যখন রাত নামে

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

‘কে, কে ওখানে?’

থমথমে মধ্যরাত। আকাশে কৃষ্ণপক্ষের ক্ষয়াটে চাঁদ আর নিচে এই নিস্তব্ধ পোড়োজমিতে এতক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম একা। পোড়ো বা পতিতজমি না বলে এই জায়গাটাকে ভাগাড় বলাই বরং ঠিক হবে। লোকেও তাই বলে মনে হয়, নাম গোদাডাঙা। শহরের শেষপ্রান্তে পাঁচিল ঘেরা যে গোরস্থান আছে, এ জায়গাটা সেটা ছাড়িয়েও আরও কিলোমিটার খানেক দূরে। দুনিয়ার আবর্জনা, মরা পশুপাখি ফেলা হত আগে। এখনও হয় কিন্তু সেটা আরও সামনের দিকে। সেসব পিছনে ফেলে আরও ভেতরদিকে চলে এসেছিলাম, যতদূর এগোনো যায় আর কী।

সামনে একটা নিঝুম জলা, তার পাড়ে কিছুটা উঁচু একটা ঢিবি মতো। ওটার উপর উঠে জলার ওপারে সারি সারি গাছগুলোর জটলায় তৈরি নিশ্ছিদ্র অন্ধকারটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। একটানা ঝিঁঝির ডাকে বেশ একটা ঝিমঝিম নেশা ধরে, পাতলা কুয়াশা জাল ছড়াচ্ছে দূরে। বেশ কিছুক্ষণ একভাবে থাকতে থাকতে একটা ঘোর মতো তৈরি হতে যাচ্ছিল, আচমকাই পিছন দিক থেকে অস্পষ্ট কিছু শব্দ এল কানে। শুকনো পাতা ভাঙা বেশ কিছু আগুয়ান পায়ের শব্দ।

কান খাড়া হয়ে উঠল, শিরশির করে উঠল শিরদাঁড়া। ক্রমশ কাছে আসতে থাকা শব্দগুলো আসছে বাঁ দিক থেকে। সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে আড়চোখে তাকাতেই চোখে পড়ল তিনটে ছায়ামূর্তি। আবার চিৎকার করে উঠল সেই একই গলা ‘কে, ওখানে কে?’

টর্চের আলো এসে পড়ল আমার গায়ে। পা থেকে মাথা, মাথা থেকে পা ওঠা নামা করে থামল মুখে। পুরোটা ঘুরে দাঁড়াতে সরাসরি এসে পড়ল চোখে। ধাঁধিয়ে গেল মণি, ঝাঁকি মেরে সরিয়ে নিলাম মাথা। দু-হাতের প্রসারিত তালু আর দশটা আঙুল দিয়ে আলোটা যতটা সম্ভব আটকে চোখ কুঁচকে তাকাতেই দেখি তিনজন দাঁড়িয়ে মাত্র কয়েক হাত তফাতে।

‘কী চাই এখানে, এখানে কী দরকার, এত রাতে...?’

আমাকে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পিছনের দীর্ঘদেহী ঝাঁঝিয়ে উঠল ‘কী হল, কী জিজ্ঞেস করা হচ্ছে? এখানে কেন, কী চাই?’ ঘড়ঘড়ে গম্ভীর বলদর্পী আরেকজনের গলা ‘কী হল, কথা নেই কেন? বোবা নাকি?’

ধমকে বলা উৎক্ষিপ্ত উচ্চারণে ঘা খায় ইগো। রাগে চিড়বিড়িয়ে ওঠে ঘিলু কিন্তু কোনোক্রমেই রাগা যাবে না। এমন সব পরিস্থিতি আজকাল আমার কাছে নতুন না, কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ হারানো যাবে না। আলতো করে চোখের পাতাজোড়া এক করি, অঙ্গসঞ্চালন সাবলীল, সপ্রতিভ ভঙ্গিতে নেমে এসে দাঁড়াই লোকগুলোর সামনে।

আবার আমার আগাপাশতলা টর্চ মারে বেঁটে লোকটা। হাত খানেক দূরে সিঙ্গল স্ট্যান্ডে রাখা আমার বাইকটার উপর আলো বুলিয়ে আবার ফোকাস করে আমার চোখের উপর। যতদূর সম্ভব শান্ত স্বরে বলি, ‘টর্চ মারবেন না প্লিজ, যা বলার মুখে বলুন।’

‘পুলিশের লোক...?’

‘না।’

‘রিপোর্টার?’

‘না, না!’

‘তাহলে এখানে? কী চাই, বল এখানে কী দরকার?’ মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল, বড়োসড়ো চেহারার লোকটা এগিয়ে এল চোটপাট নিয়ে। অচেনা লোকের কাছ থেকে তুইতোকারি মোটেও পছন্দ না, দেহভাষায় এমন আগ্রাসন। চোখের কোণটা সামান্য কুঁচকে পরোয়াহীন চালে বললাম, ‘এমনিই এসেছিলাম, এদিকটায় কোনোদিন আসিনি তাই দেখতে। কেন কী হয়েছে বলুন তো, এখানে আসা বারণ নাকি?’

কটমট করে তাকায় লোকটা, শক্ত হয়ে ওঠে চোয়াল। কিছুটা কৌতুক মেশানো হিংস্রতায় তাকায় পাশের দাঁড়ানো লোকটার দিকে ‘এ কী বলে?’

‘এই এই…’ একেবারে গায়ের উপর চলে আসে দীর্ঘদেহী। ‘কেসটা কী, এখানে কেন এসেছিস, বাড়ি কোথায়?’

মুখে দিশি মদের তীব্র গন্ধ, গা গুলিয়ে উঠল, পাক খেয়ে উঠল ঘিলুর মধ্যেও যেন। মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ‘কেন আপনাদের বলতে যাব কেন, কারো বাবার জায়গা তো না যে আসা বারণ। স্বাধীন দেশ, যেখানে খুশি যেতে আসতে পারি, মাঝরাতই হোক বা ভরদুপুর বেলা যখন ইচ্ছে যেতে পারি। তার জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হবে নাকি?’ তবু শেষ মুহূর্তে গিলে নিলাম।

গলা খাঁকড়ে উঠল লোকটা ‘কী হল বল, নাকি দেব দু-চ্চার থাবড়া?’ ডান হাতটা ঘাড়ের পিছনে সজোরে খেলিয়ে, চড় মারতে উঁচিয়ে তোলে।

প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় মাথাটাকে কিছুটা পিছনে সরিয়ে নিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে এনে ডাঁটসে দাঁড়ালাম। দেহ রেখায় ভয়ের চিহ্ন নেই, নার্ভাস দেখাচ্ছে না মোটেও। টর্চ হাতে লোকটা পাশের জনকে বলে, ‘এই বার করে নে তো, পকেট-ফকেটে যা যা আছে সব বার করে নে। গাড়ির চাবি মোবাইল যা পাবি সব।’

‘মানে...!’ বলতে না বলতেই দীর্ঘদেহী তার পেশল দুটো হাত পুরে দেয় আমার জিন্সের সামনের দুটো পকেটে। ‘কী হচ্ছে, হচ্ছেটা কী!’ চেঁচিয়ে উঠি আমি। লোকটা জোরে বাড়ি মেরে বাধা দিতে উদ্যত আমার হাত দুটো সরিয়ে চোখের নিমেষে বার করে আনে মোটর সাইকেলের চাবি, স্মার্টফোন খানা।

ক্ষিপ্র গতিতে হাত চালিয়ে দেয় পিছনে, হিপ পকেট হাতড়ে বার করে আনে আমার চামড়ার মানি ব্যাগটা। মুখ মুচড়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে, হাতের জিনিসগুলো চালান করে দেয় পিছনের লোকটার হাতে। হতবাক, আপাদমস্তক বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠি, ‘কী হল, কী হল এটা?’

‘কী আবার হবে, যা হওয়ার তাই হয়েছে। যা এবার যাঃ, ফোট ফোট এখান থেকে।’

‘ফোট মানে, এটা কী হল...!’

‘কী আবার হল, মাঝরাতে এসব জায়গায় এলে যা হয় তাই হল!’

মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে, চাবিটা শূন্যে ছুঁড়ে লুফে নিয়ে এগিয়ে গেল মাঝের লোকটা। লক খুলে কিক মেরে স্টার্ট করে বলল ‘বাঃ এ তো তোফা গাড়ি। আমি গেলাম, তোরা আয় তালে?’

‘যা, আসছি...।’ খিঁক খিঁক শব্দে কুৎসিতভাবে হেসে ওঠে বেঁটে লোকটা। আমার দিকে ফিরে এলাকার বাইরের দিকে আঙুল তুলে বলে, ‘যা দৌড়ো, পালা, পালা এখান থেকে।’

‘এসব কী হচ্ছে , হচ্ছেটা কী? গাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন কেন, ফোনটা দিন, মানিব্যাগ...? কী হল!’ চিৎকার করে দৌড়ে গিয়ে ধরলাম বাইকের পিছনের হাতলটা। লোকটা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে জঞ্জাল জমে তৈরি হওয়া ঘাসজমির নরম মাটিতে বসে যাওয়া বাইকের চাকাটা তুলে এগিয়েছে সামান্যই। আমি পেছনটা ধরে হ্যাঁচকা টান দিতেই, গাড়িটা টাল খেয়ে গেল।

বেকায়দায় অ্যাক্সিলারেটর ঘোরাতেই চাকা গেল স্কিড করে। শরতের শেষদিক, ঘাসের ডগায় শিশির ছিল। ব্যালান্স হারিয়ে গাড়ি ডান দিকে এমনভাবে কাত হয়ে গেল যে এই পড়ল বলে। বলশালী ডান পা মাটিতে গিঁথিয়ে দিয়ে লোকটা খুব সামলে নিল বটে কিন্তু হাঁটু মাটিতে ঠেকে গিয়েছিল, না হলে ভারী গাড়িখানা নিয়ে অবধারিত পড়ত মুখ থুবড়ে।

আহত ভূপতিত জন্তুর মতো গোঁ গোঁ করতে থাকা বাইকটাকে ওই ভাবেই ফেলে রেখে মালাইচাকির উপর প্যান্টে লাগা মাটি ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে আসে লোকটা। নিশ্চয়ই পায়ে বেশ লেগেছে, না হলে এই ভাবে খোঁড়াচ্ছে কেন? দাঁত কটমট করতে করতে আমার সামনে এসে অশ্রাব্য খিস্তি ছুঁড়ে দেয় একপ্রস্থ, তারপর মাংসল ডান হাতটা বাগিয়ে আমার বাঁ গালে মারে একটা সপাটে চড়।

এই রকম জোরালো একটা চড় আগে কোনোদিন খেয়েছি বলে মনে পড়ে না, মাথা থেকে শুরু করে পা অবধি কঙ্কালতন্ত্র ঝনঝন করে উঠল পুরো। থরথর করে কেঁপে উঠল সুষুম্নাকাণ্ড। ধারালো দাঁতের ধাক্কায় গালের ভেতরের দেওয়াল কেটে রক্ত বেরিয়ে এল, জিভে লাগল নিজের রক্তের নুন। বেবাক হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, বড়ো চেহারার লোকটা আমার ঘাড়ের কাছটা ধরে ভীষণ জোরে একটা ঠেলা দিল আর আমি গিয়ে পড়লাম ঢিবিটার গায়ে। বেঁটে লোকটা ছুটে এসে পাঁজরার নীচে ক্যাঁত ক্যাঁত করে পর পর চারখানা লাথি কষাল।

তলপেটের ঠিক উপরের জায়গাটা চেপে ধরে ককিয়ে উঠি, ঊরু দুখানা ভাঁজ করে বুকে ঠেকিয়ে কুঁকড়ে যাই। ঠেলা দিয়ে ওঠা ব্যথায় পিঠ ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে, ঘাসে খুঁসটে থাকা মাথা, চোখের কোণ দিয়ে তাকিয়ে দেখি গাড়িটাকে চাগিয়ে তুলল চড় কষানো সেই লোকটা। গিয়ার নিউট্রালে এনে গায়ের জোরে কিক করে আবার স্টার্ট করল মোটর বাইকটা। ‘আয়, চলে আয়’ হাওয়ায় হাত চালিয়ে ডাকল সঙ্গীদের। বাকি দু-জন দুমদাম পায়ে হেঁটে গিয়ে উঠে বসল ব্যাকসিটে। লেটেস্ট টেকনোলজি না হলেও বাইকটার সাইলেন্সার খুব একটা নিম্নমানের না তবুও গুম গুম শব্দে কেঁপে উঠল চরাচর। এঁকেবেঁকে এগিয়ে ওরা মিলিয়ে গেল ডান দিকের জঙ্গলের মধ্যে।

পড়ে রইলাম চিৎ হয়ে, চোখের উপর কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর নির্বিকার আকাশ। ক্ষীয়মান চাঁদটা ছেঁড়া ময়লাটে চাদরের মতো এক টুকরো মেঘের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল সহসা, আমার দিকে বিদ্রুপের চোখে তাকাল। যেন বলতে চাইল, ‘অতই সোজা, অন্ধকার সে কি অতই সোজা জিনিস? এতবার ঠেকেও শিক্ষা হয় না, মনে হয় না অন্ধকার দুর্জ্ঞেয়, জটিল, আকস্মিক, ভয়ানক?’

হাতঘড়িতে দুটো বেজে চল্লিশ। রাত্রির অন্তিম প্রহর সমাসন্ন। এখন এই রকম বিপর্যস্ত শরীর মন নিয়ে পায়ে হেঁটে পাঁচ কিলোমিটার দূরে বাড়ি ফেরা কী করে সম্ভব? কিন্তু কিছু করার নেই, উঠতেই হবে, যে করেই হোক এগোতেই হবে হাইরোডের দিকে। একা মানুষের পক্ষে লোকালয় থেকে অনেকদূরে এ জায়গা মোটেও নিরাপদ না। অন্য কিছুর জন্য না, এত রাতে ঘন বনের ধারে ভাগাড়ের ভেতরদিকের এই সব জায়গায় ভয়টা এমনিতে শেয়ালদের নিয়ে।

শেয়াল একা এমনিতে খুব ভিতু জন্তু কিন্তু দল বেঁধে এলে তার চেয়ে বিপজ্জনক খুব কম কিছুই হতে পারে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ঘিরে ধরে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে রেখে চলে যাবে। না না, আর এক সেকেণ্ডও না, গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াই সটান। ঘুটঘুটে অন্ধকার, ভুসভুসে নরম উঁচুনিচু জমি, তার ওপর লম্বা লম্বা সব ঘাস। কীসের ওপর পা পড়ছে জানিনা, সাপ পোকামাকড় না লতাপাতা বাছবিচার নেই। ওসব দেখতে গেলে আর এগোনো যাবে না, পায়ের দিকে অত খেয়াল রাখতে গেলে এমন সব আদাড়বাদাড়ে চলা যায় না। পদে পদে সংশয় নিয়ে আর যেখানে হোক রাতের অন্ধকারে চলা সম্ভব না।

ওসব ভয়-সংশয় থেকে অবশ্য অনেকদূরে চলে এসেছি। আজ থেকে দশ বারো বছর আগের সেই আমি আর এই আমি তো এক না। যে রাত মানে আগে ছিল বিভীষিকা, আজ সেই রাতকেই মনে হয় আশ্চর্য মোহময়। যেন আদিগন্ত তাঁর কৃষ্ণবর্ণ সূক্ষ্ম শরীর ছড়িয়ে বসে থাকা মৌন গম্ভীর ধ্যানমগ্ন এক ঋষি। দিনের চেয়ে বহুগুণ সুন্দর, কটকটে উচ্চকিত আলোর অত্যাচারের বিপরীতে বড়োই শান্ত স্নিগ্ধ নিবিড় গভীর। আমার একান্তই ব্যক্তিগত, প্রিয়তম এক সময়।

তবু যতই হোক রাত একটা আলাদা জায়গা, সম্পূর্ণ আলাদা একটা বাস্তব। এতদিনের পরিচিতি তবু মাঝে মাঝে মনে হয় সেটা মাত্র বিশ শতাংশ। বাকি আশি ভাগই অচেনা, দুর্বোধ্য, ইন্দ্রিয়াতীত। একা একা এইসব আদাড়েবাদাড়ে ঘুরতে ঘুরতে এখনও তাই শুধু হ্যামলেটের সেই অতি ব্যবহারে জর্জরিত কথাটাই বার বার ফিরে ফিরে আসে। কানে বাজে ব্যাঙ্গালোরের ভেঙ্কট পেরুমল বলে সেই মানুষটার টিপিক্যাল কর্ণাটকী উচ্চারণ ‘There are more things in heaven and earth, Horatio / Than are dreamt of in your philosophy’। না না আমি ওঁর হোরাশিও হতে পারিনি, হতে চাইওনি কিন্তু নিজের কাছে বারবার আওড়াতে তো অসুবিধে নেই। কী জানি, সত্যিই কিছু আছে কিনা? সাধারণ যুক্তি বুদ্ধির আড়ালে এমন অনেক কিছুই থাকে কিনা যাদের ব্যাখ্যা নেই, অন্তত আমাদের কাছে নেই?

রাতের পৃথিবীতে হাজার জিনিসের ব্যাখ্যা নেই। তার মধ্যে অন্যতম অবশ্যই নিশাচর এই কুকুরগুলোর আচরণ। পাকা রাস্তায় পা দেওয়ার পর কিলোমিটার খানেক কোনো সমস্যা ছিল না কিন্তু টেলিফোন টাওয়ারটার কাছাকাছি আসতে না আসতেই দুটো তিনটে চারটে দিশি কুকুর আমাকে একা এগিয়ে আসতে দেখে তারস্বরে চিৎকার শুরু করে দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে এপাশ-ওপাশ থেকে জুটে গেল আরও সাত আট। দেখতে দেখতে চারদিক থেকে ঘিরে ধরল। আশ্চর্য ব্যাপার এই কুকুরগুলোকেই দিনের বেলায় দেখলে কী ভীষণ নিরীহ নিস্তেজ করুণ লাচার মনে হয়। ধুলোর মধ্যে ধূসর সব শরীর মিশিয়ে দিয়ে ঘুমোয়, ইতস্তত মাটি শুঁকে শুঁকে ভিতু ভিতু চোখে ঘুরে বেড়ায় বা মানুষের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকে বিষন্ন উদাসীন দৃষ্টিতে। কিন্তু রাত হতেই সেই প্রাণীগুলোই কী ভয়ানক ক্ষিপ্র আর হিংস্রই না হয়ে ওঠে! রাতের আবহাওয়ায় নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে, না হলে কেন এমন হয়, না হলে কী করে এমনটা হতে পারে?

হাত বিশেক দূরে বেশ বড়োসড়ো একটা ভেপার ল্যাম্পের হলদে আলো উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে পিচরাস্তার গায়ে। সেই আলো ঝিকিয়ে উঠল কুকুরগুলোর কড়মড়িয়ে ওঠা দাঁতে, জ্বলতে থাকা চোখগুলোয়। ভুলেও ওই চোখগুলোর দিকে তাকানো নয়, ইঁট তুলে মারতে যাওয়া বা ওই জাতীয় কিছু তো একেবারেই না। আমি নির্বিকার ভাবে এগিয়ে গেলাম। ওরা চিৎকার করে গলা ফাটাক আমি বিন্দুমাত্র বিচলিত হচ্ছি না।

ব্যাপারটা যত সহজ মনে হচ্ছে মোটেই তেমনটা না, যথেষ্ট অনুশীলনসাপেক্ষ ব্যাপার। আগে তো ভাবতেই পারতাম না। এইভাবে চারদিক থেকে কুকুররা ঘিরে ধরলে হয় জড়ভরত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তাম, না হলে দৌড় লাগাতাম চোখকান বুজে। আমার প্রথমবার কুকুরের কামড় খাওয়া সেই ছুটতে গিয়েই। এখন সেই প্যানিকটা আর হয় না, রাতে ঘুরতে গেলে কুকুরদের এই সমস্যাটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কী করবে, বড়োজোর আরও একবার কামড়াবে। অ্যান্টিরাবিস যখন নেওয়াই আছে, নতুন করে কামড়ালে আর একবার একটা বুস্টার ডোজ নিয়ে নেব, সে আর কী এমন কথা। নেকড়ে বা হায়না তো আর না প্রাণে মারতে পারে।

হাঁটার গতি কিছুমাত্র কমলও না বাড়লও না , আমি নির্লিপ্তভাবে এগিয়ে চললাম। ওরা বেশ খানিকটা দূর পেছন পেছন এল, তারপর কিছুক্ষণ বাদে আপনা থেকেই থেমে চুপ করে গেল। কিন্তু আমার সামনে এখনও দীর্ঘ রাস্তা। না, বাড়ি না, আপাতত গন্তব্য সুজিত সাহার বাস লরির গ্যারেজ। ওখানে নিশ্চয়ই শঙ্করকে পাওয়া যাবে, ও না থাকলে মোক্তারদা, চানু, খুদে, মণি কাউকে না কাউকে তো পাওয়া যাবেই। ওরা এমনিতে সাহা ট্রান্সপোর্টের লরির ড্রাইভার খালাসি বা মেকানিক। এত রাতে নিশ্চয়ই খাটিয়া পেতে নাক ডাকিয়ে তুমুল ঘুমোচ্ছে। তবে আমার সঙ্গে সম্পর্কটা এমনই, জাগালে কিছু মনে করবে না। আগেও ব্যবস্থা করে দিয়েছে, আমার নানান নৈশ অভিযানে প্রচুর সাহায্য করেছে, এবারও নিশ্চয়ই বাকি রাতটা কাটানোর একটা কোনো ব্যবস্থা করে দেবে।

একটানা অতখানি হেঁটে হা-ক্লান্ত শরীরখানা নিয়ে যখন পিছন দিক দিয়ে সাহা গ্যারেজে ঢুকছি অন্ধকারটাকে মনে হল যেন ঘনতম। চাতালের শেডগুলোর নিচে পরপর অনেকে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। ওপারে সারসার দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোর দিক থেকে আসা আলোয় আমি ওদের মুখগুলো দেখতে দেখতে এগিয়ে শঙ্করকে পেলাম একেবারে শেষে। হাল্কা ঠেলা দিয়ে তুলতেই ধড়মড়িয়ে উঠল ও। ‘শ-শ-শ!’ তর্জনী ঠোঁটে ঠেকিয়ে কী চাই ইশারায় দেখাতেই ও নির্ভুল বুঝে নিল। ভেতর থেকে একটা ফোল্ডিং ক্যাম্পখাট নিয়ে এসে নিঃশব্দে পেতে দিল পাশে, পরিষ্কার একটা চাদর বিছিয়ে দিল, নিজের খাটের নিচের মশার কয়েলটা এগিয়ে দিল আমার খাটের নিচে।

ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছোটো করব না। কিছুক্ষণ আগে গোদাডাঙার ভাগাড়ের ভেতরে কী সব কাণ্ডকারখানা হয়েছে, এখন কী করণীয় ওসব কথাও তুলব না। আর পারা যাচ্ছে না, মাথা বা শরীর কোনোটাই আর নিতে পারছে না তাই খাটের ওপর শরীর ছেড়ে দিলাম। মুখের ভেতরের ক্ষতটা দিয়ে এখনও ব্লিডিং হয়েই যাচ্ছে, মুখের ওই দিকটা ফুলে রয়েছে। যা বলার, যা যা করার সব সকালে উঠে হবেখন। এই ভোররাতটা অন্তত একটু ঘুমোতেই হবে। তারপর সকালে উঠে যা ভাবার ভাবা। শঙ্কর, মোক্তারদা, চানুদের ঘটনাটা জানাতে হবে, দেখা যাক ওরা কী বলে। তারপর রওনা দেব কোতোয়ালি থানার দিকে। আইসি রতন নাথ যদি থাকেন নিশ্চয়ই কিছু না কিছু একটা ব্যবস্থা হবে।

সকালে উঠতে একটু দেরি হয়ে গেছে। ওরা বেশিরভাগই কাজে বেরিয়ে যাবে যে যার দিকে। আমাকে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসতে দেখে একটা এনামেলের ট্রেতে দু’কাপ ধোঁয়া ওঠা চা আর টোস্ট বিস্কুট নিয়ে শঙ্কর এসে দাঁড়াল পাশে। চা বিস্কুটটা হাতে তুলে নিয়ে বললাম ‘দাঁড়া একটু ঠান্ডা না হলে মুখে দিতে পারব না।’ আমার মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকায় ও ‘কী হল, ঠোঁটের কোণটা ওরম ... গাড়ি কোথায় রাখলা?’

‘আর বলিস না, বস্, বলছি।’ ওকে কাল রাতের ব্যাপারটা বিস্তারিত বললাম। সব শুনে গালের কোণে চিক করে আক্ষেপসূচক একটা শব্দ করল ও। ‘ওদিকটায় যাচ্ছ , আমাদের কাউকে একবার বলবা তো। ওসব জাগা ভালো না, কত কিছু হয় শুনেছি। ওসব জাগায় কেউ একা যায়?’

‘না না তোদের আর জ্বালাতে চাইনি। তাছাড়া আমার কাজকম্ম তো তুই জানিস, কিছু কিছু কাজ একা ছাড়া হয় না, ভেবেছিলাম অত ভেতরে কেউ থাকবে না।’

‘কিন্তু বাইক মোবাইল তো গেল...! তাহলে এখন কী করবা? দাঁড়াও আমি এদিকে খবর চালাচ্ছি। বলো তো লোক পাঠাচ্ছি, ওদিকেও আমাদের লোকজন আছে!’

‘না না ওভাবে হবে না, ওসব করতে গেলে ঝামেলা বাড়বে বই কমবে না। তার চেয়ে পুলিশকে জানানোই ভালো, দেখি আইসি নাথ সাহেব কী বলেন?’

‘কিন্তু নাথ স্যার তো বদলি হয়ে গেছে। সেদিন আমাদের একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেনের ব্যাপারে ম্যানেজার কেষ্টদার সঙ্গে থানায় গিয়েছিলাম, গিয়ে দেখি নতুন লোক এসেছে।’

‘এ বাবাঃ, তাহলে তো সমস্যা! যাকগে, কী আর করা যাবে, দেখি যিনি চেয়ারে আছেন তাঁকেই বলতে হবে। তোদের কোনো গাড়ি কি টাউনের দিকে যাচ্ছে, আমাকে থানার মোড়ে একটু নামিয়ে দেবে?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি বলে দিচ্ছি। ওই তো ওই ম্যাটাডরটা এক্ষুনি বেরোবে।’ ওই দিকে তাকিয়ে ‘লকাদা... লকাদা’ বলে চিৎকার করে উঠল শঙ্কর, মাথার উপর হাত নাড়িয়ে ডাক দিল।

‘এই দাঁড়া দাঁড়া। তার আগে ছোটো একটা কাজ আছে, তোর মোবাইলটা একটু দে না, একটা কল করতে হবে।’

বাবা নিশ্চয়ই এখনও ঘুম থেকে ওঠেননি। নিশ্চয়ই জানেন না আমি কাল রাতে বাড়ি ফিরিনি, জানার প্রয়োজনও মনে করেননি। তার জন্য তাঁকে অবশ্য আর কোনো দোষ দেওয়া যায় না। একসময় একেবারেই যে চিন্তা করেননি তা নয়, কিন্তু ইদানীং চিন্তাভাবনা করা ছেড়ে দিয়েছেন। ধরেই নিয়েছেন আমি অসংশোধনীয়, আমাকে আর বাগে আনা যাবে না। তাছাড়া সারাদিন ব্যবসার চাপ সামলে রাতের দিকে উনি মাথায় আর কিছু নিতে পারেন না, খাওয়াদাওয়ার পর নিজের ঘরে ঢুকে পড়েন, পেগ চারেক মদ্যপান করে গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। মানুষটা চিরকালই আত্মকেন্দ্রিক ছিলেন, তবে একের পর এক বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলাতে সামলাতে আজকাল বড্ড বেশিই নিস্পৃহ হয়ে গিয়েছেন।

তবু ফোন করে দেওয়াটা জরুরি, থানা হয়ে ফিরতে যদি খুব দেরি হয়ে যায়। বেলা হয়ে গেলে নিশ্চয়ই ফোন করবে, স্যুইচড অফ পেলে দুশ্চিন্তা হতেই পারে। হাজার হোক মানুষটার বয়স ষাট ছুঁয়েছে, তাছাড়া তাঁর পয়সাতেই যখন খাই তখন একটা দায় তো থেকেই যায়। লোকটার কোনো ইচ্ছেই পূরণ করতে যখন পারিনি তখন অহেতুক উদ্বেগের কারণ হতে কেমন যেন বিবেকে লাগে। নিতান্তই অপারগ না হলে যে করে হোক এক ফাঁকে ছোটো করে একটা ফোন করে, ‘চিন্তা কোরোনা আমি ঠিক আছি’ জাতীয় কিছু একটা বলে রাখি। আজও শঙ্করের ফোন থেকে তাই করলাম, ডাহা মিথ্যে কথা তবু খুব ক্যাজুয়াল টোনে বললাম ‘ন্যাশনাল হাইওয়ের ধারে বাইকটা হঠাৎ বিগড়োল, সারাতে দিয়েছি তাই ঢুকতে একটু দেরি হবে।’

‘দেরি হবে মানে?’ শুনেই চেঁচিয়ে উঠল বাবা। ‘যেখানেই থাকিস না কেন এক্ষুনি বাড়ি আয়। আমার পরিচিত একজন এসেছেন, বিরাট লোক, তোর সঙ্গে দেখা করবেন বলে বসে আছেন। সকাল থেকে একটার পর একটা ফোন করে যাচ্ছি, বারবার বলছে স্যুইচড অফ, স্যুইচড অফ!’

‘ফোন তো স্যুইচড অফ-ই, বাড়িতে পড়ে আছে। বাইকটা সারিয়ে বাড়ি ঢুকতে মিনিমাম আরও ঘন্টাখানেক তো লাগবেই।’

‘কোন হাইওয়ে? সকাল-সকাল ওদিকে কোন রাজকার্যে যাওয়া হয়েছিল শুনি?’ স্বভাবসিদ্ধ বাঁকা সুর টানে বাবা, ‘ঘন্টা খানেক লাগবে কেন? অটো টোটো যা পাবি তাতে করে যত তাড়াতাড়ি পারবি চলে আয়। এসব মানুষের সময়ের দাম অনেক, আর কতক্ষণ বসিয়ে রাখব?’

‘কিছু তো করার নেই। এসব রাস্তায় অটো-টোটো আবার কবে চলল? গাড়ি সারাই না হলে কী করে যাব, লরির মাথায় চেপে যাব নাকি?’ অবাধ্য গোঁয়ারসুলভ স্বরে বলি।

জানে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, লাইন কেটে দিয়েছে বাবা। কিন্তু কে এসেছে বাড়িতে? আমার সঙ্গে দেখা করানোর জন্য বসিয়ে রেখেছে কাকে? যেই হোক না কেন ঘন্টা দেড়েকের আগে বাড়িমুখো হওয়ার কোনো সু্যোগ নেই। আগে থানার কাজটা না মিটিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার প্রশ্নই নেই। মিনি-ট্রাকটা থেকে লাফিয়ে নামি, হনহনিয়ে হাঁটতে থাকি থানার দিকে।

থানা-চত্বরে ঢুকে অন্য কোনো দিকে না গিয়ে সোজা গিয়ে ঢুকলাম আইসির ঘরে। তাপস অধিকারী নামক ভদ্রলোককে দেখে মনে হল বেশ রাশভারী। ঘরে বেশ কিছু লোক ছিল তাই অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল ওঁকে কিছুটা ফাঁকা পেতে। আমার ব্যাপারটা বলাতে উনি আমার দিক ভ্রু কুঁচকে তাকালেন ‘অত রাতে ওখানে কী করতে গিয়েছিলেন?’

‘আমার একটা প্রোজেক্টের কাজে। আসলে আমার কাজটা এমনই মাঝেমধ্যেই এই জাতীয় সব রিমোট এলাকায় যেতেই হয়। এই থানার আগের আইসি, আই মিন আপনার ঠিক আগের ইন্সপেক্টর ইন চার্জ রতনবাবু আমার কার্যকলাপ সম্পর্কে জানেন, আমার সঙ্গে ওর যথেষ্ট ভালো পরিচয় ছিল। আপনি দরকার হলে ওনাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।’

‘না না সে সব ঠিক আছে, কিন্তু প্রোজেক্ট বলতে? আপনার কাজটা কী, অত রাতে ওইসব আউটস্কার্ট এলাকায়...?’

‘এক কথায় বলা কঠিন, খুলে না বললে বোঝানো অসম্ভব তবু টু বি প্রিসাইজ বলি গভীর রাতের দিকে আমাকে আমার কাজের প্রয়োজনে ওই সব একেবারে ফাঁকা, নির্জন, জনমানবশূন্য জায়গায় যেতে হয় ইন অর্ডার টু এক্সপ্লোর, টু আন্ডারস্ট্যান্ড, টু এক্সপিরিয়েন্স, টু ফিল সার্টেন থিংস…’

‘সার্টেন থিংস বলতে, কী জিনিস? বুঝলাম না, পরিষ্কার করে বলুন।’

‘পরিষ্কার করে বলতে আমার বিষয় ইনফ্যাক্ট নকটারনাল, নকটারনাল এক্সপিরিয়েন্সেস…’

‘কী টারনাল?’ চোখের কোণ কুঁচকে বলেন ভদ্রলোক।

‘নকটারনাল। মানে কী বলি রাত্রি বিষয়ক, রাতে ঘটে এমন অভিজ্ঞতা। রাত, অন্ধকার, সূর্যাস্তের পর অন্ধকার নামার থেকে শুরু করে পরের দিন সূর্য ওঠার আগে পর্যন্ত অনালোকিত যে সময় সেটাকে বোঝা তার বিভিন্ন দিক, বিভিন্ন রহস্যময়তা...।’

‘হুম।’ মুখ মুচড়ে হাসেন মিস্টার অধিকারী। টেবিলে রাখা পেপার ওয়েটটা আঙুল দিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বলেন ‘প্রোজেক্ট বলতে গভর্নমেন্ট স্পনসরড বা কোনো প্রাইভেট অর্গানাইজেশন এনডরসড রিসার্চ ওয়ার্ক?’

‘না না এটা আমার নিজস্ব প্রোজেক্ট, একান্তই আমার মতো করে রাত ব্যাপারটাকে বুঝতে চাওয়া, মাই পার্সোনাল এনকোয়ারি ইনটু দ্য নেচার অফ থিংস। শেষ সাত আট বছর ধরে এই নিয়ে পড়াশুনো আর খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছি।’

উনি আমার চোখের দিকে তাকালেন, এমন একটা ভাবে যেন আমাকে এক নিমেষে নির্ভুল বুঝে নিয়েছেন। কেমন যেন এক ধরণের বিদ্রুপের সুরে বললেন ‘ভূত প্রেতের ব্যাপার স্যাপার নাকি, আই মিন সুপার ন্যাচারাল, প্যারানর্মাল, অকাল্ট...?’

‘নট এগজ্যাক্টলি। তবে হ্যাঁ, রাত্রি মানে এমন একটা বিপুল অজানা জায়গা, এমনই জটিল দুর্বোধ্য সাবজেক্ট তার মধ্যে অনেককিছুই আসতে পারে। অতিপ্রাকৃত তার মধ্যে একটা দিক হতেও পারে...।’

বলেই লোকটার চোখমুখ দেখেই বুঝতে পারলাম ভুল করে ফেলেছি। গ্রস মিসটেক। আর যাই বলি না কেন, যত ব্যাখ্যাই দিতে যাই না কেন মানুষটা আমায় মেপে নিয়েছে। অতিসরলীকরণ করে মনে মনে আমায় দেগে দিয়েছে। ঠোঁটের কোণের ওই প্রত্যয়ী নিশ্চিত হাসিটাই বলে দিচ্ছে ওর আমায় বোঝা সারা। ধরেই নিয়েছে আমি আদতে ঈষৎ ক্ষ্যাপাটে, বায়ুরোগগ্রস্ত, উদঘুটে স্বভাবের বিদঘুটে বখা ছোকরা।

হাতঘড়ি দেখলেন ভদ্রলোক, উঠে দাঁড়ালেন ব্যস্ততা দেখিয়ে। শ্লেষ মেশানো গলায় তাকালেন তেরছা চোখে ‘আপনাদের আর কী বলুন? করে যান, যার যা প্রাণ চায়, যখন যা খেয়াল খুশি করে যান। আমরা তো আছিই, আপনারা ভাগাড়ের ভিতর তেপান্তরের মাঠে নৈশবিহারে যাবেন, দত্যি দানব ধরলে আমরা তো হামেহাল আছিই। আপনাদের খিদমতগার।’

‘না না, আপনি হয়তো ভুল বুঝছেন, বিহার-টিহার হতে যাবে কেন, ইটস আ সিরিয়াস অ্যাফেয়ার।’

‘বুঝতে পেরেছি, তিরিশ বছর ধরে এই চাকরিটায় ঘষটে মরছি তো তাই বুঝতে পারি। একদিকে ক্রিমিনালদের আন-রোমান্টিক সিরিয়াসনেস অন্যদিকে আপনাদের রোমান্টিক-সিরিয়াসনেস, তার মাঝখানে পড়ে আমাদের যে কী দুর্দশা আমরাই জানি।’

বলতে বলতে ক্রমশ গম্ভীর শোনাল কণ্ঠস্বর। রুক্ষতা মিশল অনেকটাই। ‘কোনো ধারণা আছে ওই সব কী ডেঞ্জারাস জায়গা? কপাল ভালো বাইক মোবাইলের ওপর দিয়ে গিয়েছে। মার্ডার করে ফেলে রেখে দিয়ে গেলে কাক পক্ষীতেও টের পেত না। বডি তো দূরের কথা হাড়গোড় অবধি বেপাত্তা হয়ে যেত।’

লোকটার ভয়েস থ্রো-টা অপমানজনক। হজম করে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই তাই বলে নমনীয়তা প্রদর্শনের প্রশ্নই উঠছেনা। ‘না না সেটা ঠিক সমস্যা না, আই মিন দ্যাটস দ্য পার্ট অফ দ্য গেম। এটা তো তেমন কোনো জায়গাই না, এর চেয়ে অনেক ডেঞ্জারাস সব জায়গায় আমি গিয়েছি। ফিজিক্যাল অ্যাসল্ট, মারধোর খাওয়া অ্যান্টিসোশ্যালদের ধমকি এসবকে আমি ঠিক ধর্তব্যের মধ্যে আনছি না।’

‘মানে!’ বড়ো বড়ো চোখ করে তাকালেন ভদ্রলোক ‘আপনি তাহলে নিজের দায়িত্ব নিজের হাতেই রাখছেন। আপনার কিছু হয়ে গেলে পুলিশের কোনো দায়িত্ব নেই তাই তো?’

ঘাড় ঝাঁকিয়ে বেশ একটা পৌরুষী দেখিয়ে বললাম, ‘সেই রকমই একপ্রকার, সেই রকমই বলতে পারেন।’

বিরক্ত সব রেখা ফুটে উঠল লোকটার মুখে। খরচোখে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাদের সমস্যাটা কোথায় জানেন... আপনাদের তো কোনো রেসপনসিবিলিটি নেই, না আইন না সমাজ, কোনো দায়িত্ব কর্তব্য নেই। আপনাদের তো যা মনে হয় বললেই হল, করলেই হল। যাগগে আপনাদের বলে তো কোনো লাভ নেই, ওয়েস্ট অফ টাইম…’

স্বরক্ষেপণ আর চাহনিতে স্পষ্ট একটা তাচ্ছিল্য। ঝট করে রাগ ছলকে উঠল মাথায় কিন্তু মুহূর্তে নিজেকে সংযত করলাম। শান্ত সংহত উচ্চারণে বললাম, ‘ঠিকই বলেছেন, আপনার জায়গা থেকে আপনি এক্কেবারে ঠিক বলেছেন। আসলে স্যার প্রাণে যখন বেঁচেই ফিরেছি তখন পার্সোনাল সেফটিটা এখন সেকেণ্ডারি। আপাতত আমার প্রাইমাল কনসার্ন আমার বাইক আর মোবাইলটা ফিরে পাওয়া। উইল ইউ প্লিজ টেক অ্যাকশন টু ব্রিং দেম ব্যাক, আই শ্যাল বি হাইলি অবলাইজড ইফ ইউ কাইন্ডলি...।’

‘কী মনে হচ্ছে ব্যাপারটা অতই সোজা? তাছাড়া এর জন্য আপনাকে আমার কাছেই বা আসতে হবে কেন? আপনাকে তো ডিউটি অফিসারের কাছে যেতে হবে, সমস্ত ডিটেলস দিয়ে জেনারেল ডায়েরি লেখাতে হবে।’

‘হ্যাঁ জানি, সেখানেই যাওয়ার কথা কিন্তু কী মনে হল আপনাকে বিষয়টা জানাই। আসলে রতনবাবু যখন ছিলেন বারকয়েক সরাসরি ওঁর কাছেই এসেছি তো, তাই বদ-অভ্যেস হয়ে গেছে বলতে পারেন। উনি আমার ব্যাপারটা জানতেন। সুদূর ব্যাঙ্গালোর থেকে শুরু করে কলকাতা হয়ে আমাদের এই শহর থেকে উত্তরবঙ্গ, আমার কাজের এই ছড়ানো ক্ষেত্রটা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। আপনি ওকে ফোনে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন, ধৃতিমান নন্দী বললেই আশা করি চিনতে পারবেন।’

বলতে বলতে একজন সাব-ইন্সপেক্টর এসে ঢুকল ঘরে। আইসি সাহেব দায়সারা উচ্চারণে আমায় বললেন, ‘ঠিক আছে জিজ্ঞেস করে দেখব। আপনি এই দরজা দিয়ে বেরিয়ে ডান হাতের করিডর দিয়ে সোজা হেঁটে চলে যান। ওখানে ডিউটি অফিসার সাধুখাঁ আছেন, ওনার কাছে গিয়ে একটা জিডি করিয়ে নিন।’

‘ঠিক আছে, থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।’

‘ইউ আর ওয়েলকাম৷’ বলে যতটা সম্ভব আনওয়েলকামিং একটা হাসি হাসলেন।

ডিউটি অফিসারের কাছে ডায়রি লিখিয়ে বেরিয়ে এসে দাঁড়ালাম পাঁচমাথার মোড়ে। বাইক আর মোবাইল সেট ফেরত পাওয়ার আশা ছেড়ে দেওয়াই ভালো তবে কোম্পানির ঘর থেকে ডুপ্লিকেট সিম পেতে এই ডায়রি নাম্বারটা দরকার। সে সব তো ঠিকই আছে কিন্তু মাথায় খালি চক্কর খাচ্ছে আইসির সেই কথাটা। এ পৃথিবীর আরও একটা মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে বলল আমার নাকি কোনো দায়িত্ববোধ নেই।

কেন? আমার মুখ দেখে কি তেমন কিছু মনে হয় বুঝি? কিন্তু দায়িত্ববোধ নেই একথা কি ঠিক? শেষ এতগুলো বছর ধরে আমি যে খোঁজে নিরন্তর ও নিরলসভাবে লেগে রয়েছি সেটা কি কোনো দায়িত্ব না? আমার তো মনে হয় মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব নিজের গোপন অন্তর্গূঢ় প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা। উত্তর যদি নাও পাওয়া যায়, কিছুতেই ধরা না দিতে চায় তবুও খোঁজ চালিয়ে যাওয়া। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া।

আমি তো চুরি করছি না, ডাকাতি করছি না, জ্ঞানত কারও কোনো ক্ষতি করছি না। তাহলে কার কী? যদি নিজের ক্ষতি করে থাকি তাতে কি কোনো অপরাধ আছে? আমার এই চুল নখ দাঁত চামড়া হৃদযন্ত্র যকৃৎ প্লীহা থুথু লালা, আমার এই রূপ বেদনা সংজ্ঞা মিলিয়ে মিশিয়ে আমার এই সত্তা সে তো আমার। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে আমার। এর উপরেও কি আমার কোনো অধিকার নেই? নিশ্চয়ই আছে, আলবাত আছে। আমার জীবন আমার, আমার একার, একান্তই একার।

বাড়িতে ঢুকছিলাম হন্তদন্ত হয়ে, ভেতর-দরজার মুখেই দেখা আমাদের বহু পুরোনো পরিচারিকা মণিমাসির সঙ্গে। কে এসেছে জিজ্ঞেস করতে বলল সে বলল রমাকান্ত লাহিড়ী। সেটা আবার কে? জানতে চাইলে বিস্মিত ভঙ্গিতে বলে ‘সে কী রমা লাহিড়ীকে চেনো না, বিরাট জ্যোতিষী?’

‘নাঃ, আমি জ্যোতিষী-ফোতিষীদের খোঁজখবর রাখি না।’ দ্রুত উঠতে থাকি সিঁড়ি বেয়ে। কিন্তু নামটা খুব চেনা চেনা, কোথায় যেন শুনেছি? কী একটা প্রসঙ্গে যেন অনেকদিন আগে শুনেছিলাম মনে পড়ছে না। যাই হোক পা চালিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিলাম দোতলার ড্রয়িং-রুম, শব্দ না করে খালি পায়ে এগোচ্ছিলাম আমার ঘরের দিকে কিন্তু চোখ এড়ানো গেল না। আমাকে দেখেই সোফায় বসা বাবা গলা ছাড়ে, ‘এই কোথায় যাচ্ছিস, এদিকে আয়...।’

‘দাঁড়াও আসছি, চোখমুখে জল দিয়ে এক্ষুনি আসছি...।’

‘না না কোথাও থেকে আসতে হবে না, আগে এখান থেকে ঘুরে যেখানে ইচ্ছে সেখানে যা।’

চোখমুখের যা দশা, পরনের জামা-প্যান্টের যা অবস্থা তাতে ঘর থেকে পাল্টে আসাটা জরুরি ছিল কিন্তু বাবা বিশ্বাস করবে না। কে জানে ছোকরার যা মতিগতি পেছনের দরজা দিয়ে পালাতেও পারে তাই চোখের সামনে যখন পেয়েছে ছাড়বে না। বাইরের লোকের সামনে সিন ক্রিয়েট করা মোটেও শোভন না, তাই আমিও ওদের দিকে পা বাড়ালাম। অনুগত ছেলের মতো এসে দাঁড়ালাম ওঁর সোফাটার পাশে।

রোগাটে গড়ন লোকটার মুখটা ফজলি আমের মতো লম্বাটে, দীর্ঘ কপাল, উন্নত নাসা, গালে সযত্নলালিত দাড়ি। উলটে আঁচড়ানো চুল ঘাড় অবধি এসে পড়েছে, মেরুন রঙের পাঞ্জাবির ঝুল হাঁটু ছাড়ানো। সামনের টি-টেবিলে খাবারটার পাশে মা-র আমলে আমার জন্ম-সময় অনুযায়ী করানো ঠিকুজিটা পাতা। আমার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে স্মিত হাসেন ভদ্রলোক, ‘এই আপনার শ্রীমান বুঝি?’

‘হ্যাঁ, এই ধৃতিমান, আমার একমাত্র পুত্র...।’ হাত বাড়িয়ে লোকটার পায়ের দিকে নির্দেশ করে বাবা আমায় বলে উঠলেন, ‘দাঁড়িয়ে কেন? প্রণাম কর, শাস্ত্রীজীকে প্রণাম কর।’

আমি নীচু হলাম বটে কিন্তু তাতে প্রচ্ছন্ন আমার অনিচ্ছাটা লক্ষ করে লোকটা আমায় হাত ধরে বলল, ‘থাক বাবা থাক, হয়েছে হয়েছে। বসো বসো।’ লোকটা দেওয়ালে টাঙানো মায়ের ছবিটার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নিয়ে বলল ‘মাতৃমুখী সন্তান, বসো বসো, ওই সামনের চেয়ারটায় বসো।’

‘না না ঠিক আছে, আপনারা একটু বসুন আমি জামা প্যান্টটা বদলে এক্ষুণি আসছি...।’

বাবা এবার আমার উপর ভালো করে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘এ কী, কী হুলিয়া করেছিস? গালখানা ওরম ফোলা লাগছে কেন, ঠোঁটের কোণখানা কেটেছে মনে হচ্ছে? জামাখানা এত নোংরা, প্যান্টে কাদা, চোর-কাঁটা? কোথায় গিয়েছিলি, এ কী অবস্থা?’

‘ওই গিয়েছিলাম এক জায়গায়, আচমকা চাকা স্কিড করে বাইক থেকে পড়ে...। তাই জন্যেই তো বলছি, আসছি দাঁড়াও, জামাপ্যান্টটা ছেড়ে এক্ষুণি আসছি।’

‘আচ্ছা এসো, তাই এসো।’ ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলেন ভদ্রলোক।

পিছন দিকে একপা-একপা করে পিছোতে লাগলাম আমি। বাবা বাধা দিলেন না কিন্তু কেমন একটা করুণ অসহায় মুখ করে হেলে পড়লেন সোফার গদিতে মোড়া হাতলের উপর। বিলাপের সুরে আমাকে শুনিয়েই যেন বলে উঠলেন, ‘জানিনা কী করে বেড়াচ্ছে! এ ছেলের হালচাল আমার মাথায় ঢুকছে না লাহিড়ী দা। দু-সপ্তাহের জন্য বাড়ি এসেছে তাও শান্তি নেই, দিন রাত কোথায় কোথায় সব ঘুরে বেড়ায় কিছু বুঝিনা। কী করতে চাইছে, কীসের পেছনে যে ছুটে মরছে কিচ্ছু বুঝতে পারিনা!’

‘অনেক আশা নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পাঠালাম। দু-বছর পড়ে মাঝপথে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে এল। ইঞ্জিনিয়ারিং নাকি ওনার দ্বারা হবে না, ওসব নাকি ওনার ভাল্লাগেনা। আমার বয়েস হচ্ছে, ঘরে বাইরে একের পর এক বেইমানির ধাক্কা সামলাতে সামলাতে আমি পুরো ধ্বস্ত। যে ক-টা মানুষকে বিশ্বাস করে কাছে টেনে নিয়েছি, নিজের লোক ভেবে সব ছেড়েছি সেই সেই মানুষগুলোই আমার সঙ্গে চরম বেইমানি করেছে। এই ক-মাস আগে নিজের ডান হাত, যাকে রাস্তা থেকে তুলে এনে ম্যানেজারের চেয়ারে বসিয়েছিলাম তার নেমকহারামি দেখে আমার সব বিশ্বাস উবে গিয়েছে, মানুষ জাতটার ওপর থেকেই সব বিশ্বাস উড়ে গিয়েছে।’

বলতে বলতে নেতিয়ে পড়ল গলা, করুণ শিথিল হয়ে এলিয়ে পড়ল। ‘ভুলেও আর পরের উপর ভরসা না, নিজের ছেলেকে সব বুঝিয়ে সুঝিয়ে দিয়ে এবার ঘাড়ের বোঝা নামাতে চাই কিন্তু কে কার কথা শোনে। শেষ তিনটে বছর ধরে এক কথা বলে যাচ্ছি, পায়ে ধরতে খালি বাকি রেখেছি, এবার ব্যবসাটা বুঝে নে, নিজের জায়গাটা নিজে হাত কলমে জেনে বুঝে নে কিন্তু কে কার কথা শোনে?’

একসময়ের সেই স্বৈরাচারী দোর্দন্ডপ্রতাপ বেপরোয়া মানুষটার আজ এ কী দশা, লোকটা যেন ইদানীং বড্ড মরিয়া হয়ে আত্মসমর্পণের জায়গা খুঁজছেন। যে লোককে জীবনে কোনোদিন ঠাকুর প্রণাম করতে দেখিনি সে কিনা আজকাল লালপাড় গরদ পরে দু-বেলা কালীপুজো করেন। দু-হাতের দশটা আঙুলে আটটা আংটি, গলায় হাতে এক গাদা করে মাদুলি তাবিজ কবজ! আসলে উনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না ভারত বিখ্যাত ঢালাই রডের দুই জেলাব্যাপী একচ্ছত্র অথরাইজড ডিলারশিপটা আর ওঁর নেই। কিন্তু তার জন্যে কি রতন মালাকার একা দায়ী? ওঁর যথেচ্ছাচার, লাগামহীন জীবনযাপন, বছর দুয়েক আগে অকারণে একটা ট্রাক্টর কোম্পানীর ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নিতে গিয়ে ভরাডুবি হওয়া দায়ী না?

যাকগে এসব ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোর আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। কিন্তু এ লোককে নিয়ে তো আর পারা গেল না, জ্যোতিষীকে সবই তো প্রায় বলে দিল, এর পর এইসব বুদ্ধিমান লোকেদের আর কীই বা জানতে বা বুঝতে বাকি থাকে! আমার যদিও ভবিষ্যৎ নিয়ে একেবারেই কোনো উৎসাহ নেই, যে যা বলে বলুক আমার তাতে কিস্যু এসে যায় না। তবু বসব, বাবার মনের শান্তির জন্য হাত মেলে ধরব এই লোকটার সামনেও। শেষ দু-বছরে অন্তত আরও দু-বার যেভাবে বসেছি। পেশাদার ভবিষ্যৎ বক্তারা তাদের অতীন্দ্রিয় ক্ষমতাবলে, গাদাগুচ্ছের অঙ্ক কষে ভবিষ্যৎ বলবেন আর আমার খুব হাসি পাবে। হো হো করে হেসে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করবে। কারণ আমার ক্ষেত্রে ওদের অনুমান প্রায় কিছুই মিলবে না, শতকরা পনেরো ভাগও মিলবে না।

মিলবে কী করে, ওরা তো কেউ আমি মানুষটাকে ঠিক বুঝতেই পারেনি, ধরতেই পারেনি! অতীত ছাড়া ভবিষ্যৎ বলে কী কিছু হতে পারে? ওরা তো আমার অতীত কিছু জানে না। বাবা সব বললেও কিছু কিছু নিয়ে কিছুতেই মুখ খুলবে না জানি। ভুলেও বলবে না, ভয়ানক নেশার ঘোরে থাকলেও নিশ্চয়ই বলবে না। ফলত ক্রমশ ওঁরা বিভ্রান্ত হবেন, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে নানান সব জটিল রেখার উদয় হবে ওঁদের মুখে আর আমার হাসি পাবে।

নিজের ঘরে ঢুকে, বাথরুমের দরজা বন্ধ করে কল খুলে দিই। বেসিনের উপর ঝুঁকে পড়ে চোখে মুখে জলের ঝাপটা মারতে থাকি। এই জন্যেই বাড়ি আসিনা, দেখা হলেই সেই এক কথা। হাজার বার বলেছি ব্যবসা আমায় দিয়ে হবে না, না খেতে পেয়ে মরলেও ওই রাস্তাটা আর আমার জন্য না। আমার পায়ের নিচে আজ যে এই রাস্তাটা সে তো অনেক আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছে, অন্যদিকে বেঁকে আমাকে অনেক দূর নিয়ে চলে এসেছে। আর কিছু করার নেই, আর ফেরার পথ নেই। যেখানে চলে এসেছি সেখান থেকে আর ফিরতে চাইলেও ফেরা সম্ভব না, এখান থেকে ফেরা যায় না।

কিন্তু নিজের ইচ্ছেয় তো আসিনি, সাধ করে তো আসিনি! কেন এ পথে এলাম, কেন বাধ্য হলাম, কোন পরিস্থিতিতে এলাম সে তো কেউ জানলেও জানি বুঝবে না। আমি আর আকাশের ওই বুড়ো চাঁদটা ছাড়া এখানের আর কেউ না। আর যে লোকটা বুঝত সে তো আর কাছে নেই। এখন কোথায় জানিনা। কেন, কোথা দিয়ে যে কীভাবে কখন উধাও হয়ে গেল মাথায় ঢোকেনি। তাই আর কারুর পক্ষে সম্ভব না, আমার এই জায়গাটা, এই অসহায়তাটা বোঝা সম্ভব না।

তাই তো বলি আমায় তোমরা ছেড়ে দাও। রেহাই দাও, দয়া করে আমাকে একা আমার পরিস্থিতিতে ছেড়ে দাও। আসলে আমার কিছু করার নেই, একবার যখন এই রাস্তায় পা দিয়ে ফেলেছি তখন আর পেছন ফিরে তাকানোর প্রশ্নই নেই। শুরু যখন করেছি তখন শেষ দেখে ছাড়ব, কিন্তু জানিনা এ পথের শেষ কোথায়?

লাহিড়ী মহাশয় একটা লম্বা বড়ো হলুদ কাগজে সবুজ কালি দিয়ে গোটা গোটা হস্তাক্ষরে তাঁর রায় জানিয়ে গেছেন। জানতাম এমনই কিছু বলবেন, তাছাড়া আর কীই বা বলার আছে। যথারীতি সেই এক কথা, প্রভূত বাধা-বিঘ্নে ভরা জীবন, জাতকের জীবন বিপদসংকুল। সব কিছু যে দিকে গড়াচ্ছে তাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে উনি নাকি কোনো আলোই দেখতে পাচ্ছেন না। বিশেষ করে শনি মঙ্গল আর রাহুর অবস্থানটা ওনাকে খুব ভাবাচ্ছে। জাতককে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করে চলাফেরা করতে হবে, না হলে সমূহ বিপদ। আমার জন্মকুণ্ডলীতে নাকি অদ্ভুত সব যোগ আছে, জীবনে অনেকবার এমন সব পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে যাতে নাকি আমার প্রাণসংশয় অবধি হতে পারে। এমনকি অপঘাতের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না একেবারে।

শুনে পিতৃদেবের তো একেবারে যাকে বলে মাথায় বাজ পড়েছে। সেই ভদ্রলোক বলে গেছেন মকর রাশির এই জাতকের নাকি এই মুহূর্তেই কিছু রত্নধারণ না করলেই না। তাই রাতারাতি কলকাতার নামজাদা জুয়েলারির দোকানে বিশ্বস্ত লোক পাঠানো হয়েছে বাজার সেরা এমিথিস্ট আর দশ রতির হরিদ্রাভ মুক্তো কিনে আনতে। যা আনাচ্ছে আনাক, প্রাণে যা চায় করুক আমি তো জানি আমি কী করব। ওঁর শরীরের যা অবস্থা, তাতে অযথা কথা বাড়াব না, সামনে হয়ত আঙুলে পরব কিন্তু তারপরে তো অবধারিত ভাবেই ওগুলোর জায়গা হবে আমার কলকাতার ফ্ল্যাটের পড়ার টেবিলের ড্রয়ার। অবশ্য পরে থাকলেও ক্ষতির কিছু ছিল কি? রত্ন ধারণ করে ভবিষ্যৎ বদলানো যায় তো দূরের কথা যে মানুষটা ভবিষ্যৎ বলে আদৌ কিছু হয় তাতেই বিশ্বাস করেনা তার এসবে কী এসে যেত? বিশ্বাস, আদর্শ বা ওই জাতীয় কোনো ছুঁতমার্গের জন্যেও ঠিক না, আমার যে রকম জীবনযাত্রা তাতে ক-দিন পরে ওদুটো দামী জিনিস খামোখা কোথাও কোনো দুষ্কৃতীর হাতে উঠবে, তার চেয়ে ওগুলোর ড্রয়ারে পড়ে থাকাই তো ভালো।

যে যাই বলুক, দুর্ঘটনা মৃত্যুভয় যা দেখাচ্ছে দেখাক, যা হওয়ার হয়ে যাক আমি আমার জায়গা থেকে নড়ছি না। কেউ বা কিছুই আমাকে আমার পথ থেকে সরাতে পারবে না, লক্ষ্যে পৌঁছনোর আগে আমায় কিছুতেই থামানো যাবে না। বিপদ যার পায়ে পায়ে ঘোরে, যার জীবন বলতে বিপদের সঙ্গে অনন্ত সহবাস তার আবার বিপদে ভয় কী? আসলে বিপদটাতো ঠিক ততটা বিপজ্জনক না, যতটা বিপদের ভয়। ভয়ই মানুষের সবচেয়ে বড়ো শত্রু, সবচেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধক। ভয় আমাদের কল্পনা, আমাদের মনের যুক্তিহীন অভিক্ষেপ। এই ব্যাপারটা নিয়ে ডাক্তার দত্তর মতো আমিও আজকাল বিশ্বাস করতে লেগেছি ‘FEAR’ মানে হল false evidence appearing real। ভয় আমাদের জীবনী শক্তি, মন, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, সম্ভাবনা সব শেষ করে দেয়। তাই ভয় জিনিসটাকে খুন করতে হবে, তিলে তিলে নাশ করতে হবে। একটু একটু করে নিষ্ক্রিয় করতে করতে একদিন একেবারে নিঃশেষ করে ফেলতে হবে।

যাই হোক পরের কথা পরে। আপাতত কলকাতায় ফিরে অন্য কোনো দিকে না গিয়ে সোজা ফ্ল্যাটে ফিরেছি। সামনের ফ্ল্যাটের প্রতুল করের পুত্রবধূ প্রত্যুষাদির কাছ থেকে চাবি নিতে গেছি, ও চাবির গোছার সঙ্গে দুটো খাম হাতে দিল। একটা তো লাইটবিল আর একটা বাঁশকাগজের মুখবন্ধ এনভেলপে চিঠিই তো মনে হচ্ছে। কুরিয়্যার মারফত এলে তার নাম্বার স্টিকার-ফিকার থাকত, ডাকে আসলে স্ট্যাম্প। সে সব কিছু নেই, শুধু আমার নাম লেখা। জিজ্ঞেস করলাম ‘কে দিয়ে গেল, কেউ এসেছিল?’

‘হ্যাঁ একটা দাড়িওয়ালা লোক। গ্রাউন্ডে স্কুটিটা নিয়ে বেরোচ্ছিলাম, গেটের কাছে দেখি লোকটা দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলছে। তোর খোঁজ করছিল তাই কেয়ারটেকার অমিয়দা আমায় ডেকে দিল। তুই আছিস কিনা জানতে চাইল লোকটা। নেই, বাড়ি গিয়েছে বলাতে চিঠিটা দিয়ে বলল আসলে দিয়ে দিতে।’

‘তুমি জিজ্ঞেস করলে না নাম কী, কে পাঠিয়েছে ইত্যাদি?’

‘না না, সে সু্যোগ পেলাম কোথায়। চিঠিটা হাতে দিয়েই বাইকে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল যে। আমি ভাবলাম তোর চেনা কেউই হবে, তোর কাছে তো কতজনাই আসে...।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে, সে ঠিক আছে।’ কৃতজ্ঞ হাসি হেসে পিছন ফিরলাম। খামের মুখটা ছিঁড়ে চিঠিটা বার করতে করতে এগোলাম নিজের দরজার দিকে।

চিঠিটা পুরো খুলে ফ্লোরের মাঝামাঝি থমকে দাঁড়াই। আরে, এ তো অরুণাক্ষ ভাদুড়ীর হাতের লেখা। সম্বোধনহীন সংক্ষিপ্ত চিঠি। ‘কী ব্যাপার তোমার, যতবার ফোন করছি স্যুইচড অফ বলছে! চিঠি পেলে ইমিডিয়েট আমার সঙ্গে দেখা কর। জরুরি দরকার। খুব তাড়াতাড়ি একটা এক্সপেডিশনে বেরোতে হবে মনে হচ্ছে। আর সঙ্গে তোমার নতুন ই ভি পি রেকর্ডারটা নিয়ে আসবে, আমারটা কিঞ্চিৎ সমস্যা করছে। বাড়িতেই আছি, ল্যান্ডেও ফোন করে নিতে পারো। স্যার।’

ডুপ্লিকেট সিম অ্যাক্টিভেট হয়ে গেছে, ফোন করার আর কোনো অসুবিধা নেই। রিং করতেই ওপারে গমগম করে উঠল গলাটা ‘কোথায় ছিলে, ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না তাই চিরকুট পাঠাতে হল।’

‘আর বলবেন না, মোবাইল সেটটা হারিয়েছি। যাই হোক বলুন এবার কোথায় যাচ্ছেন, কবে যাচ্ছেন? এর মধ্যে তেমন কিছু ঘটল?’

‘হ্যাঁ রিসেন্ট কিছু ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। ফোনে বলে কিছু বোঝানো যাবে না, এসো, সামনাসামনি বসে কথা হবে। খুব ব্যস্ত না হলে দুপুরেই চলে এসো।’

‘আচ্ছা আসছি। একটু লেট হতে পারে তবু আড়াইটের মধ্যে ঢুকে পড়ব আশা করছি।’

‘আচ্ছা এসো, আমি স্টাডিতেই থাকব।’

দুপুরে কেন, ওই বাড়িটায় যেতে কোনো সময়েই কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন যাব, এত কিছুর পরেও কেন যাব? কতবার যে মনস্থ করেছি আর কোনোদিন ওই বাড়িতে যাব না, ভুলেও আর ওই বাড়ির পথ মাড়াব না। তবু কী যে হয়, লোকটা কথা বললে কী যে হয়! কেন যে আমার মুখ দিয়ে কথা সরে না, কেন যে মুখ দিয়ে কিছুতেই না বেরোয় না কে জানে! বলতে চাই কিন্তু শেষমেষ কিছুতেই বলে উঠতে পারি না দুঃখিত, অনেক হয়েছে আর না, আমি আর যেতে পারব না!

এবার গেলে এ জীবনে নয় নয় করে কমপক্ষে উনিশবার রেজলিউশন ভাঙা হবে কিন্তু কিছু যেন করার নেই। লোকটা এমন করে কথা বলল যেন কিছুই হয়নি! মতান্তর কথাকাটাকাটি থেকে মনোমালিন্য, আমাদের মধ্যে কোনোদিনও কিছুই হয়নি। কথা শুনে মনে হল সমস্যা যদি কিছু থেকে থাকে সে সব একান্তই আমার, উনি সব ভুলে গেছেন বা কিছুই গায়ে মাখেননি। তাই দিন কয়েক পরেই আবার সেই আদি অকৃত্রিম কণ্ঠস্বর! যথারীতি নিরুদ্বেগ নির্বিকার। সেই অথরিটি, আমার উপর সেই দাবি বা অধিকার। আর আমি আবার প্রস্তুত, এক পায়ে খাড়া, ওই অদ্ভুত বাড়িটার দিকে পা বাড়াতে আগের মতোই আগ্রহী অধীর উদগ্র।

অদ্ভুত বলে অদ্ভুত! ওই রকম আর একটা বাড়ি এই মহানগরীতে আর দুটো আছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। মাথার মধ্যে বাড়িটার ছবি ভেসে উঠলেই আমার শরীর জুড়ে কেমন যেন একধরনের শিহরণ আর শিরশিরানি দুই একই সঙ্গে ঠেলে ওঠে। এলাকার বাকি বাড়িগুলো থেকে বেশ কিছুটা তফাতে বিচ্ছিন্ন একটা তিনতলা বাড়ি। বাইরের গেটের মাথা, পাঁচিল থেকে আরম্ভ করে বাড়ির গা বেয়ে ছাদ অবধি উঠে গিয়ে সারা বাড়ির সামনেটা মুড়ে রয়েছে আইভি জাতীয় একধরণের ক্লাইম্বিং লতা। আচমকা দেখলে মনে হয় ঘন সবুজ তিনভাঁজ খাওয়া কোনো এক সবুজ টিলা বুঝি। তার মধ্যে থেকে চোখের মতো জেগে আছে খড়খড়ি দেওয়া বেশ কিছু বড়ো বড়ো সাবেকি জানালা কিন্তু তারা মূলত বন্ধই থাকে।

প্রখর গ্রীষ্মে বাড়িটার দিকে তাকালে চোখ ঠান্ডা হয়ে আসে ঠিকই কিন্তু ভেতরে ঢুকলে সারাবছরই কেমন যেন একটা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া। ছায়া ছায়া, নিঃঝুম, সামনের অংশের এতসব গাছপালার আধিক্যেই বোধহয় একধরনের সোঁদাটে বুনো গন্ধ নাকে আসে। কিবা দিন, কিবা রাত সারা বছর ভেতরের দরজার সামনে চেয়ার পেতে একজন দারোয়ান বসে বসে ঝিমোয়। কোলাপসিবল গেট টানা থাকলেও, পুরো বন্ধ থাকে না। একপাশটা টেনে ভেতরে ঢুকে, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার জন্য ওকে জানানোর বা অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করি না। খাড়াই প্রায়ান্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাই। দু-ধারের ফ্যাকাশে ড্যাম্প ধরা দেওয়ালে টাঙানো সাদাকালো ছবিগুলো আমার দিকে স্থির গম্ভীর নিষ্করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে, ভেতরের হাওয়া থমথমে। যত উপরে উঠতে থাকি নৈঃশব্দ্য তত বাড়তে থাকে, তিনতলায় এসে মনে হয় আক্ষরিক অর্থেই মেঝেতে পিন পড়লে শব্দ শোনা যাবে। ওখানেই ভাদুড়ীর পার্সোনাল চেম্বার।

আর চান্দ্রেয়ী থাকে দোতলায়। একেবারে ঠিক আমারই বয়সী অরুণ ভাদুড়ীর একমাত্র কন্যা। একেবারে আমার মাথায় মাথায়। বাঙালি মেয়ে হিসাবে পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি কম উচ্চতা না। এক ঝলকে দেখলে বাঙালি বলে মনে হওয়াও দুষ্কর। গায়ের রঙ ঠিক শ্বেতাঙ্গিনীদের মতো না, বলা যেতে পারে জলপাইবর্ণ। বাড়িতে প্রায় সারা বছর অল্পবয়সী মেয়েদের মতো সাদার উপর গোলাপী বেগুনি হলুদ ফুল ফুল ছাপ দেওয়া হাঁটু ছোঁয়া ফ্রক পরে থাকে। তাই অনাবৃত হাত পাগুলো যেন একটু বেশিই লম্বা লাগে, ভয়ানক উজ্জ্বল, মসৃণ নিখুঁত নিটোল। ঈষৎ কোঁচকানো পিঠ ছাড়ানো লম্বা চুল কখনই বাঁধা অবস্থায় দেখিনি। চলতে ফিরতে কোমরের বাঁকের উপর নাচে, কথা বলতে গেলে মুখের উপর এসে পড়ে।

ওরকম দীঘল এক জোড়া চোখ আমি আর দেখিনি। সে ভাবে দেখলে মনে হতেই পারে ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যেবেলায় ছায়াচ্ছন্ন গভীর কোনো দীঘির কালচে জলে ভেসে থাকা নরম দুটি পাতা বুঝি। মণির রঙের বাইরের দিকে অদ্ভুত নীলচে যে বলয়টা রয়েছে সেটার জন্য, নাকি ওই রকম টলটল দুটো চোখের জন্য জানি না, বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হয় কেমন যেন আবিষ্ট হয়ে পড়ছি। কিছু একটা আছে, চোখ দুটোয় নিশ্চয়ই তেমন কিছু আছে, না হলে এভাবে টানে কেন? কী অপ্রতিরোধ্য সেই টান যে জানে সেই জানে।

নারীসঙ্গে আমি মোটেও পটু, আসক্ত বা স্বচ্ছন্দ কিছুই নই। মেয়েদের বরং আমি একেবারেই পছন্দ করি না কিন্তু এই মেয়েটার ক্ষেত্রে আমার যে কী হয় বুঝতে পারি না। ওর চোখের আওতার মধ্যে থাকলে আমি যেন কোনো শক্তিশালী চুম্বকক্ষেত্রের মধ্যে অবাধ্য আলপিনের মতো তটস্থ হয়ে থাকি। তাকানোর ওই ভঙ্গিটা এমনই যে, একশো কিলোমিটার দূরে থাকলেও তিষ্ঠোতে দেয় না। বশ্যতা আমার ধাতে নেই তাই অপকেন্দ্রিক তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, পালিয়ে বেড়াই। অপাঙ্গ চাহনিটা আমার নির্জন ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোতে হানা দেয়। আমার সমস্ত একাগ্রতা, অভিনিবেশ তছনছ করে দিতে চায়।

আর অরুণ ভাদুড়ীর কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো, কারণ হাজার কথা বলেও মনে হয় না মানুষটাকে নিয়ে বস্তুত কিছুমাত্র বলে ওঠা যাবে। সত্যিই মানুষটা যেন এক মূর্তিমান ধন্দ। চোখ দুটো যে আসলে এতটাই আলাদা, ভারী ফ্রেমের চশমার পুরু কাচে ঢাকা থাকায় বাইরে থেকে বোঝা অসম্ভব। কিন্তু চশমা সরিয়ে খালি চোখে তাকালে যে কোনো আগন্তুক শিউরে উঠতে পারে। চোখদুটো মুখের তুলনায় একটু বেশিই বড়ো, মণিদুটোর রং বাদামী হলেও তাতে কেমন যেন একধরনের সবজে হলুদ মিশেল আছে। মণিতে মণি রেখে স্থির চোখে তাকিয়ে যে কোনো লোককে কাঁপিয়ে দিতে পারে। পায়ের নীচের ঠান্ডা মার্বেল পাথরের মতো নিথর দৃষ্টি দিয়ে আচ্ছা আচ্ছা লোকের মনোবল শুষে নিতে পারে।

অস্বীকার করে তো লাভ নেই প্রথম দিকে আমি লোকটার নিঃশর্ত অ্যাডামায়ারার ছিলাম, ওর প্রতি একধরণের দ্বিধাহীন সমর্পণ ছিল। তখন ওর কোনো নেতিবাচক দিক আমার চোখেই পড়ত না, যা যা বলত মনে হত স্বতঃসিদ্ধ। এখন সেই মোহাচ্ছন্ন ভাবটা আর নেই, ওর সঙ্গে আমার বহু ব্যাপারেই মতান্তর হয়ে গেছে। তবু লোকটাকে কেন যে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, অস্বীকার করা যায় না, এড়িয়ে যেতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

বাইরের ফলক অনুযায়ী বাড়িটার নাম Beacon Villa। বিকন শব্দের অর্থ সাধারণত বাতিঘর, কিন্তু ‘বি’ এর পর থেকে দু-তিনটে অক্ষর এমনই অস্পষ্ট মনে হতেই পারে লেখা Beckon যার মানে ইশারা করে বা হাতছানি দিয়ে ডাকা। আমার ক্ষেত্রে এই নামটাই এক্কেবারে যথোপযুক্ত মনে হয়। সত্যিই যেন ডাকে, আমার মগজটা ফাঁকা পেলেই বাড়িটা আমায় ইশারা করে ডাকে, আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে। তবে নামে সাহেবি আমলের গন্ধ থাকলেও বাড়িটার দোতলাটা সেই আমলের তৈরি মনে হয় না। তবে একতলাটায় সেরকম কিছু চিহ্ন আছে এখনও। কি জানি বাড়িটা কোনো পুরোনো কলোনিয়াল বিল্ডিং কিনে নতুন করে তৈরি করে নেওয়া, নাকি শুরু থেকেই এদেরই ছিল?

এই বাড়িতে আমার প্রবেশ অবাধ। দারোয়ানটা আমাকে দেখলে উঠে দাঁড়ায় না ঠিক আছে কিন্তু দিন বা রাতের যে কোনো সময়েই হোক আটকায় না। যাই হোক, ভেতরের পরিবেশের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এই সিঁড়িটা দিয়ে যথারীতি নিঃশব্দেই উঠছিলাম। অবশ্য যেভাবেই উঠি না কেন ওদের টের পেতে কোনো অসুবিধে হবে না কারণ বাড়ির নানা কোণে সিসি টিভি ক্যামেরা লাগানো আছে। দোতলা আর তিনতলার মাঝের চাতালটায় থেমে দুপাশটায় চোখ বোলাতে দেখি দুদিকের দুটো দরজাই ভেতর থেকে বন্ধ। অগত্যা তিনতলার দিকে সাপের নমনীয় দেহের মতো প্যাঁচ খেয়ে ওঠা রেলিং এর কাঠের হাতল ধরে শুরুর ধাপটায় পা দিতে যাচ্ছি, বাঁ-দিকের আইভরি রঙের দরজাটা খুলে গেল। আলতো টোকায় পর্দাটা সরিয়ে চৌকাঠের উপর নির্মেদ লম্বা পা’টা রেখে দরজার ফ্রেমের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল চান্দ্রেয়ী। ‘কী ব্যাপার, কোথায় উধাও হয়ে যাওয়া হয়েছিল?’

‘উধাও হয়ে আর কোথায় যাব? বাড়ি গিয়েছিলাম।’

‘সে নিশ্চয়ই এমন অজ গাঁ না যে ফোনের টাওয়ার পাওয়া যায় না?’

‘না না, ফোনটা হারিয়েছি। কেন তোমার বাবা কিছু বলেননি?’

‘হ্যাঁ ওই রকমই কী একটা বলছিলেন বোধহয় কিন্তু আমি ভাবলাম কী জানি আবার, তোমার কথা তো...!’

‘আমার কথায় বিশ্বাস নেই বুঝি?’

‘কেন? অবিশ্বাস একচেটিয়া কি তুমি একাই করতে পারো নাকি? তাছাড়া অবিশ্বাস বলে এই বস্তুটা তো তোমার কাছেই শেখা বস। সব কিছুতেই অবিশ্বাস, আগে অবিশ্বাস তারপর বাকি সবকিছু। প্রমাণ ছাড়া নাকি কোনোকিছুই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না।’

‘প্রমাণ চাই?’

‘না, প্রমাণ বলতে তোমরা যে সব বোঝো সে সবে আমার বড়ো একটা বিশ্বাস নেই জানোই তো।’

বাঁ পায়ের হাঁটুর ওপর ভাঁজ করা ডান পা-টা আড়াআড়ি রেখে গোড়ালি থেকে ঘোরাতে থাকে মেয়েটা। সুদক্ষ শিল্পীর যত্নে গোলাপি পাথর কেটে তৈরি ভাস্কর্যের মতো সুষম একটি পা, হেয়ার রিমুভার দিয়ে প্রতিটা রোম তোলা। অঙ্গপ্রতঙ্গের এমন সব ডৌল রীতিমত বিপজ্জনক, চোখ গেঁথে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা তাই ঝটকা মেরে সরিয়ে নিই।

এই এক আশ্চর্য মেয়ে! এই এখন এমন ভাবে কথা বলছে যেন কত আপন, আমায় নয়নে হারায়, আমার জন্য কত না হাপিত্যেশ করে বসে ছিল! আবার একটু পরেই হাবভাব দেখে মনে হয় চিনতেই পারছে না, আমাকে চেনেই না, কোনোদিনও দেখেইনি! এতদিন ধরে দেখছি কিন্তু যেন থই পেলাম না, কিছুতেই যেন চিনতে পারলাম না! কেন এমন করে, কী বলতে চায়, কী করতে চায়, কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না।

অস্বস্তিটা ঢাকতে ব্যস্ততা দেখাই, অপ্রস্তুত হাসি হেসে আরও তিনটে ধাপ উপরে উঠে দাঁড়াই। আমার অসহায়তা লক্ষ্য করে নিশ্চয়ই চান্দ্রেয়ী মুচকি হাসে, ঘাড়টা সামান্য ঝাঁকিয়ে বলে ‘আচ্ছা আগে উপরে ঘুরে এসো। উনি স্টাডিতেই আছেন। গত পরশু থেকেই দারুণ এক্সাইটেড, উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছেন।’

‘কেন, কী ব্যাপার, কী হয়েছে?’

‘সে তাঁকে গিয়েই জিজ্ঞেস করো।’

‘হ্যাঁ তাই বোধ হয় ডেকেছিলেন, ইমিডিয়েটলি দেখা করতে, বলছিলেন কী একটা দরকার আছে। কোথায় একটা যাবেন না কী যেন বলছিলেন, জানো কিছু?’

‘সে আমি কী করে জানব! যাও, নিজে গিয়েই জিজ্ঞেস করো।’ আবার হেসে ওঠে। নিজের দাঁতের সেটিং এর সৌন্দর্য সচেতন মেয়েরা বোধ হয় এভাবেই ঘনঘন হাসতে ভালোবাসে।

পরের ধাপের দিকে না তাকিয়ে এগোতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ছিলাম আর কী! সামলে নিয়ে ফ্যালফেলিয়ে হাসি আর আমার মুখের চেহারা দেখে ঠোঁটের উপর আঙুলগুলো রেখে হাসতে শুরু করে চান্দ্রেয়ী। হাসি যেন থামার নাম নেই, আমি পিছন ফিরে সিঁড়ি ভাঙতে থাকি। যতদূর সম্ভব দ্রুত পেরিয়ে যেতে থাকি বাকি ধাপগুলো।

অরুণ ভাদুড়ীর ঘরটা সেকেন্ড ফ্লোরের একেবারে শেষপ্রান্তে। একটা লম্বা চওড়ায় বিশালাকার হল ঘর পেরিয়ে ওদিকে যেতে হয়। হলটাকে একটা মাল্টিপারপাস স্টুডিওই বলা যেতে পারে, এখানেই এদের যাবতীয় শুটিং এডিটিং মিক্সিংগুলো হয়। আড়াআড়ি এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াই ওই ভারী শ্যাওলাটে রঙের দরজাটার সামনে।

দরজাটা আধভেজানো ছিল। আমি যে ঢুকেছি সেটা নিশ্চয়ই ওঁর ঘরের মনিটর স্ক্রিনে নজর এড়ায়নি। তাই হয়ত খুলে রেখেছেন, না হলে এদিক দিয়ে দরজাটা সাধারণত বন্ধই থাকে।

একপাল্লা দরজাটা ঠেলে ভেতরে পা দিতেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন ভাদুড়ী। শক্ত টানটান করে বেঁধে রাখা ওর মুখটার রেখাগুলো আমাকে দেখে যেন সহসা সম্মিলিতভাবে হেসে উঠল। ‘আরে ওখানে দাঁড়িয়ে কেন, এসো এসো ধৃতি, তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম, এসো।’ এমন উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে দু-হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন, আমার কনুই এর কাছ দুটো ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে বসালেন চেয়ারে, যে দেখে কে বলবে এই মানুষটার সঙ্গে এক সপ্তাহ আগেই তুমুল কথা কাটাকাটির পর এই ঘর থেকেই হনহনিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গিয়েছিলাম।

এই জন্যেই বলি এই বাড়িটা খুব আনপ্রেডিক্টেবল। এখানে যা কিছুই হতে পারে, যখন তখন যা কিছু। লোকটার বড়োসড়ো মুখটা আজ ঝলমল করছে, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে আনন্দ। বেশ খানিকটা উঁচু থেকে নিজের গদিওয়ালা চেয়ারটার উপর শরীর ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘টুডে আই অ্যাম রিয়েলি ভেরি গ্ল্যাড ডিয়ার। ডিলাইটেড অ্যান্ড এক্সাইটেড।’

‘কেন, কী হল? কোথায় যেন একটা যাবেন বলছিলেন, নতুন একটা জায়গায়, সেই ব্যাপারে কি?’

‘না না, সে তো যাবই। শুধু ওখানে কেন, অনেকগুলো নতুন জায়গার খোঁজখবর এসেছে, সামনের সপ্তাহ থেকে একটা একটা করে সেগুলোর সবকটাতেই যাব কিন্তু এটা একটা গ্র্যান্ড নিউজ, গ্রেট অপরচুনিটি, চান্স অফ আ লাইফটাইম। অনেক বছরের অপেক্ষার পর, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে হাতে এল।’

‘কী হাতে এল? কোন অপরচুনিটির কথা বলছেন?’

‘আমাদের বাংলায় একটা কথা আছে না যে না আঁচালে বিশ্বাস নেই তাই শেষ পর্যন্ত খুব নার্ভাস ছিলাম বাট নাও ইট ইজ কনফার্মড। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ পরশু ফোনে আর গতকাল মেইল করে আমাকে ফাইনালি জানিয়ে দিয়েছে আমিই পাচ্ছি। লাস্টলি আমার প্রোজেক্টটাই ওরা স্যাঙশনড করেছে। সব কিছু ঠিকঠাক এগোলে আর ছ-মাস পর থেকে আমার স্বপ্নের প্রোজেক্ট প্রায় একটা গোটা বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে দু-বার করে ওই রকম একটা পপুলার স্যাটেলাইট চ্যানেলে টেলিভাইসড হবে। ক্যান ইউ বিলিভ ইট ধৃতি, আওয়ার প্রোগ্রাম ইজ গোয়িং টু বি ওয়াচড বাই বিলিয়নস অ্যাক্রস দ্য স্টেট অ্যান্ড দ্য কান্ট্রি? উড ইউ বিলিভ ইট…?’

‘হ্যাঁ একাধিক চ্যানেলের সঙ্গে আপনার কথা চলছে বলেছিলেন। এটা কোন চ্যানেল? আলটিমেটলি কোন চ্যানেলের অ্যাপ্রুভাল পেলেন?’

‘স্যরি সেটা যে এখনই ডিসক্লোজ করতে পারব না। কর্তৃপক্ষের নিষেধ আছে। তবে এটুকু বলতে পারি প্রথম সারির চ্যানেল, ওয়ান অফ দ্য লিডিং বেংগলি চ্যানেলস। আমার উপর ভরসা রাখো, একেবারে পচা ডোবায় বজরা নামাব না।’

‘বাহ তাহলে তো খুব ভালো খবর, কনগ্র্যাচুলেশন স্যার। আপনার অনেক বছরের পরিশ্রম আর চেষ্টা বিফলে যায়নি তাহলে?’

‘না না এখনই সেটা বলার সময় হয়নি। এ তো সবে শুরু, এ তো সবে চৌকাঠে পা। অনেক রাস্তা হাঁটতে হবে ভাই, যে জায়গাটায় যেতে পারলে সে কথা বলা যাবে তা এখনও অনেক দূরে। হাতে সময় খুব কম, জীবন এমন সুযোগ তো আর বার বার দেবে না তাই এই প্রোজেক্টটায় সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপাতে হবে, সেরাটা দিতে হবে।’

‘হ্যাঁ সে তো বটেই।’

‘সে তো বটেই সেটা কি কথার কথাই থাকবে নাকি কাজেও তার কিছু নমুনা দেখতে পাব?’

লোকটা টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়ে চোখ রাখল আমার চোখে। এই তাকানোটাকে আমি খুব সমঝে চলি, পারতপক্ষে এড়িয়ে চলি, ভয় পাই বললেও ভুল হবে না। ‘দেখ ভাই ধৃতিমান, কাজটা কিন্তু শুধু আমার না, কাজটা আমাদের। আমার, তোমার, মলয়ের, অগাস্টিনের, সমরের, শাজাহানের, কাজটা আমাদের সবার। সবাই মিলে জান লড়িয়ে দিতে পারলে তবেই একটা কাজের মতো কাজ দাঁড় করানো যাবে, না হলে এই জাতীয় বেশির ভাগ শো-এর মতো এটা আরও একটা ফ্লপ শো হতে চলেছে, আ বিগ ডিজাস্টার।

আমি হাফ হার্টেড কাজে বিশ্বাস করিনা জানো, দিলে নিজের পুরোটা দিতে হবে, উজাড় করে দিতে হবে। যে করেই হোক এই প্রোগ্রামটাকে সাকসেসফুল করতেই হবে, প্রথম ধাক্কাতেই দর্শকদের অ্যাটেনশন কেড়ে নিতে হবে, অডিয়েন্সের শিরদাঁড়া কাঁপিয়ে দিতে হবে। পুরো ব্যাপারটা যে স্কেলে ভাবা হয়েছে, তোমাদের সহযোগিতা না পেলে সেটা কিছুতেই সম্ভব না। আশা করি বুঝতে পারছো এর পেছনে কতটা অর্থ, আমার কত বছরের রিসার্চ পরিশ্রম স্বপ্ন সাধনা যা বলো সব ইনভেস্ট করা আছে, অতএব অ্যাট এনি কস্ট উই হ্যাভ টু মেক ইট আ হিট।’

‘হ্যাঁ, কিন্তু আমরা তো করেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনার সঙ্গে দিনের পর দিন পড়ে থেকেছি, যেখানে যেতে বলেছেন সেখানে গিয়েছি, প্রত্যেকটা এক্সপেডিশনে গিয়েছি। যেটুকু করেছি নিজেদের কাজ মনে করেই করেছি, আন্তরিকভাবে করেছি, যথাসাধ্য করেছি।’ কিছুটা যেন দুর্বিনীত ভঙ্গিতেই বলি।

‘অস্বীকার তো করছি না, করেছো তো, অনেক করেছো। কিন্তু ওই যথাসাধ্য শব্দটাতেই আমার আপত্তি। মানুষের সাধ্য যে কতদূর মানুষ কি তা নিজেই জানে? তোমার ক্ষমতা যে কতখানি তুমি কি নিজেই জানো? এই কম্পিটেটিভ মার্কেটে কিছুই যথেষ্ট না, উই হ্যাভ টু স্ট্রেচ আওয়ার লিমিটস। উই হ্যাভ টু মেক আ ডিফারেন্স।’

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান অরুণ ভাদুড়ী, আমার দিকে এগিয়ে আসেন দ্রুত। আচমকা আমার হাত দুটো চেপে ধরেন ‘তুমি জানো তোমায় আমি কতটা ভরসা করি। তুমি আর পাঁচজন তো এক নও ধৃতি। তুমি স্পেশাল কারণ তুমি যা পারো সেটা আর কেউ পারবে না।’

‘না না, স্পেশাল স্ফেশাল কিছু নই। অল্পবয়স থেকেই ঘটনাচক্রে এই ফিল্ডটা আমার মিশন, আমার সবচেয়ে বড়ো প্যাশন। তাই হয়ত একটু ডেসপারেট, তার বেশি কিছু না।’

‘তোমার কথা সে কি তুমি বলবে ভায়া? আমার চোখে তোমার মূল্য সে তুমি কী করে জানবে? আমি তো আমাদের ক্লোজড সার্কেলে সবসময় বলি ধৃতিমান আমাদের সবচেয়ে বড়ো অ্যাসেট। সাহস, আত্মবিশ্বাস, দুর্দান্ত বাচনভঙ্গি, সুদর্শন চেহারা, সবকিছুর এমন কম্বিনেশন সত্যিই দুর্লভ।’

‘এসব আপনি বাড়িয়ে বলছেন, সেসব কিছুই না। হাউএভার থ্যাঙ্কস ফর ইওর এনকারেজমেন্ট।’ লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নিচু করি।

‘বাড়িয়ে বলার কোনো স্কোপই নেই, তুমি জানো আমি আবেগশূন্য মানুষ, নির্বিকার নিরপেক্ষ, ম্যান অফ হার্ড ফ্যাক্টস। এতদিন পর্যন্ত প্রোজেক্ট যতটুকু এগিয়েছে, আমাদের পোর্টফোলিও আর যে সব কাজের নমুনা দেখিয়ে আমি ওদের বোর্ড অফ ডিরেক্টরসদের কনভিন্স করাতে পেরেছি তাতে তোমার ভূমিকা অস্বীকার করার তো কোনো জায়গা নেই। ব্যাপারটা যেহেতু রিয়ালিটি-শো তাই তাতে টিম লিডার কাম অ্যাঙ্কর হিসাবে আমার কাছে তুমি কতটা নির্বিকল্প আশা করি তুমিও জানো?’

নিজের প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে, মনে মনে খুশি হলেও আপ্লুত দেখানো আমার স্বভাববিরুদ্ধ তাই দৃশ্যত গম্ভীর হলেও যতদূর সম্ভব বিনয়ের সুরেই বললাম, ‘না না, আমি তো নিমিত্তমাত্র, সাপোর্ট স্টাফ হিসাবে আপনার ইন্সট্রাকশন অনুযায়ী কাজ করা ছাড়া আমি আর কীই বা এমন করেছি? আপনার স্ক্রিপ্ট, ডিরেকশন, এডিটিং, ভিডিওগ্রাফি, সাউন্ড পুরো ব্যাপারটাই আপনার ব্রেন চাইল্ড অতএব এই প্রোজেক্টে নির্বিকল্প যদি কেউ থেকে থাকে তা আপনি। কায়িকশ্রম দিয়ে আপনার পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করা ছাড়া আমি আর কীই বা করতে পারি?’

‘আমাদের শেষ বারের ঝগড়া নিয়ে ঠেস দিলে বুঝতে পারলাম। আমার উপর রাগ এখনও কমেনি মনে হচ্ছে?’ মুখ মুচড়ে হাসেন ভাদুড়ী।

‘না না, ঠেস দেব কেন? রাগ দেখিয়ে হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গিয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু সেই রাগ পুষে রেখেছি এমনটা বোধ হয় না। সে রকম কিছু মনে করলে ফিরে আসতাম কি, জানি না!’

‘মনে করাটাই স্বাভাবিক। সে তুমি মুখে যাই বলো রাগ তো হয়েছিলই, ওই রকম কথা শুনলে কার না রাগ হবে? সত্যিই সেদিন তোমার সঙ্গে আমার আচরণটা একেবারেই ঠিক ছিল না। ওই রকম উদ্ধত উচ্চারণ, ওই ভাবে চিৎকার করে ওঠা— আই অ্যাম দ্য ক্যাপ্টেন অফ দ্য শীপ, সো মাই ডিসিশন ইজ ফুল অ্যান্ড ফাইনাল। আমার এখানে কাজ করতে গেলে আমার কথা মতো চলতে হবে। কথার নড়চড় আমি বরদাস্ত করব না, নিজের মত খাটানোর চেষ্টা। যার পোষাবে থাকবে, না পোষালে দরজা খোলা আছে।

আরও কত কীই না বলেছি, রাগের মাথায় কী সব যা তা বকেছি, আমি আমি করে গলা খাঁকড়েছি। তার জন্য আমি লজ্জিত, প্লিজ কিছু মনে কোরো না ধৃতি। তুমি আমার সন্তানের মতো, সন্তানের উপর পিতার তো কিছু অধিকার থাকেই, কিছু দাবি। তাই বলি আমায় ভুল বুঝোনা, হিট অফ দ্য মোমেন্টে কী বলতে কী বলেছি কিছু মনে রেখো না। শেষ তিন মাস ধরে কাজটা পাওয়া না পাওয়া নিয়ে নানা রকম টেনশনে ছিলাম, চাপের মাথায় ভুলভাল অনেক কিছুই মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মানুষ মাত্রই তো ভুল হয় বলো, মানুষ বলেই তো ভুল…।’

কিছু কথা বলতে পারতাম, কিছু কথা বলা উচিতও ছিল কিন্তু কোনো কথাই শেষ পর্যন্ত যেন বলে উঠতে পারলাম না। ঘাড় কাত করলাম, সামান্য মাথা নেড়ে বোঝাতে চাইলাম বুঝতে পারছি, ওঁর বক্তব্য বুঝতে চাইছি। লোকটা আমার ঘাড়ে হাত রাখল ‘যা হওয়ার হয়ে গেছে, ফরগেট দ্য এপিসোড। কাজে ফিরে এসো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আবার আগের মতো কাজে লেগে পড়ো। আমাদের সামনে এখন অনেক কাজ। কাজের পাহাড় বলতে পারো অথচ হাতে সময় খুব কম। এতবড়ো সুযোগ যখন হাতে এসেছে আমরা কিছুতেই এটাকে হালকা ভাবে নিতে পারি না। দিন রাত এক করে নতুন করে ঝাঁপাতে হবে, প্রাণপাত করে দিতে হবে, আমি চাই কাজটা শুধু বাংলাতে না সারা ভারতের এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে এটা একটা মাইলস্টোন কাজ হোক।’

‘সে তো বটেই কিন্তু নতুন করে মানে? আপনি যে বললেন অ্যাপ্রুভাল হয়ে গেছে? আমাদের কাজকর্ম দেখেই তো ওদের বোর্ড অফ ডিরেক্টরসরা অ্যাপ্রুভ করেছে নাকি?’

‘হ্যাঁ সে তো বটেই, আমার লজিক আর পার্সপেক্টিভটা ওদের ইউনিক লেগেছে। আমাদের কাজের মেথড, ভিডিও শুট, ন্যারেশন, প্রেজেন্টেশনের স্টাইল ওদের পছন্দ হয়েছে। আমাদের অলরেডি যা কিছু রেডি আছে সে সব দিয়ে অন্তত বিশটা এপিসোড নামিয়ে দিতেই পারি কিন্তু তুমি তো জানো আমি অবসেসিভ মানুষ, ভয়ানক খুঁতখুঁতে, আমি কিছুতেই সন্তুষ্ট হই না। সবকিছু এতটা এগিয়ে যাওয়ার পরেও এখন কেমন যেন মনে হচ্ছে অনেক খামতি রয়ে গেছে, ইম্প্রুভমেন্টের অনেক স্কোপ রয়েছে, হাতে যখন বেশ কিছুটা সময় রয়েইছে আমার মনে হয় আমাদের সেরাটা দেওয়া দরকার, কী বলো?’

‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।’

‘আমার মনে হয় হাতে যা যা আছে তা তো আছেই তবুও আত্মতুষ্টির কোনো জায়গাই নেই। আমরা কাল থেকে আবার নেমে পড়ব, এমন ভাবে নামব যেন আজই প্রথম নামছি। নতুন কিছু পজেসড হাউসের খোঁজ এসেছে, লোকেশনগুলোও নাকি বেশ ইন্টারেস্টিং। তুমি তাড়াতাড়ি কাজে ফেরো ধৃতি, উই হ্যাভ টু মেক মোস্ট ওফ দেম, তোমার উপর সব ডিপেন্ড করছে, তোমায় ছাড়া কিছুই সম্ভব না।’

‘আচ্ছা দেখছি, আমি তো এখন এখানেই আছি, দেখছি।’

‘দেখছি না, কাল থেকেই। সি ইউ টুমরো শার্পলি অ্যাট ফাইভ ও ক্লক ইন দ্য ইভনিং।’

‘আচ্ছা তাই, তাই হবে…।’ এমনভাবে মাথা নাড়লাম যেন কত বাধ্য ছেলে! এই সব সময়ে আমায় নিজেকে দেখে নিজেরই কেমন অবাক লাগে! কী হয় কে জানে, এই লোকটার সামনে এসে দাঁড়ালে কী যে হয়!

অথচ এই লোকটাই আমার সবচেয়ে বড়ো অন্তরায়। আমার একক বা স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাওয়ার সবচেয়ে বড়ো বাধা। আসলে পুরো বিষয়টা নিয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গিটাই আলাদা। সেভাবে প্রকট না হলেও ওর সঙ্গে আমার প্রচ্ছন্ন দ্বন্দ্বের মূল জায়গাটা এই অ্যাপ্রোচ বা বিশ্বাস যাই বলা যাক সেই জায়গা থেকেই। যতদিন যাচ্ছে সেই দ্বন্দ্বটা ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে, ফাটল রেখাটা স্পষ্ট হচ্ছে কিন্তু তাতেই বা কী এসে যাচ্ছে এমন? এত যে ঝগড়া করছি, এত মতান্তর কিন্তু আমরা তো আলাদা হচ্ছি না! শেষমেষ তো সেই আবার সেই আগের জায়গায়, ঘুরে ফিরে সেই পাশাপাশি।

আমাদের যেন একে অপরকে ছাড়া চলবে না। আসলে এই অরুণাক্ষ ভাদুড়ী লোকটা নিজের কাজের জায়গাটায় এত দক্ষ, বিপুল পড়াশুনো আর আধুনিকতম টেকনোলজিক্যাল জ্ঞানগম্যির এমন সমন্বয় সচরাচর দেখা যায় না। বছর পাঁচেক আগেও কলকাতার একটা কলেজে ফিলোজফি পড়াতেন। কিন্তু ভালো ছাত্রের অভাব বা দিন দিন কলেজগুলোয় পড়াশুনোর পরিবেশ নষ্ট হয়ে আসায় শেষদিকে এক প্রকার হতাশ হয়েই ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট নেন আর নিজের উদ্যোগেই নিজের মতো করে ব্লগ লেখালেখি, ডকুমেন্টারি, শর্ট ফিল্ম বানানো ইত্যাদি শুরু করেন। সেই সব দিয়েই হাত পাকাতে পাকাতে বছর তিনেক আগে থেকেই শুরু করেন এই টেলি শো-এর প্রস্তুতি। নিজের কাজে বাইরের কারও নাক গলানো বা খবরদারি বরদাস্ত করবেন না, সেই জন্য টাকা পয়সার জন্য কারও কাছে হাত পাতেননি।

ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা এমনই এক মধ্যরাতে জলঙ্গী নদীর ধারের এক নীলকুঠির ভগ্নাবশেষের পিছন দিকে। দু-জনেই দু-জনকে দেখে যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম, দুজনেই দুজনার উপর টর্চ মেরে আপাদমস্তক বিস্ময়াভিভূত দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। পরিচয় হওয়ার পর দু-জনেরই মনে হয়েছিল এতদিন আমরা যেন ঠিক এমনই আরেকজনকেই খুঁজছিলাম, দৈবক্রমেই যেন আজ হঠাৎ দেখা হয়ে গেল। অবশ্য দেখা হওয়ার ফল যে অবিমিশ্র ভালো হয়েছে কখনই বলব না। সম্পর্কটা থেকে উপকৃত যেমন হয়েছি তেমনই সমীকরণটা গিয়েছে অনেক রকম ওঠানামা ভুল বোঝাবুঝি মন কষাকষির মধ্যে দিয়ে। নানা টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে বাধ্য হয়ে লোকটাকে অবশেষে মেনে নিতে শিখেছি, সহ্য করতে শিখেছি, হাজার দ্বিধা দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও নিজের বেছে নেওয়া নির্জন পথের ভবিতব্য বলে মানতে পেরেছি।

যাই হোক কাজের কথায় ফেরা যাক, সময় নষ্ট না করে নতুন উদ্যমে আবার কাজে লেগে পড়েছি আমরা আর আজ আমরা যে বাড়িটা কভার করতে এসেছি সেটার ব্যাপারে এই এলাকার লোকজন হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত যে এটা একটা হন্টেড প্লেস। সকালের দিকে আমরা তিনজন মানে ড্রাইভার উত্তম সাধুখাঁ, আমি, শাজাহান আলিদা এখানে এসেছি। অবশ্য ভাদুড়ী স্যার, ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট অগাস্টিন মন্ডল, ম্যানেজার মলয় পোদ্দার আর ক্যামেরা পার্সন সমর রক্ষিত পৌঁছে গিয়েছেন গতকালই। এসেই যে যার মতো কাজে লেগে পড়েছি বটে কিন্তু আমাদের কাজ আর তেমন ভারী বলতে কিছু নেই। কলকাতার কাছেই এই মফস্বল শহরে গতকাল এসে নামার পর থেকে কঠিন কাজগুলো নব্বইভাগই প্রায় সেরে রেখে দিয়েছেন ভাদুড়ীবাবু, মলয় পোদ্দার আর অগাস্টিনদা। থানার পারমিশন নেওয়া, লোকাল কাউন্সিলারের সঙ্গে দেখা করে রাজি করানো, এলাকার লোকজন পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে বাড়িটার হিস্ট্রি যতদূর সম্ভব জেনে নেওয়া ইত্যাদি প্রাথমিক কৃত্য তো সেরে রেখেছেনই, পরপরই দিনের আলো থাকতে থাকতে ভেতরে ঢুকে ছেঁচে ফেলে দিয়েছেন বাড়িটার প্রতিটা কোণ।

বাড়িটা এমনিতে একতলা, বিল্ডিং এরিয়াটা বেশ ছড়ানো, বাইরে থেকে এখনও সুদৃশ্য। শেষ তেরো বছর ধরে বাড়িটা তালাবন্ধ পড়ে আছে কিন্তু বছর কয়েক আগে মাঝরাতে চোরেরা চিলেকোঠার ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকেছিল। ভেতরে চুরি করার মতো দামী অনেক জিনিসই আছে, তাই শাবল গাঁইতি দিয়ে দরজাটা দেওয়াল থেকে উপড়ে, সিঁড়ির গ্রিলের তালা অ্যাসিড দিয়ে গলিয়ে নেমে এসেছিল নিচের তলায়। বেশ কিছু জিনিসপত্র বাইরেও চালানও করে দিতে পেরেছিল ছাদ আর পেছনের পাঁচিল মারফত কিন্তু বাথরুমের উল্টোদিকের ঘরটার সিলিং ফ্যানটা খুলতে গিয়ে ঘটে যায় এক আশ্চর্য বিপত্তি। লোকটা নাকি একটা কাঠের চেয়ারে উঠে প্লায়ার্স দিয়ে সিলিং এর আঙটা থেকে নাটবোল্ট খুলে পুরোনো দিনের ওরিয়েন্ট কোম্পানির ফ্যানটাকে নামানোর চেষ্টা করছিল, আচমকা সাদাটে চোখ ঝলসানো বিদ্যুৎ ঝলকে ওঠে পাখাটার বডি জুড়ে! নিমেষে সেই ঝলকানি ছড়িয়ে পড়ে লোকটার শরীর বেয়ে, দলের আরেকজনের চোখের সামনে ভয়ানক জোরে থরথরিয়ে কেঁপে উঠে মাটিতে ছিটকে পড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট দেহটা। তীব্র যন্ত্রণায় দুমড়ে মুচড়ে পোড়া তারাকাঠির মতো বেঁকেচুরে গিয়ে শরীরটা থমকে যায় হঠাৎ। সেই লোকটা তো ওখানেই শেষ আর যে লোকটা ঘটনাটা চোখের সামনে দেখেছিল সে ওখানেই মুখে গ্যাঁজলা উঠে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে। চুরি করার মতো এখনও অনেককিছু আছে ওই বাড়িতে, অথচ সেই থেকে কেউ, চোর ছিনতাইবাজ সমাজ বিরোধী মনে হয় না আর কেউ এ বাড়িতে ঢোকার বা পা দেওয়ার সাহস করেছে।

তারপর প্রায় দেড় বছর পর সম্ভবত ভাদুড়ীবাবুই প্রথম যিনি পা দিলেন বাড়িটার ভেতরে। পুরু ধুলোর উপর পায়ের ছাপ দেখে অন্তত তাই মনে হল। তবে চিলেকোঠার ওই ভাঙা দরজা দিয়েই আমাদের বাড়িটার ভেতরে আসতে হচ্ছে। রাতের শুটের প্ল্যানটা স্যারের কাছ থেকে বুঝে নিতে দুপুরবেলায় আমরা সবাই দাঁড়িয়ে ছিলাম বাথরুমের উলটো দিকের সেই ঘরটায়। ক্যামেরা পজিশন কোথায় হবে, আমার মুভমেন্টটা কোন দিক থেকে কোন দিকে হবে শুনছিলাম মনোযোগ দিয়ে, অগাস্টিন মন্ডল হাতের খাতায় পেনসিল দিয়ে আঁক কষছিল আর মলয়দা মাথা তুলে একভাবে তাকিয়ে ছিল পুরু ধুলো ঝুলকালি মাখা ফ্যানটার দিকে। ঘাড় বেঁকিয়ে বলে উঠল, ‘কিন্তু এর মধ্যে অস্বাভাবিক কী দেখলেন বুঝতে পারছিনা, এ তো হতেই পারে, ফ্যানটা নিশ্চয়ই খুব বাজে ভাবে বডি-কারেন্ট হয়ে ছিল, তাই হাত দিয়ে ধরতেই …।’

‘রাবিশ!’ গাল ফুলিয়ে মুখটা ছুঁচোলো করে সরু দণ্ডের আকারে ধোঁয়া ছাড়তে থাকেন ভাদুড়ী, আধপোড়া সিগারেটটা জুতোর তলায় ফেলে ডলতে ডলতে বলেন, ‘এত বোধবুদ্ধি সত্ত্বেও মাঝেমধ্যে এমন সব কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো কথা বলিস না, কী বলব!’

‘কেন? ভুলটা কী বললাম?’

‘যে বাড়িটা গত তেরো বছর ধরে তালাবন্ধ পড়ে আছে, সেই বাড়িতে কয়েক বছর আগে অবধিও পাওয়ার হাউস ইলেক্ট্রিসিটি কানেকশন রেখে দিয়েছিল বলতে চাইছিস?’ তেরছা চোখে তাকান ভাদুড়ী।

মলয়দা লজ্জা পেয়ে হাসে, ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে মাথা কাত করে। সত্যিই, শুধু ইলেকট্রিসিটি পোল থেকে বলেই নয়, এই বাড়িটা যেন পুরো মহল্লা থেকেই বিচ্ছিন্ন। অবস্থানগত ভাবেও বাকি লোকালিটির থেকে বেশ কিছুটা ভেতর দিকে। গম্ভীর শোনায় ভাদুড়ীর গলা ‘শোনা যাচ্ছে ওই সিলিং ফ্যানটায় ফাঁস লাগিয়েই নাকি বিশ্বনাথ ধর নামক ওই বাড়ির মালিকের ছোটো বোনটা সুইসাইড করেছিল। অবশ্য বাড়ির বাকি মানুষগুলোর মৃত্যুগুলোও অপঘাতই। বিশ্বনাথবাবু কাজ করতেন নেভিতে, রিটায়ারমেন্টের পর এখানে এসে বাড়িটা কেনেন আর কিছু বন্ধুবান্ধব মিলে শেয়ারে হোটেল ব্যবসা শুরু করেন। লোকগুলো নাকি ভারী অদ্ভুত ছিল, একেবারেই মিশত না পাড়াপড়শির সঙ্গে। এনএইচ থার্টি ফোরের উপর এক রোড এক্সিডেন্টে হঠাৎই একদিন ভদ্রলোক আর ওঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়। তার পর থেকে এই বাড়িতে তাঁর দুই অবিবাহিত বোন থাকতেন। এলাকার লোকজনের মুখে যা শুনলাম তাতে ওদের মতে ওদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ছিল না। বড়ো মেয়েটার অদ্ভুত আচরণের কথা যে সব টুকরো কানে এল তাতে মনে হল হয় ওগুলো মৃগী, হিস্টিরিয়া বা কোনো জটিল মানসিক বিকার না হলে ওগুলোকে আন-ন্যাচারাল ছাড়া আর কী বলা যায়? আর ছোটো মেয়েটা দিনের আলো নেভার পর থেকে বেশিরভাগ সময়েই নাকি ছাদেই থাকত, তাকে নাকি আজও মাঝেমাঝেই ছাদের আলসেতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।’

‘হ্যাঁ, আমার কানেও অনেক কথা এল। একজন তো এও বলল এই বাড়িতে গেলে নাকি কেউ ফিরে আসে না।’ শাহাজান দা বেশ সিরিয়াস টোনে বলেন। ভাদুড়ীবাবু ওঁর দিকে অপাঙ্গে তাকান, ভ্রু নাচিয়ে মৃদু হাসেন ‘তাই নাকি, কিন্তু আমাদের যে ফিরতেই হচ্ছে, আমরা যেখানে ঢুকি সেখান থেকে বেরিয়েও আসি, কী বল আলি ভাই!’ ‘হ্যাঁ এরকম কত জায়গায় গেলাম, কত জায়গা থেকেই তো বেরিয়ে এলাম!’ ‘এক্সাটলি, বেরিয়ে আসাটাই তো আমাদের কাজ। বেরিয়ে এসে এই এলাকার লোকজনকেও দেখিয়ে যেতে হচ্ছে তাহলে।’ ঠোঁটের কোণটা কামড়ে ধরে সিঁড়ির নিচের স্যাঁতসেঁতে প্রায়ান্ধকার গলি মতো প্যাসেজটার দিকে এগিয়ে যান ভাদুড়ী। ঘাড়ে হাত দিয়ে আমাকে ওই দিকে নিয়ে দাঁড়ান বেশ কিছুটা ভেতরে ‘কী বুঝছ ধৃতিমান, প্রাইমা-ফেসি দেখেশুনে কী মনে হচ্ছে?’

আত্মবিশ্বাসী কাঁধ ঝাঁকাই আমি, মাথা নেড়ে বলি ‘বোঝার আর কী আছে, এই হল টিপিক্যাল পাবলিক আই! ওরা দেখবেই, বাড়িটায় পর পর যেহেতু ওইরকম অনেকগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে তখন ওরা এখানে অনেক কিছুই দেখবে। যেমন করে আমরা সুন্দরবনে গিয়ে বাঘ দেখি আর কী, গোসাপের ল্যাজের ঘায়ে ঝোপটা নড়ে উঠলেও মনে হয় ওই তো বাঘের মাথাটা সরে গেল। আসলে এই এলাকার লোক এই বাড়িটায় ভূত দেখতে চাইছে তাই ভূত দেখছে। ওই মেয়েটার আদলে ভূতের একটা কল্প ছবি ওদের মস্তিষ্কের ভিসুয়াল মেমরিতে অলরেডি স্টোরড হয়ে আছে। তাই রাতে ওই বাড়িটার ছাদের দিকে চোখ পড়লে ব্রেনে ভিসুয়াল পারসেপশনটা যে জায়গাটায় তৈরি হচ্ছে সেখানে পাশে এসে বসে থাকা মেমরি এরিয়ার সেই ভূতের ছবিটা ঢুকে পড়ছে অজান্তেই। অন্য কিছু দেখার সঙ্গে ইমেজটা খাপে খাপে মার্জ করে যাচ্ছে। উদ্বেগ আশঙ্কা ভয় কল্পনা সব মিলেমিশে মাথার মধ্যে তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিভ্রম, আই অ্যাম শিয়োর ইটস আ ক্লিয়ার কেস অফ অপটিকাল ইলিউশন।’

‘অ্যাজ অলওয়েজ, ইউ আর অলওয়েজ শিয়োর ধৃতি, বাট অাই অ্যাম নট শিয়োর।’ স্থির চোখে তাকান ভাদুড়ী, নতুন একটা সিগারেট ধরান, ‘বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এমনই এক জটিল জায়গা, আই অ্যাম নেভার শিয়োর। তাছাড়া আমি কোনো জাজমেন্টের জায়গায় যেতে রাজি নই, বিশ্বাস অবিশ্বাস কোনো পক্ষ নিতেই রাজি না, কোনো সিদ্ধান্তে আসতে রাজি না। আমি জাস্ট দেখতে চাই, মানুষকে দেখাতে চাই, আমার মত করে মহাবিশ্বের চিরকালীন কিছু রহস্যকে বুঝতে চাই। এখানে কোনো তর্ক, কোনো বায়াস বা প্রেজুডিসকে প্রশ্রয় দিতে আমি রাজি না।’

‘কিন্তু আপনি তো চান মানুষ ভয় পাক। বিশ্বাস করেন ভয়টা একটা দুর্দান্ত ফর্ম অফ এন্টারটেইনমেন্ট। বলেন আপনার শো-এ ভয় ব্যাপারটা ঠিক মতো দেখাতে পারলে এটা হিট হতে বাধ্য।’

‘হ্যাঁ বলি তো, কারণ ভয় মানুষের একটা প্রাইমাল ইন্সটিঙ্কট, মানুষ ভয় পেতে ভালোবাসে।’

‘কিন্তু সত্যিকারের ভয় সে কি কখনই আনন্দের হতে পারে?’

‘নয় তো, সত্যিকারের ভয় কোনোদিনই সুখকর না তাই তো ভয়টাকে একটা নিরাপদ দূরত্ব থেকে দর্শকদের দেখানোর এই আয়োজন। ভয়ের জিনিসটা সত্যিই ভয়ের বলে তাকে ওই নিরাপদ দূরত্ব থেকে দেখলে আমাদের মনে একটা সাহস বা নিরাপত্তা জন্মায় যে হ্যাঁ এক্ষেত্রে আর যাই হোক ওটার বিপজ্জনক দিকটা তো কিছুতেই আমার ক্ষতি করতে পারছে না। মাঝখানে এই দুর্লঙ্ঘ্য স্পেসটাকে রেখে দিয়ে ভয়ঙ্করকে দেখার বা ফিল করা সুখকর কারণ এখানে তো ভয়ের দাঁত নখগুলো সব ভোঁতা করে দেওয়া গেছে, এখানে তো ভয়ের সেই বিষটাতো আমায় ছুঁতে পারছে না। কী বল?’

‘হুম, সে তো বটেই, সে তো ঠিকই আছে।’

‘কিন্তু যেখানে সেই দূরত্বটা নেই? যেখানে মানুষ সরাসরি সেই রিয়েল ভয়টাকে ফেস করছে, প্রায় প্রতিদিনই তার মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে সে জায়গাটার কথা কী বলবে ভায়া?’ হাতের কাছে ঝুলন্ত একটা বিশাল মাকড়সার জাল হাত দিয়ে সরিয়ে সেই চিরাচরিত থমথমে চোখে আমার দিকে তাকায় লোকটা ‘দর্শকদের তো নিরাপদে রাখতে পারলে কিন্তু আমরা… আমাদের কী হবে ধৃতি?’

‘কেন, আমাদের কী হল, আমাদের আবার কী হবে?’

‘না হলেই ভালো, কিন্তু সে যত যাই বলো এসব জায়গা তো আলটিমেটলি মোটেও ভালো জায়গা না। এই সব ডার্ক অ্যান্ড প্রবলেমেটিক প্লেসেস অফ দ্য আর্থ।’

‘কেন ভালো-মন্দের কী হল, প্রবলেমেটিক বলতে? এতদিন এই ফিল্ডে কাজ করছি আমার চোখে তো তেমন প্রবলেমের কিছু চোখে পড়ল না, মন্দ ভালোর ফারাক!’

‘চোখে না পড়লে কী এসে যাবে বলো, তোমার আমার কী মনে হয় তাতেই বা কী এসে যায়? যদি কিছু থাকার হয় সে তুমি মানলেও আছে, না মানলেও আছে। আমার নিরপেক্ষভাবে আছে।’

‘কী থাকার কথা বলছেন, কী আছে? আপনার নিরপেক্ষভাবে কী আছে?’

‘কী বলতে পারব না কিন্তু কিছু তো আছেই। আমাদের লজিক, বোধবুদ্ধির বাইরে নামহীন পরিচয়হীন সংজ্ঞাহীন। সাম ডার্ক ফোর্সেস লার্কিং ইন সাচ কর্ণারস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। জানিনা মানুষের উপর এদের প্রভাব আছে কিনা, আমি নিশ্চিত নই। ইনফ্যাক্ট যতদিন যাচ্ছে মনে হচ্ছে আমি আর কিছুতেই নিশ্চিত না, কোনো ব্যাপারেই…’

‘ডার্ক মানেই নেগেটিভ কি হতেই হবে?’ বলতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে কথাটা গিলে নিই। কথা বাড়ালেই কথা বাড়বে, এখন কাজের সময় তাই চুপ করে যাওয়াই ভালো। আরও খানিকটা ভিতর দিকে এগিয়ে যান ভাদুড়ী, ‘আচ্ছা কী মনে হচ্ছে, এই জায়গাটার টেম্পারেচার বাড়িটার অন্য সব জায়গার চেয়ে একটু বেশিই ঠান্ডা মনে হচ্ছে না? এই জোনটার ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডটা চেক করা দরকার, অগাস্টিনকে একবার ডাক দাও তো। বলো আমাদের নতুন ইএমএফ মিটার, টেম্পারেচার সেন্সরটা আনতে আর তোমার কাছে ইভিপি রেকর্ডারটা তো আছেই। আমার ধারণা রাতের দিকে এই জায়গাটায় শুধু ম্যাগনেটিক ফিল্ডই না টেম্পারেচার ফ্লাকচুয়েশনসও ডিটেক্ট করা যাবে আর খুব লো ফ্রিকুয়েন্সির সাউন্ড। গন্ধটা খেয়াল করছ, টিপিক্যাল সেই গন্ধ...?’

‘হ্যাঁ, এতদিন বন্ধ পড়ে থাকা বাড়ির কোণে তো এই গন্ধটা থাকবেই। আপনারা, মানে প্যারানরমাল এক্সপার্টরা বলেন এই সব জায়গার হাওয়াটার ক্যারেকটারটাই নাকি পুরো আলাদা, এই সব হাওয়ায় কার্বন মনোক্সাইডের পার্সেন্টেজটা নাকি খুব বেশি থাকে...।’

‘আমরা মানে?’ মাথা ঘুরিয়ে তাকান অরুণ ভাদুড়ী, ‘কেন আমরা যা বলি তুমি বলো না, তুমি আমাদের কেউ না?’

মাথা নাড়িয়ে লাজুক ভঙ্গিতে হাসি আমি, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলি তো, আপনার স্ক্রিপ্টে যা যা লেখা থাকে সবই তো হুবহু বলি। কেন বলি না? আমার প্রফেশনালিজম নিয়ে আপনার নিশ্চয়ই কোনো সন্দেহ নেই, কোনো অভিযোগ নেই?’

‘কিন্তু প্রফেশনালিজম মানে কি শুধু মালিকের কথা মেনে চলা? একই বিশ্বাসের জায়গা থেকে কাজটা করলে পারফরম্যান্স আরও ভালো হতো নাকি?’

‘না আমার তা মনে হয় না। এই নিয়ে এতদিন তো কোনো সমস্যা হয়নি, হয়েছে কি?’

উত্তর দেন না ভাদুড়ী , মুখ ফেরান অন্ধকারের দিকে। এই জায়গাটা দিনের বেলাতেই এই ধরণের সোঁদাটে গন্ধযুক্ত কেমন যেন চিটচিটে ভ্যাপসা একধরনের অন্ধকার, তো রাতে কী হবে আন্দাজ করা যেতে পারে। কোণের দিকে বন্ধ একটা মরচে ধরা কোলাপসিবল গেটের সামনে স্ট্যান্ড করানো একটা পরিত্যক্ত বহু পুরোনো মডেলের স্কুটার। কিছু না হলেও বিশ বছরের ময়লার আস্তরণ চেপে রয়েছে গায়ে। পাশের টেবিলের উপরে রাখা একটা মান্ধাতার আমলের বাক্স-টিভির খোল। তার পিছনের লোহার র‌্যাকটার একপাশ থেকে একেবারে তলা অবধি কাপড় বা পর্দা কী যেন একটা ঝুলছে। ডান হাতের মাথা-ছুঁচোলো লাঠিটা দিয়ে ওটা কী ধরণের বস্তু বুঝে নিয়ে কান খাড়া করে উলটো দিকে তাকান উনি।

‘অরুণ দা, এদিকে একবার আসুন,’ ড্রয়িংরুমের ওই প্রান্ত থেকে সমরদার গলা ভেসে আসে। ‘কোন দিকে, তুমি কোন দিকে?’ সাড়া দিয়ে বাইরের দিকে পা বাড়ান ভাদুড়ীবাবু।

‘এই তো কিচেনের পাশের স্টোররুমটায়, এই জিনিসটা কাল চোখে পড়েনি।’

‘কোন জিনিস? আর বোলো না, আমার চোখটা আজকাল এমন বাজে ভাবে বিট্রে করছে, তোমাদের চোখ এড়িয়ে গেলে আমারও গেছে নিশ্চয়ই।’

দ্রুত পায়ে এগোতে থাকেন, আমাকে ইশারা করে ডেকে পা চালান। ‘কই দেখি, কী চোখে পড়ল দেখি? তোমার তো আবার ক্যামেরাম্যানের চোখ, দেখি কী দেখলে?’

ড্রয়িংরুম লাগোয়া খোলা কিচেনটা দিয়ে বাঁ দিকে ঢুকলেই স্টোররুমটা পড়ে। দরজার পাল্লাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখি সমরদা ঘাড় উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে, চোখ নিবদ্ধ দেওয়ালের গায়। ওর মাথার সোজা উলটোদিকের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে ওর মতোই নিশ্চল দাঁড়িয়ে গেলাম আমরা দুজনও। এ কী! এ কী দেখছি? চোখের ভুল না তো? না না তা কী করে হবে, এত স্পষ্ট! বাইরে এখনও কটকটে আলো কিন্তু এই ঘরটার ভেতর ঘুপচি অন্ধকার হলেও পরিস্থিতি এমন না যে কিছুই দৃষ্টিগোচর হবে না। অবশ্য এ জিনিস ঘন অন্ধকার হলেও চোখ এড়ানোর না। দিনের আলোয় নজরে নাও পড়তে পারে কিন্তু রাত হলে তো পড়বেই, আরও বেশি করে পড়বে, পড়তে বাধ্য।

‘এ কী করে সম্ভব! ইম্পসিবল, আটারলি ইম্পসিবল! সমর অন করো, ভিডিও ক্যামেরা অন করো।’ অরুণ ভাদুড়ীর ভারি গলার প্রতিধ্বনিতে ঘরটার ভেতরের বদ্ধ বাতাস থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে। আমি তাকিয়ে আছি হাঁ করে, এ কী করে হতে পারে, সোজাসুজি দেওয়ালটার সিলিং এর গায়ের টিউব লাইটটার ডান কোনটা এভাবে জ্বলছে কী করে! না ঠিক জ্বলছে বলা যাবে না, কোণটা যে কোনোভাবেই হোক জ্বলে আছে। হলদেটে ক্ষীণ একটা আলো। পুরোনো আমলের মোটা টিউবটার কাচের উপর জমে থাকা কালো ঝুলকালির স্তর ভেদ করে আলোটার উজ্জ্বল হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই কিন্তু এটুকুই বা কী ভাবে জ্বলে আছে?

অনেক সময় জ্বলে থাকতেই পারে, এই জাতীয় টিউবলাইটের ভেতরে যে পারদ বাষ্প পোরা থাকে সেটা চোক থেকে ব্যাক ইন্ডাকশনের ফলে বা সার্কিটের গণ্ডগোলে এই রকম আলো তৈরি করতেই পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে সে কী করে হতে পারে? যে বাড়িতে শেষ বিশ বছর কোনো ইলেকট্রিসিটি কানেকশনই নেই তার টিউবের ভেতরে ইন্ডাকশনের প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে? এ কী অদ্ভুত ব্যাপার, এ কী ভুতুড়ে কাণ্ড! ভাদুড়ী চিৎকার করে ওঠেন, ‘কাল তো এই ঘরে এসেছিলাম, একাধিক বার এসেছিলাম। দিনে রাতে কখনই তো দেখিনি, টিউবটার এই দিকটা এইভাবে জ্বলে থাকতে দেখিনি? কাম অন কুইক, ক্যামেরা অন করো, মুভি স্টিল দুটো দিয়েই ক্যাপচার শুরু করো।’

ডি এস এল আরটা গলাতেই ঝোলানো ছিল রক্ষিতের। মলয় পোদ্দার দৌড়ে গিয়ে মুভিটা আনতেই সেটাও দ্রুত রেডি করে কাজ শুরু করে দেয় সমরদা। বাড়িটার সম্ভাব্য সমস্ত ছোটোখাটো সন্দেহজনক ব্যাপারই রেকর্ড করা আমাদের টিমের অ্যাসাইনমেন্টের মধ্যেই পড়ে, তো এরকম একটা ঘটনার ক্ষেত্রে তো কথাই নেই।

আমরা অবাক চোখে তাকিয়ে আছি কিন্তু ঠিক নিচের কংক্রিটের স্ল্যাবটায় পা দিয়ে উঠে দাঁড়ালে আমার মতো উচ্চতার মানুষ সহজেই টিউবটার নাগাল পেতে পারে। রেকর্ডিংটা শেষ হতেই আমি এগিয়ে আসি, ‘দাঁড়ান তো একবার আমি দেখছি, টিউবটার কেসটা কী দেখছি।’ হতভম্ব অবস্থাটা ভেঙে নড়েচড়ে উঠলাম, মুহূর্তের মধ্যে শরীরে একটা উর্ধ্বমুখী ঝাঁকুনি তুলে এগিয়ে গেলাম। স্ল্যাবটার উপর দু-হাতে ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠতে যাব পেছন থেকে টেনে ধরল সমর রক্ষিত, ‘এ কী করছ, এ কী করছ?’

‘ধৃতি ধৃতি, এটা কী হচ্ছে ? ডোন্ট গো দেয়ার, ডোন্ট মুভ অ্যাহেড প্লিজ।’ টেনে ধরেন ভাদুড়ীও, চেঁচিয়ে ওঠেন গলা ফাটিয়ে, ‘কী পাগলামি করছ, ছেলেমানুষী কোরো না। কী করতে যাচ্ছ জানো, কী ডেঞ্জারাস ব্যাপার কোনো ধারণা আছে?’

নেমে হাতের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলি, ‘কেন, কী হয়েছে, টিউবটা খুলে দেখলেই তো বোঝা যেত, ব্যাপারটা কী?’

আমার হাত ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে আসেন অরুণ ভাদুড়ী, ‘সাহস ভালো কিন্তু দুঃসাহস ভালো না। ডোন্ট আন্ডার এস্টিমেট দ্য পাওয়ার অফ ইভিল। আমি নিশ্চিত এটা একটা হন্টেড কর্নার আর ওই আলোটা হল একটা ক্লিয়ার সাইন অফ দ্যাট এগজিস্টেন্স। আর তুমি সেই টিউবটা খুলে দেখতে যাচ্ছ, মাথা ঠিক আছে তো?’

চৌকাঠের বাইরে থেকে আড়চোখে আলোটার দিকে তাকিয়ে থাকি। লোকটা বড়ো বড়ো চোখ করে বলে, ‘দূর থেকে দেখ, অন্তত তিন হাত তফাতে থেকে যা খুশি করো। অবসার্ভ করো, এগ্ জামিন করো, ইনভেস্টিগেট করো কিন্তু কোনো ভাবেই ডায়রেক্ট কনট্যাক্টে যেও না। ভুলেও হাত দিয়ে ধরার চেষ্টা কোরো না, ফল মারাত্মক হতে পারে, যে কোনো মুহূর্তে যা কিছু হয়ে যেতে পারে। এমনিতে আমাদের এই ফিল্ডটা খুবই থ্রিলিং এক্সাইটিং অ্যাডভেঞ্চার-লাইক সবই ঠিক আছে কিন্তু কোনো রকম ছেলেমানুষী না, এখানে কোনো কিছুই হালকা ভাবে নেওয়া যাবে না। এটা খুব সেন্সিটিভ জায়গা ভাই, বিপজ্জনক আর রিস্কি, ভেরি ভেরি রিস্কি তাই এখানে কাজ করতে গেলে কিছু নিয়ম মেনে চলতেই হবে, কিছু সাবধানতা বজায় রেখে চলতেই হবে।’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে।’ হাত তুলে মেনে নেওয়ার ভঙ্গি দেখাই।

‘তোমার ভালোর জন্যেই বলছি, তোমাদের সবার সেফটি আমার দায়িত্ব তাই বলছি।’

‘আচ্ছা, আচ্ছা।’

‘চলো চলো এদিকটা তো দেখা হল, এবার ওদিকটায় যাই চলো। মেলা কাজ বাকি। প্রত্যেকটা নুক অ্যান্ড কর্নার আরও একবার করে চেক করে নিতে হবে। হাতে সময় কম, রাতের প্ল্যানটা সামান্য কিছু বদলাতে হবে মনে হচ্ছে, স্ক্রিপ্ট কিছুটা বদলাতে হবে, কী বলো সমর?’

‘সে তো বটেই, বিশেষ করে এই ব্যাপারটা চোখে পড়ার পর তো বটেই। ক্যামেরা পজিশনও তো পালটাতে হবে মনে হচ্ছে।’

রাত নামার সাথে সাথে সব কিছু যেন একটু একটু করে অন্য আরেক দুনিয়ার কবলে চলে যেতে শুরু করে। জেগে উঠতে থাকে অন্য আরেকটা পৃথিবী, সারাটা দিন ধরে আলোর নিচে লুকিয়ে থাকা আবলুশ কালো অতিকায় এক ডুবোজাহাজের মতো মাথা তুলে উঠে এসে ভাসতে থাকে জলতলের উপর।

বিকেলের শেষ আলোটুকু শুষে নিয়ে বাড়িটা চোখের সামনে আমূল বদলে গেল। সন্ধেটা জুড়ে শেষ পর্যায়ের প্রস্তুতির পর সাড়ে আটটা নাগাদ শেষমেষ আমরা শুটিং শুরু করতে পারলাম। এত সব সরঞ্জাম, এত রকমের যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ যে এই সব ব্যাপারে সবদিক সামলে উঠতে দেরি একটু তো হয়ে যেতেই পারে। সারা রাত জুড়ে কাজ হবে, দরকার হলে ভোর পেরিয়েও, তাই শুরুর দেরিতে ক্ষতি নেই বিশেষ।

তবে শুরুটা হল নির্বিঘ্নেই। সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে বেশ একটা জোরদার ইন্ট্রোডাকশন দিয়ে, আমরা কেন এই বাড়িটাকে বেছে নিলাম, বাড়িটার ইতিহাস ইত্যাদি সংক্ষেপে জানিয়ে প্রতিবারের মতো এবারেও আমিই শুরু করলাম। পরিস্থিতি সে যেমনই হোক অ্যাঙ্কর আর শো-এর প্রধান মুখ হিসেবে আমি যে যথেষ্ট সাবলীল সেটা ভাদুড়ীও স্বীকার করেন। আমার বলার ভঙ্গিটা এমনিতে খারাপ না কিন্তু এই জাতীয় অনুষ্ঠানের পক্ষে একটু বেশিই নির্লিপ্ত নির্বিকার প্রকৃতির। আমাদের অন্যান্য কাজের জায়গায় এই অ্যাপ্রোচটা মানানসই হলেও এই শো-এ আমার বাচনভঙ্গিতে কিছুটা নাটকীয়তা বাঞ্ছনীয় তাই স্ক্রিপ্ট হাতে পাওয়ার আগে থেকেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই ফেলেছিলাম।

হাজার হোক পাবলিক শো বলে কথা, লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখবে সেই কথা মাথায় রেখেই দেখছি অরুণবাবুও পাল্টে ফেলেছেন লেখার ভঙ্গি। অতিনাটকীয়তা না থাকলেও স্ক্রিপ্টটা বেশ উচ্চকিত বা চড়া সুরে বাঁধা বললে ভুল হবে না। অস্বীকার করে লাভ নেই আলোটা দেখার পর, সে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণের জন্যেই হোক বা ঘটনার আকস্মিকতায়, আমার ভেতরে কোথাও একটা ঝাঁকুনি লেগেছে, রক্তস্রোতে দোলা। উত্তেজিত লাগছে, বিভ্রান্ত হলেও বেশ তৎপর, তার ছাপ পড়েছে বডি-ল্যাঙ্গোয়েজে। হাত নেড়ে নেড়ে, মাথা দুলিয়ে, চোখ মুখ যতদূর সম্ভব বাঙ্ময় করে ক্যামেরা ফেস করছি। না না, সবসময় আমার সংযত চাপা অন্তর্মুখী স্বভাবকে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো মানে হয় না। নিজেকে ভাঙতে হবে, খুলে বেরোতে হবে, চলন বলনে আরো স্বতঃস্ফূর্ত, আরো প্রাণবন্ত, আরো এক্সপ্রেসিভ হতে হবে।

অবশ্য আমাদের অন্যান্য এক্সপেডিশনের মতো বলার সময় এখানে নিজের দু-হাত ঠিক মতো ব্যবহার করতে পারছিনা কারণ আমার ডান হাতে ধরা রয়েছে ইএমএফ মিটারটা। ওটার কম্পাসের মতো ইন্ডিকেটর কাঁটাটার কাজ সম্ভাবনাময় অস্বাভাবিক স্পটগুলোর দিকে আমাদের নিয়ে যাওয়া, অদ্ভুত আচরণপ্রবণ তড়িৎ-চুম্বকীয় ক্ষেত্র পেলে সবুজ আলো আর বিপ্ বিপ্ শব্দের সাহায্যে পজিটিভিটি জানান দেওয়া। সাধারণ ডিজিটাল মুভি ক্যামেরায় রয়েছেন সমর রক্ষিত আর দামী ইনফ্রারেড নাইটভিশন ক্যামকর্ডার ভিডিও ক্যামেরায় চোখ রেখেছেন ভাদুড়ী নিজেই। এইসব সুপার-ন্যাচারাল এক্সপ্লোরেশনে এই জাতীয় থার্মোগ্রাফিক ক্যামেরার ব্যবহার আজকাল একরকম অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এমনি ক্যামেরা ছবি নেয় আলোর কিন্তু এই সব ক্যামেরা ইনফ্রারেড রেডিয়েশনের মাধ্যমে খুব লো-ফ্রিকোয়েন্সির ওয়েভলেংথ আর তাপমাত্রার তারতম্যের ছবি নিতে পারে। তার সঙ্গে আগের কয়েক মাস হল আমরা ব্যবহার শুরু করেছি ব্ল্যাক লাইটের, লং ওয়েভ ইউ ভি এ ক্যামেরা যেটা আল্ট্রাভায়োলেট রে-এর সাহায্যে সাধারণ চোখে অদৃশ্য অনেক কিছুকেই আনতে পারে দৃশ্যমানতার ভেতরে।

সেগুলো ছাড়াও আরও নানান ধরনের ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল ইক্যুইপমেন্টে সজ্জিত হয়ে আমরা এগোচ্ছি নিশ্ছিদ্র সব অন্ধকার কোণের দিকে। ফোকাস করা হচ্ছে আনাচে কানাচে, পরিত্যক্ত সব আসবাবের আড়ালে, সন্দেহজনক সম্ভাব্য সব দিকে। আমার হাতের যন্ত্রটার ভূমিকা এমনিতে লোক-দেখানো, স্ক্রিনে দেখে দর্শকদের মনে হতে পারে ওটার কাঁটার মুভমেন্টই বুঝি আমাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করছে কিন্তু তা না, একেবারেই তেমনটা না। বাকি সব রিয়েলিটি শো-এর মতো এটাও একটা পূর্ব-নির্ধারিত ঘটনাক্রম যেগুলোর এক ও অদ্বিতীয় নিয়ন্ত্রক হলেন ডিরেক্টর।

এরপর আমাদের প্রথম শট ছিল রহস্যময় সেই ফ্যানটাকে ঘিরে। ফ্যানটার উপর ক্যামেরা তাক হতেই চোখে মুখে থমথমে একটা ভাব ফুটিয়ে তুলি, স্কুল কলেজ বা পরবর্তী জীবনে থিয়েটার করার অভিজ্ঞতা নেই তবু প্রাণপণ চেষ্টায় গলায় জাগিয়ে তুললাম আতঙ্কের সুর, ‘এই সেই সিলিং ফ্যান, হ্যাঁ এই সেই ফ্যান, ঠিক সতেরো মাস আগে যেটা খুলে নামাতে গিয়ে মারাত্মক শক্তিশালী ইলেকট্রিক শকে মেঝেতে ছিটকে পড়ে মারা গিয়েছিল ছাদের দরজা ভেঙে ঢোকা চোরেদের দলের একজন অথচ এই বাড়িতে ইলেকট্রিক কানেকশন নেই গত তেরোটা বছর। চোখের সামনে সঙ্গীকে ওই রকম ভয়ানকভাবে তড়িতাহত হতে দেখে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আরেকজন। তারপর থেকে সে ঘরছাড়া, কেউ বলে তাকে নাকি ফেরিঘাট চত্বরে সন্ধ্যের দিকে প্রায়ই দেখা যায়, বদ্ধ স্কিৎজোফ্রেনিক। বিশ্বস্তসূত্রের খবর, এমনকি পুলিশও এই ব্যাপারে একমত যে এই সিলিং ফ্যান থেকেই গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়েছিল এই বাড়ির ছোটো মেয়ে মানসী। বড়ো বোন তাপসীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর এ বাড়িতে একাই থাকত সে? কিন্তু শুধু একাকীত্বের জন্যেই কি ওই আত্মহনন, নাকি আছে অন্য আরো কারণও? আসুন জেনে নিই, শুনে নিই আমাদের স্পেশালিস্ট টিমের অন্তর্তদন্ত রিপোর্ট কী বলছে…’

‘কাট।’ ক্ল্যাপ দিয়ে বলে ওঠেন অরুণ ভাদুড়ী। ‘গ্রেট গোয়িং ধৃতি, ভয়েস থ্রো মড্যুলেশন ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনস অল কারেক্ট। আ টেন-মিনিট ব্রেক, বি রেডি ফর দ্য নেক্সট শট।’

‘ওকে, থ্যাংক ইউ স্যার।’ পাশে সরে গিয়ে দাঁড়ালাম।

একবার কাজ শুরু হয়ে গেলে লোকটার মনোমতো শট দেওয়া ছাড়া আমার আর তেমন বিশেষ কিছু করার নেই। সেভাবে বলতে গেলে আমি তখন পাপেট, এই শুটিং প্রক্রিয়ায় ডিরেক্টরের হাতের সুতোয় টান খেয়ে চলা বলা রক্তমাংসের একটা পাপেট। স্যার ছাড়া আমাদের বাকি সবাই-ই কোনো না কোনোভাবে পাপেট। আসলে আমাদের এই সব টেকগুলো তো কাঁচামাল, এগুলো নিয়ে আসল রান্নাটা করতে হবে ভাদুড়ী স্যারকেই। ওঁর অননুকরণীয় কণ্ঠের ভয়েস ওভার দিয়ে, দুর্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড, স্পেশাল এফেক্ট, মিক্সিং, আন্তর্জাতিক মানের গ্রাফিক্স টেকনোলজি ব্যবহার করে পুরো ব্যাপারটাকে একটা চূড়ান্ত জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। সাসপেন্স, ড্রামা, স্টোরি-টেলিং, গা শিরশিরে রোমহর্ষক পরিবেশ তৈরি করে অসামান্য একটা এন্টারটেইনমেন্ট প্যাকেজ তৈরি করতে হবে। কম্পিটেটিভ মার্কেট দিন দিন যে জায়গায় যাচ্ছে তাতে আলাদাভাবে মানুষের নজর কাড়ার একটাই রাস্তা, ভালো কাজ, প্রতিদিন নিজেকে ছাপিয়ে গিয়ে আরো আরো ভালো কাজ।

আমাদের পরের দৃশ্যটার টেকটা নেওয়া হবে সিঁড়ির নিচের স্কুটার রাখা ওই প্যাসেজটার মুখে দাঁড়িয়ে। আমি মনে মনে আমার বক্তব্যগুলো ঝালিয়ে নিচ্ছি, বাকিরা নতুন পজিশন-এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, ভাদুড়ী ইনফ্রারেড ক্যামেরাটা ড্রয়িং-রুম ভর্তি অন্ধকারে অনির্দিষ্টভাবে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে সবদিকটা দেখছিলেন। বড়োসড়ো ঘরটার সব দিকে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেক্ট্রাম বা বর্ণালী নিক্ষেপ করে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন হাওয়ার ছবি। ফোকাস সিঁড়ির দিকে বড়ো থামটার উপর পড়তেই চিৎকার করে উঠলেন উনি, ‘এ কী, এটা কী, এটা কীসের ছায়া!’ ওখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে শিউরে উঠলেন যেন, ‘এদিকে এসো, সবাই এদিকে এদিকে, দ্যাখো তো এটা কী, কীসের ছাপ?’

আমরা সবাই যে যেখানে ছিলাম ছুটে এলাম। একে একে চোখ রাখতে লাগলাম ভাদুড়ীর নতুন নাইটভিশন ক্যামেরাটায়। মলয়দার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে আরো ভালো করে তাকালাম। সত্যিই তো, এটা কী? এটা কীসের প্রতিকৃতি? একটা হাত মনে হচ্ছে তো, হ্যাঁ হ্যাঁ একটা হাতই তো! আবার ফোকাস করলাম থামটার গায়ে। কোথায়, ইমেজটা কোথায় গেল? এই তো ছিল, কয়েক সেকেন্ড আগেও ছিল!

ক্যামেরাটা থামিয়ে রেকর্ডিংটা রিওয়াইন্ড করে পিছিয়ে আনলাম কিছুটা। হ্যাঁ এই তো সেই ছাপ, স্পষ্ট, ইনফ্রারেড তরঙ্গে কম্পমান, জ্যান্ত যেন, স্পন্দমান একটা হাতের প্রতিকৃতি। কার হাত? হাত কোথা থেকে এল? বেশ কিছুটা হতভম্ব হয়ে ক্যামেরাটা তুলে দিলাম অগাস্টিনদার বাড়িয়ে দেওয়া হাতে। বেশ খানিকক্ষণ একভাবে ইমেজটার দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করে উঠল অগাস্টিন মন্ডল, ‘নো ডাউট ইন মাই মাইন্ড এনি মোর স্যার।’

‘কী বুঝছ, এটা কী, কীসের ছায়া, কীসের হাত, কী মনে হচ্ছে?’

‘ইটস আ স্পিরিট লুকিং এ্যাট আস। আমরা ওদের দেখতে পাচ্ছিনা কিন্তু ওরা আমাদের দেখছে। এই ছাপটা দিয়ে ওরা এই ঘরে ওদের অস্তিত্ব জানান দিয়ে গেল। ওরা না চাইলে কিন্তু ধরা পড়ত না, সে আপনি ইনফ্রারেড ব্যবহার করা করুন বা ব্ল্যাক লাইট।’

আধিভৌতিক বিষয়ে ওয়াকিবহাল হিসাবে অগাস্টিনদার খ্যাতি আছে। পারিবারিকভাবে ওদের এইসব অতিপ্রাকৃত বিষয়-আশয়ে ব্যুৎপত্তি আছে, ওঁর এক কাকা নাকি একাধারে ওঁদের অঞ্চলের প্রিস্ট আবার প্রফেশনাল হিলারও বটে। অগাস্টিনদার মুখের উপর এইচ আই ডি স্পটলাইটের আলো ফেলে সমর রক্ষিত, মণিদুটো নিশাচরদের মতো জ্বলে উঠতে দেখা যায় তাতে, ‘এটা একটা সিগন্যাল, ওরা আমাদের কিছু একটা বলতে চাইছে ...।’

‘কীসের সিগন্যাল? বলতে চাইছে মানে, কী বলতে চাইছে? কী মনে হয় ওরা কি আমাদের এই শুটিং প্রসেসটা অ্যাপ্রুভ করছে নাকি ডিস-অ্যাপ্রুভ?’

‘সেটা বোঝা কঠিন। সেটা বুঝতে পারছি না, এখনই তেমন কিছু বুঝতে পারছি না। দেখা যাক কী হয়, আমরা তো আমাদের মতো কাজ চালিয়ে যাই, দেখা যাক, ইন কোর্স অফ অ্যাকশন কী হয়।’

‘কোনো প্রোটেকশন নেওয়ার দরকার আছে, কী মনে হয়?’

‘আপাতত এইভাবে চলুক না। দরকার পড়লে নিতে হবে, পরিস্থিতি তেমন বুঝলে প্রাইমারি কিছু প্রোটেকশন তো নিতে হবেই।’

ঘাড় নাড়েন ভাদুড়ী। চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকেন ওই থামের দিকের অন্ধকারে।

প্রাইমারি প্রোটেকশন বলতে আর কী? মেঝেতে চক দিয়ে বিচিত্র সব আঁক কাটা, তামার ছোটো একটা ধুনুচিতে ধুনো জাতীয় কী সব নাম না জানা দাহ্য পদার্থ পুড়িয়ে বাড়ির আনাচে কানাচে নিয়ে যাওয়া, আঙুল ও হাতের নানান অঙ্গভঙ্গি, অস্ফুট মন্ত্রোচ্চারণ। ওদের এসব কার্যকলাপ কথাবার্তা আমার ঠিক মাথায় ঢোকে না। যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলে, কী যে সব দুর্বোধ্য সান্ধ্যভাষায় কথা বলে ওরাই জানে। মাঝে মাঝে আবার কোড ল্যাঙ্গোয়েজ ব্যবহার করে, সাংকেতিক বা এই সব অতিপ্রাকৃত বিদ্যার নিজস্ব সব পরিভাষা। সেগুলোর কিছু কিছু বুঝি কিন্তু সবটা বোঝার চেষ্টা করি না। মাথায় ঢোকাই না, ঢুকিয়েই বা কী হবে বুঝতে পারি না।

কিছুর জন্যেই কিছু আটকে থাকার নয়, কাজে ফেরা হল তাড়াতাড়িই। সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে পরের শটটা দিলাম কিন্তু মনোমতো হল না। মনোযোগ কিছুটা হলেও সরে গেছে, বলার সময় বেশ ক-বার হোঁচট খেলাম। সে সব এডিটিং-এ মেরামত যোগ্য তবে ভাদুড়ীকে সন্তুষ্ট দেখাল, আমার পারফরম্যান্সে যথেষ্ট খুশি। ঘাড়ে হাত দিয়ে আমায় পাশে ডেকে নিয়ে এলেন, মিনিট সাতেকের মধ্যে আমার কাছ থেকে ঠিক কী রকম বক্তব্য আর এক্সপ্রেশন চাইছেন নিজে অভিনয় করে দেখিয়ে বুঝিয়ে নিলেন। তারপর চট করে ক্যামেরা রেডি করিয়ে থামের গায়ে ধরা পড়া হাতের ছাপটা নিয়ে নিয়ে আমায় দিয়ে যা বলার বলিয়ে নিলেন ইমপ্রমটু। ঘটনাটার আকস্মিকতায় আমি উত্তেজিত ছিলাম, মগজ অস্থির ছিল, ছিল অনেকটা বিভ্রান্তও। সেই মনের অবস্থা থেকেই ছায়াটা নিয়ে দিয়ে ফেললাম বেশ একটা এক্সাইটেড ভয়েস ডেলিভারি। ওঁকে অবিকল নকল করে নামিয়ে দিলাম। ‘ওয়ান্ডারফুল, এক্সেলেন্ট।’ তালি দিয়ে উঠলেন অরুণ ভাদুড়ী। ‘এই জন্যেই বলি, সাধে কি বলি ধৃতি যেটা পারে সেটা আর কারও পক্ষেই সম্ভব না। মাই ব্লু আইড বয়।’

যতবার লোকটার মুখ থেকে এমন সব কথা শুনি, ততবারই হাওয়া লাগে আমার পালে, ফুলে ওঠে ইগো। সে যে কারণেই হোক স্ব-স্ব ক্ষেত্রে দক্ষ যোগ্য মানুষের প্রশংসাবাক্য শুনতে কার না ভালো লাগে, লাগা অস্বাভাবিক কিছু না, রক্তমাংসের মানুষ বই তো নই। কিন্তু এ তো মুহূর্তের সুখ, এসব গায়ে মাখি না মোটেও আর আজ তো গায়ে মাখার কোনো সুযোগই নেই। আজকের শিডিউল খুব টাইট, পর পর অন্তত আরও চারটে টেক তো দিতেই হবে।

পরের টেকটা হবে কিচেনের পাশের সেই স্টোর রুমটায়। সমর রক্ষিত, অগাস্টিন দা, মলয় দা, শাজাহান দা নিজেদের কাজে এতটাই পারদর্শী যে প্রস্তুতিতে বিন্দুমাত্র সময় অপচয় হয় না। স্যারের সঙ্গে যেটুকু সময় ওদিকে ব্যস্ত ছিলাম এরা এদিকটায় সাজিয়ে রেডি করে ফেলেছে। ঘরটায় ঢুকতে গিয়ে উলটোদিকের দেওয়ালে তাকিয়ে দেখি সেই টিউবলাইটের কোণটা আর জ্বলে নেই। অগাস্টিন দার দিকে ফিরে বললাম, ‘কী হল, সেই আলো কোথায় গেল?’

‘হ্যাঁ আমিও তো তাই দেখছি, বিকেলের দিক থেকে আমারও চোখে পড়েনি। আসলে এইসব এনার্জি তো শিফ্ট করে, একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত জায়গা পালটায়।’

‘কী জানি, দেখি দেখা যাক। আগেও তো অনেকবার এরকম অনেক জায়গাতেই শুট করেছি কিন্তু এইসব ব্যাপার তো আর কোথাও দেখিনি।’

‘কেন বর্ধমান ডিস্ট্রিক্টের মঙ্গলকোট গ্রামের সেই জমিদার বাড়িটার কথা মনে পড়ে তো নিশ্চয়ই? ওখানে কিন্তু আমিও দারুণ ভয় পেয়েছিলাম, মলয়ও। কী বল মলয়?’

ঘাড় নাড়ে মলয় পোদ্দার। টিউবটার ওপর এল ই ডি আল্ট্রা-ভায়োলেট টর্চটার আলো মারে, ‘আসলে এই ব্যাপারগুলোর সবই যেন দৃষ্টি বা শ্রুতিগোচর হবে তার তো কোনো মানে নেই, বেশিরভাগ সুপার ন্যাচারাল প্রেসেন্সগুলোই ফিল করার জিনিস, অদ্ভুত আশ্চর্য সব অভিজ্ঞতা। এইসব হন্টেড লোকেশনে এসে অনেকবার এমন টের পেয়েছি ঠিক আমার পাশে কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে, ঘাড়ের পেছনে কার যেন নিশ্বাস পাচ্ছি, কখনও বা ভাইব্রেশনটা স্পষ্ট বুঝতে পারছি অথচ কিছুই চোখে পড়ছে না।’

‘তবে আমার পার্সোনাল এক্সপিরিয়েন্সে ভিজিবিলিটি-রেট নেহাত কম না। আগের ক্যামেরাটাতেও নয় নয় করে ক্যাপচারিং রেকর্ড খারাপ ছিল না আর এই লেটেস্ট টেকনোলজির সেটটা নেওয়ার পর রিসেন্টলি মঙ্গলকোটের সেই বাগানের কেসটা কিন্তু ক্লিয়ারলি ভিজিবল ছিল। ক্যামেরায় যে ফিগারটা ধরা পড়েছিল সেটা কিন্তু পুরোপুরি একটা ফ্রক পরা বাচ্চা মেয়ের। ওটা আমার মুভিক্যামেরা জীবনের অন্যতম সেরা ক্যাপচার বলতে পারিস, মুর্শিদাবাদের পিলখানার সেই বৃদ্ধের ফিগারটাও …।’ যত্নলালিত চাপ দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে সমরদা বলে।

‘আর আমি তুই আর স্যার যেটা মেদিনীপুরের ফেরিঘাটে স্বচক্ষে দেখেছিলাম? ডুয়ার্সের ফরেস্ট বাংলোয়, পুরুলিয়ার ঝালদায়... কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব?’

‘চোখে দেখার এই তো মুশকিল, সে সবের তো কাউকে কোনো প্রমাণ দেখানো যাবে না। ফটোগ্রাফিক এভিডেন্স ছাড়া পাবলিক তো কিছুকেই প্রমাণ বলে মানবে না, ছবি ছাড়া তো কাউকে কনভিন্স করা যাবে না। তবে হ্যাঁ, ছবি যে কটা আছে একেবারে মোক্ষম, কী বল?’ আত্মবিশ্বাসী কাঁধ ঝাঁকায় রক্ষিত। ‘আমাদের সার্কিটে এক্সপার্ট যারাই দেখেছে এককথায় বলেছে সত্যিই অথেনটিক। এসব জিনিসের মার্কেট ডিমান্ড ট্রিমেন্ডাস, বেচলে রাতারাতি মালামাল। একটা ব্যাঙ্কক আর লন্ডন বেসড একটা প্যারানর্মাল রিসার্চ সেন্টার তো কবে থেকে স্যারের পেছনে লেগে আছে, ওদের ল্যাব টেস্টে স্যাম্পেল পজিটিভ হলে একেবারে ডলারে পেমেন্ট। কিন্তু স্যার তো জানিস ওসব খুচরো কাজে বিশ্বাসী না, এই প্রোজেক্টটা ওঁর কমিটমেন্ট আর এখন তো এই শো-টা একপ্রকার ফাইনালাইজড।’

‘কী কথা হচ্ছে শুনি?’ অন্ধকারের ভেতর থেকে আচমকা পেছনে এসে দাঁড়ান ভাদুড়ী, ‘আবার কী ফাইনালাইজড হল…?’

‘ওই স্যার আমাদের শো-টা। টেলিভিশন চ্যানেলে শো-টা ফাইনালাইজ হওয়ার কথা বলছিলাম আর কী।’ গদগদ স্বরে বলে সমরদা।

‘ওহ, কিন্তু দ্যাট ডাসন্ট মিন ইউ উইল টেক এনিথিং ফর গ্র্যাণ্টেড। আত্মতুষ্টির কোনো জায়গা নেই। প্রোজেক্ট আলটিমেট শেপ না পাওয়া পর্যন্ত কিন্তু আমি কিছুই ফাইনাল বলতে রাজি না। সো গাইজ, এই লাস্ট হাফের কাজটায় তোমরা তোমাদের উজাড় করে দাও, মন প্রাণ স্নায়ু পেশি সব নিংড়ে দাও। ফাইনালাইজড হওয়াটা শেষ কথা না, আমি চাই বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে নজিরবিহীন কাজ, ল্যান্ডমার্ক কাজ।’

‘নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই।’ টো-এর উপর ভর দিয়ে দাঁড়ায় অগাস্টিন মন্ডল।

আমার ঘাড়ে বাঁ হাত রাখেন ভাদুড়ী, ডান হাত দিয়ে বাকিদের পিঠে চাপড় মেরে নিজের ব্যস্ততা সঞ্চারিত করে দিতে চান, ‘না না, আর কথা নয়, আর কথা নয়, কাম ব্যাক টু ওয়ার্ক। গেট রেডি ফর দ্য নেক্সট শট। কি ধৃতি, রেডি তো ?’

‘অলওয়েজ রেডি।’

‘দেন শ্যাল উই গো ফর আ টেক?’

‘অ্যাবসলিউটলি।’

আমাকে ওই স্টোর রুমটার দেওয়াল লাগোয়া স্ল্যাবটার থেকে আড়াই ফুট আগে পজিশন নিতে বলা হয়। পিঠ সেই টিউবটার দিকে। ভাদুড়ী ট্র্যাডিশনাল শুটিং-এর মতো ‘অ্যাকশন’ বলেন না, এমনি কথায় যথেচ্ছ ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করলেও এক্ষেত্রে শুধু বলেন, ‘চলো’।

পরিচিত ভঙ্গিতে হাত তুললেন অরুণবাবু, ‘চলো’ বলতে যাবেন কিন্তু শেষ মুহূর্তে মুখ দিয়ে শব্দটা বেরোল না। হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন শূন্যের দিকে। অন্ধকারে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না চোখদুটো, তবু ধারে উঁচিয়ে ধরা ইনফ্রারেড ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় এক্সপ্রেশনটা আবছা হলেও ধরা যাচ্ছে।

‘কী হল স্যার, ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?’ ওঁর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম আমি।

‘এ কী, টিউবটার কোণটা লাল…! আবার জ্বলে উঠল যে দেখছি, এ কী, কী করে! কী করে সম্ভব?’

‘মানে, লাল বলতে আবার জ্বলে উঠেছে বলতে…?’ চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন দিকে তাকাই। ‘এ কী, কী করে, কী করে হতে পারে?’

চোখের নিমেষে দেখি ওই কোণটা দিয়ে একটা ধোঁয়া বেরোতে শুরু করেছে! কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বেরোতে শুরু করল বেশ জোরে। ধোঁয়ায় বিশ্রী বিকট গন্ধ রয়েছে। তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধটা ছড়িয়ে পড়ছে ঘরের বাতাসে, সঙ্গে কেমন একটা যেন চিটপিট শব্দ আসছে কানে।

কাছে গিয়ে দেখতে যাচ্ছি, প্যান্টের পকেট থেকে ছোটো টর্চটা বার করে জায়গাটার উপর আলো ফেলতে যাচ্ছি, পিছন থেকে হাত চেপে ধরেন অরুণবাবু, চিৎকার করে ওঠেন, ‘এ কী, কী করছ, এদিকে এসো। টিউবটা বার্স্ট করবে মনে হচ্ছে, যে কোনো সময় বার্স্ট করবে।’

‘কিন্তু, এক মিনিট, জাস্ট আ সেকেন্ড...।’

‘কোনো কিন্তু না, সেফটি নিয়ে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই।’ হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দেন ভাদুড়ী, বাইরের দিকে টেনে আনেন।

ক্যামেরা কাঁধে তুলে নিয়ে আমাদের পিছন পিছন পুরো ব্যাপারটা রেকর্ড করতে করতে বেরিয়ে আসছে রক্ষিত। চৌকাঠের বাইরে এসে ফিরে তাকাতেই টিউবের ওই কোণটায় ধোঁয়ার মধ্যে কিছু স্পার্ক চোখে পড়ল। দেখতে দেখতে চোখের সামনে জায়গাটা বার্স্ট করল। ফাঁপা কাচের ভেতরের বিস্ফোটে শব্দ হল জোরে বাজি ফাটার মতো। কাচ ভেঙে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল চারদিকে।

নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছি না, হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। কী করে হল, কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না। জীবনে এত রকম গোলমেলে জায়গায় গিয়েছি, এত সব হন্টেড বাড়িতে কিন্তু কোথাও তো এমন হয়নি! ‘কী বুঝছেন স্যার?’ ভাদুড়ীর মুখের দিকে তাকাই। লোকটাও তাকায় উদভ্রান্ত চোখে, ‘কিছুই বুঝছি না, তুমিও যা দেখছ আমিও তাই।’

‘কী বুঝছ অগাস্টিন? আমাদের কি ভালো চোখে দেখছে না খারাপ চোখে?’

‘আ গ্লুমি কাইন্ড অফ স্পিরিট, ডার্ক ভেরি ডার্ক। তবে ভালো বা খারাপ চোখে দেখাতে কী আসে যায় স্যার, আমাদের কাজ তো আমাদের করতেই হবে।’

‘সে তো বটেই, একশোবার, একশোবার।’

অন্ধকার মেঝেতে ভাঙা কাচ বিপজ্জনক জিনিস। প্রত্যেকের পায়ে যদিও মোটা সোলের জুতো তবু থম মেরে দাঁড়িয়ে পড়েছি আমরা। ঘটনার আকস্মিকতায় বেশ কিছুক্ষণ হল চুপচাপ দাঁড়িয়ে গেছি। বাঁ হাতের তালুতে ডানহাত দিয়ে চপেটাঘাত করে গলা তুললেন অরুণবাবু, ‘কাম অন এভরিবডি, এসব তো আছেই, এসব তো থাকবেই, পার্ট অফ দ্য গেম ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কাম অন, লেটস গেট ব্যাক টু ওয়ার্ক গাইস। কুইক কুইক।’

আবার যথারীতি কাজে লেগে পড়লাম আমরা। নির্ধারিত সূচিমতো তার পরের পজিশনটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। সারারাত ধরে ননস্টপ শুটিং চলল। দু-দণ্ড দাঁড়ানোর ফুরসত রইল না, স্টোর রুমের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবার আর কোনো সু্যোগ নেই। কিন্তু খিচখিচ একটা রয়েই গেল, ঘুরে ফিরে মাথার ভেতরের অন্ধকারে ফ্ল্যাশ করতে লাগল টিউবের কোণের সেই আলোটা। ঘিলুর ভাঁজে ভাঁজে মাঝেমধ্যেই চিড়চিড় করে উঠতে লাগল সেই স্পার্কগুলো, মৃদু কিন্তু তীক্ষ্ণ চিটপিট সব শব্দ।

বাড়িটার পাট চুকিয়ে পরের দিন বেশ বেলা করেই কলকাতামুখো রওনা দিলাম আমরা। বিকনভিলায় ফিরে ওখানেই খাওয়াদাওয়ার পর কিছুটা বিশ্রামও হল। আমার চোখেমুখে গাঢ় ক্লান্তি আর তন্দ্রালু ভাবটা লক্ষ্য করে ভাদুড়ী বললেন নীচের তলার গেস্ট রুমে ঘুমিয়ে নিয়ে ফ্ল্যাটে ফিরতে। এ বাড়ির ওই ঘরে শোয়া আমার কাছে নতুন কিছু না, তাই না করলাম না।

কিন্তু ফোনটা সুইচড অন করতেই দেখি তিনটে মিসড কল। একটা তো বাবার কিন্তু বাকি দুটো অচেনা নাম্বার। রিং ব্যাক করতেই অতি চেনা গলাটা বেজে উঠল কানের পর্দায়। গলা ঠিক না হালকা গলা ঝাড়ার শব্দই বলা ভালো। ‘কে?’ প্রশ্নের উত্তরে ‘আমি’ টুকু বলাই যথেষ্ট। পেলব নম্র অনুচ্চ অথচ প্রত্যয়ী একটা উচ্চারণ ‘আমি।’

ভেতর থেকে খুব স্বতঃস্ফূর্ত একটা ঠেলা উঠে এল, অনেকদিন ধরে ভেতরে ভেতরে গুমরে থাকার পর নিখাদ ভালোলাগার উৎস্রোত, ‘বলো বলো, তুমি এখন কোথায়? কাল রাতে একটা শুটে গিয়েছিলাম, ফোনটা ব্যাগে স্যুইচড অফ ছিল তাই…।’

লোকটা আমার কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেবে না। আমি কোথায় ছিলাম, কেন ফোন ধরতে পারিনি এসব কিছুই জানতে চায়নি, চাইবেও না। খুব নরম আর নির্লিপ্ত ভাবে ‘ঠিক আছিস তো?’ শুধু এইটুকু জানতে চাওয়া ছাড়া আর কিছুই প্রায় বলবে না।

আজও সেই একই কথা জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম ‘হ্যাঁ ঠিক আছি।’ ব্যাস এইটুকুই, এইটুকু ছাড়া অন্য কিছু শুনতে চায় না। কথা না বাড়িয়ে লাইনটা কেটে দেয়। পরক্ষণে রিং-ব্যাক করলেও আর কিছুতেই তাকে পাওয়া যায় না। দিস ফোন নাম্বার ডাস নট এগজিস্ট বা নট অ্যাভেইলেবল বা স্যুইচড অফ ইত্যাদি নানা কথা বলে। তারপর মাস খানেক পরে কোনো একদিন রাতে হঠাৎ করে এই নাম্বারটা থেকে ফোন আসে, কেমন আছি জিজ্ঞেস করে, ঠিক আছি শুনে কেটে দেয়।

কিন্তু আজ ওঁর সঙ্গে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছিল তাই বেশ কাতরভাবেই বললাম ‘এই দাঁড়াও দাঁড়াও, লাইন কেটে দিওনা, প্লিজ, তোমার সঙ্গে খুব দরকার ছিল।’

‘কী দরকার? কোনো সমস্যা?’

‘না না কোনো সমস্যা নেই কিন্তু তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। কত বছর তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি বল তো, সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কথা হয়নি।’

চুপ করে থাকল ওপারের কণ্ঠ, তারপর স্বর তুলে বলল, ‘শুধু সেই জন্যেই, নাকি অন্য কোনো কারণ?’

‘না না অন্য কিছু না, তোমাকে খুব মিস করছি, খুব মিস করছি বরুণকাকু। তুমি যদি বলো কোথায় আছো, ঠিকানাটা দাও আমি কালই সেখানে ছুটব। জাস্ট পাঁচটা মিনিটের জন্য সামনে গিয়ে দাঁড়াব তারপর চলে আসব।’

‘তাতে কী হবে? শুধু তাতেই কি সমস্যা মিটবে?’

‘সবটা না মিটলেও কিছুটা তো মিটবে। মনের দিক থেকে তো কিছুটা শান্তি পাব, স্বস্তি পাব, মনের জোর। তুমি পাশে থাকা আর না থাকার ফারাক যে কতখানি তা আজকাল প্রতিটা দিন টের পাই, হাড়ে হাড়ে টের পাই।’

‘শুধু নিজের কথাই ভাবলি, আমার কথা একবারও ভাবলি না?’ ধরা গলায় বলে লোকটা, ‘দেখা তো করাই যায়, সে তুই আমার কাছে এসে বা আমি তোর কাছে গিয়ে দেখা তো করাই যায় কিন্তু তাহলে কি আমরা কেউই ভালো থাকব?’

‘কেন, এমন কেন বলছ?’

‘বেশ তো আছি, কেন আবার বিপদে ফেলবি? অনেক কষ্টে ওইদিককার সব বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম, তোদের ওই বাড়িটার চৌহদ্দিটার বাইরে একবার যখন বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম তখন আর কেন? এই তো বেশ যোগাযোগ আছে, মাসে একবার হলেও তো কথা হয়। জানা যায় যে দুনিয়ার যে প্রান্তেই হোক আমরা আছি, ঠিক আছি, বেঁচে আছি।’

‘না, এভাবে না, এভাবে হবে না। আমি তোমাকে দেখতে চাই, তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে চাই, সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অন্তত কথা বলতে চাই।’

‘না সে আর সম্ভব না রে। আমার কিছু করার নেই, তুই আর যা খুশি করতে বল চেষ্টা করে দেখব কিন্তু দেখা করতে চাস না। সেটা আমাদের দু-জনের পক্ষেই ভালো হবে না। তোর নিজের জগৎ আছে তুই হয়ত যা হোক করে ভুলে থাকতে পারবি কিন্তু আমি তো ভুলতে পারি না। এতগুলো বছর গেল হাজার চেষ্টা করেও তো পারলাম না, কিছুতেই ভুলতে পারলাম না।’

মনে হল যেন গলা আটকে এল মানুষটার। কী ভোলার কথা বলছে জানি, কেন ভোলা সম্ভব না তাও। ঢোঁক গিলি, চাপ দিয়ে তুলি স্বর, ‘কিন্তু সেসবের সঙ্গে আমার সঙ্গে দেখা করার সম্পর্ক কী? আমার সঙ্গে দেখা করলে কী হবে?’

‘কী আবার হবে, আবার সব ভেসে উঠবে। আমার জেগে থাকা, ঘুম সব আবার তছনছ হয়ে যাবে। অতসীদি ব্যাপারটা আমার কাছে ঠিক কী ছিল কেমন ছিল, তোরা কেউ জানিস না, কাউকেই বোঝাতে পারব না। ওঁর ওইভাবে চলে যাওয়ার মতো ধাক্কা যখন সামলে নিয়েছি, অতসব কুৎসা অপবাদ যখন সয়ে নিয়েছি, বাড়ি ছেড়ে শহর ছেড়ে রাজ্য ছেড়ে এত দূরে এসে যখন মানিয়ে নিয়ে থিতু হয়েছি, শেষ এতগুলো বছর ধরে তোদের ওই বাড়িটার দিকে উল্টোদিকে মুখ করে বসে আছি, আমাকে দয়া করে আর ওদিকে ফিরে তাকাতে বলিস না।’

‘কিন্তু সেসব তো এক যুগ আগের কথা, সময় তো শুনেছি সব ঘায়েরই উপশম করে দেয় বরুণকা। যা যা হয়েছিল তার জন্য আমি তো দায়ী না, তাহলে আমাকে কেন শাস্তি দেওয়া? আমি কী করেছি যে আমার সঙ্গে আর একবারের জন্যেও দেখা করবে না?’

‘তোকে শাস্তি দেব কেন, শাস্তি তো আমার পাওনা। এই দূরে থাকাই যে আমার শাস্তি বাবান, এই আমার প্রায়শ্চিত্ত। সব কথা তো আর মুখে বলা যায় না, ফোনে তো না-ই, তবু ছাড়ার আগে একটা কথা শুধু বলে যাব আমি আসলে ভয় পাই।’

‘ভয় কেন, কীসের ভয়?’

‘জড়িয়ে পড়ার ভয়, পুরোনো চোরা টানে আবার নতুন করে তলিয়ে যাওয়ার ভয়। কী করে বোঝাই বল, তোকে দেখলেই যে আমার তাঁকে মনে পড়ে, তোর মুখখানায় যে অবিকল তাঁর মুখ বসানো।’

‘তাতে কী, ছেলেকে তো মার মতো দেখতে হতেই পারে।’

‘হতেই তো পারে, তাই তো হয় , তাই তো সমস্যা।’ ঘন ঘন অস্থির নিঃশ্বাস নেওয়ার শব্দ আসে কানে, ‘না না, প্লিজ না, আমায় জোর করিস না, ব্যাপারটা যত সহজ ভাবছিস একেবারেই তা না। আমার সঙ্গে দেখা করলে তোর সমস্যা বাড়বে বই কমবে না। যেটা বলেছিলাম মনে আছে তো, একা-মানুষই এ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ, পারলে একা মানুষই পারবে, না হলে কেউ পারবে না, কেউ না।’

‘কিন্তু বরুণকা, বরুণকা...।’

বলতে না বলতেই ওপারে লাইন কেটে গেছে। বলা শেষ হওয়ার আগেই লোকটা লাইন কেটে দিয়েছে। ব্যস, মুহূর্তে যোগাযোগ ছিন্ন, এখন আর হাজার বার রিং করে গেলেও ওকে আর পাওয়া যাবে না। মাসখানেকের আগে মাথা কুটলেও লোকটাকে আর কিছুতেই পাওয়া যাবে না।

বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল, পাঁজরার ভেতর খাঁ খাঁ করে ওঠে আকাশ জোড়া শূন্যতা। মোবাইল স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে বসে আছি মাথা নিচু করে। লোকটাকে ভুল বোঝার কথা ছিল আমারই সবচেয়ে বেশি কারণ ওকেই আমার পিতৃদেব সহ আমাদের বাড়ির অনেকেই আমার মায়ের প্রেমিক হিসেবে ভাবে। মায়ের প্রেমিককে কোনো ছেলেরই পছন্দ করার কথা না কিন্তু এই লোকটা এমনই যে পছন্দ না করে উপায় ছিল না। হয়তো মায়ের চোখ দিয়ে দুনিয়াটাকে দেখতে শিখেছি বলেই তেমন চোখে দেখতে পারিনি। তাছাড়া আপত্তিকর তো কিছু দেখিনি, মাঝে মাঝে সন্দেহের বশে উঁকিঝুঁকি দিলেও কিছুই তেমন নজরে পড়েনি। জ্ঞান হওয়ার আগে থেকে আজ পর্যন্ত আমার জীবনে ওর কত অবদান, কত প্রভাব তাই খামোখা পরের মুখে ঝাল খেতে যাব কেন। কাছের মানুষটার চলে যাওয়াতে যে লোকটাকে একা ঘরে বসে ওইভাবে বুকভাঙা যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে দেখেছি, সেই কান্নায় কালি দেখি কী চোখে? কী করে কলুষ খুঁজি আমাকে পড়ে শোনানো ওঁর কবিতায়। হয়তো আবেগ-সর্বস্ব সব লাইন, হয়তো তেমন উচ্চমানের কাব্যকৃতি বলা যায় না কিন্তু কিছু পংক্তি যে এখনও আমার মুখস্থ, অজান্তেই ঠোঁট নড়ে ওঠে আমার,

কখনও ইচ্ছে হলে চলে এসো

এই দেশে, ফুল আর পাখিদের বেশে।

না হয় মাছের মতো, অবিরত

নেচে ওঠো জলে।

রূপোলী রঙের আলো, কিংবা লুপ্ত সোনা

চোখ ভরে দেখি।

আমারও মনের কথা

মাঝে মাঝে মনে হয় এবার ফুরোল।

অনেক তো রূপ আছে পৃথিবীর ঘরে

যে কোনো এক রূপ ধরে

যদি পারো পুনর্বার দেখা দিও তুমি

তোমায় বরণ করে নেব ভোরবেলা।

মাথা নীচু করে বিড় বিড় করছিলাম একমনে, ঠিক পিছনে নিঃশব্দে কে যেন এসে দাঁড়াল। ‘কে?’ আঁতকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই দেখি চান্দ্রেয়ী।

‘কী হল, আঁতকে উঠলে যে? কী বিড় বিড় করছিলে?’

‘না না কিছু না, ওই অনেকদিন আগের একটা কবিতা। অনেকদিন পর মনে পড়ল তাই একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম।’

‘কী ব্যাপার চিন্তিত মনে হচ্ছে? কার ফোন ছিল?’

‘না না তেমন কিছু না, ওই আমার এক দূরসম্পর্কের কাকা। আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন।’

‘কী বলছেন তিনি?’

‘তেমন কিছু না, কেমন আছি জিজ্ঞাসা করছেন।’

‘ওহ আচ্ছা, কিন্তু ওদিকে তো তোমার স্যার তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।’

‘কেন, আমি আবার কী করলাম?’

‘বাবা বলল, তোমার মতো সাহসী নাকি শেষ কুড়ি বছরে আর কাউকে দেখেনি।’

‘আমি সাহসী! ফুঃ!’ আত্মপরিহাসের সুর টানি ‘আমার ইতিহাস জানলে নিশ্চয়ই বলতেন না।’

‘তোমার ইতিহাস মানে? শুনি শুনি কেমন ইতিহাস, কী ইতিহাস?’ বৃত্তাকারে পাক খেয়ে হাঁটু ছাড়ানো ফ্রকে ঘূর্ণি তুলে সামনের তেপায়া চেয়ারটায় বসে।

যারপরনাই ক্লান্তিতে ন্যুব্জ, বরুণকাকুর সঙ্গে কথা বলার পর বিচিত্রগামী আবেগের ধাক্কায় বিস্রস্ত অসহায় চোখে তাকাই আমি। সব কথা সবাইকে বলা যায় না কিন্তু কাউকে কাউকে তো বলতে হয়ই, অন্তত বলতে ইচ্ছে করে। বিশেষ করে শ্রোতা এমন একজন কেউ হলে।

হাঁটুর উপর কনুই, হাতের খোলা তালুর অবতলে গাঁথানো থুতনি, চান্দ্রেয়ী তাকিয়ে আছে আমার দিকে, ‘কী হল বল? নাকি আমাকে বলার মতো ক্লোজ বলে মনে কর না?’

‘না না তা কেন? আর তেমন গোপনীয় কিছু তাও তো না। না মানে তোমাকে না বলার কিছু নেই, তোমাকে তো সে সব কিছু কথা বলাই যায়। আসলে আমার জীবনে এমন ভয়াবহ একটা ফেজ গিয়েছে, এমন সব প্রবল যন্ত্রণাময় দিনরাত যেটাকে ভয়ানকতম দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কী বলা যায় জানি না। এই সময়টা মনে রাখতে চাই না, ওটা নিয়ে কারও সঙ্গে বিশেষ শেয়ার করি না কিন্তু কিছুক্ষণ আগে ওই মানুষটার সঙ্গে কথা বলে খুব অস্থির লাগছে, খুব মনমরা লাগছে, এত সব কথা মনে পড়ছে।’

সামনের দিকে ঝুঁকে বসে ও, বড়ো বড়ো চোখজোড়ার পরিধিতে চাপ দিয়ে আরও বড়ো করে তাকায়। চোখ তুলে তাকাই আমি, ‘আমার ছোটোবেলাটা ছিল স্বপ্নের মতো। বাড়ির একটাই ছেলে, আদুরে, ভীতু ভীতু, সারা বছর সর্দিকাশিতে ভোগা, প্যাংলা কাঠি, মায়ের আঁচল ধরা যাকে বলে আর কী। অত্যধিক সুরক্ষিত ছোটোবেলা, এই পড়ে যাবি ওদিকে যাস না, এটা করিস না ওটা করিস না করে তোলাতোলা করে মানুষ। বাবার সিমেন্ট বালি পাথর ঢালাই লোহার ব্যবসা। সকালে বেরিয়ে যায় রাত এগারোটায় ফেরে তাই মাকে ঘিরেই সবকিছু, মা-ই নিখিল ভুবন।

তখন সদ্য সদ্য মাধ্যমিক দিয়ে উঠেছি মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ল। লাম্পটা তৈরি হয়েছিল আগেই কিন্তু মা হয় সেটা অবহেলা করেছিল না হলে আমার মাধ্যমিকের ক্রুশিয়াল দু-বছর বলে লুকিয়েছিল। যখন ডিটেক্টেড হয় তখন সেটা ম্যাচিয়োর স্টেজে। প্রম্প্ট ট্রিটমেন্ট শুরু হল, কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে। চোখের উপর দেখলাম একটা আস্ত মানুষ শুকিয়ে গুটিয়ে কী ভাবে শেষ হয়ে এল, বছর দেড়েকের মধ্যে সব শেষ। আকাশ ভেঙে পড়ল আমার মাথায়, পৃথিবীর সব আলো পলকে নিভে গেল।

নিমেষে অদ্ভুত একটা অন্ধকার গোলার্ধে ঢুকে পড়লাম আমি। শ্রাদ্ধশান্তির পর বাড়ি ভরা আত্মীয়স্বজন যে যার মতো ফিরে যাওয়ার দিন থেকে আমার ঘরে আমি একা। সেই রাত থেকেই শুরু হল আমার জীবনের কঠিনতম একটা পর্ব। ভয়, দমবন্ধ করা একটা ভয় আপাদমস্তক পুরো সত্ত্বা জুড়ে দখল নিয়ে বসল। দিন নয় যা হোক করে কাটানো গেল কিন্তু অন্ধকার নামতেই আশ্চর্য একটা আতঙ্ক চারদিক থেকে ঘিরে ফেলতে লাগল আমায়৷ পেছনে কী একটা ছায়া যেন দাঁড়িয়ে আছে, কে যেন হেঁটে চলে গেল পিছন দিক থেকে, রাতের পর রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারি না। চোখ বুজলেই মনে হয় মাথার কাছে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে, নাকের পাশ দিয়ে খুব চেনা আঁচলের গন্ধ চলে গেল, ভেজা চুলের গন্ধ। চারদিক নিঃস্তব্ধ হলে মনে হয় বারান্দার দিক থেকে কার যেন পায়ের শব্দ কানে আসছে, শাঁখাপলা লোহাবাঁধানো সোনার বালার ঠুনঠান শব্দ, হাওয়া দিলে গাছের পাতার খসখস শব্দে মনে হয় যেন অনেক দূর থেকে একটা গলা ভেসে আসছে “বাবান বাবান।”

সারারাত ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখি, দরজা বন্ধ করে বাথরুমে অবধি যেতে ভয় পাই। পাশের ঘরেই বাবা আছে কিন্তু ছোটো থেকেই তার সঙ্গে তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই, ওর সাথে যে শোব সে উপায়ও নেই। রাতে একা ঘুমোনো বাবার অভ্যাস, অন্তত চার পেগ করে মদ্যপান না করলে তার ঘুম আসে না। ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানকে দেখালাম, তিনি ঘুমের বড়ি দিলেন কিন্তু দুটো তিনটে চারটে করে স্লিপিং পিল খেয়েও আমার ঘুম আসে না। সারারাত জেগে থাকি, দিনের বেলা ঘুমোই।

এক লহমায় বিষময় হয়ে উঠল সব কিছু, দিশাহারা অবস্থা। ভয় ভয় ভয়, উঠতে বসতে সামনে পেছনে সব দিক থেকে ভয়। গা বমি বমি ভাব, খিদে নেই, যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে, চোখেমুখে অন্ধকার দেখছি, এইভাবে চলতে থাকলে নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব। বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছি, পড়াশুনো ডকে উঠেছে, কলেজ যাই না। পিসতুতো দাদা জোর করে নিয়ে গেল সাইকোলজিস্টের কাছে। সব শুনে ডাক্তার ভালো একটা অ্যান্টি ডিপ্রেশ্যান্ট ড্রাগ দিলেন, আত্মবিশ্বাসের স্তরটাকে উপরে টেনে তুলতে হবে। তাঁর মতে এসব কিছুই হচ্ছে সেন্স অফ ইনসিকিউরিটি থেকে। মা ছিল আমার সমস্ত নিরাপত্তা বোধের আধার, তিনি চলে যাওয়ার পর চারপাশ থেকে সেই সুরক্ষা বলয়টা উধাও হয়ে যাওয়াটাই এই ক্রাইসিসটা তৈরি করেছে। অন্তত দু’তিন মাস নিয়মিত এই ওষুধটা খেয়ে যেতে পারলে কনফিডেন্স লেভেলটা বাড়বে, ভেতর থেকে সব আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে আসবে।

তাতে একেবারে যে কাজ হল না তা নয় কিন্তু আসল জায়গায় কোনো উপকার হল না। রাত হতেই সেই এক সমস্যা, অন্ধকার নামলে সেই এক আতঙ্ক। বাধ্য হয়ে শরণাপন্ন হলাম বাবার দূরসম্পর্কের ভাই, আমাদের পরিবারের একদা অবিচ্ছেদ্য অংশ বরুণ গোস্বামী, মানে বরুণকাকুর। ওই যে কাকুর কথা বলছিলাম আর কী, আমার খুব কাছের একজন মানুষ। মায়ের মৃত্যুর পরে সেই মানুষটাও বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল, বাবার সঙ্গে তাঁর মুখ দেখাদেখি বন্ধ তাই ওঁর সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করলাম। উনি আমায় নিয়ে গেলেন দমদমে, ওঁর বন্ধু এক মনোচিকিৎসকের কাছে। সেই ভদ্রলোক ঘন্টাখানেকের ওপর আমার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্তে এলেন আমার সমস্যাটা নানান জটিলতার মিশেল তবে তাতে প্রধানত নেকটোফোবিয়া বা অন্ধকারে ভয়ের ভাগটা বেশি। প্যাভলভিয়ান ঘরানার ওই নামজাদা সাইকোথেরাপিস্ট হিপনোসিস বা সম্মোহন মেথডে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। বিজ্ঞানসম্মত সম্মোহনের মাধ্যমে উনি আমার মনের একধরণের রি-প্রোগ্রামিং শুরু করলেন, ধীরে ধীরে আমার চিন্তা পদ্ধতির খোলনোলচে পাল্টিয়ে একেবারে গোড়া থেকে আমার অন্ধকার-ভীতি দূর করার প্রক্রিয়া।

চেয়ারের তলার চাকা ঘুরিয়ে উনি সেদিন এসে পৌঁছলেন ঠিক আমার চেয়ারের সামনে, পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্কে আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘দেখ ভাই আমার বিদ্যেবুদ্ধি দিয়ে আমার যেটুকু সাধ্য আমি করছি তবু একটা কথা মানো নিশ্চয়ই সেল্ফ হেল্প ইজ দ্য বেস্ট হেল্প? এন্ড অফ দ্য ডে তোমার সমস্যা তোমাকেই মেটাতে হবে, সামনে তোমার বিরাট জীবন পড়ে সেখানে তোমায় একা তোমার প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। তাই আমি বলব আর কোনো উপায় নেই তোমাকে তোমার ভয়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, অন্ধকার যাতে তোমার এত ভয় সেই বস্তুটাকে সরাসরি কনফ্রন্ট করতে হবে, একা অন্ধকারের দেওয়াল ফুঁড়ে ঢুকে তার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, ভয়ের চোখে চোখ রেখে তাকে নিঃশেষ করে দিতে হবে, গোহারা হারিয়ে দিতে হবে। ব্যাপারটাকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নাও, উলটোদিকের শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হয় মারব না হয় মরব মানসিকতা নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নামো। যদি জিততে পার, এ যাত্রায় বেঁচে গেলে না হলে কিন্তু কপালে অশেষ দুঃখ আছে।’

ওঁর কথা মতো লড়াইয়ে নেমে পড়লাম আমি, নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। কাউকে কিছু না জানিয়ে এক অমাবস্যার রাতে দুরুদুরু বুক, দাঁতে চাপা দাঁত, বরুণকাকুর পায়ে পা মিলিয়ে পা দিলাম অন্ধকারের রাজত্বে। উনি আমায় প্রথমদিন নিয়ে গিয়ে ফেললেন আমাদের পুরোনো টাউনের প্রোটেস্টান্ট চার্চের পিছন দিকের পরিত্যক্ত জায়গাটায়, ব্রিটিশ আমলে তৈরি সরকারী কলেজের অতিকায় গথিক বিল্ডিং-এর জমি এই জায়গাটা শহরের অন্যতম শুনশান আর কুখ্যাত জায়গা। ঝুরিওয়ালা বেশ কিছু বটের আওতার নীচে ঘন অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে বরুণকা বলল, ‘ভয় জিনিসটা আসলে আমাদের কল্পনা, বাস্তবে ভেবে দেখ তো এই অন্ধকারটা আসলে কি? অন্ধকার মানে জাস্ট আলোর না থাকা, ফোটন কণার অনুপস্থিতি, তার বাইরে আর কী? অন্ধকার নামলে আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান এই চেনা পৃথিবীটা মুহূর্তে অচেনা হয়ে যায়। দশদিক থেকে বিপুল এক অজানা আমাদের ঘিরে ধরে। অজানা মানেই আমরা ধরে নিতে অভ্যস্ত সেটা ক্ষতিকর, বিপজ্জনক, প্রতিকূল এমনকী প্রাণঘাতী পর্যন্ত আর ভয় যেহেতু আমাদের আত্মরক্ষা প্রবৃত্তি, স্বভাবতই তখন এটা এসে হাজির হয় সুরক্ষা ঢাল হিসাবে। অথচ যুক্তি দিয়ে ভাবলে সেটা তো তেমন নাও হতে পারে, ধর না এই অন্ধকারটা না থাকলে এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে আমরা কি আদৌ ভয় পেতাম?’

‘কিন্তু সব কিছুকে কি এইভাবে র‌্যাশনালাইজ করা যেতে পারে? সব কিছু কি যুক্তিগ্রাহ্য?’ আমি জিজ্ঞেস করি, বরুণকা বলে ‘করতে হবে, মানুষ যুক্তিবাদী জীব। যুক্তিই তার মূলধন, যুক্তিই তার বেঁচে থাকার মূল অস্ত্র। ফর গড সেক ট্রাই টু

র‌্যানালাইজ ইওর ফিয়ারস, দিস অল এনভেলপিং ডার্কনেস। সারা জীবন আমি তোর পাশে থাকব না, তোকে একাই সব বিরুদ্ধ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। কে বলল একা মানুষ দুর্বল? যারা বলে তারা একাকীত্বের শক্তি জানে না, একা মানুষ শক্তিশালী, এ পৃথিবীতে সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী।’

বলতে বলতে লোকটা কখন যে আমার পেছন থেকে সরে পড়েছে টের পাইনি। এই নিকষ নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আতঙ্কে কেঁপে উঠল আশিরনখ। দু-চোখ চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলাম। ‘বরুণকা বরুণকা’ গলা চিরে চিৎকার করতে লাগলাম, দিশেহারা হয়ে এদিক ওদিক ছুটতে লাগলাম। মাটিতে ঢুকে গিয়ে স্বতন্ত্র কান্ড হয়ে ওঠা বটের ঝুরিতে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়লাম। কেউ এগিয়ে এলো না, দৌড়ে এসে হাত ধরে টেনে তুলল না। মনে হল এক্ষুনি দমবন্ধ হয়ে যাবে, এই মুহূর্তে অজ্ঞান হয়ে গেলে এ যাত্রায় বেঁচে যাব না হলে নির্ঘাৎ কিছু একটা ঘটে যাবে, ভয়ানক কিছু একটা।

কিন্তু তেমন কিছুই হল না, কোনো অনর্থ, ভূত প্রেত আত্মা অপচ্ছায়া কিছুই এসে দাঁড়াল না সামনে। কিছুক্ষণ পর থেকে যা হোক করে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিলাম, নার্ভের উত্তেজনা কমে এল, বুক ধড়ফড় স্তিমিত হল, রক্তচাপ স্বাভাবিক। অন্ধকারে চোখ সয়ে যেতে দেখতে পেলাম বরুণকা হাত তিনেক দূরের গাছের গুঁড়িটার পিছন থেকে বেরিয়ে আসছে। এগিয়ে এসে পিঠ চাপড়ে বলল, ‘গ্রেট , এই তো পারলি, প্রথম ধাক্কাটা তো মোটের ওপর ভালোই সামলালি?’ ঘাড় থেকে হাত সরিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বললাম ‘কোথায় পারলাম? আশপাশের কোথাও তুমি আছ, ব্যাক অফ দ্য মাইন্ড এই আশ্বাসটা ছিল তাই ভয়টা নিশ্চয়ই ঠিক মতো দানা বাঁধতে পারেনি, একেবারে একা থাকলে নিশ্চয়ই পারতাম না, হারগিজ পারতাম না।’

‘কে বলল পারতিস না? পারবি না মানে, পারতেই হবে।’ কিছুদিন পরে সে রকমই এক রাতে আরও একটা জায়গায় নিয়ে গিয়ে ফেলল। সেখানে আগে অস্থায়ী শ্মশান ছিল, তখন একটা পরিত্যক্ত ইঁটভাঁটা। বাইরের দিকে পাঁজা করে রাখা ইঁটের স্তুপগুলো শুরু হওয়ার আগেই লোকটা আমায় ছেড়ে দিয়ে সরে পড়েছে। কিন্তু আমাকে তো ঢুকতেই হবে তাই চোখকান বুজে সামনের দিকে ছুট লাগালাম। শিরশিরে চাঁদের আলোর রাত অমাবস্যার চেয়ে ঢের বেশি ভয়ের আর রহস্যময়। যেদিকে চোখ পড়ছে আলোছায়ার খেলা, অদ্ভুত সব আকার আকৃতির থমকে থাকা, আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছপালা লতাগুল্মগুলো যেন ফ্যাকাশে সাদা জ্যোৎস্নার জাল জড়ানো অশরীরী।

থামলেই ভয় আঁকড়ে ধরবে তাই উদভ্রান্তের মতো ছুটতে লাগলাম। পেছনে যেন কেউ একটা ধাওয়া করেছে, যেন প্রাণের ভয়ে ছুটছি। এলোমেলো ইতস্তত ছুটছি। আর কিছু চেনা না থাক আকাশের চাঁদটাতো আছে, ওটাতেই চোখ গেঁথে বাহ্যজ্ঞানহীন ছুটতে ছুটতে এসে পড়লাম বাঁধানো ঘাটটায়। আর এগোনো সম্ভব না, সামনে নদী। বাঁক নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম, পাড়ে একটা পিটুলি গাছের গোড়াটাকে পিছমোড়া করে আঁকড়ে ধরলাম, সর্বশক্তি দিয়ে অক্ষিপল্লবে চাপ দিয়ে সামনের দৃশ্যপটের ওপর ঠিকরে বেরিয়ে আসা মণি চেপে ধরলাম। যা হয় হোক আমি চোখ সরাব না, পৃথিবী রসাতলে যাক, মরে যাই যাব কিন্তু কিছুতেই চোখ সরাব না।

অবাক হয়ে দেখলাম যেমন ভেবেছিলাম তেমন কিছুই হল না। কেউ আমার গলা টিপে ধরল না, মাথায় গাছের ডাল ভেঙেও পড়ল না, জ্ঞান হারালাম না, মরেও গেলাম না। চোখের পলক পড়ল বটে কিন্তু পরক্ষণে আবার চোখ মেলে ধরলাম দ্বিগুণ জোরে। অন্ধ হয়ে যাই যাব কিন্তু কিছতেই চোখ সরাব না। ফল পেলাম হাতেনাতে। কিছুক্ষণ পর থেকে আপনা থেকেই প্যানিকের পারদ নামতে শুরু করল, রেটিনায় ভেসে ওঠা সামনের দৃশ্যাবলী থেকে ধীরে হলেও সরতে শুরু করল শুরুর সেই ভয়াল রঙ। সব কিছু আশ্চর্য স্বাভাবিক, ঝড়ের পর নেমে আসা নীরবতার মধ্যে সহসা স্নিগ্ধ শীতল মনে হল সব কিছু। প্রত্যক্ষ কারণ নেই তবু কেন জানি না অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তির আনন্দ হল আমার, এত অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়েও বুকের ভিতরে কোথাও যেন ঝিকিয়ে উঠল এক কণা আলো। সেই বিন্দুতেই সিন্ধু দেখেছিলাম কিনা জানি না তবে ডুবন্ত মানুষের মতো খড়কুটো চেপে ধরেছিলাম সন্দেহ নেই।

ওই কণাটুকুকেই সম্বল করে এবার বেরিয়ে পড়লাম। রাতে বাবা বেঘোরে ঘুমোয়, বাড়িতে কেউ বাধা দেওয়ার নেই। নিঃশব্দে পিছন দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলাম সাইকেল নিয়ে। না আজ আর কিছুতেই বরুণ গোস্বামীকে ডাকব না। সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বোধহীন হয়ে যাব, দেখি না পারি কিনা? গন্তব্য ভাঙা রেলব্রিজ, শহরের প্রান্তের এক নির্জনতম এলাকা। তবে কি এত আঁশপাট নিয়ে বেরোনই সার, প্রথম দিন মাঝপথ থেকে ফিরে এসেছিলাম, পর পর দুদিন কাছাকাছি গিয়েও ব্রিজটার ধারকাছেও ঘেঁষতে পারিনি। কিন্তু আমি তো ছাড়ব না। বেরিয়ে যখন পরেছি ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না।

জেদ চেপে গেছে বটে তবু পা তো সরে না। কিংকর্তব্যবিমূঢ়, ভেজা বালির বস্তার মতো ভারী পা নিয়ে ফাঁকা মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তালগোল পাকিয়ে যাওয়া ঘিলুর মধ্যে আচমকাই কি যেন একটা হল। যুক্তিই তো সব কথা না। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে কেমন যেন মনে হল মা নিশ্চয়ই এই অন্ধকারের মধ্যে কোথাও একটা মিশে রয়েছেন। আমি দেখতে পারছি না কিন্তু উনি আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই আমার কোনো ক্ষতি হতে দেবেন না। এই অন্তরীক্ষে তিনি যদি কোথাও থেকে থাকেন কেউ আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এই অন্ধকারের রঙ যেন তাঁর কোমর ছাড়ানো খোলা চুলের মতো, এই অন্ধকার যেন ওঁর চুলে পাওয়া জবাকুসুম তেলের মতোই সুগন্ধি। আমার খুব কান্না পেল।

সেই ঊর্ধ্বমুখী ঠেলাতেই কিনা জানি না মুহূর্তে স্রোত খেলে গেল মগজে, শিরদাঁড়া বরাবর নেমে গেল পায়ে। সাইকেল পড়ে থাকল মাটিতে আর আমি হনহনিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। ব্রিজটা তো সামনেই, আমার পক্ষে সর্বোচ্চ যত জোরে হাঁটা সম্ভব হাঁটতে লাগলাম সামনের দিকে। এতটা গতি তুলে এগোতে লাগলাম যে শরীরের উত্তাপ বাড়তে লাগল চড়চড়িয়ে। ক্ষরিত হল আপৎকালীন হরমোন, উদ্ভুত তাপে গলে জল হয়ে নামতে লাগলো আজন্ম ভয়ের পাথুরে কঠিন হিমখণ্ড।

ঢালের গায়ের ধাপগুলো পেরিয়ে মিনিট সাতেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম ব্রিজটার উপর। নীচে প্রবাহ পরিবর্তন করে দূরে সরে যাওয়া নদীর লুপ্তখাত, সাহেব আমলে তৈরি ব্রিজটা এখন বাতিল। এখানে কেউ আসে না, শহরবাসীর কাছে নিষিদ্ধ জায়গা একটা। এই কয়েক বছর আগেও নাকি এক মেধাবী যুবক এই উঁচু থেকে ঝাঁপ মেরে আত্মহত্যা করেছিল। সে যা হয় হোক, সে সব কিছুই মাথায় নেই তখন। ব্রিজটার পরিস্থিতি সঙ্গীন তবু ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা না। ধারের দিকের লোহার পাতের পাটাতনের উপর দিয়ে দমদমিয়ে এগোতে লাগলাম আওয়াজ করে। অপরিণামদর্শী একটা বেপরোয়া দাপট কোত্থেকে এভাবে জায়গা করে নিল কে জানে! হাওয়ায় ছুঁড়ে দিলাম মুঠো করা হাত। যেন পাহাড়চূড়া জয় করেছি। নিজের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করার উচ্ছ্বাস যে কী অসম্ভব বাঁধ-ভাঙা সে কাউকে কী করে বোঝাব, সে তোমায় কী করে বোঝাব…।’

কথা বলে যাচ্ছি ঠিকই কিন্তু ঢুলে পড়ছিলাম মাঝেমাঝেই। পর পর দু-রাত ঘুম নেই, পেশী স্নায়ুদলের বিরাম নেই, তাই বলতে বলতে স্বর জড়িয়ে আসছিল, ঘন ঘন হাই তুলছিলাম। এলিয়ে পড়েছিলাম কোল বালিশে ভর দিয়ে। আর কিছুতেই পারা গেল না, ধীরে ধীরে চোখের পাতা বুজে এল, তলিয়ে যেতে লাগলাম। মেয়েটা সামনে বসে, ইমেজ বড়ো বালাই তবু ওর চোখের সামনেই মাথা কাত হয়ে এল, কষ গড়িয়ে নেমে এল লালা, কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরোপুরি তলিয়ে গেলাম।

১০

বিকেলে ঘুম ভেঙে উঠে দেখি আমার মাথার তলায় বালিশ, গায়ের ওপর চাদর দেওয়া, একেবারে টানটান হয়ে শুয়ে আছি। আমার উপরে মশারি টাঙানো, নরম নীল একটা নাইট বাল্ব জ্বলছে, এসি অন। কে করল এসব? কিন্তু এ বাড়ির সবসময়ের কাজের লোক তারকনাথ তো ছুটিতে আছে!

বিছানা ছেড়ে বেরিয়েই দোতলায় উঠে আসি। চান্দ্রেয়ীর ঘরে বেল বাজাতে ও তাড়াতাড়ি এসে দরজা খুলে দাঁড়াল, মুখে চপল হাসি, ‘বলুন স্যার, ঘুম হল?’

‘হ্যাঁ, একেবারে সাউন্ড স্লিপ আর তার ব্যবস্থাটা নিশ্চয়ই তুমিই করে দিয়ে এসেছ, আই গেস? মশারিটা অবধি খাটিয়ে দিয়ে এসেছ?’

‘কী আর করা যাবে, চারিদিকে ডেঙ্গু না কী সব অজানা জ্বর-টর হচ্ছে, কলকাতায় তো রীতিমত মহামারীর চেহারা নিয়েছে, এইসব মশাগুলো নাকি দিনের বেলাতেই কামড়ায়।’

‘সামান্য মশা আর আমার কী করবে ম্যাডাম? ভূত প্রেত দস্যু ডাকাত সমাজবিরোধী খুনি কেউ যখন কিছু করতে পারল না, মশা কী করবে?’ হাওয়ায় দু-হাত চালিয়ে বলে উঠি, ‘শুনলে অবাক হবে আমার ফ্ল্যাটে কিন্তু কোনো মশারিই নেই, আগে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করতাম এখন তাও করি না। এদ্দিনেও যখন মরিনি, মনে হয় না আর সম্ভাবনা আছে?’

চোখ বড়ো বড়ো করে সিরিয়াস চোখে তাকায় চান্দ্রেয়ী, ‘এটা নিশ্চয়ই রসিকতা করতে চাইলে, কিন্তু দুঃখিত বলতে বাধ্য হচ্ছি খুবই বাজে রসিকতা। প্রিকশন ক্যান নট বি আ জোক ধৃতিমান। সাহস, কনফিডেন্স, কেয়ার-ফ্রি থাকা সবই ভালো কিন্তু এটা কিন্তু ক্যালাসনেস হয়ে যাচ্ছে, শিয়ার কেয়ারলেসনেস। এর মধ্যে আমি কিন্তু কোনো পৌরুষী দেখছি না, স্যরি।’

সে যে কারণেই হোক আমাকে নিয়ে ওর গলায় এই উদ্বেগের সুর শুনতে আমার ভালো লাগে, কানে সুখকর লাগে এই জাতীয় হিতাকাঙ্খী ধমক। আমি চোখ টেরিয়ে হাসি।

‘হাসি না, সব কিছুতেই হাসি ভালো লাগে না।’ অভিভাবকসুলভ সুরে বলে চান্দ্রেয়ী ‘আর হ্যাঁ, বাবার মুখে এসব কী শুনলাম? কাল রাতের ওই হন্টেড প্লেসটার টিউব লাইটের কোণটা জ্বলে থাকার কথা শুনছিলাম, বার্স্ট করার ব্যাপারটাও শুনলাম। ঘোস্ট-হান্টিং এর দুনিয়ার ওগুলো ডেঞ্জারাস সাইন আর তুমি নাকি সেই দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলে, এসব কী? এসব কেন করো?’

‘না না আমি দেখতে যাচ্ছিলাম কারণটা কী? জাগতিক ঘটনা হলে, না মানে ফল থাকলে কারণ তো একটা থাকবেই, থাকতেই হবে। তুমি তো জানো আমি হাতেনাতে পরীক্ষা না করে দুনিয়ার কিছুকেই ঠিক নিতে পারি না, যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে বুঝতে না পারলে?’

‘কে বলল জাগতিক ঘটনা? এতদিন ধরে এই ফিল্ডে কাজ করেও এই কথা, তোমায় নিয়ে তো আর পারা গেল না! না না এটা কিন্তু ঠিক না, এতটা বেপরোয়াপনা।’

তর্ক করতে ইচ্ছে করছিল না, ওর সঙ্গে সাধারণত আমি তর্কে যাই না। করুণ, কাঙাল, স্নেহাতুর খরগোশের মতো চোখ পিটপিট করি, ঘাড় চুলকাই ‘না ঠিকই, অস্বীকার করছি না একটা ক্যালাসাপ্যাথি আমার মধ্যে আছে, নিজেকে নিয়ে একটা উদাসীনতা, মা চলে যাওয়ার পর থেকে এটা ক্রমশই বেড়েছে। তবে হ্যাঁ, বললে হয়তো বলবে পৌরুষী দেখাচ্ছে কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী আজকাল কী হয়েছে ভয় জিনিসটা যেন আমার কাছ থেকে একেবারে চলে গেছে। ভয় যেন আমার আর করেই না, কোনো কিছু নিয়েই কোনো ভয়।’

‘কিন্তু এটা তো স্বাভাবিক পরিস্থিতি না। ভয় পাওয়াটা তো মানুষেরই ধর্ম, পশুরাও ভয় পায়। যাদের প্রাণের মায়া আছে সবাই ভয় পায়। নর্মালি সবাই কম বেশী ভয় পায়।’

‘কী জানি আমার প্রাণের মায়া আছে কিনা। আসলে মা মারা যাওয়ার ট্রমাটা ফেস করার পর থেকে আমার জীবনটা তো আর দশজনের মতো এগোয়নি। সেই থেকে আমার জীবনের লক্ষ্য খালি একটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল, বাঁচলে গেলে আমাকে আমার যাবতীয় ভয়কে জয় করতে হবে। জন্মগত ভীতু ভীতু ভাব, সব কিছুতেই আতঙ্কিত বোধটাকেই খুন করতে হবে, তিলে তিলে একেবারে শূন্য।

ঘুমিয়ে পড়ার আগে তোমার শুরুর যে সব দিনের কথা বলছিলাম, সেই যে প্রাণের দায়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম সেগুলো তো হাতেখড়ি। তারপর থেকে এদিক ওদিক কোথায় না কোথায় ঘুরে বেরিয়েছি, রাতের পর রাত ঘুরে বেড়িয়েছি। সেটা যে শুধু অন্ধকারের সঙ্গে পেরে উঠতে তাই না, রাতের একটা অদ্ভুত মায়াবী দিকও আছে। তোমরা হয়তো বললেও বুঝতে পারবে না কিন্তু একটা সময়ের পর থেকে রাত আর আমার কাছে ভয়ের আলখাল্লা খুলে দাঁড়ালো, মনে হওয়া শুরু হল সে যেন আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। রাতের অন্দরমহলে এমন একটা নিস্তব্ধতা আছে, যেন গভীর কোনো শান্তি, মগ্নতা। মনে হত এর ছোঁয়া বড়ো স্নেহার্দ্র, জন্মজন্মান্তরের চেনা, কর্ণ কুন্তী সংবাদের সেই লাইনগুলো মনে আছে নিশ্চয়ই— ‘‘অস্ফুট শৈশবকাল যেন রে আমার, যেন মোর জননীর গর্ভের আঁধার আমারে ঘেরিছে আজি।’’ ’

আয়তনয়না মেয়েটি তাকিয়ে রইল একভাবে। আগে অনেকবার অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু ও নিশ্চয়ই আমায় আগে এই সুরে কখনও কথা বলতে শোনেনি। বড্ড স্মৃতি-ভারাতুর লাগছিল, অনেক পুরোনো কথা মনে আসছিল, পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম পেছন দিকের জানলাটার দিকে, বাইরে চোখ মেলে গরাদ ধরে বলে চললাম ‘অন্ধকারে ভয় চলে যাওয়ার পর আমি রীতিমত নিশাচর হয়ে উঠলাম। আমার গতিবিধি বেশিদিন গোপন থাকল না, বাবাকে আমার সাইকায়াট্রিস্টের পরামর্শের কথা বলেছি, ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানও বুঝিয়েছেন তবু সে লোক তো নিজের মতো করে ধরেই নিল আমার উপর অশুভ আত্মা ভর করেছে বা মাথার গণ্ডগোল। না হলে কী করে এমন হতে পারে যে ছেলে এই কয়েকমাস আগেও রাতে একা বাথরুমে যেতে ভয় পেত সে কিনা নিশুতি রাতে একা একা বেরিয়ে পড়তে পারে।

যাই হোক হায়ার সেকেণ্ডারির পর আমি চেয়েছিলাম জেনারেল স্ট্রিমে ওখানকার কলেজেই বটানি বা জুলজি নিয়ে পড়ি কিন্তু বাবার এক জেদ আমায় ইঞ্জিনিয়ার করবে। অনেক টাকা পয়সা খরচ করে আমায় ব্যাঙ্গালোরের এক প্রাইভেট কলেজে ভর্তি করা হল কিন্তু আমি জানতাম ইঞ্জিনিয়ারিং আমায় দিয়ে হওয়ার জিনিস না। ব্যাঙ্গালোরের কাছেই মাথিকেরে বলে একটা জায়গায় বন্ধুদের সঙ্গে মেস করে থাকি কিন্তু পড়াশুনো সব ডকে উঠেছে, ফার্স্ট-ইয়ারেই ড্রপ দিয়েছি , এদিক ওদিক চরে বেড়াই । সেই সময়েই আলাপ হল প্রশান্ত সরকার নামের এক অকওয়ার্ড বাঙালি ছোকরার সঙ্গে। আমাদের কলেজেরই সিনিয়ার স্টুডেন্ট, একা একটা বড়ো ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। দিনের বেলায় বাইরে বেরোতে প্রায় দেখিইনা বললে চলে, ঘরে সিলেবাসের বই একটাও দেখিনি কখনও। সারা দিনরাত দেখি পরনে থ্রি-কোয়ার্টার বারমুডা, চোখে মোটা চশমা, বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে দুনিয়ার সব প্যারাসাইকলজি, এক্সট্রা-টেরেস্টিয়াল, সাইকিক ফেনোমেনন, ক্ল্যারিওভয়েন্স, অকাল্ট, ব্ল্যাক আর্টের বই পড়ে যাচ্ছে। দেওয়ালে লেখা মার্লোর বিখ্যাত নাটক ডক্টর ফস্টাসের সেই কথা ‘‘che sera sera, what will be, shall be!’’ যা হওয়ার তা হবে ...।

ওই ছেলেটা আমায় নিয়ে যায় ভেঙ্কট পেরুমলের কাছে। তিনি ব্যাঙ্গালোর বেসড সর্বভারতীয় একটি প্যারাসাইকলজিক্যাল সোসাইটি চালান। সারা ভারতে ওদের সদস্য সংখ্যা তিনশোর বেশি। এই ফিল্ডের যথেষ্ট পরিচিত একটা নাম। ওই রকম বাগ্মীলোক আমি খুব কম দেখেছি, টেলিকাইনেসিসে এক্সপার্ট, বেগুনি আলোয় ওর ঘরটায় বসে আমাদের সঙ্গে যখন কথা বলতেন মনে হত সবই সম্ভব, এই ব্রহ্মান্ডে অসম্ভব বলে কিছু নেই। ওদের সংস্থার উদ্দেশ্য আমাদের দৃশ্যমান জগতের বাইরে যে আরও একটা প্রচ্ছন্ন জগত আছে সেটা প্রমাণ করা। দুঃসাহসিক সব অভিযানে বেরোত ওরা, আমাদের স্যারের মতোই দলবল, ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে পৌঁছে যেত সারা ভারতের কুখ্যাত সব ভৌতিক লোকেশনে। সব দেখেশুনে আমি ওদের দলে ভিড়ে পড়ি, ওদের একজন ভলান্টিয়ার হয়ে যাই।

তবে ওরা আমায় রীতিমত পরখ করে নিয়েছিল, আপৎকালীন পরিস্থিতিতে নার্ভের ওপর কন্ট্রোল রাখতে পারি কিনা যাচাই করে নিয়েছিল। মেডিকেল কলেজের মর্গে একা রাত কাটানো থেকে শুরু করে কালপাল্লি নামের ওখানকার এক কবরস্থানে রাত কাটানো কী না করেছি? ওই রকম আরও কিছু টেস্টে উতরে যাওয়ার পর সেবার ওদের যে টিমটা আরব সাগরের ওপর একটা পুরো দ্বীপ জুড়ে তৈরি ভারতের সবচেয়ে রহস্যময় কেল্লা মুরুদ-জঞ্জিরাতে গিয়েছিল তাতে আমাকেও পাঠানো হয়েছিল ট্রেনি হিসেবে। সিস্টেমেটিক সুপার-ন্যাচরাল ইনভেস্টিগেশন কী করে করতে হয় আমার ওদের কাছ থেকেই শেখা।

ওদের সঙ্গে বেরোতে বেরোতে ভয় জিনিসটা আস্তে আস্তে আরও ভেঙে যেতে লাগল, ভয় জিনিসটার সংজ্ঞাটাই পুরো পালটে যেতে লাগল। অনেকদিনের অনুশীলন আর ভাবনার পদ্ধতিতে বদল আনতে আনতে ভয়টা আশ্চর্যজনক ভাবে নিউট্রাল হয়ে আসছিল, তারপর একটা সময় মনে হতে লাগল সত্যিই তো মানুষের মনটা ছাড়া এই বিশ্বচরাচরের সবই যখন ভীষণ রকম নিরপেক্ষ নৈর্ব্যক্তিক, তাই মনটাকে একই রকম নির্বিকার করে গড়ে তুলতে পারলে ভয় আবার কী, ভয়ের আর কোনো প্রশ্নই তো থাকছে না?’

অবাক চোখে তাকাল মেয়েটি। বুঝতে না পেরেই হোক বা কী বলবে বুঝে না উঠতে পেরে তাকিয়ে থাকল। কিঞ্চিত মুখ বেঁকিয়ে বিষন্ন সুরে বললাম, ‘তবে কী জানো ভয় চলে যাওয়ার ফল ভালো হয় না। ভয় চলে গেলে জীবনের ওপর থেকেই শুধু না, নিজের ওপর থেকেও ভালোবাসাটুকুও যেন উবে যেতে চায়। মনে হয় যেন কিছুতেই কিছু এসে যায় না, যা চাই তা পেলেও ভালো না পেলে আরও ভালো। আমার ক্ষেত্রে এমনটা আরও হয়েছে কারণ আমার তো কোনো পিছু টান নেই, হারানোর কিছু নেই। আমার তো আপন বলে কেউ নেই তাই পর বলেও। কাছেরও কেউ নেই, দূরেরও। ভালোবাসারও কেউ নেই, ঘৃণা করার মতোও কেউ।’ ঠিক এইভাবেও বলতে চাইনি তবু বলে ফেলে সরিয়ে নিই মুখ, ‘তবে এর অ্যাডভান্টেজটাই বেশি, তাই নেভার মাইন্ড।’

মেয়েটিকে চিন্তিত দেখাল। অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন একটা ভাবছে। কাঁধটা মৃদু শ্রাগ করি আমি, পৌরুষী ছলকে ওঠে রক্তে, ‘এই জন্যেই হয়তো পারি, তোমার বাবা বলেন আমি নাকি এমন সব কাজ করতে পারি, এমন সব জায়গায় নির্দ্বিধায় চলে যেতে পারি যেখানে নাকি আর কেউ যেতে পারবে না। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, আসলে সত্যি কথা বলতে কী আমার বুক কাঁপে না কারণ আমি তো ভৌতিক কিছুতে বিশ্বাসই করি না। ভূত-শিকারীদের দলে কাজ করলেও আমি ভূত প্রেত আত্মা অশরীরী এসব কিছুর অস্তিত্বেই বিশ্বাস করি না। এর জন্যেই অরুণবাবুর সঙ্গে আমার এত মতান্তর আবার আমাদের একে অপরকে ছাড়া চলেও না।’

‘এটা আবার কী রকম কথা হল? যে জিনিসে বিশ্বাসই করো না সে কাজে যুক্ত থাকার মানেটা কী? এটা কি এক ধরণের প্রতারণা নয়, অ্যাটলিস্ট নিজের সঙ্গে?’

‘নাঃ, মোটেও না। আমি তো বিশ্বাস করতেই চাইছি কিন্তু ওরা আমায় বিশ্বাস করাতে পারছেটা কই? হ্যাঁ, এতদিন এই ফিল্ডে কাজ করতে করতে অনেক এমন ঘটনা ঘটেছে যেগুলো পুরোপুরি মাথায় ঢোকেনি, একা একা রাতের অন্ধকারে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা হয়েছে কিন্তু সেগুলোকে এক্সট্রা-অর্ডিনারি বলা যেতে পারে কিন্তু ভৌতিক কী করে বলি?’

ভ্রু-পল্লব উত্তল হয় চান্দ্রেয়ীর, চোখের কোণে সরে আসে মণি, ‘বলা তো তোমার উপর। বলায় আর কী এসে যায়? তাছাড়া অবিশ্বাসটাও এক ধরনের বিশ্বাস, কী বল?’

‘হয়তো তাই, হয়তো বা তাই। তবে, কেন তোমার মনে হয় না, আলাদা রাস্তা দিয়ে হাঁটলে কী হবে আমার আর অরুণবাবুর খোঁজটা সেই একই, আমরা দুজনেই জানতে চাইছি সত্যিটা কী? এই পৃথিবীতে সত্য তো আর দুটো হতে পারে না তাই একই ফিল্ডে দাঁড়িয়ে আমরা দুজনা যদি একই জিনিস খুঁজি তাতে অসুবিধাটা কোথায়?’

স্থির তাকিয়ে থাকে মেয়েটি। মুহূর্তে চোখ সরিয়ে নিয়ে যায় দরজাটার দিকে। ভেজানো দরজাটা যথেষ্ট ভারি তাই হাওয়ার ঠেলা সত্ত্বেও পুরোপুরি খুলে যাচ্ছে না। ভ্রু কুঁচকে গেল ওর, চেঁচিয়ে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল তীরের বেগে, ‘কে, কে ওখানে?’

‘কেউ না, আমি আমি।’

‘ওহ, সমর কাকু। ওখানে দাঁড়িয়ে কেন, আসুন ভেতরে আসুন।’

‘না ঠিক আছে, আসলে অরুণদা ধৃতিকে ডাকছেন, তাই এসেছিলাম। তোমরা কথা বলছিলে তাই নক্ করিনি।’ দরজাটা ঠেলে ভেতরে মাথা বাড়াল সমর রক্ষিত, ‘এই ধৃতি, স্যার ডাকছেন। তাড়াতাড়ি, উনি ওয়েট করছেন।’

‘হ্যাঁ যাচ্ছি, এক্ষুনি যাচ্ছি। যাও আমি যাচ্ছি।’

সমরদা চলে গেলে ফিরি চান্দ্রেয়ীর দিকে, ‘ডাক পড়েছে, আসছি, আবার পরে কথা হবে’খন?’

‘হ্যাঁ যাও, তবে একটা কথা...।’

‘কী কথা?’

‘আচ্ছা সে পরে হবে, আগে ওপর থেকে ঘুরে এসো, পরে কথা হবে।’

‘আচ্ছা।’

১১

ওঁর পেল্লায় সাইজের মনিটরে যথারীতি চোখ পেতে বসে আছেন অরুণ ভাদুড়ী। ‘আসছি স্যার?’ বলাতে মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন ধারালো ফলার মতো চোখের কোণ ঝাঁকিয়ে, ‘হ্যাঁ এসো এসো। তোমার জন্যেই বসে আছি।’

‘হ্যাঁ, সমরদা বলল, আমায় তাড়াহুড়ো করে পাঠিয়ে দিল। কিন্তু একী আপনি তো দেখছি চেঞ্জও করেননি? আমি তো দিব্যি একঘুম দিয়ে উঠলাম আপনি তো কালরাতের জামাপ্যান্টগুলো ছাড়ারও ফুরসত পাননি, সেই থেকে তো রেস্টও নেননি?’

‘রেস্ট, কীসের রেস্ট? রেস্ট নিতে গেলে চলবে, কাজের পাহাড় পড়ে আছে আর হাতে সময় খুব কম। শুটিং সেরে এলাম মানে কাজ শেষ ভুলেও ভেবোনা, বরং কাজ শুরু। লিডিং নিউজচ্যানেল বা খবরের কাগজগুলো তো আমাদের এই প্যারানর্মালের ব্যাপারে ঘোরতর স্কেপ্টিকাল, ওরা তো পারতপক্ষে আমাদের দুনিয়ার ডিসকভারিগুলোর খবর করবে না তাই আমাদের মতো লোকজনকে সোশ্যাল মিডিয়ায় যতদূর সম্ভব অ্যাক্টিভ থাকতেই হয়। শুধু এখানকার গ্রুপগুলোতেই না, ন্যাশনাল ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোতেও আমাদের রিসেন্ট ডেভেলপমেন্টগুলোর আপডেট দিতে হয়।’

‘হ্যাঁ, সেটা আপনি খুব নিষ্ঠার সঙ্গে করেন আর সেটা খুব জরুরিও। শুধু ভালো কাজটাই তো আর যথেষ্ট না, উপযুক্ত পাবলিসিটি ছাড়া এই দুনিয়ায় কিছু হওয়ারও না। যেভাবে সব কিছু এগোচ্ছে সামনের দিনে তো মনে হচ্ছে ট্র্যাডিশনাল মিডিয়ার চেয়ে এই অলটারনেটিভ মিডিয়াই বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আজকাল সবার হাতেই তো স্মার্টফোন।’

‘হয়ে উঠবে মানে, অলরেডি হয়ে উঠেছে। আর আমাদের এই অল্টারনেটিভ রিয়েলিটির খবরাখবরের ক্ষেত্রে এই অল্টারনেটিভ মিডিয়ার চেয়ে ভালো প্ল্যাটফর্ম আর কী হতে পারে? সামনের দিনের কথা চিন্তা করেই তো প্রাণপাত করছি, আমি জানি আমার খাটনি বিফলে যাবে না। জানো, আমাদের অফিসিয়াল পেজে ফলোয়ারের সংখ্যা রিসেন্টলি কত দাঁড়িয়েছে, আমাদের ওয়েব চ্যানেলে ভিউয়ারের সংখ্যা?’

উচ্ছ্বসিত দেখায় ভাদুড়ীকে, রিভলভিং চেয়ারে পাক মেরে ঘুরে আমার দিকে তাকায়। আমার মুখ যথারীতি মেঘলা দেখে নিজের উত্তেজনাটা সঞ্চারিত করে দিতে চায় ‘আমি তো কোথাও নিজের নাম বা মুখ ব্যবহার করিনা, আমাদের সংস্থার মুখ বলতে তো তুমি। আমাদের ফলোয়ারদের কাছে তুমি কী ধরনের জনপ্রিয় কোনো ধারণা আছে, তুমি তো ওদের কাছে হিরো? আর টেলিভিশন চ্যানেলে আমাদের প্রোগ্রামটা হিট করলে তো আর দেখতে হবে না, ইউ উইল বি আ সেলিব্রিটি! অথচ তোমার তো দেখি কোনো হেলদোলই নেই এ ব্যাপারে! নিজের কোনো পেজ, চ্যানেল, ওয়েবসাইট কিছুই তো মেনটেইন করো না। কেন, তুমি এনজয় করো না? নিজের এই পজিশনটা এনজয় করো না?’

‘করব না কেন? করি করি, নিশ্চয়ই করি।’

আমার নিস্তরঙ্গ উত্তর শুনে মুখের মধ্যে জিভ দিয়ে চিক্ করে একধরণের একটা শব্দ করেন ভাদুড়ী, ‘হাবভাব দেখে তো মনে হয় না, যাকগে সে তোমার ব্যাপার, তুমি কী করবে সে তো আল্টিমেটলি তোমার চয়েজ।’

‘না স্যার, করি বলেই তো আছি, আপনাদের সঙ্গে আপনাদের পাশে আছি।’ ঘাড় কাত করে হাসি, ‘তো স্যার বলুন, কী জন্যে ডেকেছিলেন বলুন।’

‘বলার কিছু নেই, তোমাকে তো বলে কোনো লাভ নেই তাই দেখানোর জন্য ডাকলাম। দেখ, অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে কী মোক্ষম জিনিস হাতে এসেছে দেখ। তুমি তো বল— to see is to believe, এবার কী বলবে বল?’

‘আবার কী হাতে এল? দেখি, দেখি, আবার কী পেলেন?’

ডান হাতে মাউস চেপে ধরে ডেস্কটপের একটা ভিডিও ফাইল খুলতে খুলতে বাঁ হাতটা মুঠো করে হাওয়ায় ছুঁড়ে দেয় অরুণ ভাদুড়ী, ‘দুর্দান্ত একটা ফেজের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। একের পর এক ব্রেক থ্রু, গোইং থ্রু গোল্ডেন আওয়ারস অফ মাই কেরিয়ার, যাতে হাত দিচ্ছি তাই সোনা, এইভাবে চলতে থাকলে আর দেখতে হবে না।’

টেবিলে হাত রেখে সামনে ঝুঁকে পড়ি, স্ক্রিনে ভেসে ওঠে চলমান ছবি। রাত-ক্যামেরায় তোলা লাইভ রেকর্ডিং ক্লিপ, তলায় ডিজিটাল সময় নির্ধারক ঘড়ি দিনক্ষণ মুহূর্তের হিসাব দিচ্ছে। মধ্যরাতের একটা পিচঢালা সড়ক, দুধারে সারি সারি গাছ দাঁড়িয়ে। কুয়াশা নেই, ভিজিবিলিটি ক্লিয়ার। চারদিক একেবারে শুনশান, জনপ্রাণীটি নেই। বেশ খানিকক্ষণ পর পর একটা করে গাড়ি যাচ্ছে। বাস লরি কিছু না, কার জিপ বা ছোটো ট্রাক ছাড়া অন্যকিছু চলার উপযুক্ত রাস্তা না, তবে হাইওয়ের প্যারালালে শর্টকাট হিসেবে লোভনীয় সন্দেহ নেই।

মিনিট সাতেক দেখার পর বললাম, ‘এ তো ‘‘র’’ ভিডিও ফুটেজ মনে হচ্ছে। চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশের সেই যে রাস্তাটার গাছের ডালে দুটো স্টার লাইট ক্যামেরা বেঁধে রেখে আসা হয়েছিল এগুলো তার রাশ ফুটেজই তো মনে হচ্ছে, নাকি?’

‘অ্যাবসলিউটলি।’ হাত বাড়িয়ে পিঠ চাপড়ায় ভাদুড়ী, ‘ওই দুটো ক্যামেরার পেছনে কত টাকা ইনভেস্ট করেছি তো জানো। ইন্টারন্যাশনাল ওয়াইল্ড লাইফ শো-গুলোতে রাতের জঙ্গলের ছবি তোলার জন্য যে সব দামী লো-লাইট ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়, খরচের মায়া না করে সেই সব কিনে আনিয়েছি। হন্টেড ওই রাস্তাটার ঠিক জায়গায় ঠিক পজিশনে ক্যামেরা ফিট করিয়ে এসেছি। কম্পিটেন্ট লোক দিয়ে রিমোট সেন্সিং টেকনলজি ইউজ করে সাতরাত ধরে ওই নটোরিয়াস রাস্তাটার উপর কন্টিনিউয়াস নজরদারি করিয়েছি আর তার ফল পেয়েছি হাতেনাতে।’

‘ফল বলতে, কেমন ফল দেখি?’ আরও খানিকটা সামনে ঝুঁকি, ‘হ্যাঁ, রাস্তাটা সম্পর্কে জানি, সেবার তো আপনার সঙ্গে গিয়ে খোঁজখবরও করে এসেছিলাম, ওই এলাকার লোকে বলে রাস্তাটা গোলমেলে। ওই রাস্তায় নাকি অনেকগুলো অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেছে, রাতের দিকে স্থানীয় লোকজন ওদিকে পা মাড়ায় না তো বটেই খুব সাহসী ড্রাইভার ছাড়া বেশিরভাগই রাস্তাটা অ্যাভয়েড করে চলে। লোকজন তো বটেই অনেক ড্রাইভাররাও বলে রাতের দিকে অনেকেই নাকি রাস্তাটার আড়াআড়ি একটা ছায়ামূর্তিকে পাস করতে দেখেছে। ওটা থেকেই নাকি এখানকার যতসব অ্যাক্সিডেন্টগুলো হয়েছে, ভয়ে ব্রেক ফেল করেই নাকি সবকটা মিসহ্যাপ। সরকার থেকে ইদানীং লাইট লাগানো হয়েছে কিন্তু মাঝেমাঝেই নাকি সেই লাইট সব নিভে যায়, তারপর নাকি অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটে, ছায়ামূর্তির আসা যাওয়া, হঠাৎ করে গাড়ির সামনে এসে পড়া।’

‘তাই জন্যেই তো যাওয়া, ওখানে ক্যামেরা রেখে আসা। আমরা তো শুধু শো তৈরি করার জন্যেই কাজ করি না, সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়েই করি। মানুষের স্বার্থে, তাদের সেফটি আর ওয়েলফেয়ারের স্বার্থে। এতবছর ধরে রাস্তাটা নিয়ে এত গোলমাল কিন্তু কেউ তো কিছু করতে পারেনি, আমরা ছাড়া কেউ তো কাজের কাজ কিছু করতে পারেনি।’

‘সে তো ভালো কথা কিন্তু কই কিছুই তো চোখে পড়ছে না, অনেকক্ষণ ধরে তো দেখেই যাচ্ছি?’ সুর টানি আমি।

‘ডোন্ট বি ইমপেশেন্ট ম্যান, আমাদের এই লাইনে ধৈর্য আর মনোযোগটাই শক্তি। চোখ রাখো, স্ক্রিন থেকে চোখ সরিও না। গতকালের এক্সপেডিশনে যাওয়ার আগে সাতদিন ধরে আমাদের সারভেইলেন্স ক্যামেরা ফুটেজগুলোর প্রতিটা সেকেণ্ড আমি আর আমাদের টেকনিক্যাল টিম একনাগাড়ে চেক করে চলেছি। বাড়ি এসে থেকেও একনাগাড়ে আর তুমি দশ মিনিটেই অধৈর্য্য হয়ে গেলে?’

‘না না, অধৈর্য্য হইনি। আপনি এই ফুটেজটা যখন আলাদা ভাবে কেটে রেখেই দিয়েছেন তাই ভাবছিলাম সাসপেক্টেড এলিমেন্ট সামনেই বুঝি…।’

‘তা কী করে থাকবে, সাসপেক্টেড এলিমেন্টের আগে পিছে আনকাট ফুটেজ না থাকলে তুমিই তো বলবে এটা ফেক, কনকক্টেড ভিডিও। বাইরের লোক তো পরের কথা আগে তো ভেতরের লোকই আমায় সাসপেক্ট করবে, আমার তো বাইরের লোকজনের থেকে ঘরের লোকজনকে নিয়েই চিন্তা বেশি। এদের কাছে প্রমাণ করতে পারলে আমি বাইরের দুনিয়া নিয়ে ভাবিনা।’

বলতে বলতে আচমকাই শিরদাঁড়া সোজা হয়ে এল লোকটার, সচকিত হয়ে উঠে পিছিয়ে এলেন দু’এক ধাপ, চাপ পড়ল চোখের পরিধিতে, ‘এই দেখ, ক্যামেরা কী বলছে, রাত তখন সাড়ে দুটো বেজে ছত্রিশ মিনিট তেতাল্লিশ সেকেণ্ড। চুয়াল্লিশ, পঁয়তাল্লিশ, ছেচল্লিশ, সাতচল্লিশ...।’ তর্জনী উঁচিয়ে যেন ছিটকে উঠেন ভাদুড়ী, ‘দেখ দেখ, আমি আর কী বলব, নিজের চোখেই দেখ। ওই দেখ ওই যে, ওই যে। দেয়ার ইট ইজ, দেয়ার ইট ইজ...।’ চিৎকার করে ওঠে, জোরে চাপ দিয়ে তুঙ্গে তোলে স্বর।

কাঁপতে থাকা আঙুল নির্দেশ করে আছে ডেস্কটপ স্ক্রিনের বাঁদিকের কোণের একটা ছায়াশরীরের উপর। নাইট ভিশন ক্যামেরায় তোলা ছবি স্বাভাবিক আলোয় তোলা ছবির ঠিক বিপরীতধর্মী, নর্মাল ছবিতে যা যা সাদা লাগার কথা এখানে সেগুলো কালো আসবে আর কালো জিনিস গুলো সাদা। দেখতে একেবারে ফটোগ্রাফিক ফিল্মের নেগেটিভের মতো।

রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছায়ামূর্তিটা। পর পর দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর ওপার থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল যেন একদলা কুয়াশার মতো। অস্পষ্ট হলেও মহিলার শরীরই তো মনে হচ্ছে, পরনে পোশাকটা ঠিক কী ধরণের বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু পা পর্যন্ত ছড়ানোই তো মনে হচ্ছে। চুল খোলা, বেশ লম্বাটে একটা অবয়ব। স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে, কিন্তু একটা কিছু তো বটেই, মনুষ্য শরীরের মতোই কিছু একটা। তিরিশ সেকেণ্ড মতো হয়ে গেল একভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

একভাবে তাকিয়ে আছি, লোকটার গলায় উল্লাস, ‘সময় সময়, সবই সময়। উপযুক্ত সময় না এলে কিছুই হয় না। এত বছর ধরে চারদিকে যত চারা পুঁতেছি, মনে হচ্ছে সব এখন ফল দিতে শুরু করেছে, আরও দেবে। আর কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের পোর্টফোলিও এমন জায়গায় চলে যাবে উই উইল বি অ্যাট পার উইথ এনি আদার ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন।’

সামান্য মাথা নেড়ে মণিরন্ধ্র আরও প্রসারিত করি, আরও সামনে চোখ নিয়ে গেলাম, ‘স্যার, পজ করুন তো, জুম করুন জুম করুন।’ অরুণবাবু খানিকটা দূরে রয়েছেন, মাউসটা আমার হাতের সামনে তাই সেটা আমার পক্ষে চালনা করাটাই বেশি সুবিধাজনক। নিমেষে হাত চালিয়ে তুলে নিই মাউসটা। ভাদুড়ী বাধা দেন না। চলমান ভিডিওটা থামালাম, ম্যাগনিফাই করার চেষ্টা করলাম। করা যাচ্ছে না তা না কিন্তু তাতে কোনো সুরাহা হচ্ছে না। তাতে আলাদা কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না, ইমেজটা এমনভাবে ভেঙে যাচ্ছে যে কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা, প্রান্তগুলো ব্লার হয়ে যাচ্ছে।

ছায়ামূর্তি আড়াআড়ি পেরিয়ে এল রাস্তাটা। সোজা এগিয়ে মিলিয়ে গেল উলটোদিকের ঝোপঝাড়ের মধ্যে। রাস্তার মাঝামাঝি আবার পজ করে আবার ম্যাগনিফাই করার চেষ্টা করলাম কিন্তু ওটার অবস্থানটা ক্যামেরার সাপেক্ষে এমন একটা দূরত্বে যে অবজেক্টটাকে কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না। বেশ খানিকক্ষণ নানা রকম চেষ্টা করে ওটাকে বোঝার চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুতেই পারছি না দেখে মাথা নাড়েন ভাদুড়ী, ‘নিরর্থক চেষ্টা, স্টুপিডের মতো কাজ।’

‘কেন?’

‘তুমি কি ভাবছ এটা সাধারণ আর দশটা অবজেক্টের মতো কিছু একটা যে এত সহজে অ্যানালিসিস করে ফেলতে পারবে? ভেরি ট্রিকি অবজেক্ট মাই ডিয়ার বয়, ভেরি কমপ্লিকেটেড। এরা অস্তিত্ব জানান দেবে কিন্তু ধরা দেবে না, দৃশ্যমান হবে কিন্তু আমাদের কোনো সিদ্ধান্তে আসতে দেবে না। ব্যাপারটা এত সহজ হলে তো হয়েই যেত, সাধে কি তিরিশটা বছর ধরে মাথা কুটছি?’

‘কিন্তু স্যার, নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না ঠিকই কিন্তু কেমন যেন একটা মহিলার শেপ বলেই তো মনে হচ্ছে। মনে আছে যখন ওই গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছিলাম ওরা বলেছিল ওই জায়গাটায় নাকি এক বাড়ির মহিলাকে নৃশংসভাবে পুড়িয়ে খুন করা হয়েছিল, তখন ওখানে বসতি ছিল, রাস্তা তৈরি হয়নি। সেই থেকেই নাকি ওই মহিলার প্রেতাত্মা ওই জায়গাটা জুড়ে ঘুরে বেড়ায়।’

‘হ্যাঁ সেই ব্যাপারটাই তো মনে হচ্ছে। শুনেছি নাকি এই রাস্তায় বেশিরভাগ অ্যাক্সিডেন্টগুলো হয়েছে হঠাৎ এই ছায়ামূর্তিটা গাড়ির সামনে চলে আসায়।’

‘কিন্তু সেই অনুযায়ী ভাবতে গেলে ছায়ামূর্তিটা তো কোনো গ্রাম্য গৃহবধূরই হওয়ার কথা। কিন্তু তেমন তো লাগল না! পরনে কাপড়, লুটোনো আঁচল বা ওই জাতীয় কোনো ইম্প্রেশন তো কিছু তৈরি হল না?’

‘মানে?’ ভ্রু কুঁচকে তাকান ভাদুড়ী, ‘কী বলতে চাইছ?’

‘না, প্যারানর্মাল দুনিয়ার যুক্তি মেনেই যদি চলি তো এক্ষেত্রে ছায়াশরীরটা তো হিসাব মতো সেই পুড়ে মরা মহিলারই তো হওয়ার কথা, তাই না?’

‘কেন, সেই মহিলাকে তুমি চিনতে নাকি? তোমার জন্মের আগে পুড়ে মরা সেই মহিলাকে কি তুমি চাক্ষুষ দেখেছিলে, নাকি তোমার স্বপ্নে দেখা দিয়েছিল?’ হো হো করে হেসে ওঠেন অরুণবাবু, ‘মাঝেমাঝে পারোও বটে, তুমি কি আবার অশরীরীর শরীর নিয়ে পড়লে নাকি? অনিয়তাকারের আকার?’

‘অশরীরী মানে অনিয়তাকার আগে কখনও তো বলেননি? এত ইউ এফ ও বা আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট না যে কোনো ফর্ম থাকবে না। হাজার হাজার বছর ধরে কোটি কোটি মানুষ, এমনকী আপনাদের মতো প্যারানর্মাল এক্সপার্টরা সবাই তো প্রায় একই কথা বলে আসছেন প্রেতাত্মাদের হাওয়ার শরীরে মাস না থাকলেও দেখতে শেষমেষ সেই মানুষের আদলেই। মানুষ মারা যাওয়ার পরে ভূত তাই সেটা জীবিত শরীরেরই ছায়া। ছায়া থাকলে কায়ার প্রশ্ন তো একটা থাকতেই পারে…’

‘কেন? থাকতেই হবে তার কী মানে আছে? মাঝে মাঝে কী যে সব বকো, এসব কথা উঠছে কেন?’ বিরক্ত চোখে তাকালেন ভাদুড়ী, কুঁচকে উঠল ভ্রু-রেখা। ‘কায়া ছায়া কী যে সব নিয়ে পড়ো, চিন্তা করার কত ইম্পর্ট্যান্ট দিক পড়ে আছে আর তুমি মাঝে মাঝে এমন সব উটকো অপ্রাসঙ্গিক তুচ্ছ ইস্যু নিয়ে পড়ো না আর কী বলব?’

‘তুচ্ছ কেন বললেন বুঝলাম না? তেমন অপ্রাসঙ্গিক কথাও তো কিছু বলিনি। আপনি ছায়াটা দেখালেন, আমি দেখলাম। এখন সেটা দেখে আমার যদি কিছু মনে হয় সেটা কি আমি বলব না?’

‘কেন বলবে না, একশোবার বলবে কিন্তু তাই বলে এইসব স্টুপিড কথা…’ গলা খাঁকড়ে ওঠে, মানুষটাকে অস্থির দেখায়। দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে এসে স্ক্রিনে চোখ রাখেন, ভাঁজ পড়ে কপালে।

‘কেন স্টুপিড কথা বলছেন কেন? ওই তো স্ক্রিনে শ্যাডো-ফিগারটাকে পজ করে রেখেছি, অস্পষ্ট হলেও একেবারে অনিয়তাকার বা ফর্মলেস তো না। আরও একবার ভালো করে দেখে নিজেই বলুন না। পরনের লং-পোশাক বা চলার ধরণটা দেখে কোন অ্যাঙ্গেল থেকে মনে হচ্ছে এটা কোনো গ্রামীণ মহিলা?’

‘কই, আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না, তেমন কিছু চোখে পড়ছে না।’ মাথা নাড়েন ভাদুড়ী, উচ্চারণে চাপ দিয়ে কিছুটা যেন জোর করেই বলতে চান। গলা কেমন যেন বেসুরো বাজে। ‘তাছাড়া স্পিরিট অ্যাপারিশনরা কখন কোন চেহারায় ধরা দেবে সেটা কি ঠিক থাকে? ওরা নানা ধরণের চেহারা নিতে পারে, ইলিউশন তৈরি করে দর্শকদের বিভ্রান্ত করতে পারে।’

‘কিন্তু এসব ক্ষেত্রে এমন কথা তো আগে শুনিনি, কোনো বইয়েও পড়িনি!’

‘জীবনে কটা বই পড়েছ হে শুনি, কতদিন এই লাইনে আছ? কী জানো, এই দুনিয়ার রহস্য কতটুকু বোঝো?’

লোকটার মুখ থেকে আচমকাই ঝাঁঝালো স্বর শুনে ছোপ খেয়ে তাকালাম। লোকটার মুখ জুড়ে বেশ কিছু অপ্রস্তুত রেখা, কেমন যেন একটা অস্বস্তির ছাপ, পুরু ঠোঁটটা মৃদু কাঁপছে। রাগ ছলকে উঠেছিল তবু নিজেকে যতখানি সম্ভব সংযত করে নিয়ে বললাম, ‘সে তো বটেই, আমার অভিজ্ঞতা আর কতটুকু? ওই ব্যাপারটায় আমার কিছুটা খটকা লাগল তাই বললাম।’

‘কেন? খটকা কীসের! খটকা কেন লাগবে? আমাদের ভিউয়ারদের খটকা লাগলে সেটা আলাদা কথা কিন্তু আমরা যারা এই প্রোজেক্টের ঘরের লোক তাদের খটকা লাগবে কেন?’ হাতের কাছের আধ ভর্তি জলের বোতলটা খামচে ধরেন অরুণবাবু।

‘কেন লাগলে কী ক্ষতি? আমি তো চিরকালই প্রশ্ন করে এসেছি, কোনো কিছুকেই দ্বিধাহীন ভাবে নেওয়া ধাতে নেই। সেসব জেনেশুনেই তো আপনি আমায় দলে নিয়েছিলেন, আমার সঙ্গে সেই সব নিয়ে আগেও অনেকবার মতান্তর হয়েছে কিন্তু এই কনফ্লিক্টটা কি আমাদের কাজের পক্ষে স্বাস্থ্যকর না? কথায় বলে নো কনফ্লিক্ট নো গ্রোথ। আপনিই তো একসময় বলতেন কোনো ডাউট থাকলে বলো। ডাউট হেলদি জিনিস, ডাউট না থাকলে কাজে উন্নতি করা যায় না, ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ডের কাজ করা যায় না।’

‘না না সে সব ঠিক আছে কিন্তু সব কিছুর একটা লিমিট আছে, লিমিট ছাড়িয়ে গেলে সেটা আর স্বাস্থ্যকর থাকেনা সেটা অন্তর্ঘাত হয়ে দাঁড়ায়, সাবোটাজ। অর্গানাইজেশনটাকে নিজের বলে ভাবতে পারলে তুমি কি পদে পদে এমন অসহযোগিতা করতে পারতে?’

‘কী বলছেন আমি সাবোটাজ করছি? অসহযোগিতা করছি? আমি...!’

‘তাছাড়া কী? অর্গানাইজেশনের যখন এই রকম গোল্ডেন আওয়ারস চলছে, যখন একের পর এক এই জাতীয় দারুণ সব ফাইন্ডিংস হাতে আসছে, তখন কোথায় আনন্দে গা ভাসাবে না কথায় কথায় তোমার সন্দেহ, কথায় কথায় সংশয়! আমার খুঁত ধরতে পারা যেন তোমার একটা পৌরুষী, আমায় অপদস্থ করতে পারলে তুমি যেন জিতে যাও! কেমন যেন একটা ডিফায়েন্ট ভাব, একটা একবগ্গা গোঁয়ার্তুমি। আগে থেকেই মনস্থির করেই রেখেছ আমি মানব না, যাই হোক, যত কনভিন্সিং ভাবে যাই দেখাক আমি বাপু কিছুতেই মানছি না।’

‘তা তো না, আমি তো এতদিন ধরে আপনার জন্য জানপ্রাণ লড়িয়ে কাজ করে এসেছি। আপনি যা যা চেয়েছেন আমার ক্ষমতার শেষ বিন্দু অবধি গিয়ে চেষ্টা করেছি সেগুলো প্রমাণ করতে। যুক্তিবাদী হলেও জানতে বা বুঝতে চেয়েছি পাল্টা যুক্তির রাস্তাগুলোও, মনেপ্রাণে চেয়েছি আমার যুক্তিগুলো যেন শেষ অবধি ভুল প্রমাণিত হয়। কাজের জায়গায় কোনো ভাবে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা দৃষ্টিভঙ্গিকে নাক গলাতে দিইনি, পার্সোনাল ইগোকে কখনও প্রশ্রয় দিইনি, দিলে তো এতদিন ধরে কাজই করতে পারতাম না। কেন সন্দেহ আছে, আপনার মনে আমার সিনসিয়ারিটি নিয়ে কোনো সংশয়?’

‘সিনসিয়ারিটি, কীসের সিনসিয়ারিটি? তুমি তো আমাদের প্রোজেক্টে সম্পৃক্তই হতে চাইলে না, আমরা জল চাইলাম তুমি তেল হয়ে ভেসে থাকলে! ওই সিনসিয়ারিটি দিয়ে আমি কী করব, ধুয়ে জল খাব?’

‘মানে, কী বলতে চাইছেন?’

‘কী আবার বলব, কী মনে করো, আমি অতই মূর্খ, তোমার ইঙ্গিত আমি বুঝি না? কী মনে হচ্ছে আমি এই রেকর্ডেড ভিডিও ট্যাম্পারিং করেছি, সেটা কি আদৌ সম্ভব? রাত নজরদারি ক্যামেরায় লাইভ রেকর্ডিং নিয়ে কোনো রকম জালিয়াতি করা সম্ভব?’ তর্জনী দিয়ে টোকা মারেন বিশালাকৃতি এলইডি স্ক্রিনে, ‘কী বলতে চাইছ, মাঝরাতে ধরা পড়া জলজ্যন্ত এই ইমেজটা নকল, আমার টেকনোলজিক্যাল কারসাজি, এটা আমি সুপার ইমপোজ করিয়েছি? প্রমাণ করতে পারবে, দুনিয়ার সেরা ফরেন্সিক দল নিয়ে এসেও প্রমাণ করাতে পারবে?’

‘আমি তো তা বলিনি, আমি কি তাই বলেছি?’

‘বলতে আর কী বাকি রেখেছ? সাহস হয় কী করে? হাউ ডেয়ার ইউ কোয়েশ্চেন মাই ওয়ার্ক, হাউ ডেয়ার ইউ চ্যালেঞ্জ মাই ইন্টেগ্রিটি?’

‘কোথায় চ্যালেঞ্জ করলাম, কাকে চ্যালেঞ্জ করলাম, আপনাকে? এসব কী বলছেন?’

রাগে ফুঁসতে থাকেন ভাদুড়ী, ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়তে থাকে। রক্তাভ হয়ে উঠেছে চোখ মুখ। বিচলিত চোখে তাকাই আমি, ‘এভাবে কথা বলছেন কেন? কী এমন বলেছি যে আমার সঙ্গে এইভাবে কথা বলতে হবে?’

‘এইভাবে কথা বলব না তো কী বলব? তোমায় কুলো ডালা দিয়ে বরণ করব? দিল মেজাজটা চটকে, দারুণ একটা এক্সট্যাটিক মুডে ছিলাম। পর পর এতগুলো সাকসেস, এত বড়ো জিনিসটা চোখে পড়ার পর কোথায় সবাই মিলে সেলিব্রেট করব, না দিল সব বারোটা বাজিয়ে।’ খামচে ধরা জলের বোতলটা হাতের চাপে দুমড়ে মুচড়ে ফেললেন লোকটা, গায়ের জোরে ছুঁড়ে মারলেন উলটোদিকের দেওয়ালের দিকে।

হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি , কী বলব বা করব বুঝতে পারছি না। দেওয়ালে আছাড় খেয়ে মেঝের উপর গড়াচ্ছে বোতলটা। ওদিকে তাকাতেই মনে হল দরজার পাশে কে যেন একটা দাঁড়িয়ে। বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই আন্দাজ করেছিলাম কিন্তু কে হতে পারে বুঝতে পারিনি। বোতলটা ছুঁড়ে ফেলার শব্দেই হোক বা অরুণবাবুর উত্তপ্ত কথাবার্তা কানে যাওয়ায় দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে এল চান্দ্রেয়ী, ‘কী হল, কীসের শব্দ, কী হয়েছে ধৃতিমান? কী হল বাবা?’

‘কিছু হয়নি। যাও যাও, নিজের ঘরে যাও। পরে কথা হবে, এখন আর একটাও কথা নয়, যাও সামনে থেকে যাও। পরে কথা হবে, রাতে কথা হবে।’ হাওয়ায় হাত ছুঁড়ে বলে ওঠে লোকটা।

‘কিন্তু স্যার, একটা কথা শুনুন। আমায় ভুল বুঝবেন না, রেগে যাবেন না প্লিজ, আমার একটা কথা শুনুন।’ কোনো অবস্থাতেই মেজাজ না হারাতে বদ্ধপরিকর আমি এগিয়ে যাই, যতদূর সম্ভব নরম স্বরে বলি।

‘কোনো কথা শুনতে চাইনা, মাথায় আগুন জ্বলছে এখন, দয়া করে যাও। বাড়ি যাও।’ লোকটা চেঁচিয়ে উঠল, চান্দ্রেয়ীর দিকে তাকিয়ে শক্ত চোয়ালে আঙুল নেড়ে বলে উঠল, ‘এই ছেলেটাকে চলে যেতে বল, এখনই, এখনই যেন চোখের সামনে থেকে চলে যায়।’

‘স্যার স্যার, শুনুন একটা কথা...।’

‘এখন আর কোনো কথা না।’ আমার হাতের কনুই-এর কাছটা ধরে আলতো টান দিল চান্দ্রেয়ী। ‘চলো, এখন চলো। পরে কথা হবে, কাল কাল ওঁর সঙ্গে কথা বল। এখন চলো, প্লিজ চলো।’

শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভাদুড়ী, অসংলগ্ন দেখাচ্ছে মুখের রেখাগুলো, ভাঙা কাচের টুকরোর মতো ধারালো চোখ ছুঁড়ে দিতে থাকেন এদিক ওদিক। একভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বেশ খানিকটা উপর থেকে রিভলভিং চেয়ারটার গদিতে নিজেকে ছেড়ে দেন। হাত পা ছড়িয়ে বসে পাক খেয়ে ফেরেন আবার ওঁর ডেস্কটপের দিকে। আবার ফের আগের মতো চোখ গেঁথে দেন স্ক্রিনে, সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

‘দাঁড়াও চান্দ্রেয়ী একটা কথা, স্যারকে জাস্ট একটা...।’ ওর হাত ছাড়িয়ে এগোতে চাইলাম ভাদুড়ির দিকে।

‘না না আজ না, আজ না। আজ আর কোনো কথা না। প্লিজ, আমার কথা শোনো প্লিজ…’ আমার হাত ধরে বাইরের দিকে টান দিল চান্দ্রেয়ী। জোর না হলেও বেশ কার্যকরী বলপ্রয়োগে টেনে নিয়ে গেল দরজার বাইরে।

দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে আসছি কানে আসছে ভাদুড়ীর, ‘মলয় অগাস্টিন সমর শাজাহান, আশপাশে কে আছ, কাম অ্যান্ড গেট দিস বয় আউট অফ আওয়ার ডোরস।’

শুনে রাগ খলবলিয়ে উঠল আমার রক্তে। চান্দ্রেয়ী টানছে উলটোদিকে কিন্তু আমিও চিৎকার করে উঠলাম, ‘সিন ক্রিয়েট করার দরকার নেই, বাইরের দরজার রাস্তা আমি চিনি। কাউকে দরকার নেই, গলা ধাক্কা দেওয়ার জন্য কাউকে পাঠানোর দরকার নেই। নিজের পায়ে ভর দিয়েই যখন এসেছিলাম নিজের পায়ে ভর দিয়েই বেরিয়ে যেতে পারি। ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু হেল্প।’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, প্লিজ ডু দ্যাট, প্লিজ ডু...।’

এমনিতে আমি শান্তই, বিশেষ করে এই বাড়িতে যথেষ্ট সংযত কিন্তু এটা মেনে নেওয়া যায় না। যে লোকটার জন্য এত করেছি তার মুখ থেকে এমন কথা শুনলে কার মাথা আর ঠিক থাকে! পুরুষ মানুষের জীবনে নিজের রাগের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখাটাই সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ কিন্তু সব ব্যাপারে সমান ভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় না। আপ্রাণ শক্তিতে হাত ধরে টানছে চান্দ্রেয়ী, আমি ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে চাইনা। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে গলা ছাড়ি। তিনতলার বিশাল হল ঘর আর সিঁড়ির ফাঁকা স্পেসের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে কথাগুলো, ‘যাচ্ছি যাচ্ছি, বলতে হবে না চলে যাচ্ছি কিন্তু এবার কিন্তু আর ডাকবেন না। ডাকলেও কিন্তু আমি আসছি না, যাই বলুন যাই করুন এবার কিন্তু আমি আর আসছি না।’

১২

ফ্ল্যাটে ফিরেই রাতের হোম ডেলিভারিতে খাবার অর্ডার দিয়েই ফোনটা স্যুইচড অফ করে দিয়েছিলাম। লিফটে ওঠার আগেই দারোয়ানকে বলে দিয়েছিলাম কেউ খোঁজ করতে আসলে বলে দেবেন আমি নেই, বাড়ি গিয়েছি, সপ্তাহ খানেক পরে ফিরব।

ঘরে ঢুকে তীব্র রাগে অভিমানে বিরক্তিতে শরীরটাকে ছুঁড়ে দিয়েছিলাম বিছানার উপর। না না, এ কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। বেমক্কা এমন অপমানজনক আচরণ! ভাদুড়ী ভয়ানক মুডি, আনপ্রেডিক্টেবল, মেজাজ আকস্মিকভাবে ওঠা নামা করে জানা আছে তাই বলে এমন দুর্ব্যবহার! লোকটার ওপর সব রাগ গিয়ে পড়ে খাট থেকে বেরিয়ে থাকা পায়ের সামনের টি-টেবিলটার উপর। গায়ের জোরে লাথি কষাই ওটাতে। ঝনঝন শব্দে ওটার ওপর রাখা থালা বাটি গেলাসগুলো ছিটকে পড়ে মাটিতে।

নাঃ, আর কোনোদিন যাচ্ছি না, একশোবার কেন হাজারবার ফোন করুক ভুলেও ধরছি না। পায়ে ধরে সাধলেও আর ওই বাড়িমুখো হচ্ছি না। অনেক হয়েছে আর না, অনেক সয়েছি আর না। দেখি কেমন পারে, আমাকে ছাড়া ওদের কেমন চলে। একমুখে যে কত রকম কথা বলে! এই বলছে আমি নাকি ওঁর সংস্থার মুখ আবার পরক্ষণেই সেই মুখকে অস্বীকার করছে! এবার দেখুক কেমন লাগে, আমাকে ছাড়া ওঁর টেলিভিশন প্রোজেক্টের কাজ কেমন এগোয়, এক্সপ্লোরার কাম অ্যাঙ্কর হিসেবে আমার বিকল্প কোথায় পায় আমিও দেখে নেব।

মনটা বিষিয়ে আছে, কিচ্ছু ভালো লাগছিল না, তার সাথে বেয়াড়া একধরনের আলসেমিও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল, বেলা পর্যন্ত বালিশে মুখ খুঁসটে বিছানাতেই পড়ে ছিলাম। বেলা ঠিক সাড়ে দশটা বাজে, ডোরবেলটা বেজে উঠল। কাজের মাসি নিশ্চয়ই, উঠে গিয়ে দরজা খুলতে ইচ্ছে করছে না কিন্তু সে এসে জলখাবার না বানালে পেটে তো কিছু পড়বে না।

বেশ কিছুক্ষণ পর কোনো রকমে উঠে দরজা খুলতেই আকাশ থেকে পড়ি আর কী! ঠিক মতো ঘুম ভেঙেছে তো, চোখে ভুল দেখছি না তো? ‘এ কী, তুমি? তুমি কী করে এলে?’

‘কেমন করে আবার, লিফট খারাপ তাই সিঁড়ি বেয়ে।’ মৃদু ঘাড় নেড়ে স্মিত হাসে চান্দ্রেয়ী।’

‘কেন দারোয়ান কিছু বলেনি, কেয়ারটেকার? আমি যে কাউকে অ্যালাও করতে বারণ করেছিলাম, কেউ খোঁজ করলে বলে দিতে বলেছিলাম আমি নেই!’ ভ্রু কুঁচকে তাকাই আমি। পরনে ঘরের আলুথালু পোশাকের ব্যাপারে সচেতন হয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়াই।

‘কী মনে হয়, একজন কেয়ারটেকার বা দারোয়ানকে ট্যাকল করে উপরে উঠে আসা আমার পক্ষে খুব কঠিন কাজ? কী মনে করো?’ চান্দ্রেয়ীর ঠোঁটের কোণে স্বভাবসিদ্ধ চাপল্য। ‘তবে কেয়ারটেকার বা দারোয়ানকে কিন্তু দোষ দিওনা ওরা কিন্তু বলেছিলেন, তুমি নেই বলেছিলেন কিন্তু আমি তো জানতাম তুমি আছ, তাই একেবারে সোজা উপরে...।’

হাসি পেল না আমার, চোয়াল শক্ত করে যতদূর সম্ভব কটমটে দৃষ্টিতে তাকালাম। কিন্তু এই মেয়েটাকে দেখলে আমার ভেতরে এ কী রকম একটা কী যে হয় কে জানে, ঈশ্বরে বা ভূতে বিশ্বাস করলে কী বলতাম জানি না কিন্তু এক্ষেত্রে বলা ছাড়া উপায় নেই স্বয়ং প্রকৃতি জানেন ঠিক কী যে হয়। আপনা থেকেই দ্বিগুণ গতি বেড়ে গেছে হৃদস্পন্দনের, আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। মেয়েটা বলল, ‘কী হল, খুব রাগ হয়েছে মনে হচ্ছে?’

অনর্থক প্রশ্ন, এর উত্তর আর কী হতে পারে? জবাব এড়িয়ে ভাবলেশহীন তির্যক দৃষ্টিতে তাকালাম, গম্ভীর স্বরে বললাম, ‘তুমি কি একাই এলে? বাড়ি থেকে একা কোথাও বেরোও না শুনেছি?’

‘একা তো আসিনি।’

‘বুঝতে পারছি। তোমার বাবা তাঁর সাগরেদদের দিয়ে পাঠিয়েছেন তাই তো?’

‘না না আমাকে নিয়ে বাবা নিজেই এসেছেন, নীচে গাড়িতে বসে আছেন।’

‘সে কী...! কেন?’ ঠোঁট বেঁকিয়ে বিদ্রুপের সুরে বললাম। বাঁকা চোখে তাকালাম ধারালো চোখে, ‘সে যে আসে আসুক না, যার ইচ্ছে আসুক। আমি কিন্তু নিচে যাচ্ছি না, আমি কিন্তু দেখা করতে পারছি না।’

‘বুঝতে পেরেছি, সেটাই স্বাভাবিক। তাই উনি আমায় পাঠালেন, তোমার সঙ্গে কথা বলতে পাঠালেন।’

‘কিন্তু পাঠিয়ে তো লাভ নেই, আমার সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। আমি আর কোনো কথা শুনছি না, আমার দুটো কানই বন্ধ, কোনো কথাই আর আমার কানে ঢুকবে না।’

‘জানি, তোমার জায়গায় আমি হলেও হয়ত তাই বলতাম কিন্তু বাবা সত্যিই খুব অনুতপ্ত। তোমার মতো একজনের ওপর ওইভাবে রেগে ওঠার জন্য, ওই রকম দুর্ব্যবহারের জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। জানো, কাল তুমি চলে যাওয়ার পর সে কী কাণ্ড! নিজের উপর রাগে টেবিলের কাচে জোরে চাপড় মারায় ডান হাত কেটে রক্তারক্তি। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে আর উনি হাতে ব্যান্ডেজ অবধি বাঁধতে দিচ্ছেন না, সারা ঘর জুড়ে পায়চারি করে যাচ্ছেন আর শুধু একটা কথাই বলে যাচ্ছেন এ আমি কী করলাম, কাকে কী বললাম, কী বলতে কী বলে ফেললাম! জান কাল রাতে উনি খাননি, সারা রাত ঘুমোননি।’

‘কেন? উনি তো নেশা করেন না যে ঘোরে ছিলেন। আমাকে যা যা বলেছেন সব তো সজ্ঞানেই বলেছেন। তাছাড়া এই তো প্রথমবার না, এর আগেও উনি আমার সঙ্গে এই রকম ব্যবহার করেছেন। তবে এটা চরম ছিল, ওঁর কাছ থেকে এতটা আশা করিনি, এর চেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারেনা। তাই আমি এবার একেবারে ডিটারমাইন্ড, কোনোভাবেই আমাকে আর টলানো যাবে না, ওই বাড়ির সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ, চিরকালের মতো শেষ।’

‘শেষ মানে? না না, এভাবে বোলো না ধৃতি। মুখে যাই বলুক তুমি বাবার ব্লু-আইড বয়, বাবা তোমায় কী চোখে দেখেন সে কী তুমি জানো না? রাগের মাথায় তোমার সঙ্গে ওই রকম আচরণ করে ফেলায় উনি খুব মনোকষ্ট আর অপরাধবোধে ভুগছেন, তোমার সঙ্গে সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত এই সমস্যাটা না মিটলে উনি খুব শক পাবেন। এই ব্যাপারটার নিষ্পত্তি না হলে এত সবকিছু থমকে দাঁড়াবে, উনি যে রকম মুডি একজন মানুষ হয়তো প্রোজেক্টটাই বন্ধ করে দিলেন। এতদিনের এত কাজকর্ম পরিশ্রম লড়াই সব মাঠে মারা গেল, টেলিভিশন চ্যানেলের এত বড়ো অফার, ভবিষ্যতের আরও বড়ো সব পরিকল্পনা সব ভেস্তে গেল ...।’

‘তাতে আমার কী? উনি তো বলেইছেন আমি কোনোদিনই ওঁর এই প্রকল্পটাকে নিজের কাজ ভাবিনি, নিজের ভাবতে পারিনি। তেল হয়ে জলের ওপর ভেসে থেকেছি…’

‘কোথায়, উনি তো কালরাতেই আমায় বললেন ধৃতিমান না থাকা মানে পুরো ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায় মুন্ডহীন কণিষ্কের মূর্তির মতো...।’

‘ভুল করছ মুখ আর মাথা কিন্তু এক জিনিস না। আমাকে উনি আমাকে ফেস হিসেবে প্রোজেক্ট করেছেন ঠিকই কিন্তু মাথাটা উনিই। একমাত্র উনিই এই প্রোজেক্টে অপরিহার্য, বাকি আমরা কেউ থাকলেই বা কী, না থাকলেই বা কী? টেলিভিশন শো-টার কথা চিন্তা কোরো না, ওনার হাতে অলরেডি যে পরিমাণ মেটেরিয়াল রেডি আছে তা দিয়ে উনি ইচ্ছে করলে একটা কেন ওই রকম চারটে শো নামিয়ে দিতে পারে।’

‘সে হয়তো পারেন কিন্তু তুমি তো জানো ওঁর চাওয়াটা আরও অনেক বেশি, ওঁর প্রোজেক্টটা অনেক বেশি অ্যাম্বিসাস। এটাই যে ওঁর সবকিছু ধৃতি, শুধু ওঁর মিশনই না জীবনের চেয়েও বেশি বলা ভালো। এটা ধাক্কা খেলে উনি শক পাবেন, সব কিছু যখন দারুণ ভাবে লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে তখন মোমেন্টামটাকে এইভাবে নষ্ট হতে দেওয়া কি ঠিক?’

‘ওহ তাহলে ওই জন্যে, ওই জন্যেই আমায় দরকার?’

‘কেন, এভাবে ভাবছ কেন? তোমার সঙ্গে কি আমাদের শুধু দরকারের সম্পর্ক? এতদিন ধরে এত কিছুর পর তোমার এই মনে হল, এতগুলো বছর ধরে আমাদের সঙ্গে থেকে শেষে তুমি এই বুঝলে?’

‘তাছাড়া আর কী বুঝব বলতে পারো? খেয়ালখুশি মতো উনি আমায় মাথায় তুলবেন, পরক্ষণে পায়ে ঠেলবেন, এ কী ধরণের আচরণ হল? না না আর নয়, অনেক হয়েছে। এবার আমি নিজের মতো কাজ করতে চাই, আমার নিজস্ব বিশ্বাস আর পদ্ধতি অনুযায়ী নকটারনাল এক্সপ্লোরেশনের কাজে নামতে চাই। এখানে এত বছর নিঃস্বার্থ ভাবে খেটে যখন অন্তর্ঘাতের বদনামের চেয়ে বেশি কিছু জুটল না তখন নিজের রাস্তা নিজে বেছে নেওয়া ছাড়া আর তো কোনো উপায় নেই।’

চোখের প্রান্ত সঙ্কুচিত করে করুণ ভাবে তাকায় মেয়েটা, স্বর এলিয়ে দিয়ে বলে, ‘হি ইজ রিয়েলি ভেরি স্যরি, জেনুইনলি স্যরি, ধৃতি। তাছাড়া যে মানুষটা তোমায় এত স্নেহ করে তার সব কথা কি এত সিরিয়াসলি নিতে আছে? তুমি কি জানো না লোকটা কেমন, মেজাজ হারালে লোকটার মাথার ঠিক থাকে না, তখন যা বলে সব কথা কি ধরলে চলে?’

‘সেটা আমার পক্ষে সম্ভব না। সে মানুষটা যেই হোক যে আমায় বলছে হাউ ডেয়ার ইউ কোয়েশ্চেন মাই ইন্টেগ্রিটি, গেট আউট অফ মাই হাউস আর আমি তার কথা শুনে দাঁত বার করে হাসব বা বেমালুম হজম করে নেব, স্যরি এটা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব না।

বেশ কয়েক বছর ধরে তো আমায় দেখছ নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছ আমি মানুষটা কেমন? নিঃস্ব, সর্বশ্বান্ত, শেষ হয়ে যাব, এমনকি মরে অবধি যেতে রাজি তবু মাথা নোয়াব না, কারও কাছে না, অরুণ ভাদুড়ী তো দূরের কথা জন্মদাতা ধীরেন নন্দীর কাছেও না। আমি ওই রকমই, বাড়ির লোকজন বলে অল্প বয়সে মা-হারানোর ট্রমা থেকে উঠে আসা ছেলে তো তাই একটু বেয়াড়া, জেদি, হতচ্ছাড়া।’

‘সে তো আমিও, আমিও তো খুব কম বয়সে মাকে হারিয়েছি। তাই আমিও হয়তো বেশ অকওয়ার্ড, স্টাবার্ন আর তুমি যা যা বললে সেই সব কটাই। শরীরে পাঞ্জাবী রক্তও আছে তাই আরও কয়েক কাঠি বাড়া...।’

‘তাই নাকি, জানতাম না তো, ওহ তোমার মা পাঞ্জাবী ছিলেন বুঝি?’

‘এক্কেবারে, কলকাতার মেয়ে হলে কী হবে পিওর জলন্ধর কি কুড়ি। দারুণ অ্যাথলিট ছিলেন, হকিতে স্টেট রিপ্রেজেন্ট করেছিলেন, আউট অ্যান্ড আউট অ্যাডভেঞ্চারাস। দুঃসাহসিক মহিলা কিন্তু এই বেশি সাহসই মানুষের কাল হয়...।’

‘কেন কী হয়েছিল, ওনার কী হয়েছিল...?’

‘অ্যাক্সিডেন্ট, এই শহরেরই এক বিপজ্জনক রকমের পুরোনো ছ-তলা বাড়িতে বহুকাল ধরে অচল পড়ে থাকা একটা ভাঙা লিফটে বিচ্ছিরি একটা অ্যাক্সিডেন্ট...। আমি তখন ক্লাস সেভেন, যাক গে বাদ দাও, ওসব কথা এখন বাদ দাও।’ মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

‘সেকী! বহুকাল ধরে অচল পড়ে থাকা ভাঙা লিফটে উনি কী করছিলেন?’ শিউরে উঠে বড়ো বড়ো চোখে তাকাই, ‘বলোনি তো, এত বড়ো ঘটনা আগে কখনও বলোনি তো!’

‘কী বলব, কী আর বলার আছে? সে সব কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। যাই হোক তাই সেদিন যখন তোমার মায়ের ওইভাবে চলে যাওয়ার কথা শুনলাম, তোমার সেই ট্রমাটিক ফেজটা কাটিয়ে ওঠার কথা ভেতর ভেতর কেমন যেন নড়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, এ বাবা এরও তো সেই একই গল্প! উই আর অন দ্য সেম বোট, আমরা দুজনেই তো সেই এক পালকের পাখি।’

‘হ্যাঁ তাই তো, সে রকমই তো মনে হচ্ছে।’

‘সেই কথা শোনার পর তোমার দিকে অন্য চোখে তাকিয়ে ছিলাম। তার আগে থেকেই অবশ্য অন্য চোখেই দেখতাম, এমনিতে তো আলাদাই, অন্য সবার চেয়ে আলাদা।’ চোখের প্রান্তরেখাগুলো প্রসারিত করে আড়চোখে তাকায় মেয়েটি।

চোখে লেগে যায় চোখ, জানি এটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তবু ঝাঁকি মেরে সরিয়ে নিতে গিয়েও আঠায় জড়িয়ে পড়ি যেন। মণিতে আটকে পড়ে মণি। গভীর কুয়োর একদম তলার টলটলে কালো জলে ঝুঁকে তাকানোর মতো করে তাকিয়ে কিছু যেন একটা বোঝার চেষ্টা করি। আই লাইনার চর্চিত না তবু চোখের তলার দিকের সুরেখ বাঁকটা বিপজ্জনক, কিন্তু আর তো কোনো উপায়ও নেই, মানুষের মতো জটিল একটা বিষয়কে কিছুটা হলেও অনুমানের আওতার মধ্যে আনতে গেলে চোখে চোখ রাখা ছাড়া উপায় নেই।

চান্দ্রেয়ী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, করিডর দিয়ে পাস করার সময় ফ্লোরের অনেকেই দেখে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে, কেউ কেউ দরজা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে কিন্তু কী আর করা যাবে, ওকে তো ভেতরে ডাকতে পারছি না। একা ব্যাচেলরের ফ্ল্যাট, মেয়েটাকে ভেতরে ডেকে যে কথা বলব সে উপায়ও নেই। উপায় থাকলেও বা ডাকব কেন? বিকন ভিলা থেকে ওই রকম অপমানিত হয়ে বেরিয়ে আসার পর ওই বাড়ির কাউকে আর আমার এই চৌকাঠ মাড়াতে দিতে রাজি নই। ওকে অপমান করে ওইখান থেকেই তাড়িয়ে দিতে পারলে কিছুটা হলেও গায়ের জ্বালা মিটত কিন্তু যত সহজে বলা গেল ব্যাপারটা কি মোটেও অতটা সহজ?

মেয়েটার নরম চোখের পাতায় কী যেন এক আশ্চর্য মায়া-অঞ্জন, ‘জানি কিছুই ভুলবার না ধৃতি, তবু ভুলতে হয়। অত বড়ো নিস্তব্ধ বাড়িতে একা একটা মেয়ে যদি সব ভুলে থাকতে পারে তুমিও পারবে। ভুলতে আমাদের হবেই, বাঁচতে গেলে ভুলতে হবে। যদি না পারো, যদি কখনও মন দুর্বল হয়ে আসে আমার দিকে তাকিও, আমার দুর্বল লাগলে আমি তোমার দিকে তাকাব।’

ঢোঁক গিলল চান্দ্রেয়ী, বেশ কিছুটা যেন আটকে এল গলার স্বর, ‘তুমি হয়ত ভাবতে তোমার একার দুঃখটাই বুঝি সহ্যসীমার বাইরে, আমিও তাই ভাবতাম কিন্তু তা তো না, তোমার কথা শোনার পর থেকে মনে হচ্ছে আমরা তো কেউই একা না। এ পৃথিবীতে আমাদের মতো আরও অনেকেই আছে, হয়তো আমাদের চেয়েও দুর্ভাগা অনেকেই আছে, তাদের সঙ্গে দেখা হলে জীবনটার মানে পালটে যায়। স্বার্থপরের মতো শোনালেও মিথ্যে কথা বলব না তেমন কাউকে খুঁজে পেলে বুকে বল পাওয়া যায়, সহ্য করার ক্ষমতা দ্বিগুণ বেড়ে যায়, নিয়তির উপর ক্ষোভ কমে আসে। তোমার কথা বলতে পারব না, আমার তো অন্তত তাই মনে হচ্ছে, কী কিছু ভুল বললাম?’

‘না না, ঠিকই ঠিকই। আমারও তাই মনে হচ্ছে, তোমার কথা শুনে একই কথা মনে হচ্ছে।’

‘তাহলে আর কিছু মনে রেখো না। বাবা কী বলল, বাইরের আর কে কী বলল ওসব ছোটোখাটো কথা মাথায় রেখো না। বাবা বলছে বলে যদি নাও রাখো, আমি বলছি বলে অন্তত আমার কথা রাখো। তোমার সমবয়সী অনেকটা তোমারই মতো পরিস্থিতির আর একজন বলছে বলে কথা রাখো। ফিরে এসো ধৃতি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আবার আমাদের বাড়িতে ফিরে কাজে লেগে পড়। এটা তো প্রোজেক্টের খুব ক্রুশিয়াল সময়, এই রকম একটা সময় তুমি না থাকলেই না, তোমাকে ছাড়া হবে না, কিছুই এগোবে না।’

‘না না, আর যা বলো বলো ফেরার কথা বোলো না। ওই বাড়ি আর প্রোজেক্ট দুটো থেকেই আমি বেরিয়ে এসেছি, বেরিয়ে এসেছি মানে বেরিয়েই এসেছি, আর ফেরা সম্ভব না। তোমার সঙ্গে বন্ধুত্বের জায়গাটা আলাদা, সেটার সঙ্গে তোমার বাবার মিশনের ওইসব কাজকর্মকে কোনোভাবেই মেশাতে চাই না, দুটো জিনিসকে কিছুতেই মেলাতে চাই না। মোটকথা হল আমি আর অরুণবাবুর ওই টিমের কেউ নই, আই ডোন্ট বিলং টু দ্য প্রোজেক্ট এনি মোর।’

‘কিন্তু ওই বাড়িতে না ফিরলে যে আমার সঙ্গে তোমার আর দেখা হবে না যে। দেখা হওয়ার আর তো কোনো রাস্তা থাকবে না।’ চাপা স্বরে প্রায় যেন ফিসফিস করে ওঠে চান্দ্রেয়ী, ‘আমার সঙ্গে দেখা করতে হলে যে তোমায় ফিরতেই হবে, আমি তো জানো বাইরে বেরোই না, অতএব আর কোনো রাস্তা খোলা নেই।’

ফ্যালফেলে চোখে তাকিয়ে থাকি , কী বলব বুঝে উঠতে পারছি না। মেয়েটার ঠোঁটের নীচে এক চিলতে হাসি কাঁপছে, যেন প্রচ্ছন্ন আহ্বান। নিরুপায় গলায় বলে উঠি, ‘না না, সে কী করে সম্ভব? না না, তুমি আমার জায়গাটা বোঝার চেষ্টা করো প্লিজ।’

‘বুঝতে পারছি, তোমার সমস্যাটা খুব ভালো মতোই বুঝতে পারছি কিন্তু আর তো কিছু করার নেই। কারও জন্য না হয় আমার জন্য ফিরে এসো, এতদিন ধরে বাবার মিশনের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পর্যন্ত এতকিছু করেছো সেই অধিকারে ফিরে এসো। কে কী বলল, কে কী ভাবল, দ্বিধা দ্বন্দ্ব, মান অপমান, ইগোর চাপ সব ছুঁড়ে ফেলে নিজের জায়গায় ফিরে এসো।’

‘কিন্তু, কী ভাবে, এত কিছুর পর এই ভাবে..., না না, এত সহজ নাকি, এতই সহজ...?’

‘হ্যাঁ সহজ, সহজ ভাবলেই সহজ। সহজ না হলে সহজ করে নিতে হবে। সবকিছুকে সহজ করে নিতে পারাই তো আধুনিকতা, এটাই স্মার্টনেস।’

মেয়েটা কি সম্মোহন জানে কিনা কে জানে? চোখে চোখ রেখে খুব ভেতরে কোথাও আঁকশি গাঁথিয়ে আশ্চর্য ভাবে টানতে পারে। আমার না বলার ক্ষমতাকে ক্রমশ অক্ষম, ক্রমশ বিবশ করতে করতে এগিয়ে চলেছে আর আমাকে অসহায় দেখাচ্ছে, ক্রমশ অসহায়তর।

‘কেন বুঝতে পারছ না, আমি অত ফ্লেক্সিবল নই, আমি পারব না।’

‘কে বলল পারবে না, ইচ্ছে করলেই পারবে। মুখে যে যাই বলুক বিকন-ভিলার দরজা কিন্তু তোমার জন্য সব সময় খোলা ছিল, থাকবেও। বাস্তবে কিন্তু কোথাও কোনো বাধা দেখছি না, কল্পনায় সমস্যা তৈরি করতে যেও না।’

‘কোথায় কল্পনা, সব তো তোমার সামনেই ঘটেছে। তুমিই বলো? এর পরে কী করে যাওয়া যায়, কোন মুখে? না না, তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করো…’

‘না, আমার বোঝার কিছু নেই। কথা হল তুমি ফিরবে কি ফিরবে না। ফিরলে দেখা হবে, না ফিরলে আর দেখা হবে না। আর কোনোদিন দেখা হবে না তোমার সঙ্গে।’ নির্লিপ্ত স্থির দৃষ্টিপাত, নির্বিকার গলায় সে বলে, ‘আমি আমার কথা বলে দিয়েছি, নাও দ্য চয়েজ ইজ ইয়োরস।’

‘এ তো ভারী মুশকিলে পড়া গেল, এখন কী করি? ডিফিকাল্ট চয়েজ, ভেরি ডিফিকাল্ট’ বিচলিত হয়ে উঠি, এলোমেলো হয়ে যায় মুখমণ্ডলের রেখাগুলো, কাটাকুটি করে ইতস্তত ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

‘আসি তাহলে? আশা করি দেখা হবে।’ চোখের নিমেষে বাঁক নিল চান্দ্রেয়ী।

‘হ্যাঁ মানে না, মানে শোনো, দাঁড়াও একটা কথা...।’

হাত বাড়িয়ে থামানোর চেষ্টা করি কিন্তু তার আগেই ও পিছন ফিরে ফেলেছে। কমন করিডরে আর কী করি? ছুটে গিয়ে আটকানো তো আর সম্ভব না। আটকেই বা কী করব, কী বা বলার আছে যে পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠব?

লম্বা করিডর বরাবর মেয়েটা বেগে হাঁটতে থাকে সোজা। বাঁ হাতে নেমে গেছে সিঁড়ির ধাপ। চোখের কোণে তাকায় একপলক, এক ধাপ নেমে নজরের বাইরে চলে যায় মুহূর্তে। চৌকাঠের উপর থেকে কিছুতেই পা সরে না আমার। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাঁড়িয়ে থাকি, স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকি।

১৩

বিকেলের দিকের পর আর বাড়ি থেকে বেরোইনি। শুয়ে শুয়ে আকাশপাতাল অনেককিছু ভাবছিলাম। আমিই যে সব সময় ঠিক তা তো নাও হতে পারে, কোথাও ভুল হচ্ছে না তো? সত্যিই তো অরুণবাবুর টিমের সঙ্গে বেরিয়ে এমন অনেক ঘটনারই সাক্ষী হয়েছি যেগুলোর কার্যকারণ সম্পর্ক আমার মাথায় ঢোকেনি, অনেক কিছুরই জাগতিক কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি। যেমন এই কয়েকদিন আগের ওই বাড়িটার দেওয়ালে ইনফ্রারেড ক্যামেরায় ধরা পড়া হাতের ছায়াটা। কোথা থেকে এল, কী করে সম্ভব? তার কিছুমাস আগেই মহেশগঞ্জের বালাখানা এস্টেটের পরিত্যক্ত ওয়াচ টাওয়ারের সিঁড়িতে যে নিরবিচ্ছিন্ন আওয়াজটা আমাদের ইলেকট্রনিক ভয়েস ফেনোমেনন রেকর্ডারে ধরা পড়েছিল। ‘চলে যাও, চলে যাও’ ঘষঘষে, নোড়া দিয়ে বালির দানা গুঁড়ো করার শব্দের মতো গা কিড়কিড় করা তীক্ষ্ণ অথচ ক্ষীণ আওয়াজটা এখনও আমার কানে বাজে। কিংবা জলপাইগুড়িতে স্বদেশী আমলের সেই ভগ্নদশা লাইব্রেরির চিলেকোঠার ঘরের সিলিংটা থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে জল পড়া। ছাদে জলের কোন উৎস নেই, খটখটে শুকনো গ্রীষ্মের রাত অথচ কড়িবরগা দেওয়া সিলিং থেকে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে জল এসে জমছে, টুপ টুপ করে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ছে। জলের রঙ কালো, অনেকক্ষণ হাওয়ায় থাকা বেদানার রসের মতো ঘন কালচে লালও বলা যেতে পারে। ঘন রক্তের মতো দেখতে, প্রায় থকথকে ফেনিল। বোঁটকা গন্ধটা ঠিক রক্তের মতো না হলেও জমাট বাঁধতে থাকা রক্তের মতো দেখতে, যাকে পাবলিকে বদ-রক্ত বলে আর কী!

ঠিক মতো ভাবতে গেলে দু’দিকটা নিয়েই ভাবা দরকার, বাস্তব বা কয়েনের দু’পিঠ নিয়েই। অনুসন্ধানী মনকে তো অনেক বেশি মুক্ত হতে হবে। অতিপ্রাকৃত জগতটা কিন্তু একটা দুর্বোধ্য অঞ্চল, প্রায়শই আমাদের ভাবনার চেয়েও জটিল ও দুরুহ তাই এখানে সবসময় অতো একবগ্গা হলে চলে না। ভাদুড়ী কি ঠিকই বলেন, আমার অবিশ্বাসটা অবসেশন হয়ে যাচ্ছে না তো? বিশ্বাস অন্ধ সবাই জানে কিন্তু অবিশ্বাসও মাঝে মাঝে অন্ধ হতে পারে। এই সব সাত পাঁচ নানা কথা ভাবছিলাম, রাত তখন পৌনে দশটা মতো হবে। পায়ের ওপর পা তুলে আমার ফ্ল্যাটের ধপধপে সাদা সিলিংটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, মাথার কাছে রাখা ঘন্টাখানেক আগে স্যুইচ অন করা সেলফোনটা বেজে উঠল।

বিকন ভিলার ল্যান্ড নাম্বারটা জ্বলছে নিভছে স্ক্রিনে। কার ফোন, মেয়ের না বাবার? ধরব কি ধরব না, কয়েক মুহূর্ত দোনোমনো করে অবশেষে ধরেই ফেললাম। না, কানে কোনো নরম রিনরিন সুরেলা গলা বেজে উঠল না। বরং সেই চেনা ভরাট কণ্ঠ, কাচের শার্সিতে ঝোড়ো হাওয়ার ধাক্কার মতো গমগমে। তবে অন্যদিনের মতো দাপুটে না, যথেষ্ট নমনীয়, যতদূর সম্ভব অমায়িক, সংযমী। মন্দ্র মেদুর যত্নে উচ্চারণ করে উঠলেন আমার নাম, স্বরে উচ্ছ্বসিত উড়ান, ‘ধৃতিমান, মাই ফ্যাবুলাস বয় ধৃতি। ফোন না করে আর থাকতে পারলাম না, একই সঙ্গে দুটো বড়ো খবর। একটা যদিও একটু দুঃখের কিন্তু আরেকটা একেবারে জবর খবর! এ কী জিনিস হাতে এসেছে সামনাসামনি না হলে তোমায় বোঝাতে পারব না। এই রকমই কিছুর আশায় বসেছিলাম, একেবারে মেঘ না চাইতেই জল। আর আমার দুর্ভাগ্য দেখ, আজকেই তুমি আমার পাশে নেই!’

এমন সাবলীলভাবে বলল, আমি তো থ। যেন কিছুই হয়নি বা লোকটা নিকট অতীতও সব ভুলে মেরে দিয়েছে। এটা কি ওঁর কৌশল নাকি সত্যিই খুব ভেতর থেকে উঠে আসা আচরণ? কিন্তু বেশ স্বতঃস্ফূর্তই তো শোনাচ্ছে, যথেষ্ট উষ্ণ, ‘ইস্! ঠিক এই মুহূর্তে তুমি যদি আমার সামনে থাকতে, তোমাকে সারা বিশ্বে হইচই ফেলে দেওয়া এই ইন্টারন্যাশনাল জার্নালের জাস্ট আট দশটা পাতা পড়ে শোনাতাম। গপ্পগাছা ভেবো না, ফুলফ্লেজেড রিসার্চ ওয়ার্ক, কোয়ান্টাম ফিজিক্সের দাবি। অগাবগা ভুঁইফোড় লোক না, লেখক দুনিয়া কাঁপানো একেবারে লিডিং সায়েন্টিস্ট আর তাঁর মতকে বিশ্ববিখ্যাত নোবেল পুরস্কার পাওয়া ব্রিটিশ পদার্থ ও গণিতবিদ সমর্থন করেছেন। তাঁর বক্তব্যও তোমায় শোনাব। পড়ার পর থেকে টগবগ করে ফুটছি। কী আশ্চর্য কাকতালীয় ব্যাপার ভাব, এই রকম একটা সময়ে ঠিক এই রকমই একটা বুস্টার দরকার ছিল। তোমাকে পড়িয়েই ছাড়ব, ড্যাম শিয়োর, পড়লে তুমি পুরো কেঁপে যাবে, নড়েচড়ে বসবে আর আমার দিকে তাকাবে চোখ পিট পিট করে। মুখে হয়তো কিছু বলবে না কিন্তু মনে মনে বলবে— হতেও তো পারে, এই ব্রহ্মান্ডে দুয়ে দুয়ে চার সবসময় নাও হতে পারে। মিসিং ইউ আ লট বাডি। রাত হয়ে গেছে, না হলে বলতাম যেখানেই থাক এক্ষুনি একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমার বাড়ি চলে এসো! বিল পে করব আমি আর তোমায় চা ওমলেট দিয়ে বসিয়ে দশ বিশ পাতা পড়ে শোনাব…’

কী বলা উচিত বুঝতে পারছি না! প্রতিবার গণ্ডগোলের পর এমন আন্তরিক স্বরে মিটমাট করে নিতে চাওয়া ওঁর কলগুলো মোটের উপর এমনই হয়। তবে এবারের স্বরে বেশ খানিকটা বাড়তি মাধুর্য , তাই কী ভাবে রেসপন্ড করব সেই ধন্দে পড়ে চুপ খেয়ে যাই। ‘আমি পারলে এই রাতেই তোমার বাড়ি হানা দিতাম কিন্তু তুমি তো আমার উপর রাগ করে বসে আছ, যদি ঢুকতে না দাও তাই রিস্ক নিতে পারলাম না। বুড়ো হচ্ছি বুঝতেই পারছ, সামনে অনেক বড়ো বড়ো চ্যালেঞ্জ, টেনসনের চাপে হুটহাট করে রেগে যাচ্ছি। কখন যে কাকে কী বলে ফেলছি, না হলে তোমাকে ওই সব বলি, মাই ফেভারিট চ্যাপ, আমার ব্লু আইড বয়ের সাথে ওই রকম আচরণ করে ফেলি? পারলে আমায় ক্ষমা কোরো ধৃতি, উন্মাদের মতো কী সব ভুলভাল বকেছি আমায় মার্জনা কোরো।’

‘ছি ছি এসব কী বলছেন, আপনি আমার শ্রদ্ধেয় মানুষ, এভাবে বলে লজ্জা দেবেন না।’

‘যদি ক্ষমা করতে পারো ভুলে যেও, যা হয়েছে সব মাথা থেকে বার করে দিও। সেই দিনের সেই ঘটনার পর থেকে অপরাধবোধে ভুগছি, তুমি ক্ষমা করে না দিলে যে নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। আর যদি পারো, আমাকে মাফ করে দিতে পারো, কাল সকালে ঘুম থেকে উঠেই সোজা আমার বাড়ি চলে আসবে। সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠে আমার দরজায় নক করবে। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব, ক-টা দিন তোমায় দেখিনি, মনে হচ্ছে যেন কয়েক বছর...।’

আরও অনেকভাবেই দুঃখ প্রকাশ করলেন। যাই হোক আমি আর বিশেষ কথা বাড়াইনি, অহেতুক দরাদরি না করে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। সব সময় রিজিড হওয়াটা ঠিক না। অতিপ্রাকৃত নিয়ে পড়াশুনো আমারও আছে কিন্তু সে তো আর অরুণবাবুর ধারে কাছেও না। পাঁচ সাত বছর নিজের মতো করে প্রথাবর্হিভূত অনিয়মিত পড়াশুনো আর রাতে নিজে নিজে বা অরুণবাবুর টিমের সঙ্গে বিচিত্র সব তথাকথিত ভয়ের জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা আছে বলেই কি সবজান্তা হয়ে বসে আছি? কনফিডেন্স ভালো কিন্তু ওভার-কনফিডেন্স জিনিসটা ঠিক না। এইসব নানা কথা ভেবে তাই বলে ফেলেছিলাম যাব, ঠিক আছে কালই আমি একবার যাব।

বলে যখন ফেলেইছি তখন আর ভেবে লাভ নেই। সকালবেলা পুনঃ মূষিক ভব, বিকন-ভিলায় ঢোকার সময় নিজেকে আত্মসম্মানহীন মানবেতর কোনো জন্তু মনে হচ্ছিল কিন্তু কিছু করার নেই। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে না ফিরতে পারলে চান্দ্রেয়ীর সঙ্গে আর দেখা হবে না আর আজকাল কেমন যেন মনে হচ্ছে ওকে না দেখে আমি থাকতে পারব না। চোখ দুটো আমায় ডাকে, নিশির ডাকের মতো ডাকে। কে জানে আমার কী সর্বনাশ লুকিয়ে আছে ওই দীঘল চোখে? মণিতে চোখ রাখলে তল খুঁজে পাই না। জল টলমল করে, আমার পা টলমল করে। কী জানি একদিন ওই জলেই ডুবে না মরি। ভাগ্যিস মরার ভয় করি না, না হলে ধারে কাছে ঘেঁষতাম না হয়তো।

আমি যে ঢুকেছি সেটা টের পেয়েছেন আগেই তাই দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভাদুড়ী। হাতে তাঁর সেই তথাকথিত সারা পৃথিবী জুড়ে শোরগোল ফেলে দেওয়া বই। আমি গিয়ে সামনে দাঁড়াতে দ্রুত এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন একেবারে, বুকে টেনে নিলেন। পিঠে জোরে হাত ঘষতে ঘষতে হরষিত হয়ে উঠলেন, ‘ওয়েলকাম, ধৃতিমান, ওয়েলকাম টু মাই ওয়ার্ল্ড মাই ডিয়ার। সো গ্লাড টু সি ইউ ব্যাক, আমি যে কী খুশি হয়েছি বলে বোঝাতে পারব না, কাম কাম অ্যান্ড বি সিটেড।’

হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে গদিওয়ালা বিশেষ চেয়ারটায় বসালেন আমাকে। গদগদ চোখে তাকিয়ে, বইটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘হিয়ার ইজ দ্য থিং আই ওয়াজ টকিং অ্যাবাউট, এই সেই খবর যেটা সারা বিশ্বজুড়ে বড়ো বড়ো চেয়ারে বসে থাকা মহাদিগগজ সব রিয়ালিস্ট আর তাদের চ্যালাচামুণ্ডা তোমাদের মতো অবিশ্বাসীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। আমাদের হাজার হাজার বছরের জানার ভিতে যাকে বলে হাতুড়ির ঘা বসিয়ে দিয়েছে। আমাদের ইউনিভার্সের ধারণাটা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে একেবারে। না না এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, এভাবেই তো দুনিয়ার কত বদ্ধমূল ধারণা পালটায়, একসময় তো আমাদের ধারণা ছিল দুনিয়াটা বুঝি চ্যাপ্টা, তা সে ধারণা তো পালটেছে নাকি? সেই জগদ্দল পাথর যদি সরানো যায় তো এও যাবে, ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য বুঝতে ফিজিক্সের দরজা ছেড়ে মানুষ বায়োলজির দরজায় কড়া নাড়বে, একদিন নিশ্চিত বুঝতে শিখবে চেতনাই হল সব রহস্যের চাবিকাঠি। এই নিখিল বিশ্ব আসলে জীবন থেকেই উৎপন্ন হয়, উলটোটা না…’

‘মানে, বুঝলাম না? কী বলতে চাইছেন মাথায় ঢুকল না?’

‘আমি কিছুই বলতে চাইছি না, যা বলবেন এই সব প্রথম সারির বিজ্ঞানীরা বলবেন। জিনিসটা দিলাম পড়, পড়ে দেখ। এঁরা তো আর বানিয়ে বানিয়ে গাঁজাখুরি নাটক নভেল লেখেন না, ইনি কিন্তু বিজ্ঞানী আর ইনি বলছেন মৃত্যু বলে আসলে কিছু নেই, মৃত্যু হল জাস্ট একটা ইলিউশন। মৃত্যুতে শরীরের শেষ হয় ঠিকই কিন্তু জীবনের শেষ হয় না। জীবন থেকেই যায়, চিরকালের মতো থেকে যায়, অনন্তকালের জন্য…’

ভ্রু কুঁচকে তাকাই, কুঁচকে যায় চোখের কোণটাও। ঝলকে ওঠে অরুণ ভাদুড়ীর চোখ, ‘দেহের মৃত্যু নিয়ে আমাদের এত মাথাব্যথা কারণ আমরা তো আমাদের দেহ হিসাবেই চিনতে জানতে অভ্যস্ত বা এই দেহটাকেই আমাদের পরিচয় বলে মনে করি। কিন্তু আমরা তো শুধু তাই না, আমরা তো আসলে এনার্জি, চৈতন্য, সচেতনতা।

আমরা ভাবি মৃত্যুর পর সব বুঝি শেষ হয়ে গেল, আমরা অতীত হয়ে গেলাম, কিন্তু আমরা তো আসলে মরছি না তাহলে অতীত হওয়ার প্রশ্নটা উঠছে কীভাবে? এই বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলছেন অতীত বর্তমান ভবিষ্যত এসব কিছুই অ্যাবসলিউট না, সব আসলে আমাদের মনগড়া ধারণা। তুমি নিশ্চয়ই আইনস্টাইনের কলিগ জন হুইলারের নাম শুনেছ?’

‘হ্যাঁ, যিনি ব্ল্যাক হোল শব্দটা কয়েন করেছিলেন তাই তো ?’

‘হ্যাঁ, তা উনি কী বলেছিলেন জানো? বলেছিলেন সময় জিনিসটা কিন্তু মোটেও আমাদের বাস্তবের ফান্ডামেন্টাল বা মৌলিক শর্ত না আর বিজ্ঞানী শ্রেষ্ঠ আইনস্টাইন সাহেব উনিশশ পঞ্চান্ন সালে ওঁর বন্ধু মিশেল বেসোর মৃত্যুর পর কী বলেছিলেন জানো? বলেছিলেন বেসো আমার কিছুটা আগে এই আশ্চর্য পৃথিবীটা ছেড়ে চলে গেল ঠিকই কিন্তু আমার কাছে সেটার আলাদা কোনো মানে নেই, কারণ আমরা যারা ফিজিক্সে বিশ্বাস করি তারা জানি এই অতীত বর্তমান ভবিষ্যত হল শুধুমাত্র গোঁয়ারগোবিন্দর মতো নাছোড়বান্দা একটা বিভ্রম বা ইলিউশন ছাড়া আর কিচ্ছু না।’

আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি, লোকটা নাটকীয় ভাবে শূন্যে হাত ঘুরিয়ে বলেন, ‘ভুলেও ভেবে বোসো না, আমাদের বুঝি এই একটি মাত্র ইউনিভার্স। আসলে আমাদের এটাকে ইউনিভার্স না বলে বলা ঠিক হবে মাল্টিভার্স। অনেকগুলো সমান্তরাল স্তরে, অনেকটা আমসত্ত্বের মতো অনেকগুলো লেয়ারে ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের এই অকল্পনীয় বিশাল ব্রহ্মাণ্ড। প্রত্যেকটা স্তর আলাদা আলাদা ভুবন আর অসংখ্য ওই সব ভুবন আমাদের এই দৃশ্যমান সবকিছুর মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে মিশে আছে। এই ঘরের হাওয়ার মধ্যেও হয়তো যুগপৎ পাশাপাশি রয়েছে কিন্তু কেউ কারও খবর জানে না। জানা সম্ভব না, এক ভুবনের পক্ষে কিছুতেই আরেক ভুবনের বাস্তবটা বোঝা সম্ভব না।’

নজরুলের ওই গানটা শুনেছ নিশ্চয়ই— ‘তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় নাকো কভু?’ গলাটা ঈষৎ ভাঙা হলেও বেসুরো না, প্রথম দু-লাইন গেয়ে উঠলেন চোখ বুজে, ‘সত্যিই কিছুই হারায় না, আমরা কোথাও হারাই না। মৃত্যুর পর আমাদের চেতনা শুধু এক ভুবন থেকে অন্য ভুবনে চলে যায়, এক স্তর থেকে অন্য স্তরে আর সেই চলে যাওয়ার বাহকের ভূমিকা পালন করে একধরণের অতিসূক্ষ্ম প্রোটিনের কণা বা নিউরোনাল মাইক্রোটিবিউলস। লেখক বলছেন আমাদের ব্রেন আসলে একবারেই একটা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মতো। মৃত্যুর পর আত্মা বা আমাদের চেতনা স্টোরড থাকা কোয়ান্টাম তথ্যের মতো এক ব্রহ্মাণ্ড থেকে অন্য ব্রহ্মাণ্ডে চলে যায় আর সেক্ষেত্রে একটা ইউনিভার্সের কাছে আমি মৃত হলেও আরেকটা ইউনিভার্সে দিব্যি জীবিত থাকতেই পারি, কালের শেষ সীমা পর্যন্ত পারি। কী বুঝছ?’

‘বোঝার চেষ্টা করছি।’ বইটা উলটে পালটে দেখতে থাকি, ব্লার্বে লেখক পরিচিতির উপর চোখ বোলাতে থাকি।

‘চেষ্টা করো। বইটার একসেট ফটোকপি করে মুনিকে দেওয়া আছে, সকালেই বলল ওর পড়া হয়ে গেছে। ওকে ডেকে পাঠাচ্ছি, ও তোমায় ওটা দিয়ে দেবে। বলেই টেবিলে রাখা বেলে চাপ দিলেন। মলয়দা দরজার পর্দা সরিয়ে মাথা বাড়াতেই চান্দ্রেয়ীকে ডেকে দিতে বললেন অরুণ ভাদুড়ী। ‘আজ কাল এই দু-দিনের মধ্যে পড়ে শেষ করে এসে জানাবে, খুঁটিয়ে পড়বে যাতে যে কোনো জায়গা থেকে কোয়েশ্চেন করলে উত্তর দিতে পার।’

‘চেষ্টা করব, এর আগেও লাইফ আফটার ডেথ নিয়ে অনেক বই-ই পড়েছি। কিন্তু এটা তো বলছেন কোয়ান্টাম মেকানিকস এর ব্যাপার-স্যাপার। আমি তো ঠিক পিওর সায়েন্সের স্টুডেন্ট না, সায়েন্টিস্টদের লেখা কি সবটা বুঝতে পারব।’

‘মিসটেক। নাম্বার ওয়ান, এটা কিন্তু আর দশটা মৃত্যুর পরে কী হয় সেই জাতীয় বই না। এটা একটা ইউনিক থিওরি যেটা আমাদের এতদিনের চিন্তা-পদ্ধতিতেই বদল এনে এই নিখিল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি সম্পর্কে আমাদের আগেকার ধারণা সব উলটো পালটা করে দিতে এসেছে। নাম্বার টু, এটা সবাই যাতে বুঝতে পারে সেই ভাবেই লেখা, অতএব যে কোনো সেনসিবল লোকের পক্ষে এটা না বোঝার মতো কিছু না।

তাছাড়া একান্তই কোথাও আটকে গেলে আমার মুনি তো আছেই। ওকে আমি আমার বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে পরীক্ষার দিনগুলো ছাড়া কোনোদিনও কলেজে পাঠালাম না, এত ভালো রেজাল্ট সত্ত্বেও ইউনিভার্সিটি যেতে দিলাম না সে নিয়ে ওর ক্ষোভও হয়তো কিছুটা আছে কিন্তু তার জন্য ভেবো না সায়েন্সটা ও কারও চেয়ে কম জানে। আচ্ছা আচ্ছা ইউনিভার্সিটি স্কলারের সঙ্গে টক্কর দিতে পারে এনি গিভন মোমেন্ট, কী মুনি ঠিক বলছি তো?’

নিঃশব্দে কখন যে ঘরে ঢুকে এসে চান্দ্রেয়ী আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে টেরটিও পাইনি। ‘কী মুনি দিবি তো? ধৃতির কোথাও কিছু বুঝতে অসুবিধে হলে, ক্লিয়ার করে দিবি তো?’

সহাস্যে মাথা নাড়ে ও। উত্তল ঠোঁটের কোণের প্রান্তে ঝিকিয়ে ওঠে এই ঘরের ম্লান আলোও। চোখ জ্বলে ওঠে ভাদুড়ীর, ‘বইটা শুধু তো পড়লেই হবে না, এই নতুন থিয়োরি অফ এভরিথিংটাকে বুঝতে হবে। শুধু সৃষ্টি রহস্য বোঝার জন্যেই না, জীবনকে বোঝার জন্যেও। আমাদের ভুলগুলো ভাঙার জন্য, ভুল ভাবে দেখার জন্যেই তো আমাদের যাবতীয় দুঃখ, ভুল ভাঙলে আমাদের তো কোনো দুঃখ থাকার কথা না।’

হাসি ভাদুড়ীর ঠোঁটেও, ঝলমল করছে চোখ মুখ, ‘কেন দুঃখ, কীসের দুঃখ? ঠিক ভাবে দেখলে তো দেখব আমরা কিন্তু কেউই একা নই, আমাদের প্রিয়জনেরা কিন্তু কেউই আমাদের ছেড়ে যায়নি। সবাই আমাদের আশপাশেই আছে, হয়তো আমাদের সাথেই। অনেকদিন আগে তুমি আমায় তোমার মায়ের অকালমৃত্যুর কথা বলেছিলে না, ভুলেও ভেবো না উনি তোমায় ছেড়ে চলে গেছেন। আমি আমার মেয়েকেও একই কথা বলি, ও-ও ভাবে ওর মা চন্দ্রাণী আর নেই। কিন্তু সেটা তো ঠিক না, সে তো আছে। হয়তো একজায়গায় ঘনসংবদ্ধ অবস্থায় নেই, রেণু রেণু চেতনা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। হাত বাড়িয়ে না পেলে কী হল, কোনো না কোনো ভাবে তো পাওয়া যায়। ও পায়না কেন কে জানে, আমি তো পাই, তার সুগন্ধ টের পাই। থাকাটাই তো আসল কথা, যেখানে হোক যেভাবে হোক থাকাটা, কী বল?’

অরুণবাবুর দু-চোখে বড়ো বড়ো দুটো প্রশ্নচিহ্ন, দৃষ্টি চান্দ্রেয়ীর উপর নিবদ্ধ। মুখটা থমথম করছে চান্দ্রেয়ীর, চোখ নাচিয়ে তোলে ভাদুড়ী, সোল্লাসে হাত ছুঁড়ে দেয় হাওয়ায়, ‘মৃত্যু বলে আসলে কিছু হয় না। জীবন মৃত্যুঞ্জয়, আমরা মৃত্যুঞ্জয়ী, কী বল মুনি?’

নিরুত্তর তাকিয়ে আছে মেয়েটা, দু-পা এগিয়ে আসেন ভাদুড়ী, ‘তোকে তো আমি আগেই বলেছিলাম, বহুদিন আগে থেকে বলে আসছি, চন্দ্রাণী তোর কাছে না থাকলে কী হবে, আমার কাছে ঠিক আছে। জাস্ট শারীরিক ভাবে আর আমাদের মধ্যে নেই, এই যা কিন্তু তার চেতন-কণা তো আছে। বিন্দু হয়ে হোক বা সিন্ধু হয়ে, কিছু না কিছু হয়ে তো আছেই।

লেখাটা পড়ার পর থেকে আমার খুশির শেষ নেই, বুকের ভেতর থেকে আস্ত একটা পাহাড় যেন নেমে গেছে, অনেক হালকা লাগছে, অনেক ভারমুক্ত। আজ আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে বলে বোঝাতে পারব না। বলেছিলাম না শরীরের বাইরেও যে কনসাসনেস এগজিস্ট করতে পারে সেটা একদিন না একদিন বিজ্ঞান প্রমাণ করবেই, করল তো, আমার কথা ফলল তো?’

বেশ কিছুক্ষণ একভাবে তাকিয়ে থাকার পর চোখের পাতা ফেলে চান্দ্রেয়ী, ‘কী জানি?’ অন্যমনস্ক সুরে বলে ওঠে।

‘মানে, কী জানি মানে? তুই তো পড়েছিস, আশা করি অথরের বক্তব্য বুঝতেও পেরেছিস, তাহলে কী জানি বলছিস কেন?’

‘হ্যাঁ পড়েছি, খুব সুন্দর লেখা, অসাধারণ যুক্তি কিন্তু বাবা তবুও তো ওটা প্রমাণ না, অনুমান। ওগুলো তো সায়েন্টিফিক স্পেকুলেশন, হাইপোথেসিস।’

‘হাইপোথেসিস, হোয়াট ডু ইউ মিন?’ চোখের কোণে বিদ্যুৎ ঝলকে ওঠে অরুণ ভাদুড়ীর ‘কাদের হাইপোথেসিস, কার হাইপোথেসিস, কোন ক্যালিবারের মানুষ জানা আছে নিশ্চয়ই? আমেরিকার টপমোস্ট নিউজপেপার তাঁকে এই মুহূর্তের জীবিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে ওয়ান অফ দ্য গ্রেটেস্ট বলছে, কোনো ধারণা আছে এখানে কার সম্পর্কে কথা বলা হচ্ছে?’

‘সব জানি, তিনি যে তাবড় বিজ্ঞানী সে নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তাঁর মতো যে ভুবনবিখ্যাত ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট সমর্থন করছেন, ওঁরা দু-জন মিলে যে কনসাসনেস নামক ব্যাপারটার একটা কোয়ান্টাম থিয়োরি তৈরি করার চেষ্টা করছেন সেটাও জানি। নো ডাউট ওয়ান্ডারফুল আইডিয়া কিন্তু ওঁরা ব্যাপারটাকে ঠিক এইভাবে বলতে চাইছেন কি?’

‘তাহলে কী ভাবে বলতে চাইছেন? হোয়াট ডু ইউ মিন, আমি ব্যাপারটা বুঝিইনি? এই মাথাটা এতই নিরেট যে কিছুই ঘিলুতে ঢোকেনি?’

‘না না, ছি ছি, এসব কী বলছ? আমি শুধু বলতে চাইছি মায়ের থাকা না থাকা নিয়ে তুমি বিষয়টাকে যে ভাবে দেখতে চাইছ লেখক কি সেই ভাবে বলতে চাইছেন? না, মানে আমি আর কতটুকুই বা বুঝি, আমার ভুলও হতে পারে। তাছাড়া প্রমাণ মানে তো তুমি জানো, হাইপোথেসিস সে যত স্ট্রং-ই হোক সেটাকে এক্সপেরিমেন্টালি প্রুফ করা মানে যে কী ভয়ানক জটিল আর কঠিন ব্যাপার নিজে একজন স্কলার আর মাস্টারমশাই হিসেবে তুমি তো জানোই।’

‘সে কী তুই আমাকে বোঝাবি? সেটা নিশ্চয়ই আমায় তোদের কাছ থেকে শিখতে হবে না? ডু ইউ নো হু আর ইউ টকিং টু?’ চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, কটমটে চোখে লোকটা তাকায় মেয়েটার দিকে।

কেঁপে উঠল যেন মেয়েটা। আমার মতো একজন আউটসাইডারের সামনে ওর এভাবে বলে ফেলাটা ঠিক হয়নি বুঝতে পেরেই হয়ত নিজেকে বেশ খানিকটা গুটিয়ে নিল ‘এভাবে বললাম বলে কিছু মনে কোরো না প্লিজ। এক্সট্রিমলি স্যরি, আসলে মায়ের কথা উঠে এল তো, তারপরেই মৃত মানুষদের কনসাসনেস জীবিত থাকার প্রমাণের প্রসঙ্গটা এমনভাবে… কেমন যেন একটা ইমোশনাল ডিস্টার্বেন্স তৈরি হল, তাই বলে ফেললাম আর কী, কথাগুলো ভেতর ঠেলে উঠে এল।’

‘মনে করে আর কী করব? মোর অর লেস এই জেনারেশনের ছবিটা তো এই একই, দু-আনার যোগ্যতা নিয়ে চোদ্দোআনা কথা। বিশ্বাসের জোর নেই, কোনো প্রকার আত্মসমর্পণ নেই। সবকিছুতেই সন্দেহ, সব ব্যাপারেই নেগেটিভিজম। তবে তোর কাছ থেকে কিন্তু এই টোনে কথা আশা করিনি, কী আর করা যাবে সবই সঙ্গদোষ। এই জন্যেই তো বাইরের দূষিত আবহাওয়া থেকে চিরকাল দূরে রাখতে চেয়েছি, পারতপক্ষে আজেবাজে উটকো লোকজনের সঙ্গে মিশতে দিইনি। কিন্তু জমানাটাই এমন কোরাপ্ট যে মনের পিওরিটিটা বজায় রাখা মনে হচ্ছে ইমপসিবল, আটারলি ইমপসিবল।’ এক ঝটকা দিয়ে মুখ সরিয়ে নেন, কাঠের চেয়ারের হাতলটা চেপে ধরেন।

‘না না, অবিশ্বাসের প্রশ্ন উঠছে কেন? তুমি যখন বলছ তাতে সন্দেহ প্রকাশ করার আমি কে? আমি তো জাস্ট বলতে চেয়েছিলাম...।’

‘শোন তোরা না নিজেদের বেশি ইন্টেলিজেন্ট ভাবিস না আর দয়া করে আমাকে কিছু বোঝাতে আসিস না। স্পর্ধার একটা সীমা থাকে।’

‘স্যরি বাবা ...।’

‘হোয়াট আ পিস অফ ওয়ার্ড ইজ দিস স্যরি। রাবিশ?’ গলা খাঁকড়ে ওঠেন ভাদুড়ী, ফিরে তাকান ধারালো চোখে, ‘আর যা করিস করিস আমার বিষয়ে আমাকে দয়া করে কিছু বোঝাতে আসিস না। এত বছর ধরে এইসব নিয়ে পড়ে আছি তাই জানি একটা জায়গায় এসে আমাদের ট্র্যাডিশনাল বিজ্ঞান কী রকম অসহায়, সব কিছু এক জায়গায় এসে কেন বার বার আটকে যাচ্ছে, বিশ্বপ্রকৃতির রহস্য কেন কিছুতেই ভেদ করতে পারছে না। পারছে না কারণ আমাদের চিন্তার পদ্ধতিতে গলদ আছে।’

ইতস্তত পায়চারি করতে লাগেন ভদ্রলোক আর অস্থিরভাবে তাকাতে থাকেন এদিক ওদিক, ‘তবে সত্য স্বতঃসিদ্ধ, তাই তা একদিন প্রমাণ হবেই, আজ না হয় কাল সব কিছু ঠিক দিশাটা খুঁজে পাবেই। চেতনা অবিনশ্বর। আমাদের ভুল ভাঙবেই, যারা একেবারে উধাও হয়ে গেছে বলে ভাবছি একদিন না একদিন প্রমাণ হবেই তারা আছে, আমাদের মতোই বহালতবিয়তে আছে। যে সব প্রথম শ্রেণীর মগজ উঠে পড়ে লেগেছেন একদিন না একদিন হবেই। সবকিছু যেভাবে এগোচ্ছে খুব তাড়াতাড়িই হবে।’

‘সে তো খুব ভালো কথা। তাহলে তো আমার চেয়ে বেশি খুশি মনে হয় না আর কেউ হবে।’ ধরা গলায় বলে চান্দ্রেয়ী।

তেরছা চোখে তাকান ভাদুড়ী, ‘কেন, কী ভেবেছিসটা কী? চন্দ্রাণীর ওইভাবে চলে যাওয়ার দুঃখটা তোর একারই! আমার কিছুই হয় না, আমার কিছুই হয়নি!’ ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে থাকেন ভাদুড়ী।

এদের দুজনের এই ধরনের আকস্মিক কথোপকথনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমি তো বেকায়দায় পড়ে গেছি। কথাবার্তা যে আচমকাই এইদিকে বাঁক নেবে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি। ব্যক্তিগত কথাবার্তার মধ্যে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা মোটেও সমীচীন না। ‘স্যার, আজ তাহলে আসি। বইটা নিয়ে যাচ্ছি, পড়ে কাল পরশু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফেরত দিচ্ছি’ বলতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত বলে উঠতে পারলাম না।

লোকটা এগিয়ে গেলেন ডানদিকের ছাদের সিলিং অবধি ছড়ানো বুক-সেলফের দিকে। মাঝের তাকের মধ্যে থেকে বার করে আনলেন একটা বই। পাল্লাদুটো খুলে তাকিয়ে রইলেন। ওটার মধ্যে কী আছে এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না। কোনো ফটোগ্রাফ না হাতে লেখা কোনো চিঠি বোঝা যাচ্ছে না। বইটা বন্ধ করে যথাস্থানে রেখে ঘাড় কাত করে থাকলেন, ‘আমি নিশ্চিত ও আছে, আমাদের আশপাশেই আমাদের ঘিরেই আছে। অনেক রাতে মাঝে মাঝে একা যখন তেতলার ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই, গা শিরশিরে একধরনের হাওয়া আমার গায়ে মুখে এসে লাগে, আমার অনেক ভেতর অবধি ছড়িয়ে পড়ে। সে এক আশ্চর্য ভাবে ছুঁয়ে যাওয়া, রোমে রোমে শিরায় শিরায় জানান দিয়ে যাওয়া যে সে কোথাও যায়নি। আমায় ছেড়ে সে কোথাও যেতে পারেনা।

ভুলেও ভাবিস না তার আর কোনো সমস্যা আছে? আক্ষেপ আছে বা সে দুঃখে আছে। আমিত্ব থেকে মুক্তি পেলে চেতনার দুঃখ বা সুখ বলে আর কিছু থাকে না। সে ভালোও থাকে না খারাপও থাকে না। অতএব তার চলে যাওয়ার দুঃখে সারাজীবন ধরে মুষড়ে পড়ে থাকাটা মূর্খামি, অজ্ঞতা ছাড়া আর কিচ্ছুটি না। আমি ওইসব মূর্খদের দলে পড়তে চাইনা।’

‘কিন্তু তাই যদি হয় সেটা কি তোমাদের এত হাজার বছরের আত্মা, পরলোক নিয়ে বিশ্বাসের পরিপন্থী হয়ে গেল না কি? তাই যদি হয় আমার তো তাতে কোনো সমস্যা মেটার কথা না, আমি তো সেই এক তিমিরেই, আমি একা মানে তো সেই একাই...?’ কাতর চোখে তাকায় চান্দ্রেয়ী, ভেঙে ভেঙে যায় স্বর, ‘এই হাওয়ায় বা কাছে দূরে যেখানেই হোক সেই কনসাসনেস বা চেতন-কণারা যাই বলো সবই তো নৈর্ব্যক্তিক নিরপেক্ষ, একবার এই মানুষের শরীর থেকে বেরিয়ে গেলে তারা তো বিচ্ছিন্ন, উদাসীন। আমাদের নিয়ে তাদের তো আর কোনো আসক্তি নেই, ইন্টারেস্ট নেই, আমার দুঃখ কষ্টে তাদের কিচ্ছুটি এসে গেল না। আমি কেঁদেকেটে আকাশ ফাটিয়ে দিলেও তাঁর চেতনায় কোনো আলোড়ন হল না, আমি মরে গেলেও সেই চেতনা তো সেই একই রকম নির্বিকার! তাহলে ফারাক কী দাঁড়াল, থাকা না থাকার, চেতনা অচেতনায়, জীব ও জড়ে...?’

‘কী স্বার্থপর, কী ভয়ানক স্বার্থপরতা! টু হেল উইথ দিস সেলফ সেন্টারড জেনারেশন, সবকিছুতে শুধু আমি আমি আর আমি। আমি ছাড়া এরা কিচ্ছু বোঝে না, কিচ্ছুটি জানে না।’

‘তাই মনে হল কি? কী জানি, হবে হয়তো, তাহলে তাই!’

‘হ্যাঁ তাই তাই।’ টেবিলে চাপড় মারে ভাদুড়ী, ‘দোষই বা দিই কী করে, তোর সেই মনটা এখনও তৈরি হয়নি। এখনও অনেক কিছু জানার বাকি আছে, বোঝার বাকি আছে। তোদের বয়স কম, নিজেকে ছাড়িয়ে ভাবতে পারিস না। একসময় আমিও হয়তো ভাবতে পারতাম না, নিজের উর্ধ্বে উঠে, ইউনিভার্সের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে ভাবতে পারতাম না। এখন পারি, খুব স্মুদলি পারি। একদিন হয়তো তোরাও পারবি, নিষ্ঠার সঙ্গে লেগে থাকলে নিশ্চয়ই পারবি, পারতেই হবে।’

এবার আমার দিকে ফেরে লোকটা, ‘তোমাকেও পারতে হবে ধৃতি। তাড়াহুড়ো নেই, লেগে থাকো পারবে। না পারলে তোমার ব্যর্থতা, এতদিন ধরে এই ফিল্ডে পড়ে থেকেও সোল-কে একটা জায়গার উপর তুলতে না পারলে সেটা তোমার ডিসক্রেডিট।’

মোটা ফ্রেমের ভারী চশমার মধ্যে দিয়েও চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে, উঁচিয়ে ধরা মাংসল তর্জনীটা কাঁপছে, থিরথির করে নড়ছে পুরু ঠোঁট, ‘প্রথম প্রথম না পারলে ঘাবড়িও না। পারবে পারবে, মনটা টিউন করতে করতে একদিন ঠিক পেরে যাবে। অটোমেটিক্যালি কানেকশন পেয়ে যাবে যেমন এখন আমি পাই আমি, ইচ্ছে করলেই পাই। বহু ব্যাপারে আমি ওর সঙ্গে আলোচনা করি, ও আমাকে অনেক ব্যাপারেই সাজেশনস দেয়। তোদের সঙ্গে যে ভাবে কথা বলছি সেভাবে না তো কী, এ পৃথিবীতে যোগাযোগের মাধ্যম কি এক ধরনেরই নাকি? কত বিষয়ে কথা হয়। ও আমায় অন্য ভাবে ওর মতামত জানায়, তরঙ্গ মারফত অনেক রকম সিগন্যাল পাঠায়। সো আই ডোন্ট সাফার ফ্রম এনি সেন্স অফ লস, ইফ ইউ সাফার ইটস ইওর প্রবলেম, নট মাইন।

কী, বিশ্বাস হচ্ছে না? না হলে আমি কী করতে পারি বল? নো বডি ক্যান হেল্প ইউ, ইভন অলমাইটি ক্যান নট হেল্প ইউ গাইজ।’ বেশ খানিকটা উঁচু থেকে চাকা লাগানো রিভলভিং চেয়ারটার উপর নিজেকে ছেড়ে দেয় লোকটা। পাক খেয়ে পিছন দিকে ঘুরে পা তুলে দেয় একটা বেতের মোড়ার উপর। একাধিক পকেটওয়ালা লম্বা জামার নীচের দিকের পকেট থেকে একটা কিং-সাইজ সিগারেট বার করে সশব্দে জ্বালায়। ধোঁয়া ছাড়তে থাকে মুখ উপরে তুলে।

১৪

অরুণবাবুকে না বলেই জার্নালটা হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে ওঁর ঘরটা থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। করিডরের মাঝামাঝি এসে মনটা খচখচ করায় দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম সিঁড়ির মুখটাতে। আমি বেরিয়ে আসার মিনিট তিনেক পরে দেখলাম চান্দ্রেয়ীও বেরিয়ে আসছে অন্যমনস্ক পায়ে। এদিকেই আসছে। আমার পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় কেমন যেন অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল। চোখের সহজাত সেই দ্যুতিটা নেই, সেই প্রগলভ ভাবটা। ফ্যাকাশে লাগল মুখটা, বিষন্ন, ভারী।

ওর পেছন পেছন নেমে এলাম দোতলায়। নিচু স্বরে বললাম, ‘এখন আসি তাহলে? কাল আসব...?’

‘না কেন, খুব তাড়াহুড়ো আছে?’ গম্ভীর গলায় বলল মেয়েটা।

‘না না কেন বলো, কোনো দরকার আছে?’

‘না এমনিই, যদি সম্ভব হয় আর কিছুক্ষণ থাকবে? এই বাড়িটায় আমার কেমন যেন দমবন্ধ লাগছে! মাঝে মাঝে মনে হয় এত বড়ো বাড়িটা যেন আমায় হাঁ করে গিলতে আসছে। বাড়ির বিভিন্ন তলায় এই মুহূর্তে বেশ কিছু চেনা লোকই রয়েছে কিন্তু তাদের মধ্যে কি এমন একজনও কেউ আছে যার সঙ্গে দু-দণ্ড কথা বলে হালকা হওয়া যায়? কিছুটা কথা বললে একটু নিষ্কৃতি পাওয়া যায়।’

ঢোঁক গিলে একবার তাকাই ওর দিকে, একবার সি সি টিভি ক্যামেরাগুলোর পজিশনগুলোর দিকে। ‘কী দেখছ?’ ভ্রু নাচায় চান্দ্রেয়ী, ঠোঁটের কোণে একধরনের একটা ডোন্ট-কেয়ার ভাব তুলে এনে বলল, ‘চিন্তা নেই, নিশ্চিন্তে কথা বলতে পারো, এই ফ্লোরে ভয়েস রেকর্ডিং ডিভাইসটা খারাপ আছে।’

‘সে নয় হল কিন্তু ছবিতে তো উনি দেখতেই পাচ্ছেন। ক্যামেরার সামনে এভাবে ওপেন-স্পেসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলাটা অস্বস্তিকর। আচ্ছা, পিছনের বাগানের পুরোনো ফোয়ারাটার পাড়ে বসে কিছুক্ষণ কথা বলা যায় না?’

‘কেন যাবে না, চলো।’

‘স্যার কিছু বলবেন না তো, রেগে গেছেন মনে হল?’

শানিত চোখে কোণ করে তাকায় চান্দ্রেয়ী, ‘না না, কী আর বলবেন? বলতে আর কীই বা বাকি রেখেছেন? ঠিক আছে, চলো বরং বাগানের দিকে গিয়ে যাওয়া যাক চলো। আমার পক্ষে এখন খোলা হাওয়ার কোথাও একটা গিয়ে দাঁড়ানো খুব দরকার। এই সব সোঁদা সোঁদা বদ্ধ ঘরে আমার কেমন শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।’

‘তাই চলো, চলো।’ ওর পেছন পেছন সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকি আমি। মেয়েটার দ্রুত পদচালনার সঙ্গে তাল রেখে এগোতে থাকি গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে এসে।

‘না না এই ব্যাপারটা তুমি এত সিরিয়াসলি নিচ্ছ কেন? তুমিই তো সেদিন আমায় বললে উনি মুডি লোক, আমি যেন ওর এইসব আচমকা রাগের মাথায় বলা কথা গায়ে না মাখি।’

‘হ্যাঁ বলেছিলাম। আসলে আমার ধারণা ছিল উনি আর সবার উপর রাগতেই পারেন কিন্তু আমার উপর পারেন না। আমি যে ভাবে বেড়ে উঠেছি তাতে জানতাম সেটা কিছুতেই সম্ভব না। এখন যখন সেই বিশ্বাসটা ঘা খেল তখন এই নিয়ে বাড়তি তো আর কোনো চাপ নেই। ভালো ব্যবহার পাওয়ার প্রত্যাশা নেই।’

‘ঠিক আছ, ঠিক আছে, টেক ইট ইজি। কিছু মনে কোরো না বলতে বাধ্য হচ্ছি উনি আজকাল দেখছি আর্গুমেন্ট ব্যাপারটাকে একেবারেই নিতে পারছেন না। তাড়াতাড়ি রেগে উঠছেন, ওর মতামতের বিরুদ্ধাচারণ মনে হলেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছেন। আর কাছের লোক হলে তো তার এহেন আচরণকে নির্বিচারে সাবোটাজ বলে দিচ্ছেন।’

প্রত্যাশিত সম্মতি পাওয়া গেল না চোখের ভাষা থেকে। বাবার সমালোচনা কী ভাবে নিল বোঝা গেল না। উদাসীনভাবে তাকিয়ে থাকল আকাশের দিকে।

বাড়ির সামনে মোটের উপর গোছানো হলেও পিছন দিকের এই বাগানটা এখন একেবারেই পরিত্যক্ত। মাঝখানের এই ফোয়ারাটা বহুবছর আগে থেকেই নিশ্চয়ই এভাবে বন্ধ পড়ে আছে। মাঝখানের মাথায় ছাতা ধরা দেবশিশুর মূর্তিটা এখন আধভাঙা, পরিচর্যাহীন, বিবর্ণ। বাঁধানো জলাশয়টার বেড়টার গায়ের পুরু ধুলো না ঝেড়েই বসে পড়ে চান্দ্রেয়ী, ‘কতদিন পরে এই জায়গাটায় এসে দাঁড়ালাম। আগে ওইদিকের গাছগুলো সব অন্যরকম ছিল, মা এক সময় এই জলে রঙিন মাছ ছেড়েছিলেন, তখন অবশ্য ফোয়ারাটা চালু ছিল। যাই হোক বসো, এই পাড়টাতেই বসো।’

‘সেটা কোনো সমস্যা না, আমি ঠিক আছি। তোমার ঠিক লাগছে তো, এখানে এসে একটু বেটার লাগছে তো?’

‘হ্যাঁ ঠিক আছি, ঠিক আছি। আমাকে নিয়ে চিন্তা কোরো না, আমি অতো ঠুনকো না যে ভেঙে পড়ব। ছোটো থেকে আমার ওপর দিয়ে অনেক ঝড় গেছে, অনেক দেখেছি, অনেক কিছু জেনেছি বুঝেছি।’ খসে পড়া একটা পাতার মাঝখানের শিরা বরাবর একটু একটু করে ছিঁড়ে জলে ফেলতে থাকে চান্দ্রেয়ী। ‘আসলে কথাবার্তা যে হট করে এই দিকে টার্ন নেবে ভাবতে পারিনি। হচ্ছিল সায়েন্স নিয়ে কথা, হঠাৎ করে বিষয়টার মধ্যে বাবা যে ওইভাবে মায়ের দিকে নিয়ে আসবেন বুঝতে পারিনি! আমি কেমন যেন এক রকম কনফিউজড হয়ে গিয়েছিলাম।

যদিও এটা নতুন কিছু না, এর আগেও বহু ধরণের মেথড, ফিলোজফিক্যাল মেটাফিজিক্যাল সায়েন্টিফিক যুক্তি খাড়া করে উনি আমায় বার বার বোঝাতে চেয়েছেন মা আসলে কখনই যাননি, উনি আছেন, আমাদের আশেপাশেই কোথাও আছেন।’

‘সেটা হয়তো তোমাকে বাঁচাতেই, আই মিন তুমি যাতে ইনসিকিয়োর ফিল না কর, মাকে হারানোর যন্ত্রণাটা যেন তোমায় কখনোই গ্রাস না করতে পারে তোমার মানসিক-স্বাস্থ্যটা যাতে ঠিক থাকে। একজন উচ্চশিক্ষিত স্কলার মানুষ তাই সবসময় কোনো না কোনো লজিক তৈরি করে তোমার কাছে ওঁর বিশ্বাসটা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।’

‘মনে হয়না ব্যাপারটা ঠিক এতটাই সহজ।’ প্রায় অস্ফুটে বিড়বিড় করে ওঠে চান্দ্রেয়ী।

‘কেন, সহজ না কেন বলছ?’ চড়ায় তুলি স্বর।

‘না না এমনি বললাম, নাথিং সিরিয়াস অ্যাবাউট ইট।’

‘কিন্তু এটা কিন্তু জাস্ট একটা স্ট্রে কমেন্ট, স্লিপ অফ টাং মনে হল না। আমার তো মনে হল তেমন কিছু একটা সত্যি সত্যিই না মনে করলে তুমি এটা বলতে না।’ ওর চোখের দিকে তাকাই আমি। ‘আমায় কিন্তু বিশ্বাস করে বলতে পারো, বন্ধু যখন বলেছ নির্দ্বিধায় বলতে পারো।’

‘না না, এমন কোনো কথা না যে বলা যাবে না। তোমাকে বিশ্বাস করিনা এটা বোধ হয় পুরোপুরি ঠিক না, তাহলে তো কোনো কথাই বলতাম না, এই রকম মানসিক অবস্থায় এখানে দাঁড়িয়ে তোমার সঙ্গে কোনো কথাই শেয়ার করতাম না।’

‘তাহলে বলতে অসুবিধা কোথায়? তোমার কেন মনে হল ব্যাপারটা শুধু তোমার স্বার্থেই না?’

‘না মানে, বাবা হয়তো মায়ের মৃত্যুটা মেনে নিতে পারেননি বা হয়তো ওঁর প্রতি বাবার গভীর ভালোবাসা কখনই ওকে মেনে নিতে দেয়নি। হয়তো নিজের মনকে ওই রকম একটা প্রবোধ দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে পেরেছেন বা এমনও হতে পারে যে ওঁর বিশ্বাসে উনি স্থির যে মা শারীরিক ভাবে চোখের আড়ালে গেছেন হয়তো কিন্তু অন্যভাবে ঠিকই আছেন। আর সবার উপরে তো আত্মায় বিশ্বাসটা আছেই। আউট অফ বডি কনসাসনেসের অস্তিত্বে বিশ্বাসের জায়গাটায় উনি যেহেতু খুব এককাট্টা তাই হয়ত মাঝে মধ্যেই তার নানান ধরণের জাস্টিফিকেশন চান।’

‘সে তো নিজেকেও ডিফেন্ড করা হল একপ্রকার। আর কোনো কারণ থাকতে পারে কি যার জন্য উনি নিজেকে ডিফেন্ড করতে চান বা বাঁচাতে চান।’ চোখ টেরিয়ে তাকালাম সন্তর্পণে।

‘জানিনা, বলতে পারব না।’

চোখের কোণ কুঁচকে তাকাল মেয়েটা। আমার কথার বাঁক বা ঢালটা ধরতে পেরে বা না পেরে এড়িয়ে যেতে চাইল প্রশ্নটা। আঁচ করে আমিও এড়াতে চাইলাম প্রসঙ্গ। ‘আচ্ছা, তুমি বিশ্বাস করো? আত্মা, আউট অফ বডি কনসাসনেস, অতিপ্রাকৃত এসবে তোমার বিশ্বাস আছে?’

‘যে বাড়িতে বড়ো হয়েছি সেখানে বিশ্বাস না থাকাটা অস্বাভাবিক, আবার একই সঙ্গে আমি পদার্থবিদ্যার ছাত্রী। স্কুল লাইফে বিশ্বাস খুব জোরালো ছিল, বাবাকে মনে হত ঈশ্বরের পরের ধাপ, ওঁর কথা বেদবাক্য। এখনও মোর অর লেস তাই মনে হয় কিন্তু যত বয়স বাড়ছে ভেতরে ভেতরে একটা কনফ্লিক্ট তৈরি হচ্ছে। আবার একই সঙ্গে মনে হয় পৃথিবীর অপার এই রহস্যভাণ্ডারের বেশির ভাগ দরজার চাবিই যখন বিজ্ঞানের হাতে নেই তখন বাকি সব ডিসিপ্লিনগুলোকে যুক্তিহীন বলি কী ভরসায়। অতিপ্রাকৃত বল বা প্যারানর্মাল এই বিষয়টা কিন্তু খুব ইন্টারেস্টিং, এর একটা মায়াবী দিক আছে, অদ্ভুত একটা নেশা আছে, বিষয়টা আমায় টানে আবার একই সঙ্গে এর সব দিকটা মেনে নেওয়া যায় না...।’

‘এগজ্যাক্টলি, আমারও ব্যাপারটাও তো একই। আমার কথাগুলোই যেন তুমি বললে। তোমার মুখ থেকে কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে, হ্যাঁ এক্কেবারে ঠিক আমরা দুজন যেন এক নৌকারই যাত্রী। আমরা দুজনেই সেই এক পালকেরই পাখি, দুজনেই একই নিয়তির শিকার...।’

‘হ্যাঁ মিল আছে, অনেক ব্যাপারেই পরিস্থিতি হয়ত কাছাকাছি কিন্তু তোমার তবু একটা অপশন আছে, ইচ্ছে করলে তুমি এখানে থাকতেও পারো, ছেড়ে চলে যেতেও পারো কিন্তু আমার তো কোনো চয়েজ নেই, এই পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর কোনো রাস্তা নেই।’ ফুসফুস ফাঁকা করে নিঃশ্বাস ছাড়ল মেয়েটা, করুণ চোখে তাকাল।

‘এভাবে ভেবোনা প্লিজ। তুমিই তো আমার কথা শুনে সেদিন বলেছিলে, কাছাকাছির মধ্যে আমারই মতো আরও একজন মানুষ আছে জানলে যন্ত্রণা অনেকটাই লাঘব হয়, দুঃখ অনেকটাই কমে আসে।’

‘তবুও আমার যন্ত্রণা আরও বিচিত্রতর, আমাকে নাকি একেবারেই আমার মায়ের মতো দেখতে।’

‘সে তো আমিও, সবাই বলে মাতৃমুখী সন্তান...।’

‘কিন্তু তার জন্যে তো তোমার অতিরিক্ত কোনো দায়ভার নেই। সেই মহিলা তো চোখের বাইরের দুনিয়ায় চলে গিয়ে ভারমুক্ত হয়েছেন কিন্তু আমাকে তার বিকল্প হিসেবে রেখে গেছেন সারাজীবন ধরে সেই ভার বহন করার জন্য।’

‘মানে, কী বলতে চাইছ, বুঝলাম না ঠিক?’

‘সব কথা বুঝতে যেও না, সব কথা বুঝতে হবে কে মাথার দিব্যি দিয়েছে। শুধু এইটুকু বোঝার চেষ্টা কোরো মহিলার ছায়া আমায় সারা জীবন কী ভাবে হন্ট করে বেরিয়েছে। আমাকে এক মুহূর্তের জন্যেও তিষ্ঠোতে দেয়নি। জাস্ট কল্পনা করো, একটা মেয়েকে তার মায়ের অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথের পর থেকে কানের কাছে ফিসফিস করে শুধু একটা কথাই বলা হয়েছে, তোমার মা কোথাও যাননি, তুমি জাস্ট দেখতে পাচ্ছো না কিন্তু উনি আছেন, তোমার আশপাশেই কোথাও আছেন।

সে মেয়েটার জীবন কেমন হতে পার ভাবো, তার স্নায়ুর উপর কী ভয়াবহ প্রেসার আন্দাজ করো। সে যে এখনও পাগল হয়ে যায়নি সেটাই কি যথেষ্ট না?’

‘বুঝতে পারছি। আচ্ছা অ্যাক্সিডেন্টটা তো উত্তর কলকাতার অনেক পুরোনো একটা বাড়ির লিফটে হয়েছিল বলেছিলে?’

‘হ্যাঁ, বাড়িটা একসময়ের একটা অভিজাত বিল্ডিং, একসময় অনেক গুরুত্ব ছিল। অ্যাবানডনড স্ট্রাকচার যাকে বলে আর কী, রিসেন্টলি ভাঙা পড়েছে। শেষ বিশ তিরিশ বছর কেউ থাকত না, ডিসপিউটেড প্রপার্টি। এলিভেটরটা বহুকাল ধরে খারাপ ছিল, কন্ডিশন বিপজ্জনক...।’

‘তোমার মা ওখানে কী করছিলেন, ওই রকম ভগ্নদশা বাড়ির ওইরকম ভাঙা বিপজ্জনক এলিভেটরেই বা উঠেছিলেন কেন? সাহেব আমলের ওই সব বার্ড কেজ এলিভেটর কি?’

‘অত পুরোনো কিছু মনে হয় না। কী করতেই বা উঠেছিলেন তাও জানি না। শুনেছি নাকি একেবারে উঁচুতলা থেকে লিফটটা ভেঙে পড়েছিল একেবারে নীচে, ওখানেই সব শেষ...।’

‘উনি নিশ্চয়ই একা ছিলেন না, অনেকেই ছিল সঙ্গে?’

‘হ্যাঁ বাবা ছিলেন, সেই সময়ের বাবার মেন্টর দিবাকর জেঠুও ছিলেন, আরও অনেকেই ছিল। মলয় কাকু একবার আমায় একবার মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন সেদিন সমরকাকুও নাকি ছিলেন ওদের সঙ্গে। সমর কাকুকে অনেকবার কায়দা করে ব্যাপারটা জিজ্ঞাসা করেছি কিন্তু উনি বারবারই বলেছেন উনি কিছু জানেন না। ওই ঘটনার বেশ কয়েকবছর পরে উনি ওই টিমে ঢুকেছিলেন।’

‘টিম বলতে, তখনও ব্যাপারটা টিম-ওয়ার্ক মতো ছিল নাকি?’

‘সে আমি জানি না। তখন তো আমি ছোটো। তবে ওরা অনেকে মিলে একসঙ্গে কাজটা করতেন। মা-ও ওদের সঙ্গে ছিলেন, খুব অ্যাক্টিভ ভাবে ছিলেন। মা তো মারাত্মক সাহসী ছিলেন, ভীষণ অ্যাডভেঞ্চার লাভিং, ডেয়ার ডেভিল, লিভিং ডেঞ্জারাসলি গোছের মহিলা। মা আর বাবা দুজনেই সে অর্থে ছিলেন দিবাকর দত্তগুপ্তর ফলোয়ার, বিশেষ করে বাবাকে তো ওঁর ছাত্রই বলা যায়।’

‘এতদিন ধরে তোমাদের বাড়ি আসছি, স্যারের সঙ্গে এত বিষয়ে এত রকম কথা হয়েছে, তোমার বা ওঁর মুখে আগে তো এই ভদ্রলোকের কথা কোনোদিন শুনিনি? কে উনি, ওঁর পরিচয়?’

‘বাবার মুখে যেটুকু শুনেছি তাতে উনি সাতের দশকের আমাদের এই শহরের একজন নামকরা বিদ্বান মানুষ। ইংল্যান্ডে পড়াশুনো করতে গিয়েছিলেন স্কলারশিপ নিয়ে। তারপর সাইকোলজি নিয়ে গবেষণা, দুর্দান্ত কেরিয়ার, এক ব্রিটিশ মহিলাকে বিয়ে করে পড়ানোর চাকরি নিয়ে উনি সেট্ল করে যান ইস্ট এন্ড অফ লন্ডনে। ওখানে তাঁর আলাপ হয় অ্যালেন সাদে নামের এক প্যারাসাইকোলজির এক্সপার্টের সঙ্গে। সাদের নিজের হাতে তৈরি একটা প্যারানর্মাল রিসার্চ সোসাইটি ছিল যার মেম্বাররা সারা ইংল্যান্ড জুড়েই নানান হন্টেড হাউস আর এক্সট্রাটেরেস্টিয়াল ঘটনা ইনভেস্টিগেট করে বেড়াত। দিবাকর জেঠু ওই সোসাইটির সদস্য হয়ে যান, নিজের যোগ্যতায় অপরিহার্য হয়ে খুব তাড়াতাড়িই সাদের ডেপুটি। কিন্তু একটা ভয়ানক স্ট্রিট অ্যাক্সিডেন্টে ওঁর শিশুকন্যার মৃত্যু হলে ওরা দুজনেই ভয়ানক ভেঙে পড়েন। ইস্ট এন্ডের সেই বাড়ি বেচে দিয়ে স্ত্রী জ্যাকলিনকে নিয়ে চলে আসেন কলকাতায় আর এখানে পৈতৃক বাড়িতেই খুলে বসেন প্যারালাল ওয়ার্ল্ড নামক একটা আধিভৌতিক গবেষণা সংস্থা।’

‘স্যারের সঙ্গে ওঁর পরিচয় কি সেই সূত্রেই?’

‘না নিজের বিষয় সাইকোলজি হলেও প্যারাসাইকোলজি নিয়ে ওর প্যাশনটা ছিল প্রথম থেকেই। একটা ইন্টারন্যাশনাল সেমিনার অ্যাটেন্ড করতে সেবার উনি দিল্লি গিয়েছিলেন, সেখানেই পরিচয় হয় দিবাকর জেঠুর সঙ্গে। লোকটা কলকাতায় সেট্ল করার পর ওদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, বাবা ওঁর সোসাইটির অ্যাক্টিভ মেম্বার হন। ওঁর কাছেই বাবার সিস্টেমেটিক প্যারানর্মাল ইনভেস্টিগেশনের হাতেখড়ি।’

‘তাঁর সঙ্গে তোমার বাবার এখনও সম্পর্ক আছে তো নাকি?’

‘না যোগাযোগ নেই। তিনি আর এখানে থাকেন না। মলয়কাকুর মুখে খুব কনফিডেন্সিয়ালি শুনেছি মায়ের ওই অ্যাক্সিডেন্টের পরপরই ওঁর সঙ্গে বাবার নাকি খুব বিশ্রী একটা গণ্ডগোল হয়েছিল। সেই থেকে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়, তারপর থেকে ওঁকে আর কলকাতায় দেখা যায়নি। কেউ বলে উনি স্ত্রীর সঙ্গে ইংল্যান্ডেই ফিরে গেছেন, আবার কেউ বলেন এদেশেই আছেন।’

‘ওদের মধ্যে কী নিয়ে গণ্ডগোল হয়েছিল? তোমার মায়ের অ্যাক্সিডেন্টটা নিয়ে কি?’

‘জানিনা, সত্যিই জানিনা!’

‘একটা কথা সত্যি করে বলবে, তোমার মায়ের মৃত্যু নিয়ে কি কোনো বিতর্ক আছে?’

‘বিতর্ক বলতে, কীসের বিতর্ক?’ কুঁচকে ওঠে চান্দ্রেয়ীর ভ্রু-দ্বয়ের মাঝের অংশ।

‘তোমার কখনও কোনো সন্দেহ হয়নি? একটা মানুষ ওই রকম একটা পরিত্যক্ত বাড়ির বিপজ্জনক রকমের লিফটে কী করছিল? কেনই বা লিফটটা ভেঙে পড়ল? অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ, নিশ্চয়ই পুলিশ এসেছিল? তাদের তদন্ত রিপোর্ট কী ছিল? তাদের সন্দেহের তীর কোন দিকে ছিল?’

‘জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না। আমি কী করে জানব, আমাকে তো কিছু জানানো হয়নি? মায়ের মৃত্যুর পর আমার তো ব্রেক-ডাউন মতো হয়ে গিয়েছিল। আন্ডার ট্রিটমেন্ট ছিলাম টানা বেশ কয়েক বছর, প্রায় এক দেড় বছর আমার কোনো বাহ্যজ্ঞান ছিল না, এমনকি রিহ্যাব সেন্টারেও পাঠানো হয়েছিল। ডাক্তার স্ট্রিক্টলি বলে দিয়েছিল যথেষ্ট ম্যাচিয়োর না হওয়া পর্যন্ত ওই ইস্যুটা আমার সামনে না তুলতে। সে অর্থে বড়ো হওয়ার পর বাবাকে এই নিয়ে অনেকবার অনেক কথা জিজ্ঞেস করেছি, মলয়কাকু সমরকাকু, সেই সময়ে মা বাবার ঘনিষ্ঠ অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু সবাই নানানভাবে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেছে। কোনো সদুত্তর দেওয়া হয়নি, বরং ওদের কথা শুনে আমি কনফিউজড হয়েছি...।

তবে বারবারই মনে হয়েছে এ বাড়ির হাওয়ায় ওই নিয়েই হয়তো একটা চাপা টেনশন আছে। কিছু যদি নাই থাকে তাহলে এত রাখঢাকের তো কোনো মানে হয় না!’

‘বুঝতে পারছি। আচ্ছা তোমার বাবার টিমের লোকজন অনেকেই তো মাঝেমাঝেই পালা করে এই বাড়িতে থাকে। তাদের মধ্যে মলয়দা, শাজাহানদা আর উত্তম সাধুখাঁ তো তোমার বেশ ঘনিষ্ঠ। মলয়দা তো তোমার বেশ কাছের মানুষ, তাই না?’

‘হ্যাঁ মলয়কাকু শাজাহানকাকু মনে হয় আমায় সন্তানের চোখেই দেখেন। দুজনেই আমার কাছের লোক, আমায় ছোটো থেকেই দেখছেন, আমার কিছু হলে ওদের নাওয়া খাওয়া সব বন্ধ হয়ে যায়। আমার তো মাঝে মাঝে একটা এপিলেক্টিক ফিট মতো হয়। তেমন কোনো শরীর খারাপ হলে ওরা রাত জেগে বসে থাকেন। আমার সবকিছু তো ওঁরাই সামলান। তবে মলয়কাকু তো পুরোনো লোক, আমার সব কথা আমার চেয়েও বেশি যেন উনিই জানেন। ওই লোকটাই মনে হয় আমায় কিছুটা হলেও বোঝেন।’ আমার দিকে ঘাড় ঘোরায় চান্দ্রেয়ী ‘কেন বলোতো, এ কথা জিজ্ঞাসা করছ কেন?’

‘না মলয়দা তো তোমার বাবার যাকে বলে রাইট হ্যান্ড ম্যান। কাজের বাইরে ওই লোকটার সঙ্গে আমারও কিছুটা সখ্য আছে। বীরনগরের কাছে একটা ধ্বংসস্তুপ জাতীয় বাড়ির ব্যালকনি ভেঙে অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে একবার আমি ওকে বাঁচাতে পেরেছিলাম, সেই থেকে অন্যরকম একটা সম্পর্কের জায়গা আছে বলে মনে হয়। ওকে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করলে কি কিছু জানতে পাওয়া যাবে?’

‘মনে হয় না। আর সব সম্পর্ক সেকেণ্ডারি ওরা কিন্তু ফার্স্ট অ্যান্ড ফোরমোস্ট আমার বাবার লোক, যতই যা করুন যাই বলুন বাবার প্রতি আনুগত্য নিয়ে কিন্তু কোনো প্রশ্ন নেই।’

‘সে জানি কিন্তু তবুও...।’

আমরা আলোচনায় ব্যস্ত ছিলাম। একেবারেই খেয়াল করিনি, কখন যে পিছন দিক থেকে নিঃশব্দে এগিয়ে উত্তম সাধুখাঁ একেবারে আমাদের কাছে চলে এসেছে। মাত্র দেড় হাত দূরে। কী আশ্চর্য, চারদিকে অনেক শুকনো পাতা ছড়িয়ে পড়ে আছে, অথচ কিছুই টের পেলাম না। মানছি রাতের এক্সপেডিশনে চূড়ান্ত দক্ষ ওস্তাদ লোক, এদের পায়ের শব্দ শোনা যায় না তবু আমারও কিছুই কানে এল না, শেষ কয়েক মিনিট কথাবার্তায় এমনই বেখেয়াল হয়ে গিয়েছিলাম!

চোখ দুটো আমার উপরেই গেঁথে রয়েছে। দেখেই মস্তিষ্কে ঝিলিক খেলে যায়, চকিতে গুছিয়ে নিই নিজেকে। মুখের ভাষা নিমেষে বদলে ফেলে হাত নেড়ে এমন একটা ভান করি যেন জার্নালটা নিয়েই আলোচনা করছিলাম, চান্দ্রেয়ীর কাছে বুঝতে চাইছিলাম কোয়ান্টাম থিওরির ব্যাপারস্যাপার। চান্দ্রেয়ীও সচকিত হয়ে উঠেও দ্রুত আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বদলের জ্যামিতিটা বুঝে নেয়। অপটু অভিনেতার মতো আমি বলে উঠি ‘তাহলে এই হল মাল্টিভার্স থিওরি?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু আসল ব্যাপারটা অনেক কঠিন। এভাবে ক্যাজুয়ালি ফোয়ারার ধারে দাঁড়িয়ে মুখে মুখে বলে বুঝিয়ে দিলাম এত সহজ ভেবো না। পুরো ব্যাপারটাই কনসিসটেন্ট ম্যাথমেটিক্যাল স্ট্রাকচারের উপর দাঁড়িয়ে আছে।’

‘সে তো বটেই। বুঝতে পেরেছি, বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছি।’

তবু মনে হল না তাতে কিছুমাত্র মেকআপ দেওয়া গেছে। এইসব লোকজনকে বোকা বানানো কি অতই সোজা! কী জানি কতক্ষণ থেকে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে, মিনিট দুয়েক আগে এলেও তো বেশ কিছু কথা কানে যাবার কথা। উত্তমদা আমাদের কাছে এসে দাঁড়ালো।

‘এ কী! এটা কেমন হল, তুমি এসেছে জানাবে তো? কথা বলছি তার মধ্যে আচমকা...’ মুখভঙ্গিতে বিরক্তি, ঝাঁঝালো স্বরে গলা ঝেড়ে উঠল চান্দ্রেয়ী। জবাব দিল না উত্তম সাধুখাঁ, একেবারেই গায়ে মাখল না যেন। শীতল নির্বিকার চাহনি, আদেশের সুরে বলল ‘মুনি, বাবা ডাকছেন, যাও তোমার ঘরে যাচ্ছেন, মিনিট দশেকের মধ্যে যাচ্ছেন।’

‘যাচ্ছি, তুমি যাও আমি আসছি।’ ওকে যাওয়ার ইঙ্গিত করে হাওয়ায় হাত নাড়ে চান্দ্রেয়ী কিন্তু লোকটা নড়ে না। আমার দিকে কটমটে চোখে তাকিয়ে বলে, ‘দাদা জিজ্ঞেস করছিলেন বইটা কি তুমি নিয়ে এসেছ?’

‘হ্যাঁ নিয়েই এলাম, পড়ে কালই নিয়ে আসব সাথে করে। রাতেই যতদূর পারব শেষ করব, শিয়োরলি অনেক জায়গায় আটকাবে তখন তো তোমাদের মুনির কাছে আসতেই হবে।’

চান্দ্রেয়ী ঘাড় নাড়ে কিন্তু লোকটার মুখ যথারীতি নিষ্করুণ, অনমনীয়।

‘আসি তাহলে, এখন আসি, স্যারকে বলে দিও আমি বেরিয়ে গেলাম।’

নিরুত্তর তাকিয়ে থাকে উত্তম সাধুখাঁ।

১৫

আগের দিন রাত থেকেই জার্নালটায় মুখ গুঁজেছি, সকালে উঠেও ঘন্টা তিনেক ওটা নিয়ে পড়ে থেকে মোটের উপর একটা ধারণা তৈরি হয়েছে বটে কিন্তু কিছুতেই ঠিকমতো মনোযোগ বসানো যাচ্ছিল না। গতকাল চান্দ্রেয়ীর মুখে শোনা কথাগুলো খালি মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছিল, পাশাপাশি অবশ্যই উত্তমদার ওই ভাবে পিছনে এসে পড়ার ব্যাপারটাও। আমাদের কথাবার্তা কতখানি শুনেছে কে জানে! ওকে যদিও খুব করে অনুরোধ করেছি ব্যাপারটা কারও কানে না তুলতে কিন্তু তা কি আদৌ সম্ভব! আর কারও কানে না উঠুক মলয়দার কানে তো উঠবেই, তারপর সেটা অরুণবাবুর কানে।

মনটা উতলা হয়েছিল তাই বিকন ভিলায় হালচাল আঁচ করতে ওদের ল্যান্ড লাইনটায় ফোন করলাম বেশ কয়েকবার কিন্তু ফুল রিং হয়ে কেটে গেল। ব্যাপার কী? কেউ ফোন তুলছে না এমন তো সচারচর হয় না। নাঃ, আর কিছু করার নেই যেতেই হবে। যদিও বেলা অনেক হয়ে গেছে, বাইরে চাঁদি ফাটানো রোদ তবু পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখতে গেলে সশরীরে যেতেই হবে।

বেলা বারোটা বেজে গেছে, জার্নালটা হাতে বাড়ির ভেতরের গেটটা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে দারোয়ানকে, ‘স্যার আছেন তো?’ জিজ্ঞেস করায় সে জানাল, ‘না উনি বেরিয়েছেন।’ সিঁড়ির প্রথম প্যাঁচটা পেরিয়ে উপরে উঠতে গিয়ে দেখি ফার্স্ট ফ্লোর থেকে মলয়দা নেমে আসছে। আমায় দেখেই থমকে দাঁড়াল। মুখটা থমথমে মেঘলা। ‘কী হল, কোথায় চললে? স্যার তো নেই।’ কিছুটা যেন কর্কশ গলায় বলল।

‘হ্যাঁ তাই তো শুনছি, চান্দ্রেয়ী আছে তো?’

‘না, ও এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি।’

‘সে কী কেন? বারোটা বেজে গেছে, এখনও ঘুমোচ্ছে!’

‘হ্যাঁ শরীর ভালো নেই, ভোরের দিকে ঘুমিয়েছে হয়তো।’

মলয়দার চোখের দিকে তাকিয়ে মনোভাব বোঝার চেষ্টা করি। অরুণ ভাদুড়ীর দলের এই একটাই লোক যার সাথে আমার কাজের বাইরেও এক ধরনের সখ্যতা আছে। কাঁচুমাচু মুখ করে উঠে আসি আরও দু-ধাপ, ‘চান্দ্রেয়ীর শরীর খারাপ বলছ, কী হয়েছে? স্যার কোথায় গেছেন মলয়দা?’

‘স্যার কোথায় সে স্যারই জানেন, সেটা নিয়ে আমরা কেউ প্রশ্ন করিনা জানোই তো?’ গম্ভীর মুখ, বেশ একটা রাশভারী ঢঙে বলে লোকটা। স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, মুখটা সামান্য সরিয়ে কিঞ্চিত উদ্বেগের সুরে বলে, ‘কাল রাতে মুনির মাথার ব্যথাটা খুব বেড়েছিল, আবার সেই সব সমস্যা মাথাচাড়া না দিলেই ভালো। একটা খিঁচুনি মতোও হয়েছিল। কিছুক্ষণ আগে ডাক্তার মুখার্জী এসেছিলেন, বললেন থাক বিকেলে আসব, ঘুমের ওষুধ খেয়ে যখন ঘুমোচ্ছে এখন জাগাবো না।’

‘সে কী, হঠাৎ করে আবার কী হল? আমি গতকাল যতক্ষণ ছিলাম তো ঠিকই দেখে গিয়েছি!’ আশপাশে কেউ নেই দেখে নিয়ে এগিয়ে যাই, ‘দাদা আপনি আমায় বিশ্বাস করেন তো?’

‘কেন হঠাৎ এ কথা বলছ কেন?’

‘আপনি তো আমায় অনেকদিন থেকে দেখছেন, কী মনে হয়েছে আমাকে, একেবারেই বিশ্বাস করা যায় না? আপনাদের টিমের একজন ডেডিকেটেড ওয়ার্কার ভাবা যায় না? আমি আপনাদের কেউ নই?’

‘কেন, হঠাৎ এখন এসব কথা উঠছে কেন?’

‘আমাকে যদি আপনাদেরই একজন ভাবা হয় তাহলে আমায় কিছু বলা হয় না কেন? এতদিন থেকে এই বাড়িতে আসছি, আপনাদের সমস্ত অপারেশনে ক্ষমতার শেষ বিন্দু অবধি নিংড়ে দিয়েছি, প্রাণের ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা করিনি তবু সব ব্যাপারে আমাকে বাইরের লোক ভাবা হবে কেন? এ বাড়ির অতীত আমাকে কিছুই জানানো হয়নি, স্পষ্ট আঁচ করতে পারছি শেষ কয়েক সপ্তাহ ধরে এ বাড়ির মধ্যে আমার অজান্তেই অনেক কিছুই ঘটে চলেছে অথচ আমাকে ঘুণাক্ষরেও কিছু জানানো হবে না, কেন মলয়দা, কেন?’

‘কেন তোমায় কেউ কিছু... না মানে মুনির মুখে কিছু শুনেছ মনে হচ্ছে?’

‘কী শুনব, কে বলল?’ তুতলে উঠি, অস্বস্তির রেখা ফুটে ওঠে মুখে ‘কিন্তু আমরা তো... ইয়ে মানে, কেন তোমাকে উত্তমদা কিছু বলেছে?’

‘সেটাই তো স্বাভাবিক তাই না? তুমি কী করে ভাবলে বাড়ির এলাকার মধ্যে কিছু একটা ঘটবে আর সেটা আমাদের কানে আসবে না?’

‘কিন্তু সেটা কী খুব অন্যায়? বন্ধু মনে করে ও কী আমায় কিছু বলতে পারে না? আমি যদি গোপনীয়তার সম্মান রাখতে পারি তাহলে সমস্যাটা কোথায়?’

‘সেটা আলাদা কথা, কিছু বলার হলে স্যার তো নিজেই বলতেন, সেটা লুকিয়ে শুনতে হবে কেন? অহেতুক কৌতূহল জিনিসটা উনি মোটেও পছন্দ করেন না।’

‘স্যার জানেন, ব্যাপারটা ও স্যারের কানে তুলেছে নিশ্চয়ই?’

‘হুম! আর তাতে স্যার ক্ষুব্ধ হয়েছেন।’

‘কিন্তু কী এমন কথা হয়েছে, উত্তমদা সে সব কথার কতটাই বা শুনতে পারে? ড্যাম শিয়োর প্রথমদিকে ও ওখানে ছিল না!’

‘উত্তম না বললে কী হবে, কী কী কথা হয়েছে সে তো মুনিই বলেছে, আর এটা তোমার ভীষণ অন্যায় হয়েছে!’ চাপা গলায় ধমকে ওঠে মলয় পোদ্দার, ‘মুনি ওগুলো মাথায় নিতে পারে না, ওসব কথা ওর পক্ষে ক্ষতিকারক তাই আমরা ওসব থেকে ওকে দূরে রাখি। তোমার বোঝা উচিত ছিল, ওর শরীরের সমস্যার কথাটা মাথায় রাখার কথা ছিল। মেয়েটার কিছু হয়ে গেলে কে ঠেকাবে?’

‘কেন, চান্দ্রেয়ীর কি ওই জন্যেই মেন্টাল ব্রেক ডাউনটা হল? স্যারের সঙ্গে কি রাতে ওর ওইসব নিয়ে কোন বচসা মতো হয়েছিল? ও কি স্যারকে কিছু জানতে চেয়ে জোর করেছিল, স্যার কি রাগের মাথায় সে রকম কিছু বলে বসেছেন, পুরোনো ওই সব কথা শুনেই কি...?’

‘সে সব তো তোমার জানার কথা নয়, আমরাও তোমাকে জানাতে বাধ্য নই। নিজের সীমার মধ্যে থাকো হে ছোকরা, নিজেকে বেশি লায়েক ভাবতে যেও না।’

‘স্যরি মলয়দা, ভেরি স্যরি। আসলে আমি তো এত কিছু জানতাম না। ওর একটা নিউরোলজিক্যাল সমস্যা আছে শুনেছিলাম কিন্তু সেটা যে এত সিরিয়াস পর্যায়ের কিছুই সেভাবে জানতাম না। ছি ছি, আমার জন্যেই কি... এ বাবা অ্যায়াম সো স্যরি!’ দু-হাত কচলাতে কচলাতে সেকেণ্ড ফ্লোরের দিকে তাকাই।

‘স্যরি বললেই হয়ে গেল, ব্যাপারটা কতটা স্পর্শকাতর কোনো ধারণা আছে? স্যার বাইরের নানা ব্যাপারে কী রকমের অমানুষিক চাপে আছেন কোনো ধারণা আছে, কী রকম দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন আন্দাজ আছে? তার মধ্যে এইভাবে ওর বিপদ বাড়ানো, মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা...।’ বলেই কিছুটা যেন ছোপ খায় মলয় পোদ্দার, ঝোঁকের মাথায় বলে ফেলে ঢোঁক গেলে।

‘দুঃসময়, বাইরের দুনিয়ার চাপ বলতে? কী হয়েছে, স্যারের আবার কী সমস্যা হল?’

অপ্রস্তুত চোখে তাকায় মলয় পোদ্দার, মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় বলে, ‘সে শুনে তুমি কী করবে? শুনে কোনো সমাধান করতে পারবে, কোনো সুরাহা?’

‘না শুনলে কী করে বুঝব কিছু করতে পারব কিনা? কী হয়েছে বলুন, কোনো সুরাহা তো হতেও পারে? আমি আমার মতো করে তো কিছু একটা ভাবতেও পারি।’

মুখ মুচড়ে বেশ কিছুটা হাওয়া ছেড়ে হাসে মলয় পোদ্দার, কিছুটা যেন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হেসে বলে, ‘এ সমস্যা তুমি কেন বাছা, স্বয়ং ঈশ্বরও এসে কিছু করতে পারবেন না। খুব হোপলেস লাগছে, মাথা কাজ করছে না, কী যে করব বুঝে উঠতে পারছিনা। শুধু তো আমরাই না, স্যারের ইউনিটের বিভিন্ন দিকে ছড়ানো আরও গোটা তিরিশেক স্টাফ, আমাদের বোর্ড মেম্বারস, উপদেষ্টা, ল-ইয়ার সবাই ভাবছে কিন্তু কোনো রাস্তা চোখে পড়ছে না।’

‘আর আমি তো আপনাদের কেউ নই? দরকার হলে গলায় গামছা দিয়ে ডেকে আনেন, দরকার ফুরোলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন, আমার তো কোনো পজিশনই নেই, কিছু জানার এক্তিয়ার নেই, তবু কেন যে পড়ে আছি আপনাদের পেছনে কে জানে?’ ক্ষোভে মাথা ঝাঁকিয়ে তুলি।

ফুসফুস ফাঁকা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে লোকটা। বাঁক নিয়ে উপর দিকে উঠতে থাকে আর বলতে থাকে, ‘দেখি মুনির কী খবর। যাই আমায় আবার শাজাহানকে ছাড়তে হবে, মুনি উঠলে ডাক্তার মুখার্জীকে খবর দিতে হবে। ঠিক আছে তুমি এবার এসো, আজ তো স্যারের ফিরতে রাত হয়ে যাবে, মুনি কখন উঠবে তার ঠিক নেই। উঠলেও ড্রাউসি থাকবে, কথা বলতে পারবে না। তুমি বরং কাল এসো।’

ওর পেছন পেছন উঠতে লাগলাম, ‘সে ঠিক আছে, চলে যেতে বললে চলে যাব কিন্তু আপনি তো আমার কথাটা এড়িয়ে গেলেন, এটা কিন্তু আমায় অপমান করা হল মলয়দা। আপনি অন্তত আমায় বিশ্বাস করতে পারতেন, আপনার অন্তত আমার সিনসিয়ারিটি নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা ছিল না, আমি কিন্তু এই বাড়ির ভালোই চাই, চান্দ্রেয়ী, স্যার আপনাদের সবার ভালো চাই।’

‘সব বুঝলাম কিন্তু তোমার ভালো চাওয়ায় আর কী এসে যাবে? বিশ্বাস সিনসিয়ারিটি সাহস ডেডিকেশন কিছু দিয়েই যে আমাদের এখনকার এই সংকটটা যে কাটিয়ে ওঠা যাবে না।’

‘তাহলে কী লাগবে? পরিষ্কার করে বলুন না, এ রকম করছেন কেন?’

সেকেণ্ড ফ্লোরে উঠে চান্দ্রেয়ীর দরজার সামনে এসে ঠোঁটে তর্জনী ঠেকায় পোদ্দার ‘শ-শ-শ! আস্তে আস্তে, জোরে কথা না, মুনির ঘুম ভেঙে যাবে।’

ভেজানো দরজাটা বাইরে থেকে টেনে দিয়ে ওর হাত চেপে ধরি, চাপা গলায় বলি, ‘কিন্তু আজ আপনাকে বলতেই হবে দাদা, না হলে আমি যাব না। কিছুতেই বাড়ি পাঠাতে পারবেন না। এতখানি যখন বলেছেন শেষটাও বলতে হবে।’

লোকটা আমার হাত দুটো ধরে টান দেয়। গায়ে প্রচুর শক্তি, এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলা যাবে না তাই বেশ কিছুটা টেনে নিয়ে গিয়ে তেতলার দিকে উঠে যাওয়া ধাপগুলোয় তুলে আনে, ‘কী শুনবে, কী শুনতে চাও, কী আর বলব!’ মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে উপর দিকে উঠতে থাকে, আচমকা পিছন ফিরে তাকায়, ‘অবশ্য এই দিনটা একদিন না একদিন আসতই, সব কিছু যেদিকে যাচ্ছে তাতে আজ না হয় কাল এটা হতই। স্যারের সঙ্গে এত বছর ধরে আছি, তাই সমস্যাটা আমাদেরও। সেই অধিকারেই বলছি, তোমায় কিছুটা হলেও অন্য চোখে দেখি তাই বলছি কিন্তু স্যারের সামনে কোনোভাবেই এই নিয়ে মুখ খুলোনা যেন। ভুলেও এই নিয়ে কিছু বলে বোসো না…’

‘না না কথা দিচ্ছি, কথার নড়চড় হলে বলবেন।’

তেতলার চাতালটায় উঠে এসে আমার দিকে তাকায় মলয় পোদ্দার। রাত জাগা চোখ দুটো লাল, অনেকটা শ্বাস ভেতরে টেনে নিয়ে বলে, ‘বাজারে স্যারের পাহাড় সমান ধার, চারদিক থেকে ধার, লক্ষ লক্ষ টাকা ধার, কোটি কোটি টাকা...।’

‘সে কী, এত টাকা, কী করে...?’

‘সে তো এক দিনের ব্যাপার না। বিশ বাইশ বছর আগের এক বিশাল বিজনেস ডিজাস্টারের জের।’

‘বিজনেস বলতে, স্যার তো কলেজে পড়াতেন শুনেছি?’

‘পড়াতেন কিন্তু দিবাকর দত্তগুপ্ত স্যারের সঙ্গে মেশার পর থেকে ওঁর চিন্তা ভাবনাতে অনেক রকম বদল আসতে শুরু করে। ওরা পার্টনারশীপে এই কলকাতার বুকেই বিরাট একটা ব্যবসা লঞ্চ করেন, তখনকার দিনে কোটি টাকার ইনভেস্টমেন্ট। একেবারেই অভিনব ব্যবসা, এদেশে তখনও ওসব ব্যবসা করা তো দূরের কথা, কেউ কল্পনা অবধি করতে পারত না।’

‘কীসের ব্যবসা?’

‘ডার্ক ট্যুরিজম। নাম শুনেছ?’

‘হ্যাঁ, সে তো ইউরোপ আমেরিকায় খুব হয় শুনেছি, হরর ট্যুর তো? ওদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কৃষ্ণপক্ষ বা অমাবস্যা রাতে শহরের শহরের বাছা বাছা কিছু হন্টেড প্লেসে ট্যুরিস্টদের নিয়ে গিয়ে চোখের সামনে সুপার ন্যাচারালের অস্তিত্ব প্রমাণ করে দেখিয়ে দেওয়া, তাই তো?’

‘একেবারে ঠিক। ওরা প্রথমদিকে কলকাতার আট দশটা ভুতুড়ে বাড়ি বেছে দারুণ ভাবে ব্যাপারটা শুরু করে। দিবাকর স্যার বিদেশ থেকে এক্সপার্ট নিয়ে এসে আমাদের ট্রেনিং দিয়েছিলেন, লাখ লাখ টাকা খরচা করে প্রচুর ইক্যুইপমেন্ট, প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল সাপোর্ট সিস্টেম আনিয়েছিলেন। ইনিশিয়্যালি খুব ভালো রেসপন্স পাওয়া গিয়েছিল, ট্যুরিস্টের সংখ্যা বাড়ছিল দিন দিন, প্রচুর ধনী লোকজন এর পেছনে ইনভেস্টও শুরু করেছিলেন। তারপর হট করে বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো মুনির মায়ের অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটে গেল। অ্যাক্সিডেন্ট না ডায়াবলিক ডিজাইন, সেদিনও মাথায় ঢোকেনি আজও না।’

‘ডায়াবলিক ডিজাইন বলতে, অশুভ শক্তির কাজ?’

‘হ্যাঁ, দিবাকর স্যার আগাগোড়া ঘটনাটার প্যারানর্মাল ইনভেস্টিগেশন করে কনফার্মড ডিসিশন জানিয়েছিলেন ওটা ক্লিয়ার কেস অফ পারপেট্রেশন অফ ইভিল ফোর্স। অশুভ শক্তির নাশকতা।’

‘পুলিশ কী বলেছিল?’

‘পুলিশ বলেছিল অ্যাক্সিডেন্ট। সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স থেকে পরিষ্কার, এলিভেটরটার কেবল ব্রেকেজ ছিল, বিল্ডিং এর একটা দেওয়াল ধসেও পড়েছিল। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টও রায় দিয়েছিল অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথের দিকে কিন্তু প্রশ্ন আবার সেই একই। ওই রকম একটা অ্যাবানডনড বিল্ডিং-এ কোনো পাওয়ার সাপ্লাই ছাড়া লিফটটা হঠাৎ চলতে শুরু করে কী করে! অফিসিয়ালি যাই বলুক আরও সব অনেক অ্যাবনর্মাল ফিচারস দেখে পুলিশেরও একসময় সন্দেহ হয়েছিল অশুভ শক্তির হাত ছাড়া ওইভাবে অ্যাক্সিডেন্টটা হয় কী করে! দিবাকর স্যারের কলেজ ফ্রেন্ড অ্যাডিশনাল পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট নিয়োগী স্যারেরও সেই একই ওপিনিয়ন ছিল।’

‘আমাদের স্যারের ওপিনিয়ন কী ছিল?’

‘স্যারেরও মনে হয়েছিল এটা ঠিক নর্মাল অ্যাক্সিডেন্ট না, এর মধ্যে কোথাও একটা সুপার ন্যাচারাল ইনফ্লুয়েন্স আছে। তবে বৌদির ওই ভাবে চলে যাওয়াটা মানুষটা মেনে নিতে পারেননি, একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময়ই দিবাকর স্যারের সঙ্গে ওঁর কী সব নিয়ে যেন জোর গণ্ডগোল হয় আর তার সাত দিনের মাথায় ওই লোকটা একেবারে উধাও হয়ে যান, পুরো ভ্যানিশ। শুধু নিজে ভ্যানিশ হয়ে যাওয়াই না, কোম্পানির সমস্ত রকমের ফাণ্ড, ইনভেস্টমেন্ট, জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট পুরোটা প্রায় সাপটে তুলে নিয়ে ভ্যানিশ হয়ে যান। সেই থেকে তার আর কোনো ট্রেস নেই।’

‘মাই গুডনেস, সে তো মারাত্মক ব্যাপার, জায়গান্টিক ফ্রড!’

‘সে আমি বলতে পারব না, অতখানি বলার এক্তিয়ার আমার নেই। তবে এটুকু বলতে পারি সেই ধাক্কা সামলে উঠতে এতগুলো বছর ধরে স্যার সমানে যুঝে যাচ্ছেন। স্যার বলেই পারছেন, অন্য কেউ হলে হয়তো ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যেতেন। আর আজকে যেটা হল এমন দিনও যে দেখতে হবে ভাবতে পারিনি। ঘন্টা দুয়েক আগে ব্যাঙ্ক থেকে লোক এসে হাতে নোটিশ ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। বাড়িটাও যে মর্টগেজে আছে জানতাম না, পুরো ব্যাপারটা যে এই জায়গায় এসে পৌঁছেছে কিছুই জানতাম না।’

‘এ বাবা, সে কী!’ আপনা থেকেই ঠোঁটের উপর এসে পড়ে আঙুল, ‘তাহলে এখন উপায়, তাহলে এখন কী করণীয়...?’

‘দেখি স্যার কী করেন? আসলে অনেক বছর আগের সব ধার, নতুন লোনপত্তর সব সুদে আসলে বাড়তে বাড়তে এই চেহারা নিয়েছে। স্যারদের পৈতৃক অন্যান্য সব প্রপার্টি বেচতে বেচতে এতদিন চলছিল, এখন শুধু এই বিকন ভিলা আর টালিগঞ্জের কাছের একটা মার্কেট কমপ্লেক্সই ভরসা। মার্কেট কমপ্লেক্সটা আবার কী একটা আইনি জটিলতার মধ্যে রয়েছে, মোটকথা সব মিলে মানুষটা একেবারে বিধ্বস্ত।’

‘ওফ! রিয়েলি ডিফিকাল্ট সিচ্যুয়েশন! এই রকমই কিছু একটা আন্দাজ করেছিলাম, কিন্তু এতটা খারাপ কিছু আশা করিনি। যতদিন আপনাদের সঙ্গে কাজে নেমেছি বারবার মনে হয়েছে এসবের পেছনে টাকার সাপ্লাইটা আসছে কোথা থেকে। হাজার হোক এটা তো ইংল্যান্ড আমেরিকা না, এদেশে এটা তো খুব প্রফিটেবল সেক্টর নয়।’

‘না না, প্রফিট যে নেই তা নয়, চাহিদারও ঘাটতি নেই কিন্তু ধারের বোঝাটা যে ভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থেকেছে তাতে সিচ্যুয়েশনটা দিন দিন হাতের বাইরে বেরিয়ে গেছে হয়তো। আমি ওঁর ম্যানেজার ঠিকই কিন্তু সবটা আমিও জানতাম না।’

‘কিন্তু আমাদের এখনকার প্রোজেক্টটার কি এতই খরচ, টেলিভিশন সিরিজটার পেছনে কি প্রচুর টাকা ইনভেস্টমেন্ট?’

‘না না এটাই তো সব না। তুমি আসলে স্যারের কাজকর্মের যেটুকু দেখছ সেটা পুরো ব্যাপারটার টেন পার্সেন্টও না। সারা বাংলা, এমনকি বাংলার বাইরেও নানান প্যারানর্মাল বা প্যারাসাইকোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের পেছনে স্যারের ডায়রেক্ট বা ইনডায়রেক্ট ইনভেস্টমেন্ট আছে। বলতে পারো আমাদের স্যার হলেন সমস্ত ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার প্যারানর্মাল ইনভেস্টিগেশনেরই একজন লিডিং ফিগার। তুমি আর আমাদের কজনকে চেনো, আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রির কটা ব্রাঞ্চ, সিস্টার কনসার্নের কথা জানো...?’

লোকটা বার বার নিচের দিকে ঝুঁকে তাকাচ্ছে, মনে হয় চান্দ্রেয়ী উঠল কিনা সেদিকে নজর রাখছে। রেলিংটায় ভর দিয়ে ফিরে তাকায়, ‘তার ওপর আবার টিভি চ্যানেলের সঙ্গে স্যারের একটা মন কষাকষি চলছে।’

‘কেন, টিভি শো-এর ব্যাপারটাও ভেস্তে যেতে বসেছে নাকি?’

‘না তা এখনও বলা যায় না, তবে শো-এর টাইম নিয়ে চ্যানেল কর্তাদের সঙ্গে একটা দড়ি টানাটানি চলছে। ওরা বলছে শো-এর টাইম হবে রাত সাড়ে এগারোটা স্যার তাতে রাজি না। যেহেতু প্যারানর্মাল-শো, ফিয়ার এলিমেন্ট আছে তাই ওরা নর্মাল ভিউয়িং টাইমে স্লট দিতে চাইছে না কিন্তু স্যার নিজের জায়গা থেকে নড়বেন না।’

‘কী মনে হচ্ছে, কোন দিকে পাল্লা ভারী?’

‘আমাদের শো-এর মেরিট আছে। বাংলা বাজারে মনে হয় না এই রকম লার্জ স্কেলে এই রকম নিখুঁত কাজ আগে কেউ করেছে। কিন্তু আমার ভয় স্যারকে নিয়ে, উনি তো নিজের মানসম্মানের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করে কিছু করতে রাজি না। আমি বোঝানোর চেষ্টা করেছি, রাতের স্লট বা যাই হোক শো-টা আমাদের পেতেই হবে কিন্তু উনি তো জানো কী ধরনের..।’

‘হুম, সে মাঝরাত হোক বা সন্ধ্যেবেলা যে সময়েই হোক না কেন, এখন মনে হচ্ছে শো-টা হওয়া খুব দরকার, সব দিক থেকেই খুব দরকার।’

‘দেখা যাক সমরও ওঁকে বোঝাচ্ছে কিন্তু এর ভেতরে কোনো টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন নিয়ে অপমানিত বোধ করে বা রেগে গিয়ে স্যার যদি হঠাৎ করে রেগে গিয়ে বেরিয়ে আসেন তাহলে সব গেল। এই প্রোজেক্টটাই এখন আমাদের শেষ আশা ভরসা, রেপুটেশন বলো বা ব্রান্ড ভ্যালু সব দিক থেকেই এটাই এখন আমাদের মেজর ব্রেক থ্রু হতে চলেছে আর এই রকম মোক্ষম সময়ে এসে দেখ এটাই এখন প্রশ্ন চিহ্নের মুখে!’

‘এই কাজটা তো প্রায় শেষের দিকে, এটার টাকাপয়সা নিয়ে টানাটানি পড়ছে নাকি?’

‘মূল ফান্ডে টানাটানি হলে তার প্রভাব তো সব দিকেই পড়বে। তবে ইমিডিয়েটলি এই বিকন ভিলাকে তো বাঁচাতে হবে, তারপর বাকি সব কিছু…।’

ঠোঁট কামড়ে তাকাই এদিক ওদিক ‘সত্যিই দুঃসময়! এই পরিস্থিতিতে আমি যে কী করতে পারি বুঝতে পারছি না। সে যে কোনো ভাবেই হোক স্যারকে সাহায্য করতে পারলে খুব ভালো হতো, কী যে করি?’ অস্থির ভাবে তাকাই এদিক ওদিক ।

‘কী আর করবে, ব্যাঙ্ক লুট করবে, নাকি গুপ্তধন খুঁজতে বেরোবে?’ ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে আবার নিচের দিকে ঝোঁকে মলয়দা।

‘না সে বুকের পাটা আমার নেই কিন্তু কিছু টাকা জোগাড় করতে পারলে কি স্যারের কিছুটা সুরাহা হত?’

‘টাকা জোগাড়! কী করে করবে? কত টাকা জোগাড় করা সম্ভব, তোমার ধারণাটা এ কী এক দু লাখের ধাক্কা?’

‘জানি, বুঝতে পারছি। না মানে , আমি আসলে নিজে একটা পড়তি ব্যবসায়ী বাড়ির সন্তান, আমার বাবার আমাদের ডিস্ট্রিক্ট টাউনের বুকে বিল্ডিং মেটেরিয়ালস সাপ্লাইয়ের একটা ব্যবসা আছে। আমি যদিও খুব অযোগ্য উত্তরাধিকারী, একেবারেই ব্যবসার ব্যাপারে কোনো ইন্টারেস্ট নেই তবুও তাতে আমার তো একটা অধিকার থেকে যায়ই। সেই দিক থেকে আমি যদি এই সংকটের মুহূর্তে তিরিশ পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা মত আপাতত এনে দিতে পারি তাতে কি কিছুটা সমস্যা মিটবে?’

লোকটা আমার দিকে এগিয়ে আসে কয়েক পা, ‘মানে? তিরিশ পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা? তুমি দেবে?’

‘হ্যাঁ, যদি আশু এই কঠিন পরিস্থিতিটা ট্যাকল করতে টাকাটা প্রোজেক্টের কাজে আসে এটুকু আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি।’

‘কিন্তু কী হিসেবে দেবে? কেন দেবে?’

‘মেম্বার হিসেবে দেব, পুরো প্রোজেক্টের একজন হিসেবে?’

‘কিন্তু এত টাকা, না না সেটা কী করে হয়? তোমার বাবা কি রাজি হবেন? তুমি আমাদের এক্সপ্লোরেশনের একজন একজন অ্যাক্টিভ পার্টিশিপেটর মানছি কিন্তু...।’

‘কেন ধার হিসাবে তো দিতেই পারি বা একটা ছোটোখাটো ইনভেস্টমেন্ট হিসাবে?’

‘কিন্তু স্যার কি তাতে রাজি হবেন? মানুষটা সারা জীবনে কারও কাছে হাত পাতেননি, ব্যাঙ্ক কোঅপারেটিভ সওদাগরি অফিস আলাদা কথা, কিন্তু এ ভাবে কারুর কাছ থেকে...?’

‘অসুবিধাটা কী আছে, আজকালকার সব ব্যবসাতেই তো কোনো না কোনো ভাবে পার্টনারশীপ থাকেই।’

‘পার্টনার, ওই শব্দটা যেন স্যারের সামনে ভুলেও কেউ না উচ্চারণ করে।’

‘হ্যাঁ বুঝতে পারছি, ঘর পোড়া গরুর সমস্যা বুঝতে পারছি। কিন্তু এটা একটা এক্সেপশনাল সিচ্যুয়েশন। যে করে হোক এটা তো আগে ওভারকাম করতেই হবে। এই রকম বিপদের সময় ইগো সেন্টিমেন্ট মানসম্মান এসব নিয়ে ভাবার তো কোনো মানে হয় না। একটু প্র্যাকটিক্যালি চিন্তা করে দেখ, ওকে বোঝানোর চেষ্টা করো...।’

‘হ্যাঁ টাকার তো কোনো বিকল্প হয় না। টাকা তো দরকারই। কিন্তু স্যারকে তোমার এই কথাটা কী করে বলি?’ চিন্তিত দেখাল পোদ্দারকে, গালের কাঁচাপাকা দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে অন্যমনস্ক উচ্চারণে বলল, ‘দেখি, স্যারকে জানিয়ে দেখি। কিন্তু কী করে বলব জানি না, শুনে শেষে আমাকেই না যা তা কিছু ... কী করে বিষয়টা ওর সামনে পাড়বো কিছুই বুঝতে পারছি না?’

‘যে করেই হোক টেলিভিশন শো-টা বাঁচাতেই হবে। যে করেই হোক ব্যাপারটা ওঁর কানে তুলুন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জানান।’

‘জানাব, জানাতে হবে। কিন্তু সেটা কতটা কঠিন তোমরা কেউই বুঝতে পারবে না।’ উলকোভুলকো তাকায় মলয়দা, অপ্রত্যাশিত স্নায়বিক চাপ অনুভব করে যেন। অস্থির ভাবে এদিক ওদিক হাঁটতে থাকে। ‘জানি না কী করব কিন্তু কিছু তো একটা করতেই হবে।’

নির্বাক তাকিয়ে থাকি। লোকটা মুখে উদ্বেগের ছায়া, হাতের ফোনটা বেজে উঠতেই সচকিত হয়ে ওঠে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ শাজাহান, মুনি উঠেছে? আচ্ছা আচ্ছা, যাচ্ছি যাচ্ছি, এক্ষুনি যাচ্ছি।’

মুহূর্তে ব্যস্ত হয়ে উঠল মলয় পোদ্দার। ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে তুমি এবার এসো। মুনির ঘুম ভেঙেছে আমায় এবার যেতে হবে, তুমি চুপি চুপি বেরিয়ে যাও।’

‘কেন আমি দেখা করে যাই। কেমন আছে সেটা অন্তত দেখে যাই?’

‘না প্লিজ, আজকের দিনটা প্লিজ ছেড়ে দাও। তোমায় দেখলেই কথা হবে, ওর মাথায় আবার প্রেসার পড়বে। ডাক্তার দেখুক, কী বলে দেখি, তারপর যা করার করা যাবে।’

তিন চার ধাপ নেমে গিয়েও থেমে পিছন দিকে ফিরে তাকায় মলয় পোদ্দার, ‘আর হ্যাঁ, এর মধ্যে আর আসার দরকার নেই। দরকার পড়লে আমি ফোন করে নেব, ঠিক আছে?’

‘ঠিক আছে, তাই হোক।’ মাথা নিচু করে নিচে নেমে যাওয়া ধাপগুলোর প্রথমটায় পা দিই। নিঃশব্দে নামতে থাকি নিচের দিকে।

চান্দ্রেয়ীর ঘরের সামনের চাতালটা পেরিয়ে যাওয়ার সময় খুব ইচ্ছে করছিল ভেতরে একবার উঁকি মারতে কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম দ্রুত।

১৬

বাবাকে ফোন করে হাল্কা করে কিছুটা গেয়ে রেখেছিলাম। কারণ স্পষ্ট করে কিছু বলিনি কিন্তু বলেছিলাম নিজের মতো করে একটা ব্যবসার কথা ভাবছি তাই ইনিশিয়াল কিছুটা ফান্ড দরকার। ওঁর কাছে মুখ ফুটে তো কখনও কিছু চাইনি তাই জানি উনি না করতে পারবেন না। কিন্তু এদিকে তো আমি বাড়িতে বসে ছটফট করছি। চোখ বন্ধ করে পড়ে আছি কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না, রাত তখন প্রায় একটা, বালিশের পাশে রাখা সেলফোনটা বেজে উঠল। মলয়দার ফোন আশা করেছিলাম কিন্তু এ যে দেখছি অরুণ ভাদুড়ীর নাম্বার! কেঁপে উঠেছিলাম রিসিভ করতে গিয়ে, গুমরে উঠল গলাটা, ‘কোথায় আছো?’

‘ফ্ল্যাটেই স্যার। বলুন?’

‘জানি অনেক রাত হয়েছে কিন্তু কিছু করার নেই। আমাদের তো রাতটাই দিন, দিনটাই রাত তাই উত্তমকে গাড়ি দিয়ে পাঠাচ্ছি। চলে এসো, কথা আছে।’

‘ঠিক আছে স্যার, পাঠিয়ে দিন।’ বলে ফোনটা রাখার মিনিট কুড়ির মধ্যেই দেখি একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন। ধরতেই ভেসে এল উত্তমদার গলা। ‘নিচে দাঁড়িয়ে আছি চলে এসো।’

‘আসছি, জাস্ট দু’মিনিট।’

যানজটহীন রাতের রাস্তা দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটল গাড়ি। এতটা রাস্তা মাত্র আধ ঘন্টায় পার হয়ে এসে পৌঁছোনো গেল বিকন ভিলার সামনে। দারোয়ান বাইরের লোহার গেট খুলে ধরতে উত্তম সাধুখাঁ সামনে হাত দেখিয়ে বলল ‘চলো’ আর আমি যাতে অন্য কোনোদিকে না যাই তাই তিনতলা অবধি পুরো রাস্তাটা আমার পাশাপাশি এল।

এই বাড়িটার নীচের তলার দালান ঘরটা পেরিয়ে সিঁড়িগুলো ভাঙতে শুরু করলে রাত আর দিনের ফারাকটা ক্রমশ ঘুচে যেতে থাকে। বাইরে আলো অন্ধকার যাই হোক, ভেতরটা কেমন যেন একটা আলো আঁধারের মাঝামাঝি, স্যাঁতসেঁতে ভেজাভেজা, ঈষৎ সোঁদাটে গন্ধযুক্ত আবহাওয়া। আর কোনো দিকে তাকানো নেই, সরাসরি ওপরতলা থেকে যখন ডাক এসেছে তখন সোজা তিনতলার ওই ঘরটার সামনে গিয়ে না দাঁড়ানো পর্যন্ত থামার প্রশ্ন নেই।

বেলটায় তর্জনী ঠেকাতে যা দেরি, লক ঘুরিয়ে দরজা খুলে দাঁড়ালেন অরুণাক্ষ ভাদুড়ী। বরফ কুঁদে তৈরি যেন লম্বাটে থমথমে মুখটা, এতদিন দেখছি কিন্তু আজও এর ভাষা ঠিকঠাক পড়ে ওঠা গেল না। পাঞ্জাবীর প্রান্ত দিয়ে চশমার কাচ মুছতে মুছতে বলে উঠলেন, ‘এসো, ভেতরে এসো। কী শুনছি? তুমি নাকি আমার বেনেফেক্টর হওয়ার চেষ্টায় নেমেছ?’

‘না না, কেন এ কথা বলছেন কেন?’

‘কেন, সে তো তুমি জানো। ভালো ভালো, মানুষের উপকার করার চেষ্টা খুব ভালো, বিপর্যস্ত, দুর্দশাগ্রস্ত বিপন্ন মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা। একে আমাদের বাংলায় কী যেন সব বলে— বদান্যতা, পরার্থপরতা আরও সব কী যেন?’

কথার সুরটা আঁচ করে ফ্যালফেলিয়ে তাকাই। লোকটা হাত বাড়িয়ে আমায় বসতে বললেন, ‘না না, মানুষের প্রতি দয়া দাক্ষিণ্য অনুগ্রহ অনুকম্পা এই জিনিসগুলো মানুষের খুব মহৎ গুণ, বড়ো হৃদয়ের লক্ষণ।’

‘না মানে, ইয়ে স্যার কেন মানে, কী করলাম...!’

জলাশয়ে কলসী ডুবিয়ে জল তোলার বুগ বুগ শব্দের মতো হেসে উঠেন ভাদুড়ী, উপর দিকে খেলিয়ে তোলেন স্বর, ‘তুমি নাকি আমাকে অর্থ সাহায্য করতে চেয়েছ? ওহ গড ব্লেস ইউ মাই চাইল্ড, হাউ গ্রেট, ইটস রিয়েলি ভেরি কাইন্ড অফ ইউ...!’

মাথা দুলিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় লোকটা, ‘অবশ্য তোমাকেই বা কী বলি বলো, আমার নিজের ঘরের লোকজন, আমার সঙ্গে বিশ বছরের উপর সঙ্গে থাকা লোকজনই যখন দেখছি আমায় করুণা করছে তখন তো তুমি করতেই পারো! নাথিং সারপ্রাইজিং অ্যাবাউট ইট।’

‘কারা করুণা করল? করুণার প্রশ্ন উঠছে কেন স্যার?’

‘তাছাড়া কী? যারা শেষ অবধি আমার উপর ভরসা রাখতে পারে না, দুর্বিপাকে পড়তে দেখে ফ্যামিলি সিক্রেট ওপেন করে দেয় তাদের আর কী বলব? যাই হোক থ্যাঙ্কস টু দেম, তাদের কথায় অনুপ্রাণিত হয়েই তুমি আমায় চ্যারিটি করতে চেয়েছ, অরুণাক্ষ ভাদুড়ীর এমনই দুর্দিন যে তাকে চ্যারিটি করার উপযুক্ত মনে করেছ, এর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ দেব না আমার নিয়তিকে বুঝতে পারছি না।’

হাত নেড়ে বাধা দিতে যাব, লোকটা কাঠের তেপায়া টেবিলটা টেনে এনে বসল চোখের সামনে। ‘অনেক টাকা আছে না তোমার? কত টাকা আছে, আমায় তুমি কত টাকা দিতে পারো? আমার এতদিনের লড়াই, আত্মসম্মান সব আজ তোমায় বেচে দেব, বলো কত টাকা দেবে? হয়ে যাক, দর কষাকষি হয়ে যাক?’

‘আপনি ভুল বুঝছেন স্যার, এখানে আত্মসম্মানের কথা উঠছে কেন বুঝতে পারছি না। আপনাকে সম্মান করি বলেই আপনার বিপদের সময় আমার সামান্য সাধ্যমতো একটা অ্যামাউন্ট তুলে দিতে চাইছিলাম। জানি এটুকু খুবই কম কিন্তু সামনে আপনার অতো বড়ো একটা টেলিভিশন প্রোজেক্ট, চান্স অফ আ লাইফ টাইম, কোনো ভাবে যদি কাজে লাগতে পারি তাই মলয়দাকে ওই প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তাছাড়া আপনিই তো বলেন আমি নাকি আপনাদের এই প্রোজেক্টটাকে কোনোদিনই নিজের করে ভাবতে পারলাম না, সম্পৃক্ত হতে পারলাম না, তেলে জলে কোনো দিনও মিশল না তাই কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম, আমার ক্ষুদ্র হাতের মুঠোয় যেটুকু ধরে দিতে চেয়েছিলাম।’

‘সম্পৃক্ত হওয়ার কথা বিশ্বাসের জায়গায় বলেছি, কাজের জায়গায় বলেছি। পাঁচিল টপকে একান্ত ব্যক্তিগত পারিবারিক জীবনে উঁকিঝুঁকি মারার কথা নিশ্চয়ই বলিনি। প্রত্যক্ষ জগতের আড়ালে যে বিশাল বিপুল অপ্রত্যক্ষ জগত আমাদের ঘিরে রয়েছে সেই দুনিয়ায় ঢুকে গোয়েন্দাগিরি করতে বলেছি, অবাঞ্ছিতভাবে আমার বাড়ির হেঁসেল ঘরে ঢুকে গোয়েন্দাগিরি করতে বলিনি।’

‘ক্ষমা করবেন স্যার, অবাঞ্ছিত ভাবে কিন্তু কিছু করিনি। অনেকের মতো আমার জীবনেরও একটা বেদনাদায়ক অতীত আছে, ছোটোবেলায় মা-কে হারানোর ট্রমাটিক একটা পাস্ট। সেটা চান্দ্রেয়ীর কাছে বলার পর ওর হয়তো মনে হয়েছিল আমাদের দুজনার জীবনেরই একটা কমন গ্রাউন্ড আছে, দুঃখের একটা কমন উৎস। তাই হয়তো ও আমায় কিছু কথা শেয়ার করেছিল। আর মলয়দা যে সব কথা বলেছে সেগুলো শোনার পর মনে হয়েছে এ বাড়িতে এতদিন ধরে এসেও যদি এইটুকুও জানার অধিকার না থাকে তাহলে আমার এ বাড়িতে আর কোনোদিন না আসাই ভালো।’

হাঁটুর উপর ডান হাতের কনুই, তর্জনী নাচিয়ে লোকটা ঝুঁকে পড়ে সামনে। ‘বুঝতে পারছি ঝোপ বুঝে কোপ মেরেছ। তোমার দুঃখের ঝাঁপি খুলে মুনির সামনে বসেছ, ওকে ইমোশনালি ডিস্টার্ব করেছ, মেন্টালি আপসেট। আর ও তো জানই কেমন, সদর দরজা হাট করে খুলে দিয়ে ভেতরে যা যা ছিল সব বার করে দিয়েছে।’

‘না না এমন কী কথা বলেছে? আর কী বলতে চাইছেন আপনি, দুঃখের ঝাঁপি খুলে বসেছি মানে...?’ গা ঝাড়া দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম সটান। শব্দটা মুখে আগুন লাগানো তীরের মতো সরাসরি ছিটকে গিয়ে পড়েছে আমার মগজের হ্রদে, আগুন জ্বলে উঠেছে নিমেষে। ‘আপনি আমার আর যা খুশি তাই তুলে গালাগাল করুন, গায়ের ঝাল মেটাতে যা প্রাণ চায় বলুন কিন্তু এই এই জায়গাটায় হাত দেবেন না, ফর হেভেনস সেক এই জায়গাটাকে অপমান করার চেষ্টা করবেন না। এটা একটা গভীর ক্ষত, খুব জটিল জায়গা, এ জায়গাটা কেউ অপবিত্র করতে আসলে কিন্তু আমি ছেড়ে কথা বলব না। কী করে ভাবলেন কোনো কুমতলবে আমি ওই জায়গাটার ফায়দা তুলতে পারি, কাউকে ইমোশনালি ডিস্টার্ব করতে পারি?’

কেঁপে ওঠে যেন ভাদুড়ীর মণি, শিরদাঁড়া সোজা করে চোখের কোণ কুঁচকে তাকান। ঝলসে ওঠে আমার চোখের কোণ, ‘ঝাঁপি বলতে, ব্যবসাদার পরিবারের সন্তান ঠিকই, বাপ ঠাকুরদা লোহালক্করের কারবার করে এসেছেন ঠিক আছে তাই বলে ভাববেন না এ ধরনের একটা দুঃখ নিয়েও কারবার করতে পারি, দুঃখ বেচে বেড়াতে পারি...।’

মাথা নাড়ে ভাদুড়ী, ‘তোমার দুঃখটাই গভীর, তোমার দুঃখই পবিত্র আর বাকিদের গুলো খোলামকুচি? তোমার গুলো মহামূল্য আর বাকিদের কোনো দাম নেই? এখন দেখ কেমন লাগে, নিজের দুঃখে হাত পড়লে কেমন লাগে? বোঝো, এবার বোঝো...।’

রগের দু-দিকটা হাত দিয়ে ধরে লোকটা। ‘চারদিকে যখন এই রকম ডামাডোল অবস্থা, ঠিক তখনই তোমায় তুলতে হল? মুনির মাথার পোকাটা ঠিক এই সময়েই নড়াতে হল? আর সময় পেলে না, ওর সামনে ওসব কথা তোলার আর সময় পেলেনা?’

‘ইচ্ছে করে কিছুই করিনি, প্রসঙ্গক্রমে কথা উঠে এসেছে তাই বলেছি! শুনলে যে কোনো মানুষের মনে যে প্রশ্নগুলো উঠে আসবে সেগুলো করেছি! আর ওগুলো যে শুধু আমিই তুলেছি তা তো নয়, ওর মনেও তো এই প্রশ্নগুলো ছিল, বহু বছর ধরে ছিল।’

‘প্রশ্ন ও আগেও করেছে, অনেক রকম কথা জিজ্ঞেস করেছে কিন্তু লিফট অ্যাক্সিডেন্টে ওর মায়ের মৃত্যুর পুলিশ তদন্ত রিপোর্ট তো চেয়ে বসেনি! আমার দিকে ওই ভাবে কখনও তাকায়নি! আমার কথায় এভাবে সন্দেহ প্রকাশ করেনি! এসব তোমার অবদান, তোমার সঙ্গ-গুণ? তুমি ওকে তাতাচ্ছ…’

‘কী বলছেন স্যার, আমি ওকে তাতাতে যাব কেন? তাতে আমার কী স্বার্থ?’

‘স্বার্থ আমায় অপদস্থ করা। তুমি আমার কাছ থেকে বার বার অপমানিত হয়েছে তাই আমার উপর তোমার রাগ আছে। তাছাড়া ইডিওলজিক্যল কনফ্লিক্ট তো আছেই, আমি অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাসী আর তুমি সে সবে বিশ্বাস কর না, তাই আমাকে অপদস্থ করতে পারলে তোমার জিত, আমার হার।’

‘ছি ছি এসব কী বলছেন আপনি, আপনি আমায় চিরকাল ভুল বুঝেছেন আজকেও ভুল বুঝছেন।’

‘ভুল আমি বুঝিনা, আমাকে মানুষ চেনাতে এসো না। ভেবো না কেউ ঘাসে মুখ দিয়ে চলে আর এই মাথার চুলগুলো এমনি এমনি সাদা হয়েছে। ভাবতে পারিনি ও কোনোদিন আমার সামনে ওইভাবে গলা তুলে কথা বলব! সেইদিন কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল, কী ভাবে হয়েছিল, চার্জ করে বসবে! যেন সব কিছুর জন্যে আমি দায়ী, সব দায় আমার!’

বলতে বলতে জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করেন, হাঁপের সমস্যা হচ্ছে তাই পাশের টেবিল টপটা হাতড়ে ইনহেলারটা হাতে নেন, মুখে দিয়ে টানতে গিয়ে পাফ ক্যাপাসিটি নিঃশেষ দেখে খোলটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বেলটায় উপর হাত চালান। চিৎকার করে ওঠেন, ‘এই কে আছো কাছাকাছি, সমর উত্তম শাজাহান, ইনহেলারের একটা নতুন ফাইল নিয়ে এসো।’

হাঁক শুনে মলয়দা দরজা ঠেলে ঢোকে হন্তদন্ত হয়ে। ওকে দেখে দ্বিগুণ জোরে গলা ছাড়েন ভাদুড়ী, ‘ওহ তুমি! আশপাশেই ছিলে মনে হচ্ছে। আড়ি পেতে শুনছিলে কী কথা হচ্ছে? এসো এসো শোনো কী বলছি শুনে যাও। প্রোটেকশন দিতে এসেছ? চিন্তা নেই চিন্তা নেই, আমি ওকে মারব ধরব না, খুন জখমও করে বসব না।’

দ্রুত পায়ে এগিয়ে দেওয়াল আলমারির পাল্লা খুলে ইনহেলারের নতুন একটা ফাইল বার করে মলয় পোদ্দার। এগিয়ে এসে প্যাকেটটা ছিঁড়ে লোকটার হাতে দেয় ‘স্যার এসব আপনি কী বলছেন? আমি এদিক এসেছিলাম আপনাকে একটা পার্সোনাল কথা বলতে...।’

‘পার্সোনাল?’ বিদ্রুপের হাসি হেসে ওঠেন ভাদুড়ী। ‘কীসের পার্সোনাল, পার্সোনাল আর রেখেছোটা কী? আর ওসব রাখঢাক করে কোনো লাভ নেই, যা বলার বলো, এর সামনেই বলো।’

‘ডাক্তার মুখার্জীকে অনেকবার কল করলাম, আমার কাছে যে নাম্বারটা আছে ওটা স্যুইচড অফ বলছে, বাড়ির ফোনটাও নামানো আছে মনে হচ্ছে। তাই ভাবলাম আপনার কাছে যদি ওর আরও কোনো নাম্বার থাকে।’

‘কেন, এত রাতে আবার মুখার্জীকে কী দরকার পড়ল?’

আমার উপস্থিতিতে কিছুটা ইতস্তত করলেও অরুণবাবুর দিকে মাথা বাড়িয়ে চাপা স্বরে মলয়দা বলে, ‘স্যার অনেক রাত হল মুনি এখনও ঘুমোয়নি। একটা দানাও মুখে তুলতে চাইছিল না। শেষে মাথার দিব্যি দিয়ে, না খেলে আমি এ বাড়ি থেকে চলে যাব এসব নানান কথা বলে দু-গ্রাস মুখে তোলানো গেছে। কিন্তু খাওয়ার আগে পরে একটা মেডিসিনও দেওয়া যায়নি। এক নাগাড়ে পায়চারি করে যাচ্ছে, কিছুতেও শোয়ানো যাচ্ছে না তাই ডাক্তারবাবুকে একবার...।’

‘এত রাতে সে তো ঘুমোচ্ছে! আমার কাছেও তো ওই দুটো নাম্বারই। তাহলে কী করি, কী করা যাবে?’ দিশেহারা হয়ে তাকায় লোকটা। ‘খুব সমস্যা বুঝলে উত্তমকে পাঠিয়ে দেবে, ওকে তুলে নিয়ে আসবে।’

‘আমিও তো তাই ভাবছি।’ পাংশু মুখে তাকায় মলয় পোদ্দার।

‘এ সব কিছুর জন্য তোমরা দায়ী। ওর কানে নানান সময় নানান কথা তুলে তোমরাই ওর মাথাটা নষ্ট করেছ। তোমরা সবাই আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছ, হাতি কাদায় পড়লে সবাই এইভাবেই লাথি মারে, তোমরা সবাই চলে যাও আমার ঘর থেকে, তোমাদের আমার কাউকে দরকার নেই, চলে যাও।’

‘চলে তো যেতেই পারি। আপনার কথায় নিজের চালু প্রফেশন ছেড়ে এসেছিলাম, আপনি চলে যেতে বললে চলে যাব। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে আপনি অভিযোগ করছেন! আমাকে সন্দেহ করছেন!’

‘হ্যাঁ করছি, কারণ চন্দ্রাণীর অ্যাক্সিডেন্টের বিষয়টা তুমিই ওর মাথায় ঢুকিয়েছিলে।’

‘না, আপনার বোধহয় কোথাও একটা ভুল হচ্ছে স্যার। আজ থেকে সাত বছর আগে মুনির জন্মদিনের রাতে ভুল করেই হোক বা বাধ্য হয়ে কিছু কথা প্রথমে আপনিই ওকে বলে ফেলেছিলেন। ও অনেক প্রশ্ন করতে শুরু করলে আপনি আমাকে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে রিকোয়েস্ট করেছিলেন ওকে সুঝিয়ে বিষয়টা ব্যাপারটাকে সহজ করে দিতে। কোনো বিতর্ক যাতে তৈরি না হয় সেভাবে ব্যাপারটাকে চেলে নিতে, যা হয় করে হোক ম্যানেজ করে নিতে, আশা করি আপনার মনে আছে?’

‘সে তো আমি বলেছিলাম থাবাথুবো দিয়ে, যা হোক করে বিষয়টাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে। যে করে হোক পুরো ব্যাপারটাকে ঘুলিয়ে দিতে, ধোঁয়াশা তৈরি করতে, ওকে কনফিউজ করে দিতে...।’

‘সেরকমই চেষ্টা করেছিলাম, কৌশলে বিষয়টাকে যতদূর সম্ভব রহস্যাবৃত করে তুলতে চেয়েছিলাম। দিবাকর স্যার যেভাবে বিষয়টার ব্যাখ্যা করেছিলেন সে সব রাস্তায় না গিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলাম এ পৃথিবীতে এমন কিছু কিছু আশ্চর্য ব্যাপার থাকে যেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা হয় না। তাই লৌকিক বুদ্ধি দিয়ে কোনোদিনই ওর মায়ের মৃত্যু রহস্য ভেদ করা সম্ভব না। আপনিই তো বলেছিলেন ছোটোবেলা থেকে ভূত অলৌকিক অশরীরীদের গল্প বলে বলে ওর মনটাকে অন্যভাবে গড়েপিটে নিতে…’

‘সেটা তুমি পারলে কই? মাঝে মাঝে মনে হয় ইচ্ছে করেই করোনি, মেয়েটা তো চন্দ্রাণী চলে যাওয়ার দু-তিন বছর থেকে তোমাদের জিম্মাতেই ছিল!’

‘কিন্তু এ মেয়ে তো আর সেই মেয়ে না, যে তাকে যা বোঝালাম তাই বুঝল। তার বোধ বুদ্ধি মেধা সবই খুব উচ্চপর্যায়ের। ছোটো থেকেই অঙ্ক বিজ্ঞানে তুখোড়, ওকে কত দিন আর কেউ ভুলিয়ে রাখতে পারবে! ও তো প্রশ্ন করবেই, যত বড়ো হবে তত প্রশ্ন করবে।’

‘তবুও ও আমার মেয়ে। ওর শরীরে আমার রক্ত। আমার প্রতিটা কথা ও অক্ষরে অক্ষরে পালন করে এসেছে, এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমার কথাই ছিল শেষ কথা, যা বলেছি তাই করেছে। কিন্তু এই প্রথম ও আমার কথা অমান্য করল, মুখের ওপর বলল আমি পারব না। আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দাও না হলে আমাকে এক চুলও নড়ানো যাবে না। ও আমার সঙ্গে আর কোনো ব্যাপারে কো-অপারেট করবে না। ও আমার উপর শর্ত চাপাচ্ছে, আমার মেয়ে আমার উপর শর্ত চাপাচ্ছে কিন্তু ওর মা তো এ রকম ছিল না। আমার জন্য সে সব কিছু করতে রাজি ছিল, এমনকি মরতে পর্যন্তও।’

হাঁ করে তাকিয়ে আছি একবার ভাদুড়ীর দিকে, আরেকবার মলয় পোদ্দারের দিকে। কী বলছে, কেন বলছে পুরোটা মাথায় ঢুকছে না! কাতর আর্তনাদের মতো শোনাল ভাদুড়ীর গলা, ‘তুমি জানো ও আমার দিকে আঙুল তুলে কী ভাবে কথা বলল? এমন করে শাউট করে উঠল যেন আমি ক্রিমিনাল, ওর মাকে আমি মেরেছি! আয়্যাম আ ব্লাডি মার্ডারার, আমার নিজের স্ত্রীকে আমি মেরেছি!’ গায়ের জোরে রিভলভিং চেয়ারটার সিট-রেস্টের উপর বাড়ি মারেন ভাদুড়ী।

চেয়ারটা গোল হয়ে ঘুরছে, ওটাকে ডান হাত দিয়ে থামিয়ে চিৎকার করে ওঠেন, ‘চন্দ্রাণী আমার কাছে কী ছিল ও কী করে বুঝবে? সে তো শুধু স্ত্রী ছিল না, শি ওয়াজ মাই সোল-মেট, আমার বন্ধু, সব অর্থেই আমার সহধর্মিণী। দত্তগুপ্তর সঙ্গে মিশে আমি যখন এই প্যারানর্মালের রাস্তায় অনেকটা পা বাড়িয়ে ফেলেছি, বিষয়টা আমাকে ধীরে ধীরে পেয়ে বসছে, গ্রাস করে নিচ্ছে আমি ওকে বলেছিলাম চন্দ্রাণী আমি কিন্তু আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিতে চলেছি, তোমার তাতে কোনো সমস্যা নেই তো? ও তাতে কী বলেছিল জানো, বলেছিল ‘‘কীসের সমস্যা, তুমি কি জানো না তুমি বললে তোমার সঙ্গে আমিও ওই আগুনে ঝাঁপ দিতে পারি!’’ তাই দিলও, কী জানি সেই আগুনেই ও পুড়ে মরল কিনা?’

লোকটা গনগন করে জ্বলতে থাকা আগুনের পাশে প্রকাণ্ড কোনো এক হাপরের মতো হাঁপাচ্ছে, ‘সেই মহিলার মৃত্যুর জন্য যখন আমার দিকে আঙুল ওঠে তখন কী করে মাথা ঠিক রাখি বলতে পারো? নিজের একমাত্র সন্তান যখন কিছু না জেনে শুনে শুধু সন্দেহের বশে তার বাবাকে মায়ের মৃত্যুর কারণ ভাবে তখন কার মাথা ঠিক থাকে? আমার মাথার ঠিক ছিল না, একেই চারদিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে আছি তার ওপর ও যখন আমার ওই ভাবে চার্জ করল, চোখ কপালে তুলে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম, হ্যাঁ খুন করেছি তো, চন্দ্রাণীকে তো আমিই...। আর তাতে ও আরও ক্ষিপ্ত হয়ে আমার ওপর চড়াও হল আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছিল আর আমি…’

‘আর আপনি? কী করেছেন, মুনিকে আপনি কী বলেছেন?’

‘রাগে আমার কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাই মুখ দিয়ে কিছু বেরোচ্ছিল না, তাই…’

‘তাই কী করেছেন আপনি...?’ বিস্ফারিত চোখে এগিয়ে আসে মলয় পোদ্দার।

‘কী করেছি, সে আমায় জিজ্ঞেস কোরো না! কী করে করলাম জানি না কিন্তু করেছি। জীবনে যা কোনোদিন করিনি তাই করেছি, উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম তাই করেছি!’

‘কী করেছেন বলুন স্যার…’

‘সে তুমি ভাবতেও পারবে না মলয়, কিন্তু আমি করেছি, আমি ওকে সপাটে একটা চড় কষিয়ে দিয়েছি।’ থরথর করে কাঁপছে শূন্যে ছাড়া হাতের তালু, ‘এই হাত দিয়ে ওর গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসিয়ে দিয়েছি, ভাবতেও পারছি না কী করে করলাম কিন্তু করে ফেলেছি।’

‘সে কী! কী বলছেন আপনি!’ থরথরিয়ে ওঠে মলয় পোদ্দার।

আত্মঘৃণায় গা পাক দিয়ে ওঠে যেন লোকটার, এদিক ওদিক উদভ্রান্তের মতো হাঁটতে শুরু করে, বাঁ হাতের মধ্যে ধরা ডান হাতটা গায়ের জোরে ডলতে থাকে আর বলে, ‘হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে ওঠা হিলহিলে কাঞ্চনফুলের গাছের মতো নরম আমার মেয়ে। আমার এই হাতগুলো বড্ড শক্ত খড়খড়ে বলে ওর ছোটোবেলায় কোলে নিতে অবধি ভয় করতাম, গত এই ক’টা দিনের আগে পর্যন্ত মনে পড়ে না ওকে কোনোদিন গলা তুলে কথা বলেছি, সবার উপর ওর স্নায়ুর সমস্যাটা আর সেই মেয়ের গালে আমার হাত উঠল! আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি, এর জন্য ও কি আমায় কোনোদিন ক্ষমা করবে, আমি কি আমায় কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব?’

‘তাহলে এই হল ঘটনা। আপনি ওর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন, তাই এতটুকুও টের পাইনি। মিনিট চল্লিশেক পর হনহন করে হেঁটে যখন বেরিয়ে এলেন আন্দাজ করেছিলাম ভয়ানক কিছু একটা হয়েছে। কথা কাটাকাটি তো বটেই তার বেশি কিছুই হয়েছে কিন্তু এতটা তো ভাবতেই পারছি না।

আমি যখন দৌড়ে ভেতরে গেলাম পাথরের মতো বসে ছিল। চোখ দুটো টসটস করছে, মুখটা থসথস করছে। দেখতে দেখতে আমার চোখের সামনে খিঁচুনিটা উঠল, সারা শরীরটা ঝাঁকি মেরে উঠে বেঁকেচুরে যেতে যেতে আমার হাতের উপর অজ্ঞান হয়ে গেল। তারপর জ্ঞান ফেরার পর থেকে কোনো কথা বলেনি, চুপ করে পড়ে ছিল। এত বড়ো কথা কিচ্ছুটি বলেনি।’

‘ও তো বলবে না, বলার মেয়ে তো ও না। চুপ করে থাকবে, চরম কষ্ট পাবে কিন্তু মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলবে না। কিন্তু এখন আমি কী করি, ও তো আমায় ভুল বুঝে বসে আছে। ওকে তো বলেছি আমিই খুনি। ঠিকই তো, ভুল কী বলেছি, প্রত্যক্ষ ভাবে না হলে পরোক্ষ দায় তো আমার। আমিই খুনি, আমিই তো ওকে এসবের মধ্যে এনেছিলাম, সব কিছুর জন্য আমি দায়ী। হ্যাঁ হ্যাঁ আমিই আ ড্যাম ব্লাডি মার্ডারার।’

‘এসব কী বলছেন স্যার? ওটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল, আমি ওখানে উপস্থিত ছিলাম না ঠিকই কিন্তু সমর তো আমায় বলেছে কী হয়েছিল। তাতে আপনার কী দায়, সেদিন তো বৌদি স্বেচ্ছায়...।’

‘কিন্তু আমি ওকে বাধা দিইনি কেন? প্রোজেক্টের শুরুর সাফল্যে কি আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল? দত্তগুপ্ত লোকটা তো জানো হৃদয়হীন একটা মানুষ কিন্তু আমি লোকটার কথায় নেচে উঠলাম কেন? চন্দ্রাণীর দুঃসাহসের শেষ ছিল না, ন্যাশনাল অ্যাথলিট বলে ওভার কনফিডেন্ট ছিল কিন্তু আমি ওখানে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে কী মজা দেখছিলাম?’

আমি দাঁড়িয়ে সব শুনছি খেয়াল হওয়ায় মলয়দা দ্রুত হাত নেড়ে আমাকে চলে যেতে বলে, ইশারায় এই ঘরের বাইরে চলে যেতে বলে। আমি সরে যেতে চাইছিলাম কিন্তু বাধা দেন ভাদুড়ী, ‘না থাকুক, ও থাকুক। শুনুক, আমার কুকীর্তির কথা শুনুক। শুনে যদি মনে হয় নতুন করে পুলিশকে সবটা জানানো দরকার জানাক, যে যাত্রায় তো ঠিক মতো তদন্ত হয়নি। পুলিসের উঁচুতলা অবধি ইনফ্লুয়েন্স খাটিয়ে দত্তগুপ্ত ওই বিষয়টা ধামা চাপা দিয়ে কেটে পড়েছিল। আবার নতুন করে বিষয়টা উঠে আসুক, ঠিক মতো তদন্ত হোক, তাতে আমি যদি দোষী সাব্যস্ত হই তো অপরাধ মাথা পেতে নেব। আমার শাস্তি দরকার, চরম শাস্তি দরকার। উপযুক্ত শাস্তি না পেলে আমার অপরাধবোধ কোনোদিন কাটবে না। আমি শান্তি পাব না, এ জীবনে আর কোনোদিন শান্তি পাব না।’

আমার অনেকক্ষণ আগেই সরে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু নির্লজ্জ বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম। নড়ার চেষ্টা করেছি কিন্তু পা নড়ানো যায়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে মলয় পোদ্দার দু’হাত তুলে এগিয়ে যায় ভাদুড়ীর দিকে, ‘থাক স্যার, ওসব কথা এখন থাক। পরে হবে, এসব কথা পরেও তো কখনও বলা যাবে।’

‘না না পরে কেন হবে? যা বলার এখনই বলব, এখানেই বলব। আমার তো আর কিছু লুকোনোর নেই, সত্যি ফেস করতে ভয় নেই, কী হয়েছিল বলতে আর কোনো বাধা নেই। শুনে রাখ, এর ওর মুখ থেকে না, আমার মুখ থেকে শুনে রাখ।

সেদিন ছিল আমাদের হরর ট্যুরের ওই সেগমেন্টের শেষ দিকের একটা দিন। ভিউয়ারদের বলা হয়েছিল আজ না হয় আগামীকাল ওই হন্টেড বিল্ডিং এর প্রেতাত্মা দেখা দেবেই। আমরাও টেকনিক্যালি তৈরি ছিলাম, লিফটটার খাঁচাটাকে ছাদ থেকে লোহার মোটা তার দিয়ে বেঁধে কপিকলের সাহায্যে নামানো ওঠানো হবে এমন ভাবেই সিস্টেম রেডি করা হয়েছিল। আর যথারীতি সাদা পোশাক পরে মেকাপ নিয়ে টপফ্লোর থেকে তাতে প্রেত হিসেবে ঢুকবে চন্দ্রাণী। ভেরি রিস্কি অপারেশন। আমি বার বার বারণ করেছিলাম কিন্তু যে কোনো রকম রিস্কি স্টান্ট ওর কাছে ছিল নেশার মতো। কিছুতেই আমার কথা শুনল না, দিবাকর দত্তগুপ্ত ওকে এমনভাবে বুস্ট-আপ করেছিল যে ও যেন একরকম ঘোরের মধ্যে ছিল।

লিফটটার কন্ডিশন যাই হোক দুপুরে আমাদের ট্রায়ালটায় কোনো রকম গড়বড় করেনি কিন্তু সেই রাতে আসল শো-এর সময় টপফ্লোর থেকে ওকে নিয়ে লিফটের খাঁচাটা ছাড়তেই কমজোরি পাশের ওয়ালটা পড়ল ধসে। খাঁচাটা তাতে ধাক্কা খেয়ে বেকায়দায় চলে যাওয়ায় ওপর থেকে সেটাকে ছাড়ানোর জন্য যেই না দেওয়া হয়েছে টান, ব্যাস! আমাদের চোখের সামনে যা হওয়ার হয়ে গেল। আংটার হোল্ড খুলে, তার ছিঁড়ে খাঁচাটা প্রবল গতিতে সোজা নেমে গিয়ে আছড়ে পড়ল একেবারে গ্রাউন্ড ফ্লোরে। প্রচন্ড শব্দ, সঙ্গে সঙ্গে শেষ, সব শেষ!’

দু-হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে চেয়ারটার উপর শরীর ছেড়ে দেন ভাদুড়ী, আর্তনাদ করে ওঠেন প্রায়, ‘আমি বেবাক হয়ে গিয়েছিলাম, মাথা কাজ করছিল না, ওকে গাড়িতে তুলে নিয়ে ছুটেছিলাম হাসপাতালের দিকে কিন্তু শি ওয়াজ ডেড, অলরেডি আউট অফ আওয়ার ক্লাচেজ। কিন্তু ওদিকে যে তারপর কী হয়েছিল, দত্তগুপ্ত ওইটুকু সময়ে ট্যুরিস্টদের সরিয়ে দিয়ে কীভাবে যে পুলিশ এনকোয়ারি ফেস করেছিল আমি জানি না। আমাকে শুধু বলেছিল সবটা ওর ওপর ছেড়ে দিতে, ও আমায় কোনোভাবেই এসবের মধ্যে জড়াবে না। আর আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণ্য স্বার্থপরের মতো নিজেকে সেফ-সাইডে রাখতে বা আমাদের শিশুকন্যাটার স্বার্থে ওর কথা মেনে নিয়েছিলাম। সেই সুযোগে লোকটা আমাকে সর্বস্বান্ত করে দিয়ে বেরিয়ে গেল, আমি বসে বসে সবটা দেখলাম, সবটা বুঝলাম কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না।’

লোকটা কপাল থেকে হাতটা সরিয়ে নিতেই মাথাটা সামনের দিকে ঝুলে পড়ল। ‘জানি এর কোনো ক্ষমা নেই, ক্ষমা করা যায় না। তাই ক্ষমা চাইব না, মুনির কাছে ক্ষমা চাইতে যাব না। যদিও ওর মায়ের কাছে আমি হাজার বার ক্ষমা চেয়েছি, লক্ষ বার ক্ষমা চেয়েছি। এই মুহূর্তে আমার নিঃশ্বাস যে হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে সেখানে যদি সে কোথাও কোনোভাবে থেকে থাকে তাহলে আরও একবার বলছি আমায় তুমি ক্ষমা কোরো না। যদিও জানি আমার সবকিছুতে তোমার শর্তহীন সমর্থন ছিল তবু ভুলেও ক্ষমা কোরো না। পারলে আমায় শাস্তি দিও, আরও আরও বেশি করে শাস্তি দিও, আমায় ধুলোয় মিশিয়ে দিও।’ ককিয়ে ওঠেন ভাদুড়ী, ভেঙে ভেঙে যায় স্বর।

১৭

এতক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলাম একভাবে, দোর্দণ্ডপ্রতাপ লোকটাকে এইভাবে ধসে পড়তে দেখে ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠল যেন। মলয়দা কোনো কথা না বলে পিছোতে পিছোতে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আমার কনুই-এর কাছটা ধরে আলতো টান দিয়ে বাইরে নিয়ে এসে দাঁড়াল।

দেওয়াল ঘড়িতে তখন রাত আড়াইটে। খুব আলতো স্বরে মলয় পোদ্দার বলল ‘চলো আমরা এখন যাই , ওকে একটু একা থাকতে দেওয়াই ভালো।’

‘হ্যাঁ কিন্তু ওকে কি এই রকম মানসিক অবস্থায় একা ছাড়া ঠিক হবে?’

‘ঠিক আছে আমি উত্তমকে স্ট্যান্ড বাই থাকতে বলছি। কিন্তু আমাদের যেতে হবেই, আমরা থাকলে কথায় কথা বাড়বে, সারা রাত ধরে কথা চলতেই থাকবে। ওঁর বিশ্রাম দরকার, কিছুক্ষণের অন্তত ঘুম।’

উত্তমদাকে ফোন করে আমার পিঠে হাত রাখে মলয় পোদ্দার, ‘চল এত রাতে তো আর তোমার বাড়ি ফেরার প্রশ্ন উঠছে না। আমার ঘরেই বাকি রাতটা কাটিয়ে দেবে।’

মাথা নেড়ে পা বাড়াই করিডর বরাবর। মাঝপথে থমকে দাঁড়াই, ‘আচ্ছা মলয়দা তাহলে তো উনি মেনেই নিলেন? আর তো কোনো প্রশ্নই থাকল না, স্যার তো নিজের মুখেই স্বীকার করে নিলেন ওদের ওই ডার্ক-ট্যুরিজম এর পুরো ব্যাপারটাই একটা এন্টারটেইনমেন্ট বিজনেস, ভূত দেখানোর নাম করে একটা ফেক-শো। পুরোটাই শো-ম্যানশিপ, আগাগোড়া অভিনয়, টেকনোলজিক্যাল ম্যানিপুলেশন! ভূত-টুত কিছু না, সবটাই বানানো, সবটাই মিথ্যে।’

‘হ্যাঁ মিথ্যে, তো কী?’ ঘুরে দাঁড়াল মলয় পোদ্দার। ‘মিথ্যে কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য ভাবে তৈরি মিথ্যে আর তার মধ্যে আমরা কোনো অন্যায় দেখিনি। কোনো বিবেকের দংশনে ভুগিনি। সিনেমা বায়োস্কোপ টিভি সিরিয়াল যারা তৈরি করে তারা যেভাবে মানুষের আবেগ বেচে আমরা সেইভাবেই ভয় বেচতে চেয়েছিলাম।’

‘চেয়েছিলাম মানে কী, এখনও তো তাই-ই চাইছ তাই না?’

‘মানে?’

‘মানে, তোমাদের থুরি আমাদের এইসব কাজকারবারও তো সব ফেক। নানান কেরামতি কৌশল অবলম্বন করে মানুষকে ভয় দেখান, তাই তো?’

‘সে আমি জানিনা, অ্যাজ আ প্রফেশনাল ম্যান সেটা আমি বলতে পারি না। তবে এটুকু বলতে পারি আর সব এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির মতো এটাও আরও একটা এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি। মানুষ যতদিন ভয় পাবে, ভয় পেতে ভালোবাসবে ততদিন এটাও থাকবে।’

‘সেটা আলাদা কথা, অ্যাজ আ প্রফেশনাল সুপার ন্যাচারাল এক্সপ্লোরার আমারও তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু আমার যেটা সন্দেহ ছিল সেটা সত্যি হল তাহলে? স্যার বা তোমরা কোনোদিন যেটা মানতে চাওনি, আমাকে পদে পদে যে কারণে তিরস্কার করে এসেছ সেটা অবশেষে মেনে নিলে তাহলে?’

‘যদি ধরো মেনেই নিলাম, তাতে কী হবে? অবশ্য তাতে যদি তোমার ইগো স্যাটিসফায়েড হয় তাহলে ভালো কথা কিন্তু তাতে সত্যিই কি আমাদের কিছু এসে যায়? আসলে কী জানো, আমার মতো মানুষদের কাছে সত্য মিথ্যের তেমন কোনো ফারাক নেই, কারণ স্যার বলেন আমরা যেটাকে সত্যি বলছি সেটা জাস্ট একটা পার্সপেক্টিভ মাত্র, পুরো সত্যিটার অতিসামান্য একটা ফালি।’

‘এই তো মুশকিল, আবার সব গুলিয়ে দিতে চাইছ, সেভাবে বললে তো কিছুই কিছু না।’

‘হয়তো তাই কিন্তু আমাদের তো হাত পা বাঁধা, আমরা তো আর আমাদের জায়গা থেকে সরতে পারব না। যে রাস্তায় এত দূর চলে এসেছি সেখান থেকে তো আর ফেরার পথ নেই। আমাদের পেশা নেশা সর্বনাশ সর্বস্ব যা বলো সব তো এটাই।

আর এখন তো আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরার সময়। আমাদের জাহাজে জল ঢুকছে, ক্যাপ্টেন অফ দ্য শিপ হাল ছেড়ে দিয়েছেন, আমাদের সব রসদ নিঃশেষ। এখন আমাদের মতো নাবিকদের তো যে করে হোক আমাদের প্রোজেক্টটাকে বাঁচাতেই হবে, যে করে হোক আমাদের টেলিভিশন শো-এর কাজটা শেষ করতেই হবে। না পারলে ডুবে মরা ছাড়া ছাড়া আর তো কোনো উপায় থাকবে না। সব শেষ, একূল ওকূল সব...।’

‘সে তো বটেই। স্যারকে চোখের সামনে যেভাবে ধসে পড়তে দেখলাম, পরিস্থিতি যা দেখছি তাতে এখন তো মনে হচ্ছে আমাদের সবাই মিলে কিছু একটা করতে হবে। যা হোক করে সামনের টেলি-শোটা আমাদের পেতেই হবে, বাই হুক অর বাই ক্রুক আমাদের পেতেই হবে।’

‘চিন্তা তো সেই জায়গাটা নিয়ে। অন্য কিছু না আমি আপাতত মুনির কথা ভাবছি, ও যে কী করবে তাই ভাবছি।’

‘কেন, কী মনে হচ্ছে? স্যারের সঙ্গে ওর ওইরকম একটা কথাকাটাকাটি, হিট অফ দ্য মোমেন্টে স্যারের ওর গালে চড় বসিয়ে দেওয়া, এসবের ফলাফল নিয়ে ভাবছে কি?’

‘তা তো বটেই। ও এমনিতে খুব নরম মেয়ে কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয়ানক জেদি। যেটা একবার মনস্থির করে নেবে সেটা ও করেই ছাড়বে তাই ওকে নিয়ে খুব ভয় লাগছে। স্যারের উপর দিয়ে অনেক ঝড় চলে গেছে, স্যার আল্টিমেটলি একজন প্রাপ্তবয়স্ক শক্তপোক্ত মানুষ কিন্তু মুনির সঙ্গে আগে তো কখনো এই রকম কিছু হয়নি, এ রকম অভিজ্ঞতা তো ওর এই প্রথম।’

‘হ্যাঁ সেটাই চিন্তার ব্যাপার, সেটা আমিও ভাবছি...।’

‘ও যদি স্যারের কথা শুনতে অস্বীকার করে তাহলে তো মুশকিল। স্যারের কথা শুনে যেটার হিন্ট পেলাম তাতে নতুন সমস্যার গন্ধ পাচ্ছি।’

‘কোন কথা?’

‘স্যার ওকে কিছু একটা করতে বলেছিলেন যেটা ও আগেও অনেকবার করেছে কিন্তু এবার ও তাতে শর্ত চাপিয়েছিল। মায়ের মৃত্যুর রহস্য ওর কাছে খুলে না বললে ও সেটা করবে না। তারপর তো স্যারের নিজের ওপর কন্ট্রোল হারিয়ে ওই ভাবে চড় মেরে ফেলার পর এখন পরিস্থিতি এই রকম জটিল হয়ে যাওয়ার পর ও যে কী করবে?’

নিজের ঘরের সামনে এসে হ্যাচবল ঘোরায় মলয় পোদ্দার, আমাকে চেয়ারে বসতে বলে তাকায় অক্ষিবলয়ে চাপ দিয়ে, ‘কিছু করার নেই ভাই ধৃতি, এই পরিস্থিতিতে তোমাকে একটা বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে।’

‘কীসের দায়িত্ব?’

‘পুরো ব্যাপারটা যখন স্যারের নিজের মুখেই শুনলে, তখন তো আর কোনো ধোঁয়াশা থাকার কথা না। এখন মুনিকে সবটা জানিয়ে ওর ভুল ভাঙাতে হবে। নিমেষের মধ্যে ওর চোখে স্যারের ভাবমূর্তিটা পুরো নষ্ট হয়ে গেছে, ওটা আগের জায়গায় ফেরাতে না পারলে মুনিকে কিছুতেই কাজে ফেরানো যাবে না। আমাদের ইমিডিয়েট শ্যুটটা সামনের শিডিউলড ডেটে সারতে গেলে যে করে হোক ওকে রাজি করাতে হবে, ওর কাজটা ও যাতে করে সেটা এনশিয়োর করতে হবে।’

‘ওর কাজ বলতে, এই প্রোজেক্টে ওরও ভূমিকা আছে নাকি? ওকে কী করতে বলব?’

‘সেটা ও জানে।’ বোতল থেকে কিছুটা জল গলায় ঢেলে আড়চোখে তাকায় মলয়দা ‘এখন যখন তুমি ব্যাকগ্রাউন্ডের অনেক কিছুই জানো তখন তোমাকে বলতে আর তো কোনো সমস্যা নেই। ও আমাদের আমাদের অনেক কাজের সঙ্গেই যুক্ত, সবটা তুমি জানো না কিন্তু দু-একটা তো জানোই যেমন, আমি যতদূর জানি এনএইচ থার্টিফোরের প্যারালালে কালীরহাটের কাছের হন্টেড রাস্তাটায় নাইট ভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়া একটা শ্যাডো ফিগার স্যার তোমায় দেখিয়েছিলেন। ওটা কিন্তু আসলে মুনিই ছিল।’

টো-এর উপর প্রায় লাফিয়ে উঠি আমি, ‘মাই গুডনেস, তাহলে এই ব্যাপার! আমি জানতাম এরকমই কিছু একটা হবে! হতেই হবে! আচ্ছা, তাহলে বলাগড়ের কাছে সেই জমিদার বাড়িটার থামের পাশ থেকে সরে সরে যাওয়া ওই ছায়ামূর্তিটা কি ওর ছিল?’

মলয়দার মৌনতা স্পষ্টতই সম্মতির লক্ষণ। ঠোঁট নড়ে ওঠে আমার, ‘আমি তো সেই সন্দেহটাই করেছিলাম, স্যারকে মুখের উপর বলেছিলাম যতই অস্পষ্ট হোক ওই শ্যাডো ফিগারটা কিছুতেই কোনো গ্রাম্য মহিলার হতে পারে না। ওই উচ্চতার ওই রকম পোশাকে ওই ভাবে হেঁটে যাওয়া ফিগারটা নিশ্চয়ই কোনো শহুরে সফিস্টিকেটেড মহিলার, মনে মনে আন্দাজ করেছিলাম ওটা নিশ্চয়ই চান্দ্রেয়ীর মতো কেউ একজন হবে। তাহলে আমার এই সন্দেহটাও মিলে গেল?’

‘ভালো কথা কিন্তু এতে আপাতত উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু দেখছিনা ভাই। তবে সত্যি সত্যিই খুশি হওয়ার মতো একটা ঘটনা হবে যাবে যদি মুনিকে রাজি করাতে পারো। সামনের শনিবার ওই রাস্তাতেই আমাদের শুটিং, নাইটভিশন সিসি টিভি ফুটেজটাকে মাঝখানে রেখে খুব কনভিন্সিংলি স্টোরিটা তৈরি করা হয়েছিল, স্যারের স্ক্রিপ্ট, সিকোয়েন্স সব সাজানোই আছে। জরুরি ইক্যুইপমেন্ট, সেটিং, টেকনিক্যাল সাপোর্ট সব রেডি। শ্যুটটা বেশ এক্সপেনসিভ, ভাড়া করে স্পেশাল ক্যামেরা আনানো পর্যন্ত হয়ে গেছে প্রচুর খরচ করে, মিস হলে আবার বড়োসড়ো একটা ফিনান্সিয়াল লস হবে যেটা এই সময় আমরা কিছুতেই অ্যাফর্ড করতে পারিনা।’

‘সেটা কি অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায় না?’

‘একেবারেই না! ওর চেয়ে ভালো এই কাজটা আর কারও পক্ষে করা সম্ভব না। আর এই ব্যাপারটায় তো ওকে ছাড়া হবেই না কারণ প্রথম সারভেলেন্স ক্যামেরায় ধরা পড়া ফুটেজে ওরই ইমেজ ছিল। ম্যানিপুলেশন হোক বা যাই হোক ওই শ্যুটটা এতটাই নিখুঁত হয়েছিল, পেছনের এতকিছু জানা না থাকলে যে কোনো এক্সপার্টের চোখও ধোঁকা খেয়ে যেতে পারে। আগেরটার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এবারের শ্যুটটা দারুণ ভাবে নামিয়ে দিতে পারলে ষোলোকলাপূর্ণ হবে আর সেটা হলে আমাদের সামনের টিভি প্রোজেক্টের সার্কেলটা সম্পূর্ণ হবে। এটা শেষ হলে আউটডোরের কাজ আপাতত শেষ, তারপর এডিটিং নিয়ে ঝাঁপানোর পালা। কিন্তু ও যদি বেঁকে বসে তাহলে তো গেল, সব প্ল্যানিং ভেস্তে গেল।’

‘দেখি, জানি না আমার কথা শুনবে কিনা।’

‘শুনলে একমাত্র তোমার কথাই শুনতে পারে। এমনিতে আমি আর শাজাহান ওর খুবই ক্লোজ কিন্তু আমরা আফটার অল স্যারের লোকজন তাই কিছুতেই আমাদের কথা শুনবে না।’

‘জানিনা কতদূর পারব তবু আপ্রাণ চেষ্টা করব।’ চোখ তুলে তাকাই লোকটার দিকে ‘যদিও আমার নীতিবিরুদ্ধ কাজ তবু মনে হচ্ছে করতে হবে, তোমাদের মুখ চেয়ে করতে হবে।’

‘না অন্য কারও মুখ চেয়ে না যা করবে স্যারের মুখ চেয়ে করবে। অন্য কিছুর জন্যে না, শুধু এই কথা মনে রেখে করবে ওই লোকটা কিন্তু একসময় ওঁর সব দিয়েছিলেন, এসবের পেছনে সমস্ত জীবনটা বাজি রেখেছিলেন।’

‘কিন্তু এর মধ্যে উনি কি পারবেন, আবার আগের জায়গায় ফিরে ডিরেক্টরের চেয়ারে ফিরতে পারবেন?’

‘মুনি ফিরলে স্যারও অটোমেটিক্যালি ফিরবেন। আর না পারলে অগত্যা সমরকেই ক্যামেরা কাম ডিরেক্টশন দুটো কাজই একহাতে করতে হবে। এমনিতে তো স্যারের সবটা তো ছকাই ছিল, আমাদের জাস্ট সেই প্ল্যান অনুযায়ী বাকিটা এগজিকিউট করতে হবে।’

ক্লান্ত চোখের পাতা নামিয়ে আনি আমি, শীতল মেঝের উপর মণি পেতে তাকিয়ে থাকি। শরীরটা পিছন দিকে বেঁকিয়ে মলয় পোদ্দার যেন শিরদাঁড়ায় ছিলায় টান দিতে চায়, গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়ায় সোজা হয়ে, ‘পারতেই হবে ভাই, এটুকু আমাদের পারতেই হবে। চারদিকে যখন হতাশা ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছে না, সবদিক থেকে যখন আমরা হারছি তখন এতটুকু সাফল্যও আমাদের কাছে অনেক কিছু। আপাতত এইটুকুই হল ডুবন্ত মানুষের হাতের কাছের খড়কুটো, এটাকে আমাদের আঁকড়ে ধরতেই হবে। একটা সাকসেস, জাস্ট একটা সাকসেস এখন আমাদের টাচস্টোন। ওইটাই আমাদের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, মুষড়ে পড়া আমাদের পুরো টিমটাকে চাগিয়ে তুলতে পারে, স্যারের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে পারে। অতএব আমাদের ঝাঁপাতেই হবে, ডুবি কিংবা বাঁচি ঝাঁপাতেই হবে। কী বল?’

‘হ্যাঁ, আর তো কোনো উপায় দেখছি না।’

১৮

শেষ রাতে মলয়দার বিছানাতেই শুয়ে পড়েছিলাম। সকালে উঠতে বেলা হয়ে গেল। আড়মোড়া ভেঙে মুখের উপরের চাদরটা সরিয়ে উঠছি, দরজা ঠেলে শাজাহানদা ভেতরে ঢুকল।

‘ওদিকের কী খবর?’

‘সেম, বলার মতো কিছু না। দু-জনেই থম মেরে আছে। কারও মুখে কোনো কথা নেই।’

‘চান্দ্রেয়ীর শরীর ঠিক আছে তো?’

‘হ্যাঁ, শেষদিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল। একটু আগে ডাক্তারবাবু এসেছিলেন, দেখে গেছেন।’

‘কী বললেন উনি?’

‘বললেন তো ঠিক আছে। নতুন একটা ওষুধ লিখে দিয়ে গেলেন, একটা ইঞ্জেকশন করে গেছেন, ইমার্জেন্সিতে আরও একটা দিতে হতে পারে। যাওয়ার সময় ওষুধগুলো আমায় বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। আমি বললাম কেমন বুঝছেন, তাতে উনি মুখ মটকে বললেন, ‘‘কী আর বলি বলো, ওষুধ দিয়েই যদি সব সমস্যা মিটত তাহলে তো হয়েই যেত। আসল সমস্যাটা যেখানে সেখান অবধি তো ওষুধ পৌঁছতে পারছে না। তাই কী আর করি বলো? বাকিটাতে তো সে তুমি যেখানে ভাই, আমিও সেখানে। তবে চোখে চোখে রেখো, একা ছেড়ো না…’’

বলতে বলতে মলয়দা ঢুকল, হাতে ধরা ট্রেতে চায়ের একটা ফ্লাস্ক আর কিছু সেঁকা পাউরুটি। শাজাহানদাকে চোখ নেড়ে বলল, ‘শাজু, মুনির কর্নফ্লেক্স দুধটা সবিতাদি ওর ঘরে নিয়ে গেছে, এমনি নর্মালিই তো দেখে এলাম নিজে হাতেই খাচ্ছে, তবু তুই একটু গিয়ে দাঁড়া, আমি আসছি।’ ঘাড় কাত করে দ্রুত বেরিয়ে গেল শাজাহানদা। আমার প্লেটটা হাতে ধরিয়ে তাড়াতাড়ি বাটার মাখানো ব্রেডগুলো সাবাড় করে নিতে বলল, একটা রুটি নিজের মুখের মধ্যে ঠুসে দিয়ে পাশে এসে বসল মলয় পোদ্দার। ‘মুনির ব্রেকফাস্টটা হয়ে যাক, মিনিট কুড়ি পর তুমি ওর ঘরে যাও। তারপর কী করতে হবে, বলতে হবে সেই নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। নিজে যা ভালো বুঝবে করবে। কিন্তু আমার রেজাল্ট চাই।’

জোর দিয়ে মুখের গ্রাসটা ভেতরে ঢুকিয়ে সংশয়ী চোখে তাকাই। চিবোতে চিবোতে বাঁকা চোখে তাকায় লোকটা, ‘দেখতে তো কুদর্শন বলা যায় না, বিদ্যে বুদ্ধি সাহসও তো খুব একটা কম না, ওর সঙ্গে পরিচয়ও যে নেই তাও না মেয়েটাকে কোনোভাবে ইনফ্লুয়েন্স করতে পারবে না?’

উত্তর দিই না, ঘাড়টা মৃদু ঝাঁকিয়ে যেন বলতে চাই ‘কী জানি!’ চায়ের কাপে চুমুক মেরে চোখ ফেরাই মলয় পোদ্দারের দিকে, ‘স্যার ঠিক আছেন তো? উনি এখন কোথায়?’

‘ঠিক আছেন, তবে সারা রাত একফোঁটাও ঘুমোননি, শ্বাসকষ্টটা খুব ট্রাবল দিচ্ছে। একটু আগে একবার মুনির ঘরে গিয়েছিলেন, কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন, ও কথা বলেনি।

তবে মুনির আচরণ কিন্তু খুব নর্মাল। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে দেখছি যেন অন্য মেয়ে, অন্য মানুষ। রাগ-টাগ দেখানো নেই, গতকালের কোনোরকম ছায়া নেই চোখে মুখে, ব্রেকফাস্ট নিয়ে কোনো সমস্যা করল না, মনে হচ্ছে তার পরের মেডিসিনগুলো নিয়েও সমস্যা করবে না। কিন্তু কেমন যেন একটা লাগছে, এই পরিস্থিতিতে বেশি নর্মালটাই যেন অ্যাবনর্মাল তাই না...?’ চিন্তার ভাঁজ পোদ্দারের মুখে।

চা-টা শেষ করে উঠে দাঁড়িয়েছি, দেখি উল্টোদিকের করিডর দিয়ে বগল-বন্দী একটা ফাইল নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন অরুণ ভাদুড়ী, পাশে উত্তম সাধুখাঁ। ‘স্যার কোথায় যাচ্ছেন, মলয়দা, স্যার কোথায় বেরোচ্ছেন?’

‘হুম, দশটার মধ্যে ওকে বেরিয়ে যেতে হবে। সাড়ে দশটা নাগাদ মার্কেট কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ওঁর মিটিং। ওরাই কমপ্লেক্সটা কিনে নিচ্ছে, আইনি নানা ঘোরপ্যাঁচের জন্য জলের দরে পাচ্ছে কিন্তু স্যারের কিছু করার নেই। ব্যাঙ্কে ইমিডিয়েট একটা লাম্পসাম জমা দিতে হবে, না হলে পায়ের নীচের মাটিটুকু নিয়েও টানাটানি পড়বে...।’

যাই হোক, মোটের উপর পরিস্থিতির বেশির ভাগটাই আপাতত হাতের বাইরে, তবু তো আমাদের চেষ্টা করতেই হবে, যার যার সাধ্যমতো চেষ্টা করতে হবে। চোখে মুখে জল দিয়ে, ভেজা হাত এলোমেলো চুলের ভিতর চালিয়ে কিছুটা ভদ্রস্থ হয়ে মিনিট কুড়ি পর চান্দ্রেয়ীর ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। দরজা ঠেলে সন্তর্পণে ঢুকলাম ভেতরে। আমায় দেখে শাজাহানদা ভেতরের ঘরের দিকে ইশারা করে বেরিয়ে গেল, শব্দ না করে প্রায় পা টিপে এগিয়ে গেলাম।

ভেতরের এই ঘরটা এমনিতে শোয়া বসার না। এই ঘরের পাল্লাহীন দেওয়াল আলমারিগুলোতে সারে সারে নতুন পুরোনো অনেক যন্ত্রপাতি রাখা আছে, নানা ধরনের ক্যামেরা, লাইট স্ট্যান্ড ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। বাঁ হাতে কোণ করে মেঝেয় পাতা একটা বড়োসড় ম্যাট্রেস। তাতে একটা একটা কুশনের উপর কনুই গেঁথে আধশোয়া হয়ে একটা ভিডিও ক্যামেরা নাড়াচাড়া করেছিল চান্দ্রেয়ী। ঘরটা প্রায় অন্ধকার, চৌকাঠের উপর দাঁড়িয়ে গলা বাড়িয়ে তাকালাম ভেতরে, ‘আসব?’

‘হ্যাঁ এসো।’

‘শরীর ঠিক আছে তো?’

‘এক্কেবারে।’

‘ওটা কী, ইনফ্রারেড ক্যাম মনে হচ্ছে? কী দেখছ?’

‘ভূতের ছবি।’

এগিয়ে যাই ওর কাছে, ঝুঁকে পড়ে দেখতে থাকি। বোতাম টিপে টিপে ও একের পর এক ছবি দেখছে। ‘এগুলো কোন সময়ের ছবি, এনি থিং স্পেশাল?’

‘না না, এগুলো বছর খানেক আগের খিদিরপুরের কাছের একটা হন্টেড লোকশনের র ফুটেজ।’

‘ওহ, ওখানে তো আমায় নিয়ে যাওয়া হয়নি। ওখানে তুমি ওদের সঙ্গে ছিলে কি? ওখানে তেমন সাসপিশাস কিছু পাওয়া গিয়েছিল নাকি?’

‘সাসপিশাস কিছু পেতে গেলে বাইরে কোথাও যেতে হয় তোমায় কে বলল? সে তো তুমি যখন ইচ্ছা যেখানে খুশি পেতে পার, এই ঘরের মধ্যেও পেতে পারো।’

‘মানে, কী বলতে চাইছ?’

‘এই ঘরের ভেতর ভূত দেখতে চাও?’

‘হ্যাঁ না মানে, কী বলতে চাইছ বুঝতে পারছি না। এই ঘরে ভূত দেখা বলতে...?’

‘দেখতে চাও কি না, সেটা জিজ্ঞাসা করছি।’

‘হ্যাঁ দেখালে দেখব না কেন?’

‘তাহলে দাঁড়াও, ওই থামটার দিকে পিঠ করে দাঁড়াও, দাঁড়িয়ে থাক।’

হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় চান্দ্রেয়ী। আমি থামটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হাতের ইনফ্রারেড ক্যামেরা আমার ওপর তাক করে।

‘কী করতে চাইছ, আমায় কী ভূত পেয়েছ নাকি?’

‘ভূত ছাড়া কী? আমরা সবাই ভূত, তুমি ভূত আমি ভূত। শুধু যারা আমাদের ছেড়ে, আমাদের সবকিছুর বাইরে চলে গেছে তারাই শুধু ভূত না।’

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, চান্দ্রেয়ী বলে উঠল, ‘সরে এসো, এবার সরে এসো।’

থামের সামনেটা থেকে এদিকে সরে এসেছি কিন্তু ও আমার ছেড়ে জায়গাটার উপর ইনফ্রারেড তরঙ্গ তাক করে আছে তবুও। ‘কী হল, ওখানে কী আছে? ওখানে ফোকাস করে আছ কেন?’

‘দেখই না, কেমন তুলি, তোমার ভূতের ছবিটা কেমন তুলি।’

ক্যাপচার কমপ্লিট করে আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে ‘দেখে যাও, নিজের ভূতের ছবি নিজে দেখে যাও।’

অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে ওর দিকে এগিয়ে যাই। ওর হাতে ধরা ক্যামেরা স্ক্রিনের উপর তাকাই। ক্যাপচার করা দেড় মিনিটের ভিডিওটা ও প্রথম থেকে চালায়। হ্যাঁ এই তো আমি দাঁড়িয়ে আছি থামটার গায়ে, এই আমি সরে এলাম। ফোকাসটা রয়েছে এবার ফাঁকা থামটার উপর। কিন্তু এ কী! এই ছায়াটা কার? আমারই তো মনে হচ্ছে, হ্যাঁ, আমারই তো!

কিন্তু কী করে, এটা কী করে সম্ভব! আমি তো ওখানে নেই, তাহলে আমার ছায়া ক্যামেরায় ধরা পড়ছে কী করে? চান্দ্রেয়ীর দিকে বিস্ময়ের চোখে তাকাই, ‘কী হল, ব্যাপারটা কী হল? আমি তো ওখান থেকে সরে এসেছি তাহলে এই ছায়াটা কী করে? ক্যামেরাটায় কোনো কারসাজি করা আছে নাকি?’

‘কারসাজি থাকবে কেন? নিজের ভূতকে চিনতে পারছ না, আমি তো তোমার ভূত ধরেছি! জ্যান্ত ভূত।’

‘না না ইয়ার্কি না, সিরিয়াস! কী হল ব্যাপারটা? এই সেম ব্যাপার কিছু দিন আগে শুটিং করতে যাওয়া সেই ভুতুড়ে সিলিং ফ্যানওয়ালা বাড়িটায় হয়েছিল। কোথাও কিছু নেই, দেওয়ালের গায়ে ধরা পড়ল একটা হাতের ছাপ! সমরদা রানডম ক্যামেরা ঘোরাচ্ছিল, হঠাৎ ধরা পড়ল!’

‘কী করে আবার, এতদিন ধরে ভূত ধরতে বেরোচ্ছ আর ভূত ধরা পড়লে বলছ কী করে?’

‘ভূত ধরা দলের ইনসাইডার বলেই তো বলছি কারসাজিটা কী, না হলে তো আঁতকে উঠতাম।’

মুখ মুচড়ে হাসে চান্দ্রেয়ী, ‘কে বলল ইনসাইডার? ইনসাইডার হলে তো তুমি এই প্রশ্নটাই করতে না। ইনসাইডার হলে জানতে এটা জাস্ট একটা সায়েন্টিফিক ট্রিক, ইনফ্রারেড টেকনোলজির একটা খুব বেসিক ব্যাপার।’

‘তাই তো ভাবি, কী করে সম্ভব!’

‘অনভিজ্ঞ লোক এই ছায়াটাকে ডেফিনিটলি ভূত বলে ভুল করবে কিন্তু এর পেছনের কেসটা জানা থাকলে বলবে লোক ঠকানোর ফন্দি ছাড়া আর কিচ্ছুটি না। কমপ্লিট ফ্রড।’

‘কী করে হচ্ছে, ছায়াটা কী করে তৈরি হচ্ছে?’

‘ভেরি সিম্পল। এমনি ক্যামেরা ছবি নেয় আলোর ভিত্তিতে কিন্তু ইনফ্রারেড ক্যামেরা ছবি নেয় তাপের। অন্ধকার জায়গায় যেখানে আলো নেই সেখানকার ছবি তুলতে তাই এই থার্মাল ইমেজিং ছাড়া রাস্তা নেই। তুমি যখন ওই থামটার সামনে চল্লিশ সেকেন্ড মত দাঁড়িয়েছিলে ওইখানে তোমার শরীরের তাপটা ছিল। এখন কথা হচ্ছে আলো যত তাড়াতাড়ি জায়গা বদলাতে পারে, তাপ তত তাড়াতাড়ি পারে না। ফলে আমি যখন তোমার ছেড়ে যাওয়া জায়গাটার ওপর ক্যামেরা তাক করলাম তখন ক্যামেরা তোমার ছেড়ে যাওয়া তাপের ছবি নিয়েছে, যেটা পাবলিকের চোখে হল গিয়ে তোমার ভূত। নাথিং সারপ্রাইজিং অ্যাট অল!’

‘ওহ মাই গড! তাহলে এই হল ফান্ডা!’ মুখ হাঁ হয়ে আসে আপনা থেকেই। ‘তাহলে ওই বাড়িটার দেওয়ালে এই জিনিসই দেখেছি। কিন্তু কেউ তো কিছু বলেনি, সবাই এমন একটা ভাব করল যেন কী না ভয়ংকর কিছু দেখেছে! তারপর চোখমুখ পাকিয়ে এমন সব কথা বলতে শুরু করল, প্রেতাত্মার ছায়া, আ ডেঞ্জারাস কাইন্ড অফ আ স্পিরিট লুকিং ওভার আস আরও কত সব কথা!’

‘ওসব অভিনয়, সব নাটক। আমার পিতৃদেব শ্রীযুক্ত অরুণ ভাদুড়ী, তার অ্যাসিস্ট্যান্ট সমর রক্ষিত, অগাস্টিন মন্ডল আর সব যারা আছে সব আসলে অভিনেতা।’ বলতে বলতে বেরিয়ে এল ওই প্রায়ান্ধকার ঘরটা থেকে, হনহন করে এগিয়ে বড়ো দরজার আধ ভেজানো পাল্লাটা একেবারে ঠেলে দিয়ে এল, ‘শুধু তো এইটাই না, টিমের সঙ্গে ইনভেস্টিগেশনে গিয়ে আর সব যা কিছু তোমার চোখে ভৌতিক কান্ডকারখানা ঠেকেছে জেনে রেখো সবকটাই কারসাজি, ছোটো বড়ো নানান সায়েন্টিফিক ট্রিক আর সে কথা গলা উঁচিয়ে বলতে আমার আর কোনো বাধা নেই। যে কারও সামনে দাঁড়িয়েই বলতে পারি, সে তোমাদের মহামান্য বিগ বসই হন বা তোমার মতো আউটসাইডার সবার সামনেই বলতে পারি।’

কী একটা সন্দেহের বশে দরজাটা খুলে বাইরের করিডরের দুদিকে তাকিয়ে নেয় চান্দ্রেয়ী, আশপাশে কেউ নেই আশ্বস্ত হয়ে এগিয়ে আসে আমার দিকে, ‘তাই বলি, আউটসাইডার আছ, ভালো আছ। ভেতর ঘর থেকে ব্যাপারটা দেখলে একটা সময়ের পর থেকে নিজের উপর প্রচণ্ড রাগ হত, ভীষণ রকম ঘৃণা হত। মনে হত তুমি যেন একটা মিথ্যের রাজ্যে বাস করছ। যা দেখছ সব মিথ্যে, যা বলা হচ্ছে সব মিথ্যে, যাদের দেখছ সবাই মূর্তিমান মিথ্যে। এর মধ্যে থাকতে থাকতে একসময় মনে হওয়া শুরু হত তুমি নিজেও বুঝি একটা মিথ্যে! ইভরি থিং ইজ ফেক, এভরি ওয়ান ইজ ফেক, ইওর লাইফ ইজ আ ফেক! তাই এভাবে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না, এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে না থাকা ভালো, তোমার সঙ্গে আগাগোড়া করা হয়েছে, তোমার পায়ের নীচে আসলে কোনো মাটি নেই, তুমি একটা বুদবুদের মধ্যে বাস করছ, যখন তখন ফেটে যেতে পারে, যে কোনো সময়।’

‘এসব কী বলছ! না না, এভাবে ভাবছ কেন?’

সত্যিই এ মেয়েটাকে আপাদমস্তক অন্যরকম লাগছে, যেন আরও একটা মানুষ! চোখে মুখের সেই পরিচিত ছবিটাই যেন নেই, চোখের কোণে আলাদা একধরণের তির্যকতা। ‘কিন্তু তুমি তো আগে কখনও আমায় এভাবে কিছু বলনি! ভুলেও কখনও আমার সামনে এইসব ফেক ব্যাপার স্যাপার নিয়ে তোমার কোনো অভিযোগ বা ক্ষোভের কথা জানাওনি? বরং আমি সন্দেহ প্রকাশ করলে বিদ্রুপ করেছ, আমাকে এইসব অতিপ্রাকৃত আধিভৌতিকে সবসময় বিশ্বাস করতে বলেছ! কিছু সপ্তাহ আগে অবধিও তোমার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে এইসব ঘোস্ট হান্টিং, প্যারানর্মাল ইনভেস্টিগেশন ইত্যাদিতে তোমার ভরপুর আস্থা রয়েছে!’

‘অভিযোগ বা ক্ষোভ না ওসব তো অনেক দূরের কথা, এখন যেটা বললাম সেটা এই মুহূর্তে আমার অস্তিত্বের সবচেয়ে বড়ো ক্রাইসিস বলতে পার। কিছু সপ্তাহ আগে ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল, তাছাড়া একজন ইনসাইডার হিসেবে এগুলো বলা মানে তো বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে গেল। এখন বলছি কারণ এখন আমি মানসিকভাবে আগের জায়গাটা থেকে সরে এসেছি।’

‘কেন, কী হয়েছে, তেমন গুরুতর কিছু হয়েছে?’

‘সে অনেক কথা, সে পরে বলা যাবেখন। আপাতত আমি বেরোতে চাই, এই বাড়ির অসহ্য আবহাওয়ার বাইরে বেরিয়ে একটু শ্বাস নিতে চাই। যে দিকে দুচোখ চায় চলে যেতে চাই কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য এ বাড়ির বাইরে আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, এমনকি কোনো আত্মীয়স্বজনও নেই।’

‘কী যা তা বলছ?’

‘যা তা না, অনেক ভেবেচিন্তে বলছি। এছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই, না হলে আমি নির্ঘাৎ পাগল হয়ে যাব, না হয় কিছু করে বসব। তোমায় বন্ধু মনে করি তাই বলছি, প্লিজ আমায় একটু সাহায্য কর।’

‘সাহায্য মানে, কী সাহায্য চাইছ?’

‘হাতে একদম সময় নেই, আর খুব একটা বেশি সময় তোমাকে এভাবে একা পাব না তাই একেবারে সোজা মোদ্দা কথায় আসি, আমাকে এই বাড়ি থেকে বেরোতে সাহায্য করবে? জানি এ বাড়িতে অনেক চোখ, প্রতিটা কোণায় সারভেইল্যান্স ক্যামেরা বসানো কিন্তু আমার কথা ভেবে এইটুকু করতে পারবে না?’ করুণ চোখে তাকাল মেয়েটা।

‘তুমি কী বলছ নিজে জানো? প্লিজ চান্দ্রেয়ী, তোমার কিন্তু শরীরটা ভালো নেই, মাথায় এতটা প্রেসার নিও না, একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করো। আর যা সাহায্য চাও করব কিন্তু এভাবে ভেব না প্লিজ।’

‘বুঝতে পারছি তুমি পারবে না, সে ক্ষমতা তোমার নেই।’ ভ্রুকুটি করে তাকায় চান্দ্রেয়ী ‘মুখে যতই বল ভয় পাইনা, কাউকে ভয় পাইনা, ভূত প্রেত কিছুকে না কিন্তু আসলে তুমিও ভয় পাও, অরুণ ভাদুড়ীকে ভয় পাও।’

‘বুঝতে পারছি তুমি আমার পৌরুষে ঘা দিয়ে আমাকে টেম্পেড করতে চাইছ, কিন্তু আমি সেটা হব না। তোমার ভালো চাই বলে কিছুতেই হব না।’

‘কীসের ভালো চাও? বাদ দাও ওসব ছেলে-ভোলানো কথা, ভালো চাইলে আমার এই রকম অবস্থায় নির্বিকার থাকতে পারতে? জানো আমি এখানে কী অবস্থায় আছি, আমার প্রতি এ বাড়িতে কত বড়ো অন্যায় হয়েছে, আমাকে দিয়ে এখানে কী করানো হয়?’

‘যদি বলি জানি, সবটা জানি, তুমি কি আমায় বিশ্বাস করবে?’ সরাসরি চোখে চোখ রাখি।

‘কী জানো, কিছুই জানো না, জানতে পার না।’ শানিত ফলার মতো চোখ ঘোরায় চান্দ্রেয়ী।

‘হ্যাঁ এটা সত্যি জানতাম না, গতকাল রাত অবধি কিছুই জানতাম না কিন্তু এখন জানি।’ প্রত্যয়ী উচ্চারণে বলি।

মেয়েটা আমার চোখে চোখ গেঁথে পরখ করার চেষ্টা করে আমার আত্মবিশ্বাস। ঋজু ভঙ্গিতে ঘাড় তুলি ‘কীসের নামে দিব্যি করলে বিশ্বাস করবে জানি না কিন্তু আমার মৃত মায়ের নামে দিব্যি করে বলছি কাল রাতে আমি সবটা জেনেছি। স্যার আমায় নিজের মুখে সব বলেছেন। তোমার মায়ের দুর্ঘটনার সেই রাত থেকে এই ঘরের গতকালের ঘটনা সবটাই বলেছেন।’

‘কী, উনি বলেছেন? তোমায়?’

‘হ্যাঁ, আর কে বলবেন? উনি ছাড়া আর কে জানবেন, সেদিনের অ্যাক্সিডেন্ট স্পটের সেই লিফটে কী হয়েছিল বা এই ঘরে তোমার সঙ্গে কথাকাটাকাটি হতে হতে মেজাজ হারিয়ে তোমার গালে ...।’

‘কী বলেছেন...?’ কেঁপে ওঠে চান্দ্রেয়ীর ভ্রু-যুগল। ‘সে যাই বলুন, বললেই তো হবে না! উনি বলবেন আর সেটা সবাইকে বিশ্বাস করতে হবে? জুলুম নাকি, গায়ের জোর নাকি?’

‘জুলুমের প্রশ্নই ওঠে না। যে পরিস্থিতিতে কথা হয়েছে, উনি যেভাবে বলে উঠেছেন আমি নিশ্চিত উনি এক বর্ণও মিথ্যে বলতে পারেন না আর সব শুনে মনে হয়েছে উনি পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোর মধ্যে একজন। এই সবকিছুর জন্য উনি ভীষণ রকম দুঃখিত, ভয়ানক অনুতপ্ত, ওঁর আত্মধিক্কারের কোনো সীমা নেই। হ্যাঁ মানুষটা হয়তো বেশ কিছু গুরুতর ভুল করেছেন, কিন্তু ভুল কার হয় না বলো, মানুষমাত্রই ভুল করে তাই আমার মনে হয় তোমার ওঁকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত।’

‘বাহ বাহ বাহ!’ শব্দহীন তালি দিয়ে ওঠে চান্দ্রেয়ী। ‘বুঝতে পারছি, তোমার সঙ্গেও আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গেছে বুঝতে পারছি! ভেবেছিলাম তোমায় অন্তত টলানো যাবে না, তুমি অন্তত আমার কথা বুঝবে কিন্তু এখন দেখছি তুমিও রাতারাতি দলবদল করে ফেলেছ! ওঁর হয়ে সাফাই গাইতে এসেছ, ওঁর শিখিয়ে দেওয়া কথা আওড়াতে এসেছ!’

দরজার দিকে তর্জনী ছুঁড়ে চিৎকার করে ওঠে, ‘যাও চলে যাও, আমার কাউকে দরকার নেই, সবাই চলে যাও। লিভ মি অ্যালোন, এভরিবডি জাস্ট লিভ মি অ্যালোন।’

‘হ্যাঁ যেতেই পারি, আগেও অনেকবার চলে গিয়েছি এবারও চলে যেতেই পারি কিন্তু এবার আমি যাব না। গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিলেও যাব না কারণ তুমি আমায় বন্ধু না মনে করতেই পারো আমি তোমায় বন্ধু ভাবি আর যে কোনো মূল্যে তোমার ভালো চাই।’

ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে মেয়েটা, এলোমেলো চুল, বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিপাত। জোড়হাত করে বলে, ‘বেগ অফ ইউ, আমার ভালো চাইতে বারণ করছি, দয়া করে কেউ আমার ভালো চাইতে এসো না। মুখে অনেকেই অনেক কথা বলে কিন্তু আসলে তো এ বাড়িতে দিনের পর দিন আমাকে ইউজ করা হয়েছে, যেভাবে একদিন আমার মাকেও করা হয়েছে। তিনি না হয় নিষ্কৃতি পেয়েছেন কিন্তু আমি পাই কী করে?’

এগিয়ে আসি, একেবারে ওর সামনে দাঁড়াই। ‘কী বলতে চাইছ আমি জানি আর সেটা যদি তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে হয় সেটা মোটেও সমর্থনযোগ্য না। আগেও জোর করা হয়েছে কি?’

‘না তখন তো বিষয়টা অন্যরকম ছিল, ব্যাপারটাকে মনে হত বুঝি একটা মজা, একটা থ্রিল, অন্য রকম একটা অ্যাডভেঞ্চার কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে স্রেফ জুলুমবাজি, আমি যেন ওই লোকটার হাতের পাপেট!’

‘কে যে হার হাতের পাপেট আমি জানি না। তবে অরুণ ভাদুড়ী লোকটার কথা সবটা শোনার পর আমার মনে হয়েছে ওর মতো মস্ত বড়ো একটা পাপেট এ দুনিয়ায় খুব কম আছে, নিয়তি যাকে বিপজ্জনকভাবে আকাশে লটকে নাচাতে নাচাতে আজ একেবারে খাদের ধারে নিয়ে এসেছে। তুমি কি জান, লোকটা এখন কী অবস্থায় রয়েছেন? মাথায় কত কোটি টাকার ধার, উনি প্রায় দেউলিয়া, আজ গিয়েছেন এই বাড়িটা বাঁচাতে ওঁর শেষ সম্বলটুকুও বেচে দিতে?’

শুনে কিছুক্ষণের জন্য থম মেরে যায় চান্দ্রেয়ী। মুখ সরিয়ে নেয় ডান দিকে। স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে দেওয়ালের দিকে। চোখ সরাই না আমি, ‘ব্যাপারটা একজন আত্মসম্মানী মানুষের পক্ষে তাঁর মেয়েকে বলা লজ্জার তাই উনি কখনই বলবেন না, তোমার শরীরটা ঠিক ছিল না তাই মলয়দা বা কেউ নিশ্চয়ই তোমায় কিছু জানায়নি। তোমার মাথায় চাপ পড়বে তাই আমিও এসব কিছু বলতে চাইছিলাম না কিন্তু কেমন যেন মনে হল তোমার জানা দরকার...’

মুখের রেখাগুলো এলোমেলো হয়ে যায়, ‘জেনে কী করব? কে মাথার দিব্যি দিয়েছিল এই রাস্তায় আসতে? নিজের শখ, নেশা, জেদ, মর্জিতে যখন ওই দুনিয়ায় পা দিয়েছিলেন তখন তার ফল ওকেই ভুগতে হবে।’

‘কেন ওঁর সমস্যা তোমার সমস্যা না?’

‘আমার সমস্যা বলেই তো নিজেই নিজের এমন এক মূর্তিমান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু লোকটার কী অধিকার ছিল নিজের সাথে সাথে আমাদের দুজনের জীবনও এই অন্ধকারের দুনিয়ায় টেনে আনার, আমাদের দু-জনের জীবন নিয়ে এইভাবে ছিনিমিনি খেলার? যে গেছে সে তো গেছেই কিন্তু আমার কী হবে? সারাটা জীবন কি আমার এই ভাবেই চলবে? এটা কোনো জীবন হল? আত্মীয় নেই, বন্ধু নেই, হাসি নেই, একটা কোনো খোলা জানলা নেই, এমন একটা কালাপুরী বাড়ি যে শরীরে একফালি আলো অবধি এসে লাগে না!’

মুখটা লালাভ দেখাচ্ছে, জলস্ফীতি ঘটে আরও বড়ো দেখাচ্ছে যেন। ‘বেশ হবে, লোকটা দেউলিয়া হয়ে গেলে আমার খুব আনন্দ হবে। আর কার কী হবে জানি না এই অভিশপ্ত বাড়িটা হাতছাড়া হয়ে গেলে আমি অন্তত খুব খুশি হব। ভিটে মাটি চাটি হয়ে গিয়ে আমাদের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হলে বেশ হবে, বাইরের দুনিয়াটা তো অন্তত দেখতে পাব। বাইরে কত আলো, লোকজন, কত মেলা উৎসব, হই হুল্লোড়, আনন্দ! আর আমি বছরের পর বছর এই জেলখানায় পড়ে আছি!

কেন, আমি কি মানুষ না? আমার কি ইচ্ছে করেনা আর দশটা মেয়ের মতো বাঁচতে? মাকে আর আমাকে যে লোকটা পিশাচিনী বানাতে চেয়েছে তার শাস্তি দরকার। অবশ্য এই সব তো সেই সবেরই শাস্তি হচ্ছে , আমি চাই লোকটা দেউলিয়া হয়ে যাক আর এই বাড়িটা থেকে আমাদের বার করে দেওয়া হোক আর এইসব ভুতুড়ে কাজকারবার বন্ধ হয়ে আমরা রাস্তায় নেমে আসি।’

‘কী যে ছেলেমানুষের মতো কথা বল? জীবনটা কিন্তু মোটেও রোমান্টিক বিষয় না, খুব কঠিন নির্মম জায়গা। ঝোঁকের মাথায় যা মনে এল বলছ ঠিক আছে কিন্তু দেউলিয়া হয়ে যাওয়া মানে বাস্তবে কী সে সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা আছে? অতএব এসব ইমপ্র্যাক্টিক্যাল কথা বাদ দিয়ে এসো যে করে হোক সামনের বিপর্যয়টা ঠেকাই। লোকটা যেমনই হোক, জীবনে যত ভুল যত অপরাধই করুক না কেন, সম্পর্কটাকে তো অস্বীকার করতে পারছ না তাই এসো লোকটাকে সাহায্য করি। সব অভিমান অভিযোগ ভুলে ওর সামনের টেলি প্রোজেক্টটা উতরে দিই...।’

‘টেলি-প্রোজেক্ট, ইউ মিন সামনের শনিবারের শুটিংটার কথা বলছ মনে হচ্ছে? যেটা নিয়ে লোকটার আমাকে প্রয়োজন তাই তো?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ একেবারে ওইটাই ওইটাই। ওই কাজটা ভালোয় ভালোয় উতরে গেলেই আউটডোরের পর্যায়টা শেষ হবে, তাই ওটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। ওতে তোমার একটা গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করার আছে তাই সবাই তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। এই ভয়ানক দুর্দিনে ওই টেলি-সিরিজটাই এখন পুরো টিমের কাছে শেষ আশার আলো। শো-টা ফাইনালি অ্যাকসেপ্টেড হয়ে গেলে, একবার টেলিকাস্ট হতে শুরু করলে পুরো মোড় ঘুরে যাবে, পুরো টিমটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে, পুরো ব্যাপারটা নিশ্চিত ভরাডুবির হাত থেকে বেঁচে যাবে।

আর এই রকম একটা ক্রুশিয়াল সময়ে তুমি বেঁকে বসেছ, তুমি নাকি প্রোজেক্ট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছ। ভাবতে পারছ তার মানে কী? বুঝতে পারছ তোমার পার্টিসিপেশন কতটা জরুরি, এই সময় তোমাকে না হলেই না...?’

চোখ টেরিয়ে তাকাল চান্দ্রেয়ী। মুখে অদ্ভুত একটা এক্সপ্রেশন, ওটা হাসি না কটাক্ষ বোঝা গেল, ‘তাই আমায় দরকার তাই তো?’

‘এই একই প্রশ্ন তুমি একসময় আমায় করেছিলে, আমি কিন্তু সেদিন শুধু তোমার কথা ভেবে ফিরে এসেছিলাম। আমায় বলেছিলে যদি না ফেরো আমার সঙ্গে তোমার আর কোনোদিন দেখা হবে না। তোমায় না দেখে থাকতে পারব না তাই আমি কিন্তু ফিরে এসেছিলাম। আর আজ যদি তোমার সেই একই কথাগুলো রিপিট করে বলি তুমি না ফিরলে আর কিন্তু আমাদের দেখা হবে না তুমি কী বলবে?’ বলতে গিয়ে গলা কেঁপে উঠলেও বলে ফেললাম।

‘জানি না কী বলব!’ আমার চোখে চোখ পড়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় কিছুটা যেন জোর করেই চোখ সরিয়ে নিল ও। ‘দেখা হবে না মানে? যদি শ্যুটে না ফিরি তুমি কি টিম ছেড়ে দেবে নাকি?’

‘ধরে নাও তাই।’ বুক ঢিপ ঢিপ করতে শুরু করেছে আমার।

‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করতে চাইছ? তোমাকে আলাদা চোখে দেখি, খুব কাছের একজন বন্ধু বলতে যা বোঝায় তাই মনে করি, হয়তো তার চেয়েও অনেকটা বেশিই মনে করি, সেই সু্যোগ নিতে চাইছ?’

‘তুমিও তো সেই সু্যোগটা নিয়েছিলে, নাও নি?’ স্মিত হাসি আমি ‘সত্যি কথা বলতে কী, সেদিন হয়তো তোমার টানেই ফিরে এসেছিলাম, তোমার জন্যেই শত সমস্যা সত্ত্বেও স্যারের টিমে লেগে থেকেছি। হ্যাঁ সুপার ন্যাচারাল এক্সপ্লোরেশন আমার প্যাশন, হ্যাঁ আমি বুঝতে চাই, জানতে চাই সত্যিই কি কিছু আছে, আমাদের যুক্তি বুদ্ধির বাইরে অতিপ্রাকৃত বলে সত্যিই কি কিছু আছে! কিন্তু সে তো আমি আমার মতো করেও করতে পারতাম, মাঝেমাঝে সুযোগ পেলেই আদাড়বাদাড়ে ঘুরে যেটা আমি করেই থাকি। তাহলে আমার এখানে পড়ে থাকা কেন, এই বিকন ভিলায় ফিরে ফিরে আসা শুধু কি পাবলিসিটির লোভে...?’

অবনত চোখের কোণ হেসে ওঠে মেয়েটার, মুখ জুড়ে কেমন যেন লাজুক রঙ ছড়িয়ে পড়ে। আমি স্বরে যতদূর সম্ভব মিনতি মিশিয়ে বলি, ‘ফিরে এসো চান্দ্রেয়ী, আর কারও জন্য না অন্তত আমার কথা শুনে ফিরে এসো। এইবারের মতো ব্যাপারটা যা হোক করে ব্যাপারটা উতরে দাও, ভালোয় ভালোয় সবটা মিটে যেতে দাও। তারপর তুমি আমায় যা বলবে আমি করব। যেখানে বলবে সেখানে নিয়ে যাব। জীবন কাকে বলে আমি তোমায় দেখাব। এত আলো দেখাব যে সারা জীবনের অন্ধকারের কথা ভুলে যাবে, সব অন্ধকার স্মৃতি।

আমি বললে স্যার বারণ করতে পারবেন না। এইটা মিটে গেলে সামনের সপ্তাহেই আমি তোমায় নিয়ে বাইরে বেরোব। না না এই বাড়ির কোনো গাড়ি না, উত্তমদা সঙ্গে আসতে চাইলে মুখের উপর মানা করে দেব। রাস্তা থেকে একটা হলদে ট্যাক্সি ভাড়া করে ব্যাক সিটে বসে ড্রাইভারকে বলব চলো ভিক্টোরিয়া। সবকটা জানলা পুরো খুলে দেব, যানজটটা ছাড়িয়ে কিছুটা বাইরে বেরোতে পারলে দেখবে কী হাওয়া, কে বলল কলকাতা গুমোট শহর, ময়দানের ওইদিকটা দিয়ে গাড়ি ছুটলে দেখবে কী হাওয়া। মনে হবে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একটা ফাঁকা জায়গা দেখে নির্জনে কোথাও বসব, হু হু করে হাওয়া আসবে আর আমরা বসে বসে গল্প করব, অনেকক্ষণ ধরে যা মনে আসে বকবক করে যাব। কী ঠিক আছে তো, যাবে তো, রাজি তো?’

‘যাব।’

মেঝে থেকে আলতো করে চোখ তুলতে গিয়েও নামিয়ে নিল মেয়েটা। মুহূর্তে কী একটা যেন ভেবে তুলে আনল উপরে, আমার চোখে ছুঁইয়ে কিছু যেন একটা বুঝে নিয়েই সরিয়ে নিল। ভেতরে কেমন যেন একটা অজানা আনন্দ আনচান করে উঠল, আমি বললাম, ‘সব কিন্তু তোমার উপর উপর নির্ভর করছে। কী ফিরছ তো?’

‘দেখি, চেষ্টা করব।’ মৃদু হাসে চান্দ্রেয়ী।

হাসিটা ইতিবাচক। বুকের ভিতরে কার্নিশে বসা এক ঝাঁক পায়রা ডানা ঝাপটে ওঠে আমার। হাওয়ায় ভর দিয়ে হাত চারেক উপরে চাড় মেরে উঠেই শূন্যে পাক খেয়ে খোলা নির্মেঘ আকাশে উড়তে শুরু করে। মাটিতে পা নেই যেন আমার, প্রচ্ছন্ন আশ্বাসে চোখ বন্ধ হয়ে আসে।

একহাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা চান্দ্রেয়ীর দিকে ফিরি। কিন্তু মুখটা হঠাৎ কেমন যেন অন্যমনস্ক লাগে। সামান্য পাশ করে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। ওর এই কৌণিক দৃষ্টিপাতটা আগেও লক্ষ্য করেছি। কয়েক সেকেণ্ড আগে মুখের ছবি আলাদা ছিল, পরমুহূর্তে কী যেন একটা ভাবনার মধ্যে ঢুকে পড়ে পরিপার্শ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটা কি ওর কোনো সমস্যা কিনা জানি না, তবে মেয়েটার মুড হঠাৎ হঠাৎ ফ্লাকচুয়েট করে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

সামনের দিকে ঝুঁকে বলি, ‘কী হল? কিছু ভাবছ?’

‘না না কিছু না।’ আস্তে আস্তে বাঁ পাশে ঘুরতে থাকে। পিছনদিকে বাঁক নিয়ে খুব ধীরে চলতে শুরু করে ঘুমের ভিতর হাঁটতে শুরু করা মানুষদের মতো।

বাধা দিই না, খালি পিছন থেকে বলি, ‘তাহলে কাল কথা হচ্ছে?’

সম্মতিসূচক ঘাড় কাত করে ও। সোজা হেঁটে এগিয়ে চলে ভেতরের ঘরটার দিকে।

১৯

রাতারাতি এতটা বদল আশা করেনি মলয় পোদ্দার। কাল রাতেও যে মুখটা মেঘলাটে ছিল সকালে তাতে পুরোনো হাসির রেখা। ও রাজি হয়েছে শিডিউল মতো শ্যুটিং স্পটে যেতে। মলয় পোদ্দার তো আত্মহারা। আমার হাত ধরে এমন চোখে তাকাল যেন আমি মিরাকল কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলেছি।

সবচেয়ে আশ্বস্ত হলাম অরুণবাবুকে দেখে। মুখে হাসি নেই, অন্তত পঞ্চাশ কোটি টাকার প্রপার্টিটা একেবারে জলের দরে ডিল করে আসার পর ভেতরে ভেতরে মুষড়ে পড়েছেন ঠিকই কিন্তু ব্যাঙ্কের দেনাটার তো আপাতত কিছু একটা ব্যবস্থা করা গেছে। তবে সেটার চেয়ে ঢের বড়ো কথা মনে হল চান্দ্রেয়ী যে ওঁকে দেখে হেসেছে। সৌজন্যমূলক আর অল্প হলেও কথা বলে গেছে তাতেই যেন লোকটা কৃতার্থ। অনেকটা পজিটিভ লাগল চোখ মুখ। একেবারে হাত পা ছেড়ে বসে পড়েছিলেন কিন্তু আজ অনেকটাই স্বাভাবিক। যদিও উনি বলে দিয়েছেন এই শ্যুটটা সমর রক্ষিতকেই ম্যানেজ করে নিতে হবে। উনি সঙ্গে থাকবেন কিন্তু অ্যাক্টিভলি কিছু করবেন না।

অবশ্য যা করার তো উনি করেই রেখেছেন। দামী শিটের লম্বা খাতায় প্রতিটা স্টেপ পুঙ্খানুপুঙ্খ লিখে, স্কেচ করে এঁকে অনেকদিন আগেই ব্লু প্রিন্ট রেডি করে রেখেছেন। যা যা হবে ওই খাতা অনুযায়ীই হবে। হায়দ্রাবাদ থেকে নাম করা এক স্পেশালিস্ট ক্যামেরাম্যানের অ্যাসিস্ট্যান্ট এসে পৌঁছবে কাল। টেকনিক্যালি সাউণ্ড লোক, সাউথের একটা নাম করা ডার্ক এন্ড নামক সোসাইটির হয়ে প্যারানর্মাল অ্যাক্টিভিটিস শ্যুট করে, ফিল্মের কাজ করে। সমর রক্ষিত মেইন ক্যামেরায় থাকলেও, এই জাতীয় শ্যুটের জন্য বিশেষ ক্যামেরাটা চালাবেন সেই লোক।

লেটেস্ট টেকনোলজি তো আজকাল সব প্রথমে সাউথেই আসছে। আর চন্দ্রন নামের ওই স্পেশালিস্টের সঙ্গে অরুণবাবুর যোগাযোগ হয়েছে বেশ অনেক মাস হল। মাঝে মাঝেই ভিডিও কনফারেন্সে কথা হয়। সেই লোকই ভাদুড়ীর মাথায় ঢুকিয়েছে এখন তো ওয়েব সিরিজের যুগ, এর একটা ন্যাশনালই শুধু না ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট আছে। ভালো কাজ করতে পারলে শুধু রাইট বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা কামানো যায়। তাই এক কাজে অনেক কাজ সারার পরিকল্পনা আছে স্যারের। ইমিডিয়েটলি টেলি-শোটা প্রায়োরিটি কিন্তু এই রাশগুলো নিয়ে ভবিষ্যতেও অনেক কাজকর্মের সুযোগ আছে। সেই জন্য খরচের ব্যাপারে কোনো কার্পণ্য করতে রাজি না তিনি, অ্যারেঞ্জমেন্টের কোনো খামতি।

নতুন করে তো কিছু ভাবার নেই, কাউকে কিছু বোঝানোর নেই। প্রোগ্রামটা তো অনেক আগে থেকেই শিডিউলড হয়েই ছিল শুধু মাঝখানে কিছু অনভিপ্রেত সমস্যা তৈরি হওয়ায় সব কিছু ভেস্তে যেতে বসেছিল এই যা। যাই হোক আপতত হাওয়া বেশ অনুকূল, আমি সোজা চান্দ্রেয়ীর ঘরে ঢুকে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়ালাম, ‘থ্যাঙ্কস আ লট তুমি আমার কথা রেখেছ।’ হ্যাণ্ড শেক করতে হাত বাড়িয়ে দিলাম, হাতটা ধরে হাসল ও। বললাম, ‘শনিবার এটা আমার কাছে একটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে। আগে তো তোমায় কখনও শ্যুটে যেতে দেখিনি, ব্যাপারটা কেমন করে হয় জানি না। তোমার কাছে নতুন কিছু না কিন্তু এই জাতীয় কাজে আমি এবার নতুন।’

‘তুমি থাকছ ওখানে, অ্যাজ অ্যাঙ্কর?’

‘না অ্যাঙ্কর হিসেবে না এমনিই থাকছি, টিমম্যান হয়ে। এই জাতীয় শ্যুটে তো অন দ্য স্পট অ্যাঙ্কর থাকে না। ন্যারেশন থাকলে সেটা তো আলাদা শ্যুট হবে তারপর এডিটিং-এ জোড়া হবে। যাই হোক রিল্যাক্সড থাকা যাবে, তোমার কাছাকাছি থাকব, জায়গাটা ন্যাশনাল হাইওয়ের কাছে কিন্তু খুব ফাঁকা ফাঁকা। গপ্প করা যাবে, তুমি ফুরসত পেলে একদিক হয়ে জমিয়ে গপশপ করা যাবে।’

‘দেখা যাক।’ ম্লান হাসে চান্দ্রেয়ী।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলে, ‘তুমি আগে গেছ জায়গাটায়?’

‘হ্যাঁ, সেবার স্যারের সঙ্গে দিনের বেলায় গিয়েছিলাম জায়গাটার একটা ওভারভিউ করতে। মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে রাস্তাটার ব্যাকগ্রাউন্ড ইনফরমেশন জোগাড় করেছিলাম। রোডটা কেন কুখ্যাত, ওখানে কী ধরনের সব ভৌতিক কাণ্ডকারখানা হয় বা ইতিপূর্বে হয়েছে, জায়গাটার হিস্ট্রি কী, আজ পর্যন্ত কটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, আই উইটনেসদের বক্তব্য কী— এইসব নানান ডেটা কালেকশন করেছিলাম।’

‘তাহলে তো এলাকাটা ভালোই চেনো।’

‘মোটামুটি চিনি। কেন, এলাকাটা চিনি কিনা জিজ্ঞেস করছ কেন?’

‘এমনিই জিজ্ঞেস করছি। আসলে সেবার ওরা আমায় ওখানে নিয়ে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু এখন গেলে কিচ্ছু চিনতে পারব না। আসলে এই সব ক্ষেত্রে আমায় গাড়ি করে নিয়ে যাওয়া হয়, স্পটে নেমে কাজটা সেরে আবার উঠে চলে আসি। ফলে আশপাশের কিছুই চেনা হয় না।’

‘রাতে গেলে সব জায়গাই এক রকম লাগবে তবে আমার আবার উলটো। ইদানীং তো মনে হয় দিনের চেয়ে রাতেই বোধহয় আমি বেশি স্বচ্ছন্দ। আসলে বছরের পর বছর রাতবিরেতে চলাফেরা করতে করতে অন্ধকার বিষয়টা অনেক সহজ হয়ে এসেছে, অন্ধকারে চোখ সয়ে গেছে। শুধু চোখটাই জ্বলে না এই যা, তা না হলে আমি তো আজকাল পাক্কা নিশাচর।’

‘তাহলে তো ভালোই হয়।’ অস্ফুটে বলে মেয়েটা।

‘কী বললে?’ সচকিত হয়ে উঠি।

‘কিছু না বললাম তাহলে তো বেশ ভালোই। নিশাচর আর প্রেতিনীতে তো দিব্যি রাজযোটক?’

‘সে আর বলতে! সে আর বলতে!’ উচ্ছ্বাসে ডগমগ করে উঠি।

বহুদিন বাদে কোনো একটা দিন এত ভালো লাগছে। বিকন ভিলার ভেতরের থমথমে পরিবেশে অপ্রত্যাশিত ভাবে হঠাৎ বেশ একটা খুশি খুশি আবহাওয়া। এতদিন প্রত্যেকেই বড্ড মুষড়ে পড়েছিল কিন্তু আজ সবার মুখেই হাসি। বেশ একটা পিকনিক পিকনিক ভাব, সামনের শনিবার রাতে যেন সবাই মিলে বনভোজনে যাওয়া হবে।

বাড়িটা থেকে ফ্ল্যাটে ফিরে কিছুতেই মন বসছে না। মেয়েটার কথা মনে পড়লেই মনটা আশ্চর্য এক নির্ধূম আনন্দে ভরে উঠছে। ওই রকম দুর্লভ দর্শনা একটি মেয়ে তার বিরল সুন্দর দুটো চোখ তুলে আমার দিকে ওইভাবে তাকিয়েছে ভাবলেই আহ্লাদে ভেঙে আটখানা হয়ে ভেঙে যেতে চাইছে শরীর। দেখতে দেখতে অনেক রাত হল কিন্তু আনন্দের উৎস্রোতেই বুঝি ঘুম আসছে না। পুলকিত অন্ধকারে কাব্যমদির মন কখনও বা ভেবে বসছে ওই রকম একটি মেয়ের জন্য সব কিছু করা যায়, সে বললে ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছুঁইয়ে বিষ পান করে মরেও যাওয়া যায়।

পরের দিন গিয়েও দেখলাম সেই একই বাতাবরণ। অরুণ ভাদুড়ীর মুখে সেই বিষাদাচ্ছন্ন ভাবটা একেবারেই নেই, প্রস্তুতিতে লেগে পড়েছেন নিঃশব্দে। আমাকে ডেকে বসালেন হাসি মুখে। নিজের ফ্লাস্ক থেকে কফি ঢেলে খাওয়ালেন। আমার দিকে সকৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘ইউ হ্যাভ ডান আ ট্রিমেন্ডাস জব। মলয় বলছিল মুনির সঙ্গে তোমার সেদিনের কথাবার্তা যে এই রকম মিরাকিউলাস রেজাল্ট দেবে ভাবতে পারিনি! আমি ভাবতে পারিনি এত তাড়াতাড়ি মেয়েটাকে আবার আগের জায়গায় ফিরে পাব। আমি তো একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম, হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম বুঝি সব গেল কিন্তু এখন মনে কিছু একটা হলেও হতে পারে। থ্যাঙ্কস আ লট ধৃতি, যদিও থ্যাঙ্কস দিয়ে তোমায় ছোটো করব না।’

‘না না আমাকে থ্যাঙ্কস জানাবেন কেন? আমি তো আপনার টিমেরই একজন, অবশ্য আদৌ যদি সেটা মনে করেন?’

‘ছি ছি, এসব বলে আমায় আর লজ্জা দিও না। আর তো তোমায় লুকোনোর কিছু নেই, তোমাকে তো সবই বলেছি, এখন তো তুমি সবই জানো।’

কফির কাপটা শেষ করে আমিও একটা সকৃতজ্ঞ হাসি ফিরিয়ে দিই। ভাদুড়ীর কাপটা একটু বেশিই বড়ো। চিনেমাটির কাপটায় ঠোঁট ছুঁইয়ে আমার দিকে ফিরলেন, ‘আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞাসা করি আমাদের শো-টা যদি রাত সাড়ে এগারোটার স্লটে যায়, খুব কি ক্ষতি হবে?’

‘একেবারেই না। বরং ভালো হবে জানবেন, এক্সক্লুসিভ শো-গুলো একটু রাতের দিকে হওয়াই ভালো তাতে ভিউয়ারদের অ্যাটেনশনটা খুব ভালো পাওয়া যাবে। সব জিনিস তো সবার জন্য না, এই শো-এর টার্গেট দর্শকরা রাতটাকেই প্রেফার করে। তাছাড়া আজকালকার যা লাইফ স্টাইল তাতে কটা লোক রাত বারোটার আগে বিছানায় যায় বলতে পারেন?’

‘হ্যাঁ সেটাই ভাবছি। আমি আর জোরজার করলাম না, তাহলে ওই স্লটটাতেই রাজি হয়ে গেলাম। একটু আগেই চ্যানেল কর্তৃপক্ষ ফোন করেছিল। জিজ্ঞেস করল কাজ কতদূর? আমি বললাম এই তো হয়ে এসেছে, আর একটা ছোটো কাজ যা বাকি।’

‘ওহ গ্রেট, তাহলে তো ব্যাপারটা একপ্রকার কনফার্মড, কী বলেন?’

‘হ্যাঁ, তা এখন একরকম বলা যায়।’

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি।

তবে একটা ব্যাপার বেশ ভালো লাগল, চান্দ্রেয়ীর সঙ্গে আমার গড়ে ওঠা নতুন এই নৈকট্যটা নিয়ে কারও দেখলাম বিশেষ মাথাব্যথা নেই, কেউ আমাদের উপর নজরদারি করছে না, আড়িও পাতছে না আশপাশ থেকে। বরং ব্যাপারটাকে বেশ প্রশ্রয়ই দেওয়া হচ্ছে। যাই হোক সবকিছু মিলিয়ে কোথা দিয়ে যে এতটা সময় গড়িয়ে গেল ঠিক নেই। দেখতে দেখতে দিনটা চলে এল, সন্ধ্যে ঘনিয়ে এল অলক্ষ্যে। বাকিরা সব দুপুরের পর থেকেই পৌঁছে যেতে শুরু করেছ স্পটে। সন্ধ্যেবেলায় শেষ লটে উত্তমদার গাড়িতে চান্দ্রেয়ীর সঙ্গে উঠলাম আমরা দু-জন, মানে আমি আর মলয়দা। মলয়দা বসল উত্তমদার পাশে সামনে সীটে আর আমরা বসলাম পেছনে।

চান্দ্রেয়ীকে দেখলাম একেবারে চুপচাপ, মুখে একটা কথা নেই। আমি বকবক করে যাচ্ছি কিন্তু ওর মুখে একটাও কথা ফোটাতে পারছি না। ‘কী হল শরীর খারাপ লাগছে?’ ওর মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করি। ‘না না ঠিক আছি।’ ও ঘাড় নাড়ে, মুখে জোর করে ফুটিয়ে তোলা হাসি। কপালে দু-চারটে ঘামের বিন্দু দেখে আবার বলি, ‘কোনো সমস্যা হলে বোলো কিন্তু...।’

‘নো প্রবলেম ঠিক আছি।’

‘জল খাবে?’

‘না না অ্যাবসলিউটলি ওকে।’

জায়গাটায় কাছাকাছি গিয়ে দেখি মাঝরাস্তায় পি ডব্লু ডির বোর্ড বসিয়ে নো এন্ট্রি জোন করে দেওয়া আছে। স্পটে পৌঁছে তো অবাক, এত পুরোদস্তুর ফিল্ম শুটিং-এর মতো পরিবেশ! হায়দ্রাবাদ থেকে আসা ক্যামেরাম্যান তার হেল্পারদের সঙ্গে নিয়ে চারদিক থেকে বেশ কিছু ক্যামেরা সেট করতে ব্যস্ত। খুব লো লাইটে যাকে বলে স্টার লাইট মোডে কাজ হবে তাই বিশেষ ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। অল্পবয়সী ফ্রেঞ্চকাট দাড়িয়ালা লোকটাকে মনে হল বেশ খুঁতখুঁতে তাই রেডি হতে আরও বেশ খানিকটা সময় লাগবে। বাকি সব কিছু মোটামুটি রেডি কিন্তু এই শুটিংটা হবে সম্পূর্ণ নতুন মেথডে তাই ক্যামেরার পজিশন যতক্ষণ না মনঃপূত হচ্ছে ততক্ষণ ওয়েট না করে উপায় নেই।

সমর রক্ষিত আজ ডিরেক্টরের ভূমিকায়। অরুণ ভাদুড়ী আজ প্রত্যক্ষভাবে কিছু না করলেও টিম লিডার তো শেষমেষ তিনিই তবে মলয়দারও কর্তৃত্ব কম না। আমাদের দিকে এগিয়ে এসে অগাস্টিন মন্ডল আমাদের সারি সারি গাছগুলোর নিচে রাস্তার ধারে পেতে রাখা চেয়ারগুলোর দিকে হাত দেখিয়ে খানিকক্ষণ বসতে বলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সমরদা এগিয়ে এসে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে চান্দ্রেয়ীর পাশে বসল আর আমাকে বলল টর্চটা জ্বালাতে। উরুর উপর হাতের বোর্ডটাকে পেতে ক্লিপ দিয়ে আটকানো কাগজগুলোর উপর পেন চালিয়ে চান্দ্রেয়ীকে বোঝাতে শুরু করল ওকে কী কী করতে হবে। পজিশন মুভমেন্ট আজকের সিকোয়েন্স অফ অ্যাকশন বুঝে নিয়ে মাথা নাড়ে ও। আমাকেও কিছু কিছু জিনিস বুঝিয়ে দেওয়া হয় তারপর কারণ আজ আমার কাজ চান্দ্রেয়ীকে অ্যাটেন্ড করা, শুটিং এর সময় ওর পাশে পাশে থেকে ওকে প্রয়োজন মতো সাহায্য করা ইত্যাদি।

কিছু গাড়ি ভাড়া করে আনানো হয়েছে। অতিপ্রাকৃতিক উপস্থিতিতে অ্যাক্সিডেন্ট প্রবণ অঞ্চলের প্রতিরূপ তৈরি করতে হবে তাই ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি রাখা হয়নি। অনেকগুলো ফ্যাক্টরকে যুগপৎ পরিচালনা করিয়ে যথেষ্ট ডিফিকাল্ট শ্যুটিং তাই সময় তো একটু লাগবেই। হাত পাঁচ সাতেক দূরে সবাই কাজে ব্যস্ত, চান্দ্রেয়ী আর আমি এখানে একাই বসে আছি। চান্দ্রেয়ী এতক্ষণ স্পিকটি-নট হয়ে বসে ছিল, আচমকা আমার দিকে তাকিয়ে অদূরের ঝোপঝাড়টার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘চলো ওইখানটা গিয়ে দাঁড়াই...।’

‘ওখানে কী করবে?’

‘চলো না দাঁড়াই, এখানটায় সবার চোখের সামনে বোকার মতো বসে থাকতে ভাল্লাগছে না।’

‘আচ্ছা চলো।’ চান্দ্রেয়ীকে নিয়ে এগিয়ে যাই সামনের দিকে।

রোডটার ধারটা বেশ খানিকটা ঢাল মত। গড়ানটা যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে শুরু হয়েছে অনেকটা দূরে এন এইচ থার্টি ফোর পর্যন্ত বিস্তৃত পাটের খেত। আজ অমাবস্যা না কিন্তু কৃষ্ণপক্ষের ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। জাতীয় সড়ক দিয়ে চলতে থাকা আলোর বিন্দুগুলো ছাড়া এখান থেকে আর কোনো আলো চোখে পড়ছে না। ‘আর কতখানি ভেতরে যাবে, সাপখোপ থাকতে পারে।’ ঝোপটা পেরিয়ে আরও আড়ালে যেতে চেয়ে ওকে দ্রুত পায়ে এগোতে দেখে বলি। টাল সামলাতে না পেরে পড়ছিল ডান দিকে, বাঁ-হাত দিয়ে ওর কনুই এর কাছটা ধরে অবধারিত পতন সামলাই।

‘কোথায় যেতে চাইছ? আর কত দূর?’ ভ্রু উঁচিয়ে তাকাই।

‘চলোই না, এই যে বললে অন্ধকারে ভয় পাও না, অন্ধকারেই নাকি বেশি কমফর্টেবল...?’

‘হ্যাঁ সেটা সমস্যা না, কোথায় যেতে চাইছ তো বুঝতে পারছি না।’

‘আরে চলোই না, চলো জমির ওই আলটার উপর গিয়ে দাঁড়াই?’

‘ওদিকে গেলে কী করে হবে, এক্ষুনি যদি ডাক পড়ে?’

‘না না ওসব রেডি করতে শুরু করতে এখনও অনেকটা দেরি আছে। এসো না, এসো।’ প্রায় ছুটে আরও খানিকটা এগিয়ে যায় ও। আমিও পেছনে পেছনে এগিয়ে যাই।

‘এসব কী ছেলেমানুষী হচ্ছে, এই সব ঝোপঝাড় কিন্তু সেফ না।’ আমি টর্চ জ্বালাই।

‘না না টর্চ জ্বালিও না প্লিজ, ওদিকে কারও চোখে পড়লে আমাদের প্রাইভেসিটা নষ্ট হবে।’

আলো নিভিয়ে ওর পিছনে এগোই আরও। কিন্তু এ কী ও তো প্রবল গতিতে আল পথ দিয়ে এগোচ্ছে! ‘ওদিকে কী হল, কোথায় যাচ্ছ?’

‘শ-শ-শ!’ ঠোঁটে তর্জনী ঠেকায় ও, ‘জোরে কথা বোলো না, জাস্ট আমার সঙ্গে এসো। আরও একটু পা চালিয়ে।’

‘মানে, এ কী পাগলামি হচ্ছে? এই অন্ধকারের মধ্যে পাটখেতের মধ্যে দিয়ে এ কোথায় যাচ্ছ? কী করতে চাইছ বলত?’

বলতে বলতে রীতিমত ছুটতে শুরু করে দেয় চান্দ্রেয়ী। আমার তো চোখ কপালে উঠে গেছে, কী বলি, কী করি বুঝতে পারছি না। চিৎকারও করতে পারছিনা। চাপা স্বরে প্রাণপণে ছুঁড়ে দিই গলা, ‘এ কী এভাবে ছুটো না, হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে!’

আলপথ ধরে ছোটা তো দূরে কথা হাঁটারও অভিজ্ঞতা নেই তাই মাঝে মাঝেই থামতে হচ্ছে। সেই সুযোগে গতি বাড়াই আমি, সাত আটটা পদক্ষেপেই ওকে ধরে ফেলি, ‘কী করতে চাইছ তুমি? কী হচ্ছেটা কী?’

‘কী করতে চাইছি বুঝতে পারছ না? পালাতে চাইছি। আর বেশি দূর তো না, আর কিলোমিটার খানেকও হবে না। তারপরেই এন এইচ থার্টি ফোর। পকেটে যথেষ্ট টাকা আছে, যে গাড়িকে বলব তুলে নেবে। একা তো নই, তুমি তো সঙ্গে আছ। সাহায্য করবে না, বিশেষ বন্ধুকে এইটুকু সাহায্য করবে না?’

‘উন্মাদ হয়ে গেছ নাকি? কী বলছটা কী?’ ওর হাতদুটো ধরে জোরে ঝাঁকি দিই, ‘তুমি জানো না কী বলছ, প্লিজ এটা কোরো না। তুমি কিন্তু লোকটার সঙ্গে এত বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা করতে পার না। প্রচুর টাকার ইনভেস্টমেন্ট, সব কিছু একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে, টেলি-শোটা হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, এখন তুমি এটা করতে পারো না।’

‘পারি, বাঁচতে গেলে এটা আমায় পারতেই হবে। এইভাবে আমি বাঁচতে পারব না। আমি স্বাভাবিক জীবন চাই, দুঃখ দারিদ্র্য অভাব অনটন সব সহ্য করতে রাজি কিন্তু আর ভূত সাজতে রাজি নই। এই ভাবে চলতে থাকলে আমি খুব তাড়াতাড়িই পাগল হয়ে যাব।’

‘কিন্তু সেটা আগে বলতে পারতে? আর কাউকে না অন্তত আমায় বলতে পারতে? তাহলে এখানে এলে কেন? ওদের সব কিছু অ্যারেঞ্জ করতে বললে কেন? ওদিকে সব কিছু রেডি, এতগুলো লোকের পরিশ্রম, প্রত্যাশা প্রফেশন আরো কতকিছু এর সঙ্গে জড়িত। বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে, তীরে এসে তরী ডুববে। তুমি এত ইরেসপন্সিবল ভাবতে পারছি না!’ তীব্র ভর্ৎসনার সুরে ঝাঁঝিয়ে উঠি।

‘যা বলার বলো, আমি কিন্তু ডিটারমাইন্ড। আমি এর একটা শেষ দেখে ছাড়ব। এই প্রোজেক্টের ভরাডুবি হোক সেটা আমি চাই, এরা সর্বস্বান্ত না হলে এসব কাণ্ডকারখানা বন্ধ হবে না। এরা সাফল্য পেলে উৎসাহিত হয়ে আরো কত কী যে করবে! এতদিন ধরে ছবিতে ভূত বানিয়ে এসেছে এর পর জ্যান্ত ভূত বানাবে। সে সব ভূতুড়ে কারবার আমার থেকে আমার মাকে কেড়ে নিয়েছে, আমার স্বাভাবিক ছেলেবেলা ছারখার করে দিয়েছে, আমাকে একটা প্রেতাত্মা বানিয়ে ছেড়েছে তার আমি সর্বনাশ চাই।’

‘তোমার মায়ের প্রসঙ্গ কেন তুলছ? তোমার মা কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বামীকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, লোকটার কর্মকাণ্ডতে তাঁর পুরোপুরি সমর্থন ছিল, লোকটার প্রোজেক্ট যাতে সাফল্যের মুখ দেখে তার জন্য উনি সব কিছু করতে রাজি ছিলেন, মরতে অবধি রাজি ছিলেন।’

‘মা মার কাজ করেছেন আমাকেও তাই করতে হবে তার কী মানে আছে? আমি বিজ্ঞানের ছাত্রী, দিনের পর দিন বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে পাবলিকের সঙ্গে প্রতারণা আমি আর বরদাস্ত করব না।’

‘প্রতারণা কে বলল, তাহলে তো বেশিরভাগ এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করে দিতে হয়। এও তো একটা ওয়ার্ল্ড অফ মেক বিলিভ, উইলিং সাসপেনসন অফ ডিসবিলিভ, পাবলিক ডিমান্ড সাপ্লাইয়ের সিম্পল খেলা। তুমিই তো বলেছিলে এটার একটা অন্যরকম থ্রিল আছে...।’

‘এত থ্রিল আমি আর নিতে পারছি না। কোনো ধারণা আছে, আমার মনের ওপর এই ভাবে প্রেত সাজার এফেক্ট কী রকম হতে পারে কোনো ধারণা আছে! একা একা ঘরের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে মাঝে মাঝে মনে হয় যেন শরীরটা হালকা হয়ে আসছে। মনে হয় শরীরের ভর ভার বলতে আদৌ কিছু আছে তো, আমি আদৌ আছি তো? আমি আদৌ মানুষ তো? তখন পা থেকে মাথা অবধি অদ্ভুত একটা শূন্যতা পাক খেয়ে ওঠে, নিজের সারা গায়ে হাত বুলিয়ে দেখি, গায়ে চিমটি কাটি, গালে চড় মারি!’

‘বুঝতে পারছি, একদম বুঝতে পারছি কিন্তু…’

‘বুঝতে পারছ না, কথায় বলে কিছুই বোঝানো যাবে না। কথার আর আমার কাছে কোনো মানে নেই, আমার এখন বাঁচতে ইচ্ছে করে, আর দশটা মানুষের মতো বাঁচতে ইচ্ছে করে, আমাকে বাঁচতে দাও।’ হাত ছাড়িয়ে আবার দৌড়োতে শুরু করে চান্দ্রেয়ী।

‘প্লিজ, আমার কথা শোনো, একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখ। শ্যুটের কথা না হয় বাদ দাও, ওসব লাভ লোকসান পরের কথা কিন্তু এত মানসম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। তোমায় না দেখলে লোকটা দুশ্চিন্তায় দিশেহারা হয়ে যাবে। তুমি আমি দু-জনেই নেই দেখলে অতগুলো লোক পাগলের মতো আমাদের খুঁজতে শুরু করবে। তোমাকে অ্যাটেন্ড করার দায়িত্ব আমার ছিল, এটা তো আমার বেইমানি হয়ে গেল? আমাদের দু-জনের কী ভীষণ বেইজ্জতি বুঝতে পারছ? দলের লোকজনই বাজে অপবাদ দেবে, বিশ্রী স্ক্যাণ্ডাল রটবে, সেটা কি আমাদের দু-জনের পক্ষেই সুইসাইডাল হলো না? সবার সামনে স্যারের তো লজ্জায় মাথা কাটা যাবে! নাঃ আমি ভাবতে পারছি না!’

‘মানসম্মান পরে, আগে তো বাঁচা। আর বেশি রাস্তা নেই, এই তো এসে গেলাম, আর তো কিলোমিটার আধেক। তার পরেই ন্যাশনাল হাইওয়ে, একবার পৌঁছতে পারলে আর কেউ ঠেকাতে পারবে না।’

‘এভাবে পালিয়ে বাঁচা যায় না চান্দ্রেয়ী। কেউ আজ পর্যন্ত পালিয়ে গিয়ে বাঁচতে পারেনি। চলো ফেস করি, দু-জনে মিলে সমস্যাটা ফেস করি। মলয়দাকে অন্তত ফোন করে কিছু একটা ব্যবস্থা করি, যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে। যা হোক কিছু একটা বলে মেকাপ করে নিই…’

‘না না, প্রশ্নই ওঠে না।’ মুহূর্তে গতি থামায়, চকিতে ফিরে তাকায় পিছনে, ‘তুমি ফোনটা স্যুইচড অফ কর, না হয় ছুঁড়ে ফেলে দাও পাটখেতের মধ্যে। যাই করো আর তাই করো আমাকে কিন্তু আর কিছুতেই ফেরানো যাবে না। অর্ধেকটা পথ যখন পালিয়ে এসেছি, আজ আমাকে পুরোটাই পালাতে হবে। আর তুমি যদি আমায় পেতে চাও, আমাকে পালাতে সাহায্য করো।’

‘পেতে তো চাই, চিরজীবনের জন্য পেতে চাই কিন্তু সেটা চোরের মতো পালিয়ে গিয়ে কেন? আর কী কোনো উপায় নেই, সোজা রাস্তা নেই?’

‘না নেই। এতখানি দৌড়ে এসে, এতখানি রাস্তা চলে আসার পর আর নেই। এখান থেকে আর ফেরার রাস্তা নেই। হয় তুমি আমায় শেষ পর্যন্ত সঙ্গ দেবে না হলে এখান থেকে আমায় একা ছেড়ে ওদের ওইদিকে ফিরে যাবে। এই দুইয়ের মাঝামাঝি আর কোনো রাস্তা নেই আর তৃতীয় কোনো রাস্তা নেই।’

‘সব ঠিক আছে, আমি তোমার সঙ্গে আছি, কোনো পরিস্থিতিতেই তোমাকে ছেড়ে যাব না। কিন্তু এটা কি ঠিক হল? এটা কী ঠিক করলে?’

‘ঠিক ভুল আমি জানি না, ঠিক ভুল আমি বুঝি না। আমি শুধু পালাতে চেয়েছিলাম, ঠিক ওই মুহূর্তে পালানোটাই মনে হয়েছিল নিয়তির মারের জবাবে পাল্টা মার দেওয়ার একমাত্র রাস্তা তাই পালিয়ে এসেছি, এখন আর ফেরার উপায় নেই।’

আর ছুটতে পারছে না চান্দ্রেয়ী, জোরে জোরে শব্দ করে হাঁপাচ্ছে তবু থামছে না। ওকে অনুসরণ করা ছাড়া এখন আর আমার কোনো উপায় নেই। হাইওয়ের ধারে পৌঁছে কোনো একটা যানবাহনে উঠে নিরাপদ কোনো গন্তব্যে না পৌঁছোনো পর্যন্ত আপাতত থামার কোনো সুযোগ নেই।

২০

একের পর এক গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছিল মুখের সামনে দিয়ে। অনেকক্ষণ পর্যন্ত কেউ আমাদের লিফট দিতে চাইছিল না। অবশেষে কোনো রকমে বলে কয়ে একটা লরিকে দাঁড় করানো গিয়েছিল। ড্রাইভারের হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে রাজি করানো গিয়েছিল। সেই আমাদের পৌঁছে দিয়েছিল আমার টাউনে। শেষ রাতে দরজায় নক করেছিলাম ছোটো পিসির। তাঁকে যদিও কিছু বলতে হয়নি সে বিষয়টা তাঁর মতো করে বুঝে নিয়েছিল। চান্দ্রেয়ীকে হাসি মুখে ভেতরে নিয়ে গিয়ে ওর জন্য খুলে দিয়েছিল পিসতুতো বোন ঝুমুর পড়ার ঘর।

কিন্তু এদিকে আমি তো উন্মাদের মতো ছটফট করছি, মাথা কাজ করছে না। ছাদে গিয়ে অস্থির ভাবে এ কার্নিশ থেকে ও কার্নিশ পায়চারি করছি, স্নায়ুর চাপ আর বেশিক্ষণ নেওয়া যাচ্ছে না। ওদিকে যে এতক্ষণে কী কেলেঙ্কারিটাই না ঘটে গেছে সেই আশঙ্কায় হাত পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে, সম্ভাব্য ফল কী কী হতে পারে চিন্তা করে বার বার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে।

আচমকা বেপরোয়া একটা সাহস উঠে এল ভেতরে। যা হওয়ার যখন হয়ে গেছে তখন আর যা হয় হোক। শিরদাঁড়া সোজা করে মাথা ঝাঁকি দিয়ে তুলি। এত বড়ো কাণ্ডটা যখন ঘটেই গেছে তখন তার ফল ভোগ করতে পিছপা হলে চলবে কী করে। চোখ বন্ধ আর চোয়াল শক্ত করে প্যান্টের পকেটে পুরে দিই হাত, বার করে আনি ফোনটা ।

অরুণ ভাদুড়ীকে কল করার সাহস বা মুখ এই মুহূর্তে কোনোটাই নেই আমার। বরং মলয় পোদ্দারকে ফোন করা অপেক্ষাকৃত সহজ। বুড়ো আঙুলটা নিয়ে আসি কল বাটনটার উপর তারপর এক কোণে গিয়ে চাপ দিয়ে ফেলি। ওপাড়ের গলাটা উৎকণ্ঠিত বেজে ওঠে, ‘কী ব্যাপার ধৃতি, কাল রাতে হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে গেলে?’

‘আমি ইয়ে মানে...’

‘তুমি না মাঝে মাঝে পারও বটে, এইভাবে না বলে কয়ে কেউ গায়েব হয়ে যায়! শ্যুটের এর পর চারদিক তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তোমাকে কোত্থাও পেলাম না। কী হয়েছিল, কোথায় চলে গিয়েছিলে?’

মলয়দার উদ্বিগ্ন গলা কিন্তু উচ্চারণে প্রত্যাশিত সেই ভয়াবহ উৎসারটা নেই। অতিমাত্রায় শঙ্কিত, অধীর, বিহ্বল গোছের তেমন কিছু মনে হল না। স্বরে একটা রিল্যাক্সড ভাব, আশ্চর্য একটা স্বাভাবিকত্ব কানে অস্বাভাবিক ঠেকল!

‘শ্যুট বলতে, শ্যুট হয়েছে...?’ শুকনো গলা ঝাড়ি।

‘কেন, হবে না কেন? খুব ভালো কাজ হয়েছে, ক্যামেরার লোকটা দুর্ধর্ষ টেক করল। একেবারে ইন্টার ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের কাজ হয়েছে।’

‘মানে, কিন্তু চান্দ্রেয়ী...?’

‘খুব ভালো কো অপারেট করেছে। স্টেডি পারফরম্যান্স। সময়ের সাথে সাথে অনেক ম্যাচিয়োর হয়েছে, আসলে মাথাটা তো খুব শার্প, কিছু বললে চট করে ধরে নিতে পারে। আগে কখনও এত স্বতঃস্ফূর্ত দেখিনি...!’

‘কিন্তু ও তো...!’ ফোন ধরা হাতটা থরথর করে কেঁপে ওঠে আমার।

‘হ্যাঁ, ও শুটিং-এর পর তুমি কোথায় জিজ্ঞেস করছিল। লাস্ট টেকটার সময় থেকেই বলছিল শরীরটা ভালো লাগছে না, মাথা ধরেছে, গা গুলোচ্ছে। চারদিক খুঁজে তোমায় পেলাম না তাই শেষে শাজাহানকে বললাম ওকে বাড়ি নিয়ে চলে যেতে।’

‘মানে, কিন্তু ও তো, মানে...!’

‘মানে আর কী? মানে তো তোমায় জিজ্ঞেস করব। তুমি গেলেটা কোথায়? শ্যুটের আগে ক্যামেরা রেডি করে ওকে যখন ফাইনালি ডাকতে গেলাম তোমাকে তো ওর পাশে দেখলাম না। ওকে তুমি কোথায় জিজ্ঞেস করতে বলল ওই তো ওই ঝোপটার দিকে গেল, বাথরুম টাথরুম করতে গেল বোধ হয়।’

শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল আমার। ঘিলুর মধ্যে কেমন যেন একটা স্পার্ক খেলে উঠল, সারা শরীর নিমেষে ঘেমে উঠল। ‘হ্যাঁ আমি মানে, ওই ইয়ে মানে, ও ঠিকই বলেছে…’

‘শ্যুটিং ফুটিং শেষ হলে অনেক রাত অবধি স্যার আর আমি দাঁড়িয়েছিলাম। স্যার খুব টেনশন করছিল, তোমাকে অন্তত পঞ্চাশবার ফোন করেছি কিন্তু সেটাও তো স্যুইচড অফ করে রেখে দিয়েছিলে। একবার ভাবলাম পুলিশে খবর দিই, তারপর মনে হল তিনি তো আবার নকটারনাল এক্সপ্লোরার বলে কথা। অন্ধকারে কী দেখে আবার কোন দিক ভিড়ে গেছ ঠিক নেই।’ হুম হুম করে চেনা ঢঙে হেসে ওঠে মলয় পোদ্দার।

‘না না চিন্তা তো হবেই, দুম করে ওইভাবে গায়েব হয়ে গেলে চিন্তা তো হয়ই। এক্সট্রিমলি স্যরি, অত রাতে, টানা অতক্ষণের শ্যুটের পর তোমাদের ট্রাবল দিলাম। কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞেস করব মলয় দা, বুকে হাত দিয়ে ঠিক করে বলবে?’

‘হ্যাঁ বল, বুকে হাত দিয়ে কী বলব?’

‘না মানে, ইয়ে বলতে আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছ না তো?’

‘কী নিয়ে ঠাট্টা করব, এর মধ্যে ঠাট্টার বিষয় কী পেলে? কী ব্যাপার বলত! গাঁজা টাঁজা খেয়েছ নাকি? কী বলতে চাইছ বুঝতে পারলাম না।’

‘না না, কিছু না, ঠিক আছে, ঠিক আছে।’

‘কোথায় আছ এখন, তাড়াতাড়ি চলে এসো। ক্যামেরা থেকে মেশিনে নিয়ে তোমায় র ফুটেজগুলো দেখাব, কী নিখুঁত কাজ হয়েছে দেখবে। এবার মনে হয় না কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে, তোমার মতো বিশ্ব খুঁতখুঁতে লোকও কোনো দিকে আঙুল তুলতে পারবে।’

গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না আমার। সারা শরীরটা যেন বিবশ হয়ে গেছে ! তবু কোনো রকমে বলে উঠি, ‘চান্দ্রেয়ী ঠিক আছে তো, ও এখন কোথায়?’

‘ও তো এখন ঘুমোচ্ছে। কাল রাতে মাথা ব্যথাটা ভুগিয়েছে, তাই ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে উঠতে দেরি হবে।’

‘ঠিক আছে ঘুমোক। আমি ও বেলায় যাচ্ছি। স্যারকে বোলো চিন্তা না করতে, আমি ঠিক আছি।’

‘ঠিক আছে বলে দিচ্ছি, কিন্তু তোমার কথাগুলো কী রকম যেন লাগল। ঠিক আছ তো, কোনো সমস্যা নেই তো? সে রকম কিছু হলে বল?’

‘না না একদম ঠিক আছি, অ্যাবসলিউটলি ওকে।’

ফোনটা রেখে ভোম মেরে দাঁড়িয়ে পড়ি। প্রায় প্রস্তরীভূত। এটা কী হল! সব ঠিক-ঠাকই শুনলাম তো? মাথা ঠিক আছে তো? আমি নিজে ঠিক আছি তো? কোনো ঘোরে চলে যাইনি তো। আশিরনখ একটা জোরালো ঝাঁকি তুলে আনি ।

ছাদের সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড়িয়ে নেমে আসি নিচের তলায়। দৌড়ে গিয়ে দরজা ঠেলে ঢুকি ঝুমুর ঘরে। গিয়ে দেখি বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে চান্দ্রেয়ী। মাথায় বালিশ নেই, চুল এলোমেলো, পায়ে ভর্তি ধুলোকাদা। পা টিপেটিপে এগিয়ে যাই, আলতো করে হাত রাখি ওর কপালে। হ্যাঁ এই সে সেই মেয়েটা! আমার স্পর্শের নীচে রক্তমাংসের স্পন্দমান ঈষদুষ্ণ পূর্ণদৈর্ঘ্য বাস্তব। এটা কী করে অলীক হতে পারে? কিন্তু এটা যদি বাস্তব হয়, ওটা তাহলে কী?

হাতটা ওর কপাল থেকে সরাতে দেরি হয়ে গিয়েছিল, ধড়মড় করে উঠে বসে ও। ‘কী হল, কী হল?’ আমাকে ওর কপালে হাত দিয়ে ওই রকম ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকায়।

‘কী হল সেটাই তো বুঝতে পারছি না! মলয়দাকে ফোন করেছিলাম।’

‘কী বলছে, মলয়কাকু কী বলছে?’

‘যা বলছে সে সব আমার কিছু মাথায় ঢুকল না, নাকি আমারই মাথা খারাপ হয়ে গেছে বুঝতে পারছি না!’

‘কেন কী বলল?’

‘বলল কাল রাতের শুটিং নাকি খুব ভালো হয়েছে। তোমার পারফরম্যান্স নাকি দুর্দান্ত আর তুমি নাকি এখন বিকনভিলায় তোমার ঘরের বিছানায় শুয়ে আছ। কাল রাতে শ্যুটিং-এর পর মাথার ব্যথাটা তোমায় খুব ভুগিয়েছিল তাই আমাকে ছাড়াই নাকি তোমায় বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।’

‘কী? মানে...!’ বিছানা ছেড়ে উঠে সটান দাঁড়িয়ে পড়ে চান্দ্রেয়ী ।

‘মানে কী হতে পারে ভাব? আমার সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে, এ কী করে সম্ভব!’

মাথায় হাত দিয়ে বিছানায় বসে পড়ে চান্দ্রেয়ী। এদিক ওদিক উদভ্রান্তের মতো তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে বলে, ‘ফোনটা একটু দাও তো।’

‘কাকে ফোন করবে?’

‘বাবাকে।’

‘আমার ফোন থেকে?’

‘হ্যাঁ। কিছু করার নেই, এত বড়ো স্টেপ যখন নিতে পেরেছি তখন কোনো কঠিন সত্যির সামনে দাঁড়াতেই আর কোনো অসুবিধা নেই।’

ফোনটা বাড়িয়ে ধরতেই, হাত থেকে একপ্রকার প্রায় ছোবল মেরে কেড়ে নিজের মুঠোর মধ্যে নেয় যন্ত্রটা। অরুণ ভাদুড়ীর পার্সোনাল নাম্বারে ডায়াল করে। ওদিক থেকে ভারী গলাটা বেজে ওঠে স্পিকারে, ‘হ্যাঁ ধৃতি, কাল রাতে হঠাৎ ওভাবে উধাও হয়ে গেলে, কী ব্যাপার? যাই হোক, মলয়কে ফোন করেছিলে শুনে আশ্বস্ত হলাম।’

‘ধৃতি না, আমি বলছি বাবা, মুনি।’

‘তুই? এ তো ধৃতির ফোন, তোর কাছে কী করে এল?’

‘আমি ধৃতির কাছেই আছি। ওর কাছ থেকেই সেটটা নিয়ে কথা বলছি।’

‘কী? ধৃতি কি এই বাড়িতে নাকি?’

‘না, আমি ওর এক আত্মীয়র বাড়িতে।’

‘মানে? তুই তো তোর রুমে, আমি সকালে গিয়েও দেখে এসেছি তুই ঘুমোচ্ছিলি।’

‘না আমি ওখানে নেই। ইনফ্যাক্ট আমি ওখানে ছিলামই না, সত্যি কথা বলতে কি আমি কাল রাতে বাড়িই ফিরিনি?’

‘কী বলছিস? রাতে বাড়ি ফিরিস নি মানে? শাজাহান নিজে সঙ্গে করে তোকে বাড়ি নিয়ে এসে আমাকে ফোন করে জানিয়েছে। দেরি করে বাড়ি ফিরলেও, আমি নিজে গিয়ে দেখে এসেছি, তুই ঘুমোচ্ছিলি। রাতে অল্প ওটস ছাড়া কিছু খাসনি, শোয়ার আগে কী কী ওষুধ পড়েছে সব খবরই পেয়েছি।’

‘ভুল দেখেছ, না হয় অন্য কাউকে দেখেছ।’

‘কী আবোল তাবোল বকছিস? মাথার ঠিক আছে তো? দেখ আমার বয়স হয়েছে, এসব হেঁয়ালি আর মাথায় নিতে পারি না।’

‘হেঁয়ালি আমার না মহাকালের কিছুই বুঝতে পারছি না! তুমি নিজে গিয়ে আরও একবার আমার শোয়ার ঘরটা দেখে এস আশা করি ওখানে আমাকে পাবে না। কাল রাত থেকে শুরু করে এখন অবধি আমার ফ্লোরের সবকটা সিসি টিভি ফুটেজ চেক কর। আমি ঘন্টা তিনেকের মধ্যে বাড়ি ঢুকছি।’

‘তুই এখন কোথায়?’

‘তোমার বাড়ি থেকে প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার দূরে। আর একটা কথা, আমি কিন্তু গতকাল রাতে তোমার শ্যুটিং-এ ছিলাম না। শ্যুট শুরু হওয়ার আগেই আমি ধৃতিকে সঙ্গে নিয়ে ওই স্পটটা থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। ধৃতি সেটা চায়নি, আমি ওকে বাধ্য করেছিলাম।’

‘মানে, এসব কী বলছিস, মাথার ঠিক আছে তো?’

‘এক বর্ণও মিথ্যে বলছি না। আর অনুগ্রহ করে এসব কোনো ভাবেই কাউকে জানাতে যেও না, আমাদের এই তিনজনা ছাড়া এই কথাগুলো চতুর্থ কারও কানে যেন না ওঠে।’

‘ঠিক আছে। তুই রওনা দে, যত তাড়াতাড়ি হয় বাড়িতে ঢোক।’

‘আসছি, তুমি থারোলি ভিডিয়ো গুলো চেক কর, আমি আসছি।’

একটা প্রাইভেট কার ভাড়া করে আমরা রওনা দিলাম আধ ঘন্টার ভিতরে। রাস্তা কম নয় কিন্তু ঘড়ির থেকে মন উবে গেছে। সময়ের বোধ বাষ্পীভূত হয়ে মহাশূন্যে মিশে যেতে চাইছে কেবল। খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি, বাইরে থেকে ছুটে এসে যে হাওয়া চুল উড়িয়ে মুখে চোখে এসে লাগছে তাকে আজ বড্ড অচেনা লাগছে। এই আলো হাওয়া পিছন দিকে ছুটে চলা সব দৃশ্যাবলী সব মনে হচ্ছে অচেনা। এই চোখে আগে কখনও দেখিনি, দেখার সুযোগ আসেনি। কেমন যেন মনে হচ্ছে হয় আমি অলীক না এই সব কিছু!

মিনিট চল্লিশের মাথায় ফোনটা বেজে উঠল। অরুণ ভাদুড়ীর নাম্বার। চান্দ্রেয়ীর হাতেই ছিল সেটটা। ওর পাশেই বসে আছি তাই কিছুই কান এড়িয়ে যাওয়ার নয়। গুমরে উঠল গলাটা ‘দেখলাম রে মুনি। কাল রাত এগারোটা তেত্রিশ মিনিট, মানে শাজাহানের বাড়িতে ঢোকার পর থেকে প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুঁটিয়ে দেখলাম আর সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে এল। সব এখন এই দিনের আলো আর রাতের তারার মতো পরিষ্কার।’

‘কী দেখলে? আমার হয়ে কে এসে ঢুকল শাজাহানকাকুর সঙ্গে?’

‘কে আর ঢুকবে, যে এসে ঢুকল সে না চাইলে যে তাকে এ পৃথিবীর কোনো ক্যামেরা যে আর ধরতে পারবে না।'

‘আমি যা ভাবছি তুমিও কি তাই ভাবছ বাবা?’

‘আর কী ভাবব, আর কী ভাবার আছে! কাল শুটিং-এর সময় তাই আমার কেমন খটকা লেগেছিল। ওই রকম সাবলীল তো তুই কোনোদিন ছিলি না। একজন অ্যাথলিট ছাড়া ওই রকম বডি মুভমেন্ট তো কারও থাকতে পারে না, ওই রকম সহজ চলাফেরা…’

স্থির হয়ে আসে চোখের মণি। মুখটা সম্পৃক্ত মেঘের মতো গুরুভার আর ভঙ্গুর। ডুকরে ওঠে চান্দ্রেয়ী, ‘সে তোমার শেষ অবধি পাশে থাকতে চেয়েছে বাবা, কিন্তু আমি এ কী করলাম! আমি যে তোমায় শাস্তি দিতে চেয়েছিলাম, আমার সারা জীবনের সব দুঃখ দুর্ভোগের শোধ তুলতে ভীষণ কোনো একটা শাস্তি…’ আটকে এল বাকযন্ত্র ।

‘শাস্তিই তো আমার প্রাপ্য।’ চিৎকার করে ওঠে লোকটা। ‘এত মিথ্যাচার, নিজের নেশার বশে তোদের দু-জনার জীবন নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলার জন্য চরমতম শাস্তি তবুও সে কেন আমায় ক্ষমা করবে? এই ক্ষমাও কি আমার শাস্তি নয়! আমায় তো ক্ষমা করা যায় না, কোনোভাবে কোনোদিক থেকেই যায় না।’

‘কী জানি, সে হয়তো বুঝেছিল কী ভাবে তোমার হাত পা বাঁধা, একটা রাস্তায় অনেক দূর চলে যাওয়ার পর মানুষ কী রকম অসহায় বুঝতে পেরেছিল!’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ রাস্তা অজগরের মত, ওরা মানুষকে গিলে খায়। তারপর নিজের শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে নিশ্চিন্ত নির্বিকার হয়ে পড়ে থাকে।’ জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ার শব্দ আসে কানে ।

‘বুঝতে পারছি বাবা। যাঁর রক্ত এই শরীরে, তার না বোঝার তো কিছু নেই।’

‘সেই জন্যেই বলছি, সে যা করেছে তুই ভুলেও তা করিস না। আমায় সমর্থন করিস না। আমাদের বিশ্বাস করিস না, এই অজগরগুলো যতই বুড়ো হয় শেষমেষ তো অজগরই, এরা কিন্তু নিজেদের সন্তানদেরও রেহাই দেয় না।’

‘ভয় দেখাচ্ছ না নিজে ভয় পাচ্ছ? ভয় পেয়ো না, তোমার মেয়ে এখন এত বড়ো হয়ে গেছে, তাকে আর তুমি গিলতেও পারবে না, হজমও করতে পারবে না।’

হো হো হাসি ভেসে আসে কানে, পরক্ষণেই গলাটা যেন আটকে আসে অবরুদ্ধ আবেগে, ভেঙে ভেঙে যায়, ‘সে জানি সে জানি। তাই তো ফিরতে বলছি, না হলে বলতাম পালা পালা। একবার যখন পালাতে পেরেছিস আর ফিরিস না, আমার ডেরায় আর ফিরিস না।’

‘ফিরছি বাবা। আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো। শান্ত হয়ে বসো, কোথাও যেও না। আমরা আসছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আসছি।’

‘না না কোথাও যাব না, কোথায়ই বা আর যেতে পারি তোকে ছেড়ে। আয় মা, ধীরে সুস্থে আয়।’

চান্দ্রেয়ী আমার দিকে ফেরে। গাড়ির সিটের গদিতে রাখা ওর নরম বাঁ হাতটার আঙুলগুলো নিখুঁত, আমি আমার দ্বিধাগ্রস্ত আঙুলগুলো বাড়িয়ে দিই ওই দিকে। সেও তার-গুলো এগিয়ে দেয়। মৃদু নড়ে ওঠে ওর ঠোঁট, ‘অজস্র ধন্যবাদ ধৃতি।’

‘ধন্যবাদ কাকে, আমাকে?’ চোখের পাতা কেঁপে ওঠে আমার।

‘আর কাকে?’

‘কাছের মানুষকে ধন্যবাদ জানানো কি ঠিক?’

‘ঠিক না, একেবারেই ঠিক না।’ হেসে ওঠে দীঘল দুটো চোখ। সেই টলটলে মণিদুটি, তলহীন কোনো জলাধার যেন বা একজোড়া শক্তিশালী চুম্বক। আমায় টানছে, শুষে নিচ্ছে। আবার সেই একই রকম অসহায় বোধ করছি, হারিয়ে যাচ্ছি, হারিয়ে ফেলছি নিজেকে কিন্তু আর কিছু করার নেই। হারিয়ে গিয়েও যে এত আনন্দ জানা ছিল না আগে।

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%