একাদশীর ভূত

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

এই যে বাড়িতে বারবার আপনার আগমন হচ্ছে এ বেশ ভাল কথা কিন্তু কেন আগমন হচ্ছে তা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
শুধু এই কথাটুকু লোকটাকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে গত তিনদিন ধরে মনে মনে আগুপিছু করে যাচ্ছে নব। লোকটা যে জালি সে বিষয়ে নবর তেমন সন্দেহ নেই। দাড়ি গোঁফ জটা সব ঠিকই আছে, যেমনটা এদের থাকে আর কি। মহেশতলা শ্মশানের লাগোয়া কালীর থান থেকে এটিকে আমদানি করেছে এ বাড়ির মেজবউ। মতলবখানাও পরিষ্কার। যতীনকে বশ করে ভেড়া বানানো।
সতুপিসি বোশেখে গত হয়েছেন। 'তার ঘরখানা ভাঙা হল।
ঝুরঝুরে হয়েই ছিল, পুরনো গা ঘষটালেও ভেঙে পড়ত। ঘর ভাঙার পর হারানো বাঁশ-বাঁখারি-কাঠ মেলাই জড়ো হয়েছে উঠোনের একধারে। নব তা থেকেই সব গুছিয়ে তুলছে। সতুপিসির ভিটেতে যতীন দালান তুলবে। মাছের ব্যবসায় তার এখন হাতে কাঁচা পয়সা।
নব পচা, ঘুণধরা সব বাঁশ - বাখারির স্তূপ তৈরি করছিল। সঙ্গে শচীন।
শচীন একটা বাঁশের খুঁটি উপড়ে ফেলে বলল, এই বাঁশটার গায়ে একটা ফুটো আছে। ফেড়ে দেখ তো নবদা, ভিতরে পয়সাকড়ি আছে কি না!
বলছিস! বলে নব বাঁশটা ফেড়ে ফেলল। অবাক হয়ে দেখল, কথাটা মিথ্যে নয়। বাঁশের একটা গাঁটে কিছু খুচরো পয়সা আটকে ছিল। ঝনাৎ করে পড়ল। তবে বেশি নয়। সব মিলিয়ে টাকা দশেক হতে পারে।
শচীন হাসল, বলছিলুম কি না।
নব মাথা নেড়ে বলল, খুব গুপ্তধনই পেয়েছিস ভাই। সতুপিসির আর ওর বেশি মুরোদ কী ছিল বলো !
নব পয়সাগুলো যত্ন করে কুড়িয়ে গুনে দেখল, এগারো টাকা পাঁচ পয়সা।
এ পয়সা দিয়ে কী হবে রে?
একটা বামুন খাইয়ে দাও। সতুপিসির আত্মা ঠাণ্ডা হবে। বলছিস! বামুন খাওয়ানোর অনেক বায়ানাক্কা। তার চেয়ে মহেশ ভট্টাচায্যির বাড়িতে একটা সিধে পাঠিয়ে দিলে হয়।
তাই দাও।
নব পয়সাটা ট্যাকে গুঁজে বিড়ি ধরিয়ে জিরোতে বসল।
বিড়ি খেতে খেতে দক্ষিণের ঘরটার দিকে চেয়ে ছিল নব। লোকটা একটু আগে দাওয়ায় বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ দু হাতের আঙুল দিয়ে সাঁই সাঁই করে দাড়ি আঁচড়াল। তারপর ঘটির জলে পা ধুয়ে ফের ঘরে ঢুকে গেল। খুব লম্বা-চওড়া লোক নয়। রোগার দিকেই। বয়স বোঝা যায় না, তবে চল্লিশের নীচেই হবে। ঘরে বসে সারাদিন কোন মারণ উচাটন করে কে জানে। তবে বিশেষ বের টের হয় না।
ও শচীন।
বলো দাদা।
সাধুটিকে কেমন বুঝছিস ?
ভিটের নীচে পুরনো ইট আছে কিছু। শচীন কোদাল চালিয়ে ইট বের করে ছুঁড়ে দিচ্ছিল উঠোনে। বলল, সাধুসন্তের আমি কীই বা জানি বলো। তেনারা আছেন তাঁদের মতো, আমরা পাপীতাপীরা আছি আমাদের মতো ।
নব বিড়িটা একটু দেখল। বড্ড ছোট্ট বিড়ি। পরেশ পালের ওইটেই দোষ। জিনিসটা বানায় বড্ড ভাল। ভারি মিঠে-কড়া ধোঁয়া, কিন্তু দু-চার টানেই শেষ। বিড়িটা দুঃখের সঙ্গেই ফেলে দিয়ে নব বলে, শিবানন্দ সাধুটাকে আমার মনে হচ্ছে জালি।
ভাল জিনিস একটা থাকলে তার নকলও বেরয়। এ লোকটাকে যতীনদাদা জোটাল কোত্থেকে ?
যতীনের জোটাতে বয়ে গেছে । আনা করিয়েছে সরস্বতী।

ও বাবা! বলে এক লম্ফে দু হাত পিছিয়ে এল শচীন। ভিটের এক সুড়ঙ্গ থেকে সড়াৎ করে বেরিয়ে তেলের মতো গড়িয়ে গেল সাপটা, পাঁশুটে রং ।
নব উদাস গলায় বলল, বাস্তুসাপ। ছানাপোনা আছে, দেখিস । শচীন ফের কোদাল চালাতে চালাতে বলল, সাধুসন্তদের কথা কী বলছিলে?
সাধুসন্তের খতেনে আমার কী দরকার ? কথাটা হচ্ছে শিবানন্দকে নিয়ে। সরস্বতী একে আনা করাল কেন ?
কেন ?
বুঝছিস না?
আহা, বোঝালে তো বুঝব! এ বাড়ির গুহ্য কথা কি আমার
জানা ?
যতীনকে বশীকরণ করাতে আনা হয়েছে, বুঝলি ?
তাহলে তো যতীনের বগলে সুপুরি।
তার মানে?
শচীন এক গাল হেসে বলে, বগলে সুপুরি হল গে অশান্তি, অসোয়াস্তি।
তাই বটে। তবে এ লোকটা বুজরুক।
বুঝলে কেমন করে ?
ও বোঝা যায়।
মাথা নেড়ে শচীন বলে, উঁহু, কথাটা হাল্কাভাবে নিও না। কমলিনী ছুঁড়ির কাণ্ড জানো? কেষ্ট গুঁইকে বশ করতে কোন সিদ্ধাইমার সিঁদুর এনে পরল। কেষ্ট এখন তো বউয়ের আঁচলে বাঁধা। বাপ-মাকে কিছু বললে কেষ্ট আগে দা নিয়ে তেড়ে যেত বউকে। এখন রা-টি কাড়ে না। জল উঁচু তো জল উঁচু, জল নিচু তো জল নিচু ।
নব আর একটা বিড়ি ধরাল। পশ্চিমে মেঘ ঘনাচ্ছে। বৃষ্টি আসবে। এবার বৃষ্টিটাও হচ্ছে বাপ । এই হাতিয়া, বেভোড়, কাম গাজিপুর, খিজিরগঞ্জ, নোয়াপাড়া পুরো তল্লাট জুড়ে হয়েই যাচ্ছে।
নব বলে, জল এলো রে।
শচীন দুঃখের গলায় বলল, বেতোড়ের পোলটা এবার যাবে। কালই দেখে এসেছি চরফুলেশ্বরী নদী ফুঁসছে। পোলটার নড়া দাঁতের মতো অবস্থা।
নবর খুব দুশ্চিন্তা হল না। হাতিয়া বড় একটা ডোবে না। তবে আশপাশে জল জমে আনাগোনা কিছু বেগোছ হয় । সড়ক ডুবলে অবশ্য নৌকা আছে। ঠিক ছ নম্বর টানের মাথায় বিড়িটা শেষ হল। নব উঠে পড়ে বলল, চ, ঘরে গিয়ে সেঁধোই ।
শচীন কোদালটা হাতে ঝুলিয়ে বলল, তোমাদের সাধুবাবা হাত দেখতে জানে ?
সে বলতে পারি না। কেন বল তো?
কুলতলির ন্যাড়া ভট্টচার্য বলেছিল আমার নাকি রিষ্টি আছে। রিষ্টি কি?
কে জানে! খারাপ জিনিসই হবে। তোমাদের সাধুকে দিয়ে একবার দেখিয়ে নিতাম।
বললাম না, এ জালি মাল। ওসব কি বলতে পারবে?
সে পারুক না পারুক দেখিয়েই নিই না। পয়সা নেবে নাকি?
তা কে জানে !
বাদলাটা যখন এসেই গেল তখন চলো সাধুবাবার কাছেই গিয়ে বসি।
এ কথাটা নবর পছন্দ হল। সাধুর আগমনটা কেন হচ্ছে এই
তক্কে জেনে নেওয়া যাবে।
উঠোনটা পেরোনো গেল না। হুড়মুড় করে বাতাস, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঝেঁটিয়ে বৃষ্টি এসে গেল। টিনের চালে একবার কাড়ানাকাড়া বাজছে। দাওয়ায় উঠে শচীন কোমরে বাঁধা গামছাখানা খুলে মাথা মুছে নিল। তার চুলের একটু বাহার আছে। রাজেশ খান্না মার্কা চুল। ভিজলে বড্ড নেতিয়ে যায়।
নবর গামছা সঙ্গে নেই । সে শুধু গা থেকে হাতের কানায় কাচিয়ে যতটুকু পারে জল ঝরিয়ে নিল।
সাধুবাবা দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। পরনে রক্তাম্বর। তাদের দিকেই চেয়ে আছে। একটু যেন তটস্থ হয়েই বলল, আসেন বাবারা,
ঘরে এসে বসেন ।
কথা বলার ভঙ্গিটা তেমন খারাপ কিছু নয়। বেশ ভীতু ভীতু ভাব আছে গলায়।
শচীন এক গাল হেসে বলল, পেন্নাম হই সাধুবাবা। আসেন বাবারা, জলের ছাটে ভিজে যাচ্ছেন যে!
দুজনে গুটি গুটি ঘরে ঢুকে পড়ল। ঘরখানা একরকম বৈঠকখানা গোছেরই বলা যায়। একধারে ধানের বস্তা ডাঁই করা, অন্য ধারে কিছু কাঠের তক্তা।
মাঝখানে একখানা বেঞ্চ আছে, আর দুটো কাঠের পুরনো চেয়ার। পিছনের দেওয়ালে সাঁটা একখানা চৌকিতে সাধুবাবার বিছানা। তোশক নেই। একখানা কম্বল পাতা, তার ওপর সবুজ একখানা খাটো চাদর। খুব পাতলা একখানা বালিশও আছে।

শিবানন্দ যেন ভারি তটস্থ। বলল, বাবারা বসেন।
তা বসল দুজনে। বসেই শচীন উরুতে ডান হাতখানা ঘষে নিয়ে বলল, একবার হাতখানা দেখবেন নাকি ?
সাধু বসেনি। দাঁড়িয়েই আছে। বলল, কী বলছেন বাবা ? বলছি এই আমার হাতখানা যদি দেখেন।
দাড়ির ফাঁকে সাধুর হাসিটি ভারি লাজুক। মাথা নেড়ে বললো ও বিদ্যে আমার জানা নেই।
বলেন কি, সাধুরা তো মেলাই জানে।
সাধু মাথাটা নামিয়ে ভারি অপরাধী ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, আমি যে জানি না বাবা। শেখা নাই কিছু ।
শচীন একটু দমে গিয়ে বলল, আমার নাকি একটা রিষ্টি আছে সাধুবাবা, সে নাকি খুব খারাপ।
রিষ্টি জানি না বাবা ।
নব গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, তবে কী জানেন সাধুবাবা? সাধুবাবা জুলজুল করে নবর দিকে চেয়ে ফের চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে, লোকে কত কী জানতে চায়। আমি কি অত জানি বাবা ? নব এবার ফাঁক বুঝে বলেই ফেলল, তবে এই যে আপনার আগমন হল এটা কিসের জন্য বলতে পারেন ?
সরস্বতী নিয়ে আসে।
হ্যাঁ, কিন্তু আনে কেন ?
সাধু ভারি আতান্তরে পড়ে গিয়ে চারদিকে টালুমালু চায়। তারপর বলে, আমি তার মামা হই কিনা ।
অ্যাঁ। বলে নব ভারি অবাক হয়, মামা ?
আজ্ঞে।

তাহলে তো কুটুম মানুষ। খাতিরের লোক । আজ্ঞে সেসব কিছু নয়।
তা সাধু হলেন যে !
হলাম নাকি! বলে শিবানন্দ ভারি আমুদে হাসি হাসল। বলল,
সাজা সাধু।
তা সাজেরই বা দরকারটা কী?
আজ্ঞে, শখ হয়েছিল। চেষ্টা দিচ্ছি।
নব একটু হতাশই হয়ে পড়ল। সাধু ফুঁড়ে মামা বেরোনোয় সে খুশি হয়নি।
টিনের চালে টাকডুমাডুম বৃষ্টি। শিবানন্দ এখনও দাঁড়িয়ে আছে। আপনি বসুন মামাবাবু
এই বসি ।
বলল , কিন্তু বসল না।
লোকটা কেমন ধারা তা বুঝতে পারছে না নব। নিজেকে এখন একটু বেকুব-বেকুব লাগছে।
গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, মহেশতলা শ্মশানেই থাকা হয় বুঝি মামাবাবুর ?
শিবানন্দ ভারি ভালমানুষি হাসি হেসে বলে, শ্মশান জায়গা খারাপ নয়। কালীর মন্দিরের চাতালে ছাউনি আছে । দিব্যি থাকা যায় । তবে পুরুত পাণ্ডারা একটু জুলুম করে। সব জায়গায় ভাল মন্দ দুইরকমই আছে।
তা বটে। কিন্তু মামাবাবু, হঠাৎ সাধু হতে গেলেন কেন ? শিবানন্দ তেমনি সরল হাসি হেসে বলে, আর কিছু হওয়া গেল না যে! দেখলুম সাধু হওয়াই সবচেয়ে সোজা।

বটে !
শিবানন্দর হাসিটা ভারি মিঠে , চোখ অবধি হাসে । এইটে নবর তেমন খারাপ লাগছিল না। শিবানন্দ বলল , এক তান্ত্রিকের গাঁজা টিপে দিতুম। পা দাবাতুম। তিনি মন্তরও দিলেন। রাত্তিরে শ্মশানে বসে মেলা প্রক্রিয়াও হত।
তাতে কিছু সিদ্ধি টিদ্ধি হল না ?
হাত উল্টে শিবানন্দ বলল, কে জানে! সিদ্ধি টিদ্ধি জানি না বাবা। সিদ্ধি হলে কি আর মাতালের হাতে মার খাই ?
সে আবার কি ?
হাসিটা শিবানন্দের একবারে মজ্জাগত। বলল, সে পড়েছিলুম বাবা , এক ষণ্ডা মাতালের হাতে। ঝড়বৃষ্টির রাত ছিল। কালীর থানে বসে খুব কারণবারি সেঁটে একেবারে টং। রাত বারোটায় আমাকে এসে ধরে পড়ল, বাবাজী আমি শিবানীর কাছে যাব, ঝড়বৃষ্টি থামিয়ে দাও। আমি তো আতান্তরে পড়লুম। ঝড়বৃষ্টি থামানোর ক্ষমতা কি আমার আছে? বললুম, বাবা, ঝড়বৃষ্টি ভগবানেরই লীলা, ও কি মানুষ থামাতে পারে? তা সে তো প্রথমটায় কাকুতিমিনতি, পা জড়িয়ে ধরা। তারপর রেগে আগুন হয়ে শালা, শোরের বাচ্চা, বেজন্মা বলে সে কি গালাগাল আর মার। দাড়ি ছিঁড়ে, জটার
চুল উপড়ে রক্তাম্বর কেড়ে নিয়ে সে এক কাণ্ড। বাঁ চোখখানা কানাই করে দিয়েছিল প্রায় ঘুষি মেরে। শেষে অজ্ঞান হয়ে পড়েই গেলুম মারের চোটে।
শচীন হাঁ করে শুনছিল। এবার বলল, তা আপনিও দিতেন উল্টে দু-চার ঘা।
না বাবা, সে আমার কম্ম নয় । মশামাছিটাও মারতে পারি না ।

আমার হাত ওঠে না। সকলকে দিয়ে কি সব হয় ?
নব খুব মুরুব্বির মতো, বলল, না-ই যদি কিছু হয় তো শ্মশান মশানে পড়ে থাকাটা তো কাজের কথা হচ্ছে না মামাবাবু। খামোখা
সেখানে পড়ে আছেন কেন ?
কোথায় যাব বাবা ?
কেন, আপনাদের বাড়ি নেই ?
এক গাল হাসল শিবানন্দ, সীতাপুর গাঁয়ে ছিল বটে বাড়ি। সে আর না থাকার মধ্যেই।
কেন, কেন ?
সে অনেক কথা। সাধু কি আর সাধে হতে গেলাম বাবা? উপায় ছিল না না হয়ে।
বিয়েটিয়ে হয়নি ?
ও বাবা, নিজেরই জোটে না তো বিয়ে।
তা বয়সটা কত হল মামাবাবুর ?
ছত্রিশ চলছে।
তবে তো কাঁচা বয়স।
বয়সটা কি কোনও কথা বাবা? মানুষ বসে থাকলেও বয়স হয়ে যায়। আমার তো ছত্রিশেও মনে হয় যেন ছিয়াত্তর চলছে। কাজকর্ম না থাকলে যা হয় আর কি। বসা মানুষ টক করে বুড়িয়ে যায়। তা কাজকর্মের অভাবটা কি মামাবাবু? আমরা তো দম ফেলার সময় পাই না।
তা দেখছি বাবারা, সকাল থেকে ঘরখানা ভাঙা পড়ছে, আপনারা খাটছেন, বসে বসে দেখছি তখন থেকে। সংসারে যখন ছিলুম তখন আমাকেও খাটাত খুব। সে একটা দিনই গেছে।

নব বলল, তাহলে সংসারই তো ভাল ছিল!
মাথা নেড়ে শিবানন্দ বলে, না বাবা, ভাল ছিল না। খাটাত, মারধর করত, খেতে দিত না — ওসব আমি হিসেবের মধ্যে ধরি না। সংসারে একটা দুলা লোক থাকলে, আর তাকে রক্ষে করার মতো কেউ না থাকলে অত্যাচার হবেই । অত্যাচার করেও মানুষের একরকম সুখ হয়। তবু সেটা ধরছি না। সংসারে আর একটা গা ঘিনঘিনে ব্যাপার আছে, সেইটে সহ্য হত না ।
সেটা কী মামাবাবু?
সব সময়ে একটা স্বার্থের গন্ধ, একটা ছোঁক-ছোঁক ভাব, কেউ কারুকে এক কানাকড়ি ছেড়ে দিতে নারাজ। এই করতে করতে এক মায়ের পেটের পাঁচটা ভাই-ই পাঁচটা ভাইয়ের শত্তুর হয়ে গেল । ওইটে আমার কেমন যেন সয় না। ওই যে ভাঙা ঘর থেকে সাপটা বেরোলো ও-ও বরং ভাল। কিছু না করলে কামড়ায় না। কিন্তু সংসারে সব যেন ফণা তুলেই আছে। ঘরে ঘরে ফোঁসফোঁসানি।
বৃষ্টিটা আরও চেপে নামল এবার। যেন একশো লেঠেল টিনের চাল পেটাচ্ছে। নবর বিড়ি খেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। মামাবাবুর সামনে খাবে কি না ঠিক করতে পারছে না বলে একটু উসখুস হচ্ছে। বিড়ি যখন টানে জব্বর টান।
শিবানন্দ অন্তর্যামী কি না কে জানে । তবে ভারি বিনয়ের সঙ্গে বলল, বাবারা, আপনারা বিড়িটিড়ি খেলে খেতে পারেন। কোনও বাধা নেই। আমি ধর্তব্যের মধ্যে নই।
নব বিড়ির বান্ডিলটা কষি থেকে বের করে ফেলল, মুখে একটু ভদ্রতা করে বলল , তবু মামাবাবু বলে কথা।
সরস্বতীর মা আমার মামাতো দিদি। সম্পর্ক তেমন কাছেরও
নয়। ওসব ধরবেন না বাবারা। খান, বিড়ি খান।
আপনার কি চলে মামাবাবু? তান্ত্রিকরা তো গাঁজাটাজাও খায় । শিবানন্দ বিনয়ে বিগলিত হয়ে বলে, দু-চার টান যে দিইনি তা নয়, কিন্তু ধোঁায়াটা আমার তেমন জুত ঠেকে না ।
এতক্ষণ শচীন কোনও কথা বলেনি । এবার ফস করে বলে উঠল, আচ্ছা সাধুবাবা, আপনার হাতে কটা ভূত আছে?
শিবানন্দ হাসতে হাসতে মাথা নাড়তে লাগল। এত হাসল যে চোখে জলই এসে গেল। তারপর বলল, আমিই তো ভূত । আসল ভূত আমি পাব কোথায়? সেসব বিদ্যেও জানি না ।
একটু দমে গিয়ে শচীন বলল, শ্মশানটশানে মেলাই তো ঘুরেছেন, তা ভূতটুত দেখলেন না?
ঘনঘন মাথা নেড়ে শিবানন্দ বলে, পাপী তাপীর কাছে কি আর তাঁরা আসেন ? ভূত দেখার মতো চোখই তৈরি হল না। শুদ্ধ চোখ না হলে কি আত্মার অবলোকন হয় ?
কথাটা শচীনের পক্ষে একটু শক্ত হয়ে গেল। তবু সে বুঝবার মতো করেই মাথা নেড়ে বলে, তা অবশ্য ঠিক। তবে বাবাজী, সেই চোখ শ্রীপদ দাসের মেয়ে চকমকিরই আছে ? সে তো রোজই ভূত দেখে । তার ওপর আবার ভরটরও হয় ।
হতে পারে বাবা, তবে আমি ওসব জানি না। আমার এ চোখে তো হয়নি। চেষ্টা অবশ্য মেলা করেছি। মরুণে মানুষের কাছে রাত জেগে বসে পলক না ফেলে দেখার চেষ্টা করেছি আত্মাটা কোথা দিয়ে বেরয়। আর মরা মানুষ তো অগুন্তি দেখেছি শ্মশানে। কোথায় যে তেনারা ঝুল খেয়ে থাকেন ঠিক ঠাহর হয়নি আজও।
শচীন বলে, আপনার ভয়টয় করেনি?
শিবানন্দ মাথা নেড়ে বলে, না বাবা, ভয় কী? তেনারাও তো আমারাই ঘুরেফিরে। কঙ্কাল দেখে কত লোকে ভয় পায়, নিজের ভিতরেও যে একখানা কঙ্কাল আছে তা আর ভেবে দেখে না।
আপনি একবার চকমকিকে দেখবেন?
ঘাড় কাৎ করে শিবানন্দ বলে, কেন দেখব না? আপনি নিয়ে
যাবেন আমায় , দেখব।
ও বাবা, ও বাড়িতে ঢুকলে আমার ঘাড়ে মাথা থাকবে ভেবেছেন ? অবাক হয়ে শিবানন্দ বলে, কেন বাবা, তারা কি আপনার শত্তুর? খুব শত্রুর। শ্রীপদ দাস পারলে আমার   মুণ্ডুখানা কড়মড় করে চিবিয়ে খায়।
তাহলে তো ভয়ের কথা! সে বাড়িতে কি যাওয়া ভাল?
না না, শত্রুতা তো আমার সঙ্গে। আপনি গেলে খাতির-যত্নই পেয়ে আসবেন। ও নবদা, যাবে নাকি সাধুবাবাকে নিয়ে একটু।
নব বিরক্ত হয়ে বলে, তা আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছিস কেন? নরম ঘাড় পেয়েছিস ?
আহা, তোমাকে তো আর কিছু বলবে না !
তোকে বলেছে।

কুসুমকুমারী জলের উঠোন পার হচ্ছে। মেঘলা আকাশ থেকে মেটে ময়লা আলোয় আজ সব যেন ম্যাদাটে মেরে আছে। আর বৃষ্টিটাও হচ্ছে বাপ , যেন মহেশতলাকে রসাতলে না ডুবিয়ে ছাড়বে না । এই খানিক আগে একটু দম ধরেছে, খানিক পরেই আবার ছ্যাড়ছ্যাড় করে নেমে পড়বে। নামলেই হল। তা এই ফুরসতে কুসুমকুমারী উঠোন পেরোচ্ছে। শাড়ির সামনেটা বাঁ হাতে উঁচু করে ধরা, ডানহাতে একখানা পিতলের বাটি। মাথার এক ঢল চুলে মুখখানা আধো ঢাকা। একটু আনমনা কি? এদিক পানে তাকাল না। উঠোনটা পিছল, জলে ডুবে আছে। হড়কালে কেলেঙ্কারি।
শ্রীপদর চালাঘরের দোকানে বসে গোরাচাঁদ দৃশ্যটা হাঁ করে দেখছিল। কথার মাঝখানেই ঘটনা। দৃশ্য দেখে গোরাচাঁদের বাক্য হরে গেছে। ভাগ্য ভাল শ্রীপদ ততটা খেয়াল করেনি। এই বাদলায় দুটি বাচ্চা মেয়ে তেল নিতে এসেছে। শ্রীপদ ছোটো কাটারায় তেল মাপতে ব্যস্ত। ওরকম খেঁকি লোক দুটো হয় না। কথা বলাই এক ভজঘট ব্যাপার। তুইয়ে বুইয়ে ভাবখানা রেখেছে বটে গোরাচাঁদ, কিন্তু মহেশতলা-বল্লারপুরে হেন লোক নেই যার সঙ্গে শ্রীপদর বনিবনা হয়।
গোরাচাঁদের আসা এই কুসুমকুমারীর জন্যই। পথটা কম নয়। হেসেখেলে মাইল দেড়েকে হবে। অর্ধেক পথই জলে কাদায় এমন অবস্থা যে সাইকেলে চাপা যায়নি, ঠেলে আনতে হয়েছে। তবু নিশি-

পাওয়া মানুষের মতো রোজই একবারটি আসে গোরাচাঁদ। চালাঘরের পিছনের শ্রীপদর বাড়ি, লাগোয়া উঠোন। পিছনের দরজাটা দিনমানে খোলাই থাকে। গোরাচাঁদ কথা কয় আর ওই দিকে চোরা চোখে চেয়ে থাকে। কখনও সখনও দেখা যায়, কখনও সখনও বসে থাকাই
সার হয়।
তেল মেপে খদ্দের বিদেয় করে শ্রীপদ বলল, পোল ভাঙলে বিপদ আছে। জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে চড়বে।
বুকটা ধকধক করছিল গোরাচাঁদের। মাথার ভেতর ওলটপালট। সংক্ষেপে বলল, হুঁ ।
মাঠের ধানও এবার গেল।
শ্রীপদর গলায় উৎকণ্ঠার চেয়ে আহ্লাদের ভাগটাই বেশি। কেন, তা গোরাচাঁদ জানে। দিন সাতেক আগে গঞ্জ থেকে ম্যাটাডোরে মাল এসেছে শ্রীপদর। এখন জিনিস দুনো দামে বিকোনোর মওকা এসে যাচ্ছে। আহ্লাদ হতেই পারে।
গোরাচাঁদ তাকে ভরসা দিয়ে বলল, পোলের খুঁটি নড়বড় করছে, আমি নিজে দেখে এসেছি।
শ্রীপদর গলায় কণ্ঠি, কপালে গেরিমাটির তিলক, গায়ে হাফ হাতা গেঞ্জি। রংটি ঘোর কালো, শরীর সুঁটকো, মুখে একটা রসকষহীন ভাব। এই লোকের যে কুসুমকুমারীর মতো মেয়ে থাকতে পারে সেটা প্রত্যয় হয় না। দুনিয়ায় যে কত উল্টো জিনিসই ঘটে যাচ্ছে !
শ্রীপদ নিচু তক্তপোষটায় পা তুলে বসা। ময়লা ধুতি হাঁটুর ওপর তোলা। বলল, দেশটা চোরে একেবারে ভরে গেল। পাইকার শালা মালই দিতে চায় না ।

গোরাচাঁদের মন বড় চেগেছে, নইলে সে এখন বেকায়দায় একটা প্রশ্ন করতে পারত, বাপু, পাইকার মাল দেয় না তার সঙ্গে চোরের সম্পর্ক কী? আর পাইকার যদি চোরই হয়, তাহলে তুমিই শালা কম কিসের?
কথাগুলো শ্রীপদ দাসকে বলা যায় বটে, কিন্তু কুসুমকুমারীর বাপকে বলা যায় না। কিছুকাল আগেও শ্রীপদ নিতান্তই শ্রীপদই ছিল বটে গোরাচাঁদের কাছে, ইদানীং শ্রীপদ আর তার চোখে সেই শ্রীপদ নেই। এখন শ্রীপদ হল গে শ্রীমতী কুসুমকুমারীর শ্রীবাপ ।
উঠোনটা এখন ফাঁকা। গোড়ালিভর ঘোলা জল জমে আছে। তার মধ্যে টুসকির মতো দু চার ফোঁটা করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল এবার। উঠোনের ওপাশে শ্রীপদর মালপত্র রাখার ঘর। ভিটের নীচে . কচু গাছের খুব বাড়বাড়ন্ত অবস্থা। এইসবই দেখছে গোরাচাঁদ আর ভাবছে। ভাবনাটা আজকাল জটিল হচ্ছে, কুটিলও হয়ে যাচ্ছে। হওয়াই কথা। ঘটনাটাও সোজাসুজি ঘটছে না যে। আর এই যে কুসুমকুমারীর জন্য তার এত আনচান , এত অস্থিরতা, ঝড় বাদল মাথায় করে দেড় মাইল ঠেঙিয়ে আসা—এসব যার জন্য সে মোটে জানেই না গোরাচাঁদের কথা।
জানলেও লাভ নেই। বরং উল্টো বিপত্তি হবে। চার বছর আগে গোরাচাঁদের বিয়ে হয়েছে মুন্সিহাটের সীতাপতি সাঁতরার মেয়ে লক্ষ্মীর সঙ্গে । গোরাচাঁদের বাপ শিবশম্ভু পাল জাঁক করেই বিয়েটা দিয়েছিল। ওইটেই বড্ড গণ্ডগোল পাকিয়ে আছে তার জীবনে। একটা মেয়েও আছে গোরাচাঁদের, আড়াই বছর বয়স। লক্ষ্মীকে বিয়ে করে গোরাচাঁদের প্রথম প্রথম ভালই লেগেছিল। এখন আর লাগছে না। বছরখানেক আগে সে কুসুমকুমারীকে দেখেছিল এই

দোকানেই। শ্রীপদ হাটে গিয়েছিল, কুসুম সামাল দিচ্ছিল দোকান । সে দেখা তো দেখা নয়, একেবারে শিরে সর্পাঘাত। নিদান নেই । সেই থেকে গোরাচাঁদের আনাগোনা। শ্রীপদর সঙ্গে চেনাজানা ছিলই । সেটাই ঝালিয়ে নিল আর একটু । এইরকম উঁকিঝুঁকিই চলছে সেই থেকে। কাজ আর এগোয়নি। আর তাতে গোরাচাঁদের আনচান ভাবটা বাড়ছে বই কমছে না। যত দিন যাচ্ছে তত বড় মাতন হয়ে পড়ছে সে । এরকমভাবে চলবে না। কিছু একটা করতে
হয়।
করেওছিল সে । লক্ষ্মীকে বাণ মারার জন্য তান্ত্রিক ধরেছিল। বাণে কাজ হয়নি। তবে দুদিন সর্দিজ্বরে একটু ভুগেছিল বটে। তা সেটা বাণের জন্যও হতে পারে। তান্ত্রিকটাও দুঃখ করে বলেছিল, বাণটা একটু কমজোরি হয়েছিল বলে মনে হচ্ছে। আমাশা হওয়ায় ঠিকমতো মন্তরে জোর দিতে পারিনি কিনা, তাই সর্দিজ্বরের ওপর দিয়ে গেল। ক'দিন পরে এসো বাপু , একেবারে উর্দুরি চাপিয়ে দেব।
গোরাচাঁদ অবশ্য আর তান্ত্রিকের কাছে যায়নি। মন্ত্রতন্ত্রের চেয়ে অনেক কাজের জিনিস আছে। গোবিন্দপুরের নন্দ মণ্ডলকে ধরল সে। নন্দ নামকরা খুনে। পাঁচশো টাকায় ঘাড় কাৎ করে ফেলল । কিন্তু লক্ষ্মীর জান বহুৎ কঠিন। হল কি, রথের মেলা থেকে ফেরার সময় বটতলায় অন্ধকারে চাকুটা চালিয়েছিল ঠিকই নন্দ। কিন্তু সেই সময় লক্ষ্মী এমন হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল যে সাঁই করে নেমে আসা চাকু লক্ষ্মীর লক্ষ্যভেদ করতে না পেরে নেমে গিয়ে বিধল নন্দরই ঊরুতে । বাপ রে, মা রে বলে কী চিৎকার তার। সাতদিন হাসপাতালে।
তবে কথাটা প্রকাশ পায়নি , এই যা ভরসা। লক্ষ্মী না মরলে

কুসুমকুমারীর জন্য জায়গা হচ্ছে না। জায়গা হলেই কথাটা পাড়া যায় শ্রীপদর কাছে। কিন্তু জায়গা হওয়াটাই কঠিন হচ্ছে। আর যত কঠিন হচ্ছে ততই গোরাচাঁদের মাথাটা পাগলু-পাগলু হয়ে যাচ্ছে।
কে এক খদ্দের সর্ষের তেল যাচাই করতে টিনের মধ্যে ফস করে আঙুল ঢুকিয়ে দেওয়ায় শ্রীপদ খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠল , কেমন বেআক্কেল হে তুমি ! ফস্ করে আঙুল ঢুকিয়ে দিলে! কোথায় কোন নর্দমা ঘেঁটে এসেছ কে জানে। নেবে তো এক ছটাক, বায়নাক্কা
ষোলোআনা। যাও, যাও, বিদেয় হও এখন।
লোকটা দাঁত বের করে হাসছিল। ডান হাতের আঙুলের তেলটা বাঁ হাতের কব্জিতে ঘষে গন্ধ শুঁকে বলল , এঃ , এ যে একেবারে গাদ। রেড়ির তেল মেশানো নাকি হে দাসের পো?
শ্রীপদ টং হয়ে বলল, মেশানো আছে তো আছে, তাতে তোমার বাপের কী? গাঁ শুদ্ধু লোক এ তেল সোনাহারা মুখ করে খাচ্ছে , উনি এলেন কোন খাঞ্জা খাঁয়ের নাতি! রেড়ি দেখাচ্ছে, এঃ !
শ্রীপদর তড়পানিতে লোকটা কিছু মিইয়ে গেল। আঙুলের তেলটা খোঁচাখোঁচা দাড়িওলা গালে ঘষে একখানা ছোটো শিশি এগিয়ে দিয়ে বলল, দু শো গ্রাম দাও তো!
শ্রীপদ গজগজ করতে করতে তেল মাপছে, আর এ দিকে গোরাচাঁদ ফের পিছনের দরজা দিয়ে উঠোনে চোখের জাল পেতে বসে আছে, যদি কুসুমকুমারী পাখি ফের একবারটি ধরা পড়ে। কুসুমকুমারী দেখতে কেমন তা গোরাচাঁদ হলফ করে বলতে পারবে না। তাকে স্বীকার করতেই হবে, কুসুমকুমারী ফর্সার মধ্যে পড়েই না, নাকটা তেমন চোখা নয় বরং একটু ভোঁতার দিকেই। চোখ দুখানা টানা-টানা ভাবতে ইচ্ছে যায় তার, কিন্তু দুঃখের বিষয়

কুসুমকুমারীর চোখ বরং একটু ফোলাফোলা। তবে গালদুটি ভরাট, একটু বেশিই ভরাট। ঠোঁট দুটো কিছু পুরু , তবে টুসটুসে। তবে আলাদা আলাদা করে দেখতে গেলে ভজঘট। সব মিলিয়ে কুসুমকুমারী হল হিন্দি সিনেমার দিল কি ধড়কন।
দুপুর হয়ে এল এল। শ্রীপদ গোছগাছ করতে লেগেছে। দোকানের ঝাঁপ ফেলে ভিতর বাড়িতে স্নান-খাওয়া করতে যাবে। গোরাচাঁদের আর একটা ব্যর্থ দিন শেষ হল। ফের কাল এসে
চোখের জাল পেতে বসে থাকা ।
গোরাচাঁদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠতেই যাচ্ছিল, এমন সময় দুটো লোক এসে ঢুকল। একজন একটা কাপালিক। গোঁফদাড়ি রক্তাম্বরে একেবারে জম্পেশ । অন্যজনকে গোরাচাঁদ চেনে। নবকৃষ্ণ।
নব বলল, শ্রীপদদা, খবরটবর কী?
শ্রীপদ দুই মূর্তিকে দেখে কিছুটা বিরক্ত। গলাতেও সেটা প্রকাশ পেল , আর খবর! গয়ংগচ্ছ। তা ইনি কে ?
হন।
ইনি মস্ত সাধু। সম্পর্কে আমাদের সরস্বতী বউঠানের মামাও
অ। বলে শ্রীপদ একটা ন্যাকড়া দিয়ে তক্তার তেল পুঁছতে পুঁছতে বলল, তা কী মনে করে ?
এই দেখা সাক্ষাৎ আর কি।
শ্রীপদ মুখখানা তেতো করে বলল, দেখাসাক্ষাতের কী আছে? দেখাসাক্ষাত মানেই খানিক আয়ুক্ষয়।
গোরাচাঁদ একটু নড়েচড়ে বসল। এই যে বাধা পড়ল এতে তার একটু সুবিধেই। আরও কিছুক্ষণ বসে থাকা যাবে। কুসুমকুমারীর কখন গমনাগমন হয় উঠোন দিয়ে তার ঠিক কী ?

কাপালিকটার চোখ দুখানা যেন ভাঁটার মতো নয়। বরং মিয়োনো। শ্রীপদর কথায় ভারি সাদামাঠা হাসি হেসে বলল, তা আয়ুক্ষয়ই বটে বাবা। খুব আয়ুক্ষয়। তবে বৃথা বাক্যেই আয়ুক্ষয় হয়, তাঁর গুণ গাইলে আয়ু বাড়ে। বুঝলেন বাবা !
শ্রীপদ অনেক কিছু বোঝে, আবার অনেক কিছু বুঝতে চায় না। মুখের ভাবের বিশেষ পরিবর্তন হল না। গলার স্বরটাও বেশ ঝাঁঝাল। বলল, তা কথাটথা কিছু ছিল নাকি? তবে আমার এখন
চান-খাওয়ার সময়।
তা যান বাবা, যান। স্নান - খাওয়া সারুন গিয়ে। বেলাও হল বটে কম নয় । আমরা বরং আজ আসি।
নব একটু তে- এঁটে আছে। বলল, ও শ্রীপদদাদা, আজকাল কি ঘড়ি ধরে স্নান-খাওয়া সারো নাকি? তা কব্জিতে ঘড়িটাও তো বাঁধোনি। কবে থেকে সাহেব হয়েছ?
শ্রীপদ তেলের ন্যাকড়াটা সরিয়ে রেখে বলল , কী কাজ সেটা বলবি তো! উঠতে যাচ্ছিলুম, ভিতরবাড়িতে কাজ আছে—
নব তেড়িয়া হয়ে বলল, অমন ছোটলোকের মতো করছো কেন? দুটো পয়সা করেছো বলে? পয়সা হলেই ভদ্রলোক হওয়া যায় না, বুঝলে!
নব যে-সে নয়, যতীনের ভাই। দূর সম্পর্কের হলেও ভাই। আর যতীন এখানকার মাতব্বর লোক। সুতরাং শ্রীপদ একটু নরম হয়ে বলে, কী এমন বললুম রে বাবা! চান- খাওয়ার সময়টা বুঝলি তো — ভিতর বাড়ি থেকে তাড়া আসে। তা যাকগে , সে না হয় পরেই হবে।
নব বেশ কড়া গলায় বলে, তোমার উপকারের জন্যই আসা ।

এই সাধুর পয়সার ধান্দা নেই। এসেছেন যে সে তোমার বাপের ভাগ্যি।
বাপ তুলে কথাতেও শ্রীপদ আর রা কাটল না। সাধুজীর দিকে চেয়ে বলল , বসুন বাবা, বসুন ।
সাধু অবশ্য বসল না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তেমনি হাসতে লাগল । তারপর গোরাচাঁদের দিকে চেয়ে ভারি সরল গলায় বলল, আপনি কে বাবা? কেউ হন ?
গোরাচাঁদ মনে মনে বলল, “ জামাই হই বাবাজী, হবো হবো করছি।” মুখে বলল, না, এই গাঁয়েরই লোক।
তা বেশ বাবা, বেশ। সব ভাল তো আপনার? সব দিক ভাল ? আজ্ঞে ভালই।
নব বলল, তোমার ছোট মেয়ে চকমকিকে একবার সাধুবাবা
দেখতে চান ।
শ্রীপদ একটু যেন অস্বস্তিতে পড়ে বলে, তাকে আর দেখার কী
আছে ?
সাধু বলল, তার কি ভর হয় বাবা?
শ্রীপদ দুনো অস্বস্তিতে পড়ে বলে, ওই হয় মাঝে মাঝে। ডাক্তার-বদ্যি দেখানো হয়েছিল।
ডাক্তার! ডাক্তার কিছু পারেনি করতে ?
কেউ কিছু পারেনি।
কী হয় বাবা, তার?
ওই ভরটরের মতোই। এখনও ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। শ্রীপদ কেন চকমকির কথায় অমন পাশ কাটাচ্ছে তা আর কেউ না জানুক গোরাচাঁদ জানে। বেশি দিনের কথাও নয় । মাসটাক আগে

এক বর্ষা-বাদলার সকালে গোরাচাঁদ নিজের পয়সায় তেলেভাজা আর মুড়ি খাইয়েছিল শ্রীপদকে। তখনই একথা সেকথায় শ্রীপদ বলে ফেলেছিল, আর কিছুদিনের মধ্যেই চকমকি একটা সাড়া ফেলে দেবে দেখিস !
কিসের সাড়া গো !
ভরটর হচ্ছে, বুঝলি না! ভাল লক্ষণ! দু-চার টাকা প্রণামীও পায় মাঝে মাঝে। দাঁড়িয়ে গেলে আর দেখতে হবে না।
শুনে গোরাচাঁদ অবাক। চকমকি একরত্তি মেয়ে , চোদ্দ পনেরোর বেশি নয়। এখনও বেণী দুলিয়ে এক্কা-দোক্কা খেলে বেড়ায়। সে প্রাণামী পাচ্ছে , এ বড় আশ্চর্য কথা। তবে হ্যাঁ, তার ভিরমি গোছের কী যেন হয় বলে শুনেছে গোরাচাঁদ। কী সব যেন বিড়বিড় করে বকেও তখন। কিন্তু গোরাচাঁদ চকমকিকে নিয়ে তো ভাবে না, ভাবে কুসুমকে নিয়ে। তাই ব্যাপারটা মাথায় থাকেনি তার।
তেলেভাজা দিয়ে মুড়ি খেতে খেতে সে বলল, সে তো খুব ভাল কথা গো! বাড়িতে সিদ্ধাই থাকলে অনেক সুবিধে। দুধেল গাই ।
শ্রীপদর সব কথাতেই ইদানীং সায় দিয়ে যাওয়া ছাড়া গোরাচাঁদ আর উপায় দেখছে না। কিন্তু দুধেল গাই কথাটা মোটেই পছন্দ হল না শ্রীপদর। খ্যাঁক করে উঠে বলল, দুধেল গাই মানে? ওরকম পট করে আলটপকা একটা বলে দিলেই হল! এ তো ভাঁওতাবাজি নয়, রীতিমতো সাধনমার্গের ব্যাপার। তুই এসবের বুঝিস কী রে
গাড়ল ?
গোরাচাঁদ এ কথায় একটু থতমত খেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি বলল, না না, সে তো ঠিকই। চকমকি মোটেই সেরকম মেয়ে নয় ।
৩০
তারপর ঘটনা আরও এগিয়েছে। কী সব জলপড়া টলপড়াও দিচ্ছে আজকাল। পাড়ার মেয়ে-বউরা আসে। পাড়াগাঁর ব্যাপার, যা হোক কিছু ঘটলেই সবাই সেই দিকে ঢলে পড়ে। তবে চকমকিকে নিয়ে যে শ্রীপদ কিছু একটা এঁটেছে তাতে সন্দেহ নেই। একদিন শ্রীপদ বলে উঠল , ওই ছোঁড়াটাকে জুতোপেটা করতে
হয় ।
আঁতকে উঠে গোরাচাঁদ বলেছিল, কাকে গো?
ওই যে রাখালরাজের ছেলেটা। মহা শয়তান !
তা করেছেটা কী ? বলো তো আমার দলবল নিয়ে দিই ঘা
কতক ।
ছোঁড়া ফস্টিনস্টি করতে আসত রোজ। গুজগুজ ফুসফুস আমি দু চোখে দেখতে পারি না।
এ কথায় রাগটা রগে উঠে গেল গোরাচাঁদের। ফস্টিনস্টি করতে আসা মানে তো কুসুমকুমারী-চাঁদে রাহুর ত্রাস! সে তক্ষুণি অস্তিন গোটায় আর কি! রীতিমতো বাঘা গলায় বলল, এত বড় সাহস ! এ তো ভীষণ খারাপ ব্যাপার!
হুঁকোয় টান দিয়ে শ্রীপদ বলেছিল , মেয়ের বয়স চোদ্দ পেরোয়নি, এর মধ্যেই পিছু লেগেছে। বলি চকমকির যোগ্য তুই? কী এমন এলেম আছে রে তোর!
একটু নিশ্চিন্ত হল গোরাচাঁদ । যাক, কুসুমকুমারী নয়,
চকমকি । তবে গলায় রোখটা বজায় রেখেই বলল, শচীনের কথা বলছো তো ! খুব চিনি ছোকরাকে। দেবখন কড়কে।
শ্রীপদ হুঁকো রেখে বলল, তুমি কড়কাবে কী? আমিই সেদিন খুব দুচার কথা শুনিয়ে দিয়েছি। পালানোর পথ পায় না।

বৃত্তান্তটা ওই পর্যন্ত হয়ে আছে। আর এগোয়নি চকমকির কথা এই আবার উঠল। কিন্তু শ্রীপদ যেন ভারি অস্বস্তিতে পড়েছে । পড়ারই কথা। সাধুবাবা যদি চকমকির ভিরমি বা ভর ধরে ফেলেন তাহলে শ্রীপদর তাতে লাভটা কী? বরং ভিরমিকে ভর বলে চালিয়ে ওর সঙ্গে আরও নানা ভড়ং মিশিয়ে দুচার পয়সা আয়ের একটা ব্যবস্থা হয় ।
সাধুবাবা আপনমনে বসেছিল। বলল, ভর হয় এ তো খুব ভাল কথা। সব মেয়ের ভিতরেই জগদ্ধাত্রী আছেন, যে যতটুকু তাঁকে ভরে নিতে পারে নিজের মধ্যে। মেয়েকে সাবধানে রাখবেন বাবা।
শ্রীপদ ঘাড় নেড়ে বলল, আজ্ঞে।
সাধু আর নব বোধহয় চলেই যেত। সেইরকমই ভাবখানা করছিল যেন। কথা ফুরিয়ে গেলে লোকে যেমন উঠি-উঠি করে তেমন একটা পরিস্থিতি। ঠিক এই সময়ে ঘরে যেন একটা বাজ পড়ল । এমন চমকানো বহুকাল চমকায়নি গোরাচাঁদ।
সাধুবাবাকে মা বসতে বলেছে। ওঁদের চলে যেতে দিও না বাবা। ভিতরের দরজার কাছে কুসুমকুমারী দাঁড়িয়ে। পিছনে এলো চুলের চালচিত্তির। রক্তমাংসের তৈরিই নয় জিনিসখানা।
বুকের ভিতরটা এমন তোলপাড় হতে লাগল যে গোরাচাঁদ একটু ককিয়েও উঠল যেন। তারপর হাঁ করে চেয়ে রইল। মাত্র কয়েক সেকেন্ড। খবরটা দিয়েই উঠোনে নেমে ফের আড়াল হল কুসুমকুমারী।
শ্রীপদ তার বউকে ভয় খায় খুব। শশব্যস্তে একখানা ন্যাকড়া দিয়ে চৌকিটা ঝাড়তে ঝাড়তে বলে উঠল , আপনি বসুন আজ্ঞে। বসে যাও হে নব। বলে তাড়াতাড়ি চৌকি থেকে নেমে ভিতরবাড়িতে

চলে গেল।
চৌকিটা বড়সড়ই। গোরাচাঁদও পিছনের দিকে একটু সরে গেল। সাধুবাবা সন্তর্পণে বসবার পর, নব একটু ফাঁক রেখে বসল।
তা এই বসে-থাকাটা বেশ লম্বাই হয়ে যাচ্ছিল। ভিতরবাড়ি থেকে একটা হুকুম এল বটে, কিন্তু আর ঘটনা এগোচ্ছে না। ঘরের মধ্যে মাছির ওড়াওড়ি।
নব খানিক বাদে তার দিকে চেয়ে বলল, গোরাচাঁদ এখানে কী
মনে করে?
এই বিষয়কর্মেই এসেছিলাম। মাঝে মাঝে একটু বসে যাই। সাধুটি নিরীহ বটে, কিন্তু তার দিকে যখন ফিরে তাকিয়ে একটু হাসল তখন চোখে চোখ রাখতে একটু লজ্জা-লজ্জা করল গোরাচাঁদের।
বাবা কি এখানেই থাকেন ?
এই মাইলটাক রাস্তা। পাশের গাঁ।
তা কী করা হয় বাবা ?
চাষবাস আছে, বাবা - কাকারা করে। আমিও দেখি ।
সংসার করেছেন বাবা ?
আজ্ঞে করেছি।
বেশ বেশ, সংসারধর্ম করা খুব ভাল ।
সাধু একটু উদাস মুখে বসে রইল। কথা আর এগোচ্ছে না। তবে আজ গোরাচাঁদের কপালটা বড়ই খুলে গেছে। সকালে আজ কার মুখ দেখে উঠেছিল কে জানে। হঠাৎই ফের তাকে চমকে দিয়ে কুসুমকুমারী এসে ঘরে ঢুকল। হাতে দু'খানা পিরিচ। পিছনে তাদের ঝি বাসি । তার হাতেও একখানা পিরিচ আর জলের ঘটি ।
কুসুম পিরিচ দু'খানা সাধুবাবা আর নবর সামনে নামিয়ে রেখে বলল, একটু জল খান। মা পাঠাল।
ঝি বাসির হাতের পিরিচখানা জুটল গোরাঁচাদের। পিরিচে চারটে করে বড় বড় নারকোলের নাড়ু আর একটা করে মুড়ির মোয়া। খাবে কি, বুকের ঘরঘরানিতেই গোরাচাঁদের অবস্থা কাহিল। আজ খুব হচ্ছে বটে দেখা সাক্ষাটা।
গাঁয়ের লোক সব, টপটপ নাড়ু মোয়া খেয়ে ফেলল। গোরাচাঁদ একটা নাড়ু চিবোলো বটে, বাকিগুলো পেরে উঠল না। পিরিচখানা কি সে কুসুমকুমারীর হাত থেকে পেতে পারত না? ভগবান যখন আজ দিলেন, তখন আর ওই খুঁতটুকু রাখলেন কেন ?
আগে শ্রীপদ , তার পিছনে চকমকি গুটি গুটি এসে দাঁড়াল। চকমকির মুখে একটা ঘাবড়ে যাওয়া ভাব।
শ্রীপদ বলল , এই যে বাবাজী , এই আমার ছোট মেয়ে।
চকমকি কি করবে ভেবে না পেয়ে টক করে সাধুবাবার পায়ে হাত দিয়ে একটা প্রণাম করল। চকমকির এই চোদ্দ পেরিয়ে পনেরো। পরনে সবুজ সালোয়ার কামিজ। মুখের ধরন কুসুমের মতোই। একটু লম্বাটে, এই যা।
সাধুবাবা চকমকির দিকে চেয়ে ভারি মিঠে হাসি হেসে বলল
বাঃ বেশ মেয়ে ।
চকমকি মাথা নিচু করে সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
সাধু নরম গলায় বলে তোমার কি ভর হয় মা?
কি জানি কী হয়।
যখন হয় তখন কিছু টের পাও না?
চকমকি ডাইনে-বাঁয়ে মাথা নেড়ে বলে না তো। শরীরটা
খারাপ লাগে আর তখন মাথাটা খুব ঝিমঝিম করে।

তখন চোখের সামনে কিছু দেখতে পাও? অনেক কিছু দেখতে পাই।
কালী দুর্গা কিছু দেখ ? তাও দেখি।
খুব ভাল, খুব ভাল। সাধু এই বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ খুব নিচু গলায় বলল, দেখাটা কিছু নয়। হতে হয়।
এই বলে সাধুবাবা উঠে পড়ল। শ্রীপদ তাড়াতাড়ি বলল, ইয়ে সাধুবাবা, চকমকির মায়ের যে একটু কথা ছিল।
সাধু মিষ্টি হেসে বলল, চান খাওয়া করুন বাবা। আমি ফের আসবখন। এ মেয়ের লক্ষণ কিছু খারাপ নয় বাবা। ভয় পাবেন
না।
ইস্কুল থেকে ফিরছে চকমকি। বড্ড বাদলা যাচ্ছে ক দিন। রাস্তায় ছপছপ করছে জল । আকাশে ফের নতুন করে মেঘ হয়েছে। আজ আবার ভাসাবে। চকমকির মোটেই বাদলা দিন ভাল লাগে না। তার ভাল লাগে বেশ ঝলমলে দিন। আর জ্যোৎস্নায় ভরা, তারায় ভরা
রাত।
জামতলায় ওই শচীন দাঁড়িয়ে আছে। কোমরে ঠেস দেওয়া সাইকেল। বুকটায় একটা আনন্দের যন্ত্রণা খামচে ধরে তাকে। এই যে শচীন তার জন্য এখানে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে এটা খুব ভাল লাগে চকমকির। বাবা আজকাল আর শচীনকে পছন্দ করে না। খুব বকাঝকা করেছিল, তাই আর শচীন তাদের বাড়িতে ঢুকতে সাহস পায় না। শচীন নাকি খারাপ।
তা খারাপ ভালর কীই বা বোঝে চকমকি। তবে শচীনকে তার বড্ড ভাল লাগে। একটু ভীতু, একটু সরল আর খুব নরমসরম। জামতলায় মুখোমুখি হতেই শচীন ভারি লজ্জার ভাব করে বলল সাধুবাবা কী বলেছে জানো ?
কী ?
বলেছে তুমি খুব সুলক্ষণা মেয়ে।
চকমকি ঠোঁট উল্টে বলে, নতুন কথা নাকি? রোজ তো এসে এসে সেই কথা বলে যাচ্ছে। আর সেই শুনে বাবা খুব লাফাচ্ছে।
৩৬
শচীন একটু ম্লান হয়ে গিয়ে বলল, তাই নাকি ?
চকমকির মনটা এ সব ভাবলেই খারাপ হয়ে যায়। বাবা আজকাল প্রায়ই তাকে বলে, তোকে সিদ্ধাই হতে হবে। অনেক উঁচুতে উঠতে হবে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চকমকি বলল, আমার আর ওসব কথা ভাল লাগে না । আজকাল খেলতে দেয় না, পড়তে দেয় না। ইস্কুলে যাওয়াও নাকি বন্ধ করে দেবে। বলো তো কেমন লাগে ।
শচীন পারতপক্ষে চকমকির মুখের দিকে তাকায় না। তার ভারি
লজ্জা।
মুখ নিচু করে রেখেই শচীন বলে, তোমার জন্য কিছু করতে ভারি ইচ্ছে যায়। কিন্তু কী করব বলো তো!
কী আর করবে। আমি একদিন গলায় দড়ি দেব এই তোমাকে
বলে রাখলাম !
শচীন এ কথায় ভারি দুঃখ পেয়ে বলে, না না, ওসব কথা ভাল নয়। ওরকম ভাবতে নেই।
হ্যাঁ গো শচীনদা, আমাকে একটু সাইকেল চালাতে শেখাবে? আমার ভারি সাইকেলে চাপতে ইচ্ছে করে।
শিখবে? তা শিখলেই হয়। সোজা জিনিস।
কি ভাবে চালাতে হয়ে বলো তো!
উঠে বসলেই হয়
উঃ বাবা, আমি ঠিক পড়ে যাবো। আচ্ছা, চলো তো ওই আজুর মাঠের ধারে একটু চেষ্টা করি।
তা চলো ।
আজুর মাঠের ধারটা নির্জন জায়গা। তবু কেউ যদি দেখে ফেলে
তবে বিপদ আছে। কিন্তু আজ চকমকির বড় ইচ্ছে যাচ্ছে।
সাইকেলখানা শচীনের কাছ থেকে নিয়ে চকমকি একটু ঠোট টিপে হাসল, উঠব?
উঠে পড়লেই দেখবে সাইকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। এখন ভয় পেতে নেই ৷
ধরে থাকবে তো আমাকে?
ধরতে হবে না। ধরে রাখলে তোমার ভরসা হবে না।
চোখ বুজে একটা দম নিল চকমকি। বিড় বিড় করে কী যেন বলল একটু। শচীন ভেবেছিল, ইয়ার্কি করছে, আসলে কি আর
চড়বে!
কিন্তু তাকে ভারি অবাক করে দিয়ে প্যাডেলে বাঁ পা রেখে চকমকি এক ঝাঁকিতে সিটে উঠে পড়ল। তারপরই চেঁচানি, উম্মা
গো !
পড়ো -পড়ো হলেও টালমাটাল সাইকেলে সন্তত দশ গজ গড়িয়ে গেল চকমকি। পিছনে শচীন ছুটছে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই তো বেশ হচ্ছে।
সাইকেলটা কাৎ হল অবশেষে। পড়ার আগেই ধরে ফেলল শচীন । চকমকি দু হাতে জড়িয়ে ধরল তাকে।
শচীনের ভারি লজ্জা । সংকুচিত হয়ে বলল, লাগেনি তো! না। পড়তে দাওনি যে লাগবে কি করে?
বলে ঠোঁট টিপে হাসল একটু।
শচীন বলল, শিখেই তো গেছ দেখছি। তোমার বেশ সাহস আছে। প্রথমবারেই এমনটা কেউ করতে পারে না, ভয় পায়।
দাও তো, আবার চেষ্টা করি।
আজ থাক। না আজই ।
রোগ আছে মেয়েটার। চার-পাঁচবার একই রকম হল বটে, কিন্তু তারপর প্যাডেল মেরে দিব্যি চালাতেও লাগল। হাত কেঁপে সামনে চাকা আঁকাবাঁকা হচ্ছে বটে, কিন্তু আর পড়েও যাচ্ছে না।
শচীন অবাক হয়ে দেখল। বলল, তুমি তো সত্যিই সিদ্ধাই। এ কথাতেই কি না কে জানে, হুড়ুম করে একেবারে কাৎ হয়ে জলে কাদায় সাইকেল সমেত পড়ল চকমকি। শচীন তাড়াতাড়ি গিয়ে তুলল।
চকমকি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, তুমিও বলছ ও কথা !
শচীন জিব কেটে বলে, ওটা কথা নয়। কথার কথা। ঠাট্টাই ধরে
নাও ।
মোটেই না। তুমিও আমাকে সিদ্ধাই ভাবো ।
কক্ষনো নয়। সাধুবাবা তো বলেই দিয়েছে আমাকে, তোমার একটু মৃগীর মতো আছে।
মৃগী কাকে বলে জানো? আমি জানি না ।
শচীন বলে, ওই একরকম ফিটের ব্যামো।
মাথা নেড়ে চকমকি বলে, আমার মোটেই ফিট হয় না তো?
তা হলে কী হয়?
আমাকে ভূতে ধরে । একাদশীর ভূত।
সেই যে সজনে গাছে গলায় দড়ি দিয়েছিল?
সে -ই। আমি পষ্ট তাকে দেখতে পাই যে !
কখন দেখ?
যখন ঝিমুনিটা আসে, তখন।

ঝিমুনিটা কীরকম চকমকি ?
সে ভারি মজার। শরীরটা ঝিমঝিম করে আর ঘুম-ঘুম পায়। তখন চোখের সামনে একাদশীকে দেখতে পাই। এলো চুল, বড় বড় চোখে আমার দিকে চেয়ে আছে।
ভয় করে না?
এখন আর করে না। একাদশী তো আমার সঙ্গে কথা কয় । ও বাবাঃ, কথাও কয় নাকি?
অনেক কথা কয় । কইবে না? তার এক বুক দুঃখ । দজ্জাল মায়ের জন্যই তো মরল।
শচীন এসব কথায় একটু ব্যোমকে গিয়ে বলে, এসব কথা সাধুবাবাকে বলোনি ?
না। তাকে বলতে যাব কেন ? সে কে? তোমাকে যা বলতে পারি, সবাইকে তা পারি?
তাই? বলে শচীন হাঁ করে চেয়ে থাকে।
চারধারে বর্ষার ক্ষণজীবী আলো মরে একটা ঝুঝকো ভুতুড়ে আঁধার ঘুলিয়ে উঠল হঠাৎ। ভারি নিশুতির মতো নিস্তব্ধতা।
খুব বড় বড় চোখে শচীনের দিকে চেয়ে চকমকি বলল, আমাকে কি তোমার ভয় করে শচীনদাদা ?
চকমকিরও এলো চুল। বড় বড় চোখ। হঠাৎ তার নাকের পাটা ফুলে ফুলে ঘন ঘন শ্বাস পড়তে থাকে।
শচীন মাথা নেড়ে বলে, না।
সত্যি বলছ?
সত্যিই বলছি।
আমি যখন একাদশী হয়ে যাব, তখন ?

তুমি কি একাদশী হতে পারো ? যদি পারি?
তা হলেও না ।
কেন ভয় পাও না? সবাই তো পায়।
কি জানি , তোমাকে আমার কখনও ভয় হয় না। মনে হয় তুমি
কত ভাল মেয়ে।
চকমকি কেমন ধারা একটু হয়ে গেল। ভারি আনমনা, ভারি বিষণ্ণ ।
বাড়ি যাও চকমকি। সন্ধে হয়ে এল। শ্রীপদখুড়ো খুঁজতে বেরোবে।
বাড়ির মধ্যে আমার দমটা বন্ধ হয়ে আসতে চায়, জানো ? আমার খুব ইচ্ছে যায় একটা খোলামেলা নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকি। আমাকে কোথাও নিয়ে চলে যাবে শচীনদাদা ?
শচীন তাড়াতাড়ি জিব কেটে বলে, না না, অমন কথা বলতে নেই
তুম বড্ড ভীতু মানুষ কিন্তু ।
শচীন মুখখানা শুকনো করে বলল, তোমাকে লোকে তা হলে
খারাপ ভাববে যে !
ভাবুকগে। আমাকে তো তুমি বিয়েই করবে, না ?
শচীন লজ্জায় মাটিতে মিশে গিয়ে বলে, সে কি আর আমার কপালে আছে চকমকি? শ্রীপদখুড়ো তো আমাকে দেখলেই বিগড়ে
যায় ।
চকমকি এমনিতে খুব হি হি করে হাসে। সেই হাসিটা আজ ফুটল না। আজ চকমকির মন ভাল নেই। একটুখানি হেসে ফের
গম্ভীর হয়ে বলল, তুমি খুব ভীতু।
শচীন ডাকাবুকো লোক নয়। তার ভয়ও বটে নানারকম। কালীগঞ্জের হাটে এক জ্যোতিষীকে দেখে হাত পেতে বসে গিয়েছিল শচীন। তার ওই এক বাতিক আছে। জ্যোতিষী দেখলেই ঢলে পড়ে। তা সেই জ্যোতিষী বলেছিল, সবই তো ঠিক আছে বাপু, বুক ঠুকে এগোলেই কাজ হয়।
সেইটে আর হল না শচীনের। বুক ঠুকে এগোতে পারলে কি আর শচীন পড়ে থাকত? জোগাছির করালী দাসের পুকুর কাটার বরাত পেয়েছিল শচীন। শুনতে সোজা হলেও কাজ তত সোজা ছিল না। করালীর মতলব ছিল পাশে নগেশ মুৎসুদ্দির খানিক জমি পুকুর কাটার নামে খাবলে নেয় । মুৎসুদ্দির পো এখন বর্ধমান না কোথায় গেছে। সেই তক্কে পুকুর কাটাচ্ছিল করালী। ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে হাঁক মারছিল, কুপিয়ে ফ্যাল! কুপিয়ে ফ্যাল! সেই সময়ে মুৎসুদ্দির পক্ষের কিছু লোকজন এসে হাজির, এ কী! অ্যাঁ! এ কী হচ্ছে বাপু? করালী হাঁক মারছিল, তাড়াতাড়ি কর! তাড়াতাড়ি। লোকগুলোর সঙ্গে একটা বন্দোবস্তে আসতে করালী তফাত হল । কিন্তু শচীন ধন্ধে পড়ে আর কাটল না। তার মনে হল, এ অধর্ম হচ্ছে। করালীর মতলব ভাল নয়। করালী ফিরে এলে শচীন বলল , এ আমি পারব না মশাই, অধর্ম হচ্ছে। করালী খিঁচিয়ে উঠে বলেছিল, তুমি তো বড্ড ভণ্ডুল লোক হে। পারবে না সেটা আগে বলতে হয় । পয়সা ফেললে লোকের অভাব ।
নিজের সম্পর্কে শচীন করালীর ওই কথাটাই ধরে নিয়েছে । সে বড় ভণ্ডুল লোক । নইলে কাজ সে ভালই জানে। ইলেকট্রিকের কাজ, রঙের কাজ, ঘর তোলার কাজ। এত জেনেও লাগসই কিন্তু

হয়ে ওঠেনি আজ অবধি।
চকমকি ভারি উদাস হয়ে বলল, বাবার মতলব জানো ?
কী মতলব ?
তোমাদের ওই সাধু শিবানন্দকে বাবার বড্ড পছন্দ । শচীন ঘাড় কাৎ করে বলে, বাবাজী লোক ভাল।
খারাপ বলেছি? বরং ভালই। বড্ড ন্যাতানো ঠাণ্ডা মানুষ। বাবার খুব ইচ্ছে সাধুকে রেখে দেয়।
বটে ! সে তো খুব ভাল প্রস্তাব।
তোমার মুণ্ডু। বাবার মতলব তো জানো না।
কী আবার মতলব ?
এমনি রাখবে ভেবেছ? ভৈরবের সঙ্গে ভৈরবী জুড়ে দিয়ে
রাখবে। বাড়িতে আখড়া হবে।
শচীন অবাক হয়ে বলে, ভৈরবীটা আবার কে?
এটাও বুঝলে না? আমি ছাড়া আর কে ?
আকাশ থেকে যেন একটা বজ্রাঘাত হল শচীনের মাথায়।
তোমার সঙ্গে ?
সাধুটা ভালমানুষ, একটু বোকাসোকাও আছে । দু'জনকে জুড়ে দিলে একেবারে সোনায় সোহাগা হবে। প্রণামী আসবে, তোলা
পড়বে।
শচীন কথা কইল না, শুধু “গাঁক” করে একটা শব্দ বেরোল
গলা থেকে ।
চকমকি বলল, ঘরজামাই-ই হল একরকম। আজকালের মধ্যেই সাধুর কাছে কথা পাড়বে বাবা।
শচীন কথা ফিরে পেয়ে বলল, কথাটা পাড়েনি এখনও ?

না । তবে সাধু রোজ আসছে, তাকে ভাল মন্দ খাওয়ানো হচ্ছে খুব।
শচীন ঘন ঘন চোখের পাতা মেলে অকুলে পড়ে যাওয়া গলায়
বলল , তা হলে ?
সে জন্যই তো বলছিলাম আমাকে নিয়ে কোথাও পালিয়ে
চলো ।
শচীনের বুকের মধ্যে যেন একটা কুয়োর মতো অতল সৃষ্টি হল। বড্ড বেকুবের মতো হল মুখখানা, দু'বার ঢোক গিলে বলল, কোথায় যাব চকমকি? আমার যে অন্য কোথাও কোনও ঠেক নেই।
অত ভাবছ কেন? ভেগে পড়ি চলো, যা হয় হবে। শ্রীপদ খুড়ো কি ছাড়বে ভেবেছ? তুমি নাবালিকা, থানা পুলিশ
করবে।
অত ভাব বলেই তো বলি, তুমি ভীতুর ডিম। বিয়ে তবে আমার ওই শিবানন্দর সঙ্গেই হবে, দেখো।
আকাশে মেঘখানা আরও জমকালো হয়ে এল। চার দিক অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। মাঠ পেরিয়ে বৃষ্টি চলে আসছে রণপায়ে।
দু'জনে একরকম দৌড়-পায়ে ফিরতে লাগল। জামতলার কাছে এসে চকমকি বাঁ ধারে যাবে। বৃষ্টিতে ভেজা কচি মুখখানা শচীনের দিকে ফিরিয়ে বলল, একটু ভেবো শচীনদাদা, আমার যে কী হবে!
তাই তো আমার দিনরাতের ভাবনা চকমকি।
চকমকি চলে যাওয়ার পরও জামতলার অন্ধকারে সাইকেল নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে শচীন। গাঁয়ের অন্ধকার একেবারে নিপাট। কোথাও আলোর কুটোটুকু নজরে পড়ে না। আকাশেও ঝিলিকটুকুই যা ভরসা । তা এখন সেই ঝিলিকও বিশেষ নেই। টানা

বর্ষায় থাকেও না বড় একটা। আর আকাশ আজ একেবারে কলসী উপুড় করে ঢালছে।
এই জলে সাইকেল চালানো যায় না। সেখানে ঠেলে ঠেলেই হাঁটতে থাকল শচীন। আকাশের জল, রাস্তার জল কোনওটাই ঠিক খেয়াল করল না সে । মনটা বড় উচাটন।
সাধুবাবাকে গিয়ে যে ধরে পড়বে সেও পারবে না শচীন । তার
বড় লজ্জা । বড় সংকোচ।
রথতলার পাশে একখানা মাঠ । মাঠ পেরিয়ে তার বাড়ি। ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে বাড়ি ফিরল শচীন। ভিতরের উঠোনে ঢুকে সাইকেলখানা বারান্দায় ঠেলে তুলল। মুছে টুছে পরে ঘরে রাখতে হবে। আজকাল বড্ড সাইকেল - চুরির হিড়িক পড়েছে।
তাদের বেশ বড় বাড়ি, দুই জ্যাঠা আর এক কাকার সঙ্গে বাবার জড়ানো সংসার, এক এক বেলা মুনীশ -কুটুম-কাজের লোক মিলিয়ে না হোক পঞ্চাশ-ষাট জনের পাত পড়ে। একটা সুবিধা এই, সংসারটা বড় বলে আলাদা করে কারও ওপর তেমন নজর পড়ে
না।
উঠোনে আধ হাত জল দাঁড়িয়ে গেছে। ব্যাং ডাকছে খুব । বারান্দায় দাঁড়িয়ে গামছায় মাথা আর গা মুছছিল শচীন। এমন সময় খুড়তুতো বোন ঢেঁপি এসে বলল , শচীনদাদা , কখন থেকে নবদাদা
এসে তোমার জন্য বসে আছে।
এই যাচ্ছি।
তারা চার ভাই এক ঘরে। ছোট দুই ভাই ইস্কুলে পড়ে । তাদের বড়টি পোকামারা ওষুধের সাপ্লাই দিয়ে বেড়ায়। শচীনের ওপর আরও দু' জন আছে দু'জনেই সংসারী , ছেলেপুলে আছে। তাদের

ঘর আলাদা ।
ঘরে এসে শচীন দেখল, পড়ুয়া দু' ভাই পড়ছে। ন’ ভাই ঘরে নেই। নব শচীনের তক্তপোষের এক ধারে বসে বিরক্ত মুখে বিড়ি ফুঁকছে।
তাকে দেখে বিড়ির শেষটা একটা ভাঁড়ে গুঁজে চৌকির তলায় নামিয়ে রেখে বলল, কখন থেকে বসে আছি।
একটু কাজে বেরিয়েছিলুম। তা কী খবর?
নব আর একটা বিড়ি বের করে অখণ্ড মনোযোগে টিপে টুপে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল। তারপর সেটা ধরাবে কি না, সেটা ভাবতে ভাবতে দেশলাইটা দুবার নাড়া দিল। তারপর বলল, ওদিকে যতীন তো হামাগুড়ি দিচ্ছে।
শচীন মাথা দিয়ে লুঙ্গি গলিয়ে নিয়ে ভেজা পাতলুন ছেড়ে ফেলল । বলল , সে আবার কি?
নব পড়ুয়া দু'জনের দিকে একটু চেয়ে নিয়ে গলাটা নামিয়ে বলল . ওঃ সে এক কাণ্ডই বটে!
শচীন তেমন হেসে পড়ল না, তার মন ভাল নেই। যতীনের খবরে তার কীই বা দরকার? ভেজা পাতলুনটা বারান্দায় দড়িতে ঝুলিয়ে রেখে এল সে। তারপর নবর পাশে বসে খুব উদাস গলায় বলল , কী এমন কাণ্ডটা হল?
বললুম না, যতীন একেবারে হামাগুড়ি দিচ্ছে! নাঃ, শিবানন্দ ঠাকুর এলেম দেখাল বটে! মুখে জানি-জানি না ভাব, কিন্তু তলায়
তলায় সব ক্ষ্যামতা রাখে। বাপ! চোখ আমার খুলে গেছে। বিরক্ত হয়ে শচীন বলল, কী হয়েছে তা বলবে তো!
নব বিড়িটা এবার ধরিয়েই ফেলল। বলল, সেইটে বলতেই তো

বাদলা মাথায় করে আসা। তুই তো সাতদিন আর ও - মুখো হোসনি, জানবি কী করে?
শচীন তেমনি উদাস গলায় বলে, আমার কি এক ঠাই বসে তাকলে চলে ? নন্দীপুরে শ্যামবাবুর পাম্প মেশিন সারাতে গিয়েছিলুম, তারপর তেহাটি শা বাবুদের টিউবওয়েল বসালাম, তারপর...
থাক থাক। মেলা কাজের মানুষ হয়েছিস।
শচীন মৃদু স্বরে বলে, কাজ না করলে কি চলে? আজও ভাল করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারলুম না।
নব বলে, তোর আবার ভাবনা! তুই হলি সব কাজের কাজী। সেই জন্যই তো হল না। একটা নিয়ে লেগে থাকলে হত । হবে হবে। ভাবছিস কেন ? তোর বয়সটাই যা কী? আমার মতো
তো অন্যের দোর ধরে পড়ে থাকতে হচ্ছে না!
এবার কী বলছিলে বলো। যতীন হামাগুড়ি দিচ্ছে, না কী যেন! নব হেসে কুটিপাটি হয়ে বলে, হামাগুড়ি মানে একেবারে গড়াগড়ি ।
সেটা আবার কেমন ?
এখন বউয়ের কথায় উঠছে বসছে। কাছছাড়া অবধি হতে চায় না । আগে তো হাটে-বাজারে, এখানে ওখানেই পড়ে থাকত। এখন দিনের বেশির ভাগ সময়েই বউয়ের আঁচলের তলায়।
খবরটা শুনে শচীনের মনে কোনও ইতর বিশেষ হল না। তা থাক না যতীন বউয়ের আঁচলের তলায় বসে, তাতে কার কী ? শচীন আর ঠাণ্ডা গলায় বলল , অ ।
নব শচীনের ঠাণ্ডা ভাবটা তেমন লক্ষ্য করল না। মুখে গ্যাল গ্যাল করছে একটা হাসি । বিড়িতে একটা টান দিয়ে বলল, শিবানন্দ

ঠাকুরের ক্ষ্যামতাটা এমনিতে বোঝা যায় না। কিন্তু তলে তলে
মকরধ্বজ।
শচীন ফের বলল, অ। তা এতে ক্ষমতাটা কী দেখলে?
নব চোখ বড় বড় করে বলল, উরেব্বাস রে! ক্ষ্যামতা নয় ? বলিস কী রে পাগল? যতীন আর সরস্বতীতে যে ক দিন আগে কুরুক্ষেত্তর হয়ে গেল। তাও আবার ওই শিবানন্দ ঠাকুরকে নিয়েই। যতীনের ভারি রাগ ছিল নাকি সাধুবাবার ওপর। এসে বসে বসে খ্যাঁটন ওড়ায়, বুজরুকি করে বেড়ায় এইসব। তা বাবাজিরও কানে গিয়েছিল কথাগুলো। ফিসফিস করে তো আর বলেনি। তা সেই রাত্তিরেই বাবাজি তল্পিতল্পা গুটোচ্ছিলেন। তখন সরস্বতী যতীনকে গিয়ে কী কানমন্তর দিল কে জানে, যতীন গিয়ে সটান পা জড়িয়ে ধরে পড়ে রইল। বাবাজির আর যাওয়া হল না। তার পর থেকেই যতীন একেবারে ভেড়া।
কানমন্ত্রটা কী?
নব খুব হাসল ফের। বিড়িটা নিবে গিয়েছিল। বিড়ির ওইটেই দোষ, বড্ড নেবে। দেশলাইয়ের শ্রাদ্ধ। ফের বিড়িটা জ্বেলে বলল, নাঃ , সাধুর এলেম আছে। দশটি বছরে যা হল না, তা এবার হল।
সেটা কী ?
সরস্বতীর ছেলে হবে রে!
অ। শচীনের গলা ফের নিরুত্তাপ।
বুঝতে পারলি না বুঝি ?
কী বোঝার আছে? সরস্বতীর ছেলেপুলে হবে, এই তো! নব একটু গরম হয়েই বলল, ছেলেপুলে হবে বলে গা করলি না যে বড়! এমনি হচ্ছে নাকি?
তবে?
সাধুবাবার মন্তরের জোরেই হচ্ছে। কী করে বুঝলে ?
শিবানন্দঠাকুর একদিন আমায় বললে, বাবা আমি তো ওষুধ টষুধ জানি না । সরস্বতীর ছেলেপুলে হচ্ছে না বলে বড় দুঃখ। তা আমি মায়ের কাছে ছাড়া আর কার কাছে চাইব। তাই চেয়েছি। দেখা যাক কী হয় ।
মা-টা আবার কে ?
তা কি অত জানি? মা হলেন গিয়ে জগদ্ধাত্রী। কালীই হবে মনে হয়। তান্ত্রিকরা তো কালীই ভজে।
শচীন উদাস গলাতেই বলে, অ। তা হলে তো ভালই।
ভাল বললে কিছুই বলা হল না। চারদিকে রা পড়ে গেছে এ খবরে। মেলা লোকজন আসছে শিবানন্দঠাকুরের কাছে। টনাটন প্রণামী পড়ছে। আজ সকালে পঞ্চায়েতের রামকিঙ্কর আর হরিপদ এসে অবধি গড় করে গেল। শিবানন্দঠাকুরের হিল্লে হয়ে গেল।
শচীন আলগা গলায় বলল, ভালই তো।
এবার বিড়িটা ফেলে নব একটু ঝুঁকে বসল। গলাটা এক পর্দা নামিয়ে বলল, একটা কথা বলতে আসা।
কী কথা নবদা?
খবর শুনলে বিগড়ে যাস না।
শচীন মলিন একটু হেসে বলে, বলেই ফেল। বিগড়োবো না। আমি বলি কি, তুই চকমকির আশা ছাড় ।
চকমকির নামটা শুনে একটু চমকে ওঠে শচীন। উদাস ভাবটা এক ঝটকায় খসে গেল। একটু অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার বলো তো!

আজই শ্রীপদ এসেছিল শিবানন্দ ঠাকুরের কাছে। চকমকিকে একরকম উচ্চুপ্পুই করে গেল।
তার মানে কি বিয়ে ?
নব একটু হেসে বলে, ওরে পাগল, এ কি আর এমনি বিয়ে রে? ভৈরবের সঙ্গে ভৈরবীর সম্পর্ক। ভেবে দ্যাখ ভাইটি, এতে কত ভাল হবে। শিবানন্দ ঠাকুর তো যাই-যাই করছিল কেবল। পা বাড়িয়েই আছে। কিন্তু এমন একজন গুণী লোককে কি ছেড়ে দেওয়া যায়? সম্পর্কটা হলে একটু বাঁধা পড়বে। শ্রীপদর বাড়িতে দিব্যি আখড়া হবে।
শচীন অবাক হল না। এরকম একটা কথা তো চকমকি শুনিয়েই গেছে। সে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মানুষ যা চায় তা-ই কি পায় ? সে জন্য তার দুঃখ নেই কিন্তু চকমকি যে একটু অন্যরকম চেয়েছিল !
শচীনের দীর্ঘশ্বাসটা নবর কানে গেল। আজ নবর বেশ উত্তেজনা। বিড়ির পিঠে ফের বিড়ি বের করে চাপা গলায় বলল , ওরে, এতে তোর ভালই হবে। ও মেয়ে কি আর তোর সইত, বল? ওসব ডাকিনী-যোগিনী-সিদ্ধ মেয়ে, বাঁধা পড়লে মারা পড়বি। হয়তো একদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখলি, তোর বুকের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে রক্ত শুষে খাচ্ছে। কাজ কি বাপু বিপদের মধ্যে গিয়ে ? শিবানন্দ ঠাকুর নিজে তান্ত্রিক, সামলে নিতে পারবে।
শচীন মাথা নেড় বলে, সবই বুঝলাম নবদা। তা শিবানন্দ ঠাকুর কী বলে ?
কী আবার বলবে? শুনে চোখ বুজে ভোলানাথ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, দেখা যাবে।
আর কিছু নয় ?

না রে না। ওই দেখা যাবে মানেই চকমকি প্রসাদ হয়ে গেল ।
ও আর কারও ভোগে লাগবে না।
শচীন মাথা নেড়ে বলল, বুঝলাম।
টিনের চালে বৃষ্টির শব্দটা হঠাৎ তুঙ্গে উঠে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মিইয়ে যেতে লাগল ।
নব উঠে পড়ল, বৃষ্টিটা ধরেছে, এই বেলা বেরিয়ে পড়ি।
এসো নবদা।
পুরুষমানুষের চোখ মেয়েরা ঠিকই বুঝতে পারে। কার চোখ কোন মতলবে গা চেটে যাচ্ছে তা টের পেতে মেয়েদের লহমাও লাগে না। ওই যে লোকটা রোজ একটু বেলার দিকে এসে তার বাপের দোকানে দুপুর অবধি বসে থাকে ওর চোখ কুসুমকুমারী টের পায়।
পায় বলে কি তার রাগ হয় ? না, সেটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না কুসুম। তার গাঁয়ে জন্মে এত বড়টি হল, কটা পুরুষ আর তাকে দেখে ভুবন ভুলে তাকিয়ে থেকেছে? আজকাল আর বাড়ির বার বড় একটা হয় না কুসুমকুমারী। কারণ বাড়িতে তার অনেক কাজ। উদয়াস্ত কাজ। শ্বাস ফেলার সময় নেই। কিন্তু যখন বাইরে ইস্কুল পাঠশালে যেত তখন পথেঘাটে ঠিক এমনটি হয়নি। তাকায়নি এমন নয়, ফুটও কেটেছে , এমন কি চিঠিও দিয়েছে বটে। কিন্তু তবু এমন লাগামছেঁড়া ব্যাপার নয়। এ লোকটা উদোর মতো
করে চেয়ে যে সারা বেলা তার জন্য চোখের জাল পেতে বসে থাকে এটাই অবাক কাণ্ড। সে জানে এমন কিছু সুন্দরী নয় সে । তবে চলনসই। হ্যাকছিঃ নয়, এই যা। তার চেয়ে তার ছোট বোন চকমকির বরং চটক বেশি। কুসুম একটু খ্যাঁদাবোঁচা, একটু আহ্লাদী চেহারার মেয়ে। চকমকির মুখখানা ভারি কাটা কাটা, নাকখানা চোখা , ঢলঢলে চোখ, পুরন্ত ঠোঁট। তবু লোকটা—মানে ওই গোরাচাঁদ বসে থাকে তার জন্যই।

গোড়াচাঁদের বউ আছে, একটা মেয়ে না ছেলে কী যেন আছে। তবু কুসুমকুমারীর জন্য যে এত পাগল সেইটেই কুসুমকুমারীর গুমোর বাড়িয়ে দেয় আজকাল।
তবে হ্যাঁ , গোরাচাঁদ চেয়ে থাকার বেশি আর এগোয়নি। হয়তো সাহস পায় না, হয়তো তার বাবা শ্রীপদকে ভয় পায়, হয়তো কুসুমকুমারীকেও ভয় পায়। আর একটু এগোলেই সর্বনাশ! এর বেশি বাড়াবাড়ি করলে কুসুমকে উল্টো কিছু করতে হবে। কারণ চোখের পুজো ভাল বটে, কিন্তু নষ্টামি তো কুসুম সইবে না। গোরাচাঁদকে পছন্দ করার কিছু নেই। কুসুম তাকে পছন্দ করেও না। কিন্তু ওই যে চেয়ে থাকে এটা কুসুমের ভারি ভাল লাগে। কীরকম যেন ভাল লাগাটা! মনে হয় যেন আয়নার নিজেকে
দেখে -নেওয়া।
কুসুম অবশ্য রাশ টেনে রাখে। দোকানের পিছনের খোলা দরজাটার সামনে বেশি যায় না। আবার মাঝে মাঝে উঠোন পেরোতে গিয়ে একটু শরীর খেলিয়ে যায়ও।
চকমকিতে আর কুসুমকুমারীতে এই সব নিয়ে কথা হয়। লোকটা এমন হ্যাংলা, জানিস !
চকমকি বলে, তুই বাবাকে বলে দিস না কেন ?
যাঃ, বাবার কি বুদ্ধি আছে? চেঁচিয়েমেচিয়ে পাড়া জানান দিয়ে
বসবে ।
তা হলে কী করবি দিদি ?
কুসুমকুমারী হাসে। বলে, কী আর করব? পুরুষগুলো তো ওরকমই হয় ।
হ্যাঁ রে দিদি, ঠিক কথা ।

তোর পেছনেও লাগে বুঝি ছেলেগুলি? হি - হি করে হেসে চকমকি বলে, খুব। তখন কী করিস ?
পালিয়ে আসি।
হ্যাঁ রে, শচীনের সঙ্গে কি তোর খুব ভাব ?
একটু মলিন হয়ে গিয়ে চকমকি বলে, ভাব হয়ে কী হবে বল !
বাবা যে ওকে একদম পছন্দ করে না।
না।
শচীন ছেলেটা কিন্তু বড্ড ভাল। মুখের দিকে চেয়ে কথা কয়
ওইটাই তো হয়েছে ওর মুশকিল। বড্ড ভীতু আর লাজুক। বাবা সেদিন কত অপমান করল, জুতো মারব, লাথি মারব বলল, তাড়িয়ে দিল , একটা রা করেনি।
ওই জন্যেই তো ভাল।
চকমকির চোখ একটু ছলছল করে শচীনের কথায়। ভাল লোকদের বড্ড কষ্ট। শচীনের মুখখানা ভাবতে ভাবতেই চকমকি ঘুমিয়ে পড়ে। অন্য দিকে কুসুমকুমারীরও ঘুমচোখে গোরাচাঁদের চোখ দু'খানা উঁকি মেরে চেয়ে থাকে। ওই চোরাচোখেরও একটা ভারি সম্মোহন আছে।
বাড়িতে ঘটনা বেশ দ্রুত মোড় ফিরছে আজকাল। সেদিন দুপুরে শিবানন্দ মহারাজ এলেন । তার পর থেকেই সব অন্যরকম। প্রথম দিন শিবানন্দ ভিতরবাড়িতে আসেননি। পরদিন এলেন। তার পর থেকে রোজ, দু' বেলা ।

সাধুর সঙ্গে থেকে থেকে গোরাচাঁদ আজকাল ঢুকে পড়ছে ভিতরবাড়িতে এবং ঘন ঘন চোখাচোখি হচ্ছে কুসুমকুমারীর সঙ্গে। ক্যাবলা মুখ করে মাঝে মাঝে তাকে দেখে হাসছেও গোরাচাঁদ। ভীতু হাসিই। কিন্তু ঘেঁষতে যে চাইছে তাতে ভুল নেই। অবাক কাণ্ড এই যে, কুসুমকুমারীর এতেও তেমন খারাপ লাগছে না। তা বলে সে যে গোরাচাঁদের দিকে ঢলে পড়ছে তা মোটেই নয়। কিন্তু একটু আসকারা দিয়ে ফেলছে।
একদিন শিবানন্দের পিছু পিছু এসে বড় বারান্দায় ভক্ত হনুমানের মতো বসে ছিল। কুসুমকুমারী তখন বারান্দার অন্য কোণে বসে সুপুরির খোলা ছাড়াচ্ছিল। হঠাৎ ফাঁক বুঝে উঠে এসে গোরাচাঁদ চাপা গলায় বলল, একটু জল খাওয়াবে? বড্ড তেষ্টা পেয়েছে যে !
এই প্রথম কথা কুসুমকুমারীর সঙ্গে। জল দেওয়ার সময় ফের সেই ক্যাবলা হাসি। এই জল চাওয়া, ওই হাসি এসব কে না বোঝে বাপু ? তবু কুসুমকুমারী বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না যে, তার কিছু খারাপ লেগেছে। হামাগুড়ি দিয়ে পুরুষটা এগোচ্ছে তার দিকে। ঝাঁপিয়ে পড়বে নাকি ?
ঘটনা মোড় নিচ্ছে অন্য দিকেও। শ্রীপদর বড্ড পছন্দ শিবানন্দবে । শ্রীপদর বউ নিভাননিরও পছন্দ । দু'জনে কথা হতে হতে কথাটা বেরিয়ে পড়ল। বাড়িতে আখড়া হবে। শিবানন্দ আর চকমকি মিলে সাধনভজন করবে। শ্রীপদর ধারণা, দুটো পয়সা আসবে তাতে। খাতির বাড়বে গাঁয়ে।
এ প্রস্তাবে কুসুমকুমারী অবাক হল না। এরকম তো হতেই পারে। দু' বোনে এক বিছানায় শোয়। রাতে কুসুম চকমকিকে বলল, শুনেছিস ?

চকমকি শুকনো গলায় বলল, শুনেছি। কী করবি ?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চকমকি বলল, মেয়ে হয়ে জন্মানোটাই ভুল হয়েছে রে দিদি ।
তা আর বলতে! তবে শিবানন্দ মানুষ তো বড্ড ভাল। খারাপ বলেছি?
কুসুমকুমারী খুব আস্তে করে বলে, খারাপ হবে না, দেখিস। চকমকি চুপ করে থাকে। জীবনের ভাল মন্দ সে কিছুই জানে না । কেন তাকে একাদশীর ভূত এসে মাঝে মাঝে ধরে তাও কি সে জানে? সে কি সত্যিই জানে, সে সিদ্ধাই না আর কিছু? জানে না বলেই সারা দিন তার মাথায় হাজার চিন্তা ভোমরার মতো ঘুরে বেড়ায়। তার সব সময় আজকাল পাগল- পাগল লাগে, সবসময় কান্না পায়।
আমি এরকম কেন হলাম রে দিদি ? আর পাঁচজনের মতো কেন
হলাম না ?
কুসুমকুমারী বোনের গালে হাত বুলিয়ে আদর করে বলল, আমি যদি তোর মতো হতাম তবে বেশ হত । আমার তো তোকে হিংসে
হয়।
আমার কিন্তু বড্ড ভয় - ভয় করে। আচ্ছা আমি কি সিদ্ধাই, না আমাকে ভূতেই ধরে, না কি আমার মৃগী রোগ আছে, বল তো!
শিবানন্দ ঠাকুর কিছু বলেনি তোকে?
না তো! উনি তো কেবল হাসেন। কিছু বলেন না। জিজ্ঞেস করে দেখিস।
জিজ্ঞেস করতেও ভয় লাগে। কে জানে বাবা কী বলে দেবে।

কুসুমকুমারী একটু ভেবে বলে, আমার মনে হয় তুই সিদ্ধাই। কী করে বুঝলি?
তোর যখন ভর হয় তখন তুই বিড়বিড় করে মন্তর বলিস । মন্তর তো তুই শিখিসনি, তা হলে বলিস কী করে? সিদ্ধাই ছাড়া কি
ওরকম হয়?
চকমকি বলে, উহুঁ, আমি মন্তর বলি না তো !
তা হলে কী বলিস ?
তা জানি না। তখন আমার অনেক কথা আসতে থাকে। অনেক কথা। একাদশীর মুখটা দেখতে পাই তখন। আর বলি, হে ঠাকুর, আমার যেন একাদশীর মতো গলায় দড়ি দিতে না হয়। হ্যাঁ রে দিদি, আমাকে বোধহয় ভূতেই পায়।
চকমকির মাথার চুলে বিলি কেটে কুসুমকুমারী বলে, শিবানন্দ ঠাকুর ভূতপ্রেত সব তাড়িয়ে দেবে, দেখিস।
কথাটা বিশ্বাস হয় চকমকির। আবার হয়ও না , তার কেবল মনে হয়, কেউ কিছু করতে পারবে না তার। একাদশী কি তাকে ডাকে ? তাকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়তে বলে ? তার বড্ড ভুল হয়েছিল একাদশীকে দেখতে যাওয়ায়, সজনে গাছ থেকে ঝুলছিল একাদশী। সে এক বিচ্ছিরি কাণ্ড । দেখেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল চকমকি । তার পর থেকেই ঝিমুনির ভাবটা এলেই একাদশীর মুখটা চোখের সামনে ভাসে । এলো চুল, বড় বড় চোখ। একাদশী তার সঙ্গে কথা কয় তখন, যেমন বেঁচে থাকতে বলত। কী কথা তা সবসময় বোঝা যায় না, পরে মনেও থাকে না। কিন্তু কী যেন তাকে বলতে চায় একাদশী।
দিদি, ঘুমোলি?

না, ভাবছি। কী ভাবছিস ?
কত কথা! তোর কথাই বেশি ভাবি।
আমার যে কী হবে রে দিদি !
ভালই হবে। ভাবছিস কেন ?
আমার যে যোগিনী হতে ইচ্ছে যায় না।
কী ইচ্ছে যায়?
এই লেখাপড়া করতে, খেলতে, বন্ধুদের সঙ্গে বসে গল্প করতে। সে তো সবাই করে। আমিও করি। তাতে লাভ কী বল তো! বিয়ে হয়ে গিয়ে শ্বশুরবাড়িতে হাঁড়ি ঠেলব তো, তার বেশি আর কী হবে? তোর জীবনটা হবে অন্যরকম ।
আমার তবু ইচ্ছে যায় না।
চকমকির চোখের সামনে শচীনের কাতর মুখখানা ভেসে থাকে। বড্ড ভীতু আর ভাল, কিন্তু কাজের নয় একদম । তবু ওই শচীনের কথা ভাবলে তার বুকটা যেন একটু ঠাণ্ডা হয় , জ্বলুনিটা কমে।
অন্য দিকে কুসুমের অন্যরকম। সে দুটো চোরা চোখের চাউনি দেখতে পায় আধো-ঘুমে । গোরাচাঁদ কী চায় সে জানে। পষ্টাপষ্টি চায়নি এখনও, তবে এবার চাইবে। কী করবে কুসুমকুমারী? মা গো, ভাবতেও গা শিরশির করে, তবু তাকে ওই একজনই তো চায়। মনপ্রাণ দিয়েই হয়তো চায়। আর কেউ ওরকমভাবে তো চায়নি কখনও। পুরুষমানুষকে বিশ্বাস নেই, ঠিক কথা। আবার, শুধু বিশ্বাসেই কি সব হয়? বিশ্বাস করার মতো হলে কি আর এই গা ছমছম করা শিরশিরানি হতে পারত?
আজকাল শিবানন্দ সাধুর পসার বেড়েছে। সঙ্গে তার লোকজন জুটেছে। ভক্তিশ্রদ্ধা করছে মানুষ। তাবিজ-কবজ-মাদুলির বায়না হচ্ছে খুব। সকালে শিবানন্দ যখন এসে শ্রীপদর ভিতরবাড়ির বারান্দায় মোড়া পেতে বসত তখন তার সঙ্গে জনা পাঁচ-সাত লোক । তাদের গাঁয়ের পঞ্চায়েত গোবিন্দ হালুই অবধি আছে।
কুসুমকুমারী শতরঞ্জ পেতে দিল সবার জন্য। ওরই ফাঁকে চোখাচোখি হল গোরাচাঁদের সঙ্গে। চাপা হাসি। কে জানে কেন আজ কুসুমকুমারীও হাসল একটু । এরকম একটু দানধ্যান না করলে কি হয় ?
শ্রীপদ দোকান ছেড়ে শশব্যস্ত উঠে এল ভিতরে। লোকজন দেখে শ্রীপদর মুখে আর হাসি ধরে না। বাবাজির বাজার তা হলে ভালই বলতে হবে। হচ্ছে, হচ্ছে, বেশ গরম হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। মেয়েটা সুখেই থাকবে। সংসারেরও একটু সুসার হবে।
গোবিন্দ বেরিয়ে এসে শ্রীপদর কনুই ধরে ফেলল। তারপর উঠোনে একটা কোণে ঠেলে এনে দাঁড় করিয়ে বলল, বাবাজির সঙ্গেই নাকি চকমকির বিয়েটা দিচ্ছ শুনলাম।
জিব কেটে শ্রীপদ বলল, বিয়ে বলতে নেই। বিয়ে কি আর ওঁদের হয় ! বাবাজি চকমকিকে সাধনসঙ্গী হিসেবে নেবেন।
ঘরজামাই হিসেবেই থাকবেন তো!
ছিঃ ছিঃ , তোমার মুখ না আঁস্তাকুড়? ঘরজামাই আবার কী? এ বাড়ি ওঁদের সাধনপীঠ হবে, এ আমার বাপের ভাগ্যি।
গোবিন্দ একটু থতমত খেয়ে বলল, কিছু মনে কোরো না ভায়া, আমাদের কি ওসব ভাষা জানা আছে। বুঝিই বা কতটুকু। তবে এ বেশ ভালই হল। বাবাজিকে এ গাঁয়ে বেঁধে ফেলতে পারলেই মঙ্গল। লাগিয়ে দাও এবার।

মহা আহ্লাদে শ্রীপদ বলে উঠল, এগুচ্ছে ! এগুচ্ছে !
ওদিকে ভিতরের বারান্দায় ভারি লাজুক মুখ করে শিবানন্দ বসা।
বারবার মাথা নাড়ছে আর বলছে, বড্ড ভুল হচ্ছে আপনাদের। বড্ড ভুল হচ্ছে।
হরিপদ নামে গাঁয়ের মাতব্বর বলে উঠল , আজ্ঞে যা বলেছেন। আমাদের সব কাজেই ভুলভাল। আপনি আছেন এই এক ভরসা। ভুল ধরিয়ে দেবেন।
কেদার বলে উঠল , আজ্ঞে বাবাজি, সবই আপনার ইচ্ছে। শিবানন্দ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কদরও বাড়ে। এ হল সেই দৃষ্টান্ত।
কিছু না বুঝেই হরিপদ বলল, বড় ঠিক কথা
এমন সময় একটা লোক নবর পিছু পিছু এসে ঢুকল। নব বিগলিত হয়ে বলল, বাবাজি , এই ইনি হলেন মুন্সিহাটের সীতাপতি সাঁতরা। মস্ত তামাকের আড়ত।
বসেন বাবা বসেন। শিবানন্দ হাতজোড় করে তটস্থ।
সীতাপতি যেন ভক্তিমার্গের লোক নয় । পেন্নাম টেন্নামের ধার দিয়েও গেল না। বরং একটু তেড়া ঘাড় করে দাঁড়িয়ে বাবাজিকে তীক্ষ্ণ চোখে দেখে নিয়ে বলল , তা বাবাজি, আপনার কারবারটা কী বলুন তো!
কোণের দিকে গোরাচাঁদ একটু সিঁটিয়ে বেড়ার ধারে সরে বসল। শিবানন্দের মুখে সেই সরল হাসি, কাজ কারবার কিছু নাই বাবা। সীতাপতি একটু গরম গলায় বলে, আমার জামাই গোরাচাঁদ আপনার কাছে ঘুরঘুর করে বলে শুনলাম। তার মতলব কি জানা আছে বাবাজির?

সীতাপতির গলার স্বরটা তেমন ভাল ঠেকল না কারও কাছে। একটু উসখুস করছে সবাই।
শিবানন্দ মাথা নেড়ে বলে, আজ্ঞে না বাবা, আমি তো মনের কথা পড়তে পারি না !
সীতাপতি চাঁছাছোলা গলায় বলল, জানেন না তা কি হয় ? তার মতলব কিন্তু ভাল নয় বাবাজি, এই বলে রাখলাম। এক তান্ত্রিককে ধরে বাণ মারিয়েছিল আমার মেয়েকে মারবে বলে। সে বুজরুকিতে কাজ হয়নি। তারপর গোবিন্দপুরের নন্দ মণ্ডলকে লাগিয়েছিল খুন করাতে। প্রমাণ চান? নন্দ সবই কবুল করেছে আমার কাছে। সেও আমার সঙ্গেই এসেছে, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে । ও নব, নন্দকে ডেকে আনো তো!
সবাই একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। নব শশব্যস্তে নন্দকে ডাকতে যাচ্ছিল, সেই সময় হঠাৎ উঠে গোরাচাঁদ তাকে একরকম ধাক্কা দিয়েই লাফ মেরে উঠোনে পড়ে পিছনের কচুবন আর আদার পাঁদার ভেঙে যে দৌড়টা দিল তা দেখার মতোই।
দৌড়টা কুসুমকুমারীও দেখল। মুখখানা গম্ভীর হয়ে গেল তার। যে শিরশিরানিটা হচ্ছিল সেটা ঘাম দিয়ে ছেড়ে গেল যেন! ওফ্‌, পাষণ্ড বটে তো!
নন্দ মণ্ডল এসে সটান কাটা কলাগাছের মতো শিবানন্দর সামনে পড়ে গিয়ে বলল, আমি মহা পাপী বাবা। মেলা লাশ নামিয়েছি।
রক্ষে করুন।
ঘরে একটা দিশি মদের কাঁচা গন্ধ ঘুলিয়ে ওঠে । নন্দ ভালমতোই চাপান দিয়ে এসেছে।
শিবানন্দ আতান্তরে পড়ে বলে, উঠুন বাবা উঠুন। অমন করতে নেই ।
সীতাপতি বলে , দেখলেন তো, জামাই কেমন পালাল ? আপনার কাছেও ঘুরঘুর করছে ফের আমার মেয়েকে বাণ-টান মারার জন্য।
ওসব যে আমি জানি না বাবা।
লোকে বলছে আপনি নাকি মস্ত সাধু, মেলা কিছু জানেন। কিন্তু আমার মেয়ের যদি কিছু হয় বাবাজি, তা হলে আমিও সীতাপতি সাঁতরা, ছেড়ে কথা কইব না । আর ওই শালার ব্যবস্থাও আমি করছি। ওরে নন্দ , ওঠ, ওঠ। মেলা কাজ আছে।
নন্দ ভেউ ভেউ করে কাঁদতে কাঁদতে উঠে পড়ল।
সীতাপতি বেশ হাঁকডাক করেই বলল, বিয়ের সময় দশটি হাজার টাকা নগদ , এগারো ভরি সোনার গয়না, খাট পালঙ্ক, আলমারি, সাইকেল কী না দিয়েছি শালাকে! এই তার প্রতিদান ! ক'দিন ধরেই মেয়ে বলছে বাবা, তোমার জামাইয়ের ভাবখানা কেমন কেমন দেখছি । আমার ভাল মনে হল না। প্রথমে গা করিনি। তারপর শীতলাহাটে নন্দ এসে আমাকে ধরল। মদ খাওয়ার পয়সা চায় । সেই কড়ারে গুপ্ত কথা ফাঁস করেছিল বলেই বাঁচোয়া। শুনে রাখুন বাবাজি, ও জামাইশালা পালিয়ে বাঁচবে না। ওর পিঠের চামড়া তুলে ডুগডুগি বানাবো, বুঝলেন! বদ লোককে যারা প্রশ্রয় দেয় তারাও লোক খারাপই হয় । আপনিও তৈরি থাকুন।
সীতাপতি যেন একটা ঝড় তুলে গটগট করে বেরিয়ে গেল। আচমকা ঘটনায় সবাই একটু ভোম্বল হয়ে গেছে। হকচকানো ভাবটা কাটিয়ে প্রথম লাফাটা শ্রীপদই। চেঁচিয়ে বলতে লাগল, এঃ, দুটো পয়সা হওয়াতে একেবারে আঙুল ফুলে কলাগাছ! দু'দিন আগেও কেউ সীতাপতি সাঁতরার নামটাও জানত না। আজ বড়

মুরুব্বি হয়েছেন!
গোবিন্দ পোঁ ধরে বলল , আরে হ্যাঁ, হ্যাঁ , ওর মুরোদ খুব জানা আছে। পঞ্চায়েতে জিতে মাথাটাই ঘুরে গেছে দেখছি।
হরিপদ রীতিমতো রাগের গলায় বলল, দেন বাবাজি, শালাকে একখানা মোক্ষম বান মেরে, শালা রক্তবমি হয়ে ফেঁসে যাক ।
যে যাই বলুক, বোঝা যাচ্ছিল সীতাপতি সাঁতরা কঠিন লোক। ধনবল, জনবল আছে। নইলে গাঁ বয়ে এসে তড়পে যেতে পারত না।
অবিচল শুধু শিবানন্দ। বারবার মাথা নেড়ে নরম গলায় বলতে লাগল, আমি কি জানি! আমি কি কিছু জানি! আমার যে ক্ষমতা বলতে কিছু নাই।
একটু চাপা গলায় কেদার বলল, বাবাজি, ওই গোরাচাঁদের মতলবও কিন্তু ভাল নয়। নিতাই পাইক তার বন্ধু লোক। তার কাছেই সব শুনেছি। বলব গোরাচাঁদের কীর্তি ?
কেদার বলতেই যাচ্ছিল, এমন সময় ঘর থেকে শ্রীপদর বউ চেঁচিয়ে উঠল , ভর হয়েছে! ভর হয়েছে ।
চকমকির মাথার মধ্যে রিমঝিম শব্দ হচ্ছিল। ধীরে ধীরে চোখ আবছা হয়ে আসছে। আর চোখের সামনে ভেসে উঠছে একাদশীর মুখ। এলো কোঁকড়া চুল, বড় বড় চোখ।
চকমকি বিড়বিড় করছিল, একাদশী তুই আমায় নে।
একাদশী বলল, আচ্ছা, আমি কী দোষ করেছিলুম, বল তো। জামতলায় খাপড়া খেলছিলুম, মা চুলের মুঠি ধরে টেনে এনে এমন মার মারল। বলল, মর পোড়ামুখি, তুই মরলে আমার হাড় জুড়োয় ।

রোজ কেবল মরতে বলত। আমি ভাবলুম, একবার মরেই দেখি, মা তখন চোখের জলে বুক ভাসায় কি না , নাকি মা আমার সত্যিই পাথর !
একাদশী, তুই কি কাঁদছিস নাকি?
কাঁদব না? মরে যে ভুল করে ফেললাম! মা কী কান্নাই কাঁদল বুক চাপড়ে, ও একাদশী , তুই ফিরে আয়। জন্মের শোধ আর কোনওদিন যদি তোকে কিছু বলি।
আমারও যে তোর মতো মরতে ইচ্ছে যায়।
মরে গেলেই অক্কা, বুঝলি! তখন সব ফক্কা। মরবি কেন ? জামতলায় খেলবি না? বড় হবি, ছেলেপুলে হবে, কত মজা! আমার কিচ্ছু নেই। কিচ্ছু নেই।

মহেশতলা শ্মশান জায়গা খারাপ নয়, বুঝলেন বাবা। কালীমন্দিরের চাতালে ছাউনি আছে। দিব্যি থাকা যায়। পুরুত - পাণ্ডা মাঝে মাঝে জুলুম করে বটে, সয়ে নিলেই হয়। মাতাল বদমাশ বাবুরাও আসেন টাসেন, তা তাদের আগমন হলে একটু তফাত হতে হয়। আর কোনও ঝামেলা নেই ।
নব কাঁদো কাঁদো মতো হয়ে বলল, তা হলে আমাদের কী হবে?
কেন বাবা, আপনার দুঃখ কী? কাজকাম আছে, সংসার আছে। সংসার যে নরক বাবাজি, নইলে আপনি পালাচ্ছেন কেন? জিব কেটে শিবানন্দ বলে, উরে বাবা, সংসারকে নরক ভাবতে আছে ? সংসারীরা না থাকলে সাধুই কি বাঁচে? সংসারী যে অন্নবস্ত্রের জোগানদার। লোটাটা, কম্বলটা , কমণ্ডুলুটা, ধুনির কাঠটা, চাল ডালটা, এমন কি নেংটিটা অবধি কারা যোগায় বাবা? সংসারীরা না থাকলে সাধুর জারিজুরি কি খাটে? অমন ভাবতে নেই বাবা। নব দুঃখ করে বলল , দিব্যি পসারটা হচ্ছিল আপনার। লোকজন আসা-যাওয়া করছিল। দিলেন সব ভণ্ডুল করে।
শিবানন্দ ফের জিব কেটে হেসে ফেলল , বলল, মরেছিলাম আর কি! আপনারা ঢোল সহবৎ লাগিয়ে দিয়েছিলেন বাবা! আমার কি

ওসব সয় ? আমি বড় অপদার্থ লোক বাবা। কিছুই জানা নাই আমার, লোকে সিদ্ধাই বানিয়ে বসেছিল আর কি! মারা পড়তে হত বাবা ।
সরস্বতী বসে বসে এতক্ষণ চোখের জল ফেলছিল। পাশে হাতজোড় করে যতীন বসা। ধরা গলায় বলল, কিছু জানি না, কিছু জানি না যতই বলুন, আপনার মহিমা ধরে ফেলেছি মামাবাবু। নতুন পাকা ঘর উঠছে আমার, সঙ্গে লাগোয়া চানঘর। পাকাপাকি থাকবেন তো বলুন, না হয় লেখাপড়া করে দিচ্ছি।
শিবানন্দ খুব হাসল দুলে দুলে। বলল, আসা-যাওয়া হবে 'খন বাবা। ঘর আমার আর্যে নেই। তুমি যে -সাধুকে ঘর দিতে চাও বাবা, আমি যে সেই সাধুই নই। এটা কাউকে বোঝানো যাচ্ছে না বলেই পালাচ্ছি। কবে ধরা পড়ে কিল খাব।
নবর পিছনে মুখ নামিয়ে শচীন বসা। এতক্ষণ কথা কয়নি। শিবানন্দ তার দিকে চেয়ে বলল, শ্রীপদবাবাকে মিছে কথা কইনি বাবা, সত্যিই আপনাদের রাজযোটক ।
শচীন মুখ তুলে ক্ষীণ একটু হেসে বলে, এই যে বলেন আপনি জ্যোতিষী জানেন না !
মাথা নেড়ে শিবানন্দ বলে, বর্ণ-টর্ণ ঠিক আছে, মনের মিলমিশ আছে, রাজযোটক ছাড়া আর কী? এর জন্য জ্যোতিষী জানার
দরকার হয় না ।
শ্রীপদখুড়ো কিন্তু খুশি নয়। গনগন করছে।
জানি । শ্রীপদবাবার অন্য ইচ্ছে ছিল যে । কিন্তু তাই কি হয়?

শচীন ফের মুখ নামাল। শিবানন্দ বাবাজির জন্য আজ তার মনটা খারাপ লাগছে। তবে মহেশতলা শ্মশান বেশি দূরে নয়। গিয়ে হাজির
হওয়া যাবে মাঝে মাঝে।
হরনাথ ভট্টচার্য শ্রীপদর দোকানে চৌকিতে বসে পঞ্জিকা দেখছিল। চোখে চশমা। শ্রীপদ খদ্দেরের জন্য বাতাসা মাপছে।
হরনাথ বলল, শ্রাবণটা তো গেল, ভাদ্র আশ্বিন মল মাস। সেই অগ্রহায়ণ। চৌঠা একটা দিন আছে।
শ্রীপদ বাতাসার ঠোঙায় সুতলি জড়িয়ে তেতো গলায় বলল, হুঁঃ, রাজযোটক না হাতি। বাবাজি বলল বলে মানলুম, কিন্তু ছোঁড়াটার তো গতিক ভাল বুঝি না। বড় সংসার, মেয়েটাকে খাটিয়ে মারবে।
হরনাথ ভটচায চশমাটা খুলে খাপে ভরে বলে, ছেলে খারাপ নয়। বিয়েটা লাগিয়েই দাও। গতকালও আজুর মাঠে সাঁঝের মুখে তোমার মেয়েকে সাইকেল চালাতে দেখেছি, পিছনে ওই শচীন ছোঁড়া দৌড়চ্ছিল। মেয়েসন্তান যখন সাইকেল চালাচ্ছে তখন আর বাকিটা থাকছে কি? বিয়েটা লাগিয়ে হাত ঝেড়ে বসে থাকো।
সাইকেলের কথাটা শ্রীপদর কাছে নতুন নয়। আরও দু'-চার জনের কাছে শুনেছে। গা-টা রাগে রি- রি করে বটে, কিন্তু কিছু বলছে না শ্রীপদ।
মুখে শ্রীপদ বলল, হুঁঃ ।
এক ময়দার খদ্দের এল। শ্রীপদ ময়দায় ডুব দেওয়ার চেষ্টা
করল । জগৎ সংসার যত ভুলে থাকা যায় ততই ভাল। ছুঁড়ি কোথায় গুছিয়ে ভৈরবী হয়ে বসবে, ভক্তের লাইন লেগে যাবে সমুখে, তা না, ছুঁড়ি সাইকেল চালাচ্ছে। চালাক গে, মরুক গে । শ্রীপদ অখণ্ড
মনোযোগে ময়দা মাপতে লাগল।
অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%