জয়ন্ত দে

আক্কেল আজ আবার সেই ফোনটা পেল। মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে-প্রাইভেট নম্বর!
প্রাইভেট নম্বর ব্যাপারটা আক্কেল জানে। যাঁরা নিজের ফোনের নম্বরটি সবাইকে জানাতে চান না, গোপন রাখতে চান, তাঁরাই এই 'প্রাইভেট নম্বর' ব্যবহার করেন। বিশেষ অনুমতি নিয়ে এই নম্বরটি নেওয়া হয়। আক্কেলের বাবার কাছে অনেক নেতা মন্ত্রীর ফোন আসে প্রাইভেট নম্বর থেকে। ফোনটি ধরার পর জানা যায় কে ফোন করেছেন। ইচ্ছে করলে তাঁকে রিংব্যাক করা যায় না।
ফোনটা পেয়েই ওর আলস্যে গুটিয়ে থাকা ভাবটা মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। কম্বলের ভেতর নিজেকে টান-টান করে খুব মৃদু স্বরে বলল, 'হ্যালো।'
'ফোন ধরতে দেরি হল কেন—ঘুমোচ্ছিলে? এখন কিন্তু ন'টা বেজে গেছে। যাক, কী হল, আমার কেসটা নিয়ে কী ভাবছ?
ফোনের ওপারে সেই ভদ্রমহিলা। ওঁর গলার স্বর বেশ ভারী। খুব আস্তে-আস্তে কথা বলেন।
'আপনার কেসটা মানে?'
'তোমার স্মৃতি শক্তি তো এত দুর্বল নয়! না কি আমার কথা ঠিক বুঝতে পারছ না?'
'না, আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না।' আক্কেল কিছুটা অসহিষ্ণু গলায় বলল।
'খুব সহজ কথা। আমি আবারও বলছি—আমি একজন খুনিকে চাইছিলাম। ঠান্ডা মাথার খুনি। যে ডান হাত দিয়ে কাজ করে অথচ তার বাঁ হাত জানতে পারে না। তেমন একজন কাউকে আমার চাই।'
'আমি আবারও জানতে চাইছি, খুনি চাই মানে—আপনি কী খুন করাবেন?' আক্কেলের সকালবেলার ঘুমটা চটকে গেছে। সে গলায় বেশ জোর এনে স্পষ্ট করে কথাটা বলল।
'তোমার প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না। আমি আমার রিকোয়ারমেন্টটা বলেছি। একজন খুব ঠান্ডা মাথার খুনির ফোন নম্বর বা যোগাযোগের ঠিকানা চাই। ব্যস। তোমার কাজ এইটুকু। এর জন্যে তুমি পারিশ্রমিক পাবে।'
'আপনি কি কাউকে খুন করতে চান?'
'তুমি বার বার আমাকে এ কথাটা জিগ্যেস করছ কেন? আমি যদি এই প্রশ্নের উত্তরে তোমাকে হ্যাঁ বলি, তুমি তখন অনেক প্রশ্ন করবে? মাঝখান থেকে আমার কাজটাই পণ্ড হয়ে যাবে। আবার যদি না বলি, তুমি তাহলেও বিস্ময় প্রকাশ করবে, আমি কাউকে খুন করাব না, তবে কেন খুনি খুঁজছি? তুমি আমার কথা ঠিক বিশ্বাস করবে না। ফলে তোমার কাছে কাজটার কোনও গুরুত্ব থাকবে না। তাই ওসব না ভেবে এটাকে একটা কাজ হিসেবেই নাও। আর পাঁচজন মানুষের সমস্যার সমাধান করার জন্য যেমন বিজ্ঞাপন দিয়েছ—ভেবে নাও না এটাও আমার একটা সমস্যা। আমি তোমার কাছে হেল্প চাইছি। বিনিময়ে তুমি তোমার কনসালটেন্সি ফিজ পেয়ে যাবে।'
আক্কেল কম্বলের ভেতর আধ শোয়া হল, তার আলস্যের বাঁকা ভাব ঘুচে গেছে। সে নিজের গলাটা একটু ভারী করে বলল, 'আপনি হয়তো ঠিকই বলেছেন, কিন্তু আমরা এতকিছু ভেবে বিজ্ঞাপন দিইনি। আমি, আমার এক বন্ধু মেঘ, আর তার বোন বাঁশি তিনজনে একদিন মজার ছলে বলছিলাম মানুষের কত খুচরো টেনশন হয়, এমন যদি কোনও সংস্থা থাকত যারা এইসব খুচরো কেসগুলো টেকওভার করে সমস্যার সমাধান করে দিত, বিনিময়ে চার্জ নিত, তবে কত ভালো হত। আসলে হয়েছিল কী জানেন, বাঁশি কিছুদিন আগে একটা সমস্যায় পড়েছিল। ওর খালি মনে হত কেউ ওকে ফলো করছে। এই নিয়ে ওর খুব টেনশন চলছিল। ওরা আমার হেল্প চেয়েছিল। পরে দেখা গেল ব্যাপারটা ঠিক ওরকম কিছু নয়।'
'তবে ব্যাপারটা কী? কোনও রোমিও!'
'না, তা নয়।'
'মনের ভুল বলছ?'
'হ্যাঁ, তাই।'
'তা কী করে হবে? মন এত ভুল করবে?'
ভদ্রমহিলার কথা শুনে আক্কেল একটু থমকাল। ভদ্রমহিলা তার সকালের ঘুমটা খুনি চাই, খুনি চাই বলে নষ্ট তো করলই, উলটে এখন আবার বাঁশির কেসটার হিস্ট্রি চাইছে। সাতসকালে কার এত বকবক করতে ইচ্ছে করে?
ভদ্রমহিলা বললেন, 'এখন বাঁশি ঠিক আছে নিশ্চয়ই?'
'হ্যাঁ, ঠিক আছে। সেদিন এসব কথা থেকে আমি ওদের বলছিলাম এইসব খুচরো সমস্যার সমাধান করার জন্য একটা অফিস খুললে কেমন হয়? আমার কথা শুনে মেঘ যে দুম করে খবরের কাগজে এমন বিজ্ঞাপন করে দেবে আমি ভাবতে পারিনি। তারওপর আমার বাড়ির ল্যান্ড নম্বর!'
'তা বিজ্ঞাপন দেখে ক'টা কেস এসেছে?'
'তা এসেছে বেশ ক'টা—তবে সবই আজেবাজে। একটাও যুৎসই নয়।'
'সব আজেবাজে বলছ কী করে? আমার কেসটা কি খারাপ?' ভদ্রমহিলা ঠান্ডা গলায় ধমক দিলেন।
আক্কেল নিজেকে একটু গুছিয়ে নিল। বলল, 'দেখুন আপনি আমার থেকে বয়েসে বড়, তবু বলি, সব কিছুর একটা এথিক্স থাকে। আমি সেই এথিক্সের জন্যেই আপনাকে ঠান্ডা মাথার খুনি খুঁজে দিতে পারব না।'
'শোনো ছোকরা, ছোট বলে তোমাকে আমিও কড়া কথাটা বলতে পারছিলাম না। অহেতুক বিজ্ঞাপন দিয়ে তুমি তোমার কিছু টাকা ধ্বংস করতে পারো কিন্তু মানুষের সময় নষ্ট করতে পারো না। তুমি আমার যথেষ্ট সময় নষ্ট করেছ। ভেবেছিলাম তুমি পারবে। কিন্তু বাস্তবে দেখলাম তুমি একটি অপদার্থ।'
'কী বলছেন আপনি'! আক্কেল কম্বল ঠেলে উঠে বসল।
'শোনো, তোমার বিজ্ঞাপন দেখে আমি প্রলুব্ধ হয়েছি। আমি সময় নষ্টের খেসারত চেয়ে কনজিউমার ফোরামে যেতে পারতাম, কিন্তু আর সময় নষ্ট করতে চাই না। যাই হোক, তুমি ক্ষমা প্রার্থনা করে ওই খবরের কাগজে আবার বিজ্ঞাপন দেবে। সেখানে লিখবে—আমি একজন দুগ্ধপোষ্য। আমি দুধুভাতু কেসই সমাধান করতে পারি, কোনও জটিল কেস গ্রহণ করতে পারব না।'
কম্বল ছেড়ে ঠেলে উঠে বসেছিল আক্কেল। তার ঘুমের এলোমেলো ভাব কেটে গেছে। সে বলল, 'এই যে আপনি বলছেন, আমাদের বিজ্ঞাপন দেখে আপনি প্রলুব্ধ হয়েছেন। আপনার অনেক সময় নষ্ট হয়েছে, এটা ডাহা বাজে কথা। করেছেন তো ক'টা ফোন। তাতে কত সময় আপনার নষ্ট হল?
'প্রথম দুটো ফোন করেছি তোমাদের ল্যান্ড লাইন নম্বরে। তার হিসেব আমার কাছে নেই। ওটা বাদ দিলাম। তারপর তোমার মোবাইলে আজ নিয়ে তিনটে। আজ ন'টা দুইয়ে ফোন করেছি, এগারো মিনিট হয়ে গেছে, এখনও কথা চলছে। প্রথম ফোন করেছিলাম বিজ্ঞাপন যেদিন বেরিয়েছিল, সেই রবিবার। কথা বলেছি বিকেল পাঁচটা থেকে পাঁচটা দশ পর্যন্ত। মানে দশ মিনিট। তখনই কথা হয় আমি বুধবার সন্ধে সাড়ে সাতটার সময় ফোন করব। কথামতো আমি ফোন করি। তুমি তখন বাঁশিদের বাড়ি। কথা বলেছি, সাতাশ মিনিট। কিন্তু তোমার ফোনটা স্পিকারে দেওয়া ছিল, আর সেখানে তোমার পাশে মেঘ ও বাঁশি ছিল। অর্থাৎ আমার কথা জেনেছ তোমরা তিনজনে। ফলে আমার সময় নষ্টের ব্যাপারটা বেশ বেড়ে গেছে। যেটা ছিল একজন, শুধু তুমি। সেটা হয়ে গেছে তিনজন। তুমি, মেঘ ও বাঁশি!'
আক্কেল হাসল, 'আগের দুটো ফোন বাদ দিলে, আপনি সাকুল্যে ফোন করেছেন দশ আর সাতাশ মিলিয়ে সাঁইত্রিশ মিনিট। আর আজকে যা হবে, এই আপনার সময় নষ্টের হিসেব?'
ফোনের ওপার থেকে ভদ্রমহিলা হাসলেন, 'এই বুদ্ধি নিয়ে মানুষের সমস্যার সমাধান করবে? না, তোমাদের দ্বারা হবে না। আমি ভুল করেছি, ভুল লোককে বেছে ফেলেছি। ভেবেছিলাম ফ্রেশ ছেলে, খালি ব্রেন, খেলালে বুদ্ধি খুলবে, কিন্তু দেখছি গ্রে ম্যাটার বড় কম। আরে ওই সাঁইত্রিশ মিনিটের জন্য আমি হাহুতাশ করব। সাঁইত্রিশ মিনিট তো আমি দুটো শব্দজব্দ আর দুটো সুদোকু খেলে ব্যয় করি, সেটা না হয় তোমার মতো বোকা ছেলের সঙ্গে কথা বলে কাটালাম। আমাকে ইনভেস্ট করতে হয়েছে আরও অনেক বেশি।'
'মানে?'
'কোনও কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার আগে জেনে নিতে হয় কোম্পানিটা কেমন। কোম্পানিটা চিটিং করছে কিনা? আমাকেও ফোন করে, পায়ে হেঁটে, গায়ে খেটে, তোমাদের খোঁজখবর নিতে হয়েছে। তোমরা কারা? কতটা ছেলেমানুষি, কতটা ক্ষমতা? টাকাপয়সার দরকার কেমন? কতটা পারবে? তার ওপর সদিচ্ছা, মানে মানুষের উপকার করতে চাও নাকি কোনও দুরভিসন্ধি আছে? সব জানতে হয়েছে। সব জেনে নিয়ে তবে তোমাদের কাজ দিয়েছি।'
'খোঁজ নিলেন?'
'হ্যাঁ নিলাম। না নিয়ে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেব কী করে? প্রথমে ভেবেছিলাম তুমি একা। তাই তোমার খোঁজ নিয়েছিলাম। পরে দেখলাম তোমার সঙ্গে আরও দুটি আছে, তখন আবার তাদেরও খবর নিতে হল। একজনের থেকে তিনজনের খোঁজ মানে খাটুনি বেড়ে গেল।' ভদ্রমহিলা হাসলেন।
'কী খবর পেলেন?' আক্কেল একটু বাঁকাভাবে জিগ্যেস করল।
'কার কথা বলব, তোমার কথা? তুমি, মানে আক্কেল বসু। বি.এসসি, ফিজিক্সে অনার্স, মাস্টার্স করেছ। পাশ করে এখন বিসিএস হওয়ার তাল করছ। তবে সেটা তোমার বাবার ইচ্ছেতে। তোমার বাবা দিব্যসুন্দর বাসু, একজন আইএএস। সায়েব মানুষ। তিনি তোমার ওপর খুব ক্ষুব্ধ। কেন না তুমি এখনও ভেবে উঠতে পারোনি—এ জীবন লইয়া কী করিবে? তোমাদের বাড়িতে আর আছেন তোমার মণিমা। যিনি আমার প্রথমদিন ফোন ধরেছিলেন। তোমার মোবাইল নম্বর দিয়েছিলেন। তোমার মা মারা যাওয়ার পর উনিই তোমাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। তোমার কোনও অ্যাফেয়ার নেই। কিন্তু বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা প্রচুর। খুব আড্ডাবাজ। সারাদিন ফেসবুক, ওয়াটসআপ, ইন্সটাগ্রাম, স্নাপচ্যাট করে অনেক সময় নষ্ট করো। আর হ্যাঁ, আর একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি, যেটা বেশ ইন্টারেস্টিং। একজন আইএএস-এর ছেলের নাম কী করে আক্কেল হল—খোঁজ নিয়ে জানলাম, ব্যাপারটা খুব দুঃখজনক। সরি, তবু তোমাকে আমি বলছি। তুমি তোমার মায়ের পেটের ভেতর উলটো ভাবে ছিলে। এবং তোমাকে জন্ম দিতে গিয়ে তোমার মা মারা যান। তোমার বাবা বুঝেছিলেন, পেটের ভেতর থেকেই তোমার আক্কেল জ্ঞান খুব কম। তোমাকে সেই আক্কেল দেওয়ার জন্য তিনি তোমার নাম রাখেন আক্কেল। আর তুমি বসু, মানে তুমি সাধারণ মানুষ। আর উনি আইএএস, উনি সায়েব—তাই বাসু।'
ভদ্রমহিলা কথা শেষ করে একটু চুপ করে থাকলেন। বললেন, 'কি মেঘ আর বাঁশির কথা বলতে হবে?'
আক্কেলের মাথা ভেতর টং-টং করছে। কী ডেঞ্জরাস মহিলা! ভদ্রমহিলা!
'কোনও কথা বলছ না যখন মৌনতা ধরে নিলাম সম্মতির লক্ষণ। তবে শোনো, মেঘ আর বাঁশির কথা বলি। ওরা দুজনে তোমার ঠিক বন্ধু নয়। ওরা তোমার গুণমুগ্ধ। যমজ ভাইবোন। আগে তোমাদের পাড়াতেই থাকত। তোমাকে আকিদা বলে ডাকে। আর বাঁশিকে ফলো করার যে ব্যাপারটা ঘটেছিল, সেটা ঘটেছিল মূলত ওর বাবাকে নিয়ে একটা চরম জটিলতা থেকে। সেই জটিলতা থেকে বাঁশি মনে-মনে ওর বাবাকে খুঁজত। রাস্তায় কোনও মানুষের মধ্যে ও পছন্দের কিছু পেলে ও বাবার ছায়া দেখতে পেত। তুমি আমার কাছে বিষয়টা ব্যাখ্যা করলে মনের ভুল। আমি কিন্তু বিষয়টিকে ভুল ভাবিনি। বরং ঠিক ভেবেছি। সত্যিই ওকে কেউ অনুসরণ করত। আমি যদি বলি বাঁশির মনই বাঁশির পিছু নিয়েছিল। নিজের মনের মতো অনুসরণকারী আর কেউ আছে না কি?'
কথা থামিয়ে ভদ্রমহিলা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন। আক্কেলের কানের ভেতর কেউ যেন গরম তেল ঢেলে দিয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আক্কেল আর থাকতে পারল না, বলল, 'হ্যালো।'
'হ্যাঁ আমি ফোন ছাড়িনি। তুমি বুঝতেই পারছ এইসব খবর সংগ্রহ করার জন্যে আমাকে কতটা খাটতে হয়েছে। আমি বৃথা তোমার ওপর চটিনি।'
আক্কেলের চোয়ালে শক্ত হয়েছে, সারা গা চিড়বিড় করছে, বলল, 'বুঝতে পারছি আপনার অনেক খরচ হয়ে গেছে, কোনও প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিকে নিশ্চয় বলেছিলেন। তা আপনি তাদেরই বলছেন না কেন কোনও ঠান্ডা মাথার খুনি খুঁজে দিতে?'
ভদ্রমহিলা হাসলেন, বললেন, 'না, তোমার বুদ্ধি আরও পাকা হওয়া দরকার। এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি অন্যের সমস্যা সমাধান করবে কী করে! না, না, তুমি কাগজে ক্ষমা চেয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে দাও। আরে বাবা এগুলোর খোঁজ নিতে আমাকেই বেরুতে হয়েছিল। প্রথমে তোমার জন্যে। পরের ওই যমজ ভাইবোন দুটির জন্যে। ওদের মা দেখলাম ডাক্তার। গাইনি। সরকারি হাসপাতালে আছেন। প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন না। কথা বলেছি। বেশ শক্ত মহিলা। তোমাদের সবারই বাবা-মা বেশ শক্ত ধরনের। আলগা নয়। তাতে একটা জিনিস হবে, তোমরা হঠাৎ অন্যায় করতে পারবে না। কেন না অন্যায় করার প্র্যাকটিস তোমাদের মধ্যে নেই। তবে হ্যাঁ, তোমার মেঘ কিন্তু বড় আবেগপ্রবণ। তোমাকে কতটা সাহায্য করতে পারবে জানি না, তবে গুলিয়ে দিতে পারবে। এ বিষয়ে নিশ্চিত। নাও, ভালো অ্যাসিসটেন্ট যত দিন না পাচ্ছ ওকে দিয়েই কাজ চালিয়ে নাও।'
'আপনি নিজে যদি আমাদের এত খোঁজ নিতে পারেন, তাহলে একজন ঠান্ডা মাথার খুনি কেন খুঁজে নিতে পারছেন না?' আক্কেলের কথায় এবার বেশ ঝাঁঝ ফুটে উঠল।
'কে বলল খুঁজে নিতে পারছি না? আসলে ওটা আমি খুঁজব না। আমি তোমাকে খুঁজেছি। তুমি খুনি খুঁজবে—সব কিছু কি একা হাতে করা যায়, না ভালো দেখায়? কাজ ভাগ করে নিতে হয়। সবাই করে কম্মে খাক!' ভদ্রমহিলা খুব শান্ত স্বরে কথাগুলো বললেন।
আক্কেলের বুকের ভেতর রাগ গরগর করছিল।
ভদ্রমহিলা আরও শান্ত গলায় বললেন, 'তাহলে কী ঠিক করলে, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্ষমা চাইবে, না কি আমার কেসটা নেবে?'
আক্কেল নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল, বলল, 'আপনি আমাকে না খুঁজে কোনও গুন্ডা-মস্তানকে ধরতে পারতেন, ওদের কাছে ব্যাপারটা ইজি ছিল। আপনার কাজ সহজে হয়ে যেত।'
'হত না। ওদের কাছে কোনও খুনই ঠান্ডা মাথার নয়। ওরা কেউই একা খুন করে না। ওদের পিছনে পাওয়ার কাজ করে। পাঁচজন জানেও। জেনে চুপ করে থাকে। বরং ওদের থেকে কোনও পুলিশকেও কাজে লাগাতে পারতাম। ওদের কাছে প্রচুর খুনির সন্ধান থাকে। কিন্তু আমি একজন ফ্রেশ খুনি খুঁজছি। যে পুলিশের হাতে ধরা পড়েনি। সবার চোখে ধুলো দিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখতে পেরেছে। অথবা কোনও খুন করবে বলে ঘুঁটি সাজাচ্ছে।'
ভদ্রমহিলা থামেন। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বলেন, 'কাজটা নিলে তোমার বাড়িতে অ্যাডভান্সের টাকা পৌঁছে যাবে। তোমাকে আমি ভাবার জন্য আরও এক সপ্তাহ সময় দিচ্ছি। সাত দিনের মধ্যে তুমি ইয়েস নো জানাবে। ইয়েস হলে ফেসবুকে তোমার প্রোফাইল পিকচারটা চেঞ্জ করে একটা পাখির ছবি দেবে। আর নো হলে একটা মুখোশ টাঙাবে। তোমার প্রোফাইলের ছবি দেখেই আমি তোমাকে ফোন করব।'
'যদি না বলি।'
'কাগজে ক্ষমা প্রার্থনা করা বিজ্ঞাপনের বয়ান লিখে রাখবে, সেটা শুনিয়ে আমার থেকে কারেকশন করে নেবে। ভাবো, ভাবো। সাতদিন সময় পেলে ভেবে ফেলো। আমার কিন্তু তোমার ওপর বিশ্বাস আছে। আমার মন বলছে— তুমি পারবে। সাহস করে কেসটা নিয়েই ফেলো। হার-জিত তো আছেই। অনেস্টলি চেষ্টা করেই দেখো। খালি ব্রেন, সেটাকে কাজে লাগালে—। তুমি যদি কেসটা নাও আমি তোমাকে একটু আধটু হেল্পও করতে পারি। আগে তুমি ভেবে নাও, কাজটা তুমি নেবে কি না।'
ফোনটা কেটে গেল।
আক্কেল ফোন ছেড়ে দেখল নটা ঊনচল্লিশ। মানে আজ সাঁইত্রিশ মিনিট। সাঁইত্রিশ প্লাস সাঁইত্রিশ। চুয়াত্তর। এক ঘণ্টা চোদ্দো মিনিট!
মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক। মণিমারও ঠিক এটাই হল। হরিদ্বার মুসৌরি বেড়াতে গিয়ে কী কিনবে, কী কিনবে করে তার একমাত্র আদরের পোষা ছানা আক্কেলের জন্য একটা ব্ল্যাংকেট কিনে ফেলেছিল। নরম তুলতুলে লোমের। গায়ে ফেললে শুধু গরম আছে, ওজন নেই। মণিমার এই ব্ল্যাংকেট কেনা দেখে দিব্যসুন্দর বাসু বেশ অর্থবহ হেসেছিল, বলেছিল, 'এই কম্বল ওকে গিফট করলে ও আরও কুঁড়ে হয়ে যাবে।'
'ও মোটেই কুঁড়ে নয়। আপনি ওকে সব সময় বড় ভুল ব্যাখ্যা করেন।'
'তাহলে ঠিক ব্যাখ্যা কী?'
'ঠিক ব্যাখ্যা হল, এক-একজন এক-একরকম। ও আপনার মতো নয়।'
'আচ্ছা আমি কি ঠিক?'
'আপনি মনে করেন আইএএস হওয়াটা আক্কেলের প্রধান কাজ হওয়া উচিত ছিল। সেটা হচ্ছে না যখন, ওর অন্তত বিসিএস হওয়া উচিত।'
'কিন্তু কম্বলটা যে মুড়ি দিয়ে পড়ে আছে তার কী হবে?'
'আপনি কম্বল কম্বল করবেন না, ওটা ব্ল্যাংকেট।' গম্ভীর মুখে কথাটা জানিয়ে মণিমা আক্কেলের ঘরের সামনে এসে দেখল, হাতে ব্রাশ আর পেস্ট নিয়ে খুব গম্ভীর মুখে ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটু আগে দেখেছিল, আধশোয়া হয়ে ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছিল। ঘুম থেকে উঠে ছেলেটা হঠাৎ এমন অস্থির হয়ে ঘুরছে কেন?
মণিমা বলল, 'উঠেছিস, আমি চা দিতে বলছি।'
'চা দাও। আর শোনো, লুচি আর তরকারি একটু বেশি করে কোরো এক্ষুনি বাঁশি আর মেঘ আসছে।'
'সে আসুক। কিন্তু কারও কি কিছু হয়েছে? তোকে কেমন যেন লাগছে।'
'না, তেমন কিছু নয়। আসলে একজন আমাকে বোকা, আর অপদার্থ ঠাওরাচ্ছে।'
'সর্বনাশ! তা সে কী কোনও মেয়ে।'
আক্কেল চোখ বড় বড় করে তার মণিমার দিকে তাকায়, বলে, 'মেয়ে নয় মহিলা। ভদ্রমহিলা।'
'ও মেয়ের মা। তা মেয়েটি কী বলছে? সে-ও কি তার মায়ের মতো তোকে বোকা আর অপদার্থ ভাবছে?'
মণিমার কথায় আক্কেল মাথায় হাত দিল, 'উঃ মণিমা, তুমি কি একটা ব্যাপার ছেড়ে বেরুতে পারবে না! শোনো ওসব কিছু না। এটা কাজের জায়গা। আমার এক ক্লায়েন্টের কাজ আমি করব না বলেছি, তাই শুনে তিনি আমাকে অপদার্থ বলে দিলেন।'
'কোন ক্লায়েন্ট—সেই ভদ্রমহিলা নাকি? ভারী অন্যায় করেছেন, তোর উচিত ওঁকে একটা মুখের মতো জবাব দেওয়া।'
'জবাব দেওয়া মানে কাজটা আমায় নিতে হবে।'
'আমিও তাই বলি, কাজটা নিয়ে নে। উনি যখন এতই ধরেছেন তোকে—।'
একটু পরে মেঘ আর বাঁশি এসে হাজির হল।
মেঘ খুব উত্তেজিত। বাঁশি এসেই বলল, সে কিছু খাবে না। খেয়ে এসেছে। মেঘ বলল, আমি খাব। সে খুব দ্রুত এক প্লেট লুচি আর আলুর তরকারি নিয়ে বসে গেল। প্রথম দিন থেকেই মেঘ ঠান্ডা মাথার খুনি খুঁজে দেওয়ার ব্যাপারটায় বেশ থ্রিলড। ও রাজি। কিন্তু বাঁশি বেশ সতর্ক, বলল, 'ব্যাপারটা আমার ভালো ঠেকছে না। প্রথমত, আমার খুন-খারাপির মধ্যে থাকার কোনও ইচ্ছে নেই। এই সব খুনি-খুন শুনলেই আমার শরীরের ভেতর কেমন করে। রক্ত মানেই গা গুলিয়ে ওঠে। এর থেকে আমাদের বিপদও হতে পারে। যেমন, উনি যদি সেই খুনির সাহায্যে কোনও খুন করেন, এবং ধরা পড়েন, তাহলে কিন্তু আমরাও জড়িয়ে পড়ব।'
মুখে লুচি ঠেসে মেঘ বলল, 'বাঃ, আমরা জড়িয়ে পড়ব কেন?'
'যে অস্ত্র সাপ্লাই দেয় পুলিশ তাকেও ধরে। আমরা সেই কাজটাই করছি। আমরা হিসেব মতো কাউকে খুন করার জন্যে ওই শয়তান বুড়ির হাতে একটা জীবন্ত অস্ত্র তুলে দিচ্ছি। অর্থাৎ আমরা অপরাধী।'
আক্কেল বলল, 'এখনই ভদ্রমহিলাকে শয়তান বুড়ি হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।'
মুখ খালি হলেও মেঘের মুখটা ঝুলে গেল। বলল, 'একটা মাত্র কেস এল—আর সেটাই বড় জটিল।'
বাঁশি বলল, 'আর দ্বিতীয় বিষয়টা হচ্ছে, ব্যাপারটা খুব কঠিন। শুধু খুনি বললে চেষ্টা চরিত্র করে কয়েকজনের ফোন নম্বর এনে দেওয়া যায়। কিন্তু যে ধরা পড়েনি, কিন্তু সন্দেহজনক, পুলিশ গোয়েন্দার জাল কেটে বেরিয়ে গেছে এমন একজনকে পাওয়া বেশ কঠিন।'
আক্কেল বলল, 'কঠিন বলেই তো উনি কেসটা আমাদের দিতে চাইছেন। টাকাও দেবেন। এমনকী অনেস্টলি চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও উনি অ্যাডভান্সের টাকা ফেরত নেবেন না। তা ছাড়া, মেঘ বিজ্ঞাপন দেওয়ার পর একটাও ফোন আসেনি। একমাত্র উনি ফোন করেছেন। তা ছাড়া উনি বেশ হোমওয়ার্কও করেছেন আমাদের নিয়ে?'
'হোমওয়ার্ক মানে?' বাঁশি বেশ তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করল।
আক্কেল সকালের ভদ্রমহিলার খোঁজখবর নেওয়ার কথাগুলো বলতে গিয়েও বলল না। ওর মনে হল, এ সব কথা শুনলে বাঁশি আরও ঘাবড়ে যাবে।
মেঘ বলল, 'হ্যাঁ, কী হোমওয়ার্কের কথা বলছিলে আকিদা?'
'হোমওয়ার্ক মানে, ওই আরকি? উনি বলছিলেন, প্রয়োজনে আমরা ওঁর কাছ থেকেও হেল্প নিতে পারি? উনি আমাদের সাহায্যও করবেন।'
'বাঃ দারুণ তো! উনি কেস দিলেন, টাকাও দেবেন, আবার হেল্পও করবেন বলছেন...। আর কী চাই...।' মেঘ বেশ উচ্ছ্বসিত।
আক্কেল বলল, 'আমারও মনে হচ্ছে দারুণ। আচ্ছা, আমরা যদি ওঁকে বলি—বাঘের দুধ বললে সুন্দরবনের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করা যায়। অথবা চিড়িয়াখানায় যারা বাঘের দেখভাল করে তাদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করা যায়। কেন না ওখানে বাঘ আছে, তেমন ঠান্ডা মাথার খুনির জন্য কোথায় যাব? উনি আমাদের সেই জায়গার হদিশ দিক। এটা এক নম্বর।'
'আর দ্বিতীয় নম্বরটা?' তীক্ষ্ণ গলায় বাঁশি বলল।
'উনি আমাদের কথা দেবেন—ওই খুনিকে দিয়ে কোনও খুন করানো চলবে না।'
'যা বাব্বা! উনি খুনি খুঁজছেন খুন করাবেন বলেই। কেউ ছুরি কিনে সাজিয়ে রাখে না, সুযোগ হলেই ব্যবহার করে।' বাঁশি বলল।
'সবাই ছুরি দিয়ে হত্যা করে না, জন্মদিনের কেকও কাটে, এটা ভুলছিস কেন?'
বাঁশি ঠোঁট ওলটাল, 'উনি আমাদের এই শর্ত মানবেন কেন?'
'না মানলে, আমরা করব না। তাতে উনি আমাদের অপদার্থ বলতে পারবেন না। কাগজে ক্ষমা চেয়ে বিজ্ঞাপনও দিতে বলবেন না।'
'ঠিক কথা।' মেঘ প্লেট চাটতে চাটতে ঘাড় নাড়ল। 'ক্ষমা চেয়ে বিজ্ঞাপন দিলে—ব্যাপারটা খুব প্রেস্টিজের হবে।'
'কী করব তাহলে, আমি কি ফেসবুকে প্রোফাইল চেঞ্জ করব পাখির ছবি দেব?' আক্কেল বেশ চিন্তান্বিত গলায় বলল। 'আর যদি না হয় তবে আমার প্রোফাইল পিকচার হিসেবে একটা মুখোশ টাঙাতে হয়।'
'দাও পাখির ছবি দিয়ে দাও।' বাঁশি বলল।
'তাহলে উনি ফোন করবেন। ফিফটি পারসেন্ট টাকা অ্যাডভান্স পাঠিয়ে দেবেন।'
'আমাদের ফিজ কত?' মেঘ বলল।
'কত করা যায়?' আক্কেল বলল।
'টোয়ন্টি থাউজেন্ড।' বাঁশি বলল।
বাঁশির কথায় মেঘ আঁতকে উঠল। বলল, 'অত টাকা শুনেই উনি পালিয়ে যাবেন। না, না, কম করো।'
বাঁশি বলল, 'থোড়ি উনি একদামে রাজি হবেন। মহিলা ক্লায়েন্ট—দরাদরি করবেনই। আরে আমি তো জানি মেয়েদের স্বভাব। তখন নয় বুঝেসুঝে কম করা যাবে।'
আক্কেল বলল, 'না, আমরা কেসটা নেব। কিন্তু আপাতত কোনও ফিজ নেব না। বলব, কাজের প্রোগ্রেস দেখে জানাব।'
'ওকে।' বাঁশি বলল। 'তাহলে ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারে পাখির ছবি বসিয়ে দাও। উনি গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে যাবেন।'
ওরা চলে যেতে আক্কেল ল্যাপটপ খুলে নিজের প্রোফাইলে একটা কাকের ছবি দিল। কাক একটা পাখি হল! এটা বাঁশির কথা।
ছবি দেওয়ার ঘণ্টাখানেক পরে ফোন করলেন ভদ্রমহিলা। বললেন, 'থ্যাঙ্ক ইউ, আমার প্রপোজাল তাহলে অ্যাকসেপ্ট করলে। সেই সঙ্গে আরও ভালো লেগেছে, পাখি হিসেবে তোমার কাককে পছন্দ করাটা। কাক খুব বুদ্ধিমান পাখি। ঠিক আছে তোমার বাড়িতে টাকা পৌঁছে যাবে।'
টাকাটা কী আপনার হাতে-হাতে দিতে অসুবিধে আছে? তা হলে সামনাসামনি ক'টা কথা বলে নেওয়া যেত?'
ভদ্রমহিলা হাসলেন, বললেন, 'তুমি আমাকে সামনাসামনি দেখতে চাইছ তাই তো। শোনো এতে আমার একটু অসুবিধে আছে। আমি আমার পরিচয় গোপন করতে চাই।'
আক্কেল বলল, 'আমরা এখনই কোনও টাকা নিতে চাই না। আগে কাজ শুরু করি, তারপর...।'
'না, অ্যাডভান্স নিতে হবে এটাই শর্ত। টাকা না নিলে তোমাদের কাজে গরজ থাকবে না।'
আক্কেল বলল, 'তাহলে আমারও দুটো শর্ত আছে। এক নম্বর, আমাদের খুঁজে দেওয়া ঠান্ডা মাথার খুনিকে দিয়ে আপনি কোনও খুন করাতে পারবেন না।'
'আর দু-নম্বর?' ভদ্রমহিলা গলা আগের থেকেও গম্ভীর হল।
'দু-নম্বর হল, আপনি বলেছিলেন প্রয়োজনে হেল্প করবেন। আপনাকে একটু সাহায্য করতে হবে। বলতে হবে—সেই ঠান্ডা মাথার খুনিকে পাওয়ার সম্ভাব্য জায়গা কোথায়?' খুব নির্বিকার গলায় কথাটা বলে আক্কেল একটু থামল। বলল, 'আমার কথা মনে হয় আপনি ঠিক বুঝতে পারলেন না। ধরুন যদি পাত্র বা পাত্রী চান, তাহলে আপনি ম্যাট্রিমনিয়াল সাইটে বা খবরের কাগজে পাত্র চাই, পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন দেখবেন। যদি বাঘের দুধ চান, তবে আপনি সুন্দরবন বা চিড়িয়াখানায় গিয়ে খোঁজ নেবেন। তেমন এক্ষেত্রে আমি ঠান্ডা মাথার খুনি খুঁজতে কোথায় যাব? আমাকে যদি সম্ভাব্য কোনও জায়গার হদিশ দিতে পারেন।'
ভদ্রমহিলা হাসলেন, 'পাত্র-পাত্রী ও বাঘের দুধের উদাহরণ দিলে। আমিও তোমাকে দুটো ভিন্ন উদাহরণ দিতে পারি। এই যেমন, এক নম্বর জয়নগরের মোয়া, দুই নম্বর কাটোয়ার ডাঁটা। এগুলো পেতে কিন্তু কাউকে আর জয়নগর বা কাটোয়ায় দৌড়াতে হবে না। যেখানে খুশি পাবে।' ভদ্রমহিলা হাসলেন, বললেন, 'ছাড়ো ওসব কথা, একটা অন্য উদাহরণ দিই। তোমাকে আমি যদি বলি ঈশ্বর চাই। আমি তোমাকে ঈশ্বরের খোঁজও দিচ্ছি। তোমাকে যদি মন্দির, মসজিদ বা গির্জা দেখিয়ে দিই—পারবে তাকে আনতে?'
ভদ্রমহিলা আবারও হাসলেন বললেন, 'তোমার ক্ষমতা থাকলে তুমি বাড়িতে বসেই একজন ঠান্ডা মাথার খুনিকে খুঁজে বের করতে পারবে। আবার উলটো দিকে আমি যদি তোমাকে মন্দির মসজিদ বা গির্জা দেখিয়েও দিই তাহলেও তুমি ঈশ্বরকে ধরে আনতে পারবে না। বুঝলে আমার কথা?'
আক্কেল বলল, 'আপনার কথা শুনে যা বুঝলাম আপনি দ্বিতীয় ব্যাপারটায় কোনও হেল্প করতে পারবেন না। আর প্রথম যেটা বললাম, সেটার ব্যাপারে কী বলবেন?'
'তোমার খুঁজে দেওয়া খুনিকে দিয়ে আমি খুন করাব না তাই তো? ঠিক আছে করাব না। ইনফ্যাক্ট আমি ওকে দিয়ে খুন করাতামও না। আমার আসলে বুদ্ধিটা চাই। প্ল্যানিং। ব্যস আর কিছু না। আমি সব কাজ অন্যকে দিয়ে করাতে ভালোবাসি না। নিজে হাতে কিছু কিছু কাজ করার মজাই আলাদা। তোমার প্রথম পয়েন্টটা নিয়ে কোনও সংশয় আর থাকল না। এবার দ্বিতীয় পয়েন্ট, তাই তো? ঠিক আছে আমাকে একটু সময় দাও, আমি তোমাকে ঠান্ডা মাথার খুনি কোথায় পাওয়া যেতে পারে তার একটা হদিশ দেব। এবং চেষ্টা করব সেখানে তোমাকে পৌঁছে তত্বতালাশ করার সুযোগ করে দিতে।'
ভদ্রমহিলা থামলেন। বললেন, 'কী খুশি তো? গুড লাক। এসো আজ এখন থেকে আমরা কাজ শুরু করে দিই।'
মনোহরগঞ্জে যখন ট্রেন থামল, ঘড়ির কাঁটা তখন একটা ছুঁই ছুঁই।
আক্কেল আর মেঘ ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনে দাঁড়াল। ওদের সঙ্গে যারা নেমেছিল তারা সব দ্রুত স্টেশনের বাইরে যাওয়ার রাস্তা ধরল। মেঘ কাঁধে ব্যাগ নিয়ে কোমরে হাত দিয়ে চারদিক দেখল, বলল, 'লোক থাকবে—তারা কোথায়, ফোন নম্বর আছে আকিদা, একটা ফোন লাগাও।'
আক্কেল বলল, 'তারা এসে গেছে। আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে, ভালো করে দেখ।'
'কোথায়?—আমাদের নিতে এসেছে?'
আক্কেল ঘাড় নাড়ল। একজন পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছরের বেশ লম্বা শক্তপোক্ত চেহারার লোক। পরনে সাদা নীলের স্ট্রাইপড হাফ শার্ট, আর কালো প্যান্ট। গোঁফ দাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে কাটা। তার পাশের লোকটি অপেক্ষাকৃত বেঁটে। আধময়লা ছাই ছাই রঙের একটা হাফ শার্ট পরে, সে চারদিকে খুব চঙমঙ করে দেখছে।
আক্কেল বলল, 'আকিদা ওরা আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।'
'আসতে দে।' সত্যি সত্যি সেই দুজন মানুষই এসে আক্কেল আর মেঘের সামনে দাঁড়াল। লম্বা ভদ্রলোক বললেন, 'আপনারা কি কলকাতা থেকে আসছেন? আক্কেল বসু?'
আক্কেল হাত তুলে নমস্কার করল, বলল, 'আমি। আপনি নিশ্চয় অশ্বিনীবাবু?'
'হ্যাঁ, আমি অশ্বিনী, অশ্বিনী সরকার, আপনি ঠিক চিনেছেন।'
'চেনার কিছু নেই, আমাকে বলা হয়েছিল আপনিই আসবেন।'
অশ্বিনীবাবু হাসলেন বললেন, 'এ আমাদের ড্রাইভার সুরেশ। চলুন, তা হলে আমরা রওনা দিই।'
আক্কেল বলল, 'এ আমার বন্ধু। এর নাম মেঘ।'
অশ্বিনীবাবু মাথা ঝোঁকালেন। বললেন, 'বাইরেই গাড়ি আছে, বেশিক্ষণ না মিনিট কুড়ির পথ।'
স্টেশনের সামনে বেশ অনেকটা জায়গা। তারপর সার সার বড় বড় গাছ। সেই গাছের তলায় গাড়ি রিকশা সাইকেল, যে যার মতো খুব শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে। অন্য জায়গার মতো প্যাসেঞ্জার নিয়ে কামড়াকামড়ি নেই। 'মানতাসা! মানাতাসা!' বলে একটা বাচ্চা ছেলে তারস্বরে চিৎকার করে যাচ্ছে।
'মানতাসা এখান থেকে কত দূর?' মেঘ বলল।
'দেড়ঘণ্টার রাস্তা।' অশ্বিনীবাবু কিছু বলার আগেই আক্কেল বলল।
সুরেশ গাড়ি স্টার্ট দিল।
গাড়ি একটু এগোতেই স্টেশনের বাইরে দেখা গেল বড় বড় করে লেখা রেস্ট রুম।
ওদিকে তাকিয়ে মেঘ বলল, 'রেস্ট রুম!'
অশ্বিনীবাবু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন তার আগে আক্কেল বলল, 'এটা ট্রেনের গার্ডদের রেস্ট নেওয়ার জায়গা। মনোহরগঞ্জটা পুরোপুরি একটা রেল কলোনি।'
আক্কেলের দিকে তাকিয়ে অশ্বিনীবাবু বললেন, 'এদিকে আগে এসেছেন নাকি?'
'না। তবে এর ওপর দিয়ে অনেকবার গেছি।'
'হ্যাঁ, খুব বড় জংশন এটা। রেল কলোনি। এখানে যারা বসবাস করে তাদের পরিবারের কেউ না কেউ রেল কোম্পানির সঙ্গে কাজেকর্মে জুড়ে ছিল। রেল কোম্পানির সঙ্গে জড়িত মানুষরাই এদিকে জীবিকার তাগিদে আস্তানা গেড়েছিল। পরে তারা এ জায়গাটা ভালোবেসে থেকে যান। তারা সব বংশপরম্পরায় আছে আর কি! আর আছে এদিককার কিছু আদিবাসী। সংখ্যায় তারা খুব কম।'
'আপনার পরিবারেরও কেউ রেল কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?' আক্কেল বলল।
'না, আমার পরিবারের কেউ সরাসরি রেল কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিল না। তবে পরোক্ষভাবে তো ছিলামই। আমার চাকরি করতেই এখানে আসা। আমি যাঁর ম্যানেজারি করতাম, কমলিকা দেবীর হ্যাজব্যান্ড, তিনি ছিলেন রেল কোম্পানির বড় মাপের ঠিকাদার। সেদিক দিয়ে দেখলে আমিও রেলের সঙ্গে যুক্তই ছিলাম।'
'শুনেছি শ্রমিক থেকে জিনিসপত্র অনেক কিছুই উনি সাপ্লাই করতেন।'
'আপনি সবই তো জানেন দেখছি। হ্যাঁ, বড়দা, মানে কিরণশংকরবাবু বেঁচে থাকতে ব্যবসা খুব বড় ছিল। ওই ব্যবসারও অনেক কিছুই আমি সামলাতাম। বড়দার অবর্তমানে, বউদিকে নিয়ে ব্যবসার হাল আমিই ধরেছিলাম। কিন্তু সে ব্যবসা আর থাকল না। এখনও এই পরিবারের সঙ্গে জুড়ে আছি আর কি! পুরোপুরি মজুমদার পরিবারের ম্যানেজার। আজ বত্রিশ বছর এই পরিবারের সঙ্গে জুড়ে আছি। বড়দা মারা যাওয়ার পর আমাকে অনেকটা দেখতে হয়।'
হঠাৎ মেঘ বলল, 'আমরা কি কমলিকা মজুমদারদের বাড়িতে যাচ্ছি...।'
'হ্যাঁ, শংকর নিবাস। এখানে আলাদা করে তেমন ভালো হোটেলপত্র নেই। তা ছাড়া বউদি চান আপনারা শংকর নিবাসেই থাকুন। ওখানে থাকার জায়গা অঢেল, আপনাদের কোনও অসুবিধে হবে না।'
হঠাৎ আক্কেল বলল, 'উনি এখন ঠিক আছেন?'
আক্কেলের প্রশ্নটা শুনেই যেন সুরেশের হাত স্টিয়ারিঙে কেঁপে গেল। নড়ে উঠল গাড়িটা। ও একটু ঘাড় ফেরানোর চেষ্টা করেও ফেরাল না।
অশ্বিনীবাবু বললেন, 'ওঁর ওপর হামলা হয়েছিল একটা—কিন্তু এখন একদমই ঠিক আছেন।'
'বেশ তাড়াতাড়ি সামলে উঠেছেন তাহলে, ভালো!'
অশ্বিনী সরকার কোনও কথা বললেন না। একটুখানি চুপ করে থাকলেন, বললেন, 'ব্যাপারটা কিন্তু মিটে গেছে।'
'মিটে গেছে বলতে?'
'অনেকে মনে করেছেন, আমার ছেলে...হীরক, এ কাজটা করেছে।...ওর খুব মাথা গরম, তবু বলছি হীরু এ কাজ করার ছেলে নয়। আর যদি ও করে থাকে, তবে আমি নিজে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে এসেছি বউদির কাছে। আশা করি এখন সব মিটে গেছে।'
'ও যদি না করে থাকে আপনি ক্ষমা চাইলেন কেন? না, না, এটা ঠিক করেননি। এতে হীরকবাবুর খারাপ হল। পরোক্ষে দোষ স্বীকার করে নেওয়া হল।'
'না, ক্ষমা ও চায়নি, আমি চেয়েছি। তাতেই বউদি প্রচণ্ড রেগে গেলেন। তারপরই শুনলাম আপনারা আসছেন। দোষী ধরতে। আপনি পুলিশের লোক! আপনিই বিচার করবেন।' অশ্বিনীবাবু চলন্ত গাড়িতে হাত জোড় করলেন।
আক্কেল বলল, 'না, না, আমরা কেউই পুলিশের লোক নই। আমরা দুজনেই স্টুডেন্ট। সত্যি বলতে কী আমরা এখানে ক'দিন ছুটি কাটাতেই এসেছি।'
অশ্বিনীবাবু নড়ে উঠলেন। কী যেন ভাবলেন, বললেন, 'এই যে শুনলাম, একজন পুলিশের লোক আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসছেন। তবে আপনি পুলিশের লোক নন! দেখুন উনি আমাকে আপনাদের পরিচয় দেননি। শুধু বলেছেন, আপনাদের দেখভাল করতে, যাতে কোনও অসুবিধে না হয়। কিন্তু এ খবরটা রটেছে ঠাকুর-চাকরদের মুখ থেকে। এই বাড়িতে এখন এটা নিয়েই ফিসফিস চলছে। কলকাতা থেকে দুজন জাঁদরেল সিআইডির লোক আসছে।'
অশ্বিনীবাবুর কথা শুনে মেঘ ফিক করে হেসে ফেলল, বলল, 'সিআইডি! বাব্বা এ তো গল্পের গরু চাঁদে!'
অশ্বিনীবাবু বললেন, 'এমনভাবে খবরটা রটেছে যেন আপনারা এসেই ওকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাবেন। আপনারা জানেন না কী দুঃসহ অবস্থার মধ্যে আমরা দিন কাটাচ্ছি। এখানে কাজ ছেড়ে যে চলে যাব সে অবস্থায় নেই, গেলে আরও দোষের ভাগীদার হব। তবে হ্যাঁ, আর এখানে থাকব না। এবার এখানকার মায়া কাটিয়ে আমরা চলেই যাব।'
'কোথায় যাবেন?'
'অন্য কোথায় আর যাব? এখানেই কাছাকাছি কোথাও থাকব। সত্যি বলতে কী এই জায়গায় চল্লিশ বছর ধরে আছি। এখানেই কোথাও একটা কিছু খুঁজে নেব। যা টাকাপয়সা জমানো আছে তাতে বাদবাকি জীবনটা চলে যাবে।'
'কেন আপনার ছেলেও তো আছে।'
'আমি ছেলের আশা করি না। বরং বলতে পারেন মেয়ের ভরসা অনেকটা করি। থাক আমাদের কথা। তা আপনারা ক'দিন থাকবেন? এখানে সে অর্থে দেখার কিছু নেই। যা আছে তা ওই মানতাসা ফলস। কিন্তু ওদিকে মাওবাদীদের খুব উৎপাত। রিস্ক আছে। যদি যেতে চান, আমার একজন ভালো লোক আছে ব্যবস্থা করে দেব। আশা করি অসুবিধে হবে না।'
আক্কেল হাসল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, এসেছি যখন ঘুরে যাব নিশ্চয়ই। আমরা ঘুরতেই তো এসেছি।'
অশ্বিনীবাবু বললেন, 'আর আছে রঞ্ঝা আর সঞ্ঝা নদী। রঞ্ঝা দিদি আর সঞ্ঝা ছোট ভাই। রঞ্ঝা নদীকে আপনি এখানে দেখতে পাবেন। কিন্তু সঞ্ঝাকে খুঁজে পাবেন না। সঞ্ঝা বড় দুখী নদী, এখানেই পাক খেতে খেতে মনোহরগঞ্জের কোথায় হারিয়ে গেছে। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কয়েকটা মরা চর, তার সাক্ষী বহন করে আছে। নিন আমরা এসে গেছি।'
শংকর নিবাস বেশ বড় বাড়ি। বাইরে থেকে দেখলেই বোঝা যায় এক সময় এই বাড়ির প্রভাবপ্রতিপত্তি ছিল খুব। বড় গেটটা ধরেই উঁচু পাঁচিল চলে গেছে টানা। সারা বাড়িটাকে পাক দিয়ে ঘিরেছে। পাঁচিলটা সাধারণ পাঁচিল থেকে অনেকটা উঁচু। তার ওপর লোহার জালি তার দিয়ে ঘেরা। সামনে বিশাল লোহার গেট।
গেটের সামনে এসে সুরেশ দাঁড়িয়ে পড়ল। অশ্বিনীবাবু গাড়ির দরজা খুলে লাফিয়ে নামলেন। কিন্তু তার আগেই গেট খুলে গেল। অশ্বিনীবাবু আর গাড়িতে উঠলেন না। বললেন, 'আপনারা যান, আমি আসছি।'
অশ্বিনীবাবু নামতেই সুরেশ যেন কথা বলার সুযোগ পেল। গাড়িটা একটু এগিয়ে সে বলল, 'আপনারা পুলিশ মাফিক নেহি। আমার দেখেই মালুম হয়েছিল। এ-দারবান জগৎ সিং বহুত ডরপুক—পুলিশ লাগছে, সিআইডি লাগছে বলে ক্যায়সা হল্লা মাচাল।'
মেঘ ফিসফিস করল, 'পুলিশ সিআইডি বললে বহুত খাতির পাওয়া যেত আকিদা।'
'তারপর লোকাল পুলিশ এসে গুঁতো দিলে—তখন কে ঠেলা সামলাত?' আক্কেল বলল।
'কেন তোমার বাবা—আইএএস দিব্যজ্যোতি বাসু!'
সাজানো বাগান পেরিয়ে ওদের গাড়ি এসে থামল বাড়ির পোর্টিকোতে। গাড়ি থেকে নামতে-নামতেই অশ্বিনীবাবুও এসে পড়লেন। বললেন, 'আপনাদের ঘর ওপরে, চলুন, আপনাদের ওপরে নিয়ে যাই।'
অশ্বিনীবাবুর সঙ্গে আক্কেল আর মেঘ ওপরে উঠল। পুরনো বাড়ি। কিন্তু সারা বাড়িটা সাজানো গোছানো ঝকঝক করছে। সিঁড়িগুলোর পাথরে বিচিত্র নকশা করা। দোতলার টানা লম্বা বারান্দায় হাঁটতে-হাঁটতে মেঘ নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছিল মার্বেলে। বারান্দার দেওয়ালে বড় বড় ছবি টাঙানো। হরিণের সিং আছে দেওয়ালে লটকানো।
মেঘ বলল, 'এদিকে হরিণ আছে নাকি?'
'হরিণ আছে। এক সময় হিংস্র প্রাণীও ছিল। এখন মাঝে-মাঝে লেপার্ড বের হয় আশেপাশে। ছাগল ভেড়া টেনে নিয়ে যায়।'
দেওয়ালের একটা জায়গা খালি। ওপর দিকে লোহার আংটা আছে, নীচে বাহারি কাজ করা তিনপায়ার টেবিল। জায়গা কেমন খালি খালি। বেশ স্পষ্ট ওখানে কিছু একটা ছিল। এখন নেই। মেঘ বলল, 'এখানে কিছু ছিল, তাই না?'
অশ্বিনীবাবু বললেন, 'হ্যাঁ, হাতির দাঁত। চুরি গেছে। তবে কোণের ওই হাতিঘরে এখনও দুটো হাতির দাঁত আছে। সময় করে দেখবেন, ওগুলোও খুব বড়!'
সামনের ঘরটা দেখিয়ে অশ্বিনীবাবু বললেন, 'আপনারা এই ঘরটায় থাকবেন। আসুন।'
বিশাল ঘর। তেমনই দামি দামি কাঠের আসবাবে ঘরটা সাজানো। সামনের জানলা দিয়ে বাগান দেখা যাচ্ছে, সবুজ মখমলের মতো ঘাস, আর নানা রঙের ফুলের মেলা।
ওরা ঘরে ঢুকেই দেখল ঘরের ভেতর একজন দাঁড়িয়ে। অশ্বিনীবাবু বললেন, 'এ ঝড়ু। আপনাদের দেখভাল করবে। আপনারা এখন কি কিছু খাবেন?'
'না, শুধু চা।' আক্কেল বলল।
'ঝড়ু চা করে দিচ্ছে। আপনারা চান-টান সারুন। দুপুরে খাবার সময় ঝড়ু ডেকে নিয়ে যাবে।'
আক্কেল বলল, 'কমলিকা দেবী?'
'উনি আপনাদের আসতে দেখেছেন। ওনাকে আমি বলছি, আপনারা ঠিকমতো এসে পৌঁছেছেন। খাবার টেবিলে বউদির সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে।'
ওরা হাতমুখ ধুয়ে নিয়ে দেখল ঝড়ু প্লেট সাজিয়ে খাবার নিয়ে হাজির। চা আছে, সঙ্গে বেশ কয়েকরকম মিষ্টি। ওদের খিদে পেয়েছিল, মেঘ মুহূর্তে দু-তিনটে মিষ্টি খেয়ে ফেলল। খাবার শেষ করে মেঘ বলল,—'আকিদা মনে হচ্ছে দুপুরেও খাওয়ার পর্বটা ভালোই হবে। তা এখন কী করবে? চলো একটু বাড়িটা ঘুরি।'
আক্কেল আড় চোখে ঘরের এক ধারে বসে থাকা ঝড়ুকে দেখল। বলল, 'ঘেরার ইচ্ছে হলে ঘরের মধ্যে হাঁটা চলা কর। বাইরে গিয়ে বেশি ডিটেকটিভপনা করিস না। আমি একটু গড়িয়ে নিই।'
আক্কেল শুয়েছিল। মেঘ জানলার সামনে দাঁড়িয়ে। ঝড়ু ওর দিকে তাকিয়ে বসে আছে। মেঘ বলল, 'আকিদা এ কি আমাদের সঙ্গেই সেঁটে থাকবে!'
হঠাৎ-ই প্রাইভেট নম্বরটা আক্কেলের মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠল। ফোন ধরতেই সেই ভদ্রমহিলার গলা, 'আশা করি তোমাদের কোনও অসুবিধে হয়নি। কমলিকার সঙ্গে দেখা হয়েছে?'
'না, হয়নি।'
'শোনো ওঁকে আমার কথা কিছু জিগ্যেস কোরো না। তোমরা তোমাদের বুদ্ধি অনুযায়ী চলো—আমার জন্য খুনি তোমরা এখান থেকেই পেয়ে যাবে।'
'পেয়ে গেলে কী করব? তাকে হাত-পা বেঁধে পুলিশে দেব? পুলিশ আমাদের কথা শুনবে কেন?' আক্কেল কিছুটা ব্যঙ্গের গলায় কথাটা বলল।
'প্রথমত তোমাদের পুলিশের কাছে যাওয়ার কোনও দরকার নেই। কেন না পুলিশ তোমাদের অ্যাসাইনমেন্ট দেয়নি। দিয়েছি আমি। আমি দরকার পড়লে পুলিশকে বলব। পুলিশ নিয়ে তোমাদের চিন্তা করতে হবে না। তোমরা চোখ-কান খুলে কাজের দিকে ধ্যান দাও।'
ফোন কেটে গেল।
মেঘ বুঝেছে—সেই ভদ্রমহিলার ফোন। মেঘ বলল, 'আমি তোমাকে বেশ ঝামেলায় ফেলে দিলাম না আকিদা?'
আক্কেল কোনও কথা বলল না। এইসব খুন-খারাপির কথা গল্পের বইয়ে পড়া ভালো। সিনেমায় দেখা ভালো। বাস্তব জীবনে মোটেই সুখকর নয়। সারা পৃথিবীতে কত মানুষ কত কিছু খুঁজছে, আর তারা কিনা একটা ঠান্ডা মাথায় খুনি খুঁজে বেড়াচ্ছে। ছিঃ! তাও সেটা কী কাজে লাগবে তারা জানে না। সেই খুনি কি খুন করবে? নাকি 'যেমন খুশি সাজো'-র মতো সেজেগুজে ঘুরে বেড়াবে।
আক্কেল ভেবেছিল, ফোনের ওপারে বৃদ্ধা মহিলাকে সে ভালো চাল দিয়েছে। ওঁকেই বলেছে—ঠান্ডা মাথার খুনি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাব্য জায়গার হদিশ দিয়ে সাহায্য করতে। তারপর সাতদিনও কাটেনি, গতকাল সকালে হঠাৎই প্রাইভেট নম্বর থেকে ফোন এল। বললেন—সম্ভাব্য জায়গা মনোহরগঞ্জ। স্বর্গত কিরণশংকর মজুমদারের বাড়ি। ওঁর স্ত্রী কমলিকার ওপর ক'দিন আগে রাতেই হামলা হয়েছে। কেউ ওঁকে খুন করতে চাইছে। তোমরা ওখানে কালই চলে যাও। কমলিকা তোমাদের সাহায্য করবে। এখনই ওর সঙ্গে কথা বলে নাও।'
আক্কেল বলেছিল, 'কমলিকা মজুমদারের ফোন নম্বর দিন।'
খাবার টেবিলে দেখা হল কমলিকা মজুমদারের সঙ্গে। কত বয়েস হবে ওঁর। বছর ষাটেক। না, তার বেশি নয়। বেশ লম্বা চেহারা, ভারী গড়ন। মুখটাও বেশ ভারী। চোখের কোলগুলো ফোলা ফোলা। মাথার সব চুলই প্রায় সাদা। সাদা চুলের সঙ্গে অফ হোয়াইট কালারের শাড়িটা তাঁকে আরও গম্ভীর করে দিয়েছে। কথা বলার ভঙ্গির মধ্যেও তাঁর বেশ দাপট।
ঝড়ুর সঙ্গে আক্কেল আর মেঘ ঢুকতেই কোনও রকম ভণিতা না করেই কমলিকা ওদের 'তুমি' সম্বোধন করলেন। বললেন, 'তোমাদের আসতে কোনও অসুবিধে হয়নি তো?'
আক্কেল উত্তর দিল না। মেঘ বলল, 'না, না, কোনও অসুবিধে হয়নি।'
খাবার টেবিলে পর পর সবাই বসে। কমলিকা বলল, 'এসো তোমাদের সঙ্গে সবার আলাপ করিয়ে দিই—।'
কমলিকার ডানদিকে বসে বিতান। কমলিকা আর স্বর্গত কিরণশংকরের একমাত্র ছেলে। বয়েস বছর পঁয়তিরিশ। চেহারার ধরনটা গোলগাল মতো। চোখে রেব্যানের চশমা। থাকে কলকাতায়। সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। কিছুদিন হল একটি সফটওয়্যার কোম্পানি খুলেছে। কাজের চাপ প্রচণ্ড। তারমধ্যেই এখানে আসা বেশ চাপের। না এলে মা মনক্ষুণ্ণ হবে, কিছুটা ভয়, কিছুটা ভক্তিতে আসতে হয়েছে। মোদ্দা কথা না এসে উপায় নেই।
বিতানের পাশে বসে ওর স্ত্রী নীলম। দুজনের বয়েসের বেশ তফাত আছে। নীলম নামটা সিনেমার নাম। আগে মডেলিং করত। দু-একটা সিনেমায় অভিনয় করেছে। কিন্তু তেমন ভালো কাজ সে অর্থে পাচ্ছে না। তবে খুব অ্যাম্বিশাস। কমলিকা ওদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার সময় একবারও তাকাল না। ফোন নিয়ে ব্যস্ত। আর মাঝে মাঝেই চুলের ভেতর চিরুনির মতো হাত চালাচ্ছে।
আক্কেল দেখল, নীলম খাবার টেবিলে বসে এভাবে চুল নিয়ে কায়দা করছে বলে দূরে এক মহিলা বেশ বিরক্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে। উনি জয়া। অশ্বিনী সরকারের স্ত্রী।
নীলমের পাশে বসে ওর দাদা অপরূপ চক্রবর্তী। ফিল্ম ডিরেক্টর, প্রডিউসার। পর পর দুটো সিনেমা ফ্লপ। দুটিতেই নায়িকা ছিল নীলম। এখন একটা অসাধারণ গল্প পেয়েছে। এটা যদি নামাতে পারে, ক্যামব্যাক হবেই বলে ওর বিশ্বাস। তবে আপাতত বেশ ক্ষুব্ধ সবকিছুর ওপর। বিশেষত নীলম ও বিতানের ওপর। চোখে-মুখে একটা একরোখা ভাব।
ওর পাশেই বসেছে মেঘ, তারপর আক্কেল।
মেঘ খুব হালকা গলায় নিজের পরিচয় দিল। শুধু নামই বলল। আর কী বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না।
মেঘকে একটু নার্ভাস হতে দেখে আক্কেল নিজের পরিচয় দিল। আমি আক্কেল বসু। কলকাতায় থাকি—। আপাতত এখানে ক'দিন থাকব।
ঠিক এটুকু বলার পরই কমলিকা বললেন, 'আক্কেলের সঙ্গে আমার এক বন্ধুর সূত্রে চেনা-পরিচয় হয়েছে। ওদের আমি ডেকেছি আমার একটি বিশেষ কাজে। ওরা আমাকে সাহায্য করবে। আমি সবাইকেই অনুরোধ করব, ওরা যদি কোনও সাহায্য চায়, কেউ যেন তাতে বিরক্ত না হয়। মনে রাখবে ওরা আমাকে সাহায্য করতেই এসেছে।'
আক্কেলের উলটো দিকে কিছুটা খাপছাড়া মতো একা বসে দীপিকা। রোগা ছিপছিপে। একনজর তাকালেই চোখ টানে। যে-কোনও ছেলেকেই ওর দিকে একবার তাকালে আর-একবার ঘুরে দেখতে হবে। আক্কেল দেখছিল, মেঘ বার বার ঘাড় ঘোরাচ্ছে। ওর চোখ দুটি খুব সুন্দর। ছোট কপাল। কপালের ওপরে কুঁচো চুলগুলো আলতো হয়ে নেমে এসেছে। গায়ের রং খুব ফরসা। ও কিছুটা জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। সত্যি বলতে কি, ওর এখানে বসার কথা নয়। দীপিকা এ-বাড়ির ম্যানেজার অশ্বিনীবাবুর মেয়ে। থাকে ব্যাঙ্গালোরে। সেখানে একটা স্কুলে ইংরেজি পড়ায়। ক'দিন আগেই এসেছে। ওর পাশের একটা চেয়ার ফাঁকা। বেশ বোঝা যায়, এটা কমলিকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। চেয়ারটা ইচ্ছে করেই ফাঁকা।
তারপর বসে আছে সৌহার্দ্য, ডাক নাম বব। কমলিকার নাতি। বয়েস দশ। তার হাতেও মোবাইল। গেম খেলছে। তার পাশে নন্দিনী। কমলিকার মেয়ে। দেখলেই বোঝা যায়, ভদ্রমহিলা বেশ অহঙ্কারী। স্বামী সন্তান গর্বে গরবিনী। তার পাশে স্বামী সুহৃদ। সে চুপ করে বউয়ের পাশে বসে আছে। বোঝা যায়, স্ত্রী অন্ত প্রাণ। ডাইনিং টেবিলের একদম মাথায় বসে কমলিকা। ঠিক তার ওপারের চেয়ার ফাঁকা। এক সময় ওখানে বসতেন কিরণশংকর মজুমদার।
কিরণশংকর মজুমদার ছিলেন এখানকার এক নামি বিজনেসম্যান। তাঁর যাবতীয় ব্যবসা ছিল রেল কোম্পানির সঙ্গে। টেন্ডার ধরা, বড় বড় অর্ডার সাপ্লাই। প্রতিযোগিতা খুব। কিরণশংকর মারা যাওয়ার পর কমলিকা অশ্বিনীকে সঙ্গী করে প্রথম প্রথম ব্যবসাটা চালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছিলেন না। ওঁরা ছেড়ে দেন।
এই বাড়িতে এরা ছাড়াও আছেন অশ্বিনীবাবু। অশ্বিনী সরকার। যাঁর সঙ্গে আক্কেল ও মেঘের পরিচয় হয়েছে। ওর স্ত্রী জয়া। ওঁদের ছেলে হীরক। মেয়ে দীপিকা। দীপিকা আগে এখানে থাকত। এখন বেঙ্গালুরুতে। এ ছাড়া দুটি কাজের মেয়ে মুন্না ও চম্পাকলি। রান্নার ঠাকুর দুর্গাশরণ। একটি কাজের ছেলে ঝড়ু। আরও দু-তিনজন ঠিকে কাজের লোক। ড্রাইভার সুরেশ। গেটে থাকে জগৎ সিং। ও রীতিমতো বন্দুকধারী পাহারাদার।
খেতে বসে আক্কেল দেখল জয়া খাওয়া-দাওয়ার পুরো ব্যাপারটা তদারকি করছেন। উনি খুব বেশি নড়াচড়া করছেন না। কাজের মেয়ে দুটিই সব দিচ্ছে, কিন্তু ওঁর নজর আছে তীক্ষ্ণ। খাবার-দাবার ব্যাপারটা উনিই দেখেন, তাই নীলমের চুল নিয়ে এত নাড়াচাড়া ব্যাপারটায় ওঁর বিরক্তির কারণ যথেষ্ট। একটা চুল খসে উড়ে এসে কারও খাবারে পড়লে জয়ারই বদনাম হবে।
আক্কেলের বার বার দীপিকার দিকে নজর পড়ছিল। অসাধারণ সুন্দরী মেয়েটা। তেমনই শান্ত। খুব কম খাবার নিয়ে বসে আছে।
সবাইকেই এখানে বসে দেখে ফেলল আক্কেল। শুধু বাকি থাকল হীরক, হীরু।
খেয়ে এসে ঘরে ঢুকতে মেঘ বলল, 'বলো তো কে বেশি সুন্দরী—মেয়ে দীপিকা, না ওর মা।'
ওর মা জয়া সুন্দরী। এখনও চোখ ঝলসে যাওয়া রূপ! দীপিকার রূপের মধ্যে কেমন যেন একটা নিষ্পৃহ ভাব। হয়তো সে এখানে, এদের মধ্যে খেতে বসতে চাইছিল না। তাই খাবার টেবিলে তার মনের ছাপ পড়েছিল মুখে।
কমলিকা বলেছিলেন, 'বিকেলে এসো—আমার ঘরে। আমি তোমাদের ডেকে পাঠাব।'
বিকেল নয়, ঠিক সন্ধের মুখে ঝড়ু ওদের নিয়ে গেল কমলিকার ঘরে। ঘর না বলে হলঘর বললেই ভালো হয়। ঘরের মাঝখানে পুরনো দিনের কারুকাজ করা খাট। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। মেঘ ঘরে ঢুকেই খাটটা দেখছিল। কমলিকা বসেছিল খাটের এক ধারে, খাটের চার ধারে যে থাম্বাগুলো উঠেছে, সেই ছত্রির দিকে পিঠ দিয়ে। ওগুলো সব এক একটা ডানা মেলা পরি! কাঠের কী অপূর্ব কাজ।
আক্কেলের কেমন অবাক লাগল, কমলিকাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে। কেন না ঘরের একদিকে কাঠের কারুকাজ করা সোফা আছে। মাঝে ছোট একটা টেবিল। তবু ওখানে কেন বসে আছেন কমলিকা!
কমলিকা বলল, 'সেদিন আমি এখানেই বসেছিলাম। আমি দীর্ঘদিন রাতে ডাইনিংরুমে গিয়ে খাই না। আগে যত রাতই হোক উনি ফিরলে—একসঙ্গে খেতাম। আমার রাতের খাবার নিয়ে আসে চম্পাকলি। তার একটু আগে আমি টিভি চালিয়েছিলাম। আমি সিরিয়াল দেখি না। ভালো বাংলা সিনেমার চ্যানেলগুলো ঘুরিয়ে দেখার মতো কোনও সিনেমা না পেয়ে, বিরক্ত হয়ে অনেকক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম। রাতের দিকে একটা চ্যানেলে উত্তমকুমারের একটা সিনেমা শুরু হয়। তখন খাটের ঠিক এ জায়গাটায় এসে আমি আয়েশ করে বসি।'
'রাত তখন ক'টা?'
'ঠিক ন'টা থেকে সাড়ে ন'টার মধ্যে। তার দু-তিন মিনিটের মধ্যে চম্পাকলি আসে খাবার নিয়ে। ও ঠিক সাড়ে ন'টায় আমার খাবার নিয়ে ওপরে আসে। যাই হোক সেদিন চম্পাকলি তখনও আসেনি। আমি খাটের বাজুতে ঠেস দিয়ে সিনেমা দেখছিলাম। হঠাৎ আমার মনে হল, কেউ যেন ঘরে ঢুকেছে। আমি তো দরজার দিকে মুখ করেই বসে আছি, তাহলে ঘরের ভেতর কে? বারান্দা দিয়ে কেউ কি ঘরে ঢুকেছে? আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে গেলাম কে? তখনই আমার গলায় চেপে বসল একটা দড়ির ফাঁস। কেউ যেন একটা দড়ি আমার গলায় পেঁচিয়ে প্রাণপণে টানছে। আমি চিৎকার করার চেষ্টা করলাম, পারলাম না। কিন্তু হঠাৎই দড়ির ফাঁস থেকে আমার গলাটা মুক্ত হয়ে গেল। আমি নিজেকে সামলে নিয়ে দেখি-ঘরের ভেতর কেউ নেই।'
কমলিকা থামেন। বলেন, 'আমার মনে হয়, খাটের বাজুর ওই পরিটার জন্য সে আমাকে ঠিক কায়দা করতে পারেনি। পরির কোনও একটা খাঁজে ওর দড়িটা আটকে গিয়েছিল। এদিকে চম্পাকলি আসছে। ওর পায়ের আওয়াজ সিঁড়িতে পেয়ে, শয়তানটা আমাকে ছেড়ে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়। খুব সামান্য সময়—দু-তিন মিনিটের মধ্যে ঘটনাটা ঘটে। যে ঢুকেছিল, সে চম্পাকলির না আসা পর্যন্ত শেষ চেষ্টা করেছিল। পারেনি। এই যে দেখো।'
কমলিকা তার গলায় হালকা একটা কালো দাগ দেখায়। বলেন, 'খাটের বাজুর একটা খাঁজে দড়িটা আটকে গিয়েছিল। দড়িটা ফেলেই ও পালায়। আমি দড়িটা তুলে রেখেছি। দাঁড়াও তোমাদের দড়িটা দেখাই।'
কমলিকা ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা সাদা খাম বের করেন। খামের ভেতর থেকে একটা সাদা রঙের দড়ি বের করেন। নতুন তাঁতের শাড়ির পাড় ছেঁড়া দড়ি। বলেন, 'ওই সময়ই চম্পাকলি না এলে আমাকে আমার স্বামীর মতো দড়ির ফাঁসে মরতে হত।'
কমলিকার শেষ কথায় আক্কেল অবাক হল, বলল, 'আপনার স্বামী, কিরণশংকরবাবুর মৃত্যু কি স্বাভাবিকভাবে হয়নি?'
'ও এটা তোমরা জানো না। বলা হয়নি। আমার স্বামীকে খুন করা হয়েছিল। উনি নিজে গাড়ি চালাতেন। পাহাড়পুর থেকে ফিরছিলেন। রাতে ফেরার কথা ছিল। ফিরলেন না। সকালে ওঁকে রাস্তার ধারে গাড়ির ভেতর পাওয়া গিয়েছিল মৃত অবস্থায়, ওঁর গলায় দড়ির ফাঁস ছিল।'
'দড়ি!'
'হ্যাঁ, সেদিনও আমাকে যে মারতে আসে সে দড়ির ফাঁসই দিয়েছিল।'
'উনি কত বছর আগে মারা যান?'
'সামনের শনিবার, ওর অষ্টম মৃত্যুদিন। কতদিন হয়ে গেল। আমি সেদিনের কথা আজও ভুলতে পারিনি। আমি সারা রাত খাবার টেবিলে বসে থাকলাম। সেদিন আবার অশ্বিনী বাড়ি নেই। তার আগেরদিন ভোররাত থেকে ও কল-ঘর-বার করছে। সকালে উনি ড্রাইভার পাঠিয়ে অশ্বিনীকে নার্সিং হোমে ভর্তি করালেন। ওর স্যালাইন চলছে। সন্ধের পর উনিই বাড়িতে ফোন করে খবর দিলেন অশ্বিনী ভালো আছে। কাল সকালে ছেড়ে দেবে। আর উনি আরও কীসব কাজ সেরে বাড়ির দিকে রওনা হবেন। কিন্তু উনি আর ফিরলেন না। পুলিশের ধারণা—ডাকাতি করার উদ্দেশে রাস্তায় ওর গাড়ি থামায়। টাকা পয়সা, গায়ের সোনাদানা যা ছিল নিয়েছে। উনি খুব সোনা পরতেন। গলায় মোটা হার ছিল। হাতে আটখানা আংটি। সোনার বোতাম, ঘড়ির ব্যান্ড। সব নিয়েছে। কিন্তু সঙ্গে খুনও করেছে।' কমলিকা থামেন। একটু চুপ করে থাকেন। বলেন, 'আমার আশ্চর্য লাগছে, সাত বছর আগের সেই দড়ির ফাঁস আবার আমার পরিবারে ফিরে এল! দাও, দড়িটা দাও আমি তুলে রাখি।'
আক্কেল খামের ভেতর দড়িটা রেখে দিয়ে চুপ করে ঘরের ভেতরটা দেখে। ওরা যেদিক দিয়ে ঢুকেছে তার উলটো দিকে আর একটা দরজা। দরজার বাইরে বারান্দা। আক্কেল বলল, 'লোকটি নিশ্চয় ওই দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়?'
'হ্যাঁ, ওই বারান্দার পরেই আমাদের বাগান। প্রচুর গাছ আছে। কোনও গাছের ডাল বেয়ে আমার ঘরে ঢুকেছিল, আর ওই রাস্তা দিয়েই পালায়।'
মেঘ পায়ে-পায়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়। একা গিয়ে বারান্দায় দাঁড়ায়। বলে, 'বাব্বা, এদিকে তো পুরো অন্ধকার।'
'হ্যাঁ, বাগানটা খুব বড়, প্রচুর গাছ। ভোরবেলা এই বারান্দায় দাঁড়ালে মন ভালো হয়ে যায়।'
'এটা যখন ঘটেছে তখন আপনার মেয়ে-জামাই বা ছেলে-বউমারাও আসেনি?'
'এ সময়টা ছুটি পড়লে আমার মেয়ে নাতিকে নিয়ে দিন পনেরোর জন্যে আসে। ওরা আছে। আর আমার ছেলে-বউমা—তারাও এসেছে।'
'শুনলাম, অশ্বিনীবাবু এসে আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে গেছেন?'
'হ্যাঁ, আসলে তার আগেরদিন একটা ব্যাপারে হীরুকে আমি ধমকাই। ওর অনেক কাজকর্ম আমার ভালো লাগে না। ও আমাকে ছোট-বড় কথাও বলে। তারপরে এই ঘটনা।' কমলিকা চুপ করে থাকেন। তারপর মাথা নাড়েন, 'না, না, আমি বিশ্বাস করতে পারি না, হীরু এই কাজটা করবে। কিন্তু আমার সঙ্গে অমন ঝগড়া, তারপর আমার ওপর আক্রমণ হতে ঠাকুর, চাকর, কাজের মেয়েদের মনে হতে থাকে হীরুই এই কাজটা করেছে। অশ্বিনী সেকথা শুনেই আমার কাছে এসেছিল। ঠাকুর চাকর কাজের লোকদের কথা গায়ে মেখে অশ্বিনীর এভাবে আমার কাছে আসা, আমি মেনে নিতে পারিনি। আমি অশ্বিনীর ওপর খুব রেগে গিয়েছিলাম। তবে ওকে আমি বলেছি—হীরু এ কাজ করতে পারে না। এ কাজ সে-ই করেছে, যে সাত বছর আগে করেছে?'
'আপনার কথা আমি ঠিক বুঝলাম না। আপনি তো বলছিলেন, সাত বছর আগে যা হয়েছিল আপনার স্বামীর সঙ্গে সেটা একটা ডাকাতি। তার সঙ্গে আপনি এখনকার ঘটনা মেলাচ্ছেন কী করে?'
'দেখো এই পোড়া দেশে ভাতের অভাব থাকতে পারে, অস্ত্রের অভাব নেই। তা সাত বছর আগেও কম ছিল না। তখনও ডাকাত ডাকাতি করতে এসে খুন করল দড়ির ফাঁস দিয়ে। আর এখনও কেউ আমাকে খুন করতে চাইছে দড়ির ফাঁস দিয়ে। কী আশ্চর্য মিল না! আমি সেদিনও বলেছিলাম পুলিশকে ভালো করে তদন্ত করতে। ওটা নিছক ডাকাতি ছিল না। ডাকাতি নয়, ওঁকে খুন করার উদ্দেশ্যই ছিল প্রধান। পুলিশ আমার কথা বিশ্বাস করেনি। কেউ একজন আছে, আমার স্বামীর পুরনো শত্রু, যে এই কাজের সঙ্গে জড়িত। সেটা কখনও হীরু নয়। হীরু হতে পারে না।'
'আপনাদের পরিবারের সবচেয়ে কাছাকাছি আছে অশ্বিনীবাবুদের পরিবার।'
'অশ্বিনী-জয়া, হীরু বা দীপু—আমাদের পরিবারের বাইরে নয়। যে এই কাজটা করতে চাইছে সে বাইরের কেউ, কে হতে পারে?'
আক্কেল বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর খুব ধীরে বলে, 'আপনি কি পুলিশকে কিছু জানিয়েছেন?'
'না, পুলিশকে জানাইনি। পুলিশ এসে কী করবে, অহেতুক ক'দিন বাড়ি ভর্তি করে যখন খুশি আসবে যাবে। আমাদের এখনও রেলের যেসব কাজকর্ম হয়, সেগুলো নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া করবে। পুরনো কিছু লোকজনকে হ্যারাস করবে।'
'আপনাদের এখনও রেলের কাজকর্ম হয়?'
'হয়, তবে সেটা খুবই সামান্য। ছোটখাটো কিছু অর্ডার। আমার ইচ্ছে করে না। আসলে, আমাদের তখন অনেক কর্মচারী ছিল। আমাদের কোম্পানি থেকেই তাদের সংসার প্রতিপালন হত। উনি মারা যাওয়ার পরেও আমি কোম্পানিটি চালানোর চেষ্টা করি। প্রতিযোগিতায় পারি না। পিছিয়ে আসি। কোম্পানিটি প্রায় বন্ধই করে দিই ধাপে ধাপে। এখন যেটুকু আছে, তা ওরাই চালায়, ওরাই অর্ডার আনে, আমার সাহায্য, যোগাযোগ যেটুকু লাগে সেটা আমি করি। আমাদের নাম, গুডউইল কাজে লাগায়।'
'এখন কর্মচারীর সংখ্যা কত?'
'জনা তিরিশেক।'
'অশ্বিনীবাবু কিন্তু আমাদের বলেছিলেন, কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে—। উনি এখন আপনাদের সংসারেরই ম্যানেজারি করেন।'
'ঠিকই বলেছেন, ভুল কিছু বলেননি। উনি আর কোনওভাবে ওই কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত নয়।'
'কেন?'
কমলিকা ম্লান হাসেন। 'আসলে ওখান থেকে যা রোজগার হয়, তা খুবই কম। বেশিরভাগটাই আমি ওদের মধ্যে ভাগ করে দিই। এতে ওরা মন-প্রাণ দিয়ে কাজ করে। বলতে পারেন, আমার ঠিক ঠিক গোনা চব্বিশজন কর্মচারীই এখন ওই কোম্পানিটির মালিক। আমি যেটুকু টাকা পাই, তা আমার ইনভেস্ট করা টাকার সুদ। হয়তো তাতে সামান্য লভ্যাংশও থাকে। এতে আমি খুশি এবং সম্মানিতও। এখন আমি যদি সম্পূর্ণ মালিক হয়ে উঠে ওখানে অশ্বিনীকে যুতে দিই, তাতে ওদের ক-টাকায় আবার একটা ভাগ বসবে। সেইসঙ্গে ওদের ওপর একটা খবরদারিও হবে। আমি এটা চাই না। অশ্বিনী মনে করে, এটা আমাদের কোনও কোম্পানি নয়। আর যদি আমাদের কোম্পানি হয় তাহলে আমি ঠকছি। আমার মত সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওরা ছোট করে হলেও শংকর ট্রেডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এতেই আমি খুশি।'
'হীরুবাবুর সঙ্গে কী নিয়ে আপনার মনান্তর?'
'হীরু চেয়েছিল শংকর ট্রেডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনে ঢুকতে। আমি চাই না। ইদানীং ও শংকর ট্রেডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন-এর নামে কিছু কন্ট্রাক্ট ধরেছে। সেখানে অনেক কিছুই ও জাল করেছে। এগুলো প্রথম কারণ হলেও, আসল কারণ দীপু, দীপিকা। আমার স্বামী বেশ কিছু টাকা দীপুকে দিয়ে গেছে। এটা নিয়ে ওর ঈর্ষা। অথচ আমি ওকে কম দিইনি। ও দু-দুবার ব্যবসা করতে গিয়ে ফেল করেছে। সত্যি বলতে কী ওর কাজে মন নেই। ও আড্ডা, বন্ধু-বান্ধব, মারপিট, দাঙ্গা-হাঙ্গামা করতেই বেশি ভালোবাসে। এমনও শুনেছি ওর সঙ্গে নকশালদের যোগাযোগ আছে। ও আমাদের ড্রাইভার সুরেশকে একবার মেরেছিল। সেবার অনেক কষ্টে আমি ওকে বাঁচিয়েছিলাম। পুলিশ কেস হতে দিইনি। তবে হ্যাঁ, আমি ওর বড়মা, ও কখনওই আমার গায়ে হাত তুলবে না। যেটা রটেছে, সেটা ভুল।'
আক্কেল বলল, 'আপনার সঙ্গে এখানকার পুলিশের সম্পর্ক কেমন?'
'এখানকার থানার দায়িত্বে আছেন বজরঙ্গবাবু। তোমাদের যে-কোনও দরকার পড়লে তাঁর কাছে যাবে। আমি আজই ওঁকে ফোন করে তোমাদের কথা বলে রাখব।'
হঠাৎ মেঘ বলল, 'আমি একটা কথা বলব?
'হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলো। তুমি তো চুপ করেই আছ।'
'আপনাদের বাড়িটা খুব সুন্দর। আচ্ছা আমি কি নিজের মতো করে এই বাড়িটায় ঘুরতে পারি। আসলে সবসময় যদি ছায়ার মতো ঝড়ু সঙ্গে সঙ্গে চলে, কেমন যেন বন্দি মনে হয়।'
কমলিকা হাসলেন। 'তোমাদের দরকারের জন্যই ঝড়ুকে রাখা হয়েছে। ঠিক আছে, প্রয়োজনে ঝড়ুকে তোমরা ডেকে নেবে। ও আর তোমাদের কাছে থাকবে না। তোমরা বাড়ির আর পাঁচজনের মতোই থাকো।'
আক্কেল বলল, 'কিরণশংকর মজুমদারের মৃত্যুদিন শনিবার—। আততায়ী আবার আপনার ওপর হামলা করতে পারে। আপাতত যদি সন্ধের পর বারান্দার দিকের দরজাটা বন্ধ রাখতে পারেন ভালো হয়।'
'ওই দরজাটা বন্ধ থাকলে আমার দমবন্ধ হয়ে যায়। ভয়ে ভয়ে প্রতিদিন আমি মরতে পারব না। ও দরজা আমি শোয়ার আগে বন্ধ করতে পারব না। তা ছাড়া এখন তোমরা তো আছ।'
আক্কেল হাসল।
কমলিকা দেবীর সঙ্গে কথা বলে বাইরে এসেই আক্কেল দেখল কাজের মেয়ে চম্পাকলি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে। প্রথমেই ওর মনে হল চম্পাকলি প্রথম থেকেই দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনেছে। ওদের দেখে চম্পাকলি একটু মাথা নীচু করে সরে গেল। মেঘ ওর দিকে তাকিয়েই বলল, 'এই মেয়েটি কি কমলিকা দেবীর ঝড়ু! আমাদের ঝড়ুর মতো দরজার গায়ে সেঁটে ছিল।'
ছায়াসঙ্গী ঝড়ুর হাত থেকে মুক্তি পেয়ে মেঘ বেশ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। আক্কেল-মেঘ যখন বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসছিল দেখতে পেল রেলিং-এর ধারে জয়া আর দীপিকা দাঁড়িয়ে। ওদের দুজনের চোখই আকাশের দিকে।
ওদের দেখাদেখি মেঘও একটু ঝুঁকে আকাশের দিকে তাকাল। কিন্তু তেমন কিছু ওর দৃষ্টিগোচর হল না। আক্কেল হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়ল সেখানে, জয়াকে বলল, 'তখন আপনাকে বলা হয়নি, দুপুরে খুব ভালো খেয়েছি। দারুণ রান্না হয়েছিল।'
একগাল হাসলেন জয়া। বললেন, 'আমাদের রান্নার ঠাকুর দুর্গাশরণ, অনেক বছর ধরে এখানে আছে। খুব ভালো রান্না করে। আমি ওকে বলে দেব—তোমরা ওর প্রশংসা করেছ।'
'আপনারাও তো অনেক বছর এখানে আছেন। কলকাতায় গেছেন কখনও?'
'কলকাতায় আমাদের বাড়ি ছিল—বাগবাজারে।' জয়া হাসলেন।
'আমি দক্ষিণ কলকাতার ছেলে—বাগবাজার বললেই শুধু দুর্গাঠাকুর আর গঙ্গার ঘাটের কথা মনে হয়।'
'ঠিক বলেছ, আমাদের বাড়ি ঠিক গঙ্গার ঘাটের কাছে। যেতে বাঁ-দিকে একটা লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির আছে, তার দুটো বাড়ি আগে।'
'রোজ ঘাটে যেতেন স্নান করতে?'
জয়া হাসলেন। 'আমরা গঙ্গায় সাঁতার কেটে মানুষ হয়েছি।'
'এখন আর বাপের বাড়ি যাওয়া হয় না।'
'কার কাছে যাব, কেউ নেই। আমাদের নিজেদের বাড়ি ছিল না, ভাড়া বাড়ি।'
ভাড়াবাড়ির কথায় মেঘ বেশ উৎসাহ পেল। বলল, 'আমার মায়ের নেতৃত্বে আমরা সারা কলকাতা জুড়ে ভাড়া থেকেছি। দু-চার বছর পরপরই নতুন নতুন জায়গা।'
'এতে পড়াশোনার খুব ক্ষতি হয়।'
'হয় হয়তো। কিন্তু সেকথা আমার মা বিশ্বাস করত না। আসলে আমাদের মায়ের খুব ভয় ছিল, কোনও না কোনওদিন আমার বাবা ফিরবে, আর ফিরে এসে মুরগীছানার মতো আমাদের তুলে দিয়ে চলে যাবে।'
'মানে?' দীপিকা বলল।
'আমার মা আমার বাবাকে ছেড়ে এসেছিলেন। তখন আমার বাবা তাকে হুমকি দিয়েছিল, তিনি যে-কোনওদিন এসে ছেলেমেয়েদের তুলে নিয়ে যাবেন। আমার মা সেই ভয় পেতেন।'
'আহা রে!' জয়ার গলায় আকুতি।
দীপিকা বলল, 'এসেছিল কোনওদিন?'
'না, না, মাতালরা মুখে অমন অনেক কথা বলে। তারপর তারা হয়তো ভুলেই যায়। কিন্তু সেই ভয়ের জীবনের অনেকটা সময় আমার মা দৌড়ে বেরিয়েছে। এখন থেমেছে। বলছে ফ্ল্যাট কিনবে।'
আক্কেল বলল, 'বার বার জায়গা চেঞ্জ করলে সত্যি পড়াশোনার খুব ক্ষতি হয়। তা আপনি কী এখানে পড়াশোনা করেছেন?'
'আমি কাছেই স্কুলে পড়েছি। কলেজও কাছে ছিল...।'
'তারপর অতদূর চাকরি করতে চলে গেলেন—অবশ্য চাকরির যা বাজার।'
'না, না, আমি এদিকেও চাকরি পেয়েছিলাম। কলকাতাতেও পেয়েছিলাম। শেষে বেঙ্গালুরুর স্কুলের চাকরিটা নিলাম।'
'আরে কলকাতায় আসতে পারতেন—। মনোহরগঞ্জ থেকে কলকাতা ক'ঘণ্টার রাস্তা। যখন খুশি মায়ের কাছে চলে আসতে পারতেন।' মেঘ বলল।
'না, কলকাতায় চাকরি করব না। বেঙ্গালুরুরই ভালো। আমি একটু দূরের চাকরিই প্রেফার করেছিলাম।' দীপিকা ম্লান হাসল। বলল, 'আপনারা কী বাইরের দিকে যাচ্ছেন? তাহলে একটা কথা বলি—বেশি দূর কোথাও যাবেন না।'
'কেন এদিকেও কী চুরি-ডাকাতির ভয় আছে?' মেঘ বলল।
দীপিকা হাসল, 'পুলিশের লোকদের চোর-ডাকাতদের ভয়!'
'আমরা পুলিশের লোক নই, তাই আমাদের চোর-ডাকাতদের ভয়!' আক্কেল বলল।
'হ্যাঁ, উনি বলছিলেন বটে, আপনারা গাড়িতে আসার সময় বলেছেন, আপনারা পুলিশের লোক নন।' জয়া বললেন।
'হ্যাঁ, অশ্বিনীবাবুকে আমরা ঠিকই বলেছি। কে যে কথাটা রটাল!' আক্কেল বেশ বিরক্তির সঙ্গে বলল।
জয়া বললেন, 'হীরু ওর বড়মার সঙ্গে কথা কাটাকাটি করতে পারে। ঝগড়া করতে পারে। কিন্তু ও বড়মার গায়ে হাত দেবে এ আমি বিশ্বাস করি না। তবু ওর বাবাকে দিয়ে আমি ক্ষমা চাইয়েছি।'
'কমলিকা দেবীও আমাদের এই কথা বলেছেন। তবে অশ্বিনীবাবু ক্ষমা চেয়ে ভুল করেছেন। হীরু এসে ওর বড়মার সামনে একবার দাঁড়ালেই সব সমস্যা মিটে যেত। কেন না উনিও মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন, হীরুবাবু এ-কাজ করতে পারেন না।'
'তাহলে তো সবকিছু মিটে গেল।' জয়া হালকা গলায় বললেন। 'হীরুর ওই ব্যবহারের জন্যে বউদির কাছে আমি মুখ দেখাতে পারি না।' জয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
'না মিটে গেল না। ওঁর ওপর একটা আক্রমণ তো হয়েছে। সেটা কে করল? কেন? কী তার উদ্দেশ্য? ওঁকে মেরে কার কী লাভ—জানতে হবে?' আক্কেল খুব শান্ত গলায় বলল।
'ও, আপনারা পুলিশের লোক নন, কিন্তু পুলিশের কাজই করতে এসেছেন—। তাহলে সবাই যা বলছে, তা ভুল কিছু বলছে না। আপনারা অপরাধী ধরতে এসেছেন।' দীপিকা বলল।
'অপরাধীকে ধরতে নয়, যদি সম্ভব হয় চিহ্নিত করতে, তার অপরাধের উদ্দেশ্য কী জানতে? আক্কেল বলল।
'ওই একই হল। আমি যেদিন ফিরলাম সেদিনই ফেরার পথে বাজারের দিকে গিয়েছিলাম, গঙ্গাচরণকাকার দোকান থেকে মা আর বড়মার জন্যে দুটো শাড়ি নিলাম। এক বছর পর ফিরছি, ওখান থেকে কিছুই আনিনি। সেই শাড়ি দিতে দুপুরে গিয়েছিলাম বড়মার কাছে। তখন বড়মাই আমাকে বললেন, কেউ এ পরিবারের খুব ক্ষতি করতে চাইছে। ঠান্ডা মাথায় সে ছক সাজাচ্ছে। নইলে কোম্পানি নিয়ে এত ঝামেলা। তখনও বুঝিনি, বড়মা হীরুর কথা বলছে। আমার মনে হয়, হীরু হয়তো মাঝে মাঝেই বড়মার ওপর গিয়ে চোটপাট করত। বড়মা কাউকে কোনওদিন বলেনি।' দীপিকা থামল, বলল, 'আর সেদিনই ওই ঘটনা ঘটল!' দীপিকা থামে, ওর চোখে টলটল করে জল। বলে, আমি যদি আগে এসব জানতাম, আর আসতাম না। বড়মার গায়ে হাত তুলতে পারে—এ-বাড়িতে এমন কেউ থাকতে পারে ভাবলেই আমার ঘৃণা হচ্ছে—ছিঃ-ছিঃ!'
দীপিকার কথায় আক্কেল কোনও উত্তর দিল না। জয়াও নির্বাক।
'কাল রাতে আপনাদের সঙ্গে যখন ফোনে কথা বলছিল, তখন আমি ছিলাম সামনে। বড়মা আমাকে বলল—দুটি ছেলে আসছে আমাদের বাড়িতে। ছেলে দুটিকে সাহায্য কোরো। ওরা যদি কোনও কথা জানতে চায়, বোলো। আমার খুব অবাক লেগেছিল। অবশ্য কাল সকালেই আমি ফিসফাস শুনেছিলাম—পুলিশ আসছে, সিআইডি আসছে।'
আক্কেল বলল, 'আমরা পুলিশ-সিআইডি কিছু না। এসেছি, ওঁকে যদি কোনও সাহায্য করতে পারি।'
দীপিকা বলল, 'আমার মনে হয় পুলিশ সিআইডি না ডেকে বড়মা ভুল করছে—বড় যদি কোনও বিপদ ঘটে? পুলিশ ডেকে আগে সেই বদমাইশকে ধরতে হবে।'
'কে মনে হয় আপনার—কার কীর্তি!'
'জানি না। পুলিশ এলে সব বেরিয়ে যেত, আমি বুঝতে পারছি, বড়মা নিন্দার ভয়ে—।'
'ঘরের লোক হলে নিন্দার ভয় থাকে। কিন্তু বাইরের লোক হলে নিন্দার ভয় থাকে না। এখন আমি বলতে পারব না কেন উনি পুলিশ ডাকেননি?' আক্কেল বেশ শক্ত গলায় কথাটা বলল।
'ভুল করেছে, পুলিশ ডাকলে যে করেছে সে একটু ভয় পেত। কিন্তু এতে সে ভয় পাবে না। বরং সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। স্বার্থ! চারদিকে এত সব অর্থলোভী মানুষজন। এদের হাত থেকে বড়মার মুক্তি নেই।'
'তারা কারা?'
'সেটা আপনি দেখুন। একটু খোঁজ করলেই বুঝতে পারবেন। এর জন্যে কোনও গোয়েন্দাগিরি করতে হবে না। শুনুন, কেন করেছে—তার উত্তর আমি আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি, অর্থ! অর্থ! এটাই শেষ কথা। এবার শুধু কে করেছে সেটা বের করুন। এটাই আপনাদের কাজ।'
আক্কেল হাসল, বলল, 'আমার কাজ আমি জানি। জানেন, আমার এক ডাক্তারকাকা আছেন। অ্যানেস্থেটিস্ট। ওকে একবার এক পেশেন্ট-পার্টি বলেছিল,—ডাক্তারবাবু আপনি অজ্ঞান করার জন্য এত টাকা নেন! আমার ডাক্তারকাকা হেসে উত্তর দিয়েছিল,—আজ্ঞে অজ্ঞানটা আমি ফ্রি-তে করাই। আমি টাকা নিই জ্ঞান ফেরাতে। সেভাবে আমিও আপনাকে বলতে পারি, অপরাধী চিহ্নিত স্বাভাবিক নিয়মেই হয়ে যাবে, যদি অপরাধের কারণটা ঠিক ঠিক খুঁজে পাওয়া যায়।'
দীপিকা সোজা হয়ে দাঁড়াল, বলল, 'সরি, আমার মনে হয় আপনারা পারবেন। আমি যাই।' দীপিকা হঠাৎ কথা থামিয়ে একটু এগিয়ে তার ঘরে ঢুকে গেল।
আক্কেল দেখল, অন্য একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নীলম আর তার দাদা অপরূপ বারান্দার চেয়ারে এসে বসল। অপরূপ তাদের দিকেই তাকিয়ে। নীলম কিন্তু তাকাল না, ও মোবাইলেই ব্যস্ত।
জয়া বলল, 'দীপু ওর বড়মাকে খুব ভালোবাসে। হীরুর এভাবে ঝগড়া করাটা ও মেনে নিতে পারছে না। আমি জানি না, হীরু এলে এ মেয়ে কী করে। আমার খুব ভয় করছে। হীরু রগচটা ছেলে। হিতাহিতজ্ঞান ওর নেই।' জয়া মুখে আঁচল চাপা দিয়ে আকাশের দিকে তাকান।
আক্কেল শান্ত গলায় বলে, 'ওরা ভাই-বোন। ওদেরকে ওদের মতো বোঝা-পড়া করতে দিন। আশা করি কোনও সমস্যা হবে না। হীরু ওর বড়মার সঙ্গে ঝগড়া করেছে, ওর দিদি এটা নিয়ে ওকে বকতেই পারে। আবার হীরু ওর দিদিকে এই বিশ্বাস দেবে—সে কারও গায়ে হাত দেয়নি। তেমন মানুষ সে নয়। ব্যস, দেখবেন ওদের মধ্যে চাপা কষ্ট কেটে যাবে। ভুল বোঝাবুঝি থাকলে মিটে যাবে।'
জয়া আকাশের দিকেই তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
আক্কেল বলল, 'চল মেঘ, আমরা একটু বাইরে থেকে হেঁটে আসি।'
ওরা পর পর ঘরগুলো পেরিয়ে হেঁটে এল।
মেঘ বলল, 'বাড়ির সামনের জায়গাটা দেখেছ—হাঁটার ইচ্ছে হলে এখানেই হাঁটা যায়।'
'না, বাইরেই যাব।'
ওদের দিকে এগিয়ে এল ঝড়ু। মেঘ বলল, 'আমরা একটু বাইরে যাচ্ছি, বেড়াতে।'
আক্কেল হাসল, বলল, 'সত্যি সত্যি ঝড়ু তোর অভিভাবক হয়ে গেল! তুই ওকে বেশ বলে-কয়ে যাচ্ছিস।'
মেঘ মুখ ভার করে ওর দিকে তাকাল।
ওরা পায়ে পায়ে বাইরে এল। গেট খুলে দিয়ে জগৎ সিং ওদের নমস্কার জানাল। আক্কেল বলল, 'জগৎ সিং ইধার বহুত চোরি-ডাকাতি হোতা হ্যায় কেয়া?'
'নেহি সাব।'
'বাগিচা সে চোর ঘুঁসা মাতাজিকা রুমমে।'
জগৎ সিং মাথা নীচু করল।
ওরা বাইরে এল। চারদিক খুব শান্ত। আলতো হয়ে আঁধার পড়ে আছে চারদিকে। বাড়ির বাইরে পিচের চওড়া রাস্তা চলে গেছে। আশেপাশে মানুষজনের ভিড়ভাট্টা নেই। মেঘ বলল, 'এখানে কোথায় যাবে আকিদা?'
'কোথাও যাব না।'
'তাহলে?'
আক্কেল বলল, 'ও যে চায়ের দোকানটা দেখছিস, ওখানে চ—।'
ওরা পায়ে পায়ে চায়ের দোকানটার সামনে এসে দাঁড়াল। মেঘ বলল, 'তুমি চা খাবে?'
'হ্যাঁ, চা খেতে হবে বই কী!'
দুজনে চায়ের দোকানে ঢুকল। দোকানের ভেতর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চার-পাঁচজন লোক বসে। একজন বয়স্কা মহিলা আলুর খোলা ছাড়াচ্ছে। একজন চা বানাচ্ছে। চা বানাতে-বানাতে সে দুজনের সঙ্গে গল্প করছে। কথা বলছে বাংলা হিন্দি মিশিয়ে। আক্কেল দোকানে ঢুকে বেশ আয়েশ করে বসল। যে চা বানাচ্ছে সে ওদের দিকে তাকাল। আক্কেল চা চাইল না। চুপ করে বসে থাকল। মেঘ ওকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, আক্কেল ওকে ইশারায় থামাল। মেঘ দেখল, তারা আসার সময় যে গল্প হচ্ছিল তা হঠাৎ থেমে গেছে। এবার ওরা চাপা স্বরে হিন্দিতে পরস্পরের মধ্যে দু-একটি কথা বলেই চুপ করেছে।
মেঘ দেখছে আক্কেল দোকানে ঢুকেও চা চাইছে না। উলটে তাকে থামিয়ে দিয়ে চুপ করে বসে আছে। একজন খদ্দের চায়ের দাম মিটিয়ে চলে গেল। আরও একজন উঠবে উঠবে করছে। সে-ও উঠে পড়ল। বাকি থাকল দোকানের দুজন আর দুজন খদ্দের। এরাই নিজেদের মধ্যে গল্প করছিল।
এবার দোকানদার হিন্দিতে ওদের জিগ্যেস করল—চা দেবে কি না?
আক্কেল বিশুদ্ধ বাংলাতে চা চাইল। বলল, চিনি দেবেন না।
চিনি দেবে না শুনে—দোকানদার ওদের দিকে তাকাল। বাংলায় বলল, দুটোতেই। আক্কেল বলল—হ্যাঁ। মেঘ আঁতকে উঠল। দোকানদারের দিকে তাকিয়ে আক্কেল বলল, 'কী ভাবছেন আমাদের দুজনেরই সুগার আছে কি না?'
দোকানদার বলল, 'হ্যাঁ, কম চিনি ঠিক আছে, কিন্তু বিনা চিনি—।'
আক্কেল বলল, 'মজুমদারবাড়িতে এসেছি। এসে থেকে যে ক'বার চা খেলাম, এত চিনি বেশি। তাই এখন বিনা চিনিতে চা খাব।'
আক্কেলের এমন ডাহা মিথ্যে কথায় মেঘ অবাক হয়ে তাকাল। অস্ফুটে বলল, 'চা!'
লোকটি বলল, 'মজুমদার বাড়ি মানে আপ লোক শংকর নিবাসে এসেছেন?'
আক্কেল এক ঝটকায় বলল, 'হ্যাঁ।'
লোকটা ওর দিকে অদ্ভুত চোখে তাকাল। বলল, 'আগে কখনও তো দেখিনি? এ-বছর দেখছি অনেক নতুন আদমি এসেছে।
আক্কেল দ্রুত হিসেব করে নিল, আপাতত তারা দুজন আর অপরূপবাবু। আর কি কেউ? বলল, 'হ্যাঁ, আমরা বেড়াতে এসেছি।'
'জানি, বড়বাবুর মৃত্যুবার্ষিকী আছে। ফি-বছর সবাই আসে। কাল পুলিশের লোকও এসেছে শুনেছি।' কথা বলতে বলতে লোকটা চা বানিয়ে ওদের দিয়ে দিল। মেঘ ঢোঁক গিলল, আবার পুলিশের লোক!
আক্কেল বলল, 'না, না, পুলিশ-টুলিশ কিছু আসবে না, ওসব ফালতু কথা।'
লোকটা কপাল কুঁচকে তাকাল, বলল, 'বড়মার ওপর অ্যাটাক হল। শুনলাম খুব বড় সিআইডি আসছে। আসেনি? না, এলে কিন্তু বিপদ বাড়বে। উনি যা সব ডিসিশন নিচ্ছে বহুত লোক বিগড়ে গেছে।'
'বিগড়ে গেছে কেন?'
'কোম্পানির চব্বিশজনকে উনি মালিক করে দিচ্ছেন। ওদের মধ্যে ছ'জনকে বাদ দিচ্ছেন। এই ছয় জন কী ছেড়ে দেবে। এদের মধ্যে দুজন খুব হারামি। ওরা সবাইকে ঘোল খাইয়ে কোম্পানিসে মস্তিসে টাকা নিচ্ছিল। গোলমালের ভয়ে কেউ মুখ খুলত না। কিন্তু বড়মা মালিক। তার কাছে সব খবর থাকে। সে মালিকানা দিচ্ছে সাচ্চা চব্বিশজনকেই।'
'হীরুবাবু কি ওদের সঙ্গে আছে?'
'হীরুবাবু তো পুরো কোম্পানিই চাইছিল। নিজেই চালাবে। কিচ্ছু পাচ্ছে না। দীপুদিদি সব পাবে। বড়মা কর্তাবাবুর কথামতো দীপুদিদিকে বেশি দেবে। হীরুদাও ঝামেলা করবে। দুই দিকেই ও ফাঁকি পড়ে গেল। আসলি কথা হীরুদা বুঝছে না—।
'অ্যাঁ, কাম করো, কাম করো, ক্যায়া বকোয়াস!' আলুর খোসা ছাড়ানো থামিয়ে মহিলা ধমক দেয়। চুপ করে যায় লোকটা। আক্কেল আরাম করে চা খায়। হাবিজাবি দু-একটা কথা বলে সে বেরিয়ে আসে।
বাইরে এসেই মেঘ ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। 'চিনি ছাড়া চা খাওয়ালে কেন!'
গম্ভীর মুখে আক্কেল বলল, 'এখানে আমাদের চিনি ছাড়াই চা খেতে হবে রে—। তবে মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনতে পাব! শুনলি না, হীরু দুদিকেই ফাঁকি পড়ছে। লাভ হচ্ছে দীপুর।'
সকালবেলা ঘুম ভাঙল চাপা কথাবার্তায়। অনেকেই যেন একসঙ্গে কথা বলছে। এ সময়টা আক্কেল কোনওদিন বিছানা ছাড়ে না। তার ঘুমও ভাঙে না। কিন্তু আজ কোন ভোরে তার ঘুম ভেঙে গেছে। আহা, মণিমা আজ যদি তাকে এমন ভোরে উঠতে দেখত কত খুশি হত। মেঘ অকাতরে ঘুমাচ্ছে। কথা বলার আওয়াজের ভেতর আক্কেল উঠে জানলার সামনে দাঁড়াল। দেখল এ-বাড়ির পোর্টিকোর নীচে বড় একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে।
গাড়ির পিছন দিকে ব্যাগ উঠছে। গাড়ির সামনে কমলিকা দেবীর হাত ধরে বব। একটু দূরে সুহৃদ দাঁড়িয়ে, ওর পাশে নীলম। কোমরে হাত দিয়ে খুব চিন্তান্বিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে নন্দিনী। আক্কেল এক ঝলক তাকিয়েই বুঝল, নন্দিনী সুহৃদরা কোথাও যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে, তবে কি চলে যাচ্ছে? কিন্তু কাল দুপুরে যখন আলাপ হল তখনও আক্কেল বোঝেনি ওরা আজ চলে যাবে। বা, কাল সন্ধেবেলায় যখন কমলিকা দেবীর ঘরে গিয়েছিল তখনও তো শোনেনি, তাহলে কী এমন হল যে ওরা আজই চলে যাচ্ছে। হয়তো এটা ঠিক করা ছিল।
আক্কেল কিছুক্ষণ জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবল, তার কী করা উচিত। সে কী দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখবে, নাকি পায়ে-পায়ে পোর্টিকোর নীচে সে-ও গিয়ে দাঁড়াবে একবার?
আক্কেল খুব দ্রুত মুখে চোখে-মুখে জল দিল। তারপর মর্নিংওয়াক যাওয়ার ভাব করে বেরিয়ে পড়ল ঘর ছেড়ে। মেঘ পাশে ফিরে শুল। দরজা ভেজিয়ে সে বারান্দায় এল। লম্বা টানা বারান্দা পেরিয়ে সে হেঁটে এসে দাঁড়াল পোর্টিকোর নীচে।
এই সাতসকালে কমলিকা ছাড়া প্রায় সবাই-ই আক্কেলের কথা ভুলে গিয়েছিল। হঠাৎ তাকে দেখে তাই সবাই থমকে গেল। তবু তার মধ্যে কমলিকা আর নন্দিনী এই সকালেও আক্কেলের কথা ভাবছিল। তারা কিন্তু ওকে দেখে খুশিই হল।
আক্কেল কমলিকা আর দীপিকার দিকে একসঙ্গে তাকিয়ে বলল, 'গুডমর্নিং!'
ওরা দুজনেও তাকে পালটা গুডমর্নিং জানাল। সেই সঙ্গে কমলিকা বলল, 'ওরা আজ চলে যাচ্ছে।'
আক্কেল খুব স্বাভাবিকভাবে ঘাড় ঝুঁকিয়ে বলল, 'আচ্ছা!' সে এগিয়ে গিয়ে ববের মাথায় আলত করে হাত বুলিয়ে দিল। বিমর্ষ বব আক্কেলের দিকে বাঁকা চোখে তাকাল। ওর পাশে অপরূপ চক্রবর্তী দাঁড়িয়ে।
কমলিকা বললেন, 'আপাতত ওরা দুর্গাপুরে যাবে। সুহৃদদের বাড়ি। ওখানে ক'দিন থেকে মুম্বই চলে যাবে।'
আক্কেল ঘাড় নাড়ল। কমলিকা খুব নীচু গলায় বললেন, 'কাল রাতেই আমার মনে হল—ওদের চলে যাওয়া ভালো। নাহলে ছোট বাচ্চাটার মনের ওপর খুব চাপ পড়ছে।'
ববের চোখ-মুখে স্পষ্ট এ-বাড়ির গোলমাল ওর ছুটিটা নষ্ট করে দিল। কমলিকা দেবী বললেন, 'তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে, 'পরে বলব, আগে ওদের ছেড়ে দিই।'
আক্কেল যেন নিশ্চিত হল, কিছু একটা হয়েছে কাল রাতে। তাতেই তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু কী হয়েছে?
এগিয়ে এল নন্দিনী। অহঙ্কারী ভঙ্গি ছেড়ে ওকে বেশ বিধ্বস্ত লাগল। সে চাপা গলায় বলল, 'মা তাহলে আসি?'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ বেরিয়ে পড়, আর দেরি করিস না।'
নন্দিনীর দু-চোখ ভেজা। 'আমার কিন্তু একদম যেতে মন চাইছে না। তুমি সাবধানে থাকবে।'
কমলিকা হাসলেন, 'চিন্তা করিস না, আমার কিচ্ছু হবে না।'
'সন্ধের পর বাগানের দিকের দরজাটা বন্ধ করে দেবে।' নন্দিনী বেশ আতঙ্কিত গলায় বলল।
কমলিকা আবার হাসলেন। 'তুই কি ভাবছিস দরজা বন্ধ করলেই আমি নিরাপদ?'
নন্দিনী আক্কেলের দিকে ঘুরল, বলল, 'আপনার ফোন নম্বরটা দেবেন, আমি খুব টেনশনে আছি। মা যে কী করছে, আমার খুব ভয় হচ্ছে। মা সবকিছুই উড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমার ভালো ঠেকছে না। জানেন, আমি বলছিলাম—তুমি আমার সঙ্গে মুম্বাই চল। আমাদের সঙ্গে থাকবে। শান্তিতে থাকতে পারবে। এই অশান্তি কার ভালো লাগে। আমি ফিরে গিয়ে এক মুহূর্তে শান্তি পাব না।'
কমলিকা বললেন, 'ভয় পেয়ে আমি সব কিছু ছেড়ে চলে যাব? তাহলে তো এগারো বছর আগেই তোদের নিয়ে চলে যেতে পারতাম। আমি কোথাও যাব না।'
কমলিকা দেবীর মুখে কাঠিন্যর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আক্কেল বলল, 'চিন্তা করবেন না, ভয় পেলে ভয় আরও বাড়ে। আমরা তো আছি।'
আক্কেলের কথা শুনে নন্দিনীর চোখ-মুখ মুহূর্তে সজীব হয়ে উঠল। বলল, 'প্লিজ আপনারা দেখবেন। আপনাদের ভরসায় আমি মাকে এখানে রেখে যাচ্ছি।'
নন্দিনীর কথা শুনে সামনে দাঁড়ানো অশ্বিনী সরকার মাথা নীচু করলেন। ওঁর পাশে জয়া। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ওঁদের চোখে-মুখে বেশ ব্যথা। কমলিকা বললেন, 'ওরা আর কদ্দিন, আমাকে নিজের ভরসাতে বাঁচতে হবে।'
এগিয়ে এলেন অশ্বিনী, নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, 'আমার প্রাণ থাকতে বউদির কিছু হবে না। তুই শান্তিতে যা মা। এ-সংসারের কোনও ক্ষতি আমি কাউকে করতে দেব না।'
নন্দিনী কেঁদে ফেলল, 'কাকা তুমি দেখবে। আমি রোজ তোমাকে ফোন করব।'
কিছুটা দূরে সুহৃদ আর নীলম দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। সুহৃদ এগিয়ে এল, বলল, 'আপনার ফোন নম্বরটা আমাকে দিন প্লিজ।'
আক্কেল ফোন নম্বর বলল। সুহৃদ নন্দিনী দুজনেই তাদের ফোনে আক্কেলের নম্বর সেভ করল। সুহৃদ বলল, 'আপনার কী মনে হয়—এই ব্যাপারটা পারিবারিক রাখাটা ঠিক? আমার কিন্তু মনে হয় ইমিডিয়েটলি পুলিশে এফআইআর করা দরকার। তাদের দিয়ে ইনভেস্টিগেশন করানো।'
আক্কেল বলল, 'আমারও তাই মনে হয়।'
'না, আমার এখনও তা মনে হয় না। সময় হলে কাউকে বলতে হবে না, আমি নিজে পুলিশ ডেকে নেব।' কমলিকা কঠিন গলায় বললেন।
'ঠিক আছে মা, আপনি যা ভালো বোঝেন করবেন। তবে একটা কথা বলি, বেশি রিস্ক নেবেন না। আর প্রয়োজন হলে আমাকে খবর পাঠাবেন। আমি যেভাবেই হোক চলে আসব।'
কমলিকা বললেন, 'তোমরা এবার রওনা দাও। দেরি হয়ে যাচ্ছে।' তিনি ববের মাথায় চুমু খেলেন। গাড়ির দরজা খুলে একে-একে উঠে পড়ল। গাড়ি ছেড়ে দিল।
ওরা গেটের বাইরে চলে যেতেই কমলিকা বললেন, 'তুমি ব্রেকফাস্ট করে আমার ঘরে এসো।'
একে-একে সবাই ঘরে চলে গেল।
আক্কেল পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল। সে সমানের বাগানে কয়েক পা হাঁটল। এখানে বাগানে নানা ধরনের ফুলের গাছ। সবুজ মখমলের মতো ঘাসের কার্পেট পাতা। হাঁটতে গেলে পা যেন ডুবে যায়। কিন্তু সে এখানে না হেঁটে বাড়ির পাশ দিয়ে চলল পিছনদিকের বাগানে। এদিক দিয়ে হামলাকারী কমলিকার ঘরে ঢুকেছিল।
পিছনদিকে এসে সে সত্যিই চমকে গেল। অনেকদিন পরে এমন বাগান সে দেখল। বড় বড় গাছ আকাশ জুড়ে আছে। তাদের পাতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে সূর্যের আলো নামছে নীচে। সে আলো যেন ছাঁকনিতে শুদ্ধ হয়ে মাটির কাছে ফিরছে। মূলত ফলের গাছে ভরা এ বাগান। আম জাম সবেদা আর কাঁঠাল গাছের মেলা। তারপরও ছড়িয়ে ছিটিয়ে সেগুন, মেহগনির মতো দামি গাছ। এ ছাড়াও অনেক গাছের নাম জানে না আক্কেল। প্রকাণ্ড তেঁতুল গাছটা ফেলে এগোতেই করমচার ঝোপ। তার পাশে অশ্বত্থের বিস্তার। এখানে এসে আক্কেল দাঁড়ায়। এখান থেকে কমলিকার বারান্দাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এদিকটা লোকজন আসে বোঝা যায়। বারান্দার পাশেই পর পর দুটো গাছ। দুটোই আমের। আম গাছগুলো প্রায় বারান্দা ছোঁয়া।
হঠাৎ সে শুকনো পাতার ওপর কারও পায়ের আওয়াজ শুনল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার আগেই সেখানে দীপিকা এসে দাঁড়াল। বলল, 'এটা আমাদের লুকোচুরি খেলার জায়গা। আমরা ছোটবেলায় দলবেঁধে এখানে খেলতাম।'
'বাগানটা এত পরিষ্কার, ঝকঝক করছে।'
'বড়মার কাছে এই বাগানটা প্রাণ। সামনে ফুলের বাগানটা পরে হয়েছে। নন্দাদি করেছে। এটা কবেকার, হেন গাছ নেই যা এখানে পাবেন না। আপনার পাশে যে গাছ ওটা তেজপাতার।
আক্কেল বলল, 'আপনারা না এলে কী হবে, এখানে অনেক মানুষজনের আসা যাওয়া আছে।'
দীপিকার মুখটা কষ্টে নীল হয়ে গেল, বলল, 'এদিক দিয়েই বড়মার ঘরে লোক ঢুকেছিল। একজন মানুষ সবকিছু কেমন লণ্ডভণ্ড করে দিল।'
'সাত বছর আগের ঝড়টা আবার এ-বাড়ির ওপর দিয়ে বইতে পারত। অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে।' আক্কেলের গলায় সান্ত্বনা।
দীপিকার মুখে কষ্টের রেখাগুলো মেলায়নি। বলল, 'তাও কম কী হয়েছে? কাল সন্ধেবেলাতেও শুনিনি ওরা চলে যাবে। আমি আটটা সাড়ে আটটার সময় বড়মার ঘরে গিয়েছিলাম। তখন ওদের চলে যাওয়ার কথা হয়নি। কিন্তু বড়মা রাতে বাবাকে ডেকে বলেছেন—ওদের চলে যেতে বলেছি। কাল সকালেই ওরা চলে যাবে। আপনি সুরেশকে বলে রাখুন।'
দীপিকা থামে। কথা বলতে ওর কষ্ট হচ্ছিল। বলল, 'বাবাও বড়মার কথায় অবাক হয়ে গিয়েছিল। কী এমন হল যে ওরা চলে যাবে—বড়মা বলেছে, ববের ওপর মানসিক প্রেশার পড়ছে। বাড়ির পরিবেশ সুস্থ নয়। বাবা বড়মার কথা শুনে নন্দাদির ঘরে গিয়েছিল। নন্দাদি নাকি প্রচণ্ড কান্নাকাটি করছিল। বলল, এভাবে এ-বাড়ি থেকে চলে যেতে হবে ভাবতে পারছি না। কাকা তোমরা সবাই থেকেও এটা কী হচ্ছে। বাবা সারারাত ঘুমোতে পারেনি। আমি সারারাত বাবার পায়ের আওয়াজ শুনেছি, সারারাত পায়চারি করেছে। বাবা কাল বার বার মাকে বলেছে—কী এমন হল, বউদি ওদের আজ সকালেই চলে যেতে বললেন। কেন? কেন? যদি কিছু হয়ে থাকে আমাকে একবার জানাবে না। আমি কী এ-বাড়ির কেউ না! কী জানি টেনশনে না বাবার সুগারটা আবার বেড়ে যায়।'
আক্কেল চুপ করে দীপিকার কথা শুনছিল। ওর মনে হল, শুধু বাবা নয়, মেয়েও সারারাত ঘুমায়নি।
'ওর ডায়াবেটিস আছে! আপনিও খুব চিন্তা করেছেন—সারারাত তো আপনিও ঘুমাননি।'
'না, ঘুমাইনি। ভয় নয় বুঝলেন, খুব হতাশ লাগছে। বাবা বলছে—এই ঝামেলা মিটলে এখান থেকে চলে যাবে। বাবা যেন কোথাও একটা অপরাধবোধে ভুগছে। আমার ভাই ঠিক এমন না—ও বড়মার গায়ে হাত দেওয়ার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারবে না। বিশ্বাস করুন, ও বড়মাকে অসম্ভব ভালোবাসে। আমি বুঝি ওর ক্ষোভ আছে। জ্যাঠাবাবু বেঁচে থাকার সময় আমাকে বেশ কিছু টাকা দিয়ে যান। তা সুদে আসলে এখন অনেক। ভাইকে কিছু দেননি। ভাই তখন বেশ ছোট। তাইজন্যে হয়তো জ্যাঠাবাবু ওকে কিছু দেননি। তারপর তো উনি মারাই গেলেন। নইলে উনিও ভাইকে বঞ্চিত করতেন না বলে আমার বিশ্বাস।'
দীপিকা আবারও থামে। নিজের কষ্ট যেন ঢোঁক গিলে ও বুকের ভেতর চালান করে। 'আমার ভাই ছোটবেলা থেকেই আমাদের মতো না। ও কিছুতেই পড়াশোনা করত না। আমি বিতুদা, নন্দাদি সবাই পড়াশোনা করতাম। আর ও স্কুল না গিয়ে কোথায় না কোথায় খেলে বেড়াত। মারপিট করত। একটু বড় হতেই লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খেত। সবাই ওকে বকত। কিন্তু বড়মা ওকে প্রশ্রয় দিত। বড়মার কাছে ভাইয়ের সাতখুন মাফ ছিল! না, না, ও বড়মার মৃত্যু চিন্তা মনেও আনবে না।'
আক্কেল বলল, 'কমলিকা দেবীও হীরকবাবু নাম বলেননি।'
'তাহলে কে ওর নাম রটাল। আমার বাবা মায়ের ওপর কী পরিমাণ মানসিক চাপ পড়েছে বোঝাতে পারব না। আমার মা যেন কথা বলতে ভুলে গেছে। আচ্ছা, সত্যি কথা বলুন তো, আপনার কী মনে হয়; আমার ভাই কোনওভাবে ঘটনাটায় ইনভলবড?'
'আমি হ্যাঁ না কিচ্ছু বলতে পারব না।'
'আপনার সন্দেহের তালিকায় তা হলে হীরু আছে, তাই তো? আচ্ছা, আপনি কি এই সন্দেহের কথা কাল কোনওভাবে বড়মাকে বলেছেন? নইলে নন্দাদিকে? তবে কেন এভাবে ওদের চলে যেতে হল?'
'আমার কাছে কোনও প্রমাণ নেই। আমি প্রমাণ ছাড়া কারও নাম বলতে পারি না।'
'আমি কিন্তু বলতে পারি দুজনের নাম। আমার কথা আপনি বিশ্বাস করবেন না। আমার কাছেও নিজের কানে শোনা কথা ছাড়া কোনও প্রমাণ নেই। তবু আমি নাম বলে যাচ্ছি, আশা করি আপনি একটু ভাববেন—তারা হল অপরূপ আর নীলম। বড়মা ওদের কাছে পাহাড় হয়ে অনেক কিছু আটকে দাঁড়িয়ে আছে। বড়মা সরলে ওদের অনেক লাভ। বিতুদা এর মধ্যে নেই। বরং এসব নিয়ে বিতুদার সঙ্গেই নীলমের সম্পর্কটা খারাপ হয়ে গেছে। এবার প্রমাণ জোগাড় করা আপনার কাজ। প্লিজ আপনি একচক্ষু হরিণ হবেন না।'
দীপিকার কথায় আক্কেল হাসল।
দীপিকা চলে গেল। আক্কেল এখান থেকে আবার কমলিকার বারান্দার দিকে দেখল। ঘরের ভেতর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। না, খাটের একাংশও দেখা যাচ্ছে। কমলিকাকে খাটের ধারে বসে থাকতে দেখেই খুনি ঢুকেছিল তা হলে। কিন্তু আক্কেল এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারল না। বড় মশা। উঃ! সে ফিরে চলল।
ঘরে ফিরে দেখল মেঘ ঘুমাচ্ছে। ঝড়ু চলে এল চা নিয়ে। চায়ের ট্রে নামিয়ে রেখে সে শুয়ে থাকা মেঘের দিকে তাকাল। আক্কেল ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ওকে ডাকতে বারণ করল।
ঝড়ু ডাকল না। সে-পা ঘষছে, বুঝতে পারছে না তার এখন কী করা উচিত? সে কি চলে যাবে, না এ-ঘরের ভেতরই মেঘের জেগে ওঠার অপেক্ষা করবে। ইতিমধ্যে সে টি-পট থেকে এক কাপ চা ঢেলেছে। এক কাপ চা দেখে, আক্কেল ইশারা করল আর এক কাপ চা ঢালতে। ঝড়ু অবাক হয়ে আর এক কাপ চা ঢালল। আক্কেল বলল, 'চায়ে পিও।' ঝড়ু আঁতকে উঠল। আক্কেল চোখ বড় করে ভয় দেখাল। ঠান্ডা গলায় বলল, 'পিও।'
ঝড়ু ভয়ার্ত চোখে দরজার দিকে তাকাল। আক্কেল উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে এসে তার হাতে প্লেট সুদ্ধ কাপ ধরিয়ে দিল। বলল, 'ডরো মাত, পিও।' তারপর নিজে আয়েশ করে চা খেতে লাগল।
ডায়েরি খুলল।
ডায়েরির পাতায় অনেকগুলো ঘর তৈরি করা। এক নম্বর ঘরে লেখা আছে—হীরক। সেই নামের পাশে সে আর একটি ঘর বানাল। তার মধ্যে লিখল—নীলম ও অপরূপ!
পাশে লিখল—কেন? অর্থঅনর্থক!
বাঁশিকে ফোন করল আক্কেল।
কমলিকা বললেন, 'কাল সন্ধেবেলা আমার ঘরে দীপু এসেছিল। অনেকক্ষণ ছিল একসময় আমি আর দীপু দুজনে বারান্দাতেও বসেছিলাম। ওই জায়গাটা আমাদের দুজনেরই খুব পছন্দের। আর একটু পরে আমার মেয়ে এল। তখন দীপু চলে গেল। আমি আর নন্দা কথা বলছিলাম। নন্দা আমাকে বার বার বলছিল—ওর সঙ্গে মুম্বাই যেতে। ওখানে গিয়ে কিছুদিন থেকে আসতে। আমার ওপর হামলা হওয়ার পর থেকেই ও খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আমাকে খালি বলছিল—সন্ধে হলেই বারান্দার দিকের দরজাটা বন্ধ করে দিতে। কালও এসব কথা বলতে-বলতে বার বার বাগানের দিকে তাকাচ্ছিল। হঠাৎ দেখলাম, ওর চোখে-মুখে কেমন একটা আতঙ্ক। আমি বললাম—কী হয়েছে রে? ও বলল—মা বাগানের দিকে খুব ভালো করে তাকিয়ে দেখো একটা ছোট্ট আলো জ্বলছে। ওর কথা শুনে আমি খুব ভালো করে দেখলাম। ও ঠিকই বলছে। বাগানের মধ্যে একটা আলো। সিগারেট বিড়ির আগুনের মতো। আলোটা নিভল না। জ্বলেই থাকল। খুব ভালো করে দেখতে-দেখতে মনে হচ্ছিল—ওখানে কেউ যেন দাঁড়িয়ে। ও খুব ভয় পেয়ে গেল। কাল থেকে চম্পাকলিকে বলেছে—আমার ঘরে শুতে। ওর আতঙ্ক দেখে আমার মনে হয়েছে, ওর এখানে থাকা ঠিক হবে না। ও অসুস্থ হয়ে পড়বে। ও আতঙ্কে ববকে একদম ছাড়ছে না। ছেলেটা যে একটু ঘুরে ফিরে খেলে বেড়াবে—। সব মিলিয়ে পরিবেশটা বেশ অসুস্থ।'
'তাই আপনি ওকে বললেন চলে যেতে?'
'হ্যাঁ। এ ছাড়া আমার কোনও উপায় ছিল না। কাল ওখানে কেউ নিশ্চয় ছিল, কিছু একটা ঘটানোর তালে। হয়তো সন্ধে থেকে দীপু, নন্দাকে দেখে সেই সুযোগ পেল না।'
আক্কেল বলল, 'কিছুক্ষণ আগে আমি বাগানে গিয়েছিলাম। বেশ বড় বাগান। দুটো আম গাছ দেখলাম একদম আপনার বারান্দা ঘেঁষে। যে কেউ ওই গাছ থেকে আপনার বারান্দায় উঠে পড়তে পারে।'
'তা পারে। সেটা তোমার মতো আমিও জানি। কিন্তু দোহাই ওই ফলন্ত গাছ আমি কাটতে পারব না। তাতে যদি আমার মৃত্যু হয় সে-ও ভি আচ্ছা!'
আক্কেল হাসল, 'গাছ কাটতে পারবেন না, সন্ধের পর দরজা বন্ধও করতে পারবেন না—ঠিকই, কেন করবেন? চোরের ভয়ে মাটিতে ভাত খাওয়া যায় না! বরং চোরকেই ধরতে হবে।'
কমলিকা দেবী শক্ত গলায় বললেন, 'আমাকে এত সহজে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে না। যে এই কাজটা করছে, সে যেখানেই থাকুক, তাকে আমি ঠিক টেনে বের করব। তোমরা আমাকে একটু সাহায্য করো।'
'আপনি কোম্পানিটা হস্তান্তর করছেন কবে?'
কমলিকা আক্কেলের দিকে তাকাল। বলল, 'এরমধ্যেই করব। বিতানকে ডেকেছিলাম, ওকে একবার আলোচনার টেবিলে বসানোর জন্যে। কিন্তু ও স্পষ্ট জানিয়েছে—বসবে না। এরসঙ্গে কী আমার ওপর হামলার কোনও যোগসূত্র আছে?'
'থাকতেও পারে। শংকর ট্রেডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন নিয়ে অশ্বিনীবাবুর দুঃখ বা মনোকষ্ট রয়েছে। ওঁর ছেলে হীরুর সঙ্গে আপনার সামনাসামনি সংঘাত হয়েছে। বাইরের দুজন মালিকানা পাচ্ছে না বলে খ্যাপা কুকুরের মতো হিংস্র হয়ে আছে। ফলে কোম্পানির সঙ্গে এ হামলার যোগসূত্র তো থাকতেই পারে।'
মাথা নীচু করে থাকল কমলিকা। তারপর খুব ধীরে বলল, 'আমি ঠিক ডিসিশনই নিয়েছি। চব্বিশজন যারা শংকর ট্রেডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনকে বন্ধ হতে দেয়নি। প্রাণপাত করে খেটে যাচ্ছে। আমি ঠিক করেছি, এদেরকেই ট্রাস্টি করে মালিকানা দিয়ে দেব। হীরু আমার কাছে যেটা চেয়েছিল, সেটা হল কোম্পানির নাম। গুডউইল। আমি মরে গেলেও ও ওটা পাবে না। এর আগে আমি ওকে যথেষ্ট টাকা দিয়েছি। বিজনেস করার জন্য। ও পারেনি। উড়িয়েছে। আমি শুনেছি আমার ছেলে ও বউমারও বিষয়টাতে আপত্তি আছে। ওরা কোম্পানি বোঝে না, ওরা চাইছে ওখান থেকে টাকা তুলে নিতে। কিন্তু ওখান থেকে টাকা তুলে নিলে কোম্পানিটা রক্তশূন্য হয়ে যাবে। আমার মনে হয়, আমি ঠিক ডিসিশনই নিয়েছি। এখান থেকে আমি সরব না।'
'চব্বিশজন। ছ-জনকে বাদ দিলেন কেন?'
'ছ'জন নয়। দাবিদার আছে দুজন। একজন শ্যামল পাত্র, অন্যজন নরেশ যাদব। প্রথমজন কোনও কাজ করে না। পাজির পা ঝাড়া, শুধু ঘোঁট পাকায় আর দলবাজি করে। কোম্পানিতে চুরি আমদানি করেছে। টেন্ডারের গোপন খবর ও অন্যদের চালান করত। আমার স্বামী বেঁচে থাকতে দু-দুবার ওকে কোম্পানি থেকে বের করে দিয়েছিলেন।'
'উনি নাকি হীরুবাবুর কাছের লোক—?'
'হ্যাঁ, ইদানীং হীরুর মাথা খাচ্ছে। ওকে আমি ধর্তব্যে আনি না।'
'আর দ্বিতীয়জন, নরেশ যাদব?'
'লোকটি গুন্ডা, বদমাইশ। একটা পাক্কা শয়তান। আমার স্বামী বেঁচে থাকতে ওঁর পোষা কুত্তা ছিল। এখন প্রকাশ্যে বদনাম করছে। আবার এটাও শুনেছি, আমার স্বামীর মৃত্যুতে ওর হাত থাকলেও থাকতে পারে। তবে পুলিশ কিছু পায়নি।'
'বদনাম বলছিলেন, কী ধরনের বদনাম?'
কমলিকার মধ্যে কষ্টের ম্লান হাসি, 'থাক না। আমি সেটা নিজের মুখে নাই-বা বললাম। আছ যখন দু-একদিনের মধ্যেই শুনতে পাবে। আমার স্বামী খুব ঠান্ডা মাথার মানুষ ছিলেন। সব কাজ করতেন খুব ভেবেচিন্তে।'
'কী বললেন? ঠান্ডা মাথার মানুষ।' আক্কেল খুব স্পষ্ট করে কথাটা আবার জিগ্যেস করল।
'হ্যাঁ, খুব শান্ত স্বভাবের। অসম্ভব বুদ্ধি রাখত। ওঁর ডান হাতের করা কাজ বাঁ-হাত জানতে পারত না। এত নিঃশব্দে টেন্ডার পাশ করাতেন। সেই উনিই একবার কোম্পানির মধ্যে শ্যামল পাত্রকে চড় মেরেছিলেন। আমি ওঁকে বাদ দিয়েছি, স্রেফ ওঁর নোংরা মুখের জন্য। এ ছাড়া আমি আমার মৃত স্বামীকে কীভাবে শ্রদ্ধা জানাতে পারি?'
'আচ্ছা এই নরেশ যাদব, শ্যামল পাত্র এদেরকে উনি কোম্পানি থেকে তাড়িয়ে দেননি কেন?'
কমলিকা এক আশ্চর্য হাসি হাসলেন। বললেন, 'হ্যাঁ উনি শ্যামল পাত্রকে সাসপেন্ড করেছেন, ডিউটি থেকে অফ করে দিয়েছেন। আর প্রতিবারই ওর বউ-বাচ্চারা এসে হাতে-পায়ে ধরে, কান্নাকাটি করে। ওরা আবার কোম্পানিতে ঢুকে পড়ে। উনি বলতেন—ওদের শাস্তি দেব কী, শাস্তি পাবে তো ওদের বউ-বাচ্চারা।'
একজন লোককে নিয়ে ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন জয়া। বললেন, 'বউদি ভট্টাচার্যদাদা এসেছেন।'
'অশ্বিনীবাবু নেই?'
'ওর মনে হয় প্রেশারটা আবার বেড়েছে। কাল সারারাত ঘুমায়নিও। ছটফট করেছে। সকালে নন্দারা চলে যাওয়ার পর শুয়েছে। অনেক ডাকলাম, দেখলাম অকাতরে ঘুমাচ্ছে। দীপু বলল, ভট্টাচার্যকাকাকে বড়মার কাছে নিয়ে যাও। আমি আসছি। ও এসে ফর্দ লিখে নেবে।'
'আসুন ভট্টাচার্যবাবু।' কমলিকা ডাকলেন।
আক্কেল বলল, 'আমি তাহলে যাই। আপনারা কথা বলুন।'
'হ্যাঁ, শনিবার দিন বাড়িতে পুজো হবে। উনি এসেছেন—পুজোর জিনিসপত্র—।' কমলিকা বললেন।
জয়া বললেন, 'তুমি এখানে, তোমার বন্ধু ঘুম থেকে উঠে সারা বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছিল। আমি জোর করে ব্রেকফাস্ট করতে বসিয়েছি। তুমি আমার সঙ্গে চলো।'
কমলিকা বললেন, 'এ কী ব্রেকফাস্ট করোনি, চলে এসেছ!'
আক্কেল হাসি মুখে জয়ার সঙ্গে বেরিয়ে এল।
জয়া বললেন, 'কখন ঘুম থেকে উঠেছ, না খেয়ে ঘুরছ। সারা বাড়ির লোকের জলখাবার খাওয়া হয়ে গেছে।'
আক্কেল বলল, 'সারা বাড়ির লোকের খাওয়া হয়নি। অশ্বিনীবাবু খাননি। আপনারও খাওয়া হয়নি। দীপিকা কি খেয়েছে?'
জয়া আক্কেলের মুখের দিকে তাকালেন। বললেন, 'তুমি কী করে বুঝলে, ঠিক আমাদের তিনজনেরই খাওয়া বাকি আছে।'
আক্কেল বলল, 'খুব সহজ, অশ্বিনীবাবু ঘুমাচ্ছেন। ওঁকে ছেড়ে আপনারা কি খেয়ে নিতে পারেন? আরও মনে হয়, অশ্বিনীবাবুকে আপনি সেভাবে ডাকেনওনি। একবারের বেশি দুবার ডাকলে উনি ঠিক উঠে পড়তেন—। এমন একটা কাজ বাকি রেখে উনি ঘুমাতে পারতেনই না।'
জয়া চমকে উঠে আক্কেলের দিকে তাকালেন, বললেন, 'ঠিক বলেছ, একবার ডেকেই কেমন মায়া হল। দীপুকে বললাম—দীপুও ওর বাবাকে ডাকতে নিষেধ করল।'
ওদের পাশ দিয়ে দীপিকা দ্রুত চলে গেল কমলিকার ঘরের দিকে। জয়া বললেন, 'মেয়েটাও না খেয়ে আছে।'
আক্কেল বলল, 'ওনার আর লিস্ট করতে কতক্ষণ লাগবে। চলুন আমরা বরং ওঁর জন্যে অপেক্ষা করি।'
'না, না, তুমি কেন আমাদের সঙ্গে অপেক্ষা করবে? দীপু শুনলে খুব রাগ করবে।'
'উনি কী খুব রাগী!'
'না, বড় অভিমানী। নইলে সব ছেড়েছুড়ে সেই কোথায় পড়ানোর চাকরি নেয়। এ চাকরি তো এদিকে কোথাও পেতে পারত। দূরে হলে কলকাতার দিকেও পেতে পারত, করল না। বউদি কত বারণ করলেন—শুনল না।'
'আপনি বারণ করেননি।'
'না, ওর বড়মার কথা যখন শোনেনি, আমি আর কী বলব।'
'ওর বাবা, অশ্বিনীবাবু বোঝাতে পারতেন!'
জয়া ম্লান হাসলেন।
খাবার ঘরে ঢোকার আগেই মেঘের হাসি শোনা গেল। আক্কেল ঘরে ঢুকে দেখল। মেঘের খাওয়া শেষ, সামনে খালি প্লেট নিয়ে বসে আছে। ওর সামনে অপরূপ আর নীলম। ওকে দেখে মেঘ বলল, 'আকিদা আমি ফিল্মে অভিনয় করার একটা অফার পেয়েছি। অপরূপবাবু নেক্সট প্রোডাকশনে আমাকে নেবেন।'
অপরূপ আর নীলমের দিকে হাত তুলে আক্কেল নমস্কার জানাল। অপরূপ হাত তুলল ওপরে। কিন্তু নীলম সেভাবে নড়ল না। বরং চোখের পাতা নামিয়ে সৌজন্য সেরে নিল।
অপরূপ বলল, 'আমার নাম অপরূপ চক্রবর্তী। আর ও এ বাড়ির বউ, আমার বোন নীলম।'
'হ্যাঁ, আমি ওঁকে খুব ভালো করে জানি। ওঁনার কাজ দেখেছি। ইনফ্যাক্ট আপনারও।'
আক্কেলের কথায় তিনজনই নড়ে উঠল।
আক্কেল বলল, 'স্বর্ণমৃগয়ায় আপনি তো সোহিনী করেছিলেন। অসুস্থ সোহিনীর চরিত্রে কিন্তু আপনি অসাধারণ!'
'আপনি দেখেছেন!' নীলম গলা ভেঙে কথা বলে উঠল।
'মুভিটা চলা উচিত ছিল। এক সপ্তাহ পরই কেন উঠে গেল বুঝলাম না। সে অর্থে কোথাও রিভিউও হয়নি।'
আক্কেলের কথায় মেঘ হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
অপরূপ হাহাকার করে বলল, 'প্রোডিউসারের জন্য তীরে এসে আমার তরী ডুবেছে। পোস্ট প্রোডাকশন খরচে উনি এমন কৃপণতা করলেন। আরও বিজ্ঞাপনের দরকার ছিল। রিপোর্টারদের সঙ্গে আরও লিয়াঁজো করার দরকার ছিল। উনি এমন একটা সময় এসে, বেঁকে বসলেন, যে আমার কিছু করার ছিল না। খবরের কাগজ, টিভিতে—একটু হুল্লোড় হলেই হল ভরে যেত।'
আক্কেল বলল, 'কনটেন্টের দিক দিয়ে খুব স্ট্রং বিষয় ছিল। পাতি প্রেমের গপ্প ছিল না। কিন্তু কেউ জানতে পারার আগেই হল থেকে সিনেমা হাওয়া। অবশ্য শেষদিনে আমি দেখেছিলাম অশেষদা, মানে অশেষ ঘটক বলাতে। আরও এক সপ্তাহ চললে অশেষদাই হয়তো স্বর্ণমৃগয়া নিয়ে একটা বিতর্কমূলক লেখা লিখত। কিন্তু সিনেমা না চললে—।'
'অশেষ ঘটক আমার মামাতো দাদা, নামি সাংবাদিক, সম্পাদক—এরা কোনও সিনেমার কথা লিখলে, দর্শকদের ওপর তার একটা ইমপ্যাক্ট হয়।'
'হয় মানে খুব হয়। যদি তারপরেও বই ফ্লপ করে, নেক্সট কাজ পেতে অসুবিধে হয় না। ইন্ডাস্ট্রিতে তোমার একটা স্টেপিং হয়ে যায়—উঃ!' অপরূপ গরম নিশ্বাস ফেলল।
নীলম বলল, 'উনি আমার কথা কিছু বলেছেন?'
'না, সেভাবে পরে আর ডিটেলে আলোচনা হয়নি। তবে উনি খুব ইমপ্রেসড ছিলেন।'
'জানেন আমি নিজে গিয়ে ওঁকে প্রিমিয়ারের কার্ড দিয়ে এসেছিলাম। আসেননি। কিন্তু ঠিক কোথাও দেখেছেন। বড় সাংবাদিক এঁরা। আগে কোনও জুনিয়ার পাঠিয়ে খোঁজখবর নিয়ে, তারপর এসেছেন। আমার কপাল!' অপরূপের আফশোসে মুখ ঝুলে গেল।
চম্পাকলি খাবার দিল আক্কেলকে। আক্কেল ওকে বলল, 'সেদিন তুমি কাউকে দেখতে পাওনি, না? বাইরে কি খুব অন্ধকার ছিল?'
'সবে সন্ধে লেগেছে। হ্যাঁ, অন্ধকার ছিল—।'
আক্কেল চম্পাকলির মুখের দিকে তাকাল। সবে সন্ধে লেগেছিল! ওর পাশে এসে দাঁড়ালেন জয়া।
অপরূপ তড়বড় করে বলল, 'আপনি খেয়ে নিন। আমরা বাগানের দিকে আছি। মেঘমশাইও আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে। আপনি আসুন। আড্ডা মারা যাবে। ক'দিন পরে বাড়িটায় যেন একটু হাওয়া বইছে। নইলে, শুধু খাচ্ছিলাম আর শুচ্ছিলাম। আসুন, আসুন, আমরা ওয়েট করছি।' অপরূপ নীলম মেঘ তিনজনেই উঠে পড়ল। আক্কেল মেঘের দিকে তাকাল না। নীলম মৃদুস্বরে বলল, 'আপনি তাহলে আসুন—।'
আক্কেল ঘাড় নাড়ল। ও খাওয়া শুরু করতে যাবে। জয়া বললেন, 'হাত ধুলে না?'
আক্কেল হেসে এগিয়ে গিয়ে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে এল। খাবারের প্লেট টেনে বলল, 'আপনি বসুন।'
'না, দীপু আসুক, তারপর খাব।'
'খেতে হবে না । তাবলে কি দাঁড়িয়ে থাকবেন? বসুন ওই চেয়ারে।' আক্কেলের গলায় হুকুমের সুর।
জয়া একটু ইতস্তত করলেন, বললেন, 'বসলে হবে, অনেক কাজ।' কথাটা বলেও জয়া বসল। আক্কেল বলল, 'আমার মণিমা আমার খাওয়ার সময় সামনে বসে।'
'তোমাকে তো দেখলে মনে হয় না, তুমি এমন দুধের খোকা!'
'তা বটে। কিন্তু মণিমা ছাড়ে না। এটা ওর শান্তি। সত্যি বলতে কী এটা আমারও ভালো লাগে। এই যে আপনাকে বসালাম।'
'মাকে মণিমা বলো?'
'না, আমার জন্মের সময় মা মারা গেছেন। মণিমাই মানুষ করেছে। মণিমাই আমার মা।'
'হীরুরও প্রায় তাই, আমি ওর মা, কিন্তু একটু বড় হতেই বউদিই ওকে মানুষ করেছে।' কথাটা বলে জয়া একটু থামলেন। বললেন, 'কী জানি এখন মনে হয়, ঠিক হয়নি।'
'কেন এমন কথা মনে হয়?'
'হীরুর মধ্যে বড়লোকি চাল ঢুকে গেছে। ও কখনও বোঝে না, ও কোন পরিবারের ছেলে। ও যেন নিজেকে মজুমদার পরিবারের ছেলে মনে করে। ও আমাদের কেউ না—'
হীরুবাবু কি আসছেন না বাড়িতে?'
'কাল রাতে এসেছিল। আমি ওর ঘরে রোজ রাতে খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে দিই। কালও রেখেছিলাম। সকালে দেখলাম, রাতে জল ছাড়া কিছু খায়নি। একটুও খাবার স্পর্শ করেনি। আবার ভোরবেলা উঠে চলে গেছে। অন্য সময় হলে, বউদি ঠিক ওকে ডেকে পাঠাত। নিজের কাছে বসিয়ে খাওয়াত। ও তো সেই বউদির সঙ্গেই ছোটবড় কথা বলেছে। আমি এখন কাকে গিয়ে বলব—হীরু রাতে না খেয়ে সকালে বেরিয়ে গেছে।'
'তাহলে উনি অনেক রাতে এসেছেন। বাইরে থেকে খেয়েই এসেছেন।'
'তাই হবে হয়তো। আসলে হীরু ওর বড়মার প্রশ্রয়েই এত সাহস পায়। এ ছেলেকে নিয়ে আমার কম জ্বালা নয়। আমার সঙ্গে তো কথাই বলে না। ওর বাবার সঙ্গেও না। সেই ছোটবেলা থেকে। ওর যা কিছু সব ওর বড়মা। অথচ ও বড়দার সামনে ঘেঁষত না। তবে ভাইবোনদের সঙ্গে খুব ভাব ছিল। ও ছোট কিন্তু ও ছোট থেকেই সব দিদি-দাদাদের বুক দিয়ে আগলে রাখত। কেউ ওর দাদা-দিদির নামে একটা কথা বললে, সে যেই হোক তাকে মেরে দিত। ও একটু রাগী ধরনের। এ-বাড়ির কেউ এমন না। দীপু হীরুর এই বাড়িতে জন্ম। আর আমার দুটো ছেলেমেয়েকে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল বড়দা আর বউদি। দীপুকে চোখে হারাতেন বড়দা। নিজের ছেলেমেয়ের থেকেও যেন বেশি। বিতান খুব ভালো ছেলে। লেখাপড়ায় ভালো। কিন্তু ওর বাস্তব বুদ্ধি কম। নন্দিনী এ বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবার বড়। কিন্তু ও কখনও বড়দের ব্যাপারে ঢুকত না।'
'আপনার মেয়ের সঙ্গে হীরুবাবুর এ ব্যাপারে কথা হয়েছে?'
'ঘটনার পরের দিন থেকে হীরু এ-বাড়িতে নেই। তবে মাঝে এসে রাতে শুলেও ভোরে চলে যায়। আমি বিছানা দেখে বুঝতে পারি। সিগারেট খায় তো। আসট্রেতে সিগারেট দেখলে বুঝতে পারি ও এসেছিল।'
'এ-বাড়ির গেটে তো দরোয়ান আছে।'
'ওর তো এ-বাড়িতে ঢুকতে কোনও মানা নেই। বউদি ওকে নিয়ে একটাও কথা বলেনি। ঠাকুর চাকরদের ফিসফিসানি শুনে ওর বাবা গিয়েছিল। নইলে ওর বড়মার সঙ্গে হীরুর কী হচ্ছে, কী চলছে, এটা আমাদের জানার কথা নয়। আমি ওর জন্ম দিয়েছি শুধু। জ্ঞান হতেই ও ওর বড়মার হীরুডাকত!'
জয়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আক্কেল ডাকল চম্পাকলিকে। বলল, 'আমি দোতলার বারান্দায় বসছি। তোমার সঙ্গে একটু কথা বলব । এসো।'
আক্কেল-মেঘ কলকাতার বাইরে। এই ক'দিন বাঁশি লেখালিখির কাজটা একটু এগিয়ে রাখবে ভেবেছে। তাই ক'দিনই সে হন্যে হয়ে ঘুরছে। অশেষ ঘটক তাকে দারুণ একটা ফিচার লিখতে দিয়েছে। চলচ্চিত্র শিল্প থেকে হারিয়ে যাওয়া পুরোনো দিনের নামি শিল্পীদের কথা। অবশ্যই তাঁদর জীবিত হতে হবে। তাঁরা এখন কী করছেন, কীভাবে আছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। উদ্দেশ্য এইসব শিল্পীদের আবার সামনে আনা। তাতে যদি কারও ভালো হয় হবে।
অশেষদা এভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে—
টেলিভিশন অনেক শিল্পীকে পুনর্বাসন দিয়েছে। বছরে ক'টা আর ফিল্ম তৈরি হয়, তাতে কতজনই বা কাজ পায়? কিন্তু সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে প্রচুর মানুষ এসেছেন, এখান থেকেই খুদকুড়ো সংগ্রহ করে জীবন চালিয়েছেন। কিন্তু দেহপট সনে নট সকলি হারায়! একটা সময়ের পর তারা আর কাজ পায়নি। এদিকে জীবনের অনেকটা সময় চলে গেছে। আর অন্যকিছু কাজ করে জীবন নির্বাহ করবে, সেটার সঙ্গেও তারা মানানসই হয়ে উঠতে পারে না। কিন্তু টিভির নানা চ্যানেলের রোজকার সিরিয়ালগুলোতে এই শিল্পীরা কাজ পাচ্ছেন। নিজেদের পছন্দমাফিক কাজ—অভিনয় করছেন। এমন কিছু মানুষজনের জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছে বাঁশি। তার সঙ্গে আছে ফটোগ্রাফার গোবিন্দ দাস।
অশেষ ঘটক বলেছে ধারাবাহিকটি শুরু হবে মার্চ মাস থেকে। তার আগেই বাঁশিকে অন্তত ছটি লেখা জমা দিয়ে দিতে হবে। অশেষ ঘটক চাইছে প্রথম দিকের দশটা পর্বের অন্তত সাত-আটটিতে তারা হারিয়ে যাওয়া নায়িকাদের কথা রাখতে চায়। নায়ক থাকুক জনা দুয়েক। তার পরের পর্বগুলোতে কয়েকজন পরিচালক, অন্যান্য অভিনেতা-অভিনেত্রী।
বাঁশিকে কয়েকজন প্রবীণ পরিচালকের ফোন নম্বর দিয়েছিল অশেষ ঘটক। এঁদের কাছে গেলে বেশ কয়েকজন নায়িকা-অভিনেত্রীর খোঁজ পাওয়া যাবে। এই পরিচালকদের একজন হেমেন্দু রায়, বাড়ি টালিগঞ্জ, নানুবাবুর বাজারের সামনে। তিনি এত অসুস্থ ভালো করে কিছু বলতেই পারলেন না। তবে ভারতী দেবী, সবিতা দেবীর কথা বললেন। ভারতী দেবীর ফোন নম্বর দিলেন। আর সবিতা দেবী থাকেন বোনপোর কাছে, নৈহাটিতে। বললেন উনি সুস্থ হয়ে উঠে আরও কয়েকজনের কথা বলবেন।
পরিচালক কমল সরকারের বাড়ি বেহালা চৌরাস্তা। কিন্তু গিয়ে তাঁকে পাওয়া গেল না। সেই বাড়ি ভাঙা হয়েছে। মাল্টিস্টোরিড উঠবে। আশপাশের কেউই বলতে পারল না, এ-বাড়ির বাসিন্দারা উঠে কোথায় গেছেন। তবে বাঁশি কাজ গুছিয়ে এসেছে প্রমোটারের ফোন নম্বর নিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রমোটার এখন জেলে। তাই ওর সঙ্গে যোগাযোগও করা যাচ্ছে না।
আর একজন পরিচালক শচীন গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি বাগবাজারের কাছে। ইনি অনেকগুলো ছবি করেছেন। এখন রোগভোগে জর্জরিত। সিনেমা পাড়ার সঙ্গে তেমন কোনও যোগাযোগ নেই। তবে এখনও দু-চারজন আসে তাঁর কাছে। তিনি বেশ কয়েকজন প্রতিভাময়ী নায়িকার কথা বললেন। যেমন অনুরাধা দেবী, সুরঞ্জনা দেবী, কনকলতা। অনুরাধা দেবী সম্প্রতি মারা গেছেন। সুরঞ্জনা দেবী আগে বাগবাজারেই থাকতেন। এখন চন্দননগরের দিকে আছেন। আর কনকলতাকে দু-একবার টিভিতে দেখেছেন। উনি এটুকু বলতে পারলেন। তবে এর সঙ্গে তিনি মিলন মুখার্জির নাম করলেন, ওঁর দুটো সিনেমায় হিরো হয়েছিলেন। বাংলাদেশের কোন এক রাজপরিবারের ছেলে। এখন বারাসতে আছেন—মাঝে-মাঝে শচীন গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে আসেন। ওঁকে নিয়ে লেখার জন্য বাঁশিকে বললেন।
অশেষ ঘটক বললেন—ঠিক আছে মিলন মুখার্জির ইন্টারভিউ আর ছবি করে ফেলো। স্টকে থাক। এর মধ্যে বরং ভারতী দেবীর সঙ্গে কথা বলো। কনকলতা যখন সিরিয়ালে কাজ করেছে—ওঁকেও খুঁজে পেয়ে যাবে। একদিন সবিতা দেবীর খোঁজে নৈহাটি চলে যাও। আর সুরঞ্জনা দেবী কোথায় থাকে বললে—চন্দননগর? সেখানেও যাও। খোঁজ লাগাও। প্রথমে স্টেশনের চায়ের দোকান, রিকশাওয়ালাদের থেকে খোঁজখবর করার চেষ্টা করবে। আমি তোমাকে ওদিককার কয়েকজন রিপোর্টারের ফোন নম্বর দিয়ে দেব। না পেলে ওদের হেল্প নেবে। এ ছাড়াও তুমি পুরোনো সিনেমা ম্যাগাজিনের অফিসগুলোতেও যাও। সেই সময়কার মানুষ যাঁরা সিনেমা নিয়ে চর্চা করতেন তাঁদের ধরার চেষ্টা করো।
গোবিন্দ দাস হতাশ গলায় বলল, বুঝলে বাঁশিম্যাম অশেষদা তোমাকে খড়ের গাদা থেকে সূচ খুঁজতে দিয়েছে। তুমি বরং খোঁজাখুঁজি করো। পেলে জানিও আমি চলে যাব।
আক্কেলের বাড়ি এসে মণিমাকে বাঁশি এই কথাগুলো বলছিল। ওর কথা শুনে রেগে গেলেন মণিমা। পরিষ্কার গলায় বললেন, 'না, তোর ওই গোবিন্দ মোটেই ভালোমানুষ নয়। তুই একা খুঁজবি কেন? কাজটা তো তোদের দুজনের। তুই সব খুঁজেটুঁজে বের করবি আর ও গিয়ে পট পট করে ছবি তুলবে তা হয় না।'
বাঁশি লম্বা হয়ে মণিমার কোলের কাছে শুয়েছিল। বলল, 'সেটাই দস্তুর।'
মণিমা বলল, 'পরিচালক শচীন গঙ্গোপাধ্যায় তোকে ঠিক কথা বলেছেন—আমিও কনকলতাকে দেখেছি সাঁঝতারার রূপকথা সিরিয়ালে। কয়েকটা এপিসোডে ছিল। বেড়াতে আসা মাসিমা বা ঠাকুরমার ভূমিকায় অভিনয় করেছিল। আরও একজনকে আমি সিরিয়ালে দেখেছি, সুরঞ্জনা দেবী। ওঁর সিরিয়ালটা এখনও চলছে। কিন্তু আমি নামটা মনে করতে পারছি না। দাঁড়া তোকে আমি দু-একদিনের মধ্যে দিতে পারব।'
শুয়ে শুয়ে বাঁশি হাত গুনল। বলল, 'মিলন মুখার্জি, ভারতী দেবীর সঙ্গে কথা হয়েছে। মিলন মুখার্জির জন্যে পরশু বারাসতে যাব। আজ যাচ্ছি, হাতিবাগান। উনি কার্তিক বোস লেনে থাকেন। দুটোর সময় যেতে বলেছেন। ওখান থেকে আর একবার শচীন গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে যাব। ওদিকে একটা কাজ আছে। তার পরের দিন যদি নৈহাটি যাই কেমন হয়?
'নৈহাটিতে তো সবিতা দেবী থাকে বলছিস। সবিতা দেবীর বই আমি দেখেছি। এমন কিছু অভিনয় করত না। বড় বেশি ন্যাকামি করত। একটা-দুটো বইতে নায়িকা হয়েছিল। বাদবাকি সব বইতে বউদির ভূমিকায়।'
'বাঁশি একটু ভারী গলায় বলল, 'তোমার এই বই শুনলে সিনেমা করা লোকেরা খুব রাগ করবে মণিমা।'
মণিমা অবাক হল, 'কেন রে তবে কী বলব—সিনেমা, মুভি?'
'সেটা বললে ভালো, নাহলে ওরা সবাই বলে ছবি।'
মণিমা একটু চুপ করে থাকল। বলল, 'আমরা তো বাপু বই বলতাম। বই বললে বুঝতে তো কারও অসুবিধে হয়নি।'
'না, বই বললে কেমন বই বই মনে হয়। তুমি বরং ছবি বলো।'
'ছবি বললেও তো কেমন ছবি ছবি মনে হয়। মনে হয় দেওয়ালে বাঁধানো, পটে ঝোলানো।'
'এমন সিনেমার ডাক নাম ছবি। ছবি করছে, ছবি দেখলাম—এমন আর কি?'
মণিমা হাসল, সিনেমা, মুভি, চলচ্চিত্র এগুলো হল তুলে রাখা নাম। আর তুই যে ছবি বললি—ওটা ডাক নাম।
ডাক নামটা একেকজনের কাছে একেকরকম হতে পারে। যে নিজের বাড়িতে ঘণ্টা ডাকে সাড়া দেয়, তাকেই আবার মামারবাড়িতে সবাই পটলা বলে ডাকে, আর সে সাড়াও দেয়। সাড়া দিচ্ছে কি না সেটাই আসল কথা। না, আমার মুখে ছবি কথাটা আসবে না। আমি বই-ই বলি।'
বাঁশি হাসে, 'তাই বলো। তোমার সঙ্গে যুক্তিতে পেরে ওঠা দায়।'
মণিমা বলল, 'তা তোর আকিদা, মেঘবাবুর খবর কী? আমি যা শুনলাম, বিশাল খাতির যত্ন পাচ্ছে।'
'আমিও তাই শুনেছি। ভালোই হয়েছে, মেঘ তা হলে খাবে আর ঘুমাবে। আকিদা আমাকে ফোন করেছিল, অনেকগুলো কাজ দিয়েছে। বেশ কয়েকটা জায়গায় ঘুরতে হবে।'
মণিমা অবাক হয়ে বাঁশির দিকে তাকাল, 'কাজ করতে গেল ওরা, আর তুই এখানে খাটবি—।'
'হ্যাঁ, সেকথা আকিদাই বলেছে। দূরত্ব যদি কম হত তবে আকিদাই চলে আসত। কতগুলো জিনিস আকিদা যাচাই করে নিতে চায় আর কি—।'
'ভালো, তাহলে তুইও ওদের টিমে আছিস।'
'এখন সবই টিম গেম। মাঠে এগারোজন যারা খেলছে তা ছাড়াও মাঠের বাইরে অনেক সাপোর্টিং স্টাফ থাকে। ওরাও কিন্তু প্লেয়ার। অপনেন্টের ভুল-ত্রুটি সব এরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেয়।'
মণিমা হাসল, বলল, 'তাহলে তোর ফ্রিলান্সিং টিমে আমাকেও নিয়ে নে। আমি ঘরে বসে, ফোন করে দেখি না কতজনকে জোগাড় করে দিতে পারি?'
মণিমায়ের কথা শুনে তাকে জড়িয়ে ধরল বাঁশি। তারপরই তড়াক করে লাফিয়ে উঠল, ওরে বাবা আমাকে এখন কতগুলো বাংলা চ্যানেলের অফিসে ঘুরতে হবে। তারপর হাতিবাগানের কাজ সেরে, বাগবাজারে টো-টো—।'
মণিমা বলল, 'ঠিক আছে তুই টো-টো কর। আমিও দেখি ফোনে-ফোনে কতটা তোকে গুছিয়ে দিতে পারি। তার আগে আমার অশেষকে ফোন করতে হবে। ওর কাছ থেকে কয়েকটা চ্যানেলের ফোন নম্বর নেব। আর ওর নামটা ব্যবহার করার পারমিশন চাইব।'
বাঁশি ঘাড় নেড়ে উঠে পড়ল।
মণিমা বলল, 'তবে আমার কি মনে হয় জানিস, ভারতী দেবী হোক আর মিলন মুখার্জি, এদের কথা ইন্টারভিউ নেবার সময় টেপ করবি নিশ্চয়ই। কথা শেষ করে টেপ গোছাবি। সেই গোছাতে-গোছাতে একটা প্রশ্ন করবি, সেই সময়কার অন্য সব নায়িকা অভিনেত্রীদের ব্যক্তিগত জীবনের কথা, কাজ ছেড়ে একটু কেচ্ছা আর কি। তোর টেপ বন্ধ আছে দেখে ওরা পেট খোলসা করে তোকে আরও কিছু অজানা তথ্য দেবে। অন্য গল্প শোনাবে। তারা কে কোথায় আছে, কী করছে এরা দেখবি নির্ঘাত জানে। একটু আপন হলে খবর তুই পাবি। তবে এসব কিন্তু শেষ পর্ব।'
কাঁধে ব্যাগ তুলে বাঁশি বলল, 'তুমি কিন্তু সুরঞ্জনা দেবীর সিরিয়ালটার খোঁজ করবে।'
মণিমা হাসল, 'শুধু খোঁজ করব কী করে, আমিও তো তোর টিমে আছি, প্রয়োজনে ওর সঙ্গে আমিও একটু কথা বলে নেব। বড় ভালো অভিনয় করত। কিন্তু নায়কগুলো পেয়েছিল পচা ধসা, একটা বইও হিট করেনি। কিন্তু সুরঞ্জনার অভিনয় যারা দেখেছে সবাই ওঁকে মনে রেখেছে।'
'বাব্বা, তুমি তো দেখছি সুরঞ্জনার ফ্যান!'
বাগানে গাছের নীচে আড্ডা জমে উঠেছে। মেঘ, অপরূপ আর নীলম বসে। আক্কেলকে দেখেই ওরা হইহই করে উঠল এদিকটা রোদ্দুর নেই। কিন্তু টাটকা একটা আমেজ আছে। ছোট গোল টেবিল ঘিরে ছ'খানা বেতের চেয়ার। একটা চেয়ার টেনে আক্কেল বসল। তবে বেশিক্ষণ সে বসবে না। জরুরি কিছু কাজ আছে, তার মধ্যে দুটি কাজ সে আজই শেষ করবে।
আক্কেল বলল, 'বিতানবাবুকে দেখছি না।'
'ও কলকাতায় গেছে। আজ ফিরবে।' নীলম বলল। 'ইউকে থেকে দুজন গেস্ট এসেছে। তাদের সঙ্গে মিটিং ছিল।'
মেঘ বলল, 'অপরূপবাবু দারুণ একটা খুনের গল্পের স্ক্রিপ্ট করছেন। ওঁর নেক্সট ফিল্ম।'
মেঘের কথায় অপরূপ চক্রবর্তী একটু গর্বিত হাসি হাসল। বলল, 'ঠিক একটা খুন নয় বুঝলেন, বেশ অনেকগুলো খুন হবে। পর পর। মনে করুন ফার্স্ট হাফে মিনিমাম তিনটে, সেকেন্ড হাফে আরও চারটে।'
'ওরে বাবা এ তো রক্তের ছড়াছড়ি।'
'এখন একটা আধটা খুনে দর্শক ধরে রাখা মারাত্মক কঠিন। গল্পের শুরুতে একটা খুন হল, ডিটেকটিভ বুদ্ধি করে প্রবলেম সলভ করল। শেষ দৃশ্যে যবনিকা উঠল। দর্শক এমন কাহিনিতে বোর হয়ে গেছে। তারা চায় অ্যাকশন। তাই খুনির সঙ্গে গোয়েন্দার একটা ছাদ থেকে ছাদে রান অ্যান্ড চেসিং আছে। আর দুটো থাকবে কার চেসিং।'
'দারুণ ব্যাপার!'
'আমার দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যারেক্টার কাস্ট হয়ে গেছে। নীলম আর মেঘ। মেঘকে আমি আমার গোয়েন্দার আসিস্টেন্ট করব। গোয়েন্দা এখনও ঠিক হয়নি। ইচ্ছে বলিউডের কাউকে নেওয়া।'
'তাহলে আপনার একটা মারাত্মক ব্রেক হবে—।' নীলমের দিকে তাকিয়ে আক্কেল কথাটা বলল। আর কথাতেই যেন ঘৃতাহুতি পড়ল। বেশ ক্ষুব্ধ গলায় অপরূপ বলল, 'সেটাই আমি আমার বোনকে বোঝাতে পারছি না। এর আগে শুধুমাত্র ওর গোঁয়ার্তুমির জন্য আমার আগের ফিল্মের প্রোমোশনটা কালারফুল হয়নি। প্রোডিউসারদের অনেক কষ্টে ম্যানেজ করতে হয়। ওরা এত ফিল্ম-টিল্ম বোঝে না। ওরা হয় বিজনেস বোঝে, নয় ঝিকঝাক ধামাকা। আরে বাবা নিজেকে গসিপের সাবজেক্ট বানাতে হবে। যত গসিপ, তত পাবলিকের আগ্রহ। তুমি বাড়িতে ডাল ভাত খাও, কে আপত্তি করছে। কিন্তু বাইরের হাবেভাবে তোমায় হটডগ খাওয়া লোক হতে হবে।'
অপরূপের কথায় হালকা গলায় আক্কেল বলল, 'সিলভার স্ক্রিন!'
নীলম বলল, 'তুমি যাই বলো ওই প্রোডিউসার ভদ্রলোক ঠিক নন। উনি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে আসেননি, উনি শুধু ফুর্তি বোঝেন। উনি যাকে তাকে যখন তখন ডাকছেন—'
নীলমের কথায় অপরূপ একটুও ঘাবড়াল না। হিসহিসে গলায় বলল, 'করুক না। উনি ফুর্তি করবেন, আমরা কাজ করব। আর এরকম অনেকেরই একটু আধটু দোষ থাকে। ব্যাপারটা ঠিকভাবে ট্যাকেল করতে হয়। নইলে এ লাইনে টিকে থাকা যায় না।'
অপরূপের কথায় কেউ কোনও কথা বলে না, তবু হঠাৎ অপরূপ বলে, 'নইলে ঘর থেকে টাকা বের কর। কোম্পানির এতগুলো টাকা বারোভূতের পকেটে যাচ্ছে। ওই টাকায় বিতানেরও হক আছে। এ টাকা ওর বাবার। কমলিকা দেবী পারেন না বিতানকে বঞ্চিত করে সব টাকা কোম্পানির কতগুলো স্টাফের মধ্যে ভাগ করে দিতে।'
নীলম থমথমে মুখে বলল, 'এ ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। বিতানকে অনেক বলেছি। ও মাকে গিয়ে কিছু বলবে না। আমি আর কত বলব? ও কলকাতা থেকে ফিরুক, একটা হেস্তনেস্ত করব।'
'কিরণ-কমল মুভি! বিতানকে বল এই ব্যানারে ফিল্ম করব। প্রোডিউসারের দায়িত্ব নিক। কোম্পানির টাকায় আরামসে কাজটা নেমে যায়। ফিল্ম রিলিজ করলে দু-সপ্তাহে টাকা উঠে যাবে। তখন ওদের টাকা ওদের মুখের ওপর ছুড়ে দিবি।'
আক্কেল অপরূপের দিকে তাকাল। অপরূপের চোখে মুখে বিরক্তি চুঁয়ে পড়ছে। বলল, 'আট দিন ধরে কাজ কর্ম ছেড়ে, এখানে বসে আছি। বিতান আজ কাল করে এড়িয়ে যাচ্ছে। ওর একবারও আমার সঙ্গে বসার সময় হল না। অথচ তুই বলেছিলি এখানেই সব কথা ফাইনাল হবে। কিরণ-কমল মুভি! এটাও একটা ব্যবসা।'
অপ্রস্তুত নীলম বলল, 'হয়ে যাবে। বিতান ফিরুক।'
হঠাৎই আড্ডার পরিবেশটা পালটে গেছে। ঝড়ের মতো অনেক কথা বয়ে গেছে। এখন আবার চারদিক শান্ত। কেউ কথা বলছে না। আক্কেল বলল, 'আপনাদের ফিল্মটা শুরু হোক, আমি অশেষদাকে ধরে আগেভাগেই একটা পাবলিসিটির ব্যবস্থা করে দেব। একটা হইচই বাঁধিয়ে দিতে হবে বুঝলেন। সিরিয়াল কিলারের গল্প। আশা করি ভালোই হবে। আপনারা দুজনেই গুণী মানুষ।' আক্কেল উঠে পড়ল, 'আপনারা গল্প করুন। আমার একটু কাজ আছে, যেতে হবে।'
আক্কেলের সঙ্গে মেঘও উঠে পড়ছিল, আক্কেল বলল, 'আরে না, না, তুই বস। আমি যাব আর আসব।'
শংকর নিবাস থেকে বেরিয়ে আক্কেল চায়ের দোকানে ঢুকল।
আজ চায়ের দোকানে ঢুকতেই লোকটা তাকে দেখে হাসল। বলল, 'বিনা চিনি?' আক্কেল ঘাড় নাড়ল। কিন্তু চা নেওয়ার আগেই দোকানে এল একজন মাঝবয়েসি লোক। দোকানে বসে সে চা চাইল না, সঙ্গের প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে কতগুলো কাগজ বের করে দেখতে লাগল। দোকানের বউটি বলল, 'এ ক্যায়া পন্ডিতজি—হরোস্কোপ! থোড়া হাম কো ভি বাতা দো না।'
দেশোয়ালি হিন্দিতে তাদের মধ্যে কথা শুরু হল। নানা খাস গল্প। তারপর হঠাৎ পন্ডিতজি জানাল, অশ্বিনীবাবুর তবিয়ত গড়বড় আছে। তাই ম্যানেজারবাবুর মেয়ে আর বড় মালকিন মিলে বড়বাবুর বাৎসরিক পুজো করছে, কাজের ফর্দ নিয়েছে।
চায়ের দোকানের লোকটি চায়ে চামচ নাড়তে-নাড়তে বলল, ম্যানেজারবাবুর মেয়ে বলছ কেন? বলো, বড়বাবুর বউ আর মেয়ে মিলে লিস্টি বানাল।
ওর কথায়, বউটা লোকটাকে ধমক দিল। জানাল, এসব কথা হীরুবাবুর কানে গেলে ঝামেলা বাধাবে। লোকটা গম্ভীর মুখে বলল,—হীরুবাবুর জামানা খতম। ওর পিছনে পুলিশ লেগে গেছে।
আক্কেল দাম মিটিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে পড়ল। বাঁশি ফোন করেছিল ওকে। অনেকক্ষণ কথা হল।
আক্কেলের মাথার ভেতর দপদপ করছে।
কাল আর আজ, তাকে পরপর অনেকগুলো জায়গায় যেতে হল। থানায় গিয়ে বজরঙ্গবাবুর সঙ্গে একটু আলাপও সেরে আসতে হয়। কমলিকা মজুমদার ফোন করে দিয়েছিলেন। একটা নার্সিং হোমেও দৌড়াতে হল। বাঁশিকে ফোন করতে হল দফায় দফায়। কিন্তু এ সমস্ত কিছুর পরে আজ বাঁশির ফোন পেয়ে তার সব গুলিয়ে গেছে। এখন ডায়েরির পাতায় কী লিখবে ও?
আজকে, একটু আগে তার সব কিছু কেমন যেন আবছা হয়ে গেল এক মুহূর্তে। তার মনে হল সে কোনও ট্র্যাপে পড়তে চলেছে। ক'দিন ধরে যা হয়েছে, যেটা হচ্ছে সেটা প্রধান নয়। এটা হল সামনে দেখানো। আসলে এর পিছনে কোনও গূঢ় কারণ রয়েছে। এবং সেই গূঢ় কারণের একটা মারাত্মক ফলাফলও আছে। কিন্তু সেটা আড়ালেই আছে এখনও।
এদিকে মেঘ নীলম অপরূপের সঙ্গে দারুণ আড্ডায় মেতে আছে। ও বেশ বেড়াতে আসার মুডে।
আক্কেলের মনে হচ্ছে ধোঁয়ার ভেতর সে কোনও অবয়ব দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু নারী, না পুরুষ ঠাহর করতে পারছে না। তার কী মরীচিকা দেখে বিভ্রম হচ্ছে! সে কি ভুল পথে চলেছে? নাকি ঠিক পথেই চলেছে। আর তাকে দিশেহারা করে দিতেই কি এই চক্কর?
আক্কেল ডায়েরির পাতা খুলে আরও একটা ঘর বানাল। তার মাঝে একটা জিজ্ঞাসার চিহ্ন। তার ডায়েরির আগের দুটো ঘরে হীরু এবং নীলম-অপরূপের নাম। এই মাত্র বানানো ঘরে একটা জিজ্ঞাসার চিহ্ন।
ঘরে এসে আপাতত সে বিছানায় আরাম করে বসল। মেঘ ঘরে নেই, নিশ্চয়ই অপরূপ-নীলমদের সঙ্গে আড্ডা মারছে। এমন সময় কেউ এসে দরজায় টোকা দিল। খুব অসহিষ্ণু হাত। মেঘ নয়। ঝড়ুও নয়। আক্কেলের মাথার ভেতর চিড়িক করে উঠল। হীরু হবে কী? বলল, 'দরজা খোলা, আসুন।'
বিছানার ওপরই সে সোজা হয়ে বসল। ঘরে ঢুকল একটা একুশ-বাইশ বছরের ছেলে। সুঠাম চেহারা, চওড়া কাঁধের ছেলেটা ঘরে ঢুকেই নিজেকে যেন একটু ঝাঁকিয়ে নিল। বেশ সুন্দর মুখে ক'দিনের না কাটা দাড়ি, এলোমেলো চুল। ওর থুতনির সরুভাবটা দেখে আক্কেল এক ঝলকে বুঝে নিল। এ হীরক। তার অনুমান মিলে গেছে। হীরক ক্রুদ্ধ চোখে আক্কেলের দিকে তাকাল। চেয়ার দেখিয়ে আক্কেল বলল, 'বসুন।'
ছেলেটা স্পষ্ট গলায় বলল, 'না, না, বসব না। আপনার সঙ্গে একটা জরুরি কথা বলার জন্যে এসেছি।'
ছেলেটার বেশ কঠিন মুখ। দুটো চোখ দপদপ করছে। দুটো হাতই মুঠো করা। 'আমার নাম হীরক।'
'বুঝতে পেরেছি।'
'না, আপনি কিছু বুঝতে পারেননি, এবার আপনাকে আমি বোঝাব। আপনি কেন পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন?'
'কেন গিয়েছিলাম সেটা কি আপনাকে বলতে হবে?'
'হ্যাঁ, বলতে হবে।'
'সরি।' আক্কেল হাসল, 'আপনাকে বলব না।'
'আপনি যেজন্য গিয়েছিলেন সেটা কিন্তু বড়মাও পারতেন। তিনি কিন্তু তা করেননি।'
'কী করেননি কমলিকা দেবী?'
'উনি এ-বাড়ির কথা পুলিশকে জানাননি। পুলিশের কোনও সাহায্য চাননি। পুলিশ ডাকেননি। আর আপনি দু-দিন এসেই পুলিশের কাছে দৌড়লেন!'
'প্রয়োজন ছিল।'
'না, কোনও প্রয়োজন থাকতে পারে না। বড়মা যা বলবেন আপনি তাই করবেন। আপনি পুলিশের কাছে কী করতে গিয়েছিলেন, মজুমদার পরিবারের কেচ্ছা করতে? হামলা হয়েছে ওঁর ওপর। উনি পারতেন না পুলিশ ডাকতে, কই উনি তো ডাকেননি। আর আপনি পুলিশকে ইনফর্ম করে এলেন!'
'আপনি ভুল করছেন।'
'আমি কোনও ভুল করিনি। ভুল করেছেন আপনি। আপনাকে বড়মা এনেছেন, আপনি তাঁর সম্মান দেখবেন না?'
আক্কেল কিছু বলার আগে ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকল দীপিকা, ওর পাশে মেঘ। দীপিকা এসে সটান হীরকের মুখোমুখি দাঁড়াল, বলল, 'উনি কোনও ভুল করেননি। আমি ওঁকে বলেছি, পুলিশকে বলতে। এতে তোর কী হয়েছে—তুই তো বড়মাকে মারতে যাসনি, তাহলে তোর এত ভয় কেন? তুই কেন এসে এভাবে কথা বলছিস? ওনারা আমাদের গেস্ট। তুই নিজে বড়মার কোন সম্মান রাখছিস?'
হীরক হিসহিসে গলায় বলল, 'আমি তোর সঙ্গে কোনও কথা বলতে চাই না। তুই এখান থেকে চলে যা। ওঁর সঙ্গে আমি কথা বলছি, তুই এর মধ্যে ঢুকবি না।'
'তুই ওঁর সঙ্গে কথা বলছিস না, তুই হুমকি দিচ্ছিস।'
'আমি এখনও কোনও হুমকি দিইনি। আমি ওঁকে জিগ্যেস করেছি, উনি থানায় কী করতে গিয়েছিলেন?'
'উনি থানায় গিয়েছিলেন তুই কী করে জানলি? কই আমি তো জানি না, এই বাড়ির আর কেউ তো জানে না। তাহলে তুই কী করে জানলি—নিশ্চয় তাহলে তুই ওঁকে ফলো করছিস। এ-বাড়িতে তুই রাতে চোরের মতো আসছিস, অথচ এই বাড়ির লোকেরা কী করছে সেটা জানতে পারছিস, মানে এখানে তোর লোকজন আছে বল!'
হীরক একটু চুপ করে থাকে, বলে, 'আমিও এ-বাড়ির মেম্বার, এই পরিবারের একজন, খোঁজ তো আমাকে রাখতেই হবে।'
'এত যদি আত্মসম্মান তা হলে পরিবারের সম্মানটা রাখিস না কেন? ছোটবেলা থেকে তুই এ-বাড়ির মানসম্মান ধুলিসাৎ করছিস।'
বাঁকা হাসি হাসল হীরক, 'এ-বাড়ির যেটুকু মানসম্মান আছে আমি তা টিকিয়ে রাখছি। তোর গায়ে সবাই থুতু দেয়। আমি একটু-আধটু গোলমাল পাকালে তোদের ভালো, তোরা আলোচনায় থাকবি না, তোদের বদমাইশি কেউ দেখতে পাবে না। আমি সরে গেলে তোদের গায়ে শকুন বসবে।'
দীপিকা কাঠ মুখে হীরকের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর দুচোখ টসটস করছে জলে। সে কোনওক্রমে বলে, 'আমার জন্যে তোকে ভাবতে হবে না। তুই ভালো থাক ভাই।'
হীরক আক্কেলের দিকে তাকায়। বলে, 'এই যে শুনুন, যা জানতে চান আমাকে প্রশ্ন করবেন, বলব। চায়ের দোকানে গিয়ে এ-বাড়ির গসিপ শুনবেন না। আমি পারতাম আপনাকে মেরে লোপাট করে দিতে। শুধু আপনি বড়মার জন্য এসেছেন তাই কিছু বললাম না।' কথাটা বলে হীরক দাঁড়াল না, চলে যাচ্ছিল। আক্কেল বলল, 'হীরকবাবু তাহলে ওই কথা থাকল। আপনার কাছেই আমি কিছু কথা জানতে চাই। কিন্তু আপনাকে পাব কোথায়?'
হীরক মুখ বিকৃত করল, 'বেশি চালাকি করবেন না। এটা মনোহরগঞ্জ। মেরে রেলে লোহালক্কড়ের তলায় ঢুকিয়ে দেব, সব চালাকি ঘুচে যাবে।'
'তাহলে যে এ পরিবারের আর একটা বদমান হবে!' আক্কেল শান্ত গলায় বলল। বলল, 'তার থেকে মাথা শান্ত করুন, কাজে দেবে। আমার কিছু কথা জানার আছে, সময় করে আসবেন।'
দীপিকা ঘরের মধ্যেই দাঁড়িয়ে ছিল স্থাণুর মতো। হীরক চলে যেতে কোনওক্রমে ও বলল, 'কিছু মনে করবেন না। আপনি আপনার কাজ করুন। আমি থাকতে কেউ আপনাকে বাধা দিতে পারবে না।'
আক্কেল হাসল, 'থ্যাঙ্ক ইউ। হীরকবাবু ওঁর স্বাভাবিক রিঅ্যাকশন দেখিয়েছেন। আমার ভালো লাগল, উনি আমার খোঁজখবর রাখছেন।'
আক্কেলের কথায় দীপিকার মুখটা লাল হয়ে গেল। বলল, 'ওঁর হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি।'
'কেন আপনি ক্ষমা চাইবেন? ওর জন্যে এর আগে কমলিকা দেবীর কাছে অশ্বিনীবাবু গিয়ে ক্ষমা চেয়ে এসেছেন। আমার কাছে আপনি ক্ষমা চাইছেন। এটা মনে হয় ঠিক হচ্ছে না। আপনারা ওঁর জন্য কষ্ট পাচ্ছেন কেন? ওঁকে ছেড়ে দিন না, যে যার নিজের মতো। আমাদের তো আপনিও পছন্দ করছেন না। সেটা মনে-মনে রাখছেন। উনিও পছন্দ করছেন না। সেটা মুখ ফুটে স্পষ্ট করে বলেছেন। এর বেশি কিছু না।'
'দেখুন, আপনাদের আমি পছন্দ করছি না, এটা ভুল। আমি মনে করি—বড়মার উচিত ছিল পুলিশ ডাকা। আপনাদের ডেকেছেন ঠিক আছে। কিন্তু পুলিশ ডাকলে যে শয়তান এ কাণ্ড করেছে সে একটু হলেও ভয় পেত। ধরা পড়ুক আর না-পড়ুক অন্তত পুলিশের ভয়ে আর এদিক মাড়াত না। কিন্তু বড়মা আপনাদের ডেকেছেন। আপনি হয়তো যে করেছে তাকে চিনে ফেলবেন, কিন্তু তার আগে সে তো আবার বড় একটা বিপদ ঘটাতে পারে?'
আক্কেল বলল, 'একদম ঠিক। সে আবার আক্রমণ করতে পারে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।'
দীপিকা ম্লান গলায় বলল, 'এ-বাড়ির আমি কে? আমার কথা কে শুনবে? আমি চলে গিয়ে আর কোনওদিন ফিরব না। এ-বাড়ি আর আগের মতো নেই। কত শান্তির জায়গা ছিল এটা। সব নষ্ট হয়ে গেল।' দীপিকা থামে, নিজেকে সামলায়, বলে, 'আপনি স্নান করেছেন, নিন, স্নান করে নিন। খাবার সময় হয়ে গেছে। আর একটা কথা, আপনাদের সঙ্গে হীরুর এই ব্যবহারের কথা বড়মাকে বলবেন না প্লিজ। উনি খুব কষ্ট পাবেন। অবশ্য ওঁর কানে এতক্ষণে হয়তো সব কথাই উঠে গেছে। কী যে লজ্জা করে—মনে হয় মরে যাই। যাঁদের অন্নে বেঁচে আছি, তাঁদেরই অপমান করছি, ছিঃ-ছিঃ!' দীপিকা মুখে সালোয়ারের ওড়না চেপে চলে গেল।
এতক্ষণ মেঘ কোনও কথা বলেনি। ঘরের এক ধারে জানলার ওপর বসেছিল। ও একটু অপ্রস্তুত। বলল, 'আমি তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। তুমি তো অনেকক্ষণ বেরিয়েছ আকিদা, সব ঠিক আছে?'
আক্কেল হাসল, বলল, 'হ্যাঁ, অনেকগুলো কাজ সেরে ফিরলাম।'
'তোমার ফোন না পেয়ে বাঁশি আমায় ফোন করেছিল। বলল, তোমার সঙ্গে কী সব কথা আছে।'
'হ্যাঁ, ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।'
'তোমার কি মনে হয় আকিদা,—দীপিকার কথায় হীরু থামবে, ও আবার কোনও গোলমাল পাকাবে না তো?'
'পাকাতেই পারে। চানটা সেরে নিই। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। ঝড়ু ডাকলেই আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করা যাবে না।'
আক্কেল স্নান সেরে বেরনোর আগেই ঝড়ু এসে হাজির।
খাবার টেবিলে আজ নতুন আর দুজন মানুষ। এখানে খেতে বসার সিটের অ্যারেঞ্জমেন্ট প্রায় একই রকম। কলকাতা থেকে মিটিং সেরে বিতান ফিরেছে একটু আগে। এখন কমলিকা দেবীর মেয়ে-জামাই নাতি চলে যেতে খাবার জায়গাটা অনেক ফাঁকা হয়ে গেছে। সবাই চেয়ার ছেড়ে ছেড়ে খেতে বসেছে। কিন্তু এসবের মধ্যে দীপিকার চেয়ারটা যেন অনেকটা দূরে সরে গেছে।
আজ খেতে বসার সময় কমলিকা আক্কেল আর মেঘকে তার মেয়ে-জামাইয়ের জায়গাটা দেখিয়ে বসতে বললেন। আক্কেল আর মেঘ তাদের আগের বসার সিট ছেড়ে কমলিকার পাশে এসে বসল। কিন্তু দীপিকা যেন সেই বেমানান ভাবে অনেকটা দূরে বসে।
কমলিকা নতুন দুজন মানুষের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। একজন মধুগোপাল নাথ। ল-ইয়ার। অন্যজন ভূদেব প্রসাদ। শংকর ট্রেডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অ্যাকাউন্টেন্ট। ওঁদের দুজনকেই কমলিকা ডেকেছিলেন কোম্পানির বিষয়ে ওঁর কিছু কথা জানাতে।
ওঁদের বসা দেখেই আক্কেলের মনে হল, ওঁরা বেশ চিন্তায় আছে। ওঁদের মধ্যে উকিলবাবু মধুগোপাল নাথ একবার আক্কেলের দিকে মুখ তুলে বলেছেন, 'কোর্টে আমাকে সবাই এমজি বলেই চেনে।'
মেঘ বলল, 'এমজি—মহাত্মা গান্ধী! কলকাতায় গেছেন নিশ্চয়ই—আপনার এমজি শুনে এমজি রোডের কথা মনে পড়ে গেল।'
কমলিকা দেবী বললেন, 'উনি খুব ভালো মানুষ। অনেক গরিব দুঃখীর কোর্ট কেস বিনা পয়সায় করে দেন।'
কমলিকার কথায় অমায়িক হাসলেন মধুগোপাল।
আক্কেল বলল, 'বাঃ, তাহলে তো আপনার এমজি-র আরও একটা মানে হল।'
অপরূপ বলল, 'আসলে বিচ্ছিরি নাম হলে, বা বড় নাম হলে বা কঠিন নাম হলে মানুষ এই অ্যাব্রিভিয়েশন ইউজ করে—।'
অপরূপের কথায় মধুগোপাল একটু ক্ষুণ্ণ হল, বলল, 'আমার নামটা বিচ্ছিরি নয়, খুব বড় বা কঠিনও নয়। তবু আমি এমজি হয়েছি। আসল কারণটা আমি জানি না।'
'আসল কারণটা অনেক সময় খুব সূক্ষ্ম হয়, সেটা লুকনোই থাকে। সাধারণভাবে ধরা যায় না।' কথাটা বলে আক্কেল তাকাল কমলিকা দেবীর দিকে। বলল, 'হয়তো আপনার এই অসহায় মানুষের দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়াটাই কারও মনে মহাত্মা গান্ধীর কথাটা মনে হয়েছে। সেখান থেকে সংক্ষেপে আপনি এমজি।'
মধুগোপালবাবুর মুখ চকচক করে উঠল, বলল, 'হ্যাঁ, আমি আমার উকিল জীবনের প্রথম দিকে ঢেলে গরিব-দুঃখীর কাজ করতাম বিনা পয়সায়। স্বর্গত কিরণশংকর মজুমদারই আমাকে এ ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। তবে এটা আমার পসার বাড়ানোর কাজে দিয়েছে। কিন্তু ওদের মনে আমি একটা ভরসা দিয়েছি। আজ আপনার কথায় সত্যি আমি আমার নামের অন্য একটা মানে পেলাম। আমার দায়িত্বও যেন বেড়ে গেল। জানেন এখনও কেউ এলে, তার টাকা না থাকলেও আমি ফেরাই না।'
অপরূপ বলল, 'হে হে আক্কেলবাবু আপনাকে পুরো গ্যাস খাইয়ে দিল!'
মধুগোপালের থমথমে মুখ, প্লেটের ওপর আঁচড় কাটছে। গম্ভীর গলায় বলল, 'আপনি জানেন না, এই বাড়ির মালিক স্বর্গত কিরণশংকর মজুমদারও অনেক অভাগাকে টেনেছেন। তার দু-একটা নাম আমি এখনই বলে দিতে পারি। যেমন, গঙ্গাচরণবাবু, নরেশবাবু...। এরা সব কী ছিল?'
'আমার বাবা, আমরাও...।' অস্ফুটে দীপিকা বলল।
বিতান বুঝেছে, ব্যাপারটা ঠিক ভালো জায়গায় যাচ্ছে না। সে বলল, 'মধুকাকা আপনি এখন আর রাজনীতিতে নেই শুনলাম।'
'না, রাজনীতিতে আর যাই করা যাক মানুষের কাজ করা যায় না। সব ছেড়েছুড়ে দিয়েছি। আর দল বা পার্টির কাজ নয়, যা করি নিডি মানুষের কাজ।'
ভূদেব প্রসাদ বললেন, 'উনি আমাদের খুব সাহায্য করেন।'
হঠাৎ বিতান বলল, 'তাহলেও আপনারা নিডি নন। পুরোপুরি অন্যের টাকায় একটা বড় বিজনেস চালাচ্ছেন।'
ভূদেব প্রসাদ মুখ তুলে তাকালেন বিতানের দিকে। বললেন, 'আপনার কথা একদম ঠিক। আমরা চাই আপনি বা আপনারা আসুন। কোম্পানির হাল ধরুন। চালান কোম্পানিটা। খুব ভালো হবে। আমরা জান লড়িয়ে দেব। কোম্পানিটা বাঁচলে, আমরা বাঁচব। আমরা আপনাদের ছাড়া চলতে চাই না।'
কমলিকা বললেন, 'খাওয়ার সময় এসব কথা থাক।'
বিতান বলল, 'ভূদেববাবু আপনার কি মনে হয় না, আমরা ঠকে যাচ্ছি?'
ভূদেব প্রসাদ বিষণ্ণ হাসি হাসলেন।
'আপনারা কোম্পানি চালান। কিন্তু আমাদের টাকাটা আমাদের দিয়ে দিন।' বিতান বেশ জোরের সঙ্গেই কথাটা বলল।
'আপনাদের টাকা, আপনারা তুলে নেবেন। নিতেই পারেন। কিন্তু, তাহলে আর কোম্পানিটা চালানোর কথা বলবেন না। শংকর ট্রেডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাশনের নামটা মুছে যাবে।'
'কেন মুছে যাবে? হীরক শুধু নামটা চাইছে। বাজারে, রেল কোম্পানির কাছে শংকর ট্রেডার্স-এর এখনও যা গুডউইল সেটা দিয়েও অনেক কাজ হয়। আমরা টেন্ডার দিলে এখনও সেটা গুরুত্ব পায়।'
'বিতানবাবু, শরীর যত তাগড়াই হোক, রক্ত বের করে নিলে সে শরীরের বিনাশ হবেই।' ভূদেব প্রসাদ বললেন।
বিতান কিছু বলতে যাচ্ছিল। হাত তুলে কমলিকা দেবী ওকে থামালেন। গম্ভীর গলায় স্পষ্ট স্বরে বললেন, 'মতামত যে কেউ দিতে পারে। শংকর ট্রেডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব আমি। আর এটা মতামত জানানোর জায়গা নয়। সবাইকেই বলা হয়েছিল আলোচনার টেবিলে আসতে। এমনকী আমি হীরুকেও ডেকেছিলাম। দীপুকেও খবর পাঠিয়েছিলাম।'
কমলিকা দেবীর কথায় গুম মেরে গেল বিতান। স্পষ্টতই সে আর খেল না। চুপ করে বসে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর 'আমি উঠছি' বলে উঠে চলে গেল। ঘরের পরিবেশ বেশ ভারী।
আক্কেল ভূদেব প্রসাদকে বললেন, 'আমি একবার আপনাদের অফিস দেখতে যাব।'
'ওয়েলকাম! চলে আসুন!'
আক্কেল কমলিকা দেবীর দিকে তাকাল, বলল, 'আজ দুপুরে কোনও একটা বাংলা চ্যানেলে 'ঝিন্দের বন্দি' দেখাবে।'
কমলিকা দেবী আক্কেলের দিকে শান্ত চোখে তাকালেন। বলল, 'আমি দুপুরে একদম টিভি দেখি না। বই পড়ি। সন্ধের পর আমার টিভি দেখা। তাও সিরিয়াল নয়। সিনেমা।'
মেঘ কমলিকা দেবীর চোখের দিকে তাকিয়ে হালকা চোখে আক্কেলকে দেখল। ও স্পষ্ট বুঝতে পারল, পরিবেশ হালকা করার জন্য আকিদা অহেতুক সিনেমার কথা তুলল।
আক্কেল বলল, 'সে আপনি আমাদের আগেই বলেছেন। কিন্তু ঝিন্দের বন্দি দেখে আপনাকে না বলে থাকতে পারলাম না। অপরূপবাবু 'ঝিন্দের বন্দি', 'অগ্নীশ্বর'-এর মতো সিনেমা বানান তো! দেখি কী করে ছবি ফ্লপ করে।'
অপরূপ মাথা নাড়ল, বলল, 'দুটো গ্রেট ছবি!'
আক্কেল কমলিকা দেবীর দিকে তাকাল, বলল, 'এখনও এসব সিনেমা টিভিতে হলে হাঁ করে দেখি। অনেকদিন এই দুটো সিনেমা টিভিতে দেয় না। আপনি তো বাংলা সিনেমা দেখেন—এখন টিভিতে কীসব আজেবাজে সিনেমা দেয় দেখেছেন।'
খাবার ঘরের পরিবেশ বেশ হালকা হয়ে গেছে। অপরূপ সিনেমা নিয়ে নানা কথা বলতে শুরু করল। আক্কেলের খাওয়া শেষ।
ঘরে ঢুকতেই আক্কেল বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল। মেঘ বলল, 'একটা কথা বলব আকিদা?'
'বলে ফেল।'
'তুমি কিন্তু আজ ধরা পড়ে গেছ। অমন উত্তপ্ত বাক্যালাপের পর তুমি যখন 'ঝিন্দের বন্দি'র কথা তুললে, আমি বুঝতে পেরেছি—তুমি ঘরের পরিবেশটা হালকা করার জন্য কথাটা বলছ। উনিও কিন্তু বুঝেছেন—তোমার উদ্দেশ্য সিনেমা নয়, স্রেফ ঘরের পরিবেশটা পালটে দেওয়া। তাই বলছিলাম তুমি ধরা পড়ে গেছ ওনার কাছে।'
আক্কেল হাসল। অদ্ভুত হাসি। বলল, 'আমার উদ্দেশ্য সিনেমাই...!'
কমলিকা বললেন, 'তুমি ওখানে বসলে কেন? এখানে এসে বসো।'
'এখান থেকে আপনাদের বাগানটা ভালো দেখা যায়।' আক্কেল বলল, 'আপনি ওই সোফায় বসুন।' কিন্তু আক্কেলের কথা কমলিকা শুনলেন না। বললেন, 'সোফায় বসলে বাগানের আলোটা তোমাদের দেখাতে পারব না।'
মেঘ সোফায় বসে একটা ম্যাগাজিন ওলটাচ্ছে। এর মধ্যে একবার কমলিকা বারান্দা থেকেও ঘুরে এলেন। আক্কেল বলল, 'আপনার খাটের গায়ে এই পরিগুলো অসাধারণ! খুব সূক্ষ্ম কাজ। এত সূক্ষ্ম কাজের লোক এদিকে আছে?' আক্কেল প্রশংসা করতে-করতে খুব খুঁটিয়ে পরির কাজ দেখছিল। কিন্তু মেঘের মনে হল, ও যেভাবে কাঠের কাজ দেখছে, এভাবে মানুষ সোনার কাজ দেখে। যেন ও কাজ দেখছে না তীক্ষ্ণ চোখে কিছু একটা খুঁজছে!
আক্কেল বলল, 'তাহলে শেষ পর্যন্ত কোম্পানির ব্যাপারে কী ডিসিশন নিলেন?'
'ডিসিশন তো আমার আগেই নেওয়া হয়ে গেছে। আমি ওদের ডেকেছিলাম বিতানকেও একবার জানাতে। কিন্তু বিতান আলোচনায় এল না, অথচ খাবার টেবিলে বসে স্পষ্ট জানাল বিষয়টা ও মেনে নিতে পারছে না। ওর আলোচনায় আসা উচিত ছিল। ওর বক্তব্যও জানানো উচিত ছিল।'
'কিন্তু ডিসিশন যে আপনি আগেই নিয়ে নিয়েছেন বলছেন!' আক্কেলের কথায় কমলিকা চুপ করে থাকেন। আক্কেল বলে, 'তা কাগজপত্র কবে সইসাবুদ করেছেন?'
'মধুগোপালবাবু কাগজপত্র একপ্রকার তৈরি করে ফেলেছেন। বিতান দেখল না। দেখবে না বলেই জানিয়ে দিয়েছে। সেক্ষেত্রে আমি আর বেশি দেরি করব না। ঝামেলা মিটিয়ে ফেলব।' বিমর্ষ গলায় কমলিকা বলেন।
হঠাৎ আক্কেল বলে, 'আমার মণিমায়ের গলায় আপনার হারের মতো একটা হার আছে! যেন দুটো হার এক জোড়া! একই কাজ।'
কমলিকা হাসেন, 'পাগল ছেলে! এই হারকে বিছে হার বলে। উনিও তাহলে বিছে হার পরেন আর কি—! কথাটা শেষ করতে পারেন না কমলিকা। দরজার বাইরে দূরের বাগানে তাঁর চোখ আটকে গেল। ফিসফিস করে বললেন, 'ওই দেখো।'
মেঘ লাফিয়ে আসতে যাচ্ছিল। আক্কেল তাকে হাতের ইশারায় আটকাল। নিজেও ঘাড় ঘোরাল না। বলল, 'এই হারগুলো খুব শক্ত হয়।'
কমলিকা বললেন, 'সোনা খুব শক্ত ধাতু।'
আক্কেল মাথা চুলকালো, 'কিন্তু ভারী বিছে হার টান দিয়ে ছেঁড়া শক্ত'। কিছুটা যেন বিড়বিড় করার মতো করে বলল। আর কথা বলতে-বলতে সে আলত ঘাড় ঘুরিয়ে বাগানের আলোটা দেখে নিল। বলল, 'ঠিকই বলেছেন। তা কতক্ষণ আলোটা থাকে?'
'তা বলতে পারব না। আমি বেশ কয়েকদিন ধরে এই আলোটা দেখছি। কাল একটু ভয় ভয়ই করছিল। চম্পাকলি থাকতে-থাকতে আমি খেয়ে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তখনও আলো ছিল। রাতে আর সাহস পাইনি খুলে দেখতে।'
'ভালো করেছেন।' মেঘের গলায় বেশ উত্তেজনা।
আক্কেল বলল, 'আপনার কী মনে হয়—খুনি বাগানে এসে অপেক্ষ করছে, ফাঁকা পেলেই আপনাকে খুন করবে?'
কাঁপা গলায় কমলিকা বললেন, 'আমাকে তো খুন করতেই এসেছিল, আমার গলায় দড়ির ফাঁসও দিয়েছিল। ও এখন কী চায়—আমি জানি না। তবে উনি বলতেন—ওঁর আশেপাশের কয়েকজন ছুরি শান দিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় বসে আছে। ওঁর কথা আমি শুনে বুঝতে পারতাম না। কিন্তু পরে বুঝেছি—যখন সত্যি হল। একদিন, একদিন সঙ্গে অশ্বিনী থাকল না, আর সেদিনই বিপদ ঘনাল।'
'আপনাকে কেউ কেন মারতে চাইছে, কী মনে হয় আপনার?'
দীর্ঘশ্বাস ফেলেন কমলিকা। বলেন, 'জানি না, তার জন্যেই তো তোমায় ডাকলাম। তবে আমার এখন মনে হচ্ছে, এসব কিছুই ওই কোম্পানিকে জড়িয়ে। আমি ওটা ছেড়ে নিষ্কৃতি পেতে চাইছি, কিন্তু—।'
'কিন্তু কী?'
'কিন্তু সেটাও আমার ছেলে-বউমা, হীরু কেউই পছন্দ করছে না। এখন তাই নিয়েও অশান্তি।' কমলিকা হাসলেন। বললেন, 'তবে আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি তার থেকে এক চুলও নড়ব না। সম্পূর্ণ মালিকানা ওদের দিয়ে দেব। এক কানা কড়িও কোম্পানি থেকে তুলব না। একদিন অপরূপ আমার কাছে একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল। বলছিল, শংকর ট্রেডার্স ওর নেক্সট ফিল্মটার প্রোডিউসার হোক। আমি রাজি হইনি। ও আমাকে অনেক টাকার লোভ দেখাচ্ছিল। নাম, যশের কথা বলছিল। আমি রাজি হইনি। ও মনোক্ষুণ্ণ হয়েছিল। পরের দিন নীলম আমাকে এসে বলল—আমি নাকি ওর দাদাকে ইনসাল্ট করেছি। অথচ আমি বলেছিলাম—ওই জগৎটা আমার মতো সাধারণ মানুষদের জন্য নয়। আমি এই ভালো আছি। আমি বুঝিনি এতে অপমানের কী আছে!'
কমলিকা থামলেন, একটুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। বললেন, 'তোমাকে একটা কথা বলি, বলতে আমার খারাপই লাগছে। নীলম আমার ছেলের বউ। কিন্তু মেয়েটা ভালো নয়। ওর ব্যাকগ্রাউন্ডও সুস্থ নয়। এই যে অপরূপকে ও এত দাদা দাদা করছে—এই অপরূপ কিন্তু ওর নিজের দাদা নয়, এমনকী ওদের মধ্যে কোনও আত্মীয়তারও সূত্র নেই। বরং ওদের দুজনকে নিয়ে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অন্য কথাই শোনা যায়।'
আক্কেল বলল, 'আমি জানি—আমি যা খবর পেয়েছি, ওদের দুজনের সম্পর্কটা অ্যাকট্রেস আর ডিরেক্টরের। আমি এ-ও শুনেছি, অপরূপবাবু নাকি কোথাও কোথাও বলেছেন—নীলমকে হিরোইন করার জন্যেই তাঁর দু-দুটো ফিল্ম ফ্লপ হয়েছে। আর ওঁর এই ক্ষতি-পূরণ করতে বাধ্য হয়েই নীলম ওঁকে এখানে নিয়ে এসেছে। যাতে কোনওভাবে বিতান বা আপনাকে বুঝিয়ে শংকর ট্রেডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের ব্যানার আর একটা ছবি করা যায়।'
কমলিকা ম্লান হাসলেন, বললেন, 'এগুলো আমি সব জানি। নীলম একটা প্রোডাকশন হাউস খুলতে চায়। সেটার নাম হবে কিরণ-কমল। অপরূপের কথা শুনে আমি হ্যাঁ-না কিছুই বলিনি। আমি বোকা নই, যে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর নাম আছে বলে গদগদ হয়ে সব টাকা ওদের হাতে তুলে দেব। একটা দু-পয়সার ফিল্ম ডিরেক্টর আমাকে ধাপ্পা দেবে! এই অপরূপ এসেছিল, বিতুর কোম্পানির প্রোমো অ্যাড বানাতে। মডেল ছিল নীলম। সেখান থেকে সমস্যাটা আমার ঘরে এসে ঢুকল—। সত্যি বলতে কী—আমি এই দুজনকে বেশ ভয়ই পাচ্ছি। ওরা টাকা হাতানোর মতলব করে এ বাড়িতে এসেছে, ওরা অনেক কিছু করতে পারে। ওই অপরূপ—ওর এত বড় সাহস, দীপুর কাছে এসে প্রেম নিবেদন করছে। ওকে বিয়ে করতে চায়। আর নীলম খেলছে অন্য খেলা!'
'কী খেলা?'
কমলিকা এক মুহূর্তও ভাবলেন না। বললেন, 'আমি কেন নন্দাদের চলে যেতে বললাম—তুমি কী ভাবছ বাগানের ওই আলো দেখে, আমি ঘাবড়ে গেছি। তা নয়, আমি দেখছিলাম, বিভিন্নভাবে অপরূপ ববের সঙ্গে ভাব পাতাচ্ছে। ববও ক'দিনেই আঙ্কেল আঙ্কেল করে অপরূপের আপন হয়ে গেছে। এইখানে আমার একটু আপত্তি আছে।'
'মানে?'
'বব যত অপরূপের সঙ্গে আপন হচ্ছে। ববকে নিয়ে অপরূপ সরে গেলে, নীলম অন্য খেলা খেলছে। সেটা আমার জামাই সুহৃদকে নিয়ে। ওরা ক'দিনেই সুহৃদকে বেশ কব্জা করে ফেলেছে। আমার মেয়ে বড় বেহুঁশ। সে জানে বাবা-ছেলে দুজনে একসঙ্গে আছে। কিন্তু আমি জানি তা নেই, অপরূপ ববকে নিয়ে বাগানে ঘুরছে, আর ওই ঘরে সুহৃদ আর নীলম গল্প করছে। ওই মেয়ে একটা ডাইনি।'
'আর আপনার ছেলে!'
'ও অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিতু যে কী করে অমন একটা মেয়ের সঙ্গে ফেঁসে গেল, তা এখনও আমি বুঝে উঠতে পারছি না। তবে এখন ও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। যতদূর শুনেছি, ওদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটাও ভাঙতে বসেছে। যে ভাব-ভালোবাসা সামনে দেখছ, তা লোকদেখানো। এসব অনেক কথাই বিতু দীপুকে বলেছে, ও নীলমের হাত থেকে বাঁচতে চায়। ও ওর কাজ নিয়েই মেতে আছে। নইলে এ ক'দিনে ও কতবার কলকাতায় গেল আর এল নিজেই জানে না।'
আক্কেল বলল, 'কিন্তু আমি তার পরেও বলব—নীলমকে নিয়ে এটা আপনার অনুমান।'
'না, অনুমান নয়। ক'দিন আগে বিতান কলকাতায় গিয়েছিল। মিটিং-এ। সেদিন সারা দুপুর অপরূপ আর বব ছিল আমাদের দোতলার ঘরে। আর ওরা ঢুকেছিল হাতিঘরে।'
'হাতিঘর বলতে—দোতলার কোণের ঘরটা?'
'হ্যাঁ, এক সময় ওই ঘরটা খুব সাজানো গোছানো ছিল। বলতে পারো, আমার স্বামীর সংগ্রহ করা যাবতীয় জিনিসের মিউজিয়াম। ওখানে বড় দুটো হাতির দাঁত আছে, তাই ওটা হাতিঘর।'
'আপনাদের বারান্দায় একটা হাতির দাঁত ছিল শুনলাম? সেটাই কী এখন ওই ঘরে আছে?'
'না, বারান্দার হাতির দাঁতটা চুরি হয়ে যায়। হীরুরই কাজ। তারপর থেকে বাইরে আরও যা যা ছিল সব আমি হাতিঘরে ঢুকিয়ে তালা বন্ধ করে দিয়েছি। ওখানে ঝড়ু রোজ গিয়ে ঝাড়পোছ করে। ওই ঘরে নীলম আর সুহৃদ সারা দুপুর কাটিয়েছে। সেখানেই ওদের দুজনকে বেশ আপত্তিজনক অবস্থায় দেখা গেছে। যে দেখেছে সে মিথ্যে বলবে এত সাহস তার নেই, শুধু ওই দিন নয়, আমার মনে হয়, ওরা আরও অনেক সময় ওই ঘরে ঢুকেছিল। যা, একমাত্র অপরূপ শয়তানটাই জানে। কেন না ওই দিন দুপুরে ওদের সুযোগ করে দিয়ে, ওদের ঘরে অপরূপ ট্যাবে গেম খেলেছে ববের সঙ্গে।
'আপনি নন্দিনীকে কিছু বলেছেন?'
'না, নন্দাকে কিছু বলিনি, শুধু ওদেরকে এখান থেকে পাঠিয়ে দিলাম। আসলে আলোটা দেখে সত্যি বলছি, আমি আর নন্দা একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তাতে আমার ডিসিশন নিতে সুবিধে হয়।'
'ভালোই করেছেন। আজ সকালে থানায় গিয়েছিলাম। বজরঙ্গবাবুর সঙ্গে আলাপ করে এলাম।'
'হ্যাঁ, শুনেছি। শুনলাম, থানায় যাওয়া নিয়ে হীরু তোমায় উলটোপালটা কথা বলেছে। ওর মাথা সবসময়ই গরম!'
আক্কেল হাসল, বলল, 'খুনোখুনির মধ্যে ঢুকলে একটু-আধটু বিপদের সামনে পড়তেই হয়।'
লজ্জিত কমলিকা বললেন, 'দেখি কোনওভাবে আমি ওকে খবর পাঠিয়ে বলে দেব—আর যেন ও তোমাদের কিছু না বলে। ও আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে।'
আক্কেল বলল, 'কোনও দরকার নেই। ব্যাপারটা ওখানেই মিটে গেছে। দয়া করে টেনে আনবেন না। তাতে আমার কাজের অসুবিধে হবে।'
কমলিকা ঘাড় নাড়লেন। ওঁর রাতের খাবার নিয়ে এল চম্পাকলি। চম্পাকলি বলল, 'মায়ের খাওয়া হয়ে গেলে আমাকে অশ্বিনীকাকাকে ডাকতে যেতে হবে। উনি আমাকে তাই বলে রেখেছেন।'
আক্কেল বলল, 'ঠিক আছে। তাই করো।'
বাইরে এসে মেঘ বলল, 'আমিও দেখলাম আলোটা আছে।'
'যে জায়গাটায় আলোটা জ্বলছে জায়গাটা চিনতে পারবি?'
'পারব, কিন্তু যেতে পারব না। তুমিও যেও না। যদি কেউ অ্যাটাক করার জন্যে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকে—পুলিশে একটা ইনফর্ম করে উনি ব্যাপারটা দেখতে পারেন। কিন্তু ওঁর কেমন একটা নিষ্পৃহভাব। আমার ভালো ঠেকছে না।'
'ভালো ঠেকছে না মানে। দেখো, এক বয়ষ্কা ভদ্রমহিলা আমাদের এই কাজটা দিয়েছেন। আমরা এসেছি এক বয়ষ্কা মহিলার ওপর যে হামলা করেছে তাকে ধরতে। আমার তো মনে হচ্ছে ওই দুজন এক।'
মেঘের কথায় আক্কেল ভ্রূ কোঁচকাল। বলল, 'কেন তোমার এমন মনে হল?'
মেঘ বলল, 'উনি আমাদের কাছে প্রথম থেকে নিজেকে লুকিয়েছেন। এমনকী বয়েসটাও বুঝতে দেননি। সেকেন্ড ডে-তে ফোনের ওই ভদ্রমহিলা কী বলেছিলেন মনে আছে—বলেছিলেন তুমি আমার থেকে অনেক ছোট। কত ছোট বলব না। যদি বলি ছেলের বয়সি, তাহলে তুমি আমার বয়েসের একটা আন্দাজ পেয়ে যাবে। আবার নাতির বয়েসি বললেও সেই একই ব্যাপার। আমার বয়েস কত, তার হিসেব করতে বসবে। তাই শুধু এটুকু জেনে রাখো, আমি তোমার থেকে অনেক বড়।'
আক্কেলের কপালে ভাঁজ।
মেঘ বলল, 'ওর ওপর বাড়ির ভেতর হামলা হল। সবাই বলছে হামলা করেছে হীরু। ওনার কিন্তু মনে-মনে হীরুকে নিয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু উনি যুক্তি দিয়ে হীরুর নামটা বাদ দিতে চাইছেন। বলছেন, ওর স্বামীর খুনিই ওর ওপর হামলা করছে। হীরু তখন ছোট। ব্যাপারটা নিয়ে উনিই বেশি কনফিউজড।'
মেঘের কথার মাঝে আক্কেল দেখল, বারান্দার রেলিং-এর ধারে বেতের সোফায় বিতান আর দীপিকা বসে। দীপিকার হাত দিরে বিতান কিছু একটা দেখছে। হঠাৎ দেখা গেল একতলার সিঁড়ি দিয়ে হুড়মুড় করে উঠে আসছে নীলম। উঠে এসে সটান বিতান আর দীপিকার মুখোমুখি, বেতের একটা সোফা টেনে বসল। তারপর তীব্র গলায় হিসহিস করে উঠল, 'ইস, বড় অসময়ে এসে পড়লাম। নাহলে জানতেই পারতাম না, তোমাদের কেমন প্রেমালাপ চলছে। তা, এখন কি এনগেজমেন্ট রিং পরানো হচ্ছিল!'
অপ্রস্তুত বিতান বলল, 'আরে, এই দেখো, ছোটবেলায় আমি একবার এয়ারগান মেরে ওর হাতের ওপরটা কেটে দিয়েছিলাম। সেই দাগ এখনও মেলায়নি, সেটাই হঠাৎ চোখে পড়ল। চলো আমরা বরং খেতে যাই, আমি তোমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।'
'কথা ঢাকার চেষ্টা কোরো না বিতান। তাহলে তুমি আমায় ফোন করে জানতে আমি কোথায়। আমি তো জানতাম তোমার সঙ্গে দীপিকার কোনও সম্পর্ক নেই। এখন তোমাদের দুজনকে দেখলে মনে হয় না তোমাদের মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই। আমাকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা কোরো না।'
'বাজে কথা বোলো না, সত্যিই আমরা তোমার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম।' দীপিকা হালকা গলায় বলল।
'শাট আপ! আমি আমার হাজবেন্ডের সঙ্গে কথা বলছি। তুমি এর মধ্যে মাথা গলাচ্ছ কেন—নষ্ট মেয়েমানুষ! অন্যের স্বামীর দিকে হাত বাড়াতে লজ্জা করে না। বিবেকে বাধে না। নষ্টামি করছ, আবার আমাকে জ্ঞান দিচ্ছ? এ-বাড়ির ওপর তোমার খুব লোভ আমি জানি।'
'কী করে জানলে এমন কথা? কে তোমায় বলল—' দীপিকা হাসল।
'কাউকে বলতে লাগে না। নিজের চোখেই তো সব দেখতে পাচ্ছি। আর কার মুখ তুমি ঢাকবে। ঠাকুর চাকর থেকে সারা মনোহরগঞ্জের লোকজন তোমাদের কথা জানে।'
দীপিকার মুখ লাল, বলল, 'ভদ্রভাবে কথা বলো। তুমি ঠাকুর চাকরের সমগোত্রীয় নও। আর তুমি বাইরের লোকও নও। তুমি এ-বাড়ির বউ। নিজেকে এত ছোট কোরো না। এটা সিনেমা পাড়া নয়, এটা বাড়ি। নিজের মনের নোংরামিটা এভাবে প্রকাশ্যে এনো না।'
'আমি নোংরা, তবে তুমি কী! তোমরা কী! তোমার মা, তোমার ভাই, তুমি—সবক'টা ধান্দাবাজ। এ-বাড়ির রক্ত চুষছ!'
'তুমি আমাকে যা বলছ বলো—কিন্তু আমার মায়ের নাম মুখে আনবে না।'
'কেন আনব না? উনি সতীলক্ষ্মী নাকি! সব আমি জানি। আর আনলে কী করবে—?'
'বললাম তো এনো না, কিছু বলার থাকলে আমাকে বলো। আমার মায়ের কথা তোমার মুখে যেন আর না শুনি।'
'শুনলে কী করবে? তুমি আমাকে হুমকি দিচ্ছ?'
'হ্যাঁ, তাই দিচ্ছি। এটা কলকাতার সিনেমাপাড়া নয়।' দীপিকা ভয়ঙ্কর রাগে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ওদের মাঝে এসে দাঁড়ায় অপরূপ। বলে, 'প্লিজ তোমরা একটু শান্ত হও। এখানে বাইরের লোক আছে, তারা কী ভাববে?'
'তাদেরও জানতে কিছু বাকি নেই। ওরাই পুলিশ ডাকবে। তখন এদের সবার কোমরে দড়ি পরবে।' নীলম বলল।
দীপিকা বলল, 'সবার কোমরে নয়, আমার কোমরে দড়ি পড়বে—আর দড়ি পরার আগে সেই দড়ি আমি তোমার গলায় পেঁচিয়ে মেরে রেখে যাব।'
অপরূপ আবার বলল, 'এটা মোটেই ভালো হচ্ছে না। তোমাদের দুজনের যদি কোনও ব্যাপারে কথা বলতে হয় ঘরে যাও। বা কাল সকালে বাগানে বসে ধীরে সুস্থে আলোচনা করো। আর তো ক'টাদিন, তারপর আমরা আবার যে যার জায়গায় ফিরে যাব।'
অপরূপের কথা নীলম পাত্তা দিল না। বলল, 'যে বাড়ির খেয়ে বড় হলে, সেই বাড়ির ক্ষতি করছ? এখন হাতেনাতে ধরেছি, তাই আমাকে ভয় দেখাচ্ছে! ভালো, ভদ্র, কিন্তু ভেতরটা আর লুকাতে পারছ না। মায়ের গুণ আর যাবে কোথায়?'
দীপিকা এগিয়ে আসে, ওর উদ্ধত হাত দেখে ভয় পেয়ে সরে যায় নীলম। দীপিকা বলে, 'আর একটা কথা বললে—আমি তোমায় ধাক্কা মেরে নীচে ফেলে দেব।'
দীপিকার কথায় নীলম ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে চুপ করে যায়। তারপর হাউহাউ কান্নায় বিতানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বলে, 'দেখো তুমি থাকতে, এ-বাড়িতে আমায় কীভাবে অপমানিত হতে হল। এজন্যে আমি এখানে আসতে চাইনি।' বিতান নীলমকে নিয়ে ঘরে চলে যায়। নীলম ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
অপরূপ এগিয়ে আসে, বলে, 'ও পাগল! ওর খুব সন্দেহবাতিক! আসলে আমাদের ফিল্ম লাইনে স্ট্রাগল করতে গিয়ে ও অনেক কিছু দেখেছে। তাই ও সহজে কিছু নিতে পারে না। ওর জন্যে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি।'
অপরূপের কথায় দীপিকা ওর দিকে ঘুরেও তাকাল না।
অপরূপ বলল, 'আসলে ওর মেজাজ দুপুর থেকেই খারাপ হয়ে আছে। আমি আজই ওকে তোমার কথা বলছিলাম। ও তখনও নিতে পারেনি। আমি ভেবেছিলাম—ও আমার কথা শুনে, তোমাকে আমাকে সাহায্য করবে। কিন্তু ও তখনই রেগে গেল। উলটে আমাকেই পাঁচ কথা শুনিয়ে দিল। তখন থেকেই ওর মাথাটা গরম হয়ে ছিল আর কি!'
'কী কথা বলেছেন আপনি—।'
অপরূপ হালকা কাশল, বলল, 'আমি আমার ভালো লাগার কথাই বলেছিলাম। আপনাকে যে কথা বলেছি, সে কথাই ওকে বলেছিলাম, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। ও যদি আমার হয়ে, ওর শাশুড়ি, তোমার মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে—।'
দীপিকা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, 'প্লিজ অপরূপবাবু আপনি যান—আমার কিছু ভালো লাগছে না।'
অপরূপ গেল না, উলটে বেতের চেয়ারে বসল। আর দীপিকা হনহন করে চলে গেল।
আক্কেল বলল, 'চল মেঘ আমরা খাবার ঘরে যাই। আজ রাতে অনেকেই খাবে না।'
আক্কেলের অনুমান ঠিক, কেউই খেতে আসেনি। এখন অনেক মানভঞ্জনের পালা হবে। সত্যি খাবার ঘরে আজ কেউ আসেনি। শুধু অশ্বিনীবাবু এসে ওদের মুখোমুখি খেতে বসলেন। আক্কেল বলল, 'আপনার শরীর কেমন আছে?'
'ঠিক আছে।' ম্লান হাসলেন অশ্বিনীবাবু। বললেন, 'শরীরের কোনও দোষ নেই, সব আমার কপাল!'
খাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় দশটা। খেয়ে ঘরে এল না আক্কেল, বলল, 'একটু পায়চারি করে আসি। যাবি না কি?'
মেঘ বলল, 'তোমার আবার এ নেশা কবে থেকে হল?'
আক্কেল বলল, 'একটা চক্কর দিয়েই ফিরে আসছি।'
কিছুক্ষণের মধ্যেই ও ফিরে এল। মেঘ তখন মোবাইল নিয়ে খুটখাট করছে। 'কী হল চলে এলে?'
'বাইরে খুব মশা রে, হাঁটতে গেলে, বা বাইরে কোথাও দু-দণ্ড দাঁড়ালে, মশা তাড়ানোর ধূপ নিয়ে যেতে হবে।'
আক্কেল বাড়ির বাইরে পোর্টিকোর নীচে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। আজ একবার শংকর ট্রেডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের অফিসে যাবে। মধুগোপালবাবুকে বলা আছে। ফার্স্ট আওয়ারে গিয়েই অফিসটা একবার ঘুরে আসতে হবে। মধুগোপালবাবু সকাল দশটার সময় গাড়ি পাঠাবেন।
ঠিক দশটায় গাড়ি এল। গাড়িতে স্বয়ং মধুগোপালবাবু। যেতে যেতে মধুগোপালবাবু বললেন, 'আপনার ওই ফিল্ম ডিরেক্টর লোকটা সুবিধের নয়। উনি ঝোপ বুঝে কোপ মারতে চাইছেন। মিসেস মজুমদারকে বড় জ্বালাচ্ছেন।'
'হ্যাঁ, আমাকে কমলিকা দেবী বলেছেন।'
'বাড়ির বউ সে-ও ওর সঙ্গে তাল দিচ্ছে। পরিবারের মানসম্মান দেখছে না। বিতুটার জন্যে খারাপ লাগে।'
মনোহরগঞ্জ খুব ছোট জায়গা। মিনিট পঁচিশ লাগল না। ওঁরা পৌঁছে গেল অফিসে। ওদের জন্যে বাইরেই দাঁড়িয়েছিল ভূদেব প্রসাদ। অফিস বাড়িটা বেশ অনেকটা জায়গার ওপর। মধুগোপালবাবু কোর্টে চলে গেলেন। ভূদেববাবু বললেন, 'আপনি কী দেখতে চান বলুন?'
আক্কেল হাসল, বলল, 'আলাদা করে কিচ্ছু দেখতে চাই না। সেরেফ এখানে আসতে চেয়েছিলাম। শংকর ট্রেডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনকে একবার চোখের দেখা দেখতে চেয়েছিলাম। আমাকে অশ্বিনীবাবু বলেছিলেন—কোম্পানি উঠে গেছে। আর কমলিকা মজুমদার আবার কোম্পানির বিলিবন্টনের কথা বলছিলেন। তাই একবার চোখের দেখা দেখতে চেয়েছিলাম।'
'আপনি কী কারও সঙ্গে কথা বলতে চান?' ভূদেববাবু বললেন।
'একটা কথা জানার ছিল, কিরণশংকরবাবু যখন মারা যান, তখন আপনাদের রাইভ্যাল কোম্পানি কারা ছিল?'
ভূদেববাবু হালকা কাশলেন, বললেন, 'সত্যি কথা বলতে কী আমরা যে সব জিনিস নিয়ে টেন্ডার করি, তাতে আমাদের রাইভ্যাল গ্রুপ সারা ভারতে ছড়ানো। তবে কিরণশংকরবাবু খুব বড় কন্ট্রাকটের জন্য ঝাঁপাতেন না। উনি ছোট ছোট অনেক টেন্ডার ধরতেন। কিন্তু পরিমাণে বা সংখ্যায় অনেক। ওঁর পলিসি ছিল বড় টেন্ডারের জন্য কামড়াকামড়ি করব না। বরং ছোট টেন্ডার ধরো, বেশিসংখ্যক কাজ করো, এতে কারও চোখে পড়বেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে কোম্পানির গ্রোথ ভালো হবে। কিন্তু তাতেও শত্রুতা কম ছিল না।'
'এই ছোট টেন্ডারের ক্ষেত্রে ওঁর কমপিটিটর কারা ছিল?'
'আলাদা করে কার নাম বলি, উমেদপুরের ওমপ্রকাশ গুপ্তাজির গুপ্তা গ্রুপ, এমডি এল রাজারা আমাদের পলিসিতে চলত। ফলে ওদের সঙ্গে এই রিজিওনে আমাদের বেশ টক্কর হত। কিন্তু সেটা কখনওই খুনোখুনির পর্যায় নয়। আমার মনে হয় ওঁর মৃত্যুটা ডাকাতি ছাড়া আর কিছু নয়। ওঁর শরীরে এত সোনা থাকত—এত সোনার জিনিস পরতেন—। সে সময় পুলিশও ডাকাতি করার জন্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল।'
'তারা কি স্বীকার করেছিল? তাদের কি শাস্তি হয়েছিল?'
'সেরকম কোনও খবর জানি না, থানায় গিয়ে খোঁজ করতে হবে।'
'বজরঙ্গবাবুর কাছেও তাদের কোনও তথ্য নেই। ডাকাতি ও খুনের জন্যে কাউকে ধরা হয়নি।'
ভূদেববাবু বললেন, 'সে কতদিন আগের কথা—। কাল ওনার মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা এইদিনে সবাই ওঁদের বাড়িতে যাই। এদিনটা আমাদের সবার কাছেই খুব দুঃখের।'
আর একজন এসে ভূদেববাবুর পাশে বসলেন।
'উনি বিজয়কৃষ্ণবাবু। অ্যাকাউন্টস দেখেন।'
আক্কেল বলল, 'নরেশ যাদবের সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে?'
'নরেশ যাদব! লোকটা কিন্তু সুবিধের নয়। ওকে কী বলবেন? আমাকে বলুন না আমি বলছি আপনাকে।'
'না, না, তেমন কিছু না। শুনেছিলাম, কিরণশংকরবাবু মৃত্যুর পর ওঁকে ডাকা হয়েছিল। একটু জানব—পুলিশ কেন ওকে ডেকেছিল?'
'পুলিশ শুধু ওকে কেন, শ্যামল পাত্রকেও ডেকেছিল। আমাদের সঙ্গে এসেও কথা বলেছিল। কিন্তু তেমন কোনও ব্যাপার পুলিশ পায়নি।'
'তবু আমি একটু কথা বলতে চাই।'
হালকা গলায় ভূদেববাবু কাশলেন, বললেন, 'লোকটা খুব খতরনাক। জায়গা-জমি নিয়ে গণ্ডগোলে ও ওর এক জ্ঞাতি ভাইকে খুনও করেছে। এখানে আসার পরেও কোর্ট পুলিশে কম দৌড়েছে। শেষে বড়বাবুই অনেক টাকাপয়সা দিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়েছিলেন।'
'বড়বাবু কেন?'
'ওকে বড়বাবু তো অফিসের কাজের জন্য রাখেনি। রেখেছিল চারদিকের নানা হুজ্জতি, গোলমালে ও ছিল বড়বাবুর বডিগার্ড।'
'তা হলে বড়বাবুর নামে কুৎসা করত কেন?'
আক্কেলের কথায় ভূদেববাবু চুপ করে থাকেন। বেশ অনেকক্ষণ পরে বিজয়কৃষ্ণবাবু বলেন, 'অল্প কথায় এটা হচ্ছে দুই চামচার লড়াই। নরেশ আর অশ্বিনীর। কে বড়বাবুর কত কাছে যাবে। এই লড়াইয়ে অ্যাডভান্টেজ পেয়েছিল অশ্বিনী—বিয়ে করে, তাতেই নরেশের সব রাগ।'
'এটা কবে থেকে?'
একটু চুপ করে থেকে বিজয়কৃষ্ণবাবু বললেন, 'হঠাৎই বড়বাবু অশ্বিনীর বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। অশ্বিনীর আপত্তি ছিল। কিন্তু বড়বাবু শুনলেন না, বিয়ে দিলেন। আপনি অশ্বিনীর স্ত্রী জয়াকে দেখেছেন, অপূর্ব সুন্দরী। বউ পেয়ে অশ্বিনী খুব খুশি হয়েছিল—।' হঠাৎ কথা থামায় বিজয়কৃষ্ণ।
'খুশি হয়েছিল—খুশি থাকল না কেন?'
চুপ করে থেকে বিজয়কৃষ্ণবাবু বললেন, 'দীপু। বিয়ের সাত মাসেই দীপু হল—তারপর একটা অশান্তি। মন্দ লোকের মন্দ কথা। ছোট টাউন তো।'
'চলুন একটু নরেশ যাদবের সঙ্গে কথা বলি।'
ভূদেববাবু বললেন, 'মধুগোপালবাবু চলে গেছেন। আপনি চলুন, আমি নিয়ে যাচ্ছি।'
ভূদেববাবু আক্কেলকে অন্য একটা ঘরে নিয়ে এলেন। একজন লোক ঘরটায় একা বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। ভূদেববাবু বললেন, 'নরেশ এনাকে বউদি পাঠালেন। উনি ও-বাড়ির গেস্ট। আমাদের অফিস দেখতে এসেছেন। তোমার সঙ্গে একটু কথা বলবেন।'
'বসুন।'
'আপনি কথা বলুন। আমি ও-ঘরে আছি।' ভূদেববাবু চলে গেলেন।
আক্কেল হাত তুলে নমস্কার করল। 'আমার নাম আক্কেল বসু।'
'আমার নাম নরেশ যাদব। আপনি কলকাতা থেকে এসেছেন, মহারানিকে অ্যাডভাইস দিতে। তা কোম্পানি নিয়ে কী অ্যাডভাইস দিলেন?'
নরেশ যাদবের কথা শুনে আক্কেল হাসল, 'না, আমি কোম্পানি নিয়ে অ্যাডভাইস দিতে আসিনি।'
'আচ্ছা বলতে পারেন—ওনার কী অসুবিধে আমাকে নিয়ে? আমি ওনার কোনও বাড়া-ভাতে ছাই দিয়েছি?'
'সেটা আমি কী করে বলব?'
'তবে আপনি কী বলবেন? আমি বলছি—কিরণশংকর মজুমদারের রাখেল যে অশ্বিনী সরকারের বউ জয়া তা সারা মনোহরগঞ্জের লোক জানে। ওই মেয়ে দীপু—ও কিরণশংকরের মেয়ে। আমি এটা মুখে বলেছি বলে আমি খারাপ। দাও আমাকে কোম্পানি থেকে বাদ দিয়ে দাও। আমি কিছু বললে—কোম্পানির সব চামচেরা আমার মুখ বন্ধ করার জন্যে ছুটে আসবে। আমাকে একঘরে করে রেখেছে। কিন্তু আমি যতদিন থাকব, পানিকে পানি বলে যাব। আমি কখনও পানিকে দুধ বলব না।'
নরেশ যাদবের কথা শুনে শান্ত গলায় আক্কেল বলল, 'কী দরকার অন্য বাড়ির, অন্য মানুষের কেচ্ছা করার, হরি নাম করুন নরেশবাবু, ভালো থাকবেন।'
'আমাকে ট্রাস্টি থেকে বাদ দেবে? আর আমি ওদের হরিনাম শোনাব? এরপর মাইক ফুঁকব, সব ইতিহাস খুলে দেব। এমন হাঁড়ি ফাটাব না...।'
'আপনি বরং কিরণশংকরবাবু কীভাবে খুন হলেন সেই হাঁড়ির ফাটান—আমি একটু শুনি। পুলিশ কেন আপনাকে ডেকেছিল?'
'আপনি কী বলতে চাইছেন, খুনের ব্যাপারে আমি জানি?'
'লোকে তাই বলে। বলে পুলিশ ভালো করে ইনভেস্টিগেশন করেনি। করলে নাকি আপনার কোমরে দড়ি পরত?'
কথাটা শুনেই লাফিয়ে ওঠে নরেশ যাদব। 'এখানে কী করতে এসেছেন—মাজাকি! আমাকে খুনি সাজাবেন?'
আক্কেল বলল, 'মাজাকি মানে মজা আর ইয়ার্কি মিলে শব্দটা তৈরি হয়েছে না? আমি কিন্তু মজা করতে আসিনি, আমি এসেছি কিরণশংকরবাবুর খুনের কথাটা জানতে? পুলিশ কেন ডেকেছিল আপনাকে?'
'সেটা পুলিশের কাছে গিয়ে জিগ্যেস করুন।'
'আপনার নামে আগে একটা খুনের কেস ছিল—সেই কেসটা কিরণশংকরবাবুই ধামা চাপা দিয়েছিল। তাই তো? তাঁকেই কি না শেষ পর্যন্ত আপনি খুন করলেন।'
নরেশ যাদব চিৎকার করে বলে, 'আপনাকে আমি ছাড়ব না, আপনি আমার নামে বদনাম রটিয়ে যাচ্ছেন।'
'বদনাম করছি না, দড়ি পরানোর ব্যবস্থা করছি।'
'আপনার এত হিম্মত—আমাকে দড়ি পরাবেন! আপনি পারবেন প্রমাণ করতে আমি খুন করেছি?'
আক্কেল হাসল, 'পুরনো কেসটা প্রথমে খুঁচিয়ে তুলব। যে গ্রামে জ্ঞাতিভাইকে খুন করে এসেছিল সে কি আর একটা খুন করতে পারে না?'
'তবে রে...তুই আমাকে চমকাতে এসেছিস। শালা এটা মনোহরগঞ্জ, এখান থেকে তুই জ্যান্ত ফিরবি না।'
ভূদেববাবু আরও কয়েকজন এসে আক্কেলকে আড়াল করে দাঁড়ায়। কয়েকজন নরেশকে টেনে নিয়ে যায়।
বিজয়কৃষ্ণবাবু এগিয়ে আসেন, বলেন, 'ভাই আপনি গাড়িতে উঠুন। ও এখন অনেক গর্জাবে। আপনি ভীমরুলের চাকে ঢিল ছুঁড়েছেন। আপনার এখন চলে যাওয়াই ভালো।'
ওরা গাড়িতে ওঠে, গাড়ি চলতে শুরু করে।
গাড়িতে আসতে-আসতে বিজয়কৃষ্ণবাবু বললেন, 'আমরা কিন্তু চাই না ওরা দুজন ট্রাস্টি থেকে বাদ যাক। কিন্তু মিসেস মজুমদার কিছুতেই ওদের রাখবেন না। এক্ষেত্রে আমাদের কিচ্ছু করার নেই। ওরা ক্ষ্যাপা কুকুর হয়ে আছে।'
আক্কেল জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, 'কী মনে হয় নরেশ যাদব কামড়াতে পারে?' সবাই চুপ করে। আক্কেল বলল, 'আমার কিন্তু মনে হয় ওর চিৎকারই সার। ওর ওপরে কেউ চিৎকার করলে তবে উনি থামবেন। আমাকে একটু থানায় ছেড়ে দিন।'
বিজয়কৃষ্ণবাবু বিব্রত মুখে বললেন, 'আপনার কি মনে হয় এসব নরেশের কীর্তি?'
'উনি কীর্তিমান!'
আজ স্বর্গত কিরণশংকর মজুমদারের মৃত্যুবাষির্কী। সকাল থেকেই পুজোর আয়োজন চলছে। পুজোয় বাইরের লোকজন প্রায় কেউ নেই। আক্কেল দেখল, সকালের ব্রেকফাস্ট করতে এসেছে তারা চারজন। সে, মেঘ, অপরূপ আর নীলম। আজ ব্রেকফাস্ট নিরামিষ। এই ক'দিনে সে দেখেছে, এ-বাড়ির ব্রেকফাস্টে ডিম মাস্ট। আজ লুচি, আলুর তরকারি, আর মিষ্টি।
খেতে-খেতে নীলম বলল, 'আমি একদম উপোস করতে পারি না।' স্পষ্ট বোঝা গেল, কথাটা সে জয়াকে শোনাচ্ছে। নীলমের কথায় জয়া তীব্র চোখে তার দিকে তাকাল। আজ এ-বাড়ির অনেকেই উপোস করে আছে। নীলমের কথার রেশ ধরে উপোস কীভাবে শরীরের ক্ষতি করে, অপরূপ বিস্তারিত বোঝাচ্ছে মেঘকে। আর মেঘ তা তেতো গেলার মতো শুনছে।
নীলম অপরূপ খেয়ে বেরিয়ে যেতে জয়া ফিসফিস করে আক্কেলকে বললেন, 'ছেলেটাকে কাল রাতে বললাম—আজ পুজোর সময় একবার আসতে। এসে বড়মার পাশে বসতে। যা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে মিটে যাবে। এ-বাড়ির শান্তির জন্যে আজ অন্তত তুই একবার আসিস।'
'কী বলল শুনে? আসবে?'
'আমার সঙ্গে ও কথা বলে না। আমি ওর ঘরে গিয়েই বসে এলাম। আসার কথা কিছু বলল না। শুধু আমি যখন চলে আসছিলাম তখন বলল,—আমার সঙ্গে বড়মার কোনও ভুল বোঝাবুঝি নেই।'
'তবে আর চিন্তা করছেন কেন? হীরুবাবু আসুক, না-আসুক ও নিশ্চয় এ-বাড়ির মঙ্গল চায়।'
'কী জানি! লোকে তো ভিন্ন কথা বলে।'
'এত বাইরের লোকের কথা শুনছেন কেন?'
'এ-বাড়ির লোকেরা সব বাইরের লোকের কথাই বেশি শোনে।' জয়া খুব হতাশ গলায় বললেন।
একতলার হল ঘরে কমলিকা, দীপিকা পুজোর আয়োজন করছে। চম্পাকলি জোগানদার, ওদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন অশ্বিনীবাবু। আক্কেল ওখানে যেতেই অশ্বিনীবাবু ওকে বললেন, 'জল খাবার খেয়েছেন?'
আক্কেল ঘাড় নাড়াল। অশ্বিনীবাবু বললেন, 'আপনার সঙ্গে একটা কথা আছে?'
'বলুন।'
'একটু এদিকে আসুন।' অশ্বিনীবাবু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। বললেন, 'আমি একটা খবর পেয়েছি, সেদিন বউদির ঘরে ঢুকেছিল নরেশ যাদব।'
'আপনাকে কে বলল?'
'আমি খবরের সোর্সটা বলব না। খুবই বিশ্বস্তসূত্রে পেয়েছি। তবে খবরটা মনে করি সত্যি। দাদার মৃত্যুর পর পুলিশ ওকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তারপর ছেড়েও দিয়েছিল। আপনি তো বজরঙ্গবাবুর সঙ্গে দেখা করেছেন। আজ কাজ শেষ হলে—ভাবছি আমি একবার যাব। ওঁকে বলে আসব।'
'সে আপনি যা ভালো বুঝবেন করবেন।'
অশ্বিনীবাবু মাথা ঝুঁকিয়ে কী যেন ভাবলেন। বললেন, 'একটুর জন্য কত বড় বিপদ থেকে বাঁচা গেছে। বউদি যে কেন পুলিশকে বলছেন না, আমি বুঝতে পারছি না।' কথাটা বলে নিজের মনে মাথা নাড়াতে নাড়াতে আবার ঘরের ভেতর গেলেন তিনি। ঠিক তখনই একসঙ্গে ঝড়ু আর মুন্না এসে দাঁড়াল দরজার সামনে। মুন্না চিৎকার করে বলল, 'বড়মা দিদি এসেছে।'
'দিদি, কোন দিদি?' কমলিকা আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করেন।
'নন্দাদিদি। সবাই ফিরে এসেছে।' মুন্না বলল।
চেয়ারে বসেই কমলিকা দুচোখ বন্ধ করলেন। ওঁর চোখে-মুখে বিরক্তি। আর তখনই লাফাতে-লাফাতে ঘরের মধ্যে এল বব।
ববের পিছনে নন্দিনী আর সুহৃদ।
ঘরে ঢুকেই মাথা নীচু করে নন্দিনী বলল, 'আমরা ফিরে এলাম মা। কোনও প্লেনের টিকিট নেই। আমরা আমাদের টিকিটেই ফিরব। ও ঠিক কথাই বলেছে—আমরা কারও ভয়ে এ-বাড়ি ছেড়ে যাব না। যে ক'দিন থাকব এখানেই থাকব।'
কমলিকা চোখ খুলে দেখলেন, সুহৃদের পাশে নীলম আর বিতান দাঁড়িয়ে হাসছে।
নীলম বলল, 'কাল রাতেই দিদির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমি ওদের এভাবে চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছিলাম না। তখন বিতান বলল—ওরা তো আবার চলে আসতে পারে বর্ধমান থেকে। তারপর এখান থেকেই মুম্বই যাবে, যেমন যাওয়ার কথা ছিল।'
সুহৃদ বলল, 'মা, আপনাকে আমরা জানাইনি। জানলে আপনি আপত্তি করবেন বলে। বব বড় হয়েছে। আমরা ববকে সব বুঝিয়ে এনেছি। আমরা সবাই আছি, এ-বাড়ির কোনও ক্ষতি হবে না।'
কমলিকার চোয়াল শক্ত। আক্কেলের দিকে তাকালেন। আক্কেলের মুখে মৃদু হাসি। আক্কেল বলল, 'এই ক'দিন ববের পুরো দায়িত্বে থাকবে মেঘ।' বব চোখ কুঁচকে মেঘের দিকে তাকাল। মেঘ এগিয়ে এসে ববের কাঁধে হাত রাখল।
অপরূপ বলল, 'আরে ববের সঙ্গে আমি থাকব। বাজে লোকদের ঢিসুম ঢিসুম করে দেব।'
নন্দিনীরা চলে যেতে সারা বাড়িতে যে একটা গুমট আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল, তা মুহূর্তে কেটে গেল।
কমলিকা নন্দিনীকে বললেন, 'যাও ঘরে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে এসো।'
নন্দিনী বলল, 'মা আমি কিছু খাইনি। উপোস করে আছি।'
'ঠিক আছে, তুমি বরং সুহৃদ আর ববকে খাইয়ে এ ঘরে এসো। এবার পুজো শুরু হয়ে যাবে।'
জয়া এসে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন, 'নন্দা তুমি গিয়ে জামাকাপড় পালটে এসো। আমি ওদের নিয়ে যাচ্ছি।' জয়ার সঙ্গে-সঙ্গে বব আর সুহৃদ চলে গেল।
একটু পরেই পুজো শুরু হল। আক্কেল বাড়ির বাইরে পোর্টিকোর নীচে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। বাঁশি ফোন করেছে।
বাঁশি বলল, 'আকিদা তুমি চিন্তা করতে পারবে না মণিমার কী পারফরমেন্স। ঠিক সুরঞ্জনা দেবীকে খুঁজে বের করেছে। ওনার সঙ্গে কথা বলে, আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করে দিয়েছে। আমি আজই যাচ্ছি চন্দননগর। আর কী আশ্চর্য জানো, আমার সঙ্গে মণিমাও যাচ্ছে। উনি হলেন সুরঞ্জনা দেবীর স্পেশাল গেস্ট। মণিমা আমাকে জিগ্যেস করছিল—তোমার কাজের কী খবর?'
'তুই কী বললি?'
'বললাম, আঁধারেই পড়ে আছে। জাল কাটতে পারছে না।'
'মণিমাকে আর কিছু বলিসনি তো।'
'একদম নয়।' বাঁশি হাসল।
'ভেরি গুড।'
'এবার বলো তো সত্যি সত্যি তোমার কাজ কতদূর এগিয়েছে?'
'একটা গিঁট খুলেছি। আর সেটা তোর সূত্র থেকেই। এবার সেকেন্ড জটটা ছাড়াতে হবে। তুই মন দিয়ে কাজটা কর। শেষ টানটা তোকেই দিতে হবে বাঁশি। পাজলটা মনে হচ্ছে মিলে যাবে।'
কতক্ষণ পুজো চলবে আক্কেল বুঝতে পারছে না। এমন সময় মধুগোপালবাবু এলেন, সঙ্গে আর একজন। এসেই এক গাল হেসে বললেন, 'এঁকে চেনেন নাকি?'
আক্কেল ঘাড় নাড়ল।
মধুগোপালবাবু বললেন, 'এঁকে তামাম মনোহরগঞ্জের বাঙালি পরিবার চেনে। উনি হলেন গঙ্গাচরণবাবু। বাজারে শাড়ির দোকান আছে। বাঙালি শাড়ি।'
গঙ্গাচরণবাবু বিনয়ের সঙ্গে হাত জোড় করে মাথা নামালেন। ওঁর হাতে ফুল। বললেন, 'এই বাড়ি আমার কাছে মন্দির। বছরের এই দিনটা আমি কোনওভাবেই মিস করি না।'
'হ্যাঁ আপনার কথা শুনেছি।'
'হে হে। আমাকে এ-বাড়ির সবাই ভালোবাসে। বাজারের দিকে এলে চলে আসবেন আমার দোকানে। খুব ছোট দোকান। এখানে খুব ভালো একরকম মিষ্টি পাওয়া যায়। দেশোয়ালি মিষ্টি। অনেকটা জনাইয়ের মনোহরার মতো। আমি বলি মনোহরগঞ্জের মনোহরা। আমার আবার মিষ্টির ওপর খুব লোভ।'
আক্কেল হাসল, 'যাব। মনোহরগঞ্জের মনোহরার টানেই যাব।'
মধুসূদনবাবু বললেন, 'আমি একটু মিসেস মজুমদারের সঙ্গে দেখা করে আসি।' ওর হাতে ফুল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এলেন। বললেন, 'আজ এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়াব না, তাহলে আটকে পড়তে হবে। আজ সারাদিন ধরেই নানা লোক আসবে। একটু পরেই অফিসের লোকজনরা আসবে।'
কিছুক্ষণ পরেই ভূদেববাবুরা এলেন। বেশ কয়েকজন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। তাদের একজন বলল, 'তাহলে আমরা গাড়ি নিয়ে চলে যাই ভূদেবদা?'
'যাও, গিয়ে লালজি, রতন, তনুময়দের পাঠিয়ে দিও।'
কিরণশংকর মজুমদারের মৃত্যুবাষির্কী উপলক্ষে সারাদিনই বাড়িতে প্রচুর মানুষজন এলেন। শ্রদ্ধা জানিয়ে গেলেন।
বজরঙ্গবাবুও এলেন দুপুরবেলা। আক্কেলকে দেখে হেসে বললেন, 'না, সেই ডাকাতগুলো নিতান্তই মামুলি ডাকাতি করত, কিরণশংকরবাবু খুনের সঙ্গে তাদের যোগ নেই। পুলিশ তদন্তে করতে গিয়ে ওদের ধরেছিল, দু-একমাস অন্য কেসে জেল খেটে তারা বেরিয়ে গেছে। তবে একটা খটকা আছে, ওদের একজনের সঙ্গে নরেশ যাদবের দোস্তি ছিল। হতে পারে পুলিশ তাই জন্যে নরেশ যাদবকে ডেকেছিল।'
'ওদের নাম-ঠিকানা পাওয়া যাবে?'
বজরঙ্গবাবু হাসলেন। হেসে একটা কাগজ এগিয়ে দিলেন। 'আপনার জন্যে সব গুছিয়ে এনেছি। একটা রেল ডাকাতি করতে গিয়ে মরেছে। একজন বেঁচে আছে। তবে সে এখন আনাজ বিক্রি করে। লাইন ছেড়ে দিয়েছে। এ-ই নরেশের দোস্ত। যান, আমার নাম করে কথা বলে আসুন। দেখুন যদি কিছু পান। তবে পুরনো কেস তামাদি হয়ে গেছে...।'
'ধন্যবাদ।'
বজরঙ্গবাবু বললেন, 'এগারো বছর আগে আমি এই থানায় ছিলাম না। তবে কিরংশংকরবাবুকে আমি চিনতাম। আলাপ হয়েছে, গল্পও করেছি। আচ্ছা, একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া কেস নিয়ে আপনি কেন এত খোঁজখবর নিচ্ছেন?'
'সেরেফ কৌতুহল!'
বজরঙ্গবাবুর চোখে-মুখে সন্দেহ, 'ঠিক বললেন না ভাই। আমি জানি, এই বাড়িতে কমলিকা ম্যাডামের ওপর অ্যাটাক হয়েছে। কিরণশংকরবাবুর মতোই, সে-ই দড়ি দিয়ে একই কায়দায়। আমি কোনও অভিযোগ পাইনি। তবে শুনে আমি ছুটে এসেছিলাম, উনি সম্পর্কের খাতিরে দড়িটি দেখিয়েছিলেন। এখন আমার প্রশ্ন, আপনি কী খুঁজছেন, সাত বছর আগেকার সেই পুরনো পাপী, না এখানকার হামলাকারী?'
'আমি একজন ঠান্ডা মাথার খুনিকে খুঁজছি। আমার একজন খুনি চাই।'
'খুঁজুন। পেলে জানাবেন। আমার শুভেচ্ছা রইল। আমি আপনাকে পূর্ণ সহযোগিতা করব।'
'থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।'
'আচ্ছা বলতে পারেন, মিসেস মজুমদার কেন পুলিশে অভিযোগ করেননি? উনি কি পুলিশকে ভরসা করেন না?'
'আপনার সঙ্গে তো ওঁর খুব ভাব, ওঁকেই জিগ্যেস করুন। আমার মনে হয়, উনি চান না এই পরিবারকে নিয়ে আর কোনও গল্প তৈরি হোক।'
বজরঙ্গবাবু ঠোঁট টিপলেন, ঠান্ডা গলায় বললেন, 'কিরণশংকরবাবুর সঙ্গে-সঙ্গে তো উনি গল্পটা শেষ করে দিতে পারতেন। উনি এত বছর ধরে সবকিছু টানছেন কেন? মানুষের মন বোঝা খুব শক্ত। হয়তো মৃত স্বামীর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছেন।' বজরঙ্গবাবু মাথা ঝাঁকালেন। 'যাক, আজকের দিনে, পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। চলুন, ম্যাডামের সঙ্গে একটু দেখা করে আসি।'
হীরু এসেছিল খুব শান্ত ভাবে। বেশ বোঝা যাচ্ছে, স্নান করেছে। পরিপাটি করে চুল আঁচড়েছে। চোখে-মুখে সেই উগ্রতা নেই। আক্কেলের সঙ্গে দেখা হল। একবার দেখে মাথা নামিয়ে নিয়ে পুজোর ঘরে ঢুকে গেল। গিয়ে বসল কমলিকার পাশে।
আক্কেল বাইরেই ছিল, গেটের কাছে। দেখল, সুরেশ আসছে। জগৎ সিং তাকে হাত ইশারায় বলল, 'ছোটদা আয়া।'
সুরেশের মুখটা পাণ্ডুর হয়ে গেল। পরক্ষণে সে জগৎকে চাপা গলায় গালাগালি করে চলে গেল। আক্কেল জগৎ সিংয়ের কাছে এসে দাঁড়াল। বলল, 'সুরেশ কী হীরুবাবুকে ভয় পায়?'
আক্কেলের কথায় সে হেসে গড়িয়ে পড়ল। জানাল—সুরেশকে সে হীরুর নাম করে খ্যাপায়। সুরেশ চম্পাকলিকে বহুত তং করত। হীরু জানতে পেরে সুরেশকে আচ্ছা করে পিটাই করেছে। এত মেরেছিল যে সুরেশকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। থানা-পুলিশ পর্যন্ত কেসটা গড়াচ্ছিল, কমলিকা দেবী জানতে পেরে মিটমাট করে দেন।
বেলা বাড়ল, আজ দুপুরের খাওয়াদাওয়ায় অনেকেই নেই। খেয়ে উঠতে না উঠতেই বাঁশির ফোন। ফোন নিয়ে আক্কেল বাইরের বাগানে চলে এল। '—ওয়েল ডান বাঁশি। ওয়েল ডান। তুই যে কাজ কলকাতায় বসে করছিস, তা অসাধারণ।'
আক্কেলের মনে হচ্ছে—বাঁশির এক একটা ফোন যেন যাবতীয় রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে দিচ্ছে। অথবা ঘনীভূত রহস্যের জাল কেটে দিচ্ছে।
ওকে খুঁজতে-খুঁজতে বাইরে এল মেঘ, বলল, 'আকিদা তোমার কি কোনও ব্যাপারে খটকা লাগল না?'
'কোন ব্যাপারে?'
মেঘ একটু থমকাল, বলল, 'নন্দিনী-সুহৃদবাবুরা চলে গেলেন, আবার দুদিন না যেতে যেতে হাজির হলেন?'
আক্কেল তাকিয়ে আছে মেঘের দিকে। মেঘ বলল, 'এ-বাড়ির কর্ত্রী কিন্তু ব্যাপারটা ভালো চোখে নেননি। তারপর থেকে দেখছিলাম বার বার তিনি অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলেন। উনিই চলে যেতে বলেছিলেন, ওরা গেল, আবার ফিরেও এল। আরও একটা জিনিস, তোমার নজরে পড়েছে কি না জানি না। হীরু আজ প্রচণ্ড ভালো ছেলের মতো এল। তা বাবা এসেছ বেশ করেছ। কিন্তু পুজো পাঠ চুকল, তখনও দেখেছি, ভদ্রলোকের মতো আছে। কিছুটা একা একা। বাইরে বারান্দার বেতের চেয়ারে বসে আছে। বিতানবাবুর সঙ্গেও ববকে নিয়ে খেলছে। এক ফাঁকে বিতানের সঙ্গে খেতেও দেখলাম। তারপর বাপ আর ছেলের মধ্যে কী সব কথা হল—হীরুকে দেখলাম, অশ্বিনীবাবুর ওপর তড়পাচ্ছে। অশ্বিনীবাবুও কেমন কাঠ মেরে দাঁড়িয়ে। মুহূর্তের মধ্যে হীরুর চোখ মুখ পুরো পালটে গেল। পুরো খুনে মস্তানদের মতো। কীসব বলে টলে বাইক নিয়ে কোথাও বেরিয়ে গেল।'
'কী বলল কিছু শুনেছিস?'
'না, আসলে অপরূপবাবু কানের সামনে দিনরাত যা সিনেমার বোল আওড়াচ্ছেন, আমার আর অন্য কিছু শোনার উপায় নেই। তার ওপর তুমি ববের দায়িত্ব দিয়েছ। আমি ওকে একেবারে ওর মায়ের কাছে হ্যান্ডওভার করে এসেছি। বলেছি—বিকেলে আসতে, আমি ওর সঙ্গে খেলব।'
চিন্তাম্বিত আক্কেল বলল, 'তুই বাড়িটা দেখিস—আমি একটু বের হব। ববের দায়িত্ব কিন্তু তোর।'
'কোথায় যাচ্ছ একটু বলে যাও—অচেনা অজানা জায়গা।'
'বেশিদূর নয়, অজমগঞ্জ। যাচ্ছি একটা ডাকাতের সঙ্গে দেখা করতে।'
আক্কেলের কথায় মেঘ হাঁ করে থাকল।
আক্কেল বেরিয়ে পড়ল, লোকটার নাম সত্যা লোঢা। বাড়ি অজমগঞ্জ। বজরঙ্গবাবুর ভয় দেখিয়ে লোকটার সঙ্গে যতটুকু কথা বলা যায়। কোনও দিশা কী মিলতে পারে এখান থেকে—কে জানে? শুধু জানতে হবে, লোকটা এখন সন্ধেবেলা কী করে? জানতে হবে, লোকটা এই পরিবারের বা কোম্পানির নরেশ যাদব ছাড়া কাকে চেনে?
আক্কেলের ফিরতে-ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল। সে বাড়ির ঢোকার মুহূর্তেই জগৎ সিং তাকে ডাকল, বলল, 'বহুত হাঙ্গামা হো গিয়া সাব?'
'কী হাঙ্গামা?'
'ছোটবাবুকে পুলিশ পাকড়েছে। থানায় ভি লিয়ে গেছে।'
'কেন কী করেছে তোমার ছোটবাবু?'
'নরেশ যাদবকে পিটাই করেছে। নরেশ যাদব হসপিটালে ভরতি, খুন ভি হয়ে যেত।'
আক্কেল বাড়ির ভেতর এল। সারা বাড়িটা শুনশান। সোজা সে চলে এল কমলিকা দেবীর ঘরে। উনি শুয়ে আছেন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে চম্পাকলি।
আক্কেলকে দেখে কমলিকা দেবী উঠে বসলেন। বললেন, 'শুনেছ?'
'জাস্ট খবরটুকু পেয়েছি।'
'কাল তুমি কোম্পানিতে গিয়েছিলে, তোমার সঙ্গে নরেশ যাদবের কথা কাটাকাটি হয়েছে?'
'হ্যাঁ, কেন বলুন তো। তবে তেমন গুরুতর কিছু না। লোকটি গুন্ডা প্রকৃতির। আমার সঙ্গে কথা বলতে-বলতে রেগে গেল।'
'হ্যাঁ, হীরু এটা কালই জেনেছে। ওকে কিছু বলেনি রাত পোহালে বাড়িতে কাজ বলে। কিন্তু দুপুরে ও কোনওভাবে জেনেছে আমার ওপর হামলা করেছে নরেশ যাদবই। এটা জানতে পেরেই ও অফিসে গিয়েছিল নরেশের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলতে। সেখানে ওর সঙ্গে নরেশের কথা কাটাকাটি হয়। দুজনে হাতাহাতি করে। ওরা মারপিটও করেছে অফিসের মধ্যে। হীরু ওর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। শুনলাম, ওর একটা হাতও ভেঙে দিয়েছে। নরেশ এখন হাসপাতালে।'
'আর হীরুবাবুকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে?'
'পুলিশ প্রথমে অ্যারেস্ট করেনি। কিন্তু অশ্বিনী, অশ্বিনী পুলিশকে বাধ্য করিয়েছে হীরুকে অ্যারেস্ট করাতে।'
'মানে?'
'হ্যাঁ, মার খেয়ে নরেশ হাসপাতালে গিয়েছিল। ওর সঙ্গে কোম্পানির কয়েকজন লোকও গিয়েছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গেই ফোনে সব খবর পেয়েছি। অশ্বিনীও পেয়েছিল। বজরঙ্গবাবুও অশ্বিনীকে ফোন করে ঘটনাটা জানায়। তখন অশ্বিনীই বজরঙ্গবাবুকে বলে—হীরুকে অ্যারেস্ট করতে। একথা শুনে আমি অশ্বিনীর কাছে গিয়েছিলাম, অশ্বিনী আমার মুখের ওপর বলল—এ ছাড়া কোনও উপায় নেই। হীরুর এবার একটু শাস্তি পাওয়া দরকার। কেন ও সবসময় এত মাথা গরম করবে? ও অফিসে ঢুকেও ভাঙচুর করেছে। আমি বিতান, অপরূপকে মধুগোপালবাবুর কাছে কোর্টে পাঠিয়েছি। ওরা মধুগোপালবাবুকে সঙ্গে নিয়ে যা হোক ব্যবস্থা করবে। হয়তো আজকের রাতটা ওকে লক আপে কাটাতে হবে। কেন না অশ্বিনীর কথায়, শ্যামল পাত্রের উসকানিতে নরেশ পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে। জানি না মধুগোপালবাবু আজ কী করবেন, তবে কাল যেভাবেই হোক ছাড়িয়ে আনতে হবে। আমার অশ্বিনীর এই ব্যাপারটা ভালো লাগেনি। নরেশও ধোয়া তুলসী পাতা নয়। আমার মনে হয় ও হীরুকে প্রোভক করেছে। ওর মুখের বিশ্রী বিশ্রী কথায় হীরু খেপে গেছে।'
'হীরুকে তাহলে অশ্বিনীবাবুই অ্যারেস্ট করালেন!'
আক্কেল আশপাশে মেঘকে দেখতে পেল না। কিন্তু নন্দিনীর সঙ্গে দেখা হল। সে বলল, সুহৃদ, বব আর মেঘ বেরিয়েছে। সারা বাড়ির পরিবেশ গুম মেরে। আক্কেলও বাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। ঘড়িতে সাড়ে সাতটা বাজে। ও এসে চায়ের দোকানে বসল। সেখানেও হীরু আর নরেশ যাদবকে নিয়ে খোশগল্প হচ্ছে। বেশ অনেকক্ষণ চায়ের দোকানে বসে আছে আক্কেল। কিছুই তার ভালো লাগছে না, সে অনেককিছু জেনেছে, সে অনেক কিছু বুঝেছে। কিন্তু তার পরেও অনেকগুলো ফাঁক। যা সে কিছুতেই ভরাট করে উঠতে পারছে না। বার বার শুধু এক অন্ধগলির ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেক কিছু যেন মিলছে, কিন্তু অনেক কিছুই আবার মিলছে না।
এমন সময় কমলিকা দেবীর ফোন—তুমি যেখানেই থাকো, তাড়াতাড়ি এসো।
সে বাড়ির ভেতর ঢুকতে-ঢুকতে দেখল—তার পাশ দিয়ে ধাঁ ধাঁ করে পুলিশের একটা জিপ শংকর নিবাসের মধ্যে ঢুকে পড়ল। জিপের ভেতর বিতান, অপরূপ।
তাহলে কী কোনওভাবে বোঝাপড়া করে হীরুকে ছাড়িয়ে আনা গেছে। কিন্তু গেটে জগৎ সিং পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। ওকে দেখেই বলল, 'হামার নোকরিটা এবার খতম হয়ে যাবে সাব।'
আক্কেল আর জগৎ সিংয়ের সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করল না। দ্রুত দোতলায় উঠে এল। ওপরে উঠেই দেখল বারান্দার ওপর সবাই বিস্ফারিত চোখে দাঁড়িয়ে। 'কী হয়েছে?' আক্কেল সামনে জয়াকে পেয়ে জিগ্যেস করল। জয়ার মুখ দিয়ে কথা সরল না। তিনি শুধু ইশারা করলেন বিতান-নীলমদের ঘরের দিকে। আক্কেল নীলমের ঘরের দিকে যেতে যেতে দেখল সিঁড়ি দিয়ে হুড়মুড় করে মেঘ, সুহৃদ উঠে আসছে। ওদের সঙ্গে বব। ববকে দ্রুত হাতে ছিনিয়ে নিয়ে নন্দিনী নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
আক্কেল ঘরের ভেতর ঢুকল। বজরঙ্গবাবু ওকে দেখেও দেখলেন না। বজরঙ্গবাবু পাশে আরও একজন পুলিশ। সে মন দিয়ে ডায়রি খুলছে। বিছানার ওপর টান টান হয়ে শুয়ে আছে নীলম। তার পাশে বসে বিতান। একটু দূরে অপরূপ।
বজরঙ্গবাবু বললেন, 'কী হয়েছে পুরো খুলে বলুন।'
নীলম চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। সে বার বার গলায় হাত দিচ্ছে। আক্কেল দেখল, নীলমের মাথায় ব্যান্ডেজ, গলায় টকটকে লাল রেখা! ফরসা মসৃণ চামড়ায় রক্তচ্ছটা!
নীলম বিড়বিড় করে বলল, 'আমি ঘরে একা ছিলাম। আমার মনে হল কেউ যেন ঘরের দরজায় নক করছে। আমি ভাবলাম, বুঝি আমাকে ডাকছে। আমি বাইরে গেলাম। আর তার পরেই কেউ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে আমার গলায় একটা দড়ি পরিয়ে ফাঁস দিয়ে টানছে। আমি হুড়মুড় করে পড়ে গেলাম। সে-ও আমারও ওপর চেপে বসে দড়ি টানছিল। তারপর হঠাৎ আমাকে ছেড়ে দিল, আর একটা পাথর দিয়ে আমার মাথার পিছন দিকে মারল। তারপর আর কিছু মনে নেই—।'
বজরঙ্গবাবু গম্ভীর মুখে বললেন, 'ছেড়ে দিল আপনাকে? গলায় ফাঁস দিয়েও ছেড়ে দিল, তারপর পাথর দিয়ে মারল।'
'হ্যাঁ, ছেড়ে দিল। কেন আপনি কী চান, আমাকে মেরে ফেললে ভালো হত?' ডুকরে কেঁদে উঠল নীলম।
বজরঙ্গবাবু বিব্রত মুখে কমলিকা দেবীর দিকে তাকাল। বলল, 'ম্যাডাম কাঁদবেন না। আপনাকে অ্যাটেম্পট করেছে—আপনি বেঁচে আছেন। এবার বলুন ঠিক কোন জায়গায় এটা হল? আপনার ঘরের দরজার সামনে?'
নীলম মাথা নাড়ল। তখনই ঘরের বাইরে থেকে কেউ যেন বলল, 'বউদি হাতিঘরের ভেতর পড়েছিল।' তার কথায় বজরঙ্গবাবু চিৎকার করে বলল—'কে? কে বলল?'
বজরঙ্গবাবুর চিৎকারে ঘরের ভেতর কাঁপতে-কাঁপতে এল মুন্না। বজরঙ্গবাবু বললেন, 'তুমিই কি ওকে প্রথম দেখছ?'
মুন্না ঘাড় নাড়াল। বলল, 'আমি হাতিঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখনই দেখলাম বউদি হাতিঘরের মেঝেয় পড়ে গোঁ-গোঁ করছে।'
কমলিকা বললেন, 'ওর চিৎকারেই জয়া নীচে থেকে ছুটে যায়। তারপর আমরা সবাই আসি।'
বজরঙ্গবাবু মুখ গম্ভীর করে বসে বলেন, 'মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধলে কে?'
'জয়া বেঁধেছে। মাথা ফাটেনি, তবে অনেকটা জায়গায় থেঁতলে তো গেছে।'
'কতখানি জায়গা? দেখার উপায় নেই। চোট কতখানি বুঝতে হবে তো—।'
'ডক্টর মিশ্রকে খবর দিয়েছি—এসে যাবেন এক্ষুনি।' কমলিকা বললেন।
বজরঙ্গবাবু বেশ জোরে জোরে বিড়বিড় করলেন, 'ফাঁস দিয়ে মারতে যদি এল, তবে না মেরে ছাড়ল কেন? ছাড়ল যদি, তবে এক ঘা পাথর ঠুকেই পালাল কেন। আরও কয়েক ঘা দিয়ে তো কাজ কমপ্লিট করতে পারত—!'
বজরঙ্গবাবুর কথা শুনে নীলম আবার ডুকরে কেঁদে উঠল। 'আপনি কী দেখতে পেয়েছেন তাকে?'
'দেখতে পাইনি, ওদিকে তেমন আলো নেই। তবে—।'
'তবে কী?'
নীলম জড়ানো গলায় বলল, 'আমার শরীর খারাপ লাগছে।' ও উঠে বসতে গেল, কিন্তু তেমনভাবে পারল না। কিছুটা ঠেলে উঠে আবার শুয়ে পড়ল, বলল, 'আমি বুঝতে পেরেছি কে করেছে—আমি আর এক মুহূর্ত থাকব না এখানে। আমি আজই চলে যাব। কলকাতায় যাব বিতান, ব্যবস্থা করো।'
বজরঙ্গবাবু হালকা গলায় হুমকি দিলেন, 'কে করেছে বলে মনে হচ্ছে আপনার—তার নামটা একবার বলুন—তারপর আপনি যাবেন।'
হঠাৎ কমলিকা দেবী এগিয়ে এলেন, বললেন, 'বজরঙ্গবাবু ওর শরীরটা খারাপ লাগছে। আজ ওকে ছেড়ে দিন কাল আসবেন, তখন ওর সঙ্গে কথা বলবেন।'
বজরঙ্গবাবু খুব গম্ভীর গলায় বললেন, 'তা হয় না ম্যাডাম, লোহা গরম থাকতে-থাকতে হাতুড়ি পিটতে হয়। আপনার ওপর অ্যাটাক হল, আমি শুনে আপনাকে ফোন করলাম, আপনি অস্বীকার করলেন। আজ আপনার ঘরের বউয়ের ওপর অ্যাটাক হল। তার মানে হচ্ছে—হামলাকারীকে সে চিনতে পেরেছে, কিন্তু সে বলবে না। আজ যদি বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যেত, তাহলে কিন্তু আমাদের ছুটে বেড়াতে হত।'
বজরঙ্গবাবুর কথা শেষ হওয়ার আগেই ঝড়ুর সঙ্গে ঘরের ভেতর হন্তদন্ত হয়ে যিনি এলেন তিনি এ-বাড়ির হাউস ফিজিশিয়ান। এসেই বললেন, 'প্লিজ আপনারা সবাই ঘরটা ফাঁকা করে দিন।'
বেশ কয়েকজন বেরিয়ে গেল। বজরঙ্গবাবু বসে থাকলেন।
আক্কেল বেরিয়ে এল ঘর থেকে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল হাতিঘরের দিকে। ইশারা করে ঝড়ুকে ডাকল। ঝড়ুকে নিয়ে হাতিঘরের ভেতর এসে দাঁড়াল। ঝড়ু সব আলোগুলো জ্বেলে দিল। আক্কেল তীক্ষ্ণ চোখে চারদিকে দেখতে লাগল। ঘরের মেঝেয় একটা বড় শাঁখ পড়ে। ঝড়ু সেটা তুলতে যাচ্ছিল। আক্কেল বারণ করল। বলল, 'থাক ওটা বজরঙ্গবাবুর কাজে লাগবে।' তাহলে পাথর নয়, টেবিল থেকে পাথর নিতে গিয়ে শাঁখটা নিয়েছিল। আর তখনই ঠিক শাঁখটার পাশে একটা দড়ির টুকরো দেখতে পেল। বিঘৎ খানিক। ছিঁড়ে গেলে যেমন হয়। তাহলে দড়িটা ছিঁড়ে গেছে। আক্কেল সেটা কুড়িয়ে নিল। খুব আনপড় খুনি মনে হচ্ছে, যে অস্ত্রটাই ব্যবহার করতে জানে না।
একটু পরেই অকুস্থল দেখতে বজরঙ্গবাবু এলেন। তাঁর চোখে শাঁখটি এড়াল না। কমলিকা দেবীকে বলে গেলেন, 'কপাল ভালো খুনি শেষ মুহূর্তে পথ পালটেছিল, দড়ির ফাঁস ছেড়ে পাথর দিয়ে ঠুকে মারতে চেয়েছিল, পারেনি, তার কারণ হাতের সামনে সে যেটাকে পাথর ভেবেছিল, সেটা শাঁখ।'
তবে কাল বজরঙ্গবাবু আসবেন। যাওয়ার সময় বজরঙ্গবাবু হালকা গলায় হেসে বললেন, 'যাক বড় কোনও অ্যাক্সিডেন্ট ঘটেনি। থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম, এক্ষেত্রে আমার ওপর ভরসা করে ডেকেছেন—।'
কিন্তু বজরঙ্গবাবু যার উদ্দেশ্যে বললেন, তিনি কিন্তু বেশ কঠিন চোখে অশ্বিনীবাবুর দিকে তাকালেন। বললেন, 'ধন্যবাদটা অশ্বিনীবাবুর প্রাপ্য—আমার বাড়িতে আমি হুট করে পুলিশ ঢোকাতাম না।'
ওঁর কথায় অশ্বিনী সরকার মাথা নীচু করে নিল।
বজরঙ্গবাবু চলে যেতে আক্কেল দেখল বারান্দার এক ধারে দীপিকা দাঁড়িয়ে। ওর দু-চোখ লাল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ও শকটা সামলাতে পারেনি। কাঁদছে। আক্কেল ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই, দীপিকা বলল, 'এই আমার শেষ—আর কখনও এখানে আসব না। জানেন এ-বাড়িটা এমন ছিল না। সব যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। এর কি কোনও বিহিত হবে না। বড়মা ফোন করত না পুলিশকে। আমিই ফোন করেছিলাম। আর সহ্য করতে পারছি না।'
আক্কেল বলল, 'তাহলে আপনি ইনফর্ম করেছেন, আপনার বাবা ফোন করেননি?'
বজরঙ্গবাবু বলেছিলেন কাল সকালে আসবেন। কিন্তু এলেন রাতে। এ-বাড়ির সবার খাওয়া তখন সবে শেষ হয়েছে। বাড়ির ভেতর ঢুকে এক গলা হেসে কমলিকা দেবীকে বললেন, 'ম্যাডাম আবার আমাকে আসতে হল। চিন্তা করবেন না, সঙ্গে মহিলা পুলিশ আছে। আমরা খুনির বা হামলাকারীর নামটা জানতে পেরেছি।'
বিহ্বল কমলিকা দেবী কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে।
বজরঙ্গবাবু বললেন, 'চলুন ঘরটা একটু সার্চ করব।' কমলিকা মাথা নীচু করে প্রশ্নহীন ভাবে ওঁকে নিজের ঘরে দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বজরঙ্গবাবু বললেন, 'দীপিকা ম্যাডামের ঘরে চলুন। উনিই আমাদের সঙ্গী হবেন।'
দীপিকার ঘরের টেবিল থেকে একটা দড়ি পাওয়া গেল। দড়িটা তাঁতের শাড়ি বাঁধার দড়ি। এরকমই একটা দড়ি কমলিকা দেবীই দেখিয়েছিলেন আক্কেলকে। বজরঙ্গবাবু দড়িটা তুলে নিয়ে আক্কেলকে দেখালেন। আর কমলিকার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এই রকম একটা দড়ি দিয়েই আপনার ওপর অ্যাটাক হয়েছিল। আমি খবর পেয়ে আসতে আপনিই আমাকে দড়িটা দেখিয়েছিলেন। সেই দড়ির জোড়া এটা। হামলাকারী বেছে বেছে শাড়ির দড়িই নিয়েছিল। সত্যি বলছি, ম্যাডাম, আমার সেদিনই মনে হয়েছিল, আপনার হামলাকারী কোনও মেয়ে। পুরুষ নয়। পুরুষ হলে সে অন্যকোনও দড়ি নিয়ে আসত। সে এত শাড়ি বাঁধা দড়ি পাবে কোথায়!'
সবার চোখের সামনে দীপিকা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে। সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, তার বড়মা বা নীলমের ওপর হামলা ও হত্যার চেষ্টার জন্য তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তার মুখে কথা বলার কোনও ভাষা নেই। বজরঙ্গবাবু দীপিকার দিকে তাকিয়ে বলল, 'কী যে চলে মানুষের মনের ভেতর, কে জানে? আজ একই দিনে দুই ভাইবোন আমার থানায় রাত কাটাবে। আর দুজনের ক্ষেত্রে পুলিশকে সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে এসেছেন ওদের বাবা। থাঙ্ক ইউ অশ্বিনীবাবু।'
অশ্বিনী সরকার মাথা নীচু করে বলল, 'নীলম দেখেছে দীপুকে। এ-কথা ও বিতানকে বলেছে। অপরূপকে বলেছে। ওরা যখন এসে আমাকে কথাটা জানাল তারপর আমি আর চুপ করে বসে থাকতে পারি না। সবই আমার কপাল!'
সারারাত ঘুমাতে পারল না আক্কেল। মাথার ভেতর প্রচণ্ড একটা ঘুরপাক চলছে।
দীপিকা?
নীলম কি দেখতে পেয়েছে দীপিকাকে? সত্যি কি দেখেছে, নাকি অনুমান? নাকি প্রতিহিংসা?
আক্কেল জেগে ছিল, সারারাত ধরে ডায়েরির পাতায় অনেক কাটাকুটি খেলা খেলেছে। অনেক হিসেব মেলানোর পরেও অনেক হিসেব মিলছে না। বার বার মনে হচ্ছে কেন? কেন?
কেন দীপিকা খুন করার চেষ্টা করল নীলমকে? সে দিনের ওই ঝগড়ার জের কি কাউকে খুন পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে? দীপিকা কি সেই স্বভাবের মেয়ে?
আবার যদি সে মারার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল, তবে নিজেই পুলিশ ডাকল কেন? এ-বাড়ির রেওয়াজ অনুযায়ী চুপ করে থাকতে পারত। নাকি ওভার কনফিডেন্স!
ভোরবেলা আক্কেলের ফোন বাজছে। প্রাইভেট নম্বর। ফোন ধরতেই সেই বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার গলা, 'কী খবর তোমাদের?'
আক্কেল কিছু বলতে যাচ্ছিল। উনি বললেন, 'শোনো আমার মনে হয়—তোমরা পারবে না। তবে হ্যাঁ, তোমরা অনেস্টলি চেষ্টা করেছ। তারজন্যে তোমাদের আর টাকা ফেরত দিতে হবে না। তা কী করবে—ঘরের ছেলে ঘরে ফিরবে? নাকি আরও দু-একদিন দেখবে? ও-বাড়িতে যা ঘটার তা তো ঘটেই গেছে। কবে ফিরছ তাহলে, তোমার মণিমা, বাবাও চিন্তা করছেন, নিশ্চয়।'
আক্কেল বলল, 'আর দু-একদিন। আমার কাজ প্রায় শেষ। শুধু শেষ অংকটা মিললেই খেল খতম!'
'মানে শেষ অংকটা মেলালেই—? কী বলতে চাইছ তুমি?'
'আপনার ঠান্ডা মাথার খুনির সন্ধান পাওয়া যাবে।'
'তার সন্ধান পেয়েছ নাকি তুমি? কে? কে হতে পারে?'
'যে কেউ? এখন প্রমাণ নেই আমার কাছে। কিন্তু আমি আশাবাদী।'
'যদি প্রমাণ না পাও?'
'আমি এখানে গোয়েন্দাগিরি করতে আসিনি। আমি এসেছি—খুঁজতে। সেই খুঁজতে খুঁজতে কী পেলাম সেটা সবাইকে জানিয়ে চলে আসব। চলে আসার সময় সবাইকে দাঁড় করিয়ে দেব একটা জায়গায়—বিবেকের সামনে—দেখা যাক।'
হো হো করে ভদ্রমহিলা হাসলেন, 'খুনির আবার বিবেক!'
আক্কেল সকাল সকালই বেরিয়ে পড়ল থানার উদ্দেশ্যে। এখন নিশ্চয়ই বজরঙ্গবাবু থানায় আসেননি। প্রয়োজনে ওঁর বাড়িতে গিয়ে কথা বলতে হবে।
কিন্তু থানায় গিয়ে দেখল, বজরঙ্গবাবু তোম্বা মুখ করে বসে আছেন। ওকে দেখে বললেন, 'কী ব্যাপার সক্কাল সক্কাল কী মনে করে?'
'আপনার কাছে এলাম, আপনি আমাকে পথ দেখান, দীপিকাকে কীভাবে ছাড়ানো যায়?'
'মানে একটা অ্যাটেম্পট টু মার্ডারের আসামিকে আপনি ছাড়িয়ে নিয়ে যাবেন? কীভাবে?'
'কীভাবে সেটা তো আপনি বলবেন? আইন আপনি জানেন, আইনের ফাঁকও জানেন। নিরপরাধ একটা মেয়ে ফেঁসে যাবে, এটা হতে পারে না।'
আপনি কি মেয়েটার প্রেমে পাড়ছেন?'
ম্লান হাসল আক্কেল।
বজরঙ্গবাবু বললেন, 'বলুন আপনি কী জানতে চান?'
'কোন পথে দীপিকাকে ছাড়ানো যাবে?'
বজরঙ্গবাবু নিজের মাথায় হাত বোলালেন। 'ওকে ছাড়া মানে কিন্তু পুলিশের ব্যর্থতা!'
'কিন্তু দীপিকা নির্দোষ!'
'আমাদের কাছে স্পষ্ট অভিযোগ আছে—ভিকটিমই দেখেছে দীপিকাকে। আর দড়িটি পাওয়া গেছে ওর ঘর থেকেই।'
'আপনার কি মনে হয়—যে দড়ি দিয়ে সাত বছর আগে কিরণশংকর খুন হয়েছিল, হাইওয়ের ওপর রাতের অন্ধকারে, সেখানেও কি দীপিকা ছিল?'
'আপনি কি পাগল হলেন, সাত বছর আগে, তারপর ওই একটা মেয়ে—হাইওয়ের ওপর। ওটা আর এটা আলাদা। আমি সিওর।'
'যদি আলাদাই হবে, তবে খুন করার জন্য দীপিকা দড়িই বেছে নেবে কেন?'
বজরঙ্গবাবু মুখ ভারী করে বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। বললেন, 'সেটা দীপিকাই বলতে পারবে? আমরা ওর কাস্টডি চাইব। ইনভেস্টিগেশনে আশা করি সব বেরিয়ে আসবে।'
'তাহলে দীপিকাকে ছাড়া যাবে না বলছেন? একজন নিরপরাধ শাস্তি পেয়ে যাবে আপনি থাকতে?'
'আপনার মনে হচ্ছে, ও নিরাপরাধী? ফেঁসে গেছে?'
'আমি নিশ্চিত।'
'কোনও প্রমাণ দিতে পারবেন?'
'এক্ষুনি না, এখনও আমার সব অনুমান।'
'পরিষ্কার প্রমাণ না থাকলে আমি কিছু করতে পারব না। অভিযোগ আছে। আজই ওকে আমরা কোর্টে চালান করব। পারলে ওখান থেকে জামিন নিন। তবে ব্যাপারটা সহজ নয়।'
আক্কেল সোজাসুজি বজরঙ্গবাবুর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, বলল, 'আর কোনও পথই নেই?'
'পথ থাকবে না কেন? আপনি যদি বলেন দীপিকা নির্দোষ, তাহলে দোষীকে খুঁজে দিন।'
'খুঁজে দেব। এটা এক নম্বর পথ। আর অন্য কোনও পথ?'
বজরঙ্গবাবু চোখ কুঁচকে বলেন, 'অভিযোগকারীকে দিয়ে অভিযোগ তুলে নিন। তাহলে কোর্ট বিবেচনা করতে পারে—আর মধুগোপালবাবু তো আছেনই, বাদ বাকিটা উনি করে দেবেন।'
'নীলম কি এটুকু করবে?'
'যদি বোঝেন নিরপরাধী, তবে চেষ্টা করুন। আপনি না পারলে, কমলিকা ম্যাডামকে বলুন। আর উনি না পারলে—উনি তো অ্যাকট্রেস। দুর্বলতা কোথায় খুঁজুন? কোনও ডিরেক্টর, অ্যাক্টর—তাঁদের দিয়ে অনুরোধ করান।' বজরঙ্গবাবু হাসলেন। বললেন, 'চলুন এবার আমি উঠব। একজন আবার সুইসাইড করেছে, আমাকে সেখানে যেতে হবে।'
আক্কেল উঠে পড়ে। বজরঙ্গবাবু বললেন, 'চলুন আপনাকে ছেড়ে দিয়েই যাই। সুইসাইড কেস—শুধু আমার বউকে খুশি করতে আমাকে সশরীরে যেতে হচ্ছে।'
গাড়িতে উঠলেন বজরঙ্গবাবু, মেজোবাবু, একজন কনস্টেবল আর আক্কেল। বজরঙ্গবাবু বললেন, 'বুঝলেন ব্যাচেলর লোক একা একা রসেবসে ভালোই ছিল। হঠাৎ মনে কী দুঃখ জাগিল কে জানে? যা খবর পেলাম, মনে হচ্ছে ঘুমের ওষুধ খেয়েছে।'
আক্কেল চুপ করে আছে। ও কি পারবে নীলমকে রাজি করাতে। নীলম কি রাজি হবে সমস্ত অভিযোগ তুলে নিতে?
বজরঙ্গ বললেন, 'ভোরবেলা লোকটার খবর আসতে আমার বউ আমাকে খেদিয়ে তুলে দিল মশাই। একজন শাড়িঅলার জন্যে আমার বউয়ের কী দুঃখ! বুঝলেন, এখানকার বাঙালি মেয়েমহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সবাই হায় হায় করছে। এই একটিমাত্র লোক যার দোকানে তাঁতের শাড়ি পাওয়া যেত। আর দুপুর থেকে বাঙালি-বাড়ির মেয়ে-বউরা ওখানে গিয়ে, নতুন কী এসেছে, নতুন কী এসেছে করে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকত। আপনাদের বাড়িতে, মানে শংকর নিবাসেও ওর নিত্য যাওয়া আসা ছিল। উনি আবার কমলিকা ম্যাডামের জন্যে সব এক্সক্লুসিভ শাড়ি আনতেন।'
'ওর কি বাজারে দোকান ছিল? গঙ্গাচরণবাবু?'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি ওকে চিনতেন নাকি? ছোট দোকান, হেভি চালু। কিন্তু শুনুন, লোকটার অতীত রেকর্ড ভালো নয়। পুরোনো কেস ডায়েরি ঘাঁটলে ওর অনেক কেচ্ছাকীর্তির হদিশ পাবেন। বলতে পারে দস্যু রত্নাকর। ওকে ব্যবসায়ী বানিয়েছিলেন কিরণশংকর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সদ্ভাব থাকেনি। সে এক অন্য গল্প। আমি আমার গিন্নির কাছ থেকে শুনেছি। দাঁড়ান বলছি আপনাকে—।'
আক্কেল বলল, 'আমি কী আপনার সঙ্গে যেতে পারি?'
'কেন পারেন না? আপনারও তো চেনা মানুষ, চলুন আমার সঙ্গে। আপনি গেলে আমার ভালোই লাগবে। দেখুন সুইসাইডটা যদি খুন টুনে বদলে দিতে পারেন, তাহলে এই ঠান্ডা শহর রেলের লোহালক্ক ছাড়া একটা অন্যরকম খোশগপ্প পায়। আর প্রেমপীরিত হলে তো জমে ক্ষীর!'
মৃত লোকটির নাম গঙ্গাচরণ গোস্বামী। একটা ছোট একতলা বাড়িতে থাকেন.। সারা বাড়িটা সাজানো-গোছানো। কে বলবে এখানে ভদ্রলোক একা থাকতেন। বাড়ির সামনে নানাধরনের ফুলের গাছ। সব গাছের পরিচর্যা উনি নিজের হাতে করতেন। মিশুকেও ছিলেন। তবে রোজ রাতেই ওঁর একটু-আধটু মদ্যপানের নেশা ছিল। একাই মদ খেতেন। কখনও কারও সঙ্গে ওকে মদ খেতে দেখা যায়নি। তবে ওর দুর্বলতা ছিল অতীত। অতীত নিয়ে কেউ কিছু বললে—গুম মেরে যেতেন। তাই পারতপক্ষে কেউ ওঁর অতীতের কথা তুলত না।
ওঁর সঙ্গে যারা মর্নিংওয়াক করে তারাই সকালে এসে আবিষ্কার করে ওঁর মৃতদেহ। কোনও সুইসাইড নোট নেই। টেবিলের ওপর একটা ছোট মদের বোতল আর খাবারের প্লেট পড়ে আছে। পাশে ছোট একটা মিষ্টির বাক্স।
বজরঙ্গবাবুর পিছন পিছন ঘরে ঢুকেই আক্কেল বলল, 'কী করে বুঝলেন ঘুমের ওষুধ খেয়ে সুইসাইড করেছে?'
'মর্নিংওয়াকের লোকজনগুলো তো তেমনটাই জানাল। কিন্তু—।'
'ওষুধের অ্যালুমিনিয়াম স্ট্রিপগুলো কোথায় গেল? আমি যতদূর জানি, ঘুমের ওষুধ খেয়ে কেউ সুইসাইড করলে মুখ দিয়ে এত গাঁজা বের হয় না। চুপচাপ ঘুমাতেন।'
'তাই তো দেখছি। ওষুধের পাতার কোনও নাম গন্ধ নেই।' বজরঙ্গবাবুরও চোখ এড়ায়নি ব্যাপারটা। 'তাহলে কী মদ খেয়ে হার্টফেল করেছে?' বজরঙ্গবাবু পালটা বললেন।
'যে রোজ মদ খায়, তার ওই একটা ছোট বোতলে তেমন কিছু হওয়ার কথা নয়। বরং অন্য জিনিস দেখুন।'
'অন্য জিনিস বলতে টেবিলের ওপর খাওয়ার প্লেট, গ্লাস...।'
আক্কেল বলল, 'সম্ভবত উনি বিষ খেয়ে থাকতে পারেন।'
'বিষ!'
'হ্যাঁ, বিষ! ওর খাবারের সঙ্গে বিষ মেশানো ছিল বলেই আমার মনে হয়।' আক্কেল এগিয়ে আসে, টেবিলে ওপর পড়ে থাকা সব জিনিসপত্রগুলো দেখে। বজরঙ্গবাবুও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্লেট গ্লাস দেখেন।
আক্কেল বলল, 'এটা দেখুন—।' একটা মিষ্টির বাক্স!
বজরঙ্গবাবু আক্কেলের মুখের দিকে তাকালেন। ওঁর চোখে-মুখে বিস্ময়।
'আপনি এটা থেকেই অনেক উত্তর পেয়ে যাবেন। তবে আমার অংক না মিললে আপনার হিসেবও মিলবে না বজরঙ্গবাবু।' টেবিল থেকে চোখ না সরিয়ে আক্কেল বলল। ওর চোখে-মুখে আলো।
বজরঙ্গবাবু বললেন, 'আপনি কী দেখছেন অমন করে—নিশ্চয় টেবিলে রাখা ওই দড়িটা দেখছেন না?'
আক্কেল হাসল, বলল, 'বজরঙ্গবাবু আমার মনে হয় এই শাড়ির দড়িটায় অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। এই দড়িটা আমি নিতে পারি?'
'নেবেন, নিন। আমি মিষ্টির প্যাকেটটা নিই, আপনি দড়িটা নিন। আশা করি এই দড়িটার সঙ্গে গঙ্গাচরণের মৃত্যুর কোনও সম্পর্ক নেই। একজন শাড়িওয়ালার বাড়িতে শাড়িবাঁধার দড়ি থাকতেই পারে, কী বলেন?'
'একদম নেই বলব না। তবু দেখা যাক—এই দড়িটা আমার ওঠা বা অন্ধকার গহ্বরে নামার মই হয় নাকি?'
আক্কেল শংকর নিবাসে ফিরল।
সোজা এসে নীলমের ঘরের সামনে দাঁড়াল। তার আগে সে ফোন করল বিখ্যাত চিত্রসমালোচক অশেষ ঘটককে। বলল, 'অশেষদা তোমাকে যেভাবেই হোক রাজি করাতে হবে। তুমি বললে ও না করতে পারবে না বলবে, কেসটা তুল নাও। আক্কেল বিষয়টা দেখছে। যদি ও দোষী হয় আক্কেল ওকে ছাড়বে না। প্রমাণসমেত ওকে জেলে পাঠাবে।'
অশেষ ঘটক রাজি হলেন। বললেন, 'হ্যাঁ রে আবার কোনওভাবে ফেঁসে যাব না তো?'
'শেষে তুমি ভয় পাচ্ছ অশেষদা, এটা তোমায় মানায় না।'
আক্কেল ওদের ঘরে গিয়ে দেখল নীলম শুয়ে। বিতান অপরূপ ওকে ঘিরে বসে আছে। ঘরে ঢুকে নীলমকে আক্কেল বলল, 'আপনার সঙ্গে আমার দুটো কথা আছে।'
অপরূপ কিছু বলতে যাচ্ছিল। নীলম তাকে হাত ইশারায় থামাল। আক্কেল বলল, 'আপনি নিজের চোখে দেখেছেন দীপিকাকে। আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি। কিন্তু পুলিশ, কোর্ট, আইনকে আপনি বিশ্বাস করাতে পারবেন না।'
আক্কেলের কথায় অপরূপ কিছু বলতে যাচ্ছিল। আক্কেল বলল, 'প্লিজ অপরূপবাবু একটু থামুন।'
কিন্তু অপরূপ থামল না। বলল, 'ও যা বলার পুলিশকে বলেছে। আপনার সঙ্গে কোনও কথা বলবে না।'
আক্কেল বলল, 'তাহলে আমি প্রমাণ করে দেব—নীলমকে হত্যার ষড়যন্ত্রে আপনিও আছেন অপরূপবাবু।'
'আরে কী বলছেন আপনি? আপনি কি পাগল?' অপরূপ আঁতকে উঠল।
'আমি পাগল নই। কিন্তু পাগলা কুকুর সামলাতে জানি। আমি যদি বলি, দীপিকাকে দিয়ে আপনি এই কাণ্ড করিয়েছেন। কারণ আপনি দীপিকাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। আপনি জানেন দীপিকার কাছে প্রচুর টাকা। তার ওপর দীপিকা সুন্দরী। আপনি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনার চাওয়ার পথে দেওয়াল তুলে দাঁড়িয়ে ছিল নীলম। তাই আপনি ছক করে নীলমকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সেই সঙ্গে জানাব আপনি মিথ্যে পরিচয় দিয়ে এখানে আছেন। আপনি ওর দাদা নন। আপনার সঙ্গে ওর কোনও রক্তের সম্পর্ক নেই। সেরেফ আপনাদের সম্পর্ক একজন অভিনেত্রী ও পরিচালকের সম্পর্ক। না, আমি আর অন্য কোনও কথা তুলব না।'
আক্কেলের কথায় কাঁপতে-কাঁপতে বসে পড়ে অপরূপ।
ম্লান মুখে ঠান্ডা গলায় বিতান বলে, 'আপনি কী বলতে এসেছেন সেটা বলুন।'
আক্কেল নীলমের দিকে তাকায়, বলে, 'আপনি কাল দীপিকাকে দেখেননি। আপনি ভুল করছেন। কারণ, এক নম্বর, জায়গাটা বেশ অন্ধকার ছিল, উনি পুলিশকে দেওয়া বয়ানে সে কথাই বলেছেন।
দুই, আপনার ওপর অ্যাটাক হয়েছে পিছন থেকে। আপনার পিছনে নিশ্চয়ই কোনও চোখ নেই। হামলাকারী আপনার মাথায় পাথর মেরে প্রায় অজ্ঞান করে চলে গেছে। অর্থাৎ আপনি কিছু দেখেননি নীলম।'
আক্কেল থামল। বলল, 'কমলিকা দেবীও দেখেননি। তাঁর ঘরে আলো ছিল। তাঁকে কেউ মাথায় আঘাত করেনি। তাসত্বেও উনি দেখতে পেলেন না, আর অন্ধকারে, পিছন থেকে আপনি দেখতে পেলেন। দীপিকা হল স্রেফ আপনার অনুমান। যেহেতু দুদিন আগে ওর সঙ্গে আপনার একটা বিশ্রীরকম কথা কাটাকাটি হয়েছে। সেহেতু আপনি, এই ঘটনার সঙ্গে ভুল করে, বা অনুমান করে ওকে জড়িয়ে দিচ্ছেন। আমি মনে করি না, আপনি ইচ্ছে করে করেছেন। কিন্তু আপনি করছেন যা সেটা ভুল। একটা ভ্রম! প্লিজ কেসটা তুলে নিন।'
নীলম বলল, 'ওই রাক্ষুসীটা আপনার, আমার বরের, অপরূপের—সবার মাথা খেয়েছে। আপনি ওর হয়ে ওকালতি করছেন। এই বাড়িতে কেউ আমার নেই।'
'না, আমি ওর হয়ে কোনও ওকালতি করছি না। আমি ওকে ছাড়াতে চাইছি, ওকে প্রমাণ সহ ধরব বলে। প্রমাণ চাই। প্রমাণ। এক্ষেত্রে আপনি আমায় হেল্প করুন। ভবিষ্যতে আমিও আপনাকে হেল্প করব। আমি জামিনদার হিসেবে আমার দাদা অশেষ ঘটককে রাখছি। নিন ফোন ধরে তার সঙ্গে কথা বলে নিন। স্রেফ একটা চান্স আমাকে দিন।'
আক্কেল হঠাৎই ওদের কথার মাঝে কাউকে কোনও সুযোগ না দিয়ে অশেষ ঘটককে ফোন করে বলল, 'অশেষদা নাও, তুমি নীলম ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলো।'
ফোনের ওপারে অশেষ ঘটক। তিনি নীলমকে ভরসা দিলেন, প্রতিশ্রুতি দিলেন। নেক্সট ফিল্মে নীলমকে তিনি যা কভারেজ দেবেন তা ইদানীংকালে কোনও বাংলা অভিনেত্রী পাননি। বিনিময়ে নীলমকে সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে। দীপিকার নামে করা অভিযোগ তুলে নিতে হবে। আক্কেল চাইছে দীপিকাকে প্রমাণ সহ ধরতে। ওকে সাহায্য করতে হবে।
অপরূপ ঘটনার গতি প্রকৃতি দেখে ঘনঘন ঘাড় নাড়ছিল। নীলমও রাজি হয়ে গেল। বলল, 'ঠিক আছে আমি সব অভিযোগ তুলে নিচ্ছি।'
ফোনের ওপাশে অশেষ ঘটক হাসলেন। বললেন, 'থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম। কলকাতায় ফিরুন একদিন জমিয়ে আড্ডা মারা যাবে।'
মাথা নীচু করে বিতান বসে থাকল। নীলমের লিখিত চিঠি নিয়ে আক্কেল দৌড়াল মধুগোপালবাবুর বাড়িতে।
দুপুরের দিকে আক্কেলের সঙ্গে থানা থেকে দীপিকা আর হীরু ফিরে এল।
নীলম জানাল, এ-বাড়িতে সে এক মুহূর্ত থাকবে না। ঠিক হল, কাল সকালে বিতান, নীলম, অপরূপরা ফিরে যাবে। আক্কেল জানাল, ওদের সঙ্গে সে আর মেঘও চলে যাবে।
কিন্তু তার আগে আজ সন্ধেবেলা যেন সবাই কমলিকা দেবীর ঘরে হাজির হয়—এটা আক্কেলের বিনীত অনুরোধ।
আক্কেলের কথায় কমলিকা দেবী কোনও তাপ উত্তাপ প্রকাশ করলেন না। বললেন, 'সবাই যদি আসে—আসুক।'
কমলিকা মজুমদার চেয়েছিলেন সবাই বসার ঘরে বসুক। কিন্তু আক্কেল বলল, 'যদি খুব অসুবিধে না হয় আমরা আপনার ঘরেই বসব।'
কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায় আক্কেলের প্রস্তাবে রাজি হলেন কমলিকা। কিন্তু তিনি মনোক্ষুণ্ণ হয়েছেন, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আক্কেল কিন্তু কমলিকা মজুমদারের মনোভাব দেখেও তাঁর ঘর থেকে বসার জায়গা সরাল না।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়েছে। শংকর নিবাসে আলো জ্বলেছে। লালচে আলোয় আজ এ-বাড়িকে কেমন যেন রহস্যময় মনে হয়। যেন মনে হয় আরও কিছু ঘটবে এ-বাড়িতে।
নীলম কিছুতেই আসতে চাইছিল না। ও পরিষ্কার জানিয়েছে—ওর এ-বাড়ির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। আজ পর্যন্ত ও এখানে আছে। কাল সকালে চলে যাবে, আর কোনওদিন মনোহরগঞ্জে পা রাখবে না। ওর পাশে মাথা নীচু করে বসে আছে বিতান। ওর চোখে-মুখে হতাশা। তবু সুহৃদ সান্ত্বনা দিল, 'এত রিজিড হতে নেই নীলম। দেখো আমরা এই গোলমালের জন্যে মনোহরগঞ্জ ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু আবার স্বেচ্ছায় এখানে এসেছি। তুমি না হয়ে আমি বা নন্দিনীও বিপদে পড়তে পারতাম। দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে। আবার পরের বছর আমরা আসব, তোমাকেও আসতে হবে। আবার আমরা সবাই মিলে হইহই করব। আমি গাইব, তুমি নাচবে।'
'না, সুহৃদ তোমরা আমাদের বাড়ি এসো। এই মৃত্যুপুরীতে ঢুকো না। এখানে অন্য কেউ নয়, আমাকে মারারই প্ল্যান হয়েছিল।' কথাটা বলতে-বলতে নীলম ঠক ঠক করে কাঁপছিল।
শেষ বিকেলে আক্কেল গিয়ে আবার দাঁড়াল, নীলমের সামনে। বলল, 'আজ সন্ধেবেলা আপনি আসবেন। আপনাকে আমার খুব প্রয়োজন। আমিও কাল আপনাদের সঙ্গেই ফিরে যাব। যেতে-যেতে তখন আপনাকে বাদবাকি কথাগুলো বলব, প্লিজ আসবেন।'
নীলম চুপ করে থাকল।
সন্ধে হতেই কমলিকার ঘরে পর পর সবাই এসে হাজির হল।
আক্কেল এই ঘরে এসে দেখে কমলিকা আর হীরু বসে আছে। একটু পরেই অশ্বিনী আসেন। নন্দিনী-সুহৃদ বারান্দায় দাঁড়িয়ে, সবকিছু থেকে কিছুটা যেন নিজেদের সরিয়ে রাখছে। তার পরে নীলম-বিতান-অপরূপ এল একসঙ্গে। বসলও পরপর। সব শেষে জয়া আর দীপিকা। জয়া বসলেন না, ঘরের এক কোণে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকলেন। দীপিকা চলে গেল বারান্দার দরজার কাছে। ওর চোখ-মুখ ফোলা। লাল টস টস করছে। মেঘ এক ঝলক চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল—সবাই এসেছে আকিদা।
আক্কেল সবার দিকে তাকাল। বলল, 'না, সবাই আসেনি। ঝড়ু, দুর্গাশরণ, মুন্না আর চম্পাকলি কই?'
ঝড়ু তার নাম শুনে দরজার কাছে উঁকি দিল। নন্দিনী বলল, 'মুন্নার কাছে বব আছে।'
কমলিকা বললেন, চম্পাকলিও হয়তো ওদের সঙ্গে আছে। ওদের ডাকব? ছেলেটার কাছে ওরা আছে।'
'না, থাক—প্রয়োজনে ডেকে নেওয়া যাবে?'
'ওদের আবার কী দরকার পড়বে?' হীরু বেশ বিরক্তির সঙ্গে জিগ্যেস করল।
আক্কেল হাসল, বলল, 'আমার সুরেশ, জগৎ সিংকেও প্রয়োজন পড়বে।'
কমলিকা মজুমদার খাটের এক ধারে বসে আছেন। বললেন, 'ওদের যখন প্রয়োজন মনে হবে ডেকে নিও।'
আক্কেল জয়ার দিকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিল, বলল, 'বসুন।' সুহৃদ-নন্দিনী-দীপিকাকে উদ্দেশ্য করে বলল, 'আপনারাও বসুন।'
সুহৃদ-নন্দিনী সোফায় বসল। দীপিকা একটা বেতের চেয়ার টেনে আনল বারান্দা থেকে। সবার থেকে বেশ দূরত্ব বজায় রেখে বসল।
আক্কেল বলল, 'আমি কিছু কথা বলব—যেগুলো সবাই জানেন, যেগুলো এ-বাড়ির ভেতর ছিন্ন পাতার মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। আমি শুধু সেগুলো তুলে আমার কথার ভেতর সাজাব। যদি ভুল জায়গায় ভুল পাতা বসিয়ে ফেলি—আপনারা সংশোধন করে দিতে পারেন।'
ঘরের ভেতর অখণ্ড নীরবতা।
আক্কেল বলল, 'আমি শুরু করি এই ঘর দিয়ে। আমি কমলিকা দেবীকে বলেছিলাম—আমরা এই ঘরে বসব। উনি ঠিক চাননি, আমরা এই ঘরে মিলিত হই। উনি চেয়েছিলেন—আমরা সবাই বসার ঘরে বসি। কিন্তু এই ঘরে না বসলে এ-বাড়ির কাহিনিই যে শুরু হবে না।' আক্কেল একটু থামল। বলল, 'সাত বছর পর—এই ঘরে আততায়ী আবার পা রেখেছিল ক'দিন আগে। আর সেদিনই শুরু হয়েছিল এ-বাড়ি, এ-পরিবারকে ঘিরে দ্বিতীয় অধ্যায়। সে হামলা চালিয়েছিল এ-বাড়ির কর্ত্রী কমলিকা মজুমদারের ওপর। উনি এখন যেখানে বসে আছেন, সেদিনও এখানেই বসেছিলেন। এটা ওঁর খুব প্রিয় জায়গা। এই কথা আমরা সবাই এখন জানি। সেদিন হামলাকারী রাত ন'টা থেকে সাড়ে ন'টার মধ্যে, ঠিক কমলিকা দেবীর রাতের খাবার নিয়ে আসার আগের মুহূর্তে এইঘরে ঢুকেছিল। খুন করার অস্ত্র হিসেবে সে ব্যবহার করেছিল দড়ি। প্রশ্ন খুন করার জন্য কেন দড়ি? তাহলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হয় সাত বছর আগে। সাত বছর আগে, এই বাড়ির কর্তা কিরণশংকর মজুমদার হাইওয়ের ওপর খুন হন। খুনি তাকে গলায় দড়ির ফাঁস দিয়ে হত্যা করে। কেউ সেই খুনের জন্য ধরা পড়েনি। অর্থাৎ সেই খুনি এখনও মুক্ত। কমলিকা দেবীর মনে হয়, সেই খুনির আবার আগমন হয়েছে, সে-ই খুন করার চেষ্টা করেছে। এবারও তার অস্ত্র দড়ি!'
আক্কেল থামে। কমলিকা মজুমদারের দিকে তাকায়। কমলিকা নিশ্চুপ। আক্কেল বলল, 'উনি কখনও হীরকবাবুকে সন্দেহ করেননি। কিন্তু তার আগে, বা তারও আগে হীরকবাবুর সঙ্গে ওঁর কোম্পানির হস্তান্তর নিয়ে মনোমালিন্য হচ্ছিল। ঘটনার আগের দিন হয়তো সেটা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তার পরে এই আক্রমণের ঘটনা ঘটে, তাই কোনও একটা জায়গা থেকে কথা ছড়ায় যে হীরকবাবু এটা করেছেন।'
আক্কেলের কথা থামিয়ে অশ্বিনী বলে, হ্যাঁ তাইজন্যে আমি নিজে এসে বউদির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি। ব্যাপারটা মিটে গেছে বলেই আমি মনে করি।'
আক্কেল বলল, 'আপনি ক্ষমা না চাইলেও ব্যাপারটা মিটে গেছে। কেন না কমলিকা দেবী জানেন ওই ঘটনার সঙ্গে তাঁর হীরু কোনওভাবে জড়িত নন। উনি আমাকে বার বার সেকথা জানিয়েছেন। আমি সেটাই সবার সামনে জানিয়ে দিলাম। তাহলে প্রশ্ন থাকে কথাটা রটিয়েছে কে? উত্তর হল, কথাটা রটানোর জন্য দায়ী স্বয়ং হীরকবাবু। তাঁর ওই রুক্ষ ব্যবহার, মারকুটে ইমেজ। কিন্তু একটা সহজ সত্য হল—হীরকবাবু যদি কমলিকা দেবীকে মারতে আসেন তাহলে দড়ি নিয়ে আসবেন কেন? দড়ি দিয়ে খুন করেছিল সেই সাত বছর আগের খুনি, যে যুক্তিই থাক সেই খুনি কিন্তু কখনও হীরকবাবু হতে পারেন না। কেন না তাঁর কম বয়েস তখন?'
আক্কেল থামে, বলে, 'হীরকবাবুকে আমি যে যুক্তি থেকে প্রথমেই হামলাকারীর তালিকা থেকে বাদ দিয়েছি, ঠিক সেই যুক্তিতেই দীপিকাকেও বাদ দেব। আবার কমলিকা দেবীর ঘটনার ক্ষেত্রে সবার সন্দেহ কিন্তু সেই সাত বছর আগের আততায়ীর দিকে। তাহলে তার হাত কি নীলমের গলায় পড়তে পারে না? ফলে কোনওভাবেই কোথাও দীপিকা নেই। তাই ওকে নীলমের হামলাকারীর তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। যতই ওর ঘর থেকে দড়ি পাওয়া যাক।'
নীলম বলল, 'আপনি কি এই যুক্তি দেখানোর জন্য আমাদের সবাইকে এখানে ডেকেছেন? যাক, আপনার যুক্তি শুনে আমি খুব খুশি হলাম। তাহলে আমি আমার ঘরে যাই। আপনার কাজ তো মিটে গেছে?'
আক্কেল হাসল, বলল, 'আপনি যাবেন, যান। একটা কথা আপনাকে জানিয়ে রাখি, এই ঘরের মধ্যে আপনার আততায়ী নেই, সে বাইরে আছে। বলা যায় না, আপনাকে একা পেয়ে এবার সে তার অসম্পূর্ণ কাজটা সম্পূর্ণ করে ফেলতে পারে!'
'মানে?' নীলম যেন কেঁপে উঠল।
'বুঝতে পারলেন না, তাহলে বলব, আর একটু বসুন, সবার সঙ্গেই আপনি নিজের ঘরে যাবেন। প্লিজ একা আপনি যাবেন না। আপনি এখনও বিপদসীমার বাইরে নন।'
নীলম ফ্যালফ্যালে চোখে আক্কেলের দিকে তাকিয়ে নিস্তেজ হয়ে গেল। আক্কেল বলল, 'এবার একটা অন্যরকম কথা বলি আমি। কথাটা ভুল বললে কমলিকা দেবী সংশোধন করে দেবেন। আচ্ছা কমলিকা দেবী 'অগ্নীশ্বর' বা 'ঝিন্দের বন্দি' কেমন সিনেমা? আপনার পছন্দের?'
'হঠাৎ সিনেমার কথা কেন?' কমলিকা আশ্চর্য হয়ে আক্কেলের দিকে তাকান। 'খুব ভালো সিনেমা।' ওঁর মুখে হালকা হাসি।
'এই দুটো সিনেমা আপনি শেষ কবে দেখেছেন?'
'অনেক দিন দেখিনি। তুমি কবে যেন বলছিলে—দুপুরের দিকে টিভিতে দেখাবে, কিন্তু আমি দুপুরে টিভি দেখি না বলে দেখা হয়নি। কেন বলত?'
আক্কেল বলল, 'আপনি আমাকে বলেছিলেন, আপনার ওপর যেদিন হামলা হয় সেদিন আপনি সন্ধে থেকে টিভির চ্যানেল ঘুরিয়ে ভালো কোনও সিনেমা পাননি। রাত ন'টা সাড়ে ন'টা নাগাদ টিভিতে উত্তমকুমারের একটা সিনেমা দেখায়, আপনি সেটা দেখতে শুরু করেন। কিন্তু আমি সমস্ত বাংলা সিনেমার চ্যানেলগুলো থেকে খবর নিয়েছি, ওইদিন সন্ধেবেলা একটা চ্যানেলে ছ'টা থেকে 'ঝিন্দের বন্দি' দেখিয়েছে, আর একটা চ্যানেলে সন্ধে সাতটা থেকে 'অগ্নীশ্বর' দেখিয়েছে। আর ন'টা বা সাড়ে ন'টা থেকে বাংলা মুভি চ্যানেলগুলো যে সিনেমা দেখিয়েছিল, তা একটাও আপনার ভালো লাগবে না, দুটিই সাউথের ছবি—ডাবিং করা। একটা এখনকার, ভীষণ একটা মাথাধরা আঁতেলমার্কা সিনেমা। কোনওটাই উত্তমকুমারের সিনেমা নয়। এই যে লিস্টটা আমার কাছে আছে, আপনি ইচ্ছে করলে এটায় চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন।'
কমলিকা মজুমদার ঠান্ডা গলায় বললেন, 'ওর থেকে কী প্রমাণ হচ্ছে? কী বলতে চাইছ—সেটা পরিষ্কার করে বলো?'
আক্কেল হাসল, বলল, 'আমি যেটা বলতে চাইছি, তাহলে আপনি এভাবে আমাকে মিস গাইড করলেন কেন?'
'আমার কোনওরকম বলাতে ভুল হয়ে থাকতে পারে। অত বড় একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সব হয়তো তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল। সন্ধেবেলার দেখা উত্তমকুমারের সিনেমাটা রাতে বলেছিলাম। এতে এমন কিছু অন্যায় নেই।'
'না নেই। কিন্তু আমার মনে হয় আপনার ওপর কোনও আক্রমণই হয়নি।'
'তবে কি আমি মিথ্যে বলছি? আমার গলায় এখনও দাগ আছে—। কী বলছ তুমি, আমার ঘরে বসে?'
'না, আপনি মিথ্যে বলছেন না। আপনার কোনও ভুল হয়েছে। বিভ্রম! ঘটনাটা এমন হতে পারে, আপনি খাটের ধারে বসেছিলেন। আপনার অজান্তে আপনার গলার হারটা খাটের বাজুর পরির হাতে আটকে যায়। আপনি টানলেন, আপনার গলায় টান পড়ল। আপনি দু-চোখ বন্ধ করে টানাটানি করে আপনার গলা কেটে হার বসে যায়। কিন্তু আপনার টানাটানিতে আবার একসময় হারটা খুলেও যায়। আপনি আঁতকে উঠে দেখেন, পরির হাতে একটা দড়ি ঝুলছে। আপনার মনে হয়, দড়িটা ফেলে আততায়ী পালিয়েছে। আপনি চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। সেটা নিয়ে নানা কথা রটে। অনেক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। আর সেটা হয় সন্ধেবেলা। আপনার আর সন্ধেবেলার টিভি দেখা হয় না। কিন্তু আপনি একটু পরেই বুঝেছিলেন—ওটা আপনার মনের ভুল। তবু ভুলটাকে আপনি সবাইকে জানালেন না। বরং আপনি এ ঘটনাটা আমাকে বলার সময় সাড়ে ন'টায় বলেছেন। বলেছেন, আততায়ীর পালিয়ে যাওয়ার একটা কারণ চম্পাকলির পায়ের শব্দ।'
'এ আপনি সব মনগড়া কথা বলছেন—তাহলে দড়িটা এল কোথা থেকে?' অপরূপ ব্যঙ্গের হাসি হেসে কথাটা বলল।
'দড়িটা এল দীপিকার কেনা শাড়ি থেকে। এখানে আসার সময় গঙ্গাচরণবাবুর দোকান থেকে দীপিকা দুটি শাড়ি কিনেছিল। একটা শাড়ি ওঁর মায়ের জন্যে, আর একটা শাড়ি বড়মার জন্যে। কমলিকা দেবীর শাড়িটা দেখানোর সময় দড়িটা কোনও একটা পরির হাতে আটকে রাখেন। কমলিকা দেবী গলার টান মুক্ত হয়ে দেখেন একটা দড়ি। উনি দুইয়ে দুইয়ে চার করেন। আসলে, কমলিকা দেবী সিঁদুরে মেঘ দেখে আগুন লেগেছে ভেবেছেন। এখনও হারের খাঁজে পরির হাতের পালিশ লেগে আছে। আর উনি যদি দীপিকার দেওয়া শাড়িটা বের করেন, তাতেও শাড়ি-বাঁধার কোনও দড়ি পাওয়া যাবে না বলেই আমার বিশ্বাস।'
কমলিকা দেবী নিশ্চুপে বসে। বিড়বিড় করেন, 'হতে পারে! কী জানি আমার সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।'
নন্দিনী বলল, 'কিন্তু আমি যে তাকে দেখেছি—বাগানে দাঁড়িয়ে, সেখানে একটা আলোমতো কিছু—।'
আক্কেল হাসে, 'এটা আমি বলব না, এটা হীরকবাবু বলবেন—।'
হীরক দু-হাতে নিজের মুখ মুছল। বলল, 'ওটা আমি বড়মার ওপর যেন আর অ্যাটাক না হয়, সেজন্যে রাতে দরজা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত পাহারা দিতাম।'
'আর আলোটা হল মশকিউটো কয়েল, খুব মশা ওখানে। আমি ওখান থেকে পোড়া কয়েলের অনেকগুলো টুকরো পেয়েছি।' আক্কেল হীরকের বলা কথার সঙ্গে জুড়ে দিল। বলল, 'এ-কথাটা শুধু আমি নই, ড্রাইভার সুরেশ জানে। আশা করি অশ্বিনীবাবুও জানেন।'
'মাই গুডনেস!' নন্দিনী যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু পরক্ষণে বলল, 'তাহলে নীলমের ওপর যে আক্রমণটা হল, সেটা কে করল?'
আক্কেল বলল, 'বলছি। তার আগে আরও একটু ক্লিয়ার হয়ে যাওয়া উচিত। না হলে এ কাহিনি ঠিকমতো জোড়া যাবে না, অনেকটাই না দেখা, না জানা থেকে যাবে। পরের কাহিনিটি এমন—আজ প্রথম এখানে বসে কমলিকা দেবী এ সত্যটা জানতে পারলেন এমন কিন্তু নয়। ওঁর এই বিভ্রমটা সেদিনই ঘটনাটি ঘটার কিছুক্ষণের মধ্যে কেটে গিয়েছিল বলেই আমার বিশ্বাস। উনি বুঝেছিলেন, উনি ভুল করেছেন। ওঁর ওপর কোনও আক্রমণ হয়নি। কিন্তু উনি ওঁর ভুল ভাঙার পথে গেলেন না। বরং নির্লিপ্ত থেকে ব্যাপারটা থেকে সবাইকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। বজরঙ্গবাবু থানা থেকে ফোন করলেও উনি পুলিশ ডাকলেন না। বরং আমাকে ডেকে পাঠালেন। ডেকে পাঠালেন চারদিকে একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে। যাতে উনি কোম্পানি হস্তান্তরের কাজটা নির্বিঘ্নে করে ফেলতে পারেন। আর সে সব কারণে, আক্রমণের পরেও উনি ওঁর বারান্দার দিকের দরজা অবারিত রেখেছেন। আসলে ওঁর কোনও ভয় নেই, উনি জানেন সত্যটা কী!'
'কিছুই হয়নি, তবু মিথ্যে ভয় পেয়ে মা আমাদের এ-বাড়ি থেকে রাতারাতি চলে যেতে বললেন? এটা কেমন কথা?' নন্দিনী বেশ অসহিষ্ণু গলায় প্রশ্ন করে।
আক্কেল শান্ত চোখে কমলিকা দেবীর দিকে তাকায়, বলে, 'এর উত্তর উনিই দিতে পারবেন। তবু আমি বলছি। উনি লক্ষ করেছিলেন—আপনার স্বামীর সঙ্গে নীলম একটু অন্যভাবে মেলামেশা করা শুরু করেছে।'
'অন্যভাবে মানে?' নন্দিনীর গলার স্বর বেশ তীব্র হয়ে ওঠে।
'একটু লুকিয়ে চুরিয়ে ওরা এ-বাড়ির হাতিঘরে দেখা করছিল। ওদের মধ্যে একটু অন্যধরনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছিল। নীলমের মেন্টর অপরূপবাবুর পরামর্শে এটা হচ্ছিল—।'
সুহৃদ কিছু বলতে যাচ্ছিল। আক্কেল বলল, 'প্লিজ সুহৃদবাবু কাদা আর ঘাঁটব না। আপনাদের দুজনকে ঝড়ু খুবই আপত্তিজনক অবস্থায় হাতিঘরে দেখেছে। আপনি বুঝতে পারছিলেন না, কোম্পানি হস্তান্তর সম্পর্কিত বিষয়ে আপনাকে আর নন্দিনীকে সঙ্গে পাওয়ার জন্য অপরূপবাবু এই চালটি নীলমকে দিয়ে খেলছে। কিন্তু এতকিছুর পরে ওরা যাকে সামনে রেখে এগোবে সেই বিতানবাবু ছিলেন নিস্পৃহ, তিনি সরাসরি মায়ের বিরোধিতা করছিলেন না। টাকার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছিলেন না। তাই অপরূপের কিরণ-কমল মুভি কোম্পানির স্বপ্নে জল পড়ে যাচ্ছিল।'
অপরূপ উঠে দাঁড়াল, বলল, 'আপনার কাছে এসবের কী প্রমাণ আছে?'
আক্কেল বলল, 'আপনি চুপ করে বসুন। প্রমাণ ঝড়ু, প্রমাণ চম্পাকলি। প্রমাণ দরজার গায়ে বিশেষভাবে নক করা। তিনবার আঙুল ঠোকা। যে ঠোকার আওয়াজে নীলম কাল রাতে চলে গিয়েছিল হাতিঘরে। কিন্তু সেখানে সুহৃদবাবু ছিলেন না, ছিল অন্য কেউ? কী নীলম আমি কি ভুল বলছি—। নীলমের মনে হয়েছিল কেউ ডাকল। কে ডাকল যে তার খোঁজে উনি একেবারে হাতিঘরে চলে গেলেন?'
নীলম মাথা নীচু করে। উদভ্রান্তের মতো বিতান তাকাল নীলমের দিকে। নন্দিনী জলভরা চোখে সুহৃদের দিকে তাকিয়ে আছে। সুহৃদ উদাস চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে।
অশ্বিনীবাবু বললেন, 'তারপরের টুকু আপনি বলুন। নীলম হাতিঘরে গেল, কিন্তু ওর ওপর কে আক্রমণ করল?'
'চম্পাকলি!' ঠান্ডা গলায় বলল আক্কেল।
সারা ঘরের মধ্যে কথাটা যেন ঘুরপাক খেল। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল হীরক। হিসহিস করে বলল, 'দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা হয়েছে! কোথায় সে—?'
আক্কেল বলল, 'হীরকবাবু আপনি শান্ত হয়ে বসুন। বজরঙ্গবাবু আজ সন্ধেবেলাতেই চম্পাকলিকে বাড়ির বাইরে থেকে তুলে নিয়ে গেছেন। ও সব কথা স্বীকারও করেছে। আমার কাছে বজরঙ্গবাবুর মেসেজ এসেছে একটু আগে। বলেছে—নীলমের সোনার হার, গয়নার লোভে পড়ে ও এসব করেছে।' সবাই চুপ করে। কেউ কোনও কথা বলছে না। হঠাৎ ফ্যাসফেসে গলায় কমলিকা দেবী বললেন, 'আক্কেল তোমার নিশ্চয় কথা শেষ হয়েছে, আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। ও ধরা পড়েছে, স্বীকার করেছে যখন সব মিটে গেছে।'
কমলিকা দেবীর দিকে তাকিয়ে আক্কেল বলল, 'কথা শেষ হয়ে গেলে খুব ভালো হত জানেন। কিন্তু বজরঙ্গবাবুকে বলা চম্পাকলির কথা আমার যে বিশ্বাস হয়নি। আমি মনে করি, চম্পাকলি নিছক লোভে পড়ে এ কাজ করেনি। ও একাজ করেছে আপনার কথায়।'
'কী বলছেন আপনি!' হীরক লাফিয়ে ওঠে।
আক্কেল মাথা নাড়ে, 'হীরকবাবু এত উত্তেজিত হবেন না। আপনাদের এ-বাড়ির কাহিনি এখনও শুরু হয়নি। সেটা আমি বজরঙ্গবাবুর সামনে শুরু করতে চাই বলে একটু সময় নিলাম। আপনি বসুন, বজরঙ্গবাবু এসে গেছেন। এই যে আমাকে মিসড কল করেছেন।'
বজরঙ্গবাবু এসে ঘরে ঢুকলেন। ঢুকেই দরজার সামনে একটা চেয়ার টেনে সটান বসলেন। 'একটু দেরি হয়ে গেল ভাই। তোমার বাবা মিস্টার বাসু ফোন করেছিলেন। নো প্রবলেম, তুমি তোমার কথা বলো। আশা করি তোমাকে কেউ ডিসটার্ব করবে না। আমি আছি।'
হীরক বলল, 'ও পুলিশ ডেকে আপনি আপনার ভাষণ শোনাবেন!'
আক্কেল বলল, 'চম্পাকলি বলেছে সে গয়নার লোভে পড়ে একাজ করেছে। লোভে পড়ে এত কিছু করেও চম্পাকলি একটাও সোনার জিনিস নিয়ে গেল না। কেন? খুব অবাক লাগছে না? আসলে যদি চম্পাকলি নীলমকে খুন করতে পারত, তাহলে দোষ হত সে-ই সাত বছর আগের খুনির। কিন্তু সে খুন করতে পারেনি, হয়তো ব্যাপারটা নিয়ে টানাহেঁচড়া হবে, একথা ভেবেই কমলিকা দেবী ওকে লোভের কথাই শিখিয়েছেন। অভয় দিয়েছেন, ওর কিছু হবে না বলে। আর চম্পাকলি যদি বলেও কমলিকা দেবীর কথায় ও এ-কাজ করেছে, কে ওর কথা বিশ্বাস করবে? কিন্তু কেন এমন একটা কাজ করলেন কমলিকা দেবী? আপনি বলবেন আমাদের?'
কমলিকা মজুমদার কোনও উত্তর দিলেন না, ওঁর দু-চোখে আগুন।
আক্কেল রুমাল বের করে মুখ মুছল। বলল, 'আমার মনে হয়, কমলিকা দেবী এটা করেছেন প্রচণ্ড রাগে। হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে। হয়তো ওঁর এমন কোনও ইচ্ছা ছিল না। উনি এখানকার পরিবেশের কথা বলে নন্দিনী-সুহৃদকে এ-বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। উনি কোনও খুনির ভয়ে ওদের পাঠিয়ে দেননি। ওর পাঠানোর উদেশ্যটাই ছিল মেয়ের সংসারটা বাঁচানোর। যাতে সুহৃদ সুযোগ পেয়ে আরও বেশি না জড়িয়ে পড়ে। একথা উনিই আমাকে বলেছেন।
কিন্তু নন্দিনী-সুহৃদরা চলে গিয়েও ফিরে এল। তখন উনি বুঝতে পারলেন, এটা নীলম আর সুহৃদের প্ল্যান—পরস্পরকে আরও কয়েকদিন কাছে পাবে বলে মনোহরগঞ্জে আবার ফিরে আসা।
তখন কমলিকা দেবীর মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। উনি দুপুরেই ঠিক করলেন, একটা হেস্তনেস্ত করে ফেলবেন। অন্যসময় হলে হয়তো উনি এই দায়িত্ব ওঁর হীরু ডাকাতকে দিতেন। কিন্তু তার আগেই হীরু গোলমাল পাকিয়ে থানায় ঢুকে গেছে।
কমলিকা দেবী ভাবলেন, চম্পাকলিকে দিয়ে নীলমের মতো পাপ নিকেশ করবেন। নীলম তার ছেলের জীবন শেষ করেছে, এখন তার মেয়ের সংসারটা নষ্ট করছে। ওর আর বেঁচে থাকার কোনও অধিকার নেই। কিন্তু ভাগ্যের জোরে খুন হল না নীলম। গলায় ফাঁস দেওয়ার সময় চম্পাকলির হাতের দড়ি ছিঁড়ে গেল। চম্পাকলি টেবিল থেকে পাথর ভেবে যেটা তুলল সেটা শাঁখ। ঠিকমতো ধরতে পারল না বলে নীলমের মাথায় আঘাত করেও সুবিধে করতে পারল না। ওকে হাতিঘরে ফেলে চলে এল। তারমধ্যে নীলম হয়তো চম্পাকলির দিকে তাকিয়েছিল। এতে চম্পাকলির ভয় হল। কমলিকা দেবী ওকে গয়নার লোভের কথা বলে অভয় দিলেন। যদি ধরা পড়ে সে যেন গয়নার লোভের কথা বলে। তারপর ঠিক কমলিকা দেবী ওকে ছাড়িয়ে আনবেন।'
কমলিকা দেবী চিৎকার করে উঠলেন, 'থামো তুমি। তোমার সাহস তো কম নয়, এটা কলকাতা নয়, এটা মনোহরগঞ্জ, এখানে আমার নামে বদনাম করে তুমি পার পাবে না। মনগড়া কথা বলছ। তোমার কাছে কী প্রমাণ আছে?'
আক্কেল ঠান্ডা গলায় বলল, 'এটার প্রমাণ আমার কাছে আছে। দীপিকার টেবিলে শাড়ি বাঁধার একটা গোটা দড়ি পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু নীলমকে মারতে এসে চম্পাকলির হাতের দড়িটি ছিঁড়ে গিয়েছিল। তার এক টুকরো পড়েছিল হাতিঘরের ভেতর। এই যে সেটা আমার কাছে আছে। এটা আপনার সেই দেখানো শাড়ি-বাঁধার দড়ির ছেঁড়া অংশ। কমলিকা দেবী আপনি কি আপনার সে-ই দড়িটি দেখাতে পারবেন? আমার মনে হয়, ওই দড়িটি আর আপনার কাছে নেই। থাকলেও পুরোটা নেই, তারই ছেঁড়া অংশ কি এটি। আপনার শাড়ির পাড়ের সঙ্গে এটা নিশ্চিত মিলে যাবে।'
বজরঙ্গবাবু কমলিকা মজুমদারের দিকে তাকালেন। বললেন, 'ম্যাডাম আপনার সেই দড়িটা দেখান, প্লিজ! আপনার নতুন শাড়িটাও একটু দেখব।'
আক্কেল বলল, 'আমি আপনাকে কেন মিথ্যে জড়াব, আপনি নিজেকে জড়িয়েছেন। আর প্রথম আমার জট ছাড়িয়েছে কে জানেন, শুনলে অবাক হবেন, সে চম্পাকলি। সে আমায় প্রথম জানিয়েছিল—সেদিনের ঘটনাটা।
কমলিকা মজুমদার দু-চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। ওঁর বন্ধ চোখ দিয়ে দর দর করে জল পড়ছে। হীরক অবাক হয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে।
বজরঙ্গবাবু বললেন, 'ব্যস আর কিছু বলতে হবে না। দু-ডান্ডা দিলে চম্পাকলির পেট থেকে সব কথা হড়হড় করে বেরিয়ে আসবে। তাহলে মিস্টার বসু কেস সলভড। চম্পাকলিকে অ্যাটেম্পট টু মার্ডার দেব। ও থানায় আছে। আসলে নীলম ম্যাডাম কেসটা তুলে নিয়েছে বলে আমাদের একটু টেকনিক্যালি অসুবিধে আছে। এখন আবার ঘটনাটা পুরো ফ্যামেলি ম্যাটার হয়ে গেল।'
আক্কেল সারা ঘরের সবার দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমি আপনাকে একটা কথা বলি বজরঙ্গবাবু, চম্পাকলিকে ছেড়ে দিন। এ-বাড়ির ভেতর সবকিছু তালগোল পাকিয়ে রয়েছে। এখানে কী হচ্ছে, আর কী হবে না তা কেউ জানে না। নীলম একটা মারাত্মক খেলা খেলেছে অপরূপের অঙ্গুলি হেলনে। আর তাতে ভীতসন্ত্রস্ত এক মা সন্তানদের ভালো রাখার জন্যে আরও ভুল পথে পা বাড়িয়েছেন। এখন আপনি যদি এদের মুক্ত করে দেন, এঁরা নিজেরাই সারা জীবন ধরে নিজেদের শাস্তি দিয়ে যাবে। আমি জানি না, এই ঘটনার পরে কমলিকা দেবী তাঁর ছেলেকেও হারাবেন কি না? অথবা তাঁর ছেলে আর বউমার মধ্যে আর কতদিন স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকবে? অন্যদিকে নন্দিনী ও সুহৃদের দাম্পত্যজীবনও এক প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে। আমি জানি না, ওদের মধ্যে এর পর সম্পর্কটা কেমন হবে? কমলিকা দেবী বাদবাকি জীবনটা কী নিয়ে বাঁচবেন? কোন অহঙ্কার আর তিনি বজায় রাখবেন?'
বজরঙ্গবাবু বললেন, 'নীলম ম্যাডাম যদি কোনও অভিযোগ না করেন—।'
'না, আমার কোনও অভিযোগ নেই।' নীলমের শান্ত গলা।
'থ্যাঙ্ক ইউ!' বজরঙ্গবাবু গা ঝাড়া দিলেন। 'আমার একটা সাজেশন ছিল, চম্পাকলিকে আর এ-বাড়িতে এন্ট্রি দেবেন না। ওকে বলি, বাড়ি চলে যেতে। কী বলেন কমলিকা ম্যাডাম?'
কমলিকা কোনও সাড়া দিলেন না।
'তাহলে আমি উঠি?' বজরঙ্গবাবু বললেন।
'কিন্তু আমার যে এখনও কথা শেষ হয়নি বজরঙ্গবাবু।' আক্কেল বলল।
'আরও আছে, বলুন। কেস যে সলভড হয়ে গেল। আর কী!'
সারা ঘরে শ্মশানের স্তব্ধতা।
শ্মশানের স্তব্ধতা ভাঙল আক্কেল। বলল, 'আমার কথা শেষ হয়নি এখনও। বরং আমার মনে হয় এটা আপনারা প্রতিমার চালচিত্রটুকু দেখলেন। এখনও অনেকটা দেখার বাকি আছে।'
'কী বলতে চাইছেন আপনি? বজরঙ্গবাবু বেশ মজার সুরে বললেন।
আক্কেল বলল, 'আপনারা কেউ প্রশ্ন করলেন না, তাহলে দীপিকার ঘরের টেবিলে দড়ি এল কোথা থেকে? যা থেকে নীলমের অভিযোগটা প্রমাণ হয়ে গেল। কে ফাঁসাতে চাইল দীপিকাকে?'
'কে ফাঁসাবে ওকে? নীলমই দীপুর নাম বলেছে। তারপর আমি পুলিশকে খবর দিয়েছি। আমি ঠিক কাজই করেছি।' অশ্বিনীবাবু হুড়মুড় করে কথাগুলো বললেন।
আক্কেল চিন্তান্বিত গলায় বলল, 'নীলম নাম বলল, আর ওর নাম শুনেই কেউ দড়িটা রেখে এল দীপিকার ঘরে। কে? কে সেই ব্যক্তি?'
কমলিকা মজুমদার বিড়বিড় করলেন, 'আমি দীপুর ঘরে কোনও দড়ি রাখিনি, ওকে ফাঁসাতে চাইনি। এটা মিথ্যে। আমার কথা বিশ্বাস করো। আমি যাই করি, দীপুর ক্ষতি চাইনি। দীপু আমার কথা বিশ্বাস কর।'
দীপিকা ঠোঁট কামড়ে কান্না চাপল।
অশ্বিনীবাবু বললেন, 'আমার মনে হয় ব্যাপারটা নিয়ে একটু বেশিই লেবু চটকানো হচ্ছে। যে প্রশ্নের সমাধান হয়ে গেছে, তাকে আবার কেন খোঁচানো হচ্ছে?'
আক্কেল বলল, 'খোঁচানো নয় অশ্বিনীবাবু, এর নাম বোধহয় খনন। সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া। আমি এবার একটা অন্য ঘটনা আপনাদের বলি। আবারও বলি, আমার কাছে প্রমাণ নেই তেমন। আমি সেরেফ ছিন্ন পাতাগুলো জোড়া দেওয়ার কাজটুকু করছি। আপনারাও ইচ্ছে করলে সেখানে হাত লাগাতে পারেন।'
আক্কেল থামে। সারা ঘরের দিকে একবার চোখ বোলায়। বলে, 'ঘটনাটি অনেকদিনের পুরনো। আমি ছোট করেই বলি। বিষয়টা এভাবে আলোচনা করা শোভা পায় না। তবু বাধ্য হয়েই বলছি। কিরণশংকর মজুমদারের সঙ্গে জয়া দেবীর সম্পর্ক নিয়ে সারা মনোহরগঞ্জে নানা গল্প ছড়ানো আছে।'
আক্কেল কথাটুকু বলতেই মুখে আঁচল চাপা দিলেন জয়া। ওঁর জলভরা চোখ দিয়ে টপ করে কয়েক ফোঁট জল গড়িয়ে পড়ল। অশ্বিনী মাথা নীচু করে নিলেন। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল হীরকের।
আক্কেল বলল, 'আমি সেই প্রসঙ্গে আজ সামনাসামনি কিছু কথা বলব।'
হীরক বলল, 'বলার মতো কথা ওগুলো নয়। সবাই জানে। ফালতু কেন হ্যাজাচ্ছেন?'
অশ্বিনী সরকার বললেন, 'কথাগুলো বলা কি খুব জরুরি? না বললেই নয়।'
'না বললে দীর্ঘদিনের একটা বেদনা চাপা পড়ে থাকবে অশ্বিনীবাবু। যে নির্মম সত্য, যেটুকু আমি জেনেছি, আমি সেটুকুই বলব।'
হীরক বলল, 'আমি কি চলে যেতে পারি?'
'না, আপনি যাবেন না।'
'কেন আমি কি খুনখারাবি করেছি যে আমাকে আটকাচ্ছেন? আপনি যে গল্প বলবেন সে গল্প আমার জানা। এতটা বড় হলাম এই গল্পের ঢিল খেতে-খেতে। প্লিজ আপনি গল্প বলুন আমি যাই।'
'প্লিজ হীরকবাবু, আর একটু সময় আপনি থাকুন।'
'বজরঙ্গবাবু হুঙ্কার দিলেন, 'এই ঘর থেকে কেউ নড়বেন না। আমার হুকুম।'
হীরক উঠে গিয়ে বারান্দায় দাঁড়াল।
আক্কেল বলল, 'অশ্বিনীবাবু আপনি ভাগ্যতাড়িত হয়ে কিরণশংকরবাবুর কাছে আসেন খুব ছেলেবেলায়। ওঁর কাছে ঠাঁই পান ছোট ভাইয়ের মতো। আপনার মতো ভাগ্যতাড়িত আর একজন আসেন কিরণশংকরবাবুর কাছে। তাঁর নাম গঙ্গাচরণ।'
'আমাদের পরিবারের মধ্যে গঙ্গাচরণ কী করে এল?' অশ্বিনী সরকার বেশ ঝাঁঝাল গলায় বললেন।
'অশ্বিনীবাবু আমাকে কথা বলতে দিন। ভুল ত্রুটি হলে আপনি আর কমলিকা দেবী আছেন সংশোধন করে দেবেন। যদি আমার ধারণা ভুল হয়, ক্ষমা করে দেবেন। গঙ্গাচরণের অতীত ভালো ছিল না। খুন জখম অনেককিছু গল্পই আছে ওঁর নামে। কিন্তু কী করে যেন এখানে এসে গঙ্গাচরণ কিরণশংকরের পছন্দের মানুষ হয়ে ওঠেন। আপনারা দুজন কিরণশংকরের কাছের মানুষ। তার সঙ্গে আর একজন জুটলেন, তিনি হলেন নরেশ যাদব। তাঁরও অতীত ভালো না। কিরণশংকর এই বাংলার বাইরে অন্য জায়গায় ব্যবসার খাতিরে একটু অন্যধরনের মানুষজনকেই কাছের মানুষ বানিয়েছিলেন।'
'এখানে আমার একটু আপত্তি আছে। ওদের সঙ্গে আমাকে মেলাবেন না। আমি গরিব ঘরের ছেলে, কাজের সন্ধানে এসে বড়দার কাছ ঠাঁই পাই। আমার অতীতে কোনও কালো দাগ নেই। গরিবিটাই আমার একমাত্র অসহায়ত্ব।' অশ্বিনী সরকার বললেন।
'ঠিক, আপনি একদম ঠিক। কিরণশংকরবাবু গঙ্গাচরণকে প্রচুর টাকা দিয়েছিলেন ব্যবসা করার জন্যে। তার বিনিময়ে হঠাৎ একদিন তিনি ওঁকে বললেন, 'ওঁর আত্মীয়া একটি মেয়েকে বিয়ে করতে হবে। গঙ্গাচরণবাবু বেঁকে বসলেন। ওদের মধ্যে সম্পর্কটা মারাত্মক খারাপ হয়ে গেল। এবার কিরণশংকরবাবু আপনাকে বললেন, মেয়েটিকে বিয়ে করার কথা। আপনি রাজি হয়ে গেলেন। বিয়ের সময় বউ দেখে খুশিই হয়েছিলেন—এত সুন্দরী বউ হবে আপনি স্বপ্নেও ভাবেননি। বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু কয়েক মাস পরেই আপনি জানতে পারলেন আপনার স্ত্রী গর্ভবতী। সাত মাসেই জয়া দেবীর সন্তান হল—দীপিকা। মনোহরগঞ্জের সব মানুষ জানল অশ্বিনী সরকার মেয়েটির নামে বাবা, মেয়েটির আসল জনক হলেন কিরণশংকর মজুমদার। এটা ঘরে বাইরে পরিষ্কার হয়ে গেল। কিন্তু কিরণশংকরবাবু এসব কিছুকে পাত্তাই দিতেন না। তার সামনে শ্যামল পাত্র একবার বলে ফেলেছিল, তার শাস্তিও তাকে ভোগ করতে হয়েছিল। তবে আমি যত দূর শুনেছি, এসব কানাঘুষো কিরণশংকরবাবুর পিছনেই হত, কারও ক্ষমতা ছিল না সামনে বলার। অন্যদিকে আপনার প্রবল রাগ ক্ষোভ জমা হতে থাকল কিরণশংকরবাবুর ওপর। কিন্তু আপনি অসহায়। আপনার কিছুই করার নেই। আপনি এই ঠকে যাওয়ার কথা বলতেন বন্ধু গঙ্গাচরণকে। দিন দিন আপনার সঙ্গে গঙ্গাচরণবাবুর বন্ধুত্ব বাড়ল। আপনার ছেলে হল। আপাতভাবে সুখের সংসার। কিন্তু আপনার মনের মধ্যে ধিকধিক করে আগুন জ্বলেই থাকল। এভাবে দীর্ঘদিন গেল। সময়ের সঙ্গে গঙ্গাচরণও ব্যবসাটা ভালো জমিয়েছে। এমন সময় কিরণশংকরবাবু গঙ্গাচরণকে চাপ দিতে থাকলেন টাকা শোধ করার জন্যে। যে টাকার সুদে আসলে অংকটা বিশাল। নইলে পুলিশের ভয় দেখালেন।'
আক্কেলের কথার মাঝে দু-চোখ চেয়ে সোজা হয়ে উঠে বসেছেন কমলিকা দেবী।
অশ্বিনী কঠিন চোখ আক্কেলের দিকে তাকিয়ে, বললেন, 'বলুন তারপর?'
'না, তারপর আর আমি কিছু জানি না। গঙ্গাচরণবাবুকে আর টাকা শোধ করতে হয়নি। কেন না কিরণশংকরবাবুই খুন হয়ে যান।'
'আপনার এ-কথাগুলো বলার কী মানে আমি খুঁজে পেলাম না।' অশ্বিনী সরকার কেটে কেটে কথাগুলো বললেন।
আক্কেল হাসল, বলল, 'কথা যখন শুরু করেছি তখন একটা জায়গায় ঠিক পৌঁছাব বলে আমার বিশ্বাস। এবার আমি খুব সামনে এগিয়ে যাই—কমলিকা দেবীর ওপর অ্যাটাক হল। যে খুন করতে এসেছিল সে দড়ি দিয়ে খুন করার চেষ্টা করল। এটা দেখে আপনি অবাক হয়ে গেলেন। আপনার মনে হল—এটা কখনওই হতে পারে না। সেই সঙ্গে আপনার ভয় হল, কেউ কোনওভাবে হীরুকে ফাঁসাতে চাইছে? তাই আপনি আগেভাগে গিয়ে কমলিকা দেবীর কাছে ক্ষমা চেয়ে এলেন। তার আগে আপনি গেলেন গঙ্গাচরণের কাছে।'
আক্কেল থামল। কয়েকখণ্ড নিঃস্তব্ধতা। বলল, 'এবার কাহিনিটি যদি এরকম হয়—কমলিকা দেবীর সেই ভ্রম কিরণশংকরবাবুদের খুনিদের জাগিয়ে তুলল। ভেতর ভেতর তারা এ বাড়ির ওপর আবার আঘাত হানার জন্যে প্রস্তুত হল। কেন সেকথা পরে বলছি—।'
'আপনি কী আজেবাজে বলছেন, অনেক সহ্য করেছি। থামুন, থামুন আপনি।' অশ্বিনী সরকার রেগে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
আক্কেল বলল, 'আপনি আমায় থামাতে পারবেন না অশ্বিনীবাবু। আপনি চুপ করে শুনবেন। আমার কাছে কোনও প্রমাণ নেই। তাই আপনার ভয়ের কিছু নেই। আমি একটা গল্প বলছি মাত্র, আপনি শুধু শুনে যান। না হলে আপনাকে শোনাতে বাধ্য করবেন বজরঙ্গবাবু।'
বজরঙ্গবাবু হুঙ্কার দিল, 'সবাই শুনছে, আপনার অসুবিধে কী আছে সরকারমশাই? চুপ করে শুনুন।'
'ও আজেবাজে কথা বলছে। ওর কথার কোনও প্রমাণ নেই।'
আক্কেল বলল, 'কাল পুজোপাঠের সময় অনেক লোক সারাদিন ধরে এসেছে এ-বাড়িতে। গঙ্গাচরণবাবুও এসেছিলেন স্বাভাবিকভাবে। সকালে এসেছিলেন, চলেও গিয়েছিলেন। আবার উনি এসেছিলেন সন্ধের মুখে। এবার কিন্তু উনি আর ফিরে যাননি। আপনি তাকে লুকিয়ে রাখেন এ-বাড়ির একটি ঘরে। কোন ঘর সেটা আজ বিকেলে মেঘ আর ঝড়ু আবিষ্কার করে ফেলেছে। সেখানে খাবারের প্লেট, খৈনির ডিবেও মিলেছে। খৈনির ডিবেটা গঙ্গাচরণবাবুর।'
অশ্বিনী সরকার ছটফট করে উঠলেন।
'ওদিক আপনি আপনার প্ল্যান মাফিক আমাকে সকালবেলা নরেশ যাদবের কথা বললেন। দুপুরে কাজ মিটলে হীরকবাবুকেও বললেন। বললেন মানে, ওকে তাতালেন। আপনার কথা শুনে সকালে আমারও মাথা গরম হয়েছিল আর হীরকবাবুর তো হবেই। নরেশ যাদব কমলিকা দেবীর ওপর হামলা করেছে শুনে হীরকবাবু অফিসে ঢুকে ওকে মারধর করল। আপনি পুলিশকে দিয়ে ওকে অ্যারেস্ট করালেন। তড়িঘড়ি কেন অ্যারেস্ট করালেন হীরকবাবুকে?
রাতের বেলায় গঙ্গাচরণ যে খুনটা করবে, তার আঁচ থেকে হীরকবাবুকে আগেভাগেই আপনি সরিয়ে রাখলেন। যে থানার লকআপে থাকবে সে কোনও ভাবেই খুন করতে পারে না। নিজের সন্তানকে সেফ কাস্টডিতে রেখে আপনি খেলতে নামলেন। বিতান-অপরূপকে কায়দা করে মধুগোপালবাবুর কাছে আর থানায় পাঠিয়ে দিলেন। বাড়ি ফাঁকা। তার আগেই কাজের লোকের মারফত আপনিও জেনে গেছেন নীলম কখন লুকিয়ে লুকিয়ে সুহৃদকে নিয়ে হাতিঘরে ঢোকে। প্রতিদিন বিকেলবেলা, আর রাত আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ। গঙ্গাচরণ রাতের সময়টাই বেছে নিয়ে অপেক্ষা করে বসে থাকল।
ওদিকে আপনাদের অজান্তে তখন এ-বাড়ির অন্দরে অন্য প্ল্যান হচ্ছে। চম্পাকলি গিয়ে সুহৃদবাবুর মতো করে নীলমের দরজায় টোকা দিল। নীলম ভাবল আজ আগেভাগেই সুহৃদবাবু ওকে ডাকছেন। নীলম হাতিঘরে ঢুকল। চম্পাকলি ওকে অ্যাটাক করল। সারাবাড়িতে ধুন্ধুমার কাণ্ড! আপনি আর গঙ্গাচরণ অবাক হয়ে গেলেন। বুঝতে পারলেন না কী হল? এটা কার প্ল্যান? আপনার প্ল্যান ছিল, নীলমকে মারার আগেই দড়িটা রেখে আসবেন দীপিকার ঘরে। সন্ধেবেলায় আপনি সেকাজটা সেরে রেখেছিলেন। দড়ির ফাঁসে নীলমের মৃত্যু হলে, পুলিশ এলে, কোনওভাবে পুলিশকে জানিয়ে দেওয়া হবে নীলমের সঙ্গে দীপিকার প্রকাশ্য ঝগড়ার কথা। আর দীপিকার বিরুদ্ধে সাক্ষী তো অনেক। সাক্ষী আমি, অপরূপ, বিতান, আপনি—দীপিকা সবার সামনেই নীলমকে মারতে গিয়েছিল। পুলিশ দীপিকাকে সন্দেহ করে ওর ঘর সার্চ করবে, তখনই তারা এক লহমায় পেয়ে যাবে খুনের দড়িটা।' আক্কেল থামল।
দীপিকা বিস্মত চোখে অশ্বিনী সরকারের দিকে তাকিয়ে।
'মিথ্যে কথা!' অশ্বিনী সরকার গর্জে উঠল।
'অশ্বিনীবাবু আপনি চেয়েছিলেন, দীপিকা ফাঁসুক। দড়ির ফাঁসে আপনার ছেলে নয়, কিরণশংকরের মেয়ে ফাঁসুক। দীপিকা আপনার মেয়ে নয়। ও কিরণশংকরের মেয়ে। কিরণশংকর ওকে প্রচুর টাকা দিয়ে গেছেন। আপনি সারা জীবন ধরে মনে প্রাণে চেয়েছিলেন, কিরণশংকর আর দীপিকার সর্বনাশ। কেন না ওদের দুজনের জন্যে আপনাকে মাথা নীচু করে থাকতে হয়েছে সারাজীবন। কিরণশংকর শেষ হয়েছে গঙ্গাচরণের হাতে। আজ তার হাতেই আপনি দীপিকার সর্বনাশের দায়িত্ব দিলেন। আপনি দীপিকার ঘরে খুনের আগেই দড়িটা রেখে এসেছিলেন। আর নীলম যখনই দীপিকার নাম বলল, আপনি পুলিশে খবর দিয়ে, ডেকে এনে তাদের দড়িটা খুঁজে দিলেন। তার ফলস্বরূপ দীপিকার একরাত্রি হাজতবাস হল। হয়তো আরও বড় বদনামের ভাগীদার হতেন উনি।'
অশ্বিনী সরকার বললেন, 'আপনার গল্প শেষ তাহলে। আপনি ঠিক বলেছেন, আমার বলতে দ্বিধা নেই বড়দার ওপর আমার খুব রাগ। দীপুর ওপর আমার খুব ঘেন্না। একদম ঠিক কথা। আমি মনে করি, জয়া হচ্ছে পরিস্থিতির শিকার—আমারই মতো। আমি জানি দীপুকে পেটে নিয়েই ও আমার সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। কিন্তু তারপরও আমি কোনওদিন ওকে বেচাল দেখিনি। দেখিনি বড়দার সামনে এগিয়ে যেতে, কথা বলতে। আমি ওকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আমার রাগ-ঘেন্না নিয়ে আমি চিতায় উঠব। কিন্তু আমার অত সাহস নেই কাউকে খুন করতে যাব।'
আক্কেল হাসল, বলল, 'অশ্বিনীবাবু আপনি কিরণশংকরকে নিজের হাতে খুন করেননি। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনি জানতেন কিরণশংকরকে মারার জন্য গঙ্গাচরণ রেডি হয়ে আছে। আপনি সেই সুযোগ দিতে শরীর খারাপ করে নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছিলেন। গঙ্গাচরণকে জানিয়েছিলেন কিরণশংকর কখন ফিরবেন, কোথা দিয়ে ফিরবেন। এবার আপনি সেই কথা তুলে গঙ্গাচরণকে চাপ দেন, ব্ল্যাকমেল করেন। তাকে এই বাড়িতে ডেকে আনেন। তাকে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু আপনি দুটো কাজ আগেই সেরে ফেলেছিলেন, এক নম্বর, দড়িটা যেমন দীপিকার টেবিলে রেখে এসেছিলেন, তেমন গঙ্গাচরণকে একটা সন্দেশের বাক্স দিয়েছিলেন। পুজোর প্রসাদ হিসেবে। বলেছিলেন, রাতে খেতে। আপনি ঠিক করেছিলেন, সাক্ষী রাখবেন না। সেই সন্দেশে বিষ ছিল। কিন্তু বাক্সে ভুলক্রমে থেকে গিয়েছিল এক টুকরো ফুল, পুজোর ফুল। কাল রাতে গঙ্গাচরণ সেই মিষ্টি খেয়েই মারা গেছে। আর পুজোর ফুল দেওয়া বাক্সটা বজরঙ্গবাবু সকালেই পেয়েছেন গঙ্গাচরণের টেবিল থেকে।'
অশ্বিনী সরকার ঘাড় নাড়লেন। 'না, আপনি সামান্য মিষ্টির প্যাকেট, পুজোর ফুল দিয়ে আমাকে খুনি সাজাতে পারবেন না।'
আক্কেল বলল, 'আমি জানি তো পারব না। কিন্তু আমার বিশ্বাস সারা মনোহরগঞ্জের মানুষ এরপর থেকে আপনাকে একজন খুনি হিসেবেই চিনবে।'
আক্কেলের কথায় অশ্বিনী হাসলেন। তাচ্ছিলের হাসিটা ওঁর ভেতর থেকে উঠে এল। যেন হেসে কথাগুলো উড়িয়ে দিলেন।
আক্কেল স্থির চোখে অশ্বিনীবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, বলল, 'সেই সঙ্গে আর একটা কথা আপনাকে জানাই অশ্বিনীবাবু। আপনার স্ত্রী জয়া দেবী কিরণশংকরবাবুর অন্য কেউ নয়, যা আপনি জানেন, যা মনোহরগঞ্জের লোকজন মনে করে। আপনার স্ত্রী হলেন কিরণশংকর মজুমদারের বোন—এটা আপনি জানেন না। এটা আমার অনুমান নয়, সত্য!'
'কী?' তীক্ষ্ণ গলায় জিগ্যেস করলেন অশ্বিনী সরকার।
এবার আক্কেল হাসল, বলল, 'জয়া দেবীর মা হলেন অতীতের এক ব্যর্থ নায়িকা, অভিনেত্রী সুরঞ্জনা দেবী। ওঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কিরণশংকর মজুমদারের বাবা শিবশংকরের। সুরঞ্জনা আর শিবশংকরের মেয়ে জয়া দেবী। শিবশংকরের অবর্তমানে ভয়ঙ্কর অভাব, দারিদ্রতার পাঁকে যখন মা আর মেয়ে নিমজ্জিত তখনই ওঁদের খোঁজ পেয়ে একদিন উদ্ধারকর্তা হয়ে বাগবাজারের বাড়িতে হাজির হন কিরণশংকরবাবু। সে সময় জয়া দেবী সদ্য বিধবা। ওঁর ট্যাক্সি ড্রাইভার স্বামী বিয়ের সপ্তাহখানেকের মাথায় গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করে মারা গেছেন।
ওঁদের অবস্থা দেখে কিরণশংকরবাবু অস্থির হয়ে ওঠেন। কারও তোয়াক্কা না করে ওঁদের তুলে নিয়ে আসেন চন্দননগরে। তারপর বোনের জন্য শুরু করেন পাত্র খোঁজা। গঙ্গাচরণকে নির্বাচন করেন। কেন না গঙ্গাচরণের ব্যবসা চলে কিরণশংকরবাবুর টাকায়। কিন্তু শেষবেলায় গঙ্গাচরণ বেঁকে বসে। তখন রাজি হন অশ্বিনীবাবু। আপনাদের বিয়ে হয়।
আদর্শ দাদার মতোই কাজ করেছিলেন কিরণশংকর। কিন্তু তাঁর বাবার অসম্মান হবে, এই ভেবে সুরঞ্জনা দেবী ও জয়া দেবীকে দিয়ে তিনি প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন, জীবিত বা মৃত কোনও অবস্থায়ই জয়া দেবী তাঁর আসল পরিচয় দেবেন না। এসব কথা একমাত্র জানতেন কমলিকা দেবী। তাই তিনি তাঁর মৃত স্বামীর মতো শত বদনামের মুখে দাঁড়িয়ে আপনাদের ত্যাগ করেননি।'
অশ্বিনী সরকার আশ্চর্য হয়ে কমলিকা মজুমদারের দিকে তাকালেন। তারপর জয়ার দিকে তাকালেন। জয়া কাঁদছে। আক্কেল বলল, 'ট্র্যাজিডি কী জানেন, বাবার মানসম্মানের জন্য কিরণশংকরবাবু তাঁর বোনের পরিচয় গোপন করলেন। আর ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য জয়া দেবী তাঁর সন্তানসম্ভাবনার কথাটি দাদা-বউদির কাছে জানালেন না। বিয়ের এক সপ্তাহের মধ্যে গর্ভবতী হয়েছিলেন জয়া দেবী। অথচ কিরণশংকরবাবু বা জয়া দেবী কেউ যদি একজন প্রথমেই তাঁদের গোপন কথাটি প্রকাশ্যে আনতেন তাহলে শংকর নিবাসের ভেতর এত অন্ধকার জমত না।'
জয়া কেঁদে উঠল।
হীরক বারান্দা থেকে ঘরের ভেতর এসে দাঁড়াল। ওর চোখে-মুখে বিহ্বলতা। ফ্যাসফেসে গলায় বলল, 'আপনি ঠিক বলছেন?'
'আপনি আপনার মাকে জিগ্যেস করুন। বড়মাকে জিগ্যেস করুন। সত্য গোপন করেছেন ওরা।'
হীরক এগিয়ে গিয়ে কমলিকা মজুমদারের মুখোমুখি দাঁড়াল। কমলিকা ঘাড় নাড়ালেন। হীরক এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল তার মাকে। 'এত অপমান সয়ে কেন এই কথাগুলো চেপে থাকলে মা? আর সারাটা জীবন ধরে এই কথাগুলোই যে আমাকে তাড়া করে বেড়াল।' হীরক কাঁদছে।
আক্কেল বলল, 'জয়া দেবী আপনার মা, সুরঞ্জনা দেবীর সঙ্গে আমার বন্ধু বাঁশির দেখা হয়েছে। সুরঞ্জনা দেবীর সঙ্গে কোনওভাবে আমার মণিমায়ের পরিচয় আছে। আমার মণিমায়ের বুদ্ধিতে, আমার বাবার ফোন থেকে সুরঞ্জনা দেবী ফোন করতেন আমাকে। উনিই আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। ওঁদের তিনজনের জন্যে আমাদের এই মনোহরগঞ্জে আসা। সুরঞ্জনা দেবী চাননি কমলিকা দেবী কোনও বিপদে পড়েন। উনি কোনওভাবে ওঁর পরিচিতমহল থেকে খবর পেয়েছিলেন অপরূপ চক্রবর্তী মনোহরগঞ্জে যাচ্ছে নীলমের সঙ্গে। ওরা কিরণ-কমল মুভি খুলতে চাইছে। অপরূপ টাকার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছে। আর কমলিকা মজুমদার হল ওদের টাকা পাওয়ার উৎস। তাই ওরা টাকার জন্য যে-কোনওভাবে কমলিকা দেবীকে বিপদে ফেলতে পারেন। সুরঞ্জনা দেবীর সঙ্গে এখনও কমলিকা দেবীর যোগাযোগ আছে।'
আক্কেলের কথায় মেঘের মুখে ঝিলিক। অপরূপ মাথা নীচু করল। মেঘ বিড়বিড় করল—বাঁশি গ্রেট! তাহলে আমাদের বিজ্ঞাপন দেখে সুরঞ্জনা দেবী আকিদাকে ফোন করে। সেই ফোন ধরে মণিমা...। তারপর সব মণিমার সঙ্গে সুরঞ্জনা দেবী কথা হয়। বাদ বাকি মণিমার প্ল্যান।
'আমার এক বন্ধু বাঁশি প্রচণ্ড পরিশ্রম করে এ খবরগুলো জোগাড় করেছে। পরিচালক শচীন গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছ থেকে অভিনেত্রী সুরঞ্জনার কথা শোনে। ও যায় বাগবাজারে সুরঞ্জনা দেবীর খোঁজে। এদিকে আমিও ওকে পাঠাই জয়া দেবীর সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে। ও গিয়ে দেখে দুজনেই মা আর মেয়ে। আশ্চর্য ব্যাপার! জয়া দেবীর বাগবাজারের বাড়ি গিয়ে সেখানকার পুরনো ভাড়াটেদের খুঁজে এই বাঁশি অসাধ্যসাধন করেছে। অথচ অশ্বিনীবাবু আপনি সারা জীবন ধরে কিছুই খোঁজেননি। জয়া দেবীকে জানতে চাননি। শুধু রাগ আর ঘেন্না বুকে নিয়ে ঘুরেছেন। নিজে পারেননি, কিন্তু যারাই এ-বাড়ির ক্ষতি করতে চায়, এই পরিবারকে ধ্বংস করতে চায় তাদের ইন্ধন জুগিয়েছেন। তা কখনও নরেশ যাদব, তো কখনও শ্যামল পাত্র, আবার খুব গোপনে গঙ্গাচরণের মতো মানুষদের নিয়ে খেলেছেন। দীপিকা না হতে পারে আপনার মেয়ে, কিন্তু সে তো আপনাকে জন্মের পর থেকে বাবা বলেই ডেকে এসেছে—আর আপনি কী ভয়ঙ্কর প্ল্যান করে তাকে খুনের ষড়যন্ত্রে ফাঁসাতে চেয়েছেন!'
বজরঙ্গবাবু বললেন, 'অশ্বিনীবাবু আপাতত গঙ্গাচরণবাবু খুনের প্রমাণটা আমাদের কাছে আছে। বাক্স থেকে আপনার হাতের ছাপ কি পাওয়া যাবে না? আপনি কেন গঙ্গাচরণবাবুকে লুকিয়ে রাখলেন? কেন নীলমের ঘটনার পরে, ঠিক আমি আসার আগে তাকে বাড়ির বাইরে দিয়ে এলেন? টেনশনে আপনার মনে ছিল না, গেটে জগৎ সিং আছে। আপনি কোর্টে জানাবেন, আপনি নির্দোষ। আপাতত চলুন আমাদের সঙ্গে। তার আগে মিস্টার বসু আর একটা পয়েন্ট একটু ক্লিয়ার করবেন, মিসেস মজুমদার নীলমকে মারতে চেয়েছিল, তার সন্তানদের বাঁচানোর জন্য। এটা বুঝলাম। কিন্তু গঙ্গাচরণ বা অশ্বিনীর টার্গেট কেন নীলম ম্যাডাম? ওরা তো দীপিকা ম্যাডামকেও টার্গেট করতে পারত।'
আক্কেল কাঁধের ওপর ঘাড় বেঁকিয়ে কড়কড় করে ঘাড় ফাটাল। ম্লান হাসল, বলল, 'আসলে নীলম হল সফট টার্গেট। তাকে নিয়ে অপরূপ খেলছে। অপরূপ আর নীলমের সম্পর্ক নিয়ে ক্ষুব্ধ বিতান। সে-ও তার স্ত্রীর কাছ থেকে মনে মনে সরে যাচ্ছে। কমলিকা দেবী থেকে দীপিকা-জয়া দেবী, কেউ ওকে পছন্দ করে না। সুহৃদবাবুও ফাঁক তালে ওকে নিয়ে খেলে নিল। ও মরলে কোথাও এতটুকু তোলপাড় হত না। তাই দু-পক্ষই ওকে টার্গেট করেছে। কেউ ওকে ডাইনি ভাবছে, তো কেউ ওকে টোপ বানাচ্ছে! আমার মতে নীলম হল এ-বাড়ির একজন বেওয়ারিশ মানুষ!'
'হুমমম!' দীর্ঘশ্বাস ফেলল বজরঙ্গবাবু। আর হাহাকার করে কেঁদে উঠল নীলম। 'আমি মানুষ নই লাশ। জীবন্ত লাশ!'
বিধ্বস্ত অশ্বিনী সরকার উঠে দাঁড়ালেন, অদ্ভুত চোখে জয়ার দিকে তাকালেন। দীপিকার দিকে তাকাতে গিয়েও তাকালেন না। ভাবলেশহীন মুখে বললেন, 'চলুন!'
দীপিকা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। আক্কেলও উঠল। বলল, 'আমার আর কিছু বলার নেই।'
বজরঙ্গবাবুর সঙ্গে অশ্বিনী সরকার সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেলেন। একটু পরেই জিপের স্টার্ট হওয়ার আওয়াজ পেল সবাই। কিন্তু মিনিট কুড়ি পরেই বজরঙ্গবাবুর ফোন এল আক্কেলের কাছে। উনি হাঁপাচ্ছেন। চিৎকার করে বললেন, 'আমি অশ্বিনীবাবুকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে উনি বিষ খেয়েছেন। আরে মশাই নীচে গিয়ে বলল—মাথা ঘুরছে, সুগারটা মনে হয় ফল করছে। আমি একটু মিষ্টি আর জল খেয়ে নেব? সরকারবাবুর সঙ্গে এতদিনের সম্পর্ক, আমি জানি উনি সুগারের প্রেশেন্ট, আমি কী করে না বলি? বললাম—নিন। উনি আমার সামনে টেবিলের ড্রয়ার খুলে সন্দেশ বের করে খেলেন। জল খেলেন। তারপর থানায় এসে দেখি জিপ থেকে নামতেই পারছেন না। মুখ দিয়ে গেঁজলা বেরুচ্ছে। উঃ, সেটা যে গঙ্গাচরণকে দেওয়া সন্দেশের আর একটা পিস তা আমি কী করে বুঝব?'
অশ্বিনী সরকার হাসপাতালে পৌঁছোনোর আগেই মারা যান।
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন