সোমনাথ সুন্দরী

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

শেষ রাত। বিশাল মন্দির চত্বর ঘুমিয়ে আছে। গবাক্ষে বসানো পিলসুজ আর মন্দির প্রাকারের মশালগুলোর আলো ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে বহুক্ষণ আগেই নিভে গেছে। অপসৃয়মান চাঁদের আবছা আলোতে প্রায় অস্পষ্ট বাগিচাসম্মিলিত বিশাল মন্দির প্রাঙ্গণ। কোথাও কোনও মানুষের কোলাহলের শব্দ নেই। শেষ রাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সবাই। শব্দ বলতে শুধু মন্দিরের পিছনে সমুদ্রর ঢেউ ভাঙার শব্দ। সে শব্দ অনেকটা শঙ্খধ্বনির মতো। কাছেই সমুদ্রতট। পূর্ণিমার রাতে কোনও কোনও সময় জোয়ারের জল এসে ছুঁয়ে যায় পশ্চাৎ ভাগের মন্দির প্রাকারকে।

সারাদিন অজস্র মানুষের, পূণ্যার্থীর কোলাহলে, মন্ত্রোচ্চারণে, ঘণ্টাধ্বনির শব্দে ঢাকা পরে থাকে উর্মিমালার শব্দ। কিন্তু সন্ধ্যারতি সাঙ্গ হবার পর যখন চারপাশ ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে তখন জেগে উঠতে শুরু করে ঢেউ ভাঙার শব্দ। বিশেষত এই শেষ রাতে যেন বেশ প্রকট হয়ে ওঠে উর্মিমালার এই শঙ্খনাদ। আর সেই শব্দে প্রতিদিনের মতো ঘুম থেকে উঠে গর্ভগৃহের ঠিক সামনের প্রশস্ত চত্বরে এসে দাঁড়ালেন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব।

প্রতিদিনের মতো এদিনও তিনি একবার অভ্যাস মতো তাকালেন নীচের দিকে। গর্ভগৃহের সামনে থেকে প্রশস্ত সোপানশ্রেণী তিন ধাপে নীচের বাগিচায় নেমেছে। ধাপগুলোর দু-পাশে পুরোহিত সেবকদের বাসস্থানগুলো এখনও গভীর নিদ্রামগ্ন। আর বিশাল বাগিচার প্রাকারের গায়ে ও মন্দিরের অন্য আবাসিকদের কক্ষগুলোও অন্ধকারে প্রায় অদৃশ্য হয়ে আছে। কে বলবে বিশাল এই প্রাচীন মন্দির তিন সহস্র মানুষের আবাসস্থল। এ মন্দিরকে নগরী বললেও অত্যুক্তি হয় না।

তবে তাদের জেগে উঠতে আর বেশি দেরি নেই। আর তাদের জাগিয়ে তোলার কর্তব্য সম্পাদন করেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। তাই এ সময় তাঁকে এখানে এসে দাঁড়াতে হয়। গর্ভগৃহকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকারে ষোলোটি স্তম্ভ ধরে রেখেছে মূল মন্দিরের মাথার ওপরের ছাদটাকে। নানা কক্ষ আর উপমন্দির সম্মিলিত মন্দিরের এই প্রধান চত্বর। তারাও বৃত্তাকারে ঘিরে রেখেছে গর্ভগৃহকে। তবে সন্ধ্যারতির পর এ স্থানে অন্য কারো থাকার অনুমতি নেই। একমাত্র প্রধান পুরোহিত ছাড়া। ত্রিপুরারিদেবের দুই প্রধান সহকারী পুরোহিত নন্দিবাহন আর মল্লিকার্জুনের কক্ষ সোপানশ্রেণীর পরবর্তী ধাপের দু-প্রান্তে। আর অন্য দুই শত পুরোহিত থাকেন বিশাল বাগিচার গায়ে প্রাকার সংলগ্ন ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ গুলোতে। কেউ কেউ আবার নগরীতে ফিরে গিয়ে রাত্রিবাস করেন। নগরীর নাম প্রভাস পত্তন।

মন্দিরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এ নগরী। তবে এ মন্দির আর এ নগরী যে কত প্রাচীন তা কারও জানা নেই। এমনকী পুরোহিতশ্রেষ্ঠ, চিরন্তন পীঠের প্রধান সেবক ত্রিপুরারিদেবেরও নয়। চারদিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ-উদ্যানের দিকে একবার তাকিয়ে নেবার পর তিনি তাকালেন আকাশের দিকে। চন্দ্রদেব প্রায় অন্তর্হিত চলেছেন আকাশের বুক থেকে। ওই চন্দ্রদেবের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই মন্দিরের। প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাস অনুসারে চন্দ্রদেবই নাকি এই প্রভাস তীর্থে শিবের আরাধনা করে তাঁর দ্বারা শাপমুক্ত হয়ে এ মন্দির নির্মাণ করান। তেমনই লেখা আছে হিন্দু পুরাণে। চন্দ্রদেবের নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত এ মন্দিরের নাম, শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এই মন্দিরের নাম।

বেশ কিছুক্ষণ আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন ত্রিপুরারি। সোমদেব এক সময় সত্যি অন্তর্হিত হলেন, তার পর পুব আকাশে ফুটে উঠল শুকতারা। ঠিক এই ক্ষণের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন প্রধান পুরোহিত। এবার নিদ্রাভঙ্গ করতে হবে মন্দিরবাসীদের। মন্দিরের অন্ধকার গর্ভগৃহর দারুকাঠ নির্মিত আর্গলের পার্শ্ববর্তী এক অনুচ্চ স্তম্ভর গা থেকে একটা মোটা শিকল চত্বর অতিক্রম করে সোপানশ্রেণীর দিকে এগিয়েছে। স্বর্ণ নির্মিত শৃঙ্খল।

সেই শিকলের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন ত্রিপুরারি। তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন। আজকাল এ কাজটা করতে কষ্ট হয় তার। কিন্তু এ কাজের দায়িত্ব যেহেতু তারই, তাই তিনি প্রতিদিনের মতো তুলে নিলেন সেই স্বর্ণ শৃঙ্খল। তার পর মন্দিরবাসীদের ঘুম ভাঙাবার জন্য ঝনঝন শব্দে সেটা বাজাতে আরম্ভ করলেন। বার কয়েক সেটা বাজাবার পরই নীচ থেকে গর্ভগৃহর সামনের চত্বরে উঠে এলেন তাঁর দুই সহযোগী নন্দিবাহন আর মল্লিকার্জুন। তারা দুজনও হাত লাগালেন সে কাজে।

আধো অন্ধকারের মধ্যে মন্দিরের উপরিভাগ থেকে স্বর্ণ শৃঙ্খলের সেই ঝনঝন-ঝমঝম শব্দ ছড়িয়ে যেতে লাগল মন্দিরের নীচের প্রাঙ্গণে, বাগিচা অতিক্রম করে দূরবর্তী প্রাকার সংলগ্ন ঘুমন্ত প্রকোষ্ঠগুলোতে। ধীরে ধীরে জেগে উঠতে লাগল মন্দির। বেশ কিছুক্ষণ সময় ধরে শিকলটা বাজাবার পর থামলেন তারা। এবার সমুদ্র স্নানে যেতে হবে ত্রিপুরারিকে।

আজ অনেক কাজ প্রধান পুরোহিতের। কিছু কুমারী নারী আজকে দেবতার উদ্দেশ্যে নিজেদের সমর্পণ করবে। সে কাজে পৌরহিত্য করতে হবে ত্রিপুরারিদেবকে। গর্ভগৃহর সমুখস্থ চত্বর ছেড়ে প্রথমে নিজের কক্ষে প্রবেশ করলেন প্রধান পুরোহিত। তারপর সেখান থেকে পট্টবস্ত্র সংগ্রহ করে মন্দিরের পশ্চাদবর্তী সোপানশ্রেণী বেয়ে এগোলেন সমুদ্রর দিকে। জলোচ্ছ্বাসের শঙ্খধ্বনির মতো শব্দ ক্রমশ বাড়ছে। সমুদ্র যেন তার এই শঙ্খনাদের মাধ্যমে আহ্বান জানাচ্ছে সূর্যদেবকে উদিত হবার জন্য।

রঙ ধরতে শুরু করল সমুদ্রর বুকে পুব আকাশে। ইতিমধ্যেই জেগে উঠেছে আবাসিকরা। তারা নিয়োজিত হতে শুরু হয়েছে নিজেদের কাজে। চয়নিকার দল সাঁজি হাতে পুষ্প চয়নের জন্য, বাদ্যকার আর দেবদাসী নর্তকীর দল দেবতার সামনে প্রভাতী সঙ্গীত, নৃত্যগীত পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করেছে। প্রত্যহ তিনবার—প্রভাতে, দ্বিপ্রহরে আর সন্ধ্যায় নৃত্যগীত পরিবেশিত হয় দেবতার সামনে। পুরোহিত আর সেবকদের এক অংশ শুরু করেছে পূজার উপাচার সাজানোর কাজ। নানা ধরনের শব্দ ভেসে আসতে শুরু করেছে নানা প্রান্ত থেকে।

এক সময় প্রভাতী সূর্যকিরণ সত্যিই ছড়িয়ে পড়ল স্বর্ণখচিত মন্দির শীর্ষে। স্বর্ণ কলমে প্রোথিত সোনার জয়ধ্বজে, রৌপ্য মণ্ডিত দারুকাঠের স্তম্ভ শোভিত শ্বেত শুভ্র মন্দির প্রাঙ্গণে, মন্দিরের চারপাশে ঘিরে থাকা পুষ্প শোভিত বাগিচাতে। ভোর হল প্রভাসক্ষেত্রে, চিরন্তন পীঠ—সোমনাথ মন্দিরে। প্রাকার বেষ্টিত মন্দিরের প্রধান তোরণের বাইরে শুরু হল ভক্ত-দর্শনার্থীদের কোলাহল। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই দেবতা দর্শনের উদ্দেশ্যে মন্দির প্রাকারের বাইরে সমবেত হয়েছে তারা। দেবতার অলৌকিক বিগ্রহ দর্শন করে অক্ষয় স্বর্গলাভের আকাঙ্ক্ষায়।

তবে তাদের বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। যতক্ষণ না মন্দির প্রাঙ্গণ পরিষ্কৃত হয়, যতক্ষণ না প্রধান পুরোহিত গর্ভগৃহর স্বর্ণদ্বার উন্মুক্ত করে দেবতার নিদ্রাভঙ্গ করেন, প্রত্যুষের পূজাপাঠ, নৃত্যগীত দেবতার সামনে পরিবেশনার কাজ সম্পন্ন না হয় ততক্ষণ বাইরের জনস্রোতকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না মন্দির প্রাকারের অভ্যন্তরে।

তবে এসব কাজ যথাসম্ভব দ্রুত সম্পন্ন করে পুরোহিতকুল সেবায়েতের দল। তাই ভোরের প্রথম আলো মন্দিরশীর্ষে পড়ার সময় যখন সমুদ্রে অবগাহন করে নতুন পট্টবস্ত্র পরিহিত হয়ে মন্দিরের দিকে ত্রিপুরারিদেব এগোলেন, ততক্ষণে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে সমুদ্র পর্যন্ত মানব শৃঙ্খল রচনা করে ফেলেছে মুণ্ডিত মস্তক সেবায়েতরা। হাতে তাদের বড় বড় রুপোর কলস। সমুদ্রর জল এই মানব শৃঙ্খলের মাধ্যমে এগোচ্ছে মন্দিরের দিকে। এভাবেই প্রতিদিন প্রত্যুষে মন্দিরের ধৌতকার্য সম্পন্ন হয়। ক্ষৌরকারের দলও উপস্থিত হতে শুরু করেছে সমুদ্রতীরে পূণ্যার্থীদের নিয়ে। মন্দির প্রাকারের বহিঃদেশে কুটির তাদের। পাঁচ শত ক্ষৌরকার বসবাস করে সেখানে। সমুদ্র তীরে বসে তারা দেবতা দর্শন অভিলাসী তীর্থযাত্রীদের স্নানের আগে মস্তক মুণ্ডন করে।

সমুদ্র স্নান সেরে পবিত্র হয়ে ত্রিপুরারিদেব প্রথমে মন্দিরে নিজের কক্ষে ফিরে এলেন। কপালে চন্দনের প্রলেপ লেপন করে পট্ট উত্তরীয়তে নিজেকে আবৃত করে যখন তিনি গর্ভগৃহর স্বর্ণ মাণিক্য খচিত দারুকাঠের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ততক্ষণে মন্দির চত্বরের ধৌতকার্য সম্পন্ন হয়েছে।

গর্ভতোরণের দু-পাশে সার বেঁধে সমবেত হয়েছে স্বর্ণপাত্রে পূজার উপাচার শোভিত পট্টবস্ত্র পরিহিত সেবায়েতরা আর সালঙ্কারা, নিক্কন ফুলসাজ শোভিত দেবদাসীরা। আর কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে বাদ্যকার বাহকের দল। বন্ধ তোরণের দু-পাশে হীরকখচিত দুগ্ধভাণ্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছেন নন্দিবাহন আর মল্লিকার্জুন। তাদের পরনেও নতুন পট্টবস্ত্র, চন্দন চর্চিত কপাল। প্রধান পুরোহিতের মতো তাদেরও মুণ্ডিত মস্তক।

ত্রিপুরারিদেবের জন্যই প্রতীক্ষা করছিল সবাই। পুরোহিতশ্রেষ্ঠ গর্ভগৃহের তোরণের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই উপস্থিত জনতা মাথা নীচু করে প্রণাম জানাল তাকে। সোনায় মোড়া দারুকাঠের বিশাল দুই কপাট। তার মধ্যে খচিত আছে হীরক-চুণি-মকরতমণি ইত্যাদি বহুমূল্য রত্নরাজি। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের রাজন্যবর্গ দেবতার প্রতি উৎসর্গ করেছেন এসব রত্নমালা। কেউ কেউ বলেন যে, এই গর্ভগৃহর একটা কপাটের বিনিময়ে নাকি যে-কোনও বৃহৎ রাজ্য ক্রয় করা যায়। যদিও যুগ যুগ ধরে, শত শত বৎসর ধরে এই চিরন্তন পীঠে যে-সব সম্পদ সঞ্চিত হয়ে আছে তার তুলনায় এ তোরণ সামান্য কণা মাত্র।

ত্রিপুরারিদেব প্রথমে ভূমিষ্ঠ হয়ে চৌকাঠে মাথা ছুঁইয়ে দেবতার নিদ্রাভঙ্গ করার জন্য মার্জনা চেয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর ঠিক মাথার ওপরে সোনার শিকলে বিশালাকার ঘণ্টা ঝুলছে। প্রধান পুরোহিত তার দক্ষিণবাহু ঊর্ধ্বে তুলে একবার ঘণ্টাটা বাজালেন। আর সেই শব্দে বিশাল মন্দিরের বিভিন্ন প্রান্তে নন্দি মন্দির-সহ যত উপমন্দির আছে তার ঘণ্টাগুলো বাজানো শুরু হল।

এভাবেই রোজ ঘুম ভাঙানো হয় দেবতার। মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। এবার উন্মোচিত হবে গর্ভগৃহের দরজা। আর কিয়ৎকালের মধ্যেই ভক্তরা দর্শন করতে পারবে আরাধ্য দেবতাকে। ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে-সঙ্গেই মন্দির প্রাকারের শুরু হল 'জয় সোমনাথ' ধ্বনি। সমুদ্র-গর্জন হারিয়ে যেতে লাগল তার আড়ালে।

গম্ভীর অথচ শান্ত অনুচ্চ কণ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে কপাট দুটো দু-পাশে সরালেন ত্রিপুরারিদেব। উন্মোচিত হল গর্ভগৃহ। কিন্তু ভিতরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন কষ্টি পাথরের দেওয়াল-সম্মিলিত গর্ভগৃহ।

মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশের অধিকার এ মন্দিরের সামান্য কয়েকজন মানুষ ব্যতীত অন্যদের নেই। বিগ্রহকে স্পর্শ করা তো অকল্পনীয় ব্যাপার। এমনকী মন্দিরে আগত দর্শনার্থী রাজারাও গর্ভগৃহে পা রাখতে পারেন না। সাধারণ পুণ্যার্থীদের মতো গর্ভগৃহের চৌকাঠের বাইরে থেকেই বিগ্রহ দর্শন করতে হয়। অবশ্য তাতেই পুলকিত হন তারা। ধনসম্পদ দান করেন মন্দিরে, নিজ রাজ্যে ফিরে গিয়ে প্রচার করেন অলৌকিক দেবমাহাত্ম্য।

কক্ষদ্বার উন্মোচিত হতেই একজন সেবায়েত বিশালাকৃতির এক জ্বলন্ত ঘিয়ের প্রদীপ এনে দাঁড়ালেন প্রধান পুরোহিতের সামনে। তার হাত থেকে সেই প্রদীপ নিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে ত্রিপুরারিদেব প্রবেশ করলেন গর্ভগৃহে। হীরকখচিত প্রদীপদণ্ডর ওপর তিনি স্থাপন করলেন সেই অগ্নিশিখা। মৃদু আলোকিত হয়ে উঠল কক্ষ।

এই মন্দির চত্বর রত্নরাজি, স্বর্ণশোভিত হলেও কিন্তু গর্ভগৃহে সে বৈভবের কোনও চিহ্ন নেই। একমাত্র ওই প্রদীপদণ্ড ছাড়া। কালো পাথরের তৈরি দেওয়াল, মাথার ওপরের ছাদ সবই আভরণহীন কৃষ্ণকায়। তবে দেবতার বিগ্রহটি বড় অলৌকিক দৃশ্য সম্পন্ন। যা যে-কোনও মন্দিরের মহামূল্য রত্নরাজি খচিত বিগ্রহর চেয়ে অনেক বেশি দেবমাহাত্ম্যর কথা জানান দেয়, ভক্তিভাব সঞ্চারিত করে দর্শনার্থীদের মনে।

তিন গজ দীর্ঘ কলো পাথরের তৈরি সোমনাথের বিগ্রহটি অর্থাৎ শিবলিঙ্গটি ভূমি প্রথিত নয়। মাটি থেকে এক গজ তফাতে শূন্যে ভেসে আছেন সোমনাথ! না, ওপর থেকে নেমে আসা কোনও শৃঙ্খলের সাহায্যে তিনি আবদ্ধ নন। সম্পূর্ণ বন্ধনহীন ভাবে শূন্যে ভাসমান কালো পাথরের তৈরি বিশালাকার বিগ্রহটি।

এই চিরন্তন পীঠে দেবতা যে সত্যিই অবস্থান করছেন এর চেয়ে বড় চাক্ষুষ প্রমাণ আর কী হতে পারে! এজন্যই তো এই প্রভাস ক্ষেত্রের মন্দিরকে শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম মনে করা হয়। মহাদেব যে এখানে স্বয়ং বিরাজমান ওই শিবলিঙ্গ রূপে। যুগ যুগ ধরে এ মন্দিরে ওভাবেই শূন্যে ভাসমান হয়ে অবস্থান করছেন তিনি। এই সোমনাথ বিগ্রহকে ডাকা হয় নানা নামে। সত্য যুগে তিনি পরিচিত ছিলেন 'ভৈরবেশ্বর' নামে, ত্রেতা যুগে তিনি 'শ্রাবণীকেশ্বর' আর দ্বাপর যুগে 'শ্রীগণেশ্বর' আর বর্তমানে পরিচিত 'সোমেশ্বর মহাদেব' নামে।

অতীব জাগ্রত এই সোমেশ্বর মহাদেব বিগ্রহ। এর করুণা, কৃপাদৃষ্টিতে জন্মান্ধ দৃষ্টি লাভ করে, খঞ্জ অক্লেশে গিরি লঙ্ঘন করে, বন্ধ্যা নারীর পুত্র-সন্তান লাভ হয়। ছিন্ন বস্ত্রের ভিক্ষু রাজ সিংহাসন লাভ করে, রাজা অভিষিক্ত হন সম্রাট রূপে। আর দেবতা যদি কুপিত হন তবে তার অভিসম্পাতে নেমে আসে মহামারী, মহাপ্রলয়। ভূতনাথের তাণ্ডব নৃত্যে ধ্বংস হয় সব কিছু। যে কারণে নটরাজকে তুষ্ট রাখতে দীনহীন ভিক্ষু থেকে রাজাধিরাজ, গণিকা থেকে ধর্মাচারী ব্রাহ্মণ, সবাই মাথা নত করে এই সোমেশ্বর মহাদেবের শূন্যে অবস্থানরত লিঙ্গ বিগ্রহের সম্মুখে।

ত্রিপুরারিদেব প্রদীপদণ্ডে আলোক শিখা প্রতিস্থাপনের পর দুগ্ধভাণ্ড হাতে গর্ভগৃহে প্রবেশ করলেন নন্দিবাহন ও মল্লিকার্জুন। আবার কিয়ৎক্ষণের জন্য গর্ভগৃহর দ্বার ভিতর থেকে বন্ধ করা হল। মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে দুগ্ধস্নান সমাপন করে স্বর্ণ বিল্বপত্র স্থাপন করা হল লিঙ্গের মস্তকে। তারপর আবার উন্মোচিত করা হল গর্ভগৃহর কপাট।

তার ঠিক সমুখেই সেবায়েতরা দাঁড়িয়ে ছিল পূজার নানা উপাচার—বিল্বপত্র, ফুলমালা, ধূপ ইত্যাদি নিয়ে। দুই সহ-প্রধান পুরোহিত তাদের থেকে সে সব গ্রহণ করে গর্ভগৃহর মাটিতে সাজিয়ে রাখলেন। বিগ্রহর সামনে মাটিতে আসন পিড়ে পেতে বসে প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব উপাচার সহযোগে শুরু করলেন প্রত্যুষকালীন পূজাপাঠ। মন্ত্রোচ্চারণ আর ধূপের ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল গর্ভগৃহ। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল এই পূজাপাঠ। তারপর তা সাঙ্গ করে বিগ্রহকে নীলকণ্ঠ ফুলের মালা নিবেদন করে সঙ্গীদের নিয়ে গর্ভগৃহের বাইরে এসে দাড়ালেন ত্রিপুরারিদেব। দেবদাসী আর বাদ্যকারের দল প্রস্তুত হয়েই ছিল, তাঁরা বাইরে এসে দাঁড়াতেই গর্ভগৃহর উন্মুক্ত তোরণের সামনে দেবতার উদ্দেশ্য শুরু হল নৃত্যগীত।

গর্ভগৃহর সমুখস্থ চত্বর থেকে দেবদাসীদের নূপুরের নিক্কন ধ্বনি ছড়িয়ে পড়তে লাগল মন্দিরের নানা অংশে। দুই সহযোগীকে নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে প্রধান পুরোহিত প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন সেই দৃশ্য। দেবতার প্রাত্যহিক মনোরঞ্জন পর্ব শেষ হল এক সময়। অনতিবিলম্বেই এবার ভক্তদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে মন্দিরের প্রবেশদ্বার। ত্রিপুরারিদেব তাঁর সঙ্গীদের কাছে জানতে চাইলেন, 'যে নারীরা দেবতার কাছে নিজেদের সমর্পণ করবে তাদের অঙ্গসজ্জার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে তো?'

মল্লিকার্জুন জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, প্রভু। দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমার তত্ত্বাবধানে সে কাজ শুরু করা হয়েছে। আজ যারা নিজেদের সোমেশ্বর মহাদেবের চরণে সমর্পণ করবে তারা প্রত্যেকেই সম্ভ্রান্ত বংশীয়া। নৃত্যগীত, বাদ্য যন্ত্রের ব্যবহারে বিশেষ পারদর্শী। চালুক্য রাজপরিবারের এক দুহিতাও আছে তাদের মধ্যে।'

সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণের পর যেমন নতুন নাম গ্রহণ করা হয় পূর্ব জীবনের সঙ্গে সব সম্পর্ক মুছে ফেলার জন্য, ঠিক তেমনই দেবদাসীদের ক্ষেত্রেও এই পন্থা অবলম্বন করা হয়। দেবতার কাছে নিজেদের সমর্পণের মুহূর্তে নতুন নাম ধারণ করে পূর্ব পরিচয় মুছে ফেলে তারা। পূর্ব জীবনের সব সংস্রব ত্যাগ করতে হয় তাদের। দেবতার কাছে নিজেদের উৎসর্গ করার পর তারা আর কারো কন্যা, ভগ্নী বা প্রেয়সী থাকে না, ধনী-দরিদ্র বংশ পরিচয়ের প্রভেদও থাকে না। এখন তাদের একমাত্র পরিচয় তারা দেবদাসী। তাদের একমাত্র নাথ—সোমেশ্বর মহাদেব।

প্রধান পুরোহিত প্রশ্ন করলেন, 'যে নামে তাদের দেবতার কাছে উৎসর্গ করা হবে সে তালিকা প্রস্তুত?'

নন্দিবাহন জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, সে তালিকা প্রস্তুত, কেবলমাত্র একটি নাম ছাড়া। যে চালুক্য দুহিতার কথা বললাম—নারীদলের মধ্যে রূপে, গুণে, নৃত্য-গীতে সর্বশ্রেষ্ঠা। অষ্টাদশী সে কন্যার মধ্যে ভবিষ্যতে প্রধানা নর্তকী তিলোত্তমার স্থলাভিষিক্তা হবার সম্ভাবনা আছে। তাই আমার মনে হয়েছে, প্রধান পুরোহিতই তার নাম স্থির করুন।'

কথাটা শুনে ত্রিপুরারিদেব মৃদু বিস্মিত ভাবে বললেন 'তাই নাকি! সে কার্য তবে আমি সম্পাদন করব। মধ্যাহ্নের ঠিক দু-দণ্ড আগে সেই নারীদের সমর্পণের উপাচার সহ এখানে উপস্থিত করবে। আর তার আগেই যেন আজকের মতো দর্শনার্থীদের দর্শনকার্যের সমাপন ঘটে।' এই বলে প্রধান পুরোহিত এগোলেন তার কক্ষের দিকে।

মন্দিরের প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হল এরপর। বন্যার স্রোতের মতো পুণ্যার্থীরা প্রবেশ করতে লাগল ভিতরে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থেকে যুবক-যুবতী-শিশু, খঞ্জ থেকে দৃষ্টিহীন, কে নেই এই উদ্বেলিত জনতার মধ্যে! আর এদের নিয়ন্ত্রণের জন্য পুরোহিত আর সেবায়েতের দলও হাজির যথাস্থানে। মন্দিরের নিরাপত্তা ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য এছাড়া রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথের নেতৃত্বে যে রক্ষীদল আছে তারাও নিয়োজিত হল দর্শনার্থীদের সামলানোর কাজে।

'জয় সোমেশ্বর মহাদেবের জয়' আর ঘণ্টাধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল মন্দির চত্বর। বিল্বর স্তূপ জমা হতে লাগল চত্বরের এক অংশে। তা ছাড়া গর্ভগৃহের ঠিক পাশেই দান গ্রহণের জন্য বিশালাকৃতির সার সার যে রূপোর জালাগুলো আছে তা পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে লাগল রৌপ্য খণ্ড, স্বর্ণ খণ্ড, মূল্যবান পাথর শোভিত নানা অলঙ্কারে।

ওই কলসগুলো যুগ যুগ ধরে এমন ভাবেই পূর্ণ হয়ে আসছে। সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরে দান করলে যে মনস্কাম পূর্ণ হয়। সে জন্য গরিব ভিক্ষু থেকে ধনী রাজপুরুষ, যারাই মন্দিরে আসেন তারাই তাদের সাধ্যমতো দান করেন ওই পাত্রগুলোতে। তবে সব থেকে বড় দান কিন্তু স্বর্ণ-রৌপ্য বা মণি-মাণিক্য নয়, সে দান হল কন্যা বা ক্ষেত্র বিশেষে পুত্র দান। এ দানে সর্ব পাপ থেকে মুক্তি ঘটে আর অক্ষয় স্বর্গলাভ হয় বলে ভক্তকূলের বিশ্বাস। যে কারণে রাজা-মহারাজারাও অনেক সময় নিজ সন্তানকে উৎসর্গ করেন প্রভাস তীর্থে সোমেশ্বর মহাদেবের পাদপদ্মে।

চত্বর ত্যাগ করে ফিরে নিজ কক্ষে প্রবেশ করলেন ত্রিপুরারিদেব। কয়েক বৎসর পূর্বে মন্দিরের অধ্যক্ষের দেহাবসানের পর রাজ নির্দেশে তাঁকেই বর্তমানে মন্দিরের অধ্যক্ষর দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। তাঁর কক্ষটা বিশাল হলেও বাহুল্য বর্জিত। কক্ষের কেন্দ্রস্থলে কাষ্ঠ নির্মিত একটা পালঙ্ক আছে। আর আছে সামান্য কিছু তৈজসপত্র। কিন্তু কক্ষের বাকি অংশ দখল করে আছে রেশম ও ভূর্জপত্রের নানা পুঁথি ও মন্দির পরিচালনা সংক্রান্ত দস্তাবেজ।

নির্দিষ্ট একটা কার্য সম্পাদনের অভিপ্রায় একটা ভূর্জপত্র নিয়ে বসলেন ত্রিপুরারিদেব। খাগের কলম দিয়ে তিনি আঁক কষতে যাচ্ছেন ঠিক সেই সময় মৃদু ঘণ্টাধ্বনি শুনে দেওয়ালের এক অংশে মাথার ওপর দিকে তাকালেন।

একটা ঘণ্টা আছে সেখানে, সেটা কেঁপে উঠছে। ছিদ্রপথ দিয়ে বেরিয়ে আসা একটা রজ্জু দ্বারা যুক্ত ক্ষুদ্রাকৃতির ঘণ্টাটা। রজ্জুতে টান পড়লে ঘণ্টাটা মৃদু শব্দে বেজে ওঠে। ওই রজ্জুর অপর প্রান্ত কোথায় তা অবশ্য একমাত্র ত্রিপুরারিদেব ছাড়া অন্য কারো জানা নেই।

বেশ কয়েকবার বেজে উঠে থেমে গেল ঘণ্টাটা। মৃদু অবাক হলেন ত্রিপুরারিদেব। নিতান্ত প্রয়োজন ব্যতীত এ ঘণ্টা বাজে না। অর্থাৎ সে প্রধান পুরোহিতের সাক্ষাৎ প্রার্থী। তবে রাত্রি না নামলে, গর্ভগৃহ চত্বর শূন্য না হয়ে গেলে তাঁর কাছে পৌঁছতে পারবেন না ত্রিপুরারিদেব। তবে মধ্য যামে তিনি অবশ্যই তার কাছে যাবেন একথা ভেবে নিয়ে কাজে মন দিলেন তিনি।

গুর্জর দেশের অন্তর্গত এই প্রাচীন নগরী। সোলাঙ্ক বংশীয় রাজপুত নৃপতি ভীম গুর্জর দেশের শাসনকর্তা। উর্ম্মিমালা বিধৌত এ নগরীর নাম প্রভাস পত্তন বা দেবপত্তন। প্রাচীন নগরী। তবে এ নগরী বাণিজ্য ক্ষেত্র হিসাবে যত না পরিচিত তার চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত তীর্থক্ষেত্র হিসাবে। তবে অঙ্গিরা ইতিপূর্বে এ নগরীতে কোনও দিন আসেনি। সত্যি কথা বলতে সে যেখানে বড় হয়ে উঠেছে সেই বল্লভী নগরীর বাইরেও ইতিপূর্বে কোনও দিন পা রাখেনি সে।

অশ্বপৃষ্ঠে বল্লভী থেকে প্রভাস পত্তন পাঁচ দিনের পথ। গতকাল সন্ধ্যাতেই নগরীর প্রান্ত সীমায় উপস্থিত হয়েছিল সে। কিন্তু অন্ধকার নামতে চলেছে দেখে সে আর নগরীতে প্রবেশ করা সমুচিত মনে করেনি। কারণ এ নগরী অঙ্গিরার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। তা ছাড়া সে শুনেছে যে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই মন্দিরের প্রবেশ তোরণ বন্ধ হয়ে যায়। হয়তো সে প্রবেশ করতে পারত না মন্দিরে। যে মন্দির তার গন্তব্য। কাজেই অঙ্গিরা নগরীতে প্রবেশ না করে নগরীর উপকণ্ঠে এক কাননে কিছু তীর্থ যাত্রীদের সঙ্গে রাত্রিবাস করেছিল।

রাত্রিবাস সাঙ্গ করে, কাননের সন্নিকটে এক ক্ষুদ্র জলাশয়ে স্নান সমাপন করে, সে যখন নগরীর প্রবেশ তোরণের সামনে উপস্থিত হল, তখন সূর্যদেব ওপরে উঠতে শুরু করেছেন। নগরীর ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। প্রবেশ তোরণের সামনে নানা জাতের মানুষের ভিড়। কিছু রক্ষীও আছে।

তোরণের এক পাশে একটা বিরাট অশ্বশালা আছে। তীর্থযাত্রীরা অশ্ব গচ্ছিত রাখে সেখানে। অঙ্গিরা সেখানে তার ঘোড়াটাকে জমা রেখে পদব্রজে তোরণের সামনে এসে দাঁড়াল। হয়তো সে অস্ত্র সজ্জিত দেখেই কয়েকজন রক্ষী এসে তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তাদের একজন তাকে প্রশ্ন করল, 'কোথা থেকে আসা হচ্ছে?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'বল্লভী নগরী।'

অপর একজন যুবককে প্রশ্ন করল, 'তুমি কোথায় যাবে?'

'মন্দিরে।' সংক্ষিপ্ত জবাব দিল অঙ্গিরা।

'সোমেশ্বরের দর্শনে যাবে তো সঙ্গে ধনুর্বাণ কেন? তরবারি কেন? তুমি কি যুদ্ধ ব্যবসায়ী?' জানতে চাইল রক্ষী।

অঙ্গিরা জবাব দিল 'না, আমি যুদ্ধ ব্যবসায়ী নই। তবে, অস্ত্র চালনায় পারদর্শী। এগুলো আমার সঙ্গে থাকে।'

'কিন্তু ভিনদেশীদের তো অস্ত্র বহন করে নগরীতে প্রবেশের অনুমতি নেই। মন্দিরে তো নয়ই। অস্ত্র ত্যাগ করে তোমাকে নগরীতে প্রবেশ করতে হবে।' বলে উঠল একজন রক্ষী।

অতীতে বহুবার আক্রান্ত হয়েছে, লুণ্ঠিত হয়েছে সোমেশ্বরদেবের মন্দির। আরব শাসনকর্তা জুয়ানেদ তো একবার ধ্বংসই করেছিলেন সোমনাথ মন্দির। যদিও মহাদেবের কৃপায় আবার নতুন করে গড়ে উঠেছে চিরন্তন পীঠ আর এই নগরী। যদিও এই আগন্তুকের চেহারা দেখে তাকে যবন বলে মনে হয় না। আর তার সঙ্গে অন্য কেউও নেই। তবুও সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এমনওতো হতে পারে লোকটা গুপ্তচর? তাই রক্ষীদের দলপতি এরপর অঙ্গিরাকে বলল, 'তুমি মন্দিরে কি করতে যাবে? তোমাকে দেখে তো ঠিক পুণ্যার্থী বলে মনে হচ্ছে না!'

প্রশ্ন শুনে একটু ইতস্তত করে অঙ্গিরা জবাব দিল, 'আমি পুরোহিতশ্রেষ্ঠ ত্রিপুরারিদেবের সাক্ষাৎপ্রার্থী।' অঙ্গিরার জবাব শুনে অবাক হয়ে গেল রক্ষীরা। এই প্রভাস পত্তনের চিরন্তন পীঠের সর্ব প্রধান ব্যক্তি হলেন ত্রিপুরারিদেব। শুধু তাই নয়, গুর্জর রাজের পর এ রাজ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সম্মানীয় ব্যক্তি তিনি। তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থী এই ভিনদেশী যুবক!

অঙ্গিরা রক্ষীদলের মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারল যে তার কথাটা তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। এদিকে সূর্যদেব মাথার ওপর উঠে চলেছেন। মন্দিরে পৌঁছতে বিলম্ব হয়ে যাচ্ছে অঙ্গিরার। কাজেই সে এবার এই রক্ষীদলের হাত থেকে মুক্তি লাভের আশায় তার কোমরবন্ধ থেকে একটা বিশেষ ধরনের স্বর্ণমুদ্রা বার করে সেটা এগিয়ে দিল রক্ষীপ্রধানের দিকে।

সেটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে চমকে উঠল রক্ষী প্রধান। সোনার চাকতিটার এক পার্শ্বে খোদিত আছে সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের ছবি, আর অন্য পার্শ্বে খোদিত রাজা ভীম আর প্রধান পুরোহিতের সম্মিলিত স্বাক্ষর। এ মুদ্রার নাম 'সোমেশ্বর মুদ্রা।' মন্দিরের প্রধান পুরোহিত স্বহস্তে এ মুদ্রা অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু লোককে প্রদান করে থাকেন।

এ নগরীর হাতে গোনা কয়েকজন লোকমাত্র এই মুদ্রা প্রাপক। যারা প্রাপক তাদের মৃত্যু হলে তাদের মুদ্রা আবার তার পরিবারকে সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরে ফিরিয়ে দিতে হয়, নচেৎ মৃতের দাহকার্য সম্পন্ন হয় না। আর এই মুদ্রা কেউ চুরি করলে তার মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে।

অতীব গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা আসলে হল বিশেষ ধরনের ছাড়পত্র ও ক্ষমতার আধার। এ মুদ্রা যাঁর কাছে থাকে সে একমাত্র মন্দিরের গর্ভগৃহ ব্যতিরেকে মন্দিরের যে-কোনও স্থানে বা নগরীর যে-কোনও স্থানে যখন খুশি প্রবেশ করতে পারে। রাজ কর্মচারীদের নির্দেশদানও করতে পারে তাঁরা। যাঁদের কাছে সোমেশ্বর মুদ্রা থাকে তাকে সোমেশ্বরের পরম সেবক রূপে চিহ্নিত করেন প্রধান পুরোহিত।

সোমেশ্বর মুদ্রা লাভের জন্য পুরোহিতকুল ও সেবায়েতদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও চলে। কেউ কেউ একে দ্বাদশ মুদ্রাও বলেন। শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মতো এই মুদ্রার সংখ্যাও দ্বাদশ বা বারোটি। কোনও মুদ্রা প্রাপকের মৃত্যু হলে তবেই প্রধান পুরোহিত তা তুলে দেন নতুন কারো হাতে। সেই মুদ্রার অধিকারী এই ভিনদেশী যুবক।

বিস্ফারিত নেত্রে মুদ্রাটা পর্যবেক্ষণ করে মুদ্রাটা অঙ্গিরার হস্তে সমর্পণ করে রক্ষীপ্রধান বলল, 'মার্জনা করবেন। আপনি এ মুদ্রার অধিকারী তা আমরা বুঝতে পারিনি। আপনার গতিরোধ করে সময় অপচয় করার জন্য দুঃখিত। আপনি যদি প্রয়োজন অনুভব করেন তবে আমার রক্ষীরা মন্দিরের দ্বারপ্রান্তে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসতে পারে।'

অঙ্গিরা জবাব দিল 'না। তার কোনও প্রয়োজন নেই।'

অঙ্গিরা প্রবেশ করল নগরীতে। পাথরের তৈরি প্রধান সড়ক সোজা চলে গেছে সমুদ্র তীরস্থ মন্দির অভিমুখে। পথপার্শ্বে পাথর আর কাষ্ঠ নির্মিত ছোট-বড় গৃহ, তীর্থযাত্রীদের আবাসস্থল। আর প্রত্যেক মন্দির নগরীর মতো এ নগরীতেও নানা ক্ষুদ্রাকৃতির উপমন্দির অর্থাৎ অন্যান্য দেব-দেবীর ছোট-ছোট মন্দির আছে। আর আছে পূজা উপাচার সংগ্রহের জন্য অসংখ্য বিপনি। ফুল, ধূপ, পট্টবস্ত্র, পাথর অথবা ধাতু পাত্রের দোকান। শিব পূজার আবশ্যিক উপাদান সবুজ বিল্বফল স্তুপাকৃত হয়ে রয়েছে কোথাও কোথাও। সোমনাথ মহেশ্বরের উদ্দেশ্যে ধনাঢ্যরা স্বর্ণ-রৌপ্য দান করে। সে সবের বিপণিও রয়েছে কোথাও কোথাও।

দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শহরবাসী ও পুণ্যার্থী ভক্তরা পথে নেমে পড়েছে। নানা জাতের নানা মানুষের ভিড় আর হাঁক-ডাকে সরগরম চারদিক। আর তার সঙ্গে আছে উপমন্দিরগুলোর ঘণ্টাধ্বনি আর তার সামনে বসা ভিক্ষু-পঙ্গুদের ভিক্ষা লাভের কাতর আবেদন। কেউ কেউ দয়াপরবশ হয়ে তাদের উদ্দেশ্যে মুদ্রা ছুড়ে দিচ্ছে। বিশেষত যে সব তীর্থযাত্রীরা সোমেশ্বর দর্শন শেষে ঘরে ফিরছে তারা ভিক্ষুকদের দান করছে পুণ্য লাভের জন্য। আর আছে মহাদেবের বাহন প্রকাণ্ড কিছু ষণ্ড। মাঝে-মাঝেই খাদ্য লোভে ফুলমালার পসরাতে তারা হানা দিচ্ছে।

যে সব পূণ্যার্থী সোমেশ্বরকে দর্শন করতে আসেন তাদের মধ্যে অধিকাংশরই মন্দিরের অতিথি নিবাসে স্থান সঙ্কুলান হয় না। হবার কথাও নয়। পথ পার্শ্বে মাঝে মাঝে উন্মুক্ত স্থানে বিরাট বিরাট ছত্রী আছে। ধনহীন সাধারণ পুণ্যার্থীদের রাত্রিবাসের, আহারাদির স্থান এ জায়গাগুলোই। সেখানে এই সকালবেলাই বিরাট বিরাট ধাতব পাত্রে তাদের জন্য আহার প্রস্তুত হচ্ছে।

এ সব দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল অঙ্গিরা। পথ চিনতে কোনও অসুবিধা নেই। জনস্রোত সোজা এগিয়ে চলেছে মন্দিরের দিকে। বিরাট বিরাট পুণ্যার্থীদের দল সব। তাদের সবার আগে নিশানবাহী একজন লোক। এক এক দলের এক এক রকম নিশান। যাতে কেউ দলছুট না হয়ে যায়, তাই নিশান দেখে এগোচ্ছে সে দলের পশ্চাদবর্তী লোকেরা। আর তাদের সঙ্গে সঙ্গে শুভ্রবসন পরিহিত মুণ্ডিত মস্তক পুরোহিতের দল।

তীর্থযাত্রীদের মন্দির দর্শন করালে তাদের প্রাপ্তি যোগ হবে। তাই দলগুলোর সঙ্গে ছুটে চলেছে তারা। সেই জনতার ভিড়ে মিশে এগোতে এগোতে কিছু সময়ের মধ্যেই দূর থেকে মন্দিরের শীর্ষদেশ দেখতে পেল অঙ্গিরা। দিনের আলোতে দূর থেকেই ঝলমলে দ্যুতি ছড়াচ্ছে মন্দির শৃঙ্গ। যেন আরও একটা সূর্য স্থাপিত হয়েছে সেখানে।

স্বর্ণ কলসের ওপর প্রোথিত জয়ধ্বজা সমুদ্রর বাতাসে পতপত করে উড়ছে। যে মন্দিরের দিকে অঙ্গিরা প্রবেশ করার জন্য এগোচ্ছে, সে স্থানে ইতিপূর্বে সে না গেলেও সেই মন্দির সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা আছে অঙ্গিরার। সোমেশ্বর মন্দিরের পশ্চাদ্ভাগে সমুদ্রর মধ্যে একটা বিশাল স্তম্ভ আছে। ওই স্থানটাই নাকি পৃথিবীর শেষ সীমানা।

অঙ্গিরা যতই মন্দিরের দিকে যেতে লাগল, ততই ভিড় বাড়তে লাগল। তীর্থযাত্রীদের ভিড় তো আছেই, তার সঙ্গে পুরোহিত আর সেবায়েতদের ভিড়। সাধারণ পুরোহিত আর সেবায়েতদেরও একটা বড় অংশের বাসস্থান মন্দিরের বাইরে প্রাকার সংলগ্ন অঞ্চলে।

ধীরে ধীরে মন্দিরটা জেগে উঠতে লাগল অঙ্গিরার চোখের সামনে। স্বর্ণধ্বজা, স্বর্ণ-রৌপ্য খচিত বিশাল বিশাল থাম, মন্দির প্রাকার। হাজার জনতার ভিড়ে মিশে এক সময় সে সত্যি পৌঁছে গেল মন্দিরের সামনে। সোমনাথ মন্দির!

বাল্যকাল থেকে সে কত শুনেছে এই মন্দিরের কথা। কিন্তু এ মন্দির যে এত বিশাল তা ধারণা ছিল না অঙ্গিরার। ঘণ্টাধ্বনি আর ধূপের গন্ধ ভেসে আসছে মন্দির চত্বর থেকে। আর আসছে 'জয় সোমেশ্বর', 'হর হর মহাদেব' ধ্বনি। মন্দিরের সুউচ্চ প্রাকারও অলঙ্করণ শোভিত। উন্মুক্ত রৌপ্য খচিত বিশাল তোরণ দিয়ে বহু মানুষ আসা-যাওয়া করছে।

মন্দিরের সেই প্রবেশ তোরণের কিছু রক্ষী আর লাঠিধারী সেবায়েতদের ভিড়। মন্দির চত্বরে পুণ্যার্থীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। অঙ্গিরা বুঝতে পারে শস্ত্রধারী অঙ্গিরাকে তারা সাধারণভাবে মন্দিরে প্রবেশ করতে বাধাদান করবে। সেবায়েতদের মধ্যে একজন নেতৃত্ব দিচ্ছে অন্যদের। ব্যাপারটা খেয়াল করে সে সটান হাজির হল লোকটার কাছে। তারপর কোমরবন্ধ থেকে সোমেশ্বর মুদ্রাটা বার করে সেটা সেবায়েত প্রধানকে দেখিয়ে বলল, 'আমি পুরোহিত শ্রেষ্ঠর সাক্ষাৎপ্রার্থী।'

নগরতোরণের সেই রক্ষী প্রধানের মতো এ লোকটাও অবাক হয়ে গেল ভিনদেশী এই যুবকের কাছে সোমেশ্বর মুদ্রা দেখে। প্রবেশ তোরণের ঠিক গায়েই একটা ছত্রী আছে। লোকটা কয়েকজন সেবায়েতকে ডেকে বিষয়টা সম্বন্ধে তাদের অবগত করে তাদের তত্ত্বাবধানে, বলা ভালো তাদের প্রহরাতে অঙ্গিরাকে সেই ছত্রীর নীচে রেখে মন্দিরের ভিতরে ঢুকল কর্তাব্যক্তিদের এই শস্ত্রধারী যুবকের আগমন সংবাদ দিতে।

ছত্রীর নীচে দাঁড়িয়ে অঙ্গিরা জনসমাগম দেখতে লাগল। আর সেবায়েতরা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল তাকে। কে এই ভিনদেশী যুবক? সোমেশ্বর মুদ্রা এ যুবক হস্তগত করল কী ভাবে? অঙ্গিরার প্রতি কৌতূহলের দৃষ্টিতে দেখতে লাগল তারা।

বেশ কিছুক্ষণ পর সেবায়েত প্রধান ফিরে এল। তার সঙ্গে একজন প্রৌঢ় পুরোহিত। মুণ্ডিত মস্তক, শুভ্রবসন পরিহিত লোকটার গায়ের রঙ ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের। কর্ণে হীরক খচিত স্বর্ণ কুণ্ডল ঝিলিক দিচ্ছে সুর্যলোকে। পায়ে রূপোর পটি বসানো কাঠের পাদুকা। একজন সেবায়েতও আছে লোকটার পিছনে। রৌপ্যদণ্ড সমন্বিত মখমলের ছাতা সে ধরে আছে পুরোহিতের মাথায়। দেখেই বোঝা যাচ্ছে স্বর্ণ কুণ্ডলধারী, কপালে বাহুতে চন্দন চর্চিত বৃষস্কন্ধ কৃষ্ণবর্ণের এই ব্রাহ্মণ সাধারণ কোনও পুরোহিত নন।

লোকটা প্রথমে অঙ্গিরার সামনে এসে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল তাকে। তারপর হাত বাড়াল সেই সোমেশ্বর মুদ্রাটা পরখ করার জন্য। মুদ্রাটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার পর সেটা যে খাঁটি সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলেন ব্রাহ্মণ। তারপর সেটা অঙ্গিরাকে ফিরিয়ে দিয়ে নিজের আত্মপরিচয় দিয়ে বলল 'আমি মল্লিকার্জুন। এ মন্দিরের সহ-প্রধান পুরোহিত। যুবক তোমার পরিচয় কী? প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাও কেন?'

অঙ্গিরা তাকে নিজের পরিচয় দান করে বলল, 'আমার যুবা বয়স লাভ হলে প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা। প্রধান পুরোহিত তেমনই নির্দেশ দিয়েছিলেন আমার পিতা-মাতাকে। সেই নির্দেশ পালন করতেই আমি চিরন্তন পীঠে উপস্থিত হয়েছি। আমার নাম অঙ্গিরা।'

অঙ্গিরার জবাব শুনে তাকে আর কোনও প্রশ্ন করলেন না মল্লিকার্জুন। ইশারায় তিনি তাকে অনুসরণ করতে বললেন। সোমনাথ মন্দিরে পা রাখল অঙ্গিরা। কেমন যেন এক শিহরন অনুভব করল সে। যখন থেকে তার জ্ঞান হয়েছে, কথা বলতে বুঝতে শিখেছে, তখন থেকে সে কত গল্প শুনে এসেছে এই মন্দির সম্পর্কে। অবশেষে আজ সে পা রাখল এই মন্দির প্রাঙ্গণে।

চারপাশে ভক্তকুলের ভিড়, ঘণ্টাধ্বনি আর সোমেশ্বর মহাদেবের নামে জয়ধ্বনি। প্রাকার তোরণ থেকে যে পথ সোজা মন্দিরের দিকে এগিয়েছে তার দু-পাশে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে সুরম্য উদ্যান। মাঝে মাঝে সেখানে ছোট ছোট উপমন্দিরও আছে। এসব দেখতে দেখতে মন্দিরের সোপানশ্রেণীর সামনে উপস্থিত হল অঙ্গিরা। এ জায়গা থেকে মন্দিরের ওপরের চত্বর পর্যন্ত তিল ধারণের স্থান নেই ভক্ত সমাগমে।

সোপানশ্রেণী যেখান থেকে শুরু হয়েছে ঠিক তার সামনেই শ্বেতপাথর বাঁধানো একটা হাত খানেক চওড়া প্রণালী আছে। গোড়ালি পর্যন্ত জল ধারা তার একদিক থেকে অপরদিকে প্রবাহিত হচ্ছে। সে জলে পা ডুবিয়েই শুদ্ধ হয়ে মন্দিরের সোপানশ্রেণীতে ওঠার জন্য পা রাখতে হয়। এ জায়গাতে এসে থামতে হল অঙ্গিরাকে।

মল্লিকার্জুন, অঙ্গিরাকে বললেন, 'চর্মপাদুকা, চর্মদ্রব্য আর অস্ত্র নিয়ে মন্দির চত্বরে ওঠা নিষেধ। এসব এখানে ত্যাগ করতে হবে। তবে নিশ্চিন্তে থাকো। তোমার জিনিসগুলো যত্নেই থাকবে। যথা সময় আবার তুমি তা গ্রহণ করতে পারবে।'

সহ-প্রধান পুরোহিত সোপানশ্রেণীর সামনে জলধারার নিকটে এসে দাঁড়াতেই তাকে দেখে কয়েকজন সেবায়েত তাঁর আজ্ঞা পালনের জন্য হাজির হয়েছিল। মল্লিকার্জুনের নির্দেশ মতো তাদের কাছেই পাদুকা, অস্ত্র সমর্পণ করল অঙ্গিরা। তারপর পরিখার জলে পা ডুবিয়ে দেহকে পবিত্র করে মল্লিকার্জুনকে অনুসরণ করে উঠতে শুরু করল সোপানশ্রেণী বেয়ে।

অন্তত দুই শত হাত চওড়া সোপানশ্রেণী। প্রচুর লোক ওঠা নামা করছে। প্রধান তিনটি ধাপ আছে সোপানশ্রেণীতে। অঙ্গিরা যখন দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছল তখন ওপর দিক থেকে নেমে এল একদল রমণী। পরনে তাদের জরিবোনা পট্টবস্ত্র, বাহুতে, গলায়, কবরীতে ফুলমালা। স্বর্ণনিক্কন আর স্বর্ণভূষণা যুবতী সব।

কাজল আর কুমকুম সজ্জিত মুখমণ্ডলের সেই অপরূপারা ছমছম নূপুর ধ্বনি তুলে ওপর থেকে নামতে নামতে মল্লিকার্জুনকে দেখে মুহূর্তের জন্য থামল। মাথা ঝুঁকিয়ে তারা প্রণাম জানাল সহ-প্রধান পুরোহিতকে। মল্লিকার্জুনও মুহূর্তের জন্য থেমে আপন গাম্ভীর্য ও পদমর্যাদা বজায় রেখে মাথাটা মৃদু নাড়ালেন প্রণাম গ্রহণের জন্য। তারপর আবার অঙ্গিরাকে নিয়ে উঠতে শুরু করলেন ওপর দিকে। যুবতীর দল নেমে গেল নীচের দিকে।

এদের দেখে অঙ্গিরার মনে হল ঠিক যেন এক ঝাঁক রঙিন প্রজাপতি চলে গেল তার পাশ দিয়ে। অঙ্গিরা অনুমান করল এই সুন্দরী রমণীরা নিশ্চয়ই দেবদাসী। এদের গল্পও শুনেছে সে। এই রমণীকুল নিজেদের জীবন-যৌবন সমর্পণ করেছে সোমেশ্বর মহাদেবকে।

মল্লিকার্জুনের পশ্চাদ্ধাবন করে অঙ্গিরা অবশেষে উঠে এল মন্দিরের প্রধান চত্বরে। ওপরে উঠে চমকে গেল সে। এখানকার স্তম্ভ, দেওয়াল সবই স্বর্ণমণ্ডিত! সূর্যালোক সে সবের গায়ে পড়ার ফলে যে বিচ্ছুরণ ঘটছে তাতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। ফুল আর ধূপের সুবাস ছড়িয়ে আছে চারপাশে। অপূর্ব সেই ঘ্রyণ। গর্ভগৃহ সংলগ্ন অঞ্চলে পুরোহিত আর পুণ্যার্থীদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। মাথার ওপর থেকে নেমে আসা সোনারূপার ঘণ্টাগুলো বেজে চলেছে অবিরাম শব্দে। মল্লিকার্জুনকে দেখে চত্বরে উপস্থিত সেবায়েতরা ভিড় হটিয়ে তার চলার পথ করে দিতে লাগল।

মল্লিকার্জুন, অঙ্গিরাকে নিয়ে এক সময় উপস্থিত হলেন চত্বরের প্রান্তসীমায়। এ জায়গাতে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। কয়েকজন লাঠিধারী সেবায়েত সেখানে প্রহরারত। তারা মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানিয়ে পথ ছেড়ে দিল তাদের দুজনকে। আরও কিছুটা এগিয়ে অঙ্গিরাকে নিয়ে একটা কক্ষের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন মল্লিকার্জুন।

বন্ধ দরজার পাল্লাতে রূপার পাত বসানো। মল্লিকার্জুন দরজায় টোকা দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে গেল। অঙ্গিরা দেখতে পেল একজন শুভ্র বস্ত্র সমন্বিত, ঋজু, গৌরবর্ণের বৃদ্ধকে। কর্ণে স্বর্ণকুণ্ডল, বাহুতে মাণিক-খচিত বাজুবন্ধ। তাঁর শিখাটা মাথার পিছন থেকে কাঁধ বেয়ে বুকের কাছে নেমে এসেছে। আর তার প্রান্তদেশে বাঁধা আছে একটা স্বর্ণবিল্বপত্র।

মল্লিকার্জুন তাঁকে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে বললেন, 'প্রধান পুরোহিত আমাকে মার্জনা করবেন আপনার কাজের সময় ব্যাঘাত ঘটালাম বলে। এই যুবক বল্লভী নগরী থেকে প্রভাসক্ষেত্রে পদার্পণ করেছে। নাম অঙ্গিরা। এই যুবকের কাছে সোমেশ্বর মুদ্রা আছে। আপনার সাক্ষাৎপ্রার্থী।' এই বলে মল্লিকার্জুন, অঙ্গিরাকে ইশারা করলেন মুদ্রাটা দেখাবার জন্য।

ইনিই তবে এই সোমেশ্বর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব! অঙ্গিরা প্রথমে ভূমিষ্ঠ হয়ে ত্রিপুরারিদেবের পাদস্পর্শ করল। ঠিক এই সময় একটা ব্যাপার খেয়াল করল সে। ত্রিপুরারিদেবের বাম পদে শেষ তিনটি আঙুল নেই! ত্রিপুরারিদেব তার ডান বাহু আশীর্বাদের ভঙ্গীতে একটু ওপরে তুললেন। অঙ্গিরা এরপর উঠে দাঁড়িয়ে তার বস্ত্রের ভিতর থেকে সোমেশ্বর মুদ্রাটা বার করে সমর্পণ করল প্রধান পুরোহিতের হাতে।

ত্রিপুরারিদেব মুদ্রাটা হাতে নিয়ে পরখ করলেন ঠিকই, কিন্তু অঙ্গিরার মনে হল, এ মন্দিরে অন্যরা যেমন তার কাছে সোমেশ্বর মুদ্রা দেখে বেশ বিস্মিত হয়েছে তা প্রধান পুরোহিতের ক্ষেত্রে ঘটল না।

এমন মুদ্রা নিয়ে ভিনদেশ থেকে কেউ যে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসবে বা আসতে পারে এমনটা যেন ধারণা ছিল তাঁর। তবে মুদ্রাটা ভালো করে দেখার পর তিনি একদৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর অঙ্গিরাকে প্রশ্ন করলেন, 'তোমার পিতা-মাতার নাম?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'পিতার নাম মরীচি, মাতা অম্বালিকা। আমার পিতাই এই সোমেশ্বর মুদ্রা আমাকে দিয়েছিলেন।'

'তাদের সনাক্তকরণ চিহ্ন?' জানতে চাইলেন প্রধান পুরোহিত।

এ প্রশ্ন যে তিনি করতে পারেন তা তাঁর পিতা-মাতা অঙ্গিরাকে জানিয়েছিল। তাই সে জবাব দিল 'পিতার ডানবাহুতে অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন ছিল, মাতার বাম ভ্রূ-র উপরিভাগে কৃষ্ণবিন্দু ছিল।'

প্রধান পুরোহিত তার কথায় সন্তোষ প্রকাশ করে বললেন, 'তোমার পিতামাতা এখন কোথায়?'

অঙ্গিরা মৃদু চুপ করে থেকে জবাব দিল, 'তিন মাস পূর্বে আমি একবিংশ বর্ষে পদার্পণ করলে তাঁরা একসঙ্গে নদীবক্ষে প্রাণ বিসর্জন দেন।'

'তাদের শ্রাদ্ধকার্য কি সম্পাদন হয়েছে?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'না, তাদের নির্দেশ মতোই আমি শ্রাদ্ধকার্য সমাপন করিনি। মৃত্যুর পূর্বে তারা আমাকে বলে গেছেন আমি যেন তাদের মৃত্যুর পর এই প্রভাসক্ষেত্রে পদার্পণ করে সোমেশ্বর মন্দিরে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি, নিজেকে সমর্পণ করি সোমেশ্বরের চরণে। আপনি আমাকে যে নির্দেশ দেবেন একমাত্র তা পালন করলেই সোমেশ্বরের কৃপাতে তাদের স্বর্গলাভ হবে। নচেৎ সাধারণ শ্রাদ্ধকার্যে তাদের স্বর্গারোহন হবে না। আত্মার মুক্তি ঘটবে না।'

ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'হ্যাঁ, ঠিকই বলে গেছেন তাঁরা।'

একথা বলার পর তিনি শেষ প্রশ্নটা করলেন, 'তুমি বিবাহ করনি তো?'

'না।' জবাব দিল অঙ্গিরা।

ত্রিপুরারিদেব এরপর সোমেশ্বর মুদ্রাটা অঙ্গিরার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে প্রথমে তাকে বললেন, 'তুমি দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে এসেছ। আপাতত বিশ্রাম নাও। আগামীকাল যথা সময় তোমাকে আহ্বান করব আমি।'

একথা বলার পর তিনি মল্লিকার্জুনকে নির্দেশ দিলেন, 'প্রধান পুরোহিতের ব্যক্তিগত অতিথি নিবাসে এই যুবকের থাকার ব্যবস্থা করুন। পুরোহিত নন্দবাহন, প্রধান মহারক্ষী জয়দ্রথ আর প্রধান সেবায়েত বিষধারীকে এ যুবকের আগমনবার্তা জানিয়ে দেবেন। যাতে এই যুবকের কোনও সমস্যার কারণ না ঘটে।'

প্রধান পুরোহিতের কথা শুনে সহপ্রধান পুরোহিত মল্লিকার্জুন 'যথা আজ্ঞা দেব' বলে সেই স্থান ত্যাগ করে অঙ্গিরাকে নিয়ে রওনা হলেন অতিথি নিবাসের দিকে। দরজার কপাট বন্ধ করে দিলেন প্রধান পুরোহিত। নিজ আসনে বসার আগে আবারও দেওয়ালের এককোণে মাথার দিকে রজ্জুবদ্ধ ঘণ্টাটার দিকে চোখ পড়ল তাঁর। মনে মনে তিনি বললেন, 'হয়তো-বা এবার তার মুক্তি সমাগত।'

মধ্যাহ্নের ঠিক দু-দণ্ড পূর্বে নিজের কক্ষ ত্যাগ করে পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্ত মতো গর্ভগৃহের ঠিক সামনে এসে উপস্থিত হলেন পুরোহিতশ্রেষ্ঠ। তাঁর পূর্ব নির্দেশ মতোই গর্ভগৃহর সামনের চত্বর থেকে ততক্ষণে অপসারিত করা হয়েছে পুণ্যার্থী, দর্শনার্থীদের।

প্রধান দেবদাসী তিলোত্তমা ও আরও কয়েকজন দেবদাসীর তত্ত্বাবধানে সেখানে হাজির করা হয়েছে সেই সব নারীদের, যাদের আজ সমর্পণ করা হবে সোমেশ্বরের চরণে। রঙিন পট্টবস্ত্র, স্বর্ণভূষণ আর ফুল মালায় সজ্জিত করা হয়েছে তাদের। ঠিক যেমন বিবাহকালে সজ্জিত করা হয় নারীদের, তেমনই। তাদের মুখমণ্ডলও চন্দন চর্চিত।

গর্ভগৃহর একপাশে সমর্পণের উপাচার সামগ্রী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেবায়েতরা। দুই প্রধান সহকারী পুরোহিত নন্দিবাহন, মল্লিকার্জুন উপস্থিত আছেন। আছেন সেবায়েত-প্রধান বিষধারীও। ত্রিপুরারিদেব সেখানে গিয়ে উপস্থিত হতেই সবাই নতমস্তকে অভিবাদন জানালো তাকে।

প্রধান পুরোহিত প্রথমে তাকালেন দেবতার কাছে নিজেদের সমর্পণের উদ্দেশ্যে অপেক্ষারত কন্যাদের দিকে। দ্বাদশ থেকে অষ্টাদশ বর্ষীয়া কন্যা সব। বেশ কয়েক মাস যাবৎ এ মন্দিরের কানন সংলগ্ন এক সংরক্ষিত স্থানে এদের নৃত্যগীতের তালিম দিয়েছে দেবদাসী প্রধানা তিলোত্তমা। যদিও গর্ভগৃহর সামনে মন্দিরের প্রধান চত্বরে এই প্রথম পা রাখল তারা। আজকের পর থেকে অবশ্য তাদের নিয়মিত আসা-যাওয়া শুরু হবে এই চত্বরে। বারো জন নারী।

প্রধান পুরোহিতের চোখ ঘুরতে লাগল এক এক করে তাদের মুখমণ্ডলের ওপর। অপরূপা সব। তাদের মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য আর জৌলুশই জানিয়ে দিচ্ছে এই নারীরা সব সম্ভ্রান্তবংশীয়া দুহিতা। প্রধান পুরোহিতের দৃষ্টি এক সময় এসে থমকে গেল এক নারীর মুখের ওপরে। দেবদাসী প্রধানা তিলোত্তমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সে।

দেবদাসী তিলোত্তমা শুধু নর্তকী শ্রেষ্ঠাই নয়, এ মন্দিরের সুন্দরী শ্রেষ্ঠাও বটে। কিন্তু এ কন্যার অঙ্গ সৌষ্ঠব আর রূপের কাছে তিলোত্তমার সৌন্দর্যও যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব নারীসঙ্গ না করলেও সুন্দরী নারী তিনি কম দেখেননি। তিনি দীর্ঘকাল ধরে এ মন্দিরের সুন্দরী দেবদাসীদের তো দেখেছেনই, দেখেছেন এ মন্দিরে পূজা দিতে আসা বহু রাজদুহিতাকেও। কিন্তু, এমন সৌন্দর্য তিনি ইতিপূর্বে দেখেননি। ইন্দ্রসভার নর্তকীরাও হয়তো ম্লান হয়ে যাবে এ নারীর সমুখে দাঁড়ালে।

সারবদ্ধ অন্য নারীরা বিস্মিতভাবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। কিন্তু এই কন্যা আনতভাবে চেয়ে আছে ভূমির দিকে। যেন স্বর্ণভূষণে সজ্জিত এক স্থির প্রস্তরমূর্তি। মেয়েটি প্রধান পুরোহিতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বুঝতে পেরে মল্লিকার্জুন প্রধান পুরোহিতের পাশে এসে দাঁড়ালেন। তারপর চাপাস্বরে বললেন, 'এই সেই চালুক্য কন্যা।'

পুরোহিতশ্রেষ্ঠর এবার খেয়াল হল এই কন্যার নাম তারই স্থির করার কথা। কিন্তু সোমেশ্বর মুদ্রা নিয়ে বল্লভী নগরী থেকে সেই যুবক হঠাৎ এসে উপস্থিত হওয়াতে তাঁর চিন্তা অন্য খাতে প্রবাহিত হচ্ছিল। তাই নামকরণের ব্যাপারটা তিনি বিস্মৃত হয়েছিলেন।

মুহূর্তের মধ্যে অবশ্য একটা নাম মাথায় এসে গেল তার। তিনি মল্লিকার্জুনকে বললেন, 'এ নারীর নামকরণ করলাম, সমর্পিতা। সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে যে নিজেকে সমর্পণ করেছে।' প্রধান পুরোহিত তিলোত্তমাকে কাছে ডাকতে বললেন।

নন্দিবাহনের ইশারাতে নর্তকীশ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা এসে সামনে দাঁড়াতেই ত্রিপুরারিদেব তাকে প্রশ্ন কলেন, 'তুমি নিশ্চিত তো যে এই কন্যারা সব অক্ষত যোনি?'

তিলত্তমা জবাব দিল, 'হ্যাঁ, প্রভু। আমি নিশ্চিত।'

এরপর ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশে এই নারীদের সোমনাথের কাছে সমর্পণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। মন্দিরের গর্ভগৃহর ঠিক সমুখভাগে সারবদ্ধ ভাবে দাঁড় করানো হল নারীদের। দুই প্রধান সহচরকে নিয়ে গর্ভগৃহতে প্রবেশ করলেন ত্রিপুরারিদেব। পূজার উপাচার আগেই সে কক্ষে সাজিয়ে রেখেছেন নন্দিবাহন। একটা স্বর্ণপাত্রে রাখা আছে নীলকণ্ঠ ফুলের বারোটি মালা। প্রধান পুরোহিত সেই মালাগুলি স্থাপন করলেন সোমেশ্বরের গলায় অর্থাৎ শিবলিঙ্গে। বিল্বফল, দুগ্ধ, ঘৃত উৎসর্গ করে শুরু হল মহাদেবের পুজো। প্রধান পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে দেবতাকে এই নারীদের গ্রহণ করার অনুরোধ জানালেন।

বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল এই বন্দনা। তারপর নন্দিবাহন দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এক-একজন নারীকে গর্ভগৃহে প্রবেশ করাতে লাগলেন। যারা দেবদাসী তারা জীবনে এই একবারই গর্ভগৃহতে পা রাখার সৌভাগ্য লাভ করে। এ সৌভাগ্য রাজা-মহারাজাদেরও হয় না।

কন্যারা ঘিরে দাঁড়ালো ভগবানকে। চোখে-মুখে তাদের অপার বিস্ময়। তাদের চোখের সামনে শূন্যে ভাসমান সোমেশ্বর মহাদেব। তিনি যে সত্যিই আছেন এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে?

ত্রিপুরারিদেব খেয়াল করলেন সেই চালুক্য দুহিতা একবার দেবতার দিকে তাকিয়েই মাথাটা নামিয়ে স্থির অচঞ্চল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। মল্লিকার্জুন অন্য একটি পাত্রে রাখা স্তুপীকৃত ফুলমালার থেকে একটি করে মালা তুলে দিলেন প্রত্যেক নারীর হাতে। প্রধান পুরোহিত সম্মিলিতভাবে সমর্পণের মন্ত্রপাঠ করাতে শুরু করালেন নারীদের। এ মন্ত্রোচ্চারণ আসলে সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে নিজেদের তনু-মন, সর্বস্ব নিবেদনের অঙ্গীকার।

এ কাজ সম্পন্ন হলে, মল্লিকার্জুন নতুন নামে আহ্বান করতে লাগলেন এক-একজন নারীকে। তারা এসে তাদের হাতের মালাটা তুলে দিতে লাগল মল্লিকার্জুনের হাতে। আর প্রধান পুরোহিত সোমেশ্বর মহাদেবের কণ্ঠ থেকে এক-একটা নীলকণ্ঠ ফুলের মালা তুলে দিতে লাগলেন নারীদের হাতে। সে মালা কণ্ঠে ধারণ করতে লাগল তারা। প্রত্যেক দেবদাসীকে একটা করে চন্দনকাঠের ক্ষুদ্র পেটিকা দেওয়া হয়। তাতে আজীবন ওই নীলকণ্ঠ ফুলের মালা তারা রেখে দেয়।

ত্রিপুরারিদেব শেষ মালাটা তুলে দিলেন সমর্পিতার হাতে। নিশ্চুপ ভাবে মালাটা কণ্ঠে ধারণ করল সে। মল্লিকার্জুন এরপর নারীদের হাত থেকে মালাগুলি তুলে দিলেন প্রধান পুরোহিতের হাতে। নারীরা স্পর্শ করতে পারবে না দেবতাকে। তাই তাদের হয়ে প্রধান পুরোহিত এক-একজন নারীর নাম করে সেই মালাগুলি পরিয়ে দিলেন সোমেশ্বরের কণ্ঠে।

প্রদীপের আলোতে, ধূপের ধোঁয়ায় এই মাল্যদান পর্ব সম্পন্ন হতেই এই কন্যারা দেবদাসীতে রূপান্তরিত হল। এরপর আরও একটা ক্ষুদ্র কাজ ছিল যেটা সম্পন্ন করলেন পুরোহিত নন্দবাহন। একটি স্বর্ণপাত্র থেকে একটি একটি করে স্বর্ণ ঘুঙুরদানা নিয়ে তুলে দিলেন প্রত্যেক নারীর হাতে। এই ঘুঙুরদানা তারা পায়ের ঘুঙুর ছড়াতে বেঁধে নিয়ে নৃত্য পরিবেশন করবে সোমেশ্বর মহাদবের সামনে। সব কার্য সম্পন্ন হল। নারীর দল বিগ্রহ আর পুরোহিতকুলকে প্রণামের পর তাদের নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন ত্রিপুরারিদেব। আর সেই গর্ভগৃহর চৌকাঠ অতিক্রম করে বাইরে এসে দাঁড়াবার সঙ্গে-সঙ্গেই এই নারীদের সব পূর্ব পরিচয় মুছে গেল। নাম, ধাম, কুল, পিতৃপরিচয় সবকিছু। তাদের আজ থেকে একমাত্র পরিচয় হল তারা দেবদাসী। জীবনে-মরণে তাদের একমাত্র নাথ হলেন সোমেশ্বর মহাদেব—সোমনাথ।

বাইরে যারা এতক্ষণ ধরে তাদের নির্গমনের প্রতীক্ষাতে দাঁড়িয়েছিলো তারা প্রস্তুত হয়েই ছিলো। প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে এই নবীনা দেবদাসীরা বাইরে বেরোতেই পুষ্পবৃষ্টি শুরু হলো। সারা মন্দির চত্বর জুড়ে শুরু হলো ঘণ্টাধ্বনি আর শঙ্খনাদ। সুবিশাল মন্দির চত্বর অতিক্রম করে সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো সারা প্রভাস পত্তনে। সারা নগরী জেনে গেল আরও একদল নারী নিজেদের উৎসর্গ করলো সোমেশ্বর মহাদেবের পাদপদ্মে।

এই সব নারী আর তাদের পিতামাতাদের অক্ষয় স্বর্গ লাভ হবে সোমেশ্বরের আশীর্বাদে। নগরীর কোনও কোনও পিতা-মাতাও হয়তো এই ঘণ্টাধ্বনি শুনে মহাদেবের উদ্দেশ্যে কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম জানিয়ে স্বর্গলাভের বাসনাতে তাদের কন্যা সন্তানকে সোমেশ্বরের কাছে নিবেদনের সংকল্প করল।

প্রধান পুরোহিতের কাজ সমাপ্ত। দেবদাসীদের ফিরিয়ে নিয়ে চলল তিলোত্তমা। একজন ছত্রধারী স্বর্ণছত্র এনে ধরল তাঁর মাথায়। সমর্পণ কার্য সম্পাদন করে প্রধান পুরোহিত নিজের কক্ষে ফিরে এলেন। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল এক সময়। আকাশ পরিক্রমণ করে সূর্যদেব সমুদ্রে অবগাহন শুরু করলেন। দিন শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল সন্ধ্যারতির প্রস্তুতি। এ কাজটা অবশ্য প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের দুই সহযোগী মল্লিকার্জুন আর নন্দিবাহনই সামলান।

আরতির পর সোমেশ্বরের উদ্দেশ্যে নৃত্য গীত পরিবেশন করে দেবদাসীরা। তারপর সেদিনের মতো মন্দিরের গর্ভগৃহের কপাট বন্ধ করে সবাইকে নিয়ে গর্ভগৃহ চত্বর ত্যাগ করে নীচে নেমে আসেন দুই প্রধান সহকারী পুরোহিত। গর্ভগৃহ চত্বরে একমাত্র প্রধান পুরোহিত ব্যতীত অন্য কোনও ব্যক্তির থাকার অনুমতি নেই যদি না প্রধান পুরোহিত বিশেষ কোনও কারণ বশত রাত্রিকালে কাউকে সেখানে আহ্বান করেন।

বিশেষ কিছুদিন ব্যতীত সন্ধ্যারতির সময় গর্ভগৃহর সামনে উপস্থিত থাকেন না প্রধান পুরোহিত। সমুদ্রের বুকে সূর্য ডুবে গেল এক সময়। দোর বন্ধ। কক্ষের ভিতর থেকেই ত্রিপুরারিদেব অন্য দিনের মতোই শুনতে পেলেন সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি, শঙ্খের শব্দ, দেবদাসীদের সঙ্গীত মুর্ছনা, নিক্কনের মৃদু শব্দ। তারপর এক সময় সে শব্দ আসতে আসতে একেবারে থেমে গেলো। নিস্তব্ধতা নেমে এল প্রধান পুরোহিতের কক্ষের বাইরে মন্দিরের গর্ভগৃহ সংলগ্ন প্রধান চত্বরে।

প্রধান পুরোহিত বিশ্রাম ত্যাগ করে উঠে একটা ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালালেন। সামান্য কিছু ফলাহার গ্রহণ করে আবার ভূর্জপত্র আর খাগের কলম নিয়ে বসলেন। অন্ধকার নামার পর মন্দির নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়াতে আবার জেগে উঠতে শুরু করেছে সমুদ্র গর্জন। চত্বরের একদম শেষ প্রান্তে প্রধান পুরোহিতের কক্ষ। আর তারপরই মন্দির প্রাকার। রাত্রিকালে তট অতিক্রম করে তার গায়েই আছড়ে পড়ে তরঙ্গমালা। ত্রিপুরারিদেবের কক্ষ সংলগ্ন একটা সংকীর্ণ সোপানশ্রেণী প্রাকার ভেদ করে নেমেছে তটরেখার বুকে। ও পথেই প্রত্যহ সমুদ্র স্নানে যান ত্রিপুরারিদেব।

কক্ষত্যাগ করার জন্য মধ্যযাম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল ত্রিপুরারিদেবকে। তারপর তিনি প্রদীপ নিভিয়ে বাইরের চত্বরে বেরিয়ে এলেন। চাঁদ মাথার ওপর থেকে আলো ছড়াচ্ছে ঘুমন্ত মন্দিরের ওপর। সমুদ্র গর্জন ছাড়া কোথাও কোনও শব্দ নেই। মন্দির প্রাকারে মশালগুলো আলো ছড়াচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তা যেন এই সুবিশাল মন্দির প্রাঙ্গণের বিশাল স্তম্ভ, প্রাকার, কক্ষগুলোর আনাচে কানাচে জমাটবাঁধা অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে তুলেছে।

লঘু পায়ে ত্রিপুরারিদেব এসে উপস্থিত হলেন গর্ভগৃহর বন্ধ তোরণের সামনে। গর্ভগৃহর সামনে মাথার ওপর ছাদ থাকায় চাঁদের আলো সরাসরি এখানে প্রবেশ করছে না। আলো আঁধারি খেলা করছে গর্ভগৃহর সমুখে। সেখানে কিয়ৎক্ষণ দাঁড়িয়ে প্রধান পুরোহিত নীচের চত্বরের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে কিনা। যদিও নীচ থেকে গর্ভগৃহর সামনে অন্ধকার মেখে দাঁড়িয়ে থাকা প্রধান পুরোহিতকে দেখতে পাবার সম্ভাবনা নেই, তবুও তিনি যে কাজে যাচ্ছেন তাতে সতর্কতা অবলম্বন করা বিশেষ প্রয়োজন।

এক সময় নিশ্চিন্ত হলেন প্রধান পুরোহিত।—না, কেউ কোথাও নেই। ত্রিপুরারিদেব তোরণ সংলগ্ন কুলুঙ্গি থেকে একটা ক্ষুদ্রাকৃতি স্বর্ণ প্রদীপ আর দু-খণ্ড অগ্নিপ্রস্তর তুলে নিয়ে সন্তর্পণে স্বর্ণ কপাট উন্মোচন করে প্রবেশ করলেন মন্দিরের অন্ধকার গর্ভগৃহে। ভিতরে প্রবেশ করে কপাটের অর্গল তুলে দিলেন তিনি। অগ্নিপ্রস্তর ঘর্ষণ করে প্রদীপ জ্বালালেন।

মৃদু আলো ছড়িয়ে পড়ল গর্ভগৃহতে। প্রধান পুরোহিতের সামনে শূন্যে ভাসমান সোমেশ্বর মহাদেবের ঘুমন্ত বিগ্রহ। তার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে ত্রিপুরারিদেব মনে মনে বললেন, 'আপনার নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটলে আমাকে মার্জনা করবেন। আপনার কার্য সম্পাদনের জন্যই মধ্যযামে আমাকে এখানে উপস্থিত হতে হল।' একথা বলার পর তিনি বিগ্রহ অতিক্রম করে উপস্থিত হলেন বিগ্রহর পশ্চাতভাগে দেওয়ালের সামনে। দেওয়ালের গায়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে তিনি দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে পেষণ করতেই দেয়ালের একটা অংশ দু-পাশে কিছুটা সরে গিয়ে উন্মুক্ত হল একটা সুড়ঙ্গ পথ। একজন মাত্র মানুষ প্রবেশ করতে পারে সেখানে।

প্রদীপ হাতে ত্রিপুরারিদেব প্রবেশ করলেন সেই সুড়ঙ্গ পথে। দু-পাশে স্যাঁতস্যাতে নিরেট পাথুরে দেওয়াল। অন্ধকার এত গাঢ় যে কয়েক হস্ত দূরে কোনও বস্তু ঠাহর হয় না। নানা বাঁক নিয়ে সুড়ঙ্গ ক্রমশ নীচের দিকে নেমেছে। প্রধান সুড়ঙ্গের দু-পাশ থেকে নানা পথ এগিয়েছে নানা দিকে। ভুলক্রমে সে পথে পা বাড়ালে সুড়ঙ্গের গোলকধাঁধায় ঘুরে পথ হারিয়ে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে মৃত্যু নিশ্চিত। এই সুড়ঙ্গে অবাঞ্ছিতভাবে প্রবেশ করা ব্যক্তির মৃত্যু ঘটাবার জন্যই এই ব্যবস্থা। ত্রিপুরারিদেবের অবশ্য এ পথ চেনা। প্রতি পক্ষকালে পানীয় জলের কলস আর খাদ্যদ্রব্য নিয়ে এ পথে আসতে হয় তাকে। মাত্র তিন দিবস আগেই তিনি এ পথে এসেছিলেন। সেই সর্পিল সুড়ঙ্গ অতিক্রম করে তিনি এক সময় উপস্থিত হলেন এক কক্ষে।

কৃষ্ণবর্ণের পাথরের তৈরি কক্ষ। এ কক্ষের ঠিক মাথার উপরই গর্ভগৃহের অবস্থান। কক্ষে কোনও বিগ্রহ না থাকলেও একটা ক্ষুদ্রাকৃতি বেদি আছে। প্রধান পুরোহিত সেই বেদির সামনে উপবেশন করে প্রদীপটা মাটিতে নামিয়ে রাখলেন। তারপর দু-হাতে বেদিটা ঠেলতেই বেদিটা একপাশে সরে গেল। উন্মুক্ত হল একটা গহ্বর। এই গহ্বর দিয়েই প্রতি পক্ষকালে একবার পানীয় জলের কলস আর খাদ্যদ্রব্য রজ্জুবদ্ধ করে নামিয়ে দেন নীচের আরও একটি অন্ধকার কক্ষে।

সে কক্ষের কথা মন্দিরের অধ্যক্ষ আর প্রধান পুরোহিত ব্যতীত কেউ কোনওদিন জানতে পারে না। প্রধান পুরোহিত বা অধ্যক্ষের মৃত্যু আসন্ন হলে তারা তাদের উত্তরসূরী অধ্যক্ষ বা প্রধান পুরোহিতকে সোমেশ্বরকে স্পর্শ করিয়ে, মন্ত্রগুপ্তির শপথ বাক্য পাঠ করিয়ে জানিয়ে দেন এ কক্ষের কথা। ত্রিপুরারিদেবও সে ভাবেই জেনেছেন।

মন্দিরের অধ্যক্ষের মৃত্যু ঘটেছে। নতুন অধ্যক্ষ এখনও নির্বাচিত হননি। তাই ত্রিপুরারিদেবই এই মন্দিরের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি যিনি এ কক্ষের কথা জানেন। মন্দিরের নতুন অধ্যক্ষ নির্বাচিত হলে অবশ্য ত্রিপুরারিদেবকেই তাকে অবগত করতে হবে এই গুপ্ত কথা। কারণ উত্তরসূরী নির্বাচিত হবার আগেই মৃত্যু ঘটেছিল পূর্বতন অধ্যক্ষের। গহ্বরের নীচে জমাটবাঁধা অন্ধকার। গহ্বরের মুখটাতে ঝুঁকে পড়ে ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'তুমি কোথায়? আমি এসেছি।'

নীচ থেকে একটা অস্পষ্ট শব্দে ভেসে এল, 'এইতো আমি। প্রভু আপনি এসেছেন!'

ওপর থেকে সেই ভূগর্ভস্থ কক্ষের অন্ধকারে কিছু দৃষ্টিগোচর না হলেও মৃদু শব্দ শুনে ত্রিপুরারিদেব বুঝতে পারলেন গহ্বরের ঠিক নীচে এসে দাঁড়িয়েছে যে, তার ডাকে সাড়া দিল সেই মানুষ।

প্রধান পুরোহিত প্রথমে তাকে প্রশ্ন করলেন, 'তোমার কি খাদ্যপানীয়র অভাব ঘটেছে?'

'না।' জবাব এল নীচ থেকে।

'তুমি কি রোগগ্রস্থ?' আবার প্রশ্ন করলেন প্রধান পুরোহিত।

আবারও জবাব এল, 'না।'

ত্রিপুরারিদব এবার মৃদু বিস্মিত ভাবে প্রশ্ন করলেন, 'তবে তুমি ঘণ্টাধ্বনি করে আমাকে আহ্বান করলে কেন?'

ত্রিপুরারিদেবের যে রজ্জুবদ্ধ ঘণ্টা আছে তার রজ্জুর প্রান্তভাগ লোকচক্ষুর আড়ালে এই গোপালকক্ষের ভিতর শেষ হয়েছে। নীচে যে আছে সে দড়ি ধরে টান দিলে মাথার ওপরে প্রধান পুরোহিতের কক্ষে ঘণ্টাটা বেজে ওঠে। এভাবেই নীচের লোকটা সংকেত পাঠায় প্রধান পুরোহিতকে। সে সংকেত ধ্বনি শুনে এখানে উপস্থিত হয়েছেন পুরোহিত শ্রেষ্ঠ।

ত্রিপুরারিদেবের প্রশ্ন শুনে মৃদু চুপ করে থেকে নিচের লোকটা বলল, 'আমি এই অন্ধকারের প্রহরী হয়ে আছি দ্বাদশ বৎসর ধরে। আর কতকাল আমাকে এখানে থাকতে হবে? আমার কি মুক্তি হবে না?'

ত্রিপুরারিদেব প্রথমে তার উদ্দেশ্যে বললেন, 'তুমি কিন্তু সোমেশ্বর মহাদেবের নামে শপথ নিয়ে স্বেচ্ছায় এ কার্যভার গ্রহণ করেছিলে। তুমি যে দায়িত্ব পালন করছ তার জন্য তোমার আর তোমার ঊর্ধ্বতন চতুর্দশ পুরুষের স্বর্গবাস নিশ্চিত। এ সৌভাগ্য রাজা-মহারাজাও লাভ করতে পারেন না। এমনকী, আমিও নই।'

তাঁর বক্তব্য শুনে সেই অন্ধকারের প্রহরী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, 'এসব কথা আমি জানি প্রভু। কিন্তু আমি আর একলা থাকতে পারছি না। আপনাকে কথাটা জানাব ভেবেও এতদিন সংকোচে বলতে পারিনি। আজ বললাম। কদিন ধরে প্রচণ্ড একাকিত্ব আমাকে গ্রাস করছে। মাথায় আত্মহননের ভাবনা আসছে...।'

এ কথা শোনার পরই তাকে থামিয়ে দিয়ে ত্রিপুরারিদেব বলে উঠলেন, 'স্তব্ধ হও। এ কথা মনে স্থান দিও না। এ কক্ষে আত্মহনন করলে কোনও দিন তোমার মুক্তি হবে না। এ কক্ষকে অপবিত্র করার অপরাধে অনন্ত নরকবাস হবে তোমার।'

ত্রিপুরারিদেবের কথা শুনে লোকটা যেন অস্পষ্ট ভাবে বলল, 'নরক কি এ কক্ষের থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর?'

ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'কী বললে তুমি?'

কিন্তু নীচ থেকে কোনও সাড়া এল না। তবে লোকটার কথা শঙ্কা জাগাল প্রধান পুরোহিতের মনে। এই অন্ধকারের প্রহরী যদি সত্যি আত্মহননের পথ বেছে নেয় তখন? যেমন কেউ কেউ বেছেছে ইতিপূর্বে। একটু ভেবে নিয়ে প্রধান পুরোহিত এরপর নরম স্বরে তার উদ্দেশ্যে বললেন, 'তুমি সোমেশ্বরের প্রহরী, এ সব ভাবনা মনে স্থান দিও না। মহাদেবের আশীর্বাদে হয়তো-বা আর কিছুকালের মধ্যেই মুক্তি ঘটতে চলেছে তোমার। দ্বাদশ বৎসরকাল যাবৎ যে কঠিন দায়িত্ব সম্পাদন করেছ তুমি, তার থেকে মুক্তি ঘটবে তোমার।'

কথাটা শুনে অন্ধকারের প্রহরী যেন মৃদু উৎফুল্ল হয়ে বলল, 'আপনি সত্যি বলছেন প্রভু? মুক্তি ঘটবে আমার?'

ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'হ্যাঁ। সোমেশ্বরদেব তেমনই ইচ্ছা প্রকাশ করছেন বলে আমার ধারণা। মহাদেবের কাছে তোমার মুক্তি প্রার্থনা করো। তিনি যেন তোমার মুক্তির পথ প্রশস্ত করেন। তোমার আর কিছু বলার আছে? এবার আমাকে প্রস্থান করতে হবে।'

অন্ধকারের প্রহরী জবাব দিল, 'না, প্রভু, আর কিছু নিবেদন নেই আমার। সোমেশ্বর মহাদেব যেন আমার ডাকে সাড়া দেন।' এ কথা বলে থেমে গেল লোকটা।

ত্রিপুরারিদেব বেদিটা পূর্ব স্থানে ঠেলে দিয়ে সেই গহ্বরটা আবার ঢেকে দিলেন। তারপর প্রদীপটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন ফেরার জন্য। যেমন সবার অগোচরে তিনি মন্দিরের গর্ভগৃহতে প্রবেশ করেছিলেন, তেমনই সবার অগোচরে কিছু সময়ের মধ্যেই গর্ভগৃহর বাইরে বেরিয়ে কপাট টেনে দিলেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। তারপর তিনি রওনা হলেন তাঁর কক্ষের দিকে। শুকতারা ফুটে ওঠার আগেই অবশ্য তাকে আবার ফিরে আসতে হবে এই স্থানে। সোনার শিকল বাজিয়ে মন্দিরবাসীদের নিদ্রাভঙ্গ করার জন্য।

তখনও অন্ধকার কাটেনি। একটা অদ্ভুত শব্দে ঘুম ভাঙল অঙ্গিরার। গতকাল প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাঁর নির্দেশ পালন করে পুরোহিত মল্লিকার্জুন অঙ্গিরাকে পৌঁছে দিয়ে গেছিলেন এই অতিথিশালায়। তারপর থেকে আর কক্ষ ত্যাগ করেনি অঙ্গিরা। অতিথিশালার তত্ত্বাবধায়ক এক সেবায়েত এসে তার কক্ষতেই ফলাহার দিয়ে গেছিল। ক্লান্তি কাটাবার জন্য অঙ্গিরার বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। দীর্ঘ সময় সে ঘুমিয়েই কাটিয়েছে।

ঘুম ভেঙে উঠে বসে সে তাকাল গবাক্ষর দিকে। শব্দটা বাইরে থেকেই আসছে। না, কোনও বাদ্য যন্ত্রর নয়, একটা ছমছম-ঝনঝন ধাতব শব্দ! মন্দিরের সব কিছুর সঙ্গে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। তাই শয্যা থেকে নেমে দরজার অর্গল খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো অঙ্গিরা। মাথার ওপরে অপসৃয়মান চাঁদের আলোতে আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল মন্দিরটা। শুকতারাও ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ সূর্যোদয়ের বেশি দেরি নেই।

শব্দটা মন্দির থেকেই আসছে। যদিও আলো না ফোটার কারণে কাঁপতে থাকা সোনার শিকলটা নজরে পড়ল না তার। তবে একটি জিনিস খেয়াল করলো সে। ওই ধাতব শব্দে ধীরে ধীরে চারপাশ যেন জেগে উঠতে শুরু করেছে। নানারকম শব্দ শুরু হয়েছে চারদিকে। অন্ধকারের মধ্যেই মন্দিরে নীচের বিশাল প্রাঙ্গণে নানা ছায়ামূর্তি ব্যস্ত সমস্ত হয়ে চলাচল শুরু করেছে।

অঙ্গিরা দেখতে লাগল সে সব। কিছু সময়ের মধ্যেই শুকতারা মুছে গিয়ে পুবের আকাশে রঙ ধরতে শুরু করলো। ধাতব শব্দটা থেমে গেল। মন্দিরের পশ্চাৎ ভাগে সমুদ্রের বুক থেকে উদয় হতে শুরু করেছেন সূর্যদেব। অঙ্গিরার চোখের সামনে ছায়ামূর্তিরা মানুষের রূপ নিল।

ভোরের আলো ফোটার পূর্ব মুহূর্তেই নিজেদের কাজে নেমে পড়েছে আবাসিকরা। কারো হাতে কলস, কারো হাতে ঝাড়ু বা অন্যান্য নানা সামগ্রী। নারী-পুরুষ সবাই আছে। অঙ্গিরার অতিথি নিবাসের সামনে দিয়েই একদল চয়নিকা ফুলের সাজি নিয়ে এগোল মন্দিরের একপাশে অবস্থিত পুষ্পকাননের দিকে।

ভোরের আলো যখন ভালো করে ফুটলো ততক্ষণে মন্দিরের ওপরের চত্বর থেকে সিঁড়ি বেয়ে সার বেঁধে কলসি হাতে দাঁড়িয়ে পড়েছে সেবায়েতের দল। সেই মানবশৃঙ্খল মন্দিরকে বেড় দিয়ে হারিয়ে গেছে সমুদ্রর দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য অঙ্গিরা ব্যাপারটা বুঝতে পারল। সেবায়েতদের ওই মানবশৃঙ্খলের হাতে ধরা কলসের মাধ্যমে সমুদ্র থেকে জল বাহিত হয়ে আসছে।

মন্দিরের ধৌত কার্য শুরু হল। আর এরপর মন্দির প্রাকারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার প্রধান তোরণের বাইরে থেকেও ধীরে ধীরে ভেসে আসতে লাগল নানা শব্দ, জনতার কোলাহল, হ্রেষারব, হাতির বৃংহতি। তোরণ খোলার প্রতীক্ষাতে বাইরে সমবেত হতে শুরু করেছে পূণ্যলোভী জনতা। কোলাহল ব্যস্ততার মধ্যে জেগে উঠতে লাগল সোমেশ্বরের মন্দির। অঙ্গিরা অবাক হয়ে দেখতে লাগল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।

ধৌতকার্য সম্পন্ন হবার পর মুণ্ডিত মস্তক সেবায়েতের দল পূজার নানা উপাচার বহন করে মন্দিরের ওপরে উঠতে লাগল। দূর থেকে ভেসে আসতে লাগল দুগ্ধ, ঘৃত, ফুলের সুবাস।

অঙ্গিরা দেখল একদল রূপসী রমণী উঠছে সোপানশ্রেণী বেয়ে। দেবদাসী ওরা। তাদের সম্মিলিত পদচারণায় তাদের পায়ে বাঁধা ঘুঙুরের শব্দও কানে আসছে। গর্ভগৃহের তোরণ উন্মোচিত হবার পর সোমেশ্বরকে নৃত্য প্রদর্শন করবে তারা। তাদের অলঙ্কার আর জরির পোশাক প্রভাতী সূর্যকিরণে ঝলমল করছে।

গর্ভগৃহের তোরণ উন্মোচিত হল যথা সময়ই। তখন সূর্যালোক ছড়িয়ে পড়েছে মন্দিরের আনাচেকানাচে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্দিরের প্রধান চত্বরে আর নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা ঘণ্টাগুলো একসঙ্গে বাজতে শুরু করল। আর সেই শব্দে মন্দির প্রাকারের বাইরে প্রতীক্ষারত দর্শনার্থীরা উদ্বেলিত হয়ে 'জয় সোমেশ্বর মহাদেবের জয়', আর 'হর হর মহাদেব' ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলল।

অঙ্গিরা এবার অতিথিশালা ত্যাগ করে এগোল মন্দিরের দিকে। সোপানশ্রেণী বেয়ে ওপরে ওঠার সময় অঙ্গিরা এবার দেখতে পেল অজগর সাপের মতো বিশাল স্বর্ণ শৃঙ্খলটা। গতকাল যখন সে সোপান বেয়ে ওপরে উঠেছিলো তখন প্রচুর জনসমাগম থাকায় শিকলটা সে খেয়াল করেনি। শিকলটা দেখে অবাক হয়ে গেল অঙ্গিরা।

সে যখন চত্বরের ওপরে উঠে এল ততক্ষণে গর্ভগৃহর সামনে বাদ্যকারদের বাজনা আর দেবদাসীদের নৃত্যগীত শুরু হয়ে গেছে। ঘুঙুরের মুর্ছনার শব্দ অনুসরণ করে পায়ে পায়ে অঙ্গিরা হাজির হল সে জায়গাতে।

গর্ভগৃহর বিশাল কপাট দুটো উন্মুক্ত। সূর্যালোকে ঝলমল করছে মাণিক্য খচিত স্বর্ণ কপাট। তার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। আর তার সামনে কিছুটা তফাতে নৃত্য পরিবেশন করছে একদল সুন্দরী দেবদাসী। তাদের একপাশে কিছুটা তফাতে বসে বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে বাদ্যকারের দল। শুভ্র বসনাবৃত রুপো বাঁধানো দণ্ড হাতে সেবায়েতের দল ঘিরে রেখেছে চারদিক।

ধূপের গন্ধে ম-ম করছে জায়গাটা। ওই হীরকখচিত কপাটের অভ্যন্তরেই যে সোমেশ্বর মহাদেব অবস্থান করছে তা বুঝতে অঙ্গিরার অসুবিধা হল না। অঙ্গিরাকে কেউ সে স্থান থেকে চলে যেতে বলল না। অবাক হয়ে সে দেখতে লাগল দেবদাসীদের নৃত্যগীত। কী সুন্দর এই নারীরা! যেন স্বর্গের অপ্সরারা এসে হাজির হয়েছে সোমেশ্বরকে নৃত্যগীত পরিবেশনের জন্য! কী অপূর্ব তাদের সঙ্গীত মুর্ছনা! কী সুন্দর তাদের ঘুঙুরবন্ধ পায়ের নৃত্য বিভঙ্গ!

বেশ কিছুক্ষণ নৃত্যগীত প্রদর্শনের পর দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে তা এক সময় শেষ হল। একটা স্তম্ভের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল অঙ্গিরা। তার পাশ কাটিয়ে উচ্ছল কলরব করতে করতে নীচে নামার জন্য এগোল দেবদাসীর দল। সেবায়েতরাও এদিক ওদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এবার অন্য কাজ সামলাতে হবে তাদের।

অঙ্গিরা দেখল একদল রক্ষী এবার উঠে এসেছে মন্দিরের ওপরে এই গর্ভগৃহ চত্বরে। অবাক হয়ে চারপাশে তাকাচ্ছিল অঙ্গিরা। হঠাৎ একজন এসে দাঁড়ালেন তার সামনে। পুরোহিত মল্লিকার্জুন। অঙ্গিরা মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল তাঁকে। তিনি প্রশ্ন করলেন, 'সব কুশল তো?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'হ্যাঁ।'

তিনি তাকে বললেন, 'বিগ্রহ দর্শন করলে এখনই করে নাও। প্রধান তোরণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। বন্যার স্রোতের মতো মানুষ ওপরে উঠে আসবে। তখন আর এত বড় চত্বরেও তোমার স্থান সঙ্কুলান হবে না।' এ কথা বলে তিনি অন্যদিকে প্রস্থান করলেন।

তার নির্দেশ পালন করে অঙ্গিরা গর্ভগৃহের হীরকখচিত সেই উন্মুক্ত কপাটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গর্ভগৃহর অভ্যন্তরে তাকিয়ে শূন্যে ভাসমান সোমেশ্বর মহাদেবকে দর্শন করে বাহ্যজ্ঞান যেন কিছুক্ষণের জন্য লুপ্ত হয়ে গেল তার! এ-ও কি সম্ভব! শূন্যে সত্যিই ভাসমান সোমেশ্বর মহাদেব!

বিস্মিত বিহ্বলভাবে ভাসমান বিগ্রহর দিকে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে, ভূমিষ্ঠ হয়ে চৌকাঠে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম জানাল অঙ্গিরা। সোমনাথ দর্শনে যেন ধন্য হল তার জীবন। দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে সে উঠে দাঁড়াতেই মন্দিরের প্রধান তোরণ উন্মুক্ত হয়ে গেল। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে প্রচণ্ড ধ্বনি উঠল 'জয় সোমেশ্বরের জয়! হর হর মহাদেব'!

চত্বরের ওপর থেকে অঙ্গিরা দেখল সত্যিই বন্যার স্রোতের মতো মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করতে শুরু করেছে পুণ্যার্থীরা। তার পর সেই জনস্রোত আর তীব্র কোলাহল নীচের চত্বর অতিক্রম করে সোপানশ্রেণী বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। অঙ্গিরা তা দেখে গর্ভগৃহর সামনে থেকে সরে গিয়ে বেশ কিছুটা তফাতে যেখানে প্রণামী গ্রহণের জন্য বিরাট বিরাট জ্বালা বা ধাতব কলসগুলো রাখা আছে, তার কাছাকাছি এক স্থানে, এক দেওয়ালের গায়ে আশ্রয় নিল।

গর্ভগৃহ চত্বরে উঠে এল সেই জনতা। তাদের সামলাতে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল রক্ষী আর সেবায়েতদের। নানা দেশ থেকে আসা কত ধরনের পুণ্যার্থী! স্বর্ণ পোশাকে আবৃত ধনাঢ্য থেকে শুরু করে, সামান্য কৌপিন পরা জটাধারী সন্ন্যাসী। অশক্ত বৃদ্ধ থেকে শিশুকাঁখে রমণী। জনস্রোতে সবাই মিলিমিশে একাকার। তাদের সামলাতে হিমসিম সেবায়েত আর রক্ষীরা। গর্ভগৃহের সামনে অবস্থান করতে দেওয়া হচ্ছে না কাউকে। দেবতা দর্শনের সঙ্গে-সঙ্গেই ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে পুণ্যার্থীকে।

শুধু গর্ভগৃহ নয়, পুরো চত্বরটাতেই ছড়িয়ে পড়েছে জনতা। দেওয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকলেও মাঝে-মাঝেই জনস্রোত এসে ধাক্কা দিচ্ছে অঙ্গিরাকে। এক নাগাড়ে বেজে চলেছে মন্দিরের বিশালাকৃতি পিতলের ঘণ্টাগুলো। চত্বরের মধ্যে এক পাশে জমে উঠতে শুরু করেছে বিল্ব ফলের পাহাড়।

অঙ্গিরা যেখানে দণ্ডায়মান তার সামনের কলসগুলোও উপচে পড়তে শুরু করল কিছুক্ষণের মধ্যেই। স্বর্ণ-রৌপ্য মুদ্রা তো আছেই, তার সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের দুর্মূল্য অলঙ্কার, হিরা-জহরত নিবেদিত হচ্ছে সোমেশ্বর মহাদেবের আশীর্বাদ লাভের উদ্দেশ্যে। মহাবিত্তশালী থেকে ভিক্ষুক যে যার সাধ্যমতো দান করছে তার মনবাঞ্ছা পূরণের জন্য।

একদল রক্ষী তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে নজর রাখছে জায়গাটার ওপর। সূর্যকিরণে ঝলমল করছে কলস থেকে উপচে পড়া স্বর্ণখণ্ডগুলো। অঙ্গিরা বিস্মিত ভাবে তাকিয়ে দেখছিল চারপাশ। হঠাৎ একজন তার সামনে এসে দাঁড়াল। কুঞ্চিত কেশ, শ্মশ্রুমণ্ডিত তামাটে বর্ণের দীর্ঘকায় চেহারা। ধাতু বর্মে আবৃত শরীর। কোমরবন্ধ থেকে খড়গকোষ ঝুলছে। অঙ্গিরাকে ভালোভাবে নিরিক্ষণ করে লোকটা কর্কশভাবে জানতে চাইল, 'তুমি কে? দীর্ঘক্ষণ ধরে এখানে দাঁড়িয়ে এই রত্ন কলসগুলোর দিকে কি উদ্দেশ্যে চেয়ে আছ?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'আমার নাম অঙ্গিরা। বল্লভী নগরী থেকে এসেছি পুরোহিতশ্রেষ্ঠ ত্রিপুরারিদেবের কাছে।'

তার জবাব শোনার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্নকর্তার মুখমণ্ডল থেকে কাঠিন্য অন্তর্হিত হল। মাথা ঝুঁকিয়ে মৃদু অভিবাদন জানিয়ে সে বলল, 'ও, আপনি সেই ব্যক্তি! আমি মহারক্ষীপ্রধান জয়দ্রথ। আমি আপনার কথা জেনেছি। আপনি তো প্রধান পুরোহিতের অতিথিশালাতে অবস্থান করছেন। পরিচিত হয়ে ভালো লাগল।'

তার কথা শুনে অঙ্গিরাও তাঁকে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে বলল, 'আমিও প্রীত হলাম আপনার পরিচয় লাভ করে।'

জয়দ্রথ বললেন, 'আপনার অস্ত্রগুলি আমার এক সৈনিকের তত্ত্বাবধানে আছে। অতিথিশালাতে পাঠিয়ে দেব। তা আপনিও কি আমাদের মতো যুদ্ধব্যবসায়ী, অর্থাৎ সৈনিক?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'না, আমি ঠিক সে অর্থে সৈনিক নই, তবে অস্ত্রবিদ্যা রপ্ত করেছি। বিশেষত ধনুর্বিদ্যা।' এ বিষয়ে সে আরও কিছু বলতে পারত, কিন্তু গুপ্তবিদ্যা সবার কাছে প্রকাশ করা ঠিক নয় বলে অঙ্গিরা সে প্রসঙ্গে আর কিছু বলল না মহারক্ষী প্রধানকে।

অঙ্গিরার জবাব শুনে জয়দ্রথ হেসে বললেন, 'আসলে গচ্ছিত শস্ত্রগুলো দেখে আমি ভেবেছিলাম আপনি যুদ্ধ ব্যবসায়ী। আপনার ধনুর্বাণ আর তলোয়ার পেশাদার যুদ্ধ ব্যবসায়ীদের মতোই।'

অঙ্গিরা মৃদু হেসে জবাব দিল 'আসলে আমার পিতা যুদ্ধব্যবসায়ী ছিলেন। ওই ধনুর্বাণ আর তরবারি তাঁরই ছিল।' এ কথা বলার পর অঙ্গিরা স্বর্ণ পূর্ণ কলসগুলোর দিকে তাকিয়ে বিস্মিতভাবে বলল, 'রোজ এত সম্পদ জমা হয় এখানে! এ সব কোথায় যায়! রাজকোষে?'

মহারক্ষী প্রধান বললেন, 'না, রাজকোষে নয়, দশ সহস্র মানুষের ভরণপোষণ, মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি নানা কাজে ব্যয় হয় এই সম্পদ। বাকিটা সঞ্চিত থাকে উৎসব, দান ইত্যাদি নানা কাজের জন্য। দেবতার সম্পদের ওপর রাজার কোনও অধিকার নেই।'

একথা বলার পর তিনি নীচের চত্বরে জনতার ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমাকে এবার ওই নীচের চত্বরে যেতে হবে। চারপাশ ঘুরে দেখতে হবে। এই জনস্রোতে মিশে তস্কর-প্রবঞ্চকের দলও মন্দিরে প্রবেশ করে। তা ছাড়া সেবায়েত-পুরোহিতদের সঙ্গে পুণ্যার্থীদের নানা সময়তেই বিবাদ-বিসংবাদ হয়। এসব এ সময়কালে মন্দিরের সর্বত্র দৃষ্টি রাখতে হয় আমাকে। মন্দিরের শান্তিরক্ষা ও নিরাপত্তার ভার আমার ওপরই নিয়োজিত।'

কথাটা শুনে অঙ্গিরা বলল, 'চলুন, আমিও নীচে নামব। এখানে আসার পর সারাদিন অতিথিশালার কক্ষেই ছিলাম। চারপাশটা ঘুরে দেখব। তা ছাড়া এই স্থানে জনসমাগমের চাপে শ্বাস রোধ হয়ে আসছে।' মহারক্ষী প্রধান বললেন, 'মন্দিরের পশ্চাদ্ভাগে সমুদ্রতটেও যেতে পারেন। সেখানে কিছু জনসমাগম থাকলেও উন্মুক্ত বাতাস পাবেন।'

জয়দ্রথের সঙ্গে অঙ্গিরা এগোল সোপানশ্রেণী বেয়ে নীচে নামার জন্য। চার-পাঁচ জন রক্ষী একটা ক্ষুদ্র ব্যুহ রচনা করল তাদের নির্বিঘ্নে নীচের নামাবার জন্য। সেই ব্যুহ পরিবৃত হয়ে জয়দ্রথের সঙ্গে অঙ্গিরা সোপানশ্রেণীর এক ধার ঘেঁষে নামতে শুরু করল।

তাদের এক পাশ দিয়ে ওপরে উঠে আসছে তীব্র কোলাহল মুখর জনস্রোত। ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি চলছে। কয়েকজন সেবায়েত ছড়ি হাতে সোপানের ধাপগুলোতে দাঁড়িয়ে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে দর্শনার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। ওই ঊর্ধ্বগামী জনস্রোতের মধ্যে অঙ্গিরা যদি গিয়ে পড়ে তবে মুহূর্তর মধ্যে সে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

ধীরে ধীরে নামতে নামতে অঙ্গিরারা তখন প্রায় শেষ ধাপে পৌঁছে গেছে। হঠাৎই সে দেখতে পেল একজন লোক শুয়ে পড়ল সোপানশ্রেণীতে। জনস্রোত কিন্তু ব্যাপারটাতে ভ্রুক্ষেপই করল না। 'সোমেশ্বর মহাদেবের জয়' ধ্বনিতে আকাশ বাতাস আন্দোলিত করে সেই লোকটাকে পদদলিত করে উপরে উঠতে লাগল।

সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে অঙ্গিরা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে, ব্যাপারটা মহারক্ষী প্রধান ও তার সঙ্গীদের নজর এড়িয়ে গেছে ভেবে উত্তেজিত ভাবে বলল, 'ওই দেখুন, একজন লোক পদদলিত হচ্ছে! শীঘ্রই উদ্ধার না করলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।' কথাটা কানে যেতে জয়দ্রথ নিস্পৃহ ভাবে বললেন, 'উদ্ধার করার প্রয়োজন নেই, ও স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করছে। এমন কেউ কেউ করে থাকে।'

মহারক্ষী প্রধানের কথা শুনে অঙ্গিরা বিস্মিতভাবে জানতে চাইল, 'স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করছে! এর অর্থ?' জয়দ্রথ জবাব দিল, 'এ লোকটা নিশ্চয়ই ব্রাহ্মণ হত্যা, গো-হত্যা বা পিতা-মাতাকে হত্যার মতো কোনও গর্হিত পাপ কার্য করেছিল। যে পাপের ফলে নরকবাস অবশ্যম্ভাবী ছিল। কিন্তু এই সোমেশ্বর মন্দিরে পুণ্যার্থীদের পদতলে যদি কারও মৃত্যু হয় তবে তার স্বর্গবাস হয়। এ সোপান হল স্বর্গের সিঁড়ি, মুক্তিলাভের সিঁড়ি। এভাবে মৃত্যু ঘটায় ওর পাপ স্খলন হবে। স্বর্গ আরোহন করবে ওই লোকটা।' কথাগুলো বলে জয়দ্রথ আবার নামতে শুরু করলেন। বিস্মিত অঙ্গিরা অনুসরণ করল তাকে। ততক্ষণে পুণ্যার্থীদের পদতলে তালগোল পাকিয়ে মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে সেই পাপিষ্ঠের দেহ। হয়তো বা লোকটার আত্মা যাত্রা শুরু করেছে বিষ্ণুলোকের উদ্দেশ্যে।

নীচে নেমে এল তারা। জয়দ্রথ, অঙ্গিরার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন নিজের কর্তব্য সম্পাদনের জন্য। জনতার ভিড়ে হারিয়ে গেলেন তিনি। অঙ্গিরা ভিড় ঠেলতে ঠেলতে এগোতে থাকল মন্দির প্রাকারের বাইরে যাবার জন্য। কোনওক্রমে মন্দিরের প্রধান তোরণ অতিক্রম করে বাইরে বেরিয়ে এল সে। সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু মানুষের মাথা, আর আন্দোলিত নানা বর্ণের নিশান। অযুত, নিজুত সংখ্যায় লোক এগিয়ে আসছে মন্দিরে প্রবেশের জন্য। অঙ্গিরা মন্দির প্রাকারকে বেড় দিয়ে তার গা ঘেঁষে এগোতে থাকল সমুদ্র তটে পৌঁছবার জন্য। কিছু সময়ের মধ্যে অঙ্গিরা পৌঁছে গেল সে স্থানে।

সমুদ্রতটে জনসমাগম থাকলেও সেখানের পরিস্থিতি মন্দির চত্বরের মতো দম বন্ধ করা নয়। মন্দির প্রাকারের পশ্চাতভাগের গা ঘেঁষে তটরেখা এগিয়ে বেশ কিছুটা দূরে বাঁক নিয়েছে। প্রাকারের গায়ে ছোট ছোট শনের ছাউনি দেওয়া কুটীর। তার সামনে বালুতটে সূর্যকিরণে সার বেঁধে বসে পুণ্যার্থীদের মস্তক মুণ্ডন করছে ক্ষৌরকারের দল। সংখ্যায় তারা অগুনতি। মানত করা পুণ্যার্থীরা মস্তক মুণ্ডণ সমাপ্ত হলে সমুদ্রের জলে অবগাহন করে মন্দিরের দিকে যাত্রা করছে সোমেশ্বর মহাদেবের দর্শনের জন্য।

সমুদ্র এখন শান্ত-সমাহিত। ছোট ছোট উর্মিমালা নিঃশব্দে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তটরেখা। সূর্যকিরণে ঝিকমিক করছে সমুদ্রের জল। বেশ কয়েকটা ময়ূরপঙ্খী নোঙর করা আছে তটরেখা থেকে কিছুটা তফাতে। সমুদ্রের বাতাসে উড়ছে তাদের মাস্তুলের মাথায় রঙিন নিশান। কোনও ময়ূরপঙ্খী এসেছে তীর্থ করতে, আবার কোনও ময়ূরপঙ্খী পসরা বোঝাই হয়ে এসেছে প্রভাসক্ষেত্রে বাণিজ্য করতে। দূর দেশ থেকে তারা বয়ে এনেছে চন্দন কাঠ, কড়ি, শঙ্খ রত্নরাজি।

চারপাশ দেখতে দেখতে ধীর পায়ে এগিয়ে চলল অঙ্গিরা। বেশ কিছুটা এগোবার পর মন্দির প্রাকার যেখানে গিয়ে আবার বাঁক নিয়েছে ঠিক সেই জায়গাতে পৌঁছে অঙ্গিরা দেখতে পেল তটরেখার শেষ প্রান্তে সমুদ্রের জলে কিছুটা নিমজ্জিত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে কারুকার্য মণ্ডিত বিরাট এক প্রস্তর খণ্ড। ইতিপূর্বে অঙ্গিরা সে স্তম্ভ কোনও দিন না দেখলেও, সেই স্তম্ভর পরিচয় বুঝতে পারল।

পিতা-মাতার কাছে এই স্তম্ভর কথা শুনেছিল সে। প্রভাসপত্তনে, সোমেশ্বর মন্দিরের পশ্চাদ্ভাগে সমুদ্র তটের শেষ প্রান্তে প্রোথিত ওই স্তম্ভই নাকি পৃথিবীর ভূভাগের শেষ সীমানা! তারপর আর কোথাও নাকি পৃথিবীর মাটি নেই, শুধু কূলকিনারাহীন মহাসমুদ্র আর সেই জলরাশির নীচে অবস্থান করছে মহাপাতাল।

সেই স্তম্ভের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে স্থানের বালুতটে বসল অঙ্গিরা। জায়গাটা বেশ একটু ফাঁকা ফাঁকা। যদিও মন্দির প্রাকারের ভিতর থেকে জনতার কোলাহলের শব্দ আর ঘণ্টাধ্বনি সেখানেও আসছে। সমুদ্রর দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরা ভাবতে থাকল তার নিজের কথা। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর বর্তমানে সে একা হয়ে গেছে। এত মানুষ এ পৃথিবীতে। কিন্তু এত মানুষের মধ্যেও কোথাও তার কোনও আত্মীয়পরিজন নেই।

নিজের ভবিষ্যৎ তার সম্পূর্ণ অজানা। পিতা-মাতার শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য সে এই প্রভাসক্ষেত্রে সোমেশ্বর মন্দিরে এসে উপস্থি হয়েছে, প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। কিন্তু কি কারণে, কোন কার্য সম্পাদনের লক্ষে, যে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে তা তার নিজেরও জানা নেই। তবে শিশুকাল থেকে তার পিতা-মাতা অঙ্গিরাকে অবগত করেছে যে সে এই সোমেশ্বর মন্দিরের জন্যই নিবেদিত। অঙ্গিরা এখানে এসে উপস্থিত হবার পর প্রধান পুরোহিত যে নির্দেশ তাকে দেবেন, তা তাকে পালন করতে হবে। নচেত তার পিতা-মাতার অনন্ত নরকবাস অবশ্যম্ভাবী।

একটা ব্যাপার অবশ্য অঙ্গিরার মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে। হয়তো বা মন্দির রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা হতে পারে তাকে। নইলে এত যত্ন করে তাকে অস্ত্রশিক্ষা দিলেন কেন তার পিতা? বিশেষত অস্ত্র শিক্ষার এক গুঢ় গোপনতম ব্যাপারও বাল্যকাল থেকে তিনি রপ্ত করিয়েছেন তাঁর পুত্রকে। দেখা যাক পুরোহিতশ্রেষ্ঠ ত্রিপুরারিদেব কি নির্দেশ দেন তাকে।

রৌদ্রকরোজ্জ্বল সমুদ্রতটে বসে নানা কথা ভাবতে লাগল অঙ্গিরা। সূর্যদেব ক্রমশ এগোতে লাগলেন মধ্যাকাশের দিকে। দীর্ঘ সময় ধরে উন্মুক্ত আকাশের নীচে বসে থাকার কারণে একক্ষণে উষ্ণতা অনুভূত হতে লাগল যুবক অঙ্গিরার। মন্দিরে অতিথিশালার যে কক্ষ অঙ্গিরার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে সে কক্ষ বেশ শীতল ও আরামপ্রদ।

দিনমণি প্রায় মাথার ওপর পৌঁছে গেছেন। তার খরদৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হচ্ছে সমুদ্রতটে। উষ্ণ হয়ে উঠছে তটের বালুকারাশি। অঙ্গিরা উঠে দাঁড়িয়ে সমুদ্রতট থেকে মন্দিরে যাবার জন্য পা বাড়াল। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় সে আবার পৌঁছে গেল ক্ষৌরকারদের সেই কুটিরগুলোর কাছে। যেখানে সারবদ্ধভাবে বসে মস্তক মুণ্ডণ করাচ্ছে ক্ষৌরকারের দল।

অঙ্গিরা দেখতে পেল পথের পাশে এক স্থানে ইতিমধ্যে কর্তিত কেশ জমা হয়ে পাহাড়ের আকার ধারণ করতে চলেছে! তাকে পাশে রেখে এগোতে যাচ্ছিল অঙ্গিরা, ঠিক সেই সময় একটা লোক তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, 'আপনি নিশ্চই বল্লভীদেশ থেকে আগত সেই যুবক? যিনি সোমেশ্বর মুদ্রার অধিকারী?'

প্রশ্ন শুনে অঙ্গিরা তাকাল সেই অপরিচিত প্রশ্নকর্তার দিকে। কৃষ্ণকায় বৃদ্ধ একজন লোক, কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা কেশরাশি, শেনপক্ষীর ঠোঁটের মতো নাসিকার নীচ থেকে দু-পাশে ঝুলে পড়া গুম্ফ, সবই দুধের মতো সাদা। তার কোমর শুভ্র বস্ত্র-খণ্ডে আবৃত, গায়ে একটা কৃষ্ণবর্ণের উড়নি। সোনার কর্ণকুণ্ডল দ্যুতি ছড়াচ্ছে সূর্যালোকে। তার বাজুবন্ধও স্বর্ণ নির্মিত। লোকটার শরীর লোল চর্মযুক্ত আর মুখমণ্ডল অসংখ্য বলিরেখাময় হলেও তার চোখের দৃষ্টি যেন অসম্ভব রকম তীক্ষ্ন ও অন্তর্ভেদী। ভালো করে লোকটাকে দেখার পর অঙ্গিরা বলল, 'হ্যাঁ, কিন্তু আপনার পরিচয়টা?'

বৃদ্ধ জবাব দিল, 'আমি নরসুন্দর অধিপতি খগেশ্বর। এই যে এখানে যত ক্ষৌরকার দেখছেন, প্রভাস পত্তনের পাঁচশত ক্ষৌরকারের অধিপতি আমি। তাদের গোষ্ঠীপতি।'

লোকটার পরিচয় জানার পর অঙ্গিরা তাকে প্রশ্ন করল, 'কিন্তু, আপনি আমার পরিচয় জানলেন কি ভাবে?' নরসুন্দর শ্রেষ্ঠ জবাব দিলেন, 'আপনার নাম যে অঙ্গিরা, আর আপনি যে প্রধান পুরোহিতের অতিথিশালায় অবস্থান করছেন সে সম্পর্কেও আমি অবগত। প্রভাসপত্তন নগরীতে বা সোমেশ্বর মন্দিরে একটা পক্ষী ডানা ঝাপটালেও সে সংবাদ আমার কর্ণগোচর হয়। এ তো তুচ্ছ ব্যাপার।' কথা শেষ করে মৃদু হাসলেন ক্ষৌরকার শিরোমণি।

অঙ্গিরা বলল, 'আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে আনন্দলাভ করলাম।'

খগেশ্বর বললেন 'এ নগরীতে আমাকে সবাই চেনে। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব থেকে শুরু করে স্বয়ং গুর্জর-নরেশ ভীমদেব পর্যন্ত। তারও মস্তক মুণ্ডন করিয়েছি আমি। কত রাজা মহারাজা-সম্রাটের-মস্তক মুণ্ডন হয়েছে আমার এ-দু'টি হাত দিয়ে তার কোনও হিসাব নেই। আপনি সমুদ্রতটে মস্তক মুণ্ডনের অভিপ্রায়ে এসেছেন নাকি সমুদ্র স্নানের অভিপ্রায়ে এসেছেন?'

অঙ্গিরা হেসে জবাব দিল, 'না, এর কোনওটার জন্যই এখানে আসিনি। আসলে মন্দির আর তার চারপাশটা ঘুরে দেখতে বেরিয়েছিলাম।'

জবাব শুনে একটু চুপ করে থেকে খগেশ্বর বললেন, 'কেমন দেখলেন মন্দির?'

অঙ্গিরা বলল, 'এত বড় কর্মযজ্ঞ, এত মানুষ আমি আগে কখনও দেখিনি! সব থেকে বিস্মিত হলাম সোমেশ্বর মহাদেবের শূন্যে ভাসমান প্রস্তর বিগ্রহ দেখে। যেন মানব জন্ম সার্থক হল আমার! এমন অলৌকিক দৃশ্য! সূর্যের আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে হাজারো মানুষের কোলাহলে, ঘণ্টাধ্বনিতে কেমন অদ্ভুতভাবে জেগে উঠল মন্দির। অথচ কাল রাতে সন্ধ্যারতির পর কেমন যেন গা-ছমঝমে নিস্তব্ধ হয়ে গেছিল মন্দির চত্বর। কোথাও কোনও শব্দ ছিল না।'

কথাটা শুনে একটা যেন আবছা হাসি ফুটে উঠল বহুদর্শী বৃদ্ধ ক্ষৌরকার শিরোমণি খগেশ্বরের ঠোঁটে।

তিনি বললেন, 'সূর্যালোকে নয়, মন্দির কিন্তু আসলে জীবন্ত হতে শুরু করে সূর্যাস্তের পর। যখন দেবদাসীরা সন্ধ্যারতির পর তাদের নৃত্যগীত সমাপ্ত করে গর্ভগৃহ চত্বর থেকে নীচে ফিরে আসে, বন্ধ হয়ে যায় গর্ভগৃহের দরজা। তারপর রাত যত গভীর হতে শুরু করে তত যেন জীবন্ত হতে থাকে। আসল প্রাণ ফিরে পেতে থাকে মন্দির। যাদের জ্ঞানচক্ষু আছে তারা তা বুঝতে পারে, অবলোকন করতে পারে।'

অঙ্গিরা প্রশ্ন করল, 'এর মানে?'

বৃদ্ধ এ কথার জবাব না দিয়ে কেমন যেন অর্থপূর্ণ হাসলেন। তারপর বললেন, 'যদি আপনার আমাকে কোনও প্রয়োজন হয় তবে জানাবেন। এ নগরীর সবকিছু আমার নখদর্পণে। এবার আমি অন্যত্র কার্য সম্পাদনে যাব।' এ কথা বলে আর কোনও বাক্যালাপ না করে হাঁটতে শুরু করলেন ক্ষৌরকার শিরোমণি।

অঙ্গিরার কেমন যেন অদ্ভুত লাগল লোকটাকে। বিশেষত তার হেঁয়ালি পূর্ণ কথাবার্তা। সে এগোল মন্দিরে ফেরার জন্য।

মন্দিরে দর্শনার্থীদের স্রোত তখনও অব্যাহত। তবে দ্বিপ্রহরে আরও একবার দেবতার উদ্দেশ্যে নৃত্যগীত প্রদর্শন করে গর্ভগৃহর দরজা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে দেবতার মধ্যাহ্নভোজ সমাপনের জন্য। দর্শনার্থীরা, পুণ্যার্থীরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে পুনর্বার গর্ভগৃহর তোরণ উন্মোচনের প্রতীক্ষাতে। গর্ভগৃহ চত্বর থেকে জনতার সারি নীচের চত্বরে নেমে অজগর সাপের মতো এঁকেবেঁকে রাজপথে চলে এসেছে।

সে সব অতিক্রম করে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে অঙ্গিরা, পৌঁছে গেল অতিথিশালার কক্ষে। ঠিক সেই সময়ই তার কক্ষের সামনে উপস্থিত হল কয়েকজন সেবায়েত। শিখাধারী, মুণ্ডিত মস্তক লোকগুলো। তার মধ্যে একজন স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত লোক আছেন। তার কানে সোনার মাকড়ি, গলায় সোনার হার, সোনার বাজুবন্ধ, হাতে খর্বাকৃতি ছড়িটাও সোনা বাঁধানো। একজন সেবায়েত লোকটার মাথায় রেশমের ছাতা ধরে আছে।

মধ্যবয়সি লোকটা নিজের পরিচয় দান করে জানালেন, 'আমি বিষধারী। মন্দিরের প্রধান সেবায়েত। বৈকালে সূর্যাস্তের পূর্বে প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব আপনার সাক্ষাৎ অভিলাষী। একজন সেবায়েত আপনাকে নিতে আসবে। আপনি প্রস্তুত থাকবেন।' অঙ্গিরাকে সংবাদটা দিয়ে অন্যত্র চলে গেলেন সেবায়েত প্রধান বিষধারী।

মধ্যাহ্নের আহার সমাপন করে বেশ কয়েক দণ্ড নিদ্রার পর অঙ্গিরার যখন নিদ্রাভঙ্গ হল তখন বাইরে দর্শনার্থীদের কোলাহল এদিনের মতো স্তিমিত হয়ে এসেছে। পুণ্যার্থীদের মন্দির প্রাকারের অভ্যন্তরে আর প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। মন্দিরের অভ্যন্তরে পুণ্যার্থীদের অবশিষ্টাংশ সোমেশ্বর মহাদেবের দর্শন লাভ করার পর মন্দির ত্যাগ করছে।

অঙ্গিরা তার কক্ষসংলগ্ন স্নানাগারে শরীর সিক্ত করে, ধৌতবস্ত্র পরিধান করে যখন কক্ষের সামনের ক্ষুদ্র চত্বরে এসে দাঁড়াল, তখন দিনের শেষ আলো মন্দিরের শীর্ষদেশে অবস্থিত স্বর্ণ কলসগুলোর গায়ে ছড়িয়ে সূর্যদেব, সমুদ্রে অবগাহন করতে চলেছেন।

সেবায়েত-প্রধান বিষধারীর কথা মতোই একজন সেবায়েত সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। অঙ্গিরাকে প্রধান পুরোহিতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেবার জন্য। অঙ্গিরাকে দেখে মৃদু মাথা ঝুঁকিয়ে সম্ভাষণ জানাল সে। অঙ্গিরা অনুসরণ করল তাকে।

দর্শনার্থী, পুণ্যার্থীদের ভিড় ফাঁকা হয়ে গেছে মন্দির প্রাকারের ভিতর। সেবায়েতের সঙ্গে সোপানশ্রেণীর সামনে অঙ্গিরা উপস্থিত হল যেখানে, সেখানে সার সার বলদে টানা শকট উপস্থিত হয়েছে। গর্ভমন্দির চত্বর থেকে ফুল, বিল্বপত্র মাথায় ঝুড়ি করে নামিয়ে এনে শকটগুলো পূর্ণ করছে সেবায়েতরা। প্রত্যহ সায়াহ্নে সমুদ্রে বিসর্জন দেওয়া হয় পুণ্যার্থীদের এসব উপাচার।

এসবের পাশ কাটিয়ে অঙ্গিরা উঠে এল গর্ভগৃহ চত্বরে। সে দেখতে পেল রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথের তত্ত্বাবধানে একদল সেবায়েত সেই দানপত্রগুলো অর্থাৎ সেই জালাগুলো থেকে মুদ্রা ও স্বর্ণখণ্ড এক স্থানে স্তুপীকৃত করেছে। বিরাট বিরাট থলেতে পরিপূর্ণ করা হচ্ছে সেসব। অঙ্গিরার সঙ্গে চোখাচোখি হতে তিনি মৃদু হাসলেন। অঙ্গিরাও মৃদু হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে মৃদু হাসল। অঙ্গিরা এরপর পৌঁছে গেল প্রধান পুরোহিতের আবাসস্থলে।

অঙ্গিরার সঙ্গী সেই সেবায়েত মৃদু ঘা দিল কক্ষের বন্ধ কপাটে। দরজা খুলে আত্মপ্রকাশ করলেন পুরোহিত-শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরারিদেব। অঙ্গিরা আর সেই সেবায়েত মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল তাকে। সেবায়েতকে ফিরে যেতে বলে অঙ্গিরাকে নিয়ে নিজ কক্ষে প্রবেশ করলেন ত্রিপুরারিদেব।

অঙ্গিরা দেখল, ত্রিপুরারিদেব, সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রধান ব্যক্তি হলেও তার কক্ষে তেমন কোনও জৌলুশ নেই। বিশ্রাম, শয়নের জন্য অতি সাধারণ শয্যা, আহারের জন্য সামান্য কিছু তৈজস, আর দু-একটি আসবাব আছে সে কক্ষে। আর দেওয়ালের গায়ের তাকগুলোতে আছে রেশম বস্ত্রে মোড়া নানা প্রাচীন পুঁথি, হিসাব রক্ষার জন্য ভুর্জপত্র ইত্যাদি। কপাট বন্ধ করলেন।

প্রধান পুরোহিত খর্বাকৃতি উচ্চতা সম্পন্ন একটা কাষ্ঠ নির্মিত চারপায়াতে অঙ্গিরাকে ইশারায় বসতে বললেন। একটু ইতস্তত করেই সেখানে বসল অঙ্গিরা। একই রকম আর একটা আসনে কয়েক হাত তফাতে অঙ্গিরার মুখোমুখি বসলেন তিনি। শ্বেতপাথরের জাফরি বসানো একটা গবাক্ষ আছে পশ্চিম দেওয়ালে। তার মধ্যে দিয়ে দিনের শেষ আলো কক্ষের মধ্যে চুঁইয়ে প্রবেশ করছে।

বেশ কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে অঙ্গিরাকে নিরীক্ষণ করার পর ত্রিপুরারিদেব জানতে চাইলেন, 'মন্দিরে থাকতে তোমার কোনও সমস্যা হচ্ছে না তো?'

অঙ্গিরা জবাব দিল 'না, প্রভু।'

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ত্রিপুরারি বললেন, 'সত্যিই তুমি তোমার পিতা-মাতার অন্তিম ইচ্ছা পালন করার জন্য এখানে এসেছ তো? আমি তোমাকে যে নির্দেশ দেব তা তুমি পালন করতে পারবে তো?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'হ্যাঁ, পারব।'

'ধরো যদি সে নির্দেশ ভয়ঙ্কর কঠিন কিছু হয়?'

অঙ্গিরা জবাব দিল 'হ্যাঁ, তাও পারব। নইলে যে আমার পিতা-মাতার মুক্তি ঘটবে না।'

'মুক্তি'—শব্দটা শুনে ত্রিপুরারিদেবের একজনের কথা মনে হল। হ্যাঁ, এ যুবকের ওপরই নির্ভর করছে তার মুক্তি। ত্রিপুরারি জানতে চাইলেন, 'তুমি তোমার পিতা-মাতার অতীত জীবন সম্পর্কে কতটুকু অবগত?'

অঙ্গিরা উত্তর দিল, 'বিশেষ কিছু নয়, শুধু জানি তারা এক সময় এই মন্দিরে বসবাস করতেন। আর এই মন্দিরের অর্থেই তারা প্রতিপালন করেছেন আমাকে।'

'কেন তারা এই চিরন্তনপীঠ পরিত্যাগ করে বল্লভীতে আশ্রয় নিয়েছিল, সে প্রসঙ্গে তারা তোমাকে কিছু জানিয়েছিল? এ সংক্রান্ত কোনও ঘটনা?'

'না,' সংক্ষিপ্ত জবাব দিল অঙ্গিরা।

অঙ্গিরার জবাব শুনে মনে মনে আশ্বস্ত হলেন প্রধান পুরোহিত। এরপর তিনি জানতে চাইলেন 'তোমার পিতা নিশ্চই তোমাকে অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছে? কোনও বিশেষ ধরনের অস্ত্রশিক্ষা?'

অঙ্গিরা যে কথাটা ক্ষৌরকার খগেশ্বরকে জানায়নি সে কথাটা এবার জানাল প্রধান পুরোহিতকে। সে বলল 'হ্যাঁ, তিনি আমাকে বিশেষ ধরনের অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছেন। শব্দভেদী বাণ নিক্ষেপ করতে পারি আমি। চোখ বন্ধ করেও অসি চালনা করতে পারি।'

পুরোহিত-শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরারিদেবের ঠোঁটের কোণে আবছা হাসি ফুটে উঠল কথাটা শুনে। তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, সে কৌশল তুমি কতটা রপ্ত করেছ সে পরীক্ষা আমি নেব।'

এরপর বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তিনি বললেন, 'সোমেশ্বর মহাদেবের সেবাতে তোমাকে এ মন্দিরে এক যুগ অর্থাৎ দ্বাদশ বর্ষ নিয়োজিত থাকতে হবে এক কঠিন দায়িত্বপূর্ণ কাজে। তারপর তোমার দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করবে তুমি। মন্দির ত্যাগ করে যে-কোনও স্থানে চলেও যেতে পারবে।'

অঙ্গিরা বলল, 'আপনি যেমন আজ্ঞা দেবেন সে নির্দেশ পালন করব আমি। কবে থেকে সে কার্যভার আমাকে গ্রহণ করতে হবে?'

প্রধান পুরোহিত একটু ভেবে নিয়ে বললেন, 'আর দুই পক্ষকাল পর পূর্ণিমা। ওই দিন তোমার মস্তক মুণ্ডণ করিয়ে ভগবান সোমেশ্বর মহাদেবের চরণে তোমাকে সমর্পণ করা হবে। আর তারও দুই পক্ষকাল পর মাঘী পূর্ণিমা। একই সঙ্গে আবার ওই দিন চন্দ্রগ্রহণও। চন্দ্রগ্রহণের দিন লক্ষ লক্ষ ভক্তর সমাগম হয় এই মন্দিরে। ওই শুভ দিন থেকে তোমার ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত করব আমি। তারপর দ্বাদশ বৎসর সে দায়িত্ব পালন করতে হবে তোমাকে।'

ত্রিপুরারিদেবের কথা শুনে অঙ্গিরা জানতে চাইল 'দেব, তবে এই মধ্যবর্তী সময়কালে আমি কি কার্য সম্পাদন করব?'

ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'মাঘী পূর্ণিমার দিন থেকে সে দায়িত্ব তোমার ওপর ন্যস্ত হবে, দ্বাদশ বৎসরব্যাপী সে দায়িত্ব পালনের জন্য তোমার এই মন্দির ত্যাগ করা চলবে না। জাগতিক সুখ ভোগের অনেক কিছু থেকেই তোমাকে বঞ্চিত থাকতে হবে ওই দীর্ঘ সময়। অবশ্য তার ফলস্বরূপ তুমি একদিন অক্ষয় স্বর্গলাভের অধিকারী হবে। তাই মধ্যবর্তী সময় তুমি তোমার ইচ্ছানুযায়ী যে-কোনও সুখ চাইলে গ্রহণ করতে পারো। নগরীর যে-কোনও অংশ পরিভ্রমণ করতে পারো।

দুই পক্ষকাল পর যে দিন তোমাকে সোমেশ্বরের চরণে নিবেদন করা হবে তার পূর্ব দিবস পর্যন্ত মৎস্য ইত্যাদি আমিষ দ্রব্যও মন্দিরের বাইরে গিয়ে গ্রহণ করতে পারো, এমনকী মন্দিরের বাইরে নগরীতে যে বারাঙ্গনারা অবস্থান করে, তাদের সঙ্গ লাভও করতে পারো। বলা যেতে পারে, এই মধ্যবর্তী সময়কাল তোমার জাগতিক সুখের জন্য নির্ধারিত। পরবর্তীতে দীর্ঘকাল সে সব সুখ থেকে বঞ্চিত থাকবে তুমি। আর এসব সুখ লাভের জন্য অর্থের অভাব হবে না তোমার।'

একটানা কথাগুলো বলে হাসলেন প্রধান পুরোহিত। তারপর বললেন, 'এবার তুমি সোমেশ্বর মহাদেবের নাম নিয়ে শপথ গ্রহণ করে বলো, আমার সঙ্গে তোমার এই কথোপকথন বাইরের পৃথিবী থেকে গোপন রাখবে তুমি। এমনকী সহপ্রধান পুরোহিতদ্বয় মল্লিকার্জুন ও নন্দিবাহনকেও আমার নির্দেশ ব্যতীত কোনও কথা ব্যক্ত করবে না।'

প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের কথা শুনে অঙ্গিরা বলল, 'আমি সোমেশ্বর মহাদেবের নামে শপথ গ্রহণ করছি যে আপনার সঙ্গে এই বাক্যালাপ গোপন রাখব আমি।'

ত্রিপুরারি বললেন, 'শপথ বাক্য মনে থাকে যেন। সোমেশ্বর মহাদেব তোমার মঙ্গল করুন।'

কথাগুলো বলে আসন ত্যাগ করে উঠে একটা কুলুঙ্গি থেকে রেশমের একটা থলি বার করলেন প্রধান পুরোহিত। অঙ্গিরাও উঠে দাঁড়াল তার আসন থেকে। ত্রিপুরারিদেব সেই রেশমের থলিটা অঙ্গিরার হস্তে সমর্পণ করে বললেন, 'এতে একশত স্বর্ণমুদ্রা আছে। আশা করি এই মুদ্রা দিয়ে এ কয়দিন তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে পারবে তুমি। প্রয়োজনবোধে আরও দেব। হ্যাঁ, কেউ যদি এই মুদ্রার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করে তবে এক্ষেত্রে তুমি বলতে পারো যে এ মুদ্রা আমি তোমাকে উপহার দিয়েছি। তবে সোমেশ্বর মুদ্রাটা কিন্তু সাবধানে রাখবে। ওটাই তোমার মন্দির নগরী পরিভ্রমণের অনুমতিপত্র। নির্দিষ্ট সময়ে ওই মুদ্রা ফিরিয়ে নেব আমি। এবার তুমি প্রস্থান করো। আপাতত বাক্যালাপ সমাপ্ত। যখন প্রয়োজনবোধ করব তখন তোমাকে সাক্ষাতের জন্য আহ্বান করব।'

পুরোহিতশ্রেষ্ঠর কথা শুনে অঙ্গিরা মাথা ঝুঁকিয়ে তাঁকে প্রণাম জানিয়ে বলল, 'যথা আজ্ঞা দেব।'

কপাটের অর্গল উন্মোচন করে ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'কিছু সময়ের মধ্যেই সন্ধ্যারতি শুরু হবে। সাধারণ পুণ্যার্থী এমনকী সাধারণ সেবায়েতদেরও এই আরতি দেখার সৌভাগ্য হয় না। সহপ্রধান পুরোহিতদ্বয়, সেবায়েত প্রধান আর নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখ্য ব্যক্তিরাই কেবলমাত্র সন্ধ্যারতি ও নৃত্যগীত দর্শন করতে পারেন। তোমাকে তা দর্শনের অনুমতি দিলাম। মন্দিরের শ্রেষ্ঠ দেবদাসীরা এসময় সোমেশ্বর মহাদেবকে নৃত্য পরিবেশন করে। ইচ্ছা হলে তুমি সোমনাথ সুন্দরীদের নৃত্য অবলোকন করে মানবজন্ম সার্থক করতে পারো।'

অঙ্গিরা মনস্থির করল, ত্রিপুরারিদেব যখন বললেনই তখন সে সন্ধ্যারতি, নৃত্যগীত অবেলোকন করবে। প্রধান পুরোহিতের কক্ষ ত্যাগ করে তাই সে এগোল গর্ভগৃহের দিকে। অন্যান্য মন্দিরকর্মী বা রক্ষীরা, সাধারণ সেবায়েতের দল ততক্ষণে তাদের কার্য সম্পাদন করে গর্ভগৃহ চত্বর ত্যাগ করে নীচে নেমে গেছে।

গর্ভগৃহের কাছে এসে কিন্তু তার সামনে বেশ কিছু নারীকে দেখতে পেল অঙ্গিরা। তারা নৃত্যগীত পারদর্শী দেবদাসী না হলেও সেবাদাসী। পুষ্প চয়ন, মালাগাঁথা, পূজার উপাচার সংগ্রহ ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত থাকে তারা। নানা আকৃতির অসংখ্য প্রদীপ সাজানো হয়েছে গর্ভগৃহর চৌকাঠের সামনে। সেবাদাসীর দল প্রদীপে তৈল সিঞ্চন করছে, কেউ-বা ধূপের পাত্র পরিপূর্ণ করছে তা প্রজ্বলনের আছে।

গর্ভগৃহর সামনে থামের ওপর ধরে থাকা ছাদ-সম্মিলিত যে অঙ্গন আছে সেখানে একটা থামের গায়ে গিয়ে দাঁড়াল অঙ্গিরা। সেখানে সহপ্রধান পুরোহিত নন্দিবাহন আর মহারক্ষী প্রধান জয়দ্রথকেও দেখতে পেল।

দেখতে পেয়ে নন্দিবাহন কিছু একটা কথা বললেন রক্ষীপ্রধানকে। তিনি অঙ্গিরার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, 'আপনাকে নীচে নেমে যাবার অনুরোধ জানাই। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ব্যতিরেকে সন্ধ্যারতির সময় কারো এখানে থাকার অনুমতি নেই।'

অঙ্গিরা জবাবে বলল, 'প্রভু ত্রিপুরারিদেব আমাকে সন্ধ্যারতি দর্শনের অনুমতি প্রদান করেছেন। তার পরামর্শে আমি সন্ধ্যারতি দর্শনে এসেছি।'

অঙ্গিরার বক্তব্য শুনে রক্ষী প্রধান মৃদু বিস্মিত হয়ে বললেন, 'আমাকে মার্জনা করবেন। তাঁর নির্দেশ সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। সন্ধ্যারতি দর্শন করুন।' কথাগুলো বলে তিনি ফিরে গিয়ে তার নির্দিষ্ট স্থানে দণ্ডায়মান হলেন।

গোধূলির শেষ আলো ছড়িয়ে সমুদ্রে ডুবে গেলেন সূর্যদেব। সেবাদাসীরা এক-এক করে প্রদীপগুলো জ্বালাতে শুরু করল। ঠিক সেই সময় গর্ভগৃহের সমুখের অঙ্গনের অপর পার্শ্বের সিঁড়ি বেয়ে সার বেঁধে উঠে আসতে লাগল দেবদাসী, সোমনাথ সুন্দরীরা। পরনে তাদের রেশমের উজ্জ্বল পোশাক, সালঙ্কারা, চন্দন চর্চিত মুখমণ্ডল, কবরী আর বাজুবন্ধতে ফুলমালার সাজ। ঘুঙুরের ছমছম শব্দে উঠে এসে অঙ্গনের একপাশে দাঁড়াল বারো জন অসামান্য রমণী। তাদের শরীরের সুগন্ধীর সুবাস বেশ কিছুটা তফাত থেকেই অনুভব করতে পারল অঙ্গিরা।

অন্ধকার নামার সঙ্গে-সঙ্গেই প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের কাজ শেষ হল। আলোকিত হয়ে উঠল গর্ভগৃহর অঙ্গন। সেই হাজার প্রদীপের আলোক শিখায় মাঝে মাঝে ঝিলিক দিয়ে উঠতে লাগল দণ্ডায়মান রূপসীদের হীরকখচিত নথ। সুবর্ণ কঙ্কন। ঘণ্টাধ্বনি হতে শুরু করল এরপর।

পুরোহিত নন্দিবাহন শাখা সম্মিলিত একটা প্রদীপ-দণ্ড তুলে নিয়ে স্তোত্র পাঠ করতে করতে গর্ভগৃহর চৌকাঠের সামনে দাঁড়িয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে আরতি শুরু করলেন। দুজন নারী জ্বলন্ত ধূপ পূর্ণ পাত্র নিয়ে দণ্ডায়মান। ঘণ্টাধ্বনি, আরতিরত পুরোহিত নন্দিবাহনের ভরাট কণ্ঠস্বরে মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ। ধূপের ধোঁয়াতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল গর্ভগৃহ চত্বর।

নন্দিবাহন তাঁর আরতি শেষ করলেন এক সময়। এবার এগিয়ে এল দেবদাসীর দল। বাইরে থেকে দেবতার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে তারা শুরু করল সম্মিলিত নৃত্য। বাদ্যযন্ত্র আর ঘুঙুরের মুর্ছনায় কেঁপে উঠতে লাগল গর্ভগৃহর অঙ্গন। সম্মিলিত নৃত্যগীতের শব্দ গর্ভগৃহর অঙ্গন থেকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল সোমেশ্বর মন্দিরের আনাচেকানাচে।

কি রূপ সেই নর্তকীদের! শরীরের কি বিভঙ্গ! কি ছন্দময় অঙ্গ সঞ্চালন! প্রদীপের আলো যেন চুঁইয়ে পড়ছে মসৃণ রেশমের আবরণে আবৃত তাদের স্তন, নিতম্ব, বাহুমূল থেকে। দেবতা ইন্দ্রের নৃত্যসভা যেন স্বর্গ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে সোমেশ্বর মহাদেবের মন্দিরে।

অঙ্গিরা বিস্মিতভাবে অবলোকন করতে লাগল এই আশ্চর্য সুন্দর নৃত্যগীত। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব যে-কোনও অতিশয়োক্তি করেননি তা বুঝতে পারল অঙ্গিরা। বেশ অনেকটা সময় ধরে দেবদাসীদের দলগত নৃত্য প্রদর্শন চলল। তারপর দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল তারা।

দুজন রমণী এসে দাঁড়াল গর্ভগৃহর প্রবেশদ্বারের সামনে। তারাও সালঙ্কারা, পুষ্পশোভিত দেবদাসী। এতক্ষণ নৃত্যগীতে অংশ নেয়নি তারা। কিন্তু, তাদের সৌন্দর্যের কাছে যেন ম্লান হয়ে গেল অন্য রূপসীরা। যেন উর্বশী আর রম্ভা এসে উপস্থিত হয়েছেন মহাদেবকে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য! তাদের একজন মধ্যযৌবনা দেবদাসীশ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা, অপরজন সদ্য যৌবনবতী নবাগতা দেবদাসী সমর্পিতা।

তাদের পরিচয় অবশ্য অঙ্গিরার জানা নেই। মাথা ঝুঁকিয়ে দেবতাকে প্রথমে প্রণাম জানাল তারা। অল্পবয়সি সদ্য যুবতীকে গর্ভগৃহের সমুখের অঙ্গনের কেন্দ্রস্থলে এনে দাঁড় করিয়ে পিছু হটে গেল তিলোত্তমা। নবাগতা দেবদাসী আজ সর্বপ্রথম এককনৃত্য পরিবেশন করবে সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে। সেই মতো তাকে তালিম দিয়েছে দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা।

বুকের কাছে তার মৃণালবাহু দুটো প্রার্থনার ভঙ্গীতে জড়ো করে কয়েক মুহূর্ত পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল সেই কন্যা। তার পরনে জরির কাজ করা পট্টবস্ত্র, রক্তিম বক্ষ বন্ধনী। মেঘ রাশির মতো কুঞ্চিত কেশদাম, কাজল, কুমকুম চন্দন শোভিত মুখমণ্ডল, ক্ষীণ কটিদেশ, ভারী নিতম্ব শোভিত সেই নারীর দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সবাই। পুরোহিত নন্দিবাহনও তার ব্যতিক্রম নন।

ধীরে ধীরে নৃত্যের ভঙ্গীতে অঙ্গ সঞ্চালন শুরু করল সেই নারী। বাদ্যযন্ত্রের তাল-লয় বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ পরিস্ফুটিত হতে শুরু করল তার নৃত্যকৌশল। অঙ্গিরা অবাক হয়ে দেখতে লাগল তাকে। এ যেন কোনও নারী নয়, অপ্সরা! এত সৌন্দর্য কি কোনও মানবীর হতে পারে!

শুধু অঙ্গিরা নয়, দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা, ত্রিপুরারিদেবের সহকারী নন্দিবাহন, রক্ষীধীশ জয়দ্রথ, যারা ইতিপূর্বে সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে বহু দেবদাসীর নৃত্যপরাঙ্গম দেখেছেন, তারাও মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল চালুক্যকন্যার নৃত্যশৈলী। ইতিপূর্বে এমন অনবদ্য নৃত্য তারাও যেন কেউ দেখেননি। মন্দিরে প্রস্তর স্তম্ভগুলোর গায়ে যত দেবতা, অক্ষর মূর্তি আছে তারাও যেন সব জীবন্ত হয়ে উঠে চেয়ে রইল তার দিকে।

এক সময় অবশ্য সমাপ্ত হল সোমনাথ সুন্দরীর নৃত্যকলা। ভূগর্ভগৃহর চৌকাঠে মাথা ছুঁইয়ে দেবতাকে শেষ প্রণাম জানিয়ে উঠে দাঁড়াবার পর তাকে আর অন্য দেবদাসীদের নিয়ে সে স্থান থেকে অন্তর্হিত হল দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা। গর্ভগৃহর দ্বার এবার বন্ধ হবে।

কিন্তু দ্বার যখন বন্ধ হল তখনও সেই নৃত্যগীতের রেশ কাটেনি অঙ্গিরার। তার কানে তখন বেজে চলেছে নিক্কণ ধ্বনি, সঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনা। চোখের সামনে ভেসে উঠছে অপ্সরা সদৃশ সেই নারীর লাবণ্য চুঁইয়ে পড়া স্নিগ্ধ মুখমণ্ডল, শরীরী বিভঙ্গ! স্তম্ভের সামনেই চিত্রার্পিত ভাবে দাঁড়িয়ে রইল সে।

গর্ভগৃহের স্বর্ণকপাট বন্ধ হয়ে গেল। এবার এই চত্বর পরিত্যাগ করতে হবে সবাইকে। প্রদীপের আলোগুলো এবার নিভু নিভু হয়ে এসেছে। অন্ধকার অপেক্ষা করছে গর্ভগৃহকে গ্রাস করে নেবার জন্য। সে স্থান পরিত্যাগ করতে লাগল সবাই। অঙ্গিরাকে একই স্থানে একই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রক্ষীপ্রধান তার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, 'এবার চত্বর ত্যাগ করতে হবে আমাদের।'

জয়দ্রথের কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে তার সঙ্গেই সোপনশ্রেণীর দিকে এগোল অঙ্গিরা। সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে নামতে জয়দ্রথকে বলল, 'কী অপূর্ব নৃত্যগীত। মানব জন্ম যেন সার্থক হল! নীলবসনা এই দেবদাসী কে? যে একক নৃত্য পরিবেশন করল?'

জয়দ্রথ জবাব দিলেন, 'ওর পূর্বাশ্রমের নাম জানা নেই। সোমেশ্বর মহাদেব প্রাপ্ত নাম—সমর্পিতা। তবে শুনেছি ওই নারী চালুক্য রাজবংশ দুহিতা। মন্দিরে নবাগতা।'

অঙ্গিরা বলল, 'যেমন সে রূপবতী, তেমনই গুণবতী। স্বর্গের অপ্সরারাও মাথা নত করবেন ওর সামনে।'

সিঁড়ির শেষ ধাপে নেমে এল তারা। নিজের বাসস্থানের দিকে এগোবার আগে মুহূর্তের জন্য হাসলেন রক্ষীপ্রধান। যুবক অঙ্গিরার উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, 'তবে মনে রাখবেন, দেবদাসীরা কিন্তু দেবতার কাছে সমর্পিত। তাদের একমাত্র আরাধ্য, একমাত্র নাথ সোমেশ্বর মহাদেব।'

অলঙ্কৃত স্তম্ভ সমন্বিত, বৃত্তাকার মর্মর পাথরের বিশাল অঙ্গনকে কেন্দ্র করে সার-সার কক্ষ-প্রকোষ্ঠ সমন্বিত এ স্থান সোমনাথ মন্দির প্রাকারের মধ্যে অবস্থান করলেও অন্য এক প্রাকার দিয়ে মন্দিরের অন্য অংশের থেকে বিচ্ছিন্ন করা আছে। মন্দিরের অন্য আবাসিকদের এ স্থানে প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ না হলেও, কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারি অথবা সহকারী পুরোহিতদ্বয়ের অনুমতি সাপেক্ষে বিশেষ প্রয়োজনে এ স্থানে প্রবেশাধিকার পায় অন্যরা।

মন্দির প্রাকারের অভ্যন্তরে মন্দির সংলগ্ন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো এ স্থান দেবদাসীদের আবাসস্থল। প্রাকার ও কক্ষ বেষ্টিত এই প্রাঙ্গণে দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমার তত্ত্বাবধানে নৃত্যগীতের তালিম নেয় দেবদাসীরা। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তর মধ্যে সে সময়টুকুতে সূর্যদেবের দহন জ্বালা সহ্য করা সম্ভব নয়, সে সময় ব্যতিরেকে বাকি সময় এ প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকে নূপুরের নিক্কণ ধ্বনি, বাদ্যযন্ত্রর শব্দ অথবা সঙ্গীতের মূর্ছনায়।

এ প্রাঙ্গণে উপযুক্ত পারদর্শী হবার পর দেবদাসীদের উপস্থিত করা হয় সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে। প্রাতঃকাল, দ্বিপ্রহর আর সায়াহ্নে দেবদাসীর উপযুক্ত সাজে সজ্জিত হয়ে প্রাঙ্গণের ঈশানকোণে যে সোপানশ্রেণী আছে তা বেয়ে গর্ভগৃহর সামনে গিয়ে উপস্থিত হয় তাদের নাথ, সোমেশ্বর মহাদেবকে তাদের নৃত্যগীত পরিবেশনের জন্য। সন্ধ্যারতি সাঙ্গ হলে দেবদাসীরা যখন ফিরে এসে আপন আপন কক্ষে প্রবেশ করে তখন নৃত্যগীত-কলহাস্য মুখরিত বিশাল এ প্রাঙ্গণে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। জনশূন্য হয়ে যায় প্রাঙ্গণ। শুধু সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে আসা নোনা বাতাস আর উর্মিমালার শব্দ পাক খায়, কেঁদে ফেরে প্রাকার বেষ্টিত এই প্রাঙ্গণে, অনেকটা ওখানকার বাসিন্দাদের হৃদয়ের মতো।

এদিনও সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে সন্ধ্যারতির নৃত্যগীত পরিবেশন করে নিজেদের কক্ষে ফিরেছে দেবদাসীরা। তারপর ঘুঙুর খুলে রেখে পোশাক পরিবর্তন করে শয্যা গ্রহণ করেছে। অন্ধকার থাকতেই ভোরের আলো ফোটার পূর্ব মুহূর্তে স্বর্ণ শিকলের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও শয্যা ত্যাগ করতে হয়। প্রস্তুতি শুরু হয় তালিম, অনুশীলনের জন্য অথবা সোমেশ্বর মহাদেবকে প্রাতঃকালীন নৃত্যগীত পরিবেশনের জন্য। সারা দিনে তিন সময়ের মধ্যে কারা কখন ভগবানের সামনে নৃত্যগীত পরিবেশন করবে তা নির্ধারণ করে দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা।

পাথুরে কক্ষটি বেশি প্রশস্ত নয়। বাহুল্য বলতে যা বোঝায় তেমন বিশেষ কিছু নেই। কাষ্ঠ নির্মিত, বস্ত্রখণ্ড সমন্বিত সাধারণ এক শয্যা আর সামান্য কিছু তৈজসপত্র রয়েছে কক্ষে। দেওয়াল গাত্রে ছোট-বড় বেশ কয়েকটি কুলুঙ্গি আছে। তার কোনওটিতে রাখা আছে মন্দির থেকে প্রাপ্ত পোশাক, ঘুঙুরের ছড়া। এ সবই অবশ্য মন্দিরের সম্পত্তি, ব্যক্তিগত কোনও জিনিস নয়। আর একটি বিশেষ কুলুঙ্গিতে চন্দনকাঠের বাক্সর মধ্যে রক্ষিত আছে সেই নীলকণ্ঠ ফুলের শুকনো মালা, দেবতার কাছে দেবদাসীদের নিজেকে সমর্পণের সাক্ষী ওই মালা। যে মালা পরানো ছিল প্রাণনাথ সোমেশ্বর মহাদেবের কণ্ঠে। নাথ নাকি ওই চন্দন পেটিকার মধ্যেই অবস্থান করেন দেবদাসীদের কক্ষে। প্রতি সন্ধ্যায় কক্ষে ফিরে এসে ওই ক্ষুদ্র পেটিকার সামনে প্রদীপ জ্বালায় দেবদাসীরা।

সে প্রদীপের আলো অনেকক্ষণ নিভে গেছে। অন্ধকার কক্ষ। সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের অস্পষ্ট শব্দ প্রাঙ্গণ অতিক্রম করে বন্ধ কপাটের ফাঁক গলে কক্ষে প্রবেশ করছে। প্রায় মধ্যরাত্রি। কোথাও আর কোনও শব্দ নেই।

মাসাধিক কাল অতিক্রান্ত সোমনাথ মন্দিরে আছে রাজশ্রী। দেবতার কাছে উৎসর্গীকৃত সে এখন। তার নামকরণ করা হয়েছে সমর্পিতা। কিন্তু মনের ভিতরে সে এখনও রাজশ্রী থেকে সমর্পিতা হয়ে উঠতে পারছে না কিছুতেই।

সোমেশ্বরের কাছে আত্মনিবেদনের পর নবজন্ম লাভ হয় দেবদাসীদের। পূর্ব জন্মের অর্থাৎ ফেলে আসা জীবনের কথা এখন মনে আনা নাকি পাপ! তেমনই তো বলে অন্যরা। কিন্তু কিছুতেই ভুলতে পারছে না ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। বিশেষত, দিনশেষে এই নিস্তব্ধ রাত্রিগুলোতে সে যখন একা থাকে তখন তার নিজেকে বড় বেশি রাজশ্রী বলে মনে হয়।

ঘুম আসতে চায় না রাজশ্রীর। ঠিক যেমন আজও আসছে না। চালুক্য রাজপরিবারে জন্ম হলেও সে অর্থে রাজকন্যা সে ছিল না। চালুক্য রাজ অম্বুজ তার খুল্লতাত। তারও একটি কন্যা আছে। যদিও তিনিই রাজশ্রীকে তুলে দিয়েছেন সোমেশ্বর মন্দিরে দেবদাসী হবার জন্য।

এর আগে চালুক্য সিংহাসনের অধিপতি ছিলেন রাজশ্রীর পিতামহ ভদ্রসেন। দুই পুত্র ছিল তাঁর। জ্যেষ্ঠ, রাজশ্রীর পিতা অম্বরীষ, কনিষ্ঠ পুত্র অম্বুজ। চালুক্যরাজ ভদ্রসেনের বানপ্রস্থ লাভের পর সিংহাসনে বসার কথা ছিল জ্যেষ্ঠ পুত্র অম্বরীষের। সে ক্ষেত্রে রাজশ্রী হতো রাজকন্যা। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। অভিষেকের কিছু দিন পূর্বে অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীদের হাতে সস্ত্রীক নিহত হলেন অম্বরীষ। কাজেই সিংহাসনে বসলেন অম্বুজ।

রাজশ্রীর পিতা-মাতার যখন মৃত্যু হয় তখন রাজশ্রীর মাত্র পাঁচ বৎসর বয়স। একথা ঠিকই যে রাজপ্রাসাদের এক কোণে বেশ কিছুটা অবহেলাতেই ধাই আর পরিচারিকাদের তত্ত্বাবধানেই সে বড় হয়ে উঠেছিল, তবুও সেখানে উন্মুক্ত বাতাস ছিল, চার দেওয়ালের মধ্যে এমন ঘেরাটোপে আটতে থাকতে হতো না তাকে। প্রাসাদের বাইরে কাছেপিঠে শিবিকাতে চেপে ভ্রমণের অনুমতিও ছিল তার। ছিল চেনা মানুষেরা।

তাদের কেউ কেউ রাজশ্রীর প্রতি সমব্যথীও ছিলেন। যেমন বুড়ি ধাই কিস্কিন্ধ্যা। আর এই প্রাকারবেষ্টিত মন্দির, চারপাশে বহু মানুষজন কাউকেই তার আপন বলে মনে হয় না। অথচ এখানে আসার পর কেউ কোনও ধরনের দুর্ব্যবহার করেনি তার সঙ্গে। কিন্তু রাজশ্রীর কেন জানি মনে হয়, এখানে কেউ কারো নয়। সবাই সহাস্য বাক্যালাপ করলেও আসলে এখানকার সব কিছুই এক অদৃশ্য প্রাণহীন কঠোর অনুশাসনে মোড়া। এখানে সে সারাজীবন কাটাবে কীভাবে? অথচ এটাই কঠিন বাস্তব।

সে এখন দেবদাসী, তার নাথ হলেন সোমনাথ। তিনিই এখন তার একমাত্র আরাধ্য। এই দেবদাসীদের আবাসস্থলই তার জীবনের শেষ আশ্রয়। তার স্বর্গবাসের নিশ্চিত ঠিকানা। কিন্তু এই সত্যটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না রাজশ্রী।

রাজসিংহাসন বা রাজকন্যার অধিকার কোনওদিন দাবি করেনি রাজশ্রী। তাকে যে কোনওদিন এখানে আসতে হবে তাও জানা ছিল না তার। সেদিন হঠাৎই অন্ধকার রাতে প্রাসাদের একপ্রান্তে তার কক্ষের সামনে শিবিকা নিয়ে হাজির হল একদল সৈনিক। তারা তাকে জানাল, চালুক্যরাজের নির্দেশ, শিবিকাতে উঠতে হবে তাকে। রাজি না হলে বলপ্রয়োগ করা হবে।

রাজশ্রীর সেই মুহূর্তে তাদের কথা শুনে মনে হয়েছিল চালুক্যরাজ হয়তো বা তার রাজ্য থেকে বহিষ্কার করতে চাচ্ছেন রাজশ্রীকে। যাতে ভবিষ্যতে তাঁর অথবা তার মনোনীত উত্তরাধিকারীর সিংহাসনের ওপর কারো ক্ষীণতম দাবি না থাকে সে কারণে।

প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তার ছিল না। সে উঠে বসেছিল শিবিকাতে। কাষ্ঠনির্মিত শিবিকার দ্বার বন্ধ করে গোপনে প্রাসাদ ত্যাগ করেছিল রক্ষীরা। তারপর নানা পথ অতিক্রম করে, দীর্ঘ দিবস পরে যখন শিবিকার দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল তখন প্রখর সূর্যালোকে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল রাজশ্রীর।

তাকে শিবিকা থেকে হাত ধরে বাইরে বের করল এক রূপসী নারী, দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা। তাদের কিছুটা তফাতে দণ্ডায়মান ছিলেন মুণ্ডিত মস্তক শিখাধারী সহ প্রধান পুরোহিত মল্লিকার্জুন। তখন অবশ্য তাদের কারোরই নাম পরিচয় জানা ছিল না রাজশ্রীর।

একটু ধাতস্থ হবার পর তার চোখে পড়েছিল বিশাল এক মন্দির, তার শীর্ষদেশে প্রথিত স্বর্ণকলসের মাথায় উড্ডীন জয়ধ্বজ। প্রাকারের ওপর থেকে, মন্দির চত্বর থেকে ভেসে আসছিল জনস্রোতের তীব্র গর্জন। সে সব দেখেশুনে বিস্মিত রাজশ্রী অস্ফুট স্বরে জানতে চেয়েছিল, 'এ কোন স্থান?'

তিলোত্তমা জবাব দিয়েছিল, 'এ স্থান প্রভাসপত্তনের সোমেশ্বর মন্দির। নরশ্রেষ্ঠ চালুক্যরাজ তোমাকে সমর্পণ করেছেন মন্দির কর্তৃপক্ষের নিকট। সোমেশ্বর মন্দির কর্তৃপক্ষ ও গুর্জররাজ ভীমদেব, চালুক্যরাজের এই দান গ্রহণ করেছেন।'

বিস্মিত রাজশ্রী জানতে চেয়েছিল, 'কিন্তু আমি এখানে কী করব?'

'তুমি দেবদাসী হবে। সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে নিবেদন করা হবে তোমাকে। তিনি নাথ হবেন তোমার। তাকে নৃত্যগীত পরিবেশন করবে তুমি।' জবাব দিয়েছিল তিলোত্তমা। আর সেদিনের পর থেকেই এই কক্ষ, বাইরের প্রাঙ্গন আর গর্ভগৃহর সমুখভাগে নৃত্যগীত পরিবেশনের স্থানই হল রাজশ্রীর পৃথিবী। সে আর এখন রাজশ্রী নয়। সোমেশ্বর মহাদেবের চরণে সমর্পিত দেবদাসী সমর্পিতা।

প্রদীপের আলো নিভে গেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু কিছুতেই যেন তার ঘুম আসছে না। কেমন যেন দমবন্ধ লাগছে রাজশ্রীর। তার মনে হতে লাগল অন্ধকারের মধ্যে চারপাশ থেকে পাথুরে দেওয়ালগুলো যেন এগিয়ে আসছে তাকে পিষে ফেলার জন্য! এক সময় সেই পরিস্থিতিতে থাকতে না পেরে শয্যা ত্যাগ করল সে। দরজার কপাট উন্মুক্ত করতেই এক ফালি চাঁদের আলো প্রবেশ করল কক্ষে।

একটু ইতস্তত করে সে বাইরের প্রাঙ্গনে পা রাখল। এক ঝলক শীতল বাতাস তার শরীর স্পর্শ করল। জনশূন্য প্রাঙ্গণ। চারপাশের কক্ষগুলো ঘুমিয়ে পড়েছে। আকাশের চাঁদের আলো প্রাঙ্গণের সর্বত্র প্রবেশ করছে না, স্তম্ভগুলোর পাদদেশে জমাট বাঁধা অন্ধকার। সমুদ্রের দিক থেকে জলোচ্ছ্বাসের গর্জন আর নোনা বাতাস ভেসে আসছে। সেদিকে প্রাকারের গায়ে ছোট একটি পাথরের বেদি আছে ছত্রী সমেত। সেখানে বসে অনুশীলনের সময় পরিশ্রান্ত দেবদাসীরা বিশ্রাম নেয়। সেই বেদির ওপর উঠে দাঁড়ালে প্রাকারের ওপাশে সমুদ্র দর্শন হয়।

ধীর পায়ে রাজশ্রী এগিয়ে গেল সেই বেদির দিকে। সমুদ্র গর্জন ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বেদির উপর উঠে দাঁড়িয়ে প্রাকারের বাইরে উঁকি দিল সে। চাঁদের আলোতে দৃশ্যমান মহাসমুদ্র। তরঙ্গমালা এসে তটরেখা অতিক্রম করে আছড়ে পড়ছে প্রাকারের গায়ে। তারা ভরা আকাশের নীচে সাপের মাথার মণির মতো ঢেউয়ের মাথায় চাঁদের প্রতিবিম্ব নাচতে নাচতে এগিয়ে এসে ভেঙে পড়ছে প্রাকারে। পরমুহূর্তেই আবার নতুন তরঙ্গমালা এগিয়ে আসছে চাঁদের মুকুট মাথায় নিয়ে।

কিছুটা তফাতে চাঁদের আলোতে জেগে আছে সেই পাথুরে স্তম্ভটা। তার অর্ধেকাংশ বর্তমানে জোয়ারের জলে নিমজ্জিত। রাজশ্রী এখানে আসার পর শুনেছে ওই স্তম্ভই নাকি পৃথিবীর ভূমিভাগের শেষ সীমানা! সেই স্তম্ভের দিকে তাকিয়ে রাজশ্রীর মনে হল, যৌবনে পদার্পণ করার সঙ্গে-সঙ্গেই কি বিধাতা পুরুষ ওই স্তম্ভর মতোই তাকে জীবনের প্রান্ত সীমায় পৌঁছে দিলেন?

বেশ কিছুটা সময় চন্দ্রালোকের নীচে তরঙ্গমালার দিকে চেয়ে রইল সে। সেই আদি-অন্তহীন জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আর সমুদ্রর দিক থেকে ভেসে আসা শীতল বাতাসে অঙ্গ ভিজিয়ে এক সময় মনের অস্থিরতা যেন কিছুটা প্রশমিত হল তার।

তালিম, দেবতার সমুখে সন্ধ্যারতি পরিবেশন এসবে পরিশ্রম কম হয়না শরীরের। তার ওপর আবার এদিন সন্ধ্যারতির সময় সমর্পিতার একক নৃত্য ছিল। এবার যেন ঘুম ভাবও নেমে আসতে লাগল তার চোখে। বেদি থেকে নেমে রাজশ্রী পা বাড়াল নিজের কক্ষে ফেরার জন্য।

কিন্তু কয়েক পা এগিয়ে একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। কিছুটা তফাতে প্রাকারের গায়ে মেঝের কাছে একটা বেশ বড় ছিদ্র আছে। প্রাঙ্গণের ধৌত কার্য সম্পন্ন হলে সে পথে জল প্রাঙ্গণের বাইরে নিষ্কাশিত হয়। শব্দ শুনে রাজশ্রী তাকিয়ে দেখল সে পথ দিয়ে সরিসৃপের মতো প্রবেশ করছে একটা দেহ! বুকে হেঁটে অঙ্গনে প্রবেশ করে দু-পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে।

এক নারীমূর্তি! যদিও তার মুখ অবগুণ্ঠনে আবৃত। সতর্ক দৃষ্টিতে চার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে হয়তো-বা সে প্রাঙ্গণ সংলগ্ন কোনও কক্ষর দিকে এগোতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎই তার চোখ পড়ে গেল তার হাত পাঁচেক তফাতে থামের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাজশ্রীর ওপর। তাকে দেখে যেন কেঁপে উঠল সেই নারী। হঠাৎ কোনও গোপন কার্য সম্পাদনের সময় কারো চোখে ধরা পড়ে গেলে যেমন হয়।

অবগুণ্ঠন সেই কাঁপনের ফলে সরে গেল তার মুখ থেকে। রাজশ্রী চিনতে পারল তাকে। এ নারীর সঙ্গে তেমন বাক্যালাপের সুযোগ না ঘটলেও তার সঙ্গে একদিন সম্মিলিত নৃত্য প্রদর্শন করেছে সমর্পিতা। তার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে ও একজন দেবদাসী। তার নাম উত্তরা। সে ও চিনতে পারল তাকে। বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠল, 'সমর্পিতা তুমি!'

সমর্পিতাও গভীর রাত্রে এভাবে তাকে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে দেখে কম বিস্মিত হয়নি। সে জবাব দিল, 'হ্যাঁ, আমি। ঘুম আসছিল না তাই প্রাঙ্গণে বেরিয়েছিলাম।'

একথা বলার পর সে কৌতূহল নিরসনের জন্য প্রশ্ন করল, 'তোরণ পথে প্রবেশ না করে ছিদ্রপথ দিয়ে ওভাবে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলে কেন?'

উত্তরা বুঝতে পারল এই নবাগতা সমর্পিতার চোখে সে ধরা পড়ে গেছে। তার আবির্ভাবের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে সে। একটু ইতস্তত করে উত্তরা জবাব দিল, 'তোরণ তো বন্ধ থাকে। তাছাড়া এই তোরণ তো অতিক্রম করার অনুমতি নেই কারও। ব্যতিক্রম একমাত্র দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা।'

সমর্পিতা মৃদু হেসে বলল 'ওই জল নিষ্কাশন ছিদ্রই বুঝি তবে বাইরে যাবার পথ?'

উত্তরা জবাব দিল, 'হ্যাঁ, ওই ছিদ্রই তো জীবনের সঙ্গে আমাদের একমাত্র যোগসূত্র। বেঁচে থাকার একমাত্র রাস্তা।'

সমর্পিতা মৃদু বিস্মিত ভাবে জানতে চাইলে, 'এ কথার মানে?'

উত্তরা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, 'প্রায় দশ বৎসর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে আমি এই চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ। আমার যখন দ্বাদশ বৎসর বয়স তখন অবন্তী রাজ্য থেকে এক শ্রেষ্ঠী আমাকে এক দাসের হাট থেকে ক্রয় করে গুর্জর প্রদেশে এনে উপহার দেয় রাজা কুমারপালকে। আমি ষোড়শ বর্ষে পদার্পণ করলে রাজা আমাকে সোমেশ্বর মন্দির কর্তৃপক্ষর হাতে তুলে দেয়। তারপর থেকে আমি এখানেই আছি।

অন্ধকার রাত হলেও ওই ছিদ্রপথই আমাকে বাইরের পৃথিবীর আলো দেখায়। শুধু আমি নয়, হয়তো-বা আরও কাউকে কাউকে। যারা আমার তোমার মতো বন্দি জীবন কাটাচ্ছে এখানে। ওই বহির্নির্গমনের গোপন পথ না থাকলে এতদিনে হয়তো পাগল হয়ে যেতাম। আহার গ্রহণই তো শেষ কথা নয়, মন আর শরীর বলেও তো কিছু আছে।' একটানা কথা বলে থামল উত্তরা।

সমর্পিতা বুঝল তার মধ্যে যে দমবন্ধ করা মানসিক ভাব আছে তা হয়তো এখানে সবার মধ্যে চাপা আছে। সে জানতে চাইল, 'ওই জল নির্গমনের পথ দিয়ে যে আসা-যাওয়া করা হয় তা তিলোত্তমা বা পুরোহিতরা জানেন?'

প্রশ্ন শুনে দেবদাসী উত্তরার ঠোঁটের কোণে আবছা একটা হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, 'তারা জানুন বা না জানুন, ধরা পড়লে কিন্তু নিস্তার নেই। ভয়ঙ্কর শাস্তি অপেক্ষা করে থাকে তার জন্য। একবার সেবায়েত প্রধানের হাতে ধরা পড়ে গেছিল এক দেবদাসী। যেই না সে ওই ফোঁকর গলে বাইরে বেরিয়েছে অমনি একদল সেবায়েত ধরে ফেলল তাকে। পুরোহিতরা শাস্তি বিধান করল তার। তিন দিন 'কীট কক্ষে' বাস করতে হবে তাকে।

এই চত্বরের নীচে একটা ভূগর্ভস্থ কক্ষ আছে তার নাম 'কীট কক্ষ'। বৃশ্চিক, নানা ধরনের বিষাক্ত কীট পরিপূর্ণ কক্ষ। সেখানে নামিয়ে দেওয়া হল সেই দেবদাসীকে। তিনদিন পর তাকে যখন সেখান থেকে ওপরে উঠিয়ে এনে এই চত্বরে আমাদের সামনে হাজির করা হয়েছিল, তখন তাকে দেখে শিউরে উঠেছিলাম সবাই। সারা শরীরে তার কীটের বীভৎস দংশন চিহ্ন। চোখের মণি, স্তনবৃন্ত সবই খুবলে খেয়েছে কীটের দল। মেয়েটা বাঁচেনি। বাঁচার কথাও নয়। প্রাঙ্গণে তাকে শোয়াবার পর একবার সে প্রাণভরে শ্বাস নিয়েছিল, তারপর চিরজীবনের জন্য মুক্তি পেয়েছিল এই বন্দি জীবন থেকে।'

উত্তরার কথা শুনে সেই হতভাগ্য নারীর কথা মনে করে যেন শিউরে উঠল সমর্পিতার শরীর।

সে বলল, 'তবু তোমরা বাইরে যাও?'

উত্তরা মৃদু হেসে বলল, 'হ্যাঁ, যাই। সেই ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা অবগত হওয়া সত্ত্বেও যাই। নইলে হয়তো উন্মাদ হয়ে যেতে হবে। যেমন অনেকে ইতিপূর্বে হয়েছে।'

জবাব দেবার পর উত্তরা বলল, 'এবার আমি কক্ষে প্রবেশ করি। আর কক্ষের বাইরে থাকা সমিচীন নয়। আশা করি আমাদের এই কথোপকথন অন্যদের থেকে গোপন রাখবে। তুমি নিশ্চই চাইবে না যে আমাকেও কীট কক্ষে নিক্ষেপ করা হোক?'

সমর্পিতা জবাব দিল, 'তুমি নিশ্চিত থাকো, আমাদের এই সাক্ষাৎ বা কথোপকথনের কথা কোথাও প্রকাশ পাবে না।' সমর্পিতার জবাব শুনে আশ্বস্ত হয়ে মৃদু হেসে প্রাঙ্গণ সংলগ্ন এক কক্ষের দিকে এগিয়ে নিঃশব্দে সেই কক্ষের ভিতর অদৃশ্য হল দেবদাসী উত্তরা। আর রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতাও ফিরে এল তার কক্ষে।

সোমেশ্বর মন্দিরে বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়েছে অঙ্গিরার। মন্দিরে কোনও ধরনের কর্ম সম্পাদন তাকে করতে হয় না। নিজ কক্ষে বিশ্রাম নেয়, কখনও-বা বিশাল প্রাকার বেষ্টিত নানা স্থানে ঘুরে বেড়িয়ে নানা কর্মযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে। প্রত্যুষে অথবা বৈকালে কখনও কখনও বা সে সমুদ্র তীরে যায়। তবে সূর্যাস্তের পূর্বেই আবার সে মন্দিরে ফিরে আসে। গর্ভগৃহর অঙ্গণে নিয়মিত সন্ধ্যারতি প্রত্যক্ষ করে অঙ্গিরা। মাঝে একবার একদিন নগর পরিভ্রমণেও বেরিয়ে ছিল সে। পুরাণকথিত প্রাচীন নগরী দেওপত্তন বা প্রভাসপত্তন। বলা যেতে পারে সোমেশ্বর মন্দিরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় প্রভাসপত্তনের নগর জীবন।

ছোট-বড় অন্য নানা মন্দিরও আছে প্রভাসপত্তনে। সেই মন্দিরগুলোতে নানারূপে পূজিত হন সোমেশ্বর মহাদেব। কাষ্ঠ এবং ইষ্টক নির্মিত বহু অট্টালিকা হর্ষপ্রাসাদও আছে নগরীতে। সেগুলি ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বাসস্থান। তাদের অধিকাংশই হয় সোমনাথ মন্দিরের পুরোহিত সম্প্রদায়ের মানুষ অথবা শ্রেষ্ঠী।

মন্দিরে এই শ্রেষ্ঠীকূল নানা ধরনের পণ্য সরবরাহ করেন, সোমেশ্বর মহাদেবকে দর্শনের জন্য প্রত্যহ এ নগরীতে বহিঃদেশ থেকে আসা যে বিপুল জনসমাগন হয়, তাদেরও বিভিন্ন পণ্য বিক্রয় করে তারা। অর্থাৎ নগরীর ধনাঢ্যকুল কোনও না কোনও ভাবে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত সোমেশ্বর মন্দিরের সঙ্গে।

দূর থেকে সোলাঙ্কি গুর্জর রাজার প্রাসাদও দেখেছে সে। কাষ্ঠ আর ইষ্টক নির্মিত বিশাল প্রাসাদ। স্বর্ণমণ্ডিত তার শীর্ষদেশ। কারুকাজ করা বিশাল তোরণের দু-পাশে সারবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে হস্তিযুথ। রণহস্তি সব। দূর থেকে তাদের বৃংহণ শোনা যায়। তবে পরিখা আর রক্ষীপরিবৃত গুর্জররাজ্যের প্রাসাদের কাছে সাধারণ নাগরিকদের ঘেঁষতে দেওয়া হয় না। অনেক তফাত থেকেই মানুষকে হঠিয়ে দেয় খড়গধারী, বর্ম-শিরস্ত্রাণ, চর্মপাদুকা পরিহিত রাষ্ট্রদল।

নগরীর কেন্দ্রস্থল কিন্তু বেশ ঘিঞ্জি। নানা জাতের নানা মানুষের ভিড় আর কোলাহল মণ্ডিত পথের দু-পাশে অজস্র বিপণি। স্বর্ণ, রৌপ্য ইত্যাদি মূল্যবান ধাতুখণ্ডর বিপণি থেকে শুরু করে মৃৎপাত্র, ফুল, ধূপ, পিষ্টক, নানা দ্রব্য সাজিয়ে বসে থাকে বিক্রেতারা।

জনতার ভিড় ঠেলে ঘুরে বেড়ায় মহাদেবের বাহন বিশালাকৃতির সব ষণ্ডরা। তাদের কারো কারো শৃঙ্গ আবার সোনা, রূপা ইত্যাদি মূল্যবান ধাতু দিয়ে বাঁধানো। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা তাদের মনষ্কাম পূর্ণ হলে সোমেশ্বরের বাহনের শৃঙ্গ আবৃত করে দেয় মূল্যবান স্বর্ণে। অনেক সময় এমনও হয় যে কোনও ক্ষিপ্ত ষণ্ডর শৃঙ্গের প্রচণ্ড আঘাতে কোনও পথচারীর মৃত্যু ঘটলে তার নিশ্চিত স্বর্গবাস হয়েছে মনে করা হয়।

এ নগরীতে মহাদেবের বাহন হিসাবে পূজিত হন ষণ্ডকূল। আর আছে পথপার্শ্বে অসংখ্য ভিক্ষুক-ভিক্ষুণী। অন্ধ, খঞ্জ, কুঁজো, কেউ বা কুষ্ঠরোগ- গ্রস্থ অথবা বার্ধক্যে জর্জরিত। তাদের মধ্যে যে কেউ ছদ্মরোগ বা জরাগ্রস্থ নেই তা হলফ করে বলা যায়না। পথের দুপাশে সারবেঁধে বসে সুর করে আর্তনাদ করতে করতে ভিক্ষা চায় তারা। কখনও বা আবার তারা অভিসম্পাতের ভয়ও দেখায় পুণ্যার্থীদের। মাঝে-মাঝেই মন্দিরে পূজা দিতে আসা পুণ্যার্থীদের ওপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে পুরোহিত-ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠীকুলের নিজেদের মধ্যে রাজপথে বিবাদ বিসংবাদ দেখা যায়।

ভ্রাম্যমান শান্তিরক্ষা বাহিনীর কর্মীরা সে সব বিবাদ-বিসংবাদ, গোষ্ঠী-কলহ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রয়োজনে যষ্ঠী সঞ্চালনও করে জনতাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে। মূল নগরীর হম্যরাজির আড়ালে নাকি বিত্তহীন মানুষদের পর্ণকুটিরগুলি অবস্থিত। সে সব অবশ্য দেখা হয়নি অঙ্গিরার। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের থেকেও আর কোন ডাক আসেনি তার।

সেদিন বৈকালে অঙ্গিরার যখন ঘুম ভাঙল তখন সমুদ্রের বুকে সূর্য ঢলতে শুরু করেছে। সন্ধ্যারতি দেখতে যেতে হবে তাকে। কিন্তু তা আরম্ভ হতে বেশ কিছু বিলম্ব আছে। অঙ্গিরার অস্ত্র-বর্ম তাকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। ধনুকটা নিয়ে পরীক্ষা করতে বসল যে। ছিলাতে মৃদু টান দিতেই তার টঙ্কারে বদ্ধ কক্ষে গুরু গম্ভীর নাদের সৃষ্টি হল। ধনুকটা হাতে নিয়ে অঙ্গিরা ভাবল, প্রধান পুরোহিত তাকে কবে অস্ত্র পরীক্ষার জন্য ডাকবেন? তা ছাড়া বল্লভী থেকে চিরন্তনপীঠে যাত্রা করার পর একদিনের জন্যও অস্ত্র অনুশীলন করার সুযোগ পায়নি সে। সেটাও করা প্রয়োজন। প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে নিজেই সাক্ষাৎ করে তার অস্ত্র অনুশীলনের জন্য একটি স্থান নির্বাচন করে দেবার আবেদন জানাবে। বিশাল মন্দির চত্বরে প্রাকারের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি ছোট-বড় কানন বা উন্মুক্ত অঞ্চল আছে যেখানে বহিরাগতরা প্রবেশ করে না। অস্ত্র-অনুশীলনের তেমন কোনও স্থান যদি প্রধান পুরোহিত নির্দিষ্ট করে দেন।

ব্যাপারটা হয়তো নিছকই কাকতালীয়, কিন্তু একথা ভাবতে ভাবতেই বাইরে থেকে কপাটে আঘাতের শব্দ শোনা গেল। ধনুক নামিয়ে রেখে দ্বার উন্মোচন করে অঙ্গিরা দেখল সেবায়েত প্রধান উপস্থিত হয়েছেন সেখানে। তিনি তাকে বললেন, 'প্রধান পুরোহিত আপনাকে এখন আজ্ঞা দিয়েছেন।'

পোশাক পরিবর্তন করে সেবায়েত প্রধান বিষধারীর সঙ্গে পুরোহিতশ্রেষ্ঠর নির্দেশ পালনে চলল অঙ্গিরা। কক্ষের দ্বার উন্মোচন করলেন ত্রিপুরারিদেব। বিষধারী, যুবককে প্রধান পুরোহিতের কাছে সমর্পণ করে অন্যত্র চলে গেলেন। ত্রিপুরারিদেবকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম জানিয়ে তার কক্ষে প্রবেশ করল অঙ্গিরা। আগের দিনের মতোই দোর বন্ধ করে মুখোমুখি বসলেন তারা। পুরোহিতশ্রেষ্ঠ প্রথমে তার কাছে জানতে চাইলেন, 'এখানে থাকতে তোমার কোনওরূপ সমস্যা হচ্ছে না তো? অর্থের আর প্রয়োজন আছে কি?'

অঙ্গিরা হেসে জবাব দিল, 'না, কোনওরূপ সমস্যার সম্মুখীন হইনি প্রভু। আর আপনি যে অর্থ আমাকে প্রদান করেছেন তার সম্পূর্ণটাই আমার কাছে রয়ে গেছে। তা ব্যয় করার কোনও উপায় খুঁজে পাইনি। আমার সামান্য যেটুকু প্রয়োজন তা সবকিছুই তো সেবায়েতরা আমার কক্ষে পৌঁছে দেন।'

অঙ্গিরার জবাব শুনে পুরোহিতশ্রেষ্ঠ মৃদু হাসলেন। এরপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, আর একটি সপ্তাহ পর পূর্ণিমা। তোমাকে তো বলেইছি যে ওই দিন তোমার মস্তক মুণ্ডণ করে দেবতার কাছে তোমাকে উৎসর্গ করা হবে। তার আগে আমি তোমার ধনুর্বাণ-বিদ্যার সেই কৌশল চাক্ষুষ করতে চাই। যে দায়িত্ব তোমার ওপর অর্পিত হতে চলেছে, সে কাজের দায়িত্ব অর্পণের পূর্বে আমার একবার সেই বিশেষ অস্ত্রবিদ্যায় তোমার পারদর্শিতা পরীক্ষা করে নেওয়া প্রয়োজন। কাল মধ্যযামে আমি সে পরীক্ষা গ্রহণ করব। তুমি প্রস্তুত থেকো। নির্দিষ্ট সময় আমি তোমার কক্ষে উপস্থিত হব।'

প্রধান পুরোহিতের কথা শুনে অঙ্গিরা বললেন, 'আপনি যেমন আজ্ঞা করবেন দেব। আমি প্রস্তুত থাকব। আপনার কাছে আমার একটা নিবেদনও আছে। আমার তিরন্দাজি অনুশীলনের জন্য আপনি যদি কোনও স্থান নির্বাচন করে দেন তবে উপকৃত হই।'

ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'হ্যাঁ, সে স্থানও আমি নির্বাচন করে দেব রাত্রিতেই। যাতে তোমার কার্যভার গ্রহণের পূর্বে নিজেকে যথাসম্ভব অস্ত্রচালনাতে দক্ষ করে তুলতে পারো তুমি।'

এ কথা বলার পর ত্রিপুরারিদেব আরও কিছু কথা বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু ঠিক সেই সময় কক্ষের মধ্যে ঘণ্টাধ্বনির শব্দ হলো। কক্ষে তো তারা দুজন ব্যতীত অন্য কেউ নেই, তবে ঘণ্টাধ্বনি হচ্ছে কী ভাবে? থেমে থেমে বেজে উঠছে শব্দটা।

অঙ্গিরা বিস্মিতভাবে চারপাশে তাকিয়ে সেই শব্দের উৎস আবিষ্কার করে ফেলল। কক্ষের একপাশের দেওয়ালের মাথার দিকের এককোণে ঝোলানো আছে একটা ক্ষুদ্রাকৃতি ঘণ্টা। সেটাই কেঁপে কেঁপে বেজে উঠছে। রজ্জুবাহিত সেই ঘণ্টার রজ্জুতে বাইরে থেকে টান দিচ্ছে কেউ। ঘণ্টা বাজছে। ত্রিপুরারিদেবও কথা থামিয়ে চেয়ে আছেন সেই ঘণ্টার দিকেই।

নিজের অজান্তেই যেন অঙ্গিরা প্রশ্ন করে বসল, 'ও কীসের ঘণ্টা?'

অঙ্গিরার প্রশ্ন শুনে যেন সম্বিত ফিরল ত্রিপুরারিদেবের। অঙ্গিরার মনে হল প্রধান পুরোহিতের মুখমণ্ডলে মুহূর্তের জন্য কেমন যেন অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠল। তিনি অঙ্গিরার প্রশ্নর সরাসরি কোনও জবাব না দিয়ে বললেন, 'এই ঘণ্টাধ্বনির বিষয়টা তেমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। এবার তুমি যাও। আগামী রাত্রির ব্যাপারটা সম্বন্ধে তোমাকে অবগত করার জন্যই তোমাকে আহ্বান জানিয়েছিলাম।' এই বলে আসন ত্যাগ করে দ্বার উন্মুক্ত করলেন প্রধান পুরোহিত। তাকে প্রণাম জানিয়ে কক্ষত্যাগ করল অঙ্গিরা। ত্রিপুরারিদেব কপাট বন্ধ করলেন ঠিকই, কিন্তু অঙ্গিরা বাইরে থেকে শুনতে পেল কক্ষের ভিতর অস্থির ভাবে বেজে চলেছে সে ঘণ্টা।

কিছু সময় পরই সন্ধ্যারতি শুরু হবে। নিজ কক্ষে ফিরে এখন আর কোনও কার্য নেই। অঙ্গিরা তাই নীচে না নেমে এগোল গর্ভগৃহ চত্বরের দিকে। পুণ্যার্থীদের দল চত্বর থেকে নীচে নেমে গেছে। রয়েছে শুধু কিছু কর্মরত সেবায়েত আর রক্ষীদের দল। অঙ্গিরা এগোচ্ছিল সেই স্থান দিয়ে যেখানে পুণ্যার্থীদের দানসামগ্রী, মুদ্রা ইত্যাদি থলেবন্দি করা হচ্ছিল। রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথ সে কাজের তত্ত্বাবধান করছিলেন। তাকে দেখে থামল অঙ্গিরা। কুশল বিনিময়ের পর জয়দ্রথ বললেন, 'সন্ধ্যারতি দর্শনে যাচ্ছেন তো? কিছু সময়ের মধ্যে আমিও আসছি।'

এ কথা বলার পর তিনি বললেন, 'আপনাকে একটা জিনিস দেখাই। এই দেখুন।' কর উন্মুক্ত করলেন জয়দ্রথ। তার তালুতে রাখা বেশ বড় একটা স্ফটিক খণ্ডর মতো দেখতে জিনিস। তবে তার ঔজ্জ্বল্য স্ফটিক খণ্ডর থেকে বেশি।

অঙ্গিরা বলল, 'কী এটা? বিশেষ ধরনের স্ফটিক?'

রক্ষীপ্রধান হেসে জবাব দিলেন, 'স্ফটিক নয়, পল না কাটা হীরক খণ্ড।'

এ জিনিস আগে দেখেনি অঙ্গিরা। বিস্মিতভাবে হীরক খণ্ডর দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরা জানতে চাইল, 'এই দুর্মূল্য জিনিস কে দান করলেন?'

জয়দ্রথ জবাব দিলেন, 'জানা নেই। কত মানুষই তো আসেন। তাদের মধ্যে অনেকে দেবতাকে যা উৎসর্গ করেন তা অন্যকে জানতে দিতে চান না। তেমনই কেউ এই হীরক খণ্ড দানপাত্রে ফেলে গেছেন। এটা এবার প্রধান পুরোহিতের কাছে জমা দেব। তিনি নির্দিষ্ট স্থানে এটি গচ্ছিত রাখবেন।' কথাগুলো বলে রক্ষীপ্রধান পা বাড়াল সেদিকে, যেদিকে প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের বাসস্থান। আর অঙ্গিরাও গিয়ে উপস্থিত হল গর্ভগৃহর কাছে। সহপ্রধান পুরোহিত নন্দিবাহনের তত্ত্বাবধানে তখন সেখানে সন্ধ্যারতির প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে।

অঙ্গিরা একটা ব্যাপার আজকাল খেয়াল করছে, সূর্যাস্তের সময় হলেই এ স্থানে আসার জন্য কেমন জানি চঞ্চল হয়ে ওঠে তার মন! বিশেষত সমর্পিতা নাম্নি দেবদাসীর নৃত্য পরিবেশন যেন একটা ঘোর লাগিয়ে দেয় অঙ্গিরার মনে। হয়তো বা তার নৃত্যর প্রতি আকৃষ্ট হয়েই সন্ধ্যারতির সময় এখানে ছুটে আসে অঙ্গিরা।

অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রদীপ জ্বলে উঠতে শুরু করল। আলোক মালাতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগল গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণ। সেখানে উপস্থিত হতে শুরু করল বাদ্যকারের দল। তারপর তিলোত্তমার সঙ্গে উপস্থিত হল দেবদাসীর দল।

প্রদীপের আলোতে ঝলমল করছে তাদের উজ্জ্বল রেশম বস্ত্র, সোনালি জরি বসানো উদ্ধত বক্ষবন্ধনী। স্বর্ণখচিত কবরী কাঁটা। তাদের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই মৃগনাভির সৌরভে ভরে উঠল বাতাস।

সেই রূপসীদের দলের মধ্যে অঙ্গিরার চোখ খুঁজে পেল সমর্পিতাকে। দেবদাসীদের যে দলটা আজ নৃত্য প্রদর্শনের জন্য উপস্থিত হয়েছে তার একদম শেষ ভাগে একটা থামের গায়ে হাত রেখে আনত দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে সে।

অঙ্গিরা তাকে দেখে আশ্বস্ত হল। এরমধ্যে একদিন সন্ধ্যারতির সময় উপস্থিত ছিল না সমর্পিতা। অন্য নারীরা সেদিন নৃত্য পরিবেশন করলেও অঙ্গিরার যেন মনে হয়েছিল সেদিনের নৃত্য পরিবেশন কেমন যেন জৌলুশহীন। সমর্পিতার পরণে রেশমের নীলাম্বরী। নীলকণ্ঠ মহাদেবের প্রিয় রঙ।

সুগন্ধী ধূপের ধোঁয়াতে ভরে উঠল গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণ। ঘণ্টাধ্বনি শুরু হল। প্রদীপদণ্ড উঠিয়ে নিয়ে আরতি শুরু করলেন নন্দিবাহন। গর্ভগৃহ চত্বর থেকে নীচের প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়তে লাগল সেই ঘণ্টাধ্বনি আর নন্দিবাহনের গম্ভীর ভরাট গলার মন্ত্রোচ্চারণ।

ঘণ্টাধ্বনি থামল এক সময়। সন্ধ্যারতি সাঙ্গ করে নন্দিবাহন প্রদীপদণ্ড নামিয়ে রাখতেই শুরু হল নিক্কণ ধ্বনি। শুরু হল দেবদাসীর সমবেত নৃত্য। তবে সে দলের মধ্যে সমর্পিতা নেই। সে একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে স্তম্ভর গায়ে। তার দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরার মুহূর্তের জন্য মনে হল কেমন যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা তার মুখমণ্ডলে জেগে আছে!

কয়েকটি দলের সমবেত নৃত্য প্রদর্শনের পর অবশেষে গর্ভগৃহর সামনে একক নৃত্য পরিবেশনের জন্য আবির্ভূত হল সমর্পিতা। অন্য দেবদাসীরা অর্ধবৃত্ত রচনা করে ঘিরে দাঁড়াল তাকে। শুরু হলো তার নৃত্য প্রদর্শন। প্রথমে ধীর লয়ে, তারপর ক্রমশ দ্রুত হতে শুরু করল তার নৃত্য বিভঙ্গ। তার ক্ষিপ্র পদচারণা আর ঘুঙুরের শব্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল গর্ভগৃহের অঙ্গণ। যেন এ কোনও মানবশরীর নয়, ঘূর্ণায়মান এক নীল তড়িৎশিখা আবর্তিত হচ্ছে অঙ্গিরার চোখের সামনে।

শুধু অঙ্গিরাই নয়, বিমোহিত অন্য দর্শকরাও। পুরোহিত নন্দিবাহন, রক্ষী প্রধান জয়দ্রথ, সেবায়েত-প্রধান বিষধারী সবাই নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সেই অপূর্ব নৃত্যশৈলীর দিকে। নানা বিভঙ্গে অনেক সময় প্রকট হয়ে উঠছে নর্তকীর শরীরের আহ্বান। চকিতের জন্য উঁকি দিয়ে যাচ্ছে সুডৌল ডিম্বাকৃতি স্তন যুগলের মধ্যে গাঢ় বক্ষ বিভাজিকা অথবা ঘূর্ণায়মান বস্ত্র খণ্ডের আড়াল থেকে গভীর নাভিকূপ। আর তা হয়তো গোপনে কামের আগুন জাগিয়ে তুলছে কোনও কোনও পুরুষের মনে।

নারী শরীরের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তর জন্য হয়তো বা চকচক করে উঠছে কোনও পুরুষের চোখ। অঙ্গিরার অবশ্য সে-সব কিছু নয়, মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল সমর্পিতার অপূর্ব, অসামান্য নৃত্য। কিন্তু এক সময় সমর্পিতার নৃত্য সমাপ্তির পর্যায়ে পৌঁছল।

সব কিছুই তো শেষ হয় এক সময়। তার নৃত্যকলা সাঙ্গ করার আগে সমর্পিতা যখন তার পদযুগল দিয়ে শেষ বারের জন্য আঘাত হানল ভূমির পর, ঠিক সেই সময় কি যেন একটা সেদিক থেকে সবার অলক্ষে ঠিকরে এসে পড়ল কিছুটা তফাতে অঙ্গিরার গায়ে। প্রাথমিক অবস্থাতে সে ব্যাপারটা যেন ঠিক খেয়াল করেও খেয়াল করল না।

স্তব্ধ হল সমর্পিতার নৃত্য আর বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। সোমেশ্বর মহাদেবের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে অন্য দেবদাসীদের সঙ্গে সমর্পিতা গর্ভগৃহ চত্বর থেকে এগোল সেই সোপানশ্রেণীর দিকে। যে সিঁড়ি বেয়ে তাদের আবাসস্থল থেকে সন্ধ্যারতির জন্য ওপরে উঠে এসেছিল তারা। কিন্তু অঙ্গিরার মনে হতে লাগল যেন নেচেই চলেছে দেবদাসী সমর্পিতা!

অঙ্গিরার বিভ্রম যখন কাটল ততক্ষণে দেবদাসীর দল অন্তর্হিত হয়েছে মন্দির চত্বর থেকে। গর্ভগৃহর তোরণ বন্ধ করছেন সহ প্রধান-পুরোহিত নন্দিবাহন। এবার ফিরতে হবে অঙ্গিরাকে। সে এগোতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ-ই তার নজর পড়ল তার পায়ের সামনে পড়ে থাকা ক্ষুদ্রাকৃতি একটা বস্তুর ওপর। যেটা একটু আগে ছিটকে এসে পড়েছিল তার শরীরে।

ভূমি থেকে জিনিসটা কুড়িয়ে নিল সে। মৃদু শব্দ হল সেটা থেকে। একটা ঘুঙুর দানা! দেবদাসী সমর্পিতার পায়ের ঘুঙুরের ছড়া থেকে ছিন্ন হয়ে ছিটকে সেখানে এসে পড়েছে। অঙ্গিরা সেটা নিয়ে কি করবে তা বুঝে উঠতে পারল না। সে কি সেটা ফেলে দেবে, নাকি কারো হাতে সমর্পণ করবে?

তবে সেই ঘুঙুরদানা হাতে নিয়ে অঙ্গিরার মনে কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হল। এই ঘুঙুরদানাই তো কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত সংযুক্ত ছিল ওই জীবন্ত উর্বশীর শরীরের সঙ্গে! কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভাবে অঙ্গিরা দাঁড়িয়েছিল ঘুঙুরদানাটা হাতে নিয়ে।

নন্দিবাহন কপাট বন্ধ করছেন। প্রদীপের আলোগুলো নিভুনিভু হয়ে এসেছে। সবার উদ্দেশ্যে রক্ষী প্রধান জয়দ্রথের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, 'এবার সবাই এ স্থান ত্যাগ করুন।'

সে কথা শুনে অঙ্গিরা সেই ঘুঙুরদানা মুঠিতে নিয়ে সোপানশ্রেণীর দিকে এগোল নীচে নামার জন্য। কক্ষে ফিরে এল অঙ্গিরা। ঘুঙুরদানাটাকে কুলুঙ্গিতে রেখে কিছু সময় সমর্পিতা নামে সেই দেবদাসীর অপূর্ব নৃত্যর কথা ভাবতে ভাবতে বেশ কিছু সময় অতিক্রম করল। তখনও যেন তার ঘোর কাটেনি সম্পূর্ণভাবে। প্রদীপের আলোতে চিকচিক করছে কুলুঙ্গিতে রাখা ঘুঙুরদানাটা। প্রদীপের আলো যখন স্তিমিত হয়ে এল তখন রাতের আহার সাঙ্গ করে শয্যা গ্রহণ করল অঙ্গিরা। আলো নিভে গেল। বাইরে নিস্তব্ধ পৃথিবী। ঘুম নেমে এলো তার চোখে। রাত গভীর হতে শুরু করল। ঘুমের মধ্যেও সে স্বপ্ন দেখতে লাগল তার সামনে নেচে চলেছে সোমনাথ সুন্দরী সমর্পিতা।

ঠিক মধ্যরাতে কক্ষ ত্যাগ করলেন সোমেশ্বর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। অঙ্গিরার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় থেকে ক্ষুদ্র ঘণ্টাটা বহুবার বেজেছে। কিছু সময় আগেও বেজেছে। কয়েক রাত আগেইতো তিনি সাক্ষাৎ করে এসেছেন তার সঙ্গে। তাকে বুঝিয়ে এসেছেন তার মুক্তি আসন্ন। তবে সেই অন্ধকারের প্রহরীর হঠাৎ কি এমন প্রয়োজন পড়ল যে, সে অবিরত ঘণ্টাধ্বনি করে আহ্বান জানিয়ে চলেছে প্রধান পুরোহিতকে?

তিনি হাজির হলেন গর্ভগৃহর তোরণের সামনে। সেখানে দাঁড়িয়ে দ্বার উন্মোচনের আগে একবার তাকালেন চারপাশে আর নীচের চত্বরের দিকে। ঘুমন্ত মন্দির চত্বর। অন্তত আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই। আকাশে মেঘ দেখা দিচ্ছে। চাঁদ থাকলেও তাকে মাঝে মাঝে ঢেকে দিচ্ছে মেঘমালা। নীচের সুবিশাল চত্বর ঢেকে যাচ্ছে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে।

পূর্ব দিনের মতোই তিনি কুলুঙ্গি থেকে প্রদীপ আর চকমকি পাথর নিয়ে গর্ভগৃহের তোরণ উন্মোচন করে ভিতরে প্রবেশ করে কপাটের অর্গল তুলে প্রদীপ জ্বালালেন। এত রাতে কক্ষে প্রবেশের জন্য বিগ্রহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে দেওয়ালের নির্দিষ্ট স্থানে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ স্থাপন করে উন্মোচিত করলেন সুড়ঙ্গ পথ।

নামতে শুরু করলেন সুড়ঙ্গের গোলাকধাঁধা বেয়ে। ত্রিপুরারিদেব পৌঁছে গেলেন গর্ভগৃহর নীচে ভূগর্ভস্থ সেই কক্ষে। প্রত্যাশা মতোই সে কক্ষেও খেলা করছিল জমাট বাঁধা অন্ধকার। প্রদীপের মৃদু আলোতে কিছুটা অন্ধকার মুক্ত হল সেই কক্ষ। কক্ষের মাঝখানে সেই ক্ষুদ্রাকৃতির বেদির সামনে নতজানু হয়ে বসে এক পাশে প্রদীপটা নামিয়ে রেখে ধাক্কা দিলেন বেদিতে। এক পাশে সরে গেল বেদি। আত্মপ্রকাশ করল সেই গহ্বর। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার খেলা করছে সেখানে।

ত্রিপুরারিদেব ঝুঁকে পড়লেন সেই গহ্বরের মুখে। অন্ধকারের প্রহরীর উদ্দেশ্যে তিনি বললেন 'কোথায় তুমি? আমি এসেছি।'

তাঁর কথার জবাবে কোনও সাড়া মিলল না নীচের সেই অন্ধকার কক্ষ থেকে।

প্রধান পুরোহিত গলার স্বরটা আরও একটু তুলে বললেন, 'আমি এসেছি। প্রহরী তুমি কোথায়?'

আশ্চর্যজনক ভাবে এবারও ত্রিপুরারিদেবের প্রশ্নের কোনও জবাব মিলল না। তাঁর কথা সেই অন্ধকার ভূগর্ভস্থ কক্ষে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল।

তবে কি অন্ধকারের প্রহরী নিদ্রামগ্ন, নাকি অসুস্থ হয়ে বাকশক্তি রোহিত বা সংজ্ঞা হারিয়েছেন? এই শেষ ভাবনাটা মাথায় আসতেই ত্রিপুরারিদেব আশঙ্কিতভাবে বললেন, 'তুমি কি অসুস্থ? সাড়া দিচ্ছ না কেন?'

আর এর পরই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। উত্তর নয়, গহ্বরের অন্ধকার থেকে প্রবল ধাক্কাতে ত্রিপুরারিদেবকে ছিটকে এক পাশে ফেলে দিয়ে এক লাফে বাইরে বেরিয়ে এল সেই অন্ধকারের প্রহরী! ত্রিপুরারিদেবের শরীরের আঘাতে প্রদীপটা কাত হয়ে পড়ে নিভে যাবার আগে দপদপ করছে। সেই আলোতে ত্রিপুরারিদেব কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখতে পেলেন তাকে। তার পরনে শুধু কৌপিনের মতো এক টুকরো বস্ত্রখণ্ড। এক হাতে ধরা ধনুক, কাঁধে তুনির।

এ কী চেহারা হয়েছে তার! এক যুগ আগে ত্রিপুরারিদেব যে যুবককে দেখেছিলেন, তার সঙ্গে এ লোকের কোনও মিলই নেই! সারা শরীর জুড়ে অসংখ্য ঘা বেরিয়েছে তার, চামড়া ফেটে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য সাদা সাদা ক্ষত। দীর্ঘ বছর ধরে শরীর সূর্যালোক পায়নি। তার ফল। কাঁধ ছাপিয়ে পিঠে নেমেছে জট পাকানো চুল। শ্মশ্রুর অরণ্যের আড়ালে তার মুখমণ্ডল প্রায় অদৃশ্য।

এই সামান্য সময়টুকুর মধ্যেই ত্রিপুরারিদেব আরও একটা জিনিস খেয়াল করলেন, দীর্ঘদিন ছেদন না করার ফলে তার হাত-পায়ের নখগুলো ভয়ঙ্কর রকমের দীর্ঘ আর তীক্ষ্ন হয়ে উঠেছে! ঠিক যেন কোনও স্বাপদের নখ! সব মিলিয়ে এ মূর্তি যার সামনে আবির্ভূত হবে সে নিশ্চয়ই এই ভয়ঙ্কর মূর্তিকে কোনও প্রেতাত্মাই ভাববে।

প্রদীপের আলো যত ক্ষীণই হোক না কেন দীর্ঘদিন পর কোনও আলোকবিন্দু দেখে মনে হয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল লোকটার। আর এর পরই অবশ্যই আলো নিভে গিয়ে চারপাশে গাঢ় অন্ধকার নেমে এল। ত্রিপুরারিদেব সম্বিত ফিরে পেয়ে বলে উঠলেন, 'তুমি এভাবে বাইরে বেরোলে কেন?'

অন্ধকারের প্রহরী ফ্যাসফ্যাসে স্বরে জবাব দিল, 'আমি আর এক দণ্ড ওই অন্ধকূপে থাকব না।'

ত্রিপুরারিদেব তাকে শান্ত করার জন্য বললেন, 'তোমাকে তো বলেইছি তোমার মুক্তি আসন্ন। সামনেই মাঘী পূর্ণিমা, ওই দিনেই মুক্তি ঘটবে তোমার। দ্বাদশ বছর যখন অতিক্রান্ত করেছ তখন আর মাত্র কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে পারবে না? মাত্র তিন পক্ষকাল। সামনে পূর্ণিমার পরের পূর্ণিমা।'

লোকটা উত্তেজিতভাবে বলে উঠল 'না, না, আর একটা পলের জন্যও আমি থাকব না ওখানে।'

প্রধান পুরোহিত তার উদ্দেশ্য বললেন, 'জন্ম-জন্মান্তরের পুণ্যলাভের এত কাছে এসে ফিরে যাবে তুমি? বঞ্চিত হবে অক্ষয় স্বর্গলাভের থেকে?'

অন্ধকারের প্রহরী বলল, 'আমার যদি নরকবাস হয়, তবুও আর এক দণ্ড আমি ওখানে থাকব না।'

আর নরকও নিশ্চয়ই ওই অন্ধকার স্থানের থেকে বেশি ভয়ঙ্কর হবে না। মুক্তিলাভ করার জন্যই আমি আজ কৌশলে এখানে আপনাকে ডেকে এনেছিলাম। আমি এখন এ স্থান পরিত্যাগ করব।'

তার কথা শুনে ত্রিপুরারিদেব আতঙ্কিত ভাবে বলে উঠলেন, 'না, এভাবে তুমি এ স্থান ত্যাগ করতে পারোনা। তুমি সোমেশ্বর মহাদেবের নামে শপথ গ্রহণ করেছিলে, আমার নির্দেশ মেনে চলবে তুমি। আমি তোমাকে যেতে দেব না। কিছুতেই নয়। এ স্থানকে অরক্ষিত রেখে তুমি যেতে পারবে না।'

এবার এক হিমশীতল কণ্ঠস্বর শোনা গেল। সে বলল, 'আমাকে বাধা দেবার চেষ্টা করলে এই মুহূর্তেই তোমাকে আমি বধ করব ব্রাহ্মণ। অন্ধকারের মধ্যে সামান্য শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনে আমি যে বাণ নিক্ষেপ করতে পারি, নির্ভুল লয়ে অস্ত্র চালনা করতে পারি তো তোমার থেকে অধিক কেউ জানে না। এই আমি ধনুকে শর রচনা করলাম। তোমার হৃৎপিণ্ডের শব্দও আমি শুনতে পাচ্ছি। সেদিকেই লক্ষ স্থির করলাম। স্থান ত্যাগ করলেই আমার বাণ, জ্যা মুক্ত হবে। ব্রহ্মহত্যার পাপের ভয় এখন আর আমার নেই।'

তার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন ত্রিপুরারিদেব। লোকটা যে কথা বলছে, অন্ধকারে নির্ভুল লক্ষে বাণ চালাবার ক্ষমতা যে সত্যিই তার আছে তা সম্যক জানা আছে প্রধান পুরোহিতের। তা ছাড়া লোকটার কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তা বলে দিচ্ছে কাজটা সে করতে পারে। লোকটা মুক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষাতে পাগল হয়ে উঠেছে। অতএব স্তব্ধ হয়ে গেলেন ত্রিপুরারিদেব।

প্রধান পুরোহিত যে আর তাকে বাধাদান করবে না তা যেন বুঝতে পারল সেই অন্ধকারের প্রহরী। নির্বাক ত্রিপুরারিদেবের মনে হল লোকটার লঘু পদশব্দ যেন ধীরে ধীরে এগোচ্ছে ওপরে ওঠার সোপানশ্রেণীর দিকে মুক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষাতে। একটা ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে ত্রিপুরারিদেবকে। যার পরিণতি ভবিষ্যতের পথে মারাত্মক হতে পারে।

দীর্ঘক্ষণ একই স্থানে একই ভাবে বসে রইলেন ত্রিপুরারিদেব। প্রহর অতিক্রান্ত হল। তারপর এক সময় উঠে পড়লেন তিনি। না, কোথাও কোনও শব্দ নেই। অদৃশ্য হয়ে গেছে অন্ধকারের প্রহরী। হাতড়ে হাতড়ে বেদিটা ঠেলে ফোকরের মুখ বন্ধ করে ত্রিপুরারিদেব এগোলেন সোপানশ্রেণীর দিকে। চেনা পথ, তাই সে পথ ধরে ওপরে উঠে আসতে অসুবিধা হল না তার।

এক সময় গর্ভগৃহর বাইরে এসে দাঁড়ালেন প্রধান পুরোহিত। নিঃশব্দে কপাট বন্ধ করে চারপাশে তাকালেন। না, আশেপাশে কোথাও সেই অন্ধকারের প্রহরী নেই। তবে সে যে খুব সহজে এই মন্দির থেকে বাইরে যেতে পারবে না, তা জানা আছে ত্রিপুরারিদেবের। এই বিশাল মন্দিরের কোনও অংশে নিশ্চয়ই লুক্কাইত অবস্থায় থাকবে সে। সমস্যা হল তার কথা কাউকে জানানো যাবে না। তাতে গোপন ব্যাপার উন্মোচনের সম্ভাবনা আছে। এই মন্দিরের যে সব স্থানে সে আত্মগোপন করে থাকতে পারে সে সব স্থানে ত্রিপুরারিদেবকেই অনুসন্ধান চালাতে হবে তার খোঁজে। বিশেষত প্রাকারের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উপমন্দিরগুলোতে। যেখানে লোকজন বিশেষ প্রবেশ করে না, সে সব স্থানে।

গর্ভগৃহর সামনে দাঁড়িয়ে নীচের ঘুমন্ত চত্বরের দিকে চেয়ে রইলেন প্রধান পুরোহিত। শুকতারা ফুটে উঠল এক সময়। ত্রিপুরারিদেব এগিয়ে গেলেন সেই স্বর্ণ শৃঙ্খলের দিকে। ঝুঁকে পড়ে ঝমঝম শব্দে সেটা বাজাতে শুরু করলেন মন্দিরবাসীদের জাগ্রত করতে।

ঠিক একই সময় শিঙা বেজে উঠল দূরের এক মরু প্রান্তরে। সেখানেও অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করেছে। চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু অস্থায়ী ছাউনি জেগে আছে মরুভূমির বুকে। শিঙার শব্দে নিদ্রাভঙ্গ হতে শুরু করল ঘুমন্ত সৈনিকদের। তাঁবুর ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করল তারা। তিরিশ হাজার সৈনিকের এক কাফেলা মাসাধিক কাল ধরে মরুভূমি অতিক্রম করে উপস্থিত হয়েছে তার প্রান্তদেশে।

সামনেই ভারতবর্ষের হিন্দু কাফেরদের ভূখণ্ড শুরু হচ্ছে। ইতিপূর্বেও অবশ্য বহুবার তারা হানা দিয়েছে এই ভূখণ্ডে। লুঠতরাজ চালিয়েছে, বিধর্মীদের রক্তে তৃপ্ত করেছে তাদের তলোয়ার, ধ্বংস করেছে অসংখ্য স্থাপত্য, প্রাসাদ, ধর্মস্থান। তবে এবারের অভিযানের লক্ষ আরও ব্যাপক। যে জন্য সেনার সংখ্যাও অনেক বেশি।

নির্দিষ্ট লক্ষে আঘাত হানার জন্যই তারা প্রবেশ করতে চলেছে মূর্তিপূজার উপাসকদের ভারতভূমিতে। বারংবার শিঙার শব্দে, আর সূর্যোদয়ের আভাস পেয়ে চঞ্চল হয়ে উঠল সমরাস্ত্রগুলোও। ভোরের প্রথম আলো মরুভূমির বুকে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ কাঁপিয়ে একসঙ্গে হ্রেসারব করে পা ঠুকতে লাগল ঘোড়াগুলো।

কিছুটা দূরে ওই যে দেখা যাচ্ছে বিধর্মীদের মাটি, রাজপুত ভূমি। আর কিছু সময়ের মধ্যেই প্রভুদের পিঠে নিয়ে, খুরের আঘাতে ধুলোর ঝড় তুলে উন্মত্ত হিংস্র উল্লাসে সেদিকে ধাবিত হবে এই অশ্ববাহিনী। কোথাও কোন প্রতিরোধ যদি আসে তবে তাকে ক্ষমাহীন ভাবে চূর্ণ করে, পদদলিত করে মামুদশাহর বাহিনী এগোবে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে। লক্ষ্যবস্তুর কাছে উপস্থিত হতে তাদের এক চাঁদ মতো সময় লাগার কথা।

প্রতিদিনের মতোই সেদিনও সেই সোনার শিকলের শব্দেই ঘুম ভাঙল অঙ্গিরার। গতরাতে দেবদাসী সমর্পিতার কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল অঙ্গিরা। সে তাকে নিয়ে স্বপ্নও দেখেছে। ঘুম ভাঙার পর ব্যাপারটা ভেবে বেশ অবাক হল অঙ্গিরা। সমর্পিতা নামে ওই দেবদাসীর নৃত্য এভাবে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে কেন?

শিকলধ্বনির সঙ্গে সঙ্গেই জেগে উঠতে শুরু করল বাইরের পৃথিবী। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে গুঞ্জন পরিবর্তিত হল কোলাহলে। পাথরের জাফরির ফাঁক গলে একটা আলোকরেখা প্রবেশ করেছে কক্ষে। কুলুঙ্গির ওপর এসে পড়েছে সেই আলো। তাতে চিকচিক করছে সেই ঘুঙুরদানাটা।

অঙ্গিরা শয্যা ত্যাগ করার পর সে কারণেই ঘুঙুরদানাটা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। দানাটা তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে তার যেন মনে হল দানাটা সুর্বণ নির্মিত! গত রাতে আধো-অন্ধকারে ব্যাপারটা সে ঠিক বুঝতে পারেনি। দানাটা কার কাছে ফেরত দেওয়া উচিত বা আদৌ ফেরত দেবার প্রয়োজন আছে কিনা, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না অঙ্গিরা। ঘুঙুরদানাটা আবার সে যথাস্থানে রেখে দিল।

অঙ্গিরার বাইরে বেরিয়ে নির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদনের কোনও ব্যাপার নেই। তাই শয্যা ত্যাগ করলেও সে অতিথি নিবাস ত্যাগ করল বেশ অনেকটা সময় পরে। ততক্ষণে ত্রিপুরারিদেব গর্ভগৃহর দ্বারোদঘাটন করেছেন, দেবদাসীদের নৃত্যগীতও সমাপ্ত। মন্দির চত্বরে প্রবেশের জন্য বাইরে অপেক্ষারত ভক্তকূলের উদ্বেলিত জয়ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হতে শুরু করেছে।

অতিথি নিবাস থেকে বাইরে বেরিয়ে অঙ্গিরা যখন অঙ্গণ, বাগিচা ইত্যাদি অতিক্রম করে মন্দিরের প্রবেশ তোরণের সামনে উপস্থিত হল, ঠিক সেই সময়ই পুণ্যার্থীদের জন্য তোরণ উন্মুক্ত করা হল। 'জয় সোমেশ্বরের জয়! জয় সোমনাথের জয়' ধ্বনি দিতে দিতে বাঁধভাঙা স্রোতের মতো চত্বরে প্রবেশ করে মন্দিরের দিকে ধাবিত হতে লাগল সোমেশ্বর মহাদেবের ভক্তবৃন্দ। কোনক্রমে তাদের পাশ কাটিয়ে তোরণ থেকে বাইরে বেরিয়ে সমুদ্র তীরের দিকে পা বাড়াল অঙ্গিরা।

সমুদ্রতটে প্রতিদিনের মতোই পরিচিত দৃশ্য। সেখানেও পুণ্যার্থী সমাগম হতে শুরু করেছে। সার বেঁধে বসে থাকা ক্ষৌরকারদের কাছে তারা কেউ মস্তক মুণ্ডন করাচ্ছে, সমুদ্রে অবগাহন করছে অথবা ব্রাহ্মণরা তাদের দিয়ে পিণ্ডদান করাচ্ছে।

প্রচলিত ধর্মের বিশ্বাস, মৃত্যুর পর আত্মারা দেহত্যাগ করে এই সোমেশ্বর মন্দিরে সমবেত হন পুনর্জন্ম অথবা মুক্তি লাভের আগে। যিনি সোমেশ্বর, তিনিই মহাদেব, তিনিই তো আবার ভূতনাথ। তাই প্রেত সমাগম ঘটে এখানে। প্রভাসপত্তনে পিণ্ডদান করলে পূর্বপুরুষের আত্মার মুক্তি ঘটে। তাই অনেকেই এখানে পিণ্ডদান করেন।

ওই পিণ্ড ভক্ষণের জন্য বড়বড় বায়সপক্ষী ঘুরে বেড়ায় সমুদ্র তটে। অনেকের এ-ও বিশ্বাস যে প্রেতাত্মারা ওই দাঁড়কাকের রূপ ধারণ করে পিণ্ড ভক্ষণ করতে আসে।

অঙ্গিরা তার পিতা-মাতার নির্দেশ মতো তাদের পারলৌকিক কার্য সম্পাদন করেনি। তার পিতার আত্মাও কি মৃত্যুর পর এই সোমেশ্বর মন্দিরে এসে উপস্থিত হয়েছেন? বায়সপক্ষী রূপে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সমুদ্রতটে মুক্তিলাভের আশাতে? কথাটা একবার মনে হল অঙ্গিরার।

অঙ্গিরা এসবের পাশ কাটিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থানে, পৃথিবীর শেষ ভূখণ্ডে যেখানে সেই স্তম্ভটা দাঁড়িয়ে আছে, তার কাছাকাছি সমুদ্রতটে পড়ে থাকা একটা শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ডের ওপর বসল। এদিন বিকালে ত্রিপুরারিদেব তার অস্ত্রপরীক্ষা নেবেন। সে পরীক্ষাতে যে সে উত্তীর্ণ হবে সে আত্মবিশ্বাস তার আছে। তবে প্রধান পুরোহিত তাকে ঠিক কোন কঠিন দায়িত্ব অর্পণ করতে চান, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না অঙ্গিরা। এবং সে সম্পর্কে ত্রিপুরারিদেবের কাছে প্রশ্ন করা সমীচীন হবে কিনা তাও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না সে। তার চোখের সামনে কূলহীন নীল সমুদ্র। তার মাথার ওপর পাক খাচ্ছে গাঙচিলের দল। সেদিকে তাকিয়ে নানা কথা ভাবতে লাগল অঙ্গিরা।

হঠাৎ বাদ্যযন্ত্রের শব্দ কানে গেল তার। শব্দটা আসছে তার পিছনের মন্দির প্রাকার যেখানে বাঁক নিয়েছে সেদিক থেকে। অঙ্গিরা তাকাল সেদিকে। বাদ্যযন্ত্রের শব্দ ক্রমশ নিকটবর্তী হতে থাকল। তারপর বাঁকের আড়াল থেকে প্রথমে আত্মপ্রকাশ করলেন পুরোহিত মল্লিকার্জুন ও কয়েকজন সেবায়েত। সহ প্রধান পুরোহিতের মাথায় ছত্রধর ছাতা ধরে আছে। তাদের দেখে অঙ্গিরা অনুমান করল মন্দির থেকে সমুদ্রতটে নির্গমনের জন্য কোনও একটা পথ আছে বাঁকের আড়ালে।

মল্লিকার্জুনের কিছুটা তফাতে আবির্ভূত হল বাদ্যকারেরা, আর তার পিছনে নৃত্যরত দেবদাসীরা। তাদের সোনার কঙ্কণ, পায়ের নূপুর সূর্যালোকে ঝিলিক দিচ্ছে। দেবতার উদ্দেশ্যে সমুদ্র তীরে কোনও নৃত্যগীত পরিবেশিত হবে নাকি?

কৌতূহলবশত সেদিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল অঙ্গিরা। কিন্তু নৃত্যরত দেবদাসীদের পিছনে পিছনে এরপর যা প্রাকারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল তা দেখে বেশ বিস্মিত হল অঙ্গিরা। বাঁশের খাঁচায় একটা শব বহন করে আনছে কয়েকজন দেবদাসী। আর সেই শব বাহকদের ঘিরেও নৃত্য করছে আরও একদল দেবদাসী!

অগ্রবর্তী মল্লিকার্জুন এসে দাঁড়ালেন সমুদ্র কিনারে, যেখানে জল এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে সমুদ্রতট। হাতের লাঠিটা তুলে তিনি তার সামনে একটা স্থান নির্দেশ করলেন। সেখানেই শব সমেত খাঁচাটা নামিয়ে রাখা হল। নারীর শবদেহ। পরনে তার নতুন পট্টবস্ত্র। ফুলমালা শোভিত শরীর। কুমকুম চর্চিত এক নারীর মুখমণ্ডল।

ব্যাপারটা দেখে কৌতূহলী হয়ে অঙ্গিরা তাদের কিছুটা কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তাকে অবশ্য ভ্রুক্ষেপ করল না কেউ। সবারই দৃষ্টি শবদেহের ওপর নিবদ্ধ। অঙ্গিরাও ভালো করে তাকাল সেই শবদেহর দিকে। এক যুবতী নারীর দেহ।

তার পায়ে ঘুঙুর দেখে অঙ্গিরা অনুমান করল এই মৃতা রমণীও কোনও সোমনাথ সুন্দরী হবে। একটা ক্ষুদ্রাকৃতি কাষ্ঠপেটিকা তার বুকের ওপর রাখা। মৃতার দক্ষিণ হস্ত তার ওপর রাখা। যেন ওই কাষ্ঠপেটিকা বুকে চেপে ধরে আছে সে।

তাঁর দিকে তাকিয়ে মল্লিকার্জুন কি যেন বললেন দেবদাসীদের উদ্দেশ্যে। সেই শবদেহকে ঘিরে দেবদাসীরা এরপর বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে নৃত্য পরিবেশন করতে লাগল।

তার সঙ্গে সঙ্গে বাদ্যকাররা উচ্চনাদে তাদের বাদ্যযন্ত্র বাজাতে লাগল। ব্যাপারটা দেখে বেশ কিছুটা অবাক হয়ে গেল অঙ্গিরা। মৃতার প্রতি শোক প্রকাশ না করে নৃত্য পরিবেশন করছে কেন দেবদাসীরা?'

অঙ্গিরার মনে প্রশ্নটা উদয় হতেই কাকতালীয় ভাবে তার ঠিক পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল, 'এই নারী জন্মর দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি ঘটল ওর। তাই অন্য দেবদাসীরা আনন্দ প্রকাশ করছে ওর মুক্তি উপলক্ষে।'

কথাটা কানে যেতে মৃদু চমকে উঠে অঙ্গিরা দেখল তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে শনের মতো চুল আর বলিরেখাময় মুখ সমৃদ্ধ সেই নরসুন্দর শিরোমণি খগেশ্বর। আবছা হাসি লেগে আছে তার ঠোঁটের কোণে।

অঙ্গিরা জানতে চাইল, 'কি রোগে মৃত্যু হল ওর? বার্ধক্য তো গ্রাস করেনি ওকে! ওর পরিচয় কী?'

খগেশ্বর জবাব দিল, 'ওর নাম অবন্তিকা। কিছু বৎসর আগে কাশীরাজ একটি হস্তি, একটি হীরকখণ্ডসহ এই কন্যাকে মন্দিরে দান করেছিল। ধুতুরা, ধুতুরার বিষে মৃত্যু হয়েছে ওর।'

কথাটা শুনে অঙ্গিরা বিস্মিতভাবে বলল 'আত্মহত্যা?'

খগেশ্বর বলল, 'আত্মহত্যা হতে পারে, হত্যাও হতে পারে। তবে যে ভাবেই ওর মৃত্যু হোক না কেন, এ মৃত্যুর পিছনে আমার একটা অনুমান আছে। কারণ হয়তো কিছু সময়ের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যাবে।' এ কথা বলে থেমে গেল খগেশ্বর।

বেশ অনেকটা সময় ধরে শবদেহকে ঘিরে সোমনাথ সুন্দরীদের নৃত্যগীত চলল। ইতিমধ্যে মল্লিকার্জুনের অনুচররা একটা ভেলা বানিয়ে ফেলেছে। নৃত্য সমাপ্ত হলে শবের এক পাশে সারবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল দেবদাসীরা। পুরোহিতের এক পাশে মাটির ভাণ্ডে কিছু উপাচার নিয়ে দাঁড়াল কয়েকজন। ধুনো, হরিতকি, তিল, গন্ধদ্রব্য ইত্যাদি উপাচার।

মল্লিকার্জুন মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে পাত্র থেকে সে সব মুঠো করে তুলে নিয়ে বর্ষণ করতে লাগলেন মৃতদেহে। এরপর একজন অঙ্গারপূর্ণ একটা পাত্র এনে ধরল মল্লিকার্জুনের সামনে! তিনি একটা লৌহ শলাকা দিয়ে প্রথমে একটা অঙ্গারখণ্ড প্রতিস্থাপন করলেন মৃতদেহের মুখে, আর অপর একটি ক্ষুদ্রাকৃতির জ্বলন্ত অঙ্গার স্থাপন করলেন মৃতার উদরে। তাই দেখে বহুদর্শী খগেশ্বর, অঙ্গিরাকে অবাক করে চাপা স্বরে বলল, 'আমার অনুমানই ঠিক ছিল। এ রমণী সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েছিল। নইলে পুরোহিত ওর উদরে অঙ্গার স্থাপন করতেন না। এ কারণেই মরতে হল মেয়েটাকে।'

অঙ্গিরা বিস্মিতভাবে বলল, 'কিন্তু এ কীভাবে সম্ভব?'

ক্ষৌরকার দলপতি বলল, 'হ্যাঁ, সম্ভব। ওর গর্ভে ছিল রাত্রির ফসল। আপনাকে আমি বলেছিলাম না, দিনে নয়, আসলে রাত্রিতেই জেগে ওঠে এ মন্দির। কত কিছু যে ঘটে তখন!'

অঙ্গার প্রতিস্থাপনের পর একজন সেবায়েত মৃতের পায়ের কাছে ঝুঁকে পড়ে কী যেন করতে লাগল। অঙ্গিরাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেবার জন্য খগেশ্বর বলল, 'জানেন তো এই সব কন্যাদের মহাদেবের উদ্দেশ্যে সমর্পণের পর, অর্থাৎ তারা দেবদাসী হবার পর তাদের প্রত্যেককে সোমেশ্বর মহাদেবের স্পর্শ পাওয়া একটা করে ঘুঙুরদানা দেওয়া হয়। যা দেবদাসীরা তাদের পায়ের ঘুঙুর ছড়ার সঙ্গে বাঁধে। বলা যেতে পারে ওই বিশেষ ঘুঙুরদানাই সোমেশ্বর মহাদেবের সঙ্গে ওই নারীদের বন্ধন রচনা করছে। সেবায়েত সেই বিশেষ ঘুঙুরদানাটি খুলে নিচ্ছে। ওটা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই এ জন্মের মতো এ মন্দিরের সঙ্গে, সোমেশ্বর মহাদেবের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে ওর।'

সেয়াবেত কাজটা সম্পন্ন করল। ঘুঙুর দানাটা সে খুলে ফেলল মৃতার ঘুঙুর ছড়া থেকে। মৃতার পাশ থেকে সরে দাঁড়াল দেবদাসীর দল। এবার তাকে শেষ বিদায় জানাবার জন্য বুকের কাছে হাত জোড় করে দাঁড়াল দেবদাসীরা। অঙ্গিরা এবার তাদের মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারল তাদের অনেকেরই চোখের কোণে টলটল করছে অশ্রুবিন্দু।

পুরোহিত মল্লিকার্জুনের কাজ শেষ হয়ে গেছিল। কয়েকজন সেবায়েত মিলে চালি সমেত মৃতদেহটাকে ভেলার ওপর তুলে দিল। তারপর ভেলাটাকে জলে নামিয়ে ঠেলতে শুরু করল ভূভাগের শেষ সীমানাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই স্তম্ভর দিকে। ভেলা নিয়ে স্তম্ভর কাছে পৌঁছে গেল তারা। লোকগুলো কিন্তু স্তম্ভ অতিক্রম করল না। তাদের পাতাল প্রবেশের ভয় আছে। স্তম্ভর এপাশে দাঁড়িয়ে তারা ভেলাটাকে সজোরে ঠেলে দিল স্তম্ভর ওপাশে।

স্তম্ভ অতিক্রম করেই ভেলাটা বেশ কয়েকবার পাক খেল, তারপর মৃতদেহ নিয়ে উল্কার গতিতে ছুটতে শুরু করল মহাসমুদ্রের দিকে। মুক্তি ঘটল সেই হতভাগ্য অথবা ভাগ্যবতী দেবদাসীর। পুরোহিত মল্লিকার্জুন ও দেবদাসীর দল মন্দিরে প্রবেশের জন্য পা বাড়াল।

সকালবেলাই এ ঘটনাটা দেখে অঙ্গিরার মন কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে গেল। সে স্থানে থাকার আর ইচ্ছা রইল না তার। তা ছাড়া একটা বড় তীর্থযাত্রীর দলকেও সেদিকে আসতে দেখল অঙ্গিরা। সে পাশে দাঁড়ানো খগেশ্বরকে বলল, 'এবার আমাকে ফিরতে হবে।'

খগেশ্বর বলল, 'আমাকেও কার্যোপলক্ষে মন্দিরে প্রবেশ করতে হবে। চলুন তবে একত্রে যাই।'

দুজনে এক সঙ্গে পা বাড়াল মন্দিরে যাবার জন্য। পথে যেতে যেতে খগেশ্বর বলল, 'সব দেবদাসীদের শেষ পরিণতি কিন্তু এটাই। সমুদ্রতে ভেসে যাওয়া, এভাবেই তাদের অন্ত্যেষ্টি কার্য সম্পন্ন হয়।'

এ কথা বলার পর খগেশ্বর হঠাৎ বলল, 'এক নতুন দেবদাসী, ওই যে প্রধান পুরোহিত যাঁর নাম রেখেছেন 'সমর্পিতা', তার রূপের কথা, নাচের কথা আজকাল অনেকেই আলোচনা করছেন। কেউ কেউ বলছেন যে ওই মেয়েটির নাকি ভবিষ্যতে দেবদাসীশ্রেষ্ঠা তিলোত্তমার স্থলাভিষিক্ত হবার প্রবল সম্ভাবনা। আমি তার নৃত্য না দেখলেও তাকে দেখেছি। ওদের বাসস্থানে মাঝে মাঝে নখর ছেদনের জন্য যেতে হয় আমাকে। তখনই দেখেছি। আপনি তাকে দেখেছেন? তার নৃত্য দেখেছেন? আমার অবশ্য তার নৃত্য দেখার সৌভাগ্য হয়নি।'

চলতে চলতে অঙ্গিরা একটু ইতস্তত ভাবে জবাব দিল, 'হ্যাঁ, দেখেছি। সন্ধ্যারতির সময় সে নৃত্য পরিবেশন করে। সত্যি, অতীব সুন্দর সেই নৃত্য বিভঙ্গ।'

কথাটা শুনে ক্ষৌরকার অধিপতি বলল, 'যার কাছে সোমেশ্বর মুদ্রা আছে সে তো সর্বত্রগামী।'

অঙ্গিরা বলল, 'সন্ধ্যারতি দর্শনের জন্য প্রধান পুরোহিত আমাকে বিশেষ অনুমতি দিয়েছেন।'

বৃদ্ধ খগেশ্বর বললেন, 'আপনার সম্বন্ধে একটা ব্যাপারে খুব কৌতূহল হচ্ছে। সোমেশ্বর মুদ্রা তো সকলের কাছে থাকে না! অন্য যাদের কাছে এখানে সোমেশ্বর মুদ্রা আছে তাদের অনেককেই চিনি। তাদের কেউ হয়তো মন্দিরের কোনও অংশ নির্মাণে প্রভূত অর্থ ব্যয় করেছেন, কেউ বা তীর্থযাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পান্থশালা নির্মাণের মতো জনহিতকর কার্য সম্পাদন করেছেন, কেউ-বা কোনও দুর্যোগ থেকে রক্ষা করেছেন মন্দিরকে, নিদেনপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে মন্দিরের সেবা করেছেন বা একনিষ্ঠ ভাবে পালন করেছেন মন্দিরের কোনও গুরুদায়িত্ব। তারপর তারা হস্তগত করেছেন সেই মুদ্রা। বয়সে তারা অধিকাংশই বৃদ্ধ অথবা নিদেনপক্ষে প্রৌঢ়। কিন্তু আপনার মতো তরুণ এই দুর্মূল্য মুদ্রা কীভাবে সংগ্রহ করলেন তা জানতে আগ্রহবোধ করছি।'

অঙ্গিরা বলল, 'এ মুদ্রা আমার পিতা-মাতার নিকট থেকে প্রাপ্ত।'

জবাব শুনে খগেশ্বর বলল, 'কোথায় থাকেন তারা? নিশ্চয়ই তাঁরা কোনও না কোনও ভাবে মন্দিরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন বা আছেন?'

অঙ্গিরা বলল, 'তারা বল্লভী নগরীতেই থাকতেন। কিছু মাস পূর্বে তারা প্রয়াত হন। তবে এক সময় তারা এই মন্দিরে ছিলেন বলে শুনেছি।'

অঙ্গিরার কথা শুনে খগেশ্বর বলল, 'কী নাম তাদের? হয়তো আমি তাদের চিনব।'

কথা বলতে বলতে কথার ভিতর জড়িয়ে যাচ্ছে অঙ্গিরা। বিস্তারিত আত্মপরিচয় লোকটার কাছে প্রকাশ করা উচিত হচ্ছে কিনা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। তবু সে জবাব দিল, পিতার নাম মারীচ, মাতা অম্বালিকা।'

খগেশ্বর বিড় বিড় করে নাম দুটো উচ্চারণ করে তার শনের মতো চুলে হাত বুলিয়ে বলল, 'না, ঠিক মনে আসছে না। বৃদ্ধ হয়েছি তো। মাঝে মাঝে স্মৃতিশক্তি লোপ পায়।' এ কথা বলার পর খগেশ্বর আর কোনও কিছু বলল না। নিশ্চুপ ভাবে হাঁটতে হাঁটতে সে মনে হয় ভাবার চেষ্টা করতে লাগল ও নাম দুটি সম্পর্কে কোনও কথা মনে পড়ে কিনা।

কিছু সময়ের মধ্যেই ভিড় ঠেলে মন্দিরে প্রবেশ করল তারা। নাপিত শিরোমণি, অঙ্গিরার কাছে বিদায় নিয়ে নিজের কর্মোপলক্ষে অন্যদিকে চলে গেল। আর অঙ্গিরা ফিরে এল অতিথিশালাতে। দ্বিপ্রহরে স্নানাহার সাঙ্গ করার পর নিজের অস্ত্রগুলো নিয়ে তাদের পরিচর্যায় বসল সে। ভালো করে ধনুকের ছিলা বন্ধন করল। তিরের ফলাগুলো ও তরবারি কোষমুক্ত করে পাথর খণ্ডে ঘষে ঘষে আরও তীক্ষ্ন আর ধারালো করে তুলল।

বিকাল হয়ে এল। অঙ্গিরার মন চঞ্চল হতে শুরু হল। সন্ধারতির সময় হয়ে আসছে। অঙ্গিরার চোখ পড়ল কুলঙ্গিতে রাখা ঘুঙুরদানার ওপর। পোশাক পরিবর্তন করে মন্দিরের গর্ভগৃহতে যাবার জন্য প্রস্তুত হল সে।

ঠিক সেই সময়তেই নিজের কক্ষে ফুলমালা পট্টবস্ত্রে সজ্জিত হচ্ছিল সমর্পিতা বা রাজশ্রী। এক তীব্র বিষণ্ণতা ছেয়ে আছে তার মনকে। যে দেবদাসীর মৃত্যু ঘটেছে তার সঙ্গে সমর্পিতার সখ্য না থাকলেও তার মৃত্যু বিষাদগ্রস্ত করে তুলেছে তাকে। তার জীবনের শেষ পরিণতি কি অমন কিছুই? তাকেও কি দেবদাসী অবন্তিকার মতো ভেসে যেতে হবে, হারিয়ে যেতে হবে সমুদ্রের বুকে?

বাইরে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। সন্ধ্যারতিতে নৃত্য পরিবেশনে যাবার জন্য সমবেত হচ্ছে দেবদাসীরা। বাইরে থেকে তাদের কলহাস্যর মৃদু শব্দ আর নূপুর ধ্বনি ভেসে আসছে। মন যতই বিষণ্ণ হোক না কেন তাকে নৃত্য পরিবেশন করতে যেতে হবে, সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে।

প্রস্তুতির অন্তিম পর্বে পায়ে ঘুঙুর বাঁধতে বসল সমর্পিতা। হঠাৎই সে খেয়াল করল তার একটি ঘুঙুর ছড়ার মধ্যে সেই স্বর্ণ ঘুঙুরদানাটা নেই! যে ঘুঙুরদানা তাকে দেবদাসী রূপে গ্রহণ করার পর তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কোথায় গেল সেটা?

সমর্পিতা কক্ষের মধ্যে খুঁজতে লাগল। সে যে কুলুঙ্গিতে ঘুঙুরছড়া রাখে, ঘরের মেঝে বা শয্যায় কোথাও সেটা পড়ে নেই। ঘুঙুরছড়া হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে সমর্পিতা ভাবতে লাগল কোথায় খসে পড়ে থাকতে পারে সেটা? গর্ভগৃহ চত্বরে, নাকি সেখানে যাওয়া আসার পথে কোনও স্থানে?

ঠিক সেই সময় কক্ষে প্রবেশ করল দেবদাসী উত্তরা। সমর্পিতার কক্ষ ত্যাগে বিলম্ব হচ্ছে বলে সে তাকে ডাকতে এসেছে। চিন্তান্বিত মুখে সমর্পিতাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল, 'তোমার শরীর খারাপ নাকি?'

সমর্পিতা জবাব দিল, 'না, শরীর ঠিক আছে।'

উত্তরা বলল, 'তবে তোমাকে চিন্তাক্লিষ্ট লাগছে কেন?'

সমর্পিতা ইতস্তত করে জবাব দিল, 'সেই সোনার ঘুঙুরদানা যেটা আমাকে দেওয়া হয়েছিল সেটা ছড়ার মধ্যে নেই। কোথাও খুলে পড়েছে ছড়া থেকে।'

কথাটা শুনেই উত্তরা চাপা স্বরে বলে উঠল, 'ওটা খুঁজে না পেলে তোমার বিপদ হবে। ওই ঘুঙুর পায়ে না থাকলে সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে নৃত্য পরিবেশন করতে দেওয়া হয় না দেবদাসীদের। এক বৎসরকাল দেবদাসীদের তখন অন্য দেবদাসীদের পরিচারিকার কাজ করতে হয় ঘুঙুর হারিয়ে ফেলার শাস্তি হিসাবে। তারপর প্রধান পুরোহিত যদি মনে করেন যে তাকে নতুন ঘুঙুরদানা দেবেন, তবে সে আবার দেবদাসীর পূর্ণ মর্যাদা ফিরে পায়। নচেৎ বাকি জীবনটা তাকে পরিচারিকা হিসাবেই কাটাতে হয়।'

উত্তরার কথা শুনে সমর্পিতা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বলল, 'তবে কি হবে?'

একটু ভেবে নিয়ে উত্তরা বলল, 'ব্যাপারটা কাউকে জানানোর দরকার নেই। কারোর খেয়াল না করারই কথা তোমার ঘুঙুরের ছড়াতে যে সেটা নেই। দেখি তোমার জন্য একটা অমন ঘুঙুরদানা জোগাড় করতে পারি কিনা?' সমর্পিতা জিগ্যেস করল 'কী ভাবে তুমি তা জোগাড় করবে?'

উত্তরা বলল, 'আমি রাতে যার কাছে অভিসারে যাই, তাকে অমন একটা দানা বানিয়ে দিতে বলব। এখন তাড়াতাড়ি বাইরে চলো। নইলে তিলোত্তমার মনে সন্দেহের উদ্রেক ঘটবে।'

উত্তরার কথা শুনে এরপর দ্রুত ঘুঙুরছড়া পায়ে বেঁধে কক্ষত্যাগ করল সমর্পিতা। প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে দেবদাসীরা যখন দলবদ্ধ ভাবে গর্ভগৃহ চত্বরে উঠে এল তখন সেখানে সার সার সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে উঠেছে। বাদ্যকারের দলও উপস্থিত হয়েছে সেখানে। প্রতিদিনের মতোই প্রদীপদণ্ড তুলে নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আরতি শুরু করলেন পুরোহিত নন্দিবাহন। ঘণ্টাধ্বনি আর ধূপের ধোঁয়াতে ভরে উঠল গর্ভগৃহ চত্বর। আরতি সাঙ্গ হলে সমবেত নৃত্য শুরু করল দেবদাসীরা।

সমর্পিতা একপাশে দাঁড়িয়ে গর্ভগৃহ চত্বরের চারদিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগল স্তম্ভগুলোর আনাচে কানাচে কোথাও তার ঘুঙুরদানাটা পড়ে আছে কিনা? তবে সেটা যদি সেখানে পড়েও থাকে তবে তা আর পাবার সম্ভাবনা যে কম, সমর্পিতা ব্যাপারটাও অনুমান করল। কারণ, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত হাজারে হাজারে মানুষ এই চত্বর পরিভ্রমণ করেছে। হয়তো বা তারাই কেউ দেখতে পেয়ে কুড়িয়ে নিয়েছে সেই সুবর্ণ ঘুঙুরদানা।

সমবেত নৃত্য চলল বেশ কিছু সময় ধরে। সে নৃত্য সমাপ্ত হলে দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা, সমর্পিতাকে ইশারা করল একক নৃত্য পরিবেশনের জন্য। গর্ভগৃহ তোরণের সমুখ ভাগে চত্বরের কেন্দ্রস্থলে এসে দাঁড়াল সমর্পিতা। তার খালি মনে হতে লাগল তার পায়ের ঘুঙুরছড়ার দিকে কেউ তাকিয়ে নেই তো? কেউ খেয়াল করেনি তো তার পায়ে সুবর্ণ ঘুঙুর দানা নেই!

মহাদেবকে প্রণাম জানিয়ে নৃত্য শুরু করল দেবদাসী সমর্পিতা। দেবদাসী আর বাদ্যকাররা ছাড়া মুষ্টিমেয় যে ক'জন সেখানে উপস্থিত তারা অবাক হয়ে দেখতে লাগল দেবদাসীর অপূর্ব নৃত্যকলা। আজ যেন অনেক বেশি দ্রুত ছন্দে নৃত্য পরিবেশন করছে দেবদাসী সমর্পিতা।

ব্যাপারটা সত্যি, যাতে কেউ তার পায়ের ঘুঙুরছড়ার ওপর মনোযোগ দিয়ে কিছু লক্ষ না করতে পারে তাই অতি দ্রুত পদসঞ্চালন করতে লাগল সে। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নৃত্যরত সমর্পিতা বিদ্যুৎ গতিতে স্থান পরিবর্তন করতে লাগল।

একপাশে সরে দাঁড়িয়েছে অন্য দেবদাসীরা। নৃত্যের ভঙ্গীতে সমর্পিতা কখনও বৃত্তাকারে পাক খেতে লাগল গর্ভগৃহর সামনে। দ্রুত লয়ে বেজে চলছে বাদ্যযন্ত্র। ঘূর্ণায়মান সমর্পিতার ঘুঙুরের ছমছম শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল গর্ভগৃহ চত্বর। সত্যি ইন্দ্রসভা থেকে উর্বশী যেন নৃত্য পরিবেশন করছেন সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে।

কিন্তু এরপরই ঘটনাটা ঘটল। নৃত্যরত অবস্থায় সমর্পিতা মাঝে-মাঝেই এগিয়ে যাচ্ছিল গর্ভগৃহর তোরণের একেবারে সামনে। যাতে গর্ভগৃহের অভ্যন্তরে শূন্যে ভাসমান সোমেশ্বর মহাদেব ভালো ভাবে তার নৃত্য দর্শন করতে পারে সেজন্য।

আরতি শেষ হবার পর পুরোহিত নন্দিবাহন প্রদীপদণ্ডটা নামিয়ে রেখেছিলেন গর্ভগৃহর দ্বারপ্রান্তে। শাখা সমৃদ্ধ প্রদীপদণ্ডের প্রদীপগুলো তখনও জ্বলছিল। নৃত্যরতা দেবদাসীর আঁচল হঠাৎই গিয়ে পড়ল তার ওপর। শুষ্ক পট্টবস্ত্রে প্রথমে অগ্নিস্ফুলিঙ্গির সৃষ্টি হল, তারপর তা জ্বলে উঠল! সমর্পিতা খেয়ালই করেনি ব্যাপারটা। সে নেচে চলেছে।

ব্যাপারটা খেয়াল করতেই আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল দেবদাসীরা। কিন্তু সমর্পিতার কাছে ছুটে যাবার সাহস তাদের হল না। আর সমর্পিতা যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারল তখন এক অগ্নিবলয় গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে তাকে। কিন্তু কিছুতেই সে যেন তার নৃত্যগতি রুদ্ধ করতে পারছে না! আর এরপরই কেউ যেন বিদ্যুৎগতিতে ছুটে এসে তার জ্বলন্ত আঁচল ধরে সজোরে টান দিল। আর সেই আকর্ষণে সমর্পিতা কয়েকবার পাক খেয়ে তার শরীর আবৃত করে থাকা নীলাম্বরি থেকে মুক্ত হয়ে মাটিতে ছিটকে পড়ল।

সম্বিত ফিরে উঠে বসতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল সমর্পিতার। কিছুটা তফাতে মাটিতে পড়ে থাকা নীলাম্বরির দিকে প্রথমে চোখ গেল তার। সেই বস্ত্রখণ্ড তখন দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করেছে! তা দেখে শিউরে উঠল সমর্পিতা। আর এক মুহূর্ত হলেই তো ওই লেলিহান অগ্নিশিখা স্পর্শ করত তার শরীরকে।

এরপরই সে দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। তার পরনে সেবায়েতদের মতো শুভ্রবসন নয়, পুরোহিতদের মতো সে মুণ্ডিত মস্তক, শিখাধারীও নয়। তীক্ষ্ন নাসা, কুঞ্চিত কেশ, তামাটে গাত্রবর্ণের, ধনুকের ছিলার মতো নির্মেদ, ঋজু, এক যুবক চেয়ে আছে তার দিকে।

সমর্পিতার রক্ষাকর্তা ওই যুবক। সে-ও কিছুটা বিস্মিত ভাবে চেয়ে আছে ভূমিতে পতিত, সদ্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা ওই দেবদাসীর দিকে। সমর্পিতা তার দিকে তাকাতেই কয়েক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি বিনিময় হলো তাদের দুজনের মধ্যে। আর এরপরই সমর্পিতার খেয়াল হল বর্তমানে সে প্রায় অর্ধনগ্ন! অন্তর্বাস ছাড়া পরনে কিছু নেই! সমর্পিতার গাঢ় বক্ষ বিভাজিকা সম্পন্ন স্তন যুগলের স্পষ্ট অবয়ব, মুদ্রার আকৃতির গভীর নাভি কূপ, কদলী কাণ্ডের মতো মসৃণ উরু যুগল, সবই উন্মুক্ত বা প্রকট ভাবে ধরা দিচ্ছে যুবকের চোখে!

ব্যাপারটা মাথায় আসতেই সমর্পিতা লজ্জিত ভাবে দু-হাত বুকে চাপা দিল তার বক্ষ বিভাজিকা আড়াল করার জন্য। যুবকও যেন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে দৃষ্টি সরিয়ে নিল সমর্পিতার ওপর থেকে। আর এরপরই চারপাশ থেকে ছুটে এল তিলোত্তমা-সহ অন্য দেবদাসীরা। এতক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকার পর হুঁশ ফিরেছে তাদের। কে যেন একটা বস্ত্রখণ্ড দিয়ে আবৃত করল সমর্পিতার শরীর। তারপর তাকে উঠিয়ে নিয়ে দেবদাসীরা গর্ভগৃহ চত্বর ত্যাগ করল।

গম্ভীর মুখে গর্ভগৃহের কপাট বন্ধ করলেন নন্দিবাহন। এ ধরনের ঘটনা অমঙ্গলসূচক। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবকে এ সংবাদ জানাতে হবে। তিনি এগোলেন প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। অঙ্গিরা একপাশে কিছুটা সরে দাঁড়িয়েছিল। এবার তাকে ফিরতে হবে। ফেরার জন্য সে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখতে পেল রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথকে। তিনি মৃদু হেসে বললেন, 'চলুন, এবার তবে ফেরা যাক। আপনার জন্যই নিশ্চিত রক্ষা পেল ওই দেবদাসী।'

জয়দ্রথের সঙ্গে ফেরার জন্য পা বাড়িয়ে অঙ্গিরা বলল, 'হ্যাঁ, আর সামান্য বিলম্ব হলেই মৃত্যু হত ওই দেবদাসীর। নিদেনপক্ষে অগ্নিদগ্ধ হয়ে চিরদিনের মতো রূপলাবণ্য হারাত। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার, তার কাছাকাছি যারা দাঁড়িয়েছিলেন তারা কেউ এগোলেন না। আমি তাই ছুটে গিয়ে ওই জ্বলন্ত বস্ত্রখণ্ড উৎপাটিত করলাম।'

রক্ষীপ্রধান হাঁটতে হাঁটতে জবাব দিলেন, 'ওই রমণী যতই সুন্দরী হোক না কেন, নৃত্যগীতে যতই পারঙ্গম হোক না কেন, সামান্য দেবদাসী বই তো কেউ নয়, একজন সামান্য দেবদাসীর জন্য কে আর নিজের জীবন বিপদগ্রস্থ করবে? এই তো আজ ভোরেই এক দেবদাসীর মৃত্যু হয়েছে। ব্যাপারটা আপনি শুনেছেন কিনা জানি না। তার দেহ সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হল। আপনি ওকে রক্ষা না করলে ওর অগ্নিদগ্ধ মৃতদেহটাও কাল প্রত্যুষে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হোত। ওরা একজন আসে একজন যায়। কতজনকেই তো মন্দিরে দেবদাসী হতে দেখলাম। আবার সমুদ্রতে ভেসে যেতেও দেখলাম। তবে দেবতার সামনে এসব দুর্ঘটনা অমঙ্গলসূচক।'

অঙ্গিরা বলল, 'অমঙ্গলসূচক মানে?'

সোপানশ্রেণী বেয়ে নামতে নামতে জয়দ্রথ বললেন, 'হ্যাঁ, দেবতার সামনে এ ধরনের দুর্ঘটনা অমঙ্গলের বার্তাবাহক বলেই অনেকের বিশ্বাস। আরব শাসনকর্তা জুয়ানেদ চার শতাব্দী পূর্বে একবার এ মন্দির অপবিত্র করেছিল, ধ্বংস করেছিল। কথিত আছে সে ঘটনার কিছু দিবস পূর্বে এক দেবদাসী নাকি তার বদ্ধ জীবনের থেকে মুক্তি পাবার জন্য উন্মাদ অবস্থায় উন্মুক্ত গর্ভগৃহর সামনে বুকে কিরিচ বিঁধিয়ে আত্মহনন করে। তারপরই হানা দেয় জুয়ানেদ বাহিনী।

আর একবার গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড দাবদাহে মধ্যাহ্নে দেবতার সামনে নৃত্য পরিবেশন করার সময় নৃত্যরতা এক দেবদাসীর মৃত্যু ঘটেছিল হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে। সে সময় গর্ভগৃহর সমুখে দেবদাসীরা যেখানে নৃত্য পরিবেশন করে তার মাথার ওপর এখনকার মতো আচ্ছাদন ছিল না। সূর্যকিরণে তপ্ত প্রস্তরখণ্ডের উপরই তাদের নৃত্য পরিবেশন করতে হতো। যাই হোক সেই দেবদাসীর মৃত্যুও অমঙ্গলের বার্তা বহন করেছিল।

শ্রাবণ পূর্ণিমাতে প্রচুর জনসমাগন হয় এই সোমেশ্বর মন্দিরে। সেবার শ্রাবণ পূর্ণিমাতে পুণ্যার্থীদের ভিড়ে পদপৃষ্ট হয়ে প্রধান পুরোহিত-সহ বহু সেবায়েতের মৃত্যু হয়েছিল। এমন আরও ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনার কাহিনি আছে সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে ঘটা অমঙ্গলজনক ব্যাপারকে কেন্দ্র করে।'

নীচে নেমে এসে রক্ষীপ্রধান পা বাড়ালেন অন্য দিকে। আর অঙ্গিরা এগোল অতিথিশালার দিকে। মধ্যরাতে প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের অতিথিশালাতে উপস্থিত হবার কথা।

অতিথিশালাতে ফিরে এসে আহার সাঙ্গ করে শয্যা গ্রহণ করেছিল অঙ্গিরা। তবে সে ঘুমায়নি। তার ঘুমাবার কথাও নয়। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব তাকে নিতে আসবেন। শুয়ে শুয়ে আজ সন্ধ্যার ঘটনা বা দুর্ঘটনাই বার বার তার মনে পড়ছিল। তার সামনে ভূমির ওপর বসে আছে অতীব সুন্দর এক নারী। মৃত্যু প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল তাকে। আতঙ্কিত বিহ্বল দৃষ্টি চোখে লেগে আছে তার। দ্রুত শ্বাসের সঙ্গে আন্দোলিত হচ্ছে তার বক্ষ। কূচ যুগলও যেন স্পষ্ট দৃশ্যমান। তার মসৃণ কটিদেশের দু-পাশ বেয়ে নামছে হীরক কণার মতো ঘর্মবিন্দু, গভীর নাভিমূল যেন শুষে নিচ্ছে চারপাশের সব আলো। অতীব সুন্দরী এক নারী পড়ে আছে অঙ্গিরার পদপ্রান্তে কিছুটা তফাতে। না, ঠিক যৌনতা নয়, এক অদ্ভুত ভালোলাগার আবেশ নিয়ে অঙ্গিরা ভাবতে লাগল সেই দৃশ্য। সময় এগিয়ে চলল মধ্যযামের দিকে। নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগে অঙ্গিরা শয্যা ত্যাগ করে অস্ত্রসাজে নিজেকে সজ্জিত করল। কাঁধে তূণীর, কোমরবন্ধে তরবারি।

ঠিক মধ্যযামেই মৃদু আঘাতের শব্দ শোনা গেল কপাটে। অঙ্গিরা দ্বার উন্মোচন করতেই দেখতে পেল বাইরে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছেন ত্রিপুরারিদেব। একাই এসেছেন তিনি। তার সহ প্রধান পুরোহিতদ্বয়, রক্ষী, সেবায়েত বা ছত্রবাহক পরিবৃত হয়ে থাকলেও প্রধান পুরোহিত যে ওসব অনুষঙ্গ বিশেষ পছন্দ করেন না, এ ব্যাপারটা এতদিনে খেয়াল করেছে অঙ্গিরা। এই মধ্যযামেও তাই তিনি মন্দিরের ওপরের চত্বর থেকে একাই নীচে নেমে এসেছেন। অঙ্গিরা তাকে প্রণাম জানাবার পর তিনি বললেন, 'তুমি প্রস্তুত? তবে চলো।'

অঙ্গিরা তার ধনুকটা উঠিয়ে নিয়ে কক্ষ ত্যাগ করে অনুসরণ করল প্রধান পুরোহিতকে। ত্রিপুরারিদেবের হাতে ধরা আছে একটা রেশমের থলে। ত্রিপুরারিদেব সে হাতটা নাড়াতেই যেন থলের ভিতর ঘুঙুরের মৃদু শব্দ হল। অতিথিশালা ত্যাগ করে ত্রিপুরারিদেব যেদিকে রওনা হলেন, মন্দিরের সে অংশে অঙ্গিরা এর আগে কোনওদিন যায়নি। সেদিকে নানা ধরনের প্রাচীন কাঠামো, মন্দির ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই বোঝা যায় বর্তমানে সোমেশ্বর মহাদেবের যে মূল মন্দির তার তুলনায় এসব মন্দির, কাঠামো অনেক বেশি প্রাচীন। কিছু কাঠামো তো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাদের ছাদ ধ্বসে গেছে, স্তম্ভগুলো ভূপতিত। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার খেলা করছে ছাদহীন দেওয়াল গুলোর আড়ালে।

অঙ্গিরার মনে হল দিনেরবেলাও তার ভিতর সূর্যালোক তেমন প্রবেশ করে না। মন্দিরের মূল প্রাকারের মধ্যে অবস্থিত হলেও এ অঞ্চলটাকে পরিত্যক্তই বলা যায়। কোথাও কোনও শব্দ নেই। অঙ্গিরাদের মাথার ওপর অর্ধেক চাঁদ। যে চাঁদ প্রতিদিন ক্রমশ বড় হতে হতে এগোচ্ছে পূর্ণিমার দিকে।

পথপার্শ্বে এক জায়গাতে বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে একটা মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে আছে। তার ঠিক মাঝখানে মাথায় চূড়োঅলা একটা মন্দিরের অংশ আজও দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তের জন্য সেদিকে তাকিয়ে একবার থামলেন ত্রিপুরারিদেব।

সেই ধ্বংসস্তূপ দেখিয়ে তিনি বললেন 'এই ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির হলো সোমেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গনের আদি মন্দির। আরব জুয়ানেদের আক্রমণে ও মন্দির ধ্বংস হয়। স্বয়ং চন্দ্রদেব ওই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন বলে মনে করা হয়।' এ কথা বলে হাঁটতে হাঁটতে তিনি বললেন, 'এই সোমেশ্বর মন্দির যে চন্দ্রদেব তাঁর অভিশাপ মোচনের পর নির্মাণ করেছিলেন তা নিশ্চয়ই তুমি জানো?' চলমান ত্রিপুরারিদেবের থলে থেকে মাঝে-মাঝেই যেন ঘুঙুর বাজছে!

অঙ্গিরা জবাব দিলো 'হ্যাঁ জানি।'

'কী অভিশাপ, কার অভিশাপ, তুমি জানো?' প্রশ্ন করলেন পুরোহিত শ্রেষ্ঠ।

অঙ্গিরা বলল, 'তা জানা নেই।'

মাথার ওপর চাঁদের দিকে তাকিয়ে ত্রিপুরারিদেব চলতে চলতে বললেন, 'চন্দ্রদেবতার ছাব্বিশ জন পত্নী ছিলেন দক্ষ প্রজাপতির কন্যা। কিন্তু চন্দ্রদেব তার অপর পত্নী রোহিণীর প্রতি অধিক আসক্ত হয়ে পড়েন ও তাঁর অন্য পত্নীদের উপেক্ষা করতে থাকেন। দক্ষ কন্যারা বঞ্চিত হতে থাকেন চন্দ্রদেবের সঙ্গ লাভ থেকে। তাঁরা অভিযোগ জানালেন পিতার কাছে। দক্ষ প্রজাপতি যখন চন্দ্রদেবকে তাঁর কন্যাদের দুর্দশা জানানো সত্ত্বেও চন্দ্রদেব এই কাজ থেকে বিরত হলেন না, তখন দক্ষ কুপিত হয়ে তাঁর জামাতাকে শাপ দিলেন যে তার শরীর ক্ষয়ে যেতে থাকবে।

প্রজাপতির অভিশাপে প্রতিদিন ক্ষয়ে যেতে লাগল চন্দ্রদেবতার শরীর। শাপ মোচনের জন্য চন্দ্রদেব এই প্রভাসতীর্থে নেমে এসে শিবের উপাসনা শুরু করেন। শিব, প্রজাপতির শাপ খণ্ডন না করলেও চন্দ্রদেবতাকে এই বর দেন যে, ক্ষয় হতে হতে চন্দ্রদেব সম্পূর্ণ অদৃশ্য হবার দিন, অর্থাৎ অমাবস্যার পরদিন থেকে আবার তার শরীর ফিরে পেতে শুরু করবেন ও পূর্ণতা লাভ করে পূর্ণ কিরণে বিকশিত হবেন, অর্থাৎ পূর্ণিমা তিথি লাভ করবেন।

ক্ষয়িষ্ণু চন্দ্রদেব যেদিন আবার প্রথম তার পূর্ণ অবয়ব ফিরে পেয়েছিলেন সেদিন ছিল শ্রাবণ পূর্ণিমা। যে কারণে প্রতি পূর্ণিমাতে বিশেষত শ্রাবণ পূর্ণিমাতে প্রচুর মানুষের সমাগম হয় এখানে।

শাপমোচন হবার পর চন্দ্রদেবতা, এখানে 'সোমনাথ' অর্থাৎ চন্দ্রদেবতা বা সোমদেবের রক্ষাকর্তার মূর্তি নির্মাণ করান এবং সোমনাথের মনোরঞ্জনের জন্য নৃত্যগীতে পারদর্শী কিছু কুমারী কন্যাকে উৎসর্গ করেন সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে। ওরাই হল আদি দেবদাসী। তারপর থেকেই সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে কন্যা উৎসর্গ করার প্রথা, দেবদাসী প্রথা চলে আসছে।' একটানা কথাগুলো বলে থামলেন।

দেবদাসী শব্দটা শুনে অঙ্গিরার চোখে আবারও ভেসে উঠল সন্ধ্যারতির সময়ের ঘটনার কথা। প্রধান পুরোহিতের উদ্দেশ্যে সে বলল, 'আজ সন্ধ্যাতে এক দেবদাসী প্রদীপ শিখাতে দগ্ধ হতে যাচ্ছিল। আমি তাকে রক্ষা করেছি।' অঙ্গিরা অনুমান করেছিল, প্রধান পুরোহিত এ সংবাদ শুনে তাকে ধন্যবাদ দেবেন বা আশীর্বাদ করবেন। কিন্তু কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য তিনি অঙ্গিরার দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, 'পুরোহিত নন্দিবাহন এ বিষয়ে আমাকে অবগত করেছেন। কিন্তু ও কাজ করতে যাওয়া তোমার উচিত হয়নি।

সমর্পিতা নামের ওই নর্তকী যদি অগ্নিগ্রস্ত অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে তোমাকে আলিঙ্গন করত তবে তুমিও অগ্নিদগ্ধ হতে পারতে, এমনকী তোমার মৃত্যুও ঘটতে পারত। তোমাকে আমি যে দায়িত্ব অর্পণ করতে চলেছি, সে দায়িত্ব পালনের জন্য তোমার জীবন অনেক মূল্যবান। একজন দেবদাসীর মৃত্যু হলে তার শূন্যস্থান অন্য কেউ সহজেই পূরণ করতে পারবে। কিন্তু তুমি যে দায়িত্ব পালন করতে চলেছ তা অন্য কারো পক্ষে পালন করা দুরূহ। এ কথাটা মনে রেখো। তুমি এমন কোনও কার্যে অবর্তীণ হবে না, যে ক্ষেত্রে তোমার জীবনহানির সম্ভাবনা থাকে।'

ত্রিপুরারিদেবের কথা শুনে মৃদু বিস্মিত হয়ে অঙ্গিরা বলল 'যথা আজ্ঞা প্রভু।'

সেই ধ্বংস্তূপ অতিক্রম করে এক উন্মুক্ত কাননে এসে উপস্থিত হলেন প্রধান পুরোহিত। এ স্থান মূল মন্দিরের কাছেই, কিন্তু এক নির্জন প্রান্তে অবস্থিত। কাননের একপাশে প্রাচীন বৃক্ষরাজি সারবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে। ঠিক তার বিপরীতে প্রাকার বেষ্টিত একটা স্থান আছে। প্রাকারের গায়ে একটা তোরণ থাকলেও তা বন্ধ। প্রাকারের ভিতর কি আছে তা বাইরে থেকে না দেখা গেলেও এক ঘুর্ণায়মান সোপানশ্রেণী সেই প্রাচীরের ভিতর এক কোণ থেকে ওপরে উঠে গিয়ে মিলিত হয়েছে গর্ভগৃহ চত্বরে।

নীচ থেকে নিঝুম, অন্ধকার ঘেরা গর্ভগৃহ চত্বর নজরে পড়ছে অঙ্গিরার। প্রাকার বেষ্টিত সেই স্থান বা বাইরে চাঁদের আলোতে অঙ্গিরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার চারপাশ নিস্তব্ধ। প্রাচীন বৃক্ষগুলোকে কেমন যেন জীবন্ত বলে মনে হল অঙ্গিরার। তারা যেন অঙ্গিরার দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে চাপাস্বরে কথা বলছে! সমুদ্রর দিক থেকে ভেসে আসা বাতাসে মৃদু খসখস শব্দ হচ্ছে গাছের পাতায়। ঠিক যেন মানুষের চাপাস্বরে কথোপকথনের মতো।

ত্রিপুরারিদেব, অঙ্গিরাকে এনে দাঁড় করালেন সেই প্রাচীন গাছগুলোর হাত তিরিশ তফাতে। সেখানে তাকে তিনি দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে গাছগুলোর কাছে এগিয়ে গিয়ে তাদের গুঁড়িগুলোর গায়ে তার থলে থেকে ক্ষুদ্রাকৃতির শঙ্খ বার করে স্থাপন করতে লাগলেন। পরপর পাঁচটি বৃক্ষের গায়ে পাঁচটি শুভ্র শঙ্খ। সে কাজ সমাপ্ত করে অঙ্গিরার কাছে ফিরে এসে তিনি বললেন, 'শঙ্খগুলোকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করো। চোখ বাঁধা অবস্থায় তোমাকে ওগুলো চূর্ণ করতে হবে।'

অঙ্গিরা তার ধনুকে শর যোজন করে ভালো করে সেই শঙ্খগুলোর অবস্থান দেখে নিল। ত্রিপুরারিদেব একখণ্ড রোশম বস্ত্র দিয়ে অঙ্গিরার চোখ বেঁধে দিলেন ভালো করে। তারপর বললেন, 'এবার শর নিক্ষেপ করো।'

সোমেশ্বর মহাদেবকে স্মরণ করে তির নিক্ষেপ করল অঙ্গিরা। তির গিয়ে বিদীর্ণ করল প্রথম শঙ্খকে। ত্রিপুরারিদেব বলে উঠলেন, 'উত্তম, অতি উত্তম!'

পর পর পাঁচটি শরে পাঁচটি শঙ্খ চূর্ণ করল অঙ্গিরা। আর তা দেখে প্রতিবারই প্রশংসাসূচক বাক্য বললেন প্রধান পুরোহিত।

এরপর আসল পরীক্ষা। অঙ্গিরা, ত্রিপুরারিদেবের থলের ভিতর থেকে নির্গত যে শব্দকে ঘুঙুরদানার শব্দ ভেবেছিল তা আসলে ক্ষুদ্রাকৃতির ঘণ্টার শব্দ। যা ছাগ, মেষ ইত্যাদি প্রাণীর গলাতে বাঁধা থাকে। শব্দভেদী বাণ নিক্ষেপে অঙ্গিরা কতটা পারদর্শী তারই পরীক্ষা নেবেন ত্রিপুরারিদেব। তিনি চোখবাঁধা অঙ্গিরাকে বললেন, 'আমি এই ক্ষুদ্রাকৃতির ঘণ্টাগুলি নিক্ষেপ করব। সেই শব্দ শুনে তুমি তির নিক্ষেপ করবে।'

তূনির থেকে একটা তির তুলে নিয়ে প্রয়াত পিতার কথা স্মরণ করে ও তাঁর আশীর্বাদ কামনা করে ধনুকে বাণ রচনা করে প্রস্তুত হল অঙ্গিরা। শব্দ শোনার জন্য উৎকর্ণ সে। প্রথম ঘণ্টাটা কিছুটা দূরে নিক্ষেপ করলেন ত্রিপুরারিদেব মাটিতে পড়ে বেজে উঠল সেটা। শব্দস্থান অনুমান করে ভূমির উদ্দেশ্যে তির ছুড়ল অঙ্গিরা। তিরের আঘাতে ঘণ্টাটা আবার বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অঙ্গিরা বুঝতে পারল, পিতার শিক্ষা তার বিফলে যায়নি। শব্দভেদী বাণ চালনাতে সফল হয়েছে সে।

প্রধান পুরোহিত এর পরের ঘণ্টাটা প্রথম ঘণ্টা থেকে কিছুটা তফাতে ফেললেন। শব্দ শুনে অঙ্গিরা আবারও তির চালাল। আবারও বেজে উঠল ঘণ্টা। প্রধান পুরোহিত প্রতিবারই ঘণ্টার দুরত্ব বৃদ্ধি করতে লাগলেন। অঙ্গিরার কানে ঘণ্টা পতনের শব্দ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসতে লাগল। তবে সে আঘাত হানতে লাগল ঘণ্টাতে।

ত্রিপুরারিদেব তাঁর শেষ ঘণ্টাটা নিক্ষেপ করলেন বেশ অনেকটা দূরে। ঘণ্টা পতনের ক্ষীণ অস্পষ্ট যে শব্দ অঙ্গিরার কানে ধরা দিল তা যেন, না শোনারই মতো। অঙ্গিরা ধনুকে শর যোজন করে মনকে সংহত করে তির নিক্ষেপের আগে মনে মনে বলল, 'হে সোমেশ্বর মহাদেব। আমার এ শর নিক্ষেপ যেন ব্যর্থ না হয়। আমার পিতা-মাতার আত্মার মুক্তির পথ প্রশস্ত করো তুমি।'

মহাদেবের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তির চালাল অঙ্গিরা। মুহূর্তের মধ্যে ঘণ্টার ঝংকার উঠল দূরবর্তী ভূমি থেকে। অঙ্গিরার প্রার্থনা শুনেছেন সোমদেব।

অঙ্গিরার চোখের আবরণ উন্মুক্ত করলেন প্রধান পুরোহিত। অঙ্গিরা তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখল ত্রিপুরারিদেবের মুখমণ্ডলে চাঁদের আলোতে যুগপত বিস্ময় আর আনন্দ ফুটে উঠেছে। অঙ্গিরা ভূমিষ্ঠ হয়ে তাঁর চরণ স্পর্শ করে উঠে দাঁড়াতেই প্রধান পুরোহিত বললেন, 'সত্যিই, এই কঠিন পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হলে তুমি। তোমার দক্ষতা প্রশ্নাতীত। যা ভবিষ্যতে তোমার কর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তোমাকে এ শিক্ষা দিয়ে তোমার পিতা তাঁর স্বর্গবাসের পথ প্রশস্ত করেছেন।'

এ কথা বলার পর তিনি বললেন, 'তুমি প্রয়োজনবোধে এ স্থানে তোমার অস্ত্র অনুশীলন করতে পারো। এ স্থানে কেউ আসে না। আর ওই যে ওই প্রাকার বেষ্টিত অঞ্চল দেখছ, ওটি হল দেবদাসীদের আবাসস্থল।' এ কথা বলার পর তিনি হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রচণ্ড আর্তচিৎকার ভেসে এল প্রাকারের ভিতর থেকে। নারী কণ্ঠের চিৎকার!

বেশ কয়েকবার শব্দটা শোনা গেল। যেন প্রচণ্ড আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল কেউ! এরপর কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর একাধিক বামাকণ্ঠের উত্তেজিত স্বর যেন ভেসে আসতে লাগল প্রাকারের ভিতর থেকে!

প্রধান পুরোহিত সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর প্রাকারের গায়ে যে প্রবেশ তোরণ আছে সেদিকে এগোলেন ওই আর্তনাদের কারণ অনুসন্ধান করতে। অঙ্গিরা একটু ইতস্তত করে অনুসরণ করল তাঁকে। তিনি আপত্তি করলেন না।

তোরণের কপাট ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল তারা। অনেক নারী কণ্ঠের কথাবার্তার শব্দ শোনা যাচ্ছে। অনুচ্চ এক সোপানশ্রেণী অতিক্রম করে পাথর বাঁধানো এক প্রশস্ত অঙ্গনে উঠে এলেন প্রধান পুরোহিত, আর তার সঙ্গে অঙ্গিরাও।

সুদৃশ্য স্তম্ভ সমন্বিত বিশালাকার এই প্রাঙ্গণের চারপাশ কক্ষ সমৃদ্ধ। দেবদাসীদের আবাসস্থল। ইতিপূর্বে এ স্থানে আসার সুযোগ ঘটেনি অঙ্গিরার।

চত্বরের একপাশে একটা স্তম্ভের নীচে সমবেত হয়েছে বেশ কিছু দেবদাসী। উত্তেজিত ভাবে তারা বাক্যালাপ করছে। কয়েকজনের হাতে জ্বলন্ত প্রদীপ আছে। ত্রিপুরারিদেবের পিছন পিছন অঙ্গিরা এগোল সেদিকে।

তাদের কাছাকাছি পৌঁছে অঙ্গিরা শুনতে পেল, একজন দেবদাসী বলছে, 'জানোই তো, মৃত্যুর পর সব আত্মারা মুক্তির জন্য এ মন্দিরে এসে উপস্থিত হয়। হয়তো এ কোনও পাপিষ্ঠ আত্মা। ব্রাহ্মণ হত্যা বা গোহত্যার মতো কোনও পাপ করেছিল। যেজন্য ওর মুক্তি ঘটছে না।'

অঙ্গিরা তার কাছে উপস্থিত হতেই প্রথমে তাদের পদশব্দে চমকে উঠল নারীর দল। অস্পষ্ট আতঙ্কিত স্বরও বেরিয়ে এল কারো কণ্ঠ থেকে। কিন্তু প্রধান পুরোহিতকে দেখতে পেয়েই সবাই বাক্যালাপ থামিয়ে সংযত হয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল।

অঙ্গিরা দেখতে পেল সামনের থামটার নীচে পা ছড়িয়ে থামের গায়ে ভর দিয়ে বসে একজন দেবদাসী। সিক্ত বসন। তার পাশে একটা শূন্য কলস দেখে বোঝা যাচ্ছে জল সিঞ্চন করা হয়েছে তার শরীরে। প্রচণ্ড আতঙ্কর ভাব ফুটে উঠেছে সেই দেবদাসীর মুখমণ্ডলে। আর তার সমুখে দাঁড়িয়ে আছে দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা।

প্রধান পুরোহিতকে দেখে তাঁকে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল তিলোত্তমা। অন্য দেবদাসীরাও জানাল। তিলোত্তমা এরপর মাটি থেকে তুলে কোনও ক্রমে দাঁড় করাল সেই দেবদাসীকে। থরথর করে কাঁপছে সে।

ত্রিপুরারিদেব তিলোত্তমাকে প্রশ্ন করল, 'ওর কী হয়েছে? কী নাম ওর?' তিলোত্তমা জবাব দিল 'ওর নাম ''উলুপী''। কিছু সময় পূর্বে এ স্থানে ওর প্রেত দর্শন হয়েছে।'

এরপর তিলোত্তমার কথায় জানা গেল, কিছুটা তফাতে তার কক্ষের বাইরে কিছু একটা শব্দ শুনে কপাট উন্মোচন করে বাইরে আসে উলুপী। এই স্তম্ভর কাছে একটা ছায়া দেখে সে এখানে এগিয়ে আসে। তারপর প্রেত দর্শন হয় তার। আতঙ্কিত ভাবে চিৎকার করে মুর্ছিত হয়ে পড়ে সে। তার চিৎকার শুনে অন্য দেবদাসীরা বাইরে বেরিয়ে জল সিঞ্চন করে তার জ্ঞান ফেরায়। উলুপী তার প্রেত দর্শনের কথা ব্যক্ত করেছে।

তিলোত্তমার কথা শুনে প্রধান পুরোহিত প্রথমে বিস্মিত ভাবে বললেন, 'প্রেত দর্শন হয়েছে!'

তারপর উলুপী নামের সেই দেবদাসীর দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, 'সে কোনও মানুষ নয়তো? কী করে বুঝলে সে প্রেত? মিথ্যা আতঙ্ক ছড়ালে তোমাকে কঠিন শাস্তি দেব।'

উলুপী হাত জোড় করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'আমি মিথ্যা বলছি না প্রভু। উলঙ্গ শরীর তার। সর্বাঙ্গে ঘা। মাথায় জটা, শুশ্রু মণ্ডিত ভয়ঙ্কর মুখমণ্ডল। হাত-পায়ের নখগুলো শ্বাপদের মতো দীর্ঘ। অমন চেহারা কোনও মানুষের হতে পারে না! পুতি গন্ধ নির্গত হচ্ছিল তার শরীর থেকে। সে আমার উদ্দেশ্যে বাক্যও বলল!'

'কী বাক্য?' গম্ভীর মুখে জানতে চাইলেন প্রধান পুরোহিত।

দেবদাসী উলুপী জবাব দিল, 'সে আমাকে বলল, 'তুমি আমাকে এ মন্দির থেকে মুক্ত করো। আমি তোমাকে ''সামন্তক মণি''-র সন্ধান দেব। আর এরপরই আতঙ্কে আর্তনাদ করে অজ্ঞান হয়ে যাই আমি।'

অঙ্গিরা খেয়াল করল দেবদাসী উলুপীর কথা শুনে স্পষ্টতই যেন চমকে উঠলেন প্রধান পুরোহিত। পরমুহূর্তেই তিনি নিজেকে সংযত করে নিয়ে প্রথমে উলুপীর উদ্দেশ্যে বললেন, 'আমার অনুমান নিদ্রা জড়িত অবস্থায় তুমি প্রাঙ্গণে এসে আলো আঁধারিতে অলীক-অবাস্তব দর্শন করেছ ও শুনেছ। তন্দ্রামগ্ন অবস্থাতে অনেক সময় এমন ভ্রম ঘটে। আতঙ্কিত হবার ব্যাপার নেই। মনে রাখবে, তোমার নাথ—ভূতনাথ। প্রেতরা সব তাঁর আজ্ঞাবাহী। কোনও প্রেত দেবদাসীদের ক্ষতি করতে পারে না।'

এ কথা বলার পর তিনি তিলোত্তমাকে নির্দেশ দিলেন, 'ওকে কক্ষে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। আর তোমরাও যে যার নিজের কক্ষে ফিরে যাও। প্রতিদিনের মতো কালও গর্ভগৃহর দ্বার উন্মোচনের সময় তোমাদের নৃত্য পরিবেশন করতে হবে।'

আজ্ঞা পালিত হল প্রধান পুরোহিতের। চত্বর শূন্য হয়ে গেল।

চোয়াল কঠিন হয়ে গেছে প্রধান পুরোহিতের। তার কপালে চিন্তার ভাব স্পষ্ট। কিছু সময় চুপ করে থাকার পর তিনি বললেন, 'চলো একবার প্রাঙ্গণটা ভালো করে পরিভ্রমণ করা যাক।'

স্তম্ভ সমন্বিত আলো-আঁধারি ঘেরা বিশাল সেই প্রাঙ্গণের আনাচেকানাচে প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে পরিক্রমণ শুরু করল অঙ্গিরা। এক সময় সে স্থানের একপাশের প্রাকারের সামনে এসে দাঁড়াল তারা। একটা বেদি আছে সেখানে। মাথার ওপর ছত্রের আচ্ছাদনও আছে। প্রাকারের ওপাশ থেকে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের শব্দ আসছে। তার অভিঘাতে মৃদু কম্পন অনুভূত হচ্ছে প্রাকারে।

চাঁদের আলোতে চিন্তাক্লিষ্ট প্রধান পুরোহিতের মুখমণ্ডল। হ্যাঁ, ভাবছেন তিনি। অন্ধকারের প্রহরী এই মন্দিরেই আছে। পালাতে পারেনি সে। দিনের বেলা যখন মন্দিরের প্রধান তোরণ উন্মুক্ত থাকে তখনও সে তার এই চেহারা নিয়ে দ্বাররক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অন্ধকারের প্রহরীর বাইরে যাওয়া অসম্ভব।

সে যদি মন্দিরের বাইরে চলে যায় অথবা পালাতে গিয়ে দ্বাররক্ষীদের হাতে ধরা পড়ে তবে দুটো ঘটনাই সমান বিপদজনক হতে পারে। গোপন সত্য উন্মোচিত হতে পারে তার মুখ দিয়ে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে সত্য গোপন করে রেখেছেন, আড়াল করে রেখেছেন মন্দিরের অধ্যক্ষ আর প্রধান পুরোহিতরা। যে সত্য গোপন রাখার জন্য ত্রিপুরারিদেবকেও মূল্য চোকাতে হয়েছে।

অন্ধকারের প্রহরীর মুখ থেকে এই সত্য উদঘাটনের ভয়েই তো তিনি তার কথা ব্যক্ত করতে পারছেন না কারো কাছে। তাকে অনুসন্ধান করার জন্য রক্ষী নিয়োগ করতে পারছেন না। এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার সম্মুখীন ত্রিপুরারিদেব। দেবদাসী উলুপীকে বলা, অন্ধকারের প্রহরীর কথাটা মনে পড়ল ত্রিপুরারিদেবের, 'তুমি আমাকে এ মন্দির থেকে মুক্ত করো। তোমাকে আমি ''সামন্তক মণি''-র সন্ধান দেব।'

কথাটা মনে হতেই ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। অন্ধকারের প্রহরীকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করতে হবে তাঁকে। কিন্তু কীভাবে? সমুদ্রর গর্জন শুনতে শুনতে তার উপায় ভাবার চেষ্টা করতে লাগলেন তিনি। তাঁর পাশে নিশ্চুপ ভাবে দণ্ডায়মান অঙ্গিরা।

মাথার ওপর চাঁদ যাত্রা শুরু করেছে বৈতরণীর দিকে। রাত শেষ হয়ে আসছে। হঠাৎ একটা পরিকল্পনা মাথায় এল তাঁর। তিনি অঙ্গিরাকে বললেন, 'যতদিন না আমি তোমাকে আসল কর্ম সম্পাদনের দায়িত্ব প্রদান করি ততদিন তুমি অপর কোনও কর্ম সম্পাদনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিলে মনে আছে?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'হ্যাঁ, প্রভু।'

ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'তবে আমি তোমাকে রাত্রিকালে দেবদাসীদের এই আবাসস্থল ও এ স্থানের বহিঃদেশে প্রহরার কাজে নিযুক্ত করছি। এমনকী প্রয়োজনে দিনের বেলাতেও এ স্থানে তুমি প্রবেশ করতে পারবে।'

এ কথার পর তিনি একটু থেমে তিনি বললেন, 'দেবদাসী উলুপী যে চেহারার বর্ণনা দিল তেমন কোনও মানুষকে যদি তুমি দেখতে পাও তবে সতর্কতার সঙ্গে তাকে অনুসরণ করে তার আশ্রয়স্থল চিহ্নিত করে তৎক্ষণাৎ সে সংবাদ জানাবে আমাকে। তবে তাকে দেখতে পেলে অন্য কাউকে সে সংবাদ জানাবে না।'

অঙ্গিরা বলল, 'যথা আজ্ঞা প্রভু।'

দেবদাসীদের আবাসস্থল ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে অঙ্গিরাকে নিয়ে ফেরার পথ ধরলেন ত্রিপুরারিদেব। অঙ্গিরার মনে শুধু একটা প্রশ্নের উদয় হল, দেবদাসী উলুপীর প্রেতদর্শন যদি তার দৃষ্টিবিভ্রম হয়ে থাকে তবে তার অনুসন্ধান করতে বলছেন কেন প্রধান পুরোহিত? তবে কি তার উপস্থিতি সত্যিই আছে? অঙ্গিরা অতিথিশালায় ফিরে এল। আর ত্রিপুরারিদেব মন্দিরে উঠে গেলেন। শুকতারা ফুটতেই সোনার শিকল বেজে উঠল।

১০

মরু প্রদেশে কিছু সময় আগে সূর্যাস্ত হয়েছে। সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্তে আকাশের লাল রঙ আর কাফেরদের রক্ত স্রোতে লাল হয়ে যাওয়া মাটি যেন মিলে মিশে এক হয়ে গেছিল। না, তাঁর নির্দেশ পালনে কোনও গাফিলতি করেনি একজন জিহাদিও।

হ্যাঁ, তারা জিহাদি। ইসলামকে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যুদ্ধ করছে তারা। জিহাদ হল যারা ইসলামকে কবুল করে না, অন্য কারো উপাসনা করে, পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ক্ষমাহীন যুদ্ধ। হ্যাঁ, গজনী থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা তিরিশ হাজার নিয়মিত সৈনিক আর মামুদ সুলতানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিন্দু মুলুকে এসে উপস্থিত তারা সবাই এ কথাই বিশ্বাস করে।

মামুদ বাহিনীর বিরুদ্ধে আজ একটা প্রতিরোধ হয়েছিল। নগরীতে প্রবেশের সময় কয়েকজন রাজপুত সামন্তরাজাদের সম্মিলিত বাহিনীর প্রতিরোধ। 'হর হর মহাদেব' ধ্বনি তুলে সমুদ্র সমান আরব বাহিনীকে প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিল মুর্খ কাফেরের দল। কিন্তু সূর্য মধ্য গগনে পৌঁছতে না পৌঁছতেই সেই হিন্দ বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে শুধু জেহাদি স্বেচ্ছা সেবকরাই।

সুলতান মামুদের নিয়মিত সেনাদলকে অস্ত্র ধরতে হয়নি। সুলতান নিজেও তাঁর তাবু ছেড়ে বাইরে বেরোননি। শুধুমাত্র যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে খবর নিয়েছেন আর প্রয়োজন বোধে নির্দেশ পাঠিয়েছেন জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্দেশ্যে। তেমনই তাঁর এক নির্দেশ ছিল নগরীর কোনও পুরুষকে জীবিত রাখা যাবে না।

যুদ্ধে সক্ষম যে রাজপুত পুরুষরা অস্ত্র ধরেছিল তাদের সংখ্যা ছিল দশ সহস্রর মতো। তারা কেউ মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অস্ত্রত্যাগ করেনি মামুদ বাহিনীর সামনে। তারপর ঘোড়ার খুড়ের আঘাতে তাদের ছিন্ন মুণ্ডগুলোকে অপসারিত করে 'তকবীর' ধ্বনি দিতে দিতে আজমের নগরীতে প্রবেশ করে।

মামুদ গজনভীর নির্দেশ মেনে নগরীর প্রতিষ্ঠা গৃহে, প্রাসাদে হানা দিয়েছে তারা। তলোয়ারের আঘাতে ছিন্ন করেছে অশক্ত বৃদ্ধদের কণ্ঠনালি। দৃষ্টিহীন বা খঞ্জ কোনও পুরুষই মুক্তি পায়নি আরব তলোয়ারের ফলা থেকে। পুরুষ শিশুদের বর্শার ফলায় বিদ্ধ করে সে দেহকে বিজয় পতাকার মতো উঁচিয়ে ধরে ঘোড়া ছুটিয়েছে স্বেচ্ছাসেবকের দল। কখনও বা বালকদের দু-পা রজ্জুবদ্ধ করা হয়েছে দুটো আরবি ঘোড়ার সঙ্গে। তারপর দুটো ঘোড়াকে দু-দিকে ছুটিয়ে হতভাগ্য বালকদের শরীর দ্বিখণ্ডিত করার খেলাতে মেতেছে আরব বাহিনী।

সুলতানের নির্দেশ কাফের পুরুষ মাত্রই তাকে বধ করতে হবে। ঠিক যেমন তিন শতাব্দী পূর্বে আরবদের সিন্ধু বিজয়ের সময় রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিন কাশেমকে, আরব শাসক হাজ্জাজ নির্দেশ দিয়েছিলেন যে রাজা দাহিরের সিন্ধ নগরীতে একজন পুরুষও জীবিত না থাকে। এবারের হিন্দু অভিযানে তাঁর পূর্বসুরীর ভাবনাকেই অনুসরণ করছেন মামুদ গজনভী।

আজমের দুর্গ নগরীর পরিধি খুব বৃহৎ নয়। সেখানে খুব বেশি ধনসম্পদ পাবার কথা নয়। তা পাওয়া যায়নি। শুধু একটা মন্দিরে সোনার তৈরি একটা নারীমূর্তি পাওয়া গেছে। পৌত্তলিক কাফেরদের সেই মূর্তিকে গলিয়ে সোনার তালে পরিণত করা হচ্ছে। তবে বেশ কিছু নারীকে নগরী থেকে বন্দি করে আনা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যরা অধিকাংশই সদ্য যুবক। ওই নারীদের দিয়ে শরীরের তৃষ্ণা নিবারণ করবে জিহাদি তরুণরা।

সুলতানের শিবির নগর প্রাকারের মধ্যে স্থাপিত। বলতে গেলে কয়েক যোজন ব্যাপী তার পরিধি। সৈনিক, জিহাদি স্বেচ্ছাসেবক অন্যান্য খিদমদগার-সহ জনসংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজারের কাছে। সঙ্গে আছে পাঁচ হাজার আরবি ঘোড়া ও তিরিশ হাজার জল ও পণ্যবাহী উটের কাফেলা। বিশাল সমারোহ।

সুলতানের শিবির থেকে কিছুটা উচ্চস্থানে আজমের নগরীর অবস্থান। হত্যালীলা ও লুণ্ঠন কার্য সমাপ্ত করে নগরী ত্যাগ করার আগে নগরীতে অগ্নিসংযোগ করেছে আল্লার উপাসকরা। বিশেষত বড় প্রাসাদ আর নিশ্চিত ভাবেই পৌত্তলিকতার আধার কাফেরদের উপাসনা গৃহগুলোতে। নগরীতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সে আগুন।

পাথর আর কাঠের তৈরি স্থাপত্যগুলোর ধসে পড়ার শব্দ মাঝে মাঝে ভেসে আসছে সেখান থেকে। জ্বলন্ত নগরীর লেলিহান অগ্নিশিখার আলোকে বহু দূর পর্যন্ত দৃশ্যমান সুলতানের শিবির। যতদূর চোখ যায় শুধু সার-সার তাঁবু আর উট, অশ্বের সমারোহ।

নানা ধরনের শব্দ ভেসে আসছে নানা জায়গা থেকে। ঘোড়ার পা ঠোকা, লেজ ঝাপটানোর শব্দ, উষ্ট্র বাহিনীর অদ্ভুত ডাক, লুণ্ঠিত নারীদের নিয়ে যুবক স্বেচ্ছাসেবকদের হুল্লোড়ের শব্দ, আবার কখনও বা সেই শব্দর মাঝে ক্ষণিকের কোনও ধর্ষিতা নারীর আর্তনাদ। মাঝে-মাঝে বৃত্তাকারে ঘেরা তাঁবুর মাঝখানে অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে ঝলসানো হচ্ছে ভেড়ার মাংস, গো-মাংস। অথবা জালার মতো বিশাল বিশাল পাত্রে আহার প্রস্তুত করা হচ্ছে।

ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট তাঁবুগুলোর মাঝখানে অবস্থান করছে আকারে বেশ বড় একটা তাঁবু। রক্ষী পরিবৃত সেই তাঁবু থেকে অন্য তাঁবুগুলো যেন কিছুটা সম্ভ্রমের দূরত্ব প্রদর্শন করছে। তবে সেই তাঁবুর বাইরে কোনও উচ্ছ্বাস বা উল্লাসের শব্দ নেই। সে সব শব্দ যেন হঠাৎই এই তাঁবুর কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। মরুভূমিতে ঠান্ডা নামতে শুরু করেছে, কিন্তু তার চেয়েও এক নৈশব্দের, সম্ভ্রমের হয়তো বা আতঙ্কের শীতলতা এই বিশেষ তাঁবুকে ঘিরে বিদ্যমান। এ তাঁবুতে অবস্থান করছেন স্বয়ং সুলতান।

বিশাল তাঁবুর ভিতর পর্দার আচ্ছাদন দেওয়া বেশ কয়েকটা কক্ষ আছে সুলতানের নানা কাজে ব্যবহারের জন্য। তারই একটাতে কয়েকজনের সঙ্গে আলাপচারিতায় ব্যস্ত সুলতান মামুদ গজনীও। মশাল দণ্ডে মশাল জ্বলছে। তার আলোকে আলোকিত তাঁবুর ভিতর কক্ষর মতো সেই স্থান।

মেঝেতে দুর্মূল্য গালিচা পাতা, ধূপদানিতে ধূপ জ্বলছে। তার একপ্রান্তে মাথা সমেত এক ব্যাঘ্র চর্মের ওপর তাকিয়াতে ঠেস দিয়ে বসে আছেন জিহাদের মূর্ত প্রতীক মামুদ শাহ। দীর্ঘকায় কঠিন পুরুষালি চেহারা, আজানুলম্বিত শ্মশ্রু মণ্ডিত মুখমণ্ডলের অধিকারী তিনি।

পরনে সোনার সুতো আর জরি বোনা, কোমরবন্ধ সমন্বিত দীর্ঘ ঝুলের পোশাক, মাথায় তাজ আর কণ্ঠহারের দুর্মুল্য পাথরগুলো ঝিলিক দিচ্ছে মশালের আলোতে। তাঁর পাশে শোয়ানো আছে তাঁর দীর্ঘ তরবারি। যে তরবারি শপথ নিয়েছে এই হিন্দু ভূমিতে পৌত্তলিকতার ভাবনাকে বিনাশ করে ইসলামের পতাকাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার।

আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করা, কেয়ামত পর্যন্ত জিহাদ চালিয়ে যাওয়া তার পবিত্র কর্তব্য। এই তরবারিকে সঙ্গী করে সুলতান ইতিপূর্বে পনেরো বার হানা দিয়েছেন কাফেরদের ভূখণ্ডে। বিশাল এই ভূখণ্ডের পূর্ব সীমা বিস্তৃত গান্ধার থেকে কনৌজ, পশ্চিমে মাকরান, দক্ষিণে সমুদ্রোপকূল এবং দেবল আর উত্তরে কান্দাহার, সিস্তান, কুজদান পর্বতমালা পর্যন্ত।

ঝিলম-পঞ্চনদের তীরবর্তী ভূখণ্ড আর এই রাজপুত ভূমিও হিন্দের অন্তর্গত। সুলতান ইতিপূর্বে যে পনেরো বার হিন্দ আক্রমণ করেছেন প্রতিবারই তিনি ধ্বংস করেছেন অসংখ্য নগরী। লুণ্ঠন করেছেন অপরিমিত সম্পদ। যে সব নর-নারী-শিশুকে ক্রীতদাস হিসাবে আরব মুলুকে নিয়ে গেছেন, ধর্মান্তরিত করেছেন, তাদের সংখ্যাই আনুমানিক পাঁচ লক্ষ!

তবে পূর্ববর্তী সে সব অভিযানের থেকে এ অভিযান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মামুদ গজনীভের কাছে। কারণ, তার সে সব অভিযান ছিল মূলত সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য। আর এবারের অভিযান সুলতানের কাছে অনেক বেশি দায়িত্বের, অনেক বেশি সহজ।

এ অভিযান হচ্ছে জিহাদ। কাফেরদের পৌত্তলিকতাকে উৎপাটিত করে, শোণিত প্রবাহে মসৃণ করতে হবে খলিফার নির্দেশিত পথ। যে কারণে জিহাদের অভিযান শুরুর পূর্ব মুহূর্ত থেকে, স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করা, সেনাদল নির্বাচন, রসদ সংগ্রহ, যাত্রাপথ নির্ধারণ সব ব্যাপারেই অনেক বেশি সতর্ক এবং কৌশলী যুদ্ধবাজ আরব মামুদ। তীব্র আঘাত হানতে হবে হিন্দের মর্মস্থলে।

বিশাল একটা মহিষচর্ম রাখা আছে সুলতানের সামনের ভূমিতে। তাতে আঁকা আছে তাদের যাত্রা পথের মানচিত্র। বেশ কয়েকজন লোক সুলতানের প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করে হাঁটু মুড়ে বসে আছে সেই মানচিত্র ঘিরে। তাদের মধ্যে একজন ব্যক্তি ব্যাতীত অন্য সবাই জন্মসূত্রে ইসলাম ধর্মাবলম্বী, গজনীর বাসিন্দা ও সুলতানের ঘনিষ্ঠ পার্শ্বচর জিহাদি। একজন যে জন্মসূত্রে ইসলাম ধর্মাবলম্বী নয় তাকে সুলতান হিন্দ ভূখণ্ডে তার ত্রয়োদশ অভিযানের সময় কনৌজ থেকে গজনীতে ক্রীতদাস হিসাবে নিয়ে গেছিলেন।

এক সময় এ লোকটা হিন্দ ভূখণ্ডের বহু স্থানে ঘুরেছে একজন মণিকর হিসাবে। দুর্মূল্য পাথরের ব্যাপারে ও হিন্দু ভূখণ্ডের পথঘাটের ব্যাপারে তার জ্ঞান থাকায়, সর্বোপরি সে গজনী যাবার পর ইসলাম কবুল করাতে সুলতান তাকে পার্শ্বচর নিয়োগ করেছেন। ইসলাম কবুল করার পর তার বর্তমান নাম কাসিম। চান্দেল রাজার বিরুদ্ধে সুলতানের চতুর্দশ হিন্দ অভিযানে পথ চেনাবার ব্যাপারে যথেষ্ট বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে সুলতানের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছে কাসিম।

সুলতান তাকালেন কাসিমের দিকে। কাসিম ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে মানচিত্রের ওপর অঙ্গুলি স্থাপন করে তা সুলতানকে দেখাতে দেখাতে বলল, 'এই হল আজমের। এই স্থানে বর্তমানে সুলতান অবস্থান করছেন। এরপর এই পথ ধরে সেই স্থানের দিকে অগ্রসর হব আমরা। আবারও বেশ কিছুটা পথ মরুভূমির মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করতে হবে আমাদের। মাঝে মাঝে কিছু ছোট অরণ্য আর জলপদও অবশ্য পড়বে। তারপর আমরা গিয়ে উপস্থিত হব কচ্ছদেশের প্রান্ত ভাগে মধেরা নগরীতে। এখানে হিন্দুদের সূর্যদেবতার বিরাট এক মন্দির আছে।'

সুলতান প্রশ্ন করলেন, 'তুমি কখনও গেছ সে নগরীতে? সে নগরীর জনসংখ্যা কতো? সৈন্য সংখ্যা কত?'

কাসিম জবাব দিল 'হ্যাঁ, মালিক। আমি একবার গেছি মাধেরাতে। সৌরাষ্ট্রর প্রধান নৃপতি মাণ্ডলিকের অধিকারভুক্ত সে অঞ্চল। সুউচ্চ প্রাকার বেষ্টিত মন্দির। তাকে ঘিরেই নগরীর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। মন্দিরের অধিবাসী নারী-পুরুষ মিলিয়ে পাঁচশত হবে। নগরীর জনসংখ্যা পাঁচ সহস্র। কিন্তু মন্দিরের স্বর্ণ মূর্তির রক্ষার্থে এক সহস্র সেনাদল আছে।'

মামুদ জানেন, তাঁর সমুদ্র সমান সেনার সামনে ওই ক্ষুদ্র সেনা দল খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে। তাই প্রতিরোধের ব্যাপারে চিন্তিত না হয়ে তিনি জানতে চাইলেন, 'কত সময় লাগবে সেখানে পৌঁছতে? পানীয় জল সংগ্রহ করা যাবে সে স্থানে?'

'আনুমানিক তিন সপ্তাহ। হ্যাঁ, মিষ্ট জলের পুষ্করিণী আছে সেখানে।' জবাব দিল কাসিম।

'তারপর?' আবার প্রশ্ন জিহাদি মামুদ গজনভীর।

কাসিম আবার মানচিত্রের ওপর হস্ত চালন করে দেখাতে দেখাতে বলল, 'এরপর দিন সাতেকের মধ্যে এই যে এ পথ ধরে কচ্ছ উপকূলে প্রভাসপত্তনে প্রবেশ করব আমরা। দেখুন এই যে এই স্থানের নাম কানিথকোট। প্রভাসপত্তন বা সোমনাথ নগরীর বাইরে এই কানিথকোটে একটা দূর্গ আছে প্রভাসপত্তনের রাজা ভীমের। হয়তো বা শেষ বারের জন্য এই স্থানে আমাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করতে পারে রাজা ভীমের বাহিনী। আর তারপরই এই চিহ্নিত স্থান হল আমাদের গন্তব্য সোমনাথ মন্দির। আবার এও হতে পারে কোনও বাধারই সম্মুখিন হল না সুলতান বাহিনী।'

কথাটা শুনে সুলতান বললেন, 'তুমি বলছ কোনও প্রতিরোধ নাও আসতে পারে? জিহাদি বাহিনী দেখে পালিয়ে যাবে তারা?'

কাসিম, সুলতানের প্রশ্ন শুনে একটু ইতস্তত করে বলল, 'রাজপুত বাহিনী যত ক্ষুদ্র বা বৃহৎ হোক না কেন, যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে তারা পালায় না। তার প্রমাণ আমরা আজও পেয়েছি। তবে হিন্দুদের একটা বিশ্বাস আছে, বিশেষত সোমনাথ নগরীর বাসিন্দাদের সে বিশ্বাস খুব প্রবল—সোমনাথ মন্দির কেউ কোনও দিন ধ্বংস করতে পারবে না। যারা তা করতে যাবে তারা ধ্বংস হবে সোমেশ্বর মহাদেবের কোপে।'

কাসিমের কথা এ পর্যন্ত শোনার পরই তাঁর গাম্ভীর্য ক্ষণিকের জন্য মুছে ফেলে তাঁবু কাঁপিয়ে অট্টহাস্য করে উঠলেন মামুদ গজনভী। হ্যাঁ, কাফেরদের এই বিশ্বাস আগেও বহুবার শুনেছেন সুলতান। মন্দিরের সেই পুতুল নাকি সর্বশক্তিমান। আর এই বিশ্বাসকে, সেই পুতুলকে ইসলামের পদতলে খণ্ড খণ্ড করার জন্যই তো হিন্দুদের বিশ্বাসের মর্মস্থল ওই সোমনাথ মন্দিরকেই তার এই জিহাদি অভিযানের নির্দিষ্ট লক্ষ বস্তু হিসাবে বেছে নিয়েছেন তিনি। তার তুর্কী তরবারি নাকি হিন্দু মুলুকের বিশ্বাস কোনটা সত্য, তা এবার প্রমাণ করে দেবেন তিনি।

কিছুক্ষণ অট্টহাস্য করার পর আবার গম্ভীর হয়ে গেলেন সুলতান। তার বহুমূল্য অঙ্গুরীয় খচিত দক্ষিণ হস্তে একটা ক্ষুদ্র তীক্ষ্ন ছুরিকা ধরা ছিল। তার ফলাটা মানচিত্রে প্রদর্শিত যাত্রাপথের ওপর একবার বোলালেন তিনি। যেন সম্ভব হলে তিনি এই মুহূর্তেই ওই ছুরিকা দিয়ে বিদীর্ণ করে দিতেন কাফেরদের যাবতীয় ধর্ম বিশ্বাস।

এরপর তিনি ইশারাতে মানচিত্রটা সরিয়ে নিতে বলে বললেন, 'বান্দা কাসিম, তুমি আমাদের পৌঁছে দেবে কাফেরদের সেই মন্দিরে। কাল ফজরের নমাজের পর জিহাদি বাহিনী যাত্রা করবে মাধেরার উদ্দেশ্যে। প্রথমে ধ্বংস করা হবে মাধেরা।' উপস্থিত সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, 'আপনার হুকুম মালিক।'

সুলতানকে কুর্ণিশ করে তাঁর তাঁবু থেকে বেরিয়ে যে যার তাঁবুতে ফেরার পথ ধরল। কোথায় যেন এক হিন্দু নারী প্রবল ধর্ষণের শিকার হয়ে আর্তনাদ করে চলেছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, জীবন বাঁচাবার জন্য ধর্ম পরিবর্তন করলেই কি সনাতন ধর্ম মন থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা যায়? মুছে ফেলা যায় বুকের গভীরে আজন্ম লালিত বিশ্বাস? নিজের তাঁবুর দিকে হাঁটতে হাঁটতে কাসিম তাই মনে মনে বলল, 'আমাকে তুমি ক্ষমা কোরো সোমেশ্বর মহাদেব। তোমার অজানা তো কিছুই নেই।'

১১

বেশ বেলা করেই অঙ্গিরার ঘুম ভাঙল। ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশ মতো গত কয়েক রাত ধরে সে টহল দিচ্ছে দেবদাসীদের আবাস সংলগ্ন চত্বরের বাইরের সেই বাগিচাতে ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে। এক রাতে সে দেবদাসীদের কক্ষ ঘেরা সেই অঙ্গণেও প্রবেশ করেছিল। কিন্তু তেমন কিছু চোখে পড়েনি।

শীতের আগমন বার্তা হিসাবে সূর্যাস্তের সময় এগিয়ে এসেছে, সূর্যোদয়ও কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। রাত্রিতে কুয়াশার চাদর নেমে আসছে মন্দিরের মাথায়। রোজ যখন শুকতারা ফুটে ওঠে, শিকলধ্বনি বেজে ওঠে, জেগে উঠতে শুরু করে মন্দির, ঠিক সে সময় কক্ষে ফিরে শয্যা গ্রহণ করে অঙ্গিরা। ঘুম ভাঙতে প্রায় মধ্যাহ্ন হয়ে যায়।

এদিনও তার ব্যতিক্রম হল না। অঙ্গিরা যখন নিদ্রাভঙ্গ করে, শরীর পরিচ্ছন্ন ও ফলাহারের পর কক্ষ ত্যাগ করল তখন সূর্যদেব ঠিক মাথার ওপর। জনপ্লাবিত মন্দির চত্বর, সোমেশ্বর মহাদেবের নামে জয়ধ্বনিতে আকাশবাতাস মুখরিত। অবশ্য আর কিছু সময়ের মধ্যেই বিগ্রহের ভোজনের জন্য গর্ভগৃহর দ্বার বন্ধ হয়ে যাবে।

অতিথিশালা থেকে মন্দির প্রাঙ্গণে নামার মুখেও একটি ছোট অঙ্গণ আছে। মাথায় তালপাতার ছাউনি দেওয়া বেশ কিছু পাথরের বেদিও আছে সেখানে বসার জন্য। সেখানেই একটা বেদিতে বসল অঙ্গিরা। বাইরের প্রাঙ্গণের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে সেখান থেকে।

একদল নারী পূজা দিয়ে ফিরছে। স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত বেশ বড় একটা দল। হয়তো দূর দেশ থেকে আসা পুণ্যার্থী তারা। দলের আগে একজন পতাকাবাহী আছে। নারীদের সবার পরনেই নীল রঙের কাপড়। আর তা দেখে সমর্পিতার কথা মনে পড়ে গেল অঙ্গিরার।

সেদিনের সেই দুর্ঘটনার পর প্রতিদিনই সন্ধ্যারতির সময় গর্ভগৃহর সামনে হাজির হয়েছে অঙ্গিরা। গতকালও ছিল। কিন্তু সন্ধ্যারতিতে আর নৃত্য প্রদর্শন করতে আসছে না সমর্পিতা। অঙ্গিরা রোজই তাকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়। এখন সে নিজে বুঝতে পারছে ওই সমর্পিতার টানেই সে রোজ হাজির হত গর্ভগৃহর সামনে।

সে কি অসুস্থ, নাকি ঋতুমতি নাকি অন্য কোনও কারণ আছে তার অনুপস্থিতির পিছনে? ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না অঙ্গিরা। আবার কাউকে সে ব্যাপারে প্রশ্ন করতেও সংকোচ বোধ করছে।

অঙ্গিরা হঠাৎ দেখতে পেল খগেশ্বরকে। সামনের পথ দিয়ে যাচ্ছিল সে। অঙ্গিরাকে দেখতে পেয়ে প্রথমে থমকে দাঁড়াল। তারপর অঙ্গণে উঠে কিছুটা কৈফিয়তের সুরে বলল, 'পুরোহিত নন্দিবাহনের কাছে গেছিলাম তার মস্তকে ক্ষুর লেপনের জন্য। প্রধান পুরোহিত আর সহ প্রধান পুরোহিতদের মাথায় এ কাজটা আমাকেই করতে হয়।' এ কথা বলার পর একটু চাপাস্বরে বলল, 'তার দেখা পেলেন?'

অঙ্গিরা জানতে চাইল, 'কার দেখা?'

অঙ্গিরার পাশে বসল খগেশ্বর। তারপর তার হাতে রাখা কাষ্ঠ নির্মিত যে ক্ষুদ্র পেটিকাটা ধরা ছিল সেটা মাটিতে নামিয়ে রেখে বলল, 'ওই যে সেই প্রেত, যে হানা দিয়েছিল দেবদাসীদের আবাস স্থলে। যাকে ধরার জন্য রাত পাহারাতে আপনাকে নিয়োজিত করেছেন প্রধান পুরোহিত।'

অঙ্গিরা কথাটা শুনে চমকে উঠল। ব্যাপারটা খেয়াল করে খগেশ্বর বলল, 'আপনাকে বলেছি না, এখানে একটা পাতা নড়লেও সে খবর আমি পাই। যেদিন রাতে সেই প্রেতাত্মাকে দেখা গিয়েছিল সেদিন রাতে তো আপনি প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে দেবদাসীদের আবাসস্থলে গেছিলেন, আর তারপর থেকে তো আপনি প্রতি রাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ওখানে।'

খগেশ্বরের কথা শুনে ব্যাপারটা চাপা দেবার জন্য অঙ্গিরা বলল, 'হ্যাঁ, আমি রাতে ওদিকে যাই বটে, তবে তার সঙ্গে সেই প্রেতাত্মাকে সন্ধান করার সম্পর্ক নেই। দেবদাসীদের বাসস্থানের গায়ে এই কাননটা উন্মুক্ত ও জনমানবহীন বলে রাত্রিতে আমি মন্দিরের ওই অংশে তিরন্দাজি অনুশীলন করতে যাই। প্রধান পুরোহিত আমাকে ওই স্থান নির্বাচন করে দিয়েছেন এটা অবশ্য সত্য কথা।'

নরসুন্দর অধিপতি কথাটা শুনে মৃদু হাসল। তার মুখ দেখে অঙ্গিরার মনে হল, ব্যাপারটা সে বিশ্বাস করেনি। খগেশ্বর এরপর স্বগোতক্তির স্বরে বলল, 'আমি শুধু ভাবছি ওই প্রেত কে হতে পারে? হাঁ, একথা ঠিকই যে মানুষের মৃত্যুর পর প্রেতাত্মারা এসে প্রভাক্ষেত্রে সমবেত হয়। কিন্তু তারা তো সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে নিজেদের মুক্তি প্রার্থনা করে প্রেতযোনি থেকে মুক্তি লাভ করে। একজন সামান্য দেবদাসীর কাছ থেকে সে মুক্তিলাভের প্রার্থনা করবে কেন? আর তার বিনিময়ে তাকে স্যমন্তক মণির প্রলোভনই বা দেখাবে কেন? তবে সে কি প্রেত নয়, মানুষ?'

খগেশ্বরের কানে যে-কোনও কথা যেতে বাকি থাকেনি তা বুঝতে অসুবিধা হল না অঙ্গিরার। এবং নাপিত শিরোমণির প্রশ্নও অবশ্যই যুক্তিযুক্ত।

খগেশ্বর এরপর তার সাদা সনের মতো চুলে হাত বুলিয়ে বলল, 'তবে হ্যাঁ, ওই একটা ব্যাপারে এই খগেশ্বরেরও সঠিক কিছু জানা নেই!'

'কী ব্যাপারে?' জানতে চাইল অঙ্গিরা।

খগেশ্বর বলল, 'ওই স্যমন্তক মণির ব্যাপারে। কেউ কেউ বলে সে মণি নাকি এ মন্দিরে রক্ষিত আছে। কিন্তু মন্দিরের তোষাগৃহতে যেখানে হিরা-জহরত, দুর্মূল্য দান সামগ্রী সঞ্চিত থাকে সেখানে যে তা নেই সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তবে রক্ষীপ্রধান বা সেবায়েত প্রধানদের থেকে আমি ব্যাপারটা নিশ্চিত জানতাম। একবার শ্রাবণী পূর্ণিমাতে নগরীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দর্শনের জন্য তোষাগৃহর দরজা উন্মুক্ত করা হয়েছিল। আমারও সেদিনে সেখানে প্রবেশের সুযোগ ঘটেছিল। নীলকান্ত মণি-সহ বহু হিরা-জহরত দেখলেও স্যমন্তক মণি সেখানে দেখিনি। হয়তো বা ওই মণি অন্য কোথাও থাকতে পারে। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা মানুষের কথাকেও অস্বীকার করা যায় না আবার!'

অঙ্গিরা জানতে চাইল 'সেই তোষাগৃহ কোথায়?'

খগেশ্বর বলল, 'সোপানশ্রেণী যেখানে নীচে নেমে শেষ হয়েছে তার দক্ষিণ পার্শ্বে সেই কক্ষে যাবার পথ। সাধারণ মানুষের সেদিকে প্রবেশ নিষেধ। সেখানে প্রবেশ পথের সমুখে এবং তোষাগৃহর লৌহ নির্মিত ভারী কপাটের সামনে সর্ব সময় অস্ত্রধারী রক্ষীরা প্রহরাতে থাকে। ওই সম্পদ-কক্ষর মেঝে, ছাদ, দেওয়াল সবই লৌহ চাদরে আবৃত, যাতে কেউ সুড়ঙ্গ খনন করে ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য।'

এ ব্যাপারটা জানা ছিল না অঙ্গিরার। বেশ কিছুদিন হয়ে গেলেও বিশাল এ মন্দিরের এখনও সবকিছু দর্শন করা হয়নি তার। অঙ্গিরা এরপর প্রশ্ন করল, 'ওই স্যমন্তক মণি নিশ্চিত কোনও দামি মণি। ও মণির বিশেষত্ব কী?'

প্রশ্নটা শুনে নরসুন্দর অধিপতি বললেন, 'ও মণি যে স্বয়ং দ্বারকাধীশ কৃষ্ণর মণি। তাঁর মানবলীলার সঙ্গে যে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো জড়িয়ে আছে তার মধ্যে ওই স্যমন্তক মণির ঘটনা অন্যতম। এমনকী ভগবান কৃষ্ণকে ওই মণির জন্য চৌর্যবৃত্তির দায়েও অভিযুক্ত হতে হয়েছিল! সে কাহিনি আপনি জানেন না!'

অঙ্গিরা বলল, ' ''সামন্তক মণি'' নামটা যেন পরিচিত হলেও সে কাহিনি আমার জানা নেই।'

খগেশ্বর একবার আকাশের সূর্যের দিকে তাকিয়ে সময়ের হিসাব পরিমাপ করে নিয়ে বলল, 'ওঠার আগে সে কাহিনি সংক্ষেপে তবে বলি আপনাকে।'

'সত্রাজিৎ নামে দ্বারকাতে এক যাদব বাস করতেন। যাঁর কাছে স্যমন্তক নামে অতি উজ্জ্বল এক বৃহৎ মণি ছিল। যার সমকক্ষ মণি স্বর্গ-মর্ত কোথাও ছিল না। সত্রাজিতের মনে সন্দেহ জাগে যে দ্বারকাধীশ কৃষ্ণ সেই মণি তার কাছ থেকে হরণ করতে পারেন। এই ভয়ে তিনি সেই মণি তার ভ্রাতা প্রসেনকে দান করেন। প্রসেন সেই মণি ধারণ করেন, এবং একদিন একলা মৃগয়াতে গিয়ে এক সিংহর দ্বারা নিহত হন। সিংহ সে মণি মুখে করে নিয়ে চলে যায়। কিন্তু প্রসেনের মৃত্যু ও সেই মণি অন্তর্হিত হওয়াতে সত্রাজিৎ ও দ্বারকাবাসীর মনে হয় ওই স্যমন্তক মণি কৃষ্ণই, প্রসেনকে হত্যা করে হরণ করেছেন!

দ্বারকাবাসীর এই মিথ্যা অপবাদ থেকে মুক্তি পেতে ভগবান কৃষ্ণ নিজে ওই মণির অনুসন্ধানে অবতীর্ণ হন। জঙ্গলে উপস্থিত হয়ে তিনি প্রসেনের মৃতদেহ যেখানে পতিত ছিল সেখান থেকে সেই সিংহের পদচিহ্ন অনুসরণ করলেন। কিছু দূর গিয়ে তিনি দেখলেন সেই সিংহ মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। তাকে পেট চিরে হত্যা করেছে কোন বিশালাকৃতির ভল্লুক। এবং সেই ভল্লুকের পদচিহ্ন এগিয়েছে এক গুহার দিকে।

সেই গুহাতে বাস করতেন ভল্লুকশ্রেষ্ঠ প্রাচীন জাম্বুবান, যিনি ত্রেতা যুগে শ্রীরামচন্দ্রর বানর সেনার সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। সিংহকে হত্যা করে জাম্বুবানই স্যমন্তক মণি হস্তগত করেছিলেন। জাম্বুবান সেই মণি কৃষ্ণর হাতে তুলে দিতে না চাওয়াতে যুদ্ধ শুরু হল কৃষ্ণ ও জাম্বুবানের মধ্যে।

অবশেষে যুদ্ধে পরাজিত হলেন জাম্বুবান। তিনি শুধু সেই স্যমন্তক মণি কৃষ্ণর হাতে দিলেনই না, তার সঙ্গে-সঙ্গে নিজ কন্যা জাম্ববতীকেও সমর্পণ করলেন তাঁর কাছে।

জাম্ববতীকে বিবাহ করে কৃষ্ণ দ্বারকাতে ফিরে এলেন এবং স্যমন্তক মণি ফিরিয়ে দিলেন সত্রাজিৎকে। মণি ফিরে পেলেও কৃষ্ণ যদি তাঁকে মিথ্যা কলঙ্ক লেপনের জন্য কোনও শাস্তি দেন সেই ভয়ে সত্রাজিৎ তাঁর কন্যা সত্যভামাকে তুলে দিলেন কৃষ্ণের হাতে। কৃষ্ণ হলেন সত্রাজিতের জামাতা। এই হল স্যমন্তক মণি আখ্যানের প্রথমাংশ।' এই বলে কিছুটা থেমে খগেশ্বর আবার শুরু করলেন।

'সেই কালে যাদবদের আরও তিনজন গোষ্ঠীপতি ছিলেন—শতধন্বা, মহাবীর কৃতবর্মা ও কৃষ্ণর পরম সেবক ও ভক্ত অত্রু্ুর। তাঁরা তিনজনই সত্রাজিতের পরম সুন্দরী কন্যা সত্যভামাকে কামনা করতেন। কিন্তু সত্রাজিৎ তাঁর কন্যাকে কৃষ্ণর নিকট সম্প্রদান করাতে ভীষণ অপমানিত বোধ করলেন তাঁরা তিনজন।

কৃতবর্মা ও অত্রু্ুর, শতধন্বাকে পরামর্শ দিলেন সত্রাজিৎকে বধ করে স্যমন্তক মণি হরণ করতে। তাঁরা দুজন শতধন্বাকে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে কৃষ্ণ যদি সত্রাজিৎ বধের বিরোধিতা করেন তবে কৃষ্ণর বিপক্ষে শতধন্বার হয়ে অস্ত্র ধরবেন।

কৃষ্ণ বারণাবতে গমন করলে শতধন্বা মহাবীর কৃতবর্মা ও অত্রু্ুরের কথায় প্ররোচিত হয়ে সত্রাজিৎকে নিদ্রিত অবস্থায় হত্যা করলেন। পিতার মৃত্যুতে শোকাতুরা সত্যভামা সংবাদ প্রেরণ করলেন কৃষ্ণকে। তিনি দ্বারকাতে প্রত্যাগমনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন শতধন্বাকে বধের উদ্দেশে। কিন্তু অত্রু্ুর ও কৃতবর্মা কৃষ্ণর সংহার মূর্তির কথা স্মরণ করে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষাতে অপারগ বলে জানিয়ে দিলেন শতধন্বাকে।

বিপদ দেখে শতধন্বা অশ্বপৃষ্ঠে জঙ্গলে পলায়ন করলেন। এ সংবাদ কর্ণগোচর হতেই কৃষ্ণ, ভ্রাতা বলরামকে রথের সারথী করে শতধন্বার পশ্চাদ্ধাবন করলেন। কিন্তু রথের চেয়ে অশ্ব দ্রুতগামী। তাই শতধন্বাকে প্রাথমিক অবস্থাতে ধরতে পারলেন না কৃষ্ণ। কিন্তু এক সময় শতধন্বার অশ্ব পরিশ্রমক্লিষ্ট হয়ে মৃত্যু বরণ করল। অগত্যা শতধন্বা পদব্রজে পলায়ন শুরু করলেন।

কৃষ্ণ যখন শতধন্বার মৃত অশ্বকে দেখতে পেলেন তখন তিনি রথ থেকে নেমে পড়লেন যুদ্ধরীতি মেনে। যে শত্রু পদব্রজে যাচ্ছে সে শত্রুকে পদব্রজে অনুসরণ করা উচিত, পদব্রজেই তার সঙ্গে-সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া উচিত। শাস্ত্র সেকথাই বলে।

বলরামকে একলা রথে রেখে তিনি পদব্রজে জঙ্গলে অনুসরণ করলেন শতধন্বাকে। দুই ক্রোশ যাবার পর কৃষ্ণ সাক্ষাৎ পেলেন শতধন্বার। ন্যায় যুদ্ধে তিনি শতধন্বার মস্তকছেদন করলেন ঠিকই, কিন্তু শতধন্বার মৃতদেহ থেকে স্যমন্তক মণি মিলল না। তিনি ফিরে এসে একথা ভ্রাতা বলরামকে জানাতেই তিনি কৃষ্ণর প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করে বললেন, 'তুমি নিশ্চয়ই সে মণি পেয়ে জঙ্গলে কোথাও তা লুকিয়ে রেখেছ পাছে আমাকে সে মণির ন্যায্য ভাগ দিতে হয় বলে। সে কারণে তুমি আমাকে রথে রেখে একলা শতধন্বা নিধনে গেছিলে। তোমার মতো লোভীর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করলাম আমি। আমি আর দ্বারকাতে ফিরব না।' একথা বলে তিনি রথ নিয়ে অন্যত্র যাত্রা করলেন।

ব্যাপারটাতে কৃষ্ণ সংকটে পড়লেন। স্যমন্তক মণি হরণের মিথ্যা অপবাদ দ্বিতীয়বার কলঙ্কিত করছে তাঁকে। অত্রু্ুর আর কৃতবর্মা, সত্রাজিৎ হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকলেও তারা কিন্তু কখনও এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে আসেননি বা সত্রাজিতের হত্যালীলাতে সামিল হননি। কিন্তু কৃষ্ণ দ্বারকাতে ফিরে জানতে পারলেন তাঁর পরম ভক্ত অত্রু্ুর তাঁকে না জানিয়েই দ্বারকা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছেন। এ ব্যাপারটা তাঁর প্রতি সন্দেহের জন্ম দিল কৃষ্ণর মনে। তবে কি অত্রু্ুরের কাছেই ওই স্যমন্তক মণি আছে? সত্রাজিৎ নিধনের পর শতধন্বা তাঁর কাছেই গচ্ছিত রেখেছিল স্যমন্তক মণি? যদিও এটা কৃষ্ণর অনুমান মাত্র। তাঁর কাছে এ ব্যাপারে কোনও প্রমাণ নেই। তিনি যাদবদের চতুর্দিকে পাঠালেন অত্রু্ুরের খোঁজে, তাঁকে বুঝিয়ে দ্বারকাতে ফিরিয়ে আনার জন্য।

সময় এগিয়ে চলল। দেখতে দেখতে তিন বৎসর অতিক্রান্ত হল। এই তিন বৎসর ভাইয়ের প্রতি অভিমানী বলরাম আর দ্বারকায় ফিরলেন না। তিনি বিদেহ নগরে বাস করতে লাগলেন। আর এই তিন বৎসর কৃষ্ণকেও কাটাতে হল ভ্রাতা বলরামের অপবাদ মাথায় নিয়ে। মানব জন্মে ভগবান বিষ্ণুও শোক-তাপ-অপমান থেকে মুক্ত হতে পারেন না।

অবশেষে তিন বৎসর অতিক্রান্ত হলে যাদবরা অত্রু্ুরের সন্ধান পেয়ে তাকে বুঝিয়ে দ্বারকাতে ফিরেয়ে আনলেন। অতঃপর কৃষ্ণ গিয়ে হাজির হলেন তার ভক্ত অত্রু্ুরের কাছে। তিনি তাকে বললেন, 'তুমি যদি সত্যিই আমার ভক্ত হয়ে থাকো, আর স্যমন্তক মণি যদি শতধন্বা তোমার কাছে গচ্ছিত রেখে থাকে তবে তুমি সেই স্যমন্তক মণি যাদবকুলের কাছে প্রদর্শন করে আমাকে কলঙ্ক মুক্ত করো। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি সে মণির অধিকারী তুমিই হবে।'

সত্যভামার ঘটনাতে কৃষ্ণর ওপর অত্রু্ুর সাময়িক ভাবে ক্ষুব্ধ হলেও তিনি কৃষ্ণর পরম ভক্ত ছিলেন। ভগবানের আবেদন আর প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না ভক্ত। কৃষ্ণর অনুমান সত্যি ছিল। অত্রু্ুর সেই স্যমন্তক মণি দ্বারকাবাসীদের প্রদর্শন করে কৃষ্ণর কলঙ্কমোচন করলেন।

স্যমন্তক মণি উদ্ধার হয়েছে জেনে বলরাম দ্বারকাতে ফিরে এলেন এবং ওই মণি দাবি করে বসলেন। একই ভাবে সত্যভামাও ওই মণি দাবি করলেন। কিন্তু কৃষ্ণ তাঁদের বললেন স্যমন্তক মণির অধিকারী অত্রু্ুর। তিনি তাঁকে কথা দিয়েছেন মণি তাঁর কাছে থাকবে। অত্রু্ুরের থেকে কেউ মণি হরণ করলে তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবেন কৃষ্ণ।

এ কথা শুনে সেই মণির দাবি ত্যাগ করলেন বলরাম ও সত্যভামা। কিন্তু ভক্তের প্রতি ভগবানের এই ন্যায়পরায়ণতা মুগ্ধ করল শিষ্য অত্রু্ুরকে। তিনি কৃষ্ণর কাছে সেই স্যমন্তক মণি নিয়ে হাজির হয়ে বললেন, 'প্রভু, আপনি ভক্তর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করুন। যাদব কুলপতি হিসাবে এ মণি আপনি আপনার মস্তকে ধারন করুন। আমি সামান্য মানুষ, এ মণি আমার ধারণ করা শোভা পাবে না। আর আপনি এ মণি ধারণ করলে ভবিষ্যতে এ মণির অধিকার নিয়ে যাদবকুলে পূর্বের ন্যায় কোনও অনর্থ ঘটবে না।'

ভক্তর বারংবার অনুরোধে কৃষ্ণ শেষ পর্যন্ত তাঁর উষ্ণীষে ধারণ করলেন স্যমন্তক মণি। সে মণি হয়ে উঠল কৃষ্ণর মাথার মণি। কিন্তু তাঁর মানবলীলা সাঙ্গ হবার পূর্বে তিনি নাকি ওই স্যমন্তক মণি দান করেন সোমেশ্বর মহাদেবের এই মন্দিরে। দীর্ঘদিনের প্রবাদ ওই মণি নাকি এই মন্দিরের কোন গোপন স্থানে রক্ষিত আছে। কেউ কেউ তো এমনও বলেন যে সোমেশ্বরের শরীরের মধ্যেই ও মণির অবস্থান। এর বিনিময়ে শুধু কুশবর্ত নয়, সম্পূর্ণ আর্যাবর্ত ক্রয় করা যায়।'

অঙ্গিরা জানতে চাইল, ' ''কুশবর্ত'' কোন স্থান?'

তার ক্ষৌরকার্যের কাষ্ঠ পেটিকাটা তুলে নিয়ে খগেশ্বর বলল, 'প্রভাসপত্তনের মতো ছোট ছোট করদ রাজ্য নিয়ে গঠিত এদেশের প্রাচীন নাম ছিল ''কুশবর্ত''। যেমন, দ্বারকা নগরীর প্রাচীন নাম ছিল ''কুশস্থলি''।'

অঙ্গিরা, বৃদ্ধ খগেশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, 'আপনার স্যমন্তক মণির কাহিনি শুনে বড় চমৎকৃত হলাম।' তার কথা শুনে স্মিত হেসে কয়েক-পা এগিয়েও আবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল খগেশ্বর। তারপর অঙ্গিরার দিকে তাকিয়ে বলল, 'তোমার পিতা-মাতার পরিচয় কিন্তু এখনও স্মরণ করতে পারছি না। নীলকণ্ঠর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে একবার জিগ্যেস করব তাঁর কিছু খেয়াল পড়ে কিনা?'

অঙ্গিরা জানতে চাইল, 'তিনি কে?'

'এ নগরীর সবথেকে প্রাচীন মানুষ। এক সময় মন্দিরের সেবায়েত প্রধান ছিলেন।' জবাব দিয়ে নিজের কাজে পা বাড়ালেন নরসুন্দর প্রধান।

অঙ্গিরা এদিন আর সে সময় অতিথিশালার অঙ্গণ ত্যাগ করল না। নিজ কক্ষে ফিরে গিয়ে নিদ্রাদানের পর সায়াহ্নে কক্ষ ত্যাগ করে সোজা গিয়ে উপস্থিত হল গর্ভগৃহর সামনে। সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গেই তিলোত্তমা হাজির হল দেবদাসীদের নিয়ে। কিন্তু তাদের মধ্যে সমর্পিতা নেই।

তিলোত্তমা নিজেও অত্যন্ত রূপসী ও নৃত্যগীতে পারঙ্গম। একক নৃত্য পরিবেশন করল সে। কিন্তু তবুও অঙ্গিরার মনে হল সমর্পিতার অনুপস্থিতিতে এই নৃত্য-গীত কেমন যেন ম্লান, অনুজ্জ্বল। ব্যর্থ মনোরথে আবার অতিথিশালাতে ফিরে এল সে।

ঠিক মধ্যরাতে অঙ্গিরা প্রতিদিনের মতো অতিথিশালা ত্যাগ করে তার ধনুর্বাণ নিয়ে রওনা হল তাকে ত্রিপুরারিদেব প্রহরার যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা সম্পাদনের উদ্দেশ্যে।

১২

আর ক'দিন পরই পূর্ণিমা। প্রায় চন্দ্রালোকিত রাত্রি। তবে রাত্রি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। চাঁদের ঔজ্জ্বল্য ফিকে হতে শুরু করবে এরপর। শেষ রাতে ক'দিন ধরে কুয়াশার স্তর গাঢ় হচ্ছে। ঠিক এই সময়তেই গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে সবাই।

অঙ্গিরার যতদূর চোখ যায়, তার চারপাশে ঘুমন্ত নিস্তব্ধ প্রাকার বেষ্টিত সোমনাথ মন্দির। দেবদাসীদের প্রাকারবেষ্টিত আবাসস্থলের বহিঃকাননে এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে সারা রাত প্রহরা দিয়েছে অঙ্গিরা। যে স্থানে ভগ্নপ্রায় প্রাচীন মন্দিরগুলো মহাকালের সাক্ষী হয়ে আজও দণ্ডায়মান সেই চন্দ্রদেবতার মন্দিরের আশেপাশে পরিভ্রমণ করে এসেছে সে।

কাননের এক পার্শ্বে দণ্ডায়মান বিশাল যে বৃক্ষদেবতারা আছেন তাদেরই একজনের গুড়ির গায়ে হেলান দিয়ে অঙ্গিরা বসেছিল বাকি রাতটুকু অতিক্রম করার অপেক্ষাতে। শুকতারা ফুটে উঠলেই সে উঠে পড়বে অতিথিশালাতে নিজের কক্ষে ফিরে যাবার জন্য।

মৃদু তন্দ্রা যেন অঙ্গিরার চোখে নেমে আসতে শুরু করেছে। হঠাৎ তার মনে হল, যে প্রাকার দিয়ে দেবদাসীদের প্রাঙ্গণ সংলগ্ন বাসস্থান আবৃত সেই প্রাকারের এক স্থানে যেন একটা ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়িয়েছে! চাঁদের আলো প্রাকারের সে স্থানে ভালো করে না পৌঁছলেও, একটা মানুষ যেন সে স্থানে প্রকারের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে।

অঙ্গিরা চোখ কচলে সেদিকে তাকাতেই বুঝতে পারল তার অনুমান মিথ্যা নয়। হ্যাঁ, কেউ একজন সেখানে আছে। মৃদু মৃদু নড়ছে সে। প্রাকারের গায়ে মানুষের আকারের কোনও বৃক্ষ নেই যে, সেই বৃক্ষ আন্দোলিত হয়ে অঙ্গিরার দৃষ্টিবিভ্রম ঘটাবে। তবে প্রাকারের গায়ে চন্দ্রালোক ভালো করে প্রবেশ না করাতে এবং চারদিক মৃদু কুয়াশাবৃত থাকাতে, সে মূর্তি নারী না পুরুষের তা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না অঙ্গিরা।

কোনও মানুষ নিশ্চিতভাবে সেখানে অবস্থান করছে বুঝতে পেরে গাছের নীচ ছেড়ে উঠে কাঁধে ধনুর্বাণ নিয়ে এগোল সেদিকে। কিন্তু কয়েক পা সেদিকে এগোতেই অঙ্গিরার মনে হল সেই মূর্তি যেন প্রাকারের গায়ে ঝুঁকে পড়ল। অঙ্গিরা যখন সেখানে উপস্থিত হল তখন সেখানে কেউ নেই।

অঙ্গিরা এত ভুল দেখল! অঙ্গিরার চোখ তো তিরন্দাজের চোখ। আর এর পরই তার চোখে পড়ল জল নিষ্কাষণের সেই বৃত্তাকার ছিদ্রটা। হ্যাঁ, অনায়াসে একজন মানুষ সামান্য কসরত করলেই ও পথে ভিতর-বাহির করতে পারে। পিঠে তূণীর না থাকলে অঙ্গিরাও ওই পথে অবশ্যই প্রবেশ করতে পারবে ভিতরের প্রাঙ্গণে।

অঙ্গিরা অনুমান করল তবে ওই পথেই অন্তর্হিত হয়েছে, যে এখানে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সে কে? সেই প্রেত, নাকি অন্য কেউ? ব্যাপারটা অনুসন্ধানের প্রয়োজন, তাই অঙ্গিরা এগোল কিছুটা তফাতে প্রাকারের গায়ে প্রবেশতোরণের দিকে।

নিঃশব্দে কপাট উন্মোচিত করে অঙ্গিরা প্রাঙ্গণে উঠে এল। স্তম্ভ সমৃদ্ধ প্রাঙ্গনে কোথাও খেলা করছে চাঁদের আলো, আবার কোথাও কুয়াশা মাখা অন্ধকার। প্রাঙ্গণ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে দেবদাসীদের ঘুমন্ত কক্ষগুলো। কোথাও কোনও শব্দ নেই। বাইরে থেকে ভেসে আসা জলোচ্ছ্বাসের শব্দ ছাড়া। সে যদি ভিতরে প্রবেশ করে থাকে তবে সে কোথায় আত্মগোপন করল?

মার্জার পায়ে অঙ্গিরা পরিভ্রমণ করতে শুরু করল চত্বরটা। এক সময় সে উপস্থিত হল সেই স্থানে যেখানে প্রকারের বাইরে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের জলরাশি। সেই স্থানে প্রাকার সংলগ্ন ছাতার নীচে বেদিতে একজনকে বসে থাকতে দেখল অঙ্গিরা। তবে তার পোশাক দেখে অঙ্গিরা বুঝতে পারল যে বসে আছে সে পুরুষ নয়, নারী। হাঁটু মুড়ে মাথা ঝুঁকিয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। নিশ্চিত কোনও দেবদাসী হবে। কিন্তু এত রাতে সে কক্ষের বাইরে কেন? অঙ্গিরা তার কাছে এগিয়ে গেল। তারপর একটু ইতস্তত করে প্রশ্ন করল, 'কে তুমি?'

অঙ্গিরার কণ্ঠ শুনে মৃদু চমকে উঠে মুখ তুলে সে বলল, 'আমি রাজশ্রী।'

শেষ রাতের চাঁদের আলো এসে পড়েছে মেয়েটির মুখে। কিন্তু অঙ্গিরা বিস্মিত ভাবে দেখল, এ নারী নিজেকে রাজশ্রী নামে পরিচয় দিলেও তাঁর সামনে চাঁদের আলোতে যে বসে আছে সে তো দেবদাসী সমর্পিতা!

রাজশ্রী অবশ্য এর পরই নিজের ত্রুটি বুঝতে পারল। উঠে দাঁড়িয়ে সে জবাব দিল, 'আমি দেবদাসী সমর্পিতা।' জবাব দেবার পরমুহূর্তেই অঙ্গিরার দিকে তাকিয়ে মৃদু বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল দেবদাসী সমর্পিতার চোখেও। সে চিনতে পারল অঙ্গিরাকে। হ্যাঁ, এ যুবকই তো তার প্রাণরক্ষা করেছিল!

অঙ্গিরা তাকে প্রশ্ন করল, 'এত রাতে কক্ষের বাইরে কেন?'

সমর্পিতা জবাব দিল, 'দেবদাসীদের বিনা অনুমতিতে প্রাকারের বাইরে যাওয়ার নিয়ম নেই জানি। কিন্তু প্রাকারের ভিতরে কক্ষত্যাগ করে এই প্রাঙ্গণে আসার ক্ষেত্রে কোনও নিষেধাজ্ঞা আছে জানি না তো? আমার নিদ্রা আসছে না তাই কক্ষ ত্যাগ করে প্রাঙ্গণে এসে বসেছি।' কৈফিয়তের সঙ্গে যেন মৃদু ঝাঁঝের রেশ নির্গত হল দেবদাসীর কণ্ঠ থেকে।

অঙ্গিরা তার জবাব শুনে মৃদু হেসে বলল, 'না, আমি কৈফিয়ত তলব করিনি। কৌতূহলবশত প্রশ্ন করেছি। এত রাতে এই নির্জন প্রাঙ্গণে বসে থাকতে তোমার ভয় করছে না?'

'ভয় করবে কেন?' জানতে চাইল দেবদাসী।

অঙ্গিরা উত্তর দিল, 'এ প্রাঙ্গণে যে একজন দেবদাসীর প্রেত দর্শন হয়েছে তা নিশ্চয়ই শুনেছ? প্রেতে তোমার ভয় নেই?'

সমর্পিতা কথাটা শুনে মৃদু হাসল। তার বিশ্বাস, জল নির্গমনের গহ্বর দিয়ে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করা কোনও দেবদাসীর প্রেমিককে দেখেই প্রেত বলে ভ্রম হয়েছে উলুপী নামের সেই দেবদাসীর। রাত গভীর হলে দেবদাসীরাই যে শুধু ওই গহ্বর পথে বাইরে যায় তাই নয়, কখনও-কখনও কোনও সাহসী যুবকও তার প্রেয়সীর প্রেমের আকাঙ্ক্ষাতে, ধরা পড়লে কঠিন শাস্তি এমনকী মৃত্যুদণ্ডর মুখে পড়তে হবে জেনেও, প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। উত্তরা তাকে একথা জানিয়েছে। উত্তরারও বিশ্বাস, উলুপী যাকে প্রেত ভেবেছে সে আসলে তেমনই কেউ। এই তো, এই যুবকের আগমনের কিছু আগেই একজন ওই ছিদ্রপথে প্রাঙ্গণে উঠে প্রবেশ করল একটা কক্ষে। যদিও সে পুরুষ নয়, অভিসার সাঙ্গ করে ফিরে আসা কোনও দেবদাসী হবে। সমর্পিতা বলল, 'আমি আগেও শুনেছি এ স্থানে নাকি রাতের বেলা প্রেত ঘুরে বেড়ায়। প্রেতে আমার ভয় নেই। তবে প্রেতেরাও দেখছি দেবদাসীদের মতো মুক্তি চায়, তাই না?'

'অর্থাৎ?' জানতে চাইল অঙ্গিরা।

সমর্পিতা জবাব দিল, 'শুনলাম ওই প্রেত নাকি দেবদাসী উলুপীকে বলেছে যে, তার মুক্তির ব্যবস্থা করলে সে তাকে স্যমন্তক মণির সন্ধান দেবে!'

সমর্পিতার বক্তব্য এবার বোধগম্য হল অঙ্গিরার। বাইরের প্রাকারে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। শেষ চাঁদের আলো এসে পড়েছে সমর্পিতার মুখে। অঙ্গিরা বুঝতে পারল এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছড়িয়ে যাচ্ছে তার মুখমণ্ডলে।

সোমনাথ সুন্দরী এরপর জানতে চাইল, 'তোমার পরিচয় কী? রক্ষী বাহিনীর কেউ?'

অঙ্গিরা এ প্রশ্নর কি জবাব দেবে বুঝতে না পেরে বলল, 'আমার নাম অঙ্গিরা। না, আমি রক্ষীবাহিনীর কেউ নই। বল্লভী নগরী থেকে এখানে এসেছি প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের কাছে। তিনি আমাকে এখানে প্রবেশানুমতি দিয়েছেন।'

'কী কার্য সম্পাদনের জন্য তুমি এখানে এসেছ?' জানতে চাইল দেবদাসী সমর্পিতা।

ব্যাপারটা এড়িয়ে যাবার জন্য অঙ্গিরা বলল, 'এখনও তিনি আমার ওপর তেমন কোনও বিশেষ কর্মভার দেননি। তবে ভবিষ্যতে দেবেন। এখানেই থাকতে হবে আমাকে।'

এ কথা বলার পর আলোচনার প্রসঙ্গ অন্য খাতে প্রবাহিত করার জন্য অঙ্গিরা বলল, 'তোমার নৃত্য প্রদর্শন আমি দেখেছি। অতীব মনোমুগ্ধকর। তবে একটু সাবধানতা অবলম্বনের প্রয়োজন। ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটতে পারত সেদিন।' কথাটা শুনে দেবদাসী সমর্পিতা হাসল ঠিকই, কিন্তু অঙ্গিরা স্পষ্ট বুঝতে পারল, সে হাসির মধ্যে যেন একটা বিষণ্ণতার আভাস এখনও বর্তমান। অস্পষ্টভাবে সে বলল, 'তোমাকে ধন্যবাদ প্রাণরক্ষাকারী।'

অঙ্গিরা হেসে বলল 'না, তেমন ধন্যবাদ দেবার কিছু নেই। দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে দেখে আমি ছুটে গিয়ে তোমাকে বলয় থেকে মুক্ত করলাম। আমি না করলে অন্য কেউ কাজটা করত।'

সমর্পিতা বেশ দৃঢ়ভাবে বলল, 'আমি জানি অন্য কেউ এ বিপদের ঝুঁকি নিত না। কাছাকাছি তো আরও অনেক পুরুষই ছিলেন। গর্ভগৃহ চত্বর দেবদাসীদের নৃত্যগীতে আলোকময় হয়ে থাকে ঠিকই, তবে তাদের জীবন প্রকৃত অর্থে মূল্যহীন। একজন নগণ্য দেবদাসীর মৃত্যু হলে তার স্থান নেবে আর একজন। সেই মৃতার শোকে একবারের জন্যও, একদিনের জন্যও বন্ধ হবে না গর্ভগৃহর সমুখে দেবদাসীদের নৃত্যগীত। দুর্ঘটনায় যদি আমার মৃত্যু হতো তবে এক দিবসের জন্যও কেউ মনে রাখত না আমাকে।'

সমর্পিতার বলা কথাগুলো যে সত্যি, তা একদিনে দেবদাসীদের সম্পর্কে অঙ্গিরা যা জেনেছে তাতে সে বুঝতে পারল। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের মুখ থেকেও দেবদাসীদের সম্পর্কে একই ভাবনার কথা শুনেছে অঙ্গিরা। সমর্পিতাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত হয়নি, কারণ মন্দিরে দেবদাসীর অভাব হবে না, কিন্তু অঙ্গিরার জীবন অমূল্য—এমনই কথা তাকে মৃদু ভর্ৎসনার স্বরে জানিয়েছিলেন ত্রিপুরারিদেব।

অঙ্গিরা, সোমনাথ সুন্দরীর বিষণ্ণতা দূর করার জন্য বলল, 'আবারও বলছি, তোমার নৃত্যশৈলী কিন্তু অতীব মনোমুগ্ধকর। অন্য দেবদাসী যারা নৃত্য প্রদর্শন করে তাদের তুলনায় অনেক উৎকৃষ্ট। শুধু আমি নই, অনেকেই তা মনে করেন। আমি এ কথাও লোককে বলতে শুনেছি যে ভবিষ্যতে দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমার স্থলাভিষিক্তা হবার সম্ভাবনা আছে তোমার। আমি তো তোমার নৃত্যশিল্প দেখার জন্যই প্রত্যহ গর্ভগৃহর সমুখে উপস্থিত হই। কী অপূর্ব তোমার নৃত্যশৈলী!'

অঙ্গিরার কথা শুনে এবার মুহূর্তের জন্য যেন সত্যিই একটা লজ্জামিশ্রিত হাসি ফুটে উঠল দেবদাসী সমর্পিতার ঠোঁটে। মাথা ঝুঁকিয়ে মাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল সে।

অঙ্গিরা এবার ভালো করে তাকাল তার শরীরের দিকে। সমর্পিতার শরীরে এখন দেবদাসীর প্রচলিত উজ্জ্বল নৃত্য পোশাক বা অলঙ্কার নেই। রাত্রির শয়নের জন্য যে শুভ্র মসৃণ দীর্ঘ বস্ত্রখণ্ডে সে নিজেকে আবৃত করেছিল সেই বস্ত্রখণ্ডই তার পরনে। অন্তর্বাসহীন বস্ত্রখণ্ডর ভিতর থেকে সোমনাথ সুন্দরীর স্তন যুগল যেন চেয়ে আছে বৈতরণীর পথে উপস্থিত হওয়া চাঁদের দিকে, শরীরে প্রতিটা বাঁক বিমূর্ত হয়ে আছে, তার দেহের প্রতিটা রেখা যেন ধরা দিচ্ছে অঙ্গিরার চোখে। বাতাসে উড়ছে, তিরতির করে কাঁপছে সোমনাথ সুন্দরীর কেশগুচ্ছ।

অঙ্গিরা অবশ্য কয়েক মুহূর্ত তার শরীরের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে জানতে চাইল, 'তুমি সন্ধ্যারতিতে নৃত্য প্রদর্শন করছ না কেন?'

অঙ্গিরার প্রশ্ন শুনে সমর্পিতা মুখ তুলে বলল, 'সেদিন আমার নৃত্য প্রদর্শনের সময় আমার বস্ত্রে অগ্নিসংযোগ হবার ব্যাপারটা নাকি অমঙ্গলজনক। দেবদাসী প্রধানা তিলোত্তমা আমাকে জানিয়েছে, যতদিন না প্রধান পুরোহিত আমার ব্যাপারে কোনও নির্দেশ দেন, পাপ স্খলনের জন্য কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, ততদিন পর্যন্ত সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে আমি নৃত্য প্রদর্শন করতে পারব না।'

অঙ্গিরা জানতে চাইল, 'পাপ স্খলন মানে? কীসের পাপ?'

সমর্পিতা জবাব দিল 'হয়তো বা সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে নৃত্য প্রদর্শনের সময় আমার বা অন্য কোনও দেবদাসীর চেতনে বা অবচেতনে কোনও ত্রুটি বা পাপ কার্য সম্পন্ন হয়ে থাকতে পারে। পুরোহিত নন্দিবাহন ও মল্লিকার্জুন সেই পাপের অনুসন্ধান করে তা প্রধান পুরোহিতকে জানাবেন। তারপর প্রধান পুরোহিত সেই ত্রুটি সংশোধন বা পাপ স্খলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে আমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।'

কথাগুলো বলার পর দেবদাসী সমর্পিতার মনে হল, সে পাপ কি তার ঘুঙুরদানা হারানোর ফল? ব্যাপারটা উপস্থিত কেউ বুঝতে না পারলেও জীবন্ত বিগ্রহ কি বুঝতে পেরেছেন ব্যাপারটা? ওই বিশেষ ঘুঙুরদানা পায়ে না থাকার কারণেই কি কূপিত হলেন মহাদেব?

এ ব্যাপারটা নিয়ে দেবদাসী উত্তরাও বেশ আশঙ্কিত। একমাত্র সেই জানে সোমেশ্বর মহাদেব প্রদত্ত ঘুঙুরদানা হারাবার ব্যাপারটা। ঘটনা যদি প্রকাশ পায় তবে নাকি এ ব্যাপারটাকেই নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা হবে সোমেশ্বর মহাদেবের কূপিত হবার কারণ হিসাবে। এবং এই অন্যায় কার্য অর্থাৎ ওই ঘুঙুর ছাড়া নৃত্য প্রদর্শনের জন্য নাকি কোনও ভয়ঙ্কর শাস্তির মুখেও পড়তে হতে পারে সমর্পিতাকে। দেবদাসীদের জীবনের অনুশাসন বড় কঠিন।

সমর্পিতার বলা কথা শুনে অঙ্গিরা বেশ আশাহত হল। সমর্পিতা যখন আবার তাঁর নৃত্য প্রদর্শন করবে তখন তা দেখার সুযোগ হবে কিনা তা অঙ্গিরার জানা নেই।

তবু সে বলল, 'আমি প্রতীক্ষায় থাকব তোমার নৃত্যকলা দেখার জন্য।'

অঙ্গিরার কথাতে বিষণ্ণ হাসল সমর্পিতা।

চাঁদ এবার মুছে যেতে শুরু করেছে। কিছু সময়ের মধ্যেই শুকতারা ফুটে উঠবে। ফিরতে হবে অঙ্গিরাকে। কিন্তু তার আগে হঠাৎই একটা কথা মনে পড়ে গেল তার। সে বলল, 'আমার কাছে একটা সোনার ঘুঙুরদানা আছে। হয়তো বা তোমাদের কারো হবে সেটা। দুর্ঘটনার আগের দিন তোমরা যখন নৃত্য প্রদর্শন করছিলে তখন কারও ঘুঙুরছড়া থেকে ছিটকে এসে আমার সামনে পড়েছিল। আমি নিজের কাছে রেখে দিয়েছি।'

অঙ্গিরার কথা কানে যাবার সঙ্গে-সঙ্গেই সমর্পিতার মুখমণ্ডল থেকে একটা শঙ্কার ছায়া সরে গেল। সে বলে উঠল, 'ও ঘুঙুরদানা তোমার কাছে! ও তো আমার ঘুঙুরদানা!'

অঙ্গিরা হেসে জবাব দিল, 'হ্যাঁ, আমার কাছেই আছে।'

দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'দয়া করে ওটা ফেরত দাও আমাকে। নইলে মহাবিপদের সম্মুখীন হব আমি।'

অঙ্গিরা বলল, 'নিশ্চই দেব। তবে সে দানা তো আমার সঙ্গে নেই। কক্ষে রাখা আছে।'

'তবে আমি কীভাবে পাব সেই ঘুঙুরদানা?' কাতর কণ্ঠে বলে উঠল সমর্পিতা।

অঙ্গিরা তার মনের অনিশ্চয়তার ভাবনা পাঠ করে বলল, 'তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। আগামী কাল রাতে আমি এ স্থানে এসে ওই ঘুঙুরদানা ফিরিয়ে দেব তোমাকে।'

সমর্পিতার মুখমণ্ডলের শঙ্কার ভাবটা অন্তর্হিত হল। সে বলল, 'আমি তবে এ স্থানে প্রতীক্ষা করব তোমার জন্য।'

আকাশের দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরা বলল, 'এবার আমাকে ফিরতে হবে। কাল আবার এই স্থানে মিলিত হব আমরা।'

স্মিত হেসে মাথা ঝোঁকালো দেবদাসী সমর্পিতা। সেই প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে ফেরার পথ ধরল অঙ্গিরা। সে যখন অতিথিশালার কাছে উপস্থিত হল তখনই আকাশে শুকতারা ফুটে উঠল। আর তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ঝমঝম শব্দে বাজতে শুরু করল সেই সোনার শিকল।

শিকলটা প্রথমে বাজান প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবই। তারপর সে কাজে যুক্ত হল তাঁর দুই প্রধান সহকারী মল্লিকার্জুন ও নন্দিবাহন। এদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দুই সহ প্রধান পুরোহিত ওপরের চত্বরে উঠে এসে ত্রিপুরারিদেবের হাত থেকে সোনার শিকলটা নিয়ে পর্যায়ক্রমে বাজাতে লাগলেন।

ঘুম ভাঙতে শুরু করল মন্দিরের। ভোরের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই এবার সমুদ্র-স্নানে যেতে হবে ত্রিপুরারিদেবকে। সেজন্য তিনি পা বাড়াতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটা অন্য শব্দ কানে আসাতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। শব্দটা কানে যেতেই মৃদু বিস্মিত হয়ে শিকলের শব্দ থামিয়ে দিলেন তার সঙ্গীরা।

অশ্বখুরের শব্দ! শিকলধ্বনির সঙ্গে-সঙ্গেই মন্দিরের প্রধান তোরণ সংলগ্ন যে ক্ষুদ্রাকৃতি তোরণ আছে তা দ্বাররক্ষীরা খুলে দেয় মন্দির চত্বর ধৌতকরণ ইত্যাদি কাজের জন্য। সে পথেই প্রবেশ করেছে কোনও অশ্বারোহী। মন্দির প্রাকারে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তার অশ্বখুরধ্বনি।

সে শব্দ এসে থামল মূল মন্দিরের সোপানশ্রেণীর ঠিক নীচে। অশ্বর পিঠ থেকে অবতরণ করে ওপরে দণ্ডায়মান তিন পুরোহিতের প্রতি মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল সেই অশ্বারোহী। তাকে দেখে পুরোহিতরা অনুমান করল সে কোনও রাজকর্মচারী হবে। ত্রিপুরারিদেব তাকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলেন ওপরে উঠে আসার জন্য।

উঠে এল সে। তিনজন পুরোহিতই তাকে ওপরে উঠে আসার পর চিনতে পারল। আগন্তুকের নাম মীরধ্বজ। রাজা ভীমের ঘনিষ্ঠ পার্শ্বচর এই মীরধ্বজ। তাঁর মাধ্যমেই রাজা ভীম সোমেশ্বর মন্দিরের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করেন।

তিন পুরোহিতের উদ্দেশ্যে আবারও মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে মীরধ্বজ বললেন, 'অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে মহারাজ ভীম তাঁর প্রাসাদে প্রধান পুরোহিত অথবা তাঁর সহকারীদের সঙ্গে বাক্যালাপ করতে চান। তিনি তাঁর প্রাসাদে আপনাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।'

আমন্ত্রণের বিষয়টা যে অত্যন্ত জরুরি তা বুঝতে অসুবিধা হল না ত্রিপুরারিদেবের। নইলে ভোরের আলো ভালো করে ফোটার পূর্বেই মহারাজের আমন্ত্রণ নিয়ে উপস্থিত হতেন না বার্তাবাহক মীরধ্বজ। তার মুখমণ্ডলেও কেমন যেন একটা চাপা উত্তেজনার ভাব জেগে আছে!

ত্রিপুরারিদেব তাকে প্রশ্ন করলেন, 'আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কিছু জানা আছে? অগ্রিম সে বিষয় অবগত থাকলে আলোচনায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যোগ দেওয়া যায়। তথ্য সংগ্রহ সংক্রান্ত যদি কোনও ব্যাপার থাকে তবে তার জন্যও প্রস্তুত হওয়া যাবে।'

প্রশ্ন শুনে মীরধ্বজ মৃদু চুপ করে থেকে বললেন, 'মন্দিরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় জরুরি আলোচনা করতে চান প্রভাসপত্তন পতি। মার্জনা করবেন, মহারাজই আপনাদের কাছে সবকিছু অবগত করবেন।'

মন্দিরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়! কথাটা শুনে বেশ বিস্মিত হলেন তিন পুরোহিত। মুহূর্তের জন্য ত্রিপুরারিদেবের একবার মনে এল তবে কি অন্ধকারের প্রহরীর অন্তর্ধানের ব্যাপার কোনও ভাবে কানে গেছে রাজা ধীরাজের? কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? সে স্থানের অস্তিত্ব বা তার প্রহরীর ব্যাপারই তো রাজা ভীমের জানার কথা নয়।

প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব মন্দির ত্যাগ করে নগরীতে প্রবেশ করেন না। একটু ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, 'আপনি মহারাজকে জানাবেন আমার ও এ মন্দিরের প্রতিনিধি রূপে সে সভায় উপস্থিত থাকবেন পুরোহিত মল্লিকার্জুন।'

প্রধান পুরোহিতের বার্তা গ্রহণ করে মন্দির থেকে নেমে অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করলেন মীরধ্বজ।

অশ্বখুরের শব্দ মন্দির প্রাকারের বাইরে মিলিয়ে গেল। আলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে, জেগে উঠছে মন্দির। সমুদ্রে অবগাহনের জন্য মন্দির ত্যাগের আগে ত্রিপুরারিদেব সহ প্রধান পুরোহিত মল্লিকার্জুনকে বললেন, 'মহারাজের সঙ্গে সাক্ষতের সময় সোমেশ্বর মহাদেবের প্রসাদী ফুল ও পরমান্ন নিয়ে যাবেন তাঁর মঙ্গল কামনাতে।'

১৩

কোঙ্কন উপকূলের অধিপতি আহরিয়া রাজপুত নৃপতি মাণ্ডলিক। তাঁর করদ রাজ্যের শাসক রাজা ভীম। আর রাজা ভীম, নৃপতি মাণ্ডলিক, সবার মাথার ওপর অবস্থান করছেন ভোজরাজ পরমদেও। মধ্য ও পশ্চিম হিন্দ ভূখণ্ডের নরপতিরা তাকেই তাদের সর্বময়কর্তা বা রক্ষাকর্তা মনে করেন। এমনকী কাশীরাজের মতো সমৃদ্ধ নৃপতিও, পরমদেওকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন।

বিশ সহস্র হস্তিবাহিনী ও একলক্ষ পদাতিক বাহিনীর অধিপতি রাজপুত্র কুলদ্ভব প্রসার পরমদেও। ভোজরাজ, শৈব্য পরমদেওর রাজধানী ধারা নগরী। ভোজরাজের তুলনায় রাজা ভীম তো বটেই স্বয়ং মাণ্ডলিকও সামান্য নরপতি মাত্র। মালোয়ার ভোজরাজের অনুগ্রহী।

প্রভাসপত্তন সোমেশ্বর মহাদেবের আবাসস্থল। স্বয়ং মহাদেবই এই প্রাচীন নগরীর রক্ষাকর্তা বলে মানুষের বিশ্বাস। পাঁচ শত বৎসর পূর্বে আরব জুয়ানেদের সেনাদের আক্রমণ ব্যতীত পরবর্তী পাঁচ শত বছর ধরে নিরুপদ্রবেই জীবন কাটাচ্ছে প্রভাসপত্তনের বাসিন্দারা।

ভারতবর্ষর ছোট-বড় সব নৃপতির কাছেই পবিত্র নগরী প্রভাসপত্তন। তাদের অনেকেই এ নগরীতে আসেন পিতৃপুরুষের জন্য পিণ্ডদান করতে, সোমেশ্বর মহাদেবের পূজা দিতে। সে সময় রাজা ভীমের আথিত্য গ্রহণ করেন তাঁরা। ভোজরাজ এ নগরীতে কোনও দিন পদার্পণ না করলেও দশ বৎসর পূর্বে তাঁর সিংহাসন আরোহণের সময়কালে পর্যাপ্ত পরিমাণ উপঢৌকন পাঠিয়েছিলেন সোমনাথ মন্দিরে। রাজা ভীম কিছুটা আত্মীয়তার সম্পর্কযুক্ত ভোজরাজের সঙ্গে। ভোজরাজ পরমদেওর এক মহিষী সোলাঙ্কি রাজবংশের কন্যা।

তিন পুরুষ ধরে প্রভাসপত্তনের শাসনকর্তা রাজা ভীম। পিতামহ মুলরাজের আমলে রাজধানী। রাজার বাসস্থান ছিলো বল্লভী নগরী। রাজা ভীমরাজের পিতা নাগরাজের আমলে বল্লভী নগরী থেকে রাজগৃহ স্থানান্তরিত হয় এই প্রভাসপত্তনেই। সামরিক বল বলতে কচ্ছর কানিথকোটে এক ক্ষুদ্র দূর্গ আছে রাজা ভীমের। সেনাদল মাত্র পাঁচ সহস্র। সীমান্তে নয়, সেই সেনাদলের অধিকাংশই মোতায়েন থাকে কানিথকোট দূর্গে ও সোমনাথ নগরীতে রাজপ্রাসাদে। প্রভাসপত্তনের শান্তিরক্ষার কাজে কখনও, কদাচিৎ তাদের অবতীর্ণ হতে হলেও ইতিপূর্বে তাদের কখনও যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়নি।

নগরীর মধ্যভাগে প্রস্তর ও কাষ্ঠ নির্মিত প্রাসাদ। সমুখ ভাগে বিশাল প্রবেশ তোরণের গায়ে গালার প্রলেপের ওপর সোনালি রঙের আবরণ দেখে স্বর্ণ মণ্ডিত বলে ভ্রম হয়। খড়গধারী, তিরন্দাজ সেনারা প্রহরা দেয় তোরণ। উন্মুক্ত এক শিবিকাতে মন্দির ত্যাগ করে প্রাসাদ অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন পুরোহিত মল্লিকার্জুন। সঙ্গে রয়েছে ছত্রধর।

শিবিকার পাশাপাশি পদব্রজে চলতে চলতে বিরাট কাষ্ঠ দণ্ড সমন্বিত ছত্র দিয়ে মল্লিকার্জুনের মস্তক আড়াল করে রেখেছে সূর্যতাপ থেকে। এ ব্যতীত আরও একজন আছেন। সেই সেবায়েত নিয়ে চলেছে রেশমখণ্ড আচ্ছাদিত এক স্বর্ণপাত্র। তাতে আছে রাজা ভীমের জন্য প্রসাদী ফুলমালা ও চন্দনকাঠের পরমান্নর আধার।

মন্দির থেকে প্রাসাদের পথে নগরীর বহু মানুষ মল্লিকার্জুনকে দেখে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানিয়েছে তাঁর উদ্দেশ্যে। সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব তো বটেই, তাঁর সহকারীদ্বয় মল্লিকার্জুন ও নন্দিবাহনও নগরবাসীর কাছে পরম সম্মানের পাত্র। প্রায় দেবতার মতোই অনেকে তাঁদের দেখেন। এই পুরোহিতশ্রেষ্ঠরাই তো সোমেশ্বর মহাদেবের সাধারণ মানুষের যোগসূত্র রক্ষা করেন।

মল্লিকার্জুনের শিবিকা প্রাসাদ তোরণে উপস্থিত হতেই প্রহরীরা তোরণ উন্মুক্ত করে দিল। তোরণ থেকে প্রাসাদ পর্যন্ত পথ দু-পাশে সেনাদলের শৃঙ্খলে আবৃত। তারাও মাথা ঝোঁকাতে লাগল মল্লিকার্জুনকে দেখে। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল করলেন পুরোহিত। দণ্ডায়মান সেনাদলের মধ্যে, মুখমণ্ডলে কাঠিণ্যের পরিমাণ যেন অধিক বলে বোধ হচ্ছে।

ইতিপূর্বে কার্যোপলক্ষে এ প্রাসাদে বহুবার এসেছেন মল্লিকার্জুন। সেনারা প্রতিবারের মতো এবারও তাঁর প্রতি মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করলেও পুরোহিত দর্শনে তাদের মুখমণ্ডলে সৌভাগ্যজনিত যে উৎফুল্ল ভাব প্রকাশ পেত, তা যেন নেই। যেন চিন্তান্বিত হিমশীতল কাঠিণ্য যুক্ত তাদের মুখমণ্ডল।

শিবিকাবাহকরা শিবিকা নামাল প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার স্বর্ণ কপাটের ঠিক সামনে। মল্লিকার্জুনের অভ্যর্থনার জন্য সেখানে দণ্ডায়মান ছিলেন রাজপ্রতিনিধি মীরধ্বজ। পুরোহিত শিবিকা থেকে নামতেই তিনি তাঁর উদ্দেশ্যে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানিয়ে বললেন, 'মহারাজ আপনার আগমনের জন্যই প্রতীক্ষারত।'

সেবায়েতের থেকে সেই রেশমবস্ত্র আবৃত পাত্র নিয়ে মল্লিকার্জুন, মীরধ্বজের সঙ্গে প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। না, রাজসভা বা রাজঅন্তঃপুরে ভীমের বিলাসবহুল কক্ষ নয়। মীরধ্বজ, পুরোহিতকে নিয়ে চললেন মন্ত্রণাকক্ষের দিকে। গবাক্ষহীন, পুরু পাথরের দেওয়াল মোড়া আধো অন্ধকার এক কক্ষ। একটি মাত্র মশাল জ্বলছে সে কক্ষে। তাতে কক্ষের অন্ধকার দূর হচ্ছে না।

অতি বিশ্বস্ত কিছু আমাত্ত ও সৈন্যাধ্যক্ষ মহাভিষাকে নিয়ে সেখানে অবস্থান করছিলেন রাজা ভীম। মীরধ্বজ, মল্লিকার্জুনকে নিয়ে সে কক্ষে প্রবেশ করতেই তাদের পিছনে লৌহকপাট বন্ধ হয়ে গেল, কোনও আলোচনা যাতে অন্য কারো কর্ণগোচর না হয় সেজন্য।

পাথরের আসনে উপবিষ্ট ছিলেন মধ্যবয়সি রাজা ভীম। মল্লিকার্জুন যেই হোন না কেন, রাজার আসন সবার ওপরে। তাই মল্লিকার্জুনই মাথা ঝুঁকিয়ে প্রথম প্রণাম জানালেন তাকে। তারপর তাঁর কাছে এগিয়ে হাতের পাত্র থেকে রেশমবস্ত্রের আবরণ উন্মোচন করে বললেন, 'মহারাজ ভীমের মঙ্গল কামনায় প্রধান পুরোহিত সোমেশ্বর মহাদেবকে বিশেষ পূজা নিবেদন করেছেন। আপনি সেই প্রসাদী ফুল আর পরমান্ন গ্রহণ করুন।'

মল্লিকার্জুনের কথা শুনে রাজা ভীম উঠে দাঁড়িয়ে সেই পাত্র গ্রহণ করে মাথায় ছুঁইয়ে তা সমর্পণ করলেন এক পার্শ্বচরের হাতে। রাজার ইশারাতে তাঁর পাশেই আসন গ্রহণ করলেন সোমনাথ মন্দিরের পুরোহিত।

কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। রাজা ভীম মৌনতা ভঙ্গ করে বললেন, 'আপনাকে আমি আমন্ত্রণ জানিয়েছি মন্দিরের নিরাপত্তার বিষয় জরুরি আলোচনার জন্য। আপনাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পূর্বের ন্যায় আছে নিশ্চয়?'

রাজার কথা শুনে সোমনাথ পুরোহিত মৃদু বিস্মিত ভাবে বললেন, 'মন্দিরের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা? মন্দিরের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের মতোই অটুট আছে। রক্ষীরা নিয়মিত প্রহরা দেয়, সেবায়েতরাও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে মন্দির চত্বর। গর্ভগৃহ ও মন্দিরকোষও নিরাপত্তার আচ্ছাদনে আবৃত। সর্বোপরি সোমেশ্বর মহাদেব প্রহরা দিচ্ছেন তাঁর আবাসস্থলকে। নিরাপত্তার তো কোনও অভাব দেখি না। কেন, তেমন কোনও সংবাদ আছে নাকি মহারাজের কাছে?'

ভীম জবাব দিলেন, 'না, মন্দিরের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ব্যাপারটা বর্তমানে কেমন তা জানার জন্য প্রশ্নটা করেছিলাম। তবে হয়তো বা কোনও দুর্যোগের সম্মুখীন হতে পারে সোমেশ্বর মহাদেব মন্দির, আর এই প্রভাসপত্তন।'

'অর্থাৎ?' জানতে চাইলেন পুরোহিত।

প্রশ্নের জবাবটা এল মহারাজের অন্য পাশে বসা প্রধান মহাভিষার কাছ থেকে। তিনি বললেন, 'বিধর্মী মামুদ বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে আবার হানা দিয়েছে ভারত-ভূখণ্ডে। মরুপথে এ ভারতভূমিতে প্রবেশ করেছে তারা। আজমের নগরী ধ্বংস করেছে গজনী বাহিনী। শিশু থেকে বৃদ্ধ, কোনও পুরুষকেই জীবিত রাখেনি তারা। আজমের নগরী ধ্বংস করার পর মামুদ বাহিনী ঝড়ের মতো এগোচ্ছে আমাদের দিকে। মাধেরা নগরীকে লক্ষ করে। হয়তো বা মাধেরা সূর্য মন্দিরই মামুদ বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু। কারণ, যতদূর সংবাদ মিলেছে, তাতে সুলতানের এ অভিযান শুধু মাত্র লুণ্ঠনের জন্য বলে মনে হচ্ছে না। কারণ তাদের যাত্রাপথে মন্দির আর দেব-দেবীর বিগ্রহকেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসাবে বেছে নিচ্ছে তারা। সে মন্দির ছোট হোক বা বড় হোক, তাতে সম্পদ থাকুক বা না থাকুক। যেন বিগ্রহ উৎপাটনই তার লক্ষ।'

কথাটা জেনে অবাক হয়ে গেলেন মল্লিকার্জুন। রাজনীতি না করলেও মামুদ নামটা শুনেছেন মল্লিকার্জুন। এক হিংস্র লোক, পরধর্ম বিদ্বেষী একটা লোক। প্রতি বৎসর একবার করে হানা দেয় ভারত ভূখণ্ডে, সম্পদ লুণ্ঠন করে, মন্দির ভাঙে। দাস হিসাবে নিজের মুলুকে নিয়ে যায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে। কাশীতেও একবার সে হানা দিয়েছিল নাকি মন্দির অপবিত্র করার জন্য। এই ভারত ভূখণ্ডর নানা প্রান্ত থেকে সোমনাথ মন্দিরে আসে পুণ্যার্থীরা। তাদের কাছেই গজনীপতি মামুদের নানা কাহিনি শুনেছেন মল্লিকার্জুন। সেই মামুদ এবার কোঙ্কনে হানা দিতে চলেছে!

সেনাপতি মহাভিষা তাঁকে প্রাথমিক সংবাদ জানাবার পর রাজা ভীম বললেন, 'নৃপতি মাণ্ডলিকের নির্দেশে মাধেরাতে করদ রাজ্যগুলো সৈন্য সমাবেশ করতে চলেছে মাসুদ বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য। আমার পক্ষ থেকে সেনাপতি মহাভিষা আজই রওনা হচ্ছেন মাধেরাতে দুই সহস্র সৈন্য নিয়ে। চালুক্যরাজ অম্বুজও আসছেন মাণ্ডলিকের আহরিয়া রাজপুতবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে। মালবের মহানৃপতি ভোজরাজকেও ইতিমধ্যে সংবাদ পাঠানো হয়েছে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে।'

এ কথা বলে রাজা ভীম একটু থামলেন। তারপর বললেন, 'কিন্তু মাধেরার যুদ্ধে সবকিছুই ঘটতে পারে। এমন যদি হয় যে রাজপুত বাহিনী পরাজিত হল এবং ভোজরাজের হস্তিবাহিনী এসে উপস্থিত হল না, তখন?

মালব এখান থেকে বেশ দূরের পথ। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নগরীর অভিজাত ব্যক্তি, সম্ভ্রান্ত নারীদের নিয়ে কানিথকোট দূর্গে চলে যাব। মাধেরার যুদ্ধে আমাদের সেনারা যদি পরাজিত হয় তবে মামুদের পরবর্তী লক্ষ্য নিশ্চই হবে প্রভাসপত্তন আর সোমনাথ মন্দিরের অতুলনীয় ধনসম্পদ ও নারীরা।

মন্দিরে যে দেবদাসীরা আছে তাদের আপনারা আমার সঙ্গে কানিথকোট দূর্গে পাঠাতে পারেন তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে। আর প্রধান পুরোহিত সহ আপনি ও পুরোহিত নন্দিবাহনও আমার সঙ্গী হতে পারেন।

হাতে সময় বিশেষ নেই। আর কয়েকদিনের মধ্যেই কানিথকোট রওনা হব আমি। দুই সহস্র সেনাদল অবশ্য রেখে যাব মন্দির ও নগরী রক্ষার্থে। এ ব্যাপারে আলোচনার জন্যই আমি আপনাদের আজ আমন্ত্রণ জানিয়েছি।'

রাজা ভোজের প্রস্তাব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মল্লিকার্জুন বললেন 'দেবদাসীরা দেবতা সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে নিজেদের সমর্পণ করেছে। তাদের নাথ সোমেশ্বর মহাদেব। তাদের জীবন-মৃত্যু সবই সোমেশ্বর মহাদবের সঙ্গে জড়িয়ে। নাথকে ত্যাগ করে তারা অন্যত্র যাবে কীভাবে? কোনও অবস্থাতেই তাদের মন্দিরের বাইরে যাবার নিয়ম নেই। তা ছাড়া...।' এই বলে মৃদু থামলেন পুরোহিত।

'তা ছাড়া কী?' প্রশ্ন করলেন ভীম।

লক্ষ লক্ষ মানুষের মতো মল্লিকার্জুনেরও প্রবল বিশ্বাস স্বয়ং সোমেশ্বর মহাদেবই তাঁর আবাসস্থল ও তার ভক্তদের রক্ষাকর্তা। পৃথিবীর কোনও শক্তিই নেই যে তাকে পরাস্ত করতে পারে। কেউ সে চেষ্টা করলে তার ধ্বংস অনিবার্য। তাই তিনি বললেন 'তা ছাড়া, মামুদ যদি সত্যিই এ নগরীতে উপস্থিত হন তবে তার মৃত্যুই তাকে এ নগরীতে টেনে আনছে বলে মনে হয়। মন্দির, বিগ্রহ ধ্বংসকারী, লক্ষ লক্ষ হিন্দুর হত্যাকারী নারকী মামুদের জীবনে কোনও পাপ আর অবশিষ্ট নেই। তাকে চূড়ান্ত শাস্তি দেবার জন্য, স্বমূলে বিনাশ করার জন্য প্রভু সোমেশ্বরই হয়তো তাকে এখানে টেনে আনছেন। জাগ্রত মহাদেবের সংহারমূর্তি এবার প্রত্যক্ষ করবে বিশ্ববাসী। একজন পাপীও আর গজনীতে ফিরে যেতে পারবে না।'—একটানা কথাগুলো বলে থামলেন সোমনাথ মন্দিরের পুরোহিত।'

মল্লিকার্জুনের কথা শুনে রাজা ভীম বললেন, 'আমিও মনে করি সোমনাথই আমাদের সবার রক্ষাকর্তা। ভোজরাজ পরমদেওর হস্তিবাহিনী যদি নির্দিষ্ট সময় উপস্থিত হয় তবে এটাই সত্য হবে। বিগ্রহ উৎপাটকদের একজনও প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারবে না। কিন্তু আমার মনে পড়ে যাচ্ছে আরব জুয়ানেদের সেনাদলের বীভৎস সেই কাহিনি! কীভাবে তারা নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছিল! মৃতদেহ পর্যন্ত ধর্ষিত হয়েছিল!'

মল্লিকার্জুন বললেন, 'সে কাহিনি আমি জানি। আরব সেনাবাহিনী চালুক্যরাজ পুলকেশীকে পরাজিত করে মন্দির ধ্বংস করে উজ্জয়নীতে প্রবেশ করতে গেছিল। গুর্জর রাজ নাগভট্ট তাদের শেষ পর্যন্ত পরাস্ত করেন। তবে সে ঘটনার আসল কারণ ছিল সোমেশ্বর মহাদেবের কোপ।

সোমনাথ মন্দিরের অনুকরণে বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্র মন্দির নির্মিত হচ্ছিল যা ধর্মসিদ্ধ নয়। সেই সব মন্দির নির্মাণ করে কিছু রাজা ও ব্রাহ্মণ সোমেশ্বর মহাদেবের নামে সম্পদ আহরণের চেষ্টা শুরু করেছিলেন মানুষকে প্রতারিত করে।

সোমেশ্বর মহাদেবের আবাসস্থল একটাই। তা হল এই প্রভাসপত্তন, অন্য কোথাও নয়। তা ছাড়া নাকি সোমেশ্বর মন্দিরের অধ্যক্ষ ও প্রধান পুরোহিতের মন্দির পরিচালনাতে ত্রুটি ছিল। দেবদাসীরা তাদের কামজ্বালা মেটাবার জন্য কিছু পুরোহিত ও সেবায়েতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। তাই তাদের শাস্তি দিয়েছিলেন সোমেশ্বর মহাদেব। তবে আরব সেনারা কিন্তু মন্দির ধ্বংস করলেও গর্ভগৃহতে প্রবেশ করতে পারেনি। অগ্নিবলয় সৃষ্টি হয়েছিল গর্ভগৃহর চারপাশে। অন্য সবাইয়ের মৃত্যু হলেও নিজেকে নিজেই রক্ষা করেছিলেন দেবতা।'

মল্লিকার্জুন যে কথা বললেন, আরবদের মন্দির ধ্বংসের পিছনে সে ব্যাখ্যা আগেও নানা জনের কাছে শুনেছেন রাজা ভীম। নিজেদের পাপের ফল নাকি সে সময় পেয়েছিল দেবদাসীরা। কুপিত হয়েছিলেন সোমেশ্বর। নইলে আরবদের সাধ্য কি ছিল সোমেশ্বর মহাদেবের মন্দিরে প্রবেশ করে?

রাজা ভীম, মল্লিকার্জুনের সঙ্গে বিতর্কে গেলেন না। তিনি শুধু বললেন 'আমার বক্তব্য আপনি প্রধান পুরোহিতের গোচরে আনবেন। মন্দির বিষয়ক যে-কোনও সিদ্ধান্তের অধিকারী আপনারাই। আমি শুধু বিষয়টা সম্পর্কে আমার কথা ব্যক্ত করলাম। তবে মামুদের নগরী বা মন্দির আক্রমণের আশঙ্কাটা আপাতত গোপন রাখবেন। নইলে আতঙ্কে আগাম বিশৃঙ্খলার জন্ম হতে পারে।'

পুরোহিত বললেন, 'আপনি নিশ্চিত থাকুন, এ সংবাদ আমি একমাত্র প্রধান পুরোহিতের কাছেই ব্যক্ত করব।'

মন্ত্রণাকক্ষের আলোচনা শেষ হল। দ্বার উন্মুক্ত হল। মল্লিকার্জুনের জন্য একজন ফলাহার নিয়ে প্রবেশ করল সেখানে। তিনি শুধু তার থেকে একটা হর্তুকী মুখে তুলে মন্দিরে ফেরার জন্য কক্ষ-প্রাসাদ ত্যাগ করলেন। সোমেশ্বর মহাদেবের ওপর তাঁর বিশ্বাস ভক্তি অটুট থাকলেও, কপালেও মৃদু চিন্তার ভাব দেখা দিল।

সোমেশ্বর মহাদেব নিশ্চিত ধ্বংস করবেন সেই পাপিষ্ঠদের। কিন্তু একটা অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি তো হবেই।

মল্লিকার্জুন যখন মন্দিরে ফিরলেন তখন বিকাল হয়েছে। মন্দির ত্যাগ করে ফিরতে শুরু করেছে পুণ্যার্থীর দল। তিনি সোজা উপস্থিত হলেন প্রধান পুরোহিতের কক্ষের সামনে। ত্রিপুরারিদেব দ্বার প্রান্তে তার সহকারীর জন্যই অপেক্ষারত ছিলেন। কক্ষে প্রবেশ করে মুখোমুখি উপবেশন করলেন দুই পুরোহিত। মল্লিকার্জুন, রাজা ভীমের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন বিস্তৃত ভাবে অবগত করলেন প্রধান পুরোহিতকে।

সে কথা শুনে ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'রাজা ভীমকে আপনি যথার্থই বলেছেন। কোনও অবস্থাতেই তাদের নাথকে ত্যাগ করতে পারে না দেবদাসীরা। আমৃত্যু দেবদাসীরা সোমেশ্বরের সঙ্গে আবদ্ধ ওই নীলকণ্ঠ ফুলের মালা আর ওই ঘুঙুরদানার মাধ্যমে। আর প্রধান পুরোহিতের তো মন্দির ত্যাগের কোনও প্রশ্নই নেই।

ব্যাপারটা আপনি নন্দিবাহনকেও জানিয়ে রাখুন। আশা করি পিতা সোমেশ্বর আমাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। আগামী কাল পূর্ণিমা। তার পরের পূর্ণিমাতে চন্দ্রগ্রহণ। লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাবেশ ঘটবে মন্দিরে। আমাদের সবাইকেই প্রস্তুত হতে হবে সেদিনের জন্য। এর মধ্যবর্তী সময় যদি কোনও দুর্যোগের সংবাদ আসে তবে পরিস্থিতি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আপনি রাজকর্মচারীদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে চলুন। তবে কোনও পরিস্থিতিতেই দেবদাসীরা মন্দির ত্যাগ করবে না। একদিনের জন্যও সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে নৃত্যগীত বন্ধ হবে না।'

মল্লিকার্জুন, প্রধান পুরোহিতের কথা শুনে ফিরে গেলেন। সন্ধ্যারতির প্রস্তুতি শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।

মল্লিকার্জুন কক্ষত্যাগ করার পরই ত্রিপুরারিদেবের মনে পড়ে গেল ভূগর্ভস্থ সেই কক্ষের কথা। প্রহরী বিহীন অবস্থায় পড়ে আছে সেই কক্ষ! মনে মনে তিনি ভাবলেন, এদিন রাত্রিতে একবার তিনি অতিথিশালাতে যাবেন অঙ্গিরার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। অঙ্গিরার ব্যাপারে প্রাথমিক কাজ আগামী কালই সম্পন্ন করতে হবে।

১৪

আকাশে প্রায় পূর্ণিমার চাঁদ, নিজের কক্ষ ছেড়ে নিঃশব্দে বাইরের চত্বরে বেরিয়ে এল রাজশ্রী—সোমনাথ মন্দিরের দেবদাসী সমর্পিতা। ভালো করে একবার চারপাশে তাকালো সে। আপাত দৃষ্টিতে তার কোথাও কাউকে চোখে পড়লনা।

চন্দ্রালোকে দাঁড়িয়ে আছে স্তম্ভ সমৃদ্ধ বিশাল চত্বরটা। থামগুলোর আড়ালে যেখানে চন্দ্রালোক প্রবেশ করছে না, সে সব জায়গাতে খেলা করছে অন্ধকার। মাথার ওপর চাঁদের অবস্থান দেখে সে অনুমান করল, এখন ঠিক মধ্যরাত। ধীর পায়ে চত্বর অতিক্রম করে সে গিয়ে দাঁড়াল প্রাকারের গায়ে সেই বেদিটার কাছে। বাইরে থেকে সমুদ্রের শব্দ ভেসে আসছে। অঙ্গিরা নামের সেই যুবকের আসার কথা।

সারা দিন নিজের কক্ষেই ছিল সমর্পিতা। সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে নৃত্যগীত পরিবেশনের জন্য ডাক পড়েনি তার। পড়ার কথাও নয়। দ্বিপ্রহরে একবার কিছু সময়ের জন্য তার সংবাদ নিতে এসেছিল উত্তরা। সে তাকে জানিয়েছে তার সম্বন্ধে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত জানাননি পুরোহিতশ্রেষ্ঠ ত্রিপুরারিদেব।

উত্তরা চেষ্টা করছে অতি দ্রুত অমন একটা ঘুঙুরদানা তার প্রেমিকের মাধ্যমে গোপনে বানিয়ে আনার। সমর্পিতা তার কথা নিশ্চুপ ভাবে শুনেছে, কিন্তু গতরাতে তার সঙ্গে যে অঙ্গিরার সাক্ষাৎ হয়েছে বা সে তাকে ঘুঙুরদানা ফিরিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সে ব্যাপারে উত্তরাকে কিছু জানায়নি অঙ্গিরা। হয়তো বা তাতে উত্তরার মনে কোনও ভুল ধারণার জন্ম হতে পারে।

তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার, গত রাতে অঙ্গিরার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবার পর থেকে সারা দিন রাজশ্রীর খালি বারবার মনে পড়েছে তার কথাই। চোখ বন্ধ করলেই সে বার বার দেখতে পেয়েছে চাঁদের আলোতে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ধনুর্বাণ কাঁধে এক সুঠাম সুন্দর যুবক।

অঙ্গিরার কথা কি তার বারবার মনে এসেছে শুধুমাত্র ঘুঙুরদানা ফেরত পাবার প্রত্যাশাতে? রাজশ্রী ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সারাদিন খালি তার মনে হয়েছে কখন চাঁদ উঠবে মাঝ আকাশে, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে সেই যুবকের। তার জন্য প্রতীক্ষা শুরু হল সোমনাথ সুন্দরী সমর্পিতার।

কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল তত আশঙ্কা তৈরি হতে লাগল সমর্পিতার মনে। যদি সে না আসে? সময় এগিয়ে চলল, তার সঙ্গে বেড়ে চলল উত্তেজনাও। যখন তার মনে হতে লাগল সে আর আসবে না, ঠিক তখনই থামের আড়াল থেকে তার সামনে আবির্ভূত হল অঙ্গিরা। তাকে দেখেই মুহূর্তের মধ্যে সোমনাথ সুন্দরীর সব মলিনতা যেন মুছে গেল! চাঁদের আলোতে তার মুখমণ্ডলে ফুটে উঠল উচ্ছল এক আনন্দের ভাব। আর অঙ্গিরার চোখেও যেন ফুটে উঠল অদ্ভুত এক ভালোলাগা, ঠোঁটের কোণে আবছা স্নিগ্ধ হাসির টুকরো। পরস্পরের এ ব্যাপারটা তাদের কারোরই চোখ এড়াল না।

অঙ্গিরা তার সামনে এসে দাঁড়াতেই দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'আমি অনেকক্ষণ প্রতীক্ষা করে আছি তোমার জন্য।'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'আমি ঠিক মধ্যরাতেই কক্ষ ত্যাগ করেছিলাম। বাইরে বেরিয়ে দেখি প্রধান পুরোহিত দণ্ডায়মান। তিনি আমার সঙ্গে বাক্যালাপ করতে করতে অনেকটা দূর পর্যন্ত এলেন। তাঁর ফিরে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল। তাই আসতে বিলম্ব হল।'

তার কথা শুনে সমর্পিতা বলল, 'আমি জানি তুমি আসবে। কিন্তু, তবু বিলম্ব দেখে মনের ভিতর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। আসলে ভাগ্য আমার সঙ্গে এতটাই প্রতারণা করেছে যে আমি আর কোনও কিছুতেই আস্থা রাখতে পারি না। আমার পিতা-মাতার হত্যা বা মৃত্যু, নিজের সিংহাসন নিষ্কণ্টক করার জন্য অথবা পুণ্য লাভের লক্ষে চালুক্যরাজের আমাকে এই মন্দিরে দেবদাসী হবার জন্য তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে গর্ভগৃহর সামনে সেদিন প্রায় মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়া। দুর্যোগ যেন কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ছে না! রাজকন্যা থেকে আমি এখন সোমনাথ মন্দিরের নগণ্য দেবদাসী।'

সোমনাথ সুন্দরীর কথা শুনে অঙ্গিরা বিস্মিত ভাবে বলে উঠল, 'তুমি রাজকন্যা! শুনেছিলাম বটে তুমি নাকি চালুক্য রাজবংশীয়া।'

সে মৃদু হেসে জবাব দিল, 'হ্যাঁ, ছিলাম। পিতা অম্বরীষ ছিলেন চালুক্য যুবরাজ। সিংহাসনে বসার ঠিক পূর্বদিনেই সস্ত্রীক নিহত হলেন তিনি। সিংহাসনে বসলেন খুল্লতাত অম্বুজ। আমাকে তিনি তুলে দিলেন সোমনাথ মন্দিরের হাতে। চালুক্য বংশীয়া নারীদের সিংহাসনে বসার নজির আছে। নিষ্কণ্টক হলেন তিনি। রাজকন্যা রাজশ্রী থেকে আমি হলাম সোমনাথ সুন্দরী সমর্পিতা।'

অঙ্গিরা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, 'সেখানে তোমার নিকটজন কেউ ছিলো না। যিনি তোমাকে এই মন্দিরে পাঠানো থেকে নিরস্ত করতে পারতেন চালুক্যরাজ অম্বুজকে?'

দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'পিতা-মাতার মৃত্যুর পর আমি এক বৃদ্ধা পরিচারিকার কাছে মানুষ হয়েছি। হ্যাঁ, আর এক জন হয়তো ছিলেন, তবে তিনি রক্তের সম্পর্কর কেউ নন। অমাত্য চন্দ্রদেব। তিনি স্নেহ করতেন আমাকে। আমার পিতা যদি সিংহাসনে বসতেন তবে তিনিই হয়তো প্রধানমন্ত্রী বা মহা অমাত্য হতেন। কিন্তু রাজার বিরুদ্ধাচরণ করার মতো ক্ষমতা তার ছিল না। তা ছাড়া গোপনে অন্ধকার রাতে শিবিকাবন্দি অবস্থাতে সৈন্যরা আমাকে এখানে পৌঁছে দেয়। রাজা অম্বুজ অত্যন্ত চতুরতা দেখিয়েছেন এ ব্যাপারে। আমাকে হত্যা করার পাপ নিলেন না, উপরন্তু সোমনাথ মন্দিরের ধন্যবাদগ্রাহ্য হলেন।'

চাঁদের আলোতে সোমনাথ সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরার মনে হল সমর্পিতার চোখের কোণে যেন অশ্রুবিন্দু চিকচিক করছে। তার বিষণ্ণতা এবার যেন অঙ্গিরাকেও স্পর্শ করল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সমর্পিতার বিষণ্ণতা কাটিয়ে দেবার জন্য অঙ্গিরা হেসে বলল, 'ও এই জন্যই তোমাকে গতকাল পরিচয় জিগ্যেস করাতে তুমি প্রথমে তোমার রাজশ্রী নাম বলেছিলে। তা আমি কী নামে ডাকব তোমাকে? রাজশ্রী নাকি সমর্পিতা?'

সোমনাথ সুন্দরী বলল, 'দেবদাসী হবার পর পূর্ব পরিচয় মুছে ফেলতে হয়। যদিও মনের ভিতর তা কোনওদিন মুছে ফেলতে পারব কিনা জানি না। সমর্পিতা নাম শুনতে সুন্দর হলেও জন্ম থেকে শুনে আসা রাজশ্রী নামই আমার প্রিয়। ভালোবাসা জড়িয়ে আছে ও নামের সঙ্গে। ও নামই শুনতে আমার ভালো লাগত। কিন্তু সর্ব সময়ে ও-নামে তো তুমি আমাকে ডাকতে পারবে না।'

নিজের অজান্তেই যেন অঙ্গিরা বলে ফেলল, 'সব সময়ে কেন, যখন নিভৃতে সাক্ষাৎ হবে তখন তোমায় রাজশ্রী নামে ডাকব।'

কথাটা বলে ফেলেই একটু লজ্জাবোধ করল অঙ্গিরা। তার সঙ্গে কেনই বা নিভৃতে দেখা হবে রাজশ্রীর? সেই বা কেন একান্তে সাক্ষাৎ করবে অঙ্গিরার সঙ্গে!

অঙ্গিরার কথা শুনে রাজশ্রীর মনের গভীরে হঠাৎই যেন একটা কাঁপন লাগল। এক অজানা অনুভূতির কাঁপন।

কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে অঙ্গিরার দিকে তাকিয়ে থেকে সে বলল, 'তবে তুমি আমাকে রাজশ্রী নামেই ডেকো।'

এ কথা বলার পর রাজশ্রী হেসে বলল, 'আমার কথা তো অনেক শুনলে, এবার তোমার কথা বলো? তোমার পিতা, মাতা, পরিজন আছে নিশ্চই?'

অঙ্গিরা বলল, 'আমারও অবস্থা তোমারই মতো। পিতা-মাতা কেউ জীবিত নেই। তারা প্রাণ বিসর্জন দেবার পর তাদের অন্তিম নির্দেশ পালনের জন্য এখানে এসেছি। আমারও কেউ নেই।'

'প্রাণ বিসর্জন' শব্দটা কানে বাজল রাজশ্রীর। সে বলল 'প্রাণ বিসর্জন— অর্থাৎ?'

অঙ্গিরা একটু ইতস্তত করে সত্যি কথাই বলল 'আমি একবিংশ বৎসরে পদার্পণ করলে তাঁরা দুজন সরস্বতী নদীতে নিজেদের বিসর্জন দেন। তাঁরা মৃত্যুর আগে আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে আমি যেন এই সোমনাথ মন্দিরে এসে প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি আমাকে যা নির্দেশ দেবেন তা পালন করতে হবে আমাকে। তবে তাদের আত্মার মুক্তি ঘটবে। মৃত্যুর পর সব আত্মারাই তো এই সোমনাথ মন্দিরে মুক্তিলাভের জন্য উপস্থিত হন। হয়তো বা তাঁরাও এখানেই আছেন। যতটুকু জানি তারা এক সময় এ মন্দিরেই থাকতেন।

রাজশ্রী, অঙ্গিরার জবাব শুনে মৃদু বিস্মিত ভাবে প্রশ্ন করল, 'তাঁরা আত্মহনন করলেন কেন? এ মন্দিরে তাঁরা কি কাজে নিয়োজিত ছিলেন?'

অঙ্গিরা উত্তর দিল, 'তার কারণ, আমার জানা নেই, তাঁরা এ মন্দিরে কী কাজে নিয়োজিত ছিলেন সে সম্পর্কে কোনওদিন অবগত করেননি আমাকে। তবে আমার মা ছিলেন অতীব সুন্দরী। বাবা, রক্ষী বা এ ধরনের কোনও পেশাতে নিয়োজিত থাকতে পারেন। তিনি অস্ত্রবিদ্যাতে পারদর্শী ছিলেন। আমাকে তিনিই ও বিদ্যা শিখিয়েছেন।'

কথাটা শুনে রাজশ্রী বলল, 'যদি তোমার মা দেবদাসী হয়ে থাকেন, তবে তিনি মুক্তি পেলেন কী ভাবে? ঘর বাঁধলেন কী ভাবে?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'এ প্রশ্নের উত্তরও আমার কাছে নেই। এমনও হতে পারে তিনি দেবদাসী নয়, মালিনী বা চয়নিকা ছিলেন। আসলে আমার পিতা-মাতা, কখনোই প্রয়োজনের অধিক বাক্যালাপ আমার সঙ্গে করতেন না।'

রাজশ্রী আবারও প্রশ্ন করল, 'তাদের সম্বন্ধে তোমার আরও কথা জানতে ইচ্ছা করে না? বিশেষত তুমি যখন এ মন্দিরে এসেছ, তারা যখন এ মন্দিরে তোমাকে পাঠিয়েছেন, নিজেরাও এ মন্দিরে ছিলেন। নিশ্চই তো কোনও সম্পর্ক আছে পুরো ঘটনাটার মধ্যে?'

অঙ্গিরা প্রশ্ন শুনে একটু চুপ করে থেকে বলল, 'হ্যাঁ, কোনও সম্পর্ক হয়তো আছে। আসলে ব্যাপারটা নিয়ে আমি এ ভাবে কোনওদিন ভাবিনি। সোমনাথ মন্দিরের কথা আমি পিতা-মাতার কাছ থেকে শুনলেও এখানে না উপস্থিত হলে বুঝতেই পারতাম না, প্রত্যহ কত বিচিত্র রকমের ঘটনা প্রবাহ অহর্নিশ পরিচালিত হয় এখানে। তাই এ মন্দিরের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে আমার খুব একটা কৌতুহলও ছিল না। যাই হোক তা হয়তো আজ আর আমার জানার উপায় নেই।' কথা গুলো বলার পর অঙ্গিরার হঠাৎই কেন জানি মনে পড়ে গেল নরসুন্দর খগেশ্বরের কথা। সে যদি তাঁর পিতা-মাতা সম্পর্কে কোনও তথ্য উদ্ধার করে দিতে পারে অঙ্গিরাকে। তবে একজন নিশ্চিত জানেন ব্যাপারটা। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। কিন্তু তাঁকে তো আর প্রশ্ন করা যাবে না?

অঙ্গিরা এরপর হেসে বলল, 'যাই হোক না কেন অন্তত এক যুগ, অর্থাৎ বারোটা বছর আমাকে কর্মে নিয়োজিত থাকতে হবে। তেমনই জানিয়েছেন ত্রিপুরারিদেব।'

রাজশ্রী বলল, 'এখানে থাকতে ভালো লাগবে তোমার? দম বন্ধ লাগবে না? আমার তো প্রতিটা দিন মনে হয় দমবন্ধ হয়ে আসছে। প্রাসাদে আমার প্রতি উপেক্ষা হয়তো ছিল, গোপন নজরদারী যে নিশ্চিত ভাবে ছিল তা এখন বুঝি। কিন্তু এমন কঠিন অনুশাসন সেখানে ছিল না। অন্তত নগরী পরিভ্রমণে যাওয়া যেত, বাগিচায় ভ্রমণ করা যেত, হরিণ শাবক, ময়ূর-ময়ূরিদের নিয়ে খেলা করা যেত।'

অঙ্গিরা বলল, 'আমার কিন্তু এ মন্দির, প্রভাসপত্তন মন্দ লাগছে না। কত ধরনের, কত দেশের মানুষের নিত্য আনাগোনা। অবশ্য আমার তো আর তোমার মতো বিধিনিষেধ নেই। মন্দির বা নগরীর যে-কোনও স্থানে আমি যেতে পারি।'

রাজশ্রী বিষণ্ণভাবে বলল 'আমারতো সে সুযোগ নেই। আমি পিঞ্জরবদ্ধ।'

অঙ্গিরা তাকে প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা, ধরো যদি তোমাকে মুক্তি দেওয়া হল, তবে কোথায় যাবে তুমি? চালুক্য প্রাসাদে কি আবার তোমার স্থান হবে?'

প্রশ্নর জবাবে রাজশ্রী একটু ভেবে নিয়ে বলল, 'না, তা হবে না। আর সেখানে আমার স্থান হলেও মৃত্যু ওৎ পেতে থাকবে। যদি দূরে অচেনা, অজানা কোনও স্থানে চলে যাওয়া যায়। স্বাধীন ভাবে নর্তকীর জীবনও তো কাটাতে পারি?'

অঙ্গিরা হেসে বলল 'তা হয়তো কাটাতে পারো। হয়তো বা কোনও রাজ সভাতে রাজনর্তকীও হতে পারো। এ ব্যাপারে তোমার দক্ষতা সম্পর্কে কোনও সংশয় নেই।

রাজশ্রী বলল, 'চালুক্য রাজ পরিবারের রমণীদের মধ্যে নৃত্যগীতের চল আছে। সে শিক্ষা আমি এ স্থানের আসার পূর্বেই পেয়েছি। এখানে যারা দেবদাসী, তারা অনেকেই এখানে আসার পর নৃত্যের তালিম পায়। আমার ব্যাপারটা তা নয়।'

অঙ্গিরার এবার খেয়াল হল, যে ব্যাপারের জন্য তার এখানে আসা সেই আসল কাজটাই তো বাকি থেকে গেছে! অঙ্গিরা পোশাকের ভিতর থেকে ঘুঙুরদানাটা বার করে তালুর ওপর রেখে বাড়িয়ে দিল দেবদাসী সমর্পিতার দিকে।

রাজশ্রীও যেন ভুলেই গেছিল ঘুঙুরদানার কথা। যুবক অঙ্গিরার উপস্থিতিই যেন তার কাছে শুধুমাত্র আকাঙ্ক্ষিত মনে হচ্ছিল। হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। চাঁদের আলোতে ঝলমল করছে অঙ্গিরার হাতে রাখা ঘুঙুরদানাটা।

রাজশ্রী হাত বাড়াল সেটা নেবার জন্য। কিন্তু অঙ্গিরার হাত স্পর্শ করতেই কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হল রাজশ্রীর মনে। অঙ্গিরার করতলের ওপর প্রথমে হাতটা রাখল সে। তারপর ধীরে ধীরে চেপে ধরল হাতটা। এ যেন সেই হাত, যে হাতের ওপর ভরসা করা যায়! এ হাত সেই হাত যে হাত তার নিজের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে অগ্নিবলয় থেকে রক্ষা করেছে তুচ্ছ দেবদাসীকে!

যুবক অঙ্গিরার হাতও এ ভাবে কোনও দিন স্পর্শ করেনি কোনও নারী। এক অনাস্বাদিত ভালোবাসার শিহরন যেন তার ধমনীতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল! এক অদ্ভুত ভালোলাগার পরশ। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে অঙ্গিরা। সে দৃষ্টিতে কেমন যেন এক আর্তি ফুটে উঠেছে অঙ্গিরার প্রতি।

সমুদ্রর বাতাসে চুল উড়ছে রাজশ্রীর। মুখমণ্ডলে জ্যোৎস্নার আলো। যেন এক অপ্সরা! অঙ্গিরার পাথর কুঁদে তৈরি করার মতো দেখতে শরীর বেয়েও চুঁইয়ে নামছে জ্যোৎস্নার আলো।

দীর্ঘক্ষণ সে ভাবেই হাতে হাত রেখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল তারা। যেন তারা সোমনাথ মন্দিরের প্রস্তর মূর্তি। যুগ যুগ ধরে ওভাবেই যেন দাঁড়িয়ে আছে! নিশ্চুপ দুজনেই, কিন্তু যেন কত কথা হয়ে চলেছে তাদের দুজনের মধ্যে!

চাঁদের আলো যখন ম্লান হয়ে এল তখন সম্বিত ফিরল অঙ্গিরার। রাজশ্রীর হাতটা তুলে নিয়ে সে নিঃশব্দে চুম্বন করে, ঘুঙুরদানাটা রাজশ্রীর মুঠিতে ধরিয়ে দিয়ে বলল 'এবার ফিরতে হবে আমাকে।'

রাজশ্রী অস্ফুটভাবে বলল, 'আমি তোমার প্রতীক্ষায় থাকব।'

দেবদাসীদের আবাসস্থল ত্যাগ করে অঙ্গিরা যখন বাইরে উদ্যানে বেরিয়ে এল তখনও তার ঘোর কাটেনি। সে যেন তখনও তার করতলে অনুভব করছে রাজশ্রী-দেবদাসী সমর্পিতার উষ্ণ স্পর্শ, কানে বাজছে তার কণ্ঠস্বর।

কক্ষে ফিরে আজ আর নিদ্রার অবকাশ নেই অঙ্গিরার। প্রধান পুরোহিতের নির্দেশমতো সূর্য ওঠার পর তাকে সমুদ্র তীরে যেতে হবে, মস্তক মুণ্ডণ-সহ তাঁর পিতা-মাতার পারলৌকিক কার্য সম্পাদনের জন্য।

রাজশ্রীর কথা ভাবতে ভাবতে ক্ষয়াটে চাঁদের আলোতে মূল মন্দির চত্বর সংলগ্ন অতিথিশালাতে ফেরার পথ ধরল অঙ্গিরা। মন্দিরের প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে যাবার সময় হঠাৎই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল অঙ্গিরা। প্রাচীন চন্দ্রমন্দিরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একজন। অঙ্গিরাকে সে খেয়াল করেনি। যে পথ ধরে অঙ্গিরা ফিরবে সে পথ ধরেই হাঁটতে লাগল সে।

চাঁদের আলো ক্ষীণ হয়ে এসেছে। রাত শেষ আর ভোরের আলো ফোটার মধ্যবর্তী এ সময়টাতে আবার অন্ধকার গাঢ় হয়, তা ছাড়া কুয়াশাও আছে। অঙ্গিরাও নিশ্চুপ ভাবে অনুসরণ করল লোকটাকে। কিছু সময়ের মধ্যেই লোকটাকে অঙ্গিরা যেন চিনতে পারল। এ লোক নিশ্চিত নাপিত শিরোমণি খগেশ্বর। অবয়ব তো তারই মতন, হাঁটার ভঙ্গিও এক। তা ছাড়া অঙ্গিরা যতটুকু বুঝতে পারছে তাতে লোকটার মাথার চুল ধবধবে সাদা! অমন সাদা চুল তো সোমনাথ মন্দিরে বা নগরীতে দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তির দেখেনি সে। কিন্তু রাতে কোথায় গেছিল নরসুন্দর শ্রেষ্ঠ? তাছাড়া সে তো মন্দিরের বাইরে বাস করে! তোরণ এখনও উন্মুক্ত হয়নি, তবে নিশ্চই গতরাতে মন্দির চত্বরেই ছিল!

ব্যাপারটা ভেবে একটু অবাক হয়ে, খগেশ্বরের কাছে পৌঁছবার জন্য দ্রুত পা চালাল সে। কিন্তু তার কাছে পৌঁছবার আগেই হঠাৎই যেন কোথায় মিলিয়ে গেল সে! সম্ভবত কোনও ধংসস্তূপের আড়ালে চলে গেল লোকটা। অঙ্গিরা বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে জায়গাতে। কিন্তু খগেশ্বরকে আর দেখতে পেল না। অগত্যা ফেরার পথ ধরল সে। অঙ্গিরা কক্ষে ফেরার কিছু সময়ের মধ্যেই ধ্রুবতারা ফুঠে উঠল। ঝমঝম শব্দে বাজল সোনার শিকল।

১৫

নাপিত শিরোমণি বৃদ্ধ খগেশ্বরের সঙ্গে অঙ্গিরার কিন্তু সাক্ষাৎ হয়ে গেল সকালবেলাতেই। ভোরের আলো ফোটার পর ত্রিপুরারিদেব তাকে সমুদ্রতীরে সেই স্তম্ভর কাছে উপস্থিত হবার নির্দেশ দিয়েছিলেন গত রাতে। অঙ্গিরা সেই নির্দেশ পালনের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হতেই দেখল খগেশ্বর তার ক্ষৌরকারের ক্ষুদ্র পেটিকা নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে। অঙ্গিরাকে দেখে সে বলল, 'প্রধান পুরোহিত আমাকে এখানে উপস্থিত থাকতে বলেছেন, আপনার মস্তক মুণ্ডণের জন্য। কিছু সময়ের মধ্যেই তিনি এসে পড়বেন।'

অঙ্গিরা বলল, 'হ্যাঁ, তিনি আমাকে জানিয়েছেন যে গর্ভগৃহর দ্বার উন্মোচন করে সোমেশ্বর মহাদেবের স্নান ও দিনের প্রথম পূজা সাঙ্গ করেই তিনি উপস্থিত হবেন এখানে। সময় হয়ে এসেছে। ওই শুনুন, গর্ভগৃহ চত্বরের ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে।'

এ কথা বলার পর অঙ্গিরার মনে হল, মন্দিরের ভিতর সেই প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের সামনে শেষ রাতে উপস্থিতির কারণটা একবার জিগ্যেস করে খগেশ্বরকে। কিন্তু সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না, নাপিত শিরোমণিকে প্রশ্নটা করা সমীচীন হবে কিনা। এমনও তো হতে পারে যে অঙ্গিরা কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারের মধ্যে যাকে তফাত থেকে দেখেছে সে খগেশ্বর নয়, অন্য কেউ! অঙ্গিরা, তাকে প্রশ্ন করবে কি করবে না ভাবছিল, কিন্তু তাদের আলোচনার বিষয় এরপর অন্যদিকে ধাবিত হল। খগেশ্বর প্রশ্ন করল 'আপনি কিছু শুনেছেন?'

'কী ব্যাপারে?' জানতে চাইল অঙ্গিরা।'

বৃদ্ধ খগেশ্বর বলল, 'গজনীর মামুদের নাম শুনেছেন? সুলতান মামুদ আবার হানা দিয়েছে এ দেশে। সঙ্গে বিশাল বিধর্মী বাহিনী। রাজপুতদের আজমের নগরী ধ্বংস করার পর সে এদিকেই আসছে!'

খগেশ্বরের কথা শুনে অঙ্গিরা বলল, 'তাই নাকি? না আমি কিছু শুনিনি এ ব্যাপারে।'

খগেশ্বর বলল 'হ্যাঁ, সেই পাষণ্ডটা আসছে মাধেরার পথে। মহারাজ মাণ্ডলিক মাধেরাতে ওই বিধর্মী আক্রমণকারীকে প্রতিরোধ করার জন্য নাকি সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছেন। নগরীতে যাতে আতঙ্ক না ছড়ায় সে জন্য রাজপ্রাসাদের তরফে ঘটনাটা আপাতত গোপন রাখার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু কী ভাবে খবরটা যেন নগরীতে ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল গভীর রাতে সেনাবাহিনীকে মাধেরার পথে যাত্রা করতে দেখেছে কেউ কেউ। হয়তো-বা সেখান থেকেই খবরটা ছড়িয়েছে। ভোর হতেই শহরের নানা স্থানে আলোচনা শুরু হয়েছে।'

অঙ্গিরা খবরটা শুনে বিস্মিত ভাবে বলল, 'নগরবাসী বা মন্দিরের এ ব্যাপারে আশঙ্কার কারণ আছে?'

বৃদ্ধ একটু চুপ করে থেকে বলল, 'যদি, মাধরাতে হিন্দু সেনারা বিধর্মীদের প্রতিরোধ করতে সমর্থ হয়, অথবা রাজাধীরাজ পরমদেওর বাহিনী যদি নির্দিষ্ট সময় এখানে এসে উপস্থিত হয় তবে আশঙ্কার কারণ নেই, নচেৎ অবশ্যই আছে। মাধেরার যুদ্ধে গজনী বাহিনী যদি আমাদের সেনাদলকে পরাস্ত করে তবে নিশ্চয়ই তারা প্রভাসপত্তনের পথে ধেয়ে আসবে সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠনের জন্য। এ মন্দিরের মতো ধনসম্পদ যে এ দেশের কোনও মন্দিরে বা রাজকোষে নেই সে খবর নিশ্চয়ই মামুদের জানা। মন্দির লুণ্ঠনের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইবে না সে। গজনীর সুলতান হিন্দুদের মাটিতে প্রতি বৎসর হানা দেয়ই সম্পদ লুঠতরাজ, নারী আর ক্রীতদাস সংগ্রহর জন্য।'

অঙ্গিরা বলল, 'সংবাদটা তবে গুরুতর!'

খগেশ্বর বলল, 'তা তো বটেই। আরব জুয়ানেদের বাহিনী কী ভাবে সোমেশ্বর মন্দির ধ্বংস করেছিল, কী ভাবে প্রভাসপত্তন নগরীতে নারকীয় হত্যালীলা, ধর্ষণ চালিয়েছিল সে সব কাহিনী বংশ পরম্পরায় শুনে আসছে নগরবাসী। পুরোনো মন্দিরগুলো আজও মানুষের চোখের সামনে সেই ভয়ঙ্কর দিনের সাক্ষ বহন করছে।

এই বালুতটেই মন্দিরের পুরোহিতদের সারবদ্ধ ভাবে দাঁড় করিয়ে মস্তক ছেদন করেছিল জুয়ানেদ বাহিনী। বহুদূর পর্যন্ত সমুদ্রের জল লাল হয়ে গেছিল নিরীহ পূজারিদের রক্তে। আজও এ বালুতট খুঁড়লে পাওয়া যায় তাদের শিলাভূত প্রাচীন অস্থি, ধাতব কর্ণকুণ্ডল ইত্যাদি। মাসুদের অভিযানের সংবাদে নগরবাসীদের আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। সে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল বলে। গতকাল পুরোহিত মল্লিকার্জুন রাজপ্রাসাদে গেছিলেন। আমার ধারণা, মন্দির কর্তৃপক্ষকে মামুদের ঘটনাটা জানিয়ে রাখার জন্যই রাজা ভীম তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।'

অঙ্গিরা বলল 'কিন্তু এ নগরী, মন্দিরের রক্ষাকর্তা তো স্বয়ং সোমেশ্বর মহাদেব। তিনি কি রক্ষা করবেন না তাঁর উপাসকদের? রক্ষা করবেন না নিজের আবাসস্থল? এ মন্দিরে তো তিনি জীবন্ত বিগ্রহ রূপে আবির্ভূত।'

বহুদর্শী বৃদ্ধ একটু চুপ করে থেকে তার ডান হাত সোমেশ্বর মহাদেবের উদ্দেশ্যে কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম জানিয়ে বলল, 'হ্যাঁ, প্রভু সোমেশ্বরই রক্ষাকর্তা। পৃথিবীর সব কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন।'

অঙ্গিরা এরপর আরও কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সে এবং অঙ্গিরা দুজনেই দেখতে পেল, মন্দির ত্যাগ করে তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। তার সঙ্গে দুজন সেবায়েতও আছে। বেশ কিছু সামগ্রী বহন করে আনছে তারা।

অঙ্গিরা আর খগেশ্বর দুজনেই নত মস্তকে প্রণাম জানাল তাঁকে। প্রধান পুরোহিত তাদের উদ্দেশ্যে আশীর্বাদের ভঙ্গীতে তাঁর দক্ষিণ হস্ত কিছুটা তুললেন। তারপর খগেশ্বরকে বললেন, 'তুমি ওর মস্তক মুণ্ডণ করো। তারপর ওর পিতা-মাতার পারলৌকিক কার্য সম্পাদন করা হবে।'

বালুতটে একটা স্থান নির্বাচন করে সেখানে সেবায়েতদের নিয়ে সেই কার্য সম্পাদনের উপাচার সাজাতে বসলেন প্রধান পুরোহিত। তাদের কিছুটা তফাতে খগেশ্বরের সঙ্গে অঙ্গিরা বসল মস্তক মুণ্ডণ আর শ্মশ্রু-গুম্ফ মোচনের জন্য। পেটিকা থেকে বেশ বড় একটা ক্ষুর বার করে অঙ্গিরার মস্তক মুণ্ডণ শুরু করল।

খগেশ্বরের কাজ কিছু সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হল। মুণ্ডিত মস্তক অঙ্গিরা গিয়ে দাঁড়াল ত্রিপুরারিদেবের সামনে। তিনি ও তার সঙ্গীরা তখন প্রয়োজনীয় নানা উপাচার সাজিয়ে ফেলেছেন বালুতটে। পুরোহিত, অঙ্গিরাকে বললেন, 'ওই স্তম্ভের কাছে গিয়ে অবগাহন করে এসো। তারপর এই যে বস্ত্রখণ্ড রাখা আছে তা পরিধান করে মেটে হাড়িতে তণ্ডুল প্রস্তুত করতে হবে কাষ্ঠ আগুনে। ওই রন্ধন করা তণ্ডুল দিয়ে পিণ্ড তৈয়ার হবে। তবে ওই স্তম্ভ অতিক্রম কোরো না। ওর পর আর তল নেই।' ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশে অঙ্গিরা এগোল সমুদ্রস্নানের জন্য।

জল ভেঙে অঙ্গিরা পৌঁছে গেল স্তম্ভর কাছে। কোমর সমান জল সেখানে। স্তম্ভর লম্বাটে একটা ছায়া পড়েছে জলে। ডুব দিল অঙ্গিরা। প্রথমে একটা ডুব। দ্বিতীয় ডুব দেবার সময় অঙ্গিরার মনে হল জলের ভিতর স্তম্ভর ছায়াটা যেন কেঁপে উঠল। তৃতীয় ডুব দিল অঙ্গিরা। এরপর সে ফেরার জন্য পিছু ফিরতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় স্তম্ভর ছায়াটা জলতল থেকে লাফিয়ে উঠে আলিঙ্গন করতে শুরু করল অঙ্গিরাকে!

ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল অঙ্গিরার। তারপর সে বুঝতে পারল এক সামুদ্রিক অজগর সর্প লেজ দিয়ে তার শরীরকে পেঁচিয়ে ধরতে শুরু করেছে! জলতলের ওপর অঙ্গিরার মুখের সামনে জেগে উঠেছে তার প্রকাণ্ড মাথাটা! কী হিংস্র ত্রু্ুর দৃষ্টি তার চোখে! হাঁ করল সেই মহাসর্প। কী বিশাল সেই মুখগহ্বর! হিংস্র দাঁত আর চেরা জিভ প্রস্তুত হয়ে আছে অঙ্গিরাকে গিলে খাবার জন্য। সেই ভয়ঙ্কর মুখগহ্বর এগিয়ে আসছিল অঙ্গিরার মাথাটা তার ভিতর পুরে নেবার জন্য। মাথার দিকে থেকেই শিকারকে গলাধঃকরণ করে অজগর সর্প। তবে সে ঘটনা ঘটার আগেই অঙ্গিরা তার বলিষ্ঠ দক্ষিণ হস্ত দিয়ে চেপে ধরল তার গলা। দুজনের মধ্যে প্রবল সংঘর্ষ শুরু হল। ছিটকে উঠতে লাগল সমুদ্রর জল। অঙ্গিরা সেই মহাসর্পর গলা চেপে ধরে চিৎকার করতে লাগল, 'সাহায্য করো, সাহায্য করো আমাকে! রক্ষা করো সর্পর কবল থেকে!'

তার আর্ত চিৎকার কানে যেতেই ত্রিপুরারিদেব-সহ সমুদ্রতটে যে সব মানুষ ছিল তাদের সকলের চোখে পড়ল সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য। ভয়ঙ্কর অজগর সর্প আলিঙ্গন করেছে অঙ্গিরাকে। তার থেকে মুক্ত হবার চেষ্টা চালাচ্ছে অঙ্গিরা, আর চিৎকার করে সাহায্য প্রার্থনা করছে!

কিন্তু কে তাকে সাহায্য করবে? ওই যুবককে বাঁচাতে গেলে ওই সর্পরাজ যদি যুবককে ছেড়ে রক্ষাকারীকে আলিঙ্গন করে তবে তার মৃত্যু নিশ্চিত। কাজেই কেউ জলে না নেমে সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত ভাবে চিৎকার শুরু করল। কিন্তু সমুদ্রসর্প ব্যাঘ্র বা ভল্লুকের মতো ডাঙার প্রাণী নয় যে চিৎকার শুনে শিকারকে ছেড়ে দেবে। শিকার তার মুখের সামনে। কতক্ষণ সে লড়বে তার শরীরের নিষ্পেষণের সঙ্গে? পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।

অঙ্গিরার কোমর পর্যন্ত পেঁচিয়ে আছে লেজ। তার প্রচণ্ড পেষণে অঙ্গিরার শরীরে অস্থি যেন চুরমার হয়ে যাচ্ছে! অবসন্ন হয়ে আসতে লাগল অঙ্গিরার দেহ, শিথিল হয়ে আসতে লাগল তার মুষ্টি।

তার শিকার যে দুর্বল হয়ে পড়ছে তা যেন বুঝতে পারল সেই মহাসর্প। সে এবার চেষ্টা শুরু করল শিকারকে স্তম্ভর ওপাশে টেনে নিয়ে যাবার। যাতে তাকে তার গলাধঃকরণে সুবিধা হয়।

সেই অবস্থাতেই হঠাৎই কেন জানি অঙ্গিরার মনে যেন ভেসে উঠল সমর্পিতার মুখ! অঙ্গিরার জীবনের আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত বাকি। ঠিক সেই সময় অঙ্গিরা খেয়াল করল তার আর এক পাশে কি যেন একটা আবির্ভূত হয়েছে! এই মহাসর্পর কোনও সঙ্গী বা সঙ্গিনী নাকি? কিন্তু অঙ্গিরা শুনতে পেল খগেশ্বরের কণ্ঠস্বর, 'গলা চিরে ফেলো, কণ্ঠ ছিন্ন করে দাও ওর।' জলের ভিতর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে ক্ষুর বাড়িয়ে দিচ্ছে খগেশ্বর।

বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টা করতেই হবে। অঙ্গিরা কোনওক্রমে বাম হাত দিয়ে ক্ষুরটা নিল, তারপর তা দিয়ে আঘাত হানতে শুরু করল সর্পরাজের গলাতে, আর তার বীভৎস চোখ দুটোতে। ফোয়ারার মতো রক্ত বেরোতে লাগল সর্পরাজের ছিন্ন কণ্ঠদেশ থেকে, লাল হয়ে উঠল সমুদ্রের জল।

ব্যাপারটা এবার উল্টো ঘটল, অবসন্ন হয়ে আসতে লাগল সেই মহাসর্পর দেহ। শিথিল হয়ে আসতে লাগল নাগপাশ। অঙ্গিরাও ব্যাপারটা বুঝতে পারল। আতঙ্ক মুছে গিয়ে শক্তি ফিরে এল তার মনে শরীরে। দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে সে আঘাত হানতে লাগল সেই মহাসর্পর শরীরে।

এক সময় সত্যিই নাগপাশ খসে গেল অঙ্গিরার দেহ থেকে। আর এরপরই কোথা থেকে যেন একটা প্রবল ঢেউ এসে অঙ্গিরা আর খগেশ্বরকে জল থেকে তুলে নিয়ে সমুদ্র তটের বালু রাশিতে ছুড়ে ফেলল।

আসন্ন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা অঙ্গিরার ধাতস্থ হতে মৃদু সময় লাগল। সে যখন উঠে দাঁড়াল তখন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন প্রধান পুরোহিত। আর অন্য কিছু মানুষও সেখানে উপস্থিত হয়েছে যারা এতক্ষণ জলে নেমে অঙ্গিরাকে বাঁচাবার চেষ্টা না করে সর্পদানবের সঙ্গে অঙ্গিরার মরণপণ সংগ্রাম দেখছিল।

অঙ্গিরা উঠে দাঁড়িয়ে দেখল তারই পাশে সিক্ত বসনে দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছে বৃদ্ধ নরসুন্দরপতি।

সে কৃতজ্ঞতা পরবশ হয়ে খগেশ্বরকে বলল, 'আপনি আমার জীবন রক্ষা করলেন। ক্ষুরটা আমার হাতে তুলে না দিলে কিছুতেই আমি নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে পারতাম না। নিশ্চিত মৃত্যু ঘটত আমার।'

কথাটা শুনে হাসি ফুটে উঠল বৃদ্ধর মুখে।

কিন্তু পরমুহূর্তেই সে হাসি অন্তর্হিত হল প্রধান পুরোহিতের কথাতে। খগেশ্বরের উদ্দেশ্যে অঙ্গিরার কথা শুনে ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'একজন সামান্য শূদ্রের ক্ষমতা কি যে সে নিয়তিকে খণ্ডন করে? আমি ব্রাহ্মণ, সোমেশ্বর দেবতার প্রধান পুরোহিত। আমার সে ক্ষমতা নেই। তোমার নিয়তিকে কেউ যদি খণ্ডন করে থাকে, তোমার প্রাণ রক্ষা করে থাকেন তবে তিনি একমাত্র সোমেশ্বর মহাদেব। তাঁর কাছে তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, প্রণাম জানাও সেই দেবতার উদ্দেশ্যে।'

ত্রিপুরারিদেবের কথা শুনে সমবেত জনতা জয়ধ্বনি করে উঠল, 'হর হর মহাদেব! জয় সোমেশ্বর মহাদেবের জয়!'

উপস্থিত জনতাকে এরপর সে স্থান ত্যাগ করতে বললেন ত্রিপুরারিদেব। তারা অন্তর্হিত হবার পর অঙ্গিরাকে দিয়ে কার্যারম্ভ হল। নতুন বস্ত্র পরিধান করে মেটে হাড়িতে কাঠের আগুনে তণ্ডুল রন্ধন করে পুরোহিতের মুখোমুখি কুশাসনে বসল মুণ্ডিত মস্তক অঙ্গিরা। কদলী, তিল, ঘৃত, মধু, রন্ধন করা তণ্ডুলের সঙ্গে মিশ্রিত করে রচনা করা হলে পিণ্ডগোলক। অন্যান্য নানা উপচারও সেখানেই ছিল। সে সব সহযোগে শুরু হল মন্ত্রোচ্চারণ সহ নানাবিধ কাজ।

বেশ অনেকক্ষণ ধরে সে সব চলার পর অন্তিম লগ্নে পিণ্ড উৎসর্গ করা হল অঙ্গিরার পিতা-মাতার উদ্দেশ্যে। পিণ্ড দান হবার পর পিণ্ড গোলকগুলি বায়সপক্ষীদের নিবেদন করাই প্রথা। বায়সপক্ষী বা কাকের রূপ ধরে আত্মারা নাকি পিণ্ডভক্ষণ করতে আসেন। অঙ্গিরা সমুদ্রতটে বেশ কয়েকদিন ঘুরে বেড়াবার ফলে এ ব্যাপারে কিছু নিয়ম সম্বন্ধে অবগত হয়েছে।

বেশ বড় আকারের দুটো কাকও খাবারের প্রত্যাশাতে অঙ্গিরাদের কিছুটা তফাতে এসে বসেছে। পিণ্ডদান সম্পন্ন হবার পর অঙ্গিরা পুরোহিতকে প্রশ্ন করল, 'আমি কি এই পিণ্ডগোলক সমূহ ওই বায়সপক্ষীদের নিবেদন করে আসব?'

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন 'না, এ পিণ্ডদান প্রক্রিয়া সাধারণ প্রক্রিয়া নয়। তুমি এই ধাতব কলসের মধ্যে পিণ্ডগুলি রাখো। এ কলস আমি আমার কাছে রাখব। তুমি যে কার্যে নিয়োজিত হতে চলেছ, যেদিন তুমি সেই কার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তার পরদিন প্রত্যুষে এই পিণ্ড আমি বায়স পক্ষীদের নিবেদন করব। মনে রেখো, সেই নিবেদন কার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তোমার পিতা-মাতার আত্মার মুক্তি ঘটবে না।'

পুরোহিতের নির্দেশ পালন করে অঙ্গিরা কলসবন্দি করল পিণ্ড গোলকগুলি। সাঙ্গ হল কাজ। প্রধান পুরোহিত উঠে দাঁড়াবার পর অঙ্গিরা ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম জানাল তাকে। সেবায়েত সঙ্গী দুজনও পিণ্ড কলস নিয়ে মন্দিরে প্রস্থান করার আগে ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'তিন দিবস কক্ষ ত্যাগ করবে না তুমি। রুদ্ধ কক্ষে বসে পিতা-মাতাকে স্মরণ করবে। তাদের আত্মার মুক্তি প্রার্থনা করবে। আজ পূর্ণিমা, আগামী পূর্ণিমাতে কার্যভার গ্রহণ করা পর্যন্ত তিনদিন পরে পরে তিনদিনের জন্য রুদ্ধদ্বার অন্ধকার কক্ষে এ প্রার্থনা চালিয়ে যাবে তুমি। তাতে তাঁদের মুক্তির পথ প্রশস্ত হবে। অন্ধকার কক্ষে প্রথমবার তিন দিবস থাকতে হয়তো অস্থির লাগবে। কিন্তু পরবর্তীতে তা অভ্যাস হয়ে যাবে।'

প্রধান পুরোহিতের কক্ষের সন্নিকটে সমুদ্র স্নানে আসার যে সোপানশ্রেণী আছে, সঙ্গীদের নিয়ে সে পথেই মন্দিরে ফিরে গেলেন প্রধান পুরোহিত। অঙ্গিরাকেও ফিরতে হবে এবার। সে দেখতে পেল কিছুটা তফাতে খগেশ্বর দাঁড়িয়ে আছে।

অঙ্গিরা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কেমন যেন অদ্ভুত বিষণ্ণতা তার মুখমণ্ডলে। হয়তো বা প্রধান পুরোহিতের বলা কথার জন্যই। ব্যাপারটা ভেবে নিয়ে অঙ্গিরা তাকে বলল, 'সোমেশ্বর মহাদেবের ইচ্ছাতেই এই পৃথিবীর সব কিছু পরিচালিত হয় জানি, কিন্তু তবুও আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।'

নাপিত শিরোমণি খগেশ্বর বিষণ্ণ হেসে জবাব দিল, 'সোমেশ্বর মহাদেবকে অস্বীকার করার ক্ষমতা আমার নেই। তাঁর কাছে আমিও কৃতজ্ঞ, আমার মতো শুদ্রকে দিয়ে তিনি তোমাকে সাহায্য করালেন বলে।'

অঙ্গিরার মনে হল এই বৃদ্ধকে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কোনও উপহার প্রদান করা প্রয়োজন। ত্রিপুরারিদেবের দেওয়া স্বর্ণমুদ্রাগুলি তো তার কাছে রয়েইছে। সে কথা ভেবে অঙ্গিরা বলল, 'আমি যদি আপনাকে কৃতজ্ঞতা পরবশত কিছু উপহার দিই তবে তা আপনি গ্রহণ করবেন?'

বৃদ্ধ হেসে বললেন, 'না, কোনও উপহারের প্রয়োজন নেই আমার। তা গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে আমার নিজেরও মনে হতে পারে যে নিজের অবচেতনে কোনও পারিতোষক লাভের আকাঙ্ক্ষাতে তোমাকে সাহায্য করতে গেছিলাম।' এরপর একটু থেমে সে বলল, 'তুমি যদি সত্যিই আমার জন্য কিছু দিতে চাও তবে অন্য একটা জিনিস সাময়িক ভাবে চাইব তোমার কাছে। দিলে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।'

'কী জিনিস?' জানতে চাইল অঙ্গিরা।

খগেশ্বর বলল, 'চলো, তোমার সঙ্গে কক্ষের দ্বার পর্যন্ত যাই। তারপর বলছি।'

মন্দিরে ফেরার জন্য হাঁটতে শুরু করলে তারা দুজন। কিছু সময়ের মধ্যেই সমুদ্রতট ত্যাগ করে তারা পৌঁছে গেল মন্দিরের প্রধান তোরণের কাছে। আজ পূর্ণিমা বলে দর্শনার্থীদের ভিড় অন্য দিনের তুলনাতে অনেক বেশি। 'হর হর মহাদেব', 'জয় সোমেশ্বর মহাদেব' ধ্বনিতে মুখরিত চারদিক। শোনা যাচ্ছে অবিরাম ঘণ্টাধ্বনি। তবু তারই মধ্যে মন্দিরে প্রবেশ করার পর সেবায়েত ও পুণ্যার্থীদের ছোট ছোট জটলা যেন মাঝে মাঝে চোখে পড়তে লাগল। নীচু স্বরে কথা বলছে তারা। সেবায়েতদের তেমনই একটা ছোট জটলার দিকে অঙ্গিরার দৃষ্টি আকর্ষণ করে খগেশ্বর বলল, 'তোমাকে বললাম না, মামুদের আক্রমণের খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে! তাই নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। এ সংবাদ বড় সংক্রামক।'

অঙ্গিরা খগেশ্বরকে নিয়ে অতিথিশালাতে তার কক্ষে পৌঁছে গেল। নাপিত শিরোমণিকে আমন্ত্রণ কক্ষে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানাতে সে-ও কক্ষে প্রবেশ করল। অঙ্গিরা এরপর তাকে প্রশ্ন করল, 'এবার বলুন আপনি কি চান আমার কাছে?'

বৃদ্ধ একটু চুপ করে থেকে অঙ্গিরাকে চমকে দিয়ে বলল, 'তোমার কাছে যে সোমেশ্বর মুদ্রাটা আছে সেটা দেবে আমাকে?'

অঙ্গিরা বলল, 'ওটা কী ভাবে দেব আপনাকে? ও মুদ্রা তো আমাকে ফিরিয়ে দিতে হবে প্রধান পুরোহিতকে।'

খগেশ্বর বলল 'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই দেবে ফিরিয়ে। আমি শুধু তিনদিনের জন্য ও মুদ্রা ধার চাচ্ছি তোমার কাছে। বিশ্বাস রাখো, তিনদিন পর আমি তোমাকে ওই মুদ্রা ফিরিয়ে দেব।'

খগেশ্বরের কথা শুনে তাকে কি জবাব দেবে তা বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল অঙ্গিরা। তা দেখে খগেশ্বর বলল, 'তুমি যদি তার বিনিময় আমার সারা জীবনের সম্পদও দাবি করো তাও দিতে আমি রাজি।'

অঙ্গিরা বলল 'না, না, সে সব গ্রহণ করার প্রশ্ন নেই।'

নরসুন্দর শ্রেষ্ঠ এরপর বললেন, 'আমার বৃদ্ধা স্ত্রী মৃত্যুশয্যায়। তার বহু দিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল যে তাঁর স্বামী সোমেশ্বর মুদ্রার অধিকারী হোক। কিন্তু সেই অবলা নারীর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় যে, যেখানে ওই মুদ্রার দাবি নিয়ে ব্রাহ্মণদের মধ্যেই তীব্র প্রতিযোগিতা চলে, সেখানে একজন শূদ্রের পক্ষে এ সৌভাগ্য লাভ অসম্ভব। হয়তো-বা আর দু-দিন মাত্র তার আয়ু। তার মৃত্যুর আগে তার হাতে এ মুদ্রাটা তুলে দিয়ে আমি তাকে দেখাতে চাই যে আমি সোমেশ্বর মুদ্রার অধিকারী হয়েছি। হয়তো ব্যাপারটা মিথ্যা হবে, কিন্তু মৃত্যু পথযাত্রী শেষ আনন্দ-শান্তি পাবে তাতে। আবারও বলছি, আমি শূদ্র হতে পারি, কিন্তু প্রতারক নই। তোমার মুদ্রা তুমি নির্দিষ্ট সময় ফেরত পাবে।'

খগেশ্বরের কথা শুনে অঙ্গিরা বলল, 'কিন্তু এ খবর যদি প্রধান পুরোহিতের কর্ণগোচর হয় তবে আমি ভর্ৎসৃত হব। শাস্তিও হতে পারে।'

খগেশ্বর জবাব দিল, 'তুমি নিশ্চিন্তে থাকো, এ বিষয়ে কাকপক্ষীও জানবে না।'

এরপর আর কিছু বলার থাকে না। অঙ্গিরা তার সামগ্রীর মধ্যে মুদ্রাটা যেখানে রাখা ছিল সেখান থেকে তা বার করে বৃদ্ধর হাতে তুলে দিল। সোমেশ্বর মুদ্রাটা হাতে নিয়ে চকচক করে উঠল খগেশ্বরের মুখ। সে বলে উঠল, তোমার কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ রইলাম। আর হ্যাঁ, তোমার পিতা-মাতার পরিচয়, দ্রুত সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি আমি।' কথাগুলো বলে কক্ষ ত্যাগ করল বৃদ্ধ নাপিত শিরোমণি।

সে চলে যাবার পর প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ মতো দ্বার বন্ধ করে অন্ধকার কক্ষে পিতা-মাতাকে স্মরণ করতে বসল অঙ্গিরা। পল-দণ্ড-প্রহর-সময় এগিয়ে চলল। বাইরে দিন কেটে গিয়ে সূর্যাস্ত হল একসময়। নিঃস্তব্ধতা, অন্ধকার নেমে এল সোমনাথ মন্দিরে। আর রাত্রি নামার সঙ্গে-সঙ্গেই মনসংযোগ ছিন্ন হতে শুরু করল অঙ্গিরার। তার বন্ধ চোখে ভেসে উঠতে লাগল রাজশ্রী-দেবদাসী সমর্পিতার মুখ! সে যেন ডাকছে তাকে! জ্যোৎস্না আলোকিত সেই প্রাঙ্গণ থেকে ভেসে আসছে তার আহ্বান! অঙ্গিরার জন্য অপেক্ষা করছে সে।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে আহ্বান যেন তীব্র হতে লাগল। এক একসময় অঙ্গিরার মনে হতে লাগল, কক্ষ ত্যাগ করে সে রওনা হয় তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রাখল অঙ্গিরা। তবে যে তার মন থেকে কিছুতেই সরাতে পারল না সেই দেবদাসীকে। অন্ধকার কক্ষে নিজেকে আবদ্ধ রাখলেও, তার চোখে শুধু ভেসে উঠতে লাগল দেবদাসী সমর্পিতার করুণ মুখ।

১৬

তিনটে দিন বদ্ধ কক্ষেই কাটাল অঙ্গিরা। কিন্তু এ তিনদিন নিদ্রায়-জাগরণে সে শুধু দেবদাসী সমর্পিতার কথাই ভেবেছে। অঙ্গিরা নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না কেন এমন হচ্ছে। সামান্য কয়েকদিনের পরিচয় বই তো তাঁর সঙ্গে অন্য কোনও সম্পর্ক নেই রাজশ্রী-দেবদাসী সমর্পিতার। একেই কি তবে প্রেম বলে? সে কখন, কীভাবে এসে মানুষের মনে হানা দেয় তা কেউ বুঝতে পারে না। নইলে কেন তার প্রতি মুহূর্তে মনে পড়ছে সেই দেবদাসীর কথা?

তৃতীয় দিন সূর্যাস্তের পর কক্ষ ত্যাগ করল অঙ্গিরা। যদি ত্রিপুরারিদেব এ তিনদিনের মধ্যে দেবদাসী সমর্পিতাকে নৃত্য প্রদর্শনের অনুমতি দিয়ে থাকেন, সে কথা ভেবে তাকে দর্শনের আশাতে অঙ্গিরা মন্দিরে উঠে হাজির হল গর্ভগৃহর সামনে। অন্য সন্ধ্যার মতো যারা যারা সেখানে উপস্থিত থাকেন, সেই নন্দিবাহন, জয়দ্রথ-সহ সবাই সেখানে উপস্থিত।

প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের কাজও শুরু হয়েছে। জয়দ্রথের সঙ্গে অন্যদিন প্রথম দৃষ্টি বিনিময় হলে তিনি হাসেন অঙ্গিরাকে দেখে। এদিন কিন্তু তার মুখে হাসি ফুটল না। অঙ্গিরাকে দেখে ঘাড়টা মৃদু ঝোঁকালেন তিনি। পুরোহিত নন্দিবাহন-সহ সবারই মুখমণ্ডল কেমন যেন গম্ভীর বলে মনে হল। তিলোত্তমার নেতৃত্বে এরপর চত্বরে উঠে এল দেবদাসীরা।

নন্দিবাহন প্রদীপদণ্ড দিয়ে সন্ধ্যা আরতি শুরু করলেন। অঙ্গিরার চোখ দেবদাসীদের ভিড়ের মধ্যে খুঁজল দেবদাসী সমর্পিতাকে। না, সে আজও আসেনি। আরতির পর প্রতি সন্ধ্যার মতো মহাদেবের উদ্দেশ্যে নৃত্যগীত শুরু হল এবং শেষও হল। পুরো ব্যাপারটাই কেমন যেন যান্ত্রিক বলে মনে হলো অঙ্গিরার। শুধু কি তা সমর্পিতার অনুপস্থিতির কারণে, নাকি অন্য কিছু কারণ আছে তার পিছনে। হ্যাঁ, কারণ যে একটা আছে তা কিছু সময়ের মধ্যেই বুঝতে পারল অঙ্গিরা।

নৃত্যগীত সমাপ্ত হবার পর সেদিনের মতো গর্ভগৃহর দ্বার বন্ধ করলেন পুরোহিত নন্দিবাহন। দেবদাসীরা ফিরে গেল। অঙ্গিরাও ফেরার জন্য এগোল সোপানশ্রেণীর দিকে। অঙ্গিরার সঙ্গেই নীচে নামার পথ ধরেছেন রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথ। তিনি বললেন, 'খেয়াল করেছেন, আজ থেকে মন্দিরে দর্শনার্থীদের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। দ্বিপ্রহরেই মন্দির প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল!'

কথাটা শুনে অঙ্গিরা বলল, 'তিনদিন আমি কক্ষত্যাগ করিনি। তাই কিছু দেখিনি। কিন্তু কেন বলুন তো?'

জয়দ্রথ মৃদু বিস্মিত ভাবে বললেন, 'গজনীর সুলতান মামুদ যে এ দেশের দিকে আসছে তা আপনি শোনেননি?'

অঙ্গিরা বলল, 'হ্যাঁ, তা আমি শুনেছি বটে।'

জয়দ্রথ বলল, 'হ্যাঁ, সে কারণেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আর কয়েকদিনের মধ্যেই মাধেরাতে যুদ্ধ শুরু হবে। রাজপুত বাহিনী যদি পরাজিত হয় তবে পাতকী মামুদ নিশ্চয়ই সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠনের জন্য এখানেও আসবে। নগরীতে কোনও পুরুষকে পেলে হত্যা করবে, নারীদের ধর্ষণ করবে, ক্রীতদাসী হিসাবে ধরে নিয়ে যাবে। যে কারণেই আতঙ্কে পুণ্যার্থীদের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। আশেপাশের কয়েকটি রাজ্য নাকি ঢেঁড়া পিটিয়ে তাদের নগরবাসীদের সুরক্ষার কথা ভেবে একথাও জানিয়েছে যে পুণ্যার্থীরা যেন মাধেরা সূর্যমন্দির আর এই প্রভাসপত্তনের সোমনাথ মন্দিরের উদ্দেশ্যে তাদের যাত্রা আপাতত স্থগিত রাখে।'

অঙ্গিরা বলল, 'না, এতটা খবর আমার জানা ছিল না।'

জয়দ্রথ বললেন, 'দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়? এমনকী মন্দিরেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কারণ, নগরবাসীরা প্রয়োজনে প্রভাসপত্তন ত্যাগ করলেও কিছু মানুষ বিশেষত পুরোহিতকুল, দেবদাসীরা আর আমরা কয়েকজন তো কোনও অবস্থাতেই মন্দির ত্যাগ করতে পারব না। শুনলাম, আতঙ্ক নিরসনের জন্য প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব নাকি মন্দিরের বাসিন্দাদের নিয়ে সভা ডাকতে চলেছেন।' এ কথা বলার পর রক্ষীপ্রধান নীচে নেমে অন্যত্র চলে গেলেন। আর অঙ্গিরাও অতিথিশালায় ফিরে এসে প্রতীক্ষা শুরু করল মধ্যরাতের জন্য।

চাঁদ যখন ঠিক মাথার ওপর উঠল তখন প্রস্তুত হয়ে কক্ষ ত্যাগ করল অঙ্গিরা। চাঁদের আলোতে নিস্তব্ধ সোমনাথ মন্দির। রাজশ্রীর সঙ্গে কি তার দেখা হবে? এ কথা ভাবতে ভাবতে আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলতে-দুলতে অঙ্গিরা রওনা হল নির্দিষ্ট স্থানের দিকে। মন্দিরের প্রাচীন ধ্বংস্তুপ অতিক্রম করে অঙ্গিরা প্রথমে উপস্থিত হল সেই নির্জন কাননে। তারপর সন্তর্পণে দেবদাসীদের আবাসস্থলের তোরণ উন্মুক্ত করে উঠে এল সেই স্তম্ভ সমন্বিত প্রাঙ্গণে। না, চারপাশে কেউ নেই। কক্ষগুলো সব ঘুমন্ত বলেই মনে হলো তার। স্তম্ভের গোলক ধাঁধা পেরিয়ে অঙ্গিরা এগোল সেই বেদির দিকে। কিছুটা এগিয়েই সে দেখতে পেল, হ্যাঁ, সেখানে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতা।

স্তম্ভের আড়াল থেকে আত্মপ্রকাশ করে অঙ্গিরা তার সামনে আবির্ভূত হতেই প্রথমে মুণ্ডিত মস্তক অঙ্গিরাকে হঠাৎ চিনতে না পেরে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল রাজশ্রী। কিন্তু অঙ্গিরা তাড়াতাড়ি তার মুখ চাপা দিয়ে বলে উঠল, 'আমি অঙ্গিরা।'

কথাটা শুনেই মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক মুছে গিয়ে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল সোমনাথ সুন্দরীর চোখ। অঙ্গিরা তার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেবার পর দেবদাসী সমর্পিতা কয়েক মুহূর্ত বিস্ময় মিশ্রিত আনন্দ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর প্রশ্ন করল, 'তোমার গুম্ফ, শ্মশ্রু, অমন সুন্দর কুঞ্চিত কেশ কোথায় গেল?'

অঙ্গিরা হেসে জবাব দিল 'পূর্ণিমার দিন পিতা-মাতার পিণ্ডদান উপলক্ষে প্রধান পুরোহিতের নির্দেশে মস্তক মুণ্ডন করতে হয়েছে।'

রাজশ্রী এরপর একটু অভিমানের স্বরে বলল, 'তুমি এ তিনদিন আসনি কেন? আমি প্রতিরাতে তোমার জন্য এখানে প্রতীক্ষা করেছি। তারপর শুকতারা ফুটে উঠলে আশাহত হয়ে কক্ষে ফিরে গেছি। সারা দিন শুধু তোমার কথাই মনে পড়েছে আমার।'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'এ তিনদিন আমারও প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে তোমার কথা। প্রতি রাতেই মনে হয়েছে এখানে চলে আসি। কিন্তু পারিনি। কারণ ত্রিপুরারিদেব তিনদিন কক্ষ ত্যাগ করতে নিষেধ করেছিল আমাকে। আগামী পূর্ণিমাতে তিনি আমার ওপর তার কাজের দায়িত্ব সমর্পণ না করা পর্যন্ত তিনদিন পরপর তিনদিন রুদ্ধ কক্ষে বসে আমাকে আমার পিতা-মাতার আত্মার মুক্তি লাভের জন্য প্রার্থনা করতে হবে। প্রধান পুরোহিত আমাকে সে নির্দেশই দিয়েছেন।'

এ কথা বলার পর একটু চুপ করে থেকে অঙ্গিরা বলল, 'হয়তো তোমার সঙ্গে আমার আর দেখাই হতো না।'

দেখা হতো না কেন?' জানতে চাইল দেবদাসী সমর্পিতা।

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'তিনদিন আগে মস্তক মুণ্ডনের পর যখন আমি সমুদ্র স্নানে নেমেছিলাম তখন এক সামুদ্রিক অজগর সর্প আক্রমণ করেছিল আমাকে। কি বীভৎস ভয়ঙ্কর তার চেহারা!

কথাটা শুনেই দেবদাসী আতঙ্কিত হয়ে অঙ্গিরার হাত জড়িয়ে ধরে বলল, 'তারপর?'

অঙ্গিরা বলল, 'সে মহাসর্প, তো আমাকে গিলেই খাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় বৃদ্ধ ক্ষৌরকার খগেশ্বর জলে নেমে তার খুর তুলে দিল আমার হাতে। সেই খুরের আঘাতে মহাসর্পর কণ্ঠদেশ ছিন্ন করে নাগপাশ থেকে মুক্ত হলাম আমি।'

এ কথা বলার পর অঙ্গিরা হেসে বলল, 'তুমি আমার কথা বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, আমি যখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করছি সেই মহাসর্পর সঙ্গে, ঠিক সেই মুহূর্তে অদ্ভুত ভাবে তোমার মুখটাই আমার মনে ভেসে উঠেছিল!'

কথাটা শুনে রাজশ্রী অঙ্গিরার চোখের দিকে তাকিয়ে তার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, 'আমি তোমার কথা বিশ্বাস করছি।'

কিছুক্ষণ পরস্পরের মুখের দিকে নিস্তব্ধ ভাবে চেয়ে রইল তারা দুজন। রাজশ্রী এরপর বলল, 'গত কয়েকদিন ধরেই আমার একটা কথা মনে হচ্ছে। হয়তো বা তোমার সঙ্গে দেখা হবে বলেই বিধাতা পুরুষ আমাকে রাজকন্যা রাজশ্রী থেকে দেবদাসী সমর্পিতা বানালেন।'

অঙ্গিরা হেসে জবাব দিল, 'আমারও এখন মনে হচ্ছে, শুধু পিতা-মাতার আত্মার মুক্তির জন্য নয়, তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে বলেই ভাগ্য আমাকে এখানে এনেছে। আমরা দুজনেই তো এক সঙ্গে থাকব এ মন্দিরে। প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে তো মিলিত হতে পারব। সে পাওয়াও তো অনেক। আমার কার্যকলাপের মেয়াদ দ্বাদশ বৎসর। সে সময় অতিক্রান্ত হলেও আমি অন্য কোনও কাজে তোমার জন্য রয়ে যাব এ মন্দিরে।'

'আমার জন্য তারপরও রয়ে যাবে তুমি!' বলে উঠল দেবদাসী সমর্পিতা।

অঙ্গিরা বলল, 'হ্যাঁ, আমার তো অন্য কোথাও কেউ নেই। প্রকাশ্যে না হলেও এখানে কেউ তো থাকবে আমার জন্য।'

এ কথা শোনার পর রাজশ্রী প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল, 'শুনছি কোন এক সুলতান মামুদ নাকি এ মন্দিরে হানা দিতে পারে এখানে। সে নাকি খুব নিষ্ঠুর। তার সেনাবাহিনীও নারীলোলুপ। দেবদাসীরা একথা বলাবলি করছে। উত্তরাও কোথাও থেকে শুনেছে এ কথা। তুমি কিছু শুনেছ?'

অঙ্গিরা বলল, 'হ্যাঁ, শুনেছি। তবে সে নিশ্চিত ভাবে এখানে উপস্থিত হবে কিনা ঠিক নেই। হিন্দু রাজারা মাধেরার কাছে সম্মিলিত সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছেন সুলতানবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য।'

রাজশ্রী বলল, কিন্তু সত্যিই যদি সে এখানে এসে পড়ে তবে কি হবে? তারা তো আমাদের ছেড়ে দেবে না? শুনেছি তারই মতো জুয়ানেদের সেনারা যখন এ মন্দিরে হানা দিয়েছিল তখন তাদের সম্মিলিত বীভৎস লালসার শিকার হয়েছিল দেবদাসীরা। সেই অত্যাচারে অধিকাংশ দেবদাসীরই মৃত্যু হয়েছিল। দেবদাসীদের রক্তে ভেসে গেছিল এ প্রাঙ্গণ। যে সব দেবদাসী প্রাণে বেঁচে ছিল, তাদের ক্রীতদাসী হিসাবে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আরও কোন ভয়ঙ্কর পরিণতির জন্য। তেমন যদি কিছু হয়?' স্পষ্ট আতঙ্কের সুর ফুটে উঠল তার কণ্ঠে।

তাকে আশ্বস্ত করার জন্য অঙ্গিরা বলল, 'তেমন কোনও দুর্যোগ উপস্থিত হলে আমি যে ভাবেই হোক রক্ষা করব তোমাকে। ভয় পেও না। জানো, আমি অন্ধকারে শব্দভেদী বাণও চালাতে পারি।' এই প্রথম ত্রিপুরারিদেব ছাড়া অন্য কারও কাছে প্রকাশ করল অঙ্গিরা।

দেবদাসী সমর্পিতা এ কথা শুনে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু, হঠাৎই একটা দৃশ্য তার চোখে পড়াতে সে বেদির কাছ থেকে অঙ্গিরাকে হাত ধরে টেনে এনে একটা থামের আড়ালে অন্ধকারে আত্মগোপন করল। থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে আঙুল তুলে চত্বরের নির্দিষ্ট দিকে তাকাবার জন্য ইশারা করল অঙ্গিরাকে।

রাজশ্রীর দৃষ্টি অনুসরণ করে অঙ্গিরা দেখল চত্বরের এক অংশে কক্ষের দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে একজন নারী। চাঁদের আলোতে অঙ্গিরা চিনতে পারল তাকে—দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা! চারপাশে তাকিয়ে চত্বরটা দেখার চেষ্টা করছে। সে কি দেবদাসী সমর্পিতাকে খুঁজছে? সে কি দেখতে পেয়েছে তাকে?

কয়েক পলের মধ্যে অবশ্য আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারল তারা দুজন। চত্বরে কাউকে দেখতে না পেয়ে তিলোত্তমা তার কক্ষের ভিতর তাকিয়ে হাত নেড়ে কাকে যেন বাইরে বেরোবার জন্য ইশারা করল! সেই ইশারাতে অন্ধকার কক্ষের ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল একজন পুরুষ! অঙ্গিরারা বুঝতে পারল শুধু সাধারণ দেবদাসীদের নয়, তাদের পরিচালিকারও গোপন প্রেম আছে!

বাইরে বেরিয়েই লোকটা এগোল প্রাচীরের গায়ে যেদিকে ফোকর আছে সেদিকে। লোকটার মুখে একটা বস্ত্রখণ্ড থাকলেও সে কিছুটা এগোবার পর হঠাৎই সেটা কাকতালীয় ভাবে খসে গেল। অঙ্গিরা তাকে চিনতে পেরে চাপা স্বরে বলে উঠল 'আরে এ যে স্বয়ং সেবায়েত প্রধান বিষধারী!'

চত্বর থেকে অন্তর্হিত হয়ে গেল লোকটা। তিলোত্তমাও কক্ষে প্রবেশ করে দ্বার বন্ধ করল। অঙ্গিরারাও হয়তো থামের বাইরে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল, কিন্তু অঙ্গিরা তার শরীরে এক অদ্ভুত স্পর্শ অনুভব করল। রাজশ্রী পাশ থেকে এমন ভাবে আলিঙ্গন করে আছে যে তার বস্ত্রখণ্ডর ভিতর থেকে তার সুডৌল স্তন যুগল স্পর্শ করে আছে অঙ্গিরার পাঁজর। নিবিড় স্পর্শ।

রাজশ্রী মুখ তুলে চেয়ে আছে অঙ্গিরার দিকে। স্তম্ভের ফাঁক গলে ছুরির ফলার মতো এক ফালি চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার মুখমণ্ডলে। গোলাপের পাপড়ির মতো ওষ্ঠাধর যেন উন্মুখ ভাবে চেয়ে আছে অঙ্গিরার দিকে। মুহূর্তর মধ্যে শরীরে এক অদ্ভুত শিহরন অনুভব করল অঙ্গিরা। যে অনুভূতি আগে কোনওদিন লাভ করেনি সে। নারীর আলিঙ্গনে দ্রুত সে শিহরন ছড়িয়ে পড়তে লাগল অঙ্গিরার ধমনীতে। পুরুষের স্পর্শে একই অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতার রক্তেও।

যে অনুভূতি সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকে পরস্পরের প্রতি আকর্ষণের জন্ম দিয়েছে নারী-পুরুষকে। এগিয়ে নিয়ে চলেছে জীবনের প্রবাহমানতা। সমর্পিতা তার ওষ্ঠাধর যেন আরও একটু তুলে ধরল। নিজের অজান্তেই যেন অঙ্গিরার ঠোঁট নেমে এল সোমনাথ সুন্দরীর ঠোঁটের ওপর।

এ যেন এক অদ্ভুত বিদ্যুৎস্পর্শের অনুভূতি। যে অনুভূতি মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করে নিল তাদের দুজনের শরীরকেই। নিবিড় আলিঙ্গনে, নিষ্পেষণে মিশে যেতে লাগল দুটো শরীর। খসে পড়ল অঙ্গিরার ধনুর্বাণ, রাজশ্রী অথবা দেবদাসী সমর্পিতার বসন, যেন তারা বনাচারী নিরাবরণ আদিম মানবমানবী।

এ রাত যেন নিমেষে কেটে গেল। তাদের যখন হুঁশ ফিরল তখন চাঁদ ম্রিয়মান। শুকতারা ফুটে ওঠার সময় হয়ে গেছে। বসনে আবৃত হয়ে উঠে দাঁড়াল তারা। কয়েক মুহূর্ত নির্বাক দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল তারা। আবেশঘন কণ্ঠে দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'আমাকে কথা দাও, তুমি কোন দিন বিচ্ছিন্ন হবে না আমার কাছ থেকে। কোনও দিন ভুলবে না আমাকে?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'হ্যাঁ, কথা দিলাম।'

দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'রাত্রির প্রত্যাশায় থাকব আমি।'

অঙ্গিরা হেসে বলল, 'আমি আসব।' এ কথা বলে অঙ্গিরা পরম মমতায় সোমনাথ সুন্দরীর কপাল চুম্বন করে রওনা হল ফেরার জন্য। অঙ্গিরা যখন অতিথিশালাতে কক্ষে ফিরে দোর বন্ধ করল ঠিক সেই সময় বাইরে শিকলের শব্দ শুরু হল। ছন্দময় সেই শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ল অঙ্গিরা।

১৭

পরদিন বেশ বেলাতেই করাঘাতের মৃদু শব্দে ঘুম ভাঙল অঙ্গিরার। মন্দিরের দৈনন্দিন কাজ তখন অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। দরজা খুলে অঙ্গিরা দেখতে পেল নাপিত শিরোমণি দাঁড়িয়ে আছে। অঙ্গিরা যেন ভুলেই গেছিল তার কথা। ভিতরে প্রবেশ করল খগেশ্বর। মলিনতা যেন গ্রাস করে আছে তার মুখকে। পোশাকের ভিতর থেকে সোমেশ্বর মুদ্রাটা বার করে খগেশ্বর বলল, 'এই নিন। তিনদিন পর মুদ্রাটা আমার ফিরিয়ে দেবার কথা ছিল, ফিরিয়ে দিলাম।'

অঙ্গিরা মুদ্রাটা হাতে নিয়ে বৃদ্ধ খগেশ্বরের মুখের মলিনতা লক্ষ করে জানতে চাইল 'আপনার স্ত্রী কেমন আছেন?'

প্রশ্নটা শুনে বৃদ্ধ মাটির দিকে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে বলল, 'আমার স্ত্রী নেই। বহুকাল আগে সে প্রয়াত হয়েছে।'

জবাব শুনে বিস্মিত অঙ্গিরা বলে উঠল, 'তবে যে আপনি বলেছিলেন যে স্ত্রীকে দেখাবেন বলে মুদ্রাটা নিচ্ছেন?'

খগেশ্বর বলল, 'আমাকে মার্জনা করবে, পাছে তুমি মুদ্রাটা না দিতে চাও তাই মিথ্যা বলেছিলাম। মিথ্যা বলার জন্য আমার গ্লানিও হয়েছে। তুমি বিশ্বাস করে মুদ্রাটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিলে। তোমাকে মিথ্যা বলা আমার উচিত হয়নি। তাই সত্যটা বললাম।'

অঙ্গিরা বলল, 'তবে এ মুদ্রা আপনি কেন নিয়েছিলেন?'

খগেশ্বর মৃদু নিশ্চুপ থেকে বলল, 'সে কারণ এই মুহূর্তে আমি তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারব না। তবে কেন জানি, তোমাকে দেখে তোমার প্রতি আমার একটা ভালো লাগা জন্মেছে। হয়তো-বা আমার পুত্র অনেকটা তোমার মতোই দেখতে ছিল তাই। দ্বাদশ বৎসর পূর্বে তার মৃত্যু ঘটেছে। পুত্রবধূও তার চিতার সামনেই সহমৃতা হয়। তোমার দ্বারা আমার কোনও অনিষ্ট হবে না জানি, হয়তো বা অনিষ্ট হতে বাকিও কিছু নেই। শেষ অনিষ্টটা যাতে রোধ করা যায় তাই মুদ্রাটা তোমার থেকে নিয়েছিলাম। কিন্তু সোমেশ্বর মহাদেবের হয়তো বা সে ইচ্ছা নেই।'

এ কথা বলার পর আবারও মৃদু চুপ করে থেকে খগেশ্বর বলল, 'তোমাকে একটা ব্যাপার জানাতে চাই। মধ্যরাত্রে একবার বেরোতে পারবে আমার সঙ্গে? এ মন্দিরের ভিতর এক স্থানে তোমাকে নিয়ে যাব।'

অঙ্গিরা বলল, 'আপনি এখন মন্দিরেই রাত্রিবাস করেন নাকি?'

খগেশ্বর বলল, 'আমার পরিচিত একজনের কক্ষ আছে মন্দিরের ভিতর। যার কক্ষ সে বর্তমানে নগরীতে নিজের বাটিকাতে থাকে। তার অনুমতিক্রমে আমি কিছুদিন হল রাত্রিবাস করছি সে কক্ষে। আমি ক্ষৌরকার প্রধান, প্রধান পুরোহিতসহ অন্য পুরোহিতদেরও মস্তক মুণ্ডন করাই। তাই কেউ আপত্তি করেনি ব্যাপারটাতে।'

অঙ্গিরা জানতে চাইল, 'গভীর রাতে মন্দিরের ভিতর কোন স্থানে আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন?'

ক্ষৌরকার প্রধান বলল, 'এখন বলব না, সেখানে গেলেই তুমি ব্যাপারটা জানতে পারবে। আজ রাত্রিকে আমি নিতে আসব তোমাকে?'

বৃদ্ধ খগেশ্বর তাকে কি দেখাতে চায় তা জানার জন্য কৌতূহল সৃষ্টি হল অঙ্গিরার মনে। সে বলতে যাচ্ছিল, 'আমি রাতে আপনার সঙ্গে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকব।' কিন্তু তার তখনই মনে পড়ে গেল, রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতা তো তার জন্য প্রতীক্ষা করে থাকবে। সেখানে তো যেতেই হবে অঙ্গিরাকে। আজ কাল, দু-রাতের পর আবার ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশ পালন করতে তিনদিন বদ্ধ ঘরে কাটাতে হবে তাকে। তিন দিনের জন্য বিচ্ছেদ ঘটবে রাজশ্রীর সঙ্গে। কাজেই এ দু-রাত কিছুতেই রাজশ্রীর সঙ্গ ত্যাগ থেকে সে নিজেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। সব কিছু হিসাব করে নিয়ে অঙ্গিরা বলল, 'আগামী পাঁচ রাত আপনার সঙ্গে যাবার উপায় নেই আমার। তারপর আমি আপনার সঙ্গে রাত্রি ভ্রমণের চেষ্টা করতে পারি।'

অঙ্গিরার জবাব শুনে বৃদ্ধর মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, 'ঠিক আছে পাঁচ রাত পরে আমাদের উভয় পক্ষের যদি সে সুযোগ থাকে তবে তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব।'

অঙ্গিরা এরপর জানতে চাইল, 'সুলতানের আক্রমণের ব্যাপারে কোনও খবর জানেন?'

খগেশ্বর বলল 'সে দ্রুত এগিয়ে আসছে মাধেরার দিকে। হিন্দু সেনারাও উপস্থিত হয়েছে মাধেরা সূর্য মন্দিরের সামনে। আগামী পাঁচ-ছ'-দিনের মধ্যেই হয়তো যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে হানাদারদের সঙ্গে।'

অঙ্গিরা জানতে চাইল, 'নগরীর অবস্থা কেমন?'

নরসুন্দর শ্রেষ্ঠ বলল, 'গতকাল প্রত্যুষে আমি প্রাক্তন সেবায়েত প্রধান নীলকণ্ঠর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য নগরীতে প্রবেশ করেছিলাম। শুনলাম রাজা ভীম নাকি কচ্ছর কানিথকোট দুর্গে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মাধেরার যুদ্ধে যদি আহরিয়া, চালুক্য, রাজপুতবাহিনী পরাস্ত হয়, নারকী যদি তার সেনাদের নিয়ে প্রভাসপত্তনের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে তবে রাজা ভীম সেনাদলের হাতে নগরী আর মন্দিরের দায়িত্ব দিয়ে পরিবার আর অমাত্যদের নিয়ে কানিথকোট দুর্গে চলে যাবেন।

সে দুর্গ ছোট হলেও উপকূলবর্তী। গজনী সেনারা যদি সেদিকেও ধাওয়া করে তবে রাজা ময়ূরপঙ্খী নিয়ে ভেসে পড়বেন সমুদ্রর জলে। মামুদ আর তাকে অনুসরণ করতে পারবে না। স্বয়ং মহারাজ ভীম যেখানে আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন সেখানে নগরবাসীদের অবস্থা তো সহজেই অনুমেয়। ধনাঢ্যরাও অন্যত্র যাবার প্রস্তুতি শুরু করেছে। আর যাদের কোথাও যাবার জায়গা নেই তারা সোমেশ্বর মহাদেবের ওপর ভরসা করে নগরীতেই রয়ে যাবে।

মন্দিরে দর্শনার্থীদের আসাও কমে গেছে। আতঙ্ক হয়তো বা বাইরের থেকে কিছুটা বেশি ছড়িয়েছে মন্দিরের ভিতর। কারণ, নগরবাসীরা অনেকেই প্রয়োজনবোধে অন্যত্র পলায়ন করতে সক্ষম হলেও এ মন্দিরের অনেকেই কোনও অবস্থাতেই মন্দির ত্যাগ করতে পারবে না। বিশেষত পুরোহিত কুল, কিছু সেবায়েত যাঁরা প্রত্যক্ষ ভাবে সোমেশ্বর মহাদেবের সেবায় নিয়োজিত থাকেন এবং দেবদাসীরা। বিপদ থেকে বাঁচবার জন্য তাদেরও একমাত্র ভরসা সোমেশ্বর মহাদেব।'—একটানা কথা বলে থামলেন বৃদ্ধ।

খগেশ্বর, প্রাক্তন সেবায়েত প্রধান নীলকণ্ঠর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছিল শুনে অঙ্গিরা তাকে জিগ্যেস করল 'আমার পিতা-মাতার এ মন্দিরের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে সেই অতিবৃদ্ধ কোনও কিছু বললেন আপনাকে?'

কথাটা শুনে হঠাৎই যেন গম্ভীর হয়ে গেল বৃদ্ধর মুখ। সে বলে উঠল, 'ও প্রসঙ্গে পরে কথা হবে। আমাকে এখনই বিশেষ প্রয়োজনে অন্যত্র যেতে হবে।' এ কথা বলে আর কালক্ষেপ না করে, অঙ্গিরাকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে কক্ষ ত্যাগ করল খগেশ্বর। তার এ ভাবে হঠাৎ চলে যাওয়াটা বেশ একটু অদ্ভুত মনে হল অঙ্গিরার।

পরামাণিক শ্রেষ্ঠ চলে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যে অতিথিশালা ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে এল অঙ্গিরা। মন্দিরে কিছু ভক্তকুল উপস্থিত হলেও তাদের সংখ্যা বেশ নগণ্য। কয়েক সহস্রর পরিবর্তে কয়েকশত মাত্র। ঘণ্টাধ্বনি বা সোমেশ্বর মহাদেবের নামে জয়ধ্বনি হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তা অন্য দিনের মতো আকাশ-বাতাসকে বিদীর্ণ করছে না। সেবায়েতদের তেমন কাজের চাপ নেই। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ভাবে জটলা করছে তারা।

মন্দির চত্বরে এদিক-ওদিক উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎই সেবায়েতদের একটা জটলার পাশ দিয়ে যাবার সময় তাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনার একটা কথা কানে এল অঙ্গিরার। এক সেবায়েত তার সঙ্গীদের বলছে, 'সোমেশ্বর মুদ্রা যাঁদের কাছে আছে তাঁরা সবাই সম্মানীয় ব্যক্তি। তাঁরা কেউ কি এ কাজ করবেন? রক্ষীরা নিশ্চয়ই মিথ্যা কথা বলছে।'

তাদের মধ্যে কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তা জানা নেই অঙ্গিরার। কিছুক্ষণ মন্দিরে ঘুরে বেড়াবার পর অতিথিশালাতে ফিরে স্নান-আহার ইত্যাদি কার্য সম্পন্ন করে রাজশ্রীর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।

সূর্যাস্তের কিছু আগে করাঘাতের শব্দে ঘুম ভাঙল অঙ্গিরার। দরজা খুলে সে দেখল রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথ একজন রক্ষী নিয়ে হাজির হয়েছেন। তিনি অঙ্গিরাকে বললেন, 'আপনাকে বিরক্ত করার কারণে দুঃখিত। কিন্তু প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ পালনের জন্য এখানে এসেছি।'

'কী নির্দেশ?' জানতে চাইলে অঙ্গিরা।

জয়দ্রথ প্রথমে অঙ্গিরার প্রশ্নর জবাব না দিয়ে বললেন, 'আপনার কাছে সোমেশ্বর স্বর্ণমুদ্রাটা আছে তো? আমাকে একটু দেখাবেন?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'হ্যাঁ, আছে। দাঁড়ান দেখাচ্ছি।'

অঙ্গিরা কক্ষের ভিতর থেকে মুদ্রাটা এনে জয়দ্রথের হাতে দিল। তিনি মুদ্রাটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সেটা আবার অঙ্গিরার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, 'আপনার কক্ষটা আমরা একটু পরীক্ষা করে দেখতে চাই। অনুগ্রহ করে আমার রক্ষীদের ভিতরে প্রবেশ করতে দিন।'

'কীসের পরীক্ষা?' বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চাইল অঙ্গিরা।

জয়দ্রথ বললেন, 'আগে পরীক্ষা হোক, তারপর জানাচ্ছি।'

রক্ষীদল প্রবেশ করল কক্ষে। অঙ্গিরার সঙ্গে আনা সামগ্রী বলতে সামান্য কিছু বস্ত্র। সেই বস্ত্রর পুঁটুলি খুলে দেখল তারা। তারপর তার শয্যার তলদেশে, ঘরের আনাচেকানাচে কীসের সন্ধানে যেন অনুসন্ধান চালাতে লাগল। এমনকী জল রাখার জন্য যে মাটির জালাটা রাখা ছিল তার মুখের আচ্ছাদন তুলে ভিতর উঁকি দিয়ে দেখল তারা। এক সময় অনুসন্ধান পর্ব তাদের শেষ হল। রক্ষীপ্রধানকে তারা জানাল, 'না তেমন কিছু পাওয়া যায়নি।'

রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথ এরপর অঙ্গিরার উদ্দেশ্যে বললেন, 'আসলে মন্দিরের এক কক্ষ থেকে বহুমূল্য কিছু রত্নরাজি স্বর্ণালঙ্কার খোয়া গেছে। তারই অনুসন্ধান করতে এসেছিলাম আমি।'

কথাটা শুনে বেশ অপমানিত বোধ করে অঙ্গিরা উত্তেজিত ভাবে বলে উঠল, 'আমাকে আপনারা তস্কর ভেবে সন্দেহ করলেন?'

জয়দ্রথ বললেন, 'উত্তেজিত হবেন না। শুধু আপনি নন, এ মন্দিরে যাদের কাছে সোমেশ্বর স্বর্ণমুদ্রা আছে এবং মন্দিরের বাইরেও যাদের কাছে এই মুদ্রা আছে, তাদের সবার গৃহতেই ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশে ওই সম্পদের খোঁজে অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। এই তো আপনার কক্ষে আসার পূর্বেই আমি সেবায়েত প্রধান বিষধারীর কক্ষে তল্লাসি চালাতে গেছিলাম। তিনিও বাদ পড়েননি।'

অঙ্গিরা জানতে চাইল, 'সোমেশ্বর মুদ্রার অধিকারীদেরই সন্দেহের তালিকাতে রাখা হয়েছে কেন?'

জয়দ্রথ বললেন, 'তবে ঘটনাটা খুলে বলি আপনাকে। নগরীর এক ধনাঢ্য নারী কিছু দিবস আগে প্রয়াত হয়েছেন। মৃত্যুর আগে তিনি তার স্বর্ণালঙ্কার ও বহুমূল্য বেশ কিছু রত্নরাজি দান করে গেছেন সোমেশ্বর মহাদেবকে। একটা থলেতে সেই দানসামগ্রী নিয়ে তার পুত্ররা সন্ধ্যারতির পর মন্দিরে হাজির হয়। মন্দিরের কোষাগারের দরজা ততক্ষণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল দৈনন্দির মূল্যবান দানসামগ্রী তার ভিতরে ঢুকিয়ে রেখে। যে খাঁজশলাকা দিয়ে কোষাগারের লৌহকপাট উন্মোচন করা হয় তাও আমি জমা রেখে এসেছিলাম পুরোহিত মল্লিকার্জুনের কাছে।

যারা রত্ন থলিটা দিতে এসেছিল, তাদের আমি প্রথমে পরদিন অর্থাৎ আজ সকালে আসতে বলি। কিন্তু তারা জানায় তা সম্ভব নয়। গতরাত্রিতেই প্রভাসপত্তন ত্যাগ করবে তারা। সম্ভবত মামুদের হানার আতঙ্কতেই নগরী ত্যাগ করছে তারা। কাজেই বাধ্য হয়ে সেই মূল্যবান দানসামগ্রী গ্রহণ করি আমি।

অন্ধকার নেমে গেছে তখন। পুরোহিত মল্লিকার্জুনও তখন কক্ষের দ্বার বন্ধ করে দিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে অন্য যে কক্ষে সম্পদ রাখা হয় আমি সে কক্ষে সম্পদ রাখি এবং সেখানে দুজন প্রহরী মোতায়েন করি। আজ সকালে আমি মল্লিকার্জুনের থেকে খাঁজশলাকা নেবার পর সেই কক্ষ থেকে রত্ন থলিটা নিয়ে মন্দিরের সম্পদ কোষে স্থানান্তর করতে যাই। কিন্তু কক্ষে সেই রত্নথলি ছিল না। প্রহরীরা জানায়, মধ্যরাতে অবগুণ্ঠনে ঢাকা এক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হয় এবং সোমেশ্বর মুদ্রা দেখিয়ে সে কক্ষে প্রবেশ করেছিল।

রক্ষীরা অবশ্য প্রথম অবস্থাতে তাকে কিছু জিজ্ঞেসাবাদ করেছিল। কিন্তু ভাঙা কণ্ঠস্বরে মুখমণ্ডল আবৃত সেই ব্যক্তি জানায় সে প্রধান পুরোহিতের নির্দেশে কক্ষে প্রবেশ করতে এসেছে। তা ছাড়া সোমেশ্বর মুদ্রা যার কাছে আছে সে গর্ভগৃহ আর সম্পদকোষ ব্যতীত যে কোনও স্থানে প্রবেশ করতে পারে। তাকে বাধাদান করা অপরাধ। রক্ষীরা যদি তাকে কক্ষে প্রবেশ করতে না দেয় অথবা তার কাজের কোনও বিলম্ব ঘটায় তবে কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হবে তাদের। অল্পবয়সি অতি সাধারণ রক্ষী দুজন ভয় পেয়ে যায় তার কথা শুনে। লোকটাকে কক্ষে প্রবেশ করতে দেয় তারা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে কক্ষ থেকে রত্নখনি নিয়ে উধাও হয় সেই প্রতারক তস্কর।'

অঙ্গিরা আশ্চর্য হয়ে গেল তার কথা শুনে।

জয়দ্রথ এরপর বললেন, 'রক্ষী দুজনকে তাদের বুদ্ধিহীনতার কারণে বরখাস্ত ও নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে। যদিও তাদের তেমন কিছু করার ছিল না। গত রাতে প্রধান পুরোহিতের কক্ষে গিয়ে তাদের পক্ষে সত্যানুসন্ধান সম্ভব ছিল না, অন্য কারো পক্ষেও ছিল না। কারণ সন্ধ্যারতি সমাপ্ত হবার পর কারো মন্দিরের সর্বোচ্চ ধাপ, গর্ভগৃহ ও তার সংলগ্ন চত্বরে ওঠার অনুমতি নেই। এবার নিশ্চই পুরো ঘটনা পরিষ্কার হল। ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশে কেন আমরা সোমেশ্বর মুদ্রা প্রাপকদের কক্ষে অনুসন্ধান চালাচ্ছি।'

আপনিই শেষ ব্যক্তি যার কক্ষে সেই সম্পদের সন্ধান চালানো হল। কোথাও কিছু পাওয়া গেল না। যে কাজটা করেছে সে হয়তো সেই রত্ন-অলঙ্কার অন্যত্র সরিয়ে ফেলেছে। আপনার কাছে মুদ্রাটা দেখতে চাইলাম কারণ, এমনও হতে পারে যে মুদ্রার প্রকৃত মালিক মুদ্রাটা অন্য কারোকে হস্তান্তর করে তার মাধ্যমেই তস্কর কার্য সম্পাদন করেছে।

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, মুদ্রাটা তার প্রাপকরা সবাই দেখিয়েছে আমাকে। তবে কি চুরিটা তারা কেউ করেনি? রত্ন থলিও কারো কাছে পাওয়া গেল না আবার সবার কাছেই নিজ নিজ মুদ্রা আছে! যদি না এমন কিছু হয় যে ওই চৌর্য কার্যের জন্য মুদ্রাটা যাকে দেওয়া হয়েছিল সে কার্য সম্পন্ন করার পর রত্নথলি অন্যত্র লুকিয়ে মুদ্রাটা আবার তার আসল মালিকের কাছে ফেরত দিয়ে গেছে।'

অঙ্গিরা, রক্ষীপ্রধানের এই শেষ কথাটা শুনে ভিতরে ভিতরে চমকে উঠল।

কার্য সম্পাদন করে ফিরে গেলেন রক্ষী প্রধান। কিন্তু তার বলে যাওয়া শেষ কথাগুলো অন্য এক ভাবনা, আশঙ্কার জন্ম দিল অঙ্গিরার মনে। এমন হয়নি তো খগেশ্বর লোভের বশবর্তী হয়ে ওই রত্নালঙ্কার হরণ করেছে? হয়তো পুরো ব্যাপারটা আগাম জানা ছিল, অনুমান করা ছিল খগেশ্বরের। সে জানত যে অন্ধকার নামার পর সে সম্পদ দিতে আসা হবে, এবং তা রাখা হবে তোষাগৃহর পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম নিরাপত্তাবলয়ে আবৃত কোনও কক্ষে? ভাবতে লাগল অঙ্গিরা।

কিছু সময়ের মধ্যেই অন্ধকার নামল। সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনিও শুরু হল। আর তার সঙ্গে-সঙ্গেই অঙ্গিরার মনে পড়তে লাগল রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতার কথা। তার ভাবনা আচ্ছন্ন করে ফেলল অঙ্গিরার মনকে। সে ভাবতে লাগল কখন মধ্যরাত্রি আসবে, সে সাক্ষাৎ করতে যাবে তার সঙ্গে, দেবদাসী সমর্পিতার ওষ্ঠে স্থাপন করবে তার ওষ্ঠ।

১৮

মাধেরা সূর্যমন্দির। সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের মতো এ মন্দির অতি প্রাচীন নয়। সোলাঙ্কি রাজা ভীমের পিতামহ মাত্র একশত বৎসর পূর্বে অপূর্ব শিল্প সুষমা মণ্ডিত এ মন্দির নির্মাণ করান। তবে এ স্থানেরও বিশেষ স্থান মাহাত্ম্য বর্তমান। ব্রহ্ম পুরাণে এ স্থানের কথা আছে।

মাধেরার অতি প্রাচীন নাম ধর্মারণ্য। পুষ্পবতী নদীতীরে ধর্মারণ্য বা অরণ্য ভূমি ছিল উপাসনা স্থল। শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কা জয় করেন ও লঙ্কেশ্বর রাবণকে হত্যা করেন। রাবণ ছিলেন ব্রাহ্মণ। তাঁকে হত্যা করার পর শ্রীরামচন্দ্র ব্রহ্ম হত্যার পাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য ঋষি বশিষ্ঠের পরামর্শে ধর্মারণ্যে এসে সূর্যদেবের তপস্যা করে পাপ মুক্ত হন এবং সীতাপুর নামে এক গ্রাম স্থাপন করেন।

শ্রীরামচন্দ্রের পদধূলিতে ধন্য এ পুণ্য ভূমিতেই সোলাঙ্কি রাজারা সূর্যমন্দির স্থাপন করেছেন। জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষ শাস্ত্রের ওপর নির্ভর করেই গড়ে তোলা হয়েছে অদ্ভুত স্থাপত্য ও অলঙ্কৃত এই মন্দির।

সোমনাথ মন্দিরের স্থাপত্য শৈলীর থেকে অনেক উৎকৃষ্ট স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত মাধেরা সূর্য মন্দির। যদিও তার ব্যাপ্তি আকারে ক্ষুদ্রকায় সোমেশ্বর মহাদেব মন্দির থেকে। প্রশস্ত চত্বরে প্রধান সূর্য মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে গণেশ, বিষ্ণু, নটরাজ, কালি প্রভৃতি দেবদেবীর একশত সাতটি উপমন্দির বা মন্দির। অর্থাৎ মন্দিরের সর্বমোট সংখ্যা মোট একশত আটটি। হিন্দুদের জপমালাতে মোট একশত আটটি রুদ্রাক্ষই থাকে। তাই শ্রীরামচন্দ্রের জপস্থানে নির্মিত হয়েছে একশত আটটি মন্দির।

সূর্যদেব যখন বিষুবীয় সময় পৌঁছন তখন ভোরের প্রথম আলো উন্মুক্ত তোরণ পথে গিয়ে পড়ে সুর্যদেবতার মূর্তির ওপর। সূর্যদেবতার মন্দিরটি তাকে ঘিরে থাকা অন্য মন্দিরগুলির তুলনায় বৃহৎ এবং দেখতে ওল্টানো পদ্মফুলের ন্যায়। পদ্মফুল সূর্যালোকের স্পর্শ পেলে পাপড়ি মেলে, আবার সূর্যাস্ত হলে পাপড়ি মুদে ফেলে। এ কারণে পদ্মকে বলে সৌরপুষ্প।

সৌরদেবতা বা সূর্যদেবের মন্দির তাই রচনা করা হয়েছে প্রস্ফুটিত ওল্টানো পদ্মফুলের আঙ্গিকে। চতুষ্কোণ পিটিকা বিশেষের ওপর। গর্ভগৃহতে সূর্যদেবের বিগ্রহ সোনার রথে আসীন। সাতটি ঘোড়া টানছে সে রথ। শুধু বিগ্রহই নয়, রথের সোনার ঘোড়াগুলিও বহুমূল্য রত্ন সমৃদ্ধ। আর এই রথ সমেত বিগ্রহকে ঘিরে আছে দশ হাত গভীর ও পাঁচ হাত চওড়া এক পরিখা। যা রাজা ও ভক্তবৃন্দের দান করা স্বর্ণমুদ্রাতে পরিপূর্ণ। ওই কূপই এই মন্দিরের সূর্যদেবের প্রধান মন্দির।

অন্য দেবদেবীর মন্দির ছাড়াও মন্দির চত্বরে রয়েছে সুবিশাল এক উপাসনাস্থল। তার বাহান্নটি খিলান এক সৌরবৎসর অর্থাৎ বাহান্ন সপ্তাহকে এবং কারুকার্যমণ্ডিত বারোটি স্তম্ভ বারোটি মাসের পরিচয় বহন করে। এ ছাড়াও আছে একশত আটটি ধাপ সমন্বিত বিশাল জলকুণ্ড, অতিথিশালা, পুরোহিত, সেবায়েতদের বাসস্থান ইত্যদি যা যা থাকার কথা, সবই আছে এখানে। বারো জন দেবদাসীও আছে। তারা নৃত্যগীত পরিবেশন করে সূর্যদেবের বিগ্রহের সামনে। মন্দিরের জনসংখ্যা দুই শত। আরও তিন শত লোক বসবাস করে মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে।

সোমনাথ মন্দিরের মতো সূর্যদেবের মন্দিরে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম না হলেও প্রতিদিন কয়েকশত মানুষের, পুণ্যার্থীদের সমাগম হতো এখানে, কেউ বা আসত সোলাঙ্কি রাজাদের অপূর্ব শিল্পকীর্তি প্রত্যক্ষ করার জন্য। কিন্তু তাদের সবারই আসা বন্ধ হয়েছে।

পুণ্যার্থীদের বদলে মন্দির চত্বরে সমবেত হয়েছে চালুক্য, সোলাঙ্কি, আহরিয়া রাজপুত সেনারা। অতিথিশালার কক্ষগুলি হয়ে উঠেছে বিভিন্ন করদ নৃপতি ও সেনাপতিদের বাসস্থান রূপে। মহারাজ মাণ্ডলিক নিজেও উপস্থিত হয়েছেন। তার রাত্রিবাসের জন্য প্রধান পুরোহিত বিভাবসু নিজ কক্ষ ত্যাগ করে আশ্রয় নিয়েছেন গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণে।

রক্ষা করতে হবে মাধেরা সূর্য মন্দির। তবে রাজা হোক বা সৈনিক কারো চোখেই ঘুম নেই। মন্দির চত্বর আর মন্দির প্রাকারকে বেষ্টন করে অহর্নিশ পাহারা দিচ্ছে হিন্দু সেনারা।

অন্যদিনের মতোই কুয়াশার জাল ছিন্ন করে সেদিনও সূর্যোদয় হল মাধেরার বুকে। ভোরের প্রথম আলো এসে পড়ল স্বর্ণরথে আসীন সূর্যদেবের স্বর্ণ কিরিটে। জলকুণ্ডে অবগাহন করে সূর্যদেবের বিগ্রহর সামনে পুজোতে বসলেন প্রধান পুরোহিত বিভাবসু।

মন্দির রাজপুত সেনাদলের ঘেরার মধ্যে থাকলেও নিত্য দিনের পূজাপাঠ ব্যাহত হয় না। গর্ভগৃহ থেকে বিভাবসুর উদাত্ত কণ্ঠের স্তোত্র পাঠ ও ফুল-ধূপ-ঘৃতর সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়তে লাগল মন্দির চত্বরে। এ মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ সেনাবাহিনীর মধ্যেও ভোরের আলোর সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত মনোবলের সঞ্চয় করে।

প্রাত্যহিক পুজাপাঠ চলল বেশ কিছু সময় ধরে। তারপর ঠিক সোমনাথ মন্দিরের মতোই বিগ্রহর সামনে নৃত্য প্রদর্শন শুরু করল দেবদাসীর দল। যদিও সংখ্যাতে তারা নগণ্য। তাদের নৃত্যগীত সমাপ্ত হলে গর্ভগৃহ চত্বরের বিশাল ঘণ্টাটা বাজালেন মাধেরা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিভাবসু। প্রধান মন্দিরকে কেন্দ্র করে উপমন্দিরের ঘণ্টাগুলোও বেজে উঠল।

এই ঘণ্টাধ্বনি শুনে মন্দির থেকে প্রসাদকণা সংগ্রহ করতে থাকে সৈনিকরা। এদিনও তার ব্যতিক্রম হল না। ঘণ্টাধ্বনি থামতেই প্রধান মন্দির চত্বরে ভিড় জমাতে শুরু করল সৈনিকরা। কয়েকজন সেবায়েত কাঠের প্রকাণ্ড বারকোষ থেকে তণ্ডুলকণা তুলে দিতে লাগল সৈনিকদের হাতে। সে কাজের তত্ত্বাবধান করছিলেন সূর্যমন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিভাবসু।

ঠিক সেই সময় মন্দির চত্বরে হঠাৎ চিৎকারের শব্দ শোনা গেল। আর সেই শব্দ কানে যাওয়া মাত্রই প্রসাদকণা গ্রহণকারী সেনারা কোনওক্রমে সেই তণ্ডুলপ্রসাদ কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করে উষ্ণীষে বেঁধে ছুটল চত্বরের দিকে। আর এর পরই উপমন্দিরের ঘণ্টাগুলো এক সাথে বাজতে লাগল। একজন সেবক ছুটে এসে বিভাবসুকে জানাল, 'এসে গেছে! এসে গেছে! মন্দির শীর্ষে প্রহরারত সৈনিকরা তাদের দেখতে পেয়েছে! এখনই যুদ্ধ শুরু হল বলে!'

তার কথা শোনার সঙ্গে-সঙ্গেই বিভাবসুও মন্দিরের সবাইকে সতর্ক করে দেবার জন্য মূল মন্দিরের বিশাল ঘণ্টাটাও আবার বাজাতে শুরু করলেন। সেই শব্দ কানে যেতেই নিজেদের কক্ষ ত্যাগ করলেন চালুক্য, সোলাঙ্কি আর আহরিয়া নৃপতি সেনাপতিরা।

পরিকল্পনা আগেই রচনা করা ছিল। ত্রিস্তরীয় বলয় রচনা করা হবে যবন বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য। প্রাকারের বহিঃবলয়ে থাকবে চালুক্যরাজ অম্বুজের নেতৃত্বে চালুক্য বাহিনী। যারা প্রথম আক্রমণ করবে যবন বাহিনীকে। অসি চালনাতে দক্ষ তারা। সোলাঙ্কিদের তিরন্দাজ বাহিনী থাকবে মন্দির প্রাকার ও প্রধান মন্দির-সহ উপমন্দিরগুলোর শীর্ষ দেশে। তাতে তির নিক্ষেপে সুবিধা হবে তাদের। আর প্রধান মন্দিরকে ঘিরে আর মন্দির চত্বরে থাকবে মহারাজ মাণ্ডলিকের নেতৃত্বে আহরিয়া রাজপুত বাহিনী। অন্য দুই বাহিনীকে অস্ত্র, রসদ যুগিয়ে সাহায্য করবে। আর যদি শেষ পর্যন্ত যবনরা মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে তবে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যবন বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ লড়াই চালাবে তারা। তিন নৃপতির নেতৃত্বে তাদের সেনাদল পরিকল্পনা মতো নিজেদের স্থানে উপনীত হল।

প্রথমে সূক্ষ্ম চুলের মতো কালো দাগ দৃশ্যমান হল দিকচক্রবালে। ক্রমশ সে দাগ পুরু হতে শুরু করল। অস্পষ্ট শব্দ পরিণত হল বিরাট চিৎকারে। রাজপুত সৈন্যরাও 'হর হর মহাদেব' ধ্বনি দিতে লাগল। দু-পক্ষের প্রচণ্ড চিৎকারে আতঙ্কিত পাখির ঝাঁক আকাশে উড়তে শুরু করল। এসে পড়ল যবন বাহিনী।

আরব মামুদ। তিনি অবশ্য সেনাদলের পুরোভাগে নেই। দিকচক্রবালে যেখানে কৃষ্ণবর্ণের দাগের মতো তাঁর বাহিনী দৃশ্যমান হয়েছিল, সেখানেই তিনি তাঁর তাঁবুতে অবস্থান করছেন। যাঁরা মন্দিরের দিকে উটের বা ঘোড়ার পিঠে এগোচ্ছে, তারা সবাই স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর আরব যুবক। এরাইতো ভবিষ্যতে আরব ধর্ম ভাবনার পতাকাকে ছড়িয়ে দেবে হিন্দ মুলুকে। তাই তাদের সাহস ও দক্ষতা দেখার জন্য, তারা যাতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারে সেজন্য একজন প্রধান সেনাপতির নেতৃত্বে তাদেরকে অগ্রগামী বাহিনীতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন সুলতান।

লম্বা লম্বা পা ফেলে মন্দির প্রাকারকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার জন্য প্রথমে এগিয়ে এল উষ্ট্র বাহিনী। তাদের একজনের হাতে পতাকাদণ্ডে খলিফার সবুজ নিশান। সে তিরের পাল্লার মধ্যে আসতেই মন্দির শীর্ষে বসা এক সোলাঙ্কি তিরন্দাজ তির নিক্ষেপ করল সেই নিশান বাহককে লক্ষ্য করে। অব্যর্থ লক্ষ্য। তির গিয়ে বিদ্ধ হল লোকটার কণ্ঠদেশে। উটের পিঠ থেকে গড়িয়ে পড়ল নিশান বাহক। তা প্রত্যক্ষ করে আকাশবাতাস কাঁপিয়ে 'হর হর মহাদেব' বলে উল্লাসধ্বনি করে উঠল রাজপুত বাহিনী।

লোকটা মাটিতে পড়লেও, পতাকাটা মাটি স্পর্শ করার আগেই তা আবার উঠিয়ে নিল এক আরব। যে পতাকা হিন্দ ভূমিতে প্রোথিত করার সংকল্প নিয়ে তারা মরুভূমির প্রচণ্ড ভয়াবহতা সহ্য করে এত দূর এসেছে, তাকে ভুলুণ্ঠিত হতে দেওয়া চলে না। পতাকাবাহী উটের পিঠ থেকে ভূপতিত হলেও উষ্ট্রবাহিনী কিন্তু থামল না প্রথমে। ধুলোর ঝড় তুলে মন্দিরের দিকে এগোবার চেষ্টা করল তারা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল চারপাশ থেকে মন্দির প্রাকারকে ঘিরে ফেলে উটের পিঠ থেকে প্রাকার ডিঙিয়ে মন্দির চত্বরে লাফিয়ে পড়ার। কিন্তু অনেক্ষণ ধরে চেষ্টা চালালেও তা ফলপ্রসূ হল না। প্রাকার আর মন্দিরগুলির শীর্ষদেশ থেকে রাজপুত বাহিনীর মুহুর্মুহু তির বর্ষণ যবনদের উষ্ট্র বাহিনীর গতি রুদ্ধ করল।

এরপর পরিকল্পনা বদল করল যবন সেনাপতি। উষ্ট্র বাহিনীকে পিছু হটিয়ে আগুয়ান হল আরব ঘোড় সওয়াররা। পরনে তাদের ঢোলা পাজামা, পাগড়ির কাপড় দিয়ে মাথা-মুখমণ্ডল আবৃত। হাতে বাঁকানো তলোয়ার। 'তকবির' ধ্বনি তুলে তারা এগিয়ে আসতে লাগল মাধেরা সূর্য মন্দিরের প্রধান তোরণের দিকে।

চালুক্যরাজ অম্বুজের নেতৃত্বে হিন্দু সেনারাও ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের ওপর। সম্মুখ সমর শুরু হয়ে গেল। 'তকবির' আর 'হর হর মহাদেব' ধ্বনি, অস্ত্রের ঝনঝন শব্দ আর আর্তনাদের বীভৎস শব্দে কাঁপতে থাকল চারদিক। প্রবল বিক্রমে যবনদের প্রতিহত করছে চালুক্যবাহিনী।

এমন প্রতিরোধের যে সম্মুখীন হতে হবে তা ভাবতে পারেনি আরব বাহিনী। বিশেষত লম্বা শূলধারী চালুক্য সেনা দলের যে অংশ ছিল, তারা আরব ঘোড়সওয়ারদের ভয়ঙ্কর শূলের আঘাতে ভূপতিত করতে লাগল।

দুপুর গড়িয়ে যখন বিকাল হল তখন আরব বাহিনী পিছু হটল। এদিনের মতো মাধেরা সূর্যমন্দির দখল করতে ব্যর্থ হল তারা। উল্লাস ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল রাজপুত শিবিরে। প্রায় দুই শতর মতো যবন হানাদারকে নিহত করেছে চালুক্যরাজ অম্বুজের সেনাদল।

তবে চালুক্য সেনাবাহিনীর হতাহতের সংখ্যাও প্রচুর। মাধেরা মন্দিরের প্রবেশ তোরণের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে আরব সেনাদের সঙ্গে চালুক্য সেনাদের দেহও। সৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে সেই চালুক্য দেহগুলোর। মন্দির চত্বরের ভিতর যেখানে সোপনশ্রেণী বিশিষ্ট জলকুণ্ড আছে, তার পাড়েই চিতা সাজানো হবে। তাই চালুক্যরাজ অম্বুজের নেতৃত্বে চালুক্য সেনাদের দেহগুলি, তাদের ছিন্ন অঙ্গগুলি সনাক্ত করে তা মন্দিরের ভিতর সেই নির্দিষ্ট স্থানে পাঠাবার কার্য শুরু হল।

সূর্য অস্ত যেতে বসেছে। আর কিছু সময়ের মধ্যেই অন্ধকারে আবৃত হবে চারপাশ। চালুক্য সেনাদের দেহগুলো মন্দিরের ভিতরে নিয়ে যাবার কাজ তখন প্রায় শেষ। ঠিক সেই সময়ে এক অপ্রত্যাশিত ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটল। এক যবন আর এক চালুক্য সেনার মৃতদেহ আলিঙ্গনবদ্ধ অবস্থায় ভূপতিত ছিল। যেন মৃত্যু মুহূর্ত পর্যন্ত পরস্পরকে প্রচণ্ড আক্রোশে নিষ্পেষণের চেষ্টা করছিল তারা। একজন চালুক্য সৈনিক মৃতদেহ দুটিকে আলিঙ্গন মুক্ত করতে যেতেই হঠাৎই মৃতের ভান করে পড়ে থাকা সেই আরব লাফিয়ে উঠে একটা তীক্ষ্ন ছুরিকা নিয়ে ছুটল, কিছুটা তফাতে তার দিকে পিছন ফিরে দণ্ডায়মান চালুক্যরাজ অম্বুজের দিকে। ব্যাপারটা চোখে পড়তেই চালুক্য মন্ত্রী তার হাতের ভল্ল নিক্ষেপ করলেন সেই যবনের দিকে। সেই ভল্ল যবনের মুণ্ড ছিন্ন করল ঠিকই, কিন্তু শেষরক্ষা হল না। সেই কবন্ধ শরীর গিয়ে আছড়ে পড়ল চালুক্যরাজের দেহের ওপর। আর তার হাতের তীক্ষ্ন ছুরি চালুক্য রাজের পৃষ্ঠদেশে প্রবেশ করে বুক ফুড়ে বেরিয়ে গেল। ঠিক সেই সময় সূর্য ডুবে গেল।

চালুক্য সেনারা দ্রুত তাদের মহারাজের দেহটা তুলে নিয়ে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে কাছেই একটা উপমন্দিরের চাতালে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিল। কিন্তু তাঁকে নিয়ে কারোরই আর তখন বিশেষ কিছু করার নেই। যবনের ছুরি ফুঁড়ে দিয়েছে চালুক্যরাজের হৃৎপিণ্ড। মৃত্যু সমাগত। চালুক্যরাজ নিজেও বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা। শ্বাস টানতে টানতে সে অবস্থাতে তাঁর শরীরের ওপর ঝুঁকে থাকা চালুক্যমন্ত্রী চন্দ্রদেবকে বললেন, 'কোন পাপে আমার এ অবস্থা হল মন্ত্রী?'

প্রশ্ন শুনে নিশ্চুপ রইলেন মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব।

চালুক্যরাজ অম্বুজ অবশ্য নিজেই এরপর উত্তরটা দিলেন। মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির অনেক সময় আত্ম-উপলব্ধি হয়। হয়তো তাই চালুক্যরাজ অম্বুজ বললেন, 'হ্যাঁ, ভ্রাতৃ হত্যার পাপ। তাঁর সন্তানকে বঞ্চিত করার পাপ। যে সিংহাসন আমার ছিল না তা গ্রহণ করার পাপ!'

মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব বললেন 'আমার প্রতি আপনার কোনও নির্দেশ আছে মহারাজ? চালুক্য সিংহাসনে কে বসবেন?'

অন্তিম শ্বাস উঠতে শুরু করেছে চালুক্যরাজ অম্বুজের। মৃত্যু যন্ত্রণাতে বিকৃত হয়ে উঠেছে তার মুখ। সেই অবস্থাতেই অনেক কষ্টে তিনি মন্ত্রী চন্দ্রদেবকে বললেন 'পাপ স্খলন না হলে আমার মুক্তি ঘটবে না। ভ্রাতুষ্পুত্রী রাজশ্রীকে আমি তুলে দিয়েছিলাম সোমেশ্বর মন্দিরে। সে সেখানেই আছে। আপনি সোমেশ্বর মন্দির থেকে তাকে মুক্ত করে নিয়ে গিয়ে চালুক্য সিংহাসনে অভিষিক্ত করুন। সোমেশ্বর সমুদ্রতটেই আমার পারলৌকিক কার্য সম্পাদন করবেন আপনি।' এ কথা বলার পরই প্রচণ্ড কেঁপে উঠল চালুক্যরাজ অম্বুজের দেহ। মাথা থেকে খসে পড়ল তাঁর রাজমুকুট। মাধেরা সূর্য মন্দিরে সেই বিষণ্ণ সন্ধ্যার অন্ধকারে স্থির হয়ে গেল চালুক্যরাজের শরীর।

মহারাজের বিস্ফারিত চোখের পাতা দুটো হাত দিয়ে বুজিয়ে দিলেন প্রবীণ চালুক্য মন্ত্রী চন্দ্রদেব। রাজ-মুকুটটা কুড়িয়ে নিলেন তিনি। সময় নষ্ট করা আর উচিত হবে না। চালুক্যরাজের দেহ উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হল জলকুণ্ডের তীরে। মাধেরা সূর্যমন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিভাবসু আর নৃপতি মাণ্ডলিকের উপস্থিতিতে জ্বলে উঠল চালুক্যরাজের চিতার আগুন। সে আগুন নির্বাপিত হবার পর চালুক্যরাজের শেষ ইচ্ছা পালন করার জন্য কোমরবন্ধে তাঁর রাজমুকুট আবৃত করে মাধেরা সূর্য মন্দির ত্যাগ করে রাতের অন্ধকারে সোমনাথ মন্দিরের উদ্দেশ্যে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব।

ঠিক সেই সময় নিজের তাঁবুতে তাঁর অনুচরদের নিয়ে যুদ্ধের গতি প্রকৃতি নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন গজনীর মালিক। তাঁর শ্মশ্রু সম্মিলিত মুখমণ্ডলে ক্ষমাহীন হিমশীতল কাঠিন্য। না, কাফেরদের জন্য বিন্দুমাত্র দয়া-মমতা নেই তাঁর শরীরে। বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করার পর তিনি বললেন, 'না, এখানে বেশি ওয়াক্ত বরবাদ করা যাবে না। আমাদের আসল লক্ষ্য সোমনাথ। এখানে বেশি দিন গুজরান করলে কাফেরগুলো হয়তো সোমনাথ থেকে সব ধনরত্ন নিয়ে পালাবে। তিন দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে এই মাধেরার যুদ্ধ। বেরহম ভাবে মারতে হবে কাফেরদের। আমি কাল নিজে তলোয়ার ধরব।'

মামুদ গজনীর একথা বলার সঙ্গে-সঙ্গেই হয়তো বা মাধেরার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেল। পরদিন সূর্যের আলো ফুটতেই গজনীবিদের নেতৃত্বে সর্বশক্তি দিয়ে মাধেরা সূর্য মন্দিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আরব বাহিনী। চালুক্য, সোলাঙ্কি, আহরিয়া রাজপুত বাহিনী প্রবল বিক্রমে লড়লেও, লড়াইতে পিছু হঠতে লাগল তারা। এর প্রধান কারণ মামুদ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা।

হিন্দু ধর্ম রক্ষক সেনার একজন যবনের মাথা কাটলেই তার জায়গাতে আবির্ভূত হল পাঁচ জন জিহাদি! দ্বিতীয় দিন সুলতান বাহিনী মন্দিরে প্রবেশ করতে না পারলেও আরব বাহিনী কার্যত চারদিক থেকে দুর্গ প্রাকার ঘিরে ফেলল। অসীম সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করলেও দ্বিতীয় দিনের যুদ্ধে কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল চালুক্য বাহিনী। তাদের মৃত রাজার পদাঙ্ক অনুসরণ করল তারা। সোলাঙ্কি আর আহরিয়া রাজপুতরা মন্দির প্রাকারের ভিতর রুদ্ধ হয়ে প্রস্তুত হলো শেষ লড়াইয়ের জন্য।

মামুদ দক্ষ যুদ্ধবাজ। দিনের শেষে রাজপুতরা দেখল যে আরব বাহিনীর উটগুলো ফিরে যাচ্ছে তাদের দূরবর্তী শিবিরের দিকে। কিন্তু রাতের গভীরে মামুদ তাঁর উষ্ট্রবাহিনীর কিছু অংশকে আবার ফিরিয়ে এনে স্থাপন করলেন মন্দির প্রাকারের পিছনের অংশে। ওই দিকের অংশে মন্দিরের দেবদাসীদের আবাসস্থল।

পরদিন সূর্যোদয়ের মুহূর্তে গর্ভগৃহর সামনে পুজোতে বসলেন সূর্যদেবের প্রধান পুরোহিত বিভাবসু। যাই ঘটুক না কেন, দেবতার পুজো তো বন্ধ করা যায় না। ঠিক সেই সময় তিনি দেখতে পেলেন দেবতার মন্দিরের দিকে ছুটতে ছুটতে আসছে দেবদাসীরা। আর তাদের পিছু ধাওয়া করে আসছে একদল তলোয়ারধারী। প্রাকার অতিক্রম করে মন্দিরে প্রবেশ করেছে যবনরা!

কিছু রাজপুত যোদ্ধা পথ অবরোধ করল যবনদের। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে-সঙ্গেই অস্ত্রের সংঘর্ষে কেঁপে উঠল মন্দির চত্বর। আতঙ্কিত দেবদাসীরা পুরোহিত বিভাবসুর সামনে উপস্থিত হয়ে বলল 'হে প্রভু আমাদের রক্ষা করুন।'

বিভাবসু বললেন, 'তোমাদের রক্ষাকর্তা তোমাদের নাথ সূর্যদেব। তোমরা তাঁর কাছে আশ্রয় গ্রহণ করো। আতঙ্কিত নারীরা প্রবেশ করল মন্দিরের গর্ভগৃহে, তাদের শেষ আশ্রয়স্থলে সূর্যদেবের চরণে। গর্ভগৃহের কপাট বন্ধ করে পিছনের বড় প্রদীপ দণ্ডটা অস্ত্রের মতো উঁচিয়ে ধরে বিগ্রহ আর নারীদের রক্ষার জন্য দাঁড়ালেন মাধেরা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিভাবসু।

প্রাকার অতিক্রম করে 'দীন দীন' ধ্বনি তুলে মন্দির চত্বরে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল যবন সেনারা। শুরু হল শেষ যুদ্ধ। যেন এক বিরামহীন ভয়ঙ্কর যুদ্ধ! সারাদিন অতিক্রান্ত হয়ে অন্ধকার হয়ে গেল। তবু যুদ্ধ থামে না। মশালের আলোতে উপমন্দিরের আনাচে কানাচে চলতে লাগল খণ্ডযুদ্ধ।

পুরো প্রাকার তখন ঘিরে ফেলেছে যবন বাহিনী। মামুদ গজনী নিজেও তার তাঁবুতে ফেরেননি। প্রাকারের বাইরে দাঁড়িয়ে জিহাদি তরুণদের তিনি উৎসাহ দিচ্ছেন প্রাকারের ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। একজন কাফেরকে হত্যা করার ইনাম দশ স্বর্ণমুদ্রা! তার কথা শুনে আরব ধর্ম যোদ্ধারা উটের পিঠ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে প্রাকারের ভিতর মন্দির চত্বরে। গজনীবিদ বুঝতে পারছেন মাধেরা জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা।

তাঁর অনুমান মিথ্যা হল না। শেষ রাতে গণপতি উপমন্দিরের সামনে প্রবল বিক্রমে লড়াই করে সবশেষে নিহত হলেন সূর্য মন্দিরের শেষ প্রহরী রাজা মাণ্ডলিক। শেষ হয়ে গেল মাধেরার যুদ্ধ। ভোরের আলো ফোটার মুহূর্তে গর্ভগৃহর দ্বার উন্মোচন করে দেবতার আরাধনাতে বসলেন প্রধান পুরোহিত বিভাবসু। যবনরাও তখন যুদ্ধ শেষে মন্দিরের তোরণ উন্মোচন করে ফেলেছে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্যার স্রোতের মতো মাধেরা মন্দিরে প্রবেশ করছে যবন বাহিনী। বিভাবসু কিন্তু তার দেবতা বন্দনায় অচঞ্চল। একদল যবন উল্লাস করতে করতে উঠে এল মন্দির প্রাঙ্গণে। এক জিহাদি তলোয়ারের এক কোপে আলাদা করে দিলো প্রধান পুরোহিতের ধড়-মুণ্ড। বিভাবসুর ছিন্ন মুণ্ড মাটিতে পড়ে বিড় বিড় করে ঠোঁট নাড়িয়ে তখনও যেন বলে চলেছে, 'ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং...।'

যে পবিত্র গর্ভগৃহতে প্রধান পুরোহিত ছাড়া অন্য কেউ তাঁর অনুমতি ভিন্ন পা রাখতে পারত না, সেই গর্ভগৃহে চর্ম পাদুকা সহযোগে প্রবেশ করল যবনদের প্রথম দলটা। রত্নখচিত দেবতার অশ্ব, রথচক্র, স্বর্ণপূর্ণ পরিখা, সর্বোপরি হীরক-মরকত-নীলাকান্ত মণি খচিত সূর্যদেবতার স্বর্ণমূর্তি দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেল আরব যুবকদের। পাগলের মতো সেই রথ ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল তারা।

হতভাগ্য সেই বারোজন দেবদাসী লুকিয়ে ছিল সেই রথ ও সূবর্ণ বিগ্রহের আড়ালে। গাছের কোটরে পাখির বাসাতে সর্প প্রবেশ করলে যে অবস্থা হয় তাদেরও অবস্থা হল তেমনই। প্রবল আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল তারা। কয়েকজন দেবদাসী যুবক জিহাদিদের নিষ্ঠুর হাতের ফাঁক গলে গর্ভগৃহ থেকে বাইরে বেরিয়ে দিগবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করল। কিন্তু কোথায় পালাবে তারা! একদল আরব ধরে ফেলল তাদের।

সাপেদের মুখে ধরা পাখির পালক যেমন আকাশে ওড়ে তেমনই কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দেবদাসীদের ছিন্ন বসনগুলো বাতাসে উড়তে লাগল। উল্লসিত আরবদের মাঝে ঢাকা পড়ে গেল মাধেরা সূর্য মন্দিরের হতভাগ্য দেবদাসীদের আর্তচিৎকার। সুলতানের নির্দেশ, কাফেরদের কোনও মূর্তি, তা রত্নখচিত হোক বা না হোক, তা আস্ত রাখা যাবে না। সে কাজ শুরু হল এরপর। বিগ্রহের অঙ্গ থেকে খুবলে ফেলা হতে লাগল সোনার পাত, দুর্মূল্য মণি-মুক্তা। সেগুলো থলেতে ভরে তোলা হতে থাকল উটের পিঠে। সূর্যদেবের রথটাকে খণ্ডবিখণ্ড করে মূল্যবান ধাতু সমৃদ্ধ ঘোড়াগুলোকেও উটের পিঠে চাপানো হল আরব মুলুকে নিয়ে যাবার জন্য। সারাদিন ধরে চলতে লাগল এই কাজ। দিন শেষ হতে চলল একসময়।

সূর্যাস্তের ঠিক পূর্বমুহূর্তে সূর্যমন্দিরের চত্বরের আসরে একলা দাঁড়িয়ে ছিল কাসেম। চত্বর প্রায় তখন ফাঁকা হয়ে গেছে। মাধেরা মন্দিরের সব সম্পদ উটের পিঠে বোঝাই করে নিজেদের শিবিরের দিকে রওনা দিয়েছে আরবরা। সামান্য কিছু আরব তখনও বিধ্বস্ত মন্দির চত্বরের আনাচে কানাচে সন্ধান চালাচ্ছে যদি কোথাও কোনও ধনরত্নের সন্ধান মেলে তার জন্য। যদিও তা মেলার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। যা ছিল তা সবই মন্দির গাত্র থেকে খুবলে নিয়েছে আরব স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। এমনকী দারুকাঠের টুকরোগুলো পর্যন্ত।

কাসেম অবশ্য এসব কাজে যোগ দেয়নি। সে ইসলাম কবুল করতে বাধ্য হলেও তার ধমনীতে যে আদি সনাতন রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। সে রক্ত এ কাজে বাধ সেধেছে শুধু তাই নয়, সারাদিন ধরে তার চারপাশে চলতে থাকা এই ধ্বংসলীলার বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা, বিভীষিকা জাগ্রত করেছে তার হৃদয়ে। পাথরের মূর্তির মতো অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে সে প্রত্যক্ষ করেছে সব কিছু।

এমন বিষণ্ণ, রক্তাক্ত সন্ধ্যা কোনও দিন নামেনি মাধেরা মন্দিরে। চারপাশে শুধু ছড়িয়ে আছে ধ্বংসস্তূপ, পাথর, কাষ্ঠখণ্ড আর মৃতদেহ। যে মাধেরা মন্দিরে এ সময় সন্ধ্যারতির ধূপের সৌরভে পরিপূর্ণ থাকত সেখানের বাতাসে এখন শুধুই রক্ত আর উটের বিষ্ঠার দুর্গন্ধ!

নিঃসঙ্গ কাসেম একলা দাঁড়িয়ে ভাবছিল, 'এ আমি কী পাপ কাজে লিপ্ত হলাম! নিয়তি কি নিষ্ঠুর খেলা খেলছে আমাকে নিয়ে! এই অনাচার, পাপকার্যের পথ প্রদর্শক হতে হচ্ছে আমাকেই।

সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তার কিছুটা তফাতে একজন আরব একটা বেশ বড় গোলাকৃতি ধরনের প্রস্তর খণ্ড নিয়ে বারবার মাটিতে আছাড় মারছিল সেটা চূর্ণ করার উদ্দেশ্যে। কাসেমকে একলা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সেই প্রস্তর খণ্ডটা নিয়ে এসে দাঁড়াল কাসেমের সামনে। সেটা সে কাসেমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'দেখো তো এটা ভাঙতে পারো কিনা। এর ভিতরেও হিরা-জহরত লোকানো থাকতে পারে। শুনেছি এই পাথরের পুতুলগুলোর ভিতরেও ধনরত্ন পুরে রাখে কাফেররা!

কাসেম কথাটা শুনে আরবের হাতে ধরা প্রস্তর খণ্ডর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল! যদিও তার গা থেকে খুবলে ফেলা হয়েছে সোনার পাত। অক্ষিকোটর থেকে বার করে ফেলা হয়েছে হীরক খণ্ডের তৈরি অক্ষিগোলকগুলো তবু জিনিসটা চিনতে অসুবিধা হল না কাসেমের। লোলুপ আরবের হাতে ধরা আছে মাধেরা সূর্য মন্দিরের সূর্য দেবতার ছিন্ন মস্তক। সুলতানের নির্দেশে অন্য আরবরা যা তাঁর দেহ থেকে ছিন্ন করে সোনা, হীরকখণ্ড খুলে নিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে গেছিল, সেটাই আবার রত্ন লাভের আশাতে তুলে এনেছে এই আরব! বিদায়ী সূর্যের শেষ রক্তিম আভাতে কাসেমের দিকেই যেন চেয়ে আছে সেই ছিন্ন মস্তক! যেন রক্ত ঝরছে মস্তকের ছিন্ন কণ্ঠদেশ ধেকে!

এ দৃশ্য আর সহ্য করা সম্ভব হল না জন্মসূত্রে সনাতন ধর্মাবলম্বী কাসেমের পক্ষে। যবনের হাত থেকে সেই ভারী সূর্যদেবের মস্তক তুলে নিয়ে কাসেম সেটা মাটিতে আছাড় না মেরে আছাড় মারল যবনের কপালে। মুহূর্তর মধ্যে চূর্ণ হয়ে গেল যবনের মস্তক। মাটিতে ছিটকে পড়ল তার দেহ!

কাসেমের মনের ভিতর এরপর কে যেন বলে উঠল, 'পালাতে হবে! পাপ স্খলন করতে হবে আমাকে! সোমনাথবাসী হয়তো জানে না যে গজনীবিদ মামুদের এ অভিযানের আসল লক্ষ সোমনাথ মন্দির। মামুদ সেখানে উপস্থিত হবার আগেই তাদের সে সংবাদ পৌঁছে দিতে হবে যাতে তারা বিগ্রহ রক্ষার চেষ্টা করেন।'

কাসেমের হৃদয় থেকে কথাটা উঠে আসার সঙ্গে-সঙ্গেই সে মন্দির চত্বর থেকে বাইরে বেরোবার জন্য ছুটতে শুরু করল। মন্দির তোরণের ঠিক মুখেই একজন আরব কয়েকটা ঘোড়ার লাগাম ধরে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করছিল ঘোড়াগুলোকে কুণ্ডের জল খাওয়াবার জন্য। কাসেম তার হাত থেকে একটা ঘোড়ার লাগাম কেড়ে নিয়ে ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে লাফিয়ে তার পিঠে উঠে বসল। বিস্মিত আরব আরও প্রশ্ন করল, 'আমার ঘোড়া নিয়ে তুমি কোথায় যাচ্ছ?'

কাসেম তার কথার কোনও জবাব না দিয়ে হাতের লাগামে ঝাঁকুনি দিয়ে ঘোড়াটাকে ছুটিয়ে দিল। কাসেম তার ঘোড়া নিয়ে পালাচ্ছে অনুমান করে আরব তার পিঠ থেকে তির-ধনুক খুলে নিয়ে তির চালাল কাসেমকে লক্ষ্য করে। ধাবমান কাসেমের পিঠে বিদ্ধ হল সেই তির। ঠিক সেই সময় ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল মাধেরার বুকে।

তির বিদ্ধ অবস্থায় গজনীবিদ মামুদের শিবির ত্যাগ করে তাদের পথ প্রদর্শক কাশেম হারিয়ে গেল রাত্রির অন্ধকারে। সুলতান শিবিরে খবরটা পৌঁছতে দেরি হল না। তিনি বললেন, 'হয়তো সোমনাথ মন্দিরে পৌঁছতে দুদিন দেরি হবে আমাদের, কিন্তু আমরা সেখানে পৌঁছবই। আর মাত্র অল্প পথ বাকি। কাসেমকে যদি ধরা যায় তবে তাকে জীবন্ত দগ্ধ করব আমি।'

পরদিনও মাধেরাতেই অবস্থান করলেন গজনীবিদ মামুদ তার উষ্ট্র বাহিনীকে মন্দির কুণ্ডের জল পর্যাপ্ত ভাবে পান করিয়ে নেবার জন্য। তার পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই শিবির উঠিয়ে মাধেরা ত্যাগ করে যাত্রা শুরু করল মামুদের বিশাল বাহিনী। গজনীবিদ মূর্তি ধ্বংসকারী আরব মামুদের শেষ লক্ষ সোমনাথ মন্দির।

১৯

অঙ্গিরাকে যেদিন খগেশ্বর সোমেশ্বর মুদ্রা ফিরিয়ে দিয়ে গেছিল, রক্ষী প্রধান জয়দ্রথ অঙ্গিরার কক্ষে রত্নরাজির সন্ধানে তল্লাসি নিতে এসেছিলেন। সে দিনের পর পাঁচ রাত কেটে গেল অঙ্গিরার। তার মধ্যে দু-রাত দেবদাসী সমর্পিতার সঙ্গে নৈশ অভিসারে, বাকি তিনরাত ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশ মতো নিজ কক্ষে আবদ্ধ থেকে দিবারাত্রি সমর্পিতার কথা ভাবতে ভাবতে। তিনি রাত্রি অতিথিশালার কক্ষে আবদ্ধ থাকার পর ভোরের আলো ফুটতেই আনন্দে চঞ্চল হয়ে উঠল অঙ্গিরার মন। আজ আবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে রাজশ্রীর—দেবদাসী সমর্পিতার।

তিনদিন পর নিজের কক্ষ, অতিথিশালা ত্যাগ করে মন্দির চত্বরে উপস্থিত হল অঙ্গিরা। চত্বর, বাগিচা সবই প্রায় ফাঁকা। বাইরের কোনও পুণ্যার্থী প্রবেশ করেনি মন্দিরে। শুধু সেবায়েতের দল এখানে ওখানে কেমন যেন আতঙ্কিত ভাবে চাপা স্বরে জটলা করছে!

মূল মন্দিরে ওঠার যে সোপানশ্রেণী আছে তা বেয়ে ওপরে ওঠার মুখে একটা ধাপে বসল অঙ্গিরা। স্বাভাবিক দিন হলে এসময় এই সোপানের ধারে বসলে মুহূর্তের মধ্যেই পদপিষ্ট হয়ে যেত সে। আজ সব কিছুই যেন কেমন ফাঁকা ফাঁকা। দু-চারজন সেবায়েত শুধু সোপান বেয়ে ওঠা-নামা করছে তাঁদের প্রাত্যহিক কর্ম সম্পাদনের জন্য।

মন্দিরের এই জনশূন্য গম্ভীর পরিবেশ অবশ্য তেমন ভাবে স্পর্শ করতে পারল না অঙ্গিরাকে। সে বিভোর ভাবে ভাবতে লাগল দেবদাসী সমর্পিতার কথা, ভাবতে লাগল কখন দিন কেটে গিয়ে সূর্যাস্ত হবে, অঙ্গিরা কখন পৌঁছবে দেবদাসী সমর্পিতাকে বক্ষলগ্ন করার জন্য; মধুর নিশি যাপনের জন্য! এ সব কথা ভাবতে ভাবতে সময় এগিয়ে চলল।

বেশ কিছু সময়ের পর অঙ্গিরার পাশে এসে দাঁড়াল একজন। অঙ্গিরা মুখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেল রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথকে। সোপানশ্রেণী বেয়ে নীচে নেমে অঙ্গিরাকে বসে থাকতে দেখে তিনি দাঁড়িয়ে পড়েছেন। অঙ্গিরাও উঠে দাঁড়াল তাকে দেখে। জয়দ্রথ হাসলেন না। তিনি বললেন, 'যাক আপনাকে এখানে পেয়ে ভালোই হল। নইলে আপনার কক্ষে যেতে হতো আমাকে।'

অঙ্গিরা কথাটা শুনে হেসে বললেন, 'কেন সেই অপহৃত রত্ন অনুসন্ধানের ব্যাপারে নাকি?'

জয়দ্রথ কিন্তু এবারও হাসলেন না। তিনি বললেন, 'না সে ব্যাপারে নয়। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব আজ সন্ধ্যারতির পর এ মন্দিরের যারা বাসিন্দা তাদের সঙ্গে মিলিত হবেন। সবাইকে সেই সভাতে উপস্থিত থাকতে হবে তেমনই নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান পুরোহিত। এ সংবাদ আপনাকে জানাবার জন্যই যেতাম।'

অঙ্গিরা বলল, 'আচ্ছা আমি উপস্থিত থাকব। কিন্তু কি কারণে এই সভা?'

রক্ষী প্রধান বললেন 'মাধেরা সূর্য মন্দিরে নাকি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তার ফলাফল অবশ্য এখনও জানা যায়নি। তবে গতকাল রাতে রাজর্ষি ভীম তাঁর পরিবার বর্গ ও পারিষদবর্গদের নিয়ে কানিথকোট দূর্গ অভিমুখে রওনা হয়েছেন। নগরবাসীরাও আতঙ্কে নগর ত্যাগ করতে শুরু করেছে। এসব দেখেশুনে প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়েছে মন্দিরবাসীদের মধ্যে। মন্দিরবাসীদের আশ্বস্ত করার জন্য, এ পরিস্থিতিতে তাঁর নির্দেশ দানের জন্যই গর্ভগৃহর সামনের চত্বরে সভার আহ্বান করেছেন প্রধান পুরোহিত। তা ছাড়া...!'—বাক্য সম্পূর্ণ করলেন না রক্ষী প্রধান।

'তা ছাড়া কি?' জানতে চাইল অঙ্গিরা।

একটু চুপ থেকে জয়দ্রথ বললেন, 'আজ সকাল থেকে সেবায়েত প্রধান বিষধারীর খোঁজ মিলছে না। আর দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমাও মন্দিরে নেই!'

অঙ্গিরার এ কথা শুনে মনে পড়ে গেল পাঁচ রাত পূর্বে মধ্য রাতে দেবদাসী তিলোত্তমার কক্ষ থেকে সেবায়েত প্রধান বিষধারীর বাইরে আসার দৃশ্য। অঙ্গিরা প্রশ্ন করল, 'সেবায়েত প্রধান বিষধারী আর দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা কি একই সঙ্গে মন্দির ত্যাগ করেছেন?'

অঙ্গিরার প্রশ্ন শুনে রক্ষী প্রধান বললেন, 'তারা একইসঙ্গে মন্দির ত্যাগ করে কোথাও গেছেন কিনা সে ব্যাপারে কোনও সংবাদ জানা নেই। তবে দেবদাসী তিলোত্তমা কীভাবে মন্দির ত্যাগ করল সেটাই রহস্যের। দ্বার রক্ষীরা কোনও দেবদাসীকেই মন্দির ত্যাগ করতে দেয় না। তেমনই নির্দেশ দেওয়া আছে প্রধান পুরোহিতের। সেবায়েত প্রধানের মন্দির ত্যাগের ওপর তেমন কোনও নির্দেশ ছিল না। যতটুকু জানা গেছে, সেবায়েত প্রধান গতকাল সন্ধ্যারতির পর একলাই মন্দির ত্যাগ করেছিলেন।' এ কথা বলার পর রক্ষী প্রধান আর দাঁড়ালেন না। অঙ্গিরার থেকে বিদায় নিয়ে তিনি নিজের কাজে অন্যত্র রওনা দিলেন। অঙ্গিরাও সে স্থান ত্যাগ করে রওনা হল অতিথিশালার দিকে।

সারাটা দুপুর-বিকাল নিজের কক্ষে বসে দেবদাসী সমর্পিতার কথাই ভাবতে লাগল অঙ্গিরা। সন্ধ্যা নামল এক সময়। সন্ধ্যারতির ঘণ্টা বাজা শুরু হলে অঙ্গিরা অতিথিশালা ত্যাগ করে সোপানশ্রেণী বেয়ে গর্ভগৃহের সামনে উপস্থিত হল। দেবদেসীদের নৃত্যগীত সাঙ্গ হবার পর সেদিনের মতো গর্ভগৃহর দ্বার বন্ধ করছেন পুরোহিত মল্লিকার্জুন। আর এক পুরোহিত নন্দিবাহনও সেখানে উপস্থিত। এক স্তম্ভের গায়ে ভূমিতে আসন গ্রহণ করল অঙ্গিরা। যে সব দেবদাসীরা কিছু আগে দেবতাকে নৃত্যগীত প্রদর্শন করেছে তারা ফিরে যায়নি এদিন। গর্ভগৃহর তোরণের এক পাশে উপবিষ্ট তারা।

ক্রমশ লোক সমাগম হতে লাগল গর্ভগৃহ চত্বরে। এক সময় অন্য দেবদাসীরাও তাদের আবাসস্থল থেকে উঠে এল সেখানে। অঙ্গিরা বিস্মিত ভাবে দেখল তাদের সঙ্গে দেবদাসী সমর্পিতাও এসেছে প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ পালনের জন্য। চকিতের জন্য দৃষ্টি বিনিময় হল তাদের দুজনের মধ্যে।

দেবদাসী সমর্পিতাও আসন গ্রহণ করল ভূমিতলে অন্য দেবদাসীদের সঙ্গে। কিছু সময়ের মধ্যেই জনসমাগমে পূর্ণ হয়ে উঠল গর্ভগৃহ চত্বর। সেই চত্বর ছাপিয়ে মানুষের মাথা গিয়ে পৌঁছল সোপানশ্রেণীতেও।

একজন প্রদীপ বাহকের সঙ্গে গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণে এসে মন্দিরবাসীদের সামনে দাঁড়ালেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত তুললেন, জনতা উঠে দাঁড়িয়ে তাকে প্রণাম জানাবার পর। এরপর তাঁর ইশারাতেই আবার সবাই ভূমিতে আসন গ্রহণ করল।

সভা শুরুর আগে দুই সহ-প্রধান পুরোহিত গিয়ে দাঁড়ালেন প্রধান পুরোহিতের দু-পাশে। কিন্তু মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল বিশাল জনতার মধ্যে। বক্তব্য শুরুর আগে তার সামনে বসা মন্দিরবাসীদের দিকে তাকালেন প্রধান পুরোহিত। প্রদীপের আলো আর মশালের আলোতে জেগে থাকা মন্দিরবাসীদের মুখমণ্ডলে প্রবল উৎকণ্ঠার ছাপ তাঁর নজর এড়াল না। মন্দিরবাসীদের উদ্দেশ্যে কথা শুরু করলেন সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব।

'আমরা সবাই সোমনাথ মন্দিরের সোমেশ্বর মহাদেবের সেবক মাত্র। এ ব্যতীত আমাদের অর্থাৎ এই সোমেশ্বর মন্দিরের বাসিন্দা পুরোহিতকুল, সেবায়েত মণ্ডলী থেকে শুরু করে, দেবদাসী, মালিনী, রন্ধকারক, দ্বাররক্ষী থেকে শুরু করে শূদ্রমণ্ডলী, সোমেশ্বর মহাদেবের ক্ষুদ্রতম সেবক পর্যন্ত কারোই পৃথক কোনও অস্তিত্ব নেই। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর সোমেশ্বর মহাদেব। এই পৃথিবীর সকল কার্য তাঁরই ইচ্ছাধীন, নিয়ন্ত্রণাধীন। তিনি মহাকাল, কাল নিয়ন্ত্রক। সামান্য বৃক্ষপল্লব পর্যন্ত তাঁর ইচ্ছা ব্যতিরেকে স্থানচ্যুত হয় না। তিনি আমাদের আশ্রয়দাতা, আমাদের রক্ষক।

মূর্তি ধ্বংসকারী মহা নারকী যবন মামুদ আবার হানা দিয়েছে আমাদের পুণ্যভূমি এই মহাভারতের মাটিতে। সে নাকি সোমনাথ নগরীতে হানা দিতে আসতে পারে এ মন্দির লুণ্ঠন করার জন্য, ধ্বংস করার জন্য! এ সংবাদে নগরীতে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। নগরবাসীর অনেকে আতঙ্কিত হয়ে নগরী ত্যাগ করতে শুরু করেছে।

মাধেরা সূর্য মন্দিরের নিকট নৃপতি মাণ্ডলিক, চালুক্যরাজ অম্বুজ প্রমুখ হিন্দুশ্রেষ্ঠরা যবন মামুদকে পরাস্ত করার জন্য যুদ্ধ শুরু করেছেন যার ফলাফলের সংবাদ এখনও নগরীতে এসে পৌঁছয়নি। হয়তো বা রাজর্ষি মাণ্ডলিকই যবন বাহিনীর গতি রুদ্ধ করে দেবেন। তবে মাধেরার যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, আমাদের মন্দিরবাসীদের অযথা আতঙ্কের কোন কারণ নেই। কারণ, আমাদের রক্ষাকর্তা স্বয়ং সোমেশ্বর মহাদেব। মন্দির লুণ্ঠন তো দূরের কথা, তাঁর আবাসস্থলে প্রবেশ করার ক্ষমতা, তাঁর বিনা অনুমতিতে দেবতাদেরও নেই। তাঁর আশীর্বাদে সব আশঙ্কা অমূলক বলে শীঘ্রই প্রমাণিত হবে। ততদিন আপনারা আতঙ্কমুক্ত, ধৈর্যশীল ভাবে মন্দিরের প্রাত্যহিক কাজে নিয়োজিত থাকুন। আবারও আপনাদের বলি আমাদের রক্ষাকর্তা স্বয়ং সোমেশ্বর মহাদেব। এ মন্দির তাঁর আবাসস্থল। এ মন্দিরে তাঁর সেবকদের কেশাগ্র স্পর্শ করার ক্ষমতা যবনদের নেই।' একটানা কথাগুলো বলে থামলেন সোমেশ্বর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব।

তাঁর এই বক্তব্য শুনেও উপস্থিত মন্দিরবাসীদের অনেকের আতঙ্ক দূর হল না। একজন প্রবীণ সেবায়েত উঠে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করে বললেন, 'প্রশ্ন করার জন্য আমাকে মার্জন করবেন প্রভু। আশঙ্কা যদি অমূলক হয়ে থাকে তবে স্বয়ং রাজা ভীম সোমনাথ নগরী ত্যাগ করলেন কেন? এ ঘটনাই আমাদের মনে আরও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। সেই নারকী যবন যদি সত্যি-সত্যিই এখানে এসে উপস্থিত হয়?'

প্রশ্ন শুনে এবার মুখ খুললেন সহ প্রধান পুরোহিত মল্লিকার্জুন। তিনি বললেন, 'নৃপতি ভীম রাজা হতে পারেন, কিন্তু তিনি আমাদের মতো সোমেশ্বর মহাদেবের সেবক নন। তাই তাঁর স্থান ত্যাগ করতে বাধা নেই। এটাও হতে পারে তিনি কোনও কৌশল অবলম্বন করতে নগরী ত্যাগ করেছেন। হয়তো বা এটাও সোমেশ্বর মহাদেবেরই কোনও ইচ্ছা। তা বোঝার সাধ্য বা ক্ষমতা হয়তো আমাদের মতো ক্ষুদ্র মানুষের নেই। তবুও যদি এটাই হয়ে থাকে যে যবন মামুদ সোমনাথ নগরীতে উপস্থিত হবে বুঝতে পেরে তিনি নগরী ত্যাগ করেছেন তবে এটা নিশ্চিত যে সোমেশ্বর মহাদেবই মামুদকে ধ্বংস করার জন্য সোমনাথ নগরীর দিকে টেনে আনছেন। আরব বাহিনী-সহ মামুদকে ধ্বংস করবেন সোমেশ্বর মহাদেব। এই পবিত্র ভূমিতে এটাই হবে যবন বাহিনীর অন্তিম অভিযান।'

মল্লিকার্জুনের কথা শেষ হবার পর ত্রিপুরারিদেবের অন্য পাশে দাঁড়ানো আর এক সহ প্রধান পুরোহিত নন্দিবাহন মন্দিরবাসীদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'হ্যাঁ, যবন মামুদ যদি তার বাহিনী নিয়ে এ রাজ্যের মাটিতে সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠনের জন্য পা দিয়ে থাকে, তবে তার নিয়তিই তাকে এখানে টেনে আনছে। পাপের আধার পরিপূর্ণ হয়েছে হিন্দু হন্তারক, মন্দির লুণ্ঠনকারী মামুদের।

সোমেশ্বর মহাদেব নটরাজ মূর্তি ধারণ করে এবার প্রলয় নৃত্য শুরু করবেন। নিশ্চিহ্ন হবে নারকী মামুদ। মালবের মহানৃপতি ভোজরাজ নিশ্চয়ই তাঁর দশ হাজার হস্তি ও একলক্ষ সেনাদল নিয়ে ইতিমধ্যে যাত্রা শুরু করেছেন সোমনাথ নগরীর দিকে। তিনি এসে পড়বেন। সোমেশ্বর মহাদেবের ইচ্ছাতে তিনি ধ্বংস করবেন যবন মামুদকে। মানবপতি রাজর্ষি ভোজের অপরাজেয় বাহিনী বন্যার প্রবল জলস্রোতের মতো আছড়ে পড়বে যবনদের ওপর। খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে, নিশ্চিহ্ন হবে আরবরা।' তিন পুরোহিতের বক্তব্য শুনে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে নিশ্চুপ হল জনতা। কেউ আর কোন প্রশ্ন করল না তাঁদেরকে।

প্রধান পুরোহিত দৃষ্টিপাত করলেন গর্ভগৃহের বন্ধ কপাটের একপাশে উপবিষ্ট দেবদাসীদের প্রতি। আতঙ্ক, আশঙ্কার চিহ্ন সবথেকে বেশি পরিস্ফুট তাদের মুখমণ্ডলেই। ব্যাপারটা খেয়াল করে তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'তোমরা যারা এ মন্দিরের দেবদাসী, তারা নিজেদের নাথ বলে গ্রহণ করেছ সোমেশ্বর মহাদেবকে। তোমাদের আমৃত্যু বন্ধন সোমেশ্বর মহাদেবের সঙ্গে। তিনি তোমাদের স্বামী। দেবতারও সবথেকে প্রিয় পাত্রী তোমরা। তোমাদের নৃত্যগীত শ্রবণ না করলে বিগ্রহের নিদ্রা ভঙ্গ হয় না, তিনি ভোজ গ্রহণ করে দ্বিপ্রহরে পরিতৃপ্ত হন না, সান্ধ্যকালে নিদ্রা যান না সোমেশ্বর মহাদেব।

কোনও দেবদাসীর মৃত্যু ঘটলে পত্নী বিয়োগের মতোই শোকগ্রস্ত হন মহাদেব। কোনও দেবদাসীর স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে তাঁর দেহ যে বস্ত্রখণ্ডে আবৃত করা হয় তা বিগ্রহেরই বস্ত্র খণ্ড। চিতার আগুন সংগ্রহ করা হয় গর্ভগৃহের প্রদীপের আগুন থেকেই। আর দুর্ঘটনাতে মৃত্যু ঘটা কোনও দেবদাসীকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেবার পূর্বে যে ফুলমালা পরানো হয় তা বিগ্রহরই ফুলমালা। যতক্ষণ মৃতার দেহ অগ্নিকুণ্ডে পঞ্চভূতে বিলীন না হয় অথবা সমুদ্রতে ভেসে যায়, ততক্ষণ গর্ভগৃহতে প্রদীপ জ্বলে না, ভোগ গ্রহণ করেন না দেবতা।

এমনই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তাঁর সঙ্গে তোমাদের। তিনি তোমাদের নাথ, তোমাদের রক্ষাকর্তা। তোমাদের অঙ্গ, সৌন্দর্য সবই তাঁর চরণে নিবেদিত। এ অঙ্গ স্পর্শ করার ক্ষমতা অন্য দেবতাদেরও নেই। নির্ভয়ে থাক তোমরা। নৃত্যগীত পরিবেশন করে তৃপ্ত করো, মুগ্ধ করো তোমাদের নাথ সোমেশ্বর মহাদেবকে। এই মানবজন্ম সোমেশ্বর মহাদেব সেবার যে অমূল্য সুযোগ তোমাদের দিয়েছে তা দিয়ে তোমরা তোমাদের স্বর্গবাসের পথ প্রশস্ত করো।'

এ কথা বলার পর প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব মন্দিরবাসীদের তাঁর শেষ কথাগুলো বললেন, 'বর্তমানে মন্দিরের পরিস্থিতির কথা ভেবে নতুন দুটি বিধি আমাকে প্রবর্তন করতে হচ্ছে। প্রথম—রাত্রিকালে কোনও ব্যক্তি তাঁর আবাসস্থল ত্যাগ করে মন্দিরের অন্যত্র গমন করতে পারবে না। একমাত্র যারা মন্দিরের বিভিন্ন স্থানে রক্ষা বা প্রহরীর দায়িত্বে আছেন, কর্তব্য সম্পাদনের জন্য তাদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। আর দ্বিতীয় নিষেধ হল, দিন হোক বা রাত্রি, একমাত্র সোমেশ্বর মুদ্রার অধিকারীরা ব্যতীত অন্য কোনও ব্যক্তি আজ এই মুহূর্তের পর থেকে প্রধান পুরোহিত বা সহ প্রধান পুরোহিতের অনুমতি ভিন্ন কোনও ভাবেই মন্দির ত্যাগ করতে পারবেন না।'

প্রধান পুরোহিতের এই নির্দেশ শুনে অঙ্গিরার মনে হল সেবায়েত প্রধান বিষধারী ও দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমার অন্তর্ধানের কারণেই সম্ভবত এ নিষেধ আরোপ করলেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব।

তিনি এরপর সভা ভঙ্গ হবার ইঙ্গিত করে বলে উঠলেন, 'জয় সোমেশ্বর মহাদেবের জয়!'

উপস্থিত মন্দিরবাসীরা উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাল, 'জয় ভৈরবেশ্বরের জয়! শ্রাবণীকেশ্বরের জয়! গণেশ্বরের জয়!' সোমেশ্বর মহাদেব, সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি যুগে যে সব নামে আবির্ভূত হয়েছেন সে সব নামে জয়ধ্বনি দিয়ে সভার কাজ শেষ হল। সবাই এরপর মন্দিরের গর্ভগৃহ চত্বর ছেড়ে পা বাড়াল মন্দিরে নিজ নিজ রাত্রিবাসের স্থানের দিকে। দেবদাসী সমর্পিতাও অন্য দেবদাসীদের সঙ্গে তাদের আবাসস্থলে এগোবার আগে চকিতের জন্য একবার পিছনে ফিরে তাকাল অঙ্গিরার দিকে। অঙ্গিরা তাকে চোখের ইশারাতে বুঝিয়ে দিল আজ রাত্রিতে সাক্ষাৎ হবে তার সঙ্গে।

দেবদাসীদের দলটা মন্দির চত্বর থেকে অন্তর্হিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই অঙ্গিরাও ফেরার পথ ধরল। অতিথিশালাতে মধ্য রাত পর্যন্ত কাটিয়ে তাকে রওনা হতে হবে প্রিয়তমার সঙ্গে মিলনের জন্য। যে মিলনের জন্য গত তিন দিন তিন রাত্রি প্রতীক্ষা করে আছে অঙ্গিরা। প্রতীক্ষা করে আছে রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতাও।

অন্ধকার গাঢ় হবার সঙ্গে-সঙ্গেই পুরু কুয়াশার আবরণে আবৃত হতে থাকল জনশূন্য মন্দির চত্বর। আকাশের চাঁদও কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে আছে অজানা কোন আতঙ্কে। মন্দির কাননে প্রাচীন বৃক্ষগুলোর কোটরে যে পেঁচককূল বাস করে, রাত্রি নামলে যারা মাঝে মাঝে কর্কশ ডাক ছাড়ে তারাও কদিন ধরে কেমন যেন নিশ্চুপ। রাত্রির অন্ধকারে কোথাও কোনও শব্দ নেই।

গর্ভগৃহ চত্বর থেকে ফিরে নিজ কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন ত্রিপুরারিদেব। বাইরে রাত্রি বেড়ে চলেছে কিন্তু ত্রিপুরারিদেবের চোখ নিদ্রাহীন। সোমেশ্বর মহাদেবের প্রতি তাঁর আস্থা অটুট থাকলেও, মন্দিরবাসীদের তিনি অভয়দান করলেও, বাস্তবিক কিছু ঘটনা তাঁকে গভীর ভাবে বিচলিত করে তুলেছে। প্রথমে অন্ধকারের রক্ষীর সেই গোপন কক্ষ ত্যাগ করা। অজ্ঞাত পরিচয় কোনও ব্যক্তির রত্ন হরণ, এদিন সকাল থেকে সেবায়েত প্রধান বিষধারী ও দেবদাসী তিলোত্তমার অন্তর্ধান, এসব ঘটনা নিদ্রা আনছে না ত্রিপুরারিদেবের চোখে। এসব দুর্ঘটনা কীসের ইঙ্গিতবাহী? কোনও অশুভ ঘটনা ঘটার ইঙ্গিত?

রাত বাড়তে বাড়তে মধ্যরাতে পৌঁছল। বিনিদ্র ত্রিপুরারিদেব তখন ভাবছিলেন—যদি সত্যিই যবন মামুদ মন্দিরে হানা দেয় তবে কি কর্তব্য তাঁর? বা এই গোলযোগের সুযোগ অন্য কেউও নিতে পারে। অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে দেবতার স্যমন্তক মণি, দেবতার রত্নাগার! হয়তো তিথি নক্ষত্রর জন্য অপেক্ষা করা আর উচিত হবে না। সে কক্ষের দায়িত্ব দ্রুত অর্পণ করা উচিত যুবক অঙ্গিরাকে।

প্রধান পুরোহিত মধ্যরাতে যখন অঙ্গিরার কথা স্মরণ করছিলেন ঠিক সেই সময় অতিথিশালা ত্যাগ করে অন্ধকার আর কুয়াশাময় পথ ধরে দেবদাসীদের আবাসস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হল অঙ্গিরা। প্রধান পুরোহিত অঙ্গিরাকে দেবদাসীদের আবাসস্থল ও সে সংলগ্ন অঞ্চলে প্রহরার কাজে নিযুক্ত করেছেন। তাই অতিথিশালা ত্যাগ করে সে স্থানে যেতে বাধা নেই অঙ্গিরার। আর যদি তার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হতো তবুও সে দেবদাসী সমর্পিতার আহ্বান অগ্রাহ্য করতে পারত কিনা সন্দেহ। অঙ্গিরা এগিয়ে চলল।

সে যখন সেই খণ্ডহর প্রাচীন চন্দ্রদেবতার মন্দির অতিক্রম করছে ঠিক সেই সময় অন্ধকার মন্দির থেকে বাইরে বেরিয়ে এল একজন লোক। অঙ্গিরার একদম মুখোমুখি হয়ে গেল সে। নাপিত শিরমণি খগেশ্বর! তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল অঙ্গিরা। সে তাকে প্রশ্ন করল, 'মধ্যরাতে চন্দ্রদেবতার ভগ্ন মন্দিরে আপনি কি করছিলেন?'

বৃদ্ধ খগেশ্বর কোনও জবাব দিল না।

অঙ্গিরার মুহূর্তের মধ্যে মনে পড়ে গেল সোমেশ্বর মুদ্রা দর্শন করিয়ে সেই রত্ন হরণের ব্যাপারটা। প্রবল সন্দেহের বশবর্তী হয়ে সে খগেশ্বরকে বলল, 'আপনি আমার থেকে কৌশলে সোমেশ্বর মুদ্রাটা নিয়েছিলেন মন্দিরের রত্ন হরণ করার জন্য, তাই না?'

এবারও নিশ্চুপ রইল খগেশ্বর।

অঙ্গিরা তাকে জবাব না দিতে দেখে ক্ষুব্ধ ভাবে বলল, 'এ উদ্দেশ্য সফল করার জন্যই, আমার থেকে মুদ্রা নেবার জন্যই আপনি সমুদ্র সর্পর থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করেছিলেন। সে সম্পদ কি আপনি এ মন্দিরে লুকিয়ে রেখেছেন?'

নরসুন্দর প্রধান খগেশ্বর এবার বললেন, 'না, ও মুদ্রা রক্ষীদের দেখিয়ে আমি রত্ন হরণ করিনি। সেবায়েত প্রধান বিষধারীও সোমেশ্বর মুদ্রার অধিকারী। তিনি রক্ষীদের সেই মুদ্রা প্রদর্শন করে ওই রত্নরাজি হরণ করে তা লুক্কায়িত রাখেন তাঁর প্রেয়সী দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমার কাছে। ওই মুদ্রার সাহায্যে তিলোত্তমা গত রাত্রিতে রত্নগুলো নিয়ে মন্দির ত্যাগ করে মিলিত হয়েছে সেবায়েত প্রধানের সঙ্গে। তারপর সম্ভবত তারা দুজনে সোমনাথ নগরী ছেড়ে পলায়ন করেছে।'

এ কথা বলার পর একটু থেমে বিষণ্ণ হেসে বৃদ্ধ খগেশ্বর বলল, 'আমার যদি রত্ন চুরি করতেই হত তবে এ মন্দিরের শ্রেষ্ঠ সম্পদ স্যমন্তক মণি হরণ করতাম। যার, সে মণির সন্ধান এখন জানা, সে অযথা ওই সামান্য ধনসম্পদ চুরি করতে যাবে কেন?'

খগেশ্বরের বলা অজানা, বিস্ময়কর কথাগুলো শুনে অঙ্গিরা বেশ বিস্ময়বোধ করল। সন্দেহ নিরসনের জন্য সে প্রশ্ন করল, 'আপনি স্যমন্তক মণির খোঁজ পেলেন কীভাবে? আর এ মন্দিরেই বা এত রাতে কি করছেন তার জবাব দিলেন না তো?'

নরসুন্দর বলল 'আমি তোমাকে এ স্থানেই নিয়ে আসব বলে ভেবেছিলাম। এই ভগ্ন মন্দিরের ভিতরে চলো। তোমার অনেক প্রশ্নের উত্তর পাবে।'

মন্দিরের ভিতরে বাইরের চাঁদের আলো প্রবেশ করছে না। খগেশ্বরের পিছন পিছন সেই অতি জীর্ণ-ভগ্ন মন্দিরের ভিতর পা রেখে অঙ্গিরা স্বগোতক্তি করল, 'কী ঘোর অন্ধকার!'

কথাটা শুনেই একটু শব্দ করে হাসল বৃদ্ধ খগেশ্বর।

অঙ্গিরা ব্যাপারটা খেয়াল করে বলল, 'আপনি হাসলেন কেন?'

ক্ষৌরকার শিরমণি জবাব দিল, 'তোমার কথা শুনে কৌতুক বোধ করলাম তাই। ওই যে বললে, 'ঘোর অন্ধকার!'

'এ কথায় কৌতুকবোধ করার কি আছে?' জানতে চাইল অঙ্গিরা।

বৃদ্ধ কথার কোনও জবাব দিল না। অন্ধকার দেওয়ালের খাঁজ হাতড়ে চকমকি পাথর বার করে একটা ক্ষুদ্রাকৃতি প্রদীপ জ্বালিয়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে এগোতে থাকল। প্রদীপের মৃদু আলোতে অঙ্গিরা যতটুকু বুঝতে পারল তাতে এ মন্দিরের সৌন্দর্যও এক সময় কম ছিল না। যদিও আরব জুয়ানেদের সেনাদের বর্বতার চিহ্ন আজও ধরে রেখেছে এ মন্দির।

দেওয়াল গাত্রের মূর্তিগুলোর কারও নাক ভাঙা, কারও হাত ভাঙা! কোনও দেবমূর্তির মুণ্ড হয়তো ছিন্ন হয়ে ধুলোতে পড়ে আছে! দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে প্রাচীনত্বর কারণে মূর্তিগুলো এমন ভাবে ধ্বংস হয়নি, ধ্বংস করা হয়েছে মূর্তিগুলোকে! কোনও এক ভয়ঙ্কর প্রাচীন অতীতের সাক্ষ্য আজও জেগে আছে সর্বাঙ্গে!

খগেশ্বরের পিছনে চলতে চলতে অঙ্গিরার এবার মনে হল সত্যিই যদি আরব মামুদ মন্দিরে হানা দেয় তবে কি সোমেশ্বর বিগ্রহ মন্দিরেরও এমনই অবস্থা হবে?

খগেশ্বর প্রদীপ হাতে এসে থামল এক অতি প্রাচীন কক্ষের সামনে। সে কক্ষের ভিতর জমাট বাঁধা অন্ধকার। কক্ষর কপাটহীন দ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে ভিতর থেকে ভেসে আসা মনুষ্য কণ্ঠের অস্পষ্ট গোঙানি-আর্তনাদের শব্দ শুনতে পেল অঙ্গিরা! তাকে নিয়ে সেই কক্ষে পা রাখল বৃদ্ধ খগেশ্বর। ক্ষুদ্রাকৃতি সে কক্ষ আলোকিত হয়ে উঠল প্রদীপের আলোতে।

অঙ্গিরা দেখতে পেল সে কক্ষের এক কোণে একটা বস্ত্রখণ্ডর ওপর দু-পা ছড়িয়ে দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে আছে বীভৎস দর্শন প্রায় নগ্ন একজন মানুষ। শুধু তার লজ্জাস্থান সামান্য বস্ত্রখণ্ডে আবৃত। লোকটার কেশদাম আর শ্মশ্রু এমনই প্রবল যে তার মুখমণ্ডল চেনা সম্ভব নয়। দীর্ঘ দিন ছেদন না করার ফলে তার হাত-পায়ের নখ শ্বাপদের নখের মতো তীক্ষ্ন-বাঁকানো। সর্বোপরি তার সারা শরীরে অসংখ্যা ঘা। সব মিলিয়ে ভয়ঙ্কর দর্শন এক মূর্তি বসে আছে অঙ্গিরার চোখের সামনে! প্রেত সদৃশ এই মূর্তিই কি হানা দিয়েছিল দেবদাসীদের আবাসস্থলে? এরই খোঁজে কি তাকে নিয়োগ করেছিলেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব?

বিস্মিত অঙ্গিরা বলে উঠল 'কে ও?'

বৃদ্ধ খগেশ্বর জবাব দিল, 'ও হল, স্যমন্তক মণির রক্ষক। তোমার ভবিষ্যৎ? তবে ওর আর একটা পরিচয়ও আছে।

অঙ্গিরা বলল 'আমার ভবিষ্যৎ মানে? ওর অন্য পরিচয়ই-বা কী?'

দ্বিতীয় প্রশ্নর জবাব প্রথমে দিল বৃদ্ধ খগেশ্বর। সে বলল, 'ও হল আমার মৃত পুত্রের একমাত্র পুত্র। ওর নাম কার্তিকেয়। এক সময় দেবসেনাপতি কার্তিকেয়র মতোই অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী ছিল ও। কিন্তু দ্বাদশ বৎসর সেই অন্ধকার কক্ষে স্যমন্তক মণির প্রহরী হিসাবে দায়িত্ব পালন করার পর ওর কী চেহারা হয়েছে দেখো। সর্বাঙ্গে বিষাক্ত ঘা। দীর্ঘদিন সূর্যালোক না দেখাতে দিনের আলোতে চোখে দেখতে পায় না। আমরাই একদিন ওকে তুলে দিয়েছিলাম মন্দিরের অধ্যক্ষ আর ত্রিপুরারিদেবের হাতে।'

একথা বলার পর একটু চুপ করে থেকে অঙ্গিরাকে চমকে দিয়ে খগেশ্বর বলল, 'হ্যাঁ, ওই তোমার ভবিষ্যৎ। ওই অন্ধকার কক্ষে অন্ধকারের প্রহরীর দায়িত্ব তোমাকে অর্পণ করতে চলেছেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। আমি দেখেছি কিছু দিবস পূর্বে তোমার চোখ বেঁধে তোমার লক্ষভেদ পরীক্ষা করছিলেন তিনি। কেন জানো? সে কক্ষে কোনও আলো প্রবেশ করে না। সেই রত্ন কক্ষের অবস্থান আমাকে বলেছে ও।

গর্ভগৃহতে মহাদেবের ঝুলন্ত বিগ্রহের পশ্চাতে দেওয়ালের গায়ে এক গোপন প্রবেশ পথ বেয়ে নীচে নেমে সেই অন্ধকার ভূগর্ভস্থ কক্ষে যেতে হয়। সে কক্ষের কথা সোমেশ্বর মন্দিরের অধ্যক্ষ আর প্রধান পুরোহিত ছাড়া কেউ কোনওদিন জানতে পারে না। অধ্যক্ষ বর্তমানে প্রয়াত হয়েছেন। সে কক্ষের কথা একমাত্র জানেন ত্রিপুরারিদেব। দৈবাৎ যদি কোনও ভাবে সেই কক্ষর সন্ধান পেয়ে স্যমন্তক মণি হরণের জন্য সেই অন্ধকারে প্রবেশ করে তবে তুমি অন্ধকারে তাকে তির নিক্ষেপ করতে পারবে কিনা, তোমার চোখ বেঁধে সে পরীক্ষাই নিয়েছেন প্রধান পুরোহিত।'

অঙ্গিরা হতবাক হয়ে গেল খগেশ্বরের বলা ভয়ঙ্কর কথা শুনে।

খগেশ্বর এরপর বলল, 'আমি তোমার থেকে সোমেশ্বর মুদ্রা নিয়েছিলাম আমার এই হতভাগ্য পৌত্র কার্তিকেয়কে মুক্ত করার জন্যই। ভেবেছিলাম ওকে ছদ্মবেশ ধারণ করিয়ে, মুদ্রাটা ওর হাতে তুলে দেব। দ্বাররক্ষীদের ওই মুদ্রা দেখিয়ে রাতের অন্ধকারে যাতে ও মন্দিরের বাইরে যেতে পারে। কিন্তু তা আর সম্ভব হল না। স্বাভাবিক চলন শক্তি হারিয়ে ফেলেছে ও। মস্তিষ্ক বিকৃতিও ঘটেছে কদিনের মধ্যে। সোমেশ্বর মুদ্রা হাতে থাকলেও ও দ্বাররক্ষীদের ফাঁকি দিতে পারবে না।

যার স্যমন্তক মণির সন্ধান জানা আছে, জানা আছে হাজার বছর ধরে সঞ্চিত গোপন রত্নভাণ্ডারের কথা, তাকে কি কখনও মুক্তি দিতে পারেন প্রধান পুরোহিত? তোমাকে বিশ্বাস করে ওকে দেখাতে আনলাম। একটাই অনুরোধ, ওর কথা কাউকে জানাবে না। ও কোনও প্রেত বা অপদেবতা নয়, একজন হতভাগ্য মানুষ। দ্বাদশ বৎসর ধরে যে অন্ধকারের প্রহরী হিসাবে নিযুক্ত থেকে রক্ষা করেছে সোমেশ্বর মন্দিরের শ্রেষ্ঠ সম্পদ স্যমন্তক মণিকে। ওর শরীরের ঘা প্রবল ভাবে বিষিয়ে উঠেছে। আর হয়তো ক'টা দিন বাঁচবে ও। ওকে শান্তিতে মরতে দিও।' শেষ কথাগুলো বলতে বলতে রুদ্ধ হয়ে এল বৃদ্ধ খগেশ্বরের কণ্ঠ। জল ঝরতে লাগল চোখ বেয়ে।

বাকরুদ্ধ অঙ্গিরা হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইল অন্ধকারের প্রহরীর দিকে। সে ভাবতে লাগল তবে কি আর কদিন পর থেকে তার সঙ্গে আর কোনও দিন দেখা হবেনা চালুক্য কন্যা রাজশ্রীর? তার প্রেয়সী দেবদাসী সমর্পিতার? সে কি নিজেকেই দেখতে পাচ্ছে তার চোখের সামনে!

এক সময় চোখের জল মুছে খগেশ্বর বলল, 'চলো এবার বাইরে বেরোনো যাক।'

খগেশ্বরকে নিশ্চুপ ভাবে অনুসরণ করে কিছু সময়ের মধ্যে মন্দিরের বাইরে এসে দাঁড়াল অঙ্গিরা। সে একটু ইতস্তত করে জানতে চাইল, 'এমন ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে আপনারা ওকে ঠেলে দিয়েছিলেন কেন?'

বৃদ্ধ খগেশ্বর বললেন, 'হয়তো এটাই ভবিতব্য ছিল। তবে আমরা কেউ-ই জানতাম না ওর এই পরিণতি হবে। এ ঘটনার মূলে এক ক্ষুদ্র কাহিনি আছে।'

'কী কাহিনি?' জানতে চাইল অঙ্গিরা।

বৃদ্ধ খগেশ্বর তাঁর শনের মতো চুলে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'দ্বাদশ বৎসর পূর্বের ঘটনা। আমরা ক্ষত্রিয় না হলেও ছেলেবেলা থেকেই অস্ত্রচালনাতে প্রবল আগ্রহ ছিল কার্তিকেয়র। নদী তীরের জঙ্গলে মাঝে মাঝে শিকারে যেত সে। চোখে বস্ত্রখণ্ড আবৃত করে শব্দভেদী বাণ চালনাও অনুশীলন করত সে। তেমনই একদিন জঙ্গলে চোখ বন্ধ করে শব্দভেদী বাণ নিক্ষেপের অনুশীলন করছিল কার্তিকেয়। ঠিক সে সময় কোনও ওষধি গুল্মর সন্ধানে জঙ্গলে প্রবেশে করেছিলেন ত্রিপুরারিদেব। তার পদ শব্দ শুনে তাকে কোনও পশু ভেবে শর নিক্ষেপ করল চোখ বন্ধ কার্তিকেয়। সে তির গিয়ে বিদ্ধ হল ত্রিপুরারিদেবের পায়ে। তার বামপদের তিনটি আঙুল দেখবে নেই। তা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল ওই তিরের আঘাতেই। একে ব্রাহ্মণের অঙ্গ ছিন্ন হওয়া, তাও আবার শূদ্রের তিরের আঘাতে। এর থেকে ভয়ঙ্কর ঘটনা আর কি হতে পারে!

পরবর্তীকালে পিতৃপুরুষদের মৃত্যুর পর তাদের অনন্ত নরককবাস তো বটেই, এ জন্মেও এ অপরাধের শাস্তি অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড ও তার পরিবারের জন্য কঠিন শাস্তি। এ অন্যায়ের প্রতিবিধানের জন্য সে সময়ের মন্দির অধ্যক্ষ ডেকে পাঠালেন পরিবারের কর্তা আমাকে। তিনি আমার সামনে এক অদ্ভুত প্রস্তাব রাখলেন। আমার পরিবার যদি গোপনে মন্দিরের হাতে দ্বাদশ বর্ষের জন্য কার্তিকেয়কে দান করে তবে সব অপরাধ ক্ষমা করবেন তারা। তবে এই দ্বাদশ বৎসর তার সঙ্গে কোনও ভাবেই সাক্ষাৎ করা যাবে না। এবং সে মন্দিরে কোথায় কোন স্থানে কোন কর্মে নিয়োজিত আছে, সে সম্পর্কে কোনও অনুসন্ধান করা যাবে না।

কার্তিকেয়কে মন্দিরের অধ্যক্ষর হাতে তুলে দিলে শুধু যে আমরা শাস্তিমুক্ত হব তাই নয়, কার্তিকেয়-সহ আমাদের কারোরই পর জন্মে শূদ্র জন্ম হবে না এই পুণ্য কাজের ফলে। নচেৎ এ জন্মে হয়তো বা মৃত্যুদণ্ড বা অনন্ত কারাবাসের মতো শাস্তি লাভ হতে চলেছে কার্তিকেয়র এবং মৃতুর পর আমাদের সবারই অনন্ত নরকবাস হবে!

কার্তিকেয় হয়তো সোমনাথ মন্দির ত্যাগ করে পালাতে পারত, কিন্তু তাকে ভাবিত করে তুলল তার পাপে তার পিতৃপুরুষদের নরকবাস থেকে মুক্ত হবার ব্যাপারটা। হয়তো বা তার সঙ্গে শূদ্র জন্ম থেকে মুক্ত হবার প্রলোভনও ছিল। এ শূদ্র জন্ম বড় ভয়ঙ্কর। উচ্চ বর্ণের লোকেরা ইচ্ছা হলেই শূদ্র নারীর লজ্জাবস্ত্র হরণ করতে পারে। শূদ্রদের সবসময় পদদলিত হতে হয়, অপমানিত হতে হয় অন্য বর্ণের লোকের দ্বারা। কাজেই কার্তিকেয় রাজি হয়ে গেল মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে নিজেকে সমর্পণ করতে। তখন সে বা আমি কেউই জানতাম না যে তার জন্য যে ভয়ঙ্কর পরিণতি অপেক্ষা করছে, তা তার মৃত্যু বা অনন্ত নরকবাসের থেকেও অনেক ভয়ঙ্কর। তাই এক অন্ধকার রাতে সবার অগোচরে মন্দিরে প্রবেশ করে অধ্যক্ষ ও প্রধান পুরোহিতের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছিল আমার পৌত্র। তারপর সে হারিয়ে গেছিল পৃথিবীর আলো থেকে। তার সন্ধান আর কেউ পায়নি।' কাহিনি শেষ করল হতভাগ্য কার্তিকেয়র পিতামহ হতভাগ্য শূদ্র বৃদ্ধ খগেশ্বর।

নরসুন্দর খগেশ্বরের মুখে অন্ধকারের প্রহরীর ও মন্দিরে সমর্পণের কাহিনি শুনে অঙ্গিরা অনেকটা স্বগতোক্তির স্বরেই বললে, 'কিন্তু আমার পিতা-মাতা তাদের কোন মহাপাপ স্খলনের জন্য তাদের পুত্রকে সোমেশ্বর মন্দিরের পুরোহিতের কাছে আত্মনিবেদনের নির্দেশ দিয়ে গেলেন? তাঁরা কি জানতেন এ মন্দিরে কোন কাজে নিয়োজিত করা হবে আমাকে?'

অঙ্গিরার প্রশ্ন শুনে বৃদ্ধ খগেশ্বর বলল, 'তোমাকে, প্রধান পুরোহিত যে কাজে নিয়োজিত করতে চলেছেন তা জানা তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না বলেই আমার ধারণা। তবে তাঁরা কেন তোমাকে প্রধান পুরোহিতের কাছে আত্মনিবেদন করতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন তা আমি সম্ভবত কিছুটা অনুমান করতে পারছি। তাদের সম্বন্ধে কিছু কথা আমি সংগ্রহ করেছি প্রাক্তন সেবায়েত প্রধান নীলকণ্ঠর থেকে।'

অঙ্গিরা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, 'কী শুনেছেন আমাকে জানান? তারা তাদের কোন পাপ স্খলনের জন্য সোমনাথ মন্দিরে তাদের পুত্রকে সমর্পণের সিদ্ধান্ত নিলেন?'

গাঢ় কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে চারদিক। মাত্র হাতখানেক তফাতে দাঁড়িয়ে থাকা খগেশ্বরের মুখমণ্ডল যেন অস্পষ্ট লাগছে অঙ্গিরার কাছে। বৃদ্ধ খগেশ্বর বলল, 'সে সত্য কি তুমি সহ্য করতে পারবে?'

অঙ্গিরা বলল, 'এ সত্য যত কঠিনই হোক না কেন তা আমার জানা উচিত। আপনি বলুন।'

বৃদ্ধ খগেশ্বর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বলল 'তুমি একজন অজাচার সন্তান। তোমার পিতা-মাতারা ছিলেন সহোদর ভ্রাতা-ভগ্নি।'

কথাটা যেন বিদ্যুৎপৃষ্ঠের মতো আঘাত করল অঙ্গিরাকে। সে অজাচার! সে প্রায় উন্মাদের মতো খগেশ্বরের গলা চেপে ধরে বলতে লাগল, 'আমি অজাচার? মিথ্যা বলছ তুমি! কেন মিথ্যা কলঙ্ক লেপন করছ আমার মৃত পিতা-মাতার ওপর?'

খগেশ্বর অতিকষ্টে অঙ্গিরার বন্ধন মুক্ত হয়ে বলল, 'তুমি শান্ত হও। আমি কোনও কলঙ্ক লেপন করছি না তাঁদের ওপর। দোহাই, আমার পুরো বক্তব্য শুনুন। হয়তো বা তাহলে তাঁদের অসহায়তার কথা বুঝতে পারবে।'

নিজেকে অতি কষ্টে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করল অঙ্গিরা। যদিও তার পায়ের তলার মাটি টলতে শুরু করেছে। হতভম্বের মতো সে খগেশ্বরের দিকে তাকিয়ে রইল। বৃদ্ধ খগেশ্বর শুরু করল তার কথা। অঙ্গিরার মনে হতে লাগল বহু যুগের ওপার থেকে যেন ভেসে আসছে খগেশ্বরের কণ্ঠস্বর।

'সোমেশ্বর মন্দিরে পাঁচ বর্ণের দেবদাসী আছে। প্রথম, যারা স্বেচ্ছায় সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে নিজের দেহমন নিবেদন করে, অর্থাৎ দত্তা। দ্বিতীয়, যারা তার পরিবারের মঙ্গললাভের জন্য, তাদের স্বর্গবাসকে নিশ্চিত করতে মন্দিরবাসী হয়, অর্থাৎ ভৃত্যা। তৃতীয় বর্ণ হল ভক্তা, অর্থাৎ যারা ভক্তির টানে মন্দিরের বাসিন্দা হয়েছে। চতুর্থ বর্ণের দেবদাসীরা হল হৃতা। অর্থাৎ যাদের হরণ করে মন্দিরে এনে দেবতাকে নিবেদন করা হয়েছে। আর পঞ্চমত হল বিক্রেতা। যে নিজেকে অর্থের বিনিময় মন্দিরের কাছে বিক্রয় করেছে। অথবা তাকে কেউ বিক্রয় করেছে।

আপনার মাতা ছিলেন বিক্রেতা শ্রেণির দেবদাসী। দাসের হাট থেকে একদল ছেলেমেয়েকে কিনে এনেছিলেন পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। আপনার পিতা-মাতা দুজনেই তখন শিশু। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত পুত্র সন্তানদের মন্দিরের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কোনও রাজ সৈন্য শিবিরে অস্ত্র শিক্ষা দিয়ে যুবক করে তোলার জন্য। তারা ভবিষ্যতে মন্দিরের দ্বাররক্ষী, প্রহরী এসব কাজে নিয়োজিত হয়। আর কন্যা সন্তানগুলিকে মন্দিরের ভিতর কোনও প্রাচীনা দেবদাসী বা মালিনীর তত্ত্বাবধানে বড় করা হয় দেবদাসী হবার জন্য। এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বড় হয়ে উঠেছিলেন আপনাদের পিতা-মাতা।

আপনার পিতা যখন যুবা বয়সে মন্দিরে পদার্পণ করলেন তখন আপনার মাকে চিনবার তার কথা নয়। আর আপনার দেবদাসী মায়েরও নয়। শিশু বয়সে বিছিন্ন হবার ফলে তাঁরা কেউ অন্যের পরিচয় জানেন না। রাতে জেগে ওঠে এই মন্দির। হয়তো কোনও এক গোপন রাতে তাদের দুজনের দেখা হয়েছিল। নারী-পুরুষের প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন তারা। ব্যাপারটা প্রধান পুরোহিত সহ মন্দিরের প্রধান ব্যক্তিদের দৃষ্টিগোচর হয় যখন তোমার মাতা সন্তান সম্ভাবনা হন।

যারা ব্যাপারটা জেনেছিলেন তাদের মধ্যে সে সময়ের সেবায়েত প্রধান নীলকণ্ঠ অন্যতম। আর এরপরই নাকি মন্দির থেকে নিখোঁজ হয়ে যান তোমার পিতামাতা।' এ পর্যন্ত একটানা কথাগুলো বলে থামল বৃদ্ধ। তারপর কিছুটা দম নিয়ে সে বলল, 'এ পর্যন্ত যে ঘটনার কথা বললাম তা প্রাক্তন সেবায়েত প্রধান নীলকণ্ঠর থেকে শোনা। আর বাকি ঘটনা হল আমার অনুমান। সে অনুমান হল তোমার পিতা-মাতা যে সহোদর-সহোদরা এই ভয়ঙ্কর কথাটা ত্রিপুরারিদেব সেই হতভাগ্য নর-নারীকে জানিয়েছিলেন। এবং তাদের এ-ও বলেছিলেন যে তাদের সন্তানকে যদি তারা ভবিষ্যতে সোমনাথ মন্দিরে সমর্পণ করেন, তবেই তাঁরা এই ভয়ঙ্কর অনাচারের পাপ থেকে মুক্ত হবেন।

নরকবাসের আতঙ্ক কার না আছে? তার ওপর এই অত্যাচারের গ্লানি! যে জন্যই সম্ভবত তাঁরা সম্মত হয়েছিলেন প্রধান পুরোহিতের প্রস্তাবে। সোমনাথ নগরী ত্যাগ করে বল্লভীতে গিয়ে তোমার জন্ম দিয়েছিলেন। তোমাকে বড় করে তোলার পর আত্মহননের আগে তোমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছিলেন তাদের আত্মার মুক্তি ঘটাবার জন্য সোমনাথ মন্দিরে এসে ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশ পালন করতে। তারা বল্লভী নগরীতে যাবার পূর্বে ত্রিপুরারিদেব তাদের হাতে সোমেশ্বর মুদ্রা তুলে দিয়েছিলেন এ কারণে যে, ভবিষ্যতে ওই মুদ্রা তোমার পরিচয় বহন করবে। তোমাকে সনাক্ত করতে সাহায্য করবে।' কথা শেষ করল বৃদ্ধ খগেশ্বর।

অঙ্গিরার পা টলতে শুরু করেছে। মাথার ভিতরটা কেমন যেন করতে শুরু করেছে। তীব্র বমনের উদ্রেক হচ্ছে, শরীর কাঁপছে! সে একজন অজাচার! মানব সমাজের নিকৃষ্টতম প্রাণী! সে আর দেবদাসী সমর্পিতার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য এগোল না। কোনওক্রমে নিজের শরীরটাকে নিয়ে ফিরে চলল অতিথিশালার দিকে।

২০

নিদ্রাহীন ভাবে সারারাত্রি ত্রিপুরারিদেব নানা কথা ভাবলেন মন্দিরের বর্তমান পরিস্থিতি আর ভবিষ্যৎ নিয়ে। কোনও কোনও সময় তার মনে হতে লাগল, 'মন্দিরের ওপর সত্যি যদি কোনও দুর্বিপাক নেমে আসে তবে কি তা আমারই কোনও পাপে? কি সেই পাপ?'

কিন্তু এরপরই আবার তার মনে হল, তিনি যা অতীতে করেছেন, করছেন, করতে চলেছেন তা কোনওটাই তাঁর ব্যক্তিগত সুখ-ভোগের জন্য নয়, করেছেন হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা সংস্কার, রীতি, প্রথা মানার জন্য। যা তুষ্ট করে সোমেশ্বর মহাদেবকে। তিনি যা করেছেন, করতে চলেছেন তা মন্দিরের ভালোর জন্য, নিরাপত্তার জন্য, সর্বোপরি সোমেশ্বর মহাদেবের জন্য। সারা জীবনই তো অনাড়ম্বর ভাবে ব্রহ্মচর্য পালন করে এ মন্দিরের সেবায় নিয়োজিত থেকেছেন তিনি। সাত রাজার ধন স্যমন্তক মণি তার করতলগত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কোনওদিন মুহূর্তের জন্যও সে মণি আত্মসাৎ করার ভাবনা আসেনি। বরং মন্দিরের সেই সম্পত্তি রক্ষা করার জন্য তার দুশ্চিন্তার শেষ নেই, চেষ্টার শেষ নেই। তিনি পাপ করবেন কেন?'

শুকতারা ফুটে ওঠার মুখে অন্যদিনের মতোই কক্ষ ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে সেই স্বর্ণ শৃঙ্খল বাজালেন ত্রিপুরারিদেব। সূর্যোদয়ের মুহূর্তে প্রতিদিনের মতোই অবগাহন করে মন্দিরে ফিরলেন। উন্মোচন করলেন গর্ভগৃহের তোরণ। নিত্য দিনের মতোই ঘুম ভাঙানো হল দেবতার। প্রতিদিনের মতোই দেবদাসীরা তাদের নৃত্যগীত পরিবেশন করল। কিন্তু সব কিছুতেই কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম ম্রিয়মান ভাব! কোথাও যেন একটা অদৃশ্য ছন্দপতন শুরু হয়েছে!

দেবদাসীদের নৃত্যগীত সাঙ্গ হবার পর গর্ভগৃহর চত্বরের বিশাল ঘণ্টাটা বাজালেন ত্রিপুরারিদেব। এই সংকেত ধ্বনি শুনেই দ্বাররক্ষীরা মন্দিরের প্রধান তোরণ উন্মোচন করে। দর্শনার্থীরা সোমেশ্বর মহাদেবের নামে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে জয়ধ্বনি দিতে দিতে বন্যার স্রোতের মতো মন্দিরে প্রবেশ করে। কিন্তু আজ আর সে কোলাহল নেই। মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি শুধু প্রতিধ্বনিত হতে লাগল প্রাকার আর উপমন্দিরগুলোতে।

প্রাত্যহিক কর্ম সম্পাদনের পর ত্রিপুরারিদেব নিজের কক্ষে ফিরে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় রক্ষী প্রধান জয়দ্রথ এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। প্রধান পুরোহিতকে প্রণাম জানিয়ে তিনি বললেন, 'এক ব্যক্তি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন। তিনি বলছেন তিনি নাকি চালুক্যরাজের মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব। তিনি নাকি মাধেরা মন্দিরের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এখানে এসেছেন! অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে তিনি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান!'

মাধেরার যুদ্ধক্ষেত্র! কথাটা শুনে বিস্মিত ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'তুমি তাকে আমার কক্ষে নিয়ে এসো।'

কিছু সময়ের মধ্যেই জয়দ্রথের সঙ্গে প্রধান পুরোহিতের কক্ষের সামনে উপস্থিত হলেন এক ব্যক্তি। ত্রিপুরারিদেব তাঁকে দেখে বুঝতে পারলেন যে আগন্তুক সম্ভ্রান্তবংশীয়। অন্তত তার পোশাক সে কথা বলছে। কিন্তু সে পোশাক বর্তমানে ধূলাময়। স্থানে স্থানে শুকনো রক্তের ছিটা লেগে আছে। ক্লান্তির স্পষ্ট চিহ্ন ফুটে আছে সেই প্রৌঢ় ব্যক্তির মুখমণ্ডলে। কোমর বন্ধনীর একটা স্থান বেশ স্ফীত। কোনও কিছু বাঁধা আছে সেখানে।

আগন্তুক, প্রধান পুরোহিতকে হাত জোড় করে প্রণাম জানাবার পর তাকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে দ্বার বন্ধ করলেন। মুখোমুখি দুজন উপবেশ করার পর সেই ব্যক্তি তার কোমরবন্ধ থেকে একটা স্বর্ণমুকুট বার করে বললেন, 'আমি চালুক্যরাজ অম্বুজের মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব। এই তার প্রমাণ, চালুক্য রাজের রাজমুকুট।'

হীরকখচিত সেই স্বর্ণমুকুট যে রাজমুকুটই হবে তা বুঝতে পারলেন ত্রিপুরারিদেব। মৃদু বিস্মিত ভাবে বললেন, 'তিনি কোথায়? মাধেরার সূর্য মন্দিরে? যুদ্ধর গতিপ্রকৃতি কী?'

চন্দ্রদেব বললেন, 'তিনি সেখানেই ছিলেন, কিন্তু এখন আর নেই, তিন দিবস পূর্বে নিহত হয়েছেন তিনি। প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়েছে যবন বাহিনীর সঙ্গে। যুদ্ধের ফলাফল বা গতিপ্রকৃতি কি হয়েছে তা আমার জানা নেই। কারণ মহারাজের মৃত্যুর পর তার দাহ কার্য সম্পন্ন করেই তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে দেওয়া নির্দেশ পালন করতে মাধেরা ত্যাগ করে আপনার কাছে ছুটে এসেছি।'

'কি সেই নির্দেশ?' বিস্মিত ত্রিপুরারিদেব প্রশ্ন করলেন।

চালুক্য মহামন্ত্রী বললেন, 'মহারাজের মৃত্যুর পূর্বে তার শেষ ইচ্ছা পূরণের অনুরোধ নিয়ে আমি আপনার কাছে এসেছি। তিনি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী রাজশ্রীকে আপনাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। মহারাজের শেষ ইচ্ছা ছিল আমি তাকে সোমেশ্বর মন্দির থেকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে এই রাজমুকুট পরিয়ে চালুক্য সিংহাসনে অভিষিক্ত করি। মহারাজ অম্বুজ তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রীর প্রতি যে অন্যায় আচরণ করেছেন, সেই পাপ স্খলনের জন্য তিনি আমাকে এই নির্দেশ দিয়ে গেছেন। তিনি তাঁর পিণ্ডদান প্রক্রিয়াও এখানেই সম্পন্ন করে চালুক্য প্রদেশে ফিরতে বলেছেন।'

চালুক্য মহামন্ত্রীর বক্তব্য শুনে চুপ করে রইলেন ত্রিপুরারিদেব।

চন্দ্রদেব বললেন, 'আপনি রাজকুমারী রাজশ্রীকে আমার হাতে তুলে দিন। আমি কালই মহারাজের পিণ্ডদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাজশ্রীকে নিয়ে রওনা হব। চালুক্য সিংহাসন শূন্য অবস্থায় পড়ে আছে।'

ত্রিপুরারিদেব এবার বললেন, 'প্রয়াত মহারাজের দ্বিতীয় ইচ্ছা, অর্থাৎ এই প্রভাসক্ষেত্রে তাঁর পিণ্ডদান, শ্রাদ্ধ কার্যাদি ইত্যাদি অবশ্যই সম্পন্ন হতে পারে। সে কাজের জন্য আমি আপনাকে সাহায্যও করতে পারি। কিন্তু চালুক্যরাজের প্রথম ইচ্ছা পূরণ, ওই নারীকে কখনোই আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়?'

চালুক্য মহামন্ত্রী বললেন, 'সম্ভব নয় কেন?'

সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'কারণ, তাকে সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে সমর্পণ করা হয়েছে। সে এখন দেবদাসী সমর্পিতা। তার আর এখন পূর্বের কোনও পরিচয় নেই। সে পরিচয় মুছে গেছে। তার এখন একমাত্র পরিচয় সে দেবদাসী। তার একমাত্র আরাধ্য সোমেশ্বর মহাদেব।'

এ কথা শুনে চন্দ্রদেব বললেন 'কিন্তু রাজশ্রী তো স্বেচ্ছায় এ মন্দিরে আসেনি। চালুক্যরাজ বলপূর্বক তাকে এখানে পাঠিয়েছিলেন।'

ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'হতে পারে সে হৃতা, বলপূর্বক তাকে এখানে আনা হয়েছে। কিন্তু কোনও দেবদাসী হৃতা, দত্তা, ভূত্যা, ভক্তা, যে শ্রেণিরই হোক না কেন, সোমেশ্বর মহাদেবের থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। সোমেশ্বর মহাদেবের সঙ্গে তাদের আমৃত্যু বন্ধন।

ত্রিপুরারিদেবের বক্তব্য শুনে চন্দ্রদেব অনুনয় করে বললেন, 'আমার সঙ্গে একবার তার সাক্ষাৎ করাবেন? সে যদি নিজে এ মন্দির ত্যাগ করে ফিরে যেতে চায়? প্রয়োজনে আমি তার বিনিময় একশত চালুক্য রূপসীকে দান করব এ মন্দিরে।'

সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের মুখমণ্ডল এবার কঠিন হয়ে উঠল। তিনি বললেন, 'দেবদাসীদের ব্যক্তিগত মতামত বা ইচ্ছার কোনও মূল্য থাকে না। সোমেশ্বর মহাদেবের ইচ্ছা বা মন্দির কর্তৃপক্ষর ইচ্ছাই শেষ কথা। বহির্জগতের কোনও ব্যক্তির সঙ্গে অথবা পূর্ব জীবনের কোনও ব্যক্তির সঙ্গে দেবদাসীদের সাক্ষাৎ কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। শত শত বৎসর ধরে চলে আসা এই অনুশাসন আমি ভঙ্গ হতে দিতে পারি না। আর, এক শত কেন, এক সহস্র দেবদাসীর বিনিময়েও তাকে আমি ফিরিয়ে দিতে পারি না। স্বয়ং চালুক্যরাজ উপস্থিত হয়ে আমাকে এ অনুরোধ জানালেও তাঁকে প্রত্যাখ্যান করতে হতো। অনুগ্রহ করে বারংবার এই অসম্ভব অনুরোধ করে আমাকে বিব্রতবোধ করবেন না।' কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন ত্রিপুরারিদেব।

আশাহত ভাবে তাঁর কক্ষ ত্যাগ করলেন চন্দ্রদেব। তারপর মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। এই মুহূর্তে তার ঠিক কী কর্তব্য তা বুঝে উঠতে পারলেন না চন্দ্রদেব। তিনি কী সোমনাথ নগরীতে কয়েকটা দিন অপেক্ষা করবেন প্রধান পুরোহিতের মত পরিবর্তনের জন্য। যদিও সে সম্ভাবনা আর নেই বলেই মনে হচ্ছে চন্দ্রদেবের। নাকি তিনি ফিরে যাবেন চালুক্যতে? তবে যাবার আগে অবশ্যই তাকে মহারাজের শ্রাদ্ধ সম্পাদন করে যেতে হবে প্রভাসক্ষেত্রের সমুদ্রতটে।

মন্দির ত্যাগ করে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উপস্থিত হলেন সমুদ্রতটে। যবন হানার আতঙ্কে প্রভাস নগরীতে পুণ্যার্থী বা পারলৌকিক কার্য সম্পাদন করতে আসা লোকজন নেই। সার বেঁধে বসে আর মস্তক মুণ্ডণ করাচ্ছে না ক্ষৌরকারের দল। চন্দ্রদেব শূন্য সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন, 'এমন যদি কারো সন্ধান পাওয়া যায় যে তাঁকে মহারাজের পারলৌকিক কার্য সম্পাদনে সাহায্য করতে পারে!' ঠিক এমন সময় তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হল এক বৃদ্ধ। মাথার চুল তাঁর শনের মতো সাদা। বৃদ্ধ তাকে প্রশ্ন করল, 'আপনি কি পুণ্যার্থী? কোথা থেকে আসছেন?'

চন্দ্রদেব জবাব দিলেন, 'আমি চালুক্য রাজের মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব। আপনার পরিচয়?'

বৃদ্ধ তার শনের মতো চুলে হাত বুলিয়ে বলল, 'প্রণাম আপনাকে। আমি সোমনাথ নগরীর ক্ষৌরকার-প্রধান খগেশ্বর।'

কথাবার্তা শুরু হল তাদের দুজনের মধ্যে।

ঠিক এই সময় অতিথিশালার অন্ধকার কক্ষে শুয়ে ছটফট করছিল অঙ্গিরা। সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না খগেশ্বরের কথাগুলো। সে অজাচার মিলনের ফল। তার এ পরিচিতির থেকে হয়তো জন্ম মুহূর্তেই তার মৃত্যু ঘটা ভালো ছিল। পিতা-মাতা না হয় তাদের সম্পর্কের কথা জেনে মিলিত হয়নি। কিন্তু ব্যাপারটা যখন তারা জানলেন তখন তার জন্মের পরই তাকে কেন নদীতে বিসর্জন দিলেন না? কেন অঙ্গিরাকে তার নিষ্ঠুর পরিচয় দিয়ে পৃথিবীর বুকে রেখে গেলেন আমৃত্যু যন্ত্রণা দেবার জন্য? নিজের পিতা-মাতার ওপর, নিজের ওপর ক্রমশই ঘৃণা বেড়ে চলল তার। এক এক সময় অঙ্গিরার মনে হতে লাগল সে হয়তো বা বুঝি উন্মাদ হয়ে যাবে! বাইরে সময় এগিয়ে চলল, দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল। সন্ধ্যাও নামল। সন্ধ্যারতির ঘণ্টাও বাজল মন্দিরে। কিন্তু সে শব্দ যেন কানে গেল না তার, যেন দিন রাত সময়ের ব্যবধান, কোনও কিছুই তার জীবনে নেই। চতুর্দিকে শুধু জমাট বাঁধা নিকষ কালো অন্ধকার। আর একটাই কথা শুধু তার মনে হচ্ছে, 'আমি অজাচার! আমি অজাচার'!

সন্ধ্যার পর রাত্রি নামল। নিস্তব্ধ হয়ে গেল সোমেশ্বর মহাদেবের আবাসস্থল। বেড়ে চলল রাত্রি। অঙ্গিরার কিন্তু ঘুম এল না। প্রবল ক্লান্তি, হতাশা আর মনবেদনাতে কিছুটা আচ্ছন্নর মতো শয্যাতে পড়ে রইল অঙ্গিরা।

এখন মধ্যরাত। হঠাৎ মৃদু করাঘাতের শব্দ যেন কানে গেল তার। হ্যাঁ, কেউ আঘাত করছে বন্ধ কপাটে। কে এল? ত্রিপুরারিদেব নাকি? নিজের শরীরটাকে কোনও রকমে শয্যা থেকে তুলে কপাট খুলল অঙ্গিরা। দ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে অবগুণ্ঠনরত এক নারী। সে তার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করতেই অঙ্গিরা অবাক হয়ে গেল। রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতা আবছা চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে! দেবদাসী সমর্পিতা কক্ষের ভিতর প্রবেশ করে কপাট বন্ধ করল। আবারও অন্ধকার নেমে এল তার কক্ষে। অঙ্গিরা বিস্মিত ভাবে প্রশ্ন করল, 'তুমি, এখানে কীভাবে এলে?'

দেবদাসী সমর্পিতা জবাব দিল 'তুমি যখন গতরাতেও এলে না তখন অস্থির হয়ে উঠল আমার মন। আর তা সহ্য করতে না পেরে আমি দেবদাসী উত্তরাকে বললাম তার প্রেমিকের মাধ্যমে তোমার সন্ধান দেবার কথা। আজ রাতেও যখন এলে না, তখন তাদের সঙ্গে নিয়ে আমি এখানে এসেছি। কিছুটা তফাতেই তারা আছে। তুমি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওনি কেন? তুমি কি অসুস্থ? না, আমি দেবদাসী বলে কোনও কারণে আমার ওপর ঘৃণা জন্মেছে?'

দেবদাসী সমর্পিতার প্রশ্ন শুনে নিরুত্তর রইল অঙ্গিরা।

অন্ধকারে তাকে দেখতে না পেয়ে, তার কণ্ঠস্বর শুনতে না পেয়ে দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'তুমি কোথায়? নিশ্চুপ কেন? আমার কাছে এসো। তোমাকে একবার দেখার জন্য, একবার স্পর্শ করার জন্য বিপদের ঝুঁকি নিয়েও আমি এখানে এসেছি।'

অঙ্গিরা এবার বলল, 'তুমি ফিরে যাও। আমার পরিচয় জানলে ঘৃণাতে আমার শরীর থেকে হাত সরিয়ে নেবে তুমি।'

চালুক্য রাজকন্যা বলল 'কেন তুমি শূদ্র নাকি? আর শূদ্র হলেও তুমি কি মানুষ নও? আমিও তো এখন রাজদুহিতা থেকে সোমনাথ মন্দিরের সাধারণ দেবদাসী মাত্র। কাছে এসো আমার।'

অঙ্গিরা এবার বলে উঠল, 'না, শূদ্রর থেকেও অনেক ভয়ঙ্কর আমার পরিচয়। আর সে পরিচয় জানলে আমি কখনোই তোমার সঙ্গে মিলিত হতাম না। আমি একজন অস্পৃশ্য অজাচার সন্তান। সহোদর-সহোদরার মিলনের ফলে আমার এই পাপ জন্ম হয়েছে।' অঙ্গিরা কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল সেই অন্ধকার কক্ষে।

রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতা এরপর অন্ধকার হাতড়ে স্পর্শ করল অঙ্গিরার শরীর। তারপর বলল, 'তোমার জন্ম পরিচয় যাই হোক না কেন, তোমার জন্মের ওপর তোমার তো কোনও হাত ছিলনা। আমি জামি আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমিও আমাকে ভালোবাসো। তুমি আমার প্রেমিক, তোমার এ পরিচয়ই আমার কাছে যথেষ্ট।'

দেবদাসী সমর্পিতার কথা শুনেও চুপ করে রইল অঙ্গিরা। দেবদাসী সমর্পিতা এরপর বলল, 'এ মন্দিরে আমার মতো অসহায় নারীর একমাত্র অবলম্বন, ভালোবাসা তুমি। হয়তো তুমি আমার সঙ্গে নিত্যদিন মিলিত হতে পারবে না জানি। কিন্তু তোমাকে দূর থেকে দেখেও বাকি জীবনটা আমি কাটিয়ে দিতে পারব।'

অঙ্গিরার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে তা অনুভব করল দেবদাসী সমর্পিতা। মৃদু নিস্তব্ধতার পর অঙ্গিরা বেদনাহত ভাবে বলল, 'কিন্তু সে দেখাও যে আর সম্ভব হবে না কিছুদিন পর থেকে।'

'কেন তা সম্ভব হবে না?' বিস্মিতভাবে জানতে চাইল দেবদাসী সমর্পিতা।

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'আমার পিতা-মাতা তাদের পাপ মুক্তির জন্য এই মন্দিরে পাঠিয়েছেন। প্রধান পুরোহিত আমাকে সোমেশ্বর মহাদেবের শ্রেষ্ঠ সম্পদ স্যমন্তক মণির প্রহরী হিসাবে নিযুক্ত করতে চলেছেন অন্ধকারময় ভূগর্ভস্থ রত্নকুঠুরীতে। সে কক্ষে একবার কেউ প্রবেশ করলে আর ওপরে উঠে আসতে পারে না। তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।'

কথাটা শুনে কিছু মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে গেল সমর্পিতা। তারপর ক্ষুব্ধ ভাবে বলল, 'না, এ হতে পারে না! এ ঘটনা কিছুতেই ঘটতে দেব না আমি। সোমেশ্বর মন্দিরের প্রাকার আর তোমার আমার মতো কত মানুষের জীবন গ্রাস করবে?'

অঙ্গিরা বলল, 'হয়তো এটাই আমার ললাট লিখন। আমি ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশ পালন না করলে যে আমার পিতা-মাতার আত্মার মুক্তি ঘটবে না। অনন্ত নরকবাস হবে তাদের।'

অঙ্গিরার কথা শুনে দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'তাঁরা কি তোমার পরিণতির কথা জেনে তোমাকে প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ পালন করতে বলে গিয়েছিলেন?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'না, ত্রিপুরারিদেব কি কাজে আমাকে নিয়োগ করবে তা তারা জানতেন না।'

দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'যে ভাবেই তোমার জন্ম হোক না কেন, কোনও পিতা-মাতা তার সন্তানকে জীবন্ত নরকের মাঝে রেখে স্বর্গসুখ লাভ করতে পারেন না, কিছুতেই এভাবে তাদের আত্মা, সন্তানের নরক যন্ত্রণার বিনিময় মুক্তি লাভ করতে পারেন না। সোমেশ্বর মহাদেবও এসব অনুমোদন করেন না বলেই আমার বিশ্বাস। এ সব নিয়ম মানুষেরই সৃষ্টি।'

এ কথা বলে একটু থেমে দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'না, আমি কিছুতেই সে কক্ষে প্রবেশ করতে দেবনা। আমাদের মুক্তির পথ খুঁজতে হবে।'

'মুক্তি! তা কি ভাবে সম্ভব?' জানতে চাইল অঙ্গিরা।

দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'যেভাবেই হোক তা সম্ভব করতে হবে। এ মন্দির ত্যাগ করব আমরা। এ মন্দিরে নিজেদের জীবন বলিদান দেব না আমরা।' একথা বলে অঙ্গিরাকে আলিঙ্গন করে তার শরীরে হাত বোলাতে লাগল দেবদাসী সমর্পিতা। সে স্পর্শে, সে আলিঙ্গনে কোনও যৌনতা নেই, জেগে আছে অঙ্গিরার প্রতি পরম ভালোবাসা, মমত্ব।

এক সময় দেবদাসী সমর্পিতার ভাবনা সঞ্চারিত হতে শুরু করল অঙ্গিরার মনেও। তার মনে হতে লাগল, হ্যাঁ, তাকে মুক্তি পেতে হবে এই সোমেশ্বর মন্দিরের অন্ধকার থেকে। রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতাকে ত্যাগ করে সেই অন্ধকূপে কিছুতেই নামবে না সে। তাতে যদি তার অনন্ত নরকবাস হয় তো হবে।

রাত শেষ হতে চলল এক সময়। দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'এবার আমাকে ফিরতে হবে। তবে মনে রেখো, মুক্তি আমাদের পেতেই হবে।'

অঙ্গিরা দারুণ ভালোবাসায় আবেগে দেবদাসীর ওষ্ঠ চুম্বন করে বলল, 'হ্যাঁ, সে চেষ্টা আমি করব। মুক্তি পেতেই হবে আমাদের। আগামীকাল রাতে আমি তোমার কাছে যাব।'

দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব।'

অঙ্গিরার কক্ষ ত্যাগ করল দেবদাসী সমর্পিতা। সে ফিরে যাবার পর অঙ্গিরা ভাবতে লাগল, 'কিন্তু কীভাবে এ কাজ সম্ভব? সে নিজে নয় মন্দির ত্যাগ করল। দেবদাসী মন্দির ত্যাগ করবে কীভাবে?' একথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার মনে হল নাপিত শিরোমণি খগেশ্বরের কথা। বহুদর্শী সেই বৃদ্ধ কি কোনও ভাবে দেবদাসী সমর্পিতার মুক্তি লাভে সাহায্য করতে পারবে? কিছুক্ষণের মধ্যেই অঙ্গিরার কানে এল সেই স্বর্ণ শৃঙ্খল বেজে ওঠার ঝনঝন শব্দ। ভোর হল প্রভাসতীর্থের সোমেশ্বর মন্দিরে।

২১

একটু বেলার দিকে নিজের কক্ষ ত্যাগ করল অঙ্গিরা। হ্যাঁ, ক্ষৌরকারপতি খগেশ্বরকে তার খুঁজে পাওয়া দরকার। হয়তো বা সে তাদের কোনও মুক্তির উপায় বার করতে পারে। অঙ্গিরা অতিথিশালা ত্যাগ করে মন্দির প্রাঙ্গণে নেমে এল।

শূন্য মন্দির প্রাঙ্গণ। সামান্য কয়েকজন সেবায়েত শুধু ইতস্ততভাবে ঘোরাঘুরি করছে। মন্দিরের দিকে একবার তাকাল সে। চত্বরের ওপরেও কেউ নেই। দিনের বেলাতেও আতঙ্কর ছায়া ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলছে সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরকে। চত্বরের বাইরে বেরোনোর তোরণের দিকে অঙ্গিরা এগোল। দ্বাররক্ষীরা রয়েছে সেখানে। তাদের সঙ্গে কিছু রাজসৈনিকও।

রাজা ভীম কানিথকোট দুর্গে প্রস্থানের আগে সামান্য কিছু সেনাকে মন্দির রক্ষার কাজে নিয়োজিত করে গেছিলেন। তারা এদিন সকালে এসে উপস্থিত হয়েছে। একজন সৈন্যাধ্যক্ষর নেতৃত্বে একশত জন সেনা। সবারই মুখে কেমন যেন চিন্তার ছাপ! সোমেশ্বর মুদ্রাটা সঙ্গেই এনেছিল অঙ্গিরা। প্রধান পুরোহিতের নির্দেশমতো দ্বাররক্ষীরা অঙ্গিরার গতিরোধ করল। অঙ্গিরা মুদ্রাটা দেখাতে তারা তোরণ উন্মুক্ত করল।

বাইরে বেরিয়ে এল অঙ্গিরা। জনশূন্য পথ। যে রাজপথ নগরীর কেন্দ্র থেকে সোজা প্রবেশতোরণের সঙ্গে এসে মিশেছে। তার দু-পাশে ফুল, বিল্ব, ধূপ ইত্যাদি পূজাসামগ্রীর পসরা নিয়ে পুণ্যার্থীদের জন্য বসে থাকে বিপণিরা। তারাও কেউ নেই। কি ভাবে যেন প্রচারিত হয়েছে যে মাধেরার যুদ্ধে যবন বাহিনীর কাছে নাকি পরাজিত হতে চলেছে রাজপুতবাহিনী। আরও তীব্র হয়েছে আতঙ্ক।

এমন জনশূন্য মন্দির, এমন জনশূন্য সোমনাথ নগরী ইতিপূর্বে অঙ্গিরা দেখেনি। মন্দিরকে বেড় দিয়ে অঙ্গিরা এসে উপস্থিত হল সমুদ্রতটে। মৃদু মন্দ ঢেউ এসে ভাঙছে বালুকারাশিতে। বিশালাকৃতির কি যেন একটা পক্ষী এসে বসেছে জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ভূভাগের শেষ সীমানায় প্রোথিত সেই স্তম্ভের মাথায়।

চারদিকে তাকাতে তাকাতে এগোল অঙ্গিরা। এবং সেই স্তম্ভের কাছাকাছি বালুতটে একটা কাষ্ঠখণ্ডের ওপর সে বসে থাকতে দেখল খগেশ্বরকে। অঙ্গিরা উপস্থিত হল তার সামনে। সমুদ্রর নোনা বাতাসে উড়ছে তার শনের মতো সাদা চুল। অসংখ্য বলিরেখাময় মুখমণ্ডলে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। অঙ্গিরাকে দেখে বিষণ্ণভাবে হাসল সে।

কাষ্ঠখণ্ডের অন্য প্রান্তে উপবেশন করল অঙ্গিরা। প্রথম মুখ খুলল ক্ষৌরকার শিরোমণি খগেশ্বর। সে স্তম্ভের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললে 'ওটা কী পক্ষী চেনে? শ্বেত গৃধিনি—শ্বেত শকুন। ওরা সাধারণ গৃধিনির মতো সব মৃতদেহ ভক্ষণ করে না। কেবল মানুষের মৃতদেহ ভক্ষণ করে। ওরা ঘোর অমঙ্গলের প্রতীক। কোথায় মানুষের মৃতদেহ পাবার সম্ভাবনা তা নাকি পূর্বেই জেনে যায় তারা। সেই স্থানে ওরা গিয়ে হাজির হয়। হয়তো বা তেমন কিছুই ঘটতে চলেছে এখানে!'

বহুদর্শী বৃদ্ধ খগেশ্বরের কথা সমর্থন করেই যেন একটা অদ্ভুত চিৎকার করল অশুভ পক্ষীটা। তারপর স্তম্ভ ছেড়ে তার বিশাল ডানা ঝাপটিয়ে সোজা উড়ে গিয়ে বসল মন্দির শীর্ষে স্বর্ণকলসের ওপর। অঙ্গিরা দেখতে পেল অনুরূপ আরও কয়েকটি নরমাংসভূক পক্ষী বসে আছে মন্দির শীর্ষে।

নিজের আসল কথা শুরু করার আগে অঙ্গিরা জানতে চাইল, 'আপনার পৌত্র কেমন আছেন?'

খগেশ্বর জবাব দিল, 'ভালো নেই। হয়তো আজকের বা কালকের রাত পর্যন্তই তার আয়ু। তার মুখে একটুকরো জ্বলন্ত কাঠকয়লা দেবার জন্য আমি অপেক্ষা করে আছি।'

খগেশ্বরের মুখমণ্ডলে জেগে থাকা বিষণ্ণতার কারণটা এবার বুঝতে পারল অঙ্গিরা। হতভাগ্য এক বৃদ্ধ তার পৌত্রর মৃত্যুর জন্য প্রহর গুনছে।

তবুও তার কাছে কথাটা পাড়তেই হবে অঙ্গিরাকে। তাই সে মৃদু ইতস্তত করে বলল, 'আপনার কাছে আমার একটি অনুরোধ আছে। একজনকে এ মন্দির ত্যাগ করার ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে আমাকে।'

জলরাশির দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ বলল, 'কোনও নারী নাকি? কোনও দেবদাসীর প্রেমে পড়েছ? হ্যাঁ, যবন মামুদ হানা দিলে সবথেকে ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা ওই দেবদাসীদের ভাগ্যেই লেখা আছে। ওই শ্বেত গৃধিনিদের থেকে ভয়ঙ্কর মামুদ বাহিনী। জীবন্ত অবস্থাতেই দেবদাসীদের কোমল শরীর তারা ছিঁড়ে খাবে। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব কোনও অবস্থাতেই দেবদাসীদের মন্দির ত্যাগ করতে দেবেন না।

খগেশ্বরের কথা শুনে চমকে উঠল অঙ্গিরা। যবন হানার ফলে এ ব্যাপারটাও যে ঘটবে, তা ভেবে দেখেনি অঙ্গিরা। একটা হিম রক্তস্রোত যেন প্রবাহিত হল তার মেরুদণ্ড বেয়ে। সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, 'হ্যাঁ, সে আমার প্রেমিকা। তাকে যে ভাবেই হোক মুক্ত করতে হবে। সে দেবদাসী সমর্পিতা। সে এক চালুক্য রাজকন্যা।'

অঙ্গিরার শেষ কথাটা কানে যেতেই মৃদু চমকে উঠে খগেশ্বর সমুদ্রর দিক থেকে তার দিকে ফিরে তাকাল। তারপর বলল, 'চালুক্য রাজকন্যা রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতা! তাকে মন্দির থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আর একজন তো এ নগরীতে উপস্থিত হয়েছেন! গতকালই এ স্থানে তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি নগরীতেই এক পান্থশালাতে অবস্থান করছেন।'

বিস্মিত অঙ্গিরা জানতে চাইল, 'কে তিনি?'

বৃদ্ধ জবাব দিল, 'চালুক্যরাজ অম্বুজের মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব। মাধেরার যুদ্ধে চালুক্যরাজ নিহত হয়েছেন। মৃত্যুর আগে তিনি চন্দ্রদেবকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে তাঁর মহামন্ত্রী যেন রাজকন্যা রাজশ্রীকে মন্দির থেকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে চালুক্য সিংহাসনে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন। মন্ত্রী চন্দ্রদেব গতকাল এসে সাক্ষাৎ করেছিলেন ত্রিপুরারিদেবের সঙ্গে। কিন্তু প্রধান পুরোহিত চালুক্য মন্ত্রীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ, চালুক্যনারী এখন আর রাজনন্দিনী রাজশ্রী নন। তিনি এখন দেবদাসী সমর্পিতা।'

অঙ্গিরা, ক্ষৌরকার শিরোমণির কথা শুনে প্রবল বিস্মিত ভাবে বলল, 'তিনি দেবদাসী সমর্পিতাকে রাজসিংহাসনে বসাবার জন্য নিয়ে যেতে এসেছেন! তবে যে ভাবেই হোক তার নিরাপদ আশ্রয়ে তুলে দিতে হবে দেবদাসী সমর্পিতাকে।'

ক্ষৌরকার শিরোমণি মৃদু হেসে বললেন, 'কিন্তু তুমি যাকে মুক্ত করার কথা বলছেন, তিনি কি একবার এ মন্দির থেকে মুক্ত হবার পর তোমাকে প্রেমিক রূপে, স্বামী রূপে গ্রহণ করবেন? তিনি কিন্তু তখন আর সোমনাথ মন্দিরের দেবদাসী নন, তিনি তখন চালুক্য সাম্রাজ্ঞী।'

অঙ্গিরা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল খগেশ্বরের কথা শুনে। তারপর বলল, 'সে আমাকে ভবিষ্যতে গ্রহণ করুক বা না করুক, এই মন্দির থেকে তাকে মুক্ত করতেই হবে। আপনি সেই সাহায্য করুন। কারণ, তাকে আমি ভালোবাসি। তার মঙ্গল কামনা ছাড়া আমার বেশি কোনও কামনা থাকতে পারে না।'

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ ভাবে চেয়ে রইলেন অঙ্গিরার দিকে। হয়তো বা সে মনে মনে খুশিই হল দেবদাসী সমর্পিতার প্রতি অঙ্গিরার ভালোবাসা দেখে।

কর্মপন্থা ভেবে নিয়ে খগেশ্বর বলল, 'তোমার ওই সোমেশ্বর মুদ্রাই পুরুষের ছদ্মবেশে তাকে মন্দির ত্যাগ করতে সাহায্য করবে। ঠিক যেভাবে নিজের সোমেশ্বর মুদ্রা প্রেয়সী তিলোত্তমার হাতে তুলে দিয়ে পুরুষের ছদ্মবেশে তাকে মন্দির ত্যাগ করিয়েছিলেন সেবায়েত প্রধান বিষধারী।

আমি মন্দিরের স্থায়ী বাসিন্দা নই। আমার মন্দিরে ঢুকতে বেরোতে কোনও বাধা নেই। দেবদাসী সমর্পিতার পশ্চাতেই মন্দির ত্যাগ করব আমি। মহামন্ত্রী চন্দ্রকে আমি আগাম খবর জানিয়ে রাখব। তাদের দুজনকে আমি নগরীর বাইরে কোনও নিরাপদ স্থানে রেখে আসব। তারা সেখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করবেন।

চালুক্য কন্যাকে তুমি মুদ্রাটা আমার হাতে সমর্পণ করতে বলবে। সেটা নিয়ে আমি মন্দিরে ফিরে এসে তোমাকে দেব। আপনি সেই মুদ্রা নিয়ে মন্দির ত্যাগ করে মিলিত হবেন তাদের সঙ্গে। এ কাজের প্রবল ঝুঁকি আছে। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে দ্বাররক্ষীরা ছদ্মবেশী দেবদাসীর তল্লাশি নেবার সময় সে যে নারী তা প্রকাশ পেতে পারে। তাকে অনুসরণও করতে পারে কেউ। কিন্তু এ পথ ছাড়া বর্তমানে আর অন্য কোনও পথ খোলা নেই।' এরপর একটু থেমে খগেশ্বর বলল, 'তবে এ কাজের জন্য দুটো রাত অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। আমার হতভাগ্য পৌত্রর জীবনদীপ নিভে না যাওয়া পর্যন্ত, তার মুখে শেষ জলটুকু অন্তত দিতে চাই আমি।'

অঙ্গিরা বলল, 'কিন্তু আজ বা কালই যবন বাহিনী মন্দিরে হানা দেবে না তো?'

এ প্রশ্ন শুনে খগেশ্বর মনে মনে একটি হিসাব করে নিয়ে বলল, 'যদি ধরে নিই তিন-চার দিন আগেই মাধেরার যুদ্ধ শেষ হয়ে থাকে তবে অতবড় উষ্ট্রবাহিনী নিয়ে যবনদের সোমনাথ পৌঁছতে অন্তত আরও চারদিন সময় লাগবে। তার মধ্যেই আশা করি তোমরা মুক্ত হতে পারবে। দেবদাসী সমর্পিতার পোশাকের ব্যবস্থা করব। আমি যে তার কাছে যাব সেকথা জানিয়ে রাখবে।'

অঙ্গিরা, তার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বলল, 'আপনি সে চেষ্টাই করুন। আপনাকে কীভাবে যে ধন্যবাদ দেব আমি জানি না!'

বৃদ্ধ ক্ষৌরকার শিরোমণি ভারাক্রান্ত গলায় বলল, 'আমাকে ধন্যবাদ জানাতে হবে না। শুধু কামনা কোরো, আমার পৌত্রর আত্মা যেন একটু শান্তি পায়।' এ কথা বলার পর উঠে দাঁড়াল খগেশ্বর। অঙ্গিরা তার থেকে বিদায় নিয়ে মন্দিরে ফেরার পথ ধরল। আর ক্ষৌরকার শিরোমণি চলল নগরীর কেন্দ্রস্থলের দিকে চালুক্য মহামন্ত্রীকে বার্তা দেবার জন্য।

সমুদ্রতট থেকে ফিরে এসে অতিথিশালাতেই সারা দিন কাটিয়ে দিল অঙ্গিরা। দিবাবসানে সন্ধ্যা নামল। অঙ্গিরা শুনতে পেল সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি। তারপর একসময় সব কিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অঙ্গিরার সময় যেন আর কাটতেই চায় না। তবে সময়ের নিয়মেই রাত্রি একসময় মধ্য যামে পৌঁছল।

অঙ্গিরা সোমেশ্বর মুদ্রা সঙ্গে করে রওনা হল দেবদাসীদের আবাসস্থলের দিকে। কুয়াশা মাখা রাত্রিতে সেই চন্দ্রমন্দিরের পাশ দিয়ে যাবার সময় অঙ্গিরা একবার থমকে দাঁড়িয়ে তাকাল সেই অন্ধকার মন্দিরের দিকে। হয়তো খগেশ্বর এখন বসে আছে মৃত্যুপথযাত্রী অন্ধকারের প্রহরীর কাছে। এ কথাটা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার হাঁটতে শুরু করল সে।

কিছু সময়ের মধ্যেই অঙ্গিরা প্রবেশ করল দেবদাসীদের আবাসস্থলে। চত্বরে উঠে এসেই সে দেখতে পেল নির্দিষ্ট স্থানে তার প্রতীক্ষাতে দাঁড়িয়ে আছে দেবদাসী সমর্পিতা। অঙ্গিরা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেবদাসী সমর্পিতা তাকে দুই বাহু দিয়ে আলিঙ্গন করল।

অঙ্গিরা প্রবল মমতায় তার ওষ্ঠ চুম্বন করে বলল, 'তুমি হয়তো বা চালুক্য সাম্রাজ্ঞী হতে চলেছ।'

দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'একথা বলার অর্থ? পরিহাস নয়তো?'

অঙ্গিরা বলল, 'না, পরিহাস নয়। মাধেরার যুদ্ধক্ষেত্রে চালুক্য রাজের মৃত্যু হয়েছে। মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব তোমাকে নিতে এসেছেন চালুক্য সিংহাসনে বসাবার জন্য। যদিও ত্রিপুরারিদেব তোমাকে মন্দির ত্যাগ করতে দিতে রাজি হননি, কিন্তু তোমার মুক্তির ব্যবস্থা ক্ষৌরকার শিরোমণি খগেশ্বর করবেন।'

কথা শুনেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল চালুক্য রাজকন্যা রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতার মুখ। সে বলে উঠল, 'সত্যি, মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব আমাকে চালুক্যরাজ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন?'

অঙ্গিরা বলল, 'হ্যাঁ, সত্যি।'

এ কথা বলার পর অঙ্গিরা খগেশ্বরের মুখে শোনা কথাগুলি, তাদের পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করল দেবদাসী সমর্পিতাকে। আসন্ন মুক্তির সম্ভাবনায় ঝলমল করে উঠল দেবদাসীর মুখমণ্ডল। সে বলল, 'সোমেশ্বর মহাদেব সত্যি করুণাময়। তিনি আছেন। আমার প্রার্থনা তিনি শুনেছেন। তিনিই আমাদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করছেন।'

এ কথা বলার পর একটু হেসে দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'আমি ওই ঘুঙুর ছড়াটা শুধু সঙ্গে করে নিয়ে যাব এ মন্দির থেকে। ওই ঘুঙুর ছড়াই তো আমাদের দুজনকে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। চালুক্য নগরীতে সোমনাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা করে সেখানে সোমেশ্বর মহাদেবের এই দানকে দেবতা জ্ঞানে পুজা করব আমি।'

কিন্তু এ কথা বলার পর চালুক্য রাজদুহিতা খেয়াল করল অস্পষ্ট চাঁদের আলোতে কেমন যেন একটা বিষণ্ণতা জেগে আছে অঙ্গিরার মুখমণ্ডলে।

দেবদাসী সমর্পিতা তা দেখে প্রশ্ন করল, 'তোমার চোখে বিষণ্ণতার ভাব কেন?'

অঙ্গিরা প্রথমে হেসে বলল, 'ও কিছু নয়।'

দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'তবে তোমার মুখে আনন্দের হাসি নেই কেন? কোনও ভাবনা গোপন কোরো না।'

অঙ্গিরা এবার বলেই ফেলল কথাটা, 'তুমি চালুক্য দেশের রানি হতে চলেছ। তুমি কি আমার মতো সাধারণ মানুষকে তোমার সঙ্গী করতে পারবে। তার ওপর আমি আবার অজাচার। তবু আমি চাই, দেবদাসী জীবনের অন্ধকার থেকে মুক্তি ঘটুক তোমার। তুমি ফিরে যাও তোমার নিজের দেশে। রানি হও তুমি।'

রাজকন্যা রাজশ্রী কয়েক মুহূর্ত অঙ্গিরার দিকে চেয়ে থাকার পর বলল, 'যখন তোমার সঙ্গে আমার ভালোবাসা, তখন এ সম্ভাবনা আমার সামনে উপস্থিত হবে তা আমরা কেউই জানতাম না। তুমি ভালোবেসেছিলে সামান্য একজন দেবদাসীকে। তোমার সে মহত্ত্ব, সে ভালোবাসাকে আমি অস্বীকার করব কী ভাবে? তোমার আমার মিলন ঘটাবার জন্যই হয়তো বা সোমেশ্বর মহাদেব তার পদতলে আমাদের দুজনকে হাজির করেছিলেন। আমি তোমার জন্য চালুক্য সিংহাসনও ফিরিয়ে দিতে পারি। আমার ভালোবাসা আমি ত্যাগ করব কী ভাবে? জন্ম-জন্মান্তরের সাথী আমরা।'

এ কথা বলার পর দেবদাসী সমর্পিতা হাত দিয়ে অঙ্গিরার মাথাটা টেনে নামিয়ে আনল নিজের মুখের ওপর। তার ওষ্ঠ স্পর্শ করল অঙ্গিরার ওষ্ঠ। প্রগাঢ় সেই চুম্বন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আদিম মানব-মানবীর রক্ত ছলকে উঠল নর-নারীর শরীরে। অঙ্গিরা, প্রেয়সীর শরীরটাকে নিয়ে গেল স্তম্ভের আড়ালে। গাঢ় কুয়াশা নামতে শুরু করেছে প্রাঙ্গণ জুড়ে। তার আড়ালে হারিয়ে গেল তারা দুজন।

শেষ রাতে প্রেয়সীর বাহুডোর থেকে নিজেকে মুক্ত করল অঙ্গিরা। সোমেশ্বর মুদ্রাটা দেবদাসী সমর্পিতার হাতে দিয়ে সে বলল, 'হয়তো বা এমন গোপনে আর মিলিত হতে হবে না আমাদের। এবার আমি আসি?'

দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'হ্যাঁ, সেই পরম নিশ্চিন্ত মিলনের জন্য আমিও অপেক্ষা করে রইলাম। কোনও শঙ্কা রেখো না মনে। আমার কথায় বিশ্বাস রেখো। জেনো তোমাকে পাবার জন্য রাজসিংহাসন ত্যাগ করতেও প্রস্তুত।'

অঙ্গিরা হেসে বলল, 'হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করলাম তোমার কথা।'

অঙ্গিরা যখন অতিথিশালাতে ফিরে এসে শয্যা গ্রহণ করল তার কিছু সময়ের মধ্যেই বেজে উঠল সেই স্বর্ণ শৃঙ্খল। আরও একটা আশঙ্কার ভোর শুরু হল সোমনাথ মন্দিরে।

২২

ভোর হল অন্য এক স্থানেও। যে পথ বেয়ে সোমনাথ মন্দিরের সন্ধানে দ্রুত এগোচ্ছে সুলতান মামুদের কাফেলা। সঙ্গে তাদের পথ প্রদর্শক কাসেম নেই। তাই কিছুটা অনুমানের ভিত্তিতেই পথ চলছে সেই বিশাল বাহিনী। মাধেরা মন্দিরের কুণ্ড থেকে তারা পর্যাপ্ত জল খাইয়ে নিয়েছে উষ্ট্র বাহিনীকে। তাই প্রাণীগুলো দিন রাত ক্লান্তিহীন ভাবে ছুটে চলেছে। শুধু সওয়ারীদের বিশ্রামের প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে থামানো হচ্ছে সেই জিহাদি বাহিনীকে। তবে কোথাও শিবির স্থাপন করা হচ্ছে না। কোনওক্রমে রন্ধন আহারকার্য সমাপ্ত করেই এগোচ্ছে তারা।

সুলতানের অনুমান হয়তো বা মাঝরাতে কাফেরদের পরাজয়ের সংবাদ তাদের আগেই পৌঁছে যাবে ওই সোমনাথ মন্দিরে। সে সংবাদ পেয়ে কাফেরগুলো যাতে মন্দিরের ধনসম্পদ নিয়ে পালাতে না পারে তাই যত দ্রুত সম্ভব সেখানে পৌঁছোনো দরকার। তাই ছোটার বিরাম নেই। এদিন সূর্যোদয়ের পর মামুদ হিসাব করে দেখলেন গজনী থেকে যাত্রা শুরু করার পর এটা আটত্রিশতম দিন!

আলো ফোটার বেশ কিছু সময় পর চলয়মান বাহিনী তাদের যাত্রা পথের পাশে একটা বনভূমি দেখতে পেল। সারারাত ধরে উটের পিঠে চলেছে জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকরা। মামুদ নির্দেশ দিলেন সেই বনভূমির পাশে কিছু সময় যাত্রা স্থগিত করার জন্য। সেই মতো থামল বাহিনী। নিজের উটের পিঠ থেকে অবতরণ করলেন সুলতান। তাঁর বিশ্রামের জন্য একটা শামিয়ানা টাঙিয়ে গালিচা বিছিয়ে দিল তার অনুচররা। সুলতান সেখানে উপবেশন করলেন। বাহিনীর লোকজন খাদ্য প্রস্তুত ইত্যাদি নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

হঠাৎ কাফেলার অগ্রবর্তী বাহিনীর লোকরা দেখতে পেল কিছুটা দূরে অরণ্যের একপাশ থেকে আত্মপ্রকাশ করে অন্যদিকে পালাবার চেষ্টা করছে এক অশ্বারোহী! এমন দৃশ্য মাঝে মাঝেই তাদের চোখে পড়ে। তাদের দেখে আতঙ্কে ছুটে পালাচ্ছে কেউ। এ দৃশ্য তাদের মধ্যে বেশ কৌতুক প্রদান করে। কিন্তু হঠাৎ তারা খেয়াল করল অশ্বারোহীর সঙ্গে ঘোটকপৃষ্ঠে একজন নারীও আছে। আর এ ব্যাপারটাই বিশেষ ভাবে প্রলুব্ধ করল স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর যুবকদের। তাদের কয়েকজন ঘোড়া ছুটিয়ে দিল পলায়মান ঘোড়সওয়ারকে লক্ষ করে। দ্রুতগামী তুর্কী ঘোড়াগুলো ধরে ফেলল তাদেরকে।

চাঁদোয়ার নীচে বসে গজনীর সুলতান তখন শুকনো খেজুর আর দ্রাক্ষা ফল দিয়ে আহার সাঙ্গ করছিলেন। এমন সময় এক প্রবীণ যোদ্ধা ও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক তার সামনে হাজির করল দুজনকে। তাদের দুজনের একজন মুণ্ডিত মস্তক পুরুষ, অন্যজন এক অপরূপ সুন্দরী নারী। দুজনেই আতঙ্কে কাঁপছে।'

মামুদ তাদের দিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জানতে চাইল, 'এরা কারা?'

যোদ্ধা জবাব দিল, 'এরা জঙ্গলে আত্মগোপন করেছিল। এগুলো এই কাফেরদের কাছে পাওয়া গেছে।'—এই বলে লোকটা একটা থলে উপুড় করে দিল সুলতানের পায়ের কাছে। সূর্যের আলোতে ঝলমল করে উঠল বেশ কয়েকটা হীরকখণ্ড। তা দেখে মৃদু বিস্মিত হলেন সুলতান। তবে সেই হীরখণ্ডের সঙ্গে তার পদতলে পড়ে থাকা অন্য একটা জিনিস দৃষ্টি আকর্ষণ করল সুলতানের। জিনিসটা ঘুরিয়ে দেখলেন তিনি। বেশ বড় একটা স্বর্ণমুদ্রা। তার একপাশে খোদিত একটা মন্দিরের ছবি, আর অন্য পাশে খোদিত আছে স্বাক্ষর।

সুলতান শুভ্রবসন মুণ্ডিত মস্তক কাফেরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'এ কার মুদ্রা?'

নিশ্চুপ রইল লোকটা।

সুলতান জবাব না পেয়ে ক্ষুব্ধ ভাবে বললেন, 'জবাব দে কাফের?' এই বলে তিনি হাত রাখলেন তার পাশে শোয়ানো তলোয়ারের ওপর। আর তা দেখেই সেই কাফেরের সঙ্গিনী আতঙ্কে বলে উঠল, 'সোমনাথ মন্দিরের।'

'সোমনাথ মন্দির!' কথাটা শুনে মুহূর্তের মধ্যে সোজা হয়ে বসলেন সুলতান। মুদ্রায় খোদিত মন্দিরের ছবিটা আর একবার দেখে নিয়ে তিনি জানতে চাইলেন, 'এ মুদ্রা তোরা কোথায় পেলি? কোথা থেকে আসছিস তোরা?'

কাফেরটা এবার নতজানু হয়ে বসে হাতজোড় করে বলল, 'এই হীরকখণ্ড, মুদ্রা সবই আপনি নিয়ে নিন সেনাপতি। আমরা সোমনাথ মন্দিরের বাসিন্দা। মন্দির থেকে পালাচ্ছিলাম। আমাদের যেতে দিন।'

এই যবন নারী-পুরুষ সোমনাথ মন্দিরের বাসিন্দা! মৃদু বিস্মিত ভাবে সুলতান জানতে চাইলেন, 'চুরি করে পালাচ্ছিলি? পালাচ্ছিলি কেন?'

কাফের জবাব দিল, 'হ্যাঁ, সুলতান মামুদের আতঙ্কে।'

গজনীবিদ এবার অট্টহাস্য করে বলে উঠল, 'আমি কে জানিস? আমি গজনীর মালিক সুলতান মামুদ।'

কথাটা শুনেই যেন প্রবল বিস্ময় আর আতঙ্কে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল সোমনাথ মন্দিরের সেবায়েত প্রধান বিষধারী। দেবদাসী-প্রধান তিলোত্তমাও কাঁপতে কাঁপতে নতজানু হয়ে বসে পড়ল তার পাশে।

আবার গম্ভীর হয়ে গেলেন গজনীবিদ। তারপর হীরকখণ্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এমন হিরে, সোনা সেখানে প্রচুর আছে তাই না?'

বিষধারী বলল, 'হ্যাঁ, প্রচুর। এ শুধু কণামাত্র। আমাদের আপনি মুক্তি দিন।'

মামুদ জানতে চাইলেন 'সেখানে কত সৈন্য আছে?'

বিষধারী জবাব দিল, 'সৈন্য নেই। মন্দির রক্ষী আর দ্বার রক্ষীর মিলিত সংখ্যা একশত মতো। আর এক সহস্র মতো নারী-পুরুষ মন্দিরবাসী আছে। দোহাই আমাদের মুক্তি দিন।'

সুলতান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, 'তোকে আমি এক শর্তে মুক্তি দেব। তুই আমাকে পথ দেখিয়ে সোমনাথ মন্দিরে নিয়ে যাবি?'

সুলতানের কথা শুনে নিশ্চুপ হয়ে গেল বিষধারী। মন্দিরের রত্ন আর দেবদাসীকে হরণ করে সে পালিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই ভয়ঙ্কর যবন সুলতানকে পথ দেখিয়ে সেখানে নিয়ে গেলে কি পরিণাম হবে তা তাঁর অনুমান করতে বাকি নেই। হাজার হোক মন্দিরের প্রধান সেবায়েত রূপে এতদিন সে কাজ করেছে। সোমনাথের সেবা করেছে।

তাকে স্তব্ধ থাকতে দেখে সুলতান ত্রু্ুদ্ধ ভাবে বলে উঠলেন, 'জবাব দে। সময় নষ্ট করিস না। নইলে এখনই তোকে বধ করব। আর তোর সুন্দরী জেনেনাটাকে তুলে দেব যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের হাতে। এমন সুন্দরী জেনেনা ওরা অনেকদিন পায়নি।'

দেবদাসী তিলোত্তমা দেখতে পেল আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা যবন যুবকরা তাদের হলদেটে দাঁত বার করে নিঃশব্দে হাসছে তার দিকে তাকিয়ে। শ্বাপদের হাসি! সুলতান নির্দেশ দিলেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর! এ দৃশ্য আর সহ্য করতে না পেরে মূর্ছিত হয়ে ঢলে পড়ল দেবদাসী তিলোত্তমা। আর প্রেয়সীর সেই দৃশ্য দেখে তার ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা ভেবে প্রবল আতঙ্কিত সেবায়েত প্রধান সুলতানের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, 'আমি আপনাকে সোমনাথ মন্দিরে নিয়ে যাব। দয়া করে এই নারীকে হত্যা করবেন না।'

বিষধারীর কথা শুনে হাসি ফুটে উঠল সুলতানের ঠোঁটের কোণে। তিনি বললেন, 'এই জেনেনাকে হাত-পা বেঁধে উটের গলা থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। খাদ্য-পানীয় পাবে না। ওর জীবন-মৃত্যু নির্ভর করছে কত দ্রুত তুই আমাকে সে মন্দিরে পৌঁছে দিতে পারিস তার ওপর।'

কথাটা শুনে তাঁর এ সিদ্ধান্ত রদ করার জন্য তাঁর পা জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিল বিষধারী। কিন্তু একজন তার শিখাগুচ্ছ ধরে টান দিয়ে সুলতানের পাদস্পর্শ করতে দিল না।

হুকুম দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন সুলতান। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর নির্দেশ পালিত হল। মূর্ছিত হতভাগ্য দেবদাসী তিলোত্তমাকে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হল একটা উটের গলাতে। বিষধারীকেও তুলে দেওয়া হল সওয়ারী সমেত আর এক উটের পিঠে। যাত্রা করার মুহূর্তে সোমনাথ মন্দিরের সেবায়েত প্রধান মনে মনে বলল, 'হে সোমেশ্বর মহাদেব। আমার এ মহাপাপ ক্ষমা করো তুমি। আমি নিরুপায়।'

বিষধারীর দেখানো পথ বেয়ে সোমনাথ নগরীর দিকে ছুটে চলল সুলতান মামুদের যবন বাহিনী।

ছুটছিল আরও একজন তার ঘোড়ার পিঠে। সে কাসেম। তিরটা কোনওক্রমে পিঠ থেকে খসিয়ে ফেলেছে সে। পথে একটা জনশূন্য গ্রাম পড়েছিল দুদিন আগে। সুলতান হানার ভয়ে সে গ্রামের বাসিন্দারা পালিয়েছে অন্যত্র। সৌভাগ্যক্রমে সেখানে তাদের ফেলে রাখা ঘোড়া পেয়েছিল কাসেম। ঘোড়া বদল করে আবারও ছুটেছে সে। কিন্তু ক্রমে ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে আসছে তার শরীর। ঘোড়াটাও যেন অবসন্ন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া আরও এক সন্দেহ ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে তার মনে। অন্ধকারের মধ্যে তিনদিন ঘোড়া ছোটাবার সময় রাত্রির অন্ধকারে দিক ভুল করেছে সে। নইলে গত কালই ভোরে তো তার সোমনাথ নগরীতে পৌঁছে যাবার কথা ছিল। কিন্তু গতকাল সারাটা দিন, তারপর রাত পেরিয়ে আজ এত বেলা হয়ে গেল তবু সোমনাথ মন্দিরের স্বর্ণচূড়া চোখে পড়ল না।

বহু যোজন দূর থেকে আকাশের গায়ে দিনের আলোতেও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো তাকে চোখে পড়ে। আর এ ব্যাপারটাই আরও অবসন্ন করে তুলেছে কাসেমকে। সে মনে মনে বলছে, 'হে দেবতা পথের দিশা দেখাও, কিন্তু সে দিশা মিলছে না। কোনওক্রমে এগোতে থাকল কাসেম। দ্বিপ্রহর অতিক্রান্ত হল। তারপর ঘোড়াটাও ধুঁকতে শুরু করল।

বিকাল নাগাদ হঠাৎই পথের পাশে অন্য একটি মন্দিরের ধ্বজা দেখতে পেয়ে সেদিকে ঘোড়া নিয়ে এগোল সে। সেই মন্দিরের সামনে পৌঁছেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল ঘোড়া। কাসেমও ছিটকে পড়ল মাটিতে। কোনওক্রমে উঠে বসে মন্দিরটার দিকে তাকাল সে। জনশূন্য মন্দির। সুলতানের ভয়ে মন্দিরবাসীরাও পালিয়েছে সম্ভবত। কিন্তু মন্দিরটা দেখে চিনতে পারল কাসেম। এ মন্দিরে ইতিপূর্বে সে একবার এসেছিল মুক্তমালা বিক্রির জন্য। বিষ্ণুদেবতার মন্দির। আর তার সঙ্গে সঙ্গে কাসেম এটাও বুঝতে পারল সে পথ ভুল করেছে। প্রথম দু-দিন ঠিক পথেই এগিয়ে ছিল সে। তারপর পথ ভুল করে পশ্চিমের বদলে পূর্ব দিকে চলে এসেছে। ঘোড়ার পিঠে আবার সোমনাথ নগরীতে পৌঁছতে অন্তত তিনদিন লাগবে আর পদব্রজে সাত দিন। কিন্তু কাসেমের ঘোড়াটা মৃত। তবে কি শেষ রক্ষা হল না?

কাসেম বলে উঠল, 'হে দেবতা, তুমি কি আমার পাপ ক্ষমা করবে না!' তার পরই হঠাৎ একদল সশস্ত্র অশ্বারোহী মন্দিরের ভিতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল ভূপতিত কাসেমকে। কাসেমের পরনে যবনদের পোশাক দেখে তারা সুলতান বাহিনীর গুপ্তচর ভেবে তার দিকে বর্শা উদ্যত করল সৈনিকরা। তারা ভোজরাজের সৈনিক। মহারাজ ভোজ কিছু অশ্বারোহী সৈনিককে আগে পাঠিয়েছেন তার বিশাল হস্তিবাহিনীর পথ নির্ণয়ের জন্য। তিনদিনের দূরত্বে তিনি তার বিশাল হস্তিবাহিনী সমৃদ্ধ সেনাদল নিয়ে আসছেন সুলতান বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য। হস্তিবাহিনীকে কর্দমাক্ত জমি, ফসলের খেত এসব এড়িয়ে চলতে হয়। সে জন্য উপযুক্ত পথের খোঁজে অগ্রবর্তী অশ্বারোহী দলের প্রয়োজন হয়। সৈনিকরা তার দিকে বর্শা নিক্ষেপ করতে উদ্যত হয়েছে দেখে কাসেম কাতর কণ্ঠে বলল, 'তোমারা আমাকে বধ করার আগে আমার কথা শোনো। তোমরা কারা?'

একজন সৈনিক বলল, 'তুই কে? আমরা ভোজরাজ পরমদেওর সৈনিক।'

কাসেম বলল, 'আমি কাসেম। পূর্বনাম ছিল কৃষ্ণ। সুলতান মামুদ আমাকে ক্রীতদাস করে গজনীতে নিয়ে গেছিলেন। তার সঙ্গেই আমি আবার এদেশে এসেছি। কিন্তু আমি তার শিবির থেকে পালিয়েছি। মাধেরা সূর্য মন্দির ধ্বংস করেছেন সুলতান। এবার তিনি সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করতে আসছেন। সে খবর আমি তাদের দিতে যাচ্ছিলাম।'

একজন কথাগুলো শুনে প্রশ্ন করল, 'তুমি যে সত্যি বলছ তার প্রমাণ কি?'

কাসেম বলল, 'দেখো আমার পিঠে তিরের ক্ষতচিহ্ন। সোমেশ্বর মহাদেব জানেন আমি মিথ্যা বলছি না।' এরপর আর কোনও কথা বলতে পারল না সে। প্রবল ক্লান্তিতে মূর্ছিত হয়ে পড়ল কাসেম। সৈনিকরা নেমে পরীক্ষা করল তার ক্ষতচিহ্নটা। লোকটা মিথ্যা বলছে না। তারা শুশ্রুষা শুরু করল কাসেমের। কিছুক্ষণের মধ্যে চোখ মেলল কাসেম। কিছুটা সুস্থ হবার পর সে বলল, 'আমাকে তোমরা সোমনাথ মন্দিরে নিয়ে চলো।'

অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান বলল, 'মহারাজ এখানে না উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত আমরা সেদিকে এগোবনা। আমি তোমাকে মহারাজের কাছে পাঠাচ্ছি।'

কাসেম বলল, 'তবে তাই করো।' সময় নষ্ট কোরো না। তাকে অনেক সংবাদ জানাবার আছে সুলতান বাহিনীর সম্বন্ধে।

অশ্বারোহী প্রধানের নির্দেশে কয়েকজন ঘোড়সওয়ার কাসেমকে একটা ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে রওনা হয়ে গেল হিন্দু সম্রাট রাজাভোজ পরমদেও যে পথে আসছেন সেদিকে। সূর্য ডুবে গেল।

সূর্য ডুবল সোমনাথ নগরীর বুকেও। অন্ধকার নামল সোমনাথ মন্দিরে। সারাদিন নিজের কক্ষেই কাটিয়েছে অঙ্গিরা। সোমেশ্বর মুদ্রাটা তার কাছে না থাকায় মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে সমুদ্রতটে গিয়ে খগেশ্বরের সঙ্গে তার সাক্ষাতের উপায় ছিল না। কিন্তু অঙ্গিরা যে সেই মুদ্রা দেবদাসী সমর্পিতাকে দিয়ে এসেছে এবং সমগ্র পরিকল্পনা তাকে জানিয়েছে, সে ব্যাপারটা সম্বন্ধে ক্ষৌরকার শিরোমণিকে অবগত করা প্রয়োজন।

অঙ্গিরা ভেবে রেখেছিল অন্ধকার নামার পরই এদিন সে বেরিয়ে পড়বে। প্রথমে সে যাবে সেই চন্দ্রমন্দিরে। সেখানে খগেশ্বরের সঙ্গে কথা বলে, সেই মৃত্যুপথযাত্রীর বর্তমান অবস্থা জানার পর রাত একটু গভীর হলে রওনা হবে দেবদাসী সমর্পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। অঙ্গিরা তার সেই পরিকল্পনা মতো মন্দিরের শেষ আরতি ঘণ্টার শব্দ বেজে ওঠার কিছু সময়ের মধ্যেই অতিথিশালা ত্যাগ করল।

সন্ধ্যারতি শেষ করে দেবদাসীরা ফিরে যাবার পরই অঙ্গিরা দেখতে পেল মন্দিরের প্রবেশচত্বর শূন্য হয়ে গেছে। অন্ধকারের সঙ্গে-সঙ্গে গাঢ় কুয়াশাও নামতে শুরু করেছে। তার মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে অঙ্গিরা এগিয়ে চলল।

সেই প্রাচীন চন্দ্রমন্দিরের সামনে পৌঁছেই অঙ্গিরা দেখতে পেল মন্দিরের প্রবেশ পথে বৃদ্ধ খগেশ্বর দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ধরা আছে একটা থলে। তার মুখমণ্ডলের বিষণ্ণতা যেন একটু গাঢ়।

অঙ্গিরা তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, 'তিনি কেমন আছেন?'

বৃদ্ধ তার কথার জবাবে ইশারাতে মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করতে বলল তাকে। এদিন আর খগেশ্বর প্রদীপ জ্বালাল না। অন্ধকারে তার পিছনে হাঁটতে হাঁটতে দেবদাসী সমর্পিতার সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা বলল অঙ্গিরা। ক্ষৌরকার শিরোমণি চুপচাপ শুনে গেল তার কথা। নির্দিষ্ট সেই কক্ষের সামনে উপস্থিত হতেই একটা অদ্ভুত গন্ধ নাকে এসে লাগল অঙ্গিরার।

বৃদ্ধ তাকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল। প্রদীপ জ্বলছে কক্ষে। সেই আলোতে অঙ্গিরা দেখতে পেল মাটিতে শুয়ে আছে অন্ধকারের প্রহরীর নিথর দেহ। তার মুখের মধ্যে পোড়া আছে একটা জ্বলন্ত কাঠকয়লা। মাংস পোড়ার গন্ধ ছড়াচ্ছে তার থেকে! এক বীভৎস করুণ দৃশ্য! বৃদ্ধ খগেশ্বর অঙ্গিরার উদ্দেশ্যে প্রথমে বলল 'কিছু সময় আগেই সব শেষ হয়ে গেছে! একজন শূদ্র যে তার অন্তেষ্টির জন্য জ্বলন্ত কাঠ কয়লার টুকরোটা পেল এটাই তার পক্ষে যথেষ্ট।'

এ কথা বলার পর বৃদ্ধ প্রচণ্ড ক্ষোভের সঙ্গে বলল, 'এসব কিছুর জন্য দায়ী ত্রিপুরারিদেব। আমি তাঁকে এমন আঘাত দেব যা সুলতান মামুদও দিতে পারবে না। তার পাপেই নিঃস্ব হতে চলেছে এ মন্দির।'

অঙ্গিরা নিশ্চুপ ভাবে দাঁড়িয়ে রইল তার কথা শুনে। অঙ্গিরারও মনে হল এসব কিছুর মূলেই রয়েছেন ত্রিপুরারিদেব। তাঁর নির্দেশেই তো পরিচালিত হয় সোমেশ্বর মহাদেব মন্দির।

বৃদ্ধ হয়তো এরপর বুঝতে পারল জ্বলন্ত কাঠ কয়লা মুখে পোরা মৃতদেহটা অঙ্গিরার কাছে অসহ্য মনে হচ্ছে। তাই সে তাকে বলল, 'সত্যিই আমি মুক্ত করব সেই দেবদাসীকে। তুমি চিন্তা কোরো না। আমার এই পুঁটুলিতে পুরুষের পোশাক আছে। তোমার সামনে যে দেহটা পুড়ছে তাকে বাইরে বের করে নিয়ে যাবার জন্যই ক'দিন আগে এ পোশাক এনেছিলাম। সে কাজ তো আর হল না। আমার আর কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে এখানে। যতক্ষণ না ওই অঙ্গারের আগুন নিভে যায়। তারপর পাথর খণ্ড সাজিয়ে কক্ষের প্রবেশ মুখটাও বন্ধ করতে হবে যাতে কোনও প্রাণী মৃতদেহর সন্ধান না পায় সেজন্য। ততক্ষণ তুমি বাইরে প্রতীক্ষা করো।'

অঙ্গিরা বাইরে এসে প্রতীক্ষা করতে লাগল। বেশ অনেকটা সময় পর কক্ষত্যাগ করল খগেশ্বর। বৃদ্ধের ক্লেশ লাঘবের জন্য অঙ্গিরা নিজেই আশেপাশে পড়ে থাকা পাথরখণ্ড তুলে এনে কক্ষের প্রবেশ মুখ বন্ধ করতে লাগল। একসময় সাঙ্গ হল তার কাজ। কক্ষর দিকে শেষ একবার দৃষ্টিপাত করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হতভাগ্য বৃদ্ধ বলল 'এ মন্দির আর ওকে মুক্তি দিল না। সোমেশ্বর মহাদেব যেন তোমাদের অন্তত মুক্তি দেন।'

মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এল তারা দুজন। নিশ্চুপ ভাবে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় দুজনে পৌঁছে গেল দেবদাসীদের আবাসস্থলের কাছে। খগেশ্বর অঙ্গিরাকে বলল, 'এক সঙ্গে দুজনের ভিতরে প্রবেশ করা উচিত হবে না। তুমি বরং বাইরে দাঁড়িয়ে চারদিকে দৃষ্টি রাখো। কেউ উপস্থিত হলেই চত্বরের ভিতর একটা প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করে আমাকে সংকেত করবে।

অঙ্গিরা বলল, 'বেশ তাই হোক।'

বৃদ্ধ খগেশ্বর প্রবেশ করল দেবদাসীদের আবাসস্থলে। বাইরে অন্ধকারের মধ্যে প্রতীক্ষা করতে লাগল অঙ্গিরা। প্রচণ্ড উত্তেজনা বোধ হতে লাগল তার। শেষ পর্যন্ত দ্বার রক্ষীদের কাছে দেবদাসী সমর্পিতা ধরা পড়ে যাবে না তো। রাত বেড়ে চলল। আর তার সঙ্গে উত্তেজনাও বেড়ে চলল অঙ্গিরার মনে।

মধ্যরাত্রিরও পরে দেবদাসী সমর্পিতাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল খগেশ্বর। চর্ম পাদুকা আর পুরুষের সাজে সজ্জিতা সমর্পিতার মুখমণ্ডলও কৃষ্ণবর্ণের বস্ত্রখণ্ডে আচ্ছাদিত। সেখানে দাঁড়িয়ে কোনও কথোপকথন সমীচিন হবে না বলে খগেশ্বর ইশারাতে অনুসরণ করতে বলল তাকে।

দেবদাসী সমর্পিতাকে নিয়ে এগিয়ে খগেশ্বর থামল সেই প্রাচীন চন্দ্রদেবতার মন্দিরের সামনে। অঙ্গিরা তাদের সঙ্গে মিলিত হল। অবগুণ্ঠন সরাল দেবদাসী সমর্পিতা। অঙ্গিরা দেখল শুধু পুরুষের পোশাকই নয়, পাটের সুতো আর প্রদীপের কাজল দিয়ে দেবদাসীর শশ্রু-গুম্ফও রচনা করে দিয়েছে খগেশ্বর!

নরসুন্দর শিরোমণি খগেশ্বর বলল, 'এ মন্দির থেকে বাইরে বেরিয়ে প্রথমে কোথায় আত্মগোপন করতে হবে তা আমি রাজকুমারীকে বলে দিয়েছি। সোনার শিকল বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরে যারা বাইরে থেকে কার্য সম্পাদনের জন্য প্রতিদিন প্রবেশ করে, তাদের জন্য তোরণ উন্মুক্ত করা হয়। তখন আমি বাইরে বেরোব। তাতে রক্ষীদের সন্দেহ কম হবে। বাইরে বেরিয়ে আমি রাজকুমারীর সঙ্গে মিলিত হয়ে মন্ত্রী চন্দ্রদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সোমনাথ নগরী ত্যাগ করে দূরবর্তী স্থানে তাদের ছেড়ে আসব। আমি মন্দিরে ফিরব একদিন বাদে। সোমেশ্বর মুদ্রা নিয়ে তারপর তুমি মন্দির ত্যাগ করবে।'

একথা বলার পর ক্ষৌরকার প্রধান বলল, 'আমার সামান্য একটা কাজ বাকি আছে। আপনাদের দুজনের কোনও কথা যদি থাকে তবে তা সেরে নিন। আমি আমার কাজ সেরে এখনই আসছি।' এ কথা বলে সে অন্তর্হিত হল ভগ্ন মন্দিরের অন্ধকারে।

কিছুক্ষণ তারা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকার পর অঙ্গিরা বলল, 'আর কিছু সময়ের মধ্যেই হয়তো তোমার দেবদাসী সমর্পিতার পরিচয় মুছে যেতে চলেছে। তুমি তখন চালুক্য রাজকন্যা রাজশ্রী। ভবিষ্যতের চালুক্য সাম্রাজ্ঞী রাজশ্রী।'

অঙ্গিরার কথা শুনে সোমনাথ মন্দিরের দেবদাসী সমর্পিতা বলল, 'আমি দেবদাসী হই বা সাম্রাজ্ঞী, আমি তোমার ভালোবাসা। সত্যি কথা বলতে কি, এই বিদায় বেলাতে আমার যেন মনে হচ্ছে যে, মন্দির থেকে আমি মুক্তি লাভ করতে চেয়েছি প্রতি মুহূর্তে, তাকেও যেন আমি নিজের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছি। এ মন্দিরের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে ঘুঙুর ছড়াগুলোকে আমি পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে নিয়েছি। আমি অপেক্ষা করে থাকব তোমার জন্য। খগেশ্বর ফিরে এসে তোমার হাতে সোমনাথ মুদ্রাটা দিলেই তুমি মন্দির ত্যাগ করে আমার সঙ্গে মিলিত হবে।'

অঙ্গিরা বলল, 'ধরো আমি মন্দির ত্যাগ করতে পারলাম না। তোমার সঙ্গে এটাই যদি আমার শেষ দেখা হয়?'

কথাটা শুনেই দেবদাসী সমর্পিতা অঙ্গিরার মুখে হাত চাপা দিয়ে বলল, 'এমন অশুভ কথা বোলো না তুমি। তুমি নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে মিলিত হবে। তোমার প্রতীক্ষায় থাকব আমি। তোমাকে না নিয়ে আমি চালুক্য নগরীতে ফিরব না।'

কথাগুলো বলে সজল চোখে সে তাকিয়ে রইল অঙ্গিরার দিকে। সে মুখের দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরার মনে হল এ মুখ কোনও দেবদাসীর নয়, এ মুখ কোনও রাজকন্যার নয়, এ মুখ সেই আদি অকৃত্রিম নারীর মুখ! যে মুখ সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকে পরিচয়হীন ভাবে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে ভালোবেসে এসেছে তার পুরুষকে। সে মুখের দিকে চেয়ে রইল অঙ্গিরা।

সামান্য কিছু সময়ের মধ্যেই মন্দির থেকে বেরিয়ে এল খগেশ্বর। সে বলল, 'এবার রাজকুমারীকে তোরণের দিকে যেতে হবে।' অঙ্গিরা আর দেবদাসী সমর্পিতা শেষবারের মতো ওষ্ঠ চুম্বন করল গভীর ভালোবাসার আবেশে। যার সাক্ষী হয়ে রইল প্রাচীন বৃদ্ধ খগেশ্বর আর সোমনাথ মন্দির।

বস্তুার ভিতর থেকে সোমেশ্বর মুদ্রাটা বার করে প্রবেশ তোরণের দিকে রওনা হল দেবদাসী সমর্পিতা। অন্ধকারে কিছুটা তফাতে তাকে অনুসরণ করল অঙ্গিরা আর বৃদ্ধ খগেশ্বর।

দেবদাসী সমর্পিতা তোরণের কাছে পৌঁছে যেতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা দুজন। কয়েকটা মশাল জ্বলছে তোরণে। অঙ্গিরারা দূর থেকে দেখতে পেল পুরুষবেশি দেবদাসী সমর্পিতাকে রক্ষীরা ঘিরে দাঁড়িয়েছে তার পরিচয় অনুসন্ধানের জন্য। তা দেখে অঙ্গিরা মনে মনে বলল, 'হে সোমেশ্বর মহাদেব তুমি রক্ষা করো আমার ভালোবাসাকে।'

সোমেশ্বর মহাদেব হয়তো শুনলেন অঙ্গিরার প্রার্থনা। তোরণ উন্মোচনের অস্পষ্ট শব্দ শোনা গেল। অঙ্গিরা দেখতে পেল তোরণের ফাঁক গলে ত্রিপুরারিদেবকে ফাঁকি দিয়ে সোমনাথ মন্দির ত্যাগ করে অদৃশ্য হয়ে গেল দেবদাসী সমর্পিতা।

বৃদ্ধ খগেশ্বর এরপর অঙ্গিরাকে বলল, 'তোমার দুশ্চিন্তার আর কোনও কারণ নেই। নগরীর বাইরে নিরাপদ স্থানে রাজকন্যা রাজশ্রী আর চালুক্য মহামন্ত্রীকে রেখে একদিন বাদেই মন্দিরে ফিরে আসব। তুমি এবার অতিথিশালাতে ফিরে যাও।'

অঙ্গিরা বৃদ্ধর হাত দুটো ধরে বলল, 'আপনার কথা, আজকের এই রাত্রির কথা আমি কোনওদিন ভুলব না।'

অঙ্গিরা রওনা হল অতিথিশালার দিকে। আর বৃদ্ধ খগেশ্বর রয়ে গেলেন কাছেই এক স্থানে। স্বর্ণশৃঙ্খল বেজে উঠলেই তাকে বেরিয়ে পড়তে হবে এ মন্দির ত্যাগ করে।

নিজের কক্ষে ফিরে গেলেও ঘুম এল না অঙ্গিরার। বাইরে রাত শেষ হয়ে শুকতারা ফুটল এক সময়। অঙ্গিরা শুনতে পেল মন্দিরবাসীর নিদ্রাভঙ্গ করার জন্য ঝমঝম শব্দে স্বর্ণ শৃঙ্খল বাজাচ্ছেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। খগেশ্বর নিশ্চয়ই মন্দির ত্যাগ করে রওনা হবে এখন।

২৩

পরদিন নিজের কক্ষে শুয়ে অঙ্গিরা সারা দিন কাটিয়ে দিল। রাজকন্যা রাজশ্রী নগরী ত্যাগ করেছে কিনা, এসবই সে ভেবে চলল সারাদিন। সন্ধ্যাবেলা একবার সে মন্দিরে উঠেছিল সন্ধ্যারতি শেষে দেবদাসীর দল যখন মন্দিরের গর্ভগৃহর সামনে নৃত্য প্রদর্শন করছিল, তখন। কিন্তু সে নৃত্য তার তেমন ভালো লাগলনা। দেবদাসী আর বাদ্যকারদের দেখে অঙ্গিরার মনে হল তারা যেন কোনওক্রমে নৃত্যগীত পরিবেশন করে নিজেদের আবাসস্থলে ফিরে যেতে চাইছে। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবকে অঙ্গিরা দেখতে না পেলেও গর্ভগৃহ তোরণের পাশে পুরোহিত নন্দিবাহন ও রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথকে দেখতে পেল। তাদের মুখমণ্ডলেও দুশ্চিন্তার ছাপ।

দেবদাসীদের নৃত্যগীত দর্শনের জন্যও তেমন লোকজন গর্ভগৃহ চত্বরে উপস্থিত নেই। দেবদাসীদের নৃত্যগীত সাঙ্গ হলে, গর্ভগৃহ তোরণ বন্ধ হবার পর অঙ্গিরা মন্দির চত্বর থেকে নীচে নামার জন্য এগোল। রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথও এগোচ্ছিল নীচে নামার জন্য। সোপানশ্রেণী বেয়ে পাশাপাশি নামার সময় অঙ্গিরা তাকে প্রশ্ন করল, 'খবর কী?'

রক্ষী প্রধান জয়দ্রথ বললেন, 'খবর বিশেষ ভালো নয়। খবর এসেছে মাধেরার যুদ্ধে হিন্দুবাহিনী পরাজিত হয়েছে। নিহত হয়েছেন নৃপতি মাণ্ডলিক, চালুক্যরাজ অম্বুজ সহ রাজপুত যোদ্ধারা। মাধেরা সূর্য মন্দির ধ্বংস করার পর সোমনাথ মন্দিরের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে মামুদের যবন বাহিনী।'

একথা বলার পর একটু থেমে বললেন, 'তবে আশার কথা মহাপ্রতিপালক বীরশ্রেষ্ঠ ভোজরাজ পরমদেও নাকি তাঁর বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছেন মন্দির রক্ষা করার জন্য। তিনি যদি যবন মামুদের আগেই সোমনাথ মন্দিরে পদার্পণ করেন তবে চিন্তার কিছু নেই। নচেৎ আপনাকেও হয়তো অস্ত্র ধরতে হতে পারে মন্দির রক্ষার্থে। যাই ঘটুক না কেন, তা আর তিন রাতের মধ্যেই ঘটবে।'

রক্ষীপ্রধানের কথা শুনে অঙ্গিরা মুখে বলল, 'হ্যাঁ, মন্দির রক্ষার্থে নিশ্চয়ই অস্ত্র ধরব আমি।' আর মনে মনে বলল, 'তখন আমি রাজকন্যা রাজশ্রীর সঙ্গে যাত্রা করব চালুক্য নগরীর দিকে। সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি তাঁর এই আবাসস্থল সোমনাথ মন্দির ও আপনাদের রক্ষা করুন যবনদের হাত থেকে। তাঁর ক্রোধে ধ্বংস হোক যবন মামুদ।'

অঙ্গিরা এরপর ফিরে এল অতিথিশালার কক্ষে। সকাল হলেই তো ফিরে আসবে বৃদ্ধ খগেশ্বর। মুদ্রা ফিরে পেলেই মন্দির ত্যাগ করবে অঙ্গিরা। সেকথা আর রাজশ্রীর কথা ভাবতে ভাবতে অঙ্গিরা ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন ভোরের আলো ফোটার পর অঙ্গিরা অতিথিশালা ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে এল। খগেশ্বরের ফিরে আসার কথা। যে স্থান থেকে মন্দিরের প্রবেশ তোরণ দৃশ্যমান এমন একটা স্থান বেছে নিয়ে খগেশ্বরের ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল অঙ্গিরা। কিছুটা বেলার দিকে প্রবেশ তোরণের বাইরে কাদের যেন চিৎকার শুনতে পেল অঙ্গিরা। তারা চিৎকার করছে 'জয় একলিঙ্গদেবের জয়! হর হর মহাদেব।'

অঙ্গিরা দেখল প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব সেই শব্দ শুনে মন্দির থেকে নীচে নেমে এগোচ্ছেন প্রবেশ তোরণের দিকে। তিনি সেখানে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই তোরণ খুলে দেওয়া হল। আকাশবাতাস কাঁপিয়ে 'হর হর মহাদেব ধ্বনি দিতে দিতে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করল একদল ভয়ঙ্কর দর্শন মানুষ। সম্পূর্ণ নগ্ন শরীর তাদের। মাথায় জটাজুট, ভষ্ম মাখা দেহ। হাতে ধরা আছে ভীষণ দর্শন শূল অথবা ত্রিশূল। কারো কারো হাতে ধরা আছে নরমুণ্ডও। অঙ্গিরা খেয়াল করল এদের কারো-কারো লিঙ্গে ছিদ্র করে লৌহ শলাকাও বেঁধান আছে নারী সঙ্গ রোধ করার জন্য!

এক সেবায়েত অঙ্গিরার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। অঙ্গিরা তাকে প্রশ্ন করল, 'এই অদ্ভুতদর্শন নগ্ন মানুষরা কারা?'

সেবায়েত জবাব দিল, 'এরা মহাদেবের একান্ত ঘনিষ্ঠ অনুচর নাগা সন্ন্যাসীর দল। এরা নিজেদের একলিঙ্গদেবের উপাসক বলে দাবি করে। এরা কোনও সময়ই নগরীতে প্রবেশ করে না। নগরীর বাইরে নির্জন নদীতটে খোলা আকাশের নীচে বসবাস করে। বাইরে মানুষদের তাদের কাছে যেতে দেয় না। খাদ্য গ্রহণেও কোনও বাছবিচার নেই। নদী থেকে ভাসমান মৃতদেহও তুলে এনে খায় শুনেছি! নরমাংসভোজী!'

এই নগ্ন সন্ন্যাসীদের পরিচয় লাভ করার পর অঙ্গিরা বিস্মিত ভাবে জানতে চাইল, 'এরা হঠাৎ মন্দিরে এসে উপস্থিত হলো কেন?'

সেই সেবায়েত বলল, 'এই ভয়ঙ্কর নাগা সাধুরা একলিঙ্গদেবের উপাসক হলেও যিনি একলিঙ্গদেব, তিনিই মহাদেব, তিনিই স্বয়ম্ভুনাথ বা আমাদের সোমনাথ। ওরা কোথা থেকে যেন খবর পেয়েছে যে যবনরা নাকি মন্দির ধ্বংস করতে আসছে! তাই মন্দির রক্ষা করতে এখানে এসেছে তারা।' কথাগুলো বলে সেই সেবায়েত অন্যত্র চলে গেল।

সেই নাগা সন্ন্যাসীর দল কিন্তু মন্দিরে উঠল না বা অন্যত্র আশ্রয় নিল না। খোলা আকাশের নীচে বসবাস করা তাদের অভ্যাস। সোপানশ্রেণীর নীচে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে কাঠ সংগ্রহ করে এনে অগ্নিকুণ্ড রচনা করল তারা। তারপর সেই কুণ্ড ঘিরে বসল ভষ্ম মাখা মহাদেবের অনুচররা।

এসব দেখতে দেখতে, আর খগেশ্বরের প্রতীক্ষা করতে করতে বেলা বেড়ে চলল। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল একসময়, কিন্তু খগেশ্বর ফিরল না।

সূর্য ডোবার পর যখন মন্দিরে সন্ধ্যারতি শুরু হল তখন অঙ্গিরা অতিথিশালাতে ফিরল ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য। তারপর আবার রাত একটু গভীর হলে অতিথিশালা ত্যাগ করল।

অন্যদিনের মতোই বাইরে সেদিনও কোনও মন্দিরবাসী নেই। শুধু ধূনি জ্বেলে বসে আছে সেই নাগা সন্ন্যাসীদের দল। ধূনির গনগনে লাল আভাতে কেমন যেন ভৌতিক দেখাচ্ছে তাদের অবয়বগুলো। অঙ্গিরা একবার ঘুরে এল সেই প্রাচীন চন্দ্রমন্দিরের কাছ থেকে। কিন্তু খগেশ্বরের সন্ধান মিলল না।

অতিথিশালায় ফিরে অঙ্গিরা ভাবতে লাগল; এদিন না এলেও পরদিন নিশ্চয়ই ফিরে আসবে খগেশ্বর। হয়তো বা রাজশ্রীদের উপযুক্ত নিরাপদ স্থানে রেখে আসতে বেশ অনেক দূরে যেতে হয়েছে খগেশ্বরকে। সে বৃদ্ধ হয়েছে, তাই দ্রুত ফিরে আসতে পারেনি। এরপর রাজকন্যা রাজশ্রীর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।

দেবদাসী সমর্পিতার সোমনাথ মন্দির থেকে অন্তর্হিত হবার পর দুটো রাত কেটে গেল। পৃথিবীর বুকে ভোরের আলো যখন ফুটল তখন ক্লান্তিহীন ভাবে সোমনাথ নগরীর দিকে এগিয়ে চলেছে নৃপতিশ্রেষ্ঠ ভোজরাজ পরমদেওর হস্তিবাহিনী আর গজনীবিদ মামুদের উষ্ট্রবাহিনী। দুই বাহিনী এগোচ্ছে দু-পথ ধরে। একদল এগোচ্ছে সোমেশ্বর মহাদেব মন্দির রক্ষা করার জন্য, অপর দল সে মন্দির লুণ্ঠন করার জন্য।

এদিন সকালে যথারীতি মন্দিরের দ্বার উন্মোচন করলেন সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। দেবতার ঘুম ভাঙানোর পর দেবদাসীরা তাদের নৃত্যগীত শুরু করল গর্ভগৃহর সামনে। কিন্তু প্রধান পুরোহিত ও তাঁর সহ পুরোহিতদ্বয় বুঝতে পারল মাঝে-মাঝেই বাদ্যযন্ত্রের তাল কেটে যাচ্ছে, ছন্দপতন ঘটছে দেবদাসীদের। আসলে যবন হানার আতঙ্ক প্রবল ভাবে গ্রাস করেছে তাদের। তাদের কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে সেই আশঙ্কাতে হাত-পা শিথিল হয়ে আসছে! সত্যি যদি সুলতান বাহিনী মন্দিরে প্রবেশ করে তখন পুরুষদের নয় অস্ত্রাঘাতে মৃত্যু হল, কিন্তু নারীদের যে ভাবে মৃত্যু হবে সে তো আরও ভয়ঙ্কর! মৃত্যুর আগে নারীদের কোমল শরীর গুলো ছিঁড়ে খাবে যবন বাহিনী!

কোনওরকমে নৃত্যগীত সাঙ্গ করে তাদের আবাসস্থলে ফেরার পথ ধরল দেবদাসীরা। হঠাৎ প্রধান পুরোহিতের মনে পড়ল দেবদাসী সমর্পিতার কথা। তিনি সহপুরোহিত নন্দিবাহনকে বললেন, 'সন্ধ্যারতির সময় প্রদীপ থেকে যার বস্ত্রখণ্ডে অগ্নি সংযোগ ঘটেছিল সেই দেবদাসী সমর্পিতার কি সংবাদ?'

পুরোহিত নন্দিবাহন জবাব দিলেন, 'তাকে আপনার পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষাতে তাদের আবাসস্থলেই রাখা হয়েছে। তবে আপনি যেদিন সন্ধ্যায় এখানে সভা আহ্বান করেছিলেন, সেদিন সে অন্য দেবদাসীদের সঙ্গে উপস্থিত হয়েছিল।'

ত্রিপুরারিদেব এরপর একটু ভেবে নিয়ে বললেন, 'ওই নারী অন্য দেবদাসীদের তুলনায় রূপবতী, নৃত্য-গীতেও অধিক পারদর্শী। দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা আর ফিরে আসবে না বলেই মনে হয়। আর ফিরে এলেও তাকে আর দেবদাসী প্রধানার আসন দেওয়া যাবে না। শাস্তি পেতে হবে তাকে। দুর্যোগ অতিবাহিত হলে দেবদাসী শ্রেষ্ঠা হিসাবে সমর্পিতা নাম্নী ওই নারীকেই তিলোত্তমার স্থলাভিষিক্ত করা যেতে পারে।'

প্রধান পুরোহিতের কথা শুনে সহ প্রধান পুরোহিত মল্লিকার্জুন বললেন, 'আপনার বিবেচনা অতি উত্তম। আমারও এমনই ভাবনা।'

প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব আবারও একটু ভেবে নিয়ে এরপর তাঁর সহকারীদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'একটা কাজ করুন। তাকে স্নান করিয়ে, নতুন পট্টবস্ত্রে সজ্জিত করিয়ে এখানে উপস্থিত করবেন। দেবতার স্থান বারি সিঞ্চন করে, পাদোদক গ্রহণ করিয়ে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে আমি তাকে শুদ্ধ করব। আজ সন্ধ্যারতির সময় নৃত্য প্রদর্শন করবে দেবদাসী সমর্পিতা।'

পুরোহিত নন্দিবাহন বললেন 'আমি সে ব্যবস্থা করছি। দেবদাসী সমর্পিতাকে সমুদ্রতে নিয়ে গিয়ে অবগাহন করিয়ে উপযুক্ত পোশাকে সজ্জিত করে দ্বিপ্রহরে এই স্থানে উপস্থিত করব।'

পুরোহিত মল্লিকার্জুন বললেন, 'সোমেশ্বর মহাদেবের আশীর্বাদে সব বিপদ কেটে যাবে বলেই আমার ধারণা। ভোর রাতে আমি স্বপ্ন দেখেছি ভোজরাজ পরমদেও, যবন মামুদের ছিন্ন মুণ্ড নিবেদন করছেন মহাদেবকে। সেই মুণ্ড দিয়ে গেণ্ডুয়া খেলছে একলিঙ্গদেবের উপাসক নাগা সন্ন্যাসীরা। ভোরের স্বপ্ন মিথ্যা হয় না।'

ত্রিপুরারিদেবের অন্য সহকারী নন্দিবাহন বললেন, 'হ্যাঁ, আমার নিশ্চিত ধারণা মন্দির ধ্বংসকারী, নারকী, যবন মামুদকে শেষ শাস্তি দেবার জন্য সোমেশ্বর মহাদেব তাকে এ মন্দিরের দিকে টেনে আনছেন।'

সোমনাথ মন্দিরের পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'হ্যাঁ, এ কথাটাই আপনারা সবাইকে বলুন। যাতে মন্দিরবাসীদের মধ্যে মনোবল বৃদ্ধি পায়, আতঙ্ক না ছড়ায়।' কথাগুলো বলে ত্রিপুরারিদেব এগোলেন নিজ কক্ষে ফেরার জন্য। সেদিকে এগোতে এগোতে ত্রিপুরারিদেব ভাবলেন, 'ওই গুপ্ত কক্ষকে আর অরক্ষিত রাখা সমীচীন নয়। যথাসম্ভব দ্রুত যুবক অঙ্গিরাকে সেখানে প্রহরী হিসাবে নিযুক্ত করতে হবে।'

ত্রিপুরারিদেব যখন তার কক্ষে ফিরে গেলেন ঠিক সে সময় অঙ্গিরা তার কক্ষ ত্যাগ করে অতিথিশালার বাইরে বেরিয়ে এসে মন্দিরের নীচের চত্বরে গত দিনের স্থানে গিয়ে বসল। ঠিক যে স্থান থেকে প্রবেশ তোরণ দেখা যায়। খগেশ্বরের ফিরে আসার জন্য অঙ্গিরার প্রতীক্ষা শুরু হল।

সূর্যদেব মাথার ওপর দিকে উঠতে শুরু করলেন। বেলা বাড়ার উৎকণ্ঠা শুরু হল অঙ্গিরার মনে। তার মনে হতে থাকল খগেশ্বর ফিরে আসছে না কেন? রাজকন্যা রাজশ্রীর কোনও বিপদ ঘটেনি তো? তাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে পেরেছে তো খগেশ্বর? চারপাশে মন্দির চত্বরে কোন শব্দ নেই। শুধু মন্দিরের শীর্ষদেশে বসে থাকা সেই গৃধিনিগুলো মাঝে মাঝে কর্কশ স্বরে চিৎকার করে আকাশ বিদীর্ণ করছে! তাদের সেই অশুভ ডাক যেন অঙ্গিরার মনের আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তুলল।

সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর উঠল তখন উৎকণ্ঠিত অঙ্গিরা নিজেকে আর সংযত না রাখতে পেরে সে স্থান ছেড়ে উঠে এগিয়ে গেল প্রবেশ তোরণের দিকে। হিমশীতল মুখে তোরণ বেষ্টন করে দাঁড়িয়ে আছে রক্ষীরা। তাদের চোখেমুখেও স্পষ্ট আশঙ্কার ছাপ। একজন রক্ষী গম্ভীর ভাবে অঙ্গিরাকে প্রশ্ন করল 'কী প্রয়োজন?'

অঙ্গিরা প্রশ্ন করল, 'তোমরা কেউ ক্ষৌরকার শিরোমণি খগেশ্বরকে দেখেছ?'

রক্ষী জবাব দিল, 'না, কদিন ধরে সে মন্দিরে আসছে না।'

অগত্যা অঙ্গিরা আবার ফিরে এসে তার পূর্বের স্থানে আসন গ্রহণ করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে দেখল পুরোহিত নন্দিবাহন, রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথকে নিয়ে ব্যস্তভাবে এগোচ্ছেন তোরণের দিকে। সেখানে গিয়ে রক্ষীদের সঙ্গে কিছু সময় কথা বললেন তাঁরা। তারপর আবার ব্যস্ত ভাবে সেখান থেকে এগোলেন মন্দিরের দিকে। উৎকণ্ঠিত ভাবে অঙ্গিরা চেয়ে রইল প্রবেশতোরণের দিকে।

২৪

সাধারণত বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে দেবতাকে ভোগ নিবেদনের সময় গর্ভগৃহর সামনে উপস্থিত থাকেন না ত্রিপুরারিদেব। বয়স হয়েছে তাঁর। এ কাজ সামলান পর্যায়ক্রমে সহ প্রধান পুরোহিত নন্দিবাহন ও মল্লিকার্জুন। কিন্তু এদিন দেবদাসী সমর্পিতার শুদ্ধিকরণের ব্যাপারটা থাকায় তিনি কক্ষত্যাগ করতে যাচ্ছিলেন সে সময়। তিনি কপাট উন্মোচন করেই দেখতে পেলেন পুরোহিত নন্দিবাহন, রক্ষী প্রধান জয়দ্রথকে নিয়ে দাঁড়িয়ে।

তাঁদের গম্ভীর মুখমণ্ডল দেখে কেমন যেন একটু সন্দেহের উদ্রেক ঘটল প্রধান পুরোহিতের। তিনি নন্দিবাহনকে প্রশ্ন করলেন, 'দেবদাসী সমর্পিতাকে গর্ভগৃহের সামনে উপস্থিত করেছেন?'

সহ প্রধান পুরোহিত নন্দিবাহন জবাব দিলেন, 'দেবদাসী সমর্পিতা নিখোঁজ। দেবদাসীদের আবাসস্থল সহ মন্দিরের সব সম্ভাব্য স্থানে তার খোঁজ করেছি, তাকে পাওয়া যায়নি। অন্য দেবদাসীরা বলছে যে তারা তিন দিন ধরে তাকে দেখেনি।'

কথাটা শুনে প্রধান পুরোহিত ক্ষিপ্ত ভাবে রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথকে বললেন, 'তাহলে দেবদাসী তিলোত্তমার মতো দেবদাসী সমর্পিতাও কি মন্দির ত্যাগ করল! কিন্তু কী ভাবে করল? রক্ষী প্রধান হিসাবে তোমাকেই এ ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।'

জয়দ্রথ মাথা নীচু করে বললেন, 'আমাকে মার্জনা করবেন প্রভু। সব রক্ষী কঠোর ভাবে আপনার নির্দেশ পালন করে চলেছে। গত তিন দিন তারা কোনও মন্দিরবাসীকে মন্দির ত্যাগ করতে দেয়নি। এ সময়কালের মধ্যে শুধু দুজন তোরণ অতিক্রম করে মন্দিরের বাইরে গেছে।'

'কারা তারা?' জানতে চাইলেন প্রধান পুরোহিত।

রক্ষী প্রধান জয়দ্রথ জবাব দিলেন 'প্রথম জন ক্ষৌরকার শিরোমনি খগেশ্বর। যে মন্দিরের স্থায়ী বাসিন্দা নয়। বাইরে থেকে মন্দির যাওয়া-আসা করে। কাজেই রক্ষীরা তাকে বাধা দেয়নি। তিন দিন পূর্বে সূর্যোদয়ের সময় খগেশ্বর মন্দির ত্যাগ করে।'

এ কথা বলার পর একটু থেমে রক্ষীপ্রধান বললেন, 'আর খগেশ্বর মন্দির ত্যাগ করার পূর্বে শেষ রাতের কাছাকাছি সময় আরও একজন মন্দির ত্যাগ করেছিল। পুরুষের পোশাকই ছিল তার পরনে। মুখমণ্ডল আবৃত থাকলেও তাঁর শ্মশ্রুমণ্ডিত চিবুক দেখা যাচ্ছিল। তবে তাকে আটকাবার ক্ষমতা রক্ষীদের ছিল না। কারণ, সে সোমেশ্বর মুদ্রা দেখিয়েছিল তাদের।'

আবার সেই সোমেশ্বর মুদ্রা! পুরোহিত শ্রেষ্ঠ সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলেন 'রক্ষীরা তার পরিচয় জানতে চায়নি? প্রশ্ন করেনি কোনও?'

রক্ষী প্রধান জবাব দিল, 'হ্যাঁ, করেছিল। কিন্তু সে ব্যক্তি ইঙ্গিতে জানিয়েছিল সে মৌনব্রত অবলম্বন করে আছে।'

কথাটা জেনে প্রধান পুরোহিত প্রথমে ভাবলেন, সেই ব্যক্তি যদি সমর্পিতা হয়ে থাকবে তবে তার শ্মশ্রু হল কী ভাবে? কিন্তু কয়েক মুহূর্ত ভাবার পরই সম্ভাব্য ব্যাপারটা যেন প্রধান পুরোহিতের মনে ধরা দিল খগেশ্বরের কথাও রক্ষীপ্রধান উল্লেখ করাতে। কেশহীন, শ্মশ্রুহীন অনেক রাজপুরুষ বা সৈনিক থাকে যারা নারীদের কাছে নিজেদের সুন্দর হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অথবা বিদ্রুপ থেকে রক্ষা পাবার জন্য কৃত্রিম কেশ, শ্মশ্রু-গুম্ফ পরিধান করে। গুপ্তচরেরাও অনেক সময় ছদ্মবেশ ধারণের জন্য তা ব্যবহার করে। আর এ কাজের জন্য ডাক পড়ে ক্ষৌরকারদেরও। তারা শুধু মুখমণ্ডল-মস্তক মুণ্ডিতই করে তা না। নরসুন্দর, ক্ষৌরকার কৃত্রিম কেশ-গুম্ফ দিয়ে মানুষকে সজ্জিতও করে। হয়তো বা খগেশ্বরই কাজটা করেছে। দেবদাসী সমর্পিতাকে পুরুষের সাজে সজ্জিত করেছে! কিন্তু সোমেশ্বর মুদ্রা? ত্রিপুরারিদেব বললেন 'খগেশ্বর তো নিত্যদিন মন্দিরে আসে। সে মন্দির ত্যাগ করার পর আর মন্দিরে প্রবেশ করতে এসেছিল?'

জয়দ্রথ জবাব দিলেন, 'না, তাকে দেখেনি কেউ।'

এরপর একটু থেমে জয়দ্রথ বললেন 'তবে রক্ষীরা বলল, 'কিছু সময় পূর্বে আপনার অতিথি অঙ্গিরা নাকি তাদের কাছে জানতে গেছিলেন যে তারা কেউ খগেশ্বরকে দেখেছে কিনা?' মার্জনা করবেন, আপনার অতিথির আচরণও সন্দেহজনক। সে গত দুদিন ধরে এক স্থানে বসে নাকি নজর রাখছে প্রবেশ তোরণের ওপর। রক্ষীদের তাই ধারণা। এবং আমিও তাকে সেখানে বসে থাকতে দেখেছি।'

একথা শুনেই প্রধান পুরোহিতের মনে হল 'আরে সোমেশ্বর মুদ্রা তো অঙ্গিরার কাছেও আছে! এমন হয়নি তো যে খগেশ্বর কোনও ভাবে সে মুদ্রা নিয়ে মুক্ত করেছে দেবদাসী সমর্পিতাকে? অর্থের বিনিময়ে তাকে তুলে দিয়েছে চালুক্য মন্ত্রীর হাতে? আর সেই মুদ্রা ফেরত পাবার জন্যই কি অঙ্গিরা খগেশ্বরের প্রতীক্ষা করছে?'

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের কর্মপন্থা ভেবে নিলেন প্রধান পুরোহিত। না আর কালক্ষেপ করা সমীচীন হবে না তার। তিনি প্রথমে তাদের নির্দেশ দিলেন রক্ষীদের কয়েকজনকে দেবদাসীদের আবাসস্থলের বাইরে প্রহরার কাজে নিযুক্ত করুন। প্রয়োজনে তারা তাদের আবাসস্থলের ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে। এবং তাদের প্রহরাতেই দেবদাসীরা দেবতার কাছে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য যাওয়া-আসা করবে। দ্বিতীয়ত সোমনাথ মুদ্রা দেখিয়েও আজ থেকে তার অনুমতি ছাড়া কেউ মন্দির ত্যাগ করতে পারবে না।

এ কথা বলার পর একটু থেমে তিনি বললেন, 'অঙ্গিরার বিষয়টি আমি তত্ত্বাবধান করছি। বিশেষ কাজের দায়িত্ব দিয়ে তাকে আমি অন্যত্র পাঠাব। একটা কাজ করুন। দেবতাকে মধ্যাহ্নভোজ নিবেদন করার পর পঞ্চব্যঞ্জন, পরমান্ন-সহ সেই মহাপ্রসাদ অঙ্গিরার আহারের জন্য অতিথিশালাতে তার কক্ষে পাঠিয়ে দিন। তাকে জানাবেন আমি এই খাদ্যদ্রব্য পাঠিয়েছি। সে যেন এই মহাপ্রসাদ ভক্ষণ করে।'

সহ প্রধান পুরোহিত নন্দিবাহন আর রক্ষীপ্রধানকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে কপাট বন্ধ করলেন প্রধান পুরোহিত।

একই ভাবে একই স্থানে বসে তোরণের দিকে উৎকণ্ঠিত ভাবে তাকিয়ে ছিল অঙ্গিরা। সেই অশুভ পাখিগুলো মাঝে-মাঝেই ডাকছে। অসহ্য তাদের চিৎকার। মধ্যাহ্নে গর্ভগৃহর ঘণ্টাধ্বনিও কানে এল তার। অর্থাৎ দেবতাকে ভোগ নিবেদন করা হচ্ছে। এর কিছু সময় পর একজন সেবায়েত উপস্থিত হল তার কাছে। সে বলল, 'আপনি অতিথিশালাতে চলুন। প্রধান পুরোহিত আপনার জন্য মহাপ্রসাদ পাঠিয়েছেন। সেগুলো আপনাকে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।'

সেবায়েতের কথা শুনে অঙ্গিরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার সঙ্গে অতিথিশালাতে উপস্থিত হল। তার কক্ষের সামনে বেশ কয়েকজন সেবায়েত খাদ্য পাত্র বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। অঙ্গিরা তার কক্ষের কপাট খুলতেই তারা সেই খাদ্যবস্তুর পাত্রগুলো কক্ষের মেঝেতে সাজিয়ে রেখে ফিরে গেল।

অন্যদিন অতিথিশালার পাচকরা অঙ্গিরার জন্য সাধারণ তণ্ডুল, ব্যঞ্জন দিয়ে যায়। কিন্তু প্রধান পুরোহিতের পাঠানো খাদ্য সামগ্রী দেখে বেশ বিস্মিত হল অঙ্গিরা। রুপোর পাত্র, থালাতে থরে থরে সাজানো নানা ধরনের ব্যাঞ্জন, পরমান্ন, মিষ্টান্ন, তাছাড়া ঘৃত সমৃদ্ধ উৎকৃষ্ট তণ্ডুল তো আছেই।

উৎকণ্ঠাতে কিছুই খেতে ইচ্ছা করছে না অঙ্গিরার। তবুও কিছুটা খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করল শরীরে বল সঞ্চয় করার জন্য। অঙ্গিরা সিদ্ধান্ত নিল রাত্রিতে চন্দ্রমন্দিরের দিকে আজও একবার যাবে খগেশ্বরের সন্ধানে। খাদ্য গ্রহণের পর অতিথিশালার কক্ষে রাত্রি জাগরণ আর প্রচণ্ড মানসিক ক্লান্তিতে ঘুম নেমে এল অঙ্গিরার চোখে।

এই দ্বিপ্রহরেই সৈনিকদের ক্লান্তি মোচনের উদ্দেশ্যে কিছু সময়ের জন্য যাত্রা স্থগিত রেখেছিলেন নৃপতিশ্রেষ্ঠ ভোজরাজ পরমদেও। গত কয়েকদিন ধরে তিনি তার সমুদ্র সমান বিশাল বাহিনী নিয়ে এগিয়ে চলেছেন সোমনাথ নগরীর দিকে। বিরামহীন তাদের যাত্রা। কয়েক দণ্ড তাঁর সেনাবাহিনীকে বিশ্রামের নির্দেশ দিয়ে তাঁর ঐরাবত থেকে অবতরণ করে নিজেও বিশ্রাম নিচ্ছিলেন রাজাধিরাজ পরমদেও। এমন সময় তাঁর অগ্রবর্তী পথ প্রদর্শক অশ্বারোহীরা কাসেমকে উপস্থিত করল তাঁর সামনে।

কাসেমের পরিচয় জেনে আর তার বক্তব্য শুনে বেশ বিস্মিত হলেন ভারতশ্রেষ্ঠ নৃপতি ভোজরাজ পরমদেও। তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, 'সেই যবন সুলতান কদিনের মধ্যে সোমনাথ নগরীতে উপস্থিত হতে পারে বলে তোমার ধারণা?'

কাসেম জবাব দিল, 'মহারাজ, আমি যে রাতে তার শিবির থেকে পলায়ন করি তার পরদিনই যদি সে যাত্রা করে থাকে তবে হয়তো বা সে আর এক-দু-দিনের মধ্যেই নগরীতে প্রবেশ করতে পারে।' যদি তার বাহিনী সঠিক পথ নির্বাচন করে।

তার জবাব শুনে উৎকণ্ঠিত ভোজরাজ জানতে চাইলেন, 'আমার হস্তিবাহিনী যেখানে অবস্থান করছে, এ স্থান থেকে সোমনাথ নগরী কত দিনের পথ?'

কাসেম হিসাব করে নিয়ে উত্তর দিল, 'অন্তত চার দিনের পথ। তবে আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলে হয়তো তিন দিনের মধ্যে আপনাকে সোমনাথ নগরীতে উপস্থিত করাতে পারব।'

যেভাবেই হোক ভোজরাজকে, যবনবাহিনী মন্দিরে প্রবেশ করবার পূর্বেই সেখানে উপস্থিত হতে হবে। কাসেমের কথা শোনার পর ভোজরাজ পরমদেও আর সে স্থানে এক পলও কালক্ষেপ করা সমীচিন বোধ করলেন না। কাসেমকে উঠিয়ে দেওয়া হল একটা হাতির পিঠে। রাজাধিরাজ নিজেও উঠে বসলেন তার রণহস্তির পিঠে। বিশ্রাম স্থগিত করে ভোজরাজ পরমদেও, কাসেমের দেখানো পথ ধরে দ্রুত এগোলেন সোমনাথ নগরীর উদ্দেশ্যে। সূর্য ডোবার পরও সে বাহিনী থামল না।

সোমেশ্বর মন্দিরে সূর্য ডোবার পর যথারীতি সেদিনও সন্ধ্যারতি হল। ঘণ্টা বাজল। রক্ষী পরিবৃত হয়ে আতঙ্কিত দেবদাসীরা গর্ভগৃহ চত্বরের সামনে উপস্থিত হয়ে নৃত্যপ্রদর্শন করে ফিরে গেল প্রাচীর ঘেরা নিজেদের আবাসস্থলে। এরপর নিদ্রাভঙ্গ হলো অঙ্গিরার। পর মুহূর্ত থেকে আবারও দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরতে লাগল তাকে। রাজকন্যা রাজশ্রীর কোনও বিপদ হয়নি তো? নগরী ত্যাগ করার সময় সেনাদল বা দস্যুবাহিনীর দ্বারা সে আক্রান্ত হয়নি তো? নাকি খগেশ্বরের কোনও বিপদ ঘটেছে? অঙ্গিরার যদি জানা থাকত যে খগেশ্বর রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতাকে কোনও নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে গেছে তাহলেও নয় অঙ্গিরা যে-কোনও উপায়েই হোক মন্দির প্রাকার অতিক্রম করে সে স্থানের দিকে রওনা হবার চেষ্টা করত। কিন্তু বৃদ্ধ খগেশ্বর সে স্থানের কথা অঙ্গিরাকে বলে যায়নি। হয়তো বা সে তখন সঠিক স্থান নির্বাচন করে উঠতে পারেনি। বাইরে রাত বাড়তে লাগল। প্রবল দুশ্চিন্তাতে অতিথিশালার অন্ধকার কক্ষে বসে ছটফট করতে লাগল অঙ্গিরা।

ঠিক একই সময় সোমনাথ নগরী থেকে অনেকটা দূরে এক জীর্ণ কক্ষে বসে অঙ্গিরার মতো একই রকম দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ভাবে তার কথাই ভাবছিল রাজকুমারী সমর্পিতা। অরণ্যের ভিতর এই অতি প্রাচীন পরিত্যক্ত শিব মন্দিরে তাদের দুজনকে তিনদিন হল পৌঁছে দিয়ে গেছে বৃদ্ধ খগেশ্বর। এ স্থান থেকে সোমেশ্বর মন্দির পদব্রজে একদিনের পথ। তার তো মন্দিরে ফিরে গিয়ে সোমেশ্বর মুদ্রা অঙ্গিরাকে সমর্পণ করার কথা। আর সে মুদ্রা নিয়ে মন্দিরনগরী ত্যাগ করে গতকালই এ স্থানে উপস্থিত হবার কথা অঙ্গিরার! কিন্তু সে কেন এখনও উপস্থিত হল না? এই জীর্ণ কক্ষে তিন রাত অতিবাহিত হয়ে গেল রাজশ্রীর। তার এই কক্ষের উন্মুক্ত, কপাটহীন দ্বার আগলে তলোয়ার হাতে বসেছিলেন চন্দ্রদেব।

মন্দিরের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে সব মহাবৃক্ষ। কিছুটা তফাতে একটা বৃক্ষর গায়ে তার ঘোড়াটা বাধা আছে। সেদিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ ভাবে বসে আছেন তিনি। গাছের শাখাপ্রশাখার ফাঁক গলে একফালি চাঁদের আলো এসে পড়েছে তাঁর মুখমণ্ডলে। চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট চেপে আছে তার কপালে।

এক সময় তিনি বললেন, 'আমাদের এ স্থানে অপেক্ষা করা আর উচিত হবে না। এই বনাঞ্চলে দস্যু থাকতে পারে, এমনকী হয়তো বা যবন বাহিনীও এ পথে উপস্থিত হতে পারে। আমি একা মানুষ তখন কী ভাবে রক্ষা করব তোমাকে? চালুক্য সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারীকে? কাল সূর্যোদয় পর্যন্ত সেই যুবকের জন্য অপেক্ষা করে আমাদের চালুক্য রাজ্যর দিকে রওনা হওয়া উচিত।'

রাজশ্রী বলল, 'আমাদের কেউ একজন অশ্বপৃষ্ঠে নগরীর দিকে গিয়ে দেখে আসতে পারিনা সেখানে কি ঘটছে?'

চালুক্য মহামন্ত্রী বললেন, 'সে কাজ আত্মহননের সামিল হতে পারে। হয়তো যবন মামুদ সোমনাথ নগরীতে প্রবেশ করেছেন বা প্রবেশ করতে চলেছেন!'

মহামন্ত্রী চন্দ্রদেবের বলা অন্তিম বাক্যটা যেন রাজকন্যা রাজশ্রীর উৎকণ্ঠা-দুশ্চিন্তা আরও বৃদ্ধি করল। সে আর কোনও কথা বলল না। নিশ্চুপ হয়ে কক্ষের বাইরের দিকে চেয়ে রইল অঙ্গিরার প্রতীক্ষায়। রাত এগিয়ে চলল। এক সময় শৃগালের দল তাদের সম্মিলিত চিৎকারে মধ্যরাত ঘোষণা করল।

মধ্যরাতে ঠিক সে সময়ই অঙ্গিরা কক্ষ ত্যাগ করতে যাচ্ছিল সেই চন্দ্রমন্দিরে যাবার জন্য। যদি সে স্থানে বৃদ্ধ খগেশ্বর ফিরে আসে সেজন্য। কিন্তু সে দ্বার উন্মোচন করার আগেই মৃদু আঘাতের শব্দ হল বন্ধ কপাটে। তবে কি খগেশ্বর উপস্থিত হয়েছে? অঙ্গিরা দ্রুত কপাট উন্মোচন করল। অঙ্গিরা দেখল, খগেশ্বর নয়, চাঁদের আলোতে তার কক্ষের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব!

কয়েক মুহূর্ত পরস্পরের দিকে নিশ্চুপ ভাবে চেয়ে রইল তারা। ত্রিপুরারিদেব মৃদু হেসে তার উদ্দেশ্যে বললেন, 'আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আজ রাতেই তোমাকে তোমার কার্যভার সমর্পণ করব। যে পঞ্চব্যঞ্জন, দেবতার প্রসাদ তোমাকে পাঠিয়েছিলাম তা তুমি গ্রহণ করেছ তো?'

অঙ্গিরা এবার খাদ্যদ্রব্য পাঠাবার অন্তর্নিহিত কারণ বুঝতে পারল। সেই অন্ধকার কক্ষে তাকে প্রেরণ করার পূর্বে শেষ বারের মতো পঞ্চব্যঞ্জন, পরমান্ন দিয়ে তার স্বাদ মেটাবার ব্যবস্থা করেছিলেন প্রধান পুরোহিত। যুপকাষ্ঠে সমর্পণ করার পূর্বে যেমন ছাগ শিশুকে উৎকৃষ্ট পল্লব ভক্ষণ করানো হয় ঠিক তেমনই!

অঙ্গিরা মৃদু স্বরে জবাব দিল, 'হ্যাঁ, প্রভু।'

প্রধান পুরোহিত বললেন, 'অতি উত্তম। এই নতুন বস্ত্র পরিধান করো, আমি যে স্থানে তোমাকে নিয়ে যাব সে স্থানে উপস্থিত হবার জন্য।' কথাগুলো বলে তিনি তার হাতে ধরা ঘোর কৃষ্ণবর্ণের বস্ত্রগুলি এগিয়ে দিলেন অঙ্গিরার দিকে।

মুহূর্তের মধ্যে তার কর্তব্য স্থির করে নিল অঙ্গিরা। কক্ষের ভিতর সে নতুন বস্ত্র পরিধান শুরু করল। দ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন প্রধান পুরোহিত। অঙ্গিরার পরিধান সম্পন্ন হবার পর ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'ধনুর্বাণ সঙ্গে নাও। আর কক্ষ ত্যাগ করার পূর্বে ওই সোমেশ্বর মুদ্রা আমাকে সমর্পণ করো। ওই মুদ্রার প্রয়োজন আর তোমার হবে না।'

অঙ্গিরা ধনুর্বাণ কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, 'ও মুদ্রা আমি আপনাকে সমর্পণ করতে অক্ষম। আমাকে মার্জনা করবেন। সোমেশ্বর মুদ্রা আমার কাছে নেই। আমি হারিয়ে ফেলেছি মুদ্রাটি। সম্ভবত আমার বস্ত্র থেকে কোথাও পতিত হয়েছে ওই মুদ্রা।'

কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত অঙ্গিরার দিকে চেয়ে রইলেন প্রধান পুরোহিত। তিনি মনে মনে ভাবলেন তবে কি তার অনুমান সত্য? ওই মুদ্রার সাহায্যেই দেবদাসী সমর্পিতাকে ছদ্মবেশ ধারণ করিয়ে মুক্ত করেছে খগেশ্বর? কিন্তু এ ব্যাপার নিয়ে অঙ্গিরাকে ভর্ৎসনা করা অথবা প্রশ্ন করা এ মুহূর্তে সমীচীন বোধ করলেন না প্রধান পুরোহিত। এখন তিনি অন্তিম কার্য সম্পাদন করতে চলেছেন অঙ্গিরাকে নিয়ে। এ সময় কালক্ষেপ করা তাঁর উচিত হবে না। তাই তিনি এরপর অঙ্গিরাকে শুধু বললেন, 'আমাকে অনুসরণ করো।'

কক্ষ ত্যাগ করল অঙ্গিরা। তারপর তারা দুজন অতিথিশালা থেকে বাইরে বেরিয়ে এগোল সোমনাথ মন্দিরের সোপানশ্রেণীর দিকে।

নিস্তব্ধ মধ্যরাত্রি। কোথাও কোনও শব্দ নেই। একটা পেঁচকের শব্দ পর্যন্ত নয়। বিশাল মন্দির চত্বর প্রাঙ্গণের কোথাও এক বিন্দু আলো পর্যন্ত নেই শুধু যে স্থানে উন্মুক্ত আকাশের নীচে অগ্নিকুণ্ড ঘিরে বসে আছে নগ্ন সন্ন্যাসীর দল, সে স্থান ছাড়া। কেমন যেন ভৌতিক দেখাচ্ছে তাদের অবয়বগুলো। পাথরের মূর্তির মতো তারা বসে আছে। অঙ্গিরাদের দিকে তারা ফিরেও তাকাল না। সোপানশ্রেণী বেয়ে ত্রিপুরারিদেবকে অনুসরণ করে অঙ্গিরা এসে উপস্থিত হল গর্ভগৃহ তোরণের সামনে। চাঁদের আলো প্রবেশ করছে না এখানে।

কৃষ্ণবর্ণের পোশাক পরিধান করার কারণে নিজের শরীরকেই যেন দেখতে পাচ্ছে না অঙ্গিরা। সে মনে মনে ভাবল, 'হ্যাঁ, অন্ধকারের প্রহরীর তো এমন পোশাকই হওয়া প্রয়োজন। তারপর এ পোশাকও একদিন খসে পড়বে শরীর থেকে। দীর্ঘদিন সূর্যালোকের স্পর্শ না পেয়ে একদিন হয়তো আমাকে জীবন্ত প্রেতের মতো দেখাবে! ঘা ফুটে উঠবে সর্বাঙ্গে। তখন আমি আর মানুষ থাকব না। আমি তখন শুধুই প্রেত সদৃশ অন্ধকারের প্রহরী। সোমনাথ মন্দিরের অন্ধকার রত্নভাণ্ডারের স্যমন্তক মণির রক্ষক।'

ত্রিপুরারিদেব গর্ভগৃহ তোরণের গায়ের এক কুলুঙ্গি থেকে একটা ক্ষুদ্রাকৃতির প্রদীপ নিয়ে চকমকি পাথর ঘষে সেটা জ্বালালেন। তারপর চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে গর্ভগৃহর তোরণ উন্মোচন করে অঙ্গিরাকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন। তারা দুজন ভিতরে প্রবেশ করার পর ভিতর থেকে কপাট বন্ধ করে দিলেন তিনি। প্রদীপের মৃদু আলো ছড়িয়ে পড়েছে কক্ষে।

অঙ্গিরার মনে হল, গর্ভগৃহর ঠিক মাঝখানে সোমেশ্বর মহাদেবের ঝুলন্ত বিগ্রহ যেন নিদ্রা ভঙ্গ করে তার দিকেই চেয়ে আছেন! প্রধান পুরোহিত কপাট বন্ধ করার পর অঙ্গিরাকে সঙ্গে নিয়ে সেই বিগ্রহর সামনে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে মনে মনে বললেন, 'হে সোমনাথ, হে সোমেশ্বর মহাদেব, আমি যা করতে চলেছি তা আপনার সম্পদ রক্ষার জন্যই করছি, আমার কোন ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়। যুবক অঙ্গিরাকে আপনার স্যমন্তক মণির প্রহরী নিযুক্ত করছি আমি। আপনি তাকে আশীর্বাদ করুন, যাতে সে আপনার সম্পদ রক্ষা করতে পারে। রত্নাগারের প্রহরীরূপে তার নিয়োগ আপনি অনুমোদন করুন। তার পিতা-মাতার আত্মার মুক্তির পথ প্রশস্ত করুন।'

এ কথা বলার পর সোমেশ্বর মহাদেবের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব অঙ্গিরাকে বললেন, 'তুমি দেবতার উদ্দেশ্যে বলো, ''আপনার মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব আপনার সম্পদ রক্ষার যে দায়িত্ব আমাকে সমর্পণ করছেন সে দায়িত্ব আমি যথাযথ ভাবে পালন করব। কোনওরূপ লোভ ও ভয়শূন্য ভাবে। আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন।'' '

একটু ইতস্তত করে প্রধান পুরোহিতের বলা কথাগুলো বলল অঙ্গিরা।

ত্রিপুরারিদেব বললেন, 'তুমি এবার শপথ গ্রহণ করো, ''আমি আমৃত্যু কোনও দিন আমার দায়িত্বের কথা, সোমেশ্বর মহাদেবের রত্ন কক্ষের কথা দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করব না।'' '

প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ মতো শপথ বাক্য গ্রহণ করল অঙ্গিরা।

ত্রিপুরারিদেব বিগ্রহর গলা থেকে একটা নীলকণ্ঠ ফুলের মালা নিয়ে সেটা অঙ্গিরার গলায় পরিয়ে দিয়ে দেবতার রত্নরক্ষক, স্যমন্তক মণির প্রহরী রূপে অভিষিক্ত করলেন অঙ্গিরাকে।

অঙ্গিরা ও ত্রিপুরারিদেব দুজনেই প্রণাম করল ত্রিভুবনপতি সোমনাথকে। অঙ্গিরাকে নিয়ে এরপর ত্রিপুরারিদেব এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন কক্ষের পাথুরে দেওয়ালের সামনে। অঙ্গিরা দেখল সে দেওয়ালের এক নির্দিষ্ট স্থানে দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুল স্থাপন করলেন দেবতার প্রধান পুরোহিত। ধীরে ধীরে ফাঁক হতে শুরু করল দেওয়ালের এক অংশ। একজন মানুষ গলে যাবার মতো পথ তৈরি হল। দেওয়ালের ওপাশে খেলা করছে নিকষ কালো অন্ধকার!

ত্রিপুরারিদেব, অঙ্গিরাকে তাঁকে অনুসরণ করতে বলে প্রবেশ করলেন সেই গহ্বরে। অঙ্গিরাও প্রবেশ করল তার পিছনে। প্রদীপের মৃদু আলোতে যতটুকু দৃশ্যমান তাতে অঙ্গিরা দেখল সংকীর্ণ সোপানশ্রেণী নেমে গেছে পাতালের দিকে। সেই সোপানশ্রেণী বেয়ে ধীর পদে নামতে শুরু করলেন প্রধান পুরোহিত। অঙ্গিরা তাকে অনুসরণ করল।

অনেক বাঁক আছে সেই সোপানশ্রেণীর। প্রতিটা বাঁকে দুপাশ থেকে নানা অন্ধকার অলিন্দ এসে মিশেছে। এ যেন এক গোলাকধাঁধা। কিছুটা নামার পর অঙ্গিরার মনে হল এরপর নামলে সে আর এই গোলকধাঁধা ভেঙে কিছুতেই উঠে আসতে পারবে না। এখনই তাকে যা করার করতে হবে। সামনে আবারও একটা বাঁক আসছে। সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত সেই বাঁকের মুখে পৌঁছতেই অঙ্গিরা বলে উঠল, 'আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন প্রধান পুরোহিত। হে সোমেশ্বর মহাদেব তুমি আমাকে ক্ষমা কোরো।'

কথাটা কানে যেতেই ত্রিপুরারিদেব থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকাতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে পিছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিল অঙ্গিরা। ত্রিপুরারিদেব অস্পষ্ট আর্তনাদ করে ছিটকে পড়ে সোপানশ্রেণী দিয়ে নীচের দিকে গড়িয়ে যেতে লাগলেন! প্রদীপ নিভে গেল। অঙ্গিরা আর নীচের অন্ধকারের দিকে না তাকিয়ে দ্রুত উঠতে শুরু করল ওপর দিকে।

অঙ্গিরা শেষ পর্যন্ত উপস্থিত হল গর্ভগৃহতে। ত্রিপুরারিদেব যেখানে অঙ্গুলি স্থাপন করে পথ উন্মোচন করেছিলেন অঙ্গিরা সে স্থানে অঙ্গুলি স্থাপন করে চাপ দিতেই পাথুরে দেওয়াল আবার নিজের স্থানে ফিরে এসে পথ করে দিল। গর্ভগৃহর নীচে অন্ধকারে আটকা পড়ে গেলেন সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত।

অঙ্গিরা এরপর গর্ভগৃহ ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে এসে গর্ভগৃহের ভারী তোরণটা বন্ধ করে দিল। গর্ভগৃহ চত্বরের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অঙ্গিরা হাঁফাতে হাঁফাতে ভাবতে লাগল তার এবার কী করা উচিত? সে কি মন্দিরের পশ্চাত ভাগের প্রাকার অতিক্রম করে সমুদ্রের দিক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়বে? তারপর নগরীতে অনুসন্ধান চালাবে খগেশ্বরের যদি দেখা মেলে সেজন্য? যদি কোনও ভাবে দেবদাসী সমর্পিতা বা চন্দ্রদেবের সন্ধান পাওয়া যায়!

ভাবছিল অঙ্গিরা। গর্ভগৃহর সমুখভাগে এই স্থান মন্দিরের সর্বোচ্চ স্থান। মন্দিরের বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায় এ স্থান থেকে। হঠাৎ অঙ্গিরা দেখতে পেল দূরে এক দিকে আকাশ যেন লাল হয়ে উঠেছে। ও কীসের আলো? অঙ্গিরা বোঝার চেষ্টা করল সেই আলোর উৎস।

শুধু অঙ্গিরাই নয়, প্রচণ্ড উৎকণ্ঠাতে, আতঙ্কে বিনিদ্র রাত্রি যাপন করছিল অনেকেই। সেই আলো যত উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগল, ততই চোখে পড়তে লাগল অনেকেরই। হঠাৎই মন্দিরের প্রবেশ তোরণের দিক থেকে কার যেন চিৎকার ভেসে এল, 'যবন আসছে! তারা এসে পড়েছে!'

লোকটার সে চিৎকার মিথ্যা ছিল না। আকাশ আলোকিত হয়ে উঠছিল মামুদ বাহিনীর হাজার হাজার মশালের আলোতে। সোমনাথ নগরীর উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে তারা।

সেই চিৎকার শোনার কয়েক মুহূর্তের মধ্যে প্রবল আতঙ্কে যেন ঘুম ভেঙে গেল মন্দিরের। একমাত্র দেবদাসীরা ছাড়া যে যেখানে তারা ছিল নিজেদের কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে এল মন্দির প্রাঙ্গণে। রাত্রির নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে ভয়ার্ত কোলাহল মুখর হয়ে উঠল প্রাঙ্গণ। চারদিক থেকে শুধু চিৎকার শোনা যেতে লাগল, 'যবন আসছে! যবন আসছে!'

অঙ্গিরা গর্ভগৃহর চত্বর থেকে যখন নীচে নামতে শুরু করল তখন তার পাশ দিয়েই দ্রুত ওপর দিকে উঠছেন পুরোহিত মল্লিকার্জুন। তিনি যেন খেয়ালই করলেন না অঙ্গিরাকে। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবকে সংবাদ দেবার জন্য ছুটছেন তিনি। অঙ্গিরা যখন নীচের প্রাঙ্গণে নেমে এল, তখন তিনি উপস্থিত হলেন প্রধান পুরোহিতের কক্ষের সামনে। কিন্তু মল্লিকার্জুন সে কক্ষে বা গর্ভগৃহ চত্বরে কোথাও সন্ধান পেলেন না সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের।

২৫

সূর্যোদয় হল সোমনাথ নগরীতে। উষ্ট্রপৃষ্ঠে বসে থাকা গজনীর সুলতান মামুদ নগরীতে প্রবেশ করার আগেই দূর থেকে দেখতে পেলেন সোমনাথ মন্দিরের স্বর্ণধ্বজ। সুলতান হিসাব করে দেখলেন গজনী মুলুক থেকে সোমনাথ নগরীতে পৌঁছতে তাঁর বিয়াল্লিশ দিন সময় লেগেছে। নগরীতে প্রবেশ করার আগে তার বাহিনীকে কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে তার পার্শ্বচরদের ডেকে নিলেন তিনি। জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকদের পাঁচটি ভাগ পাঁচ জন অভিজ্ঞ সেনাপতিদের অধীনে রাখার ব্যবস্থা করলেন। তাদের একটি দল নগরীকে বাইরে থেকে বেষ্টন করে থাকবে যাতে কেউ নগরী ত্যাগ করে বাইরে পলায়ন করতে না পারে। অথবা বাইরে থেকে কোনও সেনাদল যদি সোমনাথ নগরীকে রক্ষা করতে আসে তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য। বাকি চারটি দলকে নিয়ে মামুদ নগরীতে প্রবেশ করবেন। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবেন সোমনাথ মন্দির।

তিনি তাঁর সেনাপতিদের নির্দেশ দিলেন, 'সোজা এগোতে হবে ওই অপবিত্র ধর্মস্থানের দিকে। ধ্বংস করতে হবে, লুণ্ঠন করতে হবে সব কিছু। আর একজন কাফেরও যদি ওই স্থানে জীবিত থাকে তবে এ জিহাদ সম্পন্ন হবে না এ কথাটা তোমরা মনে রেখো। শিশু হোক, বৃদ্ধ হোক বা যুবক তোমাদের প্রত্যেকের তরবারি যেন এক-একজন কাফেরকে নিক্ষেপ করে নরকের আগুনে।'

গজনীবিদের নির্দেশ দান শেষ হতেই পথপ্রদর্শক বিষধারীর উটটা এগিয়ে এল সুলতানের কাছে। সোমনাথ মন্দিরের সেবায়েত প্রধান বিষধারী সুলতানের উদ্দেশ্যে বলল, 'ওটাই সোমনাথ মন্দির। ওই তার চূড়া দেখা যাচ্ছে। এবার আপনি আমাদের মুক্তির নির্দেশ দিন সুলতান।'

তার কথা শুনে সুলতান বললেন, 'হ্যাঁ, মন্দির দেখা গেলে তো মুক্তি দিতেই হয়। কিন্তু কোথায় তোদের পুতুলের সেই মন্দির? আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।'

সুলতানের কথা শুনে তাকে মন্দির শীর্ষ দর্শন করাবার জন্য আকাশের দিকে গলা তুলে তাকিয়ে বলল, 'ওই যে, ওই। ওই দেখুন আকাশের বুকে সোমনাথ মন্দিরের স্বর্ণধ্বজ দেখা যাচ্ছে!'

সুলতান তার কথার জবাব না দিয়ে ইশারাতে তাঁর নির্দেশ জানালেন বিষধারীর পিছনে বসে থাকা উট চালককে। লোকটা মূহূর্তের মধ্যে মালিকের নির্দেশ পালন করে কোমর থেকে ধারালো ছুরিকা বার করে পিছন থেকে এক হাতে আলিঙ্গন করে অন্য হাতে সেই ছুরি চালিয়ে দিল বিষধারীর গলায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সোমনাথ মন্দিরের সেবায়েত প্রধানের ধড়-মুণ্ড আলাদা হয়ে গেল। তারপর সেই ধড় আর মুণ্ড উটের পিঠ থেকে খসে পড়ল সুলতানের যাত্রা পথের সামনে। বিষধারীর ধড়হীন মুণ্ড তখনও যেন তাকিয়ে আছে আকাশের বুকে জেগে থাকা সোমনাথ মন্দিরের স্বর্ণ শিখরের দিকে!

পথপ্রদর্শক বিষধারীকে এমন নির্মমভাবে হত্যার নির্দেশ দিয়ে সুলতান মামুদ যেন নগরীতে প্রবেশ করার মুখে তার অনুচরদের, জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকদের বুঝিয়ে দিলেন তিনি কাফেরদের প্রতি কতটা নির্মম। কোনও কারণে, কোনও অবস্থাতেই, কোনও কাফেরকে ক্ষমা করা চলে না!

সুলতানের এক সহচর তাঁকে প্রশ্ন করল, 'মালিক, সুন্দরী জেনেনাটাকেও এখনই নরকে পাঠাব?'

গজনীবিদ সুলতান বললেন, 'না, এখন থাক। ওই পাপিষ্ঠাটাকে বরং উটের গলা থেকে খুলে পিঠে চাপাও। যাতে ও মন্দির দখল পর্যন্ত বেঁচে থাকে। স্বেচ্ছাসেবী জিহাদি বাহিনীর যে যুবক প্রথম কাফেরদের মন্দিরে প্রবেশ করবে তাকে আমি ওই সুন্দরী জেনেনা উপহার দেব।'

সুলতানের কথায় চাপা উল্লাসধ্বনি শোনা গেল জিহাদি যুবকদের মধ্যে। গজনীবিদ মামুদ এরপর খলিফার পতাকাবাহককে নির্দেশ দিলেন সামনে এগোবার জন্য।

সুলতান মামুদের নেতৃত্বে বন্যার স্রোতের মতো নগরীতে প্রবেশ করল যবন বাহিনী। নগরী প্রায় জনশূন্য। কেউ প্রতিরোধ করতে এগিয়ে এল না। সুলতান তার বাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললেন তার এবারের হিন্দ মুলুক অভিযানের অন্তিম লক্ষ সোমনাথ মন্দিরের দিকে।

গর্ভগৃহ চত্বরে সে সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই পুরোহিত নন্দিবাহন ও মল্লিকার্জুন। তারা কিছু সময়ের মধ্যেই দেখতে পেলেন দিকচক্রবাল থেকে একটা প্রবল ধূলিঝড় যেন নগরীর মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসছে মন্দিরের দিকে! তা দেখে নন্দিবাহন বললেন, 'মল্লিকার্জুন আপনি আমার থেকে বয়জ্যেষ্ঠ, তাই ত্রিপুরারিদেবের যখন সন্ধান মিলছে না তখন তাঁর অনুপস্থিতিতে আপনি মন্দিরের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করুন।'

এই বিপর্যয়ের মুহূর্তে প্রধান পুরোহিতের অনুপস্থিতিতে সহ প্রধান পুরোহিত মল্লিকার্জুনের ওপরই দায়িত্বভার বর্তায়। তাই তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, আমি গর্ভগৃহ রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করছি। আর আপনি নীচের চত্বর আর প্রবেশ তোরণ রক্ষার ভার নিন। আমাদের মাধ্যমে সোমেশ্বর মহাদেব নিশ্চয়ই রক্ষা করবেন তাঁর আবাসস্থল সোমনাথ মন্দিরকে।'

দেবদাসীরা ব্যতীত সারা মন্দিরবাসী এখন সমবেত হয়েছে সোপানশ্রেণীর ঠিক নীচে উন্মুক্ত স্থানে। সেই জনতার ভিড়ে অঙ্গিরাও ছিল। একদিকে তার দেবদাসী সমর্পিতার জন্য প্রবল দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে এ পরিস্থিতিতে তার কী করা উচিত তা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। চারদিকে ভয়ার্ত, অসহায় নর-নারীদের ভিড়ে মিশে সে-ও অসহায় ভাবে দাঁড়িয়েছিল।

সহ-প্রধান পুরোহিত নন্দিবাহন গর্ভগৃহ চত্বর ত্যাগ করে নীচে নামার সময় সোপানশ্রেণীর মধ্যবর্তী একস্থানে এসে দাঁড়ালেন। নীচ থেকে মন্দিরবাসীরা তাকিয়ে আছে তার দিকে। দু-হাত মাথার ওপর তুলে তিনি প্রথমে শান্ত হতে বললেন জনতাকে। স্তব্ধ হল সবাই।

পুরোহিত নন্দিবাহন সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, 'যবনরা এসে উপস্থিত হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তাদের দণ্ড দেবার জন্য, নিশ্চিহ্ন করার জন্য তাদের নিয়তি তাদের এখানে টেনে এনেছে। আর সেই দণ্ড সোমেশ্বর মহাদেব তাঁর সন্তানদের অর্থাৎ আমাদের মাধ্যমেই নারকী মামুদকে দিতে চলেছেন। তাই শঙ্কার কোনও কারণ নেই। আমরাই প্রতিরোধ করব, ধ্বংস করব তাদেরকে। তা সে যত বিশাল বাহিনীই হোক না কেন। আর এ কার্য সম্পাদন করতে গিয়ে যদি কারো মৃত্যু ঘটে, তবে যেন তার অক্ষয় স্বর্গ লাভ হবে। তার পুণ্যে তার সন্তান- সন্ততিরাও পুণ্যবান হবে। আমরা সবাই ভরসা রাখি আমাদের রক্ষাকর্তা সোমেশ্বর মহাদেবের ওপর। সবাই বলো, ' ''জয় সোমনাথ, জয় সোমেশ্বর মহাদেবের জয়''!' পুরোহিতের বক্তব্যে কিছুটা ভরসা পেয়ে উপস্থিত জনতা সম্মিলিত ভাবে বলে উঠল, 'জয় সোমনাথ, জয় সোমেশ্বর মহাদেবের জয়! হর হর মহাদেব!'

ঠিক এই সময় পুরোহিত মল্লিকার্জুন গর্ভগৃহ চত্বরের প্রধান ঘণ্টাটা বাজাতে শুরু করলেন। তার সঙ্গে বাজতে শুরু করল উপমন্দিরের ঘণ্টা গুলোও। মন্দিরবাসীরা, সৈনিকরা সবাই প্রস্তত হল যে যার মতো মামুদ বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য।

সোমনাথ নগরীর মধ্যে দিয়ে এগোবার সময় কোনও রকম মৃদু প্রতিরোধের সম্মুখীন না হওয়াতে মৃদু বিস্মিত হলেন মামুদ। তাঁর মনে এ আশঙ্কাও তৈরি হল যে নগরবাসীদের মতো মন্দিরবাসীরাও তাদের রত্নখচিত পুতুল-বিগ্রহ আর সম্পদ নিয়ে মন্দির ত্যাগ করেনি তো? তবে দূর থেকে ঘণ্টাধ্বনি কানে যেতে কিছুটা আশ্বস্ত হলেন সুলতান। তিনি এগোতে লাগলেন মন্দিরের দিকে। ক্রমশ প্রাকার সমৃদ্ধ বিশাল সোমনাথ মন্দিরের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল তাঁর চোখের সামনে। ওই সেই কাফেরদের ধর্মস্থান! যা ধ্বংস করার জন্য উষর মরুপ্রদেশ অতিক্রম করে কাফেরদের রক্তে তলোয়ার ভিজিয়ে ছুটে এসেছেন গজনীবিদ।

সূর্য দিকচক্রবাল আর মধ্যাকাশের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছতেই বীভৎস চিৎকার আর 'দীন দীন' ধ্বনি তুলে মামুদ বাহিনী উপস্থিত হয়ে গেল সোমনাথ মন্দিরের কাছে। মন্দিরের ভিতরে উন্মাদের মতো বেজে চলেছে ঘণ্টাধ্বনি। যবন সেনাদের চিৎকারের প্রত্যুত্তরে মন্দিরের ভিতর থেকে শোনা যাচ্ছে 'জয় সোমনাথ, হর হর মহাদেব ধ্বনি'!

মন্দিরের নিকট উপস্থিত হয়েই চারদিকে বিভক্ত হয়ে মন্দিরকে বেষ্টন করে ফেলল অভিজ্ঞ সেনাপতিদের নেতৃত্বে জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকরা। তবে যুদ্ধবাজ সুলতান একটা ব্যাপার বুঝতে পারলেন। মাধেরা সূর্য মন্দিরের প্রাকারের তুলনায় এ মন্দিরের প্রাকার অনেক উঁচু, বহির্গাত্রও মসৃণ। উটের পিঠ থেকে লাফিয়ে প্রাকারে ওঠা যাবে না বা দেওয়াল বেয়ে ওঠা যাবে না। তোরণ ভেঙেই মন্দিরে প্রবেশ করতে হবে। যে তোরণের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বেতের বর্ম, লৌহ শিরস্ত্রাণ পরা সেনা আর মন্দির রক্ষীরা।

সুলতান তাঁর স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর তরুণদের নির্দেশ দিলেন উটের পিঠ থেকে মাটিতে নেমে মন্দির তোরণের দিকে এগোবার জন্য। যে প্রথম তোরণ অতিক্রম করতে পারবে সেই তো লাভ করবে সঙ্গে আনা সেই সুন্দরী নারীর শরীর।

যুবক জিহাদিরা তাই বীভৎস চিৎকার করতে করতে এগোল সোমনাথ মন্দিরের তোরণ ভেঙে ফেলার জন্য। রাজা ভীম যে সেনাদল মন্দির রক্ষার জন্য রেখে গেছিলেন, সেই সেনাদল মামুদ বাহিনীর তুলনায় ক্ষুদ্র হলেও তিরন্দাজিতে দক্ষ। তারাও প্রস্তুত হয়েই ছিল। জিহাদি যবনরা কাছে এগিয়ে আসতেই তির নিক্ষেপ করতে শুরু করল তারা। মন্দিরের ভিতর থেকে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ধ্বনি উঠল, 'জয় সোমনাথ! হর হর মহাদেব!' যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল!

যবন বাহিনী তলোয়ার চালনাতে দক্ষ হলেও তিরন্দাজি বা লক্ষ্যভেদে তেমন পারদর্শী নয়। রাজা ভীমের তিরন্দাজদের তিরের মুখে অনেকে ছিটকে পড়তে লাগলেও তাদের সাহসের অভাব নেই। সংখ্যাতেও তারা অনেক। সেই তির বৃষ্টির মধ্যেও তারা এগোতে লাগল তোরণের দিকে।

সুলতান নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন তার তরুণ জিহাদিদের সাহস। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হওয়া প্রয়োজন এই সব যুবকদের। কারণ, খলিফার পতাকা তো এই তরুণরাই ছড়িয়ে দেবে এই হিন্দ মুলুকে। ধ্বংস করবে, উৎপাটিত করবে কাফেরদের ধর্ম ভাবনা।

সূর্য মধ্য গগনে পৌঁছতেই তির বৃষ্টির মধ্যেই যবন তরুণরা পৌঁছে গেল তোরণের সামনে। রাজা ভীমের সেনাদের সঙ্গে শুরু হলো তলোয়ারের লড়াই। মামুদ বাহিনীর বাঁকানো তলোয়ারের আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হতে লাগল রাজা ভীমের সেনাদের দেহ, উপবিতধারী মন্দির রক্ষীদের বস্ত্র। যে রক্ষীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথ। তার রক্ষীদের ভল্লর আঘাতেও উড়তে লাগল সবুজ পাগড়ি সমেত হানাদারদের ছিন্ন মুণ্ড। তবে তলোয়ার যুদ্ধে সুলতানা বাহিনী অনেক বেশি পারদর্শী কাফের বাহিনীর থেকে। মামুদ বুঝতে পারলেন, কাফেররা যত বিক্রমে যুদ্ধ করুক না কেন তারা বেশি সময় যুদ্ধ চালাতে পারবে না। স্বেচ্ছাসেবক তরুণরা একজন কাফেরকে হত্যা করলেই সুলতান উল্লসিত ভাবে বলে উঠতে লাগলেন 'শাবাশ! শাবাশ!'

অভিজ্ঞ সুলতানের অনুমানই সঠিক হল। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার কিছু সময় পরই শেষ হয়ে এল কাফের বাহিনী। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে অবশেষে যবনবাহিনীর সম্মিলিত আঘাতে মৃত্যু হল সোমনাথ মন্দিরের রক্ষী প্রধান জয়দ্রথের। তার ছিন্ন মুণ্ড নিয়ে ছুটে এসে সুলতানের পায়ের সামনে নামিয়ে রাখল এক তরুণ। সুলতান খুশি হয়ে তার আঙরখার ভিতর থেকে এক মুঠো স্বর্ণমুদ্রা বার করে ইনাম হিসাবে সেই স্বেচ্ছাসেবককে বলল, 'তোরণ ভেঙে ফেলো।'

সুলতানের নির্দেশ পালনের জন্য সচেষ্ট হল তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা। সম্মিলিত ভাবে তারা ভারী প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করতে লাগল, অস্ত্রাঘাত করতে লাগল বিশাল তোরণের কপাটের ওপর। কেঁপে উঠতে লাগল তোরণ। তার গা থেকে খসে পড়তে লাগল ধাতুর অলঙ্করণগুলো।

সমুদ্রের বুকে সূর্য ঢলে পড়ার কিছু সময় আগে মামুদবাহিনী তোরণের একটা কাঠের পাটাতন খসিয়ে ফেলল। একজন জিহাদি তরুণ সে ফোঁকর গলে ভিতরে প্রবেশ করতে যাচ্ছিল। যে প্রথম কাফেরদের ধর্মস্থানে পা রাখবে, সেই তো সুন্দরী জেনেনাকে পাবে! কিন্তু সেই তরুণের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হল না। শূলের আঘাতে বিদীর্ণ হয়ে গেল তার দেহ। আর তারপরই সেই ফাটল দিয়ে ভয়ঙ্কর চিৎকার করতে করতে বাইরে বেরোতে শুরু করল একদল মানুষ। আর তাদের দেখে বিস্মিত হয়ে গেল মামুদ বাহিনী, এমনকী স্বয়ং সুলতান মামুদও।

এ জীবনে বারংবার হিন্দ মুলুক অভিযানে বহু ধরনের যোদ্ধা দেখেছেন গজনীবিদ, কিন্তু এমন যোদ্ধা দেখেননি তিনি কোনওদিন। যারা মন্দির থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছে তারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ! জটাজুটধারী হিংস্র মুখমণ্ডল, ভস্ম মাখা শরীর। তাদের কারো হাতে ধরা ভীষণ শূল অথবা ত্রিশূল।

যে স্বচ্ছাসেবী জিহাদি যুবকরা তোরণ ভাঙছিল তারা একবার কাসেমের মুখ থেকে অথবা অন্য কারো থেকে শুনেছিল যে এই মন্দিরের কাফের দেবতার অনুচররা নাকি প্রেত-দৈত্যদানো। তেমনই বিশ্বাস কাফেরদের। এই লোকগুলো তেমন কেউ নয়তো? এরা মানুষতো? কেমন যেন আতঙ্ক সৃষ্টি হল জিহাদি যুবকদের মনে।

একলিঙ্গদেবের উপাসকরা ঝাঁপিয়ে পড়ল যবনদের উপর। বীভৎস তাদের ক্রোধ, দেহে আসুরিক শক্তি! সত্যি তারা যেন মহাদেবের সাক্ষাৎ অনুচর! তাদের শূলের, ত্রিশূলের প্রচণ্ড আঘাতে রক্তের বন্যা বইতে লাগল তোরণের সামনে।

ভয়ার্ত আর্তনাদ করতে করতে ছত্রভঙ্গ হতে লাগল সুলতানের স্বেচ্ছাসেবকরা। মন্দিরের ভিতর থেকে কাফেরদের উল্লাসধ্বনি ভেসে আসতে শুরু হল, 'জয় সোমনাথ! জয় একলিঙ্গদেবের জয়! হর হর মহাদেব!'

সুলতানও হতবাক! এমন ভয়ঙ্কর প্রতিরোধের মধ্যে তাঁর বাহিনীকে কোনও দিন পড়তে হয়নি। পরিস্থিতি এক সময় এমন হল যে সুলতান দেখতে পেলেন স্বেচ্ছাসেবকদের ছিন্ন ভিন্ন করতে করতে সুলতান যেখানে অবস্থান করছেন সেদিকেই এগোচ্ছে কাফেরদের অদ্ভুত দর্শন দানব বাহিনী। বাধ্য হয়ে কিছুটা পিছু হটে গেলেন স্বয়ং সুলতানও। ভারত ভূখণ্ডের মাটিতে এই প্রথম তাঁর কয়েক কদম হলেও পশ্চাদাপসরণ! কিন্তু শেষ পর্যন্ত একলিঙ্গদেবের অনুচররা আর সুলতানের কাছে পৌঁছতে পারল না। সমুদ্রর বুকে সূর্য ডুবে গেল। নাগা সন্ন্যাসীদের দল প্রচণ্ড বিক্রম প্রদর্শন করে সেদিনের শেষ যুদ্ধ জয় করে মন্দিরে প্রস্থান করল।

মামুদ তাঁর শিবির স্থাপন করলেন সে স্থানেই। সৈন্যাধ্যক্ষ আর জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকদের সমবেত করে তাঁদের উৎসাহ প্রদানের জন্য তিনি বললেন, 'আমি নিশ্চিত আমার যোদ্ধারা, আমার স্বেচ্ছসেবক বাহিনীর তরুণরা অবশ্যই কাল মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবে। আমি কাল নিজে তোরণের সামনে দাঁড়িয়ে তোমাদের নেতৃত্ব দেব। যাদের দেখে তোমরা আতঙ্কিত হোচ্ছো, তারা দানো বা জিন নয়, তারা মানুষ। আর মানুষের শরীর হলে সে শরীর অস্ত্রের আঘাত প্রতিহত করতে পারে না। মনে সাহস এনে আঘাত হানো ওই নগ্ন কাফেরদের ওপর। সব সময় মনে রাখবে খলিফার দোয়া তোমাদের সঙ্গে আছে। ওই নগ্ন কাফেরদের দিকে প্রতি কাফেরকে লক্ষ করে দশ জন জিহাদি তরুণ এগিয়ে যাবে। তলোয়ারের সঙ্গে বর্শা নাও। যাতে তা দূর থেকে শত্রুর শরীরে নিক্ষেপ করা যায়। এক একজন উলঙ্গ কাফেরকে বধ করার বিনিময়ে তোমরা কুড়ি দিনার আরব মুদ্রা পাবে।'

ঠিক এই সময়তেই সোমনাথ মন্দির চত্বরেও মন্দিরবাসীদের সামনে বক্তব্য রাখছিলেন পুরোহিত মল্লিকার্জুন। সোপানশ্রেণীর পাদদেশে সমবেত হয়েছে মন্দিরবাসীরা। তাদের মধ্যে অঙ্গিরাও আছে। সে বুঝতে পারছে বর্তমান যা অবস্থা তাতে সে যদি কোনও ভাবে মন্দির ত্যাগও করে তবে নিশ্চিত ভাবে যবন বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যাবে।

মল্লিকার্জুন বললেন 'আজ একলিঙ্গদেবের উপসাকরা যুদ্ধের অন্তিম লগ্নে যে বীরত্ব প্রদর্শন করলেন তা শুভ সূচনার ইঙ্গিতবাহী। তোরণ ত্যাগ করে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে যবন বাহিনী। সোমেশ্বর মহাদেবের আশীর্বাদ আমাদের সঙ্গে আছে। কাল সবাই অস্ত্র ধরবেন আপনারা। অস্ত্র না থাকলে প্রস্তর খণ্ড, যষ্ঠি ইত্যাদি ব্যবহার করবেন অস্ত্র হিসাবে। জয় আমাদের নিশ্চিত। আগামী কালই হয়তো নগরীতে এসে উপস্থিত হবে ভোজরাজ পরমদেওর বিশাল সমুদ্র সমান বাহিনী। ধ্বংস হবে যবনরা।'

এরপর আরও কিছু কথা বলে বক্তব্য শেষ করলেন তিনি। সভা সাঙ্গ হল। মন্দিরবাসীরা প্রস্তুত হতে লাগল বিনিদ্র রজনী যাপনের জন্য। রাত্রি শেষে যবন বাহিনীর সঙ্গে সংগ্রামে অবতীর্ণ হবার জন্য।

রাত গভীর হতে শুরু করল। অঙ্গিরা ভাবতে লাগল সে কী করবে? মন্দিরবাসীদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করবে মামুদ সেনার বিরুদ্ধে? কিন্তু অঙ্গিরার মনে হল, যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে তারও তো মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে। অঙ্গিরা মৃত্যু ভয়ে ভীত নয়, কিন্তু সে যে দেবদাসী সমর্পিতাকে কথা দিয়েছে তার কাছে যাবে, মিলিত হবে তার সঙ্গে। সে যে প্রতীক্ষা করছে অঙ্গিরার জন্য। যেভাবেই হোক কথা রাখতে হবে অঙ্গিরাকে। পৃথিবীর যে স্থানেই সে থাকুক তাকে খুঁজে বার করতে হবে—তার ভালোবাসা রাজকন্যা রাজশ্রীকে।

অঙ্গিরা সিদ্ধান্ত নিল, সে যুদ্ধ করবে না। আত্মগোপন করে থাকবে কোথাও। আর তার জন্য উপযুক্ত স্থান হল সেই চন্দ্রমন্দির। সুলতান বাহিনী যদি সোমনাথ মন্দিরে প্রবেশ করেও তবুও তারা নিশ্চয়ই সেই জীর্ণ, ভগ্ন, পরিত্যক্ত মন্দিরের প্রতি আকর্ষিত হবে না। কারণ, বাইরে থেকে সেই জীর্ণ মন্দির দেখেই তারা বুঝবে সেখানে কোনও সম্পদ নেই। এ কথা ভেবে নিয়ে সে এগোল চন্দ্রমন্দিরের দিকে। সেই মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করার আগে অঙ্গিরা একবার আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবল, 'রাজকন্যা রাজশ্রী এখন কোথায়? সে যেখানে আছে সেখানেও কি আকাশে চাঁদ উঠেছে? রাজশ্রীও কি চাঁদের দিকে তাকিয়ে তার কথাই ভাবছে?'

হ্যাঁ, সে বনাঞ্চলের মাথাতেও একই রকম চাঁদ উঠেছিল। পরিত্যক্ত মন্দিরের সেই কক্ষের ভগ্ন গবাক্ষ দিয়ে রাত আরও গভীর হবার প্রত্যাশাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে এ ক'দিন, দিনরাত তো শুধু তার কথাই ভেবে চলেছে রাজশ্রী। মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব আর প্রতীক্ষা করতে রাজি নন। তবে রাজশ্রী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, অঙ্গিরাকে ফেলে রেখে সে চালুক্য নগরীতে ফিরবে না। রাজমুকুট, সাম্রাজ্ঞীর পদ তার ভালোবাসার থেকে দামি নয় রাজশ্রীর কাছে। অঙ্গিরাকে খুঁজে বার করতেই হবে তাকে। অঙ্গিরাও নিশ্চয়ই তার সন্ধান করছে।

নিজের সংকল্পে অটল রাজশ্রী প্রতীক্ষা করতে লাগল রাত্রি আরও গভীর হবার জন্য। এক সময় চাঁদ ঠিক মাঝ আকাশে পৌঁছল। রাজশ্রী কক্ষের উন্মুক্ত দ্বারের দিকে তাকিয়ে দেখল ক্লান্তিতে, চিন্তাতে অবসন্ন হয়ে দ্বারের একপাশে ঘুমিয়ে পড়েছেন চালুক্য মহামন্ত্রী। তিনি নিদ্রামগ্ন এ ব্যাপারে নিশ্চিত হবার পর উঠে দাঁড়াল রাজশ্রী। সন্তর্পণে সে ঘুমন্ত চন্দ্রদেবের পাশ কাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। কিছুটা তফাতে চন্দ্রালোকে গাছের গায়ে বাধা আছে মহামন্ত্রীর ঘোড়াটা। রাজশ্রী নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে গাছের দড়িতে বাধা লাগামটা খুলে নিয়ে চড়ে বসল ঘোড়ার পিঠে। যাত্রাপথের দিকে ঘোড়ার মুখ ফেরাতেই অশ্বক্ষুরের শব্দে কেঁপে উঠে মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব দেখতে পেলেন ঘোড়ার পিঠে রাজশ্রীকে। ব্যাপারটা অনুমান করে আতঙ্কিত চন্দ্রদেব বললেন, 'কোথায় যাচ্ছ রাজকন্যা? ফিরে এসো, ফিরে এসো...।'

রাজকন্যা রাজশ্রী তাঁর কথায় কর্ণপাত করল না। সে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল সোমনাথ নগরীর উদ্দেশ্যে।

২৬

সোনার শিকলের ঝনঝন শব্দে নয়, মন্দির শীর্ষে বসে থাকা শ্বেত গৃধিনিগুলোর উন্নসিত কর্কশ চিৎকারে এদিন ভোর হল প্রভাস তীর্থে, সোমেশ্বর মহাদেবের আবাসস্থল সোমনাথ মন্দিরে। বর্ম পরিহিত মামুদ তার বাহিনী নিয়ে প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে-সঙ্গেই শিঙা বেজে উঠল। সুলতান নিজে তার সেনাপতি আর স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে এগোলেন মন্দিরের তোরণ ভাঙার জন্য।

শিঙার শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে মন্দির প্রাকারের ভিতর থেকেও শঙ্খনাদ হল। তোরণের ভিতর থেকে মন্দির রক্ষার জন্য বাইরে আত্মপ্রকাশ করল ভৈরববাহিনী, একলিঙ্গদেবের উপাসক শূল-ত্রিশূলধারী নাগা সন্ন্যাসীরা। 'দীন দীন' আর 'একলিঙ্গদেবের জয় ধ্বনিতে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হল দুই বাহিনী। এদিনের যুদ্ধরীতি সম্পর্কে সুলতানের নির্দেশ পালন করল যবন বাহিনী। উলঙ্গ কাফেরদের শূল বা ত্রিশূলের আওতার মধ্যে না গিয়ে কিছুটা তফাত থেকে দশ জন যবন সেনা মিলে এক জন নাগা সন্ন্যাসীকে লক্ষ করে বর্শা নিক্ষপ করতে লাগল।

বর্শা নিক্ষেপ করছেন স্বয়ং সুলতানও। তিনি পাশে থাকায় যবন সেনাদের মনোবল, উৎসাহ দ্বিগুণ হয়ে উঠল। নাগা সন্ন্যাসীদের ত্রিশূলের আঘাতে কিছু সুলতান সেনা নিহত হলেও যুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ পেতে লাগল সুলতান সেনারা। যুদ্ধরত গজনীবিদ অবাক হয়ে গেলেন এই নগ্ন সন্ন্যাসীদের সাহস ও শক্তি দেখে। একজন নগ্ন কাফের বর্শাবিদ্ধ অবস্থাতেই বেণীর ফাঁস দিয়ে হত্যা করল এক সুলতান সেনাপতিকে। তবে শেষ পর্যন্ত সুলতান বাহিনীর প্রবল অস্ত্রনিক্ষেপের মুখে একে একে ভূপতিত হতে লাগল মহাদেবের অনুচররা। কিন্তু তাদের শেষ জন পর্যন্ত আমৃত্যু লড়াই চালাল যবনদের বিরুদ্ধে।

যতক্ষণ তাদের শেষ ত্রিশূলধারী জীবিত রইল ততক্ষণ একজন যবনও প্রবেশ করতে পারল না মন্দিরের ভিতর। তারপর এক তরুণ স্বেচ্ছাসেবী জিহাদি তোরণের ভিতর ফাটল গলে প্রবেশ করল। তারপর তার পিছন পিছন আরও কয়েকজন।

যে মন্দিরবাসীরা মন্দিরের ভিতর যবনদের প্রতিরোধ করার জন্য অপেক্ষা করছিল তারা কেউ সৈনিক নয়, তবু তারা যে যা জিনিস সম্ভব হাতের কাছে পেয়েছে তা নিয়েই বাধা দেবার চেষ্টা করল যবনদের। মন্দিরবাসীদের কারো হাতে যষ্টি, কারো হাতে রন্ধন শলাকা, কারও হাতে ধাতব পাত্র অথবা ফুল সংগ্রহের সাঁজি। তা নিয়েই মামুদবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। কিন্তু সে সব দিয়ে আর কতক্ষণ প্রতিরোধ করা চলে অস্ত্রধারী মামুদ যোদ্ধাদের? রক্তস্রোত বইতে শুরু করল সোমনাথ মন্দিরে। বাঁকানো যবন তলোয়ারের আঘাতে উড়তে লাগল মন্দিরবাসী কাফেরদের ছিন্ন মুণ্ড। হাহাকার, আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। এরই মধ্যে সোমনাথ মন্দিরের তোরণের অর্গল উন্মুক্ত করে দিল একদল স্বেচ্ছাসেবী জিহাদি।

বন্যার স্রোতের মতো সুলতান বাহিনী প্রবেশ করতে লাগল সোমেশ্বর মহাদেবের আবাসস্থলে। তলোয়ার চালাতে চালাতে সুলতান বাহিনীর স্বেচ্ছাসেবকরা সোপনশ্রেণীর দিকে এগোতে লাগল মন্দিরে ওঠার জন্য। মন্দির চত্বরের ওপর থেকে যবনদের প্রতিরোধ করার জন্য একদল সেবায়েত দেবতার পূজার জন্য রক্ষিত বিল্ব ফল নিক্ষেপ করতে লাগল তাদের ওপর। অক্ষম, করুণ প্রচেষ্টা অসহায় সেবায়েতদের বিগ্রহকে রক্ষা করার জন্য।

একদল গজনীসেনা পৌঁছে গেল সোপানশ্রেণীর সামনে। সেখানে একটা ধাতব প্রদীপদণ্ড হাতে নিয়ে পথ আগলে দাঁড়িয়ে ছিলেন পুরোহিত নন্দিবাহন। জীবনে কোনও দিন অস্ত্র ধারণ করেননি তিনি। একজন যবন মন্দিরে ওঠার জন্য সোপানশ্রেণীতে পা বাড়াতেই নন্দিবাহন প্রচণ্ড আক্রোশে ভারী ধাতব প্রদীপদণ্ডর এক আঘাতে চূর্ণ করে দিলেন সেই যবনের মস্তক। পরক্ষণেই অবশ্য এক জিহাদির তলোয়ার পুরোহিত নন্দিবাহনের ধর-মুণ্ড আলাদা করে দিল। এরপর গর্ভগৃহ চত্বরে দাঁড়িয়ে পতাকা নাড়াতে শুরু করল সুলতান বাহিনীর পতাকাবাহক। খলিফার পতাকা! যা এখানে প্রোথিত করার জন্য সুদূর গজনী মুলুক থেকে হিন্দ মুলুকে ছুটে এসেছে মামুদবাহিনী। সে দৃশ্য দেখে উল্লাসধ্বনি করে উঠল জিহাদিরা। সোমনাথ মন্দির দখলের কাজ সম্পন্ন হয়েছে তাদের।

উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে ঘনিষ্ঠ পার্শ্বচরদের সঙ্গে নিয়ে তোরণ দিয়ে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করার সময় অট্টহাস্য করে মামুদ তার অনুচরদের বললেন, 'কাফেরদের বিশ্বাস ছিলো এ মন্দির কেউ ধ্বংস করতে পারবে না! তাদের দেবতা নাকি সর্বশক্তিমান। আমি তাদের দেবতার থেকেও বেশি শক্তিমান। চলো এবার দেখা যাক, কাফেরদের সেই পুতুল দেবতা কেমন?

সোপানশ্রেণী বেয়ে ওপরে ওঠার সময় অজগর সর্পের মতো স্বর্ণ শৃঙ্খল দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন সুলতান। এই স্বর্ণ শৃঙ্খলের মূল্যই তো অন্তত বিশ লক্ষ দিনার হবে! তবে কত সম্পদ জমা হয়ে আছে কাফেরদের এই মন্দিরে!

গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণে উঠে এসে গর্ভগৃহের বন্ধ কপাটের সামনে দাঁড়িয়ে সেই রত্নখচিত কপাট, কাঠামো দেখেও প্রবল বিস্মিত হলেন সুলতান। এত সম্পদ তো খলিফার তোষাখানাতেও নেই! কয়েক মুহূর্ত সেই কপাটের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে সুলতান পদাঘাত করলেন কপাটে। উন্মোচিত হয়ে গেল গর্ভগৃহ তোরণ। বিজয়ী গজনীবিদ সুলতান মামুদ তলোয়ার হাতে চর্ম পাদুকা সমৃদ্ধ পায়ে প্রবেশ করলেন কাফেরদের গর্ভ মন্দিরে।

গর্ভগৃহতে একটা প্রদীপ জ্বলছে। তার আলোতে মামুদ দেখতে পেলেন হীরকখচিত, রত্ন হারে সজ্জিত ঝুলন্ত বিগ্রহকে। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মুণ্ডিত মস্তক, শিখাধারী এক কাফের।

সোমেশ্বর মহাদেবের শূন্যে ঝুলন্ত বিগ্রহ দেখে মুহূর্তের জন্য বিস্মিত মামুদের মনে হল, 'তবে কি এ বিগ্রহের সত্যিই কোনও অলৌকিক ক্ষমতা আছে? পাথরের পুতুলটা শূন্যে ভেসে আছে কী ভাবে?'

তবে এ ভাবনাকে মনের মধ্যে স্থান দিলেন না সুলতান। সোমেশ্বর মহাদেবের মূর্তির পাশে দণ্ডায়মান লোকটাকে তিনি প্রশ্ন করলেন, 'তুই কে?'

লোকটা জবাব দিল, 'আমি মল্লিকার্জুন। এই সোমেশ্বর মহাদেবের সেবক, পুরোহিত।'

সুলতান তির্যক হেসে তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, 'আমি গজনীর সুলতান মামুদ।'

সুলতানের পরিচয় পেয়ে অনুনয়ের স্বরে মল্লিকার্জুন বললেন, 'দয়া করে বিগ্রহর কোনও ক্ষতি করবেন না আপনি। তার বিনিময়ে এ মন্দিরে রক্ষিত সম্পদের প্রতিটা কণা আমি আপনাকে দেব।'

সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের পুরোহিতের কথা শুনে মামুদ অট্টহাস্য করে বলে উঠলেন, 'বেওকুফ কাফের, সুলতান মামুদ তোর কাছে বিগ্রহ বিক্রি করতে আসেনি, বিগ্রহ ধ্বংস করতে এসেছে।' কথাটা বলে তিনি তলোয়ার ওঠালেন মূর্তির ওপর আঘাত হানার জন্য।

পুরোহিত মল্লিকার্জুন তা দেখে বিগ্রহকে রক্ষার শেষ চেষ্টা করার জন্য দু-হাতে জড়িয়ে ধরলেন সোমনাথকে। কিন্তু এর পরমুহূর্তেই বিগ্রহ ধ্বংসকারী গজনীর সুলতান মামুদের ভয়ঙ্কর তলোয়ার বিদ্যুতের মতো আঘাত হানল বিগ্রকে লক্ষ করে। পুরোহিত মল্লিকার্জুনের দেহ সমেত দেবমূর্তি দ্বিখণ্ডিত হয়ে খসে পড়ল মাটিতে।

বিগ্রহ দ্বিখণ্ডিত অবস্থায় মাটিতে আছড়ে পরার পরও সুলতান আরও বেশ কয়েকবার তলোয়ারের আঘাত হানলেন ভূপতিত সেই খণ্ডিত বিগ্রহকে আরও কয়েকটা খণ্ডে বিভক্ত করার জন্য। তার ভিতরে কোনও সম্পদ লোকানো আছে কিনা তা দেখার জন্য। কিন্তু এ ব্যাপারে একটু হতাশ হলেন সুলতান। খণ্ডিত বিগ্রহর পেটের ভিতর থেকে কোনও রত্ন সম্পদ পেলেন না তিনি।

তবে তেমন হতাশ হবার কিছু নেই। এ মন্দিরের চারপাশেই তো অজস্র সোনা রত্নরাজি ছড়িয়ে আছে। শুধু এই কপাট আর কাঠামোর দামই হবে এক কোটি দিনার! অসংখ্য হীরকখণ্ড, পান্না, নীলকান্ত মণি সমৃদ্ধ সোমনাথ মন্দিরের গর্ভগৃহর বিখ্যাত কপাট, যে কপাটের সামনে নতজানু হয়ে সোমেশ্বর মহাদেবের আশীর্বাদ প্রার্থনা করত হিন্দ মুলুকের শ্রেষ্ঠ সম্পদশালী নৃপতিরা।

গর্ভগৃহর থেকে বাইরে বেরিয়ে সুলতান তার অনুচরদের বললেন, 'এই কপাট যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। কাঠামো সমেত এই রত্ন-কপাট আমি অবিকৃত অবস্থাতে গজনীতে নিয়ে যাব। তোমরা মন্দিরের তোষাখানার সন্ধান করো। যেখানে যত সম্পদ আছে তা খুঁজে বার করো। আর যেখানে যত মূর্তি দেখবে প্রথমেই তা চূর্ণ করবে। কাফেররা যেন ভবিষ্যতে ও স্থানকে তাদের ধর্মস্থান হিসাবে আর কোনও দিন ব্যবহার করতে না পারে।'

সুলতানের নির্দেশ পেয়ে সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল তার বাহিনী। নানা উপমন্দিরে অথবা দেওয়াল গাত্রে যেখানে যত দেবদেবীর মূর্তি-বিগ্রহ ছিল, তা প্রথম দর্শনেই চূর্ণ করতে লাগল মামুদবাহিনী। মন্দিরের সাধারণ রত্নাগার-সহ যেখানে যত সম্পদ ছিল তা লুঠ করতে লাগল তারা। আর সম্পদের খোঁজ করতে করতেই স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী এক সময় এমনও স্থানে পৌঁছে গেল যেখানে তারা খুঁজে পেল তাদের আকাঙ্ক্ষিত শ্রেষ্ঠ সম্পদ—নারী রত্ন। মুহূর্তের মধ্যেই দেবদাসীদের আবাসস্থল পরিণত হয়ে গেল নরককুণ্ডে।

মন্দিরের সোপানশ্রেণীর ঠিক সামনের প্রাঙ্গণে সুলতানের তাঁবু খাটানো হয়েছিল। গজনীবিদ তার তাঁবুতে মহার্ঘ্য গালিচায় তাকিয়াতে শরীর এলিয়ে সঙ্গীত ধ্বনির মতো উপভোগ করতে লাগলেন দেবদাসীদের আবাসস্থলের দিক থেকে ভেসে আসা গণধর্ষিতা নারীদের, সোমনাথ মন্দিরের দেবদাসীদের ভয়ার্ত আর্তনাদ। তাদের নাথ সোমেশ্বর মহাদেব রক্ষা করতে পারলেন না তাদেরকে।

তবে সব দিনেরই শেষ থাকে। ভয়ঙ্কর দিনের অবসানে এক সময় অন্ধকার নামতে শুরু করল রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত সোমনাথ মন্দিরে। সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি, দেবদাসীদের নুপূর কিঙ্কিনির পরিবর্তে মন্দিরের নানা প্রান্ত থেকে ভেসে আসতে লাগল জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকদের উল্লাস, কখনও-বা দেবদাসীদের শেষ আর্তনাদ।

অঙ্গিরা সেই জীর্ণ মন্দিরের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল সারা দিন। সেখান থেকেই সে শুনতে পেয়েছে সোমেশ্বর মহাদেবের দিক থেকে নানা গোলযোগ, আর্তনাদের শব্দ ভেসে এসেছে। এবং অন্ধকার নামার পর কিছুটা স্তিমিত হলেও এখনও নারী কণ্ঠের তীক্ষ্ন চিৎকার মাঝে মাঝে শুনতে পাচ্ছিল অঙ্গিরা। আর তার সঙ্গে অজানা আশঙ্কাতে তার বুক কেঁপে উঠছিল। তার মনে হচ্ছিল, এমন ঘটেনি তো যে রাজকন্যা রাজশ্রী নগরী ত্যাগ করে হয়তো পালাতেই পারেনি অথবা পথে ধরা পড়ে গেছে সুলতান সেনাদের হাতে? কিন্তু এ ভাবনা মাথায় আসার পরক্ষণেই আবার তার মনে হতে লাগল, 'না, এ কখনোই হতে পারে না। আমরা ভালোবেসে কোনও অপরাধ করিনি। আমাদের ভালোবাসা সত্যি। সত্যম-শিবম-সুন্দরম। যা সত্যি, তাই সুন্দর। তাই তো শিব-সোমেশ্বর। নিশ্চয়ই সোমেশ্বর মহাদেব এমন নিষ্ঠুর হবেন না আমাদের প্রতি। নিশ্চয়ই তিনি আমাদের মিলন ঘটাবেন।'

রাত বেড়ে চলল। উৎকণ্ঠিত অঙ্গিরা নানা কথা ভাবতে লাগল। কখনও সে অজানা, অশুভ কল্পনাতে ছটফট করতে লাগল আবার কখনও বা নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টায় মনকে প্রবোধ দিতে লাগল।

এক সময় শেষ হল সুলতানের স্বেচ্ছাসেবকদের উল্লাস। দেবদাসী মহলের সেই মর্মর প্রাঙ্গণ যেখানে তারা নৃত্যগীতের তালিম নিত, সেখানে এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে তাদের ক্ষতবিক্ষত নগ্ন মৃতদেহগুলো।

তাদের মৃত্যু অস্ত্রাঘাতে মৃত্যুর চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। হয়তো তাদের কারো দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়নি, কিন্তু তাদের শরীরের এমন কোন স্থান নেই যে স্থানে স্বাপদের নখরের ছাপ নেই! তরুণ জিহাদিরা শান্ত হল আর একটা কারণে, সুলতানের তাঁবু মন্দির চত্বরেই স্থাপন করা হয়েছে। তাদের চিৎকারে নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

অভিযান সফল হয়েছে গজনীবিদের। শান্তিতে নিদ্রা যাচ্ছেন তিনি। স্তব্ধ হয়ে গেল সব শব্দ। শুধু সুলতানের তাঁবু ঘিরে যে রক্ষীরা পাহারা দিচ্ছে তাঁবুর কাছে মাঝে মাঝে তাদের অস্পষ্ট পদচারণার শব্দ শোনা যেতে লাগল।

সব শব্দ যখন থেমে গেল তখন অঙ্গিরার মনে হল একবার বাইরে উঁকি দিয়ে দেখা যাক। অন্তত একটু চাঁদের আলো তো দেখা যাবে, তাতে হয়তো তার মনের শঙ্কা কিছুটা কাটবে। গত রাত থেকেই সে অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে। একবিন্দু আলোর মুখ দেখেনি।

স্থান ত্যাগ করে অঙ্গিরা অন্ধকার হাতড়ে মন্দিরের বাইরে এসে দাঁড়াল। আকাশের বুকে চাঁদ থাকলেও তা যেন কেমন ম্রিয়মান। সোমদেব যেন করুণ চোখে তাকিয়ে আছে সোমনাথ মন্দিরের দিকে। তেমনই মনে হল অঙ্গিরার। চারপাশে কোথাও কোনও শব্দ নেই, কেউ কোথাও নেই। হয়তো-বা মামুদ বাহিনীর সৈনিকরা মন্দির দখলের পর একবার এদিকে এসেছিল, কিন্তু চারদিকে শুধু পরিত্যক্ত, জীর্ণ মন্দিরের ভগ্ন স্তুপ দেখে আবার ফিরে গেছে।

অঙ্গিরা দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, সে কি করবে? রাত্রির অন্ধকারে মিশে একবার মূল মন্দিরের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখে আসবে নাকি, সেদিকের পরিস্থিতি কি? হয়তো মামুদের রক্ষীরা সব নিদ্রামগ্ন, তার হয়তো কোনও ভাবে মন্দির ত্যাগ করার সুযোগ হল?

ভাবছিল অঙ্গিরা। হঠাৎ একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে ফিরে তাকিয়ে সে দেখতে পেল, পাশের একটা ভগ্ন উপমন্দির থেকে বেরিয়ে এসেছে এক নারী! যে অঙ্গিরার দিকে আসছে। সম্ভবত অঙ্গিরার শরীর কৃষ্ণবর্ণের পোশাকে আচ্ছাদিত বলে সে তাকে খেয়াল করেনি। তবে তার অবয়ব দেখে অঙ্গিরা বুঝতে পারল সে নারী দেবদাসী সমর্পিতা নয়। এগিয়ে আসতে আসতে মাঝে মাঝে সে থামছে, চারদিকে তাকিয়ে, বিশেষত যেদিকে সোমনাথ দেবের মন্দির সেদিকে তাকাচ্ছে, তারপর আবার এগোচ্ছে।

এগিয়ে আসতে আসতে অঙ্গিরার কয়েক হাত তফাতে চলে এল সেই নারী। অঙ্গিরাকে এবার দেখতে পেয়ে গেল সে। প্রথমে আতঙ্কে কেঁপে উঠল তার শরীর। সে হয়তো চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই অঙ্গিরা বলে উঠল, 'ভয় পেও না। আমি যবনও নই, প্রেত নই।'

অঙ্গিরার কণ্ঠস্বর শুনে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরাকে চিনতে পেরে সে নারী অঙ্গিরার সামনে এসে দাঁড়াল। অঙ্গিরারও কেমন যেন চেনা মনে হল তার মুখমণ্ডল। অঙ্গিরা প্রশ্ন করল 'তুমি কে?'

নারী জবাব দিল, 'আমি দেবদাসী উত্তরা। আমি আপনাকে চিনি। আপনি দেবদাসী সমর্পিতার প্রেমিক। আমি সে রাতে অতিথিশালাতে নিয়ে গেছিলাম সমর্পিতাকে।'

দেবদাসী সমর্পিতার মুখে তার সহচরী দেবদাসী উত্তরার কথা শুনেছে অঙ্গিরা। নিশ্চয়ই কোনওদিন সন্ধ্যারতির সময় উত্তরাকে দেখেওছে অঙ্গিরা। তাই প্রথম দর্শনেই তাকে চেনা মনে হয়েছিল অঙ্গিরার। চাঁদের আলোতে উত্তরার মুখমণ্ডলে স্পষ্ট উৎকণ্ঠার ছাপ।

অঙ্গিরা তাকে প্রশ্ন করল, 'তুমি দেবদাসী সমর্পিতার কোনও সংবাদ জানো?'

দেবদাসী উত্তরা প্রথমে বলল, 'না, সে খগেশ্বরের সঙ্গে দেবদাসীদের আবাসস্থল ত্যাগ করার পর আমি তার আর কোনও সংবাদ পাইনি। আমি তো অনুমান করেছিলাম আপনিও মন্দির ত্যাগ করেছেন।'

এ কথা বলার পর দেবদাসী উত্তরা জানতে চাইল, 'আপনি চিন্তামনিকে দেখেছেন?'

অঙ্গিরা বলল, 'তিনি কে?'

উত্তরা জবাব দিল, 'এ মন্দিরের একজন যুবক সেবায়েত। আমার প্রেমিক। যবন বাহিনীর মশালের আলো যে রাতে দেখা গেল সে রাতেই সে আমাকে এখানে লুকিয়ে রেখে গেছিল। কিন্তু তারপর সে আর ফিরে আসেনি। আমার বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে তার জন্য। এখানে তাকে দেখেছেন?'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'আমি তাকে চিনি না। আর গত রাতে এই ভগ্ন মন্দিরে প্রবেশ করার পর একটু আগেই আমি বাইরে এসে দাঁড়ালাম।'

এ কথা বলে অঙ্গিরা জানতে চাইল, 'তুমি এখন কোথায় যাচ্ছ?'

উত্তরা জবাব দিল, 'আমি সেবায়েত চিন্তামনির সন্ধানে বেরিয়েছি।। তার জন্য অশুভ আশঙ্কাতে আমার বুক কাঁপছে। কিছু হয়নিতো তার? নইলে সে ফিরে এল না কেন? ভাবছি একবার মন্দিরের দিকে যাব।'

উত্তরার কথা শুনে অঙ্গিরা বুঝতে পারল, ঠিক যেমন দেবদাসী সমর্পিতার জন্য আশঙ্কাতে সে উদ্বেল হয়ে উঠেছে, একই রকম আশঙ্কাতে সেই অচেনা সেবায়েত যুবকের জন্য দেবদাসী উত্তরাও উতলা হয়ে উঠেছে।

অঙ্গিরা বলল, 'কিন্তু মন্দিরের দিকে যাওয়া তোমার পক্ষে আত্মহত্যার সামিল হবে। যবনদের হাতে ধরা পড়লে তারা ছিঁড়ে খাবে তোমাকে। সারাদিন ধরে দেবদাসীদের আর্তনাদ এই ভগ্ন মন্দিরে বসে কানে এসেছে আমার। বীভৎস সেই আর্তনাদ!'

কথাটা শুনে দেবদাসী উত্তরা বলল, 'সে আর্তনাদ আমি শুনেছি। কিন্তু আমাকে যে খুঁজে বার করতেই হবে সেবায়েত চিন্তামণিকে। তাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।'

অঙ্গিরা আবারও তাকে বলতে যাচ্ছিল, 'মন্দিরের দিকে যেও না তুমি', কিন্তু তার আগেই উত্তরা একদিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, 'ওই দেখো, যবন আসছে! যবন আসছে!' কথাগুলো বলেই সে অঙ্গিরার কাছ ছেড়ে দ্রুত ছুটল সম্ভবত আত্মগোপন করার জন্য। অঙ্গিরাও এবার দেখতে পেল তাকে। হ্যাঁ, তার পরনে যবনদের মতোই পোশাক। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে আসছে মন্দিরের দিকে! তাকে দেখামাত্রই অঙ্গিরা প্রবেশ করল মন্দিরের অন্ধকারে। তারপর পিঠ থেকে ধনুর্বাণ খুলে প্রস্তুত হল যবন যদি মন্দিরে প্রবেশ করে তবে তাকে তিরবিদ্ধ করার জন্য।

ভগ্ন মন্দির চত্বরে ধীরে ধীরে উঠে এল লোকটা। তারপর এগোতে লাগল মন্দিরে প্রবেশের জন্য। অঙ্গিরা ধনুকের ছিলা টানার জন্য প্রস্তুত হল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে পাথরে হোঁচট খেয়ে একটা অস্পষ্ট আর্তনাদ করে পড়ে গেল সেই যবন। উঠে বসার চেষ্টা করেও যেন সে উঠতে পারছে না। আর এর পরই তার পাগড়িটা খসে গেল। বেরিয়ে পড়ল তার মাথার শনের মতো চুল। অঙ্গিরা চিনতে পারল তাকে। যবন নয়, লোকটা খগেশ্বর! অঙ্গিরা তাড়াতাড়ি মন্দির থেকে বেরিয়ে ছুটে গেল তার কাছে। মাটিতে পড়ে আছে বৃদ্ধ খগেশ্বর। অঙ্গিরা দেখল তার পাঁজরে বিদ্ধ হয়ে আছে একটা তির!

অঙ্গিরাকে দেখে প্রথমে আতঙ্ক ফুটে উঠল বৃদ্ধর মুখে। অঙ্গিরা তার ওপর ঝুঁকে পড়তেই খগেশ্বর চিনতে পারল তাকে। অতিকষ্টে সে বলে উঠল, 'তুমি জীবিত আছ! আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে, মন্দিরের ভিতর আমাকে নিয়ে চলো।' অঙ্গিরা তাড়াতাড়ি রক্তস্নাত খগেশ্বরকে পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে নিয়ে মন্দিরের অন্ধকারে প্রবেশ করল। নিরাপদ স্থানে পৌঁছে তাকে মাটিতে নামিয়ে জানতে চাইল, 'দেবদাসী সমর্পিতা কোথায়? আপনার এ অবস্থা হল কীভাবে?'

খগেশ্বর প্রথমে অতিকষ্টে জবাব দিল, 'নগরীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এক বিশাল জনমানবহীন অরণ্য আছে। সেখানে এক পরিত্যক্ত শিব মন্দিরে চন্দ্রদেবের সঙ্গে দেবদাসী সমর্পিতাকে আমি রেখে এসেছি। তারা নিরাপদ। সে স্থান সোমনাথ নগরী থেকে অশ্বপৃষ্ঠে একদিনের পথ।' একথা বলে অন্ধকারের মধ্যে জোরে জোরে শ্বাস টানতে লাগল বৃদ্ধ।

দেবদাসী সমর্পিতা নিরাপদে আছে জেনে অঙ্গিরা যেন অনেকটাই চিন্তামুক্ত হল। সে এরপর আবারও প্রশ্ন করল, 'আপনার এ অবস্থা হল কীভাবে? আপনার পরনে যবনদের পোশাক কেন?'

প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে খগেশ্বরের। সে কোনওক্রমে বলতে লাগল, 'দেবদাসী সমর্পিতাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেবার পরে আমার মনে হয়েছিল আমি আর মন্দিরে ফিরব না। যবনরা এ মন্দিরের যে ক্ষতি করতে পারবে না সে ক্ষতি আমি করব। চরম শাস্তি দেব ত্রিপুরারিদেবকে। তার জন্যই আমার পৌত্রের অমন ভয়ঙ্কর মৃত্যু হল। এ কথা ভেবে আমি অন্যত্র রওনাও দিয়েছিলাম। কিন্তু মাঝপথে আমার মনে হল, তুমি তো আমার কোনও ক্ষতি করোনি। বিশ্বাস করে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন সোমেশ্বর মুদ্রা। বিশ্বাস করে আমার সঙ্গে পাঠিয়েছিলে দেবদাসী সমর্পিতাকে। যে প্রতীক্ষা করে আছে তোমার জন্য। আর তুমিও তার সঙ্গে মিলনের জন্য। তুমি আমার সন্তানসম। তোমার সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। আমার বিবেক অথবা সোমেশ্বর মহাদেব আমাকে পালাতে দিলেন না। আমি আবার মন্দিরে ফিরে এলাম।'

একথা বলার পর খগেশ্বর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। হাঁফাচ্ছে সে। অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে তার। তবুও সে এরপর বলতে লাগল, 'আমি গতকাল যখন মন্দিরের কাছে ফিরে এলাম তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। মন্দিরের বাইরে এক শূন্য বিপনিতে সারাদিন আত্মগোপন করে রইলাম। গত সন্ধ্যায় যুদ্ধ শেষ হবার পর আমি বাইরে বেরিয়ে এসে এক মৃত যবনের পোশাক সংগ্রহ করে সেই বিপনিতেই আবার আত্মগোপন করলাম। আজ যখন মন্দিরের তোরণ ভেঙে হাজারে হাজারে যবন মন্দিরে প্রবেশ করল তখন আমিও মন্দিরে প্রবেশ করলাম। তোমার খোঁজই আবার করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু দ্বিপ্রহরের পর হঠাৎ-ই এক যবন আমি ছদ্মবেশী বুঝতে পেরে তির চালাল আমার দিকে। তিরবিদ্ধ অবস্থায় কোনওক্রমে এক স্থানে লুকিয়ে ছিলাম আমি। রাত নামতেই আমি বুঝতে পেরেছি আমি আর বাঁচব না। তাই আমি এ মন্দিরে আসছিলাম যাতে আমি আমার হতভাগ্য পৌত্রের পাশে আমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি। মৃত্যুর পরও তার সঙ্গে থাকতে পারি।'

বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে খগেশ্বর। তার হতভাগ্য শূদ্র জীবনের সময় শেষ হয়ে এসেছে। কোনওক্রমে খগেশ্বর তার শেষ কথাগুলো বলার চেষ্টা করল, 'আমাকে সে কক্ষে নিয়ে চলো তুমি। সম্ভব হলে এই শূদ্রর মুখে এক টুকরো জ্বলন্ত অঙ্গার গুঁজে দিও। আর মৃত্যুর আগে তোমাকে একটা কথা বলে যাই তা হল...।'

বাক্যটা আর শেষ করতে পারল না বৃদ্ধ। সে ঢলে পড়ল মাটিতে। অভিশপ্ত জীবনের অবসান হল ক্ষৌরকার শিরোমণি বৃদ্ধ খগেশ্বরের। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে জল গড়াতে শুরু করল অঙ্গিরার চোখ বেয়ে।

খগেশ্বরের শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করল অঙ্গিরা। তার দেহটা তুলে নিয়ে গিয়ে সেই কক্ষের দ্বার খুলে তার পৌত্রের মৃতদেহের পাশে শায়িত করল খগেশ্বরের মৃতদেহ। চকমকি পাথর ঘষে জ্বলন্ত অঙ্গার স্থাপন করল খগেশ্বরের মুখে। পিতার অন্ত্যেষ্টি যে শ্রদ্ধায় পুত্র সম্পন্ন করে, ঠিক একই রকম শ্রদ্ধায় অঙ্গিরা শেষ করল খগেশ্বরের শূদ্র অন্ত্যেষ্টি প্রক্রিয়া। বৃদ্ধ খগেশ্বর যা করেছে তার জন্য তা পিতার অধিক। তবে অঙ্গিরা, খগেশ্বরের অন্ত্যেষ্টি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময়ই অনুমান করতে পারল তাকে শেষ কথাটা কি বলে যেতে চেয়েছিল বৃদ্ধ!

যে কক্ষে সে বৃদ্ধ খগেশ্বরকে শায়িত করেছিল সেই কক্ষের বাইরে বেরিয়ে পুনরায় পাথর খণ্ড দিয়ে তার প্রবেশ পথ বন্ধ করে দিল। এ কাজ মিটতে না মিটতেই বাইরে ভোরের আলো ফুটে গেল। অঙ্গিরা শুনতে পেল যবন বাহিনী আবার জেগে উঠেছে। তাদের কোলাহল ভেসে আসছে।

অঙ্গিরার জানা হয়ে গেছে কোথায় তার জন্য অপেক্ষা করে আছে দেবদাসী সমর্পিতা। সে সিদ্ধান্ত নিল সারাদিন এ স্থানেই সে আত্মগোপন করে থাকবে। তারপর অন্ধকার নামলেই যে ভাবেই হোক মন্দির ত্যাগ করে রওনা হবে সেই অরণ্যভূমির দিকে।

২৭

রাজকন্যা রাজশ্রী আর থামেনি। সারারাত ঘোড়া ছুটিয়ে এক সময় নগরীর প্রান্ত সীমাতে যখন এসে উপস্থিত হল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। সোমনাথ নগরীর প্রবেশ তোরণের সামনে সে উপস্থিত হয়নি। নগরীর যে স্থান দিয়ে বৃদ্ধ খগেশ্বর তাদেরকে নগরীর বাইরে নিয়ে গেছিল, সে স্থানেই উপস্থিত হল রাজশ্রী। আকাশের বুকে মন্দিরের চূড়াটাও নগরীর বাইরে থেকেই দেখতে পেল। তবে তা আর সূর্যকিরণে ঝলমল করছে না। মন্দির শীর্ষে স্থাপিত স্বর্ণ কলস, স্বর্ণ ধ্বজা সবই নামিয়ে নিয়েছে মামুদ বাহিনী।

এ সময় মন্দিরে ঘণ্টাধ্বনি হয়, যা নগরীর বাইরে দাঁড়িয়েও শোনা যায়। তেমন কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছে না সেদিক থেকে। যবন হানার ভয়ে কি নিস্তব্ধ মন্দির? নাকি সে বাহিনী ইতিমধ্যেই প্রবেশ করেছে মন্দিরে? কিন্তু রাজশ্রীকে তো যেতেই হবে অঙ্গিরার খোঁজে।

সে সিদ্ধান্ত নিল নগরীতে প্রবেশ করে এমন কোনও লোক অথবা খগেশ্বরকে খুঁজে পায় কিনা, যে তাকে অঙ্গিরার সন্ধান এনে দিতে পারবে রাজশ্রীর শরীরে যেটুকু স্বর্ণালঙ্কার আছে তার বিনিময়। আর যদি তেমন কোনও লোকের সন্ধান না মেলে তবে সে নিজেই রওনা হবে মন্দিরের দিকে। তাতে তার ভাগ্যে যা আছে তা হবে। এ কথা ভেবে সোমেশ্বর মহাদেবের নাম নিয়ে রাজকন্যা রাজশ্রী প্রবেশ করল সোমনাথ নগরীতে।

নগরীর প্রবেশতোরণ গুলিতে প্রহরারত ছিল সুলতান বাহিনী। কিন্তু এ স্থানে কেউ নেই। তাই নগরীতে প্রবেশ করতে তাকে বাধার সম্মুখীন হতে হল না। মনে মনে সে শুধু বলতে লাগল, 'হে সোমেশ্বর মহাদেব, তুমি যদি সত্যই থেকে থাকো তবে অঙ্গিরার কাছে, আমার ভালোবাসার কাছে আমাকে পৌঁছে দাও। তুমি রক্ষা করো আমাদের।'

কিন্তু নগরীতে প্রবেশ করে রাজশ্রী কাউকে দেখতে পেল না। জনশূন্য নগরী, নগরবাসী যারা ছিল তারা হয় নগর ত্যাগ করেছে অথবা মামুদ বাহিনীর হাতে প্রাণ দিয়েছে। নিষ্প্রাণ সোমনাথ নগরী। এগোতে লাগল সে। কিন্তু হঠাৎ-ই একটা বাঁকের আড়াল থেকে আত্মপ্রকাশ করল সুলতানের স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর একদল লোক। নগরীর আনাচে কানাচে কোনও সম্পদ খুঁজে পাওয়া যায় কিনা সে খোঁজেই তারা শূন্য নগরীতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। রাজশ্রী তাদের দেখে আত্মগোপন করতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই যবন বাহিনী দেখে ফেলল তাকে।

অতীব সুন্দরী এক নারীকে দেখতে পেয়ে উল্লসিত ভাবে ছুটে এসে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল রাজশ্রীকে। পালাবার পথ বন্ধ হল তার। এমন রূপসী কোনও কাফের নারীকে ইতিপূর্বে দেখেনি যবন তরুণরা। মুহূর্তের মধ্যে লোলুপ দৃষ্টি ফুটে উঠল তাদের চোখে। একজন তরুণ তাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে হাত ধরে টেনে নামাতে যাচ্ছিল, কিন্তু রাজশ্রী দৃপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল, 'তোরা আমাকে স্পর্শ করবি না। আমি সাধারণ কোনও নারী নই, আমি রাজকন্যা।'

'রাজকন্যা? কোথাকার রাজকন্যা?' জানতে চাইল এক যবন।

রাজশ্রী আবার বলল, 'হ্যাঁ, আমি রাজকন্যা। চালুক্য রাজকন্যা।'

চালুক্য দেশ কোন রাজ্য, কোন দেশ তা জানা নেই হিন্দ মুলুকে নবাগত যুবকদের। তবে এই নারী তার পরিচয় সত্যি-মিথ্যা যাই বলুক 'রাজকন্যা' কথাটা শুনে থমকে গেল যবনবাহিনী।

মনে মনে আতঙ্কিত হলেও তার বহিঃপ্রকাশ ঘটলে যে বিপদ নেমে আসবে তা বুঝতে পারল রাজশ্রী। মুহূর্তের মধ্যে সে ভেবে নিল তার যদি মৃত্যু নেমে আসে তা এখানেও আসতে পারে, মন্দিরে গেলেও আসতে পারে। অন্তত মন্দির পর্যন্ত যাবার চেষ্টা করা যাক। তাতে অঙ্গিরার সঙ্গে হয়তো মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তার দেখা হয়ে গেল! একথা ভেবে নিয়ে সে রাজকন্যা সুলভ কর্তৃত্বের ঢঙে যবনদের উদ্দেশ্য বলল, 'তোরা আমাকে মন্দিরে নিয়ে চল। আর আমাকে যদি তোরা স্পর্শ করিস তবে সে খবর সুলতানের কাছে পৌঁছলে সুলতান তোদের মুণ্ডচ্ছেদ করবেন।'

রাজশ্রী তার বলা শেষ কথাগুলোতে ছলনার আশ্রয় নিলেও তা শুনে ধন্দে পড়ে গেল অনভিজ্ঞ যবন তরুণরা। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করল এই রূপসী নারীকে নিয়ে কি করা যায় সে বিষয়। এক সময় তারা সিদ্ধান্ত নিল, এ নারী সত্যি-মিথ্যা যাই বলুক না কেন, একে মন্দিরে নিয়ে যাওয়াই ভালো। অযথা ঝুঁকি নিয়ে লাভ নেই। শুধু এক যবন যাত্রা শুরু করার আগে রাজশ্রীকে প্রশ্ন করল, 'সুলতান আপনাকে চেনেন নাকি?'

প্রশ্ন শুনে রাজশ্রী তাকে ধমকে উঠে বলল, 'চুপ করো বেতমিজ। তিনি আমাকে চেনেন কিনা সেটা সেখানে গেলেই জানতে পারবি।'

এরপর আর কথা চলে না। এ নারী হয়তো সত্যি রাজকন্যা। সুলতানের পরিচিতও হতে পারে। নইলে সুলতান সৈনিকদের ধমকাবার সাহস পায় কোথা থেকে? যবন সেনারা আর বাক্যালাপ না করে রাজশ্রীর ঘোড়ার লাগাম ধরে তাকে নিয়ে এগোল মন্দিরের দিকে।

মন্দিরের কাছে পৌঁছতেই চারদিকের দৃশ্য দেখে হিম হয়ে গেল রাজশ্রীর শরীর। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে অগণিত মানুষের মৃতদেহ, কর্তিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ! শ্বেত গৃধিনির দল উল্লাসে চিৎকার করে মৃতদেহ ছিঁড়ে খাচ্ছে তাদের বাঁকানো ঠোঁট দিয়ে। বীভৎস দৃশ্য! এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে আছে যবন সেনাদল। তারাও লোলুপ দৃষ্টিতে দেখছে রাজশ্রীকে, একটু সুযোগ পেলেই ওই শ্বেত গৃধিনিদের মতোই ছিঁড়ে খাবার জন্য।

রাজশ্রী কিন্তু তার আতঙ্কের ভাব বাইরে প্রকাশ না করে আরও দৃঢ় ভাব ফুটিয়ে তুলল তার মুখমণ্ডলে। ভগ্ন প্রবেশ তোরণের সামনে এনে ঘোড়া থেকে নামানো হল রাজকন্যা রাজশ্রীকে। তাকে যারা ধরে আনল তারা প্রবেশ তোরণের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক সৈন্যাধ্যক্ষর কাছে সমর্পণ করল রাজশ্রীকে। তাকে নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করল লোকটা। চারপাশে তাকিয়ে আরও আতঙ্কিত বিস্মিত হল রাজশ্রী। কয়েক রাতের মধ্যে একী অবস্থা হয়েছে আশ্চর্য সুন্দর সোমনাথ মন্দিরের! চারদিকে ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহ তো আছেই, কোথাও ভেঙে ফেলা হয়েছে কারুকাজ মণ্ডিত শ্বেত পাথরের স্তম্ভ, কোথাও পড়ে আছে বিভিন্ন দেবদেবীর ভগ্ন মূর্তি! এমনকী দেওয়ালগাত্রের অলঙ্করণগুলোও নির্মমতার সঙ্গে চূর্ণ করা হয়েছে! সর্বত্রই শুধু মৃত্যু আর ভয়াবহ ধ্বংসলীলার চিহ্ন। যবন সৈন্যাধক্ষর সঙ্গে রাজশ্রী এগিয়ে চলল সুলতানের তাঁবুর দিকে।

দ্বিপ্রহরে তাঁবুতে কিছু পার্শ্বচরকে নিয়ে মখমলের গালিচায় বসেছিলেন গজনীবিদ। দিল খুশ তার। পরিশ্রম, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা সফল হয়েছে তার। তিনি চূর্ণ করে দিতে পেরেছেন কাফেরদের বিশ্বাস, জয় করেছেন কাফেরদের এই সোমনাথ মন্দির, ধ্বংস করেছেন বিগ্রহ। গর্ভগৃহর হীরকখচিত তোরণটা কাঠামো সমেত উপড়ে এনে রাখা হয়েছে সোপানশ্রেণীর নীচে। তাঁবু থেকে দেখা যাচ্ছে সেটা। সুলতান সেনারা এ মন্দিরের যেখানে যত সোনা, হিরা-জহরত ছিল তা খুবলে এনে হাজির করেছে সুলতানের কাছে।

সুলতান হিসাব করে দেখেছেন, ওই তোরণ, তোষাখানা আর বিভিন্ন দেবমূর্তির গা থেকে যে সম্পদ সংগ্রহ করা হয়েছে, তার আনুমানিক মূল্য হবে অন্তত পাঁচ কোটি স্বর্ণমুদ্রা। যা ইতিপূর্বে মামুদ এই হিন্দু মুলুকে যতবার লুণ্ঠন করেছেন তার সম্মিলিত মূল্যর থেকেও সহস্রগুণ বেশি। দিল খুশতো হবেই তাঁর। মাঝে মাঝে তিনি মৃদু মশকরাও করছিলেন তাঁর পার্শ্বচরদের সঙ্গে। তাঁবুতে বসে সুলতান একসময় বাইরে রাখা সেই কপাটটা দেখিয়ে তার পার্শ্বচরদের বললেন, 'ভাবছি আমি ওই দরওয়াজাটা মহান খলিফাকে সওগাত দেব।'

ঠিক সেই মুহূর্তে সেই সেনাধ্যক্ষ রাজশ্রীকে নিয়ে হাজির হল সুলতানের তাঁবুর সামনে। আবার একজন নারীকে নিয়ে তারা তাঁবুতে উপস্থিত হল! কিছু সময় আগেই তো আরও একজন নারীকে নিয়ে হাজির হয়েছিল সুলতানের তাঁবুতে। সেই কাফের নারী নাকি মৃতদেহের স্তুপের মধ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছিল তার আশিককে! সুলতান সে নারীকে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর যুবকদের হাতে তুলে দিতে বলেছিলেন। তাঁর সামনে দ্বিতীয়বার আরও একজন নারীকে হাজির করাতে, এবং তাঁর কথাতে ছেদ পড়াতে সুলতান একটু রুষ্টভাবেই তাকালেন যে সেনাধ্যক্ষ রাজশ্রীকে সঙ্গে এনেছে, তার দিকে।

সেনাধ্যক্ষ সুলতানকে কুর্নিশ করে বলল, 'গুস্তাখি মাফ করবেন মালিক। এই জেনেনাকে নগরী থেকে ধরে এনেছে স্বেচ্ছাসেবী যুবকরা। এই কাফের জেনেনা নিজের পরিচয় দিচ্ছে রাজকন্যা বলে!

রাজকন্যা! সুলতান তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন রাজশ্রীর দিকে। সুলতান তাকে ভালো করে দেখে ভাবলেন 'এই কাফের জেনেনা বহুত খুবসুরত ঠিকই, কিন্তু এখানে রাজকন্যা আসবে কীভাবে? রাজা, রাজকন্যা সবাই তো নগরী ছেড়ে পালিয়েছে আমার ভয়ে।'

এই জেনেনার কাছে রাজকন্যা সুলভ কোনও দামি জিনিস প্রমাণ স্বরূপ মেলে কিনা তা জানার জন্য সুলতান বললেন, 'ওর তল্লাশি নাও।'

যবন সৈন্যাধ্যক্ষ রাজশ্রীর শরীর স্পর্শ করতে যেতেই রাজশ্রী ব্যাপারটা অনুমান করে তার পোশাকের ভিতর থেকে ঘুঙুর ছড়া দুটো বার করে হাতে নিল। আর তা দেখেই গজনীবিদের মনে হল, এ নারী নিশ্চয়ই মিথ্যা বলছে! যদি এই কাফের নারী রাজকন্যাই হয়ে থাকে ওর কাছে ঘুঙুর থাকবে কেন? এ নারী নিশ্চয়ই নর্তকী। এ মন্দিরের দেবদাসীও হাতে পারে!

সোমনাথ মন্দিরে যে রাজারাও তাদের পরিবারের কন্যাকে সমর্পণ করে তা জানা ছিল না সুলতানের। আর এ নারী যদি সত্যিই কোনও রাজকন্যাও হয়ে থাকে তবুও কোনও কাফের নারীকে সুলতান ক্ষমা করতে পারেন না। তাই গজনীবিদ মামুদ তার পার্শ্বচরদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'এই কাফের জেনেনা বহুত খুবসুরত। এই মন্দিরের শেষ কাফের নারী মনে হয় এই সুন্দরী। অন্য সব নারীদেরই তো স্বেচ্ছাসেবক তরুণদের দিলাম। আপনারা এই নর্তকীর নাচ দেখবেন নাকি? তবে এই শেষ নর্তকীর নাচ দেখে আপনারাও আনন্দ উপভোগ করুন। ও আবার নিজেকে রাজকন্যা বলছে। রাজকন্যার সঙ্গ উপভোগ করুন।'

সুলতানের ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। তার কথা শুনে পার্শ্বচরদের কয়েকজন লজ্জিত ভাবে বলে উঠল, 'আপনার যা হুকুম সুলতান।' দীর্ঘদিন ধরে সুলতানের সঙ্গে ছায়ার মতো ঘুরছে নারী সঙ্গ বঞ্চিত অনুচররা। সুলতান তাই তাদের ইঙ্গিত দিল সুন্দরী কাফের নারীকে অন্যত্র নিয়ে যাবার জন্য। সুলতানকে কুর্নিশ জানিয়ে তার তাঁবু ত্যাগ করল অনুচররা। কিন্তু তারা সবাই সুলতানের ঘনিষ্ঠ পার্শ্বচর বলে কথা, তারা তো আর স্বেচ্ছাসেবী তরুণদের মতো দিনের বেলা সবার চোখের সামনে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন না। অতটা বেশরম হতে পারবেন না তারা। তাই তারা রাজশ্রীকে নিয়ে চলল একটু আড়ালে কোনও নির্জন স্থানের সন্ধানে মন্দিরের পিছন দিকে। তাদের সাথে চলতে চলতে রাজশ্রী ভাবতে লাগল, 'তবে কি আমার আর কোনও দিন দেখা হবে না অঙ্গিরার সঙ্গে?'

সুলতানের অনুচরদের সঙ্গে এগোচ্ছিল রাজশ্রী। হঠাৎ সে দেখতে পেল যবনদের শিকার এক উলঙ্গ নারীদেহ পড়ে আছে কিছুটা তফাতে। শিউরে উঠল রাজশ্রী। তার পরিণতিও নিশ্চয়ই এমনই হতে চলেছে একথা ভেবে।

যবনদের সঙ্গে যখন সেই দেহের পাশ কাটিয়ে রাজশ্রী এগোচ্ছিল ঠিক সেই সময় হঠাৎ-ই উঠে বসল সেই ক্ষতবিক্ষত নারী! এ যে তার সহচরী দেবদাসী উত্তরা! কিন্তু কী বীভৎস রূপ ধারণ করেছে তার শরীর, মুখমণ্ডল! মৃত্যু পথযাত্রী উত্তরাও চিনতে পারল তাকে। রাজশ্রীর উদ্দেশ্যে সে বলে উঠল, 'আছে, আছে, সে এখানেই আছে।'

যবনরা ভাবল, এই ধর্ষিতা জেনেনা মৃতদেহর স্তুপের মধ্যে যাকে খুঁজছিল তার কথাই বলছে মনে হয়। শুধু রাজশ্রী অনুমান করতে পারল উত্তরা কার কথা বলছে। কিন্তু এর পরই উত্তরা জীবিত আছে দেখে একদল তরুণ যবন উত্তরার দিকে ছুটে এল শেষ বারের মতো তার শরীর ছিড়ে খাবার জন্য। তারা ঘিরে ধরল উত্তরাকে। তাদের উল্লাসধ্বনিতে চাপা পড়ে গেল সোমনাথ মন্দিরের দেবদাসী উত্তরার শেষ আর্তনাদ। অসহায় রাজশ্রীর কিছু করার ছিল না। সে চলতে চলতে মনে মনে বলতে লাগল 'অঙ্গিরা যদি এখানে থাকে তবে মৃত্যুর আগে শেষ বারের জন্য একবার যেন দেখে যেতে পারি তাকে। হে সোমেশ্বর মহাদেব। কৃপা করো, কৃপা করো আমাকে।'

২৮

মন্দিরের পশ্চাদ্ভাগে একটা ভগ্ন উপমন্দির প্রাঙ্গণে আনন্দ উপভোগ করার জন্য স্থান নির্বাচন করল সুলতানের অনুচরের দল। উপমন্দিরটা ভগ্ন হলেও প্রাচীন নয়। সে মন্দির গতকালই ভেঙেছে যবন বাহিনী। আসন্ন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও রাজশ্রী ভেবে নিল যথাসম্ভব বেশি সময় বেঁচে থাকতে হবে তাকে। যদি তার সঙ্গে মৃত্যুর আগে শেষ দেখা হয়ে যায় অঙ্গিরার। এ কথা ভেবে নিয়ে রাজশ্রী সুলতানের অনুচরদের উদ্দেশ্যে বলল, 'আমার শরীর আপনারা গ্রহণ করার আগে আমি আপনাদের সামনে শেষ বারের মতো নৃত্য প্রদর্শন করতে চাই। যে নৃত্য আমি এতদিন দেবতার সামনে প্রদর্শন করে এসেছি সেই নৃত্যকলা। তাহলে আমার শরীর আরও সুন্দর ভাবে উপভোগ করতে পারবেন আপনারা।'

প্রস্তাবটা মনে ধরল গজনীবিদের অনুচরদের। নারী শরীরটা তো তাদের হাতের মুঠোতেই রয়েছে। শরীরটার স্বাদ গ্রহণ করার আগে একটু নৃত্য উপভোগ করলে ভালোই হয়। কামনা আরও বৃদ্ধি পাবে তাতে। তা ছাড়া সুলতানের অনুচরদের এ কথাও শোনা আছে যে, এই সোমনাথ মন্দিরের নর্তকী দেবদাসীরা নাকি এই হিন্দ মুলুকের শ্রেষ্ঠ নর্তকী!

সুলতানের সঙ্গীদের তেমন কোনও কাজও নেই এখন। সুলতান এখন বেশ কিছুদিন বিশ্রাম নেবার পর যাত্রা করবেন গজনী মুলুকে। কাজেই নিজেদের মধ্যে মৃদু আলোচনা সেরে নেবার পর সুলতানের এক অনুচর বলল, 'ঠিক আছে তুমি নাচ দেখাও। যতক্ষণ তুমি নাচ দেখাবে ততক্ষণ আমরা তোমাকে স্পর্শ করব না। কিন্তু নাচ থামালেই আমরা আলিঙ্গন করব তোমাকে।' কথাটা শুনে রাজশ্রী তার উদ্দেশ্যে বলল, 'পুরুষের জবান তো। নাচ না থামা পর্যন্ত আমাকে আলিঙ্গন করবেন না তো?'

রাজশ্রীর কথা শুনে মনে হয় আঁতে একটু ঘা লাগল লোকটার। হাজার হোক সে সাধারণ জিহাদি স্বেচ্ছাসেবী নয়, গজনীর সুলতান মামুদের ঘনিষ্ঠ পার্শ্বচর। একটু থমকে লোকটা বলল, 'হ্যাঁ, জবান দিলাম। তোমার পা না থামলে কেউ তোমাকে স্পর্শ করবে না।'

তার কথা শোনার পর সোমেশ্বর মহাদেবকে মনে মনে স্মরণ করে পায়ে ঘুঙুর বাঁধতে শুরু করল রাজশ্রী। সুলতানের অনুচররা গিয়ে বসল ভগ্ন মন্দিরের ছায়াতে। সূর্য তখন সবে পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করেছে। বেশ রোদের তাপ এখনও। সেই মন্দিরের ঠিক সামনেই উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে সুলতান মামুদের ঘনিষ্ঠ অনুচরদের সামনে তার নৃত্য প্রদর্শন শুরু করল সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের দেবদাসী সমর্পিতা।

অপূর্ব তার নৃত্যশৈলী, অপূর্ব তার শরীরের বিভঙ্গ। তার নৃত্য দেখে সুলতানের অনুচরদের চোখে ধাঁধা লেগে গেল! তাদের মনে হতে লাগল জন্নত থেকে কোন হুরী-পরী যেন নেমে এসে নৃত্য পরিবেশন করছে তাদের সামনে! কামার্ত সুলতান অনুচররা তাদের উরু চাপড়ে বলতে লাগল, 'বহুত খুব! কেয়া বাত! কেয়া বাত!'

নেচেই চলল দেবদাসী সমর্পিতা। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল তবু তার নাচ থামল না। সুলতান অনুচররা বিস্মিত হয়ে গেল এতক্ষণ সে নেচে চলেছে দেখে! কিন্তু পুরুষের জবান দেওয়া আছে বলে তারা নর্তকীকে না থামিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল কখন তার পা থেমে যায় সে সময়ের জন্য।

শরীর ক্রমশ অবসন্ন হয়ে আসছে, তবু নেচে চলল দেবদাসী সমর্পিতা। চালুক্য রাজকন্যা রাজশ্রী। নেচে চলল সে। এক সময় সূর্য ডুবে গেল সমুদ্রে। অন্ধকার নামতে শুরু করল। তবুও যবন বাহিনীকে বিস্মিত করে নেচে চলল সে। এক সময় সত্যিই আঁধার নেমে এল চারপাশে। সুলতানের অনুচররা আর রাজশ্রী পরস্পরের চোখ থেকে হারিয়ে গেল। শুধু ঘুঙুরের শব্দ শুনে সুলতানের অনুচররা বুঝতে পারল নর্তকী নেচে চলেছে। তার ঘুঙুরের শব্দ থামার প্রতীক্ষা করতে লাগল তারা।

রাজশ্রীর পা এরপর সত্যি কাঁপতে শুরু করল। শরীর আর পারছে না। পায়ের গতি শ্লথ হয়ে এল তার। নৃত্যরত অবস্থাতেই কিছুক্ষণের মধ্যে সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে ছিটকে পড়ল রাজশ্রী। থেমে গেল তার ঘুঙুরের শব্দ।

এই নিস্তব্ধতার জন্যই অপেক্ষা করছিল সুলতানের অমাত্য-পারিষদরা। ঘুঙুরের শব্দ থামতেই উঠে দাঁড়াল সুলতানের অনুচররা। একজন মন্দিরের চত্বর থেকে লাফিয়ে নামল রাজশ্রীর দেহ ছিঁড়ে খাবার জন্য। দেহটা কোথায় তা অনুমান করেই এগোচ্ছিল সে। কিন্তু ভূপতিত সংজ্ঞাহীনা রাজশ্রীর কাছে সে পৌঁছতে পারল না। তার আগেই তির বিদ্ধ হয়ে ছিটকে পড়ল। তির তার হৃৎপিণ্ড ফুঁড়ে দিয়েছে, মৃত্যুর আগে একটা শব্দও করতে পারল না লোকটা।

শুধু তার পতনের শব্দ শুনে এক সুলতান অনুচর তিরবিদ্ধ লোকটার উদ্দেশ্যে জানতে চাইল 'জনাব, হলটা কি?' কিন্তু নিকষ কালো অন্ধকার থেকে কোনও উত্তর ভেসে এলো না। ব্যাপারটা বোঝার জন্য এবং রাজশ্রীকে পাবার জন্য এরপর দ্বিতীয় লোকটা প্রাঙ্গণে নামল। কিন্তু কয়েক-পা এগোতে না এগোতেই একটা তির এসে তার পাঁজরে বিঁধল! মাটিতে ছিটকে পড়ার আগে লোকটা প্রচণ্ড আর্তনাদ করে উঠল। শেষ আর্তনাদ। আর সেই শব্দ শুনে কিছু একটা ঘটেছে বুঝতে পেরে যবন অমাত্যরা একসঙ্গে তলোয়ার খুলে নেমে পড়ল অন্ধকার প্রাঙ্গণে। কিন্তু কার বিরুদ্ধে লড়বে তারা? শত্রু তো অদৃশ্য।

গাঢ় অন্ধকারের আড়াল থেকে এক-একটা মৃত্যুবাণ এসে ভেদ করতে লাগল সুলতান পারিষদদের শরীর। তাদের অন্তিম আর্তনাদে কেঁপে উঠতে লাগল অন্ধকার। সেই চিৎকার শুনে মন্দিরের দিক থেকে আরও কিছু স্বেচ্ছাসেবী জিহাদি তরুণ সে স্থানে ছুটে এল। কিন্তু তিরের আঘাতে তারাও ভূপতিত হতে লাগল। প্রত্যেকটা মৃত্যুবাণই আঘাত হানছে তাদের হৃৎপিণ্ডে, পাঁজরে বা কণ্ঠদেশে! যাতে এক আঘাতেই তার মৃত্যু নেমে আসে।

কী অব্যর্থ লক্ষ। কিন্তু এই নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে কাউকে দেখতে না পেয়ে যবন বাহিনীর ধারণা হল, আততায়ী এক নয় একাধিক। আত্মগোপন করে থাকা কাফেরদের কোনও বাহিনী তির ছুড়ছে তাদের লক্ষ করে!

তিরবিদ্ধ অবস্থাতেই একজন জীবিত সৈনিক কোনওক্রমে পালাল মন্দিরের দিকে। বাকিরা সবাই তখন সেই অন্ধকার প্রাঙ্গণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে বা অন্তিম শ্বাস নিচ্ছে। সেই উপমন্দির প্রাঙ্গণ নিস্তব্ধ হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই অঙ্গিরা আড়াল থেকে সেই প্রাঙ্গণে বেরিয়ে এসে তুলে নিল রাজশ্রীর সংজ্ঞাহীন দেহটা। তারপর তাকে নিয়ে ছুটল সেই প্রাচীন চন্দ্রমন্দিরের দিকে আত্মগোপন করার জন্য।

মন্দিরের অন্ধকারে প্রবেশ করে অঙ্গিরা, রাজশ্রীকে মাটিতে শুইয়ে দিল। তারপর রাজশ্রীর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বলতে লাগল, 'চোখ মেলো রাজশ্রী, চোখ মেলো। দেখ আমি অঙ্গিরা।'

রাজশ্রী চোখ মেলল। পরিচিত কণ্ঠস্বর আর পরিচিত মানুষের হাতের স্পর্শে অঙ্গিরাকে চিনতে পেরে রাজশ্রী তার গলা জড়িয়ে বলল, 'সোমেশ্বর মহাদেব সত্যিই আছেন। তিনি আমাদের প্রার্থনা শুনেছেন।'

অঙ্গিরাও বলে উঠল, 'হ্যাঁ, তিনি শুধু পাথরের মূর্তি নন, তিনি সত্যিই আছেন!'

কিন্তু এরপরই সোমনাথ মন্দিরের দিক থেকে প্রচণ্ড গোলযোগের শব্দ ভেসে আসতে লাগল। তবে কি সুলতানবাহিনী তাদেরকে ধরার জন্য এদিকে আসছে? অঙ্গিরা তার প্রাণ থাকতে কাউকে স্পর্শ করতে দেবে না রাজশ্রীকে। অঙ্গিরা রাজশ্রীকে ছেড়ে উঠে গিয়ে ধনুকে শর রচনা করে সেই ভগ্ন মন্দিরের তোরণ আগলে বাইরে তাকাল। হ্যাঁ, প্রচণ্ড চিৎকার ভেসে আসছে সোমনাথ মন্দিরের ওপাশ থেকে। শিঙা ফোঁকার শব্দও যেন কানে আসছে!

গজনীবিদ সুলতান মামুদ তার তাঁবুতে বসেই অন্ধকার নামার পর তাকিয়ে ছিলেন সোপানশ্রেণীর ওপরে অবস্থিত গর্ভমন্দির চত্বরের দিকে। কিছুক্ষণ আগেই তিনি তার একদল অনুচরকে পাঠিয়েছিলেন ওই গর্ভমন্দিরে। তার কারণ, হঠাৎ-ই সুলতানের মনে হয়েছে ওই স্থানে গর্ভ মন্দিরের দেওয়ালের আড়ালে আর কোন ধনসম্পদ লুকিয়ে নেই তো? বিশেষত যে মহামূল্যবান স্যমন্তক মণির কথা তিনি শুনেছিলেন তার সন্ধান তিনি এখনও পাননি। তাই তিনি গর্ভগৃহর দেওয়ালগুলোর কোনও অংশ ফাঁপা কিনা তা দেখার জন্য তার অনুচরদের সেখানে পাঠিয়েছেন।

তাদেরই ফেরার প্রতীক্ষা করছিলেন সুলতান। একবার যেন মন্দিরের পিছন দিক থেকে মৃদু চিৎকারের শব্দও তিনি শুনেছিলেন। কিন্তু তা শুনে সুলতানের মনে হয়েছিল তা নিশ্চয়ই তার অনুচরদের উল্লাসধ্বনি। তাই ব্যাপারটাতে তিনি মনযোগ দেননি। কিন্তু হঠাৎই তাঁর এক অনুচর হুড়মুড় করে প্রবেশ করল তার তাঁবুতে। তার পাঁজরে বিদ্ধ হয়ে আছে একটা তির! আতঙ্কিত ভাবে সে সুলতানের উদ্দেশ্যে বলল, 'মন্দিরের পিছনে কাফেরদের বিশাল তিরন্দাজ বাহিনী হানা দিয়েছে! আপনার পার্শ্বচরদের অনেকেই মারা পড়েছে!' এটুকু বলার পরই সুলতানের সেই অনুচরের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল! সে ছিটকে পড়ল গালিচার ওপর। সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়ালেন গজনীবিদ। তার তলোয়ার খুলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন সঙ্গীদের নিয়ে কাফের নিধনে এগোবার জন্য।

সুলতান তার সৈনিকদের ডাকতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আর প্রয়োজন হল না। কয়েকজন অশ্বারোহী সৈন্যাধ্যক্ষ তোরণ অতিক্রম করে ছুটে এসে সুলতানের সামনে দাঁড়াল। সুলতান এদেরকে রেখে এসেছিলেন সোমনাথ নগরীর বাইরে পাহারার কাজে। সে স্থান থেকেই ছুটে আসছে তারা। প্রচণ্ড উত্তেজনা তাদের মুখমণ্ডলে। ঘোড়া থেকে সুলতানের সামনে।

সুলতান জানতে চাইলেন 'কী হয়েছে?'

উত্তেজিত ভাবে সেই সেনাপতি জানালেন, 'কাফেরদের বিশাল সেনাদল এগিয়ে আসছে নগরীর দিকে! তারা হয়তো কাল ভোরেই এখানে এসে পড়বে! ইতিমধ্যেই তারা নগরীর বাইরেটা ঘিরে ফেলার উপক্রম করেছে!'

কথাটা শুনে গজনীর সুলতান সোমনাথ মন্দির বিজেতা মামুদ বললেন, 'এতে এত চিন্তার কি আছে। আমার সৈন্যরা, আমার তিরিশ হাজার স্বেচ্ছাসেবী জিহাদি তরুণরা তাদের নিশ্চিহ্ন করবে। কাফেরদের রক্তে লাল হয়ে যাবে মাটি।'

সুলতানের কথা শুনে তাঁর বহুবার হিন্দু মুলুক অভিযানের সাথী এক অভিজ্ঞ সেনাপতি বললেন, 'তা মনে হয় সম্ভব হবে না সুলতান। কাফেরদের সেই বাহিনীতে রণহস্তীই আছে অন্তত দশ হাজার!'

'দশ হাজার হাতি!' আপনি ঠিক বলছেন?' জানতে চাইলেন বিস্মিত সুলতান।

সেনাপতি বললেন, 'হ্যাঁ, মালিক। কমপক্ষে দশ হাজার। তার বেশিও হতে পারে। যেন একটা চলমান পর্বতশ্রেণী আসছে নগরীর দিকে! আমি নিজের চোখে সীমান্ত সংলগ্ন নজর মিনারের মাথায় উঠে দেখেছি। আর পদাতিক, অশ্বারোহী সৈন্য সংখ্যা অন্তত এক লক্ষ হবে!'

আরও কয়েকজন সৈন্যাধ্যক্ষও সম্মতি প্রকাশ করলেন এ কথাতে।

দশ হাজার রণহস্তী! আর এক লক্ষ সেনা! বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন বহুবার হিন্দু মুলুকে অভিযানকারী সুলতান মামুদ। সুলতান নিজেও অভিজ্ঞ যোদ্ধা। বহু যুদ্ধের সফল নায়ক। তিনি অবিবেচক নন। তিনি বুঝে ফেললেন এই সমুদ্র সমান কাফের বাহিনীর সামনে তার বাহিনী খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। হাতির পায়ের তলায় পিষে মরতে হবে সবাইকে। বাহিনীর একজনও আর গজনী মুলুকে ফিরে যেতে পারবে না, হয়তো তিনিও নন। তাই হঠকারী কোনও সিদ্ধান্ত না নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তিনি তার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। অনুচরদের উদ্দেশ্যে তিনি সোমনাথ মন্দিরের সেই মহামূল্য কপাট-কাঠামো দেখিয়ে বললেন, 'ওটাকে দ্রুত উটের পিঠে উঠিয়ে নাও। রত্ন, সোনা ভর্তি জালাগুলোকেও উঠিয়ে নাও। শিঙা ফুঁকে সবাইকে সংকেত করো মন্দিরের সামনে উপস্থিত হতে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা এ স্থান ত্যাগ করে সমুদ্র তীর ধরে প্রস্থান করব।'

নির্দেশ পালিত হল, বেজে উঠল শিঙা। ঠিক মধ্যরাতে মামুদ তাঁর বাহিনী নিয়ে মন্দির ত্যাগ করলেন। যে পথে তারা সোমনাথে উপস্থিত হয়েছিলেন সে পথে ফেরা তাদের সম্ভব ছিল না। তাই মন্দিরের পশ্চাদ্ভাগে পৌঁছে উপকূল ধরে ছুটতে লাগল যবন বাহিনী। গজনীবিদ মামুদ, মূর্তি ধ্বংসকারী মামুদ, সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠনকারী মামুদ, সুলতান মামুদ অন্ধকারের মধ্যে ভীত সন্ত্রস্তভাবে পালাতে লাগলেন সোমনাথ মন্দিরকে পিছনে ফেলে।

সেই প্রাচীন চন্দ্রমন্দিরের প্রবেশ পথ আগলে দাঁড়িয়ে ছিল অঙ্গিরা। সেদিকে কোনও যবন সেনা উপস্থিত হয়নি। সমুদ্রের দিকে মামুদ বাহিনীর পলায়মান পদশব্দ শুনে অঙ্গিরা এক সময় অনুমান করতে পারল যে বাহিনী মন্দির ত্যাগ করে পালাচ্ছে! মামুদ বাহিনী ছোট নয়, তাই মন্দির ত্যাগ করে শেষ ব্যক্তির পায়ের শব্দ মুছে যেতেও অনেকটাই সময় লাগল। এক সময় সব শব্দ মুছে গেল, নিস্তব্ধ হয়ে গেল বিশাল সোমনাথ মন্দির।

তার প্রাকারের ভিতর বা বাইরে কোথাও কোনও শব্দ নেই। অঙ্গিরার অজান্তে কখন যেন তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে রাজশ্রী। সে অঙ্গিরার কণ্ঠ আলিঙ্গন করল। অঙ্গিরার ঠোঁট নেমে এলো রাজশ্রীর ঠোঁটের ওপর। না, এ চুম্বন, এ আলিঙ্গনে কোনও যৌনতা নেই, আছে পরম ভালোবাসা আর বিশ্বাস।

এরপর আরও বেশ কিছুক্ষণ সেখানেই অপেক্ষা করল তারা। তারপর যখন রাত শেষে শুকতারা ফোটার উপক্রম হল তখন সেই ভগ্ন মন্দির ত্যাগ করে বাইরে বেরোল দুজনে। পিছনে সেই ভগ্ন মন্দিরের এক গোপন কক্ষে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে রইল বৃদ্ধ খগেশ্বর আর অন্ধকারের প্রহরী।

সোমনাথ মন্দিরের সামনে উপস্থিত হল অঙ্গিরা আর রাজশ্রী। ঠিক সেই সময় শুকতারা ফুটে উঠল। কেউ কোথাও নেই। উন্মুক্ত সোমনাথ মন্দিরের ভগ্ন তোরণ। যে তোরণ অতিক্রম করার চেষ্টাতে এত ভয়ঙ্কর ঘটনা প্রবাহর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে অঙ্গিরা আর সোমনাথ মন্দিরের দেবদাসী রাজকন্যা রাজশ্রীকে। আজ আর তাদের বাধা দেবার কেউ নেই। সেই তোরণের দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরা বলল, 'হ্যাঁ, তিনি আছেন। সোমেশ্বর মহাদেব আছেন। মন্দির ধ্বংস করে, বিগ্রহ-মূর্তি ধ্বংস করে কি আর দেবতাকে ধ্বংস করা যায়? তিনি সর্বত্র বিরাজমান। তিনি আছেন আমার তোমার প্রাণের মধ্যে।'

রাজশ্রী বলল, 'হ্যাঁ, তিনি শুধু পাথরের মূর্তি নন। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। সব সুন্দরের মধ্যেই তিনি বিরাজমান। ভোরের আলো ফুটলেই আমরা মন্দির ত্যাগ করে রওনা হব চালুক্য নগরীর দিকে। আর এর পরই তারা সোমেশ্বর মহাদেবের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাবার জন্য মন্দিরের নীচের চত্বর থেকে ওপরের গর্ভমন্দিরে চত্বরের দিকে তাকাতেই একজনকে দেখতে পেল। গর্ভমন্দিরের চত্বরে দাঁড়িয়ে সে তাকিয়ে আছে নীচের দিকে। তারা চিনতে পারল তাকে। তিনি ত্রিপুরারিদেব। মামুদের অনুচররা উন্মুক্ত করে ফেলেছিল সেই গোপন পথ। তবে তারা আর ভিতরে প্রবেশ করেনি। শিঙার শব্দ শুনে তারা ফিরে এসেছিল। আর সেই পথ দিয়েই বাইরে বেরিয়েছেন ত্রিপুরারিদেব। তিনি কী ভাবে বাইরে এলেন তা বুঝতে না পারলেও তাকে দেখে অঙ্গিরা, রাজশ্রীকে নিয়ে এগোল সোপানশ্রেণীর দিকে, সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের জন্য।

কপাটহীন গর্ভগৃহর সামনে ত্রিপুরারিদেবের কাছে এসে দাঁড়াল তারা দুজন। কয়েক মুহূর্ত তাদের দিকে নিশ্চুপ ভাবে তাকিয়ে থাকার পর সোমেশ্বর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব বিষণ্ণ ভাবে বললেন, 'তোমাদের আর এ মন্দিরে ধরে রাখার ক্ষমতা নেই আমার। আর যদি তা থাকতও তবে ধরে রেখে কোনও লাভ নেই। সবইতো এখন শেষ।'—এই বলে তিনি তাকালেন কপাটহীন গর্ভগৃহর দিকে।

একটু চুপ করে থেকে অঙ্গিরা বলল 'না, সব এখনও শেষ হয়ে যায়নি।'

কথাটা শুনে ত্রিপুরারিদেব তার দিকে তাকিয়ে বলল, 'তোমার কথার অর্থ? তুমি কি পরিহাস করছ এই অসহায় বৃদ্ধর সঙ্গে?'

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। অঙ্গিরা তার পোশাকের ভিতর থেকে একটা সোনার কৌট বার করে তা তুলে ধরল প্রধান পুরোহিতের সামনে। মুখ বন্ধ সেই স্বর্ণ পাত্রটা দেখে চিনতে পেরে ত্রিপুরারিদেব বিস্মিত ভাবে বললেন, 'ও জিনিস তুমি কোথায় পেলে? তুমি যখন আমাকে সুড়ঙ্গে আটকে দিলে তখন আমি অনুসন্ধান করে দেখেছি ও পাত্র যেখানে থাকার কথা সেখানে ছিল না!'

অঙ্গিরা জবাব দিল, 'মৃত খগেশ্বরের পোশাকের ভিতর থেকে। সম্ভবত অন্ধকারের প্রহরী তার মৃত পৌত্রর থেকে তিনি এটা পেয়েছিলেন। এই পাত্র নিয়ে মন্দির ত্যাগ করে আপনাকে চরম আঘাত দিতে চেয়েছিলেন তিনি।'

ত্রিপুরারিদেব জানতে চাইলেন, 'ওই স্বর্ণ আধারে কি আছে তা তুমি জানো? খুলে দেখেছ?'

অঙ্গিরা বলল, 'হ্যাঁ, খুলে দেখেছি। অন্ধকারের মধ্যেও চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল আমার। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে হয়তো তার উজ্জ্বলতায় চোখ অন্ধ হয়ে যেত আমার। তাই সঙ্গে-সঙ্গে পাত্রের মুখ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। বিশাল আকৃতির এক হীরকখণ্ড! আমি সেটা কি তা অনুমান করতে পেরেছি। সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ 'স্যমন্তক মণি'!

প্রধান পুরোহিত কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধ ভাবে অঙ্গিরার হাতে ধরা স্যমন্তক মণির আধারটার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি নিশ্চয়ই এ মণি তোমার সঙ্গে নিয়ে যাবে?'

অঙ্গিরা মৃদু হেসে তাঁর উদ্দেশ্যে পাত্রটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'না, এ সম্পদ আপনি রক্ষা করুন। মন্দিরের সম্পদ, দেবতার সম্পদ আপনার কাছেই থাক। সোমেশ্বর মহাদেব আমাকে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ দিয়েছেন। ফিরিয়ে দিয়েছেন আমার ভালোবাসা রাজকন্যা রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতাকে।

পাত্রটা গ্রহণ করে অঙ্গিরার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। প্রবল বিস্মিত সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের মনে হল স্বয়ং সোমেশ্বরই যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অঙ্গিরার রূপে। নইলে এত নির্লোভ কেউ হতে পারে! ফিরিয়ে দিতে পারে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রত্ন স্যমন্তক মণি!

বিস্ময়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকার পর ত্রিপুরারিদেব আশীর্বাদের ভঙ্গিতে অঙ্গিরা আর রাজশ্রীর উদ্দেশ্যে হাত তুললেন। তারপর বললেন, 'হ্যাঁ, যতক্ষণ আমার জীবন আছে এই স্যমন্তক মণিকে অন্ধকারের প্রহরীর দায়িত্ব পালন করে রক্ষা করব আমি। সেই অন্ধকার কুঠুরির স্যমন্তক মণির আমি হব শেষ প্রহরী। আমি এবার নীচে সেই কুঠুরিতে নামব। বাইরে থেকে দেওয়ালটা ঠেলে দাও।'

স্যমন্তক মণির আধারটা নিয়ে গর্ভগৃহতে প্রবেশ করলেন সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। সুড়ঙ্গ পথ ধরে নীচে নেমে গেলেন তিনি। দেওয়ালটা বাইরে থেকে বন্ধ করে ত্রিপুরারিদেব আর সোমেশ্বর মহাদেবের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে গর্ভগৃহ ত্যাগ করে নীচে নেমে এল অঙ্গিরা।

মন্দির ত্যাগ করার জন্য তারা যখন উন্মুক্ত প্রবেশ তোরণের সামনে এসে দাঁড়াল ঠিক তখনই ভোরের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। বাইরে তাকিয়ে তারা দুজন এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল। বিশাল হস্তিবাহিনী এগিয়ে আসছে প্রবেশ তোরণের দিকে। নতুন সূর্যকিরণে ঝলমল করছে বিশাল ঐরাবতের পিঠে বসে থাকা ভোজমহারাজ পরমদেওর সোনার রাজছত্র! তাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য সোমনাথ মন্দির তোরণের দুপাশে নমস্কারের ভঙ্গিতে হাত জোড় করে দাঁড়াল যুবক অঙ্গিরা আর রাজশ্রী—সোমনাথ সুন্দরী সমর্পিতা।

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%