বিনোদ ঘোষাল
সাল ১৯৯৫। ডিসেম্বর মাসের শেষ রবিবার। সময় রাত দুটো পঁয়তাল্লিশ।
সনাতনের আবার বেগ পেল। আজ সারাদিনে অগুনতিবার। ওষুধেও কাজ করছে না। পেটটা একেবারে পচে গেছে। অবশ্য পেটের আর দোষ কী? এত অখাদ্য-কুখাদ্য সারাদিন গিললে পেট সইবে কেন? সে-ও প্রতিশোধ নেয়। অনন্ত ডাক্তার অনেকবার বলেছে, সনাতন, তোর লিভারটা পুরো গেছে। বাঁচতে চাইলে একটু নিয়ম মেনে চল। যা খুশি তা-ই খাস না। সনাতন মাথা নেড়ে বলে, আর খাব না। এইবারের মতো ঠিক করে দাও গো ডাক্তার। ওষুধ খেয়ে একটু ঠিক হলেই আবার যে কে সেই। আজও তা-ই হয়েছে। গতকাল সূর্যর দোকান থেকে বাসি ফুলুরি গোটা আষ্টেক খেয়ে ফেলে আজ সকাল থেকেই পেট কামড়ানো আর ঘন ঘন মাঠে দৌড়োনো। চৌহাটি গ্রামের শেষমাথায় যে কয়েকটি কুঁড়ে রয়েছে তার মধ্যে একটি সনাতনের। একাই থাকে। সারাদিন দিনমজুরি করে রাতে খেয়েদেয়ে ঘুম। এই রোজের রুটিন। আজ রুটিন ঘেঁটে গেছে। চূড়ান্ত হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা, রাতচরা পাখিগুলোও নিজেদের আস্তানা ছেড়ে বেরোয়নি। এর মধ্যে শালা পায়খানা যেতে ইচ্ছে করে! কিন্তু কথায় বলে, হাগা মানে না বাঘার ভয়, শীত তো কোন ছার!
আবারও কম্বল সরিয়ে উঠল সনাতন। মনে মনে নিজেকে গালাগাল দিল। তারপর এক মগ জল নিয়ে ঘরের কবাট খুলে সবে পা বাড়িয়েছে, কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার সঙ্গে গোঁওওও শব্দ কানে ঝাপটা মারল। এত রাতে এমন শব্দ কীসের? এরোপ্লেনের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু এত শব্দ এরোপ্লেনের! যাক গে, এখন অত ভাবার সময় নেই। মগ হাতে ঘর ছেড়ে সামনের মাঠের দিকে এগোল সনাতন। উহুহু, ঠান্ডায় একেবারে দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে! বুরুলিয়া মালভূমি অঞ্চল। তাই শীতকালে ঠান্ডা একটু বেশিই পড়ে প্রতিবার। তবে এইবারে যেন একটু বেশি।
আজ কুয়াশা কম। আকাশ অনেকটাই পরিষ্কার। কদিন পর পূর্ণিমা রয়েছে বলে আলোও রয়েছে। উফফ, আর সামলানো যাবে না। মাঠের কাছে পৌঁছেই উবু হয়ে বসে পড়ল সনাতন। আকাশে আওয়াজটা আরও জোরালো হচ্ছে। প্রাকৃতিক কাজ সারতে সারতেই মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল সনাতন। এ কী রে বাবা! ওই তো একটা এরোপ্লেন! এত নীচ দিয়ে আসছে কেন? ঘাড়ের ওপর এসে পড়বে নাকি! শীতের নিঝুম রাতে প্রচণ্ড শব্দ করে আকাশে থেকে অনেকটাই জমির কাছে নেমে-আসা এরোপ্লেনটা তারপর যা করল তা-ই দেখে পায়খানা করা মাথায় উঠল সনাতনের। প্লেনের ভেতর থেকে একের পর সাদা সাদা কী যেন নামতে থাকল! বাবা গো জিন নামছে, বলে পালাতে চেষ্টা করল সনাতন, কিন্তু পারল না। ভয়ের চোটে পা দুটো একেবারে জমিতে আটকিয়ে গেছে। এ কী ভয়ংকর কাণ্ড! গত তিরিশ বছরে এই চৌহাটি গ্রামের মাথার ওপর দিয়ে অনেক এরোপ্লেন উড়ে যেতে দেখেছে সনাতন কিন্তু কোনোটাই এত নিচু দিয়ে যায়নি আর তাদের পেট থেকে এমন সাদা ভূতও নামেনি। আজই সনাতনের শেষদিন। ডাক্তার ঠিকই বলত, লোভে পাপ আর পাপে মৃত্যু। লোভের বশে অতগুলো বাসি ফুলুরি না খেয়ে ফেললে এমন পেট ছাড়ত না, আর এই রাতে একা মাঠে পায়খানা করতে এসে এই জিনেদের হাতে বেঘোরে মরতে হত না। ওগুলো এবারে সনাতনকে আগে পেয়ে ওর রক্ত চুষে খাবে। ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে-থাকা সনাতন দেখল, প্লেনটা সশব্দে চৌহাটির আকাশ ছাড়িয়ে একটা সময়ে মিলিয়ে গেল আর সেই সাদা জিনগুলো যত নীচে নেমে আসছিল, চাঁদের আলোতে সেগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকল। নাহ! এ তো জিন নয়। মস্ত সাদা ছাতার মতো দেখতে। ছাতাগুলোতে বাঁধা রয়েছে বড়ো বড়ো লম্বা বাক্সের মতো কিছু একটা। চাঁদের আলোতে যেটুকু আন্দাজ করা সম্ভব সেইটুকুই করতে পারল সনাতন। ওগুলো ভাসতে ভাসতে নামতে থাকল নীচে। একটা-দুটো পড়ল সনাতনের খুব কাছে, কয়েকটা পড়ল কিছুটা দূরের জমিতে। বাকিগুলো আরও দূরে কোথাও।
মানে জিন নয়, অন্য কিছু... কিন্তু কী? ওগুলো যে আসলে প্যারাসুট তা সনাতনের জানার কথা নয়। সুতরাং আকাশের প্লেন থেকে জিন না হলেও খারাপ কিছু একটা নেমেছে এইটুকু আন্দাজ করতে পারার পর সনাতন যখন ওর দুই পায়ে সাড় ফিরে পেল তখন আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দৌড়োল নিজের ঘরের দিকে। এরপর পায়খানা পেলে ঘরের ভেতরেই করবে কিন্তু বাইরে কিছুতেই বেরোবে না।
ঘরের দরজা বন্ধ করে গায়ে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে পড়ল সনাতন। বুকের ভেতরটা ধড়াস ধড়াস করছে। এত বছরে রাতের বেলায় মাঠে কতবার গেছে, বুরুলিয়া জঙ্গল-পাহাড়ের দেশ, এখানে মানুষ ছাড়াও জন্তুজানোয়ার রয়েছে ঢের। তারা রাতের বেলায় জঙ্গল ছেড়ে মাঠঘাটেও কখনো এসে পড়ে। তাদের মুখোমুখিও কখনো হয়েছে সনাতন কিন্তু এমন অদ্ভুত দৃশ্য কখনো দেখেনি! জমিতে এরোপ্লেন থেকে ওগুলো কী নামল? দড়ি-দেওয়া ছাতায় বাঁধা লম্বা চৌকো ওগুলো কি বাক্স ছিল? কী রয়েছে ভেতরে? অজানা ভয় টুঁটি চিপে ধরল সনাতনের। কিন্তু ঘুম আসছে না। পেট গুড়গুড় করেই চলল, বেগ আটকে কান খাড়া করে বেশ অনেকক্ষণ চুপ করে শুয়ে রইল। বার বার ওর মনে হতে থাকল, এই বুঝি ওর ঘরের দরজায় এসে কেউ কড়া নাড়বে। এই বুঝি কারা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল। নাহ এইভাবে গোটা রাত ভয়ে ভয়ে কাটানো সম্ভব না। কপালে মরণ থাকলে ঘরে বসেও মরতে হবে, কিন্তু চৌহাটিতে এত রাতে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটেছে তার একমাত্র সাক্ষী সনাতন কিছুতেই ভয় পেয়ে গুটিয়ে থাকবে না। কম্বল সরিয়ে উঠে বসল ও। লম্বা শ্বাস নিল। তারপর মাফলার, চাদর ভালো করে পেঁচিয়ে টর্চ আর সাইকেল নিয়ে রওনা হল পুলিশ ফাঁড়ির দিকে। খবরটা নতুন বড়োবাবুকে দিতেই হবে। বড়োবাবুর খবরি হওয়ার এমন মোক্ষম সুযোগ দ্বিতীয়বার আসবে না।
সনাতন গ্রামের অন্ধকার, এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে পাঁচ ডিগ্রি ঠান্ডার রাতে সাইকেল চালাতে থাকল। ওর ঘর থেকে ফাঁড়ি প্রায় দুই কিলোমিটার পথ। ও যত ফাঁড়ির দিকে এগোচ্ছিল, অন্যদিকে কয়েক জোড়া পা এগিয়ে আসছিল সেই খোলা জমির দিকে, যেখানে ইতস্তত পড়ে রয়েছে বড়ো বড়ো কয়েকটি কাঠের প্যাকিং বাক্স। আর প্রতিটি বাক্সের ভেতরে অপেক্ষা করছে এক ভয়ংকর ভবিষ্যৎ যা গোটা ভারতবর্ষকে তোলপাড় করে দেবে।
সাল ১৯৯৫। অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শনিবার। সময় সকাল সাড়ে ছ-টা।
প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে এনকাউন্টার চলার পর অবশেষে কাট্টুবাগাকে আধমরা অবস্থায় পচা নালার ভেতর থেকে টেনে বার করে আনল অর্ণব। অর্ণব বারুই তালবাগান থানার মেজোবাবু। সকলে আড়ালে ডাকে পাগলা বারুই নামে। অর্ণব নিজেও জানে সেটা। পাত্তা দেয় না। এলাকার কুখ্যাত সমাজবিরোধী কাট্টুবাগাকে ধরার জন্য অনেকদিন ধরেই ফাঁদ পেতে বসে ছিল অর্ণব। কাট্টুবাগা তালবাগান বস্তির পয়লা নম্বরের তোলাবাজ। তোলাবাজি পর্যন্ত ঠিক ছিল কিন্তু পলিটিক্যাল যোগাযোগ বাড়িয়ে বেশ কিছুদিন ধরে ওর সাহসটা অতিরিক্ত বেড়ে গেছিল। মাসকয়েক আগেই অর্ণবের কাছে পাকা খবর এসেছিল, কাট্টু দেশি পিস্তলের ব্যাবসা শুরু করেছে। মুঙ্গের থেকে অস্ত্র কিনে এখানে বিক্রি করছে। অর্ণবের হাতে উপযুক্ত প্রমাণ ছিল না বলে কাট্টুকে কিছুতেই অ্যারেস্ট করতে পারছিল না, আর কাট্টুও ভয়ংকর সেয়ানা। বস্তির ভেতরে সেঁধিয়ে থাকে। গোপন পথ দিয়ে বস্তি থেকে বেরিয়ে কাজ সেরে আবার টুক করে ফিরে আসে, ওর গতিবিধির দিকে নজর রাখতেও হিমশিম খেতে হয় পুলিশকে। অর্ণবের টার্গেট ছিল কাট্টুকে ধরা। ও জানত, অতিরিক্ত লোভই একদিন কাট্টুর শেষদিন ডেকে আনবে। সেটাই হল। কদিন আগে এক প্রোমোটারকে চমকাতে গিয়ে কাট্টু ও তার দলবল একটি নির্মীয়মাণ বাড়ির ভেতরে গিয়ে বোমাবাজি করে, সেখানে ওই প্রোমোটার এবং একজন মিস্তিরি গুরুতরভাবে আহত হয়, এবং প্রোমোটার হাসপাতালে মারা যায়, কাট্টু ফেরার হয়ে যায়। অর্ণব এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। ঘটনার সাক্ষী জোগাড় করে ও পুরো তৈরি ছিল। জানত, বস্তিতে নিজের বাড়িতে ওকে এর মধ্যে একবার আসতে হবেই। অর্ণবের সোর্সরা সারাক্ষণ নজর রাখছিল বস্তির আনাচকানাচে। ঘিঞ্জি বস্তি। অচেনা কেউ ঢুকলে একা বেরোনো খুব কঠিন, অর্ণব নিজেও একবার সাদা পোশাকে গিয়ে সোর্সদের সাহায্যে জায়গাটা রেইকি করে এসেছিল। খবর ছিল, গতকাল রাতে কাট্টু ঘরে আসবে। তারপর ভোর থাকতে আবার পালাবে। এই সুযোগ আর ছাড়তে চায়নি অর্ণব। রাতের বেলাই টিম নিয়ে কাট্টুর বাড়ির কাছাকাছি লুকিয়ে ছিল। কাট্টু এল ভোররাতের দিকে। সঙ্গে দুজন লোক। অর্ণব তৈরি ছিল। যতক্ষণ কাট্টু ঘরের ভেতরে ছিল, অর্ণবরা অপেক্ষা করল। প্রায় ঘণ্টাখানেক ঘরের ভেতরে মিটিং সেরে ওরা যখন বেরোতে যাবে তখনই অর্ণব আর ওর টিম অ্যাটাক করল। এক মুহূর্ত আগে টের পেয়ে গিয়েছিল কাট্টু। সঙ্গে সঙ্গে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে দিল। বাকি দুজনও। অর্ণবের সে উপায় ছিল না। আর মাসকয়েক পরে ভোট। এখন পুলিশের গুলিতে একজন নাগরিকও যদি হতাহত হয়, বিশাল সমস্যা তৈরি হয়ে যাবে।
কোনো কোল্যাটেরাল ড্যামেজ হবে না সেইমতো সাবধানতা বজায় রাখতেই হয়েছিল। গোলাগুলি শুরু হতে বস্তির অনেকেই বেরিয়ে এসেছিল, ফলে অপারেশন চালাতে আরও অসুবিধা হচ্ছিল অর্ণবদের। আর সেই অসুবিধাটাকেই কাজে লাগাচ্ছিল কাট্টু। অর্ণবের প্ল্যান ছিল, কাট্টুকে চারদিক থেকে এমনভাবে কোণঠাসা করতে হবে যাতে ও বাধ্য হয়ে জলার দিকে যেতে বাধ্য হয়। তালবাগান বস্তিটা এই জলা-লাগোয়া। কোনো এককালে নদীর সঙ্গে যুক্ত ছিল, বহুদিন আগেই হেজেমজে গেছে। এখন এই বস্তির যাবতীয় ময়লা, নোংরা জল এই জলায় বছরের পর বছর ধরে জমে। নালাটা দুর্গন্ধযুক্ত থকথকে পাঁকে ভরা। জলার একদিকে বস্তি, অন্যদিকে রেললাইন। যথেষ্ট চওড়া হওয়ার ফলে কারো পক্ষে একলাফে এপার ওপার করা সম্ভব নয়।
কাট্টু এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে চালাতে অর্ণবের ফাঁদে পা দিয়ে শেষ পর্যন্ত জলার সামনে গিয়ে বুঝল, ও ফেঁসে গেছে। তখন মরিয়া হয়ে ওই পাঁকেই লাফ দিয়েছিল। ওটা নেহাতই মরণফাঁদ। একবার পড়লে চোরাবালির মতো তলিয়ে যাওয়াই নিয়তি। কাট্টু লাফ দেওয়ামাত্রই অর্ণব মুহূর্তের মধ্যে ছুটে চলে এসেছিল সামনে। কাট্টু উধাও। শুধু পাঁকের মধ্যে বুড়বুড়ি। কনস্টেবলদের সাহায্য নিয়ে অর্ণবও নেমে পড়েছিল পাঁকে। আতিপাতি করে হাতড়ে হাতড়ে অবশেষে হাতে ঠেকেছিল কাট্টুর মাথা। টান দিয়ে তুলেছিল ওকে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে তখন প্রায় আধমড়া। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠিয়ে দেওয়া হল হাসপাতালে। আর অর্ণব যখন ময়লা জামাকাপড়-পরা অবস্থাতেই বস্তি থেকে বেরিয়ে জিপে উঠতে গেল তখন ওকে ছেঁকে ধরল খবরের কাগজের লোকজন। অর্ণব কোনোকালেই বেশি কথা বলতে ভালোবাসে না। পরিচিতরা বলে, এই রাজ্যে দু-জন লোক কখনো হাসে না, প্রথমজন মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ বসু আর দ্বিতীয়জন পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর অর্ণব বারুই।
অর্ণব এই পৃথিবীতে হাসির কোনো কারণ রয়েছে বলে মনে করে না। তাই ওর হাসি পায় না। কথাও বলে ঠিক যেটুকু প্রয়োজন সেইটুকুই। অর্ণবকে প্রেসের লোক ঘিরে ধরে হাজারো প্রশ্ন করতে থাকলেও অর্ণব নির্বিকার। শুধু ভাবলেশহীন মুখে একটাই কথা বলল, আমরা খবর পেয়েছিলাম, কাট্টু আজ এখানে আসবে। আমরা কাট্টু এবং আরও দু-জনকে অ্যারেস্ট করতে পেরেছি। কোনো ক্যাজুয়ালটি নেই। বলে জিপে উঠে বসল অর্ণব।
প্রেসের লোকেরা আরও অনেক প্রশ্ন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেও অর্ণব আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। ক্যামেরার সামনে পোজ দেওয়া, খবরের কাগজ বা টিভি চ্যানেলে নিজেকে দেখার কোনো আগ্রহ নেই ওর। মনের ভেতরে শুধু এখন একটাই ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে, কাট্টুকে ইন্টারোগেট করা। আর অর্ণব বারুইয়ের ইন্টারোগেশন কী ভয়ংকর তা সকলেরই জানা।
থানায় পৌঁছোনোমাত্র অর্ণবকে তলব করলেন বড়োবাবু। অর্ণব পরনের ময়লা ইউনিফর্ম বদলে থানার সিনিয়র এস. আই. মণ্ডলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মণ্ডলবাবু ভুরু নাচিয়ে অর্ণবকে জিজ্ঞাসা করলেন, কাজ হল?
হ্যাঁ।
বোসো।
বসল অর্ণব।
এই তালবাগান থানায় অর্ণব এসেছে দুই বছর হল। রামকৃষ্ণ মণ্ডল প্রায় চার বছর ধরে রয়েছেন এখানে। উনি প্রোমোটেড এস. আই.। কীভাবে কঠোর পরিশ্রম ও নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে করতে হাবিলদার থেকে প্রোমোশন পেয়ে অবশেষে সাব-ইনস্পেক্টর হয়েছেন সেই গৌরবগাঁথা বারংবার রসিয়ে বলাটাই ওর জীবনের একমাত্র এন্টারটেইনমেন্ট। বয়স পঞ্চান্ন। খুব বেশি ঝুটঝামেলা পছন্দ করেন না। অর্ণব এই থানায় আসার পর থেকে তিনি মোটেও সুখে নেই। কারণ অর্ণব বারুই ঠিক ততটাই ঝুটঝামেলা পছন্দ করে। তালবাগান এমনিতে শান্তিপ্রিয়ই বলা চলে। একমাত্র ডিস্টার্বিং এলিমেন্ট ছিল ওই কাট্টু। আজ সে-ও পুলিশের কাস্টডিতে। সুতরাং এরপর আশাই করা যায়, তালবাগানে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি বজায় থাকবে।
চা দিতে বলে বড়োবাবু বেশ আয়েশ করে বললেন, যাক, যাওয়ার আগে আমার একটা বড়ো উপকার করে গেলে হে।
যাওয়ার আগে মানে! প্রশ্নটা ভুরুতে রেখে মণ্ডলবাবুর দিকে তাকাল অর্ণব।
মণ্ডল রহস্যটাকে আরেকটু ধরে রাখার জন্য অর্ণবকে বললেন, আচ্ছা অর্ণব, এই পঁচানব্বই সালে ভারতবর্ষে কী কী বিশেষ ঘটনা ঘটেছে বলতে পারো? বলে তিনি অর্ণবের উত্তরের অপেক্ষা না করেই বললেন, আচ্ছা ছাড়ো, আমিই বলছি, তুমি মিলিয়ে নাও। এক, এই বছরে গণেশ ঠাকুর গোটা দেশে দুধ খেয়েছে। দুই, বম্বে শহরের নাম বদলে গিয়ে মুম্বাই হয়েছে। তিন, ভি এস এন এল-এর ইন্টারনেট এসেছে। চার, এই সালেই ভারতের সব থেকে দীর্ঘ সিনেমা দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে রিলিজ করেছে। পাঁচ, পঞ্জাবের সি. এম. বিনীত সিং খুন হয়েছেন। ছয়, হরিয়ানায় স্কুলের প্রোগ্রামে আগুন লেগে চারশো বাচ্চা পুড়ে মরেছে। আর সাত আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীপ্রমোদ বসু ভারতবর্ষের প্রথম মোবাইল ফোনে হ্যালো বলেছেন। একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে মণ্ডল মুচকি হেসে বললেন, এতগুলো মেজর ইনসিডেন্ট এই সালে ঘটেছে আর তার সঙ্গে আজ আরও একটা ঘটনা যুক্ত হল। এই যে এই নাও, তোমার লাভ লেটার এসে গেছে। বলে হেঁ হেঁ করে হাসতে হাসতে ফ্যাক্সে আসা ট্রান্সফার লেটারটা অর্ণবের হাতে তুলে দিলেন মণ্ডল।
অর্ণব আলগোছে চোখ বোলাল। আবার ট্রান্সফার উইদ ইমিডিয়েট এফেক্ট। মুখে কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল।
মণ্ডলের চোখে-মুখে তৃপ্তির ছাপ। এই অর্ণব বারুই লোকটা তালবাগান থানায় জয়েন করার পর থেকে একদিনও শান্তিতে ছিলেন না মণ্ডলবাবু। কখন কী করে বসে কোনো ঠিক নেই। আরে, পুলিশ হয়েছি বলে কি সারাক্ষণ চোর-ডাকাতের পিছনে দৌড়োতে হবে নাকি? এমনটা কোন শাস্ত্রে লেখা রয়েছে! সারাক্ষণ মুখ-গোমড়া, কাজ-পাগল লোক নিয়ে ঘর করা খুব কঠিন। তালবাগান থানায় যেদিন থেকে অর্ণব মেজোবাবু হয়ে জয়েন করেছে সেদিন থেকেই মণ্ডলের শান্ত জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। শালার খুচিয়ে ঘা করা স্বভাব। সমাজ থাকলে সমাজবিরোধীও থাকবে। সুতরাং অত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু অর্ণব বারুই লোকটার মাথায় দিন নেই রাত নেই এলাকার কোথায় কী ঘটছে তার খোঁজখবর নিয়ে বেড়াবে। কাউকে বেচাল কিছু করতে দেখলেই মার। আর সে কী নির্মম মার, দেখে আচ্ছা আচ্ছা পুলিশেরও বুক কেঁপে উঠবে। তালবাগান বস্তির কাছে আগে একটা চোলাই- এর আর সাট্টার ঠেক ছিল, অর্ণব এসে সব বন্ধ করে দিয়েছে। ওরা সমঝোতা করতে চেয়েছিল, অর্ণব শোনেনি। এই থানায় বড়োবাবু কে সেটা অনেকেই গুলিয়ে ফেলে এই নিয়ে মণ্ডলের মধ্যে যথেষ্ট কমপ্লেক্স ছিল। অর্ণব যে সিনিয়রের কথা শোনে না, তা-ই নিয়ে উপরমহলে বেশ কয়েকবার অভিযোগও জানিয়েছিল মণ্ডল। অর্ণবের পুরোনো রেকর্ড মণ্ডল জানে। লোকটা নিজের স্বভাবের জন্য কোথাও বেশি দিন টিঁকতে পারে না। রাজ্যের নানা প্রান্তে শুধু ট্রান্সফার হতে থাকে। বেশির ভাগই শাস্তিমূলক ট্রান্সফার। কিন্তু যে নয়ে শোধরায় না, সে নব্বইতেও শোধরাবে না। অর্ণব বারুই শোধরানোর নয়। ওর মাথায় ভূত আছে।
তবে মণ্ডল এবার নিশ্চিন্ত ছিলেন খুব শিগগিরই অর্ণবের এখান থেকে ট্রান্সফার হবে। কারণ এবারে ও এম. এল. এ.-কে চটিয়ে দিয়েছিল।
মাস দেড়েক আগের ঘটনা, এই এলাকার এম. এল. এ.-র ছেলে ও তার বন্ধুরা মিলে ক্লাবে একটু বেশি মৌজমস্তি করছিল। বক্সে গানবাজনা হুল্লোড় চলছিল। অর্ণব রাতের টহলে বেরিয়ে ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং এম. এল. এ.-র ছেলে ও তার বন্ধুদের অবিলম্বে গানবাজানো বন্ধ করে বাড়ি ফিরতে বলে। লেগে যায় তর্কাতর্কি। সেদিন এম. এল. এ.-র ছেলের গালে ঠাসিয়ে এক থাপ্পড় দিয়েছিল অর্ণব। ঘটনাটা রাতে ঘটলেও খবরটা পরদিন কীভাবে যেন ছড়িয়ে পড়েছিল এলাকায়। এম. এল. এ. নিজে সদলবলে চলে এসেছিলেন থানায়। অসম্ভব বুদ্ধিমান লোক। মণ্ডল বেজায় ঘাবড়ে গেছিল, এই বুঝি একটা ঝামেলা বাধে। কিন্তু এম. এল. এ. মশাই সকলকে অবাক করে দিয়ে অর্ণবকে তার নিরপেক্ষতা এবং আইনকে সবার আগে রাখার জন্য প্রশংসা করেন, নিজের ছেলের অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চান। আর এই ঘটনার ঠিক মাসখানেকের মধ্যেই এই ট্রান্সফার লেটার। বাইরের গল্পটা আর ভেতরের গল্পটা যে এক নয় তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এই ট্রান্সফারের আড়ালে কার হাত রয়েছে সেটা একজন শিশুও বুঝবে। মণ্ডল বুঝেছেন, অপেক্ষাও করেছেন এই দিনটার। আজ ফ্যাক্সটা আসার পর থেকে বেজায় খুশি তিনি। আপদ এখান থেকে বিদায় নেবে। আর কোনো ফালতু ঝুটঝামেলা পোহাতে হবে না। সারাক্ষণ ন্যায়-অন্যায় নিয়ে পড়ে থাকলে লাইফে আর থাকল কী?
অর্ণব লেটারটা হাতে নিয়ে নিজের চেয়ারে এসে বসল। ওর পাশের চেয়ারটা সুদীপের। এই থানার ছোটোবাবু হল সুদীপ। জুনিয়র এস. আই.। বয়সেও অর্ণবের থেকে বছরকয়েক ছোটো। এই থানায় সুদীপ এসেছে আড়াই বছর আগে। কিছুদিনের মধ্যেই দু'জনের সম্পর্কটা শুধু সহকর্মীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বন্ধুত্বের পর্যায়ে চলে এসেছে। অর্ণবের যেরকম স্বভাব তাতে ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া বেশ কঠিন, কারণ ও কথা যেমন কম বলে, বাইরে থেকে কোনো আবেগের বহিঃপ্রকাশও খুবই কম। ওর সঙ্গে মিশলে মনে হবে অর্ণব বারুই এমনই একটা লোক যার চোর-গুন্ডা প্যাঁদানো, নিজের ডিউটি ছাড়া আর কোনো শখ-আহ্লাদ নেই, পুরোপুরি আবেগবর্জিত একটা মানুষ। কিন্তু এই অর্ণব বারুইকে পেরিয়ে যদি কেউ ভেতরের মানুষটাকে একবার স্পর্শ করতে পারে তাহলে সে বুঝতে পারে অর্ণব আসলে মনের দিক থেকে খুবই স্পর্শকাতর, ভালোবাসার কাঙাল, অনুভবী একজন মানুষ। যদিও খুব কমজনই সেই অচেনা অর্ণবকে চিনতে পেরেছে। যে ক-জন পেরেছে, সুদীপ তাদের মধ্যে একজন। এখানে জয়েন করার কিছুদিনের মধ্যেই সুদীপের অর্ণবের আচরণ-কাজ ইত্যাদি দেখে ওকে একটু অন্যরকম লেগেছিল। মণ্ডলবাবু অর্ণবকে পছন্দ করেন না, এই থানার কনস্টেবলরাও যে অর্ণবকে অপছন্দ করে সেটা বুঝতেও সুদীপের সময় লাগেনি, কিন্তু কেন? কারণটা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি সুদীপের। আর কারণটা বোঝার পর অর্ণবের সঙ্গে প্রায় একপ্রকার জোর করেই বন্ধুত্ব করার চেষ্টা শুরু করেছিল। অর্ণব ওর স্বভাবমতো সুদীপের সঙ্গে কাজের প্রয়োজন ছাড়া বাড়তি কোনো কথা বলত না। থানাতেও মণ্ডলবাবু সমেত বাকিরা সুদীপকে পরামর্শ দিত অর্ণবের থেকে দূরে থাকতে। ও একটা হাফপাগল, ওর থেকে দূরে থাকাই ভালো ইত্যাদি। কিন্তু সুদীপের মনে হত, বাইরের এই খোলসটার ভেতরে অন্য একটা অর্ণব আছে। সেটা জানার চেষ্টাই অর্ণব আর সুদীপকে শুধু সহকর্মী না রেখে সুন্দর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে দিয়েছে। মাস আষ্টেক আগে অর্ণব যে বিয়ে করেছে সেটাও সুদীপেরই উদ্যোগে। সুদীপের কাছে অর্ণব একটি খোলা খাতা। সুদীপের স্ত্রী হেনাও মানুষ হিসেবে খুব ভালো। অবাঙালি কিন্তু চমৎকার বাংলা বলে। দুজনের কলেজজীবনে প্রেম, তারপর বিয়ে। একটি কন্যাসন্তান। ক্লাস থ্রি-তে পড়ে। ওদের পরিবারের সঙ্গে একটা সুন্দর আত্মীয়তা গড়ে উঠেছে এই সামান্য সময়ে।
অর্ণবকে চেয়ারে বসতে দেখে সুদীপ শুধু একবার তাকাল। ট্রান্সফারের চিঠি যে এসে গেছে সেই খবর ওরও জানা। বড়োবাবুই সকলকে আহ্লাদ করে আগে জানিয়ে দিয়েছেন। তাই ওই বিষয়ে কোনো কথাই বলল না, এমনকী কাট্টুর ব্যাপারেও কোনো প্রশ্ন করল না। শুধু বলল, আজ একটু আগে বেরোবি আমার সঙ্গে?
কেন?
দরকার আছে।
হুম।
ব্লুস্টার বারে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক অর্ণব আর সুদীপ বসে সময় কাটানোর পর সুদীপ বলল, চল, এবারে ওঠা যাক। ওরা দুজনে মাঝে মাঝেই এই বারটায় আসে, পানভোজন করে, নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা আলোচনা করে। তারপর ফিরে যায়। আজও অফিসে ইউনিফর্ম বদলে দুজনে চলে এসেছিল ব্লুস্টারে। সুদীপের নিজস্ব বাইকে চেপে এসেছিল। বেশ অনেকক্ষণ কথা বলল দুজনে। মূলত ট্রান্সফার নিয়েই আজকের কথা। সুদীপ বুঝতে পারল এবারের ট্রান্সফারটা নিয়ে অর্ণব মনে মনে যথেষ্ট হতাশ। আসলে ও যতদিন ব্যাচেলর ছিল ততদিন ট্রান্সফার নিয়ে ভাবেনি, কিন্তু জীবনে অপর্ণা আসার পর থেকে এখন পরিস্থিতি আগের মতো নেই। অর্ণবের এবারে ট্রান্সফার হয়েছে বুরুলিয়ার চৌহাটিতে। বুরুলিয়া চেনা, তবে সেখানে চৌহাটি জায়গাটা কেমন তা জানা নেই। তবে এই ট্রান্সফার যেহেতু শাস্তিমূলক সুতরাং আশা করাই যায়, খুব রিমোট কোনো জায়গাই হবে।
বাইকের পিছনে বসে বাড়ি ফেরার পথে অর্ণব আবারও সুদীপকে বলল, আমার শালা কপালটাই খারাপ। আমার সংসার করা উচিত হয়নি। খুব ভুল হয়ে গেছে!
আরে মহা মুশকিল তো! সবসময় তুই নিজের দোষই কেন দেখিস? আমাদের চাকরিটাই তো ট্রান্সফারের। অপর্ণাও সেটা জানে। ও ঠিকই বুঝবে। বলল সুদীপ। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, তবে তোকে আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি, তুই কিন্তু এবার নিজেকে বদলা। আগের মতো জীবন কাটানোর কথা এবার তোকে ভুলতে হবে।
তো কী করতে হবে আমাকে?
কী করতে হবে আর কী করতে হবে না সেটা নিশ্চয়ই তোকে আমায় বুঝিয়ে দিতে হবে না। এখন তোর একটা সংসার হয়েছে। ভবিষ্যতে ছেলে-মেয়েও হবে। অনেক ভেবেচিন্তে ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিন্তু তোকে এগোতে হবে।
সোজা কথা বল না, যে অন্যায় দেখলেও চুপ থাকব, কোনো সমস্যা দেখলেও এগোব না, প্রয়োজনে ঘুস খাব।
এতটাও বলিনি, কিন্তু বেপরোয়া ভাবটা এবার থেকে একটু কমা।
তোর কী মনে হয়, এম. এল. এ-র ছেলে অন্যায় করেনি?
হ্যাঁ করেছে। কিন্তু যে দেশের যা নিয়ম। নেতা-মন্ত্রীরা, তাদের ছেলে-মেয়ে, চ্যালারা অন্যায় করবে আর পুলিশ তাদেরই প্রোটেকশন দেবে এটাই আমাদের দেশের দস্তুর। কাজেই ফোর্সে থাকতে হলে এই নিয়মই মেনে চলতে হবে।
শোন সুদীপ।
হুঁ।
আমার বিয়ে করা উচিত হয়নি।
কেন?
আমি অপর্ণাকে সুখী করতে পারব না।
ফালতু কথা বলিস না।
আর কথা এগোল না। সুদীপ বাইক থামাল অর্ণবের বাড়ির সামনে। ভাড়াবাড়ি। এখানে আসা ইস্তক এই বাড়িতেই ভাড়া থাকে অর্ণব। বিয়ের পরেও বাড়ি বদল করেনি। দোতলায় বাড়িওয়ালা থাকেন, একতলায় অর্ণব আর অপর্ণা।
চলে যাওয়ার আগে সুদীপ বলল, যে কথাগুলো তখন বললাম, মাথায় রাখিস।
হুঁ। বলে দরজায় ঠকঠক শব্দ করল অর্ণব।
ভেতর থেকে দরজা খুলল অপর্ণা। ঘরে টিভি চলছে। 'আহট' নামের একটা ভৌতিক সিরিয়াল। অপর্ণার ফেভারিট। অর্ণব দু-একবার অপর্ণার অনুরোধে দেখেছে। মোস্ট বোগাস!
ঘরে ঢুকতেই অপর্ণার প্রথম মন্তব্য, ভাগ্যিস তুমি এসে গেছ, আমি তো একা ভয়ে পুরো সিঁটিয়ে ছিলাম।
অর্ণব মৃদু হাসল। তারপর বাথরুমে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে দেখল, অপর্ণা টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখেছে। রাতে বরাবর রুটি খাওয়ার অভ্যাস অর্ণবের। অভ্যাস এই কারণেই যে বিয়ের আগে পর্যন্ত রাতের খাবারটাও দোকান থেকে কিনেই খেত, বেশির ভাগ দিনই রুটি-তরকা, ডিমকারি ইত্যাদি। অবশ্য রাতেরই বা কেন? অর্ণব দুপুরেও কখনো রান্না করে খায়নি। মায়ের করা বাড়ির ভাত-ডালের স্বাদ কেমন হয়, ভুলে গেছিল বহু বছর। বিয়ের পর থেকে অপর্ণার হাতের রান্নায় আবারও সেই ঝাপসা স্মৃতি ফিরে এসেছে।
খেতে বসে মন খারাপ হয়ে গেল অর্ণবের। ক-টা দিন একটু বাড়া ভাত কপালে জুটছিল, ওপরওয়ালার সেটাও সইল না। অবশ্য ওপরওয়ালার দোষ নেই, এটা অর্ণবের নিয়তি।
অর্ণব রাত দশটার মধ্যে বাড়ি ফিরে এলে রাতের খাবারটা ওরা একসঙ্গেই খায়। আগে অপর্ণা অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করত, অর্ণব অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে রাজি করিয়েছে। অপর্ণা এখন দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে, তার মধ্যে অর্ণব না ফিরলে একাই খেয়ে নেয়।
'আহট' শেষ হয়ে গেছে, অপর্ণা আর অর্ণব দুজনেই একসঙ্গে খেতে বসেছে।
কিছু সমস্যা হয়েছে?
না তো।
উঁহু, আমার মন বলছে, কিছু একটা হয়েছে।
অর্ণব বলল, আমার ট্রান্সফার লেটার এসেছে।
ট্রান্সফার! এ মা! কোথায় যেতে হবে?
বুরুলিয়া।
বুরুলিয়ার কোথায়?
চৌহাটি নামের একটা জায়গা।
চেনো তুমি?
না।
এখানে এত ভালো কাজ করছ তুমি আর তোমাকেই ট্রান্সফার করে দিল!
হ্যাঁ।
যাক গে, ভালো হয়েছে। বেশ নতুন জায়গায় যাওয়া হবে। খুশি হওয়ার চেষ্টা করল অপর্ণা। কবে যাব?
তুমি এখন যাবে না। আমি আগে যাব।
এ মা, কেন?
জায়গাটা কেমন জানা নেই, আগে গিয়ে চার্জ বুঝি, থাকার ব্যবস্থা করি, তারপর দেখা যাবে।
না না, একা থাকতে হবে না তোমাকে। তুমি যেখানে থাকবে, আমিও ঠিক পেরে যাব। নইলে আবার আগের মতো অনিয়ম শুরু করবে, ও আমি আর হতে দেব না।
অর্ণব রুটি ছিঁড়ে তরকারির ঝোলে ডুবিয়ে মুখে পুরে বলল, ওটা সম্ভব নয়, আমাকে ইমিডিয়েট জয়েনিং বলেছে। মানে পরশুর মধ্যে যেতেই হবে। চিন্তা কোরো না, আমি যমের অরুচি। আমার কিছু হবে না।
কথাটা শুনে অপর্ণা চুপ করে গেল। খাওয়া থামিয়ে দিল। কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে বসে রইল।
অর্ণবের খেয়াল পড়তে ও বুঝতে পারল, কথাটা ঠিক বলেনি। অপর্ণাকে বলল, সরি। জানোই তো একটা দুর্মুখ, অসভ্য লোককে বিয়ে করেছ।
আমি কি এই কথা বলেছি কখনো তোমায়?
না, কিন্তু আমি নিজেকে তো জানি।
কিছুই জানো না তুমি, এস. আই. অর্ণব বারুই অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। আর কেউ না জানুক, সেটা আমি জানি। নাও, এবার শান্তি করে খাও তো।
রাতে শোয়ার পর অপর্ণা অর্ণবের খুব কাছে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করল, আমাকে ছেড়ে একা থাকতে পারবে?
অর্ণব চুপ।
কী গো, পারবে?
অসুবিধা হবে।
কীসের অসুবিধা?
তুমি আমার অভ্যাস নষ্ট করে দিয়েছ। এত আরাম, এত সুখ, এত ভালোবাসা... এসব আমার প্রাপ্য নয়।
আর তাই বুঝি আমাকে একা ফেলে চলে যেতে চাইছ? আমাকে ছেড়ে থাকতে তোমার খুব মন খারাপ করবে, দেখো।
জানি, বলে অপর্ণার দিকে পাশ ফিরে ওকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরল অর্ণব। অপর্ণাও যেন এই মুহূর্তটারই অপেক্ষায় ছিল। অর্ণবের ঘনিষ্ঠ হয়ে এল ও।
সুখের প্রতিটি বিন্দুকে নিজের প্রতিটি কোষ দিয়ে অনুভব করতে করতে দুটো শরীর যখন সুখের চূড়ান্ত মুহূর্তের কাছে পৌঁছে, ঠিক তখনই অর্ণবের চোখের সামনে আবার...আবারও জলছবির মতো ভেসে উঠল একটা ভয়ংকর দৃশ্য। মুখে কাপড় ঢাকা-দেওয়া কয়েকটা লোক একটা ঘরের ভেতরে একজন লোককে নৃশংসভাবে কুপিয়ে মারছে। লোকটার শরীরের রক্তে ভিজে যাচ্ছে মেঝে। আর সেই ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে এক বালক ও তার মা সেই ভয়ংকর দৃশ্য দেখছে। দৃশ্যটা অর্ণবের চোখে ঝাঁপিয়ে পড়তেই কেঁপে উঠল অর্ণব। এক ঝটকায় অপর্ণাকে সরিয়ে দিয়ে হাঁপাতে থাকল।
অপর্ণা কয়েক মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গেল, তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে অর্ণবের ঘামে ভিজে ওঠা গায়ে আলতো হাত রেখে জিজ্ঞাসা করল, কী হল? আবার?
অর্ণব মুখে কিছু বলল না, শুধু সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে হ্যাঁ জানাল। তারপর দু-হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল।
অপর্ণা উঠে বসে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, শান্ত হও, সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি সরি...
আহ এমন বোলো না। সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখো। আগের থেকে এখন তো অনেকটাই কমেছে, তুমিও বলো। আস্তে আস্তে সবটা কমে যাবে, দেখো। শুয়ে পড়ো।
হুঁ শুচ্ছি। বলে উঠল অর্ণব। টয়লেটে গেল। আয়নায় নিজের মুখটাকে দেখল। একটা ব্যর্থ মানুষ, যে নিজের স্ত্রী-কে শরীরী সুখটুকুও সবসময় দিয়ে উঠতে পারে না। বেসিনে থুতু ফেলে চোখে-মুখে জল দিল। মনে মনে ধিক্কার দিতে থাকল নিজের এই জীবনটাকে। আর ঘরের ভেতর বিছানায় শুয়ে অপর্ণা প্রাণপণে নিজের কান্না চাপার চেষ্টা করছিল। জীবন তাদের কোনদিকে নিয়ে যাবে জানা নেই।
ঘরে ফিরে এসে অর্ণব জল খেল। তারপর শুয়ে অপর্ণাকে বলল, আমি আসলেই একজন ব্যর্থ মানুষ, একজন অপদার্থ। তোমাকে কোনোদিন কোনো সুখ আমি দিতে পারব না। আমি বেসিক্যালি একজন অভিশপ্ত মানুষ। তোমার খুব ভুল হয়ে গেছে আমাকে বিয়ে করে।
চুপ... একদম চুপ। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি জানি, সব ঠিক হয়ে যাবে। এই তো সবে জীবন শুরু করলাম আমরা... এখনই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে নাকি? শোও তো। বলে অপর্ণা জোর করে শুইয়ে দিল অর্ণবকে। ওকে জড়িয়ে ধরে থাকল যতক্ষণ না অর্ণব ঘুমিয়ে পড়ে।
রাত যখন অনেক গভীর, শুধু নিশাচর প্রাণীরা টহল দিচ্ছে আকাশপথে, তখন দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশীথ চতুর্বেদীর বাসভবনে বসেছে গোপন বৈঠক। উপস্থিত রয়েছেন কেন্দ্রের তিনজন মন্ত্রী আর দুজন সিনিয়র আমলা। আজ যে তাঁরা মিটিং করছেন তা যেন কাকপক্ষীতেও টের না পায় সেইজন্যই সময় হিসেবে এই মধ্যরাতকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তাঁরা প্রথমে নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা সারলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন, এবারে জাল গোটানোর সময় হয়ে গেছে। এতদিনের প্ল্যানিং এবারে কার্যকর করতে হবে। আর হাতে বেশি সময় নেই। চতুর্বেদী নিজে সকলের সম্মতিতে স্পিকার অন করে ফোন করলেন একটি বিশেষ নাম্বারে। ফোন বেজে উঠল পশ্চিমবঙ্গের এক অখ্যাত গ্রামের প্রান্তরে।
ওদিক থেকে সাড়া এল, হ্যালো।
এদিক থেকে প্রশ্ন গেল, ধান পেকেছে?
ধান পেকেছে। চাষিরা তৈরি। নির্দেশ পেলেই ফসল কাটা হবে।
তাহলে ট্র্যাক্টর এবং চাষিদের খবর দাও। বছর শেষে ফসল তুলে ফেলতে হবে।
বেশ। সাড়ের দাম এবারে মিটিয়ে দিতে হবে।
ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
ঠিক আছে। শুভরাত্রি।
শুভরাত্রি।
ফোন কেটে দেওয়ার পর স্বরাষ্টমন্ত্রী তাকালেন বাকিদের দিকে। সকলেই যথেষ্ট উত্তেজিত। যে চক্রান্ত করা হয়েছে তা শুধু ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে কেন, পৃথিবীর ইতিহাসেও আগে কখনো ঘটেনি। তাই এই চক্রান্ত যতটা কঠিন ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ, সামান্য একটু ভুল, অসতর্কতাও কেন্দ্রের সরকারসহ দেশের অর্থনীতিকে এক মুহূর্তে ধসিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তারপরেও এই প্ল্যানিং কারণ এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই, এ ছাড়া আপাতত অন্য কোনো সুযোগও নেই। এই প্ল্যানিং-এ শুধু কেন্দ্রের কয়েকজন মন্ত্রী ও আমলাই জড়িত নন, মাস্টারমাইন্ড এবং অপারেশনের দায়িত্বে আরও কয়েকজন রয়েছেন, তাঁরা দেশের নানা প্রান্তে এবং বিদেশেও ছড়িয়ে রয়েছেন। পুরো প্ল্যানিং-এ যে পাশে রয়েছে তার সঙ্গেই ফোনে একটু আগে কথা হল।
চতুর্বেদী তাকালেন সিভিল এভিয়েশন মন্ত্রীর দিকে। বললেন, দুবেজি আপনি এবার দায়িত্ব বুঝে নিন। যেমন প্ল্যানিং আছে সেইমতো এবার তৈরি হন।
হুঁ। হয়ে যাবে।
কিন্তু স্যার, আমাদের সিকিউরিটি এজেন্সিগুলোকে সামলানোর কী হবে? সিক্রেট এজেন্সি কিন্তু অলরেডি কিছু একটা আঁচ পেয়ে গেছে। ওরা আমাদের খবর পাঠিয়েছে, দেশে খুব বড়ো কিছু একটা ঘটতে পারে, তাই আগাম সাবধানতা নিতে বলেছে। বললেন হোম সেক্রেটারি রামচন্দ্র জৈন।
হুম, কোথায় হতে পারে সেই বিষয়ে কিছু জানিয়েছে কি? জিজ্ঞাসা করলেন এভিয়েশন মন্ত্রী।
না, তবে ওরা আন্দাজ করছে পূর্ব ভারতের দিকে কোথাও একটা।
পূর্ব ভারতে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বিহার, ওড়িশা, আসাম, মণিপুর অনেক রাজ্য রয়েছে।
তবু স্যার আমাদের সাবধান থাকা দরকার। র-এর কাছে খবর রয়েছে।
আর আমাদের বাকি এজেন্সিগুলো?
সি.বি.আই., আই.বি.-র কাছে কোনো খবর নেই।
হুম, কিন্তু র খবরটা কোথা থেকে পেল সেটাও ভাববার। খোঁজ লাগাতে হবে। দেশের সিকিউরিটি এজেন্সিদের আমি সামলে নেব। আর হ্যাঁ, পেমেন্ট এবারে করে দিতে হবে।
ফান্ড তৈরি আছে। সে নিয়ে চিন্তা নেই। বললেন হোম সেক্রেটারি।
এভিয়েশন মিনিস্টার হোম সেক্রেটারিকে জিজ্ঞাসা করলেন, জৈনজি, পরে এই ফান্ড নিয়ে কোনো কোয়্যারি হবে না তো? লেনদেন কিন্তু পুরোপুরি সিকিয়োরড রাখতে হবে।
কোনো চিন্তা নেই স্যার। এই ফান্ডের কোনো অফিসিয়াল রেকর্ড নেই, কোনো ডকুমেন্টেড সোর্স নেই। আর আমরা তো সরাসরি ধান কিনছি না। তাই আমাদের ফান্ডের কোনো কোনো ট্রেস থাকবে না। আপনি এই ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
বেশ, তাহলে এই কথাই রইল। আজকের মতো এই কথা থাকল। আপনি রাইজিকে ব্রিফ করে দেবেন।
ঠিক আছে। আজ উঠছি।
গোপন বৈঠক সেরে হোম মিনিস্টারের বাড়ি থেকে একে একে বেরিয়ে গেলেন তিনজন। ভারতবর্ষের এক ভয়ংকর রাজনৈতিক চক্রান্তের ব্লু-প্রিন্ট যা মাসকয়েক আগেই তৈরি হয়ে গেছিল, এবারে তা বাস্তবায়িত করার সিদ্ধান্ত হয়ে গেল এই গভীর রাতে।
সাল ১৯৯৫। ডিসেম্বর মাসের শেষ শনিবার। সময় ভোর চারটে।
ঠিক চারবার ঘণ্টা বেজে উঠল আশ্রমের। শয্যা থেকে উঠলেন প্রভু জগবন্ধু। তাঁর ঘরে আসবাব বলতে একটি তক্তপোশ, একটি জলভরা মাটির কুঁজো, গেলাস। ঘরের এককোণে একটি মাটির প্রদীপ জ্বলছে। ঘরে এই প্রদীপটি সদাই দেদীপ্যমান। আজ থেকে বারো বছর আগে যখন এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি সেদিনই মহাযজ্ঞের আগুন থেকে এই প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন, তারপর থেকে কখনোই এই প্রদীপের শিখাকে নিভতে দেওয়া হয়নি। একটি কাচের বাক্সে প্রদীপটি থাকে। তাকে নিরন্তর জ্বলতে দেওয়ার জন্য সময়মতো তেল, নতুন সলতে বসানো ইত্যাদি কাজ জগবন্ধু নিজে হাতে করেন।
ঘরের জানলা খুললেন তিনি। এখনও ভোরের আলো ফোটেনি। ঠান্ডা হাওয়া তাঁর চোখে-মুখে স্পর্শ করল। তিনি প্রাণভরে শ্বাস নিলেন। দোতলায় তাঁর ঘর থেকে দেখলেন, আশ্রমের সেবকদের ঘরের আলো জ্বলে উঠছে। অর্থাৎ সকলে শয্যা ত্যাগ করেছেন। ঘড়ি ধরে ঠিক ভোর পাঁচটার সময় আশ্রমের উপাসনাগৃহে সকল আশ্রমিককে বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকতে হবে। তার আগে প্রাতঃকৃত্য, স্নানাদি সেরে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করতে হবে। এই নিয়মও বরাবর চলে আসছে। প্রভু জগবন্ধু নিজেও কখনো এই নিয়ম লঙ্ঘন করেন না।
এই কদিন আগে ষাটবছর পূর্ণ করেছেন জগবন্ধু। কিন্তু তাঁর চেহারার ঋজুতা, জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর, দৃপ্ত পদক্ষেপ দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি ষাটোত্তীর্ণ। এখনও যেকোনো সুস্থ যুবকের মতোই কর্মঠ, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল। অবশ্য এই ঔজ্জ্বল্য কোনো অলৌকিক কারণে নয়, তাঁর জীবনযাপনের প্রণালীই তাঁকে এমন অটুট স্বাস্থ্যের অধিকারী করেছে। ঘর-লাগোয়া প্রসাধনকক্ষে প্রবেশ করে স্নানাদি সেরে পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান করে একমাথা কাঁচা-পাকা চুল ভালো করে মুছে তারপর মাথায় পাগড়ি বাঁধলেন। স্বামী বিবেকানন্দর মতো পোশাক ও পাগড়ি, শুধু রংটি গেরুয়ার বদলে কাঁচা হলুদ। মাটির কুঁজো থেকে এক গ্লাস জল নিয়ে পান করলেন। তারপর নেমে এলেন উপাসনাগৃহে।
ইতোমধ্যে সকল আশ্রমিক উপাসনাগৃহে উপস্থিত। প্রায় চারশো আবাসিক। তার মধ্যে শিশু এবং কয়েকজন সন্ন্যাসিনী রয়েছেন আর বাকি সকলেই বিভিন্ন বয়সের সন্ন্যাসী।
প্রভু জগবন্ধু প্রার্থনাগৃহে প্রবেশমাত্র সকলে উঠে দাঁড়ালেন। প্রত্যেকের পরনে একই রকম হলুদ আলখাল্লা এবং মাথায় পাগড়ি।
জগবন্ধু দুই হাত তুলে বললেন, ওম তৎ সৎ।
তাঁর বলার পর সকলে একই রকম দুই হাত তুলে উচ্চারণ করলেন, ওম তৎ সৎ।
জগবন্ধু তাঁর নিজস্ব সিংহাসনসদৃশ চেয়ারে বসলেন। তখন দুলাল সেবক সামনে এসে জগবন্ধুর লেখা প্রার্থনাসংগীত গাইতে শুরু করলেন—
জয় জয় জগৎপিতা জয় জগবন্ধু
জয় জয় পরমব্রহ্ম জয় করুণাসিন্ধু
তুমি পিতা তুমি মাতা তুমি দীননাথ
তোমার চরণে করি শত প্রণিপাত।
সমবেত কণ্ঠে প্রার্থনাসংগীতের পর আবার সকলে দুই হাত তুলে—
জয় পরমব্রহ্মের জয়
জয় প্রভু জগবন্ধুর জয়,
ওম তৎ সৎ
বললেন।
তারপর প্রভু জগবন্ধু প্রতিদিনের মতো তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন।
আশ্রমের সকল সেবক ও সেবিকা, আপনাদের সকলের মঙ্গল হোক। জগতের সকল কিছুর মঙ্গল হোক। আজ এখানে অনেক নতুন সেবক রয়েছেন তাঁদের সকলকে আবারও জগবন্ধু সেবাশ্রমে স্বাগত। আপনারা জনসেবক হয়ে নতুন জীবনে পা দিয়েছেন। মানুষের তথা জগতের সবকিছুর সেবা করাই আপনাদের একমাত্র লক্ষ্য। পরমপিতা আপনাদের অন্তরকে আলোকিত করুন। প্রিয় সেবকগণ, আপনারা ইতোমধ্যেই এই আশ্রমের উদ্দেশ্য, কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছুটা অবগত হয়েছেন তবু আজ প্রথম দিনে আমি আপনাদের কিছু বলি, আমরা বিশ্বাস করি মানুষের আসল পরিচয় তার কর্ম। তার আদর্শ। সে কোন ঘরে, কোন সম্প্রদায়ে জন্ম নিয়েছে সেটা তার আসল পরিচয় নয়, সে মানুষ হিসেবে জীবনে কী ব্রত নিয়েছে সেটাই মুখ্য। আমাদের আশ্রম বিশ্বাস করে, মানুষের আসল কাজ হল সেবা। সকলের সেবা। দেশের, দশের, সেইজন্য আশ্রমের সকল সন্ন্যাসীর একটিই পরিচয়— সেবক। কিন্তু তা-ই বলে আমরা মনে করি না আপনার জন্মসূত্রে পাওয়া পদবি মুছে ফেলা উচিত। কিন্তু আপনার পিতা-মাতাই আপনাকে এই পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন, আপনাকে বড়ো করেছেন, তাঁদের দেওয়া নাম মুছে ফেলা অন্যায়। তাই জগবন্ধু আশ্রমে সকল সেবকের নাম একই থাকে, শুধু তার পদবি, যার দ্বারা তার শ্রেণি, বর্ণ চিহ্নিত হয়, তাকে মুছে দেওয়া হয়। কারণ পৃথিবীতে সকল মানুষের একটাই শ্রেনি হওয়া উচিত। আপনাদের আজ থেকে জগবন্ধু'জ অলটারনেটিভ থিয়োরি বা সংক্ষেপে যাকে জে. এ. টি. জ্যাট বলা হয় তার শিক্ষায় শিক্ষিত করার কাজ শুরু হবে। মনে রাখবেন, জ্যাট-এর দর্শনের মূলকথা হল তিনটি—
এক, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ ভোগ বা সঞ্চয় করা যাবে না। আর একজন ব্যক্তির কতটুকু সম্পদ প্রয়োজন তা সমাজ নির্ধারণ করবে।
দুই, জগতের সকল বস্তু হতে তার সর্বোচ্চ উপযোগিতা গ্রহণ করতে হবে।
তিন, মানুষের শারীরিক ও আত্মিক ক্ষমতার পূর্ণ বিকাশ ও সদব্যবহার করতে হবে।
আজ থেকে এই তিনটিই আপনাদের জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে উঠুক। পরমপিতা আপনাদের সহায় হোন। এইটুকু বলে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর আবারও দুই হাত তুলে বললেন, ওম তৎ সৎ। সকলে সমবেতভাবে বললেন, ওম তৎ সৎ।
উপাসনাগৃহ থেকে বেরিয়ে এলেন জগবন্ধু। সঙ্গে এলেন তার বিশ বছরের পুরোনো বিশ্বস্ত দুই অনুচর অসীম সেবক ও দুলাল সেবক। তিনজনে প্রবেশ করলেন আলাপকক্ষে। এই আশ্রমে বেশ কয়েকটি আলাপকক্ষ রয়েছে। জগবন্ধু একান্ত ব্যক্তিগত এবং গোপনীয় আলোচনাগুলি করেন এই ছোটো আলাপকক্ষে।
তিনজনে কক্ষে প্রবেশ করে নিজের আসনে বসার পর এক সেবক এসে কাঁসার গ্লাস ভরতি গরম দুধ দিয়ে গেল তিনজনের জন্য। এই দুধ আশ্রমেরই গোশালার। প্রায় তিরিশটি গোরু রয়েছে গোশালায়। ঘোড়া রয়েছে দুটি। বিশেষ উৎসবের দিনে ঘোড়া দু'টিকে দিয়ে রথ টানানো হয়।
দুধের গ্লাসে চুমুক দিয়ে তিনজনে আলোচনা শুরু করলেন। নিউ দিল্লি, ইংল্যান্ড এবং তাইওয়ানে জগবন্ধু সেবাশ্রমের নতুন শাখা হয়েছে। সেইসব শাখায় সেবকদের সংখ্যা দিনে দিনে কেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, প্রচার কেমন চলছে, জগবন্ধুর লিখিত বই এবং বাণীর ক্যাসেটগুলি সব জায়গায় ঠিকমতো পৌঁছোচ্ছে কি না, সেগুলোর প্রোডাকশন, স্টক, ডিস্ট্রিবিউশন ইত্যাদি সম্পর্কে জানলেন। জগবন্ধুর কর্মকাণ্ডের প্রধান দুই কান্ডারি হল এই দুলাল এবং অসীম। এদের কাছে জগবন্ধু এক খোলা খাতা।
দুলাল বলল, প্রভু, দিল্লি থেকে গত রাতে আবারও ফোন এসেছিল।
কে?
রামচন্দ্র জৈন।
কী বলছে?
জিজ্ঞাসা করছে আমরা কতটা প্রস্তুত?
কী বললে?
বলেছি, আমরা তৈরি আছি। সামনের মাস থেকেই প্রচারে নামব। ফান্ডের কথা বলেছি। বললেন চিন্তা না করতে। এর মধ্যেই ফান্ড পৌঁছে যাবে।
হুঁ, আর জমির ব্যাপারে কোনো কথা?
সেটাও জিজ্ঞাসা করেছি। বললেন, বিষয়টা যেহেতু স্টেট ল্যান্ড অ্যান্ড রেভেনিউ-এর আন্ডারে তাই সরাসরি ওরা কিছু করতে পারবে না। তবে ওদের সাপোর্ট থাকবে।
হুম। মৃদু হাসলেন জগবন্ধু। এখন সবেতেই সাপোর্ট।
উপায় নেই তো। বলে হাসল দুলাল। বাধ্য হয়েছে বন্ধুত্ব করতে।
দুলালের দিকে তাকিয়ে জগবন্ধু বললেন, হ্যাঁ, বাধ্য হয়েছে। তবে শত্রু যখন স্বার্থের জন্য বন্ধুত্ব করে, তখন স্বার্থ ফুরিয়ে যাওয়ার পর আরও বড়ো শত্রু হয়ে ওঠে। সেই সুযোগ আর দেওয়া যাবে না।
তাহলে উপায়? জিজ্ঞাসা করল অসীম।
উপায় একটাই, ওরা কিস্তিমাত করার আগে আমাদের কিস্তিমাত করতে হবে। চালটা আগে আমাদের ফেলতে হবে।
এই সকল কথার পিছনে মস্ত একটি ইতিহাস রয়েছে। বীরভূম জেলার এক ভাগচাষির পরিবারে জন্ম হয়েছিল জগবন্ধুর। গরিব পিতা তায় মোট চারটি সন্তান। তৃতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তাই খুব অল্প বয়স থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারে রোজগার করে আনারও দায়িত্ব নিতে হয়েছিল জগবন্ধুকে। বাড়ির কাছেই ছিল একটি হরিসভা। সেই হরিসভার দালান, নাটমন্দির, দালান, উঠোন, ঝাড়পোঁছ, উৎসবে ফাইরফরমাশ খাটার কাজ করতেন জগবন্ধু। গ্রামের লোকে তাঁকে ডাকত জগা। অল্প বয়স থেকেই ক্ষুরধার বুদ্ধি, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, চমৎকার বাচনভঙ্গিতে মুগ্ধ ছিল ছোটো-বড়ো সকলে। প্রতি ক্লাসে প্রথম। মাস্টারমশাইরা বলতেন, এই ছেলে ভবিষ্যতে অনেক বড়ো হবে। দেশের, দশের মুখ উজ্জ্বল করবে। বালক জগবন্ধু যখন হরিসভার ফাইফরমাশ খাটতেন তখন কাজের ফাঁকে কান খাড়া করে শুনত হরিসভায় গীতাপাঠের আসর। পুরোহিতমশাই বিকেলবেলায় কখনো গীতা পড়ে তার ব্যখ্যা শোনাতেন গ্রামের বয়স্ক মানুষদের, কখনো পাঠ করতেন মহাভারত-রামায়ণ। ওইসব শুনতে শুনতেই ভারতীয় ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়ে গেছিল জগবন্ধুর। স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে, পুরোহিতমশাইয়ের কাছ থেকে ধর্মীয় গ্রন্থ ও তার ব্যাখ্যা পাঠ করে তার মর্মাথ বোঝার চেষ্টা তখন থেকে শুরু। মাধ্যমিক পাশ করলেন, অত্যন্ত ভালো রেজাল্ট। কিন্তু উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলেন না। বাবা মারা গেলেন তখন। ঘরে অভাব যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল, কিছুদিন সংসারের জোয়াল কাঁধে নিয়ে চলার পর আর কিছু ভালো লাগল না, মনের ভেতর তখন অনেক বড়ো স্বপ্ন বাসা বেঁধেছে। ঘর ছেড়ে রওনা হলেন বেনারসের দিকে। সেখানে কাটল বেশ কিছুকাল। তারপর ভারতের প্রায় সকল তীর্থস্থান ঘুরে বেড়ালেন, সাধুসঙ্গ করলেন অনেক। দেখলেন ভারতবর্ষকে, চিনলেন ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিকতার চরিত্রকে। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী ঘুরে তারপর আবারও ফিরলেন বঙ্গে। ততদিনে সাধনমার্গের নানা দিক চর্চা করে তন্ত্রসাধনার দিকে ঝুঁকেছেন তিনি। তারাপীঠ মহাশ্মশানে সাধনা করছেন। এক কনকনে ঠান্ডার রাতে তাঁকে চেপে ধরল দুই দুষ্কৃতী। যা রয়েছে এখনই দিয়ে দাও, নইলে মৃত্যু অনিবার্য। অকুতোভয় জগবন্ধু শান্তভাবে নিজের পরিধেয় বস্ত্রটুকুও খুলে দিয়ে দিলেন তাঁকে। সম্পূর্ণ উলঙ্গ।
দুষ্কৃতি দুজন হতচকিত। এমন প্রবল শীতেও এই লোকটা নিজের পরিধেয় বস্ত্রটিও খুলে দিয়ে দিব্যি টানটান দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঝোলাতেও কোনও টাকাপয়সা, মূল্যবান সামগ্রী নেই, সাধারণত অনেক ভণ্ড সাধুসন্ন্যাসীর আগমন ঘটে এখানে। তাদেরই টার্গেট করে এই দুজন। অনেক কিছু লুঠ করা যায়। দুষ্কৃতী দুজনে বলল, তোমার বস্ত্র ফেরত নাও। ঝোলাও নিয়ে নাও। আমাদের কিছু চাই না। জগবন্ধু বললেন, তোমরা চেয়েছিলে আমার কাছে যা যা রয়েছে সবই দিয়ে দিতে। আমার যা ছিল সবই দিয়েছি, আমার শরীরটাও তোমাদের দান করলাম, তোমরা যা খুশি করতে পারো। আমি কোনো বাধা দেব না। কিন্তু দান করা বস্তু আমি ফেরত নিই না।
দুষ্কৃতী দুজনের ভেতরে ততক্ষণে ভাবান্তর ঘটতে শুরু করেছে। তারা বুঝতে পেরেছে এই লোক সাধারণ নয়, কোনো সিদ্ধপুরুষ। পাপের ভয়ে দুজনেই লুটিয়ে পড়ল জগবন্ধুর পায়ে। আমাদের ক্ষমা করে দিন। দয়া করুন।
বেশ। তাহলে তোমরা এই পথ ছেড়ে দাও। কারণ তোমাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব রয়েছে। তাকে জাগ্রত করো।
আপনি আমাদের শিষ্য করে নিন।
আমি!
হ্যাঁ, আমাদের দীক্ষা দিন। আমাদের গুরু হোন আপনি।
বেশ। তা-ই হবে। কাল ভোর চারটের সময়ে দুজনে স্নান করে ভেজা কাপড়ে আমার কাছে এসো মায়ের মন্দিরের সামনে।
তা-ই হল। পরদিন ভোরবেলায় সেই দুজনকে দীক্ষা দিলেন তিনি। সেই প্রথম জগবন্ধুর গুরুদেব হয়ে ওঠা। আর সেদিনের দুই দুষ্কৃতীই আজকের দুই ছায়াসঙ্গী দুলাল আর অসীম। গল্পটি শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও বাস্তবে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। তারপর গড়িয়েছে সময়। সেদিনের কাঁধে ঝোলা আর দুই শাগরেদকে নিয়ে নতুনভাবে পথ চলা শুরু করেছিলেন জগবন্ধু। জ্ঞান, দূরদর্শিতা, মস্ত স্বপ্ন আর অটুট স্বাস্থ্য ছিল সম্বল। সঙ্গে দুই অনুচর। জগবন্ধু নিজের লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছিলেন। ভারতবর্ষ গ্রামনির্ভর। গ্রামেই বেশির ভাগ মানুষ বসবাস করেন। তাঁরা স্বভাবে সরল, সহজে বিশ্বাস করতে পারেন, তাই নিজেকে, নিজের ভাবনাকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে ভিত তৈরি করতে হবে গ্রামে। সেইমতো কাজ শুরু করলেন। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে ঘুরে সেখানকার মানুষদের তাঁদের মতো করে এক নতুন অধ্যাত্মবাদে শিক্ষা দিতে শুরু করলেন। শুধু আধ্যাত্মিকতাই নয়, তার পাশাপাশি বাস্তব, সাংসারিক জীবনে চলার জন্য, জীবনে সাফল্য লাভের জন্য কোন পথ অবলম্বন করতে হবে, কীভাবে জীবনযাপন করলে সার্বিক উন্নতি হবে তার শিক্ষাও দিতে থাকলেন আর পাশাপাশি সচেতন করতে থাকলেন দেশীয় রাজনীতি সম্পর্কে। আর যথারীতি অতিদ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকলেন তিনি। শিষ্যের সংখ্যা বাড়তে থাকল ঝড়ের গতিতে। ভারতীয় অধ্যাত্মবাদকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে এলেন যাতে গরিব-গুরবো অশিক্ষিত, কৃষক, শ্রমিকও অনুভব করতে পারে। বিশুদ্ধ ভাববাদকে বস্তুবাদের সঙ্গে মিলিয়ে এক নতুন ভাবনা তৈরি করলেন। জনপ্রিয়তা ঝড়ের গতিতে বাড়তে থাকল। শয়ে শয়ে থেকে হাজারে হাজারে শিষ্য-ভক্ত। রাজ্য ছাড়িয়ে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে যেতে শুরু করল জগবন্ধুর নাম। তখন তিনি প্রভু জগবন্ধু। কিন্তু জগবন্ধু শুধুমাত্র ধর্মগুরু হতে চাননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল সমাজকে তাঁর ভাবনার অনুসারী করার। আর সেটা শুধুমাত্র ধর্ম দিয়ে হবে না। খালি পেটে ধর্ম হয় না। ক্ষুধার্ত মানুষ ধর্ম নয়, ভাত চায়। পেট ভরা থাকলে তবেই ভক্তিভাব আসবে। আর সকলের পেট ভরাতে গেলে অর্থনীতির বদল চাই। সম্পদের সুষম বণ্টন চাই। দেশের উৎপাদন হবে সকল মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য, মুনাফা অর্জনের জন্য নয়। মুনাফাই মানুষের মধ্যে শ্রেণিবিভাজন করে। মুনাফাই লোভ সৃষ্টি করে। আধ্যাত্মিকতার প্রধান বাধা হল লোভ। তাই লোভের অর্থনীতির বদল দরকার। গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষদের যেমন এই কথা বোঝাতে থাকলেন, শহরের মানুষও তার কথায়, তার ভাবনায় আকৃষ্ট হতে শুরু করল। তখন ভারতবর্ষে দিল্লি এবং পশ্চিমবঙ্গে স্বদেশ পার্টি ক্ষমতায়। রাজ্যে বিরোধী পক্ষ হয়ে ক্ষমতায় আসার মরিয়া লড়াই চালাচ্ছে সোশালিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মেইন) সংক্ষেপে এস.পি.আহ.zএম.। এই সময়ে ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করার পর থেকেই সরকারের রোষে পড়ে গেলেন জগবন্ধু। সরকার নড়েচড়ে বসল। এতদিন যাকে শুধু ধর্মগুরু ভাবা হচ্ছিল, এ তো শুধু ধর্ম নয়, অন্যদিকেও পা বাড়াচ্ছে। আর বিপুল জনমত তৈরি করছে। আর বাড়তে দেওয়া উচিত হবে না। সাতের দশকের গোড়ায় তখন পশ্চিমবঙ্গ রাজনৈতিকভাবে টালমাটাল। ক্ষমতা বজায় রাখা আর ক্ষমতা দখলের লড়াই চলছে। ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে মানুষ। এই সময়ে স্বদেশ পার্টির সরকার মনে করল, জগবন্ধুও নির্ঘাত এই বিরোধী পক্ষেরই কেউ হবে। এর বিপুল জনমতও রয়েছে, সুতরাং একে আর বাড়তে দেওয়া সমীচীন হবে না। ভুয়ো মামলা সাজিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হল জগবন্ধুকে। চার বছরের কারাদণ্ড। অনেক তোলপাড় তিনি করতে পারতেন, কিন্তু তাঁর অনুগামীদের শান্ত থাকতে বলে তিনি কারাবরণ করলেন শান্তভাবে। অন্ধকার কুঠুরিতে নিভৃতে বসে, অকথ্য নির্যাতন সয়ে আরও প্রস্তুত করলেন নিজেকে আর বাইরে তার কর্মকাণ্ডকে জিইয়ে রাখল দুলাল এবং অসীম। জগবন্ধু নির্দেশ দিয়েছিলেন, যতদিন না তিনি মুক্তি পাচ্ছেন ততদিন যেন দুলাল আর অসীম জগবন্ধুর ভাবনাকে, মতবাদকে তার অনুগামীদের মধ্যে জিইয়ে রাখে, নতুন কোনো উদ্যোগ নয়, বরং যেটুকু তৈরি হয়েছে সেটা যেন নষ্ট না হয়ে যায়। বাকিটা তিনি ফিরে এসে আবারও হাল ধরবেন। দুই সুযোগ্য শিষ্য সেটাই করল। একসময় মুক্তি পেলেন জগবন্ধু। আর তাঁর মুক্তির বছরখানেকের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে গেল। অনেক রক্তক্ষয়ের পর ক্যাপিটালিস্ট সরকারকে বিদায় দিয়ে আগমন ঘটল সোশালিস্ট সরকারের। মুখ্যমন্ত্রী হলেন প্রমোদ বসু। সোশালিস্ট পার্টি, ফলে ধর্মের বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই, জগবন্ধু ও তাঁর সংগঠন নিয়ে প্রথমদিকে তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। বরং তারা ভেবেছিল, এই ধর্মীয় সংগঠন যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধী সুতরাং তারা আমাদের কিন্তু তারা আমাদের শত্রু নয়। কিন্তু সেদিন তারা ভাবতেও পারেনি ক্ষমতায় আসার দুই-তিন বছরের মধ্যেই এই জগবন্ধুই তাদের কাছে মস্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। হয়ে উঠবে অন্যতম শত্রু। বছরকয়েকের মধ্যে রাজ্য সরকার এবং জগবন্ধুর সংগঠনের মধ্যে সেই শত্রুতা এমনই তীব্র হয়ে উঠল যে তার ফলস্বরূপ ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের ইতিহাসে রচিত হল এক বীভৎস, ভয়ংকর অধ্যায়। আর তার পরেই শত্রুর শত্রু বন্ধু হয়, রাজনীতির এই নিয়ম মেনে কেন্দ্রীয় সরকার আবারও যোগাযোগ করতে শুরু করল জগবন্ধুর সঙ্গে। তৈরি হতে শুরু করল এক নতুন পরিকল্পনা।
আর কিছু? প্রশ্ন করলেন জগবন্ধু।
এই প্রশ্নের মধ্যে কী ঈঙ্গিত তা বুঝতে অসুবিধা হল না দুলালের। সে উত্তর দিল। হ্যাঁ, আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আমরা কতটা প্রস্তুত। বললাম, আমরা তৈরি আছি।
হুম। বেশ। বলে চোখ বুজলেন জগবন্ধু। এর অর্থ তোমরা দুজনে এবার উঠতে পারো।
প্রভুকে প্রণাম করে দুজনে উঠে গেল। জগবন্ধু চোখ বন্ধ রেখেই লম্বা শ্বাস নিলেন। সামনে অনেক বড়ো কাজ। অনেক বড়ো লড়াই। জিততে হবে। পৃথিবীকে জানানোর সময় হয়ে এসেছে ক্যাপিটালজম বা কমিউনিজম অথবা সোশালিজম কোনোটাই মানবকল্যাণের উপযুক্ত নয়, একমাত্র জ্যাটই পারবে গোটা মানবজাতির মুক্তি ঘটাতে। আর তাকে প্রতিষ্ঠা করতে শক্ত লড়াই সামনে।
সাল ১৯৯৫। অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শনিবার। সময় ভোর পাঁচটা।
গেঞ্জি-পরা লোকটা বলল, আমাকে ছেড়ে দাও।
লোকটার স্ত্রী ককিয়ে উঠলেন, ওকে মারবেন না, দয়া করুন, আমার ছেলেটা ছোটো, ও চাকরি ছেড়ে দেবে। আমরা চলে যাব।
চো-প। একদম চোপ। আমাদের কত কমরেডকে আপনার এই লোকটা গুলি করে মেরেছে, জানেন! গর্জে উঠল মুখে চাদর ঢাকা-দেওয়া দলের একজন।
না ভাই, আমি কাউকে মারিনি। বিশ্বাস করো ভাই। পুলিশের ডিউটি করি কিন্তু কাউকে মারিনি। আমার ছেলের দিব্যি।
চুপ শালা।
নেবু, টাইম নষ্ট করিস না-বলে ওদের দলের একজন গেঞ্জি পরা লোকটাকে পিছন থেকে চেপে ধরল, আর-একজন মুহূর্তের মধ্যে ভোজালি ঢুকিয়ে দিল পেটে। বার বার। কিশোর ছেলেটি চিৎকার করতে গিয়েও পারল না, লোকটির স্ত্রী সেখানেই অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। কিশোরটি প্যান্টে পেচ্ছাপ করে ফেলতে ফেলতে দেখল, ওর বাবার গলায় আড়াআড়ি ছোরা টানছে আরেকজন। বাবার গলার নলি থেকে ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসছে ঘন লাল রক্ত। সাদা গেঞ্জিটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে, মেঝেতে গড়িয়ে নামছে। কিশোরটি দেখল, বাবার চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে। বাবার হাত একটু কাঁপল, তারপর স্থির হয়ে গেল। পিছনে চেপে ধরে-থাকা লোকটা বাবাকে ছেড়ে দিতে, মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে গেল বাবা।
লোকগুলো হাত উঁচু করে স্লোগান দিল, ইনকিলাব জিন্দাবাদ। শ্রেণিশত্রু নিপাত যাক। বলে একজন কতকগুলো লিফলেট বাবার গায়ের ওপর ছড়িয়ে দিল। তারপর ওরা চলে গেল। ছেলেটা মেঝের একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকল। তারপর হঠাৎই দেখল উপুর হয়ে পড়ে থাকা বাবা মুখ ঘুরিয়ে বলছে, বাবাই শোন এদিকে আয়, ভয় কী আয় আমার কাছে...আয়...
আচমকাই স্বপ্নটা ভেঙে গেল। ধড়মড় করে উঠে বসল অর্ণব। ঘামে ভিজে গেছে গোটা শরীর। উফ আবার... আবার... আবারও... বছরের পর বছর ধরে এই একই স্বপ্ন খ্যাপা কুকুরের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে অর্ণবকে! এর থেকে কি কোনোদিন মুক্তি পাবে না ও!
বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। ঘরের ভেতরে এখনও অন্ধকার। ঘুলঘুলি দিয়ে হালকা আলো আসছে। ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে এল। ভোর হচ্ছে সবে। চারদিকে পাতলা কুয়াশার সর। সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু ফাঁকা। হাওয়াতে সোঁদা গন্ধ। এখানে বেশ ঠান্ডা-ঠান্ডা ভাব। গায়ে চাদরটা জড়িয়ে রাখলেই ভালো হত। অপর্ণার কথা মনে পড়ল। অর্ণবের পাথর হয়ে-যাওয়া মনটাকে একটু একটু করে নরম করে তুলছে অপর্ণা। মনের ভেতরটা বিষণ্ণ হয়ে গেছে। বাইরে উঠোনে নেমে এল। পিছন ফিরে পুলিশ ফাঁড়িটাকে দেখল। তিন দিন হয়ে গেল বুরুলিয়ার চৌহাটির এই পুলিশ ফাঁড়িই অর্ণবের বাসস্থান। আজ থেকে তিন দিন আগে হাওড়া থেকে রাত এগারোটার ট্রেনে চেপে পরদিন ভোর পাঁচটা নাগাদ নেমেছিল বুরুলিয়া স্টেশনে। সেখান থেকে ভ্যান রিকশায় চেপে রুখাশুখা মাঠ, টিলা, শালের জঙ্গলের ভেতরে লালরঙা মাটির রাস্তা পেরিয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে পৌঁছেছিল চৌহাটি ফাঁড়িতে। একতলা একটা প্রাচীন, ইট বার করা বাড়ি। দীর্ঘকাল সংস্কারের অভাবে দৈন্যদশা। বাড়িটার ত্রিসীমানায় কোনো ঘরবাড়ি গাছপালা কিচ্ছু নেই। অনেক দূরে দেখা যায় ছোটো ছোটো ন্যাড়া পাহাড়। থানা এখান থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে। তার আন্ডারে এই চৌহাটি ফাঁড়ি। থানায় গিয়ে আগে রিপোর্ট করে তারপর সেখান থেকে এই চৌহাটি ফাঁড়ি পৌঁছে ভেতরে ঢোকার আগে একবার থমকে দাঁড়িয়ে ভগ্নপ্রায় করুণদশার বাড়িটাকে দেখেছিল অর্ণব। আজ থেকে এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় এই খণ্ডেহরই ওর কর্মস্থল, বাসভূমি। এমন নয় যে অর্ণব আগে কখনো রিমোট এলাকায় ট্রান্সফারড হয়নি, বেশ কয়েকবার হয়েছে এবং সেই ট্রান্সফারগুলোর প্রতিটিই ছিল শাস্তিমূলক। কোন দোষের শাস্তি? শুধু সৎ পুলিশ হিসেবেই নয়, আরও একটি কারণে অর্ণবের কর্মজীবনে বারংবার এই শাস্তিমূলক বদলি এসেছে। যতদিন একা ছিল ততদিন বদলি নিয়ে অর্ণবের কিছু যায় আসেনি। জীবন নিয়ে ওর কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কোনো মায়া, কোনো পিছুটান না-থাকার কারণে নিজের খেয়ালখুশিমতো কাটিয়েছে দিন। কেউ তাকিয়ে দেখার ছিল না, খোঁজ নেওয়ার ছিল না, খাবার বেড়ে দেওয়ার মতো, শরীর খারাপ হলে ওষুধপথ্যটুকু এগিয়ে দেওয়ার মতো ছিল না কেউ। সম্পূর্ণ একা একটা জীবন। অর্ণব নিজেই এমন জীবন বেছে নিয়েছিল। মা মারা যাওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল ও। যত বেশি বেপরোয়া হচ্ছিল ততই বেশি বাইরে উগ্র আর ভেতরে ক্লান্ত-হতাশ হয়ে উঠছিল। সংসার করার কথা কখনো ভাবেনি, ভাবতও না, যদি না ওর যঙ্গে পরিচয় হয়ে যেত সুদীপের। পৃথিবীতে কেউ কেউ থাকে, পরম বন্ধু হয়ে ওঠাই যেন তার জীবনের লক্ষ্য। সহকর্মী সুদীপ ঠিক তেমনই একজন মানুষ। নইলে কর্মজীবনে অর্ণব যেখানেই পোস্টেড হয়েছে ঊর্ধ্বতন বা অধস্তন কোনো কর্মীর সঙ্গেই কখনো সখ্য গড়ে ওঠেনি, তার জন্য অর্ণবের স্বভাবই দায়ী। ও কখনো বন্ধুত্ব তৈরি করতে আগ্রহ বোধ করেনি, স্কুল-কলেজ-পুলিশে ট্রেনিং পিরিয়ডে কিংবা চাকরিজীবনে। নিজের মধ্যেই আটকে ফেলেছিল। কোনো শখ-আহ্লাদ বলে কিছু ছিল না। জীবনের একটাই শুধু লক্ষ্য ছিল, সমাজে ক্রিমিনালদের নিকেশ করা। এবং সেটা ভয়ংকর নিষ্ঠুরভাবে। থার্ড ডিগ্রি এবং এনকাউন্টারে সিদ্ধহস্ত অর্ণব বারুই যেখানেই পোস্টেড হয়েছে, সমাজবিরোধীরা তো বটেই, সেই থানা বা ফাঁড়ির পুলিশ সমেত হেড অফিস পর্যন্ত নাজেহাল হয়ে গেছে অর্ণবের কার্যকলাপে। কখনো কোনো গুন্ডা বা তোলাবাজকে লকআপে এমন টর্চার করেছে যে বন্দি মর-মর অবস্থায় পৌঁছেছে। আবার কখনো এনকাউন্টারে গুলি করে মেরেছে কোনো কুখ্যাত সমাজবিরোধীকে। ওপরমহলের নির্দেশও অনেক সময় মান্য করেনি অর্ণব। ফলে বারবার শোকজ, পুটআপ, সাসপেনশন, রিমোট এলাকায় বদলি। এত কিছুও বদলাতে পারেনি অর্ণবকে। কিন্তু বদলে দিল অপর্ণা। এখানে আসার পরদিন থেকে অর্ণব ফিল করছে যে ও অপর্ণাকে মিস করছে। ওর অনুপস্থিতি ওকে পীড়া দিচ্ছে। মা চলে যাওয়ার এত বছর পর এই প্রথমবার অর্ণব কাউকে মিস করছে এই অনুভূতিতে ও নিজেও অবাক হয়ে গেল। আকাশের দিকে তাকাল অর্ণব। আকাশ একটু একটু করে পরিষ্কার হচ্ছে। এখানে আসার পর আজ প্রথমবার ও সেই স্বপ্নটা দেখল। এই একই স্বপ্ন রাতের পর রাত, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর অর্ণবের কাছে ঘুরেফিরে আসে।
ফাঁড়ির ঠিক পিছনে একটা কুয়োতলা রয়েছে। কুয়ো-লাগোয়া বাথরুম-পায়খানা। মোটেও পরিষ্কার ছিল না। অর্ণব এখানে জয়েন করার পরদিনই লোক ডাকিয়ে সব পরিষ্কার করিয়েছে। এই থানায় প্লাস্টারের কোনো বালাই নেই। মেঝের অবস্থাও তথৈবচ। হরপ্পা যুগে সংস্কার হয়েছিল সম্ভবত। তারপরে আর কেউ তাকিয়েও দেখেনি। বিল্ডিংটা মোটামুটি এইরকম—প্রথমে তিন ধাপ সিঁড়ি তারপর চওড়া দালান। ইটের চারটে পিলার রয়েছে। দালানে উঠেই সামনে একটা বড়ো দরজা। ভেতরে ঢুকলেই একটা মাঝারি মাপের ঘর। ঘরে দুটো কাঠের টেবিল। চারটে কাঠের চেয়ার, তার মধ্যে একটার হাতল নেই, আরেকটার একটার পায়া নড়বড় করে। লম্বা বেঞ্চ রয়েছে একটা। কাঠের আলমারিও রয়েছে, তবে আলমারির একটা কাচও আস্ত নেই। আলমারিটায় অনেক খাতা-ফাইল ধুলো মেখে শুয়ে থাকে। এই ঘরটাই অফিসঘর। এই ঘরের ঠিক পিছনেই রয়েছে আরেকটা ঘর। সে ঘরটা আকারে ছোটো। সেই ঘরে দুটো তক্তপোশ। আর একটা স্টোভ, কেটলি, জলের কুঁজো, গ্লাস, এনামেলের বাটি, কয়েকটা সস্তার কাপ-ডিশ, চা-চিনি-দুধের কৌটো ইত্যাদি। ওই দুটো তক্তপোশের একটায় গত দু-দিন ধরে শুচ্ছে অর্ণব। এই ফাঁড়িতে অর্ণব ফার্স্ট অফিসার হয়ে এসেছে। সেকেন্ড অফিসার হল গোপাল সরকার। মাত্র পঁচিশ বছর বয়স। সে বুরুলিয়া স্টেশনের কাছে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। বছরখানেক আগে এই ফাঁড়িতে পোস্টিং হয়েছে। মোটরবাইকে যাতায়াত করে। কৃষ্ণলাল বাগ আর নন্দকুমার সাঁপুই চৌহাটি ফাঁড়ির দুই কনস্টেবল। দুজনেরই লাঠি রয়েছে শুধু। কৃষ্ণলালের বয়স আটান্ন। বাড়ি এই বুরুলিয়াতেই। সাইকেলে যাতায়াত করে। সন্ধের মধ্যেই বাড়ি ফিরে যায়। বেলা করে ডিউটিতে আসে। আর নন্দকুমার এখানেই থাকে। ওর বয়স আটাশ। বিয়ে করেছে বছর দুয়েক হল। নদিয়ায় বাড়ি। পুত্র-পরিবার সেখানেই থাকে। নন্দকুমার শোয় আরেকটি তক্তপোশে। ও এখন ঘুমোচ্ছে। গভীর ঘুম। বিছানায় পড়লে একেবারে সকালে ঘুম ভাঙে। ফাঁড়িতে প্রায় শতাব্দীপ্রাচীন একটা ওয়্যারলেস জিপ রয়েছে। অবশ্য বাবুলালের বক্তব্য চৌহাটিতে জিপ-টিপের কোনো দরকার নেই। সাইকেলেই কাজ চলে যায়। চৌহাটিতে পুলিশের কোনো কাজ নেই। কথাটা হয়তো সত্যি। জিপটা নন্দ এবং কৃষ্ণ দুজনেই যার যখন সুবিধা চালায়। গত দু-দিন ধরে নন্দকুমারের সঙ্গে প্রায় সারাদিন চৌহাটির নানা জায়গায় ঘুরেছে অর্ণব। খুব গরিব একটা গ্রাম। গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িতেই এখনও ইলেকট্রিসিটি কানেকশন আসেনি। রাস্তাঘাটের অবস্থা শোচনীয়। হাসপাতাল, প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র কিচ্ছু নেই, একখানা স্কুল প্রায় ধুঁকছে। স্টুডেন্ট নেই বললেই চলে। অর্ণব আগেও গ্রামে পোস্টেড হয়েছে এবং দেখেছে এই রাজ্যে এত বছর পরেও, রাজনৈতিক পালাবদলের প্রায় কুড়ি বছর পরেও গ্রামের অবস্থার খুব পরিবর্তন হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে আজও রাজ্যের অধিকাংশ গ্রাম বঞ্চিত। দশকের পর দশ ধরে এই বঞ্চনার শিকার হতে হতে একদিন গ্রামগুলো জ্বলে উঠবে, সেদিন আর সামলানো যাবে না। পানীয় জলের পর্যন্ত ভালো ব্যবস্থা নেই এখানে। টিউবওয়েলে যে জল ওঠে তা পানের অযোগ্য, লোকে পুকুরের জলই পান করে। আসলে এই দেশের কেন্দ্রীয় সরকার হোক বা রাজ্য সরকার, তারা উন্নয়ন বলতে শুধু নগরোন্নয়নই বোঝে, গ্রাম আজও অবহেলিত।
মনের ভেতরটা সব মিলিয়ে বিষণ্ণ হয়ে রয়েছে। একে ওই স্বপ্ন, তার ওপর অপর্ণার জন্য মন খারাপ। কৃষ্ণলালকে অর্ণব প্রথম দিনই জিজ্ঞাসা করেছিল, এখানে কাছাকাছি কোনো ঘর ভাড়ায় পাওয়া যাবে কি না। তা-ই শুনে কৃষ্ণলাল একগাল হেসে বলেছে, সদরের দিকে পেলেও পেতে পারেন কিন্তু দু-দিন গ্রাম ঘুরে দেখুন, অর্ধেক লোকের নিজেরই থাকার মতো ঘরের অবস্থা নেই তো ভাড়া কী দেবে? আপনি কিছু চিন্তা করবেন না। এখানেই আপনার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আগের স্যারও এখানেই ছিলেন। আর স্যার, এখানে তো অফিসাররা শাস্তি পেয়ে পোস্টেড হন, তাই এসেই চেষ্টা করতে থাকেন কবে পালাবেন, আপনিও নিশ্চয়ই পানিশমেন্ট পেয়েই এসেছেন তাই বেশি দিন থাকবেন না। ক-টা দিন কষ্ট করে নিন স্যার। তবে খাওয়াদাওয়ার কথা আপনাকে একেবারেই ভাবতে হবে না। ওটা আমি আর নন্দ মিলে সামলে দেব। আমি বাড়ি থেকে আপনার দুপুর আর রাতের খাবারটা টিফিন ক্যারিয়ারে করে নিয়ে আসব। আমার বউয়ের রান্না স্যার একবার খেলে রিটায়ারমেন্টের পরেও ভুলতে পারবেন না। সপ্তাহে খরচ বাবদ কিছু দিয়ে দেবেন তাহলেই হবে। আর চা-মুড়ির ব্যবস্থা নন্দই করে দেবে। আপনাকে ও নিয়েও ভাবতে হবে না।
অর্ণবের এই প্রস্তাবে রাজি হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। কৃষ্ণলালের বউয়ের রান্না মন্দ না। অবশ্য এই গ্রামে কেউ রুটি খায় না, দুই বেলাই ভাত। ভাতের সঙ্গে একটা তরকারি এবং ডিমের ঝোল। কৃষ্ণলাল বলে দিয়েছে, এখানে মাছ-টাছ পাওয়া যায় না। যদি মাংস খেতে চান তাহলে আগের দিন বলবেন সদর বাজার গিয়ে নিয়ে আসব। অর্ণবের খাওয়াদাওয়ার ব্যপারে কোনোকালেই চিন্তাভাবনা নেই, যাহোক কিছু একটা জুটলেই হল, যদিও অপর্ণা এই কিছুদিনে ওর মধ্যে খাবারের ব্যাপারেও একটা রুচি তৈরি করে দিয়েছে। কিন্তু এখানে যা অবস্থা— অপর্ণাকে নিয়ে আসা কোনোভাবেই সম্ভব না, জীবনে এই প্রথমবার অর্ণবের এই দু-দিনের মধ্যেই মনে হচ্ছে— ট্রান্সফারটা না হলেই ভালো হত। কিন্তু কীভাবে এখান থেকে কোনো শহরাঞ্চলে বা যেখানে ফ্যামিলি নিয়ে থাকা যায় তেমন জায়গায় ট্রান্সফার নেওয়া যায়? অর্ণব শুনেছে, ভেতরে সেসব ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু কখনো ভেবে দেখেনি। এখন মনে হচ্ছে, সেই চেষ্টা করতে হবে। নইলে সম্ভব নয়, তবে খুব দ্রুত হবে না। কিছুদিনের দুর্ভোগ রয়েছে।
চা-মুড়ি দিয়ে টিফিন করে, কুয়োতলায় স্নানাদি সেরে বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ কৃষ্ণর সঙ্গে বাইকে চেপে চৌহাটি ঘুরতে বেরোল অর্ণব। থানায় নন্দ এবং গোপাল থাকল। গোপাল এবং কৃষ্ণ দশটার মধ্যে চলে আসে। চৌহাটি খুব বড়ো জায়গা নয়, চাইলে একদিনের মধ্যেই পুরোটা দেখে ফেলা যায়, তবে অর্ণব সেটা চায় না, প্রথমত ওর কোনো তাড়া নেই, এখানে ওকে এখন অনেকদিন থাকতে হবে, তাই জায়গাটা ধীরে ধীরে এক্সপ্লোর করতে চায়, মানুষগুলোকে আলাদাভাবে চিনতে চায়। নন্দ আর কেষ্টদা মানে কৃষ্ণলাল অবশ্য প্রথম দিনই বলে দিয়েছিল এখানে পুলিশের কোনো কাজ নেই স্যার। খাওয়া-বসা-ঘোরা আর তাস খেলা ছাড়া আর কিছুই কাজ নেই। এখানের লোক এতই গরিব আর নিরীহ যে পুলিশ কেস কিছু হওয়ার কোনো চান্সই নেই। কোনো খুনোখুনি, চুরিচামারি তো দূরের কথা, জমিজিরেত বা পারিবারিক ঝামেলাও হয় না। খুব বেশি হলে কেউ কারো হাঁসের ডিম চুরি করেছে কিংবা সাইকেলের হাওয়া ফেলে দিয়েছে অথবা ঘটিবাটি চুরি হয়েছে, ব্যাস! যা-ও বা বছর পাঁচেক আগে একটা আন্দোলন সবে তৈরি হয়েছিল, প্রশাসন সঙ্গে সঙ্গে এমন হুড়কো দিল আন্দোলনের নেতাদের যে সেটা পুরো ভেঙেচুরে গেল। প্রভুর কৃপায় এখানে সব শান্ত!
প্রভু মানে?
সে কী স্যার, আপনি বুরুলিয়ায় এসেছেন আর প্রভু কে তা এখনও জানেন না! প্রভু জগবন্ধুর আশ্রম তো আমাদের বুরুলিয়াতেই। খুব ভক্তিভাব নিয়ে বলেছিল কৃষ্ণলাল।
এই আশ্রম সম্পর্কে সত্যিই কিছু জানা ছিল না, তাই আজ প্রভু জগবন্ধুর আশ্রমেই যাওয়ার প্ল্যান করে রেখেছিল অর্ণব।
খানিকটা যাওয়ার পর কৃষ্ণ বলল, তবে কী জানেন স্যার, আমার জন্ম এই চৌহাটিতে। পুলিশে চাকরি পাবার পর অনেক ঘাটে ঘুরে শেষে এই রিটায়ারমেন্টের সময়ে নিজের জায়গায় ট্রান্সফার পেয়েছি। আর হাতে গোনা কয়েকটা দিন, তারপরে রিটায়ারমেন্ট। নিজের জায়গা বলে বলছি না স্যার, চৌহাটির জন্য সরকার কিচ্ছু করেনি, কিন্তু আমাদের গ্রামের মানুষ একেবারে মাটির মানুষ। কোনো ঝামেলায় নেই, অশান্তিতে নেই, কিছু না পেয়েও শান্তি চায়।
হুঁ হুঁ করতে করতে শুনছিল অর্ণব। পথে গ্রামের দু-একজনের সঙ্গে দেখা হল, তারা অর্ণবকে দেখে সসম্মানে সরে দাঁড়াল, কেউ হাতজোড় করে প্রণাম করল, কেউ আবার শুধুই তাকিয়ে রইল। কৃষ্ণলাল বলল, আসলে গ্রামের প্রায় সকলেই জেনে গেছে, ফাঁড়িতে নতুন বড়বাবু এসেছে।
ফাঁড়িটা গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে। মূল গ্রামে ঢোকার দুটো পথ রয়েছে, একটা ডানদিকে, আরেকটা বাঁদিকে। ডানদিকের রাস্তাটা ফাঁকা জমির মাঝবরাবর মাটির রাস্তা আর বাঁদিকের রাস্তাটি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। শাল-পিয়ালের জঙ্গল। প্রচুর পলাশ গাছও রয়েছে তবে পলাশ ফুটবে সেই বসন্তকালে। আজ জঙ্গলের রাস্তাটা ধরল কৃষ্ণলাল। ভারী সুন্দর রাস্তা। দুইধারে লম্বা লম্বা গাছের সারি আর মাঝখান দিয়ে মাটির রাস্তা। ওই রাস্তা দিয়ে অনেকটা যাওয়ার পর আবারও মাঠ শুরু। আর মাঠের ঠিক মুখেই একটা ছোটো কুঁড়েঘর। ঘরের সামনে এক বৃদ্ধা কুঁজো হয়ে উঠোনে বসে, কী যেন করছে একমনে। বৃদ্ধা একবার আপনমনে তাকাল ওদের দিকে। তারপর আবার মাথা নিচু করে নিজের কাজ করতে থাকল। কৃষ্ণলাল সেই বৃদ্ধার দিকে ইঙ্গিত করে অর্ণকে বলল, ওই দেখুন স্যার, এ হল আমাদের বড়িমা।
বাইকের শব্দে অর্ণব মনে করল, ও ভুল শুনেছে, তাই কনফার্মড হওয়ার জন্য জিজ্ঞাসা করল, কী বললে, বুড়িমা?
না স্যার, বড়িমা। বলে খানিক হেসে বলল, ভাবছেন বুড়িমার বদলে বড়িমা কেন? আসলে ওই বুড়ি বড়ি বানায়। বড়ি জানেন তো স্যার? ডাল দিয়ে বানানো হয়?
হ্যাঁ জানি। বলল অর্ণব।
তো এই বুড়ি বড়ি বানিয়ে বিক্রি করে পেট চালায় তাই গ্রামের ছেলেরা বুড়িমা আর বড়ি এই দুই মিলিয়ে ওর নাম দিয়েছে বড়িমা।
আচ্ছা।
বুড়ির তিনকুলে কেউ নেই স্যার, একাই থাকে। গ্রামের লোকেরা কেনে, আশ্রম থেকে কেনে। বুড়ির পেট চলে যায়।
আচ্ছা।
এ বুড়ি কিন্তু এই গ্রামে বরাবর ছিল না স্যার। বছর আট-দশ আগে কোথা থেকে এসে এখানেই থাকতে শুরু করেছিল। মাথায় একটু গণ্ডগোল আছে, চোখে দেখে কম আর একেবারে বদ্ধকালা। একেবারে আগে এখানে-ওখানে শুয়ে থাকত, জগবন্ধু আশ্রম থেকে বুড়িকে একটা কুঁড়েঘর করে দিয়েছে, তারপর থেকে এখানেই থাকে স্যার। তবে বুড়ির চালচুলো কিছু না থাকলেও মনটা খুব ভালো স্যার। ছোটোদের খুব ভালোবাসে, ওদের বাতাসা দেয়, আর গ্রামে নতুন কেউ এলে তাকে কিছু না কিছু খাওয়াবেই।
বাহ!
হ্যাঁ স্যার, নিশ্চয়ই এককালে কোনো ভালো ঘরের বউ ছিল, মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ায় তাড়িয়ে-টাড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু মানুষের সংস্কার তো ম'লেও যায় না। আশ্রম থেকে ফেরার সময় একবার বড়িমার কাছে নিয়ে যাব আপনাকে।
ঠিক আছে। বড়িমা নিয়ে ভাষণ শুনতে ভালো লাগছিল না অর্ণবের।
বাইকে আরও অনেকটা যাওয়ার পর অবশেষে এসে থামল জগবন্ধু সেবাশ্রমের প্রধান ফটকের সামনে। বেশ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা আশ্রম। বাইরে থেকে আন্দাজ করাই যায় ভেতরে অনেকটা জায়গা। মস্ত উঁচু আর চওড়া গেট হাট করে খোলা। গেটের সামনে টুলে বসে রয়েছে হলুদরঙা সন্ন্যাসীর পোশাক-পরা এক ব্যক্তি। অর্ণব আর কৃষ্ণলালকে দেখে উঠে এল সামনে।
কৃষ্ণলাল লোকটিকে বলল, আমাদের নতুন স্যার এসেছেন, প্রভুর দর্শন করাতে নিয়ে এলাম।
লোকটি অর্ণবকে দেখে হাতজোড় করে নমস্কার করল, তারপর হাত দুটো অল্প ওপরে তুলে বলল, জয় জগবন্ধু। ভেতরে যান। প্রভু তত্ত্বসভায় রয়েছেন।
অর্ণব মুখে কিছু বলল না, শুধু সামান্য মাথা ঝোঁকাল। কৃষ্ণলাল অবশ্য হাত তুলে প্রত্যুত্তরে জয় জগবন্ধু বলল, তারপর অর্ণবকে বলল, আসুন স্যার। ভালো সময়ে এসেছি।
হলুদ রঙের মস্ত বিল্ডিং। সামনে চওড়া লন। লনের দুইপাশে নানারকম ফুলের গাছ। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেল মূল ভবনের দিকে। কৃষ্ণলাল বলল, স্যার একটা কথা, মানে কিছু মনে করবেন না। একটা অনুরোধ আপনাকে।
কী?
প্রভুকে একবার প্রণামটা করবেন। হাতজোড় করে করলেই হবে। আসলে হে হে...
ঠিক আছে।
বারান্দা পেরিয়ে একটা হলঘর। হলঘরের পাশে জুতো খুলে রাখার আলমারি। সেখানে জুতো রেখে কৃষ্ণলালের সঙ্গে ভেতরে ঢুকল অর্ণব। স্কুলবাড়ির মতো চৌকো আশ্রমটা। চারদিকে বিল্ডিং-এ ঘেরা মস্ত উঠোন। উঠোনের একদিকে একটি স্থায়ী মঞ্চ। সেখানে বসে রয়েছেন এক ব্যক্তি। আর সামনে মাটিতে বসে রয়েছেন কয়েকশো মানুষ, তাদের অধিকাংশেরই মাথায় পাগড়ি, গায়ে হলুদ রঙের আলখাল্লা।
কৃষ্ণলাল ফিসফিস করে বলল, ভালো সময়ে এসেছি স্যার, বসে পড়ুন। প্রভু খুব সুন্দর বলেন।
অর্ণব দ্বিরুক্তি না করে এককোণে মাটিতে বসে পড়ল।
জগবন্ধু বলছেন, মানুষের মনে নানান চিরন্তন জিজ্ঞাসা— আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? কোথায় যাব? এ জগৎটা কীভাবে সৃষ্টি হল? কে সৃষ্টি করল? ইত্যাদি, ইত্যাদি। মানুষ তার জ্ঞান উন্মেষের পর থেকেই এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছে, চলছে, চলবে ততদিন, যতদিন না সে তার সব প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর পাবে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ জন্ম দিয়েছে বিভিন্ন দর্শনের, মতবাদের। এদের মধ্যে কেউ এই জগতের স্রষ্টারূপে ব্রহ্মকে স্বীকার করে বাস্তব জগৎটাকে মায়া বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এঁরা ভাববাদী বা মায়াবাদী। আবার কেউ বাস্তব জগৎটাকে একমাত্র সত্য মেনে স্রষ্টাকেই অস্বীকার করে জড়বাদী ভোগসর্বস্ব জীবনধারা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু জ্যাট এই ভাববাদী বা জড়বাদী দর্শনের কোনোটাকেই চরম সত্য বলে স্বীকার করে না। কেননা, ব্রহ্ম হলেন, চরম ও পরম সত্য। কিন্তু আমাদের অস্তিত্বরক্ষার্থে এই জড়জগতের উপযোগিতা অস্বীকার করা যায় না। এই জগৎটাও সত্য, তবে চরম সত্য নয়, আপেক্ষিক সত্য। তাই জড়জগতের মোহে বা বন্ধনে আমরা জড়িয়ে পড়ব না ঠিকই, তবে এর সঙ্গে উচিত ব্যবহার করার কৌশল আমাদের জানতে হবে। তাই জ্যাট বলছে, বস্তুজগতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরমাগতির পথে এগিয়ে চলাই হবে আমাদের আদর্শ। ব্রহ্মসত্যজগদপিসত্যমাপেক্ষিকম অর্থাৎ ব্রহ্ম হলেন একমাত্র চরম সত্য, আমাদের লক্ষ্য, আর শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধে ভরা এই পরিদৃশ্যমান জগৎ হল আপেক্ষিক সত্য, উপলক্ষ।
বলার ভঙ্গিটি এতই সুন্দর যে তারিফ করতেই হয়। মোলায়াম কণ্ঠস্বর, ধীরস্থির, খুব গুরুগম্ভীর না হলেও পুরুষালি ব্যক্তিত্ব রয়েছে কণ্ঠে। কিন্তু জ্যাট মানে যে জগবন্ধু'স অলটারনেটিভ থিয়োরি, সেই ব্যাপারটা জানা নেই অর্ণবের। এই ব্যাপারে কৃষ্ণলালকে জিজ্ঞাসা করে মনে হয় না বিশেষ লাভ হবে। তবে মূলত ধম্মকম্মের তত্ত্বকথাগুলো একই রকমের হয়, এই জগবন্ধু প্রভুর বক্তব্যেও বিশেষ নতুন কিছু রয়েছে বলে মনে হল না ওর।
প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে প্রভুর তত্ত্বকথা চলার পর জগবন্ধু তাঁর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে বললেন, ওম তৎ সৎ। বাকি সকলে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অনুসরণ করে বলে উঠলেন, ওম তৎ সৎ।
সভা ভেঙে গেল। জগবন্ধু মঞ্চ ছেড়ে নামছেন দেখে কৃষ্ণলাল বললেন, স্যার,শিগগির আসুন, এখনই মুখটা দেখিয়ে নিই, প্রভু ভেতরে চলে গেলে আবার কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। আচ্ছা আপনি অপেক্ষা করুন, আমি গিয়ে বলছি, বলে কৃষ্ণলাল ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল প্রভুর দিকে। সন্ন্যাসী ছাড়াও ভিড়ের মধ্যে অনেক সাধারণ পোশাকের মানুষও রয়েছেন হয়তো গ্রামবাসী হবেন। অনেকে আশ্রম ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন, অনেকে ছড়িয়ে পড়লেন আশ্রমের চারদিকে। যে যার কাজ শুরু করলেন। কিন্তু সকলে চুপ। কারো মুখে কথা নেই। এটাই হয়তো আশ্রমের নিয়ম। অর্ণব দেখল, কৃষ্ণলাল জগবন্ধু প্রভুর সঙ্গে কথা বলছে। মিনিটখানেকের মধ্যে ফিরে এসে বলল, প্রভু আপনার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়েছেন, চলুন চলুন, উনি আলাপকক্ষে যেতে বললেন। অর্ণব ওর সঙ্গে আলাপকক্ষের দিকে যেতে যেতে বলল, কেষ্টদার তো দেখছি গুরুদেবের ওপর খুব ভক্তি রয়েছে।
হেঁ হেঁ করে হেসে কৃষ্ণলাল বলল, এই গ্রামের জন্য প্রভু জগবন্ধু এবং সেবকদের অনেক অবদান রয়েছে। বিপদে-আপদে, সমস্যায় সরকার তো আমাদের দেখে না, দেখেন উনি। কাজেই ওঁর প্রতি ভক্তি হওয়াটা স্বাভাবিক স্যার।
কৃষ্ণলালের কথায় কিছুটা বুঝল অর্ণব। বাকিটা আন্দাজ করল। দুজনে ঢুকল আলাপকক্ষে। দরজার গায়েই বাংলায় আলাপকক্ষ লেখা। বেশ বড়ো ঘর। অনেকগুলো চেয়ার সার সার রাখা। আর মধ্যের চেয়ারটি সামান্য বড়ো। আলাপকক্ষ ফাঁকাই ছিল। কৃষ্ণলাল আর অর্ণব গিয়ে দুটি চেয়ারে বসল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই প্রভু জগবন্ধু এলেন, সঙ্গে দুজন সেবক। কৃষ্ণলাল উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে প্রণাম জানাল জগবন্ধুকে। অর্ণব একবার ভাবল, বসেই থাকবে, তারপর কী মনে হতে ও নিজেও উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানাল। জগবন্ধুও দুজনকে প্রতিনমস্কার জানিয়ে বললেন, ওম তৎ সৎ। বসুন বসুন। বলে উনি নিজেও বসলেন। অর্ণব এবারে কাছ থেকে জগবন্ধুর চেহারাটা ভালো করে দেখল। চোখ দুটোর দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না, এমনই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি।
অর্ণবের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে জগবন্ধু বললেন, কৃষ্ণলাল বললেন, আপনি ক-দিন হল এই ফাঁড়িতে এসেছেন। কেমন দেখছেন আমাদের গ্রাম?
অর্ণব বলল, পুরো গ্রামটা এখনও দেখিনি। অল্প অল্প করে দেখছি, চিনছি, ভালো লাগছে।
অল্প অল্প করে দেখছেন? বাহ সুন্দর বললেন। মানুষ তো এখন অল্প অল্প করে কিছু করতে চায় না। তার সবেতেই বড়ো তাড়া। অল্প করে না করলে যে বেশি কিছু বড়ো কিছু করা যায় না তা মানুষ যেন বুঝতেই ভুলে যাচ্ছে। এখানে কিছুদিন থাকুন, দেখবেন, মানুষগুলোকে আপনার ভালো লাগবে। এই গ্রাম বড়ো শান্ত। এখানে পুলিশের কোনো কাজ থাকে না।
হ্যাঁ, আমিও স্যারকে সেটাই বলেছি। চৌহাটিতে পুলিশের কাজই নেই, শুধু শুয়ে-বসে সময় কাটানো।
জগবন্ধু বললেন, আপনি আমাদের আশ্রম দর্শন করতে এলেন, আমার খুবই ভালো লাগছে। এখানে তো যেই অফিসার হয়ে আসেন, আসার পরদিন থেকেই ট্রান্সফার নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। অবশ্য তাঁদেরই বা দোষ দিই কী করে, গ্রাম ঘুরে তো কিছুটা বুঝেছেন, সভ্য মানুষের থাকার মতো কিছু নজরে পড়েছে আপনার?
না, তা পড়েনি।
অথচ সংবিধান বলছে, সকলের সমান অধিকার রয়েছে ন্যায্য বিচার পাবার। সাম্যবাদ তো অনেক বড়ো কথা বলে, যে সকল মানুষ আর্থিক-সামাজিক দিক থেকে একই অবস্থানে থাকবে। সেই কথা তো ছেড়েই দিলাম। একটি গণতান্ত্রিক দেশে কি এমন অবস্থা থাকা উচিত যেখানে শুধু ধনীরা আরও ধনী হবে আর গরিব মানুষেরা না খেয়ে মরবে? আপনার কি মনে হয় না সরকার এই গ্রামের মানুষের প্রতি অবিচার করছে? শুধু এই গ্রাম কেন? আমি জীবনে এই রাজ্যের বহু গ্রাম ঘুরেছি, অধিকাংশ গ্রামেরই এক চিত্র, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মতো প্রাথমিক বিষয়গুলির অবস্থাই শোচনীয়। গ্রামের মানুষ সহজ-সরল, তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়, তাই তাদের শুধুমাত্র ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আগের সরকারো তা-ই করেছিল, তারা সাধারণ মানুষের কথা ভাবত না, গরিব মানুষের দিকে ফিরেও তাকাত না। নতুন সরকারকে নিয়ে এল মানুষ। সে বলল, গরিব মানুষের পাশে থাকবে। তাদের হয়ে কাজ করবে। সকলে সমান অধিকার পাবে, সম্পদ সমানভাবে ভোগ করবে, কিন্তু ওই যে বলে, লঙ্কায় যে যায় সে-ই হয় রাবণ। কোথায় কী? অনেক আশা নিয়ে এই সোশ্যালিস্ট সরকারকে তখতে বসিয়েছিল মানুষ। কিন্তু সরকার কথা রাখেনি। বরং ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যে এই সরকার গরিবের শত্রু হয়ে গেছে। ক্যাপিটালিস্ট সরকার আর এই সোশ্যালিস্ট সরকারের মধ্যে বেসিক্যালি কোনেও পার্থক্য নেই। কারণ দুজনেই ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতে চায়।
ক্ষমতার শর্তই তো তা-ই।
না, ওটা প্রচলিত ধারণা। সেই ভুল ধারণাকে বদলানোর সময় হয়ে এসেছে। এবারে অনেক কিছু বদলাতে হবে।
অর্ণব জগবন্ধু প্রভুর কথা শুনছিল আর খেয়াল করছিল, ঘরে আর যে দুজন মধ্যবয়সি সন্ন্যাসী বসে রয়েছেন তাঁরা একটাও কথা বলছেন না, শুধু পাথরের মতো স্থির হয়ে অর্ণবকে জরিপ করছেন। অর্ণবের অভিজ্ঞতা বলল, এরা দুজনে জগবন্ধুর খাস লোক।
কিন্তু আপনার তো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। আর এটা তো রাজনীতির বিষয়। কীভাবে বদলাবেন?
জগবন্ধু বললেন, আপনি সম্ভবত আমাদের প্রতিষ্ঠান ও তার কার্যক্রম সম্পর্কে খুব বেশি জ্ঞাত নন।
খুব বেশি তো নয়ই, আমি কিছুই জানি না। অকপটে বলল অর্ণব।
জগবন্ধু সামান্য মাথা নাড়লেন, বললেন, আমরা বিশ্বাস করি শুধুমাত্র আধ্যাত্মিকতা দ্বারা সমাজের আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়। আত্মিক পরিবর্তনের জন্য যেমন আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজন তেমনই মানুষের আর্থিক ও সামাজিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন রাজনীতি। আর জগবন্ধু সেবাশ্রম মানুষের সার্বিক উন্নতি চায় আর সেজন্য এবারে আমরা রাজনীতির ময়দানেও সরাসরি পা দিতে চলেছি।
সরাসরি মানে?
সরাসরি মানে সংসদীয় গণতন্ত্রে যেভাবে রাজনীতিতে পদার্পণ করা যায়, সেইভাবেই।
এবারে মুখ খুললেন এতক্ষণ চুপ করে বসে-থাকা দুই সন্ন্যাসীর একজন। তিনি বললেন, আমাদের সংগঠন এতদিন বাংলার এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা সামাজিক সেবামূলক ক্রিয়াকলাপ করত, এবারে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মানে ভোটে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত? জিজ্ঞাসা করল অর্ণব।
হ্যাঁ।
বিধানসভা নির্বাচনে?
হ্যাঁ।
আপনি দাঁড়াবেন? জগবন্ধু প্রভুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল অর্ণব।
হুম।
একজন সেবক এসে সামনে টেবিলে দুই থালা কাটা ফল আর কাঁসার গ্লাসে দুধ রেখে গেল।
জগবন্ধু বললেন, আপনারা গ্রহণ করুন।
আমি এখন কিছু খাব না। বলল অর্ণব।
অর্ণবের দিকে সেই একইরকম স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে জগবন্ধু বললেন, নিজের যত্ন নিন। সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনার জন্য খুব বড়ো কিছু একটা অপেক্ষা করছে। প্রস্তুত হন।
এমন কথায় খুব স্বাভাবিকভাবেই সকলের কৌতূহল হওয়ার কথা। অর্ণবেরও হল, কিন্তু ও জানে, এই গুরু-মহারাজরা অত্যন্ত চতুর হয়। এরা মানুষের সেন্টিমেন্ট, সাইকোলজি খুব ভালো বোঝে। তাই কোনো উত্তর দিল না। শুধু কৃষ্ণলালের দিকে তাকিয়ে বলল, কেষ্টদা, আপনি খেতে পারেন।
কৃষ্ণলাল যেন অর্ণবের অনুমতির অপেক্ষাতেই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে নানা রকমের ফলের টুকরো গপাগপ মুখে পুরতে থাকল।
অর্ণব বলল, আচ্ছা একটা কথা, আমি আপনার স্পিচ শুনছিলাম, আপনি জ্যাট বলে একটা শব্দ উচ্চারণ করছিলেন, বিষয়টা আমাকে একটু বলবেন?
জগবন্ধু বললেন, জ্যাট হল জগবন্ধু'জ অলটারনেটিভ থিয়োরি। বিষয়টা অনেকটাই বড়ো। আমার মুখে এইটুকু সময়ে বলা সম্ভব নয়, আপনার পক্ষেও বোঝা কঠিন হবে। বলে হাত তুলে সামনের একজনকে বললেন, দুলাল, এক কপি জ্যাট ওঁকে দাও।
দুলাল উঠে গেল।
জগবন্ধু বললেন, জ্যাট হল কমিউনিজম ও ক্যাপিটালিজমের এক বিকল্প ব্যবস্থা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যেমন সবকিছুই কতিপয় পুঁজিবাদীর হাতে কুক্ষিগত থাকে তেমনই কমিউনিজম পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে কথা বললেও সে নিজে সকল ক্ষমতা কিছু নেতার মাধ্যমে ভোগ করে, এবং যাবতীয় সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে। জ্যাট সম্পদের কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে। আর্থসামাজিক-আত্মিক সবকিছুরই বিকেন্দ্রীকরণ চাই। সাধারণ মানুষের হাতেই সব ক্ষমতা থাকবে। সে-ই হবে সমাজের যাবতীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রক।
কিন্তু আপনি নিজেও তো ক্ষমতা আদায়ের জন্যই ভোটে দাঁড়াচ্ছেন। যদি নিজে ভোটে জিতে যান তাহলেও তো সেই একই জিনিস হবে। তখন আপনার হাতে থাকবে যাবতীয় ক্ষমতা।
জগবন্ধু হাসলেন। তারপর বললেন, না থাকবে না। জ্যাট ক্ষমতা চায় ক্ষমতাকে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য।
দুলাল ফিরে এল। হাতে একটি বই। জগবন্ধু ইশারায় বইটি অর্ণবকে দিতে বললেন। অর্ণব বইটা হাতে নিল। ইংরেজিতে লেখা বই। বইয়ের নাম 'দি অলটারনেটিভ ওয়র্ল্ড। নীচে লেখা 'অলটারনেটিভ থিয়োরি বাই শ্রীজগবন্ধু।
আপনি সময় করে বইটি পাতা উলটে দেখবেন, আশা করি, বুঝতে পারবেন। যদি আগ্রহ বা সংশয় তৈরি হয়, আশ্রমের দ্বার অবারিত।
হুঁ।
আর-একটা কথা, যে সংশয়কে দীর্ঘকাল ধরে লালন করে চলেছেন, যা আপনাকে দিনের পর দিন বিনিদ্র রেখেছে তা এবার শেষ হতে চলেছে। চৌহাটি আপনার কাছে অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ হবে। মিলিয়ে নেবেন। বলে জগবন্ধু উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে অর্ণবকে বললেন, আমাকে এবারে একটু উঠতে হচ্ছে। আপনার যদি আশ্রম ঘুরে দেখার ইচ্ছা থাকে তাহলে দুলাল আপনাকে দেখিয়ে দেবে।
হ্যাঁ, আমার আগ্রহ রয়েছে। নমস্কার।
জগবন্ধু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। অর্ণব কৃষ্ণলালকে জিজ্ঞাসা করল, কেষ্টদা, আপনার হল?
হ্যাঁ স্যার, হয়ে গেছে। বলে গ্লাসের দুধটুকু ঢকঢক করে খেয়ে আহহ করে শব্দ তুলে কৃষ্ণলাল দুলালকে জিজ্ঞাসা করল, এই দুধ আশ্রমের গোরুর?
হুঁ। সংক্ষেপে উত্তর দিল দুলাল।
এইজন্যই এমন স্বাদ। চলুন স্যার। আমি রেডি।
ঘরে দুলাল ছাড়া আরও একজন যে সন্ন্যাসী ছিল তাকে দুলাল বলল, তুই কাজে যা, আমি দেখে নিচ্ছি। লোকটি চলে গেল। দুজনেরই চেহারা নজর কাড়ার মতো। ঢোলা পোশাক পরা থাকলেও পোশাকের আড়ালে শক্ত-সমর্থ চেহারার যথেষ্ট আভাস পাওয়া যায়। রীতিমতো মুগুর ভাঁজা শরীর। এখানে নিশ্চয়ই শরীরচর্চারও ব্যবস্থা রয়েছে।
দুলালের সঙ্গে অর্ণব আর কৃষ্ণলাল বেরোল। চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকল। অর্ণব যতটা আন্দাজ করেছিল তার থেকে ঢের বড়ো জায়গা নিয়ে আশ্রমটি। প্রধান বিল্ডিংটা ছাড়া পিছনে আরও একটা বিল্ডিং রয়েছে। গোয়াল, ব্যায়ামাগার, বাগান, হেঁশেল সবই ঘুরিয়ে দেখাল দুলাল। অনেক কিছু জানতে পারল অর্ণব এই আশ্রম সম্পর্কে। রাজ্য সরকারের প্রতি এদের যে তীব্র ঘৃণা রয়েছে তা কথায় প্রকাশ পাচ্ছিল। দুলাল বার বার বলছিল, এই অত্যাচারী শাসককে গদিচ্যুত করতেই হবে। মানুষের প্রতি এই অধার্মিক সরকারের শোষণ পীড়ন এবারে সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আর নয়।
শুধু সেইজন্যই কি আপনাদের ভোটে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত?
হ্যাঁ। তা ছাড়া আরও কিছু হিসাব রয়েছে, সেগুলো মেটাতে হবে।
হিসাব মানে? কীসের হিসাব?
দুলাল অর্ণবের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, আছে। তারপর আর কথা বাড়াল না।
আশ্রমটিতে বেশ কয়েকটি বিভাগ রয়েছে। প্রভু জগবন্ধু ও সিনিয়র সেবকরা একটি দিকে, নবীন সেবকরা আরেকদিকে, আর আরেকটি দিক হল শিশু-কিশোরদের। সেটি মূল ভবনের ভেতরে হলেও পাঁচিল ও গেট দিয়ে আলাদা করা। দুলাল জানাল, এই বিভাগে দরিদ্র অনাথ শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। চারজন সন্ন্যাসিনী মানে সেবিকা রয়েছে বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্য। বাচ্চাদের পড়াশোনার ব্যবস্থাও রয়েছে। আগে এই আশ্রমে অনেক সেবিকাও থাকতেন তবে সুজন সেতুর পর থেকে প্রভু জগবন্ধু আর এই আশ্রমে সেবিকাদের রাখতে ভরসা পান না। তাঁরা এখন দেশের অন্য দুটি আশ্রমে থাকেন।
'সুজন সেতু' শব্দটা খেয়াল করল না অর্ণব। দুলালকে বলল, এই এত বড়ো সংস্থান চালানোর জন্য মস্ত খরচ তো রয়েছে।
হ্যাঁ রয়েছে। তবে প্রভুর কৃপা আর পরমেশ্বরের আশীর্বাদে অর্থের অভাব আমাদের নেই। দেশ-বিদেশ থেকে অনেক অনুরাগী, ভক্তের অনুদান থেকে আমাদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের অভাব মিটে যায়। আমরা সন্ন্যাসী, আমাদের বিলাসব্যসন বলে কিছু নেই। আপনি অনেক ধর্মগুরুকে দেখবেন, মুখে ত্যাগের কথা বলে নিজে ভোগে ডুবে থাকেন কিন্তু আমাদের প্রভু জগবন্ধু বাস্তব অর্থেই ত্যাগী মানুষ। অতি সাধারণভাবে তিনি জীবনযাপন করেন, এবং যা বিশ্বাস করেন, নিজেও সেটাই করেন। আর সেই কারণেই পরমেশ্বরের কৃপায় আমাদের সংগঠনের সদস্যসংখ্যা দেশ-বিদেশ মিলিয়ে লক্ষাধিক।
হুম, বেশ, ভালো কথা। বলে মাথা ঝোঁকাল অর্ণব। তারপর বলল, আজ চলি।
আচ্ছা আসুন। আবার আসবেন, বইটি পড়ে দেখবেন, প্রভু নিজে উপহার দিয়েছেন আপনাকে।
অবশ্যই পড়ব।
আশ্রমের মূল ফটক পর্যন্ত দুলাল এগিয়ে দিল ওদের। গেটের ঠিক সামনেই রাখা ছিল মোটর সাইকেল। দুজনে চেপে বসল।
অর্ণব বলল, চলি।
দুলাল হাতজোড় করে বলল, ও তৎ সৎ।
কৃষ্ণলালও হাত তুলে বলল, ওম তৎ সৎ। তারপর বাইক স্টার্ট করল।
রাস্তায় যেতে যেতে কৃষ্ণলাল জিজ্ঞাসা করল, কেমন দেখলেন স্যার?
ভালো।
এই গ্রামে জগবন্ধু আশ্রম রয়েছে বলে গ্রামের মানুষগুলো খেতে-পরতে পায়, শরীর খারাপ হলে ডাক্তার ওষুধ পায়। নইলে এই পোড়া গ্রামের যে কী হত? সরকার তো ফিরেও দেখে না।
এই প্রভু জগবন্ধু ভোটে দাঁড়ালে তোমার সাপোর্ট এদের দলেই থাকবে তা-ই তো?
শুধু আমার কেন স্যার? গোটা বুরুলিয়ার সাপোর্ট পাবেন প্রভু। তবে এবারে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। অনেক ঝামেলা হবে স্যার। রক্ত ঝরবে। রাজ্য সরকারের কাছে এবার একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ।
হুম। কৃষ্ণলালের কথাটা খুব মিথ্যে নয়। আশ্রম ঘুরে, সেখানকার ব্যবস্থাপনা দেখে আন্দাজ করাই যায় এরা অত্যন্ত সংগঠিত, এবং চারদিক আটঘাট বেঁধেই ময়দানে নামছে। রাজ্য সরকারের সঙ্গে টক্করে নামছে মানে গাটস অবশ্যই রয়েছে, এবং সেটা কতদূর তা আন্দাজ করার উপায় নেই। তবে মাথার মধ্যে সব থেকে বেশি যেটা ঘুরপাক খাচ্ছে তা হল পুরোনো হিসাব কথাটা।
কেষ্টদা, ওই দুলাল নামের লোকটি যে পুরোনো হিসাবের কথা বলছিলেন, কীসের হিসাব জানেন কিছু?
আমার মনে হয় সুজন সেতুর কেসটা।
সুজন সেতু!
হ্যাঁ স্যার, সুজন সেতু হত্যাকাণ্ড। মনে নেই আপনার? আমার তো খুব মনে আছে। তখন আমি শিবপুরে পোস্টেড ছিলাম। প্রচুর হুজ্জোত হয়েছিল। তবে কেউই গ্রেপ্তার হয়নি, যদিও সকলেই জানত, কারা ক্রাইমটা করেছিল। তাই পুলিশ আর কাকে ধরবে? আর দশ বছর আগে সেবাশ্রম আর এখনের সেবাশ্রম এক নয় স্যার। এখন আর মুখ বুজে মরবে না সেবকরা। কৃষ্ণলালের প্রতি কথাতেই সেবাশ্রমের প্রতি ভক্তি, বিশ্বাস এবং সাপোর্ট টের পাওয়া যায়।
সুজন সেতু হত্যাকাণ্ড! রাইট! আজ থেকে বছর দশেক আগে ম্যাসাকারটা ঘটেছিল। অর্ণব তখন বাঁকুড়ায় পোস্টেড ছিল। কেসটা নিয়ে প্রচুর জলঘোলা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি। সবটাই ধামাচাপা পড়ে গেছিল। আজ মনে পড়ল বিষয়টা। এরাই সেই সেবক!
অর্ণবের ভাবনায় ছেদ পড়ল।
স্যার, একবার বড়িমার সঙ্গেও দেখা করে যান বলে সেই বুড়ির কুঁড়েঘরের সামনে গিয়ে বাইক দাঁড় করাল কৃষ্ণলাল। নিকোনো উঠোনে বিছানো কাপড়ে শুকোতে দেওয়া রয়েছে নানা আকারের অজস্র বড়ি। অর্ণবের আর ইচ্ছে করছিল না। অপর্ণাকে আর সুদীপকেও একটা ফোন করা দরকার।
আজ থাক। পরে আরেকদিন আসব। বলল অর্ণব।
যাবেন না স্যার? এক মিনিট লাগবে। আমি বাড়ির জন্য একটু বড়িও কিনে নিতাম। রাতে আপনার জন্য আলু-বড়ির ঝোল বানাবে গিন্নি।
অর্ণব কিছু বলার আগে ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল বড়িমা। ময়লা সাদা থান। মাথায় ঘোমটা, শীর্ণ চেহারা, সামনের দিকে ঝুঁকে-থাকা। চোখে মোটা লেন্সওয়ালা কালো ফ্রেমের চশমা। একেবারে টিপিক্যাল ভারতীয় গ্রাম্য বৃদ্ধা। অর্ণব আর কৃষ্ণলালের দিকে তাকাল তিনি। বোঝার চেষ্টা করল।
কৃষ্ণলাল আচমকাই প্রাণপণে চিৎকার করে বলল, বড়িমা, এই যে দেখো কাকে নিয়ে এসেছি।
বড়িমা কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু ঘাড় নাড়িয়ে বলল, বেশ বেশ।
উফ, এই এক জ্বালা, বুঝলেন স্যার। একেবারে বদ্ধকালা। বলে কৃষ্ণলাল বৃদ্ধার প্রায় কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল, বড়িমা, এই যে তুমি নতুন দারোগাকে দেখতে চেয়েছিলে, নিয়ে এসেছি।
এই কথা শুনে বৃদ্ধার মুখটা হাসিতে ভরে উঠল। মাথা নেড়ে বলল, বেশ বেশ। বোসো বাবা বোসো। বলে অর্ণবের একেবারে সামনে এসে ওকে মাথাটা সামনের দিকে ঝোঁকাতে ইশারা করল। অর্ণব মাথা ঝোঁকাতেই সেই বৃদ্ধা অর্ণবের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, বেঁচে থাকো বাবা, ভালো থাকো। কী নাম বাবা তোমার?
অর্ণব বারুই।
কী নাম?
অর্ণব গলা আরেকটু চড়িয়ে বলল, অর্ণব বারুই।
বেশ বেশ, আসলে কানের মাথা, চোখের মাথা খেয়ে বসে রয়েছি। বিয়ে-থা করেছ বাবা? ছেলে-মেয়ে কয়টি?
আরে বড়িমা, তুমি আবার আবোল-তাবোল বলতে শুরু করেছ। গল্প পরে হবে, আরেকদিন স্যার আসবেন। স্যারকে তোমার বিউলি ডালের বড়ি খাওয়াব। আমাকে দাও তাড়াতাড়ি। বড়িমার কানের কাছে মুখ প্রায় ঠেকিয়ে বলল কৃষ্ণলাল।
বড়িমা মাথা নেড়ে বলল হ্যাঁ বাবা. দিই, এখনই দিই। একটু দাঁড়াও বাবা।
কুঁজো হয়েই কুঁড়ের ভেতর ঢুকে গেল বৃদ্ধা। কৃষ্ণলাল বলল, এখনই জল-বাতাসা নিয়ে আসবে, দেখুন। ওর কাছে কেউ এলে খালি মুখে ফেরায় না। ওই দেখুন, বলতে বলতে...
বৃদ্ধা ফিরে এল এক হাতে বাটি, অন্য হাতে একটা এ্যানামেলের ঘটি।
বাটিটা অর্ণবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, খাও বাবা, রোদের মধ্যে এসেছ, একটু জল-বাতাসা খাও। তুমিও নাও।
অর্ণব আর কৃষ্ণলাল জল-বাতাসা খেল। বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আপনমনে কী সব বিড়বিড় করতে থাকল।
কৃষ্ণলাল ইশারায় অর্ণবকে বলল, মাথাতেও খানিক গণ্ডগোল রয়েছে বড়িমার।
বড়িমা, এবারে আমরা যাব। তুমি বড়িটা দাও।
বড়ি... ওহ হ্যাঁ তা-ই তো, ভুলে যাই বাবা, কিছুই মনে রাখতে পারি না। যাই।
বাটি আর ঘটি নিয়ে তিনি আবার ঘরে গেল, তারপর ভেতর থেকে এক ঠোঙা বড়ি নিয়ে এল। কৃষ্ণলাল পকেট থেকে তিনটে এক টাকার কয়েন বার করে ওকে দিল। বুড়ি সেটা নিয়ে খুব যত্ন করে নিজের আঁচলে বাঁধল, তারপর আবার অর্ণবের গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, ভালো থেকো বাবা, আবার এসো।
বাইকে যেতে যেতে অর্ণব কৃষ্ণলালকে জিজ্ঞাসা করল, ইনি কতদিন রয়েছেন এখানে?
তা স্যার অনেকদিন হয়ে গেল। তিনকুলে কেউ নেই। চোখে দেখে না, কানে শোনে না। মাথাটাও একটু খারাপ। তবে স্যার, বড়ি বানায় দুর্দান্ত। গ্রামের সকলে ওর কাছ থেকেই বড়ি নেয়। আজ খেয়ে দেখবেন।
হুঁ... আচ্ছা, ওর বয়স কত হতে পারে বলে তোমার আন্দাজ?
বুড়ি মানুষ... কত আর হবে স্যার... অনেক হবে।
উঁহু... বয়স অনেক নয়, তবে বয়সের তুলনায় একটু বেশিই বুড়িয়ে গেছেন বলে মনে হল। বলল অর্ণব।
হতে পারে স্যার। তবে চৌহাটির সকলে বড়িমাকে ভালোবাসে, বিশেষ করে বাচ্চারা। বড়িমাও বাচ্চাদের খুব ভালোবাসে, ছেলেরা প্রতিদিন বিকেলে আসে, সকলকে বাতাসা দেয়।
আচ্ছা।
বাইক এসে থামল থানায়। বাইকটা স্ট্যান্ড করার সময়ে কৃষ্ণলাল হঠাৎ অর্ণবকে বলল, স্যার, আপনি চাইলে প্রভুর কাছে দীক্ষা নিতে পারেন।
কেন, হঠাৎ দীক্ষা নিতে যাব কেন?
না... মানে উনি অন্তর্যামী। আপনাকে দেখেই অনেক কিছু বলে দিতে পারেন। এ আর পাঁচটা সাধুসন্ন্যাসীর মতো নয়। ভেতরে অনেক ক্ষমতা আছে।
হুম। আচ্ছা কেষ্টদা, আশ্রমের ভেতরে কি অস্ত্রচালনা শেখানো হয়?
না না স্যার, কোনো অসামাজিক কাজ আশ্রমে হয় না। বেআইনি কোনো অস্ত্র আশ্রমে নেই।
আমি বন্দুক-পিস্তলের কথা বলছি না। অস্ত্র মানে কি শুধুই ফায়ার আর্মস?
ওহ আচ্ছা আচ্ছা। হ্যাঁ মানে শুনেছি তলোয়ার খেলা, লাঠিখেলা এসব ওখানে শেখানো হয়, তবে স্যার আমি নিজে কখনো দেখিনি। আসলে প্রভুজি কর্মযোগে বিশ্বাসী।
বুঝলে কেষ্টদা, তোমাদের চৌহাটি গ্রামটা বাইরে থেকে একরকম, ভেতরে অন্যরকম। সেই ভেতরটা জানতে হবে।
হে হে হে, যা বলেছেন স্যার।
রাত এগারোটা নাগাদ নিজের চৌকিতে শুয়ে জগবন্ধুর দেওয়া বই পড়ছিল অর্ণব। মাথার বালিশের পাশে হ্যারিকেন জ্বলছে। এখানে প্রায় রোজই সন্ধের পর লোডশেডিং হয়ে যায়, তারপর কখন আবার কারেন্ট আসবে কোনো ঠিক থাকে না। কপাল ভালো থাকলে রাত দশটার পর ফিরে আসে নইলে মাঝরাতে। আজ অপর্ণার সঙ্গে অনেকক্ষণ ফোনে কথা বলেছে সন্ধেবেলায়। অপর্ণা এখানে আসার জন্য খুবই পীড়াপীড়ি করছিল, কিন্তু অর্ণবের কোনো উপায় নেই, থানায় তো আর নিজের স্ত্রী-কে নিয়ে এসে রাখা যায় না। আর গ্রামের যা অবস্থা বুঝেছে তাতে ভাড়াবাড়ি পাবারও কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং আবারও সেই একা একা জীবন। সুদীপ আর হেনা ওখানে রয়েছে, ফলে বিশেষ কোনো দরকারে অপর্ণার কোনো অসুবিধা হবে না। সুদীপরা যে ফ্ল্যাটে থাকে সেখান থেকে অর্ণবের ভাড়াবাড়ির দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার। দুই পরিবারের মধ্যে খুব সুন্দর সম্পর্ক। সুদীপ আর হেনার জন্যই অর্ণব অপর্ণাকে ওখানে একা রেখে আসার সাহস পেয়েছে। ওরা দুজনে মস্ত ভরসা। আজ সুদীপকে ফোন করে অনেক কথা বলেছে অর্ণব। ওর স্বপ্নের ব্যাপারটা সুদীপ জানে, এবং এটাও জানে, এই স্বপ্নটা অর্ণবের দাম্পত্যজীবনকেও নষ্ট করছে। অনেকদিন আগে থেকেই সুদীপ অর্ণবকে বলেছিল একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে, অর্ণব কিছুটা অনিচ্ছা আর বাকিটা সময়াভাবে পেরে ওঠেনি, কিন্তু আজ ও নিজে থেকেই সুদীপকে বলেছে ও সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে রাজি। সুদীপ বলেছে,কলকাতার হাতিবাগান অঞ্চলে নির্মাল্য সোম নামে খুব নামকরা একজন সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন, সুদীপের চেনাশোনা। ও আজই কথা বলে অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করছে। যেদিনই ডেট পড়বে সেদিন যেন কোনোভাবেই মিস না করে। অর্ণব কথা দিয়েছে, এবারে সত্যিই ও যাবে। অপর্ণা আজ বলেছে, আমি চৌহাটিতে যাবই, তুমি যেভাবে থাকো, আমিও সেইভাবেই থাকব। আমার কোনো অসুবিধা হবে না।
অর্ণব শুনে হেসে বলেছে, আরে পাগল, আমি একটা ছোটো চৌকিতে শুই। ওটায় একজনের বেশি শোয়া যায় না।
অপর্ণা বলেছে, ঠিক আছে, তুমি চৌকিতে শোবে, আমি মেঝেতে শোব। কিন্তু তোমাকে আমি একা রাখব না। সবে একটু অনিয়মটা বন্ধ হয়েছিল। ওখানে একা থেকে আবার অনিয়ম শুরু করবে। শরীরটার বারোটা বাজাবে।
কোনো চিন্তা কোরো না, এখানে বাড়ি থেকে কেষ্টদা যে খাবার নিয়ে আসে তা যথেষ্ট ভালো। আর আমি অনিয়ম করি না।
অপর্ণা তাও বিশ্বাস করতে চায় না। বলে, বেশ, আমাকে তাহলে একদিন নিয়ে চলো, আমি গিয়ে দেখব।
আচ্ছা ঠিক আছে, আমি দেখছি।
ঠিক তো?
হ্যাঁ ঠিক।
আরও কিছু কথার পর অপর্ণাকে অর্ণব জানিয়েছে যে ও সুদীপের সঙ্গে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর ব্যাপারে কথা বলেছে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স হলেই যাবে।
শুনে অপর্ণা খুব খুশি।
বইটা পড়তে পড়তে অপর্ণার কথা ভাবছিল অর্ণব। জীবন থেকে প্রেম- ভালোবাসা-মায়া এইসব শব্দ বহু বছর আগেই বিদায় নিয়েছিল। অপর্ণা আসার পর থেকে সেই হারিয়ে-যাওয়া শব্দগুলো যেন আবার মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে অর্ণবের জীবনে। অর্ণবের আজকাল মনে হয় অপর্ণকে যেন কেউ পাঠিয়েছে শুধু অর্ণবকে নতুন করে বাঁচানোর জন্য। জীবনকে আবারও ভালোবাসার জন্য। মেয়েটাকে বিয়ের পর থেকে কিছুই দিতে পারেনি অর্ণব, সামান্য দাম্পত্য সুখও নয়, তবু যেন ওই মেয়ে প্রতিমুহূর্তে অর্ণবকে সুখী রাখবে বলে জীবনের সর্বস্ব পণ করেছে। এমনও হয়! কেন হয় কে জানে? কিন্তু অর্ণবও এখন টের পায়, অপর্ণা ওর জীবনে মিশে গেছে, ওর যত্নে, আদরে, ভালোবাসায়। এখন যেন পুরোনো জীবনটাকে দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়, গত জন্মের স্মৃতি বলে মনে হয়। অপর্ণাকে দেখতে খুব সাধারণ, শ্যামলা গায়ের রং, চেহারা গোলগাল, মুখখানিও গোল, চোখ দুটিতে ভারী মায়া, কিন্তু সেটা খুব কাছ থেকে খেয়াল করলে তবেই নজরে আসে, অন্যথায় অপর্ণাকে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে চেনা কঠিন। সেদিক থেকে অর্ণব সোজা কথায় একজন সুদর্শন পুরুষ বলা যায়। পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি হাইট, সুঠাম চেহারা, ভারী কন্ঠস্বর, হাঁটাচলার মধ্যেও একটা নজরকাড়া ব্যাপার রয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে সাহস। জগতের কোনো বিপদকেই ভয় না-পাওয়ার একটা মনোভাব, সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চারে রুখে দাঁড়ানোর প্রবণতা। তবে অর্ণব কথা বলে খুবই কম আর হাসে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর থেকেও কম। অপর্ণা বলে, দাঁড়াও-না, আমার মতো বকবককারিণী আর খিলখিলরানিকে যখন বিয়ে করেই ফেলেছ তখন তোমারও আর বেশি দিন নেই, কিছুদিনের মধ্যেই তুমিও আমার মতো সারাক্ষণ বকবক করবে আর হি হি করে হাসবে।
অপর্ণাকে বিয়ে করার পর প্রথমদিকে অর্ণবের বেশ বিরক্তই লাগত, মেয়েটি সরলমনা ঠিকই কিন্তু অফুরন্ত কথা আর কথায় কথায় হাসি। জীবনে এত কথা বা হাসির কী আছে, ভেবে পেত না অর্ণব। কিন্তু ধীরে ধীরে ওর মনের ভেতরেও শুকিয়ে-যাওয়া একটা নদীতে আবারও ফোঁটা ফোঁটা করে জল জমতে শুরু করল, নদীর ধারে মরে-যাওয়া কথার গাছপালাগুলোতে আবার কচি পাতা গজাতে থাকল। গাছ যেমন জল না পেলে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায় ভালোবাসা-প্রেম-মায়া-স্নেহ। এগুলো হল মানুষের জীবনে ওই জলের মতো। অর্ণব আবার বেঁচে উঠছে, আগে ওর জীবন নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না, বেঁচে আছি, মরলে মরব, তবে যতক্ষণ বেঁচে থাকব, সমাজবিরোধীদের মারতে থাকব এই ছিল মনোভাব। এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, না, বাঁচা দরকার, জীবনের সবকিছুই খারাপ নয়। অপর্ণার কথা ভাবতে ভাবতেই আবার জগবন্ধুর লেখা বইটার পাতায় চোখ রাখল অর্ণব। বইটা সত্যিই খুব চমকপ্রদ। আর প্রভু জগবন্ধু কোনো ফাঁপা ব্যক্তি নন, দর্শন, শাস্ত্র, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে যা তার গভীর পড়াশোনা রয়েছে তা এই বইটার পাতা ওলটালেই আন্দাজ করা যায়। এই বইটির শেষদিকে উল্লিখিত রয়েছে প্রভু জগবন্ধুর নানা বিষয় নিয়ে লিখিত প্রায় চল্লিশটি বই রয়েছে। এই বইটি হল তাঁর সমস্ত ভাবনাচিন্তা, কাজকর্মের একটা মোটের ওপর ধারণা। খুবই ইন্টারেস্টিং। বইয়ের পাতা ওলটাতে ওলটাতে এক জায়গায় চোখ আটকে গেল অর্ণবের। জগবন্ধু লিখেছেন— অনেক পণ্ডিত মনে করেন, পৃথিবীতে সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্রীকরণ ঘটলেই সর্বত্র শাস্তি ও স্বস্তি ফিরে আসবে। কিন্তু আসল কথা হল, শুনতে ভালো লাগলেও এই ভাববাদী তত্ত্ব বাস্তবে মোটেও প্রযোজ্য নয়। সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ কোনোদিনই সম্ভব হবে না। কারণ অস্ত্রের ব্যবহার মানুষের জিনের মধ্যে প্রোথিত। আদিম যুগে মানুষ অস্ত্র ধারণ করত আত্মরক্ষা ও শিকারের জন্য। পরে শিকার বাদ দিয়ে শুধু আত্মরক্ষা এবং যুদ্ধজয়ের জন্য। আর আধুনিক সভ্যতায় আত্মরক্ষা, যুদ্ধজয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যবসা। অস্ত্র ব্যবসা একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসা। সরাসরি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত, ফলে অস্ত্র ছাড়া আধুনিক সভ্যতা অকল্পনীয়। শান্তি যদি বিদ্যা হয় তাহলে অস্ত্র অবিদ্যা। আর বিশ্বের সর্বত্রই বিদ্যা এবং অবিদ্যা উভয়ই ক্রিয়াশীল। সমাজ ও দেশকে সৎ লোকের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সৎ ও নীতিবাদী শাসকদের সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র রাখতেই হবে। পশুশক্তি নীতিবাদের মিষ্টি ভাষা বোঝে না। তাই শক্তি চাই, শক্তির জন্য সর্বাধুনিক অস্ত্র চাই। আর সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে। সাম্যবাদীদের রাষ্ট্রহীন সমাজের কল্পনা অবাস্তব ও ভুয়ো ভাববাদীদের কল্পনাবিলাস। রাষ্ট্রযন্ত্র অবশ্যই চাই, তবে সেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে নীতিবাদী ও সর্বত্যাগী সেবকদের দ্বারা।
এই অংশটুকু বার তিনেক পড়ল অর্ণব। ব্যাপারটা বেশ ভাবার মতো। অভিজ্ঞ অফিসার অর্ণবের মাথায় কয়েকটা পয়েন্ট ঘুরপাক খেতে থাকল। প্রথমত, সোশ্যালিস্ট রাজ্য সরকারের সঙ্গে জগবন্ধুর পুরোনো শত্রুতা, এবং এই বইতে পুঁজিবাদের সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিজম-সোশ্যালিজমকেও অস্বীকার করা হয়েছে অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার কারো আদর্শেই এরা বিশ্বাসী নয়। জগবন্ধু এবারে ভোটে দাঁড়াবেন রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে। এবং সব থেকে বড়ো কথা হল এই সংগঠন সশস্ত্র সংঘর্ষে বিশ্বাসী। তাহলে কি...? বইটা বন্ধ করে অর্ণব ভাবল, আরও কিছু জানতে হবে। ব্যাপারটা বেশ ঘোরালো। ওর ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলছে, এবারের ভোট এই বুরুলিয়ায় খুব শান্তিপূর্ণভাবে হবে না। খুব বড়ো কিছু একটা ঘটবে। প্রস্তুত থাকতে হবে।
সাল ১৯৯৫। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের শুক্রবার
ঠিক সকাল সাড়ে আটটার সময়ে ম্যানচেস্টারের কোপেনহেগেন এয়ারপোর্টে স্ক্যান্ডানেভিয়ান এয়ারলাইন সিস্টেমের একটি বিমান অবতরণ করল। বাইরে তখন হালকা ঠান্ডা ঝকঝকে দিনের আলো। যাত্রীরা একে একে বেরিয়ে এলেন। যাত্রীদের মধ্যে চকোলেট রঙের কোট এবং মাথায় খয়েরি রঙের হ্যাট-পরা মধ্যপঞ্চাশ এক ব্যক্তি নিজের লাগেজ সংগ্রহ করে বিমানবন্দরের বাইরে পা রাখতেই দেখলেন, উইলিয়াম ব্লেক নাম-লেখা একটা প্ল্যাকার্ড ধরে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। খয়েরি হ্যাট-পরা ব্যক্তি সেইদিকে এগিয়ে গেলেন এবং প্ল্যাকার্ডধারীকে জিজ্ঞাসা করলেন, মিস্টার ডেভিড?
লোকটি করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আপনাকে স্বাগত মিস্টার ব্লেক, আমি মিস্টার ডেভিডের সেক্রেটারি পিটার। প্লিজ আসুন, উনি আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। আপনি অনুগ্রহ করে লাগেজটা ওকে দিয়ে দিন।
পিটারের ঠিক পাশেই সাদা ইউনিফর্ম-পরা একজন দাঁড়িয়ে ছিল, সে এগিয়ে এসে ব্লেকের ট্রলি স্যুটকেসটা নিল, ব্রিফকেসটা ব্লেক হাতছাড়া করলেন না। ওতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজ রয়েছে।
কার পার্কিং লটে একটা কালো বি.এম.ডব্লিউ গাড়ির ডিকিতে ট্রলিটা ঢুকিয়ে দিল ড্রাইভার। ওঁরা দুজনে পিছনের সিটে বসলেন। গাড়ি চলতে থাকল। গাড়িতে পিটার বিজনেস সংক্রান্ত একটি কথাও বললেন না। শুধু ডেনমার্ক দেশটা আর কোপেনহেগেন শহর নিয়ে আলোচনা চলল। ডেনমার্কে ব্লেক এই প্রথমবার এসেছেন। বাল্টিক সাগরের মাঝে দ্বীপ আর উপদ্বীপ নিয়ে গড়ে-ওঠা ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরটা গোটা বিশ্বের কাছেই খুব আকর্ষণীয়। সাগর থেকে অনেকগুলো খাল ঢুকেছে এই শহরে। যার চারপাশ ঘিরে শতাধিক বছরের পুরোনো রঙিন কাঠের বাড়ি, পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রমোদ উদ্যান। আর রয়েছে ছোটো মৎস্যকন্যা। কেক ও বিয়ারের জন্যও বিখ্যাত। ডেনমার্কের রাজতন্ত্র পৃথিবীর প্রাচীনতম। গত ১২০০ বছর ধরে একই রাজপরিবারের মানুষজন ডেনমার্কের রাজা-রানির আসনে রয়েছেন। শহরের পথেঘাটে নতুন ও পুরোনো রাজপ্রাসাদ এবং রাজকীয় শিল্পকর্মও ছড়িয়ে রয়েছে, গাড়ির জানলা দিয়ে দেখছিলেন ব্লেক। আধুনিকতার পাশাপাশি প্রাচীন ঐতিহ্য মিলেমিশে চমৎকার এক ঐক্য স্থাপন করেছে। পিটার বলছিলেন, এই শহরের মানুষ ছুটির দিনে দরকারে না-লাগা দ্রব্য বিক্রি করেন, এখান থেকে অনেক সুন্দর অথচ সস্তা জিনিস কিনতে অনেকে আসেন। এ শহর সাইকেলপ্রীতিতে মশগুল। নিজস্ব গাড়ি থাকতেও বহু মানুষ সাইকেলে চড়তে খুব উৎসাহী। স্কুল- কলেজ সাইকেলে অফিসও যাতায়াত করেন। তাই শহরটা পোড়া ডিজেলের দূষণ থেকে মুক্ত।
ঝলমলে রোদের মধ্যে দিয়ে গাড়ি ছুটছে হু হু করে। রাস্তার মানুষজনকে দেখলেই বোঝা যায় সকলে সুখী। ব্লেকের ইচ্ছে হল কাজটা দ্রুত মিটে গেলে একবার এই শহরটা একবেলা হলেও ঘুরে দেখতে। এমেলিওনবর্গ রাজপ্রাসাদ, নাইহাবন বন্দর, টিভোলি গার্ডেন, ফ্রেডেরিখবর্গ রাজপ্রাসাদ, ক্রোনবর্গ দুর্গ, আরও অনেক কিছু দেখার রয়েছে এই শহরে।
প্রায় ঘণ্টা দেড়েক গাড়িতে চলার পর উঁচু পাঁচিলে ঘেরা একটা মস্ত গেটের সামনে এসে দাঁড়াল গাড়িটা। দরজা খুলে গেল। লম্বা লনের ভেতরে ঢুকে পড়ল গাড়ি। সামনে বিশাল এক অট্টালিকা, লনের দুইধারে বাহারি গাছ। ব্লেক এবারে পিটারকে জিজ্ঞাসা করল, এটা কি ডেভিডের বাড়ি?
না স্যার, এটা মিস্টার নিলসনের ফার্মহাউস। আপনাদের মিটিংটা আজ এখানেই হবে। আপনার থাকার ব্যবস্থাও এখানেই।
আচ্ছা।
গাড়ি পোর্টিকোয় থামল। পিটার আগে বেরিয়ে ব্লেককে নিয়ে সেই প্রাসাদোপম বাড়িতে ঢুকল। বিশাল ড্রয়িং রুমে দামি আসবাব ও অন্যান্য অ্যান্টিকে সাজানো। সুদৃশ্য সোফা, টেবিল। পিটার ব্লেককে বলল, স্যার, আপনি একটু বসুন, আমি স্যারকে বলছি। আপনার লাগেজ আপনার রুমে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
আচ্ছা ধন্যবাদ।
ব্লেক বসলেন। আজ ডেভিড ছাড়া নিলসনের সঙ্গেই যে দেখা এবং কথা হবে তা জানাই ছিল, শুধু মিটিং-এর ভেন্যুটা ব্লেককে আগে জানানো হয়নি, ব্লেকের ধারণা, এটা ডেভিড ইচ্ছে করেই জানায়নি, সম্ভবত ও ব্লেককে নিজে চোখে না দেখে কোনো রিস্ক নিতে চায়নি। ব্যাপারটা দোষের কিছু নয়, ব্লেক নিজে হলেও হয়তে এমনই করত। কারণ আজকের ডিল যদি ফাইনাল হয় তাহলে এটা গোটা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম একটা ঘটনা হতে চলেছে। দুনিয়া তোলপাড় হয়ে যাবে।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই পিটারের সঙ্গে এলেন দু'জন ব্যক্তি। একজনের মাঝারি হাইট, ছিপছিপে চেহারা, চৌকোটে মুখ, তোবড়ানো গাল, মাথায় অল্প চুল আর সাদা ফ্রেমের চশমার লেন্সের পিছনে শার্প একজোড়া নীল চোখ। পরনে সাদা স্যুট, প্যান্ট, পায়ে চকচক করছে সাদা শু। বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ যা খুশি হতে পারে। আর অন্যজনের চেহারা যথেষ্টই ভারী, ডিম্বাকৃতি মুখ, ডবল চিন। মাথাজোড়া টাক, পরনের স্যুটটি দেখলেই বোঝা যায় বহুমূল্যবান। বয়স আনুমানিক ষাট। হাতে একটি ছড়ি, যার বাঁটটা সম্ভবত সোনার। চোখে চশমার ফ্রেমটাও সোনার। ডেভিড হাত বাড়িয়ে দিলেন ব্লেকের দিকে। হ্যালো, আমি ডেভিড। ব্লেক মৃদু হেসে করমর্দন করলেন। তারপর ডেভিড ব্লেককে বললেন, আপনার সঙ্গে মিস্টার নিলসনের পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি নিলসন কোম্পানির চেয়ারম্যান মিস্টার নিলসন, আর ইনি মিস্টার ব্লেক— স্কাই ফ্লাই কোম্পানির সি. হ.z ও.।
পরস্পরের সঙ্গে পরিচয়পর্ব সারার পর প্রথমে কিছু ফর্মাল কথাবার্তা হল। তারপর সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এলেন ডেভিড। ব্লেককে বললেন, আপনি অর্ডার কপিটা এনেছেন তো?
হ্যাঁ, দিচ্ছি। বলে ব্রিফকেস খুলে সেখান থেকে একটা পেপার বার করে ব্লেক এগিয়ে দিলেন ডেভিডের দিকে। ডেভিড সেটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলেন, তারপর ব্লেকের দিকে তাকিয়ে বললেন, এটা ফাইনাল?
হ্যাঁ, এটাই ফাইনাল।
বেশ, বলে কাগজটা ডেভিড বাড়িয়ে দিলেন নিলসনের দিকে।
নিলসন তাঁর চশমাটা সামান্য নাকের নীচের দিকে নামিয়ে ভালো করে দেখলেন। কম্পিউটার প্রিন্টেড কাগজটায় লেখা রয়েছে—
| # | ITEM | QTY |
| 1. | RPG – 7 ROCKET LAUNCHERS – | 10 |
| 2. | AK-47 MI- | 2500 |
| 3. | MAKAROV 9MM PISTOLS- | 250 |
| 4. | DRAGUNOV 7.62 SNIPER RIFLES - | 20 |
| 5. | NIGHT VISION BINOCULARS- | 20 |
| 6. | GRENADES OFFENSIVE- | 100 |
| 7. | AMMUNITION 7.62- | 100000 |
| 8. | AMMUNITION 9 MM- | 50000 |
| 9. | ANTI TANK GRENADES- | 150 |
| 10. | TELESCOPIC SIGHTS FOR ROCKET LAUNCHERS- | 10 |
নিলসন অর্ডার পেপারটা সামনে টেবিলের ওপর রেখে ব্লেককে বললেন, ঠিক আছে, অসুবিধা নেই, সব ক-টা আইটেমই পেয়ে যাবেন। কবে এবং কোথায় ডেলিভারি হবে?
ব্লেক কোনো ভণিতা না করেই বললেন, এটা যদিও ইন্ডিয়ার ওয়েস্ট বেঙ্গলে ডেলিভারি হবে তবে পেপারওয়ার্কে তার কোনো প্রমাণ রাখা যাবে না।
সেটা তো সম্ভব নয় মিস্টার ব্লেক, ফাইনাল ডেস্টিনেশন মেনশন না থাকলে ফ্যাক্টরি থেকে আইটেম রিলিজ অর্ডার দেবে না।
আচ্ছা তাহলে ডেস্টিনেশন যদি পেপারে অন্য জায়গা থাকে?
তাতে অসুবিধা নেই। তবে এন্ড ইউজারের সার্টিফিকেট চাই। এবং অর্ডার কপিও রেজিস্টার্ড কোম্পানি থেকে দিতে হবে।
ব্লেক এবারে নিলসনের কথায় মৃদু হাসলেন, বললেন, সব ক্ষেত্রে কি এই নিয়ম পালিত হয়?
ইঙ্গিতটা বুঝতে এক মুহূর্তও সময় নিলেন না অভিজ্ঞ আর্মস ডিলার নিলসন। অস্ত্র ব্যাবসার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত রয়েছেন তাঁরা খুব ভালোভাবেই জানেন, অস্ত্র সবসময় সৎভাবে কেনা-বেচা হয় না। বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রক যেমন সোজা পথে অস্ত্র কেনে তেমনই বিবিধ জঙ্গিগোষ্ঠী বা জঙ্গিদের মদত দেওয়ার জন্য যারা অস্ত্র কেনে বা বেচে তার পেপার ওয়ার্কস মোটেও ফেয়ার হয় না। অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে সেই ঝুঁকি নেয় অস্ত্র তৈরির ফ্যাক্টরি, ডিলার, ব্রোকার, লজিস্টিক সকলে। সেই কারণে বেআইনি অস্ত্র কেনার খরচও অনেক বেশি পড়ে। ডেভিডের মাধ্যমে নিলসন আগেই জেনে নিয়েছেন যে ব্লেক যে বিপুল পরিমাণে অস্ত্র কিনতে এসেছেন সেটা বেআইনি পথেই। শুধু বেআইনি বললেও ভুল হবে, তার থেকেও বেশি। আর সেইজন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতেও তাঁর অসুবিধা নেই।
নিলসন উত্তরে হাসলেন না, সামান্য মাথা নেড়ে বললেন, না তা হয় না। তবে পেপারস তো তৈরি করতেই হয়। সেটার ফাইনাল ডেস্টিনি যা-ইই হোক।
ওটা নিয়ে অসুবিধা হবে না মিস্টার নিলসন। আপনি আমাকে কোটেশনটা দিলে আমি ফান্ডের ব্যবস্থা করে ফেলতে পারি।
নিশ্চয়ই। আজ সন্ধের মধ্যেই আপনি সব ডিটেল পেয়ে যাবেন।
কথার মাঝেই ট্রে-তে করে কফি ও নানা প্রকার স্ন্যাক্স দিয়ে গেল উর্দি-পরা বেয়ারা। পিটার ঘরে নেই, সে এই গোপন বৈঠকে কাম্য নয়।
কফির কাপে শুগার কিউব দিয়ে চুমুক দিলেন ব্লেক। তারপর বললেন আরেকটা কথা। পেমেন্টের বিষয়টা নিয়ে আমি মিস্টার ডেভিডের সঙ্গে কথা বলেছিলাম, উনি এই বিষয়টা নিয়ে সরাসরি আপনার সঙ্গেই কথা বলতে বলেছেন।
হুঁ, বলুন, আপনি পেমেন্ট কীভাবে করতে চান?
আমার পক্ষে সব থেকে সুবিধা হবে যদি গোল্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট করি। আমি মিস্টার ডেভিডকে এটাই বলেছিলাম। কিন্তু উনি বললেন সরাসরি আপনার সঙ্গে কথা বলতে।
হ্যাঁ, ডেভিড আমাকে বলেছেন তবে যেহেতু এটা বড়ো অ্যাসাইনমেন্ট তাই গোল্ড নেওয়া সম্ভব হবে না, কারণ ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে গোল্ডের প্রাইস বেশ কিছুকাল ধরে খুব ফ্লাকচুয়েট করছে। গত মাসে অনেকটা ভ্যালু নেমেছে, আগামী কয়েক মাসে আরও ডাউন হওয়ার কথা আছে, সেক্ষেত্রে এখন ডিল ফাইনাল করে ডেলিভারির পরের কয়েকদিনের মধ্যে যদি গোল্ডের প্রাইস ডাউন হয়ে যায়, আমার লস হয়ে যাবে। তাই ওই ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।
তাহলে ক্যাশ দিতে পারি।
অন্তত পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ ডলারের অর্ডার এটা। এত ক্যাশ ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্ট করবে না। তাই আমিও পারব না নিতে।
তাহলে উপায়?
আপনি লেটার অফ ক্রেডিট দিন। বললেন ডেভিড।
ব্লেক বললেন, সেটা সম্ভব নয়।
তাহলে একটাই পথ রয়েছে। আপনি আর্মস কোম্পানির নামে ড্রাফট ইস্যু করতে পারেন সুইস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে।
হ্যাঁ সেটা পারব। তবে প্রসেসটা একটু লম্বা হবে। আসলে ফান্ডটা আমার কাছে সরাসরি আসবে না, পুরোটা আমাকে অ্যারেঞ্জ করতে হবে।
ঠিক আছে, তবে ফুল পেমেন্ট ডেলিভারির অন্তত পনেরো দিন আগে করতে হবে।
সেটা অসুবিধা হবে না।
আর ফ্যাক্টরিতে অর্ডার দিতে গেলে আমাকে অন্তত পঞ্চাশ হাজার ডলার অ্যাডভান্স করতে হবে।
সেটা কি আপনার সুইস অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দিতে পারি?
হ্যাঁ তা পারেন।
তাহলে আমি আজ কিংবা আগামীকালের মধ্যেই অ্যাডভান্সটা পে করে দিচ্ছি।
ঠিক আছে। আমি আপনাকে আমার ব্যাঙ্ক ডিটেল দিয়ে দিচ্ছি। আপনি পেমেন্ট করে দেওয়ার পর আমরা বাকি কথা শুরু করব। আর-একটা কথা, আপনি নিশ্চয়ই জানেন তবুও বলে দিই, সোনার মতো অস্ত্রের দামও কিন্তু প্রায় রোজ ওঠানামা করে, তাই ফুল পেমেন্ট করার পরেও যেদিন ডেলিভারি নেবেন সেদিনের যা ভ্যালু থাকবে তা কম হোক বা বেশি সেটা আপনাকে অ্যাডজাস্ট করতে হবে, সেইমতো প্রভিশন রাখবেন।
নিশ্চয়ই।
এখন আপনি বিশ্রাম নিন। গাড়ি রয়েছে। ইচ্ছে হলে শহরটা ঘুরে দেখতে পারেন। পিটার ব্যবস্থা করে দেবে।
অনেক ধন্যবাদ। আমার শুধু ইন্টারন্যাশনাল কল ফেসিলিটি রয়েছে এমন একটা ফোন চাই।
আপনার রুমে যে ফোনটি রয়েছে সেটা থেকে গোটা পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় নিরাপদে ফোন করতে পারবেন। কেউ আড়ি পাতবে না, নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।
ধন্যবাদ মিস্টার নিলসন।
শুভদিন। আমরা তাহলে কাল এখানে আবার দেখা করছি। আজ কোপেনহেগেন শহরকে উপভোগ করুন।
নিশ্চয়ই।
তিনজনেই উঠে দাঁড়ালেন। ব্লেক ডেভিডকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনিও কি চলে যাবেন এখন?
না না, ডিল ফাইনাল না-হওয়া অবধি আমিও মিস্টার নিলসনের অতিথি এবং আপনার সঙ্গী। বলে হাসলেন ডেভিড। আমি আসলে গতকালই পৌঁছেছি এখানে। ফ্লাইট লেট ছিল তাই পৌঁছোতে রাত হয়ে গেছিল।
ওহ আচ্ছা তাহলে তো ভালোই। কথা বলা যাবে।
নিলসনের সঙ্গে ওঁরা দুজন বাইরে বেরিয়ে এলেন। পোর্টিকোয় কালো রঙের রোলস রয়েস দাঁড়িয়ে। ড্রাইভার দরজা খুলে দিল, নিলসন গাড়িতে বসলেন আর এতক্ষণ বাইরে অপেক্ষারত পিটার হাত তুলে ডেভিড আর ব্লেককে বিদায় জানিয়ে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসলেন। গাড়ি বেরিয়ে গেল। রাস্তায় যেতে যেতে নিলসন পিটারকে বললেন, তুমি আগামীকালের মধ্যে মিস্টার ব্লেকের পুরো ডিটেল আমাকে দাও।
আচ্ছা স্যার।
আর... না থাক, বাকিটা আগামীকালের পরেই বলব। নিলসনের মাথায় অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। ব্লেক যে বিশাল পরিমাণ অর্ডার নিয়ে এসেছে সেটা বিজনেসের দিক থেকে দেখলে খুবই লোভনীয়, নেট ভ্যালু অন্তত কয়েক লাখ ডলার। ডেভিডের সঙ্গে কথা বলে এটাও বুঝেছেন যে টাকাটা এর কাছে ব্যাপার না, মানে বেশ বড়ো সোর্স। জঙ্গি সংগঠনগুলো যে পদ্ধতিতে অস্ত্র কেনে তার সঙ্গে ডেভিডের অস্ত্র কেনার পার্থক্য রয়েছে। বিজনেস এথিকস মেনে নিলসন প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো আগ্রহ দেখান না বা প্রশ্ন করেন না। ব্লেক নিজে থেকে আজ বিশেষ খোলসা করে কিছু বলতে চাইছেন না। বলতে উনি বাধ্য নন, এই বিজনেসের প্রায় সবটাই গোপনীয়তা বজায় রেখে করা হয়। কারা কিনছে, কী কিনছে তা শুধুমাত্র ডিলার, ম্যানুফ্যাকচারার আর সেলারই জানতে পারে, আর কিছু ক্ষেত্রে ব্রোকাররা। যেমন ব্লেকের ব্রোকার হল ডেভিড। ডেভিডের সঙ্গে অনেকদিন ধরেই কাজ করছেন নিলসন। কখনো কোনো সমস্যা হয়নি। ডেভিড ধুরন্ধর লোক। পার্টিকে খুব বুঝেশুনে তবেই তারপরই ডিল করার দিকে এগোয়। ওর বুদ্ধি-বিবেচনাবোধের ওপর ভরসা রয়েছে নিলসনের, কিন্তু তারপরেও মনের কোণে একটু খচখচ করছে। নিজের সাবধানতা নিজের কাছে। সামান্য ভুলও নিলসনের এতদিন ধরে গড়ে-তোলা সাম্রাজ্যকে ধসিয়ে দিতে পারে। নিলসন কখনো সরাসরি জঙ্গি সংগঠনকে অস্ত্র বিক্রি করেন না, ঘুরপথে বিক্রির ব্যবস্থা করেন, কিন্তু এই ব্যাপারটা ঠিক জঙ্গি গোষ্ঠীর নয়, তার থেকেও খানিকটা জটিল। সুতরাং বুঝেশুনে এই অ্যাসাইনমেন্টটা করতে হবে। সেরকম বুঝলে ক্যানসেল করে দিতে হবে।
একদিকে নিলসন যখন এইসব কথা ভাবতে ভাবতে নিজের অফিসের দিকে যাচ্ছিলেন, অন্যদিকে নিলসনের গেস্ট হাউজের দোতলার একটি সুসজ্জিত ঘরে ব্লেক নিজের পোশাক বদলে টয়লেটে ফ্রেশ হয়ে তারপর লাঞ্চ আনালেন। অনেক বছর ধরেই ব্লেক ভেজিটেরিয়ান। সেটা জানিয়ে দেওয়ার পর সেইমতো খাবার সাজিয়ে রুমে দিয়ে গেল অ্যাটেন্ডেন্ট। পেট ভরে খেয়ে নিলেন ব্লেক। রুমে দুটো টেলিফোন রয়েছে, একটা ইন্টারকম, আরেকটা বাইরে যেখানে খুশি ফোন করার জন্য। ব্লেক একটা নাম্বার ডায়াল করলেন। সেই ফোন নাম্বারটি সাধারণ ফোনের মতো নয়। একটি বিশেষ প্রেফিক্স যোগ করে তারপর কান্ট্রি কোড এবং শেষে নয় ডিজিটের নাম্বার। রিং হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একপ্রান্তে। বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পরও রিসিভ করল না কেউ। অবশ্য এই নাম্বারে অনেক রাতের আগে ফোন করার নিয়ম নেই। করলেও যার ফোন সে তুলবে না। ফোন সাইলেন্ট করা থাকে। ভারতীয় সময় রাত দশটার পরই একমাত্র কথা বলা যায়। ব্লেক সেটা জেনেও একবার চেষ্টা করলেন, কারণ বিষয়টা আর্জেন্ট। পেমেন্ট কীভাবে করতে হবে তার একটা পরামর্শ করা দরকার। যদিও আজ রাতটা সময় রয়েছে কথা বলার। তবু তখন যদি কোনোভাবে ফোনে কানেকশন না লাগে। এত বড়ো সিদ্ধান্ত ব্লেক নিজে একা নিতে পারবেন না। এস-এর সাহায্য চাই। এস হল কোড নেম। যেমন টেলিফোনিক ডিসকাশনে ব্লেকের কোড নেম কে। ব্লেক দ্বিতীয়বার চেষ্টা করলেন না। ওঁর মনে ঘুরপাক খাচ্ছে বেশ কিছু চিন্তা। উনি নিজে আগে কখনো সরাসরি অস্ত্র কেনেননি ঠিকই কিন্তু এই পুরো প্রজেক্টটার উনি যেদিন থেকে দায়িত্ব নিয়েছিলেন সেদিন থেকেই অস্ত্র কেনা-বেচার বাজার সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছিলেন। ডেভিডের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার মাসখানেক আগেই উনি শুধু এই জগৎটা সম্পর্কে নানা সোর্স থেকে খোঁজখবর শুরু করেছিল, অস্ত্র কেনা-বেচার পদ্ধতি, বিভিন্ন আইটেমের দাম, ক্যারেজ ইত্যাদি সম্পর্কে বেসিক নলেজ নিয়ে নিয়েছিল। এই বাজার বড়ো ঝুঁকিপূর্ণ। সঠিক ব্রোকার এবং ডিলার নির্বাচন না করতে পারলে অর্থ তো খোয়া যাবেই, পুলিশের হাতে ধরা পড়লে অর্ধেক জীবন জেলের কুঠুরিতেও কাটাতে হতে পারে। তাই খুব সাবধানে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলতে হয়। ডেভিডের সঙ্গে যোগাযোগের আগে ব্লেকের আরও কয়েকজন ব্রোকার এবং ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কিন্তু কোনোটায় ব্লেক এগোতে ভরসা পাননি, কোনোটায় রেট পছন্দ হয়নি। ডেভিডের সঙ্গে ওই সময়েই যোগাযোগ। ডেভিডের খোঁজটা দিয়েছিলেন এস। ব্লেক প্রতিবার অবাক হয়ে যান এস-এর নেটওয়ার্ক এবং বুদ্ধির দৌড় দেখে। মানুষটাকে দেখে কারো বোঝার উপায় নেই, মাথায় কী প্রখর বুদ্ধি রাখেন! এত বড়ো একটা প্রজেক্টকে চুপচাপ ঠান্ডা মাথায় কোঅর্ডিনেট করে চলেছেন।
অস্ত্রের বাজার নিয়ে খুব গভীর জ্ঞান না হলেও ব্লেক এইটুকু জানেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম প্রায় রোজ ওঠানামা করলেও অস্ত্রের দাম অত দ্রুত ওঠানামা করে না, বিশেষ করে গত দুই বছরে অস্ত্রের দাম তেমন কিছুই বদলায়নি। তবে আইটেমের কোয়ালিটির ওপর দাম অবশ্যই নির্ভর করে। যেমন AK ৪৭ টাইপ ৫৬ MK-২ (প্লাস্টিক বাঁট, স্টক ও পিস্তল গ্রিপ, দুটি ম্যাগাজিন, বেয়নেট এবং ক্লিনিং কিট সমেত) পোল্যান্ড থেকে কিনতে গেলে প্রতি পিসের যা দাম পড়বে, ওই জিনিস চায়নার থেকে কিনতে গেলে দাম পড়বে প্রতি পিসে অন্তত পঞ্চাশ ডলার কম। তবে কোয়ালিটির ডিফারেন্স তো থাকবেই। তবে দামের খুব বেশি হেরফের না হলেও কিছুটা অবশ্যই হয় আর তখন ওই প্রভিশন থেকেই বাকি খরচটা সামলাতে হয়। ব্লেকের অবশ্য ফান্ডের অভাব হবে না। তবে উনি আশা করেছিলেন, ডাইরেক্ট গোল্ডের মাধ্যমে কিনলে অনেক সুবিধা হত। এখন নিলসন গোল্ড নিতে রাজি নন তাহলে কীভাবে পেমেন্টটা অ্যারেঞ্জ করা যায় সেটা প্ল্যান করতে হবে।
ইন্টারকম ফোনটা বেজে উঠল। রিসিভার তুলে হ্যালো বললেন ব্লেক।
হ্যালো, ডেভিড বলছি। লাঞ্চ হয়ে গেছে?
হ্যাঁ, এই একটু আগেই সারলাম।
এখন কি রেস্ট করতে চাইছেন?
তেমন কোনো প্ল্যান নেই।
তাহলে চলুন, শহরটা ঘুরে আসি।
সানন্দে রাজি।
ঠিক আছে, আমরা তাহলে দশ মিনিটের মধ্যে বেরোচ্ছি।
হ্যাঁ।
সন্ধের মধ্যেই পিটার এসে একটা ফাইল দিয়ে গেলেন ব্লেককে। আজ গোটা বেলাটা ডেভিড আর ব্লেক মিলে কোপেনহেগেনের বেশ কয়েকটি দর্শনীয় জায়গা ঘুরেছেন। সত্যিই তুলনাহীন! সন্ধের মুখেই ফিরে এসেছিলেন দুজনে। ঘোরাঘুরির মধ্যে কাজের কথাও হয়েছে বিস্তর। গেস্ট হাউসে পৌঁছে নিজের রুমে ঢুকে জামাকাপড় বদলানোর সময়েই ঘরের কলিং বেল বাজল। বেয়ারা এসে ফাইলটা দিয়ে বলল, পিটার দিয়ে গেছেন। সিল করা ফাইল। সিল খুলে ফাইল থেকে পেপার বার করলেন ব্লেক। কোটেশন পাঠিয়েছেন নিলসন। দাম মোটামুটি ব্লেক যা আন্দাজ করেছিলেন তার মধ্যেই। এ ছাড়া ফ্রেইট, ব্রোকারেজ ইত্যাদি আনুষঙ্গিক খরচ আলাদা। টাকাটা ফ্যাক্টর নয়, ফ্যাক্টর এখন—
প্রথমত, ইউজার এন্ড সার্টিফিকেট জোগাড় করা।
দ্বিতীয়ত, পেমেন্ট কীভাবে করা যাবে তার ব্যবস্থা করা।
তৃতীয়ত, ডেলিভারি কোন পথে নেওয়া উচিত তা সিদ্ধান্ত নেওয়া।
ফ্রেইট ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং নিয়ে আজ সারাদিনে বেড়ানোর মাঝে ডেভিডের সঙ্গে অনেক কথা হয়েছে। ডেভিড বলছিলেন, কনসাইনমেন্ট পুরোটাই জাহাজে করে ক্যালকাটা ডকে পাঠাতে। সেখান থেকে বাই রোড ফাইনাল ডেস্টিনেশনে যাবে। কিন্তু ব্লেক সেটায় সম্মত নয়। জলপথে কয়েক বছর ধরে ধরপাকড় যথেষ্ট বেড়েছে। এই বছরখানেক আগেই ব্রিটিশ কাস্টম অথরিটি একটা পোলিশ জাহাজকে পাকড়াও করেছিল যার মধ্যে ছিল তিনশো এ-কে ফর্টিসেভেন অ্যাসল্ট রাইফেল, দুই টন এক্সপ্লোসিভ, প্রচুর পিস্তল, গ্রেনেড এবং বেয়নেট। জেরায় উঠে আসে, জিনিসগুলো উত্তর আয়ার্ল্যান্ডের আই. আর. এ. এক্সট্রিমিস্টদের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এরও বছরকয়েক আগে ক্যারিবিয়ান সি থেকে আরেকটি জাহাজকে আটক করা হয়েছিল। জাহাজটায় প্রায় চারশো রাইফেল, একশো উজি সাব মেশিনগান এবং আড়াই লাখ রাউন্ড গুলি পাওয়া গেছিল। একটি ইজরায়েলি অস্ত্র কোম্পানি এই বিপুল পরিমাণে অস্ত্র জলপথে স্মাগল করছিল কলম্বিয়ান ড্রাগ সম্রাট গঞ্জালো রডরিককে। অর্থাৎ জলপথে যথেষ্ট রিস্ক। আর যদি পথিমধ্যে ধরা না-ও পড়ে তবু ক্যালকাটা ডকের গোডাউনে এই মেটিরিয়াল শিফট করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অফিসারদের কোনো পেপারস বা কিছুতে সন্দেহ হলে যদি ফিজিক্যাল চেকিং হয় তাহলে বিপর্যয় ঘটে যাবে, তা ছাড়া ডক থেকে ছাড়া পেলেও কলকাতা শহর থেকে বাই রোড আইটেম ফাইনাল ডেস্টিনেশনে পাঠানোর সময় চেকপোস্ট বা অন্য কোথাও রাস্তায় চেকিং হতে পারে, সুতরাং ওই রিস্ক নেওয়া অসম্ভব।
তাহলে হাতে রইল এয়ারে পাঠানো। কোন কার্গো ফ্লাইটে এই শিপমেন্ট করা যেতে পারে তা-ই নিয়ে আলোচনার সময় ডেভিড বলেছেন, এই ব্যাপারে নিলসন ভালো সাজেশন দিতে পারবেন। ওর অনেক চেনাশোনা রয়েছে। সুতরাং ব্যাপারটা আগামীকালই আলোচনা করা যাবে।
রুমের ভেতরে কফি বানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এক কাপ কফি তৈরি করে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন ব্লেক। সমুদ্র দেখা না গেলেও তার হাওয়া এবং ঢেউ আছড়ে পড়ার মৃদু গর্জন শোনা যাচ্ছে। গেস্ট হাউসটা স্টার হোটেলের থেকে কিছু কম নয়, আমোদ-প্রমোদের সবরকম ব্যবস্থা রয়েছে। ডেভিড কথাপ্রসঙ্গে বলেছেন, নিলসনের এমন গেস্ট হাউস আরও খানকয়েক রয়েছে, আর ওঁর নিজের বাড়িটা প্রাসাদ বললেও কম বলা হবে। প্রায় চার-পাঁচখানা বহুমূল্যের গাড়ি রয়েছে। যদিও নিলসনের পরিবার বলতে শুধু তাঁর বৃদ্ধা মা এবং তাঁর প্রেমিকা।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে নিজের কথাও ভাবছিলেন ব্লেক। নিলসনের তবু মা রয়েছেন, প্রেমিকা রয়েছেন। কিন্তু ব্লেকের রয়েছেন শুধু তিনি নিজে। আর রয়েছে একবুক প্রতিশোধের আগুন। দশ বছর ধরে ধরে জমানো ক্রোধ এবার বিস্ফোরণ ঘটানোর সময়ে এসে পৌঁছেছে। ঘড়ি দেখলেন ব্লেক। সন্ধে সাতটা, তার মানে ইন্ডিয়ায় এখন রাত সাড়ে এগারোটা। এবারে ফোন করা যেতেই পারে। ফোন করল সেই নির্দিষ্ট নাম্বারে। এবারে দু-বার রিং হতেই ওদিকে থেকে হ্যালো সাড়া পাওয়া গেল।
ব্লেক বললেন, কে বলছি।
হ্যাঁ, এসো বলছি।
আগে একবার ফোন করেছিলাম। অবশ্য তখন আপনাকে পাওয়া যাবে না জানতাম তবু আর্জেন্সি ছিল আর কী।
হুঁ, বলুন কী অবস্থা?
এমনি আজ প্রাথমিক কথা একটা হয়েছে। সন্ধেবেলা কোটেশন হাতে পেয়েছি। মোটামুটি সব মিলিয়ে ছয় থেকে সাত লাখ ডলার ধরে এগোতে হবে। আমি কোটেশনের একটা কপি আপনাকে ফ্যাক্স করে দেব আগামীকাল।
আচ্ছা। পেমেন্ট নিয়ে অসুবিধা হবে না।
না, সমস্যাটা অন্য জায়গায় হচ্ছে। এঁরা ক্যাশ নেবেন না, গোল্ড নিতেও রাজি নন, অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করতে হবে।
কোন ব্যাঙ্কে চাইছেন?
সুইস অ্যাকাউন্টে। আর আগামীকাল পঞ্চাশ হাজার ডলার অ্যাডভান্স দিতে হবে।
ব্লেকের কথা শুনে ওদিকে এস কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকলেন, তারপর বললেন, ঠিক আছে, ব্যবস্থা হয়ে যাবে। শুনুন, আমি ক্যাশটা এখান থেকে নেপালে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি, নেপাল থেকে ওটা দুবাই যাবে। দুবাই থেকে গোল্ডে কনভার্ট করে সেটা ব্যাঙ্কক যাবে, ব্যাঙ্ককে আমাদের একজন রয়েছেন, তিনি গোল্ডের এগেইন্সটে ডলার দেবেন। ওই ডলার আপনার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দেওয়া হবে, তবে কয়েকদিন সময় লাগবে।
এমন গড়গড় করে এস প্ল্যানটা বলে গেলেন যেন এসব উনি আগেই ভেবে রেখেছিলেন, হয়তো সত্যিই ভেবে রেখেছিলেন, ওঁর কাছে সব প্ল্যানের বি সি ডি থাকে। এমন সাংঘাতিক ব্রেন বলেই এত বড়ো একটা ভেঞ্চারের কোঅর্ডিনেশনের দায়িত্ব এস-কে দেওয়া হয়েছে। ব্লেকের বুঝতে এতটুকু সময় লাগল না ইন্ডিয়ার ব্ল্যাক কারেন্সিটা এত দেশে নানাভাবে ঘুরিয়ে ব্লেকের অ্যাকাউন্টে ঢোকানোর কারণ হচ্ছে নিরাপত্তা। যাতে কোনো ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি সামান্যতম সন্দেহও না করতে পারে।
সময়ে অসুবিধা হবে না। পুরো পেমেন্ট করার যথেষ্ট সময় রয়েছে। তবে অ্যাডভান্সটা আগামীকালই করতে হবে।
সেই টাকা তো আপনার কাছে রয়েছে?
হ্যাঁ, আমি সেটা দিয়ে দেব বলেছি।
ঠিক আছে। আর বাকি কী খবর?
বাকি খবর বলতে কাজ এগোচ্ছে, তবে আরও দুটো সমস্যা হচ্ছে। প্রথমত, ইউজার এন্ড সার্টিফিকেট পাওয়া আর দ্বিতীয়ত, কনসাইনমেন্টটা ডেলিভারি নেওয়ার। এরা শিপে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু আমি রাজি হইনি, আপনিও জানেন, অনেক ঝুঁকি রয়েছে।
হ্যাঁ, সেটা সম্ভব নয়, আমরা তো আগেই ভেবেছিলাম এবং আমরা কনসাইনমেন্ট বাই এয়ার নেব।
হ্যাঁ, সেই বিষয়ে আগামীকাল কথা হবে মিস্টার নিলসনের সঙ্গে। দেখছি, উনি কী সাজেস্ট করেন।
ঠিক আছে। আর কিছু?
না এইটুকুই।
ওখানে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো আপনার?
না না, কোনো অসুবিধা নেই। তেমন হলে জানাব।
ঠিক আছে, কথা হবে। ফ্যাক্সটা বাইরের কোনো বুথ থেকে করবেন।
শিয়োর। রাখছি।
হ্যাঁ।
ফোন রাখার পর ব্লেক ভাবলেন আগামীকাল ফ্যাক্স করতে হবে।
সকাল দশটার মধ্যেই মিস্টার নিলসন চলে এলেন। আজ উনি কালো স্যুট, ট্রাউজার, হ্যাট, শু-তে সেজেছেন। ডেভিড আর ব্লেক আগে থেকেই কনফারেন্স রুমে অপেক্ষা করছিলেন নিলসনের। নিলসন এসে সময় নষ্ট করলেন না। সরাসরি কাজের প্রসঙ্গে ঢুকে গেলেন। ব্লেক জানালেন তিনি নিলসনের কাছ থেকে যে কোটেশন পেয়েছেন সেই অ্যামাউন্ট এবং আনুষঙ্গিক যা খরচ রয়েছে তা পেমেন্ট করতে প্রস্তুত।
নিলসন বললেন, তাহলে আমরা আজ কন্ট্রাক্টটা সেরে ফেলব। আর আপনি অ্যাডভান্স পেমেন্টটা করে দেবেন।
হ্যাঁ, ওটা আমি আজই করে দেব। বলে ব্লেক ডেভিডের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার ব্রোকারেজের ফিফটি পারসেন্ট আমি আজ কন্ট্রাক্ট সাইনের পরে আপনাকে পে করে দেব।
আচ্ছা ধন্যবাদ, বলে মৃদু হাসলেন ডেভিড। কন্ট্রাক্ট অ্যামাউন্টের দুই পারসেন্ট কমিশন নেবেন ডেভিড। তাঁর যাতায়াতের খরচও ব্লেককেই বহন করতে হয়েছে, এখানে থাকা-খাওয়ার খরচ নিলসনের।
ব্লেক তারপর ফ্রেইটের প্রসঙ্গটা আনলেন। জাহাজে করে আইটেম কলকাতা ডকে নিয়ে আসা খুবই রিস্কি হয়ে যাবে তাই আমরা ফ্লাইটে চাইছি। আমি চাইছি, এই ব্যবস্থাটা আপনি করে দিন।
নিলসন ব্লেকের কথা শুনলেন, তারপর বললেন, ইন্ডিয়ার কোন এয়ারপোর্টে ডেলিভারি চাইছেন আপনি?
আমি আসলে কোনো এয়ারপোর্টে ডেলিভারি চাইছি না, আমার ইচ্ছা পুরো আইটেম ফাইনাল ডেস্টিনেশনে সরাসরি বাই এয়ার পৌঁছোক।
সেখানে কি ল্যান্ড করার ব্যবস্থা রয়েছে?
না, তা নেই, তবে কয়েক কিলোমিটার ফাঁকা জমি রয়েছে যেখানে ড্রপ করা যাবে।
আপনি কি বলতে চাইছেন আকাশ থেকে অস্ত্রগুলো জমিতে ফেলতে?
হ্যাঁ মিস্টার নিলসন, আমি ঠিক এটাই বলতে চাইছি।
হুম... বলে একটু চুপ থাকলেন নিলসন, ভুরু কুঁচকে নিজে একটু ভাবলেন, একবার তাকালেন ডেভিডের দিকে। তারপর আবার ব্লেকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি সিরিয়াসলি এটাই চাইছেন?
হ্যাঁ মিস্টার নিলসন, আমি সিরিয়াস। সত্যি বলতে আমার বিশ্বাস, এটাই সব থেকে নিরাপদ।
আচ্ছা, আপনি তো বলছেন যেখানে আর্মস ড্রপ হবে সেটা ফাঁকা জমি।
হ্যাঁ, পুরো ফাঁকা জমি।
তাহলে আমি আপনাকে কয়েকটি ইউক্রেনিয়ন এবং মালদভান ফ্রেইট কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি যারা টাকার বদলে যেখানে বলবেন সেখানে প্লেন ল্যান্ড করিয়ে দেবে, ওদের কাছে বেশ কিছু রাশিয়ান এয়ারক্র্যাফট রয়েছে, সেগুলো রাফ জমিতে খুব অল্প জায়গার মধ্যে ল্যান্ড করতে পারে।
ব্লেক মাথা নেড়ে বললেন, না মিস্টার নিলসন, আমি এমনটা চাইছি না। প্লেন ল্যান্ড করানোর দরকার নেই।
কিন্তু ফুয়েল নিতে গেলে যেকোনো প্লেনকেই অন্তত দু-তিনটে এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করতেই হবে। টানা কোনো প্লেন তো অত দূরের ফাইনাল ডেস্টিনেশনে পৌঁছোতে পারবে না।
সে জানি তবে আর্মস যেখানে ফাইনালি ডেলিভারি হবে সেখানে আমি চাইছি না কোনো প্লেন ল্যান্ড করুক। অসুবিধা আছে।
হুম... তাহলে তো আমার মতে আপনার একটা প্লেন কিনে নেওয়াই ভালো। একটু ব্যঙ্গ করেই কথাটা বললেন নিলসন।
ডেভিডও হাসলেন নিলসনের কথায়। আর ওদের দুজনকে চমকে দিয়ে ব্লেক বললেন, হ্যাঁ আমি রাজি। আপনার সন্ধানে যদি কোনো সেকেন্ড হ্যান্ড এবং ভালো কার্গো বিমান থাকে তাহলে কথা বলুন। আমি কিনে নেব।
নিলসন আবারও একই প্রশ্ন করলেন, আপনি কথাটা সিরিয়াসলি বলছেন?
ব্লেক উত্তর দিলেন আমি জোকস খুব একটা পছন্দ করি না মিস্টার নিলসন। আমার মনে হয়, আপনিও করেন না।
ব্লেকের এমন উত্তরে মুখটা আরও গম্ভীর হয়ে গেল নিলসনের। বললেন, হুম। ঠিক আছে, আমি দেখছি। আমার একজন পরিচিত এয়ারক্র্যাফট ব্রোকার রয়েছেন, তাঁকে কল করে দেখছি। কনফারেন্স রুমে নিলসনের জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারটির সামনেই টেবিলের ওপর রাখা একটি ফোন। ফোনটা তুলে একটা বোতাম টিপে তিনি অপারেটরকে বললেন, উইলিয়ম রকের সঙ্গে তিনি কথা বলতে চান। রিসিভার ক্রেডলে নামিয়ে রাখার ঠিক মিনিট দেড়েকের মধ্যেই আবার ফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুলে হ্যালো বলেই পরমুহূর্তে বললেন, হ্যাঁ ভালো আছি। শোনো, একটা প্রোপোজাল রয়েছে। তুমি এখন আসতে পারবে? হ্যাঁ আর্জেন্সি রয়েছে... পার্টি আমার কাছেই বসে রয়েছে... হ্যাঁ... হুঁ দেখা হচ্ছে, আমরা অপেক্ষা করছি।
ফোন রেখে নিলসন বললেন, উইলিয়মকে বিশ্বাস করা যায়, অনেকদিন ধরে ও এই ট্রেডে রয়েছে। বলেই নিলসন ব্লেককে বললেন, আপনার কাছে কি ফাইনাল ডেস্টিনেশনের ম্যাপটা রয়েছে?
হ্যাঁ অবশ্যই। বলে নিজের ফাইল থেকে ম্যাপ বার করতে গেল ব্লেক। নিলসন বললেন, না এখন থাক, উইলিয়ম আসুক। একসঙ্গেই দেখব। যা-ই হোক মিস্টার ব্লেক, যদিও আমার জিজ্ঞাসা করা উচিত নয়, তবু আপনার বিষয়ে আমার কিছু ব্যক্তিগত কৌতূহল রয়েছে, আমি কি আপনাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারি?
ব্লেক বলল, নিশ্চয়ই করতে পারেন, সম্ভব হলে অবশ্যই উত্তর দেব।
নিলসন জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি বরাবর লন্ডনেই থাকেন?
হ্যাঁ।
শুনলাম আপনি নিরামিষাশী। ধূমপান, মদ্যপানও করেন না, আপনি কি স্পিরিচুয়াল জগতের সঙ্গে যুক্ত?
হ্যাঁ, বলতে পারেন, কিছুটা যুক্ত রয়েছি।
আপনি ইন্ডিয়ার সঙ্গে কি বিজনেসের কারণে যুক্ত?
হুঁ, বলতে পারেন।
এই অস্ত্র কি ইন্ডিয়ার কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর জন্য?
এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে ব্লেক নিলসনকে পালটা প্রশ্ন করলেন, জঙ্গিগোষ্ঠী বলতে আপনি কী মনে করেন মিস্টার নিলসন?
নিলসন বুদ্ধিমান মানুষ, বুঝতে পারলেন নিজের ব্যাপারে কথা বলতে ব্লেক আগ্রহী নন, তবে পিটার একদিনের মধ্যেই ব্লেকের বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করে ফেলেছেন। নিলসন সেইসব তথ্য দেখে ব্লেক সম্পর্কে যেটুকু বুঝেছেন, ইন্ডিয়ার সঙ্গে প্রায় বছর দশেক আগে সরাসরি যোগাযোগ ছিল ব্লেকের। আরও বেশ কিছু এমন তথ্য পেয়েছেন যা বেশ রহস্যজনক। অবশ্য এই ট্রেডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অধিকাংশই নানাভাবে রহস্যজনক। নিলসন নিজেও তা-ই। আর্মস ডিলিং এর পাশাপাশি তিনি যে গোল্ড স্মাগলিং-এর সঙ্গেও যুক্ত তা খুব কম জনেই জানেন।
চল্লিশ মিনিটের মধ্যে উইলিয়ম চলে এলেন। তামাটে গায়ের রং। সোনালি চুল, ভুরুও সোনালি। অস্বাভাবিক রোগা আর তেমনই ঢ্যাঙা। চোখে রোদচশমা।
আঙুলের ফাঁকে সিগারেট নিয়ে হ্যালো নিল, বলতে বলতে ঢুকলেন। নিলসনের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার পর নিলসন ওঁর সঙ্গে ব্লেক এবং ডেভিডের পরিচয় করিয়ে দিয়ে পুরো বিষয়টা খুব সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিলেন। উইলিয়ম শুধু হুঁ হুঁ করে পুরোটা শোনার পর ব্লেককে প্রথম প্রশ্নটা করলেন, ম্যাপ আছে?
হ্যাঁ দেখাচ্ছি, বলে ব্লেক ওঁর ফাইলে দুই ভাঁজ করে রাখা দুটো কাগজের সার্ভে ম্যাপ টেবিলের ওপর মেলে ধরলেন। একটা ভারতের এবং আরেকটা পশ্চিমবঙ্গের। প্রথমে ভারতের কোথায় পশ্চিমবঙ্গের লোকেশন সেটা দেখানোর পর পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মার্ক করা, সেখানে আঙুল ঠেকিয়ে ব্লেক বললেন আমার এখানে ডেলিভারি চাই।
উইলিয়ম সানগ্লাস খুলে সামনে ঝুঁকে দেখলেন, তারপর ব্লেককে জিজ্ঞাসা করলেন, পাহাড় আর জঙ্গল রয়েছে যথেষ্ট। আপনি নিজে এই এলাকায় রিসেন্টলি গেছেন?
না যাইনি, তবে এটা জানি, এলাকাটা একই রকম রয়েছে। এখানে সিকিউরিটি ফোর্সের কোনো বালাই নেই। প্যারাসুটে করে যদি ঠিক এই জমিতে ফেলা যায় তাহলে কোনো সমস্যা হবে না।
উইলিয়ম আবারও ভালো করে মার্ক করা জায়গাটা দেখলেন, তারপর বললেন, হয়ে যাবে। আপনার এই কাজটার জন্য সব থেকে ভালো চয়েস হবে AN-২৫ লাটভিয়ান এয়ারক্র্যাফট।
ব্লেকের এয়ারক্র্যাফট সম্পর্কে কোনো আইডিয়া নেই, তাই জিজ্ঞাসা করল, কেন ভালো চয়েস বলছেন?
উইলিয়ম বললেন, দেখুন, ইউক্রেন বা রাশিয়া থেকেও এয়ারক্র্যাফট কেনা যায়, হয়তো লাটভিয়ান এয়ারক্র্যাফটের তুলনায় দাম কিছুটা কমই হবে কিন্তু রাশিয়া বা ইউক্রেন থেকে কেনার চেয়ে এখান থেকে এয়ারক্র্যাফট কেনার প্রসেসটা অনেক সোজা, নিয়মের কড়াকড়ি অনেক কম। যেটা আপনার পক্ষে সুবিধাজনক হবে।
আচ্ছা। খরচ কেমন পড়বে?
সেটা এখন বলতে পারব না। দু-লাখ হতে পারে, আবার তিন লাখ ডলারও হতে পারে। ক্র্যাফটের কন্ডিশনের ওপর নির্ভর করছে।
পুরোনো তো?
অবশ্যই। নতুন কীভাবে পাবেন? আর দু-তিনগুণ দাম দিয়ে নতুন এয়ারক্র্যাফট কিনে আপনি করবেনই বা কী? আপনার কাজ হয়ে গেলে আবার বিক্রি করে দেবেন।
হ্যাঁ সেই, তা ঠিক বলে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন ডেভিড। ব্লেককে বললেন, উইলিয়মের প্রস্তাব আমার পছন্দ হচ্ছে। আপনি কী বলছেন?
হ্যাঁ অসুবিধা কিছু নেই, তবে প্লেনের কন্ডিশন কেমন, সবকিছু ঠিকঠাক রয়েছে কি না সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।
ব্লেকের কথা শুনে উইলিয়ম বললেন, দেখুন মিস্টার ব্লেক, আমি অনেক বছর এয়ারক্র্যাফট কেনা-বেচার ট্রেডে রয়েছি, এই ট্রেডে আমার একটা সুনাম রয়েছে, মিস্টার নিলসনের সঙ্গেও আমি আগে অনেক কাজ করেছি। ফলে আপনি একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে উইলিয়ম আপনাকে বাজে জিনিস গছাবে না। লাটভিয়ার রিগাতে লাটভিও লাটভিয়ান এয়ারলাইনস যেটা আগে স্টেট এয়ারলাইনস ছিল, ওটা ব্যাঙ্করাপ্সি হয়ে গেছে। ফলে পুরো ইউনিটটা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। আপনি বুলগেরিয়ার এয়ারব্লসম কোম্পানির নাম শুনেছেন কি?
না শুনিনি। মাথা নেড়ে বললেন ব্লেক।
এই কোম্পানিটি পুরো ওয়ার্ল্ড জুড়ে এয়ারক্র্যাফট, হেলিকপ্টার এবং স্পেয়ার পার্টস কেনা-বেচা করে, সেই কোম্পানিই দায়িত্ব পেয়েছে এই লাটভিও এয়ারলাইনসের যাবতীয় এয়ারক্রাফট ইত্যাদি বিক্রির। এর চেয়ারম্যান মিস্টার জিওফ্রে হ্যারল্ড আমার অনেকদিনের পরিচিত। গত সপ্তাহেই ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ও-ই আমাকে AN-২৫ এর কথা জানিয়েছে। আপনি যদি আগ্রহী থাকেন তাহলে আমি ওর সঙ্গে কথা বলতে পারি। ওটা এখনও আছে কি না, বা থাকলে কী কন্ডিশন, কেমন প্রাইস ইত্যাদি জেনে নেব।
ব্লেক ঠিক এক মুহূর্তের জন্য ভাবলেন তারপরেই বললেন, ঠিক আছে, আপনি কথা বলুন।
ঠিক আছে। আপনি এখানে কতদিন আছেন?
আমার আগামী পরশু ফিরে যাওয়া।
যদি ক্র্যাফটটা এখনও থাকে এবং আপনি যদি কিনতে সম্মত হন তাহলে কিন্তু জিনিসটা দেখার জন্য রিগাতে যেতে হবে আপনাকে।
হুঁ, সে তো বটেই। আপনিও যাবেন তো?
যাব, তবে সেক্ষেত্রে আমার টিকিট, থাকা-খাওয়ার খরচ আপনাকে বহন করতে হবে।
সে তো অবশ্যই। আমার আপত্তি নেই। বলে ব্লেক ডেভিডের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনিও কিন্তু যাবেন। আমার দায়িত্ব।
ঠিক আছে, আপনার যেমন ইচ্ছা। উত্তর দিলেন ডেভিড।
ঠিক আছে, আমি আজ সন্ধের মধ্যে আপনাকে জানাচ্ছি।
এই গেস্ট হাউসের ফোন নাম্বার ওর কাছে আছে। বিদায় নিয়ে চলে গেলেন উইলিয়ম। আর তারপর পিটারকে ডাকলেন নিলসন। বললেন, আমাদের লাঞ্চের ব্যবস্থা করো।
তিনজনে লাঞ্চ সেরে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করলেন। ব্লেক কথামতো অ্যাডভান্সে পঞ্চাশ হাজার ডলার ক্যাশ পেমেন্ট করলেন এবং ডেভিডকে অ্যাডভান্স দিলেন পাঁচ হাজার ডলার। তিনজনে পরস্পরের সঙ্গে করমর্দন করলেন, তারপর নিলসন চলে গেলেন।
ডেভিড ব্লেককে বললেন, চলুন, আজকের দিনটা শুধু হাতে রয়েছে। শহরটা আজও খানিকটা এক্সপ্লোর করা যাক।
ব্লেকের আজ খুব বেশি ইচ্ছে ছিল না, মাথায় প্রচুর চিন্তা, কিছু কাজকর্মও রয়েছে। আজ সকালে নিলসন আসার আগেই উনি গাড়ি নিয়ে গেস্ট হাউস থেকে বেশ কিছুটা দূরের একটি ফোন বুথে গেছিলেন, ওখান থেকে আর্মস কোটেশন পেপারটা ভারতের একটি নাম্বারে ফ্যাক্স করেছেন। এবং তার কিছুক্ষণ পর সেই বুথ থেকেই একটি ভারতীয় নাম্বারে ফোন করেছেন, কথা হয়েছে। তারপর গেস্ট হাউসে ফিরে উনি মিটিং-এ বসেছেন।
ব্লেক রাজি হলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে দু-জনে বেরিয়ে পড়লেন কোপেনহেগেন শহরকে উপভোগ করতে।
সন্ধে সাতটা নাগাদ উইলিয়মের ফোন এল, ব্লেক তখন রুমেই ছিলেন। ফোন রিসিভ করতেই উইলিয়ম বললেন, হ্যাল্লো মিস্টার ব্লেক, আপনার জন্য সুখবর, AN-২৫ আপনার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে।
ব্লেক কোনো উচ্ছ্বাস না দেখিয়েই বললেন, ধন্যবাদ।
দুই লক্ষ সত্তর হাজার ডলার বেস্ট প্রাইস স্রেফ আপনার জন্য। ইঞ্জিন একদম ঠিক আছে। বাকি যা রিপেয়ারিং, সার্ভিসিং-এর খরচ আলাদা।
আচ্ছা, তাহলে এর পরের পদক্ষেপ কী?
এবারে আমাদের ওখানে যেতে হবে।
কবে?
যত দ্রুত সম্ভব।
আমার এখানের কাজ শেষ। আমি পরশু দেশে ফিরে যাব।
তাহলে আপনি পৌঁছেই আমাদের তিনজনের রিগাতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলুন। ওখানে আমার চেনা হোটেল আছে। আপনি ডেট ফাইনাল করলেই আমি বুক করে নেব।
ঠিক আছে।
আর একটা কাজ করবেন। আপনি একটা টোকেন অ্যামাউন্টের অ্যাডভান্স করে দেবেন।
কিন্তু তারপর যদি আমাদের জিনিসটা পছন্দ না হয়।
এটা হান্ড্রেড পারসেন্ট রিফান্ডেবল।
আচ্ছা। কার কোন অ্যাকাউন্টে অ্যাডভান্স করব?
আমার অ্যাকাউন্টেও করতে পারেন, অথবা কোম্পানির নামেও করতে পারেন। যেটা আপনার সুবিধা।
ঠিক আছে, আমি কাল সকালে করে দিচ্ছি।
আচ্ছা। গুড নাইট।
ফোন রাখার পরই ব্লেক আবার ডায়াল করল কোড এস-কে সেই নির্দিষ্ট স্যাটেলাইট ফোনে। আজ সারাদিনের আপডেট জানালেন ব্লেক। ওদিকে স্যাটফোন ধরে রাখা এস সব শুনলেন, মতামত দিলেন, পরবর্তী পদক্ষেপ কী নিতে হবে তা জানালেন। তারপর রেখে দিলেন।
দুই হাতের তালু ঘষলেন ব্লেক। ঘড়ি দেখলেন। সাতটা চল্লিশ বাজে। ইন্টারকমে ডিনার অর্ডার করলেন। ব্লেক বরাবর রাত আটটার মধ্যে ডিনার করে নেন তারপর টানা এক ঘণ্টা ধ্যান করে শুয়ে পড়েন। ঘুম থেকে ওঠেন ভোর চারটেয়। উঠে প্রাতঃকৃত্য, স্নানাদি সেরে যোগাসন এবং প্রাণায়াম করেন। তারপর দিন শুরু করেন। এই অভ্যাস তাঁর অনেকদিনের। বছর বারো আগে যে এক অন্য জীবনের পথের সন্ধান পেয়েছিলেন সেই পথ থেকে আজও সে সরে আসেননি।
প্রতিদিন রাতের আহারের আগে ব্লেক আরেকবার স্নান করেন। জামাকাপড় ছেড়ে টয়লেটে গেলেন। টয়লেটের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ডান কাঁধের ঠিক নীচে গভীর ক্ষতচিহ্নটিকে দেখলেন। বহুকালের পুরোনো ক্ষত, এখন বাইরে আর যন্ত্রণা নেই, রক্তক্ষরণ নেই, যা রয়ে গেছে শুধু দাগ আর অন্তরের যন্ত্রণা। দীর্ঘ বছর ধরে এই দাগটিকে ব্লেক দিনে একবার করে অন্তত দেখেন। দেখেন আর পুরোনো এক ক্ষতকে অন্তরে জাগিয়ে রাখেন। আজও দেখলেন। একবার হাত বোলালেন, তারপর শাওয়ার চালিয়ে দিলেন।
সাল ১৯৯৫। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের শনিবার
আমার ছোটোবেলাটা আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো হলেও আমি টের পেতাম আমাদের পরিবারটা আমার বন্ধুদের পরিবারের থেকে একটু আলাদা। আমার বন্ধুর বাবারা সন্ধের মধ্যে বাড়ি ফিরে আসত আর আমার বাবার বাড়ি ফেরার কোনো সময় থাকত না। আমি আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে বাবাকে কখনো সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরতে দেখিনি। শুধু তা-ই নয়, রাতে বাবা কখন বাড়ি ফিরত সেটাও জানতে পারতাম না, আবার সকালেও এক-একদিন যখন ডিউটিতে বেরিয়ে যেত আমি তখন ঘুমিয়ে থাকতাম। আমাদের পরিবারটা আমি, মা আর বাবার হলেও বাবাকে পরিবারের সদস্য বলে আমার মনেই হত না, আমরা বেড়াতেও যেতাম না। আমার যখন ক্লাস এইট ততদিনে আমরা মাত্র একবার পুরী আর একবার রাজগির ঘুরতে গেছি। আর দুইবার চিড়িয়াখানা, একবার সার্কাস। শুধু তা-ই নয়, দুর্গাপুজোতেও আমি আর মা ঠাকুর দেখতে বেরোতাম কারণ বাবার তখনও ডিউটি থাকত। এইভাবেই বড়ো হচ্ছিলাম আমি মায়ের সঙ্গে। তবে বাবা যেদিন ছুটি পেত সেদিন বাবা শুধু আমাকে আর মা-কে নিয়ে থাকত। পুরো দিনটা পরিবারের সঙ্গে। সেদিন আমাদের বাড়ি সকালে লুচি খাওয়া হত টিফিনে, দুপুরে খাসির মাংস। সন্ধেবেলায় বাবা বাড়িতে তেলেভাজা বানাত, আমরা তিনজন আমের আচার দিয়ে মুড়ি-মাখা তেলেভাজা দিয়ে খেতাম। রাতে হত পরোটা আর মাংস। আমরা খুশি ছিলাম। আমার কষ্ট হলেও মেনে নিয়েছিলাম, আমার বাবা বন্ধুদের বাবাদের মতো চাকরি করে না, আমার বাবা একজন পুলিশ। আমি ছোটো বয়সে কে বড়ো পোস্টের পুলিশ আর কে ছোটো পোস্টের পুলিশ তা বুঝতাম না। খাঁকি রঙের ইউনিফর্ম মানেই পুলিশ এইটুকুই বুঝতাম। আমার বাবা বন্দুকধারী পুলিশ ছিল না, লাঠি-ধরা কনস্টেবল ছিল। বাবাকে জিজ্ঞাসা করতাম, বাবা তোমার পিস্তল কই? রাইফেল কোথায়? বাবা হাসত, বলত, আমার এই লাঠি দিয়েই সব বদমাশকে শায়েস্তা করে দিতে পারি। বাবা ছুটির দিনে আমাকে গল্প শোনাত। চোর-ডাকাত ধরার গল্প। বাবা কীভাবে দশজন ডাকাতকে লাঠি চালিয়ে কুপোকাত করে ফেলেছিল, লাঠি ছুড়ে কোন চোরের পা ভেঙে দিয়েছিল এইসব বীরত্বের কাহিনি হাঁ করে শুনতাম আর গর্বে আমার বুক ফুলে উঠত। মনে হত আমার বাবা হল একজন শিবাজি, একজন রানাপ্রতাপ। বাবার ছিল বদলির চাকরি। আমি যখন ক্লাস এইটে উঠলাম তখন বাবা বদলি হয়ে এল শহরের খুব কাছে একটি থানায়। জায়গাটা ছিল অদ্ভুত। সন্ধের পর মাঝে মাঝেই নিঝুম হয়ে যেত, রাস্তার লাইট নিভিয়ে দিত কারা, বোমা-গোলাগুলি চলত। বাবা যতক্ষণ না ডিউটি সেরে ফিরত, মা খুব দুশ্চিন্তা করত। বাবা হেসে বলত, ধুর, আমাকে কে মারবে? আমার কিছু হবে না। বাবা হেসে বলত বটে কিন্তু বাবার সেই হাসিতে তেমন কনফিডেন্স থাকত না। মা-ও দেখতাম, বাবার কথায় ভরসা পেত না, বরং বাবাকে বার বার বলত, তুমি এখান থেকে ট্রান্সফার নেওয়ার চেষ্টা করো। এই শহরের কাছে থাকতে হবে না। এর থেকে গ্রামে নিরাপদ।
বাবা বলত, না গো শিখা, গোটা রাজ্য জুড়ে আগুন জ্বলছে, গ্রাম-মফসসল-শহর সর্বত্র। একটা দল ভেঙে আরেকটা দল, সেটা ভেঙে আরও একটা, তারপর প্রত্যেকে প্রত্যেককে আক্রমণ করবে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না শিখা, বাচ্চা ছেলেগুলোর মাথা চিবিয়ে শেষ করে দিচ্ছে ধাড়িগুলো। থানায় একেকটাকে ধরে নিয়ে আসা হয়, ওদের মুখের দিকে তাকালে বুঝতে পারবে, দুনিয়াদারির কিছুই বোঝে না, কিন্তু সমাজবদলের ভুয়ো বুলি মগজে ঢুকিয়ে হাতে বোমা-পিস্তল ধরিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছে নেতাগুলো। কী? না শ্রেনিশত্রু খতম করো। এইভাবে কোনো বদল আসে? অন্তত ভারতবর্ষে আসে না। ভারতবর্ষ শান্তির দেশ। বাবা মা-কে আরও অনেক কথা বলত। আমিও শুনতাম, কিছু বুঝতাম, কিছু বুঝতাম না। তবে এইটুকু বুঝতাম আমাদের রাজ্যটায় খুব অশান্তি।— এতটা একটানা বলার পর থামল অর্ণব। গভীর শ্বাস ছাড়ল। টেবিলের ওপর রাখা কাচের গ্লাসটা হাতে নিয়ে পুরো জলটা খেয়ে নিল।
ডাক্তার সোম বললেন, আপনি ধীরেসুস্থে সময় নিয়ে বলুন অর্ণববাবু। কোনো তাড়া নেই। আরাম করে বসুন।
গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে গদিওয়ালা চেয়ারে হেলান দিল অর্ণব। জীবনে এই প্রথমবার নিজের ভেতরের কথাগুলো নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে বলছে ও। সুদীপের পরিচিত ডাক্তার নির্মাল্য সোম একজন নামকরা সাইকিয়াট্রিস্ট। কলকাতার চেম্বারে সপ্তাহে মাত্র একদিন বসেন। দেশে-বিদেশে প্রচুর পেশেন্ট। অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে মাস দুয়েক অপেক্ষা করতে হয়। সুদীপের তৎপরতায় সেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে গেছে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ামাত্র দু-দিনের ছুটি নিয়ে শহরে এসেছে। ডাক্তার দেখিয়ে অপর্ণার সঙ্গে একটা দিন কাটিয়ে আবার ফিরে যাবে চৌহাটিতে।
চেম্বারে আসার পর অর্ণব একটু অস্বস্তিতে ছিল, নিজের ভেতরে আটকে-রাখা গোপন কথাগুলো, যন্ত্রণাগুলো সে জীবনে কাউকে বলেনি, অনেক পরিচিত বন্ধুকেও না, সেখানে একজন অপরিচিত মানুষকে কথাগুলো বলা কি সম্ভব? সে কি আদৌ বুঝবে? অনুভব করবে? অনুভব করলেও রেহাই পাবার সন্ধান কি সে দিতে পারবে? এইসব প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খেত, আজও হয়তো বলতে পারত না, কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ডক্টর সোম জানেন, কীভাবে পেশেন্টের মনের কথা বাইরে নিয়ে আসতে হয়। অনেকক্ষণ ধরে নানা ধরনের গল্প করে তারপর একটা সময় অর্ণব নিজেই বলতে শুরু করল ওর কথা।
চেয়ারে হেলান দিয়ে অর্ণব বলল, আমি কথাগুলো আপনাকে বলছি দেখে নিজেই অবাক হচ্ছি। আমার অতি পরিচিত, ঘনিষ্ঠ কাউকেই আজ পর্যন্ত আমার ভেতরের কথাগুলো বলতে পারিনি। ইন ফ্যাক্ট, বলতে ইচ্ছে করেনি।
ডক্টর সোম বললেন, এমনটাই হয় মিস্টার বারুই। আমাদের ভেতরে এমন অনেক কথা থাকে যা আমরা নিজের খুব ঘনিষ্ঠ, পরিচিতকে বলতে না পারলেও সম্পূর্ণ অপরিচিতকে পরম নিশ্চিন্তে বলে ফেলতে পারি। আসলে মানুষের মন এমনই। সে চায় নিজের কষ্ট, আনন্দ দুঃখ যন্ত্রণা প্রকাশ করতে। কিন্তু কখনো ভয়ে, কখনো সংকোচে কিংবা অন্য কোনো কারণে সে বলে উঠতে পারে না। কিন্তু সেই কথাগুলো বলার জন্য সে গুমরে মরে। আপনার মধ্যে অনেক কথা জমে রয়েছে মিস্টার বারুই। কষ্টের কথা, যন্ত্রণার কথা। সেগুলো দীর্ঘকাল ধরে জমতে জমতে আপনার ভেতরে একটা ক্ষত তৈরি করে ফেলেছে, আপনি আজ সেগুলো বার করুন, দেখবেন, জীবন অনেক হালকা হয়ে যাবে, সহজ হয়ে যাবে।
অর্ণব ডক্টর সোমকে বলল, আমি একটু চা নিচ্ছি।
ওহ শিয়োর। প্লিজ।
অর্ণব যে সোফায় বসে রয়েছে তার সামনের টেবিলে চায়ের ফ্লাস্ক রাখা। কাপে ঢালল খানিকটা। সোমকে জিজ্ঞাসা করল— আপনাকে দেব?
না, আপনি খান।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অর্ণব আবারও বলা শুরু করল—
আমি এইভাবেই বড়ো হচ্ছিলাম ডক্টর। সময়টা খুব খারাপ সেটা আন্দাজ করতে পারতাম। আমি যে স্কুলে তখন পড়তাম সেই স্কুলের একজন স্যার খুন হয়ে গেলেন, তিনি নাকি কোন পার্টির সদস্য ছিলেন, তখন ওসব ভাবার, বোঝার বয়স কোনোটাই আমার হয়নি। তবে মা আমাকে আর বিকেলে মাঠে খেলতে দিতে যেত না। শুধু আমি নয়, আমার যারা বন্ধু ছিল তারাও স্কুল ছুটির পর বাড়িতে ঢুকে পড়ত, আর কোথাও বেরোত না। সন্ধেবেলা লোডশেডিং হয়ে যেত আর তারপরেই শুনতাম বোমার শব্দ। আমরা যে পাড়ায় ভাড়া থাকতাম, আমার বাড়ির সামনে ছিল সরু গলি। সেই গলি দিয়ে অনেক রাতে কারা যেন ধুপধাপ শব্দ করে ছুটে যেত। আমি ভয় পেতাম। মা ভয় পেত। বাবার যেহেতু ডিউটির কোনো সময় থাকত না, এক-একদিন বাড়ি ফিরত গভীর রাত করে। আমি ততক্ষণে ঘুমিয়ে কাদা। রাস্তায় খুব মিছিল হত, মিটিং হত। পুলিশের গাড়ি আসত। আমি ভাবতাম আমার বাবাও পুলিশ, তাই আমাদের কোনো ভয় নেই। কিন্তু একদিন... থমকে গেল অর্ণব। কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ করে মাথা নিচু করল। ডক্টর সোম আন্দাজ করলেন, পেশেন্ট এবারে আসল কথাটা বলতে চলেছে।
অর্ণব সশব্দে শ্বাস নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে মুখ তুলে বলল, সেদিন আমার জন্মদিন ছিল। চোদ্দো বছর বয়সের জন্মদিন। সেদিনও বাবা অফিস গেছিল, তবে বলেছিল, তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেই। সেদিন আমি স্কুলে গেছিলাম বাবার কিনে-দেওয়া জন্মদিনের নতুন জামা পরে। আমার জামার রংটা এখনও মনে রয়েছে, ঘন নীল রঙের। আমি খুব ফরসা ছিলাম ছোটোবেলায়, তাই বাবা আদর করে আমায় মাঝে মাঝে আমার ধলাব্যাটা বলে আদর করত।... ওইদিন আমার মা পায়েস বানিয়েছিল, মাংস বানিয়েছিল, বাবা বলেছিল, বাড়ি ফেরার সময়ে আমার জন্য আমার প্রিয় কমলাভোগ মিষ্টি নিয়ে আসবে। সেদিন আমার খুব আনন্দ ছিল মনে। বাবা তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে বলেছিল। বাবা সেদিন সত্যিই তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছিল। আমি এত খুশি হয়েছিলাম যে বাবা ফেরার সময় কমলাভোগ কিনতে ভুলে গেছিল সেই মন খারাপটুকুও হয়নি। মা বাবাকে জিজ্ঞাসা করছিল, কী হয়েছে তোমার? এত অস্থির হয়ে আছ কেন? বাবা চাপা গলায় মা-কে উত্তর দিয়েছিল, আজ এনকাউন্টার ছিল। খুব বড়ো অপারেশন। আর ভালো লাগে না এসব।
তোমাকে কেন ডাকে? তোমার তো বন্দুক নেই।
তাতে কী? এই লাঠি হাতে নিয়েই চেজ করতে হয়। আজ খুব বড়ো অ্যাকশন হয়েছে। বড়ো গ্যাং ছিল একটা। চারটে ছেলে আজ এনকাউন্টারে স্পট ডেড, আর কতদিন যে এইভাবে কত মায়ের কোল খালি হবে... কবে যে এই অশান্তি মিটবে! এই সরকারের আয়ু আর খুব বেশি দিন নেই, সাধারণ মানুষ আর বিশ্বাস করতে পারছে না এই সরকারকে। সেটা সরকারো বুঝেছে আর তাই যাওয়ার আগে মরণ কামড় দিয়ে যাচ্ছে।
মা শুনে বলল, তোমাকে বার বার বলি, তুমি চাকরি ছেড়ে দাও। দরকার নেই এমন চাকরির।
শুনে বাবা আবারও বলল, চাকরি গেলে খাব কী? সংসার চলবে কীভাবে? ছেলের পড়াশোনা।
ও ঠিক চলে যাবে। তুমি যেটুকু সঞ্চয় করেছ তা দিয়ে একটা দোকান-টোকান খুলবে। আর আমরা এখানে থাকব না। আমরা দেশের বাড়ি চলে যাব। বাবু এখনও ছোটো, তোমার যদি কিছু হয়ে যায়, আমি ছেলে নিয়ে কোথায় দাঁড়াব?
মায়ের কথা শুনে বাবা হেসে বলেছিল, আরে কিছু হবে না। গুরুদেবের কৃপায় এতগুলো বছর ফোর্সে কাটিয়ে দিলাম। আর তো ক-টা বছর। তারপর রিটায়ারমেন্ট। এখন চাকরি ছাড়লে কী করে হবে?
সেদিন রাতে আমি, মা আর বাবা তিনজনে একসঙ্গে বসে ভাত, ডাল, বেগুনভাজা, মুরগির মাংস আর পায়েস খেয়েছিলাম। তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল তখন কত রাত জানা নেই। দরজায় প্রবল আঘাত করছিল কারা। আমার ঘুম ভাঙার আগেই আমার মা আর বাবা উঠে পড়েছিল। উঠে দেখলাম, ঘরের মধ্যে মা আর বাবা নিচু গলায় কথা বলছে। মা কাঁদছে আর বাবাকে বলছে পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে। বাবা বলছে, পালানোর উপায় নেই। পিছনের দরজাও পাহারা দিয়ে রয়েছে ওরা। ঘরের মধ্যে ডিমলাইট জ্বলছিল আর ঘরের মধ্যে বাবা আর মা অস্থির হয়ে ছোটাছুটি করছিল। মা হাউমাউ করে কাঁদছিল। আমি পুরো হতভম্ব হয়ে বিছানার ওপর বসে ছিলাম। কী হয়েছে? কারা এইভাবে দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করছে, বুঝতে পারছিলাম না। শুধু এইটুকু বুঝতে পারছিলাম, আমাদের খুব বড়ো বিপদ।
বাবা মা-কে বলল, আমার আজ আর নিস্তার নেই শিখা। ওরা আজ আমাকে চিনে নিয়েছে। আমাকে ফলো করে এসেছে...। আমার কিছু হয়ে গেলে তোমরা আর এখানে থেকো না, বাবুকে নিয়ে দেশের বাড়ি চলে যেয়ো শিখা। আলমারিতে আমার কাগজগুলো ওরা আমাকে মেরে ফেলবে শিখা।
বাবা কথা বলতে পারছিল না, তোতলাচ্ছিল। বাবার দু-চোখে আমি ভয় দেখছিলাম, অন্যরকম ভয়। পরে বুঝেছি, সেটা মৃত্যুভয় ছিল।
তোমার কিছু হবে না। তুমি লুকোও।
কোথায় লুকোব এইটুকু ঘরে? আমি দরজা খুলছি।
না খুলবে না। খুলবে না তুমি, যাবে না তুমি... কিছু হবে না তোমার। বলতে বলতে মা বাবাকে জামাকাপড় রাখার আলনাটার পিছনে নিয়ে গিয়ে বলল, এখানে থাকো। বাবু, তোর বাবার ওপর জামাকাপড়গুলো চাপিয়ে দে।
আমি কাঁপছিলাম। প্রচণ্ড একটা ভয় আমাকে গিলে খাচ্ছিল। মা আমাকে এক ধাক্কা দিয়ে সংবিত ফেরাল। আমি হুড়মুড় করে উঠে আলনার পিছনে উবু হয়ে বসে-পড়া বাবার ওপরে বিছানার চাদর, বালিশ, আলনার অনেকগুলো জামাকাপড় চাপিয়ে দিলাম। পুরো ঘটনাটা ঘটল যদিও মাত্র মিনিট দুয়েকের মধ্যে কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল ধরে সময়টা চলছে। মা দরজা খুলতে যাওয়ার আগেই সামনের দরজায় দেওয়া খিল আর ছিটকিনি বাইরের ধাক্কায় খুলে গেল আর ভেতরে ঢুকে পড়ল কয়েকটা ছায়ামূর্তি।
তাদের মধ্যে কে একজন বলে উঠল, কোথায় শুয়োরের বাচ্চাটা?
মা ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দিল আর আমি দেখতে পেলাম পাঁচ-ছয়জন লোককে। তাদের তিনজনের হাতে অস্ত্র। একজনের হাতে পিস্তল আর অন্য দুজনের হাতে ভোজালি। আমি জীবনে এত কাছ থেকে এসব অস্ত্র দেখিনি। আমি ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছিলাম, আমার মা হাউমাউ করে কাঁদছিল। বার বার বলছিল, তোমরা আমার ছেলের মতো বাবা, ওর কোনো দোষ নেই, ওর কোনো বন্দুক নেই, ওর মন খুব নরম। এই যে আমার ছেলে... আজ ওর জন্মদিন... ক্লাস এইটে পড়ে... আমার মা আবোল-তাবোল বলছিল। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে শুধু কাঁপছিলাম। ওদের একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করল, তোর বাবা কোথায়?
আমার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।
কী রে শুয়োরের বাচ্চা, তোর বাবা কোথায় রে?
আজ এখনও ফেরেনি ওর বাবা... বিশ্বাস করো।
চোপ, একদম বাজে কথা বলবেন না। আমি নিজে সন্ধে থেকে গলির মুখে বসে অপেক্ষা করছিলাম, কখন শুয়োরের বাচ্চাটা বাড়ি ফিরবে। আমি নিজে চোখে বাড়িতে ঢুকতে দেখেছি।
মা কোনোমতে বলল, হ্যাঁ এসেছিল। দুটো খেয়েই আবার বেরিয়ে গেছে।
বাজে কথা... এই তোরা দেখ তো।
আমাদের মাত্র দুটো ঘর। লোকগুলো খাটের তলা, বাথরুম, রান্নাঘর কিছুই বাদ দিল না। আমি বার বার আলনার দিকে তাকাচ্ছিলাম। ওরা বাবাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে মা-কে আবারও জিজ্ঞাসা করল, সত্যি বলছেন, বাড়িতে নেই?
বিশ্বাস করো বাবা, ও আবার ডিউটিতে বেরিয়ে গেছে। তোমাদের হাতে-পায়ে ধরছি বাবা, ও মানুষটাকে কিছু কোরো না, দয়া করো।
দয়া! পুলিশ আমাদের দয়া করে? আপনার স্বামী আমাদের কখনো দয়া করে? আমাদের কমরেডদের এনকাউন্টার করতে, লকআপে থার্ড ডিগ্রি করতে? তখন মায়াদয়া কোথায় যায়? আজ আপনার স্বামী যে এনকাউন্টারে ছিল সে খবর আমাদের কাছে আছে। আজ শুয়োরের বাচ্চাটাকে আমরা ছাড়ব না। বলে একটা ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী রে, বাবা কখন এসেছিল? কোথায় গেছে?
আমার মুখ থেকে কোনো শব্দ বেরোল না, আসলে আমি বরাবরই একটু লাজুক, ইন্ট্রোভার্ট ছিলাম। কথা বলতাম কম, ভিতু ছিলাম, মন ছিল নরম, মুরগি কাটা তো দূর, জ্যান্ত মাছ কাটাও দেখতে পারতাম না, অত রক্ত আমার সহ্য হত না। আমি অশান্তি এড়িয়ে চলতাম। এতটুকু বলে থমকে গেল অর্ণব। তারপর আবার বলল, আমি কিছু বলার আগেই মা বলে উঠল, ওর আজ জন্মদিন, আমার ছেলেটা খুব শান্ত, খুব ভিতু। ওকে কিছু বোলো না বাবা! আমার মা কাঁদছিল আর আবোল-তাবোল বলে চলেছিল। একটা ছেলে মা-কে শাসাল, সত্যিই নেই? নাকি লুকিয়েছে? ঘরে কিন্তু আগুন লাগিয়ে দেব। এসব শ্রেণিশত্রু খতম করতে আমাদের এক মিনিটও লাগবে না।
লোকগুলো খাটের তলা, ঘরের বাঙ্কে উঁকি দিয়ে দেখল। জামাকাপড়ের আলনার পিছনটা গুরুত্ব দিল না। ফিরে যাচ্ছিল, যাওয়ার আগে একজন ফিরে তাকাল আমার দিকে। আমি তখন মা-কে জড়িয়ে কাঁপছি। কী রে, তোর বাবা কোথায়? তুইও বড়ো হয়ে পুলিশ হবি? পুলিশ? বাবা নেই বাড়িতে? সত্যি কথা বল, নইলে এটা দেখেছিস? হাতের ভোজালিটা উঁচু করে দেখাল লোকটা।
আর আমি... আমি ভয়ে কেঁপে উঠে যেই এক মুহূর্তের জন্য ওই আলনার দিকে তাকিয়েছি, লোকটা সেটা খেয়াল করে এগিয়ে গেল আলনার দিকে। আমার মা চিৎকার করে উঠল, ওদিকে নেই, ওদিকে কিছু নেই। একটানে কাঠের আলনাটা সামনে ফেলে দিতেই জামাকাপড়ের স্তূপের আড়ালে উবু হয়ে বসে-থাকা গেঞ্জি-পরা বাবা ধরা পড়ে গেল।
এ বিভাসদা, এ মাল এখানে লুকিয়ে আছে। এই দেখো। বলে বাবার চুলের মুঠি ধরে সামনে নিয়ে এল ওরা।
বাবা কাতর গলায় বলল, আমাকে ছেড়ে দাও।
মা ককিয়ে উঠল, ওকে মারবেন না, দয়া করুন, আমার ছেলেটা ছোটো, ও চাকরি ছেড়ে দেবে। আমরা চলে যাব।
চো-প। একদম চোপ। আমাদের কত কমরেডকে আপনার এই লোকটা গুলি করে মেরেছে, জানেন?
না ভাই, আমি কাউকে মারিনি। বিশ্বাস করো ভাই। পুলিশের ডিউটি করি কিন্তু কাউকে মারিনি। আমার ছেলের দিব্যি। আমার বন্দুক নেই।
চুপ শালা।
নেবু, টাইম নষ্ট করিস না। বলে ওদের দলের একজন বাবাকে পিছন থেকে চেপে ধরল, আর-একজন মুহূর্তের মধ্যে ভোজালি ঢুকিয়ে দিল পেটে। বার বার। আমি চিৎকার করতে গিয়েও পারলাম না, মা অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। আর আমি প্যান্টে পেচ্ছাব করে ফেলতে ফেলতে দেখলাম, বাবার গলায় আড়াআড়ি ছোরা টানছে আরেকজন। বাবার গলার নলি থেকে ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসছে ঘন লাল রক্ত। সাদা গেঞ্জিটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে, মেঝেতে গড়িয়ে নামছে। আমি দেখলাম, বাবার চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে। বাবার হাত একটু কাঁপল, তারপর স্থির হয়ে গেল। পিছনে চেপে ধরে-থাকা লোকটা বাবাকে ছেড়ে দিল। মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে গেল বাবা।
লোকগুলো হাত উঁচু করে স্লোগান দিল, ইনকিলাব জিন্দাবাদ। শ্রেণিশত্রু নিপাত যাক। বলে একজন কতকগুলো লিফলেট বাবার গায়ের ওপর ছড়িয়ে দিল। তারপর চলে গেল, আমি ঘরের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে রইলাম। মেঝের মধ্যে বাবার লাল রক্তের সঙ্গে মিশছিল আমার প্যান্ট থেকে গড়িয়ে-পড়া পেচ্ছাব। আমার গোটা শরীর কাঁপছিল আর আমি... আচমকা আমি বিড়বিড় করে ভূগোল-পড়া মুখস্ত আওড়াতে শুরু করেছিলাম, ওটা কেন করেছিলাম, আমি আজও জানি না। এতটা বলে আবারও থামল অর্ণব। এবারে ও মৃদু হাঁপাচ্ছে। ঘেমে উঠেছে। ডাক্তার সোম শুনছেন।
জানেন ডক্টর, বাবাকে ওইভাবে চোখের সামনে খুন হতে দেখে ওই রাতের মধ্যে আমি বড়ো হয়ে গেছিলাম। আমাকে এক লাথি মেরে কে যেন একবেলার মধ্যে অনেকগুলো বছর এগিয়ে দিল। বাবার সৎকার থেকে শুরু করে বাবার অফিসে ছোটাছুটি। মা-কে পুলিশ বিভাগে চাকরি অফার করা হয়েছিল, মা নেয়নি, আমার জন্য নেয়নি। কারণ মা আমাকে সর্বক্ষণ আঁকড়ে রাখতে চেয়েছিল। আমরা শহর ছেড়ে চলে গেছিলাম মায়ের দেশের বাড়ি মানে আমার মামাবাড়ি গলসিতে। আবার ওখানে স্কুলে ভরতি হলাম। মা আমাকে প্রতিমুহূর্তে আগলে রাখত। জীবন আবার নিজের নিয়মে ধীরে ধীরে থিতু হতে চাইছিল, কিন্তু আমি কিছুতেই আর আগের মতো রইলাম না। আমার ভেতরটা ওলটপালট হয়ে গেল। আমার মামা ছিল মায়ের মতোই শান্ত, ভালোমানুষ গোছের। মামিও তা-ই। আমার মামাতো ভাইটি আমার থেকে বছর পাঁচেকের ছোটো ছিল। আমাকে ভালোবাসত, দাদা—দাদা করে পিছন পিছন ঘুরত, কিন্তু আমার কাউকে ভালো লাগত না, জগতের কোনোকিছুই আমার ভালো লাগত না, সবকিছুর ওপর একটা রাগ, ঘৃণা জন্মেছিল। স্কুলে যেতে ইচ্ছে করত না, কারণ আমার পড়াশোনা ভালো লাগত না। কিছুই ভালো লাগত না। কারো কথা শুনতে ইচ্ছে করত না। মায়ের অবাধ্য হয়ে উঠছিলাম আমি। মা, মামা, মামি, স্কুলের বন্ধুবান্ধব সকলের সঙ্গে ঝগড়া করতাম। বন্ধুদের সঙ্গে অকারণে অশান্তি বাধিয়ে মারামারি করতাম। মারপিটের সময়ে আমার গায়ের জোর যেন অসুরের মতো হয়ে উঠত। নির্দয়ভাবে মারতাম। মেরে মুখ-চোখ ফাটিয়ে দিতাম। নিজেও অনেক সময় ক্ষতবিক্ষত হতাম। স্কুল থেকে বার বার কমপ্লেইন আসত। মা-কে স্কুলে ছুটতে হত। আমার সঙ্গে মায়ের অশান্তি হত। আমি যেন অপেক্ষায় থাকতাম, কখন কার সঙ্গে একটু গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ঝগড়া করব। আমার ওতেই আরাম ছিল। মা ঝগড়া করত, তারপর কাঁদত। একসময়ে মায়ের চোখে কোনো কারণে সামান্য জল দেখলেও যে আমি কেঁদে ভাসাতাম, সেই আমিই মা-কে আমার জন্য অপমানিত হতে দেখলেও, হাউমাউ করে কাঁদতে দেখলে আমার সামান্য অনুশোচনা, মায়াদয়া তো দূর, বরং একটা জান্তব তৃপ্তি লাগত। বাড়ির সকলে আমাকে ভয় পেত, স্কুলের বন্ধুরা আমাকে ভয় পেত, কেউ মিশতে চাইত না। আর সেটাই আমার ভালো লাগত, আমার ইচ্ছে হত, দুনিয়ার সকলে আমাকে ভয় পাক। আমার চোখে চোখ রাখলে কেউ ভয়ে পেচ্ছাব করে দিক। এইরকম হওয়ার জন্য আমার কাছে দুটো পথ খোলা ছিল। প্রথম পথটা ছিল অপেক্ষাকৃত সোজা, কোনো সমাজবিরোধী হয়ে-যাওয়া অথবা ফোর্সে জয়েন করা। আমি সমাজবিরোধীদের নিজের আত্মা থেকে ঘৃণা করতাম। ইচ্ছে হত, দুনিয়ার সব সমাজবিরোধী, সন্ত্রাসীকে কেটে টুকরো করে ফেলি। তাদের রক্ত দিয়ে স্নান করি। আমার ইচ্ছে করত, পৃথিবী থেকে সব টেররিস্ট, অ্যানার্কিস্টদের তারা যেই হোক-না কেন, তাদের যা খুশি আদর্শ হোক-না কেন, সবাইকে নৃশংসভাবে অত্যাচার করি, খুন করি। আমার গা চিড়বিড় করত। অস্থির লাগত। একবার পাড়ায় একটা চোর ধরা পড়ল, আমি তাকে এমন মার মারলাম যে চোরটা প্রায় আধমড়া হয়ে গেল। পাড়ার লোক চোরের থেকে আমাকে সামলাতে বেশি ব্যস্ত হয়ে গেল। আমি সন্ত্রাসবাদীদের, সমাজবিরোধীদের ঘৃণা করতাম, বিশেষ করে যারা রাজনীতির দোহাই দিয়ে মানুষ মারে তাদের আমি টিপে মারতে চেয়েছিলাম আর সেইজন্য একসময়ে ঠিক করলাম, আমি বাবার মতো পুলিশ ফোর্সে জয়েন করব। কিন্তু কনস্টেবল নয়। গ্র্যাজুয়েশনের পাশাপাশি পুলিশের চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম, প্রথমবারের পরীক্ষাতেই আমাকে পাশ করতে হবে। যেভাবেই হোক। সেটা অবশ্য হল না, কিন্তু হাল ছাড়লাম না। বছর দুয়েক দুনিয়ার সবকিছু ভুলে শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে অবশেষে পেয়ে গেলাম চাকরিটা। মায়ের কিংবা মামার একটুও ইচ্ছে ছিল না আমি পুলিশে জয়েন করি। কিন্তু আমি কারো কথায় তখন কান দিইনি। খুব মন দিয়ে ট্রেনিং শেষ করে যখন পোস্টিং পেলাম তখন মনে হল এবার আমার হাতের মুঠোয় পৃথিবী। ওহ তার আগে বলি স্বপ্নের ব্যাপারটা, ওটা শুরু হয়েছিল আমার বাবা মারা যাওয়ার প্রায় ছয়-সাত মাস পর থেকে। আচমকা একদিন রাতে স্বপ্নটা দেখলাম। ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠে বসেছিলাম। মা জড়িয়ে ধরেছিল আমাকে। সেদিন আর বাকি রাত ঘুমোতে পারিনি। মা-কে বলেছিলাম স্বপ্নের কথাটা। মা বলেছিল, ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু হল না। স্বপ্নটা বার বার ফিরে ফিরে আসতে থাকল। প্রথম প্রথম আমি ভাবতাম, হয়তো স্বপ্নটা আর খুব বেশি দিন থাকবে না। কিন্তু সে আমাকে ছাড়ল না।
ডক্টর সোম অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনাকে একটু ইন্টারাপ্ট করছি। মোটামুটি কতদিনের ইন্টারভ্যালে দেখতেন স্বপ্নটা? আর একই দৃশ্য দেখতেন কি? না কিছুটা আলাদা?
ইন্টারভ্যাল বলতে... ওই মাসে একবার কি দু-বার...কখনো তারও বেশি সময়। আর সব থেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হত, আমি যদিও কোনো বিষয়েই আনন্দ পেতাম না, কিন্তু যদি কোনো কিছু আমাকে একটু আনন্দ বা সুখ দিত তখনই বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ত স্বপ্নটা। আমাকে ছিঁড়েখুঁড়ে দিত। আমার সবচেয়ে বড়ো শত্রু হয়ে উঠল এই স্বপ্ন। আমি ওটার থেকে রেহাই পাবার জন্য একটা সময়ে রাতের পর রাত জেগে বসে থাকতাম, আমার কাছে একটা আতঙ্ক হয়ে উঠেছিল, কিন্তু স্বপ্নটা ধূর্ত মানুষখেকো বাঘের মতো অপেক্ষা করত, কখন আমার দুই চোখ ঘুমে বুজে আসবে আর সে আমার ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে ক্ষতবিক্ষত করবে। এই স্বপ্ন থেকে মুক্তি পাবার জন্য একটা সময়ে আমি কি না করেছি... কিছুতেই রেহাই মেলেনি। আমি পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছিলাম। সারাক্ষণ গায়ে বিষ-পিঁপড়ে কামড়ানোর মতো জ্বালা করত। মনের ভেতরে প্রতিহিংসার আগুন প্রতিনিয়ত ধিকিধিকি জ্বলত। আটের দশকের একেবারে শুরুতে যখন আমার হাতে সরকারি ক্ষমতা এল ততদিনে রাজ্য থেকে লিবার্টি পার্টির আন্দোলন মানে যারা আমার বাবাকে খুন করেছিল তারা অলমোস্ট নিভে গেছে, সামান্য কিছু বিক্ষিপ্ত ইনসিডেন্ট হচ্ছিল, তবে মেজর মুভমেন্টটা শেষ হয়ে গেছিল আর স্বদেশ পার্টিও বিধানসভা নির্বাচনে হেরে গিয়ে মেইন সোশ্যালিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া মানে এস.পি.আই.এম. ক্ষমতায় এসেছে। নতুন করে সব তৈরি হচ্ছে। আর আমি তখন সরকারি উর্দি পেয়ে নিজের জমানো আক্রোশ মেটাতে শুরু করে দিয়েছি। খুব কম দিনের মধ্যেই সমাজবিরোধী এবং পুলিশ দুই মহলেই আমার নাম বা বদনাম ছড়িয়ে পড়ল। আমি হয়ে গেলাম কুখ্যাত বারুই। লকআপের মধ্যে, কিংবা এনকাউন্টারে নির্বিচারে মারতাম অ্যান্টিসোশালদের। ওরা যত রক্তাক্ত হত, যত আমার থার্ড ডিগ্রিতে আর্তনাদ করত, আমার মন তত শান্তি পেত, তত আরাম পেত। আমার মনের ভেতরে একটা সংকল্প তৈরি হয়ে গেছিল যে যতদিন বাঁচব, সমাজের কীট এই অ্যান্টিসোশালদের মারব। তারা কে, কী চায়? কিচ্ছু জানব না, শুধু জঙ্গল পরিষ্কার করে যাব। একসময়ে এমন হল রক্ত মাখার নেশা লেগে গেল আমার। নির্বিচারে মারতে শুরু করলাম, সামান্য পকেটমারকেও মেরে আধমড়া করে দিতাম। এবারে ডিপার্টমেন্ট আর চুপ থাকল না, আমার এগেইন্সটে স্টেপ নেওয়া শুরু করল, প্রথমে আমার সিনিয়ররা মৌখিকভাবে বোঝালেন, তারপর শোকজ-বদলি, সাসপেন্ডও হলাম, কিন্তু তাতে আমার কিচ্ছু এসে গেল না। আমার জীবনটায় শুধু দুটো জিনিস ছিল— এক, ওই স্বপ্ন আর দুই, অ্যান্টিসোশালদের সাফ করা। আমি ভাবতাম, আমার বাবাকে নৃশংসভাবে খুন করেছিল যারা তার বদলা বুঝি আমি এইভাবেই নিতে পারব, আর ওই অভিশপ্ত স্বপ্নটা আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু গেল তো না-ই, উলটে আরও বেড়ে গেল। আমার মা আমাকে নিয়ে চিন্তায় থাকত, কিন্তু কথা বিশেষ বলত না আমার সঙ্গে। চুপ হয়ে গেছিল। আমি চাকরি পাবার পর আর কিছুদিন মাত্র মামাবাড়িতে ছিলাম, তারপর মা-কে নিয়ে অন্যত্র চলে আসি। আমি বুঝতাম, মায়ের আমার সঙ্গে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমি মা-কে ছাড়িনি। যেখানেই আমার পোস্টিং হয়েছে, মা-কে সঙ্গে নিয়ে গেছি আর মা-ও আমাকে ছাড়েনি, সব জায়গায় আমার সঙ্গে থেকেছে। আসলে যতই দূরত্ব বাড়ুক, আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারতাম না, কোথাও একটা আগলে রাখতাম, কারণ আমাদের দুজনের আর কেউ ছিল না। আমার যখন প্রায় তিরিশ বছর বয়স তখন মা বিয়ের কথা বলল, আমি সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দিলাম।
কেন? বিয়ের ইচ্ছে বা প্রেম হয়েনি আপনার?
না, আমার মধ্যে কোনো ভালোলাগার অনুভূতি নেই, অন্তত... বলে একটু থামল অর্ণব। তারপর কথাটাকে শুধরে নিয়ে বলল, অন্তত অপর্ণা আমার জীবনে আসার আগে আমার মধ্যে কোনো ভালোবাসার অনুভূতি ছিল না।
অপর্ণা?
আমার স্ত্রী।
আচ্ছা। মানে তারপরে আপনি বিয়ে করেন।
হ্যাঁ, অনেকটা বেশি বয়সে।
কেন করলেন?
উত্তরটা দেওয়ার আগে আবার একটু থামল অর্ণব। সামান্য হেসে বলল, আমার পুরো জীবনটাই চূড়ান্ত মেলোড্রামাটিক ডক্টর। অনেকটা বচ্চন-মিঠুনের সিনেমার মতো। আমি তখন তালবাগান থানায় পোস্টেড, মাস চারেক হল এসেছি। মা-কে হারিয়েছি মাস আষ্টেক আগেই। একদিন অনেক রাতে বাড়ি ফিরে দেখলাম, দরজা নক করলেও মা এসে খুলছে না। কয়েকবার ধাক্কাধাক্কি করে শেষে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখলাম, মা বাথরুমে পড়ে রয়েছে, আমি বুঝতে পেরেছিলাম মা আর নেই, হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, ডাক্তার জানালেন, প্রায় ছয় ঘণ্টা আগেই মা চলে গেছেন। সিভিয়ার অ্যাটাক, হয়তো ওই সময়টায় ঘরে কেউ থাকলে মা-কে বাঁচাতে পারতাম। আমি পুরো একা এবং ঝাড়া হাত-পা হয়ে গেলাম। রাতে যেটুকু ঘুম হত, মা চলে যাওয়ার পর সেটুকুও চলে গেল। আরও নিয়মছাড়া জীবন। দুইবেলা ভাত বেড়ে দেওয়ারও কেউ রইল না। বাড়িতে খাওয়ার পাটও চুকিয়ে দিলাম। এক, একদিন রাতে বাড়ি ফিরে আকণ্ঠ মদ খাবার পর... বুঝলেন ডক্টর, কান্না পেত, গলায় আঙুল দিয়ে বমি করার বদলে জোর করে কাঁদতাম। রাস্তার কুকুরের মতো সুর করে কাঁদতাম। আমি অনুভব করতাম, আমি একা হয়ে গেছি, পুরো একা। এক, একরাতে এমনও হয়েছে, বাড়ি ঢুকে আবারও বেরিয়ে গেছি, সারারাত একা একা ঘুরেছি এদিক-ওদিক। আমি আরও ছন্নছাড়া আর ভায়োলেন্ট হয়ে যাচ্ছিলাম। তালবাগান থানায় আমার সঙ্গে পরিচয় হল সুদীপের। আমার কলিগ। আমাকে সব জায়গায় কলিগরা একটু অ্যাভয়েড করত, আমারও কারো সঙ্গে মিশতে ভালো লাগত না। কিন্তু সুদীপ কেন জানি না আমাকে ভালোবাসল, খুব দ্রুত আমার বন্ধু হয়ে উঠল। আর আমিও কেন জানি না কীভাবে সুদীপকে বন্ধু বলে মেনে নিলাম, ওকে বিশ্বাস করলাম, ভরসা করলাম। হতে পারে, আমি নিঃসঙ্গতায় কষ্ট পাচ্ছিলাম কিন্তু নিজের কাছে সেটা স্বীকার করিনি। আর ওই সুদীপের নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বটা আমাকে খানিকটা বিশ্রাম দিত। আমি ওকে আমার নিজের কথা বলতাম। সুদীপ ও তার স্ত্রী দুজনেই আমার খুব কাছের আত্মীয় হয়ে উঠেছিল। আমাকে বিয়ে করার কথা বলত। আমি এড়িয়ে যেতাম। কারণ নিজের জীবন নিয়ে আমার কোনো ভাবনা ছিল না, কোনো আশা, স্বপ্ন কিছুই ছিল না। আমার একটাই লক্ষ্য ছিল, যতক্ষণ বেঁচে থাকব সমাজের কীটগুলোকে মেরে নিজের জ্বালা জুড়োব। নিজেকে নিয়ে আমার যেহেতু কোনো ভাবনা ছিল না, আছি আছি নেই নেই এমন ব্যাপার তাই বিয়ে, সংসার এসব নিয়ে কখনো ভাবিনি। কিন্তু ওই যে কপালে যদি লেখা থাকে... একদিন রাতে খবর এল, কিছু মেয়েকে পাচার করা হচ্ছে। তখন প্রায় রাত এগারোটা। আমি আর সুদীপ দুজনেই টিম নিয়ে বেরোলাম। আমাদের সোর্স যে ভ্যানের নাম্বার দিয়েছিল সেটাকে চেজ করে একটা পয়েন্টে আটকালাম আমরা। মোট সাতজন মেয়ে ছিল। সকলের বয়স পনেরো থেকে পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। থানায় নিয়ে এলাম সকলকে। বিহার থেকে নেপাল হয়ে পুরো বাইরে পাচার করে দেওয়া হত ওদের। থানায় নিয়ে এসে মেয়েদের নাম-ঠিকানা নিয়ে সেইসব থানায় যোগাযোগ শুরু করলাম আমরা। ওদের মধ্যে একটি মেয়ে নিজের নাম বা ঠিকানা কিছুই বলতে রাজি নয়। আমার সন্দেহ হল, রাগও হল। বললাম, পুলিশকে সহযোগিতা না করলে হাজতবাস করতে হবে। মেয়েটি তাতেও চুপ। আমার অবাক লাগল, রাগও হল। সুদীপ বলল, তুই ছেড়ে দে, আমি দেখছি। মেয়েটিকে অনেকক্ষণ ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করল সুদীপ। মেয়েটি প্রথমে মুখ খুলতে চায়নি, কিন্তু সুদীপ মানুষের সাইকোলজি বোঝে খুব ভালো। মাথা ঠান্ডা করে জেরা করতে ওর জুড়ি নেই। মেয়েটা একসময় কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, ওকে বাড়িতে আর নেবে না। থানা থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর ও কোথায় যাবে জানা নেই।
আমরা ঠিক করলাম কোনো হোমে পাঠানো যায় কি না। মেয়েটি তাতেও রাজি নয়। জানা গেল, মেয়েটির সঙ্গে একটি ছেলের প্রেম ছিল, সেই ছেলে আসলে দালাল। মেয়েটির বাড়িতে কেউই ছেলেটিকে পছন্দ করত না, তাই একপ্রকার জোর করেই তার অন্যত্র বিয়ে ঠিক করা হয়। সামনের মাসেই বিয়ে। তখন ছেলেটা মেয়েটাকে বলে যে ওরা পালিয়ে বিয়ে করবে। ছেলেটি নিজের বাড়ি, পরিবার, কাজকর্ম সম্পর্কে যা যা মিথ্য বলেছিল সবটাই বিশ্বাস করেছিল মেয়েটি। তারপর এইসব কেসে যেমনটা ঘটে আর কী, এই ক্ষেত্রেও সেম ঘটনা। আমি আর সুদীপ মিলে আলোচনা করলাম। ঠিক করলাম, মেয়েটিকে বাড়িতেই নিয়ে যাব। ওখানে ওর অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে বুঝিয়ে ঘরের মেয়েকে ঘরে ফিরিয়ে দেব। কিন্তু পরে আমাদের মনে হল, এই কেসগুলো সব ক্ষেত্রে কাজ করে না। এমনও হয়েছে, উদ্ধার করা মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ার পর হয় মেয়েটি সুইসাইড করেছে অথবা বাড়ির লোকেই তাকে মানসিক ও শারীরিক টর্চার করে শেষ করে দিয়েছে। তাহলে উপায়? বুঝলেন ডক্টর, জীবনে সেই প্রথমবার আমি ওই মেয়েটির ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছিলাম। শুনলে হয়তো আপনার হাসি পাবে, মেয়েটির চোখ দুটো ছিল আমার মায়ের মতো করুণ আর ভয়ার্ত এবং একই সঙ্গে মায়াময়। আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম না এমন কেন ভাবছি, আমি জানতাম আমার মধ্যে একমাত্র ঘৃণা আর ক্রোধ ছাড়া অন্য কোনো অনুভূতি নেই, কিন্তু সেবার কী যে হল... সুদীপের সঙ্গে আলোচনা করলাম। সুদীপ মৃদু হেসে বলল, শোন তুই কি এই মেয়েটিকে নিয়ে একটু বেশি ভাবছিস?
আমি বললাম, সেরকম কোনো ব্যাপার না। আর মেয়েটা সত্যি বলছে কি না, সেটাও জানা নেই।
সুদীপ বলল, আমার একটা প্ল্যান রয়েছে, শুনবি?
কী?
মেয়েটাকে আমি এখান থেকে রিলিজ করিয়ে দুই দিনের জন্য আমার বাড়িতে নিয়ে যাই। হেনার সঙ্গে থাকুক। হেনা ওর সঙ্গে মিশে দেখুক, মেয়েটা যা বলছে সত্যি কি না, আর এর মধ্যে তুই আর আমি মেয়েটার বাড়ি গিয়ে দেখি পরিস্থিতি কেমন। এ যা বলছে তা সঠিক কি না।
আমি বললাম, আমার মন বলছে, মেয়েটা সত্যি বলছে।
হতে পারে, কিন্তু সেটা একবার যাচাই করে নেওয়া দরকার, বলল সুদীপ।
আমি তখন বললাম, সবটাই যদি ঠিক হয়, তারপর?
তারপর কী হবে? তখন দেখা যাবে। হোম-টোমের ব্যবস্থা করতে হবে।
যে ক'জন মেয়েকে রেসকিউ করা হয়েছিল তাদের ব্যবস্থা করা হয়ে গেল। কাউকে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হল, কারো আশ্রয় হল হোমে। আর আমি এবং সুদীপ রওনা হলাম মেয়েটির বলা ঠিকানায়। বাড়িটা শহর থেকে অনেকটাই দূরে। ট্রেনে ঘণ্টা তিনেক। তারপর ভ্যান রিকশা চেপে ধানখেতের পাশের কাঁচা রাস্তা দিয়ে পৌঁছোলাম। খড়ের চাল, মাটির বাড়ি। বাড়িতে মেয়েটির বাবা-মা, দাদা রয়েছে। বাবার সামান্য জমিজমা রয়েছে, আর খুব ছোটো একটা মুদির দোকান। ছেলেটি ইলেকট্রিশিয়ান। আমরা নিজের আসল পরিচয় দিলাম না, শুধু ঘটনাটা জানালাম, বললাম, মেয়েটি এখন পুলিশ কাস্টডিতে রয়েছে। শুনে মেয়েটির বাবা-মা এবং দাদা কেউই মেয়েকে ফেরাতে রাজি নয়, বলে, মেয়ে নিজের ইচ্ছেয় বেরিয়ে গেছে, আর তাকে ঘরে ঢুকতে দেবে না ওরা। ওই মেয়ে নষ্ট হয়ে গেছে, ঘরে ঢুকতে দিলে গ্রামের লোক আমাদের থাকতে দেবে না। আর ওই মেয়েকে আমরা বিয়েও দিতে পারব না। ও যেখানে গেছে যাক।
ওই কথাগুলো শুনে আমার তীব্র রাগ হচ্ছিল কিন্তু সুদীপ আমাকে মাথা ঠান্ডা রাখতে বলছিল বার বার। আর পরিবারটি যা বলছিল সেটা মন থেকেই। গ্রামে এমনটা হয়ে থাকে। কথায় কথায় যেটুকু বোঝা গেল— মেয়েটি স্বভাবে সহজ-সরল, ফলে ছেলেটির জালে ফেঁসে গেছে, এখন আর ফেরানোর উপায় নেই। কারণ গ্রামে তাদের থাকতে হবে। মেয়ের জন্য ভিটেমাটিছাড়া হতে তারা রাজি নয়।
আমি বললাম, কেন, মেয়ের অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দিন।
কে বিয়ে করবে ওকে? আপনি করবেন?
আমার কাছে এবং সুদীপের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর ছিল না। ওই বাড়ি থেকে আমরা বেরিয়ে এলাম।
ঠিক দুই দিন পর সুদীপ আমাকে আচমকা একটা কথা জিজ্ঞাসা করল, শোন, তুই কি মেয়েটাকে পছন্দ করছিস?
আমি একটু চমকে উঠেই ওকে পালটা জিজ্ঞাসা করলাম, এই কথা কেন জিজ্ঞাসা করছিস?
কারণ আমি তোকে কিছুটা হলেও চিনি।
তাহলে এটাও নিশ্চয়ই বুঝিস যে আমার মধ্যে মায়া-ভালোবাসা, পছন্দ ইত্যাদি বলে কিছু নেই।
আছে আছে, তুই সেটা নিজের কাছে অস্বীকার করিস। না থাকলে এতটা তুই আসতিস না। আর আমিও তোকে পরীক্ষা করার জন্যই এখানে আসার প্রস্তাবটা দিয়েছিলাম।
কী বলতে চাইছিস তুই? জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
দেখ, সোজা কথা বলছি, আমার মনে হয় তোর সংসার করা উচিত।
তুই খুব ভালো করেই জানিস ওসব আমার জন্য নয়।
সেটা তুই নিজেকে বুঝিয়ে রেখেছিস, কিন্তু আসল কথা হল তোর সত্যিই একজনকে দরকার যে তোকে ভালোবাসবে, তোর কেয়ার করবে।
আমার মধ্যে এমন কিছু নেই যার জন্য আমাকে ভালোবাসা যায়, আমার নিজের মধ্যেও ওসব কোনো ফিলিং নেই। আর আমার জীবনেরও কোনো ঠিক নেই।
তোর এই বেপরোয়া ভাবটা এবার কিন্তু একটু কমানো দরকার। অনেক হয়েছে। এইভাবে কোনো মানুষ বাঁচতে পারে না।
বেঁচে তো রয়েছি। আর মরলেই বা কার কী এসে আয়? তবে যদ্দিন বাঁচব, সমাজের কীটগুলোকে টিপে টিপে মারব।
শোন অর্ণব, তোর টিপে টিপে মারাটা কিন্তু পাগলামোর পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। তোর একটু শান্ত হওয়া দরকার।
আমার কী আছে বল?
দেখ, বাবা-মা সশরীরে না থাকলেও তাদের আশীর্বাদ রয়েছে, তোর প্রতি তাদেরও কিছু স্বপ্ন ছিল, সেটাকে তুই অসম্মান করতে পারিস না। অপমান করতে পারিস না। নইলে পরপারেও তাঁরা কষ্ট পাচ্ছেন।
সুদীপের ওই কথাটায় আমি থমকে গেলাম। আমি আবারও ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুই কী বলতে চাইছিস, স্পষ্ট করে বল।
কী বলতে চাইছি সেটা না-বোঝার মতো বোকা অর্ণব বারুই নয়, তুই মেয়েটাকে বিয়ে কর।
কী পাগলের মতো বকছিস! আমি আর বিয়ে!
কেন নয়? একটা কথা ভেবে দেখ, মেয়েটাকে যেটুকু দেখেছি তাতে মনে হয়েছে ভালো, দেখতে-শুনতেও মন্দ নয়, হেনাও বলছে মেয়েটা সত্যিই ভালো এবং সহজ-সরল। আমার মন বলছে, তুই সুখী হবি। তোদের দুজনেরই এতে ভালো হবে। আচ্ছা তুই এক কাজ কর, আজ রাতে আমাদের বাড়িতে খেতে আয়, তখন সামনাসামনি কথা হবে।
আমি মাঝে মাঝেই সুদীপের বাড়িতে রাত্রে খেতে যেতাম। সেদিনও গেলাম। মেয়েটি মানে অপর্ণাকে সেদিন হেনা নিজের শাড়ি-টাড়ি পরিয়ে সাজিয়ে রেখেছিল, দেখতে মন্দ লাগছিল না। সুদীপ আর হেনা মেয়েটিকে নিশ্চয়ই আগে থেকে কিছু বলে রেখেছিল... একটানা এতটা বলার পর একটু থামল অর্ণব। আবার জল খেল, তারপর সোমকে জিজ্ঞাসা করল, আমি বোধহয় একটু বেশিই ডিটেলিং-এ চলে যাচ্ছি, আপনি বোর হচ্ছেন, আপনার সময় নষ্ট করছি।
একটুও সময় নষ্ট হচ্ছে না। আপনার যতটা বলার ইচ্ছে ততটাই বলুন, এতটুকুও বাদ দেবেন না। আমি পুরোটাই শুনছি এবং মন দিয়ে শুনছি। বলে সিগারেট ধরালেন সোম। অর্ণবকে অফার করলেন। অর্ণব নিল, যদিও ও স্মোকার নয়, তবে আজ একটা খেতে ইচ্ছে করছে।
সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে মৃদু কেশে বলল, সেদিন আচমকাই আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল ডক্টর। কী করে, কেন রাজি হলাম কিছুই জানি না। কোনো উত্তর ছিল না আমার কাছে। অপর্ণাকে শুধু একটা কথা বলেছিলাম, আমার সঙ্গে কারো থাকতে পারা কঠিন, আপনি আমাকে দুই দিনের বেশি সহ্য করতে পারবেন না।
তার উত্তরে মেয়েটি এমন অদ্ভুত একটা কথা বলল... বলল, আপনি আর কতটা খারাপ হতে পারেন? আমি জীবনের সব থেকে খারাপ মানুষটিকে দেখে ফেলেছি। আমার আর সহ্য-অসহ্য বলে কিছু নেই। তবে আমি একজন নষ্ট হয়ে-যাওয়া মেয়ে। আপনি আমাকে সহ্য করতে পারবেন কি না সেটা ভেবে দেখবেন।
বিশ্বাস করুন ডক্টর, আমার সার্ভিস জীবনে অনেক কনফেশন আমি শুনেছি। ভালো-মন্দ সত্যি-মিথ্যে অনেক কথা শুনে থাকি। কিন্তু মেয়েটির ওই সামান্য কথাটুকু আমাকে... কেমন যেন করে দিল। মনে হল, আমি বহু যুগ এমন স্পষ্ট সত্যি কথা শুনিনি। এই মেয়েটিকে আমার বন্ধু হিসেবে দরকার। এই মেয়েটির আমাকে দরকার। আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। ওই সুদীপ আর হেনাই ব্যবস্থা করল। ওদের বাড়িতেই বিয়ে হল, উকিলের সামনে কাগজে সই আর একজোড়া রজনিগন্ধার মালা। রাতে চারজনের রান্না হেনা করেছিল। হেনা আর সুদীপ বলেছিল, আমি সুখী হব। আমি নিজেও হয়তো খানিকটা বিশ্বাস করেছিলাম। আজ আপনাকে একটা কথা বলছি ডক্টর, যা আমি আজ পর্যন্ত নিজের কাছেও স্পষ্টভাবে স্বীকার করিনি, বিয়ে করার আরও একটা কারণ ছিল, আমি ওই দুঃস্বপ্নটা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম, আমি ভেবেছিলাম, হয়তো আমার জীবনটা বদলে গেলে ওই অভিশপ্ত স্বপ্নটাও চলে যাবে... কিন্তু আমার জীবনটাই তো অভিশপ্ত ডক্টর।
স্বপ্ন গেল না?
না। সে ফিরল, এবং ফিরল বিয়ের দিন দুয়েক পর অন্যভাবে। বলে একটু থামল অর্ণব।
সোম চুপ করে অপেক্ষা করতে থাকলেন অর্ণবের জন্য।
অর্ণব সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে অ্যাশট্রেতে ঠুসে দিয়ে ধীরে ধীরে বলল, বিয়ের ঠিক দু-দিন পর আমি যখন অপর্ণা মানে আমার স্ত্রী-র সঙ্গে রাতে শারীরিকভাবে প্রথমবার ঘনিষ্ঠ হলাম, সুখের একেবারে চূড়ান্ত মুহূর্তে আমার দুই চোখের সামনে আচমকাই ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই স্বপ্নের দৃশ্য... সেই ভয়ংকর দৃশ্যটা, আমি শিউরে উঠে অপর্ণার কাছ থেকে সরে গেলাম। অপর্ণাও হতবাক, আমার কী হল? আমি সেদিন কেঁদে ফেলেছিলাম, কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার মুক্তি নেই, আমার জীবনে কোনো আনন্দ, কোনো সুখ নেই, থাকতে পারে না। অপর্ণাকে সেদিন কিছু বললাম না, দিন দুয়েক পর আবার যখন একই মুহূর্ত এল, তখনই আবার চরম মুহূর্তে সেই সেই দৃশ্য। একজন মধ্যবয়স্ক মানুষকে কয়েকজন মুখ-ঢাকা লোক চেপে ধরে নৃশংসভাবে কুপিয়ে মারছে এবং একটি কিশোর বিস্ফারিত চোখে কাঁপতে কাঁপতে তার বাবাকে খুন হতে দেখছে, সে চিৎকার করার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না, কারা যেন তার গলা চিপে ধরেছে। এতদিন দৃশ্যটা ছিল স্বপ্নে, আধো তন্দ্রায়। বিয়ের পর থেকে সেই দৃশ্যটা শুধু আর স্বপ্নেই রইল না, আমার জাগরণেও হানা দিতে থাকল। অপর্ণার সঙ্গে কাটানো যেকোনো সুখের মুহূর্তে, তা সে শারীরিক সুখ হোক কিংবা দুজনে মিলে কাছেপিঠে কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া, অথবা একসঙ্গে কোনো সিনেমা দেখতে বসলেও আচমকা হায়নার মতো আক্রমণ করতে থাকল দৃশ্যটা। আমি জাস্ট পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। অপর্ণার সঙ্গে কোনো সুখের মুহূর্ত আমি আর কাটাতে চাইছিলাম না, ভয় হতে থাকল। আমার মনের ভেতর অপরাধবোধ খোঁচাতে থাকল, মনে হতে থাকল, আমি ওকে বঞ্চিত করছি, ওর জীবনটাও নষ্ট করছি। কিন্তু অপর্ণা ভারী অদ্ভুত, জানেন ডক্টর। ও আমার মতো একটা আধা মানুষ-আধা জানোয়ারকে এতটাই ভালোবেসে ফেলল যে আমার মধ্যে এত অপদার্থতা থাকা সত্ত্বেও আমার প্রতি ওর ভালোবাসা বলুন, মায়া বলুন, একটুও কমল না, বরং দিনে দিনে আরও আমাকে আঁকড়ে ধরল। প্রথমে ভেবেছিলাম মেয়েটার কোনো চালচুলো নেই, আমার কাছে থাকলে ওর নিরাপদ একটা জীবন হবে এইজন্যই বুঝি আমাকে খাতির করছে, ভালোবাসার অভিনয় করছে, কিন্তু সেই ভাবনাটা আমার ভুল ছিল ডক্টর, আমি বুঝতে পারলাম এই মেয়ে পুরোটাই ভালোবাসা দিয়ে তৈরি, সহজ-সরল বিশ্বাস আর ভালোবাসা। তাই এদের খুব সহজে ঠকানো যায়, আবার নিশ্চিন্তে ভরসাও করা যায়। আমার শুকিয়ে কাঠ হয়ে-যাওয়া জীবনটা আবার একটু একটু করে ভিজে আর নরম হয়ে উঠছিল কিন্তু এই স্বপ্নটা, ওই দৃশ্যটা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে ডক্টর। অনেক বছর আমি সহ্য করেছি, অনেক লড়াই করেছি, কিন্তু আর পারছি না, আপনি দয়া করে আমাকে মুক্তি দিন...
শেষের লাইনগুলো বলার সময় গলা ভেঙে গেল অর্ণবের। ওর মতো কঠিন মানুষও আজ অসহায় হয়ে ভিক্ষা চাইল ডক্টর সোমের কাছে।
সোম অর্ণবের কাছ থেকে পুরো ইতিহাস শুনলেন, ওর চাকরিজীবনে বারংবার বদলি, সাসপেনশন, শোকজ, ক্রিমিনালদের প্রতি ওর চূড়ান্ত ঘৃণা হেতু নির্মমতা সবকিছু শুনলেন। তারপর ফ্লাস্ক থেকে নিজের জন্য এক কাপ আর অর্ণবের জন্য এক কাপ চা ঢেলে ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে অর্ণবকে বললেন, আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি এত সুন্দরভাবে গুছিয়ে আপনার নিজের কথা বললেন। কোনো চিন্তা করবেন না, আপনি পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবেন।
সত্যি হব?
হ্যাঁ, হবেন। থ্যাঙ্ক গড যে আপনি কিছুটা দেরিতে হলেও ডক্টরের কাছে এসেছেন। আমাদের দেশে মনের অসুখটাকে কেউ অসুখ বলে গ্রাহ্য করে না, অথচ শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনেরও যে কখনো অসুখ হয়, তারও যে চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে সেটা কেউ ভাবেই না। সুদীপ আমাকে আপনার সম্পর্কে কিছুটা বলেছিল, পুরোটা আপনার মুখে শুনলাম, ভরসা রাখুন, ঠিক হয়ে যাবেন।
কথাগুলো বলতে বলতে ডক্টর সোম নিজের ডায়েরিতে খচখচ করে বেশ কিছু লিখলেন, তারপর প্রেসক্রিপশন লিখলেন এবং তারপর অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বললেন, শুনুন মিস্টার বারুই, শরীরের চিকিৎসায় যেমন মেডিসিন কিংবা অস্ত্রোপচার লাগে, মনের অসুখে কিন্তু মেডিসিনই একমাত্র রেমিডি নয়, কিছু অভ্যাস, কিছু ভাবনাচিন্তা, কিছু জীবনযাত্রা পদ্ধতিতে বদল আনা প্রয়োজন। তাহলেই শরীরের মতো মনের অসুখও কেটে যাবে।
আমার এমনটা কেন হচ্ছে ডক্টর?
বলছি, তার আগে বলুন, আপনাদের মধ্যে বিয়ের পর থেকে শারীরিক মিলন কি একবারও হয়নি?
না হয়েছে, একেবারে হয়নি বলব না, এবং প্রতিবারই যে ওই বীভৎস দৃশ্যটা চোখের সামনে এসেছে তা নয়, কিন্তু আতঙ্কটা প্রতিবারই থেকেছে, ফলে আজ পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে আমি কোনোদিনই মিলিত হতে পারিনি, অনেক সময় ওই আতঙ্কের জন্যই আমি স্বাভাবিকভাবে জাগতে পারিনি, মানে ওকে সামান্য জড়িয়ে ধরতেও আমার ভয় করে, মনে হয়, আবার বুঝি ওই দৃশ্যটা আমার চোখে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমি রাতে জেগে থাকি, ঘুম এলেও ঘুমোতে ভয় লাগে, এইভাবে বছরের পর বছর কাটিয়ে আমি ক্লান্ত ডক্টর, বিশ্বাস করুন, আর আমি পারছি না। ভেবেছিলাম, এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেই আমার মুক্তি ঘটবে, কিন্তু অপর্ণা আমার জীবনে আসার পর আমি আর মৃত্যুর কথা ভাবতে পারি না, মনে হয় আমার বাঁচা প্রয়োজন। অন্তত অপর্ণার জন্য বাঁচাটা প্রয়োজন।
গুড। আর ইস্যু নেওয়ার ব্যাপারে কিছু ভেবেছেন?
না, আমার অনিচ্ছার কারণেই ফ্যামিলি প্ল্যানিং হয়ে ওঠেনি। আমি বুঝি, অপর্ণা একটা বাচ্চা চায়, কিন্তু মেয়েটা এমনই নিজে থেকে মুখ ফুটে কোনো ইচ্ছে, অনিচ্ছে কখনো বলে না, সবটাই আমার মতামতে সায় দিয়ে চলে। পাগল একটা! যেন আমার জন্যই ওর বেঁচে থাকা।
সোম অর্ণবের কথা বলার সময়ে মুখের এক্সপ্রেশন খুঁটিয়ে খেয়াল করছিলেন, স্ত্রী-র প্রতি শুধু গভীর ভালোবাসা, নির্ভরতা ফুটে উঠছিল চোখে-মুখে। এটা ভালো লক্ষণ।
এবার আমার কথাগুলো একটু শুনুন মিস্টার বারুই। বলে নিজের মতামত জানানো শুরু করলেন নির্মাল্য, আপনার ছোটোবেলা থেকে এখনও পর্যন্ত যা শুনলাম তাতে আমার মনে হয়েছে, অল্প বয়সে আপনি খুব শান্ত, নরম মনের ছেলে ছিলেন। এই ধরনের বাচ্চারা সাধারণত একটু বেশি সেন্সিটিভ হয়, নিজের চোখের সামনে বাবাকে ওইভাবে খুন হতে দেখে আপনার মনোজগতের সেটিংস পুরো ঘেঁটে যায়, ফলে আপনার ব্যক্তিত্ব যেভাবে গড়ে ওঠার কথা ছিল, ঠিক তার বিপরীত হয়ে ওঠেন আপনি। শান্ত ভালোমানুষ ছেলেটি হয়ে ওঠে ভায়োলেন্ট। পুরো মানসিক গঠনটা বদলে যায় আপনার। যেহেতু এত বড়ো একটা অন্যায়কে আপনি চোখের সামনে ঘটতে দেখেন, ফলে আপনার মনে সমাজের প্রতি একটা ঘৃণা, একটা মায়াহীনতা তৈরি হয়, বিশেষ করে সমাজবিরোধী যারা তাদের প্রতি আপনার একটা জিঘাংসা তৈরি হয়ে যায়। আর সেই প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্যই আপনার পুলিশ ফোর্সে জয়েনিং। কিন্তু বাবাকে চোখের সামনে খুন হতে দেখার দৃশ্য আপনাকে এতটাই শক দিয়েছিল যে আপনি কিছুতেই তাকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারেননি, বা ভুলতে চাননি। আপনি খানিকটা জোর করেই নিজের জীবনের সমস্ত সুখ, ভালোবাসা, আনন্দর মতো ভালো অনুভবগুলোকে নির্বাসন দিয়ে মনেপ্রাণে একজন অনুভূতিহীন, বিবেকহীন প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু আমাদের মনস্তত্ত্ব কী বলেন জানেন মিস্টার বারুই, একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব বা চারিত্রিক গঠন ওই সাত-আট বছরের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায়, মানে বেসিক কাঠামোটা। আর আপনার বেসিক কাঠামোটা একজন ভালো অনুভূতিশীল মানুষের, কাজেই পরিস্থিতির শিকার হয়ে আপনি নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করলেও আপনার বাইরেটা বদলাল, ভেতরটা কিন্তু বদলাল না, আপনি ভেতরে ভেতরে ভালোবাসার খিদে নিয়েই বেঁচে রইলেন, আর ক্রিমিনালদের শাস্তি দেওয়ার অছিলায় নিজেকে অত্যাচার করে এক ধরনের স্যাডিস্টিক প্লেজার পাবার চেষ্টা করে চললেন। আপনি নিজেকে বোঝাতেন আপনি একজন অমানুষ, কিন্তু আপনার অন্তরাত্মা কোনোদিনই সেটা মেনে নেয়নি, তাই যখন সত্যি সত্যিই কেউ হৃদয় দিয়ে আপনাকে বোঝার চেষ্টা করেছে, বন্ধু হতে চেয়েছে, তার কাছে আপনি নিজেকে মেলে দিয়েছেন তা কখনো সুদীপ, কখনো অপর্ণা। আসলে অল্প বয়সে বাবাকে ওইভাবে হারিয়ে ফেলার জন্য আপনার ভেতরে যে স্নেহ, মমতা, ভালোবাসার একতা তীব্র অভাববোধ তৈরি হয়ে গেছিল, ওদিকে মা-কেও আপনি দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন, ফলে সেই ভ্যাকুয়ামটা রয়েই গেছে আজও।
আমি কী করব ডক্টর?
বলছি, সব বলছি। প্রথমত, আপনাকে প্রথমে যেটা বুঝতে হবে তা হল, আপনি সমাজ থেকে ক্রিমিন্যাল সাফ করার যে পদ্ধতিটি নিয়েছেন তা ভুল। ওইভাবে একটা একটা করে মেরে আপনি ক-টা ক্রিমিনাল সাফ করবেন? দেশে আমার-আপনার থেকে সমাজবিরোধীর সংখ্যা অনেক বেশি, আর অসাধু, খারাপ ব্যক্তি তো শুধু চোর, গুন্ডা, খুনি, ধর্ষকরা নয়, দেশটা যারা চালাচ্ছে তারা হচ্ছে আসল নাটের গুরু, তাদের অঙ্গুলিহেলনেই কখনো আপনার বাবা খুন হন, কখনো কারো মা-ভাই, বোন, দাদা-দিদি, বন্ধুবান্ধব। কাজেই যদি লড়তেই হয় তাহলে কোনো ব্যক্তি নয়, আপনি সিস্টেমটার বিরুদ্ধে লড়ুন, এবং পেশিশক্তি দিয়ে নয়, বুদ্ধি দিয়ে, মগজ দিয়ে। নিজেকে বোঝান যে আপনার উদ্দেশ্য ভালো কিন্তু পদ্ধতি সঠিক নয়, কাজেই মাথা ঠান্ডা করে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে বাঁচিয়ে লড়তে হবে। ক্ষুদিরাম এবং গান্ধীজি দুজনেই দেশকে ভালোবাসতেন, দুজনেই মহৎপ্রাণ, দুজনেই শ্রদ্ধার কিন্তু ক্ষুদিরাম দেশকে স্বাধীন করার যে পদ্ধতি নিয়েছিলেন তাতে আবেগ বেশি, আগুপিছু ভাবনা কম ছিল তাই তার মতো একজন বিপ্লবীকে আমরা অকালে হারিয়েছি, শহিদ নয়, তার থেকে বেশি প্রয়োজন বেঁচে থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো যেটা গান্ধীজি করেছিলেন, আপনিও তা-ই করুন। এতে যেটা হবে, আপনার মন শান্ত হবে, আপনি সমাজ থেকে নিজেকে যে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন সেটা অনেক স্বাভাবিক হবে, ফলে সাধারণ নির্দোষ, ভালোমানুষদের সঙ্গেও আপনার যোগাযোগ বাড়বে, পৃথিবীতে শুধুই তো খারাপ লোক নেই, ভালোর সংখ্যাও তো কম নয়, তাদের সঙ্গে মেশাটা জরুরি। খোলা মনে মিশুন মিস্টার বারুই। আপনি বিশ্বাস করুন আপনি একজন সৎ পুলিশ অফিসার, একজন ভালো বন্ধু, একজন কেয়ারিং অ্যান্ড অ্যাফেকশনেট হাজব্যান্ড। এবং আপনিও সৌভাগ্যবান, অপর্ণাদেবীর মতো একজন ভালোমানুষকে স্ত্রীরূপে পেয়েছেন। পৃথিবীর অনেক ভালো ঘটনা এমন অ্যাক্সিডেন্টালি ঘটে যায় মিস্টার বারুই, যেমন আপনার বিয়ে। নিজের এমন সুন্দর একটা বিবাহিত জীবন চুটিয়ে উপভোগ করুন, আপনার বয়স প্রায় চল্লিশের কাছে, তো ঠিক আছে, বছরখানেকের মধ্যে আপনি পুরোপুরি নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে ফ্যামিলি প্ল্যানিং করুন।
কিন্তু স্বপ্নটা?
ওটা ম্যাজিক্যালি কমবে না মিস্টার বারুই, মনের অসুখ পেটের অসুখের মতো নয়, যে ওষুধ খেলেই দুই দিনের মধ্যে কমে যাবে। একটু সময় দিতে হবে। আপনি নিজের জীবনযাত্রা, নিজের ভাবনাচিন্তাগুলোকে বদলে ফেলুন— দেখবেন, ওসব স্বপ্ন নিজে থেকেই উধাও হয়ে যাবে। অন্ধকারকে ঠেলে সরানো যায় না, আলো জ্বালালে অন্ধকার নিজেই উধাও হয়ে যায়। একেবারেই স্বপ্নটা নিয়ে আর ভাববেন না, কোনো জোরাজুরি নয়। রিল্যাক্স। এভরিথিং উইল বি অলরাইট। আমি আপাতত দুটো ওষুধ দিচ্ছি, একটা ঘুমের, আরেকটা অ্যাংজাইটি কমানোর। এর ফলে কিছুদিন ডিজিনেস থাকবে, তারপর ঠিক হয়ে যাবে। আপনি এক মাস পর আমাকে জানাবেন।
আচ্ছা ডক্টর, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে উঠতে যাচ্ছিল অর্ণব। ডক্টর সোম বললেন, ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?
অনেক ছোটোবেলায় করতাম।
বুঝেছি, জোর করে বিশ্বাস ফেরানো যায় না, তবে একটু মেডিটেশন, একটু স্পিরিচুয়াল বইপত্র যদি ঘাঁটাঘাঁটি করেন তাহলে মন দ্রুত শান্ত হবে।
অর্ণব মৃদু হেসে বলল, আমাদের চাকরিতে মন শান্ত রাখা যায় না ডক্টর।
জানি, তবে আমি যে শান্তির কথা বলছি সেটা আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন।
হ্যাঁ, আমি চেষ্টা করব, আপনাকে আবারও অনেক ধন্যবাদ ডক্টর। আমি অনেক রিল্যাক্স বোধ করছি। আশা করছি, আমি কাটিয়ে উঠতে পারব।
অবশ্যই পারবেন।
অর্ণব চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে এল। ফিজ আগেই রিসেপশনে জমা করে দিয়েছিল। চেম্বার থেকে দুই কদম এগোলেই ওষুধের দোকান। প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে ওষুধগুলো নিয়ে খুব বড়ো করে শ্বাস নিল অর্ণব। জীবনে এই প্রথমবার ওর মনে হল, ওর জীবনে ভালো কিছু ঘটতে চলেছে। সুদীপের মতো নিঃস্বার্থ বন্ধু, অপর্ণার মতো স্ত্রী রয়েছে ওর পাশে, ও একা নয়।
সাল ১৯৯৫। ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মঙ্গলবার
শুকদেব ছাড়া পেয়েছে স্যার। থানায় ঢুকে অর্ণবকে বলল নন্দ।
কে শুকদেব?
শুকদেব মাহাতো— স্যার, এক সময়ের মুক্তিবাদী পার্টির নেতা ছিল, আজ থেকে বছর পনেরো আগে রাজ্যের প্রতিটা মানুষ এর নাম জানত, অনেক মানুষ মেরেছে একসময়। এই বুরুলিয়ায় একসময় ওরই রাজত্ব চলেছে। বড়ো টিম ছিল ওর। অনেক বড়ো হাত ছিল। ওর টিকি কেউ ছুঁতে পারত না। তারপর আচমকাই ম্যাজিকের মতো সেইসব হাত একদিন সরে গেল। শুকদেবের টিম ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল পুলিশ। শুকদেব গেল লকআপে। তারপর কিছুদিন বিচার চলার পর সোজা যাবজ্জীবন। আজ দেখলাম, ওর ভিটের সামনে বসে রয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম। বলল, কাল ছাড়া পেয়েছে। একবার দেখবেন নাকি স্যার?
হুম। বলল অর্ণব। শুকদেব নামটা শোনা-শোনা মনে হচ্ছে। ওই সময়টায় পশ্চিমবঙ্গে মুক্তিবাদী পার্টি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। মূলত গ্রামাঞ্চলগুলোতেই ছিল এদের কার্যকলাপ। পশ্চিমবঙ্গ এবং দক্ষিণের কয়েকটি রাজ্যে মুক্তিবাদী পার্টির বেশ রমরমা ছিল। মূলত গ্রামের দাবিদাওয়া, বঞ্চনা ইত্যাদি নিয়েই এই পার্টিটি তৈরি হয়েছিল, তবে ওই লিবার্টি পার্টির মতো এটিও সশস্ত্র আন্দোলনের পথ নিয়েছিল বলে খুব বেশি দিন এগোতে পারেনি। শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়া হয়েছিল কয়েক বছরের মধ্যেই। অবশ্য অর্ণব জানে, কোনো আন্দোলন একবার জন্ম নিলে তার ডি. এন. এ. নষ্ট হয় না, কোনো না কোনোভাবে থেকেই যায়।
আজ কৃষ্ণলাল আসেনি, গতকাল থেকে ওর শরীরটা খারাপ। আজ ছুটি নিয়েছে। এদিকে গোপালও এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে গেছে নিজের বাড়িতে।
নন্দর কথা শুনে ভুরু কোঁচকাল অর্ণব। জিজ্ঞাসা করল, বাড়িটা কোথায়?
গ্রামের মাঝেই স্যার, ওই খাঁ পুকুরটা আছে না, তার পাশে। অবশ্য বাড়ি আর কোথায়? একটা ভাঙা ঘর। প্রায় দশ বছর ধরে এমনিই পড়ে রয়েছে, ওই ঘরে সাপখোপ ছাড়া আর কিছু আছে নাকি?
কেন? শুকদেবের পরিবার নেই?
ছিল স্যার, বউ-ছেলে সবই ছিল। কিন্তু শুকদেব জেলে যাওয়ার পর এই বছর আষ্টেক আগে ওর বউটা অন্য একজনকে বিয়ে করে ছেলে নিয়ে এই ঘর ছেড়ে কোথায় চলে যায়। কে আর পেটে কিল দিয়ে আজীবন পড়ে থাকবে, বলুন স্যার? বাচ্চাটারও তো ভবিষ্যৎ রয়েছে।
হুঁ, কী দেখলে তুমি?
আমি ওই দেখলাম, ভাঙা ঘরের দাওয়া পরিষ্কার করছে। মনে হয়, এখানেই থাকবে। আপনি একবার দেখবেন নাকি স্যার?
দেখব।
তবে যা চেহারা হয়েছে, চিনতে পারবেন না স্যার। এতগুলো বছর জেলের ভাত খেয়ে আর কিছু নেই। আগুন পুরো নিভে গেছে।
ঠিক আছে। তুমি এখানে থাকো। আমি একবার বেরোচ্ছি। ওই ঘরটা কোথায় বললে?
স্যার, আপনি একদম খাঁ পুকুরের পশ্চিম ঘাটে চলে যান। ওখানে একটা ছোটো জঙ্গলমতো রয়েছে। ওর মুখেই একটা আধভাঙা ছোটো ঘর।
ঠিক আছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে চলে আসব।
একটু তাড়াতাড়ি আসবেন স্যার, আপনি ফিরলে আমি যাব কেষ্টদার বাড়িতে আপনার দুপুরের খাবারটা আনতে।
হ্যাঁ ঠিক আছে। বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল অর্ণব। এখন নিজের এলাকা ওর মুখস্থ হয়ে গেছে। এখন এখানে বেশ ঠান্ডা পড়ে গেছে। রাতে কম্বল চাপা দিয়েও শীত করে। বুরুলিয়া মালভূমি অঞ্চল। এখানে শীত বা গ্রীষ্ম দুটোই চরম। এখন বেলা দশটা। ঝকঝকে রোদ্দুর, কিন্তু ভালোই ঠান্ডা হাওয়া। কিছুটা যাওয়ার পরেই অর্ণবের মনে হল একবার বড়িমার কাছে যাওয়া উচিত। একটা ধন্যবাদ জানানোর রয়েছে। বড়িমার ঘরটা যাওয়ার পথেই পড়ে। ঘরের সামনে এসে বাইক থামাল অর্ণব। বড়িমা উঠোনে একটা পিঁড়ি পেতে বসে রয়েছে। গায়ে-মাথায় কম্বল জড়ানো। অর্ণবকে সামনে দেখে চেনার চেষ্টা করল।
বড়িমা, আমি থানার দারোগাবাবু।
হ্যাঁ বাবা, বুঝেছি, আসলে চোখে এখন ঠাওর করতে একটু সময় লাগে। বয়স তো কম হল না।
তবে বড়িমা, আপনি যতটা নিজেকে বুড়ি ভাবেন ততটা বুড়ি মোটেও নন।
শুনে খুনখুন করে হাসল বড়িমা। দাঁতগুলো দোক্তাপাতার কারণে খয়েরি। না গো ছেলে, কালে কালে অনেক গড়াল।
কত বয়স হল তোমার?
আর বয়স... নিজের বাপের দেওয়া নামটাই মাঝে মাঝে ভুলে যাই, কিছুই মনে থাকে না। ওই যেবার খুব ঝড় হল, নদীর জল গাঁয়ে ঢুকে গেল, অনেক গোরু-বাছুর মরল, সেই বছর...
বেশ বেশ বুঝেছি, বলছি যে আপনার বিউলি ডালের বড়ি আপনার বউমার খুব ভালো লেগেছে, আপনাকে জানাতে বলেছে, সেটাই বলতে এলাম।
কথাগুলো জোর গলায় বললেও এবার ভালোমতো শুনতে পেল না বড়িমা। মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অর্ণব বুঝতে পারল, উনি কিছুই শুনতে পায়নি, তাই কানের কাছে প্রায় মুখ ঠেকিয়ে জোর গলায় একই কথা রিপিট করল।
এবার বড়িমা একগাল হেসে বলল, ভালো ভালো। আবার নিয়ে যেয়ো।
হ্যাঁ, আবার বাড়ি যাব যখন নিয়ে যাব। আমি যাই এখন।
বড়িমা হাতের ইশারায় অর্ণবকে দাঁড়াতে বলল। তারপর টুকটুক করে ঘরের ভেতর থেকে নিয়ে এল দুটো লাল বাতাসা আর এক ঘটি জল।
বৃদ্ধার এই সামান্য আয়োজনের আতিথেয়তাটা খুব ভালো লাগে অর্ণবের। সাধ্য কম কিন্তু তার মধ্যেও কোনো অতিথিকে তা সে যে-ইই হোক-না কেন, কখনো খালি মুখে ফেরায় না। ওর বাতাসার স্বাদ যেন একটু বেশিই মিষ্টি, ওঁর ঘটির জল যেন একটু বেশিই পিপাসা মেটায়।
জল-বাতাসা খেয়ে অর্ণব আবার বাইক স্টার্ট দিল। এবার গন্তব্য শুকদেবের ঘর।
পুকুরের পাশ দিয়ে শুকদেবের ঘরের সামনে পৌঁছে বাইক থামাল অর্ণব। এই জায়গাটার আশপাশে তেমন ঘরবাড়ি নেই। আগাছায় ভরে রয়েছে জায়গাটা। লোকজনের আনাগোনা তেমন হয় না বোঝাই যায়। ঘর না বলে মাটির ঘরের ভগ্নস্তূপ বলাই ভালো। দালানের বাঁশ পচে মচকে গেছে, ছাদের টিনের একপাশ ঝুলছে, মাটির দেওয়াল অযত্নে ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় ধসে গেছে। ঘরটাকে পুকুরের পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় খানিকটা নজরে আসে ঠিকই তবে একঝলক দেখলেই বোঝা যায় ঘর সমেত জায়গাটা পরিত্যক্ত।
অর্ণবকে বাইক থেকে নামতে দেখে ঘরের সামনের উঠোনে উবু হয়ে বসে আগাছা সাফ করতে থাকা মানুষটা উঠে দাঁড়াল।
অর্ণব খুব দ্রুত ওর অভিজ্ঞ চোখজোড়া বুলিয়ে জরিপ করে নিল লোকটাকে। শুকনো তালপাতার সেপাই চেহারা। কালো গায়ের রং। খুদে খুদে চুল কাঁচা-পাকা। লম্বাটে তোবড়ানো মুখ, চোখের কোল গর্তে বসা। পরনে একটা ময়লা শার্ট আর লুঙ্গি। পায় চটি নেই।
অর্ণব সামনে এসে জিজ্ঞাসা করল, তুমি শুকদেব?
লোকটা নিঃশব্দে একবার ঘাড় সামান্য ঝাঁকাল।
কবে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছ?
কাল।
এখানে কেন এলে?
আমার ঘর এটা।
জেলে যাওয়ার আগে একা থাকতে?
না, বউ-বাচ্চা ছিল, চলে গেছে।
কোথায়?
জানি না।
এখানে থাকবে?
হ্যাঁ, কোথায় আর যাব?
হুম। বলে এক মুহূর্তের জন্য চুপ করল অর্ণব। তারপর বলল—শোনো শুকদেব, আমি অর্ণব বারুই। চৌহাটি থানা এখন আমার আন্ডারে। একটু খোঁজখবর নিয়ো আমার সম্পর্কে, তাহলেই জানতে পারবে আমি কেমন লোক। তোমার রেকর্ড আমার জানা। কাজেই এখানে থাকলে ভদ্রলোকের মতো থাকবে, নইলে কপালে চরম দুঃখ রয়েছে।
অর্ণবের শাসানিতে শুকদেবের কোনো ভাবান্তর হল না। সেটাই স্বাভাবিক। এত বছর জেল খাটার পর কারো চোখরাঙানি আর বিশেষ ভয় জাগায় না। অনেক কিছু ভোঁতা হয়ে যায়। তবে শাসানি দিলেও অর্ণব শুকদেবের অবস্থা দেখে বুঝতেই পারছিল, নন্দ ঠিকই বলেছে, এর আগুন পুরোপুরি নিভে গেছে, আর জ্বলে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এখন কী কাজ করবে ভেবেছ?
জানি না, দেখি।
হুম। যা বললাম, মনে থাকে যেন।
শুকদেব আবারও নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। এক সময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা যার নির্দেশে আগুন জ্বলে উঠত দাউদাউ করে, লাশ পড়ে যেত একের পর এক। যার জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকাতেও ভয় পেত তাবড় তাবড় মানুষ, আজ তার নিজেরই চোখের দৃষ্টি মরা মাছের মতো। আগুন তো দূরের কথা, ভালো করে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও নেই। জেল ওর বিষদাঁত ভেঙে দিয়েছে। এখন পুরোপুরি ভেজিটেবল। সব থেকে বড়ো কথা, যে আন্দোলনের নেতা হয়ে এর উত্থান সেই আন্দোলনই কবে ধুয়ে-মুছে গেছে। অন্য কিছু রাজ্যে চোরাগোপ্তা মুক্তিবাদী পার্টির কিছু বিচ্ছিন্ন ক্রিয়াকলাপের খবর পাওয়া যায় বটে তবে তা নজরে পড়ার মতো কিছু নয়।
অর্ণব ওখান থেকে সোজা চলে এল জগবন্ধু আশ্রমে। প্রভু জগবন্ধুর সঙ্গে ওর বিশেষ কিছু কথা রয়েছে।
আজও সেই আলাপকক্ষেই জগবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে বসেছে অর্ণব। সঙ্গে রয়েছে দুলাল। অসীম আজ অন্য কাজে ব্যস্ত। আশ্রমে এসে সরাসরি জগবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে পারেনি অর্ণব। আগে দুলাল এসে কথা বলেছে, তারপর সে গিয়ে জগবন্ধুকে খবর দিয়েছে, তারপর জগবন্ধুর সম্মতিতে মিলেছে দেখা এবং কথা বলার সুযোগ।
আলাপকক্ষে প্রায় মিনিট দশেক অপেক্ষা করার পর জগবন্ধু দুলালের সঙ্গে এলেন। দু-চার কথার পরই জগবন্ধু অর্ণবকে বললেন, আপনি আপনার যে সমস্যার কথা আমাকে বলতে এসেছেন তা নিশ্চিন্তে দুলালের সামনেই বলতে পারেন। ও আমারই একটি অংশ।
অর্ণব সামান্য চমকে উঠল, জগবন্ধু মানুষের মন পড়তে পারেন নাকি? অবশ্য এই ধর্মগুরুরা মনস্তত্ত্ব খুব ভালো বোঝেন। সেটাই তাঁদের অন্যতম বিজনেস ক্যাপিটাল।
অর্ণব এবার সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এল। বলল, প্রফেশনাল স্ট্রেসের ফলে ওর কনসেনট্রেশন একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, রাতে দীর্ঘদিন একেবারেই ঘুম হয় না, ফলে শারীরিক সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। ডাক্তার ওকে পরামর্শ দিয়েছেন মেডিটেশন করার জন্য এবং স্পিরিচুয়াল বিষয় নিয়ে একটু চর্চা করার জন্য তাই জগবন্ধুর কাছে সাহায্য চাইতে এসেছে।
জগবন্ধু শুনলেন। নিজের কপালে একবার হাত ছোঁয়ালেন, তারপর গম্ভীর হয়ে একবার হুম বলে চোখ বন্ধ করলেন। যেন কিছু ভাবতে শুরু করলেন। আর ঠিক তখনই দুলাল বলে উঠল, দেখুন অর্ণববাবু, আপনি যদি প্রভুর শিষ্য হতে চান তাহলে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আগামী পূর্ণিমার দিনে প্রভু দীক্ষা দেবেন, আপনি চাইলে ওইদিন নিতে পারেন।
অর্ণব বলল, না মানে দীক্ষার ব্যাপারটা এখনই ভাবছি না, সমস্যাটা হল আমি ঈশ্বরে একেবারেই বিশ্বাসী নই, ইন ফ্যাক্ট ধর্মকর্মেও নয়, তাই আমার পক্ষে ধ্যান ইত্যাদি করা কি সম্ভব, সেটাই জানতে চাইছি।
জগবন্ধু বললেন, হ্যাঁ সম্ভব, ঈশ্বর আর আধ্যাত্মিকতা সমার্থক নয়, আধ্যাত্মিকতার একটি অংশ হলেন ঈশ্বর বা ব্রহ্ম— যে যেমন ভাবেন, আপনি ঈশ্বরে অবিশ্বাসী হলেও এই প্রকাণ্ড মহাবিশ্বকে তো বিশ্বাস করেন। এই অনন্ত বিশ্ব যে এক প্রবল শক্তিতে চলছে সেটা তো মানেন?
হুঁ, সেই এনার্জিকে তো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
তাহলেই হবে। বলে একটু চুপ থেকে জগবন্ধু বললেন, চোখ বন্ধ করে আমার সঙ্গে বলুন, ওম তৎ সৎ।
অর্ণব তা-ই বলল।
জগবন্ধু বললেন, যেটা বললেন তার মানে জানেন?
না।
ওম হল পরমাত্মার সর্বোত্তম নাম। আর তৎ-এর অর্থ কর্মফলের বাসনা ত্যাগ করে ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা। এবং সৎ—যজ্ঞ, তপস্যা ও সত্যনিষ্ঠতার সঙ্গে জীবনযাপন করা। অর্থাৎ পরমাত্মার নাম নিয়ে কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পণ করে যজ্ঞ, তপস্যা, দানাদির মাধ্যমে সত্যনিষ্ঠ জীবনযাপন করার সংকল্পই ওম তৎ সৎ।
সাতসকালে এত ভারী ভারী জ্ঞানের কথা শুনতে মোটেও ভালো লাগছিল না অর্ণবের। ওর প্ল্যান অন্য। শুধু বলল, আচ্ছা।
জগবন্ধু মৃদু হেসে বললেন, আপনার অন্তরে খাঁটি বস্তু রয়েছে, শুধু অব্যবহারে ধুলোবালি পড়ে ঢেকে গেছে, তাকে পরিষ্কার করে তুলুন। অনেক বড়ো কিছু করার জন্য আপনি এসেছেন। আমি উঠি, আপনি দুলালের সঙ্গে বাকি কথা বলে নিতে পারেন।
অর্ণব হাতজোড় করে প্রণাম জানাল।
জগবন্ধু ডান হাত তুলে বললেন, ওম তৎ সৎ।
দুলাল অর্ণবকে চুপ থাকতে দেখে বলল, আপনিও বলুন।
অর্ণব বলল, ওম তৎ সৎ।
জগবন্ধু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
অর্ণব নিজের মনে একটা কথা স্বীকার করল, এই ব্যক্তির মধ্যে কিছু একটা আলাদা পাওয়ার রয়েছে। উনি সামনে এলে, কথা বললে একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়, ওর উপস্থিতিটাই আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো নয়, অন্যরকম। সব থেকে আকর্ষণীয় জগবন্ধুর চোখ। যেমন গভীর তেমনই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। বেশিক্ষণ তাকিয়ে কথা বলা যায় না। চোখ সরিয়ে নিতে হয়।
জগবন্ধু বেরিয়ে যাওয়ার পরেই দুলাল বলল, আপনি সৌভাগ্যবান অর্ণববাবু, প্রভু আপনাকে এতটা সময় দিলেন, উনি এতটা ব্যস্ত মানুষ, তারপরেও এতক্ষণ সময় এবং কথা খরচ করছেন শুধু আপনার জন্য— এটা আপনার সুকৃতির ফল।
অর্ণব বলল, ওই যে উনি বলে গেলেন, আমার মধ্যে খাঁটি বস্তু রয়েছে, সেইজন্যই হয়তো।
সূক্ষ্ম রসিকতাটা ধরতে পারল না দুলাল, বলল, হ্যাঁ উনি মানুষরূপী ঈশ্বর। মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি এসেছেন।
কিন্তু মানুষ কি সেটা বোঝে?
সাধারণ মানুষ তো অজ্ঞ, আর বিশেষ করে যারা শাসক তারা চিরকাল প্রভুকে শেষ করে দিতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি।
তা-ই!
কেন, আপনি জানেন না? প্রভুর ওপর একটা সময় কত অত্যাচার করা হয়েছে, কতবার প্রাণহানির চেষ্টা করা হয়েছে।
অর্ণব একেবারেই কিছু জানে না তা আদৌ নয়, কিন্তু কিছুই জানে না এমন ভাব করে বলল, সে কী! নাহ আমার এই ব্যাপারে কিছুই জানা নেই। কারা হত্যার চেষ্টা করেছিল?
কারা আবার? চিরকাল মহাপুরুষদের ওপর যারা অত্যাচার করে এসেছে সেই শাসকরাই। যিশু খ্রিস্ট থেকে শুরু করে শ্রীচৈতন্য, কার ওপরে শাসকদলের আঘাত এসে পড়েনি বলুন? আমাদের প্রভুর ওপরেও শাসকের আঘাত এসে পড়েছে বারংবার, প্রভুকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে তারা, কিন্তু পারেনি।
শাসক বলতে কোন শাসক?
আমাদের রাজ্যের সোশ্যালিস্ট পার্টি এবং স্বদেশ পার্টি উভয়েই চেষ্টা করেছে।
আচ্ছা! ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো! শুনতে আগ্রহ হচ্ছে।
দুলাল অর্ণবকে জিজ্ঞাসা করল, হাতে সময় রয়েছে?
অর্ণব মৃদু হেসে বলল, চৌহাটিতে এসে থেকে শুধু ওই সময়টুকুই তো পেয়েছি। পুলিশের কাজ তো কিছু নেই।
অর্ণবের কথায় মুচকে হাসল দুলাল, হাসিটা অদ্ভুত রকমের অর্থবহ। বলল, বেশ। চৌহাটিতে এসে পড়েছেন মানে প্রভুর টানেই আপনি এসেছেন, হয়তো আপনার দ্বারা কোনো কাজ হবে বলেই তিনি এখানে এনেছেন আপনাকে। জয় গুরু, জয় গুরু। প্রভুর মহিমা অপার। এইটুকু বলে লম্বা শ্বাস নিল দুলাল, তারপর অর্ণবকে বলতে শুরু করল এক দীর্ঘ ইতিহাস। প্রভুর বাল্যকাল থেকে শুরু করে কীভাবে তিনি বহু ঝড়ঝাপটা সহ্য করে কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপোশ না করে মানবকল্যানের জন্য এই বিশাল আয়োজন গড়ে তুলেছেন তা খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করল দুলাল। ওর বলার স্টাইল থেকে অর্ণব বুঝতে পারছিল, এই ঘটনা দুলাল আগেও বহু মানুষকে শুনিয়েছে, সেইজন্য ওকে একবারও ভাবতে হয় না ঘটনাক্রমকে কীভাবে সাজাবে। প্রভু জগবন্ধুর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ভয় পেয়ে তৎকালীন স্বদেশ পার্টির সরকার কীভাবে জগবন্ধুকে পিষে মারার জন্য মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়ে সি.বি.আহ.z লাগিয়ে জেলে পুরেছিল এবং জগবন্ধুসহ তাঁর গড়ে-ওঠা এই সামাজিক আন্দোলনকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল, জেলের ভেতরেও কীভাবে জগবন্ধুকে কখনো বিষ খাইয়ে, কখনো দমবন্ধ-করা ঘরে রেখে, অখাদ্য-কুখাদ্য খাইয়ে শরীর অসুস্থ করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু কোনোভাবেই তাঁকে হত্যা করা যায়নি, চার বছর কারাবাস ভোগ করে অবশেষে ছাড়া পেয়েছিলেন জগবন্ধু। ফেরার পর দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে নিজের অসমাপ্ত কাজকে পূর্ণতা দিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, গড়ে তুললেন মস্ত সাম্রাজ্য।
গল্প শুনতে শুনতেই অর্ণবকে নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছিল দুলাল। বাগান পেরিয়ে সে অর্ণবকে নিয়ে গেল হেঁশেলের দিকে। প্রায় জনা কুড়ি সেবক রান্নায় ব্যস্ত। বিশাল বিশাল কড়াইতে রান্না হচ্ছে।
অর্ণব দুলালকে জিজ্ঞাসা করল, রোজই কি এমন রান্না হয়?
না, আজ মঙ্গলবার বলেই বড়ো আয়োজন হচ্ছে। আসলে প্রভু মঙ্গলবারে এই মর্তলোকে আগমন করেছিলেন, সেই কারণে প্রতি মঙ্গলবারে নরনারায়ণসেবার ব্যবস্থা করা হয়। গ্রামের মানুষ আসেন, ভোজন করেন।
বাহ, কখন হয়?
বেলা একটা থেকে তিনটে পর্যন্ত। আপনিও গ্রহণ করতে পারেন।
বেশ, অন্য একদিন নেব।
হেঁশেল ছাড়িয়ে গোশালা পেরোনোর পরেই উঁচু পাঁচিল। প্রথম যেদিন এসেছিল সেদিনও এই পাঁচিলটা দেখেছিল অর্ণব। দেখে আন্দাজ করা যায়, এটা আশ্রমের বাউন্ডারি নয়, ওপারেও কিছু রয়েছে। কিন্তু পাঁচিলটা এতটাই উঁচু যে ওদিকে কিছু দেখার উপায় নেই।
অর্ণব দুলালকে জিজ্ঞাসা করল, ওইদিকটায় কী আছে, একবার দেখা যাবে?
ওদিকে কিছু নেই।
কিন্তু এখানেই তো শেষ নয়। আশ্রমের মেইন বাউন্ডারি আরও কিছুটা পিছিয়ে। তা-ই না?
হুঁ, ওই ফাঁকা খানিকটা জমি রয়েছে। মাঝে মাঝে খেলাধুলো হয়। এইটুকু বলেই দুলাল প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, আপনি তাহলে আগামীকাল ভোরবেলায় চলে আসবেন। আর হ্যাঁ, অবশ্যই স্নান করে আসবেন।
আচ্ছা, আজ তাহলে আসছি।
নমস্কার, ওম তৎ সৎ।
আজ অর্ণবও বলল, ওম তৎ সৎ। তারপর থানার দিকে রওনা হল।
সাল ১৯৯৫। ডিসেম্বর মাসের শেষ রবিবার।
সময় মধ্যরাত। AN-২৫ এর পাইলট যতবার অ্যানাউন্স করছিল, ডেস্টিনেশন থেকে তারা আর কতটা দূরে রয়েছে ততবারই ব্লেকের রক্তচাপ বাড়ছিল। এতদিনের পরিকল্পনা, এত অর্থ, এত শ্রম এবং দীর্ঘদিন ধরে পুষে-রাখা অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার সময় এসেছে। আর মাত্র কিছুক্ষণ, তারপরেই পরিকল্পনামাফিক যাবতীয় অস্ত্র প্লেন থেকে বর্ষিত হবে বুরুলিয়ার জগবন্ধু আশ্রম থেকে কিছুটা দূরে ফাঁকা জমিতে। চুপ করে বসে ছিলেন ব্লেক। তার ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছিল। মনে মনে ইষ্টনাম জপ করছিলেন। বুলগেরিয়া থেকে অস্ত্র বোঝাই করে এই প্লেন ইরান, করাচি হয়ে বেনারসে ঢুকেছে। তারপর বেনারস বিমানবন্দরে দুই দিন কাটিয়ে আজ রাতে রওনা হয়েছে বুরুলিয়ার উদ্দেশে। চৌহাটিতে অস্ত্র ভরতি বাক্সগুলো ড্রপ করে কার্গোপ্লেনটি সোজা চলে যাবে কলকাতা। তারপর সেখান থেকে থাইল্যান্ড হয়ে করাচি। এই মুহূর্তে যে প্লেনটি আকাশে রয়েছে তার হদিশ ভারতীয় বিমানবাহিনীর পশ্চিমবঙ্গের কড়াইকুন্ডা এয়ারবেসের কাছেও নেই, তারা জানেই না একটি বিমান এখন পশ্চিমবঙ্গের আকাশে চক্কর কাটছে তাদেরই নাকের ডগা দিয়ে। তার কারণ কড়াইকুন্ডার রাডার মেইনটেনেন্সের ছুতোয় বন্ধ করে রাখা রয়েছে। ফলে রাডারে ধরা পড়ছে না এই বিমানের গতিপথ। এখন প্লেনের মধ্যে ব্লেক, পাইলট এবং ত্রুু মেম্বার-সহ মোট পাঁচজন রয়েছে। ব্লেক ছাড়া সকলেই লাটভিয়ান। এই পুরো ব্যবস্থাটাই করে দিয়েছে উইলিয়ম। সত্যিই কাজের লোক। নিজের পাওনাগন্ডা পাইপয়সায় বুঝে নেওয়ার ব্যাপারে যেমন পার্টিকুলার; সার্ভিসের ক্ষেত্রেও তেমনই পারফেক্ট। যা যা বলেছিল সব করে দিয়েছে। এবং যা কিছু ব্যবস্থা করে দিয়েছে কোনোটি ফ্রি-তে নয়। রিগাতে গিয়ে কার্গো প্লেনটিকে সরেজমিনে দেখে তা রিপেয়ারিং-এর ব্যবস্থা, কাগজপত্র তৈরি করানো এবং কাজ মিটে যাওয়ার পর যাতে প্লেনটি আবার বিক্রি করে দেওয়া যায় তার ব্যবস্থা পর্যন্ত পাকা করে দিয়েছে উইলিয়ম। তারপরেও ছিল এইসব অস্ত্রের জন্য উপযুক্ত প্যাকিং বক্স এবং প্যারাসুট কেনার ব্যাপার। উইলিয়মের পরিচিত একজন আর্মি অফিসার আর্মিদের জন্য ব্যবহৃত জিনিসপত্র কেনা বেচা করেন, তার থেকেই বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন প্যারাসুট কেনা হয়েছে। মোট পাঁচটা বক্সে সব অস্ত্র ভরা রয়েছে, প্রতিটা বক্সকে প্যারাসুটের সঙ্গে বাঁধা হয়েছে। এই প্যারাসুটগুলো অনেক বেশি ওজন বহন করার উপযুক্ত।
এয়ারড্রপের টার্গেট আরও কাছে এগিয়ে আসছিল। গয়া পার করার পর থেকেই পাইলট তার বিমানের আকাশপথের উচ্চতা কমাতে শুরু করেছিল। অবশেষে কাউন্টডাউন শুরু হল। লাটভিয়ান ত্রুু-দের নির্দেশমতো ব্লেক নিজের কোমরে একটা মোটা দড়ি বেঁধে তার অপর প্রান্ত কার্গোর একটা ধাতব হ্যান্ডেলের সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন। ব্লেকের হাতে ধরা একটা জি.পি.এস. ইউনিট, ওটায় এয়ারড্রপের টার্গেট প্রোগ্রাম করে রাখা আছে। গ্রিড রেফারেন্স ৮৬.১৯ ডিগ্রি পূর্ব এবং ২৪.১৮ ডিগ্রি উত্তর। গ্রিড রেফারেন্স কমতে থাকল। ওটা জিরো হয়ে যাওয়া মানেই ডেস্টিনেশনে চলে আসা। প্রত্যেক ত্রুু মেম্বার অপারেশনের জন্য তৈরি। এবারে প্লেন হু হু করে নীচে নামতে থাকল। মাটি থেকে ঠিক দেড় হাজার ফুট উচ্চতায় তখন কাউন্টডাউন জিরো হতেই কার্গো প্লেনের দরজা খুলে গেল। প্লেনের ভেতরটা হাওয়ার তোড়ে ওলটপালট করছে। তিনজন ত্রুু মিলে ঠিক বাইশ সেকেন্ডের মধ্যে প্রতিটা বাক্সকে পর পর ঠেলে নামিয়ে দিল নীচে। প্যারাসুটে ভাসতে ভাসতে মস্ত ফাঁকা জমির দিকে নামতে থাকল বাক্সগুলো। অপারেশন সাকসেসফুল! ব্লেক এবং বাকি তিনজন ত্রুু মেম্বার একে অপরকে বুড়ো আঙুল তুলে দেখাল।
স্বস্তির শ্বাস ছাড়লেন ব্লেক। আশা করি, প্রতিটা প্যাকিং বক্সই সঠিক স্থানে পৌঁছে যাবে। প্রতিটি বাক্সের ওজন আগে থেকেই ব্লেক জানিয়ে রেখেছিল, সেইমতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে নিশ্চয়ই।
গভীর শীতের রাতের নৈঃশব্দ্য চিরে কার্গো প্লেনটা যখন চৌহাটির একেবারে মাথার ওপর দিয়ে বিকট গর্জন করতে করতে চলে যাচ্ছিল তখন সেই দৃশ্যের চাক্ষুষ সাক্ষী থাকলেন শুধু চার-পাঁজন মানুষ। প্রভু জগবন্ধু, দুলাল, অসীম, মাঠে মলত্যাগ করতে আসা এক গ্রামবাসী সনাতন এবং আরও একজন।
এই কনকনে শীতের রাতেও আশ্রমে নিজের ভবনের ছাদে অসীম আর দুলালকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন জগবন্ধু। ছাদে টেবিলের ওপর রাখা রয়েছে একটা রেডিও সেট। রেডিয়োতে তিনি মাঝে মাঝে কারো সঙ্গে কথা বলছিলেন। প্লেনটা তীব্র গর্জন করে চলে যাওয়ার পরেই রেডিয়োর রিসিভার রেখে দিলেন এবং তাকালেন দুলাল আর অসীমের দিকে। ওরা দুজন আর এক মুহূর্ত দেরি করল না, দ্রুত নেমে গেল নীচে। প্রভু জগবন্ধু কুয়াশাভরা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এতগুলো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও মনের ভেতরের ক্ষত একটুও শুকোয়নি জগবন্ধুর। এত বছর আধ্যাত্মিকতায় নিজের জীবনকে ডুবিয়ে রাখলেও, তিনি জীবনের, আদর্শের কিছু ক্ষেত্রে অতি নির্মম। শত্রুকে তিনি ক্ষমা করতে পারেন না, জগবন্ধু মনে করেন একমাত্র, দুর্বল ও অসহায় মানুষই শত্রুকে ক্ষমা করে, সবল কখনো শত্রুকে ক্ষমা করে না, বরং সে শত্রুর করা আঘাতকে দ্বিগুণভাবে ফিরিয়ে দেয়। এই ব্যাপারে তিনি চাণক্যের নীতিতে বিশ্বাসী। ব্যক্তিগত আঘাত ছাড়াও রয়েছে সাংগঠনিক আঘাত। সেই দিনটার কথা কোনোদিন এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারেননি। ভেতরে দিনে দিনে জমা হয়েছে প্রতিশোধের আগুন। তৈরি হয়েছেন উপযুক্ত প্রত্যুত্তর দিতে। অনেকগুলো বছর পর অবশেষে সেই সময় সমাগত। শত্রুর অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি এবার দিতে হবে। এক বিশাল ধর্মযুদ্ধ শুরু হবে আর কিছুদিনের মধ্যেই। আর ক-টা দিনের অপেক্ষা।
প্লেনটা যখন খুব নিচুতে নেমে এসে একের পর প্যারাসুটগুলো ফেলছিল আর সেগুলো ভাসতে ভাসতে ফাঁকা জমির দিকে নেমে আসছিল তখন মাঠে পায়খানা করতে বসেছিল সনাতন। একসময়ে প্রবল নেশাভাং করত বলে বউ তাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেককাল আগে। পরে কিছুটা শুধরেছে। গরিব গ্রামের তস্য গরিব সনাতন। গাঁজা খেয়ে খেয়ে বুদ্ধিও খানিক ভোঁতা। কাজকর্ম তেমন কিছুই করে না। গ্রামের যে যখন টুকটাক কাজ দেয় তাতেই দু-পয়সা জোটে, জগবন্ধুর আশ্রমে সপ্তাহে দু-দিন ফ্রি-তে খাওয়া জোটে, বাকি দিনগুলোতে কেউ দয়া করলে জোটে, নয়তো হরিমটর। সনাতন এমনিতে দিব্যি মজার, ওর গুণ বলতে মিঠুনের অন্ধভক্ত, অনেক সিনেমার ডায়ালগ মুখস্থ। একদিন সকালে সটান অর্ণবের কাছে এসে উপস্থিত, স্যার, আমাকে আপনার দলে নিয়ে নিন।
অর্ণব চমকে উঠে বলেছিল, দলে নিন মানে!
নন্দ আর কৃষ্ণ খুব ভালো করেই চেনে সনাতনকে। ওরা দুজন হো হো করে হেসে উঠেছিল। ব্যাপারটা জানা গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। মিঠুনের কোন এক সিনেমা দেখে সনাতনের ইচ্ছে হয়েছে, ও পুলিশের খবরি হবে। ওকে গ্রামের কয়েকজন বলেছে, নতুন পুলিশবাবুর কাছে চলে যা। উনি তোকে নিয়ে নেবেন, তাই সোজা চলে এসেছে।
তা-ই শুনে অর্ণবের মতো লোকও সেদিন হেসে উঠেছিল। সনাতনের সঙ্গে সেদিন থেকেই পরিচয়। একেবারেই কার্টুন একটা চরিত্র। ওর সঙ্গে গল্প করতে বসলে দিব্যি সময় কেটে যায়। অর্ণব ওকে বলেছিল, যেদিন আমাকে গ্রামের কোনো বিশেষ খবর এনে দিতে পারবি সেদিন তোর পুলিশের চাকরি পাকা।
তারপর থেকে সনাতন নানা রকমের খবর নিয়ে এসেছে, কার পুকুরে কে লুকিয়ে জাল ফেলেছে, কে কার বাড়ির নারকেল গাছে উঠে ডাব চুরি করেছে ইত্যাদি। পুলিশবাবু শুনেছেন কিন্তু চাকরিতে নেননি, আজ চোখের সামনে ওই জিনগুলোকে নামতে দেখে ভয়ের চোটে পায়খানা বন্ধ হয়ে গেছিল সনাতনের। কোনোমতে দৌড়ে ঘরে চলে এসেছিল। কিন্তু তারপরেই মনে হয়েছিল এটা ওর কাছে একটা মস্ত সুযোগ। গ্রামে প্লেন থেকে জিন নেমেছে এই খবরটা পুলিশবাবুকে দিতে পারলে ওর খবরি হওয়ার চাকরি কেউ আটকাতে পারবে না, তাই ওই ঠান্ডার মধ্যেই গায়ে গরম জামা চাপাচুপি দিয়ে লজঝড়ে সাইকেলটা নিয়ে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে রওনা হল চৌহাটি থানার দিকে।
অর্ণব আর নন্দ দুজনেই অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। ডাক্তার সোমের পরামর্শে অর্ণব এখন রাত দশটার মধ্যেই শুয়ে পড়ে। ডাক্তারের প্রেসক্রাইব করা একটা কড়া ঘুমের ওষুধ খায়। তা ছাড়া প্রতিদিন ভোরবেলায় জগবন্ধুর আশ্রমে গিয়ে ধ্যান করার অভ্যাস ও জগবন্ধুর ভাবনা, আদর্শ, বাণী অর্ণবের জীবনকে ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে। গত এক মাসে ওর মধ্যে একবারও সেই ভয়ংকর দৃশ্যটা দুই চোখের ওপরে হানা দেয়নি। অপর্ণাকে জানিয়েছে সেই কথা। ইদানীং প্রভু জগবন্ধুর প্রতি বেশ একটা শ্রদ্ধা, ভক্তি অনুভব করে অর্ণব। মানুষটার মধ্যেই সত্যিই আলাদা একটা শক্তি রয়েছে।
ঘুমের মধ্যেই প্লেনের গর্জন কানে এসেছিল অর্ণবের, কিন্তু সজাগ হয়নি। আচমকাই মনে হল, থানার বাইরের দরজায় কেউ ধাক্কা দিচ্ছে। কান খাড়া করে শুনল। হ্যাঁ, কেউ ডাকছে। নন্দর কোনো হুঁশ নেই। পুরো অচেতন। অর্ণব উঠে গায়ে শাল জড়িয়ে দরজা খুলে দেখল সনাতন দাঁড়িয়ে।
এ কী রে তুই! কী ব্যপার?
জোর খবর স্যার। এখনই চলুন, সাংঘাতিক খবর রয়েছে।
বিরক্ত হল অর্ণব। মাথা ঠান্ডা রেখে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, কাল সকালে শুনব। এখন যা।
না স্যার, সত্যিই সাংঘাতিক খবর, নইলে এই ঠান্ডায় এত রাতে আমি আসি?
কথাটা অবশ্য ঠিক। আচ্ছা, কী খবর বল?
স্যার, আমার পেটটা আবার পচেছে। খুব হাগছি। তো কিছুক্ষণ আগে আবার বেগ পেল। সবে বসেছি, দেখি, আমার মাথা ছুঁয়ে একটা ইয়াবড়ো এরোপ্লেন চলে গেল... আর গলা নামিয়ে খুব নাটকীয়ভাবে সনাতন বলল, ওই প্লেন থেকে অনেকগুলো জিন নামল স্যার।
কী নামল?
জিন স্যার, সাদা কাপড় পরা সব জিন। ভূত।
এবারে অর্ণব আর মাথার ঠিক রাখতে পারল না, পেল্লায় ধমক দিয়ে উঠল সনাতনকে। মারব এক থাপ্পড়, রাতদুপুরে নেশা করে মজা করতে এসেছিস! এখনই বেরো।
মা কালীর দিবি বলছি স্যার, কোনো নেশাভাং করিনি, আমি নিজের চোখে দেখেছি, প্লেনটার পেটের মধ্যে থেকে সাদা কাপড়-পরা কয়েকটা জিন ভাসতে ভাসতে নামল।
অর্ণব আবারও ওকে ধমক দিতে গিয়ে থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য কী যেন ভাবল, তারপর জিজ্ঞাসা করল, তুই ঠিক দেখেছিস, প্লেন থেকেই নেমেছিল?
নিজের চোখে দেখেছি স্যার। আর এত বছর আমি চৌহাটি রয়েছি, জীবনে কখনো এত নিচু দিয়ে এরোপ্লেন যেতে দেখিনি, কী কান-ফাটানো শব্দ স্যার। স্পষ্ট দেখলাম প্লেন থেকে সাদা কাপড়-পরা একটার পর একটা নামছে।
মানুষ?
অন্ধকারে মানুষ না কী বুঝতে পারিনি স্যার, শুধু সাদা কাপড়গুলো বুঝেছি, বিশাল বড়ো বড়ো।
অর্ণব বলল, তুই নিয়ে যেতে পারবি?
কেন পারব না?
তুই দাঁড়া।
নন্দকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে দুজনেই খুব দ্রুত তৈরি হয়ে নিয়ে রওনা হল বাইক চেপে। সামনে নিজের সাইকেলে সনাতন। অর্ণব ইচ্ছে করেই জিপটা নিল না। বুরুলিয়ার হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা অর্ণবের গায়ে চাপানো সোয়েটার-জ্যাকেট ফুঁড়ে গায়ে হুল ফোটাতে থাকল। যেমন ঠান্ডা তেমনই কুয়াশা। পুরোনো বাইকের আলোও তেমন জোরালো নয়। তাই মাঝে মাঝেই অর্ণব ওর হাতে ধরা পাঁচ সেলের টর্চটা রাস্তার ওপরে ফেলছিল। সনাতনের বাড়ির কাছে পৌঁছোতেই সনাতন বলল, স্যার আপনার গাড়িটা এখানেই রেখে দিন। মাঠে গাড়ি চালানো যাবে না।
অর্ণব তা-ই করল। সনাতন যে ঘরে থাকে তার পিছনেই ধু ধু মাঠ। মাঠ শেষে ঘন জঙ্গল। আর অন্যদিকে বেশ কিছুটা গেলেই প্রভু জগবন্ধুর আশ্রম। মাঠের কাছে আসতেই অর্ণবের মনে হল, কয়েকটা টর্চ যেন মাঠের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। মাঠে কুয়াশা এতটাই ঘন যে আলোও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
নন্দকে অর্ণব বলল, মাঠের মধ্যে কি আলো দেখতে পাচ্ছ নন্দ?
আমারও তা-ই মনে হচ্ছে স্যার। বলেই অর্ণবের কোনো পারমিশনের তোয়াক্কা না করে ওর নিজের কাঁধে ঝোলানো জোরালো আলোর টর্চটা মাঠের দিকে ফেলল। শুধু তা-ই নয়, দুই-তিনবার হুইসলও বাজিয়ে দিল।
অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে ধমকাল নন্দকে। তোমাকে হুইসল দিতে কে বলল?
না মানে যদি কেউ কোনো দুষ্কর্ম করতে এসেও থাকে তাহলে পুলিশ এসে গেছে বুঝে পালাবে স্যার।
অর্ণব শুধু বলল, তোমরা আর মানুষ হবে না। মাথায় বুদ্ধি বলে যদি কিছু থাকে!
তবে যেটা ঘটল, এদিক থেকে টর্চের আলো এবং হুইসল শোনামাত্র মাঠের মধ্যে আবছাভাবে ঘোরাফেরা করতে থাকা আলোগুলো সব নিভে গেল।
অর্ণব আচমকাই সজাগ হয়ে উঠল, সার্ভিস রিভলভারটা খাপ থেকে বার করে নন্দকে বলল, এখনই চলো, কিছু একটা গণ্ডগোল রয়েছে এখানে।
অন্ধকার মাঠের মধ্যে অর্ণব ছুটতে থাকল। সঙ্গে নন্দ। দুজনের হাতেই টর্চ জ্বলছে। পিছনে আসছে সনাতন। তিনজনে মিলে দৌড়োতে দৌড়োতে মাঠের মাঝখানে এসে থামল। অর্ণবের ষষ্ঠেন্দ্রিয়, বলছে এখানে ওরা আসার আগেই কেউ এসেছিল, একজন নয়, বেশ কয়েকজন, তারা পুলিশ এসেছে আন্দাজ করেই পালিয়েছে, কিন্তু কারা এসেছিল, কী জন্য এসেছিল? এই প্রচণ্ড ঠান্ডার রাতে এমন খোলা মাঠে তাদের আসার কী উদ্দেশ্য? তাহলে কি সনাতন সত্যিই কিছু দেখেছে? মাথার মধ্যে অনেক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। অর্ণব সনাতনকে জিজ্ঞাসা করল, জিনগুলো কোনদিকে নামতে দেখেছিলি তুই?
ওই যে ওইদিকটায়। আমি এদিকটায় হাগতে বসেছিলাম।
চল এখনই... অর্ণব সনাতনের আঙুল-দেখানো দিকে ছুটতে শুরু করল। সনাতন যদি ভুল না দেখে থাকে তাহলে প্লেন থেকে নিশ্চয়ই প্যারাসুট নেমেছে। এত রাতে চৌহাটির মতো জায়গায় প্যারাসুট করে কারা নামতে পারে? তারাই কি এখানে কিছু করছিল? মাঠের মধ্যে এলোপাথাড়ি টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে এগোচ্ছিল অর্ণব আর নন্দ। নাহ কিছুই নেই।
কী রে সনাতন, তুই ঠিক দেখেছিলি তো?
মাক্কালীর দিব্যি স্যার, ভুল দেখিনি, এখানেই তো নেমেছিল।
ক-টা নেমেছিল?
গুনিনি স্যার। বেশ কয়েকটা হবে।
নন্দ বলল, এই গাঁজাখোরের কথায় বিশ্বাস করে লাভ নেই স্যার। এখানে কিছু পাওয়া যাবে না।
অর্ণব বলল, তোমার কথা আমিও মেনে নিতাম কিন্তু ওই আলোগুলো তাহলে কী ছিল?
শিয়াল-ভামের চোখ জ্বলে স্যার। জন্তুজানোয়ার হতে পারে। এই ঠান্ডার রাতে এখানে কোন মানুষ আসবে?
হুঁ, চলো, আরও কিছুটা এগিয়ে দেখি।
বেশ অনেকটা যাওয়ার পরে নন্দই চিৎকার করে উঠল, ওই দেখুন স্যার, ওইদিকে।
অর্ণব তাকিয়ে দেখল, মাঠের মধ্যে পড়ে রয়েছে মস্ত একটা সাদা কাপড়। সেদিকে এগিয়ে গেল ও। টর্চ ফেলে দেখল, যা সন্দেহ করেছিল ঠিক তা-ই। বিশাল একটা কাপড় জমিতে বিছিয়ে রয়েছে। কাছে গিয়ে বুঝতে পারল ওর আন্দাজ সঠিক, এটা প্যারাসুটই। কিন্তু প্যারাসুটের সঙ্গে যেটা নেমেছিল তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি অর্ণব। ও দেখল, দড়িতে বাঁধা রয়েছে বিশালকায় একটা কাঠের বাক্স। বাক্সের ওপর টর্চ ফেলে অর্ণব দেখল লেখা রয়েছে— ‘CASE NO. 35 OF 62– CONTRACT NO. 215/718/ PROJECT DGDP’।
কী আছে এর ভেতর? বাক্সটা যেভাবে প্যাকিং করা, হাত দিয়ে খোলার কোনো উপায় নেই। কিন্তু দেখার দরকার রয়েছে। পা দিয়ে ঠেলে নাড়ানোর চেষ্টা করল অর্ণব, একচুলও নড়ল না। বুঝল, ভেতরে খুব ভারী কিছু রয়েছে। সনাতনের দিকে অর্ণব তাকিয়ে বলল, তোর বাড়িতে দা বা শাবল কিছু আছে?
কুড়াল আছে স্যার। জঙ্গলে কাঠ কাঠতে যাই।
যা, এখনই নিয়ে আয়। কতক্ষণ সময় লাগবে?
ওই তো ওইদিকেই আমার ঘর স্যার। যাব আর আসব।
দৌড়ে যা। টর্চ নিবি?
না না স্যার, ওসব লাগবে না। বলেই দৌড় লাগাল সনাতন নিজের ঘরের দিকে।
নন্দ বলল, কী বুঝছেন স্যার?
এখনও কিছু বুঝতে পারছি না নন্দ। বাক্সটা খুললে বোঝা যাবে।
আমাদের কি বাক্স খোলা ঠিক হবে স্যার? যদি বোম-টোম থাকে।
প্যারাসুটে করে এই খোলা মাঠে এরোপ্লেন থেকে বাক্স করে বোম কে ফেলবে নন্দ? আর ফেললেও সেটা এতক্ষণে ফেটে যেত। সনাতনের কথা যদি সঠিক হয় তাহলে এই মাঠে এবং জঙ্গলের মধ্যে অন্তত খানকয়েক প্যারাসুট থাকার কথা। সব ক-টাকে আজ রাতেই খুঁজে বার করতে হবে নন্দ।
দুজনে মিলে কি পারব স্যার?
পারতেই হবে।
এত বছর চৌহাটিতে রয়েছি স্যার, এমন ঘটনা জীবনে দেখিনি।
অর্ণব বলল, অর্ণব বারুই যেখানে যায় সেখানে অনেক ঘটনা ঘটে। শের যেখানে যায়, শিকার সেখানেই আসে। নন্দ, তুমি এক কাজ করতে থাকো। টর্চটা মাঝে মাঝে মাঠের এদিক-ওদিক ঘোরাতে থাকো আর হুইসল দিতে থাকো। হুইসল কম, টর্চ ঘোরানো একটু বেশি, যাতে যারা পালাল তারা যেন টের পায়, এখানে পুলিশ এসেছে এবং রয়েছে।
আচ্ছা স্যার।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হন্তদন্ত হয়ে সনাতন এল। হাতে একটা কুড়াল। অর্ণব আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। যথেষ্ট পরিশ্রম করে বাক্সটার দড়িগুলোকে কুপিয়ে কেটে লক ভেঙে ডালা খুলতেই ভেতরে যা দেখতে পেল তাতে এক মুহূর্তের জন্য ওর মতো কঠিন মনের মানুষও শিউরে উঠল। বাক্স ভরতি অত্যাধুনিক সব আগ্নেয়াস্ত্র। টর্চের আলোয় ধাতব অস্ত্রগুলো কেউটে সাপের মতো চকচক করছিল। এমন আধুনিক সমরাস্ত্র এত বছরের পুলিশি জীবনেও চোখে দেখেনি অর্ণব। নন্দ আর সনাতনও হতবাক। তিনজনের কারো মুখে কথা নেই।
নন্দ অস্ফুটে বলল, এসব কী স্যার? কী হবে স্যার?
এসব কী তা তো নিজে চোখেই দেখতে পাচ্ছ, কী হবে তা জানা নেই নন্দ, কিন্তু ভয়ংকর কিছু একটা ঘটতে চলেছে। বিশাল কিছু।
প্রাথমিক বিহ্বলতা দ্রুত কাটিয়ে ফেলে অর্ণব খুব দ্রুত পরবর্তী প্ল্যান করে ফেলল। নন্দ শোনো, বাকি বাক্সগুলো আজ এখনই খুঁজে বার করতে হবে। যেভাবেই হোক।
আমরা দু'জনে মিলে ক'দিক সামলাব স্যার?
হুঁ। আচ্ছা শোনো সনাতন, তুমি কৃষ্ণদার বাড়ি চেনো?
থানার কেষ্টদা তো? কেন চিনব না স্যার? চৌহাটিতে সবাই সকলের বাড়ি চেনে। ওই তো বুড়োশিব মন্দিরটা পার করলেই ডানদিকের প্রথম বাড়ি।
ঠিক আছে, এবার যা বলছি, মন দিয়ে শোনো। তুমি এখন সাইকেল চালিয়ে যাবে কৃষ্ণদার বাড়ি। ওকে যেভাবে হোক ডেকে তুলে বলবে, আমি অর্ডার দিয়েছি এখনই এখানে চলে আসতে। ওকে সাইকেলে বসিয়ে সোজা চলে আসবে এখানে। তারপর তিনজনে মিলে পুরো মাঠে এবং জঙ্গলে বাকি প্যারাসুটগুলোকে ট্রেস করবে?
কী করব?
প্যারাসুট কী জিনিস তা সনাতনকে বোঝাতে গিয়েও চুপ করে গেল অর্ণব। এখন একে এসব বোঝানোর সময় নেই। বলল, তুমি শুধু কৃষ্ণদাকে নিয়ে এখানে চলে এসো, বাকিটা নন্দ বুঝে নেবে। আর-একটা কথা, রাস্তায় যদি কারো সঙ্গে আসা-যাওয়ার পথে দেখা হয়, কেউ যদি কোনো কথা জিজ্ঞাসা করে তাহলে এসব কিচ্ছুটি বলবে না-মনে থাকবে?
এই ঠান্ডায় এত রাতে কার সঙ্গে দেখা হবে স্যার?
হতেও পারে। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে তাহলে বলবে পেট ব্যথা, ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি, মনে থাকবে?
থাকবে স্যার। আমি আরেকবার পায়খানা করেই যাচ্ছি স্যার।
আবার এখন পায়খানা! উফ! আচ্ছা তাড়াতাড়ি করো।
সনাতন তা-ই করল।
অর্ণব নন্দকে বলল, তুমি এখানে বসে থাকো। আমি এখন যাব থানায়। সেখান থেকে হেড কোয়ার্টারে ফোন করব। তারপর ফিরব। এ জিনিস আমরা দুজন মিলে সামলাতে পারব না। ব্যাকআপ দরকার। তার মধ্যে কৃষ্ণদা চলে এলে সনাতনকে নিয়ে এখানেই অপেক্ষা করবে। বুঝেছ?
হ্যাঁ স্যার, বুঝেছি।
ভয় নেই। আমি দ্রুত ফিরব। শুধু মাঝে মাঝে হুইসল আর টর্চের আলো এদিক-ওদিক ফেলতে থাকো, বুঝেছ?
বুঝেছি।
অর্ণব এই ঠান্ডার মধ্যেই ঘেমে গেছে। আর অপেক্ষা করল না। মাঠ পেরিয়ে যেখানে বাইকটা রাখা ছিল সেখানে পৌঁছে রওনা হল নিজের অফিসে। বিশাল বড়ো একটা চক্রান্ত হতে চলেছে। যেভাবেই হোক আটকাতে হবে।
ভোরবেলার মধ্যে সদর থেকে বিশাল পুলিশবাহিনী চলে এল। পুরো মাঠ এবং জঙ্গল খুঁজে পাওয়া গেল মোট চারটে বাক্স। এগুলোকে ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হল বুরুলিয়ার সদর থানায়। প্রতিটি বাক্সেই বিপুল পরিমাণে আধুনিক সমরাস্ত্র ঠাসা। তারপর শুরু হল গোটা গ্রামে চিরুনিতল্লাশি। চৌহাটির মানুষ হতবাক। অনেকেই বলল, তারা গত রাতে প্লেনের গর্জন শুনেছে কিন্তু তার বেশি কিছুই কেউ জানে না। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল সেই খবর। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জরুরি বৈঠক ডাকলেন, প্রেস বিবৃতি দিলেন। সি.বি.আই. তদন্ত দাবি করলেন। দুপুরের মধ্যে দিল্লি থেকে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর উচ্চপদস্থ অফিসার এবং রাজ্যের সি.আই.ডি. অফিসারদের টিম পৌঁছে গেল বুরুলিয়ায়। সঙ্গে কলকাতা পুলিশ। দাবানলের মতো এই ভয়ংকর খবর ছড়িয়ে পড়ল দেশে-বিদেশে। এই বিশাল পরিমাণে অস্ত্র কারা ফেলে গেল? কাদের জন্য ফেলা হয়েছিল? সব থেকে বড়ো কথা, একটা প্লেন এসে গ্রামের মাঠে অস্ত্র ফেলে গেল তার খবর র, আই.বি. কারো কাছে ছিল না! আর প্লেনটা যে তার অপারেশন সেরে নির্বিঘ্নে চলে গেল সেটার খবরও ভারতীয় বিমানবাহিনীর কাছে নেই! শয়ে শয়ে প্রশ্ন অথচ উত্তর কারো কাছে নেই। টিভি-তে, প্রতিটি সংবাদপত্রে শুধু একটি বিষয় নিয়েই আলোচনা। গোটা দেশ হতভম্ব! মিডিয়া প্রশ্ন তুলতে লাগল, বিদেশি অস্ত্রবোঝাই একটা প্লেন এসে এতগুলো অস্ত্র ফেলে দিয়ে চলে গেল, কেউ কিছু জানলই না! তাহলে দেশে নিরাপত্তা কোন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে! প্রতিরক্ষাবাহিনীর যোগ্যতা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করতে লাগল সকলে। সামনেই ভোট; এর মধ্যে এমন একটা ঘটনা দেশের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থার ঝুঁটি নেড়ে দিল। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে খোঁজাখুঁজি চলল, কারো কাছে অস্ত্র নেই। বাকি রইল শুধু জগবন্ধু আশ্রম। ওখানে হুট করে ঢুকে পড়া সম্ভব ছিল না। রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ চাইছিল জগবন্ধুর আশ্রমে ঢুকেও তল্লাশি চালানো উচিত। কিন্তু আহ.zবি. অফিসাররা তাতে রাজি হচ্ছিলেন না। জগবন্ধু আশ্রমে প্রভুর অনুমতি ছাড়া কেউই ঢুকতে পারে না। গোটা দেশে এবং দেশের বাইরে প্রভুর লাখে লাখে শিষ্য, শুধু তা-ই নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যে এই জগবন্ধু সেবাশ্রমের সম্পর্ক যথেষ্ট ভালো, প্রভু জগবন্ধু যে এই বছর নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন তার নেপথ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রচ্ছন্ন মদত রয়েছে সেটাও মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদবাবু খুব ভালো করে জানেন। এই সংগঠনটিকে তিনি ও তাঁর দল একেবারে পছন্দ করেন না। শুধু পছন্দ করে না বললে কম বলা হয়, বলা ভালো পরম শত্রু মনে করে। দুই পক্ষের মধ্যে বহুকালের শত্রুতা। বছর দশেক আগে এই জনসেবকদের ওপর সুজন সেতুতে যে হামলা হয়েছিল তার ক্ষত যে প্রভু জগবন্ধুর মনে এখনও তাজা রয়েছে তা একজন পোড়-খাওয়া রাজনীতিবিদ হিসেবে খুব ভালোমতোই জানেন প্রমোদবাবু। আর তিনি এটাও জানেন জগবন্ধুর বুদ্ধি কোনো রাজনীতিকের থেকে কম নয়।
আজ ভোরবেলা থেকেই তিনি দফায় দফায় মিটিং করছেন। সি.আই.ডি. ও পুলিশ বিভাগ, তারপর অন্য আমলাদের সঙ্গে মিটিং সেরে সকল বিভাগের মন্ত্রীদের নিয়ে মিটিং সেরেছেন। বেলায় বিধানসভা উত্তাল হয়েছে বিরোধীদের চিৎকারে। বর্তমান রাজ্য সরকারের অপদার্থতা, অক্ষমতা নিয়ে সওয়াল হয়েছে। রাজ্যের নিরাপত্তার ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, যেকোনো মুহূর্তে রাজ্যে আগুন ধরে যেতে পারে ইত্যাদি নানা অভিযোগে জর্জরিত হতে হয়েছে। প্রমোদবাবু বুঝতে পারছেন খুব কঠিন পরিস্থিতি। মাথা ঠান্ডা রেখে এগোতে হবে। একটু ভুল হলেই পাশা বদলে যাবে।
পার্টি মিটিং-এও আজ অনেক উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। সকলেই শঙ্কিত, উদবিগ্ন এবং সরকারের ও পার্টির ভাবমূর্তি আর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কারা কিনেছে, কেন কিনেছে সেইসব প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তরগুলির মধ্যে যেমন কেন্দ্রের স্বদেশ পার্টির নাম এসেছে, প্রমোদবাবুর কলেজজীবনের বন্ধু এবং রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী সব্যসাচী ভট্টাচার্য, যাকে প্রমোদবাবুও অত্যন্ত ভরসা করেন, তিনিও আজ মিটিং-এ পরিস্থিতি কীভাবে সামলানো যায় তার কোনো দিশা দেখাতে পারেননি। প্রমোদবাবু বুঝতে পারছিলেন, এই ঝড় তাঁকে একাই সামলাতে হবে। বাঁচার উপায় তাঁকেই বার করতে হবে।
পার্টি মিটিং-এর পর সব্যসাচীর সঙ্গে নিজের চেম্বারে আলাদাভাবে আলোচনায় বসেছেন তিনি। ভারতের রাজনৈতিক মহলে প্রমোদ বসুকে চাণক্য নামে ডাকা হয়। রোগা, লম্বা, ছিপছিপে চেহারা। কালো ফ্রেমের চশমা। ব্যাকব্রাশ করা ঘন কাঁচা-পাকা চুল। অত্যন্ত কম কথা বলেন, যেটুকু বলেন তা মেপে এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাইপ খান। আর সন্ধেবেলা স্কচ।
দুজনে মিলে যে মিটিংটি এখন করছেন তা অত্যন্ত গোপনীয়। সব্যসাচী আর প্রমোদ যখন একান্তে আলোচনা করেন তখন একে অপরকে তুই সম্বোধন করেন, অন্যথায় সকলের সামনে আপনি করে পরস্পরে কথা বলেন। সব্যসাচী স্বভাবের দিক থেকে খানিকটা আবেগি। অনেক সময় পার্টিবিরোধী মন্তব্য করেও পার্টিকে, সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে দেন। কিন্তু তারপরেও প্রমোদ আর সব্যসাচী হরিহর আত্মা।
সব্যসাচী সিগারেট ধরিয়ে বললেন, তুই যেটা ভাবছিস, আমারও ঠিক তা-ইই মনে হচ্ছে।
কিন্তু সেটা প্রমাণ করার কোনো উপায় আছে কি? পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন প্রমোদ।
না, উপায় নেই। তবে এটা আমাদের কাছে একটা সুযোগ হিসেবেও ধরা যেতে পারে।
কীরকম?
জগবন্ধুর আশ্রম থেকে ঠিক দুই কিলোমিটার দূরে প্রথম বাক্সটা পড়েছে, বাকিগুলো ওই সব মিলিয়ে তিন কিলোমিটারের মধ্যে। এবং ওই অঞ্চলে একমাত্র জগবন্ধুর আশ্রম ছাড়া আর কোনোরকম অর্গানাইজেশন বা কোনো পলিটিক্যাল নেতা বা ডন, মাফিয়া কেউ নেই। আর এদের সঙ্গে আমাদের রিলেশনটা কেমন সেটাও কারো অজানা নয়। জগবন্ধু এবার নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন, ফান্ডিং-এর জন্য কেন্দ্রের তো বটেই, বাইরের সোর্সও কিছু কম নেই। সুতরাং অস্ত্র এরাই কিনেছিল, এবং ভোটের আগে রাজ্যে অরাজকতা তৈরি করার চেষ্টায় ছিল। রাজ্য পুলিশের তৎপরতায় এই বিশাল নাশকতা রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মরবে, জগবন্ধুর এই বিশাল ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে যেমন সন্দেহের মুখে ফেলে দেওয়া যাবে, কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবমূর্তিকেও নষ্ট করা যাবে। এতটা বলে সব্যসাচী শেষে আরও একটা কথা বললেন, মানুষ কিন্তু আমাদের পছন্দ করছে না, আমাদের কাজে খুশি নয়।
সব্যসাচীর কথা মিথ্যে নয়। গত দশ বছরে সোশ্যালিস্ট পার্টির ওপর রাজ্যে মানুষ অনেকটাই আস্থা হারিয়েছে। উঁচুতলার নেতাদের সঙ্গে নিচুতলার নেতা, কর্মীদের যোগাযোগ প্রায় নেই, যে যার মতো লুটেপুটে খাচ্ছে। গ্রামগঞ্জে সাধারণ মানুষের ওপর অকথ্য জুলুম চালাচ্ছে পার্টির আশ্রিত গুন্ডা, মাফিয়ারা। রাজ্যে শিল্প ধুঁকছে, চাকরি কমছে। রাজনীতির শিকার হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক কলকারখানা। কেউ খুশি নয়। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অশান্তি লেগেই রয়েছে। জেলায় মাথাচাড়া দিচ্ছে বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠন। শুধুমাত্র ভরসা করার মতো কোনো বিকল্প রাজনৈতিক দল নেই বলে এখনও রাজ্যের মানুষ সোশ্যালিস্ট পার্টিকে সহ্য করে যাচ্ছে। পার্টির অভ্যন্তরেও ধরছে অনেক ফাটল। কেউ কারো কথা শোনে না, যে যার ইচ্ছেমতো কাজ করে চলেছে। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রমোদবাবু সবই বোঝেন, কিন্তু তিনি কিছু করতে পারেন না, রাশ আর তাঁর হাতে নেই। হু হু করে বেনোজল ঢুকছে পার্টিতে। তাঁদের কাছে না আছে আদর্শ, না রয়েছে নীতিবোধ। শুধু লুটেপুটে খাবার ধান্দা। কিন্তু এরা এমনভাবে পার্টির কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে যে ইচ্ছে থাকলেও আর ঝেড়ে ফেলার উপায় নেই। এরা পার্টির সঙ্গে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে যে ছাড়ানোর উপায় নেই। এদের সরাতে গেলে পার্টির অনেক গোপন ঘটনা বাইরে ছড়িয়ে যাবে। রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা দখলের লড়াই। আর ক্ষমতা দখল করতে গেলে অথবা ক্ষমতায় টিঁকে থাকতে গেলে সবরকম মানুষকেই দরকার, আদর্শবান, আদর্শহীন, নির্লোভ, লোভী, সৎ, ধান্দাবাজ সকলকে। বিশুদ্ধ বলে রাজনীতিতে কিছু নেই। সেটা সাধারণ মানুষও জানে। তারা খোঁজে কম স্বৈরাচারী শাসককে। তাকেই ভোট দেয়, যে জনজীবনকে খুব বেশি তছনছ করবে না।
সব্যসাচীর ডাকনাম বাবু। একান্তে প্রমোদ ওঁকে বাবু বলে ডাকেন। সব্যসাচীর কথা চুপ করে শুনলেন প্রমোদ, তারপর বললেন, দেখ বাবু, মানুষ বিরোধীকে যতটা পছন্দ করে, শাসককে ততটা করে না। মানুষকে খুশি করা সরকারের কাজ নয়, মানুষকে সার্বিকভাবে নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের কাজ।
সেটাও কি আমরা পারছি?
কেউই পুরোটা পারে না। পারা সম্ভব না। যতটা বেশি পারা যায় ততটাই সাফল্য।
আমরা কিন্তু পিছু হটছি প্রমোদ। আমাদের অনেক ফাঁকফোকর তৈরি হয়েছে।
এখন এসব ভাবার সময় নয়, বিপদটাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর সময় এটা। আজ দুপুরে পি. এম. এ.-র সঙ্গে আমার ফোনে কথা হবে। ওরা যেটা এতদিন চেষ্টা করছিল— আমাদের রাজ্যে নৈরাজ্য চলছে এমনটা দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা, আমার বিশ্বাস, আজ এই ব্যাপারেই উনি কথা বলবেন, আর আমাদেরও ঠিক এর পালটা দিতে হবে।
কী করবি? সন্দেহের তিরটা জগবন্ধুর দিকে ঠেলে দিবি?
না। পালটা খেলব আমরা। বলব, আমাদের রাজ্যের মানুষ সেন্ট্রালকে দোষ দিচ্ছে, কেন এত বড়ো ঘটনার কোনো আগাম খবর দেশের সিক্রেট এজেন্সিগুলোর দিকে ছিল না, কী করে একটা প্লেন দেশের ভেতরে এত অস্ত্র ফেলে গেল অথচ বায়ুসেনার কাছে কোনো খবর নেই। আমি জগবন্ধুকে এই ব্যাপারে জড়াতেই চাইছি না, পুরো অ্যাভয়েড করতে চাইছি।
কেন?
কারণ ওর দিকে আঙুল যদি আমরা তুলি তাহলে ওর পক্ষে সেটা সুবিধা হয়ে যাবে। সেই দোষারোপটাকেই ইস্যু করে ওরা এগোবে। এই চক্রান্তে আমার নিশ্চিত ধারণা, ওদের হাত রয়েছে কিন্তু আমরা সেটা কিছুতেই প্রকাশ্যে বলব না। বললে ওদের ভেতরে যে একটা চাপ তৈরি হয়েছে সেটা হালকা হয়ে যাবে। আমরা যদি না খোঁচাই তাহলে ওরাও চুপ থাকবে। আমাদের বিরুদ্ধে খুব বেশি শোরগোল করবে না। ভোটটা পেরিয়ে যাবে। তারপর এই সেবকদের একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রমোদের কূটনৈতিক বুদ্ধি সংশয়াতীত। ওর একার বুদ্ধির জোরেই পার্টিটা এখনও খুঁটির জোর ধরে রেখেছে। ভারতের যে রাজ্যগুলিতে সোশ্যালিস্ট পার্টির সরকার রয়েছে তারা সকলেই প্রয়োজনে প্রমোদের কাছ থেকে রাজনৈতিক পরামর্শ নেন। অকৃতদার প্রমোদ বসু পার্টি-অন্ত-প্রাণ। স্বদেশ পার্টি যখন রাজ্যেও ক্ষমতায় ছিল তখন বিরোধী দলের মুখ ছিলেন তিনি। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে-আসা প্রমোদ অত্যন্ত ব্রাইট স্টুডেন্ট ছিলেন। ডাক্তারি পড়তে পড়তে মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি সোশ্যালিস্ট পার্টিতে জয়েন করেন। তখন রাজ্যে চূড়ান্ত নৈরাজ্য চলছে। লুম্পেনদের রাজত্ব, পাড়ায় পাড়ায় বোমাবাজি, খুন, ডাকাতি নিত্যদিনের ব্যাপার। সাধারণ মানুষ তিতিবিরক্ত, স্বদেশ পার্টিকে আর কেউ চাইছিল না। তখন বিরোধীদের মুখ হয়ে দাঁড়ালেন প্রমোদ। সঙ্গে সব্যসাচীর মতো আরও কয়েকজন বন্ধু। যেই বছর স্বদেশ পার্টিকে ক্ষমতাচ্যুত করে সোশ্যালিস্ট পার্টি ক্ষমতায় এল সেই বছর অনেক রক্ত ঝরেছে, অনেক পার্টির ক্যাডার খুন হয়েছে, অনেক বুথে, গ্রামে, জেলায় আগুন জ্বলেছে। তারপর মানুষের রায়ে শেষ পর্যন্ত সোশালিস্ট পার্টি রাজ্যচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পদে প্রমোদ বসু। প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল সোশ্যালিস্ট পার্টির রাজত্ব। দশ বছর পরেই বেনোজল হু হু করে ঢুকতে শুরু করেছিল। এখন পার্টিটা শুধু বিরোধী না-থাকার কারণে চলছে। প্রমোদও ভেতরে ভেতরে হতাশ। উনি টের পান, এইভাবে চলতে থাকলে আর খুব বেশি দিন নেই। এইবারের নির্বাচনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ প্রভু জগবন্ধু নিজে সোশ্যালিস্ট পার্টির বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছেন। আর দেশটার নাম ভারতবর্ষ, এই দেশের মানুষ আজও ধর্মগুরুকে ঈশ্বর মানে, ধর্মের নামে যা খুশি করতে পারে। জগবন্ধুর এখন দেশজোড়া শুধু নয়, দেশের বাইরেও হাজার হাজার অনুরাগী। রাজ্যে ওর শিষ্য, ভক্তের সংখ্যা অজস্র। তাদের ভোটগুলো জগবন্ধু পাবে। ভোট করাতে যেটা সবার প্রথমে লাগে তা হল ফান্ড, সোজা ভাষায় টাকা। প্রমোদের কাছে খবর রয়েছে, জগবন্ধু বিপুল পরিমাণে ফান্ডিং পেয়েছে। ফলে লড়াই জোরদার লড়বে। স্বদেশের সঙ্গে অ্যালায়েন্স করলে সেই সংখ্যাটা শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে তা সত্যিই এবার স্পেকুলেট করতে অসুবিধা হচ্ছে। সোশালিস্ট পার্টি জিতলেও মার্জিন যে কমবে তা নিশ্চিত। আর মার্জিন কমাটাও বিপদসংকেত। জনগণের কাছে ভরসা আরও কমবে।
তাহলে কী ভাবছিস তুই? পাবলিক, মিডিয়া সকলে উত্তর চাইছে। কী উত্তর দিবি?
তৃতীয় কাউকে এই চক্রান্তের দায় নিতে হবে। তা ছাড়া উপায় নেই। বলেই প্রমোদ সেক্রেটারিকে ডাকলেন। তারপর তাঁকে নির্দেশ দিলেন, অবিলম্বে চৌহাটি থানার দায়িত্বে যে অফিসার ছিলেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই গ্রামে ক্রিমিন্যাল রেকর্ড কাদের রয়েছে তার ডিটেল জানাতে। ইমিডিয়েট।
সেক্রেটারি চলে গেলেন।
তুই কী করতে চাইছিস? সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন সব্যসাচী।
প্রমোদ সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্থিরভাবে শুধু তাকালেন। তাতেই যা বোঝার বুঝে নিলেন সব্যসাচী।
দুপুরে প্রাইম মিনিস্টারের সঙ্গে ফোনে বেশ কিছুক্ষণ কথা হল প্রমোদ বসুর। এই ধরনের কথা যেমন হয় আর কী। পুরোটাই কূটনৈতিক আলোচনা। কিছুটা সৌজন্য বিনিময়, খানিকটা উদবেগ প্রকাশ। একে অপরকে দোষারোপ করে নিজেকে সেফ করার চেষ্টা। বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত যেটা দেখা গেল, সামনে ভোট বলে কোনো পক্ষই এটা নিয়ে খুব একটা জলঘোলা করতে রাজি নয়। বরং ভোট মিটে যাওয়ার পরেই এই নিয়ে আলাদা করে তদন্তে নামা যাবে, তবে এখন পুরোপুরি ধামাচাপা দেওয়ার উপায় নেই, তাই রুটিন তদন্ত চলতে থাকুক, আপাতত জনগণের কাছে ওই এলাকারই কোনো টিম বা ব্যক্তিকে এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে দাঁড় করাতে হবে। নইলে জনগণ উদবিগ্ন হবে, সেটার প্রভাব পড়বে ব্যালটে। এবং তাতে কোন পার্টির ক্ষতি হবে তা জানা নেই। সোশালিস্ট পার্টির যেমন রাজ্যের মান্যুষের কাছে আগের মতো আর ভরসা নেই, তেমনই স্বদেশ পার্টিকেও পশ্চিমবঙ্গের মানুষ পছন্দ করে না, কাজেই এই বিপুল পরিমাণে অস্ত্র বর্ষণ করে যারা খুব বড়োসড়ো একটা দুর্ঘটনা ঘটাতে চাইছিল তাদের আটকানোর জন্য কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার উভয়েই ব্যর্থ। গ্রামবাসীদের নজরে না পড়লে এই অস্ত্রের ঠিকানা কোথায় হত তা অজানা। তাই আপাতত কাউকে একটা বলির পাঁঠা হিসেবে খাড়া করা যাক।
প্রমোদ বসু একবার প্রভু জগবন্ধুর প্রসঙ্গ তুললেন। বললেন, সি.আই.ডি. একবার আশ্রমের ভেতর ঢুকে সার্চ করতে চাইছে।
তার উত্তরে প্রাইম মিনিস্টার বললেন, আমরা সবরকমভাবেই আপনাদের সহযোগিতা করব। তবে সব দিক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেবেন। ভারত দেশটার নাম। এই দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ।
এই ধরনের আলোচনায় মুখে বলা কথার থেকে ইঙ্গিত বেশি থাকে। পোড়-খাওয়া রাজনীতিবিদরা একে অপরের ইঙ্গিত দিব্যি বুঝে নেনে। এই আলোচনাতেও যে যেটুকু বোঝার তা বুঝে নিলেন। এবং প্রমোদ বসু বেশ কিছু প্ল্যানিং করে ফেললেন। সন্ধের মধ্যে তাঁর কাছে রিপোর্ট চলে এল, চৌহাটিতে যাদের বিরুদ্ধে কোনো সময়ে পুলিশ কেস হয়েছে। সকলের প্রথমেই নাম ছিল শুকদেব মাহাতোর। শুকদেবের কেস হিস্ট্রি শুনে তিনি আবারও কোর কমিটির মিটিং ডাকলেন। এবং সেইদিনই গভীর রাতে সরকারি তদন্তকারী টিমের কাছে নির্দেশ চলে এল, শুকদেব মাহাতোকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। অর্ণব যখন জানল, শুকদেবকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ এসেছে, ও বুঝে গেল, সরকার খেলা অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছে। সি. আই. ডি. বা আই. বি. অফিসাররা কেউই অর্ণবকে গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না। এঁদের কাছে একটা চুনোপুঁটি এস. আই.-এর কোনো ভ্যালু নেই। অথচ এত বড়ো একটা ঘটনা চুপিসারে হয়ে যেত যদি না অর্ণব পরশু রাতে এতটা ঝুঁকি নিয়ে অপারেশনটা করত। পুলিশের চাকরি থ্যাঙ্কলেস জব। আর অর্ণব কোনোকালেই কারো কাছে স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকেনি, ধন্যবাদ ইত্যাদি তো নয়ই। ডিপার্টমেন্টের কাছ থেকে শোকজ, বদলি ইত্যাদি ছাড়া আর কোনো পুরস্কার পায়নি, কিন্তু অর্ণবের যেটা খারাপ লাগছে— এই কেসটার দায়িত্বে ওর থাকা উচিত ছিল অথচ ওর ডিপার্টমেন্ট বা সি. আই. ডি.-আই. বি.-র কর্তারা ওকে কোনোরকম গুরুত্বই দিচ্ছেন না। কোনোকথাই এরা শুনছেন না। ব্যাপারটা অর্ণবের ইগোতে লাগছে।
এসব নিয়ে মাথাটা গরম ছিলই, সি.আই.ডি. অফিসার তরুণ সরখেল যখন অর্ণবকে ডেকে বললেন, শুকদেব মাহাতোকে অ্যারেস্ট করতে হবে, ওর বাড়িটা কোথায় আমাদের দেখিয়ে দেবেন চলুন।
অর্ণব অবাক হল। বলল, শুকদেব মাহাতো কেন?
কেন মানে?
কেন মানে ওকে কেন অ্যারেস্ট করা হবে, আমি বুঝতে পারলাম না স্যার।
আপনার বোঝার কি খুব দরকার রয়েছে? যেটা আপনাকে অর্ডার করা হচ্ছে সেটা করুন।
দরকার রয়েছে স্যার, কারণ এই লিডটা আমার। পরশু রাতে আমি যখন মাত্র দুজন কনস্টেবল নিয়ে এই অপারেশনটা করেছিলাম তখন আমাদের কাছে দুটো টর্চ, একটা রিভলভার, দুটো লাঠি আর একটা পুরোনো বাইক ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর শুকদেব মাহাতোকে আমি দেখেছি স্যার, ওর পিছনে সময় নষ্ট করে লাভ নেই, ওর বিষদাঁত উপড়ে গেছে, বরং আমাদের উচিত জগবন্ধুর আশ্রমে একবার সার্চ করা। জগবন্ধুকে ইন্টারোগেট করা।
সরখেল হতবাক। একটা সামান্য সাব-ইনস্পেক্টরের এত সাহস! তিনি চাপাস্বরে গর্জে উঠলেন, আপনাকে যতটুকু বলা হচ্ছে, ঠিক ততটুকুই করুন। এর বেশি একদম নয়। আপনার কেস হিস্ট্রি আমাদের জানা রয়েছে। সাসপেন্ড না হতে চাইলে চুপ করে থাকুন। আমাদের দরকারে আমরা আপনাকে ডেকে নেব।
অর্ণব চুপ থাকল কিন্তু সরখেল চুপ থাকলেন না। একজন সামান্য এস. আই-এর এত ঔদ্ধত্য তিনি নিতে পারলেন না। দিন তিনেকের মধ্যে অর্ণব যে মানসিকভাবে অসুস্থ, ডক্টর সোমের আন্ডারে তার ট্রিটমেন্ট চলছে তার সব ডকুমেন্টসহ ওপরমহলে অভিযোগ করে অর্ণব যাতে এই কেসে কোনোভাবেই কোনো দায়িত্ব না নিতে পারে তার ব্যবস্থা করলেন। ডিপার্টমেন্ট থেকে অর্ণবকে জানিয়ে দেওয়া হল এই কেসে তাঁর মাথা ঘামানোর কোনো দরকার নেই। সে এখন রেস্টে থাকুক। শুধুমাত্র প্রয়োজনে তাকে ডাকা হলে সে পুলিশ বা গোয়েন্দা বিভাগ ইত্যাদিকে সাহায্য করবে। অন্যথায় এই কেসে কোনোরকম ইন্টারফেয়ার করলে তার বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নেওয়া হবে।
অর্ণব এত বড়ো অপমানটা ঢোঁক গিলে হজম করতে পারল না, এই কেসটায় ওকে এমন অন্যায়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হল সেটা ও মন থেকে মেনে নিতে পারল না। পরশু রাতে অর্ণব নন্দ আর কেষ্টকে নিয়ে কতটা প্রাণের ঝুঁকি এবং সাহস আর ধৈর্য নিয়ে ব্যাপারটাকে সামলেছিল এবং অবশ্যই সনাতনকে এর জন্য সবার আগে ধন্যবাদ দিতে হয়, ও এসে না জানালে ওই অস্ত্র এতক্ষণে যেখানে পৌঁছোনোর সেখানেই পৌঁছে যেত। অথচ...
ভোরবেলায় বিশাল পুলিশবাহিনী মশা মারতে কামান দাগার স্টাইলে শুকদেবের ওই ভাঙা ঘরটাকে ঘিরে ফেলে ওকে অ্যারেস্ট করল এবং মিডিয়ায় জানিয়ে দেওয়া হল, এই অস্ত্রবর্ষণের পিছনে মুক্তিবাদী পার্টির যোগ রয়েছে আর এই চক্রান্তের অন্যতম একজন মাথা হল শুকদেব। তদন্ত চলছে, অবিলম্বেই এই বিশাল চক্রান্তের আড়ালে কারা রয়েছে তা জানা যাবে।
জনগণ মিডিয়ার কথাকে বিশ্বাস করে। শুকদেব ধরা পড়ার পর রাজ্যের এবং জাতীয় স্তরের প্রিন্ট মিডিয়াগুলি সকলে ঝাঁপিয়ে পড়ল শুকদেবের দিকে। নানা রকমের হাইপোথিসিস নরম-গরমভাবে পরিবেশন করতে থাকল জনগণের কাছে। শুকদেব পুরো চুপ। ওর কথা কেউই শুনতে চাইল না। লকআপে জেরায় ওকে সরাসরি বলা হল, এই পুরো ঘটনায় ওর এবং ওর পুরোনো দল মুক্তিবাদী পার্টির হাত রয়েছে তা স্বীকার করতে হবে। শুকদেব আন্দাজ করতে পেরেছিল, বিশাল কেসে ওকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু ওর কথা শোনার কেউ ছিল না। আই. বি. সি. আই. ডি, সি.বি.আই., পুলিশের ধারাবাহিক জেরায় শুকদেব একসময় বুঝে গেল ওর আর নিস্তার নেই। এমনিতেই ওর জীবনের প্রতি আগ্রহ বিশেষ আর কিছু ছিল না। একসময় যে লোকটা প্রতিবাদের মশাল ছিল তার ভেতরে এখন শুধু প্রাণের পিদিমটুকু নিভুনিভু হয়ে কোনওমতে জ্বলছে। নিজেকে বাঁচানোর ইচ্ছে ছেড়ে দিল শুকদেব। পুলিশ ও তদন্তকারীরা ওকে স্কেপগোট বানিয়ে ফেলল ওপরওয়ালার নির্দেশমতো।
শুধু অর্ণব নয়, সনাতন, নন্দ এবং কৃষ্ণলাল, তিনজনই যথেষ্ট হতাশ। গোপাল সেদিনের অপারেশনে অনুপস্থিত থাকলেও পরে জয়েন করার পর ওপরমহলের কর্তাব্যক্তিদের আচরণে একই রকম ক্ষুব্ধ। তাদের এত বড়ো একটা অপারেশনের কেউ কোনো স্বীকৃতি দিল না। ডিপার্টমেন্ট তো নয়ই, টিভি-তে, খবরের কাগজে কোথাও তাদের নাম নেই। মাত্র একদিনই এস. আহ.z অর্ণব বারুইয়ের নামটা কাগজে উল্লেখ করা হয়েছিল— ব্যাস, আর নয়। সনাতনকে অফিসাররা একদিন জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন, বেচারা সিধেসাধা সনাতন তাঁদের কাছেও কাজ চেয়েছিল, ধমক খেয়ে চুপ করে গেছে। প্রথম কিছুদিন অর্ণবের থানাতে তবু অফিসারদের আনাগোনা চলছিল। গমগমে আর ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল চিরকালের নিস্তেজ হয়ে-থাকা ফাঁড়িটা। তারপর আবার যে কে সেই। জগবন্ধুর আশ্রমে সি. আই. ডি. এবং আই. বি.-এর অফিসাররা একবার গেছিলেন। সার্চ করেননি, শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন আশ্রমিক এবং প্রভু জগবন্ধুকে।
নিজেকে ঠুঁটো জগন্নাথের মতো মনে হচ্ছিল অর্ণবের। প্রভুর জগবন্ধুর কাছে নিয়মিত ধ্যান-প্রাণায়াম করা এবং সাইকিয়াট্রিস্টের প্রেসক্রাইব করা ওষুধ এবং নিজের ভাবনাচিন্তায় বদল আনার চেষ্টা করে নিজেকে বেশ খানিকটা সুস্থ করে তুলেছিল অর্ণব, পুরোনো ক্ষতির খানিকটা উপশম। কিন্তু এই অপমানটা ওকে আবার আহত করে খেপিয়ে তুলল।
আজ দুপুরে থানায় নিজের চেয়ারে গুম হয়ে বসে ছিল অর্ণব। গোপাল, নন্দ আর কৃষ্ণলাল তো রয়েছেই, সনাতনও থানার মেঝেতে বসে রয়েছে। ও এখনও আশা ছাড়েনি। প্রায় রোজই একবার করে আসে, অর্ণবকে জিজ্ঞাসা করে, খবরির চাকরিটা তার কবে হবে। অর্ণব ওকে কখনো ধমকায়, কখনো উত্তর দেয় না। কেষ্ট আর নন্দও ওকে তাড়ানোর চেষ্টা করে বিফল। গাঁজাখোরকে বুঝিয়ে কোনো লাভ নেই। আর এটা তো সত্যি কথা, ওই ঠান্ডার রাতে এতটা ঝুঁকি নিয়ে সনাতন যদি খবরটা না দিতে আসত তাহলে পুরো অস্ত্র উধাও হয়ে যেত, এবং তারপর ওই বিপুল পরিমাণে অস্ত্র যে কীভাবে ব্যবহার করা হত তা জানা নেই। ফলে সনাতনের প্রতিও যে একটা মস্ত অবিচার করা হয়েছে সেটা অনুভব করেই অর্ণব ওকে বিশেষ বকাঝকা করতে পারে না। খানিক অপরাধবোধ কাজ করে। ওর হাতে যে কিছু নেই তা সনাতনের বোঝার কথা নয়।
গোপাল বলল, আপনার সঙ্গে খুব অন্যায় হল স্যার।
অর্ণব উত্তর দিল না।
নন্দ বলল, ভাবলেও অবাক লাগে, আমাদের চৌহাটিতে এত বড়ো একটা কেস ঘটল। এবং সেখানে আসল কাজটা আমরা করলেও আমাদেরই সাইড করে দেওয়া হল।
নন্দর কথায় কৃষ্ণ বলল, অনেক বড়ো ঘাপলা রয়েছে রে নন্দ। এসব আমাদের মতো চুনোপুঁটিদের জন্য নয়। বলেই অর্ণবের দিকে তাকাল। চুনোপুঁটি বলাটা যে ঠিক হয়নি সেটা বলার পর টের পেয়েছে ও।
আমার কাজটা হবে না স্যার? জিজ্ঞাসা করল সনাতন।
কেউই উত্তর দিল না।
সেদিন এত খাটলাম। সবই জলে গেল, ধুর! নিজের মনেই বিড়বিড় করতে থাকল সনাতন। যা ভয় পেয়েছিলাম, আকাশ থেকে ওগুলোকে নামতে দেখে। তার মধ্যে যখন আশ্রম থেকে আলো পড়ছিল— বাপ রে বাপ...
কথাটা কট করে কানে বাজল অর্ণবের। আলো মানে? কী বলছিস? কোন আলো?
ওই আশ্রম থেকে একটা লম্বা আলো পড়ছিল-না— সেটা।
মানে! সোজা হয়ে বসল অর্ণব। আশ্রম থেকে আলো পড়ছিল! কেমন আলো? পরিষ্কার করে বল।
টর্চের মতো, কিন্তু একশোটা টর্চের সমান। আলোটা আশ্রম থেকে আকাশে ওড়াউড়ি করছিল। তারপর প্লেনটা যখন খুব কাছ দিয়ে চলে গেল আর ওই কাপড়গুলোর কী যেন নাম বলেছিলেন, সেগুলো নামতে থাকল তখন ওই আলোটা দুই-একবার ওগুলোর গায়ে পড়ে এমন চকচক করে উঠেছিল যে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। বুঝলেন স্যার, প্রভু মনে হয়, রাতের বেলা টর্চ মেরে আকাশ দেখেন। মহাপুরুষদের ব্যাপার...
শুনতে শুনতে উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াল অর্ণব। সনাতনকে বলল, এই কথাটা তুই আগে কেন বলিসনি?
সনাতন চুপ।
আর কাকে বলেছিস এই কথাটা?
কাকে বলব? কেউ শোনে আমার কথা!
ওই আগের যে পুলিশবাবুরা তোকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন তাঁদের বলেছিস?
না স্যার, ভুলে গেছি বলতে।
ভেরি গুড। শোন, এই কথা আর কাউকে বলবি না। বলে পকেট থেকে মানিব্যাগ বার করে একটা কুড়ি টাকার নোট বাড়িয়ে দিল সনাতনের দিকে।
সনাতন একগাল হেসে নোটটা নিল, তারপর খুব যত্ন করে দু-ভাঁজ করে ময়লা চাদরটা গা থেকে সরিয়ে শার্টের বুকপকেটে রাখল।
গোপাল বলল, তুই এখন যা।
সনাতন অর্ণবকে প্রণাম ঠুকে বেরিয়ে যেতেই অর্ণব নন্দ আর কৃষ্ণলালকে বলল, তোমাদের দুজনকে একটা কথা বলছি, খুব জরুরি কথা।
বলুন স্যার।
আগে বলো, তোমাদের দুজনের কি আমার ওপর ভরসা রয়েছে? আমাকে বিশ্বাস করো?
এটা কী বলছেন স্যার! হান্ড্রেড পারসেন্ট বিশ্বাস রয়েছে। চৌহাটিতে অনেক অফিসার এসেছেন-গেছেন, আপনার মতো কেউ নয়। বলল কৃষ্ণলাল।
বেশ, যেটা বললে তা যদি মন থেকে বলে থাকো তাহলে শোনো, আমার মন বলছিল, এই পুরো ব্যাপারটায় প্রভু জগবন্ধু এবং তাঁর সেবাশ্রমের কোনো যোগাযোগ রয়েছে। এখন সনাতনের কাছে শুনে আমার সন্দেহ বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। আমি নিশ্চিত, এই ঘটনার জাল অনেক দূর অবধি ছড়িয়ে রয়েছে। খুব বড়ো জাল।
স্যার, আপনার আন্দাজ যদি সত্যিও হয়, জাল যদি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়ানোও থাকে, আশ্রম যদি এই ঘটনায় জড়িতও থাকে তাহলেও আমরা কী-ই বা করতে পারি? আহ.zবি., সি.আই.ডি. কেউই তো আমাদের পাত্তা দিল না।
কথাটা তুমি ভুল কিছু বলোনি, কিন্তু কাজটা যখন আমরা শুরু করেছি তখন আমাদের কেউ পাত্তা দিক বা না দিক, আমরা নিজেদের মতো করে কেসটা দেখতেই পারি।
কী হবে স্যার ফালতু পরিশ্রম করে? রিস্কও নেব, অথচ কোনো স্বীকৃতি পাব না, উলটে আগ বাড়িয়ে কিছু করতে গেলে সাসপেন্ড হয়ে যেতে পারি।
নন্দ আরও কিছু বলতে গেলে ওকে থামিয়ে দিল কৃষ্ণলাল। বলল, স্যার, আপনি যা করতে বলবেন আমি করব, আমি আপনার সঙ্গে রয়েছি। তাতে যা হয় হবে। বলুন কী করতে হবে। নন্দ, তোকে কিছু করতে হবে না, ছেড়ে দে।
নন্দ বলল, আমি তো ছেড়ে দেওয়ার কথা বলিনি, খারাপ কী কী ঘটতে পারে সেই সম্ভাবনার কথাগুলো শুধু উল্লেখ করেছি। সেগুলো কি ভুল স্যার, আপনিই বলুন?
না ভুল নয়, সবটাই ঠিক। কিন্তু পুলিশের উর্দিটার দাম অনেক, নন্দ। অনেক সৌভাগ্য। এই উর্দি আমাদের গায়ে রয়েছে। শুধু ওপরওয়ালাকে খুশি করা আমাদের কাজ নয়। সমাজের যা কিছু অন্যায়, যা কিছু খারাপ তা খুঁজে বার করে তাকে শাস্তি দেওয়া আমাদের কাজ। আমি চিরকাল সেটাই করে এসেছি। তার জন্য আমাকে পেশাগত জীবনে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে, আমার প্রোমোশন আটকেছে, সাসপেন্ড হয়েছি, শোকজ পেয়েছি, আজেবাজে জায়গায় পোস্টিং পেয়েছি। কিন্তু জীবনে কখনো ঘুস খাইনি, অন্যায়ের সঙ্গে আপোশ করিনি, নিজের বিবেকের কাছে,কর্তব্যের কাছে সৎ থেকেছি। এর থেকে বড়ো আরাম আমার কাছে আর কিছু নেই।
কৃষ্ণলাল আর নন্দ দুজনের গ্রামের মানুষ। পুলিশে চাকরি করলেও মনটা সোজা। অর্ণব কথাগুলো এতটাই আবেগ দিয়ে বলল যে দুজনেই আবেগাপ্লুত হয়ে উঠল।
নন্দ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে অর্ণবকে স্যালুট ঠুকে বলল, আপনি হুকুম করুন স্যার। জান লড়িয়ে দেব।
অর্ণব বলল, তোমরা দুজনেই এই গ্রামে রয়েছ অনেকদিন হল। তোমাদের দু'জনকে লোকে বিশ্বাস করে। তোমরা গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথা বলো। গল্পগাছা করতে করতে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করো, কেউ কিছু জানে কি না। আর কেষ্টদা, এই আশ্রমে তুমি অনেকদিন ধরে যাতায়াত করো, আমাকে শুধু আশ্রমের দুটো জিনিসের সন্ধান যেভাবে হোক দিতে হবে, তার ব্যবস্থা করো।
কী করতে হবে বলুন।
আশ্রমের রেকর্ড রুমটায় আমাকে একবার ঢোকার ব্যবস্থা করতে হবে। আর আশ্রমের পিছনদিকে একটা জায়গা রয়েছে যেখানে উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা থাকলেও ওখানেই আশ্রম শেষ নয়, ওই পাঁচিলের পিছনেও আমার বিশ্বাস, কিছু একটা রয়েছে। সেটা কী তা আমি জানতে চাই। পারবে ব্যবস্থা করে দিতে?
কৃষ্ণলাল একটু ভাবল, বলল, আসলে স্যার আশ্রমে সেবকের পোশাকেই অজস্র গার্ড রয়েছে যারা সর্বক্ষণ আশ্রমকে পাহারা দিচ্ছে। আপনি বুঝতেও পারবেন না কে গার্ড আর কে এমনি সেবক। তাদের চারদিকে চোখ। তবে আমার বাড়ির পাশে থাকে দয়াল। আমার ছোটোবেলার বন্ধু। ওই আশ্রমের গার্ডের কাজ করে। ওর কাছ থেকে আশ্রমের অনেক খবরাখবর আমি মাঝে মাঝে পাই। আপনি ঠিকই বলেছেন স্যার, দয়ালও বলে, জগবন্ধু আশ্রম যেমন এই গ্রামের জন্য অনেক কিছু করেছে, তেমন অনেক কিছু এমনও করে যা ভালো নয়, এই গ্রামে জগবন্ধুর বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলতে পারে না। আমার মনে রয়েছে, তখন একবার চৌহাটির একটা ছেলে গজু জগবন্ধুর বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেছিল, ওর বক্তব্য ছিল, জগবন্ধু গরিব মানুষদের সাহায্য করার ভান করে তাদের শিষ্য বানিয়ে নিজের দল বড়ো করছেন। কয়েকদিনের মধ্যেই ছেলেটা পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছিল। এমন একবার নয়, বেশ কয়েকবার ঘটেছে স্যার। তাই ওদের বিরুদ্ধে কেউ কখনো মুখ খোলে না। অবশ্য খোলার দরকারো হয় না। চৌহাটি গ্রামের যেটুকু উন্নতি তা কোনো সরকারের করা নয়, আশ্রমের জন্য। একটা টিউকল পর্যন্ত এই গ্রামে ছিল না স্যার। আশ্রম প্রতিষ্ঠার পর এখানে এতগুলো নলকূপ হয়েছে।
অর্ণব একটু অবাকই হল। এখানে আসা ইস্তক নন্দ এবং কেষ্টদার মুখে প্রভু জগবন্ধু এবং আশ্রমের জয়গানই শুনেছে। ওঁর সম্পর্কে কোনো নেগেটিভ কথা এই প্রথমবার শুনল।
অর্ণব বলল, দেখো, তোমাদের দুজনকেই একটা কথা বলি। চৌহাটির উন্নতি করার পিছনে শুধু মহৎ উদ্দেশ্য না-ও থাকতে পারে। হতেই পারে, এইটুকু উন্নতি তাঁরা নিজেদের স্বার্থে করেছেন।
এটা কী বললেন স্যার? এখানে উন্নতি করে আশ্রমের কী সুবিধা হবে?
অনেক সুবিধা হতে পারে। প্রথমত, আশ্রম যদি তার বাইরের কার্যকলাপের আড়ালে এমন কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত থাকে যা শহরে করা অসুবিধা, সেটাই গ্রামে নিশ্চিন্তে করা যায়। গ্রামের দিকে পুলিশ প্রশাসনের নজর কম থাকে। গ্রামের মানুষরাও হয় সহজ-সরল। জটিল বিষয়ে গ্রামবাসীদের কৌতূহল কম, ফলে তাদের চোখ এড়িয়ে অনেক কিছুই করা যায়। নইলে তোমরা কেন ভাবো না জগবন্ধু আশ্রমের চারদিকে এত নাম, দেশ-বিদেশে এখন এত ব্রাঞ্চ, তবু জগবন্ধুর হেড অফিস এখানেই কেন? উনি কেন এই চৌহাটির মতো একটা জায়গায় রয়েছেন? যদি সমাজকল্যাণের কথা বলো তাহলে বলব, উনি যদি চাইতেন তাহলে এই চৌহাটি এতদিনে আরও অনেক অনেক উন্নত হতে পারত, এখানে জঙ্গল রয়েছে, পাহাড় রয়েছে, এই আশ্রম রয়েছে— এখানে ট্যুরিস্ট স্পট হয়ে যেত এতদিনে, কিন্তু এই অঞ্চলে বাইরের লোক এসে পিকনিক করতে পারবে না, জমি কিনতে পারবে না, আরও অনেক অলিখিত নিয়ম রয়েছে। কেন রয়েছে? নিশ্চয়ই এরা চায় না বাইরের লোক এখানে ভিড় বাড়াক।
অর্ণবের কথাগুলো শুনে মাথা নাড়ল তিনজনেই।
কৃষ্ণলাল বলল, আমি ঠিক এত কিছু ভেবে দেখিনি। আমি স্যার আপনার সঙ্গে আছি, যা বলবেন করব।
বেশ, তাহলে যেমন বললাম তেমন কাজ শুরু করে দাও। বলে অর্ণব টেলিফোনের রিসিভার তুলে সুদীপের থানায় ফোন করল। সুদীপ থানায় নেই, বেরিয়েছে। যিনি তুলেছিলেন, অর্ণবকে চেনেন না, নতুন পোস্টেড। অর্ণব নিজের পরিচয় দিতে তিনি বললেন, সুদীপের কাছে অর্ণবের অনেক গল্প তিনি নিয়মিত শোনেন, সুদীপ অফিসে ফিরলেই তিনি জানিয়ে দেবেন, অর্ণব ফোন করেছিলেন।
ফোনটা রাখার পর কৃষ্ণলালের দিকে তাকিয়ে অর্ণব বলল, আমি হয়তো দুই-একদিনের মধ্যে একটু কলকাতা যাব। তোমরা একটু সামলে নিয়ো। খুব দরকারি কাজ রয়েছে।
কোনো চিন্তা নেই স্যার। বলল গোপাল। সেকেন্ড অফিসার হিসেবে ফাঁড়ির দায়িত্ব ওর ওপরেই বর্তায়।
ঠিক মিনিট দশেকের মধ্যেই সুদীপের ফোন।
তুই ফোন করেছিলি?
হ্যাঁ, শোন, বিশেষ দরকার। একটা হেল্প লাগবে।
কী হেল্প?
সুজন সেতু কেস ফাইলটা আমি একবার দেখতে চাই।
তোর কি সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়? কী দরকার এসব করার?
তুই পারবি কি না বল।
কবে লাগবে?
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
আবারও বলছি অর্ণব, ভেবে দেখিস। আমি জানি, তুই কেন সুজন সেতু কেস দেখতে যাচ্ছিস। মনে রাখিস, বুরুলিয়া অস্ত্রবর্ষণ কোনো পেটি কেস নয়, বিশাল কনস্পিরেসি।
জানি। আমি শুধু একটু পড়াশোনা করতে চাই। কাজকর্ম তো কিছু নেই। ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে রয়েছি।
হুম। কবে আসবি তুই?
তুই বল।
দিন দুয়েক সময় দে।
ঠিক আছে।
ফোন রেখে দিল অর্ণব। লালবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের কেস রেকর্ডস রুমে আগেও বেশ কয়েকবার গিয়েছে, সুধীরের ওই ডিপার্টমেন্টে ভালো চেনাশোনা রয়েছে, ফলে প্রয়োজনীয় রেকর্ডস দেখতে কোনো অসুবিধা হয় না। অর্ণব ঠিক করে নিয়েছে, এবার শুধু সুজন সেতু কেস ফাইল রেকর্ডস রুমে তো দেখবেই, তার সঙ্গে এই কেস সম্পর্কিত আরও যা কিছু রয়েছে সব জানার চেষ্টা করবে। ওর মন বলছে, ওই কেসের সঙ্গে এই ঘটনার কোনো একটা যোগাযোগ রয়েছে।
গোটা ভারতে যখন বুরুলিয়া অস্ত্রবর্ষণ নিয়ে তোলপাড় চলছে তখন ব্লেক ও লাটভিয়ান ক্রিউ মেম্বাররা মিলে ফুকেটে ছুটি কাটাচ্ছিল। যদিও ব্লেকের কাছে দুঃসংবাদটা পৌঁছে গেছে যে অস্ত্র যথাস্থানে পৌঁছোয়নি। সব ক-টা বক্স গন্তব্যে পৌঁছোনোর আগেই পুলিশের নজরে চলে এসেছিল এবং সেগুলো সিজ করে ফেলা হয়েছে। এতদিনের এত পরিকল্পনা, পরিশ্রম, অর্থ সব জলে গেছে। খুব হতাশ লাগছিল ব্লেকের। মন একেবারে ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু আবার ওঁকে পরবর্তী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এবারে আরও কঠিন কাজ। হয়তো এর ফলে ওঁর বাকি জীবনটা কারাগারের অন্তরালেই কাটবে, অথবা ফাঁসি হবে। কিন্তু বড়ো স্বার্থে নিজের জীবনকে ত্যাগ করাই যায়। প্রভুর আদর্শকে রক্ষা করার জন্য, তাঁর উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য আত্মোৎসর্গ করা সৌভাগ্যের। গত পরশু প্রভুর সঙ্গে সরসরি একবার ফোনে কথা হয়েছে। তিনি ব্লেককে হতাশ হতে বারণ করেছেন এবং মনকে শক্ত করে নতুন উদ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। পদক্ষেপটি একপ্রকার আত্মবলিদানের। হয়তো এরপর আর কখনো প্রভুর সঙ্গে দেখা আর কথা বলার সুযোগ হবে না, সেজন্যই প্রভু ওঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছিলেন। আশীর্বাদ করেছেন। আদর্শকে দৃঢ় করার উৎসাহ দিয়েছেন। প্রভুর কথার মধ্যে কী যেন এক জাদু রয়েছে, শুনলে মনের ভেতরের সব সংশয়, দ্বিধা, হতাশা মুহূর্তে কেটে যায়। চারদিক উজ্জ্বল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছুই আর ধোঁয়াশা থাকে না। ঠিক এই কারণেই তো প্রথম যেবার ভারতে এসেছিলেন ব্লেক নিজের কাজের সূত্রে তখন প্রভুর সংস্পর্শে আসার পর তাঁর জীবনটাই অন্যরকম হয়ে গেছিল। তখন ব্লেক বয়সে তরুণ, অল্প বয়স থেকেই ইচ্ছা সামাজিক কাজকর্ম করার। নিজের দেশের একটি জনকল্যাণমূলক সংস্থায় কাজ শুরু করেছিলেন। সংস্থাটি এশিয়া, আফ্রিকার বেশ কিছু পিছিয়ে-পড়া দেশে নানা কাজ করত। কর্মী হিসেবে ইন্ডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল ব্লেককে। ইন্ডিয়া সম্পর্কে আগ্রহ ছিল ব্লেকের। ছোটোবেলা থেকেই খানিকটা আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহ থাকার কারণে ইন্ডিয়ার স্পিরিচুয়ালিজম নিয়ে অল্পবিস্তর পড়াশোনা করেছিলেন। ইন্ডিয়ায় এসে উনি নিজের কাজ করার পাশাপাশি ঘুরছিল ধর্মস্থানগুলোয়। কথা বলছিল সাধুসন্ত-সন্ন্যাসী, ধর্মগুরুদের সঙ্গে। জানছিল, বুঝছিল, কিন্তু যেদিন সহসাই দেখা হয়ে গেল প্রভু জগবন্ধুর সঙ্গে, তাঁর পাদপদ্ম স্পর্শ করার পরেই ব্লেক বুঝেছিল এই দিব্যপুরুষই তাঁর জীবনকে আলোকিত করতে পারেন।
অনাথ আশ্রমে বড়ো হয়ে ওঠা ব্লেক প্রভুর করস্পর্শে প্রথম অনাস্বাদিত পিতার স্নেহকে উপলব্ধি করেছিল। বুঝতে পেরেছিল, সে তার আরাধ্যকে পেয়ে গেছে। প্রভুর সান্নিধ্যে ক-টা দিন কাটানোর পর তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে নিয়েছিল ব্লেক। তখন প্রভুর বিস্তার এতদূর হয়নি। এমন জগৎজোড়া পরিচিতি হয়নি তখন তাঁর। ফলে প্রভুর কাছে পৌঁছোনো যেমন সহজ ছিল। প্রভুও তাঁর ভক্তসংখ্যা বাড়ানোর জন্য তখন মরিয়া ছিলেন। ছোটোবেলা থেকে স্নেহ, ভালোবাসা, জীবনের সঠিক দিশা না-পাওয়া ব্লেক প্রভুর সংস্পর্শে এসে এক নতুন জীবনের সন্ধান পেয়েছিল। আমিষ খাওয়া, মাদক নেওয়া বন্ধ করে দিল। ধ্যান, জপতপ ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের অন্তরকে উন্নততর করে তুলছিল। প্রথমবার প্রায় মাস দুয়েক প্রভুর কাছে কাটিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছিল ব্লেক। প্রভু তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, নিজের দেশে ফিরে গিয়ে যেন জ্যাট-এর প্রচার করতে থাকে, সেটাই তাঁর দায়িত্ব। সেই আদেশই পালন করেছিল ব্লেক। প্রভুর প্রচার বিদেশেও বাড়তে শুরু করেছিল। ব্লেকের কাজে খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন প্রভু। তিনি ব্লেককে আবারও আমন্ত্রণ করলেন একটি বিশেষ সভায় যোগদান করে ভাষণ দেওয়ার জন্য। কলকাতায় প্রভু তাঁর আশ্রমের একটি শাখা তৈরি করছেন, তার উদবোধনের দিনে তিনি ব্লেককে চাইছেন। প্রভুর আহ্বান ব্লেকের কাছে ঈশ্বরের নির্দেশের মতো মনে হয়েছিল। প্রভু তাঁকে নিজের মনে করে এত বড়ো সম্মান দিতে চাইছেন এ যেন ব্লেকের কাছে অবিশ্বাস্য ছিল। কিন্তু সেদিন সে জানত না কী ভয়ংকর দিন তাঁর জন্য এবং আশ্রমিকদের জন্য অপেক্ষা করছে।
ফুকেটের একটি বিলাসবহুল হোটেলের রুমের টয়লেটের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ব্লেক। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। নিম্নাঙ্গে একটি তোয়ালে জড়ানো। আয়নায় নিজের বুক ও পিঠের পুরোনো ক্ষতের দাগগুলিকে দেখছিল। এই ক্ষতগুলি আজ থেকে দশ বছর আগের। শারীরিক যন্ত্রণা আর না থাকলেও মনের ক্ষত আজও দগদগে। আর সেই ক্ষতির উপশমের জন্যই প্রভুর আদেশে এত বড়ো একটা কাজের দায়িত্ব নিয়েছিল।
নিজের ক্ষতস্থানগুলোতে হাত বোলাতে বোলাতে ব্লেক ফিরে গেল বছর দশেক আগের সেই দিনটায়। কলকাতার তালজলা আশ্রমে যাওয়ার দিন। কিছুদিন আগেই ভারতে চলে এসেছিল ব্লেক। প্রভুর সান্নিধ্যে কয়েকটা দিন কাটানোর পর রাতের ট্রেনে মোট চোদ্দো জন সেবক-সেবিকা রওনা হয়েছিল। এগারোজন সেবক এবং তিনজন সেবিকা ছিলেন। ট্রেনে হাওড়া স্টেশন পৌঁছোনোর পর চারটে ট্যাক্সি করে ওঁরা রওনা হল নতুন আশ্রমের দিকে। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। ব্লেক খুব উত্তেজিত ছিল, জীবনে প্রথমবার মঞ্চে জ্যাট সম্পর্কে বলবে। এত বড়ো সুযোগ ওঁকে প্রভুপাদ দিয়েছেন! অনুষ্ঠান নিয়েই আলোচনা করতে করতে যাচ্ছিলেন ওঁরা। চারটে ট্যাক্সি পর পর যাচ্ছিল। সুজন সেতুতে ওঠার ঠিক মুখে আচমকাই অনেকগুলো লোক এসে ট্যাক্সি থামিয়ে দিল। সামনের ট্যাক্সিটা থামতে দেখে পিছনের তিনটে ট্যাক্সিও থেমে গেল। কেউই কিছু বুঝতে পারছিল না ব্যাপারটা কী ঘটছে। ব্লেক ছিল দ্বিতীয় ট্যাক্সিতে। ওঁরা দেখল, সামনের ট্যাক্সির সেবকদের সঙ্গে বাইরে থাকা লোকগুলো বেশ উত্তেজিতভাবে কথা বলছে। বিষয়টা কী হচ্ছে বোঝার আগেই কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্তত পঞ্চাশ-ষাটজন লোক কোথা থেকে ছুটে এসে ওঁদের ট্যাক্সিগুলোকে ঘিরে ফেলল। ওদের হাতে লাঠি, লোহার রড আরও অনেক কিছু। ব্লেক বুঝতে পারছিল, কিছু একটা অঘটন ঘটতে চলেছে। ও যে ট্যাক্সিতে সামনের সিটে বসেছিল সেই ট্যাক্সিরই পিছনের সিটে বসেছিলেন দুজন সন্ন্যাসিনী। তাঁরা দুজনেই খুব আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন। ব্লেক ওঁদের দুজনকে শান্ত থাকতে বলে গাড়ি থেকে বেরোতে গেল, তার আগেই পাঁচ-ছয়জন মিলে ট্যাক্সির দরজা খুলে ওঁকে এবং সন্ন্যাসিনী দুজনকে টেনহিঁচড়ে বার করে নিয়ে এল। আর তারপরেই শুরু হয়ে গেল বেদম মার। মহিলা দুজনকেও কোনোরকম মায়াদয়া না করে এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করল।
মার খেতে খেতে ব্লেক দেখল ওঁদের সব ক-টা ট্যাক্সিকেই থামিয়ে সব সেবক বার করে নির্মমভাবে মারছে অন্তত জনা পঞ্চাশেক লোক। শহরের এদিকটা খুব বেশি জনবহুল নয়। গাড়িঘোড়া কমই চলে। কিন্তু তা-ই বলে জনমানবশূন্যও নয়। লোক চলাচল রয়েছে, দোকানপাটও রয়েছে। ব্লেক মার খেতে খেতে, রক্তাক্ত হতে হতেই ওদের ভাঙা বাংলায় জিজ্ঞাসা করল, কেন মারছেন আমাদের? কী দোষ করেছি আমরা?
একজন ব্লেকের বুকের কাছটা খামচে ধরে বলল, শুয়োরের বাচ্চা, আবার বাংলা কথা বলা হচ্ছে। বাচ্চাগুলোকে কি তোদের দেশেই পাচার করে নিয়ে যাস?
ব্লেক কিছুই বুঝতে পারল না। জিজ্ঞাসা করলেন, বাচ্চা? কোন বাচ্চা? কী পাচার?
কোন বাচ্চা? আমাদের জানতে বাকি নেই, তোরা কী করিস। তোরা সব ক-টা ছেলেধরা।
বলেই আবার মারতে শুরু করল ওঁকে। সন্ন্যাসিনী দুজনকেও লাঠি, বাঁশ, রড ইত্যাদি দিয়ে কয়েকজন মিলে নির্মমভাবে মারছে। মার খেতে খেতে মাটিতে পড়ে গেল ব্লেক। কে যেন চিৎকার করে উঠলেন, সব ক-টাকে পার্টি অফিসে নিয়ে চল, ওখানে ব্যবস্থা হবে। শুয়োরের বাচ্চাগুলোকে আজ জ্যান্ত ছাড়ব না।
অনেক সন্ন্যাসী আর্তনাদ করছিলেন, সাহায্য চাইছিলেন পথচারীদের কাছে। কিন্তু যাঁরা রাস্তায় ছিলেন, ওই অবস্থা দেখে মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেলেন। আশপাশের দোকানগুলোর ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গেল।
তারপর যেটা ঘটল তা ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য এক কলঙ্কময় অধ্যায়। সন্ন্যাসীদের মারতে মারতে প্রায় অচেতন করে দিয়ে সেই লোকগুলো থামল। একজন মাঝবয়সি নেতাগোছের লোক বলল, আর পার্টি অফিসে নিয়ে গিয়ে দরকার নেই, সব ক-টাকে এখানেই জ্বালিয়ে দে।
একজন উত্তরে বলল, কিন্তু বাবুদা, সুকান্তিদা বলেছিলেন সব ক-টাকে পার্টি অফিসে নিয়ে যেতে। ওখানে ব্যবস্থা করতে। লরিও রেডি আছে। এগুলোকে তুলে নিয়ে চলে যাব।
কোনো দরকার নেই। এখানেই ব্যবস্থা করে ফেল। বলে সেই বাবুদা নামের লোকটা কাকে যেন হাঁক দিয়ে বলল, তেল নিয়ে আয়।
ব্লেক মুখ থুবড়ে শুয়ে ছিলেন। ওর থেকে ঠিক তিন ফুট দুরে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন একজন সন্ন্যাসিনী। লোকগুলো ব্লেকের সামনে থেকে কিছুটা দূরে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল। ব্লেক বা বাকি সন্ন্যাসীদের কেউই যে আর উঠে দাঁড়ানোর অবস্থায় নেই সেই ব্যাপারে ওরা নিশ্চিত ছিল। ওরা যখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল তখন দুই-একটা শব্দ ব্লেকের কানে পৌঁছোল। সব ক-টাকে এখানেই জ্বালিয়ে দেব।
ব্লেক বুঝতে পারল আর রক্ষা নেই। ওঁদের কয়েকজন মাটিতে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে-থাকা সন্ন্যাসীদের শরীরে লাথি মেরে মেরে দেখছিল কার অবস্থা কেমন। কেউ পালানোর অবস্থায় রয়েছে কি না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য কোনো কোনো সন্ন্যাসীর মাথায় লোহার রড দিয়ে সজোরে আঘাত করে খুলি ফাটিয়ে দিচ্ছিল। ব্লেক মাথা না ঘুরিয়ে শুধু চোখ খুলে দেখল চারপাশটা। ব্রিজটায় ওঠার মুখে একটা রেল গেট রয়েছে। রেল গেটটা পার করে ব্রিজ। ব্রিজ আর রেল গেটের মধ্যে পঞ্চাশ ফুটের মতো দূরত্ব। ব্লেক দেখল রেল গেট নেমেছে, মানে ট্রেন ঢুকবে। এরা কারা কিছুই বুঝতে পারছ না ব্লেক, তবে এইটুকু বুঝতে পেরেছ এরা পার্টির লোক। ব্লেক চুপ করে শুয়ে রইল। গোটা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। জানা নেই আদৌ উঠে দাঁড়াতে পারবে কি না। কিন্তু মরার আগে বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টা করতেই হবে। চোখ আধবোজা রেখে শুয়ে থেকে দেখতে পেল দুই-তিনজন লোক ব্যারেলে করে তরল নিয়ে এসে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে-থাকা সন্ন্যাসীদের গায়ের ওপর ঢালছে। তরলটা কী তা মুহূর্তের মধ্যেই টের পেয়ে গেল ব্লেক। পেট্রোল। লোকগুলো ওদিকে কাজ সেরে এবার এদিকে আসবে। ট্রেনের হুইসল শোনা যাচ্ছে। এবারেই শেষ চেষ্টা। মনে মনে প্রভুকে স্মরণ করে শরীরের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে উঠে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ব্লেকের চোখ পড়ল, তাঁর সামনে উপুড় হয়ে পড়ে-থাকা সন্ন্যাসিনী ওঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। ব্লেক কোনোকিছু না ভেবে শুধু চোখের ইশারায় তাঁকে উঠে পালাতে বলল। আর তারপরেই কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ব্লেক আর এই সন্ন্যাসিনী যেহেতু খানিকটা দূরে পড়ে ছিলেন বাকিদের থেকে তাই এদিকটায় লোকগুলোর ভিড় কম ছিল। এই ট্যাক্সিতে থাকা আরেকজন সন্ন্যাসিনী একেবারেই অচেতন হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে রয়েছেন। ব্লেকের দেখাদেখি সামনের এই সন্ন্যাসিনীও দুইবারের চেষ্টায় কোনোমতে উঠে দাঁড়ালেন। তারপরেই দুজনে রেল গেটের দিকে প্রাণপণে ছুটতে শুরু করলেন। লোকগুলো প্রথমটায় বুঝতে পারেনি, তারপরেই ব্লেক আর সন্ন্যাসিনীর পোশাক দেখে কয়েকজন চিৎকার করে উঠল, ওই দেখ দেখ, দুটোতে পালাচ্ছে। ধর শুয়োরের বাচ্চা দুটোকে। লাঠিসোঁটা হাতে নিয়ে ওঁদের তাড়া করল কয়েকজন। ব্লেক প্রাণপণে ছুটছিল। সন্ন্যাসিনী পিছিয়ে পড়ছিলেন। ট্রেন একেবারে কাছে। ব্লেক বুঝতে পারছিল ট্রেন রেল গেট ক্রস করার আগে ওঁকে রেললাইনের ওদিকে যেতে হবে, নইলে আর রেহাই নেই। ব্লেক আচমকাই থামল, তারপর দুই পা পিছিয়ে সেই সন্ন্যাসিনীর হাত ধরে টানতে টানতে রেললাইনের ওপরে চলে এল। দ্রুতগামী ট্রেনটা একেবারে সামনে। কোনোকিছু না ভেবে সেই সন্ন্যাসিনীর হাত শক্ত করে ধরে ঠিক দুই লাফে রেললাইনটা পার হওয়ামাত্র ট্রেনটা প্রায় গায়ের ওপর দিয়েই ঝড়ের গতিতে ছুটে যেতে থাকল। রেল গেট পার করেই সামনে একটা গলি। সেখানে ঢুকে পড়লেন দুজনে। রাস্তা পুরো ফাঁকা। একটা রিকশা দাঁড়িয়ে। ওটায় ব্লেক এবং সন্ন্যাসিনী উঠে পড়লেন। রিকশাওয়ালা ওদের দিকে তাকিয়ে রইল।
ব্লেক বলল চলো।
রিকশাওয়ালা ওঁদের রক্তাক্ত পোশাকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কোথায়?
চলো বলছি। তাড়াতাড়ি ভাই।
রিকশাওয়ালা দোনামনা করছিল। ব্লেক জোরে ধমক লাগাল, এখনই চলো। দ্রুত। রিকশাওয়ালা আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত প্যাডেল চালাতে শুরু করল। সেই সন্ন্যাসিনী ব্লেকের হাত শক্ত করে ধরেছিলেন। ব্লেক বার বার পিছনে তাকাচ্ছিল। লোকগুলো যদি ওঁদের দেখতে পেয়ে যায় তাহলে আর রক্ষা নেই। শরীরে এতটুকু শক্তি নেই।
কোথায় যাবেন দাদা? আবার জিজ্ঞাসা করল রিকশাওয়ালা।
ব্লেক বলল, স্টেশন চলো, রেল স্টেশন।
পাশে বসে-থাকা সন্ন্যাসিনী কাঁপছিলেন। ব্লেক ওঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
স্টেশনের কাছে আসতেই সেই সন্ন্যাসিনী বললেন, ট্রেনে যাবেন না, ওরা নিশ্চয়ই ওখানে থাকবে।
ব্লেকের মাথায় এটা আসেনি। সত্যি তো, লোকগুলো নিশ্চয়ই ভাববে, ওঁরা দু'জন পালানোর জন্য ট্রেনকেই ব্যবহার করবেন। আর সব থেকে কাছের স্টেশনটাতেই যাবে। ব্লেক সঙ্গে সঙ্গে রিকশাওয়ালাকে বলল না না, রিকশা ঘোরাও, স্টেশনে যাব না।
আপনারা নেমে যান। আমি আর যাব না।
ভাই, তোমার কাছে হাতজোড় করছি, আমাদের বাঁচাও।
রিকশাওয়ালাটা কপালের ঘাম মুছে বলল, আপনাদের কী হয়েছে? পার্টির লোক ধরেছিল?
ব্লেক শুধু বললেন হুঁ।
ওরা সব শেষ করে দেবে দাদা। সব শেষ করে দেবে। বলে রিকশা ঘুরিয়ে বলল, আপনারা এক কাজ করুন। আগে ডাক্তারখানায় চলুন। যেভাবে রক্ত পড়ছে আপনাদের...
এই ট্যাক্সি... ট্যাক্সিইইই।
রিকশা থেকে হাত দেখিয়ে একটা ট্যাক্সিকে থামালেন ব্লেক। ট্যাক্সিওয়ালা ওঁদের অবস্থা দেখে মুখে কিছু বলল না। চলে গেল।
দাদা, আপনারা কি সাধু সন্ন্যাসী?
ব্লেকের এত কথার উত্তর দিতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু রিকশাওয়ালাকে চটিয়ে লাভ নেই। এ যদি রিকশা থেকে নামিয়ে দেয় তাহলে আরও বিপদ হবে। তাই উত্তরে বলল, হুঁ।
তারপরেই রিকশাওয়ালাটি যা বলল তার জন্য ব্লেক এবং সন্ন্যাসিনী মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। ও সোজা রিকশা ঢুকিয়ে দিল একটি বস্তিতে। অলিগলি দিয়ে খানিকটা যাওয়ার পর একটা ঝুপড়ির সামনে থামল। ওঁদের বলল, আপনারা নামুন। এটা আমার ঘর। শিগগির ঘরে ঢুকুন।
ওঁরা দুজনে তা-ই করলেন। ঘরের ভেতরে একজন রোগা মহিলা একটা বাচ্চাকে খাওয়াচ্ছিলেন। ওঁদের ঢুকতে দেখে থতমত খেয়ে গেলেন। রিকশাওয়ালা মহিলাকে বলল, মালতী, তোর একটা শাড়ি-ব্লাউজ দে। তাড়াতাড়ি কর। বলে রিকশাওয়ালা ব্লেকের দিকে তাকিয়ে বলল, ভয় নেই, এটা আমার ঘর। আমার নাম প্রকাশ ও আমার বউ মালতী। আপনাদের আমি জামাকাপড় দিচ্ছি। এগুলো পরে নিয়ে বাইরে যান। তাহলে ওরা চিনতে পারবে না।
ব্লেক অবাক হয়ে যাচ্ছিল, সামান্য একজন দরিদ্র রিকশাওয়ালা নিজেরই ভালো করে সংসার চলে না। সে দুজন অচেনা মানুষের জন্য এইভাবে সাহায্য করছে! প্রভুপাদ যে বলেন মানুষের মধ্যেই পরম করুণাময় জগৎপিতার অবস্থান, কোনো কোনো পুণ্যাত্মার মধ্যে সেই অবস্থান প্রকাশ পায়। প্রকাশ ও তার স্ত্রী-র মধ্যে সেই লক্ষণ স্পষ্ট। প্রকাশ ও তার স্ত্রী মিলে খুব দ্রুতহাতে জলন্যাকড়া দিয়ে ওঁদের ক্ষতস্থানগুলি পরিষ্কার করে বোরোলিন, ডেটল লাগিয়ে দিল। ব্লেকের গোটা শরীর যন্ত্রণায় কাতর। কিন্তু শরীরের যন্ত্রণা উনি টের পাচ্ছিল না প্রাণটুকু বাঁচানোর দায়ে। উনি বারংবার সন্ন্যাসিনীকে জিজ্ঞাসা করছিল, মাতা, আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে তা-ই না?
সন্ন্যাসিনী প্রতিবারই উত্তর দিচ্ছিলেন, না, আমি ঠিক আছি।
ওদের কাছ থেকে সাধ্যমতো প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু আর ওদের ব্যবহৃত পোশাক পরে নিয়ে ব্লেক আর মাতা তৈরি হল। ব্লেক ওঁর থেকে কিছু টাকা দিতে চাইল প্রকাশকে। প্রকাশ কিছুতেই নিল না। শুধু বলল, আমি আমার ভাড়াটুকু পেলেই হবে। আপনারা সন্ন্যাসী মানুষ। আশীর্বাদ করবেন যেন আমাদের ভালো হয়।
তারপর ওঁরা দুজন প্রকাশের রিকশায় উঠলেন। প্রকাশ বললেন আর আপনাদের ভয় নেই। নিশ্চয়ই আপনাদের মুখ চিনে রাখেনি। পোশাক বদলে ফেলেছেন। এবার নিশ্চিন্তে ফিরতে পারেন। ওঁরা রিকশায় করে যখন দূরের রেল স্টেশনটির দিকে এগোচ্ছিলেন তখন আকাশে কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছিল। মানুষ আর পেট্রোল-পোড়া গন্ধে ভরে যাচ্ছিল চারদিক। ব্লেক আর সন্ন্যাসিনী দুজনের অন্তর পুড়ছিলেন সেই আগুনে। আর সুজন সেতুতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছিলেন চোদ্দোজন নিরীহ মানুষ।
সেদিন দুজনে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসার পর ঘটে গেল অনেক ঘটনা। খানিক রাজনৈতিক চাপান-উতোর, পারস্পরিক দোষারোপ, প্রাথমিক তদন্ত, খবরের কাগজে হইচই। কিন্তু সকলে সবকিছু জানা সত্ত্বেও কেউ ধরা পড়ল না। কারো নামে কেস হল না। কেউ কাঠগড়ায় উঠল না। আশ্রমের পক্ষ থেকে মৌন মিছিল হল, বিচারের আশায় প্রভু জগবন্ধু দ্বারে দ্বারে ঘুরলেন, সকলে মুখ ফিরিয়ে রইল। রাজার বিরুদ্ধে কে আর আঙুল তুলতে সাহস পাবে? দিনের আলোয় প্রকাশ্য রাজপথে নারকীয়ভাবে যে চোদ্দোজন সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনীকে পুড়িয়ে মারা হল, সেই অপরাধের বিচার হল না, কোনো দোষী শাস্তি পেল না। কিছুদিন পর সকল উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে গেল। সুজন সেতু আবার আগের মতো ব্যস্ত হয়ে গেল। শুধু প্রতিশোধের আগুন বুকের ভেতর জ্বালিয়ে রাখলেন প্রভু জগবন্ধু এবং আশ্রমিকগণ।
অত বছর আগের রাজ্য সরকারের পোষা গুন্ডাদের করা আঘাতের চিহ্ন আজও বুকে-পিঠে বয়ে বেড়াচ্ছে ব্লেক। এত বছর ধরে এত পরিকল্পনা, এত শ্রম সব বৃথা গেল। খবরটা একদিন পরেই ব্লেক জেনে গিয়েছিল কিন্তু ফুকেটে কিছুদিন থাকার নির্দেশ ছিল তাই সেখানেই বাকি ত্রুু মেম্বারদের সঙ্গে কাটিয়েছে ব্লেক। মন অশান্ত, হতাশ কিন্তু যোদ্ধা কখনো ভেঙে পড়ে না। প্রভুর নির্দেশ এসেছে, এবার সময় হয়েছে চূড়ান্ত আত্মোৎসর্গের। অনেক বড়ো দায়িত্ব। যদিও এই পরিকল্পনা সম্পর্কে বাকি ত্রুু মেম্বাররা কিছুই জানেন না। তাঁদের জানানো হয়নি।
ঠিক রাত আটটার সময় ব্লেক ও বাকি সঙ্গীরা তাঁদের বিমানে করে রওনা হল। এবার গন্তব্য মুম্বই হয়ে করাচি। ফুকেট থেকে মুম্বই সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার পথ। বিমান যখন মধ্যপথে তখন রাত সাড়ে দশটা নাগাদ একজন কনস্টেবল এসে সেলের কাস্টডির সেলে কুঁকড়ে শুয়ে-থাকা শুকদেবকে ঠেলে তুলল।
চল, যেতে হবে।
শুকদেব কোনো প্রশ্ন না করেই উঠল। বাইরে ভ্যানে উঠল। নিশুতি রাত। কনকনে ঠান্ডা। এত রাতে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? প্রশ্নটা মাথায় ঝিলিক দিল, কিন্তু প্রশ্ন করে লাভ নেই। খুব একটা আগ্রহও নেই ওর। গাড়ি চলতে শুরু করল। অনেকক্ষণ চলার পর ভ্যান থামল। পিছনের দরজা খুলে একজন ওকে নির্দেশ দিল গাড়ি থেকে নেমে আসতে।
শুকদেব নেমে এসে দেখল জায়গাটা শুনশান। কোনো অফিস বা থানা কিছুই নয়। ঘন কুয়াশায় ঢাকা ঘুটঘুটে অন্ধকার। একজন অফিসার ওকে নির্দেশ দিলেন, তোকে ছেড়ে দেওয়ার অর্ডার রয়েছে। যা পালা।
অভিজ্ঞ শুকদেব এই নির্জন অন্ধকারে পুলিশের আচমকা দয়াদাক্ষিণ্য করার আসল উদ্দেশ্য বুঝে ফেলল। বলল, আমি যাব না। কোথায় যাব? আমাকে নিয়ে চলুন। যা বলছেন তা-ই তো করছি।
চোপ, যা বলছি শোন। চলে যা।
শুকদেব তাও দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখে একজন কনস্টেবল ওকে ঠেলা দিল।
শুকদেব বলল, মারলে বুকে মারুন, পিঠে নয়।
চোপ শালা। যা বলছি শোন। ভাগ।
যা।
শুয়োরের বাচ্চা ভাঙবে তবু মচকাবে না বলেই অফিসার শুকদেবের কাছে গিয়ে ওর মুখে রিভলভারের নল গুঁজে দিয়ে ফায়ার করলেন। গুলিটা খুলির পিছন দিয়ে ফুঁড়ে বেরিয়ে গেল। শুকদেব কোনো শব্দ করার সুযোগ পেল না। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল দেহটা। অফিসার কনস্টেবল দুজনকে নির্দেশ দিলেন, বডিটা ভ্যানে তুলে নে।
এই দৃশ্যের ঠিক দুই দিন আগেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সব্যসাচী গেছিলেন দিল্লিতে। সেন্ট্রাল হোম মিনিস্টার নিশীথ চতুর্বেদী এবং প্রাইম মিনিস্টারের সঙ্গে মিটিং করেছেন। শেষে দুই পক্ষই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে আপাতত পরস্পরকে দোষারোপ করতে গেলে দুজনেরই অনেক ত্রুটি জনসমক্ষে চলে আসবে, তাতে দুই সরকারেরই ক্ষতি। সামনে ভোট, এখন ইমেজ নষ্ট হলে জনগণ দিশেহারা হয়ে যাবে। তাই ব্লেম গেম থামিয়ে আপাতত পরিস্থিতি সামলানো যাক। এই পুরো ইস্যুটাই ঘুরিয়ে দিতে হবে অন্যদিকে। অস্ত্রের বাক্সগুলিতে যে স্টিকার লাগানো ছিল তাতে ফাইনাল ডেস্টিনেশনে বাংলাদেশের নাম লেখা ছিল স্পষ্টভাবে। সেটাকে ধরেই প্ল্যান সাজানো হল। কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয়েই পরস্পরকে দেওয়া কিছু শর্ত মেনে নিল। সব্যসাচীর সঙ্গে মিটিং শেষ করার পরেই হোম মিনিস্টার নিশীথজি যোগাযোগ করলেন প্রভু জগবন্ধুর সঙ্গে। পুরো বিষয়টি ওঁকে জানালেন এবং এই পরিস্থিতিতে কী করণীয় তার সাজেশনও দিলেন। প্রভু জগবন্ধু তাঁর পরমপ্রিয় ব্লেকের গায়ে এতটুকুও আঁচ যেন না পড়ে তার গ্যারান্টি আদায়, আরও কিছু দাবিদাওয়া ও শর্ত রাখলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জগবন্ধুর প্রতিটি শর্ত পালনের আশ্বাস দিলেন। এবং তারপরেই জগবন্ধু যোগাযোগ করলেন এস-এর সঙ্গে। এস-এর সঙ্গে জগবন্ধু বিশদে কথা বললেন। তিনি কী চান তা জানালেন। জগবন্ধু যদিও খানিক দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, ব্লেক আদৌ এই আত্মাহুতিতে রাজি হবে কি না কিন্তু এস যখন ব্লেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রভুর ইচ্ছা ওঁকে জানালেন তখন ব্লেক শুধু একটা কথাই বলল, আমার জীবন প্রভুর জন্য উৎসর্গীকৃত। উনি যেমনটি বলবেন তা-ইই হবে। এস-ও এতদিনের প্রচেষ্টা পুরোটা জলে চলে যাওয়ায় মনে মনে ভেঙে পড়েছিলেন কিন্তু প্রভু জগবন্ধু ওঁকেও উৎসাহ জুগিয়েছেন। বলেছেন, ভেঙে পড়লে চলবে না। এই ব্যর্থতা নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তাকে কাজে লাগাতে হবে। মস্ত সুযোগ। এস-ও জানেন, প্রভু জগবন্ধুর সিদ্ধান্ত কখনো ভুল হয় না। তাঁর দূরদর্শিতা সংশয়াতীত। তাই কোনো দ্বিধা মনে না রেখে প্রভুর পরবর্তী আদেশের অপেক্ষা করতে থাকলেন।
রাত পৌনে একটা নাগাদ জ্বালানি নেওয়ার জন্য AN-২৫ কার্গোবিমানটি যখন পারমিশন পেয়ে মুম্বই এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল তখন ব্লেক ছাড়া বাকি ত্রুুমেম্বাররা ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করতে পারেননি তাঁদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। ব্লেক বলেছিল মুম্বই এয়ারপোর্টে তাঁদের কোনো অসুবিধা হবে না। যেমন নির্বিঘ্নে তাঁরা আগের বার ইন্ডিয়ায় ঢুকেছিলেন তেমনই এবারেও নিশিন্তে বেরিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু ল্যান্ড করার কিছুক্ষণের মধ্যেই মুম্বই পুলিশের পাঁচ-ছয়টি জিপ গ্রাউন্ডে এসে প্লেনটিকে ঘিরে ফেলল। পাইলটসহ বাকি লাটভিয়ান ত্রুু-রা হতচকিত। এমন হওয়ার তো কথা ছিল না। ব্লেক যদিও জানে, এরপর কী কী ঘটতে চলেছে। পাইলট ও বাকি মেম্বাররা ছুটে এলেন ব্লেকের কাছে। ব্লেক তাদের বলল, ভয়ের কোনো ব্যাপার নেই। পুলিশ আমাদের কিচ্ছু করতে পারবে না। যদি আমাদের অ্যারেস্ট করেও, কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা ছাড়া পেয়ে দেশে ফিরে যেতে পারব।
পাইলট উত্তেজিত হয়ে বললেন, কিন্তু এমন তো কথা ছিল না। আপনি আমাদের বলেছিলেন, পুলিশ প্রশাসন আমাদের স্পর্শও করবে না।
এখনও বলছি, কেউ কিছু করতে পারবে না। আপনারা ভরসা রাখুন। এত বড়ো একটা অপারেশন আমরা সরকারের সহযোগিতা ছাড়া করতে পারতাম না, ফলে সরকার নিজের স্বার্থেই আমাদের ঘাঁটাবে না।
ব্লেক যখন ওদের কথাগুলো বলছিল তখনই কন্ট্রোলরুম থেকে নির্দেশ এল, যারা এই কার্গো বিমানে রয়েছে তারা যেন নেমে আসে।
ব্লেক ও বাকি চারজন নেমে আসামাত্রই জিপ থেকে একজন পুলিশকর্তা এগিয়ে এসে ব্লেকের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। তাঁরা কারা, কোথা থেকে আসছেন, কোথায় যাবেন ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করে ওঁদের পাঁচজনকে নিয়ে যাওয়া হল এয়ারপোর্ট থানায়। সেখানে আরেক প্রস্থ জিজ্ঞাসাবাদ চলল। এবং ব্লেক খুব মাথা ঠান্ডা রেখে একের পর এক উত্তর দিতে দিতে অবশেষে বলল, আমরা কিছুদিন আগে ইন্ডিয়ার বুরুলিয়াতে এই প্নেন থেকেই অস্ত্রবর্ষণ করেছি।
পরের দুই দিনের মধ্যে আবারও খবরের কাগজে, টিভি-তে, তোলপাড়। মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হতে থাকল, দেশ জুড়ে হই হই। যারা বুরুলিয়াতে অস্ত্রবর্ষণ করে গেছিল তাদের মুম্বই এয়ারপোর্টে ধরা হয়েছে। প্লেনটি করাচির দিকে উড়ে যাচ্ছিল, ভারতীয় বায়ুসেনার তৎপরতায় প্লেনটিকে মুম্বই শহরে জোর করে অবতরণ করানো হয়, এবং সেখান থেকে গ্রেপ্তার হয় ব্রিটিশ নাগরিক ব্লেক-সহ মোট পাঁচজন। ব্লেক জবানবন্দিতে জানায় সে একজন অস্ত্রব্যবসার ডেলিভারি এজেন্ট। মুক্তিবাদী পার্টির মায়ানমারে একটি সক্রিয় শাখা রয়েছে, সেখানেই এই অস্ত্রের ফাইনাল ডেস্টিনেশন ছিল। ব্লেকের দায়িত্ব ছিল, সে মায়ানমারের রাখাইনে অস্ত্র ফেলে দিয়ে চলে যাবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মুক্তিবাদী পার্টির কাছে খবর আসে, মায়ানমার সরকার সম্ভবত কোনো আঁচ পেয়েছে তাই তারা সিদ্ধান্ত বদলে অস্ত্র বুরুলিয়ার চৌহাটিতে এয়ারড্রপ করতে নির্দেশ দেয়। সেখানে তাদের এজেন্ট রয়েছে, সে ওই অস্ত্র পরে অন্যভাবে পাচার করত। অথচ ইউজার এন্ড সার্টিফিকেটে পরিষ্কার লেখা রয়েছে 4021/1/AA/ARMY/ASL (P) 3.। এবং বাংলাদেশের মেজর জেনারেলের সই। মায়ানমার ফাইনাল ডেস্টিনেশন হলে বাংলাদেশের ইউজার এন্ড সার্টিফিকেট কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে ব্লেক বলল, সে অত কিছু জানে না। তাহলে কে জানে? ব্লেক বলল, অস্ত্রব্যবসায়ী নিলসন জানে। তাঁর সঙ্গেই মুক্তিবাদী পার্টির যাবতীয় চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু নিলসন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ব্লেকের এই জবানবন্দির পাশাপাশি আরও একটি চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশ পেল, সদ্য জেল থেকে ছাড়া পাওয়া কুখ্যাত মুক্তিবাদী নেতা শুকদেব মাহাতোকে কয়েকদিন আগেই এই অস্ত্রবর্ষণকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং তাকে জেরা করেও ঠিক এই রকমের তথ্যই পাওয়া গেছিল। ব্লেকের সঙ্গে শুকদেবকেও একই সঙ্গে জেরা করার উদ্দেশ্যে মুম্বই নিয়ে আসা হচ্ছিল। কিন্তু পথে পুলিশ ভ্যানের মধ্যে শুকদেব আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার পাশের পুলিশকর্মীর ওপর এবং তার সার্ভিস রিভলভার বার করে নিয়ে নিজের মুখে গুলি করে সেখানেই লুটিয়ে পড়ে। ব্লেকের গ্রেপ্তারি এবং শুকদেবের আত্মহত্যার মধ্যে মাত্র ঘণ্টাকয়েকের ফারাক— এটা একটু বেশিই কাকতালীয় বলে কেন্দ্রের বিরোধী পক্ষ এবং কিছু মিডিয়া সওয়াল তুললেও তা বিশেষ ধোপে টিঁকল না। রাজনীতিতে এই ধরনের অবিশ্বাস্য কোইনসিডেন্স নতুন কিছু নয়। হামেশাই ঘটে। সকলেই সবকিছু বোঝে, কিন্তু বলার কিছু থাকে না।
স্বদেশ পার্টি, সোশ্যালিস্ট পার্টি এবং জগবন্ধু তিনজনেই যে যার কারণে হাত কামড়াতে থাকলেও আপাতত সমঝোতা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। সোশ্যালিস্ট পার্টি আপশোস করছিল, স্বদেশ পার্টির বিরুদ্ধে এত বড়ো একটা ইস্যু পেয়েও তাকে চুপ থাকতে হচ্ছে, কারণ সেদিনের মিটিং-এ সব্যসাচীকে নিশীথ ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, সোশ্যালিস্ট পার্টি এই ইস্যু নিয়ে যদি বেশি হল্লা করে তাহলে কেন্দ্র বাধ্য হবে দশ বছর আগের সুজন সেতু হত্যাকাণ্ডের ফাইল খুলতে। এবং কেন্দ্রের কাছে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ রয়েছে সেদিনের ঘটনার। বাকিটুকুও পেতে তাদের অসুবিধা হবে না। কারা সেদিন এই নারকীয় ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন সেসব নেতা-মন্ত্রীর নাম এবং কার্যকলাপের ডিটেল তাদের কাছে রয়েছে। সোশালিস্ট পার্টি এইজন্য ঝুঁকি নিতে চায়নি। দশ বছর পরে যখন পার্টির ইমেজ জনগণের কাছে বেশ খানিকটা নড়বড়ে তখন পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে আবার এই ধামাচাপা কেস জাগিয়ে তুলতে মোটেও চায়নি প্রমোদের সরকার। এবং এই ইস্যু যদি একবার জেগে ওঠে তাহলে আগের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী জগবন্ধু এবারে চুপ থাকবেন না। তিনি অপেক্ষাতেই রয়েছেন, কেন্দ্রের ইশারা পেলে তিনিও হাত মিলিয়ে অনেক কিছু করতে পারেন। অতএব শান্তিকল্যাণ। বাইরে লোক-দেখানো কিছু নরম-গরম কথা মিডিয়ার কাছে, মিটিং-এ বললেও সোশ্যালিস্ট পার্টি এই ইস্যুর বিরুদ্ধে বিশেষ কোনো স্টেপ নিল না। খেলা যেটা চলতে থাকল তা শুধুই লোক-দেখানো, এবং আইওয়াশ। তবে কেন্দ্রের তদন্তকারী অফিসাররা ব্লেকের জবানি এবং পেপারস মিলিয়ে দেখলেন মোট পাঁচটি বাক্স থাকার কথা, অথচ উদ্ধার হয়েছে চারটি। তাহলে বাকি একটি বাক্স কোথায় গেল?
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফোন করলেন জগবন্ধুকে। ইঙ্গিতে জানতে চাইলেন একটি বাক্স কোথায়? জগবন্ধুও ইঙ্গিতে উত্তর দিলেন, নিরাপদে যথাস্থানেই রয়েছে। সময় এলে ওই একটি বাক্স দিয়েই ধর্মযুদ্ধ শুরু করা যাবে। এই তথ্য শুধুমাত্র জানলেন কেন্দ্রের কয়েকজন মন্ত্রী এবং কয়েকজন তদন্তকারী অফিসার। পুরোপুরি গোপন করে রাখা হল এই তথ্য।
এইসব ঘটনার মধ্যেই কলকাতায় পৌঁছে গেল অর্ণব। সুদীপের সহায়তায় পুরোনো পুলিশ রেকর্ডসে, ন্যাশনাল লাইব্রেরির পুরোনো নিউজপেপারে মুখ গুঁজে পড়াশোনা করতে থাকল। সুজন সেতু হত্যাকাণ্ড, জগবন্ধু সেবাশ্রমের সঙ্গে রাজ্য সরকারের বিরোধ সংক্রান্ত রেকর্ডস এবং নিউজগুলো পড়তে পড়তে অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে গেল অর্ণবের। ও বুঝতে পারছিল, বিশাল এক খেলা চলছে। ও একটা ভয়ংকর ঘটনাকে আটকে দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু আবারও একটা খেলা শুরু হয়ে গেছে। রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্র সরকারের এই মৌনতাকে ও সোজা চোখে দেখতে পারছিল না। কেন্দ্রের ও রাজ্য সরকারের সঙ্গে জগবন্ধুর টক্করের কারণগুলো যত ও জানতে পারছিল ততই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল অনেক কিছু। সুদীপ ওকে বারংবার বলেছে, এসব জেনে তুই কী করবি? কোনো লাভ রয়েছে? ডিউটি যখন নেই তখন অপর্ণার সঙ্গে সময় কাটা। ছুটি নিয়ে ঘুরতে চলে যা। কিন্তু অর্ণব বন্ধুর কথায় কান দেয়নি। এ এক অদ্ভুত নেশা। যার রয়েছে সে-ই জানে। তিন দিন ধরে পুরোনো ডকুমেন্টস ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পুরোনো বাংলা খবরের কাগজের আর্কাইভে সুজন সেতু হত্যা মামলা বিষয়ক নিউজ গুলো দেখতে দেখতে একটা কাগজের খুব ছোটো একটা খবরে চোখ আটকে গেল অর্ণবের। সেখানে লেখা রয়েছে, এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শ্রীপরেশ মণ্ডল ওই অঞ্চলেরই বাসিন্দা। তিনি একমাত্র ব্যক্তি যে ঘটনার বয়ান দিয়েছিলেন, নিউজপেপারে এই কথাও বলেছিলেন, তিনি কোর্টেও সাক্ষ্য দিতে রাজি। কিন্তু তারপরেই তিনি আচমকা মুখে কুলুপ আঁটেন। কোনোভাবেই তাঁর মুখ থেকে আর কোনো কথা আদায় করা যায়নি। আন্দাজ করাই যায়, তিনি কোনো চাপে পড়ে ভয় পেয়ে চুপ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। খবরটা পড়ে রীতিমতো চমকে উঠল অর্ণব। এ তো সাংঘাতিক খবর! দশ বছর আগের এই পরেশ মণ্ডল যদি বেঁচে থাকেন তাহলে যেভাই হোক তাকে খুঁজে বার করতেই হবে।
আজ রাতে অর্ণবের বাড়িতে সুদীপ আর হেনার নেমন্তন্ন। সন্ধের পরেই ওরা চলে এসেছে। হেনা অনেকরকম রান্না করেছে। প্রাণ খুলে আড্ডা চলেছে, সঙ্গে পানাহার। অপর্ণা হার্ড ড্রিঙ্কস নিতে পারে না, অ্যালকোহলের গন্ধ ওর সহ্য হয় না, তবে হেনা ভডকা খায়। অর্ণব আর সুদীপ হুইস্কি খাচ্ছিল, হেনা ভডকা। অপর্ণার হাতে কোল্ড ড্রিঙ্কের গ্লাস। তবে চারজনেই অপর্ণার বানানো স্পেশাল চিকেন পকোড়া খাচ্ছিল। সাত দিনের ছুটির মধ্যে আর মাত্র দুই দিন বাকি। মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে ছুটি নিয়ে এসেছে অর্ণব। ডক্টর সোমের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে এর মধ্যে একদিন একটা সিটিংও দিয়ে এসেছে। সেই স্বপ্নটা আশ্চর্যজনকভাবে আর যখন-তখন হানা দিচ্ছে না! ডক্টর সোম অর্ণবের কাছে ওর সঙ্গে ঘটে-যাওয়া সাম্প্রতিক যাবতীয় ঘটনা এবং সেই বিষয়ে অর্ণবের প্রতিক্রিয়া শুনে বলেছেন, আমার ধারণা, আপনি খুব দ্রুতই আপনার এই দীর্ঘ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবেন। যেভাবে এগোচ্ছেন সেইভাবেই চলুন আর ওষুধগুলো নিয়মিত খান। নিশ্চিন্তে থাকুন। ডক্টর সোমের কথায় মনে মনে ভরসা পেয়েছে অর্ণব।
যদিও আজ অপর্ণা একটা শর্ত রেখেছিল যে আজকের রাতের আড্ডাটা হবে নির্ভেজাল আড্ডা, অর্ণব এবং সুদীপ যেন কোনোভাবেই তাদের পেশাগত আলোচনা আজকের আড্ডায় না নিয়ে আসে। সুদীপ আর অর্ণব সেই শর্তে রাজি হয়েছিল। কিন্তু পরেশ মণ্ডলের ব্যাপারটা সুদীপকে না-জানানো পর্যন্ত ওর শান্তি হচ্ছিল না। আর লোকটাকে খুঁজে বার করার জন্য সুদীপের সাহায্য ওর চাই। অর্ণব আজ বলব না-বলব না ভেবেও অবশেষে বলেই ফেলল পরেশ মণ্ডলের কথাটা।
সুদীপ বলল, তুই না সত্যিই পাগল আছিস। দশ বছর আগের পুরোনো কেস ঘেঁটে তুই কী করবি বল তো? মানে এসব করে তোর লাভটা কী হচ্ছে? কেন ফালতু সময় নষ্ট করছিস?
ধরে নে, এমনিই করছি। শখে করছি।
শখে কেউ বেগার খাটে?
আমি খাটি। তুই হেল্প করবি কি না বল।
সুদীপ অপর্ণার দিকে তাকিয়ে বলল, এই পাগলটাকে তুমি অনেকটা মানুষ তো করেছ। এবার প্লিজ একটু বোঝাও। না এসব করে কোনো লাভ নেই। কত ঝুঁকি নিয়ে এত বড়ো একটা অপারেশন তো করল, কী লাভ হল? সামান্য স্বীকৃতি তো দূরের কথা, ওপরমহল থেকে ওকে কেসটা থেকেই সরিয়ে দেওয়া হল। এরপরে আরও যদি বাড়াবাড়ি কিছু করে, আরও কী ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নেওয়া হবে কে জানে... এই দেশে সত্য উদঘাটন করে কোনো লাভ নেই অর্ণব। পুরো সিস্টেম কোরাপ্টেড। চেয়ারে বসে-থাকা প্রতিটা মানুষ কোরাপ্টেড। তুই যদি কিছু করতে যাস, তোর আর তোর পরিবারের ক্ষতি হয়ে যাবে। তার থেকে চুপ করে থাক। ডিপার্টমেন্ট যেমন অর্ডার করবে তা পালন করে যা। দ্যাট'স অল।
অর্ণব চুপ করে শুনল সুদীপের কথা। তারপর বলল, তোকে একটা কথা বলি সুদীপ, তুই জানিস, এতগুলো বছর পর আমি সেই ভয়ংকর স্বপ্নটা থেকে মুক্তি পেতে শুরু করেছি। আর স্বপ্নটা আমার কাছে যখন-তখন এসে হানা দেয় না। আমি এখন একটু ঘুমোতে পারি। অপর্ণাও জানে সেটা।
অপর্ণা চুপ করে সামান্য মাথা নাড়ল। ও সত্যিই জানে, অর্ণব মিথ্যে বলছে না। এর মধ্যে একদিন এতদিনের দাম্পত্যে প্রথমবার অর্ণব আর ও শরীরী সুখের শীর্ষেও পৌঁছোতে পেরেছে।
তুই কী বলতে চাইছিস, স্পষ্ট করে বল।
দেখ সুদীপ, ডক্টর সোম আমাকে প্রথম দিন একটা কথা বলেছিলেন, আমার ভেতরে যে ট্রমা থেকে একটা প্রবল ঘৃণা ও অ্যান্টিসোশালদের প্রতি তীব্র আক্রোশ রয়েছে সেটা নিতান্তই ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে আমি মেটানোর চেষ্টা করতাম, কিন্তু তাতে আমার অন্তর শান্তি পেত না। ডক্টর সোম আমাকে বুঝিয়েছিলেন, আমার প্রতিহিংসা বা ভয় কোনো ব্যক্তিকে মেরে যাবে না, যারা আমার বাবাকে খুন করেছিল তারা ব্যক্তি নয়, একটা সিস্টেম, তাই প্রতিশোধ নিতে হলে আমাকে সিস্টেমে আঘাত করতে হবে, যদি খারাপ সিস্টেমের গোড়ায় কোনো আঘাত করতে পারি তাহলে আমার মনের ভেতরে থাকা এই দীর্ঘলালিত যন্ত্রণা যেটা স্বপ্ন হয়ে বার বার ফেরে সেটা মুক্ত হতে পারে। এবং ভাই বিশ্বাস কর, সোমের কথা সত্যি। আমি জানি এই কেসটা অনেক বড়ো লেভেলের, আমার মতো একটা চুনোপুঁটি এইসব রাঘববোয়ালের একটা চুলও ছিঁড়তে পারবে না, কিন্তু ভাই, যদি অন্তত করাপশনটা কোথা থেকে শুরু, সেটা কতটা ছড়িয়েছে জানার চেষ্টা করি, কারো জন্য নয়, ধরে নে নিজের জন্য, তাহলে আমি মনে করব, কিছু একটা তো করলাম।
বেশ, আমি ধরে নিলাম, তুই করাপশনটা কাদের কতটা ইত্যাদি সবকিছু জানলি। তারপর? শুধু জেনে কী করবি?
তারপর অন্তত একটা পক্ষের গোপন হাঁড়ি আমি মাঠে ভাঙব। সেটা যে পক্ষই হোক।
মানে বলতে চাইছিস, স্বদেশ অথবা সোশ্যালিস্ট পার্টি যেকোনো একজনের করাপশন তুই একা প্রকাশ করে দিবি! তুই কি পুরো উন্মাদ হয়ে গেছিস!
না, একা তো পারব না। একা করতে চাইছিও না। আমি একটা কাঁটা দিয়ে আরেকটা কাঁটাকে তুলব। আরও স্পষ্টভাবে যদি শুনতে চাস তাহলে শোন, আই হেট দিস সোশ্যালিস্ট পার্টি। স্বদেশ পার্টি ধোয়া তুলসীপাতা নয়, কিন্তু তার সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা নেই, কিন্তু এই রাজ্য সরকার আমাকে সার্ভিসের প্রথম থেকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছে। হেন কোনো শাস্তি আর বাকি নেই যা এই সরকার আমাকে দেয়নি। আমি এই সরকারকে ছাড়ব না। এর ওপরের মানবদরদি ভড়ংকে আমি সকলের সামনে নিয়ে আসব। আসবই। এবং আমি তোকে বলছি সুদীপ, যদি সলিড কোনো ক্লু, প্রূফ আমার হাতে একবার এসে যায় আর সেটা যদি আমি সরাসরি সেন্ট্রালের নজরে দিয়ে দিতে পারি তাহলে আমার হয়ে বাকি কাজটা ওরাই করে দেবে। এই সুজন সেতু হত্যা মামলা আর এই বুরুলিয়া অস্ত্রবর্ষণের মধ্যে একটা যোগসূত্র আছেই, সেটা আমাকে বার করতে হবে। আমার মন বলছে, ওখানেই লুকিয়ে আছে আসল উৎস। প্লিজ হেল্প মি সুদীপ। আমি সুস্থ হতে চাই। এবং আমার সুস্থ হওয়ার এইটাই সুযোগ।
সুদীপ মন দিয়ে শুনল, তারপর সামান্য ঠোঁট উলটে বলল, ওক্কে। তুই যা ভালো বুঝিস।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সুদীপ বলল, আপনাকে কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নেই যে আপনার বয়স বিরাশি।
পরেশ মণ্ডল মৃদু হেসে বললেন, ছোটোবেলা থেকে শরীরচর্চার অভ্যাস। এই বয়সেও দুইবেলা মিলিয়ে দশ কিলোমিটার হাঁটি এবং যোগব্যায়াম করি। খুব নিয়ম মেনে খাই।
অর্ণব বলল, সেইজন্যই আপনি এখনও এতটা ফিট।
একসময় কুস্তিও করতাম ক্লাবে।
তার মানে সাহসটা আপনার যথেষ্টই ছিল।
হ্যাঁ তা ছিল বটে। বলে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন পরেশবাবু।
আজ সন্ধেবেলা সুদীপ আর অর্ণব চলে এসেছে পরেশ মণ্ডলের বাড়ি। সুদীপ একদিনের মধ্যে পরেশ মণ্ডলের বাড়ি খুঁজে বার করেছে। পুলিশ চাইলে সব পারে। এই এলাকায় তিনজন পরেশ মণ্ডল রয়েছেন, তাদের থেকে যে পরেশ মণ্ডলকে অর্ণব খুঁজছে তাকে পেতে পুলিশকে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। এই থানার ও.সি.-র সাহায্যে মাত্র একদিনের মধ্যেই আসল মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া গেছে। গতকাল রাতেই অর্ণবের বাড়ি থেকে সুদীপ ফোন করেছিল সুজন সেতু এলাকার থানায়। নিজের পরিচয় দিয়ে পরেশ মণ্ডল নামের ব্যক্তিকে ওই এলাকা থেকে খুঁজে বার করার অনুরোধ জানিয়েছিল ও। মোট তিনজন পরেশ মণ্ডলকে পাওয়া গেছিল। তিনজনের মধ্যে একজন নাবালক, আরেকজন যুবক। আর যার বয়স বেশি তার বাড়ির ঠিকানা নিয়ে আজই সন্ধেবেলায় ওরা দুজনে মিলে হাজির পরেশ মণ্ডলের বাড়িতে। পুরোনো বাসিন্দা। বাড়িটিও অনেক পুরোনো। নিজেদের পরিচয় দিয়ে সুদীপ আর অর্ণব কথা বলতে চেয়েছিল। পরেশবাবু রাজি হয়ে ওদের ভেতরে আসতে বলে বৈঠকখানায় বসেছেন।
আলাপ কিছুটা জমিয়ে সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এল অর্ণব। বলল, আমি এসেছি আপনার কাছে একটি বিশেষ কাজে। আজ থেকে বছর দশেক আগে সুজন সেতুতে যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড হয়েছিল— আপনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি খবরের কাগজে জানিয়েছিলেন, আপনি সেই ঘটনা চোখের সামনে দেখেছিলেন। এবং প্রয়োজনে আদালতে সাক্ষ্যও দেবেন বলেছিলেন, কিন্তু তারপরে আচমকাই আপনি চুপ করে যান। এবং কিছুতেই আর মুখ খোলেননি। কেন?
পরেশবাবু ভুরু কুঁচকে তাকালেন অর্ণবের দিকে। চায়ে শেষবার চুমুক দিয়ে কাপটা নামিয়ে রাখলেন টেবিলের ওপর। তারপর বললেন, ও, এই কারণে আসা? তা এতদিন পর আমার কিছু মনে টনে নেই।
অর্ণব বলল, পরেশবাবু, আপনি এই বয়সে যেরকম শারীরিক এবং মানসিকভাবে ফিট তাতে আমার মনে হয় না এমন ভয়াবহ একটা ঘটনাকে আপনি মন থেকে মুছে ফেলতে পেরেছেন। এবং আমি এটাও জানি, আপনি অত্যন্ত সাহসী মানুষ বলেই সেদিন একা সাক্ষ্য দেওয়ার কথা বলতে পেরেছিলেন।
পরেশবাবু মাথা নেড়ে বললেন, সেদিন হঠকারিতা করেছিলাম। ভুল বলেছিলাম। আমি কিছু দেখিনি, এই ব্যাপারে আমি কিছু জানি না পুলিশকে বলেছিলাম, আজও বলছি। আপনারা এখন আসতে পারেন। আচমকাই রূঢ় হয়ে উঠলেন হাসিখুশি মানুষটি।
সুদীপ বলল, পরেশবাবু, আপনি না চাইলে কিছু না-ই বলতে পারেন, আমরা জোর করতে পারব না। তবে আমরা কিন্তু পুলিশ হিসেবে আপনার কাছে আসিনি। এসেছি সম্পূর্ণ অন্য কারণে। আর সেই কারণটা শুনলে হয়তো আপনার মতামত বদলাতেও পারে।
কী কারণ?
আমার বন্ধু এই যে অর্ণব, ও একজন এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট। জীবনে অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে ওর। ও একটা বই লিখছে যা খুব বড়ো একটা পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশ পাবে। সেখানে এই ঘটনার উল্লেখ থাকবে বিশদে। তাই আপনার সাহায্য খুব দরকার। কারণ আপনি ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী।
আর লিখে কী হবে? পারবেন কি আসল সত্যকে লিখতে? পারবেন না। আমিও পারিনি। সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে,বিশেষ করে একা একা সম্ভব নয়। আমি সাহস দেখিয়েছিলাম, কিন্তু কেউ পাশে আসেনি, তবু চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু গুন্ডা লাগিয়ে, পুলিশ লেলিয়ে আমাকে, আমার পরিবারকে যেভাবে অত্যাচার করেছিল, যেভাবে আমাকে চুপ থাকতে বাধ্য করিয়েছিল তা পৃথিবীতে এই অসভ্য সরকারের পক্ষেই সম্ভব। ফুঁসে উঠলেন পরেশ।
অর্ণব এই সুযোগটাই কাজে লাগাল।
আমি নিজে একজন রাজ্য সরকারের পুলিশ হয়ে বলছি, আমিও এই সোশ্যালিস্ট পার্টির সরকারকে ঘৃণা করি। তাই এদের যত নোংরামো, যত শয়তানি আমি নিজে দেখেছি বা জেনেছি সবকিছু অকপটে লিখব।
পারবেন না, আপনার চাকরি খোয়া যাবে শুধু নয়, প্রাণটিও খোয়া যেতে পারে।
সুদীপ বলল, পরেশবাবু, আমার এই বন্ধুটি বড্ড বেশি বেপরোয়া, প্রাণের মায়া ওর প্রায় নেইই। এবং সরকারি চাকরি করেও সরকারের বিরুদ্ধে বারংবার সরব হয়েছে, ফলে অনেক খেসারতও ওকে দিতে হয়েছে। ইন ফ্যাক্ট, এখনও দিতে হচ্ছে। বলে বুরুলিয়া অস্ত্রবর্ষণে অর্ণবের ভূমিকা এবং তার বিনিময়ে যে ইনাম ওর কপালে জুটেছে— সবটাই খুব সংক্ষেপে সুদীপ বলল পরেশবাবুকে।
সুদীপের কথা শুনে এবারে নরম হলেন পরেশবাবু। অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ব্রাভো ইয়াং ম্যান। আপনার মতো সৎ পুলিশ অফিসারদের তো খুব দরকার। কিন্তু মুশকিল হল এই দেশে সততা, কর্তব্যপরায়ণতার কোনো মূল্য নেই। চোর, গুন্ডা, ঘুসখোরের দেশ।
কিন্তু তবু নিজের বিবেকের জন্য লড়তে তো হবে, বলুন। আমি এই কাজটা করে কিছুই পাব না, কিন্তু একটা সত্যি দলিল ভবিষ্যতের জন্য রেখে যেতে চাই।
পরেশবাবু বয়সের কারণেই সহজে কনভিন্সড হয়ে গেলেন। উত্তেজিত হয়ে বললেন, নিশ্চয়ই করবেন। আমি বলছি আপনাকে, সবকিছু মনে রয়েছে আমার স্পষ্ট। গড়গড় করে বলতে শুরু করলেন— সেদিন সকালে বাজার করে বাড়ির দিকে ফিরছিলাম, আচমকা দেখলাম, সেতুর ঠিক মুখে কয়েকটা ট্যাক্সিকে থামিয়ে সেখান থেকে টেনে বার করে আনা হচ্ছে কিন্তু সন্ন্যাসী এবং কয়েকজন সন্ন্যাসিনীকে। প্রায় জনা পঞ্চাশেক লোক মিলে ওদের বার করেই মারতে শুরু করল। তখন এই জায়গাটায় খুব বেশি বসতি ছিল না। ফলে লোকজন, যানবাহন কমই চলত। পথচলতি অনেকেই থমকে গেল এমন একটা ঘটনা ঘটতে দেখে। আমিও দাঁড়িয়ে গেলাম। ঠিক কী ঘটতে চলেছে, বুঝতে পারছিলাম না। সন্ন্যাসীদের, বিশেষ করে সন্ন্যাসিনীদেরও ওইভাবে মারতে দেখে আমার সহ্য হল না, একাই এগিয়ে গেলাম। ওদের একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছে?
আমার প্রশ্নকে গ্রাহ্যই করল না কেউ। যারা মারছিল তাদের বেশির ভাগেরই মুখ আমি চিনতাম না, কিন্তু দুই-একজনকে চিনে ফেললাম। দেখলাম, আমাদের কাউন্সিলর বাবলু সাহা নেতৃত্ব দিচ্ছে। তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছে? এইভাবে ওদের মারছেন কেন?
বাবলু আমাকে বলল, আরে এই মালগুলো মহা শয়তান। পুরো ছেলেধরা। বাচ্চাদের ধরে ধরে নিয়ে যায়, এখানে এসেছে বাচ্চা ধরতে। আমাদের কাছে আগেই খবর ছিল। আজ একটাকেও ছাড়ব না।
আমি বললাম, এইভাবে মারলে তো এরা মরে যাবে। আপনারা থানায় নিয়ে যান, পুলিশের হাতে তুলে দিন। বাবলু হেসে বলল, আমরাই তো পুলিশ। যান বাড়ি যান। এখানে থাকতে হবে না। বিশ্বাস করুন, অমন নৃশংসভাবে কোনো মানুষ যে কাউকে মারতে পারে তা নিজের চোখে দেখা তো দূর, স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি। কী মার, মার! বেচারা মানুষগুলো রক্তাক্ত হয়ে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ল চোখের সামনে। চারদিক ফাঁকা হয়ে গেছিল। কেউ নেই। আমাকে ওদের একজন ধাক্কা দিয়ে সামনে থেকে সরে যেতে বলল। আমি কিছুটা সরে গিয়ে একটা দোকানঘরের আড়াল থেকে দেখতে লাগলাম এক পৈশাচিক দৃশ্য। মাটিতে লুটিয়ে-থাকা ওই মানুষগুলোর গায়ে কয়েক ব্যারেল পেট্রোল ঢেলে আমার চোখের সামনে জ্বালিয়ে দিল। উফ, সে কী ভয়ংকর দৃশ্য! কয়েকজন ওই জ্বলন্ত অবস্থাতেই উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তাদের লোহার রড আর লাঠির বাড়ি মেরে আবার ফেলে দেওয়া হল। শুধু পালাতে পেরেছিল দু'জন।
কী! মুখ থেকে শব্দটা বেরিয়ে এল অর্ণবের।
দু'জন সন্ন্যাসী পালাতে পেরেছিল। সেতুর কাছে যে রেললাইনটা রয়েছে-না, ওরা শেষ মুহূর্তে নিজেদের বাঁচাতে ছুটে গেছিল ওইদিকে। ট্রেনটাও ভাগ্যক্রমে ওই সময়েই এসে গেছিল। ওদের ধাওয়া করেছিল এই সোশ্যালিস্ট পার্টির কসাইগুলো, কিন্তু ওই দুজন লাইন টপকানোর সঙ্গে সঙ্গেই ট্রেনটা চলে আসায় খুনেগুলো আর সঙ্গে সঙ্গে লাইন পেরোতে পারেনি। ট্রেনটা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওরা লাইন টপকে ছুটে গেছিল ঠিকই কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরেও এসেছিল। ওই দু'জনকে খুঁজে পায়নি। চোখের সামনে অতগুলো জ্যান্ত মানুষকে কোনোদিন দাউদাউ করে পুড়তে দেখেছেন? আমি দেখেছি। কালো ধোঁয়া, মানুষের শরীর আর পেট্রোল-পোড়া বিকট গন্ধে আমি বমি করে ফেলেছিলাম ওখানে দাঁড়িয়েই। কীভাবে সেদিন বাড়ি ফিরেছিলাম, আমিও জানি না। বাড়ি ফিরে প্রায় তিন-চার দিনের জন্য বিছানা নিয়েছিলাম। এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম আমি।
কিন্তু আপনি ঠিক দেখেছিলেন যে দু'জন সন্ন্যাসী পালাতে পেরেছিলেন?
আমার দৃষ্টিশক্তি বরাবরই প্রখর স্যার। তবে আমি প্রথমে ভুল বলেছিলাম, দু'জন সন্ন্যাসী ঠিক নয়, একজন সন্ন্যাসী আর অপরজন সন্ন্যাসিনী। এই দু'জনে প্রাণ বাঁচিয়ে পালাতে পেরেছিল।
কিন্তু এই পলাতকদের কথা তো কোথাও উল্লেখ করা নেই। কোনো কাগজে, রেকর্ডে কোথাও নেই। বলল অর্ণব।
জানি নেই। থাকবে কী করে? এটা তো ওদের ব্যর্থতা। তা ছাড়া দু'জন ভিকটিম পালাতে পেরেছে সেটা চাউর হয়ে গেলে হয়তো সাক্ষী হিসেবে তাদের আদালতে নিয়ে আসা হবে, সেটা ওদের পক্ষে ট্রাবলসাম হবে। সেইজন্য প্রচার করা হয়েছিল ওইদিন যারা এসেছিল তারা সকলেই নিহত হয়েছিল।
অর্ণবের মাথায় একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল, পুলিশ রেকর্ডস থেকে নিউজপেপার সর্বত্র লেখা রয়েছে— সেদিন চোদ্দোজনকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছিল কিছু দুষ্কৃতী। এবং এটাও লেখা হয়েছিল যে কেউই সেদিন বাঁচেনি। অথচ পরেশ মণ্ডলের কথায় সব উলটে যাচ্ছে। পলাতক দু'জনের কথা যদি শাসকের গুন্ডাবাহিনী চেপেও যায় তাহলে প্রভু জগবন্ধু কেন একবারের জন্যও পলাতক দু'জনের নাম এতদিনে একবারও উচ্চারণ করলেন না? কেন তিনিও বিবৃতিতে দিয়েছিলেন যে তাঁর আশ্রমের এগারোজন সেবক এবং তিনজন সেবিকা জীবন্ত দগ্ধ হয়েছেন? খুবই রহস্যজনক!
সুদীপ বলল, আপনার এই কথা আগে কাউকে বলেছিলেন?
হ্যাঁ, বলেছিলাম তো। আমি চিরকাল অন্যায়ের প্রতিবাদ করা মানুষ। পোর্ট কমিশনে চাকরি করতাম। জীবনে কাজে ফাঁকি দিইনি, এক পয়সা ঘুস নিইনি, ইউনিয়নের নেতাদের তেল দিইনি। নিজের মতো চলেছি। আমার স্ত্রী-ও ছিলেন আমার মতো। ফলে আজীবন মাথা উঁচু করে বেঁচেছি। একটু সুস্থ হয়েই আমি গেছিলাম থানায় জানাতে। তারা তো কেউ আমার কথা শুনলই না, উপরন্তু যখন আমি তাদের বললাম, দু'জনকে আমি নিজের চোখে পালিয়ে যেতে দেখেছি, পুলিশ আমাকে বলল, আমি নাকি ভুল দেখেছি। আর এই কথাটা বলার দু-দিনের মধ্যেই সেই বাবলু একদিন দলবল নিয়ে আমার বাড়িতে এসে শাসিয়ে গেল। পুলিশ এসে আমাকে অযথা হ্যারাস করতে থাকল। পুলিশে ছুঁলে আঠেরো ঘা, বিশেষ করে যদি আমাদের রাজ্যের মতো পুলিশ হয়। আমার জীবনটা এই পার্টির গুন্ডা আর পুলিশে মিলে নরক বানিয়ে দিল। শেষে আমি নিজের পরিবারের কথা ভেবে বাধ্য হলাম চুপ করতে। রাজ্যের বিরোধী পক্ষের কয়েকজন নেতা ততদিনে আমার কথা জেনে গেছিলেন। তাঁরা আমাকে বলেছিলেন, কেসটা কোর্টে উঠলে আমি সাক্ষ্য দেব কি না? বদলে ওঁরা আমাকে সুরক্ষা দেবেন, কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি তাঁদের কাছ থেকে সামান্যতম সুরক্ষাও পাইনি। অবশ্য নেতা-মন্ত্রীদের কাজই তো শুধু মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে নিজেদের স্বার্থ গোছানো। তাই বাধ্য হয়ে আমাকে মুখে কুলুপ আঁটতে হত। আমার যদি পরিবার না থাকত তাহলে হয়তো এই অন্যায় সহ্য করতাম না, শেষ পর্যন্ত লড়তাম, একবার ভেবেওছিলাম, পুরো ঘটনা জানিয়ে প্রাইম মিনিস্টারকে একটা চিঠি লিখব। তারপর মনে হয়েছিল কোনো লাভ নেই। প্রাইম বা চিফ সবই সমান। তাই পুরো চুপ হয়ে গেলাম। এই দেশে থাকতে গেলে চুপ করেই থাকতে হবে অর্ণববাবু। যা শুনলাম তাতে বুঝেছি আপনি একজন সৎ পুলিশ অফিসার, তার খেসারত আপনাকে যেমন দিতে হচ্ছে, আমিও একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে অনেক ভুগেছি। এখন বয়সও হয়ে গেছে, আর ক-টা দিনই বা বাঁচব।
আপনার মতো মানুষের খুব দরকার পরেশবাবু। আপনি আজ অনেক বড়ো তথ্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করলেন।
আপনার কাজে এলে ভালো। শুধু একটাই অনুরোধ, আমাকে আর এই বয়সে যেন টানাটানি করবেন না। আমি কোনো আইনগত ব্যাপারে আর এই বয়সে জড়াতে চাই না।
আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আজকের এই আলোচনা শুধুমাত্র এই তিনজনেই জানবে। আজ আসি।
আপনাদের মঙ্গল হোক। এই বৃদ্ধের একটা কথা মনে রাখবেন, মিথ্যা যতই আস্ফালন করুক-না কেন, সত্যের জয়ই শেষ পর্যন্ত হয়। কেউ না কেউ এসে আসল সত্যকে ঠিক সকলের সামনে নিয়ে আসে। আমি পারিনি, হয়তো এতদিন পর আপনি পারবেন।
ভালো থাকবেন। আসি।
দুজনে বেরিয়ে এল। সুদীপের বাইকে উঠে অর্ণব বলল, এ তো কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরোচ্ছে রে!
সুদীপ বলল, কেঁচো নয়, তুই কেউটে খুঁড়তে চাইছিলি, এখন ব্ল্যাক মাম্বা বেরোচ্ছে। খুব সাবধান ভাই।
বাড়িতে ঢুকতেই অপর্ণা বলল, গোপাল ফোন করেছিল তোমাকে।
তা-ই! এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ওর থানার নাম্বারে ডায়াল করল অর্ণব। ফোন তুলল গোপাল।
বলো গোপাল।
স্যার, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা খবর রয়েছে।
বলো বলো।
স্যার, একটা ব্যবস্থা করেছি। রেকর্ডরুমের দায়িত্বে যে সেবক রয়েছে, তার সঙ্গে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যোগাযোগ করেছিলাম। অনেক চেষ্টা করে রাজি করিয়েছি, সে রুম থেকে সুজন সেতুর গোপন ফাইল আমাদের দেখানোর ব্যবস্থা করতে পারে।
গ্রেট!
হুঁ, কিন্তু এত বড়ো একটা রিস্ক নিতে সে রাজি কী করে হল? কী স্বার্থ?
সে অনেক গল্প আছে স্যার। আপনি আসুন, বলব।
ঠিক আছে, আমি পরশু আসছি। তুমি অ্যারেঞ্জ করো।
ওক্কে স্যার।
ফোন রেখে দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অপর্ণাকে প্রবল উত্তেজিত হয়ে জড়িয়ে ধরল অর্ণব।
বাবা, এ যে দেখছি খুশিতে ডগমগ।
অর্ণব হা হা করে হেসে উঠে বলল, গিন্নি, জালে অনেক বড়ো বড়ো মাছ লেগেছে, এবার ধীরে ধীরে গোটাচ্ছি। বলেই অপর্ণার চিবুকটা ধরে বলল, আমার এত সুন্দর বউটির মুখের দিকেও ভালো করে দেখি না কতদিন হল।
থাক, খুব হয়েছে, দেখার জন্য আজীবন রয়েছে। আগে মন দিয়ে এই যুদ্ধটা জেতো।
আমি পারব তো অপর্ণা?
এতদূর পেরেছ যখন, বাকিটুকুও পারবে।
তুমি আমার জীবনের লক্ষ্মী।
কী ব্যপার বলো তো? খুব বাটারিং চলছে যে।
হা হা হা। কী করব। ভালোবাসা জিনিসটা কীভাবে প্রকাশ করতে হয় তা তো কোনোদিন জানতাম না, তাই এখন প্রকাশ করতে গিয়ে একটু যাত্রাপালার মতো হয়ে যায়। কিন্তু মন থেকে বলছি কথাগুলো।
জানি। পাগলা! বলে অর্ণবের চুলগুলো এলোমেলো করে দেয় অপর্ণা।
আমার সাত জন্মের সৌভাগ্যে আমি তোমাকে পেয়েছি।
আমিও তা-ই।
এই কথাটুকু বলেই অপর্ণা বলল, এবার দয়া করে ছাড়ো। খাবার গরম করছি।
কাল চলে যাব আমি। সবকিছু ঠিকঠাক হবে তো?
এবার তোমার জিত। মিলিয়ে নিয়ো আমার কথা।
হে দেবী, আপনার অসীম কৃপা।
পারি না। বলে ফিক করে হেসে রান্নাঘরের দিকে গেল অপর্ণা। ওর মন খুব খুশি। অর্ণব সত্যিই বদলে যাচ্ছে। সুস্থ হয়ে উঠছে। ওর ভেতরের মরে-যাওয়া নরম অনুভূতিগুলো অপর্ণার ভালোবাসার, মায়ার স্পর্শে আবারও বেঁচে উঠছে। এ যে কত বড়ো সুখের! ও জানে, অর্ণব এই লড়াইতে ঠিক জিতবে। যা-ইই হোক-না কেন অপর্ণা ওর পাশে থাকেবে। যেদিকে এগোতে চাইছে অর্ণব তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঠিকই কিন্তু এই পথটাই ওর শুশ্রূষার পথ। ঠাকুর নিশ্চয়ই রক্ষা করবেন।
ধ্যানে বসেছিলেন জগবন্ধু। আজও অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও ধ্যানে মন বসছে না। বহু বছর ধরে তিনি সন্ধ্যার প্রার্থনাসংগীত, সেবকদের তত্ত্বকথা শোনানোর পর এক ঘণ্টা ধ্যান করেন। তারপর রাতের আহার। এই এক ঘণ্টার ধ্যান তাঁর শরীর-মন উভয়কেই সুস্থ, শান্ত রাখে। এই সময়টুকুতে তিনি পরমব্রহ্মর ভাবনায় মিশে থাকেন। কিন্তু কিছুদিন ধরে এতদিনের সাধনায় ছেদ পড়ছে। ধ্যানে বসলেও তাঁর মাথার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ব্যর্থতা, হতাশার রাক্ষস। আঁচড়ে-কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। রক্তাক্ত করে দিচ্ছে। আসলে তিনিও রক্তমাংসের মানুষ। এতদিনের তিল তিল করে গড়ে-তোলা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার শেষ মুহূর্তে চোখের সামনে ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে দেখলে তা সহ্য করা কঠিন। এই রাক্ষুসে সরকারের পতন ঘটাবেন বলে এত পরিশ্রম সবকিছু জলে। আবার নতুন করে ছক সাজানো, প্রস্তুত হওয়া অনেকদিনের ব্যাপার। এদিকে বয়সও হচ্ছে। মনের ভেতরে পুষে-রাখা প্রতিশোধের আগুন যদি স্তিমিত হয়ে যায়! না, কিছুতেই হবে না। প্রভু জগবন্ধু এক মুহূর্তের জন্যও ভোলেননি পুরোনো কথা। প্রতিটা দিনের সংঘাত তাঁর মনে গেঁথে রয়েছে। তাঁর নতুন মতবাদ যেহেতু ক্যাপিটালিজম এবং সোশ্যালিজম দুটোকেই অস্বীকার করে তাই স্বদেশ পার্টি বা সোশ্যালিস্ট পার্টি কেউই জগবন্ধু বা তাঁর মতবাদ জ্যাটকে সহ্য করত না। প্রথমে স্বদেশ পার্টির আক্রমণ সয়েছেন, তারপর রাজ্যে সোশালিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসার পর তাদের রোষে পড়েন জগবন্ধু। বুরুলিয়ার গড়জয়নগরের মহারানি প্রফুল্লকুমারী জগবন্ধু সেবাশ্রমের জন্য জমি দান করেছিলেন, সেখানে আশ্রম গড়ে যখন নানা সামাজিক কাজ করে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন তিনি তখনই সোশ্যালিস্ট পার্টির নজরে পড়ে যান তিনি। তাঁর এই উত্থান, বিপুলসংখ্যক জনগণের জ্যাট-এর দিকে ঝুঁকে পড়াকে সোশ্যালিস্ট পার্টি সুনজরে দেখেনি। জগবন্ধু প্রথম থেকেই সমাজের নিচুতলার মানুষের জন্য কাজ করছিলেন। গরিব, অসহায়, দুস্থদের জন্য স্কুল, হাসপাতাল, অনাথ আশ্রম। ধীরে ধীরে বুরুলিয়াসহ প্রায় গোটা দক্ষিনবঙ্গে তাঁদের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকল, আর সেটাই গলার কাঁটায় পরিণত হল সোশ্যালিস্টদের কাছে। আর চুপ করে রইল না তারা। সেবাশ্রমের সন্ন্যাসীরা আসলে ছেলেধরা এই বলে প্রচার শুরু করা হল গোটা বাংলা জুড়ে। ডাকসাইটে সোশ্যালিস্ট নেতা অরবিন্দ দাশগুপ্ত একটি বই লিখলেন 'বিপদ রুখতে হবে' নামে। সেই বইতে সেবাশ্রমকে অ্যানার্কিস্ট বলে উল্লেখ করে দাশগুপ্ত লিখলেন— সেবকদের নরহত্যা ইত্যাদি নানা হিংসাত্মক কার্যকলাপে শিক্ষিত করা হয়। জগবন্ধু সেবাশ্রম সম্বন্ধে বিশদ তথ্য সংগ্রহ করলে এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় যে এই সংগঠন বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীলদের সাহায্য ও সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে, এদের কার্যকলাপ অনেকেরই অজানা। এরা ধর্ম ও সমাজসেবার আড়ালে যে সমস্ত কর্মসূচি গ্রহণ করছে, তার মধ্যে দিয়ে এরা উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছে। এরা ছেলেদের ধরে নিয়ে গিয়ে সাম্প্রদায়িক কাজকর্ম শেখাচ্ছে। এই হাওয়া তুলে দিতে থাকেন সেই সময়কার সোশ্যালিস্ট নেতা-নেত্রীরা। সেইসঙ্গে সেবকদের ওপর আক্রমণ চলতেই থাকল। এত কিছু করেও নিরস্ত্র সন্ন্যাসীদের পরাভূত করা গেল না। এরপর সেবাশ্রম যখন কলকাতার তালজলায় তাদের প্রধান কার্যালয় নির্মাণের কাজ শুরু করল তখন সোশ্যালিস্ট পার্টি মরিয়া হয়ে উঠল তাদের থামাতে। যেভাবেই হোক আশ্রম বানানো বন্ধ করতে হবে, সেই উদ্দেশ্য নিয়ে নানাভাবে পার্টির কর্মীরা কখনো নির্মীয়মাণ আশ্রম বিল্ডিংয়ে-র ইট-সিমেন্ট, রড ইত্যাদি চুরি করে, কখনো নিকাশি নালা বন্ধ করে দিয়ে, দেওয়াল ভেঙে দিয়ে নানাভাবে আশ্রম তৈরির কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করতে থাকল। কিন্তু জগবন্ধু নিজের লক্ষ্যে স্থির। যতই আঘাত আসুক, আশ্রম ওখানে হবেই। সরকারের পার্টিও চুপ করে রইল না। সেবাশ্রম সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক করতে ডাকা হল নাগরিক কনভেনশন। সুজন সেতুর হত্যাকাণ্ডের ঠিক দিন তিনেক আগে শনিবার বিকেল পাঁচটায় স্থান তালজলা পার্কে বিশাল জনসভা করা হল। পার্টির প্রচারপত্রে লেখা হল— বৈদেশিক শক্তির সাহায্যে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে চরম অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টায় রত, প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের মধ্যে জগবন্ধু সেবাশ্রম অন্যতম। আমরা মনে করি সাধারণ মানুষের সামগ্রিক স্বার্থে সেবকদের এই সন্ত্রাস সৃষ্টির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ প্রয়োজন। এই আবেদনপত্রে নাম ছিল সোমনাথ ব্যানার্জি ও সুকান্তি গাঙ্গুলি-সহ আরও সোশালিস্ট নেতা-নেত্রীদের নাম। এর মাস দুয়েক আগে থেকেই পার্টির মুখপত্র 'জনশক্তি' পত্রিকায় সেবকদের বিরুদ্ধে লাগাতার অপপ্রচার চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। প্রায় প্রতিটি প্রতিবেদনেই সেবকদের কাজে ঐক্যবদ্ধভাবে বিরোধিতার আহ্বান জানানো হত। বিনা বাধায় যদি এদের কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে দেওয়া হয় তো আগামীতে ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। এদের আগ্রাসন থেকে বাঁচতে গেলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। জগবন্ধু সরকারের কার্যকলাপ সবই নজরে রাখতেন কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি বাইরের প্রচারের আড়ালে সোশ্যালিস্ট পার্টি কী নরমেধ যজ্ঞের পরিকল্পনা করছে।
বহু বাধা প্রতিরোধের মোকাবিলা করে শেষপর্যন্ত আশ্রম নির্মাণ হল। কলকাতা আশ্রমের উদবোধনের দিন আশ্রম প্রাঙ্গণে চলছিল ধর্মসভার প্রস্তুতি। অন্যদিকে আর-এক প্রস্তুতি চলছিল সবার অলক্ষে, সুজন সেতু এলাকায়। বুরুলিয়া থেকে তালজলার দিকে দিকে যে সেবক-সেবিকারা ট্যাক্সিতে যাচ্ছিলেন তাঁদের ধরে সোশ্যালিস্ট পার্টির গুন্ডারা ছেলেধরা এই অভিযোগ তুলে পিটিয়ে জীবন্ত জ্বালিয়ে মারল। সেই খবর যখন জগবন্ধু পেয়েছিলেন, তিনি মাথা ঠিক রাখতে পারেননি, নিজে ছুটে যেতে চেয়েছিলেন সেখানে। কিন্তু দুলাল, অসীম ও আরও কয়েকজন অনুচর প্রভুকে সামলেছিল। সেখানে জগবন্ধুর যাওয়া যে মৃত্যুফাঁদে পা দেওয়ার শামিল তা শেষ পর্যন্ত বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল তারা। কিন্তু সেইদিনই জগবন্ধু স্থির করে নিয়েছিলেন, আর ক্ষমা নয়। এই অন্যায়ের শোধ নিতে হবে। এবং শান্তির পথে নয়, রক্তের বদলা রক্ত ঝরিয়েই নেবেন। বুরুলিয়ার আশ্রমের একটি গোপন প্রাঙ্গণে তিনি আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন। কলকাতাসহ রাজ্যের যে সকল জায়গায় সেবাশ্রমের শাখা ছিল সেখান থেকে বাছাই করা সেবকদের নিয়ে গোপনে গড়ে তুলতে থাকলেন আধুনিক অস্ত্রচালনায় শিক্ষিত দল। তিনি তৈরি হচ্ছিলেন। দেশ-বিদেশ থেকে অগণিত ভক্ত যে অনুদান-সাহায্য পাঠাতেন তাতে আশ্রমের যথেষ্ট ভালো ফান্ড তৈরি হয়েছিল, কিন্তু শুধু ফান্ডে হবে না। এই সোশালিস্ট পার্টিকে রাজ্য থেকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, পিষে মারার জন্য চাই রাজনৈতিক সাহায্য। তিনি যোগাযোগ করলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বিরোধী দলনেতা শংকর রায়ের সঙ্গে। কয়েক দফা মিটিং হল। শংকর রায় যখন নিশ্চিত হলেন, জগবন্ধু সত্যিই শত্রুর শত্রু তখন তিনিও সাহায্যের হাত বাড়ালেন। জগবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন কেন্দ্রের নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে। দিল্লিতে জগবন্ধুর আশ্রমের শাখা ছিল। তিনি বেশ কয়েকবার দিল্লি গেলেন। সাক্ষাৎ করলেন স্বদেশ পার্টির কয়েকজন হেভিওয়েট মন্ত্রীর সঙ্গে। তারপরেই ধীরে ধীরে তৈরি হল অস্ত্রবর্ষণের ব্লুপ্রিন্ট। গোটা রাজ্যে সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা-মন্ত্রীদের ওপর উপর্যুপরি আধুনিক সমরাস্ত্র সহযোগে আক্রমণ করে, গোটা রাজ্যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে হবে ভোটের কয়েক মাস আগে। এই সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা একেবারে শেষ করে দিতে হবে। রাজ্যের ল অ্যান্ড অর্ডারের দফা রফা করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। সিদ্ধান্ত হল, এই অপারেশনের জন্য যত পরিমাণে অস্ত্র চাই তার ফান্ডিং করবে কেন্দ্র সরকার, অপারেশনের যাবতীয় দায়িত্ব নেবেন জগবন্ধু। তাঁকে অপারেশন সাকসেসফুল করার জন্য বাকি যত রকমের সহায়তা দরকার, সবই আড়াল থেকে করবে স্বদেশ পার্টি। এমনকী সেবকদের আধুনিক অস্ত্রশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাম্যুনিশন, ট্রেনার দেওয়ার দায়িত্বও নিল স্বদেশ পার্টি। দেশের কয়েকটি রিমোট জনশূন্য গোপন ডেরায় বাছাই করা সেবকদের বিভিন্ন সময় পাঠানো হত ট্রেনিং-এর জন্য। প্রায় হাজারজন তরুণ সেবক প্রশিক্ষিত হয়ে উঠেছিলেন আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্রচালনায়। সবকিছু প্রস্তুত ছিল। এত অস্ত্র ঘরের সামনে পৌঁছে যাওয়ার পরেও শেষ মুহূর্তে ওই অতি দায়িত্ববান পুলিশটার জন্য সবকিছু বানচাল হয়ে গেল। অর্ণবের ওপর প্রথমে অসম্ভব ক্রোধ হয়েছিল জগবন্ধুর। দুলাল আর অসীম ফুঁসতে ফুঁসতে বলেছিল, আপনি আজ্ঞা করুন, এই হারামজাদাটাকে পুরো শেষ করে দিই। জগবন্ধু অনুমতি দেননি। অর্ণব তো কোনো দোষ করেনি। সে তার কর্তব্য করেছে। অর্ণব সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য তাঁর কাছে রয়েছে। এই ছেলেটিও রাজ্য সরকারের সুনজরে নেই। কিন্তু তবু কর্তব্যনিষ্ঠ।
আবার নতুন করে ঘুঁটি সাজাতে হবে। আপাতত ভোটের প্রচারে মনোনিবেশ করতে হবে। নির্দল প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন জগবন্ধু। রাজ্যে তাঁর ভক্তসংখ্যা অনেক। তারা সকলে জগবন্ধুকেই ভোট দেবে। শেষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাড়াতে স্বদেশ পার্টিকে সাপোর্ট করে সোশ্যালিস্ট পার্টির ভোট কাটা হবে এমনই পরিকল্পনা। আপাতত এটাই লড়াই। ভোট মিটুক, তারপর ফলাফল বুঝে আবারও নামতে হবে লড়াইতে।
ধ্যানকক্ষে বসে এইসব কথাই ভাবছিলেন জগবন্ধু। মন এত অশান্ত আগে কখনো হয়নি। জেলের অকথ্য অত্যাচারের সময়গুলিতেও নিজেকে শান্ত রেখেছিলেন, কিন্তু এবারে মন চঞ্চল। অনেক বড়ো স্বপ্ন রয়েছে জগবন্ধুর। একদিন স্বদেশ, সোশ্যালিস্ট কোনো দল এই দেশে থাকবে না। শুধুমাত্র জ্যাটই শাসন করবে এই দেশ। জগবন্ধুর মতাদর্শেই চালিত হবে এই ভূখণ্ড।
নিঃশব্দে সামনে এসে দাঁড়াল দুলাল।
কিছু বলবি?
অর্ণব বারুই এসেছিল।
এখন! কেন?
হ্যাঁ, বলছিল খুব জরুরি দরকার আপনার সঙ্গে। এখনই নাকি দেখা করতে হবে।
কী দরকার?
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, অদ্ভুত সব কথা বলছে। কাল সকালে আসতে বলেছি।
হুম। ঠিক আছে।
দুলাল চলে যাচ্ছিল।
শোনো।
মাথা ঠান্ডা রাখ। এই পুলিশটার ওপর রেগে কোনো লাভ নেই। বরং ভাব, এটাকে কীভাবে নিজেদের কাজে লাগানো যায়।
এ আমাদের কোনো কাজে লাগতে পারে? মনের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলল দুলাল।
হ্যাঁ, লাগতে পারে। লোকটা অসৎ নয়। যা করেছে অজান্তে করেছে।
দুলাল প্রভুর কথার ওপর আর কথা বলল না। প্রণাম করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
মাঝে বেশ কয়েকদিন ভোরবেলার প্রার্থনাসভায় যোগ দিতে পারেনি অর্ণব। আজ আশ্রমে চলে এসেছিল। প্রার্থনাসংগীত হয়ে যাওয়ার পর প্রভুপাদ যখন সভা ছেড়ে চলে গেলেন তখন অর্ণব আবার গিয়ে ধরল দুলালকে।
ওম তৎ সৎ বলে দুলালকে প্রণাম জানিয়ে অর্ণব বলল, আমার কথা বলেছিলেন প্রভুকে?
হ্যাঁ বলেছি। আসুন।
অর্ণবকে আলাপকক্ষে নিয়ে গেল দুলাল। অর্ণব বসল। দুলাল চলে গেল। কিছুক্ষণ পর জগবন্ধুর সঙ্গে দুলাল আবারও এল। প্রভু আসামাত্র অর্ণব উঠে দাঁড়িয়ে প্রথমে হাত তুলে জয় হোক প্রভু জগবন্ধুর বলে একেবারে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল।
জগবন্ধু অর্ণবের এই অতিভক্তির বিষয়ে সামান্য সতর্ক হলেন। হাত তুলে অর্ণবকে আশীর্বাদ করে বললেন, বোসো।
অর্ণব আর জগবন্ধু বসলেন। দুলাল দাঁড়িয়ে থাকল।
জগবন্ধু জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কাল রাতে এসেছিলে?
হ্যাঁ প্রভু, একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেটা আপনাকে জানানোর জন্য এতটাই ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলাম যে গতকাল অসময়ে চলে এসেছিলাম। আমি আপনার কাছে ও দুলালবাবুর কাছে করজোড়ে মার্জনা চাইছি।
বেশ বেশ। ঠিক আছে। বলো কী ব্যপার?
আপনি তো সবই জানেন প্রভু, আমার জীবন আপনার কাছে খোলা খাতা। ছোটোবেলা থেকে শুধু আঘাত আর বঞ্চনা পেয়েই আমার বড়ো হয়ে ওঠা। কাজের স্বীকৃতি কোনোদিন পাইনি। মন সারাক্ষণ অস্থির, চঞ্চল থাকত, আপনার সান্নিধ্য পাবার পর অনেকটা শান্তি পেয়েছি। কিন্তু... বলে এক সেকেন্ড থামল অর্ণব, তারপর বলল, আপনি তো সবই জানেন, চৌহাটিতে অস্ত্রবর্ষণের কেসটা আমি এত ঝুঁকি নিয়ে হ্যান্ডেল করলাম অথচ ডিপার্টমেন্ট এই কেস থেকে আমাকে অন্যায়ভাবে সরিয়ে দিল। আমাকে কোনো রিওয়ার্ড দেওয়া তো দূর, ডিপার্টমেন্ট বলেছে, আমি যদি ভবিষ্যতে এই কেস নিয়ে কোনোরকম ইনিশিয়েটিভ নিই তাহলে আমার এগেটেন্স ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নেওয়া হবে, মানে সাসপেন্ড বা বরখাস্ত করা অনেক কিছুই করতে পারে। আমি বছরের পর বছর ধরে এই অপমান আর নিতে পারছি না প্রভু। এবার মুক্তি চাইছি।
জগবন্ধু কোনো উত্তর দিলেন না, স্থিরভাবে তাকিয়ে রইলেন অর্ণবের দিকে।
দুলাল জিজ্ঞাসা করল, আপনি কী চাইছেন?
আমি চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে এই আশ্রমের একজন সেবক হয়ে প্রভুর চরণে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাইছি।
জগবন্ধু বললেন, শান্ত হও তুমি। তুমি গৃহস্থ, তোমার স্ত্রী রয়েছেন। তাঁর কী হবে?
যদি দুজনেই আপনার আশ্রিত হয়ে যাই? মানে দুজনেই দীক্ষা নিই আপনার কাছে?
অমন হয় না। যারা সেবক তারা সকলেই সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী। কারো কোনো পিছুটান নেই।
তাহলে আমি যদি বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাই। তারপর?
তুমি শান্ত হও। এত উত্তেজিত হোয়ো না। এত বড়ো সিদ্ধান্ত এত দ্রুত নিতে গেলে হঠকারিতা হয়ে যাবে। সংসার কেন ছাড়বে তুমি? তার থেকে যেমন রয়েছ তেমনই থাকো। আশ্রমের সঙ্গে যোগাযোগে থাকো। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।
প্রভু, আপনি তো অন্তর্যামী। সবই জানেন। আমি আপনার চরণে স্থান পেয়ে এই কিছুদিনের মধ্যেই অনেক সুস্থ হয়েছি। আমার আর এই চোর-পুলিশের অশান্তির জীবন ভালো লাগে না। এবার একটু শান্তি চাই।
হবে হবে, সব হবে। তুমি শান্ত হও। যেমন জপ-তপ-ধ্যান করছ তেমন করতে থাকো। সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু প্রভু, আমি আর পারছি না। বলতে বলতে চোখের কোণ ভিজে এল অর্ণবের। জগবন্ধু সেটা খেয়াল করলেন। অর্ণব চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে জগবন্ধুর পায়ের সামনে এসে বসল।
জগবন্ধু ওর মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, পৃথিবী দুঃখময়। জীবের তার থেকে নিস্তার নেই।
কিন্তু আপনি পারেন আমাকে এই শোক-তাপ থেকে মুক্ত করতে। আমি জর্জরিত। আমাকে অন্তত কয়েকটা দিন আশ্রমে থেকে আপনার সেবা করার সুযোগ দিন।
জগবন্ধু অর্ণবের কথা শুনে দুলালের দিকে তাকালেন। দুলাল বলল, দেখুন অর্ণববাবু, আমাদের আশ্রমের নিয়ম অনুসারে এখানে কোনো প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তিকে আশ্রমে রাখতে পারি না। আমরা আপনার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি, কিন্তু নিরুপায়। তবে এখানে থাকতে না পারলেও আপনি ভোর পাঁচটা থেকে রাত ন-টার মধ্যে যখন খুশি আশ্রমে আসতে পারেন, যতক্ষণ খুশি থাকতে পারেন।
আমি চাই আশ্রমের সেবা করতে। আমি ওতেই মুক্তি পাব। আমি এই নোংরা চাকরি ছেড়ে দেব।
বেশ বেশ। শান্ত হও। সব হবে। সময়ের অপেক্ষা করো।
কোনোভাবেই কি আমার পক্ষে ক-টা দিন আশ্রমের সেবা করা সম্ভব নয় প্রভু?
সবকিছুই নিয়মের নিগড়ে বাঁধা, অর্ণব। তাকে ভাঙা আমারও অসাধ্য। এই আশ্রমের দ্বার তোমার জন্য সর্বদা খোলা। তোমার যখন খুশি এসো। আমার আশীর্বাদ সর্বদা তোমার প্রতি রয়েছে। বলে উঠে দাঁড়ালেন জগবন্ধু।
অর্ণব আবারও জগবন্ধুকে প্রণাম করে বলল, আপনার যা আদেশ তা-ই হবে। আমাকে অনুমতি দিন।
ওম তৎ সৎ।
অর্ণব দুলালকেও হাতজোড় করে প্রণাম জানিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল।
মনে মনে বেশ হতাশ। প্ল্যানটা সাকসেসফুল হল না। আশ্রমে ওকে রাতে থাকতে অ্যালাউ করবে না। অন্য কিছু ভাবতে হবে।
অর্ণব চলে যাওয়ার পর দুলাল জগবন্ধুকে বলল, লোকটাকে আমার কেন জানি না সুবিধার মনে হয় না।
এর দাঁতে বিষ নেই রে দুলাল। পুরোপুরি হতাশায় ডুবে-থাকা মানুষ। একে নিয়ে ভাবিস না। তুই নিশীথজিকে ফোন কর। জমির ব্যাপারে এখনও কিছুই জানাচ্ছেন না কেন সেটা এবার ফয়সালা হওয়া দরকার।
দুলাল ঘর ছেড়ে উঠে গেল। কিছুদিন আগেই নিশীথজির সঙ্গে জগবন্ধুর যে ডিল হয়েছিল তাতে জগবন্ধু একটি শর্ত রেখেছিলেন, দিল্লির কাছে একটি চারশো বিঘা জমিতে তিনি আশ্রম বানাতে চান। সেই জমিটির ব্যবস্থা তাকে করে দিতে হবে। নিশীথজি কথা দিয়েছিলেন সাত দিনের মধ্যে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু এখনও তার দিক থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। রাজনীতির লোকেদের কথার কোনো দাম নেই। এরা দেওয়া কথা ভুলে যায় খুব তাড়াতাড়ি। তাই যা আদায় করতে হয়, দ্রুত আদায় করতে হয়। নইলে পরে আর কিছু পাওয়া যায় না।
দুলাল ফোন করল নিশীথকে। সেক্রেটারি ফোন ধরলেন।
দুলাল বলল, প্রভু বিশেষ দরকারে নিশীথজির সঙ্গে কথা বলতে চান।
আচ্ছা ধরুন।
মিনিট দুয়েক পরে ফোনে হ্যালো বললেন নিশীথজি।
দুই-এক কথার পরেই সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এলেন জগবন্ধু। বললেন, সাত দিন তো পেরিয়ে গেল নিশীথজি জমির ব্যাপারে আপনার কাছ থেকে কোনো বার্তা পেলাম না।
নিশীথ বললেন, এত অধৈর্য হবেন না প্রভুজি। হড়বড়ি করে এত বড়ো ডিল হয় না। আপনি জ্ঞানী মানুষ, সবই তো বোঝেন। একটু সময় লাগবে। অনেক ফাইলপত্র তৈরি করার রয়েছে।
তো সেগুলো অনুগ্রহ করে একটু দ্রুত তৈরি করুন। নইলে আমাকেও তো অন্য ভাবনাচিন্তা করতে হবে।
হবে হবে, সব হবে। আপনি সাধুসন্ত মানুষ, এত লালচি হলে কী করে হবে গুরুজি। ধৈর্য রাখুন। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। রাখি এখন। প্রণাম। বলে ফোন কেটে দিলেন নিশীথ।
জগবন্ধুর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তিনি দুলালের দিকে তাকিয়ে বললেন, সব ক-টা এক গোয়ালের গোরু দুলাল। সময় থাকতে লেগে পড়ে কাজটা আদায় করে নিতে হবে। আর্মস ড্রপ প্রোজেক্ট যেহেতু ফেল করেছে এরাও অমনি হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছে।
ফোনের অন্যদিকে নিশীথ চতুর্বেদী তাঁর ফোনটা সেক্রেটারির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এই গুরু বেশি হড়বড়ি করছে। আবার বলছে, অন্য ভাবনাচিন্তা করবে। জল মাথার ওপর চড়তে দিলে হবে না। আগে একটা ব্যবস্থা করতে হবে। বলে তিনি সেক্রেটারিকে জগবন্ধুর ব্যাপারে কিছু নির্দেশ দিলেন।
গোপাল বলল, আপনি চিন্তা করবেন না স্যার। আমার মাথায় আরেকটা প্ল্যান রয়েছে।
কী প্ল্যান? জিজ্ঞাসা করল অর্ণব।
স্যার, আমার এক বন্ধু রয়েছে, খবরের কাগজের ট্রেইনি সাংবাদিক। বয়স অল্প কিন্তু সাংঘাতিক কিছু স্টোরি করে ফেলেছে এর মধ্যে। যেমন বুদ্ধি তেমন চালাক। ওর আরেকটা শখ রয়েছে— ডকুমেন্টারি বানানো। স্যার, এইরকম যদি করা যায়, আমি বিপুলকে মানে আমার ওই বন্ধুকে বললাম, ও যদি এসে ওখানে থাকার একটা ব্যবস্থা করতে পারে তাহলেও হয়ে যাবে।
কী ব্যবস্থা করবেন স্যার? আর ওকে খামোখা থাকতেই বা দেবে কেন? বলল কৃষ্ণলাল। অকারণে আশ্রমে কেউ থাকতে পারে না। শুধুমাত্র উৎসবের সময় ছাড় পাওয়া যায়। তাও কড়া পাহারা থাকে।
আছে, একটা উপায় আছে কৃষ্ণদা। যদিও লাক ট্রাই বলতে পারো। বিপুল যদি ওই আশ্রমের এবং জগবন্ধুর ওপর ডকুমেন্টারি বানানোর প্রস্তাব দেয় এবং তাতে যদি আশ্রম রাজি হয়ে যায় তাহলে...
অর্ণব বলল, নট এ ব্যাড আইডিয়া। তুমি একবার কথা বলো বন্ধুর সঙ্গে। সে থাকে কোথায়?
থাকে উলুবেড়িয়া।
আচ্ছা। কাজটায় প্রচণ্ড রিস্ক রয়েছে, সেগুলো বলে নিয়ো। যদি রাজি থাকে তাহলে আসতে বলো। বাকি কথা সামনে হবে।
আচ্ছা স্যার। তা-ই করছি।
অর্ণব নন্দ আর কৃষ্ণর দিকে তাকিয়ে বলল, আর তোমাদের কী আপডেট?
তেমন কিছুই নেই স্যার। নন্দ বলল, এত ঠান্ডায় রোজ রাতে ঘোরাঘুরি সম্ভব হচ্ছে না স্যার। মাঝে মাঝে ঘুরছি।
ঠিক আছে। কাজটা ছেড়ে দিয়ো না।
না না স্যার। ছাড়িনি।
হুঁ, মন দিয়ে ফলোআপ করো। এই গ্রামের মধ্যেই কিছু একটা তো রয়েছেই। পেয়ে যাবে। তুমি নজর রাখো।
হ্যাঁ স্যার।
গোপাল ফোন করল ওর বন্ধু বিপুলকে। খুব সংক্ষেপে বিষয়টা বলল। সেই ছেলে তো শুনেই লাফিয়ে উঠল অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেয়ে। বলল, আমি আগামীকালই পৌঁছোচ্ছি।
অর্ণব গোপালকে বলল একটা কথা, ও যদি বাইচান্স ধরা পড়ে এবং আমাদের নাম বলে দেয়, আমরা কিন্তু সিম্পলি ডিনাই করব। যদিও তারপরেও পার পাব কি না জানা নেই।
আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার। একবার কথা বলে দেখুন। যদি আপনার মনে হয় ঠিক আছে তাহলেই অপারেশনে পাঠাবেন।
হুঁ।
রাত ন-টা বাজে। গোপাল, অর্ণব এবং বিপুল তিনজনে মিলে মিটিং-এ বসেছে কৃষ্ণলালের বাড়িতে। আজ রাতে বিপুল এই বাড়িতেই থাকবে। অর্ণব ইচ্ছে করেই বিপুলকে থানায় আসতে বলেনি। কে কখন বিপুলকে দেখে ফেলে এবং ট্রেস করে ফেলে, কোনো রিস্ক নেওয়ার দরকার নেই। গতকাল ফোন করার পর আজ সকালেই ও রওনা হয়ে গেছিল। সন্ধেবেলা পৌঁছেছে। রেল স্টেশনে নন্দ একজন চেনা রিকশাওয়ালাকে পাঠিয়েছিল বিপুলকে তার বাড়িতে নিয়ে আসতে। ওখানেই সারাদিন বিপুল থেকেছে। সন্ধের পর থেকেই চৌহাটি শুনশান হয়ে যায়। রাতের খাবারের জন্য গোপাল আর অর্ণবকে নেমন্তন্ন করেছিল কৃষ্ণলাল। সামান্যই আয়োজন। রুটি আর মাংস। কৃষ্ণলালের স্ত্রী-এর রান্না খুবই ভালো। এখানে আসা ইস্তক তার হাতের রান্নাই দুইবেলা খায় অর্ণব। মাসে একটা টাকা দিয়ে দেয় কৃষ্ণলালকে।
খেয়ে উঠে ওরা মিটিং-এ বসেছিল। থানায় নন্দ একা রয়েছে।
বিপুলকে পুরো বিষয়টা ব্রিফ করার পর অর্ণব বলল, দেখো ভাই, রিস্ক যথেষ্ট রয়েছে। তুমি ভালো করে ভেবেচিন্তে তবেই এগিয়ো। জগবন্ধু এবং এই আশ্রম কিন্তু সাংঘাতিক একটা জায়গা। এবং তুমি যদি ফেঁসে যাও তাহলে কিন্তু আমরা তোমাকে চিনি না। তোমাকে রক্ষা করারও কেউ থাকবে না। আর যদি সাকসেসফুল হও তাহলেও তোমার কোনো লাভ হবে না, কারণ নিউজপেপারে তুমি এই নিয়ে একটা লাইনও লিখতে পারবে না। পুরোপুরি থ্যাঙ্কলেস জব।
বিপুল বলল, আমার বয়স মাত্র পঁচিশ। নিজেকে জানানোর জন্য ঢের সময় পড়ে রয়েছে। আপাতত এই অ্যাসাইনমেন্টগুলোকে আমি ট্রেনিং হিসেবেই নিই। আপনি আমার ওপর ভরসা করতে পারেন না। সাকসেসফুল যদি না-ও হতে পারি, ফেলিয়োর হব না, মানে ধরা পড়ব না। আর যদি পড়িও, আপনাদের গায়ে কোনো আঁচ পড়বে না। আমি আপনার কথা জানি। গোপালদার কাছে আপনার অনেক কথা শুনেছি। আপনার মতো পুলিশ অফিসারের খুব প্রয়োজন।
অর্ণব উত্তরে কিছু বলল না। ও ভাবছিল, ছেলেটির বয়স কম। আবেগ বেশি। এত কঠিন একটা কাজ আদৌ পারবে তো? না পারলে ভয়ংকর বিপদ হবে। শুধু ওর একার নয়, অর্ণবেরও। তবু এই ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। অর্ণবের মন বলছে, রেকর্ডরুমে নিশ্চয়ই কিছু পাওয়া যাবে।
অর্ণব বিপুলের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করে ছেলেটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, কতটা বুদ্ধি রাখে তার একটা আন্দাজ করার চেষ্টা করল, তারপর খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, তোমাকে যেটা করতে হবে, এবার ভালো করে বুঝে নাও। শুধু মনে রেখো, কাজটা করে ফেলার পরে তোমাকে সবকিছু ভুলে যেতে হবে। ঠিক আছে?
হ্যাঁ স্যার।
অর্ণব ওকে কী কী করতে হবে তা বুঝিয়ে দিল। আশ্রমের রেকর্ডরুমের দায়িত্বে থাকা নিত্যানন্দ সেবকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। যে ফাইলগুলো দেখার দরকার তা নিত্যানন্দকে বলে রাখা রয়েছে, সে ওগুলো সামনেই রেখে দেবে। রুমে ঢুকে অতি দ্রুত সেগুলোর ছবি তুলে নিতে হবে। কাজটার জন্য সময় থাকবে খুব কম।
বিপুল বুঝে নিল।
অর্ণব বলল, আর তুমি তোমার যাবতীয় সরঞ্জাম নিয়ে তৈরি হয়ে এসেছ তো?
হ্যাঁ স্যার।
আর যদি তোমার সম্পর্কে তোমার অফিসে ওরা কোয়্যারি করে?
সেটাতেও অসুবিধা হবে না স্যার, আমি অফিসে বলে এসেছি যে আমি জগবন্ধু আশ্রমের ওপর ডকুমেন্টারি তৈরি করতেই যাচ্ছি। ফলে অফিসে কোয়্যারি গেলে একই উত্তর শুনবে।
গ্রেট। বেস্ট অফ লাক। তোমার ওপর অনেক ভরসা করে কাজটা দিচ্ছি।
নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার।
ও.কে.। গুড নাইট। বেস্ট অফ লাক।
অর্ণব আর গোপাল বেরিয়ে এল। জিপ থানাতেই রয়েছে। দুজনে বাইকে এসেছে। ফেরার পথে অর্ণব গোপালকে শুধু একটা কথাই বলল, আগামী কয়েকটা দিন খুব টেনশনের।
সকাল দশটা নাগাদ নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে আশ্রমে পৌঁছোল বিপুল। অসীমের সঙ্গে দেখা করে নিজের প্রস্তাবের কথা বলল। অসীম ওকে নিয়ে গেল দুলালের কাছে। দুলাল আর অসীম দুজনে মিলে বেশ কিছুক্ষণ ধরে বিপুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করল। বিপুল পুরো তৈরি হয়েই এসেছিল। নিজের আইডেন্টিটি কার্ড, আগে যেসব ডকুমেন্টারি করেছে তার নমুনা, রিভিউয়ের পেপার কাটিং ইত্যাদি সবকিছুই নিয়ে গেছিল।
দুলাল সেগুলো চেক করে তারপর জিজ্ঞাসা করল, বিপুল কেন এই কাজ করতে চায়।
বিপুল বলল, সে প্রভু জগবন্ধুর বই পড়েছে, তাঁর বাণী, আদর্শ বিপুলকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। ওর ইচ্ছা, প্রভুর এই আশ্রম, প্রভুর ও তাঁর খুব কাছের যাঁরা সেবক, যাঁরা প্রভুকে দীর্ঘদিন খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাঁদের দেখায়, অনুভবে প্রভু জগবন্ধু কেমন সেটার ডকুমেন্টেশন করা। এবং ওর ইচ্ছা, এই ডকুমেন্টারিটি সে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে পাঠাবে।
অসীম বলল, দেখো ভাই, প্রভুকে সব থেকে কাছ থেকে এবং সব থেকে বেশি দিন ধরে আমি আর দুলাল সেবক মিলে দেখছি। প্রভুর যে ঐশীশক্তি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তা সত্যিই অতুলনীয়। প্রভু স্বয়ং ঈশ্বরের অংশ।
বিপুল জানে, নিজের প্রচার সকলেই চায়। তাই এই প্রলোভনের ঢিলটা ছুড়েছিল। অসীম টপ করে টোপটা গিলল কিন্তু দুলালের মধ্যে বিশেষ ভাবান্তর দেখা গেল না। আসলে অসীমের থেকে দুলাল আরও বেশি বুদ্ধি ধরে। বিচার-বিবেচনাবোধ ওর মধ্যে একটু বেশি। বিশ্বস্ততায় দুজনে সমান হলেও বুদ্ধির দিক থেকে দুলাল এগিয়ে বলে জগবন্ধু যেকোনো আলোচনা দুলালের সঙ্গেই করেন।
দুলাল বলল, বেশ, ঠিক আছে। আমি প্রভুর সঙ্গে কথা বলি, দেখি, উনি কী বলেন। তারপর তোমাকে জানাচ্ছি।
কিন্তু আমি যে একেবারে তৈরি হয়েই চলে এসেছি।
না না, তৈরি হয়ে এলে কী করে হবে? এসব ব্যাপার নিয়ে আগে আলোচনার একটা ব্যাপার তো রয়েছে।
আপনি তাহলে অনুগ্রহ করে একটু প্রভুর সঙ্গে কথা বলবেন? আমি অপেক্ষা করছি।
আপনি এখানে উঠেছেন কোথায়?
আমি মানে এখানেই সরাসরি এসেছি। আসলে মানে কাজটা করতে গেলে এখানেই তো থাকতে হবে।
এখানে থাকবে!
ইয়ে মানে তা-ই তো ভেবেছিলাম। তবে আপনারা যদি অ্যালাউ না করেন তাহলে কোনো হোটেল-টোটেল যদি...
হা হা করে হেসে উঠল অসীম, চৌহাটিতে হোটেল! না না, এখানে ওসব কিছু নেই। আমরা দেখছি, কী ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তুমি বোসো। আর তোমার আইডেন্টিটি প্রূফ, অফিসের নাম্বার ইত্যাদি দাও।
দুলাল অসীমের দিকে তাকাল। তারপর ওরা বিপুলের কাছ থেকে কাগজগুলো নিয়ে উঠে বাইরে এল।
অসীম আর দুলাল মিলে কিছুক্ষণ আলোচনা করে স্থির করল, ছেলেটির ডকুমেন্টস চেক করে এবং ওর অফিসে ফোন করে জেনে নিয়ে এখানে থাকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এইরকম ডকুমেন্টারি ছবি তৈরির কাজ আশ্রম ও প্রভুকে নিয়ে আগেও কয়েকবার করা হয়েছে। বিদেশি বেশ কয়েকজন ভক্ত এই কাজ করেছেন। দেশেও হয়েছে। এই ছেলেটির কাজ অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে। সুতরাং অনুমতি দেওয়া যেতেই পারে। আশ্রমের অতিথিশালায় কারা থাকতে পারবেন সেই সিদ্ধান্ত দুলাল আর অসীমই নিয়ে থাকে, এইসব ছোটোখাটো ব্যাপারে প্রভুকে জানাতে হয় না।
অতিথিশালায় থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল বিপুলের। পরীক্ষার প্রথম পর্বে পাশ। অসীম দায়িত্ব নিল, এই আশ্রমের বিভিন্ন বিষয় ওকে জানাবে, ঘুরিয়ে দেখাবে। প্রথম দুই দিন হাতে মুভি ক্যামেরা নিয়ে অসীমের সঙ্গে আশ্রমের চারদিকে ঘুরে বেড়াল বিপুল। এখানকার কর্মকাণ্ডের অজস্র ক্লিপিং নিল ভোর থেকে রাত পর্যন্ত। দুলাল এবং অসীমের মস্ত সাক্ষাৎকার নিল। প্রভু জগবন্ধুর নানাবিধ ক্রিয়ার স্টিল ও ভিডিয়ো তুলল। তার ফাঁকে নিত্যানন্দ সেবকের সঙ্গে দেখা করেও নিল। যখন বুঝল, ও এই দুই শাগরেদের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে তখন ঠিক করে ফেলল, এবারে অপারেশনে নামতে হবে।
তৃতীয় দিনের রাত্রি ঠিক আড়াইটার সময় গোটা আশ্রম যখন গভীর ঘুমে, একমাত্র মূল ফটক এবং আশ্রমচত্বরে পাহারা দেওয়ার রক্ষীরা জাগ্রত তখন বিপুল নিজেকে চাদরে ঢেকে খুব সন্তর্পণে পৌঁছোল আশ্রমের রেকর্ডরুমের সামনে। কথা ছিল, ঠিক আড়াইটার সময়েই রুমের সামনে অপেক্ষা করবে নিত্যানন্দ। বিপুল পৌঁছোনোমাত্র নিত্যানন্দ অতি নিঃশব্দে রেকর্ডরুমের তালা খুলল। ফিসফিস করে বলল, ভেতরে ঢুকেই ডানদিকের টেবিলের ওপর রাখা তিনটে ফাইল। তোমার হাতে ঠিক পনেরো মিনিট। তারপরে এসে দরজা খুলব।
ঠিক আছে। বলে বিপুল ভেতরে ঢুকে গেল আর নিত্যানন্দ বাইরে থেকে তালা দিয়ে সামনে একটি সিঁড়ির আড়ালে অপেক্ষা করতে থাকল। আশ্রমের ভেতরে রাতে চত্বরে পাহারা নেই। তবু ঝুঁকি নেওয়া যায় না। কে কখন এসে পড়ে।
রেকর্ডরুমের ভেতরটায় ভ্যাপসা গন্ধ। বিপুল চাদরটা সরিয়ে ফেলে ব্যাগ থেকে বার করল টর্চ আর ক্যামেরা। টর্চের আলো ফেলে দেখল টেবিলের ওপর দুটো পুরোনো ফাইল, একটা লম্বা-চওড়া রেজিস্টার খাতা।
বিপুল এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। অন করা পেনসিল টর্চটাকে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ৮৫/১ এবং ৮৫/২ নাম-লেখা ফাইল দুটোয় যতগুলো পৃষ্ঠা ছিল তার পর পর ছবি নিয়ে নিল। এরপর '৮৫ সালের এপ্রিল মাসের রেজিস্টারটি খুলে আঠাশে এপ্রিল তারিখ থেকে পরবর্তী সাত দিনের প্রতিটি পৃষ্ঠার ছবি তুলে নিল। ব্যাস, আপাতত কাজ শেষ। উত্তেজনায় এই ঠান্ডাতেও ঘেমে স্নান করে গেছে ও। ক্যামেরা ব্যাগে ভরে রিস্টওয়াচে আলো ফেলে দেখল পনেরো মিনিট শেষ হতে আরও দুই মিনিট বাকি। যাক তাহলে সঠিক সময়েই কাজ শেষ হয়েছে। ফাইল দুটো আর রেজিস্টারটা নিত্যানন্দর নির্দেশমতো টেবিল থেকে নামিয়ে পাশে রাখা ফাইলের গাদায় ঠেসে ঢুকিয়ে দিল, তারপর দরজার সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল। ঠিক দুই মিনিট পরেই বাইরে থেকে খুট করে দরজা খুলল নিত্যানন্দ। কেউ কোনো কথা বলল না। বিপুল চাদর মুড়ি দিয়ে নিঃশব্দে চলে গেল নিজের ঘরের দিকে আর নিত্যানন্দ আবার রেকর্ডরুমের দরজায় তালা লাগিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। কেউ কিছু জানতে পারল না।
আরও একদিন আশ্রমে কাটিয়ে অবশেষে আশ্রম থেকে বিদায় নিল বিপুল। যাওয়ার আগে ফোটোরিলটা জমা দিয়ে গেল নন্দর কাছে। অর্ণব বলে রেখেছিল, ও যেন ফেরার সময় আর দেখা না করে। বাড়ি ফিরে ফোনে কথা বলে। বিপুল তা-ইই করল। অর্ণব ছেলেটির স্মার্টনেস এবং বুদ্ধিমত্তা দেখে মুগ্ধ। এই ছেলে পরবর্তীকালে তুখোড় একজন সাংবাদিক হবে সে বিষয়ে ও নিশ্চিত। রিলগুলো নন্দর পরিচিত এক ফোটোল্যাবওয়ালাকে দিয়ে প্রিন্ট করিয়ে নিয়ে এল। পজিটিভগুলো হাতে পাওয়ামাত্র অর্ণব আর গোপাল সেগুলোকে নিয়ে বসল। অন্ধকারে টর্চের আলো ফেলে ছবিগুলো তুলেছে এবং সেটাও অত্যন্ত দ্রুত, ফলে সব ক-টা প্রিন্ট যে খুব স্পষ্ট এসেছে তা নয়, তবে কাজ চলে যাবে। ওরা দুজনে মিলে প্রথমে ফাইলের ছবিগুলো দেখতে শুরু করল। এফ. আই. আর.-এর কপি, রাজ্য সরকারকে পাঠানো চিঠি, তাদের পক্ষ থেকে উত্তর, প্রেস বিজ্ঞপ্তি, কিছু নিউজপেপার কাটিং, উকিলের কাগজপত্র ইত্যাদির সঙ্গে পাওয়া গেল সুজন সেতু হত্যাকাণ্ডে যাঁরা মারা গেছিলেন তাঁদের প্রত্যেকের বিকৃত মুখাবয়ব এবং নাম, বয়স ইত্যাদি ডিটেল। মোট চোদ্দোজনের ডিটেল পাওয়া গেল। অর্থাৎ সেদিন যাঁরা জীবন্ত দগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু পরেশবাবুর কথা অনুসারে ষোলোজন গেছিলেন। সেই পলাতক দুজনের ডিটেল কই?
গোপাল বলল, এই যে, এইটা দেখুন স্যার। রেজিস্টারের এই পাতাটা দেখুন।
অর্ণব দেখল, উনত্রিশে এপ্রিলের রেজিস্টারে মোট একশো চল্লিশজন সন্ন্যাসীর নাম। নামের পাশের কলামে তাঁদের সেদিনের কাজ এবং সই করা। ওই একশো চল্লিশজনের মধ্যে কেউ বাগান, কেউ রান্না, কেউ গোশালা, কেউ ধোয়ামোছা, কেউ কাচাকুচি ইত্যাদি নানাবিধ কাজের উল্লেখ করেছেন, শুধু ষোলোজন তাঁদের কাজের জায়গায় লিখেছেন কলকাতা আশ্রম। অর্থাৎ এই ষোলোজন ওইদিন কলকাতার আশ্রমের দিকে রওনা হয়েছিলেন। ওই ষোলোজনের সঙ্গে মৃত চোদ্দোজনের নাম মেলাল অর্ণব। দুজনের নাম মৃতের তালিকায় নেই। সেই দুজনের নাম সরোজিনী সেবিকা এবং প্রহ্লাদ সেবক। পরবর্তী সাত দিনের রেজিস্টারেও তাঁদের নাম, কাজ বা সই কিছুই নেই।
অর্ণব উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, দ্যাট'স ইট গোপাল, পেয়ে গেছি। পরেশবাবু একদম ঠিক বলেছেন, দুজন সেদিন পালিয়েছিলেন। এবং মোস্ট প্রোবাবলি এঁরাই সেই দুজন যাঁরা আর আশ্রমে ফেরেন নি বা ফিরলেও ওখানে থাকেন নি।
কিন্তু স্যার, একটা প্রশ্ন, যদি ধরে নিই, সোশ্যালিস্ট পার্টি নিজেদের স্বার্থে পলাতক দুজনের কথা কোথাও উল্লেখ করেনি, কিন্তু আশ্রম কেন এই দুজনের কথা বেমালুম চেপে গেল? কেন তাদের দিয়ে কিছু বলাল না? আর কেনই বা আশ্রমের রেজিস্টারে ওইদিনের পর থেকে তাদের দুজনের আর নাম নেই?
এখানে মাত্র সাত দিনের রেজিস্টার রয়েছে, গোপাল। এবার সম্ভাবনা হল, এক, আশ্রম নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে, মানে ধরো, ওই মানুষ দুটোর সিকিউরিটির কারণে তাঁদের নাম আর এখানে লেখা হয়নি, কিংবা সাতদিন বা দশ দিন অথবা তার পরের রেজিস্টারে আবার তাদের নাম রয়েছে। কিংবা... কিংবা... জগবন্ধু ইচ্ছে করেই তাঁদের নাম রেজিস্টরে রাখেননি।
কেন স্যার?
হয়তো রাখতে চাননি তাই।
ওই দুজন কি তাহলে আশ্রমেই আছে?
থাকতেও পারেন, আবার না-ও থাকতে পারেন। কিন্তু এই দুজনের আসল নাম জানতেই হবে, গোপাল।
কীভাবে জানা যাবে স্যার? এখানে তো প্রভু অনেকের নামই বদলে দেন। এবং বিশেষ করে আশ্রমে কারো পদবি থাকে না, সকলেই সেবক।
শোনো গোপাল, যে আশ্রমে এত নিয়মশৃঙ্খলায় প্রতিটি কাজ হয়, আমার বিশ্বাস, আশ্রমে নিশ্চয়ই প্রত্যেক সেবকের নামে আলাদা ফাইল থাকবে। সেখানে জন্মকুণ্ডলী পাবার একটা চান্স রয়েছে।
মানে আবার রেকর্ডরুম! বিপুলকে আর ওখানে ঢোকানো যাবে না স্যার।
জানি, সেটা আর ঢোকানো যাবে না। এবার ওই নিত্যানন্দকে লাস্ট আরেকটা সাহায্য করতে বলো।
আবার!
উপায় নেই। ওকে বলো, এই প্রহ্লাদ সেবক আর সরোজিনী সেবিকার ফাইল দুটো বার করে শুধু যা যা রয়েছে তা হুবহু টুকে যদি আমাদের দিতে পারে।
কিন্তু যদি ছবি থাকে? তাহলে তো দেখতে পাব না আমরা। বরং তার চেয়ে যদি একটা কাজ করতে বলি, নিত্যান্দকে বলি, ওই দুটো ফাইলের কাগজগুলো বার করে যদি একদিনের জন্য আমাদের দিতে পারে তাহলে আমরা সেগুলোর ছবি নিয়ে নিতে পারব বা ফোটোকপি করে নিতে পারব। ফাইল ফাইলের মতো থাকল আমরা কাজ সেরে আবার জিনিস ওর কাছে পৌঁছে দিলাম।
কিন্তু নিত্যানন্দ কি আর এই রিস্ক নিতে রাজি হবে? আর দ্বিতীয়ত, এই কথাগুলো তুমি ওকে জানানোর ব্যবস্থা করলেও ও সেগুলো দেবে কার হাতে আর কাজ হওয়ার পর ফেরতই বা কীভাবে পাবে?
স্যার, নিত্যানন্দ আমাকে একদিন একটা কথা বলেছিল, এই আশ্রমে যত সন্ন্যাসী- সন্ন্যাসিনী রয়েছেন, সকলেই যে খুব সুখে এবং স্বেচ্ছায় রয়েছেন তা নয়। অনেকেই রয়েছেন পেটের দায়ে, কিংবা কোনো সমস্যায় পড়ে। প্রভু জগবন্ধুর আশ্রম বাইরে থেকে যেমন ভেতরের গল্পটা অতটাও পরিষ্কার নয়, কানাঘুসোয় অনেক কিছুই শোনা যায়, এখানে কাজে ভুল হলে, বা কর্তব্যে গাফিলতি ধরা পড়লে সেবকদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। স্বাধীনতা বলতে কারো কিছু নেই, কলের পুতুলের মতো কাজ করে যেতে হয়। কোনো অভিযোগ করলে তার শাস্তি মৃত্যুও হতে পারে। আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন না, কেন নিত্যানন্দ আশ্রমে থেকেও বেইমানি করবে? আসলে নিত্যানন্দর এক দাদা এই আশ্রমেরই সেবক ছিল, সে একবার আশ্রমের কোনো গোপনীয় অন্যায় ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিল, দিনকয়েকের মধ্যেই তার ক্ষতবিক্ষত দেহ জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয়েছিল। এমন ঘটনা বেশ অনেকবার ঘটেছে। নিত্যানন্দর মনে সেই ক্ষোভ রয়ে গেছে। সে নিজে কিছু করতে পারবে না, এমনকী এই আশ্রমে যে একবার ঢুকেছে সে আর কখনো স্বেচ্ছায় বেরোতে পারবে না। নিত্যানন্দর আর উপায় নেই এই আশ্রম ছেড়ে বেরোনোর। কিন্তু ও মুক্তি চায়। নিত্যানন্দর বোন আমার বড়োশালার শ্বশুরবাড়ির দিকের আত্মীয়া। সেই সূত্রেই ওর সঙ্গে যোগাযোগ। পরে খানিকটা ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল। একদিন কথায় কথায় মনের দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা আমার কাছে বলে ফেলেছিল। বলে, তুমি তো পুলিশ, দেখো-না যদি কোনোদিন আমাকে এখান থেকে মুক্তি দিতে পারো। আমি এখান থেকে বেরোতে পারব না। যদি কোনোদিন কোনো সাহায্য লাগে বোলো। আমি চেষ্টা করব। সেই কথাটা আমার মাথায় থেকে গেছিল স্যার। ওকে বলতেই রাজি হয়ে গেল।
আচ্ছা বুঝলাম। তবে নিত্যানন্দ কি কাগজ বার করে আনতে পারবে?
কথা বলে দেখছি স্যার।
কীভাবে বলবে?
আশ্রমের গোশালায় যে গোবর এবং প্রতিদিনের ময়লা জমে তা গাড়ি করে তুলে নিয়ে যাওয়ার লোক আসে। এই ময়লা গাড়ির কোনো চেকিং হয় না। ময়লা- তোলা একটা ছেলের নাম বলু। একসময় জমাদারের কাজ করত। আমাকে খুবই ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। আগের বার বলুর মাধ্যমেই নিত্যানন্দর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। এবারেও তাকেই ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তুমি তো দেখছি সাংঘাতিক ছেলে হে গোপাল।
আপনার মতো সিনিয়র পেলে সবই সম্ভব স্যার। তাহলে চেষ্টা করি?
হ্যাঁ করো। দেখো কী করা যায়।
ব্যবস্থা হয়ে গেল। নিত্যানন্দ সরোজিনী আর প্রহ্লাদের ফাইলের কাগজ বার করে একটা প্লাস্টিকে ভরে সেটা আবার অন্য ময়লা প্লাস্টিকের ভেতরে ভরে বলুর হাতে ধরিয়ে দিল ময়লা-গাড়িতে ঢালার জন্য। বলু সেটা খুব ক্যাজুয়ালি ময়লা গাড়ির মধ্যে ঢেলে দিল। তারপর বাকি সব আবর্জনা গাড়িতে স্তূপ করার পর আশ্রমের গেট থেকে বেরিয়ে গেল। বেশ কিছুটা পথ যাওয়ার পর রাস্তার ধারে গোপাল দাঁড়িয়ে ছিল। বলু গাড়ি থেকে নেমে ময়লা ঘেঁটে সেই প্লাস্টিক বার করে গোপালের হাতে ধরিয়ে দিল।
গোপাল সেই প্লাস্টিক নিয়ে এসে থানায় পৌঁছোতেই দেখল, অর্ণব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
পাওয়া গেছে?
হ্যাঁ স্যার। তবে এখন হাত দেওয়া যাবে না। আগে বাইরের ময়লা-মাখা প্লাস্টিকটা ফেলে, তারপর বার করছি।
এদিকে আরেক ঝামেলা উপস্থিত। এস.পি. সাহেব ফোন করেছিলেন আমাকে। পরশু দিন আবার কলকাতায় যেতে হবে। সি. আই. ডি. ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাকে ডেকেছে।
কেন স্যার? আমরা তো যা বলার বলেই দিয়েছি।
কী জানি, আবার কেন ডাকল। এস.পি. সাহেব আমাকে বলছেন, শুনলাম, আপনি নাকি প্রতিদিন জগবন্ধু আশ্রমে যান। কী ব্যাপার?
কী বললেন?
বললাম যা ফ্যাক্ট।
তারপর?
তারপর পরে বলছি, আগে প্যাকেটটা নিয়ে এসো দেখি।
বাইরের ময়লা প্লাস্টিক ফেলে দিয়ে ভেতরের কাগজগুলো বার করল গোপাল। অর্ণব পুরো ঝাঁপিয়ে পড়ল দেখার জন্য। প্রহ্লাদ সেবকের ছবিটা দেখেই প্রথম ধাক্কা। ইয়েস! আমার মন ঠিক এটাই বলছিল। দেখো গোপাল, ছবি দেখে চিনতে পারছ এটা কে?
ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি একটা কাগজে সাঁটা। ছবিটা অনেকটা বিবর্ণ হলেও দেখে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না এটা একজন সাহেবের মুখ।
মুখটা কেমন চেনা-চেনা লাগছে স্যার। বলতে বলতে ছবির সঙ্গের জীবনপঞ্জির দিকে তাকাতেই গোপাল চমকে উঠল। এ কী স্যার! এ তো ব্লেক! মানে যে এয়ারড্রপে ধরা পড়েছে!
হ্যাঁ। এ-ইই।
অর্ণব মন দিয়ে দেখতে থাকল। লন্ডনের নাগরিক ব্লেক কবে ইন্ডিয়ায় এল, এখানে কাজ সেরে আবার কবে লন্ডন ফিরে গেল। তারপর আবার কবে এল। তারপর আশ্রমে কবে যোগ দিল এবং আবার কবে ফিরে গেল সব তারিখ লেখা রয়েছে। শেষবার তার লন্ডন ফিরে যাওয়ার তারিখ লেখা রয়েছে। তার পাসপোর্ট নাম্বার, পুরো নাম, লন্ডনের ঠিকানা ইত্যাদি যাবতীয় তথ্য লিখে রাখা রয়েছে। ব্লেকের ইতিহাস দেখেই অর্ণবের কাছে ক্লিয়ার হয়ে গেল ব্লেক, জগবন্ধু আশ্রম এবং অস্ত্রবর্ষণ এই তিনটি বিষয় পরস্পরযুক্ত। একটি কাগজে খুব সংক্ষেপে লেখা রয়েছে ব্লেকের জীবনেতিহাস। অর্থাৎ জন্ম, শিক্ষা, কর্মজীবন ইত্যাদি।
কিন্তু সরোজিনী সেবিকার ছবি দেখে অর্ণব বা গোপাল কোনোভাবেই মহিলাকে চিনতে পারল না। চেনার কথাও নয়, এই আশ্রমে যে কয়জন সেবিকা রয়েছেন তাঁরা মূল আশ্রমের দিকে আসেন না, থাকেন না, তাঁদের বিভাগটি সম্পূর্ণ আলাদা। সরোজিনীর ডিটেলে দেওয়া রয়েছে এর আসল নাম সরোজিনী সাহু। জন্ম ওড়িশার বালাসোরে। শিক্ষাগত যোগ্যতা ক্লাস ইলেভেন। তেত্রিশ বছর বয়সে জীবিকার সন্ধানে ওড়িশা থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছিলেন। তারপর প্রভু জগবন্ধুর আশ্রমে যোগ দেন। যোগ দেওয়ার তারিখটা লেখা রয়েছে ২৪/৩/১৯৭৮। সরোজিনীর কোনো সরকারি পরিচয়পত্র নেই। অর্ণব গোপালের দিকে তাকিয়ে বলল, এবার? এঁর তো আর কিছুই নেই দেখছি। ট্রেস করব কীভাবে? কোথায় লুকিয়ে রয়েছেন কে জানে।
স্যার, জগবন্ধু এই সরোজিনীকে নিজের আশ্রমের কোনো ব্রাঞ্চে রেখে দেবেন বলে মনে হয়?
না, মনে হয় না। আবার রাখতেও পারেন। ওঁর তো দেশ-বিদেশে আশ্রমের ব্রাঞ্চ কিছু কম নেই।
তবে বিদেশে পাঠানো একটু কঠিন রয়েছে স্যার। কোনো সরকারি পরিচয়পত্র নেই। পাসপোর্ট হবে কীভাবে?
হুঁ, চেষ্টা করলে হয়তো পেরে যাবেন। তবে তুমি ঠিকই বলেছ, ভুয়ো পাসপোর্ট বানাতে গেলে একটু ঝক্কি তো নিতেই হত, আর আমাদের দেশটা এত বড়ো এখানে লুকিয়ে থাকা খুব কঠিন ব্যাপার নয়।
তাহলে?
খুঁজে বার করতে হবে গোপাল। যেভাবেই হোক খুঁজে বার করতে হবে। আপাতত তুমি এই সব ক-টা পেপার ফোটোকপি করিয়ে অরিজিনালগুলো নিত্যানন্দকে পাঠানোর ব্যবস্থা করো।
হ্যাঁ স্যার, করে ফেলছি। বলে পেপারগুলো গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল গোপাল।
অর্ণব ভাবতে বসল। কীভাবে এই সরোজিনীর সন্ধান পাওয়া যায়? বুরুলিয়ার আশ্রমে সরোজিনী নেই। থাকলে রেজিস্টারে নাম থাকত। তাও কনফার্মড হওয়ার জন্য নিত্যানন্দকে একবার বলতে হবে, পরে সরোজিনী আর রেজিস্টারে সই করেছেন কি না। তবে সম্ভাবনা কম। এই মুহূর্তে সরোজিনীকে কীভাবে খুঁজবে মাথায় আসছে না, তবে ব্লেক যে পুরোপুরি আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত সেই প্রমাণ ওর হাতে। একবার এই খবর যদি ছড়িয়ে দেওয়া যায, আশ্রমের অবস্থা ঢিলে হয়ে যাবে এবং আশ্রমের সঙ্গে যে সরকারো যুক্ত রয়েছে তার সম্ভাবনাও আরও জোরালো হয়ে যাবে। এবং সকলেই জানে স্বদেশ পার্টির সঙ্গে আশ্রমের সম্পর্ক ভালো। এই ডকুমেন্ট সোশ্যালিস্ট পার্টির হাতে এলে ওরা জাস্ট লুফে নেবে। কিন্তু অর্ণব এটা রাজ্য সরকারের হাতে কিছুতেই দেবে না। বরং... মাথায় একটা বুদ্ধি ঝিলিক দিয়ে উঠল অর্ণবের। ও ফোন করল স্বদেশ পার্টির এক পরিচিত নেতাকে। দুই-চার কথার পরেই বলল, আগামী পরশু দিন ও কলকাতায় যাচ্ছে একদিনের জন্য। একবার শংকর রায়ের সঙ্গে দেখা করতে চায়। অত্যন্ত জরুরি দরকার। একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করে দিতে। সেই নেতা অর্ণবকে ভালোমতোই চেনেন। খুব বিশেষ দরকার না থাকলে অর্ণব দেখা করার লোক নয়, তাই বললেন, চলে আসুন, দাদা এই সপ্তাহে কলকাতাতেই আছেন। আমি মিটিং-এর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
একটানা দেড়ঘণ্টা ধরে অর্ণবকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর ওকে ছাড়লেন রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্তারা। অর্ণব আন্দাজই করেছিল, ওকে কেন ডাকা হচ্ছে। আসলে জগবন্ধু সেবাশ্রমে অর্ণবের নিয়মিত যাতায়াত ভালো চোখে দেখছে না সরকার। আশ্রমের সঙ্গে অর্ণবের কীসের যোগাযোগ, কেন ও প্রতিদিন যায় ইত্যাদি নিয়েই প্রশ্নোত্তরের আসর বসেছিল। অর্ণব খুব ঠান্ডা মাথায় সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিল। শেষে গোয়েন্দা কর্তারা অর্ণবকে নির্দেশ দিলেন, আপাতত ধ্যান ইত্যাদি করার জন্য আশ্রমে অর্ণবের যাওয়ার প্রয়োজন নেই। জগবন্ধু বা ওই সেবাশ্রমের সঙ্গে কোনোরকম সংস্রব রাখা তাঁরা পছন্দ করছেন না। পরবর্তী নির্দেশ না-আসা পর্যন্ত অর্ণব যেন আশ্রমের সঙ্গে কোনোপ্রকার যোগাযোগ না রাখে।
অর্ণব সেই নির্দেশ মানবে কথা দিয়ে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তর থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিল। এখন বেলা তিনটে বাজে। আপাতত বাড়ি ফেরা যাক। আজ সন্ধে সাতটার সময় শংকর রায় অর্ণবকে তাঁর বাড়িতে দেখা করার টাইম দিয়েছেন।
বলুন কী ব্যাপার? দুই কথার পরেই সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এলেন শংকর রায়। এখন ওঁর বিজি শিডিউল। সামনে ভোট। মিটিং, মিছিলে তিনি বেজায় ব্যস্ত। যদিও শংকর রায়ের জেতার কোনো চান্স নেই, সেটা তিনি আর ওঁর পার্টি খুব ভালো করেই জানেন। এককালে শংকর রায়ের রাজত্বে এই রাজ্যের মানুষ অনেক অশান্তি সয়েছে। খুন, অত্যাচার, তোলাবাজি, ধর্ষণ রোজের ব্যাপার ছিল। মানুষ শংকর রায়ের সরকারের ওপর তিতিবিরক্ত হয়ে সোশ্যালিস্ট পার্টিকে সরকারে নিয়ে এসেছিল। তারপর বিধানসভা নির্বাচনের একটিতেও স্বদেশ পার্টি কিছুতেই আর সুবিধা করতে পারেনি। কেন্দ্রের ফান্ডিং থাকা সত্ত্বেও সম্ভব হয়নি। বাংলার জনগণ প্রতিবার সোশ্যালিস্ট পার্টিকেই ভোট দিয়েছে। তবে শেষ দুটো বিধানসভা নির্বাচনে সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, আশাভরসা অনেকটাই উবে গেছে। লঙ্কায় যে যায় সে-ই হয় রাবণ। সোশ্যালিস্ট পার্টিও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু জনগণের কাছে আর কোনো অপশন নেই। তাদের কাছে স্বদেশ পার্টির তুলনায় সোশ্যালিস্ট পার্টি অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর। তাই বাধ্য হয়ে সোশ্যালিস্ট পার্টিকে ভোট দিয়ে চলেছে।
অর্ণব বলল, স্যার, আমি আপনার কাছে বেশি সময় নেব না। আমি শুধু একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।
কী প্রস্তাব?
অর্ণব কোনো ভণিতা না করে বলল, প্রস্তাবটা বুরুলিয়া অস্ত্রবর্ষণ বিষয়ক। এবং খুবই গোপনীয়। শুধুমাত্র আপনাকেই বলতে চাই।
শংকর রায় ইশারায় তাঁর সেক্রেটারিকে ঘরের বাইরে যেতে বললেন।
অর্ণব বলল, আমার হাতে এমন কিছু ডকুমেন্টস রয়েছে যার থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এই ব্লেক আসলে প্রভু জগবন্ধুর একজন খাস লোক। জগবন্ধুর নির্দেশেই ব্লেক এই বিশাল অপারেশনটি চালিয়েছেন।
যদি তা হয়, তাতে আমার কী সুবিধা?
অর্ণব বলল, শুধু তা-ই নয়, এই ব্লেক হল সেই ব্যক্তি যে সুজন সেতু হত্যাকাণ্ডের সময় প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়েছিল। মানে একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। ভবিষ্যতে কখনো যদি আপনারা আবার সুজন সেতু ফাইল ওপেন করেন তাহলে এই ব্লেক কিন্তু একজন শক্তিশালী সাক্ষী হতে পারে।
এবারে শংকর রায় সোজা হয়ে বসলেন। অর্ণবকে জিজ্ঞাসা করলেন, এসব ডকুমেন্ট আপনার কাছে রয়েছে?
হ্যাঁ স্যার। রয়েছে। এই ফাইলে সব ফোটোকপি রয়েছে। আপনি দেখে নিতে পারেন। বলে হাতের ফাইলটা অর্ণব এগিয়ে দিল শংকর রায়ের দিকে।
শংকর ফাইল খুলে কাগজগুলো দেখতে থাকলেন আর অর্ণব প্রতিটা কাগজের গুরুত্ব সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিতে থাকল।
শংকর রায় উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন, বুঝতে পারল অর্ণব।
কিন্তু আপনি নিজে তো একজন সরকারের পুলিশ। আমার কাছে এইসব ডকুমেন্টস দেওয়ার কারণ?
দুটো কারণে আপনার কাছে আসা। প্রথমত, আপনি যদি আমার রেকর্ড হিস্ট্রি দেখেন তাহলে বুঝতে পারবেন আমি বরাবর সরকারের গলার কাঁটা। নিজের কাজটা সৎভাবে করতে চেয়েছি বলে সরকারের নির্দেশে ডিপার্টমেন্ট বরাবর পানিশমেন্ট দিয়ে এসেছে। আমি বুরুলিয়ার চৌহাটিতে পোস্টেড। এই এত বড়ো আর্মসড্রপের কেসটা আমি আর আমার দুজন কলিগ মিলে অনেক ঝুঁকি নিয়ে লিড করলাম অথচ আমাদেরই সরিয়ে দেওয়া হল।
শংকর রায় প্রশ্ন করলেন, আপনি কী চাইছেন?
আমি চাইছি, আমাকে এখান থেকে সরিয়ে ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্টে সরিয়ে দেওয়া হোক। আমি এখানে কাজ করতে চাই না।
হুম। বলে কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন শংকর রায়। ফাইলের পৃষ্ঠাগুলো আবারও ভালো করে দেখলেন, তারপর অর্ণবকে জিজ্ঞাসা করলেন, এর অরিজিনালগুলো কোথায়?
স্যার, অরিজিনাল তো নিজের কাছে রাখা সম্ভব নয়, সেগুলো আবার যথাস্থানে চলে গেছে। তবে কোনটা কোথায় রয়েছে সেটা আমি আপনাকে বলে দিতে পারব।
আর এগুলো এখন কি আমি...
হ্যাঁ, এগুলো আপাতত আমার কাছে থাকুক। আমার নাম্বার আপনার কাছে দিয়ে যাচ্ছি। আপনি ফোন করলেই আমি ডকুমেন্টসহ হাজির হয়ে যাব।
হুঁ। বলে ফাইলটা অর্ণবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এগুলো অথেনটিক তো?
স্যার, আমি নিজে সার্ভিসে রয়েছি অনেক বছর হয়ে গেল। অথেনটিক না হলে নিজে আসতাম না।
হুঁ। ঠিক আছে, এগুলো যত্নে নিজের কাছে রাখুন। আমি ফোন করব।
আচ্ছা স্যার। আমার ব্যাপারটা দেখবেন।
হুম।
নমস্কার জানিয়ে অর্ণব বেরিয়ে এল। শংকর রায় যে পেপারস দেখে সাংঘাতিক উত্তেজিত তা ওঁর চোখ-মুখের মধ্যেই ফুটে উঠেছিল। এবার খেলা জমবে।
অর্ণব বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শংকর রায় ফোন করলেন সেন্ট্রাল হোম মিনিস্টার নিশীথ চতুর্বেদীকে। বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন। নিশীথ চতুর্বেদী বললেন, যেভাবেই হোক ওই ডকুমেন্টস তাঁর চাই। বাকি ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তবে এখন কিছু নয়। সব হবে ভোটের পর।
ঠিক দুই দিন পরের কথা। সন্ধেবেলায় অর্ণব, গোপাল, নন্দ আর কৃষ্ণলাল মিলে মুড়ি-চানাচুর এবং চা খাচ্ছে। কথায় কথায় নন্দ বলল, আর রাতের বেলায় চৌহাটিতে চক্কর কাটতে পারছি না স্যার। বড্ড ঠান্ডা। এবারে আমাকে এই ডিউটিটা থেকে বাদ দিন।
অর্ণব হেসে বলল, আচ্ছা বেশ। আর ডিউটি করতে হবে না। অর্ণবের মন এখন ফুরফুরে। শংকর রায় ওকে পরদিন সকালেই ডেকে পাঠিয়েছিলেন এবং ফাইলটি হস্তগত করে কথা দিয়েছেন, ভোটের পরেই অর্ণবের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এই পুরো বিষয়টা একমাত্র সুদীপ আর অপর্ণা জানে।
একমুঠো মুড়ি মুখে দিয়ে অর্ণব কৃষ্ণলালকে জিজ্ঞাসা করল, কেষ্টদা, আজ রাতের মেনু কী?
কৃষ্ণলাল বলল, আজ স্যার আপনার প্রিয় বড়ি দিয়ে বেগুনের ঝাল আর রুটি।
ভাই কেষ্টদা, বিশ্বাস করো, এখানে আসা ইস্তক তোমাদের বড়িমার বড়ি খেতে খেতে পেটে চড়া পড়ে গেল। গোটা চৌহাটির লোক কি বড়ি ছাড়া আর কিছু খায় না!
তবে স্যার, বড়িমা কানে বদ্ধকালা হলেও দিব্যি রেডিয়ো শোনেন। বুড়ির এলেম রয়েছে। হে হে করে হাসতে হাসতে বলল নন্দ।
কথাটা শুনে অর্ণব থমকে গেল। নন্দর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কী বললে? বড়িমা রেডিয়ো শোনে?
হ্যাঁ, আমি দু-দিন ওঁর ঘর থেকে রেডিয়োর শব্দ পেয়েছি। আবার একা একা বকবকও করেন, যেন টেলিফোনে কথা বলছেন। মাথায় পুরো ছিট রয়েছে বুড়ির, হা হা হা হা।
নন্দর হাসি শেষ হল না, তার আগেই ও থতমত খেয়ে দেখল, অর্ণব ওর দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে রয়েছে।
কী হয়েছে স্যার?
এই কথাগুলো আমাকে আগে কেন বলোনি?
মানে... স্যার, পাগলি বুড়ি... এটা কী বলব?
আমি তোমাকে বলেছিলাম তো সন্দেহজনক কিছু দেখলেই সেটা আমাকে জানাতে। এটা কেন আমাকে আগে বলোনি?
স্যার... ইয়ে, এটা কি সন্দেহজনক কিছু?
ডিসগাস্টিং! তুমি পুলিশ না অন্য কিছু? মাথায় কি ঘিলু বলে কিসসু নেই! বলে কৃষ্ণলালের দিকে তাকিয়ে অর্ণব বলল, তোমার সাইকেলটা নেব। তোমায় রাতে গোপাল বাড়ি পৌঁছে দেবে। বলেই ঝড়ের বেগে থানা থেকে বেরিয়ে এল অর্ণব। ওর মন বলছে, পেয়ে গেছে। ও পেয়ে গেছে। শুধু একটা আন্দাজে ঢিল ছুড়তে হবে।
সাঁইসাঁই সাইকেল চালিয়ে অর্ণব পৌঁছোল বড়িমার ঘরের সামনে। দরজা-জানলা সবই বন্ধ। দরজায় টোকা দিল অর্ণব। বেশ কয়েকবার জোরে টোকা দেওয়ার পরে ভেতর থেকে ভাঙা গলায় 'কে' শব্দ শোনা গেল।
দরজাটা খুলুন, একটু দরকার। গলা চড়িয়ে বলল অর্ণব। মিনিটকয়েক পর খুটুস করে দরজা খুললেন বড়িমা। ঝুঁকে-থাকা কোমর সামান্য সোজা করে মুখ আর হাতে ধরা লন্ঠন সামান্য উঁচিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন, কে এসেছে?
অর্ণবকে দেখে চিনতে পারলেন না, বললেন, কে এসেছ? অন্ধকারে ঠাওর করতে পারি না।
অর্ণব মৃদু হেসে বলল, বড়িমা, থুড়ি, সরোজিনী সাহু, আমি অর্ণব বারুই, চৌহাটি থানার বড়োবাবু। আপনি ভালো আছেন তো?
বড়িমা কিছুই বুঝতে পারলেন না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন অর্ণবের দিকে।
অর্ণব আবারও বলল, আপনাকে এত রাতে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইছি সরোজিনী ম্যাডাম। আমি শুধু জিজ্ঞাসা করতে এসেছি, আপনার ফোন আর ওয়্যারলেস রেডিয়োর ব্যাটারি এবং সিগনালে কোনো সমস্যা নেই তো?
বড়িমা তখনও কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে তাকিয়ে রইলেন অর্ণবের দিকে।
অর্ণব হেসে বলল, চিন্তা করবেন না, আপনাকে অ্যারেস্ট করতে আমি আসিনি। সেই ক্ষমতাও আমার নেই। আপনার প্রকৃত পরিচয়ের সঙ্গে একবার আলাপ করতে এলাম। বড়িটা আপনি সত্যিই ভালো বানান। তার থেকেও ভালো বানান প্ল্যান। ঠিক কি না বলুন? আপনি আপাতত সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। আশা করি, আমার কথা শুনতে আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। যা-ই হোক, এইটুকুই বলি, আমি যেটা জেনেছি সেটা একান্তই আমার জানা। আর কেউ জানবে না। ভালো থাকবেন। ওহ আরও একটা কথা... অস্ত্রের যে বাক্সটা মিসিং সেটা বোধহয় আপনার এখানেই কোথাও লুকোনো রয়েছে তা-ই না?
অর্ণবের কথাগুলো শুনে গেলেন বড়িমা। তারপর মুচকি হেসে টানটান সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। চোখ থেকে মোটা ফ্রেমের চশমাটা খুললেন, এবং হেসে বললেন, না, আমার স্যাটেলাইট ফোন বা রেডিয়োর ব্যাটারিতে কোনো সমস্যা নেই। সব ঠিকঠাক রয়েছে। আর কিছু?
নাহ এইটুকুই। ধন্যবাদ, চলি তাহলে?
দাঁড়ান, বড়িমার ঘর থেকে কেউ খালি মুখে ফিরে যায় না। একটু জল-বাতাসা খেয়ে যান।
জল-বাতাসা খেতেই পারি, কিন্তু তাহলে আমারও একটা অনুরোধ আপনাকে রাখতে হবে।
সরোজিনী মৃদু হেসে বললেন, আপনার যদি হাতে সময় থাকে তাহলে বসুন।
দুটো বাতাসা দিয়ে এক গ্লাস জল খাওয়ার পরে সরোজিনী সাহুর কাছে বাকি কাহিনিটা শুনল অর্ণব।
সুজন সেতু থেকে সরোজিনী আর ব্লেক প্রাণ হাতে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে ফেরার পর সোজা গিয়েছিলেন আশ্রমে। প্রভু জগবন্ধু বললেন, এখানে দুজনের থাকা নিরাপদ নয়। দুজনকে অন্যত্র রাখতে হবে। প্রায় পনেরো দিন ব্লেক আর সরোজিনী গ্রামেরই দুটি বাড়িতে আলাদাভাবে থাকলেন। তারপর যখন বোঝা গেল, সোশালিস্ট পার্টির গুন্ডারা আপাতত আর আশ্রমের দিকে ওঁদের দুজনের খোঁজে হানা দেবে না তখন জগবন্ধু ওঁদের দুজনকে নিয়ে নতুন প্ল্যান করলেন। রাজ্য সরকারের এই নৃশংস অত্যাচারের বদলা নিতেই হবে এই সংকল্প নিয়ে ঘুঁটি সাজাতে শুরু করলেন। চোখের বদলা চোখ এই নীতিতেই পরিকল্পনা শুরু হল। সশস্ত্র বিদ্রোহ করে সোশালিস্ট পার্টিকে রাজ্য থেকে নির্মূল করতে হবে। প্রতিটা নেতা এবং মন্ত্রীর রক্ত ঝরাতে হবে, যেভাবে তারা নিরস্ত্র আশ্রমিকদের জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে সেইরকমই যন্ত্রণা দিয়ে এদেরও মারতে হবে। মস্ত বড়ো প্ল্যান তৈরি করলেন। প্রয়োজন ছিল বিপুল অর্থের এবং প্রশাসনের সাহায্যের। সেইজন্য তিনি সাহায্যপ্রার্থী হয়ে হাত বাড়ালেন স্বদেশ পার্টির দিকে। ধীরে ধীরে জগবন্ধু কেন্দ্রের আস্থাভাজন হলেন। তারা জগবন্ধুকে সাহায্য করবে, চুক্তি হল। তারপর জগবন্ধু ব্লেককে দায়িত্ব দিলেন দেশে ফিরে গিয়ে অস্ত্র কেনার এবং তা আশ্রমে পৌঁছোনোর। সরোজিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হল পুরো অপারেশনটায় লিয়াসোঁর কাজ করার। সরোজিনী একদিকে সরকারপক্ষ, আরেকদিকে ব্লেকের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্ল্যানকে এগোবেন, প্রয়োজনমতো নির্দেশ, আপডেট দেবেন। ব্লেক শুধুমাত্র রিপোর্ট করবেন সরোজিনীকে। আবার অন্যদিকে সরকারপক্ষও কথা বলবে একমাত্র সরোজিনীর সঙ্গে। এই যোগাযোগের জন্য সরোজিনীর জন্য স্যাটেলাইট ফোন এবং রেডিয়োর ব্যবস্থা করে দিল কেন্দ্র সরকার। তবে ব্লেক এবং সরোজিনীর আসল পরিচয় জগবন্ধু কোনোভাবেই স্বদেশ পার্টির কাছে প্রকাশ করলেন না। এই দুজন যে আশ্রমেরই দুই সেবক এবং ওই গণহত্যার দিন প্রাণ হাতে নিয়ে পালাতে পেরে আবার জগবন্ধুর কাছে ফিরে এসেছেন সেটা তিনি গোটা পৃথিবীর কাছে গোপন রাখলেন। কিন্তু রেজিস্টারে যে দুজনের নাম এবং সই থেকে গেল সেই সামান্য ব্যাপারটা আর তাঁর খেয়াল রইল না। তিনি চেয়েছিলেন, পৃথিবীর চোখে ব্লেক এবং সরোজিনী পুরোপুরি মুছে যাক এবং কেউ যেন জানতে না পারে এত বড়ো আর্মসড্রপের প্রধান দুই কান্ডারি আসলে এই আশ্রমেরই দুই সেবক-সেবিকা। এতে একদিকে যেমন কাজের সুবিধা হবে তেমনই ঝুঁকির সম্ভাবনাও কম থাকবে। কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে যেটা প্ল্যানিং হয়েছিল— রাজ্যে গোলাগুলি, খুন-জখম ইত্যাদি চালিয়ে পুরো নৈরাজ্য সৃষ্টি করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে জনগণের আস্থাকে একেবারে তলানিতে নিয়ে এসে এই সরকারের পতন ঘটানো। আর একবার গদিচ্যুত হয়ে গেলে তারপর একটা একটা করে টিপে মারতে কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু জগবন্ধু জানতেন, রাজনীতিতে চিরশত্রু বা চিরকালের বন্ধু বলে কিছু হয় না। পুরোটাই স্বার্থের ব্যাপার। তাই নিজে যেমন সরাসরি এই অপারেশনে ইনভলভ হননি তেমনই নিজের দুই সৈনিকও যে আশ্রমের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত নয় তা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। কারণ স্বদেশ পার্টি তার শত্রু সোশ্যালিস্ট পার্টিকে উচ্ছেদ করার জন্য আজ জগবন্ধুর সঙ্গে হাত মেলালেও কোনদিন তাঁর শত্রু হয়ে ফাঁসিয়ে দেবে কোনো ঠিক নেই। সেইজন্য অস্ত্রবর্ষণের কেসে সেবাশ্রমের সরাসরি যোগাযোগের কোনো প্রমাণ তিনি রাখতে চাননি। ব্লেককে তাঁর দেশে ফেরত পাঠিয়ে সরোজিনীকে নতুন রূপে নিয়ে এলেন চৌহাটিতে। বড়িমা রূপে আগমন ঘটল তাঁর। গ্রামের মানুষ খুব বেশি প্রশ্ন করে না। বড়িমা কে, কোথা থেকে এল সেসব খুব তলিয়ে না দেখে তাঁকে আপন করে নিল। আশ্রম থেকে কিছুটা দূরে কুঁড়েঘরে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে সরোজিনীর লড়াই চলল। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত বৃদ্ধার ভূমিকায় অভিনয় করে থাকা যে কী কঠিন তা যে করে সেই-ই টের পায়। এক-একসময় অসহনীয় লাগত, কিন্তু তারপরেই মনে পড়ত তাঁর সতীর্থদের সেই অসহায় আর্তনাদ, জীবন্ত পুড়ে মরা। ভেতরে দপ করে আগুন জ্বলে উঠত আবার। গভীর রাতে ফোনে একদিকে ব্লেক, অন্যদিকে কেন্দ্রের মন্ত্রীদের সঙ্গে কথা, এবং কখনো রেডিয়োতে জগবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা-পরামর্শ এই চলত। ক্ষুরধার বুদ্ধি এবং অসম্ভব মনের জোর সরোজিনীর। জগবন্ধু মানুষ চিনতে ভুল করেননি। তিনি জানতেন, সরোজিনী পারবে। এত বড়ো একটা অপারেশনের কোঅর্ডিনেটরের দায়িত্ব নিখুঁতভাবে সামলেছিলেন সরোজিনী। ওঁর কোড নেম ছিল 'এস'। এই নামেই ব্লেক ডাকতেন, আবার কেন্দ্র সরকারের মন্ত্রী-আমলা যাঁরা এই প্ল্যানিং-এ যুক্ত ছিলেন তাঁরাও ডাকতেন। অস্ত্র হাতে চলে আসার পর বাছাই করা প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকরা অপারেশনে নেমে পড়বে এমনই পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না।
সবটা শোনার পর অর্ণব যখন ওঁকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি যে এত কথা আমাকে বললেন, কীসের ভরসায়?
সরোজিনী উত্তরে শুধু একটা কথা বললেন, আগুনের ভরসায়।
মানে?
যে ঘৃণার আগুন আমার চোখে জ্বলছে, সেই আগুন আপনার চোখেও রয়েছে।
কিন্তু আমার জন্য আপনাদের সব যে ভেস্তে গেল। এবার কী হবে?
আবার শুরু করব। প্রভুর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছি।
আমার ওপরেও নিশ্চয়ই আপনারা ভীষণ রেগে রয়েছেন।
না, আপনি আপনার কর্তব্য করেছেন। প্রভুও আপনার প্রতি ক্ষুব্ধ নন। এখানেই তিনি অনন্য। তাঁর আশীর্বাদে আবার আমরা প্রস্তুত হব।
অর্ণব টের পেল, সরোজিনী নিভে যাননি। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, চলি, গুড নাইট। আশা করছি, আমাদের আর দেখা হবে না। আমি সম্ভবত বদলি হয়ে অন্য রাজ্যে চলে যাব। আপনার বানানো বড়ি মিস করব।
পৃথিবী খুব ছোটো জায়গা মিস্টার বারুই। বড়ি মিস না-ও তো করতে পারেন।
সাল ১৯৯৭। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের বিকেল
নয়া দিল্লির সর্দার পটেল মার্গের অফিস বিল্ডিং-এর ফোর্থ ফ্লোরের লবিতে দাঁড়িয়ে সিগারেটে সুখটান দিচ্ছিল অর্ণব। এখন লাঞ্চ আওয়ার। কিছুক্ষণ আগে অপর্ণার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বলল, ওর কাছে আজ একটা পার্সেল এসেছে। প্রেরকের নাম নেই। প্যাকেটের ভেতর দুটো বড়ির প্যাকেট। একটায় ছোটো ভাজা বড়ি, আরেকটায় বড়ো বড়ি। আর কিছু নেই। গত দেড় বছরে এই নিয়ে কম করে ছয়-সাতটা বড়ির প্যাকেট এসেছে অর্ণবের ফ্ল্যাটের ঠিকানায়। অপর্ণা এবং অর্ণব অবাক হয় না। ওরা জানে, এই বড়ির প্যাকেট দিল্লিতে ওদের বাড়ির ঠিকানায় পাঠানোর একজনই রয়েছেন। সরোজিনী সাহু ওরফে বড়িমা।
বড়ি নিয়ে দুই কথা বলার পর অর্ণবকে অপর্ণা নির্দেশ দিল, অফিস থেকে ফেরার সময় বিট্টুর জন্য অতি অবশ্যই দুই কৌটো সেরেল্যাক নিয়ে আসতে হবে। আরও টুকটাক কয়েকটা জিনিস। তারপর বিট্টুকে নিয়ে দুজনে আরও দু-চার কথা বলার পর অর্ণব ফোন রেখে নিজের চেয়ার ছেড়ে বাইরে এল সিগারেট খেতে। অপর্ণা আর অর্ণবের সাত মাসের ছেলে বিট্টু। ভালোনাম অরিত্র। গত এক বছর ধরে অর্ণব সপরিবার দিল্লির বাসিন্দা। কথা রেখেছিলেন শংকর রায়। ফাইলের পেপারগুলো নিয়ে বলেছিলেন, ভোট মিটে যাওয়ার পর আপনার ট্রান্সফার এবং সেটলমেন্ট পাকা। নিশ্চিন্ত থাকুন। খোদ হোম মিনিস্টার কথা দিয়েছেন।
রাজনীতিকদের কথায় ভরসা করা যায় না, তবু ভরসা করতেই হয়েছিল। নিশীথজি জগবন্ধুর বিরুদ্ধে এত বড়ো একটা প্রমাণ হাতছাড়া করতে চাননি। জগবন্ধুকে ভবিষ্যতে প্রয়োজনে চাপে ফেলার জন্য এই পেপারগুলো কাছে রেখে দেওয়া খুব দরকারী। তার বিনিময়ে একটা টাকাও খরচ করতে হয়নি তাঁকে। শুধু ভোটের পর অর্ণব বারুইকে ডেপুটেশনে দিল্লির ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে নিয়ে চলে এসেছেন। আপাতত তিন বছর। তারপর এখানেই ওকে বরাবরের জন্য নিয়ে নেওয়া হবে এমনই কথা রয়েছে। এই অফিসে অর্ণবকে এবং ওর কাজকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে অর্ণব সুখী।
সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে অর্ণব ভাবছিল, কত কিছু ঘটে গেল এই বছর দেড়েকের মধ্যে। ব্লেক অ্যারেস্ট হওয়ার কয়েক মাস পরেই ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে এলেন। তার কয়েক মাস পর রাশিয়ার কয়েকজন প্রতিনিধি। এবং তারপরেই প্রথমে পাইলটসহ লাটভিয়ান চারজন ত্রুু মেম্বার বেকসুর ছাড়া পেয়ে গেলেন এবং এগারো মাসের মাথায় ভারতের রাষ্ট্রপতি ব্লেককে ক্ষমা করে দেওয়ায় ব্লেকও ফিরে গেল নিজের দেশে। রাজনীতি এমনই জিনিস, এখানে সব সম্ভব। বিধানসভার ভোটে এবারেও স্বদেশ পার্টি পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। প্রভু জগবন্ধু এত কম ভোট পেয়েছেন যে তিনি উপলব্ধি করেছেন, ধর্মগুরু হওয়ার জনপ্রিয়তার সঙ্গে রাজনীতিকদের জনপ্রিয়তার কোনো মিল নেই। এখানে মানুষ জগবন্ধুকে ভক্তি করে তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়লেও ভোট কিন্তু দেবে সেই সোশালিস্ট পার্টির কোনো নেতাকেই। ফলে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সরাসরি রাজনীতিতে আর নয়। তা ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে যে জমিটা তিনি দাবি করেছিলেন সেটা এখনও ঝুলে রয়েছে। একবার কড়াভাবে সেই কথা বলতে গিয়ে তিনি চতুর্বেদীর কাছে ব্লেক সম্পর্কে যে তথ্য শুনেছেন তাতে বুঝে গেছেন, স্বদেশ পার্টি ব্লেক ও জগবন্ধুর সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে, তাই মাথা গরম করে লাভ নেই। ওতে আশ্রমের ক্ষতি হয়ে যাবে। সমঝোতা করেই এগোতে হবে। ব্লেককে বেকসুর ছেড়ে দেওয়ার আড়ালে যে অন্য গল্প রয়েছে তা কিছু খবরের কাগজ বলতে চাইলেও বিশেষ কোনো লাভ হয়নি। দেশের মানুষ খুব পুরোনো ঘটনা বেশি দিন মনে রাখতে পারে না। রাখলেও সেই ঘটনার আঁচ তাদের কাছে কমে যায়। জনগণ এমন বলেই সরকার চলে।
সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ওটা ডাস্টবিনে ফেলে নিজের চেয়ারে গিয়ে যখন বসল অর্ণব তখন পশ্চিমবঙ্গের বুরুলিয়া গ্রামের এক অখ্যাত গ্রাম চৌহাটির এক কুঁড়েঘরের সামনের উঠোনে উবু হয়ে বসে বড়ি তুলছিলেন গ্রামের বড়িমা ওরফে সরোজিনী সাহু। তাঁর ঘরের মেঝের তলায় লুকিয়ে-রাখা মস্ত একটি বাক্সের ভেতর অজস্ত্র অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র অপেক্ষা করছিল পরবর্তী নির্দেশের। আকাশের দিকে একবার তাকালেন সরোজিনী, তারপর আবার মাথা নিচু করে শুকোতে দেওয়া বড়ি তুলতে থাকলেন। পৃথিবীতে বসন্তের শেষ বিকেলে আগুনে রঙের কোনো অভাব ছিল না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন