীয় সেক্রেটারি রাকেশ সেঙ্গারের মতে নিরুদ্দিষ্ট শিশুদের সন্ধান চালানোর সময় এদের একটা বড়ো অংশের মৃতদেহ পাওয়া যায় অঙ্গ (vital organs)-হীন অবস্থায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশও শুধু এই বলে ছেড়ে দেয় যে জলে ভেসে থাকা দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ (vital organs) কোনো জন্তু-জানোয়ার খেয়ে নিয়েছে। অর্গ্যান ট্র্যাফিকিং-এর কেসের চেয়ে মার্ডার বা কিডন্যাপিং-এর কেস ফাইল করা সহজ।'
তথ্যসূত্র:
১) The Red Market: Scott Carney
২) hindustantimes.com: How Bengal, India’s human trafficking hub, is weaving a turnaround story, By Snigdhendu Bhattacharya, nov 11, 2019
৩) Illigal Organ and Human Trafficing during Covid 19, Harsha Prakash
৪) Illigal Human Organ Trade in India: A study of the International Socio-Legal Perspective (a research project of Lloyed law college), author unknown
৫) আনন্দবাজার পত্রিকা (ডিজিট্যাল), নিউইয়র্ক, ৩০ অক্টোবর ২০২১
৬) Child Trafficking, ‘manufactured orphans’: The dark underbelly of inter-country adoption in India, by Gita Aravamudan, Firstpost, September 03, 2017
৭) Telegraphindia.com: organ trafficking concerns about Assam and Calcutta (28.07.21)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন