শৈলেন ঘোষ

আমি সম্রাট নই। আমার কোনও চোখ-ঝলসানো প্রাসাদ নেই। আমার নেই কোনও সৈন্য-সামন্ত, মন্ত্রী-সান্ত্রি, পাত্র-মিত্র, সভাসদ!
তবে!
আমি এক অসভ্য বর্বর মানুষ। আমার নাম শিজুমন। আমার জন্ম এক পাহাড়ের গুহায়। তোমরা এখন আমার যে-গল্প শুনছ, সে-গল্প আমার অনেকদিন আগের। তখন আমার কত বয়েস বলতে পারব না। একশোও হতে পারে। হতে পারে তারও বেশি। হিসেব কষার মাথা নেই আমার। বলতে পারো, মুখ্যু। আমি শুধু একাই মূর্খ নই, মূর্খ আমাদের দলের অসংখ্য মানুষ সকলেই। তখন আমার জ্ঞান হয়নি। নেহাত ছোট। আমি বড় হয়েছি মায়ের পিঠে শুয়ে-বসে। মায়ের পিঠে বাঁধা ওই যে থলিটা, ওইটাই ছিল আমার ঠাঁই। ধীরে-ধীরে আমার বয়েস বাড়ল। আমি হাঁটতে শিখলুম নিজে-নিজে। তখন আমি জানতে পারলুম, আমাদের কোনও ঘর-বাড়ি নেই। আমরা ভবঘুরে। আমরা ঘুরে বেড়াই পাহাড়ে-পাহাড়ে, গুহায়, উপত্যকায়, দূরের বনে, কাছের জঙ্গলে, এখান থেকে অন্য কোথাও, অন্য দেশে।
পাহাড়। দাঁড়িয়ে আছে মাথা তুলে। পাথরের রাশি। জমাট। কোথাও তুষার ঝলমল করছে তার শিখরে। কোথাও জ্বালামুখ তার চুড়োয়। ধোঁয়া বেরোচ্ছে ধকধক করে। যখন দ্যাখো, তখনই। হাঁটতে-হাঁটতে আমি দেখি। দেখতে-দেখতে অবাক হয়ে যাই। ভাবি, যাচ্ছি কোথায়? দল বেঁধে? আরও কত হাঁটতে হবে? কবে শেষ হবে হাঁটা?
হ্যাঁ, আমরা দল বেঁধেই হাঁটি। জানি না, কেন আমরা ভবঘুরে। জানি না, এই অগুন্তি মানুষ ঘুরছি কতদিন ধরে। আমাদের গায়ে নামমাত্র পোশাক। গাছের ছাল। নয়তো হরিণের চামড়া। হাড়কাঁপুনি শীতে কী কষ্ট। কে যে আমাদের সহ্য করার শক্তি দিয়েছে!
কে বলতে পারে, কেমন করে জ্ঞান হয় মানুষের। ওই মানুষটিকে দ্যাখো! মনে হচ্ছে না, তিনি একটু অন্যরকম? আমার জ্ঞান হলে আমি জানতে পারি, উনি আমাদের নেতা। ওঁর কথা মেনে চলতে হয়। অক্ষরে-অক্ষরে। দেব-দেবীর পুজো উনি ছাড়া আর কারও করার জো নেই। তাই ওঁকে আমরা বলি দেবদূত।
জেনেছি, এই পাহাড় আমাদের দেবী। দেবদূত বলেছেন, সে দেবীর গায়ের রং সাদা। বরফের মতো। বলেছেন, গুহা হল মা-পৃথিবীর জঠর। মানুষের প্রথম জন্ম হয়েছে এই গুহাতেই। গুহারও দেবতা আছেন একজন। তিনি বৃষ্টিরও দেবতা। এমনকী, ঝঞ্জারও। আমাদের দেবদূতের অভিষেক হয়েছে এই গুহারই অন্ধকারে। আমি তাঁর অভিষেক দেখেছি। মনে আছে খুব আবছা।
গুহার দেবতার কী ভয়ঙ্কর মূর্তি। দেখলেই আমার চোখ মুদে যায়। তোমরা দেখলেও ভয়ে কাঁপবে। এ-কথা আমি জোর গলায় বলতে পারি। কী ভীষণ দুটো চোখ তাঁর। ড্যাবড্যাব করছে। ভাটার মতো জ্বলছে। দাঁতগুলো দ্যাখো, কী বিচ্ছিরি! যেন দাঁতে বিষ মাখানো। খোঁচা-খোঁচা নখ। কে বলবে হাত! হাত নয়তো, যেন থাবা। মানুষের রক্ত দেখলে তাঁর নোলায় জল আসে। তাই পুজোর সময় রক্ত না পেলে তিনি ভীষণ খাপ্পা। কী হিংস্র বলো!
গুহার দেবতা যেমন, তেমনই আমরাও। যেমন হিংস্র, তেমনই ঝগড়াটে। আমাদের সবাই বলে যুদ্ধবাজ। লুঠেরা। হ্যাঁ ঠিকই বলে। লুঠতরাজ না করলে আমাদের চলবে কেমন করে! আমরা খাব কী! তাই কেউ আমাদের দেখতে পারে না। দেখলেই দুর-দুর করে তাড়িয়ে ছাড়ে। তবেই বলো, গুহার অন্ধকার ছাড়া আর কোথায় থাকব আমরা? আমরা লুঠ করি খাবার। না-হয় ধনসম্পদ। লুঠ করতে গিয়ে মানুষ মারি। নিজেরাও মরি। এ তো নিত্যদিনের ঘটনা। মারতে-মারতে আমরা হিংস্র হয়েছি। আমরা সকলের বিশ্বাস হারিয়েছি। কাজেই খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে একটু যে শ্বাস নেব দিনের বেলা, তা আর হচ্ছে না। গুহার অন্ধকারই আমাদের ভাল।
তবে লুঠপাট তো আর আমরা ইচ্ছে করলেই করতে পারছি না। আমাদের দেবদূত হুকুম দেবেন, তবে। তবে আমরা যুদ্ধ করব। লুঠ করব। মানুষ মারব। তাঁর হুকুম ছাড়া এক পা-ও এগোবার ক্ষমতা নেই কারও।
আমাদের একজন যুদ্ধ-দেবতাও আছেন। তিনি স্বপ্নে দেখা দেন। দেখা দেন আমাদের দেবদূতকে। তিনি দেবদূতকে বলে দেন কখন যুদ্ধ করতে হবে। বলে দেন, কখন লুকিয়ে থাকতে হবে। তিনি যেমন-যেমন আদেশ করেন, দেবদূত আমাদের তেমন-তেমন করতে বলেন। আমরাও তেমন-তেমন করি। লড়ে যাই। মরি। লুঠ করি। খাই।
তবে গোড়া থেকেই গল্পটা শুরু করি।

আমি তখন খুব ছোট। সে এক অন্ধকার রাত। অন্ধকারে গুহার ভেতরটা থমথম করছে। আমরা তো ছোট। তাই এখন আমাদের ঘুমোবার রাত। আমার মতো ছোট যারা, সবাই ঘুমোচ্ছে। শুধু আমিই জেগে আছি। পড়ে আছি ঘুমের ভান করে। কেন? আমি শুনেছিলুম, আজ যুদ্ধ হবে। আমি আজ যুদ্ধ দেখব। দেখব বললেই তো আর দেখতে পাচ্ছি না। আমরা যে ছোট। ছোটদের যুদ্ধ দেখার হুকুম নেই। তাই আমি মুখ গুঁজে পড়ে আছি চাটাইয়ের ওপর। আমার মা ঘুমোয়নি। মায়ের মতো আরও অনেকের মা-ও দেখতে পাচ্ছে না আমার মুখখানা। জানতে পারছে না আমি ঘুমোচ্ছি, না চোখ পিটপিট করছি। আমি চোখ পিটপিট করে দেখছি, আমাদের দলের জোয়ান মানুষেরা অন্ধকারে ঘুরঘুর করছে গুহার ভেতরে। মুখে কথা নেই তাদের। গুহার অন্ধকারে তাদের মুখ থমথম করছে। আমি আবছা-আবছা দেখতে পাচ্ছি। তোমরা দেখলে বুকের রক্ত হিম হয়ে যাবে। অবশ্য আমার কথা আলাদা। আমি তো এদেরই একজন। আমি এদের রোজ দেখছি। এদের সঙ্গে উঠছি। বসছি। হাঁটছি। মানুষ হচ্ছি। আমি এখন ছোট। আমি জানি, একদিন আমি এদের মতো বড় হব। আমারও হবে ইয়া চওড়া বুকের ছাতি। আমিও হব অমনই দুর্দান্ত। আমিও ওদের মতো যুদ্ধ করব। শত্রুকে মারব তীর-ধনুক দিয়ে। কিন্তু যতক্ষণ না দেবদূত আদেশ করছেন, ততক্ষণ কিচ্ছু করা যাবে না। একটি তীর ছুড়েছ, কি মরেছ।
বাইরে কী ভীষণ শীত। বুকের রক্তও বুঝি ঠাণ্ডায় জমে যায়। গুহার ভেতরটা তবু ভাল। অবশ্য ততক্ষণ ভাল, যতক্ষণ না হাওয়া ঢুকে পড়ছে। তবে মাঝে-মাঝে কি আর ঢুকছে না! হাওয়া ঢুকলে হিহি করে উঠছে সারা শরীর। অন্যদিন গুহার ভেতর আগুন জ্বলে। আজ জ্বলছে না। বোধ হয় আগুন জ্বললে আলো ঠিকরোবে। আর সবাই জানতে পারবে আমরা এখানে লুকিয়ে আছি। সবাই অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করছে দেবদূতের আদেশের জন্য। অন্ধকার। চাপা উত্তেজনা। সবাই ছটফট করছে। ওই দ্যাখো, দলে আমার বাবাও আছে।
হঠাৎ আমি দেখতে পেলুম দেবদূত ব্যস্ত হয়ে ছুটে আসছেন। উদগ্রীব মানুষেরা তাঁকে ঘিরে দাঁড়াল। অন্ধকার গুহায় তাঁর গলার স্বর গমগম করে উঠল। তিনি বললেন, “শোনো হে যুদ্ধ-দেবতার পুত্র-কন্যারা, যুদ্ধ-দেবতা আমায় স্বপ্নে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন, আজ রাত্রেই উপত্যকার মানুষেরা আমাদের আক্রমণ করবে। তারা আমাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। সুতরাং তারা আমাদের আক্রমণ করার আগেই তাদের ওপর আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আর দেরি নয়। এগিয়ে চলো আমার সঙ্গে!”
সেই অন্ধকারে পাহাড় ডিঙোল গুহার মানুষেরা। চলল শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে। চুপিসারে। দেবদূতের সঙ্গে।
গভীর রাত। মানুষেরা ঘুমোচ্ছে ঘরে-ঘরে। নিশ্চিন্তে। অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল এই গুহার মানুষরা সেই ঘুমন্ত মানুষদের ওপর। জ্বালিয়ে দিল তাদের ঘরবাড়ি। লুঠ করল, যা পেল তাই। হত্যা করল, যাকে পেল তাকেই। তারপর ফিরে এল গুহায়। সঙ্গে নিয়ে এল লুঠের মাল। আর, বন্দি করে আনল ক’জন মানুষকে। এরাই বুঝি রুখে দাঁড়িয়েছিল! এরাই বুঝি বাধা দিয়েছিল গুহার জোয়ানদের।
সেই রাত্রেই আমরা পালালুম গুহা ছেড়ে। শীতের রাত। জমাট ঠাণ্ডা। পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙোচ্ছে আমাদের দল। হাঁফাচ্ছে। যেন দম ফুরিয়ে যায়। পৌঁছে গেলুম নিরাপদ জায়গায়। আর-এক পাহাড়ের আর-এক চুড়োয়। ভোরের আকাশ বুঝি দেখতে পাব এবার? কেমন করে দেখতে পাব! কুয়াশায় ছেয়ে গেছে চারদিক। এবার সূর্যদেবকে মানুষের একটি হৃৎপিণ্ড উপহার দিতে হবে। নইলে কুয়াশা কাটবে না। সূর্যদেবও উঠবেন না। সুতরাং একজন বন্দিকে হত্যা করা হল। দেবদূত তার হৃৎপিণ্ড উৎসর্গ করলেন সূর্যদেবকে। কুয়াশা কাটল। ঝলসে উঠল আকাশ। দেখা দিলেন সূর্য। কিন্তু আমাদের দলের অনেক মানুষকে আর দেখা গেল না।
কেন?
কাল রাতের সেই যুদ্ধে তারা প্রাণ দিয়েছে। হয়তো বা অন্ধকারে পাহাড় ডিঙোতে গিয়ে তাদের প্রাণ গেছে। কেউ জানে না কেমন করে হারিয়ে গেছে তারা। কেউ জানতেও চায় না, মানুষ মরল, না বাঁচল। এখানে প্রাণের কোনও দামই নেই। প্রাণ নিয়ে কেউ মাথাও ঘামায় না। অত কী! আমাদের যুদ্ধ-দেবতাকেও সন্তুষ্ট করতে কত মানুষের যে প্রাণ যায়! রোজ।
যুদ্ধ-দেবতা আমাদের ঝড়েরও দেবতা। তাঁর বাঁ পায়ে বাঁধা খঞ্জনা পাখির পালক। সঙ্গে একটা লকলকে সাপ। হাতে একটা বেঁকাতাড়া লাঠি। মুখের ওপর নীল রং দিয়ে ডোরাকাটা। গালে একটা পোড়া চিহ্ন। যুদ্ধ-দেবতার জন্মও হয়েছিল ভারী অদ্ভুতভাবে। তাঁর মা ছিলেন খুব ধার্মিক। খুব সৎ। যুদ্ধ-দেবতা জন্মাবার আগেই তাঁর একটি মেয়ে জন্মেছিল। আর জন্মেছিল তাঁর চারশোটি ছেলে। একদিন হয়েছে কী, মা তখন পুজো করছেন। হঠাৎ আকাশ থেকে একটা পালকের মুকুট ছিটকে পড়ল। পড়ল, তাঁর কোলে। তারপরেই দেখা গেল, তিনি একটি পুত্রের জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু সে-পুত্রটি মোটেই শিশু নয়। হৃষ্টপুষ্ট একজন জোয়ান মানুষ। তার বুকে একটি নীল রঙের বর্ম। মাথায় খঞ্জনা পাখির পালকের তৈরি মুকুট। বাঁ হাতে একটি বর্শা। বীরের মতো বুক ফুলিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন।
ব্যস, তাকে দেখেই মেয়ে রেগে টং! মেয়ে তক্ষুনি তার চারশো ভাইকে ডাক দিল। চিৎকার করে বলল, “শোনো, আমার বীর ভাইয়েরা, মা কাজটা ভাল করেননি। তিনি আমাদের মুখে চুনকালি দিয়েছেন। সুতরাং মাকে এক্ষুনি কেটে ফেলো!”
যেই না এই কথা শোনা, যুদ্ধ-দেবতা, যাঁর এইমাত্র জন্ম হল, ঝাঁপিয়ে পড়লেন বোনের ওপর। চোখের পলকে মেরে ফেললেন বোনকে। তারপর একাই লড়ে গেলেন চারশো ভাইয়ের সঙ্গে। সে কী ভীষণ লড়াই। চারশো ভাইকে কেটে টুকরো-টুকরো করে ফেললেন। তারপর হলেন আমাদের নেতা। সেই থেকে আমাদের রক্ষা করে আসছেন। আর তাঁরই ইচ্ছামতো দেবদূত আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন এক দেশ থেকে আর-এক দেশে। আমাদের হাঁটার যেন শেষ নেই।
কিন্তু আমি জানি, সবাইকে রক্ষা করলেও, যুদ্ধ-দেবতা আমার বাবাকে রক্ষা করতে পারেননি।
আমাদের এখানে দু-দুটো আগ্নেয়গিরি আছে। যখনকার কথা বলছি, তখন আমাদের দল চলেছে আগ্নেয়গিরির গা ঘেঁষে। যুদ্ধ-দেবতার আদেশে। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে সারাদিন, সারারাত শুধু ধোঁয়াই বেরোচ্ছে। মিশে যাচ্ছে আকাশে। ওই মেঘের গায়ে। আমি হাঁটছি, আর আনমনে দেখছি। ঠিক তখনই একটা ভয়ঙ্কর শব্দে আমার বুক কেঁপে উঠল। মনে হল, পাহাড়টাই বুঝি ধসে পড়েছে। তারপরেই দেখি, আলোর ঝলকানি। আমার চোখ ঝলসে গেল। একটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে আগুন বেরিয়ে আসছে! দাউ-দাউ করে। সঙ্গে-সঙ্গে আকাশটা মেঘে ঢেকে গেল। গর্জে উঠল মেঘ। ছুটে আসে বাতাসের ঝাপটানি। তারপর শুরু হয়ে গেল ঝড়। পাহাড়ের ওপর তুলকালাম কাণ্ড। ঝড়ের সঙ্গে শিলাবৃষ্টি। আমাদের দেবদূত চেঁচিয়ে উঠলেন, “পালাও, পালাও! ঝড়ের দেবতা আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছেন। আর রক্ষে নেই। যে যেদিকে পারো পালাও!”
সঙ্গে-সঙ্গে লেগে গেল হুড়োহুড়ি। অত বড় দলটা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল নিমেষে। পাথর টপকে যে যেদিকে পারল মারল ছুট। যেই সবাই ছুট মারল, অমনই আগ্নেয়গিরির মুখের ভেতর থেকে ছিটকে বেরোতে লাগল থান-থান পাথরের ইট। একটা মাথায় পড়েছে কি মরেছ। মাথা বাঁচাবার জন্য হুড়ুদ্দুম শুরু হয়ে গেল। তবু যদি এখানে গাছগাছালি থাকত! থাকলে, চেষ্টা করা যেত বাঁচবার। পাহাড়ের ঢালু পেরিয়ে আরও অনেকখানি নামতে হবে। তবে পাওয়া যাবে পপলার আর উইলোর বন। পাওয়া যাবে পাইন বনও। কিন্তু এখান থেকে ওখানে নামা কি সহজ কাজ! অথচ না-নেমে উপায়ও নেই। যতই ছুটছি, ঝঞ্ঝার দাপটও ততই বাড়ছে। আমি মায়ের হাত ছাড়িনি। মা আমাকে রক্ষা করছে। কখনও পাথরের আড়ালে মা আমাকে লুকোচ্ছে। আবার কখনও আমাকে টানতে-টানতে ছুটছে। কখনও মা বসে পড়ছে। মায়ের দুটো হাত আমার মাথায়। যেন না পাথর এসে লাগে। কখনও দাঁড়িয়ে উঠে আমাকে আগলে ধরছে নিজের কোলের কাছে। না, না, আমি আর পারছিলুম না। ঝড়ের ঝাপটা যেন সারা গায়ে খামচি দিচ্ছে। কী ভয়ানক ঠাণ্ডা। আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, “মা, বাবা কই?”
মা হাঁপাতে-হাঁপাতে উত্তর দিল, “জানি না।”
হ্যাঁ, সত্যিই। সেদিন থেকে আর কোনওদিন জানতে পারিনি আমার বাবা কোথায় গেছে। বুঝি হারিয়ে গেছে! হারিয়ে গেছে, না কুচ্ছিত ঝড়ের দেবতা বাবাকে ছিনিয়ে নিয়েছে আমাদের কাছ থেকে? কে জানে?
হ্যাঁ, এই ফাঁকে বলে রাখি, আমাদের আর-এক দেবতা আমার মাকেও কেড়ে নিয়েছেন আমার কাছ থেকে। সেই আমার ভীষণ কষ্টের গল্পটাই এবার শোনাব তোমাদের। এই দেবতা ছিলেন ভারী নিষ্ঠুর। ভারী নির্দয়। তাঁকে বলা হত অনিষ্টের দেবতা। মানুষের তিনি যেমন অনিষ্ট করতেন, তেমনই তিনি জাদুও জানতেন। তাই তাঁকে আমরা বলতুম জাদুকর। মানুষের ভাল করা দূরে থাক, এই জাদু দিয়ে তিনি মানুষকে মেরে ফেলতেন। আবার তাঁকে বলা হত গনগনে রোদের দেবতা। রোদের তেজে তিনি জমির ফসল ঝলসে দিতেন। দুর্ভিক্ষ লেগে যেত দেশে। সব ছারখার হয়ে যেত। মানুষ মরত অনাহারে। আর এই জাদুকর দেবতা তাই দেখে, দু’ হাত তুলে নাচানাচি করতেন। অবশ্য তাঁকে দেখাও যেত না যখন-তখন। ছোঁয়াও যেত না ইচ্ছেমতো। কখনও-সখনও তাঁকে দেখা যেত একটা উড়ন্ত ছায়ার মতো। কিংবা যেন একটা বিকট চেহারার পিশাচ। নয়তো, একটা হিংস্র জাগুয়ার। এই দেবতা স্কন্ধকাটা সেজে রাতের অন্ধকারে ঘুরে বেড়াতেন। তখন তিনি পরতেন একটা ছাই রঙের পোশাক। হাতে থাকত তাঁর নিজেরই কাটা মাথাটা। কী ভয়ানক! কোনও ভিতু মানুষ হঠাৎ দেখলে আর রক্ষে ছিল না। সটান অক্কা যেত সে।
হ্যাঁ, এই অনিষ্টের দেবতাকে সবাই ভীষণ ভয় পেত। তাই তাঁকে তুষ্ট করার জন্য মানুষের চেষ্টাও কম ছিল না। কেমন করে মানুষ তাকে তুষ্ট করত সেই কথাটা বলি এবার।
আমাদের এখানে যুদ্ধ লেগেই ছিল। কথায়-কথায় যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধ করতে গিয়ে মানুষ মরত যেমন, বন্দি হতও তেমন। এই বন্দিদের মধ্যে যাকে দেখতে ছিল সবচেয়ে সুন্দর, তাকে সাজানো হত আরও সুন্দর করে। তাকে গান শেখানো হত। বাঁশি বাজাতে শেখানো হত। ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হত তার সারা অঙ্গ। আর, কী তার পোশাক! ঝলমল করছে। দেখলে, চোখ ঝলসে যাবে। আটজন ছেলে সব সময় তৈরি থাকত তার হুকুম শোনার জন্য। পুরো একটা বছর ধরে এমনই আদর আর যত্নে তার মনকে আনন্দে ভরিয়ে রাখা হত। কত নাচ, কত উৎসব তাকে নিয়ে।
তারপর?
তারপর হত কী, ঠিক একটি বছর পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হত মন্দিরে। খুব জাঁকজমক, শোভাযাত্রা করে। সে শোভাযাত্রায় কত যে মানুষ যোগ দিত, গুনে শেষ করা যায় না। শুধু মানুষের মাথা আর মাথা। মন্দিরে পৌঁছে তাকে শোয়ানো হত সবচেয়ে উঁচু চত্বরে। তারপর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত পুজো-টুজো করে তার হৃৎপিণ্ডটা উৎসর্গ করত অনিষ্টের দেবতাকে। অনুষ্ঠানের একটু এধার-ওধার হওয়ার জো ছিল না। তা হলেই সর্বনাশ! কার যে গর্দান নেবেন তিনি, কেউ জানে না। যখনই মানুষের অনিষ্ট করার ইচ্ছে হত তাঁর, উড়ন-ছায়ার ভেক ধরতেন। ধরেই তিনি শুরু করে দিতেন সর্বনাশা ভেলকির খেলা। এমনই এক সর্বনাশা ভেলকির খেলা তিনি সেদিনও করেছিলেন। উড়ন-ছায়ার ভেক ধরে তিনি নাচতে শুরু করে দিলেন। এমনই মজা, সেই নাচ দেখে আমরা কেমন আনমনা হয়ে গেলুম। দলে-দলে মানুষ সেই ছায়ার সঙ্গে নাচতে শুরু করে দিল। সেই দলে মা ছিল। আমিও। সেই ছায়া নাচতে-নাচতে গাইতেও শুরু করে দিল। আমরাও নাচতে-নাচতে গাইতে লাগলুম। মন্ত্রমুগ্ধের মতো। নাচতে-নাচতে সেই ছায়া এগিয়ে চলল। আমরাও তার পিছু নিলুম। আমরা তার সঙ্গে চলে এলুম নদীর তীরে। গানে গলা মিলিয়ে, আর নাচে পা মিলিয়ে আমরা নদীর তীর পেরিয়ে উঠে পড়লুম সাঁকোর ওপর। নদীর বুকে। ছায়া নাচছে শুন্যে। আমরা নাচছি সাঁকোর ওপর। ছায়া গান গাইছে বাতাসে সুর ছড়িয়ে। আমরা গান গাইছি নাচের তালে সাঁকোর পলকা কাঠের ওপর। সে কী হুল্লোড়। অসংখ্য মানুষ যেন পাগলের মতো দিশেহারা হয়ে লাফালাফি করছে।
তারপরেই মড়-মড়-মড়াত।
পড়-পড়-পড়াত।
ভেঙে গেল সাঁকো। অত মানুষের অত ভার সইতে পারেনি সাঁকো। আমরা হুড়মুড়িয়ে সবাই ছিটকে পড়লুম জলের ভেতর। অনিষ্টের দেবতার উড়ন-ছায়াটা ‘হা-হা-হা’ করে হেসে উঠল শুন্যে। আমরা জলের তলায় তলিয়ে গেলুম। আমি এতক্ষণ মায়ের কাছে-কাছে ছিলুম। কিন্তু সাঁকো ভাঙতে কে যে কোথায় ছিটকে গেলুম, আর দেখতে পেলুম না। আমি জলে পড়ে ‘মা-মা’ করে আর্তনাদ করে উঠলুম। কিন্তু মায়ের কোনও সাড়াই পেলুম না। আমি জলে হাবুডুবু খেতে-খেতে কোথায় যে ভেসে গেলুম, নিজেও জানি না। কেননা, আমার জ্ঞান ছিল না।
অনেকক্ষণ পর আমার জ্ঞান এসেছিল। আমি বুঝতে পারলুম, নদীর তীরে আমি গড়াগড়ি খাচ্ছি। কেউ কোথাও নেই। নদীর জলে রাতের আকাশ ছায়া ফেলেছে। অনেক তারার আকাশ। আমি ধড়ফড় করে উঠে পড়লুম। জলের ছলাতকার ছাড়া কানে আর কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। কোথায় গেল সেই অত মানুষের হুল্লোড়! কোথায় গেল অত নাচ, গান! তার একটু রেশও আর নেই। হঠাৎ বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। মনে পড়ে গেল মায়ের কথা। কোথায় গেল আমার মা? ‘মা’ বলে ডাক দিয়ে, আমি প্রায় চিৎকার করে উঠেছিলুম। কিন্তু পারলুম না। আমি চিৎকার করার আগেই কে যেন হেসে উঠল! বিচ্ছিরি গলায়। আমি চমকে তাকালুম। এদিক-ওদিক। কাউকে দেখতে পেলুম না। শুধু একটা ভয়ঙ্কর প্রতিধ্বনি শুনতে পেলুম সেই হাসির। হাসির প্রতিধ্বনি নদীর এ-কূল থেকে ও-কূল তোলপাড় করতে লাগল। অন্ধকারে। কী কর্কশ সেই হাসি। আমার কান বুঝি ফেটে যায়! আমি দু’ হাতে দু’ কান চেপে তারস্বরে চিৎকার করে মাকে ডাক দিলুম, “মা-আ-আ-আ!”
সেই হাসিও অমনই দ্বিগুণ জোরে শব্দ তুলল, “হা-হা-হা।”
আমি ভয় পেলুম। উঠে দাঁড়ালুম। নদীর কিনারা ছেড়ে ছুটতে গেলুম। পারলুম না। তবু বারবার চেষ্টা করলুম। টলতে-টলতে হাঁটতে লাগলুম। হাসিটাও আমার পিছু নিল। আমি এবার হনহন করে হাঁটলুম। বুক আমার দুরুদুরু কাঁপছে। আরও জোরে যে হাঁটতে পারছি না। এমন সময়ে মনে হল, সেই হাসি আমার চেয়েও আগে চলেছে। চলতে-চলতে সেই হাসি থমকে থামল। একেবারে আমার সামনে। আমিও থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লুম। সঙ্গে-সঙ্গে অদৃশ্য সেই কর্কশ গলার শব্দ হুঙ্কার ছেড়ে বলল, “কোথায় যাচ্ছিস?”
আমি ভয়ে প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলুম। ভয়-জড়ানো গলায় বলে উঠলুম, “মায়ের কাছে।”
সে আবার হাসল। হাসতে-হাসতে বলল, “তোর মাকে আর খুঁজে পাবি না।”
“কেন?” শিউরে উঠলুম আমি।
“তোর মাকে আমি পাথর করে দিয়েছি।” যে হাসছিল, সে হাসতে-হাসতেই বলল।
“না-আ-আ-আ!” আমার গলায় আতঙ্ক। আমারও গলার শব্দ ভেসে গেল নদীর এপার থেকে ওপারে।
তারও হাসির শব্দ আমার গলার শব্দকে ছাপিয়ে চারদিক কাঁপিয়ে তুলল। তারপরেই তার মূর্তিটা আমার চোখের ওপর ভেসে উঠল। শূন্যে। আমি ভয়ে জবুথবু হয়ে তার মুখের দিকে তাকালুম।
সে বলল, “আমি জাদুকর। তোরা বলিস অনিষ্টের দেবতা। তোর মাকে আমার জাদুর শক্তিতে পাথর করেছি। সে এখন নদীর জলে হাবুডুবু খাচ্ছে। তুই বেঁচে গেছিস। কিন্তু ভাবিস না তুই বেঁচে থাকবি! তোকে আমি বাঁচতে দেব না। তুই এখন নেহাতই ছোট আছিস। তোর কলিজাটার ওপর আমার লোভ। ওইটি আমার চাই! একবার চেয়েছি যখন, তখন আর নিস্তার নেই।”
আমি জানি, সত্যিই আমার আর নিস্তার নেই। কেননা, অনিষ্টের দেবতার চোখ যার ওপর একবার পড়ে, তাকে মরতেই হয়। সুতরাং আমাকেও মরতে হবেই। মরতে যখন হবেই, তখন দেবতাকে ভয় পাওয়ার আর কী আছে আমার! হঠাৎ কে যেন আমার মনে সাহস দিল। মন বলল, “আর কেঁদে-ককিয়ে কোনও লাভ নেই। রুখে দাঁড়াও! দ্যাখো না কী হয়!”
মনের কথা শুনে আমি চোখের জল মুছে ফেললুম। নির্জন নদীর তীর। আমার গলার স্বরকে কঠিন করে চেঁচিয়ে উঠলুম, “আপনি কেমন দেবতা! একটা ছোট্ট ছেলেকে ভয় দেখান একা পেয়ে। নেমে আসুন শূন্য থেকে। সাহস থাকে মাটিতে দাঁড়ান আমার মুখোমুখি। শক্তি থাকে আপনি নিজের হাতে আমার কলজেটা উপড়ে নিন। আর তা যদি না পারেন, মিথ্যে গলা ফাটিয়ে হম্বিতম্বি করে কোনও লাভ নেই।”

আমার কথা শেষ হতে-না-হতেই অনিষ্টের দেবতা, মানে সেই জাদুকর এবার সাঙ্ঘাতিক গর্জন করে হেসে উঠল। তাঁর সেই হাসির শব্দে অন্ধকার আকাশে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। গাছগাছালি মাথা ঝাঁকিয়ে ঝরঝর করে ঝাঁকি দিল। আমার পায়ের তলার মাটি থরথর করে কেঁপে উঠল। তারপরেই আমার চোখে ছিটকে এল একটা আলোর ঝলকানি। ঝলকানি ঝলসে উঠতেই আমার চোখের পাতা বুজে গেল। চোখ খুলতেই দেখি, আমার সামনে, মাটিতে দাঁড়িয়ে অনিষ্টের দেবতা। মুখখানা তাঁর ঠিক একটা ভাল্লুকের মতো। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। মুখে কালো আর হলদে রঙের ডোরাকাটা। দেহখানা যেন আলকাতরায় চোবানো। দু’পায়ে তাঁর ঘন্টি বাঁধা। তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে দু’পা তুলে লাফিয়ে উঠলেন। ঝনঝন করে তাঁর দু’পায়ের ঘণ্টি বেজে উঠল। আমি আঁতকে উঠলুম। তিনি ভীষণ হাঁকার দিয়ে বললেন, “এবার দেখতে পাচ্ছিস অনিষ্টের দেবতাকে? আমার কাছে তুই একটা পুঁচকে উচ্চিংড়ে। আমাকে তোর গায়ে হাত দিতে হবে না। আমার চোখ দুটো এক্ষুনি যদি জ্বলে ওঠে, তুই দাউ-দাউ করে পুড়ে মরবি। আমার পায়ের ঘণ্টা যদি আর-একবার বেজে ওঠে, তুই মাটির নীচে তলিয়ে যাবি। ওই মাটির নীচে অন্ধকারে তুই খিদের জ্বালায় ছটফট করবি। একটুকরো আলোর জন্য হাঁকপাঁক করে হাঁপাবি। তারপর ওই জমাট অন্ধকারটা যখন তোকে জাপটে ধরবে, তোর বুক ফেটে দম বন্ধ হয়ে যাবে। তোকে কেউ দেখতেও পাবে না। তোর কথা কেউ জানতেও পারবে না। তুই মরে পড়ে-পড়ে পচবি।”
তবে আর কী। কিসের তোয়াক্কা এই দেবতাকে! মরতেই যখন হবে তখন দুটো কথা শুনিয়ে দিতে দোষ কী। আমি সেই কথা ভেবেই চেঁচিয়ে উঠলুম, “শুনুন, হে অনিষ্টের দেবতা, আপনি ভাববেন না, আপনার ওই বিদঘুটে মূর্তি দেখে আমি ভয়ে মূর্ছা যাব। এবার দেখান আপনার জাদুবিদ্যার কেরামতি! বাজান আপনার পায়ের ঘণ্টা! দেখি কে আমাকে পাতালে বন্দি করে!”
“ওরে ছেলে, তোর এত দুঃসাহস!” দেবতার মাথায় যেন খুন চাপল। ঝাঁঝালো গলায় হুঙ্কার ছেড়ে তিনি বললেন, “দ্যাখ তবে আমার ক্ষমতা!” বলে তিনি মাটিতে ঠুকে-ঠুকে তাঁর পায়ের ঘণ্টা বাজাতে লাগলেন। বাজাতে-বাজাতে তিনি হাতের চেটোটা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। ফস করে একটা পুতুল কোত্থেকে এসে তাঁর হাতের চেটোর ওপর নাচতে লাগল। আমি অবাক হয়ে গেলুম। অবাক হয়ে দেখতে-দেখতে আনমনে পুতুলটার দিকে এগিয়ে চললুম। কখন যে দেবতার নাগালের মধ্যে চলে এসেছি, একেবারেই খেয়াল ছিল না। হঠাৎ দেখি, তাঁর হাতের পুতুলটা ঝপ করে উবে গেল। দেবতা খপ করে আমাকে ধরে ফেললেন। আমি থতমত খেয়ে গেলুম। দেবতা হেসে উঠলেন। হাসতে-হাসতে আমার চুলের মুঠি ধরে টান মারলেন। আমি বাঁই-বাঁই করে চরকি খেতে লাগলুম। ভয়ে চিৎকার করে উঠেছি। আর চিৎকার করেই বা কী লাভ! আমার সময় তো ঘনিয়ে এসেছে!
এমনই সময়ে কোত্থেকে একটা দমকা বাতাস ছুটে এল। মারল এক ধাক্কা অনিষ্টের দেবতাকে। দেবতার হাত ফসকে গেল। আমি ছিটকে পড়লুম একদিকে। অন্যদিকে দেবতা হুমড়ি খেয়ে চিতপটাং। আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনিষ্টের দেবতা অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমিও পড়িমরি করে উঠে পড়েছি। আমি শুনতে পেলুম, সেই দমকা বাতাসের সঙ্গে কে যেন অনিষ্টের দেবতাকে শাসাচ্ছেন, “ওহে জাদুকর, অনিষ্টের দেবতা, তুমি আমায় চিনতে পারছ? আমি যুদ্ধের দেবতা। আমি ঝড়েরও দেবতা। তোমার স্পর্ধা তো কম নয়! আমার দলকে আমি নিয়ে যাচ্ছি নতুন পৃথিবীর সন্ধানে। আমাদের যাত্রার মধ্যিখানে তুমি কোথা থেকে হাজির হয়ে আমাদের অনিষ্ট সাধন করতে এসেছ? বেশ কিছুক্ষণ আগে তুমি আমার দলের অনেক মানুষকে নদীর জলে ছুড়ে ফেলে পাথর করে দিয়েছ, তোমার জাদুর ক্ষমতায়। নদীর ওই পাথরের মধ্যে ছেলেটির মা-ও আছে। ছেলেটির মাকে পাথর করে তুমি সন্তুষ্ট নও। তোমার এখন লোভ ছেলেটির হৃৎপিণ্ডের ওপর। কিন্তু শুনে রাখো অনিষ্টের দেবতা, আমি তা হতে দেব না।”
আমি দু’জন দেবতার কাউকে তখন দেখতে পাচ্ছি না। দু’জনেই অদৃশ্য। আমার মনে হল, সেই অদৃশ্য অবস্থায় অনিষ্টের দেবতা রাগে হাঁপাচ্ছেন। হাঁপাতে-হাঁপাতে তিনি গর্জে উঠলেন, “ওহে যুদ্ধের দেবতা, তোমার স্পর্ধা তো কম নয়। তুমি আমার অজান্তে লুকিয়ে-লুকিয়ে আমাকে আঘাত করো! জানো, আমি ইচ্ছে করলে এক্ষুনি এই পৃথিবীটাকে মুঠোভর্তি ধুলো করে দিতে পারি।”
যুদ্ধ-দেবতারও গলা কঠিন হল। তিনিও গর্জন করে বলে উঠলেন, “আমিও ইচ্ছে করলে এক্ষুনি তোমার দেমাক ভেঙে ধুলোয় লুটিয়ে দিতে পারি।”
“দাও, দেখি তোমার কত ক্ষমতা!” বলে সেই অদৃশ্য অনিষ্টের দেবতা পায়ের ঘণ্টা বাজাতে লাগলেন। ঘণ্টার শব্দের সঙ্গে-সঙ্গে দেখি, দেবতা আমার চোখের ওপর ভেসে উঠেছেন। তখন কী বীভৎস মূর্তি সেই অনিষ্টের দেবতার। যেন একটা কালো কুচকুচে দৈত্য। তিনি লাফিয়ে-লাফিয়ে নাচছেন। যতই নাচছেন, ততই মনে হচ্ছে, আকাশ কাঁপছে। মাটিও ফাটছে। আর তাঁর চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরোচ্ছে।
চোখের পলক ফেলতে না-ফেলতেই আমি দেখতে পেলুম আমাদের যুদ্ধ-দেবতাকেও। দেখলুম, তাঁর সারা দেহ দিয়ে ঝড় যেন আছড়ে পড়ছে। যেন লণ্ডভণ্ড করে সব কিছু তিনি ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চান। অনিষ্টের দেবতার চোখের আগুন তাঁকে ছুঁতে পারছে না। যুদ্ধ-দেবতা যখনই তাঁর হাতের বর্শা তুলছেন, বিদ্যুৎ চমকে উঠছে। বিদ্যুতের ঝিলিকে তাঁর নীল দেহটা আমার চোখের ওপর স্পষ্ট ভেসে উঠছে। তাঁর হাতের বেঁকাতেড়া লাঠিটা ঠিক সাপের মতো ফোঁস-ফোঁস করে তেড়ে যাচ্ছে অনিষ্টের দেবতার দিকে।
আমাকে নিয়ে দুই দেবতার লড়াই। আমি ভয়ে চুপসে যাচ্ছি। সেই ধুন্ধুমার লড়াই যতই তীব্র হচ্ছে, কী হিংস্র হয়ে উঠছে তাঁদের মূর্তি। অনিষ্টের দেবতার পায়ে বাঁধা ঘণ্টা এখন আর টুং টুং করে বাজছে না। আকাশ থেকে অনেক বাজ একসঙ্গে মাটিতে পড়লে যেমন শোনায়, ঘণ্টার শব্দ তেমনই শুনতে লাগছে। আমার কান ফেটে যাচ্ছে। যুদ্ধ-দেবতার ঝড়ের দাপট এমন যে, মনে হচ্ছে আমাকে বুঝি কুটোর মতো উড়িয়ে নিয়ে যায়! ঝড়ের দাপটে মস্ত-মস্ত গাছ মড়মড় করে ভেঙে পড়ছে। নদীর জল কূল ভেঙে উপচে পড়ছে। বুঝি সব ভেসে যায়। আমি ভয়ে ছুট দিলুম।
কোথায় ছুটব? যেদিকেই যাই সেইদিকেই যুদ্ধের গর্জন। আকাশ, পাতাল কাঁপছে। দুই দেবতার সেই যুদ্ধ এখনই যে থামবে, তার কোনও লক্ষণ নেই। তবু আমি ছুটছি। যতই ছুটছি, ততই যেন মনে হচ্ছে, অনিষ্টের দেবতার সেই কালো কুচকুচে মূর্তিটা আমার পেছনে তেড়ে আসছে। আর যুদ্ধ-দেবতার হাতে ভয়ঙ্কর সেই বর্শাটা শূন্যে চরকি খাচ্ছে। অনিষ্টের দেবতার দিকে ধেয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ অনিষ্টের দেবতার হুঙ্কারে সামনের পাহাড়ের চুড়োটা খসে পড়ল। আমি ভয়ে থমকে গেছি। এই বুঝি পড়ল আমার ঘাড়ের ওপর। না। আমি বেঁচে গেছি। আমার ঠিক মাথার ওপর দিয়ে সেটা উড়ে গেল। পড়ল একটা খাদের নীচে। আমি আবার ছুটলুম। বুঝতে পারলুম, এবারও আমায় বাঁচালেন যুদ্ধের দেবতা। তাঁর ঝড়ের আঘাতে পাথরটা উড়ে গিয়ে খাদে পড়েছে।

অন্ধকার। অন্ধকারে পাহাড় ডিঙিয়ে আমি ছুটছি। এখন ঠাণ্ডা তার বিষদাঁত দিয়ে যতই কামড় দিক, আমায় ছুটতে হবে। অনিষ্টের দেবতা না ধরে ফেলেন আমায়। তার আগেই আমাকে লুকিয়ে পড়তে হবে। ভেবে পাচ্ছি না, কোথায় লুকোব। ভেবে পাচ্ছি না, দেবতার চোখকে কেমন করে ফাঁকি দেব। সেই দৃশ্যটা একবার চোখ বুজে ভাবো, অনিষ্টের দেবতা আমাকে ধরার চেষ্টা করছেন। চেষ্টা করছেন, যুদ্ধ-দেবতার সঙ্গে লড়াই করতে-করতে। যুদ্ধ-দেবতার ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে অনিষ্টের দেবতা নাকাল হয়ে লুটোপুটি খাচ্ছেন, তবু আমাকে তাড়া করতে ছাড়ছেন না। আমিও মিথ্যে বাঁচার জন্য প্রাণপণে ছুটছি। আকাশে বিদ্যুৎ। মাটিতে অন্ধকারের ছায়া। শূন্যে যুদ্ধের দামামা। আমি একা।
এই যাঃ!
কী হল?
আমার পা পিছলে গেছে, আমি পড়ে যাচ্ছি।
কোথায় পড়ছি?
ওপর থেকে নীচে।
“বাঁচাও!” আমি চিৎকার করে উঠলুম। কিন্তু তার আগেই একটা গর্তের ভেতরে আমি হুমড়ি খেয়ে ছিটকে পড়লুম। উঃ! ভীষণ লেগেছে আমার। বুঝি, হাড়গোড় ভেঙে টুকরো হয়ে গেল। গর্তের ভেতরটা এত অন্ধকার, কিছু নজর করতে পারছি না। কিন্তু বাইরে যে এখনও দুই দেবতার যুদ্ধ চলছে তার হুঙ্কার আমার কানে আসছে। শুনতে পাচ্ছি তাঁদের আস্ফালন।
“কে?” হঠাৎ একটা গম্ভীর গলার শব্দ। প্রতিধ্বনি তুলল, কে-কে-কে?
আমি চমকে উঠেছি। আমার চোখ গর্তের অন্ধকারে। আলোর খোঁজে ছটফট করতে লাগল।
“কে?” তার গলার শব্দ আরও জোরে চিৎকার করে উঠল।
আমি কাউকে দেখতে না-পেয়ে ভয়েময়ে বলে ফেললুম, “আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।”
“এটা আমার কথার উত্তর হল না। আমি জিজ্ঞেস করছি, তুই কে?” সে এবার কড়কে উঠল।
আমি উত্তর দিলুম, “আমি একজন ছেলে।”
“তুই এত উজবুক কেন? তুই যে একটা ছেলে, তা আমি দেখতে পাচ্ছি!” তার গলায় আরও ঝাঁঝ বাড়ল, “কোথাকার ছেলে তুই?”
“আমি হেথাকার ছেলে।” অন্ধকারে মুখ ঘুরিয়ে আন্দাজে উত্তর দিলুম।
“হেথা বলতে?” তার গলা কড়কে উঠল।
“হেথা বলতে, যেথায় আমি পড়ে আছি।”
সে বলল, “হেথাকারই যদি হোস, তবে তোকে আমি চিনতে পারছি না কেন?”
আমি কষ্ট করে উঠে দাঁড়ালুম। উত্তর দিলুম, “সবাই তো সবাইকে চেনে না। আমিও বোধ হয় তোমাকে চিনি না।”
এবার সে ক্ষিপ্ত হয়েই তেড়ে উঠল, “বোধ হয়’ মানে?”
আমি একটুও ভয় না-পেয়ে বললুম, “তোমার গলার স্বরটা আমার কাছে একেবারেই অচেনা। তার ওপর তোমাকে অন্ধকারে দেখতেও পাচ্ছি না। সেইজন্যই ‘বোধ হয়’ বলছি।”
আমার উত্তর শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সে খসখস করে পাথর ঘষতে লাগল। আমার মনে হল দুটো পাথরের ঘষটানি লেগে আগুনের ফুলকি ছিটকে পড়ছে এদিক-ওদিকে। মুহূর্তের মধ্যে সেই ফুলকির ছোঁয়া লেগে ফস করে আগুন জ্বলে উঠল শুকনো পাতায়। সেই আগুনের আভায় তাকে দেখতে পেলুম। একজন জোয়ান মানুষ। চেটাই-এর ওপর বসে আছে। মনে হয় এতক্ষণ শুয়ে ছিল।
“এবার দেখতে পাচ্ছিস?” খুবই তিরিক্ষি মেজাজে জিজ্ঞেস করল সে।
আমি এক মুহূর্তও দেরি না-করে উত্তর দিলুম, “হ্যাঁ।”
“চিনতে পারছিস?”
আমি বললুম, “মনে পড়ছে না।”
সে যেন এবার একটু ঠাট্টা করেই বলল, “আমাকে যার মনে পড়ে না, তার আর কাকে মনে পড়ে?”
আমি সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর দিলুম, “মাকে।”
“তা হলে মাকে ছেড়ে, এখানে অন্ধকারে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস কেন?” তার গলা আবার গাঁক-গাঁক করে উঠল।
আমি রাখঢাক না-করে জবাব দিলুম, “অনিষ্টের দেবতা মাকে নদীর জলে ফেলে দিয়ে পাথর করে দিয়েছেন। মা কোনও দোষ করেনি। এখন আবার আমাকে তিনি মারতে চান। আমিও কোনও দোষ করিনি।”
আমার কথা শেষ হতে-না-হতেই সে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমাকে জাপটে ধরল। আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছি। এ কী! লোকটা এমন করে আচমকা আমাকে ধরে কেন! আমি হাঁকপাঁক করে বলে উঠলুম, “তুমি আমাকে ধরছ কেন?”
সে তেড়ে উঠল, “তুই তো ভারী সর্বনেশে ছেলে! অনিষ্টের দেবতার ইচ্ছেকে তুই অমান্য করিস! তাই বলি আকাশে এমন দুর্যোগ কেন! দেবতার চোখে ধুলো দিয়ে তুই লুকিয়ে বেড়াস! জানিস, তার মনের সাধ না মেটালে তিনি এক্ষুনি পৃথিবী ধ্বংস করে দেবেন!”
“পারবেন না।” বলে আমি তার দু’ হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়াবার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করে দিলুম। বলে উঠলুম, “আমায় রক্ষা করবেন, আমাদের যুদ্ধ-দেবতা।”
সে চমকে উঠল। বলল, “তুই যুদ্ধ-দেবতার দলের সঙ্গে আছিস? শুনে রাখ, আমার দেবতার সঙ্গে তাঁর শত্রুতা। অনিষ্টের যিনি দেবতা, তিনিই আমার দেবতা। তার মানে, তুই আমার শত্রু। তোর আর নিস্তার নেই।” বলে সে আমায় প্রায় চ্যাংদোলা করে তুলে নিল। আমি প্রাণপণে হাত-পা ছুড়তে লাগলুম। কিন্তু তার সঙ্গে যুঝে ওঠার ক্ষমতাই আমার নেই। আমি তো এইটুকু।
সে আমায় সেই অন্ধকার গর্ত থেকে বাইরে নিয়ে এল। দুই দেবতার তুমুল লড়াই তখনও আকাশ-মাটি কাঁপাচ্ছে। লোকটা আমাকে সাপটে ধরে ছুট দিল। ছুটতে-ছুটতে চেঁচাল, “হে জাদুকর, অনিষ্টের দেবতা, আপনি যাকে চান তাকে আমি পাকড়াও করেছি। সে আমার হাতে বন্দি। বন্দিকে নিয়ে আমি মন্দিরে যাচ্ছি। সেইখানে, আপনার মূর্তির সামনে তাকে আমি কোতল করব।” বলতে-বলতে সে যেমন জোরে ছুটছিল, তেমনই জোরে ছুটতে লাগল। আমিও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগলুম।
আমি এখন বুঝতে পেরেছি, যে লোকটা আমায় ধরেছে, সে এখানকারই বাসিন্দা। আমি পরদেশি। লুঠেরা। এই লোকটা বোধ হয় বুঝতে পেরেছে। কাজেই এর হাতে আমাকে মরতেই হবে। আর নিস্তার নেই।
উফ! দুই দেবতার যুদ্ধের কী তেজ! এখনও পাহাড় কাঁপছে। এখনও বজ্রের শব্দে থরথর করছে চারদিক। যুদ্ধের আতান্তর মাথায় নিয়ে লোকটা পাথর ডিঙোচ্ছে। তার হাতের চাপে আমি ছটফট করছি। আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আর বোধ হয় আমার যুদ্ধের দেবতা আমাকে বাঁচাতে পারলেন না। তবু আমি চিৎকার করে উঠলুম, “হে আমার যুদ্ধ-দেবতা, আমাকে বাঁচান!”
হঠাৎ আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। আকাশে কী একটা অদ্ভুত আলো ঝিলিক দিল। আমি সেই আলোয় ঝাপসা চোখে দেখলুম, যুদ্ধ-দেবতার সেই তেড়াবেঁকা লাঠিটা শুন্যে কাঁপছে। তারপর প্রচণ্ড জোরে ছিটকে এসে পড়ল এই লোকটার মাথায়। আমাকে ধরে রাখার আর তার ক্ষমতা নেই। সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল পাথরের ওপর। তার হাত ফসকে আমিও পড়লুম। সে আর নড়ল না। আমি উঠে দাঁড়ালুম। মনে হল, তার প্রাণ গেছে। তার দিকে আমার আর চোখ ফেরানোর সময় নেই। অনিষ্টের দেবতার হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি গোপন আস্তানার খোঁজ করতে লাগলুম এদিক-ওদিকে। ছুটে-ছুটে।
ছুটছি বটে, কিন্তু রাতের এই অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। কার সাধ্য গোপন আস্তানার খোঁজ পায়। এখন যুদ্ধের শব্দ ছাপিয়ে আমার কানে আসছিল পাহাড়ের চুড়ো থেকে লাফিয়ে পড়া জলপ্রপাতের শব্দ। জলপ্রপাত যে কোনদিকে, কোথায়, আমি দেখতেই পাচ্ছি না। দুই দেবতার যুদ্ধের শব্দের সঙ্গে সে-ও যেন পাল্লা দিয়ে ঝরঝর করছে। মনে হচ্ছে, এখনই বুঝি পাহাড়টা ধসে মাটির সঙ্গে মিশে যায়।
“আ-আ-আ!” আমি চিৎকার করে উঠেছি। পাথরে আমার পা হড়কে গেছে। বুঝতে পারলুম, শ্যাওলায় পা পড়েছে। বোধ হয় জলপ্রপাতের জল জমে শ্যাওলা পড়েছে পাথরে। আমি টাল সামলাতে পারলুম না। পাথরে ঠোক্কর খেতে-খেতে সিধে আমি জলপ্রপাতের জলেই পড়লুম। জল ছুটে চলেছে ওপর থেকে নীচে। পাথরে-পাথরে সে জল ধাক্কা খাচ্ছে। কী তার তোড়! সেই তোড়ে হাবুডুবু খেতে-খেতে আমিও ভেসে চললুম। কার সাধ্য সেই তোড়ের সঙ্গে পাল্লা দেয়! আমি যেন একটা কুটো। জলে ভেসে চলেছি উলটে-পালটে। পাথরে ঠুকে-ঠুকে আমার হাড়গোড় বুঝি ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। এখন আর শীত পাচ্ছে না আমার। ভয়ে সে কখনই আমার শরীর থেকে পালিয়ে গেছে। এই যে জলপ্রপাতের বরফ-গলা জল তাও এখন গায়ে লাগছে না। পাহাড় ডিঙিয়ে যে-জল নীচে ছুটে যায়, সে যে কী দুরন্ত, যারা না দেখেছে তাদের বোঝানো যায় না।
আর কতক্ষণই বা আমি যুঝতে পারব জলের সঙ্গে! কতক্ষণই বা বেঁচে থাকব প্রাণে! তবে কি আমাদের যুদ্ধ-দেবতা পারলেন না আমাকে বাঁচাতে! শেষমেশ কি আমারও মায়ের মতো অবস্থা হবে! হয়তো তাই। আমার মনে হল, আমি আর তাকাতে পারছি না। মনে হল, আমি জলের নীচে তলিয়ে যাচ্ছি স্রোতের সঙ্গে। আমি ভীষণ হাঁপাতে লাগলুম। আমার চোখের ওপর রাতের অন্ধকারের চেয়েও আরও গভীর অন্ধকার নেমে এল। আমি আর কিছুই জানি না।

রাত কেটে যখন সকাল হল, তখন কি তোমরা আমাকে দেখতে পেয়েছিলে? দেখতে কি পেয়েছিলে আমার নিঃসাড় দেহটা অনেক পাথরের খাঁজে আটকে দোলা খাচ্ছে?
না, আমার প্রাণ যায়নি। জলে নাকানি-চোবানি খেয়ে আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলুম। যখন আমার জ্ঞান ফিরল, আমি দেখলুম, সকাল হয়েছে। আলোয় ভরে গেছে চারদিক। আলো পড়েছে দূরে-দূরে পাহাড়ের গায়ে, চুড়োয়, বরফের ওপর। নয়তো গাছের মাথায়। আর পড়েছে সফেন জলে। আমি সেই জলের ওপর ভাসতে-ভাসতে আটকে আছি পাথরের খাঁজে। আশ্চর্য, এখনও কেমন করে বেঁচে আছি!
হঠাৎ আমার চোখ পড়ে গেল সেই ভাঙা সাঁকোটার দিকে। শিউরে উঠেছি আমি। মনে পড়ে গেল, অনিষ্টের দেবতা এই সাঁকোর ওপর তাঁর জাদুর জোরে টেনে এনেছিলেন আমাদের। আমি বেঁচে গেছি। মা পাথর হয়ে গেছে। তবে কি এই পাথরেরই একটি আমার মা! আমি জল তোলপাড় করে মাকে খুঁজতে লাগলুম।
এই পাথর থেকে ওই পাথর। ওই পাথর থেকে আর-এক পাথরে হাবুডুবু খাই আমি। কিন্তু খুঁজে পাই না মাকে। কেমন করে পাব? এ তো সবই নিছক পাথর। কোনওটাই তো মূর্তি নয়। কাজেই খুঁজতে-খুঁজতে আমি কাহিল হয়ে পড়লুম। এবার আমার কাঁপুনি এল। জলের ভেতরে আমি ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলুম। আর ভাবতে লাগলুম, এবার আমি কী করব!
এমন করে জলে আর বেশিক্ষণ থাকা যায় না। ঠাণ্ডায় জমে আমিও যদি পাথর হয়ে যাই! আশ্চর্যের কিছু নেই। এখনও যে কেন হইনি, সেইটাই আজব ঘটনা। পারি, চাই নাই পারি আমাকে তীরে ওঠার চেষ্টা করতেই হবে। নদীর তীর জুড়ে পাহাড়ের ঢল। আমি পাথর ছুঁয়ে-ছুঁয়ে এগিয়ে চললুম। জলের স্রোত ভেঙে তীরে ওঠা যে কী দুঃসাধ্য কাজ, যে জানে না তাকে বোঝাব কেমন করে! এই পাথরটা আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে ওই পাথরটা যেই ধরতে যাব, জলের ঝাপটায় হাত ফসকে যায়। একবার নয়, দু’বার নয়, বারবার। তারপর যখন ধরতে পারি তখন আর দম থাকে না।
এমনই করে অনেক পাথর যখন টপকেছি তখন আচমকা নজর পড়ে গেল আকাশের দিকে। দেখি, আমার ঠিক মাথার ওপর একটা ঈগল পাখি সোনালি ডানা ছড়িয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিপদে পড়লে সব মানুষ যা করে আমিও তাই করলুম। তার দিকে চেয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলুম, “বাঁচাও-ও-!”
চেঁচালে কী হবে! পাখির কি সেই সাধ্য আছে যে আমাকে বাঁচায়! কিন্তু আশ্চর্য, আকাশে উড়তে-উড়তে নেমে এল ঈগল। বসল, জলের ওপর মুণ্ডু-তোলা একটা পাথরের ওপর। সে জুলজুল করে দেখতে লাগল আমাকে। আমিও কাতর চোখে তাকাই তার দিকে। এখন জলের ছলাতকারের শব্দ ছাড়া যেমন সব নিস্তব্ধ, তেমনই সেই ঈগলও নিশ্চুপ। আমিও বোবা। কে দিল পাখিকে অমন সোনালি পালক? কী সুন্দর দেখতে লাগছে! হঠাৎ পাখিটা উড়ে গেল। তার সোনা-রং ডানা জলের ওপর ঝিলমিলিয়ে উঠল। নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল আকাশে। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম সেইদিকে। মনে-মনে ভাবতে লাগলুম, এমন পাখি আমি তো আর কখনও দেখিনি!
হি-হি-হি! হঠাৎ কে হেসে উঠল!
তার হাসির সঙ্গে আচমকা জলের ওপর ঢেউ উঠল। আমি চমকে পিছু ফিরলুম। দেখে থমকে গেলুম। আমার পেছনে উনি কে? জলে ভাসছেন? চোখ ঝলসে গেল! এমন রূপবতী, এ কার মা?
আমায় এমন করে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিনি আবার হাসলেন।
আমি কোনও কথা বলতে পারলুম না।
আমাকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে তিনি নিজেই বললেন, “আমি না থাকলে তুই কখন ডুবে যেতিস। তুই যখন এই জলে পড়ে গেলি, সেই তখনই তোকে আমি কোলে তুলে নিলুম।” বলেই তিনি মুচকি হাসলেন। হাসতে-হাসতেই জিজ্ঞেস করলেন, “তুই আমাকে চিনতে পারছিস?”
আমি হাঁ করে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে চেনবার চেষ্টা করলুম। কিন্তু চিনতে পারলুম না।
তিনি বললেন, “তা বটে, তুই আমায় চিনবি কেমন করে? তুই তো আমায় দেখিসনি কোনওদিন। আমি স্রোতের দেবী। এই যে নদী, ওই যে ঝরনা, ওই সমুদ্র, সবাই আমার ছেলেমেয়ে। আমার দাদাই গুহার দেবতা।”
আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। কেননা, আমি তো আগেই বলেছি, গুহার দেবতা ভয়ঙ্কর। যেমন তাঁকে দেখতে, তেমনই তিনি হিংস্র। আমার মতো ছোট্ট যারা, তাদের ওপর ভীষণ লোভ গুহার দেবতার। উৎসবের সময় একটার পর একটা ছেলেকে ধরে এনে বলি দেওয়া হয় গুহা-দেবতার মূর্তির সামনে। তা হলে এবার কি আমার পালা! স্রোতের দেবী এবার কি তা হলে আমাকে তুলে দেবেন গুহা-দেবতার হাতে? আমি ভয়ে কুঁচকে গেলুম।
স্রোতের দেবী আমার মুখের চেহারাটা দেখে বোধ হয় মনের কথাটা বুঝতে পারলেন। বললেন, “এবার কী হবে তোর? কী করবি একা?”
আমার কান্না পেল, অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করল। কিন্তু আমার মুখে একটি কথাও সরল না। চোখ দিয়ে দু’ ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
স্রোতের দেবী আমার চোখে জল দেখে কেমন যেন ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। ভয়-মেশানো একটা চাপা স্বরে বলে উঠলেন, “চোখের জল মুছে ফেল, মুছে ফেল! তুই কি জানিস না আমার দাদার লোভ ওই তোদের মতো ছোট্ট ছেলের চোখের জলের ওপর? লোভ তোদের প্রাণের ওপর? তাই তোদের মতো ছোট্ট ছেলেদের ধরে এনে দাদার সামনে বলি দেওয়া হয়। তোরা মরণের ভয়ে যতই কাঁদিস, দাদার ততই আনন্দ। কেন না, তোদের চোখের জলই বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে আকাশ থেকে। আমার দাদা যেমন গুহার দেবতা, তেমনই বৃষ্টিরও। দাদাকে তাই তুষ্ট করার জন্য তোদের প্রাণ উৎসর্গ করা হয়। তোরা যতই কাঁদবি, ততই বৃষ্টি। বৃষ্টি না হলে ফসল হবে কেমন করে? মানুষ বাঁচবে কী করে?”
আমি থমকে গেলুম। আমার চোখ ভয়ে শুকিয়ে গেল।
দেবী বললেন, “তোকে এবার আমার সঙ্গে যেতে হবে।”
আমি চমকে গেলুম। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “কোথায়?”
উত্তর পেলুম, “আমার আশ্রয়ে।”
ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “কেন?”
তিনি উত্তর দিলেন, “এই পাহাড়ি নদীর আছাড়ি-পিছাড়ি স্রোতে কোনও মানুষ বেশিক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে না। আমি তোকে রক্ষা করেছি এতক্ষণ। এইবার আমার সঙ্গে আমার আশ্রয়ে না-গেলে তুইও ঠাণ্ডায় বরফ হয়ে যাবি।”
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “তোমার আশ্রয় কোথায়?”
তিনি বললেন, “জলের নীচে। সেখানে তোকে লুকিয়ে রাখব।”
“কেন?” ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করলুম।
স্রোতের দেবী বললেন, “তোর জন্য কাল সারারাত যুদ্ধ করেছেন যুদ্ধ-দেবতা, অনিষ্টের দেবতার সঙ্গে। সূর্য ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে যুদ্ধের সেই ভীষণ গর্জন আর শোনা যাচ্ছে না। তাই বলে যেন মনে করিস না অনিষ্টের দেবতা হেরে গেছে! আবার যুদ্ধ হবে। সে যখন গোঁ ধরেছে, তখন সে তোর প্রাণ নেবেই। কিন্তু যতক্ষণ তুই আমার কাছে আছিস, আমি তোকে রক্ষা করব। তোর মা নেই। অনিষ্টের দেবতার কোপে তোর মা পাথর হয়ে গেছে। অনিষ্টের দেবতা ইচ্ছে করলে তার জাদুর জোরে তোকেও পাথর করে দিতে পারে। এখন আমিই তোর মা। আমি পৃথিবীর সব শিশুরই মা। আমি তোদের রক্ষা করি। তুই আয় আমার সঙ্গে।”
আমি বললুম, “হে স্রোতের দেবী, আমি জলের নীচে বাঁচব কেমন করে?”
“আমি তোকে বাঁচিয়ে রাখব। জলের নীচে তোর কোনওদিন প্রাণ যাবে না।” বলে স্রোতের দেবী আমার মাথায় হাত রাখলেন।
আমি আর কোনও কথা বলতে পারলুম না। স্রোতের দেবীর হাত ধরে আমি জলের গভীরে তলিয়ে গেলুম। আর মনে-মনে ভাবতে লাগলুম, স্রোতের দেবী সত্যিই কি পৃথিবীর সব শিশুর মা! কে জানে!
জলের স্রোতে ভেসে-ভেসে অনেকখানি যাওয়ার পর আমার চোখের সামনে ওটা কী দেখা যায়?
একটা মন্দির।
আমি দেখে চমকে উঠেছি। শুধু জল আর জল। সেই জলে ডুব দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি মন্দির। সাদা ঝকঝক করছে।
আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই স্রোতের দেবী বললেন, “ওইটা আমার আশ্রয়। এসে গেছি। আর তোর ভয় নেই। ভেতরে আয়।”
তবুও আমার মন কিন্তু-কিন্তু করছে। কেবলই মনে হচ্ছে, স্রোতের দেবীর মনের ভেতরে অন্য কোনও মতলব নেই তো! অবশ্য থাকলেই বা কী করা! অগত্যা আমি মন্দিরেই ঢুকে পড়লুম। মন্দিরে ঢুকে দু’পা গেছি কি যাইনি, আমার বুকটা ধড়ফড় করে উঠেছে। আমি যেন চোখে অন্ধকার দেখলুম। এ কী! আমার চোখের সামনেই যে দাঁড়িয়ে আছেন গুহার দেবতা। দ্যাখো, ঠিক তেমনই দাঁত বের করে হাসছেন। আমি ভয়ে সিঁটিয়ে গেলুম।
গুহার দেবতা আমার দিকে ডগডগে চোখে তাকিয়ে খকখক করে হাসতে লাগলেন। হাসতে-হাসতে স্রোতের দেবীকে বললেন, “বোন, তোর জন্য আমি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছি। মনে হচ্ছে, ছেলেটার ওপর আমার যে লোভ, এ-খবরটা বোধ হয় তোর কানে আগেই পৌঁছে গেছে! তাই দাদাকে তৃপ্ত করার জন্য ধরে এনেছিস। খুব ভাল! খুব ভাল! দ্যাখ, ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছে এর কলজের স্বাদটা নেহাত মন্দ হবে না।”
“না!” থমকে দাঁড়িয়ে ফোঁস করে উঠলেন স্রোতের দেবী। “তোমার জন্য একে আমি নিয়ে আসিনি।”
“তবে?” যেন অবাক হলেন গুহার দেবতা।
“আমি একে আমার মন্দিরে আশ্রয় দেব বলে নিয়ে এসেছি। ছেলেটির মা নেই। বাবা নেই। অনিষ্টের দেবতা এর মাকে পাথর করে দিয়েছে। নদীর জলে ডুবে আছে এর মা।” বলতে-বলতে স্রোতের দেবী আমাকে আগলে ধরলেন।
গুহার দেবতা খুব জোরে হেসে উঠলেন। হাসতে-হাসতেই বললেন, “এ তো ভাল কথাই। মা নেই যখন, তখন কাঁদবার লোকও নেই। বাবা নেই যখন, তখন বাধা দেওয়ারও কেউ নেই।”
“আমি আছি!” ঝাঁঝিয়ে উঠলেন স্রোতের দেবী।
গুহার দেবতার হাসিমুখটা এবার খানিক ফ্যাকাসে হয়ে গেল। বোনের মুখের দিকে চেয়ে বলে উঠলেন, “তুই কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছিস?”
“না।”
“তবে?”
স্রোতের দেবী বললেন, “আমি যা বলছি, সত্যি বলছি। আমি একে রক্ষা করব। এ আমার সন্তান।”
গুহা-দেবতার সেই ফ্যাকাসে মুখখানা এবার যেন ধীরে-ধীরে লাল হয়ে উঠল। ওই কুচ্ছিত মুখ বুঝি বোনের কথা শুনে রেগে অমন রক্ত-রাঙা হয়ে উঠেছে। হয়তো তাই। তিনি সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠলেন, “শোন রে বোন, ভাল চাস তো ছেলেটাকে আমার হাতে তুলে দে! নইলে তুইও রেহাই পাবি না। ভুলে যাস না, আমি গুহার দেবতা! তোর দাদা আমি। আমায় অমান্য করা মানে, তোর নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা। আমার শেষ কথা, ছেলেটার কলিজা আমার চাই!”
গুহা-দেবতার অমন আস্ফালন দেখে স্রোতের দেবীর গা কশকশ করে উঠল। দেবীও ক্ষিপ্ত গলায় উত্তর দিলেন, “তবে আমারও শেষ কথা শোনো দাদা, আমি ছেলেটিকে তোমার হাতে কিছুতেই তুলে দেব না। কিছুতেই মরতে দেব না আমি। তোমার মনের যা ইচ্ছে তুমি তাই করতে পারো। তোমার ওই রক্তচক্ষুকে ভয় পাই না আমি। ভেবো না, আমার ক্ষমতা নেই। তোমার দেমাক কেমন করে ভাঙতে হয়, আমার জানা আছে।
স্রোতের দেবীর কথা শুনে গুহা-দেবতা রণমূর্তি ধারণ করলেন। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেখান থেকে একটা লম্বা লাফ মারলেন গুহা-দেবতা। সটান পৌঁছে গেলেন স্রোতের দেবীর একেবারে মুখের সামনে। চোখের পলকে দেবী আমাকে আড়াল করে দাঁড়ালেন। দু’ হাতের থাবা দিয়ে দেবীকে ঠেলা মারলেন গুহা-দেবতা। আশ্চর্য! ঠেলা মারতেই সেই গভীর জলের অতল উত্তাল হয়ে উঠল। কোথা থেকে যে কী হল, আমি কিছুই ঠাওর করতে পারলুম না। দেখতে পেলুম, স্রোতের দেবীর মাথার চুল লণ্ডভণ্ড হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কী প্রচণ্ড স্রোত বইল সেইসঙ্গে। আমি জলের স্রোতে হাবুডুবু খেতে লাগলুম। দেখতে পেলুম না আর কিছুই। মনে হল, বোধ হয় ভাই-বোনে যুদ্ধ লেগেছে। আমি জলের ভেতর ঘূর্ণি-স্রোতে লুটোপুটি খেতে-খেতে ভেসে যাচ্ছি। শতচেষ্টা করলেও এই দুর্দান্ত স্রোত আর ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করি, এমন তাগত আমার নেই। আমায় ভেসে যেতেই হল। ভাসতে-ভাসতে কোথায় যাচ্ছি, জানি না। আমার চোখের সামনে আমি এখন স্রোতের দেবীকেও দেখছি না, দেখছি না গুহার দেবতাকেও। ঢেউয়ের ঝাপটা খেতে-খেতে আমারই চোখের পাতা বুজে আসছে। জোর করে চেয়ে আছি। কখনও দেখতে পাচ্ছি, কখনও পাচ্ছি না। তবে কি জলের ভেতর ঢেউয়ের ঝাপটানিতে আমার প্রাণ বেরিয়ে যাবে! নাকি এমনই ঢেউ তুলে স্রোতের দেবী আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন অজানা কোনও দেশে!
আমি আর বেশিক্ষণ পারিনি জলের সঙ্গে যুঝতে। পারিনি ঢেউয়ের উথাল-পাথাল সহ্য করতে। আমি হারিয়ে গেলুম জলের তলায়। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। দম যেন আটকে আসছে। কিছুই ভাবতে পারছি না আর। আমার আর মনে পড়ল না মায়ের কথা। মনে পড়ল না বাবার কথা। কিংবা মনে পড়ল না আমাদের সেই দলের কথা। সেই দলের সঙ্গে মায়ের হাত ধরে পাহাড় ডিঙোনোর কথা যেমন ভুলে গেলুম, তেমনই ভুলে গেলুম সেই আগ্নেয়গিরির কথাও। তার মুখ দিয়ে দাউ-দাউ করে আগুন জ্বলছে। ধকধক করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। আমি আর চাইতে পারছি না। এমন করে ঘুম কেন জড়িয়ে ধরছে আমার চোখের পাতা! আমি আর চেয়ে থাকতে পারলুম না। বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়লুম। তারপর আর কিছুই জানি না।

অনেকক্ষণ পর আমার ঘুম ভাঙল। অনেকক্ষণটা কতক্ষণ পর, আমি বলতে পারব না। নাকি, অনেকক্ষণটা অনেকদিন, তাও খেয়াল করতে পারছি না। কেননা, তখনও আমি জলের তলায়। জলের তলায় ভাসছি। মাথায় ঢুকছে না, এখন দিন, না রাত। আলো, না অন্ধকার। আমি ধড়মড় করে লাফিয়ে উঠলুম। মিথ্যে লাফাই। জলের ওপরে যে আকাশ, তার ধারে-কাছেও পৌঁছতে পারল না আমার দৃষ্টি। আমি প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলুম। তাও মিথ্যে। জলের ভেতর আমার চিৎকারটা চিৎকার হল কি না, তাই-বা কে বলবে! কিন্তু বোধ হল, এখন আর তেমন বিপজ্জনক প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছি না। ঢেউও নেই। এখানে জল বড় শান্ত। আমি যেন জলের দোলনায় দুলছি। দুলতে-দুলতে ভেসে চলেছি।
কিন্তু কোথায় গেলেন সেই স্রোতের দেবী? আর তো দেখতে পাচ্ছি না সেই গা-ছমছম-করা গুহা-দেবতাকে! তবে কি ভাই-বোনের যুদ্ধ এখনও চলছে? না কি স্রোতের দেবীর রোষে গুহা-দেবতাও জলের তলায় তলিয়ে গেছেন? ভাবতে-ভাবতে আচমকা আমার চোখে ভেসে উঠল যুদ্ধ-দেবতা আর অনিষ্টের-দেবতার সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধের দৃশ্যটা। ভেসে উঠল স্রোতের দেবী আর তাঁর দাদা গুহা-দেবতার ধুন্ধুমার লড়াই-এর ছবিটাও। যুদ্ধ-দেবতা আমায় বাঁচালেন ভালুক-মুখো অনিষ্টের দেবতার হাত থেকে। বাঁচলুম বটে, কিন্তু রেহাই পেলুম না তবুও। এবার মরতে-মরতে বেঁচে গেলুম গুহা-দেবতার থাবা থেকে। বাঁচলুম স্রোতের দেবীর দয়ায়।
কিন্তু এর পর? চারদিক সুনসান। তাঁরা কেউ নেই কোত্থাও। এখন, কেমন করে আমি ভেসে উঠব জলের ওপরে? কে আমায় হাত ধরে তুলবে? কে বলে দেবে পথের দিশা?
এমন সময়ে হঠাৎ আমার চোখে ধাঁধা লেগে গেল। দেখি কী, চারদিকে ফোঁটা-ফোঁটা আলো ভেসে বেড়াচ্ছে জলের গভীরে। ভাসতে-ভাসতে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। কাছে আসতেই আমার গায়ে কাঁটা দিল। দেখি, একঝাঁক মাছ। বীভৎস দেখতে। তাদের চোখ দিয়ে আলো ঠিকরে পড়ছে। আমি রাক্ষসের গল্প শুনেছি। শুনতে-শুনতে রাক্ষসের একটা বিচ্ছিরি ছবি আমার চোখের ওপর ভেসে উঠত। কিন্তু এগুলো যেন রাক্ষসের চেয়ে ভীষণ। তার ওপর এদের চোখে আলো। যেন আগুন জ্বলছে। এই বুঝি আমার গায়ের ওপর পড়ে! আমি পালাতে গেলুম। পারলুম না। দেখি, আমার একেবারে নাগালের মধ্যে অনেক ঘোড়ামুখো জন্তু! কোত্থেকে হাজির হল কে জানে! সাঁতার কাটছে। খুব বেশি হলে আমার হাতের থেকে একটু বড় এই জন্তুগুলো। সরু। লম্বা-লম্বা। একটার গায়ে আর-একটা ল্যাজ জড়িয়ে ভেসে চলেছে দলে-দলে। আমি ভড়কে গেছি। একদিকে চোখে-আলো রাক্ষুসে মাছ, আর-একদিকে ঘোড়ামুখো পুঁচকে জন্তু। আমাকে কামড়ে দেবে নাকি! ভয়ে, জলের ভেতর হাত-পা ছুড়ে আমি লাফাতে লাগলুম। ঘোড়াগুলো ল্যাজ-ট্যাজ গুটিয়ে যে যেদিকে পারল দে-লম্বা। আমি পরে শুনেছিলুম, এদের বলে সমুদ্রের ঘোড়া। এদের ছানাপোনারা মায়ের সঙ্গে ঘুরঘুর করে না। ছানাপোনাদের বাবার পিঠে থাকে একটা করে থলি। এই থলির ভেতর ছানাপোনারা চুপটি করে বসে থাকে। আর এদের বাবা তাদের পিঠে নিয়ে জলে-জলে ঘুরে বেড়ায়।
সে যাই হোক, আমি যে নদীর জলে হাবুডুবু খেতে-খেতে এখন সমুদ্রের জলে ভেসে এসেছি, আমি তখনও সেটা জানতুম না। সমুদ্রের অতলে তখন একটার পর একটা কত যে রকমারি প্রাণী দেখতে পেলুম! একটু আগে জলের ভেতর যেমন রাক্ষুসে মাছ দেখলুম, তেমনই দেখলুম ঘোড়া। এখন আবার দেখতে পেলুম সমুদ্রের সিংহ। সিল মাছ। আমার মতো লম্বা, একজনের মাথায় আর-একজন দাঁড়ালে যতটা ঢ্যাঙা দেখায় ঠিক অতটা বড় একটা সমুদ্রের সিংহ। পাখনা দিয়ে জল কেটে-কেটে অমনই দুটো সিংহ আমার দিকে ধেয়ে আসছে। তাদের কী মূর্তি! দেখলেই গায়ে কাঁটা দেয়! আমি তো আর জলের নাড়ি-নক্ষত্র কিছুই জানি না। কাজেই ওদের হাত থেকে বাঁচার রাস্তাও আমার জানা নেই। এবার আমার মরণ কেউ ঠেকাতে পারছে না।
দেখতে-দেখতে সেই ধুমসো সিংহ দুটো একেবারে আমার ঘাড়ে এসে পড়ল বুঝি! না, আমায় ছুঁল না। আমায় দেখতে লাগল। দেখতে-দেখতে একবার একটা আমার ডান দিকে যাচ্ছে, আর-একটা বাঁ দিকে। একটা পায়ের দিকে যায় তো, অন্যটা মাথার দিকে সাঁতরে আসে। তখন রাক্ষুসে মাছ আর ঘোড়াগুলোকে দেখে আমি জলে লাফালাফি করেছিলুম। তারা ভয়ে পালাল। এখন আমিই ভয়ে জলের ভেতর কুঁকড়ে গেলুম।
এমনই সময়ে হঠাৎ একটা সিংহ সাঁই করে জলের মধ্যে ডুব মারল। মেরেই আমায় ঠেলে দিল। আমি ভুস করে ডিগবাজি খেয়ে উলটে গেলুম। আচমকা এমন একটা কাণ্ড ঘটে গেলে, কে ভয় পায় না বলো? আমি বাঁচবার জন্য আঁকপাঁক করে উঠলুম। সামলে গেছি। দ্যাখো এবার বুঝি আবার ঢুঁ মারে!
না, আর তো মারল না। কী ভাবল কে জানে! আমার দিকে আর চাইল না। কিছু বললও না। সিধে চলে গেল সাঁতার কাটতে-কাটতে। কোথায়, কে জানে! আশ্চর্য, কী অদ্ভুত কায়দায় সাঁতার কাটছে! মাঝে-মাঝে ডুব দিচ্ছে। আবার ভেসে উঠছে! ছিরিছাঁদ কিছুই নেই। দুটো যেন মস্ত-মস্ত পাথরের ডেলা। সাঁতার কাটছে।
আচ্ছা, তোমাদের কি একবারও মনে হচ্ছে না, এই জলের অতলে শ্বাস নিয়ে আমি কেমন করে বেঁচে আছি? তোমাদের যদি এমন ভাবনা মনে আসে, তবে, বলি, আমিও ঠিক এমন কথাই ভাবছি। বটেই তো, আমি বেঁচে আছি কেমন করে, জলে ডুবে? কেমন করে ভাসছি এই গভীর জলের নীচে। তবে কি স্রোতের দেবীর কোনও ইন্দ্রজালের শক্তি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে!
ওই দ্যাখো, একদঙ্গল রংবেরঙের মাছ কেমন রং ছড়িয়ে সাঁতার কেটে ভেসে যাচ্ছে! যেন নাচছে। মুঠো-মুঠো রং। কী সুন্দর দেখতে লাগছে খুদে-খুদে মাছগুলোকে। রঙিন। গায়ের রং দেখলে চোখ ফেরায় কার সাধ্য! একঝাঁক এমনই রং-টুলটুল মাছ আমার দিকে এগিয়ে এল। আমাকে দেখে কি তারা অবাক হল? মাছের মনের কথা আমি আর জানব কেমন করে? কিন্তু একটুও ভয় পেল না। সত্যি বলতে কী, তারা যেন আমায় দেখে আনন্দে লুটোপুটি খেতে লাগল। তারা যেন রং ছড়িয়ে খেলা করছে। মাঝে-মাঝে আমার গা ছুঁয়ে যেন আমায় ডাকছে। বলছে, “এসো না, আমাদের সঙ্গে খেলা করো।”

আমার এখন কী সাঙ্ঘাতিক বিপদ! মুহূর্তের জন্য বিপদের কথা ভুলে অবাক হয়ে দেখতে লাগলুম, মাছেদের সেই রঙের খেলা। তারা পাখনা মেলে এগিয়ে চলেছে। আমিও ভেসে চলেছি তাদের সঙ্গে। ভাসতে-ভাসতে তলিয়ে যাচ্ছি। সমুদ্রের আরও গভীরে ওই রং-ঝলমল মাছেদের সঙ্গে। শেষমেশ বোধ হয় সমুদ্রের অতলেই আমায় ভেসে বেড়াতে হবে মাছেদের সঙ্গে। পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়া আকাশ-ভাঙা-আলো আমি হয়তো আর কোনওদিন দেখতে পাব না। জলের এই প্রাণীগুলোর মতো তখন কি আমারও নাম হবে জলের মানুষ?
দাঁড়াও, দাঁড়াও! রং-ঝলমল মাছেদের সঙ্গে এ আমি কোন রঙের রাজ্যে চলে এসেছি! আমার চোখ যে ঝলসে যায়! এ যে ওই রঙিন মাছেদের চেয়েও আরও রঙিন এক চোখজুড়ানো ফুল-পাতার বাগান। আমি সামনে দেখি, পেছনে দেখি শুধু রং আর রং। যত ফুল, তত গাছ। যত মাছ, তত রং। থরেথরে কে সাজিয়ে রেখেছে। আমার পা ঠেকল বালিতে। আমার চোখের পাতায় কে যেন এঁকে দিল রঙের স্বপ্ন! কত মাছ এ-বাগানে। কোনওটা একরঙা। কোনওটা পাঁচরঙা। কে যেন তুলি দিয়ে এঁকে দিয়েছে নানা রঙের আঁকিবুকি। তাদের গায়ে। তারা আমায় দেখেই লুকিয়ে পড়ল। কেউ লুকোল পাতার আড়ালে। কেউ টুকি দেয় ফুলের আড়ালে। কোনওটা কমলা-লাল। কোনওটা হলদে-নীল। কোনওটা সবুজ-সাদার ঝলকা। কে সাজিয়ে রেখেছে সমুদ্রের অতলজলে এমন স্বপ্নের গাছগাছালি? এমন ফুল-পাপড়ির স্বপ্নলোক?
আমি পরে শুনেছি, এই স্বপ্নলোকের নাম প্রবালদ্বীপ।
আমি আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলুম না। ভুলে গেলুম খিদে-তেষ্টার কথা। ভুলে গেলুম আমার কষ্ট। আমিও ওই মাছেদের মতো ফুলের রাজ্যে হারিয়ে গেলুম। আমিও মাছের মতো ফুল-পাতার আড়ালে-আড়ালে লুকোচুরি খেলা শুরু করে দিলুম। আমি হাত বাড়াই ধরতে। মাছেরা পালায়। আমি লুকিয়ে পড়ি। মাছেরা আমায় খোঁজে। আমি কি পারি মাছেদের চোখকে ফাঁকি দিতে? তারা ঠিক দেখতে পায়। কোনখান দিয়ে, কোন ফাঁকে যে আমায় এসে ছুঁয়ে ধরে, আমি বুঝতেই পারি না। তারা একসঙ্গে ঝাঁক বাঁধে। একসঙ্গে আমার গায়ে মুখ ঠেকায় তারা। যেন খুশিতে আদর করে। আমি হেসে ফেলি। মাছেরা হাসে কি না জানি না। কিন্তু তারা যে আনন্দে উচ্ছল হয়ে জলের ভেতরে নাচন-কোদন করে, সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না। দ্যাখো, দ্যাখো, আরও কতরকমের মাছ সেখানে হাজির হয়েছে! আমিও খেলতে-খেলতে হারিয়ে গেলুম সমুদ্রের জলের বাগানে। হারিয়ে গেলুম ফুল-পাতা আর রঙিন গাছের আড়ালে। সত্যি বলছি, তখন আমার আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করল না এখান থেকে। মনে হল, এখানেই থাকব চিরদিন। এখানেই মাছেদের সঙ্গে মাছ হয়ে খেলা করব।
আরি ব্যস! কী সুন্দর একটা গোলাপ-রঙা ফুলের পাপড়ি!
না, না, ওটা ফুলের পাপড়ি নয়। ওটাও একটা মাছ। অনেকটা তারাফুলের মতো দেখতে। কেমন চুপটি করে ফুলের সঙ্গে ফুল হয়ে লুকিয়ে আছে! ভাবছে আমি বুঝি দেখতেই পাইনি। দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। আমি তাকে ধরব বলে যেই না হাত বাড়িয়েছি, এই দ্যাখো, পালাল। পালিয়ে করল কী, অন্য আর-একটা গাছের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে রইল। আর তাকে খুঁজে পায় কে! আমি তো কোন ছার! যারা সমুদ্রের অন্য জীব, তারাই হার মানবে!
আমি অবশ্য তাকে খুঁজতে ছাড়লুম না। কিন্তু হায় রে, খোঁজাই সার! খুঁজতে-খুঁজতে হঠাৎ আমি চমকে উঠেছি। খুশিতে আমার চোখ ঝলমল করে উঠল। দেখি, অন্য আর-একটা মাছ। ঠিক প্রজাপতির মতো দেখতে। গাছের আড়াল থেকে পিটপিট করে আমাকে দেখছে। তারপরেই, কোথাও কিছু নেই, জলের ওপর ভাসতে-ভাসতে নাচতে লাগল। আমি তো অবাক! আমি আর হাত বাড়ালুম না। ও নাচুক। আমি দেখি!
আরে, ও-দুটো কী? মাছ, না কাঠবিড়ালি? মুখখানা দ্যাখো! কে যেন কাঠবিড়ালির মুখ এনে বসিয়ে দিয়েছে। রঙের বাহার দেখেছ! লাল-মাটির আভা ছড়িয়ে আছে সারা পিঠে। বুকে আর পেটে বাদামি রং। আর ল্যাজের খানিকটা গাঢ় হলদে, আর খানিকটা হালকা হলদে। দ্যাখো, প্রজাপতি মাছের সঙ্গে কাঠবিড়ালি-মাছদুটোও কেমন নাচছে! অবশ্য প্রজাপতির মতো কি আর পারছে! প্রজাপতি মাছটাকে যেমন সুন্দর দেখতে, তেমনই তার নাচ। প্রজাপতি মাছের পাখনাটা দ্যাখো, একদম হলদে। গায়ের ওপর কোথাও হলদে আভা, কোথাও লালচে। আর পিঠ থেকে পেট পর্যন্ত ডোরা-ডোরা-দাগ। নাচছে যখন, রং যেন ঠিকরে পড়ছে!
কোথাও কিছু নেই, উফ, আমার পিঠে কে যেন আগুনের ছ্যাঁকা দিল! কী রে বাবা, জলের ভেতর আগুন! আমি শাঁ করে পিছু ফিরেছি। দেখি, একটা সাপ। না, না, ঠিক সাপ না। সাপের মতো দেখতে। এও একটা মাছ। কী হিংস্র! আমি কিছু বোঝার আগেই, সে আবার আমার গায়ে ছ্যাঁকা দিয়ে দিল। সে বোধ হয় আমাকে পছন্দ করছে না। তাই বারেবারে আমাকে আক্রমণ করছে। ওই দ্যাখো, সেই কাঠবিড়ালিও পালাল, প্রজাপতিও নাচ থামাল। লুকিয়ে পড়ল। আমি তো আর কোথাও লুকোতে পারব না। ওরা ফুল-পাতার রঙের সঙ্গে নিজের রং মিশিয়ে এমন চুপটি করে বসে থাকবে, কেউ টেরই পাবে না! আমার আর লুকোবার জায়গা কই! তা ছাড়া আমার গায়ের রং তো আর মাছের মতো বাহারি নয়। অগত্যা সাপের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি জলের ভেতর দাপাদাপি শুরু করে দিলুম। সাপ কিন্তু ছাড়ে না আমায়। আমি জলে ঢুঁ মারতে-মারতে একবার এদিকে যাই, নয়তো ওদিকে পালাই। সাপও ছ্যাঁকা দেওয়ার জন্য আমাকে তাড়া করে একবার এদিকে আসে, নয়তো ওদিকে যায়। এ কী হল? এ আবার কার খপ্পরে পড়লুম? এই সাপ-মাছটা যে খুব বড়, তা নয়। আমি ইচ্ছে করলেই তাকে ধরতে পারি। কিন্তু ধরলে যদি ভীষণ ছ্যাঁকা লেগে যায়! দ্যাখো, আমাকে সে পরোয়াই করছে না! থোড়াই ভয় পাচ্ছে আমায়! দরকার নেই আর। এই পাজিটার হাত থেকে নিস্তার পেতে হলে, পালাতেই হবে। কাজেই আমি দু’হাত দিয়ে জল কাটিয়ে পালাবার পথ খুঁজতে লাগলুম।
অত সহজ! জলের ভেতর পালাবার পথ কোথায়! আমি এই কিলবিলে সাপ-মাছটার কাছে একেবারে হেরে বসে আছি। আমি হাত-পা ছুড়ে পালিয়ে যাওয়ার যতই চেষ্টা করি, সাপটা ঠিক ততই আমার সামনে চলে আসে। অগত্যা জলের ভেতর লম্ফঝম্প শুরু করে দিলুম। সে যেন জলের ভেতর জল নিয়ে হুল্লোড়। না, সে আর আমার কাছে আসতে পারে না। অবিশ্যি স্বপ্নের রঙে ঘেরা এই প্রবাল-বাগানের কোনও ক্ষতি হল কি না, জানি না। হলেও, দু-চারটে ফুলের পাপড়ি হয়তো খসে পড়তে পারে। কিংবা দু-একটা গাছের ডালপাতাও ভাঙতে পারে। তাতে রং-বাহারের এই যে প্রবাল তার কী আর এমন ক্ষতি বলো!
আমি এমন লম্ফঝম্প করতে-করতে এ কোথায় চলে এসেছি। আর পারি না। একটু থামতে হবে। একটু দম না-নিলেই নয়! দম ফুরিয়ে গেছে। হাত-পাগুলো এমন অবশ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে সেগুলো আর শরীরে নেই। না, সেই ছ্যাঁকা-দেওয়া সাপ-মাছটাকে তো এখানে দেখতে পাচ্ছি না! তা হলে বোধ হয় জলের ঝাপটায় কাবু হয়ে সে পালিয়েছে। তবু বিশ্বাস নেই। এই ফুলের আড়ালে খানিকটা লুকিয়ে থাকাই ভাল।
ওমা! আমি যেটাকে ফুল বলে মনে করেছি, সেটাও যে সমুদ্রের একটা জীব : আমি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি! সে চোখের পলকে আমাকে জাপটে ধরল। দ্যাখো, তার কত হাত-পা। শ্যাওলার মতো পিচ্ছিল তার দেহটা। চামড়া এমন ফিনফিনে, এদিকে চোখ রেখে দেখলে, চামড়ার ভেতর দিয়ে ওদিকটা স্পষ্ট দেখা যাবে। তার হাত-পা যেন গায়ের সঙ্গে কে সেলাই করে বুনে রেখেছে। দেহটা যে তার খুব বড়, তেমন নয়। কিন্তু হাত-পাগুলো অ্যায়সা লম্বা। আমার মতো আরও দু’জনকে একসঙ্গে জড়িয়ে ধরতে পারে। এই হাত-পায়ের মাঝখানে তার মুখ। সেই মুখে যেন পাখির ঠোঁট বসানো। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে সাঁতার কাটতে শুরু করে দিল। আমি যতই হাত-পা ছুড়ে লাফালাফি করছি, ততই তার জাপটানি শক্ত হচ্ছে। আমি কাবু হয়ে কেমন যেন নিঝঝুম হয়ে যাচ্ছি। আমি দেখতে পাচ্ছি, সে এই প্রবালের বাগান ছেড়ে আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে চলেছে। আমি আর থাকতে পারলুম না। তার নরম গায়ে আচ্ছাসে দিলুম এক খিমচি। অমনই সে ঠোঁটের বাড়ি দিল এক ঠোক্কর। আমার মাথায়। মাথা ঝনঝন করে উঠল। সে আমাকে আরও জোরে পেঁচিয়ে ধরল। আমি আর দম ফেলতে পারি না। তবে কি জন্তুটার হাতে এবার আমায় মরতে হবে! হয়তো। কারণ, যেভাবে আমাকে পেঁচিয়ে ধরেছে, তাতে মরণ ছাড়া আর গত্যন্তর নেই।
সে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে এল সেই প্রবাল-বাগান থেকে সমুদ্রের অথই জলে। তার হাত-পায়ের প্যাঁচে আমাকে আচ্ছা করে জড়িয়ে নিয়ে সে খেলা শুরু করে দিল। কখনও সে আমাকে জলের তলায় টেনে নিয়ে যায়, কখনও জলের ওপরে। কখনও ডিগবাজি মারে, কখনও গোত্তা খায়। আর আমি ঢকঢক করে সমুদ্রের নোনাজল গিলি আর উগরে দিই। সে যে কী কষ্ট, কী বলব! আমার মনে হচ্ছে, এই নোনাজল গিলতে-গিলতেই আমার দম ফুরিয়ে যাবে। এবার আর আমার মরণ কেউ ঠেকাতে পারছে না। হায় রে, মরলে কি মাছেরাই আমার দেহটা টুকরে-ঠুকরে খাবে! তার উত্তর কে দেবে!
খুব রক্ষে। আমি মরতে-মরতেও বেঁচে গেছি। হাত-পাওলা জন্তুটা অনেকক্ষণ ধরে, আমার সঙ্গে বেশ খানিকটা ধস্তাধস্তি করল। জলের অনেকটা দূরে সাঁতরে এল। তারপরেই হল এক কাণ্ড! ওই দ্যাখো তেড়ে আসছে তার দিকে তারই এক শত্রু। তখন আমি জানতুম না, এই শত্ৰুটির নাম কুকুর-মাছ। পরে শুনেছি। যেমন শুনেছি এখন আমি যার প্যাঁচে বন্দি, তার নাম অষ্টভুজ শম্বুক।
আমাকে আর বেশিক্ষণ সেই অষ্টভুজের হাতে বন্দি থাকতে হল না। অষ্টভুজ তার শত্রু কুকুর-মাছটাকে আচমকা দেখতেই তার পিলে গেছে চমকে। তার প্যাঁচ আলগা হয়ে গেল। আমায় মারবে কী! নিজে বাঁচে কি না তাই দ্যাখো! অষ্টভুজের প্যাঁচ যেই না আলগা হয়েছে আমার দেহটাও অমনই আপনা-আপনি সেই প্যাঁচের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমার যেন শরীরে আর সাড় নেই। আমি বেশ খানিকক্ষণ মড়ার মতো জলে ভাসতে লাগলুম। এতক্ষণ যে মরণ-যন্ত্রণায় আমি ভুগছিলুম তার হাত থেকে নিস্তার পেয়েছি। আঃ! দম ফেলে বাঁচলুম!
বাঁচলুম কী! দ্যাখো, কী সাঙ্ঘাতিক দেখতে কুকুর-মাছটাকে। লম্বায় মাছটা আমার মতো। হাঁ-মুখটা তার নীচের দিকে। গায়ের রংটা খয়েরি। তার ওপর কালো চাকা-চাকা দাগ। চোখ দেখলে কে বুঝবে, কখন সেই চোখে রাগ আর কখনই বা আনন্দ। কুকুর-মাছটা তাড়া করল সেই অষ্টভুজটাকে। কুকুর-মাছের যে একটি রসালো খাবার এই অষ্টভুজ, আমার সে তো জানার কথা নয়। শুধু দেখছি শাঁ-শাঁ করে জলে সাঁতার দিয়ে কুকুর-মাছটা এগিয়ে চলেছে অষ্টভুজের দিকে। অষ্টভুজের এবার সময় ঘনিয়ে এসেছে। দ্যাখো, অষ্টভুজটা কেমন করে পালাচ্ছে! মুখখানা তার কুকুর-মাছের দিকে। সামনে মুখ রেখে পেছনে জল টেনে-টেনে ছুটছে যেন! এমনই করে জলে সাঁতার কাটে নাকি ওরা! এতক্ষণ দেখিনি তো!
অবশ্য, আমায় আর বেশিক্ষণ দেখতে হল না। চোখের পলকেই কুকুর-মাছটা ধরে ফেলল অষ্টভুজটাকে। কুকুর-মাছটা বুঝি জিতে গেল।
না মশাই না। জিতব বললেই আর জেতা যায় না। শত্রুর সঙ্গে লড়াই না করে কে হাল ছাড়ে! অষ্টভুজটাও কুকুর-মাছটাকে জড়িয়ে ধরার জন্য তৈরি। কুকুর-মাছটা যেই না তাকে আক্রমণ করেছে, অমনই লেগে গেল ঝটাপটি। আমি একপাশে ভাসতে ভাসতে লড়াই দেখতে লাগলুম। কে জিতবে, এখনও জানি না। জানি না বলেই আমার মনে হল, এখানে ভাসতে-ভাসতে আর লড়াই না-দেখাই ভাল। কারণ যেই জিতুক সে আমাকে ছেড়ে কথা বলবে না। একটু আগে অষ্টভুজের চাপে তো মরতে বসেছিলুম। এবার যদি কুকুর-মাছটা আমাকে তাক কষে, তবে রেহাই নেই। আমি এই কথা ভেবে আড়ষ্ট হাতদুটো নাড়াবার চেষ্টা করলুম। পারলুম। পা দুটোও ছুড়তে পারলুম। সেইভাবেই ধীরে-ধীরে হাত-পা ছুড়ে পালাবার মতলব আঁটলুম। ওদের তখন জোর লড়াই শুরু হয়ে গেছে। কে জিতবে, দরকার নেই দেখার। আমি ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে মানে-মানে সরে পড়লুম। এমনই লড়াই লেগেছে, আমি আছি না গেছি, সেদিকে কে নজর দেবে!
তোমাদের কী বলব, কতরকমের যে মাছ আর কতরকমের যে প্রাণী জলের মধ্যে দেখতে পেলুম! কোনওটাকে দেখতে যেমন বিচ্ছিরি, তেমনই কোনও-কোনওটা কী সুন্দর। কোনওটা মারমুখো, আবার কোনওটা শান্ত। একঝাঁক গোরুমুখো-মাছ দ্যাখো! কেমন এদিক থেকে ওদিকে সাঁতরে যাচ্ছে! দেখলে ভয় লাগে! অবশ্য না, কারও দিকে তেড়ে যায় না। ঠাণ্ডা মেজাজে সাঁতার কাটছে। ওই দ্যাখো শজারু-মাছ! এদিকে আসছে! তুমি প্রথমটা দেখলে ভাববে, শজারু-মাছের কী আর এমন দেখার আছে! কিন্তু আমার দিকে যখন হঠাৎ তার চোখ পড়ল, অমনই সে রেগে-মেগে ফুলে উঠল, উরি বাবা, দেখি তার গা-ভর্তি কাঁটা। একবার ফুটিয়ে দিলেই হয়! রক্তারক্তি কাণ্ড হয়ে যাবে। অবিশ্যি আমায় দেখল বটে, কিন্তু আমার দিকে এল না। কিন্তু আমি এই দূর থেকেই দেখতে পেলুম, মাছটা যখন ফুলে উঠল, তখন তার গা-ভর্তি কাঁটার সঙ্গে কতরকমের রং ঠিকরে বেরিয়ে এল। বা রে! বেশ মজা তো!
হঠাৎ দেখা গেল আর-এক মজা। তবে এ-মজাটা চোখে দেখার আগে আমার কানই শুনতে পেল। আমার কানে এল, এই জলের মধ্যে কে যেন শিস দিয়ে গানের সুর ভাঁজছে। আমি হকচকিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখি একঝাঁক মাছ শিস দিতে-দিতে এদিকেই ভেসে আসছে। মাছগুলো যে আমার চেয়ে অনেক বড় সেটা দেখেই বুঝেছি। কতরকমের শব্দ যে তাদের মুখে! গান গাইছে, না শিস দিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে? না কি, আমাকে ভয় দেখাচ্ছে? কে জানে! এখন ভয় দেখালেই বা আমার কী করার আছে! এমন ঝাঁক বেঁধে ধেয়ে আসছে! এই বুঝি পড়ল আমার ঘাড়ে! আর যদি সত্যিই পড়ে, আমার কিচ্ছু করার নেই! তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমি জলে ভাসতে লাগলুম।
দ্যাখো, দ্যাখো মাছগুলো কেমন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আমাকে ঘিরে ধরছে। সে-ঘেরাটোপ ডিঙিয়ে পালাবার পথ নেই। আমার মনে হল, এবার ওরা একসঙ্গে আমার ওপর চড়াও হবে। আমার আবার ঘনিয়ে এল বিপদ! এই ফাঁকে দেখতে পেলুম, মাছের পিঠগুলো কালো। পেটের দিক সাদা। মাথাটা ঢিপিমতো। নাকটা ইয়া লম্বা। আর, বড় বলে বড়! আমার মতো তিনজনকে একসঙ্গে জুড়লে যতটা বড় দেখায়, ঠিক ততটা।
কী আশ্চর্য, মাছগুলো আমায় কিচ্ছু করল না! উলটে শিস দিচ্ছে আর ঢেউ তুলছে। ঢেউ তুলছে, না, নাচছে? আমাকে দেখে তবে কি মাছগুলোর আনন্দ হয়েছে? তাই হবে! দ্যাখো, নাচের বহর দ্যাখো! কী অদ্ভুত দেখতে লাগছে! এ-দৃশ্য যে না-দেখেছে, তাকে কি বোঝানো যায়? একটা মাছ দ্যাখো একেবারে আমার হাতের নাগালে! আমি ধরব নাকি? আমায় ধরতে হল না। সে-ই আমার হাতে মুখ দিল। আমায় টানল তার ঠোঁট দিয়ে। কেন টানছে? আমাকেও কি নাচতে বলছে?
তাকে বলতে হল না। আমি নিজেই নেচে ফেললুম। তবে আমার নাচটাকে সত্যি যেন নাচ ভেবে বোসো না! বরং বলতে পারো জলের ভেতর কুস্তি। জলের মধ্যে আমার সেই ছেলেমানুষি কোস্তাকুস্তি দেখে, মাছেদের আনন্দ দ্যাখে কে! তারা জোরে-জোরে শিস দিতে লাগল।
কিন্তু হঠাৎ কোথাও কিছু নেই এই নাচুনে মাছগুলো থমকে গেল। তাদের মুখে আর শিস নেই। পাখনায় তাদের দোলা নেই। কিছু দেখে তারা কি ভয় পেয়েছে! সঙ্গে-সঙ্গে তারা দলবেঁধে দিল সাঁতার-দৌড়। জলের ভেতর উথাল-পাথাল। দৌড়ের সে কী দৃশ্য! আমি তো দেখেশুনে একদম হাঁদা। আচমকা কী এমন হল! কেন পালাল মাছের দল!
পালাবে না? ওই দ্যাখো, ওটা কী আসছে? একটা যেন নীল রঙের পাথর! ভেসে আসছে জলের ওপর দিয়ে। শব্দ উঠছে শোঁ-শোঁ। তার ধাক্কায় জল উছলে উঠছে। আমি টাল খাচ্ছি। ধাক্কায় ভেসে যাচ্ছি।
আরও কাছে আসতে আমার দফারফা। না, না, এটা তো পাথর নয়! একটা বিকট জন্তু। যেন দৈত্য। সিধে আমার দিকে তেড়ে আসছে। আর জলের তোড়ে আমি নাকানিচোবানি খেয়ে তলিয়ে যাচ্ছি। আমার আর কিচ্ছু করার ক্ষমতা নেই। জলের ভেতর যেন প্রলয়কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। জন্তুটা কোথা থেকে যে কী করল, আমি কিছুই ঠাহর করতে পারলুম না। জন্তুটা হুড়মুড় করে আমার পেটের নীচে মুখটা ঢুকিয়ে মারল এক ঘাই। আমি ওপর দিকে হাত-পা ছুড়ে যেন উড়ে গেলুম। কতটা ওপরে, বুঝতে পারলুম না। তারপর জলে দোল খেতে-খেতে সটান বসে পড়লুম তার পিঠের ওপর। পড়েই হাঁপাতে লাগলুম। কিন্তু শুনলে তোমরা অবাক হয়ে যাবে, ওই বিরাট জন্তুটা আমাকে আর কিছু করল না। নাই করুক, আমি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে তার পিঠে বসে থাকি। দ্যাখো, পিঠটা কত উঁচু! নীচের দিকে তাকিয়ে আমি থ’ হয়ে গেলুম। এখান থেকে ইচ্ছে করলেই নামতে হচ্ছে না। যদিও জলের মধ্যে আছি, যদিও জলের মধ্যে ভেসে আমি পালাতে পারি, তবুও পালাবার উপায় নেই। তার পিঠটা যেমন উঁচু, তেমনই লম্বা আর চওড়া। তুমি পালাবে কোনদিক দিয়ে! যেদিকেই চোখ ফেরাই, সেইদিকেই দেখি তার চওড়া পিঠটা ভাসছে। পেছনে যাই, দেখি, একটা যেন টানা মাঠ। দৌড় লাগাতে খুব মজা। পাশে যাই, চোখে পড়ে না তার পাখনা। জলের ভেতর স্রোত কাটিয়ে সে চলেছে। জন্তুটা যে কত বড়, কে আন্দাজ করবে! আমি যে তার পিঠের ওপর ঘুরছি-ফিরছি বসছি-উঠছি তার কোনও গ্রাহ্যই নেই! কেমন চুপচাপ জলে সাঁতার কেটে ভেসে যাচ্ছে! এতক্ষণ আমি জলের ভেতরে হাত-পা ছুড়ে ভেসেছি। সাঁতার কেটেছি। এখন মজাসে আমি তার পিঠে দাঁড়িয়ে। চলেছি এদিক থেকে আর-একদিকে। কিন্তু কোথায় চলেছি! এই ধুমসো জন্তুটা আমায় পিঠে নিয়ে কোথায় চলল! সে আর আমি জানব কেমন করে!
আমি পরে শুনেছি, এই ধুমসো জন্তুটির নাম তিমি মাছ। আসলে মাছ বললেও তিমি কিন্তু মাছ নয়। বলে, অনেক, অ-নে-ক দিন আগে এখনকার এই তিমি নামের মাছ, জলে থাকত না। তখন তিমিকে মাছ বলত না, বলত, জন্তু। তখন তাদের পায়ে খুর ছিল। জন্তুটা মাটিতে ছোটাছুটি করত। তারা মাছের মতো কখনওই ডিম পাড়েনি। এখনও ডিম পাড়ে না। মা-তিমি ডিমের বদলে বাচ্চার জন্ম দেয়। মায়ের দুধ খায় বাচ্চারা। দুধ খেয়ে বড় হয়। বড় হয় মানে কি তোমার-আমার মতো! এত বড় হয়, না-দেখলে ধারণাই করতে পারবে না। অবশ্য এখন আমি দেখছি, আর তাজ্জব হয়ে যাচ্ছি।
থাক সে-কথা। এখন যে-কথাটা বারবার মনে হচ্ছে তা হল, এর পর আমার কপালে কী আছে! ভয়ে বুক দুরু-দুরু করলেও, তিমির পিঠে চেপে আমার যে আরাম লাগছে না, তা যেন মনে কোরো না। যেমন মজা লাগছে, তেমনই আরাম। উফ! এতক্ষণ জলে পড়ে-পড়ে হাতে-পায়ে খিল ধরে গেছে। কতক্ষণ পরে একটু আয়েস করতে পারছি। সে ঠিক আছে। কিন্তু এর পর তিমিটা যদি আমায় চিবিয়ে খায়? যদি খায়, খাবে। কী আর করা যাবে বলো!
তখন তিমির মুখটা আমার ভাল করে দেখা হয়নি। এখন অবশ্য তিমির পিঠের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে মুখখানা দেখা যেতে পারে। কিন্তু সাহস হচ্ছে কই! তবে, যাই বলো আর তাই বলো, তিমি কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমায় একটুও ভয় দেখায়নি। আমায় কেমন পিঠে নিয়ে সাঁতার কাটছে। তবে কি আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায় তিমিটা! হবে হয়তো। দেখি না! বলে, বুকে বল আনলুম। তিমির মুখখানা দেখার জন্য আমি তার পিঠের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে, মুখ দেখতে চললুম। সত্যি, তিমিটা লম্বা বলে লম্বা। হামাগুড়ি দিচ্ছি তো দিচ্ছি। কোথায় শেষ রে বাবা!
শেষমেশ পৌঁছে গেলুম তিমির মাথার কাছে। উরি বাবা, মাথার ওপর কত বড় একটা গর্ত। সেই গর্ত দিয়ে ফোঁস-ফোঁস করে নিশ্বাস পড়ছে। আর-একটু কাছে গেলেই হয়েছিল আর কী! নির্ঘাত নিশ্বাসের ধাক্কায় বেহুঁশ হয়ে যেতুম। দ্যাখো, তিমিটার মাথায় কত চুল! লম্বা-লম্বা চুলগুলো মুখের ওপর এমন ঝুলে আছে, দেখলেই তুমি ভাববে গোঁফ! হাঁ-মুখটা কই? যাচ্চলে, চোখ দুটোই বা কোথায়? আমি হাত বোলাতে লাগলুম এদিক-ওদিক। মিথ্যে হাত বোলানো। তার হাঁ-মুখও দেখতে পেলুম না, চোখও দেখা গেল না। হঠাৎ তিমিটা এমন জোরে নিশ্বাস ফেলতে লাগল, সেখানে দাঁড়ায় কার সাধ্য! হাঁ-মুখ দেখে আর কাজ নেই। শেষে কি ওই নাকের গর্তে বে-টাল হয়ে গোত্তা খাব! নাক দিয়ে একবার পেটের মধ্যে পিছলে গেলেই, ব্যস। দরকার নেই বাবা! তারচে’ বরং পিঠের মাঝখানে গিয়ে বসি। সেখানে অন্তত নাকের গর্ত দিয়ে সেঁধিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। সেই ভাল।
হ্যাঁ, আমি আবার ফিরে এলুম। তবে এটা পিঠের মাঝখান, না অন্য কোথাও, তা বলতে পারব না। আমি জানি না এর পর আরও কত দুর্ভোগ আছে আমার ভাগ্যে। একটার পর একটা, কত ঘটনাই যে ঘটছে, সে তো তোমরা দেখছই। এখন বলো তো, এই জলের ভেতর থেকে আমি ডাঙায় উঠি কেমন করে? শেষকালে কি আমিও জলের প্রাণীর মতো জলেই বাস করব? বাস করব এই তিমির মতো? না-কি ওই রং-ঝলমল মাছেদের মতো? না, না, আমি তিমিও হব না, রঙিন মাছও না। আমায় যদি সত্যি থাকতেই হয় জলের ভেতর, তবে আমার ইচ্ছে, আমি ওই প্রবালবাগের ফুল হয়ে থাকব। বলো, কতরকমের ফুল! কত রং! একটি রঙিন ফুল হয়ে যদি জলের ভেতর দোল খাই, তা হলে কী মজা! তার ওপর ওই রং-টুকটুক মাছের দল যদি লুকোচুরি খেলে আমার গায়ে গা ঠেকিয়ে, তা হলে মজার ওপর মজা।
না, আমি আর চুপচাপ বসে থাকতে পারছি না। আমার ঘুম পাচ্ছে। অবশ্য জলের ভেতর হলেও আমি সটান শুয়ে পড়তে পারি তিমির পিঠের ওপর। আমি শুয়েই পড়লুম। তারপর জলের দোলায় দুলতে-দুলতে আমি তিমির পিঠে ঘুমিয়ে পড়লুম।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলুম আমার জানার কথা নয়। জলের ভেতরে তো আর আকাশ নেই। সূর্যও ওঠে না। চাঁদও জ্যোৎস্না দেয় না। কাজেই বলা যায় না, কখন সকাল, কখন সন্ধে। তাই আমিও বুঝতে পারলুম না, তখন সকাল, না সন্ধে। আমার ঘুম ভেঙেছিল আচমকা। আচমকাই আমার মনে হল, কে যেন আমায় চ্যাংদোলা করে তিমির পিঠ থেকে তুলে নিল। ছুড়ে দিল অনেক দূরে। আমি ভয়েময়ে চিৎকার করে উঠলুম। তারপরেই দেখলুম, আমি একলাই ছিটকে পড়িনি। পড়েছে আর একটা জন্তু। আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছি। এমনকী, কয়েক মুহূর্ত আমি দমও ফেলতে পারলুম না। কী হল ব্যাপারটা!
ব্যাপারটা সাঙ্ঘাতিক। আমার সঙ্গে আর-একটা যে-জন্তু ছিটকে পড়েছে, সে একটা মানুষখেকো হাঙর। পিঠটা বাদামি। বুকটা সাদা। দাঁতের পাটি দেখলে, তার সামনে দাঁড়ায় দেখি, কে! কার এমন বুকের পাটা আছে! হাঙরটা যে আমায় খাবে বলে আক্রমণ করেছিল, সেটা তখনই আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু ছিটকে পড়েও যখন হাঙরটা আমার দিকে ধেয়ে এল তখনই মালুম হল, সে আমায় খাবে। সে আসছিল তার ভয়াল দাঁতগুলো ছরকুট্টে। তেড়ে, আমার দিকে। এই বুঝি আমাকে কামড়ে ধরে! চোখের পলকে কী যে হল, তিমিটা তীরের মতো ঝাঁকুনি দিয়ে মারল ল্যাজের বাড়ি হাঙরের মাথায় এক ঝাপটা। হাঙরটা লাট খেতে-খেতে ছিটকে পড়ল সাত হাত দূরে। পড়েই নিজেকে সামলে নিল চোখের পলকে। আবার তেড়ে এল দ্বিগুণ জোরে। আর রক্ষে নেই আমার! এবার ওই দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল বলে!
না তো! সে এবার আমায় আক্রমণ করল না তো! হাঙরটা সটান ঝাঁপিয়ে পড়ল তিমিটার ওপর। দাঁত দিয়ে কামড়ে তিমির গা থেকে তুলে নিল অ্যাত্তোখানি মাংস। রক্ত গড়িয়ে পড়ল তিমির গা বেয়ে। ভেসে গেল জল রক্তে-রক্তে। রক্ত দেখে আমি আর স্থির থাকতে পারলুম না। হাঙরটার ওপর রাগে আমার গা রিরি করে উঠল। কী, আমার বন্ধুর গায়ে দাঁত বসাস! হ্যাঁ, তিমি আমার বন্ধুই তো। সে ভালবেসে তার পিঠে আমায় স্থান দিয়েছে। সে যে এই হিংস্র হাঙরটার হাত থেকে আমাকে বাঁচাবার জন্য লড়াই করছে, সেটা বুঝতে আমার সময় লাগেনি। না, আর আমার ভিতুর মতো সিঁটিয়ে থাকা উচিত নয়। আমি এগিয়ে গেলুম। আমার আর কতটকুকু শক্তি! এই হাঙরটার কাছে আমি তো একটা টিকটিকির চেয়েও তুচ্ছ! তা হোক। আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করলুম না। লাফিয়ে উঠলুম হাঙরের পিঠে পেছন থেকে। হাঙরটা তখন তিমির ঠোঁটটা কামড়ে ধরেছে। আমিও কামড়ে ধরলুম হাঙরের পিঠটা। জোরে, আরও জোরে। আমিও কামড়ে খাবলে তুলে নিলুম তার পিঠের একদলা মাংস। এবার সে লেগে গেল আমার সঙ্গে। তিমির ঠোঁট ছেড়ে সে এমন জোরে এক ঘাঁই মারল, আমি বুঝি এই ছিটকে পড়ি তার পিঠ থেকে! না, পারল না সে। এবার সে বারবার তিড়িং তিড়িং লাফাতে শুরু করে দিল। আমিও নাছোড়বান্দা। যতই লাফাচ্ছে সে ততই আমি আঁকড়ে ধরে খামচি দিচ্ছি! মারছি ধাঁই-ধপাধপ কিল, চড়, ঘুসি। তার পিঠে। ঘাড়ে। যেখানে পাচ্ছি সেখানেই। না, আমি কিছুতেই ছাড়ব না তার পিঠ। সে লাফিয়ে উঠছে। ঘুরপাক খাচ্ছে। ল্যাজের ঝাপটায় জল ছড়াচ্ছে। ডুব দিচ্ছে। আমিও ততই তাকে কিলোচ্ছি। নয় খামচে দিচ্ছি। কামড়াচ্ছি। কিন্তু একবার যে কী হল, হাঙরটা হঠাৎ এমন একটা পাক মারল, আমি টাল সামলাতে পারলুম না। হড়কে তার পিঠ থেকে ছিটকে পড়লুম। বুঝতে পারলুম, জলের জন্তুর সঙ্গে লড়াই করা ডাঙার মানুষের কাজ নয়। তার ওপর আমার হাতে কোনও অস্ত্রও নেই। তাই, ছিটকে পড়েই আমি বুঝতে পারলুম, আর আমার রক্ষে নেই। ওই দ্যাখো, সে হাঁ করে তেড়ে আসছে! মুখের ভেতরটা কী ভয়ঙ্কর! এই বুঝি কামড়ে ধরল আমার ঘাড়টা! এবার আমি কোনদিকে পালাই! আঃ!
না, হাঙর পারল না আমায় ধরতে। ওই দ্যাখো, আমার বন্ধু তিমিকে। তার পিঠে রক্ত। ঠোঁটে রক্ত। সে ঝাঁপিয়ে পড়ল হাঙরটার ওপর। তার বিরাট দেহটা দিয়ে হাঙরটাকে ঠুসে ধরল জলের মধ্যে। তারপর তার মুখের ওপর এমন একখানি ঝাপটা মারল, হাঙর বুঝি চোখে অন্ধকার দেখে! আমি বেঁচে গেছি। অবশ্য তখনকার মতো। কিন্তু ওই দ্যাখো, আবার সে আমাকে তেড়ে আসছে। ওই দ্যাখো, তার একটা চোখ তিমির ঝাপটায় ফুটো হয়ে গেছে। রক্ত গড়াচ্ছে। শুনতে পাচ্ছ, হাঙরের নিশ্বাসের শব্দ? জলে বুদবুদ কাটছে। এবার সে আমাকে নয়, আক্রমণ করতে ছুটল তিমিকে। অত বড় দেহটা তো তিমি আর চোখের পলকে ঘোরাতে-ফেরাতে পারে না। মুশকিল তো সেখানেই। কাজেই জলের ছোট-ছোট জন্তুগুলো তাকে দুমদাম ধাক্কা মারলেও সে অত গ্রাহ্যই করে না। কিন্তু এখন তার অন্য মূর্তি। হাঙরটা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই সে দিল আর এক ঝাপটা। দ্যাখো, দ্যাখো, হাঙরের মুখখানা তুবড়ে গেছে। তবু হাঙর থামে না। সে তোবড়ানো মুখখানা নিয়েই লাফ মারল তিমির ঘাড়ে। আমিই বা হাঙরকে ছাড়ব কেন! এই তাল। আমিও লাফ দিলুম হাঙরের পিঠে। আবার শুরু করে দিলুম। মার, মার, ঘুসি মার! দে কামড়ে! সে কী লড়াই তখন হাঙরের সঙ্গে তিমির, আর একটা মানুষের। অবিশ্যি আমাকে তেমন লম্বা-চওড়া মানুষ যেন ভেবে বোসো না। আমি ছোট্ট মানুষ। তা, এইটুকু ছোট্ট মানুষই তখন যা লড়াই করল একটা হিংস্র মানুষ-খেকো হাঙরের সঙ্গে, দেখলে তোমরা অবাক হয়ে যেতে। নিশ্চয়ই বলতে, বাহাদুর ছেলে বটে!
কতক্ষণ আমাদের সেই লড়াই চলেছিল বলতে পারব না। জলের মধ্যে সে এক তুমুল লড়াই। হাঙরও ছাড়ে না, আমরাও ছাড়ি না। হাঙরের তেজ কী! মরতে-মরতেও মরে না। কিন্তু না-মরলে কী হবে, আমার আর তিমির গুঁতোর ঠেলায় আধমরা হয়ে পালাবার পথ পায় না সে। কোথায় পালাল, কে জানে! তবে, যেখানেই সে পালাক বাঁচতে আর তাকে হচ্ছে না। আজ হোক, কাল হোক সে মরবেই। কানা চোখ আর তোবড়ানো মুখ নিয়ে কি বাঁচা যায় বেশিদিন? হাঙরটাও তো কম বড় নয়। তিমির মতো অত বড় না হলেও যেন ভেবো না আমার মতো পুঁচকে। ঘাড়ে-গর্দানে হাঙরও কম যায় না! একটি জলের রাক্ষস যেন!
উফ! হাঁপিয়ে গেছি ভয়ানক। তিমিও হাঁপাচ্ছে। তার নিশ্বাস ফেলার গর্তটা দম নিচ্ছে হাঁসফাস করে। আমি হাঁপাতে-হাঁপাতে তার মুখের কাছে এগিয়ে গেলুম। তার ঠোঁটের যেখান দিয়ে রক্ত ঝরছে সেখানে হাত বুলিয়ে দিলুম। সে ঝপ করে মুখখানা জলের ভেতর নামিয়ে আমাকে তার মস্ত ঠোঁটের ওপর তুলে নিল। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম। ভাবলুম, এই বুঝি তিমি আমাকে খেয়ে ফেলে! না, মিথ্যে আমি ভয় পেয়েছি। সে আমায় আদর করল। আমাকে তার ঠোঁটে তুলে নিয়ে এগিয়ে চলল জলে ভেসে-ভেসে। আমি তার মস্ত ঠোঁটটার ওপর বসে-বসে আহত ঠোঁটে হাত বোলাতে লাগলুম।
আর আমি হাঁপাচ্ছি না। তিমিও না। কিন্তু তিমির গা দিয়ে আর ঠোঁট দিয়ে তখনও রক্ত গড়াচ্ছে। অবশ্য একটু-একটু। কমতে-কমতে যখন রক্তঝরা বন্ধ হল, ঠিক তখন থেকেই আমার হাতটাও ব্যথা করতে লাগল। হবেই তো! তখন হাঙরের গায়ে, পিঠে কিল, ঘুসিটা তো কম মারিনি! হাঙরটা কী গুণ্ডা!
এখন কোথায় চলেছি তিমির ঠোঁটে বসে! কোথায় যে তিমির ল্যাজ, এখানে বসে আন্দাজও করা যায় না। সত্যি, কত বড়! এত বড় দেহ নিয়ে ঘোরাফেরা করা কি সহজ কথা! শত্রু চুপিচুপি এসে যদি তোমাকে কামড়ে ধরে, তুমি জানতেও পারবে না, কোনদিক থেকে সে এল। তার ওপর তিমিটা কী শান্ত। বোধ হয় সব তিমিই এমন। এত শান্ত হওয়াও ভাল নয়। শত্রু তোমায় আক্রমণ করলে তুমি তাই বলে কিছু বলবে না! চুপ করে থাকবে? কক্ষনও না।
হাঙরের সঙ্গে লড়াই করে এখন আমি মালুম পাচ্ছি। ঝিমঝিম করছে সারা শরীর। আমার মতো একটা পুঁচকে ছেলের এই হাঙরের সঙ্গে লড়াই করার গল্পটা যে শুনবে, সে কিছুতেই বিশ্বাস করবে না। তা, বিশ্বাস না করলে আমি আর কী করতে পারি! কিন্তু তোমরা তো দেখলে আমি পারি কি না। এখন তো দেখছ, আমি দিব্যি তিমির ঠোঁটের ওপর বসে-বসে কেমন ভেসে যাচ্ছি! তোমরাই বলো, এটাও কি মিথ্যে? এর পরে আবার যে কী হয়, কে জানে! যাই হোক, এখন যার ঠোঁটে বসে আমি চলেছি, সে আমার বন্ধু। আমার এই বন্ধুটি যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী, এটা তো আর কেউ অস্বীকার করতে পারছে না।
আমি চলেছি। আরও কতক্ষণ চলব, সে তিমিই জানে। কোথায় নিয়ে চলল তিমি আমাকে? এখনও রক্ত পড়ছে তার ক্ষত দিয়ে। তবে তেমন না। কিন্তু দেখলে মনে হবেই, এখনও তিমির যন্ত্রণা কমেনি। কমবে কেমন করে? হাঙরটা কামড়ে খাবলে নিয়েছে কতটা মাংস, বলো! অতটা মাংস আমার সারা শরীরে আছে কি না, সন্দেহ।
কতক্ষণ আর বসা যায়। পিঠে ব্যথা ধরে গেল। না, একটু না-শুলেই নয়। কিন্তু শুলে যদি আবার ঘুম পায়! আবার যদি আর একটা হাঙর আমায় শিকার ভেবে আক্রমণ করে! খেপেছ, আর ঘুমোতে আছে! তবে একটু শুয়ে নিতেই হয়। পিঠটা বড্ড টনটন করছে। আমি শুয়েই পড়লুম। একেবারে টানটান চিত হয়ে। তিমির পিঠের ওপর। আঃ, আরাম বটে! হায় রে, এই সময়ে আকাশটা যদি দেখতে পেতুম। কেমন করে দেখব! জল, জল, চারদিকে জল। জলের সমুদ্র। সমুদ্রের জল তোলপাড় করে তিমি চলেছে। আর সেই তিমির পিঠে শুয়ে-শুয়ে আমি চলেছি। কোথায়? কে বলবে? কেউ জানলে তবে তো বলবে। সুতরাং আমি ডুবে-ডুবে ভাসছি। মনে-মনে ভাবছি, মায়ের কথা। বাবার কথা। মা পাথর হয়ে গেছে অনিষ্টের দেবতার জাদুর জোরে। আর বাবা যে আমার চোখের আড়ালে কোথায় হারিয়ে গেল! আর খুঁজে পেলুম না কোনওদিন। আমার চোখের পাতা বুজে এল। চোখের পাতা বুজে-বুজে আমি মাকে দেখি। মায়ের মুখখানা যেমন দেখতে পাই, তেমনই বাবারও। বাবার যুদ্ধে যাওয়ার সেই মূর্তিটা মনে পড়লে, আমার ভীষণ ভয় লাগে। চোখ দুটো লাল টকটক করছে। দাঁতে দাঁত চেপে বাবা এগিয়ে চলেছে। হাতে তীর-ধনুক। অনেক লোক বাবার দলে। আমার মা আমার হাত ধরে দেখছে সেই দৃশ্য। যতক্ষণ দেখা যায়।
আচ্ছা, তিমির কি ঘুম পায় না?
কেন পাবে না! তিমি যেমন ঘুমোয়, তেমনই অসংখ্য মাছও ঘুমোয়।
কোথায় ঘুমোয়?
জলে। কেউ-বা জলের এধারে-ওধারে পাথরের খাঁজে। এখন যেমন আমার ঘুম পাচ্ছে তিমির পিঠে দুলতে-দুলতে। তেমনই জলের দোলনায় মাছেরও ঘুম পায়।
বলো, কতক্ষণ হয়ে গেল! এখনও তিমির থামবার নাম নেই। আমার ঘুমের তবে দোষটা কী! তাই তো, যদি সত্যি-সত্যি ঘুমিয়ে পড়ি, তখন কী হবে?
আমি সত্যিই আর পারি না, নিজের চোখ দুটোকে জাগিয়ে রাখতে। আমি সত্যি-সত্যি ঘুমিয়ে পড়লুম। তারপর আমার সব কেমন অন্ধকার হয়ে গেল। কিছুই দেখতে পেলুম না আর।

তারপর যখন ঘুম ভাঙল, নিজের চোখকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলুম না। এ আমি কোথায় এসেছি! এ কী দেখছি আমি! কোথায় সেই জল! কোথায় সেই তিমি! আমার মাথার ওপর খোলা আকাশ। সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। আমি পড়ে আছি এই আলোছড়ানো মাটির ওপর। এইমাত্র ধড়ফড় করে উঠে বসলুম। আমার সামনে অগুন্তি গাছ-গাছালি। মস্ত উঁচু পাহাড়। আমার চেনা। কে নিয়ে এল আমাকে এখানে? কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল আমার। এবার? কোথায় যাব? বেশ তো ছিলুম জলের গভীরে। আমার বন্ধু পেয়েছিলুম এক মস্ত বড় তিমি। এই বন্ধু না থাকলে, হাঙরের পেটে যেতে হত আমায়। জলে হিংস্র হাঙর। আর মাটিতে যে হাঙরের চেয়েও নৃশংস এই দেবতারা। দেবতাদের খিদে পেলে তারা আমাদের রক্ত চান। চান আমাদের হৃৎপিণ্ড। আমার সেই হৃৎপিণ্ড নিয়ে কী কাণ্ডটাই না হল! স্রোতের দেবী আমায় রক্ষা করলেন। কিন্তু এখন কোথায় এলুম! কোন অজানা ঠাঁই-এ!
আরে! দ্যাখো, দ্যাখো, আমার সামনে কত খাবার! গাছের ছেঁড়া পাতার ওপর কে সাজিয়ে রেখেছে। এখানে তো কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না। তবে, কি এ অন্য কারও খাবার? নিশ্চয়ই এদিকে-ওদিকে কেউ আছে।
কী আশ্চর্য কথা শোনো, আমি যতক্ষণ জলের ভেতরে ছিলুম, আমার একটুও খিদে পায়নি। কিন্তু এখন চোখের সামনে খাবার দেখে আমার নোলায় জল আসছে। আমার দারুণ খিদে পেয়ে গেল। সামনে খাবার, অথচ মুখে দেওয়ার জো নেই। কী যে করি! আরও একটা কথা শোনো, আমার গায়ে জড়ানো পোশাকটারও যা হাল হয়েছে! তোমরা দেখলে হেসে কুটোকুটি খাবে। আর আমি লজ্জায় মরব। রক্ষে এই যে, আমাকে দেখার জন্য তোমরা কখনওই এতদূরে আসতে পারছ না। অবশ্য, তোমরা যদি আমার জন্য একটা পোশাক নিয়ে আসো, তবে, বেঁচে যাই আমি।
না, অনেকক্ষণ হয়ে গেল। কেউ এল না। অনেকক্ষণ ধরে খাবারের দিকে ঠায় চেয়ে আছি। আর লোভ সামলাতে পারছি না। চোখের সামনে খাবার। আর পেটে খিদে। অথচ চুপচাপ বসে-বসে দেখছি। হ্যাংলার মতো। এটা কি ভাল দেখায়! না, মোটেই ভাল দেখায় না। বরং শেষ করে ফেলাই ভাল। সুতরাং দোনোমনো করার কোনও কারণ নেই। গপগপ করে খেয়ে ফেললুম।
শেষপর্যন্ত কেউ এল না। কেউ এল না বলে কেউ কোনও আপত্তিও করল না। কিন্তু আমি অবাক হয়ে ভাবছি, এই খাবার কি তবে আমার জন্যই কেউ নিয়ে এসে, এখানে রেখে দিয়েছিল? যদি সত্যিই আমার জন্য কেউ নিয়ে এসে থাকে, তবে কে আনল? কে সে? আমার চোখের আড়ালে সে লুকিয়ে আছে কেন?
একটা কথা বলি এই ফাঁকে। আমার পেট ভরে গেছে। বাহ্! খাবারের কী সোয়াদ! এখনও মুখে লেগে আছে। পেট তো ভরল। এর পর? কোথায় যাই? কী করি?
আমি উঠে দাঁড়ালুম। পোশাকটাকে এঁটেসেঁটে বেঁধে নিলুম। শীত করছে। করুক। আমি হাঁটতে শুরু করে দিলুম। কোনদিকে যাই! চলো, যাওয়া যাক ওই ঘন গাছের জঙ্গলে। একা আমি। ভাবছ, ভয় করছে কি না? করবেই তো। আমার সঙ্গে এখন মাও নেই। বাবাও নেই। নিদেন আমাদের দলেরও কেউ নেই। আমি একেবারে একা। আমায় একাই ঘুরতে হবে। আর ঘুরতে-ঘুরতে খুঁজতে হবে আমাদের সেই দলটাকে। খুঁজতে হবে দলের নেতা সেই দেবদূতকে।
আমি জঙ্গলের ভেতরে, আরও ভেতরে ঢুকে পড়লুম। হাঁটছি আর দেখছি। দেখছি, জঙ্গলের গা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে মস্ত পাহাড়টা। আমি যে কোথায় চলেছি তার হাটহদ্দ কিছুই জানি না। শুধু জানি, হাঁটতে-হাঁটতেই হয়তো একদিন আমাদের দলটাকে দেখতে পাব। দেখতে পেলেও আমার মাকে, বাবাকে সে-দলে খুঁজে পাব না আর কোনওদিনই। আমি এখন একজন অনাথ ছেলে। বলো, এই দুঃখ নিয়েই তো রোজ রাতে ঘুমিয়ে পড়ব আমি। রোজ সকালে ঘুম ভাঙবে আমার।
পাহাড়টা যেখানে একেবারে জঙ্গলের গায়ে ঝুঁকে আছে সেখান থেকে আমি স্পষ্ট দেখতে পেলুম পাহাড়ের চুড়োটা। ওই উঁচু চুড়োটা যেন ফুলে-ফুলে ভরে আছে। কী জানি কেন মন বলল, ওইদিকেই যাই। তাই, ওই ফুলের শোভা দেখার জন্যই আমার পা ওইদিকেই এগিয়ে চলল। নীচে জঙ্গল টপকে আমার পা চলল, ফুলের বনের দিকে। ওই পাহাড় চুড়োয়।
পাহাড়ের চুড়োয় ওঠা একা-একা আমার মতো পুঁচকে ছেলের পক্ষে মোটেই সহজ কাজ নয়। বড়-বড় পাথর টপকানো তো আছেই, তার ওপর আছে মারাত্মক সব খাদ। একটু অন্যমনস্ক হলেই পা ফসকে পড়ব ওই নীচে। তারপর যে কী হবে, সে তোমরাও জানো। মা যখন ছিল আমার ভয় ছিল না। কখনও মায়ের কোলে চড়ে, নয়তো হাত ধরে পাথর টপকেছি। এখন একা। পড়লে কেউ জানতেও পারবে না।
আচ্ছা, তোমরা কি গানের শব্দ শুনতে পাচ্ছ?
হ্যাঁ, শোনা যাচ্ছে।
কোথা থেকে ভেসে আসছে গানের সুর! এই নির্জন পাহাড়ে কে গান গায়!
আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম।
চুপ। আর কথা নয়। কান পেতে শোনো! চোখ বুলিয়ে খোঁজো তাকে, যে গান গায়। খোঁজো পাহাড়ের আনাচে-কানাচে!
হ্যাঁ, আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু এ-গান তো কেউ একা গাইছে না। এ যে অনেকজনের গলা! অনেক মেয়ের গলায় গানের সুর উঠেছে। ভেসে আসছে বাতাসে দোল খেয়ে। তবে কি পাহাড়ের চুড়োয় ফুটে ওঠা ফুলের বাগান থেকে ভেসে আসছে এই গান! আমি আবার এগিয়ে চলি। ধীর পায়ে, পাথরে-পাথরে পা ফেলে, ওই চুড়োয়, ফুল-বাগানে। ফুলের গন্ধ নাকে আসছে। মন ভরিয়ে দিচ্ছে। এত ফুল এখানে কে ফুটিয়ে রেখেছে! কে?
পৌঁছে গেছি। শুনতে পেয়েছি, ফুলের আড়াল থেকে গানের সুর। দেখতে পেয়েছি এক পাথর ঘেরা গুহা। গুহার ভেতর মন্দির। আমার চোখ ঝলসে উঠেছে। ফুলের যত রং, যেন তত রং গুহার ভেতর মন্দিরের। আমি থামলুম। স্পষ্ট হল গান। সুরে-সুরে ভরে গেছে মন্দির। আমি উঁকি দিলুম পাথরের পাশে লুকিয়ে। লুকিয়ে-লুকিয়ে গান শুনি। আহা রে, আমিও যদি ওদের মতো গাইতে পারতুম!
হঠাৎ থেমে গেল গান।
কেন?
হঠাৎ কার মিষ্টি গলার স্বর শুনতে পেলুম। ঠিক যেন আমার মায়ের গলা, “কে ওখানে?”
আমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছে। আমি ভাবলুম, বুঝি-বা আমার মা। আমি পড়িমরি একছুটে ঢুকে পড়লুম মন্দিরের ভেতরে। তারপরেই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লুম। এ কে! না, আমার মা নয় তো!
তবে?
“কে তুই?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
আমি তাঁকে দেখে হতবাক হয়ে গেছি। ইনি কে! এমন রূপসী! বসে আছেন সিংহাসনে। বনবেড়ালের চামড়ায় ঢাকা সেই সিংহাসন। তাঁর সারা গায়ে ফুলের অলঙ্কার। তাঁকে ঘিরে বসে আছে একদল অপ্সরা। ফুটন্ত ফুলের মতো সুন্দর। আমি ড্যাবড্যাব করে দেখতে লাগলুম।
তিনি আমার চোখের দিকে কটমট করে তাকালেন। গম্ভীর গলায় আবার জিজ্ঞেস করলেন, “কে তুই?”
“আমি শিজুমন।” ভয়েময়ে বলে ফেললুম।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “এখানে এসেছিস কেন?”
উত্তর দিলুম, “ভেবেছিলুম তুমি আমার মা।”
তিনি ধমক দিলেন, “মিথ্যে কথা বলছিস?”
আমি বললুম, “তুমি বিশ্বাস করো, মিথ্যে বলছি না। আমি বন-পাহাড়ে হাঁটতে-হাঁটতে তোমাদের গান শুনতে পাই। শুনতে-শুনতে এখানে চলে এসেছি। তোমার গলা শুনে আমার মনে হয়েছিল, তুমি আমার মা। ”
“বানিয়ে বলছিস?” তিনি কড়কে উঠলেন। মুখখানা তাঁর রাগে রাঙা হয়ে উঠল। তিনি চোখ পাকিয়ে বললেন, “জানিস আমি কে?”
আমি উত্তর দিতে পারলুম না। তার চোখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলুম।
তিনি বললেন, “আমি ফুল আর ভালবাসার দেবী। আমি ভালবাসি সবাইকে। ভালবাসতে শেখাই মানুষকে। কিন্তু তোর মতো চোর আমার দু’ চক্ষের বিষ।”
আমি বললুম, “বিশ্বাস করো, আমি চোর নই।”
তিনি বললেন, “শুনে রাখ, আমি দেবী। আমি সবার মনের কথা জানি। তুই যে চোর, তোর চোখ দেখে তা জানতে পেরেছি। তোকে মরতে হবে।” বলে তিনি হাঁক পাড়লেন, “এই কে আছিস!”
হাঁক দিতেই দু’জন ষণ্ডামার্কা লোক কোত্থেকে ছুটে এসে আমাকে ধরল।
দেবী বললেন, “লোহার শেকল দিয়ে একে বেঁধে রাখ। ছেলেটা আমায় মিথ্যে কথা বলেছে। ছেলেটা চোর। কাল শাস্তি হবে।”
তাঁর আদেশ শুনেই লোক দুটো আমায় চ্যাংদোলা করে নিয়ে চলল। আমার পায়ে শেকল বেঁধে ফেলে রাখল আর-একটা গুহাঘরে। আমার দিকে আর ফিরেও তাকাল না। আমি আবার শুনতে পেলুম গান। এবার বোধ হয় গানের সঙ্গে নাচও হচ্ছে। কেননা, শুনতে পেলুম, নূপুরের রিনিঝিনি শব্দ গানের তালে-তালে। বলো, আর কি ভাল লাগে গান শুনতে? আমি তো এখন বন্দি। আমি পড়ে-পড়ে কাঁদতে লাগলুম। আর ওরা মনের আনন্দে নাচতে লাগল।
এ কেমন বিচার? এ কেমন দেবী? যে-দেবী আমার মনের কথা বুঝতে পারেন না, তাঁকে আবার দেবী বলে নাকি! যে-দেবী আমাকে চোর বলেন, তিনি মিথ্যে দেবী। তোমরাই বলো, এতক্ষণ ধরে তো তোমরা আমার সঙ্গে আছ। তোমরা কি একবারও দেখেছ, আমাকে চুরি করতে? মনে হয়েছে কি আমি লোভী? আমি মিথ্যে কথা বলি?
আমার হাতে শেকল। পায়ে শেকল। লোহার। আমার শক্তি নেই নড়াচড়া করার। কাজেই আমি পড়ে-পড়ে কাঁদতে লাগলুম। কখন বেলা গেল। সন্ধে নামল। রাত এল। আমি কিছুই টের পেলুম না। কেউ আমার মুখে একফোঁটা জলও তুলে দিতে এল না। কাঁদতে-কাঁদতে আমার চোখের জলে ভেসে গেছে এই অন্ধকার গুহা। চোখে এত জল আসে কোত্থেকে, এত জল! বুঝি, চোখের ভেতরেও ঝরনা আছে!
হঠাৎ মনে হল, কোনও এক গাছের ডালে, কোনও এক মস্ত পাখির ডানা ঝটপট করে উঠল। আমি কাঁদতে-কাঁদতে চমকে গেলুম। মুখ তুলে চাইলুম। যেদিকে চাই সেইদিকেই অন্ধকার। কাউকে দেখা যায় না। কিছুই চোখে পড়ে না। শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। অন্ধকারকে কেন যে সবাই অন্ধকার বলে, কে জানে! অন্ধকারের নামটা যদি অন্ধকার না হয়ে অন্য কিছু হত! তবে এখন অন্ধকারের নাম শুনে আমরা যত ভয় পাই, তখন হয়তো পেতুম না। অন্ধকার মানেই যে ভয়, এটাই বা কার মাথায় এল প্রথম? কে রটাল এই সর্বনেশে কথাটা?
ওই শোনো, গাছের ডালে পাখির ঝটপটানি এখনও থামেনি। এ আবার কী কাণ্ড! কেমন পাখি, কী পাখি আমি কিছুই জানি না। শুধু তার ঝটপটানিই শুনছি। তবে কি গাছের ওই পাখিকে কেউ আঘাত করেছে! না কি, কোনও শত্রুর সঙ্গে লড়াই করছে! একা-একা! হায় রে, আমি যদি বন্দি হয়ে না থাকতুম, তবে আমিও লড়াই করতুম। লড়াই করতুম পাখির হয়ে। পাখির শত্রুর সঙ্গে। কে না ভালবাসে বলো পাখিকে? আহা, বলো, পাখি কত সুন্দর! আরও সুন্দর লাগে যখন সে বাসার আড়ালে ছানাপোনাদের আদর করে। আদর করে তার মুখের খাবার কেমন ছানাপোনাদের মুখে তুলে দেয়! কচি-কচি মুখগুলি কেমন মায়ের ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকায়!
আমার মাও আমার চিবুক ছুঁয়ে কতবার যে চুমো খেয়েছে! তখন আমি আরও ছোট। এখন আর মায়ের মতো আমাকে কে আদর করবে? কেউ না, কেউ না। এখন আমি বন্দি। বন্দি একা, অন্ধকারে।
আমার আবার কান্না পেয়ে গেল। আমি আবার ডুকরে কেঁদে উঠলুম। কাঁদতে-কাঁদতে আমার চোখের ওপর ভেসে উঠল ফেলে আসা সেই দিনগুলি। ভেসে উঠল, খোলা আকাশের স্বপ্ন। সূর্যের দিন, আর চাঁদের রাত। বেজে উঠল, নদীর কলতান। ঝরনার ঝরা-গান। সে-দিনগুলি ছিল কত সুন্দর!
হঠাৎ এই অন্ধকারে ঝলসে উঠল আলোর রোশন। ও কে? কে দাঁড়ালেন আমার মুখের সামনে? আমি থতমত খেয়ে গেলুম। আমার চোখের ওপর ভেসে-ওঠা এ-মুখখানি কার ঝলমল করছে! এ যে দেখি ফুল আর ভালবাসার দেবী!
“শিজুমন।” তিনি ডাকলেন।
শোনো, শোনো! তাঁর ডাক শুনে পাখির ঝটপটানি থেমে গেছে। আমি চমকে উঠেছি।
তিনি আবার ডাকলেন, “শিজুমন, ভয় পাস না বাবা। আমি ভালবাসার দেবী।”
আমি অবাক হলুম তাঁকে দেখে। তাঁর কথা শুনে। এখন কেমন নরম তাঁর গলার স্বর। কেন? কেমন আলোয় ঝলসে উঠেছে তাঁর মুখখানি! কথা বলতে পারলুম না আমি একটিও।
তিনি বললেন, “আমি ভুল করেছি শিজুমন। আমি তোকে মিথ্যে শাস্তি দিয়েছি। মিথ্যে ওই লোহার শেকল দিয়ে তোকে বেঁধে রেখেছি। আমি কেন এমন নির্দয় হলুম!”
তবু আমি কথা বলতে পারলুম না। ছলছল চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলুম।
তিনি আমার আরও কাছে এগিয়ে এলেন। তাঁর দেহের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল আমার চোখে। তিনি আমার সামনে হাঁটু মুড়ে বসলেন। বললেন, “কাঁদছিস কেন শিজুমন? আমি আর তোকে বন্দি করে রাখব না। আমি তোর বন্দি শেকল খুলে দেব।” তিনি হাত বাড়ালেন। শেকলে টান দিলেন। ঝনঝন করে উঠল শেকল। আমার বাঁধন খুলে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে গেলুম।
“তোর জন্য খাবার এনেছি।” তিনি খাবারের পাত্রটি আমার সামনে রাখলেন।
আমি এতক্ষণ তাঁর মুখ দেখেছি আলোয়। হাতে খাবার দেখিনি অন্ধকারে। এখন আলোর রোশনাই খাবারের ওপর উছলে পড়েছে। তিনি একটি হাত আমার মাথায় রাখলেন। আমার সারা শরীর শিউরে উঠল। তিনি একটি হাতে চিবুক ছুঁলেন। তারপর আমার চোখের জল মুছিয়ে দিলেন। বুঝি, আমার চোখ মোছাতে-মোছাতে তাঁর চোখ দুটিও ছলছলিয়ে উঠল। আমি অবাক চোখে দেখতে লাগলুম। আর ভাবতে লাগলুম, দেবদেবীরাও কাঁদেন!
হঠাৎ তিনি খাবারের থালায় হাত দিলেন। একটুকরো খাবার তুলে নিয়ে আমার মুখে ধরলেন। বললেন, “খা!”
আমার ঠোঁট দুটি কেঁপে উঠল।
“খা!” আদরে উথলে উঠল তাঁর গলার স্বর।
আমি হতবাক হয়ে খেতে লাগলুম।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “অনেকক্ষণ খাসনি, না?”
তিনি বুঝতে পেরেছেন, তাঁর কথা শুনে আমি লজ্জা পেয়েছি।
তিনি এবার আচমকা জিজ্ঞেস করলেন, “তোর গান ভাল লাগে?”
আমি ঘাড় নেড়ে জানালুম, হ্যাঁ। কথা বললুম না।
“গাইতে পারিস?”
এতক্ষণে আমি কথা বললুম, “না।”
“আমি তোকে শিখিয়ে দেব।” তিনি আমার মুখে খাবার তুলে দিতে-দিতে বললেন।
আমি থতমত খেয়ে গেলুম তাঁর কথা শুনে। আনন্দে তোলপাড় করে উঠল আমার বুকের ভেতরটা।
ভালবাসার দেবী আমার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন এখনও। আমি খাচ্ছি। এক-একদিন আমি রাগ করে না খেলে, মাও ঠিক এমনই করে আমাকে খাইয়ে দিত। খুব দুষ্টুমি করলে কার মা না মারে। আমার মাও আমাকে মারত। যে-হাত দিয়ে মারত, সেই হাত দিয়ে যখন মা আদর করে খাইয়ে দিত, তখন কাঁদতে-কাঁদতেও কী ভাল লাগত। এখন যেমন ভালবাসার দেবীর হাতে খেতে ভাল লাগছে।
হঠাৎ ভালবাসার দেবী বলে বসলেন, “জানিস, বলতে লজ্জা করে, আমি এখানে লুকিয়ে আছি।”
আমি চমকে তাকালুম তাঁর মুখের দিকে। থ’ হয়ে গেছি তাঁর এই অদ্ভুত কথা শুনে। আমার মুখে কথা সরল না। শুধু মনে হল, এ কী কথা বলেন ভালবাসার দেবী!
তিনি আবার বললেন, “আমার শত্রু আমার পিছু নিয়েছে। সে কাউকে গান গাইতে দেখলে হিংসেয় ফেটে পড়ে। আমি গান গাই। সে সহ্য করতে পারে না। আমি ভালবাসি সবাইকে। আমায় ভালবাসে সবাই। তাই আমি তার চোখের বিষ। সে আমায় হরণ করে বন্দি করে রাখতে চায়। যেন কেউ না আমায় দেখতে পায়। আমার গান শোনে। তার হাত থেকে বাঁচার জন্যই আমি এখানে লুকিয়ে আছি।”
আমি বোবার মতো শুনছি তাঁর কথা। আমার মুখে আর খাবার উঠছে না। মন জানতে চায়, কে সে শত্ৰু? সে কি কোনও দানব, না, শয়তান? জিজ্ঞেস করার জন্য অস্থির হচ্ছি। কিন্তু পারছি না। অবশ্য আমায় জিজ্ঞেস করতে হল না। ভালবাসার দেবী নিজেই বললেন, “সে-ও এক দেবতা।”
দেবতা! কে তিনি? জানার জন্য আমার মন আকুল হয়ে উঠল।
“কে জানিস?”
আমার চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করল, ‘না, আমি জানি না। আমি জানতেই চাই!’
তিনি বললেন, “সে দেবতা হল, গুহার দেবতা।”
আমি ভয়ে সিঁটিয়ে গেলুম। কেননা, সেই গুহা-দেবতার লোভ আমার হৃৎপিণ্ডের ওপর। স্রোতের দেবী আমায় রক্ষা করেছিলেন। এবার যদি সেই হিংস্র দেবতা ভালবাসার দেবীকে খুঁজতে-খুঁজতে এখানে হাজির হন! তা হলে আমিও যে ধরা পড়ে যাব। তখন নিশ্চিত মরতে হবে আমায়। ভালবাসার দেবী আমায় কিছুতেই বাঁচাতে পারবেন না। তিনি তো নিজেই বিপদে পড়েছেন! তা হলে এবার আমি কী করব!
কোনওরকমে খাওয়া শেষ করলুম আমি।
ভালবাসার দেবী বললেন, “এখানে এই গুহা-মন্দিরে তোর ভয়ের কিছু নেই। আমি আছি। সঙ্গে আছে আমার সহচরীরা। তুই যতদিন ইচ্ছে থাকতে পারিস। আমার ভাল লাগবে। আমি তোকে ভালবাসব।”
দেবী চলে গেলেন। গুহা-মন্দিরের এদিকটা আবার অন্ধকার হয়ে গেল। ভীষণ ভয়ে আমার বুক ধুকধুক করছে। একটু আগে ভালবাসার দেবীর মুখে গান শেখার কথা শুনে আনন্দে উছলে উঠেছিল আমার মন। থাক এখন গান শেখা। এখন কেমন করে বাঁচব, সেই ভাবনায় জেরবার হয়ে যাচ্ছি। ভাবনাটা যতই চেপে ধরছে, অন্ধকারটা ততই ঘন হচ্ছে। যে-কথা শুনিয়ে গেলেন দেবী, সে-কথা শুনে কার চোখে ঘুম আসে! সুতরাং এই অন্ধকারে গুহা-দেবতার মুখখানা বারবার আমার চোখে ভেসে উঠছিল। আমি অস্থির হয়ে উঠছি। কখনও শুচ্ছি, কখনও বসছি। আর মনে-মনে ভাবছি, এখানে থাকব, না পালাব। এই অন্ধকার ডিঙিয়ে, এই রাত্রে পালাবই বা কোথায়? কোনদিকে যাব?
না, ভয় পেলে আমার চলবে না। আমায় যেতেই হবে। অন্ধকারের চেয়েও ভয়ঙ্কর গুহা-দেবতা। আমার কী ক্ষমতা, তার সঙ্গে পারি! কাজেই পালাবার জন্য আমি বুকে সাহস আনলুম। খুব সন্তর্পণে পা ফেললুম। অন্ধকারে। জানি না কোনদিকে যাচ্ছি। জানি না, এই পথ ধরে হাঁটতে-হাঁটতে আমি গুহার আরও গভীরে চলে যাচ্ছি কি না। আমার কপালে কী আছে জানি না। যাই থাক, আমাকে হাঁটতেই হবে।
হাঁটতেই হবে। কারণ অন্ধকার গুহার ভেতর তো আর ছোটা যায় না। হনহন করে যে হাঁটব, তারও উপায় নেই। কোথাও খানা, কোথাও খন্দ। মস্ত-মস্ত পাথর। তার ওপর একটু যদি অন্যমনা হই, ছিটকে পড়ব হোঁচট খেয়ে। হয় মাথা ফাটবে, না-হয় পা মচকাবে। তার চেয়ে হাঁটি-হাঁটি পা-পাই ভাল।
হ্যাঁ, মনে হচ্ছে, আমি অন্ধকারকে জয় করতে পেরেছি। মনে হচ্ছে, এবার আমি আকাশ দেখতে পাব। দেখতে পাব অসংখ্য তারা। আকাশের গায়ে। দেখতে পাব আলোর রোশনাই। তারার গা ছুঁয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে।

না তো, আমি আকাশ তো দেখতে পেলুম না। এ যে দেখি গুহার ভেতর মশাল। জ্বলছে। আমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। এখানে মশাল জ্বেলেছে কে? কেন জ্বেলেছে? আমি থমকে দাঁড়ালুম। ঝটপট একটা মস্ত-পাথরের আড়ালে গা-ঢাকা দিলুম। নিঃসাড়ে। তারপর উঁকি মারলুম।
অনেকক্ষণ পরেও কাউকে দেখতে পেলুম না। অনেকক্ষণ পরেও কারও সাড়া-শব্দ শোনা গেল না। শুধু মশালই জ্বলছে। তবে আর কতক্ষণই বা এই ঘুপচির মধ্যে বসে থাকা যায়! আমি পা টিপে-টিপে বেরিয়ে এলুম। এদিক-ওদিক চোখ ফিরিয়ে দেখি এধার-ওধার। বলা যায় না, কেউ যদি ওত পেতে থাকে!
না, আমি গুহার দেবতাকে দেখতে পেলুম না। দেখতে পেলুম, গুহার দেওয়াল জুড়ে পাথরের মূর্তি। পাথর কেটে কে এত মূর্তি গড়েছে? ওই দ্যাখো, একটা হরিণ! ঠিক মনে হচ্ছে, অনেক গাছের ফাঁক দিয়ে ছুটছে। দ্যাখা, দ্যাখো, একটা পাখি কেমন গাছের ডালে বসে আছে! মায়ের পিঠে বাঁধা ছেলেটা কেমন জুলজুল করে দেখছে! এটা যুদ্ধের ছবি। দু’ দলে যুদ্ধ হচ্ছে। কারও বুকে তীর। কারও মাথা কেটেছে। কেউ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
আশ্চর্য! এত মূর্তি। দেখতে-দেখতে আমার চোখ জুড়িয়ে গেল। মশালের আলোয় উছলে উঠেছে সেইসব মূর্তি। দেখে আমি বিপদের কথা ভুলেই বসলুম। যদি পারি তো এক্ষুনি খোদাই করি, সমুদ্রের সেই ভয়ঙ্কর হাঙরের হাঁ-করা মুখখানা। উফ্! আমার চোখে এখনও ভাসছে সেই মুখ।
“হা-হা-হা!”
কে এমন বিকট সুরে হেসে উঠল! চকিতে চোখ ফিরিয়ে দেখতে পেলুম, একজন বুড়োমানুষকে। তাঁর মাথায় ঝাঁকড়া চুল। লম্বা দাড়ি। লম্বা পোশাক। এ পোশাক কি কোনও পাখির পালক দিয়ে তৈরি! না-কি সাপের ছাল দিয়ে বোনা।
বুড়োমানুষটি হাসতে-হাসতেই বললেন, “অমন করে কী দেখছিস?”
আমি কথার উত্তর দেব কী, এখন দৌড় মেরে পালাতে পারলেই বাঁচি। কিন্তু আমি জানি, এই মশালের আলো পেরোলেই অন্ধকার। সেই অন্ধকারে কী কষ্ট করে আমি ফুল আর ভালবাসার দেবীর আস্তানা থেকে পালিয়ে এসেছি সে তো তোমরা জানোই। এখন আমার বুঝতে কোনও অসুবিধেই হল না এ-আলো কে জ্বেলেছেন। তবে, এইসব মূর্তি এই বুড়োমানুষটি গড়ছেন কি না, তখনও বুঝতে পারিনি।

তিনি বললেন, “তোর যে খুব মূর্তি খোদাই করতে ইচ্ছে করছে, আমি জানি।” বলে তিনি মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, “তোকে আমি শিখিয়ে দেব।”
আমি কেমন বোকার মতো তাঁর দিকে তাকালুম।
“আমি কিন্তু তোকে চিনি।” মানুষটি বললেন।
আমার ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। মনে হল, আবার বোধ হয় কোনও বিপদে পড়ে গেলুম আমি।
তিনি বললেন, “তুই যে খুব বিপদে পড়েছিস, সেটাও আমার জানা আছে।”
তাঁর মুখে এই কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটা ধক করে চমকে উঠল। আমি যে বিপদে পড়েছি, এই মানুষটি কেমন করে জানলেন!
“তোকে যে বিপদে ফেলেছে, তাকেও আমি জানি।”
আমার মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করতে লাগল।
“সে অনিষ্টের দেবতা। তাই না?”
আমার কেমন যেন হাত-পা অবশ হয়ে আসছে।
“তুই নিশ্চয়ই এই বুড়োকে চিনিস না।”
আমার বোধ হয় আর কথা না বললেই নয়। কিন্তু আমি কিছু বলার আগে তিনিই বললেন, “আমি শিল্পসৃষ্টির দেবতা। আমি সভ্যতার দেবতা।”
মুহূর্তের মধ্যে আমি তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নোয়ালুম। কে না জানে, তিনি আমাদের সেই দেবতা, যিনি আমাদের সৎ হতে শেখান। তিনি বলেন, কেমন করে মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবহার করতে হয়। এতক্ষণে বুঝতে পেরেছি, এই মূর্তি খোদাই করেছেন এই দেবতা, গুহার পাথরে। সবার অজান্তে।
তিনি আমার মাথায় হাত দিলেন। বললেন, “ওঠ!”
আমি উঠে দাঁড়ালুম।
তিনি বললেন, “ভয় পাস না। আমি তোকে আশীর্বাদ করছি, কোনও দেবতাই তোর প্রাণ নিতে পারবে না। পারবে না ওই অনিষ্টের দেবতাও। সে চায় না মানুষ সভ্য-ভব্য হোক। সে চায় না মানুষ শিল্পসৃষ্টি করতে শিখুক। শিখুক গান গাইতে। মূর্তি খোদাই করতে। সে চায় শুধু প্রাণ। তোদের মতো শিশুদের প্রাণ। আমি বাধা দিই। তাই তার আমার ওপর এত রাগ। সে আমাকে অপমান করে। তাই আমি এই অন্ধকার গুহায় বাস করছি। এইখানে একলা বসে মূর্তি খোদাই করছি গুহার পাথরের দেওয়ালে। আমি বুঝতে পেরেছি, তোরও ইচ্ছে তুই মূর্তি খোদাই করিস। আমি তোকে শিখিয়ে দেব।”
হঠাৎ একটা অদ্ভুত সাহসে আমার বুকটা ফুলে উঠল। হঠাৎ আমি কথা বললুম। বললুম, “দেবতা, আপনি দয়া করলে আমি ঠিক পারব।”
তিনি দরদভরা গলায় বললেন, “এই তো চাই। এই তো সাহসী মানুষের মতো কথা!”
সেইদিন থেকে আমি সেই গুহার গহ্বরে থেকে গেলুম। সেই হল আমার আশ্রয়। সেইদিন থেকে শুরু হল আমার মূর্তি খোদাই-এর শিক্ষা। শিল্পসৃষ্টির দেবতা গুহার দেওয়ালে মূর্তি খোদাই করেন। আমি দেখি। দেখতে-দেখতে অবাক হই। ভাল লাগে। কী সুন্দর!
এমনই করে দেখতে-দেখতে একদিন নিজেই আমি পাথরে খোদাই করলুম। একটি ঝরনা। দেবতা জানতে পারলেন না। একদিন একটি নদী। সেদিনও তাঁকে বললুম না। আর-একদিন একটি সূর্য। আমার সূর্য ফুটে উঠল দেবতার চোখের আড়ালে। এ-গুহাটা তো অনেক বড়। কোথায় ফুটে ওঠে আমার নদী, আমার ঝরনা, আমার সূর্য তিনি জানবেন কেমন করে! দেবতা আমায় কেন এত ভালবাসেন! তিনি আমায় ভালবেসে এনে দিয়েছেন উড়ন্ত সাপের পালকের পোশাক। কী সুন্দর। ঘুমতি রাতে তিনি আমায় গল্প বলেন। বলেন, “দ্যাখ শিজুমন, মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। মানুষই মানুষকে মারে। শুনেছিস কোনওদিন একটা জাগুয়ার আর-একটা জাগুয়ারকে মেরে ফেলেছে? না। শুনিসনি। কিন্তু নিশ্চয়ই শুনেছিস, মানুষ যেমন মানুষকেই মারে, তেমনই সে মারে জীবজন্তু—যাকে পায় সামনে, তাকেই। আর যে-দেবতা মানুষকে হিংস্র করেছে, সে হল অনিষ্টের দেবতা।” বলতে-বলতে তিনি থামেন। তারপর জিজ্ঞেস করেন, “ঘুমিয়ে পড়লি শিজুমন?”
“না, না।”
“আমার কথা শুনছিস?”
“হ্যাঁ।”
“ভাল লাগছে?”
“খুব।”
তিনি বললেন, “তোকেও কাছে পেয়ে আমারও খুব ভাল লাগছে। এতদিন ধরে তুই আমাকে দেখলি। আমি কেমন করে মূর্তি খোদাই করি তুই দেখছিস। শিখছিস। কী শিখেছিস আমি কাল দেখব। পাথর খোদাই করতে হবে। পারবি না?”
আমি খুব নরম গলায় উত্তর দিলুম, “হে দেবতা, আমি নিজে-নিজে মূর্তি খোদাই করতে পারি।”
তিনি অবাক হলেন। বললেন, “কই, আমি এখানে কোথাও দেখিনি তো?”
আমি বললুম, “হে দেবতা, আমার খোদাই করা মূর্তি আপনি এখানে তো দেখতে পাবেন না। আমি খোদাই করেছি গুহার আরও একটু ভেতরে।”
তিনি আমার কথা শুনে ব্যস্ত হলেন। বললেন, “চ’, চ’ আমাকে নিয়ে চ’ সেখানে। আমি দেখব।”
আমি বললুম, “এখনই? এখন রাতের অন্ধকার। কাল সকালে গেলে হয় না?”
তিনি বললেন, “না, না। কাল আমরা এ-গুহা ছেড়ে আর-এক গুহায় চলে যাব। মশালটা জ্বাল! চ’ দেখে আসি তোর নিজের হাতে-খোদাই মূর্তি!”
বুঝতেই পারছ, পাথর ঠুকে-ঠুকে আগুনের ফুলকি দিয়ে এখন আমি মশাল জ্বালতে পারি। মশাল হাতে দেবতাকে সঙ্গে নিয়ে গেলুম আমার ছবির সামনে। তিনি থমকে দাঁড়ালেন। দেখতে লাগলেন আমার হাতে-গড়া মূর্তি। আমি দেবতার মুখ দেখছি। দেখছি, সে-মুখে ধীরে-ধীরে হাসি ফুটছে। হঠাৎ তিনি হা-হা করে হেসে উঠলেন। আনন্দে। আমি চমকে উঠলুম। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি মাথা নত করলুম। তিনি বললেন, “শাবাশ।” বলে জড়িয়ে আদর করলেন।
পরের দিন দেবতা সত্যিই আমায় নিয়ে চললেন আর-এক গুহায়। আর-এক পাহাড়ের গহ্বরে। সেই আর-এক পাহাড়ের গা-ঘেঁষে একটা ঘন বন। বনের কোলে লাফিয়ে পড়ছে একটা ঝরনা। লুটোপুটি খাচ্ছে নাকি, লুটোপুটি খেয়ে নূপুর বাজাচ্ছে? আর ওই গাছের ডালে খঞ্জনা পাখিটা কেমন গান গাইছে। ওই দ্যাখো, নাম-না-জানা আর-এক পাখি কেমন শিস দেয়! কী ভালই না লাগে!
দেবতা জিজ্ঞেস করলেন, “শিজুমন, পারবি, ওই খঞ্জনা পাখির মতো আর-এক পাখি পাথরে খোদাই করতে?”
“হ্যাঁ, পারব।”, আমি উত্তর দিলুম। “কিন্তু...”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু বলে থামলি কেন? কী বলতে চাস?”
“দেবতা, আমার পাথরে খোদাই করা খঞ্জনা তো এমন করে গান গাইতে পারবে না।” আমি উত্তর দিলুম।
তিনি বললেন, “পাথরের পাখি গান গায় না।”
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “হে দেবতা, কেন গায় না? কেন পাথরে খোদাই নদীর বুকে ঢেউ ওঠে না? কেন সবাই চুপ করে থাকে? জীবন নেই কেন?”
দেবতা আমার মুখের দিকে চাইলেন। কিছু ভাবলেন। তারপর বললেন, “যার ক্ষমতা আছে, সে-ই পারে পাথরে জীবন দিতে।”
“আমায় আপনি সেই ক্ষমতা দয়া করে দিন না!”
তিনি উত্তর দিলেন, “শোন রে শিজুমন, ক্ষমতা কেউ কাউকে দেয় না। ক্ষমতা ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। সবার চোখের সামনে। অথচ আমরা দেখতে পাই না। সেই ক্ষমতাকে খুঁজে বার করতে হয়। যে ঠুঁটোর মতো চুপচাপ বসে থাকে, সে খুঁজে পায় না ক্ষমতা। পারে না পাথরে জীবন দিতে।”
দেবতার কথা শুনে সেইদিন থেকে আমার যে কী হল, এই অন্ধকার গুহায় বসে মূর্তি খোদাই করতে মন আর সায় দেয় না। মনে হল, এখনই বেরিয়ে পড়ি। আর, সত্যিই বেরিয়ে পড়লুম তখনই, আকাশের নীচে। আলোতে। ছুটে যাই বনে। ছুটে-ছুটে খুঁজে বেড়াই ক্ষমতা। খুঁজতে-খুঁজতে হিমশিম খেয়ে যাই। পাই না। আবার ফিরে আসি গুহায়।
এমনই করে ক’টা দিন কাটল। ক’টা দিন আনমনা হয়ে ক’টা মূর্তি খোদাই করলুম। কিন্তু আর ভাল লাগছে না। ভাল লাগছে না গুহার অন্ধকারে বন্দি থাকতে। মন কেমন করে আলোর জন্য। একটুখানি আলো।
আশ্চর্য, দেবতা বুঝি বুঝতে পেরেছিলেন আমার মনের কথা! তাই, হঠাৎ সেদিন তিনি আমায় জিজ্ঞেস করে বসলেন, “শিজুমন, আমার কাছে তোর আর থাকতে ভাল লাগছে না, না রে?”
আমি হকচকিয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকালুম। দেখলুম মশালের আলোয় তাঁর মুখখানি হাসিতে ঝকঝক করছে। ভারী মিষ্টি সেই হাসি। আমার কেমন মায়া লাগল মুখখানি দেখে। আমি লজ্জা পেলুম। কী বলব আমি দেবতাকে? তাঁকে কি আমি মিথ্যে বলব? না, কক্ষনো না।
তিনি আমায় আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি আমায় সভ্য-ভব্য হতে শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন, মূর্তি খোদাই করতে। তিনি দেবতা। তাই আমার মনের কথা জানতে পেরেছেন। তাঁকে আমার লুকোবার কিছুই নেই। আমি উত্তর দিলুম, “হে দেবতা, আপনি আমায় আশ্রয় দিয়েছেন। আমায় ভালবেসেছেন। আপনাকে আমি কেমন করে ভুলতে পারি? হে দেবতা, আপনিই তো বলেছেন, ক্ষমতা ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। সেই ক্ষমতা খোঁজার জন্য আমার মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এই গুহার অন্ধকারে থাকতে মন মানে না। তাই আমার ইচ্ছে, পৃথিবীর আলোয় আমি ক্ষমতার খোঁজ করব।”
আমি যা ভাবতে পারিনি, তাই হল। তিনি খুশিতে আমায় জড়িয়ে ধরলেন। আদর করলেন। তারপর বললেন, “ওরে শিজুমন, আমি যে তোর মুখে এই কথাটাই শুনতে চেয়েছি। ওরে ছেলে, আমি জানতুম একদিন তোর এই ইচ্ছেটাই তুই আমাকে বলবি। তুই যদি পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ঘুরে পাথরে জীবন দেওয়ার ক্ষমতা খুঁজে পাস, তবে আমার চেয়ে আর কে বেশি খুশি হবে! ওরে শিজুমন, আমি দেবতা। আমি তোকে আশীর্বাদ করেছি। কোনও দেবতাই তোর প্রাণ নিতে পারবে না। তোর আর কোনও ভয় নেই। তুই এগিয়ে যা!”

পরের দিনই আমি শিল্পসৃষ্টির দেবতার কাছে বিদায় নিয়ে সত্যি-সত্যি বেরিয়ে পড়লুম। পাহাড়ের গায়ে-গায়ে ছড়ানো বনের পথ ধরে এগিয়ে চললুম। আমি জানি না কী খাব। কোথায় শোব। আমার গায়ে উড়ন্ত সাপের পালকের পোশাক। আর আমার কাঁধের ঝুলিতে পাথর খোদাই করার একটি ছেনি। একটি হাতুড়ি। শিল্পসৃষ্টির দেবতা দিয়েছেন। একা-একা হাঁটতে-হাঁটতে আমি বুঝতে পারছি, এখন আমি ঠিক তেমনটি আর ছোট নই। আমি বড় হয়েছি। আমি যে-চোখে সেই ছেলেবেলায় আকাশ দেখে হাতছানি দিতুম, এখন আর তা দিই না। এখন মনে হয়, আকাশ আছে বলেই পৃথিবী এমন সুন্দর। আকাশ আছে বলেই সূর্যের আলো আছে। চাঁদের জ্যোৎস্না আছে। আছে তারার ঝলমলানি। পাখিরা খেলে বেড়ায় রঙিন ডানা মেলে। আকাশের জন্যই বুঝি বন এমন সবুজ! ফুল এমন রঙিন! নদী এমন উচ্ছল! পাহাড় পরেছে তুষারের মুকুট!
আমি কোথায় চলেছি? শুধু বন আর বন। হাঁটছি। দেখছি। দাঁড়াচ্ছি। ওই যে মস্ত গাছটা, কত পাখি তার ডালে-ডালে। না-জানি কতকাল ধরে এমনই করে দাঁড়িয়ে আছে। কত পাখি গেল। কত পাখি এল। গাছের কোটরে বাসা বাঁধল। ছানা-পোনাদের বড় করল। উড়তে শেখাল। তারপর একদিন সবাই উড়ে চলে গেল। আচ্ছা, পাখিরা কি গাছের কথা মনে রাখে? তাদের মন কি গাছের জন্য কেমন-কেমন করে না? পাখি ডানা মেলে উড়তে পারে। কাঠবিড়ালি ডালে-ডালে ছুটতে পারে। কিন্তু গাছ কিছুই পারে না। চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে। যেখানে জন্মায়, সেইখানেই। আমি ওই মস্ত গাছটার বুকে বুক ঠেকালুম। চিৎকার করে উঠলুম, “ও আমার নাম না-জানা গাছ, তুমি আমার বন্ধু হবে? আমি বড্ড একা। আমার কেউ নেই। আমি তোমায় ভালবাসি গাছ। তোমার কি আমাকে দেখে একটুও কষ্ট হচ্ছে না? তুমি কেন হাসতে পারো না গাছ? কেন পারো না কথা বলতে? গান গাইতে? ফুল আর ভালবাসার দেবী গান গাইতে পারেন। আমি চুপিচুপি একদিন তাঁর গান শুনে, মনে রেখেছি। তুমি শুনবে সেই গান? আমি গাচ্ছি। তোমার কান থাকে শুনো। না-থাকে বোবার মতো দাঁড়িয়ে থাকো!” বলে, আমি গাইতে শুরু করলুম। শুরু করার আগে তোমাদের কানে-কানে বলি, এ-গানটা কিন্তু ভালবাসার দেবীর নয়। আমার নিজের। তাই বিচ্ছিরি। বেতালা। এ-বেতালা গানই শোনাতে লাগলুম গাছকে :
এমন যদি হত,
ফুলগুলো সব পাখির মতো
হাওয়ায় ভেসে উড়ত,
পাখির ছানা ডিম না-ফুটে
গাছের ডালে ফুটত!
মজা হত ভারী
তোমরা বোধ হয় বলতে আমায়
আচ্ছা বোকার ধাড়ি!
এমন যদি হত,
গাছগুলো সব জলের ওপর
গটমটিয়ে হাঁটত,
মাছের ছানা জল না-ছুঁয়ে
ডাঙার ওপর নাচত!
মজা হত ভারী
তোমরা বোধ হয় বলতে আমায়
আচ্ছা বোকার ধাড়ি!
ওই তো দ্যাখো, আমার গান শুনে গাছটা কেমন পাতার ঝুমঝুমি বাজাচ্ছে! ওই তো বাতাস কেমন নাচছে। আমি উঠে পড়লুম গাছের ওপর। লাফ দিলুম, এ-ডাল থেকে আর-এক ডালে। আনন্দে হাততালি দিলুম। তারপর পাতায়-পাতায় লুকোচুরি খেলা শুরু করে দিলুম।
ওই দ্যাখো, ওই পাশের গাছে একটা সাপ! গাছের ডাল জড়িয়ে কেমন ফণা তুলেছে। আমি এই গাছের এই ডালে দুলতে-দুলতে আর-এক গাছে লাফ দিলুম। আরে, দ্যাখো-দ্যাখো একঝাঁক সারস। গাছের ডাল ছেড়ে ফুড়ুত! আকাশে উড়ল। একেবারে আমার মাথার ওপরে। কত হরিণ দ্যাখো! ছুটছে। ছুটছে, না নাচছে! আমি তরতর করে নেমে পড়লুম, গাছ থেকে মাটিতে। ওই যে ছোট্ট হরিণটা মায়ের পিছু ছুটছে, আমিও ছুটলুম তার পেছনে। ছুটলে কী হবে! আমি কি ধরতে পারি! তবু ছুটলুম। ছুটে-ছুটে খেলা শুরু করে দিলুম। গাছের আড়ালে। পাতার ফাঁকে-ফোকরে। আমার খেলা দেখে আকাশের সারসের দলও কেমন আনন্দে উথাল-পাথাল করছে! ওরে বাবা! একটা কুচকুচে ভালুক কেমন একটু দূরে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে! পেটে-পেটে ওর কী মতলব কে জানে!
না, না, ভালুকটা উঠে দাঁড়াল। দেখতে পাচ্ছ, আমার দিকেই হেঁটে আসছে! কী ধুমসো রে বাবা! কী হবে? আমায় মারবে নাকি! না, এখানে দাঁড়ানো ঠিক নয়। আমি পড়িমরি করে সামনের গাছটায় উঠে পড়লুম। ও বাবা! ভালুকটাও যে উঠছে। কেমন হেলাফেলা করে গাছে উঠে পড়ল। আমি কী করি। মারলুম এ-ডাল থেকে ওই সামনের ডালে লাফ। তার গ্রাহ্যই নেই। সেও উঠে পড়ল। আমিও একটা নীচের ডালে ঝুলে পড়লুম। ওমা, ভালুকটাও দ্যাখো কেমন ঝুলে পড়ল। এই বুঝি আমার ঘাড়ে পড়ে। না, না, পড়ল না তো! ডাল ধরে কেমন দুলছে। ভালুক দুলছে। গাছও ঝমঝমাচ্ছে। আকাশের সেই সারসের দল গাছের ডালে নেমে এসে শিস দিচ্ছে। তবে কি সবাই একসঙ্গে আনন্দ করছে! আমিই শুধু ভয়ে মরছি! না, না, আমি বেবাক ভুলে গেলুম ভয়ের কথা। আমি গাছ, পাখি আর ভালুকের নাচ-গান-হল্লা দেখতে লাগলুম হাঁ করে!
এ কী! হঠাৎ কোথাও কিছু নেই ভালুকটা ঝাঁপ দিল। ঝপাং। আমি যে-ডালে বসে আছি, সটান সেই ডালে। আমি ছিটকে পড়লুম সিধে মাটিতে। লাগল একটু। ভালুকটাও লাফ মেরে পড়ল। মাটিতে। আমি দিলুম ছুট। গাছ থেকে পড়ে আমার লাগল, না ভাঙল, কে আর ভাবে সে-কথা। এখন পালাতে পারলেই বাঁচি!
আমি ভয়েময়ে অনেকখানি পালিয়ে এসেছি। অনেকখানি এসে মনে হল, দেখি তো ভালুকটা এখনও আমায় তেড়ে আসছে কি না। এই ভেবে আমি পিছু ফিরেছি। ফিরেই থমকে গেছি। হ্যাঁ, ওই তো আসছে। কী কাণ্ড দ্যাখো! ভালুকটার পিঠে একটা বানরছানা! আমি তো দেখে ভ্যাবাচাকা হাম্বা! এমন মজা লেগে গেল, আর কে পালায়! বানর-পিঠে ভালুকটা চোখের পলকে আমার মুখের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। সটান সিধে হয়ে দাঁড়াল। যেমন আমি দাঁড়িয়ে আছি। তারপর বানরছানাটাকে পিঠে নিয়ে নাচতে লাগল। এই রে, বানরছানাটা বুঝি ডিগবাজি খায়! না, না, দ্যাখো, ছানাটা কেমন ভালুকের গলা জড়িয়ে আছে শক্ত হাতে!
নাচতে-নাচতে ভালুকটা আমার একেবারে সামনে এল।
আমি ভয় পেলুম না।
নাচতে-নাচতে আমায় ছুঁতে লাগল।
আমার হাসি পেল।
বানরছানাটা ভালুকের পিঠ থেকে হঠাৎ লাফ মারল আমার দিকে।
আমি আঁতকে উঠলুম।
আমার বুকটা জড়িয়ে ধরল।
আমি হেসে ফেললুম।
ভালুকটা নাচ থামিয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল।
বানরটা আমার বুক থেকে ঝাঁপ দিল।
আমি হাঁপ ছাড়লুম।
বানরটা লুটোপুটি খেতে লাগল।
আমিও লুটোপুটি খেতে লাগলুম। খেতে-খেতে দেখলুম, সেই একপাল হরিণও আনন্দে হুটোপাটি লাগিয়ে দিয়েছে। সেই একঝাঁক সারসের সঙ্গে অসংখ্য রঙিন পাখিও আকাশে ডানা ছড়িয়ে দিয়েছে। বাতাসে ভাসতে-ভাসতে কলরোল তুলেছে। সে যে কী আনন্দের দৃশ্য, যে না দেখেছে তাকে কেমন করে বোঝাই!
ওমা! কোথাও কিছু নেই, ভালুকটা ঝট করে আমায় পিঠে তুলে নিল। বনের ভেতর হাঁটা দিল। কী মজা! আমার মাথার ওপর উড়ে চলল ঝাঁক-ঝাঁক সারস। কত রঙিন পাখি। উরি বাবা দ্যাখো, কত বানর! ওই দ্যাখো সেই ছোটকু বানরটা। একটু আগে আমাকে জড়িয়ে ছিল। এখন কেমন মায়ের পিঠে বসে আছে!
হঠাৎ এ কী হল! ভালুকটা অমন বিগড়ে গেল কেন! হঠাৎ কেন আমাকে ছুড়ে ফেলে দিল তার পিঠ থেকে! কেন পালাল বনের ভেতর ঝোপের আড়ালে! বানরগুলোই বা কেন হুপহাপ করে লুকিয়ে পড়ল এ-গাছে, ও-গাছে। কোথায় গেল আকাশের সারসের দল! রঙিন পাখির ঝাঁক! কেন অমন সব চুপচাপ হয়ে গেল! আমি শুধু একলাটি দাঁড়িয়ে আছি বনের ভেতরে। দেখছি, ফ্যালফ্যাল করে। সত্যি বলছি আমি একদম বোকা হয়ে গেছি। কেননা, আমি যেদিকেই তাকাই, দেখি, সেদিকটা খাঁ-খাঁ। বোঝবার উপায় কী, একটু আগে এখানে একটা মস্ত মজার কাণ্ড হচ্ছিল।
কাণ্ডটা বটে! দ্যাখো, আমার সামনে কে!
ওই দ্যাখো, তার চোখদুটো জ্বলছে!
মুখখানা কী হিংস্র! দেখতে পাচ্ছ, গায়ে তার হলদে পুটকির আঁকিবুকি? ল্যাজটা কত বড়! বলতে পারো, ওর নাম কী?
জাগুয়ার।
আমি আঁতকে উঠলুম। দাঁড়াব, না পালাব? জাগুয়ারের মতো বনের গলি-ঘুঁজি আমার জানা নেই। যেখানেই পালাই, নিস্তার নেই। তবে কি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে মরব?
ওই তো সে এসে পড়ল! আমার সামনে। ওখান থেকে একটা লাফ মারলেই, আমার ঘাড় মটকে যাবে। না, জাগুয়ারটা এখনও লাফ মারল না। আমার দিকে প্যাটপ্যাট করে দেখতে লাগল। আর যেন মনে-মনে বলতে লাগল, আর বেশিক্ষণ নয়। যতক্ষণ পারিস শ্বাস নিয়ে নে। এর পর তোকে চিবিয়ে খাব!
হ্যাঁ, সত্যিই তখন আমি জোরে-জোরেই নিশ্বাস নিচ্ছি। জানি শয়তানটা এক্ষুনি ঝাঁপিয়ে পড়বে ঘাড়ে। তখন যদি আমার মুখখানা তোমরা দেখতে, নিশ্চয়ই তোমাদের করুণা হত। তোমরাও হায়-হায় করে বলে উঠতে, গেল, গেল, ছেলেটা গেল!
কিন্তু অত সহজে যাওয়ার ছেলে আমি নই। তাই যেই না—জাগুয়ারটা একটু অন্যমনস্ক হয়েছে, আমি দিয়েছি চোঁচাঁ দৌড়। ব্যস! হল উলটো বিপত্তি। আমার ছুট দেখে জাগুয়ারটাও মারল লাফ। সটান আমার মাথা টপকে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমার পথ আটকে। দাঁড়াক। আমি আবার উলটো দিকে দিলুম ছুট। পলকে সেও লাফাল। আমার পথ আটকাল। তারপর তেড়ে এল। কিন্তু ধরল না তখনও। আমি তার তাড়া খেয়ে এদিক-ওদিক ঘুরপাক খেতে লাগলুম। কিন্তু কতক্ষণ ঘুরপাক খাব! কতক্ষণ আমার দম থাকবে! এইবার আমায় মরতে হবে।
আশ্চর্য! ঠিক এই সময়ে একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে গেল। কোথায় ছিল একটা সোনালি ঈগল। আকাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল জাগুয়ারের পিঠের ওপর। খামচে দিল নখ দিয়ে। আচমকা খামচানি খেয়ে জাগুয়ারটাও লাফিয়ে উঠল। অমনই ঈগলটা তার মাথায় দিল ঠোঁটের ঠোক্কর। যন্ত্রণায় গর্জে উঠল জাগুয়ারটা। এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে সে ঈগলটাকে ধরার জন্য তাক করতে লাগল। কিন্তু আকাশের পাখিকে ধরা কি অত সোজা! নখের খোঁচা আর ঠোঁটের ঠোক্কর খেয়ে রক্তে গা ভেসে গেল জাগুয়ারের। তার মাথা গেল বিগড়ে। এবার ঈগলটা আবার যেই তাকে আঘাত করতে গেছে, অমনই জাগুয়ারটা আচমকা মেরেছে এক ল্যাজের ঝাপটা। ঈগলটা ছিটকে পড়ল। ফেঁসোর মতো হাওয়ায় ভেসে গেল তার গায়ের পালক। ঈগল আবার উঠল। পলকে সে আবার আঘাত করার জন্য ঝটাপটি লাগিয়ে দিল। তাই না-দেখে জাগুয়ারটা মারল লাফ। তারপর দে-লম্বা। কোথায় যে গেল আর দেখা গেল না।
আমি ছুটে গেলুম ঈগলটার কাছে। হাঁপাচ্ছে। তুলে নিলুম। বোধ হয় ল্যাজের ঝাপটায় পায়ে আঘাত লেগেছে। আমি তাকে বুকে নিয়ে ছুটে চললুম। কোথায় একটু জল পাওয়া যায়! না, ঈগলকে বাঁচাতেই হবে! আমার প্রাণ বাঁচাবার জন্য নিজের প্রাণ তুচ্ছ করেছে ঈগল। তাকে বাঁচাবার জন্য আমার প্রাণ যায়, যাক। আমি তাই ঈগলকে বুকে নিয়ে বনের ঝোপঝাড় ডিঙোতে লাগলুম। একটু জলের জন্য। তারপরেই আমি শুনতে পেলুম জলের ঝরঝরানি। কান পেতে ওই ঝরঝর শব্দ শুনি, আর ছুটি। যতই ছুটি, ততই যেন শব্দ এলোমেলো হয়ে যায়। কই জল? কোনদিকে? শব্দ যেন চারদিক থেকে ছুটে আসছে। অথচ জলের চিহ্ন নেই। এ কী ধাঁধায় পড়লুম। আমি দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক খুঁজে বেড়াচ্ছি। একটু জল। ঈগলের জন্য। না, আমি আর পারছি না। আমার পা টলমল করছে। আমার মাথায় যেন চক্কর লেগে গেছে। আমি বসে পড়লুম। ঈগলকে বুক থেকে নামিয়ে পাশে রাখলুম। তারপর অনেকক্ষণ হাঁসফাস করে নিশ্বাস ফেলতে লাগলুম। তখন আর কিছুই মনে পড়ছিল না। ভারী কষ্ট হচ্ছিল।

কতক্ষণ অমনই করে পড়ে ছিলুম বলতে পারব না। হঠাৎ যখন মনে হল, আমি বোধ হয় ঘুমোচ্ছিলুম, তখনই চোখ খুলেছি। চোখ খুলতেই কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি। এ যে অন্ধকারে সারা বন ঢেকে গেছে! কিচ্ছু নেই, কেউ নেই। নেই সেই ঈগলটাও। তখন যে একটার পর একটা অতসব কাণ্ড ঘটে গেল, তার একফোঁটা চিহ্নও অন্ধকারে ঠাহর করতে পারছি না। এ তো ভারী তাজ্জব কাণ্ড! বসে-বসে আমি অন্ধকার হাঁটকাতে লাগলুম। আর ভাবতে লাগলুম সেই ঈগলের কথা। কোথা থেকে উড়ে এল জানি না। কেন আমায় বাঁচাল, তা-ও জানি না। তবে কি আমি স্বপ্ন দেখেছি? সে কি তবে স্বপ্নের ঈগল?
আরে, অন্ধকারে কিসে যেন হাত ঠেকল! খাবার! কে দিল? কে রেখে গেল? কে এমন করে আমাকে দয়া করছে বারবার? আমি অবাক হয়ে ভাবছি। শুধুই ভাবছি। আর খাবারের টুকরো মুখে ফেলছি।
খিদে মিটল বটে। কিন্তু এখন অন্ধকারে কী করব আমি। গাছের গায়ে গাছ গা ঠেকিয়ে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে, আকাশটা পর্যন্ত নজরে পড়ছে না। দল বেঁধে যখন বাবা আর মায়ের সঙ্গে রাতের অন্ধকারে পথ হেঁটেছি, তখন আকাশ দেখে কেমন করে দিক ঠাহর করতে হয়, শিখেছি। সুতরাং এখন যদি একফালি আকাশও দেখতে পেতুম, তবে বোধ হয় বন থেকে বেরনোর পথের হদিস করা যেত। সত্যি করে বলো তো, তোমরা যদি আমার মতো হঠাৎ অন্ধকার বনে হারিয়ে যেতে, কী করতে? কেঁদেই ভাসিয়ে দিতে, তাই না? বটেই তো! তাবড়-তাবড় জোয়ানদেরও ধাত ছেড়ে যাবে আমার মতো বিপদে পড়লে।
কী করা যাবে! ভয় পেছনে তাড়া করলেও, ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপলে চলবে না আমার। যাহোক করে রাত কাটাবার একটা আস্তানা খুঁজে বার করতেই হবে। এখনও হঠাৎ-হঠাৎ ঈগলটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আহা রে, কে জানে ঈগলটা বাঁচল, না মরল। হয়তো দ্যাখো, বনেরই কোনও জন্তু আহত ঈগলটাকে খেয়ে ফেলেছে। জাগুয়ারটা যে তাকে আবার আক্রমণ করেনি, তাই-বা কেমন করে অবিশ্বাস করি! একটা আহত পাখিকে যে কেউ আক্রমণ করতে পারে, তাতে বাহাদুরির কিছু নেই। কিন্তু বাহাদুর তাকেই বলি, যে জাগুয়ারের মতো একটা হিংস্র প্রাণীর সঙ্গে লড়ে যেতে পারে। তা-ও কী, লড়াইটা আমার মতো একজন পথের ছেলের প্রাণরক্ষা করার জন্য। সাহস কাকে বলে! কিন্তু আমার জন্যই বা ঈগলের অত দয়া কেন? অথচ, সেই পাখির মুখে আমি একফোঁটা জলও দিতে পারলুম না।
আমি শিউরে উঠলুম! একটা যেন চাপা নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি! চকিতে আমি চোখ ফেরালুম। কিন্তু কাকেই বা দেখতে পাব এই জমাট অন্ধকারে! অথচ বুঝতে পারছি নিশ্বাসের শব্দটা কাছে আসছে। স্পষ্ট হচ্ছে। এমন সময়ে একটা গরম হাওয়ার তাপ লাগল আমার গায়ে। হঠাৎ বাজ পড়লে মানুষ যেমন আঁতকে ওঠে, আমারও তাই হল। আমি ধড়ফড় করে পিছু ফিরলুম। আমি ভেবেছিলুম, সেই জাগুয়ারটাই বুঝি পেছনে এসেছে। কই জাগুয়ার! এ যে এক বিকট মূর্তি! যেন একটা দানব। সে চিৎকার করে হেসে উঠল। আমার কানে তালা লেগে গেল। আমি চেপে ধরলুম দু’হাত দিয়ে আমার কান, অন্ধকারে চোখ দুটো তার ভাটার মতো জ্বলছে! মুখের গহ্বরটা লাল টকটক করছে। ঘোর অন্ধকারে কী ভীষণ দেখতে লাগছে।
সে ঝপ করে হাসি থামাল। ছ্যাতলাপড়া দাঁত দু’পাটি কড়মড় করতে লাগল। আমি ঝট করে আমার ঝুলির ভেতর হাত পুরতে গেলুম। ঝুলির ভেতর মূর্তি খোদাই করার হাতুড়ি আর ছেনিটা আছে। ওই হাতুড়ি দিয়ে ওকে আমি আঘাত করব। কিন্তু ঝুলি তো নেই! এদিকে হাতড়াই। ওদিকে হাতড়াই। ঝুলি কই? তবে কি কোথাও পড়ে গেছে। এই যাঃ! এখন কী করি? দানবের মতো ভয়ঙ্কর সেই জীবটা আমার দিকে হাত বাড়াল। আমাকে বুঝি ধরে ফেলে! আমি পালাই! কিন্তু কোথায় পালাই? যেদিকে চোখ যায় সেইদিকেই অন্ধকার। পালাবার পথ দেখতে পাই না। সুতরাং এখন দানবের হাতে আমায় মরতেই হবে। আর আমার যেই মরার কথা মনে হয়েছে, তখনই কে যেন আমার মনের ভেতর চেঁচিয়ে উঠল, “শিজুমন, ভিতুর মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যে মরে, সে মানুষ নয়। মরতে হলে দু’ ঘা দিয়ে মরো।”
বুকটা আমার সাহসে ফুলে উঠল। আমি চেঁচিয়ে কড়কে উঠলুম, “শোন রে দানো, ভাল চাস তো যেখানে আছিস সেখানে দাঁড়িয়ে থাক! আর এক-পা যদি কাছে আছিস, আমার হাতে তুই মরবি।”
অমনই আবার হেসে উঠল সেই দানব। সেই হাসিতে আচমকা ঝড় ওঠে। গাছের গায়ে গাছ লুটিয়ে পড়ে সেই হাসির ঝড়ে। গাছে-গাছে পাখ-পাখালি ঝড়ের ধাক্কায় ঘুরপাক খায়। চিৎকার করে। মাটি বোধ হয় কাঁপে। ভূমিকম্প হচ্ছে বুঝি! আমি টাল খেয়ে পড়তে-পড়তে সামলে যাই। মনে-মনে ভাবলুম, যার হাসির শব্দে ঝড় ওঠে, সে আমাকে খামচে ধরলেই আমার কাজ সারা! তবু দমলে চলবে না। তাই, আমি আবার বললুম, “শোন রে, নক্তচর, তোর হাসিতে ঝড় উঠুক, কি মাটি কাঁপুক, আমি ভয় পাই না। আমি যদি এক্ষুনি লাফিয়ে উঠে তোর চুলের গোছা খামচে ধরি, তোর মুণ্ডুখানা উপড়ে যাবে!”
সে এবার আরও জোরে হেসে উঠল। আরও জোরে শব্দ উঠল। মনে হল, কোথায় যেন মাটি ফাটল। যেন পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ল। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। বুঝি বাজ পড়ল! হ্যাঁ, ওই তো বাজ পড়েছে! বনে আগুন লেগেছে! ওই তো, দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠেছে বন। বনে আগুন দেখে আমি থরহরিকম্প। এখন কী করি? আহা রে, গাছগুলো অমন অসহায়ের মতো পুড়ে-পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, আর আমি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখব! এখন তো আমি আগুনের আলোয় দেখতে পাচ্ছি স্পষ্ট সব কিছু। দেখতে পাচ্ছি সেই দানবটাকেও। সে গর্জে উঠল, “ওরে পুঁচকে খোকা, আর পালাবি কোথায়? ওই আগুনই তোকে পুড়িয়ে মারবে! আমি এবার মারব টুসকি। তুই উড়তে-উড়তে পড়বি আগুনে। তারপরেই সব শেষ!”
আমিও কম যাই না! আমিও অগ্নিমূর্তি ধরলুম। বললুম, “যে-আঙুলে তুই টুসকি মারবি রে দানব, সে-আঙুল তোর মচকে ভেঙে দেব।”
“ভাঙ দেখি!” বলে সে যেই টুসকি মারার জন্য আঙুল বাড়িয়েছে, আমিও লাফিয়ে উঠে তাকে ধরতে গেছি। বলব কী, চোখের পলকে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। অদৃশ্য হয়ে কোথায় যে পালাল, আমি দেখতেই পেলুম না। আশ্চর্য!
কিন্তু এদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে দাউ-দাউ করে। বন পুড়ছে। চারদিক আগুনে-আগুনে লাল হয়ে গেছে। বনের পাখি প্রাণের ভয়ে আকাশে চিৎকার করে উড়ছে। বানরগুলো লাফ দিচ্ছে এ-গাছ থেকে ও-গাছে। পালাচ্ছে। কাঠবিড়ালি ছুটছে। যে যেদিকে পারছে। দ্যাখো, সেই হরিণগুলোকে! দ্যাখো, ভালুকের দৌড়। কোথায় যে কে পালাবে! হায় রে, আমি যে কী করি! এই গাছ আমার বন্ধু। ওই হরিণ, বানর, ভালুক, এমনকী ওই ছোট্ট কাঠবিড়ালিও আমার বন্ধু। আমি কেমন করে বাঁচাই ওদের! আমি চিৎকার করে উঠলুম, “হে আগুনের দেবতা, তুমি দয়া করো! হে দেবতা, তুমি আমাকে ঝলসে দাও, ওদের রক্ষা করো। আমার প্রাণ নিলে ওরা যদি বাঁচে, তবে তুমি আমার প্রাণ নাও!”
কিন্তু আগুনের দেবতা আমার কথায় কান দিলেন না বুঝি! আগুন জ্বলছে। লকলক করে। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলুম না। চিৎকার করি। কাঁদি। এদিক-ওদিক ছুটি। জড়িয়ে ধরি হরিণছানাকে। ওর গায়ে না আগুন লাগে। বুকে তুলে নিই কাঠবিড়ালিকে। আহা! আগুনের তাপ না-লাগে তার গায়ে। তবু আগুন বাধা মানে না। আমি কেঁদে উঠি, “হে বৃষ্টির দেবতা, আমার মতো ছোট্ট যারা, তাদের চোখে জল দেখলে তুমি খুশি হও। তারা যত কাঁদে, তোমার দয়ায় ততই বৃষ্টি হয়। দ্যাখো হে দেবতা, আমার চোখে জল। আমি উৎসর্গ করছি তোমাকে। তুমি জল দাও, আকাশ ভেঙে জল দাও! বনের আগুন নেভাও! আমার বন্ধুদের বাঁচাও!” বলতে-বলতে আমি ছুটি। ছুটতে-ছুটতে আকাশের ওপারে হাত তুলে হাহাকার করি। একটুকরো মেঘ যদি দেখতে পাই।
হায় রে, কই মেঘ?
আমি আবার আর্তনাদ করি, “হে মেঘের দেবতা, একটু কি দয়া করবে না? আকাশ কাঁপিয়ে তুমি কি একবারও গর্জে উঠবে না? তুমি কি ছড়িয়ে দেবে না এই জ্বলন্ত বনের গায়ে বৃষ্টির ঝরনা?”
আমি জানি না, বৃষ্টির দেবতার কানে আমার কথা পৌঁছল কি না। কিন্তু আকাশের দিকে চেয়ে এখন আর আমি দেখতে পাই না অসংখ্য তারার একটি তারাও। দেখতে পেলুম, বিদ্যুতের ঝলকানি। শুনতে পেলুম, মেঘের গর্জন। আমার কান্না-ভেজা চোখের পাতায় একটি-দুটি ফোঁটা। আমি আকাশের দিকে হাত তুলে আনন্দে লাফিয়ে উঠলুম। আমার চোখের জল এখন যেন খুশির কান্না হয়ে আমার গাল ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সে যেন বাঁধ মানে না। আমার চোখ কান্নার জলে যতই ভেসে যায়, বৃষ্টির ফোঁটাগুলি ততই যেন অঝোরে উপচে পড়ে বনের গায়ে-গায়ে। মাটিতে। আমি দেখতে পাই আগুনের সঙ্গে বৃষ্টির লড়াই। এ লড়াইয়ে কে জিতবে সবাই জানে। তবু শেষ অবধি লড়ে গেল আগুন। পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে গেল বনের কত গাছ। গাছে-গাছে পাখিদের কত ঘরকন্না। কত প্রাণ। কত প্রাণী।
আশ্চর্য, আগুন তো হারল, কিন্তু বৃষ্টি তো এখনও থামল না। সে তো ঝরেই চলেছে। একটানা। ঝমঝম। আমার অবস্থাটা দ্যাখো! দ্যাখো, বৃষ্টিতে ভিজে কী দুর্গতি হয়েছে। কাঁপছি ঠকঠক করে ঠাণ্ডায়। কোথায় দাঁড়াব? কোথায় দাঁড়িয়ে মাথাটা বাঁচাব? আচ্ছা, থামো না! আর তো বৃষ্টির দরকার নেই। দেখতে তো পাচ্ছ আগুন নিভে গেছে।
বয়ে গেছে বৃষ্টির। সে ঝরেই চলেছে। যেন আর কোনওদিন থামবে না। অগত্যা আমাকে আবার চিৎকার করতে হল, “হে বৃষ্টির দেবতা, তোমার দয়ায় আগুনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে বন। এবার তুমি যদি দয়া করে থামো, আমি রক্ষা পাই।”
আমার যেন মনে হল, আমার কথা শুনে বৃষ্টির ফোঁটারা ঝমঝম করে চেঁচিয়ে উঠল :
আকাশের দূর দূর
মেঘ ডাকে গুড় গুড়
দেবতার খুশিমতো ঝরছি,
তোমাদের কান্নায় জৌলুস পান্নায়
বৃষ্টির ফোঁটাগুলি গড়ছি।
কই দিলে দক্ষিণা?
সোনা দানা? ছি ছি ছি না
শুনে রাখো দাও তুমি বলি যা,
দেবতাই নিজে কন পেলে তিনি খুশি হন
দাও যদি তোমার ওই কলিজা।
বৃষ্টির এই সর্বনেশে কথা শুনে আমি থমকে দাঁড়াই। বুঝতে পারি বৃষ্টির দেবতার আমি এখন নজরবন্দি। তিনি আমার হৃৎপিণ্ড চান। এখানে, এখন আর কেউ আমাকে বাঁচাতে পারবে না। আমার হৃৎপিণ্ড না পেলে বৃষ্টি তো থামবেই না? এমনকী আমি যেখানে যাব, সেইখানে বৃষ্টিও আমাকে ধাওয়া করবে। বৃষ্টির জলে ভিজে-ভিজে আমার প্রাণ শেষ হয়ে যাবে। অবশ্য, এখন যদি মাথা বাঁচাবার মতো একটা ঠাঁই পেতুম, তবে হয়তো লড়াই করা যেত বৃষ্টির দেবতার সঙ্গে। কিন্তু সে-ঠাঁই কোথায় বা খুঁজে পাই এই দুর্যোগে! কাজেই এই বনের আধপোড়া গাছগাছালির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি বৃষ্টির জলে ভিজতে লাগলুম। আচ্ছা বলো তো, দেবতারা আমাদের মতো ছোট-ছোট ছেলেদেরই কেন প্রাণ চান। অবাক লাগে ভাবতে। কী অন্যায় লোভ। যেসব দেবতা রক্ত ছাড়া তুষ্ট হন না, তাঁরা কেমন দেবতা! কী দরকার সেসব দেবতার পুজো করে!
থাক সে-কথা। আমি জানি না, কখন ভোর আসবে। আরও কতক্ষণ এই বৃষ্টির জলে আমায় ভিজতে হবে তাও আমি জানি না। বৃষ্টি যে থামবে না, সে তো বৃষ্টিরাই আমায় জানিয়ে দিল। আমিও যে প্রাণ দেব না, এ-কথা চিৎকার করে বৃষ্টিদের বলা হয়নি। কিন্তু মন আমার বারবার বলতে চাইছে, “হে দেবতা, ক্ষমতা থাকে আপনি আমাকে বৃষ্টির জলে ভিজিয়ে মারুন! ভাববেন না আমি নিজের ইচ্ছেয় বুক পেত দেব। বুক পেতে কখনওই বলব না, এই আমার প্রাণ, আমি আপনাকে উৎসর্গ করলুম। আমি লড়াই করব আপনার সঙ্গে। চিৎকার করে বলব, আমি আপনাকে ভয় পাই না।”
ওই দ্যাখো, রাতের আকাশটা যেন একটু-একটু ফরসা হচ্ছে। জানি তো, সূর্য উঠবে না। মেঘে ঢাকা আকাশ থেকে অঝোরে ঝরেই যাবে বৃষ্টি। বৃষ্টি ঝরুক। তবু তো অন্ধকার কাটবে। রোদের ঝিলিক নাই থাক। চোখের দৃষ্টি দিনের ঝাপসা আলোয় পথ চিনে ঠিক চলতে পারবে।
আলো ফুটছে। বৃষ্টি ঝরছে। আমি ভিজছি। ভিজতে-ভিজতে হাঁটছি। আমার চোখের ওপর ভেসে উঠছে আগুনে পোড়া ধ্বংসের ছবি। আমি অবাক চোখে দেখতে-দেখতে দাঁড়াচ্ছি। ভাবছি, আহা, কাল যারা হাওয়ায় দুলে-দুলে পাতার ঝুমঝুমি বাজিয়েছে, আজ আর তাদের অনেকেই নেই। গাছের পোড়া কঙ্কালগুলো বৃষ্টির জলে ভিজছে। মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। আমি চান করছি।
হ্যাঁ, এখন আলোয় স্পষ্ট হয়েছে চারদিক। আমি দেখতে পাচ্ছি। এখান থেকে দূরে, আরও খানিক দূরে আগুনের কোনও চিহ্ন নেই। আগুন পৌঁছতে পারেনি ওখানে। এখনও ওখানে গাছেরা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ওইদিকেই এগিয়ে চললুম। তোমাদের কি মনে আছে শিল্পসৃষ্টির দেবতা আমাকে একটি পোশাক দিয়েছিলেন? মনে আছে, সেটি কিসের তৈরি পোশাক? ভুলে গেছ নিশ্চয়ই। সেটি উড়ন্ত সাপের পালকের পোশাক। এখন কী দুর্দশা হয়েছে সেই পোশাকের! দেখলে, চিনতেই পারবে না। পোশাকটা যে খুলে ফেলব, তারও জো নেই। খালি গায়েই ভিজতে হবে।
উফ! কী কাণ্ড! হঠাৎ ঝড় উঠল! উরিব্বাস, মনে হচ্ছে, বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ের যুদ্ধ লেগে গেছে! ঝড় যেন কোথা থেকে উড়ে এসে বৃষ্টির দফারফা করে দিচ্ছে!

ঠিক বটে! ছাঁত করে উঠল আমার বুকের ভেতরটা। মনে হল, হ্যাঁ, এটা তো যুদ্ধই বটে! আমার ভালবাসার সেই শিল্পসৃষ্টির দেবতা, তিনি তো ঝড়েরও দেবতা! তিনি আমাকে বাঁচাবার জন্য বৃষ্টির দেবতার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন না তো!
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তাই। আকাশের দিকে চেয়ে দ্যাখো, বৃষ্টিভরা মেঘগুলো ঝড়ের দাপটে কেমন উথাল-পাথাল করছে! বৃষ্টির ফোঁটারা ঝড়ের আঘাতে ছত্রাকার হয়ে এদিকে-ওদিকে ঝাপটা মারছে! বৃষ্টির ঝরঝর শব্দটা যেমন ভয়ঙ্কর, তার চেয়েও ভীষণ ঝড়ের শোঁ-শোঁ গর্জন। আমাকে যেন উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়!
এ কী! হঠাৎ শিলাবৃষ্টি শুরু হল যে! কোথায় পালাই? কার আড়ালে মাথা বাঁচাই? শিলাবৃষ্টির সঙ্গে তো আর যুদ্ধ করা যায় না! কিন্তু আমি বুঝতে পারলুম, ঝড় আর এখন শুধুই ঝড় নয়। ঘূর্ণিঝড়। সেই ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে আমিও ঘুরতে লাগলুম। আর আকাশভাঙা পড়ন্ত শিলার আঘাতে জেরবার হয়ে হাঁপাতে লাগলুম। আমি যে আর সহ্য করতে পারি না!
বলতে-বলতেই একটা মস্ত শিলা আমার মাথায় এসে পড়ল। আমি যেন চোখে অন্ধকার দেখলুম। আমি শত চেষ্টা করেও দাঁড়িয়ে থাকতে পারলুম না। আমি লুটিয়ে পড়লুম। তারপর আর কিছুই মনে নেই। বোধ হয় আমি জ্ঞান হারালুম।

হঠাৎই আমার জ্ঞান ফিরেছিল। কত পরে, আমি বলতে পারব না। চোখ খুলে তাকিয়ে আমি অবাক! কই সেই বন! কই বৃষ্টি, ঝড় আর শিলা! শুকনো খটখটে পাথরের ওপর আমি শুয়ে আছি। আমার সেই ভিজে শপশপে পোশাকটা শুকিয়ে ঝরঝরে হয়ে গেছে। আমি উঠে বসবার চেষ্টা করলুম। আকাশের দিকে নজর পড়ে গেল। আকাশ আলোয় উছলে আছে। আমি উঠে বসলুম। চারপাশটা ঠাহর করার চেষ্টা করলুম। কিছুই চিনতে পারলুম ন। চিনতে পারলুম, চারদিকে শুধুই পাহাড়। আমি পাহাড়ের চুড়োয় শুয়ে আছি। কে আনল আমায়, এখানে? শুনতে পাচ্ছি ঝরনার ঝরাপাত। দেখতে পাচ্ছি এধারে-ওধারে দু-একটা পাইন গাছ। এখানে বনও নেই, পাখিও নেই। শুধু রোদ। ছড়িয়ে আছে আমার সারা গায়ে। ছড়িয়ে আছে পাহাড়ের মাথায়। তুষারের গায়ে। তবে কি শিল্পসৃষ্টির দেবতা আমাকে এখানে নিয়ে এলেন? আমার শিহরন লাগল। আমি উঠে দাঁড়ালুম।
এ কী! এখানেও কে খাবার দিয়ে গেল! সেই একই রকম, একই খাবার! যেন আমার ধাঁধা লেগে যাওয়ার গোত্তর। বারবার এ কার ভেলকি দেখছি আমি? খিদে যে আমার পায়নি, তা নয়। কিন্তু আমি তো কারও কাছে ‘খেতে দাও’ বলে কেঁদে ভাসাচ্ছি না! তবে? তবে কে আমায় এমন যত্ন করে খাবার দিচ্ছে?
আর দাঁড়িয়ে থাকার কোনও মানে হয় না। আমি বসলুম। খাবারের সামনেই। খেয়ে ফেললুম।
এ আবার কী দেখছি! মনে হচ্ছে সেই ঝুলিটা! আমার চোখের সামনে পড়ে আছে। এই ঝুলির ভেতরেই তো আমার পাথর খোদাই করার ছেনি, হাতুড়ি ছিল। দেখি তো! হ্যাঁ, এই তো ঝুলির ভেতরে ছেনি, হাতুড়ি! এগুলিই তো শিল্পসৃষ্টির দেবতা আমাকে দিয়েছিলেন। আমি হারিয়ে ফেলেছিলুম। তবে কি দেবতাই আবার আমায় ফিরিয়ে দিলেন! আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলুম। দেখতে লাগলুম এই পাহাড়ের চুড়ো থেকে ওই অনেক দূরে উপত্যকার দিকে। তারপর ঝুলিটা কাঁধে ফেলে ভাবলুম, এবার আমি যাব। কোথায় যাব, জানি না। কোথায় গেলে পাখির খোদাই করা মূর্তির জীবন খুঁজে পাব, তাও জানি না। তবু আমায় পাহাড় থেকে নামতেই হবে। আমি পা ফেললুম।
কিন্তু পাহাড়ের এই চুড়ো থেকে নামবার রাস্তা কই? যেদিকে যাই সেইদিকেই পাথর। পেল্লায়-পেল্লায়। পথ আটকে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে। আর, যেদিকে পাথর নেই, সেদিকে খাদ। পাথরও ডিঙোনো যাবে না, খাদই বা টপকাই কেমন করে! এ কী কাণ্ড! কে আমায় এমন বিপদে ফেলল! কেউ কি তবে আমাকে এখানে বন্দি করেছে! আমি নীচের ওই ধু-ধু উপত্যকার দিকে তাকিয়ে প্রাণের ভয়ে চিৎকার করে উঠলুম, “কে আছ! আমাকে বাঁচাও! আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি।”
আমার এই গলার চিনচিনে শব্দ এখান থেকে যে কারও কানে পৌঁছবে না, এ তো সবাই জানে। কিন্তু কে না বাঁচতে চায়! বিপদে পড়ে, মরার আগে কে না বাঁচার জন্য চিৎকার করে! তার ওপর আমার তো এই বয়েস। আমার ভয় পাওয়াটা কি অন্যায়? তাই আমি প্রাণপণে চিৎকার করে “আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও” বলে গলা ফাটালুম। আমার গলা প্রতিধ্বনি তুলছে। পাহাড়ে-পাহাড়ে। কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছে না। চেঁচাতে-চেঁচাতে আমার গলা ভাঙল। তবুও আমার ভাঙা গলা চিৎকার করেই চলল।
হঠাৎ আমার চিৎকার থেমে গেল। আমি থমকে গেছি। চমকে চেয়ে দেখি, আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে একজন অদ্ভুত চেহারার মানুষ। এইটুকুনি লম্বা। আমার চেয়ে ছোট্ট দেখতে। ঠিক বামনের মতো। মাথাখানা অ্যাত্তো বড়। যত বড় মাথা, ঠিক তত বড় নাক। বড়-বড় দাঁত। তিনি হাসছেন ফিক-ফিক করে। হাসতে-হাসতে জিজ্ঞেস করলেন, “আমাকে চিনতে পারছিস?”
আমি উত্তর দিতে পারলুম না। ফ্যালফ্যাল করে তাঁকে দেখতে লাগলুম।
আমাকে চুপ থাকতে দেখে তিনি নিজেই বললেন, “আমার নাম বামন-দেবতা। চারদিকে যত পাহাড় দেখছিস, পাহাড়ের মাথায় যত চুড়ো দেখছিস, এসব আমার। কেউ না এদের ক্ষতি করতে পারে, এটা দেখাই আমার কাজ। আমি পাহাড়ের রক্ষাকর্তা।”
আমি কথা না বলে মাথা নত করলুম।
তাঁর ফিকফিকে হাসিভরা মুখখানা এবার গম্ভীর হল। তাঁর চোখে যেন সন্দেহ। তিনি কথা বললেন, “আমার এমন সজাগ চোখকে ফাঁকি দিয়ে তুই কেমন করে এখানে এলি?”
আমি কথা বলব কী! তাঁকে দেখে ভেতরে-ভেতরে এমন হাসি পাচ্ছে! আমি জানি, কথা বলতে গেলেই আমি হেসে ফেলব। তাই অনেক কষ্টে হাসিটাকে পেটের মধ্যে আটকে আমি তাঁর খাটো-খাটো হাত-পাগুলো দেখতে লাগলুম।
তিনি এবার কড়কে উঠলেন, “আমার দিকে অমন হাঁ করে কী দেখছিস? কথার উত্তর দিচ্ছিস না কেন?”
আমি তাঁর কড়কানি শুনে আঁতকে উঠলুম। আর কথা না-বললেই নয়! আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, “ঠিক জানি না।”
“তার মানে?” তিনি চোখ টেরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
আমি উত্তর দিলুম, “তার মানেটা আমিও জানি না।”
তিনি খেঁকিয়ে উঠলেন, “তুই তো ভারী ব্যাদড়া ছেলে। মুখে-মুখে তর্ক করিস! যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর না-দিয়ে, আজেবাজে কথা বলছিস! জানিস, এক্ষুনি যদি তোর গালে চড়িয়ে দিই, তুই একটা কুটোর মতো হাওয়ায় উড়ে যাবি!”
এই কথা শুনে আমার যে কী হল, আমি বলে ফেললুম, “আপনার ওই বাঁটকুলে হাত আমার গালেই পৌঁছবে না।”
ব্যস, হল উলটো বিপত্তি। দেবতাদের চেহারার ছিরিছাঁদ নিয়ে যে ঠাট্টা-তামাশা করা উচিত নয়, এটা আমি ভুলেই বসলুম। বামন-দেবতা আমার কথা শুনে তিড়িং করে এমন একখানি লাফ মারলেন যে, আমি আর থাকতে পারলুম না। শেষমেশ হেসেই ফেললুম। তিনি হুঙ্কার ছাড়লেন। উঠে পড়লেন আর-একটা পাহাড়ের চুড়োয়। সেখান থেকে হাত-পা ছুড়ে তিনি চিৎকার করে আমাকে ধমকাতে লাগলেন, “তোর আস্পর্ধা তো কম নয়! তুই আমার হাত-পা তুলে কথা বলিস! অসভ্যের মতো হাসিস!” বলে তিনি ওই ওপর থেকে আমাকে টিপ করলেন। চোখের নিমেষে দিলেন ঝাঁপ। এই বুঝি পড়েন আমার ঘাড়ে! এই বুঝি ভাঙল আমার ঘাড়! আমি যে একটু সরে দাঁড়াব, তারও ফুরসত পেলুম না। তিনি পড়লেন। ধপাস! যাঃ! পা ফসকে গেছে! আমার ঘাড়ে না-পড়ে তিনি পড়লেন আর-একটা পাথরের ওপর। পড়েই চিতপটাং! নিশ্চয়ই লেগেছে। আমি হাসি থামিয়ে ছুটে গেলুম তাঁর দিকে। ওমা! এ কী! তিনি যে নিজেই সটান উঠে দাঁড়ালেন! আমি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “লাগল?”
তিনি গা-হাত-পা ঝাড়তে-ঝাড়তে গোঁজ হয়ে বললেন, “দেবতাদের লাগে না।”
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “লাগে না কেন?”
তিনি উত্তর দিলেন, “দেবতারা দেবতা বলে।”
আমি আবার জিজ্ঞেস করলুম, “দেবতারা কেন দেবতা?”
তিনি এবার তাঁর গোঁজ মুখখানা তুলে আমার মুখের দিকে তাকালেন। কী ভাবলেন। তারপর তাঁর একটি ছোট্ট হাত তুলে আমার দিকে আঙুল ছুড়ে বললেন, “দেবতারা তোর মতো মানুষ নয় বলে।” বলেই তিনি হাসলেন, “হা-হা-হা!”
আমি অবাক হয়ে গেলুম। এ কী! এই তিনি হম্বিতম্বি করছিলেন। এখন আবার হাসছেন! শুধুই হাসলে তা-ও কথা ছিল। আমার যেন মনে হল, সেই হাসিতে কেমন একটা ভালবাসা মেশানো।
হ্যাঁ, সত্যিই তো! তিনি আমায় হাসতে-হাসতে ডাকলেন। আমায় ভালবাসলেন। বললেন, “তোর গায়ে হাত দেওয়া আমার সাধ্যে নেই। আমার কেন, কারও সাধ্য হবে না। কোনও দেবতাই তোর প্রাণ নিতে পারবে না। আমি দেখতে পাচ্ছি, তোর কপালে আঁকা আছে দেবতার আশীর্বাদ। কে তোকে আশীর্বাদ করেছেন? কোন দেবতা?”
আমার মনে পড়ে গেল শিল্পসৃষ্টির দেবতার কথা। আমি তাঁর কথাই বললুম বামন-দেবতাকে। তিনি বললেন, “শিল্পসৃষ্টির দেবতা যাকে আশীর্বাদ করেন, সে তো মানুষেরও সেরা মানুষ।” বলে তিনি আমায় জড়িয়ে ধরলেন। আদর করলেন। তারপর আবার বললেন, “আমার মনে হয়, নিশ্চয়ই কোনও দেবতা তোর অনিষ্ট করার চেষ্টা করেছিল। তাই কোনও অলৌকিক শক্তি তোকে এই নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। ভাল করেছে। আমার কাছে থাকলে তোর আর কোনও ভয় নেই। এই পাহাড়ের চুড়োকে যেমন বুকে আগলে রক্ষা করছি, তেমনই করে রক্ষা করব তোকেও।” বলে তিনি আমার চিবুক ছুঁলেন। আমি তাঁর পায়ের কাছে মাথা রাখলুম।
হ্যাঁ, বামন-দেবতা আমায় আশ্রয় দিলেন সেই পাহাড়-চুড়োয়। আঃ! কী চমৎকার আশ্রয়টি। পাহাড়ের গা ছুঁয়ে উঠেছে অসংখ্য পাইন গাছ। তার নীচে পাথর-ঘেরা আশ্রয় তাঁর। একা থাকেন। তাই ছোট্ট। তা হোক। তারই একপাশে আমার একটু জায়গা হল। তিনি বললেন, “ওরে ছেলে, তোর নাম জানি না। কী তোর নাম?”
“শিজুমন।”
তিনি বললেন, “শিজুমন, এখানে তোর যখন যা মন চাইবে তুই তাই করিস। কেউ মানা করবে না। আমি তো খুদে, এইটুকু। একটুখানি জায়গা হলেই আমার কুলিয়ে যাবে। তোর জন্য রইল আমার বাকি সবটুকু জায়গা। এখানে কেউ আসবে না। আমার নজরদারি ভারী সজাগ। কারও সাধ্য নেই আমার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কেউ এখানে হানা দেয়। তবে হ্যাঁ, রোজ সকালে এখানে সূর্য আসেন। আমাকে আলো দেন। চাঁদ ওঠেন পাহাড়-চুড়োর ফাঁকে। জ্যোৎস্না ছড়িয়ে দেন। বাতাস ছুঁয়ে যায় আমাকে যখন-তখন, সর্বক্ষণ। কখনও সে শান্ত। কখনও দুরন্ত। কখনও সে বয়ে আনে মেঘ। নেমে আসে বৃষ্টি। কখনও শিলা, কখনও তুষার।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “হে দেবতা, এখানে পাখি আসে না?”
তিনি জাঁক দেখিয়ে বললেন, “আসার জো আছে!”
আমি বললুম, “পাখি তো আর পাহাড়ের ক্ষতি করে না।”
তিনি বললেন, “পাখি বড্ড চেঁচায়।”
আমি জবাব দিলুম, “আমিও যদি চিৎকার করি?”
“তুই তো আর পাখি নোস।” বলে তিনি হাসলেন। হাসতে-হাসতেই বললেন, “দ্যাখ, আমিও চেঁচাই।”
“কেন?”
তিনি উত্তর দিলেন, “মুখের কাজ তো শুধু খাবার গেলা নয়। আমরা গল্প করি মুখে। হাসি। গান গাই। তা বল, সারাদিন মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকা যায়? পাখিদের এখানে আসতে দিয়ে লাভ কী? তারা কি আমার সঙ্গে গল্প করবে?”
আমি বললুম, “গল্প না করুক, গান তো শোনাতে পারে।”
তিনি বললেন, “চিকির-মিকিরকে তুই গান বলিস?”
আমি উত্তর দিলুম, “ওই চিকির-মিকিরই আমার ভাল লাগে।”
তিনি বললেন, “আমার কান ঝালাপালা হয়ে যায়।”
আমার মনে হল আর কথা না বাড়ানোই ভাল। যেটুকু আশ্রয় পেয়েছি, তিনি অসন্তুষ্ট হলে সেটুকুও যাবে। কাজেই, আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে গেলুম।
তারপর? দিন যায়। এক-একদিন তাঁকে আমার এক-এক করে সব কথা শোনালুম, কেমন করে বাবাকে হারিয়েছি। কেমন করে মা হারিয়ে গেল। কেমন করে আশ্রয় পেলুম শিল্পসৃষ্টির দেবতার কাছে। কেমন করে শিখলুম তাঁর কাছে পাথরে মূর্তি খোদাই করতে।
দিন যায়। একদিন তিনি একখণ্ড পাথর এনে দিলেন। বললেন, পাথরে মায়ের মুখ খোদাই করতে। সেই পাহাড়-চুড়োর নির্জনে বসে তাঁরই ইচ্ছেমতো মায়ের মূর্তি খোদাই করি আমি। বামন-দেবতা কখনও আমার পাশে এসে বসেন। কখনও যান অন্য কোনও চুড়োয় নজরদারি করতে। ছোটখাটো এই দেবতার হাঁটা-চলা, ওঠা-বসা দেখলে তুমিও হেসে কুটোকুটি হয়ে যাবে। প্রথম-প্রথম আমার যত হাসি পেত, এখন আর তত পায় না। অনেক সয়ে গেছে। তার ওপর এখন মায়ের মূর্তি খোদাই করছি। অন্য কথা ভাববার সময় কই আমার! আমার চোখে এখন শুধুই মায়ের মুখখানি ভেসে উঠছে। আমার মা। এই দ্যাখো, পাথরে একটু-একটু করে কেমন আমার মাকে গড়ে তুলছি।
একদিন পাথরে আমার হাতে মায়ের চোখ ফুটল।
দেবতা বললেন, “সুন্দর।”
একদিন মায়ের মুখে হাসি-মাখা ঠোঁটদুটি সাজিয়ে দিলুম।
দেবতা বললেন, “চমৎকার।”
একদিন মায়ের মুখখানি গড়া শেষ হল।
দেবতা বললেন, “অপূর্ব।”
কিন্তু আমার মন ভার হয়ে গেল। আমার চোখ ছলছলিয়ে উঠল মায়ের মুখখানি দেখে। আমার চোখে কান্না ঝরল। মনে পড়ে গেল, আমাদের সেই দিনগুলির কথা। মায়ের হাত ধরে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে পাড়ি দেওয়া। এক গুহা থেকে আর-এক গুহায়। এক দেশ থেকে আর-এক দেশে। সেইদিনই আমার মনে হল, আমি যেন বন্দি হয়ে আছি এই পাহাড়-চুড়োয়। এই নির্জন পাহাড়-চুড়ো যেন বন্দিশালা। কে যেন পাথর দিয়ে ঘিরে রেখেছে আমাকে। আমার দম আটকে আসে। বন্দিশালা ভেঙে কে আমায় নিয়ে যাবে এখান থেকে? আমার মন হাঁসফাস করে ওঠে।
একদিন বামন-দেবতা হঠাৎ আমায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে, তোর মুখে আর হাসি দেখি না কেন, এখন?”
আমি কোনও উত্তর দিতে পারি না। আমি চেয়ে থাকি আকাশের দিকে।
তিনি জিজ্ঞেস করেন, “আকাশে কী দেখিস?”
আমি তাঁর মুখের দিকে চেয়ে আলতোভাবে হাসি।
তিনি ব্যস্ত হন। জিজ্ঞেস করেন, “তোর কী হয়েছে বল তো?”
আমি এবার বলি, “না, কিছুই তো হয়নি।”
তিনি বললেন, “আমি দেখছি, যেদিন তোর মায়ের ওই মূর্তিটা গড়া শেষ করলি, সেইদিন থেকেই তুই যেন কেমন আনমনা হয়ে গেছিস।”
আমি উত্তর দিতে পারলুম না।
আমায় চুপ থাকতে দেখে তিনি কী ভাবলেন, জানি না। হয়তো আমাকে অবাক করে দেওয়ার জন্যই তিনি আচমকা বললেন, “জানিস, কাল আমি একটা চোর ধরেছি।”
আমি চমকে তাকালুম তাঁর দিকে।
তিনি বললেন, “হ্যাঁ রে! পাহাড়ের এই চুড়োটার মাথার ওপর চরকি খাচ্ছিল। ভেবেছিল, আমার চোখে ধুলো দেবে! অত সোজা! আমি নিঃসাড়ে চুড়োয় উঠে তাকে ধরে ফেলেছি।” বলেই তিনি আমার হাত ধরলেন। আমায় টানতে-টানতে বললেন, “চ’, চোরটাকে দেখবি চ’।”
আমি তাঁর সঙ্গে চোর দেখতে চললুম।
এ কার সামনে আমায় নিয়ে এলেন বামন-দেবতা? এ কী! এ যে সেই ঈগল! এই ঈগলই তো জাগুয়ারের সঙ্গে লড়াই করে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল! হ্যাঁ, হ্যাঁ! ওই তো তার ডানা দুটি সোনালি পালকে ঢাকা! ওই তো তার মায়াবী চোখ দুটি আমার দিকে কেমন চেয়ে আছে! কী করুণ! এ কী! তার পা দু’টি যে শেকলে বাঁধা! পাখি বন্দি! হায়! হায়!
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললুম, “এই কি আপনার চোর?”
“হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছিস না, চোখ দুটো কেমন লোভে টসটস করছে?” বামন-দেবতা উত্তর দিলেন।
“আপনার কী চুরি করেছে বামন-দেবতা, এই ঈগল?”
তিনি জবাব দিলেন, “চুরি করেনি। করতো।”
আমি আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “হে বামন-দেবতা, আপনার কোন জিনিসের ওপর এই হতভাগ্য ঈগলের লোভের দৃষ্টি পড়েছিল? আপনার তো মহামূল্য কোনও জিনিসই নেই।”
তিনি বললেন, “চোর কি শুধু মহামূল্য জিনিসই চুরি করে? কে বলতে পারে, সে আমাকেই চুরি করার ফন্দি আঁটেনি! মহামূল্য কোনও জিনিসের চেয়ে, দেবতা যে আরও অনেক বেশি মূল্যবান, সেটা কে না-জানে! আমি তাই ঈগলকে বন্দি করেছি। এই বন্দি অবস্থায় ঈগলকে কিছুই খেতে দেওয়া হবে না। ঈগল না-খেয়ে মরবে, এই আমার শাস্তি।”
আমি চিৎকার করে আপত্তি জানালুম, “না-আ-আ! আপনি পাখিকে মারতে পারবেন না। এ আপনার অন্যায় বিচার। আকাশ তো আপনার একার নয়। আকাশ পাখিরও। পাখি যদি আকাশে উড়ে ঘুরে বেড়ায় তবে তাকে কেন চোর বলেন দেবতা? কেন তাকে শাস্তি দেবেন?”
তিনি আমার চিৎকার শুনে থমকে তাকালেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি কঠোর হল। তারপর তাঁর খুদে হাতের একটা খুদে আঙুল তুলে আমাকে শাসালেন, “শোন শিজুমন, তোকে আমি দয়া করে আশ্রয় দিয়েছি এখানে থাকার জন্য। আমাকে হুঁশিয়ার করার জন্য নয়। আমি দেবতা। আমি যা বলব, সেই হল শেষ কথা। আমার কথার যে অবাধ্য হয়, তার শাস্তি মৃত্যু। আমি ভেবেছিলুম, শিল্পসৃষ্টির দেবতার কাছে তুই ভদ্রতা শিখেছিস। শিখেছিস শান্তশিষ্ট হতে। কিন্তু না। তুই অসভ্যের মতো চিৎকার করে আমাকে ধমকাস! তোর এই বেয়াদপি আমি সহ্য করব না। শুনে রাখ, ওই ঈগলের সঙ্গে তোকেও মরতে হবে না-খেয়ে। আজ থেকে তোকেও আর কোনও খাবার দেওয়া হবে না। আজ থেকে তোকে আর কোনও মূর্তি গড়তে দেব না আমি। দ্যাখ, তোর মূর্তি গড়ার যন্ত্রগুলো আমি এই ফেলে দিলুম পাহাড়ের খাদে!” বলে তিনি আমার ঝুলিটা টান মেরে ছুড়ে দিলেন। ওই নীচে, যেখানে চোখ যায় না, ঝুলিটা সেখানে গিয়ে পড়ল। একটু শব্দও আমার কানে এল না।
আমি কিন্তু একটুও ভয় পেলুম না দেবতার আদেশ শুনে। আমি বললুম, “হে বামন-দেবতা, আমি মরতে ভয় পাই না। মরব তবু ভাল। তবুও আমি, যে আমার উপকার করেছে তার কথা কোনওদিনই ভুলতে পারি না। শুনুন দেবতা, এই ঈগল একদিন আমাকে এক হিংস্র জাগুয়ারের হাত থেকে বাঁচিয়েছে।”
বামন-দেবতা তেমনই কঠিন স্বরে বললেন, “শোন শিজুমন, কে তোকে জাগুয়ারের হাত থেকে বাঁচিয়েছে, আমি জানি না। কিন্তু যে আমার আকাশসীমা টপকে এখানে দৃষ্টি দিয়েছে, তাকে আমি বন্দি করেছি। তাকে মরতেই হবে। সে চোর। আর সেই চোরের হয়ে যে গুণগান করে, সে-ও চোর। তাকেও মরতে হবে। ঈগলের পায়ে শেকল বেঁধেছি, যাতে সে উড়ে পালাতে না পারে। কিন্তু তোর পায়ে আমি কোনও শেকল বাঁধব না। কারণ তুই উড়তে পারিস না। আর পায়ে ভর করে যে পালাবি, তেমন কোনও রাস্তাই তোর জন্য খোলা নেই। থাক এখানে পড়ে। অনাহারে একটু-একটু করে শুকিয়ে মরার দিন গোন।” বলে বামন-দেবতা একটা বিশ্রী হুঙ্কার ছেড়ে আমার চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেলেন। আর সেই তখন থেকেই না খেয়ে আমি মরবার দিন গুনতে লাগলুম।
তবু ভাল, দেবতা আমাকে বেঁধে রাখেননি। এখনও আমি উঁচু-নিচু পাথর ডিঙিয়ে এদিকে-ওদিকে ঘোরাফেরা করতে পারছি। খাবার না-জুটলে, ক’দিন পরে সে-ক্ষমতাও থাকবে না। বামন-দেবতা যে এমন রাগী, তা আমার এতদিনে একবারও মনে হয়নি। রাগ সবারই হয়। দেবতার তো হতেই পারে। কিন্তু এমন নির্দয় শাস্তি দেওয়াটা কি উচিত কাজ! তা-ও যদি তেমন দোষের কিছু হত! হ্যাঁ, আমি তাঁর মুখের ওপর চিৎকার করেছি। ঠিক কথা, আমি অন্যায় করেছি। আমাকে তুমি যত পারো শাস্তি দাও। কিন্তু ওই নিরীহ পাখিটা? ও কী অন্যায় করেছে যে, তাকে শেকল বেঁধে বন্দি করতে হবে? অনাহারে মারতে হবে?
হঠাৎ মাথার মধ্যে কেমন একটা মতলব উঁকি দিয়ে উঠল। মনে হল, আচ্ছা, আমি কি পারি না ওই ঈগলের বাঁধন খুলে ওকে মুক্তি দিতে! কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠলুম আমি। মনটাকে যতই শক্ত করার চেষ্টা করছি, সে যেন বাগ মানছে না। এখনই যেন ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে ওই ঈগলের কাছে। এখনই মুক্তি দেওয়ার জন্য মন আনচান করে উঠছে। কিন্তু যদি ধরা পড়ে যাই!
না, দুর্বল হলে চলবে না আমার। ধরা পড়ি পড়ব। মরতে তো হবেই। কিন্তু একটা নিরীহ প্রাণীকে যদি বাঁচিয়ে মরি! হ্যাঁ, সে-প্রাণী ওই ঈগল। তার জন্যই, আমি এতদিন বেঁচে আছি। এ-কথা ভোলা যায়! অবশ্য, বামন-দেবতার চোখকে ফাঁকি দেওয়া খুব শক্ত। তাঁকে ফাঁকি দিতে হলে আমাকে চোরই সাজতে হবে। চোর সেজে ঈগলের প্রাণ বাঁচাতে হবে। এমন চোর কে না হতে চায়!
সেইদিন থেকেই আমি সুযোগ খুঁজি। বামন-দেবতা তো আর শুধু এই পাহাড়ের চুড়োটির দিকেই নজর রাখেন না, তাঁকে নজর রাখতে হয় ওই দূরে-দূরে আরও অনেক পাহাড়ের চুড়োয়। সেখানে তাঁকে রোজ যেতে হয়। যেসব রাস্তায় আমাদের পা ফেলতে ভয়, যেসব পাথরে পা ফেললে আমরা নিশ্চিত মরব, সেইসব পাথরে কেমন অক্লেশে পা ফেলে বামন-দেবতা একটা চুড়া থেকে আর-একটা চুড়োয় লাফান, তা দেখার। অবশ্য, তিনি যখন লাফান দেখলেই হাসি পেয়ে যায়! কিন্তু এখন আর হাসি পায় না। মনে হয়, বামন-দেবতাকে অমন গেঁড়িগুড়গুড়ে দেখতে হলে কী হবে, তাঁর পেটের মধ্যে শয়তান বাস করে।
আমার সমস্ত মতলবটাই ভেস্তে যায় বুঝি! কারণ, আশ্চর্য ঘটনা হল, যেদিন তিনি আমাদের শাস্তি দেওয়ার কথা শোনালেন, সেইদিন থেকে তিনি আর অন্য কোনও চুড়োয় নজরদারি করতে যান না। এখন নজরদারি তাঁর আমার আর ঈগলের ওপর। সাধ্য কী, আমি তাঁকে ফাঁকি দিয়ে ঈগলের কাছে যাই! তিনদিন কেটে গেছে। তিনদিনে পেটে কিছু পড়েনি। সারাদিন, সারারাত খোলা আকাশের নীচে পড়ে আছি। তাঁর পাশে শোয়াও আমার নিষেধ। মরণ এগিয়ে আসছে। ভাবিনি, এমন তিলে-তিলে তিনি আমাকে মারবেন! কে জানে, তিনদিন না খেয়ে ঈগল এখনও বেঁচে আছে কি না। তার কাছে যাওয়ার তো উপায় নেই। তাই খবর পাওয়ারও কোনও রাস্তা নেই। অবশ্য সে যেখানে আছে, সে-জায়গাটা কোথায়, আমি জানি। বামন-দেবতা নিজেই তো আমাকে নিয়ে গেছলেন চোর দেখাতে। কী অদ্ভুত বিচার বলো, একটা আকাশের ঈগল, উড়তে-উড়তে পাহাড়ের চুড়োর কাছে চলে এসেছে বলে সে হয়ে গেল চোর!
আমার এখন আর একটুও হাঁটাচলা করতে ইচ্ছে করে না। ভালও লাগে না। মনে হয়, পড়ে থাকি পাথরের ওপর। একটু উঠে বসলেই, হাঁফাই। দম আটকে আসে। এমনই করতে-করতে একদিন দম ফুরিয়ে যাবে। সেদিন আর কতদূর? আর যেন পারি না।
আমার শরীরের এই দশা দেখেই বোধ হয় বামন-দেবতা বুঝেছিলেন, আমার দিন ঘনিয়ে এসেছে। বুঝেছিলেন, আর কী হবে ছেলেটার ওপর নজর রেখে! ওকে মরতে দাও শান্তিতে। এই ভেবেই বোধহয় সেদিন থেকে তিনি আর আমার ওপর নজর দেওয়ার দরকার মনে করেননি। সত্যিই, সেদিন থেকে তাঁকে আর আমি দেখতে পাই না। না রাতে, না দিনে। দিনে কী করেন জানি না। তবে রাতে যে তিনি আর জাগেন না, জেগে আমায় পাহারা দেন না সেটা, এত কষ্টের মধ্যেও আমি বুঝতে পারি। কেননা, দু’দিন আগে পর্যন্ত গভীর রাতে তাঁকে উঁকিঝুঁকি মারতে দেখেছি। খুটখাট আওয়াজ শুনেছি তাঁর চলাফেরার। তাঁর ড্যাবড্যাবে চোখ দুটোও আর তেমন জ্বলজ্বল করে আমার দিকে একবারও জ্বলে উঠতে দেখি না। কাজেই, মনে হয়, তিনি নিশ্চিন্তেই ঘুমোন এখন। সেদিনও গভীর রাতে তিনি বোধ হয় ঘুমোচ্ছিলেন।
হায় রে! এমন সুযোগ আর আসবে না। এই সময়ে একবার যদি যেতে পারি ঈগলের কাছে! কিন্তু আমি যে একেবারেই থুবড়ো হয়ে গেছি। আমি যে উঠতে পারি না। বসতে পারি না। দাঁড়াবার কথাই ওঠে না। যে উঠতে পারে না, সে আবার দাঁড়াবে কেমন করে! আগেই বলেছি, হাঁপিয়ে উঠি। তবে ঈগলের কাছে যাব কেমন করে! কেমন করে তাকে বাঁচাব? কিন্তু এখনও কি সে বেঁচে আছে? বেঁচে থাকলে তবেই তো বাঁচানোর কথা ওঠে! সে যাই হোক, তবু যদি একবার যেতে পারতুম ঈগলের কাছে!
কী করে যে হঠাৎ আমার মন শক্ত হয়ে উঠল! আশ্চর্য! সেই রাতেই আমি সেই উঁচু-নিচু পাথরের এবড়ো-খেবড়ো জমির ওপর পাক খেয়ে গড়াতে লাগলুম। উফ! কী ভীষণ কষ্ট হচ্ছে! তা হোক। এই সুযোগ। আমাকে ঈগলের খোঁজ নিতেই হবে। একবার করে পাক খাই, অনেকক্ষণ থামি। দম নিই। আবার পাক খাই, গড়িয়ে চলি। এমনই করে গড়াতে-গড়াতে ঈগলের কাছে যাওয়ার পথ খুঁজি। অন্ধকারে। সে যে কী ভয়ঙ্কর অবস্থা, এখন তা কাউকে বোঝাতে পারব না।
হ্যাঁ, আমি অনেক কষ্টে খুঁজে পেয়েছিলুম ঈগলের সেই আস্তানা। দেখতে পেয়েছিলুম ঈগলকে। অবাক কথা, দেখি সে বেঁচে আছে। আমায় দেখতে পেয়েই অস্থির হয়ে সে ডানা ঝাপটাতে লাগল। মনে হল না, খেতে না পেয়ে সে আমার মতো মরতে বসেছে! আমি তার একেবারে মুখের সামনে পৌঁছে গেলুম। তার পায়ের দিকে নজর পড়ল আমার। তার পায়ে গলানো লোহার আংটা। সেই আংটার সঙ্গে লোহার শেকল জড়ানো। সেই শেকল গাছের সঙ্গে বাঁধা। আমার শক্তি নেই এই লোহার শেকল আমি খুলি। মরবার আগে মানুষের কতটুকুই বা শক্তি থাকে! যেটুকু শক্তি আছে, সেটুকু দিয়েই আমি ঈগলের বন্দি পায়ের আংটা দুটো টানামানি করতে লাগলুম। লাগছে তার। বুঝতে পারছি। তবু তার গলায় একটুও কষ্টের শব্দ শুনতে পাই না।
আমি কতক্ষণ ধরে চেষ্টা করেছি, জানি না। ওই দ্যাখো, তার একটা পায়ের আংটা খুলে গেছে! আমি আনন্দে হাঁপাতে লাগলুম। আর-একটা পা খুলতে পারলেই ঈগল মুক্তি পাবে। আমি আবার টানামানি শুরু করে দিলুম। খোলে না। বারবার টানি। তবু খোলে না। শেষমেশ ওই শীতেও আমি ঘেমেনেয়ে গেলুম। তবুও পারলুম না। আমি হেরে গেলুম। আমার সারা শরীর কেমন ঝিমঝিম করতে লাগল। খাটুনির এত কষ্ট কি আর সহ্য করা যায় এই শরীরে! আমি কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়লুম। আমার হাত নড়ে না। চোখ বুজে আসে। কিছুই মনে পড়ে না। সব ভুলে যাই। সব। এমনকী, ঈগলের কথাও।

কেমন করে আমার আবার সব মনে পড়েছিল, খেয়াল করতে পারি না। কেমন করে চোখ মেলে তাকিয়ে ছিলুম, তা-ও মনে নেই। কিন্তু চোখ তাকিয়েই আমি হকচকিয়ে গেছি। দেখলুম, আমি শুয়ে আছি নরম মাটির ওপর। গাছে-গাছে ঢাকা চারদিক। আমি ধড়ফড় করে উঠতে গেলুম। পারলুম না। আমার শক্তিই নেই। আমি যে চিৎকার করে কাউকে ডাকব, সে-ক্ষমতাও নেই আমার। আমি অসহায়ের মতো পড়ে রইলুম। এখন আমি আবার ভাবতে পারলুম। মনে পড়ে গেল সেই বামন-দেবতার কথা। কোথায় গেলেন তিনি! আমিই বা কোথায় এসেছি! কে নিয়ে এল এখানে, আমায়?
আমি উঠে বসবার চেষ্টা করলুম। কোথায় এসেছি, সে-জায়গাটা তো একবার দেখা দরকার। উঠে বসার মিছেই চেষ্টা। আমি পড়ে-পড়েই মাথা তুললুম। উঃ। পারা যায় না। মাথার ভেতরটা টনটন করে ওঠে। মাথা বুঝি খসে পড়ে মাটিতে! কিন্তু, ওটা কী দেখতে পেল আমার চোখ! এ যে দেখি, চোখের সামনে আবার সেই খাবার! ঠিক আগের মতো! কে সাজিয়ে রেখেছে! কে আমার বিপদে বারবার আমাকে এমন করে ভালবাসছে! হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। বাঁচতে হলে আমায় পেটে কিছু দিতেই হবে। না-খেয়ে এখনও বেঁচে আছি। এর পর আর রক্ষে নেই। তাই অনেক কষ্ট করে হাত বাড়ালুম খাবারের দিকে। হাত পেলুম। শুয়ে-শুয়েই মুখে পুরলুম। যেন চিবোতে পারি না! তবু, কষ্ট করেই চিবোলুম। আঃ, এমনই করে খেতে-খেতে ফুরিয়ে গেল খাবার। আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লুম।
বেশ ক’দিন, এমনই করে খেতে-খেতে আমার শরীরটা বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠল। আমি একদিন উঠতে পারলুম। বসতে পারলুম উঠে। একদিন দাঁড়াতে পারলুম। হাঁটতে পারলুম। হাঁটতে পারলুম দাঁড়িয়ে। আর সেইদিন আমি প্রতিজ্ঞা করলুম, যে আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলে, আমার জন্য রোজ খাবার আনে, তাকে ধরতেই হবে। তাই এই নির্জন বনে তাকে খুঁজি। আমি, একলাটি।
কিন্তু যে লুকিয়ে থাকতে চায়, তাকে কি সহজে খুঁজে পাওয়া যায়! তবু খুঁজি আঁতিপাতি করে। কার এত দয়া আমার ওপর? তিনি কি মানুষ, না দেবতা? কেন, আমায় দেখা দিতে চান না? এ আমায় জানতে হবে। তবে কি তিনি সেই দয়ালু শিল্পসৃষ্টির দেবতা? তিনিই কি আমাকে চোখে-চোখে রেখেছেন? হবে হয়তো! কেননা, তিনিই যে আমায় আশীর্বাদ করেছেন, কেউ আমার প্রাণ নিতে পারবে না। তাই মরতে-মরতেও আমি বেঁচে আছি।
আরে! আরে! সামনে ওটা কী? পড়ে আছে? হ্যাঁ, এই তো আমার সেই ঝুলিটা। বামন-দেবতা যেটা ওই পাহাড়ের ওপর থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। এর ভেতরই তো মূর্তি গড়ার হাতুড়ি আর ছেনিটা ছিল। দেখি, দেখি, আছে কি না!
কই? ঝুলি তো শূন্য। কোথায় গেল হাতুড়ি আর ছেনি? তা হলে বোধ হয় বামন-দেবতা যখন ছুড়ে দেন, তখনই সেগুলো এধার-ওধার ছড়িয়ে পড়ে হারিয়ে গেছে।
এমন সময়ে আচমকা আমার পেছনে কে যেন বলে উঠল, “এই ছেলে, এখানে কী খুঁজছিস, একা-একা?”
আমি ঘাবড়ে গেছি। হন্তদন্ত হয়ে পিছু ফিরে দেখি, আমার সামনে যে-মানুষটি এখন দাঁড়িয়ে আছে, তার পরনের পোশাকটা হুবহু আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া দলের পোশাকের মতো। আমি শিউরে উঠলুম। তবে কি এই মানুষটি আমাদেরই দলের একজন? আমার আর সবুর সইল না। উত্তেজনায় দমবন্ধ হয়ে আসে আমার। আমি প্রায় কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলুম, “তুমি কি আমাদের যুদ্ধ-দেবতার দলের লোক?”
তার মুখে অন্তরঙ্গ হাসি। সে বলল, “হ্যাঁ।”
আমি প্রায় নেচে লাফিয়ে উত্তর দিলুম, “আমিও ওই দলের।”
সে বলল, “তাই তোর মুখখানা চেনা-চেনা লাগছে।” বলে ভাল করে দেখল আমায়।
আমার উত্তেজনায় দমবন্ধ হয়ে আসে।
সে হাসতে-হাসতেই আমাকে জিজ্ঞেস করল, “তুই আমাকে চিনতে পারছিস?”
আমি খানিক বোকার মতো তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। চেনবার চেষ্টা করলুম। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলুম না।
সে বলল, “আমি কিন্তু তোর নাম জানি। শিজুমন, তাই না?” বলে ফিক করে হাসল।
আমার গায়ে কাঁটা দিল। আমার নিজের দলের একজন মানুষের দেখা পেয়ে আমার সাহসে বুক ফুলে উঠল। আমি তাকে বললুম, “আমার নামটা তুমি ঠিক বলেছ।”
সে জিজ্ঞেস করল, “তুই এখানে এলি কেমন করে?”
আমি খুশিতে উছলে বলে উঠলুম, “সে-ও এক মস্ত ঘটনা। আমি তোমাকে সব বলব। আগে তুমি বলো, তুমি এখানে এলে কী করে!”
সে বলল, “সে-ও এক মস্ত গল্প। বলতে অনেক সময় লাগবে।”
সে আমাকে জিজ্ঞেস করার আগেই আমি তাকে বললুম, “আমি এখন একা।”
সে বলল, “তা-ও জানি। তোর বাবা তুষারঝড়ের কবলে পড়েছিল। তোর মা পড়েছিল অনিষ্টের দেবতার ভেলকির কবলে।”
আমি তার মুখের দিকে আবার একবার অবাক হয়ে তাকালুম। তারপর বললুম, “তুমি তা হলে সবই জানো।”
লোকটি উত্তর দিল, “ নিজের দলের খবর কে না রাখে!”
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “আমাদের দল এখন কোথায় আছে?”
সে বলল, “আমিও জানি না। আমি তাদের খুঁজছি।”
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “তুমিও তা হলে হারিয়ে গেছ?”
সে উত্তর দিল, “যুদ্ধে আমি বন্দি হয়েছিলুম। আমার বাঁচার কোনও কথাই নয়। যেখানে আমাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, সেটা ছিল একটা গুহা। সেখান থেকে বেরোবার কোনও রাস্তাই আমার জানা ছিল না। যারা আমায় বন্দি করেছিল, তারা বোধ হয় ভেবেছিল, গুহা-দেবতার সামনে আমায় হত্যা করবে। কিন্তু তাদের মতলব কাজে এল না। হল কী, যেদিন আমাকে হত্যা করা হবে, ঠিক তার আগের দিন পাহাড়ে হঠাৎ ধস নামল। গোটা পাহাড়টা যেন মাটির ওপর মুখ থুবড়ে ছিটকে পড়ল। আমার সেই বন্দি গুহাটাও ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আমার ভাগ্য বলতে হয়। আমি বেঁচে গেলুম। পালিয়ে যাওয়ার পথ খুলে গেল আমার। আমি দৌড় মারলুম। দৌড়তে-দৌড়তে এইখানে চলে এসেছি। বলতে পারিস লুকিয়ে আছি। এবার এখান থেকেও পালাতে হবে।”
আমি বললুম, “বলো তো, আমিও তোমার সঙ্গে যেতে পারি।”
সে বলল, “সে তো ভালই হয়। দু’জনে একসঙ্গে খুঁজব আমাদের দলটাকে। খুঁজে পেলে দলের সঙ্গে মিশে যাব। তার ওপর, তুইও যেমন একা, তেমনই আমিও। দু’জনে একসঙ্গে থাকলে আমি তোকে দেখতে পারি। তুইও আমাকে দেখতে পারবি। বিপদের কথা তো কিছুই বলা যায় না।”
কথা বলতে-বলতে আমরা অনেকখানি পথ হেঁটে এসেছি। যতই এগোচ্ছি, ততই কেমন যেন গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছি। তা হোক, কিন্তু আমার এখন আর তত ভয় নেই। যতই হোক নিজের দলের মানুষের দেখা পেয়েছি। এটা কি কম কথা! আমার শতগুণ সাহস বেড়ে গেছে।
কতক্ষণ হাঁটছি, বলতে পারব না। তবে আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু আমার সঙ্গীটির যে কষ্ট হচ্ছে, সেটা তার চলন দেখেই বুঝতে পারছি। সে খানিক হাঁটছে। খানিক দাঁড়াচ্ছে। থেকে-থেকে হোঁচট খাচ্ছে। তার এই অবস্থা দেখে আমিই তাকে বললুম, “তোমার বোধ হয় কষ্ট হচ্ছে।”
সে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, অনেকক্ষণ হাঁটছি তো!”
“একটু বসলে তো হয়।” আমি বললুম।
সে জবাব দিল, “যেখানে-সেখানে বসা যায় না। বিশেষ করে অচেনা জায়গায়। কোনখান দিয়ে কখন বিপদ আসে, কে বলতে পারে। একটা নিরাপদ জায়গা না-পেলে বিশ্রাম নেওয়ার কথা ভাবছি না আমি।”
আমি উত্তর দিলুম, “আমার অবশ্য কষ্ট হচ্ছে না।”
সে বলল, “তুই তো এখনও ছেলেমানুষ। আমার তো বয়েসটা কম হল না!”
আমি তার মুখে বয়েসের কথা শুনে তার মাথার দিকে তাকালুম। তারপর বললুম, “অবশ্য এখনও তুমি বুড়ো হওনি।”
সে হাসল। বলল, “মাথার চুল দেখে বলছিস?”
আমিও হাসলুম।
আমার হাসি শেষ হয়নি। সে আচমকা বলল, “ওটা কী বল তো?” বলে আঙুল দেখাল।
আমি অনেক গাছের ফাঁক দিয়ে একটা পাথরঘেরা আস্তানা দেখতে পেলুম। একেবারে ঝোপঝাড়ে ভর্তি ওই দিকটা। আমি বললুম, “চলো, দেখি।”
হাঁটা দিলুম।
এবার হাঁটাটা খুব সহজ হল না। কেননা, অনেক প্রকান্ড-প্রকাণ্ড পাথর পথ আটকে পড়ে আছে। তার ওপর কাঁটা-ভর্তি ঝোপঝাড়। পাথর টপকানো যেমন কষ্টের, তেমনই কষ্ট ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে চলা। আমার পায়ে দু-একটা কাঁটা ফুটেও গেল। যাক। জানি তো, ওই সামনের পাথরটা কোনওরকমে পেরোতে পারলেই কেল্লাফতে। একেবারে আস্তানাটার সামনে।
আশ্চর্য, যতটা ভয় পেয়েছিলুম, মোটেই ততটা নয়! সামনের পাথরটা আমরা খুব সহজেই টপকে গেলুম। একেবারে মুখোমুখি পড়লুম আস্তানাটার। চারদিকে পাথর। এমনকী, ছাদটা পর্যন্ত পাথর দিয়ে ঢাকা। গুহায় বাস করে যেসব মানুষ, এমন আস্তানা তো তাদের কাছে স্বর্গ। আমি এদিক-ওদিক না দেখেই সিধে সেই পাথরঘেরা জায়গাটার ভেতরে ঢুকে পড়লুম।
পরক্ষণেই আমি চমকে উঠেছি। একটা কানফাটা শব্দ। আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছি। চোখের পলকে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। দেখি কী, অনেক কষ্টে এইমাত্র যে-গহ্বরে ঢুকেছি, সেই গহ্বরের মুখে একটা পাথর গড়িয়ে পড়েছে। আমার বেরিয়ে যাওয়ার পথ আটকে গেছে। আমি চিৎকার করে উঠলুম, “বাঁচাও-ও-ও!”
কিন্তু কে বাঁচাবে? সেখানে আমি ছাড়া তখন আর মাত্র একটি প্রাণী। তার কী ক্ষমতা এই পাথর নড়ায়! তবু আমি পাথরের গায়ে-গায়ে আঘাত করতে লাগলুম। আঘাত করে আর্তনাদ করতে লাগলুম, “আমায় বাঁচাও-ও-ও! বাঁচা-ও-ও!” আমি এদিকে ছুটি, ওদিকে যাই। ভয়ে ছটফট করি। পাথরে ঠেলা মারি। নড়ে না পাথর। আমি যেন বন্দিশালায় আটকা পড়েছি। এই বন্দিশালায় একটা পাথরের গায়ে যেখানে আর- একটা পাথর ছুঁয়ে আছে, সেখানে ছোট-ছোট ফোকর দেখা যাচ্ছে। সেখান দিয়ে আলো আসছে। আমি সেই ফোকরে চোখ গলিয়ে চিৎকার করে ডাকতে লাগলুম আমার সেই দলের মানুষটিকে, “ও দাদা, আমায় বাঁচাও!”
“হা-হা-হা!” হঠাৎ আমি হাসি শুনতে পেলুম। তারপরেই ফোকরে রাখা চোখ দিয়ে আমি দেখতে পেলুম, এক ভয়াবহ দৃশ্য। দেখতে পেলুম, আমাদের সেই অনিষ্টের দেবতা হা-হা করে হাসছেন। আমি ভয়ে দলা পাকিয়ে গেলুম। আর দেখতে পারলুম না সেই দৃশ্য।
কিন্তু শুনতে পেলুম, অনিষ্টের দেবতা আমাকে শাসাচ্ছেন, “এতদিন তুই আমার চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছিস। আজ ধরা পড়েছিস। শিল্পসৃষ্টির দেবতা তোকে আশীর্বাদ করেছেন, তোর প্রাণ কেউ নিতে পারবে না। হ্যাঁ, তাঁর আশীর্বাদের জন্যই তোর গায়ে আমি হাত দিতে পারিনি। নইলে কবেই তোকে মেরে ফেলতুম! আজও তোর গায়ে আমায় হাত দিতে হল না। ছদ্মবেশে, তোর দলের লোক সেজে আমি তোকে বোকা বানিয়েছি। এখন তুই বন্দি। এ-বন্দিদশা তোর কোনওদিন ঘুচবে না। এই নির্জন জঙ্গলের এইখানে কেউ কোনওদিন আসবে না। কেউ কোনওদিন জানতেও পারবে না, শিজুমন নামে একটা ছেলে এই মস্ত-মস্ত পাথরের আড়ালে বন্দি হয়ে আছে। কেউ তোকে খেতে দেবে না। একফোঁটা জলও পাবি না। কেউ তোকে নিজের হাতে মারবে না। আমাকেও মারতে হল না। কিন্তু খিদে-তেষ্টার জ্বালায় তুই নিজে-নিজেই মরবি। তিলে-তিলে। তুই আর দেখতে পাবি না কোনওদিন কাউকে! আমাকেও না। আমি তোর হৃৎপিণ্ড খেতে চেয়েছিলুম। দিসনি। এবার শাস্তি ভোগ কর না খেয়ে। হা-হা-হা! হা-হা-হা।”
সে প্রচণ্ড জোরে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে তার হাসি মিলিয়ে গেল। তারপরে সব নিস্তব্ধ।

আমি এখন একা। ভয়ঙ্কর একা। এমনই এক ভয়ঙ্কর বিপদ নিয়ে আমার শুরু হল আর-এক জীবন। মস্ত-মস্ত পাথরের চাঁইগুলো আমায় ঘিরে আছে। অসহায়ের মতো এই পাথরে মাথা ঠেকিয়ে আমার মতো একজন ছোট্ট ছেলে কাঁদছে। আর ভাবছে, কী হয় মানুষের মরে গেলে?
আমি অনেকক্ষণ থমকে বসে রইলুম। অনেকক্ষণ ধরে ভাবতে লাগলুম এলোমেলো কত কথা। ভাবতে-ভাবতে এমনই আনমনা হয়ে গেলুম যে, কখন দিনের আলো চলে গেছে, খেয়াল করতে পারিনি। খেয়াল করব কেমন করে! কারণ, যেখান দিয়ে দিনের আলো আসছিল, মানে, ওই পাথরের ফোকরগুলোর দিকে, আমার নজরই পড়েনি।
হঠাৎ যখন চমক ভাঙল, তখনই আমার দৃষ্টি পড়ল ওই ফোকরগুলোর দিকে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলুম। একটার পর একটা অনেক ফোকর। চোখ রাখি একটার পর একটাতে। বাইরে অন্ধকার। হঠাৎ এই ফোকরটার কাছে এসে থতমত খেয়ে যাই। আমার চোখের সামনে খাবার। কে সাজিয়ে রেখেছে ফোকরের পাথরের ওপর! কে রেখে গেছে জল! কে আমায় বারবার এমন করে ভালবাসছে! সে জানলই বা কেমন করে আমি এখানে বন্দি! সে বোধ হয় আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবে। কিন্তু কে সে? সে নিশ্চয়ই আমাকে বাঁচতে বলছে। সুতরাং আমায় বাঁচতে হবে। আমি খাবার মুখে দিলুম।
পরের দিন আরও একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। পাথরের ওই ফোকরের একটাতে কে রেখে গেছে আমার সেই মূর্তি খোদাই করার হাতুড়ি আর ছেনি! আমি অবশ্য সেদিন কুড়িয়ে পেয়েছিলুম শূন্য ঝুলিটা। বামন-দেবতা ঝুলিসুদ্ধু আমার এই হাতুড়ি আর ছেনি ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন খাদে। কে খুঁজে এনে দিল! সেই খাদেই কি এই বন্দিশালা! কে আমায় এমন চোখে-চোখে রেখেছে?
এই গহ্বরের বন্দিশালায় কেটে গেল আমার ক’টা দিন আর ক’টা রাত। আশ্চর্য, আমায় একদিনও না খেয়ে থাকতে হয়নি। কে আমায় খাবার দিয়ে যায় রোজই, আমি এখনও তা জানতে পারিনি। সে কখন যে আসে আর কখন যে যায় তারও হদিস করতে পারিনি আমি। একদিন তাকে ধরব বলে তক্কে-তক্কে ছিলুম। কিন্তু পারিনি। সেইদিন থেকে আর চেষ্টাও করিনি। যে দেখা দেবে না, তাকে বন্দিশালায় বসে কেমন করে দেখি! অগত্যা আমি নিরাশ হয়ে বন্দিজীবন কাটাই একা-একা! যদিও মূর্তি গড়ার হাতুড়ি, ছেনি ফিরে পেয়েছি, তবুও আর ভাল লাগে না কিছু করতে। আমি বসে থাকি চুপচাপ। সে যে কী যন্ত্রণা, কাকে বলি!
একা-একা চুপচাপ আমার মতো ছোট্ট ছেলে আর কতদিন থাকতে পারে? অস্থির হয়ে উঠল আমার মন। কী করি! কিছুই ভেবে পাই না। তাই একদিন আনমনে আমি পাথরের ওপর ছেনি বসাই। হাতুড়ি মারি। পাথর ছিটকে পড়ে টুকরো হয়ে কেটে-কেটে। কার মূর্তি খোদাই করব আমি! জানি না। তবু হাতুড়ি পড়ে ছেনির ওপর। পাথর কেটে খসে পড়ে এদিক-ওদিক। আমি থমকে থামি। খসে পড়া পাথরের টুকরোগুলো হাতে নিয়ে আমি জুলজুল করে দেখতে থাকি। আমার বুকের ভেতরটা শিরশির করে ওঠে। আচমকা মনে হল, এমনই করে তো ছেনির আঘাতে আমি আমার বন্দি পাথরটা ফুটো করে ফেলতে পারি! আমি তো পারি, সেই ফুটোর ভেতর দিয়ে আমার বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুদে বার করতে! ভাবতে-ভাবতে উত্তেজনায় আমার গায়ে কাঁটা দেয়। কিন্তু পরক্ষণেই আমার মনে হল, এই মস্ত পাথরটাকে ফুটো করা কি সহজ কাজ! কতদিন লাগবে? কত বছর? কেউ জানে না। আমার মন বলল, লাগুক অনেক দিন, যাক অনেক বছর। এই পাথর কাটতে-কাটতে একদিন ফুটো হবেই। একদিন আমি মুক্তি পাবই। একদিন এই অন্ধকার থেকে আমি আলোয় ফিরব।
আমি আর সময় নষ্ট করলুম না। সেই তখন থেকেই আমি পাথর ভাঙতে শুরু করে দিলুম। অবশ্য মনে একটা দারুণ ভয়! যদি অনিষ্টের দেবতার কানে পাথর ভাঙার শব্দটা পৌঁছে যায়! না, ভয় পেলে চলবে না। মরে তো বসেই আছি। তবু চেষ্টা করতে দোষ কী।
বলেছি তো, এই বন্দিশালায় অনেক ফাঁক-ফোকর পাথরের গায়ে-গায়ে। বাতাস বইলে ওই ফাঁক দিয়ে ফুরফুর করে বন্দিশালায় ঢুকে পড়ে। তার ছোঁয়া লাগে আমার গায়ে। রাতে শিশির পড়ে পাথরের আনাচে-কানাচে। পাথরের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ে বন্দিশালার ভেতরে, টুপটাপ। দিনে সূর্যের রোশনাই পাথরের ফোকর দিয়ে ঢুকে পড়ে বন্দিশালায়। তেরছা হয়ে। যেন আলোর তরোয়াল। আর রাতে যেদিন চাঁদ ওঠে আকাশে, সেদিন জ্যোৎস্নার আলো পাথরের ফাঁকে-ফাঁকে অনেক আলো হয়ে লুকোচুরি খেলে আমার সঙ্গে।
ঠুক, ঠুক। হাতুড়ির ঘা পড়ে ছেনির ওপর। বাতাস বয় ফুরফুর। পাথর ভাঙে।
ঠুক, ঠুক। শিশির পড়ে পাথরে-পাথরে টুপটাপ। পাথর ভাঙে।
ঠুক, ঠুক। আকাশে সকাল নামে। রোদ ছুঁয়ে যায় ঝিকমিক। পাথর ভাঙে।
ঠুক, ঠুক। জ্যোৎস্না নামে রেশম নরম তুলতুল। পাথর ভাঙে।
এমনই করে শীত যায়। বসন্ত আসে। চাঁদ ওঠে। বৃষ্টি ঝরে। তারা ফোটে। সূর্য ওঠে।
এমনই ক’রে কটা বসন্ত চলে গেল, আমি জানি না।
আমি পাথর ভাঙি টুক, ঠুক।
এমনই করে ক’টা বর্ষা চলে গেল, রোদ উঠল, আমি দেখিনি।
আমি পাথর কাটি ঠুক, ঠুক।
এমনই করে কত সকালে কত সূর্য উদয় হল, মনে রাখিনি।
আমি পাথর ফাটাই ঠুক, ঠুক।
এমনই করে পাথর ভাঙতে-ভাঙতে কেমন করে ছেলেবেলার দিনগুলি আমার হারিয়ে গেল, খেয়াল নেই। তারপরে কেমন করে আমি বড় হলুম, একটু বড়, আরও বড়, অনেক বড়, মনে নেই। কবে আমার কেমন করে মাথার চুলে পাক ধরল, বলতে পারব না। এখন আমার মাথাভর্তি চুল। গালভর্তি দাড়ি! চামড়া কুঁচকে গেছে। মুখে বলিরেখা। ছোট্ট একটা ছেলে বন্দিশালার গহ্বরে, পাথর ভাঙতে-ভাঙতে বুড়ো হয়ে গেল। আশ্চর্য! কে আমায় এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে? কে আমায় খাবার এনে দেয়? কার দয়ায় আমি বেঁচে আছি? তার কি বয়েস বাড়েনি? সে কি বুড়ো হয় না? কে সে, আমায় এই নতুন সাপের চামড়ার পোশাক এনে দিয়েছে? এখনও জানি না। আমি জানি শুধু ঠুক, ঠুক করে পাথর ভাঙতে। এখনও ভাঙছি। জানি না, আরও কতদিন ভাঙতে হবে। জানা নেই, কবে আমি বন্দিশালার পাথর ভেঙে খোলা আকাশের নীচে খানিক দাঁড়িয়ে শ্বাস নিতে পারব। অনিষ্টের দেবতাকে আর আমি দেখিনি কোনওদিন। হয়তো তিনি ভেবেই নিয়েছেন, কবেই আমি মরে গেছি। আমি যে সারাজীবন ধরে পাথর ভাঙছি, এটা বুঝি তিনি ভাবতেই পারেন না। ঠক-ঠক-ঠক। এই একটাই শব্দ কত শব্দ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নির্জন এই বনে। কতকাল ধরে।
এ কী! এ কী! হঠাৎ আমি কেন চমকে উঠি এমন করে! কেন আমার চোখ দুটি অমন অস্থির হয়ে ওঠে! পাথর ভাঙতে-ভাঙতে কেন আমার হাত কাঁপে। বুকের ভেতরটা কেন উত্তেজনায় অমন দুরু-দুরু করে ওঠে!
দ্যাখো, দ্যাখো, পাথর ভাঙতে-ভাঙতে আমি আলো দেখতে পেয়েছি! একটুকরো আলো কেমন আমার ভাঙা পাথরটার ছোট্ট গর্তের ভেতর দিয়ে আমার গায়ে এসে পড়ল, এইমাত্র। হ্যাঁ ভেঙেছে, পাথর ভেঙেছে। আরও একটু ঘা মারো! আরও খানিক হাত চালাও! আরও ভাঙুক!
আরও ভাঙতে-ভাঙতে আমি বন্দিশালা ভেঙে চুরমার করে ফেলেছি। আলোয়-আলোয় ভরে গেল বন্দিশালা। আমি বেরিয়ে পড়লুম। আমি এবার লাফাব, না, আনন্দে ছুটব? না কি চিৎকার করে গড়াগড়ি খাব?

আমার লাফানো হল না। আমি ছুটতেও পারলুম না। আমার মুখ দিয়ে চিৎকারও বেরোল না। আমি এখন আর সেই ছোট্ট শিজুমন নই। আমি এখন এক বুড়ো মানুষ। বন্দিশালার বাইরে এসে দাঁড়াতেই আমার চোখে কেমন ধাঁধা লেগে গেল। আমার পা কেমন কাঁপতে লাগল। মনে হল আমি আর দাঁড়াতে পারছি না। হয়তো পড়ে যাব এক্ষুনি।
না, আমি পড়ব না। আমি মন শক্ত করলুম! ফিরে-ফিরে দেখছি ওই ভাঙা পাথরটার দিকে। ওই তো হাঁ করে আছে পাথরের চাঁইটা। ওই তো পাথরের ছিটকে-পড়া কণাগুলি ঢিপি হয়ে আছে। কত দিন, কত বছর ধরে জমেছে, কে বলবে!
এবার? বন্দিদশা থেকে মুক্তি তো পেলুম। এবার যাব কোথায়? আমি কাঁপা পায়ে ধীরে-ধীরে, ঠুক-ঠুক করে হাঁটতে লাগলুম। হাঁটতে-হাঁটতে শেষবারের মতো আমার বন্দিশালার গহ্বরটার দিকে ফিরে তাকালুম। কতদিনের বন্ধু আমার এই গহ্বর। তাকে ছেড়ে যাওয়ার আগে মন যদি কেমন-কেমন করে, তুমি দোষ দিতে পারো না আমার মনকে।
আমি হাঁটছি। কিন্তু পা চলছে কই? পা দুটো কি হাঁটতে ভুলে গেল! হয়তো তাই। এতদিনের বন্দি-পা আমার একেবারেই অচল হয়ে গেছে। আমার শিরদাঁড়াটা শক্ত করে আমি তো আর সিধে হয়ে দাঁড়াতে পারছি না! কোমর ভেঙে যাচ্ছে। কেবলই সামনে ঝুলে পড়ছি। ঝুলে-ঝুলেই পা ফেলে আমি হাঁটছি।
কষ্ট হলেও আমি দাঁড়াইনি কোথাও। এই দিনেরবেলাতেও কেউ যদি বনের মধ্যে আমায় দেখতে পেত, নিশ্চয়ই আঁতকে উঠত আমার চেহারা দেখে। ভাবত, হয় আমি কোনও পিশাচ, না-হয় খোক্কস। ঘুরে বেড়াচ্ছি কারও ঘাড় মটকাবার জন্য। কে আর জানত, আমার নাম শিজুমন। কে আর ভাবত, আমিও একদিন ছোট্ট ছিলুম। আমারও একদিন খেলা করতে ইচ্ছে করত। ইচ্ছে করত, গান গাইতে। নয়তো খোলা আকাশের নীচে ছুটোছুটি করতে। একা-একা।
দ্যাখো, হাঁটতে-হাঁটতে কোথায় চলে এসেছি! আমি বোধ হয় এবার মানুষের মুখ দেখতে পাব। শুনতে পাব তাদের গলার স্বর। আমায় দেখে কেউ হয়তো মুখ ফিরিয়ে নেবে। নয়তো হেসে উঠবে কিংবা ছি ছি করে উঠবে আমার ছিরি দেখে।

আচ্ছা, দূরে, অনেক দূরে ওটা কী দেখা যাচ্ছে? পা দুটোকে মনে-মনে বললুম, আর একটু চালিয়ে হাঁট রে বাছারা! হায়! হায়! বাছাদের কী দোষ! যিনি পায়ের মালিক, মানে আমি, শিজুমন, যতক্ষণ না পা দুটো জোরে নাড়াতে পারছি, ততক্ষণ পা এমনই করে হাঁটবে। তাই হাঁটুক।
তবে থেমো না যেন!
অনেক দূরের ওইটা এখন অনেক কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছি। এই জায়গাটা বেশ উঁচু। এখানে একটু দাঁড়ানো যাক। দেখতে পেলুম, নীচে জল-থই-থই একটা মস্ত হ্রদ। হ্রদের মাঝখানে সবুজ জমি। জমির ওপর বড়-বড় ঘরদোর। অনেক মানুষ। ওই দূরের মানুষগুলোকে এত ছোট লাগছে, মনে হচ্ছে মাটি কামড়ে পোকা হাঁটছে।
আমি এই উঁচু জায়গাটা থেকে নামতে শুরু করলুম। সাবধান! মনে হচ্ছে, চোখে কম দেখছি। নামতে-নামতে হোঁচট খেলুম। পড়তে-পড়তেও বেঁচে গেলুম। এখান থেকে পড়লে আর রক্ষে ছিল না। কাজেই আরও সতর্ক হয়ে পা ফেললুম।
হ্যাঁ, হ্রদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি আমি। দ্যাখো, জলা-জমিতে নলখাগড়ায় ভর্তি। কতরকমের পাখি। যত হাঁস দেখছি, মুরগিও তত। আঃ! এবার আমি একটু মুখে জল দেব। কতদিন হয়ে গেল, কতদিন আমি চান করিনি। জলে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করলুম। জলের আয়নায় আমার মুখখানা ভেসে উঠল। ইস! সত্যিই কী চেহারা হয়েছে আমার! এই কি আমি? আমার নামই কি শিজুমন? আমি আর আমাকে চিনতে পারি না। আমি মুখে জল দিলুম। ঘাড়ে-মাথায় জল ছিটোলুম। অনেকক্ষণ জলের মধ্যে পা ডুবিয়ে দূরে, ওই জল-ঘেরা সবুজ দ্বীপের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলুম। এখান থেকে আর-একটু দূরে দেখতে পেলুম, হ্রদের বুকের ওপর দিয়ে একটা সেতু চলে গেছে দ্বীপের ঠিক মাঝখান পর্যন্ত। আমি একটু হাঁটলুম। সেতুর ওপর উঠে পড়লুম। কত মানুষ এপার-ওপার করছে! কেউ আমায় দেখল, কেউ-কেউ দেখল না। কেউ হাসল, অনেকে হাসল না। আমি গা বাঁচিয়ে সেতুর ওপর দিয়ে এগিয়ে চললুম। কত পালটে গেছে আমার দেখা সেই পৃথিবীটা! পালটে গেছে মানুষ। পালটে গেছে তাদের চালচালন। তাদের পোশাক-আশাক। আমি তাদের পাশে নেহাতই এক অসভ্য মানুষ। আমার পোশাকটা যেমন বেমানান, তেমনই আমার হাবভাব। ওদের দেখে আমার নিজেরই কেমন নিজেকে ঘেন্না করছে। তবু হাঁটছি। সেতু পেরিয়ে আমি যাব সবুজ দ্বীপের ওপারে।
শেষ হল আমার সেতু পেরোনো। আমি দ্বীপে পৌঁছে গেছি। আমি যেখানে দাঁড়ালুম, সেখান থেকে দেখছি, শুধু মানুষের মাথা আর মাথা। দেখছি কত ছোট-বড় বাড়ি। কেউ বেরোচ্ছে। কেউ ঢুকছে। কেউ হাঁটছে। কেউ ছুটছে। এ আমি কোথায় এলুম!
দ্যাখো, দ্যাখো, একটি ছোট্ট ছেলে তার হাঁসের সঙ্গে কেমন হ্রদের জলে সাঁতার কাটছে! খেলা করছে! ওই দ্যাখো, খেলতে-খেলতে হাঁসটা কেমন জলের ওপর থেকে উঠে পড়েছে! দ্যাখো, কেমন প্যাঁক-প্যাঁক করে ছুটছে হাঁসটা! পড়িমরি করে ছেলেটাও উঠে পড়ল। হাঁসটা তখন কতদূরে চলে গেছে। ছেলেটাও ছুটল হাঁসটাকে ধরতে। আমার এমন মজা লেগে গেল! মনে হল, আমিও ছুটি। ধরি হাঁসটাকে। সত্যি, কী সুন্দর দেখতে হাঁসটাকে! একদম সাদা, ধবধব করছে। ছোট্ট। রাজহাঁসের ছানা। আমি সত্যি-সত্যি ছুটতে গেলুম। টাল সামলাতে পারলুম না। পা হড়কে ধপাস! হেসে উঠল ছেলেটা। হাসতে-হাসতে আমায় দেখল। আবার ছুটল। আমি লজ্জায় আধখানা হয়ে গেলুম। ছি ছি, আমি যে বুড়ো হয়েছি, এ-কথাটা একদম ভুলে বসে আছি! আমি পড়ে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চারদিক দেখতে লাগলুম। আরও যে অনেক মানুষ আমাকে দেখছে, এটা যখন বুঝতে পারলুম, তখন তড়বড় করে উঠতে গিয়ে আবার পড়লুম। লেগেছে। মালুম দিচ্ছে। আর-একবার নিজে-নিজে চেষ্টা করতেই একজন মানুষ এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে আমাকে উঠতে সাহায্য করলেন। আমি উঠে দাঁড়ালুম। তিনি বললেন, “আর কি হাঁসের পেছনে ছোটার বয়েস আছে আপনার?”
আমি ‘হ্যাঁ’, ‘হুঁ’ কিছুই বলতে পারলুম না। লজ্জায় মুখ নিচু করে হাঁটতে লাগলুম। হাঁটতে-হাঁটতে দেখি, এ-দ্বীপ এক মস্ত শহর।
শহরে পথ আছে। গঞ্জ আছে।
গাড়ি-জুড়ির রথ আছে। সওয়ার আছে।
হইহল্লার বাজার আছে।
হাজার-হাজার মানুষ আছে।
আরও খানিকটা যেতে আমি দেখতে পেলুম, শহরের ঠিক মাঝে, না, শহরের ঠিক বাঁকে একটা মস্ত উঁচু ঢিপি। পাথর সাজিয়ে আরও উঁচু করছে সেই ঢিপিটা অনেক মানুষ। ঢিপিটার গা বেয়ে ওপরে উঠছে একের পর এক সার বেঁধে শ’য়ে-শ’য়ে। তাদের পিঠে বাঁধা পাথরের বোঝা। উফ! দেখলেই ভয় লাগে। এই বুঝি পড়ে যায়! না, পড়ছে না কেউ। তারা ক’পা হাঁটছে। খানিক থেমে দম নিচ্ছে। আবার উঠছে। ওপরে, ঢিপির গা বেয়ে। আমি অবাক চোখে দেখছি। ভাবছি, কী শক্তি ওদের!
হঠাৎ একটা ভাবনা মনের ভেতর চেপে বসল। তাই তো, এর পর আমি কী করব! বন্দি যখন ছিলুম, কাজ ছিল, বন্দিশালার পাথর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসার। একনাগাড়ে পাথর ভেঙেছি। আর এখন? আমি কি পারব, ওদের মতো পাথর বইতে? হায়! হায়! আমি যে বুড়ো হয়ে গেছি! আমার বয়েসটা যে হারিয়ে গেল, ওই পাথরের বন্দিশালায়!
কত কথাই মনে আসছে। ফেলে আসা কত কথা। ঘুমও পাচ্ছে। কোথায় বসে একটু ঝিমিয়ে নিই? ওই তো সামনেই একটা গাছ। গাছের নীচেই বসা যাক! শুতেই বা দোষ কী! ঢিপির ওপর মানুষের হল্লা-গুল্লা ছাড়া আর সব নিস্তব্ধ। জায়গাটা খুব নিরিবিলি। শান্তিতে একটু ঘুমনো যাক। ঘুমে চোখ ডুবে আসছে। কেমন যেন অস্পষ্ট হয়ে আসছে মানুষের হল্লা-হাসি। আমি সত্যি-সত্যি ঘুমিয়ে পড়লুম।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার। এ কী! রাত হয়ে গেছে যে! ইস! একেবারে অকাতরে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম আমি! আকাশে চাঁদ উঠেছে। আকাশ-ভর্তি আলো। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে পড়েছে আমার গায়ে। কোনও মানুষের সাড়া-শব্দ নেই। নিস্তব্ধ চারদিক। শুধু ঝিল্লির শব্দ কানে আসছে। বন্দিশালায় এই ঝিল্লির শব্দ শুনতে-শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। এখন সয়ে গেছে। কিন্তু চমকে ওঠার মতো আবার সেই ঘটনা এখানেও। চাঁদের আলোও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আমার সামনে খাবার। আশ্চর্য! খিদে যে আমার পেয়েছে, সে না বললেও তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। সুতরাং আর ভাববার কিছু নেই। চেটেপুটে খেয়ে পেট ভরালুম। আবার শোয়া। এ ছাড়া আর তো কিছু করার নেই এই রাতদুপুরে। বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। আমার কাছে এ-ঠাণ্ডা এমন কী আর! ছোটবেলায় তুষারপাতের সময় কত পাহাড় ডিঙিয়েছি। তখনকার কথা মনে পড়লে এখনও গা শিউরে ওঠে।
পরের দিন ভোর হতে-না-হতেই পিলপিল করে লোক জুটছে ঢিপির মাথায়। আমি পরে শুনেছি, এটাকে টিপি বলে না। বলে পিরামিড। শুরু হয়ে গেল পাথর বওয়ার কাজ। এ কী! সেই অসংখ্য মানুষের মধ্যিখানে সেই ছেলেটাকে দেখছি না? হ্যাঁ, ওই তো সাদা হাঁসটাও তো তার সঙ্গে হাঁটছে। দ্যাখো, কী ভয়ানক কাণ্ড! এই নীচের থেকে পিঠে করে সে পাথর বয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওপরে! কেন? ওইটুকু ছেলে কেন অমন কষ্ট করছে? ইচ্ছে করল ছুটে যাই। তাকে বলি, তুমি কেন পাথর বইছ? তোমার পাথর আমাকে বইতে দাও! কিন্তু হায় রে! আমার কি এখন সে-ক্ষমতা আছে! আমার যে তিনমুণ্ডু এক হয়ে গেছে। আমি যে বুড়ো থুত্থুড়ো!
সূর্য উঠে গেছে। তখনও আবছা কুয়াশায় ঢেকে আছে সারা চত্বর। গাছের পাতা ছুঁয়ে টুপটাপ শিশিরের ফোঁটা পড়ছে। একদল সারস উড়ে যাচ্ছে। কুয়াশায় লুকোচুরি খেলছি। লুকিয়ে-লুকিয়ে দেখছি ছেলেটাকে। দেখছি তার ছোট্ট রাজহাঁসের কাণ্ড! সে তার বন্ধুর পিঠে বাঁধা পাথর দেখছে ফিরে-ফিরে। যেন পিঠ থেকে পাথর পড়ে না যায়। সে উঠছে, নামছে। ডাকছে, থামছে। আমিও উঠে দাঁড়ালুম। আরও ভাল করে আরও একটু দেখি। দেখতে-দেখতে হাঁটি। হাঁটতে-হাঁটতে চলে আসি এইখানে। এইখানেই সে বারবার আসছে। এইখানেই সে তুলে নিচ্ছে পাথরের ভার পিঠে। এইখানেই সে হাঁসটাকে আদর করছে। এইখানেই সে খানিক দাঁড়াচ্ছে। আমিও দাঁড়ালুম। আজ আর ছুটতে হল না তার পিছু। আজ সে নিজেই দাঁড়াল আমাকে দেখে। আমি হাসলুম। সে আমার হাসি দেখে হাত তুলল কি না, দেখতে পেলুম না। আমি তার দিকে হাত বাড়ালুম। হাঁসটা প্যাঁক-প্যাঁক করে ডেকে উঠল। ছেলেটা আচমকা ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল, “ছেলেধরা, ছেলেধরা।”
আমি থতমত খেয়ে গেছি।
দেখতে-দেখতে এক দঙ্গল লোক ছুটে এল।
আমি পালাবার পথ দেখছি।
দেখতে-দেখতে দঙ্গল বেঁধে লোকগুলো আমাকে চেপে ধরল।
আমার দম আটকে আসছে।
লোকগুলো আমায় মারতে শুরু করল।
আমি অসহায়ের মতো মার খাচ্ছি।
এমন সময়ে একজন লোক এল। হর্তাকর্তা হবে বোধ হয়। সবাইকে হাঁক পেড়ে বলল, “মেরো না! রাজপ্রাসাদে নিয়ে চলো!”
আমাকে সবাই মিলে টানতে-টানতে রাজপ্রাসাদে নিয়ে চলল।
আমি মরতে-মরতে রাজপ্রাসাদে চললুম। রাস্তায় দলে-দলে লোক জুটে গেল। আমার পিছু নিল। চেঁচাতে লাগল, “ছেলেধরা, ছেলেধরা!”
আমি কথা বলতে পারলুম না। আমার চোখ জলে ভিজে গেল।
অনেকক্ষণ ধরে আমায় রাস্তায় ঘোরানো হল। অনেকক্ষণ ধরে অনেক মানুষের হম্বিতম্বি শুনতে পেলুম আমি। আমার পা আর হাঁটে না। আমায় টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসা হল প্রাসাদের সামনে। আর সাধ্যে কুলোচ্ছে না আমার। আমি টলে-টলে পড়ে যাচ্ছি। তবু আমায় যেতে হল প্রাসাদের ভেতরে। সামনেই বাগান। বাহারি গাছ। রঙিন ফুল। কত পাখি। উড়ে গেল। আর কিছু নজরে পড়ল না। চোখের দৃষ্টি আবছা হয়ে আসছে। আমি কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ছি। আমাকে আর মারার কী আছে! আমি তো মরেই আছি।
আমি বুঝতে পারলুম, সবাই মিলে আমাকে একটা মস্ত ঘরের মধ্যে টেনে আনল। মস্ত ঘরটা এত বড়, আমার চোখ সবটা ঠাহর করতে পারল না। একটা অদ্ভুত সুগন্ধ নাকে এল। ভাল লাগল। একটু স্বস্তি পেলুম। দোতলার সিঁড়ি ভেঙে আমাকে সম্রাটের সামনে নিয়ে আসা হল। আমি আবছা-আবছা দেখলুম সম্রাট সিংহাসনে বসে আছেন। সিংহাসনটা সোনার না রুপোর, আমি বলতে পারব না। তবে দেখতে পেলুম, সম্রাটের মাথায় আশমানি রঙের মুকুট। বোধ হয় মুকুটে গাঁথা অনেক মণিমুক্তো। আলোয় ঠিকরে মণিমুক্তোর জেল্লা আমার চোখের ওপর ঝিলিক দিচ্ছে। মাঝে-মাঝে। আমি চোখ বুজে ফেলছি। সম্রাট গায়ে দিয়েছেন, নীল আর সবুজে গাঁথা পাখির পালকের আলখাল্লা। আমি তাঁকে যেমন করে দেখছি, মনে হল তিনিও আমাকে তেমন করেই দেখছেন। হঠাৎ তিনি গম্ভীর গলায় গর্জন করে উঠলেন, “কে লোকটা?”
একজন বলে উঠল, “আজ্ঞে, ছেলেধরা।” সে বোধ হয় সম্রাটের পরামর্শদাতা।
“হুম,” করে একটা রাগের শব্দ গলায় এনে সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, “কোন ছেলেটাকে ধরেছে?”

পরামর্শদাতা উত্তর দিল, “ধরেনি, ধরব-ধরব করছিল।”
মনে হল, সম্রাট ভুরু কোঁচকালেন। তারপর পরামর্শদাতাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কী পরামর্শ দেন? কী করা উচিত?”
পরামর্শদাতা বলল, “করা তো অনেক কিছুই যায়। তবে লোকটার বয়েস হয়েছে। প্রাণে মেরে কোনও লাভ হবে না। যাতে লোকটা কোনওদিন কোনও ছেলেকে ধরতে না পারে, তাই আমি বলি লোকটার হাতদুটো উপড়ে ফেললেই যথেষ্ট।”
“তবে তাই হোক।” বলে সম্রাট আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হে, তোমার কী বলার আছে?”
আশ্চর্য, আমি উত্তর দিতে গেলুম, আমার মুখ দিয়ে শব্দ বেরোল না। কথা বলার জন্য আমার গলার ভেতরে ভীষণ কষ্ট হতে লাগল।
সম্রাট আবার বললেন, “চুপ করে আছ কেন?”
আমি প্রাণপণে কথা বলার চেষ্টা করলুম। তবু পারলুম না। বিষম খেলুম।
আমায় বিষম খেতে দেখে সম্রাট বললেন, “লোকটা বোধ হয় বোবা।”
আমি ভয়ে ফ্যালফ্যাল করে এদিক-ওদিক দেখতে লাগলুম। আমি মনে-মনে ভাবতে লাগলুম, আমি কি তবে সত্যিই বোবা হয়ে গেছি। এই এত বছর বন্দি ছিলুম আমি। এত বছরে কারও সঙ্গে একটি কথাও বলতে পারিনি আমি। তবে কি কথা না বলে, আমি কথা বলতে ভুলে গেলুম!
সম্রাট আবার গর্জে উঠলেন, “নিয়ে যাও একে! এর হাত দুটো উপড়ে নিয়ে হ্রদের জলে ফেলে দাও!”
সম্রাটের আদেশ শুনে আমার বুকের ভেতরটা দুমড়ে গেল। আমায় আবার ওরা টান মারল। আমার শক্তি নেই। তবু আমি বাঁচার জন্য হাঁকপাঁক করতে লাগলুম। তারপর হঠাৎই আমি কথা বলতে পারলুম। আমার গলা দিয়ে ঠিকরে বেরিয়ে এল, “না-আ-আ।”
মস্ত ঘরটায় প্রতিধ্বনি উঠল, “না-আ-আ।” আমি ভয়ে হাঁপাতে লাগলুম। হাঁপাতে-হাঁপাতে বললুম, “না, আমি বোবা নই! আমি বোবা নই! আমায় কিছু বলতে দিন সম্রাট! আমার কথা শুনুন!”
সম্রাট হুকুম দিলেন, “ঠিক আছে। ও কী বলতে চায়, বলতে দাও ওকে!”
আমি তখন ঠকঠক করে কাঁপছি।
সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, “কী বলতে চাও তুমি?”
আমি কাঁপতে-কাঁপতে বললুম, “আজ্ঞে, আমি ছেলেধরা নই।”
“তবে তুমি কে?”
“আমি একজন খোদাইকর। আমি শিল্পী।”
“শিল্পী!” সম্রাট যেন চমকে উঠলেন। আমাকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। হয়তো দেখলেন আমার চেহারাটা। নয়তো গায়ের পোশাকটা। না-হয় আমার মুখখানা। তারপর হো-হো করে হেসে উঠলেন। হাসতে-হাসতে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথাকার শিল্পী হে তুমি? তোমার কোনও খবর আমাদের কারও জানা নেই তো। কে তোমায় শিল্পী বলেছে? তোমাকে দেখলে তো মনে হয়, তুমি হয় ছেলেধরা, না হয় চোর।”
আমার গলায় যতটুকু শক্তি ছিল, সেই সব শক্তি দিয়ে আমি প্রতিবাদ করে বললুম, “আমি ছেলেধরাও নই, আমি চোরও নই। আমি খোদাইকর। আমি মূর্তি খোদাই করতে জানি। শিল্প-সৃষ্টির দেবতা আমাকে শিখিয়েছেন।”
সম্রাট আঙুল তুললেন আমার দিকে। বললেন, “তুমি মিথ্যে কথা বলছ! দেবতা কখনও কাউকে কিছু শেখান না। নিজেকে শিখতে হয় নিজে-নিজে।”
আমি উত্তর দিলুম, “সম্রাট আমি নিজে-নিজেই শিখেছি। দেবতার দেখে-দেখে। আমি নিজে-নিজেই গড়তে পারি আপনি যা চান। কিন্তু আপনি যদি আমার এই হাতদুটো উপড়ে ফেলে দেন, আমি কিছুই করতে পারব না।”
সম্রাট আমার কথা শুনে বোধ হয় কিছু ভাবলেন। তারপর বললেন, “আমি যদি তোমার হাতদুটো উপড়ে না নিয়ে তোমাকে রেহাই দিই, তবে তুমি আমার ওই যে পিরামিড তৈরি হচ্ছে ওর গায়ে সুন্দর একটি শিল্প খোদাই করতে পারবে?”
“পারব। বলুন, কী খোদাই করতে হবে?”
সম্রাট উত্তর দিলেন, “তোমার যা ইচ্ছে। তোমার মন যা চায়, তাই-ই তুমি খোদাই করতে পারো। শিল্পীর কাজে আমি খবরদারি পছন্দ করি না।” তারপর পরামর্শদাতাকে বললেন, “আপনারা ওকে ছেড়ে দিন। সত্যিই যদি এই মানুষটি আমার মনপছন্দ কোনও ছবি খোদাই করতে পারে পিরামিডের গায়ে, তবে আমার প্রাসাদ খোলা থাকবে এই খোদাইকরের জন্য চিরদিন। আর যদি মিথ্যে বলে আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালাবার ধান্দা করে থাকে, তবে এর শাস্তি হবে মৃত্যু।” বলতে-বলতে তিনি আমার দিকে আবার চোখ ফিরিয়ে বললেন, “যাও হে শিল্পী, তোমার কাজ শুরু করে দাও। তোমাকে আমি ছেড়ে দিলুম এখনকার মতো।”
আমি মাথা নোয়ালুম। তারপর বললুম, “হুজুর, আমার যে খোদাই করার যন্ত্রপাতি কিছুই নেই। হুজুর, বন্দিশালার পাথর কাটতে-কাটতে আমার ছেনি, হাতুড়ি ক্ষয়ে শেষ হয়ে গেছে।”
“বন্দিশালা!” সম্রাট চমকে উঠলেন। বললেন, “তবে কি তুমি সত্যিই চোর? চুরির অপরাধে তবে কি তুমি সত্যিই বন্দিশালায় বন্দি ছিলে? পাথর ভেঙে পালিয়ে এসেছ?”
আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলুম।
“চুপ করে গেল কেন?”
আমি শান্ত গলায় উত্তর দিলুম, “না সম্রাট, আমি আবার বলছি, আমি চোর নই। বন্দিশালায় বন্দি থাকার সেই কাহিনী মস্ত। আপনার পছন্দমতো আমার খোদাইয়ের কাজ যেদিন শেষ করব, সেদিন যদি আপনার ওই চোখ দুটি আমার কাজ দেখে খুশিতে ঝলমল করে ওঠে, সেদিন আমার সব কথা আপনাকে শোনাব সম্রাট। তার আগে আমার কিছুই বলার নেই। বললেও আপনি বিশ্বাস করবেন না। আর কেই-বা বিশ্বাস করতে পারে আমার এই হতশ্রী চেহারা দেখে? আমার ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক দেখে?”
“ঠিক আছে, তোমাকে নতুন পোশাক দেওয়া হবে। ছবি খোদাই করার জন্য তোমার যা-যা সরঞ্জাম দরকার, সব তুমি পাবে। এমনকী, আমার প্রাসাদে তোমার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও হবে। তুমি এগিয়ে যাও!” সম্রাট আমায় ভরসা দিলেন।
শিল্পসৃষ্টির দেবতার কাছে আমি শিখেছি ভদ্র হতে, শান্ত হতে। শিখেছি, কেমন করে বড়মানুষকে মান্য করতে হয়। আমি ঠিক তাঁরই শেখানোমতো সম্রাটের সামনে আবার মাথা নত করে বললুম, “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। ”
ঠিকই, সম্রাট আমাকে সবই দিলেন। কিন্তু তবুও আমি সিধে হয়ে দাঁড়াতে পারলুম না। আমার শিরদাঁড়া শক্ত হল না। আমার চোখের দৃষ্টি স্পষ্ট হল না। আমার নিশ্বাসের শব্দটা ক্ষীণ হয়ে আসছে। ভয় হল, পিরামিডের গায়ে ছবি খোদাইয়ের আগেই আমার জীবন যদি শেষ হয়ে যায়! তবে যে সম্রাটের কাছে প্রমাণ করে যেতে পারব না, আমি চোর নই, আমি শিল্পী!

না, আর দেরি করা ঠিক নয়। সম্রাটের দেওয়া নতুন পোশাক পরেছি আমি। আমার হাতে পাথর খোদাই করার ঝকঝকে ছেনি, হাতুড়ি। আমি প্রাসাদ ছেড়ে পথে বেরোলুম। ভারী কষ্ট হচ্ছে হাঁটতে। তবু হাঁটছি। ভাবছি, পিরামিডের গায়ে কী ছবি খোদাই করব আমি? কী ছবি দেখলে সম্রাটের চোখ দুটি খুশিতে ভরে উঠবে? সম্রাট বলবেন, বাহ্!
আচ্ছা আমি যদি সম্রাট আর সম্রাজ্ঞীর ছবি খোদাই করি পিরামিডের দেওয়ালে?
না, সেটা তেমন জুতসই হবে না। সম্রাট আর সম্রাজ্ঞীর মুখ, সে কি একটা শিল্প হল?
তবে আঁকব নাকি রাতের আকাশ? অনেক তারা?
না। পাথরে খোদাই আকাশ আর তার বুকে তারা? এটা কোনও ছবিই নয়। এ-ছবি সবাই আঁকতে পারে। তবে হ্যাঁ, সত্যিকারের আকাশটা যদি পাথরের ওপর এনে বসিয়ে দিতে পারতুম! যদি রাতের তারা সেই আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলত, তবে সেই হত ছবি। জীবন্ত। আমি চাই, জীবন্ত ছবি খোদাই করতে। আমি চাই পাথরের বুকে প্রাণ দিতে।
ভাবতে-ভাবতে চলে এসেছি সেই পিরামিডের কাছেই। কত মানুষ! সবাই কারিগর। কে জানে, কত বছর ধরে এই কারিগরের দল গড়ছে এই পিরামিড! আমিও তো অনেক বছর ধরে পাথরে হাতুড়ি ঠুকেছি। তবে একা-একা। এখানে অনেক মানুষ। অনেক মানুষ পিঠে বেঁধে পাথর তুলছে ওপরে। মাথা উঁচু হচ্ছে পিরামিডের। কিন্তু আমার মাথা উঁচু হবে কেমন করে?
আরে! আরে! ওই দ্যাখো, সেই ছেলেটা! দ্যাখো, দ্যাখো, ছেলেটা আজও পাথর বয়ে নিয়ে যাচ্ছে নীচের থেকে পিরামিডের মাথায়! ওই দ্যাখো, তার বন্ধু, রাজহাঁসের ছানাটা! ছানাটার পায়ে ঘুঙুর পরিয়ে দিয়েছে আজ। কেমন ঝুমঝুম করে বাজছে তার পায়ে! আর দরকার নেই বাবা কাছে গিয়ে। বরং এইখান থেকেই দেখি, এই আড়াল থেকে। আচ্ছা, ছেলেটার কেন মনে হল, আমি ছেলেধরা? কেন সে আমায় দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠল? কই, ওর রাজহাঁসটা তো ভয় পেল না! তবে কি রাজহাঁসটা বুঝতে পেরেছিল, আমি ছেলেধরা নই? কে জানে! রাজহাঁসের মনের কথা আমি জানব কেমন করে!
আচ্ছা, ছেলেটা কেন পাথর বইছে? এত কষ্ট করে? তবে কি ওর কেউ নেই? আমার মতো ছেলেটাও কি একা? অবশ্য, ঠিক একা বলা যায় না। ওর তো একজন বন্ধু আছে। সাদা ধবধবে একটা রাজহাঁস। পায়ে ঝুমঝুম ঘুঙুর বাজছে। মুখে প্যাঁক-প্যাঁক ডাক ছাড়ছে। আর ছেলেটার পায়ে-পায়ে হাঁটছে। একবার পিরামিডের মাথায় উঠছে। আর-একবার নীচে নামছে। কতবার যে এমন ওঠা-নামা করল, কে জানে! যেন বন্ধুকে আগলে আছে রাজহাঁসের ছোট্ট ছানাটা।
আমিও যখন ছোট ছিলুম, একটা ঈগল কেমন আমাকে একটা জাগুয়ারের কবল থেকে বাঁচিয়েছিল? ওই ঈগলও কি আমার বন্ধু হতে চেয়েছিল? নিশ্চয়ই চেয়েছিল। নইলে সে বামন-দেবতার আস্তানায় গেল কেন? কেন সে পাহাড়-চুড়োয় উঠেছিল? বুঝি আমায় দেখছিল? আচ্ছা, ঈগলটা জানল কেমন করে আমি একা? সে কতদিনের কথা। তবু আমার এখনও মনে আছে, বামন-দেবতা তাকে বন্দি করেছিল পায়ে শেকল পরিয়ে। আমি অনেক কষ্ট করে তার একটা পায়ের শেকল খুলতে পেরেছিলুম। আর-একটা পায়ের খুলতে পারিনি। জানি না, তার কী হল! কে জানে, হয়তো একটা পায়ের শেকল পরেই তার জীবন শেষ হয়ে গেছে।
হায়! হায়! হায়! ও কী হল! ও কী হল! দ্যাখো, দ্যাখো, পিঠভর্তি পাথর নিয়ে বে-টাল হয়ে পড়ে গেল ছেলেটা! ওই অত পাথরের ভার অমন একটা ছোট্ট ছেলে কতক্ষণ ধরে বইতে পারে! লেগেছে, ভীষণ লেগেছে! ওই তো সে আর্তনাদ করে কেঁদে উঠল। ছেলেটা যে উঠতেই পারছে না। ওই যে অত মানুষ তোমরা পাথর বইছ, একটু নজর দাও ছেলেটার দিকে! দেখছ না, পাথরের চাপে তার মাথাটা থেঁতলে গেছে? দ্যাখো একটা পাথরের চাঁই তার বুকের ওপরেও ছিটকে পড়েছে। ওই দ্যাখো, তার বন্ধু হাঁসটা কেমন চিৎকার করে ছোটাছুটি করছে। একবার সে ছুটে যাচ্ছে বন্ধুর কাছে। একবার ছুটে আসছে এইদিকে। একবার সে তার বন্ধুর বুকের ওপর চাপা-পড়া পাথরটা মুখ দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে হাঁকপাঁক করে। পারছে না। মাথা ঠুকছে পাথরটার ওপর। পাথর সরছে না। বন্ধুর মুখের কাছে মুখ এনে হাঁস আদর করছে। আকুলি-বিকুলি করে ডাকছে হয়তো কাউকে। যেন চেঁচিয়ে বলছে, বাঁচাও-ও! বাঁচাও-ও! আমার বন্ধুকে বাঁচাও-ও। কেউ সাড়া দিচ্ছে না। কে সাড়া দেবে? সকলেই যে কাজ করছে! পাথর বইছে! পিরামিডের মাথায় উঠছে!
আমি কি যাব? আমি কি দেখব একবার?
না, আমার যাওয়ার দরকার নেই। ওই দ্যাখো, দুটি মানুষ ওই দিকেই যাচ্ছে। ওরা বোধ হয় রাজহাঁসের চিৎকার শুনতে পেয়েছে। ওরা এবার ছেলেটিকে বাঁচাবে!
না, তারা ফিরে তাকাল না। না, তারা শুনল না রাজহাঁসের চিৎকার। তারা চলে গেল যেদিকে যাওয়ার কথা, সেইদিকে।
আমার আর লুকিয়ে থাকা সাজে না। আমি বেরিয়ে পড়লুম আড়াল থেকে। আমি আনচান করে ছুটতে গেলুম। পারলুম না ছুটতে। আমি হনহন করে হাঁটতে গেলুম। পারলুম না হাঁটতে। আমি ঠুকঠুক করে এগিয়ে গেলুম। যেমন করে এগিয়ে যায় একশো বছরের ওপর এক বুড়োমানুষ। কতক্ষণে পৌঁছব আমি ওই ছেলেটার কাছে, ওই ওপরে? পারব তো উঠতে?
হ্যাঁ, আমায় উঠতেই হবে। সব শক্তি দিয়ে আমায় উঠতে হবে। এই তো আমি পা ফেলেছি। ওপরে উঠছি আমি।
হাঁসটা এখনও চেঁচাচ্ছে।
আমি উঠছি। হাঁপাচ্ছি।
হাঁসটার চিৎকার কমছে।
আমি উঠছি। ঘন-ঘন নিশ্বাস পড়ছে।
হাঁসটার চিৎকার আরও কমছে।
আমি উঠছি। পা টলছে।
হাঁসটার চিৎকার আরও, আরও কমছে।
টলতে-টলতে আমি পৌঁছে গেলুম ওপরে। ওই তো ছেলেটা। ওই তো হাঁস। শুয়ে আছে ছেলেটির কপালে মুখ রেখে। যেন চুমো খাচ্ছে। টলতে-টলতে আমি দেখতে লাগলুম। দেখতে-দেখতে আমি হাঁপাতে লাগলুম। হাঁপাতে হাঁপাতে আমি পড়ে গেলুম। আর দাঁড়াতে পারি না। আমি হামাগুড়ি দিই। আমাকে যেতেই হবে ছেলেটির বুকের কাছাকাছি। আমাকে সরিয়ে দিতেই হবে, ওর বুকের ওপর পড়ে-থাকা ওই পাথরের চাঁইটা।
না, আমি আর হামাগুড়িও দিতে পারছি না। আমার বুকটা মাটিতে ঠেকে গেছে। আমি বুকে ভর দিয়ে এগিয়ে চলেছি। পাথর-ভাঙা কাঁকরে আমার বুকটা ছড়ে যাচ্ছে। যাক! রক্ত পড়ছে। পড়ুক! আমাকে যেতেই হবে।
আমি পৌঁছে গেছি। আঃ। আর পারি না। দম যেন বন্ধ হয়ে যায়! যাক দম বন্ধ হয়ে! আমি হাত বাড়ালুম ছেলেটির বুকে-পড়া পাথরটার ওপর। আমি পারলুম, হ্যাঁ আমি পারলুম। সরিয়ে দিলুম পাথরটা ওর বুকের ওপর থেকে। আমি তার বুকে মাথা রাখলুম। ছেলেটির বুক কাঁপছে। আমি হাঁপাচ্ছি। দেখছি, হাঁসটা মুখ ঠেকিয়ে রেখেছে ছেলেটির কপালে। বোধ হয় আর তার দম নেই। বোধ হয় আর সে পারবে না চেঁচাতে। বোধ হয় সে এমনই করে তার বন্ধুকে আগলে রাখবে। এই তো ছবি!
আমার মন আনন্দে চিৎকার করে বলতে চায়, হ্যাঁ, আমি পেয়েছি, ছবি পেয়েছি। এই আমার ছবি! একটি ছোট্ট রাজহাঁসের ছানা তার আহত বন্ধুকে আগলে কপালে চুমো খাচ্ছে! এইমাত্র যে-পাথরটা ছেলেটির বুক থেকে সরিয়ে দিয়েছি, ওই পড়ে আছে সেটি সামনে। আমাকে এই ছবি খোদাই করতে হবে এই পাথরটার ওপরেই। ছেলেটি বোধ হয় এই পাথরের আঘাতেই আহত। আমার কাঁধের ঝুলিতে এখনও সম্রাটের দেওয়া হাতুড়ি আর ছেনিটা আছে। ছেলেটির বুক থেকে আমি মাথা তুললুম। শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে আমার। আমি থরথর করে কাঁপছি। কাঁপতে-কাঁপতেই আমি হাতুড়ি আর ছেনিটা বার করলুম আমার ঝুলির ভেতর থেকে। অনেক কষ্টে এগিয়ে গেলুম পাথরটার কাছে। পাথরে ছেনি ঠেকালুম। হাতুড়ির ঠোকা দিলুম। ঠক, ঠক। শব্দ উঠল। ঠিক যেমন করে শব্দ উঠত আমার বন্দিশালায়। পাথর ভাঙার শব্দ।
আমি আবার ঠোকা দিলুম, ঠক, ঠক!
আবার মারলুম, ঠক? ঠক!
শুধু শব্দই উঠছে। কই, ছবি তো খোদাই করতে পারছি না?
আবার হাতুড়ি ঠুকি। আবার ঠুকি। আবার।
পারছি না। কিছুতেই পারছি না ছবি খোদাই করতে। শুধু পাথরই ভাঙে। পাথরের টুকরোগুলো ছিটকে পড়ে। আমার কপালে ঘাম জমে। হাঁপ ধরে।
না, না, হার মানলে চলবে না। আমি আমার হাত দুটো শক্ত করলুম। আরও শক্ত। আরও জোরে হাতুড়ি ঠুকলুম, আবার।
ছবি নয়, ছবি নয়! পাথরের টুকরোই শুধু খসে পড়ছে। যেমন করে খসে পড়ত বন্দিশালায়। তবে কি বন্দিশালার পাথর ভাঙতে-ভাঙতে আমার হাত ছবি খোদাই করতে ভুলে গেল! ছেনিতে হাতুড়ি ঠেকালেই সে বুঝি শুধুই ভাঙবে। আমার হাত কি এখন পাথর ভাঙতেই পারে! আর কিছু পারে না!
আমি ভয় পেলুম। জোরে-জোরে আঘাত করলুম ছেনির ওপর হাতুড়ি। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে উঠল আমার বুকের ভেতরটা। পাথরে আমার মাথা নুয়ে পড়ে। আমি শুয়ে পড়ি। আমার হাত গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। সে আর ওঠে না। আমার চোখের আলো বুঝি নিভে যায়!
হঠাৎ সামনের গাছটায় কিসের একটা ঝাঁকুনি লাগল! ঝরঝর করে ঝরে পড়ল একঝাঁক পাতা। আমি আবছা চোখে তাকালুম গাছের দিকে। গলা দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল, “কে?”
শুনতে পেলুম, কে যেন বলে উঠল, “আমি তোর মা। ”
শিরশির করে উঠল আমার সারা শরীর। এতক্ষণ আমার চোখের ওপর ছড়িয়ে ছিল যে ছায়া, মুহূর্তে যেন সে উধাও হয়ে গেল। আমি দেখতে পেলুম, গাছের ডালে বসে আছে একটি ঈগল। আমি আর্তনাদ করে উঠলুম, “কী বললে?”
ঈগল উত্তর দিল, “শিজুমন, আমি তোর মা।”
আমার চোখের পাতায় অবাক চাউনি। সে চোখ স্থির।
ঈগল আবার বলল, “হ্যাঁ, আমি তোর মা। এতদিন তোকে আমি রক্ষা করে এসেছি আমার চোখে-চোখে রেখে। তোকে আমি তোর অজান্তে কখনও লুকিয়ে রেখেছি বনে, কখনও পাহাড়চুড়োয়। কখনও লড়াই করেছি জাগুয়ারের সঙ্গে, কখনও আটকেছি অনিষ্টের দেবতাকে। তোর জন্য খাবার এনেছি। তোকে নতুন পোশাক দিয়েছি। তুই যে আমার ভালবাসার শিজুমন।”
আমার চোখ ছলছল করে উঠল। গড়িয়ে পড়ল একটি-দুটি ফোঁটা। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। তবু আমি কোনওরকমে জিজ্ঞেস করলুম, “মা, অনিষ্টের দেবতা তোমাকে তো নদীর জলে পাথর করে দিয়েছিলেন! তুমি ঈগল হলে কেমন করে?”
“ওরে শিজুমন, যেদিন নদীর বুকে জল ছিল না, নদীর জলে স্রোত ছিল না, সেদিন শিল্পসৃষ্টির দেবতা আমার ওই পাথরে একটি ঈগলের মূর্তি খোদাই করেছিলেন। সে আমি। ওরে শিজুমন, কত যত্ন করে তিনি ঈগলের মুখ গড়লেন। চোখে তারা ফোটালেন। ডানায় পালক গাঁথলেন। আর তখনই মনে হল, আমার প্রাণটা থিরথির করে কেঁপে উঠেছে বুকের ভেতর। আমার ডানার পালকে বাতাসের ঢেউ লেগেছে। আর তখন থেকেই আমি আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছি। শিল্পসৃষ্টির দেবতা বোধ হয় চেয়েছিলেন, আকাশে উড়ে-উড়ে আমি তোকে লক্ষ রাখি। তোকে রক্ষা করি। ওরে শিজুমন, সেই তখন থেকেই আমি তোকে চোখে-চোখে রেখেছি। তোর জন্যই আমি এতদিন বেঁচে আছি। এবার আমার যাওয়ার সময় হয়েছে। তুই আমার কাছে আয়! আমি তোকে নিয়ে যাব।”
আমার শিহরন লাগল। আমি ক্ষীণ গলায় জিজ্ঞেস করলুম, “আমায় কোথায় নিয়ে যাবে মা?”
আমার ঈগল-মা উত্তর দিল, “কোথায় যাব জানি না। শুধু জানি, জীবন শেষ হলে, সবাই যেখানে যায়।”
আমি বললুম, “হ্যাঁ মা, আমি তোমার সঙ্গে নিশ্চয়ই যাব। কিন্তু মা, যাওয়ার আগে পাথরে যে একটি ছবি খোদাই করে যেতে হবে আমায়। আমায় যে সেটি উপহার দিতে হবে সম্রাটকে। তাঁকে বলে যেতে হবে, আমি ছেলেধরা নই, আমি শিল্পী।”
মা উত্তর দিল, “ওরে শিজুমন, তোর হাত আর যে পারবে না ছবি খোদাই করতে। একশো বছর ধরে তোর হাত বন্দিশালার পাথর ভাঙতে-ভাঙতে ছবি খোদাই করতে ভুলে গেছে। শুধু পাথর ভাঙতেই শিখেছে। এখন তোর হাতে যখনই হাতুড়ি উঠবে, তখনই সে ভাঙবে। গড়বে না।”
আমি কেঁদে ফেললুম। কাঁদতে-কাঁদতে বললুম, “আমি পারব মা, গড়তে পারব। তুমি আমার কাছে এসো। আমার হাত ধরো। আমি তোমায় ছুঁয়ে খোদাই করব, একটি আহত ছোট্ট ছেলের কপালে তার বন্ধু রাজহাঁস চুমো খাচ্ছে। না, আহত হওয়ার কথা নয় মা ছেলেটির। ছেলেটি পাথর বইছিল। ছেলেটির যাতে কষ্ট না হয় তাই তার বন্ধু হাঁস ঘুঙুর-পায়ে নেচে-নেচে বন্ধুকে আনন্দ দিচ্ছিল। বলো তো মা, একটি ছোট্ট ছেলে কেন পাথর বইবে? কেন সে খেলা করবে না, বন্ধুদের সঙ্গে, খোলা আকাশের নীচে, সবুজ মাঠে? কে বলছে তাকে পাথর বইতে? কঠিন পাথর?”
মা কী উত্তর দিয়েছিল, আমি শুনতে পাইনি। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলুম, আমার চোখ বোধ হয় আর দেখতে পাবে না। সব যেন অন্ধকার হয়ে আসছে। আমি মৃদু গলায় আবার বললুম, “মা, এসো মা, আমার কাছে, আমি ছবি আঁকব পাথরে এ-ক-টি ছে-লে-র ক-পা-লে...”
আমি আর কথা বলতে পারিনি। হয়তো মা গাছের আড়াল থেকে নেমে এসেছিল। আমার পাশে। আমার মনে নেই। হয়তো মা আমার হাতে তুলে দিয়েছিল হাতুড়ি। হয়তো আমার নিস্তেজ হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল ছেনিটি। হয়তো আমি পেরেছিলুম খোদাই করতে আমার স্বপ্নের ছবিটি। হয়তো সম্রাট দেখেছিলেন সেই ছবি। হয়তো জেনেছিলেন, আমি চোর নই। আমি শিল্পী। আমার কিছুই মনে নেই।
হ্যাঁ, মনে আছে শুধু, আমি আকাশে উড়ে চলেছি, মায়ের পিছু-পিছু, সোনালি ডানা ছড়িয়ে। মায়ের মতো আমিও এক ঈগল। আলোর আকাশে ঈগল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন