সুখু আর দুখু

সুনির্মল চক্রবর্তী

ওরা দুই বোন,

ওদের গল্প বলি

মন দিয়ে শোন।

এক গ্রাম। সেখানে কত কত লোকের বাস। কত পাড়া সেখানে। কুমোরপাড়া, কামারপাড়া, জেলেপাড়া, তাঁতিপাড়া আরও কত কী! গ্রামের একটা নাম ছিল, মনে করতে পারছি না।

এ-গল্পটা তাঁতিপাড়ার গল্প। তাঁতিপাড়ায় থাকত এক তাঁতি। তার দুই বউ। বড়োবউয়ের এক মেয়ে। নাম দুখু। ছোটোবউয়েরও এক মেয়ে। তার নাম সুখু।

তাঁতি বেশি ভালোবাসে ছোটোবউকে, বড়োবউকে দেখেও দেখে না। তাই ছোটোবউয়ের মেয়ে সুখুর কপালে জোটে বেশি ভালোবাসা। বড়োবউয়ের মেয়ে দুখু বড়ো কষ্টে থাকে। তার বাবা তাকে দেখেও দেখে না।

আদর পেয়ে পেয়ে সুখুর মন ভরে যায়। সেঘরের কোনও কাজ করে না। দিনে দিনে হয় বড্ড আলসে, খিটখিটে স্বভাবের। তারই সমান বয়েসি বোন দুখু। তাকে কাছে পেলে বাজে বাজে কথা বলে। দুখু মুখ বুজে ছোটোবোনের কথা শোনে। সারাদিন কাজ করে। ঘর ঝাঁট দেয়। বাসন মাজে। উঠোন সাফ করে। কাপড় বোনে। কাপড় কাচে। সারাদিনের শেষে মায়ের সঙ্গে বসে মোটা চালের ভাত খায়। ঘরের এক কোণে ওর মা আঁচল বিছিয়ে শুয়ে পড়ে। দুখু ওর মার গলা ধরে পাশে শুয়ে যায়। অন্যদিকে সুখু আর সুখুর মার জন্য সুগন্ধি চালের ভাত। গাই গোরুর দুধ। মাখন, আরও কত কী! রাত হলে ওদের শোয়ার জন্য রয়েছে খাট, পালঙ্ক।

এইভাবেই চলছিল দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। বছরের পর বছর।

দুখুর দুঃখে বনের পাখি

করে যে হায় হায়,

দিন চলে যায় মাস চলে যায়

বছরও গড়ায়।

ওদের বাবার বয়েস হল। মরেও গেল একদিন। বড়োবউয়ের চোখে জল। মেয়ে দুখুর চোখেও জল। কী করবে ওরা ভেবে পায় না।

ওদিকে ছোটোবউ আর দেরি করে না। দুখুর মা আর দুখুকে ঝগড়াঝাঁটি করে, হেনস্থা করে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়। তারপর মাটির ভেতর এক গর্ত করে। কলসির মধ্যে রাখে তাঁতির দেওয়া যত সোনার গয়না। তারপর মাটি দিয়ে ঢেকে দেয় গর্ত।

এদিকে বড়োবউ আর তার মেয়ে দুখু ভেবে পায় না কোথায় যায়! কী খায়, কোথায় থাকে! জঙ্গলে এসে বানায় এক কুঁড়েঘর। সেখানে ভাত জোটে না। জঙ্গলের ফলমূল জোটে। কোনওদিন খায়, কোনওদিন খায় না। কেউ তাদের খবর রাখে না। তবু তাদের কোনও কষ্ট নেই। মনে কোনও হিংসে নেই। কোনও রাগ নেই।

মা-মেয়ে দু-জনে মিলে কুঁড়েঘরটা সাজায়। উঠোন সাফ করে। উঠোনে আলপনা দেয়। ঘরের আশপাশে আম, জাম গাছ লাগায়। কুঁড়েঘরে বসে মা-মেয়ে রোজ তুলো থেকে সুতো কেটে দিন চালায়।

সামনেই এক নদী। নদীতে জল টলমল করছে। জলে ছোটো, বড়ো ঢেউ। সেখানে মাছেরা খেলা করে। গাছের পাতারা ভেসে যায়। নদীর জল কত পরিষ্কার। দুখু আর দুখুর মা, রোজ নদীতে যায়। সেখানে চান সারে। কাপড় কাচে।

একদিন উঠোনে এসে বসেছে দুখু। সুতো কাটছে। আর ওর মা গেছে নদীতে চান সারতে। যাওয়ার সময় মা বলল, ঘর-দোর দেখিস দুখু।

দুখু তখন সুতো কাটতে ব্যস্ত। মার কথা কানেই গেল না।

এদিকে তখন হঠাৎ-ই সাঁই সাঁই করে বাতাস ছুটতে লাগল। বাতাস ঝড়ের আকার নিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাতাস দুখুর তুলো উড়িয়ে নিয়ে চলল।

দামাল বাতাস তুলো যত

উড়িয়ে নিয়ে যায়,

কী যে করে দুখু এখন

কান্না শুধু পায়।

দুখু তখন কাঁদছে। কেন কাঁদবে না বলো? এই তুলো থেকেই তো সুতো কাটা হবে। সুতো দিয়ে গামছা হবে। গামছা তৈরি হলে তা নিয়ে দুখু ছুটবে বাজারে। বাজারে গামছা বেচে তবেই পয়সা পাবে। সেই পয়সায় চাল, ডাল কেনা হবে। তবেই না খাবার জুটবে!

দুখুর এসব ভাবার সময় নেই। সেতখন কাঁদতে কাঁদতে ঝড়ের পিছু নিল। ঝড় কি শোনে তার কথা? শুনল না। ঝড়ের পেছন পেছন ছিল বাতাস। সেদুখুর কান্না শুনতে পেল। থমকে দাঁড়িয়ে বলল, লক্ষ্মীমেয়ে তুমি, অমন করে কেঁদো না। আমি তোমাকে তোমার তুলো ফিরিয়ে দেব। একদম ভেবো না। শুধু আমার সঙ্গে এসো।

দুখু পড়ে ভাবনায়। কী করে, কী করে, ভেবে পায় না। উড়ে যাওয়া তুলো ক-টা না পেলে সে, ঘরে ফিরবে কী করে? এসব শুনে মা-ও খুব বকুনি দেবে। তাই বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে সে-ও এগিয়ে গেল।

একটুখানি হেঁটে গেছে অমনি দেখে কী, সামনে এক কালো গোরু। গাই বলছে, কোথায় যাস দুখুদি?

ও দুখুদি, যাচ্ছ কোথায়?

বলছে কালো গাই,

বাতাস তুলো উড়িয়ে নিল

দেখি যদি পাই।

দুখু বলে, দামাল বাতাস এসে আমার চরকার সব তুলো উড়িয়ে নিয়ে গেছে। বাতাস বলেছে, সব ফিরিয়ে দেবে। তাই ওর পেছন চলেছি।

তা যাবিখন। আমার ঘর বড্ড নোংরা হয়ে গেছে। একটু সাফ করে দে-না বোন।

দুখুর মনে দয়া হল, কুয়ো থেকে জল আনল। ঝাঁটা দিয়ে গোয়ালঘর ঝেড়ে ধুয়ে সাফ করল।

এদিকে বাতাস বলেছে, দুখু একদম ভেবো না, আমার সঙ্গে এসো। বাতাস অনেক দূর এগিয়ে গেছে, পেছন ফিরে দেখে দুখু নেই। বুঝেছে দুখু কোনও কাজে আটকে গেছে নিশ্চয়ই। দুখুকে যে, কথা দিয়েছে, ওর সব তুলো ফিরিয়ে দেবে। তাই যায় কী করে? বাতাস থমকে দাঁড়ায়। ওদিকে সামনে বাতাসকে না পেয়ে, দুখু বুঝেছে বাতাস এগিয়ে গেছে। অমনি ছুটতে থাকে বাতাসকে ধরবে বলে। ছুটতে ছুটতে কিছুদূর গিয়েই দাঁড়িয়ে থাকা বাতাসকে পেয়ে গেছে দুখু। বাতাসকে সঙ্গে করে দুখু একটু এগিয়ে গেছে, অমনি কানে আসে পেছন থেকে কে যেন ডাকছে, দুখুদি ও দুখুদি।

দুখু দাঁড়ায়, দেখে একটা কলা গাছ। দুখুকে ডাকছে, বলছে, কোথা যাও দুখুদিদি, একবারটি আমার কথা শুনবে?

দুখু বলে, বলো না।

গাছ বলে, লতাপাতায় আমার শরীর জড়িয়ে আছে। চারদিকে কত আগাছাও হয়েছে।

ও দুখুদি— যাচ্ছ কোথায়?

একবারটি শোনো,

লতাপাতায় জড়িয়ে আছি

খবর রাখো কোনও?

দুখু বলে, এই ব্যাপার? এখনই তোমার কাজ করে দিচ্ছি। কথা বলা শেষ হতেই দুখু নেমে পড়ল কাজে। দু-হাত দিয়ে কত আগাছা সরাল। লতাপাতা টেনেটুনে ছিঁড়ে ফেলল, কলা গাছের কত আরাম হল। কলা গাছ বলল, দুখুদি, তুমি আমার জন্য কত কিছু করলে। তোমাকে কিছু দিতে তো হয়।

দুখু বলে, আমি কী এমন কাজ করলাম বলো?

কলা গাছ বলল, তা হয় না। তুমি তো আজ খুব ব্যস্ত মনে হচ্ছে। একদিন তোমাকে নিশ্চয়ই কিছু দেব। তা এখন কোথায় যাচ্ছ দুখুদি?

আর বোলো না। উঠোনে বসে সুতো কাটছিলাম। এমন সময় ‘শন শন’ শব্দ করে বাতাস ধেয়ে এল। তুলো উড়িয়ে দিল। কত কাঁদলাম। বাতাস বলল, তুলো ফিরিয়ে দেবে। তাই তো বাতাসের পেছন পেছন ছুটছি। এই যা:, তোমার কাজ আর তোমার সঙ্গে বকবক করতে গিয়ে দেখছি দেরি হয়ে গেল। বাতাস তো অনেক দূরে চলে গেছে, না ছুটলে হবে না, ধরতে পারব না ওকে। —বলেই দুখু ছুটতে লাগল।

ওদিকে বাতাসেরও হয়েছে মুশকিল। দুখুকে কথা দিয়েছে তুলো ফিরিয়ে দেবে। দুখুকে ফেলে একা একা যায় কী করে? দুখু যে, পেছনে পড়ে আছে। বাতাস থমকে দাঁড়ায়। দুখু ছুটতে ছুটতে বাতাসের কাছে এসে পৌঁছেছে, অমনি আবার কানে আসে পেছন থেকে কে যেন ডাকছে, দুখুদি ও দুখুদি। একবারটি আমার কথা শুনবে?

ও দুখুদি—যাচ্ছ কোথায়?

বলল সাদা ঘোড়া,

শরীরটাতে কষ্ট ভীষণ—

কপালখানা পোড়া।

দুখু দাঁড়িয়ে। পেছন ফিরে দেখে একটা সাদা ঘোড়া।

দুখু মিষ্টি করে বলে, ভাই ঘোড়া, কী তোমার দুঃখ?

ঘোড়া বলে, কবে থেকে লাগাম আর জিনপোশ গায়ে লেগে আছে। নীচু হয়ে ঘাস খেতে পারি না। এগুলো খুলে দিতে পারো?

দুখু তখনই হাত লাগিয়েছে। দু-হাত দিয়ে খুলে ফেলেছে লাগাম আর জিনপোশ। ঘোড়ার কষ্ট বলে কিছু নেই আর। আরামে চোখ বুজেছে। ওদিকে দুখু থেমে নেই। দৌড়ে গেছে ঘাসের বনে। লম্বা লম্বা সবুজ ঘাস দু-হাত ভরে তুলে নিয়ে এসেছে। ঘোড়া চোখ খুলে দেখে, খুশিতে ওর মন ডগ মগ করে ওঠে।

দুখুর আর কথা বলার সময় নেই। বাতাস যে অনেকদূরে চলে গেছে। অমনি সেছুটতে শুরু করে। ছুটতে ছুটতে বাতাসের কাছে এসে পৌঁছেছে। এবারও পেছন থেকে কে যেন ডাকছে, দুখিদি ও দুখিদি। একবারটি আমার কথা শুনবে?

ও দুখুদি—যাচ্ছ কোথায়?

ছিলাম নদীর জলে,

ডাঙায় এসে কষ্ট পাচ্ছি—

যে দেখে, সে-ই বলে।

দুখু দাঁড়িয়ে পড়ে। পেছন ফিরে দেখে একটা বোয়াল মাছ। দুখু কাছে এসে বলে, বোয়ালমাছ, কী তোমার দুঃখ? মাছ বলে, আর বোলো না, বেশ তো ছিলাম নদীর জলে। একা একাই খেলা করছিলাম। হঠাৎই ঝড়তুফান এল। দামাল ঝড়তুফান এসে আমাকে ছিটকে ফেলেছে ডাঙায়। সেই থেকে ডাঙায় শুয়ে ছটফট করছি। শুনেছি তুমি বড়ো লক্ষ্মীমেয়ে। পারো তো আমায় নদীর জলে ছেড়ে দাও।

দুখু আর দেরি করে না, মাছকে শক্ত করে দু-হাতে ধরে নদীর জলে ফেলে দেয়। মাছ স্বস্তির শ্বাস ফেলে।

দুখুর কথা বলার একদম সময় নেই। বাতাস যে কতদূর চলে গেছে, কে জানে! অমনি সে, ছুটতে শুরু করে। ছুটছে তো ছুটছেই। পেছন থেকে কেউ এখন তাকে আর ডাকছে না। কত পথ পেরোল দুখুর জানা নেই। কত মাঠ, বন, নদী পেরোল একদম মনে নেই। হাঁটতে হাঁটতে দৌড়োতে দৌড়োতে দুখু ঝরঝর করে ঘামছে। শ্বাস কেমন ওঠানামা করছে।

ওদিকে বাতাস বলছে, দুখু আর কষ্ট করতে হবে না। সামনেই যে অদ্ভুত বাড়িটা দেখছিস, ওখানে থাকে এক বুড়ি। তার কাছে গিয়ে যত তুলো চাইবি, পাবি।

বলতে বলতে বাতাস কোথায় তুলোর মতোই উড়ে গেল।

দুখু এবারে একা। ভীষণ একা। একটু একটু করে এগিয়ে গেল ছোট্ট সেই বাড়িটার দিকে। আশপাশে কেউ কোথাও নেই। উঠোনে চোখ পড়তেই দেখল, এক বুড়িমা বসে আছে। আপনমনে চরকায় সুতো কাটছে। বুড়ি কী ঝলমলে দেখতে! বুড়ি চরকায় সুতো কাটছে আর সুন্দর সুন্দর কাপড় তৈরি করছে। কাপড়গুলিও অদ্ভুত। যেন, ওদের গায়ে কেউ পাখনা জুড়ে দিয়েছে। পাখির মতন হালকা হাওয়ায় কেমন উড়ে যাচ্ছে। উড়তে উড়তে এক একটা কাপড়, এক একটা মেঘ হয়ে যাচ্ছে। মেঘ হয়ে আকাশটায় উড়ে বেড়াচ্ছে।

হাঁটতে হাঁটতে দুখু বুড়িমার কাছে চলে এসেছে। পায়ের শব্দে বুড়িমা চোখ মেলেছে। দেখে কী, চাঁদের মতোই সুন্দর ফুটফুটে একটা মেয়ে তার কাছে দাঁড়িয়ে, কী যেন বলতে চায়।

দুখু বুড়িমার কাছে এসে পেন্নাম করে বলে, প্রণাম নাও ঠাকুমা। তোমার মতোই উঠোনে বসে চরকায় সুতো কাটছিলাম। হঠাৎ সেখানে সাঁই সাঁই করে বাতাস ছুটে এল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাতাস ঝড় হয়ে আমার তুলো উড়িয়ে নিয়ে চলল। আমি কাঁদতে লাগলাম। কেন কাঁদব না বলো? তুলো থেকেই তো সুতো কাটা হবে। সুতো দিয়ে গামছা হবে। গামছা হলে তা নিয়ে ছুটব হাটে। হাটে গামছা বেচে তবেই তো পয়সা পাব। সেই পয়সায় চাল ডাল কিনব। মা ভাত রাঁধবে। তবেই না, মা-মেয়ের খাবার জুটবে। তুলো না পেলে, কী খাব বলো? জঙ্গলের ফলমূল খেয়ে থাকতে হবে। তা ছাড়া সব কিছু জানতে পারলে মা-ও ছাড়বে না। খুব বকবে। বাতাস সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। আমার কান্না শুনতে পেয়ে বলল, কেঁদো না। আমার সঙ্গে চলো। তোমাকে তোমার তুলো ফিরিয়ে দেব। তখনই বাতাসের পেছন পেছন ছুটতে লাগলাম। ছুটতে ছুটতে হাঁটতে হাঁটতে এখানে এসেছি ঠাকুমা। চারটে তুলো কি আমাকে দেবে-না?

চরকাকাটা বুড়ি ওর কথা শুনে তো অবাক! মেয়েটির সাহস আছে বটে! পথে কত কষ্টই না করেছে! মুখটা যে শুকিয়ে গেছে। খিদেয়ও পেয়েছে নিশ্চয়ই। তাই বুড়ি বলল, আর তোর চিন্তা নেই। যত তুলো চাস, পাবি। তার আগে মেয়ে আমার কথা শোন। প্রথম যে-ঘরটা দেখছিস, ও ঘরে যা। ও ঘরে গামছা পাবি। দ্বিতীয় যে ঘরটা দেখছিস, সেঘরে কাপড় আছে। তারপরে তৃতীয় ঘরটায় নানা ধরনের সুগন্ধি তেল পাবি। দু-পা হাঁটলেই একখানা পুকুর। চট করে যা তো সামনের পুকুরটায়। দুটো ডুব দিয়ে আয় তো। সাবধান, দুটোর বেশি ডুব দিবি নে কিন্তু। তারপর চাট্টি খেয়ে নে।

ঠাকুমার কথামতো দুখু হেঁটে গেল। প্রথম ঘরে ঢুকে সেতো অবাক! চারদিকে সুন্দর সুন্দর গামছা ছড়ানো। কত ফুল, পাখি আঁকা সে-সব গামছায়! সব গামছা কত রঙিন আর মোলায়েম। ঝলমল করছে। এমন রং বেরংয়ের গামছা দুখু এর আগে কোনওদিন দেখেনি। হাতের কাছে এত সুন্দর সুন্দর গামছা থাকলেও একটা গামছাও সেহাতে তুলে নিতে পারল না। আসলে মন সায় দিল না। এক কোণে পড়েছিল একটা ম্যাড়মেড়ে গামছা। সেটাকেই সেহাতে তুলে নিল।

এবারে সেহেঁটে গেল দ্বিতীয় ঘরে। সেখানে এসেও অবাক হওয়ার পালা। সারাঘরে সুন্দর সুন্দর শাড়ি ছড়ানো। কত ফুল, পাখি আঁকা সে-সব শাড়িতে। সব শাড়িই রঙিন, মোলায়েম আর ঝলমল করছে। হাতের কাছে এত সুন্দর সুন্দর শাড়ি থাকতেও একটা শাড়িও সেহাতে তুলে নিতে পারল না। তার মন সায় দিল না। এক কোণে পড়েছিল একটা আটপৌরে সুতির শাড়ি। স্নান শেষে পরবে বলে, সেটাকেই হাতে তুলে নিল সে।

তৃতীয় ঘরে এসে দুখু দেখে কী, সে-ঘরে থরে থরে সাজানো রয়েছে কতরকমের সুগন্ধি তেল। সারাঘর জুড়ে কী সুন্দর গন্ধ! হাতের কাছে এত সুগন্ধি তেল থাকতেও সে, হাত দিল না। তার মন সায় দিল না। এত সুগন্ধি তেল সেএর আগে কোথাও কোনওদিন দেখেনি। মাথায় একটুও তেল না মেখে সেএগিয়ে গেল পুকুরের দিকে।

দুখুর বড্ড ভয়। একটা ডুব দিয়েছে। মাথা তুলে দেখে ওর গায়ের কালো রং উধাও। তার বদলে গায়ের রং হল টুকটুকে। আলোয় ঝলমল করছে ওর শরীর। বঁোচা নাক হয়েছে টিকোলো। চোখ হয়েছে হরিণীর মতো টানা টানা। দাঁত যেন মুক্তোর দাঁত। চুল হয়েছে ঘন কালো। কী করে এমন হল, দুখু জানতেও পারল না।

এবারে আর এক ডুব দিয়েছে। অবাক কান্ড! দুখু দেখে কী, তার গা-ভরতি গয়না। গলায় ঝলমল করছে সীতাহার। কপালে ঝিকমিক করছে টিকলি। কানে দুলছে সোনার ঝুমকো। দু-হাতে সোনার কাঁকন। আরও কত কী! দুখু সব গয়নার নামও শোনেনি। এর আগে এতসব দেখেওনি। এমনটি হবে দুখু ভাবতেও পারেনি।

আর একটা ডুব দিতে যাবে, অমনি মনে পড়েছে, ঠাকুমা বলেছে দুটোর বেশি ডুব দিবিনে কিন্তু। জল ছেড়ে তাড়াতাড়ি ডাঙায় উঠে এসেছে দুখু।

সুতোর শাড়িখানা পরে সারাগায়ে ঝমর ঝমর গয়না নিয়ে দুখু যখন এসে দাঁড়াল, কী সুন্দর লাগছিল তাকে দেখতে! দুখু নিজেকে যেন খুঁজে পাচ্ছিল না। শুধুই অবাক হচ্ছিল।

উঠোনে এসে পৌঁছোতেই বুড়ির গলা কানে এসেছে, খুব সুন্দর লাগছে তোকে! পাশের ঘরে তোর জন্য খাবার রয়েছে। যা খেয়ে নে।

পাশের ঘরে এসে দেখে কতরকমের খাবার রয়েছে সেখানে। সুগন্ধি ভাত, পোলাও, পায়েস, দুধপুলি, ক্ষীরমোহন, কতরকমের মিষ্টি থরে থরে সাজানো। এমন সব খাবার সেএর আগে দেখেনি। আরও কত ভালো ভালো খাবার ছিল সেখানে। যার নামও সেজানে না। খুব খিদে পেয়েছিল দুখুর, তবু খাবারের দিকে যেতে পারল না। খাবার খেতে গিয়ে মনে পড়ল, দুঃখিনী মায়ের কথা, ওকে ছাড়া সেখাবে কী করে? কোনও মতে খিদে মেটাতে এক থালা পান্তা খেয়ে এল বুড়ির কাছে।

বুড়িমা বলল, খেয়েছিস তো? মাথা একপাশে হেলিয়ে জবাব দিল দুখু। বুড়িমা যা বোঝার ঠিকই বুঝে নিল।

বুড়িমা এবারে অন্য একটা ঘর দেখিয়ে বলল, ও ঘরে যা। তোর জন্য কত উপহার রেখেছি।

অন্য ঘরে এসে দুখু দেখে কী, ঘর ভরতি ছোটো-বড়ো কত ঝাঁপি। ঝাঁপিতে ঘর ঠাসা। বড়ো বড়ো ঝাঁপি নিয়ে কী করবে দুখু, জানে না। তাই বেছে বেছে একটা ছোটোঝাঁপি হাতে নিল দুখু।

দুখুর মন এবারে ছটফট করছে বাড়ি ফেরার জন্য। ওর মা নিশ্চয়ই ওকে না পেয়ে এতক্ষণে কত কান্নাকাটিই না করছে! মাকে ছাড়া দুখুও যে একদম থাকতে পারে না। বাতাস তুলো উড়িয়ে নিয়ে গেল, মায়ের বকুনি যাতে না খেতে হয়, তারজন্যই তো বাতাসের সঙ্গে এতদূর চলে এসেছে সে! বুড়িমার কাছ থেকে তুলো না নিয়ে সে, যাবে কী করে? তাই বলল, বুড়িমা উপহার তো পেলাম। তুলো দিলে কোথায়?

বুড়িমা খুব হাসল। বলল, বাড়ি গিয়ে ঝাঁপি খুললেই তুলো পাবি। তোর মা তোকে বকুনি দেবে না। তবে সাবধান, ঘরে গিয়ে তবেই ঝাঁপি খুলবি, নয়তো তুলো সব বাতাসে উড়ে যাবে। ধরতেও পারবি নে।

বুড়িমার কথা মন দিয়ে শুনল দুখু। এবারে যাওয়ার পালা।

বুড়িমা ওকে কাছে ডেকে চুমু খেয়ে বলল, ঠিকমতো যাবি। তোকে খুব ভালো লেগেছে। রাজরানি হবি তুই। বুড়িমার আদর পেয়ে একগাল হাসল দুখু।

দুখুকে এবার ফিরতে হবে তাদের ছোট্টবাসায়! যে পথে বাতাসের সঙ্গে এসেছিল সে, সেপথেই ফিরছে সে।

নদীর সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে দেখা বোয়াল মাছের সঙ্গে। বোয়াল মাছের পেটে ভরতি ডিম। কিছুদিন পরেই কাচ্চাবাচ্চা হবে। বলল, দুখুদি চিনতে পারছ? তোমার কাজ হল? তুমি আমার সেবা করেছ, বেশ মনে আছে। তোমাকে কিছু দিতে পারলে ভালো লাগত। দুখু বলল, তোমাকে চিনতে পেরেছি। তুমি বোয়াল মাছ। আমার কাজ হয়েছে। তোমার জন্য কী আর করেছি বলো? তা ছাড়া জলে তুমি ভালো আছ দেখেই খুশি হয়েছি। তুমি আমাকে মনে রেখেছ জেনে আরও খুশি হয়েছি। এ ছাড়া আর কী চাই?

পথে দেখা ঘোড়ার সঙ্গে। ঘোড়া দুখুকে ঠিক চিনতে পেরেছে। বলল, দুখুদি তোমার কাজ হল? দুখু বলল, হ্যাঁগো হয়েছে। তুমি ভালো আছ তো? ঘোড়া বলল, বেশ আছি দুখুদি। আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না। তোমাকে একটা জিনিস দেব। তুমি নিলে খুব খুশি হব। তখনই তার ইশারায় ছুটে এল এক পক্ষীরাজের ছানা। ধবধবে সাদা আর ফুটফুটে সুন্দর। দুখু ‘না’ বলতে পারল না। পক্ষীরাজের ছানা চলল দুখুর সঙ্গে।

কিছুদূর গেছে দেখা হল কলা গাছের সঙ্গে। কলা গাছ বলল, দুখুদি কেমন আছ? তোমার কাজ হল? দুখু বলল, ভালো আছি। আমার কাজ হয়েছে। কলা গাছ এবারে বলল, তুমি আমার সেবা করেছিলে। আমি ভুলিনি। তোমাকে একটা জিনিস দেব। আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না।

তখন কলা গাছ দিল একছড়া সোনার কলা। খুশিমনে হাত বাড়িয়ে তা নিল দুখু। তারপর ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হেঁটে চলল।

কিছুদূর গেছে এবার দেখা হল, কালো গোরুর সঙ্গে। কালো গোরু বলল, দুখুদি কেমন আছ? তোমার কাজ হল?

দুখু বলল, ভালো আছি। আমার কাজ হয়েছে। কালো গোরু বলল, আমার মনে আছে, তুমি আমার সেবা করেছিলে। তোমাকে একটা জিনিস দেব। আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না।

তখন কালো গোরু যার নাম মুংলি, সেতার বাছুর কপিলাকে নিয়ে এল। দুখুকে বলল কপিলা আমার মেয়ে, ওকে দেখো। ও জীবনভর তোমাকে দুধ দেবে। এটুকুই বলছি।

দুখু এগিয়ে এসে কালো গোরুকে আদর করল। কপিলাকেও আদর করল। ওদের শরীরে হাত বোলাল। মুংলির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হেঁটে চলল। সঙ্গে পক্ষীরাজ থাকতে মিছিমিছি হেঁটে যাবে কেন? চড়ে বসল পক্ষীরাজে, তারপর কত বন পেরোল, মাঠ পেরোল, নদী পেরোল, জানা নেই।

নানা উপহার নিয়ে এবারে দুখু বাড়ির কাছাকাছি এসে পৌঁছোল।

ওদিকে নদীতে চান করে দুখুর মা, সেই কখন ঘরে ফিরে এসেছে। এসে দেখে দুখু নেই। একরত্তি মেয়েটা কোথায় গেল তবে? মা তো ভেবে ভেবে কূলকিনারা পায় না। ছুটল এ-পাড়া ও-পাড়া। কোত্থাও নেই। গেল বনের ধার। গেল নদীর পাড়। সেখানেও নেই। শেষে কোত্থাও না পেয়ে ‘হায় হায়’ করতে করতে মাথাঘুরে চোখবুজে উঠোনে পড়ে গেল। কেউ এসে দেখল না। দুপুরের খাওয়া জোটেনি। কেউ এসে বলল না, কী হয়েছে দুখুর মা? কাঁদছ কেন?

এদিকে সন্ধে হয়ে এসেছে। ঘরে পিদিম জ্বালাতে হবে। কে জ্বালাবে সে-পিদিম? দুখু যে নেই। অনেক পরে দুখুর মা চোখ খুলেছে। অমনি দূর থেকে ভেসে আসে দুখুর গলা, মা-মা কোথায় তুমি? দ্যাখো এসে, কী এনেছি।

দুখুর মা অমনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উঠে বসে। তারপর ছুটে যায় দুখুর দিকে। দুখুকে দেখে তো অবাক! দুখুকে যে, চেনাই যাচ্ছে না। গায়ে কী সুন্দর শাড়ি, গলায় হার, হাতে কাঁকন। সব কেমন ঝকমক করছে। সঙ্গে আবার পক্ষীরাজ ঘোড়া, একটা হৃষ্টপুষ্ট বাছুর। হাতে আবার একখানা ছোটোঝাঁপি। তাতে কী আছে কে জানে! দুখুর মার মুখে কথা নেই। বকাবকি না করে কোনওমতে বলল, দুখু, মা আমার, কোথায় ছিলি বল তো?

দুখুকে ঘরে নিয়ে এসে বসাল মা। হাঁড়ি থেকে জল নিয়ে দুখুকে খেতে দিল। নিজে খেল।

জল খেয়ে তেষ্টা মেটাল দুখু। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল সব কথা। কেমন করে বুড়িমার কাছে গিয়ে পৌঁছোল। বুড়িমা তাকে কী কী করতে বলেছিল। তারপর তাকে কী কী উপহার দিল। পথে কাদের সঙ্গে দেখা হল। তারা কী কী করতে বলেছিল। ফেরার সময় তারা কী কী উপহার দিল ইত্যাদি।

দুখু এক এক করে সব বলে গেল আর দুখুর মা অবাক হয়ে শুনল মেয়ের কথা। একদিনেই দুখু যেন কত বড়ো হয়ে গেছে।

দুখুর আনন্দ দেখে দুখুর মায়ের মনটাও আনন্দে ভরে ওঠে। দুখুর মায়ের মন এমনিতেই খুব ভালো। দুখুর সারাশরীর জুড়ে গয়না ঝকমক করছে দেখেও, মাথা তার ঘুরে যায়নি। এত সোনার গয়না নিয়ে দুখু আর কী করবে, এত সুখ, দুখুর সইবে না। তাই ভাবল দুখুরই তো বোন সুখু। তাই সুখুও এর ভাগ নিক। সুখুকে এখনও সেনিজের মেয়ের মতোই ভাবে। দুখুও সবসময় সুখুর কথা বলে। সুখু যে, তারই ছোটোবোন।

দুখুকে নিয়ে পরদিন দুখুর মা গেল সুখুর মায়ের কাছে। সুখুদের বাড়ি। সুখুর মাকে বলল সব কথা। কী হয়েছিল। কী করে গেল, বুড়িমার কাছে। বুড়িমা তো সবকিছুই দুখুকে দিয়েছে। ঝলমলে রূপ, শরীরভরতি গয়না, এ ছাড়া পথে কারা কী দিয়েছে। পক্ষীরাজ ঘোড়া, হৃষ্টপুষ্ট গাই, আরও কত কী! তারপর দুখুর মা বলল, দুখু এতসব নিয়ে কী করবে বলো? সুখুও কিছু নিক।

সুখুর মা এতক্ষণ সব শুনছিল। হিংসেয় ফুঁসছিল, রেগে গিয়ে বলল, দুখুর জিনিস আমার সুখু কেন নেবে শুনি? আমার সুখু কি, এতই গরিব, নাকি কোনও দিন সোনার গয়না দেখেনি? নাকি দুখুর কাছে গিয়ে ভিক্ষে চেয়েছে, দুখুদি, দুখুদি, তুমি এত গয়না পেলে, আমাকে দু-চারটি দাও-না, বলেছে কি একবারও?

তারপর মাথা ঠান্ডা হলে দুখুর কাছ থেকে জেনে নিয়েছে বাকি সব কিছু। মনে মনে বলছে, দুখুর মতো এত বোকা মেয়ে নয় আমার সুখু। ও দুখুর থেকেও বেশি বেশি উপহার নিয়ে তবেই বাড়ি ফিরবে। একবার যেতে দাও ওকে।

এ-কথা ভেবে সুখুর মার মুখ খুশিতে ভরে ওঠে। এবারে দুখুর মাকে শুনিয়ে বলে, ওসব সুখটুখ নিয়ে তোমরা থাকো। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস নেওয়াও পাপ। সময় নষ্ট না করে তোমরা যেতে পারো। আমার সুখুর এসবে দরকার নেই।

দুখু ভয়ে ভয়ে মায়ের হাত ধরল। দুখুর মা, দুখুকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। বড্ড মন খারাপ হল তার। গিয়ে পৌঁছোল নিজেদের কুঁড়েঘরে। কুঁড়েঘরটা জ্যোৎস্নায় যেন, ভেসে যাচ্ছিল। আলোয় ঝলমল করছিল।

ঘরে এসে মনে হল, ছোট্টঝাঁপিটায় কী আছে, তা তো খুলে দেখাই হয়নি। বুড়িমা দুখুকে বলেছিল, তুলো ভরে রাখা আছে ঝাঁপিটায়। ঝাঁপিটা খুলতে গিয়ে, এ কী কান্ড! ঝাঁপি থেকে বেরিয়ে এল, এক রাজপুত্তুর। তার মানে বুড়িমা তার সঙ্গে মজা করেছে। বাধ্য মেয়ে হয়েছিল বলে, দুখুকে ভালোবেসে তুলোর চেয়েও অনেক ভালো সামগ্রী পাঠিয়েছে। এমন উপহার কেউ আগে পেয়েছে বলে মনে হয় না। রাজপুত্র যেমন সুন্দর দেখতে, তেমনি ঝলমল করছে তার সাজপোশাক। দুখুর মাকে প্রণাম করে রাজপুত্তুর বলল, দুখুকেই আমার পছন্দ। ওকেই বিয়ে করতে চাই। আপনি না বলবেন না। সে-ই হবে আমাদের অবাকপুরের রানি।

এসব দেখে মনে দুখুর মা মূর্ছা যায় আর কী!

দুখুর মা বলে, বাছা দু-দিন সময় তো দাও। আমার দুখুকেও একটু ভাবতে তো দেবে।

রাজপুত্তুর বলে, বেশ তো, তাই হবে।

দু-দিনের মধ্যেই আত্মীয়স্বজন খুঁজে খুঁজে নেমন্তন্ন করা হল, ধুমধাম করে দুখুর বিয়ে হল। পাড়াপড়শিরা এল। ভিন ভিন গাঁ থেকে কত লোকজন এল। শুধু এল না, সুখু আর সুখুর মা, বিয়ের কথা যত তার কানে গেল, হিংসেয় জ্বলেপুড়ে মরল সুখুর মা।

এদিকে সুখুর মা বসে নেই। পরদিনই হাটে গেছে চরকা কিনতে। চরকা কিনে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ফিরে এসেছে। সুখুকে বুঝিয়ে বলছে, রোদে তুলো শুকোতে দিয়ে আমি যাব নদীতে নাইতে। তুই থাকবি উঠোনে বসে। চরকায় তুলো কাটবি। বাতাস ঝড় হয়ে এসে সব তুলো উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তখনই কাঁদতে শুরু করবি, বাতাস এসে তখন বলবে, তুলো ফিরিয়ে দেব রে সুখু, আমার সঙ্গে চল। তখনই বাতাসের পেছন পেছন ছুটে যাবি, কেমন? পথে যেতে যেতে যাদেরই সঙ্গে দেখা হবে, তাদের সঙ্গে মিষ্টি করে কথা বলবি। বাতাস যতক্ষণ না, বুড়িমার কাছে নিয়ে যাচ্ছে, তাকে ছাড়বি নে।

সুখু উঠোনে এসে বসেছে। সুতো কাটতে কাটতে বলল, তাই হবে মা। সুখুর মা, ছোটো ছোটো পা ফেলে গেল নদীতে নাইতে।

ওদিকে কিছুপরেই হঠাৎ সাঁই সাঁই শব্দে বাতাস ছুটে এল। তারপরই ঝড়ের আকার নিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝড় এসে, সুখুর তুলো উড়িয়ে নিয়ে চলল।

দামাল যত বাতাস ছিল

হঠাৎ এল ছুটে,

মায়ের কথামতো সুখু

কাঁদছে মাথা কুটে।

সুখু তখন কাঁদছে। কেন কাঁদবে না বলো? ওর মা যে পই পই করে বলেছে, বাতাস যতক্ষণ না বলছে, পেছনে দৌড়োতে, খুব কাঁদবি। খুব চেঁচাবি। কেমন? মায়ের কথা না শুনলে মা যে খুব বকবে।

বাতাস থমকে দাঁড়িয়ে বলছে, সুখু অমন করে কেঁদো না। তোমার তুলো তোমাকে ফিরিয়ে দেব। একদম ভেবো না। আমার সঙ্গে এসো।

এ-কথাই শুনতে চাইছিল সুখু। দুখুর মতো সে-ও বাতাসের পেছনে ছুটে চলল।

একটুখানি হেঁটে গেছে, দেখে কালো গাই দাঁড়িয়ে। গাই বলল, কোথায় যাস সুখুদি?

ও সুখুদি—যাচ্ছ কোথায়?

বলছে কালো গাই,

আমার খুশিমতন যাব

তোর শুনে কাজ নাই।

সুখু কালো গাইয়ের কোনও কথাই কানে নিল না। কোনও কথাই শুনল না। বাতাসের পেছন পেছন ছুটে চলল।

দেখা হল, কলা গাছের সঙ্গে। গাছের শরীর লতায়পাতায় জড়িয়েছিল। ওর কষ্ট হচ্ছিল। ভাবছিল সুখু যদি, একবারটি তার দু-হাত দিয়ে আগাছা সরিয়ে দেয়, লতাপাতা টেনেটুনে ছিঁড়ে ফেলে, তবে ওর অনেক আরাম হয়। তাই বলল,

ও সুখুদি—যাচ্ছ কোথায়?

একবারটি শোনো।

সুখু বলে,

তোমার কথা শোনার মতো

সময় যে, নেই কোনও।

কলা গাছের দুঃখ হল, বেশি কিছু বলতে পারল না, বুঝল, এই মেয়েটা দুখুর মতো নয়। মনে হচ্ছে বড্ড স্বার্থপর।

সুখু কোনও কথাই কানে নিল না। বাতাসের সঙ্গে ছুটে চলল।

এবারে দেখা এক ঘোড়ার সঙ্গে। অনেকদিন ধরে লাগাম আর জিনপোশ গায়ে লেগে আছে। নীচু হয়ে ঘাস খেতে পারে না।

ও সুখুদি, যাচ্ছ কোথায়?

বলল সাদা ঘোড়া।

সুখু রেগে গিয়ে বলল,

সে-সব শুনে লাভ কীরে তোর?

কী পেয়েছিস তোরা?

সুখু কোনও কথাই শুনল না। ঘোড়ার দুঃখ হল। বুঝল, এই মেয়েটা দুখুর মতো নয়। বড্ড জেদি, বড্ড ঝগড়ুটে। তাই সে, চুপ করে গেল।

বাতাসের পেছনে সুখু ছুটে চলল। কিছুদূর গেছে শুনল, কে যেন, ডাকছে পেছন থেকে—

ও সুখুদি, যাচ্ছ কোথায়?

ছিলাম নদীর জলে।

সুখু দেখল, একটা বোয়াল মাছ ডাঙায় শুয়ে ছটফট করছে। সুখু কোনও দয়ামায়া দেখাল না। বরং মুখঝামটা দিয়ে বলল:

তুমি ভীষণ দুষ্টু, এসব

লোকেরাই তো বলে।

বোয়াল মাছ খুব দুঃখ পেল। এরপরেও কিছু বলতে ভয় হল।

ওদিকে সুখু কোনও কিছুই শুনল না। বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে অনেকদূর চলে এসেছে সে। কতদূর চলে এসেছে, কে জানে। অমনি সে, ছুটতে শুরু করে। ছুটছে তো ছুটছেই। পেছন থেকে কেউ এখন তাকে আর ডাকছে না। কত পথ পেরোল, সুখুর জানা নেই। কত মাঠ, কত নদী পেরোল, একদম মনে নেই। হাঁটতে হাঁটতে, দৌড়োতে দৌড়োতে সুখু ঝরঝর করে ঘামছে। শ্বাস কেমন ওঠানামা করছে।

বাতাস বলছে, সুখু আর কষ্ট করতে হবে না। সামনেই যে, অদ্ভুত বাড়িটা দেখছিস, ওখানে থাকে এক বুড়ি। লোকে বলে আদ্যিকালের বুড়ি। তার কাছে গিয়ে যা-চাইবি, পাবি। যত তুলো চাইবি, তার চেয়েও বেশি পাবি।

বলতে বলতে বাতাস কোথায় তুলোর মতোই উড়ে গেল।

সুখু এবারে একা। ভীষণ একা। মনে মনে বিরক্ত। এগিয়ে গেল, বাড়িটার দিকে। উঠোনে চোখ পড়তেই দেখল, এক বুড়িমা বসে আছে। আপনমনে চরকায় সুতো কাটছে। সুন্দর সুন্দর কাপড় তৈরি হচ্ছে। বুড়িমাকে পেন্নাম টেন্নাম, না করেই সুখু বুড়িমাকে বলল, চরকায় সুতো কাটছিলাম, বাতাস আমার তুলো উড়িয়ে নিয়েছে। বাতাস আমাকে এখানে নিয়ে এল। বলেছে তোমার কাছেই তুলো থাকে। আমাকে তাড়াতাড়ি যা, দেবার দাও।

বুড়িমা চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল সুখুকে। বলল, এত অধৈর্য কেন তুই? তুলো কেন, অনেক ভালো জিনিস দেব তোকে। মাথা ঠাণ্ডা কর, যা পুকুরে। দুটো ডুব দিয়ে আয়। সাবধান, ভুলেও তিনটে ডুব দিবিনে কিন্তু।

সুখুর তর সয় না। পাশের ঘরে গিয়ে ভালো একটা গামছা নিল। সুন্দর দেখে একটা শাড়ি নিল। সুগন্ধি তেল লাগাল মাথায়। তারপর দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপ দিল পুকুরে। এক ডুব দিল। দু-ডুব দিল। এক ডুবে পেল রূপ। আর এক ডুবে গা ভরতি সোনার গয়না। ওর মনে তখন লোভ। দুখুর চেয়ে অনেক বেশি তার চাই। বুড়ি তাকে সাবধান করেছে। তবু ভাবছে, তিন ডুবে না-জানি, আরও কত কী পাওয়া যাবে! অন্য কিছু ভাববার সময় নেই এখন।

সুখু ডুব দিয়েছে। কিন্তু একী! জল থেকে মাথা তুলে দেখে তার রূপ নেই, সোনার গয়না নেই। নাকটা হাতির শুঁড়ের মতো লম্বা হয়েছে। সারা শরীরে খোস, পাঁচড়া, আর ফোড়া। বুড়িমার কাছে এসে গালমন্দ করছে, এ কী করলি তুই? তুই যে, একটা ডাইনি। সুখু তখন খুব কাঁদছে।

বুড়িমা বলল, তিনটে ডুব দিতে কি বলেছি তোকে? এ তোর শাস্তি। কেঁদে আর কী হবে! লোভ করলে এমনই হয়। যাক অনেক কষ্ট করেছিস, এবারে চাট্টি খেয়ে নে।

বুড়ির কথামতো পাশের ঘরে গিয়ে সুখু দেখে, কতরকমের দামি দামি খাবার রয়েছে সেখানে। সুগন্ধি ভাত, পোলাও, পায়েস, দুধপুলি, ক্ষীরমোহন এমনই সব ভালো ভালো খাবার থরে থরে সাজানো। সুখুর খুব খিদে পেয়েছিল। তখনই বসে পড়ল খেতে। যতটুকু না, খেল, তার চেয়ে বেশি খাবার নষ্ট করল। খেতে গিয়ে একবারও মনে পড়ল না, মায়ের কথা। বুড়িমা খেয়েছে কি না, তা-ও জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেল।

ওদিকে তখন ঘরের বাইরে গাছের ছায়ায় একমনে বসে বুড়িমা চরকায় সুতো কাটছে। সুন্দর সুন্দর নানা রংয়ের কাপড় তৈরি হচ্ছে। কাপড় গুলিও অদ্ভুত। যেন, ওদের গায়ে কেউ পাখনা জুড়ে দিয়েছে। পাখির মতন হালকা হাওয়ায় কেমন উড়ে বেড়াচ্ছে। উড়তে উড়তে এক একটা কাপড় এক একটা মেঘ হয়ে যাচ্ছে। মেঘ হয়ে আকাশটায় মিলিয়ে যাচ্ছে।

সুখুর এসবে মতলব নেই। বুড়িমার কাছে আসতেই বুড়িমা বলল, পেটভরে খেয়েছিস তো? খাবারগুলি কেমন ছিল রে?

মুখে বিরক্তি এনে ঢেকুর তুলতে তুলতে সুখু বলল, একদম বাজে। বুড়িমা যা বোঝার ঠিকই বুঝে নিল।

সুখুর আর তর সইছে না। অনেক বেলা হল। বিরক্তির সঙ্গে বুড়িমার কাছে এসে বলল, এবারে কী দেবে দাও, বাড়ি যেতে হবে।

সুখুর কথা বুড়িমার ভালো লাগল না। অন্য একটা ঘর দেখিয়ে বলল, ও-ঘরে যা। তোর জন্য উপহার রেখেছি।

সুখু আর দেরি করল না। দৌড়ে গেল সে-ঘরে। দেখে কী, ঘরভরতি ছোটো-বড়ো কত ঝাঁপি। ছোটোঝাঁপি নিয়ে ঘরে ফিরলে মা দুঃখ পাবে। তাই একটা বড়োঝাঁপি মাথায় তুলে নিল সে। তারপর বুড়িমাকে প্রণাম না করে, আজেবাজে কথা বলতে বলতে বাড়ির পথ ধরল।

পথে দেখা বোয়াল মাছের সঙ্গে। বোয়াল মাছ তখনও ডাঙায় শুয়ে ছটফট করছিল। সুখুকে কাছে পেয়ে তার পা জড়িয়ে ধরল। সুখুর পায়ে কাটা বঁিধল। কোনওরকমে সুখু তাকে ছেড়ে পালাল।

এবারে দেখা ঘোড়ার সঙ্গে। ঘোড়ার কাছে আসতেই, ঘোড়া সুখুর বিদঘুটে রূপ দেখে ভয় পেল। এক চাট মারল সুখুকে। সুখু ছিটকে পড়ল মাটিতে। কাঁদতে লাগল অঝোরধারায়।

এবারে হেঁটে এল কলা গাছের সামনে। সুখুর ওপর রাগ ছিল কলা গাছের। কলা গাছের কোনও কথাই শোনেনি সুখু। কোনও আগাছা পরিষ্কার করেনি। কলা গাছ তার রাগ মেটাতে, এক কাঁদি কলা ফেলল সুখুর পিঠে। সুখু যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল। কোনওক্রমে হেঁটে চলল পথে।

কালো গোরুর সঙ্গে এবার দেখা হল। সুখুর ওপর রাগ ছিল তার। সুখুর অমন বিদঘুটে চেহারা দেখে কালো গাই মুংলি খুব ভয় পেয়ে গেল। শিং নিয়ে তেড়ে এল সুখুর দিকে। নিজের প্রাণ বাঁচাতে সুখু পড়িমরি করে দিল ছুট। এ ছাড়া তার কোনও উপায় ছিল না।

ওদিকে সুখুর মা, সেই থেকে সুখুর পথ চেয়ে বসে আছে। আসতে দেরি হচ্ছে দেখে, মনটাও খুব অস্থির। বাতাসের সাঁই সাঁই আওয়াজ শুনে ভাবছে তার সুখু-মা এই বুঝি এল। তার রূপ গেছে পালটে। সারাশরীর জুড়ে ঝকমক করছে সোনার গয়না। ঝাঁপি খুললেই বেরোবে রাজপুত্তুর। স্বপ্ন দেখছে আর কত কী ভাবছে সুখুর মা।

সুখুর ঘর থেকে বেরোবার পরে পরেই সুখুর মা, কাজের মেয়েকে বলেছে উঠোন ঝাড় দিতে। উঠোন ঝাড় দিয়েছে মেয়ে। তারপর বারান্দা আর ঘর, ঘষে ঘষে মেজে পরিষ্কার করতে বলেছে কাজের মেয়েকে। সে-কাজও সেই কখন শেষ করেছে বাধ্য কাজের মেয়ে। যাওয়ার আগে সারা উঠোনজুড়ে আলপনা দিয়েছে। নতুন কাপড় পরে সুখুর মা, সুখুকে বরণ করতে তৈরি হয়ে বসে আছে। মঙ্গলদীপ সাজিয়ে রেখেছে। খুঁজে পেয়েছে একখানা মঙ্গলশাঁখ। হাতে শাঁখ নিয়ে, এ-ঘর ও-ঘর করছে সুখুর মা। সুখু এলে, তখনই শাঁখে ফুঁ দেবে। মনে মনে একটা কথাই বার বার বলছে, কখন আসবি মা? তোকে দেখলে তবেই তো মন খুশি হবে। দু-চোখ ভরে তোকে দেখব রে সুখু!

সেই সুখুকে এবারে দেখতে পেল, দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, কিন্তু এ কেমন চেহারা সুখুর! হাত থেকে পড়ে গেল মঙ্গলশাঁখ। মঙ্গলদীপ সাজিয়ে কাজ নেই। আসল সুখুকে যে, চেনাই যাচ্ছে না। মেয়েকে দেখে, সুখুর মার মুখে কথা নেই। বোবা হয়ে গেছে। নাকটা যেন, হাতির শুঁড়। দু-হাতে সোনার গয়না নেই। তার বদলে ফোড়া, খোসপাঁচড়ায় সারাশরীর ভরে আছে।

মায়ের মন বলে কথা। কাঁদতে কাঁদতে সুখুকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, কে এমন করল তোকে? কী করেছিলি তুই? যার জন্য এতকষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে তোকে?

সুখুর মা তবু বিশ্বাস হারায় না। ভাবে, নিশ্চয়ই বুড়িমা তার মেয়েকে নিয়ে সামান্য মজাই করেছে। নিশ্চয়ই ঝাঁপি খুললে সব কিছু পাওয়া যাবে। দুখু যদি, অতকিছু পায় আমার সুখু পাবে না কেন? ঝাঁপির মধ্যে না-জানি, কত কী রাখা আছে! রাজপুত্তুর, সোনার গয়না অতবড়ো ঝাঁপিতে না থেকে যায় কোথায়?

সুখুকে বলছে, কাঁদিস না সুখু। বুড়িমা কাউকে দুঃখ দিতে পারে না। দুখু যদি, এতকিছু পেয়ে থাকে, আমার মেয়ে হয়ে তুই কী দোষ করলি বল?

আয় কাছে আয়—বলে মা মেয়েকে কাছে ডেকে নেয়। দু-জনে ধরাধরি করে অতবড়ো ঝাঁপি ঘরে তুলে আনে। মা বলে, আয় এবারে ঝাঁপি খুলি। এতবড়ো ঝাঁপি আমি কি একা খুলতে পারি?

মেয়ে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে কাছে এল। দু-জনে মিলে ঝাঁপি খুলল। অতবড়ো ঝাঁপি খুলতে গিয়ে একী কান্ড! কোথায় রাজপুত্তুর, কোথায় সোনার গয়না! তার বদলে ‘ফোঁস ফোঁস’ আওয়াজ করে সেখানে বেরিয়ে এল, এক পেল্লায় অজগর সাপ! সাপের বোধ হয় খুব খিদে পেয়েছিল। সুখুকে কাছে পেয়ে প্রথমেই ওকে গিলে খেল।

সুখুর মা বিপদ বুঝে সাপের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচল। পালিয়ে আর যাবে কোথায়? সুখু আর নেই, সুখু আর নেই, ভাবতে গিয়ে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। সুখুর শোকে কিছুপরেই মূর্ছা গেল। কেউ তাকে হাত ধরে টেনে তুলল না। না খেয়ে, না দেয়ে শোকে-দুঃখে সেখানেই মরে রইল সে।

নটে গাছটি মুড়োল,

গল্প আমার ফুরোল।

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%