আদরের রঙ

মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য

ট্রেক করতে করতে বেশ খানিকটা উঠে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে মুকুট। এখন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে নীচের দিকে। অনেকটা উঁচুতে উঠে এসেছে বলে মারদি আর সেতি-র গর্জন এখন আর কানে আসছে না। বহু নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নেপালের দুই খরস্রোতা নদী। তাদের আঁচল ছুঁয়ে আছে ঘন বনানী, পায়ে হাঁটা খয়েরি পথ, সবুজ খেতও আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। মাথা ওপরে তুললে চোখে পড়ছে দূরে নীল পাহাড়ের মাথায় তুষারের প্রলেপ। চড়াই পথে অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছে বলে হাঁফ ধরছে। এর আগে চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা আছে মুকুটের। তবে সে ছিল নিছকই শৌখিন আরোহণ। চড়াই পথে কিছুটা উঠে গাছের ছায়া খুঁজে নিয়ে আয়েশ করে বসা, কোল্ড ড্রিংকের ক্যানে চুমুক দিতে দিতে সঙ্গীদের সঙ্গে খোসগপ্পো করা, প্রিয় বইয়ের পাতা আলগোছে ওল্টানো, খানিক জিরিয়ে নিয়ে আবার নতুন উদ্যমে পথ চলতে শুরু করা—এভাবেই এতদিন ট্রেক করেছে সে। তবে এবারের ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা।

নেপালের সবই যেন বিশাল বিশাল। মস্ত মস্ত উঁচু তুষারশৃঙ্গ যেমন আছে তেমন আছে বিপুলাকার চারটি নদী। মহাকালী, কর্ণালী, গণ্ডক ও কোশী। তিব্বতের মালভূমি থেকে নেপালের বুক চিরে নেমে এসেছে ভারতের সমভূমিতে। নামই শুনেছে এতদিন, মারদি আর সেতি নদীকে মুকুট চোখে দেখল এবার। নদীদুটোর কোল ছুঁয়ে বিছিয়ে আছে শান্তস্নিগ্ধ এক উপত্যকা। পাখির চোখে অনেকটা ওপর থেকে দেখলে মনে হবে ঘন নিরবচ্ছিন্ন সবুজ। শুধুই জঙ্গুলে জায়গা। পথঘাট বলে কিছু নেই। কিন্তু ওপর থেকে ঠাহর হয় না, গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে উঠে গেছে একটা পাথুরে এবড়ো খেবড়ো পায়ে হাঁটা পথ। সেই খাড়া চড়াই বেয়ে এখন উঠছে তিনজন তরুণী। মুকুট, চিত্রাঙ্গদা আর ওদের হাঙ্গেরিয়ান বন্ধু রেকা। সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে পোর্টার কাম গাইড ভীমবাহাদুর।

রেকার বাড়ি হাঙ্গেরির ব্যালাটন হ্রদের ধারে তিহানি শহরে। কাঠমান্ডু থেকে পোখরা আসার পথে মুকুট আর চিত্রাঙ্গদার সহযাত্রী ছিল রেকা। সেখানেই আলাপ। ভাঙাচোরা ইংরেজিতে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে রেকা। মুকুট আর চিত্রাঙ্গদা সমবয়সি। বেঙ্গালুরুতে এমবিএ করছে দুজনে। সেখানেই এক বাড়িতে পেয়িংগেস্ট থাকে দুই বন্ধু।

মুকুটের বাবা স্বস্তিশোভন মুখার্জি চা বাগানের সিনিয়র ম্যানেজার। ম্যাকমিলান গ্রুপের অনেক চা বাগান আছে। ভদ্রলোক সেই গ্রুপের শিলচরের এক চা বাগানে ছিলেন এর আগে। কয়েক বছর আগে বদলি হয়ে এসেছেন ডুয়ার্সের মেঘদুয়ার টি এস্টেটে।

চিত্রাঙ্গদার বাবা পেশায় ব্যবসায়ী। বিজনেস টাইকুন না হলেও মাঝারি মাপের একজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট বলা যায় তাঁকে। কাজকারবার নিয়েই ভদ্রলোক সারাদিন ব্যস্ত। তবে বাবার ব্যবসা নিয়ে চিত্রাঙ্গদার আগ্রহ নেই। তার নেশা ট্রেকিং। মানালির ভদ্রকালী পদাতিক ক্লাবের সঙ্গে সে ছোটবেলা থেকে যুক্ত। স্কুলে পড়ার বয়স থেকে ট্রেকিং করে আসছে চিত্রাঙ্গদা। নিশির ডাকের মতো কোনও না কোনও পাহাড় অহর্নিশ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। সেই অমোঘ টানে সে ছুটে ছুটে যায় এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে।

চিত্রাঙ্গদার কাছে ট্রেকিংয়ের কতরকমের যে গল্প জেনেছে মুকুট তার ইয়ত্তা নেই। গালে হাত দিয়ে চোখে মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে শুনেছে পাহাড় চড়ার রোমাঞ্চের কথা। মুকুটের খুব শখ ছিল জীবনে একবার অন্তত ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করা। এর আগে দুটো আলাদা পাহাড়ি পথে ট্রেক করেছিল মুকুট আর চিত্রাঙ্গদা। একবার টংলুর ওদিকে, আর একবার সান্দাকফুর রুটে। সেই ভ্রমণ তার অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকটা। এবার সে-তুলনায় অনেকটা দুর্গম পথে ট্রেকিং করতে এসেছে দুই বন্ধু। ট্রেকিংয়ের উদ্দেশেই তাদের নেপালে আসা।

কাঠমান্ডু থেকে পোখরা তারা এসেছিল বাসে চেপে। পাশাপাশি বসেছিল মুকুট আর চিত্রাঙ্গদা। পাশের সিটে ছিল রেকা। রেকার দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ চেহারা। ঘোড়ার ল্যাজের মতো করে বাঁধা সোনালি চুল, পরনে জিন্স আর প্যারাশুট কাপড়ের জ্যাকেট। একটা ইংরেজি পেপারব্যাকে মুখ গুঁজে রেখেছিল সে। মলাট দেখে মনে হল ট্রেকিং সংক্রান্ত কোনও নন-ফিকশন হবে হয়তো। পড়তে পড়তে পকেট থেকে ক্যান্ডি বের করে মুখে দিচ্ছিল মাঝেমধ্যে।

চিত্রাঙ্গদা আর মুকুট নিজেদের মধ্যে ট্রেকিং সংক্রান্ত কথা চালাচালি করছিল। চিত্রাঙ্গদা বাংলা তেমন জানে না। তাই কথা হচ্ছিল হিন্দি আর ইংরেজিতে। সেই কথার কিছুটা রেকা বুঝতে পারছিল, বাকিটা নিজের মতো করে মানে করে নিচ্ছিল। ট্রেকিং শব্দটাও কানে গিয়ে থাকবে। মাঝেমধ্যেই চোখ তুলে দেখছিল মুকুট আর চিত্রাঙ্গদাকে। তিনটি মেয়ে, সকলেই প্রায় সমবয়সি। আলাপ জমতে দেরি হল না। রেকা ক্যান্ডি এগিয়ে দিল ওদের দিকে। মুকুট আর চিত্রাঙ্গদা থ্যাংকস দিল। স্মিতমুখে রেকা বলল, ওয়েলকাম।

চিত্রাঙ্গদা রেকার দিকে পটেটো চিপসের প্যাকেট বাড়িয়ে দিল। এক কথা থেকে দু’কথা। দিব্যি জমে গেল তিনজনের। ক’দিন আগেই নেপালে এসেছে রেকা। ভগবান বুদ্ধের জন্মভূমি নেপাল। আর সে বুদ্ধদেবের ভক্ত। নেপালে আসার এটাই প্রধান কারণ। ছোটবেলায় মা মারা গেছে। বাবা আর বিয়ে-থা করেনি। বাবার একাধিক রিসর্ট আছে। হাঙ্গেরির তিহানি শহরটা ছোট্ট। ব্যালাটন লেকের ধারে আট বর্গ কিমি অঞ্চল জুড়ে রয়েছে শুধু হোটেল, হলিডে হোম আর রিসর্ট। সারা দুনিয়া থেকে টুরিস্ট বেড়াতে আসে তিহানিতে। রেকা পড়াশোনা চালিয়ে যাবার পাশাপাশি অনলাইন ট্র্যান্সলেটরের কাজ করে। তবুও মেয়ের পকেটমানির অনেকটাই এখনও আসে বড়লোক বাবার কাছ থেকে।

রেকা জানাল, তার ছোটবেলা থেকেই নেশা ছিল পাহাড় ঘোরা। হাঙ্গেরিতে অনেক পাহাড় আছে। যারা ট্রেকার্স তারা তো বটেই, মাউন্টেনিয়ারিংয়ে আগ্রহীদের কাছেও তার আকর্ষণ অমোঘ। এর আগে বেশ কিছু পাহাড়ে চড়েছে রেকা। দেশের বাইরেও গেছে। নেপালে এই প্রথম এল রেকা। সে পোড়খাওয়া ট্রেকার। তার সঙ্গে জিপিএস আছে। ম্যাপও আছে। রেকার প্ল্যান ছিল নেপালের বিভিন্ন রাস্তায় হাঁটবে। কোনও এজেন্সির সঙ্গে হন্টন তার না-পসন্দ। তার ইচ্ছে ছিল একজন গাইড কাম পোর্টার নিয়ে সে একাই ট্রেক করবে। জীবনটাকে চেখে দেখার এমন আশ্চর্য আনন্দ আর হয় না।

মাউন্টেনিয়ারিং যাদের ধ্যানজ্ঞান, যারা ট্রেকার্স কিংবা রক ক্লাইম্বার্স তাদের একের সঙ্গে অন্যের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। মালিনী ছেত্রী নামে এক নেপালি বন্ধুর সঙ্গে সোশাল মিডিয়ায় বন্ধুত্ব হয় রেকার। পোখরায় থাকে মালিনী। কখনও দেখা না হওয়া সেই নেপালি মেয়েটি খুব উপকার করেছে। মালিনীকে আগে থেকে বলে একজন পোর্টারের ব্যবস্থা করে তবেই নেপালে এসেছে রেকা। ভীমবাহাদুর নামের ছেলেটির বয়স উনিশ কুড়ি হবে। মালিনীর মুখে শুনেছে সে খুবই কর্মঠ আর বিশ্বস্ত। পোখরায় পৌঁছে তার সঙ্গে দেখা করবে রেকা এমনই ঠিক হয়ে আছে।

রেকার কথা শুনে মুকুট আর চিত্রাঙ্গদা নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করে নিয়েছিল একবার। তার কারণ চিত্রাঙ্গদা মুকুটকে বিস্তারিত জানিয়েছিল তাদের প্ল্যান করে রাখা রুটের কথা। জানিয়েছিল তারা ট্রেক করবে অন্নপূর্ণা আর মচ্ছপুছারের ছায়াঢাকা অঞ্চল দিয়ে। মারদি নদীর পাশে পারৎসে গ্রাম। যার উচ্চতা ছ’হাজার ফিট। সেখান থেকে বাঁ দিকে সেতি নদীর ধার ধরে অন্য রুটে চামলুং হয়ে ঘাচোকের পথ দিয়ে আবার পোখরায় ফিরে আসবে তারা।

রেকার মতোই চিত্রাঙ্গদারও শখ পাহাড়ে গিয়ে পাড়া বেড়ানো। এদিকে মুকুটও পাহাড় ভালোবাসে। ক’দিনের অবকাশ পেয়ে তারা ট্রেক করতে এসেছে এই পথে। কিছুদিন শহুরে হট্টগোল থেকে দূরে কাটাবে আর বিজনে শুধুই নিজের সঙ্গ উপভোগ করবে বলে। রেকার ব্যাপারটা আলাদা। রীতিমতো ছক কষে এসেছে সে। তার গন্তব্য নির্দিষ্ট করাই আছে। যে পথে রেকা ট্রেক করবে সেই রুট চিত্রাঙ্গদার প্ল্যান করা রুটের কাছাকাছি। তবে এই রাস্তা বেশ দুর্গম। তাই বাসে চেপে আসার সময় রেকা ওদের অনুরোধ করেছিল যাতে এই পথে ওরা ওকে সঙ্গ দেয়। তাহলে বেশ মজা করতে করতে যাওয়া যাবে। সময়ও কাটবে ভালো।

সেতি নদীর পশ্চিমদিকে মারদি নদীর উৎস হল মারদি হিমাল-এর বেস ক্যাম্প। ট্রেকারদের মুখে এই মূল শিবির বা বেস ক্যাম্প কথাটা অনেকবার শুনেছে মুকুট। পর্বত আরোহীরা এই কথাটা বলে থাকেন হামেশাই। মুকুট এই সেদিনও ভাবত, পাহাড়ের কোনও সুবিধাজনক জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে রাখা থাকে আগে থেকে। পরে জেনেছে ব্যাপারটা আদৌ তা নয়। সত্যি সত্যিই কোনও ক্যাম্প আগে থেকে পেতে রাখা থাকে না।

সবুজ উপত্যকার মধ্যে গড়ে ওঠা পোখরা শহরটি খুব সুন্দর। জিওলজিস্টরা বলেন, এককালে এখানকার সমস্ত এলাকা জুড়ে বিরাট এক হ্রদ ছিল। এখনকার হ্রদগুলি তারই অবশিষ্টাংশ। পোখরাতেই একটা হোটেলে উঠেছিল মুকুটরা। সেখানেই প্ল্যান ভাঁজছিল, কী করে একসঙ্গে হাঁটা যায়। পুরোটা না হলেও ক্ষতি নেই অন্তত কিছুদূর অবধি যদি যাওয়া যায়। মালিনীর কাছ থেকে ফোন নম্বর পাওয়া গিয়েছিল আগেই, পোখরায় এসে ফোন করা হল ভীমবাহাদুরকে। কথা হল। দেখা গেল সে ওস্তাদ ছেলে। মাছ যেমন জলে সাবলীল, ভীম তেমনি স্বচ্ছন্দ পাহাড়ি সমস্যাসঙ্কুল পথঘাটে। সতেরো বছর বয়স থেকেই পোর্টার কাম গাইডের কাজ করছে সে। ঠিক হল ট্রেক করা পথে ভীমবাহাদুর তাদের সঙ্গ দেবে।

মুকুট যেটুকু পাহাড় চষেছে তার সবই শখের ট্রেকিং। কিন্তু সেই স্বল্প অভিজ্ঞতা দিয়েই সে বোঝে, ট্রেক করার রোমাঞ্চের কোনও তুলনা হয় না। কুয়াশাভেজা জঙ্গলের অলৌকিক ঘ্রাণ বুকে নিয়ে, পথের ধারে ফুটে থাকা নাম না জানা জংলি ফুলের শোভা দেখে, পাহাড়ি পথে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের সঙ্গে খেজুরে গপ্পো জুড়ে দিয়ে পথ চলার এক অদ্ভুত আনন্দ আছে। সেটা যে জানে, সে জানে। মুকুটের বন্ধুরা বলে, সে একেবারে অন্য ধাঁচের মেয়ে। তার মাথায় পোকা আছে। সে যেমন করে পৃথিবীটাকে দেখে তেমন করে আর কেউ দেখে না। এই যেমন পাহাড়ি খাড়া পথে ট্রেক করতে করতে মুকুটের মাথায় বিচিত্র সব প্রশ্ন এসে ঘাই মারছে। একটু আগেও চিত্রাঙ্গদাকে বলছিল, আমার একটা সিরিয়াস প্রশ্ন আছে। এই যে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে গোবেচারার মতো হিমকুয়াশায় ভিজছে গাছগুলো, ওদের ইনফ্লুয়েঞ্জা হয় না?

রেকা পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে বলছিল, গাছের ফ্লু? আর ইউ ক্রেজি!

মুকুট কপট রাগ দেখিয়ে বলছিল, ক্রেজি কেন? গাছ বলে কি ওরা মানুষ নয়? যখন বৃষ্টি হয় অঝোর ধারায়, গোটা পাহাড়ের সব গাছ ভিজতে থাকে অকাতরে, তখন গাঁওবুড়োর মতো কোনও বয়স্ক দাদুগাছ কি সদ্য জন্মানো চারাগাছগুলোকে বকাঝকা করে না? তাদের কি চোখ রাঙিয়ে বলে না, অনেক হয়েছে বাপু আর ভিজো না, এরপর জ্বরজারি হলে তোমার মাকেই তো রাত জাগতে হবে, ডাক্তারের কাছে ছুটতে হবে, কেমিস্টের ডিসপেনসারি থেকে কিনে আনতে হবে ওষুধ।

চিত্রাঙ্গদা হেসে কুটিপাটি হতে হতে বলল, তুই কবিতার বই পড়িস বলে তোর মাথায় এসব কিম্ভুত ভাবনা কিলবিল করে!

মুকুট মুখের একটা ভঙ্গি করে চিত্রাঙ্গদার দিকে তাকিয়ে। মুচকি হেসে রেকা বলল, আমার বয়ফ্রেন্ডের নাম অ্যাটিলা। সে ন্যাশনাল টিমে ফুটবল খেলে। যেমন শক্তপোক্ত চেহারা, তেমনি মারকুটে স্বভাবের। সে একেবারে উল্টো ক্যারেকটার। আমি ওকে বলব তোমার কথা। অ্যাটিলা শুনে তাজ্জব হয়ে যাবে। কোমল অনুভূতি তার নেই। কবিতার মর্ম সে বোঝে না। অ্যাটিলা তোমার গল্প শুনে চোখ কপালে তুলে বলবে পোয়েম তো স্কুলে পড়ায়, এমনি এমনি কেউ পোয়েম পড়ে নাকি!

মুকুট একা একাই হাসে। কবিতা ভালোবাসে বলেই তো তার চোখে পৃথিবীটা অন্যরকম হয়ে ধরা দেয়। এই যে এখন পাখির ছানাগুলো রাইম মুখস্থ করছে, কুয়াশামাখা গাছ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে, আর সব মিলিয়ে কী আশ্চর্য একটা বুনো গন্ধ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চরাচর জুড়ে এই সবকিছু মুকুট যেভাবে দেখে বাকিরা সেভাবে অনুভব করে না। তার মনটাই যে অন্যরকম। সে কীভাবে বাকিদের বোঝাবে তার নিজস্ব অনুভূতির কথা। তার মনের তল পায় না কেউ। এমনকী, তার বাবা-মাও না। এই একটু আগেই যেমন মুকুটের বাই উঠেছিল পাখির ডাক মোবাইলে ধরে রাখবে। পাখিদের কিচিরমিচির বাড়ি ফিরে গিয়ে শুনবে প্রাণ ভরে। ভারি উৎসাহ নিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করেছিল মুকুট। পাখিগুলোও বড্ড দুষ্টু। যেই সে তাদের ডাক রেকর্ড করতে যায় অমনি তারা চুপ মেরে যায়। সব যেন শোকসভায় নীরবতা পালন করছে। মুকুট হতাশ হয়ে যেই রেকর্ডার বন্ধ করে দেয় ওমনি তারা কিচিরমিচির শুরু করে।

শুধু কি পাখির ডাক? জঙ্গলে সমবেত ভাবে গান গাইছে অচেনা সব পোকামাকড়। কান পেতে থাকলে শোনা যায় গাছের পাতায় হিম পড়ার অতি সূক্ষ্ম শব্দও। কিন্তু সে সব শুনতে গেলে আর এগোনো হয় না। ছদ্মরাগ দেখিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে চিত্রাঙ্গদা আর রেকা। মুকুট কাঁধ নাচায় কাঁচুমাচু মুখে। তারা দুজন আর গম্ভীর থাকতে পারে না, হেসে ফেলে। কুয়াশা আর মেঘে ঘেরা চড়াই বেয়ে এগোতে এগোতে দাঁড়িয়ে পড়ে মুকুট। আঙুল উঁচিয়ে বলে, ওই বাঁশগাছগুলো কীরকম জিরো ফিগার মেন্টেন করছে দ্যাখ। আচ্ছা ওদের বাবা-মাও কি মানুষের মতো বকুনি দেয় ছানা গাছেদের? ফিগার ঠিক রাখার জন্য কম খেয়ে খেয়ে অ্যানোরেক্সিয়া হয়ে পড়বে বলে ভয় দেখায়?

চিত্রাঙ্গদা বলে, উফ তোর মাথাতে আসেও এসব! তুই যেন একটা কী!

মুকুটের আগে চোখ হাসে, পরে তা চুঁইয়ে নামে তার ঠোঁটে। তারপর সেই হাসির হিল্লোল পাক খেতে থাকে সারা শরীরে। মুকুট কোমরে দু-হাত দিয়ে এক পাক নেচে নিয়ে বলে, আমি কী? আমি কী? আমি কী? আমি রূপালি মানবী।

তাকে নাচতে দেখে চিত্রাঙ্গদা খিলখিল হাসে। রেকা হাল ছাড়ার ভঙ্গি করে বলে, শি ইজ বেয়ন্ড কন্ট্রোল! আর সেই সুযোগে মুকুট পুটুস করে তার মোবাইল দিয়ে একটা গ্রুফি তুলে নেয়। এই স্মৃতিগুলো যে বড্ড দামি! কিছুদিন পর তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তিনজন ছিটকে চলে যাবে তিন জায়গায়। কিন্তু এই দিনগুলোর কথা থেকে যাবে মনের গভীরে।

পোখরা বাজার থেকে মাল্টিপার্পাস স্কুল আর হাসপাতাল ছাড়িয়ে সেতি নদীর তীর ধরে পথ। প্রথম মাইল ছয়েক কোনও চড়াই নেই। সেতির ধারে ধারে মাইলখানেক গিয়ে নদী পার হতে হল। ব্রিজ আধভাঙা। ভাঙা অংশটুকু পার হবার জন্য শেষপ্রান্তে ছয় ইঞ্চি চওড়া একটা বাঁশকে গাঁটের ওপরের অংশ কেটে কেটে মইয়ের ধাপ তৈরি করা হয়েছে। সেখান থেকে মাইল তিনেক এগিয়ে হুনজা গ্রাম। এ নাকি তিব্বতি বাস্তুহারাদের গ্রাম। আসলে হুনজা কোনও একটি গ্রাম নয়, বিশাল এলাকা জুড়ে পর পর তিনটি গ্রাম, তিনটির নামই হুনজা। শস্যখেতের সমাহার চারধারে। এক ছোট্ট কুঁড়েঘরে চা খাইয়েছিলেন এক দরিদ্র গৃহকর্তা। বিত্ত নেই কিন্তু অন্তরে এই মানুষগুলো অনেক বড়।

এবার তাদের গন্তব্য ছিল ঘাচোক। পোখরা থেকে গাড়িতে ঘাচোক সোয়া ঘণ্টা লাগলেও ট্রেকিংয়ের হিসেব আলাদা। বাগলুং রাজমার্গ হয়ে ট্রেক করলে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা লাগত। কিন্তু কষ্ট হতো খাড়া পথে উঠতে। সেই দূরত্ব তিন দিন ধরে ট্রেক করে এসছে মুকুটরা। ফলে খুব একটা অসুবিধে হয়নি। নীচে তাকিয়ে চোখে পড়ছিল ছোট ছোট আল বাঁধানো সবুজ শস্যভরা খেত। বয়ে যাচ্ছে রুপোলি নদী, তার ধারে ধারে পুতুলের ঘরের মতো বাড়ি। ছোট ছোট গ্রামগুলি যেন পটে আঁকা ছবি। আসার পথে হাঁটতে হাঁটতে পথের ওপর একটা ঝোরা পেয়েছিল তারা। হাত দিয়েই সরিয়ে নিয়েছিল মুকুট। কনকনে ঠান্ডা জল তার। আধো অন্ধকারে কী রহস্যময় যে দেখাচ্ছিল ঝোরাটাকে!

রাতটুকু ঘাচোকেই কাটিয়েছিল মুকুটরা। একতলা একটা নড়বড়ে কাঠের বাড়ি। সেটাই হোটেল। লোমওয়ালা এক বিশাল আকৃতির চতুষ্পদ ভৌক ভৌক করে জানান দিচ্ছিল নিজের অস্তিত্ব। ভয়ে কাঁটা হয়ে ছিল চিত্রাঙ্গদা আর মুকুট। রেকা বেশ সাহসী। তার দু-দুটো পোষ্য আছে বাড়িতে। তারা তার দু-পাশে শোয় ঘুমোবার সময়। এহেন রেকা সাহস দেখিয়ে কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে যেতেই সে আরও খেঁকিয়ে উঠল। দু-পা পিছিয়ে এল রেকা। ফোকলা দাঁতের বৃদ্ধা মালকিন বললেন, ও হল ভাইলা, আমার চৌকিদার। তুমলোগ ডরো মাত, আমি হুকুম না করলে ও কামড়াবে না।

ভীমবাহাদুর জিগ্যেস করল খাবারের কথা। বৃদ্ধা চেনেন তাকে। সাফ সাফ বলে দিলেন, তুমি তো বাপু আগেও এসেছ হে আমার এখানে। তোমার তো ভালোই জানা আছে যে, এখানে দুপুরে আর রাতেই শুধু খাবার জুটবে। মাছ মাংস পাবে না, ডিমভাতের ব্যবস্থা হবে। তবে হ্যাঁ, চা বেশ কয়েক রাউন্ড পাওয়া যাবে। তার জন্য আলাদা পয়সা দিতে হবে না।

ভীমবাহাদুরের কাছ থেকে জানা গেল হাঁড়ির খবর। এই কুঁজো হয়ে যাওয়া বৃদ্ধা মালকিনকে সকলে বলে দাদি। তাঁকে একা রেখে তাঁর কর্তাটি বসে আছেন শিলিগুড়িতে, তাঁর ছেলে, ছেলের বউ আর নাতিনাতনির সংসারে। এই দাদিই আপনজনের মতো রাতে ভাত, আলুভাজা আর ডিমের ঝোল রান্না করে খাওয়ালেন। এই পথে ট্রেক করতে গিয়ে তাঁর এই ভাঙাচোরা হোটেলে যে কত ট্রেকার্স খেয়ে গেছে সে কথাই বলছিলেন ফোকলা দাঁতে। খাবার পর কথা হচ্ছিল নিজেদের মধ্যে। মুকুট বাকিদের বলছিল হাসিমুখে, আমার আত্মীয়স্বজন থেকে চেনা পরিচিতরা অবাক হয়েছেন আমার সাহস দেখে। দুটো মেয়ে নেপালের পাহাড়ে ট্রেক করতে যাচ্ছি শুনে তারা বলাবলি করছিল, এত কষ্ট করে পায়ে হেঁটে খামোখা পাহাড়ে চড়ার দরকার কী বাপু!

রেকা বলছিল ম্যালোরির কথা। ব্রিটিশ পর্বতারোহী জর্জ লে ম্যালোরি এভারেস্টের লক্ষ্যে তাঁর তৃতীয় অভিযানে বেরোবার সময় নিউইয়র্ক টাইমসের এক সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, কেন আপনি বার বার এভারেস্ট অভিযানে যান? তার উত্তরে তিনি যা বলেছিলেন সেই কথাটা ইতিহাস হয়ে গেছে। সেটা হল, বিকজ ইট ইজ দেয়ার। ম্যালোরির সেই উত্তরে মিশে গিয়েছিল খানিকটা বিরক্তিও। গভীর স্বরে রেকা বলেছিল, এভারেস্টের দুর্নিবার মোহ ম্যালোরিকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে, অভিযানের মূল শিবির থেকে তিনি তাঁর এক বন্ধুকে লিখেছিলেন, আই ক্যান্ট টেল ইউ হাও ইট পজেস মি--আই কান্ট সি মাইসেলফ কামিং ডাউন ডিফিটেড। এভারেস্টের বুকে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়ার আগে তাঁর এক বন্ধুকে লেখা চিঠিতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, হোয়াট হ্যাভ ইউ কাম টু কনকার? ওনলি আওয়ারসেলভস!

চিত্রাঙ্গদা বলছিল, আমি কেন ট্রেক করি সেটা বলতে পারি। শুধুই কি কৌতূহল বা রোমান্টিকতা? নিজের অহংবোধকে তৃপ্ত করা? সেসব নয়। আসলে পাহাড়ের নির্জন বিস্তার আমার কাছে এক দুর্লঙ্ঘ চ্যালেঞ্জ। প্রকৃতির বিরুদ্ধে ততটা নয়, যতটা নিজের শারীরিক আর মানসিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে। আমি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসি।

পাহাড়ি কুয়াশা ভিজিয়ে দিচ্ছিল তাদের শরীর। টর্চ জ্বালিয়ে ছেলেমানুষি করে দূরের পাহাড়ে আলো ফেলছিল মুকুট। সে দাঁড়িয়েছিল একটা খাদের ধারে। অনেক নীচে দেখা যাচ্ছিল গভীর কালো উপত্যকা। দূরে কোথাও একটা দুটো গ্রামের আভাস। চাঁদের রুপোরঙা আলোয় দেখা যাচ্ছিল উপত্যকা পেরিয়ে সারি সারি পাহাড়ের সমান্তরাল ঢেউ। অসংখ্য তারা মিটমিট করে দেখছিল তাদের। মুকুটের ভারি ভালো লাগছিল এই অপার্থিব পরিবেশটাকে। মনে হচ্ছিল বাড়ির আরাম স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে দুর্লঙ্ঘ পাহাড়ের টানে এতটা পথ হেঁটে আসা তারা কেউই সাধারণ মেয়ে নয়, সকলেই এক একজন রূপালি মানবী।

হিরের কুচির মতো তারাগুলো ঝকমক করছিল রাতের আকাশে। গলে পড়ছিল কাঁচা সোনার মতো জ্যোৎস্না। মুকুট অপলক চোখে তাকিয়ে ছিল আকাশের দিকে। মনে হচ্ছিল হাত বাড়ালেই তারাগুলোকে ছোঁয়া যাবে। সে আর পাঁচজনের মতো নয়। সুন্দরের সামনে এসে দাঁড়ালে কেন যে তার মন মেঘলা হয়ে যায় কে জানে! বিষণ্ণতার অমোঘ ব্যাধি তাকে গ্রাস করে নেয়, ধূসর রংয়ে ছুপিয়ে দেয় তাকে। আবার কী আশ্চর্য, প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গের সমবেত সৌন্দর্য একটু বাদে তার মনের সমস্ত জ্বালাযন্ত্রণা আর ক্ষত সারিয়ে দেয়। তখন এমনি এমনিই মন ভালো হয়ে যায়। বিষণ্ণতা তাকে ছুঁতে পারে না। মনখারাপের মেঘেরা তার থেকে সরে সরে থাকে সে সময়। জাগতিক কোনও না পাওয়া কিংবা ইঁদুরদৌড়ের জুজু তাকে আর ভয় দেখাতে পারে না।

মুকুট অনুভব করে, সকলের চোখের অন্তরালে দুর্গম পাহাড়ের মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে একরকম থ্রিল আছে। একজন ট্রেকার পাহাড়ে চড়তে গিয়ে শুধু পাহাড় নয়, নিজেরও মুখোমুখি দাঁড়ায়। পাহাড় ট্রেকারদের হাতে ধরে শেখায় কাকে বলে টিম স্পিরিট। সহ-অভিযাত্রীদের সান্নিধ্য ও সাহায্য একজন ট্রেকারের মানসিকতাকে গড়ে তোলে নতুন করে। এই শিক্ষা ছড়িয়ে যায় রক্তের গভীরে। এভাবেই গড়ে ওঠে জীবনবোধ। তৈরি হয় এক স্বতন্ত্র জীবনবেদও। এই সব কিছুই এক জীবনে একজন আরোহীর পরম প্রাপ্তি।

রাতে শুতে না শুতেই ক্লান্ত শরীরে ঘুম নেমে এসেছিল সকলের। মুকুটের ঘুম আসছিল না। সে এপাশ ওপাশ করছিল। মনে হচ্ছিল ঠান্ডা লেগে জ্বর এসেছে। হালকা টেম্পারেচার গায়ে। সঙ্গে থার্মোমিটার আছে, তবুও ব্যাগ খুলে সেটা বের করার উৎসাহ ছিল না। শুধু জ্বর নয়, অন্য কিছু অসুবিধেও হচ্ছিল। কিন্তু সেটা যে ঠিক কী তা বুঝতে পারছিল না মুকুট। শরীরের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা একটা অস্বস্তি তাকে শান্ত হয়ে ঘুমোতে দিচ্ছিল না কিছুতেই। একসময় তন্দ্রা এল। মুকুট স্বপ্ন দেখল ছেঁড়া ছেঁড়া। সে শুয়ে আছে হাসপাতালের বেডে। তার মাথার দু’দিকে বাবা আর মা। চটকাটা ভেঙে যাবার পর মনটা খারাপ হল। মায়ের কথা মনে পড়ছিল বারবার।

সকালে ঘুম থেকে উঠে মুকুটের মনে হল জ্বরভাবটা নেই। তবে সামান্য গা গোলাচ্ছে। তৈরি হয়ে দাদির বানানো রুটি আর সবজি পেটে দিয়ে পথে নেমেছিল তিনজন। দেখা হল এক পুরোহিত ব্রাহ্মণের সঙ্গে। তাঁর ব্যাগ থেকে উঁকি মারছিল রামচরিত মানস। তিনি মুখ তুলে তাদের জরিপ করে বলেছিলেন, ছিমছিমলে খরকা যানা হ্যায়? আপলোগ ইস রাস্তেসে যাইয়ে।

সেই মানুষটির দেখানো পথ দিয়ে ঘণ্টাখানেক চড়াই ওঠার পর এক জায়গায় এসে দাঁড়াল সকলে। রেকার সামনে খোলা ম্যাপ। ম্যাপে সেতি নদীর ধার বরাবর আঙুল বোলাল রেকা। সেখানে হাঁটাপথ দেখানো আছে। সেতি নদীর উজান পথ ধরে যাবে বলে ভাবছিল চিত্রাঙ্গদা। রেকা বলেছিল ওই পথ ধরেই এগোবে। ঘাচোকের দিকে আর ফিরে আসবে না। রুট বদলে চামলুং থেকে পশ্চিমদিকে মারদি খোলার দিকে যাবে তারা। মারদি খোলার ধারে মারদি হিমাল যাবার পথে পড়বে ওদানে হিল। তার ওপর আছে ছিমছিমলে খরকা। চামলুং থেকে সেখানে যাওয়ার কোনও পথরেখা নেই। তবে কনট্যুর দাগানো আছে। পাহাড়ে যাঁরা চড়েন তাঁরা জানেন কনট্যুরের দাগ দেখে উচ্চতা কোথায় কতটা আর কেমন করে বদলে যাচ্ছে সেটা ধারণা করা যায়।

আগেই তিনজন স্থির করে নিয়েছিল যে, ছিমছিমলে খরকায় পৌঁছে রেকা আরও ওপরদিকে মারদি হিমাল বেস ক্যাম্পের দিকে যাবে। তাকে সঙ্গ দেবে ভীমবাহাদুর। মুকুট আর চিত্রাঙ্গদা নেমে আসবে পরিচিত পথে মারদি পুল হয়ে পিচের সড়কে। তারপর কোনও একটা গাড়ি ভাড়া করে পোখরা। সকালবেলা সামান্য খাবার খেয়ে বেরিয়েছিল সকলে। এতটা পথ হেঁটে এসে এখন আর শরীর দিচ্ছে না। খিদেও পেয়েছে জোর। রেকা আর চিত্রাঙ্গদাকে দেখে পথশ্রমে যে তারা খুব কাহিল এমন মনে হচ্ছে না। কিন্তু মুকুটের একটু বেশিই ক্লান্ত লাগছে। হাঁফ ধরছে বড্ড। সারা শরীর জুড়ে একটা গা গোলানো গোলানো ভাব। বমি পাচ্ছে থেকে থেকে। সঙ্গে অনডেম ছিল। সেই ওষুধ খেয়ে গা গোলানো ভাবটা একটু কমেছে।

স্নানঘরে সেদিন একটু বেশিই সময় ধরে স্নান করেছিল মুকুট। হঠাৎ মনে হয়েছিল বাঁদিকের বুকে একটা ছোট্ট লাম্প হয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেই নিরীহ জায়গাটা খুঁটিয়ে দেখেছিল। ততটা গুরুত্ব দেয়নি। মাঝেমধ্যে স্তনবৃন্ত থেকে কষের মতো কিছু একটা বেরোচ্ছে। সেটা নিয়ে একটা অস্বস্তি ছিল তার। গত দু-তিন মাস ধরে পিরিয়ড নিয়েও একটু সমস্যা হচ্ছে। ভেবেছিল মায়ের সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে ফোনে কথা বলবে। কিন্তু তালেগোলে একদম ভুলে গেছে। এমন শারীরিক অসুবিধে তার আগে কখনও হয়নি। এবার বাড়ি ফিরলে ডাক্তার কনসাল্ট করতে হবে, মনে মনে ভাবছিল মুকুট। কেন যেন তার মন কু ডাকছিল। ছোটবেলা থেকে আর পাঁচজন শিশুর মতো তারও নানারকম অসুখ বিসুখ করেছে। আবার সেরেও গেছে ওষুধ খেয়ে। এখন অন্য প্রদেশে একা থেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। কিন্তু মনটা এমন খুঁতখুঁত করেনি কখনও। আশঙ্কা হচ্ছিল, তার খারাপ কিছু হয়নি তো!

রোদের তাপে মুখ লাল হয়ে গেছে সকলের। ঘামের স্রোত বইছে পিঠ দিয়ে। মুকুটের অবস্থা সব থেকে খারাপ। তার ভেতরের অস্বস্তিটা যে ঠিক কী রকম সেটা বুঝিয়ে বলতে পারবে না কাউকে। আর পারছে না সে। কতক্ষণে যে ছিমছিমলে খরকায় পৌঁছবে কে জানে। ভীমবাহাদুর জানিয়েছে সেখানে রয়েছে নিমা দাজুর ডেরা। সেখানে ডাল ভাত আর আলু-কোয়াশ বা বাঁধাকপি-আলুর সবজি কিছু না কিছু ঠিক জুটে যাবে। কপালে থাকলে পাওয়া যেতে পারে মুরগির মাংস, বা মুরগি অথবা হাঁসের ডিমের ওমলেট। নিমা ওয়াংদির আস্তানায় একটা রাত্তির কাটিয়ে পরদিন রেকা আর ভীমবাহাদুর উঠে যাবে ওপরের দিকে। মুকুট আর চিত্রাঙ্গদা অন্য রুট দিয়ে নেমে আসবে। এটাই আপাতত প্ল্যান।

সকলে অধৈর্য। হাঁটছে তো হাঁটছেই পথ আর ফুরোয় না। যত সময় গড়াচ্ছিল হাঁটতে তত কষ্ট হচ্ছিল মুকুটের। মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছিল যন্ত্রণায়। যত চড়াই ভাঙছিল তত যেন কষ্টবোধ গড়িয়ে গড়িয়ে নামছিল। মাথা থেকে কাঁধ। কাঁধ থেকে বুক। সেখান থেকে পিঠ হয়ে কোমর। অবশেষে দুই পা। শেষে এমন অবস্থায় এসে দাঁড়াল যে পা ফেলাই দুষ্কর। শরীর আর দিচ্ছিল না। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল মুকুট। আগে আগে চলছিল ভীমবাহাদুর। পেছন পেছন চিত্রাঙ্গদা আর রেকা। মুকুটকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে চিত্রাঙ্গদা মুখ ফিরিয়ে বলল, এনিথিং রং? কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?

উত্তর দেবে কী, চিত্রাঙ্গদার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল মুকুটের। পেটের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল আবার নতুন করে। পাকস্থলীর সমস্ত খাবার উগরে দিল মুকুট। চোখেমুখে জল দিয়ে একটা পাথরের চাটানে সে বসে পড়ল ধ্বস্ত অবস্থায়। তার দিকে উদ্বিগ্ন মুখে তাকিয়ে ছিল সকলে। মুখগুলো আবছা হয়ে আসছিল মুকুটের চোখে। প্রত্যেকের ঝুঁকে পড়া মুখগুলো দেখতে দেখতে সে বুঝতে পারছিল তার ব্ল্যাক আউট হতে চলেছে। কিছু বলতে চাইছিল, মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। বাতাসটাকে আঁকড়ে ধরতে গিয়েও ধরতে পারল না। হাঁটুদুটো ভেঙে ‘দ’ হয়ে পড়ে যাচ্ছে বুঝেও নিজেকে সামলাতে পারল না, জ্ঞান হারাল মুকুট।

রঞ্জন সকাল-সকাল নাকেমুখে গুঁজে বেরিয়ে যান হাসপাতালে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বাজে। পোশাক বদলে পাজামা পাঞ্জাবি পরে চলে আসেন ড্রয়িং রুমে। মৃদু আলো জ্বালান। মিউজিক সিস্টেমে নীচুগ্রামে বাজতে থাকে তাঁর প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত। কখনও শোনেন রাগাশ্রয়ী গান। আজ রঞ্জন শুনছিলেন ঝিঁঝিট রাগের ওপর খান আবদুল করিম সাহেবের একটি গান। পিয়া বিন চ্যায়েন নেহি আওয়াত। খানসাহেব গান গাইছিলেন আর সেই সুরের মূর্ছনা ভেসে যাচ্ছিল সমস্ত ঘরে। গান শুনতে শুনতে ফেলে আসা দিনগুলির মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিচ্ছিলেন রঞ্জন। এই অবগাহন তাঁকে ভরিয়ে দিচ্ছিল এক অকৃত্রিম বিষাদে। বহু বছর হয়ে গেল এক ধূপছায়া বিকেলে জাহ্নবী তাঁকে ফেলে চলে গেছেন জীবননদীর ওপারে। কে জানে, আজও হয়তো অপেক্ষা করে আছেন রঞ্জনের জন্য।

রঞ্জনের একটা সত্তা বলে মানুষের একটাই জীবন। পরজীবন বলে কিছু হয় না। হতে পারে না। তাঁর দ্বিতীয় সত্তা বলে, অনেক বড় বড় মানুষ জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস রাখতেন। সত্যিই যদি পাস্টলাইফ আর ফিউচার লাইফ বলে কিছু থেকে থাকে তবে তো ভালোই। জাহ্নবীর সঙ্গে যদি আবার কখনও দেখা হয়ে যায় তবে তার থেকে ভালো আর কী হতে পারে।

জাহ্নবী যখন চোখ বোজেন রঙ্গিত তখন একেবারে ছোট্ট। সে সময় কী অসহায় অবস্থায় যে পড়েছিলেন রঞ্জন তা আর বলার নয়। একদিকে পেশাগত কাজের চাপ অন্যদিকে একমাত্র সন্তান পালন করার দায়িত্ব। এই দুই চাপের মধ্যেও রঞ্জন দ্বিতীয়বার দ্বার পরিগ্রহ করার কথা ভাবেননি। নিজের ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও যেটুকু পেরেছেন স্নেহ আর সান্নিধ্য দিয়ে রঙ্গিতকে বড় করেছেন। ছেলে বাবার মতো ডাক্তারি পড়ার দিকে যায়নি। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ঢুকেছে একটা বেসরকারি সংস্থায়।

আবদুল করিম সাহেব দরদ দিয়ে গাইছেন--পিয়া বিন চ্যায়েন নেহি আওয়াত। রঞ্জন নিঝুম হয়ে বসে আছেন ড্রয়িংরুমে। শীতের দুপুরে রোদে দেওয়া লেপের মতো উল্টে পাল্টে দেখছেন জাহ্নবীর সঙ্গে কাটানো তাঁর যৌথজীবনের টুকরোগুলিকে। ফেলে আসা রৌদ্রছায়ার দিনগুলি ফিরে ফিরে আসছে মনের মধ্যে।

কাজের মেয়েটি রাতের খাবার তৈরি করে ডাকল। গানটা বাজতেই থাকল যন্ত্রে। পায়ে স্লিপার গলিয়ে ডাইনিং রুমে এলেন রঞ্জন। রঙ্গিত অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য। এটা এ বাড়ির বহুদিনের দস্তুর। রাতের আহার বাপ আর ব্যাটা একসঙ্গে সারেন। খাবার টেবিলে এসে বসলেন রঞ্জন। উল্টোদিকে আগেই এসে বসে আছে রঙ্গিত। রুটি ছিঁড়ে মাংসের ঝোল মাখাচ্ছিলেন রঞ্জন। রঙ্গিত খাচ্ছিল না, থম মেরে বসে ছিল। রঞ্জন মুখ তুলে বললেন, খাচ্ছিস না কেন রে, কী হল তোর?

রঙ্গিত বলল, একটু আপসেট হয়ে আছি বাবা। যেটা আশঙ্কা করছিলাম সেটাই হয়েছে শেষ অবধি। কোম্পানি অফিসের সাতজনকে ছাঁটাই করেছে। অরিন্দম, রাজদীপ্ত, বেদপ্রকাশ, স্বাগতা, মৌনী, প্রমথেশরা সকলেই মেইল পেয়েছে। আমাকেও ফায়ার করেছে কোম্পানি।

রঞ্জন ছেলেকে দেখলেন একটু। শান্ত গলায় বললেন, মেইল পাওয়ার পর তোদের এইচআর-এর কাছে যাসনি?

রঙ্গিত বলল, আমাদের এইচআর চিন্ময় সেনগুপ্ত। স্পাইনলেস ক্রিয়েচার সেই লোকটার কথা এর আগে বলেছি তো তোমাকে। অফিসের ন্যাকা ন্যাকা কয়েকটা মেয়ে চিন্ময়দাকে তেল দেয় যথেচ্ছ। তাদের কারওর কিন্তু চাকরি যায়নি। আমরা চিন্ময়দাকে গিয়ে ধরেছিলাম। কিন্তু লোকটা পরিষ্কার বলে দিয়েছে তার কিছু করার নেই। পরে যদি কখনও নরমালসি রিস্টোর করে, আর কোম্পানি নতুন করে লোক রিক্রুট করে তাহলে আমাদের কথাই কোম্পানি আগে ভাববে।

রঞ্জন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, দ্যাখ যেটা হয়েছে তাতে তোর কোনও হাত নেই। আর যেটা তোর হাতে নেই সেটা নিয়ে ব্রুড করে কোনও লাভও নেই। বাজারে হাজারটা কোম্পানি আছে। তোর পকেটে যখন একটা ডিগ্রি আছে, কিছু না কিছু একটা হয়ে যাবে ঠিকই। টেক ইট ফ্রম মি ডিয়ার, হ্যাভ পেশেন্স। একটু ধৈর্য ধর।

রঙ্গিত উঠে পড়ল। বেসিনে হাত ধুয়ে তোয়ালেতে মুছতে মুছতে মুখ ফিরিয়ে বলল, ধৈর্য কী করে ধরি বলো তো বাবা, আমার বন্ধুদের অনেকেই এখন অ্যাটলান্টিকের ওদিকে জমিয়ে বসেছে। কেউ কেউ বিয়ে করে সেটল অবধি হয়ে গেছে। আমিও তো ওদের মতোই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছি। অথচ আমার কপালটা দ্যাখো একবার।

গান ভেসে আসছে ভেতরের ঘর থেকে। কাজের মেয়েটিকে রঞ্জন ইশারায় বললেন সে যেন খেয়ে নেয় এবার। তাকালেন ছেলের দিকে। রঞ্জনের মুখে খেলছে আবছা হাসি। বললেন, এত সহজেই আপসেট হলে চলবে? আমি নিজের কথা তোকে বলি। তুই তখন ছোট। তোর মা চলে যাবার পর আমার ডিপ্রেসড লাগত। খাওয়া নেই ঘুম নেই কিচ্ছু নেই। বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছিল। সারা কলকাতা পাগলের মতো চরকি কাটতাম। একদিন পার্ক স্ট্রিট সিমেটারিতে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে ভেতরে কী যেন হয়ে গেল ওলটপালট। ফিলজফাইজ করলাম জীবনটাকে। আমি বলি কী এক কাজ কর, একদিন কোনও সিমেটারি থেকে ঘুরে আয়।

সিমেটারি? সেখানে গিয়ে কী করব আমি? রঙ্গিত বিস্মিত হয়ে বলল।

ওখানে গেলেই তুই বুঝতে পারবি জীবনের সারসত্য। রঞ্জন বললেন, দ্যাখ, মহাকালের পরিধি বিচার করলে এই পার্থিব জীবন আর কতটুকু। মানুষের গড় আয়ু যদি ধরিস, এই আশি নব্বই বা একশো বছর, মহাকালের বিচারে সেটা নস্যি। জীবন মানেই পালতোলা নৌকো নিয়ে মাঝদরিয়ায় পাড়ি দেওয়া। মাঝেমধ্যে ঝড় আসবে, উথাল-পাথাল ঢেউ উঠবে জলে। কিন্তু মাথা ঠান্ডা রেখে তার সঙ্গে যুঝতে হবে সামনাসামনি দাঁড়িয়ে। যে ক’টা দিন বাঁচবি, টেনশন অ্যাংজাইটি দূরে সরিয়ে রেখে বাঁচার মতো করে বাঁচ। ভালো কথা, প্যাংকুটুর সঙ্গে কি তোর কথা হয়েছে এর মধ্যে? ওকে তোর ব্যাপারটা বলে দ্যাখ একবার।

মাস দেড়েক আগে একদিন কথা হয়েছিল। প্যাংকুটুদা ব্যস্ত লোক, তাকে অকারণে বিরক্ত করতে ইচ্ছে করে না। তাছাড়া তুমি তো জানো আমাকে, কারও কাছে ফেবার চাইতে আমার সঙ্কোচ হয়। রঙ্গিত বলল নিস্তেজ গলায়।

রঞ্জন দেশলাই কাঠি নেভাবার মতো করে হাতটা নাড়িয়ে বললেন, ধুত অত সঙ্কোচের কিছু নেই। তুই জানিস না, আমার কাছে তো প্যাংকুটু মাঝেমধ্যে দুঃস্থ পেশেন্ট পাঠায়। আমি যেটুকু পারি হেল্প করি। এই তো ক’দিন আগেও কৌশিক নামে একজনকে পাঠিয়েছিল। ওর পুরনো পার্টির ক্যাডার ছেলেটা। এক ইউনিভার্সিটিতেই পড়ত, ওকে দেখেই দল করতে এসেছিল। প্যাংকুটু দল বদলেছে কিন্তু কৌশিক আদর্শগত কারণে রয়ে গেছে পুরনো দলে। চাকরি বাকরি পায়নি, প্রাইভেট টিউশন করে চলে। আমি যতদূর বুঝি সে কারণেই প্যাংকুটু ছেলেটার প্রতি দুর্বল।

রঙ্গিত বলল, প্যাংকুটুদা কী বলল তোমাকে?

রঞ্জন বললেন, কৌশিক নিম্নবিত্ত বাড়ির ছেলে। ক্যানসার হয়েছে কিন্তু ট্রিটমেন্ট করার টাকা নেই। আমাকে প্যাংকুটু রিকোয়েস্ট করল যদি কিছু হেলপ করা যায়। আমি একটা এনজিও-র সঙ্গে ছেলেটার যোগাযোগ করিয়ে দিলাম। তাতে কাজ হয়েছে। খবর পেয়েছি কৌশিক এখন অনেকটাই ভালো আছে। তুই প্যাংকুটুর সঙ্গে একবার দেখা করিস, একটা বুদ্ধি ঠিক বেরোবে। তাছাড়া তুই তো ইনকমপিটেন্ট নোস, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি আছে তোর পকেটে। অত এমব্যারাস ফিল করার কিছু নেই।

আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি বলছ যখন তখন যাব একদিন। আলগা গলায় কথাটা বলে উঠে এসে নিজের ঘরে ঢুকল রঙ্গিত। গান শোনা তার পুরনো অভ্যেস। বেছে বেছে ধূসর সময়ের একটা গান চালিয়ে দিল। জর্জ উইনস্টোনের ‘ডিসেম্বর’।

রাত হয়েছে অনেক। গাড়ি চলছে দুটো একটা। হর্ন শোনা যাচ্ছে মাঝেমধ্যে। ঘরের মধ্যে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। কাচের জানলার ওপাশে ফুটে আছে আবছা হাসির মতো আলো। একশো কুড়ি মিনিট ধরে গোলশূন্য ম্যাচ খেলার পর যেমন করে ক্লান্তিতে ফুটবলাররা নুইয়ে পড়ে মাঠে তেমন করে কলকাতা ঝিমোচ্ছে এখন। লো ভলিউমে বাজছে ‘ডিসেম্বর’। জর্জ উইন্সটোনের ব্যারিটোন কণ্ঠ সমস্ত শরীর আর মনের রন্ধ্র রন্ধ্র দিয়ে শুষে নিচ্ছে রঙ্গিত। মনে পড়ছে ভুটানের সাকতেং নামে এক পাহাড়ি গ্রামের সেই মায়াবী রাতটার কথা। মনে পড়ছে ওয়াংমো নামে এক তরুণীর কথা যে তাকে দীক্ষিত করেছিল যৌনতার অমোঘ মন্ত্রে।

সেজোপিসির ছেলে প্যাংকুটুদা ছিল মেধাবী ছাত্র। একসময় চুটিয়ে ছাত্র রাজনীতি করত। জিএস ছিল কলেজ আর ইউনিভার্সিটিতে। টিশার্টের বুকে থাকত চে গুয়েভেরার ছবি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যাবার পরও ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল প্যাংকুটুদা। স্টুডেন্টস ইলেকশন নিয়ে একবার দু-পক্ষে গোলমাল বেঁধেছিল। সেবার বেধড়ক মার খেয়েছিল বিরোধী সংগঠনের ছেলেদের কাছে। তাকে একা পেয়ে চোরের মার মেরেছিল ছেলেগুলো। বুকের পাঁজরায় চিড় ধরেছিল। শুধু তাই নয় পায়ের গোড়ালিও ভেঙেছিল। তবে সেদিন পড়ে পড়ে একতরফা মার খেতে খেতেও নাটের গুরুকে স্পট করে রাখতে ভোলেনি। ছেলেটার নাম বাপন সাহা, বাড়ি দাসপাড়ায়। মারাত্মক চোটের কারণে প্যাংকুটুদাকে বেড রেস্টে থাকতে হয়েছিল কয়েক মাস। ততদিনে থিতিয়ে গিয়েছিল গোলমাল। পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে যখন ঠান্ডা মনে হচ্ছিল তখনই অ্যাকশনে নেমেছিল সে।

পাড়ার ক্লাব থেকে আড্ডা মেরে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে বাইক চালিয়ে রোজ বাড়ি ফেরে বাপন। তাই আগে থেকে দাসপাড়ায় গিয়ে প্যাংকুটুদা রাতের অন্ধকারে অপেক্ষা করছিল একেবারে একা। ফাঁকা রাস্তায় বাপনের বাইক থামায় প্যাংকুটুদা। রাস্তার ধারে ঝোপের মধ্যে শুইয়ে রাখা হকিস্টিকটা তুলে নেয়। মুখে একটাও কথা না বলে হকিস্টিক দিয়ে বাপনের মাথা ভয়াবহ ভাবে ফাটিয়ে দেয়। তার কপালে আর মাথায় স্টিচ পড়েছিল তিরিশটা। বাপন সাহা প্রাণে বেঁচে গেলেও এই ঘটনার জল গড়িয়েছিল থানাপুলিশ অবধি। পরদিনই ওয়ারেন্ট বেরিয়ে গিয়েছিল প্যাংকুটুদার নামে। স্থানীয় এক নেতার পরামর্শে সে তখন ভুটানে লুকিয়ে ছিল এক বছর।

সাকতেং হল ভুটানের এক প্রত্যন্ত জনপদ। অরুণাচল প্রদেশ আর চিন সীমান্ত লাগোয়া এই গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। দোকানপাট হাতেগোনা। গাড়িঘোড়াও বড় একটা যায় না। বাড়ির লোক আর ঘনিষ্ট দু-একজন ছাত্রনেতা ছাড়া কেউ প্যাংকুটুদার হদিশ জানত না। রঙ্গিত তখন ইতিনিভার্সিটি পড়ুয়া। ক্রিসমাসের সময় সাকতেং গিয়ে কিছুদিন ছিল প্যাংকুটুদার ডেরায়। সেই গ্রামে কী করে যেন একটা স্কুলে পড়ানোর চাকরি পেয়ে গিয়েছিল সে। যার বাড়িতে পেয়িংগেস্ট ছিল সেই নরবু ভুটিয়ার ছিল দিশি মদের দোকান। সেই গ্রামে যতগুলি বাড়ি তার থেকে বেশি শুঁড়িখানা। সন্ধেবেলা স্থানীয় চাষাভুষোদের সঙ্গে টংবা খেত প্যাংকুটুদা। নেপালে নাকি একে বলে জাড়। যব পচিয়ে মদ তৈরি করা হয়। বাঁশের সরু পাইপ টেনে খেতে হয় সেই তরল।

নরবু ভুটিয়া বিপত্নীক। তার বাড়ির পেছনদিকে বিঘাখানেক ফাঁকা জমি। সেখানে সে গাঁজার চাষ করত। নরবুর যমজ মেয়ে। কয়েক মিনিটের নাকি ছোটবড়। বড় মেয়েটি ওয়াংমো। ছোটজন সেমইয়াং। প্যাংকুটুদা যে স্কুলে পড়াত দুই বোন ছিল সেই স্কুলেরই ছাত্রী। ছেলেমেয়েরা কুড়ি একুশ বছর বয়সেও দিব্যি স্কুলে যায় সেখানে। নরবুর দুই মেয়েই আকর্ষণীয় চেহারার। পীতাভ গায়ের রং, সিল্কের মতো মসৃণ চুল, সরু চোখ। দুজনই ফ্যাশন সচেতন। না হলে স্কুলে যাবার সময় কেউ চোখে আইলাইনার আর ঠোঁটে লিপস্টিক দেয়!

সেমইয়াং ছিল ধীরস্থির মুখচোরা স্বভাবের। কথা কম বলত। ওয়াংমো তার একেবারে উল্টো। তার বকবক শুরু হলে শেষ হবার নাম করত না। ওয়াংমোর রক্ত গরম। জ্যাকেট বা পুলওভার বিশেষ পরতে দেখা যেত না তাকে। ওই কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও কী করে যে ওয়াংমো শুধু একটা ফুলস্লিভ টাইট গেঞ্জি পরে থাকত কে জানে! ওয়াংমোর গেঞ্জি বা টিশার্টের ওপরদিকের বোতাম খোলাই থাকত সব সময়। রঙ্গিতের চোখ মনের শাসন মানত না, চলে যেত বিপজ্জনক পাহাড়ি উপত্যকার দিকে। চোখাচোখি হলে লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে নিত সে। ওয়াংমো ঠোঁট টিপে হাসত। কে জানে ওয়াংমো বোধ হয় উপভোগই করত রঙ্গিতের চোরা চাউনি।

ইলেক্ট্রিসিটি তখনও পৌঁছয়নি সেখানে। রাতে মোমবাতিই ছিল আলোর উৎস। যে ঘরে প্যাংকুটুদা থাকত তার লাগোয়া ছিল একটা সরু করিডোর। সেই করিডোর পেরোলেই নরবু ভুটিয়ার পানশালা। খদ্দের অবশ্য তেমন হতো না। হবে কী করে সেখানে তো ঘরে ঘরে শুঁড়িখানা। ওয়াংমোর অবাধ যাতায়াত ছিল পানশালায়। সেমইয়াংও যে মাঝেমধ্যে শুঁড়িখানায় আসত না তা নয়। মদ্যপান নিয়ে সেখানে কারও কোনও ছুঁৎমার্গ দেখেনি রঙ্গিত। কারণবারি সেবন অত্যন্ত সহজ ও স্বাভাবিক একটা ব্যাপার সেখানে। তবে যতদিন সাকতেংয়ে ছিল রাস্তাঘাটে মদ খেয়ে হল্লা করতে কাউকে কখনও দেখেনি রঙ্গিত।

নরবু ছিল অদ্ভুত চরিত্রের লোক। দেঁতো হেসে নিজেই বলত, সান ডাউন মতলব ফান রাইজ। নিজের শুঁড়িখানার প্রথম খদ্দের ছিল সে নিজেই। বিকেল থেকেই মদ খেতে শুরু করত লোকটা। তার পর বেসামাল হয়ে যেত সন্ধে ঘন হলেই। তখন পানশালা সামলাত ওয়াংমো। খদ্দের পকেট থেকে টাকা বের করে দিলে তারাই গ্লাস ভর্তি করে এনে দিত নেশার তরল। সেমইয়াংয়ের সঙ্গে রঙ্গিতের তেমন কথা হতো না। ওয়াংমো আবার উল্টো। রঙ্গিত আর প্যাংকুটুদা যখন মদ খেত, সে এসে তাদের পাশে বসত। আদিরসের কথা বলত অবলীলায়। ডার্টি জোকস বলে হেসে গড়িয়ে পড়ত ওয়াংমো। সেমইয়াং পড়াশোনায় ভালো। সে চাইত স্কুল টিচার হতে। ওয়াংমোর লক্ষ্য ছিল ফিল্মে নামা। রঙ্গিত সাকতেংয়ে ছিল প্রায় দু’সপ্তাহ। তার যখন ফেরার সময় হয়ে আসছে তখন ঘটে গেল এক সাংঘাতিক ঘটনা।

সেই সন্ধ্যায় সেমইয়াং কোথাও গিয়েছিল কাজে। নরবু যথারীতি ঝিমোচ্ছে গলা অবধি গিলে। প্যাংকুটুদাও সেদিন তিন রাউন্ডেই ফ্ল্যাট। ঘুমিয়ে পড়েছে পানশালার মধ্যেই। ওয়াংমো রঙ্গিতের পাশে বসে গল্প করছিল। তার মামাবাড়ি পাশের গ্রামে। সপ্তাহে একবার সেখানে যায় তারা দুই বোন। মামা চাকরি করে পুলিশে। তাদের প্রতিবেশীর নাম পাশাং ভুটিয়া। পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই লোকটার মাথায় একটাও চুল নেই। সে-ও পুলিশে চাকরি করে। সপ্তাহান্তে বাড়ি আসে। পাশাং নাকি সেক্স ম্যানিয়াক। ছুটিছাটায় বাড়িতে এলে ভরদুপুরে তার কচি বউয়ের সঙ্গে নির্লজ্জ সঙ্গম করে। তার বেডরুমের কাচের জানলায় নাকি কখনও পর্দা টানে না। ওয়াংমো লুকিয়ে লুকিয়ে সেই জ্যান্ত থ্রি এক্স মুভি দেখে।

কোনও ফাঁকফোকর দিয়ে হিমেল হাওয়া আসছিল। মিটমিট করে কাঁপছিল মোমবাতির শিখা। কথা বলতে বলতেই একসময় রঙ্গিতের হাত নিজের মুঠোতে নিয়ে নিল ওয়াংমো। তার হাত ধরে টেনে নিয়ে এল করিডোরে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওয়াংমোর অনুগামী হল রঙ্গিত। ভেজানো দরজা ঠেলে রঙ্গিতকে নিয়ে তাদেরই ঘরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল সেই দুঃসাহসী মেয়ে। অন্ধকারের মধ্যেই খুলে ফেলল নিজের পোশাক। ভুটানি ভাষায় কী সব বলতে বলতে মুখ ঘষতে লাগল রঙ্গিতের ঘাড়ে, গলায়, বুকে। রঙ্গিতের মনে হচ্ছিল অসহ্য সুখে সে গলে যাবে যে কোনও সময়।

ডিসেম্বর মাসের ভুটান। রক্ত জমিয়ে দেওয়ার মতো ঠান্ডা। সেই শীতলতম সন্ধ্যাতেও রঙ্গিতের মনে হচ্ছিল জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে তার শরীর। তার মধ্যে যে একটা আগ্নেয়গিরি ঘুমিয়ে আছে সেটা নিজেই সে জানত না এতদিন। পানশালায় সস্তার মিউজিক সিস্টেমে এই ‘ডিসেম্বর’ গানটাই বাজছিল সেদিন। তার মূর্ছনা ভেসে আসছিল সেই একচিলতে ঘরেও। ওয়াংমোর শরীরের বুনো গন্ধ ছেয়ে ফেলছিল রঙ্গিতকে। উষ্ণ হচ্ছিল শরীর। তার শিরা ধমনীর মধ্যে দিয়ে চলাচল করা রক্তের গতি বাড়ছিল ক্রমশ। নিজের হৃদপিণ্ডের লাবডুব নিজেই শুনতে পাচ্ছিল রঙ্গিত। সেই প্রথমবার কোনও নারীশরীরের কাছাকাছি আসা। রঙ্গিতের পিঠে নখের আঁচড় বসিয়ে দিয়েছিল ওয়াংমো। ঘোরের মধ্যে কথা বলে যাচ্ছিল মেয়েটা। কোনও সাধারণ কথা নয়, ভালোবাসার কথাই হবে খুব সম্ভবত।

প্রেমের প্রকাশ যেমন মধুর ঠিক তেমনই বিচিত্র, মানুষের মনেরই মতো। জায়গা বিশেষে ভালোবাসা প্রকাশ করার ভঙ্গির রকমফের হয়। ওয়াংমো একেবারেই অন্যরকম। রঙ্গিত যেসব মেয়েকে দেখে এসেছে এতকাল, তাদের মতো কোনও সংস্কারে সে আবদ্ধ নয়। ভালোবাসা প্রকাশের অনেক ধরন আছে। প্রেমের মধ্যে আর শরীরের মধ্যে যে গোপন করার কিছু নেই তা বিশ্বাস করত ওয়াংমো। সেই শীতার্ত পাহাড়ে ওয়াংমো রঙ্গিতকে উপহার দিয়েছিল এক নগ্ন নির্জন রাত।

রঙ্গিতের জীবনে সেই প্রথম রতিসুখ। জ্বর এলে যেমন হয়, তেমন লাগছিল তার। কাঁপছিল সে। ওয়াংমোর শরীর থেকে ভেসে আসছিল বুনো ফুলের মাদক গন্ধ। সেই গন্ধ এসে মিশে যাচ্ছিল রঙ্গিতের ঘামে ভেজা শরীরে। নিজেকে রিক্ত করে দেওয়ার পর রমণক্লান্ত শরীরে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে হাঁফাচ্ছিল সে। ওয়াংমো তখনও তার ঘাড়ে গলায় পিঠে বুকে চুমু খেয়ে যাচ্ছিল পরম আশ্লেষে। কী করে কোনও পুরুষকে খুশি করতে হয় শরীরের সর্বস্বতায় তা ওয়াংমো জানে। প্রথম গোঁফ ওঠার মতো, প্রথম সাইকেল চড়ার মতো, প্রথমবার সাঁতার কাটতে শেখার মতো দুরন্ত এক আনন্দময় উত্তেজনার মধ্যে নিজেকে পূর্ণ করার ও একই সঙ্গে নিজেকে নিঃস্ব করার খেলা জীবনে প্রথমবার শিখল রঙ্গিত।

একটা রাত রঙ্গিতকে অভিজ্ঞ করে দিয়ে গেল। ছেলেমানুষ ছিল, এবার পুরুষ হল সে। রঙ্গিত সেদিনই বুঝতে পেরেছিল যে, এই প্রাকৃত খেলা একবার শিখে ফেলার পর আর কেউ ভোলে না। এই আদিম মানুষী খেলা তার জীবনে প্রথমবার হলেও রঙ্গিতের গাট ফিলিং বলছিল ওয়াংমো অনভিজ্ঞা নয়। খুব সম্ভবত এর আগেও অন্য পুরুষের সঙ্গে শরীরী সংযোগ করেছে এই মেয়ে। এই সহজ স্বাভাবিক যৌনতাই সেই মুল্লুকে দস্তুর কি না কে জানে। সেখানে পুরুষ আর নারীর মিলনে কোনও সংস্কারের বেড়াজাল আছে কি না তা-ও জানা নেই রঙ্গিতের। এত বছর পর এমন একটা উত্তেজক রাত তার জীবনে যে কখনও এসেছিল, সে কথা ভেবে এখন তার অবিশ্বাস্য লাগে। সেই দিনটির পর অনেকগুলো বছর পার করে এসেছে রঙ্গিত। গ্যালন গ্যালন জল বয়ে গেছে জীবননদী দিয়ে। এখনও সেই উদ্বেল রাতটার কথা সে ভুলতে পারে না কিছুতেই।

ভুটানের সেই স্কুল টিচারের চাকরিটা ছেড়ে প্যাংকুটুদা পরে চলে এসেছিল কলকাতায়। যোগ দিয়েছিল অন্য রাজনৈতিক শিবিরে। শাসক দলের বদান্যতায় পুলিশ কেস উঠে গিয়েছিল ততদিনে। রাজনৈতিক জোয়ারভাঁটা পার করে প্যাংকুটুদা এখন এক মন্ত্রীর পিএ। আজ ‘ডিসেম্বর’ গানটা শুনতে শুনতে সেই সব দিনের কথা মনে পড়ছিল রঙ্গিতের। ওয়াংমোর গায়ের বুনো ফুলের গন্ধটা আজ আবার নাকে আসছিল। মনে হচ্ছিল, অন্ধকার ঘরের জানলাটা খুললে বাইরে বেলেঘাটা জোড়ামন্দির নয়, দেখতে পাবে ভুটান পাহাড়ের আউটলাইন।

রঙ্গিতের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ছিল সারাটা দিন। তার বাবা নামী অনকোলজিস্ট। প্রচুর রোজগার। কিন্তু সেটা তো তার উপার্জন নয়। যতই খারাপ দিন আসুক বিত্তশালী বাবার ছেলে হওয়ায় অনাহারে তাকে মরতে হবে না সেটা জানে সে। কিন্তু এভাবে দুম করে চাকরি চলে গেলে কার মেজাজ ঠিক থাকে! কর্পোরেট হাউসে চাকরি বলতে সে যা ভেবে এসেছিল এতদিন, এবার বুঝতে পারছে সেই ভাবনায় অনেকটাই ফাঁকি ছিল। অথচ এই চাকরিতে ঢোকার সময় কত কী ভেবে এসেছিল সে! সেই দিনটার কথা কি আদৌ ভোলা সম্ভব?

রাত বারোটা তখন। দুপুর থেকে শুরু হওয়া ক্যাম্পাসিং তখনও চলছে। বাহাত্তর নম্বরে নাম রঙ্গিতের। অপেক্ষা করে করে সে তখন ক্লান্ত। ইন্টারভিউ হলে গিয়ে সে দেখল তার থেকেও বেশি ক্লান্ত প্যানেল মেম্বাররা। রঙ্গিত ঢুকল ত্রস্ত পায়ে। যাঁরা ইন্টারভিউ নিচ্ছেন তাঁরা তখন নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ব্যস্ত। কেউ চোখ তুলে তাকালেন না। যেন রঙ্গিত মানুষের পদবাচ্যই নয়, সে একটা ছারপোকা। একজন অনিচ্ছাসত্ত্বেও নাম জিগ্যেস করলেন। রঙ্গিত নাম বলল। প্যানেল মেম্বারদের মধ্যে অন্য একজন, গায়ের রং অস্বাভাবিক রকম কালো, গম্ভীর গলায় বললেন, দেশের বাড়ি কি পূর্ববঙ্গে?

রঙ্গিত ঘাড় নাড়ল। ভদ্রলোক গলার টাইয়ের ফাঁস ঢিলে করে বললেন, নোয়াখালি, পাবনা, নাকি বরিশাল? এসব নিয়ে কখনও মাথাই ঘামায়নি এর আগে। সে বলেছিল, বাবার মুখে শুনেছি ঢাকা বিক্রমপুর। ভদ্রলোক খুশিয়াল গলায় বললেন, আমার বাড়িও বিক্রমপুর। বাংলাদেশ কখনও যাওয়া হয়নি বলে বাপঠাকুরদার ভিটেতে পা রাখা হয়নি। ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার তো? রঙ্গিত মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল নিয়ে মাথা ঘামায় না। লিভারপুলের খেলা থাকলে সে সচরাচর মিস করে না। কিন্তু ভদ্রলোকের কথায় সে হ্যাঁ বাচক মাথা নেড়েছিল। ভদ্রলোক বললেন, ইউ মে গো নাও। সে বিভ্রান্ত মুখে তাকিয়ে ছিল। তিনি দাঁত খিঁচিয়ে বললেন, দাঁড়িয়ে আছ কেন ভায়া, তোমার ইন্টারভিউ হয়ে গেছে। এসো এবার।

শুকনো মুখে ফিরে আসার সময় রঙ্গিতের মনটা কু ডাকছিল। প্রথমদিকে যারা ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরে আসছিল তাদের ছেঁকে ধরছিল সকলে। কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের কঠিন কঠিন প্রশ্ন করা হয়েছিল প্রথম দিকের ছেলেমেয়েদের। রঙ্গিত থই পাচ্ছিল না ভেবে, ইন্টারভিউতে এই সব অবান্তর প্রশ্ন করার মানে কী? তার মানে কি লোক আগেই নেওয়া হয়ে গেছে? রাতে ঘুম হল না। পরদিন কলেজে গিয়েই দেখে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে নোটিস বোর্ডের সামনে। মেল করা হয়েছে তাদের রেজাল্ট। সেটা দেখার জন্যই এত ভিড়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর কতগুলো কাগজ নিয়ে এক ভদ্রলোক হাঁটা শুরু করলেন সামনের দিকে। পেছন পেছন তারাও ছুটল হই রু করে। চোখ বুজে মা কালীকে ডাকছিল রঙ্গিত। নিজের নাম লিস্টের মাঝামাঝি দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না। বুক ধড়াস ধড়াস করছিল উত্তেজনায়। একজন এসে পিঠে চাপড় মেরে বলল, কংগো ভাই! রঙ্গিত থ্যাংক ইউ বলারও সুযোগ পেল না। আর এক বন্ধু এসে হাই ফাইভ করে বলল, পার্টি তো বনতি হ্যায় বস!

তখনও রঙ্গিতের হকচকানো ভাবটা যায়নি। খুশি বিস্ময় আনন্দ আর উত্তেজনা তখন একসঙ্গে ফুটে বেরোচ্ছে তার অভিব্যক্তিতে। এত সহজে চাকরি হয়ে গেল তার? তাও আবার কর্পোরেট হাউজে? এ কী রে বাবা, এটা কি সিনেমা, যাত্রাপালা, নাকি থিয়েটার? বাবা রসোগোল্লা বিতরণ করলেন প্রতিবেশীদের। খুশিতে আকাশে ডানা মেলে উড়ছিল রঙ্গিত। তবুও মনের মধ্যে একটা আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছিল। যারা ইন্টারভিউ দিয়েছিল তারা প্রায় সকলেই চাকরি পেয়ে গেল কী করে? এই যে লোকে বলে চাকরি পাওয়া আর লটারি পাওয়া নাকি এক জিনিস, তবে?

এখন রঙ্গিত বোঝে যে, তাদের চাকরির যতটা খিদে ছিল কোম্পানিগুলোর তার থেকে বেশি দরকার ছিল ওদের। সে সময় সফটওয়্যার দুনিয়াতে জোয়ার এসেছে। পরে রঙ্গিত জেনে হাঁ হয়ে গিয়েছিল যে, ইন্টারভিউয়ের প্রথমদিকের কয়েকজন ছাড়া পরের দিকের কারওর টেকনিক্যাল রাউন্ডই হয়নি। তাকে যেমন প্রশ্ন করা হয়েছিল, তার বন্ধুদেরও প্রায় একই রকম ভাবে জিগ্যেস করা হয়েছিল, ইস্টবেঙ্গল, নাকি মোহনবাগান সাপোর্টার? অথবা কাকে বেশি পছন্দ সৌরভ, দ্রাবিড়, নাকি তেন্ডুলকর? এমনই আশ্চর্য সব প্রশ্নমালা।

রঙ্গিতদের বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শ’তিনেক ছেলেমেয়ে। প্রায় সকলেই চাকরি পেয়ে গেল বিভিন্ন সফটওয়্যার কোম্পানিতে। কেউ কেউ দুটো আলাদা কোম্পানির থেকেও অফার লেটার পেল। ফাইনাল ইয়ারে উঠে পড়াশোনা একেবারে ছেড়ে দিয়েছিল রঙ্গিত। শুধু শুধু পড়ে আর কী হবে। চাকরির জন্যই তো পড়াশোনা। সেই চাকরিই যখন পেয়ে গেছে তাহলে ফোর্থ ইয়ারটা একটু আয়েশ করে কাটালে অসুবিধে কোথায়। এখন সে বুঝতে পারে গত কয়েক বছরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। হাজার হাজার বি-টেক ফি বছর তৈরি হচ্ছে রাজ্যে। নামেই সিভিল, মেকানিক্যাল, ইনফরমেশন টেকনোলজি বা ইলেক্ট্রিক্যাল। অল রোডস লিড টু রোম, তার নাম সফটওয়্যার। আসলে সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে যে কোম্পানির যত বেশি ম্যান পাওয়ার, বিদেশি ক্লায়েন্টের সঙ্গে তার দর কষাকষির সময় বরাত পাবার সম্ভাবনা তত বেশি।

রঞ্জনের জগৎ আলাদা। এই সব বুঝতে পারতেন না। একদিন খোলসা করে বুঝিয়েছিল রঙ্গিত। ধরা যাক, ক্লায়েন্ট কোনও সমস্যা নিয়ে কোনও আইটি সলিউশন কোম্পানির দ্বারস্থ হল। সেই কাজ করার জন্য দরকার পাঁচশো জন। অথচ সেই কোম্পানির রিসোর্স পুলে রয়েছে আটশো জন। ক্লায়েন্ট খুশি হয়ে ভাববে, এই অফিসকেই বরাতটা দেওয়া যাক। রঙ্গিতদের কোম্পানির কারবার বিদেশি মক্কেলদের সঙ্গে। ফলে ডিল হয় কোটিতে।

রঙ্গিত যেখানে কাজ করত তা বারো তলায়। বছরখানেক ধরে তার ট্রেনিং হয়েছিল। তার পরেই প্রোজেক্ট পেয়ে গিয়েছিল রঙ্গিত। সেটা শেষ হবার আগেই আরও একটা। তার পর আরও একটা। তিনটে প্রোজেক্ট ওয়ার্ক শেষ করতে লেগে গেল তিন বছর। রঙ্গিত ভাবত পরের প্রোজেক্ট নিশ্চয়ই বাইরে কোথাও হবে। তাকেও বন্ধুদের মতো বিদেশ পাড়ি দিতে হবে অন সাইট কাজ করতে। পাসপোর্টও করিয়ে নিয়েছিল সে। কিন্তু কথায় বলে ম্যান প্রোপোজেস গড ডিসপোজেস। ওই তিনটে প্রোজেক্টের পর আর কোনও কাজ পেল না রঙ্গিত। তাদের কোম্পানির টেকনোলজি নাকি অবসোলিট হয়ে গেছে। সুতরাং আরও অনেকের মতো রঙ্গিতের স্থান হল সাইডলাইনে। খেলার মাঠের রিজার্ভ প্লেয়াররা জার্সির ওপর রঙিন অ্যাপ্রনের মতো যেমন চাপিয়ে বসে থাকে ঠিক তেমন করে মাঠের ধারের বেঞ্চে বসে থাকত সে।

অফিসে এসে কম্পিউটার অন করার সঙ্গে সঙ্গে নীল আলো ফুটে উঠত স্ক্রিনে। সে সময় অফিসে এসে কম্পিউটার অন করে বসে থাকাটাই হল কাজ। হিউম্যান রিসোর্স-এর চিন্ময়দা এসে হাসিমুখে বলতেন, বোর লাগছে? লাইব্রেরিতে যাও। অনেক বই আছে ওখানে। সময় কাটবে। রঙ্গিতরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করত। সেখানে তো ডেল কার্নেগি টাইপ মোটিভেশনাল বইপত্র। কী করে মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করবেন, চরম দুঃসময়ে জীবনের ঝড়ঝাপটা কেমন করে সামলাবেন এমন ধাঁচের বই। রঙ্গিতের চোখে জল আসত। উস্তুম খুস্তুম করতে ইচ্ছে করত। মনে হতো ভেঙে দেয় কম্পিউটার। রাতে ঘুম হতো না।

সেদিনও অফিস থেকে আর পাঁচদিনের মতোই বাড়ি ফিরেছিল রঙ্গিত। রাতে শোবার সময় মোবাইল টিং করে উঠল। নোটিফিকেশন এসেছে মাঝরাতে। কোম্পানি তাকে মেইল পাঠিয়েছে। এক লাইনে লেখা আছে ‘ইয়োর সার্ভিস ইস নো লংগার রিকোয়ারড।’

এত অপমানিত জীবনে কখনও সে হয়নি, এমন অসম্মান তার কখনও হবে এটা রঙ্গিতের কল্পনাতেও ছিল না। চোখে জল চলে এসেছিল তার। সারা রাত না ঘুমিয়ে পরদিন সকালে অফিসে ছুটল রঙ্গিত। দেখা গেল সে একা নয়, তার মতো আরও বেশ কয়েকজন এই মেইল পেয়েছে। চিন্ময়দা সহানুভূতি দেখিয়ে বললেন, কোম্পানি বেশ কয়েকজনকে ডাউনসাইজ করেছে। কিছু করার নেই। সময় বদলাবে। আর ভালো সময় এলেই কোম্পানি আবার তাদের নতুন করে অ্যাপয়েন্ট করবে।

রঙ্গিত বাসি মুড়ির মতো মিইয়ে যেতে যেতে বুঝল ডাউনসাইজ বা স্মার্টসাইজ যা-ই বলা যাক না কেন, এ আসলে ছাঁটাই। প্রতিযোগিতার বাজারে কোম্পানির কাজ কমে গেছে। ফলে রঙ্গিতদের বসিয়ে বসিয়ে মাইনে দেওয়া আর সম্ভব নয়। তাই বাড়তি মেদ ছেঁটে ফেলছে কোম্পানি। পরের মাসে আরও কয়েকজনের ঘাড়ে বলির কোপ পড়বে।

বেশ কিছুদিন কাটল এভাবে। সকালে রঙ্গিত বাসিমুখে কাগজের কর্মখালি বিজ্ঞাপন ঘাঁটে। নাকেমুখে দুটো গুঁজে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। চক্কর মারে সারা কলকাতা। ওয়াক ইন ইন্টারভিউ দেয়। সন্ধের পর অবসন্নের মতো ফিরে আসে বাড়িতে। সেদিন কাগজে দেখেছে খবরটা। সামনের সপ্তাহে একটা ইন্টারভিউ আছে। ম্যাকমিলান গ্রুপ লোক নিচ্ছে চা বাগানে। ম্যাকমিলান বেশ নাম করা গ্রুপ। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আসামে তাদের বেশ কিছু চা বাগান আছে। আগুপিছু না ভেবে অ্যাপ্লাই করে রেখেছে সে। এখনই তার একটা কাজ চাই। এমন নয় যে, প্যাংকুটুদার কথা রঙ্গিত আগে ভাবেনি। খুব প্রয়োজন না হলে কারও কাছে সাহায্য চায় না সে। কিন্তু আর উপায় নেই। কোথাও কোনও দিশা দেখতে পাচ্ছে না সে। তার এই দাদাটি এখন রাজনৈতিক প্রভাবশালী। কিছু একটা উপায় বেরোবে ঠিক।

উঠে বসল রঙ্গিত। মোবাইল ঘেঁটে কাঙ্ক্ষিত নম্বর খুঁজে বের করল। ফোন করবে একটা? প্যাংকুটুদা দিনের বেশির ভাগ সময়ই ব্যস্ত থাকে দলের নানারকম কর্মসূচি নিয়ে। ইলেকশনের সময় ছাড়া কলকাতার বাইরে সচরাচর যায় না। এত রাতে ফোন করাটা কি ঠিক হবে? নাহ থাক। কাল তো রোববার। প্যাংকুটুদা রোববার সকালটা সচরাচর বাড়িতেই থাকে। বাড়িও বেশি দূরে নয়। কাছেই রানি রাসমণি বাজার। হেঁটে গেলে কতক্ষণই বা সময় লাগে বেলেঘাটা জোড়ামন্দির থেকে। কাল একবার প্যাংকুটুদার কাছে গিয়ে দেখাই যাক না কী হয়।

ক্যানসার! কথাটা শুনলেই বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে অজানা আশঙ্কায়। মনটা আগাপাশতলা দুমড়ে মুচড়ে যায়। মুকুটের যখন ক্যানসার ধরা পড়েছিল তখন ছাপার অক্ষরে রিপোর্ট দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না। দু’বার, তিনবার, চারবার দেখেও বিভ্রম কাটছিল না। এ হতে পারে না। কিছুতেই না। কোথাও নিশ্চয়ই বড়সড় কিছু একটা ভুল হচ্ছে। ল্যাব থেকে পেশেন্টের নাম ভুল করে তার নাম লিখে দিয়েছে।

অসুখ কোনও মানুষের একার হয় না। অসুখ করে গোটা পরিবারের। যে কোনও অসুখেই মানুষ আকুল হয়ে জানতে চায়, কত টাকা লাগবে হার্ট বাইপাস অপারেশন করতে? কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশনের খরচ কত? লিভার সিরোসিস হলে কি সেম ব্লাড গ্রুপের কেউ লিভার ডোনেট করতে পারে? মেডিক্যাল ইন্সুরেন্স কি কভার করতে পারবে অতটা? শুধু রোগী নয়, গোটা পরিবারের সকলের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে অচেনা আতঙ্ক। আগে যক্ষা হলে বলা হতো রাজরোগ হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা সেই রোগকে বাগে আনতে পেরেছে কিন্তু কর্কটরোগের থেকে নিরাময়ের কোনও সুরাহা খুঁজে পায়নি।

ক্যানসার শব্দটা উচ্চারণ করলেও ভয়ে হাত-পা কাঁপে। শিউরে ওঠে শরীর। অসুস্থ মানুষটাকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন পরিবারের সকলে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, পড়শি সকলের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে অসহায় রোগী। একটু একটু করে ক্ষয়ে যেতে থাকে রোগাক্রান্ত মানুষটা। সেইসঙ্গে গ্রহণ লাগে গোটা পরিবারটার ওপরেও। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা মানুষের বন্ধ দরজায় ঠকঠক কড়া নাড়ে অজানা এক ভয়। শমন হাতে ভয়ালদর্শন মৃত্যুদূত এসে দাঁড়িয়ে থাকে শিয়রে। প্রাণভয়ে ভীত মানুষটির হাতে ধরিয়ে দেয় অনিশ্চিতের ডাকটিকিট।

ট্রেক করতে গিয়ে ক’দিন ধরেই অস্বস্তি হচ্ছিল। গা গোলাচ্ছিল, বুকে ব্যথা হচ্ছিল থেকে থেকে। শেষে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল মুকুট। রেকা আর চিত্রাঙ্গদা তাকে নিয়ে এসেছিল কাঠমান্ডুতে। প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়ে চিত্রাঙ্গদা মুকুটকে সঙ্গে করে ফ্লাইটে নিয়ে এসেছিল বাগডোগরা। ততক্ষণে খবর চলে গিয়েছিল স্বস্তিশোভন আর অভয়ার কাছে। দুজনেই উদ্বিগ্ন হয়ে ছুটে এসেছিলেন এয়ারপোর্টে। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেননি। বাগডোগরা থেকে মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছিলেন কলকাতায়। ঢাকুরিয়া ব্রিজের কাছে অভয়ার পৈত্রিক বাড়ি। সে বাড়িতে থাকেন অভয়ার দাদা নীলমণি। এই বাড়িতেই আস্তানা গেড়েছেন স্বস্তিশোভন। চিত্রাঙ্গদা ফিরে গিয়েছিল। যাবার আগে মুকুটকে সাহস দিয়ে গিয়েছিল। হেসে বলেছিল, এমন কিছু হয়নি তোর। শিগগিরি ফিট হয়ে যাবি। আমি মাসখানেক বাদে আসব তোকে দেখতে।

যে হসপিটালে মুকুট তার চিকিৎসার প্রয়োজনে যেত সেখানে তার মতো আরও অনেক রুগি আসত। কারও মাথা ন্যাড়া। তার মানে কেমো শুরু হয়ে গেছে। কেউ আবার আসত উইগ পরে। রুগির সঙ্গে আসত তাদের বাড়ির লোকজন। সেদিন যেমন এক প্রৌঢ়কে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর স্ত্রী। স্বস্তিশোভনের সঙ্গে নীচুগ্রামে সেই ভদ্রমহিলার কথা চালাচালি হচ্ছিল। বয়স্ক মানুষটি চোখে জল নিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি জীবনে কখনও সিগারেট খাননি, তাহলে কেন ফুসফুসে বাসা বাঁধল এই রোগ বলুন তো?

পাথরের মূর্তির মতো বসা স্বস্তিশোভন। কী বলবেন তিনি? যিনি জিগ্যেস করছেন তিনিও জানেন, এই প্রশ্নের উত্তর স্বস্তিশোভন কেন, কারও কাছেই নেই। ক্যানসার এমন এক রোগ যা কাউকে জানিয়ে আসে না। কোনও নিয়ম মেনেও আসে না। মুকুটের এমন একটা অসুখ করবে সেটা কি ভেবেছিলেন তিনি কখনও? স্বস্তিশোভন অসহায়ের মতো ঠোঁট কামড়ান। আঙুল মটকান বিভ্রান্তের মতো। অনুমান করতে পারেন প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি এমন এক রোগ কুরে কুরে খেতে এসেছে তাঁর মুকুটকে। সেই সঙ্গে তাঁর পরিবারকেও।

এই হসপিটাল মুকুটকে পরিণত করে দিল অনেকটাই। যাদের শরীরে আর রক্তে বিলি কেটেছে এই রোগ তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে ব্যাখ্যাতীত এক সখ্য। মুকুটকে যেমন অন্য রুগিরা বলত, কোন স্টেজে ধরা পড়েছে তোমার? ঠাকুরপুকুরে গিয়েছিলে কখনও? টাটা হসপিটালে ট্রিটমেন্ট কেমন হয় বলতে পারো? মুম্বইয়ের যশলোক হসপিটালে খরচ কেমন জানা আছে? অনেকে শুনেছি মিহিজামে গিয়ে উপকৃত হয়েছেন। হোমিওপ্যাথিতে নাকি বহুদিন ঠেকিয়ে রাখা যায় এই রোগ?

মুকুট জবাব দিত না কোনও। সব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল অদৃশ্য অন্তরালে। ব্যবহার পাল্টে গিয়েছিল পরিজনদের, বন্ধুদের। অপরাধীর চাইতেও বেশি করে কৌতূহলী মানুষজনের অ্যাটেনশন ঘিরে থাকত তাকে। চিত্রাঙ্গদা যখন রিংয়ের পর রিং করে গেছে তখন তার ফোন রিসিভ করেনি মুকুট। বাবা-মাকে বলে দিয়েছিল পইপই করে। কাউকে জানতে দেওয়া চলবে না। এই ক্রুশ যদি বহন করতে হয়, আমি নিজেই বইব। চাই না লোকজনের সহানুভূতি। চাই না কেউ করুণার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাক।

প্রথমবার হসপিটালে যাবার কথা মুকুট ভুলবে না কখনও। বিশাল জায়গা জুড়ে বিল্ডিং। ধবধবে সাদা রং। সবুজ ঘাসে মোড়া লন। সামনে গাছপালা, ফুলের বাগান। মাঝখানে আবার সফেন জলের ফোয়ারা। হসপিটাল বলে মনেই হয় না। ভ্রম হয় স্টার ক্যাটাগরির কোনও হোটেল বলে। বাইরে থেকে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। মনেই হয় না এই হর্ম্যের রূপ আসলে বাহ্যিক। এই বিল্ডিংয়ের প্রতিটি কংক্রিটের গুঁড়োর মধ্যে থম মেরে আছে যন্ত্রণা আর বিপন্ন অনিশ্চয়তা। একটু গুটিয়ে গিয়েছিল মুকুট। সেটা অজানা ভয়ের জন্য না কি কনকনে ঠান্ডা এয়ারকন্ডিশনারের জন্য সেটা বলা তার পক্ষে মুশকিল। স্বস্তিশোভন সস্নেহে বলেছিলেন, চা খাবি একটু?

মুকুট দেখছিল, ধবধবে সাদা একটা ইস্ত্রি করা শার্ট পরেছে বাবা। সঙ্গে ডেনিম জিনস। পায়ে দামি জুতো। হাতের কাছে যা ছিল সেটাই পরে আসতে চাইছিল মানুষটা। মুকুট রাগ দেখিয়ে বলেছিল, পুজোর সময় যেগুলো কিনেছিলে সেই জামাপ্যান্ট পরতে হবে তোমাকে। ব্র্যান্ডেড জুতোটাও। কোনও কথা শুনব না আমি। তোমাকে ফিটফাট না দেখালে আমার ভালো লাগে না। কথাগুলো বলতে গিয়ে হাঁফ ধরছিল মুকুটের। ক’দিন ধরেই এটা হচ্ছিল। অর্ধেক কথা বলেই থেমে যেতে হয়। দম ফুরিয়ে যায় একটুতেই। এর মধ্যেই অভয়া কাগজের কাপে করে চা নিয়ে এলেন কোথা থেকে। চায়ে একটা চুমুক দিয়েই মুখটা কুঁচকে ফেলেছিল মুকুট। বিস্বাদ চা। অভয়া একটা সিল্কের শাড়ি পরে এসেছেন। ঘরে পরার শাড়ি পরেই আসতে চেয়েছিলেন তিনি। মুকুট আপত্তি জানিয়েছিল প্রবলভাবে। অভয়া জিগ্যেস করলেন, কীরে স্বাদ ঠিক নেই?

মুকুট মুখ কুঁচকে বলেছিল, কেমন অদ্ভুত খেতে। চা বানাতেই শেখেনি এরা। কথাটা বলেই চুপ করে গিয়েছিল মুকুট। চা বাগানের ম্যানেজারের মেয়ে সে। চায়ের স্বাদগন্ধের ভালোমন্দ মুকুট বুঝতে শিখেছে ছোটবেলা থেকেই। মনটা খচখচ করে উঠেছিল। চা হয়তো ঠিক আছে। তার রোগটার জন্যই এমন হচ্ছে না তো? মুকুটের মামা কার্ডিয়াক সার্জেন। তাঁর সাজেশন ছিল এক্ষুনি অপারেশন করতে হবে। দেরি করা মোটেই ঠিক হবে না। এদিকে মুকুটের পিসতুতো দিদির বর আবার নিজে ডাক্তার। সেই মানুষটির অপারেশনে সায় নেই। তিনি বলছেন আগে কেমো দেওয়া উচিত। তারপর অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।

স্বস্তিশোভন আর অভয়া চূড়ান্ত রকম বিভ্রান্ত। বুঝতে পারেন না কোন পথে এগোলে ঠিক হবে। তাঁরা ডাক্তারির কূটকাচালি বোঝেন না। স্বস্তিশোভন ইন্টারনেট খুলে আরও ঘাবড়ে যান। মাথা ঝিমঝিম করে। হে ঈশ্বর, শেষ অবধি প্রাণে বাঁচবে তো মেয়েটা? মুকুট একদিন অভয়াকে বলেছিল, তার ট্রেকিংয়ের বন্ধু চিত্রাঙ্গদার ফিয়নসে টাটা হসপিটালের ডাক্তার। তার সঙ্গে একবার কথা বলে দেখব? সে যদি কোনও সাজেশন দিতে পারে? অভয়া শশব্যস্ত হয়ে বলেছিলেন, না না দরকার নেই, সকলে জেনে যাবে।

জানুক না, জেনে গেলে কী হবে? মুকুট জিগ্যেস করত শুকনো মুখে। অভয়া তার সামনে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক গলায় কথা বলার চেষ্টা করতেন। মুখে জোর করে হাসি টেনে এনে বলতেন, অসুখবিসুখ কার হয় না বল দেখি। শরীর থাকলে রোগ তো হবেই। এই যে আমার হার্টের অসুখ হল দু’বছর আগে, পেসমেকার বসাতে হল সে কারণে। আমি কি মরে গেছি? এটুকু বলেই ঢোক গিলতেন অভয়া। কথাগুলো এলোমেলো হয়ে যেত। অন্য ঘর থেকে স্বস্তিশোভন এসে দাঁড়াতেন। হাসার চেষ্টা করতেন। মুখে হাসি ফুটত না। বাবা-মায়ের আমতা আমতা কথা বলা, ঢোক গেলা থেকে মুকুট সব বুঝতে পারত। সঅব।

একদিন হাসপাতালে মুকুটের পাশে এসে বসেছিল একটা মেয়ে। একেবারে পরির মতো দেখতে। মাথা ওড়নায় ঢাকা। কপাল ঢেকে কানের পাশ দিয়ে সেটা আলগোছে গলায় জড়ানো। এমন সাজে আর কেউ ছিল না। সকলের মাথাতেই রুমাল বাঁধা। কেউ কেউ টুপি পরেছে। এই মেয়েটার নাক অবধি মাস্ক। মুকুট কৌতূহলী হয়ে জিগ্যেস করেছিল, তোমার কেমো হয়ে গেছে? মেয়েটা মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছিল। কী সুন্দর টানাটানা দুটো চোখ। কী ঘন কালো ভুরু। কোনও নাটক বা সিনেমা হলে রূপকথার রাজকন্যার বেশে কী সুন্দর মানাবে ওকে। এই মিষ্টি মেয়েটার এমন অসুখ! মেয়েটা দুর্বল গলায় বলেছিল, আমার নাম রিয়া। ব্লাড ক্যানসার হয়েছে আমার।

আলাপ হয়ে গিয়েছিল রিয়ার সঙ্গে। সন্তোষপুরে বাড়ি। একটা কলেজে পার্টটাইম লেকচারার সে। ছোট একটা বাচ্চা আছে। দু’বছরের। মুকুট ঢোক গিলে বলেছিল, খুব কষ্ট হয় তাই না? রিয়া আশ্বাস দিয়েছিল, তোমার তো সবে প্রথম স্টেজে ধরা পড়েছে। তুমি ভালো হয়ে যাবে দেখো। অত চিন্তার কিছু নেই। মুকুটের মুখ থেকে কথাটা আলটপকা বেরিয়ে গিয়েছিল, তোমার তুলনায় আমি তাহলে লাকি তাই না? কথাটা বেফাঁস বলেই লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিল মুকুট। নিজের স্বার্থপরতার জন্য আত্মধিক্কার দিচ্ছিল নিজেকে। মুকুট লক্ষ করেছিল রিয়ার মুখে পাতলা সরের মতো একটা বিষাদের ছায়া পড়ল। ম্লান হেসে মাথা নেড়ে বলেছিল, হ্যাঁ তুমি সত্যিই লাকি।

হসপিটাল চত্বরে আলাপ হল বহু মানুষের সঙ্গে। ব্রেন টিউমার হওয়া আঠারো বছরের হকার ছেলে নেপাল, রান্নার কাজ করা গীতাদি, জলপাইগুড়ির এক হোটেলের মালিক অমরনাথ কুন্ডুর সঙ্গে দোস্তি হল মুকুটের। হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরত সন্ধেবেলা। শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকত জানলার ধারে। নীচে কম্পাউন্ডে বাচ্চারা ক্রিকেট খেলছে। প্রেমিক প্রেমিকা ঘুরে বেড়াচ্ছে রাস্তায়। বৃদ্ধরা বেরিয়েছেন হাঁটতে। অনতিদূরের লাফিং ক্লাব থেকে ভেসে আসছে হো হো হাসির আওয়াজ। মুকুটের চোখে জল আসত। বুকের মধ্যে ঘনিয়ে আসত অভিমান। জীবনের জলসাঘরে ঝাড়লণ্ঠন জ্বলছে। অথচ এই উত্তাল উৎসবে সামিল হওয়ার গেটপাস নেই তার।

এখন ভাবতে লজ্জা হয়, সেই সময়টায় স্বস্তিশোভন আর অভয়াকে দেখেও তার মনের মধ্যে ঈর্ষা গোপনে বিলি কাটত। মনে হতো, এঁরা তো বহু দিন বেঁচেছেন। কত বেশিদিন পৃথিবী দেখেছেন। এঁরা তো সুস্থ। তাহলে তাকেই বেছে বেছে কেন ফাঁসির আদেশ দিলেন ঈশ্বর? বাবা-মা তার জন্ম দিয়েছেন। বড় করেছেন। তাকে কত ভালোবাসেন। কিন্তু তাঁরাও তো পারলেন না তার অসুখটাকে নিয়ে নিতে। পরক্ষণেই একটা ঝাঁকি খেয়ে ফিরে আসত সচেতনতা। মনে হতো, ছিঃ তার হল কী! এসব কী হাবিজাবি ভাবছে সে! তখন মুকুটের রাগ গিয়ে পড়ত ঈশ্বরের ওপর। এত লোক থাকতে তার সঙ্গেই কেন ওপরওয়ালার এত নিষ্ঠুর আচরণ? কী দোষ করেছে সে?

অনকোলজিস্ট রঞ্জন রায়চৌধুরি প্রথমদিন যত্ন করে দেখেছিলেন মুকুটকে। মাথা গুঁজে মগ্ন হয়ে দেখছিলেন সব রিপোর্ট। মাথা তুলে গলায় মমতা আর স্নেহ মাখিয়ে বলেছিলেন, তোমার টেস্ট রিপোর্টস খুঁটিয়ে দেখেছি। ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই। মুকুট একটা ভারী শ্বাস বাতাসে মিশিয়ে দিয়ে বলে ফেলেছিল, স্যার আমার চুলের কী হবে?

ডক্টর রায়চৌধুরি রিপোর্টগুলি দেখছিলেন। অন্যমনস্ক চোখ তুলে বলেছিলেন, কী বললে? আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। মুকুট আবার বলেছিল, স্যার, আমার চুল কি সব ঝরে যাবে? পড়ে যাবে সব চুল? ডক্টর রায়চৌধুরি ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বলেছিলেন, হ্যাঁ পড়ে যাবে। তবে চিন্তার কিছু নেই। সব আবার নতুন করে গজাবে। তাছাড়া জীবনের থেকে কি চুল বেশি জরুরি? ক’দিন আগেই মুকুট বিউটি পার্লার থেকে শখ করে ব্লিচ করিয়ে এনেছিল তার ঘন কালো চুল। সেই চুলগুলো তাহলে উঠে যাবে এখন? কিন্তু আর চুলের কথা না বলে মুকুট বলেছিল, আমি কি বাঁচব না স্যার? ডক্টর রায়চৌধুরি বলেছিলেন, আমি কি সে কথা একবারও বলেছি?

মুকুট ডুবে যেতে থাকে গভীর থেকে আরও গভীর অন্ধকারে। ডাক্তারের ওপর অবুঝ রাগ হতে থাকে। মনে হতে থাকে তিনি কেন বললেন, ‘আমি কি সে কথা একবারও বলেছি?’। কেন বললেন না যে, ‘আমি অনকোলজিস্ট ডক্টর রায়চৌধুরি, আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি যে, তুমি বাঁচবে। যমের বাপও তোমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না’। তাহলে কি তার শেষের সময় চলে এসেছে? মুকুট ঘুরপাক খেতে থাকে অন্ধকার এক ছায়াসরণিতে।

বায়োপসি করার সময় ওটিতে ডাক্তারের সঙ্গে ছিল দু’জন অ্যাসিস্ট্যান্ট। দুজনেই অল্পবয়সি। একটি ছেলে। অন্যটি মেয়ে। বিশেষ ধরনের যন্ত্র, যা অনেকটা বন্দুকের মতো, তা দিয়ে তুলে আনতে হবে ভেতরের টিস্যু। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে সে ফোটাতে পেরেছিল সেই যন্ত্র। মুকুট কেঁপে উঠেছিল যন্ত্রণায়। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল তার শরীর। যে নার্স ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন সামনে তাঁর মুখটা অনেকটা অভয়ার মতো। মুকুটের দিকে ঝুঁকে পড়ে জিগ্যেস করেছিলেন, তোমার বিয়ে হয়নি, তাই না?

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘রূপালি মানবী’ মুকুটের খুব প্রিয়। কবিতাটি পড়ে যে চিত্রকল্প তার মনে আঁকা হয়ে যায় তা হল বর্ষামেদুর এক শ্রাবণে এক প্রেমিক পুরুষ কাছে পেতে চাইছে কোনও রূপালি মানবীকে। সেই রহস্যময়ীকে কাছে পাবার আকুতি ধরা পড়েছে কবিতাটিতে। মুকুটের ভাবতে ভালো লাগে, তাকেও এমন করে আকাঙ্ক্ষা করে কেউ। সে এক রূপালি মানবী। সাধারণ হয়েও সাধারণ মেয়ে সে নয়। ভিড় থেকে আলাদা। সে এত সহজে হাল ছাড়বে না। তার তো লম্বা জীবন পড়ে আছে সামনে। মনের মানুষের সঙ্গে দেখাই হল না এখনও। মুকুট জানে একদিন না একদিন সাদা ঘোড়ায় চেপে তার স্বপ্নের রাজপুরুষ তার কাছে আসবে ঠিক। স্মিতমুখে বাড়িয়ে দেবে হাত। মুকুট মনে জোর আনে। নিজেকে বোঝায় বারবার, এই সংকট কেটে যাবে ঠিক। কাটিয়ে উঠতেই হবে তাকে।

হসপিটালে কেমো পর্ব শুরু হবার আগের দিন শুধু ফোন আসছিল আত্মীয়স্বজনদের। সকলেই যে যার মতো করে তাকে অভয় দেবার চেষ্টা করেছিল। সকলেই বলেছিল, তুই কি বোকা নাকি? ব্রেস্ট ক্যানসার আজকাল একটা রোগ হল! ক্যানসারের চিকিৎসা কত আধুনিক হয়ে গেছে এখন তা জানিস? এবেলা কেমো নিয়ে ওবেলা লোকে অফিস করে। এখন যত টেনশন করছিস কেমো নিতে গিয়ে দেখবি, এই সময়টার কথা ভেবে তোর নিজেরই হাসি পাবে।

কেমোর সময় চ্যানেল করতে গিয়ে সিস্টার তিনবার সুচ ফুটিয়েছিল। মুকুটের ভেন নাকি খুব সরু। সরু ভেন বলেই কি না কে জানে, একটু পরে হাতে ব্যথা শুরু হল। নতুন করে বানানো হল চ্যানেল। সাত ঘণ্টা ধরে কেমো চলার পর বাড়ি ফিরে আসত মুকুট। ভেতরে তীব্র একটা বমি বমি ভাব। সারা শরীর জুড়ে ঝিমঝিম ভাব। বাড়ি ফিরে আসার পর কেমন একটা হ্যালুসিনেশন শুরু হতো। এক চামচ ভাত চিবোনোর ক্ষমতা থাকত না। মনের সমস্ত জোর হাওয়ায় উবে যেত। মুকুট মুখে শুধু একটা কথাই বলতে পারত, কষ্ট, বড্ড কষ্ট।

স্বস্তিশোভন আর অভয়া ঘনিয়ে আসতেন মেয়ের কাছে। গভীর মমতায় বলতেন, কোথায় কষ্ট হচ্ছে রে? মুকুট তন্দ্রাচ্ছন্ন গলায় বলত, জানি না, বলতে পারি না। সত্যিই মুকুট বুঝতে পারছিল না কষ্টটা আসলে ঠিক কোথায় হচ্ছে। তবে এটা ভালো করেই বুঝতে পারছিল যে, সে একটা গভীর কালো অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়েছে। এই টানেল কত বড় তা জানা নেই, কিন্তু মুকুট জানত তাকে পেরোতে হবে দীর্ঘতম এক কষ্টের পথ।

প্যাংকুটুদা দেশলাই কাঠি দিয়ে কান খোঁচাতে খোঁচাতে বলল, সিঁধকাঠি নিয়ে গেরস্তবাড়িতে চুরি করা আমাদের সনাতন ঐতিহ্য। বাসে ট্রেনে পকেটমারকে হাতেনাতে ধরে ফেলে গণধোলাই দিতেও চোখে পড়ে প্রায়ই। কিন্তু এসব নিম্নস্তরের বিদ্যা। মহাবিদ্যা ব্যাপারটা কিঞ্চিৎ আলাদা।

প্যাংকুটুদার কথা শুরু করার এই স্টাইলটার সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত রঙ্গিত। কথা বলে সহজেই মনোযোগ কেড়ে নিতে পারে লোকটা। রঙ্গিত হাসতে হাসতে বলল, তাই বুঝি? তা সেই মহাবিদ্যা ব্যাপারটা ঠিক কীরকম?

রানি রাসমণি বাজারের পেছনদিকটায় প্যাংকুটুদার বাড়ি। পিসেমশাই মারা গেছে কয়েক বছর হল। পিসির সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়ে যাবার পর এখন চলার ক্ষমতা নেই। বিছানাতেই শুয়ে থাকে সারাদিন। প্যাংকুটুদা এখনও বিয়ে-থা করেনি। কেউ বিয়ের কথা বললে হাসে মুচকি মুচকি, এড়িয়ে যায়। রাজনীতি নিয়েই পড়ে আছে চব্বিশ ঘণ্টা। তার এই পিসতুতো দাদাটি মেধাবী ছাত্র ছিল। দাপুটে জেনারেল সেক্রেটারি ছিল ছাত্র সংসদের। টিশার্টের বুকে থাকত চে গুয়েভেরার ছবি। ভালো এক্সটেম্পোর করত, ডিবেট কমপিটিশনে প্রাইজ ছিল বাঁধা। পরে ঘটনার প্রবাহে প্যাংকুটুদা দল বদলে চলে গিয়েছে অন্য রাজনৈতিক শিবিরে। ভোটের সময় চিংড়িঘাটা থেকে শিয়ালদা বাড়ি বাড়ি ঘুরেছিল সেই দলের প্রার্থীর সঙ্গে। সেই খাটাখাটনির ডিভিডেন্ড পেয়েছে। সেই ক্যান্ডিডেট এখন মন্ত্রী। আর প্যাংকুটুদা সেই মন্ত্রীর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট।

প্যাংকুটুদা বলল, একটা বাইক তো কিনেছিস। ড্রাইভিং লাইসেন্সও নিশ্চয়ই করিয়েছিস? সরকারি ফিজ যা আছে তার সঙ্গে বাড়তি কিছু টাকাও গ্যাঁট থেকে খসাতে হয়েছে তোকে, তাই তো? ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ডেটা স্ট্যাটিস্টিকস কী বলছে জানিস? শতকরা বিরানব্বই শতাংশ ভারতীয় কোনও না কোনও সময় ঘুষ দিয়েছেন, বা খেয়েছেন। অর্থনৈতিক দিক থেকে আমাদের দেশ অনেক ওপরে হলেও সততার হিসেবে আমাদের আসন অনেক নীচে। ডিজঅনেস্টি আর কোরাপশনের জন্য যেসব দেশ বহু নিন্দিত সেই চিন আর রাশিয়ার কাছাকাছিই বলা যায়। অথচ প্রথম বিশ্বের বহু দেশে কেনাকাটা কিংবা লেনদেন খুব স্বচ্ছ। ট্যাক্স পে করার ঝামেলা নেই। সেসব জায়গায় বিনা হ্যাঙ্গামে তুই বাড়ি কিনতে পারিস, গাড়ি বিক্রি করতে পারিস, সম্পত্তি ভাগ করতে পারিস, সরকারি বা বেসরকারি ফি দিতে পারিস।

রঙ্গিত সায় দিয়ে বলল, আমাদের দেশে জটিল কুটিল সব নিয়ম। আর সেই নিয়ম লেখা থাকে এমন আইনি ভাষায় যা পড়লে মানেই বোঝা যায় না। সেই নিয়মগুলো প্রয়োগ করেন এমন সব মানুষেরা যাদের ক্ষমতা সাংঘাতিক হলেও সেই নিয়মগুলো অ্যাপ্লাই করার সদিচ্ছা নেই। মুশকিল হল সবকিছুর মাথার ওপর রয়েছে কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত পলিটিশিয়ান। তাদের আবার মদত দিচ্ছে কিছু মাল্টি মিলিয়নেয়ার বিজনেসম্যান। সব মিলিয়ে একটা বিদঘুটে কালচার।

প্যাংকুটুদা মাথা নেড়ে বলল, অথচ দ্যাখ এত কিছুর পরও মিডিয়া চুপ করে আছে। তারা গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। মানুষ আশা করে যে, এই সব দুর্নীতিপরায়ণ লোকগুলোর মুখোশ টেনে খোলার দায়িত্ব নেবে তারাই। কোরাপশন বন্ধ করার উদ্যোগ নেবে মিডিয়া। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা! তাদের একাংশ এখন পেইড নিউজ ছাপে, বেশির ভাগ লোক সেটা বুঝতে পারে না।

রঙ্গিত দেখছিল তার এই কাজিন দাদাটিকে। প্যাংকুটুদার চোখ দেখলেই বোঝা যায় এই লোক বুদ্ধি ধরে। প্যাংকুটুদা ড্রয়ার টেনে একটা বিড়ির প্যাকেট বের করল। সেই কলেজ জীবনে বিড়ির নেশায় মজেছিল। এখন সিগারেট ধরলেও বিড়ি পুরোপুরি ছাড়েনি। একটা ফোনকল এল এই সময়। হুঁ-হাঁ করে প্যাংকুটুদা কথা বলতে থাকল কারও সঙ্গে। রঙ্গিত অপলক চোখে দেখছিল প্যাংকুটুদাকে। তার এই দাদা দুনিয়ার খবরাখবর রাখে। কথা বলার ঢং ইন্টারেস্টিং। স্বরের উত্থান পতন দিয়ে শ্রোতার মনোযোগ কেড়ে নিতে পারে সহজেই। দু-চারটে কথা বললে বোঝা যায় মানুষটার পড়াশোনা আছে। শুধু কথা বলেই সম্মোহিত করে দেবার ক্ষমতা রাখে লোকটা। মন্ত্রীর পার্সোনাল সেক্রেটারি হয়েও আচার আচরণ একেবারে সাধারণ। বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না সে কতটা ক্ষমতাশালী।

ফোনটা পকেটে রেখে প্যাংকুটুদা পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে এসে বলল, ঘুষই এখন কালচার। সকলেই এক্সট্রা-র প্রত্যাশী। এটা অনেক জায়গায় নিয়ম হয়ে গেছে যে, নিজের সঞ্চিত প্রভিডেন্ড ফান্ড থেকে টাকা তুলতে গেলেও নির্দিষ্ট টেবিলের লোককে দিতে হবে তার প্রাপ্য এক্সট্রা। ডাক্তারের কাছে গেলে তোকে নগদ টাকা দিতে হবে, যার রসিদ তুই পাবি না। ডাক্তার যখন বাড়ি কিনবেন তখন তাঁকে অনেকটাই দিতে হবে কাঁচা টাকায়। বাড়ি-বিক্রেতা যখন আয়কর দিতে যাবেন তখন দপ্তরের কোনও প্রতিনিধিকে দিতে হবে মাল্লু। এসব চলছে যুগ যুগ ধরে, কিন্তু আসলে নষ্ট হচ্ছে সমাজ। রাজনৈতিক দলগুলো ক্রিমিনালদের প্রশ্রয় আগেও যে দিত না তা নয়, তবে এখন তার বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। ভদ্রলোকের বড় দুর্দিন, ছোটলোকের বাড় বেড়েছে এখন।

এর ফলে ঠকছে সমাজের তলার দিকের শ্রেণি। যারা খেটে খাওয়া গরিব লোক। বাড়ছে চুরিডাকাতি। সাধারণ মানুষের মধ্যে কালো টাকা নিয়ে বিদ্বেষ বাড়ছে সে কারণেই। রঙ্গিত বলল।

প্যাংকুটুদা বলল, দেশে কত কোটি লোক একবেলা খেয়ে থাকে জানিস তো? লোকের হাতে টাকা নেই বলে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো গ্রাম থেকে ভাড়া করে হাজার হাজার লোককে মিছিলে নিয়ে যায়। এর থেকে নির্লজ্জ ভণ্ডামি আর কিছু হতে পারে না। কালো টাকা ছাড়া আমাদের রাজনীতির চাকা ঘুরবে না। বহু লোকের ধারণা যে, যারা কালো টাকা উপার্জন করে তারা নোটগুলো টিনে পুরে খাটের তলায় লুকিয়ে রাখে। নোট বাতিল হলে সেই পাপের সঞ্চয় অকেজো হয়ে যাবে। কিন্তু কালো টাকা তো বিছানার তোশকের তলায় রাখে না কেউ। বেনামে ইনভেস্ট করে রাখে জমি-বাড়িতে। রাঘববোয়ালেরা রাখে সুইস ব্যাংকে। যাক গে, কাজের কথায় আয়। কী কারণে এসেছিস বল।

রঙ্গিত বলল, ফোনে তোমাকে সব বলেছি। বুঝতেই পারছ কীরকম ফ্রাস্ট্রেশনের মধ্যে আছি। আমার একটা চাকরি চাই প্যাংকুটুদা। তুমি একটু দ্যাখো।

কাজের মহিলা চা দিয়ে গেছে দু’কাপ। প্যাংকুটুদা চায়ের কাপে চুমুক দিল। সন্ধানী দৃষ্টিটা রঙ্গিতের মুখের ওপর বিছিয়ে বলল, চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাইছিস কেন? দিব্যি তো আছিস। সকালে অফিস যাস। কাজ যতটুকু না করিস তার থেকে মোবাইলে গেম খেলিস বেশি। ফেসবুক ইনস্টাগ্রাম তো আছেই নিজেদের মধ্যে খোসগপ্পোও আছে। তোদের অফিসে তো শুনি কফিশপও আছে। বইয়ের দোকানও আছে। তেষ্টা পেলে হাতের কাছে পানশালাও আছে। বিয়ার-টিয়ার খেয়ে আসা যায় টুক করে। তাহলে সমস্যাটা কী?

রঙ্গিত শুরু থেকে শেষ অবধি বলল। প্যাংকুটুদা মন দিয়ে শুনল। একটু চুপচাপ। বিড়িটা ফেলে দিয়ে এখন দেশলাই কাঠি দিয়ে কান খোঁচাচ্ছে নিবিষ্ট মনে। আধবোজা চোখে বলল, ম্যাকমিলান গ্রুপের নাম শুনেছিস?

রঙ্গিত বলল, নামটা চেনা চেনা লাগছে।

প্যাংকুটুদা বলল, ওদের বেশ কিছু চা বাগান আছে আসাম আর ডুয়ার্সে। ওরা অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার রিক্রুট করছে যতদূর জানি। তুই রাজি থাকলে একবার বলে দেখতে পারি।

কী কাজ করতে হয় সেখানে? কিছুই তো জানি না। আর ইয়ে বলছি যে, ওখানে গিয়ে কি খাম হয়ে যাব? বাড়ি ফিরতে পারব না?

প্যাংকুটুদা বলল, খাম বা এনভেলপ কিছুই হবি না। দু’মাসে একবার বাড়ি আসতে পারবি। মাইনে যে হাতিঘোড়া পাবি তা নয়। তবে ধৈর্য ধরে কয়েক বছর উইকেটে টিকে থাকতে পারলে প্রোমোশন পেয়ে যাবি। উঠবি আরও ওপরে। একদিন পুরোদস্তুর ম্যানেজার হয়ে যাবি। তখন আর পায় কে! এবার ভেবে দ্যাখ কী করবি।

অত ভাবাভাবির কিছু নেই। ভিখিরির আবার চয়েস কী? চাকরিটা আমি করব।

ঠিক আছে তুই বাড়ি যা, আমি দেখছি কী করতে পারি। প্যাংকুটুদা বলল আনমনা গলায়।

কপাল ঠুকে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট জায়গায় চলে গিয়েছিল রঙ্গিত। জনা তিরিশেক ক্যান্ডিডেট হাজির ছিল। ইন্টারভিউ যিনি নিচ্ছিলেন সেই গোপাল কৃষ্ণমূর্তি জানতে চেয়েছিলেন, অভিষেক চক্রবর্তী আপনার নিজের দাদা? রঙ্গিত বলেছিল, আমি ওর কাজিন ব্রাদার। ভদ্রলোক বলেছিলেন, মিস্টার চক্রবর্তী ফোন করেছিলেন আমাকে। কিন্তু আপনি একজন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে চা বাগানে চাকরি করতে চাইছেন কেন। আপনার জায়গা তো সফটওয়্যার কোম্পানিতে। চা বাগানে আপনাকে ফ্যাক্টরিতে প্রোডাকশন দেখতে হবে নয়তো সকাল সন্ধে চরে বেড়াতে হবে বাগানে। সেটা খুব টিডিয়াস জব। স্যালারিও যে খুব বেশি পাবেন তা নয়।

রঙ্গিত বলেছিল, স্যালারি যা হয় দেবেন স্যার, ওটা বড় কোনও ইস্যু নয়। কিন্তু চাকরিটা আমার চাই।

গোপাল কৃষ্ণমূর্তি পেপারওয়েটটা নেড়েচেড়ে বললেন, ওয়েল। ইন দ্যাট কেস অসমে গিয়ে আপনাকে টোকলাই ট্রেনিং নিতে হবে। ওই ট্রেনিং নিলে আপনি চা রিলেটেড ব্যাপারে এক্সপার্টাইজ করতে পারবেন। বাইরে এক ঘণ্টা ওয়েট করুন, আমি আজই একটা চিঠি করে দিচ্ছি। অফিশিয়াল লেটার। এটা নিয়ে আপনি চলে যান জোরহাট। সেখান থেকে আপনাকে ট্রেনিং নিয়ে আসতে হবে।

রঙ্গিত খানিক থতমত খেয়ে বলল, জোরহাট গিয়ে কী করতে হবে আমাকে?

আপনি জোরহাটের নির্দিষ্ট ঠিকানায় চলে যাবেন, ট্রেনিং অ্যাটেন্ড করবেন। কোম্পানি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করবে। থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্তও আমরাই করব। ট্রেনিং শেষ হলেই জয়েনিং লেটার পেয়ে যাবেন। আপনার দাদার কাছে আমি অনেকগুলো ব্যাপারে গ্রেটফুল। তিনি যখন রেকমেন্ড করেছেন তখন...। বাই দ্য ওয়ে ডুয়ার্স যেতে কোনও আপত্তি নেই তো? ভদ্রলোক হাসিমুখে জানতে চাইলেন।

রঙ্গিত বলেছিল, নো স্যার, নট অ্যাট অল স্যার।

গোপাল কৃষ্ণমূর্তি বলেছিলেন, ডুয়ার্সে ম্যাকমিলান গ্রুপের চা বাগান হল মেঘদুয়ার টি এস্টেট। মিস্টার মুখার্জি সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে চার্জ নেওয়ার পর বাগানের প্রোডাকশন বেড়েছে। ওখানে আরও একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ডেপ্লয় করতে চাইছে ম্যানেজমেন্ট। মালবাজার থেকে ল্যাটারাল রোড ধরে খুনিয়া মোড়ের দিকে যেতে পথে পড়ে চালসা। চালসা থেকে একটু উঠে মেটেলি। তারও কয়েক কিমি ওপরে মেঘদুয়ার টি এস্টেট। জায়গাটা ভ্যালির মতো বলে টুরিস্টদের আনাগোনা লেগে থাকে। বাগানে আপনি আলাদা কোয়ারটার্স পাবেন, কুক পাবেন, ডমেস্টিক হেল্প পাবেন, ফুলবাগান দেখভাল করার জন্য মালি পাবেন। অসুবিধে হবার কথা নয়। একটু পজ দিয়ে কৃষ্ণমূর্তি বলেছিলেন, আর ইউ হ্যাপি?

রঙ্গিত কাঁপছিল খুশিমাখা উত্তেজনায়। রুদ্ধ গলায় বলল, ভেরি হ্যাপি ইনডিড।

রঞ্জন রায়চৌধুরির ষাট ছুঁইছুঁই বয়স। ফর্সা, ছিপছিপে বেতের মতো চেহারা। সিঁড়ি দিয়ে যেভাবে দোতলা তিনতলা করেন তা দেখে অল্পবয়সিরাও লজ্জা পাবে। রঞ্জনের চোখের মণি কালো, উজ্জ্বল ঝকঝকে। সাধু সন্ন্যাসীদের যেমন হয়। চোখের দিকে তাকালে মনে হয় ভেতরটা পড়ে নিচ্ছেন। মনের মধ্যে পাপবোধ থাকলে, কোনও অপরাধ করে থাকলে সেই দৃষ্টির সামনে দাঁড়াতে অস্বস্তি হয়। রঞ্জন একমনে মুকুটের কিছু টেস্টের রিপোর্টস চেক করছিলেন। মুখ তুলে বললেন, কী নাম আপনার চা বাগানের?

এসি চলছে। একটা ক্ষীণ শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরে। এতক্ষণ উইন্ডোগ্লাসের ওপারে মেঘলা আকাশটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন স্বস্তিশোভন। রঞ্জনের কথায় মুখ ফিরিয়ে বললেন, মেঘদুয়ার টি এস্টেট।

রঞ্জন বললেন, বাঃ বেশ কাব্যিক নাম তো বাগানটার! আমি একবার ডুয়ার্সের চিলাপাতা জঙ্গলের ওদিকে এক চা বাগানে গিয়ে থেকেছিলাম ক’দিন। বন্ধুস্থানীয় একজন ছিল তার ম্যানেজার। সাপখোপ যে কত আছে ঠিকঠিকানা নেই। একবার একটা লেপার্ড রাতের অন্ধকারে চা বাগানে চলে এসেছিল। অ্যাটাক করেছিল এক চা শ্রমিককে। লোকটার কাঁধ খুবলে দিয়েছিল। বনদপ্তরের লোক ডেকে সেই লেপার্ডকে খাঁচাবন্দি করা হয়েছিল। শুধু কি লেপার্ড, জঙ্গল থেকে হাতির পালও বাগানে মাঝেমধ্যে হানা দিয়ে যেত। ভেঙে দিত ঘরবাড়ি। সভ্যতা এগিয়েছে অনেকদূর কিন্তু চা বাগানের জীবন খুব বেশি বদলায়নি আজও। সেখানে এখনও পলিউশন ফ্রি এয়ার পাওয়া যায়। মনটাকে সতেজ করে নেওয়া যায় দু-চারটে দিন চা বাগান থেকে কাটিয়ে এলে।

স্বস্তিশোভন বললেন, আমাদের বাগানে একবার আসুন স্যার। পাহাড় নদী ঝোরা জঙ্গল সব পাবেন। ফ্লোরা অ্যান্ড ফনা-র জন্য ওদিকটা বিখ্যাত। টুরিস্টদের খুব পছন্দের জায়গা। আমি ইনসিস্ট করছি আপনাকে, একবার ঘুরে যান মেঘদুয়ার থেকে। আশেপাশে যা সাইট আছে আমার গাড়িতে চেপে সব দেখবেন। খুব ভালো লাগবে।

রঞ্জন বললেন, ইচ্ছে তো করে মিস্টার মুখার্জি, কিন্তু বোঝেনই তো আমার অবস্থা। এদিকে একেবারে জড়িয়ে আছি। কলকাতার বাইরে যেতে পারি না চট করে। আমার পেশেন্টরা আছে যে। তাদের রোগটা তো যে সে রোগ নয়, ক্যানসার, যে কোনও সময় ক্রাইসিস তৈরি হতে পারে।

স্বস্তিশোভন বললেন, জানি স্যার। তবে যদি কখনও সুযোগ সুবিধে হয়, আমাকে বলবেন। বাই দ্য ওয়ে, মুকুটকে কেমন বুঝছেন? আমার মেয়ে সুস্থ হয়ে যাবে তো?

রঞ্জন হাসিমুখে বললেন, আর্লি স্টেজে ধরা পড়েছে তো, কোনও চিন্তা নেই। ভালো হয়ে যাবে আপনার মেয়ে। রিপোর্টসও সে কথাই বলছে।

স্বস্তিশোভন বললেন, থ্যাংক গড। আচ্ছা স্যার এই যে লোকে বলে আগে ধরা পড়লে ক্যানসার সেরে যায়, সেটা কি সত্যি?

রঞ্জন বললেন, কথাটা অর্ধেক সত্যি তবে পুরোপুরি ঠিক নয়। প্রথমত, আগে বলতে কত আগে? এবং কী করে সেটা ধরা যাবে? প্রসূতিকে যেমন তার আসন্ন মাতৃত্বের অভিষেকের দিনক্ষণ আগে থেকে বলে দেওয়া যায় সেভাবে ক্যানসার আক্রান্তকে কি কখনও বলা যায় ঠিক কবে কর্কটরোগ তার শরীরে বাসা বেঁধেছে? না, যায় না। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, সেই পরিকাঠামো আজও আমাদের আয়ত্ত হয়নি।

আমি লে ম্যান, আমার কথায় রাগ করবেন না স্যার। মুকুটের স্টেজ যে আর্লি সেটা কী করে বোঝা গেল? স্বস্তিশোভন ইতস্তত করে বললেন।

রঞ্জন বললেন, আসলে ব্রেস্ট, ইউটেরাস, রেকটাম, থ্রোট, গাম এসবের ক্যানসার খুব কমই প্রথম অবস্থায় ধরা পড়ে। আর্লি স্টেজে ধরা পড়লে কোনও সমস্যা নেই। তখন তার চিকিৎসা করা যায় সাধ্য মতো। কিন্তু প্যাংক্রিয়াস, স্টমাক, ব্রেন, লাং এসব জায়গায় ক্যানসার হলে খুব মুশকিল। তবে মেডিক্যাল সায়েন্স আগের থেকে অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসেছে। আমরা এখন আগের তুলনায় রুগির খানিকটা আয়ু বাড়িয়ে দিতে পারি। রুগির কষ্ট আর যন্ত্রণা কমাতে পারি। তার জন্য চাই প্রচুর টাকা পয়সার জোর।

স্বস্তিশোভনের গলা কেঁপে গেল আবেগে। বললেন, টাকাপয়সার কথা আমি একেবারেই ভাবছি না। মেয়েকে বাঁচানর জন্য শেষ অবধি আমি চেষ্টা করব। তাতে যত টাকা লাগে লাগুক। তবে বুঝতেই পারছেন আমার আর আমার স্ত্রীর ওপর কী মানসিক ধকল যাচ্ছে।

রঞ্জন ভারী গলায় বললেন, বুঝতে পারছি ভালো করেই। ক্যানসার যে পরিবারে ঢোকে সেই পরিবারের সকলকেই একেবারে ছিবড়ে করে দেয়। এই তো সেদিন আমার কাছে এক বৃদ্ধা এসেছিলেন পাকস্থলীর ক্যানসার নিয়ে। তাঁর ছেলের সঙ্গে কথা বললাম। সে লটারির টিকিট বিক্রি করে। অভাবী পরিবার। আমি না পেরে একসময় বলেই ফেললাম তাকে, চিকিৎসা না করালে তার মা মারা পড়বে। কিন্তু চিকিৎসা করালে গোটা পরিবারটাই ধনেপ্রাণে মারা যাবে। আমার কথা শুনে বেচারির মুখ পাংশু হয়ে গেল। আমার নিজেরও খারাপ লাগল। সে রাতে আমি খেতে পারিনি।

স্বস্তিশোভন বললেন, আপনি মানুষটা অন্যরকম। আপনার মধ্যে এই যে মানবিক গুণগুলো রয়েছে তা আপনার সঙ্গে কথা বলেই বুঝতে পারা যায়।

রঞ্জন আনমনা গলায় বললেন, আজ আমার কাছে এক অল্পবয়সি ছেলে এসেছিল। ক্লান্ত চেহারা। দু’চোখের তলায় কালি। তার হাত থেকে কাগজপত্র নিয়ে দেখতে দেখতে বললাম, আপনি প্রেসক্রিপশন নিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন? বলে দিয়েছিলাম দেরি করা চলবে না, আর আপনি এলেন চার মাস পর? সে শান্ত গলায় বলল, আপনি যা ফিরিস্তি দিয়েছেন তার টাকা আমি সারা জীবনেও জোগাড় করতে পারব না। এই ক’মাস ঘুরে যা পেরেছি নিয়ে এসেছি। এতে যেটুকু চিকিৎসা হয় আপনি করুন। না হলে ছেড়ে দিন। নেহাত বিয়ে করেছি। বাড়িতে বউ আছে দু’বছরের বাচ্চা আছে। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বাঁচার ইচ্ছে এখনও যায়নি। সে কারণে আপনার কাছে আসা। কী বলব আপনাকে মিস্টার মুখার্জি, সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও ছেলেটির হা হুতাশ নেই। বাঁচার জন্য একটুও আকুলি বিকুলি নেই। তার আর্থিক দশা ভালো নয়। তবুও তার গলায় মিশে ছিল আত্মসম্মান। মর্যাদাবোধ। সারাদিনই ক্যানসার পেশেন্ট ডিল করি, তবুও আমার বুকটা দুলে উঠল। আমি তাকে একটা এনজিও-র ঠিকানা দিয়ে যোগাযোগ করতে বলে দিলাম।

স্বস্তিশোভন বললেন, ক্যানসার সারভাইভার্স কথাটা শুনি আজকাল। যে রুগি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েও কপালজোরে যমের দুয়ার থেকে ফিরে আসে তাদের বোঝায়। কিন্তু সেই সব মানুষগুলি, যাদের পরিবারে কারও ক্যানসার হয়েছে, অক্ষমভাবে নিজের সমস্ত বিত্তটুকু ঢেলে দিয়েও প্রিয়জনকে যাদের শেষ বিদায় দিতে হয়েছে, ক্যানসার সারভাইভার্স বলতে তাঁদের কথাও বোঝায় তাই না?

রঞ্জন বললেন, যাঁর ক্যানসার হয় তিনি নিজে শারীরিকভাবে যন্ত্রণা ভোগ করেন। আমি রুগিকে ঘাঁটি তার পরিবারকেও দেখি কাছ থেকে। যার রোগ ধরা পড়ল তার কথা ছেড়ে দিন, কিন্তু সেই রুগির বাড়ির লোকের দুর্দশার কথা ভাবুন। তাঁরা প্রিয়জনকে নিয়ে ক্যানসার-ভীতির সঙ্গে লড়াই করেন। এক অসম যুদ্ধে তাঁরাই হলেন পদাতিক সৈন্য। মারণরোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে কেউ জেতেন, কেউ ধনেপ্রাণে শেষ হয়ে যান। কিন্তু অনেকে মরেও মরেন না, ঘুরে দাঁড়ান নতুন করে। জীবনটাকে তাঁরা ঝালিয়ে দেখতে চান আরও একবার। এক অর্থে ক্যানসার সারভাইভার্স তাঁরাও। বাড়ির কারও ক্যানসার হলে তা পরিবারের অন্যান্য মানুষদের ধ্বংস করে দেয়। এক অসম লড়াই শেষ করে দেয় তাঁদের। মনোবল পৌঁছয় তলানিতে। টাকাপয়সা শেষ হয়ে যায়। সমাজের উচিত তাদের দিকটাও মনে রাখা।

স্বস্তিশোভন বললেন, সত্যি কথা বলেছেন স্যার। আচ্ছা আমি বলছিলাম যে, মুকুট ভালো হয়ে যাবে তো স্যার?

হোপ ফর দ্য বেস্ট। জোর করে আশার কথা আমি শোনাই না। তবে নিরাশায় ডুবে যাওয়া আমার চরিত্রের বিরোধী। মৃত্যু ধ্রুব। সৃষ্টির শর্ত তো তা-ই। বেঁচে থাকার অর্থই হল মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই। কিন্তু তাই বলে লড়াই ছাড়া যাবে না। সাপের উৎপাত যেসব জায়গায় সেখানে ঘরের চারপাশে কার্বলিক অ্যাসিড ছড়িয়ে রাখে মানুষ, সেভাবেই বাঁচতে হবে আমাদের। রঞ্জন দীপ্ত গলায় বললেন।

স্বস্তিশোভনের পছন্দ হয়েছে কথাটা। সায় দিয়ে বললেন, এটা মনের কথা বলেছেন স্যার। মৃত্যুর সঙ্গে আমাদের যুঝতে হবে সমস্ত শক্তি দিয়ে। আর সেই লড়াই আমরা লড়বও। এবং আমার বিশ্বাস, জিতবও ঠিক।

রঞ্জন বললেন, দ্যাট শুড বি দ্য স্পিরিট। যতরকম প্রতিকূলতা আছে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দেওয়াল তুলতে হবে। মুকুটকে বিপদ থেকে আগলে রাখার জন্য আপনারা যেভাবে ভালোবাসার দেওয়াল তুলেছেন তার কথাই আমি বলছি। বলছি আত্মবিশ্বাস আর বরাভয়ের প্রাচীরের কথা। হাতের কাছে যেটুকু অস্ত্র পাওয়া যাবে তা দিয়েই লড়তে হবে। সে রোগের নাম যদি ক্যানসার হয় তবুও দমে গেলে চলবে না, জারি রাখতে হবে লড়াই।

ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরোলেন স্বস্তিশোভন। বাইরে হাওয়া দিচ্ছে বেশ। গাছপালাগুলো দুলছে জোরে জোরে। রাস্তার ধুলোবালি হাওয়ার টানে ভেসে বেড়াচ্ছে। প্লাস্টিকের ছোটবড় ক্যারিব্যাগ উড়তে শুরু করেছে আকাশে। বাতাসে গরমের মাত্রা দিন দিন বাড়তে শুরু করেছে। তিনি আগে ছিলেন অসমের শিলচরে। পরে বদলি হয়ে চলে এসেছেন মেঘদুয়ার চা বাগানে। সেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়া এই গরমে। তাই এখন কলকাতার ধুলোবালি আর দূষণ সহ্য হয় না। তিনি এখন কলকাতায় মেয়ের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন কিন্তু মন পড়ে রয়েছে মেঘদুয়ারে। জেলা শাসকের সঙ্গে আজ দুপুরে মিটিং হবার কথা। তিনি বলে রেখেছিলেন জোয়ারদারকে। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার জোয়ারদার অ্যাটেন্ড করছে আজকের মিটিং। টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি মিস্টার বিশ্বাসকেও বলা আছে সব। কোম্পানিও জানে তাঁর ব্যাপারটা। কিন্তু মন মানে না। কবে যে তিনি মেঘদুয়ারে ফিরতে পারবেন কে জানে!

মুকুটের হারক্লোন ইঞ্জেকশন নেবার দিন ছিল আজ। একটু আগে তিনি আর অভয়া ফিরেছেন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে। কেমো নিলেই কাহিল হয়ে পড়ে মুকুট। সাংঘাতিক ধকল যায় শরীরের ওপর দিয়ে। মনে হয় শরীরের প্রত্যেকটা কোষে কোষে বিস্ফোরণ হচ্ছে। যন্ত্রণায় ফেটে পড়ছে মাথা। সে সময় বাবা-মায়ের পক্ষে রুগির শিয়রে বসে থাকা অসম্ভব। নিজের সন্তান এমন অসহনীয় কষ্ট পাচ্ছে সেটা না পারা যায় দেখতে, না পারা যায় মেয়েকে একা ছেড়ে চলে যেতে।

মুকুট আলো বন্ধ করে শুয়ে আছে। অভয়া ঠায় বসা মুকুটের মাথার পাশের চেয়ারটায়। স্বস্তিশোভন ড্রয়িংরুমে সোফায় বসা। টিভি চলছে। কী যে দেখাচ্ছে টিভিতে তা তিনি বলতে পারবেন না। নিজের মধ্যেই ডুবে আছেন স্বস্তিশোভন। এতটাই তন্ময় হয়ে আছেন যে, কোনও জাগতিক শব্দ বা দৃশ্য তাঁকে ছুঁতে পারছে না। সময়ের মতো গড়িয়ে যাচ্ছে সময়। কখন যে অভয়া তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন স্বস্তিশোভন বুঝতে পারেননি। অভয়া চশমার কাচ বাষ্পে ঢাকা। অভয়া কি কাঁদছিলেন নাকি চুপচুপ করে? স্বস্তিশোভন মুখ তুলে বললেন, কী হল, কিছু বলবে?

অভয়া চশমাটা খুলে হাতে নিয়ে বললেন, কী আশ্চর্য, তোমার কি খিদে পায় না? ঘড়িটা দেখেছ একবার? রাত হয়েছে অনেক। এসো, খেতে এসো।

স্ত্রীর দিকে তাকালেন স্বস্তিশোভন। অভয়ার মুখেচোখে ক্লান্তির ছাপ। চোখের নীচে কালি। মুখে বলিরেখা স্পষ্ট হয়েছে গত কয়েকদিনে। অভয়া কোনওদিনই ডাই করতে পছন্দ করেন না। প্রয়োজনও পড়েনি। এতদিন তাঁর মাথার চুলে ভেতরে ভেতরে পাক ধরলেও বাইরে থেকে বোঝা যেত না। কিন্তু মুকুট অসুস্থ হবার পর মাত্র ক’দিনেই অভয়ার মাথার সামনের দিকের বেশ কিছুটা অংশ সাদা হয়ে গেছে। স্বস্তিশোভন একটা শ্বাস গোপন করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হ্যাঁ চলো।

আচ্ছা ভায়া একটা কথা জিগ্যেস করি, রাধামাধব দত্ত লেনের বাইরে তুমি কখনও বেরোওনি তাই না? ডক্টর শর্মা মিটিমিটি হাসছিলেন।

ছোট্ট হাসপাতাল। ইন পেশেন্টের জন্য দুটো ঘর। একটা পুরুষ ওয়ার্ড। একটা মহিলাদের জন্য বরাদ্দ। সকালের রাউন্ড দিয়ে ডক্টর শর্মা এখন বসে আছেন আউটডোরে। নীল ট্রাউজার আর সাদা শার্টের ওপর সাদা অ্যাপ্রন। পায়ে কালো শু। মাথায় চুল কম। ফ্রেঞ্চকাট কাঁচাপাকা দাড়ি। হাসপাতালের কম্পাউন্ডারের নাম কাজিমল। থ্যাবড়া নাক, খুদে খুদে চোখ। চোখের আশেপাশে অজস্র পাখির পায়ের ছাপ। লোকটার বয়সের কোনও মাথামুন্ডু নেই। মুখে সবসময় একটা হাসি লেগেই আছে। কাজিমল স্টোভ জ্বালিয়ে চা বানিয়ে এনেছে। দার্জিলিং আর সিটিসি মিক্সড। চিনি কম। শব্দ না করে চা খাচ্ছেন ডক্টর শর্মা। পাশে বসে আছে রঙ্গিত।

এই বাগানে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার জনা ছয়েক। ফ্যাক্টরি দেখার ভার মহাপাত্র আর জোয়ারদারের। বাগানের প্রোডাকশনের কাজ দেখে রঙ্গিত সমেত আরও চারজন। শইকিয়া, ডিসুজা, ত্রিপাঠি আর মেরহোত্রা। ডিসুজা, ত্রিপাঠি আর মেরহোত্রা অবাঙালি। তাদের সঙ্গে ইংরেজি বা হিন্দিতে কথা বলতে হয়। ঠিক জুত হয় না। শইকিয়া আর মহাপাত্র যথাক্রমে অসম আর ওড়িশার মানুষ। বাংলা বোঝেন, তবে ভালো বলতে পারেন না। সে কারণেই জোয়ারদারের সঙ্গ তার পছন্দ। রঙ্গিত লক্ষ করেছে নাম নয়, পদবি ধরেই ডাকার চল চা বাগানে। মহাপাত্র, ডিসুজার বয়স পঞ্চাশের বেশি। অন্য অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজাররাও চল্লিশের ওপারে। সকলেই ফ্যামিলি ম্যান। বউ, ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকেন নিজের নিজের ডেরায়। নিজের ঘেরাটোপের বাইরে বেরোবার চল তেমন একটা দেখেনি রঙ্গিত। সপ্তাহে একদিন শুধু প্ল্যান্টার্স ক্লাবে গেট টুগেদার হয়। পানভোজন হয় সন্ধে থেকে। সকলে মিলে পিএনপিসি আর হই হই হয় ওই একদিনই।

অল্পবয়সি অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার এই বাগানে একমাত্র জোয়ারদার। বছরখানেক আগে বিয়ে করেছে। শ্বশুরবাড়ি জামসেদপুর। জোয়ারদারের সঙ্গে রঙ্গিতের ভাব হয়ে গেছে এর মধ্যে। সারাদিন ধরে চা-পাতা তোলার পর কুলিকামিনরা যখন নিজের ডেরায় ফিরে যায় তখন হাঁটতে হাঁটতে জোয়ারদারের সঙ্গে মেঘদুয়ার হাসপাতালে চলে আসে রঙ্গিত। ডক্টর শর্মার সঙ্গে আলাপ হয়েছে সদ্য। তিনিও অবাঙালি, তবে পশ্চিমবঙ্গে বড় হয়েছেন বলে বাংলা বলতে পারেন যে কোনও বাঙালির মতোই। বন্ধুবৎসল লোক, মাটির মানুষ বলতে যা বোঝায়। এখানে এসে সকলের সঙ্গে একপ্রস্থ গপ্পো করে সুগন্ধি চা খেয়ে ফিরে আসে নিজের কোয়ার্টারে। আজ অবশ্য জোয়ারদার আসেনি, একাই এসেছে সে।

জানলার বাইরে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো বিছিয়ে আছে চা বাগান। সেই সবুজ সমুদ্রের বুক চিরেছে পায়ে চলা খয়েরি পথ। ধুলো উড়িয়ে গলায় ঘণ্টার শব্দ তুলে ঘরে ফিরছে পোষা গোরুর পাল। হাসপাতাল লাগোয়া একটা স্থলপদ্ম গাছ। দিনের বেলা সাদা রং থাকে, গোধূলির সময় ফিকে গোলাপি হয়ে যায়। গাছে ফুল ফুটেছে অনেক। এক ফুল থেকে অন্য ফুলে হলদে একটা ফড়িং উড়ে বেড়াচ্ছে। মুখটা ফিরিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে রঙ্গিত বলল, বাউন্ডুলে বলতে যা বোঝায় তা আমি নই আবার যতটা ভাবছেন ততটা ঘরকুনোও নই।

ডক্টর শর্মা অবাক হবার অভিনয় করে বললেন, বলো কী হে! বাঙালির আবহমানকালের হলিডে ডেস্টিনেশন দিপুদা-র বাইরে আর কোথাও কখনও গেছ জীবনে? মরুভূমি ভিজিট করেছ কখনও? মেরুজ্যোতি দেখেছ?

রঙ্গিত হাসল, মরুভূমি যাওয়া হয়নি, মেরুজ্যোতিও কখনও দেখিনি ঠিকই তবে অল্পবিস্তর পাহাড় জঙ্গল সমুদ্র আমিও ঘুরেছি। আম বাঙালির মতো পুরী-দিঘা-দার্জিলিং আমারও ঘোরা হয়ে গেছে। আর ডুয়ার্সের চা বাগান আমার আগেই দেখা। টোকলাই ট্রেনিং নিতে আসামের জোরহাট গিয়ে থেকেছি মাস ছয়েক। তবে অস্বীকার করব না, মেঘদুয়ারের মতো জায়গা আমি এর আগে দেখিনি। এই বাগানের সত্যিই কোনও তুলনা নেই। রংবাহারি ফুল, প্রজাপতি, পাখি, ঝোরা, বন, নদী, পাহাড়, চা বাগানের এমন অপূর্ব কোলাজ কোথাও পাওয়া যাবে না।

ডক্টর শর্মা সায় দিয়ে বললেন, মেঘদুয়ারের আবহাওয়াও খুব ভালো। শীতে একটু বেশিই শীত পড়ে ঠিকই তবে বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসের গরমে যখন কলকাতা পুড়ে যায় তখন মেঘদুয়ারে তাপের পারদ তিরিশ ছাড়ায় না। ব্লিসফুল ওয়েদার বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই।

একজন সাপে কাটা রুগি এসেছে হাসপাতালে। মাঝবয়সি লোকটার পায়ের গোছে সাপে কামড় দিয়েছে। কয়েকজন তাকে ধরাধরি করে নিয়ে এসেছে। লোকটার মুখ শুকিয়ে আমসি। ব্যথায় নয়, ভয় পেয়ে কাতরাচ্ছে লোকটা। ডক্টর শর্মা চায়ের কাপ রেখে উঠে দাঁড়ালেন। আউটডোরে শোয়ানো হয়েছে রুগিকে। ডক্টর শর্মা সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত টানতে শুরু করলেন। রঙ্গিত লক্ষ করল, এখন তিনি একেবারে অন্য মানুষ।

এই বাগানে কিছুদিন আগে জয়েন করেছে রঙ্গিত। ডক্টর শর্মার স্নেহভাজন হয়ে পড়েছে এই ক’দিনে। সকাল আর সন্ধে দিনে দু’বার করে এই হাসপাতালে চা খেতে আসা একটা রুটিনে দাঁড়িয়ে গেছে রঙ্গিতের। ধীরে ধীরে আলাপ হয়ে গেছে সকলের সঙ্গে। এই হাসপাতালে দু’জন নার্স, একজন বীথিদি, অন্যজন অঞ্জনাদি। রঙ্গিতের সঙ্গে নিজের দিদির মতোই ব্যবহার করেন ওঁরা। অঞ্জনাদি ফিমেল ওয়ার্ডে গেছেন কী একটা কাজে। বীথিদি দ্রুত পায়ে চলে এসেছেন এদিকে। তাঁর দিকে তাকিয়ে কেজো গলায় ডক্টর শর্মা বললেন, সিরিঞ্জের মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। তার মানে যে সাপটা পেশেন্টকে কামড়েছে সেটা নির্বিষ হবার সম্ভাবনাই বেশি। আপনি একটা কাজ করুন, পেশেন্টের নাড়ির গতি দেখে নিন চট করে।

সাবধানে লোকটির পায়ের বাঁধন খুলে ফেললেন অঞ্জনাদি। পা-টা নীল হয়ে ফুলে রয়েছে। মনে হয় সাপের বিষের জন্য নয় পা-টা ফুলেছে বাঁধনের জন্য। অঞ্জনাদি লোকটির কবজি ধরে বললেন, স্যার খুব ধীরে চলছে।

ডক্টর শর্মা রঙ্গিতের দিকে তাকিয়ে বললেন, টাইমলি একে নিয়ে আসা হয়েছে ভাগ্য ভালো। একটা কথা মনে রেখো। সাপের বিষের জন্য কিছু হয় না। শক্ত করে বাঁধন দেওয়ার ফলে গ্যাংগ্রিন হয়ে যায় অনেক সময়। তখন অ্যামপুট না করে উপায় থাকে না। শহরে তবুও কিছুটা সচেতনতা এলেও আনফরচুনেটলি গ্রামের দিকে মানুষের স্নেকবাইট নিয়ে কনসাসনেস এখনও আসেনি। এসব দিকে সাপে কামড়ালে লোকে আগে ওঝার কাছে ছোটে।

বীথিদি বললেন, অথচ নাইনটি পার্সেন্ট সাপ নির্বিষ। বিষহীন সাপ কামড়ালে রোগী ওঝার কাছে গেলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু সত্যি যদি বিষধর সাপ কামড়ায় তাহলে সে লোককে বাঁচাবার ক্ষমতা ওঝাদের নেই। বরং রোগী বাঁচতে পারে যদি সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে আসা যায়।

রোগীকে দুজন ওয়ার্ডবয় এসে বেডে নিয়ে গেল। বীথিদি আর অঞ্জনাদি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ওদিকে। ডক্টর শর্মা এসে বসলেন তাঁর চেয়ারে। কাজিমলকে হাঁক দিয়ে আর এক রাউন্ড চা দিতে বললেন। রঙ্গিতকে বললেন, তোমার জব ইন্টারভিউ কলকাতায় হয়েছিল না? কে নিয়েছিলেন ইন্টারভিউ?

রঙ্গিত বলল, কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটের হেড অফিসে হয়েছিল। ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন গোপাল কৃষ্ণমূর্তি স্যার। তিনি আমাকে টোকলাই ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠিয়েছিলেন জোরহাটে। সেই ট্রেনিং শেষ করে কলকাতায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই পেয়ে গিয়েছিলাম অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। চাকরির চিঠি পেয়ে আর দেরি করিনি। পরদিনই ব্যাগ গুছিয়ে এসে পড়েছি এখানে।

কাজিমল আর এক রাউন্ড চা নিয়ে এসেছে। চায়ের গন্ধে জায়গাটা ম’-ম’ করছে। চা নিয়ে এতদিন রঙ্গিতের আগ্রহ ছিল না। বাড়িতে বা অফিসে রোজ দু-এক কাপ খেত। ব্যস ওটুকুই। কিন্তু চায়ের রাজ্যে এসে বুঝতে পারছে চা খুব সহজ জিনিস নয়। অজস্র মানুষের রুজিরুটি জড়িয়ে আছে চা শিল্পের সঙ্গে। চায়ে চুমুক দিয়ে রঙ্গিত বলল, আগে চায়ের নেশা তেমন ছিল না। দেখতে দেখতে চায়ের নেশাটা পেয়ে বসেছে আমাকে।

ডক্টর শর্মা চায়ে চুমুক দিয়ে আরামের একটা ‘আহ’ শব্দ করলেন। হেসে বললেন, চা বাগানে চাকরি করছ চায়ের নেশা না থাকলে চলবে?

রঙ্গিত আলতো চুমুক দিল চায়ে। গলায় প্রশংসা মিশিয়ে বলল, এই বাগানের সকলে আপনাকে বেশ রেসপেক্ট করে, এটা বেশ ভালো লাগে দেখতে আমার।

ডক্টর শর্মা বললেন, শহরের লোক মনে করে ডাক্তারি আর ব্রত নয়, নিছক একটা পেশা। মানুষকে টাকা দিয়ে সেই পরিষেবা কিনতে হয়। সেজন্য ডাক্তারদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা আর শহুরে মানুষের কাছে আগের মতো নেই। কিন্তু এই চা বাগানে তুমি দেখবে সেই ছবিটা অনেক আলাদা। এখানে সবাই সম্মান করে ডাক্তারকে। অঞ্জনা আর বীথিকেও ভালোবাসে আর সম্মান করে স্থানীয় মানুষ। মেঘদুয়ারের কুলিকামিনরা খুব মানে ওদের দুজনের কথা।

রঙ্গিত হেসে বলল, সে তো নিজের চোখেই দেখছি।

ডক্টর শর্মা হাসলেন, তার অন্য একটা কারণও আছে। আসলে মহকুমা হাসপাতালের ইনফ্রাস্ট্রাকচার এখনও ভালো নয়। ফলে ক্রিটিকাল রুগিকে পাঠাতে হয় মেডিক্যাল কলেজে। তার দূরত্ব অনেকটা। রাস্তাও ভালো নয়। সেখানে দালালের উৎপাত আছে। দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খুইয়েছে অনেকে। ফলে আমাদের ওপর অনেকটা নির্ভর করতেই হয় স্থানীয় মানুষকে।

রঙ্গিত বলল, আর একটা ব্যাপার আছে। শহরের ডাক্তারদের কেউ কেউ কুলিকামিনদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। সেখানে গেলে তাদের ঘুরতে হয় অনেক।

ডক্টর শর্মা বললেন, সেটা মিথ্যে নয়। এদিকের মানুষগুলো একে অশিক্ষিত তার মধ্যে টাকাপয়সা নেই। ফলে তাদের ভোগান্তির শেষ থাকে না। এসব কারণে প্রান্তিক মানুষদের চা বাগানের হাসপাতালের ওপর ভরসা না করে উপায় নেই।

রঙ্গিত নিজে অসুস্থ হয়ে কখনও হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। তবে আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবদের দেখতে অনেক সময় হাসপাতাল যেতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। এতদিন হাসপাতাল বলতে তার চোখে ভেসে উঠত পুঁজ-রক্ত-মল-মুত্র সমেত এক ভয়াবহ ছবি। পুতিগন্ধময় পরিবেশে কুকুর-বেড়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে অবাধে। ভিখিরি আর পাগল বসে আছে পাশাপাশি। দু-একজন মোদো মাতালও যে নেই তা নয়। বিল্ডিংয়ের দেওয়ালে থুতু, কফ, পানের পিক আর গুটকার দাগ। পেশেন্টের আর্তনাদ আর মৃত রুগির ঘনিষ্ঠজনের হাহাকার ভেসে বেড়ায় যেখানে।

সেই ছবিটার সঙ্গে এই হাসপাতালের একটুও মিল নেই। এমন পরিচ্ছন্ন হাসপাতাল শুধু সিনেমাতেই দেখা যায়। টিনের চাল দেওয়া লম্বা একফালি সাদা বিল্ডিং। পুরু দেওয়াল। গোল গোল থাম। সামনে মোরাম বিছানো পথ। দু’দিকে সার দিয়ে দাঁড়ানো ইউক্যালিপটাস গাছ। গাঁদা, পপি, ডালিয়া দিয়ে সাজানো সামনের চত্বর। রোগীর ভিড় নেই। নিঝুম নিস্তব্ধ চারদিক। হাসপাতাল যে এমন ঝকঝকে তকতকে হতে পারে সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

চা বাগানটাও খুব সুন্দর। সৃষ্টির সেই আদি যুগে প্রকৃতির খেয়ালে সমতল থেকে অনেকটা উঁচুতে পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠেছিল এই ভূমি। চা গাছ এমন জমিতে ভালো হয় যেখানে জল দাঁড়ায় না। রোদ যাতে না লাগে তার জন্য লাগাতে হয় শেড ট্রি। ছায়া দিয়ে প্রখর রোদের হাত থেকে চা গাছগুলিকে বাঁচাবে বলে। চা বাগানে দুটো অদৃশ্য গণ্ডি কাটা। একদিকে সাহেব, মেমসাহেব, বেয়ারা, বাবুর্চি, আয়া, মালি, ড্রাইভার। অন্যদিকে বাবুদের মহল্লা। ফুল ফল আর সবজিতে ঘেরা লাল টিনের চাল ও সবুজ কাঠের বাংলো। নাম নয়, পদবিতেই তাঁদের পরিচয়। ডিসুজা, শইকিয়া, মেরহোত্রা, ত্রিপাঠি, জোয়ারদার, মহাপাত্র…।

ওদিকে লেবারলাইন। যারা চা বাগানে পাতা তোলার কাজ করে সেই মাইলি, ফুলমতিয়া, সাইলি, মায়া, কাঞ্চি, লছমন, মাইলা, শুকরা, কালে, সায়লারা থাকে ওখানে। আর থাকে বাগানের কুলি, অফিসের কাজের লোক। রঙ্গিতের বাংলো এই অদৃশ্য গণ্ডির মাঝখানে। সবগুলো বাড়ির নকশাই হুবহু একরকম। ময়রার দোকানের ছাঁচে বানানো ‘আবার খাব’ সন্দেশ যেমন হয়। সিনিয়র ম্যানেজার মিস্টার মুখার্জির বাংলো পড়ে প্রথমেই। তার থেকে খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে পর পর সারি দেওয়া অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারদের বাংলো।

ডক্টর শর্মার বাংলো রঙ্গিতের ডেরার পাশে। তিনি আর তাঁর স্ত্রী বৃন্দা থাকেন। একমাত্র মেয়ে মনময়ূরী এমবিএ পাশ করেছে পুনে থেকে। মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। মেয়ে জামাই দুজনেই পুনের বাসিন্দা। এই হাসপাতালের দুই সিস্টার, বীথিদি আর অঞ্জনাদি দুজনে একই বাংলোর দুটো আলাদা পার্টে থাকেন। বীথিদির স্বামী অচিন্ত্যদা শিক্ষকতা করেন নাগরাকাটার ওদিকে একটা হাইস্কুলে। এই বাগান থেকে যাতায়াত করেন। অঞ্জনাদি বিয়ে করেননি। এখনও যখন একা আছেন তার মানে বিয়ের পিঁড়িতে আর বসবেন বলে মনেও হয় না।

রঙ্গিতের একজন ডমেস্টিক হেল্প আছে। ঘর ঝাড়মোছ করা, বাসন ধোয়ার কাজ সে করে। তার রান্না করার জন্য আছে এক বয়স্ক আদিবাসী মহিলা। রান্নায় ঝাল তার একটু বেশিই দেওয়ার অভ্যেস ছিল, এখন বলে বলে শুধরোনো গেছে। আর আছে দুজন মালি। ঘাস কাটে, ফুল ফোটায় তারা। এমনকী, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, একজন রাখালও আছে! তার বাংলোর পেছনে ছোট একটা গোয়ালঘরে একটা গরু আছে। রাখাল সকালে গোয়াল থেকে গরু বের করে নিয়ে যায়। বিকেলে ফিরে আসে। কিছু বলতে হয় না, রান্নাঘরে ঢুকে পাত্রে দুধ ঢেলে চলে যায়।

আগে দু’জন ডাক্তার ছিলেন মেঘদুয়ার টি এস্টেটে। ডক্টর মাইতি রিটায়ার করে ফিরে গেছেন মেদিনীপুরে তাঁর বাড়িতে। সেখানে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন এখন। দ্বিতীয় ডাক্তার চেয়ে হেডঅফিসে চিঠি চালাচালি করা হয়েছিল। কোম্পানি এখনও কাউকে পাঠায়নি। ফলে ডক্টর শর্মার ওয়ার্কলোড একটু বেশিই পড়ে গেছে।

এই হাসপাতালে রুগি আসে নানারকম। ডায়েরিয়া, পেট ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, সাপে কাটা। আজ যেমন চা খেতে এসে রঙ্গিত আঁতকে উঠল একজন আদিবাসী শ্রমিককে দেখে। মারামারি করে মাথা ফাটিয়ে এসেছে লোকটা। রক্ত বেরোচ্ছে গলগল করে। লোকটার কোনও তাপ উত্তাপ নেই। চারটে স্টিচ দিতে হল ব্রহ্মতালুতে। সুঁই ফোটাবার সময় একবারও আহ উহ শব্দ করল না লোকটা।

বিকেলে আবার অন্য ঘটনা। হাসপাতালে চা খেতে এসে রঙ্গিত দেখে ক্রিস্টোফার সোরেন নামে এক মাঝবয়সি পেশেন্টকে নিয়ে আসা হয়েছে। চা-গাছে দেওয়ার বিষতেল খেয়েছে বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া আর মারামারি করে। ডক্টর শর্মা রোগীর স্টমাক ওয়াশ করিয়ে একটা ইঞ্জেকশন দিলেন। তার পর স্যালাইন চালু করে দিতে বললেন অঞ্জনাদিকে। রঙ্গিত জানতে চাইল, কী মনে হচ্ছে? সারভাইভ করবে তো?

ডক্টর শর্মা বললেন, করে তো যাওয়া উচিত। তবে রিস্ক নেওয়া ঠিক হবে না। ঘণ্টাখানেক দেখব। বাই এনি চান্সেস পেশেন্টের কনভালশন শুরু হয়ে গেলে রেফার করে দেব মেডিক্যাল কলেজে বা মালবাজার হাসপাতালে।

রঙ্গিত বলল, রেফার করে দেবেন? কিন্তু একবার খিঁচুনি শুরু হলে তো বিপদ। এতক্ষণ ট্র্যাভেল করতে গেলে পথেই তো রুগি মারা যাবে। মেডিক্যাল কলেজ তো বহূদূর। মালবাজার হাসপাতালও কম দূর নয়। তাহলে?

অঞ্জনাদি বললেন, মরাটা অসম্ভব নয়। কিন্তু মুশকিল হল এই হাসপাতালে কোনও পেশেন্ট মারা গেলে আমাদের ওপর দিয়ে সাংঘাতিক ঝড়ঝাপটা যাবে। বিষ খাওয়া রুগি মারা গেলে তো অনেক সমস্যা। থানায় খবর পাঠাতে হবে। ইতিমধ্যেই সূর্য ডুবে গেছে। এখন ফোনাফোনি করে খবর পাঠালেও আজ আর পুলিশ আসবে বলে মনে হয় না। পুলিশ আসবে কাল সকালে। ততক্ষণ এখানেই ডেডবডি পড়ে থাকবে। এর আগে এমন হয়েছে। বাগানের কুলিকামিনরা তো অত আইনকানুন বোঝে না। তারা হুলুস্থুল শুরু করবে।

বীথিদি চলে এসেছেন কখন যেন। একটা চেয়ার টেনে বসে শুনছিলেন সকলের কথা। রঙ্গিতের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, নতুন নতুন এসব দেখছেন বলে আপনার মনকেমন করছে। আপনার কোনও ধারণা নেই পেশেন্ট মারা গেলে কী কাণ্ড হতে পারে। শান্ত হাসপাতাল চত্বরে লোকের মেলা লেগে যাবে এই পেশেন্টের যদি কিছু হয়। পোস্টমর্টেম না করিয়েই ডেডবডি নিয়ে যেতে চাইবে কিছু লোক। সেসব ঝামেলা সাধ করে ডেকে আনার কোনও মানে হয় না।

পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসা রঙ্গিত আর ডক্টর শর্মা। চায়ে একটা চুমুক দিল রঙ্গিত। ভুরু তুলে জিগ্যেস করল, অনেকদিন ধরেই কথাটা বলব বলব ভাবি। প্রশ্নটা আর করা হয় না। আপনি এই বাগানে এলেন কীভাবে?

ডক্টর শর্মা বললেন, সে এক লম্বা গল্প।

রঙ্গিত উৎসুক গলায় বলল, বলুন না। কাজ তো কিছু নেই হাতে।

ডক্টর শর্মা বললেন, আমি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। ডাক্তারি পাশ করার পর একটা নার্সিংহোমে কিছুদিন আরএমও ছিলাম। কিন্তু ওখানে এত অনৈতিক কাজ চলত যে কী বলব। বৃন্দার কাছে গজগজ করতাম। কিন্তু বাইরে মুখ খুলব কী করে? ওদের পলিটিক্যাল কানেকশন সাংঘাতিক। আমার আগে একজন বিদ্রোহী হয়েছিল, তাকে শহিদ হতে হয়েছিল। সেই নার্সিংহোমে আমার পোষাচ্ছিল না। বিবেকে কাঁটা ফুটছিল বারবার। একদিন মাথার পোকা কিলবিল করে উঠল। দুম করে চাকরি ছেড়ে দিলাম। সরকারি চাকরির জন্য অ্যাপ্লাই না করে ইন্টারভিউ দিয়ে সটান ঢুকে পড়লাম ম্যাকমিলান গ্রুপের চা বাগানের হাসপাতালে। প্রথমে ছিলাম আপার অসমে। ঘুরে ঘুরে মেঘদুয়ারে এসেছি। এখানে অনেকগুলো বছর হয়ে গেল।

রঙ্গিত বলল, এই হাসপাতালে সবরকম পেশেন্ট আসতে দেখছি। ডায়েরিয়া, পেটব্যথা, শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক, হার্ট রিলেটেড সমস্যা। কিন্তু লেবার পেন নিয়ে তেমন কাউকে আসতে দেখি না। কেসটা কী বলুন তো? আশপাশে কি কোনও এনজিও প্রসূতি সদন খুলেছে?

ডক্টর শর্মা তাকালেন বীথিদি আর অঞ্জনাদির দিকে। রঙ্গিত দেখল তাঁরা মুখের একটা ভঙ্গি করে হাসছেন। ডক্টর শর্মা বললেন, দাইমা কাকে বলে বোঝো?

দাইমা? বাড়িতে যে মহিলারা প্রসব করায় তাদের কথা বলছেন?

হ্যাঁ ঠিক তাই, হাসলেন ডক্টর শর্মা। বললেন, আমাদের এই বাগানে একজন দাইমা আছে। মাঝবয়সি মহিলা, গুণবালা তামাং তার নাম। সে নামে অবশ্য কেউ চেনে না মহিলাকে। ছেলেবুড়ো সকলেই বলে দাইমা। লেবার লাইনে যত মহিলা আছে প্রসব ব্যথা উঠলে সকলেই দাইমার কাছে ছোটে। আমাদের এই হাসপাতালে কেউই আসে না।

রঙ্গিত বিস্মিত হয়ে বলল, আপনি কোয়ালিফায়েড ডাক্তার। এখানে অঞ্জনাদি আর বীথিদির মতো দু-দুজন এফিশিয়েন্ট নার্স আছেন। ওটি-তে অপারেশন করার মতো যন্ত্রপাতিও আছে। সবচাইতে বড় কথা এই হসপিটালে ট্রিটমেন্টও ফ্রি। একটা নয়া পয়সাও লাগে না চিকিৎসা করাতে। তাহলে লোকে খামোখা কেন যায় দাইমার কাছে?

ডক্টর শর্মা বললেন, কলকাতার গন্ধ এখনও যায়নি তোমার গা থেকে। শহুরে দৃষ্টি দিয়ে দেখলে তুমি কিছুই বুঝতে পারবে না। আসলে কী জানো, অশিক্ষিত মানুষের অন্ধবিশ্বাস দূর করা সম্ভব নয়। এই চা বাগানের গরিবগুরবো মানুষজন আমাদের থেকেও বেশি ভরসা করে দাইমাকে। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য বলতে পারো। কিন্তু এটাই সত্যি। দ্য আলটিমেট ট্রুথ।

রঙ্গিত অসহিষ্ণু গলায় বলল, সেই অর্ধশিক্ষিত মহিলাকে ভরসা করার একটা গ্রাউন্ড তো থাকবে। এই দাইমা নিশ্চয়ই আপনাদের মতো সি সেকশন অপারেশন করতে পারে না?

দ্যাখো রঙ্গিত, চা বাগানের মহিলারা পরিশ্রমী হয় বলে প্রায় প্রত্যেকের স্বাভাবিক ভাবেই প্রসব হয়। সিজার করার প্রয়োজন পড়ে না। এই মহিলা যে একেবারেই কাজ জানে না তা তো নয়। নরমাল ডেলিভারির ঝুঁকি থাকলে দাইমা আগেই সেটা জানিয়ে দেয় পেশেন্ট পার্টিকে। সময় থাকতে থাকতেই তারা শহরে চলে যায়। সেভাবে মিসহ্যাপ হয় না। ডক্টর শর্মা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে একটানা বলে গেলেন।

মিস্টার মুখার্জি কি জানেন এই ব্যাপারটা?

বীথিদি ম্লান হাসলেন, বিলক্ষণ জানেন। তিনিও বহুবার আক্ষেপ করে বলেছেন যে, এই মহিলা এখানে একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তিনি আর কী করবেন। গুণবালা তামাংকে তো আর বাগান থেকে তাড়িয়ে দিতে পারেন না। বাগানের লেবারদের ভরসার জায়গা নিয়ে বসে আছে ওই দাইমা।

ডক্টর শর্মা বললেন, একশো তিরিশ কোটির দেশ আমাদের। ডাক্তার আর কতজন, এই দেশের গ্রামেগঞ্জে কোয়াক ডাক্তার আর দাইমারা ছড়িয়ে আছে লাখে লাখে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এই মানুষগুলোই ধরে রেখেছে দেশের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো। এদের কাঁধের ওপর ভর করেই চলছে দেশের গরিব মানুষ। তারা আছে বলেই আমাদের মতো মুষ্টিমেয় সংখ্যক ডাক্তাররা শ্বাস নিতে পারছি। তা না হলে সরকারি হাসপাতালের ওপর কতটা চাপ পড়ত সেটা অনুমান করতে পারছ নিশ্চয়ই?

রঙ্গিত বলল, যেখানে ত্রিসীমানায় ডাক্তার নেই সেখানে ঠিক আছে। কিন্তু এখানে যখন একটা হাসপাতাল আছে যেখানে সিজারিয়ান সেকশন অপারেশন করার একটা পরিকাঠামো আছে, সবচাইতে বড় কথা আপনার মতো ডাক্তার আর বীথিদি অঞ্জনাদির মতো পাশ করা নার্স আছেন, সেখানে স্থানীয় প্রসূতিরা কেন ওই দাইমার কাছে যাচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে? ম্যাকমিলান গ্রুপ দাইমাকে এই হাসপাতালে অ্যাটাচ করে নিলেই তো পারে। সেটা তো কোম্পানি বোধ হয় ইচ্ছে করলেই করতে পারে। তাই নয়?

কোম্পানি যোগাযোগের চেষ্টা একবার করেছিল। দাইমা সাফ বলে দিয়েছে লাখ টাকা দিলেও এখানে কাজ করবে না। তার কারণ আছে। বহু বছর আগে এই মেঘদুয়ার হাসপাতালে গুণবালা তামাংয়ের একটা ভুল অপারেশন হয়েছিল। ডিউ টু আটার নেগলিজেন্স ওই মহিলার ফ্যালোপিয়ান টিউব কেটে ফেলেছিল এক ডাক্তার। ফলে সারা জীবনেও মা হতে পারেনি মহিলা। হিউজ লস যাকে বলে। বুঝতে পারছ এবার?

বুঝতে পারছি। সেই মিসহ্যাপটাই কাল হয়েছে। সেই আনটুয়ারড ইনসিডেন্টের পর থেকেই দাইমার এই হাসপাতালের ওপর রাগ।

ঠিক তাই। তবে আমি দাইমকে দুষব না, বরং বলব মহিলার সেন্টিমেন্টের কারণটা কোয়াইট ন্যাচারাল। যে কারওরই রাগ হতো তার সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটলে।

দাইমাকে মিট করার খুব ইচ্ছে। চলুন না একদিন একটা ভিজিট করে আসি।

ঠিক আছে যাওয়া যাবে একদিন। ডক্টর শর্মা ক্যাজুয়াল গলায় বললেন।

কাল পরশু একবার যাওয়া যায়? রঙ্গিত যেন নাছোড়বান্দা এক কিশোর।

বীথিদি আর অলকাদি হাসছেন মিটিমিটি। ডক্টর শর্মা হেসে ফেলে বললেন, তুমি তো সাংঘাতিক ছেলে হে রঙ্গিত! তোমার স্বভাব দেখছি একেবারে এঁটুলি পোকার মতো। একবার কোনও কিছু আঁকড়ে ধরলে আর ছাড়ো না। আচ্ছা ঠিক আছে তোমার যখন এত ইচ্ছে তখন না হয় যাওয়া যাবে একদিন।

কাল যাওয়া যায়?

কাল হবে না, পরশু যাওয়া যেতে পারে।

রঙ্গিতের চোখেমুখে ছেলেমানুষি ঝিলিক। হেসে বলল, জোয়ারদারকে বলে রাখি তাহলে। একসঙ্গে যাওয়া যাবে’খন।

ডক্টর শর্মা হাসতে হাসতে বললেন, বলে দাও জোয়ারদারকে।

সাতদিন ধরে টানা বৃষ্টি পড়ছে।

তুমি দেখতে পাচ্ছ না

সত্যি বলতে কি,

আমিও দেখতে পাচ্ছি না

তবু পড়ছে

মন খারাপ করে দেওয়া ঝরঝর বৃষ্টি

অদৃশ্য জলে ভিজে যাচ্ছে

আমার ছড়িয়ে রাখা দু’পা

বাড়িয়ে ধরা হাতের তালু

এক ফোঁটা পড়ল

আমাদের দু’জনের ঠিক মধ্যেখানে

এসো, তাতে আঙুল ছোঁয়াই।

পৌলোমী সেনগুপ্তর কবিতা। অসময়ে চলে যাওয়া শক্তিশালী এক কবি। পৌলোমীর কবিতা মুকুটের ভালো লাগে পরিমিতিবোধের জন্য। খুব কম কথায় অনেক কথা বলতেন তিনি। পৌলোমী চলে গেছেন ক্যানসারে। সে কারণেই হয়তো এই কবির প্রতি সে তার বুকের মধ্যে নামিয়ে দিয়েছে পক্ষপাতের সিঁড়ি। এই কবিতাটা তার মাথার মধ্যে পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরছিল আজ।

বিষণ্ণ দীর্ঘ এক একটা প্রহর। মনটাকে স্থির রাখাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আগে কবিতা পড়ার পাশাপাশি একটু আধটু কবিতা লেখারও অভ্যেস ছিল। পত্র পত্রিকায় ছাপতে দেবার মতো কিছু নয়, তা ছিল লেখার খাতায় আঁকিবুকি। কিন্তু এখন সেসবের স্পৃহা নেই। তার নিজের হাত যেন তার নিজের থেকে দূরের হয়ে গেছে। দূর থেকে তার কাছে ভেসে আসছে অন্য কোনও গূঢ় অর্থবাহী শব্দ। মেঘের মতো তার মনের ভেতর ঝরে পড়ছে বৃষ্টি হয়ে।

অস্তিত্ব কী? আমাদের দর্শনে এই প্রশ্ন আজকের নয়। প্রাচীনকাল থেকেই ভাবুক মানুষের মনে জেগেছে এই জিজ্ঞাসা। আমি কে? আমি কেন? এই কথাটা মুকুটকেও ভাবিয়ে তুলত শুরুতে। একটা সময় এল যখন এই প্রসঙ্গ অবান্তর মনে হল। ধ্বংসের মধ্যে কীভাবে সৃষ্টির বীজ লুকিয়ে থাকে সেসব কথা মনে হতো তখন। আবেগের বাষ্প এসে ভিড় করত গলার কাছে। সকলের সামনে থেকে সরে আসত মুকুট। নিজের থেকেও যেন সচেতন দূরত্ব রচনা করতে চাইত।

রাতে যখন সকলে ঘুমিয়ে পড়ে, তখন চুপটি করে শুয়ে থাকত সে। ঘুম আসে না কিছুতেই। তখন সেই নির্ঘুম রাতে তার চেতনে অবচেতনে এসে ভিড় করে নানা রঙের ছবি। কিছুই তো দেখা হল না এই জীবনে। কত শহর, কত মানুষ, কত জীবজন্তু, কত পাখির উড়াল, নাম না জানা কত রঙের ফুল। রক্তের মধ্যে চারিয়ে যায় বিচিত্র সব ছবির কোলাজ যা অনাবিল সৌন্দর্য দিয়ে সাজানো। কখনও কল্পনার ছায়াপথ ধরে মুকুটের মন ঘুরে বেড়ায় অচেনা দেশের পথে পথে। ফিরে যায় ঝাপসা হয়ে যাওয়া শৈশব আর কৈশোরের দিনগুলোতে। মনে পড়ে নেপালের পাহাড়ে ঠিকরে তার মুখে এসে পড়া সকালবেলার রোদ্দুরের কথা। মারতি আর সেতি নদীর বেগবান জলধারার কথা। কুয়াশাভেজা হিমেল রাতের কথা। ফেলে আসা রৌদ্রছায়ার কথা। রাতের অনন্ত নক্ষত্রবীথির সঙ্গে উড়ে যেতে যেতে মনে মনে ভ্রমণ করে মুকুট। চোখ ভিজে যায় চোখের জলে। মনখারাপ লগ্ন হয়ে থাকে তার চেতনায়।

মুকুটের বাবা-মা নিজেদের হাসিখুশি দেখানোর চেষ্টা করেন। মুকুট নিজেও বাবা-মায়ের সামনে প্রতিনিয়ত অভিনয় করে যায় ভয়ডরহীন থাকার। সকালে যখন হাসপাতালে যেতে হয় তখন মন থেকে সমস্ত অবসাদ দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে যায়। প্রতি একুশ দিন অন্তর কেমো নিতে হচ্ছে তাকে। হার্টের পাশে কেমো পোর্ট বসানো। সেখান দিয়ে কেমো নিতে হয়। হসপিটালে যেতে যেতে মুকুটের অজস্র বন্ধু হয়ে গেছে এতদিনে। দিনহাটা, বেলাকোবা, ধুপগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ থেকে আসা বিভিন্ন বয়সি ক্যানসার পেশেন্টদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে আত্মীয়তার বাঁধন।

সিস্টার, ডক্টর থেকে ক্যান্টিনের ছেলেটা অবধি বন্ধু হয়ে গেছে কী এক ম্যাজিকে। হারক্লোন ইঞ্জেকশন নিতে হয় মুকুটকে। মহার্ঘ্য ওষুধ। চিকিৎসা চলতে চলতেই মুকুট দেখে কীভাবে লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়ে কেমোর দাম। হেলথ ইন্সুরেন্সের কোটা শেষ হয়ে যায় একসময়। মেয়ের চিকিৎসার জন্য ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে ভাঁড়ার থেকে প্রায় সবটুকু বিত্ত তুলে নেন স্বস্তিশোভন। অভয়া সোনার দোকানে বাঁধা রাখেন নিজের বিয়ের গয়নাগাটি। তবুও কুলোতে চায় না। মুকুট পাশের ঘর থেকে শুনতে পায় টাকা জোগাড় করা নিয়ে কতটা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তার বাবা-মা। মুকুট শুনতে পায় পাশের ঘর থেকে স্বস্তিশোভন চাপা গলায় বলছেন, কীভাবে কেমোর দাম বাড়ছে তুমি ভাবতে পারবে না অভয়া। যখন শুরু হয়েছিল তার দেড়গুণ দাম বেড়ে গেছে এই ক’দিনে। আমি হাল ছাড়ছি না। আমার সমস্ত সঞ্চয় শেষ হয়ে গেলে যাক, আমাদের একমাত্র মেয়েকে সুস্থ করে তোলার জন্য লড়ে যাব আমি। কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছি যখন শেষ পর্যন্ত লড়ব।

অভয়া ফিসফিস করে বলেন, আমি লকার থেকে কিছু গয়না তুলে এনেছি। সেই গয়নাগুলো বন্ধক দিয়ে দাও। প্রয়োজনে বাকিগুলোও সোনার দোকানে বাঁধা দেব। তেমন হলে বিক্রিও করে দেব। মেয়ের বিয়ের জন্যই তো রাখা আছে ওগুলো। এটুকু বলে হয়তো মেয়ে শুনে ফেলবে ভেবে চুপ করে যান অভয়া। একটুক্ষণ থেমে থেকে আবার কীসব বলতে থাকেন। টাকাপয়সা সংক্রান্ত কথা। সেসব কানে আসে না। পাশ ফিরে বড় একটা শ্বাস ছাড়ে মুকুট। ভাগ্য করে এমন বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নিয়েছে সে। ঈশ্বরের করুণা ছাড়া এমন হতে পারে না।

গভীর দুঃসময়ের মধ্যে আশার আলো দেখা যায় এবার। ঈশ্বরপ্রেরিত দূতের মতো এগিয়ে আসেন অনকোলজিস্ট রঞ্জন রায়চৌধুরি। সেদিনও একটা কেমোর ডেট ছিল মুকুটের। হসপিটাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে স্বস্তিশোভনের মুখে হাসি ফুটে উঠতে দেখেছিল সে। তার বাবা বলছিলেন, ডক্টর রায়চৌধুরি দেবতুল্য মানুষ। হসপিটালে চা খেতে খেতে লোকজনের কাছে তাঁর সুখ্যাতি শুনছিলাম। ভদ্রলোক বিপত্নীক। টাকার খাঁই নেই। গরিব পেশেন্টদের বিনে পয়সায় দেখেন। সাহায্য করেন সাধ্যমতো।

অভয়া বলেছিলেন, আগে রাশভারী বলে মনে হতো তাঁকে। কথা বলতে ভয় ভয় করত। এখন বুঝতে পারি তাঁর অন্তরটা পরিষ্কার। তার নিজের মেয়ে নেই। সে কারণেই মুকুটকে হয়তো মেয়ের মতো স্নেহ করেন।

স্বস্তিশোভন বলেন, ভদ্রলোক ইনিশিয়েটিভ নিয়ে মুম্বাইয়ের এক এনজিও-র সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তাঁর কথায় সেই এনজিও এগিয়ে এসেছে। কথা হয়েছে তাঁদের সঙ্গে। চার ভাগের এক ভাগ দামে এবার থেকে জোগাড় হয়ে যাবে ইঞ্জেকশনের খরচ। আমাদের দুশ্চিন্তা অনেকটা কমল। সবই ঠাকুরের ইচ্ছে।

প্রথম কেমোর দু’সপ্তাহ পর সমস্ত চুল ঝরে গিয়েছিল। জট পাকিয়ে গিয়েছিল কিছু। নিজে হাতে কাঁচি দিয়ে সেই চুল কাটতে চেষ্টা করেছিল মুকুট। পারছিল না। অভয়াকে ডেকেছিল তখন। হাউ হাউ করে কাঁদছিলেন অভয়া। সেই ক্লাস ফোরে শেষবার ন্যাড়া হয়েছিল মুকুট। অভয়ার নেশা ছিল বছরে একবার করে মেয়ের চুল কামিয়ে ন্যাড়া করা। জেদি মেয়ের কথায় অভয়াকে কাঁচি ধরতে হল। খবরের কাগজের ওপর ঝরে পড়তে লাগল মুকুটের কালো চুল। আয়নার দিকে নির্মোহ চোখে তাকিয়ে ছিল মুকুট। বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীর মতো লাগছিল দেখতে নিজেকে। শান্ত, বিকারহীন। স্বস্তিশোভন নিজেকে সামলে নিয়ে ছদ্ম প্রশংসা করে বলেছিলেন, তোকে তো একেবারে বাচ্চা মেয়ের মতো লাগছে দেখতে। মোবাইলে একটা ছবি তুলে রাখ সময় থাকতে থাকতে। পরে খুব হাসবি এই ছবিগুলো দেখে।

মুকুট আড়চোখে দেখে কীভাবে চোখের জল লুকোন অভয়া, কীভাবে ঘরের বাইরে গিয়ে কেঁদে আসেন চুপ করে। এভাবেই যত কেমোর সংখ্যা বাড়তে থাকে তত ঘন চোখের পাতা, গাঢ় ভুরু সব উঠে যেতে থাকে। পড়ে থাকে একেবারে ধু-ধু শূন্যতা। সারা শরীরে ক্লান্তি ঘন হতে থাকে। এক অন্তহীন অবসন্নতা গ্রাস করে মুকুটকে। আত্মীয়স্বজন দেখতে আসে তাকে। বড়রা হাসিহাসি মুখ করে বলে, আর তো মাত্র ক’টা দিন। সহ্য করে নে দাঁতে দাঁত চেপে। তারপরই তো একেবারে ভালো হয়ে যাবি। ঠাকুরের আশীর্বাদ ছিল বলেই তো আর্লি স্টেজে ধরা পড়েছিল অসুখটা! ভাগ্যিস দেরি হয়নি। দেরি হলে বড় বিপদ ছিল আমাদের।

হাসার চেষ্টা করে মুকুট। সারা দেহে চেপে বসা ক্লান্তির জন্য হাসতেও ইচ্ছে করে না। একদিন আরামবাগ থেকে সেজোমাসি এসেছিল। সঙ্গে ক্লাস ফোরে পড়া মাসতুতো ভাই বুবকা। তার দিকে দুর্বল হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল মুকুট। চাইছিল একটু ছুঁতে। বুবকা এক সেকেন্ডের জন্য হাতটা বাড়িয়েই চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। মুখটা নীচু করে সভয়ে পিছিয়ে গিয়েছিল দু’পা। মুকুটের হাতে বুবকার সেই কোমল ছোঁয়াটুকু থেকে গেল দীর্ঘক্ষণ।

তিন মাসের মাথায় অপারেশন হল মুকুটের। তার এক মাসের মধ্যে রেডিয়েশন। সব ভালোয় ভালোয় মিটে গেল। তাই ডক্টর রায়চৌধুরির কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই স্বস্তিশোভন আর অভয়ার। তাঁর হাতযশে আর ঈশ্বরের দয়ায় মুকুট এখন প্রায় সুস্থের দিকে। অন্ধকার টানেল দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একশো আশি ডিগ্রি অ্যাবাউট টার্ন করেছে মুকুট। ঘুরে দাঁড়িয়েছে মৃত্যুর মুখ থেকে। এতদিন মুকুটের শরীরের ভিতর আঁচড়াচ্ছিল কর্কট রোগ। হাত থেকে মেঝেতে পড়ে যাওয়া কালির শিশি থেকে যেমন করে কালি নিঃশব্দে ছড়িয়ে যায় সারা ঘরে তেমন করে মুকুটের শিরা উপশিরা দিয়ে শরীরের অলিগলিতে ছড়িয়ে যাবার পরিকল্পনা ছিল এই অসুখের। তাকে জব্দ করেছেন ডক্টর রায়চৌধুরি। পাল্টা মার খেয়ে সেই অসুখ ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়েছে মুকুটের শরীর ছেড়ে।

মুকুটকে এখন অবশ্য হারক্লোন ইঞ্জেকশন নিতে হচ্ছে মাঝেমধ্যে। সেটাও কেমো নেওয়ার মতোই। তিন সপ্তাহ অন্তর নেওয়ার নিয়ম। হসপিটালে যেতে হয় সে সময়। হসপিটালে নতুন নতুন বন্ধু হয়। তাদের যতটুকু পারে সাহায্য করে মুকুট। আলাপ করিয়ে দেয় ডক্টর রায়চৌধুরির সঙ্গে। সেই সব রোগীর সঙ্গে ধৈর্য ধরে কথা বলেন তিনি। কম পয়সায় বা সম্পূর্ণ বিনে পয়সায় কী করে ক্যানসারের চিকিৎসা করা যাবে তা জানান। তাঁর বরাভয় রোগীদের সাহস দেয় লড়াই করার।

মুকুটের মনে হয় যারা প্রকৃত অর্থে ট্রেকার্স, তাদের শোনিতে, অস্থিতে, মজ্জায় বাস করে এক ভিন্নতর বোধ, জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রে দুর্লঙ্ঘকে জয় করাই তার সাধনা। তার একটা সত্তা তার অবচেতনকে বোঝায় ফিসফিস করে। মুকুট, তুমি পারো না এমন কোনও কাজ নেই। এই কঠিন লড়াই জিততেই হবে তোমাকে। হারার আগে তুমি হারবে না কিছুতেই। মরার আগে মরবে না কখনও।

এই সঙ্কল্প তাকে চাগিয়ে দেয় নতুন করে। মরণের মার খেতে খেতেও মুকুট মরে না। আরও বাড়ে তার মনের জোর। চিত্রাঙ্গদা ফোন করেছিল সেদিন। কুশল সংবাদ দেওয়া নেওয়ার পর মুকুট উত্তেজিত গলায় বলে, দোস্ত, তুই রেডি থাকিস। আবার যাব আমরা ট্রেকিংয়ে। চিত্রাঙ্গদা ফোনের ওপার থেকে চুমু ছোঁড়ার চকাস শব্দ করে বলে, অফ কোর্স যাব আমরা। লাভ ইউ হানি।

মুকুট এখন এই হসপিটাল থেকে ভালো হয়ে যাওয়া বন্ধুদের সঙ্গে ফোন করে গেট টুগেদার করে। আড্ডা দেয়। এর মধ্যেই একদিন ফোন এল মোবাইলে। তাকিয়ে দেখে ফুটে উঠেছে রিয়ার নাম। সেই রিয়া, ক্যানসারে আক্রান্ত সে মেয়েটির সঙ্গে মুকুটের আলাপ হয়েছিল এই হসপিটালেই। ওপার থেকে রিয়া খুশিয়াল গলায় জানায় লাস্ট স্টেজ থেকে ফিরে এসেছে সে-ও। সামনের মাসে তার বিয়ে। পাঁচ বছর ধরে প্রেম করেছে তারা। সেই ছেলেই পাণিগ্রহণ করতে চলেছে তার। বাইপাসের ধারে একটা বিল্ডিং বুক করা হয়েছে। সেখানেই বিয়ে হবে। মুকুটের আসা চাই তার বিয়েতে। নইলে রিয়া আড়ি দিয়ে দেবে মুকুটের সঙ্গে। কথাই বলবে না সারা জীবন।

ফোন রেখে হেসে ফেলে মুকুট। পুরো পাগলি একটা! মনে মনে রিয়াকে আরও বেশি ভালোবেসে ফেলে মুকুট। পৃথিবীটাকে মুকুটের আরও সুন্দর লাগে। মনে হয় তাকে ঘুমোবার আগে আরও অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। তার অকুতোভয় মানসিকতা আর দুর্মর সাহস দেখে মরণও নিজেকে সামলে নেবে। তার লড়াই করার স্পৃহা দেখে সংযত হবে মৃত্যু। তার দিকে এগোতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়বে থমকে। সেই ফাঁকে আরও অনেকটা পথ হেঁটে নেবে সে। আরও অনেকটা পথ।

দিগন্ত ছোঁয়া থাক থাক সবুজ ঢেউ। যে দিকে দু’চোখ যায়, মাইলের পর মাইল শুধু সবুজ। অনেকটা দূর অবধি গিয়ে সেই হরিৎ সমুদ্র সটান উঠে গিয়েছে টিলার ওপর। দূরে অস্পষ্ট নীলাভ পাহাড়ের আভাস। ওপরে চাঁদোয়ার মতো খোলা নীল আকাশ। এ এক সম্পূর্ণ অন্য ভুবন। চা বাগানের মধ্যে একটা দুটো করে দেবদারু গাছ। এদের বলে শেড ট্রি। প্রখর রোদ থেকে বাঁচতে চা গাছগুলিকে ছায়া দেয় যারা। হাওয়ায় হাওয়ায় কাঁপন ধরে দেবদারুর ঝিরিঝিরি পাতায়। অনতিদূরে রয়েছে ঝাউ। ঝাউয়ের পাতায় লেগে বাঁশির মতো শব্দ তোলে শিরশিরে হাওয়া।

এই অলৌকিক দৃশ্যের মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকে রঙ্গিত। ভোর না হতেই চা বাগানের পথ দিয়ে হেঁটে যেতে শুরু করে কুলিকামিনের দল। এই দলের মধ্যে মেয়ের সংখ্যাই বেশি। নেপালি খুব অল্প, আদিবাসীই প্রায় সকলে। কষ্টিপাথরের মতো তাদের গায়ের রং। এত অভাব অনটনের মধ্যেও তাদের মুখে হাসি লেগেই আছে। মেয়েগুলি চা গাছের পাতা তুলতে তুলতে নিজেদের মধ্যে হাসি মশকরা করে। দু’পাশে সবুজ ছোপ ছোপ চা গাছগুলির পাতা থেকে মন মাতানো গন্ধ উঠে আসে। এলোমেলো করে দেয় শরীর আর মন। ভোরবেলার সূর্য যখন পুব আকাশে লাফ দিয়ে ওঠে তখন ডুরে শাড়ির আঁচল কোমরে বেঁধে পিঠে ঝুড়ি ঝুলিয়ে মেয়েদের দল লেবার লাইন থেকে বাগানের দিকে হেঁটে যায়। বাগানে গা ডুবিয়ে পাতা তোলে তারা। এদের মধ্যে একটি মেয়ে আলাদা করে চোখ টানে। এই ভিড়ের মধ্যে সেই মেয়ে একেবারেই আলাদা।

মেয়েটির চোখে দূর নীলাভ পাহাড়ের ছায়া। আষাঢ়ের মেঘের মতো গায়ের রং। চা পাতায় রোদ্দুর পড়ে যেভাবে ঠিকরে যায় এই মেয়েটির ত্বকও তেমনই মসৃণ। মুক্তোদানার মতো উজ্জ্বল তার সাদা দাঁত। মেয়েটি অকারণে হাসে, যখন হাসে তখন তার মেদহীন ছিপছিপে শরীরে থিরিথিরি কাঁপন ওঠে। সে এমনি এমনিই গান গেয়ে ওঠে আপনমনে। চা গাছ থেকে দু’টি পাতা একটি কুঁড়ি তুলতে থাকে দ্রুত হাতে। পিঠে ঝুড়ির মধ্যে বর্শার ফলকের মতো চা গাছের পাতা আর কুঁড়ি ভরতে ভরতে সে গান ভাঁজে। নির্মেদ পৃথুলা গড়নের মেয়েটির দিক থেকে চোখ ফেরানো দুষ্কর। জোয়ারদারের কাছ থেকে মেয়েটির নাম শুনেছে রঙ্গিত। সরসতিয়া। সরস্বতী থেকেই কি অপভ্রংশ হয়ে এসেছে এই নাম? কে জানে হবে হয়তো!

চা বাগানের ফ্যাক্টরির সামনে অনেকটা ফাঁকা জমি। সেখানে স্টেজ বাঁধা। কিছুদিন আগে করম পুজো হয়ে গেল এখানে। আদিবাসী সমাজের সব থেকে বড় সেই উৎসবে প্রকৃতির উপাসনায় রাতভর ধামসা মাদলের তালে তালে চলে নাচ। চলে আমোদ প্রমোদ, গাওয়া হয় গান। ছোট থেকে বড়, নাচে গানে এক অন্য পরিবেশ তৈরি হয় সে সময়। নিজেদের দুঃখ কষ্ট ভুলে সকলেই মেতে ওঠে আরাধনায়। এই বাগানে আসার পর জোয়ারদারের সঙ্গে সখ্য হয়েছে। তার কাছ থেকে রঙ্গিত জেনেছে এদিকের বাগানগুলোতে এতদিন যা হাজিরা ছিল এখন তা বেড়েছে খানিকটা। কিন্তু চাল ডাল তেল নুন সবজির দাম যেভাবে বেড়েছে তাতে এত কম টাকায় সংসার চালানো মুশকিল। বড় কষ্ট করে বেঁচে থাকে চা শ্রমিকেরা। তাদের যন্ত্রণার কথা শহর অবধি পৌঁছয় না।

জলপাইগুড়ির কাছে রায়পুর চা বাগানে জোয়ারদার কাজ করত। সেই বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জোয়ারদার ভাগ্য খুঁজতে গিয়েছিল দার্জিলিং লাগোয়া রংলি রংলিওটে। সেখানে কিছুদিন থেকে এসেছে মেঘদুয়ার টি এস্টেটে। এই বাগান খুব ছোট নয়। এখকানে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারদের কাজের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া আছে। জোয়ারদার আর মহাপাত্র দেখে ফ্যাক্টরির কাজ। জনা চারেক অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের সঙ্গে রঙ্গিত ফিল্ডে কাজ করে।

জোয়ারদার আর রঙ্গিত বাইক চালিয়ে আসছিল। দু’দিকে চা বাগানের বিস্তার, মাঝখান দিয়ে চলে গেছে এক চিলতে পথ, কোম্পানির দেওয়া মোটর সাইকেল চালিয়ে সেই পথ দিয়ে বাগানের কাজ দেখতে হয় রঙ্গিতকে। জোয়ারদার ফ্যাক্টরির কাজ দেখে। কাজের সূত্রে ফ্যাক্টরির বাইরে তার যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। রঙ্গিতের দরকার হয় না ফ্যাক্টরির ভেতর ঢোকার। কিন্তু একদিন তাদের দুজনেরই সিনিয়র ম্যানেজার হবে প্রমোশন পেয়ে। তাই একজন অন্যজনের ডিপার্টমেন্টের কাজের গতিপ্রকৃতি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করে। আজ যেমন রঙ্গিতের সঙ্গে জোয়ারদার গিয়েছিল কুলিলাইনের দিকে। বেলা হয়ে গেছে বেশ। ফিরছিল এখন। আশ্বিনের আকাশ জাদু জানে। এই সময়ের বাতাসের মধ্যেও একটা জাদু আছে। ধুপধুনো আর কেমন মন ভালো করা পুজো পুজো গন্ধ ভেসে আসে নাকে। বাইক দাঁড় করাল রঙ্গিত। একটা সিগারেট নিজে ধরাল, মুখ খোলা প্যাকেটটা জোয়ারদারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, দুর্গাপুজো হয় না এই বাগানে?

এই বাগানের অবস্থা তুলনায় ভালো, তাই ফি বছর পুজো হয়। কিন্তু এদিকের বেশির ভাগ বাগানেই আগে ধুমধাম করে দুর্গাপুজো বা কালীপুজো হলেও এখন আর পুজো হয় না।

কেন?

বহুদিন ধরেই এসব বাগানের কাজ প্রায় বন্ধ। ধুঁকে ধুঁকে চলছে বাগানগুলো। পেটের টান এদিকের মানুষের প্রতিদিনের সঙ্গী। গতকাল বিন্দিয়া আর ফুলমতিয়ারা একশো কেজি করে পাতা তুলেছে। সেজন্য মজুরি ছাড়াও ওদের অতিরিক্ত একশো টাকা দেওয়া হয়েছে। বিন্দিয়াকে জিগ্যেস করেছিলাম, কী করবে ওই টাকা দিয়ে। বলল, বাচ্চাটাকে একটা জামা কিনে দেবে। আমরা এদের বেঁচে থাকার কষ্টের কথাটা ভাবতেও পারি না।

মেঘদুয়ার চা বাগানে তো মহিলাদের সংখ্যা বেশি তাই না?

শুধু আমাদের চা বাগান নয়, এদিকের প্রায় সব বাগানেই আশি শতাংশ মহিলা কর্মী। এদের অনেকের স্বামী অন্য কাজ করে। টাকার খোঁজে অনেকেই চলে গেছে ভুটানে। কেউ গেছে কেরালায়। কেউ গেছে আসামে। এখানে রোজ চব্বিশ কেজি করে পাতা তুলতে হয়। কেউ যদি একশো কেজি পাতা তোলে তখন তাকে আলাদা করে ইন্টেনসিভ দেওয়া হয়। বোনাস টোনাসের প্রশ্নই নেই।

রঙ্গিত মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, কাগজে পড়েছি এদিকে একের পর এক বাগান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় মজুরিই পাওয়া যায় না, বোনাস তো দূর অস্ত।

জোয়ারদার ধোঁয়া উড়িয়ে বলল, মেঘদুয়ারে সেসব সমস্যা নেই। এখানে কুলিকামিন থেমে বাগানবাবু সকলেই বোনাস পায়। পুজোও হয় ঘটা করে। ওই যে সামনে লেবারদের বাচ্চা রাখার ঘরটা দেখছেন, ওর পাশেই মণ্ডপ বেঁধে পুজো হয়। সিগারেটের শেষটুকু ফেলে দিয়ে জোয়ারদার বলল, পুজোয় কি এখানে থাকছেন? নাকি কলকাতা যাচ্ছেন?

রঙ্গিত বলল, অষ্টমীর দিন সন্ধেবেলা পদাতিক এক্সপ্রেসের টিকিট কেটে রেখেছি। ইচ্ছে আছে একবারে লক্ষ্মীপুজো পার করে ফিরব। তবে ফেরার টিকিট কাটিনি এখনও। কলকাতা গিয়ে পরিস্থিতি বুঝে কাটব।

তার মানে সপ্তমীর দিনটা এখানেই থাকছেন। দেখবেন ভালোই লাগবে। আমিও প্রথম প্রথম বাগান ছেড়ে পালাতাম পুজোর সময়। তবে আজকাল আর যাই না। দুর্গাপুজোর সময় এদিকে বেশ হই হই হয়। অ্যামবিয়েন্সটাই পুরো বদলে যায়। আমার কিন্তু চা বাগানের পুজোটা মন্দ লাগে না। হাসে জোয়ারদার।

পুজোর ক’দিন তো শুনেছি ছুটি থাকে পুরোপুরি। তখন সকলেই রিল্যাক্স করে নিশ্চয়ই?

সত্যি বলতে কী, ওই কয়েকটা দিনই তো আয়ুরেখা বাড়িয়ে দেয় আমাদের সকলের। পুজোর ক’দিন সকলে নিজেদের মতো করে সময় কাটায়। বাগানের কর্মীরাই পুজোর পুরো আয়োজনটা করে। ওরাই মণ্ডপ বাঁধে। ওরাই প্রতিমা আনে। বাগানবাবুরা, তাদের গিন্নিরা সকলেই এগিয়ে আসে পুজোর সময়। প্রতিমা রাখার জায়গা পরিষ্কার করে সেখানে আলপনা আঁকা হয়। প্রতিমা যথাস্থানে বসানো হলে তাঁকে বরণ করা হয়। ফল কাটা, ভোগ রান্না সব কিছুই করে মহিলারা। ভোগ বিতরণ করার ভার হল পুরুষদের। বেশ একটা হুল্লোড় মজা হয় ওই কয়েকটা দিন।

এই বাগানে তো যা দেখছি আদিবাসী মানুষজনই বেশি, তাই না?

শুধুই আদিবাসী নয়, নেপালি লোকজনও রয়েছে কিছু। এদিকের সব বাগানে বাঙালি রীতি নীতি মেনেই পুজো হয়। নিয়মনিষ্ঠ ভাবে পুজো করেন বাঙালি পুরোহিত। পুজোর ক’দিন সকাল থেকে মণ্ডপেই থাকে বাগানের মানুষজন। বিকেল হলে খুদেদের নিয়ে অন্য বাগানে ঠাকুর দেখতে যায় সকলে। ফিরে একবার মণ্ডপে আসে। এই ক’দিন নিজেদের মধ্যে নাচগান খাওয়া দাওয়া চলে। হয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতা।

একটা দুর্গাপুজোর খরচ তো প্রচুর। এত টাকা আসে কোথা থেকে?

জোয়ারদার বলল, বেশির ভাগ চা বাগানে প্রতিমার টাকাটা মালিক দেন। পুজোর অন্য খরচ বাবদ বাকি টাকা সকলে চাঁদা তুলে ওঠায়। মেঘদুয়ারের ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। এখানে প্যান্ডেলের খরচ থেকে পুজোর ভোগ সব খরচ একাই দেন সিনিয়র ম্যানেজার মিস্টার মুখার্জি। তিনি খুব ভালো মানুষ। তাঁর স্ত্রীও মিশুকে। আচ্ছা আপনি কি মিস্টার মুখার্জির মেয়েকে দেখেছেন? বেঙ্গালুরু নাকি চেন্নাই কোথায় যেন পড়াশোনা করে।

আমি এই বাগানে জয়েন করেই মিস্টার মুখার্জিকে মিট করেছিলাম। ওই একদিনই তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। পরে আর দেখাও হয়নি, কথাও হয়নি। শুনলাম মেয়ের ট্রিটমেন্টের ব্যাপারে তিনি কলকাতায় চলে গেছেন।

জোয়ারদার জানতে চাইল, আমাদের এদিকে টি প্ল্যান্টার্স ক্লাব আছে জানেন তো? গেছেন সেখানে কখনও?

এখনও যাওয়া হয়নি। শুনেছি একশো বছর আগে সাহেব মেমরা খানাপিনা করত সেই ক্লাবে। আগাগোড়া শিরিষ কাঠ দিয়ে তৈরি। সাদা শিরিষ কাঠের সেই ক্লাবঘরটাও একটা দেখার মতো ব্যাপার। প্রত্যেক শুক্রবার সন্ধেবেলা সেখানে গেট টুগেদার হয়। এই তল্লাটের চা বাগানের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আর সিনিয়র ম্যানেজাররা আসেন সেখানে।

ক্লাবে বার আছে। পানভোজন-টোজন হয়। সেখানেই শুনলাম মিস্টার মুখার্জির মেয়ে ট্রেকিং করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। সিরিয়াস ব্যাপার ছিল। কাঠমান্ডু থেকে ফ্লাইটে বাগডোগরা নিয়ে এসেছিল তার এক বান্ধবী। খবর পেয়ে মিস্টার আর মিসেস মুখার্জি মেয়েকে নিয়ে সেদিন বিকেলের ফ্লাইটেই চলে গেছেন কলকাতায়।

শুনেছি তাঁর মেয়ের ক্যানসার ধরা পড়েছে।

ব্রেস্ট ক্যানসার। তবে ফার্স্ট স্টেজে ধরা পড়েছে বলে বাঁচোয়া। কেমো নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। মিস্টার মুখার্জি মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় আছেন এক রিলেটিভের বাড়িতে। মিসেস মুখার্জিও আছেন মেয়ের কাছে। ডক্টর শর্মার কাছে শুনলাম সব। তাঁদের ওপর দিয়ে ঝড় যাচ্ছে খুব।

ডক্টর শর্মাকে সেদিন মিস্টার মুখার্জি কী একটা ব্যাপারে ফোন করেছিলেন। কথায় কথায় বলেছেন, তাঁর মেয়ে চাইছে পুজোর সময়টা প্রতি বছরের মতো মেঘদুয়ার বাগানেই কাটাতে।

বুঝলেন রায়চৌধুরি, আমি মিস্টার মুখার্জির মেয়েটার কথা ভাবছি। এই বয়সেই এমন একটা রোগ বাধিয়ে বসল। কী সুন্দর যে দেখতে মেয়েটা! গমের মতো গায়ের রং, টানা টানা চোখ, টিকালো নাক। তবে ছোট ছোট করে ছাঁটা চুলটাই সর্বনাশ করে দিয়েছে। নইলে দুর্গাপ্রতিমার মতোই লাগত মেয়েটাকে। জোয়ারদার ডান হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে একটা বৃত্ত তৈরি করে একগাল হাসল।

বিন্দিয়া, ইন্দু, ফুলমতিয়া, সরসতিয়ারা পাতা তুলছিল নিজেদের মধ্যে হাসি মশকরা করতে করতে। রঙ্গিতদের দেখে একজন মুখে শসসস্ শব্দ তুলে বলল, চুপ যা চুপ যা সব। সকলেই মুখ থেকে হাসিটা মুছে গম্ভীর হবার চেষ্টা করল। চা পাতা তোলায় মন দিল আবার। তাদের ঝুড়ি ভরে উঠতে থাকল দুটি পাতা একটি কুঁড়িতে। রঙ্গিত লক্ষ করল, শুধু সরসতিয়া আড়চোখে তাকিয়ে আছে এদিকে। ঠোঁট টিপে হাসছে এখনও। তারা একটু আড়াল হলেই আবার হাসির ছররা উঠবে এখানে। রঙ্গ রসিকতা হবে নিজের নিজের নাগরদের নিয়ে। কেউ হয়তো গেয়ে উঠবে দু’কলি গান। শরীরে মোচড় দিয়ে অকারণ পুলকে হেসে উঠবে বাকিরা।

অসংখ্য কামিনদের পাতা তোলার দৃশ্যটা এমনই। কুলিরাও ইতস্তত ছড়িয়ে থাকে এদিক ওদিক। যে যার দায়িত্ব প্রতিপালন করে মুখ বুজে। লেবার সর্দার থাকে তাদের মধ্যে। তারা ঘুরে ঘুরে চৌকিদারি করে। হিসেব রাখে প্রত্যেকের কাজের। সারা দিন ধরে সরসতিয়া, ফুলমতিয়া, বিন্দিয়ারা যত পাতা তোলে তার গিনতি হয়। বিকেলের দিকে যার যা প্রাপ্য সেই টাকা টিপছাপ দিয়ে বুঝে নেয় সকলে। টাকাটা চার ভাঁজ করে নিয়ে নেয় হাতের মুঠিতে। সার বেঁধে ফেরে লেবার লাইনে। নিজেদের ঝুপড়িতে।

পাহাড়ের কোলে মেঘদুয়ার চা বাগানটাকে দেখে মনে হয় যেন প্রকৃতিরই একটা অংশ। স্তরায়িত মেঘের মতো উঁচু নীচু সবুজের ঢেউ। সন্ধের ভোঁ পড়ে গেছে বাগানে। চা বাগানের যুবতী মায়েরা, যাদের বাচ্চা আছে, তারা তাদের বাচ্চাগুলোকে ক্রেশে রেখে কাজে এসেছিল। সেখান থেকে নিজের শিশুকে কাপড়ের ঝোলায় পিঠে ঝুলিয়ে নিয়ে চলেছে নিজের ডেরার উদ্দেশে। কেউ কেউ আবার নিরাপদে কোনও গাছের ডালে নিজের বাচ্চাকে ঝুলিয়ে চা পাতা তুলেছে সারা দিনমান। এবার তারাও বাচ্চা নিয়ে রওনা দিয়েছে নিজের বাড়ির দিকে। লাইন দিয়ে নিজেদের মধ্যে সাদরি কিংবা নেপালি ভাষায় কথা বলতে বলতে এগিয়ে চলেছে শ্রমিকেরা। সন্ধের আবছা আলোয় তাদের সিল্যুয়েট দেখা যায়।

সন্ধেবেলা রঙ্গিত তার কোয়ার্টার্স থেকে টের পায় লেবার লাইনের ওদিক থেকে ভেসে আসছে চোলাইয়ের গন্ধ। শোনা যায় তুমুল হুল্লোড়। ছিটকে আসে হাসির হররা। সরসতিয়ার মুখটা তার চোখে ভাসে। রঙ্গিত শুনেছে মেয়েটার বাবা মারা গেছে লিভার পচিয়ে। মা মরেছে ছোটবেলায়। সরসতিয়াকে নিজের মেয়ের মতোই দেখে গুণবালা তামাং। দাইমার সঙ্গে এক ছাদের তলায় থাকে সে। দাইমা নেপালি, সরসতিয়া আদিবাসী, কিন্তু দাইমাকে ‘মা’ বলে ডাকে মেয়েটা।

রঙ্গিত সরসতিয়াকে ডাকাবুকো চেহারার এক পুরুষের সঙ্গে দু’একদিন দেখেছে। শুকরা নাম লোকটার। মেঘদুয়ার চা বাগানের লেবার সর্দার। ঘন কালো ঝাঁকড়া চুল, পুরুষ্টু কালো গোঁফ। এক নজর দেখলে বোঝা যায় লোকটার সারা শরীরে যৌবনের তাজা রক্ত বইছে। একটু বেশি গরম পড়লে গেঞ্জি খুলে নিয়ে কোমরে বেঁধে নেয় শুকরা। গান ভাঁজে গুনগুন করে। তখন স্পষ্ট হয় শুকরার শরীরের পেশি। রঙ্গিত মুগ্ধ চোখে লোকটাকে দেখে। হ্যাঁ পুরুষালি চেহারা বটে শুকরার! মনে মনে ভাবে, আদুল গায়ের শুকরাকে দেখে নিশ্চয়ই চোখ ফেরাতে পারে না সরসতিয়া। জোয়ারদারের কাছে রঙ্গিত শুনেছে ওদের কথা। শুকরা অপেক্ষা করে কখন আঁধার করে আসবে। সরসতিয়া ইচ্ছে করে একটু দেরি করবে। ফুলমতিয়া আর বিন্দিয়ারা আগেভাগে চলে যাবে চা বাগান ছেড়ে। তার পর কোনও গোপন জায়গায় মিলিত হবে দুই প্রেমিক প্রেমিকা।

রঙ্গিত মনের চোখ দিয়ে দেখতে পায় দৃশ্যটা। লেবার লাইন পার করে, স্টোর হাউজ আর পাম্প হাউজ ছাড়িয়ে দুই প্রেমিক প্রেমিকা ছুটছে ঊর্দ্ধশ্বাসে। দূরে, অনেক দূরে এক অন্য পৃথিবীতে পৌঁছে গেছে তারা। ঘন আঁধারে ঘাস আর গুল্মলতা দিয়ে তৈরি বিছানায় ভালোবাসা-বাসি করছে দু’জনে। তাদের উদ্দাম প্রেমের সাক্ষী হয়ে আছে শাল, সেগুন, কৃষ্ণচূড়া, দেবদারু, চাঁপা, টুং আর বহেরা গাছের দল। তবে রঙ্গিতের দুশ্চিন্তা হয় এদের দুজনের প্রেমের পরিণতি নিয়ে। জোয়ারদার সেদিন বলছিল, সৃষ্টির আদি থেকেই নারীর দখল নিয়ে পুরুষের মধ্যে যা চলে আসছে এই বাগানেও সেটাই শুরু হয়েছে। সরসতিয়াকে নিয়ে এখানেও আছে অদৃশ্য এক লড়াই।

রঙ্গিত কৌতূহলী হয়ে বলেছিল, কী রকম লড়াই?

জোয়ারদার বলেছিল, পঞ্চায়েত প্রধান হিম্মত লোহার নজর দিয়েছে সরসতিয়ার দিকে। হিম্মতের জান পহেচান বড় বড় লিডারদের সঙ্গে। ভোটের সময় হিম্মত যাকে ভোট দিতে বলবে তাকেই ভোট দেয় বাগানের কুলিকামিন। হিম্মত লোহার হল দোর্দণ্ডপ্রতাপ লিডার। কলকাতার নেতারাও একডাকে হিম্মতকে চেনে। এই চত্বরে নেতারা মিটিং করতে এলে হিম্মত চা বাগান থেকে লরিতে আশেপাশের সব বাগানের লেবারদের নিয়ে যায় মিটিংয়ে। চা আর পুরি-সবজি খাওয়ায় নিজের পকেটের পয়সায়। তাকে রীতিমত খাতির করে নেতারা। আপনার কি পরিচয় হয়েছে হিম্মতের সঙ্গে?

লোকটা এসে আলাপ করে গেছে সেদিন। একা আসেনি, সঙ্গে কয়েকজন সহচর এসেছিল। আমি বাগানে লেবারদের কাজ সুপারভাইজ করছিলাম তখন। কথাবার্তা শুনেই মনে হচ্ছিল দাপুটে লোক। হাঁড়িয়া খেয়ে এসেছিল সকলেই। মুখ দিয়ে বিশ্রী গন্ধ বেরোচ্ছিল। আমি কিছু বলতে গিয়েও বলিনি। সামলেছি নিজেকে। রঙ্গিত গলায় বিরক্তি মিশিয়ে বলছিল।

জোয়ারদার বলল, না বলে ভালো করেছেন। এসব লোকের সঙ্গে যত দূরত্ব বজায় রাখবেন তত সেফ থাকবেন। আর একটা ধারণা ভুল আপনার। হিম্মত হাঁড়িয়া খাওয়ার লোক নয়। দূর অতীতে কোনও এক সময় হাঁড়িয়া হয়তো খেত, তবে এখন ফরেন লিকার ছাড়া খায় না। তাও সস্তার মাল না, দামি মাল। স্কচ টচ খেলেও আশ্চর্য হব না।

কিন্তু সে টাকা জোগায় কে?

টাকা জোগায় চিন্তামণি। সে নিয়ে আপনি ভেবে করবেন কী। লোকটার বয়স চল্লিশ ছাড়িয়ে পঞ্চাশের দিকে যাচ্ছে। এখনও শরীরে খ্যাপা মোষের তাগদ। পুরুষ্টু শরীরের মেয়ে দেখলে নিজেকে স্থির রাখতে পারে না। যেভাবেই হোক তাকে বিছানায় চাই তার। সেই মেয়েকে রাতের পর রাত ভোগ করবে। তার শরীরটাকে ছিবড়ে করে দিয়ে আবার নতুন উদ্যমে নতুন শিকার খুঁজবে। বাগান ছাড়িয়ে ওদের ইউনিয়ন অফিস। সন্ধের পর সেখানেই পাবেন তাকে। সেটাই ঘুঘুর বাসা, ওর স্যাঙাৎদের নেশাভাঙ চলে সেখানে, খরচ হিম্মতই দেয়।

কিন্তু মেয়েগুলো নিজের ইচ্ছেতে হিম্মতের কাছে যায় না নিশ্চয়ই? রঙ্গিত জানতে চাইল।

জোয়ারদার বলল, ছেলেমানুষের মতো কী যে বলেন আপনি! নিজের ইচ্ছেতে না এলে কী হতে পারে সেটা খুব ভালো করে জানে বাগানের মেয়েরা। হিম্মতের দলবল ডাইন অপবাদ দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারবে বাড়িসুদ্ধু। বাঁচতে চাইলে বাগানছাড়া হতে হবে চোখের জল ফেলে। কেউ ভয়ে বাড়াবে না সাহায্যের হাত। এখন সরসতিয়ার দিকে নজর পড়েছে হিম্মতের। আচ্ছা রায়চৌধুরি, আপনি সরসতিয়াকে দেখেছেন?

হ্যাঁ দেখেছি তো। বেশ ভালো দেখতে।

জোয়ারদার চোখ মটকে বলল, আপনার ভেতরে কি রসকষ বলে কিছু নেই? ভালো দেখতে কী বলছেন, সরসতিয়া হল কালো কষ্টিপাথরে তৈরি খাজুরাহোর মূর্তি। সাধু সন্ন্যাসীর কথা জানি না তবে যে কোনও পুরুষের হার্টবিট বেড়ে যাবে মেয়েটার ফিগার দেখে। হিম্মতের নজর যে এই চটকদার মেয়ের দিকে পড়বে সেটাই স্বাভাবিক। বাগানের মেয়েবউরা সরসতিয়াকে বহুবার বারণ করেছে, যাতে শুকরার সঙ্গে মেলামেশা না করে। শুকরাকেও সাবধান করেছে পইপই করে। শুকরাকে তো দেখেছেন। হি-ম্যানের মতো চেহারা। খাজা কাঁঠালের মতো মাসল। সাহসও সাংঘাতিক। একাই দশটা লোকের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে পারে। একবার একটা লেপার্ড ঢুকে পড়েছিল চা বাগানে। শুকরা কুকরি হাতে ঘায়েল করে দিয়েছিল চিতাবাঘটাকে।

রঙ্গিত অবাক হয়ে বলল, সরসতিয়া তার ইয়ারদোস্তদের কথা কানে নেয়নি? কিন্তু কেন?

জোয়ারদার মুখের একটা ভঙ্গি করে বলল, আপনি সরসতিয়াকে চেনেন না রায়চৌধুরি, সে অন্য ধাঁচের মেয়ে, ভয়ডর বলতে কিছু নেই। সাবধানবাণী শুনলে হাসে। কারও কথা গায়েই লাগায় না। কিন্তু বিপদটা কোথায় জানেন, হিম্মত সুবিধের লোক নয়। সে যে কী করতে পারে আর না পারে তার ঠিক নেই। ভুক্তভোগীরা জানে, হিম্মত চটে গেলে ওদের দুজনের বাগানে থাকাই মুশকিল হয়ে যাবে। সরসতিয়াকে ডাইন তকমা দিয়ে বাগান থেকে তাড়িয়েই ছাড়বে রেগে গেলে। শুকরাকেও মেরে হাড়গোড় ভেঙে দিতে পারে।

জোয়ারদারের সঙ্গে ফ্যাক্টরির দিকে এগোচ্ছিল রঙ্গিত। পিছন ফিরে পাতা তোলায় ব্যস্ত সরসতিয়াকে দেখল। হেসে হেসে মেয়েটা কী যেন বলছিল ফুলমতিয়াদের। আঁট করে বাঁধা পোশাক ছাপিয়ে উপচে পড়ছে যৌবন। উপমাটা মিথ্যে নয়। ভরা বর্ষার নদীর মতো উপচে ওঠা শরীরের মেয়েটাকে দেখে মনে হয় খাজুরাহো থেকে তুলে নিয়ে আসা কোনও কালোবরন যক্ষিণী মূর্তি। রঙ্গিত বলল, আমরা কি সরসতিয়া আর শুকরার ব্যাপারে কিছু করতে পারি?

জোয়ারদার বলল, না, আমরা কেউই কিছু করতে পারি না। কলকাতার নেতাদের সঙ্গে হিম্মতের ওঠাবসা। আমরা তো চুনোপুঁটি। মিস্টার মুখার্জি থাকলে কথাটা কানে দিয়ে রাখতাম। কিন্তু তিনি কলকাতায়। মেয়েকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। এর মধ্যে আর ফোন করে বিরক্ত করতে চাইছি না। তিনি ফিরে না আসা অবধি আমাদের কিছু করার নেই।

রঙ্গিত দাঁড়িয়ে আছে তার কোয়ার্টার্সের বারান্দায়। দূরের লেবার লাইনের দিক থেকে ভেসে আসছে নেশাতুর পুরুষদের হইচই। অশান্ত লাগছিল। মনের মধ্যে জট পাকাচ্ছিল। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে জানান দিচ্ছিল, একটা কিছু অঘটন ঘটতে চলেছে মেঘদুয়ারের বাগানে। খুব শিগগিরি। সেখানে দর্শকের ভূমিকা নেওয়া ছাড়া তার কিছুই করার নেই।

পাহাড় নয়, সমুদ্র কিংবা জঙ্গলই রঞ্জনের বরাবরের পছন্দের গন্তব্য। পাহাড়ে কখনো যাননি তা নয়, কিন্তু তেমন ভালো লাগত না। বমি পেত পাহাড়ি রাস্তা গাড়ি করে পাড়ি দিতে হলে। বন্ধুদের সঙ্গে একবার উত্তরাখণ্ড গিয়েছিলেন ঘুরতে। সেখানকার অসামান্য দৃশ্যপটও মন কাড়তে পারেনি তাঁর। রঞ্জন বহু বছর আগে একবার পাহাড়ে এসেছিলেন হানিমুনে। জাহ্নবী পাহাড় ভালোবাসেন। রঞ্জন বাসেন না। তাতে কী হয়েছে। তখন রঞ্জন সাতাশ। জাহ্নবী বাইশ। সদ্য বিয়ে হওয়া বউয়ের হাতে হাত রেখে মধুচন্দ্রিমায় পাহাড়ে এসেছিলেন তিনি।

কেউ প্রেমে পড়েছে কি পড়েনি সেটা বোঝা যায় বিরহ এলে। ঠিক তেমনি কেউ যে কারও প্রেমে পড়েছে সেটা জানতেও তার থেকে দূরে সরে যেতে হয়। পাহাড়ের ব্যাপারটাও তাই। পাহাড়কে ভালোবাসা কতটা গভীর ও খাদহীন সেটা বোঝা যায় পাহাড়যাপন শেষে সমতলে ফিরলে। মধুচন্দ্রিমা কাটিয়ে কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন রঞ্জন আর জাহ্নবী। কাজের চাপে পাহাড়ের কথা তাঁর আর মনেই ছিল না।

রঞ্জন তখনও আজকের মতো এতটা ব্যস্ত হয়ে পড়েননি। তখনও তাঁর রোজের রুটিন ঘড়ির কাঁটা নিয়ন্ত্রণ করত না। ব্যস্ততা ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাও ছিল। সে সময় হাসপাতাল আর চেম্বারে দিনের অনেকটা সময় কাটাতে কাটাতে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে মারতে হঠাৎ করেই একদিন রঞ্জন বুঝতে পারলেন তিনি পাহাড়ের প্রেমে পড়ে গেছেন। তাঁর মনের মধ্যে শীতের দিনে গাছের টুপটাপ পাতা খসে পড়ার মতো এসে পড়ত একটার পড়ত একটা দৃশ্য। পাহাড়ের ম্যাজিকটাই এমন।

সদ্য বিয়ে করা বউকে ইমপ্রেস করবেন বলে রঞ্জন ঠিক করেছিলেন হানিমুনে পাহাড়ে যাবেন। জাহ্নবীও এক কথায় রাজি। টিকিট কাটা হল। বিয়ের সাত দিনের মাথায় এক বিকেলে মিঞাবিবি গাব্দাগোব্দা ব্যাগ নিয়ে শিয়ালদা স্টেশনে হাজির। সে সময় পাহাড়ে গণ্ডগোল শুরু হয়েছে। অ্যাক্টিভিস্টরা কখন আচমকা বন্ধ ডেকে বসবে তার ঠিক নেই। ফলে টুরিস্টের আনাগোনা কম। গাড়িঘোড়াও কম চলছে। দার্জিলিং যাবার ঝুঁকি না নিয়ে ঠিক হল গ্যাংটক যাওয়া হবে। সেভাবে শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক যাবার একটা বাস ধরে মেল্লি অবধি আসা হল।

মেল্লি আসার পর রঞ্জনের মাথায় বাজ পড়ল। বাস আর যাবে না। সিকিমেও কী নিয়ে গণ্ডগোল শুরু হয়েছে। কিন্তু এমন উটকো ঝামেলার মধ্যেও টেনশন হল না মোটেও। বাস থেকে নেমে বড় করে একটা শ্বাস নিলেন রঞ্জন। ফুসফুস ভরে গেল পাতলা বাতাসে। চোখের সামনে অপার্থিব দৃশ্য। পাহাড়ে সাদা সাদা মেঘ নেমে আসছে। তিস্তা অনেক নীচে। বর্ষার নদী বলে কথা। ঘোলা জলের গর্জন এতটা ওপর থেকেও শোনা যাচ্ছিল স্পষ্ট। চারদিকে পাহাড় ঘেরা। তার মধ্যে ছোট্ট এক জনপদ। গাছপালার মাথার ওপর মেঘ জমে আছে। অন্যদিকে নীল আকাশ। এমন সুনীল আকাশ কলকাতায় যে কেন দেখা যায় না কে জানে!

ছোট ছোট দোকান। বেকারির জিনিস বেশি। খিদে পাচ্ছিল জাহ্নবীর। কিন্তু ভাত খাবার মোটেও ইচ্ছে নেই। দোকানি বলল, ভেজ মোমো শেষ হয়ে গেছে। শুধু চিকেন মোমো হবে। জাহ্নবীর আবার দীক্ষা নেওয়া আছে। চিকেন খাবেন না। শেষ অবধি একটা কোল্ড কফি আর কেক কেনা হল। সেই দিয়ে খিদে মেটানো গেল খানিকটা। এগোন হল সরু পথ ধরে। এক গুজরাতি ভদ্রলোক, দশাসই চেহারা, মিষ্টির দোকান দিয়েছেন। সেখান থেকে পুরি সবজি কেনা হল। সঙ্গে রসোগোল্লা। গরম গরম পুরি আর ঝাল ঝাল সবজি খেতে বেশ ছিল। কিন্তু এমন হলদে রঙের ক্রিকেট বলের মতো শক্ত রসোগোল্লা সারা জীবনে আগে কিংবা পরে আর কখনও খাননি তাঁরা দুজনে।

পথে একটুক্ষণ অপেক্ষা করতে করতেই গাড়ি জুটে গেল শেয়ারে। জিপ গাড়ি। আরও দু’তিনজন প্যাসেঞ্জার উঠল গাড়িতে। ড্রাইভার সেই সব লোকগুলোর সঙ্গে নেপালিতে কথা বলতে বলতেই ড্রাইভ করতে লাগল। শেয়ারের গাড়ি। প্যাসেঞ্জাররা সকলেই মঙ্গোলয়েড মুখের। মনে হচ্ছিল কোনও একান্নবর্তী পরিবারের সদস্যরা বুঝি একজোট হয়েছে দৈবের নির্বন্ধে। নিজেদের মধ্যে তাদের খোসগল্প আর ফুরোয় না। এক বৃদ্ধা যাবে দু-কিমি দূরে লিম্বুগাঁও নামে এক জনপদে। সেই গ্রাম এই রুটে পড়ে না। তাতে কী এল গেল। বৃদ্ধার কষ্ট হবে না? ড্রাইভার গাড়িটা ঘুরিয়ে নিল সে কারণে।

একজন বয়স্ক প্যাসেঞ্জারের বাজারে কিছু কাজ আছে। তার জন্য গাড়িটা দাঁড়িয়ে থাকল পাক্কা দশ মিনিট। আর এক যাত্রী নেমেছিল চা খেতে। চায়ের দোকানি এসে সব প্যাসেঞ্জারকেই এক কাপ করে চা দিয়ে গেল। বাদ গেলেন না রঞ্জন আর জাহ্নবীও। জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন জাহ্নবী। মেঘ করে আসছে। বেকারির গন্ধ আসছে নাকে। তিনি চুপটি করে বসে আছেন। এখন হলে বিরক্তি আসত। কিন্তু তখন রঞ্জন সাতাশ। জাহ্নবী বাইশ। সেই বয়সটার ম্যাজিকই অন্যরকম। দুজনের কারওরই খারাপ লাগছিল না। গাড়ি এসে দাঁড়াল একটা ফাঁকা জায়গায়। প্যাঁ পোঁ করে নানারকম আওয়াজ ভেসে আসছে একটা গুম্ফা থেকে। প্রার্থনাসংগীত বোধ হয়। এখানেই গাড়ির ড্রাইভারের বাড়ি। তার বাড়িতেই রাত গুজরানের ব্যবস্থা হল। বিনিময়ে কিছু একটা দিলেই চলবে। হোমস্টে ব্যবস্থা তো শুরু হয়েছে হালে, তখন এসবের চল ছিল না।

ড্রাইভারের নাম ওয়াংগেল। তার বাড়িটা পাহাড়ের গায়ে ঠেস দেওয়া। গেটের সঙ্গে একটা কুকুর বাঁধা। আলু আর ভুট্টার চাষ করা হয়েছে সামনে। সারি সারি ভুট্টা ফলে আছে। বাড়ির ঠিক সামনে একটা আপেল গাছ লাগানো হয়েছিল কখনও শখ করে। তাতে ফল ফলেনি। কখনও ফলবে কি না কে জানে। রডোডেনড্রন গাছ রয়েছে বেশ কিছু। ফুল ধরেনি তাতে। বোঝা গেল ওয়াংগেল বেহদ্দ গরিব নয়। সম্পন্নই বলা যায়। চা খেতে দিল। দুধ চা, যথেচ্ছ চিনি দেওয়া। জাহ্নবী হেসে বললেন, এটা ফ্রিজে রাখলে মালাই বরফ হতে পারে।

সন্ধেবেলা রঞ্জন আর জাহ্নবী এক চক্কর ঘুরে এলেন পাশের গুম্ফা থেকে। সঙ্গে ওয়াংগেল এল গাইড হয়ে। গুম্ফায় বাজনা বাজছিল। কয়েকটা বাচ্চা বাচ্চা লামা, লাল পোশাক পরা, গরম জল খেতে খেতে প্রার্থনা করছিল। এর কী অর্থ কে জানে। রঞ্জন দেখলেন যার পুজো হচ্ছে সেই দেবতা মোটেই সৌম্যকান্তি নন। বরং ভয় ভয় ভাব হয় মূর্তিটি দেখলে। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি। গুম্ফায় চলছে তিব্বতি ভাষায় মন্ত্র উচ্চারণ। গা ছমছমে পরিবেশ তৈরি হয়েছে সেই আলোআঁধারি মাখা গুম্ফায়। জাহ্নবী সারাক্ষণ আঁকড়ে রাখলেন রঞ্জনের হাত।

ওয়াংগেলের ডেরায় নিশিযাপন। একটা ছোট্ট ঘর ছেড়ে দেওয়া হল হানিমুন কাপলকে। আলু কোয়াশের ডালনা, ডিমের কারি আর ভাত এল নৈশাহারের জন্য। ওয়াংগেলের স্ত্রী ছেকি। হাসিখুশি মানুষ। রান্নার হাত মন্দ নয়। সেই ছোট্ট ঘরেই রাত কাটালেন দুজনে। সকালে বেরোলেন পায়ে হেঁটে। মেঘ আর কুয়াশা ঢাকা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভালোবাসার কথা বলছিলেন দুজনে। পথের একদিকে বর্ষার জল পেয়ে ঘন হয়ে উঠেছে জঙ্গল। চকচকে সবুজ ফার্ন। ফুটে আছে নাম না জানা বুনো ফুল। সারা জঙ্গল সরগরম হয়ে আছে পাখির ডাক আর ঝিঁঝির আওয়াজে। কুয়াশামাখা আদিম অকৃত্রিম জঙ্গল হাঁ করে দেখছে দুই সদ্য বিবাহিত যুবক যুবতীকে। কলকাতায় ইটকাঠের জঙ্গলের সঙ্গে এই বুনো আরণ্যক গন্ধের তুলনা হয় না।

অচেনা এক পাহাড়ি গ্রামে দুটো রাত কাটিয়ে কলকাতা ফিরে এসেছিলেন রঞ্জন আর জাহ্নবী। ওয়াংগেল তাঁর শেয়ারের জিপে দুজনকে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন অবধি পৌঁছে দিয়ে এসেছিল। তাঁদের বিবাহবার্ষিকীর আগেই জাহ্নবীর কোলে এসে গিয়েছিল রঙ্গিত। এখনও একটু একা হলেই সেই সুখস্মৃতির আঁচ নেন রঞ্জন। এখনও কি বেঁচে আছেন ওয়াংগেল? তাঁর হাসিখুশি স্ত্রী ছেকি? আর কি এই জীবনে কখনও দেখা হবে এই পরিবারটির সঙ্গে?

রঙ্গিত যখন খুব ছোট তখন জাহ্নবীর ক্যানসার ধরা পড়ল হঠাৎ করে। জীবনটাকে উপভোগ করার সময় দিল না নিয়তি। পরপারের ডাক চলে এল জাহ্নবীর কাছে। রঞ্জন তখন সাধারণ ডাক্তার। বিশিষ্ট অনকোলজিস্ট তখনও হয়ে ওঠেননি। জাহ্নবীর মৃত্যু রঞ্জনকে একা করে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি তাঁর মনের মধ্যে তৈরি করে দিয়েছিল এক দ্রোহ। ক্যানসারের মতো এক প্রবল পরাক্রান্ত প্রতিপক্ষকে তিনি মনে মনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজের বিপক্ষ হিসেবে। প্রথম প্রথম আপ্রাণ চেষ্টা করলেও সাফল্যের হার ছিল কম। এখন তিনি নিজেও যেমন অভিজ্ঞ হয়েছেন তেমনি চিকিৎসা শাস্ত্রও উন্নত হয়েছে। তূনীরে এসেছে নতুন অস্ত্রশস্ত্র। সেই গোলাবারুদ দিয়ে যুঝছেন ক্যানসারের সঙ্গে। কোনও রোগীকে যখন মৃত্যুমুখী টানেল থেকে মুখ ফিরিয়ে জীবনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন তখন যে পরিতৃপ্তি হয় তার তুলনা হয় না। মনে হয়, মরণনদীর ওপারে তাঁর জন্য অপেক্ষায় থাকা জাহ্নবীকে খুশি করতে পারলেন তিনি।

নেপালের পাহাড়ে ট্রেক করতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল একটি ফুটফুটে মেয়ে। তাঁর কাছেই চিকিৎসার জন্য এসেছিল মেয়েটি। প্রথমদিন আতংকিত হয়ে জিগ্যেস করেছিল কেমো নিলে চুল পড়ে যাবে কি না। রঞ্জন সহৃদয় গলায় বলেছিলেন, পড়বে। ইন ফ্যাক্ট সেটাই সব থেকে হার্মলেস সাইড এফেক্ট। মেয়েটির মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল ভয়ে। রঞ্জনের মায়া হয়েছিল। বলেছিলেন, ডোন্ট প্যানিক। কয়েক মাস পর সেই চুল নতুন করে গজাবে। এবার আরও ঘন হয়ে গ্রো করবে। মেয়েটি হেসেছিল চোখে জল নিয়ে।

জাহ্নবীর শখ ছিল একটা মিষ্টি দেখতে মেয়ে হোক। রঞ্জন চাইতেন ছেলে। দুজন যখন একান্ত হতেন তখন জাহ্নবী নিভৃতে রঞ্জনকে বলতেন, এবার আমাকে একটা মেয়ে উপহার দাও। সেসব কথা আজও মনে পড়ে তাঁর। মুকুট নামের এই মেয়েটিকে কয়েক মাস ধরে ট্রিটমেন্ট করেছেন রঞ্জন। ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন জীবনের পথে। মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে রঞ্জনের। জাহ্নবী হয়তো এমন একটি মেয়েরই স্বপ্ন দেখতেন। এই মেয়েটির জন্য অপত্যস্নেহ অনুভব করেন রঞ্জন। আজ সে এসেছিল তাঁর চেম্বারে। রঞ্জন বলেছিলেন, তুমি এখন ফিট। যে কোনও ভিগোরাস কাজ তুমি করতে পার। ইউ ক্যান ডু এনিথিং অ্যাজ ইউ উইশ। বলো তুমি কী করতে চাও? ফুটবল খেলতে চাও? নাকি ক্রিকেট?

মুকুট একটুও না ভেবে বলেছিল, কোনওটাই না স্যার। আমি ফুটবল ক্রিকেট নিয়ে ইন্টারেস্টেড নই। আমি আবার যেতে চাই পাহাড় অভিযানে। ট্রেক করতে যেতে চাই সেই রুটে যেখান থেকে মাথা নীচু করে ফিরে এসেছিলাম। কিন্তু যতবার ছিমছিমলে খরকার পথে ট্রেক করতে যাবার কথা ভাবছি তত মনটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ব্যর্থতার ভাবনা কাবু করে ফেলছে আমাকে। শারীরিক আর মানসিক শক্তি পাচ্ছি না। স্যার, আমি কি পারব?

রঞ্জন তাকিয়ে দেখছিলেন মেয়েটিকে। মুকুটের দুর্গাপ্রতিমার মতো মুখ, টানাটানা চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁর মন দ্রব হয়েছিল। বাৎসল্য স্নেহে জারিত হচ্ছিল ভেতরটা। মনে হচ্ছিল এই মেয়েটিকে সামান্যতম সাহায্য করা গেলে তৃপ্ত হবেন তিনি। রঞ্জন বলেছিলেন, তোমার শরীর আর ক’দিন পরই ট্রেক করার উপযুক্ত হয়ে উঠবে। কিছুদিন বিশ্রাম নাও। ততদিনে তুমি আরও রিকভার করে যাবে। দশ হাজার ফিট অলটিটিউডেও সমস্যা হবে না।

মেয়েটি চলে যাবার পর কিছুক্ষণ আত্মমগ্ন হয়ে রইলেন রঞ্জন। জাহ্নবী এমন একটা মেয়েকেই গর্ভে ধারণ করতে চেয়েছিলেন। যার চোখেমুখে বুদ্ধির দীপ্তি থাকবে, আচরণে থাকবে সহজ সপ্রতিভতা। যে মেয়ে হবে সুন্দর, কিন্তু ন্যাকামি বর্জিত। যার চরিত্রের মধ্যে কোমলতাও যেমন থাকবে তেমনি থাকবে দৃঢ়তাও। যেটা সচরাচর করেন না সেটাই করলেন রঞ্জন। পরের রোগীকে অপেক্ষায় বসিয়ে ছেলেকে ফোন করে জিগ্যেস করলেন, বলছি যে, মিস্টার মুখার্জি তো তোর বস?

রঙ্গিত ফোন ধরে খানিক হকচকিয়ে গিয়ে বলল, হ্যাঁ তিনিই সিনিয়র ম্যানেজার। তুমি কি তাঁকে চেনো?

তাঁকে চিনি। তাঁর মেয়েকেও চিনি। মেয়েটির নাম মুকুট। ভালো নাম সুরভিপ্রজ্ঞা মুখার্জি। তার ব্রেস্ট ক্যানসার হয়েছিল। আমিই ট্রিটমেন্ট করছি। একনাগাড়ে কথা বলে নিয়ে একটু পজ দিয়ে রঞ্জন। বললেন, তোকে কেন ফোন করলাম সেটা বলি এবার। শোন, বাড়ি আর হাসপাতাল করতে করতে একঘেয়ে হয়ে গেছে জীবনটা। কলকাতার ক্যাকোফোনি ছেড়ে নির্জন কোনও জায়গায় যেতে ইচ্ছে করছে খুব। মনের ব্যাটারিগুলো বসে গেছে একেবারে। সেগুলোও রিচার্জ করা দরকার। বহু বছর আগে ডুয়ার্সের এক চা বাগানে কাটিয়েছিলাম দু-চারটে দিন। সেই স্মৃতি আমাকে হন্ট করে এখনও। বলছিলাম যে, তোর মেঘদুয়ার চা বাগানে গেলে কেমন হয়?

বেশ তো, চলে এসো। ফ্লাইটে আসবে তো? কবে আসছ সেটা আগে থেকে জানিও। আমি বাগডোগরা এয়ারপোর্ট পৌঁছে যাব তোমাকে রিসিভ করতে।

দেখি, ট্রেনেও যেতে পারি। আসলে কী জানিস, বহুদিন ট্রেনে চাপা হয় না। রঞ্জন বাচ্চাদের মতো করে বললেন।

রঙ্গিত বলল, ঠিক আছে। তাহলে আমি তোমাকে আনতে বাগানের গাড়ি নিয়ে স্টেশনে চলে যাব। এখানে আমার কোয়ার্টার্স অনেক বড়। হাত-পা ছড়িয়ে থাকতে পারবে। আমার এখানে তোমার কোনও অসুবিধে হবে না।

রঞ্জন হাসলেন, মিস্টার মুখার্জি মেঘদুয়ারে যাবার জন্য বলেছেন বারবার। নানারকম ওজর আপত্তি করে কাটিয়েছি এতদিন। কিন্তু এবার ভাবছি যে, একটু চেঞ্জ দরকার, আর ভাল্লাগছে না কলকাতায়। তাই মেঘদুয়ারে যাব বলে স্থির করেছি। মিস্টার মুখার্জি বলে রেখেছেন ওখানে তাঁরই গেস্ট হতে হবে। আমি ডেট ফিক্স করে তোকে জানাচ্ছি কেমন?

রঙ্গিত ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল খানিক। রঞ্জন রায়চৌধুরিকে এমন উৎফুল্ল মুডে সে শেষ কবে দেখেছে মনেই করতে পারছে না।

১০

রঙ্গিত পুজোমণ্ডপে দেখল মেয়েটিকে। জোয়ারদার ঠিকই বলেছিল। দুর্গাপ্রতিমার মতো মুখচোখ। তবে ছোট করে ছাঁটা নয়, মেয়েটির চুল কাঁধ অবধি নেমে আসা, ঢেউ খেলানো। ঢাক বাজছিল। পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ করছিলেন। একটা চেয়ারে সে চুপটি করে বসে ছিল একাকী। সোনালি তাঁতের শাড়ি পরা বাদামি ত্বকের মেয়েটিকে দেখছিল রঙ্গিত। রূপকথার বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা এক অপরূপা রাজকন্যে। মিস্টার মুখার্জি ডিউটিতে থাকলে পোলো নেক শার্ট আর সাদা শর্টসে দেখা যায় তাঁকে। আজ ধুতি পরেছেন। কাঁথার কাজ করা হলদে পাঞ্জাবি। ব্যস্তসমস্ত হয়ে পুজোর তদারকি করছিলেন মিসেস মুখার্জি। কপালে লাল গোল টিপ, সিঁথিতে সিঁদুর, সাদা আর মেরুন মেশানো তসরের শাড়িতে ভদ্রমহিলা যেন সাবেক কালের কোনও জমিদারগিন্নি।

জোয়ারদার, ডক্টর শর্মা, বীথিদি, অঞ্জনাদিরা বসে ছিলেন ওদিকটায়। মহাপাত্র, মেরহোত্রা, ত্রিপাঠিরাও ঘোরাফেরা করছেন পাজামা পাঞ্জাবি পরে। বেশ একটা উৎসব উৎসব পরিবেশ। রঙ্গিতকে দেখতে পেয়ে মিস্টার মুখার্জি ডেকে নিলেন। আলাপ করিয়ে দিলেন মেয়ের সঙ্গে। রঙ্গিত হাসিমুখে বলল, হ্যালো। মুকুট শেকহ্যান্ড করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, স্কুলের খাতায় আমার নাম সুরভিপ্রজ্ঞা মুখোপাধ্যায়। সেটা উচ্চারণ করতে গিয়ে দাঁত খুলে আসার সম্ভাবনা আছে। তাই সে নামে আমাকে কেউ ডাকে না। বন্ধুরা আমাকে মুকুট বলে। তুমিও আমাকে মুকুট বলে ডেকো।

আমি সম্প্রতি এই চা বাগানে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হয়ে জয়েন করেছি। নিজের নাম বলে মুকুটের সঙ্গে শেক হ্যান্ড করল রঙ্গিত। ভেতরে ভেতরে একটু অবাক হল। কী নরম হাত রে বাবা মেয়েটার!

মেয়েটা কি লবঙ্গ চিবোচ্ছে? লবঙ্গ লবঙ্গ একটা গন্ধ ভেসে আসছে তার নাকে। আশ্বিন যাব যাব করছে। হেমন্তের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে কান পাতলেই। প্রকৃতির জলছবির মধ্যে ফুটে উঠছে অনাগত হেমন্তের অমোঘ ইশারা। তবুও সাউথ কটনের নীল রংয়ের পাঞ্জাবি পরা রঙ্গিতের কপালে আর নাকে ঘাম জমছিল বিন্দু বিন্দু। সিনিয়র ম্যানেজারের মেয়ে বলে কথা, সে ভেবেছিল গোমরাথেরিয়ামের কোনও প্রজাতি হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আদপেই তা নয়। প্রথম আলাপেই সহজ সারল্য দিয়ে তার মনোযোগ টেনে নিল মেয়েটি। মুকুট বলল, আমি বেশিক্ষণ আপনি আজ্ঞে করতে পারি না। তোমাকে ‘তুমি’ করেই বলতে শুরু করেছি। তুমিও আমাকে তুমি করে বলতে পারো।

রঙ্গিত স্মিতমুখে বলল, এখন কেমন আছে তোমার শরীর?

এখন ভালো আছি। তবে অন্ধকার একটা স্পেল কাটাতে হয়েছে আমাকে। এই রোগ যার না হয়েছে সে বুঝবে না মানসিক ভাবে কীভাবে ধ্বস্ত করে দেয় এই অসুখ। একটা সময় তো আমি বাবাকে বলেছিলাম স্বেচ্ছামৃত্যুর জন্য আবেদন করতে চাই। আমি যে খুব সহজেই ভেঙে পড়ি তা নয়, কিন্তু এত কষ্ট হচ্ছিল যে আর সহ্য করতে পারছিলাম না।

এত সহজে হাল ছেড়ে দিলে চলে? রবীন্দ্রনাথের সেই কথাটা মনে নেই? ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই?’

কথায় কথায় রবি ঠাকুর কোট করা বাঙালির পুরনো অভ্যেস। মুকুট হো হো হেসে বলল, রোগশয্যায় শুয়ে সেই রবীন্দ্রনাথই কিন্তু বলেছিলেন, ‘ধূসর গোধূলিলগনে সহসা দেখিনু একদিন / মৃত্যুর দক্ষিণ বাহু জীবনের কণ্ঠে বিজড়িত / রক্ত সূত্রগাছি দিয়ে বাঁধা।’

ঈষৎ অপ্রস্তুত হল রঙ্গিত। তার রবি ঠাকুর পড়া নেই তেমন। তাই থতমত খেয়ে বলল, তা বটে।

কবি বলেছিলেন ‘জীবন যখন ফুলের মতো ছিল, সমর্পণের চিন্তা সেই দিনগুলোতে মনে উদয় হয়নি।’ আমারও তাই। মুকুট বলল, কিন্তু হসপিটালের ক্যানসার ওয়ার্ডে দেখলাম মৃত্যুযন্ত্রণা কতটা করুণ হতে পারে। যখন কোনও ক্যানসার রুগির শরীরের জ্বালাযন্ত্রণা অসহনীয় হয়ে ওঠে তখন মনে হয় জীবনের আশা করে আর লাভ নেই। এর থেকে মুক্তিই ভালো। মুম্বইয়ের এক হসপিটালের নার্স অরুণা শনবাগের কথাটা মনে আছে? হাসপাতালের এক সাফাইকর্মী তাঁকে ধর্ষণ করার পর মাথায় এমন আঘাত করেছিল যে, অরুণা জড়পদার্থে পরিণত হন। চার দশক ধরে বেডরিডন থাকার পর তাঁকে মুক্তি দেবার জন্য সুপ্রিম কোর্ট জারি করে যুগান্তকারী আদেশ। সেই অর্ডারের বলেই আইনসঙ্গত হয় প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া। তবে এর আইনি জটিলতা প্রচুর।

রঙ্গিত বলল, সেটা জানি। অন ডিউটি ডক্টরকে লিখিত প্রতিবেদন দিতে হয়, যা দরকার হলে কোর্টে পেশ করা হতে পারে। বেলজিয়াম বা সুইটজারল্যান্ডে আছে অ্যাক্টিভ ইউথেনেশিয়া। ব্রিটেন থেকে বহু টার্মিনাল পেশেন্ট সুইটজারল্যান্ডে গিয়েছিলেন শুধু আত্মহত্যা করবেন বলে। নিজে সেই ক্রাইসিস ফেস করেছিলাম বলে আমি উপলব্ধি করেছি মৃত্যুর মতো এত শক্তিশালী প্রতিপক্ষ আর নেই। তার কাছে ধনী আর দরিদ্র সব সমান।

মুকুট মাথা নেড়ে বলল, তা ঠিক। রোড রোলার-এর কাছে যেমন সামনে পড়ে থাকা সবকিছু সমান, মৃত্যুর কাছেও হ্যাভ আর হ্যাভ নট সব এক।

রঙ্গিত জানতে চাইল, তোমার তো ফার্স্ট স্টেজে ধরা পড়েছিল। তোমারও কি এমন কষ্ট হয়েছিল?

মুকুট শুকনো গলায় বলল, কেমো নেবার সময় এত যন্ত্রণা হতো যে, আমি ভাবতাম মরতেই যখন হবে তখন এত কষ্ট পেতে পেতে মরব কেন। স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেওয়াই তো ভালো। উইকিপিডিয়া ঘেঁটে খুঁজতাম আত্মহত্যার সহজ উপায়। দেখতাম ইউথেনেশিয়া নিয়ে কী আইন আছে আমাদের দেশে। বাবা মা আমার কথা আমল দেয়নি। ডক্টর রায়চৌধুরিও আমার আর্জি শুনে হেসেছেন। এখন ভাবি, ভাগ্যিস আত্মহত্যা করিনি!

এভরিথিং ইজ প্রিডেস্টাইন্ড। তুমি সুইসাইড করলে কত কী মিস করতে ভাবো একবার। আজ এই দুর্গামণ্ডপে উপস্থিত থাকতে পারতে না। তোমার বাবা-মায়ের সান্নিধ্যও আর পেতে না। ইন ফ্যাক্ট আমাদের আজ এখানে দেখাও হতো না। মজা করে বলল রঙ্গিত।

তা বটে। বাই দ্য ওয়ে, তুমি আজ বাড়ি যাচ্ছ তাই না? কলকাতার পুজো মানেই তো জমজমাট ব্যাপার। কত বড় বড় সব আলো ঝলমলে প্যান্ডেল। খুব ভালো কাটবে তোমার ছুটির দিনগুলো। মুকুট বলল হাসিমুখে।

রঙ্গিত মুখ ভেটকে বলল, ধুস ওখানে সবই তো অমুক নেতার পুজো তমুক দাদার পুজো। উঁচু উঁচু রাস্তা আটকানো প্যান্ডেল। একটার সঙ্গে অন্যটার প্রতিযোগিতা। পুজো হতো আমাদের ছোটবেলায়। আমার মামার বাড়ি কলকাতার বাইরে। সেখানে প্যান্ডেলের বাইরেও ছোট ছোট পুজোর আয়োজন করা হতো। তার কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। সেই সব স্মৃতি এখনও হন্ট করে আমাকে।

এটা সত্যি কথা। শহুরে পুজোয় মাইকে ঘোষণা করা হয় সব শ্রেণির সব সম্প্রদায়ের মানুষ সামিল হয়েছে আমাদের এই পুজোয়। তখন বোঝা যায় এই পুজো আসল নয়, আসলের ভান। পুরস্কার পাওয়ার জন্য এই দাবি, আর কিছু নয়। মুকুট বলল, আমাদের চা বাগানের এই পুজোতে আড়ম্বর নেই জৌলুস নেই কিচ্ছু নেই। কিন্তু এই পুজোয় সত্যিকারের প্রাণ আছে।

মেয়েটা কী ঝরঝর করে অনাড়ষ্ট ভঙ্গিতে কথা বলে। কী স্পষ্ট সাবলীল উচ্চারণ! রঙ্গিত মুগ্ধ হচ্ছিল। সায় দিয়ে বলল, এটা তুমি ঠিক বলেছ। এই পুজোয় সত্যিই প্রাণ আছে।

মুকুট বলল, আমার মামাবাড়ি শান্তিনিকেতন। সেখানে পুজোর সময় যেতাম। সেই মাঠকে বলা হতো দুর্গামেলার মাঠ। যে মাঠে দুর্গাপুজো হতো সেই মাঠের মাঝে বাঁধানো থাকত একটা মঞ্চ। পাড়ার লোক চাঁদা তুলে বানিয়েছিল। তখন রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহ পায়নি পুজোগুলি। সত্যিকারের সর্বজনীন পুজো ছিল। মেলা তো সব শ্রেণির মানুষকে মেশায়। দুর্গামেলা কথাটার তাৎপর্য বোঝা যেত পুজোর দিনগুলিতে।

রঙ্গিত বলল, তখন বিজ্ঞাপনের চমক ছিল না। কিন্তু আন্তরিকতার গন্ধ লেগে থাকত সেই সব পুজোর গায়ে। পুজোর দিনগুলো রঙিন হয়ে উঠত হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান সব শ্রেণির মানুষের অবাধ মেলামেশায়।

ডক্টর শর্মা এসে বসেছেন দুজনের পাশে। মন্তব্য করলেন, কী ভালো ছিল সে সব দিন! এখনকার মতো তুমুল রেষারেষি ছিল না পাড়ায় পাড়ায়। আন্তরিকতা ছিল সকলের মধ্যে। মেলা আর সমাজের গুরুত্ব চিন্তাবিদরা ভালো করেই বুঝতেন। তাঁরা মেলার আয়োজন করতেন মানুষকে মিলিয়ে দেবার জন্য। তখন ক্লাবগুলিকে ঘিরে অংক কষত না কেউ।

রঙ্গিত বলল, এখন দুর্গাপুজো বা শ্যামাপুজো মানেই ভোটের অংক। কোন রাজনৈতিক দাদা কত জাঁকজমক করে পুজো করতে পারে তার ওপর নির্ভর করে তার ভোটের ভবিষ্যৎ। আসলে যেখানেই মানুষ দলবদ্ধ হয় সেখানেই সুযোগ নিতে এগিয়ে আসে রাজনীতির মানুষেরা। সময় বদলেছে। সেই দিনগুলোও হারিয়ে গিয়েছে।

ডক্টর শর্মা বললেন, আমি কিন্তু স্মৃতি জমিয়ে রাখি। সেই সব পুরনো মেদুর সোনালি দিনের স্মৃতিগুলোকে আমি আমার নিজস্ব তোরঙ্গে তুলে রেখেছি ন্যাপথলিন দিয়ে। ইচ্ছে হলে তোরঙ্গ খুলে ফেলে আসা দিনগুলোকে নেড়েচেড়ে দেখি। আবার তুলে রেখে দিই।

দুর্গাপুজোর সময় মেঘদুয়ারে আমি আসি এই কারণে। শহরের পুজোয় ভিড়ে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। ভালো লাগে না। চা বাগানের পুজোয় আড়ম্বর নেই কিন্তু প্রাণ আছে। আমার এমন পুজোই ভালো লাগে। প্রাণের আরাম হয়। মুকুট বলল।

রঙ্গিত বলল, বাঙালির সব থেকে বড় উৎসব দুর্গাপুজো। কিন্তু যে হারে ধর্ম নিয়ে আকচাআকচি বাড়ছে তাতে ভয় করে। মানুষের মন থেকে ধর্মান্ধতা দূর করা দরকার। একটা কাজ করা যায়, দুর্গামণ্ডপে কিছু প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যায়। সেখানে থাকল ধরো হজরত মহম্মদ বা যিশু খ্রিস্টের জীবনী। থাকতে পারে এই এলাকারই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কৃতী মানুষের ছবি। সমাজে তাঁদের অবদানের কথা। এই বাগানেই সেটা করা যেতে পারে। পুজো উদ্বোধনের জন্য ডাকা যেতে পারে এলাকার সব সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ও সর্বমান্য মানুষদের থেকে একজন করে বেছে নিয়ে।

মুকুট মাথা নেড়ে বলল, খবরের কাগজে বা টিভিতে যদি এই খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে তবে অন্যান্য পুজো কমিটিগুলোও উৎসাহ পাবে। আইডিয়াটা ইউনিক। বাবাকে বলতে হবে কথাটা।

ডক্টর শর্মার স্ত্রী বৃন্দা ডাকছেন। ‘যাই ওদিকে, ডাক পড়েছে আমার, পুজোর কাজে সাহায্য করতে হবে’, বলে ডক্টর শর্মা উঠে গেলেন পুজো প্রাঙ্গনের ওদিকে। মুকুটের দিকে তাকিয়ে রঙ্গিত বলল, তুমি এখন ফিট?

মুকুট বলল, কেমো নেওয়া শেষ হয়েছে। তবে চেক আপ করিয়ে যেতে হবে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর। যে অনকোলজিস্ট আমাকে দেখছেন সেই ডক্টর রায়চৌধুরি আশ্বাস দিয়ে বলেছেন ফার্স্ট স্টেজে ধরা পড়েছে বলে বিপদ কাটানো গেছে এ যাত্রা। তিনি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। তাই আত্মহত্যা করতে হয়নি। এমন মানুষ যে হতে পারে সেটা তাঁর সঙ্গে দেখা হবার আগে জানতাম না।

রঙ্গিত বলল, ডক্টর রায়চৌধুরি যখন বলেছেন তখন চিন্তা নেই। শিগগিরি ফিট হয়ে যাবে।

মুকুট বিস্মিত হয়ে বলল, তুমি তাঁকে চেনো?

ডক্টর রঞ্জন রায়চৌধুরি আর আমি তো বেলেঘাটার রাধামাধব দত্ত লেনে থাকি। নিস্পৃহ গলায় বলল রঙ্গিত।

মুকুটের বিস্ময় আরও বাড়ল যেন। হাঁ হয়ে গিয়ে বলল, তিনি তোমার নেক্সট ডোর নেবার বুঝি?

মুকুটের টানাটানা চোখ, তীক্ষ্ণ নাক, কাঁধ অবধি ঢেউ খেলানো সুন্দর চুল, ভরন্ত ঠোঁট, নরম সুডৌল বুকের আভাসে মনে হচ্ছিল রূপকথার বইয়ের পাতা থেকে কোনও রাজকন্যা তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ঠাকুরমার ঝুলির এই রাজকন্যা এতকাল ঘুমিয়ে ছিল, সোনার কাঠি রুপোর কাঠি ছুঁইয়ে তাকে জাগিয়ে দিয়েছে কেউ। রঙ্গিত স্মিতমুখে বলল, তুমি যার নাম বললে সেই ভদ্রলোক আমার জন্মদাতা বাবা। আমরা এক ছাদের তলাতেই থাকি।

মুকুট চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কথাটা বিশ্বাস করবে কি না ভাবছে। শেষে বলল, সত্যি?

লবঙ্গ লবঙ্গ গন্ধটা আবার নাকে এল রঙ্গিতের। মেয়েটির শরীর থেকে ভেসে আসছে অলীক ঘ্রাণ। একটা অব্যক্ত ভালোবাসার আবেশ ছড়িয়ে পড়ছে তার সারা শরীর জুড়ে। ঝিমঝিম করছে তার মাথার ভেতরটা। নাসারন্ধ্রে সেই মিঠে গন্ধ নিতে নিতে রঙ্গিত হাসল, হ্যাঁ রে বাবা, সত্যি। কিন্তু কী জানো, রক্তসূত্রের আত্মীয়তা আসল আত্মীয়তা নয়। আসল আত্মীয়তা জন্মায় মানসিকতার নৈকট্য দিয়ে, দৃষ্টিভঙ্গির মিল দিয়ে, মূল্যবোধের সমতা দিয়ে।

তোমার কথা শুনে আমার আবার রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ছে। তিনিই তো বলেছিলেন আত্মার যিনি কাছে থাকেন, তিনিই আত্মীয়।

রঙ্গিত বলল, আমিও সেটাই মনে করি। রক্তসূত্রে যে আত্মীয়তা আমরা পাই তাতে কোনও বাহাদুরি নেই। এটাও অবশ্য ঠিক যে, তাতে কোনও দৈন্যও নেই। জন্মসূত্রে কেউ রাজা হন, কেউ দীনহীন। কেউ ব্রাহ্মণ, কেউ শূদ্র। কিন্তু যে-আত্মীয়তা জীবনে চলার পথে গড়ে ওঠে তা-ই হল সত্যিকারের আত্মীয়তা। আমার কাছে সেটা অনেক বেশি প্রেশাস।

পুজোর ঢাক বাজছে। পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণ কানে ভেসে আসছে। যজ্ঞের ধূপধুনোর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। কারা যেন ডাকছেন নাম ধরে। মুখ ফিরিয়ে ‘যাই’ বলল মুকুট। রঙ্গিতের দিকে তাকিয়ে বলল, আজকের দিনটা আমার জীবনে স্পেশাল। আমি মানুষটা একটু অদ্ভুত। চট করে আমি সকলের সঙ্গে মিশতে পারি না। যাদের সঙ্গে আমার ওয়েভ লেন্থ ম্যাচ করে না তাদের আমি এড়িয়েই চলি। আমার বেশ ভালো লাগল তোমার সঙ্গে আলাপ করে।

আমার বাবা প্রতিষ্ঠিত অনকোলজিস্ট। তিনি নিজের কাজের জায়গায় নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছেন। কিন্তু আমি এখনও তেমন কিছু করে উঠতে পারিনি। তবে বাবার পরিচয়ে পরিচিত হওয়াটা আমার লক্ষ্য নয়, আমাকে আমার কাজ দিয়ে একদিন মানুষজন চিনবে সেটাই আমি চাই। যে কোনও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষই তো তেমনটাই চাইবে। সেটাই তো কাম্য। তুমিও নিশ্চয়ই চাইবে তোমার বাবার পরিচয়ে নয়, নিজস্ব একটা স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলে সকলের কাছে পরিচিত হতে। রঙ্গিত একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছিল। এবার হালকা গলায় বলল, কী ম্যাডাম, আমি কথাটা ঠিক বলেছি কিনা?

মুকুট তাকিয়ে আছে রঙ্গিতের দিকে। তার চোখের দৃষ্টি গভীর। নরম, কিন্তু ধীর গলায় বলল, ইউ আর আ ডিসেন্ট ম্যান। আজ থেকে তোমার প্রতি রেসপেক্ট আমার আরও বেড়ে গেল।

১১

সূর্য অস্ত যাচ্ছে পশ্চিম আকাশে। গোধূলির শেষ আলোটুকু শুষে নিচ্ছে চা বাগান। সবুজ মসৃণ চা গাছের পাতাগুলো থেকে ভেসে আসছে মন কেমন করা সুবাস। ঢেউ খেলানো চা বাগানের ওপর দিয়ে পশ্চিম আকাশটাকে অপার্থিব লাগছে। নাম না জানা কোনও পাখি ডাকছে ট্যাঁ-ট্যাঁ করে। হেমন্তের প্রকৃতি প্রোষিতভর্তৃকা নারীর মতোই বিধুর রঙে সেজেছে। আলোর গন্ধটাও আজকাল কেমন বদলে বদলে যাচ্ছে। পাঁচটা বাজতে না বাজতেই আঁধার ঘনিয়ে আসে। আজও যেমন সূর্য এইমাত্র অস্ত গেলেও সিঁদুরে লাল রং ধার দিয়ে গেছে পশ্চিম আকাশকে। সেই লালিমার আয়ুও বেশিক্ষণের নয়। তা একটু পরই বদলে যাবে ধূসর রঙে। চা বাগানের পথ দিয়ে হাঁটছে তিনজন। ডক্টর শর্মা, রঙ্গিত আর জোয়ারদার। রঙ্গিত বলল, জানেন তো ডক্টর শর্মা, কাল রাতে আমার একটুও ঘুম হয়নি।

ডক্টর শর্মা জানতে চাইলেন, কেন কী হল?

রঙ্গিত বলল, আর বলবেন না, মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল লোকজনের গলার আওয়াজে। প্রথমে ভেবেছিলাম ডাকাত-টাকাত পড়েছে বোধ হয়। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি কুলি লাইনের রাস্তায় আলো জ্বালিয়ে কিছু একটা হচ্ছে। আগুন জ্বালিয়ে ঢাক ঢোল পিটিয়ে কীসব মন্ত্র উচ্চারণ করছে কারা যেন। অনেকক্ষণ ধরে আঁচ করার চেষ্টা করলাম, তবে ব্যাপারটা যে কী সেটা বুঝতে পারলাম না।

ডক্টর শর্মা বললেন, কাল তো অমাবস্যা গেছে। তার মানে তুমি নিশ্চয়ই ভূতপুজো দেখেছ।

রঙ্গিত অবাক গলায় বলল, মানে? ভূতকে আবার পুজো করা হয় নাকি?

ডক্টর শর্মা একচোট হেসে বললেন, এ তো আর শহর নয়, চা বাগান এলাকা। এসব দিকে আদিবাসীদের অনেকেই ভূতে বিশ্বাস করে। অমাবস্যার রাতে জাঁকজমক করে ভূতের পুজো হয়। পুরোহিত ধরে নিয়ে আসা হয়। তারা মন্ত্র উচ্চারণ করে। ঢাকঢোল বাজে। আরও নানারকম ব্যাপার আছে। সব যে আমিও বুঝি তা নয়। চা বাগানের জীবনযাপন অন্যরকম। কোনও জায়গার সঙ্গেই মিলবে না। শহুরে মানুষ জানেই না হরিয়া বিন্দিয়া রুকমিনি ফুলমতিয়া সরসতিয়া ভীমা চামেলি বিষ্ণু শুকলালদের কথা। জানে না এই মানুষগুলি কী অমানুষিক মেহনত করে চা বাগানে। তাদের শ্রমের দাম আমরা দিতে পারি না।

জোয়ারদার বলল, বুঝলেন রায়চৌধুরি, আপনি কখনও এদের ঘরে গেলে দেখবেন চুলোতে মাটির হাঁড়ি বসিয়ে রোদে শুকোনো চায়ের পাতা ভাঙে এরা। তারপর সেই পাতা চুলোয় ভেজে হাঁড়িতে তুলে রাখে। সকালে কাজে যাবার সময় জ্বাল দিয়ে নুন দিয়ে গুলে খায় অনেকেই। বিমল লামা ‘নুন চা’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। সেই বই পড়ে মানুষ জানতে পেরেছে চা বাগানের অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের জীবনযাপনের অনেক অজানা কথা। বইটা আমার কাছে আছে। আপনি চাইলে আমি পড়তে দিতে পারি।

রঙ্গিত বলল, দেবেন তাহলে। বই পড়া আমার হ্যাবিট ছিল একসময়। কলকাতা থেকে কিছু পছন্দের বই নিয়ে এসেছিলাম। এখনও শোবার সময় রোজই কিছু না কিছু বই পড়ি।

খুব ভালো অভ্যেস। ডক্টর শর্মা বললেন, আচ্ছা তুমি ইঞ্জিনিয়ার মানুষ, চা বাগানের কোনও প্র্যাক্টিক্যাল এক্সপিরিয়েন্স ছিল না তোমার, এই প্রথম দেখছ হাতেকলমে। তা, কেমন লাগছে এই চা বাগান?

রঙ্গিত বলল, আমার চা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা বলতে গেলে কিছুই ছিল না। তবে টোকলাই ট্রেনিং আমার খুব কাজে দিয়েছে। এবার ফিল্ডে কাজ করে করে আমি এক্সপিরিয়েন্স গ্যাদার করছি। বাই কার্টসি জোয়ারদার, ফ্যাক্টরির কাজকর্মও খানিক শিখেছি। এই যেমন ধরুন ব্ল্যাক টির নামই শুনেছি এতদিন, তা তৈরির যে প্রসেস, সেই উইদারিং, রোলিং, ফারমেন্টিং আর ড্রায়িং সেটাও জোয়ারদারের কাছেই জানলাম।

ডক্টর শর্মা প্রশংসা করে বললেন, তুমি বেশ ইনকুইজিটিভ। চাকরি জীবনে এত অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার দেখলাম, কাজ জানার এমন উদগ্র কৌতূহল আর কারও মধ্যে দেখিনি। এটা খুব ভালো লক্ষণ ক্যারিয়ারে শাইন করার। তুমি একদিন অনেক উঁচুতে উঠবে।

রঙ্গিত মজা করে বলল, কিউরিওসিটি কিলস দ্য ক্যাট বলে একটা আপ্তবাক্য আছে। ঘুরিয়ে সেটাই বলতে চাইছেন তো?

ডক্টর শর্মা বললেন, তা কেন? আমি তো অ্যাপ্রিসিয়েট করলাম। তুমি একদিন না একদিন সিনিয়র ম্যানেজার হবে। সব অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারেরই তো অ্যামবিশন থাকে আরও ওপরে ওঠার। কিন্তু ফিল্ড আর ফ্যাক্টরি এই দুটো অ্যাসপেক্টেই যদি ভালো দখল না থাকে তবে সমস্যা হয়। বাই দ্য ওয়ে তুমি উইদারিং কী ভাবে করা হয় দেখেছ?

রঙ্গিত সায় দিয়ে বলল, সেদিন ফ্যাক্টরিতে দেখলাম। চা পাতা থেকে জলীয় বাষ্প বার করে দেওয়ার কাজটাকে যে উইদারিং বলে সেটাও জানলাম। এর ফলে পাতাগুলো ভেঙে যায় না, পাতাগুলোকে বাঁকানো বা রোল করানো সহজ হয়।

জোয়ারদার বলল, এই সেদিনও ফ্যাক্টরির বিভিন্ন তাকে চা পাতাগুলোকে সমানভাবে ছড়িয়ে দিয়ে এসব কর্মকাণ্ড চলত। সেটা টাইম কনজিউমিং। এখন আধুনিক যন্ত্র বেরিয়ে গেছে। মেশিনের সাহায্যে চা পাতা থেকে জলীয় বাষ্প বের করে তা আনা হয় রোলার বিভাগে। সেখানে চা পাতাগুলিকে টুইস্ট বা মোচড়ানো হয়। আধঘণ্টা পর পাতার ভালো অংশগুলোকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ফারমেন্টেশনের জন্য। যে পাতাগুলো ভালো নয় তা ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয় রোলিং বিভাগে।

রঙ্গিত বলল, জানেন তো, ছোটবেলায় একটা পেশা নিয়ে মারাত্মক আগ্রহ ছিল, সেটা হল টি টেস্টারের প্রফেশন। অবাক হয়ে ভাবতাম, একটা লোক শুধু চায়ের স্বাদ নিয়ে মাসে মাসে কীভাবে মোটা টাকা মাইনে পায়? আচ্ছা টি টেস্টার কি আদৌ আসেন এই চা বাগানে?

জোয়ারদার হাসল, আসেন বইকি। আপনিও এদের পাল্লায় পড়বেন একদিন না একদিন। এই সব লোকগুলোকে ফেস করা আর হেলমেট ছাড়া জামাইকার আন্ডার প্রিপেয়ার্ড বাউন্সি পিচে ম্যালকম মার্শালের বাউন্সারের মোকাবিলা করা এক।

রঙ্গিত অবাক হয়ে বলল, কেন বলুন তো?

জোয়ারদার বলল, টি টেস্টারদের ওপর দায়িত্ব থাকে চায়ের গুণগত মান অ্যাসেস করা। এঁরা দিল্লি মুম্বই থেকে সুট বুট পরে চা বাগান ভিজিটে আসেন, গ্যাট ম্যাট ইংরেজি বলেন। তাতেই লোকে ভড়কে যায়। এঁরা প্রথমেই চায়ের অ্যাপিয়ারেন্স দেখেন। যেমন অর্থোডক্স চায়ের ক্ষেত্রে তাঁরা দেখেন গোল্ডেন টিপ, সিলভার টিপ, গ্রে টিপ আর ব্ল্যাক টিপ।

রঙ্গিত বলল, টিপ কাকে বলে? চায়ের যে অংশটা কুঁড়ি থেকে পাওয়া যায় সেটাই তো?

জোয়ারদার বলল, চা পাতার কুঁড়িতে আঁশ থাকতেই হবে। চায়ের যে রস এই আঁশে লেগে থাকে সেটাই টিপ-এর রং ঠিক করে দেয়। ঘাঘু কোনও টি টেস্টার হলে এই টিপ দেখেই ধরে ফেলতে পারে চা প্রস্তুতির সময় যথেষ্ট টেক কেয়ার করা হয়েছিল কি না। চায়ের লিকার নিয়ে টি টেস্টারদের কোড আছে।

রঙ্গিত ভুরু কুঁচকে বলল, যেমন?

জোয়ারদার হেসে বলল, যেমন ‘কপারি’ বলতে বোঝানো হয় ভালো চা। আবার ‘ব্রাইট’ বললে বোঝাবে ভালো লিকার, যার মানে পরিষ্কার লাল রং। অর্থাৎ একে আবার ব্রু করা যেতে পারে। এখন শব্দগুলো গ্রিক লাগছে শুনতে, তবে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন এই টার্মগুলোর সঙ্গে।

ডক্টর শর্মা মজা করে বললেন, আমি টেকনিক্যাল লোক না হয়েও একটা জিনিস জানি। টি টেস্টার যদি চা-পাতা দেখে ‘ডাল’ কথাটা উচ্চারণ করেন তবে ম্যানেজারের মুখ শুকিয়ে যায়। ডাল মানে নিকৃষ্টমানের চা। অর্থাৎ এই চা তৈরি করার সময় যথেষ্ট যত্ন নেওয়া হয়নি সেটা ধরে ফেলেছেন টি টেস্টার। আরও কিছুদিন যাক এই বাগানের চরিত্র ধরে নিতে পারবে তুমি।

রঙ্গিত বলল, বাগানের চরিত্র নিয়ে যখন কথা উঠল তাহলে আমি আমার অবজারভেশন বলি। এখানে এতদিন থেকে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে এই জায়গাটা সম্পর্কে। যেমন এই চত্বরের বেশির ভাগ বাগানে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে গোলমাল লেগেই আছে। মদ খাওয়া নিয়েই যত গণ্ডগোল। তবে মেয়েরা একতরফা মার খায় না। পাল্টা মারও মারে। পুরুষদের বেশির ভাগই পাঁড় মাতাল। সন্ধেবেলা কাজ শেষে কোয়ার্টার্সে ফিরে আসার সময় কত লোককে যে মাতলামি করতে দেখি তার ঠিক নেই। তবে মেয়েরাও নেশা করে চুটিয়ে। আর হ্যাঁ মেয়ে বলে আন্ডারএস্টিমেট করার ব্যাপার নেই। চা বাগানের মেয়েরা পুরুষদের থেকে অনেক বেশি পরিশ্রমী।

ডক্টর শর্মা বললেন, ভালোই অবজার্ভ করেছ বলতে হবে। আসলে ওদের সমাজ আমাদের উল্টো। যারা চা পাতা তোলে তাদের একটা শ্রেণির মধ্যে কিছু অদ্ভুত নিয়ম আছে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হলে অনেক মহিলা স্বামী আর সংসার ছেড়ে প্রেমিকের সঙ্গে গিয়ে নতুন সংসার পাতে। এদের যুবক যুবতীরা প্রেম করলে আর তাদের বিয়েতে অভিভাবকদের মত না থাকলে বাড়ি থেকে পালিয়ে দুজনে অন্য কোথাও ঘর বাঁধে। অভিভাবকের মত থাকলে সমস্যা নেই। তখন শুরু হয় উৎসব। সে এক দেখার মতো ব্যাপার।

জোয়ারদার বলল, পুরোহিত দিয়েই এদের বিয়ে হয়। সানাই আর ঢোল তো আছেই, সানাইয়ের মতো বিশাল একরকম বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আসে সকলে। বরযাত্রীর ভোজে থাকে ঢালাও মদ। আর থাকে শুয়োরের মাংস। একটা লম্বা বাঁশ, দুই প্রান্তে কাপড় বেঁধে দোলার মতো করে কনেকে বসিয়ে কাঁধে নিয়ে কনের শ্বশুরবাড়ি যায়। কেউ মারা গেলে কাঁধে করে শঙ্খ বাজিয়ে শ্মশানযাত্রা হয়। শ্মশানে দাহ করে সাদা কাপড়ের নিশান লাগায়।

ডক্টর শর্মা হাসলেন, ফি রবিবার করে হাট বসে পাশের চা বাগানে। বস্তির মেয়েরা পিঠে ঝোলানো বেতের টুকরিতে করে নানারকম পশরা নিয়ে হাটে যায়। মাখন, কোয়াশ এমন সব জিনিস। কুলিলাইনে গেলে দেখবে রাস্তার ধারে বস্তির লোকেরা মদ খাচ্ছে। জুয়া খেলছে। কোনও লজ্জা বা অপরাধবোধ কিছু নেই। ইন ফ্যাক্ট কোনও রাখঢাকই নেই। এদের সমাজ এমনই।

জোয়ারদার বলল, রোববার তো ফ্রি-ই থাকেন, হাটে কখনও যাবেন পারলে। সেখানে সেরা আকর্ষণ হল মুরগির লড়াই। দুটো সতেজ মুরগির পায়ে বেঁধে দেওয়া হয় ধারালো ছুরি। দুটো মুরগি নিজেদের মধ্যে প্রাণঘাতী লড়াই লড়তে থাকে। তাজা রক্ত ঝরে মাটিতে। রঙিন পালক উড়ে বেড়ায় হাটের ধুলো মেখে। ডিএসএলআর ক্যামেরা কাঁধে অনেক শখের ফোটোগ্রাফারই চলে আসে মুরগি লড়াইয়ের ছবি তুলতে।

কুলিলাইনের মাথায় একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তিনজন। বাড়িটার নীচের দিকটা মাটি আর পাথরের। ওপরে রেলিং ঘেরা বারান্দা। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘরটাও কাঠের। টিনের চাল। নীচের দিকে ঘেরা দেওয়া। সেখানে গোরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগি। রঙ্গিত আঙুল উঁচিয়ে বলল, এটা কী ব্যাপার?

জোয়ারদার বলল, এসব জঙ্গল ঘেঁষা চা বাগানের দিকে হাতির উপদ্রব যেমন আছে তেমনি চিতাবাঘের আনাগোনাও লেগেই থাকে। মানুষের ওপরও আক্রমণ করে লেপার্ড। মারাও গেছে অনেকে। চিতাবাঘের হাত থেকে হাঁস মুরগি ভেড়া ছাগলের মতো জীবজন্তুদের বাঁচানোর জন্য এই ব্যবস্থা। তার পর গলাটা তুলে হাঁক দিল, দাইমা, হো দাইমা!

দু-তিনবার ডাকার পর ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে তামাটে রঙা এক মহিলা। ছিপছিপে চেহারা। উচ্চতা মাঝারি। গলায় সরু রুপোর চেন। হাতে রংচটা সোনালি চুড়ি। কপালে বড় একটা সবুজ পুঁতির টিপ। রঙ্গিতের মনে হল পঞ্চাশের এপারেই হবে বয়স। কোঁচকানো ভুরু আস্তে আস্তে সহজ হল। মহিলা বলল, নমস্তে সাব, অন্দর আইয়ে।

ভেতরে ঢুকেছে সকলে। হরিণ আর বাইসনের শিং দিয়ে সাজানো বসার জায়গা। দেওয়ালে ঠাকুর দেবতার ছবি। ঘরটা সাজানো গোছানো। তিনজনের উদ্দেশে হাত জড়ো করে নমস্কার জানাল দাইমা। মুখে একটা প্লাস্টিক হাসি ফুটিয়ে বলল, চা বলি? চা চলবে তো আপনাদের?

ডক্টর শর্মা বললেন, দরকার নেই চায়ের ঝামেলা করার। আমরা একটু আগেই চা খেয়ে বেরিয়েছি।

দাইমা গলা তুলে ভেতরে কাউকে চা বানাতে হুকুম দিল। মুখ ফিরিয়ে বলল, ঝামেলা কেন বলছেন? আমরা চা বাগানের মানুষ। চা নিয়েই তো থাকি। এক কাপ চা খেলে খারাপ কিছু হবে না।

রঙ্গিত স্মিতমুখে বলল, আমি মেঘদুয়ার চা বাগানের নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। আপনার কথা অনেক শুনেছি। তাই আলাপ করতে এলাম।

একটা কাঠের চেয়ারে বসেছে রঙ্গিত। দেওয়ালে সাদাকালো বাঁধানো নেপালি এক দম্পতির ফোটো, দাইমার বাবা-মা হবে হয়তো। প্লাস্টার অফ প্যারিসে তৈরি পুতুল। কাঁচা হাতে পেনসিলে আঁকা এক মঙ্গোলয়েড বৃদ্ধের পোর্ট্রেট। দাইমা ভাঙা হিন্দিতে বলল, কেন গরিবকে লজ্জা দিচ্ছেন স্যার। কত পড়াশোনা জানা মানুষ আপনারা। আমার মতো আনপড়ের সঙ্গে কী আর আলাপ করবেন। বসুন, আরাম করে বসুন।

রঙ্গিত বলল, এই চা বাগানের সব প্রসূতি মহিলাই শুনি আপনার কাছে প্রসবের জন্য আসে। বাগানে একটা হাসপাতাল থাকতেও কেউ ডেলিভারি করাতে সেখানে যায় না। ঠিক কী কারণে আপনার ওপর এত ভরসা সকলের বলুন তো। আপনি কি জাদুটোনা জানেন?

শ্লেষের তির কি বিঁধেছে জায়গামতো? রঙ্গিত ঠিক বুঝতে পারল না। তবে দাইমা হাসিটা মুখে ধরে রেখেই বলল, জাদুটোনা কিছু জানি না। তবে হ্যাঁ গত বাইশ বছরে হাজারখানেক ডেলিভারি আমি একা হাতে করিয়েছি। আশপাশের বাগান থেকেও মহিলারা আমার কাছে ছুটে আসে। যেটুকু পারি সাহায্য করি। কিছু পুণ্য কামিয়েছি এভাবে।

রঙ্গিত বলল অবাক হয়ে, কিন্তু এত পেশেন্ট একা হাতে কী করে সামলান আপনি?

দাইমার মুখে হাসি। বলল, সেই শক্তি আমার ভগবান দেন আমাকে। শিক্ষিত লোকেরা যতই নাক কুঁচকোন, গোটা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে আমাদের মতো দাইমারা। আপনারা পড়ালেখা জানা লোক, তাহলে জানেন নিশ্চয়ই, এই দেশে এক লক্ষের বেশি মানুষ নিয়মিত দাইয়ের কাজ করে।

সংখ্যাটা খানিক বেশিই হবে হয়তো। কিন্তু আমার জানতে ইচ্ছে করছে যে, আপনি দাইমার কাজ শিখলেন কী করে? রঙ্গিত কৌতূহলী হয়ে জিগ্যেস করল।

আমার এক মাসির কাছে শিখেছি। ছোটবেলায় দেখতাম পেশেন্ট পার্টি ডাকলে মাসি যেত ওদের সঙ্গে। আমিও যেতাম পেছন পেছন। দেখে দেখে শিখতাম কাজ। বাইশ বছর আগে প্রথমবার ডেলিভারি করিয়েছিলাম। ফুটফুটে একটা ছেলে হয়েছিল, নাম দিয়েছিলাম রোশন। সে এই বাগানে পাতা তোলে। আমাকে ডাকে মা বলে। নিজের ছেলেমেয়ে নেই, আমার হাতে যাদের জন্ম তাদের প্রত্যেককেই আমি নিজের সন্তান বলে মানি। তারাও আমাকে মায়ের মতোই দেখে।

প্রত্যেক ডেলিভারির জন্য কত পারিশ্রমিক নেন? রঙ্গিত কথাটা বলা উচিত হবে কিনা ভাবছিল। শেষে বলেই বসল।

যে যেমন দেয়। দাইমা উদাস হাসল, কেউ সঙ্গে একটা শাড়িও দেয়। কারও থেকে চাই না কিছু। লোকে আমাকে ভরসা করে ডাকে সেটাই বড় কথা। এদিকের লোকের তো আর টাকাপয়সা নেই। তারা টাকা দেবে কোথা থেকে। কিন্তু আমারও তো একটা ধর্ম আছে। সব জেনেশুনে তো আমি আর বসে থাকতে পারি না।

যে মেয়েটি চা নিয়ে ঘরে এল তার আষাঢ়ের মেঘের মতো গায়ের রং। সামনের টুলটায় চায়ের কাপ রাখল সে। দাইমা সস্নেহে বলল, ও হল সরসতিয়া। এই বাগানেই পাতা তোলার কাজ করে। ওকে চেনেন?

রঙ্গিত মুখের যে ভাবটা করল তাতে হ্যাঁ বা না দুটোই বোঝায়। দাইমা বলল, সরসতিয়া আমাকে মা বলে ডাকে। মায়ের মতোই শ্রদ্ধা ভক্তি করে। ওর জন্ম দিতে গিয়ে ওর মা মারা গিয়েছিল। ওর বাবা এই বাগানে পাতা তুলত। লোক এমনিতে ভালো হলেও পাঁড় মাতাল ছিল। মারা গেছে লিভার ড্যামেজ হয়ে। কাঁচা বয়সের মেয়ে, তাই ওর বাবা মারা যাবার পর ওকে আমার কাছে নিয়ে এসেছি। সরসতিয়া যখন আমাকে মা বলে ডাকে তখন আমার মনে হয় ও আমার নিজের মেয়ে।

দাইমা সকলের মুখের ওপর দৃষ্টি বুলিয়ে হাসল, আপনারা কী ভাবছেন আমি জানি। ওই মেয়ে আদিবাসী, আমি নেপালি, এই তো? কী জানেন, সরসতিয়া পেটে ধরা মা-কে কখনও দেখেনি বলে আমাকে নিজের মায়ের মতোই দেখে। রাতে শোবার সময় আমার পায়ে তেল মালিশ করে দেয়। আমি পেশেন্টের বাড়ি থেকে না ফেরা অবধি আমার জন্য না খেয়ে বসে থাকে। ঘর পরিষ্কার আর রান্নাবান্না আমাকে করতে দেয় না। সব নিজে হাতে করে। নিজের পেটে ধরা মেয়েও এমন হয় না। আগের জন্ম বলে কিছু থেকে থাকলে সরসতিয়া সেই জন্মে আমার মেয়ে ছিল নিশ্চয়ই।

সরসতিয়া লাজুক মুখে চলে গেল পাশের ঘরে। রঙ্গিত প্রসঙ্গ বদলে বলল, বহুদিন আগে মেঘদুয়ার বাগানের হাসপাতালে আপনার নাকি একটা ভুল অপারেশন হয়েছিল। কথাটা কি সত্যি?

দাইমা মুখ নামিয়ে আঙুলের নখ দেখছে মনোযোগ দিয়ে। মুখ তুলল। চোখ সরু করে রঙ্গিতকে দেখল খানিক। বলল, আপনি কী করে জানলেন?

ডক্টর শর্মা বললেন, আমি এখানে এসে সেই ঘটনাটার কথা ভাসা ভাসা শুনেছি। আপনি নাকি তখন প্রেগন্যান্ট ছিলেন। এই হাসপাতালে একজন সাউথ ইন্ডিয়ান ডাক্তার ছিলেন তখন। তিনিই আপনার চিকিৎসা করেছিলেন। তিনি কিছু একটা ভুল করেছিলেন। তাতে আপনার একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। তাই না?

দাইমা বলল, সেই শয়তান ডাক্তারটার নাম উগালে।

ডক্টর শর্মা বললেন, উগালে নয়, ওয়াগলে। বিষ্ণু ওয়াগলে নামে এক ডাক্তার বছর বিশেক আগে ছিলেন এই মেঘদুয়ার চা বাগানে। আমি তাঁকে মিট করিনি কখনও তবে নামে চিনি।

ওই ডাক্তারই আমাকে দেখত। এক রাতে খুব ব্যথা শুরু হল পেটে। মারাত্মক ব্যথা। সেই মাদ্রাজি ডাক্তারের কাছে গেলাম। সে আমাকে শহরে নিয়ে যেতে বলল। বাচ্চাটা নাকি একটা নালির মধ্যে বড় হচ্ছে। সেজন্য ব্যথা। চা বাগান থেকে গাড়ি দিল আমাকে। আমার তখন সাংঘাতিক ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। সহ্য করতে পারছি না এমন কষ্ট। চালসা অবধি পৌঁছতে পৌঁছতেই সব শেষ হয়ে গেল। বাঁ হাতের চেটো দিয়ে দাইমা চোখ মুছল। মাটির দিকে দৃষ্টি। মুখ তুলে বলল, আবার ভর্তি হলাম বাগানের হাসপাতালে। কী একটা অপারেশন হল। কয়েকদিন পর ছুটি হল। ছুটির সময় উগালে বলল, তলপেটের মধ্যে একটা নালি ফেটে গিয়েছে। আমি আর কখনও মা হতে পারব না।

ডক্টর শর্মা বললেন, আপনি কি ফ্যালোপিয়ান টিউবের কথা বলছেন?

ওসব ডাক্তারি নাম জানি না। তবে ছেলেটা আমার মতো দেখতে হয়েছিল। একদম আমার মতো চোখ, নাক। নিজে হাতে কবর দিয়েছিলাম বাচ্চাটাকে। ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল দাইমা।

ডক্টর শর্মা বললেন, আপনার স্বামীর মৃত্যুও কি সে সময়েই ঘটেছিল?

দাইমা ধরা গলায় বলল, বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যাবার পর আমার মরদ পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। সারাদিন মদ খেত। পাগল কা মাফিক ঘুরে বেড়াত এখানে ওখানে। একদিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। ওই মাদ্রাজি ডাক্তারকে আবার দেখালাম। সে বলল, মাথার শিরা ছিঁড়ে গেছে। কলকাতা নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু টাকা পয়সা ছাড়া বাইরে গিয়ে কী করব। ব্যাংকে মেয়াদি জমা রাখা কিছু টাকা ছিল। সেসব তুলে নিলাম। ধার করলাম কিছু। ট্রেনের টিকিট কাটা হয়েছিল। কিন্তু সময় পেলাম না। চোখের সামনে মারা গেল আমার মরদ।

দাইমা নাক টানল একবার। যাবতীয় হতাশা গলার স্বরে মিশিয়ে বলল, এই চা বাগানের হাসপাতাল আমার শত্রু। আমার সর্বনাশ করেছে উগালে আর এই হাসপাতাল। যদি ইনসান কা বাচ্চা হয়ে থাকি তাহলে এর বদলা আমাকেই নিতে হবে। তাই গত বাইশ বছর ধরে একা লড়াই করে যাচ্ছি আমি।

পাশের ঘর থেকে অস্পষ্ট একটা শব্দ রঙ্গিতের কানে এল। মনে হল গলায় আঙুল দিয়ে বমি করছে কেউ। একটু পর জল ঢালার শব্দ ভেসে এল ওদিক থেকে। জোয়ারদার সেদিকে তাকিয়ে ছিল। মুখটা ফিরিয়ে জানতে চাইল, আপনি আর সরসতিয়া ছাড়া এ বাড়িতে আর কেউ কি থাকে?

দাইমা বলল, আমরা দুজন থাকি। তবে আমার দরজা সকলের জন্য খোলা। যেসব ছেলেমেয়ের জন্ম আমার হাতে তাদের অনেকেই হুট হাট দেখা করতে চলে আসে আমার সঙ্গে। কেউ কেউ একমুঠো ভাত বা দুটো-একটা রুটি খেয়ে যায়।

ডক্টর শর্মা বললেন, হেলথ ডিপার্টমেন্ট থেকে কর্মীরা তো গ্রামীণ এলাকায় যান। প্রসূতিদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলো তো ওঁরাই দেখেন। এই বাগানে সরকারি লোকজন কেউ আসে না?

বলতে পারব না। দাইমা শক্ত মুখ করে বলল।

রঙ্গিত গলা খাকারি দিয়ে বলল, আচ্ছা একটা কথা জিগ্যেস করি। ডেলিভারি করাতে গিয়ে আপনার হাতে কখনও মারা যায়নি কেউ?

দাইমা নিস্পৃহ ভঙ্গিটা মুখে ধরে রেখেই বলল, না, মারা যায়নি। কেন যায়নি বলতে পারব না। আমার মনে হয় সেটা ওপরওয়ালার দয়া। তবে এটা ঠিক যে, পেশেন্ট দেখলেই আমি বুঝতে পারি বাড়িতে ডেলিভারি হবে নাকি রেফার করতে হবে। তেমন বুঝলে মেডিক্যাল কলেজে পাঠিয়ে দিই। সময় নষ্ট করি না। জীবন বাঁচানোই তো মানুষের ধর্ম। ঠিক কি না বলুন?

বাইরে কিছু মানুষের হাঁকডাক শোনা গেল। নেপালি ভাষায় কেউ কিছু বলছে। দাইমা নেপালি ভাষায় সাড়া দিয়ে হুড়মুড় করে উঠে পড়ল। ব্যস্ত গলায় বলল, পাশের বাগানে লেবার পেন উঠেছে এক মহিলার। ডেলিভারি করানোর জন্য ডাকতে এসেছে আমাকে। বুঝতেই পারছেন, আমার হাতে সময় নেই। আমাকে বেরোতে হবে।

দাইমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ফিরে আসছিল তিনজন। ডক্টর শর্মা বললেন, কী বুঝলে? আমি তো আগেই বলেছিলাম, হার্ড নাট টু ক্র্যাক।

রঙ্গিত চিন্তামগ্ন গলায় বলল, মহিলা জেদি, একগুঁয়ে। শুধু এই হাসপাতালের ডাক্তার কম্পাউন্ডার বা নার্স কেন, মেঘদুয়ার চা বাগানের হাসপাতালের যত এমপ্লয়ি আছে তাদের সবাইকেই ধরে নিয়েছে শত্রুপক্ষ।

ডক্টর শর্মা বললেন, তখন পাশের ঘর থেকে বমির শব্দ পেলাম। সরসতিয়া ছাড়া দাইমার বাড়িতে আর কেউ থাকে না। আমি ভাবছি যে, কী হল মেয়েটার? সাধারণ জ্বরজারি, ফুড পয়জন বা শরীর খারাপ হয়ে থাকলে তবু ভালো। কিন্তু আমি অন্য আশঙ্কা করছি। বীথি আর অলকার কাছে আমি শুনেছি ঘটনাটা। শুকরা ওঁরাও নামে এই বাগানের একজন লেবার সর্দারের সঙ্গে সরসতিয়া মেলামেশা করছে ইদানিং। সেটা ভালো চোখে নিচ্ছিল না হিম্মত লোহার। বাই এনি চান্সেস, সরসতিয়া প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়নি তো?

রঙ্গিত হাসতে হাসতে বলল, প্রেগন্যান্ট হলে নিজের ইচ্ছেতেই তো হয়েছে। মিঞা বিবি রাজি তো কেয়া করে কাজি। সরসতিয়া প্রেগন্যান্ট হলে আপনার দুর্ভাবনা কীসের?

জোয়ারদার হাসল না। গম্ভীর গলায় বলল, রায়চৌধুরি, আপনি যত সহজ ভাবছেন তত সহজ নয় বিষয়টা। আপনি নতুন এসেছেন, এই বাগানের রাজনীতি জানেন না। সরসতিয়া প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়লে মুশকিলে পড়বে ওরা দুজন। তখন হিম্মত লোহারের আক্রোশ আরও বাড়বে সরসতিয়া আর শুকরার ওপর।

রঙ্গিত বলল, আক্রোশ বাড়লে কী আর করা যাবে। হিম্মত লোহার আর কীই বা ক্ষতি করবে ওদের দুজনের।

চা বাগান বড় সহজ জায়গা নয়। আপনি বাইরে থেকে জাজ করতে পারবেন না। ডকুমেন্টারি ফিল্মে চা বাগানের মেয়েপুরুষ দল বেঁধে চা পাতা তোলে আর মাদল বাজিয়ে ট্রাইবাল ডান্স করে। সেসব মনোগ্রাহী দৃশ্য দেখে সামগ্রিক অন্ধকারের ছবিটা ধরা যাবে না। বাস্তব আসলে অনেক জটিল, বুঝলেন রায়চৌধুরি। জোয়ারদার দুঃখের হাসি হাসল, সেই চিত্রকল্প এমন সুখী সুখী নয়। রাজনীতির অনেক চোরা মারপ্যাঁচ লুকিয়ে আছে ভেতরে। চা বাগানের সবুজ পাতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কুলিকামিনের বহু বছরের ঘাম, রক্ত, চোখের জল আর শোষণের ইতিহাস। দিন বদলেছে ঠিকই কিন্তু শোষণ আজও আছে। রাজনীতির আবর্তে শুধু তার বাইরের চেহারা বদলেছে। হিম্মত হল সেই অশুভ রাজনীতির জারজ সন্তান। তবে এ একেবারে অন্য ধাতুর লোক। তার হাত অনেক লম্বা। সে চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে।

ডক্টর শর্মা গম্ভীর গলায় বললেন, কথাটা খুব ভুল বলেনি জোয়ারদার। শুকরার বড় কোনও ক্ষতি হয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। সরসতিয়াকে সে পায়নি, সেই মেয়েকে অন্য কোনও পুরুষ যদি পায়, তবে সে খ্যাপা ষাঁড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাকে বাধা দেবার ক্ষমতা কারও নেই। এর আগে টি বেল্টের দুই মহিলাকে ডাইন অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে মারতে গিয়েছিল। পালিয়ে বেঁচেছে তারা। সরসতিয়া আর শুকরার কপালে কী আছে কে জানে।

জোয়ারদার নীচু গলায় বলল, আমার আশঙ্কা হচ্ছে খুব শিগগিরই একটা কুরুক্ষেত্র বাধবে মেঘদুয়ার বাগানে। স্বার্থে ঘা লাগলে হিম্মত লোহার রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার আগে এক মুহূর্তও ভাববে না। তেমন হলে দেখবেন, সরসতিয়া আর শুকরাকে ধনেপ্রাণে শেষ করে দেবে হিম্মত।

রঙ্গিত বলল, এমন যখন পরিস্থিতি তাহলে পুলিশকে একটা ইন্টিমেশন দিয়ে রাখা যায় না? ওরা যদি কিছু করতে পারে।

জোয়ারদার বলল, ধুস লাভ নেই কোনও। সব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে। কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। প্রতিবাদ করতে গেলে আপনিই উল্টে নাকাল হবেন। শেলটার দেওয়ার লোক পাবেন না খুঁজে। আমি কিন্তু ভয় দেখাচ্ছি না, বন্ধু হিসেবে অ্যাডভাইস করছি, নিজের মতো করে কাজ করুন। কাজ শেষ হলে ঘরে ফিরে যান। সপ্তাহে একদিন টি প্ল্যান্টার্স ক্লাবে যান, দু-তিন পেগ হুইস্কি-ভদকা-রাম খান, মৌজমস্তি করুন। গল্পের বই পড়ার হ্যবিট আছে যখন বই পড়ুন। চা বাগানের পলিটিক্স নিয়ে খামোখা ভাবতে যাবেন না। ওসব আপনার কাজ নয়। ভেবে লাভও নেই। একটা কথা জেনে রাখুন, এই আপনি বা আমি, আমরা হলাম পাতি লোক, এটাই গ্রাউন্ড রিয়ালিটি। এতদিন ধরে চলে আসা এই সিস্টেম আমরা বদলাতে পারব না।

রঙ্গিত থমকে গেল। অস্ফুটে বলল, সকলেই যদি এমন করে ভাবে তাহলে তো এমনই চলতে থাকবে।

রঙ্গিতের পিঠে হাত রেখে ডক্টর শর্মা শুকনো হাসলেন, বীরপাড়া টি বেল্টের ওদিকে এক শ্রমিক নেতা পার্টির প্রশ্রয়ে কীরকম দাদাগিরি চালিয়েছিল মনে আছে তো? মিডিয়ায় খবরটা চাউর হল বলে সকলে জানতে পারল। নেতারা ঢোক গিলে বলল, তারা এসব নাকি জানতই না এতদিন। তাই বলছি ভায়া, এসব নিয়ে খামোখা চাপ নিতে যেও না। বেশি ইনভলভড হয়ে গেলে অল্প বয়সেই ব্লাডপ্রেশার আর ব্লাডসুগার ধরে যাবে।

অস্থির অস্থির লাগছে রঙ্গিতের শরীরটা। তার চারপাশে কী ঘটে চলছে তা নিয়ে কোনও ধারণাই ছিল না এতদিন। খবরের কাগজে মাঝেমধ্যে কিছু খবর চোখে পড়ে। এক-দু মিনিট সেই খবরটা ঢেউ তোলে মাথায়। তারপর পাতা উল্টে অন্য খবরে চলে যায়। কিছুক্ষণ আগে পড়া সেই খবরের রেশ মাথায় থাকে না। কিন্তু এই চা বাগানে এসে সব দেখেশুনে সত্যি সত্যিই তাজ্জব হয়ে গেছে রঙ্গিত। এমন কখনও হয়? কিছুতেই ভেবে পায় না সে, এমনও কখনও হয়!

দুজন এগিয়ে গিয়েছিলেন খানিকটা। রঙ্গিত দাঁড়িয়েই ছিল। ডক্টর শর্মা মুখ ফিরিয়ে গলাটা তুলে বললেন, কী হল ভায়া, দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?

রঙ্গিত তখনও স্থাণুর মতো দাঁড়ানো। জোয়ারদার হাঁক দিয়ে বলল, ওই দেখুন চারধার কেমন কালো হয়ে এসেছে। তেন্ডুয়া বেরোতে পারে, হাতি চলে আসাও আশ্চর্য নয়। চলুন চলুন, পা চালিয়ে চলুন।

হাওয়া দিচ্ছে জোর। রঙ্গিত একটা শ্বাস ফেলল অন্যমনস্ক ভাবে। সরসতিয়া কিংবা শুকরার জন্য কেন এত ভাবছে সে! যা তার হাতে নেই তা নিয়ে অহেতুক ভেবে কী লাভ। নিজের মধ্যে ফেরার চেষ্টা করতে করতে রঙ্গিত গলাটা তুলে বলল, আপনারা হাঁটতে থাকুন, আমি ধরে নিচ্ছি আপনাদের।

১২

রূপালি মানবী, সন্ধ্যায় আজ শ্রাবণ ধারায়

ভিজিও না মুখ, রূপালি চক্ষু, বরং বারান্দায় উঠে এসো

ঘরের ভিতরে বেতের চেয়ার, জানলা বন্ধ দরজা বন্ধ

রূপালি মানবী, তালা খুলে নাও, দেয়ালে বোতাম আলো জ্বেলে নাও,

অথবা অন্ধকারেই বসবে, কাচের শার্সি থাকুক বন্ধ

দূর থেকে আজ বৃষ্টি দেখবে, ঘরের ভিতরে বেতের চেয়ার, তালা খুলে নাও।

চাবি নেই, একি! ভালো করে দ্যাখো হাতব্যাগ, মন

অথবা পায়ের নীচে কার্পেট, কোণ উঁচু করে উঁকি মেরে নাও

চিঠির বাক্সে দ্যাখো একবার, রূপালি মানবী, এত দেরী কেন?

বাইরে বৃষ্টি, বিষম বৃষ্টি, ঝড়ের ঝাপটা তোমাকে জড়ায়

তোমার রূপালি চুল খুলে দেয়, চাবি খুঁজে নাও—

তোমার রূপালি অসহায় মুখ আমাকে করেছে আরও উৎসুক—

ধাক্কা মারো না! আপনি হয়তো দরজা খুলবে, পলকা ও তালা

অমন উতলা রূপালি মানবী তোমাকে এখন হওয়া মানায় না

অথবা একলা রয়েছে বলেই বৃষ্টি তোমাকে কোনো ছলে বলে

ছুঁতে পারবে না, ফিরতে না তুমি বাইরে বিপুল লেলিহান ঝড়ে—

তালা খুলে নাও।

রূপালি মানবী, আজ তুমি ওই জানলার পাশে বেতের চেয়ারে

একলা এসব আঁধারে অথবা দেয়ালে বোতাম আলো জ্বেলে নাও

ঠান্ডা কাঁচের শার্সিতে রাখো ও রূপালি মুখ, দুই উৎসুক চোখ মেলে দাও।

বাইরে বৃষ্টি, বিষম বৃষ্টি, আজ তুমি ঐ রূপালি শরীরে

বৃষ্টি দেখবে প্রান্তরময়, আকাশ মুচড়ে বৃষ্টির ধারা...

আমি দূরে এক বৃষ্টির নীচে দাঁড়িয়ে রয়েছি, একলা রয়েছি,

ভিজেছে আমার সর্ব শরীর, লোহার শরীর, ভিজুক আজকে

বাজ বিদ্যুৎ একলা দাঁড়িয়ে মানি না, সকাল বিকেল

খরচোখে আমি চেয়ে আছি ওই জানালার দিকে, কাচের এপাশে

যতই বাতাস আঘাত করুক, তবুও তোমার রূপালি চক্ষু—

আজ আমি একা বৃষ্টিতে ভিজে, রূপালি মানবী, দেখবো তোমার

বৃষ্টি না-ভেজা একা বসে থাকা।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা রূপালি মানবী। মুকুটের অন্যতম প্রিয় এই কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলো। সেই কবিতা আজও ফিরে ফিরে পড়ে সে। শ্রাবণের ঘনঘোর বর্ষার প্রেক্ষাপটে এক প্রেমিকপুরুষ এবং এক নারী এই কবিতার প্রাণভোমরা। বহুবার পড়া অথচ ফিরে ফিরে পড়তে বেশ লাগে মুকুটের। যতবার পড়ে ততবারই নতুন লাগে। মনের স্লেটে জলরং দিয়ে নিজের খেয়ালে কাটে যা খুশি আঁকিবুঁকি। অথচ এটা বর্ষাকাল নয়, হেমন্ত। কিন্তু ভালো কবিতার কোনও ঋতু হয় না। পাঠকের মনটাই আসল। বর্ষার কবিতা অন্য ঋতুতেও পড়াই যায়। মনকে ভিজিয়ে নেওয়া যায় বৃষ্টিমেদুর সজল চিত্রকল্পে। মুকুটের আজ সারাটা দিন গেল এই কবিতায় অবগাহন করে। বিকেল পার হয়ে গোধূলি এল অথচ কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলো থেকে মুকুট এখনও বেরোতে পারল না।

হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে ব্যালকনিতে বসে আছে মুকুট। আদিগন্ত বিছিয়ে থাকা ঢেউ খেলানো চা বাগানের রং সবুজ থেকে গাঢ় সবুজ হতে হতে কালো হয়ে আসছে। দিনের শেষে ক্লান্ত পাখিরা ফিরে আসছে নিজ নিকেতনে। তাদের তীক্ষ্ণ শিস আকাশ বাতাস ফাটিয়ে দিচ্ছে। পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে সূর্য। একটু বাদেই অস্ত যাবে দেবদারু গাছের ওপাশ দিয়ে। যত দিন যাচ্ছে বেলা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। বিকেল ফুরোতে না ফুরোতেই ঘনিয়ে আসছে সাঁঝ।

হেমন্তের সন্ধের মধ্যে মনকেমনের একটা বিষণ্ণ অনুভূতি জড়িয়ে থাকে। ব্যালকনিতে বসে দূর আকাশের দিকে তাকালে বুকটা হু-হু করে ওঠে মুকুটের। মনে হয় কিছুই পাওয়া হল না জীবনে। শুকনো বাতাস উত্তর থেকে হিম বয়ে আনে এই সময়। মানুষের মতো করে অভিব্যক্তি জানাবার সাধ্য গাছেদের থাকে না। কিন্তু তাদের কাণ্ডে কান পাতলেই মুকুট শুনতে পায় তাদের বুকের দুরুদুরু শব্দ। এই অঞ্চলের চিকরাশি, ওদাল, শাল বা সেগুন গাছের এক একটা বড় বড় পাতা লাট খেয়ে যখন পড়ে মাটিতে তখন মুকুট বুঝতে পারে তাদের পাতা খসাবার সময় এল এবার। এখন পূর্ণ যৌবন। আর কিছুদিন পর হেমন্ত চলে যাবে। মৃদুমন্দ পায়ে নেমে আসবে গাঢ় কুয়াশার আস্তরণ।

কংক্রিটের জঙ্গলে ঋতুচক্র টের পাওয়া যায় না আজকাল। শীত, গ্রীষ্ম আর বর্ষা ছাড়া অন্য কোনও ঋতুর অস্তিত্ব যেন নেই সেখানে। বিপন্ন প্রজাতির মতো অবলুপ্ত হয়ে গেছে শরৎ হেমন্ত কিংবা বসন্ত। কিন্তু মেঘদুয়ার চা বাগানে প্রতিটি ঋতুই বিরাজ করে স্বমহিমায়। ডুয়ার্সে ফাঁকা জায়গা, প্রচুর গাছপালা, ঝোপঝাড়, খাল, বিল, পুকুর আর নদী আছে বলেই হয়তো হেমন্তর আসা-যাওয়া উপলব্ধি করতে অসুবিধে হয় না। নানারকম পাখি দেখা যায়, শোনা যায় তাদের কিচিরমিচির, মাঝরাতে আচমকা ডেকে ওঠে তক্ষক।

হেমন্ত মানে মোহময়ী কুয়াশার ফিনফিনে আবরণ। হেমন্ত মানে দীপ জ্বালানোর উৎসব। আকাশপ্রদীপ জ্বালানোও বটে। ব্যালকনিতে বসে মুকুট দেখতে পাচ্ছে ডক্টর শর্মা তাঁর কোয়ার্টার্সের সামনে এখন আকাশপ্রদীপ জ্বালছেন। তাঁকে সাহায্য করছে রঙ্গিত। আকাশপ্রদীপ দেখতে মুকুটের বেশ লাগে। রঙিন কাগজের ঘেরাটোপে একটা মাটির প্রদীপকে বাঁশের ডগায় বেঁধে উঁচুতে তুলে দেওয়া হয়। দেবতারা ও বিগত পূর্বপুরুষদের আত্মা যাতে শূন্যমার্গে পথ হারিয়ে না ফেলেন সেজন্য নাকি দীপ জ্বালানো হয়। হেমন্তকালে আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর তাৎপর্য যা-ই হোক না কেন সেটা যে ভারি সুন্দর এক দৃশ্য তাতে কোনও সন্দেহ নেই। রঙ্গিতকে অনিমেষ চোখে দেখছিল মুকুট। তার মনের মধ্যে সংগোপনে চলছিল আলোছায়ার খেলা। হৃদয়ের গভীর হৃদয় থেকে উঠে আসা শব্দ শুনতে পাচ্ছিল সে।

নতুন পরিচয় হওয়া মানুষের ক্ষেত্রে মুকুটের কৌতূহল বেশি হয় না। কিন্তু কিছুতেই রঙ্গিতকে মন থেকে সরিয়ে রাখতে পারছে না সে। যত ভাবছে রঙ্গিতের কথা ভাববে না তত তার মনের ওপর জাঁকিয়ে বসছে যেন। পৃথিবীটা একঘেয়ে মানুষে ভরে যাচ্ছে। সেই জনসমুদ্রের ঢলের মধ্যে এক-আধটা দ্বীপ দেখা যায় কখনও। সমাজের মূল্যমান যখন একরকম, তখন শান্তিনিকেতনকে একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বলে ভাবতেন রবীন্দ্রনাথ। ইয়েটসের সেই ইনিসফ্রি দ্বীপের মতো। মুকুটের মনে হয় কখনও যদি প্রয়োজন হয় তবে ক্লান্ত দগ্ধ দিনে গাছপালায় ঢাকা কোনও দ্বীপের মতোই তার প্রাণের ওপর ছায়া দিতে পারবে সে। ধু-ধু মরুভূমিতে মরূদ্যান যেমন তৃষ্ণার্ত পথিককে ভরসা জোগায়, তেমন করে।

নায়কোচিত চেহারা বলতে যা বোঝায় তা নয় রঙ্গিতের। গড় মানুষের থেকে সামান্য ভালো দেখতে, তার বেশি নয়। ভিড়ের মধ্যে তাকে আলাদা করে চেনা যায় না। তবে রঙ্গিতের চোখদুটোর মধ্যে আবিলতা নেই। সে ওপরচালাক নয় বরং একটু উদাস স্বভাবের। মেয়েরা এমন প্রেমিক পুরুষকেই কল্পনা করে এসেছে বরাবর। রঙ্গিতের মা যখন ক্যানসারে মারা গিয়েছিলেন সে তখন একেবারেই ছোট। পড়াশোনায় যে খুব মন ছিল তা নয়। বরং বয়সন্ধির সময় পড়াশোনা থেকে তার মন সরে গিয়েছিল। তার বেশিরভাগ বন্ধু যখন চাকরি বাগিয়ে পাড়ি দিয়েছে বিদেশে তখন রঙ্গিত ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি জুটিয়ে যোগ দিয়েছিল এক বেসরকারি কোম্পানিতে। কিছুকাল ঠিকঠাকই চলছিল। তারপর একদিন তার চাকরি চলে গেল। ভাগ্যবিড়ম্বিত রঙ্গিত যেন ঈশ্বরপ্রেরিত হয়েই এসেছে মেঘদুয়ার চা বাগানে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হয়ে।

এই বাংলোর হাতায় একটা শিউলিগাছ আছে। বারোমাসই ফুল ফোটে। অভয়া বলেন ‘বারোমাস্যা’। সারা বছর সেই শিউলি গাছ নিজেকে উজাড় করে দেয়। এই সন্ধ্যায় শিউলির গন্ধের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে চা বাগানের ঝিম ধরানো ঘ্রাণ। উতলা বাতাস শিউলি ফুলের সঙ্গে চা গাছের মাদক গন্ধ বয়ে নিয়ে আসছে মুকুটের নাসারন্ধ্রে। নতুন চাল, ছোট ফুলকপি, টেনিস বলের মতো বাঁধাকপি উঠেছে ডুয়ার্সের হাটে। তার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে হেমন্তের কুয়াশা আর শিশিরের জল। রান্নাঘরে গিয়ে সেসব নাকের কাছে তোলে মুকুট। ঘ্রাণ নেয়।

আজকাল সারাবছরই ফুলকপি, বাঁধাকপি কিংবা পালংশাক পাওয়া যায়। প্যাকেটজাত মটরশুঁটিও পাওয়া যায় শপিং মলে। কিন্তু কিছু জিনিসকে প্রকৃতির রসচক্রের সঙ্গে যাপন করতে হয়। ফুলকপি যেমন। ফুলকপি রান্নার গোড়ার কথাই হল তার ভেতরের স্বাদটাকে সম্মান করা। অভয়া ফুলকপি রেঁধেছিলেন আজ। ছোট করে ফুলকপি কেটে, শুধু নুন আর অল্প কালোজিরে দিয়ে ভেজে, কম তেলে জল ছিটিয়ে ঢেকে ঢেকে নরম করে এনেছিলেন সেই স্বাদ। দুপুরে ভাত দিয়ে চেটেপুটে খেয়েছে মুকুট। আস্তে আস্তে মুখের ভেতর গলে গিয়েছিল ছোট দানাগুলো জিভের চাপে। সেই স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে।

রঙ্গিত সন্ধেবেলা এসেছে মুকুটদের বাংলোয়। গরম গরম গাজরের হালুয়া খেতে খেতে ট্রেক নিয়ে কথা হচ্ছিল। মুকুট বলছিল, এর আগে আমি দু’বার ট্রেক করেছি। তবে সে ছিল শখের ট্রেকিং। সাহস করে আগের বার নেপালে গিয়েই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। ফিরে আসতে হয়েছিল মাঝরাস্তা থেকে। তবে সুস্থ হয়ে ওঠার পর পাহাড় আমাকে টানতে শুরু করেছে আবার। কিন্তু মনের জোরটা পাচ্ছি না কিছুতেই।

রঙ্গিত বলল, পাহাড় তোমার খুব ভালো লাগে তাই না?

মুকুট বলল, তা লাগে। কিন্তু কেন ভালো লাগে তা ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারব না। ব্রিটিশ পর্বতারোহী জর্জ লে ম্যালোরি যখন এভারেস্টের উদ্দেশে তাঁর তৃতীয় অভিযানে বেরোবেন বলে ভাবছেন, তখন তাঁকে এক সাংবাদিক জিগ্যেস করেছিলেন, আপনি কেন বারবার এভারেস্ট অভিযানে যান? তখন ম্যালোরি তাঁর গলায় কিছুটা বিরক্তি আর বিদ্রূপ মিশিয়ে বলেছিলেন, বিকজ ইট ইজ দেয়ার। নাম করা মনস্তত্ত্ববিদ কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং পরে বলেছিলেন, আসলে জবাবটা হবে-–বিকজ ইট ইজ উইদিন।

রঙ্গিত বলল, এই যে সকলে এত ঝুঁকি নিয়ে পাহাড় চড়তে বেরোয়, তা কি অজানাকে জানার কৌতূহল? রোমান্টিসিজম? শুধুই অহম-এর চরিতার্থতা? নাকি খ্যাতির মোহ?

মুকুট বলল, দ্যাখো এর কোনও একটা উত্তর হয় না। পাহাড়ের অপূর্ব সৌন্দর্য, বিশাল নির্জন ক্যানভাসে নিজের মুখোমুখি হওয়া, এই নিভৃতির মধ্যে সহযাত্রীর সান্নিধ্য ও সাহায্য যা মানুষকে নতুন করে গড়ে তোলে–-এসব কিছুই হল একজন পাহাড় অভিযাত্রীর প্রাপ্তি। এই চ্যালেঞ্জ যেমন নিজের শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে তেমনি নিজের মানসিক কাঠিন্যের সঙ্গেও বটে। ম্যালোরি এভারেস্টের পথে হারিয়ে গিয়েছিলেন। তার আগে তাঁর এক বন্ধুকে লেখা চিঠিতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘হোয়াট হ্যাভ উই কাম টু কনকার? ওনলি আওয়ারসেলভস।’ সেই কথাটা ইতিহাস হয়ে আছে। কেননা এর থেকে খাঁটি সত্যি আর হয় না।

রঙ্গিত বলল, তোমার সঙ্গে সহমত। নিজেকে জয় করাটাই সব থেকে কঠিন কাজ।

মুকুট ম্লান হাসল, পাহাড় আমাকে টানে। কিন্তু এই মারণরোগ আমার মনটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে গেছে। আগের বার মাঝপথ থেকে ফিরে এসেছি। আবার যে ট্রেক করতে যাব সেই মনের জোরটাই আর পাচ্ছি না। ইউটিউব ঘেঁটে ঘেঁটে বহু মোটিভেশনাল ভিডিও দেখছি। কিন্তু লাভ কিছু হচ্ছে না।

আমি এই ব্যাপারে তোমাকে আউট অব দ্য বক্স একটা সাজেশন দিতে পারি।

কীরকম? মুকুট উৎসুক গলায় জানতে চাইল।

মালবাজারের কাছে রাঙামাটি চা বাগানের চাইবাসা ডিভিশনে কখনও গেছ? সেখানে ইংরেজ আমলের একটা সমাধিক্ষেত্র আছে। একেবারে নিস্তব্ধ, নির্জন। নিজের হার্টবিটের শব্দ তুমি নিজেই শুনতে পাবে সেখানে গেলে। সে এক অদ্ভুত পরিবেশ। বলে বোঝানো যাবে না সেই অ্যামবিয়েন্স। সেখানে আমি গিয়েছি দু-চারবার। সেই সিমেটারি থেকে তুমি ঘুরে এসো একদিন। আমি বলছি তুমি উপকার পাবে।

মুকুট থতমত খেয়ে গিয়ে বলল, শুধু শুধু সমাধিক্ষেত্র যেতে যাব কেন? এসব গোরস্থান, কবরখানা, শ্মশান-মশানে আমার অ্যালার্জি আছে। যেদিন মারা যাব তখনই শ্মশানে যাব এমনই আমার ইচ্ছে। তার আগে আমার এসব জায়গায় যাবার আগ্রহ নেই।

রঙ্গিত হেসে ফেলল, বালাই ষাট তুমি এখনই মরতে যাবে কেন। শতায়ু হও তুমি। আসলে আমি একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করতাম। একদিন আচমকা ডাউনসাইজ করল আমাদের কোম্পানি। অনেকের চাকরি গেল। বেশ কিছু বন্ধুর মতো আমিও বেকার হয়ে গেলাম। বাড়িতে বসে থেকে থেকে দম বন্ধ হয়ে যেত। একদিন পার্ক স্ট্রিটের সিমেটারিতে চলে গিয়েছিলাম আমি। একেবারে একা।

মুকুট আঁতকে উঠে বলল, তোমার ভয় করল না?

খামোখা ভয় করবে কেন, বরং মনখারাপ হল। অসংখ্য নাম না জানা মানুষের মৃতদেহ শুয়ে রয়েছে মাটির নীচে। কোনও সমাধি একশো বছর পুরনো। কোনওটা সোয়াশো বছরের। আবার কেউ মারা গেছে আরও আগে। শেষ বিকেলের ভেজা রোদে স্নান করছিল গোরস্থানটা। একটা টগরগাছে ফুল ফুটে ছিল অগুনতি। সেই সাদা রংয়ে কোনও প্রাণ নেই। গাছগাছালির ছায়া ঢাকা অন্ধকার মনটাকে উদাস করে দিচ্ছিল। একটা বিষাদের ছায়া জড়িয়ে রেখেছিল সমস্ত কবরখানাটাকে। সেই সমাধিক্ষেত্র আমাকে নতুন করে জীবনের পাঠ শেখাল। সেদিন উপলব্ধি করলাম, আমরা সকলেই সওয়ার হয়েছি হাওয়ার গাড়িতে।

হাওয়ার গাড়ি! তুমি কি কবিতা পড়ছ নাকি আজকাল? কবিদের মতো রহস্যময় ভাষায় কথা বলছ দেখছি। মুকুট বিস্মিত হয়ে বলল।

হাওয়ার গাড়ি না বলে তাকে অদৃশ্য সময়যানও বলতে পারো। রঙ্গিত হাসল।

মুকুট মুখের একটা ভঙ্গি করে বলল, তুমি কি গ্রিক বলছ নাকি হিব্রু? আমি তো ভাবতাম এই চা বাগানে আমি একাই কবিতা পড়ি। এখন দেখছি তা নয়।

রঙ্গিত হাসল না। বলল, আমরা সকলেই মৃত্যুবীজ নিয়ে পৃথিবীতে এসেছি। একটু একটু করে সকলেই এগিয়ে চলেছি জরার দিকে। এই সফরের শেষে মৃত্যু এবং একমাত্র মৃত্যুই অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। এই যে সমাধিক্ষেত্রে অজস্র মানুষ চিরকালের জন্য ঘুমিয়ে আছে এরাও তো একদিন এসেছিল আমাদেরই মতো। সকলেই কাটিয়েছে নিজেদের জীবন, যার যেমন মেয়াদ। আজ হোক কাল আমরাও এদের দলে নাম লেখাব।

সেটা তো ধ্রুবসত্য। আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, বাবা-মা সকলেই মারা যাবে একদিন। কেউ আগে যাবে। কেউ পরে। এটাই নিয়তি। আমরা তো চিরকাল বেঁচে থাকতে পারব না। সেদিক দিয়ে বলাই যায় যে, আমরা সওয়ার হয়েছি এক অদৃশ্য হাওয়ার গাড়িতে। মুকুট বলল গভীর গলায়।

সেটাই সেদিন বোঝালাম নিজেকে। চলেই যখন যেতে হবে একদিন তাহলে কীসের এত টেনশন। কীসের এত চাপ? সবকিছুই নিমিত্তমাত্র। আজ আছে কাল নেই। পার্ক স্ট্রিটের সিমেটারি আমাকে জীবনের চূড়ান্ত পরিণতির কথা নতুন করে জানিয়ে দিল চুপিচুপি। আর সেদিন আমার মনের জট কেটে গেল অনেকটাই।

মালবাজার অনেকবার গিয়েছি আমি। তবে আনফরচুনেটলি রাঙামাটি চা বাগানের চাইবাসা ডিভিশনের এই সমাধিক্ষেত্রে আমি কখনও যাইনি। কাল বিকেলে ফ্রি আছ? তবে চলো, কাল এক চক্কর ঘুরে আসি সেই সিমেটারি থেকে। যাবে?

সার্টেনলি। কোনও সুন্দরী আকাশের চাঁদ চাইলে সেটা পেড়ে আনাটাই নিয়ম। তুমি জন্নত যেতে চাইলে তো বটেই জাহান্নমে যেতে চাইলেও আমি সঙ্গ দেব।

মুকুট ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বলল, আমি মোটেই সুন্দরী নই। তাছাড়া আমি সাজগোজ, রূপটান এসব পছন্দ করি না। আমি এমনই। আমার মধ্যে শ্রীলক্ষ্মী বা লক্ষ্মীমন্ত ভাব তুমি দূরবিন দিয়ে খুঁজলেও পাবে না।

রঙ্গিত এক পলক তাকিয়ে থাকল মুকুটের দিকে। আসতে আসতে বলল, তুমি তোমার মতো করে সুন্দর। বাইরের প্রসাধনের কোনও দরকার নেই তোমার। সহজ সপ্রতিভতাই তোমার প্রসাধন।

রঙ্গিত তাকিয়ে ছিল একদৃষ্টে। লজ্জা পেয়ে মুখ সরিয়ে নিল মুকুট। রঙ্গিতের মনে হচ্ছিল মুকুটের প্রতি তার ভালোলাগার আবেগঘন অনুভূতিপুঞ্জ বদলে যাচ্ছে অতলান্তিক ভালোবাসায়। রঙ্গিত এক নদীর নাম। নদীর মতোই স্বচ্ছতোয়া তার মন। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, নোনা অশ্রুর বিনিময়ে যদি এই নারীকে পেতে হয় তার জন্য সমুদ্রজন্মও নিতে রাজি সে। এমন একটি রূপবতী নারীর সঙ্গে দেখা হবে বলেই কি অদৃষ্ট তাকে পাঠিয়েছিল এই চা বাগানে? রঙ্গিত জানে না, তবে আশারোপণের এই পরম ক্ষণে সে স্থির করল, মুকুটকে ভালোবেসে অপার সমুদ্র হতেও পিছ-পা হবে না সে।

১৩

স্বস্তিশোভন আর অভয়া দুজনেরই রক্তে শর্করা বিপদসীমার কাছে চলে এসেছে। ওষুধ খেতে হয় না। ডাক্তারের পরামর্শে ডায়েট কন্ট্রোল করে আর আধ ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করলেই ব্লাডসুগার নিয়ন্ত্রণে থাকে। চা বাগানের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা মূল সড়কের দিকে চলে গেছে সেই পথ ধরে হাঁটেন দুজনে। আজও হাঁটছেন। স্বস্তিশোভনের পরনে ট্র্যাকসুট, পায়ে স্নিকার। অভয়া সালোয়ার পরে আছেন, পায়ে কেডস।

কম দিন হল না মেঘদুয়ারে। এই কয়েক বছরে অভয়া অনেক কিছু জেনেছেন এই চা বাগানের জীবনযাপন সম্বন্ধে। স্থানীয়রা প্রায় সকলেই ঘরোয়া টোটকা বা ঝাড়ফুঁকে তুমুল বিশ্বাসী। এই বাগানের অনেকেই ক্রিশ্চান। নেপালিদের মধ্যে বৌদ্ধ আছে অনেক ঘর। তবে বেশিরভাগই হল হিন্দু। অনেক মেয়েকেই গাছকোমর করে শাড়ি পরতে দেখেন তিনি। তাঁদের বাংলোর পরিচারিকা সীতার মুখে শুনেছেন এখানকার মেয়েদের পোশাক হল চৌবন্দি, চৌলা আর গুনিউ। কোমরে পরে পটকা। গায়ে দেয় ওড়না বা শাল। কাশ্মীরি দামি শাল নয়, সস্তার নাগা শাল। মেয়েরা গয়না পরে কানে আর নাকে। তার নাম ডোংরি আর মুন্দি। গলায় পরে মঙ্গলসূত্র। হাতে চুড়া। পায়ে শোভা পায় বোলি চাঁদি।

এই বাংলোতে দুজন মালি আছে। তাদের কাছ থেকে অভয়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনেছেন সব। এখানকার ছেলেরা প্রায় সকলেই প্যান্ট শার্ট পরে। এদিকের পুরুষদের পোশাক নাকি দোউড়া শুরাল কিংবা কামি। ছেলেদের অনেকেরই কোমরে থাকে কুকরি। এখানে স্থানীয়দের খাবার ভুট্টা, রুটি, মাংস, মাছ আর ভাত। উৎসব হলে শুয়োরের মাংস। মদ খায় প্রায় সকলেই। কিন্তু রাস্তাঘাটে মাতলামো করতে সচরাচর দেখা যায় না কাউকে। বছরের বেশ খানিকটা সময় শীত থাকে বলে বারো মাস ধরেই উল বোনে মহিলারা। ওপরে রেঞ্জার অফিস। নীচে চায়ের গুদাম। বস্তির ওপরদিকে আর এক সমাজ। তারা চা বাগানে কাজ করে না। এখানে পুজো পার্বণ হয় নানারকম। উৎসবের সময় রুটি বানায় এরা। মোটাসোটা, গোল নরম মিষ্টি, জিলিপির মতো ভাজা। সিয়েলে বাসেল তার নাম। রাতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অভয়া দেখেন দূরে কুলিলাইনের ওদিকে আগুন জ্বলে। ভেসে আসে গানের কলি। বারান্দায় ঝোলানো বস্তার দোলনায় বাচ্চাকে বুড়ি আম্মা শোনায় ঘুমপাড়ানি গান--লহই লহই লাথার কে। চা বাগান জুড়ে ভেসে বেড়ায় সেই সুর। প্রতিধ্বনি শোনা যায় অনেকক্ষণ অবধি। অভয়ার কানে সেই সুর মাদকতা বয়ে নিয়ে আসে।

ঘাস কেটে পিঠে বোঝা নিয়ে উঁচু চড়াই থেকে নেমে আসছিল কয়েকটি মেয়ে। স্বস্তিশোভনকে দেখে নমস্কার দিয়ে গেল। পাশ দিয়ে নেমে গেল কথা বলতে বলতে। অভয়া জানতে চাইলেন, এই মেয়েগুলো কি মেঘদুয়ার বাগানে চা পাতা তোলে?

না, এরা পাতা তোলে না। তুমি তার মানে ভেবো না যে এদের কোনও কাজ নেই। যারা চা পাতা তোলে না তাদের কিন্তু হাজার কাজ। একটু বড় বাচ্চার দেখাশোনা, ছাগল গোরু চরানো, জ্বালানি কাঠ জোগাড় করার মতো নানারকম কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে এরা। এই মেয়েগুলো কুলিলাইনের গণ্ডির বাইরে পাহাড়ের ওপর দিকে বস্তিতে অন্যের খেতে কাজ করে। এখন সেখান থেকে ফিরছে।

শর্মা দম্পতি সন্ধেবেলা নিয়মিত হাঁটেন। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর ডক্টর শর্মা পোশাক বদলে একটা কিছু মুখে দিয়ে বেরোন আধঘণ্টার ব্রিস্ক ওয়াকিং করতে। আজও হনহন করে হাঁটছিলেন। দুজনেই দাঁড়িয়ে পড়লেন স্বস্তিশোভন আর অভয়াকে দেখে। ডক্টর শর্মা হাসিমুখে বললেন, গুড আফটারনুন স্যার, গুড আফটারনুন মিসেস মুখার্জি।

স্বস্তিশোভন আর অভয়া পাল্টা শুভ সন্ধ্যা জানালেন তাঁদের। বৃন্দা জানতে চাইলেন, মুকুটের শরীর এখন কেমন আছে?

অভয়া বললেন, কেমো নেওয়ার পাট চুকে গেছে। এখন শুধু রেগুলার কোর্সে চেক আপ করাতে হবে। পরশু দুপুরের ফ্লাইটে কলকাতা যাচ্ছি মেয়েকে নিয়ে। দেখা যাক অনকোলজিস্ট কী বলেন।

ডক্টর শর্মা বললেন, আমরা মুকুটকে নিজের মেয়ের মতোই দেখি। অসুখের দিনগুলোতে সত্যিই দুশ্চিন্তায় ছিলাম মেয়েটাকে নিয়ে। তবে জানতাম ঈশ্বর এমন নির্দয় হতে পারেন না।

বৃন্দা বললেন, আমিও মনে মনে জানতাম এমন ফুলের মতো একটা মেয়ের এত বড় ক্ষতি তিনি কখনওই করবেন না। ওর জন্য প্রার্থনাও করেছিলাম ঠাকুরের কাছে। আপনারা ঘুরে আসুন কলকাতা থেকে, দেখবেন অনকোলজিস্ট নিশ্চইই বলবেন, মুকুট আবার আগের মতো সব কিছু করতে পারবে।

স্বস্তিশোভন বললেন, আপনাদের সকলের আশীর্বাদ আর ভালোবাসা পেয়েছে মুকুট, এটা ওর সৌভাগ্য। আসলে বেশ বড় একটা ফাঁড়া গেল ওর ওপর দিয়ে। তবে সেসব নিয়ে ভেবে আর লাভ নেই। আবার নরমাল লাইফ লিড করুক মেয়ে, বাবা-মা হিসেবে আমরা এটাই শুধু চাই।

বৃন্দা বললেন, মুকুট আর রঙ্গিত এর মধ্যে আমাদের আস্তানায় এসেছিল। গল্প হচ্ছিল নানারকম। তখন মুকুট বলছিল ওর অপূর্ণ স্বপ্নের কথা। নেপালের একটা রুটে ট্রেক করতে গিয়েই তো অসুস্থ হয়েছিল ও। ফিরে আসতে হয়েছিল অভিযান মাঝপথে রেখে। তার পর এত কিছু ঘটে গেল …। কত বড় ঝড় গেল ওর ওপর দিয়ে। ধন্যি মেয়ে বটে মুকুট, এখন আবার সেই পথেই সে ট্রেক করতে যেতে চায়। তবে একটা জিনিস দেখে ভালো লাগল, ওকে বুস্ট আপ করছে রঙ্গিত। যখন কোনও কাজ করতে মনের মধ্যে সংশয় তৈরি হয় তখন এই মরাল সাপোর্টটা খুব দরকার।

অভয়া বললেন, এতদিন মানসিক ভাবে দুমড়ে ছিল মুকুট। এখন সুস্থ হতে না হতেই প্ল্যান আঁটছে আবার সেই অসমাপ্ত অভিযানে যাবে বলে। আমরা না পারছি মেয়ের কথা ফেলতে, না পারছি এই জেদে সায় দিতে।

ডক্টর শর্মা বললেন, এই জেনারেশনের ছেলেমেয়েরা আমাদের থেকে অনেক আলাদা। ওদের ডিটারমিনেশন সাংঘাতিক। আমি বলি কী, মুকুটের হেলথ যদি পারমিট করে, আর ও যদি আবার পাহাড়ে যেতে চায় ওকে ট্রেকিংয়ে যেতে দিন।

অভয়া বললেন, কলকাতা যাই আগে, দেখা যাক ডাক্তার কী বলেন।

স্বস্তিশোভন ডক্টর শর্মার উদ্দেশে বললেন, সেদিন শুনলাম আপনারা গুণবালা তামাংয়ের কাছে গিয়েছিলেন। কী বুঝলেন দাইমাকে? মহিলা কি এখনও আগের মতোই অ্যারোগ্যান্ট?

ডক্টর শর্মা বললেন, অ্যারোগ্যান্স নয়, আমি বলব সেলফ কনফিডেন্স। নিজের কাজ ভালো করে না জানলে এই আত্মপ্রত্যয় আসে না। দাইমাকে আমাদের হাসপাতালে কনট্রাকচুয়াল ভিত্তিতে যদি নিয়ে নেওয়া যেত তাহলে ভালো হতো। টেকনিক্যাল জব সম্ভব নয়। কিন্তু আয়া-টায়া জাতীয় কোনও পদেও যদি ঢোকানো যেত...। আপনি ম্যাকমিলান গ্রুপের বড়কর্তাদের সঙ্গে একবার কথা বলে দেখতেন যদি...।

স্বস্তিশোভন বললেন, আমি ওই মহিলাকে চিনি ভালো করেই। সে মরে গেলেও মেঘদুয়ার হাসপাতালে কাজ করতে আসবে না। ওর একটা পারসোনাল লসের কাহিনি আছে। বহু বছর আগে ভুল ট্রিটমেন্ট হয়েছিল বেচারির। সেই থেকে একটা তীব্র শোক মহিলাকে পাথর করে দিয়েছে। সেই শোক গুণবালা ভোলেনি।

ডক্টর শর্মা বললেন, সে তো ঠিকই। আচ্ছা হিম্মতের ব্যাপারে কিছু কথা কি আপনার কানে এসেছে? এই লোকটার অসভ্যতামি দিন দিন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সেদিন ইউনিয়ন অফিসে ডেকে পাঠিয়েছিল সরসতিয়াকে। গুণবালাও গিয়েছিল সঙ্গে। প্রচ্ছন্ন থ্রেট করেছে দুজনকে। শুকরা মুন্ডার সঙ্গে ঘোরাফেরা করছে সরসতিয়া, সেটা নিয়েই তার গাত্রদাহ।

স্বস্তিশোভন বললেন, আমাদের সমাজটাই বদলে গেছে। ভালো লোকেরা এখন অসহায়, একঘরে। হুলিগানদেরই দাপট। এই যুগে আপনি যত বড় অ্যান্টিসোশাল তত আপনি ক্ষমতাবান। আর পলিটিক্যাল পার্টি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে হিম্মতদের মতো লোকগুলোকে। পার্টির আসকারা পেয়েই ধরাকে সরা জ্ঞান করে সমাজের এসব জঞ্জালরা।

ডক্টর শর্মা বললেন, হিম্মতের বাবা নরসিংকে তো দেখেননি, আপনি এই বাগানে আসার বহু আগেই সে পরপারে চলে গেছে। সে মেঘদুয়ারেই চা পাতা তুলত। দিনরাত নেশাভাঙের ওপর থাকত লোকটা। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বহু খুনখারাপি করেছে নরসিং। পলিটিক্যাল পার্টির অগাধ আদরে চারাগাছ থেকে মহীরুহ হয়ে উঠেছিল।

স্বস্তিশোভন বললেন, সে সব গল্প আমি শুনেছি। নরসিংয়ের দল থেকেই ভুঁইফোঁড়ের মতো সোমরা এক্কা নামে এক মস্তানের আবির্ভাব হল। এদিকের টি বেল্টে স্থাপন করল একচ্ছত্র আধিপত্য। পার্টির কিছু নেতার পকেট ভর্তি করে দিল তোলা থেকে ওঠানো টাকায়। ভোটের সময় আশাতীত সার্ভিস দিল পার্টিকে। কিন্তু নরসিং হল এতদিনের রাজা। সে দুদিনের বৈরাগী সোমরাকে জায়গা ছাড়বে কেন! ফলে যা হয় তা-ই হল, কাজিয়া বাঁধল নরসিংয়ের সঙ্গে। সোমরা এক্কাকে সিংহাসনে বসিয়ে তার মাথার ওপর থেকে হাত তুলে নিল পলিটিক্যাল পার্টি। নরসিং পড়ল ঘোর বিপদে। ভিটেছাড়া হয়ে সে পালিয়ে ছিল কয়েক বছর। কিন্তু সে আর কতদিন! সোমরার হাতে বেঘোরে খুন হয়ে গেল একদিন। রেললাইনে পড়ে ছিল নরসিংয়ের টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া বডি।

ডক্টর শর্মা বললেন, নরসিংয়ের বউও গলায় দড়ি দিয়েছিল কিছুদিন পর। কয়েক বছর সোমরার রাজ চলল এদিকে। একদিন সোমরাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে বাবার মৃত্যুর বদলা নিয়েছিল হিম্মত। সেদিন থেকে সে-ই এদিকে অলিখিত রাজা। নরসিংয়ের ক্রোমোজম আছে শরীরে, ফলে ক্রিমিনাল জিন নিয়েই জন্মেছে হিম্মত। হিম্মতের পরিণতিও ঠিক এমন হবে একদিন। আজ নয় কাল অপঘাতেই মরতে হবে ওকে। ক্রাইম ডাজ নট পে।

ডক্টর শর্মা বললেন, ক্রিমিনাল জিন নিয়েই যে কেউ জন্মায় ব্যাপারটা তেমন নয়। মানুষের ব্যক্তিত্ব অনেকটাই নির্ভর করে বিভিন্ন জিনের সমষ্টির ওপর। কিন্তু এক একটা জিনের প্রভাব আলাদা করে দেখলে দেখা যাবে তার অবদান খুব সামান্যই। যাদের জিনে ক্রিমিনালিটি ছিল, তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে সামাজিক চাপে পড়ে ক্রিমিনাল হয়ে যেতে দেখা যায়। কিন্তু এই সামাজিক চাপ যদি কম থাকে, বা না থাকে তবে সেই মানুষের ক্রিমিনাল না হওয়ার প্রোবাবিলিটিই বেশি।

অভয়া জানতে চাইলেন, তার মানে সামাজিক চাপের মতো আর্থিক চাপও নিশ্চয়ই একটা কারণ?

বৃন্দাও প্রশ্ন করলেন, এটা তো আমারও প্রশ্ন। এরা সকলেই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছে। তাদের যে আর্থিক সংকট আছে সেটা তো অস্বীকার করা যায় না।

স্বস্তিশোভন মাথা নাড়লেন, এই লজিক আমি মানি না। এদের থেকেও অনেক বেশি কষ্টে আছে দেশের কোটি কোটি লোক। আমাদের গরিব দেশের একটা বড় অংশই তো ভুখা মানুষ। তারা কি সকলেই বন্দুক ধরছে খেতে না পেয়ে? নাকি খুনখারাপি করছে দু মুঠো ভাত জোগাড়ের জন্য? তাহলে সামাজিক বা আর্থিক কোনও চাপ যাদের নেই, যারা কেবল লোভের জন্য ক্রিমিনাল হয়, তাদের বাবা-মা কিংবা ঠাকুরদা-ঠাকুমার জিন নিশ্চয়ই দূষিত?

ডক্টর শর্মা হাসলেন, অতশত জানি না। তবে মনে হয় ডাউনস সিনড্রোম, কনসেপ্ট অফ সুপার-মেলস, অ্যাকোন্ড্রোপ্লাজিয়ার স্টাডি, স্কিন-ক্যানসারে জিনের এফেক্ট সব এর ফল। ইদানিং ছেলেমেয়ে হবার আগেই বাবা-মায়েরা ডাক্তারের কাছে ছুটছে। জেনেটিক কাউনসেলার কথাটা হালে শুনছি। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কথাটাও কানে আসছে। তবে হিউমান জেনেটিক্সের ওপর যে কাজ হয়েছে তার বেশিটাই ফিজিওলজিকাল অ্যাসপেক্টের ওপর। সাইকোলজিকাল অ্যাসপেক্টের গভীরে ঢুকতে শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা। মানুষের মনের রহস্য বোঝা তখন সহজ হবে।

স্বস্তিশোভন বললেন, হিম্মতকে আমি যতটুকু বুঝেছি, সে হল ইনকনসিডারেট, ওয়ান ট্র্যাক মাইন্ডের লোক। একগুঁয়ে ভীষণ। সে যেটা করবে বলে মনে করবে সেটা করেই ছাড়বে।

ডক্টর শর্মা নীচু স্বরে বললেন, আমার অনেক বয়স হল, এসব অনাচার আর সহ্য হয় না। বুকের ওপর অনেক ভার জমেছে। জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিতে ইচ্ছে করে সব।

স্বস্তিশোভন ধীর গলায় বললেন, আমারও তাই। বড্ড হতাশা হয় জানেন তো। মাঝেমাঝে চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে।

অভয়া দেখলেন সাদা কুয়াশা উঠে আসছে মাটি ফুঁড়ে। চা বাগানে অফুরন্ত সবুজ বলেই কুয়াশারা দুধের সরের মতো ঘন হয় এসব দিকে। ঝাপসা হয়ে যাওয়া বাইফোকাল চশমার কাচ মুছলেন অভয়া। কুয়াশা। ধীরে ধীরে তিনি নিজেই বোধ হয় কুয়াশা হয়ে যাচ্ছেন। তিনি একা নন, তাঁর স্বামী, ডক্টর শর্মার মতো সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরাই তো কুয়াশা এখন। কে না জানে যে, কুয়াশার মধ্যে বিদ্যুৎ চমকায় না, আগুনও জ্বলে না। অভয়ার হাসিতে ম্লানিমা এসে লাগল। শান্ত গলায় বললেন, একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে কলকাতা যাচ্ছি। কিন্তু মন পড়ে থাকবে মেঘদুয়ারেই। আপনারাও কিন্তু সাবধানে থাকবেন।

১৪

মোটর সাইকেলে চেপে শর্টস আর টি-শার্ট পরে চা বাগানের বিভিন্ন ডিভিশন দিয়ে দিনভর চক্কর কাটতে হয় রঙ্গিতকে। দেখতে হয় বিস্তৃত এলাকা জুড়ে বিপুল কর্মকাণ্ড ঠিকঠিক চলছে কিনা। ম্যানেজার থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার সকলেই এই পোশাক পরেন। হাঁটুর নীচের অংশ, কিংবা কনুইয়ের নীচে হাতের বাকি অংশটুকু রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে যায়। রোদের তাপ থেকে বাঁচার জন্য টুপি ব্যবহার করেন অনেকে। রঙ্গিতের প্রথম প্রথম শর্টস পরতে অস্বস্তি হতো। এখন সেই প্রাথমিক জড়তা কেটে গেছে।

আজ তাড়াতাড়ি ডিউটি সেরে কোয়ার্টার্সে ফিরেছিল রঙ্গিত। কেজো পোশাক ছেড়ে তৈরি হয়ে নিয়েছিল চটজলদি। তারপর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে মুকুটের সঙ্গে। একটা পুরনো এসইউভি গাড়ি তাকে দেওয়া হয়েছে বাগান থেকে। বাগানের বিভিন্ন ডিভিশনে যাতে যাতায়াত করতে সুবিধে হয়। সেই গাড়িটায় চেপে আজ বেরিয়েছে রঙ্গিত। ড্রাইভিং সিটে সে। পাশের সিটে মুকুট। মালবাজার ছাড়াল গাড়ি। খোলা জানলা দিয়ে হাওয়া আসছে।

গাড়ি এগোচ্ছে চা বাগানকে পাশে রেখে কালো অ্যাসফল্টের রাস্তা দিয়ে। হাওয়া দিচ্ছে মৃদু মৃদু। গরম বোধ হচ্ছে না তেমন। আজকের পড়ে পাওয়া বিকেলটা ভারি ভালো লাগছে মুকুটের। চালসা মোড় চলে এল একটুক্ষণ বাদে। ল্যাটারাল রোড ধরে চলছে গাড়ি। রঙ্গিত বলে চলছিল গোরা সাহেবদের হাত ধরে কী করে চা এল ভারতবর্ষে সেই গল্প। মুকুট রঙ্গিতের দিকে তাকিয়ে ছিল ঠিকই কিন্তু তার মস্তিস্কে চলছিল অন্য কিছু ভাবনার প্রবাহ। সে যে রঙ্গিতের প্রতি ক্রমশ আসক্ত হয়ে পড়ছে সে কথা কি রঙ্গিত জানে? রঙ্গিতের মনের অতলে ডুবুরি নামানোর চেষ্টা করছিল সে।

উল্টোদিক থেকে একটা বাস আসছিল। রাস্তার বাঁ দিকে গাড়িটাকে চাপিয়ে দিতে দিতে রঙ্গিত বলল, এই যে রাস্তা দিয়ে আমরা যাচ্ছি একটা সময় এসব ছিল বনেজঙ্গলে ঘেরা এক জায়গা। বুনো জন্তুদের স্বর্গরাজ্য ছিল তখন ডুয়ার্স। ছবিটা রাতারাতি বদলে গেল যখন ইংরেজরা বুঝতে পারল এই অঞ্চলেই ফলবে সবুজ সোনা। দেড়শো বছর আগের ডুয়ার্স কী ছিল ভেবে দেখো একবার। শাল, সেগুন, ধুপি আর টুন গাছে ছাওয়া সেই ঘন জঙ্গল থেকে ভেসে আসত হাতির ডাক, বাঘের গর্জন আর বিষাক্ত সাপের হিসহিস। রাক্ষুসে মশার কামড় থেকে ম্যালেরিয়ার ভয় যেমন ছিল, তেমন ছিল প্রবল বর্ষায় ডায়েরিয়ার আশঙ্কা।

মুকুট বলল, বাবার কাছে বহুবার শুনেছি সেসব গল্প। হাতির পিঠে চেপে দার্জিলিং যাবার পথে জোসেফ ডালটন হুকার একবার এসেছিলেন জলপাইগুড়িতে। জনমানুষহীন এই গ্রামে তিনি দেখেছিলেন হাতে গোনা কিছু খড়ের ঘর আর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সাভানা ঘাসের মতো তৃণভূমি। ইংরেজরা মনে করত, এই হতদরিদ্র, বুনো এলাকাকে নিজের অধীনে আনার জন্য অহেতুক খরচ করে কোনও লাভ নেই। কিন্তু চা শিল্পের সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়ার পর এদিকটা নিয়ে ইংরেজদের মনোভাব পাল্টে যায়।

রঙ্গিত সায় দিয়ে বলল, ঠিক তাই। সে কারণে বলা হয় ডুয়ার্সের ইতিহাসের সঙ্গে চা বাগানের ইতিহাসও গভীরভাবে জড়িয়ে। এই যে আমরা চলে এসেছি স্পটে। এই হল সেই সিমেটারি যার কথা তোমাকে বলেছিলাম।

বিকেলের আলো মরে আসছে। গোলাপি আলোর বিভা ছড়িয়ে আছে পশ্চিম আকাশে। গাড়ি থেকে নেমে এল মুকুট। শ্বেতপাথরের তৈরি বিষণ্ণ মুখের এক পরি হাঁটু গেড়ে বসে আছে একটা সমাধির ওপর। ডানাদুটি ঠিক থাকলেও হাতদুটি ভাঙা। শ্বেতপাথরের পরিটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মুকুট। একটা লেখা দেখিয়ে বলল, এই যে দ্যাখো রাঙামাটি চা বাগানের ম্যানেজার ডব্লু ডি কাউল ১৯১৯ সালে তাঁর স্ত্রী মারিয়াম ইভাকে এখানে সমাধিস্থ করেন।

ছায়া ছায়া অন্ধকার। কেমন একটা বিষাদের ভারী চাদর দিয়ে যেন এই গোটা সিমেটারিটা মোড়া। মনখারাপ হয়ে যায় এই গোরস্থানে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর কথা ভাবলে। রঙ্গিত বলল, পশ্চিম ডুয়ার্স তো বটেই, গোটা ডুয়ার্স অঞ্চলে এত প্রাচীন সমাধিস্থল আর নেই। কিন্তু অবহেলা আর অযত্নে নষ্ট হচ্ছে এই সিমেটারি। দেড়শো বছর আগে যারা তাঁদের কাছের মানুষদের সমাধিস্থ করেছিলেন তাঁরা কেউ ভাবেননি একদিন এমন অবস্থা হবে এই জায়গাটার।

পাশেই আর একটা সমাধি। গুটিগুটি পায়ে সেদিকে এগোল মুকুট। তিন-চারটে সাদা প্রজাপতি উড়ছে তার ওপর চক্রাকারে। মুকুট বলল, এটা ১৮৫৪ সালে স্কটল্যান্ডে জন্ম নেওয়া জন উইলিয়াম থমসনের সমাধি। ভদ্রলোক চা বাগানে কাজ করার জন্য ডামডিমে আসেন। কিন্তু এখানকার পরিবেশ তাঁর সহ্য হয়নি। রোগে ভুগে ১৮৮৯ সালে মারা যান তিনি। এই মাটিতে থমসনকে চিরকালের জন্য শুইয়ে রাখা হয়। আবার এই যে দ্যাখো সাতখাইয়া চা বাগানে কাজ করতে এসেছিলেন মানুষটা, কিন্তু ১৯২৩ সালে মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয় সেই যুবক। এই সিমেটারিতে সমাধিস্থ করা হয় ফ্রেডেরিক চার্লস জর্ডান নামের সেই বিদেশিকে।

রঙ্গিত আর একটি কবরের ওপর লেখা পড়ছিল। মুখ তুলে বলল, এদিকে এসে দেখে যাও, এটা বাগরাকোট চা বাগানের উইলিয়াম ভ্যালেন্টাইন শিয়ারারের সমাধি। ইনি ছিলেন টি প্ল্যানটার। সাতাশ বছর বয়সে মারা যাবার পর তার ভাই ও বোন এই স্মৃতিসৌধ তৈরি করিয়েছিলেন। আর এই যে এটা, লিস রিভার চা বাগানের জন অ্যান্ডারসন পার্থ দম্পতি তাঁদের সন্তান জেমসের জন্য বানিয়েছিলেন এই সমাধি। কত অল্প বয়স ছিল জেমসের, ভাবলে কেমন দমচাপা কষ্ট হয়।

মুকুট বলল, এই প্রথম এলাম এখানে। কেমন অদ্ভুত এখানকার পরিবেশ, যেদিকে তাকাই কবরের ছড়াছড়ি। আমি ভিতু হলেও আমার এখানে এসে ভয় লাগছে না একটুও। উল্টে মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে উঠছে। কত মানুষ জীবন যাপন করেছে তাদের দৈবনির্দিষ্ট মেয়াদ অনুযায়ী। উপভোগ করেছে এই পৃথিবীটাকে। এখন তারা সকলে কেমন ঘুমিয়ে আছে এখানে। ভাবতেই কেমন লাগে তাই না? আচ্ছা একটা কথা বলি, এই অঞ্চলে এত ইংরেজ এসেছিলেন চা বাগানে চাকরি করতে, কিন্তু এই এলাকায় প্রথম কে এসেছিলেন?

রঙ্গিত বলল, রিচার্ড হাউটান। ১৮৭৪ সালে তিনি চা বাগান প্রতিষ্টা করেছিলেন মালবাজারের কাছে গজলডোবায়। তারপরই এই অঞ্চলে চা শিল্পের সম্ভাবনা খুলে যায়। দলে দলে ইংরেজ ভিড় জমাতে শুরু করে এদিকে। মালবাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠে একের পর এক চা বাগান। সেই সব চা বাগানে কাজ করতে এসেছিল ইংরেজ থেকে শুরু করে বাঙালি, নেপালি, পাঞ্জাবি, আদিবাসী। চিনেম্যানরাও এসেছিল চাকরি করতে। পরে বেঙ্গল ডুয়ার্স রেলওয়ের অধীনে মালবাজারে গড়ে ওঠে বড় জংশন স্টেশন। তার গুরুত্ব এখন আর ততটা না থাকলেও সেই রেলস্টেশনের হাত ধরেই ডুয়ার্সের ইতিহাস বদলাতে শুরু করেছিল।

সন্ধে হয়ে এসেছে। ছায়া ঘনাচ্ছে সিমেটারিতে। অন্ধকারে কেউ কারও মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। রঙ্গিত মুকুটের একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে নিল। নরম গলায় বলল, সত্যি করে বলো তো, কেমন লাগল আজকের ট্রিপ?

মুকুটের গলায় মনখারাপের মিড় টান দিল মৃদু। নীচু গলায় বলল, এখানে এসে মনটাই কেমন হয়ে গেল। এখন মনে হচ্ছে এই যে আমরা প্রতিনিয়ত লড়াই ঝগড়া করে যাচ্ছি সামান্য অর্থ যশ খ্যাতির জন্য। অথচ ভেবে দ্যাখো আমাদের মতো নশ্বর মানুষের বাঁচা মরা এসব মহাকালের কাছে কত তুচ্ছ ব্যাপার।

রঙ্গিত বলল, একটা জিনিস কখনও ভেবে দেখেছ? সমাধিক্ষেত্র যেমন মনের সমস্ত উদ্বেগ আর আশঙ্কা দূর করে তেমনি আর একটা জিনিস উপহার দেয়, তা হল সাহস আর বীরত্ব। নেভিল কার্ডাসের নাম শুনেছ?

মুকুট বলল, শুনেছি। ক্রিকেটকে সাহিত্যের মর্যাদা দিয়েছিলেন তিনি।

রঙ্গিত বলল, সেই কার্ডাস বলেছিলেন, হোয়াটস ব্রেড ইন দ্য বোন কামস আউট ইন অ্যান ইনিংস। তার মানে রক্ত, অস্থি আর মজ্জার গভীরে চারিয়ে আছে যে-জীবনবোধ, একজন ব্যাটসম্যানের কোনও ইনিংস থেকে ঠিক সেটাই বেরিয়ে আসে। তোমার ক্ষেত্রেও আমি এটাই বলব। কঠিন শারীরিক লড়াই তুমি লড়েছ এতদিন। এবার লড়তে হবে তোমার মনের সঙ্গে।

মুকুট বলল, আমার খুব প্রিয় মানুষ হলেন ম্যালোরি। তিনি তাঁর এক বন্ধুকে লিখেছিলেন, ‘আই কান্ট টেল ইউ হাও ইট পজেস মি, আই কান্ট সি মাইসেলফ কামিং ডাউন ডিফিটেড’। ভদ্রলোকের সেই কথাগুলো আমার কানে বাজে। কেউ আমার পেছনে এসে দাঁড়ায়, বলে তোমাকে আবার যেতে হবে ট্রেকিংয়ে। মাথা নীচু করে হেরে ফিরে আসা যাবে না কিছুতেই। আচ্ছা রঙ্গিত, তোমার বাবা তো পাহাড় ভালোবাসেন। তিনি কি কখনও ট্রেক করেছেন?

রঙ্গিত বলল, আমার বাবা-মা হানিমুনে সিকিমের কোনও এক পাহাড়ি গ্রামে গিয়েছিল। ছবি দেখেছি আমি। দুজনে পরে বেশ কিছু পাহাড়ে গেছে। বাবা ট্রেকিংও করেছে অল্পবিস্তর। তার পর মা হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ল। আপ্রাণ চেষ্টা করেও মাকে বাঁচাতে পারল না বাবা। মা মারা যাবার পর বাবা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে অনেকটা। পাহাড় তো দূরের কথা, বেড়াতেও যায় না কোথাও। তবে তোমার সঙ্গে আলাপ করে বাবা খুশি হয়েছে।

মুকুট বলল, আমাকে তিনি এতটা স্নেহ করেন এ আমার সৌভাগ্য।

রঙ্গিত হাসল, বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল এক ছেলে আর এক মেয়ে হোক। ছেলের নাম দিয়েছিল রঙ্গিত নদীর নামে। মেয়ের নাম ভেবে রেখেছিল তিস্তা। কিন্তু মা তো বাঁচেনি বেশিদিন। আমি যখন ছোট তখনই মা চলে যায় আমাকে ছেড়ে। বাবাকে বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না, কিন্তু মানুষটার মনটা খুব নরম। বাবা নিজের না জন্মানো মেয়ের জন্য স্নেহ আর ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছিল, সেই আবেগের ক্ষরণ হয়েছে তোমাকে দেখে।

মুকুট বলল, সেদিন তাঁকে কথায় কথায় বলছিলাম আগের বার ঘাচোক থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল। এবার ছিমছিমলে খরকা অবধি ট্রেক করে যাব বলে ভাবছি। সেটা শুনে তিনি বলছিলেন, ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা জীবনদর্শন বদলে দেয়। জীবনকে নতুন করে চেনায়। পেশাগত জীবনে যে কোনও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সাহস দেয়। ব্যক্তিজীবনেও এই অভিজ্ঞতা অমূল্য সঞ্চয় হয়ে থাকে। এবার চেক আপে যাচ্ছি। এবার গিয়ে জানতে চাইব আমি এখন ট্রেক করতে যাবার মতো কন্ডিশনে এসেছি কি না।

আমি যদি জয়েন করতে চাই তোমাদের টিমে, তোমরা নেবে আমাকে?

আর ইউ কিডিং? তুমি যাবে আমাদের সঙ্গে? মুকুট চোখ বড় বড় করে বলল।

আমি মজা করছি না। সিরিয়াসলিই বলছি। নেবে আমাকে তোমাদের দলে?

তোমাকে আমি নিজের থেকেও বেশি ট্রাস্ট করি। তুমি কোম্পানি দিলে তো কথাই নেই, অ্যান্ড আই ক্যান বেট, চিত্রাঙ্গদাও খুশি হবে তুমি আমাদের টিমে জয়েন করলে।

সিমেটারি থেকে ফিরে আসছিল দুজন। রঙ্গিতের আঙুল নিজের আঙুলে জড়ানো, পুরুষালি গায়ের গন্ধ ভেসে আসছে তার নাকে। আঁধার ঘনাচ্ছে এই জঙ্গুলে পথে। রঙ্গিত ড্রাইভ করছে ডানহাতে। চোখ উইন্ডোগ্লাসে। মুখে স্মিত হাসি। তার বাঁ হাতের আঙুলগুলো আঁকড়ে ধরে আছে মুকুট। কখনও অচেনা আবেশে চোখ বুজে ফেলছে। কখনও আবার চোখ খুলে প্রাণভরে দেখছে প্রিয় পুরুষটিকে। এই পথ যদি অনন্ত হতো তাহলে কী ভালোই না হতো!

বাংলোর ব্যালকনিতে বসে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিল মুকুট। হেমন্ত যেমন জাদুবিদ্যা জানে তেমন আর কেউ নয়। শরতের অপার্থিব আলো আর ছায়া, রোদের সঙ্গে মেঘবৃষ্টির খেলা হেমন্তে এসে গহন গভীর এক রহস্যের মোড়কে আড়াল করে দেয় সব কিছু। পৃথিবীকে এক প্রগাঢ় রহস্যে ঢেকে দেয় সে। এবারও এদিকে হেমন্ত নেমে এসেছে ধীর পায়ে। তার কুয়াশা, ছাতিমফুল, মৃদু শীত আর অলৌকিক কুহক নিয়ে। পুরনো জাদুবিদ্যা সে আজও ভোলেনি। তার অমোঘ ইশারায় আজও চরাচর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে মায়া। কুহক জড়ানো ভঙ্গিতে জাদুলাঠি ঘোরায় সে। রাতারাতি বদলে যায় প্রকৃতি। রঙ্গিতের পাশে বসে মেঘদুয়ারে ফিরে আসার সময় সেই বশীকরণমন্ত্রে সম্মোহিত হতে হতে মুকুট ভাবছিল, আহা বড় মধুর এই জীবন।

১৫

‘কুহু কুহু কোয়েল বোলে

প্যায়ার কি পেরু ঢুঁরে

জগচড়াই জগমে উতারে গেই

পঞ্ছামে সুরত মিনজুর পাওয়ে।’

সরসতিয়ার স্তনসন্ধিতে মুখ গুঁজে সাদরিতে এই সবই বলে চলছিল শুকরা। সাদরি কোনও ভাষা নয়, হিন্দি-বাংলার অপভ্রংশ আর আদিবাসী ভাষা মিশে তৈরি হওয়া উপভাষা। এদিকের চা বলয়ে শুধু নয়, লাগোয়া সমতলেও সাদরিতে কথা বলে বহু মানুষ। সরসতিয়া দাইমার কাছে শুনে শুনে জেনেছে ইতিহাস। দেড়শো বছর আগে চা বাগানে শ্রমিকের কাজ করার জন্য ভারতের মধ্যভাগ থেকে লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল আদিবাসী মানুষগুলোকে। গোরুছাগলের মতো খাঁচায় পুরে আনা হয়েছিল তাদের। চলেছিল নির্মম অত্যাচার। পাশবিক ধর্ষণ। অমানবিক শোষণ। ভারতের মধ্যদেশ থেকে তারা এসেছিল, তাই আজও কেউ কেউ তাদের বলে ‘মদেশিয়া’। ডুয়ার্সের নিমতিঝোরা, তুরতুরি, নিদাম, মথুরা, শুখনা, মাকড়াপাড়া, রাধারানি সব বাগানেই কমবেশি সাদরিভাষার চল।

একটু আগে সরসতিয়ার শরীরে নিজের শরীর মিশিয়ে দিয়েছে শুকরা। দু’জনের শরীরের মধ্যে একটুও ফাঁক ছিল না। প্রমত্ত ভালোবাসা-বাসি করার পরও সরসতিয়াকে ছাড়ছিল না শুকরা। পুরুষালি হাতে ভালোবাসার মানুষটার নরম শরীরটাকে জাপটে ধরে রেখেছিল শক্ত করে। যেন আর কোনওদিনই ছাড়বে না তাকে। সরসতিয়ার পেটে আসতে চলেছে তার সন্তান। এক অনার্য পুরুষ আসছে এই পৃথিবীতে। সময় হলে এই দুনিয়া ছেড়ে সে চলে যাবে একদিন, কিন্তু তার ঔরসজাত সন্তানের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকবে শুকরা। এ কি কম কথা! সরসতিয়া শুকরার ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করিয়ে দিয়ে বলেছিল, তুই আমাকে ছেড়ে যাবি কী করে? আমার মরদকে অত সহজে যেতে দেব নাকি আমি!

শুকরা বলেছিল, হিম্মত আমাকে ডাকা করেছিল ইউনিয়ন অফিসে। মদ খেয়ে শালা পুরো টাল্লি হয়ে ছিল। আমাকে চেতাবনি দিয়ে বলল তোর সঙ্গে আর যেন না মিশি। আমাদের দুলৌড় ও সহ্য করবে না। আমি আমার জন্য ভয় পাই না। আমার জান কড়া। আমি অত সহজে মরব না। আমি মরলে দশজনকে মেরে তার পর মরব। কিন্তু তোর জন্য আমার ভয়। আমি তোকে সবসময় দেখে রাখতে পারব না। তুই সাবধানে থাকিস।

সরসতিয়া সাদরিতে বলছিল, জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে আমরা পেরে উঠব না। হিম্মতের বড় বড় লিডারদের সঙ্গে ওঠাবসা। চা বাগানের কুলিকামিনদের কাছ থেকে পার্টির নাম করে হপ্তা তোলে হিম্মত। সেটা কি পার্টির বড় নেতারা জানে না? কিন্তু ওকে ছোঁয় না কেউ। অন্য কেউ হলে সাজা হতো। কিন্তু হিম্মতের জেল জরিমানা কিচ্ছু হবে না। ওর সঙ্গে আমরা পারব না। তার চেয়ে মেঘদুয়ার চা বাগান ছেড়ে আমরা অন্য কোথাও পালিয়ে যাই চল।

শুকরা রেগে গিয়ে বলেছিল, দিমাগ ঠিক আছে তো তোর? পালায় তো ডরপোক লোগ! এই চা বাগানে আমার জন্ম। বেড়ে ওঠা। এই বাগান ছেড়ে আমি যাব না কোথাও। হিম্মতের ক্ষমতা নেই আমার কোনও ক্ষতি করে।

সরসতিয়ার বুক ধুকধুক করে। হিম্মত তার পেছনে লেগেছে বহুদিন ধরে। বহুত তঙ করছে। এই তো গত মাসে তাকে ডাকা করিয়েছিল ইউনিয়ন অফিসে। ভাঙাচোরা টিনের চালওয়ালা দু-কামরার সেই অফিসটাকে দেখলেই বাগানের মেয়ে-বউদের গা ছমছম করে। এই তল্লাটের কত কামিন যে সেই ঘুপচি ঘরে ইজ্জত খুইয়েছে তার হিসেব নেই। ডাগর শরীর হলে সেই মেয়েবউকে হিম্মত নিজে ভোগ করে প্রথমে। পরে প্রসাদ চাখতে দেয় তার স্যাঙাৎদের। চ্যালাচামুণ্ডারাও আছে রাজার হালে। তাদের ইউনিয়ন অফিসেই নেশাভাঙ আর মৌজমস্তি চলে দিনভর। সে খরচ দেয় হিম্মত।

এক বিকেলে দাইমার সঙ্গে ইউনিয়নের অফিসঘরে সরসতিয়া গিয়েছিল। বাইরে যতই সাহসী ভাব দেখাক, সরসতিয়ার বুকটা ধুকপুক করছিল অচেনা এক ভয়ে। জায়গাটাই এমন। তার সঙ্গে জড়ানো গলায় কথা বলছিল হিম্মত। দূর থেকে মদের গন্ধ পাচ্ছিল সরসতিয়া। শুধু চোখ দিয়েই তার শরীরটাকে চেটেপুটে খাচ্ছিল লোকটা। গা ঘিনঘিন করে উঠেছিল তার। দাইমা বুঝতে পেরেছিল হিম্মতের মতিগতি। ঘরে ফিরে আসার সময় বলেছিল, কখনও একা থাকিস না। সন্ধের পর তো নয়ই। কিন্তু এভাবে কি বাঁচা যায়!

এর মধ্যে একদিন চা-পাতা ওজন করিয়ে বাগানবাবুকে দিয়ে কাগজে লিখিয়ে নিজের প্রাপ্য টাকা নিয়ে সরসতিয়া ফিরে আসছিল বস্তির রাস্তা দিয়ে। তখন সন্ধে হবে হবে করছে। ফুলমতিয়া পাশে এসে চাপা গলায় বলেছিল, আমার মরদের কাছে শুনলাম, এদিকের জঙ্গলে রাতের অন্ধকারে তেন্ডুয়া শিকার করছে একটা দল। সেই চামড়া বিদেশে পাচার হচ্ছে চোরাপথে। গাজিয়াবাদ থেকে এদিকে এসেছে কয়েকজন লোক। তারাই এসব করছে। হিম্মতের সাঁট আছে ওদের সঙ্গে।

সরসতিয়া কথাটা বুঝতে সময় নিয়েছিল। অবাক হয়ে বলেছিল, তেন্ডুয়া?

ফুলমতিয়া বলেছিল, হাঁ রে হাঁ, তেন্ডুয়া। মানে চিতা। লেপার্ড। লাখ লাখ টাকা দাম তার চামড়ার। আমার মরদ শিউমঙ্গল ডেরাইভারি করে। গাড়ি চালায় মালবাজার নাগরাকাটা রুটে। কাল চালসার মোড়ে একটা ধাবায় ও চা খাচ্ছিল। হিম্মতকে একটা পাগড়ি পরা লোকের হাত থেকে টাকার বান্ডিল নিতে নিজের চোখে দেখেছে ও। কপাল ভালো হিম্মত শিউমঙ্গলকে দেখেনি। শুন না রে, শুকরার বোনের মরদ পুলিশের গাড়ি চালায় না? তুই শুকরাকে বলিস পুলিশের কাছে যাতে পৌঁছয় এই খবরটা। লেকিন সাবধান। হিম্মতের কানে গেলে কী হবে বুঝতে পারছিস? আমাকে জিন্দা গোর দিয়ে দেবে।

দুজন কথা বলায় মশগুল ছিল বলে খেয়াল করেনি, কখন যেন হিম্মতের চ্যালা বুধুয়া পেছন থেকে এসে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল বেড়াল পায়ে। চমকে উঠেছিল সরসতিয়া। বুধুয়া তার কাঁধে একটা আলতো চাপড় মেরে বলেছিল, তোকে হিম্মত ডাকা করেছে পার্টি অফিসে। সনঝেবেলা আসভি। অওর হাঁ কান খুলে শুনে নে, আগের দিনের মতো দাইমাকে সঙ্গে আনবি না। হিম্মতভাই আকেলি যেতে বলেছে তোকে। সরসতিয়ার উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে বুধুয়া চলে গিয়েছিল নিঃশব্দে।

আজ ছুটির দিন। মহিলারা ঘরের কাজ করছে। পুরুষেরা নেশা করছে নিজের ডেরায়। সে আর শুকরা এখানে আজও এসেছে। এখান থেকে দেখা যায় চা ফ্যাক্টরির টিনের চাল। দিনের বেলায় মেশিনের শব্দ ভেসে আসে ভেতর থেকে। কোলাহলে মুখর হয়ে থাকে সারাটা দিন। ভেসে আসে চা পাতার ঘ্রাণ। তাজা চা গাছের পাতা তুলে এনে ফ্যাক্টরির ভেতর বিভিন্ন পদ্ধতিতে তাকে চায়ে পরিণত করা হয়। আজ ফ্যাক্টরি বন্ধ। ফ্যাক্টরি থেকে খানিকটা দূরে এই জায়গা। একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে নরম ঘাস গালিচা বিছিয়ে রেখেছে। বহুকাল এদিকে চা চাষ হয় না। সার, জল না পেলেও চা গাছগুলো প্রকৃতির খেয়ালে এখনও মরেনি। কোনও কোনও চা গাছ নাকি একশো বছর অবধি বাঁচে। এই গাছগুলোর বয়স কত কে জানে। গাছগুলো হলদে হয়ে গেলেও বেঁচে আছে এখনও। সাক্ষী দিচ্ছে পুরনো দিনের। সরসতিয়া শুনেছে চা গাছকে বাড়তে দিলে তা নাকি দোতলা বিল্ডিংয়ের সমান উঁচু হতে পারে। চা গাছ যাতে চারফুটের বেশি না বাড়ে তাই তিন-চার বছর অন্তর চা গাছ ছাঁটাই করতে হয়, একে মানিজাররা বলে প্রুনিং।

সরসতিয়া কখনও ক্যান বিয়ার খায়নি, তার জন্য ক্যান বিয়ার নিয়ে এসেছিল শুকরা। এতক্ষণ ধরে দুটো বিয়ার একা খেয়েছে শুকরা। সরসতিয়া একটা ক্যান শেষ করেছে কোনও মতে। মুখ ভেটকে বলেছে আর যেন কখনও বিয়ার না আনে শুকরা। এর তেতো স্বাদ তার একদমই পছন্দ নয়। বরং হাঁড়িয়া ঢের ভালো। দুটো বিয়ারের ক্যান খেয়ে বেহেড হয়ে যাওয়ার লোক শুকরা নয়। সে বলশালী পুরুষ। দশটা জোয়ান লোকের সঙ্গে একা টক্কর নিতে পারে।

আজ সকাল থেকেই আকাশের এ কোণে ও কোণে পাথরের চাঙড়ের মতো মেঘ ঝুলে আছে। মাঝে মাঝে একটু রোদ দেখা গেলেও মেঘাচ্ছন্ন ভারী আকাশ আচমকা চমক দিয়ে ওঠে। পরক্ষণেই আভাটুকু নিভে যায়। বিকেল থেকে একটা হাওয়া দিচ্ছিল বলেই কিনা কে জানে, নেশাটা জমে উঠেছিল। তার সঙ্গে সরসতিয়াকে এমন আদিম পরিবেশে এত কাছে পাওয়ার রোমাঞ্চে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল শুকরার। ক্রমশ দৃঢ় হয়েছিল তার পৌরুষ। ঘুম থেকে জেগে উঠেছিল সরসতিয়ার শরীরও। পৃথিবীর সবচাইতে পুরনো আর আদিম খেলাটা খেলেছিল দুজনে মিলে।

শুকরার বোন চামেলির শাদি হয়েছে মালবাজারে। চামেলির স্বামীর নাম লাল, পুলিশের গাড়ি চালায়। চামেলি মা হয়েছে গতমাসে। বাচ্চাটা চামেলির মতো দেখতে অবিকল। তেমনই উজ্জ্বল দুটো চোখ, কোঁকড়া চুল, চামেলির মতোই বাচ্চাটারও চিবুকের ঠিক নীচে একটা জুড়ুল। ওরা থাকে মাল থানার পেছনে একটা ঘুপচি ঘর ভাড়া নিয়ে। শুকরার একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড মোটর সাইকেল আছে। সেই বাইক দাবড়ে শুকরা গতকাল গিয়েছিল বোনের বাড়ি। লিকার শপ আছে ক্যালটেক্স মোড়ে। মালবাজার গেলে সেখান থেকেই কিছু না কিছু কিনে নিয়ে যায় শুকরা।

কাল রাতে লাল আর শুকরা মৌজমস্তি করেছে চুটিয়ে। চামেলি হুইস্কি-টুইস্কি ছোঁয় না। তার জন্য কয়েকটা ক্যান বিয়ার নিয়ে গিয়েছিল শুকরা। চামেলি একটা ক্যানের খানিকটা খেয়ে আর খেতে পারেনি। তার নাকি তেতো তেতো লাগে। লাল এদিকে হুইস্কি ছাড়া আর কিছু খায় না। ফলে তিনটে বিয়ারের ক্যান বাইকের ডিকির মধ্যে পুরে মেঘদুয়ারে নিয়ে এসেছিল শুকরা।

আকাশ মেঘে ঢাকা বলে একটু তাড়াতাড়িই বিকেলটা ফুরিয়ে গেল। বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটা দাঁড়িয়ে আছে একাকী। উন্মত্ত রমণের পর শ্রান্ত অবস্থায় দুজন চিত হয়ে শুয়েছিল। শুয়ে শুয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছটার ডালপালা দেখছিল সরসতিয়া। কী বিশাল এই গাছ! কত তার ডালপালা, কত পাখির আশ্রয় এই গাছের ডালে ডালে! আর যখন ফুল ফোটে লাল আগুনের মতো তখন তো চোখ সরানোই যায় না। শুকরা সাদরিতে বলল, কী দেখছিস?

ওই কৃষ্ণচূড়া গাছটাকে। পাতাগুলো কী সুন্দর না?

শুকরা হাসে, মেরে জানেমন জানে জিগর, পাতা নয়, গাছের শিকড়গুলো দ্যাখ ভালো করে। ওর শিকড়গুলো কতদূর ছড়িয়ে গেছে দেখেছিস? আমার কী মনে হয় জানিস, আমি হলাম ওই বড় কৃষ্ণচূড়া গাছটা। তুই আমার শিকড়। তোর পেটে যে আসতে চলেছে সে-ও আমার শিকড়। তোদের দুজনের জন্যই আমি আকাশ ছুঁয়ে আছি। তোরা দুজন আমার আলো, হাওয়া, রস। তোরাই আমার মাটি, আমার সবটুকু জোর। শিকড়গুলো কেউ কেটে দিক গোড়া থেকে, সঙ্গে সঙ্গে শুকিয়ে মরে যাব আমি। ধপ করে পড়ে যাব তখনই। শিকড় যার নেই, তার কিছুই নেই।

প্রেমিকাকে আবার আদর করে জড়িয়ে ধরে শুকরা। কপালে, ঠোঁটে, স্তনসন্ধিতে চুমু খেতে থাকে পাগলের মতো। সরসতিয়া শুকরার আদর খেতে খেতে হুঁশ হারিয়ে ফেলছিল। তার শ্বাস দ্রুত হচ্ছিল, নাকের পাটা ফুলে উঠছিল। তার মধ্যেই উদ্বিগ্ন গলায় বলেছিল, চামেলির মরদকে বলেছিস তো সব?

অস্থির হাতে প্রেমিকার শরীর ঘাঁটছিল, যেন যা করার এখনই করে ফেলতে হবে। যেন ভীষণ তাড়া তার। সরসতিয়ার ঠোঁটে আঙুল রেখে শুকরা বলেছিল, শসসস্! চুপ যা, চুপ যা তুই। ভালোবাসার সময় এত কথা বলতে হয় না।

চুপ করে গিয়েছিল সরসতিয়া। শুকরা গান গাইছিল গুনগুন করে। ‘কুহু কুহু কোয়েল বোলে / প্যায়ার কি পেরু ঢুঁরে / জগচড়াই জগমে উতারে গেই / পঞ্ছামে সুরত মিনজুর পাওয়ে’।

সরসতিয়ার ভারি ভালো লাগছিল। আজ সত্যিই একটা অন্যরকম দিন। সোঁদা হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসছিল মিষ্টি বাতাস। শুকরার বুকে আলতো করে নাক ছোঁয়াল সরসতিয়া। পুরুষালি ঘামের গন্ধের সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসছে বৃষ্টিভেজা সোঁদা মাটির গন্ধ। সেই গন্ধের মধ্যে মিশে আছে চা গাছেরও গন্ধ। কেমন নেশা ধরে যাচ্ছে তার। শুকরা যে-গান গাইছিল, তার অর্থ হল কুহু কুহু ডাকে কোয়েল / ঘুঘুপাখি খোঁজে কবুতর / চড়াই চরে মাঠে মাঠে / সবার থেকে ময়ূর যে সুন্দর।

হাসছিল সরসতিয়া। হাসির দমকে তার সারা শরীর কাঁপছিল। শুকরা অবাক হয়ে বলল, কেয়া রে, হাসছিস কেন?

সরসতিয়া শুকরার মাথার চুল ঘেঁটে দিতে দিতে বলল, আমার মরদ মানুষ ভালো, কিন্তু তার খোপরি যেন আগুনের চুল্লি। মেজাজ গরম হয়েই থাকে। হাত চালিয়ে দেয় কথায় কথায়। তার সঙ্গে কথা বলতে ভয় পায় সকলে। সেই লোক তার ভালোবাসার আওরতকে গুনগুনিয়ে গান শোনাচ্ছে এটা কেউ শুনলে বিশ্বাসই করতে পারবে না।

শুকরা হেসে ফেলেছিল সরসতিয়ার কথায়। আবার নতুন করে জেগে উঠেছিল তার শরীর। সরসতিয়ার ঠোঁটে ডুবিয়ে দিয়েছিল ঠোঁট। সরসতিয়াকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল শুকরার পুরুষালি রোমশ হাত। আবেগে আশ্লিষ্ট হতে হতে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল সরসতিয়া। আর তখনই একটা ভোঁতা শব্দ তার কানে এল।

একই সঙ্গে হাতদুটো আলগা হয়ে গেল শুকরার। চমকে উঠল সরসতিয়া। তাকিয়ে দেখল শুকরার চোখদুটো খোলা, কিন্তু মাথাটা এলিয়ে পড়ে গেল তার মাথার ঠিক পাশে। শরীরী আশ্লেষের ঘোর কেটে গেছে, সরসতিয়া অবাক বিস্ময়ে দেখল তার পাশে লুটিয়ে পড়ে আছে শুকরা। চোখদুটো খোলা, কিন্তু তাতে ভাষা নেই কোনও। বিকট শব্দ করে গোঙাচ্ছে। গ্যাঁজলা বেরিয়ে আসছে মুখের কষের সঙ্গে। তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে হিম্মত। হাতে একটা মোটা লোহার রড। শুকরার ঘন, আঠালো কালচে লাল রক্তের কয়েক ফোঁটা ছিটকে এসেছে তার গালে, ঠোঁটে, গলায়।

ভয়ে ধুকধুক করছে সরসতিয়ার বুক। চিৎকার করতেও যেন ভুলে গেছে সে। অবাক বিস্ময়ে সে তাকিয়ে আছে হিম্মতের মুখের দিকে। দেখছে হিম্মতের সাথীদের। এবার পাশ ফিরে তাকাল শুকরার দিকে। তার রক্ত, মজ্জা, হাড়, মাংস সব জমে গেছে বোবা আতঙ্কে। সরসতিয়া উঠে বসল ধড়ফর করে। গায়ে কিছু নেই। একটাও সুতো নেই। স্বাভাবিক প্রতিবর্তক্রিয়ায় পাশে রাখা অন্তর্বাসের দিকে হাত বাড়িয়েছিল সে।

হিম্মত ঠিক বুঝতে পেরেছে। চিলের মতো ছোঁ মেরে সেটা সরিয়ে নিয়েছে। খ্যালখ্যাল করে হাসতে হাসতে ছুড়ে দিয়েছে দূরে। বুধুয়া পোষা কুকুরের মতো গিয়ে কুড়িয়ে নিয়েছে সেগুলো। বস্ত্রখণ্ডটা শুঁকতে শুঁকতে অশ্লীল একটা মন্তব্য করল তার যৌনাঙ্গ জড়িয়ে। সরসতিয়া আর শুকরাকে ঘিরে রেখেছে কয়েকজন। প্রত্যেকেই লোভী হায়নার মতো তাকিয়ে আছে তার নিরাবরণ শরীরটার দিকে। হাতে ধরা লোহার রডটা হিম্মত দিয়ে দিল বুধুয়ার হাতে। শুকরার মাথায় ভালোরকম আঘাত লেগেছে। ক্ষতস্থান থেকে ঘন জমাট রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে। আবছা আলোয় কালচে দেখাচ্ছে রক্তের রং। সরসতিয়ার অস্বস্তি হচ্ছিল। আঙুল বুলিয়ে বুঝতে পারল তার স্তনসন্ধিতেও লেগে আছে শুকরার রক্ত। শ্লথ গতিতে গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে বটের আঠার মতো সেই ঘন তরল। বোঁটকা গন্ধ বেরোচ্ছে। টাটকা রক্তের গন্ধ কি এমন হয়?

পায়ুছিদ্র দিয়ে গরম লোহার শিক ঢুকিয়ে দেওয়ার সময় জ্যান্ত শুয়োর যেমন করে আর্তনাদ করে ওঠে তেমন করে শুকরা কাতরাচ্ছে। আকাশ বাতাস শিউরে উঠছে সেই কাতরানির শব্দে। হিম্মত নিজের মধ্যে নেই। শুকরার তলপেটে আবার একটা লাথি মারল টেনে। জান্তব শব্দ করে কেঁপে উঠল শুকরা। হিম্মত হাসল বাকি সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে। আবার সজোরে লাথি মারল শুকরার বুকে। একটা অস্ফুট শব্দ করে কেঁপে উঠেই স্থির হয়ে গেল শুকরার শরীর।

হিম্মতের জুতোয় লেগে আছে কাদা। কাদামাখা জুতো দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিল শুকরার মাথাটা। একটু ঝুঁকে সরসতিয়ার চুল জড়িয়ে নিল নিজের হাতের মুঠোতে। চুল ছেড়ে হাতের উল্টো পিঠ সরসতিয়ার গালে ছোঁয়াল। আঙুলগুলো নামিয়ে আনতে লাগল ঠোঁটে। গলার কাছটায় আঠা আঠা ভাব। গা ঘিনঘিন করছে সরসতিয়ার। বমি পাচ্ছে ভীষণ। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। মুখটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিল সরসতিয়া। হিম্মত এবার তার আঙুলগুলো নামিয়ে আনছে সরসতিয়ার ঠোঁট থেকে চিবুক, চিবুক থেকে গলা, শেষে স্তনসন্ধিতে। হিম্মতের হাতটা ঠেলে সরিয়ে দিল সে।

হিম্মত হেসে উঠল হা হা করে। একজোড়া কাক কৃষ্ণচূড়া গাছটার ডালে বসা ছিল। কাকদুটো উড়ে গেল ভয় পেয়ে। হিম্মত হাসিটা মুছে নিল মুখ থেকে। অচেতন হয়ে পড়ে থাকা শুকরার উদ্দেশে আবার একটা অশ্রাব্য গালি দিয়ে বলল, এই হারামখোরের বডিটা সরিয়ে নিয়ে যা তো কেউ। অওর শুন লে কান খোলকে। আমাদের দুজনকে তোরা একটু একা ছেড়ে দে। এখন একটা খেল খেলব আমি আর সরসতিয়া।

জটলার মধ্যে হাসির ফোয়ারা উঠছিল। ঘিনঘিন করছিল সরসতিয়ার সারা শরীর। সেই সঙ্গে ছমছমে একটা ভয় তার মেরুদণ্ড দিয়ে গুঁড়ি মেরে নেমে আসছিল নীচের দিকে। হিম্মতের অনুচরদের থেকে একজন চোখ মটকে জানতে চাইল, খেলকুঁদ করোগে অব? ইস রান্ডি কে সাথ কৌন সা খেল খেলোগে তুম হিম্মতভাই?

হিম্মত হাতের মুদ্রায় একটা অশ্লীল ভঙ্গি ফোটাল, এখন চু কিতকিত খেলব আমি আর সরসতিয়া। তোরা নজদিগই থাকিস, আমার কাজ শেষ হলে তোদের ডাকব। কেয়া রে, খেলেঙ্গে না তুমলোগ?

জরুর খেলেঙ্গে হিম্মতভাই! প্যায়ার সে খেলেঙ্গে, মজেসে খেলেঙ্গে! পৈশাচিক উল্লাসে হই হই করে উঠল সকলে।

১৬

অসময়ের বৃষ্টি শুরু হয়েছে এদিকে। আজও সকাল থেকেই আকাশ ছেয়ে ছিল জলভরা মেঘে। রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে পান চিবোতে চিবোতে টিভি দেখছিল গুণবালা। দিনে দুটো-তিনটের বেশি পান খায় না সে। একশো ডিলাক্স জর্দাই তার পছন্দ। সারাদিনের খাটাখাটনির পর এটাই তার অভ্যেস। এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলে যেতে গিয়ে তার চোখ চলে গিয়েছিল টিভির খবরে। গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছে গাঙ্গেয় উপকূলে। উপকূলবর্তী জায়গায় জারি হয়েছে সতর্কতা। কলকাতার দিকে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছিল পরশু। গুণবালা সকালে উঠে দেখেছিল নিম্নচাপের মেঘের দল পৌঁছে গেছে এদিকে। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে টিপটিপ করে।

গতকাল বৃষ্টির জন্য বাড়ি থেকে বেরোয়নি। আজ রবিবার, ছুটির দিন। গুণবালার ইচ্ছে ছিল একটু শুয়েবসে কাটায়। বয়স বাড়ছে। শরীরে বাসা বাঁধছে নানারকম রোগ। আজকাল দৌড়ঝাঁপ করতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু কপালে সুখ সইল না। দুপুরে সবে দু’মুঠো ভাত খেয়ে উঠেছে তখনই এল এক পার্টি। চালসার ওদিকে গ্রিন ভ্যালি চা বাগান। এখনই যেতে হবে সেখানে। দেরি করলে পেশেন্ট খারাপ হয়ে যাবে। মারা যাওয়াও অসম্ভব নয়।

লোকটার নাম প্রভু গুরুং। শিলিগুড়ি হংকং মার্কেটে দোকান। গুরুং কেঁদে ফেলেছিল হাউমাউ করে। চোখের জল মুছতে মুছতে বলেছিল, গুণবালা যেন তার মেয়েকে বাঁচায়। সেকেন্ড-হ্যান্ড একটা গাড়ি চালিয়ে এসেছিল গুরুং। তার সঙ্গী একজন অল্পবয়সি ছেলে। সে বোধ হয় মেয়েটির দেওর। দেরি না করে ঝটপট তৈরি হয়ে নিয়েছিল গুণবালা। গুরুংয়ের বাড়ি পৌঁছে দেখে সন্তানসম্ভবা মেয়েটির বয়স মোটে তিনিশ। রোগাভোগা চেহারা। ওজন চল্লিশ বিয়াল্লিশ কেজির বেশি হবে না। তার মধ্যে প্রি-ম্যাচিওর ডেলিভারি। এসব বাচ্চা বিয়োনোর কেস মানে মহা ঝঞ্ঝাট!

গুণবালা যখন বাড়ি থেকে বেরোয় তখন সরসতিয়া ঘরে ছিল না। তাকে খোঁজারও সময় ছিল না। গুরুং ঘোড়ায় লাগাম পরিয়ে এসেছিল। এমন তাড়া দিচ্ছিল যে, সরসতিয়াকে বলে আসার অবধি সুযোগ পায়নি গুণবালা। আজ সকালে বাড়ির উঠোনে এক শালিখ দেখেছিল সে। তখন থেকেই মনটা কু ডাকছিল। গুরুংয়ের মেয়ের কেসটা আসার পর তার মনটা খুঁতখুঁত করছিল। আজকের ডেলিভারিটা ভালোয় ভালোয় সে উতরোতে পারবে তো? একে মেয়েটার স্বাস্থ্য ভালো নয়, তার মধ্যে জল ভেঙে গিয়েছে আট মাসের মাথায়। কী হয় কে জানে।

তবে গুরুংয়ের বাড়িতে পৌঁছে পেশেন্টকে দেখে অস্থিরতা খানিক কাটল গুণবালার। সে যতটা ভয় পাচ্ছিল তেমন কিছুই হল না। রাতের দিকে সন্তান প্রসব করল মেয়েটা। পুত্রসন্তান। ফুটফুটে গায়ের রং। নাতির মুখ দেখে গুরুং খুব খুশি। সে পকেট হাতড়ে মানিব্যাগ বের করে গুণবালার হাতে পাঁচশো টাকার নোট দিল একটা। তার পর গাড়ি করে তাকে পৌঁছে দিয়ে গেল মেঘদুয়ার চা বাগানে। মূল ফটকের কাছে গাড়িটা আসতেই গুণবালা বলল, ব্যস আর তেল পুড়িয়ে কষ্ট করে যেতে হবে না। আমাকে এখানেই নামিয়ে দাও। আমি চলে যেতে পারব।

নিম্নচাপের মেঘ পিতলের থালার মতো চাঁদটাকে ঢেকে ফেলেছে প্রায়। জ্যোৎস্না যা আছে তা কেমন হলদে রংয়ের। গ্রহণের সময় জ্যোৎস্নার রং এমন হয়, গুণবালা কয়েকবার দেখেছে। দু’দিকে চা বাগান, মধ্যিখান দিয়ে কালো পিচের রাস্তা। একদিকে সেগুন, শাল, দেবদারু গাছের ডালপালা জড়াজড়ি করে আছে। আমগাছও আছে একটা-দুটো। গাছগাছালির ওপারে কবরখানা। বাগানে কয়েকঘর আদিবাসী খ্রিস্টান আছে। তারা কেউ মারা গেলে ওখানে গোর দেওয়া হয়। একটা রাতচরা প্যাঁচা ডেকে উঠল কর্কশ শব্দে। গুণবালা যখন কিশোরী, সে সময় একটা আমগাছে গলায় দড়ি দিয়েছিল সোমরা মুন্ডার পোয়াতি বউ কুমুদ। বুকটা ছমছম করে উঠল সে কথা ভেবে।

দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে এবার দাঁড়িয়ে পড়ল গুণবালা। একটা আর্তনাদের মতো শব্দ কানে এল না? কেউ কি ডুকরে কাঁদছে? তার গায়ের রোম দাঁড়িয়ে গেল কান্নার শব্দে। চুড়েল নয়তো! সে নিজের চোখে কখনও দেখেনি কিন্তু শুনেছে যে অমাবস্যা আর পূর্ণিমার রাতে নাকি চুড়েলের দেখা পাওয়া যায়। যে একবার অপদেবতার দর্শন পায় তার মাথার গণ্ডগোল দেখা দেয়। বহুকাল আগে দেখা কুমুদের বিশাল জিভ বের করা মরা মুখটা ভেসে উঠল চোখে। কোথা থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে তা ঠাহর করতে না পেরে আবার হাঁটতে শুরু করল সে। দূরে কৃষ্ণচূড়া গাছটার ওদিক থেকে একটা টর্চের আলো একবার জ্বলল, পরক্ষণেই নিভে গেল। গুণবালা সতর্ক হল, কে ওখানে এত রাতে?

হিম্মতের প্রশ্রয়ে তার চ্যালাচামুণ্ডাদের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে আজকাল। ইউনিয়ন অফিস হল ধোঁকার টাটি, সেখানে ছেলেগুলো নেশা করে, উত্যক্ত করে বাগানের কামিনদের। কেউ ভয়ে কিছু বলতে পারে না। হিম্মতের চ্যালাদের মধ্যে কর্মা, শিউপূজনদের জন্ম হয়েছিল তার হাতে। সে কথা ভাবতেই লজ্জা হয় তার। কেন যে এই সব পোকামাকড়দের দুনিয়ার আলো দেখিয়েছিল সে! ওরাই কি নেশা করছে ওদিকে? পাশেই ফরেস্ট। রাতের অন্ধকারে বেআইনি ভাবে দামি দামি গাছ কাটে অনেকে। এদিকের জঙ্গলে নাকি আজকাল তেন্ডুয়া শিকার করতে শুরু করেছে চোরাশিকারিরা। তারা নয়তো? কেমন থমথম করছে সব। বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে। আজ বাগানটা একটু বেশিই চুপচাপ না?

জোরে হাঁটলে আজকাল বুকে কষ্ট হয়। মালবাজারে গিয়ে ডাক্তার দেখাবে দেখাবে করে যাওয়াই হচ্ছে না। আর দেরি করা যাবে না, যেতে হবে সময় করে। এসব ভাবতে ভাবতে গুণবালা নিজের ডেরায় যখন পৌঁছল তখন তার হাঁফ ধরেছে। নিজের ডেরার সামনে এসে সে রীতিমতো অবাক। দরজা জানলা সব বন্ধ। বাইরের আলো জ্বলছে না। সরসতিয়া প্রয়োজন ছাড়া বাইরে কোথাও যায় না। এদিকে মূল দরজায় তালা মারা। দুটো চাবির একটা থাকে তার কাছে। অন্যটা সরসতিয়ার কাছে। মেয়েটা কোথায় গেল এত রাতে? গুণবালা সঙ্গের ফোলিও ব্যাগ থেকে চাবি বের করে দরজা খুলল। সুইচ টিপে আলো জ্বালল ঘরের।

দুপুরে ভাত, পেঁপে-আলুর সবজি আর ডিমের ঝোল রান্না করে ঢেকে রেখে গিয়েছিল। সেই খাবার তেমনই আছে। ভাবনায় পড়ল গুণবালা। মেয়েটা তাহলে গেল কোথায়! শুকরা মুন্ডার সঙ্গে যে সরসতিয়ার আশনাই চলছে তা তার অজানা নয়। শুকরা ছেলেটা সহজ সরল। পাত্র হিসেবে তাকে তার অবশ্য অপছন্দও নয়। সরসতিয়াকে খুশ রাখলেই হল। তাছাড়া সবচাইতে বড় কথা সরসতিয়ার পছন্দই তার পছন্দ। কিন্তু কী হল ব্যাপারটা? ছুটির দিন বলে সরসতিয়া শুকরার বাইকে চেপে ঘুরতে চলে গেল না তো? তাকে না বলে তো এমন কাজ করে না কখনও সে!

লোকে রাতে বিরেতে বিরক্ত করে। সে কারণে ফোন কেনেনি গুণবালা। সরসতিয়ারও ফোন নেই। ভুরু কুঁচকে খানিক ভাবল সে। হিম্মত গতমাসে একবার ডাকা করিয়েছিল সরসতিয়াকে। তাকে নিয়ে সে গিয়েছিল ইউনিয়ন অফিসে। হিম্মতের চাউনি ভালো লাগেনি তার। মনটা কু ডাকছিল। মেয়েটার কোনও বিপদ আপদ হল না তো? ইন্দুদের বাড়িতে গেল গুণবালা। তাদের বাড়িতে সরসতিয়া নেই। বিন্দিয়া, ইন্দু বা ফুলমতিয়াদের ঘরেও না। কারওর সঙ্গে দেখাই হয়নি আজ সরসতিয়ার। কেউই তার ব্যাপারে কিছু জানে না।

গুণবালা দ্রুত পায়ে হাঁটছে কবরখানার দিকে। ধড়ফড় করছে বুকের ভেতরটা। আবছা কষ্ট হচ্ছে। দম ফুরিয়ে আসছে। হলদে চাঁদের আলো ধুইয়ে দিচ্ছে পথঘাট। দূর মাঠের গাছপালা জ্যোৎস্নায় ঝাপসা দেখাচ্ছে। গুণবালার পেছন পেছন ফুলমতি আর ইন্দু আসছে। তাদের সঙ্গে পা চালিয়ে হাঁটছে তাদের মরদরা। কৃষ্ণচূড়া গাছটার ওখানে তখন টর্চ জ্বলতে দেখেছিল গুণবালা, সেই জায়গাটা না দেখে আসা অবধি শান্তি নেই। এতক্ষণ চাঁদটাকে ঢেকে রেখেছিল মেঘ। ঘন হয়ে ছিল চাপ ধরা অন্ধকার। মেঘ সরে গেছে। সেই অন্ধকারটাই তরল থেকে তরলতর হতে হতে কখন যে হলদে জ্যোৎস্নায় বদলে গেছে অন্যমনস্ক গুণবালা তা খেয়াল করেনি। এবার কানে এল শব্দটা।

কেউ কাঁদছে গোঙাতে গোঙাতে। শব্দের উৎসের দিকে এগোতে লাগল সে। খানিক আগে যখন এই পথ দিয়ে যাচ্ছিল তখন তার বুকটার মধ্যে সজোরে গাঁইতি চালাচ্ছিল কেউ, কিন্তু ভূতপ্রেতের কথা এখন মাথায় আর নেই। বরং অচেনা একটা আশঙ্কা তার শরীরের কলকব্জা অকেজো করে দিচ্ছে। কৃষ্ণচূড়া গাছটার যত কাছে এগোচ্ছে তত স্পষ্ট হচ্ছে কান্নার শব্দটা। একটা প্যাঁচা ডেকে উঠল সশব্দে। গুণবালার হৃদপিণ্ড ধকধক করছে ভয়ে। আরও একটু এগোতেই যা দেখল তার জন্য প্রস্তুত ছিল না সে। একটা ঝিম ধরানো বিহ্বলতা তার মেরুদণ্ডে বরফ ছুঁইয়ে দিল। স্থির হয়ে গেল গুণবালা। তার পেছন পেছন আসা মেয়েপুরুষেরা স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে পড়েছে সার দিয়ে।

হলদে জ্যোৎস্নায় দেখা যাচ্ছে কৃষ্ণচূড়া গাছটার গুঁড়িতে পিছমোড়া করে বাঁধা সরসতিয়া। মুখ বাঁধা কালো কাপড় দিয়ে। সারা গায়ে একটা সুতো পর্যন্ত নেই। এমন দৃশ্য দেখাও কপালে ছিল তার! গুণবালা ছুটতে শুরু করল সামনের দিকে। মাথা এতাল বেতাল করছে। বুকে চাপ ধরা ব্যথাটা বেড়েছে। হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল একবার। উঠে আবার ছুটল। সরসতিয়ার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে গুণবালা। মেয়েটা একেবারে নগ্ন। তার মুখে, গলায়, ঘাড়ে, স্তনে, জঙ্ঘায়, উরুসন্ধিতে, পায়ের গোছে হাড়হিম করা আঁচড়। যোনিমুখ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নেমেছে কালচে রক্ত। সেই রক্ত এসে মিশেছে মাটির ধুলোয়। ফুলমতিয়া খুলে দিল সরসতিয়ার হাতের বাঁধন। মুখের কাপড় খুলে ইন্দু নিজের গায়ের চাদরটা দিয়ে ঢেকে দিল সরসতিয়াকে। উলোঝুলো চুল, চোখে পাগলের মতো দৃষ্টি, সরসতিয়া উন্মত্তের মতো আঙুল উঁচিয়ে দেখাল দূরের দিকে। গোঙাচ্ছে পশুর মতো। সে কী বলতে চাইল কিছুই বোধগম্য হল না কারওর। তার তর্জনী অনুসরণ করে সকলে তাকাল সেদিকে।

কান্না নয় কান্নার মতো একটা শব্দ করে গুণবালা হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল মাটিতে। চোখমুখ বিস্ফারিত। গুণবালাকে একা নয়, ভয়ংকর একটা দৃশ্যের অভিঘাত কাঁপিয়ে দিয়েছে সকলকেই। থরথর করে কাঁপছে ফুলমতিয়া, ইন্দুরা। তাদের মরদরা কেউই ডরপোক নয়, সকলেই বলশালী, সাহসী। কিন্তু এমন একটা দৃশ্যের সামনে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে পড়েছে সকলে। কেউ কোনও কথা বলার অবস্থায় নেই। হলদে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে জায়গাটা। পাগলাটে একটা হাওয়া দিচ্ছে থেকে থেকে। দূরের পাহাড় ছুঁয়ে আসা সেই হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে উঠছে মানুষগুলো। ওদিকে একটা ঝোরা। এতক্ষণ চোখ যায়নি, এবার কেউ একজন তাকাল সেদিকে। ঝোরাটার পাশে এবড়োখেবড়ো জায়গাটায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে বিশালদেহী এক পুরুষ। খালি গা, পরনে শুধু আন্ডারপ্যান্ট। সাড় নেই কোনও। চাপ চাপ রক্ত পড়ে রয়েছে মাটিতে। গুণবালা ডুকরে উঠল, শুকরা...হো শুকরা!

১৭

অভয়ার জ্যাঠতুতো দাদা মারা গেছেন লাং ক্যানসারে। অভয়ার স্কুলের বেস্টফ্রেন্ড নির্মলাও চলে গেছেন একই রোগে। ইউটেরাসে ক্যানসার। প্রস্তুতি নেবার সময় পাওয়া যায়নি। পাশের বাড়ির অবনীবাবুও চোখ বুজেছেন প্রস্টেট ক্যানসারের আক্রমণে। ডাক্তারেরা জবাব দেওয়ার পরও বছরখানেক হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা চালিয়ে যন্ত্রণামুক্ত ছিলেন শেষ অবধি। বহুকাল ধরে ক্যানসার রোগটার সঙ্গে সঙ্গে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের দেখছেন অভয়া। যেসব পরিবারে ক্যানসার এসেছে গুপ্তঘাতকের মতো কাউকে ছিনিয়ে নিতে, শুধু রোগীকেই নয় সেসব পরিবারের মানুষগুলিকেও লড়তে হয়েছে এই দুরারোগ্য রোগের বিরুদ্ধে। ক্যানসার সারভাইভার্স বলতে এই মানুষগুলোকেও বোঝায়।

মুকুট যুদ্ধ করেছে রোগটার সঙ্গে। কিন্তু সেই যুদ্ধ কি মুকুট একা লড়েছে? শারীরিক কষ্ট একা সহন করতে হয়েছে ঠিকই কিন্তু তাঁর আর স্বস্তিশোভনের মানসিক যন্ত্রণা কী পরিমাণ ছিল, কত রাত তাঁরা না ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন, মেয়ের শিয়রে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন দিনের পর দিন, সেটা বাইরের লোক কী করে বুঝবে? নিরাপত্তাহীন অনিশ্চয় দিন আর নেই। আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র অনেক এগিয়েছে। তবে ডক্টর রায়চৌধুরির নিষ্ঠা আর আর রোগীর প্রতি আত্মনিবেদনের কোনও তুলনা হয় না। শুধু যন্ত্রপাতি প্রয়োগ করে অপারেশন, রেডিয়েশন এসব নয়, দরকার রোগীর মনের শুশ্রূষা।

এক দেবদূতসম ডাক্তার মুকুটকে ইচ্ছাশক্তি জুগিয়ে গেছেন ক্রমাগত, আগ্রহী করে তুলেছেন জীবনের প্রতি। বাঁচার জন্য মনোবল তলানিতে চলে গিয়েছিল মুকুটের। সেই অবস্থায় তিনি নতুন করে বাঁচার জন্য তাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। অভয়া আর স্বস্তিশোভন জন্ম দিয়েছেন মেয়েকে। তাঁদের ভূমিকা তো থাকবেই। কিন্তু এই ঈশ্বরপ্রতিম মানুষটির কথা তিনি ভুলবেন কী করে? বেশ কিছুদিন হল রঙ্গিতকে দেখছেন অভয়া। তাঁর মনে হয়েছে ছেলেটির মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা আর সংস্কৃতিবোধ আছে। রঙ্গিত রুচিবান। ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে তাই মাতৃস্নেহ পায়নি। মনের মধ্যে ছেলেটির কোথাও একটা নিঃসীম শূন্যতা আছে সেটা অভয়া অনুভব করতে পারেন। রঙ্গিত কথা বলতে বলতে অনেক সময় চুপ করে যায়। উদাস চোখে মুখের দিকে তাকিয়েই থাকে। একটু পর সম্বিত ফিরে পেলে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।

ব্রিটিশ যুগের রীতি এখনও চালু আছে চা বাগানে। নিজের শ্রেণি ছাড়া কেউ কারও সঙ্গে পারতপক্ষে মেলামেশা করে না। ডিউটির সময় ছাড়া কুলিকামিনরা বাগানবাবুদের ছায়া মাড়ায় না। বাগানবাবুরা এড়িয়ে চলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারদের। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজাররাও সিনিয়র ম্যানেজারের থেকে দূরে দূরে থাকেন। হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স বা ফিটার আর কলবাবুরাও থাকেন নিজের বৃত্তে। স্বস্তিশোভনের সঙ্গে অন্য অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজাররা দূরত্ব বজায় রেখে মেশেন। তবে রঙ্গিতের জন্য তাঁদের দরজা সবসময় খোলা। একদিন অভয়া পেড়েছিলেন কথাটা। স্বস্তিশোভন বলেছিলেন, মেয়ের ওপিনিয়ন নাও। রঙ্গিত কী বলছে শোনো। সম্পর্ক হয় পরিবারে পরিবারে। ডক্টর রায়চৌধুরির মতামতটাও জানা দরকার।

দুঃসহ কর্কট সহবাসের দিন গেছে। মারণরোগ মুকুটকে ছেড়ে গেছে। এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে মুকুট। কিন্তু এখন তার মাথায় চাগাড় দিচ্ছে আবার ট্রেকিংয়ে যাওয়ার ভাবনা। চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছে ফোনে। সেদিন ডক্টর রায়চৌধুরির কাছে যাওয়া হয়েছিল চেকআপে। পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে বেশ কিছু। ডাক্তারের হিমশীতল চেম্বারে মুকুটকে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। ডক্টর রায়চৌধুরির ব্যক্তিত্ব এমনই যে উল্টোদিকের লোকের মুখে কথা সরে না। অভয়া সঙ্কোচের সঙ্গে বলেছিলেন, মুকুট ট্রেক করতে যাবার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে। কিন্তু ওর যা শরীরের অবস্থা ও কি তা পারবে?

ডক্টর রায়চৌধুরি মুকুটের মেডিকাল রিপোর্টস দেখে নিচ্ছিলেন মন দিয়ে। কাগজগুলো টেবিলে নামিয়ে রেখে বললেন, জীবনে চ্যালেঞ্জ থাকা খুব দরকার। সেটা না থাকলে জীবনটা আলুনি হয়ে যায়। কঠিন লড়াই জিতে এসেছে আপনাদের মেয়ে। ও এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। আর পাঁচজন সুস্থ স্বাভাবিক যে কোনও মানুষের মতোই এই নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে ওর কোনও বাধা নেই। তাছাড়া আপনাদের মেয়ে তো এভারেস্ট ক্লাইম্ব করতে যাচ্ছে না। তাহলে এত ভয় কীসের?

মেয়েটা এত বড় অসুখ থেকে উঠল, আবার বিপদের মুখে তাকে কী করে ছেড়ে দিই বলুন স্যার! অভয়া বললেন।

ডক্টর রায়চৌধুরি বললেন, মুকুট আমার মেয়ে হলে আমি কিন্তু ওকে ট্রেক করতে পাঠাতাম। শারীরিক ভাবে কোনও অসুবিধে নেই ওর। এত ভয় কীসের? দুর্লঙ্ঘকে লঙ্ঘন করে আসার পর দেখবেন ওর মানসিক জোর একশো গুণ বেড়ে গেছে। মস্ত একটা জীবন পড়ে আছে ওর সামনে। সেই জীবনটা ভয়ডরহীন ভাবে বাঁচতে হবে তো!

এরপর আর কীই বা বলা চলে। চুপ করে গিয়েছিলেন অভয়া। ডক্টর রায়চৌধুরি বললেন, ক্লাইম্ব আর ট্রেক কিন্তু এক নয়। ক্লাইম্বিং করতে গেলে পাহাড়ে চড়ার প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। অক্সিজেন সিলিন্ডার, বিশেষ পোশাক, রোপ, পিটনের মতো বহু সরঞ্জাম লাগে। কিন্তু পাহাড় ভালোবাসলে আর শরীর ফিট থাকলে ট্রেক করা যেতেই পারে।

স্বস্তিশোভন প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললেন, আপনার কাছে কতবার এসেছি চিকিৎসার ব্যাপারে, আপনি তো রঙ্গিতের কথা কখনও বলেননি!

আমি চাইনি রঙ্গিত আপনার কাছে কোনও আনডিউ বেনিফিট বা ফেবার পাক। কর্মক্ষেত্রে নিজের মেধা, সততা আর পরিশ্রমের জোরে সে উন্নতি করুক এটাই বাবা হিসেবে আমি চাই। তার পর মুকুটের দিকে তাকিয়ে রঞ্জন বললেন, যখন বয়স কম ছিল তখন আমিও ট্রেক করেছি অল্পবিস্তর। ইচ্ছে ছিল একবার ক্লাইম্বিং করব। হল না। বয়স একটা বড় ফ্যাক্টর। আজকাল দেখি এভারেস্ট অভিযানের হিড়িক উঠেছে। অনেকেই যাচ্ছে এভারেস্ট চড়তে। ক্লাইম্বিং এমনিতেই রিস্কি। এভারেস্ট হলে তো কথাই নেই। সেই এভারেস্টেও সিলিন্ডার ছাড়া যেতে শুরু করেছে অনেকে।

মুকুট বলল, স্যার, অন্য পাহাড়ের চাইতে এভারেস্ট অভিযানের বিপদ অনেক বেশি। খুম্বু হিমবাহ, যা আসলে বরফের নদী, তা পড়ে যাত্রা শুরুর সময়েই। ঢালের এক প্রান্ত অবধি সেই নদী এসে একেবারে খাড়া পড়েছে নীচের দিকে। যেভাবে পাহাড়ি নদী চলার পথে আচমকা জলপ্রপাত হয়ে ঝরে পড়ে ঠিক সেভাবে। এক একটা স্তম্ভের আকার বহু টন। সে পথ খুবই বিপজ্জনক। দড়ি, স্ক্রু, ইস্পাতের তৈরি গজাল বা পিটন, বোল্ট, অ্যালুমিনিয়ামের মই নিয়ে সহজ আরোহণের পথ তৈরি রাখতে হয় সেখানে। তবে দুর্ঘটনাও ঘটে প্রায়ই।

ডক্টর রায়চৌধুরি বললেন, তোমার দুশ্চিন্তার কিছু নেই। মাউন্টেনিয়ারিং ঝুঁকিবহুল হলেও ট্রেক ততটা কঠিন নয়। দশ হাজার ফিটে অক্সিজেন ক্রাইসিস হবার ব্যাপার নেই। ট্রেক করতে যাবার আগে প্রপারলি হোমওয়ার্ক করে নিয়েছ নিশ্চয়ই?

মুকুট বলল, করেছি স্যার। ছিমছিমলে খরকা ট্রেকিং রুটে বিপদের ঝুঁকি কম। খরচও পাহাড়চুড়ো অভিযানের তুলনায় কিছুই নয়। কাঠমান্ডুতে থাকে গাইড কাম পোর্টার ভীমবাহাদুর। মাছ যেমন জলে স্বচ্ছন্দ সে তেমনটাই সাবলীল দুর্গম পাহাড়ে। তবে আমার মনের জোর ছিল না। সেদিন আমি আর রঙ্গিত গিয়েছিলাম একটা সিমেটারিতে। সেখানে গিয়ে আমার মানসিকতাই বদলে গেছে পুরো। আমি এখন অনেক বেশি মেন্টালি স্ট্রং। রঙ্গিতই সাজেস্ট করেছিল ওখানে যেতে।

ডক্টর রায়চৌধুরি হাসলেন, রঙ্গিত একবার পার্ক স্ট্রিটের সিমেটারিতে গিয়েছিল আমার কথা শুনে। সেখানে গিয়ে জীবন সম্বন্ধে ওর পুরনো ধ্যানধারণা আমূল বদলে যায়। তোমাকেও সেই টিপস দিয়েছিল রঙ্গিত?

মুকুট বলল, হ্যাঁ স্যার। ক্যানসার যখন ধরা পড়েছিল সে সময় আমিও একটা অন্ধকার টানেলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার শরীরটা বেঁচে থাকলেও মন মরে গিয়েছিলে সে সময়। কিছুই ভালো লাগত না। নতুন করে ট্রেক করতে যাবার মতো সাহস পাচ্ছিলাম না। এমন একটা ফেজের মধ্যে দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম তখন রঙ্গিতের মুখে আমি শুনেছিলাম এই গল্প। আমাদের ওদিকে ইংরেজ আমলের একটা সিমেটারি আছে। সেখানে গিয়ে আমি জীবন আর মৃত্যুকে নতুন করে দেখতে শিখলাম। মনে হল জীবন আর মৃত্যু কী অদ্ভুতভাবে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে সেখানে।

ডক্টর রায়চৌধুরি বলেছিলেন, জীবননদীতে নৌকো নিয়ে পাড়ি দিতে হলে ছোট বড় অজস্র ঢেউয়ের মোকাবিলা করতে হয়। তোমার জীবন সবে শুরু হল। তোমাকেও যেমন, তেমনি রঙ্গিতকেও অনেক পথ হাঁটতে হবে। তাই নিজের সঙ্গে নিজেকে যুঝে নেবার খিদে ভেতরে আছে কি না সেটা বুঝতে হবে তোমাদেরই। রঙ্গিতকে তো আমি বলেছি তোমাদের সঙ্গে ট্রেক করতে যেতে। তাতে ওর যেমন উপকার হবে। তোমরাও খানিকটা বেনিফিটেড হবে।

ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসেছেন তিনজন। স্বস্তিশোভনের একটা ফোনকল এল। কথা বলতে বলতে তাঁর মুখচোখের ভাব বদলাতে শুরু করল। দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। অস্ফুটে বললেন, বলছেন কী আপনি ডক্টর শর্মা?

মুকুট আর অভয়া করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেছেন। মুকুটের মুখে হাসি। ট্রেকিংয়ে যাওয়ার পারমিশন পেয়ে খুশিতে উড়ছে। অভয়ার এদিকে বুক ধুকধুক। সম্ভব হলে নিজেই চলে যেতেন মেয়ের সঙ্গে। তবে একটাই সান্ত্বনা, রঙ্গিত থাকবে মুকুটের সঙ্গে। এই ছেলেটির ওপর তাঁর অগাধ আস্থা। ট্রেকিংয়ে মুকুটের সঙ্গে রঙ্গিত থাকলে চিন্তা নেই। রঙ্গিত যে তাঁর মেয়ের যথেষ্ট খেয়াল রাখবে সেটা জানেন তিনি। পাশে স্বামী নেই দেখে অভয়া মুখ ফেরালেন।

স্বস্তিশোভন এখনও কথা বলেই চলেছেন। অভয়ার কপালে ভাঁজ পড়ল। ফিরে গেলেন কয়েক পা, জিজ্ঞাসু মুখে তাকালেন স্বামীর দিকে। ফোনটা হাতে নিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে দাঁড়িয়ে আছেন স্বস্তিশোভন। কী করবেন যেন বুঝে উঠতে পারছেন না। অস্থির অস্থির করছে শরীরটা। অভয়া বললেন, তুমি তো ঘামছ দরদর করে। কার ফোন এসেছিল? তোমাকে এমন টেনস দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে? সব ঠিক আছে তো?

স্বস্তিশোভনের মুখে শ্রাবণের মেঘ। উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, ডক্টর শর্মা ফোন করেছিলেন। ভয়ংকর কাণ্ড ঘটে গেছে মেঘদুয়ার চা বাগানে। সরসতিয়াকে গ্যাং রেপ করেছে হিম্মত আর তার লোকেরা। শুধু তা-ই নয়, শুকরা মুন্ডাকে ওরা এমন মার মেরেছে যে সে বেচারি কোমায় চলে গেছে। শুকরাকে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। আমাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছতে হবে মেঘদুয়ারে। আমি এখনই আইআরসিটিসি সাইট চেক করছি। দেখি আজ রাতের কোনও ট্রেন পাই কি না।

১৮

তোমার গভীর থেকে ভিতরে বাহিরে

কি যে আছে আমি তা তো জানি,

হাতখানি রেখেছিলে

হৃদয়ের গভীর হৃদয়ে

যেখানেতে ফুটেছিল একটি গোলাপ,

তাকে তুমি তুলে নিয়ে কবরী বেঁধেছো।

এই প্রেম, এইটুকুই এর বেশি কি আছে আবার

রক্তে মাংসে হাড়ে ও মজ্জায় নাকি

থাকে কোনো বীজ, নাকি ঘুণ

বার বার খুন করে জেনেছি আভাস

কাশফুলে দুলে ওঠে হাওয়া

পাওয়া কি হে হবে কোনো কাজ

আজ ভাবি এইখানে আছে প্রেম, জেনো,

এই বুকে, বুকেরও গভীরে আছে, হৃদয়ে।

মুকুটের খুব প্রিয় কবিতা এটি। কার লেখা কবিতা? তুষার রায়ের লেখা। এই কবির আর কোনও লেখা মুকুট কখনও পড়েনি। কিন্তু তার হাতে একটা কবিতার বই এসেছিল একবার। সেখানে সে পড়েছিল এই কবিতা। লিখে রেখেছিল ডায়েরিতে। মাঝে মাঝে পড়ে বলে পঙ্‌ক্তিগুলো মুখস্থ হয়ে গেছে তার। তার নিজের হৃদয়ের গভীর হৃদয় দিয়ে আজ সকাল থেকেই সে ভাবছিল কবিতাটার কথা। ভাবছিল রঙ্গিতের কথা। এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না যার মনে কখনও প্রেমের সঞ্চার ঘটেনি। প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনি স্পষ্টভাবে এমন পুরুষ বা নারী পাওয়া গেলেও প্রেমাস্পদের প্রতি একান্ত গোপনে, নিরুচ্চারভাবে প্রেমের অনুভূতি জন্মায়নি এমন নারী বা পুরুষ হৃদয় বোধহয় নেই। সে যতটা রঙ্গিতকে ভালোবাসে, রঙ্গিতও কি ততটাই ভালোবাসে তাকে? মনের ভেতর এই প্রশ্নটাই অনুক্ষণ জ্বালিয়ে খায় মুকুটকে।

রবিবার ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকে। পুরুষেরা সেদিন ঘরে বসে নেশা করে, কুলিলাইনের রাস্তায় কেউ কেউ তাস খেলে টাকা দিয়ে। মেয়েরা ঘরের কাজ করে। সেদিন চা বাগান প্রায় জনমানবহীন। ছুটির দিনগুলোর বিকেলে রঙ্গিত আর মুকুট হেঁটে আসে একটু। মেঘদুয়ার চা বাগানে অনেকগুলো দিন কাটিয়ে ফেলেছে রঙ্গিত। মুকুটের সঙ্গে তার সম্পর্কের রসায়ন বদলেছে। বন্ধুতার পথ ধরে এসেছে ভালো লাগা। সেই সুতো ধরে ভালোবাসাও এসেছে অমোঘ অনিবার্যতা নিয়ে। গ্রীষ্ম আর বর্ষা গিয়ে শরৎ এসেছে। তবে আকাশ মেঘমুক্ত হয়নি। কখনও কখনও ছাই রঙের মেঘেরা ভিড় করে আসে আকাশে। জল ঝরিয়ে রিক্ত হলে নির্ভার মেঘের ফাঁক দিয়ে ঝিলিক মারে রোদ্দুর। রৌদ্রছায়ার খেলা চলে চরাচর জুড়ে।

ডক্টর শর্মার স্ত্রী বৃন্দা পছন্দ করেন তাদের জুটিকে। ভালো কিছু রান্না করলেই ফোন করে ডেকে এনে খাওয়ান রঙ্গিত আর মুকুটকে। আজও দুপুরে নেমন্তন্ন ছিল দুজনের। পদ ছিল শিউলি ফুলের মতো ভাত, মুগডাল, কাতল মাছের কালিয়া, দেশি মুরগির মাংস, খেজুরের চাটনি। ডক্টর শর্মা আর বৃন্দা অবাঙালি হলেও তাঁদের সংস্কৃতিতে মিশে গেছে বাঙালিয়ানা। এই দুই রুচিবান দম্পতি বেশ পছন্দ করেন রঙ্গিত আর মুকুটকে। তাদের সঙ্গ ভালোবাসেন।

খাবার টেবিলের পাশেই জানালা। রঙ্গিত খেতে খেতে দেখছিল বাইরেটা। আকাশ কালো করে এসেছিল। গাছপালাদের পাতায় পাতায় শুরু হয়েছিল উসখুসানি। বৃষ্টি হয়ে গেল এক পশলা। জল ঝরিয়ে এবার যেন শান্ত হল প্রকৃতি। বিকেলের দিকে সিমেটারির দিকটাতে এসেছে দুজনে। স্নিগ্ধ বিকেল। হাওয়া দিচ্ছে মৃদুমন্দ। কৃষ্ণচূড়া গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে চা বাগানের সবুজ ঢেউগুলির দিকে তাকিয়ে চুপটি করে ছিল মুকুট। রঙ্গিত কাছে গিয়ে মুকুটের কাঁধে হাত রাখল। নিবিড় গলায় বলল, কী ভাবছ এত বলো তো?

মুকুট মুখ ফিরিয়ে বলল, চা বাগান দেখলে আদিম ডুয়ার্সের গন্ধ ভেসে আসে আমার নাকে। ভারতের মধ্যদেশ থেকে কত শত আদিবাসী মানুষকে ঠকিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল এখানে। ক্রীতদাস, ক্রীতদাসীর মতো তাদের পিঠের ওপর পড়েছে চাবুক। তাদের রক্তের গন্ধ, ঘামের গন্ধ, ভালোবাসার গন্ধ, রিক্ততার গন্ধ মিশে আছে চা বাগানে। কত সাদা চামড়ার মানুষ কত বিচিত্র শুভ ও অশুভ ফন্দি নিয়ে এসব দিক দিয়েই গেছে তাদের ক্যারাভানে। তারও কোটি কোটি বছর আগে বিশাল আকৃতির ডাইনোসররা এই পথেই দাঁড়িয়ে থেকেছে ওই দূরের নীলপাহাড়ের মতো। তাদের উত্তরসূরি হাতির বৃংহতি ভেসে এসেছে অরণ্যের আড়াল থেকে। ভাবলেই কেমন অবাক লাগে তাই না?

রঙ্গিত বলল, বর্তমানই হল অতীতের শব। ভবিষ্যতের ভ্রূণও সে। বর্তমানের সাদা দাগে বাঁ পা ছুঁইয়েই তো আমরা জীবনের অজানা গন্তব্যের দিকে ছুটে যাই। সূর্য ডোবে, সূর্য ওঠে, কিন্তু আমাদের এই অনন্ত দৌড় আর শেষ হয় না। ইংরেজরা এই দেশ ছেড়ে চলে গেছে কতদিন হয়ে গেল। এতগুলো বছর পার হয়ে যাওয়ার পর প্রশ্ন জাগে, চা বাগানের কুলিকামিনদের জীবন কি খুব বদলেছে? আমি তো বলব চা বাগানের সেই শোষণ বা বঞ্চনার যুগ শেষ হয়েছে ঠিকই তবে আজও এই প্রান্তিক মানুষগুলো পড়ে আছে সমাজের একেবারে তলার সারিতে। তোমার কী মনে হয়?

মুকুট বলল, আসলে কী জানো, প্রদীপের নীচেই থাকে অন্ধকার। সভ্যতার আলোর কল্যাণে সভ্য মানুষের দৃষ্টি বহুদূর যায় কিন্তু চা বাগানের কুলিকামিনদের দিকে কারও নজর পড়ে না। তাদের দুঃখের কথা জানে না কেউ। এই যে সরসতিয়ার গ্যাংরেপের মতো এত বড় একটা ঘটনা ঘটল, তার বিচার হল কিছু? এই যে এতদিন ধরে জীবন্ত লাশের মতো শুকরা শুয়ে আছে মেডিক্যাল কলেজের এক বেডে, তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে, কী তার অপরাধ? না, সে ভালোবেসেছিল একটি মেয়েকে। একপাক্ষিক ভালোবাসা নয়, মেয়েটিও ভালোবেসেছিল তাকে। কিন্তু তার পরিণতি কী হল? এই ঘৃণ্য কাণ্ডের অপরাধীরা কি ধরা পড়ল?

রঙ্গিত বলল, মেরহোত্রা আর জোয়ারদারদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল সেদিন। ওদের মুখে শুনছিলাম হিম্মত এখন সন্ধের পর ইউনিয়ন অফিসেও আসতে শুরু করেছে। মদের আসর বসাচ্ছে আগের মতো। আজ না হোক কাল সে ঘুরে বেড়াবে দিনের আলোয়। কেউ তার টিকিটাও ছুঁতে পারবে না।

খানিকক্ষণ চুপচাপ। মুকুট বলল, তোমার এক কাজিন দাদা আছে বলছিলে না একদিন? অভিষেক চক্রবর্তী না কী যেন নাম?

রঙ্গিত বলল, প্যাংকুটুদার কথা বলছ? কাগজের ক্লিপিংসগুলো আমি ওকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু কাজের কাজ দেখছি কিছুই হল না। আসলে আমাদের মতো কমনম্যানদের ক্ষমতা এত সীমিত যে খুব হতাশ লাগে মাঝেমাঝে। সমাজে একের পর এক অন্যায় ঘটে চলে, আমরা অসহায় চোখে সব দেখি, কিন্তু কিছুই করতে পারি না।

মুকুট বলল, ফোনে বলা একরকম আর সামনা সামনি বলা আলাদা। এবার কলকাতা গেলে তার সঙ্গে দেখা কর তুমি। এদিকের পরিস্থিতির কথা বুঝিয়ে বলো। সামনা সামনি বললে তার ইমপ্যাক্ট বেশি হবে।

রঙ্গিত ঘাড় নাড়ল, ঠিকই বলেছ। ভাবছি নেক্সট টাইম কলকাতা গিয়ে সরাসরি দেখা করব প্যাংকুটুদার সঙ্গে।

একটা শ্বাস ছেড়ে মুকুট বলল, সরসতিয়ার ঘটনাটার পর আমার আজকাল কিছুই ভালো লাগে না। খুব মুড সুইং করছে ইদানিং। আমি নিজেই নিজেকে বুঝতে পারছি না। কিছুদিন পর ট্রেক করতে যাব বলে কখনও এক্সাইটেড হয়ে পড়ছি। আবার পরক্ষণেই সেই নারকীয় কাণ্ডের কথা ভেবে ঝিম মেরে যাচ্ছি ভেতরে ভেতরে। ভালো লাগছে না কিছু।

কলকাতার দিকে এই সময় বাতাসে বেশ আর্দ্রতা থাকে। কিন্তু মেঘদুয়ারের আবহাওয়া অনেক বেশি কোমল। এখন যেমন হাওয়া দিচ্ছে বেশ। মুকুটের কপালে এসে পড়ছে উড়ো চুল। মুকুটের ঘন কালো চুলের গোছা ছিল একটা সময়। কেমো নেবার পর তা ঝরে পড়তে শুরু করে। অল্পদিনের মধ্যে প্রায় ফাঁকা হয়ে যায় পুরো মাথা। সে সময় মন খারাপ হয়েছিল খুব। কিন্তু ডক্টর রায়চৌধুরির কথাই সত্যি হয়েছে। সুস্থ হবার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় আগের মতোই ফিরে এসেছে চুল। মুকুটের কাঁধে আলতো হাত রেখে রঙ্গিত বলল, লেটস চেঞ্জ দ্য টপিক। ট্রেকিং প্ল্যান নিয়ে কথা বলা যাক। একটা প্রশ্ন করি তোমাকে। ট্রেক করার জন্য কত চেনা রুটই তো ছিল, তোমরা ছিমছিমলে খরকার ওই অকওয়ার্ড রুট কেন বাছলে?

মুকুট নিজেকে সহজ করার চেষ্টা করতে করতে বলল, চিত্রাঙ্গদার ভগবান বুদ্ধ নিয়ে একটা অবসেশন আছে। যেখানে বেড়াতে যায়, একটা করে বুদ্ধমূর্তি কিনে নিয়ে এসে বাড়ির ড্রয়িং রুম সাজায়। একদিন চিত্রার সঙ্গে কোনও আনকমন রুটে ট্রেক করতে যাব বলে প্ল্যান করছিলাম। আমিই আইডিয়াটা দিয়েছিলাম, ভগবান বুদ্ধের জন্ম নেপালের তরাই অঞ্চলে। নেপালের কোনও রুটে ট্রেক করতে গেলে কেমন হয়? কথাটা চিত্রার মনে ধরে। মালিনী নামে ওর এক ফেসবুক ফ্রেন্ড থাকে কাঠমান্ডুতে। মালিনীও ট্রেকার। তার সঙ্গে কথা বলেই এই রুটে ট্রেক করতে যাবার প্ল্যান আঁটে চিত্রা। ভীমবাহাদুরের সঙ্গে যোগাযোগও করিয়ে দিয়েছিল মালিনী। পরে রেকার সঙ্গে আলাপ হল। কী আশ্চর্য কোইন্সিডেন্স, রেকাও দেখি তথাগত ভক্ত।

রঙ্গিত বলল, চিত্রাঙ্গদা বা রেকার নেপালের প্রতি আকর্ষণ কেন তা এবার বুঝলাম। আমিও বইতে পড়েছি বুদ্ধদেব স্বয়ং নাকি তাঁর ধর্মপ্রচারের জন্য নেপালে পরিভ্রমণ করেছিলেন। সম্রাট অশোকও বুদ্ধের অনুগামী হয়ে এসেছিলেন নেপালে। কাঠমান্ডু কথাটা এসেছে কাষ্ঠমণ্ডপ থেকে সেটা জানো হয়তো। তার আগে নাম ছিল কান্তিপুর। অতীতে লক্ষ্মী নরসিং মল্ল নামে এক রাজা মস্ত এক গাছের কাঠ থেকে এক বিশাল মণ্ডপগৃহ তৈরি করেন। সেই থেকে কান্তিপুরের নাম বদলে হয়ে যায় কাষ্ঠমণ্ডপ, যা পরে অপভ্রংশ হয়ে যায় কাঠমান্ডুতে।

মুকুটের ঠোঁটের কোণে এতক্ষণে হাসির রেখা ফুটেছে। বলল, আমাদের সিধুজ্যাঠাকে একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে। এত যে আপনার জ্ঞান তা কি গুগল আহরিত বিদ্যে? বেলেঘাটা জোড়ামন্দিরের বাইরে আপনি আদৌ গেছেন কি কখনও?

লবঙ্গ লবঙ্গ গন্ধটা আবার নাকে এল যেন। রঙ্গিত কপট রাগ দেখিয়ে বলল, আমার লেগপুল করা হচ্ছে?

মুকুট বলল, তোমার কত বড়সড় চেহারা, আমি দুর্বল চেহারার মানুষ। তোমার পা কখনও টানতে পারি?

রঙ্গিত বলল, দ্যাখো, আমি খুব বেশি যে পাহাড় ঘুরেছি তা নয়। তেমন স্কোপও পাইনি। স্কুলে পড়ার সময় এক্সকারশনে একবার ডুয়ার্স নিয়ে গিয়েছিল। জয়ন্তীতে হয়েছিল আমাদের প্রকৃতি চেনার পাঠশালা। পাহাড় জঙ্গল নদী পাখি প্রজাপতি এসব চোখের সামনে একেবারে জ্যান্ত দেখে দারুণ লেগেছিল। এনজয় করেছিলাম এক্সকারশানটা। কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের পাহাড়েও গিয়েছি।

মুকুট জানতে চাইল, সে তো সকলেই এদিক ওদিক ঘোরে। কথা হচ্ছে ট্রেকিং নিয়ে। কখনও তুমি ট্রেক করেছ? পাহাড় চড়ার অভিজ্ঞতা আছে তোমার পায়ে হেঁটে?

রঙ্গিত লাজুক হাসল, ট্রেক আমি করেছি একবার। তবে সে এক এমব্যারাসিং কাণ্ড ঘটিয়েছিলাম। ভাবলে এখনও লজ্জা লাগে।

মুকুট মুখটা তুলে ঠোঁট ছুঁচোল করে বলল, কীরকম কাণ্ড শুনি?

রঙ্গিত হাসতে হাসতে বলল, তখন কলেজ থেকে সদ্য বেরিয়েছি। আলিপুরদুয়ার থেকে রায়মাটাং হয়ে লেপচাখা ট্রেক করতে গিয়ে বড্ড বিপদে পড়েছিলাম। রায়মাটাং পৌঁছবার আগ দিয়ে পচা পাইন পাতায় পা হড়কে গিয়েছিল। ভাগ্যিস সঙ্গে আরও দুই বন্ধু ছিল। তারা তাড়াতাড়ি ব্যাগ খুলে স্টিকিং প্লাস্টার বের করে আঁট করে বেঁধে দিয়েছিল পায়ে। টিপে টুপে বলল, হাড়গোড় ভাঙেনি। ফেরার সময় লেংচে লেংচে ফিরতে হল। সেই দুই বন্ধু খুব হাসাহাসি করেছিল আমাকে নিয়ে।

মুকুট হেসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে বলল, হাসারই তো কথা। লেপচাখা অবধি ট্রেক করতে গিয়েই এই হাল! আমাদের এই বীরপুরুষ ছিমছিমলে খরকা অবধি ট্রেক করে উঠতে পারবে তো? আই ডাউট!

মদনদেব অলক্ষ্যে বসে কখন শর নিক্ষেপ করেন ধরাধামে বোঝা দায়। মুকুটের অনিন্দ্য স্থলপদ্মের মতো মুখটির দিকে তাকিয়ে ছিল রঙ্গিত। তীক্ষ্ণ নাসা, আয়ত চোখের এই মেয়েটির মুখশ্রীর মধ্যে কী জাদু আছে কে জানে! ফিল্মি হিরোদের মতো করে এক ঝটকায় মুকুটকে কোলে তুলে নিল রঙ্গিত। হো হো করে পায়রা ওড়ানো হাসি হেসে বলল, নিজে তো উঠবই প্রয়োজনে আপনাকে কোলে তুলে নিয়ে ট্রেক করব।

মুকুট এদিক ওদিক দেখতে দেখতে বিব্রত গলায় বলল, হয়েছে রে বাবা, হয়েছে। বুঝেছি আমি, এবার ছাড়ো।

রঙ্গিত তাকিয়েই আছে নিষ্পলক। নিজের মুখ নামিয়ে এনেছে মুকুটের মুখের কাছে। মুকুট লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিয়েছে। পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে ফিসফিস করে বলল, নামিয়ে দাও আমাকে। কী যে করো তুমি, এই অবস্থায় আমাদের কেউ দেখে ফেললে কী হবে জানো?

রঙ্গিত ফিসফিস করে বলল, উঁহু জানি না। জানতেও চাই না।

আমার বুঝি লজ্জা করে না? তুমি তো দস্যু দেখছি একটা। ছাড়ো আমাকে, কে কোথায় দেখে ফেলবে! রঙ্গিতের বুকে মুখ ডুবিয়ে দিল মুকুট।

কিছু কিছু মুহূর্ত আসে সকলেরই জীবনে যখন কথা বলতে একেবারেই ইচ্ছে করে না। তখন মুখের ছুটি। এখন যেমন মুকুটের আনত মুখটি তুলে তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল রঙ্গিত। কেটে যাচ্ছিল পল, অনুপল। ইংরেজি গান শুনলেও রাগ রাগিনী তেমন বোঝে না রঙ্গিত। তার বাবার নেশা আছে ক্লাসিক্যাল গান শোনার। সে সব গানের ধুন তার কানে যায় ঠিকই কিন্তু তা মন অবধি পৌঁছয় না। কিন্তু আজ এই বিকেলে মেঘদুয়ার চা বাগানের এই নিরালা নির্জনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল যেন দূর থেকে ভেসে আসা কোনও স্বর্গীয় সুরে ভরে যাচ্ছে তার মস্তিস্ক। মদ না খেয়েও মনে হচ্ছে সুরার মতোই সুরের মাদকতা ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তার চেতনে, অবচেতনে। তার সমস্ত সত্তায়।

মুকুটকে নামিয়ে দিয়েছে রঙ্গিত। মুকুট তার দিকে তাকিয়ে আছে সম্মোহিতের মতো। রঙ্গিতের মনে হচ্ছিল, এতদিন শুধু দিন গুজরানই করেছে সে, বাঁচেনি বাঁচার মতো করে। বছরের পর বছর মাড়িয়েই গিয়েছে শুধু। মুকুটকে নিজের বুকের মধ্যে নিয়ে, তার মুখ থেকে ভেসে আসা লবঙ্গ লবঙ্গ ঘ্রাণ নিতে নিতে রঙ্গিতের মনে হচ্ছিল মানব মানবীর এই আশ্চর্য শরীরে দহন আর প্রলেপ একসঙ্গেই লুকিয়ে থাকে। কখন যে এক শরীরের স্পর্শে অন্য শরীরে আগুন জ্বলে উঠবে আর কখন স্নিগ্ধ হবে তা আগে থেকে বোঝা ভার। প্রিয় নারীর সান্নিধ্যে রঙ্গিত ভেসে যাচ্ছিল ব্যাখ্যাতীত এক অনুভূতিতে, যা নিছক সুখ নয়, তার থেকেও হয়তো উচ্চতর কোনও বোধ। মুকুটের সঙ্গে তার জীবন এক সুতোয় কখনও গাঁথা হবে কি না সেটা রঙ্গিত জানে না। কিন্তু এটুকু সে মনে মনে জানে, আজকের এই আনন্দঘন নিবিড় অনুভূতি নিজের বুকের গোপন কোরকে সে বহন করবে বহুদিন।

ক্র্যাও ক্র্যাও করে আচমকা একটা শব্দ হল। সচকিত হয়ে তাকাল মুকুট। একটা প্যাঁচা কৃষ্ণচূড়া গাছটার ডালে বসা। দিন এখনও ফুরোয়নি। সন্ধে হব হব করছে। দিনের আলোয় এই প্রথম প্যাঁচা দেখল সে। তার মুখচোখ বদলে যাচ্ছে একটু একটু করে। চোখের তারায় অস্থিরতা। হেমন্তের কুয়াশা ধীরে ধীরে অচেনা করে দিচ্ছে মুকুটকে। ধীর পায়ে সে কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে গিয়ে দাঁড়াল। আঙুল উঁচিয়ে সবুজ গালচের মতো জায়গাটা দেখিয়ে বলল, শুকরা আর সরসতিয়ার রাঁদেভ্যু পয়েন্ট ছিল এটা, এই যে এই জায়গাটা...। তাই না?

রঙ্গিত নীচু গলায় বলল, হবে হয়তো। থাক না ওসব কথা এখন।

মুকুটকে যেন ভূতে পেয়েছে। ঘোরের মধ্যে বলল, এখানেই হয়তো শুকরা আর সরসতিয়া ভালোবাসার কথা বলাবলি করছিল। এই সব কোনও জায়গাতেই গোপন আততায়ীর মতো এসে হাজির হয়েছিল হিম্মত। খাবলে খুবলে চেটেপুটে খেয়ে ফেলেছিল সরসতিয়াকে। এই যে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, এখানেই কোথাও হয়তো শুকরাকে পশুর মতো মেরেছিল হিম্মতের লোকেরা। কথাটা ভাবতেই আমার গা গুলিয়ে উঠছে জানো...বমি পাচ্ছে!

মুকুট ভেতর কাঁপিয়ে উঠে আসা কান্নাটাকে গেলার জন্য ঢোক গিলল একবার। ধরা গলায় বলল, সেদিন গিয়ে সরসতিয়াকে দেখে এসেছি। তাকানো যায় না মেয়েটার দিকে। একজন রেপ ভিকটিম, যার ভালোবাসার মানুষকে পাশবিক ভাবে মেরে ফেলা হয়েছে, শুধু তা-ই নয় খুন হয়ে যাওয়া প্রেমিকের সন্তান নিজের পেটে ধারণ করছে যে, সেই মেয়ের শরীর আর মনের অবস্থা কী হতে পারে আন্দাজ করতে পারছ?

রঙ্গিত এগিয়ে এসেছে শ্লথ পায়ে। মুকুটের পিঠে হাত রাখল। নরম গলায় বলল, অন্ধকার হয়ে এসেছে। জায়গাটা আনসেফ। বুনো জন্তু বেরোতে পারে যে কোনও সময়। চলো, এবার ফিরি আমরা।

মুকুট হাত ছাড়িয়ে নিল রঙ্গিতের। ঝাঁজিয়ে উঠে বলল, তোমরা পুরুষ, তোমরা কী করে বুঝবে একজন গ্যাংরেপ ভিকটিমের মনের অবস্থা? ওর জায়গায় আমি থাকলে তো পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে যেতাম। কিছু একটা করো রঙ্গিত। আমি হাতজোড় করছি। পায়ে পড়ছি তোমার। জাস্টিস দাও সরসতিয়াকে। কিছু একটা করো। প্লিজ।

রঙ্গিত স্থাণুর মতো দাঁড়ানো। মুখে কথা আসছে না। হায় ঈশ্বর, কী করবে সে! সে একজন কমনম্যান ছাড়া আর কিছু নয়। কীই বা করার আছে তার!

১৯

ক্যামাক স্ট্রিটে মেঘদুয়ার চা বাগানের হেড অফিস। কিছু কাজ ছিল রঙ্গিতের। সারাদিন লেগে গেছে অফিসের কাজে। সেসব মিটিয়ে বেলেঘাটা ফিরতে ফিরতে সন্ধে। রাতে প্যাংকুটুদাকে ফোন করেছিল রঙ্গিত। ফুলবাগানে দলের কয়েক দফা কর্মসূচি আছে। সে কারণে ক’দিন হল পার্টি অফিসেই প্যাংকুটুদা পড়ে আছে ঘাঁটি গেড়ে। আজ রাতের ট্রেনে রঙ্গিতের মেঘদুয়ারে ফেরার টিকিট কাটা। সকালে উঠে জলখাবার খেয়ে একটা অটো ধরে ফুলবাগান পৌঁছেছে সে। পার্টি অফিস সম্বন্ধে আগেই রঙ্গিতের কিছু ধারণা ছিল। সব সময় সেখানে মেলা লেগে থাকে। সেখানে অভিষেক চক্রবর্তীর মতো লোককে একা পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। কথাগুলো একান্তে বলা জরুরি হলেও রঙ্গিতের উপায় ছিল না। হাটের মধ্যেই কথা বলতে হবে হয়তো। তেমনই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এখানে হাজির হয়েছে সে।

জায়গাটা খুঁজে বের করতে অসুবিধে হয়নি। এই পার্টি অফিস বহু পুরনো। দল যখন শাসন ক্ষমতায় ছিল না, এই বাড়ি সেই সংগ্রাম আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতি বহন করছে। পুরোনো একতলা বাড়ির মাঝারি একখানা ঘরে পার্টি অফিস। রাস্তার দিকে দরজার মাথায় একটা সাইনবোর্ড ঝুলছিল। গোটা দুই কাঠের আলমারি, খানকতক কাঠের চেয়ার। দুটো কাঠের টেবিল। তার ওপর স্তূপ করে রাখা কিছু খবরের কাগজ। দেওয়ালে দলীয় নেতৃত্বদের ছবি। একধারে ময়লা তক্তপোষে বিছানা পাতা। বহুদিন সেই চাদর যে ধোয়া হয়নি সেটা না বলে দিলেও বোঝা যায়। কোনও পার্টিকর্মী রাতে এই বিছানাতেই ঘুমোন হয়তো। সেই তক্তপোষেই এখন হাঁটু মুড়ে বসে আছে প্যাংকুটুদা। বেশি লোক ছিল না অফিসে। তিন চারজন প্রবীণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে ছিলেন। উৎসুক চোখে লক্ষ করছিলেন রঙ্গিতকে। এক মঙ্গোলয়েড মুখের মাঝবয়সি টাকমাথা লোক ভুটানি ভাষায় কথা বলছিল প্যাংকুটুদার সঙ্গে। রঙ্গিতকে দেখে প্যাংকুটুদা বলল, এসেছিস? এই চেয়ারটায় বোস। এঁকে চিনতে পারছিস?

ঘরের সিনিয়র সিটিজেন মানুষগুলোর মধ্যে একজন উঠে পড়লেন। গলা খাকারি দিয়ে বললেন, তাহলে ওই কথাই রইল অভিষেক। বেলা গড়িয়েছে অনেকটাই। স্নান খাওয়ার সময় হল। দুপুরের দিকে আমার আবার গুচ্ছের ওষুধ খেতে হয়। আমি তাহলে আসি। সন্ধের দিকে আবার দেখা হচ্ছে। প্যাংকুটুদাও ঘাড় নেড়ে বলল, ঠিক আছে অবিনাশদা। সন্ধেবেলা ওই ব্যাপারটা ফাইনাল করে ফেলব।

সেই অশীতিপর ভদ্রলোকের দেখাদেখি উঠে পড়লেন বাকিরাও। বিদায় নিয়ে এক এক করে চলে গেলেন প্রবীণের দল। মঙ্গোলয়েড মুখের মানুষটি তাকাল রঙ্গিতের দিকে। ছোট ছোট চোখ, পীতাভ গায়ের রং। এই লোকটিকে চেনাচেনা লাগছে কেন? সে আগে কখনও দেখেছে কি? প্যাংকুটুদা হেসে বলল, ইনি পাশাং ভুটিয়া। সাকতেংয়ের কথা ভুলে যাসনি নিশ্চয়ই? এই ভদ্রলোক সাকতেং থেকে এসেছেন।

সাকতেং কথাটা শুনেই মাথার মধ্যে জর্জ উইনস্টোনের সেই ‘ডিসেম্বর’ গানটা রিমঝিম করে বেজে উঠল। ফিরে এল সেই মোহময়ী রাতের স্মৃতি। রঙ্গিত বলল, ভুলব কেন। আমি তো সেখানে তোমার ডেরায় কিছুদিন কাটিয়েও এসেছিলাম।

প্যাংকুটুদা বলল, যার বাড়িতে আমি পেয়িং গেস্ট ছিলাম সেই নরবু ভুটিয়াকে ভুলে যাসনি নিশ্চয়ই? নরবুর দুই মেয়ে ওয়াংমো আর সেমইয়াংয়ের কথাও হয়তো মনে আছে তোর? ওয়াংমোদের মামাবাড়ির পাশেই পাশাংয়ের বাড়ি। পাশাংয়ের বউয়ের নাম ছেকি। বিয়ের দু-বছরের মাথায় কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে ছেকি মারা যায়। সাডেন ডেথ যাকে বলে। যে মানুষটার হার্টের অসুখ কোনওদিন ধরাই পড়েনি তার এত অল্প বয়সে এমন মৃত্যু খুবই আনফরচুনেট। ছেকিকে খুব ভালোবাসত পাশাং। বউ মারা যাবার পর তার দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু ওয়াংমোর মামা অর্থাৎ নরবুর শ্যালক তাশি চাকরি করে পুলিশে। সে পাশাংয়ের সহকর্মী, প্রতিবেশীও। তাশি পাশাংকে প্রস্তাব দেয় ওয়াংমোকে বিয়ে করার। পাশাং নিমরাজি হয়ে যায়।

রঙ্গিত যত শুনছিল তত হাঁ হয়ে যাচ্ছিল। নিরুচ্চারে, নিজের মনে মনে বলছিল, এমনও হয়! মুখে বলল, ও আচ্ছা।

প্যাংকুটুদা বলল, পাশাং নাম কা ওয়াস্তে একটা চাকরি করে ঠিকই কিন্তু সে হল বনেদি বড়লোক। থিম্পু আর পারো শহরে পারিবারিক হোটেল আছে ওদের। পাশাংয়ের বাবা সেসব দেখাশোনা করেন। দোজবরে হলে কী হবে, পাত্র হিসেবে পাশাং মন্দ নয়।

রঙ্গিত স্তম্ভিত হয়ে দেখছিল পাশাং নামের টাকমাথা মাঝবয়সি লোকটাকে। বিপত্নীক পাশাং যতই এলিজিবল পাত্র হোক, ওয়াংমোর মামা তাশির তাকে পাত্র হিসেবে যতই পছন্দ হোক, কিন্তু ওয়াংমো? সে তো জলজ্যান্ত যুবতী, সে তো আর চোখে ঠুলি পরে নেই। সেই সেক্স সাইরেন কী করে এই বিয়েতে রাজি হল! তাছাড়া সে তো বয়সে পাশাংয়ের হাঁটুর কাছাকাছি!

প্যাংকুটুদা বোধ হয় রঙ্গিতের মনের ভাব বুঝেছে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল, শেক্ষপিয়ার সায়েব কী বলেছিলেন মনে নেই? দেয়ার আর মোর থিংস ইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ হোরেশিও...। পাশাংয়ের মতো দোজবরে পাত্রর গলায় মালা দিতে ওয়াংমোর আপত্তি ছিল না। শি ওয়াজ হ্যাপিলি এগ্রিড টু টাই নাপশাল নট। আর পাশাংয়ের তো আপত্তির প্রশ্নই নেই। ওয়াংমোর মতো রূপসিকে বিয়ে করার প্রস্তাব পেলে মুনিঋষিও টলে যাবে, সে কোন ছাড়। পাশাং রাজি হয়ে যায়। বিয়ে হয়ে যায় দুজনের।

রঙ্গিতের মনে পড়ছে ভুটান পাহাড়ে কাটানো দিনগুলোর কথা। ওয়াংমো গল্প করত তার মামাবাড়িতে গেলে সে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখত এক মাঝবয়সি পুলিশ অফিসার কীভাবে তার অল্পবয়সি বউয়ের সঙ্গে নির্লজ্জ সঙ্গম করে। কাচের জানলার এপাশ থেকে সব কিছুই নাকি দেখা যায়। সে নিজেই বলত লোকটা সেক্স ম্যানিয়াক। আর সেই লোককেই কিনা বিয়ে করে ফেলল ওয়াংমো! প্যাংকুটুদা হেসে বলল, কী ভাবছিস? স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম কথাটা তাহলে ভুল নয়। মেয়েদের মন দেবতাও বোঝে না মানুষ বুঝবে কী করে!

রঙ্গিত চোখ গোলগোল করে বলল, মেয়েদের মনের কথা বোঝা তো পরের ব্যাপার কিন্তু আমি তো এটাই বুঝতে পারছি না যে, ভুটান থেকে এই লোকটা তোমার ফুলবাগান পার্টি অফিসে কী করতে এসেছে?

প্যাংকুটুদা বলল, সে এক লম্বা গল্প। ওয়াংমোর আকাঙ্ক্ষা ছিল ফিল্মে নামা। বলিউড ছিল তার টার্গেট। কাঁচা বয়সে এমন ঝোঁক লক্ষ লক্ষ টিনএজারের থাকে। তাদের মধ্যে ওয়ান পারসেন্ট বাড়ি থেকে পালিয়ে মুম্বই যায় হিরো হিরোইন হতে। ওয়াংমো নাইনটি পারসেন্টের দলে। পাশাংয়ের সঙ্গে বিয়ে হবার পর ওয়াংমো রূপালি পর্দার নায়িকা হবার স্বপ্ন পাহাড়ের খাদে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সেই মেয়ে এখন ঘোর সংসারী। দুই বাচ্চার মা। পাশাংয়ের বাবা মারা যাবার পর থিম্পু আর পারোর হোটেলের বিজনেস এখন সে-ই দেখে। কিন্তু মুশকিল হল ওয়াংমোর রুপোলি পর্দার ভূত এখন তার বোন সেমইয়াংয়ের ঘাড়ে চেপে বসেছে।

রঙ্গিত চোখ গোলগোল করে বলল, সে আবার কী?

প্যাংকুটুদা বলল, অবাক হবার আরও বাকি আছে। আগে বিদ্যুৎ ছিল না, হালে সাকতেংয়ে ইলেক্ট্রিসিটি এসেছে। ইন্টারনেটও সহজলভ্য। সাকতেং থেকে অনলাইনে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে শুরু করে সেমইয়াং। সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে তনুময় মিত্র নামে কলকাতার এক প্রোডাকশন হাউসের বিগশটের সঙ্গে আলাপ হয় তার। ভদ্রলোকের সঙ্গে ফোনেও কথা হয়। স্ক্রিন টেস্টের জন্য তাকে তনুময়ের ইউনিট থেকে বলা হয় কলকাতায় আসতে। তিন-চারদিনের অ্যাসাইনমেন্টে সেমইয়াং আসে কলকাতায়। পাশাং এসেছিল শ্যালিকার এসকর্ট হয়ে। দুজনে উঠেছিল একই হোটেলের আলাদা আলাদা রুমে। এক সকালে ক্যাব ভাড়া করে সেমইয়াং গিয়েছিল স্ক্রিন টেস্ট দিতে। বিকেলের মধ্যেই ফিরে আসার কথা। কিন্তু ফেরেনি। তার ফোন সুইচড অফ। অচেনা এক নাম্বার থেকে ফোন করে সে পাশাংকে জানিয়েছে, তাকে খোঁজার চেষ্টা যেন না করা হয়।

রঙ্গিত বিস্মিত হয়ে বলল, কিন্তু কেন?

প্যাংকুটুদা মাথা নেড়ে বলল, তনুময় মিত্র প্রোডাকশনের হিন্দি একটা ওয়েবসিরিজ আসছে সামনের বছর। মুম্বইতে রেকি চলছে। দু-চার মাস পর শুরু হবে শুটিং। সেমইয়াংকে সেই ওয়েব সিরিজেই ডেবু করাবে বলে প্রমিস করেছে তনুময় মিত্র। হোটেল ছেড়ে তার ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠেছে সেমইয়াং। তার সঙ্গেই এখন লিভ ইন করছে সে। এবার পাশাংয়ের মনের হাল তো বুঝতেই পারছিস। কোন মুখে বাড়ি ফিরবে সে? কী জবাব দেবে সে নরবুকে? ওয়াংমোকেই বা কী বলবে? পাশাং মিসিং ডায়েরি করেছে পুলিশে। এদিক ওদিক নানারকম চক্কর কাটছিল। কী করে আমার খোঁজ পেয়ে এসেছে আমার কাছে।

রঙ্গিত সেমইয়াংয়ের কথা ভাবছিল। কী ডেসপারেট মেয়ে রে বাবা! ওয়াংমো সুশ্রী। তার আসল ঐশ্বর্য হল স্বাস্থ্য। এমন সুদেহিনী কদাচিৎ চোখে পড়ে। সেমইয়াংও তাই। চাবুকের মতো ফিগার। তনুময় মিত্র নামে সেই প্রোডাকশন হাউসের কর্তা হয়তো তাকে প্রলোভন দেখিয়েছে। কিন্তু সেমইয়াং নিজেই যদি পতঙ্গের মতো আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় তবে কে তাকে রুখবে!

পাশাং বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল হন্তদন্ত হয়ে। এখান থেকে সোজা এয়ারপোর্টের দিকে। আজ বিকেলেই তার ফ্লাইট থিম্পু যাবার। রঙ্গিতের ভাবনা তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল পুরো। মাথা জ্যাম। প্যাংকুটুদা হেসে বলল, তোর কী খবর বল। কাজ-টাজ কেমন চলছে? শুনলাম তুই নাকি নেপালের কোথায় ট্রেকিংয়ে যাচ্ছিস? চা বাগানের ম্যানেজারের মেয়ে আর তার এক হিমাচলি বন্ধুনীও নাকি যাচ্ছে তোর সঙ্গে?

কে দিয়েছে খবরটা তোমাকে, বাবা?

সোর্সের নাম আমাদের লাইনে বলা বারণ। প্যাংকুটুদা হাসতে হাসতে বলল।

ঠিকই শুনেছ। আমার সিনিয়র ম্যানেজার মিস্টার মুখার্জির একমাত্র মেয়ের নাম মুকুট। সে ট্রেকিং করতে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ফিরে আসতে হয়েছিল মাঝপথ থেকে। ক্যানসার ধরা পড়েছিল ওর। বাবার চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে মুকুট আবার একই রুটে ট্রেক করতে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তার বেস্টি হল এক হিমাচলি মেয়ে, চিত্রাঙ্গদা। চিত্রা মুকুটকে কোম্পানি দিচ্ছে। এছাড়া এক পাহাড়ি গাইড থাকছে সঙ্গে। আমিও যাচ্ছি ওদের সঙ্গে।

প্যাংকুটুদা এদিক ওদিকে কেউ নেই দেখে গলা নামিয়ে ফিচেল হেসে বলল, একটু এগিয়ে এসে তোর কপাল আমার কপালে একটু ছুঁইয়ে দিয়ে যা। তোর ছোঁয়ায় যদি আমারও কপাল ফেরে! দুই সুন্দরীর সঙ্গে ট্রেকিংয়ে যাওয়ার প্রস্তাব পেলে আমি তো পার্টি পলিটিক্স ছেড়েছুড়ে বেরিয়ে পড়তাম পাহাড়ের পথে। তবে দু-দুটো বিউটিফুলের সঙ্গে পাহাড় চড়তে যাচ্ছিস। ব্রাদার, বি কেয়ারফুল।

রঙ্গিত হাসছিল হো হো করে। প্যাংকুটুদা বলল, তোরা যদিও মাউন্টেনিয়ারিং করতে যাচ্ছিস না, ট্রেক করতে যাচ্ছিস। তবুও বলি, হিমালয় বড় আজব জায়গা ভায়া। তুই ফুলের জন্য হিমালয়ে মৃত্যুর সেই ঘটনাটা জানিস তো?

রঙ্গিত বলল, কোন ঘটনা?

প্যাংকুটুদা বলল, বিভিন্ন ভ্যারাইটির প্রিমুলা ফুল তো বটেই তাছাড়াও নানা রংয়ের রডোডেনড্রনে ছেয়ে থাকে ফুলের উপত্যকা। হিমালয়ের রংবাহারি ফুলের সন্ধানে এক বিদেশিনী ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সে একা এসেছিলেন। ফুল কুড়োতে কুড়োতে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়েন তিনি। ফুলের উপত্যকাতেই সমাধি হয় জোয়ান মার্গারিট লেগি-র।

রঙ্গিত বলল, এমন ভয়ংকর সুন্দর মৃত্যুর কথা ভাবলে সুনীলের সেই ‘মার্গারিট, ফুল হয়ে ফুটে আছ’ বইটার কথা মনে পড়ে যায়। যদিও এই মার্গারিট আর সুনীলের মার্গারিট এক কিনা জানি না। তবে কী জানো, সমতলের দূষণ এখন পায়ে পায়ে উঠে পড়ছে হিমালয়েও। পাহাড় ভালোবাসে যারা তাদের কাছে এ বড় কষ্টের। আমি এদিক দিয়ে সত্যিই লাকি। ডুয়ার্সে যেসব চা বাগান আছে তার বেশিরভাগই ইংরেজ আমলে যেমন ছিল আজও তেমনই আছে। এখনও হেমন্তর পায়ের শব্দ ওদিকে টের পাওয়া যায়। তুমি কখনও এসে ঘুরে যেও। নিজেই বুঝতে পারবে।

প্যাংকুটুদা হাসল, বুঝতে পারছি, বেশ বুঝতে পারছি। খোকা, তোমার মনে যে হেমন্তের রং লেগেছে সেটা বুঝতে বেশি ইন্টেলিজেন্স লাগে না। ম্যানেজারের মেয়েটাকে গেঁথে ফেলেছিস বড়শিতে এই তো? কংগ্র্যাটস। যাক গে, কী এমন জরুরি ব্যাপার যে, আমাকে খুঁজে এখানে চলে এসেছিস সেটা বলে ফেল। আমার হাতে সময় কম। সন্ধেবেলা আবার পার্টির মিটিং আছে।

এদিক ওদিক তাকিয়ে নিল রঙ্গিত। কেউ নেই কাছাকাছি। গলা খাকারি দিয়ে বলল, মেঘদুয়ার চা বাগানে যে নারকীয় ঘটনা ঘটে গেছে তা তো তুমি জান। সেই বাগানের সরসতিয়া নামে এক মেয়েকে গ্যাংরেপ করেছিল হিম্মত লোহার আর তার দলবল। সরসতিয়ার প্রেমিক শুকরাকে এমন মার মেরেছিল যে সে চলে গিয়েছিল কোমায়। মিডিয়া প্রথমদিকে কিছুদিন লেখালিখি করলেও পরে ফলো আপ করা ছেড়ে দেয়। আমি তোমাকে সব কাগজের ক্লিপিংস পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ভাবলাম ফোনে যখন কাজ হচ্ছে না তখন সামনাসামনি তোমাকে গিয়ে একটু খুঁচিয়ে আসি।

প্যাংকুটুদা বলল, আমি দেখেছি তোর পাঠানো ক্লিপিংসগুলো। মন্ত্রীর কানে আমি কথাটা তুলেওছিলাম। কিন্তু পার্টির অনেক কমপালশন থাকে...তুই বোকা নোস, নিশ্চয়ই তোকে সব কিছু বুঝিয়ে বলার দরকার নেই।

কয়েকজন যুবক আর একজন যুবতী দাঁড়িয়ে আছে বাইরের বারান্দায়। নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা ইয়ার্কি করছে। এই ঘরে তাদের কথা শুনছে না কেউ। মন্ত্রীর পিএ অভিষেক চক্রবর্তীকে যে কথা বলা যায় না সে কথা প্যাংকুটুদাকে কি বলা যায়? রঙ্গিত গলাটা নামিয়ে বলল, হিম্মত লোহার দাপুটে লোক। সংগঠনের ওই তল্লাটের সব দায়দায়িত্ব তার। টি বেল্টের ভোটব্যাংক সে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে। সে কারণেই তোমার দলের আটকাচ্ছে কোনও স্টেপ নিতে ওর বিরুদ্ধে। আসলে জল মাপছে তোমার পার্টি। তোমার দল মাথার ওপর থেকে হাত তুলে নিলে হিম্মত চলে যেতে পারে বিপক্ষ দলে। তখন ভোটব্যাংক কতটা মার খাবে সেই লাভক্ষতির অংকটাই হল আসল।

প্যাংকুটুদা বলল, তুই রেগে আছিস রঙ্গিত। তুই যত সহজ করে সাম-আপ করলি, ইকোয়েশনটা তেমন নয়। অনেক ঘোরপ্যাঁচ আছে এর মধ্যে। দলের মধ্যেও উপদল আছে। বাইরে থেকে তা দেখা যায় না। দ্যাখ, আদর্শগত অবস্থান থেকে সকলেই চায় ক্রিমিনালাইজেশন অফ পলিটিক্স বন্ধ হোক। শেকড়সুদ্ধু উপড়ে দেওয়া হোক এই রোগ। শরীর থেকে বের করে দেওয়া হোক বদরক্ত। তবে ইমেজ ভালো হবে পার্টির। মানুষের কাজ করলে, যে কোনও সমস্যায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে জনসমর্থন পাওয়া যাবেই। ভোট জেতার জন্য ক্রিমিনাল পোষার দরকার নেই। কিন্তু কেউ কেউ ঝুঁকি নিতে ভয় পায়। এই সব বাহুবলীদের সাইডলাইনে বসিয়ে রেখে ভোটের ময়দানে নামতে সাহস পায় না।

রঙ্গিত বলল, শুকরা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি ছিল এতদিন। আমরা নিয়মিত গিয়ে খোঁজ নিয়েছি তার। দেখেছি কীভাবে ক্ষয় হতে হতে জড়পিণ্ডের মতো বেঁচে আছে মানুষটা। শুকরার বাবা হা-গরিব লোক। তার ফ্যামিলির আর্থিক অবস্থা তেমন কিছু নয়। মেডিক্যাল কলেজে পেশেন্টের ট্রিটমেন্ট ফ্রি হলেও এই ক’মাসে শুকরার পেছনে কম খরচ হয়নি। পুরোটাই চালিয়েছেন আমাদের চা বাগানের সিনিয়র ম্যানেজার আর আমরা দু-চারজন। একটা ক্ষীণ আশা ছিল মিরাকল ঘটলেও ঘটতে পারে। কিন্তু তা আর হয়নি। শুকরার জ্ঞান ফেরেনি আর।

প্যাংকুটুদা বলল, তুই কী ভাবিস আমাকে বল তো রঙ্গিত? পার্টি যে অন্ধকারে আছে তা ভাবার কোনও কারণ নেই। গোপাল কৃষ্ণমূর্তির মতো অনেকেই আছে যাদের কাছ থেকে টি বেল্টের সব খবরই কানে আসে আমাদের। গত সপ্তাহে যে মারা গেছে শুকরা সেটাও আমরা জানি।

রঙ্গিত প্যাংকুটুদার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। কেটে কেটে বলল, তাহলে এটাও হয়তো জানো যে, শুকরা মারা যাওয়ার পর ফুঁসতে শুরু করেছে টি বেল্টের মানুষ। তলে তলে একজোট হচ্ছে বাগানের কুলিকামিনরা। কানাঘুষো শুনছি বাগানে যে কোনওদিন ল অ্যান্ড অর্ডার ক্রাইসিস তৈরি হবে। হিম্মত খুন হয়ে গেলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তোমাদের ইউনিয়ন অফিসও পুড়িয়ে দিতে পারে উত্তেজিত জনতা। পরে বোলো না যে, আমি তোমাকে আগে থেকে কিছু বলিনি।

প্যাংকুটুদা দেখছে রঙ্গিতকে। কপালে ভাঁজ পড়ল অনেকগুলো। ভারী একটা শ্বাস বাতাসে মিশিয়ে দিয়ে বলল, তুই মেঘদুয়ার ফিরে যা। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। আমি দেখছি কী করা যায়।

২০

রাতে ভালো ঘুম হয় না। এপাশ ওপাশ করেই আজকাল কেটে যায় গোটা রাত। কখনও কখনও ভোরের দিকে চোখ লেগে আসে। তখন এক একদিন অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে সরসতিয়া। টুকটুকে লাল একটা ট্রেনে চেপে সে আর শুকরা চলেছে কোনও দূর অজানায়। সেই ছোটবেলায় বাবার পাশে বসে মালবাজার থেকে শিলিগুড়ি গিয়েছিল, তারপর এই নিয়ে দ্বিতীয়বার তার ট্রেন চাপা। তার পাশের সিটে বসে আছে শুকরা। মনের আনন্দে কলকল করে কথা বলছে সে। প্রয়োজনের কথা। অপ্রয়োজনের কথা।

কচি কলাপাতার মতো একটা সবুজ ছাপা শাড়ি পরেছে সরসতিয়া। সেই সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ। নাকে লাল পাথর বসানো নাকফুল, গলায় চাঁদির হার, হাতে গোছা গোছা কাচের চুড়ি। শুকরা পরেছে লাল কলার তোলা গেঞ্জি আর জিনসের প্যান্ট। প্রিয় মানুষের সঙ্গে যাচ্ছে বলে সরসতিয়া আনন্দে টগবগ করে ফুটছে। তার ভেতর হাসির যে একটা গোপন ঝরনা আছে তা উপচে পড়ছে শুকরাকে এত কাছে পেয়ে।

রেল লাইনের ধারে যত দূর চোখ যায় ধানের খেত। সোনালি রোদে মাঠ যেন স্নান করছে। রোদের সোনা গায়ে মেখে ঝাঁক ঝাঁক পাখি উড়ছে। কত রকমের যে পাখি, সব পাখির নাম জানে না সরসতিয়া। শালিক, বুলবুলি, কানিবক, পাতিবক, বুনো টিয়া। শয়ে শয়ে রঙিন কাগজের টুকরো কেউ যেন বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছে। মাথার ওপর নীল শামিয়ানার মতো আকাশ। দু-এক খণ্ড সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ সূর্যটা ঢেকে যায় মেঘে। নীল আকাশের দখল নেয় কালো শ্লেটের মতো মেঘ। চমকে ওঠে বিদ্যুৎ। বাজ পড়ে প্রবল শব্দে। মেঘের স্তরগুলো গলে পড়তে শুরু করে। বৃষ্টি নামে এলোপাথারি। ঝড় ওঠে। পাখিগুলো হাওয়ার তোড়ে ছিটকে যায় এদিক ওদিক।

ভয়ে শুকরার হাত আঁকড়ে ধরতে যায় সে। হাতের স্পর্শ অচেনা ঠেকে। ঝামার মতো কড়া চেটো। এমন খরখরে হাত তো শুকরার নয়! কে এ? সে চমকে তাকিয়ে দেখে তার পাশে শুকরা নয়, বসে আছে হিম্মত লোহার। ইস্তিরি করা চাপা পাজামা আর লম্বা ঝুলের ফুলশার্ট। মুখ পরিষ্কার কামানো, মাথায় টেরিকাটা ফাঁপানো চুল। লুব্ধ চোখে জুলজুল করে তাকাচ্ছে তার দিকে। হিম্মত ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হাসে ঠোঁট মুচড়ে। প্রেমিক নয়, কামুক পুরুষের চাউনি তার দুই চোখে। শিউরে ওঠে সরসতিয়া। তড়িঘড়ি উঠে পড়তে চায় সিট ছেড়ে। পারে না।

বিভ্রান্ত হয়ে সরসতিয়া দেখে কেউ আঠা দিয়ে আটকে দিয়েছে তাকে সিটের সঙ্গে। নড়তে পারে না সিট ছেড়ে। হাসতে হাসতেই সশব্দে একটা ঢেকুর তোলে হিম্মত। তার দিকে হাত বাড়ায়। এক টানে খুলে নেয় তার শাড়ির আঁচল। ছিঁড়ে দেয় ব্লাউজের বোতাম। তখনই ট্রেনটা দাঁড়িয়ে পড়ে। হিম্মত হ্যাঁচকা টানে সরসতিয়াকে নিয়ে নেমে পড়ে ট্রেন থেকে। রেললাইনের ধার ঘেঁষে শুকিয়ে যাওয়া একটা নদী। মরা নদীর স্তব্ধ জলে ভেসে আছে কার মৃতদেহ। ভালো করে তাকাতেই কেঁপে ওঠে সরসতিয়া। এ তো শুকরার লাশ! চোখদুটো খোলা। মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই, শুকরা নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে সরসতিয়া আর হিম্মতের দিকে।

ট্রেনটার রং বদলে যায় স্বপ্নের এই জায়গায় এসে। লাল নয়, কুচকুচে কালো ময়াল সাপের মতো শুয়ে থাকে নিথর ট্রেনটা। সাহায্যের জন্য প্রাণপণে ডাকাডাকি করতে থাকে সরসতিয়া। কিন্তু কেউ তার হাঁক শুনতে পায় না। গোটা ট্রেনে একজন যাত্রীও তার চোখে পড়ে না। প্রবল ঝড়বৃষ্টির মধ্যেই সরসতিয়ার হাত ধরে নেমে পড়ে হিম্মত। হিড়হিড় করে টানতে টানতে তাকে নিয়ে আসে একটা ফাঁকা জমিতে। গায়ে বৃষ্টির ছাঁট পড়ে। স্পষ্ট দেখতে পায় না কিছু। তবু আন্দাজে জায়গাটা শ্মশানঘাট বলেই মনে হয় সরসতিয়ার। একটা চিতা জ্বলছে দূরে। তার লেলিহান আগুন উঁচুতে উঠে আকাশ ছুঁতে চায়। কে পুড়ছে? হিম্মত তাকে টানতে টানতে নিয়ে আসে চিতাটার কাছে। শুকরা শুয়ে আছে উপুড় হয়ে। আগুন ঘিরে রেখেছে শুকরার দেহ। মড়া পোড়া ঘ্রাণ নাকে ভেসে আসে।

বিশাল এক বট ডালপালা ছড়িয়ে, মাটিতে ঝুরি নামিয়ে ইতিহাসের আদি যুগ থেকেই দাঁড়িয়ে আছে এই শ্মশান চত্বরে। বটগাছের মাথায় শকুন উড়ছে। তাদের তীক্ষ্ণ ডাক ঝড়বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে কানে আসে। বুকের ভেতর দিয়ে কনকনে ঠান্ডা স্রোতের মতো নেমে যায় শকুনের চিৎকার। সরসতিয়ার সারা শরীর কেঁপে ওঠে অসহনীয় ঠান্ডায়। গাছের তলায় একটা টালির চালের ঘর। ঘরটার দরজা বন্ধ। শেকল তোলা। শেকল খুলে ধুপধাপ শব্দে ভেতরে ঢোকে হিম্মত। ঘরে চৌকির ওপর তেলচিটে একটা বিছানা। তার ওপর সরসতিয়াকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

ঝড়বৃষ্টি আর বজ্রপাতের শব্দ থেমে যায়। অগাধ নৈঃশব্দ্যে ডুবে যায় চারদিক। জেগে থাকে হিম্মতের হাসির শব্দ। মাঝেমাঝে শুধু বাতাসে করাত চালিয়ে যেতে থাকে শকুনের কর্কশ চিৎকার। আর তখনই ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে সরসতিয়া। বিস্ফারিত চোখে এদিক ওদিক তাকায়। তার বুকের ভেতর শাবল চালিয়ে কেউ যেন পাঁজরাগুলো চুরমার করে দিতে থাকে। চারদিকে বাতাসের অভাব নেই তবুও তার শ্বাস আটকে আসতে থাকে। বুকে দমচাপা কষ্ট হয়। হাঁসফাঁস করতে থাকে সরসতিয়া।

ঠিক টের পেয়ে যায় গুণবালা। সরসতিয়ার পাশে শোয়া দাইমা জেগে ওঠে ঠিক তখনই। স্নেহের হাত বুলিয়ে দেয় তার পালিতা কন্যার মাথায়। সরসতিয়ার চোখ ছাপিয়ে জল আসে। শুকনো মুখে আকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করে শুকরার কথা। বুকের ভেতর চিনচিনে চাপা কষ্ট টের পায় দাইমা। কী বলবে চট করে ভেবে পায় না। সরসতিয়ার বুকে পিঠে হাত বুলিয়ে হাসে। গোপনে একটা শ্বাস ছেড়ে বলে, শুকরা মেডিক্যালে ভর্তি আছে। এখন আগের চেয়ে ভালো। ওখানে বড় বড় সব ডাগদার দেখছে। তোর মরদ বিলকুল ঠিক হয়ে যাবে। কোনও চিন্তা করিস না।

মেঘদুয়ারের মানিজার লোক ভালো। একদিন বাগানের থেকে গাড়িতে চেপে মেডিক্যালে গিয়েছিল গুণবালা। সঙ্গে ফুলমতিয়া, শিউমঙ্গলরাও ছিল। নাকে নল, মুখে নল, লোহার বেডে অচেতন অবস্থায় শুয়ে থাকা শুকরাকে দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি গুণবালা। চুপচাপ বেরিয়ে এসেছিল বাইরে। বেরিয়ে এসেছিল শিউমঙ্গল আর ফুলমতিয়ারাও। অপার নৈরাশ্য ঘিরে ধরেছিল তাদের। মেডিক্যাল কলেজের বাইরে এসেও কোনও কথা বলছিল না কেউ। সকলে নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে নিয়েছিল একবার। মুখ ফুটে কেউ কাউকে কিছু বলেনি কিন্তু মনে মনে সকলেই বুঝে গিয়েছিল শুকরার বাড়ি ফেরার আশা দুরাশা। কোনও ডাক্তার কিছু করতে পারবে না। মৃত্যুর শমন চলে এসেছে শুকরার নামে। তাকে চলে যেতেই হবে সব ছেড়েছুড়ে। সে আর ফিরে আসবে না মেঘদুয়ারে। কখনও না।

বাড়ি ফিরে গুণবালা দেখে দুই হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে বসা সরসতিয়া। তাকে দেখে উঠে দাঁড়ায়। ব্যাকুল গলায় জানতে চায় শুকরার কথা। তার মুখভর্তি নখের আঁচড়ের শুকিয়ে যাওয়া দাগ। চোখের সাদা অংশটা লালচে। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বুক ফাঁকা হয়ে যায়। গুণবালা শুকনো হাসে। বর্ণহীন মুখের স্বাভাবিক রং ফিরিয়ে আনতে আনতে বলে, এখন ভালো আছে শুকরা। হুঁশ ফিরে এসেছে। তোর খোঁজ করছে। তোর পেটে যে আসছে তার কথা বলছে বার বার। মেডিক্যালের ডাগদারসাব বলল আর কয়েকদিন পরই শুকরার ছুটি হবে। তুই এখন ভালো করে খাওয়া দাওয়া কর তো বিটিয়া। যে আসছে এই দুনিয়ায় তার খেয়াল রাখ।

ইদানিং স্ফীত পেটের ভেতর প্রাণের স্পন্দন টের পেতে শুরু করেছে সরসতিয়া। তলপেটে আলতো আঙুল ছোঁয়ায় সে। অনুভব করতে চায় তার রক্তমাংসের শরীরটার ভেতরে বেড়ে ওঠা আর একটা প্রাণকে। শুকরার সন্তান বাপের মতোই দামাল হবে মনে হয়। দস্যিটা লাথি ছোঁড়ে দুমদাম। বাচ্চাটা কি শুকরার মতোই দেখতে হবে? সরসতিয়ার রক্তের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ চমকে চমকে যেতে থাকে। সেই ভয়াবহ দিনটার কথা ঘুরপাক খেতে থাকে তার মাথার ভেতর। ঘাসের গালচের ওপর সে আর শুকরা সোহাগ করছিল। সে ছিল চিত হয়ে। তার ওপর শুকরা উপুড় হয়ে শুয়ে বিড়বিড় করে বলে চলছিল ভালোবাসার কথা। আচমকা ধাতব একটা শব্দ হয়। লুটিয়ে পড়ে শুকরা। শুকরার নিস্পন্দ মুখটা আজও ঘাই মারে তার মনের মধ্যে। তার চোখমুখ আর শরীরের মাংসপেশী কুঁকড়ে যেতে থাকে। স্মৃতির মধ্যে ঘুরেফিরে আসতে থাকে সেই অভিশপ্ত রাতের সমস্ত অপমান আর লাঞ্ছনার পুঙ্খ অনুপুঙ্খ। একটা রাত তার গোটা জীবনটাকে তছনছ করে দিয়ে চলে গেল। বেঁচে থাকার আর কোনও কারণ রইল না।

এর মধ্যে একদিন ভোঁতা একটা ছুরি দিয়ে কবজির শিরা কাটতে গিয়েছিল সরসতিয়া। গুণবালা দেখতে পেয়ে গিয়েছিল ভাগ্য ভালো। ছুটে এসে তার হাত থেকে কেড়ে নিয়েছিল ছুরি। সেদিন থেকে কাজ কমিয়ে দিয়েছে গুণবালা। খুব চেনাজানা না হলে যায় না ডেলিভারি করাতে। যদিও বা কোথাও যায় ফুলমতিয়া, ইন্দু বা বিন্দিয়াদের ডেকে নেয় ঘরে, মেয়েটাকে পাহারা দেওয়ার জন্য। শুকরার জ্ঞান ফিরছিল না। সে মেডিক্যালের বেডে পড়ে ছিল অচেতন অবস্থায়। ডাক্তাররা হাল ছেড়ে দিয়েছিল। কুলিলাইনের সকলেই জানত একদিন না একদিন খারাপ খবরটা আসবে। এল এক সকালে। কালে গিয়েছিল মেডিক্যালে। সে-ই বয়ে আনল শোক সংবাদ। গুণবালা খবরটা শুনল যখন তার মনে হল, মুহূর্তের জন্য তার হাত-পায়ের জোড় আলাদা হয়ে যাচ্ছে।

শিউমঙ্গল খবর পেয়ে চলে এসেছিল গুটিগুটি। তার উদ্দেশে কালে চাপা গলায় বলল, ভেইয়া, শুকরা মর গিয়া। তীব্র ঘৃণায়, রাগে, বিষাদে গনগন করছে মুখ। শিউমঙ্গল বলল, মর গিয়া নেহি, বোলনা চাহিয়ে থা, উসকো হিম্মত নে জানসে মার দিয়া। গুটিগুটি এসে পড়ে সহরাই। কেমন হিংস্র দেখায় তার তামাটে মুখটা। বিশাল আকৃতির সহরাই আসে ধুপ ধাপ শব্দ করে। ভারী গলায় সে বলে ওঠে, শুকরা মেঘদুয়ার কা আদমি থা, হামলোগন কা আদমি থা। ছোড়েঙ্গে নহি শালা উন কামিনো কো।

বাকিরা ধুয়ো তোলে, ছোড়েঙ্গে নহি উন রাকসস কো। খতম কর দেঙ্গে উন কামিনো কো। তাদের চাপা গর্জন ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে মেঘদুয়ারের আনাচে কানাচে। হতেই থাকে।

ইদানিং প্রায় নিয়মিত রাত ঘন হলে শিউমঙ্গল, কালে, সহরাইদের মতো মেঘদুয়ারের পুরুষ শ্রমিকেরা আসে গুণবালার ঘরে। পিছু পিছু আসে তাদের আওরত ফুলমতিয়া, চাঁদিয়া, বিন্দিয়া, ইন্দুরা। ফিসফিস করে কথা চালাচালি হয় নিজেদের মধ্যে। শুকরার শবদেহ সাহুডাঙ্গি শ্মশানঘাটে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল সেদিন। কিন্তু আগুনটা নেভেনি। শ্মশানঘাট থেকে গুণবালা তামাং মেঘদুয়ার টি এস্টেটের কুলিলাইনে বয়ে এনেছিল সেই আগুনের আঁচ। এবার সকলের অলক্ষ্যে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা সেই তুষের আগুন ছড়িয়ে যেতে থাকে কুলিলাইনের ঘর থেকে ঘরে। কুলিলাইনের বাইরের লোক সেই আগুনের কথা জানতেও পারে না।

২১

পায়ে নাল লাগানো চামড়ার জুতো। পরনে খাটো বেঁটে ধুতি। ছিটের মোটা পুরোহাতা জামা, লোকটার বয়স চল্লিশের মতো হবে। দুদিনের বাসি দাড়ি গালে। কাঁচাপাকা গোঁফ। চোখে ঘোলা দৃষ্টি। রঙ্গিত স্বস্তিশোভনের উদ্দেশে বলল, ও হল শিউমঙ্গল, মালবাজার নাগরাকাটা রুটে গাড়ি চালায়। ওর বউ ফুলমতিয়া আমাদের চা পাতা তোলে। শিউমঙ্গল সরসতিয়ার সেই ঘটনাটার ব্যাপারে অনেক কিছু জানে। এতদিন চুপ করে ছিল। এবার মুখ খুলতে চায়।

স্বস্তিশোভন তাকান। লোকটা জড়োসড়ো ভঙ্গিতে দেখছে তাঁকে। সেই অভিশপ্ত ঘটনাটার পর বেশ কিছুদিন টালমাটাল একটা পরিস্থিতি চলছিল। বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল পাতা তোলার কাজ। ফ্যাক্টরি খোলেনি অনেকদিন। কিন্তু অনন্তকাল তো আর বন্ধ থাকতে পারে না সবকিছু। চা পাতা না তুললে শ্রমিকদের পেট চলবে কী করে! ধীরে ধীরে চা বাগানের কাজকর্ম আবার নতুন করে শুরু হল আগের মতো। এখন বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় সময়ের পলির নীচে চাপা পড়ে গেছে সেই কুৎসিত ঘটনা। কিন্তু সত্যিই কি আর পড়েছে? ডক্টর শর্মা আজও রাতে ঘুমোতে পারেন না। স্বস্তিশোভন আর অভয়াও ছটফট করেন। রঙ্গিত আর মুকুটের আলাপচারিতায় সরসতিয়ার কথা চলে আসে যখন তখন। গুণবালারও কাজে মন নেই। সবসময় একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। এর মধ্যে বাচ্চা প্রসব করাতে গিয়ে এক পেশেন্ট খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে দাইমা কমিয়ে দিয়েছে কাজ। খুব চেনা লোক না হলে যায় না ডেলিভারি করাতে।

সেদিন ফোন এসেছিল মেডিক্যাল কলেজ থেকে। সব যন্ত্রণার অবসান হয়েছে। কোমায় থাকা অবস্থাতেই চলে গেছে শুকরা। খবরটা মেঘদুয়ারে আসতে দেরি হয়নি। শুকরার মৃত্যুর পর চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে নতুন করে। স্বস্তিশোভনের কানে খবর আসে। শুনেছেন এই চা বাগানের কুলিকামিনদের মধ্যে ছড়াচ্ছে বিক্ষোভের আগুন। ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে সকলে। মিডিয়া প্রথমদিকে লেখালিখি করেছিল কিছুদিন। নতুন নতুন খবরের স্রোত এসে যাওয়ায় মিডিয়ার প্রাথমিক সেই উৎসাহ থিতিয়ে যায়। ফলো আপ আর সেভাবে করেনি কেউ। শুকরার মৃত্যুর খবর ভেতরের পাতায় খুব ছোট করে দিয়ে দায় সেরেছে একটা দুটো কাগজ।

এটাই হয়। এমনটাই তো দস্তুর। স্বস্তিশোভন অরুণা শাহবাগের ঘটনা জানেন। অরুণা চার দশক কোমায় ছিলেন। দীর্ঘকাল কোমায় থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির কথা তিনি কাগজে পড়েছেন। কার রেসিংয়ের সর্বকালের সেরা চ্যাম্পিয়ন মাইকেল শুমাখারের ঘটনাও তাঁর অজানা নয়। মিরাকল না ঘটলে শুকরা যে বাঁচবে না সেটা তিনি জানতেন। তেমন কিছুই ঘটল না। গাছ থেকে শুকনো পাতা ঝরার মতো একদিন টুপ করে খসে পড়ল শুকরা।

স্বস্তিশোভন দাঁতে দাঁত চাপেন। অসহায় লাগে খুব। শুকরার মৃত্যু বড়সড় একটা আঘাত দিয়েছে তাঁকে। শুকরার অশীতিপর গরিব বাবার কান্না তাঁকে ছারখার করে দিয়েছে ভেতর থেকে। এমন একটা অবস্থায় আজ সকালে রঙ্গিত এসে বলেছিল শিউমঙ্গলের কথা। সে নাকি দেখা করতে চেয়েছে মানিজার সাবের সঙ্গে। জরুরি কথা আছে তার। আজ সন্ধেবেলা তাকে আসতে বলা হয়েছিল। ডক্টর শর্মাকেও আসতে বলেছিল রঙ্গিত। সকলেই চলে এসেছেন সময়ে।

এখন স্বস্তিশোভন, অভয়া, রঙ্গিত, মুকুট আর ডক্টর শর্মা বসে আছেন লিভিং রুমে। সকলেই তাকিয়ে আছেন আগন্তুকের দিকে। শিউমঙ্গল হাত জড়ো করে বলল, মানিজার সাব, ফুলমতিয়া, আপনার বাগানে পাতা তোলে, সে আমার জরু। শুকরা মুন্ডা আমার জিগরি দোস্ত। এই বাগানেই আমাদের খেলকুঁদ, পেরাইমারি ইশকুল যাওয়া, বড় হওয়া। শুকরা লেবার সর্দার হল, আমি হলাম ডেরাইভার। মানিজার সাব, শুকরা যখুন মেডিক্যালে অ্যাডমিট হল তখুন আপনি যা করলেন কেউ তা করবে না। আপনি ভগওয়ান আছেন। শুকরার মওত হয়ে যাবার পরও আপনি যা করলেন ও ভি কেউ করবে না।

স্বস্তিশোভন দেখছেন শিউমঙ্গলকে। লোকটা তাঁর সম্বন্ধে খুব একটা বাড়িয়ে বলছে না। সেই ঘটনাটার সময় তিনি ছিলেন কলকাতায়। খবর পেয়েই চলে এসেছিলেন মেঘদুয়ারে। যতদিন শুকরা বেঁচে ছিল তার চিকিৎসার কোনও ত্রুটি হতে দেননি। সেদিন শুকরার মৃত্যুর খবরটা পেয়ে সব কাজ ফেলে তিনি শুকরার বুড়ো বাবাকে জিপে তুলে নিজেই ড্রাইভ করে ছুটে গিয়েছিলেন মেডিক্যাল কলেজে। শুকরার বডি সেখান থেকে মরচুয়ারি ভ্যানে করে সাহুডাঙ্গি শ্মশানে নিয়ে গিয়ে সৎকারের ব্যবস্থাও করেছিলেন। অন্ত্যেষ্টির সময় তাঁর সঙ্গে ডক্টর শর্মা, রঙ্গিত, জোয়ারদার, মহাপাত্র সকলেই হাজির ছিলেন। সারাদিন অভুক্ত থেকে বাগানে ফিরেছিলেন যখন ততক্ষণে সন্ধে হয়ে গেছে।

শিউমঙ্গল গায়ের আলোয়ানটা আঁট করে নিয়ে আধভাঙা হিন্দিতে বলল, সরসতিয়া আর শুকরাকে নিয়ে হিম্মত যে একটা ঘোঁট পাকাচ্ছিল সেটা জানতাম। দুজনের একটা লড়াই তলে তলে ছিলই। সরসতিয়া মা হবে, সেই খবর জানার পর মাথায় আগুন চড়ে গিয়েছিল হিম্মতের। সেদিন সনঝাবেলা সরসতিয়া আর শুকরা ইশক লড়াতে গিয়েছিল ফ্যাক্টরির ওদিকে। হিম্মতের কানে কেউ পৌঁছে দিয়েছিল এই খবর। হিম্মত এসেছিল ওর লোকজন নিয়ে। চুপ চুপ কে পেছন থেকে এসে শুকরার মাথায় হিম্মত লোহার রড দিয়ে মারে। বেহোশ হয়ে যায় শুকরা। উসকে বাদ উন লোগ জানবার কি মাফিক রেপ করে সরসতিয়াকে।

রঙ্গিত ফুঁসে উঠে চাপা গলায় বলল, জানোয়ারের কথা বোলো না। তারা এমন বিবেকহীন হয় না। হিম্মত সেদিন যা করেছে তা পশুরাও করবে না। সরসতিয়াকে প্রথমে ছিঁড়ে খেয়েছিল হিম্মত। নখ দিয়ে আঁচড় কেটে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল সারা শরীর। মেয়েটাকে দেখে আমি চিনতে পারিনি প্রথমে। প্রেতের মতো ভয়ংকর করে দিয়েছিল তার মুখচোখ। সরসতিয়াকে গ্যাংরেপ করেও শান্তি হয়নি, অজ্ঞান শুকরাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল গাছের নীচে। রেপ করার আগে পরে বেধড়ক মেরেছিল সরসতিয়াকেও। বসিয়েছিল সালিশি সভা।

শিউমঙ্গল বলল, আমাকেও ওরা ডেকে লিয়ে গিয়েছিল। সরসতিয়ার গায়ে কোনও কাপড়া উপড়া ছিল না। শুকরাও বেহোশ ছিল একদম। জ্ঞান উন ছিল না কোনও। শুকরাকে লাথের পর লাথ মারছিল হিম্মত, এতই ছিল তার খুন্নাস। সরসতিয়ার মুখ বেঁধে রেখেছিল যাতে চিৎকার করতে না পারে। চিৎকার করে বলেছিল, সরসতিয়া আর শুকরার জাতগোত্র আলাদা। তাদের দুলৌড় হলে সমাজের ক্ষতি হবে। সরসতিয়াকে গর্ভবতী করে শুকরা গুনাহ করেছে। তাই মারাংবুরুর শাপ নেমে আসবে বাগানে। বারিশে শেষ হয়ে যাবে বাগান। মুখে রক্ত তুলে মারা যাবে কুলিকামিনদের ঘরের বালবাচ্চা। সকলের ভালোর জন্যই শুকরা আর সরসতিয়াকে শাস্তি দিতে বাধ্য হয়েছে তারা। আমাদের মধ্যে কেউ ইচ্ছে করলে আরও একবার সরসতিয়াকে উচিত শিক্ষা দিতে পারে।

এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে শিউমঙ্গলের কথা শুনছিল সকলে। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে অভয়া বলল, লজ্জা করে না তোমাদের! তোমরা নিজেদের পুরুষ বলে পরিচয় দাও? সেদিন অত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল আর তোমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলে সব? তোমাদের মধ্যে কেউ কোনও প্রতিবাদ করেনি? ছিঃ!

শিউমঙ্গল মুখ নীচু করে বলল, আপনি সাচ বাত করেছেন মেমসাব। নিজেকে মর্দ বলে পরিচয় দিতে শরম হয় আমার। ভেড়ুয়া মনে হয়। গিদ্ধর বলে গালি দিতে ইচ্ছে করে। সরসতিয়ার ওই হাল দেখকে হামরা উসদিন চুপ করে ছিলাম। কী বলব মেমসাব, আমাদের মধ্যে ভজন একটা জানোয়ার। মনের মধ্যে ওর কোনও মায়াদয়া নেই। হিম্মতের কথায় সরসতিয়াকে গাছের আড়ালে নিয়ে গিয়েছিল ভজন। আরও একবার রেপ করেছিল সেখানে। সরসতিয়ার কান্নার মতো শক্তিও ছিল না। মিটিং শেষ হলে শুকরা আর সরসতিয়াকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল হিম্মতরা। যাবার আগে সরসতিয়াকে রসসি দিয়ে বেঁধে দিয়েছিল কৃষ্ণচূড়া গাছটার সঙ্গে।

উদাস চাঁদ উঁকি মারছে আকাশে। হিম হিম একটা বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে অভয়াকে। তিনি নরম মনের মানুষ। তাঁর অস্বস্তি হচ্ছে প্রবল। তাঁর চোখের কোণে জল। স্বস্তিশোভন বললেন, শুকরার মাথায় বড় চোট লেগেছিল। বেচারিকে এমন মার মেরেছিল যে, বুকের পাঁজর তো বটেই প্রায় সব হাড়ই ভেঙে দিয়েছিল ওরা। মাথা থেঁতলে গিয়েছিল। ভীষণ ব্লিডিং হচ্ছিল। ওর বুডঢা বাপ ছুটে এসেছিল খবর পেয়ে। ছেলেকে ওই অবস্থায় দেখে কান্নাকাটি করছিল প্রথমে। চলে এসেছিল আরও দু-চারজন। তারা আরও লোক ডেকে এনেছিল। কয়েকজন মিলে মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল শুকরাকে।

ডক্টর শর্মা বললেন, গুণবালা সেদিন অন্য একটা বাগানে গিয়েছিল একটা ডেলিভারি কেসে। বাড়ি ফিরে সরসতিয়াকে দেখতে না পেয়ে কয়েকজনকে নিয়ে খুঁজতে বেরিয়েছিল মেয়েটাকে। তখনই কৃষ্ণচূড়া গাছটার গোড়ায় বাঁধা অবস্থায় দেখতে পায় ওকে। ঘটনার আকস্মিকতায় গুণবালা কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না। সরসতিয়াকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিল ফুলমতিয়া, ইন্দু আর ওদের মরদরা। মেয়েটার ফিজিক্যাল ইনজুরি যতটা না হয়েছিল তার চাইতে মেণ্টাল ট্রমা হয়েছিল বেশি। এতদিন হয়ে গেল মেয়েটা এখনও ঘোরের মধ্যে আছে। তবে সরসতিয়ার গর্ভের ভ্রূণ অক্ষত আছে। বেচারির ওপর এত অত্যাচার হয়েছে কিন্তু সেই তুলনায় ক্ষতি খুব একটা হয়নি।

অভয়া বললেন, আমি তো কিছুতেই ভেবে পাচ্ছি না, এত বড় একটা ঘটনা ঘটল অথচ থানায় কেউ এফআইআর করার সাহস দেখায়নি। ভাবা যায়!

ডক্টর শর্মা বললেন, কার ঘাড়ে ক’টা মাথা আছে যে, হিম্মতের নামে পুলিশকে রিপোর্ট করবে? শেষে আমরা দাইমা সমেত আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে থানায় গিয়ে ডায়েরি করে এসেছিলাম। প্রথমে ওসি ডায়েরি নেবে না বলে বাহানা করছিল। হই হল্লা করার পর নিয়েছিল।

মুকুটের বোধবুদ্ধি স্থবির হয়ে গেছে। সেদিন সে কাগজে পড়েছে, দক্ষিণ ভারতে একজন দশ বছরের ছেলে তার আট বছরের খেলুড়ে বান্ধবীর ওপর রেগে গিয়ে তাকে হত্যা করেছে। সেই হত্যার উপায় ঠাউরেছে বুদ্ধি করে। প্রথমে মেয়েটির মুখে মাটি ঢুকিয়ে তার কণ্ঠরোধ করে তারপর কুপিয়ে মেরেছে। কী ভয়ংকর একটা নিরাপত্তাহীন সময়ে বাস করছে মানুষ! তার মেরুদণ্ড দিয়ে নেমে আসছিল ভোঁতা একটা ভয়। শরীরের রক্ত জমাট হয়ে যাচ্ছিল বোবা অনুভূতিতে। নির্ভয়া কাণ্ডের কথা বড় বেশি করে আজ মনে পড়ছিল। সতেরো বছরের এক ছেলে একটি মেয়ের যোনিতে রড ঢুকিয়ে অন্ত্র ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে, নিজের হাতে অন্ত্র ছিঁড়ে বার করে উল্লসিত হয়, কঠোর শাসন ছাড়া কী করে এই সমস্ত মানুষরূপী পশুর মানসিক উত্তরণ সম্ভব? মুকুট অস্ফুটে বলল, এত বড় একটা অপরাধ হয়ে গেল অথচ অপরাধী ধরা পড়ল না। কোনও সাজাও পেল না! ধিক এই সিস্টেম, ধিক!

শিউমঙ্গল বলল, আমি নাগরাকাটা মালবাজার রুটে পাসিঞ্জার গাড়ি চালাই। সরসতিয়া আর শুকরার ঘটনাটা যেদিন ঘটে তার দো-চার রোজ আগে চালসার মোড়ে একটা ধাবায় আমি চা খাচ্ছিলাম। হিম্মতকে সেখানে পাগড়ি পরা একটা লোকের হাত থেকে দু হাজার টাকার বান্ডিল নিতে আমি দেখেছি। উও আদমি পাঞ্জাবিই হবে শায়দ, মাথায় পাগড়ি ছিল যখন। উঁচা লম্বা ফর্সা সেই লোকটাকে এসব দিকে আগে কখনও দেখিনি।

রঙ্গিত ভুরু ধনুক করে বলল, দু-হাজার টাকার বান্ডিল মানে দু’লাখ টাকা। এত টাকার ডিল কী কারণে হতে পারে? শিউমঙ্গল, তোমার কী মনে হয়?

শিউমঙ্গল খানিক ভেবে বলল, এদিকের ফরেস্ট থেকে তেন্ডুয়ার চামড়া ইউপি ঝাড়খণ্ড হয়ে বিদেশে চোরাপাচার হচ্ছে। পুলিশ কাউকেই ধরতে পারেনি। ফরেস্ট অফিস থেকে রাত পাহারা দিলেও কেউ অ্যারেস্ট হয়নি আজ অবধি। বাকিটা সমঝে নিন। আচ্ছা আমাকে এবার যেতে হবে মানিজার সাব। তবে যাওয়ার আগে একটা কথা বলে রাখি, মেঘদুয়ার বাগান শুধু নয়, আশপাশের এলাকাতেও কিন্তু একজোট হচ্ছে কুলিকামিনরা। সকলেই মওকা খুঁজছে। যে কোনওদিন হিম্মত ওর পাপের শাস্তি পাবে, আমার কথা মিলিয়ে নেবেন।

এদিক ওদিক তাকিয়ে বেড়ালপায়ে চলে গেল শিউমঙ্গল। কয়েক সেকেন্ড গেল। তার অপসৃয়মান শরীরটার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ডক্টর শর্মার উদ্দেশে মুকুট বলল, সরসতিয়া এখন কেমন আছে?

ডক্টর শর্মা বললেন, মেয়েটা প্রেগন্যান্ট। ফলে ওর শারীরিক কিংবা মানসিক দুদিক দিয়েই সুস্থ থাকাটা জরুরি। এমনিতে ওর নিজের বাড়িতে আছে সরসতিয়া। ফুলমতিয়া, বিন্দিয়ারা কেউ না কেউ ওর আশেপাশে থাকে সবসময়। দেখে রাখে ওদের সহেলিকে। দাইমা ইদানিং কাজ কমিয়ে দিয়েছে, ওর পালিতা মেয়েকে যাতে কড়া নজরে রাখতে পারে। হাসপাতালের দুই সিস্টার অলকাদি আর বীথিদিও সপ্তাহে একদিন করে যায় মেয়েটাকে দেখতে। ওর তো মাথার ঠিক নেই। ওকে একা ছেড়ে রাখা মুশকিল। এই তো সেদিন কোন ফাঁকে সবজি কাটার একটা ভোঁতা ছুরি জোগাড় করে ফেলেছিল রান্নাঘরে গিয়ে। সেই ছুরি দিয়ে হাতের শিরা কাটতে গিয়েছিল। গুণবালা দেখতে পেয়ে গিয়েছিল বলে বাঁচোয়া।

রঙ্গিত বলল, আমি আর মুকুট সেদিন দাইমার বাড়িতে গিয়েছিলাম। দেখে এসেছি সরসতিয়াকে। খুব খারাপ লেগেছে। পাগলের মতো বিড়বিড় করে একা একা।

স্বস্তিশোভন বললেন, পেটের বাচ্চাটার স্বার্থে ওর ঠিকমতো খাবার দাবার খাওয়া দরকার। ওষুধপথ্য দরকার। ডেলিভারির সময় তো ঘনিয়ে আসছে। কী যে হবে কে জানে! অ্যাবরশন করিয়ে নিতে পারলেই বোধ হয় ভালো
হতো।

ডক্টর শর্মা মাথা নেড়ে বললেন, ইটস টু লেট। সেসব করতে গেলে মেয়েটার প্রাণ বিপন্ন হতে পারে। তবে শুকরা চলে যাওয়ার পরও দেখছি অনেকেরই শান্তি নেই। সেদিন রাতে ঘুমোতে যাবার আগ দিয়ে এক অচেনা নম্বর থেকে আমার কাছে থ্রেটকল এসেছিল। ফোন করে একজন খসখসে গলায় হুমকি দিয়ে বলল শুকরার সন্তান যদি পৃথিবীর মুখ দেখে তাহলে আমার নাকি বিপদ আছে। হিম্মত না হোক ওরই কোনও লোক হবে। বৃন্দা বেশ ভয় পেয়ে গেছে। পাওয়াটাই স্বাভাবিক। রাজনীতির লোকেদের প্রোটেকশন দেবার জন্য জেড ক্যাটিগরির সিকিওরিটি আছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের নিরাপত্তা দেবে কে?

মুকুট বলল, শুকরাকে খুন করেও শান্তি হয়নি? এখন শুকরার নিরপরাধ সন্তানকেও পৃথিবীর মুখ দেখতে দিতে দেবে না এরা। আমার মাথায় ঢোকে না এই লোকগুলো কোন শ্রেণির জীব!

রঙ্গিত বলল, পলিটিক্যাল পার্টির নেতাদের হাত আছে হিম্মতের মাথার ওপর। থানাপুলিশ করে কোনও লাভ হবে না। লোকটা এখন গোপনে ইউনিয়ন অফিসে আসছে। কাল থেকে চোখের সামনে ঘুরে বেড়াবে। এদিকে পুলিশ বলছে হিম্মত নাকি অ্যাবসকন্ড। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোন দেশে বাস করছি আমরা ভাবি তাই।

অভয়া বললেন, আমি প্রথমত একজন মহিলা। আমার এক মেয়েও আছে। এদিকে যে চা বাগানে এই ঘটনা ঘটেছে তার সিনিয়র ম্যানেজারের স্ত্রী আমি। আমি মাঝে মাঝে নিজের কথা ভাবি। ফুলের বাগান নার্চার করা ছাড়া, বড়ি কিংবা আমসত্ত্ব রোদে দেওয়া ছাড়া, মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর নাতি মানুষ করা ছাড়া আমার মতো মহিলাদের এই সমাজের জন্য যেন কিছুই করার নেই। পড়াশোনা শিখে কোনও লাভ হল না। নিজেকে ক্লীব আর অপদার্থ বলে মনে হয় মাঝে মাঝে।

স্বস্তিশোভন বললেন, সেম ফিলিং। আমি তো কিছু খেতে গেলেই শুকরার মরা মুখটা দেখতে পাই। সরসতিয়ার নখ আঁচড়ানো ভয়াবহ চেহারাটা চোখে ভাসে। ফ্রাস্ট্রেটেড লাগে। কিছু ভালো লাগে না। কিচ্ছু না।

অভয়া বড় করে একটা শ্বাস ছেড়ে উঠে পড়লেন। বললেন, আমি ডিনারের ব্যবস্থা করছি। রঙ্গিত তুমি খেয়ে যাও আমাদের সঙ্গে। ডক্টর শর্মা, আমি বৃন্দাকে ডেকে নিচ্ছি ফোন করে। আপনারাও ডিনার করুন আমাদের সঙ্গে।

রঙ্গিত থমথমে মুখে বলল, আমার আজ খিদে নেই তেমন। আজ থাক অন্যদিন হবে।

ডক্টর শর্মা বললেন, আজ ওসব থাক। বৃন্দা রান্না করে রেখেছে। সেই খাওয়াও বোধ হয় আজ আর মুখে রুচবে না।

অভয়া আর কিছু না বলে উঠে পড়লেন। মুকুটও লঘু পায়ে মায়ের পেছন পেছন চলে গেল ঘর ছেড়ে। ডক্টর শর্মা বললেন, পুকুরে ঢিল ফেললে প্রথমে একটু ঢেউ ওঠে। সব একসময় থিতিয়ে যায়। সরসতিয়ার বেলাতেও ক’দিন সোরগোল হল, যথারীতি নতুন ঘটনার ভিড়ে চাপা পড়ে গেল এই ন্যাক্কারজনক কাণ্ড। এর কি কোনও বিচার হবে না? হিম্মতের গায়ে টোকা দেওয়ার সাহস হবে না কারও? পুলিশ প্রশাসন কি এমন করেই চোখে পট্টি পরে থাকবে?

রঙ্গিত বলল, হিম্মত হল পার্টির অ্যাসেট। নরসিং লোহারকে রিপ্লেস করেছিল সোমরা এক্কা। সোমরাকে সরিয়েছিল হিম্মত লোহার। তবে আমি বলছি আমার কথাটা মিলিয়ে নেবেন। হিম্মতকেও একদিন খুন হতে হবে। যে তাকে মার্ডার করবে একদিন সে হয়তো কোনও গোকুলে বাড়ছে সকলের অলক্ষ্যে।

স্বস্তিশোভন বললেন, শুকরার ঔরসজাত সন্তান, যে সরসতিয়ার গর্ভে জন্মাতে চলেছে সে-ই হয়তো বড় হয়ে তার বাবার মৃত্যুর বদলা নেবে। এই ভিশাস সাইকল চলতেই থাকবে। সেই আশঙ্কা থেকেই হয়তো ডক্টর শর্মাকে ফোন করে থ্রেট করছে হিম্মতের লোক। তবে হিম্মতের হাত থেকে এখনই নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে না। তার অত্যাচার আরও কয়েক বছর সহ্য করে যেতেই হবে।

ডক্টর শর্মা বললেন, আমি রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ বুঝি না। কোন ক্ষেত্রে লিডার মন্ত্রীরা দ্রুততার সঙ্গে অ্যাকশন নেন, আর কখন মৌনীবাবা সেজে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকেন বলা মুশকিল। রাজনীতি এখন টু পাইস ইনকামের জায়গা অনেকের কাছে। হিম্মতরা না থাকলে সেই ব্যবসা চলবে না। নিজেদের স্বার্থেই এই সব ক্রিমিনালকে শেলটার দিয়ে যেতে হবে এক শ্রেণির পলিটিশিয়ানদের।

রঙ্গিত আঙুলের নখ পর্যবেক্ষণ করছিল। কী করে কথাটা বলা যায় ভাবছে। ইতস্তত করে বলল, স্যার, কাল রাতে আমি একটা মেইল পেয়েছি। আমি এর আগে যে কোম্পানিতে চাকরি করতাম তারা ফ্রেশ অফার লেটার পাঠিয়েছে আমাকে।

স্বস্তিশোভন কথাটা বুঝতে খানিক সময় নিলেন। বললেন, ও আচ্ছা। কী বলছে তারা?

রঙ্গিত বলল, আমাদের কয়েকজনকে কোম্পানি ডাউনসাইজ করেছিল সে সময়। তখন বিশ্বব্যাপী মন্দা চলছিল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। এখন ধীরে ধীরে অবস্থা স্বাভাবিক হচ্ছে। কোম্পানি আবার বিদেশি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে বড় ডিল পেয়েছে। ফলে আমার অনেক বন্ধুদের রিঅ্যাপয়েন্ট করার জন্য চিঠি পাঠিয়েছে। আগে যা পে প্যাকেজ ছিল এখন তার থেকে অনেক বেশি দেবে বলছে। এক বছর পর ব্রাজিলে পাঠাবে একটা অনসাইট কাজ দিয়ে।

স্বস্তিশোভনের আলগা হাসির মধ্যে একখণ্ড ধূসর মেঘ ভেসে আছে। বললেন, খুব ভালো খবর। বেটার প্রসপেক্ট পেলে নিশ্চয়ই অ্যাভেল করবে। তোমার জায়গায় আমি হলেও হয়তো সেটাই করতাম। উইশ ইউ অল দ্য বেস্ট।

২২

গত কয়েকদিন দম ফেলার ফুরসত পায়নি প্যাংকুটু। নাওয়া খাওয়ারও অবকাশ ছিল না। নেতা মন্ত্রীরা ফোন করে গেছেন প্রতিনিয়ত, দলের চিফ ইন কমান্ডও তাকে ফোনকল করেছিলেন এক দুপুরে। নেতাজি ইন্ডোরে দলীয় সম্মেলন ছিল। সেই সংক্রান্ত ব্যাপারে কিছু জরুরি নির্দেশিকা দিয়েছিলেন তিনি। গত এক-দেড় সপ্তাহ ধরে রানি রাসমণি রোডের বাড়ির পাট চুকিয়েই ফেলেছিল সে। অবশেষে সব মিটে গেছে ভালোয় ভালোয়। এবার দু-চারদিনের অবসর। ন্যস্ত দায়িত্ব সম্পাদন সে করেছে ঠিকই তার পরই শরীরটা বিগড়েছে।

প্যাংকুটুর নিজস্ব কোনও গাড়ি নেই। পার্টি একটা গাড়ি অ্যালট করে রেখেছে তার জন্য। কিন্তু পারতপক্ষে তাতে চাপতে চায় না সে। পরশু ফুলবাগানের পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে অটো ধরে বেলেঘাটা আসছিল। তখনই বেমক্কা ঝড় উঠল। রাস্তার ধুলোবালি উড়ে এসে লাগছিল চোখেমুখে। বৃষ্টিও শুরু হল মুষলধারে। বৃষ্টির ছাঁট লেগে গা-মাথা ভিজে গিয়েছিল বলেই হয়তো রাত থেকে শুরু হল গা ম্যাজম্যাজানি। ভোররাতে জ্বর এল। পরদিন সকালে প্যারাসিটামল আনিয়ে খেতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে সিজনাল ফ্লু। আরও দু-একটা দিন হয়তো থাকবে জ্বরটা। সে কারণে রানি রাসমণি রোডের পৈতৃক বাড়িতেই আপাতত পড়ে আছে সে। শরীরটাও বিশ্রাম চাইছে। আপাতত সে তাই বেরোচ্ছে না কোথাও।

চা খেতে খেতে কগজ ওল্টাচ্ছিল প্যাংকুটু। রাজনীতির আঙিনা সরগরম হয়েছে পেগাসাস কাণ্ড নিয়ে। এক মন্ত্রীর ফোনে আড়ি পাতা হচ্ছিল। তা প্রকাশ্যে আসায় শুরু হয়েছে হুলুস্থুল। আড়ি পাতার প্রসঙ্গে প্যাংকুটুর মনে পড়ে যাচ্ছিল পুরনো কথা। একবার প্রতিপক্ষ দলের এক ছাত্রনেতার মাথা ফাটিয়ে সে পালিয়েছিল কলকাতা থেকে। এক নেতার পরামর্শে ভুটানের সাকতেং গ্রামে আত্মগোপন করে ছিল সে। পেয়িং গেস্ট ছিল এক বাড়িতে। বাড়ির মালিক নরবু ভুটিয়া বিপত্নীক। তার দুই যমজ মেয়ে ছিল তারই ইশকুলের ছাত্রী। ওয়াংমো ছিল প্রগলভা। বকবক করত প্রচুর। গায়ে পড়া ধরনের মেয়ে ওয়াংমো। সেমইয়াং ছিল ধীর স্থির স্বভাবের, বেশ শান্ত। কথাও বলত না পারতপক্ষে। ঘটনাবিহীন ছিল সাকতেংয়ের সেই সব দিন। কিন্তু তার মধ্যেই একদিন ঘটে গেল এমন এক ঘটনা যা ঝড় তুলে দিল প্যাংকুটুর আপাতশান্ত জীবনে।

প্যাংকুটু টের পেত কেউ আড়াল থেকে তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে। নরবুর বাড়িতে একটাই ঘর বরাদ্দ ছিল তার জন্য। সেই অপরিসর ঘরেই শোয়া বসা। সঙ্গে লাগোয়া স্নানঘর। অবশ্য কনকনে ঠান্ডার কারণে দু-চারদিন স্নান না করে থাকলেও তেমন অসুবিধে হতো না। তার স্কুল ছিল বাড়ি থেকে হাঁটাপথ। সকালে বেরিয়ে স্কুল করে বিকেলের দিকে সে ফিরত ঘরে। নরবুর বাড়ির মধ্যেই ছিল শুঁড়িখানা। যে ঘরে প্যাংকুটু থাকত তার পাশের ঘরটাই ছিল পানশালা। একাকিত্ব ছিল নিত্যসঙ্গী। সাকতেংয়ের দিনগুলোতে মদ্যপান করার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। সন্ধেবেলা পানশালায় গিয়ে দু-পাত্তর খেয়ে ফিরে আসত নিজের ঘরে। দুই বোনের কেউ না কেউ তার ঘরে এনে দিয়ে যেত ভাত রুটি সবজি। এক-একদিন বেশি নেশা হয়ে গেলে আর হুঁশ থাকত না। খাবার পড়ে থাকত খাবারের মতো। প্যাংকুটু ঘুমিয়ে পড়ত অকাতরে।

ছুটির দিনগুলো ছিল বোরিং। গল্প কবিতার বই নরবুর বাড়িতে আশা করাই বাতুলতা। ইলেক্ট্রিসিটি নেই। ফলে টিভিও নেই। মোবাইল নেটওয়ার্কেরও প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু শুয়ে বসে কাঁহাতক সময় কাটে। তার মধ্যে ছিল ওয়াংমোর উৎপাত। যে কোনও ছুতোয় সেই মেয়ে এসে এঁটুলি পোকার মতো গায়ে সেঁটে যেত তার। প্যাংকুটুর গায়ে পড়া মেয়ে পছন্দ নয়। প্রেম বা যৌনতা নিয়ে সে উদাসীন। কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে তার সঙ্গে বহু মেয়ের আলাপ পরিচয় থাকলেও প্রেমসম্পর্ক স্থাপন হয়নি কারও সঙ্গে। প্রথমে কিছুদিন ছুঁকছুঁক করেছিল ওয়াংমো। কিন্তু প্যাংকুটু তেমন আগ্রহ দেখাত না বলে সে-ও তার প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিল। পরের দিকে তাকে এড়িয়েই চলত একরকম।

বিরক্তিকর একঘেয়ে ছিল সেই সব দিন। তার থেকেও দীর্ঘ ছিল রাত। সময় যেন কাটতেই চাইত না। স্কুল ছুটি থাকলে তো কথাই নেই। সন্ধের পর তার সঙ্গী হতো অ্যালকোহল। কিন্তু যতক্ষণ সে ঘরে থাকত একটা অস্বস্তি হতো। মনে হতো কেউ যেন তাকে লক্ষ করছে দরজার ওপাশে, পর্দার আড়াল থেকে। পা টিপে টিপে গিয়ে প্যাংকুটু একদিন চোর ধরে ফেলল হাতে নাতে। এবং হতচকিত হয়ে আবিষ্কার করল, যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে মুখ নীচু করে সে ওয়াংমো নয়, সেমইয়াং!

প্যাংকুটু আরও বিস্মিত হল এটা দেখে যে, সেমইয়াং মুখ নীচু করে আছে ঠিকই কিন্তু তার মধ্যে কোনও অপরাধবোধ নেই। এমনকী, ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জাটুকুও নেই। প্যাংকুটু রেগে গিয়ে বলেছিল, তুমি আমার ঘরে আড়াল থেকে এমন উঁকিঝুঁকি মারো কেন? আর একদিনও যদি এমন কাণ্ড করো আমি তোমার বাবাকে সব জানিয়ে দেব। সেমইয়াং তার মুখের দিকে তাকিয়েই মুখ নামিয়ে নিয়েছিল। কেমন একটা গলায় বলেছিল, আই অ্যাম সরি। বাট...বাট আই অ্যাম ইন লাভ। আই লাভ ইউ স্যার। আই কান্ট স্টপ লাভিং ইউ।

এমন অকপট প্রণয় প্রস্তাবে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল প্যাংকুটু। প্রেম কাকে বলে তা কি জানে এই ইশকুলে পড়া মেয়ে? প্যাংকুটু বলেছিল, আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড? কেয়া তুম পাগল হো? এসব ভাবনা দূর করো মাথা থেকে। নিজের ঘরে যাও, পড়াশোনায় মন দাও। তোমাকে টিচার হতে হবে না? তাহলে তো মন দিয়ে পড়ালেখা করতে হবে, তাই না? গো টু ইয়োর রুম অ্যান্ড স্টাডি হার্ড। সেমইয়াং কোনও উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে চলে গিয়েছিল ঘর ছেড়ে। সেদিনের পর বদলে গিয়েছিল সেই মেয়ে। কাজের কথার বাইরে বিশেষ কথা বলত না। আড়াল থেকে তার উঁকিঝুঁকি মারাটাও একরকম বন্ধ হল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল প্যাংকুটু।

নরবুর বাড়িতে ডমেস্টিক হেল্প ছিল না। বাড়ির পাশেই গ্রসারি শপ। সেখান থেকে আসত চাল-ডাল-আটা। দু-পা দূরে সবজি বাজার। সবজি আর চিকেন বিক্রি হতো। নরবু নিয়ে আসত সেসব। দুই বোন রান্না করত পালা করে। একদিন ওয়াংমো পরের দিন সেমইয়াং। জলের অভাব ছিল সাকতেংয়ে। রানিং ওয়াটার ছিল না। কাছেই একটা ঝরনা। সেখান থেকে পাইপ দিয়ে জল আনতে হতো বাড়িতে। দুই বোনের মধ্যে কেউ না কেউ জল ভরা বালতি এনে রেখে যেত তার বাথরুমে, তার ঘরে চা কিংবা খাবার নিয়ে আসত। সেদিনের পর সেমইয়াং কেজো কথার বাইরে কথা বলত না। অভিমানিনী প্রেমিকার মতো আচরণ দেখে প্যাংকুটু মনে মনে হাসত। সত্যিই তাকে ভালোবেসে ফেলেনি তো মেয়েটা? পরক্ষণেই মনে মনে হাসত, ধুস তা হয় নাকি! এসব হল ইনফ্যাচুয়েশন। এই বয়সের রোগ। দুদিন বাদেই কেটে যাবে নতুন কাউকে খুঁজে পেলে।

সেদিন রবিবার, স্কুল বন্ধ। ওয়াংমো দু’দিনের জন্য গেছে মামাবাড়ি। সেমইয়াং যায়নি। নরবুকে বলে দিয়েছে তাকে হোমটাস্ক করতে হবে। সেদিন প্যাংকুটু ঘুম থেকে উঠেছিল দেরিতে। আড়মোড়া ভেঙে বারান্দায় এসে দেখে সোনাঝরা রোদ এসে স্নান করিয়ে দিচ্ছে ঝকঝকে সকালটাকে। সেমইয়াং তার জন্য গরম চা নিয়ে এল। প্যাংকুটু চায়ের কাপ হাতে মুগ্ধ চোখে প্রকৃতির রূপ দেখছিল। এতগুলো দিন কাটিয়ে ফেলল অথচ কোথাও যাওয়া হল না সেভাবে। আঙুল উঁচিয়ে দিকনির্দেশ করে আলগোছে বলেছিল, সাকতেং ভিউ পয়েন্টটা ওদিকে না?

সেমইয়াং সায় দিয়েছিল। প্যাংকুটু বলেছিল, শুনেছি ট্রেক করে যেতে হয় সাকতেং ভিউপয়েন্টে। পাহাড়, স্যাংচুয়ারি আর নদী একসঙ্গে দেখা যায় সেখান থেকে। তুমি সেখানে যাবার রাস্তা চেনো? সেমইয়াং আবার ঘাড় নেড়েছিল। প্যাংকুটু জিগ্যেস করেছিল, এখন রওনা দিলে দুপুরের মধ্যে ঘুরে আসা যাবে? সেমইয়াং মাথা নেড়ে বোঝাল যে, যাবে। প্যাংকুটু বলল, অচেনা রাস্তায় ট্রেক করতে গেলে অসুবিধে হতে পারে। বলছি যে, তোমার কি এখন কোনও কাজ আছে? তুমি কি আমাকে কোম্পানি দেবে?

সেমইয়াং উজ্জ্বল মুখে বলল, আমি গিয়েছি বেশ কয়েকবার। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দু-কিমি নামতে হয় প্রথমে। তার পর আরও ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আবার দু-কিমি খাড়া ওঠা। আপনি কি সত্যিই ভিউপয়েন্ট যাবেন স্যার?

বাটার টোস্ট আর ডিমসেদ্ধ খেয়ে বেরিয়ে পড়া হল। প্রথমে ডাউন ট্রেক করতে হল দু’কিমি। তার পর স্যাংচুয়ারির মধ্যে দিয়ে খাড়া সরু ও পিছল পথ ধরে আরও দুই কিমি ওপরদিকে হাঁটা। এই স্যাংচুয়ারির গাছগাছালি একেবারে আলাদা। যেন কোনও আদিম অরণ্য। শ্যাওলা জমে থাকা পাথর ছড়িয়ে আছে চারদিকে, রোদের প্রবেশপথ রুদ্ধ। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। অ্যাডভেঞ্চারাস পথ সন্দেহ নেই। প্যাংকুটুর কোনও অভিজ্ঞতা নেই ট্রেকিংয়ের। গ্রিপ ধরে এমন জুতোও নেই। সাধারণ কেডস। সে দু’বার আছাড় খেল পিছল পথে। সেমইয়াং মুখ টিপে হাসছিল প্যাংকুটুর কাণ্ড দেখে। বহু কষ্টে ভিউপয়েন্টে পৌঁছন গেল। কোমরে হাত দিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে একটু দম নিল সে। একটাই কথা তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, অ-সা-ধা-র-ণ!

ট্রেক করে এসে গরম লাগছিল বেশ। ঘাম দিচ্ছিল রীতিমতো। সেমইয়াং চামড়ার জ্যাকেট খুলে কাঁধে নিয়ে নিয়েছিল। প্যাংকুটুও তার সোয়েটার খুলে দুটো হাতা গলার সঙ্গে পেঁচিয়ে রেখেছিল। অনেক দূরে একটা গ্রাম। বাড়িগুলো পুতুলের বাড়ি। পুরনো একটা মনাস্ট্রি রয়েছে কাছেই। আছে ইংরেজ আমলের চার্চ। ইংরেজদের সঙ্গে ভুটানিদের একাধিকবার যুদ্ধ হয়েছিল। সেই ইতিহাস জানার পর এই নিরালা পাহাড়ি গ্রামে ছোট্ট একখানা চার্চ দেখে বিস্মিত হতে হয়। প্যাংকুটুর অবাক লাগছিল। এই মুলুকে যে এমন একটা জায়গা আছে এতদিন জানাই ছিল না!

চারদিকে ছোটবড় গাছের সমারোহ। তার ডালে ডালে পাখিরা সকলে পোকা সংগ্রহে ব্যস্ত। নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝেমাঝে চলছে সুরেলা অথচ তীক্ষ্ণ গলায় তাদের ডাকাডাকি। নাম না জানা অগুনতি ফুল ফুটে রয়েছে। পাথরের ওপর দিয়ে ছিপছিপে এক নদী নাচতে নাচতে জঙ্গলের পথে এঁকেবেঁকে হারিয়ে গেছে। তার পায়ে নূপুরের রিনরিন শব্দ। প্যাংকুটু সাদামাটা ফোন ব্যবহার করে। এই প্রথম তার ফোনে ক্যামেরা নেই বলে আফশোস হল খুব। এই আরণ্যক রহস্যঘন পরিবেশের এক কণাও ক্যামেরাবন্দি করা গেল না।

সেমইয়াং বলল, এই নদীতে রাতের দিকে লেপার্ডেরা জল খেতে নামে।

প্যাংকুটু বেশ চমকেছিল। তাকে ভয় পেতে দেখেই হয়তো সেমইয়াং মজা পেল। মুখ টিপে হেসে বলল, এই জঙ্গলে কিন্তু খতরনাক ভালুও আছে স্যার। নদীর ওপার থেকে যে কোনও সময় ভালু এদিকে এসে পড়তে পারে। দিনের আলোতে ওরা বেরোয় না। তবে এমন স্যাঁতসেতে পরিবেশে ভালু চলাফেরা করতে ভালোবাসে। কখনও কখনও নীচে নেমে হানা দেয় কাছেপিঠের গ্রামেও। মাংসাশী না হলেও যথেষ্ট হিংস্র হয় এরা। মানুষকে মেরেও ফেলে অনেক সময়। অ্যান্ড ওয়ান মোর থিং, এই জঙ্গলে কিছু কিছু আছে পোকামাকড় আছে যারা রীতিমতো বিষাক্ত। স্যার, বি কেয়ারফুল।

এই গ্রামে টুরিস্টের আনাগোনা নেই। রোদেলা দুপুরে সাকতেং ভিউপয়েন্ট জনমানবহীন। চারদিক নিস্তব্ধ নিথর। পাখির ডাক আর অচেনা পোকার কটকট শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। কখন বুনো জীবজন্তু এসে পড়বে তার জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছিল প্যাংকুটুর। কিন্তু সেমইয়াংয়ের মধ্যে উদ্বেগের কোনও ছায়া নেই। এই মেয়ে কোন ধাতু দিয়ে গড়া কে জানে! প্যাংকুটুর গা ঘেঁষে দাঁড়ানো সেমইয়াংয়ের মুখে এসে পড়ছিল ব্রোঞ্জ রংয়ের রোদ্দুর। আর তখনই সবজেটে একটা পোকার দিকে চোখ পড়ল প্যাংকুটুর। পোকা নাকি পতঙ্গ? কেননা তার আবার ডানাও আছে। বড়সড় বোতামের মতো দেখতে।

সেই সবুজ গা ঘিনঘিনে জিনিসটা কোত্থেকে উড়ে এসে বসেছে সেমইয়াংয়ের কণ্ঠার কাছে। সেটাকে টোকা মেরে সরিয়ে দিতে গিয়েছিল প্যাংকুটু। কিন্তু এমন কপাল, সেই কুৎসিতদর্শন পোকাটা সেমইয়াংয়ের গেঞ্জির বোতামের ফাঁক দিয়ে গলে গেল ভেতরে। সেমইয়াং লাফঝাঁপ দিয়ে অস্থির। ভুটানি ভাষায় চেঁচামিচি করে ঘাসের ওপর ছুঁড়ে ফেলল তার চামড়ার জ্যাকেট। প্যাংকুটুর দিকে পেছন ফিরে ঝটিতি খুলে ফেলল তার গেঞ্জি। তবুও নিস্তার পেল না পোকার হাত থেকে। শেষে খুলে ফেলল ব্রা-ও। প্যাংকুটু চেষ্টা করছিল অন্যদিকে তাকাতে। কিন্তু মনকে পোষ মানাতে পারছিল না। জিনে ধরা মানুষের মতো তাকিয়েই থাকল সেমইয়াংয়ের খোলা পিঠের দিকে।

এই অপ্রস্তুত দশায় কতক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জানে না প্যাংকুটু। কয়েক মুহূর্ত? নাকি অনন্তকাল? পোকাটা উড়ে গিয়েছিল কখন সেটাও জানে না সে। সেমইয়াংয়ের লাফঝাঁপ কখন যে থেমে গেছে বলতে পারবে না প্যাংকুটু। কিন্তু তার পরের দৃশ্যগুলো তার মাথায় গেঁথে আছে আজও। তার দিকে একসময় মুখ ঘোরাল সেমইয়াং। ধীরে, অতি ধীরে। প্যাংকুটু তখন বিবশ। তাকে জাদু করে রেখেছে কোনও অদৃশ্য জাদুকর। চোখ সরাতে পারছে না সে। বিহ্বল হয়ে সে তাকিয়ে দেখছিল এক পাহাড়ি তরুণীর ঐশ্বর্য।

ততক্ষণে সম্বিত ফিরে পেয়েছে সেমইয়াং। পোকাও নেই, পোকা সংক্রান্ত ভীতিও নেই। দুই হাত জড়ো করে উন্মুক্ত দুই স্তন আড়াল করার চেষ্টা করছিল। তাকিয়ে ছিল প্যাংকুটুর দিকে। দু-এক মুহূর্ত পর তার মুখে ফুটে উঠল দুর্বোধ্য হাসি। হাত নামিয়ে প্যাংকুটুর সামনে লঘু পায়ে এসে দাঁড়াল। তার চোখের দিকে গভীর চোখে তাকাল। দু-হাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরল ভালোবেসে। স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, ফ্রম দ্য কোর অফ মাই হার্ট আই লাভ ইউ। উইল ইউ ম্যারি মি?

প্যাংকুটু বিস্মিত হয়ে দেখছিল পাহাড়ি মেয়েটাকে। দু-চোখে ভালোবাসার নিবিড় আমন্ত্রণ। মনের মধ্যে কোনও প্যাঁচঘোচ নেই। কাউকে ভালোবাসলে তা মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখার কোনও ছল জানা নেই তার। আড়াল-আবডাল নেই ভালোবাসার কথা উচ্চারণে! কী স্বতঃস্ফূর্ত প্রেমের প্রকাশ! ভানহীন ভনিতাহীন কী সহজ সাবলীল এই মেয়ে! সেমইয়াংয়ের গলায় যে আর্তি ছিল তা কৃত্রিম নয়, মেয়েটা হয়তো সত্যিই তাকে মন দিয়ে ফেলেছে এমনটাই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল প্যাংকুটুর। ধীরে ধীরে সে তার ঠোঁট নামিয়ে আনল সেমইয়াংয়ের কপালে। আবেশে চোখ বুজে ফেলল সেই মেয়ে। তার স্ফূরিত ঠোঁট ভেজা পদ্মের পাপড়ির মতো মেলে ধরল তার মুখের সামনে। প্যাংকুটু নিজের ঠোঁট দিয়ে দখল করল সেমইয়াংয়ের নরম ফুলের মতো অধর ও ওষ্ঠ।

সেই পাহাড়ি গ্রামের কোনও নারী হয়তো তার পছন্দের পুরুষকে ভালোবাসলে শুধু মন নয় শরীর বিলিয়ে দিতেও দ্বিধা করে না। খোলা আকাশের নীচেই ধীরে ধীরে নিরাবরণ হয়েছিল প্যাংকুটু। নিজেকে সম্পূর্ণ আবরণমুক্ত করে নিয়েছিল সেমইয়াংও। উন্মুক্ত পরিবেশে সবুজ রেশমের মতো বিছানা প্রস্তুত করে রেখেছিল প্রকৃতি। প্যাংকুটুর জীবনে এই প্রথম কোনও নগ্নিকার সংস্পর্শ। প্রথম রিপু তাকে নিয়ে গিয়েছিল এক ঘোরের মধ্যে। সেমইয়াংয়ের জীবনেও হয়তো এই প্রথম কোনও পুরুষসান্নিধ্য। সে আঁকড়ে ধরেছিল প্যাংকুটুকে। নখ দিয়ে আঁচড়াচ্ছিল পিঠ, মুখ ঘষছিল তার বুকে।

প্যাংকুটুর ভেতর চলছিল রাসায়নিক ক্রিয়া বিক্রিয়া। ঘটে যাচ্ছিল ব্যাখ্যাতীত ওলটপালট। প্রারম্ভিক ভালোবাসা-বাসির পর যখন সময় এসেছে নিজেকে দৃঢ় করার, ঠিক তখন, ঠিক তখনই ঢিমে হয়ে গিয়েছিল তার কামনার আগুনের আঁচ। শিথিল হয়ে গিয়েছিল তার পৌরুষ। পুরোপুরি অবশ হয়ে গিয়েছিল সে। হে ধরণী দ্বিধা হও দশা তখন তার। লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিল প্যাংকুটু। মুখ লুকোবার জায়গা খুঁজে পাচ্ছিল না। গোটা ঘটনাটা বুঝে উঠতে সময় লেগেছিল সেমইয়াংয়ের। বড় একটা শ্বাস গোপন করে নিজের পোশাক পরে নিয়েছিল দ্রুত। মাটিতে ছড়িয়ে থাকা অন্তর্বাস জিনস গেঞ্জি জ্যাকেট কুড়িয়ে নিতে নিতে প্যাংকুটু সেমইয়াংয়ের চোখের দিকে না তাকিয়ে বলেছিল, সরি। আমি অ্যাম রিয়্যালি সরি। চরম সময়ে এই শীতলতা একজন পুরুষের কাছে কতখানি অগৌরবের তা যে জানে সে-ই জানে। যেন কিছুই হয়নি এমন করে সেমইয়াং বলেছিল, আমাদের ফিরতে হবে। চলুন স্যার, লাঞ্চের সময় হয়ে গেল।

আকাশে মেঘের আনাগোনা। এতটাই নিচ দিয়ে মেঘের দল যাচ্ছিল যেন হাত দিয়ে ছোঁয়া যায়। পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে নেমে আসতে আসতে মেঘগুলো দেখছিল প্যাংকুটু। তার মনের আকাশেও এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছিল বিষাদমেঘ। এক একটা দিন মানুষের জীবনে আসে যেদিন সব এলোমেলো হয়ে যায়। এতদিন ধরে নিজেকে একরকম জানার পর যখন কেউ উপলব্ধি করে যে এতদিনের জানাটা ছিল সম্পূর্ণ ভুল, তখন সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ভেতরে ভেতরে। সে দিনই মনে মনে প্যাংকুটু স্থির করে নিয়েছিল, বিয়ে করবে না কখনও। আজীবন ব্যাচেলর থেকে যাবে। এই বিপন্ন লজ্জার মুখোমুখি দ্বিতীয়বার হতে চায় না সে।

সাকতেং ছেড়ে একদিন কলকাতায় ফিরে এসেছিল প্যাংকুটু। কোনও যোগাযোগ ছিল না নরবুর দুই মেয়ের সঙ্গে। সেমইয়াং কখনও কখনও তার কাছে ভেসে এসেছে নিদ্রাহীন রাতের জেগে দেখা স্বপ্নে। সে চেষ্টা করেছে সেদিনের ঘটনাটাকে মন থেকে মুছে ফেলতে। যেন এমন কিছু ঘটেইনি কখনও। তারপর গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনন্ত জলরাশি। তার রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি বেড়েছে। বাড়ির থেকে বিয়ের জন্য চাপ আসছে। কিন্তু কর্মব্যস্ততার দোহাই দিয়ে সেই চাপ এড়িয়ে যাচ্ছে প্যাংকুটু। শারীরিক মিলনের মুহূর্তে সে যে উত্থিত হতে পারে না তা এই পৃথিবীতে সেমইয়াং ছাড়া আর কেউ জানে না। প্যাংকুটু চায় না তার এই অপারগতার কথা আর কেউ জানুক।

সেদিন পাশাংয়ের মুখে সব শুনে বিস্মিত হয়েছিল প্যাংকুটু। দুই যমজ বোনের মধ্যে ওয়াংমোর ছিল টিনসেল টাউনে নামার স্বপ্ন। যৌবনের রাজ্যে পা রাখার পর অনেক ছেলেমেয়েরই যেমনটা হয়ে থাকে। কিন্তু সেই স্বপ্ন কী করে সেমইয়াংয়ের ভেতর চারিয়ে গিয়েছিল কে জানে। সেই মেয়ে রঙিন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে গিয়ে স্বেচ্ছায় হারিয়ে গিয়েছে কলকাতার জনারণ্যে। পাশাং পড়েছে ঘোর মুশকিলে। তার শ্যালিকা স্বাধীনচেতা এক মেয়ে। প্রাপ্তবয়স্কা এক নারী স্বেচ্ছায় অন্য পুরুষের সঙ্গ করলে কিছু করার নেই। অতি কষ্টে ছুটি ম্যানেজ করে এসেছিল সে। তার ছুটি ফুরিয়ে এসেছে। এখন টুরিস্ট সিজন। হোটেলের ব্যবসাও মার খাচ্ছে তার অনুপস্থিতিতে। ওয়াংমো দুই বাচ্চা নিয়ে নাজেহাল, সব সামলাতে পারছে না একা হাতে। তাই শ্যালিকাকে ফিরে পাবার আশা ছেড়ে পাশাং ফিরে গিয়েছিল ভুটান।

দলের এক সাংসদের কথায় প্যাংকুটু পার্ক স্ট্রিট গিয়েছিল একজনের সঙ্গে দেখা করতে। ভদ্রলোকের ফিল্মের প্রোডাকশন হাউস ছাড়াও নানারকম ব্যবসা ট্যাবসা আছে। তিনি এবার চাইছেন উত্তরবঙ্গে গ্রিনউড নামে একটা চা বাগান কিনতে। তার কিছু টেকনিক্যাল জটিলতা আছে। সে ব্যাপারে প্যাংকুটুর সাহায্য চাই তাঁর। ফোনে কথা হয়েছিল দুজনের। পার্ক স্ট্রিটের এক ফুড জয়েন্টে লাঞ্চ করার কথা। নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছে প্যাংকুটু দেখল তার আগেই এসে পড়েছেন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই ভদ্রলোক। পাশে এক ঝাঁ চকচকে সঙ্গিনী। ফুলস্লিভ ক্যাজুয়াল সাদা শার্ট, ডেনিম জিনস, পায়ে চামড়ার জুতো, মাথায় রেশমের মতো একঢাল চুল, পীতাভ গায়ের রং, কপালে তুলে দেওয়া সানগ্লাস, মঙ্গোলয়েড চোখের হালফ্যাশনের সেই মেয়েটির দিকে তাকাতেই চোখ বিস্ফারিত হয়ে গিয়েছিল প্যাংকুটুর। অস্ফুটে বলে উঠেছিল, কী আশ্চর্য সেমইয়াং না!

তনুময় মিত্র একবার দেখছিলেন প্যাংকুটুকে একবার তাঁর সঙ্গিনীকে। প্যাংকুটুকে অবাক হয়ে বললেন, ডু ইউ নো হার?

উত্তর দেবে কী, প্যাংকুটু তখন বিস্মিত হয়ে দেখছে যুবতীটিকে। মাঝে কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। সাকতেং গ্রামের সেই ছিপছিপে তরুণী এখন পূর্ণ যুবতী। তার উপস্থিতি চারদিক যেন আলো আলো করে দিয়েছে। সেই সৌন্দর্যের ছটা এতটাই প্রখর যে, একবার তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। তাকে দেখে সেমইয়াংয়ের চোখেও বিস্ময় ফুটেছে। প্রাথমিক অভিঘাত সামলে বলল, হোয়াট আ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ! স্যার, হাও ডু ইউ ডু?

রাজনীতির মানুষদের মুখেচোখে অভিব্যক্তি সহজে ফোটে না। আনন্দ হতাশা ক্রোধ লজ্জা যে কোনও অনুভূতিতেই তাঁদের মুখে একই পাথুরে এক্সপ্রেশন। কিন্তু মঙ্গোলয়েড মুখের এই যুবতীটিকে দেখে পুরোপুরি হাঁ হয়ে গেছে প্যাংকুটু। স্মৃতির অতল থেকে ভেসে আসছে একের পর এক ছবি। টিনের তোরঙ্গে রাখা সুখস্মৃতির ন্যাপথলিন ন্যাপথলিন গন্ধ নাকে আসছে তার। সাকতেং গ্রামে কাটানো কত যে মুহূর্ত লেপটে আছে এই মেয়েটির সঙ্গে! তার অগৌরবের ইতিহাস, তার ব্যক্তিগত বিষাদের কথা এই মেয়ে জানে। নিজেকে সামলে নিতে নিতে প্যাংকুটু বলল, আয়্যাম ডুইং ওয়েল। হোয়াট অ্যাবাউট ইউ? ক্যায়সি হো তুম?

সেমইয়াং একবার পাশে বসা তনুময়ের দিকে আড়চোখে তাকাল। স্থির দৃষ্টি রাখল প্যাংকুটুর মুখে। তার উদ্দেশে বলল, স্যার, আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। ইটস ইমপরট্যান্ট। অ্যান্ড প্রাইভেট অ্যাজ ওয়েল।

২৩

মানুষ তো মাঝেমাঝে সিংহ হয়ে উঠতে চায়

জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য বলতে চায় যাত্রার ঢঙে

মানুষ তো মাঝে মাঝে ট্রেকিং-এ যায় নন্দাঘুন্টি কিন্নর

তেমনি এসেছিলে তুমি

আমার বেপরোয়া বেহিসেবী উড়নচণ্ডী পাহাড় জুড়ে

আবার তাঁবু গুটিয়ে কখন ফিরেও গেছ

ঘরে

সমতলে

নিরামিষ মাছের ঝোল ইসবগুল আর বউ-য়ের কোলে

বেহিসেবের প্যারা গ্লাইডিং

ভয়ে ভয়ে দু-একটা দিন

(গুরুপাকে চশমামার্কা অম্লজীন সহযোগে)

কবিতার নাম ট্রেকিং। অঞ্জনা চক্রবর্তীর কবিতা। কী বলছে কবিতাটি? লোকে যেমন ট্রেক করতে যায় কয়েকটা দিনের জন্য, এই প্রেম হয়তো অন্যজনের কাছে ছিল তেমনই। শুধুই কয়েকটি দিনের ছুটি কাটানোর জায়গা। একটু অ্যাডভেঞ্চারাস ছুটি কাটানো। তার পর সে তার নির্দিষ্ট আশ্রয়ে ফিরে গেছে। নারী-হৃদয় বুঝতে পারছে বড় ভুল করে ফেলেছিল সে। তার তীব্র শ্লেষ আর দ্রোহ লুকিয়ে আছে কবিতাটির পঙতিতে পঙতিতে। কবিতাটি সকালে পড়েছিল, এখনও মাথার মধ্যে নিয়ে বসে আছে মুকুট, লাইনগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।

বাংলোর সামনে মরশুমি ফুলেরা যেন রঙের দাঙ্গা বাঁধিয়ে দিয়েছে। সবসময়ের দু’জন মালি দেখভাল করে এই ফুলবাগানের। ভেতরদিকে আছে রকমারি ফলের গাছ। যে কোনও সিনিয়র ম্যানেজারের বাংলো যেমন হয়, স্বস্তিশোভনের কোয়ার্টারসেও ফুটবল খেলা যায়, এতটাই বড় বড় ঘর। স্বস্তিশোভন আর অভয়া, দুটি মাত্র প্রাণী থাকেন এই বাংলোয়। এদিকে ঘর পাঁচখানা। এতগুলো ঘর ব্যবহারই হয় না। দোতলার দক্ষিণমুখী ঘরটায় আলো হাওয়া খেলে ভালো। মুকুটের জন্য আলাদা করে রাখা। ছুটিছাটায় মুকুট এলে এই ঘরটাই হয় তার সে সময়ের ঠিকানা।

প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। সামনের সপ্তাহে ট্রেক করতে যাওয়া হবে নেপালে। চিত্রাঙ্গদা চলে এসেছে মানালি থেকে। এয়ারপোর্ট থেকে তাকে এই চা বাগানে নিয়ে এসেছে রঙ্গিত আর মুকুট। মুকুটের মনের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা। শুধু চিত্রাঙ্গদা নয়, রঙ্গিতও যাচ্ছে তাদের সঙ্গে। পোখরা থেকে তাদের দলে যোগ দেবে গাইড কাম পোর্টার ভীমবাহাদুর। ঠিক হয়েছে মুকুট ট্রেক করে ফিরে আসার পর ক’দিন বিশ্রাম নেবে। তার পর চলে যাবে বেঙ্গালুরু। কর্কটরোগের সঙ্গে সহবাস করতে হয়েছে দীর্ঘ একটা সময়। ফলে পড়াশোনা হয়নি। এমবিএ-টা নিয়ে এবার উঠেপড়ে লাগতে হবে।

মুকুটের সাউথফেসিং ঘরটায় সন্ধেবেলা বসেছে জোর আড্ডা। অভয়া মাংসের কচুরি নিয়ে এসেছেন বানিয়ে। দুধ চা আর গরম গরম কচুরি খেতে খেতে কথা চালাচালি হচ্ছে। চিত্রাঙ্গদা আর মুকুট বকবক করছে বেশি। রঙ্গিত শ্রোতার ভূমিকায় আছে। সারাদিন অফিস করে পোশাক পাল্টে চলে এসেছিল রঙ্গিত। এক সপ্তাহ বাদেই ট্রেক করতে যাওয়া। ট্যুর সংক্রান্ত আলাপ আলোচনা চলছে। হিন্দি আর ইংরেজিতে কথা হচ্ছে। তবে চিত্রাঙ্গদা আধো আধো বাংলা বলতে শিখেছে। মাঝেমধ্যে চিত্রাঙ্গদা বাংলা বলার চেষ্টা করছে। খুব মিষ্টি লাগছে শুনতে।

সাংবাদিকদের মতো একটা কাল্পনিক বুম হাতে নিয়ে রঙ্গিত চিত্রাঙ্গদার কাছে জানতে চাইল, এই যে তুমি পাহাড়ে ট্রেক করতে যাও বারবার, এই গভীর টানের উৎস ঠিক কী?

চিত্রাঙ্গদা বলল, ধরে নাও সেটা অপার্থিব সৌন্দর্য। ওই নীল পাহাড়, বুনো গন্ধমাখা পাহাড়ি জঙ্গল, নানারকম চরিত্রের মানুষজন, অজানা অচেনা গাছপালা, নানা রঙের পাখি আমাকে টানে। আর কী টানে জানো? অখণ্ড নিস্তব্ধতা। এই নিস্তব্ধতার রকমটাই আলাদা। তাছাড়া যখন ভাবি টেথিস সাগর থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের সবচাইতে উঁচু পাহাড়ের চুড়োগুলি তখন বিস্ময়ের শেষ থাকে না। আমি তো পাহাড়েরই মেয়ে। মানালি আমার হোমটাউন। ছোটবেলায় দেখতাম ব্যবসার কাজ সামলেও বাবা আমার মাকে নিয়ে অমরনাথ, কেদারনাথ যাচ্ছেন। ছোট বলে আমি সুযোগ পেতাম না। গ্র্যাজুয়েট হবার পর এক বন্ধুকে নিয়ে আমি অমরনাথ যাই। আর সেখানেই আমি পাহাড়ের প্রেমে পড়ে যাই।

রঙ্গিত বলল, তোমাদের ওদিকে ভদ্রকালী পদাতিক ক্লাব আছে না?

চিত্রাঙ্গদা বলল, আছে তো। সেখান থেকেই আমি সরকারি প্রশিক্ষণ নিই। তারপর বেশ কিছু ছোটখাট পাহাড়ে চড়েছি। কী জানো, ক্লাইম্ব করা খুব কঠিন। রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং জব। ট্রেকিং সে তুলনায় সহজ। আমার ট্রেক করতেই বেশি ভালো লাগে।

রঙ্গিত তার হাতে ধরা নকল বুম মুকুটের মুখের সামনে ধরে বলল, এবার আপনি বলুন ম্যাম, পাহাড় আপনাকে কেন টানে?

মুকুট হাসিমুখে বলল, যারা পাহাড়ে চড়েন তাঁরা বলেন, ক্লাইম্ব দ্য মাউন্টেন উইথ জয়। বেদবাক্যের মতো এই কথাটাই আমাকে মোটিভেট করে। আমি ক্লাইম্ব করিনি কখনও। দু’বার ট্রেক করেছি। একবার তো মাঝপথ থেকে ফিরেই এসেছি অসুস্থ হয়ে, তুমি জানো ভালো করে। সেই ঘটনার পর দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি বাড়ি আর হাসপাতালে ছুটোছুটি করে। কিন্তু কয়েকবার পাহাড়ে গিয়ে একটা জিনিস ভালো করে বুঝেছি, প্রত্যেক পাহাড়ের একটা নিজস্ব গরিমা আছে।

রঙ্গিত সায় দিয়ে বলল, সেটা ঠিক। খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় এক পাহাড় পাশের পাহাড় থেকে আলাদা।

মুকুট বলল, গতবারের অসমাপ্ত অভিযান আমাকে যন্ত্রণা দিয়েছে খুব। মনে হয়েছে আবার নতুন করে যদি শুরু করা যায়। যদি ঘাচোক থেকে ট্রেক করে উঠতে উঠতে যাওয়া যায় ছিমছিমলে খরকায়। কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না একেবারে। দেন ইভেনচুয়ালি আই মেট ইউ। তুমিই আমাকে মোটিভেট করেছ। সেই সিমেটারির অভিজ্ঞতা আমার জীবনদর্শন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এই যে আবার নতুন করে পাহাড়ে ট্রেক করতে যাব বলে ভাবছি, তার ক্রেডিট গোজ টু ইউ।

রঙ্গিত মুকুটের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি মেন্টাল এবং ফিজিক্যাল—দুই অ্যাসপেক্টেই ফিট। কাজেই আর পাঁচজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ যদি ট্রেক করতে পারে তবে তুমিও পারবে। তোমার বুকের ভেতর যে সাহসের বেলুনটা আছে ওটা চুপসে গিয়েছিল। আমি সেটা ফুলিয়ে দিয়েছি শুধু। তার বেশি কিছু নয়।

মুকুট রসিকতা করে বলল, তুমি ক্রেডিট নেবে না তাহলে?

রঙ্গিত হাসল, বহু পর্যটক বা সাধুসন্ন্যাসী বিনা প্রশিক্ষণে, বিনা গাইডে, খালি পায়ে হেঁটে পাহাড় পর্বতে কতই না দুর্গম পথ অতিক্রম করেছেন। তুমি তো আর মাউন্টেন ক্লাইম্ব করতে যাচ্ছ না, আমাদের রাজ্যের পিয়ালি বসাকের মতো এভারেস্ট চুড়োতেও অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়া যাচ্ছ না। তুমি যাচ্ছ ছিমছিমলে খরকার মতো একটা অফবিট রুটে ট্রেক করতে। সেখানে অক্সিজেন সিলিন্ডার তো বটেই ক্লাইম্ব করার দড়ি, গাঁইতি এসবও লাগে না। তাহলে ট্রেক করতে পারবে না কেন, নিশ্চয়ই পারবে। আমি আনকোরা হয়েও তোমাদের সঙ্গী হতে চেয়েছি এই কারণেই।

চিত্রাঙ্গদা বলল, আমাদের ট্রেনিংয়ের সময়েও ঠিক এই কথাটাই বলা হয়। হিমালয়ের পথে পথে সাধুসন্তদের দেখে, বিশেষ করে তাঁদের কৃচ্ছসাধন আমাদের সাহস যোগায়। দুর্গম পাহাড়চুড়ো অভিযানকে সহজভাবে নিতে শেখায়।

গল্পে গল্পে সময় গড়াচ্ছিল। অভয়া এলেন আর এক রাউন্ড চা নিয়ে। মুকুটকে বললেন, তোদের ট্রেক করতে যাবার উত্তেজনা দেখে আমার খুব অবাক লাগছে। মনে হচ্ছে কী এমন সে, যার জন্য মানুষ এভাবে করে আকুল হয়? সে কি শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির ডাক? যে বাঁশির ডাক শুনে রাধা নেমে আসতেন পথে পাগলপারা হয়ে?

মুকুট বলল, জড়ায়ে আছে বাধা, ছাড়ায়ে যেতে চাই / ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে / মুক্তি চাহিবারে তোমার কাছে যাই, / চাহিতে গেলে মরি লাজে। ওই যে কবিতায় আছে না কথাটা, এটাও ঠিক তাই। মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করছে আমাদের। কেউ যেন একটা পর্দা দিয়ে রেখেছে সামনে। পর্দা সরিয়ে সামনে না যাওয়া অবধি শান্তি নেই। যে পথে মানুষ বেশি পা রাখেনি যেতে হবে সেই পথ মাড়িয়ে। শুকনো পাতা ভেঙে এগিয়ে যেতে হবে। পায়ের চাপে পাতা গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যাওয়ার শব্দটা আমার কানে মিষ্টি লাগে। খুব মিস্টকও। সেই শব্দটা আবার শুনব বলেই তো যাচ্ছি ট্রেক করতে।

রঙ্গিত বলল, তুমি কবিতা ভালোবাসো বলেই এমন করে বলতে পার। নাহ্ রাত হল অনেক। এবার উঠতে হবে আমাকে।

অভয়া বললেন, আর একটু বোসো। চিত্রাঙ্গদার অনারে আজ সর্ষে শাক করেছি। সেই সঙ্গে মাংসের একটা হিমাচলি প্রিপারেশন। রয়েছে কড়াই পনির। একসঙ্গে ডিনার করব আজ। তুমি খেয়ে যাও।

অগত্যা বসে পড়ল রঙ্গিত। নতুন করে আবার শুরু হল আড্ডা। হাঙ্গেরির তিহানি শহরে রেকাকে ধরা হল হোয়াটস অ্যাপ কল করে। রেকার সঙ্গে রঙ্গিতের পরিচয় করিয়ে দিল মুকুট। মেঘদুয়ার চা বাগানে ফোনের নেটওয়ার্ক ততটা ভালো নয়। লাইন কেটে যাচ্ছিল বারবার। তবুও মহা উৎসাহে রেকার সঙ্গে হই হই করে গল্প করছিল চিত্রাঙ্গদা আর মুকুট। রেকা নিজে এবার যাচ্ছে আল্পস পাহাড়ের দিকে। সেই নিয়ে সে ব্যস্ত। মুকুটকে শরীরের যত্ন নিতে বলে তাদের আসন্ন ছিমছিমলে খরকা ট্রেকিং অভিযানের জন্য উইশ করল রেকা।

শান্ত পায়ে ঘরে এসেছেন স্বস্তিশোভন। অফিসের কেজো পোশাক নয়, পাজামা পাঞ্জাবি পরে আছেন। গায়ে পাতলা একটা চাদর। কুশন দেওয়া সেগুন কাঠের ঢাউস চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসলেন তিনি। মুকুটের উদ্দেশে বললেন, তোদের হইচই দূর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম। কী নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে শুনি?

মুকুট বলল, নেক্সট উইকে আমাদের ট্রেকিং শুরু। সেসব নিয়েই গপ্পো হচ্ছে আর কী। কথা হচ্ছিল হিমালয়ের টান নিয়ে। তুমি তো জানো বাবা, আমি ছোটবেলা থেকেই পাহাড় ভালোবাসি। হিমালয়ের টান আমার কাছে অমোঘ। আমি যে সময়টা হাসপাতাল আর বাড়ি করে কাটিয়েছি তখনও ঘুমের মধ্যে হিমালয় আমাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে। যত দিন যাচ্ছে সেই টান বাড়ছে। কী যে আছে হিমালয়ের মধ্যে কে জানে!

চিত্রাঙ্গদা বলল, হিমালয় তো আর যে সে কথা নয়, প্রাচীন সাহিত্যে সে হিমবন্ত নামে পরিচিত। পালিতে হিমভ। সংস্কৃতে হইমবন্ত। আবার কালিদাসের কুমারসম্ভবে নগাধিরাজ। হিমালয়ের ব্যাপারটাই আলাদা।

স্বস্তিশোভন কথার ধরতাই ধরে নিলেন। চাদরটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বললেন, আমাদের অথর্ব আর ঋক বেদেও একই নাম। সংহিতা, তন্ত্র ও পুরাণে হিমালয় হল পর্বতের রাজা। রঘুবংশের রঘু হিমালয় আরোহণ করেছেন। মার্কণ্ডেয় পুরাণে হিমালয়ের আকৃতিকে বলা হয়েছে ধনুকের মতো। হিমালয় মাউন্টেন রেঞ্জের ছোট কোনও পাহাড়ে ট্রেক করতে গেলেও রোমাঞ্চ হওয়াই স্বাভাবিক। নেহাত বুড়ো হয়েছি নইলে আমি নিজেও তোদের দলে ভিড়ে যেতাম।

রাতের আহার চলছে। চিত্রাঙ্গদাকে চিকেনের দুটো টুকরো দিয়ে অভয়া এবার রঙ্গিতকে নিয়ে পড়েছেন। আর এক হাতা পনির নেবার জন্য সাধাসাধি করছেন অভয়া। রঙ্গিত না না করছে। সেদিকে তাকিয়ে স্বস্তিশোভন বললেন, রঙ্গিতকে বেশি করে খাইয়ে দাও। এই বাগানে ও কিন্তু বেশিদিন নেই।

মুকুট সপ্রশ্ন চোখে তাকাল রঙ্গিতের দিকে। অবাক হয়ে বলল, মানে?

স্বস্তিশোভন বললেন, আমি ভেবেছিলাম তুই বোধহয় খবরটা জানিস।

মুকুট রঙ্গিতের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, কী খবর?

রঙ্গিত আলগা হেসে বলল, আমার পুরনো কোম্পানি থেকে মেইল করে চিঠি পাঠিয়েছে। কোম্পানি একমাসের মধ্যে কলকাতার সেক্টর ফাইভের অফিসে জয়েন করতে বলেছে। স্যালারি, পার্কস বেশ ভালো। খুব শিগগিরি একটা প্রোজেক্টের কাজে বছর দুই-তিনের জন্য ওরা আমাকে ব্রাজিল পাঠাবে বলছে।

মুকুটের মুখে কি ধূসর একটা ছায়া ঘনাল? স্থির চোখে রঙ্গিতকে দেখতে দেখতে বলল, আমরা এতক্ষণ ধরে আড্ডা দিচ্ছিলাম, তুমি এসব কথা ঘুণাক্ষরেও বলোনি তো!

রঙ্গিত অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, ট্রেক করে ফিরে আসার পরই কথাটা জানাব তোমাকে এমনই ভেবে রেখেছিলাম।

মুকুটের মুখে অভিমান আর রাগ এক্কাদোক্কা খেলছে। কেটে কেটে বলল, তোমার ভালো খবর শুনে আমি খুশি হব না ভেবেছিলে বুঝি?

রঙ্গিত বলল, এমন করে কেন বলছ! আমার যে কোনও সাফল্য তো তোমারও সাফল্য।

মুকুট ভ্রূভঙ্গি করে বলল, তোমার সাকসেস যদি আমারও সাকসেস হয় তাহলে তো তোমার এই ভালো খবরটা আমাকেই প্রথম জানানো স্বাভাবিক ছিল, তাই না?

রঙ্গিত দুর্বল হেসে বলল, সেন্টি দিও না তো। আমি তো কালই বাক্সপ্যাটরা নিয়ে চলে যাচ্ছি না। এখনও ফাইনাল ডিসিশন নিইনি। অফারটা লুক্রেটিভ, আপাতত এটুকুই বলতে পারি। তাছাড়া যে বিষয় নিয়ে আমি পড়াশোনা করেছি সেই ইঞ্জিনিয়ারিং স্কিল অ্যাপ্লিকেশনের একটা সুযোগ পাওয়া যাবে সেখানে
গেলে।

মুকুট নিরুত্তর। দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। চোয়াল শক্ত। সকালে পড়া ট্রেকিং নামের কবিতাটা ফিরে ফিরে আসছে মাথার মধ্যে। রঙ্গিত কি তবে তার জীবনে এসেছিল মাত্র কয়েকটা দিনের জন্য? লোকে ট্রেকিং করতে পাহাড়চুড়োয় যেমন যায়? তার গলার কাছে একটা নীলচে শিরা দপদপ করছে। রঙ্গিত জানে মুকুট কোনও কারণে ভীষণ রেগে গেলে এমন হয়। ঘরে অস্বস্তিকর একটা নীরবতা নেমে এসেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য চিত্রাঙ্গদা বলল, কনগ্রাচুলেশনস ডিউড! তা তুমি সেই কোম্পানিতে কবে জয়েন করছ?

রঙ্গিত হালকা গলায় বলল, কিছুই ঠিক করিনি এখনও। আগে ভালোয় ভালোয় ট্রেক করে ফিরি, তার পর ওসব নিয়ে ভাবব। কোম্পানি আমাকে একমাস সময় দিয়েছে। সেটা তো খুব কম সময় নয়। এখনই অত তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই।

মুকুট একটা শ্বাস গোপন করে অস্ফুটে বলল, বুঝলাম।

চেয়ার টেনে উঠে পড়ল রঙ্গিত। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ওয়াশরুমের দিকে। বেসিনে সাবান দিয়ে হাত ধুতে ধুতে রঙ্গিত বুঝতে পারছিল এই ঘরের সবগুলো চোখ এখন তার পিঠের ওপর স্থির হয়ে আছে।

২৪

হেমন্তের আকাশ ভেঙে নেমেছে শীত। গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে কোয়ার্টার্সের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন ডক্টর নন্দগোপাল শর্মা। কুয়াশা ঘিরে রেখেছে মেঘদুয়ার চা বাগানটাকে। দৃষ্টিসীমার পরিধি বেশি দূর যাচ্ছে না। রাতজাগা কোনও পাখি তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকছে। উৎসুক হয়ে পাখিটাকে খোঁজার চেষ্টা করলেন ডক্টর শর্মা। দেখতে পেলেন না। এই চা বাগানে এখন শীত দাঁতনখ বের করে ফেলেছে। রঙ্গিত আর মুকুটরা যেখানে ট্রেক করতে গেছে সেই নেপালের পাহাড়ের মতো হাই অল্টিটিউডে এখন শীতের প্রকোপ কতটা সেটাই মনে মনে আন্দাজ করার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

নন্দগোপাল শর্মার জন্মকর্ম কলকাতা হলেও তাঁদের আদি বাড়ি বিহারের বেগুসরাইতে। সেখানেই থাকে জ্ঞাতিরা সকলে। তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন। বয়স যখন কম ছিল তখন কয়েকবার ট্রেক করেছেন কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে। সান্দাকফু ফালুট রুটেই গেছেন দু’বার। বক্সার ওদিকে চুনাভাটিতে গিয়েছেন একবার। তাঁর মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগত, যারা ট্রেক করে কী উদ্দেশ্য থাকে তাদের, নিজের ক্ষমতার সীমাকে অতিক্রম করে যাওয়া? প্রকৃতির ছুড়ে দেওয়া কঠিন ও কঠোর চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করা?

মুকুটকে নিয়ে বৃন্দার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই কথা হয় তাঁর। মুকুট একটা বড় বিপদ কাটিয়ে উঠেছে। আগের বারের অসমাপ্ত অভিযান সে শেষ করতে চায়। সেটা তার নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। নিজের শারীরিক আর মানসিক শক্তিকে যাচাই করে নেবার সুযোগ এটা। বৃন্দাও প্রশংসা করেন মুকুটের। বলেন, একজন সত্যিকারের ট্রেকার তো এমনটাই হবে। দ্যাট শুড বি দ্য স্পিরিট। বয়সে অনেক ছোট মেয়েটির জন্য মনে মনে টুপি খোলেন বৃন্দা এবং ডক্টর শর্মা।

কিন্তু রঙ্গিত তো সেভাবে ট্রেক করেনি আগে। তাহলে কেন সে এতটা বিপদসংকুল পথে যেচে চলে গেল ট্রেকিং করতে? ডক্টর শর্মার প্রশ্নে রঙ্গিত একবার বলেছিল, উদ্দেশ্যহীনতাই নাকি তার ট্রেক করতে যাওয়ার উদ্দেশ্য। কোনও উদ্দেশ্যর হাত ধরেই সে বাঁচতে চায় না। কেননা উদ্দেশ্য শব্দটার গায়ে কেমন যেন স্বার্থপরতার আঁশটে গন্ধ জড়ানো থাকে। আমাদের সমাজে শিশুকাল থেকেই সকলে তার প্রতিটি পদক্ষেপ করে এক বা একাধিক বিশেষ উদ্দেশ্যে। সেই সব উদ্দেশ্যর মধ্যে প্রধান হল অর্থ উপার্জন। জীবনের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা হল অর্থবান, এবং আরও অর্থবান হওয়া। কোটিপতি হয়েও খুশি নয় মানুষ। তার তখন চাই একশো কোটি। এই খিদের, এই জাগতিক আকাঙ্ক্ষার বুঝি কোনও শেষ নেই।

স্বার্থপরতার চশমা চোখে এঁটে তিনি জীবনটাকে দেখেন না। অর্থবান হওয়াই যদি তাঁর উদ্দেশ্য হতো তাহলে আজ তাঁর স্থান মেঘদুয়ার চা বাগানের হাসপাতালে হতো না। তিনি এমনিতে সুখী। একমাত্র মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন, মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবার পর তার বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। যা মাইনে পান তা দিয়ে তাঁর আর বৃন্দার দিব্যি চলে যায়। কিন্তু তাঁর অধীত বিদ্যা প্রয়োগ ঘটাবার সুযোগ এমন হাসপাতালে থাকে না বড় একটা। সেটাই ডাক্তার হিসেবে তাঁর একমাত্র খেদ। বয়স বেড়েছে। জীবনের অভিজ্ঞতাও বেড়েছে সেই সঙ্গে। এই বয়সে এসে তিনি বোঝেন, জীবন মানেই এক দুর্লঙ্ঘ পাহাড়। প্রতিটি মানুষই সেই অর্থে ট্রেকার। খাড়া পথ ধরে হেঁটে ওপরে ওঠাই মানুষের ধর্ম। চড়াই পথের শেষে, একেবারে তুঙ্গে, প্রতিটি মানুষের জন্যই অপেক্ষা করে আছে একটা করে ব্রহ্মকমল ফুল। রূপে গন্ধে বর্ণে অনন্য সেই স্বর্গীয় ফুলের কাছে পৌঁছনটাই মানবজীবনের নিয়তি। কেউ কেউ সেই ফুলের হদিশ পায়। কেউ সারাজীবনেও খোঁজ পায় না।

ঠান্ডাটা বাড়ছে। জোর একটা হাওয়া চা বাগানের ওদিক থেকে উঠে আসছে তাঁর কোয়ার্টার্সের দিকে। কনকনে হাওয়াটার মধ্যে ধার আছে বেশ। এদিকে বৃন্দা অনেকক্ষণ ডাকছেন ভেতর থেকে। খাবার দেওয়া হয়েছে টেবিলে। চাদর ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বারান্দার দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। একটা শ্বাস গোপন করে ভেতরের দিকে এগোলেন তিনি। রাতে স্বল্প আহার করেন। আজও ডিনার করে বিছানায় চলে গিয়েছিলেন। শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিলেন। শুয়ে শুয়ে শুনতে পাচ্ছিলেন বাইরে হইমন্তী হাওয়ার ফিসফাস। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছেন জানেন না। ঘুম ভাঙল কারও একটা গলার আওয়াজে। উঠে পড়লেন তিনি।

দরজা খুলে বারান্দায় এলেন ডক্টর শর্মা। দেখেন কাজিমল দাঁড়িয়ে আছে। ভুরু ধনুক হল তাঁর। হাসপাতাল থেকে কদাচিৎ কল বুক হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেস রেফার করে দিতে হয় মেডিক্যাল কলেজে। এই হাসপাতালে কিছুই করার থাকে না। তিনি চোখ কচলাতে কচলাতে জিগ্যেস করলেন, কী ব্যাপার! এত রাতে তুমি? কী হয়েছে কাজিমল? কোনও ইমারজেন্সি কেস এসেছে?

কাজিমল যেন বিরাট অপরাধ করেছে এমন একটা কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, আপনাকে একবার যেতে হবে হাসপাতালে। পেশেন্ট এসেছে স্যার। লেবার কেস। আপনাকে বীথিদিদি ডাকছে।

ডক্টর শর্মা ভুরু কুঁচকে বললেন, কোন পেশেন্ট এল এত রাতে?

কাজিমল বলল, সরসতিয়া।

ডক্টর শর্মা অবাক হয়ে বললেন, সে কী! তার তো এখনও সময় হয়নি! বীথি আর অলকা পালা করে নাইট ডিউটি করেন। আজ তার মানে বীথির ডিউটি। বিছানার উষ্ণতার মায়া ত্যাগ করে মানুষটি কেজো পোশাক পরে নিলেন। হাতের আঙুল চালিয়ে এলোমেলো চুল ঠিক করে নিতে নিতে ডক্টর শর্মা বললেন, তুমি এগোও, আমি আসছি।

বৃন্দা সুখনিদ্রা দিচ্ছিলেন। তাঁকে ঘুম থেকে তুলতে হল বাধ্য হয়ে। পোশাক বদলে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে হাসপাতালে পৌঁছলেন ডক্টর শর্মা। গিয়ে দেখেন বীথি উদ্বিগ্নমুখে দাঁড়িয়ে আছেন বারান্দায়। ডাক্তারবাবুকে দেখে যেন তাঁর দুশ্চিন্তা দূর হল। কেজো গলায় বললেন, স্যার লেবার রুমে চলুন শিগগিরি।

ডক্টর শর্মা কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, কী হয়েছে? মাঝরাত্তিরে এমন জরুরি তলব?

বীথি গলায় বিরক্তি মিশিয়ে বললেন, দাইমার জন্য এমন হয়েছে। মেয়েটাকে বাড়িতে ফেলে রেখে দিয়েছিল অনেকক্ষণ। সেখানেই ডেলিভারি করানোর চেষ্টা করেছিল। কিছু কমপ্লিকেসি চলে আসায় শেষ অবধি ডেলিভারি করাতে পারেনি। এখন পেশেন্টকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। কেস কিন্তু ক্রিটিকাল স্যার।

ডক্টর শর্মা হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন ঘরে। সরসতিয়ার গায়ের রং আষাঢ় মাসের মেঘের মতো কালো। যন্ত্রণায় মেয়েটার মুখ নীলচে হয়ে গেছে। কথা বলতে পারছে না এতটাই ব্যথা। সরসতিয়ার চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক নয়। তার ওপর দিয়ে যে ঝড় চলে গেছে গত কয়েক মাস ধরে, তার পর মাথার সুস্থতা থাকাও সম্ভব নয়। ডক্টর শর্মা পেশেন্টকে জরিপ করে নিচ্ছেন ডাক্তারি চোখে। বীথি অভিজ্ঞ নার্স। তিনি ঠিকই আঁচ করেছেন। বাচ্চার মাথা ফুলে গেছে। অন্তত আট ঘণ্টা আটকে না থাকলে বাচ্চার মাথা এতটা ফুলত না।

পেশেন্টের বেডের পাশে দাঁড়ানো মহিলা বলল, ডাগদারসাব, আমার মেয়েকে আপনি বাঁচিয়ে দিন। আপনি যা বলবেন আমি তাই করব। আপনার কেনা বাঁদি হয়ে থাকব।

দাইমার দিকে অপলক চোখে তাকালেন ডক্টর শর্মা। গুণবালা শুকনো মুখে দাঁড়ানো। ঝড়ে ভেঙে পড়া গাছের মতো শুকনো চেহারা। কান্নাভেজা গলায় বলল, ডাগদারসাব, কেউ শুকরার মারা যাবার খবরটা দিয়েছিল সরসতিয়াকে। পাগল কা মাফিক কাঁদছিল ঘরের দাওয়ায় এসে। কাঁদতে কাঁদতেই মাটিতে পড়ে গিয়েছিল মাথা ঘুরে। তখনই জল ভেঙে গিয়েছিল। আমি চেষ্টা করেছিলাম বাড়িতে। কিন্তু দেখলাম আমি পারব না। আপনি যা করার করুন ডাগদারসাব।

ডক্টর শর্মার রাগ হয়ে গেছে খুব। গলা চড়িয়ে বললেন, যা করার করুন মানে? আপনি তো পেশেন্টকে শেষ করেই এনেছেন। আমি বুঝতে পারছি আপনি সরসতিয়াকে বাড়িতে রেখে নিজের মতো করে অনেকক্ষণ চেষ্টা করেছেন। আপনি তো নাদান নন, বুঝতে পেরেছেন যে কেসটা গণ্ডগোলের। তাহলে এত দেরি করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন কেন?

দাইমা অপরাধীর মতো মুখ করে বলল, আমি বুঝতে পারিনি যে বাচ্চার মাথাটা ঠিকঠাক নেই। বের করার সময় দেখলাম মাথাটা বাজেভাবে ঘুরে আটকে আছে। সিজার না করলে হবে না। সেজন্য বিপদে পড়ে এখানে নিয়ে এসেছি। ডাগদারদাব, আপনার পায়ে পড়ি, আপনি যা হয় কিছু একটা করুন।

বীথি বুঝিয়ে বললেন, আপনি নিজেও জানেন ব্যাপারটা। সিজার করলেও বাচ্চা খারাপ বেরোবার ভয় আছে। তখন ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট লাগবে। সেই সুবিধে তো এই হাসপাতালে নেই। আপনি সরসতিয়াকে শহরে নিয়ে যান। সেখানে নিওনেটাল কেয়ার ইউনিট আছে। বাচ্চা ওখানে ভালো থাকবে।

দাইমা ভেঙে পড়েছে এবার। এগিয়ে এসেছে ডক্টর শর্মার দিকে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ডাগদারসাব, এখান থেকে তিন ঘণ্টা দূরে শহরের হাসপাতাল। রাস্তাও খুব খারাপ। যেতে গেলে পথেই শেষ হয়ে যাবে বাচ্চাটা। সরসতিয়ার প্রাণটাও বাঁচবে না। ওরা দুজনে বাঁচুক মরুক, আপনার হাতেই যা হবার
হোক।

ডক্টর শর্মা নীচের দাঁত দিয়ে ওপরের ঠোঁট কামড়ে থাকলেন একটুক্ষণ। মনে মনে একটা জরুরি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। বীথিকে কেজো গলায় বললেন, ওটি রেডি করুন সিস্টার। ফরসেপ হবে পেশেন্টের।

বীথি বহুদিন ধরে চেনেন ডক্টর শর্মাকে। তাঁর রকমসকম জানেন ভালো করে। এই মানুষটা অন্য ধাতু দিয়ে গড়া। তিনি দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন ওটির দিকে। ডক্টর শর্মা দাইমার উদ্দেশে বললেন, আপনি হাতমুখ স্যানিটাইজার দিয়ে ধুয়ে নিন। আমি চাই আপনিও থাকুন ওটিতে।

ডক্টর শর্মা দেখলেন সরসতিয়া শুয়ে আছে হাত পা শক্ত করে। মেয়েটার মনের জোর আছে। তিনি দেখলেন বীথি ভোকাল টনিক দিয়ে সরসতিয়ার সাহস বাড়াবার চেষ্টা করছেন। ঘাম দিচ্ছে একটু একটু। ডক্টর শর্মা ঈশ্বরের নাম নিয়ে নেমে পড়লেন কাজে। প্রথমেই দ্রুতহাতে ফরসেপ লাগিয়ে ফেললেন। প্রসবের দ্বার খানিকটা কেটে দিয়ে জায়গাটা প্রশস্ত করে ফেললেন চটপট। তাঁর ব্লাড প্রেশার বেশির দিকে। টেনশনে সেটা আরও বেড়েছে নিশ্চয়ই। এই শীতের মধ্যেও দরদর করে ঘাম দিচ্ছে শরীরে।

মিনিট বিশেক হবে হয়তো। সেটাই মনে হচ্ছে যেন অনন্ত সময়। দাঁতে দাঁত চেপে নিজের কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। এবার এসেছে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। নিজের ধৈর্যক্ষমতাকে শেষ সীমায় নিয়ে গেলেন ডক্টর শর্মা। ফরসেপ দিয়ে সদ্যোজাতকে বার করে আনলেন কিছুক্ষণের চেষ্টায়। ফুটফুটে এক পুত্রসন্তান। হাত-পা সব নীল হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে বীথি সাকার মেশিন দিয়ে পরিষ্কার করে ফেলেছেন বাচ্চাটার শ্বাসনালী। ডক্টর শর্মা নিজে শিশুটির বুকে চাপ দিয়ে হৃদপিণ্ড স্বাভাবিকভাবে চালু করার চেষ্টা করলেন কিছুক্ষণ। কোনও সাড়া আসছে না। নিস্তেজ হয়ে পড়ে রয়েছে বাচ্চাটা। তিনি টেনশনে ঠোঁট চাটলেন একবার। বীথির দিকে তাকালেন। তাঁর দু-চোখে অসহায়তা। তাঁর উদ্বেগ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে বাকিদের মধ্যেও। মনে হচ্ছে যেন কোনও রুদ্ধশ্বাস সিনেমা চলছে। বীথি চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেছেন। ডক্টর শর্মাকে দেখছেন অনিমেষ দৃষ্টিতে।

এত বছরের অভিজ্ঞতা বীথির, কত জটিল কেস দেখেছেন, জীবনমৃত্যুর পাশাখেলা দেখেছেন অগুনতিবার, সেই তিনি নিজেও যেন আজ নতুন করে বুঝতে পারছেন সারসত্য। কোনও ডাক্তার যখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে বসেন তখন তাঁর হুঁশ থাকে না। তিনি লড়াই করেন তাঁর সাধ্য অনুযায়ী। হাল ছেড়ে দিয়ে হারতে চান না কখনও। সেই যুদ্ধে প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার নিধিরাম সর্দার ডাক্তারের সঙ্গে ঝাঁ চকচকে নার্সিং হোমের ডাক্তারের কোনও ভেদাভেদ নেই। কেমন সেই অপারেশন থিয়েটারের পরিকাঠামো, কী নেই তাঁর হাতে সেসব নিয়ে তিনি ভাবেন না তখন। সেই ডাক্তার তখন তাঁর নিজের যাবতীয় জ্ঞান আর অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে নেমে পড়েন এক অসম যুদ্ধে। মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলতে বসেন মাথা ঠান্ডা রেখে। আপ্রাণ চেষ্টা করেন রুগিকে বাঁচানোর।

মুকুট আর রঙ্গিত গেছে ট্রেকিং করতে। দুর্লঙ্ঘ পাহাড় আরোহণ করে নিজের ক্ষমতাকে যাচাই করা তাদের উদ্দেশ্য। সেখানে যেমন যে কোনও মুহূর্তে সঙ্কট ঘনিয়ে আসতে পারে তেমনি ব্যবহারিক জীবনেও তৈরি হতে পারে ক্রাইসিস। যে কোনও মানুষ প্রথমে দিশাহারা হয়ে পড়েন এমন সময়। ডাক্তাররাও মানুষ। তাঁরাও প্রথমে বুঝে উঠতে পারেন না কী করবেন। কিন্তু লড়াকু মানুষের অ্যাড্রিনালিন হরমোন চাগিয়ে ওঠে সত্যিকারের বিপদের মুখোমুখি হলে। বীথির ট্রেকিং করার অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু এখন ঘামে জবজবে মানুষটাকে দেখে অকৃত্রিম শ্রদ্ধায় মাথা নত হল তাঁর। মনে হল সেই অর্থে ডক্টর শর্মাও একজন লড়াকু যোদ্ধা। জীবন যদি পাহাড় হয় তাহলে তিনিও একজন ট্রেকার।

দাইমা চোয়াল শক্ত করে এগিয়ে এসেছে। কোনও কথা না বলে হাত বাড়িয়ে দিল সিস্টারের দিকে। যন্ত্রের মতো শিশুটিকে নিয়ে নিল নিজের হাতে। অভিজ্ঞ হাতে পাম্প করতে শুরু করল সদ্যোজাত শিশুটির হৃদযন্ত্র। বেশ কিছুক্ষণ পাম্প করার পর শব্দ করে কেঁদে উঠল শিশুটি। পাখির বাচ্চার গলার আওয়াজ যেমন হয়, তেমনই দুর্বল কণ্ঠ। সেই ক্ষীণ শব্দ কানে আসায় ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল দাইমা, এতক্ষণ কষ্ট সহ্য করেও মুখে টুঁ শব্দটি না করা দাইমা। বীথি আর ডক্টর শর্মা নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে নিলেন একবার। দুজনেই স্বস্তির শ্বাস ফেললেন।

ডক্টর শর্মা খুলে ফেলেছেন অ্যাপ্রন। ধ্বস্ত হয়ে বসে পড়েছেন একটা চেয়ারে। তাঁর যে বুকপিঠ ঘামে ভিজে গেছে সেটা অনুভব করলেন এতক্ষণে। গুণবালা তামাং গুটিগুটি এগিয়ে গেছে তাঁর দিকে। কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে আছে তাঁর মুখের দিকে। চোখে চিকচিক করছে জল। ডক্টর শর্মা বীথিকে নির্দেশ দিলেন, সিস্টার, আপনি পেশেন্টের এপিসিওটমি উন্ড সেলাই করুন। হারি আপ। উই হ্যাভ নো টাইম।

বীথি সরসতিয়ার প্রসব দরজার কাটা অংশ সেলাই করলেন পরম যত্নে। ডক্টর শর্মা অ্যামবুব্যাগ দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করতে লাগলেন বাচ্চাটির ফুসফুসে। গুণবালা তামাং উঠে দাঁড়িয়ে গলায় আর্তি মিশিয়ে বলল, ডাগদারসাব, আমার কোলে বাচ্চাটাকে দেবেন আর একবার?

ডক্টর শর্মা বাচ্চাটাকে গুণবালার কোলে দিতে দিতে বললেন, বাচ্চাটার ফুসফুসে জল ঢুকে গেছে। অ্যান্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন দিতে হবে কিছুদিন। নইলে নিউমোনিয়া হয়ে যাবে। বুঝতেই পারছেন, ওর নিজের টেনে খাবার ক্ষমতা নেই। ফলে গ্লুকোজ ইঞ্জেকশনও দিতে হবে। কিছুদিন এই হাসপাতালে থাকতে হবে ওকে। তার পর বাড়ি নিয়ে যাবেন।

দাইমা শিশুটির মাথায় পরম স্নেহে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, আজ আপনি ছিলেন বলেই ওর প্রাণ বাঁচল। আপনাদের ঋণ আমি সারাজীবনেও শোধ করতে পারব না।

ঘাম দিচ্ছিল এতক্ষণ। এখন ব্লাড প্রেশার নেমেছে বলে শারীরিক সেই অস্বস্তিটা আর হচ্ছে না। ডক্টর শর্মা হাসলেন এতক্ষণে। স্মিতমুখে বললেন, আপনি ইচ্ছে করলেই ঋণ শোধ করতে পারেন।

দাইমা হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে বলল, বলুন কী করতে হবে আমাকে।

ডক্টর শর্মা বললেন, বিশেষ কিছুই করতে হবে না। এবার থেকে এই হাসপাতালে আপনাকে সেবা দিতে হবে।

দাইমা জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে। ডক্টর শর্মা বললেন, আমি মিস্টার মুখার্জির সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁকে বুঝিয়েছি আপনি এই হাসপাতালে এলে শুধু এই চা বাগান নয়, আশেপাশের বহু মানুষের উপকার হবে।

দাইমা অস্ফুট স্বরে বলল, মানিজারসাব কী বলেছেন?

ডক্টর শর্মা বললেন, তিনি তো আপনার জন্য দরজা খুলেই রেখেছেন। আপনি এত বছর ধরে দাইমার কাজ করছেন। আপনার অভিজ্ঞতার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে আশেপাশে এমন কেউ নেই। হাজারখানেক বাচ্চার জন্ম হয়েছে আপনার হাতে। এই হাসপাতালে দুজন ট্রেইন্ড সিস্টার আছেন। আমি নিজেও আছি। তবুও আপনাকে আমরা চাই। এই হাসপাতালের পরিকাঠামো যখন আপনার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশবে তখন দেখবেন কী ম্যাজিকটাই না হয়। আপনি কি চান না এই তল্লাটের নতুন মায়েদের মুখে হাসি ফুটুক?

দাইমা মাথা নীচু করে থাকল কিছুক্ষণ। যখন মাথা তুলল তখন দু’চোখে জল। ভেজা গলায় বলল, আমি আপনাকে একটা প্রণাম করতে চাই ডাগদারসাব।

দেব-দেবী, ধর্ম, শাস্ত্র এসবের কথা ডক্টর শর্মা ভালো জানেন না। কিন্তু গুণবালা তামাং নামে এই মহিলার কৃতজ্ঞ চোখদুটো দেখে, সরসতিয়ার সদ্যোজাত সন্তানের মুখের দিকে স্নেহমাখানো চোখে তাকিয়ে তাঁর মন এক তীব্র দুঃখমেশানো সুখে ছেয়ে গেল। শহরের মাল্টিস্টোরিড নার্সিং হোমে কাজ করতে না পারার খেদ ধুয়ে মুছে গেল এক লহমায়। মনে হল এই সদ্যোজাত শিশুটিই স্বর্গের ব্রহ্মকমল ফুল। এবং এই মুহূর্ত তাঁর ডাক্তারিজীবনের এক পরম প্রাপ্তি। হাসপাতালের ছোট্ট ঘরের কাঠের চেয়ারটায় ঠেস দিয়ে বসে শান্ত কিন্তু পরিতৃপ্ত গলায় ডক্টর শর্মা হাঁক দিলেন, কাজিমল, কোথায় গেলে হে? সকলে ঠান্ডায় জমে গেলাম যে! আমাদের একটু চা খাওয়াতে পারো?

২৫

সেমইয়াং একটু আগে এসে তার ঘুম ভাঙিয়েছে। হাতে করে নিয়ে এসেছে গরম চায়ের কাপ। বাইরের বারান্দায় প্যাংকুটু গুটিগুটি পায়ে এসেছে চায়ের পেয়ালা হাতে। কত যে ফুল ফুটে আছে তার ইয়ত্তা নেই। নীল আকাশের গায়ে লেপ্টে আছে সবজেটে পাহাড়। মেহগিনি রোদ এসে ধুইয়ে দিচ্ছে চারপাশ। উড়ে বেড়াচ্ছে রঙিন প্রজাপতি। নরবুর বাড়ির পেছনদিকে ডালপালা মেলে দেওয়া ন্যাসপাতি গাছটা আজও যেমন কে তেমনই আছে। তার ডালে বসে আছে একজোড়া হলুদ পাখি। তীক্ষ্ণ কিন্তু সুরেলা ডাক পাখিদুটির। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আঁকিয়ে তাঁর ক্যানভাসে ধরতে পারবেন না দৃশ্যের এই সমগ্রতা। ঈশ্বর যখন নিজস্ব ইজেল থেকে রং দিয়ে তুলি বুলিয়ে কোনও ছবি আঁকেন তখন তার তুলনা আর কিছুই হতে পারে না। অখণ্ড নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে চরাচর জুড়ে। সাকতেংয়ে ইলেক্ট্রিসিটি বা ইন্টারনেট এসেছে ঠিকই তবে এখনও এই পাহাড়ি গ্রাম আছে নিজের মতোই। বেশ লাগছে আজকের এই পড়ে পাওয়া সকালটা।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে প্যাংকুটু দেখছিল পায়ে চলা পথটাকে। সেবার সেমইয়াংইয়ের সঙ্গে ট্রেক করে ওঠার পথে চোখে পড়ছিল ভেঙে পড়া গাছের ডাল, তাদের ওল্টানো গুঁড়িতে সবুজ শ্যাওলা। আদিম মহাদ্রুমেরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সরু পথের দুদিকে। বেশ খানিকটা ওঠার পর যখন হাঁফ ধরে গেছে তখন এল ভিউ পয়েন্ট। তার পর যা ঘটল তা তার জীবনটাকে বয়ে নিয়ে গেল অন্য খাতে। সেদিনের পর থেকে অপরাধবোধে ভুগত প্যাংকুটু। সেমইয়াংয়ের ব্যবহারও বদলে গিয়েছিল। আগের মতো আর আড়ি পাতত না দরজার বাইরে থেকে। আগের মতো তার ঘরে চুপিচুপি ঢুকে পড়ত না কোনও না কোনও অছিলায়।

মানুষের মন বড় বিচিত্র। যতদিন সেমইয়াং তার প্রতি উৎসাহ দেখাত ততদিন প্যাংকুটুর তাপ উত্তাপ ছিল না তাকে ঘিরে। তার ভাবনার পরিসরের মধ্যে এই মেয়ে কখনও আসেইনি। কিন্তু যেদিন থেকে সেমইয়াং তার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ল সেদিন থেকে প্যাংকুটুর ভেতর শুরু হল ছটফটানি। বুকের ভেতর তুমুল পাখসাট। চোরা কৌতূহল হতো জানার জন্য যে, ওয়াংমোকে কি সেদিনের ঘটনার কথা জানিয়েছে সেমইয়াং? তার অক্ষমতার কথা কি বলে দিয়েছে যমজ বোনকে? দুই বোনকেই জরিপ করত প্যাংকুটু। লক্ষ করত তাদের চালচলন। কিন্তু কারও মধ্যে আচরণগত বিশেষ কিছু পরিবর্তন দেখতে পায়নি সে। যেন সেই সকালটা আসেইনি তার জীবনে। যেন এমন কোনও ঘটনা ঘটেইনি কখনও।

কলেজ ইউনিভার্সিটিতে প্যাংকুটু সান্নিধ্যে এসেছে অজস্র ছাত্রছাত্রীর। সে ছাত্রনেতা। বহু ছেলেমেয়ের সঙ্গে মিশতে হতো তাকে। সকলে মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনত। সে সহজেই মোহিত করে দিতে পারত শ্রোতাদের। সে যতটা সপ্রতিভ ভাবে ছেলেদের সঙ্গে মিশত তেমনি মেয়েদের সঙ্গেও কথা বলত অনাড়ষ্ট ভঙ্গিতে। রাজনীতিই তখন প্যাংকুটুর ধ্যানজ্ঞান। ক্যান্টিনে বসে কাপের পর কাপ চা শেষ করতে করতে আর সিগারেট কিংবা বিড়িতে সুখটান দিতে দিতে রাজনৈতিক মতাদর্শের বইপত্তর পড়ত প্রতিনিয়ত। এসব নিয়ে সে এত ব্যস্ত ছিল যে, কোনও মেয়েকে ঘিরে প্রেমজ আকর্ষণ কখনও জন্মায়নি তার। মেয়েরাও তাকে দেখে বরাবরই সম্ভ্রমোচিত দূরত্ব বজায় রেখেছে। প্রেমঘটিত আসক্তি দেখায়নি কখনও। কিন্তু সাকতেংয়ের সেই দিনটা তার জীবনটাই বদলে দিল।

কলকাতায় ফিরে রাজনীতির জোয়ারভাঁটার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল প্যাংকুটু। এতদিন যে দলের ভাব আদর্শের প্রতি সে অনুগত ছিল, সেই দলের কিছু নেতার জীবনযাপনের বৈভব, ব্যক্তিজীবনের দ্বিচারিতা ও দুর্নীতিকে সারজল দিয়ে লালন পালন করা নিরন্তর প্রশ্ন তুলছিল তার মনে। পার্টির মিটিংয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কাজিয়া হল এমনই বিষয় নিয়ে। রাগের মাথায় সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিল সে। কয়েক মাস চুপচাপ বসে থাকার পর সে সময়ের বিরোধী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব একদিন এল তার কাছে। কথা হল। এক সাধারণ নির্বাচনের আগ দিয়ে এক জনসভায় আরও কয়েকজনের সঙ্গে অভিষেক চক্রবর্তীও যোগ দিল সে দলে।

কী গেছে সেসব দিন। রোদে পুড়ে জলে ভিজে দিনের পর দিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছে ক্যামপেনিংয়ের কাজে। পাশের জেলাতেও গেছে কখনও কখনও। জনসভায় ভাষণ দিয়েছে। দলীয় সংগঠনের কাজ সামলেছে দক্ষতার সঙ্গে। পার্টি অফিসে রাতের পর রাত পড়ে থেকেছে। কোনও কোনও দিন খাওয়ার সময় পায়নি। বিপক্ষ দলও ছেড়ে কথা বলেনি। ক্যামপেন করতে গিয়ে অন্য দলের কর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতি হয়েছে। লাঠির বাড়ি খেয়ে মাথায় স্টিচও পড়েছে একবার। যতদিন তাদের দল শাসন ক্ষমতায় আসেনি ততদিন মাঝরাতে পুলিশ এসে তার দরজায় কড়া নেড়েছে। হাজিরা দিতে বলেছে থানায় গিয়ে। অবশেষে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছে তার দল। দলের প্রতি আনুগত্য ও কর্মদক্ষতার কারণে তাকে এক মন্ত্রীর আপ্ত সহায়ক মনোনীত করা হয়েছে। রাজনৈতিক উত্থানের পর এখন মন্ত্রীদের অনেকেই চেনেন অভিষেক চক্রবর্তীকে। এই অর্জন তার একদিনে হয়নি। জীবনের সেরা সময়টা রাজনীতিতে দেওয়ার কারণেই তার এই প্রাপ্তি।

প্যাংকুটুর এখন পেছন ফিরে দেখতে গিয়ে মনে হয়, সাকতেংয়ের সেই অভিশপ্ত দিনটাকে নিজের মেমারি ব্যাংক থেকে ডিলিট করার জন্যই সে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিল রাজনীতির সঙ্গে। কলকাতায় চলে আসার পর কোনও যোগাযোগ রাখেনি নরবু আর তার দুই মেয়ের সঙ্গে। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী বীর অ্যাকিলিস ছিলেন দুর্দমনীয় যোদ্ধা। শিশুপুত্র অ্যাকিলিসকে গোড়ালি ধরে নদীতে চুবিয়ে স্নান করিয়েছিলেন তাঁর মা। তাঁর শরীরের একমাত্র বিক্ষতপ্রবণ জায়গা ছিল তাঁর গোড়ালি। সেখানেই তিরবিদ্ধ হয়ে মারা যান অ্যাকিলিস। তার থেকে এসেছে অ্যাকিলিস হিল কথাটা। প্যাংকুটুরও দুর্বলতম জায়গা আছে একটা। আর কেউ না জানুক একমাত্র সেমইয়াং জানে যে, সে এক অক্ষম পুরুষ। এ যে কত বড় যন্ত্রণা তা একজন পুরুষই শুধু বোঝে।

ভুটান থেকে কলকাতায় ফিরে এসে রাজনীতির আগুনের আঁচে নিজেকে সেঁকে নিচ্ছিল প্যাংকুটু। তবুও সময় বের করে প্যাংকুটু একদিন গিয়েছিল এক সায়কায়াট্রিস্টের কাছে। তিনি সব শুনেছিলেন মন দিয়ে। কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে বলেছিলেন সমস্যাটা আদৌ শারীরিক নয়, মানসিক। তিনি রেফার করেছিলেন এক সাইকোলজিস্টের কাছে। এক্সাইড মোড়ের কাছে সেই মনের ডাক্তারের চেম্বারে দু-সপ্তাহ অন্তর অন্তর গিয়ে নিয়মিত কাউনসেলিং করিয়েছে প্যাংকুটু। যত কাজই থাক, ডাক্তারের চেম্বারে হত্যে দিয়ে গেছে দিনের পর দিন।

ভূগোল বইতে অস্তিত্ব আছে এমন পাহাড় জয় করতে পাহাড় অভিযানে যায় মানুষ। কিন্তু পাহাড় তো আর শুধু ম্যাপের বইয়ে থাকে না। থাকে না দোকানে কিনতে পাওয়া যায় এমন গ্লোবেও। আসলে মানুষের মনের মানচিত্র খুঁজলেও পাওয়া যাবে নানা আকৃতির বরফের পাহাড়ের অস্তিত্ব। সেই মানুষটি নিজে ছাড়া আর কেউ সেই বরফপাহাড়ের খোঁজ রাখে না। তার উচ্চতা মাপার কোনও গজফিতেও নেই। একজন সত্যিকারের ট্রেকারই পারে সেই দুর্লঙ্ঘ পাহাড়চুড়োকে জয় করতে। সেই দিনগুলোতে প্যাংকুটুর মনের মধ্যে শুম্ভ নিশুম্ভর যুদ্ধ লেগেই থাকত সবসময়। একবার মনে হতো পারবে না। পরক্ষণেই মনে হতো এই বরফঘেরা অঞ্চল থেকে জীবনের রৌদ্রভরা বারান্দায় তাকে ফিরতেই হবে। তার এই দাঁতে দাঁত চাপা লড়াইয়ের কথা কেউ জানে না। না তার আত্মীয়স্বজন, না তার বন্ধুবৃত্তের কেউ।

পশ্চিম ডুয়ার্সে গ্রিনউড চা বাগান কেনার ব্যাপারে এক ভদ্রলোক যোগাযোগ করেছিলেন প্যাংকুটুর সঙ্গে। জমিজমা ও ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত কিছু জট আছে। মন্ত্রীকে বলে যদি সেটা ছাড়িয়ে দেওয়া যায়। দলের এক নেতৃত্ব অনুরোধ করেছিলেন বলে পার্ক স্ট্রিটের এক ফুড জয়েন্টে তনুময় মিত্রের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিল সে। সেখানেই সেমইয়াংয়ের সঙ্গে দেখা। তাকে এত বছর পর দেখে সেমইয়াং অবাক। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে তাকে বলেছিল, স্যার আপনার সঙ্গে আমার প্রাইভেট কিছু কথা আছে। কথাটা জরুরি। কথাগুলো আপনাকে একান্তে বলতে চাই।

প্যাংকুটু হ্যাঁ বা না কিছু বলার আগেই সেমইয়াং ইংরেজিতে তনুময়কে বলল, মিস্টার চক্রবর্তী আমার ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। একটু ব্যক্তিগত কথা আছে তাঁর সঙ্গে। আমরা একান্তে কথা বললে কি তুমি কিছু মনে করবে? তনুময় কতটা অবাক হয়েছিলেন আর কতটা বিরক্ত তা প্যাংকুটু বলতে পারবে না। তবে সে দেখছিল তনুময়ের মুখের রং বদলে যাচ্ছে কেমন। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে প্যাংকুটুকে বলেছিলেন, আপনারা কথা বলুন। আমি একটু ওয়াশরুম থেকে ঘুরে আসছি।

প্যাংকুটুকে একাকী পেয়ে সেমইয়াং সরাসরি চলে এসেছিল কাজের কথায়। যা বলল তার নির্যাস এরকম, তনুময় বিত্তশালী লোক। প্রোডাকশন হাউস ছাড়াও তাঁর নানারকম বিজনেস আছে। দুজনের যোগাযোগ সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইট থেকে। তনুময়ের প্রোডাকশন হাউসের প্রস্তাব পেয়ে সে স্ক্রিন টেস্ট দিতে এসেছিল কলকাতায়। তনুময় তাকে সিলেক্ট করেন। আপকামিং ওয়েবসিরিজে কাস্টও করেন। চুক্তিপত্রে সই করে সে। কাস্টিং হয়ে গেছে। মুম্বাইতে প্রোডাকশন টিম গেছে রেকি করতে, এর মধ্যেই শুটিং শুরু হবার কথা। এবার তনুময় বিয়ের প্রস্তাব দেন সেমইয়াংকে। ততদিনে সে-ও আকর্ষিত হয়েছে সফট স্পোকেন পুরুষটির প্রতি। সে সম্মত হয়। তনুময়ের নিউটাউনে ফ্ল্যাট আছে। দু-হাজার স্কোয়ার ফিটের সেই ফ্ল্যাটে সেমইয়াং একাই থাকে। তনুময় দেশের বিভিন্ন শহরে দৌড়ে বেড়ান ব্যবসার কাজে। কলকাতায় থাকলে কখনও কখনও আসেন নিউটাউনের ফ্ল্যাটে। রাত কাটিয়ে যান।

এক শুনশান দুপুরে বছর চল্লিশের এক সুন্দরী ভদ্রমহিলা এসে হাজির হন সেমইয়াংয়ের কাছে। নাম বলেন প্রিয়াংকা মিত্র। থাকেন ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনে। পরিচয় দেন তনুময়ের বিবাহিতা স্ত্রী হিসেবে। তনুময় আর তাঁর বিয়ের রিসেপশনের কিছু ছবি মোবাইল ঘেঁটে দেখালেন প্রিয়াংকা। তাঁদের একটি মেয়েও আছে নয় বছরের। শিশুকন্যাটির ফোটোও দেখান সেমইয়াংকে। বলেন তনুময় নাকি আদ্যন্ত লম্পট। সহজ সরল মেয়েদের ভুল বুঝিয়ে বিছানায় নিয়ে যাওয়ার কাজটা নাকি খুবই দক্ষতার সঙ্গে করেন। ভালোমানুষি দেখিয়ে যে তনুময় কত মেয়ের সর্বনাশ করেছেন সেসব বৃত্তান্ত প্রিয়াংকা শোনান তাকে। এ-ও বলে দেন পুরোনো হয়ে গেলে অন্য মেয়েদের মতো তার স্থানও হবে আস্তাকুঁড়ে।

স্বাভাবিক ভাবেই সেমইয়াং হতচকিত। দুটো দিন না খেয়ে না ঘুমিয়ে কাটে তার। তনুময় নিউটাউনের ফ্ল্যাটে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়াংকা এপিসোড সে উগরে দেয় তাঁর কাছে। না, তনুময় অস্বীকার করেননি। বরং ক্যাজুয়াল গলায় বলেন যে, প্রিয়াংকা তাঁর স্ত্রী। তবে এই মুহূর্তে তাঁরা সেপারেশনে আছেন। ডিভোর্স ফাইল চলছে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রিয়াংকাকে ডিভোর্স দিয়ে সেমইয়াংকে বিয়ে করতে আর কোনও বাধা থাকবে না তনুময়ের। তবে প্রিয়াংকার বাকি অভিযোগের কোনও সত্যতা নেই। প্রিয়াংকার পর সেমইয়াং ছাড়া আর কোনও নারী আসেনি তাঁর জীবনে। এই অসত্য অভিযোগ নিয়ে তার এত বিচলিত হবার কিছু নেই।

পাহাড়ি গ্রামের মেয়ে সেমইয়াং। এসব দেখেশুনে তার ভক্তি উঠে গেছে গ্ল্যামার জগতের ওপর থেকে। এর মধ্যে ওয়াংমোর মেইল এসেছে সেদিন। তার বাবা অসুস্থ। ক্যানসার ধরা পড়েছে পাকস্থলীতে। থিম্পু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ডাক্তাররা জবাব দিয়ে দিয়েছে। শেষ ক’টা দিন নরবু বাড়িতেই কাটাতে চায়। সেমইয়াং তনুময়কে জানায় তার ফিল্মে কাজ করার শখ মিটে গেছে। এবার ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরতে চায়। তনুময় বেঁকে বসেন। তার সই করা চুক্তিপত্র দেখিয়ে বলেন সে ফিরে গেলে তাঁর প্রোডাকশন হাউস তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে। টাকা ফেরত তো দিতে হবেই এমনকী হাজতবাসও হতে পারে। এমন একটা অবস্থায় তার কাছে দেবদূত হয়ে এসেছে প্যাংকুটু। যার কাছে তনুময়ের মতো বিগশট ফেবার চাইতে পারেন, সেই লোক যে প্রভাবশালী সেটুকু আন্দাজ করতে পেরেছে সে। প্যাংকুটুর কাছে আর্তি সেমইয়াংয়ের, নরবুর জীবনের শেষ দিনগুলোতে যাতে সে পাশে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা যেন করে দেয়।

সেদিন প্যাংকুটু উঠে একটু দূরে গিয়ে মোবাইল থেকে কাউকে ফোন করেছিল। ফিরে এসে চেয়ারে বসতে বসতে স্মিতমুখে বলেছিল, মিনিস্টারের সঙ্গে কথা হয়েছে। গ্রিনউড ডুয়ার্সের ঐতিহ্যশালী চা বাগান। একটা সময় বেশ বোলবালা ছিল। কত যে ফিল্মের শুটিং হয়েছে তার হিসেব নেই। তবে বাগানে টারময়েল চলছিল বহুদিন ধরে। মালিকপক্ষ পিএফ আর গ্র্যাচুইটির টাকা না দিয়ে ফ্যাক্টরিতে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর সরকারের মধ্যস্থতায় বাগানের শ্রমিকদের দিয়ে একটা পরিচালন সমিতি তৈরি করে বাগানটাকে চালানো হচ্ছিল। আপনি ওটা কেনার ব্যাপারে ইন্টারেস্টেড শুনে মিনিস্টার বলেছেন তিনি সবরকম কোঅপারেশন করবেন। আপনি মাসখানেক বাদে আসুন আমার অফিসে। আমি টেকনিক্যাল দিকগুলো দেখে নিচ্ছি। আপনার কাজ স্মুদলি হয়ে যাবে। তবে আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে মিস্টার মিত্র।

তনুময় মিত্র ধুরন্ধর মানুষ। প্যাংকুটুর চোখে চোখ রাখলেন খানিক। বিনয়ে গলে গিয়ে বললেন, রিকোয়েস্ট কী বলছেন স্যার, আপনি হুকুম করুন। প্যাংকুটু কেটে কেটে বলেছিল, দেখুন সেমইয়াং আমার পূর্ব পরিচিতা। সাকতেংয়ে ওদের গ্রামের বাড়িতে আমি থেকেছি বহুদিন। ওর ফ্যামিলির সবাইকেই আমি চিনি। ব্যাপার কী বলুন তো মিস্টার মিত্র, পাহাড়ি মেয়ে হলে যা হয়, কলকাতায় বেচারির দমবন্ধ হয়ে আসছে। তার মধ্যে খবর পেয়েছে ওর বাবা মৃত্যুশয্যায়। ফলে সেমইয়াং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভুটান ফিরতে চায়। আপনি বরং আপনার আপকামিং প্রজেক্টে অভিনয় করার জন্য অন্য কাউকে কাস্ট করে নিন, কেমন?

তনুময় মিত্র হকচকিয়ে যান। প্যাংকুটুর আপাতনিরীহ প্রস্তাব তাঁর কপালে বাড়তি ভাঁজ ফেলে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ফুড জয়েন্টেও তাঁর কপালে ঘাম জমে। তনুময়কে ঈষৎ বিভ্রান্ত দেখায়। তিনি একবার প্যাংকুটু আর একবার সেমইয়াংকে দেখেন। ভাবনার সমান্তরাল প্রবাহ চলতে থাকে তাঁর মস্তিস্কে। ব্যবসায়ী মানুষ তিনি। ডেবিট আর ক্রেডিট মেলাবার চেষ্টা করেন। মুখ ফুটে হ্যাঁ না কিছুই বলেন না। মুখে প্লাস্টিক হাসি ঝুলিয়ে রেখে চিকেনের টুকরো দাঁতে কাটেন।

ধীরে সুস্থে লাঞ্চ শেষ করে প্যাংকুটু। জল খায় দু-চুমুক। ন্যাপকিন দিয়ে হাত মুখ মোছে। শান্ত ভাবে চেয়ার টেনে উঠে দাঁড়ায়। সেমইয়াংইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে নরম কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে, কাম উইথ মি। তার বাড়ানো হাত ধরে সেমইয়াং। দুজন তনুময়ের চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায় কাচের সুইংডোর খুলে। রাস্তায় নেমে হলুদ ট্যাক্সি দাঁড় করায় প্যাংকুটু। বিনা বাক্যব্যয়ে তাকে অনুসরণ করে গাড়িতে ওঠে সেমইয়াং। সেই রাতে সে সেমইয়াংয়ের থাকার ব্যবস্থা করে পরিচিত এক বন্ধুর হোটেলে। চেনা লোককে দিয়ে উড়ানের টিকিট বুক করে। পরদিন সেমইয়াংকে নিয়ে থিম্পু উড়ে যায় প্যাংকুটু।

এয়ারপোর্ট থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে সাকতেং পৌঁছয় দুজনে। নরবু তখন জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ওয়াংমো আর পাশাং আগেই চলে এসেছিল নরবুর শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে জেনে। সেমইয়াংকে কংক্রিটের জঙ্গল থেকে ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য প্যাংকুটুকে কী বলে ধন্যবাদ দেবে বুঝতে পারে না নরবু। সে তখন মৃত্যুশয্যায়। ফুডপাইপ দিয়ে খাওয়ানো চলছে। মুখে নল। তার মধ্যেও কৃতজ্ঞতার কথা বলতে বলতে সে কেঁদে ফেলে। অশ্রু গড়িয়ে গড়িয়ে নামে তার ভাঙাচোরা গাল বেয়ে। বাবার হাত ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে সেমইয়াং।

পরদিন ভোরবেলা সব যন্ত্রণার অবসান হয়। মারা যায় নরবু। সেই পাহাড়ে যে কয়েক ঘর প্রতিবেশী আছে তারা সকলে চলে আসে। নরবুর শবদেহ উঠোনে নিয়ে যাওয়া হয়। যত্ন করে স্নান করিয়ে নতুন থানকাপড় পরিয়ে সুসজ্জিত বিছানায় উঠোনে রাখা হয় বিকেল অবধি। আসে পুরোহিত। মন্ত্র উচ্চারণ শেষে দাহ করা হয় পাহাড়ি নদীর ধারে স্থানীয় শ্মশানে নিয়ে গিয়ে। প্যাংকুটু নিজেও নরবুর দেহ নিয়ে সকলের সঙ্গে গিয়েছিল শেষযাত্রায়।

পাঁচদিনের অশৌচ পালন শেষ হয়েছে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে একটা সপ্তাহ। ওয়াংমো আর পাশাং ফিরে গেছে থিম্পু। সেমইয়াং পিতৃশোক সামলে উঠেছে অনেকটাই। আপাতত কিছুদিন নরবুর স্মৃতি জড়ানো সাকতেংয়ের এই বাড়িতে একাই থাকবে সে। যদি ভালো না লাগে তখন থিম্পু চলে যাবে। পাশাং আর ওয়াংমো তার দায়িত্ব নেবে যতদিন সে বিয়ে না করছে। এদিকের কাজ মিটে গেছে। প্যাংকুটু কলকাতা ফিরবে এবার। এয়ার টিকিট কাটাও হয়ে গেছে।

গতকাল রাতে খাবারের থালি নিয়ে সেমইয়াং এসেছিল প্যাংকুটুর কাছে। ভাত, ডাল, আলু-ফুলকপির সবজি। প্যাংকুটু আগে যে ঘরে থাকত সেই এক চিলতে ঘরেই স্থান হয়েছে তার। বিছানায় বসেই সে খেতে শুরু করেছিল। সেমইয়াং দাঁড়িয়েই ছিল সামনে। প্যাংকুটুর প্রতি সে কতটা কৃতজ্ঞ সে কথা বলতে বলতে আবেগে গলা কাঁপছিল তার। তার পর বলেছিল, স্যার, ক্যান আই আস্ক ইউ আ কোয়েশ্চেন?

প্যাংকুটু এক ঢোক জল খেয়ে বলেছিল, সার্টেনলি। বলো, কী জিগ্যেস করতে চাও।

সেমইয়াং বলেছিল, নিজের লোকের জন্যও কেউ এত কিছু করে না। আমি গ্রামের সহজ সরল মেয়ে ছিলাম। এখন কলকাতায় গিয়ে দুনিয়াটাকে ভালো করে চিনেছি। বুঝেছি এই দুনিয়ায় কেউ কারও নয়। সে কারণেই আমি কনফিউজড। আমি বুঝতে পারছি না, আপনি আমার জন্য এতটা কেন করলেন স্যার?

প্যাংকুটু খাওয়া থামিয়ে হাসল, কী এমন করেছি। ও কিছু নয়।

সেমইয়াং স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকানো। বলল, আমার জায়গায় অন্য কোনও মেয়ে হলে তার জন্যও কি আপনি এতটা ফেবার করতেন?

প্যাংকুটু থমকেছে। কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগে সেমইয়াং বলল, স্যার, প্লিজ টেল দ্য ট্রুথ। ডু ইউ লাভ মি? প্যাংকুটু স্তম্ভিত। কী বলছে এই মেয়ে? ভালোবাসার কথা এমন সহজ সারল্যে জিগ্যেস করার কথা কংক্রিটের জঙ্গলে বড় হওয়া কোনও মানুষ, সে পুরুষ হোক বা নারী, বলতে পারবে কখনও? প্যাংকুটু তাকিয়ে ছিল সেমইয়াংয়ের দিকে। গভীর গলায় বলেছিল, তোমার হঠাৎ মাথায় এই প্রশ্ন এল কেন?

সেমইয়াং স্ফূরিত ঠোঁট মুচড়ে জেদি বাচ্চাদের মতো করে বলল, আনসার মাই কোয়েশ্চেন স্যার। ডু ইউ লাভ মি?

প্যাংকুটু বিরক্ত হয়েছে এবার। কী পাগলের পাল্লায় পড়েছে সে! আর নেওয়া যাচ্ছে না। এবার একটু কড়া হতেই হয়। খাবারের প্লেট মাটিতে নামিয়ে রাখতে রাখতে পাথুরে গলায় প্যাংকুটু বলল, নো, আই ডোন্ট।

প্যাংকুটু ভেবেছিল সেমইয়াং দমে যাবে। তা হল না মোটেই। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। কেটে কেটে বলল, ডোন্ট টেল লাই। আমার চোখের দিকে তাকান। ইয়েস, লুক অ্যাট মাই আইজ। নাও স্যার, আনসার মি। ডু ইউ লাভ মি?

সম্মোহিতের মতো পাহাড়ি যুবতীটির চোখের দিকে তাকাল প্যাংকুটু। কড়া করে ‘নো’ বলতে গিয়েও উচ্চারণ করতে পারল না। ইচ্ছের বিরুদ্ধেই বলে ফেলল, আই ডোন্ট নো।

আশ্চর্য এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল মুখে। সেমইয়াং ফিসফিস করে বলল, বাট স্যার, ডেসপাইট এভরিথিং এলস, আই লাভ ইউ। আই জাস্ট কান্ট স্টপ লাভিং ইউ।

প্যাংকুটুর ভেতরে কী চলছে তা সে নিজেও বলতে পারবে না। এতদিন কি তবে নিজের মনকেই চোখ ঠেরে ছিল সে? প্রেম বোধ হয় হরিণের কস্তুরীর মতো। কস্তুরীর মাদক ঘ্রাণ যেমন কখনও লুকনো যায় না, প্রেমের সুগন্ধও কোনও কিছু দিয়ে কখনও চাপা দেওয়া যায় না। এতদিনে সত্যের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার পর এবার মুখ ফেরাল সে। বুঝতে পারল এত বছর ধরে সেমইয়াংয়ের থেকে যত দূরে সে সচেতন ভাবে নিজেকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে, অবচেতনে ততটাই পাহাড়ি মেয়েটির কাছে চলে গেছে সে। সেদিন পার্ক স্ট্রিটে তনুময় মিত্রর সঙ্গিনী হিসেবে সেমইয়াংয়ের জায়গায় অন্য কোনও নারী থাকলে কি এমন করে গলা জলে নামত সে? জানে না প্যাংকুটু।

সে অনুভব করল তার শরীর ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে। দীর্ঘ অতিদীর্ঘ সময় ধরে শীতঘুম দিয়ে ওঠার পর সে এবার জাগছে একটু একটু করে। সেমইয়াংয়ের কাঁধ ধরে এক ঝটকায় সে টেনে আনল নিজের দিকে। সেমইয়াং চোখ বুজে ছিল। সে সমর্পণের জন্য প্রস্তুত। প্যাংকুটু ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হল। যন্ত্রচালিত রোবটের মতো সেমইয়াং খুলে ফেলল নিজের পোশাক। পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম খেলায় মত্ত হল দুজন।

সেমইয়াং তার খোলা বুকে মুখ ঘষছিল আর কীসব বিড়বিড় করছিল ভুটানি ভাষায়। প্যাংকুটু তাকে আদর করছিল তীব্র আশ্লেষে। সেমইয়াং সুখের আবেশে কাঁপছিল থিরথির করে। জীবনের সঙ্গে যৌনতার এক গভীর যোগাযোগ আছে। প্যাংকুটুর আফশোস হল, হায় এতদিন সে জানতেই পারেনি জীবনের রোমাঞ্চকর ও সুখদায়ক এই দিকটার কথা! ভুটানের এই পাহাড়ি গ্রামে সেই সত্য নতুন করে জানল সে।

সকালের কাঁসার মতো রোদ্দুর এসে পড়েছে ন্যাসপাতি গাছটার ডালে বসে থাকা একটা হলদে পাখির ওপর। চোখ ফেরাল প্যাংকুটু। রতিসুখে তৃপ্ত এক নারী এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশে। মুখ ফিরিয়ে সেমইয়াংকে দেখল সে। লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে নিল সেমইয়াং।

সামনের সরু পাহাড়ি রাস্তাটার দিকে তাকাল প্যাংকুটু। এই জঙ্গুলে পথ ধরেই তো তারা ট্রেক করেছিল সেবার। বেশ খানিকটা ডাউন ট্রেক করার পর আবার খাড়াই বেয়ে ওঠা। যত উঠছিল পাকদণ্ডীর পাকে পাকে দেখছিল পাহাড়ের রূপ বদলাচ্ছিল অবিরত। ধাপে ধাপে সবুজ গালচে জুড়ে রংয়ের খেলা। একসময় শুরু হল পাইনবন। আদিম অন্ধকার, তার মধ্য দিয়ে রোদ্দুরের সোনার জাফরি। কুরোসাওয়ার ‘সানশাইন থ্রু দ্য রেইন’ ছবিতে এমনই এক অদ্ভুত আলো দেখেছিল সে। সেই ছবির ভাষা মিশে গিয়েছিল তার জীবনের ভাষার সঙ্গে। তার আকাশেও তো এতদিন ঘন হয়ে ছিল বিষাদমেঘ। এবার এত বছর পর শাপমুক্তি ঘটল তার।

শরীরে মনে এখন খেলে বেড়াচ্ছে রোমাঞ্চ আর রোমহর্ষ। অনেক বছর আগে ভুটানের সাকতেং নামে এই নির্জন গ্রাম প্যাংকুটুকে উপহার দিয়েছিল একরাশ লজ্জা। নিজের কাছে মুখ দেখানোই দায় হয়ে উঠেছিল। নিজেকে মনে হচ্ছিল শাপগ্রস্থ এক অভাগা পুরুষ, মনে হচ্ছিল আজীবনের জন্য দগ্ধ হয়েছে তার জীবন। ছাই হয়ে উড়ে গেছে তার অন্তরের সমস্ত আনন্দ আর খুশি। ছায়ার মতো পড়ে রয়েছে তার মনের অবশেষটুকু। সে নিজে নয়, তার ছায়ামাত্র বেঁচে ছিল এতদিন। সাকতেং গ্রামে ফিরে আসার পর প্যাংকুটুর মনের আকাশের সমস্ত কালো মেঘ কেটে গেছে। অবশেষে তার জীবনে এসে পড়েছে মনখুশির রোদ্দুর। ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল এতক্ষণ। জুড়িয়ে গিয়েছিল চা। চুমুক দিয়ে একবারে কাপের পুরো চা-টা গলায় ঢেলে দিল প্যাংকুটু। পাশে দাঁড়ানো সেমইয়াংয়ের দিকে তাকিয়ে বাচ্চাদের মতো করে বলল, আরও এক কাপ চা খেতে ইচ্ছে করছে। উড ইউ মাইন্ড টু মেক আনাদার কাপ অফ টি?

সেমইয়াং হেসে বলল, আই ওন্ট মাইন্ড।

২৬

ঈশ্বর যেন নিজস্ব ইজেল থেকে রং নিয়ে বহু সময় নিয়ে এঁকেছেন এই নিসর্গ। আদরের উপত্যকার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল মুকুট। কী অপূর্ব এই পাহাড়ের প্রাকৃতিক রূপ! আগের বার এখান থেকেই তো ভাঙা মন নিয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল তাকে। মারদি আর সেতি নদীর কোল ছুঁয়ে থাকা সেই উপত্যকায় আবার ফিরে এসেছে মুকুট। আগেরবার চিত্রাঙ্গদা, ভীমবাহাদুর আর মুকুটের সঙ্গে ছিল হাঙ্গেরিয়ান তরুণী রেকা। রেকা নেই, এবার এসেছে রঙ্গিত। নেপালের অন্নপূর্ণা আর মচ্ছপুছারের ছায়াঢাকা অঞ্চল। মারদি নদীর পাড়ে পারৎসে গ্রাম। উচ্চতা ছ’হাজার ফিটের মতো। মনোরম আবহাওয়া এখন। তেরো ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এত কম অল্টিটিউডে এমন অপরূপ নিসর্গ বড় একটা দেখা যায় না।

এখান থেকে মুকুটদের পৌঁছতে হবে ঘাচোক। সেখান থেকে ট্রেক করে যেতে হবে ছিমছিমলে খরকা। আর একটু ওপরে রয়েছে মারদি হিমাল বেস ক্যাম্প। সেখান থেকে আর ওঠা হবে না, মূল শিবির ছুঁয়েই ফিরে আসা হবে সদলবলে। এটাই ট্যুর প্ল্যান। তিনদিন ধরে ট্রেক করছে তারা। অসুবিধে হয়নি। সব জায়গাতেই থাকার জন্য হোমস্টে পাওয়া গিয়েছিল। চিকেন, রুটি আর ভাত পাওয়া গেছে সবখানে। আজ ঘাচোক অবধি পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল ঘনিয়ে এল। আকাশ মেঘলা ছিল। একটু পরিষ্কার হতেই স্বস্তির হাসি হাসল ভীমবাহাদুর। বলল, আর চিন্তা নেই আমাদের।

ঘাচোকে সেই দাদির ডেরার সামনে হাজির হল সকলে। তাদের দেখে ফোকলা দাঁতে একগাল হেসে অভ্যর্থনা জানাল বৃদ্ধা। দাদির চেহারা বদলায়নি একটুও। বলিরেখা পড়ে যাওয়া মুখের সজীব হাসি এখনও একই রকম সবুজ আছে। আগের বার যেখানে থাকা হয়েছিল সেখানেই থাকার ব্যবস্থা। ব্যাগপত্তর ঘরে রেখে বারান্দায় বসল সকলে। দাদি চা বানিয়ে এনেছে। সঙ্গে থিন অ্যারারুট বিস্কুট। চা বিস্কুট খেতে খেতে গপ্পো হচ্ছে। সন্ধে নেমে গেল দেখতে দেখতে। এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। কারেন্ট নেই। জেনারেটরে তেল অবধি নেই। আশেপাশে দু’তিনটে পাহাড় মিলিয়ে এই ক’টা মাত্র মানুষ। সন্ধে গাঢ় হতেই কিচেন থেকে দাদির রান্নার ছ্যাঁকছোক ভেসে আসতে লাগল। বারান্দা থেকে নড়বড়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল রঙ্গিত। পেছন পেছন মুকুট। সামনের রাস্তায় নেমে এল দু’জনে।

একটা বছর তার কীভাবে কেটেছে সেটা মুকুটের থেকে ভালো আর কেউ জানে না। কর্কটরোগের আক্রমণে মনের জোর তলানিতে এসে ঠেকেছিল। মনে হচ্ছিল অসমাপ্ত পাহাড় অভিযান আর হবে না। কিন্তু কী অদ্ভুত ভাবে রঙ্গিত এল তার জীবনে! মুকুট মাঝে মাঝে ভাবে এই যে মানুষ জন্মাচ্ছে জীবন যাপন করছে তারপর একটা সময় তার মৃত্যু হচ্ছে--এসব কিছুর পেছনে কোনও গূঢ় উদ্দেশ্য আছে। সে তার ক্ষুদ্র মস্তিস্ক দিয়ে বুঝতে পারছে না। কিন্তু কালচক্রের ঘূর্ণনের মধ্যে রয়েছে কোনও দুর্জ্ঞেয় জটিল রহস্য। নইলে সম্পূর্ণ অন্য এক বৃত্ত থেকে তার কাছে রঙ্গিত এল কেমন করে? কেমন করেই বা মুকুটের ফুরিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস আবার ফিরিয়ে দিল সে? এসবের কী ব্যাখ্যা কে জানে!

মুকুটের মনে হয় জ্ঞানবুদ্ধির বাইরে এমন সব আশ্চর্য ঘটনা আজও কখনও কখনও ঘটে চলে পৃথিবীতে। সকলের চোখের আড়ালে কোনও একজন আছেন সেই অদৃশ্য নিয়ন্তা তাঁর নিজের নিয়মে তিনি ম্যাজিক ঘটিয়েই চলেন। সাধারণ বুদ্ধিতে তার কার্যকারণ বোঝা যায় না। আর বোঝা যায় না বলেই তো বেঁচে থাকাটা এত ইন্টারেস্টিং। পাহাড়ি সর্পিল পথের মতো মানুষের জীবন। পথের পরের বাঁকে রোদ কুয়াশা না মেঘ কী যে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে কেউ জানে না।

পাশাপাশি হাঁটছিল রঙ্গিত আর মুকুট। চারদিক শুনশান, স্তব্ধ। মুকুট গাঢ় স্বরে বলল, ট্রেক করে ফেরার পর ক’দিন আমরা মেঘদুয়ারে কাটাব। তারপর আমি চলে যাব বেঙ্গালুরু। একটা বছর নষ্ট হয়ে গেছে। আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করতে হবে। এদিকে তুমি ফিরে যাবে কলকাতায়। কিছুদিন পর অনসাইট প্রোজেক্ট নিয়ে ব্রাজিল পাড়ি দেবে। তার পর কী হবে?

রঙ্গিত হেসে বলল, আজকাল দূরত্ব কোনও ফ্যাক্টর নাকি? এখন গোটা পৃথিবীটাই তো একটা গ্রাম। এই ভুবনডাঙায় এক জায়গার থেকে আর এক জায়গার দূরত্ব কিছুই নয়। আমাদের সম্পর্কের মধ্যে যদি জোর থাকে তাহলে নিশ্চয়ই তা দানা বাঁধবে। আপাতত এই প্রশ্নটা ভবিষ্যতের গর্ভেই রাখা থাক। তোমার ঠাণ্ডা লাগছে না? আমি তো কাঁপছি রীতিমতো। চলো ঘরে ফিরি এখন।

দাদির আন্তরিক হাসিটা একদম একই রকম রয়েছে এখনও। শহরের দূষণ এখনও ছুঁতে পারেনি এই পাহাড়ি বৃদ্ধাকে। তাঁর ডেরায় রাতের আহার ডিমের ঝোল আর ভাত। সঙ্গে কাঁচা লংকা আর তেল দিয়ে মাখা আলুসেদ্ধ। ঘুমোবার জন্য বিছানাপত্রও পরিপাটি। দুটো করে মোটাসোটা কম্বলও পাওয়া গেল। রাতটুকু গুজরান করা হল দুটো আলাদা ঘরে। একটা ঘরে চিত্রাঙ্গদা আর মুকুট। পাশের ঘরে রঙ্গিত আর ভীমবাহাদুর। ভাইলা নামের দৈত্যের মতো চেহারার রোমশ কুকুরটা চিৎকার করছিল শুরুতে। পরে আর ঝামেলা করেনি। খাওয়া দাওয়া করে ভাইলা আর দাদি ঘুমোল এক ঘরে, এক কম্বল মুড়ি দিয়ে। পাশের ঘরে মুকুটরা।

সাতসকালে ঘুম ভাঙল। রুটি আর আলুর সবজি বানিয়ে এনেছে দাদি। সেসব খেয়ে রওনা দিল চারজন। আগের বার একটুতেই হাঁফ ধরছিল মুকুটের। গা গোলাচ্ছিল। এবার আর সেসব শারীরিক অসুবিধে নেই। ক্লান্তিবোধ আছে কিন্তু সেটা তেমন ধর্তব্যের মধ্যে নয়। এদিকে চিত্রাঙ্গদা আর ভীমবাহাদুর দিব্যি উঠছে তরতরিয়ে। রঙ্গিত ক্লাব ক্রিকেট খেলেছে এককালে। ফলে সারাদিন মাঠে কাটাবার অভিজ্ঞতা আছে। এই পথশ্রম তার কাছে তেমন কঠিন কিছু নয়। এভাবেই হেঁটে বারো কিমি পথ উঠতে হবে তাদের। তবে আসবে ছিমছিমলে খরকা।

গতবার আবহাওয়া পরিষ্কার ছিল। এবার সামনেটা মেঘে ঢাকা। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। চারদিকে বিরাজ করছে অখণ্ড নিস্তব্ধতা। সকলে যেন মেঘবন্দি হয়ে আছে। মেঘ ভেদ করে একবার ঢুকলেই যেন এক রহস্যময় দেশে ঢুকে পড়া যাবে। আর ঠিক এই সময়েই টুপটুপ করে বৃষ্টি এল। এমন অদ্ভুত বৃষ্টি আগে দেখেনি মুকুট। এসি ঘর থেকে একটুখানি বেরিয়ে গরমের মধ্যে দাঁড়ালে চশমার কাচ যে রকম বাষ্প জমে ঝাপসা হয়ে যায় আবার কেটেও যায় খানিক পরে তেমনি করে দূরের পাহাড়টা দৃশ্যমান হল। সামনের সাদা ধবধবে মেঘগুলো ছুট দিল আকাশে। তাদের কী যে এত তাড়া কে জানে! কে জানে বিরহী যক্ষের কাছে উড়ো চিঠি নিয়ে ছুটল কি না!

অনেক উঁচুতে চলে এসেছে মুকুটরা। পেটে যা ছিল সব হজম হয়ে গেছে এতক্ষণে। সকলে শুধু ভাবছিল ছিমছিমলে খরকা কখন পৌঁছব। ওখানে নিমা ওয়াংদির আস্তানা। সেখানে ডাল ভাত সবজি আর ওমলেট পাওয়া যাবে। ভীমবাহাদুরের কাছেই জানা গেছে নিমার কথা। সে আগেও এসেছে এখানে। কিন্তু মারদি নদীর বুক দিয়ে গ্যালন গ্যালন জল বয়ে গেছে গত এক বছরে। নিমাদাজু কেমন আছে কে জানে! নিমা ওয়াংদির কথা ভীমবাহাদুরের মুখ থেকে শুনেছে মুকুটরা। এত উঁচুতে একটাই মাত্র অস্থায়ী ঘর। এর ওপর কোনও বসতি নেই। নীচের দিকে সবচেয়ে কাছের জনপদও বারো কিলোমিটার আগে ছাড়িয়ে এসেছে তারা। পাঁচ হাজার ফিট নীচে। এ পথে খুব বেশি দল ট্রেক করতে আসে না। ট্রেকিং সিজন ছাড়া বাদবাকি সময় এদিকের পাহাড় পড়ে থাকে জনমানবশূন্য দশায়। বেশ খানিকটা পথ চড়াই ওঠার পর অবশেষে একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল সকলে।

লম্বাটে আকারের পাথরের ঘর। ওপরে কাঠের বিম। তার ওপর স্লেট পাথরের ছাদ। ঘরে ঢোকার একটাই দরজা। বাইরে শেকল দেওয়া। ভীমবাহাদুর বিভ্রান্ত গলায় বলল, গেল কোথায় লোকটা?

রঙ্গিত জিগ্যেস করল, তুমি আগে এসেছ এখানে?

ভীমবাহাদুর একগাল হেসে বলল, কতবার যে এখানে এসেছি তার ঠিক নেই। শেষবার এসেছি বছর দুয়েক আগে। এই যে চৌকো চেহারার পাথরটা দেখছেন, এখানে বসেই তো গরম গরম ভাত খেয়েছিলাম আলু-কোয়াশের ঝালঝাল সবজি দিয়ে। এখনও সেই স্বাদ মুখে লেগে আছে।

মুকুট এদিক ওদিক দেখছিল। তাদের শহুরে জীবনযাপনের থেকে কত আলাদা এত উঁচু পাহাড়ের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন! লোকালয় বা দোকানপাট কত নীচে! কত কঠিন এখানকার মানুষের বেঁচে থাকা! মুকুট বলল, কী করে তোমার এই নিমাদাজু?

ভীমবাহাদুর বলল, কাজের কি আর শেষ আছে? সারাদিন প্রচুর পরিশ্রম করতে হয় নিমাদাজুকে। এখানে তো জল নেই। অনেকটা নিচ থেকে জল বয়ে আনতে হয়। আগুন জ্বালাতে গেলে কাঠ দরকার। জঙ্গল থেকে কাঠকুটো নিয়ে আসতে হয় নিমাদাজুকে।

চিত্রাঙ্গদা কোমরে হাত দিয়ে সকলের কথা শুনছিল। এবার জানতে চাইল, তোমার নিমাদাজু কি একাই থাকে এই বাড়িতে?

ভীমবাহাদুর চোখ কপালে তুলে বলল, সে কী কথা, আরে না না, নিমাদাজু এখানে একা থাকবে কেন, ওর বউ আছে তো। যদিও বউ থাকা না থাকা সমান। বেচারি অসুস্থ খুব। ফলে নিমাদাজুকে নিজেই হাত পুড়িয়ে রান্না করে খেতে হয়। তাছাড়া এই পাহাড়ে কাজের কি অভাব আছে নাকি? বাড়ির চমরি গাইগুলোর দেখভালো করা, বিছানায় শুয়ে থাকা অসুস্থ বউয়ের সেবাযত্ন করার মতো হাজার কাজ করতে হয় নিমাদাজুকে। আগের বার এসে ভাবিকে দেখেছি সাংঘাতিক কাশতে। তার আবার শরীর খারাপ হল কি না কে জানে!

হিমশীতল হাওয়ার ঝাপটা বইছে এলোমেলো। জ্যাকেটের কাপড় পতপত করছে। মাথার চুল আঙুল চালিয়েও সামলানো যাচ্ছে না। চিত্রাঙ্গদা বলল, এই দুর্গম পাহাড়ে আচমকা কেউ অসুস্থ হলে তো মহা বিপদ। এতটা পথ উজিয়ে রুগিকে কাঠমান্ডুতে নিয়ে যেতে গেলে তো প্রাণ অবধি চলে যেতে পারে। এমন হতেই পারে যে বউ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাকে নিয়ে নিমাদাজু নীচের দিকে কোথাও নেমে গেছে।

ভীমবাহাদুর খানিক ভাবল। চিত্রাঙ্গদার কথায় সায় দিয়ে বলল, হতেও পারে। আর একটু অপেক্ষা করে দেখা যাক।

ঘরের বাইরে দেওয়ালে ঝোলানো সরু কাঠের তক্তা। তার ওপর রাখা পুরু প্লাস্টিকের থলে। তাতে সযত্নে লাগানো হয়েছে ফুলগাছ। রঙিন কিছু ফুল ফুটে আছে। রঙ্গিত লোভ সামলাতে পারল না। সঙ্গের ক্যামেরাটা বের করে তাক করল সামনের দৃশ্যের দিকে। দু-চারটে স্ন্যাপ নিতে না নিতেই নিঃশব্দ পদসঞ্চারে নিচ থেকে উঠে এল গুঁড়োগুঁড়ো মেঘের দল। কিছু বোঝার আগেই ভিজিয়ে দিল সকলকে। সেই সঙ্গে ভিজিয়ে দিল বাহারি ফুলগুলোকেও। রঙ্গিত বলল, নিমাদাজু হোক বা অন্য কেউ, কিন্তু এই ঘরে লোকে এখনও বসবাস করে। নিয়মিত দেখভাল না করলে ফুলগাছগুলো এমন তরতাজা থাকার কথা নয়। এই দ্যাখো কয়েকটা মুরগিও তো দেখছি ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সত্যিই তাই। একটা মা মুরগি টুকটুক করে হাঁটছে। লাইন দিয়ে তার পিছু নিয়েছে ছানাপোনারা। ঘাড়টা অদ্ভুত ভাবে বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে দেখছে আগন্তুক চারজনকে। মুকুট আর চিত্রাঙ্গদার মুখ খিদেতে শুকিয়ে গেছে। রঙ্গিত আর ভীমবাহাদুরেরও সেই একই দশা। কী করবে বুঝতে পারছে না। মুকুট ঠাঁইনাড়া হতে রাজি নয়। বলল, একটু অপেক্ষা করে দেখাই যাক না। আমার মন বলছে কেউ না কেউ ঠিক আসবে। আমি নড়ছি না। কেউ না আসা অবধি গ্যাঁট হয়ে বসে থাকব এখানে। কিছু না হোক মাথার ওপর ছাদটুকু তো রয়েছে।

ভীমবাহাদুর বসে ছিল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে। উঠে এসে উশখুশ করে বলল, ঘরের ভেতর কিছু আছে কিনা দেখি? যদি থাকে তাহলে কিছু বানিয়ে ফেলি বরং।

রঙ্গিত অবাক হয়ে বলল, অন্যের ঘরে না বলে ঢোকাটা কি ঠিক হবে? তোমরা পাহাড়ি মানুষ। তোমরা তো পাপ পুণ্য এসব খুব বিশ্বাস করো। তাহলে কী করে এমন একটা কথা বললে তুমি?

চিত্রাঙ্গদা মুচকি হেসে রঙ্গিতের উদ্দেশে বলল, তুমি প্রথমবার ট্রেক করছ তাই তোমার ভীমবাহাদুরের কথায় অবাক লাগছে। কিন্তু এতে এত চমকানোর কিছু নেই। সব পাহাড়ি এলাকাতেই এমন চলে।

রঙ্গিত অবাক হয়ে বলল, কী চলে? ঘরে কেউ না থাকলে ঘর খুলে ঢুকে পড়া যায়?

ভীমবাহাদুর হেসে বলল, দিদি ঠিকই বলেছে। আপনি নতুন বলে অবাক লাগছে। কিন্তু পাহাড়ে এটাই দস্তুর। ঘরে ঢুকে রান্না করার পর পুরোটা খেয়ে নেওয়াটা ঠিক নয়। কিছুটা খেয়ে বাকিটা রেখে দিতে হয়। বাড়ির লোক এসে পড়লে মূল্য বাবদ কিছু একটা ধরে দিতে হয়। কেউ না এলে টাকা রেখে যেতে হয় চোখে পড়ার মতো কোনও জায়গায়।

রঙ্গিত হাঁ করে শুনছিল ভীমবাহাদুরের কথা। বাবা রে বাবা, এমনও হয়! এদিকে ভীমবাহাদুর ততক্ষণে ঢুকে পড়েছে ঘরের ভেতর। তার সঙ্গে সঙ্গে চিত্রাঙ্গদা। পরক্ষণেই বেরিয়ে এল বড় বড় চোখ করে। হই হই করে বলল, ভেতরে এসো তোমরা। দেখে যাও কাণ্ড!

মুকুট আর রঙ্গিত দৃষ্টি বিনিময় করে নিল একবার। ওদের উত্তেজনার কারণ বোঝা যাচ্ছে না। দ্রুতপায়ে রঙ্গিত ঢুকে পড়ল ঘরে। পেছন পেছন মুকুট। ঘরে দুটো জানলা আছে। সেই জানলা দিয়ে আর খোলা দরজা দিয়ে খানিকটা আলো এসে পড়েছে ভেতরে। তাতে দেখা যাচ্ছে একটা জানলার কাছে বেতের তৈরি লম্বা একটা ঝুড়ি। ঝুড়িটা ঘরের বরগার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা। সেখানে এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল এক দুধের শিশু। এবার লোকজনের গলার আওয়াজে উঠে বসেছে সে। চোখ পিটপিট করে দেখছে তাদের।

ফুটফুটে একটা বাচ্চা। ছেলে নাকি মেয়ে! মেয়েই বোধ হয়। বারবি ডলের মতোই খুদে খুদে হাত পা। ছোট্ট ছোট্ট আঙুল। ড্যাবড্যাব করে এদিকেই তাকিয়ে আছে। মুকুট চোখ গোল গোল করে দেখছে বাচ্চাটাকে। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না ঘটনাটা। মুখ ফিরিয়ে তাকাল রঙ্গিত আর চিত্রাঙ্গদার দিকে। বলে উঠল, কী মিষ্টি দেখতে বাচ্চাটা!

রঙ্গিত ফোটো তুলে নিল বাচ্চাটার। ভীমবাহাদুর ক্যাজুয়াল গলায় বলল, এভাবেই পাহাড়ি মায়েরা তাদের বাচ্চাদের রেখে মাঠে ঘাটে কাজ করতে যায়। দু-এক ঘণ্টা বাদে বাদে এসে বাচ্চাটাকে দেখে যায়। প্রয়োজন হলে বুকের দুধ খাইয়ে যায়। বাচ্চা যখন এখানে রেখে গেছে তার মানে নিমাদাজু বা তার পরিবারের লোকজন আশেপাশেই আছে।

চিত্রাঙ্গদা নিজের কোলে নিয়ে নিয়েছে বাচ্চাটাকে। মুকুটের কিছুতেই হজম হচ্ছে না ব্যাপারটা। মাঝে-মাঝেই বলে উঠছে, এদের কি একটা আক্কেল নেই? কেউ যদি ঘরে ঢুকে বাচ্চাটাকে নিয়ে চলে যায়?

ভীমবাহাদুর বলল, ধুত! বাচ্চা চুরি-টুরি আপনাদের সমতলে হয় দিদি। পাহাড়ে ওসবের বালাই নেই।

মুকুট বলল, এটা কোনও কথা হল? কচি বাচ্চাটাকে তার মা ফেলে রেখে চলে গেছে কোন আক্কেলে? এর বাবাই বা কেমন লোক?

ভীমবাহাদুর বলল, দিদি, আপনারা বুঝবেন না, পাহাড়ের মানুষের জীবন অনেক কঠিন। টাকাপয়সা নেই বলে লড়াই করে টিকে থাকতে হয় এখানে। টিকিয়ে রাখতে হয় পরিবারকে। তাই বেঁচে থাকার জন্য পাহাড়ের মায়েদের একটু নির্মম হতেই হয়।

মুকুট চিত্রাঙ্গদার থেকে নিজের কোলে নিয়েছে বাচ্চাটাকে। বাচ্চাটার কপালে আর গালে হামি দিল খানকতক। সে ছোট্ট ছোট্ট ঠোঁট ফাঁক করে হাই তুলল। এদিকে ভীমবাহাদুর চলে গেছে ভেতরে। ব্যস্ত হয়ে পড়েছে রান্নাবান্না নিয়ে। বাচ্চাটাও মুকুটের কোল থেকে ঝুঁকে নেমে পড়েছে নীচে নামবে বলে। মুকুট ছেড়ে দিল শিশুটাকে। সে খেলতে লাগল মাটিতে থেবড়ে বসে। কী সব বলতে লাগল আপনমনে। তার যে মা এখানে নেই সেটা তার হাবভাব দেখে বোঝার উপায় নেই।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। এক মাঝবয়সি মহিলার আবির্ভাব ঘটল ঘরে। পিঠে ঝুড়ি। মুকুটদের দেখে মহিলার সরু সরু মঙ্গোলয়েড চোখে ফুটে উঠল নিখাদ বিস্ময়। তার সঙ্গে কথা চালাচালি হল ভীমবাহাদুরের। ভাষার আড়াল সরিয়ে জানা গেল নিমা ওয়াংদির স্ত্রী গত হয়েছে। এই মহিলার নাম পেমা। সে নিমার সহোদরা বোন। আর এই ফুটফুটে বাচ্চাটা হল পেমার নাতি। পেমার মেয়ে, অর্থাৎ বাচ্চাটার যে মা সে মারা গেছে কোভিডের সময়। ফলে এখন পেমাকেই দেখভাল করতে হয় দুধের শিশুটাকে। মেয়ে মারা যাবার পর নিমার শরীর ভেঙে গেছে। তবুও এখনও বাড়ির সব কাজ নিমা নিজেই করে। এক সপ্তাহের সবজি আর আনাজপাতি কিনতে নিমা আর তার জামাই অনেকটা নীচে নেমে ঘাচোকে গেছে। বাচ্চাটাকে রেখে গেছে পেমার কাছে।

নাতিকে কোলে নিয়ে মহিলা চলে গেল ঘরের ভেতরে। ছ্যাঁকছোক শব্দ শুনে মনে হল ভীমবাহাদুরের সঙ্গে হাত লাগিয়েছে রান্নায়। একটুক্ষণ পর ভীমবাহাদুর বেরিয়ে এল ঘর থেকে। দু’হাতে দুটো থালা। থালায় ভাত আর ডাল। সঙ্গে আলু আর কপির ঘন থকথকে সবজি। মুকুট আর চিত্রাঙ্গদার দিকে তাকিয়ে হাসল রঙ্গিত। যে পথে গত চারদিন ধরে তারা ট্রেকিং করছে সেই পথে প্রত্যেক জায়গাতেই থাকাখাওয়ার বন্দোবস্ত আছে। মুকুট আর রঙ্গিতের মনে হয়েছিল এই পথে কোনও পোর্টার কিংবা গাইডের প্রয়োজন নেই। তাতে টাকাও বাঁচে অনেক। পাহাড়ি পথে হাঁটার কষ্ট ছাড়া তেমন কোনও অসুবিধেও নেই। চিত্রাঙ্গদা কিন্তু প্র্যাকটিকাল। সে বলেছিল, এই রিস্ক কোনও অবস্থাতেই নেওয়া যাবে না। চিত্রাঙ্গদাই যে ঠিক ছিল সেটা বোঝা গেল এখন। ভীমবাহাদুর না থাকলে তাদের খুবই অসুবিধে হতো এই পাহাড়ে।

মুকুট আর রঙ্গিতকে চিত্রাঙ্গদা বুঝিয়েছিল সেতি উপত্যকায় শেষ গ্রাম চামলুং থেকে মারদির পথে ছিমছিমলে খরকা অবধি পথের ব্যাপারে কিছুই জানা নেই তাদের। কিন্তু ভীমবাহাদুরের এই পথ হাতের তালুর মতো চেনা। তাকে পোর্টার কাম গাইড হিসেবে সঙ্গে নেওয়াটা দরকার। ভীমবাহাদুর যে কতটা কাজের সেটা গতকালই বোঝা গেছে। ঘাচোক থেকে ছিমছিমলে খরকা আসার পথে দু-জায়গায় পাথরের দেওয়াল ট্র্যাভার্স করে চলতে হচ্ছিল সকলকে। ট্রেকিংয়ের সময় পাথরের দেওয়াল আড়াআড়ি পেরোবার নিয়ম। সেটাই করছিল সকলে। হাঁটার সময় এড়িয়ে চলতে হচ্ছিল পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা বরফের বড় বড় জিভ। ইংরেজিতে একে বলে আইস-টাং। ভীমবাহাদুর সঙ্গে ছিল বলে বিপদ আপদ হয়নি ওদের।

সকালে আর একটা কাণ্ড হল। বাঁশ আর রডোডেনড্রনের জঙ্গল কেটে ভীমবাহাদুর তৈরি করেছিল চলার পথ। শুধু তাই নয় মারদি খোলার ওপর পাথর আর গাছের ডাল ফেলে তিনজনকে খরস্রোতা নালা পার করাল সে। শুধু তা-ই নয়, নালার জলে একটা সরু জায়গায় ঝোপঝাড় ফেলে গোটা চারেক ট্রাউট মাছও ধরে ফেলেছে সে। রঙ্গিতরা নিজের নিজের মোবাইলে ভিডিও করে ধরে রেখেছে তার কাণ্ডকারখানা।

ট্রেক করতে করতে ওপরের দিকে উঠছিল সকলে। একটা জায়গায় এসে পাওয়া গেল ধস এলাকা। যে পথ ধরে যেতে হবে তার অনেকটা জায়গা জুড়ে ধস। সাধারণত ধস পড়ার পর ধীরে ধীরে মানুষজন সেই পথ দিয়ে চলাচল শুরু করে। তখন পায়ে হাঁটা পথ তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু এখানে সেটা নেই। অনুমান করা যায় ধস এর মধ্যেই নেমেছে। তাদের তিনজনের কপালে ফুটে উঠেছিল দুশ্চিন্তার ভাঁজ। রঙ্গিত বলল, আর নয়। এবার ঘাচোক ফিরে যাওয়াটাই বাঞ্ছনীয়।

কিন্তু ভীমবাহাদুর সে কথা শোনার বান্দা নয়। মুখচোখ শক্ত করে বলল, আমি পাহাড়ি ছেলে। আমার অত সহজে নার্ভ ফেল করে না। কথাগুলো বলে কিছুক্ষণ চোখ বুজে থাকল সে। ধসটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কীসব বলল। কে জানে বোধ হয় ইষ্টদেবতার নাম স্মরণ করল। তার পর রঙ্গিতদের নিষেধ উপেক্ষা করে সেই ধসের মধ্যে দিয়েই অতি সাবধানে পা ফেলে ফেলে হেঁটে একটা পায়ে চলাচল করার পথ তৈরি করে ফেলল। বুক ঢিপঢিপ করছিল তিনজনের। মুকুট ঠাকুরকে ডাকছিল, যেন কোনও অঘটন না ঘটে। তার তৈরি করা সেই পথ দিয়েই পা টিপে টিপে তিনজন পার হয়েছিল সেই পথটুকু। সে সময় কিছু একটা অঘটন ঘটতেই পারত। দুর্ঘটনা তো এভাবেই ঘটে। কিন্তু কপাল ভালো, তেমন কিছু ঘটেনি।

খানিক বাদে একটা ওভারহ্যাংয়ের নীচে আশ্রয় নিল সকলে। রান্নাবান্নার ব্যাপার ছিল না। দু-চারদিনের কাজ চালাবার মতো ছাতু, বিস্কুট, ছোলা, বাদামের মতো শুকনো খাবার নিয়ে আসা হয়েছিল সঙ্গে করে। চা-চিনি আর একটা স্টিলের বাটিও আনা হয়েছিল। যদি সুযোগ পাওয়া যায় তাহলে চা বানিয়ে যাতে খাওয়া যায়। চিত্রাঙ্গদার কাছে একটা ছোট তাঁবু আছে। এছাড়াও কিছু নুডলস আর সুপের প্যাকেট আছে। রয়েছে পোর্টেবল স্টোভ। কিন্তু ছিমছিমলে খরকার পর চিত্রাঙ্গদা যে পথে যাবে এটা সেই রাস্তায় তার নিজের ব্যবহারের জন্য।

ওভারহ্যাংয়ের নীচে প্লাস্টিক পেতে থাকার জায়গা তৈরি করেছিল ভীমবাহাদুর। এবার কোত্থেকে কিছু কাঠকুটো জোগাড় করে আনল। তিনটে বড় পাথর তিনদিকে বসিয়ে একটা চুলা মতো বানিয়ে ফেলল চটজলদি। স্টিলের বাটির মধ্যে চাপিয়ে দিল চায়ের জল। নালা থেকে ধরা ট্রাউট মাছগুলোকে পোড়াল আগুনের আঁচে। চিত্রাঙ্গদা ব্যাগ থেকে নুডলস বের করে আনল। নুডলস সেদ্ধ করে চারভাগ করা হল। নুডলস, মাছভাজা আর লিকার চা দিয়ে জমে গেল সন্ধেটা। চিত্রাঙ্গদা মাছে আলতো কামড় দিয়ে আহ্লাদে ‘ওয়াও’ বলে উঠল। তার পর বাঁ-হাতে মাছভাজাটা ধরে ডানহাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে বৃত্ত বানিয়ে হাসিমুখে পোজ দিল চিত্রাঙ্গদা। সেই ছবি ক্যামেরায় তুলে নিল মুকুট। পেট পুরে খেয়ে ওঠার পর একটা পাথরের ওপর বসে রইল রঙ্গিত। মুকুট আর চিত্রাঙ্গদা
বেরোল এক চক্কর ঘুরে আসতে। ঠান্ডার মধ্যে হাঁটাহাঁটি করে ফিরে এল একটুক্ষণ বাদে।

গপ্পো হচ্ছিল নিজেদের মধ্যে। ভীমবাহাদুর বলল, যে কোনও অভিজ্ঞ ট্রেকার মাত্রেই বুঝবে যে, এই পথ ভার্জিন নয় ঠিকই কিন্তু খুব বেশি লোকের চলাচল নেই এদিকে। ট্রেক করতে এই তল্লাটে আসে না সচরাচর কেউ।

মুকুটের দিকে তাকিয়ে রঙ্গিত বলল, ছিমছিমলে খরকা অবধি আমরা এসেছি। আই স্যালিউট ইউ। তুমি যা করে দেখিয়েছ তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। এমন একটা শক্ত অসুখ থেকে ওঠার পর দশ হাজার ফিট অল্টিটিউড ট্রেক করে ওঠার কথা শুনলে কেউ বিশ্বাস করবে না। তবে আর ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। আমরা এখান থেকেই এবার নেমে যাব। চিত্রা আর ভীম উঠবে আরও খানিকটা পথ। রঙ্গিত ভীমবাহাদুরের উদ্দেশে বলল, আর কতদিন ট্রেক করতে হবে তোমাদের?

ভীমবাহাদুর জবাব দিল, আমি আর চিত্রাদিদি তিনটে দিন ট্রেক করব। প্রথম দিন আমরা যাব কুমাই। পরদিন পৌঁছব খোয়চোন। তৃতীয় দিন টাকরা হয়ে চারদিনের দিন পৌঁছব মারদি হিমাল বেস ক্যাম্পে।

রঙ্গিত জানতে চাইল, কী আছে সেখানে?

চিত্রাঙ্গদা হাসল, আমি হোমওয়ার্ক করেই এসেছি এখানে। সেখানে রয়েছে বরফের তৈরি বিশাল এক অ্যাম্ফিথিয়েটার। বেসক্যাম্প ছাড়িয়ে মারদি হিমাল আর মচ্ছপুছার যেখানে এক হয়েছে সেখানে একবার ট্রাই করব ওঠার। নেমে আসার আগে বেসক্যাম্পের পথে একটা স্যাংচুয়ারি আছে। মারদি হিমালে প্রথম আরোহণকারী জিমি রবার্টস এর নাম দিয়েছিলেন আদার স্যাংচুয়ারি। সেখানে পায়ের নীচে শুধু বরফ আর বরফ। ওপরদিকে তাকালে হিউনচুল্লি, থারপুচুল্লি, অন্নপূর্ণা, লামজুং হিমাল হয়ে একেবারে হাত ছোঁয়া দূরত্বে মচ্ছপুছারের চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য।

রঙ্গিত আফশোস করে বলল, সেসব দৃশ্য দেখার জন্য মন বড় টানছে। কিন্তু উপায় নেই। মুকুট সবে একটা বড় অসুখ থেকে উঠেছে। এখন আর বাড়তি ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। এবার আমাদের ফিরতে হবে। তুমি মানালিতে ক্লাইম্বিংয়ের ট্রেনিং নিয়েছ। তোমার কথা আলাদা, তুমি আরও বেশ খানিকটা উঠতে পারবে। এমনিতেও রোপ, ভালো সরঞ্জাম ছাড়া ওই পথে ওঠা মুশকিল। আমরা শখের ট্রেকার। আমাদের আর রিস্ক না নেওয়াই ভালো।

ভীমবাহাদুর সায় দিয়ে বলল, দাদা ঠিকই বলেছে। অত রিস্ক না নেওয়াই ভালো।

মুকুট কোমরে হাত দিয়ে ভীমবাহাদুরের গলা নকল করে বলল, অত রিস্ক না নেওয়াই ভালো! তার পর ছদ্ম বকুনি দিয়ে বলল, তবে রে ব্যাটা! তখন যে তুমি ধস নামা জায়গাটা পার হলে তখন তাহলে ঝুঁকি নিয়েছিলে কেন? যদি কিছু একটা হয়ে যেত?

লাজুক হাসল ভীমবাহাদুর। তার পিঠে স্নেহের হাত রাখল রঙ্গিত। সকলে হেসে উঠল হো হো করে। এদিকে নিমা ওয়াংদি আর তার জামাই চলে এসেছে। ছেঁড়াফাটা জিন্স, গায়ে তাপ্পি দেওয়া কোট, পায়ে জুতো, মাথায় টুপি। ঠোঁটে সস্তার সিগারেট। মুখে লাজুক হাসি। ভীমবাহাদুর জড়িয়ে ধরল তার নিমাদাজুকে। রঙ্গিতদের দিকে মুখ ফিরিয়ে চওড়া হেসে বলল, এই হল নিমা ওয়াংদি।

জামাইয়ের চেহারা শক্তপোক্ত। চৌকো চোয়াল, মজবুত স্বাস্থ্য। তবে মানুষটা একটু লাজুক ধরনের। গলার স্বরও মেয়েলি। নিমার বিপরীত চরিত্র একেবারে। সে মুখে লজ্জা লজ্জা হাসি ফুটিয়ে মেয়েলি গলায় রঙ্গিতকে বলল, আপনারা কোথা থেকে আসছেন?

কথাটা অবশ্য বলার জন্যই বলা। কেননা রঙ্গিত কিছু জবাব দেবার আগেই জামাই কোলে নিয়ে নিল বাচ্চাটাকে। আদর করতে লাগল বিজাতীয় ভাষায় কী সব বলে। ততক্ষণে রান্নায় নেমে পড়েছে নিমা। গরম ভাতের সঙ্গে ডিমের ঝোল আর আলুসেদ্ধ দিয়ে ডিনার সারা হয়ে গেল ছ’টা নাগাদ। সাতটা বাজতে না বাজতেই শুয়ে পড়ল সকলে। যে সময় কোনও শহর যখন আড়মোড়া ভাঙছে জীবনের উৎসবে সামিল হবে বলে তখন এই উঁচু পাহাড়ে গভীর রাত। জগৎ সংসার একেবারে নিথর। কান পাতলে শুধু শোনা যায় হাওয়ার শনশন শব্দ। গাছের পাতা খসে পড়ার মৃদু আওয়াজও জোরালো হয়ে ধাক্কা মারে কানে।

রাতে নিমাদাজুর আস্তানাতেই কাটল। বাচ্চাটা কথা বলছে বকম বকম করে। কী যে বলছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বাচ্চাটার গলার আওয়াজ শুনতে শুনতে কখন যে তার চোখ বুজে এসেছে তা মুকুট জানে না।

সকাল হল একসময়। চোখ মেলল মুকুট। এবার বিচ্ছিন্ন হবার পালা। চিত্রাঙ্গদা দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। দুটো হাত দু’দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বলল, উইশ ইউ অল দ্য বেস্ট।

উঠে দাঁড়াল মুকুট। চিত্রাঙ্গদা জড়িয়ে ধরেছে মুকুটকে। ছাড়ে না কিছুতেই। মিনিটখানেক গেল এভাবে। দুজনে দুজনকে ছাড়ল একসময়। এবার চিত্রাঙ্গদা হাগ করল রঙ্গিতকে। উষ্ণ আলিঙ্গন করে বলল, আমি আর ভীমবাহাদুর উঠব ওপরের দিকে। তোমরা ফিরে যাবে নীচে। আমাদের রুট আলাদা হয়ে যাবে এবার। তোমাদের সঙ্গে এযাত্রা আমার আর দেখা হবে না। তার আগে তোমাদের দুজনকে একটা কথা বলি। কী, বলি?

চিত্রাঙ্গদা রঙ্গিতকে আলিঙ্গনমুক্ত করল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর গলায় বলল, তোমাদের দুজনকে পাশাপাশি খুব মানায়। তোমাদের রুচি একরকম, ওয়েভ লেন্থ একরকম, প্যাশন একরকম। তোমরা যে একে অন্যকে ছাড়া থাকতে পারবে না সেটা কি তোমরা জানো না? নাকি সত্যের থেকে মুখ ফিরিয়ে আছ? এর পর মুকুট চলে যাবে বেঙ্গালুরুতে। তুমি চা বাগানের চাকরি ছেড়ে জয়েন করবে আইটি সেক্টরে। অনসাইট প্রোজেক্টের কাজ নিয়ে চলে যাবে ব্রাজিলে। তখন তোমাদের রিলেশনশিপের কী পরিণতি হবে ভেবে দেখেছ?

রঙ্গিত পূর্ণ চোখে তাকাল মুকুটের দিকে। পাহাড়ি ধূসর মেঘের মতোই একটুকরো বিষাদ লেগে রয়েছে মুকুটের মুখে। এই বিষাদ কি আসন্ন বিচ্ছেদের কথা ভেবে? জানে না রঙ্গিত। চিত্রাঙ্গদা বলল, রঙ্গিত, গিভ হার আ হাগ। তুমি মুকুটকে প্রোপোজ করো প্লিজ। ইটস হাই টাইম।

নীচু গ্রামে কেউ সেতার বাজাচ্ছে রঙ্গিতের মধ্যে। গান বা বাজনা শুনতে ভালোবাসলেও সুরের, সংগীতের আলাদা করে রূপরহস্য বোঝে না রঙ্গিত। জানে না সূক্ষ্ম আঙ্গিকের ব্যাপার স্যাপার। ওসব হিসেব রাখার দরকারই বা কী। চিত্রাঙ্গদার কথার মধ্যে কী একটা যেন ছিল। মুকুটকে বুকে টেনে নিল রঙ্গিত। বুকটা ভরে উঠল তার। মনে হল মিড়ের মোচড়ে এক অলৌকিক সেতারের সুর এখন তার আর্ত-আনন্দিত মনটাকে মাতাল করে দিচ্ছে। ঝমঝম করে কী এক নেশার মতো করে বেজে উঠছে তার গোটা শরীর। নরম আঁচে জ্বলে ওঠা কামনার আগুন ক্রমশ পোড়াতে শুরু করল রঙ্গিতকে। ভুটানের এক জনবিহীন গ্রামে প্যাংকুটুদার আতিথ্যে কিছুদিন কাটিয়েছিল সে। সেখানে এক অলৌকিক সন্ধ্যায় ওয়াংমো নামে এক তরুণীর সঙ্গে মিলিত হয়েছিল রঙ্গিত। সেদিন প্রবল নেশার ঘোরে ছিল সে। কী করে কী হয়েছিল সে কিছুই বলতে পারবে না। জৈবিক তাড়নার কথাই শুধু মনে আছে, তার বেশি কিছু নয়।

সেদিনের পরম আশ্লেষের অনুভূতির কিছুই তার স্মৃতিপটে ধরা নেই। তার মেমারি ব্যাংকে সেই সন্ধেটা রয়ে গেছে টুকরো টুকরো কিছু কোলাজ হয়ে। কিন্তু আজকের আদীপ্ত অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা। আর্ত, না কি আনন্দিত? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে রঙ্গিত, একইসঙ্গে এই দুই বিপরীত অনুভূতি কি কখনও চেতনার গভীরে গিয়ে মিশে যেতে পারে? আবিষ্ট করে দিতে পারে গোটা শরীর ও মনকে? পারার কথা নয়। কিন্তু সেটাই তো হচ্ছে এখন। রঙ্গিতের শরীরটাই যেন সেতার হয়ে উঠছে একটু একটু করে। রক্তের মধ্যে ঢিমে আঁচে আগুন জ্বলছিল তার, মুকুটের কপালে, দুই চোখের পাতায় চুমু খেল রঙ্গিত। নিজের ঠোঁট পরম আশ্লেষে ডুবিয়ে দিল মুকুটের নরম ঠোঁটে।

পৃথিবীতে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন যার জীবনে প্রেম আসেনি কখনও। মুখ ফুটে বলতে পারেনি হয়তো এমন হতে পারে, কিন্তু নিজের হৃদয়ে গোপনে প্রেমের অনুভব হয়নি এমন মানুষ যদি কেউ থেকে থাকে তবে সে নিতান্তই দুর্ভাগা। এই কারণেই প্রেমকে বলা হয় চিরজীবি। নিজের অনুভূতিগুচ্ছ এক অচেনা হাওয়ায় যেন রিনরিন করে উঠছে। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে বুকের গহীনে। প্রথম বৃষ্টির সোঁদা গন্ধমাখা ঘ্রাণ ভেসে আসছে নিজের নাকে। অন্তরের অন্তস্থলে তীব্র অথচ গহন এক রোমাঞ্চ হচ্ছে। রঙ্গিতের মনে হচ্ছে এতদিন সে বেঁচে ছিল তো এই বিশেষ মুহূর্তটার জন্যই।

মুকুটের ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরিয়ে এনে তার চিবুকে আঙুল ছোঁয়াল রঙ্গিত। নরম আলো ছড়িয়ে পড়ছে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়চুড়োয়। সেই আলোর গন্ধে ভরে উঠছে চারদিক। ভালোবাসার আলোয় ভেসে যাচ্ছে আদরের উপত্যকা। হালকা হালকা শিরশিরে হাওয়া দিচ্ছে। থিরথির করে উড়ছে মুকুটের চুল। অপূর্ব এক আবেশে চোখ বুজে আছে মুকুট। তার স্থলপদ্মের মতো অনিন্দ্য মুখশ্রীতে লগ্ন হয়েছে এক অলৌকিক বিভা। রঙ্গিতের মনে হচ্ছে এক আশ্চর্য আলোয় আজ আলো হয়ে উঠেছে তারা নিজেরাই। মনে হচ্ছে তারা দুজন জন্মেছিল তো এই জন্যই। এতটা পথ হেঁটে ভালোবাসাঘন এই পরম মুহূর্তটার কাছে একদিন পৌঁছবে বলে।

২৭

হেমন্তের এই অবেলায় রোদের রং বাসি হলুদের মতো, তার তাপ দ্রুত জুড়িয়ে যায়। লাটাইতে সুতো গোটাবার মতো শেষবেলার রোদ কেউ যেন খুব তাড়াতাড়ি টেনে নেয়। আজও অফিসের গদি দেওয়া চেয়ারটায় বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন স্বস্তিশোভন। নিশ্চল ঢেউয়ের মতো সবুজ চা বাগান, ঢ্যাঙা চেহারার শেড ট্রি, দূরের কুলিলাইন, আঁকাবাঁকা খয়েরি মাটির রাস্তা, আর তার ওপরে পশ্চিম আকাশে প্রকাণ্ড লাল বলের মতো সূর্যটা স্থির হয়ে দাঁড়ানো। তার গা ঘেঁষে কয়েকটা পাখি উড়ছিল। স্বস্তিশোভনের চটকা ভাঙল যখন গলা খাকারি দিয়ে কেউ ভারী গলায় বলল, মিস্টার মুখার্জি, ভেতরে আসতে পারি? আমি থানা থেকে আসছি।

মুকুট রঙ্গিত চিত্রাঙ্গদারা গেছে ট্রেকিংয়ে। ভীমবাহাদুর নামে অল্পবয়সি একজন পোর্টার কাম গাইডও কাঠমান্ডু থেকে যোগ দিয়েছে তাদের দলে। তাতে কী! তাঁরা বাবা-মা। উদ্বেগ তো হবারই কথা। পাহাড়চুড়োয় ফোনের নেটওয়ার্ক থাকে না অনেক জায়গাতেই। ফলে যোগাযোগ করা যায় না। মেয়েটা সদ্য এত বড় অসুখ থেকে উঠল। অভয়া মুখে প্রকাশ করেন না, কিন্তু মুকুট ঘরে না ফেরা অবধি তাঁর কপালের ভাঁজ সমান হবে না। স্বস্তিশোভনের কাজে মন নেই। মেয়েকে ঘিরে নানারকম দুর্ভাবনা পোকার মতো কিলবিল করে ঘুরে বেড়ায় মনের মধ্যে। এর মধ্যে সরসতিয়ার ব্যাপারটা যোগ করেছে নতুন মাত্রা। স্বস্তিশোভন নিজের মধ্যে ফিরতে ফিরতে বললেন, প্লিজ কাম ইন।

খাকি উর্দি পরা মানুষটি মধ্যবয়সি। ইউনিফর্মের কাঁধের কাছে তারার সংখ্যা দেখে বোঝা যায় উঁচু পদমর্যাদার পুলিশ অফিসার। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, কাঁচায় পাকায় মেশানো। তামাটে গায়ের রং। শক্ত চোয়াল, ভারি ঠোঁট, গালে বসন্তের দাগ। ছোট ছোট চোখ একটু ভেতরে ঢোকা, ছড়ানো মোটা নাক, পেটানো লোহার মতো চেহারা। খাকি উর্দিধারীর পায়ের ধুলো কি এর আগে পড়েছে কখনও মেঘদুয়ার চা বাগানের সিনিয়র ম্যানেজারের চেম্বারে? জানেন না স্বস্তিশোভন। তিনি আপ্যায়নের ভঙ্গি করে বসতে বললেন অফিসারকে। বললেন, কী ব্যাপার বলুন।

পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ খুলে দেখিয়ে পুলিশ অফিসার ভারী গলায় বললেন, হিম্মত লোহারের নামে ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে। শুকরা মুন্ডাকে খুন করা ছাড়াও সরসতিয়া নামে এই চা বাগানের এক চা শ্রমিককে গ্যাং রেপ করার চার্জ ফ্রেম করা হয়েছে হিম্মত ছাড়াও বুধুয়া ওঁরাও, ফিলিপ এক্কা সমেত মোট পাঁচজনের নামে। আমার টিম অলরেডি মুভ করে গেছে কুলিলাইনের দিকে। আপনাকে ফরমালি জানানোটা আমার কর্তব্য। তাই আমাকে আসতে হল।

সবটুকু বিস্ময় আর বিমূঢ়তা একসঙ্গে জড়ো করে স্বস্তিশোভন তাকিয়ে ছিলেন আগন্তুকের দিকে। নাকের ডগায় ঘুরে বেড়ালেও এতদিন পুলিশ হিম্মত আর তার দলবলকে অ্যাবসকন্ড বলেছে। আচমকা কী এমন ঘটল যে পুলিশ ওয়ারেন্ট জারি করে ধরতে চলে এল হিম্মতকে? পলকহীন চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলেন স্বস্তিশোভন। প্রশ্নটা মুখে এলেও নিজেকে সংযত করলেন তিনি। অবিশ্বাসী গলায় বললেন, কুলিলাইনে গিয়ে কি ওদের পাওয়া যাবে?

নেংটি ইঁদুর গর্ত ছাড়া আর কোথায় লুকোবে? সব গর্তের হদিশই পুলিশ জানে। আপনি চিন্তা করবেন না, ও ঠিক আমরা খুঁজে বের করে নেব। নিজের রসিকতায় নিজেই হাসলেন খাকি জামাপ্যান্ট পরা ভদ্রলোক।

স্বস্তিশোভন দেখলেন পুলিশ অফিসারকে। শব্দ না করে দুর্বোধ্য হাসি হাসছেন মানুষটি। তিনি মুখে বললেন, খুঁজে বের করলেই ভালো।

পুলিশ অফিসার চোখ কুঁচকে বললেন, আসলে কী জানেন, শুকরা মুন্ডার মার্ডার বা সরসতিয়া নামের মেয়েটাকে গ্যাংরেপ নয়, হিম্মতের এগেনস্টে আরও একটা চার্জ আছে। উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা কয়েকজন পোচারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এদিকের জঙ্গলের চিতাবাঘ মেরে তার চামড়া বিদেশে চোরাচালান করার অপরাধ। কত টাকার যে ব্যাপার আপনি ধারণাও করতে পারবেন না। আচ্ছা ঠিক আছে আমি তবে আসছি। ভালো থাকবেন।

পুলিশ অফিসারটির চোখের সাদা জমি লালচে। চোখ দুটো শুকনো নয়, ঘোলাটে জলে ডোবা। তাঁর শরীরী ভাষায় এমন কিছু একটা সংকেত ছিল যে স্বস্তিশোভন অনুমান করতে পারলেন এতদিন বাদে পুলিশের এই অতি-তৎপর হয়ে ওঠার পেছনে কিছু একটা রহস্যময় ব্যাপার আছে। সেটা উঁচু মহল থেকে চাপ হতে পারে, মন্ত্রীর ফরমান হলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

ধুলো উড়িয়ে পড়ে থাকা শুকনো পাতার মচমচানির শব্দ তুলে চলে গেল পুলিশের জিপ। এতক্ষণ সূর্যটা পশ্চিম আকাশের ঢালু পাড়ে সরু সুতোয় যেন ঝুলছিল। জিপটা ধোঁয়া উড়িয়ে বেরিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সুতো ছিঁড়ে টুপ করে সেটা গাছপালার আড়ালে নেমে গেল। জানলার ধার ঘেঁষে বসে ছিলেন স্বস্তিশোভন। বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, কিন্তু কোনওদিকে তাঁর দৃষ্টি ছিল না। সূর্য ডোবার পরই বাতাসে হিমের কণা মিশতে শুরু করল। তার সঙ্গে মিশল গুঁড়ো-গুঁড়ো অন্ধকার। মলিন সন্ধ্যা নামছিল মেঘদুয়ারে। কুয়াশায় ক্রমশ ঝাপসা হতে শুরু করেছিল গাছপালা, দূরের চা বাগান, মাঠ-আকাশ।

স্বস্তিশোভন দেখলেন পা চালিয়ে ডক্টর শর্মা আসছেন এদিকে। অন্যদিনের মতো শ্লথ পায়ে নয়, হন্তদন্ত হয়ে এলেন আজ। ঘরে ঢুকেই হুড়মুড় করে বললেন, আপনি শুনেছেন কিছু? জানেন কি খবরটা? হিম্মত আর বুধুয়াদের কুলিলাইন থেকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ?

স্বস্তিশোভন ইঙ্গিতে তাঁকে বসতে বললেন উল্টোদিকের চেয়ারে। অনুত্তেজিত গলায় বললেন, একজন পুলিশ অফিসার এসেছিলেন। কুলিলাইনে যাবার আগে আমাকে ওয়ারেন্ট দেখিয়ে গেছেন। কিন্তু আরও একটা বড় ঘটনা ঘটেছে। একটু আগে মহাপাত্র ফোন করে সেই খবরটা জানিয়েছে। আশেপাশের চা বাগানের বহু লোক নাকি চড়াও হয়েছে ইউনিয়ন অফিসে। মেয়েবউরাও আছে সেই দলে। ভাঙচুর হচ্ছে তুমুল। এতদিন ধরে মানুষের মনে অনেক ক্ষোভ জমে ছিল। কিন্তু ভয়ে নিজের নিজের গুহায় ঢুকে বসেছিল সকলে। আজ কোটর ছেড়ে বেরিয়েছে সব।

ডক্টর শর্মাকে বিচলিত দেখাচ্ছিল। এবং উদভ্রান্ত। চেয়ারে বসে রুদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন, পুলিশকে একবার ইনফর্ম করতে হবে না? মব যদি উত্তেজিত হয়, যা খুশি করতে পারে। মানুষের ভেতরে এতদিনের জমে থাকা রাগের আউটবার্স্ট হবে এখন। ইউনিয়ন অফিসে আগুন লাগিয়ে দেওয়াও অসম্ভব কিছু নয়।

স্বস্তিশোভন শান্ত ও অকম্পিত গলায় বললেন, যা হচ্ছে হতে দিন।

ডক্টর শর্মা কী বলতে যাচ্ছিলেন। স্বস্তিশোভন তাঁকে নিরস্ত করে বললেন, আমি রাতের পর রাত ঘুমোতে পারিনি। অভয়া আর মুকুটের মন আর স্নায়ুর ওপর দিয়ে মারাত্মক চাপ গেছে। আমি জানি আপনি আর বৃন্দাও নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। এতদিন কিছু করতে না-পারার এই জ্বালা হাজারটা নখে চিরে ফালা-ফালা করে দিয়েছে আমাদের। এবার শান্তিতে ঘুমোব সকলে। বসে বসে কোমরটা ধরে গেছে। আসুন, বাইরে গিয়ে একটু ভালো করে শ্বাস নিই।

দুজন এসে দাঁড়ালেন সামনের ফাঁকা জায়গাটায়। চাঁদ উঠেছে আকাশে। বিশাল আকাশ চোখে পড়ে এখান থেকে। মেঘশূন্য আকাশটাকে অলৌকিক মনে হচ্ছে। নক্ষত্রখচিত রাতে ক্ষীণকটি চাঁদ উঠেছে। দয়িতের সঙ্গে চুপিচুপি মিলিত হবে বলে বেরিয়েছে অভিসারে। ডক্টর শর্মা খানিক স্থির হয়েছেন এখন। তাঁর মুখচোখে প্রশান্তি এসেছে এতক্ষণে। চা বাগানের শেড ট্রিগুলো ছুঁয়ে আসা হিমেল হাওয়া এসে ঝাপটা মারছে মুখে। তারাভরা আকাশ আর কিশোরী চাঁদের আলোয় ভিজতে ভিজতে কালের প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছেন দুজনে। স্বস্তিশোভন বললেন, মানুষের মধ্যেই আছে সুর। অসুরও। কাকে আমরা চেতনে বা অবচেতনে ইনডালজেন্স দিচ্ছি সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। হিম্মতের কথাই ধরুন। তার বাবা নরসিং লোহার ছিল মূর্তিমান ত্রাস। খুনজখম করেছে অনেক। জোর করে, ভয় দেখিয়ে ভোগ করেছে চা বাগানের কামিনদের। একদিন তার বয়স বাড়ল, গরম রক্তের নতুন একজন রিপ্লেস করল তাকে। পার্টি বুড়ো হয়ে যাওয়া নরসিংয়ের মাথার ওপর থেকে হাত তুলে নিল। তাড়া খাওয়া ইঁদুরের মতো পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হল বাঘ থেকে বেড়াল বনে যাওয়া লোকটাকে। ছন্নছাড়া কাটাতে হল বাকি জীবন। তার বউয়ের জীবন নরক করে দেওয়া হল। পরিনামে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে হল সেই মহিলাকে। সেই ক্রিমিনাল বাপের ঔরসে জন্মেছে হিম্মত। জন্ম থেকেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পেলে যা হয়, হিম্মত যে একদিন অপরাধী হয়ে উঠবে তার মধ্যে তো আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

এই নিস্তব্ধ রাতে, প্রায় অলৌকিক পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছেন দুজন মানুষ। ডক্টর শর্মা বললেন, আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না, পুলিশ এতদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর হঠাৎ এমন অ্যাকটিভ কী করে হয়ে গেল? তার মানে পুলিশের কাছে নির্দেশ এসেছে ওপরমহল থেকে। কী বলেন?

শাসক দল হয়তো আশঙ্কা করেছিল হিম্মতকে বলি না দিলে এদিকে রাজনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমান বেড়ে যাবে। ভোটব্যাংক নড়ে যাবে। সে কারণেই এত তোড়জোড়।

স্বস্তিশোভন মাথা নেড়ে বললেন, আমরা আদার ব্যাপারি। আমাদের পক্ষে এসব রাজনৈতিক অংক আর ঘোঁতঘাত জানা কি সম্ভব? জানার দরকারটাই বা কী।

ডক্টর শর্মা বললেন, কিওরিসিটি কিলস দ্য ক্যাট বলে একটা কথা আছে জানেন তো? আমারও সেই দশা। যাই হোক আর তো ক’টা দিন। রঙ্গিতরা ফিরে এলে পুরো ছবিটা পরিষ্কার হবে। আমার ধারণা অভিষেক চক্রবর্তীর হাত আছে এতে। থাকতেই হবে।

স্বস্তিশোভন বললেন, ওসব ছাড়ুন। কাজের কথা বলি। আমার কাছে একটা ইমপোর্টেড স্কচ পড়ে আছে। বেশ কয়েক মাস আগে গিফট করেছিল একজন। ওটার কথা তালেগোলে মনেই ছিল না। আজ রাতে আপনার আর মিসেস শর্মার আমার কুটিরে ডিনারের নেমন্তন্ন রইল। সেই জিনিসটার একটা সদগতি করা যাবে। কী জানেন, আজ আমার মনটা অনেকটাই ভারমুক্ত হয়েছে। স্বস্তি পেয়েছি এতদিন পর।

ডক্টর শর্মা বললেন, মিস্টার মুখার্জি, আমি টিটোটলার নই। মদ যে খাই না তা নয়, রেগুলার ড্রিংক করি না। তবে মাঝেসাঝে এক-আধ দিন খানিক পান করা যেতেই পারে। বিশেষ করে এমন একটা আনন্দের দিনে। আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তাহলে এখন বাড়ির দিকে এগোই। আটটার মধ্যে আপনার ডেরায় চলে আসছি আমরা দুজনে।

স্বস্তিশোভন বললেন, আমার আর তর সইছে না। আসুন তাড়াতাড়ি। জমিয়ে সেলিব্রেশন হবে আজ।

২৮

ফেরার সময় সঙ্গে চিত্রাঙ্গদা নেই। ভীমবাহাদুরও নেই। চারটে দিন একসঙ্গে ট্রেক করার পর দুটো মানুষ আচমকা নেই। মানুষের জীবনও তো ঠিক এমন। মৃত্যুবীজ বপন করে দেওয়া হয়েছে তার জন্মের সময়। জন্মাবার পর থেকে মৃত্যুর দিকে শ্লথ ও মন্থর গতিতে ক্রমশ এগিয়ে চলেছে মানুষ। নিজস্ব জীবনপথ ধরে হাঁটছে সকলে। বিভিন্ন সময়ে নিজস্ব রুটে হাঁটতে গিয়ে বিভিন্ন সঙ্গী জুটে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে কিছুটা পথ চলছে সে। আবার বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। আবার নতুন সঙ্গী জুটছে। এটাই নিয়ম। এক বছর আগে এই রুটে ট্রেক করতে আসার সময় যেমন হাঙ্গেরিয়ান বন্ধু রেকা জুটে গিয়েছিল। এবার সঙ্গী হয়েছে রঙ্গিত।

ছিমছিমলে খরকা থেকে নামার সময় ততটা সমস্যা হচ্ছিল না। পথে একটা জঙ্গল পড়েছিল। অগভীর জঙ্গলে বুনো জন্তু থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গেলে শর্টকাট হবে ভেবে মুকুট বেছে নিয়েছিল সেই আরণ্যক পথ। কিন্তু সেটাই কাল হল। ঘণ্টা দুয়েক ধরে পথ হারিয়ে উদভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক খানিক ছোটাছুটি করল দুজন। একই জায়গায় ফিরে ফিরে আসছিল বারবার। বেলা পড়ে আসছে। ক্লান্তি বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে বিপন্নতা। অচেনা রাস্তায় পথ হারানোর বিপদ অনেক। যখন ক্লান্ত বিপর্যস্ত হতে হতে বেদম হয়ে পড়েছে দুজন ঠিক তখনই পাহাড়ের খাঁজের মধ্যে এক চিলতে জমিতে একটা কাঠের দোতলা বাড়ি চোখে পড়ল। দিশা হারিয়ে ওই বাড়িটাকে দেখে মনে হচ্ছিল মরুভূমির মধ্যে খুঁজে পাওয়া এক মরূদ্যান। দুজন নেমে আসতে লাগল বাড়িটার দিকে। খুব কাছে যখন নেমে এসেছে তখন মুকুট আঁতকে উঠে বলল, ওই দ্যাখো কাণ্ড! যে কোনও সময় তো বাচ্চাটা পড়ে যাবে!

রঙ্গিত তাকিয়ে দেখল সত্যিই এক মানুষ উঁচু একটা পাথরের চাটানের ওপর ছোট্ট একটা বাচ্চাকে বসিয়ে রেখে বাচ্চাটার মা কেমন নিশ্চিন্ত মনে কাজ করছে। প্রায় দৌড়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে ধরল মুকুট। বাচ্চাটার বয়স এক বছরও হয়নি। এখনও হাঁটতে শেখেনি। ভয়ের বোধও আসেনি। কিন্তু আসন্ন বিপদের ভয়ে নিজের বুকটাই ধুকপুক করতে শুরু করল রঙ্গিতের।

পাথরের ওপরের জায়গাটা বড় জোর দুই বর্গ ফিটের। তারই ওপর বছরখানেকের বাচ্চাটা ঝিমোচ্ছে। একটা হাত পাথরের ওপর রেখে শরীরের ভর দিয়েছে যাতে পড়ে না যায় নীচে। চট করে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল মুকুট। মনে মনে ভীষণ রাগ হচ্ছে। রাগী দৃষ্টি নিয়ে বাচ্চাটার মায়ের দিকে তাকাল মুকুট। মায়ের বয়স তেইশ চব্বিশের বেশি হবে না। কিন্তু এরই মধ্যে দুটো বাচ্চার জন্ম দিয়েছে। ভাঙাচোরা শুকিয়ে যাওয়া শরীর। বছর চারেক বয়স হবে বড় মেয়েটির। মায়ের সঙ্গে উঠোনে বসে সে ফসল আলাদা করে রাখছে।

মুকুট বউটির দিকে যতটা রেগে তাকাল তার একশোগুণ বেশি ক্রোধ নিয়ে বউটি তাকাল ওদের দিকে। বুকটা কেঁপে উঠল মুকুটের। দেখল বউটির বাঁদিকের চোখটা নেই। সেখানে একটা বীভৎস খোঁদল। কোনও দুর্ঘটনায় মনে হয় চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। ভালো চোখের মণিটা পিঙ্গলবর্ণ। কী অদ্ভুত সেই দৃষ্টি! সেই আগুনে দৃষ্টির কোনও ব্যাখ্যা হয় না। এই জগতের প্রতি ব্যাখ্যাতীত রাগ যেন লুকিয়ে আছে সেই চোখের ভাষায়। ১৯৮৪ সালে যুদ্ধের দিনগুলোতে শরবত গুলা নামে পাকিস্তানের আফগান রিফিউজি ক্যাম্পে এক তরুণীর মুখের ফোটো তুলেছিলেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির ফোটোগ্রাফার স্টিভ ম্যাককারি। গনগনে আগুন লুকিয়ে ছিল সেই মেয়েটির দু-চোখে। সেই ছবি সাড়া ফেলে দেয় গোটা বিশ্বে। এই মহিলার চোখের ভাষার মধ্যেও ঠিক তেমন দাউদাউ ক্রোধ।

বউটি ধুপ ধুপ করে হেঁটে এসে মুকুটের কোল থেকে জোর করে বাচ্চাটাকে ছিনিয়ে নিয়ে আবার ওই পাথরটার ওপর বসিয়ে দিল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে তাকাল মুকুটের দিকে। এবার চোখের আগুনের আঁচ আরও খানিকটা বেড়েছে। মুকুট আর রঙ্গিত নিজেদের মধ্যে মুখ তাকাতাকি করছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। বাচ্চাটাকে এই অবস্থায় ফেলে যাবে কী করে! এমনিতেই ঘণ্টা চারেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে জঙ্গলে পথ ভুল করে ছোটাছুটি করে। তার মধ্যে বেলা হয়ে গেছে। এ তো আর সমতল নয়, এ হল পাহাড়। একটু পরেই অন্ধকার হয়ে যাবে। এখন হাঁটা শুরু করলে মারদি পুল অবধি পৌঁছবার অনেক আগেই রাত্রি নেমে আসবে। মুকুট উদ্বিগ্ন গলায় বলল, কী করা যায় বলো তো?

রঙ্গিত বলল, রাতটা এখানেই কাটিয়ে গেলে মন্দ কী। একটু নড়বড়ে হলেও দোতলা কাঠের বাড়ি আছে। একটা থাকার ঘর পাওয়া যাবে ঠিক। খাবারও জুটে যাবে আশা করি।

বউটা মুখ ঘুরিয়ে আবার ডুবে গেছে নিজের কাজে। উল্টদিকে যে ওরা দুজন তার পিঠের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। বাচ্চাটাও তেমনি। একরত্তি বাচ্চা, ওই ছোট্ট পাথরের স্ল্যাবটার ওপর যথারীতি একটা হাত নীচের দিকে দিয়ে নিজের ভারসাম্য রেখে বসে বসে আবার ঝিমোচ্ছে নির্বিকার ভঙ্গিতে।

কিছুক্ষণ কাটল। একটু বাদে একজন এল টলতে টলতে। বয়স চল্লিশের মতো। নোংরা কালিঝুলি মাখা প্যান্ট। গায়ে মরা সাহেবের কোট। মুখে মদের গন্ধ। ঠোঁটে ঝুলিয়ে রেখেছে ঢুলুঢুলু হাসি। বাচ্চাটাকে পাথর থেকে তুলে কোলে নিয়ে আদর করতে লাগল লোকটা। মুকুট নীচু গলায় বলল, এ নিশ্চয়ই ওই মহিলার স্বামী। লোকটা মুকুটের গলা শুনতে পেয়ে এদিকে ফিরে তাকিয়েছে। হাসিমুখেই জিগ্যেস করল, কী চাই?

রঙ্গিত হিন্দিতে বুঝিয়ে বলল সব। জানা গেল লোকটার নাম কাঞ্ছা রাই। ঘাচোকে একটা প্রাইমারি স্কুল আছে। সে সেখানকার শিক্ষক। আজ স্কুলে ছাত্র আসেনি বলে হাজিরা দিয়েই চলে এসেছে কাঞ্ছা। সে নিজে বিয়ে করেনি। ওই মেয়েটি তার বোন। বোনের স্বামী মারা যাবার পর সে বাপের বাড়িতে ফিরে এসেছে। কাঞ্ছা এই বাচ্চাদুটোর মামা।

রঙ্গিত ফিসফিস করে বলল, যে ইশকুলের শিক্ষক এমন তার ছাত্রছাত্রীর কথা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। তার পর গলার স্বর খানিক তুলে বলল, রাতটুকু আপনার এখানেই থাকতে চাই। ব্যবস্থা হবে?

কাঞ্ছা দেঁতো হেসে বলল, এই পথে লোকজন বড় একটা আসে না, কেননা প্রচলিত ট্রেকিং রুট এটা নয়। তা সত্ত্বেও দোতলায় একটা ঘর বাইরের লোকের জন্য ছাড়া আছে। সেই ঘরে থাকার ব্যবস্থা হতে পারে।

খরচ কত পড়বে?

কাঞ্ছা ঠোঁট উল্টে বলল, আরে ধুস আমি ওসব খরচ টরচ নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমার কোনও জোরজুলুম নেই। আপনাদের যা ন্যায্য মনে হয় সেটাই দেবেন।

কাঠের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় এল সকলে। ঘরটা দশ বাই ছয় মাপের হবে। ঘুপচি ঘর। তবে মোটামুটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কাঞ্ছার সৌজন্যে সারা ঘরে দিশি মদের গন্ধ ম ম করছে। নাক একটু সিঁটকোল মুকুট। দিশি মদের দু-চারটে বোতল ছড়িয়ে আছে এলোমেলো। ঘরে মালপত্র রাখতে রাখতে জিগ্যেস করল, বাচ্চাটাকে ওর মা এমন করে পাথরের ওপর বসিয়ে শাস্তি দিচ্ছিল কেন? যদি বাচ্চাটা পড়ে যেত নীচে?

কাঞ্ছা নেশার ঘোরে আছে এখনও। বিভ্রান্ত মুখে বলল, কোন বাচ্চা? কীসের বাচ্চা?

রঙ্গিত বুঝিয়ে বলল। কাঞ্ছা অবিকল সিনেমার কেষ্ট মুখার্জির মতো হাসিহাসি মুখে মন দিয়ে শুনল রঙ্গিতের কথা। ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি প্রথমে। কথাটা মাথায় ঢুকতে একটু সময় নিল। একগাল হেসে আশ্বস্ত করে বলল, পড়বে না। এই পাহাড়ে এভাবেই বাচ্চাদের মানুষ করা হয়।

মুকুট সবিস্ময়ে বলল, মানে?

যেন গভীর কোনও দর্শনের ব্যাখ্যা করছে এমন একটা মুখ করে কাঞ্ছা বলল, আপনাদের সমতলের সঙ্গে পাহাড়কে গুলিয়ে ফেলবেন না। এমন রুক্ষ পাহাড়ে বেঁচে থাকতে গেলে শুধু পাঁচটা ইন্দ্রিয়র ওপর ভরসা করে থাকলে চলে না। এখানে বাঁচতে গেলে ছয় নম্বর ইন্দ্রিয়কেও ধারালো হতে হবে। নইলে কেউ টিকতে পারে না।

রঙ্গিত বলল, বাচ্চাটা তো কোনও দোষ করেনি। তাহলে ওকে এভাবে শাস্তি দিচ্ছে কেন ওর মা?

কাঞ্ছা মাথা-টাথা চুলকে বলল, পাথরটা কিন্তু আজকের নয়। একশো বছরেরও পুরোনো। মনে আছে আমাকেও ছোটবেলায় আমার মা ওই পাথরটায় বসিয়ে রেখে বাড়ির কাজ করত। তাতে কী হয়েছে? আমি তো পড়ে যাইনি কখনও।

মুকুট সবিস্ময়ে বলল, এটা কি কোনও কথা হল? আপনি পড়েননি, কিন্তু কেউ তো পড়ে যেতেই পারে!

কাঞ্ছা ওর বোনকে দেখিয়ে হাসল, সেটা অবশ্য পারে। এই যে আমার বোনকে দেখছেন, ওকেও ছোটবেলায় আমাদের মা ওই পাথরের চাটানে বসিয়ে রাখত। একদিন টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গিয়েছিল ও। একটা ধারালো পাথরের টুকরো ঢুকে গিয়েছিল ওর চোখে। চোখটাকে বাঁচানো যায়নি। বাঁ-চোখটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

বউটি মুখ ঘুরিয়ে কাঞ্ছার কথা শুনছিল। একটা চোখে মণি নেই। সেখানে একটা বীভৎস খোঁদল। দেখলেই গা ছমছম করে। অন্য চোখে জ্বলন্ত আগুন। মুকুট কিংবা রঙ্গিত দুজনের কেউই এমন আগুন জীবনে কখনও দেখেনি।

সকলে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। পাহাড়ে এখন গভীর রাত। নিজের জায়গায় গিয়ে শুল মুকুট। এই কয়েকটা দিনের ধকল তাকে কাবু করে দিয়েছে বেশ। ইচ্ছে থাকলেও আর ওপরে ওঠার ধকল নেবার সাধ্য নেই তার। অপরিসীম ক্লান্তিতে দু-চোখের পাতা বুজল মুকুট। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে সে জানে না।

রাতে একবারও ওঠেনি কেউ। শ্রান্ত শরীর বলে ঘুমটাও এসেছিল জমিয়ে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে পথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল মুকুট আর রঙ্গিত। সবিস্ময়ে তাকিয়ে দেখে তাদের সামনে কখন যেন মাটি ফুঁড়ে এসে দাঁড়িয়েছে চিত্রাঙ্গদা আর ভীমবাহাদুর!

মুকুট চোখ গোলগোল করে বলল, অ্যাম আই ড্রিমিং আ ড্রিম? স্বপ্ন দেখছি নাকি? তাই যদি হয় তাহলে আমাকে কেউ যেন না জাগায়।

হো-হো করে হেসে ফেলল চিত্রাঙ্গদা। হাসি রঙ্গিতের মুখেও। চিত্রার মুখেই শোনা গেল বৃত্তান্ত। গতকাল সকালে ট্রেক করতে গিয়ে পায়ে একটু চোট পেয়েছে সে। খুব বেশি চোট নয়। তবে পায়ের এই চোট নিয়ে মারদি হিমাল মূল শিবিরের বরফের কারুকাজ করা অ্যাম্ফিথিয়েটার অবধি ট্রেক করাটা কার্যত ওর পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। তাই আর দুরূহ রুটে যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে চিত্রাঙ্গদা। ঠিক করেছে মুকুটদের নেমে যাওয়া পথ ধরে নামবে।

আজ আবার চারজন মিলে পথ হাঁটছে। ওঠার পর থেকে নামার পরিশ্রম তুলনায় অনেক কম হয়। রঙ্গিত আর ভীমবাহাদুরের কোনও সমস্যা হচ্ছে না। তবে মুকুট একটা বড় অসুখ থেকে সবে উঠেছে। যথেষ্ট ধকল গেছে। এর বেশি ঝুঁকি নেওয়াটা ঠিক নয় তার পক্ষে। চিত্রাঙ্গদার পায়ের চোটটাও ভালো নয়। সেজন্য ধীরে ধীরে সাবধানে নামতে হচ্ছে। বারোটা নাগাদ সকলে এসে পড়ল ওদানে। ভীমবাহাদুর বলল, দিদির পায়ের অবস্থা ভালো নয়। সে কারণে ধীরে ধীরে চলতে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে চললে তো রিভনে পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে। তাহলে কী করা যায় এখন?

সত্যিই ভাবার মতো বিষয়। স্কি স্টিকের সাহায্যে চিত্রাঙ্গদা হাঁটছে শ্লথ গতিতে। পকেট থেকে চকোলেট নিয়ে মুখে দিল মুকুট। বাড়িয়ে দিল বাকিদের দিকেও। হাত বাড়িয়ে সেটা নিল চিত্রাঙ্গদা। হাসল ক্লান্ত মুখে। তার শরীরটা চলছে না আর। রঙ্গিত বলল, জানি খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার কিন্তু একটু পা চালিয়ে চলো প্লিজ। নইলে আমাদের পৌঁছতে পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে। তাহলে বিপদ আরও বাড়বে।

ভীমবাহাদুর বলল, টেনশন করবেন না। আমি আগেও এই পথে এসেছি। সামনে এগোলে একটা ছোট্ট পাহাড়ি বাড়ি পড়বে। সেখানেই আশ্রয় নেব আমরা।

আবার ঘন অরণ্যের মধ্যে দিয়ে নামতে থাকা। প্রত্যেকের পা ব্যথা হয়ে গেছে ভীষণ। এই ধকল আর নেওয়া যায় না। হাঁটুর মালাইচাকি খুলে আসছে যেন। ঘণ্টা দুয়েক বাদে সত্যিই একটা বাড়ি চোখে পড়ল। ভীমবাহাদুর জোরকদমে হেঁটে এর মধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেছে। সব জায়গাতেই মুকুট দেখেছে যে এই ছেলেটা এমনটাই করে। চটপট গিয়ে টিমের বাকিদের থাকার ব্যবস্থা পাকা করে আসে।

বাড়িটা বেশ সাফসুতরো। উঠোন ঘিরে পাথরের পাঁচিল। পাঁচিলের ওপর প্লাস্টিকের ঝুলিতে আর পাঁচিলের ধার ধরে নানা রঙের ফুলের চাষ করা হয়েছে। উঠোনের মাঝখানে এক বৃদ্ধ রোদে পিঠ দিয়ে বসে ছিলেন। হাতে ধরা একটা হিন্দি বই। পুরনো হয়ে যাওয়া বইটার মলাট পড়া যাচ্ছে দূর থেকে। মুলকরাজ আনন্দ কি কহানিয়া। বৃদ্ধ বইটা নামিয়ে রেখে হাত জড়ো করে নমস্তে বললেন। ঘরের সামনে টানা বারান্দা। হ্যাংগিং টবে শোভা পাচ্ছে রঙিন ফুলের দল। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ভীমবাহাদুর মাঝবয়সি এক মহিলার সঙ্গে কথা বলছিল। এদিকে এসে বলল, আপনারা এই বেঞ্চে বসুন। চা খান। আমি আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করে ফেলছি।

কাঠের পুরনো সেই বেঞ্চে বসে ইতিউতি তাকাচ্ছিল মুকুট। কয়েকটা মুরগি টুকটুক করে উঠোন দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা লোমওয়ালা ভুটিয়া কুকুর গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল উঠোনের এক কোণে। মুরগিগুলোর পায়ের শব্দে কুকুরটা আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। মুরগিগুলো দৌড়ে পালাল ককর কক ডাক ছেড়ে। পাহাড়ে সন্ধে ঘনাচ্ছে। পশ্চিম আকাশের রং উজ্জ্বল ম্যাজেন্টা থেকে দ্রুত বদলে যাচ্ছে ময়ূররঙা অন্ধকারে। পাহাড়ের ফাঁকফোকর থেকে উঠে আসছে সাদা সাদা কুয়াশা। অখণ্ড নিস্তব্ধতা ভেঙে যাচ্ছে ঘরে ফেরা পাখিদের ডাকাডাকিতে আর তীব্র শিসে। মুকুট সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। কীভাবে কেটে গেল কয়েকটা দিন। এবার এখান থেকে যাবে মেঘদুয়ার টি এস্টেটে। অনাগত ভবিষ্যৎ তার জন্য কী সাজিয়ে রেখেছে ঝুলিতে কে জানে!

সেই মাঝবয়সি মহিলা আর ভীমবাহাদুর মিলে বড় ঘরটার একটা দিক যতটা সম্ভব পরিষ্কার করে ফেলেছে। ভীমবাহাদুর বলল, আমি ওপর থেকে আপনাদের জন্য দুটো চৌকি নিয়ে আসছি। রঙ্গিত বারণ করে বলল, গত কয়েকদিন মেঝেতেই শুয়েছি। আর একটা দিন শুতে কোনও অসুবিধে হবে না।

প্লাস্টিক বিছিয়ে তার ওপর তোশক আর চাদর পেতে সকলের বিছানা হল। ভদ্রমহিলা চা নিয়ে এলেন। সঙ্গে জলের পাত্র। অন্ধকার হয়ে এসেছে। ভদ্রমহিলা রান্নায় ব্যস্ত হয়ে গেলেন। চা খাওয়া হয়ে গেলে কাপ ধোয়ার জন্য বাইরে এল মুকুট। সূর্য অস্ত গেছে। সেই বয়স্ক ভদ্রলোকও লাঠির সাহায্যে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন। হাতমুখ ধোবে ভাবছিল রঙ্গিত। কিন্তু পলিথিন পাইপে জল পড়ছে না। ভদ্রমহিলা বাইরে বেরিয়ে এলেন। ইশারায় কাপদুটো নীচে নামিয়ে রাখতে বললেন। ঘরের ভিতর থেকে একটা ছোট বালতিতে করে জল নিয়ে এলেন। ঠান্ডা কনকনে জল। কোনও মতে হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় এসে বসতেই জাঁকিয়ে ধরল শীত। পা দুটোর ওপর দিয়ে অনেক অত্যাচার গেছে। এবার পা দুটোকে একটু বিশ্রাম দিতে হবে। পাশের ঘরটাই রান্নাঘর। পাহাড়ে সাধারণত এই রান্নাঘরগুলো ড্রয়িংরুমের কাজ করে থাকে। সকলে মিলে একসঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া হয়। খাবারও খাওয়া হয় এখানে। এমনকী, দু-একজনের শোয়ার বন্দোবস্তও থাকে এই ধরনের ঘরে।

পাহাড়িদের রান্নাঘর বেশ বড় হয়। এই ঘরটাও তাই। উনুনের কাঠের ধোঁয়া চিমনি দিয়ে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। রান্নাঘরে একটা তক্তপোশের ওপর বসে ভদ্রলোক মাঝেমধ্যে কাশছেন আর রান্নায় ব্যস্ত গিন্নির সঙ্গে টুকটাক কথা বলছেন। দু-ঘরের খোলা দরজা দিয়ে সবই নজরে আসছে। একটু পর ভীমবাহাদুর ঘরে ঢুকল। এসেই সকলের পাশে মাটিতে বসে পড়ে একগাল হেসে বলল, পাইপে জল পড়ছিল না। তাই বেরিয়েছিলাম ব্যাপারটা দেখতে। বেশ খানিকটা ওপরের দিকে উঠে দেখি বড় একটা পাথর পড়ে পলিথিন পাইপ ফেটে গিয়েছিল। এতক্ষণ ধরে পাইপ কেটে জোড়া লাগিয়ে এলাম। এবার আর কোনও সমস্যা নেই।

ভীমবাহাদুর টিমে থাকলে কোনও সমস্যাই সমস্যা নয়। রঙ্গিত বলল, কিন্তু ঠান্ডায় জমে গেলাম যে একেবারে। তুমি কি এখন আমাদের জন্য আর এক রাউন্ড চায়ের ব্যবস্থা করতে পারবে?

ভীমবাহাদুর বলল, কেন পাওয়া যাবে না? জরুর পাওয়া যাবে। এটা তো সমতল নয়, এ হল পাহাড়। কী, দাজু আমি ঠিক বলেছি কি না?

বৃদ্ধ সায় দিয়ে বললেন, আমার বেটা একদম ঠিক বলেছে।

চা এল। তাতে চুমুক দিয়ে শরীর গরম হল খানিকটা। ফিরল এনার্জি। আড্ডা দিতে দিতে চলল রান্নাবান্নার পর্ব। রান্না শেষ হবার পর গল্পগুজব হল সকলে মিলে। মুকুট আর রঙ্গিত কালকের প্ল্যান নিয়ে আলোচনা করছে নিজেদের মধ্যে। ভদ্রমহিলা এই ঘরেই খাবার সার্ভ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চিত্রাঙ্গদা বিছানায় বসে খাবার খেতে রাজি নয়। বলল, তোমরা কি আমাকে অসুস্থ পেয়েছ নাকি?

সকলে চলে এসেছে রান্নাঘরে। ভাত, রাইশাক, আলুর সবজি, সয়াবিন আর আলু দিয়ে ঝোল আর দেশি মুরগির ডিমের ওমলেট। সব খাবারই গরম গরম। বৃদ্ধ হেসে বললেন, এই নিয়ে মাত্র চারটে দল এই বাড়িতে থাকল। একবার একটা বড় দল তাঁবু খাটিয়ে উঠোনে রাত কাটিয়েছিল। একবার দুজন ফিরিঙ্গি মেয়ে এসে ছিল দোতলার ঘরে। আর একবার এসেছিল ছ’জন বাঙালি যুবক। আর এবার তারা চারজন।

আরণ্যক গন্ধ ভেসে আসছে নিচ থেকে। হাওয়া দিচ্ছে মাঝেমধ্যে। মেরুদণ্ড কেঁপে উঠছে সেই হাওয়ায়। আকাশের দিকে তাকাল মুকুট। পরিষ্কার আকাশে হাজার হাজার নক্ষত্র ঝকমক করছে হিরের টুকরোর মতো। এই অপার্থিব সৌন্দর্য ব্যাখ্যাতীত। এই অনন্ত নক্ষত্ররাশি থেকে ঝরে পড়া স্নিগ্ধ আলোতে স্নান করার মধ্যে যে অনির্বচনীয় আনন্দ আছে সেটা সকলে বোঝে না। যে বোঝে, সে বোঝে। ভীমবাহাদুর থালাবাসন নিয়ে বাইরে এল। পাইপের জলে সেসব ধুয়ে নিয়ে আবার ভেতরে ঢুকে গেল। মুকুটরাও রান্নাঘরে চলে এল গুটিগুটি। ভদ্রলোক বিছানায় চাপড় মেরে বসতে বললেন সকলকে। পকেট হাতড়ে সস্তার সিগারেট বের করলেন। সেটা জ্বালিয়ে মনের সুখে টান দিলেন বৃদ্ধ। আমেজে আরও ছোট ছোট হয়ে এল তাঁর চোখ। রঙ্গিত বলল, আপনারা খাবেন না?

বৃদ্ধ একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ব্যস্ত হবার কিছু নেই। ভীমবাহাদুর খেয়ে নিক। আপনারাও আরাম করে শুয়ে পড়ুন। তারপর আমি আর আমার গিন্নি খাব।

মুকুট কথাটা বলবে বলবে করে এবার বলেই ফেলল, এ বাড়িতে আর কাউকে তো দেখছি না। আপনাদের ছেলেমেয়েরা সব কোথায়?

বৃদ্ধ ফের একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। নাতি বা নাতনি হবে এর মধ্যে। আমার ছেলে দু’জন। দুই ভাইই আছে গোর্খা রেজিমেন্টে। আমিও একসময় আর্মিতে ছিলাম। আমাদের এই অঞ্চলে সকলেই গুরুং। আমরাই শুধু রাই। গুরুংরা বেশির ভাগই আছে ফৌজিতে। আমার দুই ছেলেও আর্মিতে সুযোগ পেয়ে ঢুকে গেল।

মুকুট বলল, তাহলে তো আর চিন্তা নেই। দুই ছেলেই চাকরি পেয়ে গেছে। রোজগার করছে। সেই সঙ্গে দেশরক্ষার মহান কর্তব্য পালন করছে দুজনই।

বৃদ্ধা ঠোঁটের কোণে গর্বের হাসি ঝুলিয়ে বললেন, সেদিক দিয়ে আমরা ভাগ্যবান। দুই ছেলেই মাসে মাসে টাকা পাঠায় আমাদের। আমিও সরকারি পেনশন পাই। চলে যায় ঠিক। আপনারা তো স্বামী স্ত্রী। তা কবে বিয়ে হয়েছে আপনাদের?

মুকুট অপ্রস্তুত মুখে কী বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই রঙ্গিত আড়চোখে মুকুটকে দেখে নিয়ে মুচকি হেসে বলল, এই তো কিছুদিন আগেই বিয়ে হয়েছে। এটা আমাদের একরকম হানিমুন ট্রিপ বলতে পারেন। আচ্ছা দাজু, বলুন তো সত্যি করে, কেমন মানিয়েছে আমাদের?

বৃদ্ধ তারিফ করার ভঙ্গিতে বললেন, রামরো … রামরো! সাক্ষাৎ রামসীতা যেন ধরাধামে এসেছেন নতুন অবতারে!

ভদ্রমহিলাও সায় দিয়ে বললেন, খুব সুন্দর জুটি আপনাদের। রামজি আপনাদের সুখী রাখুন চিরকাল। কিন্তু আমাদের ডেরায় দুটো মাত্র শোবার ঘর। হানিমুন কাপলের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। কিন্তু সেটা করতে পারছি না। একটা বেডে তিনজনকে কষ্ট করে শুতে হবে।

রঙ্গিত হাত তুলে নিরস্ত করে বলল, আপনার ডেরায় যে আমাদের থাকতে দিয়েছেন সেটাই অনেক। লম্বা জীবন পড়ে আছে আমাদের সামনে। এখন দু-একটা রাত স্বামী স্ত্রী আলাদা শুলে কিছু যাবে আসবে না।

মুকুট বেজায় লজ্জা পেয়েছে। আবার খুশিও হয়েছে মনে মনে। সেই অনুভূতিই ফুটে উঠেছিল তার মুখে। চিত্রাঙ্গদা খিলখিল করে হাসছে। ভীমবাহাদুর মুখ নীচু করে ভাত খাচ্ছে। কেশে উঠল হঠাৎ। মুখ টিপে হাসতে গিয়েই কাশি চলে এসেছে বোধ হয়। রঙ্গিত আর মুকুট যে বিবাহিত নয় সেটা বুঝতে পেরেছে। তবে তাদের মধ্যে কিছু একটা চক্কর আছে সেটা সে সকলের কথা শুনে আঁচ করতে পারছে। ভদ্রমহিলা ভীমবাহাদুরের আপত্তি গ্রাহ্য করলেন না। সে-ও যে খুব বেশি ওজর আপত্তি করল তা নয়। বেচারির খিদে পেয়েছিল খুব। বৃদ্ধা রঙ্গিতের উদ্দেশে বললেন, এবার তাহলে একটা সুন্দর দেখে বাচ্চা নিয়ে নাও। শুভ কাজে খামোখা আর দেরি কেন?

মুকুট আঁতকে উঠে বলল, এখনই বাচ্চা নিয়ে নেব?

চিত্রাঙ্গদা শরীর কাঁপিয়ে হাসছে। রঙ্গিত খুব চেষ্টা করছে না হাসার। পারছে না। এদিকে বৃদ্ধ একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে দার্শনিক সুলভ গলায় বললেন, বাচ্চা নিতে গেলে দেরি করে লাভ নেই। পাহাড়ে সেটাই দস্তুর। এই আমাদের কথাই ধরো না, আমার দুই ছেলের বয়স তেইশ আর চব্বিশ। দুজনকেই এবার বিয়ে দেব ঠিক করেছি। কবে চোখ বুজি তার ঠিক নেই। তার আগে নাতিনাতনির মুখ দেখে যেতে চাই। তাহলে মরার সময় শান্তি পাব।

ভীমবাহাদুরের খাওয়া হয়ে গেছে। হাত আঁচিয়ে এসেছে। বিজ্ঞের মতো মুখ করে বলল, এত অল্প বয়সে ছেলেদের বিয়ে না দেওয়াই ভালো। আমি ঠিক করেছি তিরিশের আগে বিয়ে করব না। অনেক টাকা জমাব, তার পর বিয়ে করব।

বৃদ্ধা ক্ষুন্ন দৃষ্টিতে তাকালেন ভীমবাহাদুরের দিকে। কথাটা তাঁর মোটেই পছন্দ হয়নি। সরোষে বললেন, বুড়ো বয়সে বিয়ে করার থেকে আজীবন কুমার থেকে যাওয়া ভালো। বয়স্ক মানুষটি সিগারেটে শেষ টান দিয়ে কেশে উঠলেন শব্দ করে। সামলে নিয়ে বললেন, এই ছোকরাই তো আপনাদের গাইড কাম পোর্টার? ও আপনাদের ঠিকমতো দেখভাল করেছে তো?

মুকুট বলল, যেসব ভয়ানক পাহাড়ি পথে ও আমাদের জন্য ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা বানিয়ে নিয়ে এসেছে তার কোনও তুলনা হয় না। খুব স্মার্ট ছেলে ও। আমি হলফ করে বলতে পারি, ভীমবাহাদুরের জায়গায় অন্য কেউ হলে আমরা এতখানি পথ ট্রেক করতে পারতাম না।

ভীমবাহাদুর মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে। লজ্জা পেয়েছে একটু। মুকুট এগিয়ে গিয়ে ভীমবাহাদুরকে জড়িয়ে ধরে একগাল হেসে বলল, আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। আমার কোনও ভাই বা বোন নেই। এখন থেকে ভীমবাহাদুর আমার ভাই। ও খুব ভালো ছেলে। ট্রাস্টওয়ার্দি। ভীমবাহাদুর না থাকলে আমাদের এই অভিযান হতো না।

এই বাড়িতে দুটো শোবার ঘর। ভীমবাহাদুর একটা ঘরে শুয়েছে বৃদ্ধ ও বৃদ্ধার সঙ্গে। অন্য ঘরে একটা বিছানায় পাশাপাশি শুয়েছে তিনজন। বড় ঘরের মেঝেতে তোশক পেতে শোবার ব্যবস্থা। বিছানার একদিকে চিত্রাঙ্গদা। একদিকে রঙ্গিত। মাঝখানে মুকুট। মুকুট পাশ ফিরে রঙ্গিতের হাতে চিমটি কাটল একবার। চাপা স্বরে বলল, তুমি মানুষটা কী বলো তো? বাবার বয়সি গুরুজনের সঙ্গে এমন কাঁচা রসিকতা কেউ করে বুঝি?

রঙ্গিত অবাক হবার ভান করে বলল, আমি আবার কী করলাম?

মুকুট চোখ ছোট করে বলল, ভদ্রলোকের কাছে আমাকে তোমার বউ বলে পরিচয় দিলে কেন?

রঙ্গিত চাপা গলায় বলল, রসিকতা করিনি তো। আমি গ্রামারে খুব কাঁচা। ফিউচার টেন্স আর প্রেজেন্ট টেন্স গুলিয়ে যায় অনেক সময়। তাছাড়া আমি খুব ভুল কি কিছু বলেছি? আজ নয় কাল তুমি তো আমার বউ হবেই।

মুকুট রঙ্গিতের হাতে আবার একটা চিমটি দিয়ে বলল, সত্যি?

চিত্রাঙ্গদা পাশ ফিরে মড়ার মতো ঘুমোচ্ছে। এবার হাতের আঙুল দিয়ে মুকুটের কপালে এসে পড়া চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বলল, সত্যি সত্যি সত্যি। তিন সত্যি।

চিত্রাঙ্গদা উল্টদিকে মুখ করে শুয়েই গলা খাকারি দিল। ফিকফিক হেসে বলল, আমি কিন্তু ঘুমিয়ে পড়েছি। হানিমুন কাপল কী করছে না করছে সেসব কিছু দেখছি না। কিছু শুনছিও না।

মুকুট বলল, সত্যিই শুনছ না তো?

চিত্রাঙ্গদা এবার আর হাসল না। পাশ ফিরে মুকুটের চিবুকে হাত দিয়ে গভীর গলায় বলল, এনজয় এভরি মোমেন্ট মাই ডিয়ার ফ্রেন্ডস। এই রাত স্বর্গীয়। টেক ইট ফ্রম মি, এমন রাত আর কখনও ফিরে আসবে না তোমাদের জীবনে। দিনের পর দিন যাবে। কালের নিয়মে বছরের ওপর চেপে বসবে আরও অনেকগুলো বছর। এভাবেই একদিন চুলে পাক ধরবে তোমাদের। দুই থেকে তিন, তারপর হয়তো চার হয়ে যাবে তোমরা। ফ্যামিলি বড় হতে থাকবে। আমিও ছিটকে যাব অন্য কোনওখানে। তখনও আজকের এই খুশি আনন্দ আর দুষ্টুমিভরা পল অনুপলের কথা মনে থাকবে তোমাদের।

রঙ্গিত মুকুটকে কাছে টেনে নিল আরও। মুকুটের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল রঙ্গিত। মুকুটের মুখ থেকে লবঙ্গ লবঙ্গ গন্ধ ভেসে আসছে তার নাকে। মুকুটের কপালে, গালে, থুতনিতে, কানের লতিতে, ওষ্ঠে, অধরে একের পর এক চুমু এঁকে দিচ্ছিল রঙ্গিত।

তপ্ত হয়েছে নিঃশ্বাস। গায়ের প্রতিটি রোম দাঁড়িয়ে গেছে মুকুটের। কানের লতি গরম হয়ে গেছে। নিজের প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে শুষে নিচ্ছে রঙ্গিতের শরীরের ওম। জ্বর এসেছে যেন তার। মুকুট জানে চিত্রাঙ্গদা ভুল কিছু বলেনি। এ এক অলৌকিক রাত। তাদের হয়তো বিয়ে হবে একদিন। কেটে যাবে দিনের পর দিন। একদিন প্রৌঢ় হবে তারা। তামাদি হয়ে যাবে তাদের দাম্পত্য। আজকের এই থরোথরো আবেগ তখন থিতিয়ে যাবে। কিন্তু এই অলৌকিক রাত সত্যি সত্যিই আর কখনও ফিরে আসবে না তাদের জীবনে। এই মুহূর্তটাই সব থেকে দামি। এই সব আনন্দের মুহূর্তগুলো গেঁথেই তো তৈরি হয় বিনিসুতোর এক মালা। এই মালা খণ্ডমুহূর্তের নয়, এই মালা চিরদিনের।

২৯

স্বস্তিশোভনের সুবিশাল লিভিং কাম ড্রয়িংরুমে আড্ডায় বসেছে সকলে। রঞ্জন রায়চৌধুরি তাঁর ব্যস্ত রুটিনের মধ্যেও দুদিনের ছুটি বের করে এসেছেন মেঘদুয়ার চা বাগানে। তাঁর সঙ্গে প্যাংকুটুদা এসেছে সহচর হয়ে। প্যাংকুটুদা একা আসেনি, তার সঙ্গী হয়ে এসেছে সেমইয়াং। এতদিন বিয়ে করার নাম শুনলে গায়ে জ্বর আসত, কিন্তু এই ভুটানি রূপসি যুবতী রঙ্গিতের পিসতুতো দাদাটিকে কী জাদু যে করেছে কে জানে, অবশেষে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে রাজি হয়েছে প্যাংকুটুদা। এর মধ্যেই দিনক্ষণ স্থির হবে। হবু পুত্রবধূ বাঙালি নয় তাতে কী হয়েছে? প্যাংকুটুদার মায়ের কোনও আপত্তি নেই এই বিয়েতে। ছেলে যে অবশেষে সংসারী হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতেই খুশি রঙ্গিতের পিসি। খুশি পরিবারের সকলেই।

প্যাংকুটুদা, সেমইয়াং আর রঞ্জন বসেছে একটা সোফায়। উল্টোদিকের সোফায় বসে আছেন অভয়া আর স্বস্তিশোভন। দুটো কাউচে বসেছে মুকুট আর রঙ্গিত। ডক্টর শর্মা আর বৃন্দাও আজ হাজির হয়েছেন সিনিয়র ম্যানেজারের বাংলোয়। খোসগল্প হচ্ছে। রঞ্জন চুমুক দিলেন চায়ের কাপে। অস্ফুটে ‘আআহ’ উচ্চারণ করলেন।

প্যাংকুটুদার স্বভাব একই আছে। একপেশে হাসিটা হেসে বলল, আমরা যখন চা খেয়ে লম্বা করে একটা ‘আআহ’ বলি তখন একবারও চা বাগানের ভরপেট খেতে না পাওয়া শ্রমিকদের কথা ভাবি না, তাদের চোখের জলের মর্মও বুঝতে চেষ্টা করি না। আসলে তাদের ঘামরক্তের গন্ধ আমাদের নাক অবধি পৌঁছয় না। কথাটা অপ্রিয় হলেও সত্যি যে, আমরা অতটা তলিয়ে ভাবি না। এসব অপ্রাসঙ্গিক কথা ভাবতে নাগরিক মানুষের বয়েই গেছে।

রঞ্জন সায় দিয়ে বললেন, সেটাই তো ট্র্যাজেডি। শুধু চা নয়, ভাত দিয়ে ইলিশমাছের ঝোল মেখে খাবার সময় কি আমরা সেই সব জেলেদের কথা একবারও ভাবি, যারা ট্রলারে চেপে গভীর সমুদ্রে নিজের জীবন বিপন্ন করে মাছ ধরতে যায়? ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হলে অনেক জেলে সমুদ্র থেকে আর ফিরে আসে না। কিন্তু মাছবাজারে ইলিশ টিপেটুপে দেখার সময় জেলেদের কঠিন জীবনের কথা আমরা কেউ ভেবেও দেখি না।

ওসব আলোচনা এখন থাক না। স্বস্তিশোভন রঞ্জনের উদ্দেশে বললেন, এটা মেঘদুয়ার টি এস্টেটের ফার্স্ট ফ্লাশ। ফ্লেভারটা ভালো লেগেছে আপনার?

রঞ্জন তারিফের ভঙ্গি করে বললেন, যদিও বরাবর দুধচিনি ছাড়া দার্জিলিং চা খাবার অভ্যেস আমার, তবে এই দুধ আর চিনি দেওয়া সিটিসি চা-ও মন্দ লাগছে না। বেশ লাগছে।

অভয়া সেমইয়াংয়ের উদ্দেশে বললেন, কেমন লাগছে আমাদের বাগানের চা? হাও ইজ দ্যাট?

সেমইয়াং ডানহাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুল জড়ো করে বাকি তিনটে আঙুল উঁচিয়ে বলল, রামরো!

সকলে হো হো করে হাসছিল। ডক্টর শর্মা বললেন, কৌতূহলে আমাদের পেট ফেটে যাচ্ছে। মিস্টার চক্রবর্তী আপনি রহস্যটা ভেঙে বলুন প্লিজ, কী এমন ঘটনা ঘটল যে, এতদিন ধরে স্কট ফ্রি ঘুরতে থাকা হিম্মত লোহার আর তার দলবলকে পুলিশ একেবারে ভ্যানে উঠিয়ে নিয়ে শ্রীঘরে চালান করে দিল?

প্যাংকুটুদা চায়ে আলতো একটা চুমুক দিল। নিজেকে খানিক গুছিয়ে নিয়ে বলল, সরসতিয়াকে গ্যাংরেপ করার ব্যাপারটা আমি রঙ্গিতের মুখে শুনেছিলাম। ম্যাকমিলান গ্রুপের চিফ গোপাল কৃষ্ণমূর্তির কাছেও সব খবরই আমি পেয়েছি ডিটেলে। শুকরার মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হবার কথা, কয়েক মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ অবধি মারা যাওয়ার কথাও আমি জেনেছি। আমি সব জানিয়েছিলাম মন্ত্রীকে। তাতে কাজের কাজ কিছু হয়নি। আমিও এতরকম ঝামেলায় ফেঁসে ছিলাম যে ওপরমহলে খোঁচাখুঁচি করে উঠতে পারিনি। রঙ্গিত গতমাসে আবারও এসেছিল আমার কাছে। তার আগে আমি খবর পেয়েছিলাম যে, হিম্মত আর তার স্যাঙাতেরা কয়েক মাস ফেরার থাকার পর আবার ফিরে এসেছে মেঘদুয়ারে। শুকরা মারা যাওয়ার খবর শুনে কিংবা হিম্মতদের স্কট ফ্রি ঘুরে বেড়াবার খবর পেয়ে এমনিতেই একটা আত্মধিক্কার হচ্ছিল। তার মধ্যে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো একটা নতুন খবর কানে এল আমার।

ডক্টর শর্মা বললেন, কী খবর?

প্যাংকুটুদা বলল, চোরা কাঠের কারবারিদের বাড়বাড়ন্ত তো এই জঙ্গলে ছিলই, সম্প্রতি কিছু চোরাশিকারিও ঘাঁটি গেড়েছিল এদিকে। পোচারদের সেই চক্র উত্তরপ্রদেশ বেসড। লোকগুলো লেপার্ডের চামড়া চোরা পথে চালান করছিল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে। পকেটে ভরছিল লক্ষ লক্ষ ডলার। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে, হিম্মত এই সঙ্গে ইনভলভড। শুধু তাই নয়, এদিকের জঙ্গলের টেকো-গেকো নামে একরকম প্রাণীও হিম্মতের প্রত্যক্ষ মদতে লক্ষ লক্ষ টাকায় পাচার হচ্ছে বিদেশে। পাচার হচ্ছে হাতির দাঁত। সরকারি কিছু লোকও এর সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বাস করুন, সে রাতে ঘুমোতে পারলাম না ভালো করে। ভাবলাম যদি মানুষের বাচ্চা হয়ে থাকি তবে এবার একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। একটা দুশ্চরিত্র নেশাখোর লোক, একটা নোংরা অ্যান্টিসোশাল এলিমেন্ট এভাবে যা ইচ্ছে তাই করে যাবে এটা হতে দেওয়া যায় না।

স্বস্তিশোভন নড়েচড়ে বসে বললেন, তারপর?

প্যাংকুটুদা বলল, আমি যে মন্ত্রীর আপ্ত সহায়ক তিনি পুলিশমন্ত্রী নন ঠিকই কিন্তু তবুও তাঁর কানে কথাটা এর আগেও তুলেছিলাম। তিনি ততটা গা করেননি। সেদিন রাজ্য সম্মেলনে তাঁকে আবার পেয়ে গেলাম। সভা শেষে তাঁকে বললাম, আপনি কিছু একটা করুন প্লিজ। তিনি আবারও ক্যাজুয়াল গলায় বললেন, দেখছি। আমি উত্তেজিত গলায় বললাম, আর কবে দেখবেন আপনি? সব জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাবার পর?

রঞ্জন বেশ বিস্মিত হয়ে বললেন, এভাবে বললি একজন হেভিওয়েট পলিটিক্যাল ম্যানকে?

প্যাংকুটুদা মুখের একটা ভঙ্গি করে বলল, তুমি তো জান ভালো করে, আমাদের শরীরে বাঙালের রক্ত। রাগ উঠে গেলে আর হুঁশ থাকে না কাকে কী বলছি। এদিকে তিনি তো যে সে লোক নন। ক্যাবিনেট মিনিস্টার বলে কথা। তিনি ভাবতেও পারেননি আমার মতো একজন ঠান্ডা মাথার মানুষ এমন আচরণ করবে। তিনি আমার মুখের দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। আমার কথা যে খানিক তফাতে বসা দলের চিফ হুইপের কানে গেছে সেটা আমি বুঝতে পারিনি। আমাকে আবেগশূন্য ধীরস্থির গোছের মানুষ হিসেবেই তিনি দেখে এসেছেন। আমাকে এমন মাথা গরম করতে দেখে তিনি অবাক হয়ে বললেন, কী হয়েছে? অভিষেককে তো এমন উত্তেজিত হতে দেখি না কখনও!

রঙ্গিত কৌতূহলী গলায় বলল, তারপর?

প্যাংকুটুদা বলল, সেদিনের সভার পর চিফ হুইপের বেশ কিছু অ্যাসাইনমেন্ট ছিল। সভা শেষে তিনি উঠে পড়েছিলেন। তাঁর কী হল কে জানে, ফিরে এসে আবার বসে পড়লেন চেয়ারে। ডাকলেন আমাকে, সব ঘটনা পুঙ্খ অনুপুঙ্খ শুনলেন আমার কাছে। আমি আগাপাশতলা সব বললাম। শুনে থমথমে হয়ে গেল তাঁর মুখ। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজে মোবাইল থেকে ফোন করলেন আইজি-কে। কড়া গলায় নির্দেশ দিয়ে বললেন, রং বিচার না করে দোষীদের ধরার ব্যবস্থা করতে। সেই আদেশ পরে শুনতে পেলাম ডিআইজি হয়ে পৌঁছে গেছে এসপি-র কাছে। তার পর যথারীতি তা নামল এসডিপিও আর লোকাল পুলিশ স্টেশনের ওসি-র কাছে। মন্ত্রের মতো কাজ হল। পরদিনই হিম্মত আর তার টিমকে অ্যারেস্ট করল পুলিশ।

ডক্টর শর্মা বললেন, এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এমন একজন ঘৃণ্য অপরাধীকে ধরার জন্য এত কাঠখড় পোড়াতে হয়। তবুও বলব, ক্রিমিনালটাকে যে শেষ অবধি অ্যারেস্ট করা গেছে সেটাই অনেক। শুনেছি পুলিশ রিমান্ডে রয়েছে হিম্মত। সামনের সপ্তাহে কোর্টে কেস উঠবে। তবে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ইনিশিয়েটিভ নেওয়ার জন্য। নইলে হিম্মত এখনও বাইরেই থাকত।

প্যাংকুটুদা মাথা নেড়ে বলল, আপনি যেভাবে সরলীকরণ করছেন ব্যাপারটা তা নয়। আসলে আমি উপলক্ষ মাত্র। আসল সত্যটা কী জানেন? সামনে ভোট আসছে। টি গার্ডেন বেল্টে পার্টির মুখ পুড়িয়েছে হিম্মতের মতো কিছু লোকেরা। এই সব হুলিগানদের ঝেড়ে ফেলে পার্টি ক্লিন ইমেজ এস্টাবলিশ করতে চাইছে। সে কারণেই শুরু হয়েছে পারগেটরি প্রসেস। কাগজে দেখে থাকবেন স্বচ্ছ ভাবমূর্তি যাঁদের নেই এমন বেশ কিছু নেতাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। হিম্মতের পেছন থেকেও সরে গেছে পার্টি। বিরোধী দলের কিছু নেতার সঙ্গে শুনেছি হিম্মত যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল। তারাও জল মাপছে। দূরত্ব বজায় রেখে চলছে হিম্মতের সঙ্গে। আসলে কী জানেন, এসব হুলিগানদের নিজেদের কায়েমি স্বার্থে ব্যবহার করে এক শ্রেণির নেতা। তবে দেখবেন হাওয়া ঠান্ডা না হওয়া অবধি হিম্মতকে শেলটার দেবে না কেউ।

স্বস্তিশোভন বললেন, লোয়ার কোর্ট কী ভারডিক্ট দেয় দেখা যাক। ধর্ষণ আর খুন এই দুই কেস মিলে হিম্মতের ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট হওয়ার কথা। না হলেও চোদ্দ বছরের আগে জেল থেকে বেরোতে পারবে না কোনওভাবেই। বাকিদেরও খুব কম সাজা হবে না। হোপ ফর দ্য বেস্ট।

প্যাংকুটুদা বলল, লোয়ার কোর্টের রায় এগেনস্টে গেলে হিম্মত নিশ্চয়ই হাইকোর্টে মুভ করবে। টাকা খরচ করে বড় ল-ইয়ার ধরবে। জানি না কী হবে তখন। তবে হাইকোর্ট আগের রায় বহাল রাখলে হিম্মত আর তার টিম হয়তো যাবে সুপ্রিম কোর্ট। এই চক্কর চলতেই থাকবে। ততদিন অন্তত জেলেই পচতে হবে হিম্মতকে। ক্রাইম ডাজ নট পে।

সেমইয়াং গলায় উদ্বেগ মিশিয়ে বলল, কিন্তু সরসতিয়া? শরীর তো বটেই মনের ওপরও খুব চাপ পড়েছে নিশ্চয়ই তার। সে কেমন আছে এখন?

ডক্টর শর্মা বললেন, আমার এক ব্যাচমেট এখন নাম করা সাইকোলজিস্ট। আমার অনুরোধে সে সরসতিয়াকে প্রতি রবিবার করে অনলাইন কাউন্সেলিং করছে। পুরোটাই নিখরচায়। আমিও চেষ্টা করছি আমার মতো করে ওর মানসিক স্বাস্থ্য চাঙ্গা করতে। এই নির্দোষ মেয়েটাকে সুস্থ করা আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। বীথি আর অলকা নামে মেঘদুয়ার হাসপাতালের দুই সিস্টারও যথেষ্ট সাহায্য করছে আমাকে। আই অ্যাম গ্রেটফুল টু দেম।

প্যাংকুটুদা বলল, সরসতিয়ার মনের অবস্থাটা শুধু ভাবছি। এমনিতেই একটা কঠিন ট্রমার মধ্যে ছিল। শুকরা মারা যাবার খবর শুনে বেচারি মানসিকভাবে আরও অতলে তলিয়ে গিয়েছিল। সেই জায়গা থেকে কি বেরিয়ে আসতে পারবে সে?

ডক্টর শর্মা বললেন, ফরচুনেটলি বাচ্চাটা জন্মাবার পর মেয়েটা অনেকটা সহজ হয়েছিল। হিম্মতের গ্রেফতারির খবর পাবার পর আরও খানিকটা স্বাভাবিক হয়েছে মেয়েটা। সাইকোলজিস্টের কথা অনুযায়ী, সব যদি ঠিকঠাক চলে, আর কিছুদিন পর ফুলমতিয়া বা বিন্দিয়াদের সঙ্গে ও আবার আগের মতো চা পাতা তুলতে শুরু করবে। আমরা সকলে সে দিনটার অপেক্ষায় আছি।

অভয়া আর বৃন্দা দুজনেই একসঙ্গে শ্বাস ফেলে বললেন, থ্যাংক গড। তাই যেন হয়।

দুপুরে খাওয়ার টেবিলে এলাহি আয়োজন। বিউলির ডাল, বেগুনভাজা, আলুপোস্ত, তেলকই, সর্ষে ইলিশ, পাঁঠার মাংস, চাটনি, দই, মিষ্টি। রঞ্জন খাবার দেখে আঁতকে উঠে বললেন, করেছেন কী?

অভয়া হেসে মৃদু গলায় বললেন, এটুকু কষ্ট করে খেয়ে নিন। আজ রাতের ট্রেনে তো ফিরেই যাচ্ছেন কলকাতায়। আবার কবে আপনাকে পাব কে জানে।

স্বস্তিশোভন ভাত মাখতে মাখতে বললেন, স্যার আপনারা মাত্র দুটো দিনের জন্য এলেন। আর একটা দিন থেকে গেলে ভালো হতো।

রঞ্জন মাথা নেড়ে বললেন, উপায় নেই যে। নোবেলজয়ী ক্যানসার গবেষক এলিয়ট ভারমাসের নাম শুনেছ? তিনি কলকাতায় এসেছেন গতকাল। সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স-এ মেঘনাদ সাহা স্মৃতি বক্তৃতা দেবেন কাল বিকেলে। ক্যানসার সংক্রান্ত ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে আমার ই-মেইলে কথা চালাচালি হয়েছে। এই মানুষটির সঙ্গে আমাকে দেখা করতেই হবে। জানতে হবে, যমের আহ্বান বলে যে-রোগের পরিচয়, সেই রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মানুষ কতদূর এগোল?

প্যাংকুটুদা মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে বলল, বিজ্ঞান এত এগোচ্ছে, একটা কথা বলুন তো, শুধু একটা মাত্র ওষুধে ক্যানসার নির্মূলের কি আশা নেই?

রঞ্জন বললেন, দ্যাখো, গত পঞ্চাশ বছরে অনেক কিছুই জানা গেছে রোগটির ব্যাপারে। আমরা এগিয়েছিও কিছুটা। কিন্তু ক্যানসার এক অজেয় শত্রু। সময়ে তার ডিটেকশন না হলে চিকিৎসকদের পক্ষে লড়াই করা কার্যত অসম্ভব। কেননা রোগটা তো কোনও নির্দিষ্ট পথে এগোয় না। নানা ভাবে কাবু করে জীবকোষকে। সুতরাং ক্যানসারের ট্রিটমেন্ট একই পথে এগোবে কী করে?

স্বস্তিশোভন বললেন, করোনা অতিমারির ভ্যাকসিন আবিষ্কার হবার পর তা দেওয়া হয়েছিল দেশসুদ্ধু লোককে। ভালো কাজও নাকি তাতে হয়েছে। শুনেছিলাম ক্যানসারের প্রতিষেধক হিসেবে টিকা ব্যবহারের কথা নাকি ভাবা হচ্ছে আজকাল। এটা কি সত্যি?

রঞ্জন বললেন, ভারমাসের কাছ থেকেই জেনেছি পরিবেশজনিত ক্যানসার রোগের কথা। ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়া সংক্রমণে ওই রোগের ব্যাপারেও জেনেছি অনেক কিছু। শুধু ক্যানসার আক্রান্ত কোষকে নিশানা করে চিকিৎসা কিংবা প্রতিষেধক হিসেবে টিকা ব্যবহারের কথাও ভাবা হচ্ছে আজকাল। তবে এটাও ঠিক, ২০৩০ সালের মধ্যে সারা পৃথিবী জুড়ে কর্কট রোগের প্রকোপ বাড়বে বহু গুণ।

কথা হচ্ছিল বাংলায়। সেমইয়াং শুনছিল সকলের কথা। খানিকটা বাংলা এখন বুঝতে পারে সে। বলতে শেখেনি এখনও। রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে হিন্দি আর ইংরেজি মিশিয়ে বলল, আমার বাবার স্টোমাক ক্যানসার হয়েছিল। রোগ ধরা পড়ার পর বেশিদিন সময় পাওয়া গেল না। আমি যখন সাকতেং গ্রামে পৌঁছেছি আমার বাবা তখন ডেথবেডে। এত যন্ত্রণা পেয়েছে মানুষটা, সেই কষ্ট চোখে দেখা যায় না। আমার একটা প্রশ্ন আছে স্যার আপনার কাছে। প্রতিষেধক টিকা যদি বেরিয়ে যায় তাহলে আর ক্যানসারের প্রকোপ বাড়বে কেন?

রঞ্জন বললেন, ক্যানসারের যে সব ক্ষেত্রের চিকিৎসা পদ্ধতি বের হয়েছে তা রীতিমতো ব্যয়বহুল। ধনী মানুষেরাই পারেন সেই খরচের ভার বহন করতে। তাছাড়া আছে রাজনৈতিক বাধা। কোনও কোনও দেশে আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন শুনেছি প্রয়োগ করা যাচ্ছে না রাজনৈতিক প্রতিবাদের চাপে পড়ে। আর একটা ব্যাপার হল, ভিসার কড়াকড়িতে আমেরিকায় এখন মেধা আমদানি কমে গেছে। মেধাবী গবেষকরা এখনও পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে, আমেরিকা নয়, ব্রেন-ড্রেন এখন অস্ট্রেলিয়ার দিকেই ধাবমান। এদিকে ব্রিলিয়ান্ট ছাত্ররা গবেষণার তুলনায় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির চাকরিকেই প্রেফারেন্স দিচ্ছে। বোঝা গেল সমস্যার জায়গাটা? কলেজ ইতিনিভার্সিটির গবেষণাগারে এখন অর্থের টান। মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা দেখছে চাকরি জোটানো কঠিন। তাই বাধ্য হয়েই তারা কেরিয়ার হিসেবে প্রযুক্তিকে বেছে নিচ্ছে।

প্যাংকুটুদা মুচকি হাসল, ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টদের দুষে লাভ নেই। তারা তো বেটার অপশন খুঁজবেই। রঙ্গিতবাবুর কথাই ধরা যাক। বেশি মাইনে আর ভালো প্রসপেক্টের জন্যই তো তিনি ফের চলেছেন আইটি সেক্টরে জয়েন করতে। আবার শুনছি আজ বাদে কাল অনসাইট প্রোজেক্টের কাজ নিয়ে ব্রাজিল যাবেন।

রঙ্গিতের খাওয়া হয়ে গেছে। মুখের একটা ভঙ্গি করে বলল, আবার আমাকে নিয়ে পড়লে তুমি?

প্যাংকুটুদা হেসে বলল, একটা কথা আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারছি। খুব শিগগিরি রঙ্গিতবাবুকে মেঘদুয়ার চা বাগানে স্পেশাল একটা মিশন নিয়ে আসতে হবে। দায়িত্ব তো এড়িয়ে যেতে পারি না, আমাদেরও হয়তো আসতে হবে সহচর হয়ে। আমি আগেভাগেই একটা কথা বলে দিই। বরযাত্রীর গাড়ির ভেতর আমার জায়গা না হলে আমি কিন্তু ছাদে চেপে চলে আসব। ছাত্র রাজনীতি করার সময় বাসের ছাদে চেপে বহু জায়গায় গিয়েছি। আমার কোনও অসুবিধে হবে না।

রঙ্গিত সেমইয়াংয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল, তুমি বাসের ছাদে চেপে বরযাত্রী আসতে চাইলে আমরা বাধা দেব না। তবে আমাদের এই সুন্দরী বউদি কিন্তু আমাদের সঙ্গে গাড়ির সিটে চেপেই আসবে। তবে জিনস টিশার্টে নয়, লেহেঙ্গা চোলি কিংবা ঝলমলে শাড়ি পরে।

সেমইয়াং হাসছে লাজুক মুখে। রঞ্জন উপভোগ করছেন ছেলে আর ভাগ্নের রসিকতা। অভয়া আর স্বস্তিশোভন নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করে নিলেন একবার। মুকুট লজ্জা পেয়ে লঘু পায়ে চলে গেল ওদিকে। সকলে আড্ডায় মজে গেছে নতুন করে। রঙ্গিত রুমাল দিয়ে মুখ মুছে নিল একবার। ঘরের বিরাট বেলজিয়ান গ্লাসের আয়নায় নিজেকে দেখল এক পলক। মুকুটকে অনুসরণ করে বাইরের বারান্দায় চলে এল। মৃদু স্বরে বলল, চলো, একটু হেঁটে আসি।

৩০

বিচ্ছেদ! তীব্র একটা শব্দ। শুনলেই বুক কেঁপে ওঠে। মনে হয় ছেদন তার তীব্রতা আর প্রচণ্ডতা নিয়ে উপস্থিত আছে শব্দটার মধ্যে। একটা শীতল ইস্পাতের কুঠার যেন অপেক্ষায় বসে আছে শিরশ্ছেদ করবে বলে। মুকুট যেদিন থেকে তার হৃদয়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল, দেখতে শুরু করেছিল মিলনের স্বপ্ন, সেদিন থেকেই তার আশঙ্কা ছিল বিচ্ছেদ এসে চুরমার করে দেবে না তো তার কাঙ্ক্ষিত পৃথিবী? এই আশা ও আশঙ্কার দোলাচল প্রেমের পথ চলার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে মিলনের স্বপ্ন দেখত মুকুট, তার চেহারা ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু সেই সঙ্গে দুঃস্বপ্নও দেখত প্রায়ই। পরিণতি পায়নি সরসতিয়া আর শুকরার প্রেম পরিণয়। তাদের সম্পর্কের গন্তব্য নির্ধারিত ছিল শুকরার আয়ুষ্কাল দিয়ে। তাদের ভালোবাসার কী হবে?

বিচ্ছেদ ছাড়া কোনও প্রেম পূর্ণতা পায় না। পরিণয় যদি প্রেমের গন্তব্য হয় তাহলে বিচ্ছেদ এক অদৃশ্য ভবিতব্য। প্রেম কবে পরিণয়ের পূর্ণতা পাবে সেই স্বপ্ন দিয়ে শুরু হয় যে কোনও প্রণয়পর্ব। কিন্তু কালো পোশাকে ঢাকা গোপন আততায়ীর মতো বিচ্ছেদ দাঁড়িয়ে থাকে প্রেমের সেই জটিল সরণির কোনও এক বাঁকে। দুই প্রণয়ীর মাঝখানে বিচ্ছেদ কবে আর কীভাবে এসে দাঁড়াবে তা নিয়ে ভাবনার অন্ত থাকে না। মুকুটের মনে এই প্রশ্নটা ইদানিং প্রায়ই আসে, কী আছে তাদের সম্পর্কের শেষে? মুকুট কোথাও পড়েছিল কথাটা—লাভ ইটসেলফ ইজ হোয়াট ইজ লেফট ওভার হোয়েন বিয়িং ইন লাভ হ্যাজ বার্ন্ড অ্যাওয়ে। প্রেমে পড়ার মধ্যে একটা জ্বালা আছে। তা যখন পুড়ে ছাই হয়ে যায় তখন পড়ে থাকে সেই নির্যাস যা প্রেম। তাদের প্রেমের ভবিতব্য তবে কী?

মেঘদুয়ার চা বাগানের প্রকৃতি একটু একটু করে বদলাচ্ছে। দুপুরবেলার রোদের মেহগিনি রং ক্রমশ ফিকে হলুদ হয়ে যাচ্ছে। হেমন্তের আকাশ ভেঙে শীত নামছে ডুয়ার্সে। চা বাগান থেকে আজকাল ভেসে আসে চা গাছের অদ্ভুত ঘ্রাণ। দোয়েলের শিসের তীব্র শব্দ ভেসে আসছে দেবদারু গাছের আড়াল থেকে। এরা কি তবে দুই প্রণয়ী? পরস্পরকে ডাকছে নাম ধরে? পাশাপাশি হাঁটছে দুজন। মুকুট বলল, আমি চলে যাচ্ছি বেঙ্গালুরু। নতুন করে শুরু করতে হবে পড়াশোনা। তুমি আর কতদিনই বা কলকাতায়, তারপর তো তুমি চলে যাচ্ছ ধরা ছোঁয়ার বাইরে, সেই ব্রাজিলে। একটা কথা জানতে ইচ্ছে করে খুব। তুমি যখন আমাকে ছেড়ে অনেক দূর চলে যাবে তখন মেঘদুয়ার চা বাগানে আমাদের কাটানো এই রৌদ্রছায়ার দিনগুলির কথা তোমার মনে পড়বে?

এক রূপালি মানবীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে এই চা বাগানে এসে। এক অর্গলহীন ভালোবাসায় ভরে উঠেছে আমার এই তুচ্ছ জীবন। এই কথা আমি ভুলব কী করে? রঙ্গিত মুকুটের হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল।

একটা ইংরেজি লাইন খুব মনে পড়ছে জানো। কে লিখেছেন মনে নেই। কথাটা হল--লাভ। অফ কোর্স, লাভ। ফ্লেমস ফর আ ইয়ার। অ্যাশেস ফর থার্টি। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় প্রেম, যার আগুন জ্বলে এক বছর। যার ছাই পড়ে থাকে তিরিশ বছর। তুমি যখন দূরদেশে চলে যাবে তোমার বিরহ আমাকে পোড়াবে সারাক্ষণ।

রঙ্গিত প্রগাঢ় স্বরে বলল, তোমাকে ছেড়ে যত দূরে আমি যাব তুমি তত বেশি করে আমার সঙ্গে থাকবে। তোমাকে যখন দেখব না, তোমার গলা যখন শুনব না, তখন তোমাকে দেখব আরও বেশি করে, শুনব আরও বেশি করে।

সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল মুকুট। নরম গলায় বলল, এখন আমরা কেউ যুক্ত হতে পারি না। যোগাযোগের যন্ত্র হাতের মুঠোয়, সে কারণে হাতে হাত রাখি না কেউ। এক সময় প্রেমাস্পদের হাতে হাত রেখে দুটো মানুষ পাশাপাশি হাঁটত, এখন সেই হাত মোবাইল সামলায়। আগে টেলিফোন বুথ থেকে বহু চেষ্টায় লাইন পেয়ে একজন এক প্রান্ত থেকে হ্যালো বললে অন্যপ্রান্তের মানুষটির রোমাঞ্চ হতো। একজনের চুপ করে থেকে কথা খোঁজা, শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ থেকে অন্যজন খুঁজে পেত একে অন্যের মনের হদিশ। কোথায় হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো, রাতগুলো, বলো!

রঙ্গিত বলল, আসলে সেই সময়টার সঙ্গেই বিচ্ছেদ হয়ে গেছে আমাদের। এখন শুধু একটা গভীর মায়া পড়ে আছে। একসময়ের প্রিয়, অথচ এখন বাতিল হয়ে যাওয়া খেলনার মতো। ডিপোতে বহুকাল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শ্যাওলা গজিয়ে যাওয়া বেওয়ারিশ বাসের মতো।

মুকুট বলল, আমরা থাকতাম আসামের শিলচরের ওদিকে এক চা বাগানে। বাবা ছিলেন সিনিয়র ম্যানেজার। বাবা অনেক চিঠি পেতেন। বিভিন্ন অকেশনে পেতেন অগুন্তি গ্রিটিংস কার্ড। আমারও মনে হতো আমি কবে বড় হব, আর আমাকেও মানুষ এমন চিঠি লিখবে, গ্রিটিংস কার্ড পাঠাবে। কিন্তু সমস্যা দাঁড়াল অন্য জায়গায়। আমি যখন বড় হয়ে যাব, তখন আমিও তো বাবার মতোই ব্যস্ত হয়ে যাব। অত চিঠি পড়ার সময় থাকবে না আমার কাছে। তাহলে কী করা যায়? আমি সে কারণে বাতিল পিচবোর্ড দিয়ে বানিয়েছিলাম একটা চিঠির বাক্স। যাতে না-পড়া চিঠিগুলো থাকবে। পরে সুবিধেমতো সেই চিঠিগুলো পড়ব বলে।

সেই চিঠির বাক্স আছে এখনও? রঙ্গিত তাকিয়ে আছে মুকুটের মুখের দিকে।

মুকুট ম্লান হেসে বলল, আমরা আসাম থেকে মেঘদুয়ার চা বাগানে যখন এসেছিলাম আমি তখন খুকি। জিনিসপত্র প্যাকিং করার সময় সেই জুতোর বাক্স আর তোলা হয়নি। সেটা রয়ে গেল সেই ম্যানেজার্স বাংলোয়। মাঝে গড়িয়ে গেছে এতগুলি বছর। আমি ভাবি আমাদের পরে সেই বাংলোয় যারা থাকতে এসেছিল তারা সেই বাক্সটা হয়তো ফেলে দিয়েছে। এমনও হতে পারে, সেই বাক্সটা আছে কোথাও। চুপটি করে বসে আছে আমার অপেক্ষায়।

তুমি আন্দাজ করতে পারো সেটা কোথায় আছে?

মুকুট যেন গোপন কথা বলছে এমন করে বলল, আমার মনে হয় আমাকে দেখতে না-পেয়ে সেই বাক্সটা একদিন আমার খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিল। ফরেস্ট গাম্প ছবির সেই পালকটার মতো হাওয়ায় ভেসে ভেসে চলে গিয়েছিল কোনও এক পাহাড়ে। আমি জানি এক পাইন গাছের গোড়ায় সে আজও অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য।

তুমি এসব দেখতে পাও বুঝি?

হ্যাঁ পাই-ই তো। চোখ বন্ধ করলেই সেই পাইন গাছটাকে আমি দেখতে পাই। মাঝে কতগুলো দিন চলে গেছে। আমার বয়স বেড়েছে যেমন, তেমন সেই চিঠির বাক্সটার গায়েও সময়ের ধুলো জমেছে। তার ওপর পড়েছে বরফের আস্তরণ। এই এতগুলো বছরে আমার পছন্দের মানুষদের যত না-লেখা চিঠি সব এসে জমা হয়েছে সেই চিঠির বাক্সে। কাজের চিঠি কম, প্রায় সবই অকাজের চিঠি।

লক্ষ্মীটি, তুমি ক’টাদিন অপেক্ষা করো আমার জন্য। আমি একটু গুছিয়ে নিই। তুমিও পড়াশোনাটা শেষ করে নাও। সময় হলে আমি টোপর পরে বিয়ে করতে আসব তোমাকে। তবে একটা কথা। মধুচন্দ্রিমায় অন্য কোথাও আমরা যাব না। সেই পাইন গাছটার খোঁজে বেরোব আমরা দু’জনে।

কোথায় সেই গাছ আছে তুমি জানো? মুকুট চোখ বড় বড় করে বলল।

ছিমছিমলে খরকা থেকে আর একটু ওপরে উঠলে পাওয়া যাবে সেই পাইন গাছ। হানিমুনে সকলে প্রমোদভ্রমণে যায়। আমরা যাব ট্রেক করতে। রঙ্গিত বলল শান্ত গলায়।

আবার সেই ছিমছিমলে খরকা রুটে?

একদম। তবে এবার কিন্তু আমরা সহজে হাল ছাড়ব না। আরও ওপরে উঠব। ছিমছিমলে খরকার থেকে বেরিয়ে প্রথমদিন পড়বে কুমাই। পরের দিন খোরচোন। তৃতীয়দিন টাকরা হয়ে চারদিনের মাথায় পৌঁছব মারদি হিমাল বেস ক্যাম্পে। যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে বরফের কারুকাজ করা এক অ্যাম্ফিথিয়েটার। আর রয়েছে সারি সারি পাইন গাছ। যাদের সবুজ পাতাগুলো বরফের গুঁড়ো লেগে সাদা হয়ে রয়েছে। ওই সারি সারি পাইন গাছের মধ্যে কোনও একটা গাছের নীচেই আছে তোমার সেই চিঠির বাক্স।

মুকুট বলল, অত পাইন গাছের মধ্যে থেকে সেই বিশেষ গাছটাকে তুমি কী করে চিনবে?

রঙ্গিতের মুখে সহজ সারল্যমাখা হাসি। মন্দ্র স্বরে বলল, একা যদি না পারি, তুমিই তো আছ আমার সঙ্গে। দুজন মিলে হাত লাগালে সেই চিঠির বাক্স ঠিক খুঁজে পাব। তোমার প্রিয় মানুষদের যত না-লেখা চিঠি সব তো জমা হয়ে আছে সেই বাক্সে। ওটা খুঁজে বের না করলে চলবে কেমন করে। সেই মিশন নিয়েই তো আমাদের যাওয়া।

তুমুল আবেগের তোলপাড় হচ্ছে ভেতরে। নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করছে মুকুট। পারছে না। সমস্ত শরীর কাঁপছে থিরথির করে। চোখ ভিজে যাচ্ছে জলে। রঙ্গিতের বুকে মাথা রেখে বলল, আর যদি খুঁজে না পাই?

মুকুটের মুখ থেকে ভেসে আসছে লবঙ্গ লবঙ্গ গন্ধ। রঙ্গিত হাসল, যদি নিজদের ওপর বিশ্বাস না থাকে তাহলে না-ও পেতে পারি। কিন্তু যদি বিশ্বাসের জোর থাকে তাহলে দেখে নিও তুমি, একটা বাচ্চা মেয়ের পিচবোর্ডের ওপর রংচংয়ে নকশা করা সেই চিঠির বাক্সটাকে আমরা ঠিক খুঁজে পাব। পাবই।

ভালোবাসার নিজস্ব দীপ্তি আছে। সেই অলৌকিক আলো ক্রমশ ছড়িয়ে যাচ্ছে চরাচর জুড়ে। পাতলা একটা জলের পর্দা এতক্ষণ স্থির হয়ে ছিল। এবার তা মুকুটের চোখ থেকে ঝরে পড়ল মুক্তোবিন্দু হয়ে। দিঘল চোখ আরও খানিক আয়ত করে, চিবুক সামান্য তুলে, পাতলা ঠোঁট স্ফূরিত করে, আবছা গলায় মুকুট বলল, সত্যি?

রঙ্গিত দু’চোখ ভরে দেখছে এক রূপালি মানবীকে। তার ইপ্সিত এই নারীকে কাছে পাবার জন্য নিজের সর্বস্ব বাজি রাখতে পারে সে। নিজের ঠোঁট মুকুটের ঠোঁটে নামিয়ে আনতে আনতে গাঢ় স্বরে রঙ্গিত বলল, সত্যি সত্যি সত্যি...। তিন সত্যি।

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%