পাঠ অভিজ্ঞতা কাস্টমাইজ করুনথিম, ফন্ট, লাইন উচ্চতা প্রয়োজনমত পরিবর্তন করুন।
দেখান
বনের খবর
প্রমদারঞ্জন রায়
• ১ • যারা জরিপের কাজ করে, তাদের মধ্যে অনেককে ভারি ভয়ংকর সব জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়৷ সেই সব জায়গায় হাতি, মহিষ, বাঘ, ভাল্লুক আর গণ্ডার চলা-ফেরা করে, আবার যেখানে সেই-সব নেই, সেখানে তাদের চেয়েও হিংস্র আর ভয়ানক মানুষ থাকে৷ প্রায় কুড়ি-বাইশ বছর এই সব জায়গায় ঘুরে কত ভয়ই পেয়েছি, কত তামাশাই দেখেছি৷
সরকারি জরিপের কাজে অনেক লোককে দলে-দলে নানা জায়গায় যেতে হয়৷ এক-একজন কর্মচারীর উপর এক-একটা দলের ভার পড়ে৷ তাঁর সঙ্গে জিনিসপত্র বইবার জন্য, হাতি, গোরু, ঘোড়া, খচচর ও উট, আর জরিপ করবার জন্য সার্ভেয়ার, আমিন, খালাসি ও চাকর-বাকর বিস্তর থাকে৷ বনের মধ্যে থাকতে হয় তাঁবুতে৷ লোকজনের বাড়ির কাছে থাকা প্রায়ই ঘটে ওঠে না, এক-এক সময় এমনও হয় যে চারদিকে কুড়ি-পঁচিশ মাইলের মধ্যে আর লোকালয় নেই৷ বন এমনই ঘন আর অন্ধকার যে তার ভিতর অনেক সময় সূর্যের আলো প্রবেশ করে না; চলবার পথ, জঙ্গল কেটে তৈরি করে নিতে হয়, তবে অগ্রসর হওয়া যায়৷ যদি জানোয়ারের রাস্তা, বিশেষত হাতির রাস্তা, পাওয়া গেল তো বিশেষ সুবিধার কথা বলতে হবে৷
এমনি বিশ্রী জায়গা! প্রথম-প্রথম এই সব জায়গায় সহজেই ভয় হত৷ আমার মনে আছে প্রথম বছর যখন শান স্টেটে যাই, আমার তাঁবুর সামনে বসে একটা বাঘ ফোঁস-ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলছিল, আমি তা শুনে বড়োই ব্যস্ত হয়েছিলাম৷ তারপর, এর চেয়েও কত বড়ো-বড়ো ঘটনায় পড়েছি কিন্তু তেমন ব্যস্ত কখনো হইনি৷
কলেজ ছেড়ে চাকরিতে ঢুকে কাজ শিখবার জন্য দেরাদুন গিয়েছিলাম৷ আমার মাথায় তখনো চাকরির চাপ পড়েনি
কাজ শিখছি, তখনো যেন স্কুলের ছাত্র৷ স্কুলের ছাত্রের স্বভাব সুলভ বাঁদুরে বুদ্ধি পেটের মধ্যে তখনো পুরোমাত্রায় রয়েছে৷ তার ফলে লোকের উপর মধ্যে-মধ্যে একটু-আধটু অত্যাচার হত— লেগ পুলিং চলত৷
সেই বছর দেরাদুনে দুজন হিন্দুস্থানি ও তিনজন বাঙালি অফিসার ছিলেন, সকলেই আমার চেয়ে সিনিয়ার৷ তাঁরাও পাহাড়-জঙ্গলে কাজ শিখতে গিয়েছিলেন৷ বাঙালি অফিসারদের মধ্যে একজন— শ্রীযুক্ত অ আমার পূর্ব-পরিচিত, শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আমার তিন ক্লাশ উপরে পড়তেন৷ অন্য দু-জন, শ্রীযুক্ত নি- আর শ্রীযুক্ত হি-ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পুরাতন ছাত্র৷ শ্রীযুক্ত নি- আর শ্রীযুক্ত অ- আমাকে বড়ো স্নেহ করতেন৷ কত নিমন্ত্রণ যে তাঁদের বাড়িতে খেয়েছি৷ হিন্দুস্থানি ভদ্রলোকদের মধ্যে সর্দার অ-পাঞ্জাবি শিখ আর শ্রীযুক্ত দু-অযোধ্যার লোক৷ সর্দার সাহেব ধীর গম্ভীর লোক, কারো সঙ্গে বড়ো একটা মিশতেন না, বেশি কথাবার্তাও বলতেন না৷
আমরা চারজন বাঙালি একসঙ্গে মেস করে ছিলাম, আমাদের তাঁবু ছিল দেরাদুন থেকে মাইল দুই দূরে— নালাপানিতে৷ শনিবার কাজ শেষ করে আমরা অনেকেই দেরাদুনে আসতাম, আবার রবিবার সন্ধ্যায় তাঁবুতে ফিরে যেতাম৷ কেউ বা রবিবার রাতটাও দেরাদুনেই কাটিয়ে সোমবার ভোরে ক্যাম্পে হাজির হতেন৷ শ্রীযুক্ত হি- অনেক সময়ই রবিবার রাত্রে দেরাদুনে খাওয়া-দাওয়া করে গভীর রাত্রে তাঁবুতে হাজির হতেন, শ্রীযুক্ত নি- সন্ধ্যার পূর্বেই ফিরতেন৷ আমাদের ফিরবার রাস্তা ছিল একটি গোরস্থানের পাশ দিয়ে আর শ্মশানের ভিতর দিয়ে৷ দু-চারদিন শ্রীযুক্ত হি-কে অত রাত্রে একলাটি আসতে দেখে, শ্রীযুক্ত নি- একদিন তাঁকে তাড়া দিলেন, ‘অত রাত্রে অমন করে একলাটি আস, তোমার ভয় করে না?’
‘কীসের ভয়?’
‘কেন ভূতের ভয়, শ্মশানের উপর দিয়ে আসতে হয়, আবার পাশে গোরস্থান৷’
শুনে তো শ্রীযুক্ত হি- হো-হো করে হেসেই আকুল, ‘জ্যান্ত মানুষকে তো ভয় করলাম না, বাকি এখন মরা মানুষকে ভয়৷’
শ্রীযুক্ত নি- তো চটে লাল৷ বলাবাহুল্য তিনি একটু নার্ভাস প্রকৃতির লোক ছিলেন৷
নালাপানির কাজ শেষ হলে আমরা আরও মাইল দুই দূরে সোং নদীর ধারে রায়পুরে, এক আমবাগানে ক্যাম্প করেছিলাম৷ প্রকাণ্ড আমবাগান, তার এক ধারে ছয়জন সাহেবের তাঁবু, এক ধারে আমরা চার-পাঁচজন ভারতবাসী, আর এক পাশে দুজন ইনস্ট্রাক্টার— মুন্সী জ্যাকেরিয়া আর জ্যাকেরুদ্দিন৷
এক রবিবার সমস্ত সকালটা আমরা নিজের-নিজের তাঁবুতে বসে আপিসের কাজ করেছি৷ বেলা বারোটা-সাড়ে বারোটায় খাওয়া-দাওয়া সেরে আমি শ্রীযুক্ত দু-এর তাঁবুর দিকে যাচ্ছিলাম, পথে মুনশি জ্যাকেরিয়ার তাঁবু৷ দেখলাম, তাঁর সামনে একটা টেবিলের উপর একখানা খাপসুদ্ধ তলোয়ার আর এক সেট উর্দি৷ সেখানে শ্রীযুক্ত অ-, শ্রীযুক্ত গি- আর শ্রীযুক্ত দু- দাঁড়িয়ে মুনশিজির সঙ্গে গল্প করছেন৷
আমি জিগগেস করলাম, ‘এগুলো কী?’
মুনশিজি বললেন, ‘একজন সওয়ার জরিপের কাজ শিখতে এসেছে৷ এ তার হাতিয়ার আর উর্দি৷’
আমি পাগড়ি, কোমরবন্ধ ইত্যাদি উলটিয়ে-পালটিয়ে দেখলাম৷ তারপর তলোয়ারখানা তুলে নিয়ে, টেনে খাপ থেকে বার করলাম৷ তার ব্যালেনসটা পরীক্ষা করবার জন্য হাতলটা ধরে, জোরে সামনের দিকে একটা খোঁচা মারলাম— অবশ্য শূন্যে৷
টেবিলের অন্য পাশে, বেশ চার-পাঁচ ফুট দূরে ছিলেন শ্রীযুক্ত নি-৷ ‘বাপরে!’ বলে এক লাফে তিনি আরও চার-পাঁচ ফুট পিছনে সরে গেলেন৷
আমার মাথায় শনি চাপল৷ আমি এক পা অগ্রসর হয়ে আবার তলোয়ার চালালাম হাওয়াতে৷ ‘আরে বাপ!’ বলে শ্রীযুক্ত নি- লাফিয়ে আরও তিন-চার ফুট পিছনে সরে গেলেন৷
আর যায় কোথায়! তিনি যতই পিছনে হটে যান, আমি ততই দু-এক পা করে এগোই আর তলোয়ার চালাই শূন্যে— তিনি আবার চিৎকার করে পিছনে হটে যান, একবার চেয়েও দেখেন না যে তলোয়ারের ডগা তাঁর চার-পাঁচ ফুটের মধ্যেও পৌঁছয় না৷
সকলে তো হেসেই আকুল! আর সকলে যতই হাসে, তিনিও তত চিৎকার করেন আর আমাকে গালি দেন— ‘রাখ ওটা হাত থেকে, শিগগির রাখ৷’
আমি তলোয়ারখানা খাপে পুরে টেবিলের উপর রেখে দিলাম, মুনশিজি হাসতে-হাসতে সেখানা তাঁর তাঁবুর ভিতরে রেখে এলেন, আর শ্রীযুক্ত নি-কে বললেন, ‘গোসসা মৎ করো বাবু সাহেব, উয়ো তো স্কুল কা ছোকরা হ্যায়!’
সোং নদীর অপর পারে দোয়ারা পাহাড়ে কাজ করতে গিয়েছিলাম আমরা চারজনে— শ্রীযুক্ত নি-, শ্রীযুক্ত অ-, শ্রীযুক্ত জ- আর আমি৷
কাজ করতে-করতে যখন পাহাড়ের চুড়োয় পৌঁছলাম তখন ঝড় আর মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হল৷ সকলে মিলে একটা ঝোপের আড়ালে আশ্রয় নিলাম আর জরিপের বড়ো-বড়ো ছাতার আড়ালে অতি কষ্টে ম্যাপগুলোকে রক্ষা করলাম৷ দেড়-দু ঘণ্টা পর, ঝড়-বৃষ্টি থামলে আমরা উঠে বাকি কাজটুকু শেষ করবার জন্য ব্যস্ত হলাম৷ একটুকু মাত্র বাকি আছে, তখন শ্রীযুক্ত নি- বললেন, ‘এক্ষুনি চল, না হলে তাঁবুতে পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে৷’
আমরা বললাম, ‘এইটুকু কাজের জন্য আবার কাল এত দূর আসা হতে পারে না৷ এইটুকু শেষ করেই যাব, একটু সবুর করুন৷’
না, তিনি কিছুতেই রাজি হলেন না, বললেন, ‘একে তো বিশ্রী রাস্তা, তার উপর আবার বৃষ্টিতে ভিজেছে৷ নিশ্চয়ই বেজায় পিছল হয়েছে, অন্ধকার হয়ে গেলে যেতেই পারব না, এক্ষুনি চল৷’
‘তাহলে আপনি এগোন আমরা কাজটুকু শেষ করে আসছি, আপনাকে রাস্তায় ধরে নেব৷’
তিনি চলে গেলেন, আর যাবার সময় তাঁর নিজের বল্লম লাগানো লাঠিটা তো নিলেনই, আমারটাও নিলেন৷
কুড়ি-পঁচিশ মিনিটে বাকি কাজটুকু আমরা করলাম৷ ততক্ষণে পশ্চিমদিক লাল করে সূর্য অস্ত যায়-যায়৷ শ্রীযুক্ত অ- বললেন, ‘চল, যেদিক দিয়ে এসেছি, সেইদিক দিয়ে ফিরে যাই৷’
আমরা বললাম, ‘না৷ ওটা বড্ড খাড়া৷ চড়বার সময়ই তিন-চার জায়গায় ধরে-ধরে উঠতে হয়েছে৷ এখন বৃষ্টিতে ভিজে ওইসব জায়গা আরও বিশ্রী হয়েছে৷ অনর্থক রিসক নেবার দরকার নেই৷’
শ্রীযুক্ত অ- গ্রাহ্যই করলেন না, একজন পাহাড়ি খালাসি সঙ্গে নিয়ে ওইদিক দিয়েই চলে গেলেন৷ শ্রীযুক্ত জ- আর আমি রাস্তা ধরে চললাম৷ রাস্তা আড়াই ফুট থেকে তিন ফুট চওড়া, দেয়ালের মতন প্রায় খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে এঁকে-বেঁকে নেমেছে৷ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে দেখে আমরা দৌড়ে চললাম, খালাসিরাও আমাদের পিছন-পিছন দৌড়ে নামতে লাগল৷ বোধহয় তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক রাস্তা নেমেছি, শ্রীযুক্ত জ- বললেন, ‘সামনে যেন শ্রীযুক্ত নি-?’
‘সে কী রকম? তিনি তো আধঘণ্টা আগে বেরিয়েছেন, এতক্ষণে বোধহয় নীচে নালায় পৌঁছে গেছেন৷’
শ্রীযুক্ত জ- বললেন, ‘ওই দেখ৷’
তাকিয়ে দেখলাম সত্যি-সত্যিই শ্রীযুক্ত নি- নামছেন৷ আর সে পাহাড় নামা এক অদ্ভুত কাণ্ড! তিনি খাদের দিকে পিছন ফিরে, পাহাড়ের চুড়োর দিকে মুখ করে, একেবারে পাহাড়ের দেয়াল ঘেঁষে, দুই হাত দুই বল্লমে ভর দিয়ে ‘হাঁটি-হাঁটি পা-পা’ করে এক-এক পা ফেলছেন, দু-জন পাহাড়ি খালাসি তাঁর দুই পাশে, দুই হাত দিয়ে আগলিয়ে রয়েছে৷ ঠিক যেন ছোটো ছেলে, মা-বাবার দুই হাত ধরে ধীরে-ধীরে পা ফেলছে পাশের দিকে— যেমন করে ডাঙায় কাঁকড়া চলে৷
আমরা দু-জন দৌড়ে নামছিলাম, পায়ে ভারি-ভারি বুট, তার দুমদুম আওয়াজ হচ্ছিল৷ ওই শব্দ কানে পৌঁছানো মাত্র শ্রীযুক্ত নি- একেবারে বসে পড়লেন৷ আমার মাথায় ভূত চাপল, রাস্তার পাশে বেশ বড়ো গোটা দু-চার পাথর ছিল, তার একটাকে ঠেলে খাদে ফেলে দিলাম৷ হুড়-হুড় শব্দে সব ভেঙে চুরমার করে, সেটা যেন একেবারে পাতালে চলে গেল৷ বেচারা নি-! তাঁর কী দুরবস্থা!’ চোখ বুজে বসে-বসে খালি আমাকে তাড়না করছেন, ‘হতভাগা, তোর না হয় সাতকুলে কেউ নেই, মরতে হয় তুই খাদে পড়ে মর-না৷ শুধু-শুধু আমাদের কেন আবার টানছিস?’ একটু অপ্রস্তুত হয়ে আমি বললাম, ‘আচ্ছা দাদা, আর না৷ আপনি চলুন, আমরা আপনার পিছন-পিছন আস্তে-আস্তে চলছি৷’
‘না, না, কিছুতেই নয়৷ তোকে দিয়ে বিশ্বাস নেই, তুই এগিয়ে না গেলে, আমি উঠছি না এখান থেকে৷’
অগত্যা কী করি৷ অতি কষ্টে শ্রীযুক্ত জ- আর আমি পাশ কাটিয়ে তাঁকে পার হয়ে গেলাম, তিনি পাহাড়ের দেয়াল ঘেঁষে, চোখ বুজে বসে রইলেন৷ আমরা দৌড়ে নেমে গেলাম৷
নীচে সোং নদীতে পৌঁছে দেখি শ্রীযুক্ত অ- আমাদের অপেক্ষায় বসে রয়েছেন৷ জিগগেস করলেন, ‘এত দেরি কেন?’ সব কথা তাঁকে বললাম৷ তিনি বললেন, ‘সবুর কর, তিনি আসুন৷’
অনেকক্ষণ পর শ্রীযুক্ত নি- এলেন আর আমার চোদ্দো পুরুষ উদ্ধার করলেন৷ বললেন আমি একটা রেকলেস ফুল!
আগেই বলেছি সর্দারসাহেব ধীর, গম্ভীর লোক, কারও সঙ্গে বড়ো একটা মিশতেন না, নিজে একলাটি কাজ করতে যেতেন৷ আমরা যেতাম তিন-চারজন এক সঙ্গে৷ আমরা কাজ করে তাঁবুতে ফিরে এলে কিন্তু সর্দারসাহেব রোজ রাত্রে শ্রীযুক্ত জ-এর নকশাখানা নিয়ে তাঁর নিজের নকশার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন, কোনদিকে কতটুকু কাজ আমরা করেছি, কোন পাহাড়ের কতটুকু আমরা চড়েছি ইত্যাদি৷ যদি দেখতেন যে কোনোদিকে তাঁর চেয়েও বেশি দূরে আমরা মেপেছি, বা কোনো পাহাড়ে বেশি উঁচু পর্যন্ত উঠেছি, অমনি তার পরদিনই, ওই পাহাড়ে গিয়ে আমাদের চেয়েও একটু বেশি কাজ করে আসতেন৷ একদিন ঠিক করলাম সর্দারসাহেবকে একটু ভোগাতে হবে৷
আমরা সত্যি-সত্যি যতটুকু জরিপ করেছি, টিমলি পাহাড় তার বাইরে৷ শ্রীযুক্ত জ-এর ও আমার নকশার উপর ওই পাহাড়ের চেহারা একটু-একটু এঁকেছিলাম জানি মাত্র৷ একদিন শ্রীযুক্ত জ-এর ম্যাপের উপর ওই আঁকাটার চারদিকে পেনসিল দিয়ে এ-পাশে ও-পাশে আরও পাঁচ-সাতটা নালা আর পাহাড়, কতকটা আভাসে আর কিছুটা কল্পনার সাহায্যে এঁকে একটা নকশা তৈরি করলাম, ঠিক যেন আমরা ওই সব জরিপ করে এসেছি৷ সর্দারসাহেব রোজই শ্রীযুক্ত জ-এর নকশাই দেখে থাকেন, তাই তাঁর নকশার উপরই করলাম৷ আমারটা তিনি দেখবেন না, সুতরাং আমার নকশার উপর করলে পণ্ডশ্রম হবে৷
আমার কাণ্ড দেখে শ্রীযুক্ত জ- বলতে লাগলেন, ‘তুমি এই গরিবকে কাল টিমলি পাঠাবে দেখছি৷ আই হোপ সো, ইট উইল সারভ হিম রাইট!’
যেমন রোজ হয়, তেমনি সে রাত্রেও সর্দারসাহেব শ্রীযুক্ত জ-এর নকশার সঙ্গে তাঁর নিজের নকশা মিলিয়ে দেখলেন৷
সকালে উঠে, কাজে বার হবার সময় শ্রীযুক্ত জ- সর্দারসাহেবকে ডাকলেন, তাঁর চাকর এসে বলল, ‘উয়ো তো রাত সাড়ে-চার বাজে কাম পর চলে গঁয়ে৷’
আমরা কাজকর্ম শেষ করে সন্ধ্যার সময় তাঁবুতে ফিরলাম, সর্দারসাহেব তখনও ফেরেননি৷ একটু দুঃখ হল, তাড়াতাড়ি লন্ঠন দিয়ে, তিন-চারজন লোক পাঠালাম তাঁর খোঁজ করার জন্য৷ অনেক রাত্রে তিনি ফিরলেন৷
ভোরে উঠেই সর্দারসাহেব শ্রীযুক্ত জ-এর নকশার জন্য লোক পাঠালেন৷ ইচ্ছা, তাঁর নিজের নকশার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন৷ নকশা দেখেই তো তাঁর চক্ষুস্থির, শ্রীযুক্ত জ-এর নকশা পরিষ্কার! টিমলির আশেপাশে কোনো কাজই নেই, পরিষ্কার সাদা কাগজ মাত্র!
বলা বাহুল্য আগের দিনই আমি সব রবার দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করে রেখেছিলাম৷ সর্দারসাহেব তাড়াতাড়ি শ্রীযুক্ত জ-কে ডেকে জিগগেস করলেন, ‘ওই কাজটুকু কাল দেখেছিলাম, সেটা কী হল?’
শ্রীযুক্ত জ- বললেন, ‘ওখানে তো কাজ করিনি আমরা৷ ওটুকু প্র-এর স্কেচিং আর ইম্যাজিনেশন-এর দৌড়৷ কাল কাজে যাবার সময় ও নিজেই সেটা মুছে ফেলেছে৷’
সর্দারসাহেবের মনের ভাবটা যে কেমন হয়েছিল তা ভগবানই জানেন৷ আমি নাকি ‘এ ভেরি মিসচিভাস ফেলো!’
দেরাদুনে আমার উপর হুকুম হল ঘোড়ায় চড়তে শিখতে হবে৷ একটা ঘোড়ার বন্দোবস্ত করলাম৷ আগে কখনো চড়িনি, কাজেই ‘শিক্ষাটা’ সোজা হল না, বিশেষ বেগ পেতে হল৷ জিনের সঙ্গে যেন আড়ি, একটু নড়াচড়াতেই সে আমাকে ঠেলে ফেলে দেবার উপক্রম করে৷
সে সময়ে দেরাদুনে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কনজারভেটার রায়বাহাদুর ক- থাকতেন৷ তিনি একদিন আমার অবস্থা দেখে জিগগেস করলেন, ‘বাবাজির বুঝি এই প্রথম চেষ্টা?’
‘হ্যাঁ৷’
‘আচ্ছা, চলো৷ আমি তোমাকে কী করে চড়তে হয় দেখিয়ে দিচ্ছি৷’
তিনি আমার শিক্ষকতা গ্রহণ করলেন, বলা বাহুল্য তাঁর শিক্ষকতার গুণে অল্পদিনের মধ্যেই একটু-একটু চড়তে শিখেছিলাম৷
রায়বাহাদুর ছিলেন পাকা শিকারি৷ বাঘ, ভাল্লুক অনেক শিকার করেছেন তিনি৷ তাঁর কাছে অনেক শিকারের গল্প শুনেছিলাম, তার মধ্যে একটি বড়োই হাস্যকর৷
তিনি তখন চক্রাতায় ডেপুটি কনজারভেটার, সেখানে সঙ্গে তাঁর এক ভাইপো ছিলেন৷ অবসরমতো খুড়োর বন্দুক দিয়ে কখনো-কখনো পাখি শিকার করতেন৷ রায়বাহাদুরের বাঘ শিকারের বড়ো শখ, তাই তাঁর অধীনস্থ সব ফরেস্ট গার্ডদের উপর হুকুম দিয়েছিলেন যে বাঘের সন্ধান পেলেই তাঁকে খবর দেবে৷
একদিন কার্যোপলক্ষে তাঁকে দেরাদুন চলে আসতে হয়েছিল৷ তার পরদিনই দুজন ফরেস্ট গার্ড এসে হাজির৷
‘সাহেব কোথায়?’
‘কেন? সাহেব কাল দেরাদুন গিয়েছেন৷’
‘শিগগির তাঁকে খবর দিন৷ বাঘ৷’
‘কোথায়?’
‘এই মাইল দুই দূরে, মোষ মেরেছে৷’
ভাইপো বললেন, ‘সাহেব তো তিন-চারদিন পর আসবেন৷ তোমরা গিয়ে মাচা বাঁধো, আমি মারব বাঘ৷’
যথাসময়ে হাতিয়ার নিয়ে তাঁরা বের হলেন৷ রাস্তায়, ওই গার্ডরা শিখিয়ে রাখল যেন বাঘ আসা মাত্রই বন্দুক না ছোঁড়া হয়, তাক করে বসে থাকতে হবে; ওরা বাবুর গা টিপলে তবে যেন ফায়ার করেন৷
ভাইপো বললেন, ‘আচ্ছা৷’
সেখানে পৌঁছেই তো বাবু চটে লাল, ‘অত নীচু কেন মাচা?’
গার্ডরা বলল, ‘বাবু, সাহেবের জন্য আরও ঢের নীচু মাচা বাঁধা হয়৷ আপনি নতুন লোক বলে উঁচু করে বেঁধেছি৷ বেশি উঁচু হলে মারবার সুবিধা হয় না৷’
শিকারিরা মাচায় উঠে বসলেন৷ মাহুতকে হুকুম দিলেন যে উপরি-উপরি দুবার বন্দুকের আওয়াজ করলেই যেন হাতি নিয়ে আসে৷ রাইফেল হাতে ভাইপো মাঝখানে বসলেন, গার্ড দুজন তাঁর দু-পাশে৷ আবার তাঁকে তারা বলে রাখল যেন তাক করে প্রস্তুত হয়ে থাকেন, কিন্তু তারা আঙুল দিয়ে তাঁর গা টিপলে তবে যেন বন্দুক ছোঁড়া হয়৷
সব ঠিক, এবার বাঘ এলেই হয়৷
সন্ধ্যার আগেই, কিছু দূরে একটা শব্দ ‘হিঁয়াও’— যেন একটা কুকুর হাই তুলল৷ গার্ডরা বলল, ‘ওই আসছে৷’ আবার সব নিস্তব্ধ৷ দশ-পনেরো মিনিট পর, অল্প দূরে ‘ক্যাঁও ক্যাঁও’ শব্দ করে একটা ময়ূর উড়ল, গার্ডরা ভাইপোকে ইশারায় সাবধান করে দিল— আসছে৷ কয়েক মিনিট পরেই এসে হাজির— এক প্রকাণ্ড বাঘ, যেন একটা লাল ঘোড়া৷ মহিষটাকে গার্ডরা টেনে পাঁচ-সাত ফুট সরিয়ে রেখেছিল, বাঘটা তা লক্ষ্য করে সোজা মহিষটার কাছে না এসে, একটু দূরে বসে রইল, আর চারদিকে দেখতে লাগল৷ কয়েক মিনিট দেখে, উঠে সটান গিয়ে মোষটার ওপর হামা দিয়ে বসল— পিছনের দু-পা মাটিতে, সামনের দু-পা আর বুক মোষটার উপর৷ আবার চারদিক দেখে নিয়ে, খেতে আরম্ভ করল৷
বাঘটা যখন খাওয়ায় মত্ত, তখন একজন গার্ড আঙুল দিয়ে শিকারির পায়ে চাপ দিল৷ দু-এক মিনিট অপেক্ষা করেও বন্দুকের আওয়াজ হল না দেখে, আবার আঙুলের চাপ দিল, এবারেও কোনো ফল হল না৷ ভাইপো বন্দুক ছুঁড়লেন না৷
ব্যাপার কী? ব্যাপার গুরুতর! ভাইপোর চোখ কপালে উঠেছে, দাঁত-কপাটি লেগেছে, হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে গেছে! ব্যাপার দেখেই গার্ডরা বুঝতে পারল যে তাঁকে দিয়ে এই বাঘ শিকার হবে না৷ আবার ভাবল— এমন সুযোগ চলে যাবে৷ তাদের মধ্যে একজন শিকারে বেশ অভ্যস্ত ছিল, সে ধীরে-ধীরে ভাইপোর হাত থেকে রাইফেলটি তুলে নিতে গেল৷ আর যায় কোথায়? গোঁ-গোঁ-গোঁ করে, ঘুমের মধ্যে বোবায় ধরলে লোকের যেমন অবস্থা হয়, ভাইপো তাকে একেবারে জড়িয়ে ধরলেন৷
গোলমালে বাঘের খাওয়া বন্ধ হল আর উপরের দিকে মুখ তুলেই শিকারিদের দেখতে পেয়ে বিকট গর্জন করে, এক লাফ দিয়ে দশ-বারো ফুট দূরে পড়ল৷
ফরেস্ট গার্ডরা বলল, ‘বাবু, দুবার বন্দুকের আওয়াজ করুন, হাতি আসুক, বাড়ি ফিরে যাই৷ আজ আর বাঘ আসবে না৷’
বাবুর মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না, খালি ওই মুখ চাপা গোঁ-গোঁ শব্দ৷ বন্দুক বা ওদেরও ছাড়ে না, পাছে বন্দুকের আওয়াজ করে৷ বন্দুক ছোঁড়াও হল না, হাতিও এল না৷ সমস্ত রাত ওই মাচায় কাটাতে হল৷
এদিকে বাংলোর সকলেই বড়ো ব্যস্ত হয়ে উঠলেন৷ ব্যাপার কী? ভোর হতে চলেছে, অথচ এখনও বন্দুকের আওয়াজ হল না৷ নানা চিন্তা করে নিজেরাই হাতিতে চড়ে খোঁজ করতে গেলেন৷ হাতি যখন গাছতলায় পৌঁছল, তখনও বাবু মাচা থেকে নামতে চান না, ‘কী জানি, হতভাগা বাঘ হয়তো আবার কোনো ঝোপের মধ্যে বসে রয়েছে৷’
সকলে ধরাধরি করে তাকে মাচা থেকে একেবারে হাতির পিঠে নামিয়ে নিল৷ বাংলোয় পৌঁছে তাঁর যা দুরবস্থা দেখা গেল, তা বলা যায় না৷ দুর্গন্ধে কাছে যাওয়া মুশকিল! বাঘের গর্জনের সঙ্গে-সঙ্গে এই বীভৎস কাণ্ড হয়েছে!
রায়বাহাদুরের কাছে এই গল্প শুনে মনে হয়েছিল লোকটি কী ভীতু! কিন্তু পরে অনেকবার বাঘের বিকট গর্জন শুনে মনে হয়েছে যে, ওরকম হওয়াটা নেহাত আশ্চর্যের বিষয় নয়৷
দেরাদুনে প্রায় এক বছর ছিলাম, তারপর আমার উপর ব্রহ্মদেশে শান স্টেটে যাবার হুকুম হল৷
• ২ • ১৮৯৯-১৯০০ ব্রহ্মদেশ, শান স্টেট৷ দেরাদুন থেকে কলকাতা, তারপর জাহাজে রেঙ্গুন৷ রেঙ্গুন থেকে আবার রেলপথে থাজি জংশন, মিকটিলা রোড৷ তারপর হাঁটা পথে শান স্টেট৷ থাজি থেকে দক্ষিণে শান স্টেটের প্রধান শহর, টাউংজি, দশদিনের পথ— ১১০ মাইল৷ টাউংজি থেকে আমাদের কর্মস্থান আরও বারো-তেরোদিনের পথ; প্রথমবার পদব্রজেই গিয়েছিলাম৷ যে কয়দিন বড়ো রাস্তা ধরে চলেছি, তাঁবু খাটাতেই হয়নি, বারো-চোদ্দো মাইল পর-পর গভর্নমেন্টের আড্ডা আছে৷ সেই আড্ডার বাংলোয় রাত কাটিয়েছি৷ বড়ো রাস্তা ছাড়লে পর তাঁবু আশ্রয় করতে হয়েছে৷ সে সময়ে শান স্টেটে রেল লাইন খোলা হয়নি, টাউংজি পর্যন্ত গোরুর গাড়ি চলত, তারপর খচচর বা বলদ সম্বল৷
আমার কাজের সাহায্যের জন্য আমার সঙ্গী রামশবদ নামে একজন বুড়ো সার্ভেয়ার গিয়েছিলেন— তাঁর দুই চাকরের কথা বলি৷
সার্ভেয়ারটি ব্রাহ্মণ, বাড়ি অযোধ্যায়৷ প্রায় ৩৫-৩৬ বছর সার্ভে ডিপার্টমেন্টে কাজ করেছেন৷ চাকর দুটিও তাঁরই দেশের লোক— সুচিৎ আর বেণী, তারাও ব্রাহ্মণ৷ বেণী বুড়ো, বেঁটে, রোগা আর হিংসায় তার পেটটা ভরা৷ সুচিৎ তার বিপরীত, লম্বা, মোটা, ফরসা আর সাদাসিদে মানুষ৷ তারা দু-জনে মিলে ওই সার্ভেয়ারটির রান্নাবান্না, কাজকর্ম সব করে৷ সার্ভেয়ার তাদের দু-জনকেই খেতে দেয়, বেণীর কিন্তু তা সহ্য হয় না৷ সুচিৎ কেন বাবুর খাবে? আর যদি খাবেই, তবে অত খাবে কেন? সুচিতের শরীরটি যেমন, আহারটিও তেমনি, সে বেণীর ডবল খায়৷ কাজও করে সে বেণীর চেয়ে ঢের বেশি, কিন্তু তা হলে কী হয়? বাবু যে সুচিৎকে খেতে দেন, বেণী তা সইতে পারে না৷ সুচিৎ আবার যতটা খায়, সব সময় তা হজম করতে পারে না, সেজন্য কাজ করতে-করতে অনেক সময় তাকে ঘটি হাতে ছুটতে হয়৷ সেদিন সন্ধ্যাবেলা, বাবুর চায়ের জল করতে বসে তাকে তেমনি ঘটি হাতে ছুটতে হল৷
চারদিকে ঘোর জঙ্গল৷ বাঘের ভয় খুবই আছে, কাজেই সুচিৎ বেশিদূর যায়নি৷ অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে দেখে, খচচরওয়ালারা খচচর সব ভালো করে বেঁধে চারদিকে ধুনি জ্বালাবার জোগাড় করছে৷ এমন সময় তাদের একজন দেখলে ওরে বাবারে! কী বড়ো বাঘ আসছে গুড়ি মেরে৷ এ ঝোপ থেকে ও ঝোপের আড়ালে, সেখান থেকে আর এক ঝোপের পিছনে— এমনি করে সুচিৎকে ঠিক ধরবার চেষ্টা৷
দেখেই তো সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘পালাও, পালাও! বাঘ এসেছে, ধরলে!’
এ কথা শোনামাত্র সুচিৎ যে কী প্রাণপণ ছুটেছিল, তা বুঝতেই পার৷ কোথায় রইল তার লোটা আর কোথায় রইল তার জল, সে দু-লাফে একেবারে তাঁবুর ভিতরে এসে হাজির৷ ভয়ে বেচারার প্রাণ শুকিয়ে গেছে, মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না৷ বাবুর চা সে-রাত্রে উনুনের উপরই রইল, বাঘকেও সুচিৎকে না খেয়ে ফিরে যেতে হল৷ তার অনেকক্ষণ পরে চার-পাঁচজনে মিলে, মশাল জ্বালিয়ে সুচিৎকে নদীতে স্নান করিয়ে আনল৷ সেই পৌষ মাসের শীতে বেচারা কী কষ্টই পেল, তা দেখে কিন্তু বেণীর মুখে হাসি ধরে না৷ তবে বেণীরও যে সকল দিন এমনি হেসে কেটেছিল তা নয়, সে গল্প পরে শুনবে৷
আগেই বলেছি, সুচিৎ যে বাবুর খায়, বেণীর তা সহ্য হয় না৷ ঝগড়াঝাঁটি লেগেই আছে৷ দিন-রাত খুঁটিনাটি নিয়ে এই ঝগড়ার চোটে বেচারা বুড়ো রামশবদের আর সহ্য হয় না, সেজন্য বিরক্ত হয়ে বেণীকে বলেছেন, ‘তোমরা দু-জনেই সরকারের চাকর৷ কাজ কর সরকার বাহাদুরের, খেতে দিই আমি, তাই নিয়ে ওর সঙ্গে ঝগড়া কেন? তোমার তো আর সে খায় না৷’ ইত্যাদি৷
চটে গিয়ে বেণী আর বুড়োর ভাত খায় না, নিজে আলাদা রেঁধে খায়৷ বুড়োর কোনো কাজও সে আর করে না, দিব্যি আরামে বসে থাকে৷ আগে ব্যবস্থা ছিল যে পালা করে তারা দু-জনে বুড়োর সব কাজ করে দেবে, আর আবশ্যকমতো বুড়োর সঙ্গে জঙ্গলে কাজ করতে যাবে৷ সুচিৎই কাজে যেত, বেণী রান্না করত, কখনো জঙ্গলের কাজে যেত না৷ বেণী ঝগড়া করে বসে-বসে দিন কাটায়, জঙ্গলেও যায় না, বুড়োর কাজও করে না৷ সুচিৎকে দুই কাজই করতে হয়৷
আমি দিন দুই দেখে একটু চাপ দিলাম, ‘বেণী, তুমি বাবুর কাজ না কর বেশ, সরকারের মাইনে যখন খাও, সরকারের কাজ তোমাকে করতে হবে৷ বসে থাকতে পাবে না৷ কাল থেকে তুমি বাবুর সঙ্গে কাজে যাবে৷ না গেলে, তোমার মাইনে কাটা যাবে৷ সুচিৎ যখন বাবুর রান্নাবান্না সব করে দেয়, তখন সুচিৎ আর কাজে যাবে না৷’
বেণীর জঙ্গলে গিয়ে অভ্যাস নেই, মহা ফাঁপরে পড়ে গেল৷ কিন্তু উপায় নেই, তাই যেতেই হল৷ কাজে বের হয়েছি, দেখেছি বেণীর পিঠে একটা বোঁচকা বাঁধা৷
ব্যাপার কী? শুনলাম বেণীর যা কিছু পুঁজি আছে, সব ওই বোঁচকার মধ্যে— ৩৬০ টাকা৷ ভীষণ কৃপণ, কাকেও বিশ্বাস করে না৷ সেজন্য এই টাকা, দেশে তার আত্মীয়স্বজনদের কাছে রেখে আসে না, সর্বদাই সঙ্গে নিয়ে-নিয়ে ফেরে, তাঁবুতেও রেখে যাবে না, যদি কেউ চুরি করে৷ তিন-চারদিন বোঁচকা বেঁধেই কাজে গেল, তারপর একদিন বসে একটা লম্বা থলে সেলাই করে, তাতে টাকা ভরে কোমরে বাঁধল, আর তার উপর একটা কম্বল জড়িয়ে প্রকাণ্ড ভুঁড়ি বানাল৷ কিন্তু অমন করে আর কদিন চলবে? একে তো জঙ্গলের কাজে অনভ্যস্ত, তার উপর আগের মতো চর্ব্যচোষ্যও জোটে না, একবেলা দুটি শুকনো ভাত মাত্র খায়৷ কৃপণ, পয়সা খরচ করে দু-বেলা খাবে না৷ একটু জব্দ হয়ে পড়ল৷
সেদিন আমরা সালউইন নদী পার হয়েছি আর নদীর কিনারায় তাঁবু খাটিয়েছি৷ শানেরা নদীতে মাছ ধরছিল, বেচতে এল৷ বুড়ো অযোধ্যার ব্রাহ্মণ হলেও মাছ-মাংসের ভক্ত৷ আমি মাছ খাই না, বুড়োকে দেখিয়ে দিলাম৷ বুড়ো বলল, ‘নেব না৷’
‘কেন?’
‘সুচিৎ ভালো রাঁধতে পারে না, মিছিমিছি নষ্ট করব কেন?’
আমি বললাম, ‘মাছ রাখ, আমার লোক সুচিৎকে মাছ রান্না দেখিয়ে দেবে৷’
বুড়ো একটু ইতস্তত করে একটা মাছ কিনল৷
আমি একটু ঘুমিয়ে উঠেছি, স্নান করব৷ মাছ রান্নার গন্ধ পেয়ে দেখতে গেলাম আমার লোক সুচিৎকে দেখিয়ে দিচ্ছে কি না৷ গিয়ে দেখি বেণী রান্না করছে৷
‘কী বেণী, কী হল?’
‘আরে হুজুর, বাবু না হয় রাগ করে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন, কিন্তু আমি তো কদিন থেকে দেখছি যে বাবুর খাওয়া হয় না৷ ওটা তো রাঁধতে জানে না, তাই মাছটা রেঁধে দিচ্ছি৷’
বুড়ো আমাদের কথা শুনে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসেছিল, আর একটু-একটু হাসছিল৷
সন্ধ্যার সময় দেখি বুড়ো আর সুচিতের সঙ্গে বেণী ভাত ও মাছ খাচ্ছে৷ মাছের লোভটা হতভাগা ছাড়তে পারলে না!
সালউইন নদীর পারে একটা পাহাড়ের কাজ শেষ করে, অপর পারে অন্য পাহাড়ে যাব৷ সোজাসুজি রাস্তা থাকলে ওই পাহাড়ের উপরের গ্রামটি মাইল সাতেক মাত্র দূর, কিন্তু সোজা যাবার উপায় নেই৷ মাঝখানে সালউইন নদী, তার দু-পাশের পাহাড়গুলো একেবারে দেয়ালের মতো খাড়া, পার হবার সাধ্য নেই৷ কাজেই বাধ্য হয়ে চারদিনের পথ ঘুরে যেতে হল৷ দ্বিতীয় দিন সালউইন নদী পার হয়েছিলাম আর সেদিনই মাছের লোভে বেণীর রাগ উড়ে গিয়েছিল৷
ওই পাহাড়ের উপর মুসোদের গ্রাম৷ সেই দেশে শান ছাড়া মুসো, পালাউং, কুই প্রভৃতি অনেক জাতির লোক বাস করে৷ পাহাড়ের মাথায় মুসোদের গ্রাম৷ তারা অন্য জায়গায় বড়ো একটা যাতায়াত করে না, কাজেই তাদের পথঘাটের বিশেষ দরকার হয় না, নালায়-নালায়ই কাজ চালিয়ে নেয়৷ জিনিসপত্র যা প্রয়োজন, প্রায় সবই তাদের আছে৷ খেতের ধান, খেতের লঙ্কা, কুমড়োও খেতের, রাইও খেতের৷ এই রাইপাতা তাদের উত্তম তরকারি৷ শিকার করে আর সেই মাংস খায়— হাতি, ঘোড়া, বাঘ, ভাল্লুক থেকে আরম্ভ করে কাঠবিড়ালিটি অবধি বাদ দেয় না৷ কাজেই তাদের কোনো জিনিসেরই অভাব হয় না— খালি নুন ছাড়া৷ নুনের জন্যই মাঝে-মাঝে নীচে শানদের গ্রামে আসে, তাই নালার ভিতর দিয়ে একটু-একটু রাস্তা আছে৷
তুলোও তাদের নিজের খেতের, সেই তুলোর সুতো কেটে সে দেশের মেয়েরা কাপড় বোনে৷
হাতিয়ার— তীর, ধনুক, দা, কুড়ুল আর বর্শা— কদাচিৎ মান্ধাতার আমলের এক-আধটা বন্দুকও দেখা যায়৷ তীর-ধনুক তারা নিজেরাই তৈরি করে, দা, কুড়ুল ইত্যাদি শানদের গ্রাম থেকে কিনে আনে৷
এরা খুব শিকারি৷ জঙ্গলে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়, নানা রকম জানোয়ার শিকার করে, নানা রকম পাখি এনে পোষে৷ ভয় তাদের একেবারেই নেই৷ দু-তিনজন মিলে চার-পাঁচদিন ধরে ওই ভয়ংকর বনে শিকার খুঁজে বেড়ায়, একটুও ভয় পায় না৷
এদের গ্রামগুলি দূর থেকে বড়ো সুন্দর দেখায়৷ পাহাড়ের মাথায় উঁচু-উঁচু মাচার উপর সারি-সারি বাঁশের ঘর, দূর থেকে দেখতে বেশ৷ কিন্তু কাছে গেলে বমি আসে এমনি নোংরা৷ এই যাত্রায় এদের গ্রামে দু-তিন দিন ছিলাম৷ গ্রামের প্রধান একটা বড়ো সুন্দর পাখি পুষত৷ সাদা ধবধবে, মোরগের মতো লেজ, সাদার উপর কালো-কালো কারিকুরি, যেন তুলি দিয়ে আঁকা, ডানায়ও ঠিক তেমনি কারিকুরি৷ লেজের দুটি পালক খুব লম্বা, গলাটি ঘোর নীল আর চকচকে, মাথায় ঘোর নীল রঙের ঝুঁটি৷ আমার বড়ো লোভ হল, তাই প্রধানকে ডেকে আড়াই টাকায় সেটি কিনলাম, ভাবলাম কলকাতায় নিয়ে আসব৷ পাখিটা সারাদিন বনে-বনে ঘুরে বেড়ায়, রাত্রে ঘরে আসে৷ সকালে আমরা চলে আসব, প্রধান সকালে উঠে পাখিটাকে ধরে এনে দিল, একটা খাঁচায় পুরে তাকে নিয়ে এলাম৷ নিয়ে এলাম বটে, কিন্তু দু-দিন বাদেই বেচারা মরে গেল৷ হয়তো খাঁচায় বন্ধ রাখাতে তার মন ভেঙে গিয়ে থাকবে, অথবা পুরোনো মনিবের জন্য তার গভীর দুঃখ হয়েছিল, যে দু-দিন আমাদের কাছে ছিল, এক ফোঁটা জল স্পর্শ করেনি৷
শান স্টেটে একটা তামাশা দেখেছিলাম আর একটু আশ্চর্যও হয়েছিলাম৷ আমাদের সঙ্গে যে সমস্ত শান কুলিরা জঙ্গলে কাজ করতে যেত, তাদের প্রায়ই দু-তিনদিন জঙ্গলেই থাকতে হত, কিন্তু তারা অনেক সময়েই রাঁধবার জন্য কোনো হাঁড়ি বা কড়া, বা অন্য বাসন-কোসন নিয়ে যেত না, অথচ ভাত খেত৷ কী করে রান্না করে? একটা লম্বা কাঁচা বাঁশের চোঙার একটি বাদে সমস্ত গাঁটগুলিকে ফুটো করে, সেটাকে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিয়ে, তাতে আবশ্যক মতো চাল পুরে, জল ভরে, ঘাস-পাতা দিয়ে মুখটা বন্ধ করে একটা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে দেয়৷ তিন-চার ঘণ্টা অমনি থাকে, তারপর ওই চোঙাটা ধুনির আগুনে ঝলসায়৷ চারদিকে বেশ ঝলসানো হলে চোঙাটা জায়গায়- জায়গায় পুড়ে যায়— সেটাকে ধুনি থেকে বার করে রেখে দেয়৷ ঠান্ডা হলে পর দা দিয়ে আস্তে-আস্তে বাঁশটাকে চিরে ফেলে আর তার ভিতর থেকে দিব্যি একটি ভাতের পাশ বালিশ বার হয়ে আসে৷ সেটা চাকা-চাকা করে কেটে সকলে ভাগ করে নেয়, আর নুন, লঙ্কা, শুকনো মাছ বা মাংস উপকরণ দিয়ে খায়৷ গরমের দিনে কখনো বা ঝিঁঝি পোকা ধরে, আগুনে পুড়িয়ে তার চাটনি করে খায়৷ ঝিঁঝি পোকা নাকি অতি উপাদেয়!
ওই বছর একটা বড়ো দুর্ঘটনা হয়েছিল আমার কাজ শেষ হবার ক-দিন আগেই৷ আমাদের উপরওয়ালা মিস্টার এস- লিখলেন: তোমার কাজ তো শেষ হল বলে, শেষ হলেই তোমার পাশে সাদিক হুসেন কাজ করছে, তাকে সাহায্য করে, তার কাজ শেষ করে দাও৷ সে বড্ড পিছিয়ে পড়েছে৷
আমার কাজ শেষ হতে আরও তিন-চারদিন লাগবে, আমি তখন থেকেই পাশে সাদিক হুসেনের কাজ করব বলে গ্রাম, রাস্তাঘাট ইত্যাদি সংবাদ সংগ্রহ করতে লাগলাম৷ প্রথমেই যে সংবাদ পেলাম তাতেই তো চক্ষুস্থির! ওই পাহাড়ে সার্ভেওয়ালারা নাকি একজন লোক মেরে ফেলেছে৷
দোভাষীকে ডেকে বললাম, ‘এই গুজব আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, কাল হাট আছে, তুমি হাটে খবর নাও৷’
ভোরে উঠে দোভাষী আর দু-জন খালাসিকে হাটে পাঠিয়ে দিলাম৷ আমার তাঁবু থেকে দু-তিন মাইল দূরে, অন্য গ্রামে হাট ছিল৷ বিকেলে দোভাষী এসে খবর দিল যে ওই গুজব মিথ্যা৷ কিন্তু ওই যে পাহাড় দেখা যাচ্ছে (আট-দশ মাইল দূরে একটা পাহাড় দেখিয়ে), ওই পাহাড়ে হুসেনবাবুর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে অমুক গ্রামের প্রধান গাছ চাপা পড়ে মারা গিয়েছে৷ দোভাষী বিস্তারিত কোনো খবর আনতে পারেনি৷ তবে এইটুকু বলল, ‘ওই পাহাড়ে কোনো লোক যেতে চায় না, বলে ওখানে নিশ্চয় ভূত আছে৷’
তিন-চারদিন পরে যখন আমার কাজ শেষ হল, আমি আর বুড়ো সার্ভেয়ার রামশবদবাবু ওই পাহাড়ের নীচে গ্রমে তাঁবু ফেললাম৷ এই গ্রামের প্রধানই মারা পড়েছিল৷ গ্রামের লোক পাঠিয়ে তাদের বড়ো প্রধানকে খবর দিলাম যেন এসে আমার সঙ্গে দেখা করে৷
বর্মিরা গ্রামের প্রধানকে ফুঙ্গি বলে আর শানেরা বলে ‘পুকং’৷ দশ-বারোটা গ্রামের উপর একজন বড়ো সর্দার থাকে, তাকে বর্মিরা বলে ‘মিও থুজি’ আর শান স্টেটে বলে ‘হেং’৷
রাত আটটা-সাড়ে-আটটার সময় হেং এসে হাজির, তার সঙ্গে এসেছিল আরও তিন-চারটা গ্রামের প্রধান, আর একটি বারো-তেরো বছরের ছেলে, একটি ছয়-সাত বছরের মেয়ে ও একটি ত্রিশ-বত্রিশ বছরের স্ত্রীলোক— এরা ওই মৃত প্রধানের পুত্র, কন্যা ও স্ত্রী৷ গ্রামের লোকও কুড়ি-বাইশজন এসেছিল৷ তাদের কাছ থেকে সব খবর পেলাম৷
সার্ভেয়ারদের চার-পাঁচজন খালাসি আর গ্রামের দশ-বারোজন শান কুলি পাহাড়ের উপর জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করতে গিয়েছিল— দূরবিনের কাজ হবে৷ লোকজনদের হুকুম দিয়ে কাজ করাবে বলে প্রধান সঙ্গে গিয়েছিল৷ কোথায় কী কাটতে হবে, কোনদিক থেকে আরম্ভ করতে হবে, ইত্যাদি, সব তার লোকদের দেখিয়ে দিয়ে প্রধান পাহাড়ের মাথায় আট-দশ ফুট উঁচু একটা প্রকাণ্ড পাথরের উপর চড়ে বসল আর সকলকে হুকুম করতে লাগল এটা কাট, ওটা কাট ইত্যাদি৷ শান কুলিরা এ সব কাজে সিদ্ধহস্ত, তারা কায়দা মাফিক কেটে যাচ্ছে৷ এমন কায়দায় কাটছে যে প্রত্যেকটি গাছ কাটা হলে নীচের দিকে ঝুঁকে পড়ছে৷
খালাসি কয়জন হাজারিবাগের লোক, তাদের এ সব খেয়াল নেই, এ কায়দাও জানা নেই৷ তারা একটা গাছ উল্টো কেটেছে— মটমট করে গাছটা নীচের দিকে না ঝুঁকে উপরের দিকে ঝুঁকেছে, এই পড়ে আর কি! ‘ভাগো, ভাগো দরখত গিরতা হ্যায়!’ যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল৷ গাছটাকে তার দিকে ঝুঁকতে দেখে প্রধান ও-পাথরটার উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে সামনের নালার মধ্যে আশ্রয় নিল৷ নালার দুই কিনারা খুব উঁচু, তার ভিতর গাছের ধাক্কা লাগবে না৷ দুর্ভাগ্য তার, গাছটা পড়ল ওই প্রকাণ্ড পাথরটার উপর৷ পাথরটা মাটিতে আলগোছে বসানো ছিল, অত বড়ো গাছের ধাক্কায় একেবারে সমূলে উপড়ে গিয়ে ওই নালার ভিতর গড়িয়ে পড়ে গেল৷ ‘হায়, হায়, হায়!’ চিৎকার করে সকলে ছুটে এসে দেখল মাত্র আধখানা শরীর পড়ে আছে, বাকি অর্ধেকটা একেবারে চুরমার হয়ে যেন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে৷
গ্রামে সংবাদ দিতে, গ্রামের লোকেরা ওই আধখানা দেহ সেই পাহাড়ের উপরেই কবর দিল, আর দেবতাকে সন্তুষ্ট করবার জন্য সেখানে পুজো দিয়ে এল৷
ওরা আর ও-পাহাড়ে যায় না, ওখানে ভূত আছে৷ দু-তিনজন, যারা সে সময় ওখানে উপস্থিত ছিল, তারা সকলে ওই একই কথা বলল৷ আমি হেঁকে বলে বন্দোবস্ত করলাম যে সকালে দুজন পথ দেখিয়ে আমাকে পাহাড়ে নিয়ে যাবে, কিন্তু কোনো গাছ তারা কাটবে না৷ তাহলে আর রক্ষা নেই, নাট (ভূত) আবার কাকে শেষ করবে!
ওই ছেলেটিকে সঙ্গে করে তার মামা আর প্রধানের নিজের একজন লোক আমাদের সঙ্গে আমাদের হেডকোয়ার্টারে এসেছিল— প্রায় দশদিনের পথ৷ আমরা সকলে মিলে চাঁদা তুলে প্রায় ২৫০ টাকা তাকে দিয়েছিলাম৷
• ৩ • ১৯০০-১৯০১৷ আগের বছর যেসব জায়গায় কাজ করেছিলাম তার ঠিক দক্ষিণেই এবারও কাজ করতে গিয়েছিলাম৷ সেই দীর্ঘ পথ, কুড়ি-একুশ দিনের রাস্তা পার হয়ে পৌঁছলাম৷ এবার সেয়ানা হয়েছি, দশদিনের পথ হেঁটে এসে ঘোড়া কিনে নিয়েছিলাম৷
৩৫০-৪০০ বর্গমাইলের মধ্যে আর লোকজনের বসতি নেই, খালি পাহাড় আর জঙ্গল৷ পথঘাট নেই, আছে খালি বুনো মহিষ, বাঘ, ভাল্লুক— এইসব৷ বুনো মহিষের পথ ধরে আমরা পাহাড় ওঠা-নামা করি৷ খচচর চলে না তাই দূর গ্রাম থেকে কুলি সঙ্গে এনেছি, জঙ্গল কাটবে আবার মোটও বইবে৷ সারাদিন এক হাঁটু জলে, নালায়-নালায় চলে, ক্লান্ত হয়ে, বেলা চারটের সময় দুটি নালার দোমোহনায় অর্থাৎ সঙ্গমস্থলে এসে আড্ডা করলাম৷ আমি আর সেই বুড়ো সার্ভেয়ার, সঙ্গে সাত-আটজন হাজারিবাগের লোক আর চার-পাঁচটি শান৷ সেই গ্রামের প্রধানের ছেলে বন্দুক নিয়ে সঙ্গে এসেছে৷ জঙ্গল কেটে, তাঁবু খাটাতেই প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এল৷
সকলে নানা কাজে ব্যস্ত, আমি আর বুড়ো রামশবদবাবু সবে প্রধানের ছেলেকে জিগগেস করেছি যে সেই বনে কী-কী শিকার পাওয়া যায়, এমন সময়ে নালার ওপারে পাহাড়ের উপরে একটা কী রকম কোঁকানো গোছের আওয়াজ হল, যেন কেউ খুব ব্যথা পেয়ে কোঁকাচ্ছে৷ শুনেই তো আমরা লাফিয়ে উঠেছি, আর প্রধানের ছেলে, ‘বাঘে হরিণ ধরেছে’ বলে বন্দুক হাতে সেইদিকে ছুটল৷
তার পিছন-পিছন আমি আর বুড়ো সার্ভেয়ার, আর তিন-চারজন লোকও দৌড়ে চললাম৷ একজনের হাতে একটা তলোয়ার ছিল, আমি সেটা হাতে তুলে নিয়ে, হাত বাড়িয়ে তলোয়ারটা ঘুরিয়ে, সকলকে সাবধান করে দিলাম, ‘তোমরা এর ভিতর এস না— যদি লোক খায়৷’
প্রধানের ছেলে আমাদের আর এগোতে মানা করেছিল, কাজেই আমরা নালার কিনারায় বসে রইলাম৷ এমন সময়ে সে ভারি ব্যস্ত হয়ে বন থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের ডাকতে লাগল— এত ব্যস্ত যে তার মাথার পাগড়ি কোথায় যে ফেলে এসেছে সে হুঁশ ছিল না৷ অমনি আমরা চার-পাঁচজনে সেইদিকে ছুটে চললাম, আর তিন-চারজন অন্য দিক দিয়ে ঘুরে চলল৷ রামশবদবাবু সেখানেই বসে রইল, বুড়োমানুষ— আটান্ন বছর বয়স, সন্ধ্যার সময় আর কোথায় যাবে?
আমরা ছুটে পাহাড়ে চড়তে লাগলাম৷ সকলের আগে প্রধানের ছেলে, তার পিছনে আমি, আর আমার পিছনে তিন-চারজন লোক৷ খানিক উঠলাম, তারপর একটা নালা, তার ওপারে যাবার উপায় নেই একেবারে দেয়ালের মতো খাড়া৷ আমি প্রধানের ছেলের কোমর ধরে যেমনি তাকে ঠেলে উপরে তুলে দিতে গিয়েছি, অমনি ঠিক আমাদের মাথার উপরে একটা বাঁশঝাড়ের পিছন থেকে গুড়-গুড় করে একটা আওয়াজ হল৷ আমরা তো তাড়াতাড়ি পিছন হটে এলাম, কিন্তু সঙ্গের লোক কয়টি ছুটে পালাতে গিয়ে জড়াজড়ি করে নালার ভিতরে পড়ে গেল৷
জানোয়ারের দস্তুর এই যে তাকে দেখে যে পালাবে, সে তাকেই ধরবে৷ কাজেই তখন কী আর করি? তলোয়ার বাগিয়ে তাদের বললাম, ‘যদি পালাবি, তো কেটেই ফেলব৷’ বেচারারা সেখানেই দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল৷ দাঁড়িয়েছে তলোয়ারের ভয়ে, আর কাঁপছে বাঘের ভয়ে৷
এমন সময়ে, অন্য দিক দিয়ে যে তিন-চারজন লোক গিয়েছিল, তারা ‘‘পাকড়া! পাকড়া!’’ বলে চিৎকার করে উঠল৷ শুনে আমার যা ভয় হল, ভাবলাম বুঝি বা কাউকে বাঘে ধরেছে৷ আমরা প্রাণপণে সেইদিকে ছুটলাম৷ গিয়ে দেখি, বাঘে তাদের পাকড়ায়নি, তারা পাকড়িয়েছে হরিণ! পাকড়িয়েই বেচারার গলায় গোটা তলোয়ারের দুই-তিন কোপ মেরেছে, আবার তার উপর চড়ে বসেছে৷ প্রকাণ্ড হরিণ, সেটা তখনও মরেনি৷
আমি জিগগেস করলাম, ‘বাঘ কোথায়?’
তারা উত্তর দিল, ‘বাঘ আবার কীসের? চারটে বুনো কুকুর ছিল, আমাদের দেখেই পালিয়েছে৷’
এই কুকুরগুলোই আমাদের দেখে গুড়-গুড় করেছিল৷ বুনো কুকুর বড়ো নিষ্ঠুর জানোয়ার৷ সকলের আগে ওই জীবন্ত হরিণটার চোখ দুটি কামড়ে নিয়েছিল৷ বেচারা অন্ধ হয়ে আর গুঁতোতেও পারেনি, পালাতেও পারেনি, কাজেই তারা সুবিধা পেয়ে তার পিছন থেকে মাংস ছিঁড়ে খেতে আরম্ভ করেছিল৷ এমনি করে প্রায় দু-তিন সের মাংস খেয়ে ফেলেছিল৷
যারা ভয় পেয়ে পালাতে গিয়ে জড়াজড়ি করে নালায় পড়ে গিয়েছিল, এর পর সকলে মিলে তাদের কী রকম জ্বালাতন করত, সেটা আর কী বলব৷ এর অর্থ এ নয় যে অপর সকলেই খুব সাহসী পুরুষ৷ তারা সেখানে উপস্থিত থাকলে হয়তো তারা সকলেই ছুটে পালাত৷ এই কথার প্রমাণ আরও অনেকবার পেয়েছি৷
এই জঙ্গলেই অন্য এক পাহাড়ে বুড়ো সার্ভেয়ারের তাঁবু পড়েছে৷ বেণী এখন বাবুর রান্না করে, তাকে তাঁবুতে রেখে, সুচিৎ আর অন্য লোকজন সঙ্গে নিয়ে বুড়ো কাজে গিয়েছে৷ সমস্তদিন খেটে-খুটে, সন্ধ্যার সময় তাঁবুতে ফিরে আসছে, আর মনে-মনে জল্পনা করছে— তাঁবুতে এসেই ভাত তৈরি পাবে, আর হাত-পা ধুয়ে খেয়েই দিব্যি ঘুম দেবে!
তাঁবুতে পৌঁছেই দেখে বেণী তাঁবুতে নেই, রান্না করবে কে? এদিক-ওদিক চারদিক খুঁজে, তাদের বড়ো ভাবনা হল— বুঝি বেণীকে বাঘে নিয়ে গেছে! সঙ্গের শান কুলিরা কিন্তু সকল দিক ভালো করে দেখে বলল যে বাঘ ওখানে আসেনি, বাঘের কোনো চিহ্নই নেই৷
তখন সকলে চিৎকার করে বেণীকে ডাকতে লাগল৷ অনেক ডাকাডাকির পর, খানিক দূর থেকে ভাঙা গলায় উত্তর এল, ‘আমি এখানে৷’ সকলে আলো হাতে সেইদিকে ছুটল৷ সেদিকেও তাকে দেখতে না পেয়ে, আবার ডাকতে আরম্ভ করল৷ তখন গাছের উপর থেকে বেণী বলল, ‘আমি গাছে, নামতে পারছি না৷’
তার কথা শুনে শানরা তাড়াতাড়ি গাছে চড়ে দেখে বেণী তার পাগড়ি খুলে নিজেকে সেই পাগড়ি দিয়ে, গাছের ডালের সঙ্গে বেশ করে বেঁধে বসে রয়েছে৷ বাঁধন খুলে তাকে সেই গাছ থেকে নামিয়ে আনা হল৷ বেচারা অনেক কষ্টে গাছে উঠেছিল৷ গায়ের অনেক জায়গা ছিঁড়ে গিয়েছে, কাঁটার খোঁচা, আঁচড়ও নিতান্ত কম পায়নি৷ সকলে জিগগেস করল, ‘তোর এ দশা কী করে হল রে?’
বড়ো-বড়ো চোখ করে বেণী বলল, ‘বা-আ-ঘ এসেছিল৷ নালার ধারে এসে এমন গড়গড়িয়ে উঠল যে আমি ছুটে চলে এলাম, তাতেই গা ছড়ে গেছে আর কাঁটার খোঁচা লেগেছে৷ বাঘটা আবার ডাকতে-ডাকতে উপরে উঠে আসতে লাগল, কাজেই আমিও গাছে উঠে গেলাম৷ কী করে যে উঠলাম জানি না, আর কখখনো গাছে উঠিনি৷ উঠেই পাগড়ি খুলে ডালের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে বেঁধে নিয়েছিলাম, তারপর শীতে হাত-পা অবশ হয়ে গেছে, নামতে গিয়ে আর নামতে পারি না৷’
শানরা কিন্তু বলল, ‘বাঘ এসেছিল আর তার পায়ের দাগ নেই কোথাও, তা কি হতে পারে?’
বেণী ভারি চটে উঠল, ‘বেটাদের চোখ নেই তাই বলছে বাঘ আসেনি৷ রাত্রে এসে যখন ধরবে, তখন বুঝতে পারবে৷’
বলতে-বলতেই নিচে নালার ধারে গমগম করে একটা শব্দ হল৷ আর বেণীও অমনি লাফিয়ে উঠে বলল, ‘ওই শোনো, বাঘ এসেছে কি না৷’
শুনে তো সকলে হেসে গড়াগড়ি, সেটা ছিল একটা হরিণ, বার্কিং ডিয়ার৷
আমাকে যখন বুড়ো সকল কথা বলল, আমি বেণীকে ডেকে জিগগেস করলাম, ‘বেণী, তুমি পশ্চিমের লোক হয়ে, একটা হরিণের ডাক শুনে অমন করলে?’
বেণী বলল, ‘হুজুর, দিনের বেলা ওটা বাঘই ছিল৷ রাত্রে আমার ভুল হয়েছিল৷ তখন মেজাজটা ঠিক ছিল না, তাই বুঝতে পারিনি৷’
সে যেমনই হোক, বেণীকে বাঘের কথা নিয়ে সকলে মিলে কী রকম খেপিয়েছিল, তা বোধহয় আমি বুঝিয়ে না দিলেও চলবে৷
আমার সঙ্গে শিবদয়াল নামে একজন খালাসি ছিল, সে নতুন লোক আর ছেলেমানুষ৷ এবার আমার কাজে অনেক উঁচু-উঁচু পাহাড় ছিল, বিশেষত একটা পাহাড়— চারদিক থেকে দেখা যায়, সকল পাহাড়ের উপর মাথা তুলে রয়েছে৷ সকলেই দেখে আর জিগগেস করে, ‘হুজুর, উয়ো কালা পাহাড় দেখ পড়তা হ্যায়, উয়ো ভি হমলোগকা কাম মে হ্যায়?’
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়৷ ওটাও আমাদের কাজের মধ্যে৷’
‘বাপ, কৈশা চড়েঙ্গে উসপর?’ ইত্যাদি টীকা-টিপ্পনী চলেছে কতদিন ধরে৷
তারপর সত্যি-সত্যিই ওই ‘কালা’ পাহাড় চড়বার দিন এল৷ খালাসি কুলি ইত্যাদি নিয়ে ভোরে কাজে বের হলাম, জঙ্গল কাটতে হবে৷ সঙ্গে দেখি শিবদয়াল নেই৷ ‘আরে শিবদয়াল কোথা?’
তাকে তাঁবুতে রেখে গেলাম৷ সন্ধ্যার সময় যখন তাঁবুতে ফিরে এলাম, তখন আমার চাকর শশী বলল, ‘শিবদয়ালের না পেটে ব্যথা? আপনারা চলে যাবার পরই তো ও দিব্যি রান্না করে খেয়েছে৷ গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছে৷’
‘ডাক বেটাকে৷’ সে এলে তাকে জিগগেস করলাম, ‘কীরে, একি শুনছি?’
‘হুজুর, তোমরা চলে যাবার পর পেট ব্যথা কমে গেল, তখন দুটি চাল সিদ্ধ করে খেয়েছি৷’
বেটা বাঁদর!
কিছু জঙ্গল কাটা বাকি ছিল৷ পরের দিন সকালবেলা কুলিদের সঙ্গে শিবদয়ালকেও পাঠালাম এক রকম জোর করে৷ রাত্রে নাকি তার পেটের ব্যথা আবার বেড়েছিল৷
বিকেলে যখন তাঁবুতে ফিরল, ডেকে জিগগেস করলাম, ‘পেট ব্যথা কেমন?’
‘আরাম হো গয়া হুজুর৷’
অন্য খালাসিরা বলল, ‘হুজুর ওর পেট ব্যথা তো হয়নি৷ পাহাড় দেখে ভয় পেয়ে চড়াই বাঁচাবার জন্য পেট ব্যথার ভান করেছিল৷ আজ চড়তে-চড়তে বলছিল যে আমার খেয়াল ছিল চড়তে-চড়তে পায়ের হাড় ব্যথা হয়ে যাবে, এ তো দেখছি বেশ রাস্তা রয়েছে৷’
বোকা লোক, তার খেয়াল নেই যে অর্ধেকের বেশি রাস্তা আগের দিন ওই গ্রামে আসবার সময় চড়া হয়েছে৷ যে গ্রামে আমরা তাঁবু ফেলেছিলাম, সেটা পাহাড়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চড়াইয়ের উপরে৷ এর পর পাহাড় দেখে আর তার পেটে ব্যথা হয়নি৷
এ বছরের মতো, আমাদের জরিপের কাজ শেষ হয়েছে, সকলে মিলে দেশে ফিরতে আরম্ভ করেছি, সকলেরই ভারি ফুর্তি৷
পথের দুই পাশে ঘোর বন, তারই ভিতর দিয়ে ছোটো নদী এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে, সেই নদীর ধারে-ধারে রাস্তা৷ কখনো বা এপার, কখনো বা ওপার, এমনি করে আমরা চলেছি৷ একটা মোড় ফিরেই তো আমাদের চক্ষুস্থির— হাত ত্রিশেক সামনেই, একেবারে রাস্তার কিনারায়, প্রকাণ্ড দাঁতওয়ালা এক হাতি দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ বুনো হাতি নয়, তার সামনের দু-পায়ে শিকল জড়ানো৷ তবু তার চেহারাটা কেমন-কেমন বোধ হচ্ছিল, হাতিটার সঙ্গে লোকজন নেই৷ বেটা আমাকে আর বুড়ো সার্ভেয়ারকে দেখেই, আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে, দাঁত উঁচিয়ে দাঁড়াল৷
আমাদের সঙ্গে অনেকগুলি লোক, ঘাড়ে বোঝা নিয়ে আমাদের পিছন-পিছন আসছিল৷ তাদের মধ্যে সামনের লোকটি, মোড় ঘুরেই হাতি দেখে ‘আরে বাপরে!’ বলে পিছন ফিরে দে দৌড়৷ আর অমনি বোঝা সুদ্ধ তার পিছনের লোকটির সঙ্গে টক্কর খেল৷ আর টক্করের চোটে বোঝা সুদ্ধ দুজনেই রাস্তার মাঝখানে গড়াগড়ি দিল৷ ততক্ষণে আরও কয়েকজন এসে, মোড় ঘুরে, সামলাতে না পেরে তাদের ঘাড়ে পড়ল৷
একটুক্ষণ বাদে হাতিটা আস্তে-আস্তে নদীর ওপারে গিয়ে একটা বাঁশঝাড়ের পিছনে, আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷ তা দেখে আমরাও নালার কিনারায় এলাম, কিন্তু নালা পার হতে আর কারও ভরসা হয় না৷ অনেক বলা-কওয়ার পর এক-একজন করে, কাঁপতে-কাঁপতে, আস্তে-আস্তে হাতিটার সামনাসামনি অবধি যায় আর কোনো প্রকারে হাতিটাকে পার হয়েই প্রাণপণে ছুট দেয়৷ তা দেখে বুড়ো সার্ভেয়ার চটে গিয়ে তাদের বড়োই গালি দেয়, কিন্তু তারপর যখন নিজের পালা এল,তখন অন্য সকলের মতো সেও হাতির সামনাসামনি এসেই চোখ-মুখ বুজে বোঁ করে দৌড় দিল৷ শেষে তাঁবুতে এসে যা হাসির ধুম!
মং কাংজি নামে একজন দোভাষী আমাদের সঙ্গে ছিল, সেই বেচারার উপরেই যত হাসির চোট পড়ল৷ বেচারার অপরাধের মধ্যে সে শান, তার দেশেরই হাতি, তবু সে কেন ভয় পাবে?
মং কাংজির একটু ভয় পাওয়ার অভ্যাস যে ছিল না, সেটা কিন্তু আমি বলতে পারি না৷ আরেকদিনও সে এমনি করে একটা হরিণের ভয়ে ছাতা-টাতা ফেলে চম্পট দিয়েছিল৷
এই হরিণটাকে তিন-চারটে বুনো কুকুরে তাড়িয়ে এনেছিল৷ প্রকাণ্ড সম্বর হরিণ, এই বড়ো তার ডালপালাওয়ালা শিং, যেন মাথায় বাঁশঝাড় গজিয়েছে৷ বেচারা ছুটে-ছুটে এমনি ক্লান্ত হয়েছিল যে আর ছুটতে পারছিল না৷ আমাদের দু-জন লোক তাকে তাড়া করল, সে পাহাড়ের নীচের দিকে, রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁপাতে-হাঁপাতে পালাতে লাগল৷ ঠিক সেই পথে, ছাতা মাথায় মং কাংজি আসছিল৷ তারপর যে কী হল, তা আগেই বলেছি৷ সে ভালো করে চেয়েও দেখল না যে কী জানোয়ার আসছে— বাঘ, ভাল্লুক, না হরিণ৷ কাঁইমাই করে চিৎকার করতে-করতে এমন বিকট ভঙ্গিতে দৌড় দিল যে সকলে তা দেখে হেসেই আকুল৷ তখন মং কাংজির লজ্জা হল, সে জানত না যে সে একটা হরিণের ভয়ে এমন করে পালিয়েছিল৷
হরিণটা চলে যাবার একটু পরেই বুনো কুকুরগুলো এসে উপস্থিত হল৷ তারা মাটি শুঁকতে-শুঁকতে আসছিল, আর এমনই আশ্চর্য যে, যে-পথ দিয়ে হরিণটা গিয়েছিল, ঠিক সেই পথ ধরে তারাও চলছিল৷ হঠাৎ আমাদের গন্ধ বা আওয়াজ পেয়ে কুকুরগুলো থমকে দাঁড়াল৷ তারপর মাথা তুলে একটিবার আমাদের দেখতে পেয়ে, আর কি তারা সেখানে থাকে?
আরেকজন সাহসী লোক ছিল— আমির আহম্মদ৷ দেড়শো-দুশো লোক দল বেঁধে বনের পথে চলেছে, আমির আহম্মদ সকলের আগে— তার সাহস কিনা সকলের চেয়ে বেশি৷ জঙ্গলের পথ, জানোয়ারের ভয় সর্বত্রই আছে৷ আমির আহম্মদের চোখ খালি চারদিকে ঘুরছে— কোন পথ দিয়ে বাঘ এসে না তাকে সেলাম করে ফেলে৷ এমন সময় বনের ভিতর একটা কী যেন সড় সড় করে উঠল, লাল মতো একটা কী যেন দেখতে পাওয়া গেল! অমনি আর যায় কোথায়? আমির আহম্মদ প্রাণপণ ছুটতে লাগল, সঙ্গে-সঙ্গে হাত-পা ছুড়ে চেঁচিয়ে সকলকে বলতে লাগল, ‘পালাও, পালাও, শিগগির পালাও! বাঘ আসছে, কিছু আর রাখবে না৷’
সকলে তা শুনে বড়ো ব্যস্ত হল, কিন্তু যখন সেই জানোয়ারটা সত্যি-সত্যিই এল, তখন সবাই দেখল যে ওটা একটা লাল কুকুর৷ এর পর আমির আহম্মদের যা লাঞ্ছনা, সে আর কী বলব!
বনের ভিতর তাঁবু, বাঘের ভয় খুব, বিশেষত রাত্রে, তাই পাহারা রাখতে হয়৷ সে রাত্রে শিবদয়ালের পাহারা ছিল৷ সে তাঁবুর সামনে আগুনের ধুনির কাছে বসে রয়েছে আর ঘোড়া ও খচচরগুলোর উপর নজর রাখছে, পাছে সেগুলোকে বাঘে নিয়ে যায়৷ আগেই বলেছি শিবদয়াল নতুন লোক, এই প্রথম জরিপের কাজে এসেছে৷ বাঘের দেশ হাজারিবাগে তার বাড়ি বটে, কিন্তু বাঘ সে চোখেও দেখেনি, বাঘের ডাকও শোনেনি৷
সকলে ঘুমুচ্ছে৷ নালায় কোলা ব্যাঙ ডেকে উঠল৷ সে যে কী রকম জন্তু, সেকথাও শিবদয়াল জানে না৷ আমি ডেকে বললাম, ‘শিবদয়াল, সাবধান! ও কী ডাকছে শোনো৷’
অমনি সে ভারি ব্যস্ত হয়ে উত্তর দিল, ‘হুজুর, জরুর শের হোগা৷’ বলেই সে সকলকে ডাকাডাকি করে তুলছে, ‘ওঠো, ওঠো, বাঘ এসেছে! ওই শোনো ডাকছে৷’
তা শুনে একজন খালাসি হাসতে-হাসতে বলল, ‘দূর বোকা! ওটা বুঝি বাঘ? ওটা কচ্ছপ ডাকছে৷’
এই ঘটনার পরে ব্যাঙ ডাকলেই সকলে মিলে শিবদয়ালকে খেপাতো, ‘শিবদয়াল, তোর বাঘ ডাকছে৷’
নালায় হাতি দেখে মং কাংজি আর অন্যান্য অনেকে ভয় পেয়েছিল বলেছি, কিন্তু সকলের চেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিল শঙ্কর খালাসি৷ তাঁবুতে পৌঁছে দেখি শঙ্কর আসেনি— সে আমার খাবার নিয়ে যেত৷ জিগগেস করলাম, ‘শঙ্কর কোথায়?’
একবার নাকি সে একটা পাগলা হাতিকে একটা লোককে পিষে মেরে ফেলতে দেখেছিল৷ সেই অবধি হাতি দেখলেই তার বড়ো ভয় হয়, সে হাতি জংলিই হোক আর পোষাই হোক৷
আমরা কাজ শেষ করে ফিরে চলেছি, তিনদিনের পথ এসেছি, দেখি আমার অপেক্ষায় দুজন চাপরাশি বসে রয়েছে৷
‘সার্ভেয়ার সাদিক হুসেনের কাজ এখনও প্রায় দু-মাসের বাকি৷ গিয়ে দেখো, ও কী করছে, আর সম্ভবপর হলে, কাজ শেষ করে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসো’— বড়োসাহেব হুকুম পাঠিয়েছেন৷
সেই গ্রাম থেকে সাদিক হুসেনের কাজের জায়গা তিনদিনের পথ৷ রাস্তায় আর গ্রাম নেই, কাজেই তিনদিনের খোরাক জোগাড় করে চললাম৷ বুড়ো তো মহা খাপ্পা, বলল, ‘কেন বাবু অমন তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করলে? তাই তো এই দুর্ভোগ,’ ইত্যাদি৷
সাদিক হুসেনের কাছে পৌঁছে দেখলাম যে প্রায় আড়াইশো বর্গ মাইলে কাজ তখনও বাকি, এ বছর শেষ করা অসম্ভব৷
বড়োসাহেবকে যথাযথ রিপোর্ট পাঠিয়ে, কাজে লেগে গেলাম৷
দুটো পাহাড়ের কাজ শেষ করে, তৃতীয়টায় এসেছি৷ সমস্ত পাহাড়ে আগুন লেগেছে, চারদিক ধোঁয়ায় ঘেরা, তিন-চার মাইল দূরের পাহাড় পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায় না৷ এ পাহাড়টায় জল নেই, তাই বাধ্য হয়ে চার মাইল দূরে, গ্রামে তাঁবু ফেলেছি৷ ভোরে, অন্ধকার থাকতেই কাজে বার হয়েছি৷ বেজায় খাড়া চড়াই, যখন পাহাড়ের কিনারার উপর পৌঁছলাম, তখন একেবারে হাঁপিয়ে পড়েছিলাম৷ দাঁড়িয়ে একটা চীর অর্থাৎ পাইন গাছে হেলান দিয়ে একটু বিশ্রাম করতে লাগলাম৷ পাহাড়ের অপর দিকটা একেবারে দেয়াল বললেই চলে— এমন খাড়া৷ অনেক জায়গায় গাছপালা তো নেইই, এমনকী ঘাস পর্যন্ত নেই৷ একটা বড়ো পাথর পড়ে ছিল, আমি সেটাকে ধরে, ঠেলে, ওই খাড়া জায়গায় গড়িয়ে দিলাম৷ বাবা! সে এক হুলস্থূল ব্যাপার! হড়হড়, হড়হড়— সে পাথরটা পড়ছে তো পড়ছেই৷ দুটো ছোটো পাইনগাছ ছিল, ওই পাথরের ধাক্কায় একটা মট করে প্যাঁকাটির মতো ভেঙে গেল, আর অন্যটা একেবারে সমূলে উপড়ে, হুড়মুড় করে চলল তার সঙ্গে ওই অতল গর্তে৷
আমি তো তামাশা দেখছি, এদিকে পিছনে বুড়ো রামশবদ তো যায়-যায়৷ ওই দেখে তার মাথা ঘুরে গেছে— ‘চক্কর আয়া,’ আর ‘বাপ-বাপ!’ বলে সে একেবারে শুয়ে পড়েছে৷ অনেক হাওয়া করে তবে তাকে ঠান্ডা করি৷ তখন আমার মনে পড়ল, দেরাদুনে একদিন শ্রীযুক্ত নি-রও ঠিক এমনি অবস্থা হয়েছিল৷
এই বুড়ো আরও একদিন বড়ো বিপদে ফেলেছিল৷
সালউইন নদীর উপরে এক বিদঘুটে পাহাড়ে চড়তে হবে— নদী থেকে পাহাড়ের চুড়ো প্রায় ৫৫০০ ফুট উঁচু আর এমন খাড়া যে সেদিক থেকে চড়া যায় না৷ পাহাড়ের নীচের দিকটায় জঙ্গল আছে, কিন্তু চুড়োর কাছাকাছি শেষের পাঁচ-ছশো ফুট খালি ঘাস আর পাথর৷ আঠারো-উনিশ মাইল ঘুরে পাহাড়টার অন্য পিঠ বেয়ে উঠতে হবে৷ আমরা তো সমস্ত দিন চলে পাহাড়ের উল্টো পিঠে, জঙ্গলে তাঁবু ফেললাম৷ তার পরের দিনও ঘুরে-ঘুরে চড়তে-চড়তে প্রায় তিনটে বেজে গেল, তখনও চার-পাঁচশো ফুট বাকি৷ আমাদের মাথার উপরে দেয়ালের মতন খাড়া প্রেসিপিস, তাতে এক জায়গায় একটা ফাটল, আর সেই ফাটল দিয়ে ঝিরঝির করে জল পড়ছে, অতি পরিষ্কার আর সুস্বাদু জল৷ জলের কাছে অল্প একটু সমান জায়গা আছে৷ শানেরা ওইখানে পাহাড়ের দেবতাকে পুজো দিতে আসে, আর ওই সমান জায়গাটাতে আড্ডা করে৷ ওই সমান জায়গাটুকুর সামনে বড়ো-বড়ো গাছ আর উপর দিকটায় প্রকাণ্ড একটা পাথর ঝুঁকে আছে, ঠিক যেন ছাদের মতন৷ ঝরনার নীচের জমিটুকু ভেজা, তাতে প্রকাণ্ড বড়ো সব বাঘের পাঞ্জার ছাপ৷ বাঘও ওই ঝরনায় জল খেতে আসে৷ সঙ্গের শান কুলিরা বলল, ‘এখানে কোনো ভয় নেই৷ দেবতা থাকেন এখানে, বাঘ কিছু বলবে না৷’ আমরাও ওই সমান জায়গাটুকুতে আড্ডা করলাম৷
পরের দিন বাকিটুকু চড়তে আরম্ভ করলাম৷ সে এক ব্যাপার, প্রথমে কতকটা হাত ধরে-ধরে গাছে চড়বার মতো চড়তে হল পাহাড়ের স্যাডল অর্থাৎ, কাঁধটা পর্যন্ত, তারপর একটা গুহার মধ্যে ঢুকলাম৷ দেখলাম ওই গুহার মধ্যে অনেকগুলো নিশান টাঙানো আছে, বাতি জ্বালানো হয়েছিল তার চিহ্ন আর কয়েক আনা পয়সাও রয়েছে৷ শানেরা এখানেই পুজো দেয়৷
গুহার অন্যদিকটা খোলা, যেন প্রকাণ্ড একটা পাতকুয়ো৷ সেখানে একটা খুব মোটা গাছের ডাল দাঁড় করানো হয়েছে, তার গায়ে ধাপ কাটা৷ ওই গাছ বেয়ে উপরের ফুটো দিয়ে গুহার উপরে উঠলাম৷ সেখানে খালি ঘাস৷ একটু দাঁড়াবার জায়গা আছে, আর যত দূর দূরান্তর পর্যন্ত সব দেখা যাচ্ছে৷ সেখানে পৌঁছে তো চক্ষুস্থির! সামনে যে রাস্তা তাতে বুনো ছাগল বা বাঁদর ছাড়া অন্য জীব যাবে কী করে? পাহাড়ের কানা ঘেঁষে এক ফুট বা পনেরো ইঞ্চি চওড়া পথ, তাতেও আবার হাঁটু সমান উঁচু ঘাস৷ এক পাশে দেয়ালের মতো পাহাড়, তাও আবার ওই পথের দিকে ঝুঁকে রয়েছে, আর অন্যদিকে এক হাজার ফুটের মধ্যে আর আটকাবার মতো কিছু নেই! তার প্রায় ৪৫০০ ফুট নীচে সালউইন নদীর সবুজ জল৷ ওই তাকের মতো কানাটুকুর উপর দিয়ে প্রায় দেড় জরিপ অর্থাৎ বত্রিশ-তেত্রিশ গজ যেতে হবে৷
শানেরা তো বাঁদরের মতো চলে গেল৷ আমিও, ভগবানের নাম নিয়ে, সালউইন নদীর দিকে পিঠ করে, কাঁকড়ার মতো পাশের দিকে পা ফেলে, এক-পা এক-পা করে পার হলাম৷ ওপারে পৌঁছে, ফিরে দেখলাম সকলে পার হল কি না৷ টিন্ডেল আর দোভাষী বলল, ‘হুজুর, বুড়াবাবু নেহি আয়া৷ আনে নহি শকতা, সো গয়া— শির ঘুমতা, বদন কাঁপতা৷’
উপায়? শানদের ডাকলাম, দোভাষী দু-জনকে সঙ্গে দিলাম৷ তারা পাগড়ি দিয়ে বুড়োর কোমর বেঁধে, চারজনে সামনে-পিছনে টেনে ধরে, এক রকম ঝুলিয়ে বললেও চলে, তাকে ওইটুকু পার করে আনল৷ ভয়ে বুড়োর চোখ কপালে উঠেছে৷ কাজ শেষ হলে পর, আবার ঠিক অমনি ভাবে বুড়োকে ওইটুকু পার করা হল৷ এমন বিটকেল পাহাড় আমি কমই চড়েছি৷
সাদিক হুসেনের কাজ যতটা সম্ভব করলাম৷ বড়োসাহেবের হুকুম এল, ‘কাজ বন্ধ করে চলে এসো৷’ আমরা হেডকোয়ার্টারে ফিরে চলেছি৷ রাস্তায় দু-দিন গ্রাম পাব না, ক্যাম্প করতে হবে জঙ্গলে৷ শানরা বলল প্রথম দিন বিশেষ কোনো অসুবিধা হবে না, কিন্তু দ্বিতীয় দিনই মুশকিল৷
‘কেন?’
‘জলের কষ্ট৷’
‘জল কি কোথাও নেই?’
‘হ্যাঁ, এক জায়গায় এক পরিত্যক্ত ফুংগিচং-এ জল আছে, কিন্তু সেখানে বড্ড বাঘের ভয়৷ বাঘের উপদ্রবে, গ্রাম ছেড়ে লোকজন সব পালিয়ে গেছে৷ ফুংগিরা কিছুদিন ছিলেন, শেষটা তাঁরাও চলে গেছেন৷’
আমি বললাম, ‘চলো, ওই পরিত্যক্ত ফুংগিচং-এই আড্ডা করব৷ রাত্রে বড়ো-বড়ো ধুনি জ্বেলে, কড়া পাহারার বন্দোবস্ত করা যাবে৷’
দ্বিতীয় দিন ওই ফুংগিচং অর্থাৎ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের আশ্রমে পৌঁছলাম৷ গ্রাম ছেড়ে লোকজন কোথায় চলে গেছে৷ আম-কাঁঠালের গাছে সব ফল ধরে রয়েছে৷ তিন-চারটে কুয়ো আছে, তাতে পরিষ্কার জল৷ ফুংগিদের আশ্রমের ঘর-দরজা, স্তূপ সব মজুদ রয়েছে৷ আমরা আশ্রমের সামনে খোলা ময়দানে তাঁবু ফেললাম৷ ধুনি জ্বালাবার জন্য অনেক কাঠের ব্যবস্থা করে, ডবল পাহারা বসালাম৷ রাত্রে কিন্তু কেউ স্বস্তিতে ঘুমুতে পারল না৷ এক-একবার একটু চোখ বন্ধ করি আর অমনি হৈ-হৈ চিৎকার৷
‘কী হল?’
‘বাঘ খচচর ধরতে এসেছে৷’
এমনি করে রাত কাটল৷ সকালে এক জায়গায় পায়ের দাগ দেখে মনে হল খুব বড়ো বাঘ ছিল না৷ তা ছোটোই হোক, আর বড়োই হোক, হতভাগা সমস্ত রাত আমাদের ঘুমুতে দেয়নি৷
আটদিন চলে আমাদের হেড ক্যাম্পে পৌঁছলাম৷ আমার সঙ্গে একটা ওইদেশী কুকুর জুটেছিল, আগের দিন রাত্রে সেই কুকুরটাকে বাঘে খেল৷
কুকুরটা কী রোগা যে ছিল তা আর কী বলব৷ গ্রামে তাকে কেউ খেতে দিত না, সেইজন্য বোধহয় আমাদের ক্যাম্পে জুটেছিল৷ দুটো ভাত তাকে দেওয়া হল, বেচারা সবে তাতে মুখ দিয়েছে, আর অমনি গ্রামের অন্য দুটো কুকুর তার উপর লাফিয়ে পড়ল৷ আমি তাদের ঠেঙিয়ে তাড়িয়ে এটাকে খেতে দিলাম৷ ভোরে উঠে ডেরা ডান্ডা বেঁধে আমরা চলেছি, দেখি সেও আমাদের পিছন-পিছন আসছে৷ বেণী ব্রাহ্মণ, তার ভয় হল, যদি ‘চুলা’ নষ্ট করে, তাই তাড়া করল৷ আমি নিষেধ করে বললাম, ‘আনে দেও গরিব কো৷’ লাল রঙ, তাই নাম রাখা হল লালু৷ আমার তাঁবুর কানাতের পাশে সে শোবার জায়গা বেছে নিল, কেননা রোজ রাত্রে খাবার পর তাকে এক মুঠো ভাত দিতাম আমি৷ এমনি করে ছ’মাস আমাদের সঙ্গে ঘুরে বেশ মোটাসোটা হয়েছিল৷ দু-তিনটে নতুন ঘর ছিল সেখানে, তাতেই আশ্রয় নিয়েছি৷ লালু সেদিন রাত্রে ঘরের ভিতর শুয়েছে, দু-তিনবার ঠেলে তাকে ঘরের বাইরে রেখে এসেছি, কিন্তু আবার এসেছে৷ শেষটা নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও বারান্দায়ই শুয়েছে৷ ভোরে উঠে ডাকাডাকি, লালু নেই! খচচরওয়ালারা বলল, ‘নিশ্চয় বাঘে নিয়েছে৷ চিতা বাঘ, কুকুরটা তাড়া করেছিল রাত্রে৷’
রেলস্টেশনে পৌঁছতে আরও আঠারো-উনিশ দিন লেগেছিল৷ রেলস্টেশনে পৌঁছবার আগের দিন এক ফুংগির আশ্রমের উঠানে তাঁবু ফেলেছি, ম্যালেরিয়ায় ভুগছিলাম, জ্বর এসেছে৷ তাড়াতাড়ি তাঁবু খাটানো হল, আমি শুয়ে পড়লাম৷ মে মাস, বেজায় গরম৷ খালাসিরা তাঁবুর কানাত তুলে বেঁধে দিয়েছে— হাওয়া আসবার জন্য৷
একে তো পথ চলবার পরিশ্রম, তার উপর জ্বর, আমার একটু তন্দ্রা এসেছে৷ হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল— ‘সাপ! সাপ!’ সবে মনে-মনে ভাবছি ডেকে জিগগেস করি ‘কোথায় সাপ!’ আর একটা পাঁচ-ছয় ফুট লম্বা প্রকাণ্ড ধামনসাপ ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে তাঁবুতে ঢুকল, আর আমার বুকের উপর দিয়ে ডিঙিয়ে তাঁবুর অন্য পাশ দিয়ে বার হয়ে গেল৷ লোকজন সবাই ‘বাপরে! বাপরে!’ বলতে-বলতে পিছন-পিছন ছুটে তাঁবুতে ঢুকল, সঙ্গে রামশবদ আর সাদিক হুসেনও এল৷ আমি চুপ করে শুয়ে আছি দেখে নিশ্চিন্ত হল৷
পরের দিন সকালে আমি বললাম, ‘বুড়ো চলো, গোটেক ভিয়াডাক্ট দেখে যাব৷ এ বস্তি থেকে একজন গাইড সঙ্গে নাও৷’
গোটেক পুল দেখবার মতো জিনিস৷ মাঝখানে পাহাড়ী নদী, আর দু’পাশে খাড়া পাহাড়, এঁকে-বেঁকে রেল লাইন যতটা সম্ভব নেমেছে৷ দুটি সুড়ঙ্গও আছে, তারপর পুলের উপর দিয়ে পার হয়েছে৷ আধ-মাইলের উপর লম্বা পুল, সমস্তটা ইস্পাতের৷ পুলের উপর থেকে নদীর জল প্রায় ১৬৫ ফুট হবে৷ তখনও লাইন খোলা হয়নি, পুল তৈরি হচ্ছে মাত্র৷ খচচর, খালাসি প্রভৃতি রাস্তা ধরে রেল স্টেশনে গেল, আমি আর বুড়ো সার্ভেয়ার সোজা পথে পুল দেখতে গেলাম, সঙ্গে দোভাষী আর দুজন খালাসি৷
গোটেক-এ পৌঁছলাম৷ পুল প্রকাণ্ড, অনেক লোক তাতে কাজ করছে৷ স্লিপার ফেলা হয়েছে, কিন্তু তখনও রেল বসানো হয়নি, দুই কিনারা থেকে লাইন বসাতে আরম্ভ করেছে মাত্র৷ বুড়ো পুলের কাছে এসে এক নজর দেখে নিল, তারপরেই মুখ ফিরিয়ে খাদে নামতে আরম্ভ করল৷ ওই খাড়া পাহাড়ের গায়ে এক-একটা পাকডাণ্ডি অর্থাৎ সরু পায়ে-হাঁটা পথ আছে, বুড়ো আর খালাসিরা সেই পথে চলল; আমাকেও বার-বার তাদের সঙ্গে যেতে অনুরোধ করতে লাগল; বুড়ো বলতে লাগল, ‘জবরদস্তি মৎ করো বাবা৷’
আমি পুলের উপর দিয়েই চললাম৷ অতি সোজা কাজ, স্লিপার-এর উপর-উপর পা ফেলে চলে যাব৷ যতটুকু লাইন বসানো হয়েছিল ততটুকু তো নির্বিবাদে চলে গেলাম, কিন্তু তারপরই যত গোলমাল৷ স্লিপারগুলো ফেলা আছে বটে, কিন্তু তখনও পেরেক মারা হয়নি, কাজেই সেগুলো অতি সহজেই খটখট করে নড়ে৷ স্লিপার-এর মাঝের জায়গাটুকু তখনও খোলা রয়েছে, নীচের দিকে চোখ পড়লেই একেবারে ১৫০-১৬০ ফুট নিচে নদীর জল দেখা যায়, মাথায় যেন একটু-একটু গোল বাধে! এখন কী করি? অতগুলো লোক একদৃষ্টে দেখছে আমার অবস্থা কী হয়, আর আমি কিনা ফিরে গিয়ে হাসির ফোয়ারা তুলব? তা হবে না, এই পুলের উপর দিয়েই পার হব৷ এক-পা, এক-পা করে অগ্রসর হতে লাগলাম৷
মনে করেছিলাম বুড়োর অনেক আগে পার হব, কিন্তু যখন ওপারে পৌঁছলাম, দেখি বুড়ো আমার অপেক্ষায় বসে রয়েছে৷
জিগগেস করলাম, ‘কতক্ষণ?’
‘তা কুড়ি-পঁচিশ মিনিট৷’
ওপারে পৌঁছে আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল৷
• ৪ • ১৯০১-১৯০২৷ ব্রহ্মদেশ ও শান স্টেট৷ সাদিন হুসেনের যে কাজ আগের বছর শেষ হয়নি, সেই কাজের ভার পড়ল আমার মাথায়৷ শেষ হলে অন্য কাজে যেতে হবে৷ এ-বছর বুড়ো রামশবদ নেই, আমি একলাই চলেছি৷ বুড়ো পেনশান নিয়েছে৷ একমাস পরে অন্য সব লোক আসবে৷
বনের ভিতর মাঝে-মাঝে গ্রাম আছে৷ আমি নকশার কাজ করি এবার, সুতরাং সুবিধা পেলেই তাঁবু ফেলি৷ গ্রামে থাকি, আর কাজ করতে যাই চারপাশের পাহাড়ে, জঙ্গলে৷ আশেপাশের পাহাড়-জঙ্গলের ম্যাপ আঁকা হলে, তাঁবু তুলে অন্য গ্রামে চলে যাই, গ্রাম না-থাকলে জঙ্গলেই আড্ডা করি৷
এইরকম একটা গ্রামে আমি কিছুদিন ছিলাম৷ আমার জরিপের কাজ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অনেক দূর অবধি দেখতে পাওয়া চাই, নতুবা কাজের সুবিধা হয় না, বিশেষত পাহাড়ের কাজের৷ পাহাড়ের চুড়োয় চড়েই কাজ আরম্ভ করতে হয়, যদি সেখানে বন থাকে, তাহলে প্রথম কাজ হয় ওই বন কেটে পরিষ্কার করে কাজের সুবিধা করে নেওয়া৷ একদিন একটা পাহাড়ে উঠে, সঙ্গের লোকজনদের জঙ্গল কাটতে বলেছি, তারা দা-কুড়ুল নিয়ে তাদের কাজে লেগে গেছে৷ দু-চার ঘা ভালো করে দিতে-না-দিতেই এমন ভীষণ গর্জন করে একটা ভল্লুক বের হয়ে এল যে কী বলব! সে তার গর্তের ভিতর ঘুমুচ্ছিল, সেই কাঁচা ঘুম কেন ভেঙে দিল সেইজন্য তার রাগ৷
যারা তার ঘুম ভাঙিয়েছিল, তারা অবশ্য তাকে দেখেই বাপ-মা’র নাম নিয়ে, প্রাণপণে ছুট দিয়েছিল! ভাল্লুক এসে আর তাদের কারো সাক্ষাৎ পায়নি, কাজেই রাগে গরগর করতে-করতে আবার বনে ঢুকে পড়ল৷ মজার কথা এই যে, শেষে আর কেউ স্বীকার করতে চায় না যে ভাল্লুকের ভয়ে তারা পালিয়েছিল৷ শঙ্কর বলল, ‘আমি কি পালিয়েছিলাম, আমি গিয়েছিলাম আমার দাখানা আনতে৷’ এই শঙ্করই আগের বছর বলেছিল যে সে হাতি ছাড়া অন্য কোনো জানোয়ারকে ভয় পায় না!
ভাল্লুক বড়ো বেখাপ্পা জানোয়ার৷ ও-দেশের লোকেরা বাঘের চেয়েও ভাল্লুককে ভয় করে বেশি৷ বাঘে ধরলে হয়তো মেরেই ফেলল— আপদ চুকে গেল৷ ভাল্লুক বড্ড কষ্ট দিয়ে মারে, প্রাণে না মারলেও জন্মের মতো খোঁড়া করে দেয়, হয়তো চোখই কামড়িয়ে নিয়ে গেল৷
একটা গ্রামে তাঁবু ফেলে ছ-সাত দিন ছিলাম৷ গ্রামের প্রধানটি বড়ো ভালোমানুষ, আমার উপর তার বড়ো স্নেহ জন্মেছিল৷ তার গ্রাম থেকে ছয়-সাত মাইল দূরে হয়তো তাঁবু ফেলেছি, তার এলাকায়ও নয়, তবু সেখানে অবধি আমাকে দেখবার জন্য উপস্থিত হত৷ হাতে করে আমার জন্য তরি-তরকারি, নানা গ্রাম থেকে জোগাড় করে নিয়ে আসত৷ যখন তার গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হলাম, তখন তো তার আর আনন্দের সীমাই রইল না৷ রোজ বিকেলে সে আমার কাছে এসে বসত, আর শিকারের জানোয়ারের আরও কত কিছু গল্প করত৷ তার ডান হাতখানি কী করে ভাল্লুক ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেই গল্প আমি তখন তার কাছে শুনেছিলাম৷
প্রধান, তার গ্রামের আরও কয়েকজন লোকের সঙ্গে জুটে পাহাড়ে বাঁশ কাটতে গিয়েছিল৷ তাদের দেশে একরকম মোটা বাঁশ হয়, তাতে তাদের কলসির কাজ চলে৷ তার এক-একটা চোঙায় পাঁচ-ছয় সের জল ধরে— তারা সেই বাঁশ আনতে গিয়েছিল৷ পাহাড়ে উঠে সকলে যে যার কাজে ছড়িয়ে পড়েছে— প্রধানও এক জায়গায় খুব মোটা-মোটা বাঁশ দেখতে পেয়ে কাটতে গেছে৷ বাঁশের পিছনে যে প্রকাণ্ড একটা ভাল্লুক শুয়ে রয়েছে সে তা দেখতে পায়নি৷ যেমন সে খটাং করে বাঁশের গায়ে কোপ বসিয়েছে, অমনি আর যাবে কোথায়? হ্যাঁও-হ্যাঁও করে বন-জঙ্গল কাঁপিয়ে, ভাল্লুক এসে তার ঘাড়ে পড়ল৷ প্রধান বেচারা অতশত কল্পনাও করেনি, তার কেমন ভ্যাবাচ্যাকা লেগে গেল, আর হাতের দাখানা কোথায় পড়ে গেল, কী যে করবে কিছুই বুঝতে পারল না৷ ভাগ্যিস তার সঙ্গের লোকরা ভাল্লুকের গর্জন শুনে তখনি ছুটে এসেছিল, তা না হলে সেদিন তাকে মেরেই ফেলত৷ হঠাৎ অনেকগুলো লোক উপস্থিত হওয়াতে ভাল্লুকটা পালিয়ে গেল, কিন্তু যাবার সময় প্রধানের ডান হাতখানা কবজির উপর অবধি ছিঁড়ে নিয়ে গেল৷
এমন জানোয়ারকে লোকে ভয় করবে না তো আর ভয় করবে কাকে? বাঘই হোক, ভাল্লুকই হোক, বনের ভিতর তাদের হল এলাকা— কাজেই সেখানে তাদের বিশেষ হিসেব করে চলতে হয়৷ সকল সময় আবার হিসেব করবারও সময় থাকে না, তার আগেই ছুট দিতে হয়, বা ‘আর কিছু’ করতে হয়৷
‘আর কিছু’ কী রকম বলছি শোনো৷
ওই গ্রাম ছেড়ে, আমরা অন্য গ্রামে উঠে গিয়েছি৷ সেখানে একদিন কাজ বন্ধ করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল, আমরা তাড়াতাড়ি তাঁবুতে ফিরতে আরম্ভ করলাম৷ সকলের আগে দুজন শান, তাদের পিছনে আমি, আমার পিছনে দোভাষী, আর তার পিছনে আমার সহিস ঘোড়া নিয়ে৷ খালাসিরা জরিপের যন্ত্রপাতি ঘাড়ে করে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট হাত পিছনে পড়েছে৷
শুকনো নালার ধারে-ধারে, আঁকাবাঁকা পথ, তার একটা মোড় ঘুরেই তো সামনের শানটি ক্যাঁও-ম্যাঁও করে চিৎকার করে পিছনের দিকে এক লাফ দিয়েছে— পথের মাঝখানে চার-পাঁচ হাত দূরেই এক প্রকাণ্ড বাঘ! বাঘটা তখুনি লাফ দিয়ে নালায় পড়ল৷ পড়ল, কিন্তু পালাল না, সেইখানেই পায়চারি করতে লাগল৷
এদিকে শানরা দুজন পালাবার জোগাড় করছে দেখেই আমি তাদের হাত ধরে ফেললাম, বললাম, ‘পালাচ্ছ কোথায়?’
তারা উত্তর দিল, ‘বাবু, ওটা দুষ্টু বাঘ, দেখো-না, আমরা অত কাছেই রয়েছি, চেঁচামেচি করছি (পিছনের লোকদের ডাকা হচ্ছিল) তবু যাচ্ছে না, ফিরে-ফিরে আমাদের কাছেই আসছে৷’
আমি বললাম, ‘তা হচ্ছে না বাপু, পিছনে আমার লোক রয়েছে, তারা না-এলে যাওয়া হচ্ছে না৷’
এদিকে দোভাষী বনে আগুন ধরাবার চেষ্টা করছিল, কিন্তু হিমে লতা-পাতা ডাল-পালা সব ভিজে রয়েছে, কিছুতেই আর আগুন জ্বলে না৷ পিছনের লোকগুলোকে যতই ডাকি, ‘জলদি আও, জলদি আও,’ লোকগুলো ততই খালি বলে, ‘আতা হুঁ৷’
আবার জিগগেস করে, ‘কেয়া হুয়া?’
আমি বললাম, ‘তুমহারা নানা হিঁয়া বয়ঠা হ্যায়!’
লোকগুলো একটু ঢালু, প্রায় খাড়া জায়গা দিয়ে আসছিল৷ আমার কথা শুনে ওই জায়গাটুকু হেঁটে নামবার অবসর হল না তাদের৷ তাদের কাপড় আর পিছনের চামড়ার যে কী দশা হয়েছিল সেটা বুঝতে পার৷ একেই বলেছিলাম ‘আর কিছু’ করা৷
তখন আমরা সকলে মিলে, দশ-বারোজন একসঙ্গে কতই চিৎকার করলাম, কিন্তু সে হতভাগা বাঘ কিছুতেই সে জায়গা থেকে নড়ল না৷ পাতার উপর মড়মড় করে পায়চারি করতে লাগল৷ তখন আর সেখানে থাকা নিরাপদ না মনে করে, সকলে হাত ধরাধরি করে চলে এলাম৷ হাত ধরাধরি করবার মানে, যাতে কেউ পিছনে পড়ে না থাকে— একলাটি পিছনে পড়লেই বাঘ এসে তাকে ধরবে৷
বাঘ কিন্তু আমাদের ধমক-চমক হজম করতে পারল না৷ সে রাত্রে এসে, আমাদের তাঁবুর পিছনে দাঁড়িয়ে, অনেকক্ষণ ধরে আমাদের শাসিয়ে গেল৷
প্রথমে যে গ্রামের কথা বলেছি, সেই গ্রামে বাঘের বড়ো উৎপাত ছিল৷ একটা চিতাবাঘ প্রায়ই রাত্রে এসে কুকুর, মোরগ ইত্যাদি যা পেত ধরে খেত৷ গ্রামের লোকরা সেটাকে মারবার জন্য কত রকম ফন্দি করল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না৷ বন্দুক নিয়ে তার অপেক্ষায় বসে থাকলে সেটা কেমন করে বুঝতে পারে, আর অন্য কোথায় চলে যায়— গ্রামের লোকদের রাত জাগাই সার হয়৷ তীর পেতে রাখলে সে অন্য পথে যাতায়াত করে, তীরের আশেপাশেও মাড়ায় না৷ খোঁয়াড় তৈরি করে, তাতে কুকুরছানা পুরে রাখলে সে বেচারা সারারাত খালি ক্যাঁও-ক্যাঁও করে সারা হয়, বাঘ তার খবর নেয় না৷
শেষটা তাদের মধ্যে একজন বুদ্ধিমান লোক, অনেক চিন্তা করে এক ফন্দি বার করল৷ বড়ো-বড়ো বাঁশের ডগায় খুব মজবুত পাকা বেতের বাঁশ বেঁধে সে কতকগুলো বঁড়শির মতো তৈরি করল৷ গ্রামের চারদিকে বেড়া দেওয়া, সেই বেড়ার মাঝে-মাঝে ফুটো রয়েছে, আর সেই ফুটো দিয়ে বাঘ গ্রামে প্রবেশ করে৷ বুদ্ধিমান লোকটি ওই সব ফুটোর সামনে এক-একটা করে ওই বঁড়শি পুঁতল, আর বাঁশ বেঁকিয়ে, ফুটোর মুখে ফাঁদ পেতে, তার সামনে একাট করে মুরগি বেঁধে রাখল৷
তারপর দু-তিন দিন গেল৷ বাঘ আসে, কিন্তু ফাঁদ দেখে যেন সন্দেহ করে আর তাতে পা দেয় না৷ গ্রামের লোকেরা বলতে লাগল, ‘আর কেন? এখন ফাঁদগুলো তুলে ফেলি, ওতে কি আর বাঘ পড়বে?’ সেদিন রাত্রেই বাঘের চ্যাঁচানিতে তাদের ঘুম ভেঙে গেল৷ তাড়াতাড়ি লাঠি সোঁটা, বন্দুক ইত্যাদি নিয়ে, মশাল জ্বালিয়ে ঘরের বাইরে দেখে, বাঘমশাই বাঁশের ডগায় ঝুলতে-ঝুলতে গর্জন করছেন৷ তাঁর পিছনের পায়ে ফাঁস লেগেছে, সেখানে তার দাঁত পৌঁছচ্ছে না, আর ফাঁস কেটে পালাতেও পারছেন না— খালি ছটফটানি আর তর্জন-গর্জন সার হচ্ছে৷ আর তা তিনি খুব ভালো করেই করছেন৷
এমন তামাশা তো আর হামেশাই জোটে না, কাজেই সারাটা রাত জেগে শানেরা তা দেখল৷ তামাশায় একটু ঢিল পড়লেই বল্লমের খোঁচা মেরে বাঘমশায়কে আবার চাগিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করল না৷ তারপর সকালে তারা গুলি করে বাঘটাকে মেরে ফেলল৷
এর পর আর কোনো বাঘ তাদের মুরগি নিতে আসেনি৷
ভিখারি নামে একজন লোক অনেকদিন আমার সঙ্গে ছিল৷ দু-পয়সা রোজগার করার সুযোগ পেলে সে ছাড়ত না৷ বদ্যি বল, রোজা বল, ভিখারি একাধারে সব৷ বদ বুদ্ধিও যথেষ্ট ছিল তার পেটে৷
একটি শান ছেলে প্রায়ই আমাদের ক্যাম্পে আসত৷ শানদের গোঁফ নেই, আর আমাদের খালাসিদের প্রায় সকলেরই গোঁফ আছে৷ তা দেখে শান ছেলেটির ভারি শখ হয়েছে তার গোঁফ হোক৷ সে কত অনুনয় বিনয় করে খালাসিদের জিগগেস করে, কী করলে তার গোঁফ গজাবে৷ ভিখারি তাকে বলল, ‘গোঁফ চেষ্টা করলেই হতে পারে, কিন্তু তাতে খরচ আছে৷’ ছোকরা তো তা শুনে বড়োই খুশি, খরচ যতই লাগুক সে দেবে৷ তার গোঁফ হওয়া চাই-ই৷ তখন ভিখারি খুব গম্ভীর হয়ে বলল, ‘পুজো করতে হবে৷ তাতে ফুল চাই, ধূপ-ধুনো চাই, আর দুটো সাদা ধবধবে মোরগ আর চার সের চাল৷’
সেই ছোকরার গোঁফের বড়োই দরকার, বলা মাত্রই সে সমস্ত জিনিস এনে হাজির করল৷ ভিখারিও নতুন উনুন তৈরি করে, ভাত আর মোরগ চড়াতে একটুও দেরি করল না৷ যতক্ষণ রান্না হচ্ছিল, ততক্ষণ সে ধূপ-ধুনো নিয়ে বেশ জমকালো রকমের পুজো করল, বিড়-বিড় করে অনেক মন্ত্রও আওড়াল৷ তারপর সব খালাসি মিলে মোরগের ঝোল আর ভাত পেট ভরে খেয়ে, পরে সেই উনুনের কয়লা, রেড়ির তেল আর একটু চিনা কালি দিয়ে খাসা মলম তৈরি করে সেই শান ছোকরাকে বলল, ‘এই মলম দিয়ে বেশ করে গোঁফ এঁকে, নাকে-মাথায় কাপড় জড়িয়ে রাত্রে শুয়ে থাকবে, সকালে উঠে দেখবে, এয়া বড়ো গোঁফ হয়ে আছে৷ লেকিন, খবরদার, একটুও যেন মুছে না যায়, তাহলে আর গোঁফ হবে না৷’
শান ছোকরাও তাই করেছে, কিন্তু, হায়! তার গোঁফ আর গজাল না৷ তখন সে এসে ভিখারিকে পাকড়াও করল৷ ভিখারি বলল, ‘এপাশের আঁকা গোঁফটা একটু মুছল কী করে?’
শান ছোকরা বলল, ‘রাত্রে কাপড় লেগে মুছে গেছে৷’
ভিখারি বলল, ‘আমি তো আগেই বলেছি, মুছলে আর হবে না৷’
আরেকবার ভিখারি গিয়েছিল এক বুড়ির মাথাধরা সারাতে৷ বুড়ি ভালো হলে তাকে একটা কুমড়ো দেবে৷ শানদেশের লোকেরা মাচার উপর ঘর বাঁধে৷ ভিখারি যেমনি সেই মাচার উপর ওঠবার জন্য সিঁড়িতে পা দিয়েছে, অমনি বুড়ির কুকুর এসে তার পায়ের গোড়ায় কামড়ে ধরেছে৷
সেদিন আর ভিখারি বেচারার ডাক্তারি করা হল না, তাকেই কাঁধে করে তাঁবুতে আনতে হল!
আগেই বলেছি জঙ্গলের কাজে সকল সময়ে গ্রাম পাওয়া যায় না৷ অনেক সময় জঙ্গলের মধ্যে একটু জায়গা পরিষ্কার করে নিয়ে তাঁবু খাটাতে হয়৷ শুকনো, খটখটে জায়গা আর জল দেখে তাঁবু ফেলতে হয়৷ এই রকম একটা জায়গায় তাঁবু ফেলা হয়েছে৷ সঙ্গে আমার ছজন খালাসি, দোভাষী, আর তিনজন শান কুলি৷ জায়গাটা ভালো নয়, কেননা ওই বনে পাঁচ-ছ মাইলের মধ্যে আর জল নেই, ওইটুকু মাত্র জল৷ সকল জানোয়ার ওইখানটায় জল খেতে আসে, চারদিকে তাদের পাঞ্জার দাগ রয়েছে৷ আমার সঙ্গে ঘোড়া রয়েছে৷ ঘোড়া, খচচরের উপর নাকি বাঘের বড়ো লোভ৷ সকলে বলে যে ঘোড়া বা খচচর পেলে, বাঘ আর অন্য জানোয়ার ধরে না৷
কাজ করে সন্ধ্যার সময় তাঁবুতে ফিরে দেখি, তাঁবুগুলো একটু বেকায়দায় খাটানো হয়েছে৷ পাতা-লতা দিয়ে, ঘোড়ার জন্য একটা চালা করেছে, তার একটা দিক খোলা, খোলা দিকটা আবার জলের দিকে৷ ধুনি জ্বালিয়েছে মাঝখানটায়৷ আমি বিশেষ করে বলে দিয়েছিলাম ঘোড়ার জন্য চালাটা যেন মাঝখানে করা হয়, আর দুপাশে দুটো ধুনি করা হয়৷ দোভাষীকে ডেকে জিগগেস করলাম, ‘এ কী করেছ? গ্রামের লোক যে বলে দিয়েছিল এখানে বাঘের বড্ড ভয়৷’
সে উত্তর দিল, ‘হুজুর, শানরা বন্দুক এনেছে, ভালো করে পাহারা দেবে, প্রকাণ্ড ধুনি জ্বালবে, তিন-চার রাত কেটে যাবে৷ কোনো ভয় নেই, জানোয়ার এদিকে আসবে না৷’
আমার মনটা কেমন খুঁতখুঁত করতে লাগল, দোভাষীর কথায় আশ্বস্ত হল না৷
রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর, দোভাষী, খালাসি আর শান কুলিরা ধুনির পাশে বসে রাত সাড়ে-নটা-দশটা পর্যন্ত তামাক খেয়েছে, গল্পগুজব করেছে, তারপর শুতে গেছে৷ আমি আগেই শুয়ে পড়েছিলাম, কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম বলতে পারি না, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল৷ কেমন অস্বোয়াস্তির ভাব মনে৷ ঘোড়াটার গলার দু-পাশে মোটা বাঁশের কঞ্চি মজবুত দড়ি দিয়ে গলার সঙ্গে বাঁধা৷ ওই বাঁশ দুটো একটু পর-পর খটাং-খটাং করে ঠোকাঠুকি হচ্ছে৷ ঘোড়াটা অমন করছে কেন? আমার মন বলছে যে, কোনো একটা জানোয়ার তাঁবুর কাছেই দাঁড়িয়ে আছে৷ এই রকম অস্বোয়াস্তির ভাবটা আরও অনেকবার, অনেক ঘটনায় আমার হয়েছে৷
আমার তাঁবুর পিছনেই নালা, নালার ওপারে পাহাড়৷ হঠাৎ মট করে একটা আওয়াজ হল, যেন কোনো জানোয়ারের পায়ের চাপে একটা শুকনো ডাল বা অন্য কিছু ভেঙে গেল৷ সঙ্গেসঙ্গে একটা ভারি জানোয়ারের পা পিছলাবার একটু আওয়াজ কানে এল, সঙ্গেসঙ্গেই ঘোড়ার গলার খটাং-খটাং শব্দটাও খুব ঘন-ঘন হতে লাগল৷ আমি সবে মনে করছি উঠে দেখি ব্যাপার কী, আর অমনি ঘোড়াটা এক বিকট চিঁ-হি-হি করে চিৎকার করে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে আমিও জোরে চিৎকার করে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলাম, শশী আর খালাসিরাও চিৎকার করতে-করতে তাদের তাঁবু থেকে বের হল৷
কোথাও কিছু নেই! খালি ঘোড়াটা ঠকঠক করে কাঁপছে, গলায় রসি-বাঁধা খোঁটা একটা একেবারে উপড়িয়ে ফেলেছে, আর শান স্টেটের ওই দারুণ শীতের মধ্যেও তার সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে গেছে৷
পাহারাওয়ালা ঘুমিয়ে পড়েছে, ধুনি নিভে গেছে৷ ধমক দিয়ে আবার ধুনি জ্বালানো হল, কড়া পাহারার বন্দোবস্ত করা হল আর ঘোড়াটাকে খুলে এনে খালাসিদের তাঁবুর সামনে ধুনির পাশে বেঁধে রাখা হল৷
রাত কেটে গেল৷ ভোরে উঠে শানরা দেখতে পেল কেমন জানোয়ার এসেছিল৷ ঘোড়ার ঘরের পাশেই তার প্রমাণ মজুদ— বড়ো বড়ো থাবার দাগ— বাঘ! শানরা বলাবলি করতে লাগল, ‘ঘোড়াটা এখানে রাখা আর নিরাপদ নয়৷ আমাদের গ্রামে পাঠিয়ে দাও৷’
চার মাইল দূরে তাদের গ্রামেই পাঠিয়ে দিলাম৷ হতভাগা কিন্তু সেখানেও গিয়েছিল ঘোড়াটার খোঁজে৷ তবে কিনা ঘোড়াটা গ্রামের প্রধানের ঘরে ছিল, সেইজন্য বিশেষ কোনো সুবিধা করতে পারেনি, বন্দুকের দু-চারটা আওয়াজ করার পর পালিয়ে গেল৷
বর্মার লোকেদের সঙ্গে আমার বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল, বিশেষত শানদের সঙ্গে৷ মোটের উপর এদের আমার বেশ লাগত, যদিও মাঝে-মাঝে এদের তরকারির গন্ধে একটু মুশকিলে পড়েছি৷ তবে এ কথাটা দু-দিক দিয়েই খাটে— যেমন তাদের মশলার গন্ধ আমার সয় না, তেমনি আমাদের ঘিয়ের গন্ধও তারা সইতে পারে না৷
মাছকে টুকরো-টুকরো করে কেটে হাঁড়ির ভিতর পুরে, হাঁড়ির মুখ ভালো করে বন্ধ করে মাটিতে তিন-চারমাস পুঁতে রাখে, তারপর সেটা পচে একেবারে গলে গেলে, সেটাকে বার করে খায়৷ এই জিনিসটিকে ওরা বলে ‘ঙাপি’ আর এমন সরেস জিনিস নাকি এ দুনিয়ায় নেই! আমাদের যেমন ঘি, গরম মশলা, তাদের ওই জিনিসটাও তেমনি, সব তরকারিতেই তার একটু-একটু দেওয়া চাই, নইলে সে তরকারির ‘লজ্জত’-ও হয় না, ইজ্জতও হয় না৷ এদিকে ঘিয়ের গন্ধে তাদের পেটের ভাত উলটিয়ে আসে!
শুনেছি বর্মার কোন শহরে নাকি এক হিন্দুস্থানি ময়রা খাবারের দোকান করেছিল৷ কিন্তু তার ঘিয়ে ভাজার গন্ধে বর্মীরা গিয়ে ডেপুটি কমিশনারের কাছে নালিশ করেছিল যে সে এমন দুর্গন্ধময় জিনিস রান্না করে যে তারা সহ্য করতে পারছে না, তাদের ও-পাড়ায় বাস করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে৷ গল্পটা প্রথমে শুনে অতিরঞ্জিত মনে করেছিলাম, কিন্তু এমন ব্যাপার আমার নিজেরই ঘটেছিল৷
খেটেখুটে সন্ধ্যার সময় তাঁবুতে ফিরেছি— এইবার একটু আরাম করব৷ হঠাৎ গোলমাল৷ ফুংগির আশ্রমে তাঁবু ফেলেছিলাম, ফুংগি মহা খাপ্পা হয়ে উঠেছেন, ‘এখান থেকে তাঁবু তুলে নাও বা রান্না বন্ধ করো৷’
অপরাধ?
আমার লোক লুচি ভাজছিল, তার দুর্গন্ধে নাকি তার প্রাণ আইঢাই!
শশী একদিন খিচুড়ি রেঁধেছে৷ সেই রাঁধা খিচুড়ির গন্ধ পেয়েই তো সঙ্গের শানরা ভারি চঞ্চল হয়ে উঠেছে৷ শশী জিগগেস করল, ‘খাবে?’ তারা প্রথমে বলল, ‘না৷’ তারপর একটু হাতে নিয়ে, নাক-মুখ সিঁটকিয়ে মুখে দিল৷ পরে দু-চারবার মুখ নেড়েই তাদের আর হাসি ধরে না, তখন খালি বলে, ‘আরও দাও, আরও দাও৷’ শেষে যখন পেট ভরে এসেছে, তখন শশীকে জিগগেস করল, ‘কী দিয়ে রেঁধেছ?’ শশী বলল, ‘চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আদা, হলুদ, লঙ্কা আর ঘি৷’ সেকথা তারা তো কিছুতেই বিশ্বাস করবে না, বলে, ‘ঘিয়ের গন্ধে তো বমি আসে, এতে তা থাকলে কি আর খাওয়া যেত?’ যাই হোক, এর পরে তারা প্রায়ই শশীকে খিচুড়ি রাঁধতে বলত৷
এই বছর, আমার কাজ খানিকটা জায়গায় ছিল যেখানে গ্রাম নেই৷ বহুকাল আগে নাকি এখানে বড়ো-বড়ো গ্রাম ছিল, এখন ঘোর বন৷ এই জায়গাগুলো জরিপ করবার সময় দশ-বারোদিন জঙ্গলে ক্যাম্প করে থাকতে হয়েছিল৷ যে জায়গাগুলোয় ক্যাম্প করেছিলাম, সেখানে পুরোনো গ্রামের সব চিহ্ন বর্তমান— আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, সুপারি ইত্যাদি ফলের গাছ; পাকা ‘ফয়া’ অর্থাৎ প্যাগোডা— বৌদ্ধস্তূপ বা মন্দির আর জলের কুয়ো৷ আমরা চার-পাঁচদিন আগে লোক পাঠিয়ে দুটো কুয়োর জল সেঁচে ফেলে দিয়েছিলাম, তাতে আবার অতি পরিষ্কার জল বেরিয়েছিল, সেই জলই আমরা ব্যবহার করেছিলাম৷
একটু দূরে অনেকটা জায়গা জুড়ে শরবন, তার মধ্যে খেতের আল আর জলের নালার চিহ্ন বর্তমান৷ সমস্ত দেখে-শুনে মনে হয়েছিল যে ওইখানে নিশ্চয়ই আগে খুব বড়ো গ্রাম ছিল৷ এক বুড়ো শানের কাছে তার ইতিহাস শুনেছিলাম৷
বহু বছর আগে, আমাদের ক্যাম্পের জায়গায় প্রকাণ্ড এক গ্রাম ছিল, ছোটোখাটো শহর বললেই চলে— প্রায় দুশো-আড়াইশো ঘর লোকের বসতি ছিল সে গ্রামে৷ এটা মং-নাই স্টেটের এলাকা৷ বর্মার রাজা মং-নাই আক্রমণ করেছিলেন, কেননা মং-নাই-এর রাজা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেননি, মং-নাই-এর রাজা কেন বর্মার রাজার সঙ্গে লড়াইয়ে এঁটে উঠতে পারবেন? হাজার-হাজার বর্মী সৈন্য মং-নাই ছেয়ে ফেলল৷ মং-নাই-রাজ যুদ্ধে হেরে এই গ্রাম থেকে ন-দশ মাইল দূরে এক দুর্গম পর্বত কন্দরে আশ্রয় নিয়েছিলেন৷ বর্মী সৈন্য এসে এই গ্রাম আক্রমণ করল৷ গ্রামবাসী যথাশক্তি দিয়ে লড়েছিল, কিন্তু শেষটা হেরে গেল৷ বর্মীরা গ্রামের বয়স্ক স্ত্রী-পুরুষ সকলকে হত্যা করল, অন্যদের ধরে নিয়ে গেল আর গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দিল৷ সেই অবধি এই গ্রাম উজাড়; এর কাছেও আর কোনো গ্রামের পত্তন হয়নি৷
ওই গ্রামের ন-দশ মাইল দূরে, যে জায়গায় মং-নাই-রাজ আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেটাও আমি জরিপ করেছিলাম৷ সে এক অদ্ভুত জায়গা, পনেরো-কুড়ি বর্গমাইল হবে, আর দুটি মাত্র প্রবেশপথ৷ চারদিকে কাঁটা ও পাথরের পাহাড়, দেয়ালের মতো খাড়া আর ক্ষুরের মতো ধারালো, চার হাত-পায়ে চড়াও মুশকিল৷ দুদিকে দুটি মাত্র প্রবেশ-পথ যা আছে তাতেও একসঙ্গে একজনের বেশি চড়তে পারে না৷ তাও আবার এমন খাড়া যে উপরে দশজন মাত্র লোক বসে থাকলে, হাজার লোক শত চেষ্টাতেও উঠতে পারবে না৷ আজও সেখানে সব প্রকাণ্ড-প্রকাণ্ড পাথর সাজানো রয়েছে, এইসব পাথর শত্রুর উপর গড়িয়ে দেওয়া হত৷ বার দুই-তিন চেষ্টা করে, বহু লোক বলি দিয়ে বর্মী সৈন্য সেখান থেকে পশ্চাৎপদ হতে বাধ্য হয়েছিল৷
এই জায়গাটুকুর মধ্যে কোনো নালা নেই, কিন্তু অনেকগুলো বড়ো-বড়ো ‘ডেভিলস কলড্রন’ আছে তাতে বেশ সুস্বাদু জল৷ মং-নাই-রাজ আর তাঁর লোকজনের জলের অভাব হয়নি৷
আমার কাজ শেষ হলে, দু-তিনজন সার্ভেয়ারের কাজ পরিদর্শন করতে গিয়েছিলাম৷ একদিন একজন সার্ভেয়ারের কাজ দেখে ফিরছি৷ হঠাৎ ঝোপের ভিতর কী একটা নড়ল৷৷ ক্যাঁও-ক্যাঁও করে একটা ময়ূর উড়ে গেল, আর তার ডানার আড়াল থেকে তিনটে বাচচা বার হয়ে চিঁ-চিঁ করে ছুটোছুটি করতে লাগল৷ তাড়া করে একটাকে ধরলাম৷ বাচচাটা পায়রার মতো বড়ো৷ আমি তাকে ধরে বুকে করে নিয়ে চলেছি আর বেচারার কী কান্না— ঠিক যেন তার মাকে ডাকছে৷ আমার বড়ো দুঃখ হল, বাচচাটাকে ছেড়ে দিলাম৷ সে বেচারা অমনি যেদিকে তার মা গিয়েছিল, সেদিকে দৌড়ে গেল আর তার মাকে ডাকতে লাগল৷ উড়বার শক্তি তখনও হয়নি৷ মাকে পেল কি না তা ভগবানই জানেন৷
এবারকার মতো কাজ শেষ হল৷ আমরা আবার আমাদের হেড আপিস, ব্যাঙ্গালোরে ফিরে গেলাম৷
• ৫ • ১৯০২-১৯০৩৷ কেংটুং রাজ্য৷ এবার আমাদের ঢের দূরে যেতে হবে— রেলের লাইন থেকে প্রায় পঁচিশ-ছাবিবশদিনের পথ৷ আমার ঘাড়ে আবার দূরবিনের কাজ পড়েছে৷ সঙ্গে অনেক লোক আর ভারবাহী খচচর, বলদও প্রায় ষাট-পঁইষট্টিটা৷ আঠারো দিনের পথ চলে এসে আমরা একটা বড়ো নালার ধারে, এক ফুংগির আশ্রমে তাঁবু খাটিয়েছি৷
নদীতে বাঁধ দিয়ে ফুংগি মাছ পুষেছেন৷ মাছগুলোকে ফুংগি বড়ো ভালোবাসেন, রোজ ভাত রেঁধে তাদের খেতে দেন৷ মাছও ঢের, জলে একটা কিছু ফেললেই চল্লিশ-পঞ্চাশটা এসে জড়ো হয়৷ আমরা লেবুর খোসা ফেলে অনেকক্ষণ ধরে তাদের তামাশা দেখলাম৷ সঙ্গের লোকদের রকম-সকম দেখে মনে হল যেন মাছগুলো দেখে তাদের জিভ দিয়ে জল পড়ছে৷ আমি সেইজন্য তাদের সাবধান করে বললাম, ‘খবরদার, ফুংগির মাছ যেন ধোরো না৷’ তারা ব্যস্ত হয়ে জিভ কেটে বলল, ‘আরে রাম, ফুংগির মাছ ধরতে যাব?’ আমার কিন্তু সন্দেহ মিটল না, আর কাজেও তাই হল৷ রাত্রে আমি যেই ঘুমিয়েছি অমনি তারা গিয়ে দুটো মাছ ধরেছে৷ এ খবর অবশ্য আমি পরে পেয়েছিলাম৷
এর শাস্তি ভগবান হাতে-হাতেই দিয়েছিলেন৷ পরের দিন আমাদের সালউইন নদী পার হতে হবে৷ আমি আরও দুবার এই পথে যাওয়া-আসা করেছিলাম, কাজেই রাস্তা আমার বেশ ভালো করেই জানা৷ আমি আগের দিন বিকেলে সকলকে ডেকে একটা পাহাড় দেখিয়ে বললাম, ‘ওই পাহাড়ের নীচে গিয়ে দুটো পথ পাবে৷ যেটা পাহাড়ের উপর উঠে গেছে সেটাই আসল পথ৷ যেটা নালার ধারে-ধারে গেছে, সে পথে যেয়ো না, গেলে দু-দিনেও সালউইন নদীতে পৌঁছতে পারবে না৷’
তাদের কপালে দুর্ভোগ ছিল, তারা সেকথা শুনবে কেন? তারা আমার আধ-ঘণ্টা আগে রওয়ানা হয়ে গিয়েছিল, আর গিয়েছিল ঠিক যে পথে যেতে আমি নিষেধ করেছিলাম, সেই পথে৷ পাহাড়ের নীচে এসেই তাদের পায়ের দাগ দেখে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ব্যাপারখানা কী৷ আমি তখনই তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য একজন লোককে দৌড়িয়ে পাঠালাম, তারা তার কথা গ্রাহ্যই করল না৷
তাদের সঙ্গে একজন ভারি চালাক সার্ভেয়ার ছিল, সে নাকি আগের বছর এই সমস্ত জায়গা জরিপ করে গেছে৷ সে বলল, ‘পাহাড়ের রাস্তা বড়ো বিশ্রী, তাতে বেজায় চড়াই৷ আমি রাস্তা জানি, চলো নদী ধরে যাই, ওদের ঢের আগে পৌঁছব৷’
সেই ফাজিলের কথায় ভুলে বেচারারা বারোটা-সাড়ে-বারোটা পর্যন্ত নালায়-নালায় চলেছে, কখনো এপার, কখনো ওপার৷ তারপর কয়েকজন হাতিওয়ালার কাছে জানতে পারল যে সেদিকে আর পথ নেই৷ কাজেই তখন আবার সেই পাহাড়ের তলায় ফিরে আসতে হবে— এদিকে পা কিন্তু আর চলে না৷ দু-টাকা বকশিস কবুল করে, এই পথটুকু হাতিতে করে পৌঁছে দেবার জন্য হাতিওয়ালাদের রাজি করিয়েছিল, কিন্তু হাতিটা কিছুতেই তাদের বইতে রাজি হল না৷ দুপুরের রোদে তার মেজাজ বিগড়িয়ে গিয়েছিল, মাহুত যত তাকে বসতে বলে, হাতিটা ততই আরও চটে যেতে লাগল৷ কাজেই হেঁটে আসা ছাড়া অন্য উপায় আর রইল না৷
এদিকে আমি সমস্ত জিনিসপত্র, খচচর, বলদ সুদ্ধ নদী পার হয়েছি, আর বালির উপর তাঁবু খাটিয়ে, কতক্ষণ অবধি তাদের আশায় বসে রয়েছি৷ বসে-বসে সন্ধ্যা হয়ে গেল, আমি খালি ভাবছি— ‘তাইতো, তারা এখনও এসে পৌঁছল না৷ ভোরে সাড়ে-চারটের সময় বেরিয়েছে আর এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে— রাস্তা তো মোটে দশ মাইল৷’ এমন সময় একজন খালাসি বলল, ‘ওই বাবুরা আসছে৷’ চেয়ে দেখি নদীর ওপারে তাদের দেখা যাচ্ছে, চলতে আর পারছে না৷ এক বেচারা তো নদীর কিনারায় পৌঁছে বালির উপর শুয়ে পড়ল, তার ওজন তিন মন ছাবিবশ সের! দেখে আমার বড়ো দুঃখ হল, তাড়াতাড়ি তাদের পার করিয়ে আনিয়ে, চা খাইয়ে একটু ঠান্ডা করলাম৷
সেই চুরি-করা মাছ দুটো আর তাদের খাওয়া হল না, সেগুলো রোদে একেবারে পচে গিয়েছিল৷ দোভাষীরা বলাবলি করতে লাগল, ‘ফুংগির মাছ চুরি করার সাজা!’
সেই রাত্রে আমার চাকর শশীকে খাবার জন্য তার তাঁবুতে এক বাঘ ঢুকেছিল আর ঘড়ির অ্যালার্মের শব্দে পালিয়ে গিয়েছিল৷ শশী কিন্তু আগে বুঝতে পারেনি যে ওটা বাঘ, সে মনে করেছিল খচচর৷ তাই সে খচচরওয়ালাদের গালি দিয়েছিল, ‘বেটারা বড়ো পাজি৷ রোজ বলি খচচর বেঁধে রাখ, তা শোনে না৷ একদিন খচচরের পা ভেঙে দেব তখন বুঝতে পারবে৷’
সকালে উঠেই আমাদের কাজে বের হতে হয়, তার আগে রান্নাবান্না তৈরি চাই, তাই শশী রাত চারটের সময় ওঠবার জন্য ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রাখে৷ রাত্রে যখন সকলে ঘুমে অচেতন, বাঘ এসে শশীর তাঁবুতে ঢুকেছে৷ একেবারে ভিতরে আসতে পারেনি, তাঁবুর কানাতের তলা দিয়ে বুক অবধি ঢুকিয়ে ঠেলাঠেলি করছিল আর চারদিকে হাতড়াচ্ছিল— এক বিঘত আর এলেই শশীর মাথাটা পাবে৷ এমন সময় ‘ক্ক-ড়-ড়-র-র’ শব্দে অ্যালার্ম বেজে উঠল৷ বাঘ বোধহয় ভাবল, ‘সর্বনাশ! বুঝি বা আকাশ ভেঙে পড়ল৷’ বেজায় চমকে গিয়ে অমনি সে এমন এক লাফ দিল যে, তাঁবুর দড়ি ছিঁড়ে, খোঁটা উপড়িয়ে, তাঁবু সুদ্ধু ওলটপালট! শশীর এতে ঘুম ভেঙে গেছে, সে উঠেই খচচরওয়ালাদের গাল দিতে লাগল৷ গোলমাল শুনে সকলে ছুটে এসে দেখি কী ভয়ানক ব্যাপার৷ তাঁবুর ভিতরে বাঘের বুকের দাগ আর নখের আঁচড় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ ভগবানের কৃপায়, ঠিক সময়মতো অ্যালার্ম না পড়লে আর উপায় ছিল না৷
এ-বছর আমার সঙ্গে খানসাহেব আ- দূরবিনের কাজ শিখতে গিয়েছিলেন৷ খানসাহেবের বিশাল দেহ, ছ-ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা, বুক ৪৮" কোমর ৫৪", ওজন তিন মন ছাবিবশ সের, আজি জংশনে ওজন করেছিলাম তাঁকে৷
আমি তো দশ দিনের পথ চলে ঘোড়া কিনেছি, খানসাহেব পদব্রজেই চললেন এবং প্রায় দুশো মাইল হেঁটে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু যখন কাজ আরম্ভ হল, তখন তাঁর একটু কষ্ট হতে লাগল৷ তিনি তাঁর উপযুক্ত একটা ঘোড়া খুঁজতে লাগলেন৷ তাঁর উপযুক্ত ঘোড়া কি আর সে-দেশে মেলে?
আমরা এবার শ্যামরাজ্যের সীমানায় কাজ করছিলাম৷ প্রত্যেকের সঙ্গে কুড়িজন সেপাই ও একজন হাবিলদার ছিল পাহারার জন্য৷ একজন সুবেদারের অধীনে সবসুদ্ধ আশিজন সেপাই এসেছিল৷ এই সুবেদারের সঙ্গে খানসাহেবের চিন দেশে বক্সার লড়াইয়ের সময় আলাপ হয়েছিল আর বেশ ভাবও হয়েছিল৷ খানসাহেব ঘোড়া খুঁজছেন আর উপযুক্ত ঘোড়া মিলছে না শুনে সুবেদারসাহেব ঠাট্টা করে বললেন, ‘আরে খানসাহেব, ভঁইষী লে লেও, সাওয়ারী ভি করোগে, আউর দুধ ভি পিওগে!’ খানসাহেব তো মহা খাপ্পা! এখানে বলে রাখি খানসাহেব দুধের বড়ো ভক্ত৷ আমরা টিনের দুধ দিয়ে চা খাই, কিন্তু তাঁর রোজ টাটকা দুধ চাই, আর সেই দুধের জন্য দোভাষীর উপর রোজ তম্বি করতেন, সুবেদার সেটা লক্ষ করেছিলেন৷
খানসাহেব বাহাদুর লোক ছিলেন৷ নানা দেশে তিনি ঘুরেছিলেন, অনেক কাজ তিনি করেছিলেন৷ তার ফলে কুড়ি টাকায় কাজে প্রবেশ করে পাঁচশো টাকার পেনশান নিয়েছিলেন, আর প্রথমে ‘খানসাহেব’ ও পরে ‘খানবাহাদুর’ উপাধি লাভ করেছিলেন৷ শ্যাম দেশের সীমা কমিশন, চিনা সীমা কমিশন, বক্সার যুদ্ধ, তুরস্ক-পারস্য সীমা কমিশন প্রভৃতিতে খুব কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করেছিলেন৷
আমি যখন প্রথম শান স্টেটে কাজ করতে যাই, সেই বছর ও তার আগের দু-তিন বছর খানসাহেব ও আমাদের আপিসের আরও কয়েকজন চিন সীমা কমিশন-এ কাজ করতে গিয়েছিলেন৷ সেখানে একবার একটা বীভৎস কাণ্ড হয়েছিল, তার গল্প খানসাহেবের কাছে শুনেছিলাম৷
ওই সীমা কমিশনে তাঁদের সঙ্গে কে- নামে একজন মহারাষ্ট্রীয় সার্ভেয়ার ছিল৷ লোকটি খুব কাজের, কিন্তু বড়ো মাতাল, আর সেজন্য তাকে কখনো-কখনো মুশকিলে পড়তে হত৷ যে সময়ের কথা বলছি, তখন তাঁদের তাঁবু ছিল চিনের এলাকায়৷ সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, সকলেই তাঁবুতে পৌঁছে গেছে, কিন্তু ওই মহারাষ্ট্রীয় সার্ভেয়ারটি তখনও আসেনি৷
কী হল? শত্রুর দেশ এটা, কোথায় গেল? তাদের বড়ো সাহেব ব্যস্ত হয়ে তাকে খুঁজবার জন্য চারদিকে লোক পাঠালেন৷ সকলে ফিরে এল, কিন্তু কে-র কোনো খবর পাওয়া গেল না৷ সাহেবের দোভাষী ছিল একজন চিনা, সেও খুঁজতে গিয়েছিল৷ কোনো খবর না পেয়ে সেও তাঁবু-মুখো ফিরে চলল৷ গিয়েছিল গ্রামে-গ্রামে ঘুরে, কিন্তু ফিরবার সময় মাঠের মাঝখান দিয়ে সোজা তাঁবুর দিকে চলল৷ মাঠটার মাঝামাঝি এসে একটা বিকট দুর্গন্ধে তার দম বন্ধ হবার উপক্রম হল৷
‘কীসের গন্ধ? কোত্থেকে আসছে? নিশ্চয় গ্রামের জমানো সারের কুণ্ডের মুখ খোলা পড়ে আছে আর হাওয়াতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে চারদিকে৷’
ওই-দেশে গ্রামবাসী সকলের মল একটা প্রকাণ্ড কুণ্ডে জমা করে রাখা হয়, আর বৃষ্টির জলে সে এক বিটকেল ব্যাপার হয়৷ লম্বা বাঁশের ডগায় ‘হাতা’ বাঁধা, তা দিয়ে ওই নরক-কুণ্ড থেকে তুলে-তুলে জমিতে সার দেওয়া হয়৷ একটা প্রকাণ্ড কাঠের ঢাকনি দিয়ে কুণ্ডের মুখটা রাত্রে ঢেকে রাখা হয়৷ দোভাষী চিনা, কাজেই সে বুঝতে পারল যে নিশ্চয় আজ কোনো কারণে কুণ্ডের মুখ খোলা পড়ে রয়েছে৷ ভাবল ওটাকে বন্ধ করে যাই৷
কুণ্ডের কাছে গিয়ে তো চক্ষুস্থির! কুণ্ডের ভিতরে কী যেন নড়ছে আর হাবুডুবু খাচ্ছে৷ ডাকল— উত্তর শুনেই বুঝল যে ওই সার্ভেয়ার৷ ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে ক্যাম্পে এসে সকলকে খবর দিল৷ তখন সকলে গিয়ে তাকে তুলল৷ একটা মজবুত রশি গর্তে ফেলে দিল, কে- সেটাকে তার বুকে জড়িয়ে বাঁধল, আর সবাই মিলে টেনে তাকে ওই নরক-কুণ্ড থেকে তুলল৷
বলা বাহুল্য, মদের নেশা তার আগেই ছুটে গিয়েছিল৷
তারপর কত সাবান দিয়ে যে তাকে পরিষ্কার করা হয়েছিল তা বুঝতেই পার৷
সেদিন হাট ছিল৷ ও-দেশে হাটে খুব মদ বিক্রি হয়৷ হতভাগা কাজ শেষ করে খুব মদ খেয়েছিল৷ তারপর বোধহয় টলতে-টলতে ওই মাঠের মাঝখান দিয়ে তাঁবুতে আসছিল, আর পড়েছে ওই নরক-কুণ্ডের মধ্যে!
অত শাস্তিতেও সে মদ ছাড়েনি, পরিণামে মদ খেয়ে-খেয়েই শেষে মারা গিয়েছিল৷
ওই চিন সীমা কমিশনে বুড়ো সার্ভেয়ার রামশবদও এক বছর কাজ করতে গিয়েছিল৷ সেখানে তাদের একটা খুব খাড়া পাহাড় চড়তে হয়েছিল৷ পাহাড়টাতে গাছপালা নেই, খালি ছোটো-ছোটো ঘাস আর গুড়িগুড়ি পাথর আর বেজায় খাড়া৷ রামশবদের সঙ্গে এক সাহেব অতি কষ্টে পাহাড়ে চড়ে কাজ করলেন, কিন্তু নামবার সময় প্রাণ ওষ্ঠাগত! ওঠবার বেলা তবু ঘাস ধরে-ধরে উঠেছিলেন, নামবার বেলা আর ধরবার কিছু নেই, ছোটো-ছোটো নুড়ি পাথরে পাও রাখা যায় না, পিছলে যায়৷ দু-চারবার চেষ্টা কারবার পর সাহেব তো মাটিতে বসলেন আর পিছন ছেঁচড়ে দিব্যি নেমে এলেন৷ তাঁর মোটা কর্ডের পেন্টেলুনেরও কিছু ক্ষতি হল না৷ বুড়োর আর সে রকম করবার সাহসে কুলোচ্ছে না, এদিকে সাহেব বিষম তাড়া দিচ্ছেন, ‘আরে জলদি আও না! বৈঠ বৈঠ কর উৎরো!’
কী আর করা, অগত্যা তাই করতে হল৷
এদিকে সাহেব তাড়া দিয়েই পথ চলতে শুরু করেছেন, পিছনে পায়ের আওয়াজ পেয়ে জিগেস করলেন, ‘আয় গিয়া রামশবদ?’
‘হ্যাঁ হুজুর, আয়া তো, লেকেন আধা পাৎলুন পাহাড় পর রহগিয়া!’
বেচারার জিনের পাজামার পেছন দিকটা পাহাড়ে রেখে আসতে হয়েছে!
একদিন আমরা একটা বনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি, পথে দেখি একটা গ্রামের ঘরদোর সব পড়ে রয়েছে কিন্তু জনমানুষ নেই৷ দিনের বেলায় পর্যন্ত বাঘ এসে গ্রাম থেকে মানুষ ধরে নিয়ে যেত, সেইজন্য সবাই গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে৷ কাজের জন্য এমন বনের মধ্যে দিয়েও চলতে হয়৷ একলাটি যাবার জো নেই, অমনি বাঘ এসে ধরে খাবে৷ আমাদের সঙ্গে একজন মুসো এসেছে পথ দেখাবার জন্য, সে আবার আরও দুজন মুসোকে সঙ্গে এনেছে, নয়তো আমাদের পৌঁছে দিয়ে ফিরবার সময় তাকে বাঘে ধরবে৷ বনের মধ্যে রাত হয়ে গেলে তারা ‘আড্ডায়’ থাকবে৷ আড্ডাগুলো আবার পাঁচিলঘেরা বাড়িঘর নয়, শুধু বাঁশের ঝোপের আগায় একখানি মাচা, তাইতে চড়ে বসে কাঁপতে-কাঁপতে রাত কাটাতে হয়৷
বাঘেরা বেশ জানে যে সে-বনের ভিতর তারাই রাজা৷ বেলা সাড়ে-আটটার সময় ঘোড়ায় চড়ে একটা নদী পার হচ্ছি, সঙ্গে পাঁচ-ছজন লোক৷ নদীর মাঝামাঝি এসে দেখি এই বড়ো একটা বাঘ প্রায় আমাদের রাস্তার উপরে দাঁড়িয়েই জল খাচ্ছে৷ আমরা যে আসছি সেজন্য তার কোনো ভাবনাচিন্তাই নেই৷ দু-এক চুমুক জল খায় আর মাথা তুলে এক-একবার আমাদের দেখে নেয়৷ আমরা অনেক চ্যাঁচামেচি করাতে আস্তে আস্তে উঠে, রাজার মতো চালে সেখান থেকে চলল৷ দু-চার পা যায় আর ঘাড় ফিরিয়ে এক নজর আমাদের দেখে৷ ততক্ষণে পিছন থেকে আমাদের আরও ঢের লোকজন এসে পড়েছে, সকলে মিলে মহা শোরগোল তুললে পর বাঘটা ছুটে গিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল৷
সেখান থেকে একটা গ্রামে গিয়ে দুদিন ছিলাম৷ তারপর আমাদের ওই পথেই ফিরতে হবে আর ওই জায়গাতেই রাত কাটাতে হবে৷ গ্রামের প্রধান অনেক মানা করল, কিন্তু কিছুতে আমাদের ফেরাতে না-পেরে, শেষটা দু-জন লোক সঙ্গে নিয়ে নিজেই বন্দুক হাতে আমাদের সঙ্গে চলল৷
বিকেলে দুই নালার মোহানায় এসে তাঁবু খাটিয়েছি, চাকর-বাকররা কেউ রাঁধতে, কেউ খেতে, কেউ বা বাসন মাজতে ব্যস্ত৷ আমি তাঁবুর সামনে চেয়ারে বসে, পরদিনের কাজের পরামর্শ করছি৷ এমন সময় হঠাৎ আমার মনে হল, নালার দুই মোহানার কাছে একটা বড়ো গাছের আড়াল থেকে গলা বাড়িয়ে একটা কী যেন আমাকে দেখছে! বার কয়েক আমি হঠাৎ কথা বন্ধ করে সেইদিকে তাকাতে কিন্তু কিছু দেখতে পেলাম না৷ শেষটা ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম দুটো কী জিনিস, জ্বল-জ্বল করে উঠল৷
আর বুঝতে বাকি রইল না ও-দুটো বাঘের চোখ৷ অমনি তো আমি ‘বন্দুক আন’ বলে লাফিয়ে উঠেছি, আর বাঘও আর লুকিয়ে থেকে কোনো লাভ নেই দেখে দুই লাফে একেবারে আমার পায়ের নীচে৷ ছ-সাত ফুট নীচে হবে, আর দূরও হবে ছ-সাত ফুট৷
এদিকে খালাসি মশাইরা বাঘের নাম শুনেই যে যার কাজ ফেলে, তাঁবুর মধ্যে ঢুকে দরজা এঁটে দিয়েছেন৷ বন্দুকটা এনে দিতে কারো সাহসে কুলোল না৷ অগত্যা নিজেই তাঁবুর ভিতর থেকে রিভলভারটা নিয়ে এলাম৷ কিন্তু এসে আর বাঘটাকে দেখতে পেলাম না৷ সে হল্লা শুনে বেগতিক বুঝে সরে পড়েছে৷ পাতার উপর মড়মড় পায়ের আওয়াজ শুনে, সেইদিকে দু-তিনবার আওয়াজ করলাম৷ এতক্ষণে খালাসিদের মুখে কথা ফুটল, একজন বলতে লাগল, ‘কেয়া দেখা হুঁ৷ এত্তা বড়া থা, উধারসে চলা গিয়া৷’
একটা পাহাড়ে কাজ করতে গিয়েছিলাম, সেটাকে দূর থেকে দেখলে একটা দেয়াল বলে মনে হত৷ ওই জঙ্গলে থাকতে হবে অন্তত দুই রাত, সেই মুসো বস্তি থেকে কুলি নিয়ে গিয়েছি৷ পাহাড়ের মাঝামাঝি আট-দশ ইঞ্চি চওড়া একটু পথ, মুসোদের শিকারের রাস্তা, তার নীচেই একেবারে খাড়া দেয়ালের মতো পাহাড়৷ সেই পথে আমরা যাতায়াত করি৷
একদিন সকালে উঠে আমি কাজে বেরিয়ে গিয়েছি, মুসো কুলিরাও জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেছে৷ পিছনে আছে আমার চাকর শশী, একজন দোভাষী আর শঙ্কর ও মঙ্গল নামে দুজন খালাসি৷
মঙ্গলের সঙ্গে দোভাষীদের কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছে৷ মঙ্গল তাই চটে, ‘যাই, সাহেবের কাছে রিপোর্ট করি’ বলে চলে গেছে৷ তখন দোভাষী ভাবল যে তাড়াতাড়ি গিয়ে মঙ্গলের সঙ্গে ভাব করতে হবে, কী জানি যদি সত্যি রিপোর্ট করে বসে৷ বিদঘুটে রাস্তা, পা হড়কালেই একশো-দেড়শো ফুট নীচে গড়িয়ে পড়তে হবে৷ দোভাষী ভয়ে-ভয়ে মাথা হেঁট করে পথের উপর চোখ রেখে চলেছে, আবার ক্ষণে-ক্ষণে মুখ তুলে দেখছে মঙ্গলকে দেখা যায় কি না৷
মঙ্গলের আবার তামাক খাবার রোগ৷ পথ চলতে-চলতে ক্রমাগত তাকে কলকে হাতে নিয়ে দাঁড়াতে হয়৷ দোভাষী একবার মুখ তুলে দেখতে পেল যে একটু সামনেই বাঁশঝাড়ের আড়ালে লালপানা কী একটা দেখা যাচ্ছে৷ মঙ্গলের মাথায় লাল পাগড়ি, তাহলে নিশ্চয়ই মঙ্গল ওখানে বসে তামাক সাজছে৷ দোভাষী তো হাঁপ ছেড়ে বাঁচল, আর মাথা নীচু করেই বলতে লাগল, ‘হ্যাঁ ভাই মঙ্গল, এটা কি ভালো হল? এক জায়গায় দশ-পাঁচটা হাঁড়ি থাকলে একটু-আধটু ঠোকাঠুকি হয়ই, তাই বলে কি কথায় কথায় উপরওয়ালার কাছে রিপোর্ট করতে আছে? বলতে-বলতে সে বাঁশঝাড়ের সামনে এসে পড়েছে আর মুখ তুলেই দেখে— বাবা গো, কোথায় মঙ্গল? এ যে প্রকাণ্ড বাঘ ওঁৎ পেতে রয়েছে, আর দোভাষীর দিকে চেয়ে-চেয়ে লেজ ঘুরোচ্ছে!
দোভাষী তাড়াতাড়ি তার ছোট্ট তলোয়ারখানার মুখ বাঘের দিকে ধরে নিয়ে দাঁড়াল, যদি বাঘটা লাফিয়ে পড়ে!
বাঘটাও উঠে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু মাঝখানে বাঁশঝাড়, তাই আর লাফাবার সুবিধা পাচ্ছে না৷ দোভাষী ভাবছে শশী আর শঙ্কর তার পিছনে, শশী এখুনি বন্দুক চালাবে, কিন্তু শশী যে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে জুতোর ফিতে বাঁধছে তা কি আর সে জানে! শেষে যখন একটুখানি মুখ ফিরিয়ে দেখে বুঝল যে পিছনে কেউ নেই, তখন সে চিৎকার করে উঠল৷ চিৎকার কি সহজে বের হতে চায়? ভয়ে বেচারার গলা শুকিয়ে গেছে৷ যাই হোক, একটা গলাভাঙা গোছের আওয়াজ শশীর কানে পোঁছুল, আর তখুনি তারা ‘ভয় নেই, ভয় নেই’ বলে ছুটে এল৷ বাঘটাও তাই দেখে থতমত খেয়ে ‘হূপ’ বলে গাল দিয়ে ছুটে পালাল৷ দোভাষী তখন ঠকঠক করে কাঁপছে, ঘামে তার গায়ের কাপড় সমস্ত ভিজে গেছে, কথা বলতে পারছে না৷ অনেক কষ্টে বললে, ‘বাঘ!’
এরপর আর সে কখনো একলা পথ চলত না৷
এই শান স্টেট থেকে আমি দুটো বাঘের চামড়া এনেছিলাম৷ এই বাঘ-মারার ইতিহাসটি বেশ৷ একজন লোক বনে হরিণ মারতে গিয়েছিল৷ একটা হরিণের পায়ের দাগ ধরে তাকে খুঁজে বের করে সে গুলি করতে গেল, কিন্তু বন্দুকে আর আওয়াজ হল না, যাকে বলে মিস-ফায়ার হওয়া৷ ঘোড়া তুলে আবার মারতে গেল, এবারও আওয়াজ হল না৷ লোকটা ভাবল বুঝি ক্যাপটাই খারাপ, ট্যাঁকে আরও ক্যাপ ছিল, তার একটা বের করতে গেল৷ কোঁচড় থেকে ক্যাপ বের করতে গিয়ে মুখ ফিরিয়েই দেখে তার পিছনেই প্রকাণ্ড এক বাঘ, সাত-আট ফুট দূরেও নয়৷ এই তাকে ধরে আর কি! তখন সে ভয়ের চোটে সেই খারাপ ক্যাপসুদ্ধই বন্দুক তুলে ঘোড়া টিপে দিলে, আর কী আশ্চর্য! গুড়ুম করে বন্দুকের আওয়াজ হল, সঙ্গে-সঙ্গে বাঘের মগজও উড়ে গেল৷ ভগবান যাকে রক্ষা করেন, বাঘও তাকে মারতে পারে না৷
অন্য বাঘটাকে মেরেছিল একটি বারো বছরের ছেলে৷ দুপুরবেলা মুসোদের গ্রামের মেয়ে-পুরুষরা সকলে খেতে কাজ করতে গেছে, গ্রামে আছে কেবল ছেলেপিলের দল৷ সে-দেশের ঘর হয় মাচার উপর, উপরে মানুষরা থাকে আর নীচে থাকে তাদের পোষা জন্তুজানোয়ার৷ দিনের বেলাতেই একটা বাঘ একজনের ঘরের নীচে ঢুকে একটা শুয়োর ধরেছে, আর শুয়োরটা চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করে তুলেছে৷
সেই ঘরে ছিল ওই বারো বছরের ছেলেটি আর তার বাবার গুলিভরা বন্দুক৷ সে আস্তে-আস্তে উঠে, মাচার বাঁশের ফাঁক দিয়ে এক গুলিতেই বাঘমশাইয়ের শুয়োর খাবার শখ মিটিয়ে দিল৷ তারপর গ্রামসুদ্ধ লোক মজা করে ওই বাঘের মাংস খেল!
ওই বছরই আমি একটা পাহাড়ে দূরবিনের কাজ করতে গিয়েছিলাম৷ গ্রাম অনেক দূরে, তাই মনে করেছিলাম যখন পাহাড়ের উপর জল আছে তখন সেখানেই জলের কাছে তাঁবু খাটাব আর দু-রাত ওইখানেই কাটাব৷ গ্রামের লোকরা কিন্তু বেঁকে দাঁড়াল৷ ‘ও-পাহাড় ভালো না৷ ওখানে ‘‘নাট’’ (অপদেবতা) আছে, লোকের উপর অত্যাচার করে, হাতি দিয়ে পিষিয়ে মারে,’ ইত্যাদি৷
হয়তো জঙ্গলে বুনো হাতি আছে সেইজন্য অনিচ্ছা৷ পাহাড়টার চুড়োয়-চুড়োয় বুনো হাতির রাস্তা৷ রাজার লোক আমার সঙ্গে ছিল, সে গ্রামের প্রধানকে অনেক বুঝিয়ে বলল, কিন্তু কোনো ফল হল না৷ তাদের মহা ভয় পাহাড়ে যদি সরকারের লোকের কোনো অনিষ্ট হয়, তাহলে রাজা হয়তো আবার তাদের ধরে টানাটানি করবেন৷
আমি দেখলাম তাদের যখন অত অনিচ্ছা, তখন জোর-জবরদস্তি করে নিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না৷ জিগগেস করলাম, ‘যদি আমরা খুব ভোরে, এই চারটে-সাড়েচারটেয় কাজে বেরোই তাহলে কখন চুড়োয় পৌঁছব?’ তারা হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘সূর্য এইখানে উঠলে পর,’ আন্দাজ বেলা দশটায়৷ আমি বললাম, ‘আমি যদি এইখানেই তাঁবু রেখে দিই আর ভোরে বেরিয়ে, কাজ সেরে, তোমাদের গ্রামেই শুই, তাহলে যেতে পারবে তো?’ তারা মহা খুশি হয়ে বলল, ‘নিশ্চয়ই৷ যদি সন্ধ্যা হয়ে যায়, বড়ো-বড়ো মশাল জ্বেলে চলে আসব৷ সঙ্গে বন্দুক নেব৷’
সেই বন্দোবস্তই করলাম৷ ভোর সাড়ে-চারটে-পাঁচটায় বেরিয়ে, কাজ করে, সন্ধ্যা সাড়ে-সাতটা-আটটার মধ্যে তাঁবুতে ফিরে এলাম৷
এই ঘটনার দুবছর পরে আমাদের আপিসের এক সাহেব ওই পাহাড়ে জরিপের কাজ দেখতে গিয়েছিলেন৷ গ্রামের লোকেরা তাঁকেও বাধা দিয়েছিল, কিন্তু তিনি সে কথা শুনবেন কেন?
সকালে উঠে সাহেব সার্ভেয়ারের কাজ দেখতে বেরিয়ে গেছেন, লোকজনদের হুকুম দিয়ে গেছেন যে পাহাড়ের সব চেয়ে উঁচু চুড়োটার নীচে যেন তাঁবু লাগায়৷ পথ নেই, সেইজন্য তারা হাতির রাস্তা ধরে, খচচরের পিঠে জিনিসপত্র বোঝাই করে উপরে উঠল৷ বিকেলে চুড়োর নীচে পৌঁছে দেখল সেখানে বেশ জল আছে, কাজেই সেখানেই তাঁবু ফেলল৷ গ্রামের লোকেরা তাদের পৌঁছে দিয়েই ফিরে এল, ও-পাহাড়ে তারা কিছুতেই থাকবে না৷
এদিকে সাহেব কাজে বেরিয়েছেন৷ তিনিও কাজ শেষ করে ওই জায়গাতেই আসবেন, তবে তাঁকে সমস্ত বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত ঘুরে সার্ভেয়ারের কাজ দেখতে দেখতে আসতে হবে৷ সেদিন কিন্তু সাহেবের কপালে তাঁবুতে পৌঁছনো ঘটে উঠল না৷ বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে রাত হয়ে গেল৷ অন্ধকারে চলতে না পেরে সাহেব ও তাঁর সঙ্গের লোকরা পাহাড়ের উপরে এক জায়গায় গাছের নীচে ধুনি জ্বালিয়ে শুয়ে রইলেন৷ ভাবলেন সকালে উঠে তাঁবুতে যাবেন৷
এদিকে তাঁবুতে সকলে তাঁর পথ চেয়ে বসে রয়েছে, কখন সাহেব আসবেন, কিন্তু সাহেবের আর দেখা নেই৷ ডাকাডাকি করে বেয়ারাদের গলা ধরে গেল, কিন্তু সাহেব তখন ঢের দূরে, সে-ডাক শুনতে পেলেন না৷
শেষটা তারা আশা ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল৷
অনেক রাত্রে খচচরগুলোর ছুটোছুটিতে সকলের ঘুম ভেঙে গেছে৷ ব্যাপারখানা কী? এই ভেবে যেমন একজন খালাসি তাঁবুর দরজা ফাঁক করে গলা বের করেছে, আর অমনি দেখে— ওরে বাবারে, এয়া বড়ো দাঁতওয়ালা হাতি, তার পিছনে আরও হাতি৷ সে আস্তে-আস্তে সকলকে সাবধান করে দিয়ে যেমন তাঁবুর পিছন দিক দিয়ে বেরোতে যাবে অমনি হাতিও তাঁবুর উপর এসে পড়ল৷ তখন সকলে গড়িয়ে-গড়িয়ে খাদের ভিতর ঢুকে কোনোরকমে প্রাণ বাঁচাল, আর হাতিগুলো সেই রাস্তায় চলে গেল৷ তাঁবু-টাঁবু যা কিছু তাদের সামনে পড়েছিল, সব তারা শুঁড় দিয়ে ছুড়ে ছুড়ে খাদের মধ্যে ফেলে দিয়ে গেল৷ খচচরগুলোও রাস্তার উপর বাঁধা ছিল তারা সকলে দড়ি-টড়ি ছিঁড়ে পালাল, শুধু একটা খচচর মজবুত নতুন দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল, সে বেচারা পালাতে পারেনি৷ হাতিরা সেটাকে পা দিয়ে মাড়িয়ে একেবারে পিষে দিয়ে গেল৷
সকালে সাহেব তাঁবুতে ফিরে তো একেবারে হতভম্ব!
এবারকার মতো কাজ শেষ করে আমরা ব্যাঙ্গালোরে, আমাদের হেডকোয়ার্টারে ফিরে গেলাম৷
• ৬ • ১৯০৩—১৯০৪৷ কেংটুং রাজ্য৷ এবছর দু-জন সাহেব আমার সঙ্গে দূরবিনের কাজ শিখতে গিয়েছিলেন৷ আমি দূরবিনের কাজ করব আর সাহেবরা চোদ্দো-পনেরোদিন আমার সঙ্গে-সঙ্গে থেকে কায়দাকানুন শিখে নিজের-নিজের কাজে চলে যাবে৷ আমাদের সর্বদাই রেলের লাইন ছেড়ে কুড়ি-বাইশদিনের পথ চলতে হয়, এবার তিনজনে একসঙ্গে যাচ্ছি, গল্পগুজবে বেশ পথ চলাটা আরামে কাটালাম৷ সকলেই ঘোড়া কিনেছিলাম, কিন্তু দুঃখের বিষয় ঘোড়া কটাই সব বুনো৷ একে তো এইরকম হ্যাটকোটওয়ালা অদ্ভুত জীব তারা আগে কখনো দেখেনি, তার উপর আবার তাদের পিঠে নিয়মমতো বড়ো একটা কেউ চড়েনি৷ কাজেই ঘোড়াগুলোকে বাগ মানাতে যে আমাদের বেশ কষ্ট করতে হয়েছিল সেকথা বলাই বাহুল্য৷ এক-এক সময়ে সামান্য কারণে বা অকারণে হঠাৎ দৌড় দেয়, আবার কখনো বা তাদের মেজাজ বিগড়ে যায়, আর কিছুতেই নড়বে না, চার পা শক্ত করে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে!
ভোরে বেরিয়েছি, কুয়াশায় চারদিক ঢাকা৷ আগে-আগে চলেছে একজন শান পথ দেখিয়ে, তার পিছনে আমি, আমার পিছনে এক সাহেব, তার পিছনে অন্য সাহেব, তার পিছনে তিনজন সহিস৷ একটা বেশ বড়ো নালার কিনারায়-কিনারায় তিন-চার ফুট চওড়া রাস্তা এঁকেবেঁকে চলেছে, রাস্তার অন্য পাশে খাড়া পাহাড়৷
চলতে-চলতে সামনে একটা পাহাড়ি নদী পড়ল, তাতে বেশ জল আর স্রোত, কিনারাটা খাড়া আর বেজায় পিছল৷ শানটিকে পা টিপেটিপে নামতে দেখেই আমি ঘোড়ার রাশ টেনে ধরেছি, কিন্তু তবু একটু পিছলে গেল৷ চার-পাঁচ ধাপ চলার পর আমার খেয়াল হল যে পিছনের দুজনকে সাবধান করে দেওয়া দরকার৷ ডেকে বললাম— সাবধান, লুকআউট, আর সঙ্গে—সঙ্গে ঝপাং করে জলে পড়বার আওয়াজ! ফিরে দেখি একজন সাহেবের মাথা থেকে কোমর অবধি জলের নীচে খালি ঠ্যাং দুটো উপরে বেরিয়ে রয়েছে৷ টুপিটা জলে ভেসে যাচ্ছে৷
‘আরে, আরে,’ বলে সহিসটা দৌড়ে এসে সাহেবকে তুলল, টুপিটা ধরল৷
আর আমার সেই হতভাগা বুনো ঘোড়া, ওই পিছল ঢালু জায়গায় পৌঁছে ওই জলের স্রোত দেখে ভড়কে গিয়ে, হঠাৎ সামনের পা দুটো শক্ত করে আর মাথাটা মাটির দিকে ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে আর আমি তার মাথার উপর দিয়ে উল্টে একেবারে জলে!
বেচারা আমরা! ওই শীতের মধ্যে প্রায় সমস্তদিন ভিজে কাপড়ে থাকতে হল৷
আরেকদিন আমি একলাই চলেছি, সঙ্গে সহিস আর একজন খালাসি, আগে-আগে লাংরিয়া (পথ-প্রদর্শক)৷ একটা নালা পার হতে হবে, তাতে একহাঁটু কাদা আর দু-তিন ফুট উঁচু কিনারা৷ ঘোড়া তো নালায় নামল, কিন্তু অন্য পাড়ে আর কিছুতেই উঠবে না৷ তিন-চারবার চেষ্টা করেও তাকে ওপারে তুলতে পারলাম না৷ এক-একবার সামনের দু-পা পাড়ের উপর তুলে দেয় বটে, কিন্তু তক্ষুনি আবার নামিয়ে নেয়৷ একবার যেই সামনের দু-পা পাড়ের উপর তুলেছে অমনি আমি সপাং করে দু ঘা চাবুক লাগিয়েছি তার পিছনে, আর হতভাগা পিছনের পা দুটো গুটিয়ে নিয়ে, ঠিক কুকুরের মতো কাদার মধ্যে বসে পড়েছে! আমি তো কাদায় একেবারে ঢুকে গেলাম, ঘোড়াটাও ডিগবাজি খেয়ে আমার উপর দিয়ে ডিঙিয়ে গেল৷ সহিস ও খালাসি ‘হায়, হাঁয়’ করে ছুটে এল, না জানি কী হয়েছে! কিন্তু একহাঁটু কাদার মধ্যে পুঁতে গিয়েছিলাম বলে আমার কোনো চোটই লাগেনি, খালি কাদা মেখে ভূত!
এমনি করে হাসি-তামাশার মধ্যে নিজের-নিজের কাজের জায়গায় পৌঁছলাম৷ প্রায় দুশো-সওয়াদুশো মাইল পথ-চলার কষ্ট যেন বুঝতেই পারলাম না৷
একদিন একটা পাহাড়ে উঠেছি, দেখি সামনে অন্য একটা পাহাড়ের চুড়োর জঙ্গল না-কাটালে কাজ করা অসম্ভব৷ কিন্তু কুলিরা কিছুতেই ওই চুড়োর জঙ্গল কাটবে না৷ সেখানে নাকি তাদের ‘নাট’ থাকেন, সেখানকার গাছ কাটলে তিনি চটবেন, আর চটলে বড়োই মুশকিল হবে৷ কিন্তু সরকারি কাজ তো আর এসব কথায় বন্ধ থাকতে পারে না, কাজেই আমাদের খালাসিদের নিয়েই জঙ্গল কাটাতে হল৷ প্রায় সমস্ত গাছই কাটা হয়ে গেছে, শুধু দুটো বড়ো-বড়ো গাছ বাকি আছে, এমন সময় সেখানকার দুজন মাতববর লোক এসে বললে, ‘ও দুটি আমাদের পুজোর গাছ, ওদের ছেড়ে দিন৷’ তাই আর ও-গাছ দুটিকে কাটালাম না৷
এর পরের বছর আবার সেই পাহাড়ে আমার যাবার দরকার হয়েছিল৷ গিয়ে দেখি পাহাড়ের উপরের গ্রামটা আর সেখানে নেই, দু মাইল দূরে আরেকটা পাহাড়ে চলে গেছে৷ প্রধানকে জিগগেস করলাম, ‘গ্রাম ছেড়ে চলে এলে কেন?’
প্রধান বললে, ‘সে তো তোমাদেরই দোষ৷ তোমরা সেই যে বন কেটে ফেলেছিলে তাতে দেবতা চটে গিয়ে বাঘ হয়ে এসে আমাদের কি যেমন-তেমন সাজা দিয়েছে ভেবেছ! মানুষ গোরু শুয়োর সব মেরে আর কিছু বাকি রাখেনি৷ কাজেই আমাদের পালিয়ে আসতে হয়েছে৷’
বন আর পাহাড়ের দেশ, পদে-পদেই বিপদের সম্ভাবনা৷ কাজেই ভূতের ভয়, বাঘের ভয়, ভালুকের ভয়, হাতির ভয়, লোকের মনে লেগেই আছে৷ বনের দেবতা আর ভূতের ভয় এদের বড্ড বেশি, আমি আগে সে কথা জানতাম না৷
এই পাহাড়টাতে বাস্তবিকই বড্ড বেশি বাঘ৷ বাঘের জ্বালায় গ্রাম ছেড়ে তো সকলে পালিয়ে গেল, দেবতাই এইসব করেছেন বলে নিজেদের মনকে প্রবোধ দিল আর দেবতাকে সন্তুষ্ট করবার জন্য পাহাড়ের উপর ঘটা করে পুজো দিল৷ বাঘের সংখ্যা কিন্তু তাতে একটুও কমল না৷
আমি ভোরবেলায় ওই পাহাড়ের চড়াই উঠছি৷ আমি উঠছি ঘোড়ায় চড়ে আর বাঘমশাইও হেলতে-দুলতে ওই পথেই নামছে! হঠাৎ দু-জনে চোখাচোখি, আর অমনি ‘হূপ’ করে শব্দ করে দে এক লাফ, হুড়মুড় করে একেবারে কুড়ি-পঁচিশ ফুট নীচে খাদের ভিতর পড়ল৷ একবার চেয়েও দেখল না যে কোথায় পড়ছে!
আরেকবার ওই পাহাড়ের উপর দিয়ে আমাদের দু-জন ডাকওয়ালা যাচ্ছিল৷ তাদের বিশেষ করে বলে দেওয়া হয়েছিল, যেন খুব তাড়াতাড়ি হেঁটে যায় আর বেশ রোদ থাকতেই যেন পাহাড়ের অন্যদিকে নীচের গ্রামে পৌঁছে যায়, কেননা ওখানে বড়ো বাঘের ভয়!
তাদের আরও বলা হয়েছিল যে পাহাড়ের দুই-তৃতীয়াংশ পার হয়ে গেলে দুটো রাস্তা পাবে৷ একটা ডান দিকে পাহাড়ের ধারে-ধারে গেছে, অন্যটা ছোটো রাস্তা পুবমুখী নীচে নেমে গেছে৷ ডানদিকেরটা বুনো রাস্তা, ওপথে গেলে জঙ্গল—জঙ্গলে ঘুরে মরবে৷ ওই পুবের ছোটো রাস্তা দিয়েই যেতে হবে, আর ওই দোবাট থেকে পাঁচ-ছয় মাইল এগিয়ে গেলেই গ্রাম পাবে৷
ডাকওয়ালারা দু-জনেই অযোধ্যার লোক৷ বুদ্ধির দোষেই হোক বা অন্য কারণেই হোক, তারা শেষ পর্যন্ত ডানদিকের রাস্তা দিয়েই চলে গেল৷ তিন-চার ঘণ্টা চলার পর হুঁশ হল— তবে না বলেছিল যে রাস্তাটা নীচে নেমে যাবে? আর দোবাট থেকে পাঁচ-ছয় মাইল পরেই গ্রাম পাবে? এ যে পাহাড়ের উপরে-উপরেই চলেছে, আর শেষই হচ্ছে না৷ তবে বা ওই ছোটো রাস্তাটাই ঠিক ছিল৷ ওঠ গাছে, দেখ কোনদিকে গ্রাম৷ একজন গাছে উঠে বলল, পুবদিকে, অনেক দূরে, পেছনে খেত দেখা যাচ্ছে৷ তখন গাছ থেকে নেমে ছুটোছুটি করে তারা সেই দোবাটে ফিরে চলল৷ কিন্তু কিছু দূর গিয়েই বুঝতে পারল যে দোবাটে পৌঁছবার বহু আগেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে৷ তখন তারা বাঘের কথা মনে করে তাড়াতাড়ি রাত কাটাবার জায়গা খুঁজতে লাগল৷ পাহাড়ের উপর শিকারিদের একটা বিশ্রামের জায়গা ছিল, সেখানে গাছের নীচেটা পরিষ্কার আর কাছেই একটা ছোটো নালায় জল আছে৷ তারা ভাবল এইখানেই রাত কাটিয়ে, ভোরে দোবাটে ফিরে গিয়ে, ছোটো রাস্তাটা ধরে গ্রামে যাবে৷
গাছতলায় জিনিসপত্র রেখে একজন কাঠ জড়ো করতে লাগল৷ রান্না করতে হবে, ধুনি জ্বালতে হবে, বলে দিয়েছে এ পাহাড়ে বড়ো জানোয়ারের ভয়৷ অন্য লোকটি বালতি নিয়ে জল আনতে গেল৷ অমনি— ‘হুঁ-উ-ম-ম’ বন-জঙ্গল কেঁপে উঠল, যেদিক থেকে তারা ফিরেছে সেই দিক থেকে বাঘ ডাকল৷ দু-জনেই হাতের কাজ ফেলে দৌড়ে এসে গাছের গোড়ায় উপস্থিত হল৷ আবার ‘হুঁ-উ-ম-ম’— যেন একটু কাছে! আবার ‘হুঁ-উ-ম-ম’— আরও কাছে! বাঘটা এইদিকেই আসছে আর একটু পর-পর হুঙ্কার ছাড়ছে৷
হুটোপুটি করে দু-জনেই গাছে উঠল, আর বেশ উঁচুতে উঠে, ঘন পাতার আড়ালে লুকিয়ে রইল৷ পাছে পড়ে যায়, এই ভয়ে পাগড়ি খুলে গাছের ডালের সঙ্গে নিজেদের বেশ করে বাঁধল৷
বাঘও ‘হুঁ-উ-ম-ম’ করতে করতে গাছে নীচে এসে হাজির হল৷ এসেই সোজা গিয়ে ওদের লোটা-কম্বল শুঁকতে আরম্ভ করল আর এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল৷ কোথাও কিছু না দেখতে পেয়ে আবার হুঙ্কার! আবার খোঁজ-খোঁজ, আবার হুঙ্কার! তারপর জলের ধারে চলে গেল৷ সেখানে তাদের বালতি দেখেই হোক, বা অন্য কোনো কারণেই হোক, আবার গর্জন৷ জল খেয়ে উপরে উঠে এসে এক-একবার জিনিসপত্র শুঁকে দেখে, আবার হুঙ্কার!
কতক্ষণ ধরে এই রকম করে, তারপর গাছতলায় বাঘ বসে রইল৷ কিছুক্ষণ বসে থাকে, আবার উঠে পায়চারি করে, লোটাকম্বল শোঁকে আর হঙ্কার দেয়৷ লোক দুটির অবস্থা বোঝাই যায়৷ বাঘের ভয়ে শীত কোথায় পালিয়ে গিয়েছে, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গিয়েছে৷ সমস্ত রাত বাঘটা ওই রকম করল, তারপর ভোরের দিকে ডাকতে ডাকতে, যেদিক থেকে এসেছিল, সেইদিকেই আবার চলে গেল৷
ডাকওয়ালারা বেলা আটটা-নটা অবধি গাছের উপরেই বসে রইল, তারপর বাঘের আর কোনো সাড়াশব্দ নেই দেখে, নেমে এসে, জিনিসপত্র নিয়ে দে দৌড়! খাওয়া-দাওয়া চুলোয় গেল, একেবারে গ্রামে পৌঁছে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল! গ্রামের প্রধান সমস্ত শুনে তাদের খুব বকুনি দিল— এ পাহাড়ের বাঘ বড়ো দুষ্টু, মানুষখেকো৷ অত করে বলে দেওয়া সত্ত্বেও ও-রাস্তায় গেলে কেন?
আরেকটা পাহাড়ে এক সাহেবের তিনটে খচচর বাঘে খেয়েছিল৷ সাহেবের আগে আমিও ওই পাহাড়ে কাজ করেছিলাম৷ পাহাড়ের দক্ষিণ দিকে এক মাইল দূরে একটা আড্ডা আছে, জঙ্গলের আড্ডা৷ নিতান্ত অপারগ না হলে কেউ ওই আড্ডায় থাকে না, আর ওখানে রাত কাটাবার দরকার হলে, অনেক লোক একসঙ্গে জুটে তবে ক্যাম্প করে৷
আমারও ইচ্ছা ছিল ওখানে ক্যাম্প করব, কিন্তু গ্রামের লোকেরা মানা করল, ‘ওখানে যেয়ো না, বড়ো বাঘের ভয়, আমরাও ওখানে কখনো রাত কাটাই না, একলা ও-পথে যাই না৷’ আমি ওই আড্ডায় না গিয়ে পাহাড়ের উত্তরে, প্রায় চার মাইল দূরে মুসোদের গ্রামে ছিলাম৷ বেজায় চড়াই আর বিশ্রী রাস্তা৷ সাহেবেরও ওই পাহাড়ে একটু কাজ ছিল৷ তিনি বললেন, ‘ওই চার মাইল চড়াই আমি উঠছি না৷ জঙ্গলের আড্ডাতেই থাকব৷’’
আমি অনেক করে মানা করলাম, গ্রামের লোকেরাও বলল, কিন্তু সাহেব কিছুতেই শুনলেন না৷ ওই জঙ্গলের আড্ডাতেই ক্যাম্প করলেন৷ বড়ো ধুনি জ্বালানো হল, সঙ্গের খচচরগুলোকে তার পাশেই বেঁধে রাখা হল৷ খাওয়া-দাওয়ার পর সকলে শুয়ে পড়ল৷ অনেক রাতে চ্যাঁচামেচিতে সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল৷ ‘কেয়া হুয়া?’ শুনলেন তিনটি খচচর বাঘে নিয়ে গেছে, আর বাঘও একটা নয়৷ ধুনি জ্বালানো হয়েছিল বটে কিন্তু পাহারা রাখা হয়নি৷ ধুনি নিভে গিয়েছিল৷
খচচরওয়ালা বেচারিরা তো একেবারে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল৷ সাহেবেরও বড্ড রাগ হল, ভোরে উঠেই খুঁজতে বেরোলেন৷ খাদের ভিতর সন্ধান মিলল৷ একটার অর্ধেক খেয়েছে, অন্য দুটো আস্তই রয়েছে৷ সাহেব হুকুম দিলেন, ‘গাছে মাচা বাঁধো, আমি বাঘ মারব৷ এখন কাজে যাচ্ছি, তিনটের সময় ফিরে চারটের সময় মাচায় বসব৷’
চিনা খচচরওয়ালা তো মহা খুশি৷ সকলে মিলে মাচা বেঁধে সব ঠিকঠাক করে রাখল৷ সাহেব কাজ থেকে ফিরে, চা খেয়েই, বন্দুক টোটা ইত্যাদি নিয়ে বাঘ মারতে চললেন, চারটেও বাজেনি তখনও৷ গিয়েই তো চক্ষুস্থির! সোজা তালগাছের মতো একটা গাছ, তার কুড়ি-পঁচিশ ফুট উপরে একটা ডাল বেরিয়েছে, সেইখানে মাচা৷
‘উঠব কী করে?’
খালাসিরা বলল, ‘হুজুর, ওই মোটা লতার মই তৈরি করেছি, তাই বেয়ে উঠতে হবে৷ আমরাও তাই করেছিলাম৷’
সাহেবের পায়ে জুতো, কাজেই অতি সন্তর্পণে উঠতে হবে৷ বন্দুকটা একটা খালাসির হাতে দিয়ে, তাকে তাঁর পিছনে-পিছনে উঠতে বলে, সাহেব তো গাছে চড়তে আরম্ভ করলেন৷ কতকটা চড়েছেন, আর অমনি একটু দূরেই ‘হুঁ-উ-ম-ম’— বাঘ ডেকে উঠল৷ বোধহয় পেট ভরে খেয়ে একটু আয়েস করছিল আর এরা গিয়ে বেচারার কাঁচা ঘুমটা ভেঙে দিয়েছেন, কিংবা হয়তো কিঞ্চিৎ জলযোগের জন্য আসছিল, এদের দেখে বিরক্তি প্রকাশ করল৷ যাই হোক, সেই ‘হুঁ-উ-ম-ম’ শুনেই তো খালাসির হাত থেকে বন্দুক নীচে পড়ে গেল আর সেও লাফিয়ে পড়ে দে দৌড়! সাহেবও লাফিয়ে নেমে, বন্দুক ঘাড়ে করে একেবারে তাঁবুতে৷ বাঘ মারা আর হল না৷
• ৭ • ১৯০৪-১৯০৫ বেলুচিস্থান৷ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) পরের বছর আবার শান স্টেটে যাব বলে সব ঠিক৷ এক মাসের ছুটি নিয়ে কলকাতা হয়ে, কয়েকদিন সেখানে কাটিয়ে তবে যাব৷ হঠাৎ শিমলা থেকে তারে হুকুম এল: একে এক্ষুনি কোয়েটা পাঠিয়ে দাও৷ ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হল বেলুচিস্থানের উপযোগী কাপড়-চোপড় তৈরি করে নেবার জন্য৷ তাড়াহুড়ো করে কাপড়-চোপড় করিয়ে ট্রেনে চেপে বসলাম৷ ব্যাঙ্গালোর থেকে কোয়েটা লম্বা পথ৷ পুণা, বম্বে, বরোদা, মাড়োয়ার, হায়দারাবাদ ও সিবি হয়ে তবে কোয়েটা৷ পথে সিবিতে প্লেগ ক্যাম্পে আমাকে দু-দিন আটকিয়ে রাখল, কেননা আমি ব্যাঙ্গালোর থেকে আসছি আর সেখানে প্লেগ হচ্ছিল৷
লম্বা পথ, ট্রেনে চলতে-চলতে একেবারে প্রাণ আইঢাই! রাজপুতানার মরুভূমিতে তো বালিতে নাক-চোখ বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়৷ আর ভীষণ গরম!
কোয়েটা পৌঁছে কাজে বেরোবার জন্য সব গুছিয়ে নিয়েছি, পরদিন ভোরে রওয়ানা হব, আবার তার এল: কোহাট যাও৷ কাজকর্ম অন্য লোকের জন্য ছেড়ে দিয়ে আবার ট্রেনে চাপলাম, গেলাম কোহাট৷ কোহাট থেকে বন্নু আর টর্চি উপত্যকা৷ কোহাট অবধি রেল, তারপর টঙ্গা৷
এত লম্বা ট্রেন যাত্রা আমি জন্মে কখনো করিনি৷ কোথায় ব্যাঙ্গালোর আর কোথায় কোহাট! কতদিন পর্যন্ত খটাং-খটাং খট-খট করে আমার কানের ভিতরেও ট্রেন চলেছিল৷
আমি বেলুচিস্থানে যে কাজ ফেলে এলাম, দু-দিন পরে আমাদের আপিসের এক সাহেব সেই কাজ করতে গেলেন৷ আফগানিস্থানের সীমানা পর্যন্ত কাজ করতে হবে৷ সে সব দেশের লোকেও আইনকানুন বড়ো একটা মানে না৷ তাই সাহেবের সঙ্গে বারো-চোদ্দোজন সিপাই গেছে৷ তারা রাত্রে তাঁবু পাহারা দেবে, দিনে তাঁর সঙ্গে কাজ করবে৷ এই সিপাইরাও ওই দেশেরই লোক— ‘বেলুচ’৷ তাদের উপর একজন হাবিলদার ছিল৷ সিপাইদের মধ্যে অবার দুই দল ছিল, দুই দলের মধ্যে একটু মনোমালিন্যও ছিল, সেইজন্য প্রায়ই খুঁটিনাটি নিয়ে কথা কাটাকাটি লেগেই থাকত৷ হাবিলদার এক দলকে একটু অনুগ্রহ করত, সেইজন্য অন্য দল বিশেষ সন্তুষ্ট ছিল না৷ সে-দলের একজন সিপাই হাবিলদারের নেকনজরে ছিল না, সম্ভবত তার উপর কিছু-কিছু জুলুমও চলত৷ সেও দু-একবার সাহেবের কাছে নালিশ করতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু সিপাইরা তাঁর অধীন নয় মনে করে তিনি তার নালিশে কান দেননি৷
এর ফলে তাদের গোলযোগ আরও গুরুতর হয়ে উঠল, এমনকী সঙ্গিন অবস্থা হয়ে দাঁড়াল৷ এই সময়ে প্রায় একেবারে আফগান সীমার উপরে সাহেবের তাঁবু পড়ল৷ পাঁচ-ছয়শো গজ মাত্র ব্যবধান৷ সেইদিনই রাস্তায় ওই সিপাই আর হাবিলদারের মধ্যে কিছু বচসা হয়েছে৷ সিপাই তাঁবুতে এসেই সাহেবের কাছে নালিশ করল যে হাবিলদার তার উপর অন্যায় জুলুম করেছে ইত্যাদি৷ এবারও সাহেব শুনলেন না৷ হাঁড়িপানা মুখ করে সিপাই বসে রইল৷ রাত্রে হাবিলদার ওরই ঘাড়ে পাহারা চাপাল৷
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সকলে শুয়েছে, সিপাই পাহারায় দাঁড়াল৷ দু-ঘণ্টা বাদে অন্য সিপাই এসে তাকে বদলি করবে৷ সাহেবের তাঁবুর পাশেই সিপাইদের তাঁবু, মাঝখানে কয়েক ফুট জায়গা৷ রোজ পাহারাওয়ালা সিপাই তাঁবুর সামনে পাইচারি করে, কিন্তু সেদিন ওই সিপাই তাঁবুর চারদিকে ঘুরতে লাগল আবার মাঝে-মাঝে দুই তাঁবুর মাঝখান দিয়েও যাতায়াত করতে লাগল, আবার যেন কখনো-কখনো দুই তাঁবুর মাঝে দাঁড়িয়ে কী দেখতে বা ভাবতে লাগল৷
সাহেবের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, আর শুয়ে-শুয়ে ভাবছিলেন, আজ পাহারাওয়ালা অমন করছে কেন? একবার ভাবলেন বাইরে গিয়ে দেখি ব্যাপার কী, আবার তক্ষুনি তন্দ্রা এল৷ চোখ বুজতে-না-বুজতে দুড়ুম করে বন্দুকের আওয়াজ, পাকড়ো-পাকড়ো চিৎকার! সকলেই উঠেছে, সাহেবও পিস্তল হাতে তাঁবু থেকে বের হলেন৷
‘কী ব্যাপার? কে গুলি চালল?’
ওই সিপাই৷
আলো জ্বালা হল৷ হাবিলদারকে প্রাণে মেরেছে, আরও দু-তিনজন সিপাই জখম হয়েছে৷ তাদেরও অবস্থা খারাপ৷ সিপাইটা আরও একটা রাইফল আর দু-তিন ব্যান্ডোলিয়ার কার্তুজ নিয়ে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়েছে৷ আলো জ্বালানো হল বটে, কিন্তু পরক্ষণেই নিভিয়ে দিতে হল৷ কারণ, হতভাগা সিপাই একটু দূরে একটা পাহাড়ের উপর আশ্রয় নিয়েছিল, আর একটু পর-পর লন্ঠনের আলো তার নজরে পড়তেই পিং করে গুলি ছুড়ছিল৷
সকালে লোকজন সিপাইদের ওখানে রেখে, রাইফল আর কার্তুজ নিয়ে সাহেব একলাই গেলেন চোদ্দো মাইল দূরে কেল্লায় খবর দিতে৷ তারপর সেখান থেকে ডাক্তার, সিপাই ইত্যাদি এসে সকলকে নিয়ে গেল৷ দু-তিনদিন বিশ্রাম করে, অন্য দল সিপাই নিয়ে, সাহেব আবার কাজ শুরু করলেন৷
সিপাইটার আর কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না, সে আফগান এলাকায় চলে গিয়েছিল৷
আগেই বলেছি আমি বেলুচিস্থানের কাজ ফেলে বন্নু আর টর্চি উপত্যকায় চলে গিয়েছিলাম৷ বর্মায় যেমন বাঘ-ভাল্লুকের ভয় ছিল, এখানে তার কিছুই নেই৷ এ-দেশের ভয় হল শীতের, আর বাঘ-ভাল্লুকের চেয়েও হিংস্র মানুষের— ডাকাতের৷
উঃ, সে কী ভয়ানক শীত! পাহারাওয়ালা বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয় আর দুঘণ্টা পর-পর বদলি হয়৷ বাইরে বলতে আবার একেবারে খোলা মাঠ নয়, মাথার উপরে চাল আছে৷ গায়ে তো তাদের এক বোঝা কাপড়-চোপড় আর ‘পোস্তিন’৷ লোমসুদ্ধ ছাগলের চামড়ার কোটকে ‘পোস্তিন’ বলে, তার মতো গরম আর কিছু হতে পারে না৷ কিন্তু তাতেও কি আর শীত যায়? কয়েকজন পাহারাওয়ালা এই সব সুদ্ধই জমে মরে গেল৷
উপরে মোটা-মোটা তিনটে কম্বল, গায়ে গরম গেঞ্জি, ফ্ল্যানেলের জামা আর সোয়েটার, পায়ে দু-জোড়া গরম মোজা, তবু মনে হয় না কিছু গায়ে দিয়েছি৷ এর উপর একটা ‘পোস্তিন’ চড়ালে তবে কিছু আরাম বোধ হয়৷ তবু কিন্তু নাক-মুখ ঢেকে শুতে হয়, আর তা সত্ত্বেও ভোরের দিকটা হাত-পা ঠান্ডা হয়ে ঘুম ভেঙে যায়৷ তাঁবুর বাইরে তো সমস্ত একেবারে সাদা ধবধব করছে৷ পাহাড় মাঠ সব সাদা, নদীর জলও জমে গেছে, উপরের দিকটা৷
তাঁবুর ভিতরে বালতির জল কম্বল চাপা দিয়ে রাখলেও জমে পাথরের মতো হয়ে যায়৷ আর তাতে মাঝে-মাঝে বড়ো তামাশা হয়৷ একজন বাঙালি ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে একজন পাঞ্জাবি চাকর৷ লোকটা বেশ মজবুত, খাটতেও পারে খুব, কিন্তু বুদ্ধিটা একটু কম৷ বাবুর বোধহয় সেদিন ভালো করে হজম হয়নি, তাই তিনি ভোরে উঠে, ব্যস্ত হয়ে চারককে বললেন, ‘জলদি এক লোটা পানি দেও৷’ হুকুম দিলেন বটে কিন্তু চাকর আর জল দেয় না, বাবু যতই তাড়া দেন সে ততই বলে, ‘হুঁ, হু, যাচ্ছি৷’ বাবুর আর সবুর সয় না, তিনি চ্যাঁচামেচি আরম্ভ করলেন আর আমার তাতে ঘুম ভেঙে গেল৷ আমি উঠে বাবুর ভঙ্গি দেখে বুঝলাম তাঁর অবস্থা বেগতিক৷ তখন আমার লোক তাড়াতাড়ি এক ঘটি জল এনে দিল, বাবুও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন৷
ব্যাপার হয়েছে কী, চাকরটি রাত্রে বালতির মধ্যে লোটা রেখে দিয়েছিল৷ তাড়া দেওয়া মাত্র সে ছুটে জল আনতে গেছে, কিন্তু এদিকে বালতিসুদ্ধ জল জমে পাথর! তার ভিতর থেকে লোটা বের হবে কী করে? উনুন ধরিয়ে, বালতি সুদ্ধ বরফ চাপিয়ে লোটা বের করতে পনেরো মিনিট লেগেছিল৷
থার্মোমিটার ১৭° ফ্যারেনহাইট পর্যন্ত নেমেছিল, আবার যখন গরম পড়ল তখনও প্রাণ ওষ্ঠাগত, ডাকবাংলোর বারান্দার ছায়াতে ১১৭°!
ও-দেশে জঙ্গল নেই, অন্তত বর্মায় বন বলতে আমরা যা বুঝতাম তা নেই৷ সমস্ত পাহাড় ন্যাড়া, তাতে খালি ছোটো-ছোটো ঘাস আর পাথর, সেই ঘাস আবার শীতের ধাক্কায় একেবারে জ্বলে গেছে৷ পাঠানের দেশ, বড়ো শক্ত জায়গা৷ দিনে হাতিয়ার-বাঁধা পাহারাওয়ালা নিয়ে কাজে বেরুতে হয়, আবার রাতেও বন্দুক নিয়ে লোক পাহারা দেয়৷ এই কাজের জন্য একুশ-বাইশজন লোক সঙ্গে আছে, এরাও পাঠান, এই দেশেরই লোক হাতিয়ারও তাদের নিজের, আমরা খালি তংখা দিই৷ তারা কেল্লায় পলিটিকেল সাহেবের কাছে গিয়ে দলিল সই করে দিয়ে এসেছে যে গবর্নমেন্টের এতজন লোক, এতগুলো জানোয়ার ও আসবাব ইত্যাদি বুঝে পেল, আবার গুণে ফিরিয়ে দেবে৷ জিনিসপত্র বইবার জন্য সঙ্গে উট আছে, উটওয়ালারা পাঞ্জাবি মুসলমান, পাঠান দেশের দু-চারটি কথা বলতে পারে৷ সঙ্গের খালাসিরাও পাঞ্জাবি মুসলমান৷
সে দেশে বড়ো ডাকাতের ভয়, সুবিধা পেলেই সব লুটে নেয়৷ সেইজন্য রাত্রে সর্বদা পাহারা রাখতে হয়, আর নিজেও সশস্ত্র থাকতে হয়৷ দিনে কাজে যাই কোমরে রিভলভার বেঁধে, রাতে শুই গুলিভরা রিভলভার বালিশের তলায় রেখে৷ এই দারুণ শীত কিন্তু আগুন জ্বালাবার জো নেই৷ একে তো কাঠই মেলে না, তার উপর ধুনি জ্বালালে দূর থেকে ডাকাতরা দেখতে পেয়ে গুলি চালাবে৷
কাজ শেষ করে সন্ধ্যার আগে তাঁবুতে ফেরা চাই৷ অন্ধকারে চোর-ডাকাতের সুবিধা, যদি পথের পাশেই বসে থাকে তাহলেও দূর থেকে দেখা যাবে না৷ মেরে, কেটে, লুটে নেওয়া তাদের ব্যাবসা বললেও চলে৷
ও-দেশের প্রধানদের ‘মালিক’ বলে৷ একজন মালিক আমার কাছে বখশিস চেয়েছিল৷ আমি বললাম, ‘টাকা তো আমার কাছে নেই, কেল্লার তহশিলদারের কাছে টাকা রেখে এসেছি৷ আমি চিঠি দিচ্ছি, তাঁর কাছে যাও বখশিস মিলবে৷’
সে হেসে বললে, ‘আচ্ছা বাবুসাহেব, আমি তো ওয়াজির, লুটে খাওয়া আমার পেশা, যখন সুবিধে হবে বখশিসটা নিয়ে নেব৷’
নিজেদের মধ্যেও অনেক সময় মারামারি কাটাকাটি! অনেক সময় দেখা যায় এ গ্রামের কোনো-কোনো লোক গ্রাম বিশেষে যায় না৷ কেন? ও-গ্রামের অমুকদের সঙ্গে এদের বংশগত শত্রুতা— ব্লাড ফিউড— আছে৷ কোন প্রাচীন যুগে এদের পূর্বপুরুষদের কেউ ওদের পূর্বপুরুষদের কাকেও হত্যা করেছিল৷ তারপর আবার ওদের কেউ এদের আর কাউকে মেরে সেই রক্তের ঋণ শোধ করেছিল, আবার এরা তার প্রতিশোধ নিয়েছিল, এমনি করে বংশানুক্রমে রক্তের বিরোধ চলে আসছে৷
এখন ওদের পালা৷ এদের কাউকে পেলেই শেষ করবে৷
টর্চি উপত্যকার উত্তর পশ্চিম দুইদিকে আফগান রাজ্য৷ দক্ষিণ মাসুদদের দেশ, মাসুদরাও ওয়াজির, সকলেই লুটপাটে ওস্তাদ! আমাকে কাজের খাতিরে আফগান সীমানায় যেতে হত৷ দু-দুবার ওরা আমার ক্যাম্প লুটে নেবার বন্দোবস্ত করেছিল, আর দু-বারই ভগবানের কৃপায় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম৷
এবার আফগান সীমানার দু-আড়াই মাইল দূরে একটা গ্রামে আমার তাঁবু ছিল৷ প্রোগ্রামমতো বরাবর কাজ করে এসেছি, কিন্তু এই প্রথম একদিন দেরি হল৷ ঠিক সময়ে কাজ শেষ হল না, কাজেই বাধ্য হয়ে আমাদের আরও একদিন সেখানে থেকে যেতে হল৷ হুকুমমতো ভোরে উঠেই একখানি চিঠি সাহেবের কাছে পাঠিয়ে দিলাম৷ একজন সওয়ার চিঠি নিয়ে চোদ্দো-পনেরো মাইল দূরে কেল্লায় চলে গেল, আমি কাজে বেরোলাম৷
বিকেলে ওই সওয়ারের ফিরবার কথা, চোদ্দো-পনেরো মাইল রাস্তা ঘোড়ায় চড়ে গেছে, কিন্তু সে ফিরল না৷ পরদিন আমি কাজে বেরিয়েছি, পথে ওই সওয়ার, তহশিলদার সাহেব, আরও বহুলোকের সঙ্গে দেখা৷ কী ব্যাপার? আমার যে আগের দিন ফিরবার কথা ছিল এ-খবরটা কী করে নাকি ডাকাতরা জানতে পেরে, লুটপাট করবার জন্য পথে এক জায়গায় আড়ি পেতে বসেছিল৷ আমার সওয়ারটি পাহাড়ের উপর থেকে, প্রায় এক মাইল দূরে, রাস্তার ধারে একটা কী চকচক করছে দেখতে পেয়ে, সন্দেহ করে দাঁড়াল৷
দু-তিনবার ওই চকচকে জিনিসটা তার চোখে পড়ল৷ ভালো করে দেখে বুঝতে পারল যে ওটা বন্দুকের নলিতে রোদ পড়ে চকচক করছে৷ তখন সে সেই রাস্তায় না গিয়ে পাহাড়ের উপরে ছাগল-ভেড়ার রাস্তা ধরে চলল৷ তিন-চতুর্থাংশ গিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেল অনেক লোক পাথরের আড়ালে বন্দুক হাতে গুড়ি মেরে বসে আছে৷ লোকগুলোও ততক্ষণে তাকে দেখতে পেয়েছে, আর সে ভালো রাস্তা ছেড়ে জংলি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে দেখে বুঝতে পেরেছে যে ও তাদের দেখে ফেলেছে৷ তখন তারা বেরিয়ে এসে ওকে তাড়া করল, দু-চারটে বন্দুকও ছুড়ল, এও বন্দুক ছুড়ল, তারপর ঘোড়া হাঁকিয়ে পালিয়ে গেল, ওরা কুড়ি-পঁচিশজন আর ও একলা৷
অনেক ঘুরে দুটো-তিনটার সময় কেল্লায় পৌঁছেছিল৷ তহশিলদার সাহেব সব শুনে তার সঙ্গে লোকজন পাঠিয়েছেন৷ পরে তিনি আমাকে বলেছিলেন বড্ড বেঁচে গিয়েছ৷ ওই গ্রামে নিশ্চয়ই ওদের চর আছে৷
আর একবার ওই একই গ্রামে আমার তাঁবু ছিল৷ এবার যথাসময়েই কাজ শেষ হয়েছিল, কিন্তু আমাকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে৷ কেল্লার কাছে একটু কাজ ছিল তাও শেষ করতে হবে৷ খোঁজ করলাম অন্য রাস্তা আছে কিনা যাতে ঘণ্টা দু-তিন আগে পৌঁছানো যায়৷ শুনলাম একটা ছোটো পথ আছে৷ গ্রামের লোকেরা বলল সেটা দিয়ে গেলে চার-পাঁচ মাইল বেঁচে যাবে, কিন্তু রাস্তা খারাপ, বোঝা নিয়ে উট চলতে পারবে না৷ প্রায় তিন-চার জরিপ খারাপ রাস্তা, এক জরিপ হল বাইশ গজ৷ ওইটুকুর জন্য চার-পাঁচ মাইল ঘুরব! আমি বললাম, ‘এই রাস্তাতেই চলো৷ খারাপ জায়গাটাতে বোঝা নামিয়ে উট পার করে নেব৷ আবার বোঝাই করলে হবে৷’
গ্রামের কয়েকজন লোক সঙ্গে নিয়ে ওই পথেই চললাম৷ খুব সাবধানে উটগুলো খারাপ জায়গাটা পার হল, বোঝা নামাতে হল না৷ কেল্লায় পৌঁছে যথাসময়ে কাজ শেষ করলাম৷
পরদিন তহশিলদার সাহেব খবর দিলেন যে আবার আফগান ডাকাতরা ওই জায়গায় আমাদের অপেক্ষায় বসে ছিল৷ অনেকক্ষণ বসে থেকে, যে গ্রামে তাঁবু ছিল সেখানে গিয়ে মহা তম্বি! কেন সরকারি লোকদের গ্রামে থাকতে দেওয়া হয়েছিল! আর তারা গেল কোথায়? কোন রাস্তায় গেল, ইত্যাদি৷
একদিন সন্ধ্যার সঙ্গে-সঙ্গেই কাজ শেষ করে তাঁবুতে ফিরেছি, কাপড়-চোপড় ছেড়ে, হাত-পা ধুয়ে, বিশ্রাম করে, খেয়ে শুয়ে পড়েছি৷ সমস্তদিনের পরিশ্রম, বেজায় শীত, আবার থাকি তাঁবুতে, কাজেই একটু তাড়াতাড়ি তাঁবুর দরজা বন্ধ করে লেপ মুড়ি দিতে পারলেই ভালো লাগে৷
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি বলতে পারি না, বন্দুকের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল৷ ওদেশের লোকেরা শত্রুর ভয়ে সব গ্রামের চারধারে উঁচু মাটির দেয়াল দেয়৷ আমরা একেবারে সেই দেয়ালের গা ঘেঁষে তাঁবু খাটিয়ে ছিলাম৷ জিগগেস করলাম, ‘কীসের আওয়াজ?’
‘ডাকাত এসেছে, তাদের বন্দুকের আওয়াজ৷’
‘কত দূরে ডাকাত?’
‘তিন-চার-শো গজ হবে, তবে রাত বলে ভালো বোঝা যাচ্ছে না৷’
জ্যোৎস্না রাত বলে রক্ষা৷ আমাদের লোকেরা ততক্ষণে সকলে জেগে গেছে, পাহারাওয়ালারা বন্দুক নিয়ে প্রস্তুত, হুকুম পেলেই চালায়৷ আমি সবেমাত্র দোভাষীকে দিয়ে হুকুম দিয়েছি, অমনি আবার সেই বন্দুকের আওয়াজ৷ তখন আমাদের লোকরাও বন্দুক চালাতে আরম্ভ করল, বার দশেক চালাবার পর আবার সমস্ত চুপচাপ হয়ে গেল৷ তারপর লোকজনদের সকলের খোঁজ নিলাম, সকলেই ভালো আছে, কারো গায়ে গুলি লাগেনি৷ তখন পাহারাওয়ালাদের সাবধান করে দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম৷ সকালে উঠে দেখা গেল একটা উটের পায়ে গুলি লেগেছে, বিশেষ কিছু না, কয়েকদিন ওষুধ লাগাতেই সেরে গেল৷
ও-দেশের লোকরাই আমাদের সঙ্গে পাহারা দিত৷ জন দুই মালিক আর পনেরো-কুড়িজন অন্য লোক৷ বন্দোবস্ত ছিল যে মালিকরা দৈনিক মজুরি পাবে দেড়-টাকা-দু-টাকা করে আর অন্যরা আট আনা হিসাবে৷ নিজেদের এলাকায় তারা রক্ষণাবেক্ষণ করবে, অন্য এলাকায় যাবে না৷ এক সর্দারের এলাকার কাজ শেষ হলে, পথে এসে অন্য এলাকার লোক বসে থাকত আর তাদের হাত থেকে গুণে সকলের ভার নিত৷ এই পাহারাওয়ালাদের খাসাদার বলে৷
একটা গ্রামের কাছে গিয়ে তাঁবু ফেলেছি, গ্রাম থেকে প্রায় সিকি মাইল দূরে৷ এই এলাকার লোকরা কেল্লা থেকে আমাদের মালপত্র সব গুণে এনেছে, কিন্তু তবুও সন্ধ্যার সময় গোলযোগ আরম্ভ করেছে৷ শুনতে পেলাম একটা কিছু খুঁটিনাটি চলছে, তর্ক হচ্ছে৷ সর্দার দু-জন যেন এক-একবার বেশ গরম হয়ে উঠছে৷
দোভাষীকে জিগগেস করলাম, ‘কী হয়েছে?’
দোভাষী বললে, ‘খাসাদাররা গোল করছে, শয়তানি আরম্ভ করেছে, বলছে তাদের প্রত্যেককে এক টাকা করে না দিলে তারা কাজ করবে না, এক্ষুনি চলে যাবে৷’
সর্দার দু-জনকে ডেকে পাঠালাম, তাদের সঙ্গে চার-পাঁচজন খাসাদারও এল৷ জিগগেস করলাম, ‘ব্যাপার কী? কীসের গোলমাল?’
সর্দাররাও দোভাষীর কথার পুনরক্তি করল, আর বলল, ‘এরা বদমাস, তাই গোলমাল করছে৷’
খাসাদারদের জিগগেস করলাম, ‘তোমরা তো রোজ আট আনা হিসাবে রাজি হয়ে এসেছ, এখন আবার গোল করছ কেন?’
ওরা বলল, ‘আমরা রাজি হইনি, সর্দাররা রাজি হয়েছে৷ আমরা এক টাকা রোজের কম রাজি হব না৷ এক্ষুনি চলে যাব৷’
ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে এসেছে, আর তাঁবুও গ্রাম থেকে সিকি মাইল দূরে, সেইজন্যেই বেটাদের শয়তানি৷
আমি সর্দারদের জিগগেস করলাম, ‘তোমরাও কি চলে যাবে?’
তারা উত্তর দিল, ‘তাহলে আর এতক্ষণ ধরে ওদের সঙ্গে ঝগড়া করছি কেন? আমাদের কথার নড়চড় হবে না৷’
আমি বললাম, ‘আমি আট আনার বেশি এক পয়সা দেব না৷’
তখন মহা খাপ্পা হয়ে খাসাদাররা সকলে চলে গেল আর যাবার সময় বেশ করে শাসিয়ে গেল, ‘রাত্রে ভালো করে পাহারা দিস, চাই কি আমরাই আসতে পারি৷’
সর্দাররাও পাল্টা শাসিয়ে জবাব দিল, ‘জানিস এটা সায়েদাখানের এলাকা? রাত্রে আসবার সময় খুব সাবধানে আসিস, কার গর্দানে কটা মাথা আছে দেখা যাবে!’
সায়েদাখান ওখানকার ওয়াজিরদের প্রসিদ্ধ মালিক, তার দোর্দণ্ড প্রতাপ৷ আমার সঙ্গের সর্দাররা সায়েদাখানের আপনার লোক৷ আমরা সে রাতটা খুব সাবধানে কাটালাম, খুব কড়া পাহারার বন্দোবস্ত করলাম৷ সর্দাররা খালাসিদের সাবধান করে দিল যেন রাত্রে কেউ তাঁবু থেকে বাইরে না যায় বা বাতি না জ্বালায়৷ সামান্য নড়াচড়ার উপরেই রাত্রে গুলি চলবে৷ যাই হোক, রাত কেটে গেল, কোনো গোলযোগ হল না৷
সর্দারদের সঙ্গে তাদের আপনার লোক তিনজন ছিল৷ সকালে উঠে একজনকে আমি কেল্লায় পলিটিকেল তহশিলদারের কাছে পাঠালাম, দু-জনকে তাঁবু পাহারায় রাখলাম আর সর্দার দু-জনকে সঙ্গে নিয়ে কাজে চলে গেলাম৷ কাজ শেষ করে সেদিন শিগগির ফিরেছি, এসে দেখি তাঁবুতে লোকে লোকারণ্য, তহশিলদার সাহেব, সিপাই আরও মেলা লোক৷ তাঁবুতে পৌঁছানো মাত্র তহশিলদার সাহেব বললেন, ‘বাবুসাহেব, তুমি করেছ কী! কাল তোমাকে খোদা বাঁচিয়েছেন৷ পাঁচটি মাত্র লোক সঙ্গে নিয়ে কেউ এ-জায়গায় রাত্রে থাকে? তোমার তক্ষুনি গ্রামে চলে যাওয়া উচিত ছিল৷’
‘তহশিলদার সাহেব, চটো কেন? কাল যদি ওদের অন্যায় আবদারে রাজি হতাম বা ওরা চলে গেলে পর আমিও ভয়ে গ্রামে চলে যেতাম, তাহলে ফলটা কী হত? তুমি তো পলিটিকেল লোক, একবার চিন্তা করে দেখো৷ ওরা হয়তো আবার দেড় টাকা চেয়ে বসত, বা অন্য চাল চালত৷ আর চলে গেলে এখানে আর কেউ কাজ করতে পারত না, বদনাম হত, সরকারের কাজের ক্ষতি হত৷’
একটু চিন্তা করে তহশিলদার সাহেব সেকথা মেনে নিলেন, কিন্তু তাঁবু তুলে গ্রামে নিয়ে যেতে বললেন৷
আমি বললাম ‘তা হবে না, এখানেই থাকব, আপনি অন্য খাসাদারের ব্যবস্থা করুন৷’
অনেক চেষ্টা করে তহশিলদার অন্য লোকের বন্দোবস্ত করে দিলেন৷
এর পর আরও দু-দিন ওই আড্ডায় ছিলাম৷ কাজ শেষ করে তবে কেল্লায় ফিরলাম৷
ও-দেশে আছে সব ঝানু চোর৷ বন্নু শহরে আমার তাঁবু ছিল ডাকবাংলোর কমপাউন্ডে৷ উটওয়ালারা উট নিয়ে সরাইয়ে আশ্রয় নিয়েছে৷ সরাইয়ের চারদিক ঘেরা, তার ভিতর থেকে দেয়াল কেটে কখন কে উট বের করে নিয়ে গেছে, কেউ টেরও পায়নি৷ বহু কষ্ট করে প্রায় দু-মাস পরে ওই উট পাওয়া গিয়েছিল৷
একদিন বন্নু শহর থেকে প্রায় পাঁচ-সাত মাইল দূরে একটা পাহাড়ে কাজ করতে গিয়েছি, সঙ্গে চারজন খাসাদার৷ পাহাড়ের উপর উঠে দূরবিন (থিওডোলাইট) লাগিয়ে কাজের জন্য প্রস্তুত হচ্ছি, এমন সময় একজন খালাসি বলল, ‘হুজুর, হরিণ!’ চেয়ে দেখলাম আন্দাজ ৩৫০—৪০০ গজ নীচে নালার ধারে চার-পাঁচটা হরিণ চরছে৷ একজন খাসাদার অমনি রাইফল হাতে নিয়ে শুয়ে পড়ল, আর খুব ভালো করে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল৷ একটা হরিণ তক্ষুনি মাটিতে পড়ে ছটফট করতে লাগল, আর বাকি কটা নিমেষের মধ্যে কোথায় যেন উড়ে গেল৷
দু-জন খাসাদার আমার বড়ো পেন-নাইফখানা চেয়ে নিয়ে হরিণটাকে হালাল করতে ছুটল৷ হরিণটা মরেনি, গুলি লেগে তার কোমর ভেঙে গিয়েছিল, নড়বার শক্তি ছিল না৷ এরা ছুটে গিয়ে তাকে জবাই করল, তারপর গোটা একটা পিছনের ঠ্যাং ছাড়িয়ে নিল, দুজনে মিলে হরিণটাকে ঘাড়ে করে নিয়ে এল৷ আর দু-জন এর মধ্যেই শুকনো ঘাস, কাঁটাঝোপ ইত্যাদি জড়ো করে তাতে আগুন ধরিয়েছে, আর একটা চ্যাপটা সমান পাথর আগুনের উপর চাপিয়ে দিয়েছে৷ হরিণ নিয়ে এলে পর চারজনে মিলে ওই পাটাকে ফালি-ফালি করে কেটে, ওই গরম পাথরটার উপর রাখতে লাগল৷ মিনিট দুই ছ্যাঁকছোঁক করলে পর, উল্টে দিল, আরও মিনিট দুই ছ্যাঁকছোঁক করলে পর, তুলে খেতে আরম্ভ করল৷ তখনও রক্ত পড়ছে৷
একজন আমাকে জিগগেস করল, ‘খাবে?’
আমি বললাম, ‘না৷’
তাই শুনে একজন ঠাট্টা করে বলল, ‘বাবু ক্যায়সা খায়গা? ঘি চাহিয়ে, মাশালা চাহিয়ে, তব না বাবু খায়গা!’
দেখতে দেখতে চারজনে মিলে একটা গোটা রাং, চার-পাঁচ সের মাংস হবে, সমস্তটা খেয়ে শেষে করল৷
একবার আমাদের এক সাহেবের তাঁবু পড়েছে এক গ্রামে৷ তাঁবু থেকে প্রায় সিকি মাইল দূরে উটওয়ালারা উট চরাচ্ছে, সঙ্গে লোকজন রয়েছে৷ বেলা সাড়ে-তিনটে-চারটের সময় কোথা থেকে আট-দশজন লোক হাতিয়ার-টাতিয়ার নিয়ে এসে উপস্থিত! আর এসেই উটগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে চলল৷ উটওয়ালাদের চিৎকার শুনে খাসাদাররা বন্দুক হাতে ছুটল, একটু কাছে পৌঁছতেই গুলি চালাতে আরম্ভ করল৷ ‘লুটেরা’-রা যখন দেখল উটসুদ্ধ পালাতে পারবে না, তখন উট ছেড়ে দিয়ে পিট্টান দিল৷ যাবার সময় দুটো উটের পা কেটে দিয়ে গেল৷ খাসাদাররা ওই দুটো উটকে তাড়াতাড়ি জবাই করে ফেলল, আর চারদিকের লোকজন মিলে তো মহা ভোজ!
ওখানকার লোকগুলোই বেখাপ্পা৷ সর্বদা হাতিয়ার সঙ্গে থাকে আর কথায়-কথায় হাতিয়ার চালায়৷ শেষটা আমাদের সার্ভেয়ারদের উপরও গুলি চালাতে আরম্ভ করল৷ বেচারা সার্ভেয়াররা সমস্তদিন খেটে ক্লান্ত হয়ে ফিরেছে, স্নান করে, খেয়ে-দেয়ে শুয়েছে, এইবার একটু আরাম করবে, আর অমনি দুড়ুম-দুড়ুম তাঁবুর উপর গুলি! সার্ভেয়ারদের সঙ্গেও সশস্ত্র পাহারা আছে, কিন্তু অন্ধকারে তারা কী করবে? তার উপর তাঁবু নালার ধারে, গুলি চালাচ্ছে পাহাড়ের উপর থেকে৷ কোনো রকমে রাত কাটিয়ে, সকালে উঠে একেবারে কেল্লায়!
অবশেষে সেবারের মতো কাজ বন্ধ করে আমরা আবার ব্যাঙ্গালোরে ফিরে গেলাম৷
• ৮ • (১৯০৫-১৯০৬ ব্রহ্মদেশ৷ শান স্টেট) আবার আমরা শান স্টেটে গেলাম৷ দু-বছর আগে আমি আর এক সাহেব এই সমস্ত জায়গাতে দূরবিনের কাজ করেছিলাম, এবার আমার ঘাড়ে জরিপ করবার ভার পড়ল৷
পাহাড়ের উপর জঙ্গলের লোকরাও চাষবাস করে কিন্তু তাদের প্রক্রিয়াটা অন্য ধরনের৷ হাল সেখানে চলে না, কেননা একে তো পাহাড়ে সমান জমি নেই; দ্বিতীয়ত, জমি পাথরের মতো শক্ত৷ সুতরাং বাধ্য হয়ে তাদের চাষের অন্য ধারা বের করতে হয়েছে৷
পাহাড়ে-পাহাড়ে ঘুরে, মাটি পরীক্ষা করে, উপযুক্ত জমি ঠিক করে নেয়৷ ধান, তুলো, আফিঙ— প্রত্যেকটার জন্য বিশেষ রকমের জমি চাই৷ জমি ঠিক হলে, তারা সমস্ত জঙ্গল কেটে ফেলে৷ জঙ্গল কেটে দু-আড়াই মাস ফেলে রাখে, গাছপালা সমস্ত রোদে শুকিয়ে প্যাঁকাটির মতো হয়ে যায়৷ তারপর ভালো দিন দেখে, পুজো দিয়ে, তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়৷ সমস্ত পুড়ে ছাই হয়ে গেলে, জায়গাটা পরিষ্কার করে নেয়৷ তারপর তাতে ছোটো ছোটো গর্ত খুঁড়ে, গর্তে দু-চারটি করে বীজ রেখে, পোড়া মাটি চাপা দেয়৷ ধান, কচু, কুমড়ো লঙ্কা— সমস্ত ওই একই জমিতে৷ তারপর চারা বেরোলে, মাচা বেঁধে রাত জেগে পাহারা দেয়, নইলে বুনো শুয়োর বা হরিণ এসে সব শেষ করবে৷
মার্চ-এপ্রিল মাসে যখন এই সব জমিতে আগুন ধরিয়ে দেয় তখন চারদিক ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়৷ এক-এক সময় এমন ধোঁয়া হয় যে দিনের বেলাও তিন-চার মাইল দূরের পাহাড় দেখা যায় না৷ অনেক সময় এই খেতের— বর্মীরা বলে ‘টাউনিয়া,’ আসামে বলে ‘জুম’— আগুন সমস্ত পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ে, আবার কখনো গরমের দিনে শুকনো গাছে আপনা থেকেই আগুন লেগে যায়, এক ডালের সঙ্গে অন্য ডালের ঘষা লেগেই বোধ করি৷ রাত্রে দূর থেকে দেখতে বেশ, কিন্তু যারা জঙ্গলে থাকে তাদের মাঝে মাঝে বিপদে পড়তে হয়৷
একবার একজন সার্ভেয়ারের তাঁবু এই জঙ্গলের আগুনে পুড়ে গিয়েছিল, তার সঙ্গে দু-তিনজন খালাসিও পুড়ে মরেছিল৷ তাঁবুর চারদিকে লম্বা-লম্বা ঘাস ছিল৷ ভোরে যখন খালাসিরা রান্না করতে উঠেছে, তখন তারা দূরে পাহাড়ের উপরে আগুন দেখতে পেয়ে বলেছিল, ‘বাবু, আজ কাজে যেয়ো না৷ ওই দেখো আগুন, মনে হচ্ছে যেন এইদিকেই আসছে৷ আজ আমরা তাঁবুর চারদিকের ঘাস পরিষ্কার করে ফেলবার জন্য পাল্টা আগুন ধরাতে চাই৷’
সার্ভেয়ার বললে, ‘আগুন ঢের দূরে৷ এখানে পৌঁছতে এখনও দু-তিন-দিন লাগবে৷ একদিনের তো কাজ বাকি৷ আজ সেইটুকু শেষ করে, কাল ভোরে চলে যাব৷’
সার্ভেয়ার কাজে চলে গেল৷ সন্ধ্যার পর ফিরে এসে, খাওয়া-দাওয়া সেরে শুয়ে পড়ল৷ ভোরে উঠে চলে যাবে৷ রাত্রে ঝড়ের মতো হাওয়া চলতে লাগল, আর ঘুম ভাঙবার আগেই আগুন এসে তাদের ঘিরে ফেলল৷ সার্ভেয়ার আর জন তিনেক লোক অতি কষ্টে প্রাণ নিয়ে পালাতে পেরেছিল, বাকিরা পুড়ে মরেছিল৷
একদিন আমিও এই আগুনের হাতে পড়েছিলাম৷ পাহাড়ের উপর দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে চলেছি, সামনে আগুন, তখনও পথ থেকে একটূ দূরে৷ লোকজনদের এগিয়ে দিয়ে, পিছন থেকে তাড়া দিয়ে, লম্বা-লম্বা পা ফেলে চললাম, আগুন পথের উপর পৌঁছবার আগেই পার হয়ে যাব৷ লোকজন সকলেই পার হয়ে গেছে, আমিও প্রায় পেরিয়ে গিয়েছি, এমন সময় হাওয়াতে আগুন উড়িয়ে এনে ফেলল প্রায় পথের পাশে৷ আমি ঘোড়া ছুটিয়ে দিলাম, ইচ্ছেটা যে আগুন ঘিরে ফেলবার আগেই পার হয়ে যাব, আর তখুনি একটা জলন্ত ডাল এসে পড়ল একেবারে সামনে ঘাসের উপর৷ দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠল, সঙ্গে-সঙ্গে পিছনে দুমদাম বাঁশ ফাটতে আরম্ভ করল, আর ঘোড়াটা ভড়কিয়ে গিয়ে একেবারে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দে ছুট! খালাসিদের পার হয়ে একটা নীচু গাছের ডালের তলা দিয়ে ছুটল৷ ডালটা আমার বুকে লেগে আমি তো পাঁচ-সাত ফুট দূরে ছিটকিয়ে পড়লাম, ঘোড়াটা দিব্যি গলে বের হয়ে গেল৷ আমার শুধু পায়ে একটু চোট লেগেছিল, তিন-চারদিন খুঁড়িয়ে হেঁটেছিলাম৷ পকেট থেকে ঘড়িটা দশ-বারো ফুট দূরে ছিটকিয়ে পড়েছিল কিন্তু থামেনি, সমানে টিকটিক করছিল৷ আর ঘোড়াটা পঞ্চাশ কদম গিয়েই থেমেছিল৷
• ৯ • (১৯০৬-১৯০৭ ব্রহ্মদেশ৷ পকোফু, চিন হিলস) শান দেশে আর আমার যাওয়া হয়নি৷ এবছর অন্য আপিসের সঙ্গে পকোফু আর চিন হিলস-এ কাজ করতে গিয়েছিলাম৷ লোকজন, দেশ, ভাষা সবই আমার কাছে নতুন৷ পাঁচ-ছয় বছর শান স্টেটে কাজ করে শান ভাষা একটু-একটু শিখেছিলাম৷ এখানে এসে সেসব আমার কোনো কাজে লাগল না৷ নতুন করে সব জিনিসের পত্তন করতে হল৷
এখানেও জঙ্গলের কাজ, স্থানে-স্থানে পথের কষ্ট, অর্থাৎ পথ না থাকার কষ্ট৷ রাস্তা নেই বললেই চলে, বিশেষত পাহাড়ে৷ পাহাড়ে নদী, তাই আশ্রয় করে লোকজন চলে৷ আর একটা পথ আছে কিন্তু তাতে বড্ড ঘোরফের৷
নদীতে হাতি চলা অসম্ভব— এদেশে খচচর নেই, মাল বইবার জন্য সরকারি হাতি একটা সঙ্গে আছে৷ পথ বলতে যা বোঝায় তার কিছুই নেই, আছে শুধু জল আর বড়ো-বড়ো চ্যাটালো পাথর৷ নদীর কিনারাগুলো এক-এক জায়গায় নিরেট পাথর আর দেয়ালের মতো খাড়া, তার গায়ে পা রাখবার মতো একটু-একটু জায়গা আছে বটে, কিন্তু সে অতি সামান্য৷ তার উপর দিয়ে বাঁদরের মতো চার হাত-পায়ে না হলে চলবার জো নেই৷ মানুষেরই এই দশা, হাতি চলে কী করে?
ভোরবেলায় উঠে, তাড়াতাড়ি চা খেয়ে কাজ দেখতে বেরিয়েছি, সঙ্গে একজন বর্মী সার্ভেয়ার, মাং-ফো-হান, বড়ো ভালোমানুষ৷ আমাদের তাঁবু ছিল আটশো ফুট উঁচুতে, আর যেতে হবে পাঁচ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের উপর দিয়ে৷ মালপত্র নিয়ে হাতি গেছে অন্য পথে, তার সঙ্গের লোকজনদের পাঁচ-ছয় মাইল দূরে একটা হাতিওয়ালাদের আড্ডায় পৌঁছে তাঁবু ফেলতে বলে দিয়েছি৷ দু-আড়াই মাইল দূরেই আরও একটা হাতির আড্ডা আছে, বিশেষ করে বলে দিয়েছি যেন সেখানে না যায়৷
আমরা কাজ করতে-করতে চলেছি৷ একে তো ওই রাস্তা, তায় আবার পাহাড় বেজায় চড়াই, তার দশ আনা উঠতে-না-উঠতে সন্ধ্যা হয়ে গেল৷ কাজেই সার্ভেয়ারকে বললাম, ‘চলো, এখন ফিরি, বাকি কাজ কাল এসে শেষ করব৷’
আমরা সোজাসুজি নদীতে নামতে আরম্ভ করলাম৷ নামতে-নামতে হাঁটুতে ব্যথা ধরে গেল, তবু পথ আর ফুরোয় না৷ ক্রমে অন্ধকার হয়ে এল, তখনও নদী প্রায় সিকি মাইল নীচে রয়েছে৷ বাকি পথটুকু আরও খাড়া, আলো না হলে তাতে চলা অসম্ভব৷ কাজেই আমরা সেখানে বসে-বসে শুকনো বাঁশ দিয়ে চার-পাঁচটা বড়ো-বড়ো মশাল তৈরি করে নিলাম৷ মশাল জ্বেলেও কি সহজে নামা যায়? কাঁটাগাছ ধরে-ধরে নামতে গিয়ে অনেকেরই হাত ছড়ে গেল৷
সে বললে, ‘একটা আধ মাইল নীচে, আরেকটা দেড়-দু মাইল উপরে হবে, অন্ধকারে ভালো করে বুঝতে পারছি না৷’
উপরের আড্ডাটাতেই আমাদের যেতে হবে৷ সে যে কী বিদঘুটে রাস্তা তা আর কখনো ভুলব না৷ কখনো বালির উপর দিয়ে, কখনো বা পাথর ডিঙিয়ে, আবার কখনো বাঁদরের মতো কাঁটা, বাঁশ, লতাপাতা আঁকড়িয়ে ধরে পাহাড়ের গা বেয়ে চলেছি৷ দুটো মশালের আলোতে সে অন্ধকারে বিশেষ সুবিধা হচ্ছিল না৷ দেড় মাইল পথকে মনে হচ্ছিল যেন আট-দশ মাইল৷ হাঁটতে-হাঁটতে যখন আর পা চলতে চায় না, তখন সার্ভেয়ারকে জিগগেস করলাম, ‘আর কদ্দূর?’
সে বললে, ‘অধেক এসেছি৷’ শুনে তো আমার চক্ষুস্থির!
খালাসিরা বললে, ‘হুজুর, একটু না জিরোলে আর চলতে পারছি না৷’
কী করি? তাদের সেখানে রেখে, সার্ভেয়ার আর একজন খালাসিকে— যার কাছে আমার খাবারটুকু ছিল— সঙ্গে নিয়ে চললাম৷ খালাসির হাতে একটা মশাল বেশি দিয়েছি, দরকার হলে জ্বালাব৷ এমনি করে আরও কিছু দূর গেলাম৷ মনে হচ্ছিল কত ঘণ্টাই না জানি চলেছি৷ জিগগেস করলাম, ‘আর কদ্দূর?’
সার্ভেয়ার বললে, ‘পঞ্চাশ-ষাট জরিপ হবে৷’
শুনে মনে একটু উৎসাহ হল, আবার খানিকটা চলে একটা নদী পার হলাম৷ ততক্ষণে সার্ভেয়ারের হাতের মশালটা নিবু-নিবু হয়ে এসেছে৷ সে খালাসিকে বললে, ‘সেই যে আরেকটা মশাল এনেছিলি—সেটা দে৷’
সে বললে, ‘সেটা তো ফেলে দিয়েছি৷’
ব্যস, আমাদের তো চক্ষু চড়কগাছ!
‘ফেলে দিয়েছিস কী রে ব্যাটা? কার হুকুমে ফেললি?’
‘কেন বাবু যে বলল আর বেশি দূর নেই৷’
তখন আরেকটা মশাল তৈরি করা ছাড়া উপায় নেই৷ খালাসিকে বললাম, ‘তোর সঙ্গে দা আছে, সেটা দে৷’
কিন্তু দাখানাও বেটা পিছনের লোকদের কাছে রেখে এসেছে৷ এখন উপায়? সার্ভেয়ারকে বললাম, ‘শুকনো লতাপাতা জড়ো করে এই নিবু-নিবু মশালটার বাকি বাঁশটুকু দিয়ে একটু আগুন জ্বালো৷ তারপর শুকনো বাঁশ পাথর দিয়ে থেঁতলে মশাল বানাও৷’
ততক্ষণে মশালটা নিবে গিয়েছিল৷ সার্ভেয়ার আর খালাসি শুকনো পাতা জড়ো করে, তার ভিতর ওই মশালের বাকি বাঁশ কখানা চাপা দিয়ে, উপুড় হয়ে তাতে ফুঁ দিতে লাগল৷ আমি পাশে দাঁড়িয়ে দেখছি৷ আমার পিছনে ছোটো নদী, সামনে হাত ছয়-সাত দূরে একটা মস্ত বড়ো চওড়া পাথর প্রায় আমার সমান উঁচু৷ ওরা ক্রমাগত খালি ফুঁ-ই দিচ্ছে, হিমে ভেজা পাতা সহজে জ্বলতে চায় না৷
এমন সময় ওই বড়ো পাথরটার দিকে আমার চোখ পড়ল৷ দেখলাম তার উপর কীসের দুটো চোখ জ্বলজ্বল করছে৷ চোখ দুটো আমারই দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে৷ চোখ পাথরটা থেকে প্রায় দেড় হাত উঁচুতে, ভাবলাম নেকড়ে বা হায়েনা হবে৷ আবার ভাবলাম যদি তাই হয় তো অত দূরে-দূরে কেন?
ততক্ষণে পাতায় সবে একটু আগুন ধরেছে৷ এখন যদি আমি কিছু বলি বা গোলমাল করি, ওরা আর আগুন জ্বালাতেই পারবে না, আর তা হলেই বিপদ৷ কাজেই আমি চুপ করে রইলাম৷ ওরা তখনও খালি ফুঁয়ের উপর ফুঁ দিচ্ছে, দিতে-দিতে হঠাৎ যেমনি দপ করে আগুন জ্বলে উঠল, অমনি সেই জানোয়ারটাও ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল৷ বাবা! এই বড়ো বাঘ! এতক্ষণ গুড়ি মেরে ছিল, তাই বেশি উঁচু দেখাচ্ছিল না৷
বাঘটা উঠেই লাফ দিয়ে মাটিতে নামল, আর অমনি সার্ভেয়ারও বুঝতে পেরেছে৷ সে সেই দেশের লোক, বনে-বনে ঘুরে বেড়ায়, তার কাছে লুকোবার জো নেই৷ সে লাফিয়ে উঠে বলল, ‘ওটা কী রে?’
আমি বললাম, ‘যাই হোক, এখন তো চলে গেছে, শিগগির মশাল জ্বালো৷’
ততক্ষণে আগুন খুব জ্বলে উঠেছে আর চারদিক আলো হয়ে গেছে৷ বাঘটা তাই দেখে আস্তে-আস্তে পাহাড়ে উঠে গেল৷ শুকনো পাতার উপর তার পায়ের শব্দ শুনে সার্ভেয়ার বলল, ‘বড়া জবর শের৷’
খালাসিটা কিছু বলল না, সে খালি ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল৷
যাই হোক, আমরা তাড়াতাড়ি মশাল তৈরি করে জ্বেলে নিয়ে সেখান থেকে রওয়ানা দিলাম৷ সার্ভেয়ার ঠিকই বলেছিল, একটু চিৎকার করে ডাকবামাত্র আড্ডা থেকে জবাব এল, আর আমরাও একটু পরেই আড্ডায় পৌঁছলাম৷
আড্ডায় পৌঁছে দেখি সেখানে খালি সার্ভেয়ারের দু-জন খালাসি আর তার বিছানাটি আর খালাসিদের খান কয়েক কম্বল আছে৷ হাতি বা অন্য লোকজন বা জিনিসপত্র কিছুই আসেনি৷ সে সব যে কোথায় গেছে এরা তার কিছুই জানে না৷ জিগগেস করলে খালি বলে, ‘তারা আসেনি৷’
সে রাত্রে আর খাওয়া-দাওয়া হল না, একটা কম্বল জড়িয়ে কোনো রকমে রাত কাটানো গেল৷ সকালে উঠে দু-জন খালাসিকে হাতির খোঁজে পাঠালাম, আর বাকি লোকদের নিয়ে আমরা কাজে বেরিয়ে গেলাম৷ একজন খালাসির কাছে সের খানেক চাল ছিল, খালাসিরা তাই রেঁধে নুন দিয়ে খেল, আমাদের দু-জনের উপোস! সন্ধ্যার পর কাজ থেকে ফিরে দেখি গুণধররা হাতি নিয়ে এসেছেন৷ দাঁত বের করে বললেন, ‘ভুলে অন্য আড্ডায় গিয়েছিলাম৷’
যে আড্ডার সম্বন্ধে বিশেষ করে বারণ করে দেওয়া হয়েছিল, সব জায়গা ছেড়ে হতভাগারা সেইখানেই গিয়েছিল৷ এখন যে এসেছে তাও আমাদের পাঠানো দূত গিয়ে ডেকে এনেছে বলে!
যাই হোক, তখন আর আলোচনায় কোনো লাভ নেই৷ ত্রিশ ঘণ্টা পেটে কিছু পড়েনি, খিধেয় প্রাণ ওষ্ঠাগত! কাজেই তাড়াতাড়ি চারটি খেয়ে শুয়ে পড়লাম৷ সে রাত্রে আমার যে কী চমৎকার ঘুম হয়েছিল সে আর কী বলব! তখন কেউ আমার দুটো আঙুল কেটে নিলেও টের পেতাম কি না সন্দেহ৷
এপ্রিল মাস, বেজায় গরম পড়েছে৷ সার্ভেয়ার, খালাসি সকলেই ব্যস্ত, তাড়াহুড়ো করে ভোরে কাজে বেরোয়, সমস্ত সকালটা খেটেখুটে ক্লান্ত হয়ে বেলা দুটো-তিনটের সময়ে যদি কোনো নালায় জল পায়, খেয়ে প্রাণটা ঠান্ডা করে৷ যতক্ষণ ঠান্ডা থাকে পাহাড়ের উপরে-উপরে কাজ করে৷ দুপুর পার হলে জলের খোঁজে নালায় নামে৷ কখনো-কখনো আবার জল পাওয়াই যায় না, নালা শুকনো, তাতে আছে খালি বালি আর পাথর৷
সার্ভেয়ার রণজিৎ সিং জলের আশায় এমনি একটা নালায় নেমেছে, আর নালার ভিতরে জরিপ টেনে চলেছে৷ সার্ভেয়ার একটা মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে, টিন্ডেল আর মেট জরিপ টেনে আনছে৷ একজন খালাসি আগে-আগে গিয়েছে, সে সামনের মোড় থেকে সিগনাল দেবে৷ হঠাৎ লোকটি দাঁড়াল, কী যেন নিবিষ্ট মনে দেখল, তারপর ফিরে ঊর্ধ্বশ্বাসে দে-দৌড়! একেবারে সার্ভেয়ারের কাছে হাজির৷
ততক্ষণে পিছনের লোকরা এসে পড়েছে৷ তাদের সঙ্গে দুজন বর্মীকুলি ছিল, তারা বললে, ‘চলো, মারব৷ ও সাপ আমরা খাই, বড়ো চমৎকার খেতে৷’
রণজিৎ সিং-এর হাতে একটা বল্লম ছিল, কুলিদের কোমরে খুব ধারাল দা ছিল, আর সকলে বাঁশ কেটে চোখা-চোখা বল্লম তৈরি করে নিল৷ সেই জায়গায় এসে কিনারার ঘাসের দিকে আঙুল দেখিয়ে খালাসি বলল— ‘উও হ্যায়৷’
সকলে তাকিয়ে দেখল প্রকাণ্ড গোসাপের মাথার মতো একটা মাথা দেখা যাচ্ছে! আর মুখ দিয়ে যেন জিভ বের হয়ে রয়েছে৷ বর্মীরা পাথর ছুড়ে মারল, আর সমস্ত ঘাস নড়ে উঠল, কিন্তু মাথাটা খুব সামান্য নড়ল৷ তখন সকলে মিলে বাঁশের বল্লম নিয়ে জায়গাটুকু ঘিরে ফেলল আর ঢিল ছুড়তে লাগল৷ একজন কাছে গিয়ে তার হাতের বল্লমটা ছুড়ে মারল আর সাপটাকে একেবারে মাটির সঙ্গে গেঁথে ফেলল৷ তখন সব ওলটপালট হতে লাগল৷ বর্মীরা তাড়াতাড়ি আরও দু-তিনটে বল্লম দিয়ে সাপটাকে জায়গায়-জায়গায় মাটির সঙ্গে চেপে ধরল৷ বেচারা আগেও বিশেষ নড়তে পারছিল না, এখন একেবারে অচল হয়ে গেল৷
সার্ভেয়ার কাছে গিয়ে দেখল ওটা জিভ নয়, সাপটার মুখ দিয়ে কোনো জানোয়ারের লেজ বেরিয়ে আছে, জানোয়ারটা সাপের পেটে৷ দু-জন বর্মী দা দিয়ে চাপ দিয়ে সাপটাকে হাঁ করাল আর দুজন ওই ল্যাজটা ধরে টানতে লাগল৷ টানতে-টানতে বের হয়ে এল প্রকাণ্ড একটা হনুমান৷ কী করে যে হনুমানের মতো হুঁশিয়ার জানোয়ারকে সাপটা ধরেছিল কে জানে!
বর্মীরা বলল তারা সাপটার চামড়া ছাড়িয়ে মাংস নেবে৷ সার্ভেয়ার রাজি হল না, তাঁবু অনেক দূরে, শিগগির না ফিরলে রাত হয়ে যাবে৷ কাল তো বাকি কাজটুকুর জন্য আসতেই হবে, তখন মাংস নিতে পারবে৷
অগত্যা সাপটাকে ওই রকম মাটির সঙ্গে গাঁথা অবস্তায় রেখেই তারা চলে এল৷ পরদিন সকালে গিয়ে দেখে সাপটার কোনো চিহ্নই নেই, যেন উড়ে গেছে৷ সকলে আন্দাজ করল যে আগের দিন পেট ভরা ছিল বলে সাপটা বেশি নড়াচড়া করতে পারেনি, পালাতেও পারেনি, আর সেইজন্যই তাকে অত সহজে কাবু করতে পেরেছিল৷ তারপর এরা চলে এলে রাত্রে যখন সে একটু প্রকৃতিস্থ হল, তখন দু-চারবার গায়ে মোচড় দিয়ে ওই সব বল্লম উপড়িয়ে ফেলে চলে গেছে৷
• ১০ • (১৯০৭-১৯০৮৷ পূর্ব-বঙ্গ ও আসাম) আমাদের গোটা আপিসটাই ব্রহ্মদেশ থেকে চলে এসেছে৷ পূর্ব-বঙ্গ ও আসামের শ্রীহট্ট, কাছাড়, ত্রিপুরা ইত্যাদি জরিপ করতে হবে৷ আমার উপর আবার দূরবিনের কাজের ভার পড়েছে, স্বাধীন ত্রিপুরারাজ্য ও লুশাই পাহাড়ে কাজ করতে হবে৷
যেমন পথের কষ্ট বর্মায় ছিল, এখানেও তেমনি কষ্ট বা তার চেয়েও বেশি৷ সে সব কষ্ট সহ্য করেই সব জায়গায় কাজ করে এসেছি, হার মানতে হয়েছিল খালি ত্রিপুরার রাজার দেশে এক জায়গায়৷ বেজায় জঙ্গল, রাস্তা নামে আছে মাত্র, কাজের বেলা খুঁজে পাওয়া দায়৷ প্রায়ই নালায়-নালায় পথ, সারাদিন জলে-জলেই চলতে হয়, মাঝে-মাঝে ছোট-ছোট গ্রাম আছে, তাকে ফুকী ইত্যাদিদের বাস৷ আমাকে লংতরাই যেতে হবে৷ সে বড় বিদঘুটে পাহাড়, তার দুপাশ দেয়ালের মতো, শুধু সাদা, কালো আর লাল পাথর, আর ঘোর বন৷ অনেক জায়গায় আবার শুধুই পাথর, গাছপালার নামগন্ধ নেই৷
এই পাহাড়ের উপর আমাকে যেতে হবে, সঙ্গে হাতি আছে কিন্তু হাতি সেখানে চড়তে পারবে না৷ আমাদের সঙ্গে হাজারিবাগের খালাসি আছে, শুধু তাদের দিয়েও কুলোবে না৷ কাজেই দেখলাম যে আরও পনেরো-কুড়িজন লোক না হলে সে পাহাড়ে যাওয়া অসম্ভব৷ এখন মুশকিলের কথা এই যে যদিও আশেপাশে দশ-বারো মাইলের মধ্যে গ্রাম আছে, সেখানকার কেউই লংতরাই যেতে রাজি নয়৷ বাপরে, সে যে তাদের দেবতা! সেখানে গেলে কি আর তারা কেউ বাঁচবে? যে যাবে সেই মরবে৷ তারা লংতরাইকে পুজো করে, তার গায়ে পা ঠেকালে কি আর রক্ষে আছে!
গ্রামের চৌধুরিকে ডেকে কত বোঝালাম, কিন্তু তারও মনটা লংতরাইয়ের পাথরের মতোই শক্ত, কিছুতে যেতে সম্মত হল না৷ সে বললে, ‘তোমাদের এক সাহেব আমাদের নিষেধ কাকুতি-মিনতি না শুনে লংতরাই গিয়েছিল৷ মহারাজার হুকুম, কী করি, না গিয়ে উপায় ছিল না৷ আমরা শুয়োর, মুর্গি, হাঁস দিয়ে লংতরাইকে তুষ্ট করে পাহাড়ে চড়লাম৷ সাহেব তার কিছুই করল না৷ তার সাজাটাও তাকে পেতে হল৷ সেই যে লংতরাই তাকে জ্বর দিয়ে দিলেন, আর সে ভালো হল না, কদিন পরেই মরে গেল৷ আর আমরা যাব না সেখানে, সেবার অনেক খরচ করিয়ে আমাদের লংতরাই ছেড়ে দিয়েছিলেন, এবার ছাড়বেন না৷’
শেষ পর্যন্ত আমাকে বাধ্য হয়ে লংতরাই না গিয়েই ফিরতে হল, এমন একটি লোক পেলাম না যে আমাদের শুধু পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়৷
ত্রিপুরা রাজ্যে শিকার জুটত বেশ৷ পাখি, হরিণ, শুয়োর, আরও বড়ো-বড়ো জানোয়ার মায় গণ্ডার, হাতি৷ শিকারের অবসর আমাদের নেই, তবে কাজের শেষে পেটের দায়ে যা কিছু রাস্তায় মিলে যায়৷
শিকারি পর্বতে কাজ করতে গিয়েছিলাম৷ কেন যে শিকারি নাম হয়েছে তা আর কেউ বলতে পারল না৷ এক জায়গায় অনেকগুলো বুনো ফলের গাছ, গ্রামের লোকেরা বলল সকাল সন্ধ্যায় ওখানে জানোয়ার আসে— হরিণ, শুয়োর— ফল খাবার লোভে৷ আগে থেকে গিয়ে চুপ করে বসে থাকলে একটা কিছু শিকার মিলবেই৷ গাছের উপর তারা মাচা তৈরি করে রেখেছে৷ আমি বললাম, ‘মাচা ওঠা হবে না, জুতো নিয়ে উঠতে পারব না, পড়ে গেলে হাত-পা ভাঙবে৷’
‘হরিণের খোঁজে বাঘও আসে৷’
‘তা আসুক৷’
বিকেল চারটের সময় গিয়ে একটা ঝোপের মধ্যে একটা বড়ো গাছে পিঠ দিয়ে বসলাম— আমি আর একজন খালাসি, গ্রামের লোকটি জায়গা দেখিয়ে দিয়ে চলে গেল৷
একটু বাদেই জানোয়ারের সাড়া পাওয়া যেতে লাগল, ছোটো হরিণের, যাকে বলে ‘বার্কিং ডিয়ার’— তার ডাক শুনতে পেলাম, বেশ কাছেই ডাকছিল৷ একটু পরেই জানোয়ারের পায়ের সুর-সুর শব্দও একটু একটু কানে আসতে লাগল৷ থেকে-থেকে শুকনো পাতার উপর পায়ের শব্দ হচ্ছিল৷ তখনও বেশ আলো রয়েছে, আমি তো বন্দুক বাগিয়ে তৈরি, এই বের হল আর কি! পর মুহূর্তেই আমি একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গেলাম, ঝোপ থেকে বেরোল আমারই এক খালাসি, শোধন৷
‘হতভাগা, তাঁবুতে মানা করে এলাম এদিকে যেন কেউ না আসে, আর তুই এখানে মরতে এলি কেন?’
‘লাকড়ি ঢুঁড়তে-ঢুঁড়তে চালা আয়া হুজুর, খেয়ালসে উতর গায়া যো কি হুজুর হিঁয়া পর শিকারকে লিয়ে বৈঠে হ্যাঁয়৷’
বলা বাহুল্য সেদিন আর আমাকে দিয়ে শিকার করা হল না, ভগবানকে ধন্যবাদ দিয়ে তাঁবুতে ফিরে এলাম৷ শোধন জাতে নাপিত কিন্তু বুদ্ধি মোটেই নাপিতের মতো নয়৷ আর-একবারও ওই শোধনের বুদ্ধির দৌড়ে হাতের শিকার ফসকে গিয়েছিল, সে কথা পরে বলছি৷
মহারাজার দেশে দূরবিনের কাজ শেষ করে আমরা লুশাই পাহাড়ে চলেছি৷ সাড়ে-ছশো-সাতশো বর্গ মাইলের মধ্যে আর গ্রাম নেই, কোনো রাস্তাও নেই৷ সেই লুশাই পাহাড়ের সীমানায় আমাদের জন্য লুশাই পাহাড়ের প্রধান শহর আইজল থেকে লোক রসদ ইত্যাদি আসবার কথা, ততদূর অবধি পৌঁছে দেবার জন্য মহারাজার লোক আমাদের সঙ্গে চলেছে৷ পথে একটি পাহাড়ে আমরা কাজ করব৷ এতে চার-পাঁচদিন লাগবে, আমরা আটদিনের খোরাক সঙ্গে নিয়েছি৷ লঙ্গাই নদীতে সীমানা, সেখানে পৌঁছবার আগে একটা উঁচু পাহাড় পার হতে হয়, তারই চুড়োতে আমাদের কাজ৷
পথ নেই, বুনো হাতির রাস্তা আছে৷ মাঝে-মাঝে কাঠুরেদের আড্ডা আর রাস্তা পাওয়া যায়, তারা কখনো-কখনো এই জঙ্গলে কাঠ কাটতে আসে৷ আমি যে পাহাড়টাতে কাজ করব সেটা মহারাজার লোকদের দেখিয়ে দিলাম৷ তারা অনেকক্ষণ ধরে পরামর্শ করে চলতে লাগল৷
ভীষণ বন, আর পাহাড়ের পর পাহাড়, খালি পাহাড়ের পর পাহাড়৷ সরু-সরু নালা আর তার দুপাশে পাহাড়, একবার চড়ো, একবার নামো, আবার চড়ো, আবার নামো— সকাল থেকে সন্ধ্যা এই রকম করতে হয়৷ মাঝে-মাঝে ভাঙা কুঁড়েঘর পাওয়া যায়, সেগুলো কাঠুরেদের আড্ডা৷ তার অনেকগুলোই বুনো হাতিতে ভেঙে ফেলেছে৷ বন এমনি ভয়ানক যে সূর্যের মুখ আর দেখা যায় না, কোনদিকে যে যাচ্ছি তাও সব সময় বুঝতে পারা যায় না৷ সেইজন্য মাঝে-মাঝে বড়ো-বড়ো গাছে— দেড়শো-দুশো ফুট উঁচু গাছও আছে— চড়ে দেখে নিতে হয় পাহাড়টা কোন দিকে৷
তিনদিনে সেই পাহাড়ে পৌঁছে আমরা তার উপর কাজে লেগে গেলাম৷ লোকজনদের বলে দিলাম, ‘যেখানে জল পাবে সেইখানে পাহাড়ের উপর তাঁবু লাগাও, নালার ধারে তাঁবু লাগিয়ো না যেন৷’
সন্ধ্যার সময় ক্যাম্পে পৌঁছে দেখি ঠিক জানোয়ারের রাস্তার মাঝখানে তাঁবু খাটিয়েছে৷ রাত্রে যে-কোনো জানোয়ারই আসুক-না-কেন, সে ওই পথে এসে একেবারে তাঁবুতে হাজির হবে৷
তখুনি তাড়াহুড়ো করে, তাঁবুর সামনে আর পিছনে, পথের উপর প্রকাণ্ড দুই ধুনি জ্বালানো হল৷ তারপর বাঁশ কেটে রাস্তা বন্ধ করে দিলাম, সে পথে জানোয়ার আসবার আর কোনো সুবিধাই রইল না৷
রাত্রে একটা প্রকাণ্ড বাঘ এসে অনেক চেষ্টা করেও সে পথে নামতে না-পেরে সে কি তার রাগ আর গর্জন! আমি তাড়াতাড়ি বন্দুক নিয়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে পড়লাম, কিন্তু বাঘটাকে দেখতে পেলাম না৷ তার গর্জনে এদিকে কানে তখনও তালা লাগছিল, আর মাটি সত্যি-সত্যিই কাঁপছিল৷ শেষটা আন্দাজে তিন-চারবার বন্দুকের আওয়াজ করবামাত্র বাঘটা সরে পড়ল৷
এদিকে খালাসি বেচারা বাঘের ডাক শুনেই দল সুদ্ধ ছুটে গিয়ে তাঁবুতে ঢুকেছে৷ দু-তিন হাত উঁচু বাঁশের মাচা বেঁধে, তার উপর তারা তাঁবু খাটিয়েছিল৷ এতগুলো লোক একসঙ্গে দৌড়ে তাঁবুতে ঢুকবামাত্র বাঁশের মাচা-টাচা ভেঙে হুড়মুড় করে সকলে চিতপাত! তারপর সব হেসে গড়াগড়ি!
এর পর আরও একদিন আমরা সেই জায়গায় ছিলাম, কিন্তু বাঘমশাই আর আসেননি৷
আগেই বলেছি যে আটদিনের খাবার সঙ্গে নিয়ে আমরা লঙ্গাই নদীর দিকে চলেছি৷ সেখানে লুশাই পাহাড় থেকে আমাদের জন্য লোক আসবে, রসদও সঙ্গে আনবে৷ সেই লোকজন এসেছে কিনা দেখবার জন্য আমি লঙ্গাই নদীতে কয়েকজন লোক পাঠিয়ে দিলাম৷
পরদিন অন্য লোকজন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমি নিজেও সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলাম৷ গিয়ে দেখি লুশাই পাহাড়ের লোকদের কোনো খবর নেই৷ দেখেই তো আমার চক্ষুস্থির! আমার চাল ফুরিয়ে গেছে, সঙ্গে কুড়ি-বাইশজন লোক, এরা খাবে কী?
খালাসিদের যার কাছে যেটুক চাল ছিল তাড়াতাড়ি সব জড়ো করে এনে আমার নিজের তাঁবুতে রেখে দিলাম৷ তিন-চারজন লোককে টাকা দিয়ে তক্ষুনি মহারাজার রাজ্যে চাল আনতে পাঠালাম৷ দু-জন খালাসিকে পাঠালাম নদীর ধারে-ধারে নীচের দিকে নেমে গিয়ে লুশাই পাহাড়ের লোকদের খবর দিতে৷ বাকি সকলে সেইখানেই থাকলাম৷
রোজ সকালে মাথা পিছু তিন বা সাড়ে-তিন ছটাক চাল মেপে দিই, তারা সেই রেঁধে ফেন সুদ্ধ খায়৷ বেচারা খালাসিদের বড়ো কষ্ট! রোজ এক সের চাল খাওয়া যাদের অভ্যাস, সাড়ে-তিন ছটাকে তাদের কী হবে?
বন্দুক নিয়ে বনে-বনে ঘুরি কিন্তু শিকার আর মেলে না৷ খালাসিরা এসে মিনতি করে বলতে লাগল, ‘যে চাল আছে আমাদের দিন, আমরা একবার পেট ভরে খাই, তারপর কপালে যা আছে তাই হবে৷’ আমি অনেক বুঝিয়ে তাদের তাঁবুতে ফিরিয়ে দিলাম৷
পরদিন ভোরে উঠে লোকজন সঙ্গে নিয়ে আবার শিকারের খোঁজে বেরোলাম৷ কিন্তু কী আশ্চর্য! যখন কাজে বেরোই কত জানোয়ার দেখতে পাই, আর সেদিন কিছুই চোখে পড়ছে না, একটা পাখিও না৷ অনেকক্ষণ ঘুরে-ঘুরে যখন নিরাশ হয়ে তাঁবুর দিকে ফিরে চলছি, তখন খুব বড়ো-বড়ো দুটো হরিণ— সম্বর— দেখতে পেলাম৷ হরিণ দুটো জানোয়ারের রাস্তা ধরে পাহাড় থেকে নামছিল৷
আমরা উপর থেকে দেখতে পেয়ে, ঘুরে এসে, পথের পাশে এক জায়গায় বুনো হলুদের গাছ ছিল, তার মধ্যে গুড়ি মেরে বসে রইলাম৷ তখনও হরিণ দুটো নীচে নামেনি, আমি তো বন্দুক ঘাড়ে তৈরি! আর খালাসিরা সেই জঙ্গলে সব মড়ার মতো শুয়ে পড়ল৷
হরিণ দুটো আস্তে-আস্তে নামছে আর মাঝে-মাঝে দুটো-একটা লতাপাতায় মুখ দিচ্ছে, দেখে ভাবছি আরেকটু নেমে এলেই গুলি চালাব কাছেও হবে আর কোনো গাছের আড়ালও হবে না৷ মাত্র হাত পনেরো-কুড়ি দূরে আছে, হঠাৎ পিছন থেকে শোধন চেঁচিয়ে উঠল, ‘মারো, হুজুর, মারো!’
আর হরিণ তো একেবারে উধাও!
‘হতভাগা, এ কী করলি!’
‘মেরা খেয়াল হুয়া ক্যা হুজুর হারিণ দেখা নেহি৷’
ব্যস! সকলে তাকে চেপে ধরল, এই মারে তো এই মারে! বেচারাদের কপালে সেদিনও শিকার মিলল না৷
এমনি করে তিনদিন গেল, চতুর্থ দিনে আমাদের সেই তিনজন খালাসি মহারাজার রাজ্য থেকে চাল নিয়ে এল৷ খালাসিদের বেজায় ফুর্তি৷ এমনি পেট ভরে খেল যে আর সেদিন কাজ করবার সাধ্য রইল না! আবার সেইদিনই সন্ধ্যাবেলায় অন্য দু-জন লোক আমাদের চাল-ডাল সুদ্ধ সেই লুশাইদের নিয়ে ফিরে এল৷
খাওয়ার কষ্টের কথায় মনে পড়ল, বোধা টিন্ডেল আর দশজন লোককে পাঠিয়েছিলাম দুটো পাহাড়ের জঙ্গল কাটতে৷ একে তো ঘোর বন, তার উপর আবার বেজায় কুয়াশা, বেলা সাড়ে-দশটা এগারোটার আগে সে কুয়াশা ছোটে না৷ বেচারিরা রাস্তা ভুল করে ফেলল৷ প্রথম পাহাড়ের কাজ শেষ করে আটদিনের দিন গিয়ে দ্বিতীয় পাহাড়ে পৌঁছল৷ মাত্র তিনদিনের খোরাক বাকি আছে৷ কাজ আরম্ভ হল৷ বোধা হুঁশিয়ার লোক, সমস্ত চাল তার নিজের হেফাজতে রাখল আর প্রত্যেক খালাসিকে মেপে রসদ দিতে আরম্ভ করল৷ রসদ আছে মাত্র তিনদিনের, কাজ পাঁচ-সাতদিনের কমে হবে না৷ আধ সের হিসাবে চাল আর তাতে দু-মুঠো ডাল দিয়ে, পাতলা সাবুর মতো খিচুড়ি রেঁধে খেতে লাগল৷
চারদিন পর দু-জন লোক সঙ্গে নিয়ে বোধা পাহাড় থেকে নেমে ধলেশ্বরী নদীর কিনারায় এসে বসে রইল, আশা যদি কোনো লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়৷ ধলেশ্বরীতে মাঝে-মাঝে নৌকো যাতায়াত করে৷ দু-দিন কিছু খায়নি৷ দ্বিতীয় দিন বিকেলে আমার লোকদের সঙ্গে দেখা হল, তারা কুড়ি-বাইশ মাইল দূর থেকে চাল নিয়ে ফিরছিল৷ এরা এক বস্তা চাল নিয়ে পরদিন আবার পাহাড়ে চড়ল৷ গিয়ে দেখে বাকি আটজন লোক একেবারে চলৎশক্তি রহিত, দু-দিন তাদের সেই পাতলা খিচুড়িও জোটেনি৷ দু-দিন বসে তাদের খাইয়ে চাঙ্গা করে তুলে, তবে কাজ শেষ করে ফিরে এল৷
জিগগেস করায় বোধা উত্তর দিল, ‘হাঁ, হুজুর, তকলিফ বহুত হুয়া, লেকেন সরকার কো কাম করনাই হ্যায়৷ তিন বরস সরকার কো নিমক খায়া, অব বেইমানি ক্যায়সে করুঁ?’
বোধাকে যে উপযুক্ত রকম পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল সে কথা বলা বাহুল্য৷
লুশাই পাহাড়ের যে জায়গায় আমার কাজ ছিল সে বড়ো ভয়ংকর জায়গা৷ সাড়ে-ছশো সাতশো বর্গ মাইল জায়গা, তার মধ্যে একটা গ্রাম নেই, পথ নেই৷ সঙ্গে প্রায় ষাটজন লোক, জিনিসপত্র৷ খোরাক ইত্যাদিও ঢের৷ সে সব বইবার জন্য দুটো হাতিও আছে৷
দশ-বারোজন লুশাই বন কেটে পথ করে আগে-আগে চলে, তবে আর সবাই এগোতে পারে৷ অত করেও, অত মেহনতের পরও একদিনে চার-পাঁচ মাইলের বেশি অগ্রসর হওয়া যায় না৷ সন্ধ্যার অন্ধকারে যখন তাঁবু পড়ে, তখন কারো হাত-পা যেন চলতে চায় না৷ তার উপর আবার পাহারা দিতে হয়৷
সে ঘোর বনে মানুষের নামগন্ধ নেই, শুধু জানোয়ারের কিলিবিলি!
সন্ধ্যার পর পা ফেলতে গেলে মনে হয় এই বুঝি বাঘই মাড়ালাম৷
বেলা নটা-দশটার আগে আর সূর্য দেখা যায় না৷ এক-এক জায়গায় এমনি ঘন বন যে আকাশ দেখবার জো নেই, ঠিক মনে হয় যেন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে৷ আমি সকলের আগে-আগে চলি, সঙ্গে একজন বুড়ো লুশাই থাকে, সে বড়ো শিকারি৷ তার পিছনে দু-জন খালাসি, তাদের মধ্যে শ্যামলালের হাতে আমার দূরবিন, বন্দুক আর টোটার থলে, অন্যজনের হাতে আমার খাবার আর জল৷ তিনজনের হাতেই এক-একখানি দা৷
আমরা চারজনে গাছে দাগ কেটে অন্য সকলের আধ মাইল বা কিছু বেশি আগে-আগে যাই, আর সেই দাগ দেখে লুশাই কুলিরা বন কেটে পথ তৈরি করে, হাতি আর বাকি লোকদের নিয়ে আসে৷ রোজই এমনি করে চলতে হয়৷ একদিন পনরো-কড়ি ফুট চওড়া একটা বুনো হাতিদের রাস্তা পাওয়া গেল, লোকজনদের খুব মজা, বন কাটতে হচ্ছে না৷
চলতে-চলতে এক জায়গায় দেখলাম পথের উপর প্রকাণ্ড গাছ পড়ে রয়েছে৷ দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলাম আমাদের হাতি দুটো এ-গাছ ডিঙোবে কী করে? ভাবতে-ভাবতে গাছটার উপর চড়তে আরম্ভ করলাম, আর অমনি আমার পায়ের নীচেই যেন একটা কী হুড়মুড় করে উঠল৷ জিগগেস করলাম, ‘কেয়া হ্যায় রে?’ শ্যামলাল বললে, ‘হুল্লুমান হোগা হুজুর৷’
বলতে-না-বলতে সেটা গাছপালা ভেঙে কামানের গোলার মতো বেরিয়ে এল— গণ্ডার! এক নজর আমাদের দিকে দেখেই ‘ঘোঁৎ’ বলে দৌড় দিল৷ আমি পিছনের দিকে হাত বাড়িয়ে রয়েছি শ্যামলাল বন্দুক দেবে, কিন্তু কোথায় শ্যামলাল! সে ততক্ষণে প্রাণ বাঁচাবার সোজা পথ খুঁজছে৷ গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ে, শ্যামলালের হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে, টোটা ভরে, গণ্ডার মারতে ছুটলাম, কিন্তু ততক্ষণে গণ্ডার কোথায় যে গা ঢাকা দিয়েছে, আর তাকে খুঁজে পেলাম না৷
পরদিন খুব ভোরে উঠে চলতে আরম্ভ করেছি৷ আজকের পথ নালায়-নালায়, সঙ্গে সেই বুড়ো লুশাই আর শ্যামলাল৷ ভোরবেলা নানারকম শিকার পাওয়া যায়, সেইজন্য বন্দুক ভরে নিয়েই চলেছি৷ শিকার সামনে পড়ছে কিন্তু মারতে পারছি না, একে ঘোর বন, তায় কুয়াশা৷ শিকার দেখতে-না-দেখতে জঙ্গলে মিলিয়ে যায়৷ হাতি, গণ্ডার, বাঘ, হরিণ, সকলেরই তাজা পাঞ্জা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে৷ পাখিরও অভাব নেই, গোটা দুই ফেজেন্ট মেরেছি৷ হাতির পথ ধরে, নালাটাকে কখনো এপার কখনো ওপার করতে করতে পাকোয়া নদীর দিকে চলেছি, আজ রাত্রে সেখানে ক্যাম্প করব৷
একটা শুকনো নালা সামনে পড়েছে, আমরা তার মধ্যে নামলাম, লুশাইবুড়ো আমার আগে আর শ্যামলাল পিছনে৷ শ্যামলাল তখনও নালার ভিতর নামেনি, আমরা নালা পার হয়ে উপরে উঠতে যাব, এমন সময় আমাদের সামনেই ভারী একটা জল-কাদা তোলপাড়ের শব্দ হল৷ নিশ্চয় বুঝতে পারলাম হাতি, গণ্ডার বা বুনো মোষ হবে, কাদায় লুকিয়ে আয়েস করছিল, আমাদের সাড়া পেয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে৷ আমরাও তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে, দুই লাফে নালার যে পার থেকে নেমেছিলাম সেখানে উঠে ফিরে চেয়ে দেখলাম ব্যাপারখানা কী৷ ব্যাপার গুরুতর, বিশাল-দেহ এক গণ্ডার, যমদূতের দাদামশায়ের মতো, দাঁড়িয়ে ফোঁস-ফোঁস করছে৷ লাল দুটো চোখ মিটমিট করছে, কান দুটো পিছন দিকে হেলানো৷ আমার পকেটে তিনটি মাত্র গুলিওয়ালা টোটা, মাঝে ফুট পনরো চওড়া নালা, ওপারে গণ্ডার, শ্যামলাল পালিয়েছে৷
লুশাইটি ক্রমাগত বলছে, ‘মারো সাহেব!’ তার মুখে দাখানা, পা তুলে দিয়েছে গাছের গোড়ায়, বেগতিক দেখলেই বাঁদরের মতো চড়ে যাবে৷ আমি কী করব? সেই ছেলেবেলায় গাছে চড়তাম এখন সে বিদ্যা একেবারেই ভুলে গেছি, তার উপর পায়ে বুট! কাজেই ধীরে-ধীরে বন্দুকে গুলি ভরে প্রস্তুত হয়ে রইলাম৷ গণ্ডার যদি নালা পার হয়ে এপারে আসতে চায় তবেই গুলি চালাব, নইলে চালাব না৷
লুশাই খালি বলছে ‘মারো, মারো’, কিন্তু তিনটি মাত্র গুলি সম্বল নিয়ে, গণ্ডার মারতে গিয়ে শেষে কি প্রাণটা হারাব?
যাই হোক, আমাকেও গুলি চালাতে হল না, লুশাই বুড়োকেও গাছে চড়তে হল না, গণ্ডারটা মিনিটখানেক পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থেকে, একটা হুঙ্কার দিয়ে, দৌড়ে পাহাড়ে উঠে গেল৷ তার সামনে যত বাঁশ পড়ল, সমস্ত প্যাঁকাটির মতো পটপট করে ভেঙে গেল৷
তখন আমরাও আস্তে-আস্তে চলতে লাগলাম৷ আধ মাইলও যাইনি, আবার সামনে ভীষণ হুড়োমুড়ি! তারপর মড়মড় করে বাঁশ ভাঙার শব্দ৷ তারপর, উঃ, কী ভীষণ গর্জন! সারা বন থরথর করে কেঁপে উঠল৷ এবার একটু বেকায়দা, লুশাই বুড়োর আশেপাশে গাছ নেই, কীসে চড়বে? শ্যামলাল হতভাগা ইতিমধ্যে এসে জুটেছে, টোটার থলে থেকে আট-দশটা গুলিভরা টোটা নিয়ে ইতিপূর্বেই পকেটে পুরেছি৷
পথ ছেড়ে দিয়ে একটা ঝোপের মধ্যে বন্দুক হাতে দাঁড়ালাম৷ দাঁতওয়ালা হাতি, হয় পাগল (মস্ত) তা না হয় অন্য কোনো জানোয়ার দেখেছে৷ লুশাই বলল, ‘বোধহয় সেই গণ্ডারটা ওর সামনে পড়েছে৷’
হাতিটা কিন্তু আমাদের দিকে এল না, তিন-চারটে ডাক দিয়ে, ধীরে-ধীরে বাঁশ ভাঙতে-ভাঙতে পাহাড়ে উঠল৷ আমরাও চলতে লাগলাম৷
আমরা পাকোয়া নদীর কিনারায় পৌঁছলাম৷ নদীটা সত্তর-আশি হাত চওড়া হবে, তাতে এক কোমর জল৷ নদীর ধারে হাতির পায়ের তাজা দাগ৷ একটার পিছনে একটা, তার পিছনে একটা, এমনি করে এক পাল হাতি গেছে৷ পায়ের দাগ দেখে আমি বললাম, ‘পাঁচ-সাতটা হাতি হবে৷’
লুশাই বুড়ো ভালো করে দেখে বলল, ‘চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশটার কম নয়৷ ঠিক দাগে-দাগে পা ফেলে গেছে বলে বোঝা যাচ্ছে না৷’
সারাদিন জলে-জলে চলে আমার কাপড়-চোপড় সব ভিজে গিয়েছিল৷ আমি পাহাড়ে হেলান দিয়ে বসে জুতো-মোজা খুলতে আরম্ভ করলাম৷ লুশাইকে বললাম, ‘ওপারে গিয়ে তাঁবুর জায়গা দেখ৷’
লুশাই ওপারে চলে গেল, শ্যামলালও বন্দুক তার সঙ্গে নিয়ে চলে গেল৷ আমি বসে-বসে ‘হুঁ-উ-উ’ করে চিৎকার করে, পিছনের লোকদের ডাকতে বললাম, খাবারওয়ালা খালাসি তাদের সঙ্গে, আমার বেজায় খিদে পেয়েছে৷
বার দুই ‘হুঁ-উ-উ’ করে চেঁচিয়েছি, অমনি আমার উপরের একটা পাহাড় থেকে একটা হাতি ‘হুঁ-উ-উ’ বলে ডেকে উঠল, আর আমার ওখান থেকে পঞ্চাশ-ষাট হাত দূরে আরও অনেক হাতি গুড়গুড় শব্দ করে তার জবাব দিতে লাগল৷ আমি আবার চেঁচালাম, হাতিগুলোও আবার ঠিক তেমনি করল৷ আবার চেঁচালাম, আবার তাই হল৷ একটা হাতি পাহাড়ের উপর ‘হুঁ-উ-উ’ করে, আর বাকিগুলো নালার কিনারা থেকে গুড়গুড় শব্দ করে আর নাকে ফোঁসফোঁস আওয়াজ করে৷
এমন সময় আমার মাথার উপর থেকে মড়মড় করে বাঁশ ভাঙবার আওয়াজ হতে লাগল আর নদীর ওপার থেকে শ্যামলাল আর লুশাইবুড়ো ব্যস্ত হয়ে আমাকে ডাকতে লাগল, ‘চলে এসো, চলে এসো৷’ তিন-চারটে হাতি আমার চিৎকার শুনে দেখতে আসছে এ কী রকম জানোয়ারের ডাক, আমার মাথা থেকে বোধহয় ১০০-১২৫ গজ উঁচু পর্যন্ত নেমে এসেছে৷
আমি তাড়াতাড়ি নদীর ওপারে গিয়ে, শ্যামলালের হাত থেকে বন্দুক নিয়ে নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ শ্যামলাল আর লুশাইবুড়ো খুব হল্লা জুড়ে দিল, তাই শুনে হাতিগুলো আবার পাহাড়ের উপর উঠে গেল৷ তারপর অনেকক্ষণ নদীর ধারে দাঁড়িয়ে রইলাম, হাতি আর দেখতে পেলাম না, তবে ক্রমাগতই আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম আর নদীর জল ঘোলাটে হয়ে উঠছিল৷
চারটে-সাড়ে-চারটের সময় অন্য লোকজন এসে পৌঁছল৷ নদীর ওপারে বন কেটে তাঁবু খাটানো হল, খুব বড়ো-বড়ো ধুনি আর পাহারার বন্দোবস্ত করা হল৷ আগেই বলেছি আমাদের সঙ্গে দুটো হাতি ছিল, মাহুতরা রোজ তাদের চরে খাবার জন্য বনে ছেড়ে দেয়, সেদিন কিন্তু তাঁবুর কাছে বেঁধে রাখল৷ ছেড়ে দিলে বুনো হাতিতে এ-দুটোকে ভুলিয়ে নিয়ে যাবে, নয়তো মেরে ফেলবে৷ লুশাইরা শুকনো বাঁশের মশাল তৈরি করে, লম্বা লম্বা কাঁচা বাঁশের আগায় বেঁধে রাখল৷ রাত্রে হাতি এলে ওই মশাল জ্বেলে, তার লম্বা বাঁশের বাঁট ধরে ঘুরিয়ে হাতি তাড়াবে৷ এমনি করে লুশাইরা তাদের খেত থেকে হাতি তাড়ায়৷
সে রাত্রে আর হাতির জ্বালায় ঘুম হয়নি৷ অন্ধকার হতেই হাতিগুলো আমাদের কাছে এল, আর বোধহয় ধুনির আলোতে আমাদের হাতি দুটোকে দেখতে পেয়ে তাদের ভারি খটকা লাগল, ও-দুটো আবার ওখানে কী করছে! পাঁচ-সাতটা হাতি মিলে এপারে আসবার জন্য এক-একবার নদীতে নামে, তারা নদীর মাঝামাঝি আসতে-না-আসতেই আমাদের হাতি দুটো ছটফট আর চিৎকার করতে আরম্ভ করে৷ অমনি আমাদের লোকরাও প্রাণপণে মশাল ঘুরিয়ে বিকট চিৎকার করতে-করতে ছুটে আসে আর হাতিগুলো দৌড়ে আবার ও-পারের বনে ঢোকে৷ সারাটা রাত এইভাবে কাটল৷ ভোরবেলা কতকগুলো হাতি পুবের পাহাড়ে আর কতকগুলো পশ্চিমের পাহাড়ে উঠে গেল৷
সকালে উঠে, চা খেয়ে, জিনিসপত্র বেঁধে আমরাও আবার পথ ধরলাম৷ সেই পুবের পাহাড়ে আমাদেরও যেতে হবে৷ রোজ যেমন যাই, আজও তেমনি চলেছি, আমার পিছনে যথাক্রমে শ্যামলাল, খাবারওয়ালা আর আমার চাকর গঙ্গারাম৷
কিছুদূর গিয়েই একটা ঝিল পেলাম, তাতে জল নেই কিন্তু খুব কাদা৷ আমরা বলাবলি করতে লাগলাম কোন দিক দিয়ে, কেমন করে ঝিল পার হব, এমন সময় সেই ঝিলের মাঝখানের শরবনের আড়াল থেকে উঠে একটা হাতি বাঁশবন ভেঙে সে যা হুড়মুড় করে ছুট দিল! পাহাড়-পর্বত যেন সব একেবারে ভেঙে পড়ল৷
যাই হোক, এতে আমাদের এই উপকার হল যে কোন দিক দিয়ে যে ঝিল পার হতে হবে তা আর আমাদের বুঝতে বাকি রইল না৷ সেই হাতির পায়ের দাগ ধরে আমরাও ঝিল পার হয়ে গেলাম৷ তখন লুশাই বুড়ো জিগগেস করল, ‘কোনদিকে যাব?’
আমি বললাম, ‘যেদিকে হাতি গেছে সেই দিকে৷’
হাতির পায়ের দাগ দেখে আর বাঁশ ভাঙা দেখে আমরাও সেইদিকে চলতে লাগলাম৷ খানিক দূর পাহাড় চড়ে বন্দুকটা আবার শ্যামলালের হাতে দিলাম৷
লুশাইবুড়ো আগে গিয়ে পাহাড়ের উপর পৌঁছল, পৌঁছেই ডেকে বলল, ‘মস্ত দেয়াল (হাতির রাস্তা), কোনদিকে যাব?’
আমি বললাম, ‘পুবদিকে যাও উপরের দিকে৷’
সে উপরের দিকে পঞ্চাশ-ষাট হাত উঠেছে, আমিও ততক্ষণে এসে দেয়ালে পৌঁচেছি, শ্যামলাল আমার চার-পাঁচ হাত পিছনে, গঙ্গারাম আর অন্য খালাসিটি আরেকটু পিছনে৷
দেয়াল ধরে উপরের দিকে হয়তো সবে আট-দশ হাত গিয়েছি, এমন সময় সামনে ভয়ংকর একটা গোলমাল, বাঁশ ভাঙার হুড়মুড়, জানোয়ারের গর্জন আর লুশাইবুড়োর চিৎকার৷ আমি হাঁকলাম, ‘কেয়া হুয়া রে?’
শ্যামলাল পিছন থেকে উত্তর দিল, ‘গেণ্ডা হোগা হুজুর৷’
সামনের দিকে চেয়ে দেখি লুশাইবুড়ো ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে নামছে আর তার পিছনে প্রকাণ্ড এক হাতি শুঁড় তুলে কামানের গোলার মতো আসছে৷
তাই দেখে আমি ‘বন্দুক লাও’ বলে পিছনে হাত বাড়িয়েছি, কিন্তু বন্দুক আর আসে না, চেয়ে দেখি শ্যামলাল লম্বা দেবার ফিকির করছে! দুই লাফে তাকে ধরে, দুই থাপ্পড় দিয়ে বললাম, ‘ভাগতা কাঁহা?’ তারপর বন্দুকটা কেড়ে নিয়ে উপরের দিকে ছুটলাম৷ বন্দুক হাতে মনে পড়ল তার এক নলে ছিটা আর-একটা নলে মাত্র গুলি ভরা৷ ছুটছি আর টোটা বদলাবার চেষ্টা করছি৷ সহজে কি বদলানো যায়? তাড়াতাড়িতে এক সেকেন্ডের কাজ পাঁচ মিনিটেও হতে চায় না৷
যাই হোক, কোনো রকমে ছিটা বদলে গুলি ভরলাম৷ তখনও দৌড়চ্ছি, তায় আবার উপরের দিকে, মাটির দিকে চোখ রেখে পাছে পড়ে যাই৷ গুলি ভরে, সামনের দিকে চাইলাম৷ সর্বনাশ! লুশাই বুড়ো দাঁড়িয়ে রয়েছে, হাতের দাখানা ফেলে দিয়েছে, রাস্তার মাঝখানে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ হাতিটা তার কাছ থেকে হাত ন-দশ মাত্র দূরে, এই ধরল বলে!
সেখানে রাস্তায় দুটো মোড় ছিল, আমার চোখের সামনেই হাতির কপালটা৷ আর কথা নেই, বন্দুক তুলে কপালে গুড়ুম করে ছেড়ে দিলাম৷ হাতি কিন্তু তাতে থামল না, এক পা আরও চলে এসেছে৷ এবার তার পাঁজর আমার সামনে৷ বন্দুক আমার তোলাই ছিল, গুড়ুম করে সেই পাঁজরে অন্য নলটি ছেড়ে দিলাম৷ এবার ওষুধ ধরল৷ আওয়াজও করা আর হাতির যা চিৎকার! পাহাড়বন থরথর করে কাঁপতে লাগল৷ আর সঙ্গে-সঙ্গে হাতিটাও ঘুরে কয়েক পা ছুটে গিয়েই কুড়ুঙ্গের ভিতর হুড়মুড় করে পড়ল— আবার যা চিৎকার!
আমি দুই গুলি মেরেই, পথ ছেড়ে দিয়ে আরও দুটো গুলি ভরে নিয়েছি, আর হাতিটার পিছনে আরও একটা চালিয়েছি, কিন্তু সে গুলিটা বাঁশে আটকে গেল, হাতির গায়ে লাগল না৷
বিপদ তো কেটে গেল, এখন চারদিকে চেয়ে দেখতে লাগলাম৷ লুশাই বেচারা তখনও সেইখানেই কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে৷ আমার কাছ থেকে মোটে ছ-ধাপ দূরে, আর হাতিটাকে যেখানে গুলি মেরেছিলাম, সে জায়গাটা লুশাইবুড়োর কাছ থেকে মোটে তিন ধাপ হবে৷ আমার তো মনে হচ্ছিল হাতির শুঁড়টা যেন ঠিক তার মাথার উপর ছিল৷ পিছনে চেয়ে দেখি কুড়ি-পঁচিশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে গঙ্গারাম, শ্যামলাল আর অন্য খালাসিটা ঠকঠক করে কাঁপছে আর খালি বলছে, ‘বাবা রে বাবা, ওরে বাবা!’ তারা এগোয়ও না, পালায়ও না৷ গঙ্গারামের বেজায় দুর্দশা, ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে খালি বলে, ‘বাবা রে বাবা, এত্তা বড়া কপাল!’ হাতির কপালটাই শুধু তার চোখে পড়েছিল৷
আমি লুশাই বুড়োর কাছে গেলাম, বেচারা প্রাণের আশা ছেড়ে দিয়েছিল৷ আমি কাছে যাবামাত্র আমার পা জড়িয়ে ধরল, মুখে কথা নেই৷
তখন পর্যন্ত হাতির চিৎকারে বন-জঙ্গল কাঁপছে, আর যেদিক দিয়ে সে গিয়েছিল সেদিকে খালি রক্ত আর রক্ত!
আমরা হাতির কাছ থেকে লুশাই বুড়োকে বাঁচাতে ব্যস্ত আছি, আর ততক্ষণে আমাদের অন্য লোকজন সকলে এসে হাজির হয়েছে৷ বন্দুকের আওয়াজ শুনে তারা খুব ফুর্তি করতে-করতে আসছে— আজ খুব হরিণের মাংস খাওয়া যাবে৷ এসেই সামনে পেয়েছে শ্যামলাল, গঙ্গারাম আর খালাসিকে, তাদের মুখে খুব ভালো করেই শুনেছে ব্যাপারখানা কী! তখন আর কারো মুখে হাসি নেই৷
একজন লুশাই দোভাষী ছিল, সে কজন লুশাই কুলিকে সঙ্গে নিয়ে দেখতে গেল হাতির কী হল৷ খালাসিরাও দু-চারজন তাদের সঙ্গে গেল৷
একটু দূর গিয়েই তারা চ্যাঁচামেচি লাগিয়েছে৷ দোভাষী আর দু-জন লুশাই ছুটে এসে বলল, ‘চলো, হাতিটা যেন কুড়ুঙ্গের ভিতর পড়ে আছে, আজ হাতির মাংস খাওয়া যাক৷’
আমি কিছুতেই রাজি হলাম না, বললাম, ‘বিপদ কেটে গেছে৷ লোকটার প্রাণ বেঁচেছে এই ঢের, আর হাতির মাংস খেয়ে কাজ নেই৷’
তখন তারা আমার বন্দুকটা চাইল, তাও দিলাম না দেখে শুধু দা, কুড়ুল নিয়ে চলে গেল৷ তারা কুড়ুঙ্গের ভিতর কিছু দূর নেমে গেল, তারপর আবার চ্যাঁচামেচি, তারপরই আবার তারা ছুটে এসে হাজির৷
‘শিগগির এসো, শিগগির এসো— হাতির বাচচা!’
ছোট্ট একটা হাতির বাচচা, যে পথ দিয়ে হাতিটা কুড়ুঙ্গের মধ্যে নেমেছে, সেই পথ দিয়ে নামছে৷ ওই হাতিটারই বাচচা, হাতিটা কুনকি ছিল৷ বাচচাটার এক পায়ে চোট লেগেছে, বেচারি খোঁড়াচ্ছে৷ দোভাষী দৌড়ে গিয়ে তার শুঁড় ধরেছিল আর ব্যস্ত হয়ে অন্য সকলকেও এসে ধরবার জন্য ডাকছিল, কিন্তু কেউ আর ভরসা করে এগোলো না৷ বাচচা হলে কী হবে, হাজার হোক, হাতিরই তো বাচচা! সে ঢিপঢাপ করে দোভাষীকে ঢুঁ মারতে আরম্ভ করল আর ছোটো-ছোটো পা দিয়ে লাথি! দোভাষী তাই থতোমতো খেয়ে ছুটে এসেছে আমাদের খবর দেবার জন্য৷
ওই বাচচার খাতিরেই তার মা লুশাইবুড়োকে মারবার জন্য তাড়া করেছিল৷ সন্তানের মায়া! বাচচাটা চলতে পারেনি বলে সে তাকে নিয়ে পালের সঙ্গে যেতে পারেনি, পিছনে পড়েছিল৷ তারপর বুড়ো গিয়ে হঠাৎ তার সামনে পড়াতে বোধহয় বেচারির মনে হয়েছিল— ওই যাঃ, বুঝি আমার বাচচাকে ধরে নিতে এসেছে!
লুশাই পাহাড়ে বাঘ মারবার এক মজার ফন্দি দেখেছিলাম৷ বনের ভিতর বাঘ ভাল্লুক চলবার পথ আছে, কোনপথ দিয়ে বাঘরা বেশি যাতায়াত করে লুশাইরা আগে সেই খোঁজ নেয়৷ তারপর সেইপথের ধারে, যেখানে পাহাড়ের গা খুব ঢালু, সেখানে কোদাল দিয়ে খুঁড়ে আরও বেশি খাড়া আর গভীর গর্ত করে রাখে৷
তারপর লম্বা-লম্বা বাঁশের খোঁটা পুতে, ওই গর্তের উপর, রাস্তার বরাবর সমান করে বড়ো মাচা বাঁধে৷ তার উপর মাটি ফেলে, ঘাস, লতাপাতা বসিয়ে ঠিক পাহাড়ের গায়ে অন্য জমির সঙ্গে বেমালুম মিলিয়ে দেয়৷ মাচার নীচে অবশ্য ফাঁক থাকে, আর তার নীচে মাটিতে এই বড়ো-বড়ো ভীষণ ধারালো বল্লম পোঁতা থাকে৷ সমস্তটাকে ডালপালা দিয়ে ঢেকে এমন সুন্দর করে রাখে যে হঠাৎ দেখে বোঝবার জো নেই যে এর ভিতর আবার এত কারসাজি আছে৷ তারপর মাচার উপর বেশ মোটাসোটা শুয়োরছানা বা কুকুর এমন ভাবে বেঁধে রাখা হয় যে মাচার উপর না-চড়ে তাকে ধরবার উপায় নেই৷
বাঘমশায় হেলতে-দুলতে পথ দিয়ে আসেন, আর দেখতে পান সামনেই ফলার প্রস্তুত! ব্যস, অমনি হালুম বলে দে লাফ, আর হুড়মুড় করে মাচা ভেঙে একেবারে বল্লমের উপর পড়া! ফলার রইল মাথায় আর বল্লম বিঁধল পেটে, আর চ্যাঁচানির চোটে আকাশ গেল ফেটে! তারপর যতই হাত-পা ছোঁড়ে, আরও বল্লম গায়ে বিঁধতে থাকে, ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে সব শেষ!
একে তো বিশ্রী রাস্তা, দেয়ালের মতো খাড়া পাহাড়, তাতে আবার বৃষ্টি পড়েছে, গোদের উপর যেন বিষ ফোঁড়া! আমি কাজে চলে গেছি, লোকদের বুঝিয়ে বলেছি একটা নদীতে পৌঁছে তাঁবু লাগাবে৷ তিনটের সময় কাজ শেষ করে ফিরছি৷ ভীষণ জঙ্গল, মানুষের সমাগম নেই, খালি দলে-দলে হাতি ফেরে৷ সেইজন্য একটু লম্বালম্বা পা ফেলে চলছি, পাছে রাত হয়ে যায়৷
লোকদের যেখানে ক্যাম্প করতে বলেছিলাম, তার দু-আড়াই মাইল আগেই তাঁবু পেলাম৷ আমাদের একটা হাতি পিছলে পড়ে চোট খেয়েছে, তাকে নিয়ে আর তারা বেশি দূর এগোতে পারেনি৷ কাজেই আর কী করা যায়৷ সন্ধ্যা হয়ে আসছে, এখন ইচ্ছা না হলেও সেখানেই থাকতে হবে৷ তাঁবুটা একটা ছোটো নদীর ধারে রাস্তা থেকে কুড়ি-পঁচিশ হাত দূর৷ নদীর উপর একটা বাঁশের সাঁকো আছে৷
খাওয়া-দাওয়া সেরে সকলে শুয়েছি৷ এপ্রিল মাস, বেজায় গরম বলে তাঁবুর দরজা আর বন্ধ করিনি৷ দু-জন খালাসি— ডম্মর আর শোধন— নদীর ধারে বালির উপরে রান্না করে, খেয়ে, সেখানেই শুয়ে আছে৷
প্রায় সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছে, আমারও একটু-একটু তন্দ্রা আসছে, এমন সময় শুনলাম গঙ্গারাম দোভাষীকে বলছে, ‘দোভাষী ভাই, ওটা কী, ওই যে পোলের উপর দিয়ে আসছে?’
আমি কান খাড়া করে শুনতে লাগলাম, বাঁশের পোলের উপর দিয়ে একটা বেশ বড়ো আর ভারি জানোয়ার আসছে, পোলটা তার ভারে ক্যাঁচম্যাচ করছে৷ পাশেই বন্দুক আর টোটা ছিল, হাতে নিয়ে চুপি-চুপি তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলাম৷ পোলটার মাঝামাঝি এক জায়গায় গাছের ফাঁক দিয়ে একটু চাঁদের আলো পড়েছিল৷ সেই জায়গাটুকুতে জানোয়ারটা আসবামাত্র দেখলাম— প্রকাণ্ড বাঘ! তখুনি আবার সেটা অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেল৷ তখন আমি বন্দুকে ছিটা ভরে গুড়ুম-গুড়ুম দুটো আওয়াজ করলাম, আর বাঘটা দুই লাফে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল৷ গুলি মারবার সাহস হল না, কারণ অন্ধকারে ঠিক জায়গায় না লাগবারই কথা, অনর্থক তাকে জখম করে বিপদ ডেকে আনা কেন?
বন্দুকের আওয়াজে সকলেরই ঘুম ভেঙে গেছে৷ শোধন তো উঠেই একদৌড়ে তাঁবুর মধ্যে৷ ডম্মর কিন্তু কিছুতেই এল না৷ হাতির মাহুত ডেকে বলল, ‘ভাগ, ডমরা, ভাগ, শের আয়া!’ ডম্মরের ভ্রূক্ষেপ নেই৷ তখন দু-তিনজন ছুটে গিয়ে তাকে ঠেলতে লাগল৷ সে জেগেই ছিল, ঠেলা খেয়ে চটে লাল!
সত্যি-সত্যি সমস্ত রাত সে ওই বালির উপর কাটাল, পোলটা তার কাছ থেকে মাত্র পনেরো-ষোলো হাত দূরে ছিল৷
ডম্মরের সত্যিই খুব সাহস ছিল৷ একদিন তো চলেছি, সঙ্গে লুশাই বুড়ো আর শ্যামলাল৷ সন্ধ্যা হয়ে আসছে, তখনও হাতি আর অন্য লোকজনদের দেখা নেই৷ মেজাজটাও তাই একটু বিগড়ে ছিল৷ একটা মস্ত সম্বর হরিণকে গুলি করেছিলাম, সেটাও দু-তিনবার ডিগবাজি খেয়ে উঠে পালিয়ে গেল, চারদিকে খালি রক্ত আর রক্ত! বেজায় ঘন বেতবন, তার মধ্যে দৌড়ানো যায় না, হরিণটা প্রাণের দায়ে বেতবন অগ্রাহ্য করে তার কাঁটা সব ছিঁড়ে-ফুঁড়ে বেরিয়ে গেল৷ পাকোয়া নদীতে জলের আওয়াজ শুনে বুঝতে পারলাম সে সাঁতরে পার হচ্ছে৷ আমরা যখন জলের কিনারায় পৌঁছলাম, অন্য পারে হরিণের পিছনটা শুধু এক মুহূর্তের জন্য দেখতে পেলাম৷ তাও আবার বন্দুক তুলতে-না-তুলতে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল৷
প্রায় তিনটে বাজে, ওইখানেই বসে রইলাম৷ লুশাইবুড়ো ক্রমাগত বলছিল নদী পার হতে পারলে হরিণটাকে পাওয়া যেত৷ কিন্তু নদী পার হবার উপায় নেই, অনেক জল৷ নিরাশ হয়ে ফিরে এসে, যেখানে প্রথমে হরিণটাকে দেখেছিলাম সেখানে বসে পড়লাম, হাতি-টাতি এলে এখানেই তাঁবু ফেলব৷
চার-পাঁচজন কুলি এসে পৌঁছল৷
‘হাতি আর অন্য লোকরা কত দূরে?’
‘বহুৎ দূর!’
আমাদের তো চক্ষুস্থির! এ যে সন্ধ্যা হয়ে এল৷ তখন হাতির গলার ঘণ্টা শুনতে পেলাম৷ অন্ধকার হল, তিন-চারজন খালাসি আমার বিছানা নিয়ে এসে হাজির হল৷
‘আর হাতি?’
‘হুজুর, চোখে দেখা যায় না, হাতি আর বেতের মধ্যে চলতে পারছে না৷’
নিরুপায় হয়ে যে যেখানে ছিল সেইখানেই শুয়ে রইল, কারো খাওয়া-দাওয়া নেই, আগুন জ্বেলে সব রাত কাটাল৷ অথচ খোরাক কাছেই মজুত আছে, কিন্তু আসবে কী করে?
ভোর না হতেই হাতি আর বাকি লোকজন এসে উপস্থিত হল৷ দেখা গেল সবাই এসেছে, খালি ডম্মর নেই৷ টিন্ডেলকে তাড়া করলাম, ‘হতভাগা, তোর লোক গেল কোথায়?’
সে বললে, ‘হুজুর, আমার খেয়াল ছিল বুঝি বা আগে-আগে আপনার সঙ্গে চলে এসেছে৷’
বড়োই ভাবনা হল৷ তৎক্ষণাৎ দু-জন খালাসি, দু-জন লুশাই কুলি আর টিন্ডেলকে ফিরিয়ে পাঠালাম৷ বললাম যেন আগের দিনের আড্ডা পর্যন্ত দেখে আসে, আমরা তো মাত্র তিন-চার মাইল পথ এসেছি৷
লোকজন, হাতি, কারো খাওয়া হয়নি, সবাই ক্লান্ত৷ আামরা মাইল দুই চলে তাঁবু ফেলবার জোগাড় করতে লাগলাম৷ বন পরিষ্কার করে, তাঁবু ধরে টানাটানি করছে, এমন সময় টিন্ডেল আর তার সঙ্গের লোকরা ডম্মরকে নিয়ে এসে হাজির হল৷
‘আরে হতভাগা! কোথায় ছিলি?’
সে বললে সে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, মাথাও ব্যথা করছিল, তাই পথের ধারে বসে একটু দম নিচ্ছিল, কিন্তু ঘুম এসে গেল৷ যখন ঘুম ভাঙল তখন একেবারে সন্ধ্যা হয়ে গেছে৷ কী আর করা, পথ থেকে সরে গিয়ে একটা ঝোপের মধ্যে শুয়েছিল, সকালে উঠে নিজেই চলে আসছিল, পথে টিন্ডেলের সঙ্গে দেখা৷
সকলে জিগগেস করল, ‘হতভাগা, ভয় করল না?’
‘আরে ভাই, শো গয়া বিলকুল, ক্যায়সে ডর লাগেগা?’
যাক, ওই জঙ্গলে ভীষণ সব জানোয়ার, ভগবান ওকে রক্ষা করেছেন৷
• ১১ • (১৯০৮-১৯০৯ ত্রিপুরা রাজ্য৷ লুশাই হিলস) পরের বছর আবার ত্রিপুরা রাজ্যে ফিরে গেলাম, সঙ্গে আট-দশজন সার্ভেয়ার, জরিপের কাজ করতে হবে৷
আগের বছর বহু চেষ্টা করেও লংতরাই যাবার বন্দোবস্ত করে উঠতে পারিনি৷ এবার আমার একজন সার্ভেয়ার লংতারই গিয়েছিল৷ সঙ্গে খালি কয়েকজন হাজারিবাগের খালাসি নিয়ে তাকে যেতে হয়েছিল৷ ও-দেশের কোনো লোকই যেতে রাজি হয়নি৷ এদের কিন্তু কোনো অনিষ্ট হয়নি৷ তারা একটা ফুকিগ্রামে তাঁবু ফেলেছিল, লংতরাই সে-গ্রামের পশ্চিমে৷ সার্ভেয়ারটি মুসলমান, সন্ধ্যাবেলা পশ্চিমমুখী হয়ে নমাজ পড়ছে৷ ফুকিরা অবাক হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখল, তারপর বলল, ‘দেখেছ? এরাও লংতরাই মানে৷ দেখছ-না ওই বাবুও তার পুজো করছে৷’
ত্রিপুরার মহারাজার রাজ্যে ভারী-ভারী সব বন আছে৷ কোন অতীতকালে এসব জায়গায় মানুষের বসতি ছিল৷ বনের ভিতর বড়ো-বড়ো পুকুর পাওয়া যায়, উত্তর দক্ষিণে লম্বা, মনে হয় হিন্দুর পুকুর৷ কোনো-কোনো জায়গায় খেতে জল নিয়ে যাবার খাল আছে, তাকে নহর বলে৷ কিন্তু তাতে জল নেই, সে সব খেতও এখন নেই৷ এখন শুধু দশ-বারো ফুট উঁচু শরবন, আর নল, আর বেত, আর ঘোর জঙ্গল৷ কতকাল হল এসব গ্রাম লোপ পেয়েছে তার ঠিকানা নেই, ও-দেশের লোকরাও বোধহয় সঠিক বলতে পারে না৷ আজকাল আবার একটু-একটু আবাদ আরম্ভ হয়েছে, দু-চার-ছয় ঘর লোক মিলে জায়গায়-জায়গায় নতুন গ্রামের পত্তন করেছে৷
এদের বড়ো কষ্ট৷ বর্ষাকালে সব জ্বরে মরে তার উপর হাতি শুয়োর এসে ধান খেয়ে যায়, তৈরি ফসল, দিনের বেলা তারা ধান কাটে, আবার রাত জেগে পাহারা দেয়, নইলে হরিণ আর শুয়োর সব খেয়ে যাবে, কিছু রাখবে না৷
এদের মধ্যে একজন মুসলমান আমাকে অনেক আদর-যত্ন করে বলল, ‘হুজুর, দু-একটা শুয়োর মারতে পারলে বড়ো উপকার হয়৷’
তার কথায় আমি শুয়োর মারবার জন্য অনেক রাত পর্যন্ত ধানখেতে বন্দুক হাতে বসে রইলাম, কিন্তু সেদিন আর শুয়োর এল না৷ লাভের মধ্যে আমি সেখানকার বিষম হিমে একেবারে ভিজে গেলাম৷ তখন আমি বিরক্ত হয়ে তাঁবুতে এসে সবে একটু ঘুমিয়েছি, অমনি একজন লোক ‘হুজুর, হুজুর’ বলে ছুটে এল৷ ‘চল্লিশ-পঞ্চাশটা শুয়োর এসে খেতে নেমেছে, আসুন৷’ কিন্তু আর কে যায়?
একদিন ও-দেশের কয়েকজন ভদ্রলোক মিলে আমাকে শিকারে নিমন্ত্রণ করেছিলেন৷ হাতিতে চড়ে পাঁচ-ছয় মাইল যেতে হবে৷ সঙ্গে লোকজন বিস্তর চলেছে, তাদের ঘাড়ে এই বড়ো-বড়ো জাল৷ সেই জাল দিয়ে বনের একটা দিক ঘেরা হবে৷ দুটি-দুটি জালের মাঝখানে পনরো-কুড়ি ফুট করে ফাঁকা থাকবে, আর সেই সব ফাঁকের মধ্যে বন্দুক হাতে শিকারিরা দাঁড়াবে৷ বনের এক পাশে রাস্তা আর মাঠ, অন্য পাশে নদী৷ এক মাথায় তো শিকারি আর জালই রয়েছে, অন্য মাথায় গিয়ে সঙ্গের লোকজনরা সারি বেঁধে, শোরগোল করে ঢালঢোল পিটিয়ে, কেরাসিনের টিন বাজিয়ে জঙ্গল ভেঙে আসতে থাকবে৷ বনের ভিতর জানোয়ার যত সব আছে, তারা তখন বেগতিক বুঝে ওই সব জালের ফাঁক দিয়ে পালাবার জন্য ছুটে আসে৷ সেই সময় শিকারিরা তাদের মেরে থাকে৷
আমরা চার-পাঁচজন বন্দুকওয়ালা, আর একজন বুড়ো শিকারি— অনেক বাঘ শিকারের পাণ্ডা সে৷ কে কোথায় দাঁড়াবে, সে-ই সবই ঠিক করে দিল৷
আমরা দাঁড়িয়েছি, দু-চারজনকে আমাদের আশেপাশে গাছে চড়িয়ে দিয়ে বাকি লোকজন সব অন্যদিকে চলে গিয়েছে৷ যারা গাছে চড়েছে তাদের উপর কড়া হুকুম কোন দিক দিয়ে জানোয়ার পালায় তার খেয়াল রাখবে৷ বুড়ো শিকারি বলতে লাগল, ‘বড়ো শিয়াল— মানে বাঘ— বেরোবার খুবই সম্ভাবনা৷ এই জঙ্গলটুকুকে বাঘের আড্ডা বললেই চলে৷’
শুনেই তো বন্দুকধারীরা গাছে চড়বার পথ দেখতে লাগলেন, দু-জন তো বাঁদরের মতো উঠেই গেলেন, আর দু-জন সুবিধা না পেয়ে একটু-একটু খোলা জায়গায় গিয়ে একসঙ্গে দাঁড়ালেন৷
আমি মাটিতেই বসে রইলাম, মোটা মানুষ, গাছে ওঠা চলবে না৷ একটু পরে বুড়ো এসে আমাকে মাটিতে দেখে কী যেন চিন্তা করল, তারপর জিগগেস করল, ‘কর্তা বুঝি গাছে উঠবেন না?’
আমি বললাম, ‘না৷’
তাই শুনে সে বললে, ‘তবে আমি কর্তার কাছেই দাঁড়াব৷’
যে জায়গায় বসেছিলাম, বুড়োর সে জায়গা পছন্দ হল না, সে আমাকে একটা বাঁশঝাড়ের পিছনে দাঁড় করিয়ে দিল৷
বুড়ো বলল, ‘যদি হরিণ আসে সামনে থাকতেই মারবেন, কিন্তু যদি বড়ো শেয়াল বেরোয় তাহলে আমাদের ছাড়িয়ে চলে গেলে তবে মারবেন, পাঁজরার দিকে৷’
দু-জনে বসে আছি৷ ঢাক, ঢোল আর টিনের একটু-একটু আওয়াজ কানে আসছে, বনের ভিতর জানোয়ার নড়বার-চড়বার আওয়াজও একটু-একটু শুনতে পাচ্ছি৷ শুনেই তো আমি একেবারে বন্দুক তুলে তৈরি৷ রাম! রাম! বেরোল কিনা একটা শেয়াল! আমার এমন রাগ হল৷
এতক্ষণে লোকজনের চিৎকারও একটু-একটু শুনতে পাচ্ছিলাম৷ আবার বনের ভিতরে জানোয়ার নড়বার শব্দ, শুকনো পাতার উপর পায়ের আওয়াজ৷ এবার আওয়াজ হচ্ছিল সেই যে দু-জন ভদ্রলোক এক জায়গায় দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের সামনে৷ একটু আওয়াজ হয়েই তখুনি আবার চুপচাপ হয়ে গেল৷
বুড়ো আমাকে হুঁশিয়ার করে দিল জানোয়ার যাই হোক, ওদিক থেকে আমাদের দিকে আসছে৷ এতক্ষণে লোকজনের গোলমালও বেশ কাছেই এসেছে৷ ওই! আবার জানোয়ারের গড়র-গড়র শব্দ৷ একবার শব্দ হওয়া মাত্র আমি বন্দুকের দুই ঘোড়া তুলে রেডি! পরক্ষণেই হুড়মুড় করে সব ভেঙে-চুরে পাঁচটা হাতি বেরিয়ে এল, পোষা হাতি!
আমরা প্রাণপণে হাঁউমাউ করে চেঁচিয়ে, বাঁশ দিয়ে ঠেঙিয়ে হাতিগুলোকে ফেরাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু হতভাগারা কি তা গ্রাহ্য করে? একে তো হাতি, তায় আবার পোষা৷ হাঁউ-মাউ-কাঁউ তারা ঢের শুনেছে, ঠেঙাকে তারা হিসেবেই আনে না৷ জাল-টাল সমস্ত ছিঁড়ে তারা বেরিয়ে গেল৷ ও-দেশে হাতিগুলোকে বনে ছেড়ে দেয়, তারা ইচ্ছমতো চরে খায়৷ একদিন পর, কখনো বা দু-দিন পর মাহুতরা এসে দেখে যায়, নুন খাইয়ে যায়৷
সেদিন আর যে আমাদের শিকার জুটল না তা বলবার আগেই নিশ্চয় সবাই বুঝে নিয়েছ৷
এই হাতি বেরোবার আগে অন্য এক টুকরো জঙ্গল ঘেরা হয়েছিল৷ সেখানেও আমরা বন্দুকধারী সব জালের ফাঁকে-ফাঁকে দাঁড়িয়েছিলাম, কেউ একটা গাছ, কেউ বা একটা ঝোপ মাত্র আশ্রয় করে৷ ক্রমে ঢাক-ঢোলের আওয়াজ বেশ স্পষ্ট শোনা যেতে লাগল৷ আমি আগে কখনো এই রকম শিকার করিনি, সেইজন্য বড়োই ব্যস্ত হয়ে রয়েছি, না জানি কখন কী বেরোয়!
যেন একটা খড়খড় শব্দ কানে পৌঁছল, বন্দুক তুলে খুব নিবিষ্ট মনে জঙ্গল পরীক্ষা করতে লাগলাম, কিন্তু কিছুই চোখে পড়ল না৷ হঠাৎ ভরর শব্দ করে তিন-চারটে বনমোরগ আমার মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল৷ আবার সব নিস্তব্ধ, খালি ঢাক-ঢোলের আওয়াজ৷ আবার ভরর শব্দ করে এক জোড়া মধুরা (কালো ফেজেন্ট) উড়ল, হাতে লম্বা লাঠি থাকলে মারতে পারতাম৷ অন্য শিকারিদের মাথার উপর দিয়েও এমনি মোরগ, মধুরা উড়ে গেছে৷ আর আমরা সবাই বড়ো শিকারের আশায় বসে আছি৷
এতক্ষণে লোকজনদের গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম৷ হঠাৎ শুকনো পাতার উপর জানোয়ার চলবার শব্দ হল, তারপরই সড়াৎ করে আট-দশ ফুট সামনে ঝোপের মধ্যে একটা জানোয়ার লাফিয়ে পড়ল৷ আমার তো মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল৷ না জানি কী বেরোল! তারপরেই তাকিয়ে দেখি একটা শেয়াল! আমাকে দেখেই আবার সে জঙ্গলে গিয়ে ঢুকল৷
দু-তিন মিনিট পরে মনে হল একটা ছোটো ঝোপ একটু নড়ে উঠল, আবার দু-তিন মিনিট সাড়াশব্দ নেই৷ তারপর ধীরে-ধীরে লতাপাতা ফাঁক করে দুটো হরিণ বেরোল৷ একটা এক গুলিতেই শুয়ে পড়ল, অন্যটা বন্দুক ঘুরোবার আগেই অদৃশ্য হয়ে গেল৷
ওই একটিমাত্র হরিণ ছাড়া সেদিন আর অন্য শিকার জুটল না৷ শিকারিরা, জঙ্গল-ভাঙনেওয়ালারা বড়োই দুঃখিত, এখানে নাকি সর্বদা বড়ো-বড়ো শিকার মেলে!
• ১২ • (১৯০৯-১৯১০) এবারও আমি ত্রিপুরা, শ্রীহট্ট আর কাছাড়ে কাজ করতে গিয়েছিলাম৷ এই দু বছরে একটা বিষয়ে খুব অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সে হল জোঁকের৷ জোঁক যদি দেখতে চাও, তাহলে কাছাড়ের বনে একবারটি যাও৷ অনেক দেশে, অনেক জায়গায় ঘুরেছি, এমন জোঁক আর কোথাও দেখিনি৷ সে জোঁকই বা কত রকমের, কত রঙ-বেরঙের! ছোটো, বড়ো, মাঝারি৷ এক-একটা দু-ইঞ্চি আড়াই-ইঞ্চি লম্বাও আছে, সে যখন রক্ত খেয়ে পটলের মতো মোটা হয়, তখন তাকে দেখলে ভয়ে প্রাণ উড়ে যায়৷ কত রঙেরই বা জোঁকগুলো—মেটে, কটা, কালো, ফ্যাকাশে, সবুজ, ছাই৷ এক-একটার গায়ে আবার ডোরা-ডোরা, জলের ভিতর চোখে পড়লে হঠাৎ মনে হয় যেন প্রকাণ্ড শুঁয়ো পোকা!
দু-চার ফোঁটা বৃষ্টি পড়লে তো জোঁকের জ্বালায় ঘাসের উপর বা জঙ্গলের ভিতর চলবার জো নেই! আধ মাইল পার হতে-না-হতেই দুটি পা একেবারে জোঁকে বোঝাই হয়ে যায়, পনেরো-কুড়িটা করে একসঙ্গে এসে ধরে! যাদের খালি পা, তাদের অনেক সময়ই দা দিয়ে চেঁছে জোঁক ছাড়াতে হয়৷ এতেও যদি অব্যাহতি পাওয়া যেত তাহলে আর দুঃখ ছিল না৷ অনেক জায়গায় নীচে তো জোঁক রয়েছেই, তার উপর আবার গাছ থেকেও টুপটাপ করে মাথায় পড়ে৷
সার্ভেয়ার খালাসি পাঠিয়েছে ডাক আনবার জন্য৷ চিঠিপত্র আনবে আর সেইসঙ্গে চাল-ডালও কিছু কিনে আনবে৷ ইতিমধ্যে বেশ এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে৷ ফিরবার সময় খালাসিরা একটা জলার উপর দিয়ে পোল পার হয়ে আসছিল৷ দুখানা আড়াআড়ি বাঁশ, তার উপর লম্বালম্বি তিনখানা বাঁশ পাতা, এই হল পোল এবং এরই উপর দিয়ে পার হচ্ছে৷ এমন সময় নীচের দিকে চেয়ে দেখে মাছ! কই মাছ আর ল্যাটা মাছ! ইঞ্চি তিনেক বৃষ্টির জল জমেছে তারই মধ্যে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে৷
সে মাছের লোভ কি আর সামলানো যায়? খালাসি মাছ ধরবার জন্য লাফিয়ে জলে নামল৷ আর সে যাবে কোথায়! বেচারা আর উঠবার পথ পায় না এমনি জোঁকে ধরেছে তাকে! অনেক কষ্টে উপরে উঠে পা দুখানির দিকে চেয়ে তার চোখ দুটো কপালে উঠে গেল! পা দুটো যেন জোঁক দিয়েই তৈরি৷ ভাগ্যিস আরেকজন লোক সঙ্গে ছিল, সে দা দিয়ে চেঁছে জোঁক ছাড়াল, নইলে সেদিন মাছ খাওয়া ভালো করেই হয়েছিল আর কি!
আমার তো বাঘ-ভাল্লুকের অত ভয় করে না, জোঁককে যত করে৷ ভয় করবে না? এদের হাত এড়াবার জন্য কত ফন্দিই-না করি, কিন্তু এড়াবার জো আছে? কখন যে ধরে তাও বোঝবার উপায় নেই, বোঝবার আগেই সে যত খুশি রক্ত খেয়ে পেট ঢাক করে বসে আছে! মোজা, তার উপর বুট, তার উপর একেবারে পায়ের কবজি অবধি ইজের, তার উপর কবজি থেকে হাঁটু পর্যন্ত পট্টি জড়ানো, তবু তাকে ফাঁকি দেবার জো নেই৷ এতগুলো জিনিসের ভিতর দিয়েও বেমালুম ঢুকে যায়! এমন জানোয়ারকে ভয় করব না তো কাকে করব?
গ্রাম থেকে দেড়-দুদিনের পথ দূরে, ঘোর বনে সফদর-হুসেন সার্ভেয়ার কাজ করে, তার সঙ্গে ন-দশজন লোক৷ খালাসি বেচারিরা বনে থাকে, নুন লঙ্কা ভাত ছাড়া বড়ো একটা জোটে না৷ তাও দুদিনের পথ থেকে পনেরোদিনের মতো একসঙ্গে সব এনে রাখতে হয়৷ মাঝে-মাঝে নুনও ফুরিয়ে যায়, তখন শুধু ভাত খায়৷
আজ বড়ো ভারি শিকার জুটেছে৷ কাজ শেষ করে সার্ভেয়ার তাঁবুতে ফিরে আসছে, আর চোখের সামনেই শিকার, প্রকাণ্ড হরিণ! সেটাকে মারতে পর্যন্ত হবে না, ইতিপূর্বেই বাঘ সেটাকে মেরে নিয়ে খেতে বসেছে৷ অনেকক্ষণ আগে যে মেরেছে তাও না, বড়ো জোর ঘণ্টা দেড়েক হবে৷
সকলে মিলে চিৎকার করে বাঘটাকে তাড়াল৷ তারপর তারা মহা আনন্দে হরিণটাকে বয়ে নিয়ে চলল৷ বাঘ সামান্যই খেয়েছিল, সেদিকের খানিকটা মাংস কেটে ফেলে দেওয়া হল৷ কিন্তু অত বড়ো হরিণ কি সহজে বয়ে নেওয়া যায়? তায় আবার অনেকখানি পাহাড় চড়তে হবে, এদিকে সারাদিন খেটে সকলেই কাহিল হয়ে পড়েছে৷
তখন তারা বুদ্ধি খাটিয়ে উপস্থিত কাজ চালাবার মতো শুধু একটা রাং কেটে নিল, বাকি হরিণটা একটা গাছের উপর, মাটি থেকে দশ-বারো ফুট উঁচুতে দুটো ডালের মাঝখানে টাঙিয়ে রেখে গেল৷
সে রাত্রে তাদের আহারটি বেশ ভালো রকমই হয়েছিল, পরদিন সকালেও ওই মাংসতেই চলেছিল৷ সকালে কাজে যাবার সময়ে সার্ভেয়ার বলল, ‘দুদিনের চাল বেঁধে নিয়ে চলো, কাজ করতে-করতে অনেক দূর যেতে হবে, ফিরবার সুবিধা হবে না৷’
খালাসিদের মহা ফুর্তি! তারা শুধু চাল আর নুন লঙ্কা সঙ্গে নিল, মাংস তো পথেই টাঙানো আছে, তাই দিয়ে বেশ জমকালো রকমের ভোজ হবে৷
জিনিসপত্র ঘাড়ে করে হাসতে-হাসতে তারা গাছতলায় এল৷ কিন্তু হায়, হায়! মাংস তো নেই, একটুও নেই! আছে শুধু গাছের গায়ে বাঘের নখের আঁচড়! বাঘের মতো জন্তু, সে নিজের হাতের শিকার অত সহজে ছেড়ে দেবে, তা কখনো হতে পারে? নিশ্চয় চুপি-চুপি তাদের পিছন-পিছন এসে সব দেখেছিল৷ তারপর সুবিধা বুঝে, লাফ দিয়ে, থাবা মেরে হরিণ নামিয়ে নিয়ে গেছে৷ মাটিতে যে রক্ত পড়েছিল, তাও চেটে-চেটে খেয়ে যেতে ভোলেনি৷ এদিকে এ বেচারাদের যে কষ্ট সেই কষ্ট! আবার সেই নুন লঙ্কা দিয়ে ভাত খেতে হল৷
আরেকবার দু-জন সার্ভেয়ার কাছাড়ের বনে কাজ করতে গিয়েছিল৷ একই নালার ধারে তিন-চার মাইল উপরে নীচে তাদের ডেরা৷ ঘোর জঙ্গল, বুনো হাতির রাস্তা ছাড়া পথ নেই৷ চোদ্দো-পনেরো মাইল দূর থেকে চাল-ডাল ইত্যাদি এনে খেতে হয়৷ প্রত্যেকের সঙ্গে দশ-বারোজন করে হাজারিবাগের খালাসি ছিল৷ কাজকর্মও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, চার-পাঁচদিনের বেশি কাজ বাকি নেই৷ তারপর তারা অন্য জায়গায় যাবে৷
গোপাল সিং আর অমর সিং দু-জনেই রাজপুত৷ গোপাল সিং দিনের কাজ শেষ করে তাঁবুতে এসে হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসেছে৷ তার চারকটাও তার সামনে বসে খাচ্ছে, মাঝখানে হাত দু-তিন জায়গা৷ দু-গ্রাস ভাতও মুখে দেয়নি, আর অমনি ‘হাল্লুম’ বলে এই বড়ো বাঘ দু-জনের মাঝখানে লাফিয়ে পড়েছে! বাঘ দেখেই তো তারা বন্দুকের গুলির মতো দু-দিকে ছিটকিয়ে পড়ল, তারপর বাপ রে বাপ, খাওয়া-দাওয়া কোথায় গেল, জিনিসপত্র ফেলে দে পিট্টান!
হাতির রাস্তা ধরে তারা প্রাণপণে ছুটতে লাগল৷ দু-তিন মাইল চলে দেখতে পেল অমর সিং তার কাজ শেষ করে তাঁবুতে ফিরে যাচ্ছে৷ অমর সিং ওদের দেখে মনে করল বুঝি কাজ শেষ হয়ে গেছে৷ তারপর যখন শুনল যে তারা বাঘের ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, তখন অমর সিং গোপাল সিংকে বুঝিয়ে বলল, ‘দেখো, কাজ থেকে পালিয়ে গেলে বড়ো বদনাম হবে৷ জঙ্গলের কাজ, জানোয়ার তো হামেশাই পাওয়া যায়৷ আমার কাজ শেষ হয়ে গেছে, চলো, কাল থেকে আমরা দু-জনে মিলে তোমার কাজ করি৷ দু-তিনদিনেই শেষ হয়ে যাবে, তখন একসঙ্গে চলে যাব৷ আমাদের দু-জনের ডেরা এক জায়গায় থাকলে আমরা কুড়ি-বাইশজন লোক হব, তাহলে আর কোনো জানোয়ার আসবে না৷’
এই প্রস্তাবে গোপাল সিং রাজি হয়ে, অমর সিং-এর সঙ্গে তার তাঁবুতে গেল৷ সেখানেও ভাত তৈরি, দুই দলে মিলে তাই ভাগ করে খেতে বসল৷ একজন খালাসির খাওয়া শেষ হয়েছে, সে বেচারা ডেরার পাশে নালার জলে থালাখানা ধুতে গেছে৷ অমনি বাঘ এসে তার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়েছে! কারো মনে হয়নি যে সে ব্যাটা এই তিন-চার মাইল পথ চলে তাদের পিছন-পিছন এখানে এসে হাজির হবে৷ বাঘে ধরবামাত্র লোকটা চেঁচিয়ে উঠল আর সঙ্গে-সঙ্গে অপর সকলেও এমনি চিৎকার জুড়ে দিল যে আর কী বলব!
অমর সিং-এর টিন্ডেল অর্থাৎ সর্দার খালাসি নান্দা ছিল বড়ো বাহাদুর লোক৷ এর আগেও ব্রহ্মদেশে দু-একবার বাঘের সঙ্গে তার হাতাহাতি হয়েছে৷ সে তখনই ধুনি থেকে একটা জ্বলন্ত বাঁশ তুলে নিয়ে, ছুটে গিয়ে, ধাঁই করে বাঘের মাথায় এক ঘা বসিয়ে দিল৷ তার ফলে বাঘও সেই লোকটিকে ছেড়ে দিয়ে তৎক্ষণাৎ নান্দাকে ধরে বসল৷
নান্দা কিন্তু ছাড়বার পাত্র নয়৷ তার বাঁ হাতটা বাঘের মুখে রইল আর ডান হাতের সেই বাঁশ দিয়ে সে বাঘের নাকমুখ বেশ করে থেঁতলিয়ে দিতে লাগল৷ বাঘ তখন বেগতিক বুঝে নান্দাকে ছেড়ে দিয়ে নদীর ওপারে গিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল৷ তাই দেখে নান্দাও সেই লোকটাকে তুলে উপরে নিয়ে এল৷
বাঘ কিন্তু সেখান থেকে যায়নি, এপারে বসে রাগে গরগর করছে৷ সকলে ভয়ে তাঁবুর ভিতরে গিয়ে আশ্রয় নিল, আর প্রাণপণে তাঁবুর দরজার সামনের ধুনিটা উস্কে দিতে লাগল৷ কিন্তু বাঘ কি তাতে ভয় পায়? তার মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়া হয়েছে, সে অত সহজে ছাড়বে কেন? নালা ডিঙিয়ে এসে তাঁবুর চারদিকে ঘুরতে লাগল৷ এক-একবার ভীষণ রাগে তাঁবুতে থাবা মারতে লাগল, আর সে কি ভীষণ গর্জন!
এদিকে তাঁবুর ভিতরে সকলে প্রাণপণ চ্যাঁচাচ্ছে আর থালা, ঘটি, বাটি, কেরাসিনের টিন, যা কিছু ছিল তাই নিয়ে খুব করে পিটছে৷ এমনি করে অনেক রাতও হল আর বাঘও যেন চুপ করে গেল৷ এদিকে ধুনিটাও একটু নিবু-নিবু হয়ে এল৷ বাঘের সাড়াশব্দ নেই, হয়তো চলে গিয়ে থাকবে, এই মনে করে একজন খালাসি সাহসে বুক বেঁধে, ধুনিটাকে উস্কিয়ে দেবার জন্য বাইরে এল৷
আর যাবে কোথায়? হতভাগা বাঘ ধুনির পিছনেই লুকিয়ে বসেছিল, লাফিয়ে এসে তার ঘাড়ে পড়ল!
এখন এ বেচারাকে কে ছাড়াবে? আর কে ছাড়াবে? নান্দার হাত দিয়ে দরদর করে রক্ত পড়ছে, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই, আবার ধুনি থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠ নিয়ে কষে বাঘের মাথায় এক ঘা!
বাঘ নান্দাকে বেশ চিনেছিল, সেইজন্য এক ঘা খেয়েই আর দ্বিতীয় ঘায়ের জন্য অপেক্ষা করল না, তার বোধহয় মনে হল এবার লেজটি গুটিয়ে সরে পড়াই ভালো৷
তখন সে লোকটাকে তাঁবুতে এনে, সকলে মিলে চেঁচিয়ে আর থালা-ঘটি পিটে রাত কাটাল৷ সকালে উঠে জিনিসপত্র সেখানেই ফেলে, শুধু নকশাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে চম্পট দিল৷
দুদিন পরে সেই আড্ডায় গিয়ে দেখা গেল যে বাঘটা রাগের চোটে তাঁবুটাকে কামড়িয়ে টুকরো-টুকরো করে ফেলেছে৷ এক বস্তা চাল আর একটা তেপায়া ছিল, সেগুলোকেও চিবিয়ে আর কিছু রাখেনি৷
প্রথম যে লোকটাকে বাঘে ধরেছিল, সে তিনদিন পরে মারা গেল৷ নান্দা আর অন্য লোকটা তিন মাস হাসপাতালে ভুগে ভালো হয়ে গেল৷
বনের ভিতর জরিপের কাজ করতে হলে, সামনে আর পিছনে দু-জন লোক নিশান নিয়ে দাঁড়ায়, আর ওই নিশান দেখে-দেখে ৬৬ ফুট লম্বা জরিপের চেন দিয়ে মেপে যেতে হয়৷ অনেক সময় কিন্তু নিশানও দেখা যায় না, তখন একখানা ছোটো আয়না হাতে নিয়ে চমকাতে হয়৷ তার ঝিকমিক তিন-চার জরিপ দূর থেকে দেখা যায়৷ আয়না চমকাবার সময় সামনের লোকটি সঙ্গে-সঙ্গে চিৎকার করতে থাকে, তাতে ঠিক তার সোজাসুজি জরিপ দিয়ে মাপবার সুবিধা হয়৷
ফুটকিয়া নতুন লোক, সামনের চমকের কাজ তার হাতে৷ চমক দিয়েছে ঠিকই কিন্তু আওয়াজ আর দেয় না৷ ব্যাপার কী? সে পথে বাঘের ভয় আছে, গ্রামের লোকেরা আগেই আমাদের সাবধান করে দিয়েছিল৷ কাজেই আমার মনে একটু সন্দেহ হল, আমি লম্বা-লম্বা পা ফেলে দেখতে চললাম৷
একটু দূর গিয়েই দেখি কাদার উপর ফুটকিয়ার পায়ের দাগ আর তার পাশেই প্রকাণ্ড বাঘের পাঞ্জা৷ বাঘটা এইমাত্র গিয়েছে, তখনও চারদিক থেকে জল গড়িয়ে এসে পাঞ্জার দাগে জমা হচ্ছে! আমি খুব জোরে চিৎকার করে হাঁক দিলাম, ‘ফুটকিয়া!’ হাত কুড়ি-বাইশ সামনে থেকে ভাঙা গলায় আওয়াজ হল: ‘হুজুর!’ আর তার সঙ্গে-সঙ্গেই মনে হল কী একটা জানোয়ার জঙ্গলে গা ঢাকা দিল৷ দৌড়ে ফুটকিয়ার কাছে গেলাম৷ বেচারা রাস্তার মাঝখানে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে কথাটি নেই৷
‘কীরে, কী হয়েছে?’
বললে, ‘একটা কিছু আমার পিছনে-পিছনে আসছিল৷’
‘কোথায় গেল?’
‘এখানেই তো ছিল, হুজুর ডাকলেন আর জঙ্গলে ঢুকে পড়ল৷’
যেখানটায় ছিল বলে দেখিয়ে দিল সে জায়গাটা ফুটকিয়ার কাছ থেকে সাত-আট হাত দূরে হবে৷
‘কেমন জানোয়ার ছিল রে?’
‘তানি মটুকে তো থা— ’ বলে হাত দিয়ে মাটি থেকে ফুট দুই উঁচু দেখাল৷ ‘লাল আউর কালা ভি থা৷ এতনা বাড়া শির থা, আউর দুম হিলাতা থা৷’
‘আরে, শের থা রে?’
‘নহি হুজুর! শের হোতা তো হামকো খা ডালতা নহি?’
ভালো! যে প্রকাণ্ড পায়ের দাগ, আমার আর মিনিট খানেক দেরি হলেই খা ডালতা কিনা বুঝতে পারত৷ আসল কথা ফুটকিয়া কখনো বাঘ দেখেনি৷
গরমের দিনের রোদ হাতির সহ্য হয় না, সেইজন্য ভোরে জিনিসপত্র নিয়ে লোকজন চলে গেছে, আমি সার্ভেয়ারের সঙ্গে কাজে গিয়েছি৷ বেলা বারোটার পর কাজ বন্ধ করে ঘোড়ায় চড়ে তাঁবুতে চললাম৷ বারো মাইল যেতে হবে, পথে আবার পাহাড়ের চড়াই আছে৷ পাঁচ-ছয় মাইল মাত্র গিয়েছি, দেখলাম রাস্তার পাশে কয়েকটা বোঝা পড়ে আছে, সেগুলি দেখতে ঠিক আমাদের মালপত্রেরই মতো৷ আরও একটু চলে দেখি একটা গাছের ছায়ায় আরও মালপত্র আর সঙ্গে একটা খালাসি বসে রয়েছে৷
‘আরে, কেয়া হ্যায় রে?’
‘হুজুর, একটা হাতি ভেগেছে, তাই আমি জিনিসপত্র আগলাবার জন্য বসে আছি, টিন্ডেল আর লোকজনরা হাতির পিছন-পিছন দৌড়েছে৷’
এই ফটিফটিয়া অর্থাৎ মোটর-সাইকেল বড়ো বিষম জিনিস৷ হাতি বেচারা আসামের জঙ্গলে নিশ্চিন্ত মনে পথ চলেছে আর যদি বিনা নোটিশে পিছন থেকে ওই বিদঘুটে আওয়াজ করতে-করতে একটা কিম্ভূতকিমাকার জীব এসে পড়ে, তাহলে কার না প্রাণ আঁতকে ওঠে?
চা বাগানের সাহেবদের ফটফটিয়া আছে৷ এদের জ্বালায় কতবার যে নাকাল হতে হয়েছে সে আর কী বলব! রাস্তার মোড় ঘুরেছি অমনি ফটফট আওয়াজ করে এসে হাজির! ঘোড়াটা লাট্টুর মতো ঘুরে যেদিকে তার মন গেল দে দৌড়! সে কাঁটাই হোক, আর কাদাই হোক, আর যাই হোক! দুর্দশা দেখে কেউ একটু সহানুভূতিও প্রকাশ করে না, সবাই হেসে কুটোপাটি!
আমার সঙ্গের হাতি দুটোর মধ্যে একটা কানা ছিল, তাকে নিয়েই যত গণ্ডগোল হত৷ বেচারা এক চোখে কিছুই দেখতে পায় না, অন্য চোখটাও প্রায় অকর্মণ্য— ছানি পড়েছে, কাজেই পালানোই আত্মরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায় ঠাউরিয়ে ছিল৷
এ বছর কাজ শেষ করে আমরা শিলং চলে গেলাম৷ আমাদের আপিস ব্যাঙ্গালোর থেকে শিলং-এ উঠে এল৷ এখন আমাদের আসামেই কাজ করতে হবে৷
• ১৩ • (১৯১০-১৯১২ আসাম৷ খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড়) এবার খাসিয়া পাহাড়ে কাজ করতে গেলাম৷ রাস্তার কষ্ট আমার আর গেল না৷ বর্মা, ত্রিপুরা, লুশাই হিলস সব জায়গায় রাস্তার কষ্ট ভোগ করেছি, আবার এখানেও সেই রাস্তার কষ্ট! দু-বছর খাসিয়া পাহাড়ে কাজ করেছিলাম আর দুবছরই হাড়ভাঙা খাড়া রাস্তা, আর বাঁশ আর লতার পোল নিয়ে সার্কাস করার মতো কসরত করতে হয়েছে৷
খাসিয়া পাহাড়ের গড়নটা একটু অদ্ভুত৷ যেন একটা প্রকাণ্ড বড়ো টেবিলের উপরটার একদিক উঁচু করে তুলে ধরা হয়েছে, আর উপরের কাঠটা করাত দিয়ে তিনকোনা ফালি-ফালি করে চেরা হয়েছে৷ খাসিয়া পাহাড় একটি অধিত্যকা, টেবল-ল্যান্ড৷ মাঝে-মাঝে নদী-নালা সব প্রকাণ্ড-প্রকাণ্ড খাদ কেটে বয়ে গেছে৷ অধিত্যকার উপরটা বেশ, বেশি চড়াই-উতরাই নেই, যেদিকে খুশি যাতায়াত করা যায় কিন্তু ওই খাদগুলো পার হওয়া প্রাণান্তকর ব্যাপার৷ উপরের অংশে জঙ্গল নেই বললেই হয়, অনেক জায়গাতেই পাহাড়ের উপর শুধু ঘাস, কোথাও বা পাথর, আর মাঝে-মাঝে গাছ৷
চেরাপুঞ্জিতে ছিলাম৷ একজন সার্ভেয়ারের কাজ দেখতে যেতে হবে৷ পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য একজন খালাসি এসেছে৷ তাকে জিগগেস করলাম, ‘বাবুর ডেরা কত দূর?’
‘দশ-বারো মাইল হবে৷’
‘রাস্তা কেমন?’
‘পাকডাণ্ডি রাস্তা হুজুর, বহুৎ খারাব৷’
ঘোড়াও যাবে না, ধরে-ধরে উঠতে হয়৷
সকালে সার্ভেয়ারের ক্যাম্পে যাব, আগের দিন বিকেলে দেখতে গেলাম রাস্তা কেমন৷ বাপ! ও রাস্তায় যাওয়া আমার কর্ম নয়৷ কিছু দূর ধরে-ধরে বেশ চলে যাওয়া যায়৷ তারপর পঞ্চাশ-ষাট ফুট একেবারে খাড়া পাথর৷ সে জায়গায় দুখানা বাঁশ পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে রাখা হয়েছে, মাঝে-মাঝে আবার লতা দিয়ে পাথরের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যেন পড়ে না যায়৷ ওই মই দিয়ে ওঠা-নামা আমার কর্ম নয়!
খালাসিকে জিগগেস করলাম, ‘এমন কটা আছে?’
সে বললে যে চার-পাঁচ জায়গায় এমনি করে বাঁশ বা বড়ো গাছের ডালের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা-নামা করতে হবে৷ শুনেই তো আমি ফিরে এলাম৷ ওই প্রকাণ্ড খাদের তিনদিক ঘুরে সার্ভেয়ারের তাঁবুতে পৌঁছতে আমার চারদিন লাগল৷ খাসিয়া পুরুষ-মেয়েরা কিন্তু পিঠে বোঝা নিয়ে অক্লেশে এই সব পথ দিয়ে যাতায়াত করে৷ এই রকম গোটা কয়েক খাদ আমার কাজের এলাকার মধ্যে ছিল৷ প্রাণের দায়ে সবকটাই তিন-চার দিনের রাস্তা ঘুরে যাওয়া-আসা করতে হত৷
কিনসি নদীতে পোল পার হওয়াও এক ব্যাপার, বিশেষত এক পশলা বৃষ্টি হবার পর৷ নদী সেখানে প্রায় একশো গজ চওড়া, সাধারণত তাতে কোমর জল৷ তার উপর পোল৷ দু-খানা করে বাঁশ আড়াআড়ি (ক্রস করে) পাতা কুড়ি-পঁচিশ ফুট দূরে-দূরে, আর তার উপরে দু-খানা করে বাঁশ লম্বালম্বি পাতা, ভালো করে জড়িয়ে বাঁধাও নয়৷ আড়াআড়ি বাঁশের এক দিকে মোটা এক-গাছি লতা বেঁধে দিয়েছে, সেইটাই হল ধরবার রেলিং!
এই তো পোল, এরই উপর দিয়ে পার হতে হবে! বুটসুদ্ধ সে যে কী ব্যাপার তা বুঝতেই পার৷ রেলিংটা যদি শক্ত বাঁশের হত তবুও একটু ভর দিয়ে নিজেকে সামলিয়ে নেওয়া যেত, এই ল্যাকপ্যাকে লতায় সে উপায়ও নেই৷ পোলের উপর উঠে চার-পাঁচ পা যেতে-না-যেতেই সমস্ত পোলটা দুলতে থাকে আর পাতা বাঁশ দুটো ক্যাঁচম্যাচ করতে আরম্ভ করে! এই বুঝি ভেঙে জলে পড়লাম৷ আর বৃষ্টি পড়লে তো পাথরে পাঁচ কিল! নদীর জল পাগলা কুকুরের মতো দৌড়তে থাকে আর সমস্ত পোলটা থরথর করে কাঁপতে থাকে৷
বড়ো সাহেব কাজ পরিদর্শনে এসেছিলেন৷ তাঁকে কিনসি নদী পার হতে হবে৷ নদীর ধারে এসে জিগগেস করলেন, ‘পার হব কী করে?’
‘ওই পোলের উপর দিয়ে৷’ বলেই আমি গিয়ে পোলের উপর উঠলাম৷ সাহেব একটুক্ষণ পোলের রকমসকম দেখলেন, তারপর ঝপ-ঝপ করে জলে নামলেন৷ বললেন ওই সব বাঁদুরে কায়দার আর তাঁর বয়স নেই! সমস্তদিন বেচারাকে ভিজে কাপড়ে থাকতে হয়েছিল৷
মনে পড়ল শান স্টেটে একবার এমনি এক পোল পার হতে গিয়ে আমাদের অফিসার মিস্টার ফে- র বড়ো দুর্দশা হয়েছিল৷ রামশরণ হল গাড়ওয়ালি ব্রাহ্মণ, বেঁটে মানুষ, কিন্তু খুব মজবুত আর বাঁদরের মতো পাহাড়ে চড়ে৷ মিস্টার ফে— এসেছেন তার কাজ একজামিন করতে৷ সাহেব হলেন লম্বা-চওড়া মোটাসোটা মানুষ, ওজন প্রায় আড়াই, পৌনে-তিন মন হবে, বয়সও হয়েছে ঢের৷
সকালে উঠে খচচর বোঝাই করে জিনিসপত্র পাঠিয়ে দিয়ে সাহেব কাজে বের হলেন৷ কিছু দূর গিয়েই নদী পার হবার পালা৷ প্রায় একশো পঁচিশ গজ চওড়া নদী, ঢের জল তাতে, আর ওইরকম একটি পোল৷
পোল দেখে তো সাহেবের চক্ষুস্থির!
‘রামশরণ, পার হব কী করে?’
‘কেন সায়েব ওই তো পোল রয়েছে?’
‘আরে, ওতে কি ভার সইবে?’
‘আলবৎ! বহুত মজবুত হ্যায়, হুজুর!’ বলে রামশরণ পোলের উপর গিয়ে উঠল, আর কিছু দূর গিয়ে, লাফিয়ে, নেচে কুঁদে, সাহেবকে দেখিয়ে দিল যে পোলটা সত্যি-সত্যিই মজবুত৷ রামশরণ পার হয়ে গেল৷ সাহেব দাঁড়িয়ে পরিণাম দেখলেন, তারপর তিনিও পোলের উপরে উঠলেন, আর পা টিপে-টিপে এগোতে লাগলেন৷ প্রায় মাঝামাঝি পৌঁছেছেন তখন পোলটা দুলতে আরম্ভ করল৷ সাহেব একটু থতোমতো খেয়ে লতার রেলিং চেপে ধরলেন৷ ওই তো রেলিং, সে অত ভার সইবে কেন? পোলও আরও দুলতে আরম্ভ করল, সাহেব নিজেকে সামলাতে গিয়ে বেশ একটু জোরে পা ফেলেছেন আর মড়-মড়-মড়াৎ— সাহেব একেবারে গলা-জলে!
লোকজন ছুটে গিয়ে তাঁকে তুলল৷ উঠেই তিনি সার্ভেয়ারের বাপান্ত করলেন৷ বেচারাকে শান স্টেটের ওই দারুণ শীতে সমস্তদিন ভিজে কাপড়ে থাকতে হল৷
বাঘ, নেকড়ে, বা শেয়াল মারবার জন্য অনেক রকম ফাঁদ দেখেছি যা জঙ্গলের লোকরা ব্যবহার করে৷ বর্মাই বল, আসামই বল, আর বাঙলাদেশই বল, সব জায়গাতেই এই সব ফাঁদের একটা আশ্চর্য সাদৃশ্য আছে৷
জানোয়ারের চলতি রাস্তার (গেম ট্র্যাক-এর) ধারে, পাহাড়ের খুব ঢালু জায়গায়, গভীর গর্ত খুঁড়ে, তার মধ্যে ভীষণ ধারালো সব বল্লম পুঁতে রাখে৷ তার উপর বাঁশের কঞ্চি বা বাঁখারির চাল তৈরি করে, মাটি, ঘাস, লতাপাতা দিয়ে এমন করে ঢেকে রেখে দেয় যে কিছু বোঝাই যায় না৷ তারপর ওই মাচার উপর বেশ মোটাসোটা একটা কুকুর-ছানা বা শুয়োরছানা বেঁধে রেখে দেয়৷ বাঘ আপন মনে হেলে-দুলে ওই পথে চলতে গিয়ে দেখতে পায় সামনেই খাবার তৈরি! হাল্লুম! আর যাবে কোথায়, বল্লম বিঁধে প্রাণ হারায়!
আবার ঠিক ওই রকম করে রাস্তার মাঝে, মাটিতে গর্ত খুঁড়ে, ঢাকা দিয়ে, টোপ বেঁধে রেখে দেয়৷ মাচার নীচে বল্লমের বদলে থাকে কাদা৷ এর মধ্যে পড়লে বাঘ প্রাণে মরে না বটে কিন্তু কাদায় পড়ে নড়বার জো থাকে না, চেঁচিয়ে দেশ মাথায় করে৷
তারপর বেড়ার মধ্যে ফুটো করে তাতে পাকা বেতের ফাঁস ঝুলিয়ে রাখা হয়৷ ফাঁসটা একটা মজবুত বাঁশের ডগায় বেঁধে, জোর করে বাঁশটা নীচু করে আটকিয়ে রাখা হয়৷ বেড়ার ফুটোর সামনেই মোরগ বা অন্য কিছু টোপ কায়দা করে দড়ি দিয়ে ফাঁসের সঙ্গে জড়ানো থাকে৷ বাঘ বা শেয়াল খাবার লোভে, ফুটো দিয়ে ঢুকে যেমনি মোরগ ধরে টান দেয়, অমনি কল খুলে যায়, সঙ্গে-সঙ্গে জানোয়ারটারও হাতে, পায়ে বা গলায় ফাঁস লেগে সে শূন্যে ঝুলতে থাকে৷ তারপরে যা তামাশা!
আবার মাটিতে মজবুত খুঁটি পুঁতে খোঁয়াড় তৈরি করা হয়৷ তার মধ্যে একটা ছোটো কুঠুরিতে কুকুর বা ছাগল বেঁধে রাখে৷ খোঁয়াড়ের দরজা কল এঁটে খুলে রাখা হয়৷ বাঘ ভিতরে ঢুকে যেই টোপটি খেতে যায় অমনি হড়াৎ করে দরজা বন্ধ হয়ে যায়৷ তারপর মারো আর ধরো, যেমন ইচ্ছা৷
বাঘ চলবার রাস্তা বা তার মারা শিকারের উপর তীর বা বন্দুক পেতে রাখে৷ বাঘ এসে শিকার ধরে টানলেই, তীর বা বন্দুকের গুলিতে মারা যায়৷ তীরটা অবশ্য বিষাক্ত৷
মজবুত কাঠের মাচা তৈরি করে তার উপর ভারি-ভারি পাথর বা কাঠ চাপিয়ে রাখে৷ মাচার একটা দিক বেশ শক্ত করে মাটিতে আটকিয়ে দেয়৷ অন্য দিকটা তুলে ধরে দড়ি দিয়ে নীচের টোপের সঙ্গে কৌশল করে বেঁধে রাখে৷ বাঘ বা শেয়াল টোপ ধরে টানবামাত্র কল খুলে যায় আর ওই প্রকাণ্ড বোঝা তার ঘাড়ে পড়ে৷ এই ফাঁকে শেয়াল বা ছোটো বাঘ চাপা পড়ে৷
এরই আবার একটা রকমারি খাসিয়া পাহাড়ে পেয়েছিলাম৷ সেটাতে মাচা তৈরি করে ওজন চাপানো নয়, প্রকাণ্ড একটা পাথর চমৎকার ব্যালান্স করে রাখা, আর তার উপরে টোপ৷ লাফিয়ে ছাড়া ওই টোপ ধরা যায় না, আর লাফালেই পাথর উলটিয়ে গিয়ে জানোয়ারটা চাপা পড়ে প্রাণ হারায়৷ এই রকম একটা বাঘের ফাঁদে পড়ে আমার রাজপুত সার্ভেয়ার আরেকটু হলেই প্রাণ হারিয়েছিল৷
অমর সিং পাহাড়ের উপর কাজ করছিল৷ যে জায়গায় দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে ভালো দেখতে পাচ্ছিল না৷ তার পাঁচ-সাত ফুট নীচে একটা বেশ বড়ো পাথর ছিল৷ মনে করল হয়তো বা পাথরটার তলায় গেলে ভালো দেখতে পাবে৷ লোকজনদের বললে, ‘যন্ত্রপাতি নিয়ে তোমরা ঘুরে ওই পাথরটার নীচে নেমে যাও৷ আমি সোজা নামছি৷’
খালাসিরা ঘুরে নামতে আরম্ভ করল আর অমর সিং সোজা ওই পাথরটার উপর লাফিয়ে পড়ল৷ ওটা ছিল বাঘ মারা ফাঁদ৷ লাফিয়ে পড়বামাত্র পাথরটা উলটিয়ে গিয়ে তাকে চাপা দিল৷ তার অদৃষ্ট ভালো, ভগবানের কৃপায় এক পাশে পড়েছিল, শুধু একটা পা চাপা পড়েছিল, তার ফলে চলৎশক্তি রহিত হয়ে দশ-বারোদিন বিছানায় পড়েছিল৷
গৌহাটি-শিলং রাস্তার মাঝামাঝি নংপো৷ নংপো থেকে একটু দূরেই সরকারি রিজার্ভ ফরেস্ট৷ ওই জঙ্গলে সার্ভেয়ার নারায়ণ সিং কাজ করছিল৷ দুটো পাগলা হাতি, যাকে বলে ‘মস্ত’, ওই জঙ্গলে ছিল৷ যদিও আজ পর্যন্ত হাতি ওদের চোখে পড়েনি, তবুও ওরা খুব সাবধানে কাজ করত৷ একদিন কাজে বেরিয়েছে৷ পিছন থেকে চমকওয়ালা চমক দিলেই কাজ আরম্ভ করবে, সেইজন্য দাঁড়িয়ে আছে৷
সার্ভেয়ার আর তার সঙ্গের লোকরা ক্রমাগত চেঁচাচ্ছে, ‘আরে চমকাও রে, চমকাও৷’ কিন্তু চমক আর দেয় না৷ বিরক্ত হয়ে দু-জন খালাসি দেখতে গেল লোকটা কী করছে, চমক দেয় না কেন৷ তারা নীচে নেমে দেখে লোকটা সেখানে নেই৷ চেঁচিয়ে বাবুকে ডাকল৷ সার্ভেয়ারও দৌড়ে গেল৷ একটু দূরেই তার দাখানা পড়ে রয়েছে৷ কাছে গিয়ে দেখল রক্ত আর মগজ! আরও একটু দূরে দেখতে পেল একটা বাঁশঝাড়ের মধ্যে খালাসির চূর্ণ করা দেহটা বিঁধে রয়েছে৷ সব জায়গায় হাতির পায়ের দাগ৷
সকালের কুয়াশাতে তারা হাতির রাস্তায়-রাস্তায় কাজ করছিল৷ কোথায় যে পাশেই হতভাগা হাতি চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল সেটা কুয়াশার জন্য দেখতে পায়নি৷ আর সকলে চলে যাবার পর যখন চমকওয়ালা একলা সেখানে দাঁড়িয়েছিল, তখন হতভাগা হাতি নিঃশব্দে বেরিয়ে এসে তাকে ধরেছিল আর সঙ্গে—সঙ্গেই আছাড় মেরে হাড় ভেঙে দেহটাকে ওই বাঁশঝাড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল৷
পরে ওই হাতিটাকে আসামের কমিশনার সাহেব মেরেছিলেন৷
এ-বছর আমার কাজ ছিল খাসিয়া আর গারো পাহাড়ের সীমানার কাছে৷ সেখানে একটা জায়গা ছিল একেবারে গ্রামশূন্য৷ ওই জায়গাটাতে মেলা শিকার ছিল৷ দু-জন সার্ভেয়ারের কাজ দেখতে গিয়েছিলাম, তাদের খালাসিরা একমাস ধরে শুধু নুন লঙ্কা আর ভাত খাচ্ছে৷ আমাকে দেখে মুখ ভার করে অবস্থাটা জানাল৷ বিকেলে বন্দুক হাতে বেরোলাম আর আধ-ঘণ্টার মধ্যে দুটো হরিণ মারলাম, একটা প্রকাণ্ড সম্বর আর একটা বড়ো বার্কিং ডিয়ার৷ সম্বরটাকে আট-দশজন লোকও তুলে আনতে পারেনি৷ চামড়া ছাড়িয়ে, মাংস কেটে টুকরো-টুকরো করে আনতে হয়েছিল৷ লোকও ঢের ছিল, দুজন সার্ভেয়ার আর আমার খালাসিরা ছাড়াও চার-পাঁচজন খাসিয়া কুলি৷ মাংস ভাগ-বাটরা করে দেওয়া হল, প্রত্যেকেই অনেক মাংস পেল আর সকলেই মহা খুশি!
রাত্রে খালাসিরা মিলে অনেক রাত পর্যন্ত হল্লা করল৷ ভোরে শুনি আবার হল্লা৷ আমি উঠে হাত-মুখ ধুয়ে, কাপড়-চোপড় পরে চা খেতে বসেছি, কাজে বেরোতে হবে৷ আমার টিন্ডেল হাঁড়িপানা মুখ করে এসে নালিশ করল, ‘হুজুর, আমার মাংস চুরি করে খেয়ে ফেলেছে৷’
‘কে খেয়েছে?’
‘পাহারাওয়ালারা৷’
‘কাদের পাহারা ছিল?’
দু-জন খালাসির নাম করল৷ তাদের একজন আবার ওর নিজের শালা৷ তাদের দুজনকে ডেকে আনলাম৷
‘কী ব্যাপার? তোমরা মাংস খেয়ে ফেলেছ?’
‘হ্যাঁ হুজুর, মেলা মাংস খেয়েছি৷’
‘তোমাদের হিস্যার মাংস ফেলে ওরটা খেলে কেন?’
তখন হাত জোড় করে টিন্ডেলের শালা বলল, ‘হুজুর, ওটা ওর হিস্যার মাংস নয়৷ ওটা চুরির মাংস৷’
‘চুরির মাংস কেমন?’
‘হুজুর, কাল দুটো হরিণ মেরেছিলেন আর সকলকে বেঁটে নিতে বলেছিলেন৷ এদিকে টিন্ডেল ছোটো হরিণটার একটা পিছনের ঠ্যাং লুকিয়ে রেখে বাকি মাংস ভাগ করে দিয়েছিল, নিজেকে সুদ্ধ হিসেব করে৷ রাত্রে সবাই শুলে ওই ঠ্যাংটা বের করে, লম্বা-লম্বা ফালি করে কেটে আগুনের উপর টাঙিয়ে দিয়েছিল আর আমাকে পাহারায় বসিয়ে রেখেছিল, শুকোলে যেন তুলে রাখি, ওই মাংস সে দেশে নিয়ে যাবে৷ এটা কেন ভাগ করা হয়নি জিগগেস করাতে আমাকে ধমকে বললে, ‘‘চারসের-সাড়ে-চারসের মাংস পেয়েছিস, আবার কী চাস? চুপ করে থাক, আর যা বলছি তাই কর৷’’ আমরা কিন্তু ওই মাংস আগুনে পুড়িয়ে, নুন দিয়ে খেয়ে ফেলেছি৷’
আমার এমন হাসি পেয়েছিল যে কী বলব৷ টিন্ডেলকে বললাম, ‘ওদের হিস্যা ওরা খেয়ে নিয়েছে তাতে নালিশ করবার কিছু নেই! আর তোমার হিস্যা তোমার শালা খেয়েছে, তাতে তোমার বলবার কী আছে? শালারা তো অমন খেয়েই থাকে!’
• ১৪ • (১৯১২-১৯১৩ আসাম৷ কামরূপ) গৌহাটির পরপারে ফুরুয়া পাহাড়৷ পাহাড়ের পশ্চিমদিকে বেশ বড়ো গ্রাম, গ্রামের নামও ফুরুয়া৷ সেই গ্রামের কিনারায় সার্ভেয়ারের তাঁবু৷ আমি তার কাজ দেখতে গিয়েছি৷ নৌকোতে গিয়েছি, উজান বেয়ে যেতে বেশ দেরি হয়ে গেছে৷ তাঁবু খাটাতে প্রায় সন্ধ্যা৷
একজন লোককে জিগগেস করলাম, ‘এখানে শিকার পাওয়া যায়?’
সে বললে, ‘হ্যাঁ৷ ওই পাহাড়ের নীচে-নীচে রাস্তা ধরে গেলে, সকাল সন্ধ্যায় পাওয়া যায়, মুর্গি ইত্যাদি৷’
একজন খালাসিকে বললাম, ‘টোটার ব্যাগটা নিয়ে আমার সঙ্গে চল৷’
বন্দুক ঘাড়ে ফেলে তো দু-জনে বেরোলাম৷ ধীরে-ধীরে চলেছি, প্রায় একমাইল-দেড়মাইল রাস্তা গিয়েছি, কোথাও কিছু নেই৷ দু-চারটে বনমোরগ দেখেছিলাম, কিন্তু সাধ্য কি যে কাছে যাই৷ ওই গ্রামে দু-চারটে বন্দুক আছে, সেগুলোকে গ্রামের লোকরা ফটফট চালায়, কাজেই শিকার সব হুঁশিয়ার হয়ে গেছে, দেড়শো-দুশো গজ দূর থেকেই পালিয়ে যায়৷
পরিশ্রমই সার হল, নিরাশ মনে তাঁবুতে ফিরে আসছি এমন সময় চোখে পড়ল ত্রিশ-চল্লিশ গজ সামনে একটা শুকনো নালার উপর, নালার চকচকে সাদা বালির উপর দিয়ে একটা কালো জানোয়ার চলে গেল৷ নালাটা পাহাড় থেকে নেমেছে আর রাস্তা কেটে ধানখেতে পড়েছে৷ জানোয়ারটা যখন রাস্তা পার হয় তখন আমার চোখে পড়েছে৷ ওখানে বাঘ-শুয়োরও আছে, গ্রামের লোকরা সাবধান করে দিয়েছিল৷ বন্দুকে ছিটা ভরা ছিল, খালাসিটাকে কানে কানে বললাম, ‘গুলিওয়ালা টোটা দে৷’
হতভাগা! পকেটে একটা গুলিওয়ালা আর একটা বাকশটওয়ালা কার্তুজ ছিল, সে দুটো বন্দুকে পুরে নিলাম, আর ধীরে-ধীরে নিঃশব্দে চললাম৷ পায়ে রোপ-সোলের জুতো ছিল কোনো রকম আওয়াজ হচ্ছিল না৷ নালায় পৌঁছে খুব সাবধানে দেখতে লাগলাম কী ওটা৷ দেখি তিন-চার হাত সামনেই মাটি খুঁড়ছে প্রকাণ্ড এক শুয়োর, আমার দিকে তার পিছন৷
একবার ভাবলাম— যাক, মারব না, মাত্র ওই একটি তো গুলি, যদি এক গুলিতে না মরে! তারপরই মনে হল দূর ছাই, ওই তো তিন-চার হাত সামনে রয়েছে, মরবে না আবার কি! যেমন মনে হওয়া আর অমনি বন্দুক তুলে গুড়ুম করে ছেড়ে দিলাম৷
শুয়োরটা একেবারে ডিগবাজি খেয়ে পড়ে গেল৷ আট-দশ সেকেন্ড পড়ে থেকে, উঠতে চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু আবার উলটে পড়ে গেল৷ আবার একটুক্ষণ ছটফট করে, আবার উঠতে চেষ্টা করল৷ বার তিনেক উঠে-পড়ে, আমার দিকে ফিরে দাঁড়াল৷ খালাসিটা পালাবার চেষ্টায় ছিল, তাকে ধমক দিলাম— ‘পালালে তোকেই গুলি করব৷’
শুয়োরটার যা চেহারা, বাপ! তার গর্দানের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে, কটাস-কটাস করে দাঁত ঘষছে, এই বুঝি আমার দিকে তেড়ে আসে৷ মাত্র একটি বাকশট সম্বল আমার, বন্দুক ঘাড়ে তুলে প্রস্তুত তো হয়েই আছি, চার্জ করলে, যখন বন্দুকের নাকে পৌঁছবে, তখন ঘোড়া টিপব৷
শুয়োরটা কিন্তু চার্জ করল না৷ পাঁচ-ছয় সেকেন্ড ওই ভাবে কটাস-কটাস করে দাঁত ঘষে বিকট একটা হুঙ্কার দিয়ে পাশের শরবনের মধ্যে লাফিয়ে পড়ল৷ আমিও খালাসিটার হাত ধরে পিছু হেঁটে নালার ওপারে গিয়ে উঠলাম৷ উঠে তাকে বললাম, ‘আব ভাগো৷’
লোকটা কিন্তু ভাগল না, আমার সঙ্গে-সঙ্গেই তাঁবুতে ফিরে এল৷
তাঁবুতে ফিরে টিন্ডেলকে তাড়া দিলাম গুলিওয়ালা টোটা দেয়নি কেন? আরও বললাম, ‘সকালে দু-জন লোক গিয়ে ওইখানটায় খুঁজে দেখ৷ ওটা নিশ্চয় মরেছে৷’
সকালে উঠে আমি কাজে গেলাম, বিকেলে ফিরে এসে জিগগেস করলাম, ‘কেয়া রে? মিলা?’
‘নহি হুজুর, কাঁহা ভাগ গিয়া৷’
পরদিন সকালে আমরা আবার ওই রাস্তায় যাচ্ছিলাম, সেই শুকনো নালার ধারে শরবন, নালা থেকে আট-দশ ফুট দূরেই ঢের শকুন৷
‘কেয়া হ্যায় রে?’
‘আরে হুজুর ওহি শুয়ার তো থা লেকিন সব খা গিয়া৷’
অনুসন্ধান করা হল, লোক দুটো কেন বলেছিল যে নেই, চলে গেছে৷ ধমক খেয়ে একজন স্বীকার করল যে তারা ভয়ে ওদিকে মাড়ায়ইনি৷
ফুরুয়ায় বড়ো বাঘের উৎপাত৷ গ্রাম থেকে তিন-চারটে গোরু ধরে নিয়ে গেছে৷ সার্ভেয়ার শামসের সিং বলল, ‘হুজুর, বন্দুক দাও৷’
আমি বললাম, ‘আমি তো তিন রাত কাটালাম, কই বাঘ বেরোল না, তার ডাকও শুনলাম না৷’
সে বলল ইতিপূর্বে তারা প্রায় রোজই বাঘের ডাক শুনেছে৷
আমি গৌহাটি ফিরে এলাম৷ সেইদিনই আমার চাপরাশি রামাবতার আর দু-জন খালাসিকে শামসের সিং-এর তাঁবুতে পাঠালাম, তার টাকার দরকার৷ পরদিন সকালে তারা ফিরে এল আর সার্ভেয়ারের লম্বা এক চিঠি নিয়ে এল৷ রাত্রে বাঘের ভয়ে তারা ঘুমোতে পারেনি শিগগির বন্দুক পাঠিয়ে দাও নইলে খালাসিরা ভয়ে কাজে বেরোবে না ইত্যাদি৷
রামাবতারকে ডেকে জিগগেস করলাম, ‘বুড়ো, ব্যাপার কী?’
সারারাত নাকি কেউ ঘুমোয়নি৷ তাঁবুর সামনে বসে বাঘ গর্জন করেছে৷
‘যেখানে আপনার তাঁবু ছিল সেইখানে দাঁড়িয়ে চার পায়ে মাটি খুঁড়েছে আর গর্জন করেছে৷ আমরা কত চিৎকার করেছি, গ্রাহ্যই করেনি৷’
যাই হোক, একটা বন্দুক পাঠিয়ে দেওয়া হল৷
বনে-জঙ্গলে ছোটো-বড়ো কত রকমের জানোয়ার, আর তাদের অস্ত্রই বা কত রকমের৷ শিং, নখ, দাঁত, ক্ষুর— এক-একজনের এক-একটা চলে! এক-একজনের আবার মুখ ও পা দুই-ই চলে৷ যেমন, বাঘের দাঁত ও নখ, মহিষের শিং ও ক্ষুর, শুয়োরের দাঁত ও ক্ষুর৷ বনে-জঙ্গলে কত রকমের জানোয়ারই দেখেছি, কিন্তু শুয়োরের মতো এমন অদ্ভুত মেজাজের জীব আর দেখলাম না৷ বাঘ বল, ভাল্লুক বল, হাতি, মহিষ, গণ্ডার সকলেই চলে অতি সাবধানে, অতি সন্তর্পণে, পাছে কেউ জানতে পারে৷ দশ-বিশ ফুট দূর দিয়ে বাঘ-ভাল্লুক নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে চলে যায়, কিছু জানবার, কিছু বোঝাবার জো নেই৷ হাতিটা পর্যন্ত এক-এক সময়ে প্রায় ঘাড়ের উপর এসে না পড়লে আর বুঝতে পারা যায় না যে হাতি আসছে৷
এইরকম সন্তর্পণে চলা বুনো জানোয়ার মাত্রেরই স্বভাব, শুধু শুয়োর বাদে৷ শুয়োর যখন চলে সে যেন নোটিশ দিতে-দিতে আসে, ‘সাবধান, আমি আসছি!’ এদিক-ওদিক তাকানো নেই, টিপে-টিপে পা ফেলা নেই, খালি ঘোঁৎ-ঘোঁৎ ফোঁস-ফোঁস, পা দুলিয়ে বুক ফুলিয়ে চলা, আর ঝোপ-জঙ্গল ঘেঁটেঘুঁটে তোলপাড় করা৷ আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারি ওই আসছেন বরাহ-অবতার৷ এমন একরোখা গোঁয়ার জন্তু বুঝি আর নেই, তাই লোকে বলে শুয়োরের গোঁ৷
যেমন মেজাজ, তেমনি তেজ আর তেমনিই তার শক্তি৷ পালাবার পথ থাকলে প্রায় সব জন্তুই আগে সেইটে খোঁজে৷ কিন্তু শুয়োরের সে-সব জ্ঞান নেই৷ তোমাকে দেখে যদি দৈবাৎ তার পছন্দ না হয়, সে খামখা পঁচিশ হাত জঙ্গল পার হয়ে তোমাকে তাড়া করে আসবে৷ তার উপর তুমি যদি আগে থেকে খোঁচাখুঁচি করতে যাও, তাহলে তো আর কথাই নেই৷ খোঁচা খেয়ে হজম করবে এমন জন্তুই সে নয়! তাকে মেরে কেটে রক্তাক্ত করে ফেল, সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপও নেই৷ তুমি একাই হও, আর পঁচিশজন লোকই সঙ্গে আনো, সে তার তোয়াক্কা রাখে না৷ গায়ে আঁচড় পড়লে, তার মাথায় যেন খুন চাপে৷ যতক্ষণ তার শরীরে প্রাণ থাকে ও নড়বার-চড়বার শক্তি থাকে, ততক্ষণ ওই সর্বনেশে গোঁ সে ছাড়ে না৷ রাগ আছে, সাহস আছে, তার উপর শারীরিক ক্ষমতা আছে আর হাতিয়ারেরও অভাব নেই, এমন জন্তুকে কে না ভয় করে? আমাদের দেশে বলে: ‘বাঘ-শিকারির ভাত রেঁধো৷ শুয়োর-শিকারির রেঁধো না৷’ সে যে ফিরে আসবে তার কোনো নিশ্চয়তাই নেই৷
ছোটো-বড়ো, রঙ-বেরঙের কত রকম শুয়োর৷ কোনোটা সাদা, কোনোটা কালো, কোনোটার কাদার মতো রঙ৷ কারো পিঠে লম্বা-লম্বা লোম, রাগলে, সেই লোম ফুলে ওঠে৷ কারো ঘাড়ে খাড়া-খাড়া চুল, আবার কারো বা সর্বাঙ্গ চুলে ঢাকা৷ কারো দুটি দাঁত, কারো চারটি, আবার কারো বা নাকের পাশে চামড়া ফুঁড়ে দাঁত বেরিয়েছে৷ এক-একটার মুখ ভরা আলুর মতো বড়ো গোল-গোল আঁচিল৷ কেউ থাকে দু-চার-ছয়জন মিলে, আর কোনোটা বড়ো-বড়ো দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়৷ কিন্তু মেজাজ প্রায় সকলেরই একরকম, একটু উনিশ-বিশ মাত্র৷
শুয়োর শিকারেরও নানান কায়দা৷ কোথাও হয়তো ঘোড়ায় চড়ে বল্লম দিয়ে শিকার করে, কোথাও বা জাল দিয়ে ঘিরে ফেলে, তাড়া করে সেই জালে ফেলে বর্শা দিয়ে মারে, আর যাদের সে সাহস নেই, তারা দূর থেকে বন্দুক চালায়৷
একদিন ভোরে কাজে বেরিয়েছি, সঙ্গে আট-দশজন লোক৷ চারদিকে লম্বা-লম্বা নলখাগড়ার বন, মাঝে-মাঝে দু-একটা খেতও আছে৷ হঠাৎ দেখি একটা সর্ষে-খেতের মাঝখানে কালো-কালো কী দেখা যাচ্ছে৷ প্রথমটা মনে করলাম হয়তো বাছুর হবে, কিন্তু একটু এগিয়ে দেখি প্রকাণ্ড দুই শুয়োর! প্রথমে আমাদের সঙ্গের কুকুরটা ঘেউ-ঘেউ করে তাড়া করতে গিয়েছিল, কিন্তু বড়ো শুয়োরটা ঘোঁৎ করে ফিরে দাঁড়াতেই সে লেজ গুটিয়ে কেঁউ-কেঁউ শব্দ করতে-করতে দে দৌড়! হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না৷ ভাবলাম সকলে চেঁচামেচি করে ওদের তাড়ানো যাক৷ তাতে কিন্তু হিতে বিপরীত হল, শুয়োরটা এমনি তাড়া করে এল যে আমরা যে-যেদিকে পারলাম দৌড়িয়ে একেবারে জঙ্গলের বাইরে৷
আরেকদিন কিন্তু আমাদেরই জয়লাভ হয়েছিল৷ সেদিন কাজ থেকে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল, তাঁবু দূরে, তাই তাড়াতাড়ি ফিরছিলাম৷ পথের মধ্যে একেবারে আট-দশটা শুয়োরের সামনে পড়ে গেলাম৷ আমরাও যেমন চমকে উঠলাম, শুয়োরগুলোও থমকে দাঁড়াল, আর ঘোঁৎ ঘোঁৎ! পালের গোদা পিছনে ছিলেন, তিনি তাড়াতাড়ি সঙ্গীদের ঠেলে, দু-চারটাকে উল্টে ফেলে দিয়ে একেবারে সামনে এসে হাজির! আর তাঁর যা চেহারা! ঘাড়ের লোম খাড়া, দুই চোখ লাল, আর প্রকাণ্ড দুই দাঁত বের করে সে এমন এক বিকট ভেংচি দিল যে আমি বেগতিক বুঝে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে বন্দুক তুললাম৷ শুয়োরটাও তাড়া করল, সঙ্গে সঙ্গে বন্দুকের গুলি তার কপালে!
বরাহ এক গুলিতেই চিতপটাং৷ সঙ্গের লোকরা তাকে তাঁবুতে এনে মহা ভোজের জোগাড় করল, আমার লাভ হল শুধু তার বড়ো-বড়ো দাঁত দুটি৷
আরেকবার একজন মুসলমান সার্ভেয়ারের কাজ দেখতে গিয়েছি৷ সে বড়ো ভালো লোক৷ আমাকে অনুরোধ করল, ‘হুজুর, শুনেছি আপনি সকলকেই শিকার মেরে খাওয়ান, আমার কাছে তো কখনো মারেননি৷’
জিগগেস করলাম, ‘এখানে শিকার আছে?’
‘হাঁ হুজুর৷ গ্রামের লোকরা ধান কাটছে, তারা বলে যে রোজ রাত্রে হরিণ, মোষ, শুয়োর ইত্যাদি ধান খেতে আসে৷’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা, সন্ধ্যার পর যাব৷ যদি তোমাদের কপালে থাকে তো শিকার মিলবে৷’
একদিন রাত দশটা-এগারোটা অবধি বসে থেকে-থেকে ফিরে এলাম, শিকার পেলাম না৷ সমস্তদিন পাহাড়-জঙ্গল ঘেঁটে তারপর রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত ধানখেতে বসে থাকা নেহাত আমোদের কথা নয়৷ কাজেই পরদিন আর যাবার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু সেই যে বলেছিলাম ‘তোমাদের কপালে থাকে তো মিলবে’— কাজেই যেতে হল৷ খালাসিদের জন্যই বেশি ভাবনা৷ বেচারারা সমস্তদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে, আর খায় শুধু ভাত নুন লঙ্কা, কদাচিৎ একটু ডাল, কুমড়ো বা কচু মেলে৷
সন্ধ্যার পর দু-জন খালাসি সঙ্গে করে বেরোলাম, তাঁবুতে বলে গেলাম যে বন্দুকের আওয়াজ পেলেই লোক পাঠাবে৷
প্রায় সমস্ত ধান কাটা শেষ হয়ে গেছে, শুধু তাঁবু থেকে সিকি-মাইল দূরে এক টুকরো বাকি আছে, তারও চার পাশের ধান কাটা হয়ে গেছে৷ জঙ্গলের কিনারায়-কিনারায় চললাম, কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না৷ চারদিক দেখে নেবার পর, ওই ধানটুকুর পাশে একটু ঘাস ছিল, দু-ফুট আড়াই-ফুট উঁচু, তার মধ্যে গুড়ি মেরে বসে রইলাম৷ জ্যোৎস্না উঠেছে, জঙ্গলের দিকে মুখ করে বসে আছি, কিন্তু কিছুই বেরোয় না৷
রাত নটা সাড়ে-নটা বাজল, মনে করলাম এখন তাঁবুতে ফিরে যাই, এমন সময় জানোয়ারের পায়ের শব্দ কানে এল৷ আমার পিছনদিকে একটা বিল ছিল, তাতে উঁচু শরবন৷ সেইদিক থেকে আওয়াজ আসছে, একটার বেশি জানোয়ারের৷ চুপ করে বসে আছি, নড়িও না, যেন কানে কোনো আওয়াজই পৌঁছয়নি৷
জানোয়ারগুলো বেশ চালাক৷ দশ-বারো পা আসে, আবার ছুটে পালিয়ে যায়, আবার দশ-বারো কদম এগোয় আবার পিছন ফিরে দৌড়োয়৷ আমরা যেন কিছুই শুনিনি, যেমন হামাগুড়ি দিয়ে বসে ছিলাম তেমনি রইলাম৷ তিন-চারবার ওইরকম করে বোধহয় জানোয়ারদের বিশ্বাস হল এখানে লোকজন কেউ নেই, আর একেবারে সোজা পাশ কাটিয়ে এসে আমাদের সামনে হাজির— শুয়োর! সকলের আগে একটা প্রকাণ্ড, তার পিছনে দুটো পাশাপাশি, তারও পিছনে কী আছে না আছে দেখতে পাচ্ছিলাম না৷ আমাদের উপর চোখ পড়তেই শুয়োরগুলো নিশ্চল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আমাদের দেখতে লাগল৷ কোনটাকে মারি? সামনের বড়োটাকে? ওটা দূরে, এ-দুটো কাছে৷ পাঁচ-ছয় হাত মাত্র ব্যবধান৷
কাছের দুটোকে লক্ষ্য করে বন্দুক ছুঁড়লাম৷ একটা তো নিঃশব্দে শুয়ে পড়ল, দু-একবার হাত-পা ছুঁড়ে ঠান্ডা৷ অন্যটা ক্যাঁ-ক্যাঁ শব্দ করতে করতে তিন ঠ্যাঙে দৌড়৷ অন্যগুলো যে কোনদিকে উড়ে গেল লক্ষ্য করতে পারলাম না৷ উঠে দাঁড়িয়ে একটাকেও আর দেখতে পেলাম না৷
বন্দুকের আওয়াজ শুনেই তো খালাসিরা হল্লা করে তাঁবু থেকে দৌড়ে এল৷ এসে দেখে শুয়োর৷ তখন একজন চিৎকার করে অন্যদের খবর দিল কী শিকার মিলেছে৷ বেচারা সার্ভেয়ার তো শুনেই তোবা-তোবা বলে তাঁবুর দরজা বন্ধ করে দিল৷ আর খালাসিরা মহানন্দে ভোজের আয়োজন করতে লাগল৷
একবার সার্ভেয়ারের তাঁবু অনেক দূরে, গ্রামের লোক বলল একদিনে পৌঁছনো যাবে না৷ মাঝে আর গ্রাম নেই, কাজেই বাধ্য হয়ে ভোরে বেরিয়েছি, যেমন করেই হোক সন্ধ্যার আগে পৌঁছতে হবে৷
সমস্তদিন চলতে-চলতে লোকজন সব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে৷ বেলা চারটে প্রায়, তখনও দু’মাইল রাস্তা বাকি৷ দোভাষী আমি আর একজন খালাসি একটা নালার কিনারায় বসেছি, অন্য খালাসি আর খাসিয়া কুলিরা পিছনে পড়েছে, তাদের জন্য অপেক্ষা করছি৷ হঠাৎ আমার পিছনের জঙ্গলে ঘোঁৎ-ঘোঁৎ শব্দ৷ নিঃশব্দে উঠে, আমার বন্দুকটি হাতে নিয়ে, দোভাষী দেখতে চলল কী জানোয়ার৷ শুয়োর সন্দেহ নেই, ঘোঁৎ-ঘোঁৎ তার প্রমাণ৷ এক মিনিটের মধ্যে গুড়ুম শব্দ আর সঙ্গে-সঙ্গে শুয়োরের হুঙ্কার৷ ছুটে দেখতে গেলাম কী ব্যাপার৷ গিয়ে দেখি গুলি লেগে শুয়োরের কোমর ভেঙে গেছে, বেচারা চলৎশক্তিরহিত! তবুও তার হুঙ্কার কী! আর দোভাষীকে মারবার জন্য চেষ্টাই বা কত! ঘাড়ের লোম দাঁড়িয়ে উঠেছে, লাল চোখ দিয়ে আগুন ছুটছে, কটাস-কটাস করে দাঁত পিষছে, আর শুধু সামনের পা দুখানা দিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করছে দোভাষীর দিকে এগোতে৷ পিছু হটবার নামও নেই! আরেক গুলিতে তার সব যন্ত্রণার অবসান করে দেওয়া হল৷
একদিন একটা মজা হয়েছিল৷ সমস্ত দিন সার্ভেয়ারের কাজ দেখেছি, বড়োই পরিশ্রান্ত৷ কাজ শেষ করে, ঘোড়ায় চড়ে তাঁবুতে চলেছি, আট-নয় মাইল পথ যেতে হবে৷ রাস্তা ভালো, জ্যোৎস্না রাত, ভাবনা নেই৷ দু-জন মাত্র লোক আমার সঙ্গে, আমার সহিস অলক আর একজন খালাসি৷
আমরা তো লম্বা পা ফেলে চলেছি, নদী পার হতে হবে, সন্ধ্যার আগে নদীর ধারে পৌঁছবার ইচ্ছা৷ প্রায় মাঝ-পথে একটা বড়ো বিল আছে৷ বিলের কাছে এসে দেখি মেলা হাঁস৷ বড়োই লোভ হল৷ লাফিয়ে ঘোড়া থেকে নামলাম৷ অন্য লোকটিকে ঘোড়া ধরতে বলে, আমি আর অলক হামাগুড়ি দিয়ে চললাম, মতলব সোলা গাছের ( যা দিয়ে টুপি তৈরি হয়) আড়ালে-আড়ালে চলে একেবারে বিলের কিনারায় পৌঁছব৷ তারপর মাত্র কুড়ি-ত্রিশ গজ বাকি থাকবে, দুমদাম দুটো কার্তুজ চালালে দু-চারটে হাঁস নিশ্চয় পাব৷
প্রায় কিনারায় পৌঁছে গেছি, সবেমাত্র মনে-মনে ভাবছি এইবার উঠে দেখি কোনদিকে বন্দুক চালাব৷ আর অমনি সোলাগাছের আড়াল থেকে ‘ক্রা-আ-আ’ বলে একটা সারস ডেকে উঠল৷ চার-পাঁচটা সারস ডাঙায় চরছিল, আর সেই সঙ্গে-সঙ্গে বিলের সমস্ত পাখি ভ-র-র শব্দে উড়ে গেল৷ ওই সারসটাও সঙ্গে সঙ্গে উড়ল৷
এমন রাগ হল হতভাগার উপর যে কী বলব৷ সারসটা যখন আমার মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, গুড়ুম করে তার বুকে দুই নম্বর ছিটা ছেড়ে দিলাম৷ অমনি ঘুরপাক খেয়ে সারসটা জলে পড়ল৷ সমস্ত পাখিটা জলে ডুবে গেল, শুধু তার মাথাটা আর গলার খানিকটা উপরে রইল৷
অলক তাড়াতাড়ি গামছা পরে ওটাকে ধরে আনবার জন্য জলে নামল৷ আমি তাকে অনেকবার বললাম, ‘লাঠি নিয়ে যা, ওটা জ্যান্ত, কামড়াবে৷’ কিন্তু সে কিছুই গ্রাহ্য করল না৷ বলল, ‘নাহি হুজুর, গলেমে পকড় লেঙ্গে৷’
সেখানে তিন-চার ফুট জল হবে৷ অলক পাখিটার কাছে গিয়ে হাত বাড়াল তার গলাটা ধরবার জন্য, আর সারসটা তার প্রকাণ্ড ঠোঁট হাঁ করে এল তাকে কামড়াতে৷ অলক অমনি এক পা পিছনে হটে গেল৷ আবার পাখিটার অন্য পাশ দিয়ে হাত বাড়াল৷ পাখিটা মুখ ঘুরিয়ে আবার ওই প্রকাণ্ড হাঁ অলকের দিকে ফেরাল৷ কিছুতেই আর ধরতে পারে না৷ শেষটা নিরুপায় হয়ে সে ডুব দিয়ে সারসের পা ধরল৷ কিন্তু পা ধরে যেমন সে দাঁড়িয়েছে আর অমনি সারসটা তার প্রকাণ্ড দুই ডানা মেলে অলকের মুখে মাথায় ডানা দিয়ে তিন-চরটে ঝাপটা মারল, অলকও ‘বাপরে বাপ’ বলে তাকে ছেড়ে দিল৷ অমনি সারসটা বিদ্যুৎবগে আকাশে উড়ে গেল৷
আমি এতক্ষণ অলকের কাণ্ড দেখে হেসে আকুল হচ্ছিলাম, মারবার অবসর হল না৷ ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রায় সিকি-মাইল পথ বেচারা উড়ে গেল, তারপর হঠাৎ ডিগবাজি খেয়ে নল-খাগড়ার বনের মধ্যে পড়ে গেল, বোধ হল যেন মরে পড়ল! ওই ছিল তার শেষ চেষ্টা, ওই জঙ্গলের ভিতর তাকে খুঁজে বের করা অসম্ভব৷
• ১৫ • (১৯১৩-১৯১৫৷ আসাম) আসামের নওগাঁ জেলার দক্ষিণ দিকে অনেক শরবন, তার মাঝে-মাঝে বিল, আর টুকরো-টুকরো জঙ্গল, ছোটোখাটো দু-চারটে পাহাড়ও আছে৷ এসব জায়গায় আগে গ্রাম ছিল, লোকের বসতি ছিল, কালাজ্বর আর নাগাদের ভয়ে এখন উজাড় হয়ে গেছে, আর যত জানোয়ারের বাসভূমি হয়েছে৷ হরিণ, মহিষ, মিথন, শুয়োর, বাঘ, ভাল্লুক আর কোনো-কোনো জায়গায় হাতিও দেখতে পাওয়া যায়৷ এ সমস্ত শিকারের প্রশস্ত জায়গা, অনেক সাহেবসুবো এখানে শিকারের জন্য এসে থাকেন৷
জরিপওয়ালার শিকার খেলবার সময় নেই৷ কিন্তু পাহাড়ে, জঙ্গলে নালায়-নালায় ঘুরে জরিপ করতে হয়, কাজেই তাদের চোখে শিকার পড়ে ঢের৷ হয়তো বা মাথা ঘুলিয়ে যায়, নয়তো মারবার অবসর পায় না, কখনো বা সাহসে কুলোয় না, আবার কখনো বা নিরস্ত্র অবস্থা, একেবারে খালি হাত৷ সব রকম অবস্থাতেই পড়েছি৷ ঘটনার পর ভেবে দেখেছি যে ওই অবস্থাটাই ওই বিশেষ ঘটনার উপযুক্ত ছিল৷ অন্য অবস্থা বা ব্যবস্থা হলে হয়তো বিশেষ বিপদ ঘটবার সম্ভাবনা ছিল৷
দু-একটা ঘটনা শুনলে বুঝতে পারবে ব্যাপারটা কেমন হয়৷
আমার সঙ্গে একজন পাঞ্জাবি ভদ্রলোক ছিলেন৷ নতুন কাজ শিখছেন, আমি তাঁর কাজ দেখতে গিয়েছি৷ খালাসিরা ছুটি নিয়েছে, কাল হোলি, কাজে যাবে না৷
ভদ্রলোক বললেন, ‘চলুন শিকারে৷’
‘বহুৎ আচ্ছা৷’
ভোরে দুজনে হাতি চড়ে বেরোলাম৷ তিনটে হাতি, একটাতে আমি, একটাতে তিনি আর একজন গ্রামের শিকারি, আরেকটা হাতি দরকারমতো জঙ্গল ভাঙবে, জানোয়ারের পথ আগলাবে৷ তিনদিকে পাহাড়, একদিকে ধানখেত, তার মাঝখানে ঘাস, খাগড়া, বিল ইত্যাদি৷ একটা নোনা মাটির জায়গাও তার মধ্যে আছে৷
আমরা ধীরে-ধীরে জঙ্গলের কিনারা ধরে চলেছি৷ একটা প্রকাণ্ড শুয়োর সামনে পড়েছিল কিন্তু তার উপর গুলি চালানো হয়নি, হরিণের লোভ আমাদের৷ কিন্তু আর কোনো জানোয়ারই চোখে পড়ছিল না৷ সকলেই আশ্চর্য হয়েছি, বিশেষ করে শিকারি, কারণ এটা শিকারের পক্ষে আদর্শ জায়গা৷ জানোয়ারের পায়ের দাগও আছে ঢের, শুয়োর, হরিণ, মিথন৷ আজ কিন্তু ওই শুয়োরটা ছাড়া আর কোনো জানোয়ারই দেখতে পেলাম না৷
ক্রমে সূর্য দেখা দিল৷ আর কেন? এবার ফিরি৷ হঠাৎ শিকারি হাত দিয়ে সামনে ইশারা করল৷ দু-চারটে ঘাস একটু-একটু নড়ছে, যেন কোনো জানোয়ার পাশ কাটিয়ে সরে পড়ছে৷ পাছে ওটা জঙ্গলে ঢুকে পড়ে সেই ভয়ে আমরা প্রথমেই তাড়াতাড়ি জঙ্গলের দিকটা ঘিরে ফেললাম৷ এক পাশে সেই ভদ্রলোক, এক পাশে আমি, আর মাঝখানে অন্য হাতিটা, তিনটে হাতির মাঝে-মাঝে আট-দশ ফুট ব্যবধানও নেই৷
ঘাস নড়াটা তখন অন্যমুখী হয়ে, এক টুকরো আট-দশ ফুট লম্বা-লম্বা ঘাসের জঙ্গল ছিল, তার মধ্যে ঢুকে থেমে গেল৷ এর পিছনেই ছোটো-ছোটো ঘাস৷ আমরাও মনে-মনে ভাবলাম, ভালোই হল, এদিকে আমরা, ওদিকে ছোটো ঘাস, বেরোলেই চোখে পড়বে আর মারব৷
আমাদের হাতি লম্বা ঘাসের জায়গাটার মধ্যে প্রায় ঢুকে পড়েছে হঠাৎ মাঝের হাতিটা ফ্যাঁশ করে নাকে শব্দ করে একেবারে ঘুরে দাঁড়াল— এই ভাগে আর কি! তার ঘাড়ে পাকা মাহুত, কানে অঙ্কুশ লাগিয়ে জবরদস্তি তাকে আটকিয়ে ধরেছে৷ আমাদের হাতি দুটোও চঞ্চল হয়ে উঠেছে৷
মাঝের হাতির মাহুত হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল— ‘বাঘুয়া! এত্তা বড়া দুম!’ সঙ্গে-সঙ্গে তার হাতি চিৎকার করে, মলমূত্র ত্যাগ করে, একাকার! চোখের পলক ফেলতে-না-ফেলতে, বন্দুক ঘুরোতে-না-ঘুরোতে, বাঘটা হামা দিয়ে ওই হাতির পেটের তলা দিয়ে গলে বেরিয়ে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে একেবারে অদৃশ্য!
হাতি বেচারারা লাটিমের মতো তিন-চারবার ঘুরপাক খেল, সামলাতে-না-সামলাতে শিকার ধোঁয়ার মতো কোথায় মিলিয়ে গেল!
একবার মাত্র একটা হলদেপানা জীব আমাদের চোখে পড়ল কি না-পড়ল৷ ওই হাতিটার মাহুত আর শিকারি ছাড়া কেউ ভালো করে দেখতেও পেল না৷
একেই বলেছিলাম— হয়তো মারবার অবসর মিলল না৷ ওই বাঘটা বেরোবার পর বুঝলাম এতক্ষণ কেন অন্য কোনো জানোয়ারের গন্ধ পাইনি৷ শুয়োরটাকে যে দেখেছিলাম, তার কথা আলাদা, সে বাঘ-টাঘ গ্রাহ্য করে না৷ সকলেই তার সঙ্গে হিসেব করে চলে৷ কথায় বলে সঙ্গী ছাড়া যে শুয়োর চলে, সে মত্ত হাতির চেয়েও ভীষণ৷
আরেকদিন ওই ভদ্রলোকেরই কাজ দেখতে গিয়েছি৷ মাস শেষ হয়েছে, সারা মাসের রিপোর্ট তৈরি করতে হবে, সেজন্য দু-দিন সেখানে থাকতে হবে৷ ভদ্রলোক বললেন, ‘কাল রবিবার, এক-আধটা হরিণ মারতে পারলে খালাসি বেচারারা খেতে পেত৷’
বললাম, ‘আচ্ছা, চলো, যাব৷’
ভদ্রলোক একজন শিকারি জোগাড় করলেন৷ ভোরে উঠে আমরা শিকারে চলেছি, সঙ্গে তিনটে হাতি৷ এক হাতিতে আমি, একটাতে শিকারির সঙ্গে উনি৷ ভদ্রলোক একটু বেখাপ্পাভাবে বসেছেন, দুপা-ই তাঁর একদিকে, হাতির মাথা পড়েছে তাঁর এক পাশে৷ ডেকে বললাম, ‘অমন করে বোসো না, শিকারের সুবিধা হবে না৷ খালি একদিক দেখতে পাবে, অন্যদিক দিয়ে জানোয়ার বেরোলে তোমার পিছনে পড়বে, ঘুরে মারতে-মারতে সে চলে যাবে৷ আর যদি কোনো কারণে হাতি ভড়কে গিয়ে হঠাৎ দৌড় দেয়, তাহলে উল্টে পড়ে যাবে৷’
তিনি তো হেসে খুন— ‘নহি জী, কভি নহি গিরেঙ্গে৷’
হাওদা-টাওদা নেই৷ আমি মাহুতের ঠিক পিছনে, দু-দিকে দুই পা দিয়ে ঘোড়ায় চড়ার মতো বসেছি৷ তিনি বললেন অমন করে বসা বড়ো কষ্টকর৷
শিকারি আমাদের সামনে একটা গাছ দেখিয়ে মাহুতকে বলল, ‘এখানটাতে রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢোকো৷’ আর সঙ্গে-সঙ্গে ধপ করে একটা ভারি জিনিস পড়ার শব্দ! আমার পিছনের হাতিটাও খুব ছটফট করতে লাগল৷
মুখ ফিরিয়ে দেখি ভদ্রলোক ঘাসের মধ্যে চিতপাত! হাতির মুখ তাঁবুর দিকে, মাহুত তার কানে অঙ্কুশ লাগিয়ে ধরে রেখেছে, হাতি তো পালাতে পারলে বাঁচে!
শিকারের জায়গায় তো ঢুকলাম৷ বড়ো-বড়ো ঘাস, মাঝে-মাঝে আমলকী গাছ তার চারদিকে জঙ্গল৷ শিকারির নির্দেশমতো ভদ্রলোক শিকারির সঙ্গে একদিকে গেলেন, আমি অন্যদিকে গেলাম৷ পঞ্চাশ গজও যাইনি আর পিছনে গুড়ুম-গুড়ুম বন্দুকের আওয়াজ৷ মাহুত তৎক্ষণাৎ হাতি ফিরিয়ে ওইদিকে ছুটল৷ সামনেই ভদ্রলোক একটা আমলকী গাছের পাশে, হাতির পিঠে হাঁ করে বসে আছেন!
‘আরে, কী মারলে? শিকার কই?’
মাহুত বলল, ‘হুজুর, বড়ি জবর সামর (সম্বর) থা, মাথে পর ইয়া বড়া ঝাড়! গোলি নহি লাগা হোগা, ভাগ গিয়া৷’
রক্তের দাগ খুঁজবার জন্য আমিও নামলাম, শিকারিও নামল৷ বলল, ‘ওইখানে দাঁড়িয়ে আমলকী খাচ্ছিল আর সাহেব ওইখান থেকে গুলি করেছেন৷’
মাত্র পঁচিশ-ত্রিশ ফুট দূরে, গুলি লাগেনি হতে পারে কি? দেখতে গেলাম কী ব্যাপার! গিয়ে দেখি আমলকীগাছের নীচে গোটা দু-চার ছোটো-ছোটো গাছ, সেগুলির বড়ো-বড়ো পাতায় অসংখ্য ফুটো, ছিটার দাগ!
‘ওকি, এ কী করেছ? ছররা মেরেছ নাকি?’
তিনি তো বন্দুক খুলে একেবারে হাঁ! নতুন শিকারি, তাড়াহুড়োতে পাঁচ নম্বর ছররা মেরে বসেছেন৷
বলা বাহুল্য সেদিন আর শিকার মিলল না৷
একেই বলেছিলাম— কখনো বা মাথা ঘুলিয়ে যায়৷
যেখানে এই সব কাণ্ড হচ্ছিল, তার একটু পুবেই শিবসাগর জেলার সীমানা৷ এর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ বর্গ মাইল জায়গা বাঘের ভয়ে উজাড় হয়ে গিয়েছিল৷ মানুষখেকো বাঘ৷ দশ-বারোটা গ্রামের লোক ঘরদোর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল৷ আমাদের লোক যখন সে জায়গা জরিপ করতে গিয়েছিল তখনও ওই এলাকা উজাড়! মানুষখেকো বাঘের ভয়ে মিকিররা কেউ ওর ভিতরে যেতে চায় না৷ একটা বাঘ কয়েক মাস আগে মারা পড়েছে বটে, কিন্তু মিকিররা বলে যে বাঘ দুটো ছিল, একটা মারা পড়েছে বটে কিন্তু একটা তো এখনও আছে, গেলেই ধরে খাবে৷
আমার একজন গুর্খা সার্ভেয়ারকে ওই জায়গাগুলো জরিপ করতে পাঠিয়েছিলাম, তার সঙ্গে বন্দুক৷ পাহারা দেবার জন্য আরেকজন গুর্খাকেও সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল৷
জায়গাটুকু জরিপ হওয়া মাত্র আমি সার্ভেয়ারের কাজ দেখতে গেলাম৷ অনেক বুঝিয়ে, বাইরের অন্য গ্রাম থেকে দশ-বারোজন কুলি সঙ্গে নিয়ে গেলাম৷
দু-দিন ওই জঙ্গলে ছিলাম, কিন্তু পরিত্যক্ত গ্রাম আর খেত আর জঙ্গল ছাড়া কিছু দেখিনি৷ দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যার পর মশাল জ্বেলে, এক গ্রামে পৌঁছলাম৷ ওই গ্রামের লোকেরাও জঙ্গল থেকে পালিয়ে গেছে, এই এলাকার বাইরে নওগাঁ জেলায় নতুন গ্রামের পত্তন করেছে৷ গ্রামের প্রধানের একমাত্র ছেলেকে ওই মানুষখেকো বাঘ খেয়েছিল৷ প্রধান পুত্রশোকে মরিয়া হয়ে, ছেলের মৃতদেহের উপর একটা বাঘকে মেরে ফেলেছিল৷ এই সব কাহিনী যখন শুনছিলাম তখন প্রাণের ভিতর যে কেমন করছিল, বলতে পারি না৷
শুনলাম বাঘের ভয়ে তো লোকজন সকলেই নিজের-নিজের ঘরদোর, খেত, ফসল, সমস্ত ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু তৈরি ফসল ফেলে এসেছে বলে অনেকেই বড়ো কাতর হয়েছিল৷ প্রধানের তুলোর খেত ছিল ওই পাহাড়ে৷ একেবারে তৈরি ফসল, তুলে আনলেই হল৷
ফেলে এসে তাদের মন বড়ো ব্যস্ত ছিল, বিশেষত প্রধানের ছেলের৷ একদিন সকালে সে বলল, ‘দেখে আসি খেত সব কেমন আছে৷’
প্রধান বারণ করল, গ্রামের লোকরাও মানা করল কিন্তু সে কারো কথা শুনল না৷ বন্দুক ঘাড়ে করে চলে গেল৷ বলে গেল, ‘এক নজর দেখেই ফিরে আসব৷’
গেল বটে, কিন্তু আর ফিরে এল না৷ তিন-চার ঘণ্টা অপেক্ষা করে প্রধান তো একেবারে পাগলের মতো হয়ে উঠল৷ অনেক মিনতি করে দু-চারজন লোক সংগ্রহ করে দেখতে গেল কী ব্যাপার৷ খেতের পাশে গিয়েই দেখতে পেল বন্দুকটা পড়ে আছে৷ একটু এগিয়ে দেখল তার মাথার পাগড়ি আর রক্ত৷ আরেকটু সামনেই কী যেন একটা পড়ে আছে, লতাপাতা দিয়ে ঢাকা, আর মাছি ভনভন করছে৷
দেখেই তো সঙ্গীরা পালিয়ে গেল৷ প্রধান কত কাকুতি-মিনতি করল, কেউ তার কথায় কান দিল না৷ তখন সে একাই দু-পা এগিয়ে দেখল সত্যিসত্যিই তার ছেলের দেহটা পড়ে আছে, ঘাড়ে কামড়ের দাগ, খানিকটা খেয়ে ফেলেছে৷
সে গ্রামে ফিরে এল৷ বাড়ি-বাড়ি ঘুরে প্রত্যেকটি লোককে কত সাধ্যসাধনা করল, ‘চলো আমার সঙ্গে, বাঘটাকে মারব৷’ কিন্তু কেউ রাজি হল না৷ তখন সে চার-পাঁচটা বন্দুক চেয়ে নিয়ে একাই আবার ওই তুলোর খেতে চলে গেল৷ সকলে কত বারণ করল, ভয় দেখাল, কিছুই শুনল না৷ একমাত্র ছেলেকে বাঘে নিয়েছে, তার আর বেঁচে লাভ কী? এ বাঘ সে মারবেই৷
তুলোর খেতে পৌঁছে, মৃতদেহের উপর সরু-সরু দড়ি দিয়ে বেঁধে, চারপাশে চারটে গুলিভরা বন্দুক পেতে রাখল৷ বাঘ এসে দেহটা ধরে টানবামাত্র ওই চারটে বন্দুক একসঙ্গে ছুটে যাবে৷ তাতেও যদি কোনো কারণে বাঘ না-মরে, সেইজন্য নিজে একটা বন্দুক ভরে নিয়ে, কাছে একটা ছোটো গাছে উঠে বসে রইল৷
বেলা চারটে বাজতে-না-বাজতে বাঘ এসে হাজির৷ তার ভয়ে দেশসুদ্ধ লোক পালিয়েছে, সুতরাং তার আর ভয়-ভাবনা কিছুই নেই৷ সোজা একেবারে মৃতদেহের কাছে৷ বোধহয় সে জায়গায় কিছু দেখে তার কোনোরকম সন্দেহ হয়েছিল, সেইজন্য দু-চারবার জোরে হাঁক দিল, তারপর দেহটা ধরে টান দিল৷ চারটে বন্দুক একসঙ্গে গর্জে উঠল, সঙ্গে-সঙ্গে প্রধানের বন্দুকটাও ছুটল৷ বাঘটা একবার মাত্র লাফিয়ে উঠে, মাটিতে পড়ে, দু-চারবার ঘড়ঘড় শব্দ করে একেবারে চুপচাপ৷
প্রধান আবার বন্দুক ভরে নিয়ে গাছ থেকে নেমে দেখল সব শেষ হয়েছে৷ তখন সে দৌড়ে গিয়ে সকলকে খবর দিল৷ লোকজন গিয়ে বাঘটাকে বয়ে আনল৷ পাহাড়ের উপর দেবতার পুজো দিল৷ ওই পাহাড়ে কিন্তু আর তারা ফিরে যায়নি, তাদের বিশ্বাস একটা বাঘ মরেছে, কিন্তু আরেকটা তো আছে, গেলেই ধরে খাবে৷
ওই এলাকায় কাজ করবার সময় আমি একটা বড়ো বোড়া সাপ মেরেছিলাম৷ যমুনা নদীর ধার দিয়ে রাস্তা, আমি বেরিয়েছি কাজে৷ সঙ্গে ঘোড়ার সহিস ও আরেকজন খালাসি৷ পথে শিকার পাওয়া যায়— হরিণ, বনমোরগ, হরিয়াল, বুনো পায়রা ইত্যাদি৷ পথের ধারে একটা বটগাছে ফল পেকেছে, আর তাতে ঢের পাখি৷ বন্দুক হাতে ধীরে-ধীরে আমি গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়ালাম৷ গাছে অনেক হরিয়াল৷ লক্ষ্য করে বন্দুক ছুঁড়লাম, দুটো হরিয়াল পড়ল৷ একটা আমার পায়ের কাছেই পড়ল, আরেকটা ওই বটগাছের একটা প্রকাণ্ড ডাল পড়েছিল, তার পিছনে পড়ল৷
সঙ্গের খালাসিটাকে বললাম, ‘ওটাকে খুঁজে আন৷’ ডালটা প্রায় তিন-সাড়ে-তিন ফুট উঁচু৷ খালাসি সেটাকে ডিঙিয়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই ‘বাপরে বাপ’ বলে আবার লাফিয়ে ডালটা পার হয়ে এসে দে দৌড়! আমি তাকে ধরে জিগগেস করলাম, ‘কেয়া হ্যায় রে?’
‘হুজুর, এতনা মোটা হ্যায়,’ বলে নিজের ঊরু দেখাল৷ আমি খুব সাবধানে ডালটার উপর চড়লাম, আর তার চেয়েও বেশি সন্তর্পণে ওধারে নামলাম৷ খালাসি বলতে লাগল, ‘গাছের গোড়ায় দেখুন হুজুর৷’
চেয়ে দেখি প্রকাণ্ড একটা বোড়া সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে রোদ পোয়াচ্ছে৷ তার মাথা আর লেজ দেখা যায় না, কুণ্ডলীপাকানো ঢিবিটা প্রায় আমার কোমর সমান উঁচু৷ বন্দুকে পাঁচনম্বর আর আটনম্বর ছিটা ভরা ছিল৷ পাঁচ-ছয় ফুট দূর থেকে সাপের শরীরের সব চেয়ে মোটা অংশটা লক্ষ্য করে বন্দুক ছুঁড়লাম৷ আর অমনি, বাপ! কুণ্ডলীর সব উলট-পালট হতে লাগল, আর তার মাঝখান থেকে প্রকাণ্ড মাথা বিকট হাঁ করে বেরোল৷
আমি এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম৷ গুড়ুম করে অন্য নাল ছেড়ে দিলাম, আর সাপটার মাথার উপরের অংশটা উড়ে গেল৷ আটনম্বর ছিটা, পাঁচ-ছয় ফুট থেকে মেরেছিলাম, কয়েক মিনিটের মধ্যে সব ঠান্ডা৷
ততক্ষণে অন্য খালাসিরাও এসে জুটেছে৷ বললাম, ‘ওটাকে টেনে বাইরে আন৷’
কেউ ছোঁবে না, সাপ, বাবা! অগত্যা আমিই লেজ ধরে টেনে সাপটাকে রাস্তার উপর আনলাম৷ কাছে গ্রাম ছিল, গ্রামের লোকরাও ছুটোছুটি করে এসে হাজির হল৷ তারা তো মহা খুশি! বলাবলি করতে লাগল: ‘এইটে আমার একটা বাছুর খেয়েছে!’ ‘আমার দুটো ছাগল খেয়েছে!’
গাঁওবুড়ো (প্রধান) বললে, ‘হুজুর, আরও একটা আছে৷ সেটাকেও যদি মেরে দিতে পারতে, বড়ো ভালো হত৷’
আমি বললাম, ‘দেখিয়ে দাও, মেরে দিচ্ছি৷’
তখন তো আর সেটা সেখানে উপস্থিত নেই, আমিও আর অপেক্ষা করতে পারি না, কাজেই তাকে আর মারা হল না৷
যেটা মেরেছিলাম সেটা সাড়ে-এগারো ফুটের উপর লম্বা ছিল৷
আরেকবার মিকির হিলস-এ আরেকজন সার্ভেয়ারের কাজ দেখতে গিয়ে বেশ তামাশা হয়েছিল৷ সার্ভেয়ারের তাঁবু প্রায় আট মাইল দূরে৷ তাকে খবর দিয়েছি যে সকালে সাতটা-সাড়ে-সাতটার মধ্যে, মাঝ-রাস্তায় একটা উঁচু পাহাড় ছিল, তার চুড়োয় যেন আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, আমি তার কাজ দেখব৷ ভোরে উঠে বেরিয়েছি, সাতটা-সাড়ে-সাতটার মধ্যে চার মাইল পাহাড় চড়তে হবে৷ দেড় মাইল আন্দাজ গিয়েছি আর সামনেই রাস্তার পাশে বাঁশঝাড়ের নীচে বেজায় হুটোপুটি! লোকজন থমকে দাঁড়াল, কোথায় পালাই, ওটা না জানি কী! আমি ঘোড়া থেকে নেমে বন্দুক হাতে ধীরে-ধীরে অগ্রসর হলাম৷ পাঁচ-সাত কদম গিয়েছি আর সমস্ত বাঁশঝাড় নাড়া দিয়ে, জঙ্গল তোলপাড় করে লাফিয়ে উঠল সাত-আটটা প্রকাণ্ড হনুমান, এক-একটা প্রায় একজন দশ-বারো বছরের ছেলের সমান উঁচু৷ কী রকম চটে গিয়েছিলাম তা বুঝতেই পারছ৷ মনে করেছিলাম বুঝি বা হাতি! গ্রামের লোক সাবধান করে দিয়েছিল ওই রাস্তায় একটা পাগলা মকনা (দন্তহীন পুরুষ) হাতি আছে, আমরা যেন বিশেষ হুঁশিয়ার হয়ে যাতায়াত করি৷
সমস্তদিন পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে সার্ভেয়ারের কাজ দেখে, বেলা চারটের সময় তার তাঁবুতে পৌঁছলাম৷ এবার ফিরবার পালা৷
আট মাইল রাস্তা৷ পাহাড়ের চড়াই-উতরাই আছে, রাস্তাও খারাপ, তার উপর আবার পাগলা হাতিও আছে৷ লম্বা-লম্বা পা ফেলে চললাম, সন্ধ্যার আগে তাঁবুতে পৌঁছতে হবে৷ কী জানি অন্ধকার হলে আবার না কোনো বিপদ ঘটে৷
বড়ো পাহাড়টা পার হয়ে নীচে নেমেছি, সেই জায়গায় যেখানে ভোরে হনুমান দেখেছিলাম৷ আগে-আগে একজন খালাসি শ্যামলাল— বন্দুক ঘাড়ে৷ তার পিছনে আমি ঘোড়ার উপর৷ আমার পিছনে ঘোড়ার সহিস অলক, তার পিছনে আরও তিন-চারজন খালাসি৷ সূর্য ডোবে-ডোবে, সকলে মাটির দিকে মুখ করে তাড়াতাড়ি চলেছি৷ হঠাৎ শ্যামলাল ‘বাপরে!’ বলে পিছন ফিরে দে দৌড়!
অলকের পাশ কাটিয়ে যাবার সময় সে তাকে ধরে ফেলল৷ আমিও ঘোড়া থেকে নেমে, তার হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিলাম৷ সে বেচারা থরথর করে কাঁপছে৷
‘ছাড়ো, হুজুর! ভাগো, জবর হাঁথি!’
‘কোথায় রে হাতি?’
‘ওই বাঁশঝাড়ের নীচে!’
বন্দুকে ছিটে ভরে পা টিপে-টিপে এগোলাম, মাত্র তিন-চার পা, আর কিছুই দেখা যায় না৷ আমার পনেরো-কুড়ি ফুট সামনে একটা ঝোপ ছিল, সেটা যেন একটু নড়ল, অমনি আমি ওই ঝোপটার পাশের মাটি লক্ষ্য করে, বন্দুকের আওয়াজ করলাম৷ বন্দুকের আওয়াজ হওয়া মাত্র, বিকট চিৎকার করে, প্রকাণ্ড এক মকনা হাতি একেবারে রাস্তার উপর এসে হাজির হল৷ রাস্তার উপর এসেই আমাদের দিকে মুখ ফেরাল, আর সঙ্গে-সঙ্গে আমিও পরপর দুবার বন্দুকের আওয়াজ করলাম— ছররা, মাটি লক্ষ্য করে৷ হাতিটাও অমনি লাটিমের মতো ঘুরে, রাস্তায়-রাস্তায় দে দৌড়! আমিও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বন্দুক ভরে নিয়ে, হাতির পিছনের পায়ের কাছে, মাটি লক্ষ্য করে আবার দুবার বন্দুকের আওয়াজ করলাম৷ আর যাবে কোথায়? কী কু-কাজই হাতিটা তখন করে ফেলল! আমাদের রাস্তা দিয়ে চলাই তখন মুশকিল হল, এই হোঁচট খাই কিংবা পা পিছলে পড়ে হাত-পা ভাঙি আর কি!
ওই মিকির হিলস-এর পাহাড়ে মিকিরদের ছোটো-ছোটো গ্রাম আছে, দু-চারটে নাগা বস্তিও আছে, দু-একটা পাকডাণ্ডি রাস্তা আর ঘোর জঙ্গল, আর নানারকম জানোয়ার৷ ওই জঙ্গলে দু-তিন জায়গায় আমি ‘পুং’ অর্থাৎ গন্ধকের উৎস দেখেছি৷ ওই সব জায়গায় বেলা দুটোর সময়ও জানোয়ার দেখতে পাওয়া যায়৷
এখানকার একটা ‘পুং’-এর কাছেই আমার এক সার্ভেয়ারের ডেরা ছিল৷ তাকে বড়ো সন্তর্পণে যাতায়াত করতে হত, ভয়ে-ভয়ে রাত কাটাতে হত, সারারাত প্রকাণ্ড ধুনি জ্বেলে রাখতে হত৷ জানোয়াররা কিন্তু তবুও ওই ‘পুং’-এ আসত৷ একদিন রাত্রে বৃষ্টিতে ধুনি নিভে গিয়েছিল৷ হঠাৎ একজন খালাসির ঘুম ভেঙে গেল, তাঁবুর বাইরে ধুনির আলো নেই দেখে সে ধুনিটা উস্কিয়ে দেবার জন্য বাইরে এল৷
ওরে বাবারে! বড়ো-বড়ো দুটো হাতি ধুনির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁবুগুলোকে দেখছে! ধুনি নিভে গেছে৷ খালাসির চিৎকারে আর সকলে জেগে চেঁচাতে আরম্ভ করল, তখন হাতি দুটো চলে গেল৷
পরদিন আমি সার্ভেয়ারের তাঁবুতে গিয়ে হাতির পায়ের দাগ দেখেছিলাম৷ কেন যে তাঁবু মাড়িয়ে চ্যাপটা করেনি, সেটাই আশ্চর্যের বিষয়!
ওইখানে তাঁবু রেখে সার্ভেয়ারকে একবার তিন-চারদিনের জন্য অন্য জায়গায় কাজ করতে যেতে হয়েছিল৷ সে একটা তিরপল সঙ্গে নিয়ে গেল, আর জিনিসপত্র পাহারা দেবার জন্য দু-জন খালাসিকে রেখে গেল৷ সঙ্গের মিকির কুলিরা বলল, ওই জঙ্গলে মাত্র দু-জন লোককে রেখে যাওয়া নিরাপদ নয়৷ তারা কুড়ি-বাইশ ফুট উঁচুতে একটা মাচা বেঁধে দিল, রাত্রে খালাসিরা ওই মাচায় শোবে৷
একদিন বেশ কেটে গেল৷ দ্বিতীয় দিন একজন খালাসি নালায় জল আনতে গিয়ে দেখল যেন একটা বার্কিংডিয়ার তাঁবুর দিকে আসছে৷ দ্বিতীয় খালাসি রান্নার জোগাড়ে ছিল, সে একবার তাকিয়েই দে দৌড়!
‘ভাগ! ভাগ! শের আতা হ্যায়!’
দু-জনে দৌড়ে গিয়ে মাচায় উঠল৷ এদের হড়বড়িতে বাঘেরও চোখ পড়েছে ওদের উপর, সেও লাফিয়ে দেখতে এল ব্যাপার কী! খাওয়া-দাওয়া চুলোয় গেল৷ তারা কত চিৎকার করল, বাঘ কি তা শোনে? ওই তাঁবুর সামনে বসে রইল৷ সমস্ত দিনটাই পাহারা দিল৷ রাত্রেও ছিল কিনা সেটা তারা বলতে পারল না, অন্ধকার রাত ছিল, দেখতে পায়নি৷
পরদিন সকালে দেখে— শর্মা তো হাজির আছেনই, আবার একটি সঙ্গীও এনে জুটিয়েছেন! সেদিনও বেচারাদের উপবাস! মাচার উপর বাঁশের চোঙায় জল ছিল, তাই রক্ষা৷ তৃতীয় দিন বিকেলবেলা সার্ভেয়ার ও তার লোকরা ফিরে এল, তাদের গলার আওয়াজ পেয়েই বাঘ দুটো চলে গেল৷
মিকির হিলস-এ কাজ করবার সময় আমার প্রধান আড্ডা ছিল কল্যাণীতে৷ একবার এক সাহেব কল্যাণীর ফরেস্ট বাংলোতে চার সপ্তাহ ছিলেন৷ তিনি শিকার করতে এসেছিলেন, বাঘ মারাই ছিল তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য৷ গাছে উপর মাচায় বসে তিনি অনেক রাত কাটিয়েছেন, কিন্তু দুঃখের বিষয় একটা বাঘও মারতে পারেননি৷ অথচ সে এলাকায় বাঘ আছে, কতবার আমাদের সামনেই পড়েছে৷
একদিন রবিবার, কাজে যাব না৷ ভোরে উঠেই বন্দুক হাতে বেরিয়েছি, বনমোরগ মারব৷ গ্রামের পাশেই ধানখেত, তার দু পাশে পাহাড় আর জঙ্গল, আর এক পাশে কল্যাণী নদী৷ জায়গায়-জায়গায় পাকা ধান সবে কাটতে আরম্ভ করেছে৷ আমি আর একজন খালাসি ধীরে-ধীরে জঙ্গলের কিনারায়-কিনারায়, আলের উপর দিয়ে চলেছি৷ একজন লোক রাত্রে খেত পাহারা দিয়ে গ্রামে ফিরছিল, সে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ওইখানে মোরগ নেমেছে৷ আমরাও সেইদিকে চললাম৷ দু-একটা ধানের গোছা নড়ছে আর মাঝে-মাঝে দু-একটা মোরগের লালঝুঁটিও দেখা যাচ্ছে৷
চলতে হচ্ছে অতি সাবধানে, মাটিতে চোখ রেখে৷ সরু আল, দেড়-ফুট দু-ফুট উঁচু, পড়ে যাবার ভয় আছে৷ এক জায়গায় আলের উপর আট-দশটা লম্বা-লম্বা খাগড়া৷ আমরা সেই খাগড়ার ঝোপটাকে আট-দশ ফুট তফাতে রেখে পাশ কাটিয়ে পার হয়েছি, আর খপ করে কাদায় বড়ো মাটির ঢেলা পড়বার মতো একটা আওয়াজ হল৷ মুখ ফিরিয়ে দেখলাম বাঘ! চিতা বাঘ৷ সেও মোরগ খাবার জন্য খাগড়ার আড়ালে ওৎ পেতে বসেছিল৷ হঠাৎ আমরাও এসে পড়েছি আর সেও লাফ দিয়ে নীচে নামল৷ তারপর ভারিক্কি চালে জঙ্গলে চলে গেল, দৌড়ল না বা একটু ব্যস্ততাও দেখাল না৷ কিন্তু আমাদের যে সে দেখেছে ও অপছন্দ করেছে তার প্রমাণস্বরূপ তার ঘাড়ের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে উঠেছিল৷ হাতে বন্দুক ছিল, কিন্তু চালাবার ভরসা হল না, বন্দুকে মোরগ মারবার জন্য দু নম্বর ও পাঁচ নম্বর ছিটা ভরা ছিল৷
পরে ওই সাহেবের সঙ্গে গল্পচ্ছলে যখন আমি ওই ঘটনাটা বললাম, সাহেব বললেন, ‘মারলে না কেন? ছয়-সাত ফুট দূর থেকে দু নম্বর ছিটাই তো ছোটো বাঘের পক্ষে যথেষ্ট৷’ দুঃখ করতে লাগলেন, ‘আমার যা কপাল! তিন-চার সপ্তাহ চেষ্টা করেও একটা বাঘ দেখতে পেলাম না৷’
কল্যাণীতে থাকতে একদিন বাঁদরের এক অদ্ভুত কাণ্ড দেখেছিলাম৷ নদীর কিনারায় আমার তাঁবু ছিল৷ নদীর ওপারে বন, সেখানে একপাল বাঁদর থাকত, চল্লিশ-পঞ্চাশটা কি আরও বেশি হবে৷ রাতদিন তাদের কিচির-মিচির শুনতাম, অনেক সময় বসে-বসে তাদের তামাশা দেখতাম৷ একদিন বিকেল বেলায় একেবারে হুলস্থূল ব্যাপার, যেন আবার রাম-রাবণের যুদ্ধ লেগেছে! আমার চাপরাশী এসে বললে, ‘হুজুর তামাশা দেখুন এসে৷’
তাঁবু থেকে বেরিয়ে, নদীর ধারে এসে দেখলাম, ওপারে একটা বড়ো গাছের উপর সমস্ত বাঁদরগুলো জড়ো হয়েছে আর মহা হল্লা করছে৷ দূরবিন লাগিয়ে দেখলাম সব চেয়ে উপরে একটা ডালে প্রকাণ্ড একটা বাঁদর বসে আছে, তার আশেপাশে আরও তিন-চারটে বড়ো-বড়ো বাঁদর, প্রকাণ্ডটা পালের গোদা৷ তাদের একটু নীচেই, একটা ডালের উপর চার-পাঁচটা বাঁদর অন্য একটা বাঁদরকে জড়িয়ে ধরে আছে৷ আর সব বাঁদরগুলো দু-তিন ভাগ হয়ে এদিকে-ওদিক বসেছে৷ আর কী কিচির-মিচির কী হল্লা! ভালো করে দেখে আমার মনে হল ওদের নালিশ ফরিয়াদ চলেছে, বিচারক হল পালের গোদা৷
একবার একদল কিচির-মিচির করে, তারপর অন্য এক দল, তারপর পালের গোদা৷ কিছুক্ষণ ওইরকম চলল, তারপর গোদামশাই খুব ধমক-চমক করলেন, আর চার-পাঁচটা বাঁদর মিলে ওই বাঁদরটাকে শূন্যে তুলে ছুড়ে নদীতে ফেলে দিল৷ কী চিৎকার আর কী আর্তনাদ তার! জলে ফেলে দেওয়া মাত্র অন্য সবগুলো বাঁদর লাফালাফি করে গাছ থেকে নামল আর নদীর কিনারায় জলের ধারে এসে দাঁড়াল৷
ওই বেচারা যেমন ডাঙায় উঠতে যায়, অমনি তিন-চারটে বাঁদর মিলে ওকে ঠেলে দেয়, তবুও উঠতে চেষ্টা করলে, ধরে চুবিয়ে দেয়৷ বার কয়েক এমন করে বেচারা যেন শ্রান্ত হয়ে পড়ল৷ পাহাড়ী নদী, বেশ স্রোত, কতক্ষণ আর লড়বে? শেষটা অবসন্ন হয়ে স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলল, সাঁতরাবার আর শক্তি নেই৷ আর কী কাতরানি তার! আমাদেরও দুঃখ হচ্ছিল কিন্তু বাঁদরগুলোর একটুও দয়া হল না৷ তার সঙ্গে-সঙ্গে নদীর কিনারায়-কিনারায় দৌড়ে যেতে লাগল, আর ও বেচারা কিনারার কাছে এলেই ধমক দিতে আর শাসাতে লাগল৷
এক জায়গায় শিকার করতে গিয়ে বড্ড জব্দ হয়েছিলাম৷ সার্ভেয়ারের কাজ দেখতে গেছি৷ সামনে জমি, তাতে দু-চারটে ছোটো নদী, আর ছোটো-বড়ো বিল অসংখ্য৷ সব জুড়ে নলখাগড়ার বন, দশ-বারো ফুট উঁচু৷ বিলের ধারে ‘খুঁটি’ আছে, তাতে পঞ্চাশ-ষাটটা করে পোষা মহিষ আর সঙ্গে রাখাল৷ দু-চারটে গ্রামও আছে৷ বিলের ধারেই আমাদের তাঁবু পড়েছে৷
বিকেলে যখন তাঁবুতে পৌঁছলাম তখনও বেশ আলো আছে৷ কাজ করবার সময় বিলে অনেক হাঁস দেখেছি, একটা হাঁস মেরেছি৷ তাঁবুতে পৌঁছে সার্ভেয়ারকে বললাম— নৌকো পেলে হাঁস মারতে পারি৷ সার্ভেয়ার ‘খুঁটি’ থেকে নৌকা জোগাড় করে আনল৷ আমরা হাঁস মারতে চললাম৷ সার্ভেয়ারটি মুসলমান, হালাল না করলে খাবে না৷ তাঁবু থেকে একটু দূরে গিয়ে দেখলাম ‘ভেলা’ অর্থাৎ গগনবেড় বা পেলিক্যান৷ ছেলেবেলায় দেশে দল বেঁধে ভেলা উড়ে যেতে দেখেছি, শুনেছিলাম খেতে বড়ো উপাদেয়৷ বড়ো লোভ হল৷ প্রকাণ্ড জীব, একটা মারলেই পাঁচ-সাত সের মাংস পাওয়া যাবে৷
মাঝিকে বললাম, ‘ওই দিকে চলো৷ ভেলা মারব৷’ ওদের কাছে যেতে বলা যত সহজ, কাছে যাওয়া তত সহজ নয়৷ আমরা যতই এগোই, পাখিরাও আমাদের দিকে পিঠ করে ততই সরে-সরে যায়৷ অতি কষ্টে, অনেক কারসাজি করে, চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ গজের মধ্যে পৌঁছোলাম৷ আর কাছে যাওয়া যায় না, কোনো অবলম্বন নেই যার আড়ালে লুকিয়ে এগোব৷ বন্দুকের দু নম্বর ছিটা ভরে, লক্ষ্য স্থির করে, ঘোড়া টিপলাম৷ বন্দুকের আওয়াজ হবামাত্র সব পাখি আকাশে উড়ে গেল, একটাও পড়ল না৷ প্রায় সিকি মাইল উড়ে, ওরা আবার জলে বসল৷ এবার একটু সুবিধা হল, টুকরো-টুকরো নলখাগড়ার ঝোপ ছিল৷ তার আড়ালে নৌকো চালিয়ে, যখন আবার খোলা জায়গায় বেরোলাম, তখন পাখিগুলো মাত্র পঁচিশ-ত্রিশ গজ দূরে৷ বন্দুক তুলে আবার ছুড়লাম, আবার কোনো ফল হল না৷ পাখিও উড়ল, আমিও অন্য নাল ছাড়লাম৷ তিন-চারটে পালক পড়ল, পাখিগুলো দিব্যি উড়ে গেল৷ দু নম্বর ছিটা ওদের পালক ভেদ করে শরীরে লাগতে পারল না৷ সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, দেড় ঘণ্টা ভেলার পিছনে নষ্ট করেছি, এখন কি আর খালি হাতে ফিরব নাকি? পথে দুটি ছোটো হাঁস মেরে নিলাম৷
তাঁবুতে ফিরে এলাম, কিন্তু মেজাজটা বড়ো খাপ্পা৷ এমন জব্দ আর কখনো হইনি, এর একটা ব্যবস্থা করতে হবে৷ ভোরে যখন ঘুম ভাঙল, তখন চারদিক কুয়াশায় ঢাকা৷ বিছানায় শুয়ে একটা ফরফর শোঁ-শোঁ শব্দ কানে আসছিল৷ জিগগেস করলাম, ‘কিয়া হ্যায় রে?’
‘ভেলা হ্যায়, হুজুর৷’
মাথার উপর দিয়ে শোঁ-শোঁ শব্দে শত-শত পাখি, হাঁস ভেলা ইত্যাদি, উড়ে যাচ্ছে৷ মারা অসম্ভব, কুয়াশায় ভালো দেখা যায় না কত উঁচুতে৷
হাত-মুখ ধুয়ে চা খেতে বসেছি৷ একজন খালাসি এসে খবর দিল, ‘হুজুর, ভেলা৷’
বাইরে এসে দেখি সিকি মাইল দূরে, শত-শত ভেলা সার বেঁধে চলেছে৷ ক্রমাগত জলে মাথা ডোবাচ্ছে আর তুলছে, শিকারে ব্যস্ত!
আমি আর সার্ভেয়ার আর একজন খালাসি নৌকোতে উঠলাম৷ আগের দিনের দুরবস্থার কথা মনে ছিল, আজ হুঁশিয়ার হয়ে বন্দুকের এক নলিতে গুলি অন্য নলিতে বাকশট ভরেছি৷ দেখব আজও উড়ে যায় কিনা৷
ভেলাগুলো বড়োই ব্যস্ত, আমাদের লক্ষ্যই করছে না৷ আমরা খুব কাছে পৌঁছে গেছি৷ ত্রিশ-বত্রিশ গজ হবে, তখন তাদের খেয়াল হয়েছে, অমনি আট-দশটা একসঙ্গে ডানা মেলেছে, উড়ে যাবার ইচ্ছা৷ আমিও এর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম, দু-একটা হয়তো জল থেকে দু-চার ফুট উঠেছে, বেশির ভাগই তখনও জলের উপর, ডানা খোলা অবস্থায়৷ তাদের মাঝখানটা লক্ষ্য করে গুলিভরা কার্তুজ ছেড়ে দিলাম৷ কয়েকটা পাখি এলিয়ে পড়ল, আর বাকিগুলো শোঁ-শোঁ করে উড়ে গেল৷ দশ-পনেরো ফুট না উঠতে বাকশট ছাড়লাম, আরও কটা ঝুপঝাপ করে জলে পড়ল৷ যে-কটা জ্যান্ত ছিল, সার্ভেয়ার তাদের হালাল করল৷
ভেলা তো শিকার করলাম৷ তাঁবুতে ফিরে সবাইকে ভাগ করেও দিলাম৷ দু-তিনটে আপিশের বাবুদের জন্য পাঠিয়ে দিলাম৷ সকলেরই মহা আনন্দ, আজ খুব ভোজ হবে৷
সন্ধ্যার সময় কাজ থেকে ফিরে, স্নান করে, খেতে বসলাম৷ আমার লোকও মাংস রান্না করেছে৷ কিন্তু মাংস খেতে গিয়ে একেবারে অবাক৷ এ তো মাংস নয়, ঠিক যেন জুতোর চামড়া! আর গন্ধ কী, বাপ! খায় কার সাধ্য!
খালাসিরাও কেউ খেতে পারেনি৷
‘কেন রে?’
‘বহুৎ বদবো, হুজুর, আউর সিজা নহি৷’
সকলের মুখেই এক কথা, মাংস একেবারে অখাদ্য৷
হাজারিবাগের ভুঁইয়া সাঁওতাল, তারাও খেতে পারল না, সে যে কেমন মাংস বোঝাই যাচ্ছে৷
কাল রবিবার, কাজে যাব না৷ সকলেই শ্রান্ত-ক্লান্ত, বিশ্রাম করবে আর কাপড়-চোপড় ধোবে, জঙ্গলে তো আর ধোপা নেই৷ সন্ধ্যার সময় মাহুত এসে বলল, ‘হুজুর, গাঁয়ের এই লোক বলছে ওই পাহাড়ে অনেক ভাল্লুক আছে৷’
গ্রামের লোকটিও বলল, ‘খুব ভোরে গেলে ভাল্লুক আর বুনো মোষ দেখিয়ে দিতে পারি৷’
পাহাড়টা তাঁবু থেকে মাইল দুই দূরে৷ দু-দিন আগে সন্ধ্যাবেলা ওই পথে ফেরবার সময় আমিও একটা ভাল্লুক দেখেছিলাম৷ মাহুতকে বললাম, ‘আচ্ছা, ভোরে সাড়ে-চারটের সময় বেরোব৷’
অন্ধকার থাকতেই বেরোলাম৷ সঙ্গে দুটো হাতি, গ্রামের লোকটি আর দু-জন খালাসি৷
প্রথমেই ওই ভাল্লুকের পাহাড়ে চললাম, সূর্য ওঠার আগে পাহাড়ের নীচে পৌঁছলাম৷ পাহাড়ের নীচে-নীচে হাতি চলতে লাগল, কারো মুখে টুঁ শব্দটি নেই৷ হঠাৎ গ্রামের লোকটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল একটা উইয়ের ঢিপির গোড়ায় একটা কালো কিছু দেখা যাচ্ছে৷ হাতি আরেকটু কাছে গেলে দেখলাম একটা ভাল্লুক উইয়ের ঢিপি খুঁড়ছে৷ উইয়ের ডিম ভালুকের অতি প্রিয় খাদ্য৷ দশ-পনেরো গজ দূরে হাতি, ভাল্লুকটার কিন্তু খেয়ালই নেই, এমনি আহারে মত্ত সে৷ হাতিটা আরও দু-চার কদম কাছে গেল, আর কাছে যাবার চেষ্টা করলে ভাল্লুকটা পালাবে৷ বন্দুক তুলে লক্ষ্য স্থির করবার চেষ্টা করতে লাগলাম, কিন্তু বৃথা চেষ্টা! নতুন-নতুন হাতি, সম্ভবত ভাল্লুকের গন্ধ পেয়েছে, বড়ো ছটফট করছে, এক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়ায় না৷ অনেক কষ্টে মাহুত তাকে একটু শান্ত করল, আমি তাড়াতাড়ি যথাসম্ভব লক্ষ্য স্থির করে ঘোড়া টিপলাম৷ কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য! সঙ্গে সঙ্গে হাতিটাও মাথা নাড়ল, তার ফলে গুলি ভাল্লুকের মাথায় না লেগে, পাঁচ-ছয় ইঞ্চি সামনে উইয়ের ঢিপিতে লাগল৷ কিছু বালি ছিটকে ভাল্লুকের মুখে পড়ল৷ ‘এত আস্পর্ধা কার’— দেখবার জন্য সে মুখ তুলল, আর হাতি দেখেই ‘ঘোঁৎ’ শব্দ করে পালাবার ব্যবস্থা করল৷
ভাল্লুকের পাঁজর লক্ষ্য করে অন্য নলি ছেড়ে দিলাম৷ ‘হুস’ শব্দ করে ভাল্লুকটা ছিটকে লম্বা-লম্বা ঘাসের মধ্যে পড়ল, আর সমস্ত ঘাস তোলপাড় করতে লাগল৷
মাহুত বলতে লাগল, ‘হুজুর, ফের মারো৷’
‘না, দরকার নেই, পড়েছে৷’
ঘাস নড়া থেমে গেল, মরে গেছে৷ এতক্ষণে হাতি সেই জায়গায় পৌঁছুল, ভাল্লুকের নামগন্ধও নেই৷ ঘাসের উপর গড়াবার, ছটফট করবার চিহ্ন আছে বটে কিন্তু জানোয়ার নেই৷ সে হামাগুড়ি দিয়ে ভীষণ কাঁটার ঝোপের ভিতর দিয়ে পাহাড়ের এক গর্তের মধ্যে ঢুকেছে, মনে হল এইটেই তার আস্তানা— ‘লেয়ার’৷
হামাগুড়ি দেওয়া ছাড়া ওর ভিতরে ঢোকা অসম্ভব৷ ভাল্লুকের পিছনে ওই কাঁটা আর গর্তের ভিতর হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে প্রবৃত্তিও হল না, আমার সাহসেও কুলোল না৷ ভাল্লুকের চামড়াও আর আমার জুটল না৷
আমার হেডকোয়ার্টার কয়েকদিন যমুনামুখে ছিল৷ ভাল্লুকের ভীষণ কাণ্ড সেখানে দেখেছিলাম৷ যমুনামুখের একজন ফরেস্ট গার্ড সন্ধ্যার সময় হরিণের সন্ধানে নদীর অপর পারে সরষে খেতে গিয়েছিল৷ সকালে সন্ধ্যায় হরিণ সরষের কচি পাতা খেতে আসে৷ ধীরে-ধীরে জঙ্গলের ধারে-ধারে চলেছে, চোখ চারদিকে ঘুরছে, কোথাও হরিণ বের হয়েছে কিনা৷ খেতের পাশেই জঙ্গলের ধারে একটা পুরোনো উইয়ের ঢিপি, ওই ঢিপিটার পাশ দিয়ে যাবার সময় ভাল্লুকের পায়ের দাগ চোখে পড়ল, আর ছোটো জানোয়ারের কুঁই-কুঁই ডাকও তার কানে গেল৷ চারদিক দেখে বুঝতে পারল যে ওই ঢিপিটার মধ্যে ভাল্লুকের ছানা আছে৷ সে চুপচাপ চলে এল৷
তাদের আপিসে এসে অন্য একজন ফরেস্ট গার্ডকে ভাল্লুকের ছানার কথা বলল, আর দু-জনে পরামর্শ করল যে ভোরে তারা কোদাল খোন্তা নিয়ে, হাতিয়ারবদ্ধ হয়ে যাবে আর উইঢিপি খুঁড়ে ভাল্লুকের ছানা বের করে আনবে৷ আপিসের উপরওয়ালাদের আর সে সব কথা জানাল না৷
ভোরে উঠে তারা চলে গেল৷ সেই জায়গায় পৌঁছে একজন হাতের বন্দুক পাশে রেখে, গর্তের মুখ একটু খুঁড়ে নিয়ে, উপুড় হয়ে গর্তের মুখে কান রেখে, ভাল্লুকের ছানা গর্তের ভিতর আছে কিনা শুনতে লাগল৷ অন্য গার্ডটি একটু দূরে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক দেখছিল৷ সে একটা কিছু দেখবার জন্য একটু দূরে সরে গেল, এমন সময় ভীষণ গর্জন করে পিছন থেকে এসে ভাল্লুকী প্রথম গার্ডের পিছন কামড়ে ধরল৷ লোকটি উল্টে পড়ে গেল আর হাত দিয়ে নিজের মুখটা রক্ষা করবার চেষ্টা করতে লাগল৷ ভাল্লুকী চিবিয়ে তার হাতখানা একেবারে গুড়ো করে দিল৷ ইতিমধ্যে অন্য গার্ডটি ছুটে এসে হাজির হয়েছে৷ সে বন্দুক তুলে নিয়ে এক গুলিতেই ভাল্লুকীটাকে মেরে ফেলল৷ প্রথম গার্ড অজ্ঞান, এ বেচারা দৌড়ে গিয়ে আপিসে খবর দিল আর সকলে মিলে খাটিয়ায় তুলে তাকে নিয়ে এল৷ তখুনি তাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হল৷
বহু যত্ন ও চেষ্টা সত্ত্বেও তার প্রাণরক্ষা হল না৷
গোলাঘাট আর বড়োপখারের মাঝামাঝি গরমপানিতে গন্ধক-জলের একটা উষ্ণ প্রস্রবণ আছে৷ অনেক লোক এই গরম জলে স্নান করতে আসে৷ এর জলে নাকি রোগ নিবারণী শক্তি আছে, বিশেষত চর্মরোগ৷ সরকারি জঙ্গল বিভাগের একটা বাংলোও সেখানে আছে৷ ওই বাংলোয় আমি কয়েকদিন ক্যাম্প করেছিলাম৷
একজন সার্ভেয়ারের কাজ দেখতে যাব, আট মাইল দূরে তার ক্যাম্প৷ ভোরেই ঘোড়ায় চড়ে বের হয়েছি, সঙ্গে আমার সহিস আর একজন লোক৷ বড়োপখারের রাস্তায় চলেছি, ওই রাস্তায় এক জায়গায় বাঘের ভয়, বাংলোর চৌকিদার দু-একবার আমাকে সে কথা বলেছে আর সাবধান করে দিয়েছে যেন অন্ধকারে হুঁশিয়ার হয়ে চলাফেরা করি৷ বেশ তাড়াতাড়ি চলেছি৷ ডাকবাংলো থেকে চার-পাঁচ মাইল পথ গিয়েছি৷ খুব কুয়াশা৷ ঘোড়ার পিঠে বসে মনে হতে লাগল— এই জায়গায়-না বলেছিল বাঘের ভয়? পরমুহূর্তেই রাস্তার একটা মোড় ঘুরেছি আর কথা নেই বার্তা নেই জঙ্গল থেকে লাফিয়ে খপ করে রাস্তায় পড়ল— বাঘ! একেবারে মুখোমুখি৷ আমরা তো থমকে দাঁড়ালাম, ভয়ে ঘোড়াটা একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গেল; বাঘটাও ‘হুপ’ বলে এক লাফ দিয়ে ঝপাং করে জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে পড়ল৷ কে যে বেশি ভয় পেল তা বুঝতে পারলাম না!
এই গরমপানিতে একটা মজার ঘটনা হয়েছিল৷ কাজকর্ম শেষ হয়েছে, সকল সার্ভেয়ারদের উপর হুকুম হয়েছে : ‘গরমপানিতে এসে জড়ো হও, কাল ভোরে আমরা গোলাঘাট যাব৷’ গোলাঘাটে আমাদের আপিস ছিল৷
সন্ধ্যার সময় ইন্দ্রসিং সার্ভেয়ার এসে নালিশ করল, ‘হুজুর, বক্তাওয়ার সিং-এর সর্বনাশ হয়েছে৷ কাল রাত্রে তার ৮৭ টাকা চুরি গেছে৷’
‘কী করে চুরি গেল?’
‘হুজুর, টাকা তার তাঁবুর ভিতরে বাক্সে ছিল৷ ভুলে বালিশের নীচে চাবি ফেলে এসেছিল৷ কাজ শেষ করে তাঁবুতে ফেরেনি, আমার তাঁবুতে শুয়েছিল৷ বেলা আড়াইটে-তিনটে নাগাদ তার টিন্ডেল আর একজন লোক ‘পেট ব্যথা করছে’ বলে তাঁবুতে চলে যায়৷ আজ সকালে যখন আমরা বক্তাওয়াসিং-এর তাঁবুতে এলাম, সে আগে চাবি খুঁজেছে, তারপর বালিশের নীচে থেকে চাবি নিয়ে বাক্স খুলে দেখে একটিও টাকা নেই৷’
‘লোকজন যারা তাঁবুতে ছিল তাদের জিগগেস করনি?’
‘হ্যাঁ হুজুর, আমার সামনেই টিন্ডেলকে জিগগেস করা হয়েছিল৷ সে তো চটে গেল— সে কিছু জানে না, তাকে কেন জিগগেস করা হচ্ছে৷ বাবুর রোটিওয়ালাও (রাঁধুনি) তো তাঁবুতে ছিল৷’
বাবুর রোটিওয়ালা বলল যে সে ‘লকড়ি’ খুঁজতে গিয়েছিল, তখন ওই টিন্ডেল আর অন্য খালাসিটা তাঁবুতে ছিল— প্রায় আধঘণ্টা৷ সব খালাসিদের ডেকে পাঠালাম৷ অনেক জেরা করলাম৷ তাদের কথাবার্তার ভাব-ভঙ্গি দেখে, রকম-সকম দেখে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হল যে ওই টিন্ডেল বেটাই চোর৷ কিন্তু কিছুতেই স্বীকার করে না৷
একটুক্ষণ চিন্তা করে আমার চাপরাশি রামাবতারকে ডেকে পাঠালাম, বললাম, ‘তোমাকে ভোরে গোলাঘাট যেতে হবে৷ ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের নামে চিঠি দিচ্ছি, পুলিশ নিয়ে আসবে৷ আর ইন্দ্রসিং আর বক্তাওয়ারসিং বাবুদের যত খালাসি আছে সকলকে আটক করতে হবে৷ যে পর্যন্ত না এই চুরির টাকার একটা কিনারা হয় ততদিন এদের আটক রাখতে হবে৷ রাস্তায় বাঘের ভয় আছে, মশালের বন্দোবস্ত করো আর তোমার সঙ্গে যাবার জন্য দু-জন লোক ঠিক করো৷’
তারপর তাড়াতাড়ি দুটো চিঠি লিখে আমার টেবিলের উপর রেখে দিয়ে বললাম, ‘এই চিঠি নিয়ে যাবে, একখানা ম্যাজস্ট্রেট সাহেবের আর একখানা আমাদের বড়োসাহেবের৷ তুমি যাবার সময় এই চিঠি নিয়ে যাবে৷’
রাত্রে শুতে যাব এমন সময় চার-পাঁচজন টিন্ডেল এসে অনেক মিনতি করল, ‘হুজুর চুরি যেই করুক, একজন করেছে৷ সকল খালাসিকে আটক করলে বড়ো জুলুম হবে৷ ওদের বড়ো ক্ষতি হবে৷’
আমি বললাম, ‘আমি সেটা জানি না৷ এ হতেই পারে না যে অতগুলো টাকা চুরি গেল আর কেউ কিছু জানে না৷ নিশ্চয়ই জানে৷ সকলে একজোট হয়ে কিছু বলছে না, এখান থেকে বেরিয়ে গেলে ভাগাভাগি করে নেবে৷ কাজেই পুলিশ এসে একটা ব্যবস্থা করুক৷’
‘হুজুর, পুলিশের হাতে দিলে এদের নিজের কামানো পয়সাও সব চলে যাবে৷’
‘যাক, সব বেটাই চোর এরা, চোরের উপর আমার কোনো সহানুভূতি নেই৷ তোমাদের যদি অত দরদ হয়ে থাকে তাহলে তোমরা চাঁদা তুলে, বা পঞ্চায়েত করে চোরের কাছ থেকে বাবুর টাকা আদায় করে দাও৷’ এই বলে আমি তাদের হাঁকিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম৷
গরমপানি থেকে গোলাঘাট চোদ্দো মাইল রাস্তা, তাতে আবার গরমের দিন, কাজেই ভোরে চারটে নাগাদ সকলকে উঠতে হবে৷ চারটের আগেই গোলমাল আর চেঁচামেচিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল৷ উঠে দেখি এক জায়গায় চার-পাঁচজন সার্ভেয়ার, হাতির মাহুত, আর অনেক খালাসি জড়ো হয়ে গোলমাল করছে৷ ডেকে জিগগেস করলাম, ‘কী হয়েছে?’
ইন্দ্রসিং আর এক বুড়ো সার্ভেয়ার ছুটে এসে বলল, ‘হুজুর, বক্তাওয়ারসিং-এর টাকা পাওয়া গিয়েছে৷’
‘কী করে পাওয়া গেল?’
‘দেওয়ানজির (ওই বুড়ো সার্ভেয়ারকে সকলে দেওয়ানজি বলে ডাকত) চাকর তাঁর বিছানা বাঁধবার জন্য খাটিয়া ধরে ঠেলেছিল, পাশে হাতিভীম গদি ছিল, তাতে খাটিয়ার ধাক্কা লেগেছিল আর অমনি ঝনাৎ করে গদির উপর থেকে কয়েকটা টাকা নীচে পড়ে গিয়েছে৷ আওয়াজ শুনে দেওয়ানজি দেখতে গেলেন কী ব্যাপার৷ গিয়ে দেখলেন কয়েকটা টাকা মাটিতে পড়ে আছে, আর গদির উপর সারে-সারে অনেক টাকা সাজানো আছে৷ গুণে ৮৭ টাকা সব পাওয়া গেল৷’
আমি চাপরাশিকে ডেকে বললাম, ‘তোমাকে আর গোলাঘাট যেতে হবে না৷ চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলো৷’
চিঠিটা ছিঁড়তে গিয়ে দেখি তাতে কিছুই লেখা নেই শুধু হিজিবিজি আঁকা৷
• ১৬ • (১৯১৫৷ আসাম: ডিমাপুর, নাম্বর) বাইশ-তেইশ বছর জরিপের কাজে নানা প্রদেশে গিয়েছি, নানা জায়গায় ঘুরেছি, কত বন-জঙ্গল দেখেছি, কিন্তু আসামের নাম্বরের মতো জঙ্গল কোথাও দেখিনি৷ জঙ্গল যে এমন বিদঘুটে হতে পারে তা আমার ধারণাই ছিল না৷ অনেক জায়গাতেই বিশ্রী জঙ্গল আছে কিন্তু তার আগাগোড়া সমস্তটাই এক ধরনের নয়৷ কোথাও বা অল্প-বিস্তর বেত, কোথাও বা বড়ো-বড়ো গাছের বন, আবার কোথাও বা একটু-আধটু খোলা-খালা, কিন্তু নাম্বরে সব অন্য রকম— খালি বেত, আর বেত, আর বেত৷ যে জায়গায় বড়-বড় গাছ আছে, সেখানেও গাছের নীচে বেত, আর সকল গাছ জড়িয়ে উঠেছে বেত— ষাট-সত্তর ফুট লম্বা বেতও আছে৷ এক-এক জায়গায় এমন ঘন বেতও পেয়েছি যে সে বেত কেটে পথ করা যায় না, সুড়ঙ্গ তৈরি করতে হয়, তবে এগোনো যায়৷
মনে আছে এক জায়গায় একজন সার্ভেয়ারের কাজ দেখতে গিয়েছিলাম, সঙ্গে দশ-বারোজন খালাসি ছিল৷ তারা সারাদিন প্রাণান্ত পরিশ্রম করে মাত্র কয়েক ফুট চওড়া আর ত্রিশ-বত্রিশ জরিপ লম্বা একটি সুড়ঙ্গ-পথ কাটতে সমর্থ হয়েছিল৷ শেষে হার মেনে চলে আসতে হয়৷
একে তো ওই রকম জঙ্গল, তার উপর আবার জানোয়ারে কিলবিল করছে৷ বাঘ, ভাল্লুক, হরিণ, শুয়োর, হাতি— কোনোটাই বাদ যায় না৷ আর জোঁক? তার কথা না বললেও চলে— এখনও গায়ে কাঁটা দেয় ওই জোঁকের কথা মনে পড়লে৷
সার্ভেয়ার ইন্দ্রসিং-এর কাজ দেখতে গিয়েছি৷ পথে একটা হরিণ মেরেছি৷ একটা নদীর ধারে আমার তাঁবু পড়েছে৷ সন্ধ্যার সময় সার্ভেয়ার এল৷ রাত্রে সে জায়গায়ই সে থাকবে, সকালে উঠে তার কাজ দেখতে দেখতে সার্ভেয়ার রণজিৎ সিং-এর ডেরায় যাব৷ তাদের দুজনের তাঁবু এক জায়গায়৷ ঘোর জঙ্গল, তাতে আবার অসংখ্য জানোয়ার, সেইজন্য সুবিধা হলেই দুজন সার্ভেয়ার এক জায়গায় তাঁবু খাটায়, তবুও তো বাইশজন লোক রাত্রে একসঙ্গে থাকবে৷
সকালে উঠেই সার্ভেয়ারের লোকেরা নালিশ করল, ‘হুজুর, আমরা শিকারের ভাগ পাইনি৷’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা, আজ যদি শিকার মেলে, সেটা তোমাদের হবে৷ আমার লোকের কোনো দাবি থাকবে না তার উপর৷’
লোকজনদের সোজা পথে রণজিৎ সিং-এর তাঁবুতে পাঠিয়ে দিলাম৷ বলে দিলাম সন্ধ্যার আগেই যেন দু-তিনজন লোককে লন্ঠন সঙ্গে দিয়ে, নদীর রাস্তায় পাঠিয়ে দেয়, অনেক কাজ— আমাদের হয়তো দেরি হতে পারে৷
বেশ চওড়া নদী, কিন্তু তাতে জল অতি সামান্য, বালিই বেশি৷ জলের স্রোত মাত্র ত্রিশ-বত্রিশ গজ চওড়া, বালির মধ্যে এঁকেবেঁকে চলেছে, কখনো বা এপার, কখনো বা ওপার ঘেঁষে৷ নদীটা প্রায় আড়াইশো গজ চওড়া হবে৷ জায়গায়-জায়গায় ছোটো-ছোটো দ্বীপ আছে, তাতে শুধু শরবন৷ নদীর কিনারাতেও কোথাও-কোথাও ত্রিশ-চল্লিশ গজ চওড়া শরবন৷
জঙ্গল কেটে লাইন তৈরি করে চলেছি, দেরি হচ্ছে, লোকজন হয়রান হয়ে পড়েছে৷ বারোটা-সাড়ে-বারোটার সময় একটা ছোটো নালার ধারে বসেছি, কিছু জলযোগ করব, লোকজনও জল খাবে, ‘খৈইনি’ খাবে৷ আমার খাওয়া প্রায় শেষ হয়েছে, এমন সময় এক খালাসি এসে বললে, ‘হুজুর, হরিণ৷’
খাওয়া ফেলে তাড়াতাড়ি বন্দুক হাতে ছুটলাম৷ একটা হরিণ ঝোপের মধ্যে ঘুমোচ্ছিল, আমাদের গোলমালে উঠে পালাচ্ছে৷ সেটাকে মেরে সার্ভেয়ারের লোকেদের বললাম, ‘এটা তোমাদের৷ বয়ে নিয়ে চল, কিন্তু খবরদার যেন গাফিলি না হয়, আমার লোকের ভাগ নেই এতে৷’
মহা খুশি হয়ে দু-জন খালাসি সেটাকে ঘাড়ে করে চলল৷
চারটের সময় আমরা একটা শুকনো নালায় পৌঁছুলাম, তখন সার্ভেয়ার বলল, ‘হুজুর, আজ এইখানে কাজ বন্ধ না করলে, তাঁবুতে পৌঁছতে পারব না৷ এই নালা ধরে নদীতে যেতে হবে— প্রায় এক মাইল রাস্তা, তারপর নদী-নদী যেতে হবে দু-আড়াই মাইল রাস্তা৷’
কাজ বন্ধ করে চললাম৷ বিশ্রী পথ— সার্ভেয়ারের কাটা লাইন, তাড়াতাড়ি চলা অসম্ভব৷ বড়ো নদীতে যখন পৌঁছলাম তখন সূর্য অস্ত গেছে, যদিও চারদিকে পরিষ্কার আলো, পাহাড়ের মাথায়-মাথায় একটু-একটু রোদের ছিটেফোঁটা ঝিকমিক করছে৷ বেশ চওড়া নদী, জলের স্রোত ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ গজ চওড়া— একহাঁটু গভীর আর পরিষ্কার জল৷
নদীতে পৌঁছেই লোকজন একেবারে বালির উপর বসে পড়ল৷ বললে, ‘হুজুর থক গিয়া, পানি পিয়েঙ্গে৷’
আমরাও একটা পাথরের উপর বসলাম, পাঁচ-সাত মিনিট বিশ্রাম করলাম; লোকজনেরা হাত-মুখ ধুয়ে জল খেল৷ আমি ক্রমাগত তাড়া দিচ্ছি, ‘সন্ধ্যা হয়ে গেছে, এই অন্ধকার হল বলে, জলদি চলো৷’
সার্ভেয়ার বলল, ‘আর ভয় নেই৷ চওড়া নদী, এখুনি লোক এসে পড়বে লন্ঠন নিয়ে৷ ওদের চারটের সময় বেরোতে বলে দিয়েছি৷’
লোকজন উঠে দাঁড়াল আর চার-পাঁচজন মিলে ‘হু-উ-উ’ বলে জোরে চিৎকার করল— তাঁবু থেকে যাদের আসবার কথা, তারা কত দূর এল দেখবার জন্য৷ চিৎকারও করা আর পাশের আট-দশ ফুট উঁচু শরবন থেকে পাঁচ-সাতটা বুনো হাতি ফ্যাঁস-ফ্যাঁস শব্দ করে বের হয়ে এল, আর দৌড়ে জল পার হয়ে অন্য পারের জঙ্গলে ঢুকল৷
অত বড়ো-বড়ো পাঁচ-সাতটা জানোয়ার পনেরো-কুড়ি গজ মাত্র দূরে ওই খাগড়াটুকুর মধ্যে ছিল, কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি৷ লোকজন হঠাৎ অতগুলো হাতি দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠল, তাদের সামলে নিয়ে চলতে আরম্ভ করলাম৷ ক্রমে সন্ধ্যা হয়ে গেল৷ উপরে ঝলমল করছে আকাশভরা তারা, আর নীচে ঝকঝক করছে বালি, তার উপর দিয়ে আমরা চলেছি আর একটু পর-পরই জল পার হচ্ছি৷
পথ আর ফুরোয় না৷ সার্ভেয়ার বলল সবসুদ্ধ ষোলো-সতেরোবার জল পার হতে হবে৷ লন্ঠন নিয়ে লোক আসবার কোনো লক্ষণই নেই৷ আর দু-চার বার ‘হু-উ-উ’ বলে চিৎকার করা হয়েছে, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি৷ সকলে চটে লাল, সার্ভেয়ারের টিন্ডেল বলতে লাগল, ‘আচ্ছা, বেটাদের হরিণ খাওয়াব এখন! তাঁবুতে বসে আরাম করছে৷ অতবার করে বলে দিয়েছি চারটের সময় লন্ঠন নিয়ে আসবি তার নামও নেই৷’
এক-একবার জল পার হই আর লোকেরা বলাবলি করে, ‘আউর আট দফে, আউর সাত দফে’ ইত্যাদি৷ বালিতে পা আর চলে না, বালির উপর জায়গায়-জায়গায় পাথর, গাছের ডাল বা শেকড় পড়ে রয়েছে কাজেই চোখ নীচের দিকে রেখেই চলতে হয়, নয়তো হোঁচট খাবার আশঙ্কা৷ সাতটা বাজতে চলল, সকলেই পরিশ্রান্ত৷
‘আরে ফের আওয়াজ দেও৷’
‘হু-উ-উ৷’
এইবার উত্তর এল কিন্তু বহুদূর থেকে৷ সঙ্গের লোকেরা তাদের বাপান্ত করতে লাগল, ‘হতভাগারা তাঁবুতে বসে আওয়াজ দিচ্ছে!’ এমন সময়ে আবার নদীর মোড় ঘুরলাম আর দূরে আলো চোখে পড়ল৷ লোকেরা বলল, ‘ওই আসছে৷’
আমি ভালো করে দেখে বললাম, ‘ওটা লন্ঠনের আলো নয়, ধুনির আলো বলে মনে হচ্ছে৷’
তখন তো সকলে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল, ‘হতভাগারা আগুন পোয়াচ্ছে!’
ক্রমে সেটার আরও কাছে পৌঁছলাম, বেশ বুঝতে পারলাম যে একটা গাছ কিংবা বাঁশঝাড়ের গোড়া জ্বলছে আর দুটো লোক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ ক্রমে আরও কাছে গেলাম, আর একবার জল পার হলেই তাদের কাছে পৌঁছব৷
আগে-আগে দু-জন খালাসি হরিণ ঘাড়ে করে চলেছে, তাদের পিছনে আমি আর সার্ভেয়ার পাশাপাশি, আমাদের পিছনে বন্দুকওয়ালা, তার পিছনে অন্য লোকরা৷ আমাদের ডান দিকে জল, বাঁদিকে তিন-সাড়ে-তিন ফুট আন্দাজ উঁচু বালির পাড়, তার উপর সাত-আট ফুট পরিষ্কার বালি, তারপর কষায় আর শরবন৷ ওই বালির উপর একটা গাছের গোড়া বা পোড়াকাঠ পড়ে আছে৷ হরিণওয়ালা খালাসি দু-জন যখন ওই কাঠটার পাশ দিয়ে চলে গেল আমার মনে হল যেন কাঠটা একটু নড়ল৷
‘কাঠ নড়ল কী রকম?’ এই প্রশ্ন মনে ওঠা মাত্র আমি জোরে হাঁকলাম— ‘হ্যাইও৷’
আর চাই কি? ‘ফ্যাশ’ বলে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে উঠে দাঁড়াল এই বড়ো এক বাঘ!
আমি আর ইন্দ্রসিং দাঁড়ালাম, হরিণওয়ালারাও ‘বাঘ! বাঘ!’ বলে দাঁড়াল, কিন্তু হতভাগা বন্দুকওয়ালা ‘বাপরে! বাঘুয়া!’ বলে তিন লাফে পিছনের লোকদের ঘাড়ে গিয়ে পড়ল! আমাদের হাতে লাঠি ছাড়া আর কিছু নেই, বাঘটা কিন্তু দুবার গলা শানিয়েই শরবনে ঢুকে পড়ল৷ হাতের ছড়ি দিয়ে ছুঁতে পারতাম এত কাছে ছিল৷
একেই বলে ‘রাখে হরি মারে কে?’
আগুনের সামনে যে লোক দু-জন ছিল তারা এতক্ষণ চেঁচিয়ে আকাশ ফাটাচ্ছিল৷ আমরা জল পার হয়ে ওপারে গেলাম৷ তখন ওই খালাসি দু-জন বলতে লাগল, ‘হুজুর, এই হতভাগাই তো দুঘণ্টার উপর আমাদের আগলে রেখেছে৷ না এগোতে পারি, না তাঁবুতে ফিরে যেতে পারি৷ আমরা বেগতিক দেখে লন্ঠনের কেরাসিন ঢেলে এই বাঁশঝাড়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছি৷ আর ওই হতভাগা ওইখানে বসে পাহারা দিয়েছে, আগুনটা নিভলেই আমাদের ধরে খেত৷ আমরা যখন এখানে এসেছি, তখন ওটা এখানে জল খাচ্ছিল৷ আমাদের দেখে উঠে দাঁড়িয়েছে৷ আমরা ভয়ে তাঁবুমুখো হয়েছিলাম আর দৌড়ে ওটা জল পার হয়ে সামনে পথ আগলে দাঁড়িয়েছে৷ হুজুর এখন না এলে ঠিক আমাদের খেত, আগুন আর পনেরো-কুড়ি মিনিট পরেই নিভে যেত৷’
সত্যি কথা৷ আগুনটা তখন নিভু-নিভু হয়ে আসছিল৷ ভগবানকে ধন্যবাদ দিয়ে আমরা তাঁবুতে পৌঁছলাম৷
এইজনই বলেছিলাম যে কোথাও বা শিকার মেলে— কিন্তু তখন একেবারে খালি হাত, নিরস্ত্র অবস্থা৷
পরের দিন সকালবেলা আমরা ওই রাস্তায় বাকি কাজটুকু শেষ করতে গিয়েছিলাম৷ যাবার সময় রাত্রের জানোয়ারটা কত বড়ো ছিল তা দেখতে পেলাম৷ যে জায়গায় জল খেয়েছিল আর যে জায়গায় হামা দিয়ে বসে ওই লোক দুটিকে পাহারা দিয়েছিল, দু জায়গাতেই পায়ের দাগ দেখলাম৷ আঙুল সুদ্ধ আমার পাঞ্জার প্রায় সমান এক-একটা! বেশ বড়ো বাঘ ছিল৷
দু-দিন ওই জায়গায় ছিলাম, তারপর ফিরবার পালা, পথ ওই নদী-নদী, যে জায়গায় প্রথম দিন হাতি বের হয়েছিল সেই পর্যন্ত৷ তারপর সার্ভেয়ারের কাটা লাইন ধরে-ধরে রিজার্ভ ফরেস্ট-এর সীমানা পর্যন্ত; সীমানার উপর বারো ফুট চাওড়া লাইন কাটা, ওই লাইন ধরে নীচুগারদ হয়ে ডিমাপুর যাব৷ নিচুগারদ থেকে ডিমাপুর পর্যন্ত পাকা রাস্তা৷
একটু ভোরে বের হয়েছি, যদি কোনো শিকার মেলে৷ আমার সঙ্গে ফুদনা নামে এক খালাসি৷ সাঁওতাল, বেশ হুঁশিয়ার লোক আর জঙ্গলে তার দৃষ্টিশক্তি বেশ সাফ৷ অনেকবার দেখেছি ঝোপের মধ্যে হরিণ বা শুয়োর নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আমার চোখে পড়ল না, কিন্তু ফুদনা ঠিক ধরেছে৷ সে তার দেশে— হাজরিবাগের জঙ্গলে, শিকার করে থাকে আর তার সাহসও যথেষ্ট আছে, অনেকবার তার প্রমাণও পেয়েছি৷
নদী-নদী চলেছি, যে জায়গায় প্রথম দিন বাঘ দেখেছিলাম, সে জায়গাটা পার হয়ে প্রায় এক-দু মাইল পথ চলে গেছি৷ একটু-একটু রোদ উঠেছে, চারদিক তাকিয়ে দেখি আবার পথ চলি৷ সামনে বালির উপর একটা শুকনো গাছের ডাল পড়ে আছে, হলদে রঙের শুকনো পাতা তার, চার-পাঁচ ফুট দূরেই জঙ্গল৷ দু-চারবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে আবার ওই শুকনো পাতা কটির দিকে চোখ গিয়েছে, ওরে বাবা, ওটা যে বাঘের বাচচা! আমাদের দিকে তার পিঠ, কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে রোদ পোয়াচ্ছে৷
আমরা দাঁড়ালাম, বন্দুকটা ফুদনার ঘাড়ে, পিছন দিকে হাত বাড়িয়ে ফিসফিস করে বললাম, ‘বন্দুক৷’ ওই যে ফিসফিস করে কথা বলেছি, ওইটি তার কানে গিয়েছে৷ বাচচাটা তড়াক করে লাফিয়ে উঠে এক নজরে আমাদের দেখে নিয়ে সঙ্গে-সঙ্গে লাফ দিয়ে জঙ্গলে পড়ল৷ ‘মারো, মারো’ বলে ফুদনা আমার হাতে বন্দুক দিল বটে, কিন্তু মারবার সময় আর মিলল না৷ বন্দুক হাতে করে ধীরে-ধীরে এগোলাম, এক-এক পা ফেলি আর পাতা পরীক্ষা করে দেখি কোথাও তার মা বসে আছে কিনা৷ কিছুই দেখতে পেলাম না৷
জানোয়ার দেখলাম না বটে, কিন্তু পাঁচ-ছয় কদম সামনে গিয়েই পায়ের দাগ পেলাম৷ মা আর বাচচার দুজনের পায়ের দাগ পাশাপাশি, জল খেয়ে উঠে এসেছে৷ বাচচাটা যখন ওই জায়গায় শুয়ে রোদ পোয়াচ্ছিল তখন তার মাও নিশ্চয়ই কাছেই কোথাও বসে আমাদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিল৷ গুলি চালালে আর রক্ষা ছিল না৷ বাচচার শোকে আমাদের আর পিছনের খালাসিদের সকলকে মুলোর মতো চিবিয়ে খেত৷ সৌভাগ্যের বিষয় হাতে বন্দুক ছিল না, হাতে বন্দুক থাকলে হয়তো বা বাচচাটাকে মেরে ফেলতাম৷ বাচচাটা একটা কুকুরের সমান উঁচু ছিল৷
সে জায়গা ছেড়ে চললাম৷ অন্য খালাসিরা এসে জুটেছিল, তাদের দশ-বারো মিনিট সেই জায়গায় অপেক্ষা করতে বলে আমরা এগিয়ে চললাম৷ ক্রমে নদী ছেড়ে সার্ভেয়ারের কাটা লাইন ধরে জঙ্গলে প্রবেশ করলাম৷ অনেক জানোয়ারের পাঞ্জা দেখতে পাচ্ছিলাম, হরিণ, শুয়োর জল খেয়ে গেছে, তাদের পায়ের দাগ আছে৷
বন্দুক ঘাড়ে ধীরে-ধীরে চলতে লাগলাম, বেলা প্রায় সাড়ে-আটটা৷ শুনতে পেলাম একটু সামনে শুকনো পাতার উপর খুব খড়খড় শব্দ হচ্ছে৷ ‘কেয়া হ্যায় রে?’
ফুদনা বলল, ‘হুজুর, টেঙ্গা হোগা৷’
টেঙ্গা এক ধরনের পাখি, শালিখের মতো বড়ো, খয়েরি রঙ, বুক আর মাথার উপরদিকটা সাদাপানা, কুড়ি-বাইশটা একসঙ্গে থাকে, জঙ্গলে কোনো জানোয়ার দেখলে এরা সাধারণত বড়োই চ্চোমেচি করে সকলকে সাবধান করে দেয়৷ বললাম, ‘টেঙ্গা হ্যায় তো জমিন পর কেয়া করতা হ্যায়?’
‘শুখা পাত্তি পর লোটতা-পোটতা৷’
আমার মন ওই কৈফিয়তে প্রবোধ মানল না, টেঙ্গা মাটির উপর অমন লুটোপুটি খাবে কেন? বন্দুক ভরে এগোলাম কিন্তু খুব সাবধানে, একেবারে যেন হাঁটি-হাঁটি পা-পা! ক্রমে যে জায়গায় শব্দ হচ্ছিল সেই জায়গায় এলাম৷ আট-দশটা টেঙ্গা বসে আছে, কিন্তু গাছে, আর আমাদের দেখে কিচির-মিচির করতে লাগল৷
ফুদনা হেসে বলল, ‘ওই দেখো হুজুর৷’
বললাম, ‘তা বটে, কিন্তু কী দেখে তখন অমন করছিল?’
কোথাও কিছু নেই, আরও পাঁচ-সাত কদম আগে গেলাম, ‘ট্যাং’ শব্দ করে একটা প্রকাণ্ড হরিণী আমাদের সামনে দিয়ে দৌড়ে লাইন পার হয়ে গেল৷ টেঙ্গাগুলি আবার চেঁচামেচি করে উঠল৷
ফুদনা বলল, ‘ইসিকো দেখা থা হুজুর৷’
আমার বিশ্বাস হল না, শুধু এই? তবে মাটিতে হড়বড় কেন? আর কিছু দূর এগোলাম, কিছুই নেই৷ বন্দুকটা বড়ো ভারী, প্রায় আট পাউন্ড৷ কার্তুজ খুলে ব্যাগে রেখে, বন্দুকটা ফুদনার ঘাড়ে চাপালাম৷ লাঠি হাতে নিয়ে চলতে লাগলাম, কিন্তু তেমনি আস্তে-আস্তে পা টিপে৷ লাইনটা আঁকাবাঁকা, সামনেই মোড়, হঠাৎ মনে হল মোড়ের পাশে ঝোপের মধ্যে একটা কী নড়ল— চার-পাঁচ কদম দূরে হবে৷ দুজনেই দাঁড়িয়ে এক মনে দেখলাম, কিন্তু কিছুই চোখে পড়ল না; হয়তো কোনো ছোটো পাখি ছিল, এক ডাল থেকে আরেক ডালে লাফিয়ে গেল৷
আরও দু-চার পা চলে মোড়ের উপর এলাম, আর আকাশ-পাতাল ফাটিয়ে গর্জন করে, যেন একেবারে আমার পায়ের নীচে থেকে, প্রকাণ্ড বাঘ পিছনের দু পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল, সঙ্গে-সঙ্গে উল্টে সাত-আট ফুট দূরে লাফিয়ে পড়ল— ঠিক যেন ডিগবাজি খেল৷ আবার সেই ভীষণ গর্জন— আবার একলাফ, আবার গর্জন আবার লাফ৷ তিন লাফে প্রায় কুড়ি-পঁচিশ ফুট চলে গেল আর সেইখানে দাঁড়িয়ে কী ভীষণ গর্জন!
আমি তো প্রথম গর্জন আর লাফের পরেই পিছনে হাত বাড়িয়ে ‘বন্দুক, বন্দুক’ বলে ডাকছি কিন্তু বন্দুক আর দেয় না৷
মুখ ফিরিয়ে দেখলাম বন্দুক দেবার শক্তি ফুদনার নেই৷ তার চোখ কপালে উঠেছে, হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে গেছে, সে ঠকঠক করে কাঁপছে৷ এক পা পিছনে হটে গিয়ে তার হাত থেকে বন্দুক নিলাম, বললাম, ‘ছররা দে৷’ বেচারা এমন ঘাবড়ে গিয়েছে যে কার্তুজের ব্যাগটা আর খুলতে পারে না৷ আমিই তাড়াতাড়ি এক মুঠা কার্তুজ বের করে নিলাম৷
তখনও বাঘের গর্জনে বন-জঙ্গল কাঁপছে, বন্দুকে ছিটা ভরে সেই বাঘের দিকে মুখ করে দুটো ফায়ার করলাম, বাঘটা আরও দুটো লাফ দিয়ে আবার গর্জে উঠল৷ আমি আরও দুবার বন্দুকের আওয়াজ করলাম৷ তখন মনে হল যেন বাঘটা দৌড়ে পালিয়ে গেল, গর্জন থেমে গেল৷ আমি কিন্তু আরও দুবার ফায়ার করলাম৷
লিখতে যত সময় লাগল তার সিকি ভাগের মধ্যে অত সব কাণ্ড হয়ে গেল৷ বাঘের গর্জন থেমে গেলে পর চারদিক তাকিয়ে দেখতে লাগলাম, ব্যাপার কী, বাঘটা ওখানে শুয়ে কী করছিল? ফুদনা ততক্ষণে প্রকৃতিস্থ হয়েছে, তার চোখে পড়ল আগে— ‘হুজুর, ওই দেখো৷’ তাকিয়ে দেখলাম, আমার চার-পাঁচ ফুট সামনে প্রকাণ্ড এক সম্বরের মৃতদেহ পড়ে আছে, আশেপাশে আট-দশ ফুট জমি যেন একেবারে চষে ফেলেছে৷ সম্বরটার ঘাড় ভেঙে ফেলেছে, তার মুখ উপরদিকে আর সিং মাটিতে, গলায় চারটে ফুটো, আর তার থেকে রক্ত ঝরছে৷ পিছনের এক পায়ের হাঁটু ভাঙা, একখানা চোঙ্গা হাড় বেরিয়ে পড়েছে, সেটা একটা ছোটো গাছের সঙ্গে জড়ানো রয়েছে— ঠিক যেন ইচ্ছা করে বেঁধে রেখেছে৷ পিছনের রাঙের প্রায় দু সের মাংস উড়ে গেছে, সামনের একটা রাং থেকে প্রায় তিন পোয়া মাংস নেই৷ এইবার বুঝতে পারলাম যে এই দুয়ের লড়াইয়ের হড়বড়ি আমরা শুনতে পেয়েছিলাম৷ বাঘটা প্রথম যখন লাফিয়ে উঠেছিল, তখন ইচ্ছা করলে হাতের লাঠি দিয়ে তাকে ছুঁতে পারতাম৷
পাঁচ-সাতটা বন্দুকের আওয়াজ শুনে পিছনের খালাসিরা ধরে নিয়েছে যে বড়ো জবর শিকার পড়েছে, আর আধ মাইল দূর থেকে হল্লা করতে করতে এসে হাজির হয়েছে৷ পৌঁছে সব দেখে-শুনে তাদের চক্ষুস্থির৷ ফুদনাকে চেপে ধরল, ‘তুম ডর গিয়া থা?’
আমার টিন্ডেল শীতল লাফিয়ে উঠে বলল, ‘ওরা নিয়ে এলে আমরা চাঁদা তুলে আরও দশ টাকা দেব৷’
তখন সবাই মিলে তাদের বলতে লাগল, ‘যা-না দেখি, কেমন মুরদ৷’
রির্জাভ ফরেস্ট-এর সীমানার উপর বারো ফুট চওড়া লাইন, জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে রাখা হয়, তাতে ঘাস গজায়৷ ওই পরিষ্কার করা লাইনের উপর সকাল সন্ধ্যায় অনেক শিকার পাওয়া যায়— মোরগ, হরিণ তো প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায়৷
একদিন ভোরে আমি আর ফুদনা এমনি এক ফরেস্ট-এর সীমানা ধরে চলেছি৷ অন্য লোকেরা হাতির পিঠে মালপত্র বোঝাই করে আসছে৷ বেজায় কুয়াশায় চারদিক ঘেরা, দশ-পনরো ফুট দূরেও ভালো করে কিছুই দেখা যায় না৷ বন্দুকে দু-নম্বর ছিটা আর বাকশট ভরে নিয়েছি, মোরগ বা ছোটো হরিণ যা মিলবে মারব৷
হঠাৎ মনে হল যেন একটা ছোটো হরিণ (বার্কিং ডিয়ার) আমাদের বাঁদিক থেকে এসে, বারো-চোদ্দো ফুট সামনে লাইনটা পার হয়ে ডানদিকের জঙ্গলে ঢুকল৷ লালচে জানোয়ার চোখে পড়ল কিন্তু কুয়াশার জন্য আর কিছু ভালো করে দেখা গেল না৷ লাইনটার ডানদিকে আট-দশ ফুট দূরে একটু পরিষ্কার জায়গা ছিল— সেখানটায় বড়ো গাছই বেশি৷ ওই জায়গাটুকুতে বের হলেই মারব মনে করে, বন্দুক তুলে তৈরি হয়ে দাঁড়ালাম৷ এবার বের হলেই ঘোড়া টিপে দেব৷
বের হল বটে, কিন্তু এই বড়ো বাঘ! ফুদনা আমার কানে-কানে বলেছে ‘বাঘুয়া’— ওইটুকু তার কানে গেছে, আর তার ঘাড়ের লোম দাঁড়িয়ে উঠল, একবার মুখ ফিরে আমাদের দেখল, তারপর যেমন চলছিল সেই তালেই চলে গেল, একটুও ব্যস্ত হল না৷ ঠিক যেন আমাদের সাবধান করে গেল— খবরদার, বুঝে-শুনে কাজ কোরো৷
এই নাম্বরে কাজ করবার সময় এক জায়গায় একটা মরা হাতি দেখতে পাওয়া গিয়েছিল, দুটো বাঘ ওই হাতির মাংস খাচ্ছিল৷ কী করে হাতিটা মরল তা স্পষ্ট বুঝতে পারা গেল না৷ বাঘে মেরেছে বলে মনে হল না, কেননা হাতিটা প্রায় পূর্ণ বয়স্ক৷ অত বড়ো হাতি বাঘে মারতে পারবে না৷
বেতের মধ্যে হাতির রাস্তা, ওই রাস্তা ছাড়া যাবার পথ নেই, ঝড়ে একটা প্রকাণ্ড গাছ উপড়িয়ে ওই রাস্তার উপর ফেলেছে, রাস্তার উপর গাছের মূল কাণ্ডটা প্রায় চার-পাঁচ ফুট উঁচু হয়ে আছে৷ হাতিটার সামনের দু-পা গাছটার এক পাশে আর পিছনের দু-পা গাছের অন্য পাশে, গাছের কাণ্ডটা তার পেটের নীচে৷ দেখে শুনে মনে হল বোধহয় হাতিটা ওই গাছ ডিঙিয়ে যাবার চেষ্টায় ছিল৷ সামনের পা পার করে আটকিয়ে গিয়েছিল, পিছনের পা দুটি আর পার করতে পারেনি, ফিরেও আসতে পারেনি৷ কদিন না জানি ওই অবস্থায় থেকে তবে তার প্রাণ বের হয়েছিল৷
বাঘ দুটো সম্ভবত ওই রকম বেকায়দায় তাকে পেয়েছিল আর মরবার পর বা মরমর অবস্থায়ই খেতে আরম্ভ করেছিল৷ পেটের দিকটা খাচ্ছিল৷ কাজ করতে-করতে আমাদের লোকরা সেখানে গিয়ে উপস্থিত, তাদের দেখে বাঘ দুটো পালিয়ে গেল৷ তারপর আরও দু-তিনবার তারা ওই রাস্তা দিয়ে গিয়েছে আর প্রত্যেকবারই বাঘ দুটোকে দেখতে পেয়েছে— আহারে ব্যস্ত! কী গন্ধ যে হয়েছিল ততদিনে তা বুঝতেই পারছ৷
এই যে ঘোর নাম্বর জঙ্গল, জানোয়ার কিলবিল করছে, আমাদের লোক চারমাস এই জঙ্গলে কাজ করেছে৷ কতদিন কত বিপদে পড়েছে, ম্যালোরিয়ায় ভুগেছে, দু-তিনজন ব্যারামে ভুগে প্রাণও হারিয়েছে, কিন্তু ভগবানের কৃপায় কেউই জানোয়ারের হাতে প্রাণ দেয়নি৷
দু-তিনবার সার্ভেয়াররা খবর পাঠিয়েছে, ‘কাজ করা যাচ্ছে না৷ খালাসিরা ভয়ে কাজে বের হতে চায় না, পালাবার জোগাড়ে আছে৷ রোজ তাঁবুতে বাঘ এসে হল্লা করে, শিগগির একটা কিছু ব্যবস্থা করো৷’
কারো তাঁবুতে শিকারি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, সে বন্দুক ঘাড়ে করে সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরে কাজ করিয়েছে৷ আবার কোনো জায়গায় বা দু-জন সার্ভেয়ারকে এক কাজে নিয়োগ করতে হয়েছে, প্রত্যেকের সঙ্গে দশ-বারোজন লোক৷ তারা এক জায়গায় তাঁবু রাখে, একসঙ্গে কাজে বের হয়৷ বাঘের সাড়া পেলেই দুড়ুম-দাড়ুম বন্দুক ছুড়ে বাঘ তাড়ায় আর কাজ করে৷
এক জায়গায় তো মহা মুশকিল হল৷ খানিকটা জমিতে আর কোনো রকমেই জরিপ করা যায় না, সার্ভেয়ারের লোকের আওয়াজ পেলেই হাঁউ-হাঁউ করে বাঘ ছুটে আসে৷ দু-জন বাহাদুর লোককে সে জায়গাটুকু জরিপ করার জন্য পাঠানো হয়েছিল— একজান পাঠান, আগে পল্টনে ছিল; আরেকজন মাদ্রাজি মুসলমান, তার চার পুরুষ পল্টনে কাজ করেছে৷ দু-জন চার-পাঁচদিন একসঙ্গে কাজ করল৷ একজন কাজ করে আর অন্যজন বন্দুক ছুড়ে বাঘ তাড়ায়৷
এই মাদ্রাজি সার্ভেয়ারটি একদিন বড়ো বিপদে পড়েছিল৷ কাজ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল, সঙ্গে-সঙ্গে আকাশ কালো হয়ে মেঘ উঠল৷ ঘন-ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে আরম্ভ করল আর বাজ পড়তে লাগল৷ সার্ভেয়ার কাজ বন্ধ করে খালাসিদের তাড়া দিল, ‘জলদি চলো, তুফান আতা হ্যায়, জঙ্গলমে রাস্তা ভুল যাওগে৷’
তাড়া দিয়েই সার্ভেয়ার রওয়ানা হয়ে গেল৷ বলে গেল আগুনের লাইন ধরে প্রায় এক মাইল যাবে তারপর সেই হাতির রাস্তা ধরে আড্ডায়৷ হাতির রাস্তা অনেক আছে কিন্তু একটা তাদের বিশেষ পরিচিত৷ সেটাকে তারা পরিষ্কার করে নিয়েছে, সর্বদা ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়া-আসা করে৷ আগুনের লাইন থেকে তাঁবু সিকি মাইল৷
সার্ভেয়ার তো চলে গেল, খালাসি বেচারাদের জিনিসপত্র বেঁধে নিয়ে যেতে চার-পাঁচ মিনিট দেরি হল৷ ‘এই ঝড় এল, এই ঝড় এল’— ভয়ে ছুটতে-ছুটতে তারা তাঁবুতে এল৷
‘বাবু কোথায়?’
আড্ডার লোকরা বলল, ‘বাবু তো আসেনি৷’
‘বাবু আসেনি? বাবু তো আমাদের আগে চলে এসেছে৷’
ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে আর তুমুল ঝড়-বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে৷ কত চিৎকার করে ডাকাডাকি করল, কিন্তু কোনো সাড়া পেল না৷
এদিকে সার্ভেয়ার তো লম্বা-লম্বা পা ফেলে চলেছে, যদি ঝড় আরম্ভ হবার আগে তাঁবুতে পৌঁছতে পারে৷ একটু অন্যমনস্ক হয়ে চলছে আর পথ ভুলে অন্য এক হাতির রাস্তা ধরে চলে গেছে৷ হঠাৎ কড়-কড়-কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ল আর চারদিক ঝলসিয়ে বিদ্যুৎ চমকাল, তখন তার চৈতন্য হল৷ ‘এ কোথায় এলাম? এ রাস্তা তো নয়! আগুনের লাইন থেকে তাঁবু মাত্র সিকি মাইল— এ তো অনেক দূর এসেছি’ ইত্যাদি ভাবতে-ভাবতে ফিরতে আরম্ভ করল৷ ততক্ষণে তুমুল ঝড় আর মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করে দিয়েছে৷ পথ চোখে দেখা যায় না, বুঝতেই পারছে না কোনদিকে যাচ্ছে৷
তখন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে লাগল, কী কর্তব্য৷ স্থির করল যে কোথাও বসে রাত কাটানোই যুক্তিসংগত, নয়তো এই অন্ধকারে ঝড়-বৃষ্টিতে প্রাণ হারাতে পারে, আর এতে খেয়াল হল যে ওই হাতির রাস্তার উপর বসে থাকা সমীচীন নয়, যত জানোয়ার এই পথ দিয়েই যাতায়াত করে৷ সার্ভেয়ারের হাতে একখানা ছোটো তলোয়ার ছিল, সে তা দিয়ে গাছে দাগ কাটতে আরম্ভ করল, আর ওই হাতির রাস্তা ছেড়ে কুড়ি-পঁচিশ ফুট জঙ্গলে ঢুকে একটা উইঢিপি পেল, তার উপরে একটা বড়ো গাছ৷ ওই গাছে পিঠ দিয়ে উইঢিপির উপর বসল, ওইখানেই রাত কাটাবে৷ তলোয়ারখানা সামনের দিকে বাগিয়ে ধরে রইল যদি কোনো জানোয়ার আসে, পিছনে প্রকাণ্ড গাছটার আড়াল৷
সমস্ত রাত যে তার কী ভাবে কেটেছিল তা বুঝতেই পার৷ ভিজে একেবারে চুপচুপে হয়ে গেছে, জোঁকও যে কত ধরেছে, তা বলা যায় না৷ এক-একবার পাশে ঝোপ-জঙ্গলে একটা কিছুর শব্দ হওয়া মাত্র তার মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠছে, ঘুটঘুটে অন্ধকার, চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না৷ সৌভাগ্যের বিষয় ঝড়-বৃষ্টি সমস্ত রাতই ছিল, ঝড়ের দাপটে জানোয়ার বড়ো একটা বের হয়নি, সকলেই নিজেদের আস্তানায় আশ্রয় নিয়েছিল৷
ভোর হলে বেচারা আধমরা অবস্থায় উঠে রাস্তায় এসে ফিরে চলল, অর্ধেক রাস্তা যেতে-না-যেতে তার লোকজনদের সঙ্গে দেখা হল তারা তাকে খুঁজতে বেরিয়েছে৷ বাবুকে দেখে লোকগুলির ধড়ে প্রাণ এল, তারা তার আশা ছেড়ে দিয়েছিল, বাবু হয়তো বা গাছ চাপা পড়েছে, নয়তো তাকে বাঘে খেয়েছে৷
• ১৭ • (১৯১৬-১৯১৮ (আসাম: ডিব্রুগড়: নাগা হিলস) তোমরা অনেকেই চিড়িয়াখানায় উল্লুক দেখেছ৷ আমি আসামের জঙ্গলে অসংখ্য উল্লুক দেখেছি, কতবার নিঃশব্দে গাছের নীচে দাঁড়িয়ে তাদের কাণ্ডকারখানা লক্ষ্য করেছি৷ তাদের মজার সব কাজ দেখে আমার ভারি আমোদ হত৷ গাছের উপর উল্লুক এক জীব, আর মাটিতে একেবারে অন্য জানোয়ার, মাটিতে অমন আনাড়ি জানোয়ার বোধহয় নেই৷ যখন আপন মনে থাকে, দু হাত বাঁকিয়ে উপর দিকে তুলে, হেলে-দুলে এমন মজা করে চলে যে হাসি রাখা যায় না৷ তখন দেখতে পেলে তোমরা বলবে, ‘কী আনাড়ি অকর্মা জানোয়ার হাঁটতেও পারে না৷’
আবার ওই জানোয়ারটিকে গাছের উপরে দেখো, সে এক অদ্ভুত ব্যাপার! দলে-দলে গাছে বসে চিৎকার করতে থাকে, পালের গোদা উপরে বসে হাঁকে— ‘হুঁ-কু’, আর অমনি নীচের ডাল থেকে কুড়ি-পঁচিশটা জোয়ান একসঙ্গে সুর ভাঁজে, ‘হুঁকু, হু-উ-ক৷’ থামতে-না-থামতে সর্দারমশায় আবার হাঁকলেন, ‘হুঁ-কু’— অমনি আবার সুর উঠল ‘হুঁকু, হুঁকু, হুঁ-উ-কু’, মিনিটের পর মিনিট ওই রকম চলবে৷
একটু শব্দ করো বা গাছপালা কিছু নাড়ো, আর অমনি এ-গাছ থেকে ও-গাছ, ও-গাছ থেকে সে-গাছ এমনি করে লাফিয়ে দু-তিন মিনিটের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল৷ আর সে কী লাফ! কুড়ি-পঁচিশ-ত্রিশ ফুট অম্লানবদনে পার হয়ে যায়৷ পঁচিশ-ত্রিশ ফুট উপর থেকে লাফিয়ে ঝপাং করে ঢালুর নীচের গাছে পড়বে, হাত-পায়ের যা সামনে পাবে একটা-না-একটা ডাল ধরে দোল খাবে আর ওই দোলের সঙ্গে-সঙ্গে লাফিয়ে আরও পঁচিশ-ত্রিশ ফুট নীচে অন্য গাছে, আবার অন্য গাছে৷ দেখতে-না-দেখতে কোথায় চলে গেল৷ বন নিস্তব্ধ হয়ে গেল৷
লুশাই পাহাড়ে কাজ করবার সময় এর একটা বাচচা খুঁজেছিলাম৷ একটা বাচচা এনে দিতে পারলে গ্রামের লোকদের দশ টাকা বকশিশ দিতে প্রতিশ্রুত হয়েছিলাম৷ লুশাইরা বলেছিল, ‘মাকে মেরে বাচচা ধরে দিতে পারি৷’ আমি অবশ্য রাজি হয়নি৷ পোষা জন্তু হিসেবে ওরা ভারি মজার হয়৷
বাচচার কথায় মনে পড়ল৷ একদিন কাজ করে তাঁবুতে ফিরে হাত-পা ধুয়ে চা খেতে বসেছি, শুনতে পেলাম যেন কেউ কাঁদছে৷ টিন্ডেলকে ডেকে জিগগেস করলাম, ‘কে কাঁদছে?’ আমার সন্দেহ হয়েছিল বুঝি বা আমার লোকেরা গ্রামের লোকদের উপর কোনোরকম অত্যাচার করেছে৷
টিন্ডেল বলল, ‘হুজুর, হল্লুমান রোতা হ্যায়৷’
‘হনুমান কাঁদছে, মানে?’
তখন শুনলাম হাতির মাহুতরা একটা হনুমানের বাচচা জঙ্গল থেকে ধরে এনেছে, তার মা বেচারা গাছে-গাছে লাফিয়ে, জঙ্গল থেকে তাদের পিছনে-পিছনে তাঁবু পর্যন্ত এসেছে আর সেই চারটে থেকে গাছে বসে কাঁদছে৷ পরে তার বাবাও এসেছে৷
তাঁবু গ্রাম থেকে একটু দূরে জঙ্গলের কিনারায়৷ তাঁবুতে আমার চাপরাশি রামাবতার ছিল, অযোধ্যার ব্রাহ্মণ, তাকে ডেকে জিগগেস করলাম, ‘তুমি হিন্দু, ব্রাহ্মণ, আর তোমার সামনে হনুমানের বাচচা ধরে এনেছে, আর তুমি কিছু বললে না?’
‘হুজুর, এই মাহুতরা জানোয়ার, আমার কথা শোনে না, কত বলেছি, কিছুতেই ছাড়ে না, বলে বহুৎ জঙ্গল থেকে ধরে এনেছে৷’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা, আমি হুকুম দিচ্ছি তুমি গিয়ে বাচচাটাকে ওই গাছের ডালে বসিয়ে দিয়ে এসো৷ দেখো তো ওর মা কেমন করে কাঁদছে! আমার দুঃখ হচ্ছে, আর তুমি রামের দেশের লোক, তোমার দরদ হচ্ছে না?’
হুকুম পেয়ে বুড়োর গোঁফ ফুলে উঠল, সে তৎক্ষণাৎ ছুটে গিয়ে মাহুতদের ডেরা থেকে ছানাটিকে নিয়ে এল, আর তাকে ওই গাছের নীচের ডালের উপর বসিয়ে চলে এল৷
তার মা উপরের ডালে বসে-বসে রামাবতারের কাজ লক্ষ্য করছিল, তার কান্না থেমে গিয়েছিল৷ বাচচাটিকে গাছের ডালে বসিয়ে দিয়ে চাপরাশি চলে এলে পর তার মা ধীরে-ধীরে নামতে আরম্ভ করল, দু-চার পা নামে আবার চারদিকে তাকিয়ে দেখে নেয়৷ শেষে যখন বাচচাটার কাছে পৌঁছল, প্রথম তাকে ভালো করে শুঁকে দেখল, তারপর তাকে বুকে তুলে নিল আর তড়াক-তড়াক করে লাফিয়ে উপরে উঠে গেল৷ সেখানে মা-বাবা দুজনে কত রকমে যে বাচচাটাকে আদর করল তার আর কী বলব! তারপর তাকে নিয়ে তারা লাফাতে-লাফাতে গভীর বনে চলে গেল৷
এ-বছর আমাকে নাগা পাহাড়ে যেতে হয়েছিল৷ যে জায়গায় আমার কাজ ছিল সেটা নাগা হিলস জেলার বাইরে, জংলি নাগাদের এলাকায়৷ সঙ্গে সিপাই-সান্ত্রী না নিয়ে এ এলাকায় প্রবেশ করবার হুকুম নেই৷ সাদিয়া থেকে দশজন সিপাই আমাদের সঙ্গে গিয়েছিল৷ আমরা মার্গারিটা থেকে নৌকোয় চড়ে বুড়িডিহিং নদী দিয়ে ওই নাগা সীমানা পর্যন্ত গিয়েছিলাম৷ বুড়িডিহিং নদী আর অন্য একটি নদীর দোমোহনায় তাঁবু ফেলা হয়েছিল৷ সাত-আটজন সিপাই সঙ্গে নিয়ে খালাসিরা পাঁচ-ছয়দিন আগেই চলে গিয়েছিল— জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করবার জন্য৷ আমরা চারদিন পরে এসে দোমোহনায় তাঁবু ফেলেছিলাম৷ প্রথম যেদিন সে জায়গায় পৌঁছলাম সেদিন রাত্রে বড়ো তামাশা হয়েছিল৷
ওই দোমোহনার অপর পারে ডিহিং রিজার্ভ ফরেস্ট৷ দু বছর আগে আমাদের আপিসের মিস্টার নি- ওই রিজার্ভ ফরেস্ট-এ কাজ করেছিলেন৷ তিনি আমাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন যে ওই রিজার্ভ ফরেস্ট-এ দুটো পাগলা হাতি আছে, মাফুন-এর ডেপুটি রেঞ্জারও বারবার সে কথা বলে দিয়েছিলেন৷
আমার সঙ্গে মিস্টার বা- নামে একজন নতুন অফিসার দূরবিনের কাজ শিখতে গিয়েছিলেন৷ যাতায়াতের কষ্ট, নৌকো ছোটো, সেজন্য আমরা একটিমাত্র তাঁবু নিয়ে গিয়েছি, দু-জনে একই তাঁবুতে থাকব৷ দু-পাশে দুখানা খাটিয়া, মাঝখানে একটি ছোটো টেবিল— লেখাপড়া, খাওয়া-দাওয়া সব ওই টেবিলেই সারতে হয়৷
পাগলা হাতির ভয়, রাত্রে বড়ো ধুনি জ্বালাবার বন্দোবস্ত করেছি, আর খালাসিদের ভালো করে পাহারা দেবার জন্য হুকুম দিয়েছি, যেন ধুনি নিভে না যায়৷ বুনো জানোয়ার আগুনকে বড়োই ভয় পায়৷
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে শুয়েছি৷ টেবিলটার উপর দু-জনের দুটো বন্দুক আর বালিশের নীচে কার্তুজ রেখেছি৷ সমস্ত দিনের পরিশ্রমের পর শোয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়েছি৷
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি তা বলতে পারি না, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল৷ মনে হচ্ছিল যেন একটা বড়ো জানোয়ার নড়ছে৷ কান পেতে শুনতে লাগলাম, স্পষ্ট বুঝতে পারলাম একটা খুব বড়ো জানোয়ার ধীরে-ধীরে তাঁবুর দিকে আসছে৷ খসখস আওয়াজ মাঝে-মাঝে কানে আসছিল৷
খেতে বসে মিস্টার বা- বলেছিলেন যদি রাত্রে হাতি বা অন্য কোনো জানোয়ার আসে তাহলে তাঁকে যেন ডেকে তোলা হয়৷ আমি আস্তে-আস্তে বললাম, ‘বা- হাতি এসেছে, ওঠো৷’
‘কোথায় হাতি?’
‘ওই শোনো খসখস শব্দ—’
সে জায়গায় চারদিকে জঙ্গল, গাছের ডালপালার সঙ্গে জানোয়ারের শরীরের ঘষা লাগার শব্দ ওটা৷
মিস্টার বা- আর ওঠবার নাম করেন না, শুধু বলেন, ‘না, না, আপনি ভুল শুনেছেন, আমি তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না৷’
এমন সময় মট করে শুকনো ডাল ভাঙবার শব্দ হল, যেন জানোয়ারের পায়ের চাপে শুকনো ডাল ভাঙল৷ বললাম, ‘ওই শোনো৷ শিগগির ওঠো, এক্ষুনি বেরোলো বলে, উঠে দুটো ফায়ার করো৷’
বাইরে জ্যোৎস্না, যদিও আকাশে দু-চার টুকরো মেঘ ছিল৷
মিস্টার বা- নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে উঠলেন, তাঁবুর দরজা একটু ফাঁক করে বললেন, ‘কই, কিছু দেখছি না তো৷’
‘আরে বন্দুক ছোঁড়ো-না৷’
ওই তাঁবুর দরজার ফাঁক দিয়ে বন্দুকের নল বের করে দিয়ে গুড়ুম গুড়ুম দুবার ফায়ার করলেন, অমনি তাঁবুর খুব কাছ থেকে মড়-মড় শব্দে ডাল ভেঙে দে দৌড়— হাতি!
আমি বললাম, ‘শুনলে?’
মিস্টার বা- বললেন, ‘দেখতে তো পেলাম না কিছু৷’
তিনি কিন্তু তখনও তাঁবুর দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন, এক পা-ও বাইরে যাননি৷
‘হতভাগারা, এক্ষুনি যে হাতিতে মাড়িয়ে সকলকে চ্যাপ্টা করে দিত৷ পাহারাওয়ালারা গেল কোথায়?’
‘হুজুর, বহুৎ থক গিয়া থা নিঁদ আ গিয়া৷’
কী করা যায়, কথাটা অতি সত্যি৷ সমস্ত দিনের পরিশ্রমের পর ঘুমিয়ে পড়া স্বাভাবিক৷ যাক, ধুনি ঠিক করে, পাহারাওয়ালাদের ভয় দেখিয়ে, আবার শুয়ে পড়লাম আর তখুনি ঘুমিয়ে পড়লাম৷
আবার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল৷ আবার মনের ভিতর সেই ভাব হচ্ছিল যে জানোয়ার এসে আমাদের দেখছে৷ কান খাড়া করে শুনতে লাগলাম, আবার সেই ভারী জানোয়ার চলবার আওয়াজ, আবার সেই খসখস শব্দ৷ জানোয়ারটা খুব সাবধানে পা টিপে-টিপে চলছে৷ মিস্টার বা- কে ডাকলাম, ‘ওঠো৷’
‘কেন?’
‘ওঠো, আবার হাতি এসেছে৷’
আর তাঁর সাড়া নেই, কত ডাকলাম, কোনো জবাব নেই৷ হাত বাড়িয়ে পা ধরে টানলাম, কিন্তু ভীষণ ঘুম! নড়লেনও না, ঠিক যেন কুম্ভকর্ণ ঘুমোচ্ছেন৷
বন্দুক তুলে নিয়ে, কার্তুজ ভরে ধীরে-ধীরে বাইরে এলাম৷ পাহারাওয়ালা ঘুমে অচৈতন্য, ধুনি আবার নিভে গেছে৷ ধুনির কাছেই যেন প্রকাণ্ড ছায়ার মতো কালো একটা কী দাঁড়িয়ে আছে, একেবারে জঙ্গলের কিনারায়৷ ধীরে-ধীরে ধুনির কাছে এলাম— সামনেই প্রকাণ্ড হাতি! নিশ্চল দাঁড়িয়ে খালাসিদের তিরপলটা লক্ষ্য করছে৷ খালাসিরা তাঁবু আনেনি, তিরপল খাটিয়ে শুয়েছে, হাতিটা আট-দশ ফুট দূরেও হবে না৷
হাতির শুঁড়ের নীচেই গুড়ুম-গুড়ুম শব্দে দুবার বন্দুকের আওয়াজ করে দিলাম, আর ক্যাঁ-ক্যাঁ শব্দে চিৎকার করে, লাট্টুর মতো ঘুরে একদৌড়ে একেবারে জঙ্গলে৷ আমি কিন্তু তার পিছন-পিছন আরও দুটো ফায়ার করেছিলাম৷
একে তো কানের কাছে বন্দুকের আওয়াজ, তার উপর আবার সঙ্গে সঙ্গে হাতির চিৎকার শুনে সব লোক চেঁচামেচি করে উঠল, মিস্টার বা-ও তখন ‘কী? কী?’ বলে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলেন৷ দু-জন সিপাই, তাদের তাঁবু একটু দূরে ছিল, তারাও ‘কেয়া হুয়া?’ বলতে-বলতে ছুটে এল৷ সকল কথা শুনে তারা বললে, ‘হ্যাঁ, এই বদমাস রোজ রাত্রে এখান দিয়েই নদী পার হয়৷
মিস্টার বা- দুঃখ করতে লাগলেন, ‘আমাকে ডাকলেন না কেন?’
ভালো! পা ধরে টেনে খাটিয়া থেকে প্রায় ফেলে দিয়েছিলাম, তবুও কিনা ভদ্রলোক বলেন— আমাকে ডাকলেন না?
তিনি বললেন, ‘আমি তো কিছুই টের পাইনি, কখন ডাকলেন, কখনই বা পা ধরে টানলেন৷’
হাতিটা সে রাত্রে আমাদের তাঁবুর দিকে আর আসেনি৷ এরপর আমরা দু-তিন রাত সেইখানে ছিলাম, কিন্তু ওদিক দিয়ে আর সে নদী পার হয়নি৷
মিস্টার বা-কে আমি অনেকদিন পর্যন্ত ওই হাতির কথা বলে তামাশা করেছি৷ নতুন লোকের প্রথম-প্রথম জঙ্গলে এসে ওইরকম হওয়াটা কিছু আশ্চর্যের কথা নয়৷
পচা হাতির গন্ধের কথা আগে এক জায়গায় বলেছি, সেটা শোনা কথা, আমার সার্ভেয়ারের অভিজ্ঞতা৷ এ সম্বন্ধে আমার যা অভিজ্ঞতা আছে, তা মনে হলে এখনও অন্নপ্রাশনের ভাত উল্টে আসে৷
দীঘাতরং বড়ো চা বাগিচা৷ ম্যানেজার সাহেব হাতির খেদার ঠিকা নিয়েছেন, সরকারি রিজার্ভ ফরেস্ট-এ তিনি হাতি ধরবেন৷ আমাদের সার্ভেয়াররা ওই রিজার্ভ ফরেস্ট-এ জরিপ করেছিল, তাদের গোলমালে সব হাতি পালিয়ে যাবে, ধরতে পারবেন না৷ সেইজন্য আমার সঙ্গে বন্দোবস্ত হল, যে জায়গায় তিনি খেদার জোগাড়যন্ত্র করেছিলেন, তার আশেপাশে পাঁচ-ছয় মাইলের মধ্যে মার্চ মাসের আগে আমাদের লোকজন প্রবেশ করবে না৷ মার্চের শেষ ভাগে আমি আমার সার্ভেয়ারের কাজ পরিদর্শন করতে গেলাম৷
সন্ধ্যার সময় সার্ভেয়ারের সঙ্গে পরামর্শ করছিলাম, সকালে উঠে কোনদিকে কাজ দেখতে যাব৷ আমি তার নকশার উপর একটা দিক দেখিয়ে বললাম, ‘এইদিক দিয়ে যাব আর ওইদিক দিয়ে সন্ধ্যার সময় ফিরব, তা সম্ভব?’
সার্ভেয়ার একটু চিন্তা করে বলল, ‘হাঁ, হো সকতা৷ লেকিন ইস জগগা পর থোড়া মুশকিল হ্যায়৷’
‘কেয়া মুশকিল?’
‘খেদা কো একঠো হাথি মর গয়া থা, থোড়া বদবো হ্যায়৷’
খেদাতে যে সব হাতি ধরেছিল তার মধ্যে একটাকে বেঁধে ‘কোট’-এর (স্টকেড—এর) ভিতর থেকে বের করে আনবার সময় টানা-হেঁচড়া ধস্তাধস্তিতে চোট পেয়েছিল, আর কদিন পর মরে গিয়েছিল৷ তার মৃতদেহটা ওই জায়গায় ফেলে গিয়েছিল, পচে দুর্গন্ধ হয়েছে৷
আমি বললাম ওইটুকু জায়গা বই তো নয়, নিশ্বাস বন্ধ করে দৌড়ে পার হয়ে যাব৷
কাজে বের হলাম, যাবার সময় বিশেষ কিছুই বুঝতে পারলাম না৷ বিকেলে তাঁবুতে ফিরে আসবার সময় হঠাৎ সাঁই-সাঁই শব্দে চল্লিশ-পঞ্চাশটা শকুন উড়ল, হাজার-হাজার মাছির ভনভন আওয়াজ কানে এল, একটা উৎকট দুর্গন্ধও নাকে এল— অমনি আমরা নিশ্বাস বন্ধ করে দৌড়লাম৷ শকুনের ঝাঁক পার হলাম, মাছির ভনভনানি আর কানে আসছে না, এদিকে আবার দম আটকিয়ে মরবার উপক্রম, নিশ্চয়ই এতক্ষণে বিপদ কেটে গেছে৷ নিশ্বাস ফেললাম, প্রাণ বাঁচল বটে কিন্তু ওরে বাবা! কী বিটকেল দুর্গন্ধ! ওয়াক! ওয়াক! শুধু বমি!
যার নাকে এ গন্ধ ঢোকেনি সে লোক ধারণাই করতে পারবে না যে সে কেমন গন্ধ৷ প্রাণপণে দৌড়, আর ওয়াক! ওয়াক! আবার বমি আবার দৌড়৷ ফুসফুস ফেটে যাবার উপক্রম হয়েছে নিশ্বাস ফেল একটু, আর ওয়াক! ওয়াক!! ওয়াক!!!
বাবা! এ যেন একেবারে নাকের স্নায়ুতে-স্নায়ুতে, ফুসফুসের অলিগলিতে এই ভীষণ পচা গন্ধ ভরে দিয়েছে৷
সঙ্গের হাজারিবাগের খালাসি যারা ছিল তাদেরও প্রায় ওই অবস্থা৷
সার্ভেয়ার জাফর হুশেন ব্রহ্মপুত্র নদের কিনারায় কাজ করছিল৷ পূর্বোক্ত রিজার্ভ ফরেস্ট-এর অর্থাৎ গভর্নমেন্টের খাস জঙ্গলের সীমানা থেকে আরম্ভ করে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত তার কাজ৷ জঙ্গল খারাপ তাতে আবার জানোয়ারের ভয় বেশি, কাজেই তিন-চারজন লোক তাকে বেশি দেওয়া হয়েছে৷ সার্ভেয়ার কাজে বের হয়ে গেছে, দুজন খালাসি আড্ডায় রয়েছে, রান্নাবান্না করবে জিনিসপত্র সামলাবে৷ জানোয়ারের ভয় আছে, বাঘ আছে, আড্ডায় একজন লোক রেখে যাওয়া নিরাপদ নয়৷ দু-একদিন বাঘ দেখেছে, ডাক তো রোজই শুনতে পায়৷
লম্বা একটা লতা-পাতার ঘর তৈরি করেছে, তার সামনের দিকটা খোলা, সেইদিকে ধুনি জ্বালানো হয়৷ একজন খালাসি ধুনি আর রান্নার কাঠ সংগ্রহ করছে, অন্য লোকটি নদীতে বাসন ধুতে গেছে— নদীটা ছোটো, মাত্র এক ফুট জল৷ হঠাৎ ছপছপ শব্দ এল তার কানে, মুখ তুলে দেখল এই বড়ো বাঘ নদী পার হচ্ছে, মাত্র পাঁচ-সাত চেন দূরে, (এক চেন বাইশ গজ)৷ সে চুপিচুপি উঠে, দৌড়ে আড্ডায় এল, এক নম্বর খালাসি তখন সবে এক বোঝা কাঠ মাথায় করে এনে দাঁড়িয়েছে৷ দু নম্বর খালাসি এসেই বলল, ‘জলদি ভাগ, শের আতা হ্যায়৷’
দু-জনে ছুটে গিয়ে গাছে উঠে পাতার আড়ালে আশ্রয় নিল৷ তারা গাছে চড়ে বসবার দু-তিন মিনিটের মধ্যেই হেলতে-দুলতে কর্তা এসে হাজির হলেন, সোজা ওই নদীর ঘাটে৷ কোথাও কেউ নেই৷ এইমাত্র নদীর অন্য পার থেকে ‘ভোজ’ দেখতে পেয়েছিল, এরই মধ্যে গেল কোথায়? ‘হিঁয়াও!’
দুই লাফে উপরে উঠে এল, বাসনগুলি শুঁকে দেখল, কাঠের বোঝাটা শুঁকল, আহা কী চমৎকার গন্ধ! কিন্তু, গেল কোথায়? ‘হিঁয়াও!’ ওই ঘরটার দিকে গেল, রান্নার জায়গার চারপাশ ঘুরে দেখল, বিছানাপত্র সব জড়ানো ছিল উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে সেগুলো দেখল, আবার শুঁকে দেখল৷ তাজা গন্ধ সর্বত্র, কিন্তু গেল কোথায়? আবার ‘হিঁয়াও!’ বুঝতেই পারছ, বেচারার জিভ দিয়ে কেমন জল পড়ছিল! খাদ্যের অমন সুগন্ধ, আগের মুহূর্তে আবার তা নিজের চোখে দেখেছে, আর কিনা ভোজনে বসতে-না-বসতেই কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল? এতে মনে দুঃখ তো হবারই কথা, কাজেই— ‘হিঁয়াও!’
বাঘটা অনেকক্ষণ সেই আড্ডায় বসেছিল, পায়চারি করেছিল, তারপর যখন বিকেলবেলা সার্ভেয়ার কাজ থেকে ফিরে আসছিল আর তার লোকজনের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল, তখন চলে গেল৷
সার্ভেয়ার আর তার লোকজনদের দেখেই ওই লোক দুটি গাছের উপর থেকে চেঁচিয়ে তাদের সাবধান করে দিলে যে আড্ডায় বাঘ বসে আছে, তারা তা শুনে চিৎকার আরম্ভ করল, তবে হতভাগা গেল৷
সার্ভেয়ার তাঁবুতে পৌঁছল তবে এরা গাছ থেকে নেমে এল৷
পরের দিন আমি সার্ভেয়ারের কাজ দেখতে গিয়ে তার আড্ডায় ঘরের সামনে, উনুনের চারদিকে, বাঘের পাঞ্জা দেখেছিলাম৷ এই বাঘটা দু-জন লোক খেয়েছিল, কাঠুরেরা সার্ভেয়ারকে বিশেষ সাবধান করে দিয়েছিল৷
• ১৮ • (১৯১৮-১৯২০৷ আসাম : লখিমপুর : জৈন্তিয়া পাহাড়) এ বছর আমাদের আপিসের মিস্টার মি- দূরবিনের কাজ করবার জন্য জৈন্তিয়া পাহাড়ে গিয়েছিলেন৷ সেখানে কতকটা জায়গা একেবারে দুর্গম আর মানুষখেকো বাঘেরও ভয়৷ তার অত্যাচারে কয়েকটা গ্রাম একেবারে উজাড় হয়ে গিয়েছিল, সেই অঞ্চলের জৈন্তিয়া কুলিরা সহজে জঙ্গলে কাজ করতে যেতে সম্মত হত না৷ মিস্টার মি-কে অনেক জোগাড়যন্ত্র করে তাঁর খালাসিদের সঙ্গে কুলি পাঠাতে হত৷
দুবার তাঁর লোকদের সঙ্গে ওই বাঘের সাক্ষাৎ হয়েছিল৷
একবার তাঁর তিন-চারজন খালাসি একটা গ্রামে যাচ্ছিল, গ্রাম থেকে কুলি নিয়ে তারা পাহাড়ে যাবে৷ সূর্যাস্তের আগেই গ্রামে পৌঁছতে হবে, সেইজন্য তারা লম্বা-লম্বা পা ফেলে চলেছে৷ হতভাগা বাঘ কিন্তু তাদের পিছু ধরেছে৷ এক-আধবার ছায়ার মতো চোখে পড়ে আবার চোখের পলক না ফেলতে জঙ্গলের আড়াল হয়ে যায়৷ কখনো বা পিছনে দেখা দেয় আবার কখনো বা কুড়ি-ত্রিশ ফুট সামনে৷ লোকরা একেবারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল, কেমন ভয় পেয়েছিল সে তো বোঝাই যায়৷ তারা হাত ধরাধরি করে অতি সাবধানে চলেছে, এবার গ্রামে পৌঁছবে, তখন বাঘটা ক্রমাগত তাদের সামনে রাস্তার উপর দেখা দিতে লাগল৷
বেচারা খালাসিরা ভয়ে আর এগোয় না৷ শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে এক জায়গায় একটা শুকনো গাছ দেখতে পেয়ে সেখানে দাঁড়াল৷ তাদের সঙ্গে লম্বা দড়ি ছিল, চার-পাঁচটা গাছের চারদিকে ওই দড়ি দিয়ে চার-পাঁচবার ঘিরে নিল৷ ঠিক যেন ফাঁদ পেতেছে৷ তারপর ওই শুকনো গাছে আগুন জ্বেলে দিয়ে ঘেরা জায়গাটুকুর মধ্যে আশ্রয় নিল৷
কত চিৎকার করে কত ডাকাকাকি করল, কিন্তু গ্রামের লোকেরা কোনো সাড়াই দিল না, যদিও গ্রামের লোকের গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল তারা৷ সমস্ত রাত তারা ওই জায়গাতে কাটাল৷ বাঘটা কতবার দেখা দিল, কিন্তু আগুনের ভয়েই হোক, কি দড়ি-ঘেরা জায়গাটাকে ফাঁদ মনে করেই হোক, তাদের ধরবার চেষ্টা করেনি৷
সকালে যখন তারা গ্রামে গিয়ে পৌঁছল, তখন গ্রামের লোকেরা বড়োই আশ্চর্য হয়ে গেল যে তাদের বাঘে খায়নি৷ পরে সাহেব গিয়ে গ্রামের প্রধানকে বিশেষ তিরস্কার করেছিলেন৷ তাদের ওই এক উত্তর: ‘আমরা ওদের চিৎকার শুনতে পাইনি৷’
আর একবার ওই সাহেবের কয়েকজন লোক একটা পাহাড়ে কাজ করতে গিয়েছিল, তাদের সঙ্গে ওই গ্রামের কয়েকজন কুলি ছিল৷
পাহাড়ের চুড়োর সমস্ত জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করা হয়েছে, বড়ো-বড়ো গাছ সব চারদিকে এলোমেলো ভাবে পড়ে আছে, চুড়োটুকু পরিষ্কার৷ খালাসিরা ওই চুড়োর উপর ক্যাম্প করবার বন্দোবস্ত করতে লাগল, কিন্তু সঙ্গের জৈন্তিয়া কুলিদের ওই খোলা জায়গাতে থাকা পছন্দ হল না, কিংবা নিরাপদ মনে করল না৷ তারা একটু নীচে নেমে জঙ্গলের আড়ালে লতাপাতার কুঁড়ে খাড়া করে নিল৷
জরিপের কাজ সকালে সাতটা, সাড়ে-সাতটা থেকে আরম্ভ হয়৷ লোকজন অন্ধকার থাকতে উঠে, হাত-মুখ ধুয়ে, রান্নার জোগাড় করে৷ এ পাহাড়ে বাঘের ভয়, সেইজন্য কেউই ভোরে ওঠেনি৷ চারদিক পরিষ্কার হলে, উঠে, হাত-মুখ ধুতে ব্যস্ত আছে৷ একজন জৈন্তিয়া কুলি তাদের কুঁড়ে ঘরের কাছেই ঝোপের আড়ালে পায়খানায় গেছে, আর তাকে বাঘে ধরে নিয়ে গেল, বাঘটা যেন সুযোগের অপেক্ষায় বসে ছিল৷ অন্য সব কুলিরা হাউমাউ করে চিৎকার জুড়ে দিল, আর পাহাড় ছেড়ে একেবারে গ্রামে চলে গেল৷
বেচারা খালাসিরা কজন পাহাড়ের চুড়োতেই থেকে গেল৷ বাঘ কিন্তু তাদের উপর হামলা করেনি৷ সে বোধহয় ওই কাটা গাছগুলোকে ডিঙিয়ে যাওয়া নিরাপদ মনে করেনি৷ কিংবা সেগুলো দেখে ফাঁদ মনে করেছিল৷ সেইজন্য তাদের কাছেও যায়নি৷
হাবিলদার সিংবীর থাপা জৈন্তিয়া পাহাড়ের যেখানে মানুষখেকো বাঘ আছে সেখানে কাজ করতে গিয়েছিল৷ তার সঙ্গে বেশি করে লোকজন আর হাতিয়ার দেওয়া হয়েছিল৷ রান্না করবার জন্য নিজের একজন গুর্খা সঙ্গে গিয়েছিল৷ তার কাজের জায়গায় মানুষখেকো বাঘের ভয় আছে, তাকে বিশেষ সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল যেন খুব হুঁশিয়ার হয়ে কাজকর্ম করে, তাঁবু ফেলে৷
হাবিলদার ছিল পল্টনওয়ালা আর খুব বাহাদুর লোক, সেইজন্য বেছে-বেছে তাকেই ওই কাজে পাঠানো হয়েছিল৷
আড়াই-মাস তিন-মাস বেশ কেটে গেল, বাঘের সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ হল না৷ চারদিকের কাজ শেষ হয়ে গেছে, মাঝখানে একটু বাকি আছে, অল্প কয়েকদিনের কাজ৷ গ্রামে তাঁবু রেখে আর এ-কাজটুকু হতে পারে না, অনেক দূর পড়ে যায়, যাতায়াতেই প্রায় সারাটা দিন চলে যায়৷ সেখানে একটা পরিত্যক্ত গ্রাম ছিল, বাঘের অত্যাচারে লোকরা সব পালিয়ে গেছে৷ হাবিলদার মনে-মনে স্থির করল ডেরা তুলে ওই শূন্য গ্রামে নিয়ে যাবে, মাত্র কদিনের কাজ বাকি, সেটুকু ওই গ্রামে থেকেই শেষ করবে৷ গ্রামের ঘর-দোর সবই মজুত ছিল৷ যে গ্রামে এতদিন তাঁবু ছিল, সে গ্রামের লোকরা ওদের সঙ্গে গিয়ে ওই শূন্য গ্রামে কয়েকদিন বাস করতে রাজি হল না৷ অনেক তর্কাতর্কির পর শুধু ওই গ্রামে পৌঁছে দিয়ে আসতে রাজি হল৷
হাবিলদার কত বোঝাল যে তিনমাসের মধ্যে আমাদের সঙ্গে বাঘটার দেখা হয়নি, ওটা নিশ্চয়ই অন্য কোথাও চলে গেছে, আর তো মাত্র কদিনের কাজ বাকি, ইত্যাদি, কিন্তু কোনো ফল হল না৷ তারা বলল সেই গ্রামে পৌঁছে দিয়েই চলে আসবে৷
সমস্তদিন হেঁটে বিকেলবেলা তারা সেখানে পৌঁছল৷ গ্রাম থেকে মাইল দুই দূরে এক টুকরো খেত ছিল, সেখানে মেলা তরকারি হয়েছে— কুমড়ো, শিম, কচু ইত্যাদি৷ খালাসিরা বলল, ‘এখানে একটু সবুর করো, আমরা তরকারি নেব৷ তিন মাস খালি ডাল ভাত আর নুন ভাত খাচ্ছি৷’
কুলিরা বিশেষ আপত্তি জানাল, তারা কিছুতেই দাঁড়াবে না, সন্ধ্যা হয়ে যাবে৷ হাবিলদার তখন খালাসিদের বলল, ‘আজ চলো, কাল সকালে আমি কাজে যাব না৷ তোমরা তখন এসে তরকারি নিয়ে যেয়ো৷’
তারা রাজি হয়ে চলতে লাগল আর সন্ধ্যার আগেই গ্রামে পৌঁছে গেল৷
পরদিন ভোরে উঠে কুলিরা চলে গেল, তিনজন খালাসি তাদের সঙ্গে ডাক আনতে গেল, চারজন খালাসি গেল তরকারি আনতে৷ এরা তরকারি নিয়ে ফিরলে তবে রান্না করে খাবে, নুন ভাত আর তারা খাবে না৷
হাবিলদার তাঁবুতে বসে নিজের কাজে ব্যস্ত৷ ক্রমে বেলা হল, যে সব লোকরা তাঁবুতে ছিল তারা উদবিগ্ন হয়ে উঠল, ওরা এখনও আসে না কেন? দু-মাইল তো রাস্তা, দু-ঘণ্টা আড়াই-ঘণ্টার মধ্যে ফিরবার কথা৷
বারোটা বেজে গেল, ক্রমে বিকেল হল, কিন্তু ওই চারজন লোকের দেখা নেই৷ চিৎকার করে কত ডাকাডাকি করা হল, কোনো উত্তর নেই৷ একবার ভাবল ওরা বোধহয় ওই খেতেই রান্না করে খেতে বসেছে, কিন্তু তাও তো সম্ভবপর নয়, কেননা সঙ্গে চাল নেই, বাসন-কোসন নেই, রাঁধবে কীসে?
বড়োই আতঙ্ক উপস্থিত হল৷ তারা বড়ো-বড়ো ধুনি জ্বেলে সমস্ত রাত জেগে কাটাল৷ সকালে উঠেই হাবিলদার রাইফেল ঘাড়ে চলল তার লোকজনের খোঁজে, তার সঙ্গে চলল তার রোটিওয়ালা অর্থাৎ তার রাঁধুনি৷ তখন একজন খালাসি তাঁবুতে ছিল, সেও সঙ্গে চলল, একলাটি তাঁবুতে থাকবে না৷ আগে-আগে বন্দুক ঘাড়ে হাবিলদার, মাঝখানে রাঁধুনী, পিছনে খালাসিটি৷ প্রায় দেড় মাইল পাহাড় চড়ে, এক জায়গায় দেখতে পেল পথের উপর একটা কাটা গাছের ডাল পড়ে রয়েছে, তার পাতা শুকোতে আরম্ভ করেছে, পাশে গাছের গায়ে দা দিয়ে ছাল ছাড়ানো৷ বুঝল আগের দিন কুলিরা রাস্তা ছেড়ে এইখানে বনে ঢুকেছিল৷ রাস্তার উপর ডাল কেটে ফেলে রখেছে পিছনের লোককে সাবধান করার জন্য যেন ওই পথে কেউ না যায়৷
দু-চার পা জঙ্গলে গিয়ে দেখল জায়গায়-জায়গায় গাছের গায়ে দা দিয়ে দাগ দেওয়া আছে, ওইখান দিয়ে তারা গেছে৷ কিন্তু কেন? হাবিলদার দাঁড়িয়ে একটু ভাবল, তারপর বন্দুক ভরে নিয়ে রাস্তা ধরে চলতে লাগল৷ যারা তরকারি আনতে গিয়েছিল, রাস্তায় তাদের পায়ের দাগ দেখল৷ আরও সিকি মাইল আন্দাজ গিয়ে দেখল রাস্তার পাশেই খানিকটা জায়গার মাটিতে নখের আঁচড়ের দাগ, আর কী যেন পড়ে আছে৷ এক পা এগিয়ে দেখল— রক্তের দাগ৷
চকিতে একবার চারদিকে দেখে নিয়ে তারা আবার চলতে লাগল৷ হঠাৎ পিছনে ক্যাঁক করে একটা আওয়াজ হল, মুখ ফিরিয়ে দেখল পিছনের খালাসিটি আর নেই আর পাশেই ঘাসবন নড়ছে৷ বুঝতে বাকি রইল না তাকে বাঘে টেনে নিয়ে যাচ্ছে৷ কাছেই পাহাড়ের ঢালুর কিনারায় গাছ ছিল, দুজনে প্রাণপণে সেদিকে ছুটল৷ হাবিলদার ছুটে গিয়ে লাফিয়ে একটা ডাল ধরে অতিকষ্টে কয়েক ফুট চড়ে গেল, তার ঘাড়ে বন্দুক, পায়ে বুট জুতো৷
তার চাকরটা সবেমাত্র গাছের গোড়াতে পৌঁছেছে আর ঝড়ের মতো বাঘটা এসে তার ঘাড়ে পড়ল৷ তার চিৎকার শুনে হাবিলদার নীচের দিকে তাকিয়ে দেখল কী ব্যাপার, আর তাড়াতাড়ি রাইফেলটা ঘুরিয়ে এক হাতেই গুলি ছুড়ল৷ বন্দুকের আওয়াজ শুনেই বাঘটা রোটিওয়ালাকে ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে গিয়ে ঢুকল৷ হাবিলদার ততক্ষণে আরো দু-পা উঠে ডালের উপর ভালো করে বসে বন্দুকে আবার কার্তুজ ভরে নিল৷ বাঘ আর চোখে পড়ছে না, সে গা ঢাকা দিয়েছে৷ রোটিওয়ালা পড়ে আছে, ঢালুর উপর দিকে তার পা, নীচের দিকে মাথা৷
হাবিলদারের গাছ থেকে নীচে নামবার সাহস হচ্ছে না, যদি নামবার সময় বাঘ লাফিয়ে এসে ঘাড়ে পড়ে৷ গাছের উপর বসে সে বাঘের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল৷
রোটিওয়ালা কিন্তু তখনও জীবিত৷ সে কোঁকাতে-কোঁকাতে বলতে লাগল হাবিলদার যেন তাকে ফেলে না যায়, সে তার আপনার লোক৷
হাবিলদার বলল যে সে কখনো তাকে ফেলে যাবে না৷ কেন যে নামতে পারছে না তাও বলল, গাছের উপর তবু কিছু দূর দেখা যায় বাঘ আসছে কিনা, মাটিতে নামলে কিছুই দেখতে পাবে না, হয়তো নামবার সময়ই বাঘ এসে ধরে ফেলবে৷ হাবিলদার আরও বলল পট্টি আর পাগড়ি জড়িয়ে দড়ি তৈরি করে উপর থেকে রুটিওয়ালার কাছে নামিয়ে দেবে! সে যেন সেটাকে বুকে পিঠে জড়িয়ে বাঁধে, তাহলে হাবিলদার দড়ির অন্যদিক ধরে টেনে তাকে গাছে তুলে নেবে৷ তারপর ভগবান যেমন ব্যবস্থা করেন৷
এর মধ্যে দু-একবার একপাশের জঙ্গল একটু নড়েছে আর হাবিলদার সেইদিক লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে৷ তার মনে হচ্ছিল বাঘটা আবার রোটিওয়ালার কাছে আসছিল কিন্তু বন্দুকের আওয়াজ শুনে পালিয়ে গেল৷
রোটিওয়ালা বেচারা কত চেষ্টা করল কিন্তু কিছুতেই দড়িটা বুকে জড়িয়ে নিতে পারল না৷ তার ঘাড়ে বিষম চোট লেগেছিল, অতি কষ্টে কোঁকাতে-কোঁকাতে কথা বলছিল৷ যখন কিছুতেই দড়িটা জড়াতে পারল না তখন সব চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে কোঁকাতে লাগল৷ সমস্ত দিন ওই অবস্থায় পড়ে রইল, সন্ধ্যার সময় কোঁকানো বন্ধ হল৷
এর মধ্যে আরও দু-চারবার ঝোপ নড়া দেখে বন্দুক চালাতে হয়েছে, পাছে বাঘটা বেচারার দেহটা নিয়ে যায়৷ রাতটাও ঠিক ওইভাবে কাটাতে হল৷ একবার পলকের জন্য হাবিলদার বাঘটাকে দেখতে পেয়েছিল, গুলিও করেছিল৷ কিন্তু অন্ধকারে গুলি লাগল কিনা বোঝা গেল না৷ সকালে দেখা গেল রোটিওয়ালার দেহটা সেখানেই পড়ে আছে৷
এখন কী কর্তব্য হাবিলদার তাই চিন্তা করতে লাগল৷ চবিবশ ঘণ্টা চলে গেছে, এক ফোঁটা জলও পেটে পড়েনি, তার উপর এই ভীষণ কাণ্ড! অবস্থা তো বোঝাই যাচ্ছে৷ এমন করে কতক্ষণ চলবে? সেই মরতেই হবে, কিন্তু এখনও শরীরে শক্তি আছে, চেষ্টা করলে হয়তো বা এই ভীষণ জায়গা থেকে বের হয়ে যেতেও পারা যায়৷
এই রকম মনে-মনে আলোচনা করে, তিন-চারবার উপরি-উপরি বন্দুকের আওয়াজ করল৷ এইবার গাছ থেকে নামবে৷ তখন তার মনে হল কেউ যেন চিৎকার করে ডাকছে৷ হাবিলদারও চেঁচিয়ে জিগগেস করল, ‘কে তুমি?’
একজন খালাসি তার নাম বলল৷ সেই প্রথম দিন যে ক-জন তরকারি আনতে গিয়েছিল, তাদের একজন৷
‘কোথায় তুমি?’
‘গাছে৷ বাঘ মরেছে?’
‘না, গুলি করেছি, কিন্তু পালিয়ে গেছে৷ তুমি গাছ থেকে নেমে আমার দিকে এসো, আমিও গুলি করতে-করতে এগোচ্ছি, বাঘ ভয়ে আসবে না৷’
হাবিলদার গাছ থেকে নেমে ওইদিকে চলল৷ চার-পাঁচ কদম যায় আর বন্দুকের আওয়াজ করে৷ খালাসিও এসে হাজির হল৷ তখন দু-জনে সেই উজাড় গ্রামের দিকে দৌড়ল৷ খালাসিকে সামনে রেখে, হাবিলদার পিছন-পিছন ভরা বন্দুক হাতে নিয়ে৷ গ্রামে এসে খালাসি বলল সে জল খাবে, আটচল্লিশ ঘণ্টা জল খায়নি৷ হাবিলদার সামান্য জল দিয়ে বলল, ‘বেশি খেলে অসুখ করবে৷ চলতে পারবে না৷’
তারপর কিছু চাল সঙ্গে নিয়ে তারা সেই সর্বনেশে জায়গা ছেড়ে গেল৷ নীচে নালায় গিয়ে ওই চাল দু-মুঠো ভিজিয়ে চিবিয়ে খেল, তবে জল খেল৷
তারপর, বারো-তেরো মাইল দূরে অন্য পাহাড়ে গ্রাম ও খেত দেখা যাচ্ছিল, সেইদিকে চলল৷ সমস্ত জিনিসপত্র ফেলে এসেছে, শুধু বন্দুকটি, দুখানা কম্বল আর দু-মুঠো চাল সঙ্গে এনেছে৷ সন্ধ্যার পর সেই খেতে গিয়ে পৌঁছল৷ পা আর চলে না৷ খেত পাহারা দেবার জন্য আট-দশ ফুট উঁচু মাচার উপর ছোটো একটি কুঁড়েঘর ছিল৷ কিছু ভিজে চাল আর জল খেয়ে, ওই মাচার উপরে উঠে তারা শুয়ে রইল৷ ভয়ে, আতঙ্কে, ঘুমোতে পারল না৷ সঙ্গে দেশলাই ছিল, ওই ঘরে কাঠ ছিল, আগুন জ্বেলে সারা রাত জেগে কাটাল৷
পরদিন সকালে যখন গ্রামে পৌঁছল, তখন তাদের আধ-মরা অবস্থা৷ দেখতে-দেখতে এই সংবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল৷ আমাদের আপিসের সাহেবরা হাতি নিয়ে বাঘ মারতে গেলেন, কিন্তু বাঘের কোনো সন্ধানই পেলেন না৷
আগেই বলেছি হাবিলদার বাহাদুর লোক৷ আবার সে ওই জায়গায় ফিরে গিয়ে তার আত্মীয়ের সৎকার করেছিল, আর বাকি কাজটুকুও শেষ করেছিল৷
খালাসিটার কাছে আগের দিনের সব ঘটনা শোনা গেল৷ ওরা চারজন অন্য কুলিদের ছেড়ে একজনের পিছনে একজন লাইন বেঁধে রাস্তা ধরে তরকারি আনতে যাচ্ছিল৷ যেখানে হাবিলদার প্রথম রক্ত দেখেছিল, সকলের পিছনের লোকটিকে ওইখানে বাঘে ধরে৷ বাকি তিনজন ওই রাস্তায়-রাস্তায় ছুটতে আরম্ভ করে আর বাঘটাও পিছনে-পিছনে তাড়া করে, একজনের পর একজন করে আরও দুজনকে মেরে ফেলে৷ ততক্ষণে সকলের আগের লোকটি ছুটে গিয়ে একটা গাছে উঠে প্রাণ বাঁচায়৷
এর পরের বছর আমি কলকাতায় বদলি হয়ে গেলাম আর জঙ্গলের কাজের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ সম্পর্ক ঘুচে গেল৷ সুতরাং আমার বক্তব্যও এখানে শেষ হয়ে গেল৷