শিশির বিশ্বাস

বিগত বিংশ শতকের মধ্যপর্বে এক জুন মাসের বিকেল। খানিক আগে সামান্য বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তার জল এখনও শুকোয়নি। হংকং শহরের গরম তাতে কমেনি অবশ্য। কৌলুনের দিকে নাথান রোডের উপর মস্ত এক বাড়ি, চুকিং ম্যানসন। হংকং শহরের আর পাঁচটা রাস্তার মতো এই নাথান রোডও যথেষ্টই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ব্যতিক্রম এই চুকিং ম্যানসন। নোংরা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। সামনে ফুটপাতের উপর অস্থায়ী দোকানের সারি। হকারের দল সস্তা জামা–কাপড়, ছাতা, ব্যাগ সাজিয়ে বসে আছে। দরদাম, চিৎকার-চ্যাঁচামেচি। ওরই ভিতর সরু গলির ভিড় ঠেলে টুং–টাং শব্দে রিক্সাও যাওয়া–আসা করছে। সব মিলিয়ে জায়গাটা যথেষ্টই জমজমাট।
চুকিং ম্যানসনের উপর তলাগুলো বসবাসের জন্য ব্যবহার হলেও নীচতলার পুরোটাই দোকান। গোটা কয়েক চিনা রেস্তোরাও রয়েছে। তাদের একটা পিং পিং। খুব বড়ো নয়। তবে ছিমছাম। নাথান রোড পার হয়ে পিং পিং রেস্তোরাঁর দিকে এগিয়ে আসছিল এক তরুণ যুবক। বয়স বছর তিরিশের মধ্যে। টকটকে ফর্সা রং। ইস্পাতের মতো ছিপছিপে শরীর। পরনে রং-ওঠা জিনসের প্যান্ট। চওড়া বেল্ট। গায়ে লাল রঙের একটা সুতির গেঞ্জি। যুবকটি দরজা ঠেলে সোজা ঢুকে গেল রেস্তোরার ভিতর।
কাউন্টারের ওধারে মাঝবয়সী যে চিনা ভদ্রলোকটি বসে ছিলেন, যুবকটিকে দেখেই শশব্যস্তে উঠে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে বললেন, “হাই প্যাট, অনেক দিন পরে দেখছি! কোথাও গিয়েছিলে নাকি? দেশে?”
উত্তরে যুবকটি যে-ভাবে মাথা নাড়াল, তার অর্থ হ্যাঁ বা না দুটোই হতে পারে। তারপর সামান্য ঝুঁকে গলা নামিয়ে বলল, “লিন, আমার খোঁজে আজ কেউ এসেছিল?”
উত্তরে লিন নামে কাউন্টারের বয়স্ক ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন। না। কেউ আসেনি।
আগন্তুক এবার কাউন্টারের উপর রাখা খোলা রেজিস্টারের উপর সামান্য চোখ বুলিয়ে বলল, “তিন নম্বর সেল দেখছি ফাঁকা আছে। যা-হোক কিছু একটা পাঠিয়ে দাও ওখানে। খুব তাড়াতাড়ি। আর কেউ যদি এর মধ্যে আমার খোঁজে আসে, তো পাঠিয়ে দিয়ো।”
কথা শেষ করে যুবকটি এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত পায়ে হলঘর পার হয়ে ওধারে তিন নম্বর খুপরির পর্দা ঠেলে ঢুকে পড়ল। তারপর আরামে চেয়ারে বসে একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েস করে মৃদু ধোঁয়া ছাড়তে লাগল। খাবার অবশ্য এসে গেল অল্প সময়ের মধ্যেই। বাটি ভর্তি পছন্দের নুড্ল্ স্যুপ। সঙ্গে সামান্য প্রন আর স্যালাড। অযথা দেরি না করে আধখাওয়া সিগারেট আ্যসট্রেতে গুঁজে দিয়ে প্লেটে রাখা চপস্টিকস্ দিয়ে যে-ভাবে খেতে শুরু করল তাতে বোঝা যায়, চিনা না হলেও মানুষটি এই ব্যাপারে যথেষ্টই দক্ষ।
খাওয়া তখন শেষ না হলেও প্লেটে সামান্যই বাকি, দরজার পর্দা সরিয়ে ভিতরে উঁকি মারলেন স্বয়ং লিন। দুই চোখে যথেষ্টই উদ্বেগের চিহ্ন, “প্যাট তোমার টেলিফোন। বিশেষ জরুরি।”
খাওয়া থামিয়ে মানুষটি সামান্য চোখ তুলল, “লিন, ওকে বলো দশ মিনিট বাদে ফোন করতে। আর চট করে কফি পাঠিয়ে দাও।”
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে লিন সামান্য ইতস্তত করে গলা নামিয়ে বললেন, “প্যাট, ফোন করেছেন খোদ ‘জেড’। ধরলেই ভাল করতে।”
বলা বাহুল্য জেড একটি সাংকেতিক নাম। এবং ব্যক্তিটি যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, সেটা লিনের দুই চোখে উদ্বেগ আর কথার ধরনেই বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু প্যাটের মনোভাবে বিশেষ পরিবর্তন হল না। আরামে চিবোতে চিবোতে বলল, “চিন্তার কারণ নেই লিন। গরজটা আমার নয়, জেডের। সুতরাং যা বললাম তাই কর।”
অগত্যা সামান্য ইতস্তত করে লিন পর্দা নামিয়ে চলে গেলেন। তারপর কাউন্টারে ফিরে কাঁপা হাতে টেলিফোনের নামানো হ্যান্ডসেট তুলে নিয়ে ঢোক গিয়ে বললেন, “সার প্যাট খাচ্ছে। আসতে চাইল না। দশ মিনিট পরে ফোন করতে বলল।”
অন্য প্রান্ত থেকে কোনও জবাব এল না। কেটে গেল লাইন। প্রায় হাঁফ ছেড়ে লিন-ও নামিয়ে রাখলেন টেলিফোন।
ঘড়ি ধরে ঠিক দশ মিনিট বাদেই আবার ফোন বাজল। লিন এবারও দেরি না করে হন্তদন্ত হয়ে ছুটলেন তিন নম্বর সেলের দিকে। খাওয়া শেষ করে প্যাট ইতিমধ্যে একটা সিগারেট ধরিয়েছে। ধীরে-সুস্থে উঠে কাউন্টারে গিয়ে আমেজে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে টেলিফোন তুলে বলল, “প্যাট বলছি।”
ওধার থেকে ভারী গলায় উত্তর এল, “ইদানীং তোমার বেয়াদবি কিছু বেড়েছে দেখছি!”
উত্তরে প্যাট কোনও কথা বলল না। শুধু চোয়াল দুটো মুহূর্তের জন্য সামান্য শক্ত হয়েই মিলিয়ে গেল। সামান্য নীরবতার পরে ও-প্রান্তে সেই ভারী গলা, “হায়াত হোটেলের ২০৩ নম্বর রুমে আমি আছি। এখুনি চলে এসো। রেস্তোরার বাইরে নীল রঙের টয়েটো রয়েছে তোমার জন্য।” কথা শেষ হতেই লাইন কেটে গেল।
ধীরে-সুস্থে এবার টেলিফোনটা নামিয়ে রাখল প্যাট। লিন হাঁ-করে তাকিয়ে দেখছিলেন। গলা নামিয়ে বললেন, “তোমার এই বেপরোয়া স্বভাবটা একটু পালটাও প্যাট। অকারণে কোন দিন টেঁসে যাবে!”
প্যাট ওর দিকে তাকিয়ে সামান্য বাঁকা হাসল। তারপর পকেট থেকে পার্স বের করে দুটো নোট কাউন্টারে রেখে বেরিয়ে পড়ল।
চুকিং ম্যানসন থেকে সামান্য এগিয়ে রাস্তার উল্টো দিকে বিশাল হায়াত হোটেল। হেঁটেই যাওয়া যায়। তবু গাড়িতে গেলে কিছু সুবিধাই হয়। কারণ হায়াত হোটেলের নীচের দুটো তলায় বাজার, দোকানপাট। আসল হোটেল তিনতলা থেকে। ঢালু এক বাঁকানো ফ্লাইওভার সোজা চলে গেছে তিনতলায় হোটেলের লবির দিকে। তবে সেই পথ শুধুই গাড়ির জন্য। দোকানপাটের মাঝ দিয়ে সিঁড়ি ধরে হেঁটে উঠতে কিছু সময় লাগে। ঝামেলাও।
পিং পিং থেকে বেরিয়ে নীল রঙের টয়েটো গাড়িটা দেখতে পেলেও প্যাট সেদিকে এগোলো না। ব্যস্ত নাথাল রোডের জেব্রা ক্রসিংয়ের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে চলল।
খানিক বাদে হোটেলের নির্দিষ্ট ঘরের সামনে এসে দেখল দরজায় বাইরে লাল বাতি জ্বলছে। আলতো করে পরপর তিনবার বেল টিপল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভারী দরজা সামান্য ফাঁক হল। প্যাট ঘরে ঢুকে দেখল ভিতরে জনা পাঁচেক সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে স্বয়ং জেড বসে আছে। এদের কেউই প্যাটের অপরিচিত নয়। একসঙ্গে বহু কাজে সামিল হয়েছে। কাছের মানুষ। ব্যতিক্রম শুধু লি পিং। রোগা লিকলিকে চেহারা। দেখে মনে হবে ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। কিন্তু কুতকুতে দুই চোখে শয়তানের দৃষ্টি। প্যাট তাই ওর নাম দিয়েছে নরকের শয়তান। লি পিং হংকং শহরের কুখ্যাত মাফিয়া জেডের শুধু সর্বক্ষণের সহচরই নয়, পার্সোনাল অ্যাসিটেন্ট, প্রধান পরামর্শদাতা —সবকিছু।
প্যাট ঘরে ঢুকতেই লি পিং বলল, “এসো ভাইটি। আমরা কিন্তু তোমার জন্য অনেকক্ষণ ধরে কড়িকাঠ গুনছি।”
লি পিংয়ের কথা এ-রকমই মিষ্টি। অথচ ভিতরে ছুরির শান। প্যাট অবশ্য নির্লিপ্ত-ভাবে একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল, “অনেকক্ষণ নয়, মাত্র বাইশ মিনিট। সময়টা মিলিয়ে নিতে পারো। কিন্তু আমার ব্যাপারটা তোমাদের মনে আছে বলে তো মনে হচ্ছে না। অনেক দিন হয়ে গেল।”
এমন বাঁকা উত্তরেও লি পিং একটুও রাগল না। আরও মোলায়েম গলায় বলল, “রাগ কোরো না ভাইটি। সে-জন্যই তো তোমাকে ডাকা হয়েছিল আজ। কিন্তু অযথা দেরি করে বসের মেজাজটা গরম করে দিলে।”
“সত্যি!” এই এতক্ষণে প্যাট আগ্রহে লি পিংয়ের দিকে তাকাল। বুঝবার চেষ্টা করল, লোকটার কথা কতটুকু খাঁটি। কিন্তু বলা বাহুল্য ব্যর্থ হল। কুতকুতে চোখে নিঃশব্দে হাসছে লোকটা। দেখে ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে গেল। অন্য সময় হলে জবাবটা অন্য রকম হত। কিন্তু অনেক কষ্টে সে-ইচ্ছে দমন করে অদূরে জেডের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “সরি বস।”
জেড অবশ্যই সাংকেতিক নাম। লোকটার আসল নাম কেউ জানে না। শোনা যায়, যারা জানত তাদের কেউই আর ধরাধামে নেই। তবে দেখে বোঝা যায় লোকটা অ্যাংলো চাইনিজ। বিরাট দশাসই চেহারা। মুখে অসংখ্য কাটাছড়ার দাগ। একটা রিভলভিং চেয়ারে বসে গুম হয়ে শুনছিল। সেই ভাবেই গুম হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “তুমি তাহলে মনস্থির করেই ফেলেছ?”
প্যাট মাথা নাড়ল, “একদম তাই। অনেক দিন তো হল এখানে। এবার দেশে ফিরে যাব।”
“কিন্তু তুমি তো জানো, মাফিয়া দলে ঢোকার পথ আছে। কিন্তু বেরোবার পথ নেই।”
“জানি। কিন্তু মন যখন একবার স্থির করেছি, বেরিয়ে আমি যাবই। তুমি আটকাতে পারবে না। বরং অযথা ঝামেলাই বাড়বে। তাই তোমার সম্মতি নিয়েই যেতে চাই।”
“মনে হচ্ছে, দেশের ব্যাঙ্কে অনেক ডলার জমিয়ে ফেলেছ!”
“যৎসামান্য। আর যেহেতু গ্যাংয়ের প্রতিটি ব্যক্তির নাড়ির খবর তোমার নখদর্পণে। তাই অযথা কৈফিয়ত দেওয়া বোকামি।”
“তুমি যেদিন আমার হাতে এসে পড়েছিলে সেদিন প্রায় কপর্দকহীন। পুলিশের তাড়া খেয়ে হন্যে হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলে—”
“জানি। কিন্তু পরিবর্তে আমিও তোমাকে কম দিইনি। কিন্তু এ-সব বাজে কথায় সময় নষ্ট করার জন্য নিশ্চয় আমাকে ডেকে পাঠাওনি?”
জেড এবার কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বলল, “এর কোনওটাই বাজে কথা নয় প্যাট। দল ছাড়ার চেষ্টা এর আগে যারা করেছে, কী হাল হয়েছে তাদের, তুমি ভালই জানো। আমি চাই না তোমার মতো কাজের মানুষের সেই হাল হয়। ও-সব বোকাদের জন্য। তুমি অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম বলেই সাহস করে বলতে পেরেছ। তবু একটা সুযোগ তোমাকে দেব। পরিবর্তে একটা কাজ করতে হবে। যদি সফল হতে পারো, দেশে ফিরে যেতে পারবে।”
জেড থামতে প্যাট অবাক হয়ে খানিক তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর বলল, “আশা করি কথার নড়চড় হবে না।”
“একদম। তবে দেশে ফিরে যাবার পরে তোমাকেও কিছু শর্ত মানতে হবে।”
“সে তো আগেই তোমাকে বলেছি।” সামান্য ঘাড় নাড়ল প্যাট। তুমি বেশ জানো প্যাটের কথার নড়চড় হয় না। তবু আবার বলি, দলের গোপন খবর যেটুকু জেনেছি, তার কিছুমাত্র আমার কাছ থেকে ফাঁস হবে না।”
থামল প্যাট। জেডের দিক থেকে কোনও সাড়া এল না। সামান্য অপেক্ষার পর ও বলল, “তাহলে কাজের কথাটা শোনা যেতে পারে।”
প্রত্যুত্তরে জেড আরও কিছুটা সময় গুম হয়ে রইল। বোধ হয় শেষবারের মতো বুঝে নিতে চাইল, প্যাটকে কাজের কথাটা বলা উচিত হবে কি না। তারপর চোখ তুলে পাশে লি পিংয়ের দিকে সামান্য ইঙ্গিত করতেই সে ঘরে উপস্থিত অন্যদের বেরিয়ে যেতে বলল।
অন্যরা ঘর ছেড়ে যাবার পর তিনজন নির্বাক হয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর সন্তর্পণে চারপাশে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে মুখ খুলল লি পিং, “শোনো প্যাট, ব্যাপারটা খুবই গোপনীয়। শুনে যদি কাজে নামতে না চাও, বস কিছু মনে করবে না। তবে বিষয়টি এই ঘর থেকে বের হবার সঙ্গে-সঙ্গে ভুলে যাবে।”
প্যাট নীরবে মাথা নাড়ল।
লি পিং এবার পাশে পাথরের মতো বসে থাকা জেডের দিকে সামান্য তাকিয়ে পকেট থেকে একটা ম্যাপ বের করে সামনে টেবিলের উপর রাখল। সামান্য দৃষ্টি ফেলে প্যাট দেখল সেটা ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্সের একটা ম্যাপ। বাজার-চলতি কোনও বই থেকে ছিঁড়ে নেওয়া। লম্বা গোটা কয়েক শুঁড়ওয়ালা সেলিবিসের পুব দিকে মালুকা সাগরে নিরক্ষরেখার কাছে প্রায় বিন্দু চিহ্নের মতো ক্ষুদ্র এক দ্বীপের চারপাশে লাল কালি দিয়ে একটা গোল চিহ্ন দেওয়া। লি পিং সামান্য গলা ঝেড়ে নিয়ে সেই বৃত্তের উপর ডান হাতের তর্জনী রেখে বলল, “প্যাট, এই যে দ্বীপটা দেখতে পাচ্ছ, আকারে খুবই ছোটো। কিন্তু এই অঞ্চলের অন্যান্য দ্বীপের মতোই দুর্গম। জল-কাদার ঘন অরণ্য। উটের কুঁজের মতো পাহাড়। তবে জনমানুষশূন্য নয়। বাস করে কিছু জংলি মানুষ। তাদের জীবনযাত্রা আদিম মানুষের মতো। শুধু কাঁচা মাংস নয়, প্রয়োজনে নরমাংস খেতেও অভ্যস্ত। প্রাগৈতিহাসিক যুগে পড়ে থাকলেও অনেক দূর থেকে পাথর ছুড়ে লক্ষ্যভেদ করতে অদ্বিতীয়। এই কাজে যে পাথর ওরা ব্যবহার করে, তা তীক্ষ্ণ ফলা যুক্ত বিশেষ আকৃতির। পাথর ঘষে নিজেরাই তৈরি করে নেয়। নিপুণ লক্ষ্যে ছোড়া পাথর আক্রান্ত ব্যক্তির খুলিতে গেঁথে মুহূর্তে মৃত্যু হয়। দ্বীপটিতে এ-পর্যন্ত সভ্য মানুষের পদচিহ্ন কমই পড়েছে। যারা গিয়েছে, তাদের একজন-মাত্র শরীরে বিষাক্ত ক্ষত নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছিল। অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচানো যায়নি।
‘মানুষটার মাথাও ঠিক ছিল না। প্রায় উন্মাদ। তার কাছ থেকে যেটুকু জানা গেছে, দ্বীপে শুধু জংলি মানুষ নয়, রয়েছে এক দঙ্গল হিংস্র ড্রাগন। তারা আরও ভয়ানক। বলা বাহুল্য অসুস্থ মানুষটার এ-সব কথা কেউই বিশ্বাস করেনি। ইন্দোনেশীয় সরকারও তেমন গা করেনি। কিন্তু হঠাৎই টনক নড়ল। কিছুদিন আগে এই দ্বীপের কাছে সমুদ্রে একটা বিমান ভেঙে পড়ায় ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারে কয়েকজন ডুবুরি নামানো হয়েছিল। তাদের একজন অগভীর সমুদ্রের তলা থেকে একটা বিশাল প্রাণীর মাথার খুলি দেখতে পেয়ে তুলে আনে। গোড়ায় এটা নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামায়নি। কিন্তু ক’দিন পরে ম্যানিলার এক বিজ্ঞানী পরীক্ষার পরে সেটাকে কোনও মাংসাশী ডাইনোসরের খুলি বলে সনাক্ত করেন। অথচ খুলিটি ফসিল নয়। কোনও মতেই সেটার বয়স কয়েকশো বছরের বেশি নয়। অথচ ডাইনোসর জাতীয় প্রাণী পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কয়েক কোটি বছর আগে। ফসিল ছাড়া তাদের দেহাবশেষের কোনও চিহ্নই আজ পাওয়া সম্ভব নয়। অগত্যা কার্বন–১৪ টেস্ট। জানা গেল এক অত্যাশ্চর্য তথ্য। খুলিটি মাত্র কয়েক বছরের পুরোনো। তাদের সন্দেহ, দ্বীপের হিংস্র ড্রাগন আসলে প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসর গোত্রের প্রাণী।
‘ব্যাপারটা যথাসম্ভব গোপন রাখা হলেও বিজ্ঞানী মহলে হইচই পড়তে দেরি হল না। তাদের বুঝতে বাকি রইল না, দুর্গম এই দ্বীপে এমন কিছু প্রাগৈতিহাসিক যুগের সরীসৃপ বাস করছে, যারা প্রকৃতির কোনও রহস্যময় কারণে আকার আকৃতিতে সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। অতি সম্প্রতি এই দ্বীপে আমেরিকা এবং ইন্দোনেশিয়ার যৌথ উদ্যোগে ছোটোখাটো এক অভিযান হয়েছিল। কিন্তু জংলিদের আক্রমণে তারা বেশি ভিতরে ঢুকতে পারেনি। কয়েকজনের মৃত্যুর পর পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
‘পরিত্যক্ত হলেও অভিযান একেবারে বিফল হয়নি। একজন জংলি দ্বীপবাসীকে তারা বন্দি করে আনতে পেরেছিল। তাকে দিনের-পর-দিন পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা অতি সম্প্রতি কিছু অদ্ভুত তথ্য পেয়েছেন। ওই দ্বীপের কোনও এক গুপ্তস্থানে স্তূপীকৃত রয়েছে রাশি-রাশি হীরে-জহরত। জংলিরা পুরুষানুক্রমে সেগুলি রক্ষা করে আসছে। ওদের বিশ্বাস উজ্জ্বল এই পাথরগুলো দ্বীপের দেবতা। ঝড়–বৃষ্টি, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক রোষ থেকে ওদের রক্ষাকর্তা।”
লি পিং থামল। আলতো করে পাশে জেডের দিকে তাকাতেই সে নড়ে উঠল এবার, “শোনো প্যাট, খবরটা গোপন রাখা হলেও বুঝতেই পারছ, পৌঁছে গেছে আমাদের কাছে। যাই হোক, হাজার-হাজার কোটি ডলার মূল্যের ওই হীরে–জহরত আমাদের চাই। যদি এনে দিতে পারো, দেশে ফেরার ছাড়পত্র পেয়ে যাবে। সঙ্গে হীরে–জহরতের একটা ভাগও পাবে। তবে যেতে হবে সম্পূর্ণ একলা। সঙ্গে কাউকে পাবে না।”
প্যাট নীরবে শুনছিল। এবার ঠান্ডা গলায় বলল, “তা ওই ড্রাগন দ্বীপে পৌঁছোনো হবে কী করে?”
“ড্রাগন দ্বীপ! বাহ্, বেশ বলেছ!” জেড অল্প হাসল, “হ্যাঁ, সোজা পথে ড্রাগন দ্বীপে পৌঁছোবার উপায় আপাতত নেই। ইন্দোনেশীয় সরকার বর্তমানে দ্বীপটার উপর কড়া নজর রেখেছে। অগত্যা কিছু কাঠখড় পোড়াতে হবে। দিন কয়েক সময় লাগবে। সেটা সারা হলেই তোমাকে এক রাতে দ্বীপের কাছাকাছি কোথাও প্লেন থেকে সমুদ্রে নামিয়ে দেওয়া হবে। তারপর বাকি কাজ তোমার।”
কয়েক মুহূর্ত প্যাট কী ভাবল। তারপর বলল, “ও কে। আমি রাজি।”
সেই কথায় জেড কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল ওর দিকে, “কাজটা নিচ্ছ তাহলে! ভাল করে আর একবার ভেবে জবাব দাও বরং।”
“জবাব ভেবেই দিয়েছি আমি।” শীতল গলায় প্যাটের উত্তর, “মৃত্যু এ-পর্যন্ত ডাক তো কম দেয়নি। কিন্তু পেরে ওঠেনি। চ্যালেঞ্জটা তাই নিচ্ছি। যথা সময়ের মধ্যে হীরে–জহরতগুলো পেয়ে যাবে। শুধু একটা কথা। যেদিন হীরে বোঝাই ব্যাগ তোমাদের হাতে তুলে দেব, তার দু’এক দিনের মধ্যেই আমি দেশে ফেরার প্লেনে চাপতে চাই।”
জেডের চোখ তখন জ্বলজ্বল করছে। ছোকরা এত সহজে রাজি হবে ভাবেনি। আর প্যাট রাজি হওয়া মানে যত কঠিনই হোক কার্যোদ্ধার হবার যথেষ্টই সম্ভাবনা। ছেলেটাকে কম দিন তো দেখছে না। তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলল, “একদম। তুমি আজ রাতের প্লেনেই ম্যানিলা চলে যাও। ড্রাগন দ্বীপে যাবার ব্যবস্থা ওখান থেকেই হবে। দিন-কয়েক অপেক্ষা করো ওখানে।”
অযথা দেরি না করে সামান্য মাথা নেড়ে প্যাট বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ও চলে যেতেই জেড বলল, “হতচ্ছাড়াটার বুকের পাটা আছে বটে।”
উত্তরে লি পিং তার কুতকুতে চোখ দুটো তুলে জেডের দিকে তাকিয়ে বলল, “তা আছে ছোঁড়ার। কিন্তু হীরেগুলো নিয়ে আসতে পারলে ওকে সত্যিই ছেড়ে দেবে নাকি?”
উত্তরে জেডের মুখে একটু বাঁকা হাসি শুধু ফুটে উঠল শুধু।
প্যাট নামে যে তরুণ মানুষটির কথা এতক্ষণ বলা হল, পাঠকের অবগতির জন্য জানিয়ে রাখা দরকার তার আসল পিতৃদত্ত নাম প্রতাপ। প্রতাপ ঢালি। নির্ভেজাল বঙ্গ সন্তান। জন্ম ওপার বাংলার এক গণ্ডগ্রামে। প্যাট তার ডাকনাম। প্রতাপের এই নাম দিয়েছিল মেরিন লাইন শিপিং কোম্পানির জাহাজ বোনাপার্টের সেকেন্ড অফিসার ম্যাকডোনাল্ড সাহেব। সেই কাহিনি শোনাতে হলে শুরু করতে হবে কিছু আগে থেকে।
প্রতাপের বাবা গোবিন্দ ঢালি ছিল ওপার বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের খেতমজুর। দিন চলত অন্যের জমিতে ভাগচাষ করে। তবে গোবিন্দ ঢালির বাবা মনোহর ঢালি ছিলেন একজন পাকা লাঠিয়াল। আর ওটাই ছিল তাঁর একমাত্র জীবিকা। জমিদারবাড়ি থেকে ডাক এলেই দলবল নিয়ে ঢাল–সড়কি হাতে লড়ায়ের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে তাঁর জুড়ি ছিল না। দশ–বিশটা লাশ একাই ফেলে দিতে পারতেন। আশপাশের বিশ–ত্রিশটা গ্রামে তাঁর খ্যাতি ছিল প্রায় কিংবদন্তির মতো। ছেলে গোবিন্দ ঢালিও তাঁর জীবিকা শুরু করেছিলেন লাঠিয়াল হিসেবেই। কিন্তু তারপর একসঙ্গে অনেকগুলো আঘাতে সব চুরমার হয়ে গেল। দেশ স্বাধীন হতে উঠে গেল জমিদারি প্রথা। লাঠিয়ালদের কদরও ফুরিয়ে গেল। সুতরাং গোবিন্দকে এক সময় চাষবাসেই নেমে পড়তে হল।
দুঃসাহসী বেপরোয়া স্বভাব প্রতাপ তাই পেয়েছিল উত্তরাধিকার সূত্রেই। ছেলেবেলাতেই হয়ে উঠেছিল গ্রামের ডানপিটে ছেলেদের সর্দার। দুষ্টু বুদ্ধিতে প্রতাপের মাথা যতটা সাফ ছিল, ততটাই সাফ ছিল লেখাপড়ায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রথমটা যত উৎকর্ষ লাভ করতে পেরেছিল, পরেরটা তেমন নয়। প্রতাপের বাবা-ঠাকুরদা ছিলেন নিরক্ষর। লেখাপড়া শেখার চলও ওদের গ্রামে তেমন ছিল না। তবু প্রতাপ যে গ্রামের প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি হতে পেরেছিল, তা সম্পূর্ণ মায়ের আগ্রহে।
গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের পাঠ সাঙ্গ হবার পরেই প্রতাপের লেখাপড়া শেষ হবার কথা। কারণ হাই স্কুল প্রায় চার মাইল দূরে। কিন্তু ততদিনে লেখাপড়া শেখার আগ্রহ প্রতাপের ভিতরের জেগে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত হাই স্কুলে ভর্তি হল প্রতাপ।
সামান্য ভাগচাষী গোবিন্দ ঢালি অবশ্য বেশি দিন ছেলের পড়ার খরচ চালাতে পারেননি। ক্লাস নাইনে ওঠার পর তিনি জানিয়ে দিলেন, ছেলের পড়াশুনোর খরচ তিনি আর চালাতে পারবেন না। ছেলে বরং মাঠের কাজে তাঁকে সাহায্য করুক। অগত্যা পড়াশুনো বন্ধ করে বাবার সঙ্গে লাঙল–বলদ দিয়ে মাঠের কাজেই নেমে পড়তে হল।
হয়তো এই ভাবেই জীবনটা কেটে যেত প্রতাপের। কিন্তু হঠাৎই দিন কয়েকের জ্বরে ভুগে মারা গেলেন বাবা। সেটা ১৯৬৫ সাল। প্রতাপের বয়স তখন সবে আঠারো। এরপর দেশের ওই গণ্ডগ্রামে পড়ে থাকতে আর ভাল লাগল না। ঠিক করল মা-কে নিয়ে কলকাতায় চলে যাবে। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন অবশ্য অনেক বুঝিয়েছিল। দেশ–বাড়ি ছেড়ে বিদেশ-বিভূঁই কলকাতা শহরে গিয়ে কাজ নেই। কিন্তু প্রতাপকে দমানো যায়নি।
অগত্যা পৈতৃক ভিটেমাটির মায়া কাটিয়ে মাকে নিয়ে এক রাতে সীমান্ত পার হয়ে কলকাতা শহরে। প্রতাপের জীবনে শুরু হল এক নতুন অধ্যায়।
বলা বাহুল্য, কলকাতায় এসে প্রায় অকূল পাথারে পড়ল প্রতাপ। স্বজন–পরিজন, সহায়-সম্বলহীন এ এক অন্য জগত। সম্বল বলতে হাতে কয়েকশো টাকা আর ক্লাস এইট পাসের বিদ্যে। সুতরাং একটা বছর প্রায় যেন ঝড় বয়ে গেল ওর জীবনে। কিন্তু হার মানেনি। একের-পর-এক সেই ঝড়ঝাপটা সামলে টিকে গেল শেষ পর্যন্ত। আশ্রয় নিলো বেলেঘাটার এক বস্তিতে। জীবিকা ফুটপাত নয়তো ট্রেনে হকারি।
তা এই ভাবেই চলছিল। এর মধ্যে প্রতাপ একদিন সওদার মালপত্রের খোঁজে গিয়েছিল তক্তাঘাটার কাছে। হঠাৎ চোখ পড়ল মেরিন হাউসের দিকে। সামনে এক দঙ্গল মানুষের জটলা। তাদের অনেকেই ওর সমবয়সী। বঙ্গসন্তান ছাড়াও রয়েছে নানা প্রদেশের মানুষ। কৌতূহলী প্রতাপ এগিয়ে গিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানল, হাতে সি.ডি.সি নিয়ে ওরা মেরিন হাউসের সামনে অপেক্ষা করছে জাহাজে ডাক পাবার জন্য।
একে-একে সেদিন ওদের কাছ থেকে অনেক কিছুই জানতে পারল প্রতাপ। চোখের সামনে খুলে গেল এক নতুন জগতের বন্ধ দরজা। দুঃসাহসী, ডানপিটে প্রতাপ বেপরোয়া অনিশ্চিত যে-জগতের স্বপ্ন এতদিন ধরে দেখে আসছে, এ সেই জগত। মার্চেন্ট জাহাজের সি-ম্যান।
যে কাজে সেদিন তক্তাঘাটায় এসেছিল, পড়ে রইল সব। বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে ফিরে এল বাড়িতে। মাথায় তখন ভাবনা, মা রাজি হবেন তো? এই বিদেশ-বিভূঁই শহরে সে ছাড়া মার যে আর কেউ নেই।
কিন্তু তেমন কিছু হয়নি। গরীব চাষি পরিবারের বউ মনোরমা দেবীর মনের ভিতরেও কিছু আগুন ছিল নিশ্চয়। আর তাই হয়তো সব বাধা উপেক্ষা করে ছেলেকে স্কুলে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। অগত্যা মায়ের সম্মতি মিলতে দেরি হল না। শুনে বরং খুশিই হলেন। জানিয়ে দিলেন, তেমন হলে কয়েক মাস গৃহস্থ বাড়িতে বাসন মেজেও চালিয়ে নিতে পারবেন।
প্রতাপ এরপর আর দেরি করেনি। শিপিং হাউসে সি-ম্যানের খাতায় নাম লেখাবার কিছুদিন পরে প্রথমে ছোটো এক ট্রেনিং। জাহাজে রোলিং, পিচিং, হিবিং ইত্যাদি সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক পাঠ। তারপরেই হাতে মিলল পোস্ট অফিসের পাশ বইয়ের মতো ছোটো এক বই, সি.ডি.সি। ‘মেরিন লাইন’ শিপিং কোম্পানির রোস্টার। বিদেশি জাহাজ কোম্পানির রোস্টার পাওয়া গেছে দেখে গোড়ায় কিছু খুশিই হয়েছিল প্রতাপ। কিন্তু সেই খুশি উবে যেতে সময় লাগেনি।
সি.ডি.সি হাতে কোম্পানির জাহাজ পাবার জন্য দিনের-পর-দিন মেরিন অফিসে ধর্না। শত-শত সি-ম্যান বসে আছে ধর্নায়। কেউ ছ’মাস। কেউ এক বছর। একে তো কলকাতায় জাহাজ ভেড়ে কম। দু-চারজন সি-ম্যান যা দরকার হয়, ডাক পড়ে পুরোনোদের। প্রতাপের সি.ডি.সি আনকোরা নতুন। কোনও সমুদ্র সফরের ছাপ নেই। কেমন করে ডাক মিলবে?
চোখের সামনে মেরিন অফিসের বোর্ডে নতুন-নতুন জাহাজের নাম লেখা হয়। তার মধ্যে মেরিন লাইন কোম্পানির জাহাজও থাকে। পরে মুছেও ফেলা হয় কিন্তু প্রতাপের ডাক মেলে না। ক্লান্তিহীন প্রতাপ তবু নাছোড়বান্দা। প্রতিদিন একবার করে শিপিং অফিসে হাজিরা দিয়ে যায়। জাহাজ তাকে পেতেই হবে।
শেষে একদিন বোর্ডে মেরিন লাইন শিপিং কোম্পানির জাহাজ বোনাপার্টের নাম উঠল। একজন সি-ম্যান চাই। প্রতাপ এই প্রথম অবাক হয়ে দেখল, অন্য দিনের মতো জাহাজের নাম লেখা হতেই উপস্থিত সি-ম্যানেরা কাউন্টারের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল না। বরং জাহাজ পাবার ব্যাপারে হঠাৎ সবাই যেন কেমন উদাসীন। ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে প্রতাপ ওর পরিচিত একজন সি-ম্যান নিতাইদাকে জিজ্ঞাসা করল কারণটা।
নিতাই ভট্টাচার্য পুরোনো সি-ম্যান। অভিজ্ঞ মানুষ। হেসে বললেন, “খবর্দার যাসনি প্রতাপ। একবার ওই জাহাজে চাপলে প্রাণ নিয়ে আর ফিরে আসতে পারবি না।”
“কেন নিতাইদা?”
প্রত্যুত্তরে নিতাই ভট্টাচার্য বলল, “তুই নতুন, জানার কথা নয়। বোনাপার্ট একে তো সেকালের লঝঝড়ে জাহাজ। চলে কয়লায়। সি-ম্যানদের বেজায় মেহনত। বয়লারে কয়লার বেলচা টানতে-টানতে হাতে দু’দিনে ফোসকা পড়বে। সেটাই সব নয়। আসল কারণ জাহাজের সেকেন্ড অফিসার ম্যাকডোনাল্ড সাহেব। লোকটা সাক্ষাত শয়তান। মেজাজ সপ্তমে চড়েই থাকে। কালো চামড়ার নেটিভ তো দু’চোখের বিষ। রাতের অন্ধকারে কত সি-ম্যানকে যে ঠেলে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে, তার ঠিক ঠিকানা নেই।’ সামান্য দম নিয়ে নিতাই ভট্টাচার্য ফের শুরু করল, ‘এই যে জাহাজটা কোলকাতায় সি-ম্যান চাইছে, তার মানে আসার পথে সাহেব ফের কারও পিণ্ডি চটকেছে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করা হচ্ছে এখান থেকে। মরতে ওই জাহাজে কে যেতে চাইবে?”
প্রতাপ বলল, “তাহলে শিপিং অফিসগুলো ব্যবস্থা নেয় না কেন?”
“কীসের ব্যবস্থা!” নিতাই ভট্টাচার্য ঠোঁট ওলটাল। “প্রমাণ কোথায়? একে বিদেশি কোম্পানি। খোঁজ নিয়ে দ্যাখ, কলকাতায় জাহাজ ভিড়িয়ে ওরা রিপোর্ট লিখিয়ে কাজে সেরে ফেলেছে, অমুক সি-ম্যান অমুক দিন থেকে নিখোঁজ। আনট্রেসেবল। ব্যস, হয়ে গেল। মেরিন লাইন কোম্পানিতেও নাকি ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের দারুণ প্রতিপত্তি। কেউ ঘাঁটায় না।”
কথা শেষ করে নিতাই ভট্টাচার্য সবে থেমেছে। সবিস্ময়ে লক্ষ্য করল, প্রতাপ ততক্ষণে পকেট থেকে সি.ডি.সি বের করে ফেলেছে। কিছু বলার আগেই ছুটতে শুরু করেছে কাউন্টারের দিকে। দেখে নিতাই ভট্টাচার্যের মুখে কথা সরেনি। প্রতাপ অবশ্য একবার মুখ ঘুরিয়ে বলেছিল, “চলি নিতাইদা। জাহাজ পেতে হলে এই চান্স আমার মিস করলে চলবে না। ওই বোনাপার্টেই নাম লেখাচ্ছি।”
জাহাজে ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ে কিন্তু লোকটাকে বেশ মজার মানুষ বলেই মনে হয়েছিল প্রতাপের। প্রায় সাত ফুট লম্বা মাঝবয়সী মানুষ। গায়ের রং বাদ দিলে প্রায় গোরিলার মতো চেহারা। এই ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের সামনে সেদিন হঠাৎই পড়ে গিয়েছিল ও। জাহাজ তখন দিন দুয়েক হল কলকাতা ছেড়েছে। কী এক কাজে ব্রিজে এসেছিল প্রতাপ। হঠাৎ দেখে সামনে ম্যাকডোনাল্ড সাহেব। ওকে দেখেই হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, “ইউ ম্যান, হোয়াটস ইওর নেম?”
এই অবস্থায় নতুন সি-ম্যান তো বটেই, পুরোনো সি-ম্যানেরাও যে যেদিকে পারে ছুটে পালায়। প্রতাপ অবশ্য একটুও ঘাবড়ায়নি। ঘড়ঘড়ে জড়ানো গলায় সাহেব কী বলতে চাইছে, বুঝতে যেটুকু সময়। তারপর ঠান্ডা গলায় উত্তর, “প্রতাপ, প্রতাপ ঢালি সার।”
বলা বাহুল্য একজন নেটিভ সি-ম্যানের কাছ থেকে এমন ব্যবহার ম্যাকডোনাল্ড সাহেব একেবারেই আশা করেননি। খেঁকিয়ে উঠে ফের হুঙ্কার ছাড়লেন, “হো–য়া–ট?”
“প্রতাপ, প্রতাপ ঢালি।” আগের মতোই ঠান্ডা গলায় উত্তর এল।
“নৌ–উ—উ–উ।” আচমকা যেন ফেটে পড়লেন ম্যাকডোনাল্ড সাহেব, “ইউ ওনলি ‘প্যাট’। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
সাহেবের ব্যবহারে প্রতাপ বেশ মজাই পাচ্ছিল তখন। তা ছাড়া সাহেবের মুখে হঠাৎ ‘প্যাট’ নামটা শুনে মনেও ধরে গিয়েছিল। মাথা দুলিয়ে হেসে বলেছিল, “ওকে সার। থ্যাঙ্ক ইউ।”
ম্যাকডোনাল্ড সাহেব অবশ্য আর দাঁড়াননি সেখানে। গটমট করে চলে গিয়েছিলেন। খবরটা কিন্তু জাহাজের সি-ম্যানদের মধ্যে রাষ্ট্র হতে দেরি হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল জাহাজের অন্য সি-ম্যানেরা প্রতাপকে বেশ সম্ভ্রমের চোখে দেখতে শুরু করেছে। বোনাপার্ট জাহাজের সেকেন্ড অফিসার ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের সমানে দাঁড়িয়ে এ-ভাবে কথা বলতে পারে, এমন সি-ম্যান জাহাজে এই প্রথম। জাহাজে ক্রুদের কাজে প্রতাপের খাতির বাড়তে দেরি হয়নি এরপর।
প্রতাপের ডিউটি ছিল বাঙ্কারে কয়লা টানা। দিনে দু’বার টানা চার ঘণ্টা করে ডিউটি। কাজটা বেশ শক্ত। নিতাইদা যে বলেছিলেন, কয়লা টানতে-টানতে হাতে ফোস্কা পড়ে যাবে, মিথ্যে নয়। তবে প্রতাপের কথা আলাদা। জমিতে লাঙল টানা হাত ওর। বেলচা হাতে ট্রলিতে কয়লা তুলতে বা ফার্নেসে দিতে সে-হাতে আর যাই হোক ফোস্কা পড়ে না। সমস্যাও হয়নি। তার উপর প্রতাপ ইতোমধ্যে জাহাজে সি-ম্যানদের অলিখিত প্রধান। কিছু পড়াশুনো তো ছিলই। কাজ চালাবার মতো ইংরেজি কথাও শিখে ফেলেছে। সি-ম্যানদের আবেদন নিবেদন, সাহেবদের কাছে পৌঁছে দেবার লোক ওই প্রতাপ। আশ্চর্য! ম্যাকডোনাল্ড সাহেব প্রতাপের কথা বেশ শুনেও থাকে।
জাহাজের সারেং ছিলেন মুলার সাহেব। জাতে গ্রিক। মাথার চুল ধপধপে সাদা। যথেষ্ট বয়স। প্রতাপকে বেশ পছন্দ করে ফেলেছিলেন। একদিন ডেকে বলেছিলেন, ‘প্যাট, ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের নজরে যখন পড়ে গেছ, চিন্তা নেই। তবে ওই লিডারশিপের অভ্যেসটা ছেড়ে দাও। অযথা ঝামেলায় পড়তে পারো।’
মুলার সাহেব অভিজ্ঞ মানুষ, ব্যাপারটা ঠিকই বুঝেছিলেন। তবে বলা বাহুল্য প্রতাপ কান দেয়নি। জাহাজে ক্রু তথা সি-ম্যানদের মধ্যে সে একমাত্র বাঙালি হলেও সবাই ভারতীয়। কয়েকজন মারাঠি। বাকি সব দক্ষিণের মানুষ। সমস্যা হলে সবাই ছুটে আসে তার কাছে। এগিয়ে না গিয়ে উপায় কী?
দেখতে-দেখতে কেটে গেল ছ’টা মাস। জাহাজ প্রথমে কলম্বো। তারপর করাচি বন্দর ছুঁয়ে সুয়েজ হয়ে আলেকজান্দ্রিয়া। একে-একে নতুন-নতুন বন্দর আর দেশ। পূর্ব বাংলার এক গণ্ডগ্রামের ছেলে প্রতাপের চোখের সামনে ধীরে-ধীরে খুলে গেল এক অচেনা জগতের বন্ধ দরজা। জাহাজ বন্দরে ভিড়লে একদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য ছুটি পাওয়া যায়। শহরে নেমে খানিক হইহই করে বেড়িয়ে আসা যায় তখন। বিদেশ-বিভূঁই শহরে বেপরোয়া ঘুরে বেড়ানো, এক অন্য অভিজ্ঞতা। তারই ফাঁকে বাড়িতে মাকে টেলিগ্রাম।
ইতিমধ্যে ইংরেজিতে আরও চোস্ত হয়েছে। ভিনদেশে শহরের পথে ওর মুখে সেই ইংরেজি শুনে অনেক আচ্ছা মানুষও সম্ভ্রম করে। জাহাজের সামান্য এক কয়লা টানা কুলি বলে ভাবতেও পারে না। মাত্র ছ’মাসের মধ্যে প্রতাপ তাই শুধু দেখা নয়, জেনে ফেলল অনেক কিছু। তারপরে হঠাৎই এল সেই দিনটি।
মনোহর ডোঙ্গারকার ছেলেটি মারাঠি। বয়স প্রতাপের থেকে সামান্যই বেশি। বেচারা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল হঠাৎ। সি-ম্যানদের বিশ্রাম বলে কিছু থাকতে নেই। দিন দুই বাদে কিছু সুস্থ হয়ে উঠতেই তাকে যথারীতি পাঠিয়ে দেওয়া হল সেই বয়লারে কয়লা ঠেলার কাজে। সেখানে কাজ করতে করতে অসুস্থ ছেলেটি ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল হঠাৎ। আর এমনই দুর্ভাগ্য, পড়ে গেলে একেবারে ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের চোখে। গণ্ডগোলের সূত্রপাত তাই নিয়েই। অসুস্থ মানুষটাকে যাচ্ছেতাই অপমান করেছিলেন ম্যাকডোনাল্ড সাহেব। এমনকি মাইনে কেটে নেবার হুমকিও। খবরটা কানে আসতেই ছুটে গিয়েছিল প্রতাপ। বলা বাহুল্য ব্যাপারটা মোটেই বরদাস্ত করেননি তিনি। উচ্চকণ্ঠে দু’তরফের কথা কাটাকাটি হয়েছিল বেশ কিছুটা সময়। তারপর কটমট করে প্রতাপের দিকে এক ঝলক জ্বলন্ত দৃষ্টি হেনে চলে গিয়েছিলেন।
ব্যাপারটা যে সহজে মিটবে না, বুঝতে বাকি ছিল না কারও। সারেং মুলার সাহেব তো ওকে ডেকে বলেই ফেলেছিল, “ব্যাপারটা ভাল করোনি প্যাট। যাই হোক একটু সাবধানে থাকবে।”
ইতিমধ্যে জাহাজে এসে ম্যাকডোনাল্ড সাহেব সম্পর্কে সত্যি–মিথ্যে অনেক কিছুই শুনেছে ও। ব্যাপারটা যে সহজে মিটবে না, সেটা প্রতাপও বুঝেছিল। কিন্তু সপ্তাহ দুই অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও ম্যাকডোনাল্ড সাহেব বা জাহাজের ক্যাপ্টেনের তরফ থেকে কোনও উচ্চবাচ্যই শোনা গেল না। অগত্যা ব্যাপারটা ভুলে যেতেই বসেছিল। ঠিক সেই সময় ঘটল ব্যাপারটা।
জাহাজ তখন ইয়োকোহামা বন্দর থেকে রওনা হয়ে চলেছে ম্যাকাও–এর দিকে। দিন কয়েক হল প্রতাপের ডিউটি বদল হয়ে কাজ পড়েছে ব্রিজে। হুইল হাউসের স্টারবোর্ডে লুক আউটের কাজ। ফার্নেসে কয়লা টানার থেকে অনেক হালকা। তার উপর খোলামেলা জায়গা। সেদিন চাঁদনি রাত। ওয়াচ সেরে প্রতাপ নির্জন ডেকে রেলিংয়ের ধারে পায়চারি করছিল। সেই সময় পিছনে কোথাও বসে থাকা ওর পোষা সিগালটা হঠাৎ ‘কু–র–র–র’ শব্দে ভীত কণ্ঠে ডেকে উঠল। এই সিগালটা মাস কয়েক আগে একদিন ঝড়ের ঝাপটায় ডেকের উপর আধমরা হয়ে পড়ে ছিল। পাখিটাকে সেবা শুশ্রূষা করে বাঁচিয়ে তুলেছে প্রতাপ। সেই থেকে পাখিটা চমৎকার পোষ মেনে গেছে। জাহাজ ছেড়ে যায়নি আর। প্রতাপ ডাকলেই উড়ে এসে ওর হাতে বসে। খাবার খায়। পাখিটার একটা নামও দিয়ে ফেলেছে, ফ্রাগা।
সেই রাতে হঠাৎ ফ্রাগার ডেকে ওঠার অর্থ বুঝতে বিলম্ব হয়নি প্রতাপের। কোনও কিছু দেখে ভয় পেয়েছে। প্রায় তৎক্ষণাৎ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ও। আর সেই মুহূর্তে মোটা রুলের আঘাতটা সামান্যর জন্য ওর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। মোটা রুল হাতে হিংস্র জন্তুর মতো পিছনে দাঁড়িয়ে ম্যাকডোনাল্ড সাহেব।
আঘাতটা ব্যর্থ হতে সাহেব অবশ্য আর ঝুঁকি নেয়নি, প্রতাপ সামলে নেবার আগেই মুহূর্তমাত্র দেরি না করে হাতে রুল ফেলে দিয়ে বুনো মোষের মতো বিশাল দেহ নিয়ে জোড়া পায়ে লাথি কষিয়ে দিয়েছিলেন প্রতাপের উপর। টাল সামলাতে না পেরে প্রতাপ রেলিং টপকে পড়ে গিয়েছিল সমুদ্রে।
প্রতাপকে ওইভাবে সমুদ্রের জলে পড়ে যেতে দেখে ফ্রাগা বার কয়েক চিৎকার করল আবার। কিন্তু তার সেই ডাক নির্জন রাতের অন্ধকারে কোনও সাড়া জাগাল না। অগত্যা ফ্রাগা এবার জাহাজ ছেড়ে আকাশে উড়ল।

প্রতাপ পূর্ব বাংলার ছেলে। জলকে ভয় পায় না। গোড়ায় চেষ্টা করেছিল জাহাজের গ্যাংওয়ে ধরার। ধরতে পারলে হয়তো সহজেই উঠে আসতে পারত। কিন্তু জলে পড়েই ডুবে বেশ খানিকটা দূরে চলে গিয়েছিল। যখন ভেসে উঠল, চলন্ত জাহাজ তখন অনেকটাই এগিয়ে গেছে। সাঁতরে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল তারপরেও। কিন্তু চলন্ত জাহাজের ঢেউয়ের ধাক্কায় সেটা আর সম্ভব হল না। ওর চোখের সামনেই জাহাজটা ক্রমে অনেক দূরে চলে গেল।
সেই রাতে অকূল সাগরে যতক্ষণ পারা যায় ভেসে রইল প্রতাপ। হার মানা চলবে না। তারপর হঠাৎই বাতিল এক কাঠের টুকরো কাছ দিয়ে ভেসে যেতে দেখে দু’হাতে আঁকড়ে ধরেছিল সেটা।
পরবর্তী টানা তিনটে দিন সেই কাঠের টুকরো আঁকড়ে সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করেছে প্রতাপ। হার মানেনি। আর সেই তিনটে দিন প্রায় ছায়ার মতো ওকে সঙ্গ দিয়ে গেছে ফ্রাগা। কখনও জলে ভেসে। কখনো চক্কর দিয়েছে মাথার উপর। প্রাণদাতা মানুষটিকে ফেলে যায়নি।
প্রতাপের শেষ দিনটা কেটেছিল প্রায় বেহুঁশ অবস্থায়। শরীর আর বইছিল না। তবু দুই হাতের কঠিন বাহু বন্ধনের ভিতর কাঠের টুকরোটা ছাড়েনি। সেই দিনই বেলা প্রায় দুপুর নাগাদ ফিলিপাইনের উপকূল থেকে কয়েক নট দূরে এক মাছ ধরা ট্রলার দেখতে পায় ওকে। দেখার কথা নয় অবশ্য। কারণ ট্রলার যাচ্ছিল অনেকটাই দূর দিয়ে। গোড়ায় দেখতেও পায়নি। কিন্তু সিগালটাকে জলের উপর ওইভাবে চক্কর মারতে দেখে সন্দেহ হয়েছিল। কৌতূহলে খানিক এগিয়ে যেতেই প্রতাপকে দেখতে পেয়ে তুলে নেয়।
অফুরন্ত প্রাণশক্তি, সহজে হার না মানা জেদ, অদম্য সাহস আর খানিকটা ভাগ্যের উপর নির্ভর করে পুরো চারটে দিন বিপদসংকুল দক্ষিণ চিন সাগরে শুধুমাত্র একটা কাঠের টুকরো অবলম্বন করে শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেল প্রতাপ। শুরু হল আর এক জীবন।
প্রথমে ফিলিপাইনের লাওয়াগ। যে ট্রলার ওকে জল থেকে উদ্ধার করেছিল, তারাই পৌঁছে দিয়েছিল উত্তর ফিলিপাইনের এই বন্দর শহরে। সেখান থেকে ম্যানিলা। দেশে ফিরতে হলে ম্যানিলায় ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া উপায় নেই। কপর্দকহীন প্রতাপের ম্যানিলায় আসতে কিছু সমস্যা ছিল হয়তো। কিন্তু ব্যাপারটা সহজ হয়ে গিয়েছিল উদ্ধারকারী ট্রলারের প্রধান ওয়াং–এর জন্য। ওয়াং চিনা হলেও ফিলিপাইনের মানুষ। ঝানু লোক। ম্যানিলার অন্ধকার জগতের সঙ্গে কিছু যোগাযোগও ছিল। ঝানু ওয়াং প্রতাপের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে অসুবিধা হয়নি, ছেলেটা কোন জাতের। লাওয়াগে ওকে নামিয়ে দেবার সময় হাতে একটা ঠিকানা দিয়ে বলেছিলেন, ‘প্যাট, ম্যানিলায় গিয়ে এই ঠিকানায় একবার যোগাযোগ করতে পারো। কাজ পেয়ে যাবে।’
ম্যানিলা পৌঁছোবার প্রয়োজনীয় প্লেনভাড়া সমেত কিছু হাত খরচও দিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
প্রতাপ অবশ্য ঠিক করেছিল, ম্যানিলায় পৌঁছে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। দেশে মায়ের কাছেই ফিরে যাবে আবার। কিন্তু হল না। ম্যানিলা শহরের জাঁকজমক আর বেশ মোটা মাইনের একটা কাজের প্রস্তাবে, মত পালটে ফেলল। কাজটাও মনের মতো। ফিলিপাইন দেশটা অসংখ্য ছোটো-বড়ো দ্বীপ নিয়ে। দ্বীপ থেকে দ্বীপে পণ্য পরিবহনের জন্য দিনভর চলাচল করে অসংখ্য বার্জ আর বামবোট। তেমনই এক বামবোটের সারেং তথা প্রধান।
গোড়ায় জানাতে না পারলেও অল্প দিনের মধ্যেই অবশ্য বুঝে ফেলেছিল মাল পরিবহনের আড়ালে এদের আসল কাজ স্মাগলিং। ততদিনের কারবারের সঙ্গে ভালই জড়িয়ে পড়েছে। তবে তা নিয়ে আক্ষেপ ছিল না। হাতে অঢেল কাঁচা পয়সা। থাকার জন্য ভাল হোটেল। অথচ কাজ তেমন বেশি নয়। যখন কাজ পড়ে, একটানা কয়েক দিন। তারপর দু’এক সপ্তাহ টানা বিশ্রাম। ম্যানিলা শহরতলীর দারুণ এক ফ্ল্যাট। দলে ক্রমে খাতিরও বাড়ছিল। তারপর একদিন পুলিশের সঙ্গে আচমকা এনকাউন্টার। কয়েক মিনিটে শেষ হয়ে গেল গ্যাংটা। প্রতাপ অবশ্য নিরাপদেই সরে পড়তে পেরেছিল।
তবে একেবারে পার পাওয়া যায়নি। মাস খানেক বাদে ধরা পড়ে পুলিশের হাতে। তবে ততদিনে গুছিয়ে নিয়েছিল সব। অগত্যা প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস।
এই ঘটনার অল্প কিছুদিন পরেই ওর জেড–এর সঙ্গে যোগাযোগ। তবে সেই ইতিহাস আমাদের এই কাহিনির জন্য তেমন প্রাসঙ্গিক নয়। যেমন প্রাসঙ্গিক নয়, কী করে ও ধীরে ধীরে জেড–এর দলের এক অপরিহার্য ব্যক্তি হয়ে উঠল, সেই কাহিনি।
তবে বর্তমান গল্পে ফিরে যাবার আগে একটি ছোট্ট ঘটনা বলে নেওয়া যায়। বোনাপার্ট জাহাজের সেকেন্ড অফিসার ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের সঙ্গে এরপর একদিন হঠাৎই দেখা হয়ে গিয়েছিল প্রতাপের। হংকং শহরে প্রতাপের তখন যথেষ্টই প্রতাপ। স্বয়ং জেডও সমীহ করে। তবু ম্যাকডোনাল্ড সাহেবকে হাতের মুঠোয় পেয়েও ছেড়ে দিয়েছিল।
প্রতাপ সেদিন সঙ্গীদের সঙ্গে চ্যাথাম রোডে স্টার ফেরিঘাটের কাছে এক রেস্টুরেন্টে ঢুকেছে। হঠাৎ নজরে পড়ল খানিক দূরে ম্যাকডোনাল্ড সাহেব একটা টেবিলে একরাশ খাবার নিয়ে গোগ্রাসে গিলছে। পেটে রাক্ষসের খিদে। ওই দৃশ্য দেখে মাথায় হঠাৎ দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গিয়েছিল। সঙ্গীদের বসতে বলে সোজা সেই টেবিলের সামনে। তারপর নিতান্ত নিরীহ মুখে শুধু বলেছিল, “হাই ম্যাক, হাউ ডু ইউ?” ঠিক যে-ভাবে জাহাজের ক্যাপ্টেন রবার্ট সাহেব কথা বলতেন সেকেন্ড অফিসারের সঙ্গে।
মাথা নিচু করে খাচ্ছিলেন ম্যাকডোনাল্ড সাহেব। তাই দেখতে পায়নি আগে। খেতে খেতেই সামান্য মাথা তুলে প্রতাপকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রায় বিষম খেলেন। মুখটা আপনা থেকেই হাঁ হয়ে গেল। আধ–চিবোনো স্টেকের খানিকটা মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ল। দুই চোখ বিস্ফারিত করে সামনের মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইলেন খানিক। তারপর তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠেই পড়ি-কি-মরি করে দৌড়।
ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের ওই দুর্গতি দেখে সেদিন প্রাণ ভরে হেসে নিয়েছিল প্রতাপ। সাহেবের বিলটাও মিটিয়ে দিয়েছিল।
বোনাপার্ট জাহাজ হংকংয়ের বন্দরে এরপরেও ছিল দিন কয়েক। প্রতাপ খোঁজ নিয়ে জেনেছিল, এই ক’দিন ম্যাকডোনাল্ড সাহেব একবারের জন্যও জাহাজ থেকে নামেননি। ঝামেলা হতে পারে ভেবে একজনকে দিয়ে রেস্টুরেন্টের বিলের পেমেন্ট পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার নেয়নি। ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা পরে ম্যানেজারের কাছেই শুনেছিল।
মাফিয়া লিডার জেডের পক্ষে অসম্ভব বলে কিছু নেই। তবু প্রস্তুতির জন্য দিন দশেক সময় লাগল। প্রতাপ অবশ্য হায়াৎ হোটেলে সেই মিটিংয়ের দিনই রাতের প্লেনে ম্যানিলা চলে এসেছিল। জেডের নির্দেশ না থাকলেও এরপর হংকং ছাড়ত ও। দিন কয়েক এখন একা থাকা দরকার। যে ড্রাগন দ্বীপে ওকে যেতে হবে, তার কিছুই প্রায় জানা নেই। অগত্যা দোকান থেকে অনেক খুঁজে পুরোনো ন্যাশনাল জিওগ্রাফির কয়েকটা সংখ্যা কিনে নিয়েছিল। প্রতিটিতে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার কিছু রিমোট দ্বীপ আর অরণ্য অঞ্চলের উপর একাধিক নিবন্ধ। পরের কয়েকটা দিন ঘরে বসে খুঁটিয়ে পড়ে ফেলেছিল সেগুলো। নিতান্ত পুঁথিগত হলেও পরবর্তীকালে এই যৎসামান্য জ্ঞান যথেষ্টই কাজে লেগেছিল।
এরপর একদিন সবুজ সংকেত চলে এল। পরের দিনই শহরের প্রান্তে এক ফ্লাইং ক্লাব থেকে একটা টু–সিটার প্লেন রাতের অন্ধকারে আকাশে উড়ল। টু–সিটার হলেও বিমানটি মামুলি নয়। আমেরিকার বিখ্যাত নির্মাণ সংস্থার তৈরি। একটানা দশ ঘণ্টা পর্যন্ত উড়তে পারে। বিমানটি ফ্লাইং ক্লাবে এসেছে অতি সম্প্রতি। সংস্থার কর্তা ব্যক্তিরা প্রায়ই সেটাকে চালিয়ে পরীক্ষা করছেন। সুতরাং সন্দেহ করল না কেউ।
টু–সিটার প্লেন ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই পৌঁছে গেল যথাস্থানে। রাত তখন প্রায় বারোটা। আকাশে সরু এক ফালি জ্যোৎস্না। ম্লান আলোয় অনেক নীচে উত্তাল সাগরের মাঝে ঘন অরণ্য আর পাহাড় পরিবেষ্টিত দ্বীপ প্রায় নিঝুম পুরীর মতো।
পাইলট ইঙ্গিত করতেই হাতে বাইনোকুলার নিয়ে নীচে যথা সম্ভব চোখ ঘোরাল প্রতাপ। যতদূর চোখ যায় এক বিন্দু আলো বা প্রাণের চিহ্ন নেই।
কিছুটা যেন নিশ্চিন্ত হল। ওয়েটস্যুট আগেই পরে নিয়েছিল। এবার ডাইভিং মাস্কটাও লাগিয়ে নিল। কোমরে লাইফ বেল্ট। আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র বোঝাই ক্যাপসুলটা নিয়ে প্রায় নিমেষে প্রস্তুত। পাশেই একটা মুখ বন্ধ কাঠের ছোটো বাক্সে সিগাল ফ্রাগা নিঃশব্দে ঝিমচ্ছিল। বাক্সের মুখ খুলতেই অল্প ডানা ঝাপটে উঠে বসল প্রতাপের কাঁধের উপর। প্রতাপ মৃদু হেসে বলল, “এবার লাফ দিতে হবে রে ফ্রাগা। হুঁশিয়ার থাকিস।”
প্রায় ছ’হাজার ফুট উপর থেকে ঝাঁপ দিয়েছিল প্রতাপ। প্যারাসুট খুলল প্রায় অর্ধেক নেমে আসার পর। সুতরাং নিরাপদেই সমুদ্রে ল্যান্ডিং করতে পারল।
এই রাতে সমুদ্র যথেষ্টই শান্ত। আকাশে এক ফালি জ্যোৎস্না থাকায় অন্ধকার তেমন গাঢ় নয়। ডাইভিং মাস্কের ওয়াটার প্রুফ হেডলাইটের সুইচ অন করে দিতেই রিফ্লেকটার লাগানো জোরালো হেডলাইটটা জ্বলে উঠতে সামনে খানিক দূর পর্যন্ত আরও পরিষ্কার হয়ে উঠল। প্যারাসুটের দড়ি খুলে দিল প্রতাপ। কোমরে বাঁধা মালপত্র বোঝাই ক্যাপসুলটা পাশেই ভাসছিল। ডিম্বাকৃতি মস্ত ক্যাপসুলটা আসলে ভাঁজ করা রবারের হাওয়া নৌকো। ভাঁজের ভিতর সযত্নে রাখা রয়েছে দরকারি যাবতীয় জিনিসপত্র। ক্যাপসুলের এক প্রান্তে আঁটা ক্যাপ খুলতেই বের হয়ে এলো ছোটো এক ব্লোয়ার। বার কয়েক প্যাডেল টানতেই ক্যাপসুলটা খুলে গিয়ে নৌকোর মতো ফুলে উঠল। খোলের ভিতর ডাঁই করা জিনিসপত্র। নৌকোয় পুরো বাতাস বোঝাই হতে কিছুটা সময় লাগল আরও। লাইফ বেল্ট খুলে তুলে দিল নৌকোয়। তারপর ডান পা নৌকোয় তুলে হাতের হ্যাঁচকা টানে লাফিয়ে উঠতে যাবে, আচমকা ঢেউয়ে নৌকো সামান্য সরে গেল। আর সেই মুহূর্তেই ছুরির ফলার মতো দুই সার দাঁত বের করে মস্ত একটা প্রাণী ভুস করে ওর গা ঘেঁসে ভেসে উঠল। ক্ষুধার্ত হাঙর!
হাঙরটা যেভাবে ছোঁ মেরেছিল, তাতে এতক্ষণে প্রতাপের বাঁ পা তার পেটে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু গেল না তার কারণ, প্রাণীটা ছোঁ দেবার মুহূর্তে প্রতাপ নৌকোয় ওঠার জন্য লাফ দিয়েছিল। আর তার ফলে রবারের হালকা নৌকো স্থানচ্যুত হয়ে সামান্য সরে গিয়েছিল। তাই লক্ষ্যচ্যুত প্রাণীটা ওর গা ঘেঁষে ভেসে উঠল জলের উপর। শিকার ফসকে যেতে দারুণ আক্রোশে লেজের ঝাপটা মারল।
আচমকা জোরাল ঝাপটায় প্রতাপ টাল সামলাতে না পেরে হাত ফসকে ছিটকে পড়ল জলে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত শিউরে উঠল। মালুকা সাগরে এই জাতীয় হাঙর সাধারণত একা ঘোরে না। চলে দল বেঁধে। আশপাশে আরও কয়েকটা থাকা খুবই সম্ভব। ভাগ্যিস লাইফ বেল্টটা আগেই খুলে ফেলেছিল। কোমর থেকে ছুরিটা বের করে সঙ্গে বাঁধা নৌকোর দড়িটা কেটে ফেলল। দড়িটা ছাড়ল না অবশ্য। ধরে রইল বাঁ-হাতে। বোঁ করে লাট্টুর মতো একটা পাক খেয়ে চারপাশে তড়িৎ গতিতে চোখ বুলিয়ে নিল। ডাইভিং মাস্কের আলোয় খানিক দূরে জলের উপর অন্তত তিনটে হাঙরের পাখনা দ্রুত ছুটে আসছে ওর দিকে। ইতিমধ্যে পাশে ভেসে ওঠা প্রাণীটা ফের শিকারের উপর ছোঁ মারার জন্য ডুব দিয়েছে জলের নীচে। বুক ভরে মস্ত একটা শ্বাস নিয়ে বাঁ-হাতে নৌকোর দড়ি আগের মতোই আঁকড়ে জলের নীচে ডুব দিল প্রতাপ।
ডাইভিং মাস্কে উন্নত মানের লেন্স থাকায় হেডলাইটের আলোয় বেশ দেখতে পেল দু’পাশ দিয়ে ছুঁচলো মাথা দুটো বিশাল প্রাণী নীচ থেকে তীব্র বেগে ছুটে আসছে। ছুঁচলো মাথার সামান্য তলার দিকে ধারালো ছুরির ফলার মতো দুই সার তীক্ষ্ণ দাঁত আবছা আলোতেও ঝিলিক দিয়ে উঠছে। ক্ষুধার্ত প্রাণী দুটো প্রায় পাল্লা দিয়ে ছুটে আসছে ওকে ছিঁড়ে খাবার জন্য।
ডান পাশের হাঙরটা আকারে কিছু ছোটো হলেও সবচেয়ে কাছে রয়েছে সেটাই। সম্ভবত এটাই আগের বার ওর পাশে ভেসে উঠেছিল। যে গতিতে ছুটে আসছে, তাতে সেটাই ওর উপর আগে ঝাঁপিয়ে পড়ার সম্ভাবনা। বাকিটা তুলনায় বড়ো হলেও কিছু দূরে।
মুহূর্তে মনস্থির করে ফেলল প্রতাপ। দম নেবার জন্য আর একবার উপরে উঠতে পারলে ভাল হত। কিন্তু সে-চেষ্টা করল না। মুহূর্তের জন্যও প্রাণীটার উপর থেকে চোখ সরানো চলবে না। কোমরে আঁটা ওয়েটস্যুটের বেল্টে লোহার ওজন থাকায় জলের তলায় সহজে স্থির হয়ে থাকতে পারছে সেটাই বড়ো সুবিধে। কোমরে গোঁজা মাউজার সি–৯৬ রয়েছে। কিছুটা পুরনো আমলের পিস্তল হলেও দারুণ কাজের। কিন্তু এই জলের তলায় তেমন কাজে আসবে না। ডান হাতে তীক্ষ্ণ ছুরিটা ধরাই ছিল। নৌকোর দড়ি ধরে দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করতে লাগল।
সাঁ করে প্রায় বিদ্যুৎ বেগে দুই সার তীক্ষ্ণ দাঁত নিয়ে ছোঁ মারল হাঙরটা। আগাগোড়া চোখ রেখেছিল প্রতাপ। তাই প্রায় অন্তিম মুহূর্তে প্রাণীটার গতিপথ থেকে এক ঝটকায় সরে যেতে সমস্যা হল না। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে প্রাণীটা এবারও ওর পাশ দিয়ে সোজা উঠে গেল উপর দিকে। ঠিক এই সমটার জন্যই অপেক্ষা করছিল প্রতাপ। মুহূর্ত মাত্র দেরি না করে ডান হাতের লম্বা ছুরিটা আমূল বিঁধিয়ে দিল হাঙরটার পেটে। তীব্র গতির দরুন নরম পেট নিমেষে কুমড়ো ফালি দেবার মতো চিরে দু’ফালা হয়ে গেল। রক্তে ভরে গেল চারপাশ।
পিছনে ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্তের ধারা নিয়ে হাঙরটা লাফিয়ে ভেসে উঠেই তীব্র বেগে ফের গোঁত্তা মারল জলের তলায়। আর সেই মুহূর্তেই পিছনে বড়ো যে হাঙরটা ছুটে আসছিল, কাঁচা রক্তের গন্ধে গতিপথ পালটে ঝাঁপিয়ে পড়ল আগেরটার উপর। চারপাশে আরও যেগুলো ছিল, ছুটল সেই দিকে। নিমেষে হিংস্র দাঁত শিকারকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলল।
প্রতাপ ততক্ষণে উঠে পড়েছে নৌকোয়। প্রথমেই ডাইভিং মাস্কের হেডলাইট খুলে নিবিয়ে ফেলল। ওটা জ্বেলে রাখা মানেই অযথা অন্যদের জানান দেওয়া। দূরে দ্বীপটা দেখা যাচ্ছে না আর। হারিয়ে গেছে দিগন্তরেখার ওপারে। কম্পাস দেখে হিসেব করে নিয়ে ও দাঁড় টানতে লাগল।
দূরত্ব কম নয়। প্রতিকূল স্রোত। তবু যতটা সম্ভব দ্রুত পৌঁছোতে হবে। ভোর হবার আগেই। ইতোমধ্যে গোটা কয়েক হাঙর চারপাশে পাক খেতে শুরু করেছে। পিঠের উপরের পাখনা কখনও নৌকো ছুঁয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে শুধু পিস্তল নয়, রাইফেলও রয়েছে। সহজেই ঘায়েল করা যায়। কিন্তু তাতে দ্বীপের জংলীদের কাছে নিজের উপস্থিতি প্রকাশ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা। তবু হঠাৎ চারপাশে এত হাঙর দেখে কিছু অবাকই হল ও। মালুকা সাগরে হাঙরের উৎপাত কিছু বেশি ঠিকই। তাই বলে এক জায়গায় এমন হাঙরের ঝাঁক দেখবে, আশা করেনি।
ব্যাপারটা ভাবতে ভাবতে দাঁড় টানছিল প্রতাপ। হঠাৎ আবছা আলোয় জলের উপর সাদা কী একটা ভাসতে দেখে নৌকো সেদিকে এগিয়ে নিল। ঢেউয়ের উপর একটা প্যারাসুট ভেসে চলেছে। গোড়ায় ভেবেছিল, ওরই হয়তো। কিন্তু ভাল করে লক্ষ করে বুঝতে পারল প্যারাসুট একটা নয়, দুটো। আশপাশে ভাসছে আরও নানা জিনিসপত্র। ছেঁড়া কাপড়, প্ল্যাস্টিকের টুকরো, দড়িদড়া। নৌকো বা জাহাজডুবি হলে যেমন দেখা যায়।
স্থানটিতে এত হাঙরের উপস্থিতির সঙ্গে মেলাতে গিয়ে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। সন্দেহ নেই, খানিক আগে তেমন কিছুই ঘটেছে এখানে। নরমাংসের লোভে হাঙরের ভিড় সেই কারণে। তবু খটকা কিছু রয়েই গেল। জাহাজডুবি হলে প্যারাসুট কোথা থেকে আসবে?
ব্যাপারটা নিয়ে বেশি ভাববার সময় অবশ্য প্রতাপের তখন ছিল না। হাঙরের দল যেভাবে চারপাশে ছোঁক ছোঁক করছে, যত দ্রুত সম্ভব দ্বীপে পৌঁছনো দরকার।
প্রতাপ যখন দ্বীপের কাছে পৌঁছল, শেষ রাত। চাঁদ অস্ত গেছে অনেকক্ষণ। পুব আকাশে সামান্য আলোর ছটা। সেই আলোয় দ্বীপটাকে কতকটা উটের কুঁজের মতো দেখাচ্ছে। ঘন অরণ্যে ছাওয়া দ্বীপের মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে একসারি খাড়া পাহাড়। সেই পাহাড়ও ঘন অরণ্যে পূর্ণ। কোথাও প্রাণের সাড়া নেই। বিপুল গর্জনে একের-পর-এক ঢেউ শুধু আছড়ে পড়ছে নির্জন বালুকাবেলার উপর।
নামার আগে দিনের আলোয় নৌকো থেকে দ্বীপটাকে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে নেবার দরকার ছিল। কিন্তু সে-জন্য সূর্য না ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করা দরকার। তাতে জংলিদের নজরে পড়ে যাবার সম্ভাবনা। সময় নষ্ট না করে প্রতাপ সুবিধামতো ছোটো এক বালুকাবেলায় নৌকা ভেড়াল।
জোয়ার চলছে। সমুদ্রের জল ছোটো বালুকাবেলা প্লাবিত করে অদূরে বনাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। হালকা রবারের নৌকো ডাঙায় টেনে তুলতে পারল সহজেই। সিগাল ফ্রাগা এতক্ষণ নৌকোর কানায় বসে ঝিমচ্ছিল। উড়ে প্রতাপের কাঁধে বসল। নৌকোর হাওয়া বের করে দিয়ে দ্রুত গুছিয়ে ফেলল প্রতাপ। অদূরে শুকনো বালির উপর ছড়ানো কিছু বড়ো ধরনের বোল্ডার। দেখে বোঝা যায় জোয়ারের জল তেমন পৌঁছোয় না। ও সেই বোল্ডারগুলোর আড়ালে ভাঁজ করা নৌকোটা গুঁজে দিয়ে কিছু ডালপালা চাপা দিল। তারপর অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্র বোঝাই রুকস্যাক পিঠে চাপিয়ে রাইফেল আর জলের বোতল তুলে নিল কাঁধে।
শেষ রাতের অন্ধকার হলেও অচেনা জঙ্গলের ভিতর বেশি দূর যাওয়া ঠিক হবে না। তাই খানিক এগোবার পর মস্ত গাছের পাশে ঘন একটা ঝোপের দেখা পেয়ে প্রতাপ ঢুকে পড়ল ভিতর।
রাত বেশি নেই। ভেবেছিল বাকি সময়টা নিরুপদ্রবেই কাটিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু হল না। একে তো ভিজে প্যাচপেচে কাদা। জুতো বসে যায়। তার উপর মশা। মিনিট কয়েকের মধ্যে প্রায় ছেঁকে ধরেছে। রুকস্যাকে মশার ক্রিম রয়েছে। কিন্তু বের করে মাখতে ভরসা হল না। ক্রিমের গন্ধে ওর অবস্থান অন্য কারও কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা। আগে ভোর হওয়া দরকার।
ভোরের আলো ফুটতে চারপাশটা একসময় ফর্সা হয়ে উঠল। হুম–হুম শব্দে খুব কাছেই একজোড়া হর্নবিল ডেকে উঠল। নিস্তব্ধ বনভূমির মধ্যে মশাদের কথা বাদ দিলে এই প্রথম কোনও আওয়াজ শুনতে পাওয়া গেল। ক্রমে দু’চারটে অন্য পাখির রব। মশার ঝাঁক অবশ্য কমার লক্ষণ নেই। বরং বেলা বাড়তেই শুরু হল মাছির উপদ্রব। সামান্য অসতর্ক হলেই মাছির ঝাঁক উড়ে বসছে মুখের উপর। বিরক্তিকর ব্যাপার।
দিনের আলো আরও কিছু চড়ে উঠতে প্রতাপ সাবধানে পা ফেলে এগোতে লাগল। গাছপালার ভিতর যতটা চোখ যায় শুধু ভিজে মাটি আর প্যাচপেচে কাদা। ভাঙাচোরা দাঁত বের করা পাথরের টুকরো। ওর লক্ষ্য দ্বীপের মাঝে উটের কুঁজের মতো পাহাড়টা। জেডের কাছ থেকে বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও প্রতাপ তার সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে বুঝেছিল, তেমন কোনও মূল্যবান পাথর যদি এখানে থাকে, তা রয়েছে দ্বীপের প্রায় কেন্দ্রে ওই পাহাড়ের ভিতর কোনও স্থানে। প্রথমে ওখানেই খোঁজা দরকার।
গোড়ায় দূরত্ব খুব বেশি নয় বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ঘণ্টা তিনেক চলার পরেও পাহাড়ের দূরত্ব তেমন কমেছে বলে মনে হল না। ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে চলার গতি তেমন বেশি নয়। চারপাশে সতর্ক দৃষ্টিও রাখতে হচ্ছিল। অথচ পরিশ্রম কম হয়নি। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার এই নিরক্ষীয় অঞ্চলের বিভিন্ন অরণ্যের কথা আগে শুনে থাকলেও বিস্তারিত জানতে পেরেছে ম্যানিলার হোটেলে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির পাতা থেকে। তাই একেবারে অজানা নয়। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা আরও ভয়ানক। তার উপর পায়ের নীচে কোথাও জলকাদায় একাকার। পুরনো পচা পাতার ঢাঁই। পা পড়লেই হাঁটু পর্যন্ত নেমে যাচ্ছে। এগোতে হচ্ছে অনেক সাবধানে। তার উপর আর এক আপদ জোঁক। সুযোগ পেলেই হাত–পায়ের অনাবৃত স্থানে কামড়ে ধরে ঝুলে পড়ছে। সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে ছাড়াতে হচ্ছে।
তেমন বন্য প্রাণীর দেখা এখনও না মিললেও বেশ কয়েকটা সাপের দেখা মিলেছে। সৌভাগ্য, কোনওটাই তেমন বড়ো নয়। উপরন্তু নির্বিষ জাতের। আরও ঘণ্টা দেড়েক এ-ভাবে চলার পর প্রতাপ সামান্য বিশ্রাম নেবার প্রয়োজন অনুভব করল। খিদেও পেয়েছে। ঘড়িতে তখন দুপুর প্রায় বারোটা। সকালের ঝকঝকে আকাশ ইতোমধ্যে বেশ মেঘলা। বৃষ্টি নামার সম্ভাবনা। অবশ্য গরম কমেনি। নিরক্ষীয় অঞ্চলের বিশ্রী গুমোট। ঘামে জবজব করছে শরীর। গায়ের জামাটা খুলতে পারলে ভাল হত। কিন্তু মশা–মাছি তো বটেই নতুন উপদ্রব জোঁকের কথা ভেবে ভরসা হল না। পথ চলায় সাময়িক বিরতি দিয়ে সুবিধামতো মোটা একটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসল।
সঙ্গী ফ্রাগা এতক্ষণ কাঁধের উপর ঠায় বসে ছিল। এবার উড়ে অদূরে পড়ে থাকা মোটা এক গাছের গুঁড়ির উপর। ফ্রাগাকে দেখে প্রতাপের বুঝতে বাকি রইল না, বেজায় খিদে পেয়েছে তারও। রুকস্যাক খুলে একটা মুখ আঁটা ছোটো পলিপ্যাক বের করল ও। ছুরি দিয়ে মুখ কেটে ফেলতেই বের হল নুন আর মরিচ দেওয়া সেদ্ধ মাংস আর স্যামন মাছের টুকরো। গোটা কয়েক মাছের টুকরো ফ্রাগার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বাকিটা খেতে শুরু করল।
ছোটো প্যাকেট। খাবারের পরিমাণ খুব বেশি নয়। দারুণ খিদেয় দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল। খাইয়ে হিসেবে পরিচিত মহলে খ্যাতি আছে প্রতাপের। আজ ওই সামান্য খাবারে শুধু খিদেটাই মিটল, পেট ভরল না। রুকস্যাকের ওজন একেবারেই বাড়াতে চায়নি। সেই হিসেবে আগামী সাত দিনের খাবার নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে যদি কাজ শেষ না হয় অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। তা-ও গুলি–বন্দুক যথাসম্ভব ব্যবহার না করে। এই ছোটো দ্বীপে নিজের উপস্থিতি গোপন রাখা দরকার। অতিরিক্ত কিছু খাবারের প্যাকেট আনা হলেও রয়েছে নৌকোয়। ক’দিন যথেষ্ট হিসেব করেই চলতে হবে।
খাবার শেষ করে প্রতাপ এবার কাঁধে ঝোলানো জলের বোতলটা খুলল। জল প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। প্রচণ্ড ঘাম আর পরিশ্রমের জন্য জল কিছু বেশিই খাওয়া হয়েছে। সঙ্গে ক্লোরিন ট্যাবলেট রয়েছে। এরপর তাই দিয়ে জলের ব্যবস্থা করতে হবে। বোতলের বাকি জলটা গলায় ঢালতে গিয়ে আকাশের দিকে চোখ পড়তে প্রতাপ প্রমাদ গণল। বৃষ্টি আসছে। সম্ভবত মুষলধারে।
এসব অঞ্চলের বৃষ্টি সম্পর্কে যেটুকু তথ্য জানা আছে, তা একেবারেই সুখপ্রদ নয়। বাস্তব যে আরও ভয়ানক, গত কয়েক ঘণ্টার অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারছিল প্রতাপ। তার উপর জুন মাস। তবু আকাশের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে উঠলেও মনটা কিছু ভালও হয়ে গেল। খালি জলের বোতল ফের ভরে নিতে পারবে।
অনুমান মিথ্যে হয়নি। অল্প সময়ে মধ্যে সেই যে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল, থামার নাম নেই। গায়ে রেন কোট চাপিয়ে নিলেও এই অবস্থায় চলার প্রশ্ন আসে না। ঘন জঙ্গলে এমনিতেই আলো কম। অবিশ্রান্ত বর্ষণে প্রায় রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। পায়ের তলায় স্রোতের মতো জল বইতে শুরু করেছিল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত উঠে এল। ফ্রাগা মাটিতে পড়ে থাকা যে ভাঙা গুঁড়ির উপর বসে ছিল, জলের স্রোতে সেটা চলতে শুরু করলে বেচারা উড়ে একটা গাছের ডালে বসল। প্রতাপ গ্রামের মানুষ। গাছে ওঠার ব্যাপারে যথেষ্টই দক্ষ। যে-ভাবে জল বইছে, অসাবধানে ভাসিয়েও নিতে পারে। কিন্তু যে-ভাবে শ্যাওলা ধরা গুঁড়ি বেয়ে জলের ধারা নামছে, পিছলে পড়ার সম্ভাবনা। অগত্যা দাঁড়িয়ে রইল সেখানেই।
একটানা প্রায় চার ঘণ্টা অঝোরে বর্ষণের পর বৃষ্টি যখন থামল, পড়ন্ত বিকেল। মেঘ কেটে আলো ফুটলেও তেমন জোরালো নয়। সন্ধে নামবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। সমুদ্রের কাছে হওয়ায় জমা জল দ্রুত কমতে শুরু করলেও এই সন্ধের মুখে প্রতাপ আর এগোতে চাইল না। সামান্য খোঁজ করতেই লতাগুল্মে ছাওয়া উঁচু একটা ঢিবি আকারের জমি নজরে পড়ল। গাছপালায় ভরতি হলেও রাত কাটাবার পক্ষে সুবিধাজনক। এত বৃষ্টিতেও জল ওঠেনি। অগত্যা তাঁবু বের করে খাটিয়ে ফেলল। চট করে যাতে নজরে না পড়ে, গোটা কয়েক ডাল কেটে পুঁতে দিল চারপাশে।
কাজ তখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, হঠাৎ এক অদ্ভুত জিনিস নজরে পড়ল ওর। একটা বড়োসড়ো কাপড়ের পুঁটলির মতো কিছু ঢিবিটার নীচে একটা ঝোপের গায়ে আটকে আছে। সম্ভবত জলের স্রোতে ভেসে এসেছে। এই পাণ্ডব বর্জিত স্থানে এমন পরিষ্কার কাপড়ের পুঁটলি দেখে প্রতাপ কৌতূহলে এগিয়ে গিয়েছিল। যা দেখল, পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল।
দামি জিনস আর শার্ট পরা একটা মুন্ডুহীন মৃতদেহ। ভোঁতা কোনও অস্ত্র দিয়ে মাথা কুপিয়ে কেটে নেওয়া হয়েছে। মস্তকবিহীন হলেও দেখে বোঝা যায় লোকটি ইউরোপীয়। প্রায় সাড়ে ছ’ফুট লম্বা পেশিবহুল শরীর। পরনে কেতাদুরস্ত পোশাক। কোমরে বুলেটের বেল্টে কিছু তাজা কার্তুজ তখনও বর্তমান। বাঁ হাতের তালুর পিছনে জাহাজের নোঙরের উল্কি। স্বল্প আলোয় যথাসম্ভব নজর করেও মৃতদেহে অন্য কোনও আঘাতের চিহ্ন খুঁজে পেল না। সম্ভবত মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। তারপর কেটে নেওয়া হয়েছে মাথা। অথবা সরাসরি মাথা কেটে হত্যা করাও সম্ভব। আর সেই হত্যা খুব বেশি আগের নয়। মৃতদেহ ফুলে উঠলেও পচন ধরেনি। অবশ্য ক্ষতস্থানে ইতিমধ্যে অল্প হলেও মাছির ম্যাগট দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ লোকটি খুন হয়েছে গতকালই কোনও এক সময়ে। তার এই দ্বীপে পা রাখার কয়েক ঘণ্টা আগে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতেই পড়েছে এই সব অঞ্চলে আদিবাসীদের অনেকেই নৃমুণ্ড শিকারি। বাসগৃহের সমানে সাজিয়ে রাখা নরমুণ্ডের সংখ্যা দিয়েই বিচার হয় গৃহস্থের সম্মান, প্রতিপত্তি। শুনেছে এই প্রথা উত্তর-পূর্ব ভারতে নাগাদের মধ্যেও রয়েছে। লোকটা তাই কাদের হাতে খুন হয়েছে, বুঝতে বিলম্ব হল না প্রতাপের। কিন্তু অনেক ভেবেও বুঝে উঠতে পারল না, বিজন দ্বীপে লোকটার কী কারণে পদার্পণ? গত রাতে সমুদ্রে দুটো প্যারাসুট ভাসতে দেখেছে। সম্ভবত লোকগুলো ওরই মতো গোপনে পাড়ি দিয়েছে এই দ্বীপে।
ব্যাপারটা তলিয়ে ভাবতে গিয়ে একটা অন্য সন্দেহ ওর মাথার ভিতর দলা পাকিয়ে উঠতে লাগল। জেড আর তার সাগরেদ শয়তান লি তাকে মোটেই সত্যি কথা বলেনি। ওই দ্বীপে যে অঢেল হীরে–জহরত রয়েছে, তা মোটেই আর গোপন নেই। জেনে ফেলেছে আরো কিছু ব্যক্তি। তারাও লোক পাঠিয়েছে। ইতিমধ্যে দ্বীপের জংলী আদিবাসীদের সঙ্গে তাদের খণ্ডযুদ্ধও হয়ে গেছে। অর্থাৎ দ্বীপের জংলী মানুষেরা এখন অনেক সতর্ক। হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে ওদের। অগত্যা শুধু জংলীদের মোকাবিলাই নয়, হুঁশিয়ার থাকতে হবে গুপ্তধনের খোঁজে আসা অন্যদের নিয়েও। আর সেই লোকগুলো যে মোটেই সামান্য নয়, তার প্রমাণ নিহত ব্যক্তির শারীরিক কাঠামো। হাতের উল্কি। কোমরে বুলেটের বেল্ট।
সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে ইতোমধ্যে। অযথা না ভেবে প্রতাপ এগিয়ে গেল নিজের তাঁবুর দিকে। পরিস্থিতি অল্প সময়েই বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। তবে তার মোকাবিলার জন্য অযথা চিন্তা নয়, দরকার নিটোল একটা একটা ঘুম।
রাতের খাওয়া সেরে তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েছিল ও। রাত তেমন বেশি না হলেও চারপাশ ভয়ানক রকম নিস্তব্ধ। মাঝেমধ্যে ঝিঁঝির কোরাস ছাড়া আর কোনও সাড়াশব্দ নেই। নির্জন নিশুতি রাত থমথম করছে।
ঘুম কোনো দিনই তেমন গাঢ় নয় প্রতাপের। তার উপর অপরিচিত দ্বীপে প্রথম রাত। সেই ঘুমের ভিতর অনেক দূর থেকে ভয়ানক এক গুরুগম্ভীর আওয়াজ কানে আসতে হঠাৎই জেগে উঠে বসল ও। প্রথমে মনে হয়েছিল মেঘের গর্জন। কতকটা সেই রকমের আওয়াজ। কিন্তু মেঘের আওয়াজ একটানা এতক্ষণ চলে না। দ্রুত বাইরে এসে দাঁড়াল। আওয়াজটা তখনও চলছে। কখনও বেশ জেরেই। মনে হচ্ছে কয়েক হাজার ড্রামে একসঙ্গে ঘা পড়ছে। সেই রকম গুম–গুম আওয়াজ। কান পেতে খানিক শুনেও কোনও কিনারা করতে পারল না। শুধু টের পেল, বিজন এই দ্বীপে ওত পেতে রয়েছে আরও অনেক বিপদ।
পরের দিন ভোরে প্রতাপের ঘুম ভাঙল ফ্রাগার চিৎকারে। বাইরে গাছের ডালে বসে ফ্রাগা তারস্বরে চিৎকার করে চলেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, অন্তত ঘণ্টাখানেক আগে আলো ফুটেছে। যদিও ঘন জঙ্গলের ভিতর তেমন পরিষ্কার হয়নি এখনও। কিন্তু ফ্রাগা ওইভাবে ডাকছে কেন? কিছু দেখেছে নিশ্চয়।
মুহূর্তে রাইফেল হাতে বাইরে বের হয়ে এল প্রতাপ। ওকে দেখেই ফ্রাগা উড়ে ওর কাঁধের উপর এসে বসল। ডাকার বিরাম নেই তখনও। ঘন জঙ্গলের ভিতর স্বল্প আলোয় গোড়ায় কিছু নজরে পড়েনি। কিন্তু ফ্রাগার দৃষ্টি অনুসরণ করে যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা ভাবতেও পারেনি। প্রথমে মনে হয়েছিল, দুটো প্রাগৈতিহাসিক যুগের ডাইনোসর যেন সিনেমার পর্দা থেকে উঠে এসেছে। তারপর মনে হল ডাইনোসর নয়, দুটো ভীষণ দর্শন ড্রাগন। দ্বীপে এই ড্রাগনের কথাই হংকংয়ের সেই মিটিংয়ে লি পেংয়ের কাছে শুনেছিল।

পা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত প্রায় পনেরো ফুটের মতো লম্বা। কালো কোঁচকানো চামড়ার উপর অজস্র গুটি। তাকালে সারা শরীর শিরশির করে ওঠে। চারটি বাঁকা পায়ের ডগায় তীক্ষ্ণ ধারাল নখ। আগুনের হলকা বের হচ্ছে মুখ নিয়ে। হাপর টানার মতো শোঁ–শোঁ শব্দ। দারুণ উৎসাহে প্রাণী দুটো অদূরে সেই মুণ্ডুহীন দেহটা খুবলে ছিঁড়ে খাচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশিটাই খেয়ে ফেলেছে।
বিস্ময়ের ধাক্কা সামলাতে কিছু সময় লাগল প্রতাপের। গোড়ায় মনে হয়েছিল স্বপ্ন দেখছে বুঝি। রক্ত-মাংসের কোনও প্রাণীর মুখ দিয়ে কি আগুন বের হতে পারে! অজান্তেই হাতের রাইফেল উঠে গিয়েছিল প্রাণী দুটোর দিকে। তারপরেই মনে পড়ল ক’দিন আগে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির পাতায় দেখা কোমোডো ড্রাগনের ছবি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো গোসাপ জাতীয় প্রাণী। ইন্দোনেশিয়ার কয়েকটি দ্বীপেই দেখা যায় এদের। লালচে হলুদ রংয়ের চেরা লম্বা জিভ যখন ঝিলিক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে, হঠাৎ দেখলে আগুনের ফুলকি বলেই ভুল হয়।
ইন্দোনেশিয়ার এই কোমোডো ড্রাগন বড়ো আকারের গোসাপ হলেও শুধু হিংস্রই নয়, ভয়ানক বিষাক্ত প্রাণীও বটে। যে-সব দ্বীপে এদের বাস স্থানীয় মানুষ বা অন্য প্রাণী সযত্নে এড়িয়ে চলে। তেমন দ্রুত ছুটতে না পারলেও মুখ দিয়ে অবিরাম ঝরতে থাকা লালা এতটাই বিষাক্ত যে, সামান্য কামড়েই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সারা শরীর বিষিয়ে ওঠে। নিশ্চিত মৃত্যু। এরা তাই ঘন ঘাস বা পাথরের আড়াল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের উপর। কোনওক্রমে দাঁত বসাতে পারলেই কাজ হাসিল। বড়ো সম্বর বা বুনো মোষ কামড় খেয়ে ছিটকে পালাতে পারলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিষের যন্ত্রণায় ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। তারপর কমোডো ড্রাগনদের ভোজের আসর বসে। পচা মৃতদেহর প্রতিই ওদের আকর্ষণ বেশি। তা না হলে তাঁবুর ভিতর ঘুমিয়ে থাকা সে নিজেই হয়তো এতক্ষণে শিকার হয়ে পড়ত। সামান্য একটা কামড়েই তিল তিল করে মৃত্যু। ভাবতে গিয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল ওর। এই বিজন দ্বীপের ঘন অরণ্যে প্রতি পদক্ষেপেই ওত পেতে রয়েছে মৃত্যু।
ওর চোখের সামনেই প্রাণী দুটো মৃতদেহটি দেখতে দেখতে খেয়ে প্রায় সাফ করে ফেলল। সামান্য অংশও আর অবশিষ্ট রইল না। পড়ে থাকা রক্ত মাখা জামাকাপড়ের উপর শুধু কয়েক লক্ষ মাছির ভনভন।
উদরপূর্তি করে কমোডো দুটো বিদায় নিতে ফ্রাগা থেমে গেছে তখন। মাছির সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। ভয়ানক ভনভন শব্দে শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছিল প্রতাপের। দ্রুত তাঁবু গুটিয়ে ফেলে ও স্থানত্যাগ করল। ঝোপঝাড় ভেঙে শুরু হল পথ চলা।
আকারে ছোটো হলেও দ্বীপটা পুব–পশ্চিম বরাবর লম্বাটে ধরনের। মাঝখানে উঁচু পাহাড়। যেখানে ও বোট ভিড়িয়েছে, সেটা দ্বীপের পশ্চিম প্রান্ত। তাই চলতে হবে পুব দিক বরাবর। পুরো দ্বীপটাই হয়তো পাড়ি দিতে হবে। অনেকটাই পথ। ঘণ্টাখানেক চলার পরেই প্রতাপ বুঝল, কাজটা খুব সহজ নয়। অরণ্য আক্ষরিক অর্থেই দুর্ভেদ্য। যত ভিতরে যাচ্ছে তত গভীর। গাছপালার উচ্চতাও বাড়ছে। বিশাল আকারের মহীরুহ যেন পরস্পরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আকাশ ছুঁতে চাইছে।
তার উপর ঘন অরণ্যে প্রতি পদক্ষেপেই ওত পেতে আছে বিপদ। কোমোডো ড্রাগন নজরে পড়েছে আরও বার দুয়েক। ভয়ংকর প্রাণীটার সংখ্যা এখানে যথেষ্টই। চলতে হচ্ছে সতর্ক হয়ে। তারই মধ্যে স্থানে স্থানে নানা চিহ্ন দেখে টের পাওয়া যাচ্ছে, এসব অঞ্চলে দ্বীপের জংলি মানুষের যথেষ্টই আনাগোনা। কোথাও নিপুণভাবে গাছ কাটা হয়েছে। নেভা অগ্নিকুণ্ডর চিহ্ন। এক স্থানে ঝোপের পাশে অদ্ভুত এক অস্ত্র দেখতে পেল। লম্বা বাঁট লাগানো পাথরের কুড়ুল। জিনিসটা যথেষ্ট মজবুতই শুধু নয়, যথেষ্ট ভারী। এত ভারী কুড়ুল যারা ব্যবহার করে, তাদের দৈহিক শক্তির কথা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।
অস্ত্রটা সঙ্গে নেবার ইচ্ছে ছিল। এই ঘন অরণ্যের ভিতর ওটা রাইফেল বা পিস্তলের চাইতে বেশি কাজের। কিন্তু ওজনের কথা ভেবে হল না।
ভিজে প্যাচপেচে কাদা ভরা ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পরবর্তী প্রায় দেড় ঘণ্টার মতো পথ চলল প্রতাপ। কিন্তু বেশি পথ যে এগোতে পারা যায়নি, বুঝতে পারছিল দূরে পাহাড় শীর্ষের দিকে তাকিয়ে। এভাবে পথ চললে আজ কোনও মতেই পাহাড়ের কাছে পৌঁছোনো যাবে না। হয়তো আগামী কালও নয়। অথচ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ শেষ করা দরকার।
বিষয়টি যখন ভাবিয়ে তুলেছে, ভয়ানক ব্যাপারটা ঘটল ঠিক ওই সময়। নানা ভাবনায় তখন ও কিছু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। সামনে একটা জলাশয় পড়তে তেমন হুঁশিয়ার হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। তেমন বড়ো জলাশয় নয়। চারপাশে বিশাল আকারের অজস্র মহীরুহ অসংখ্য ডালপালা ছড়িয়ে ছায়া বিস্তার করেছে। হালকা অন্ধকার। পাড়ের নরম কাদায় জীবজন্তুর একাধিক পায়ের দাগ। নরম কাদা এড়িয়ে মোটা শেকড়ের উপর পা দিয়ে জায়গাটা পেরোতে কিছু অসুবিধাই হচ্ছিল। ফ্রাগা হয়তো সেই কারণেই উড়ে খানিক দূরে এক গাছের ডালে আশ্রয় নিয়েছে। ব্যাপারটা তাই প্রায় জানান না দিয়েই এল।
আচমকা মাথার উপর হাপর টানার মতো চাপা নিঃশ্বাসের শব্দে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় মুহূর্তে মাথাটা সরিয়ে নিয়েছিল প্রতাপ। তাই মাথাটা বাঁচল। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। দ্রুত মাথা সারাতে গিয়ে পিছল শেকড়ের উপর সামান্য বেসামাল হয়ে পড়েছিল। সামলে ওঠার আগেই বিশাল এক পাইথন প্রকাণ্ড মুখব্যাদান করে পেঁচিয়ে ধরল ওকে। প্রাণীটার সেই প্রকাণ্ড মুখ গহ্বরের দিকে তাকিয়ে সারা শরীর প্রায় হিম হয়ে গিয়েছিল। সন্দেহ নেই, ক্ষুধার্ত প্রাণীটা ডাল থেকে ঝুলছিল। সময় মতো মাথা সরিয়ে না নিলে এতক্ষণে ওর মাথা দানোটার মুখের ভিতর। তা যখন হয়নি, অযথা না ভেবে আশু কর্তব্যটা বেশি জরুরি।
দানবটা এই অল্প সময়ের মধ্যে ভালই চেপে ধরেছে। বুকের উপর বাঁধন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। একটু পরেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে। বিপুল চাপে বুকের পাঁজর চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তবে হাত দুটো মুক্তই আছে এখনও। দারুণ আতঙ্কে হিম হয়ে আসা মগজের কোষগুলো সক্রিয় করার জন্য সামান্য ঝাঁকিয়ে নিল ও। দুই হাতের বজ্রকঠিন পাঞ্জায় চেপে ধরল দানবের গলা। পরবর্তী মিনিট দেড়েক প্রতাপের মগজের কোষগুলো শুধুমাত্র একটি কথাই জানান দিয়ে গেল, দানবটার গলায় এঁটে বসা তোমার হাতের পাঞ্জা একটুও আলগা হলে চলবে না প্রতাপ।
কিন্তু মগজের ভিতরে সেই চেতনা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। প্রতি আক্রমণ শুরু হতেই দানবটা ক্রমশ মরিয়া। গলার পেশিগুলো রবারের মতো স্ফীত হয়ে উঠছে। দুই হাতের প্রচণ্ড চাপেও রাখা যাচ্ছে না। অথচ দানবটার দেহের বাঁধন প্রতাপের বুকের উপর ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে আসছে। সেই প্রচণ্ড চাপে শরীরের পেশিগুলো শিথিল হয়ে আসতে চাইছে। পাঁজরের প্রতিটি হাড় বোধ হয় গুঁড়িয়ে যাবে এখনি।
কোমরের বেল্টে গোঁজা পিস্তল আর ছুরিটার দিকে একবার তাকাল। দুটো বস্তুর উপরই চেপে বসে আছে দানবটার মসৃণ চিত্রবিচিত্র দেহ। মুক্ত করার কোনও সম্ভাবনাই নেই। দানবটা এবার দুটো পা–ও জড়িয়ে ধরতে শুরু করেছে। নাহ্, আর দেরি করা যায় না। সারা শরীরের শক্তি কেন্দ্রীভূত করে প্রতাপ লাফ মারল এবার। শরীরে প্যাঁচানো দানবটাকে নিয়েই জলে এসে পড়ল।
জল বেশি নয়। কোনওক্রমে কোমর ডোবে। কিন্তু কাজ হবে ওতেই। মাভৈ। প্রাণপণ শক্তিতে দানবটার মাথা ও চেপে ধরল জলের তলায়। মাত্র কয়েক মিনিট। কিন্তু এই সময়টুকুই যেন অনন্তকাল বলে মনে হচ্ছিল ওর। আত্মরক্ষার তাগিদে দানবটার বাঁধন গোড়ায় আরও জোরে চেপে বসছিল শরীরের উপর। মনে হচ্ছিল, বুঝি আর পারবে না। হেরেই যাবে হয়তো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হার মানল দানবটা। গলার উপর প্রতাপের দুই হাতের প্রচণ্ড চাপে নিঃশ্বাসে আগেই টান পড়েছিল। এবার জলের নীচে একেবারেই বন্ধ হয়ে যেতে সামান্য শিথিল হয়ে এল গাছের গুঁড়ির মতো দেহটা। এই সময়টার জন্যই অপেক্ষা করছিল প্রতাপ। মুহূর্তে কোমর থেকে ছুরিটা টেনে নিয়ে দানবের গলার নীচে বসিয়ে নিমেষে দ্বিখণ্ডিত করে দিল।
তারপর দ্রুত হাতে ফাঁস আলগা করে প্রতাপ প্রথমেই চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। ঘন অরণ্যে এমন জলাশয়ের ধারেই গাছের ডালে ওত পেতে থাকে এই পাইথনগুলো। কোনও বন্যপ্রাণী জল খেতে এলে উপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর। ব্যাপারটা অজানা নয়। হুঁশিয়ার হওয়া উচিত ছিল। সন্তর্পণে চারপাশ আর একবার দেখে নিয়ে কাদা ভেঙে উঠে পড়ল প্রতাপ। পোশাক, পিঠের ব্যাগ ভিজে সপসপ করছে। সেই অবস্থায় ঝোপঝাড় ভেঙে ফের চলতে শুরু করল।
আরও কিছুক্ষণ চলার পরে চারপাশের জঙ্গল কিছু পাতলা হয়ে এল। নরম কাদার বদলে মাটিও কিছু শক্ত। পাথুরে ধরনের। গাছপালা ওই কারণেই পাতলা এদিকে। অগত্যা চলার গতি কিছু বাড়ল এবার। তবে চারপাশ অনেক ফাঁকা হবার কারণে আরও সতর্ক। চট করে নজরে পড়ে যাবার সম্ভাবনা। ওই সময় ক্ষীণ একটা জলধারার শব্দ প্রতাপের কানে এল। কান পেতে বুঝল, পাহাড়ি নদীর জলধারা! নদীর উজান ধরে এগোলে সহজেই পাহাড়ে পৌঁছোনো সম্ভব।
প্রতাপ সেই নদীর দিকেই যাবে কি না ভাবছে, হঠাৎ কাছেই মৃদু নড়াচড়ার শব্দ। নিমেষে বড়ো এক লাফে সরে গেল প্রতাপ। মুহূর্তে খটাশ করে জোরাল আওয়াজ। কোমর থেকে মাউজার বের করে লাট্টুর মতো পাক খেয়ে পিছনে তাকিয়ে অজান্তেই শিউরে উঠল ও। একটু আগে যেখানে ছিল, সেই গাছের গুঁড়িতে মাঝারি আকারের তীক্ষ্ণ এক পাথরের টুকরো গেঁথে রয়েছে। মুহূর্তে স্থান ত্যাগ না করলে এতক্ষণে পাথরটা ওকে ফুঁড়ে ফেলত। দ্রুত কাছেই এক গাছের আড়ালে সরে গিয়ে সন্তর্পণে চারপাশে তাকাল। আততায়ীকে দেখতে পেল না কোথাও। আক্রমণ ব্যর্থ হতে নিঃশব্দে সরে পড়েছে সে। সম্ভবত পিছন থেকে অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছিল। ও দাঁড়িয়ে পড়তে সুবিধাজনক অবস্থায় পেয়ে আক্রমণ হেনেছে।
কাজটা যে দ্বীপের জংলিদের বুঝতে অসুবিধা হল না প্রতাপের। যে-ভাবে একের-পর-এক ব্যাপারগুলো ঘটে যাচ্ছে, তাকে ভয়ংকর বললেও কম বলা হয়। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু যেন ডাক দিয়ে চলেছে। অরণ্য এদিকে কিছু পাতলা হবার কারণে জংলীদের কেউ ওকে দেখতে পেয়ে পিছু নিয়েছে। এই অবস্থায় আর পথচলা নয়, জঙ্গলে গা-ঢাকা দেওয়াই মঙ্গল। রাতে দু’চোখের পাতা আর বন্ধ করা যাবে না। হংকং শহরে মাফিয়া সর্দার জেডের গ্যাংয়ের সবচেয়ে ডাকসাইটে মানুষটি এই প্রথম টের পেল, জীবনে অনেক সংকট মুহূর্ত পাড়ি দিয়ে এলেও এমন অবস্থায় পড়তে হয়নি আগে।
সেদিনের মতো চলার বিরতি দিয়ে প্রতাপ এরপর দিক পালটে ঢুকে পড়েছিল জঙ্গলের গভীরে। রাতে আশ্রয় নিয়েছিল এক গাছের উপর। নামল পরের দিন রোদ কিছু চড়া হবার পরে। চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি রেখে ফের পা চালাল নদীর দিকে। সহজে পাহাড়ের কাছে পৌঁছোতে হলে নদী ধরে চলাই সুবিধে।
যথাসম্ভব দ্রুত পথ চলছিল প্রতাপ। হঠাৎই নজরে পড়ল প্রায় মিটার দশেক দূরে ঘন গাছপালার আড়ালে একটা মানুষ। পরনে গাঢ় জলপাই রঙের পোশাক। মুখে মঙ্গোলীয় ছাপ। হাতে রাইফেল উঁচিয়ে গাছের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে আছে। সন্দেহ নেই, আড়াল থেকে লক্ষ করছে ওকে। বুঝতে সুযোগ না দিয়ে প্রতাপ মুহূর্তেই চোখ ঘুরিয়ে ঢুকে গেল পাশেই ঘাসের জঙ্গলে। তারপর খানিক ঘুরপথে নিঃশব্দে হাজির হল লোকটার কাছে এক ঝোপের আড়ালে। আরও কাছে যেতে পারলেই ভালো হত। কিন্তু সামনের জমিটা একদম পরিষ্কার। আড়াল নেই। অগত্যা সেখান থেকেই হাতের মাউজার উঁচিয়ে গর্জে উঠল, “হ্যান্ডস আপ।”
প্রতাপ যে ওই ভাবে এত কাছে এসে হাজির হবে, আচমকা পিস্তল হাতে গর্জে উঠবে, লোকটা ভাবতে পারেনি। মুহূর্তের জন্য কিছু হতচকিত হয়ে পড়েছিল। প্রতাপের কাছে সেই সময়টুকুই যথেষ্ট। নিমেষে গর্জে উঠল তার হাতে অস্ত্র। পর পর দুবার। দুটো গুলিই লোকটার হাতের রাইফেলের ব্যারেলে আছড়ে পড়ল। লোকটার হাত থেকে অস্ত্রটা ছিটকে পড়তেই নিমেষে গর্জে উঠল ও, “বাঁচতে চাও তো হাত তুলে উঠে দাঁড়াও। বাইরে এসো। নইলে আমার হাতের মাউজার তোমার খুলি উড়িয়ে দিতে একটুও দ্বিধা করবে না।”
এক মুহূর্ত ইতস্তত করে লোকটা হাত তুলে ঝোপের আড়াল থেকে বাইরে এসে দাঁড়াল।
লোকটাকে জাপানি বলেই মনে হল প্রতাপের। মাঝবয়সী মজবুত শরীর। মাথা জোড়া চকচকে টাক। পরনে জলপাই রঙের জিনসের ঢিলে প্যান্ট। কাদায় চলার উপযোগী রবারের জুতো। পিঠে ছোটো এক ব্যাগ। এই সঙ্কটের মধ্যেও লোকটা তার প্রায় বোজা খুদে দুই চোখে পিটপিট করে ওর দিকে তাকিয়ে। ভাবলেশহীন মুখ।
লোকটাকে আপাদমস্তক আর একবার নিরীক্ষণ করতে গিয়ে প্রতাপের মনে হল, এই মুখ ও কোথায় যেন দেখেছে আগে। কিন্তু স্মরণ করতে পারল না। অবশ্য সব জাপানিদের মুখ ওর কাছে প্রায় একই রকম। লোকটার কোমরে গোঁজা পিস্তলটা আগেই দেখে নিয়েছিল। আরও কিছু অস্ত্রও লোকটার কাছে থাকা সম্ভব। আগে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করা দরকার। তারপর অন্য কাজ।
হাতের মাউজার উঁচিয়ে প্রতাপ সন্তর্পণে এগিয়ে গেল লোকটার কাছে। কোমরের পিস্তলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
লোকটার কোমরের অস্ত্র তখনও ছুঁতে পারেনি ও। মাথার উপরে তোলা লোকটার বাঁ-হাত বিদ্যুৎবেগে নেমে এল। শেষ মুহূর্তে ব্যাপারটা লক্ষ্য করে মাথা সরিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেও হাতের অস্ত্র ব্যবহার করেনি। নিতান্ত অপারগ না হলে এ-সব ক্ষেত্রে প্রতাপ আগ্নেয়াস্ত্র খুব একটা ব্যবহার করে না। তবে আজ আত্মরক্ষা সম্ভব হল না। প্রতিপক্ষের হাত বিদ্যুতের চেয়েও ক্ষিপ্র। মুহূর্তে প্রতাপের মনে হল যেন কয়েক হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ ওর শরীর দিয়ে বয়ে গেল। প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি। মুহূর্তে দুই চোখে অন্ধকার নেমে এল। কাটা গাছের মতো সে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
প্রতাপের জ্ঞান ফিরে আসতে সময় লাগেনি অবশ্য। বড়োজোর মিনিট দুই। কানের কাছে ফ্রাগার চিৎকারে লাফিয়ে উঠে বসেছিল মুহূর্তেই। নাহ্, মাউজার হাতেই রয়েছে। কিন্তু লোকটার চিহ্নমাত্র নেই। আচমকা আঘাতে ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে সময় নষ্ট না করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেছে।
ব্যাপারটা অস্বাভাবিক সন্দেহ নেই। হাতে পেয়েও লোকটা ছেড়ে দিয়েছে ওকে! লোকটাকে দেখে প্রথমে খুনে হানাদার দলের বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু লোকটার এই ব্যবহারে ধারণাটা পালটে গেল। লোকটা আর যাই হোক, খুনে নয়। ও নিজেও সেই ধারার মানুষ। মাফিয়া লিডার জেডের সঙ্গে রয়েছে বেশ কয়েক বছর। অগুনতি এনকাউন্টারে সামিল হয়েছে। কিন্তু নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া প্রাণহানি ঘটায়নি। তাই অযথা মাথা না ঘামিয়ে ফের চলতে শুরু করল।
আরও আধঘণ্টার মতো চলার পরে প্রতাপ নদীর দেখা পেল। ছোটো হলেও জোয়ার-ভাটার দরুন তীব্র স্রোত। পাথুরে জমির কারণে দু’পাশে গাছপালা তেমন ঘন নয়। অনেকটাই পরিষ্কার। দূরে নদীর বাঁকে নীল আকাশের পটে পাহাড়টাকে দেখা যাচ্ছে। বেশ দূরেই এখনও। তবে গতিপথ দেখে নিশ্চিন্ত হল, নদীটা ওই পাহাড় থেকেই এসেছে। পূর্ব সিদ্ধান্ত মতো প্রতাপ নদীর পাড় ধরে চলতে লাগল এরপর।
নদীর ধার কিছু পরিষ্কার হওয়ার কারণে গতি বাড়ানো গেলেও এদিকে জংলিদের আনাগোনা যথেষ্টই বেশি। চারদিকে তাদের নানা চিহ্ন। বুনোলতা দিয়ে বাঁধা গাছের গুঁড়ির একটা ভেলাও এক স্থানে জলে ভাসছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, জংলিরা চলাফেরার জন্য এই নদীপথ হামেশাই ব্যবহার করে। নদীর পাড়ে পায়ের ছাপও যথেষ্ট।
এ-সব দেখে নদীর পাড় ধরে চলার মতলব ছাড়তে হল প্রতাপকে। যে-কোনও মুহূর্তে ফের ওদের নজরে পড়ে যাবার সম্ভাবনা। একবার প্রাণ বেঁচেছে। এবার তেমন সৌভাগ্য না-ও হতে পারে। প্রতাপ ফের হয়তো জঙ্গলের মধ্যেই ঢুকে পড়ত। কিন্তু হঠাৎ অদূরে নদীর বাঁকে গাছপালার ফাঁকে উঁচু একটা মাচার মতো বস্তুর দিকে নজর পড়তে মত পাল্টাল।
এ-সব অঞ্চলে আদিবাসী মানুষের লং হাউস ব্যবহারের কথা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে মাত্র অল্প দিন আগেই পড়েছে। সেই জিনিস বলেই মনে হল। আসলে প্রচণ্ড বৃষ্টি আর জলকাদার জন্য এদিকে বোর্নিও, সারাওয়াক প্রভৃতি অঞ্চলের আদিবাসী মানুষেরা মাটি থেকে পাঁচ–ছয় ফুট উপরে মাচায় ঝুপড়ি বেঁধে বাস করে। লম্বা মাচায় এক সঙ্গে অনেকগুলো ঘর তৈরি হয়। তাতে দল বেঁধে বাস করে সবাই। কখনও এক সঙ্গে বিশ–তিরিশটির বেশি পরিবার।
তবে কি ইন্দোনেশিয়ার এই প্রত্যন্ত দ্বীপের আদিবাসীরাও প্রয়োজনের তাগিদে লং হাউস ব্যবহার করতে শিখেছে! দূরে গাছপালার ফাঁকে যে সামান্য অংশ নজরে পড়ছে তাতে সে-রকমই মনে হচ্ছে। কিন্তু একটা কথা ভেবে কিছু অবাকই হল। এত কাছে বাসস্থান, কিন্তু এ-পর্যন্ত একটা মানুষ নজরে পড়েনি। মাটিতে অসংখ্য পায়ের ছাপ। কিন্তু কোনওটাই তেমন টাটকা নয়। কোনও কারণে লং হাউসটা পরিত্যক্ত নয় তো? নাকি ওকে দেখে কোনও এক মতলবে গা-ঢাকা দিয়েছে?
প্রতাপ ঝুঁকি না নিয়ে ঢুকে পড়ল জঙ্গলে ভিতর। কিছুটা ঘুরপথে সন্তর্পণে এগিয়ে গেল সেই মাচার দিকে।
বোঝায় কিছুমাত্র ভুল হয়নি। মাচাটা আদিবাসীদের লং হাউসের মতোই। তবে বইতে সারাওয়াকের যে-সব লং হাউসের কথা পড়েছে, ছবিতে দেখেছে, তেমন নয়। অনেক অবিন্যস্ত, অপটু হাতে তৈরি। তাহলেও মোটা গাছের গুঁড়ির খুঁটির উপর বাঁশ-কাঠের মাচাটা যথেষ্টই মজবুত। সিঁড়ি বা মইয়ের ব্যবস্থাও নেই। নেই জনমানুষের কোনও চিহ্ন। কোনও কারণে বাসস্থানটি পরিত্যক্ত।
কৌতূহলী প্রতাপ পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল এবার। প্রায় বুক সমান উঁচু মজবুত মাচা। কাছে গিয়ে তাকাতেই মাচার শেষ প্রান্তে প্রথম ঘরের বাইরে শুকনো কোনও লতায় গাঁথা নর-করোটির মালা। গুনে দেখল মোট এগারোটি নর-করোটি গাঁথা রয়েছে তাতে। প্রতিটি খুলিতে একাধিক ফুটো। তীক্ষ্ণ অস্ত্রের চিহ্ন। নিহত সেই বিদেশী আগন্তুকের মাথা কেন কেটে নেওয়া হয়েছে, পরিষ্কার হল এবার।
ঝুপড়িগুলো সেটা শেষ বারের মতো পর্যবেক্ষণ করে প্রতাপ পিঠের রুকস্যাক নামিয়ে মাচার প্রান্ত ধরে লাফিয়ে উঠে পড়ল উপরে। সন্তর্পণে প্রথম ঘরের ভিতরে। মামুলি গাছের ছাল, ডালপালা আর লতাপাতা দিয়ে কোনওক্রমে তৈরি ঝুপড়িঘর। খোলা দরজা। ভিতরে লাউ বা কুমড়ো জাতীয় ফলের খোলার গোটা কয়েক পাত্র।
পর পর আরও কয়েকটা ঘর উঁকি দিল প্রতাপ। মাচার উপর যথেষ্ট সন্তর্পণে পা ফেললেও মচমচ শব্দ হচ্ছিল। আকৃতি-প্রকৃতিতে প্রতিটি ঘর প্রায় একই রকম। বাইরে ঝোলানো নর-করোটির মালা। তবে পার্থক্য রয়েছে নর-করোটির সংখ্যার। মাত্র তিনটি নর-করোটির মালাও যেমন রয়েছে, পুরো এক ডজন নর-করোটি দিয়ে তৈরি মালাও চোখে পড়ল। গোটা দশেক ঝুপড়ি দেখে প্রতাপ তখন মাচার প্রায় মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে। হঠাৎ কাঁধের উপর ফ্রাগা তারস্বরে চিৎকার করে উঠল।
ফ্রাগার এই চিৎকারের অর্থ বুঝতে ভুল হল না প্রতাপের। প্রায় লাট্টুর মতো পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল ও। পিছনে দাঁড়িয়ে একটা মানুষ। বেঁটেখাটো হলেও বলিষ্ঠ শরীর। কোমরে ঝোলানো গোটা কয়েক শুকনো ঘাসের গোছা। সারা মুখ আর শরীরে বিচিত্র রঙের রেখা। হাতে একটা কাঠের হাতল লাগানো পাথরের কুড়ুল। ঠিক এমন একটা অস্ত্র খানিক আগে চোখে পড়েছে।
বাঁশ–কাঠের মাচা প্রতাপের প্রতি পদক্ষেপেই মচমচ শব্দ করছিল। অথচ যথেষ্ট সতর্ক থাকা সত্যেও এই দেহাতি মানুষটি কখন যে তার পিছনে এসে হাজির হয়েছে, ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। ততক্ষণে মানুষটির হাতের অস্ত্র প্রতাপের মাথা লক্ষ্য করে শূন্যে উঠেছে। তবে বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না প্রতাপ। জীবনে এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা কম তো করতে হয়নি! মুহূর্তে মাথা সরিয়ে নিয়ে আঘাতটা সহজেই এড়িয়ে গেল। হাতের অস্ত্র শূন্যে বাতাস কেটে বেরিয়ে যেতে ঝোঁক সামলাতে না পেরে জংলি মানুষটা কিছু বেসামাল হয়ে পড়ল। মুহূর্তে প্রতাপের হাত তড়িৎ গতিতে চলে গেলে পিঠে, রাইফেলের দিকে। ব্যারেলটা দুই হাতে ধরে কুঁদো দিয়ে আক্রমণকারীর মাথায় নিমেষে পালটা আঘাত করল।
আর্ত চিৎকার করে মানুষটা কাটা গাছের মতো মাচার উপর চিত হয়ে পড়ে গেল। ফ্রাগা আর একবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে প্রাণ বাঁচাল।
জংলি মানুষটা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যেতেই প্রতাপ চকিতে চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। না, অন্য কেউ নেই। পড়ে থাকা মানুষটির দিকে ভাল করে তাকাল এবার। আনুমানিক বছর তিরিশ বয়স। বেঁটেখাটো বলিষ্ঠ গড়ন। কিন্তু লোকটির বাঁ-পায়ের উরুর দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠল। পেশিবহুল উরুর অনেকটা জুড়ে বড়ো এক ক্ষত। ছিন্নভিন্ন মাংস ফুলে ঠেলে বেরিয়েছে। শুকনো রক্তের দাগ দেখে বোঝা যায় ক্ষতটি খুব পুরনো নয়। কিন্তু চিকিৎসার অভাবে খুব ভালো অবস্থায় নেই। অসংখ্য মাছি ছেঁকে ধরেছে। ওই রকম ভয়ানক আহত অবস্থায় লোকটা যে কী-ভাবে এমন নিঃশব্দে তার পিছনে হাজির হল ভেবে উঠতে পারল না।
সম্ভবত কোনও এক ঘরের মধ্যে ঘাপটি মেরে ছিল। লং হাউসের অন্য বাসিন্দারা কোনও কারণে আশ্রয় ছেড়ে গেলেও ভয়ানক আহত হবার কারণে লোকটি তাদের সঙ্গী হতে পারেনি। ক্ষতস্থান দেখেই বোঝা যায় রাইফেলের গুলির আঘাত। এখনই ব্যবস্থা না নিলে বিষাক্ত হয়ে পচে মরবে।
এমন মানুষ লং হাউসে আরও থাকা সম্ভব। আহত লোকটার তখনও জ্ঞান ফেরেনি। সময় নষ্ট না করে প্রতাপ ছুটল লং হাউসের ঘরগুলোর দিকে। সব মিলিয়ে গোটা পনেরোর মতো ঘর একেবারেই খালি। তবে প্রতি ঘরেই পড়ে রয়েছে লাউ বা কুমড়োর জাতীয় ফলের বড়ো আকারের একটি বা দু’টি খোল। গ্রাম বাংলায় এই খোল জিনিসপত্র রাখার পাত্র হিসেবে ব্যবহার হয়। ওদের গ্রামের বাড়িতেও ছিল। কৌতূহলী হয়ে একটায় হাত ঢোকাতে উঠে এল ইঞ্চি তিনেক লম্বা ঘোলাটে রঙের স্বচ্ছ একটা পাথর। খানিক দেখে পাথরটা কী জাতের বুঝে উঠতে না পারলেও পরে খুঁটিয়ে দেখার জন্য পকেটে রেখে দিল।
যথাস্থানে ফিরে প্রতাপ এবার আহত মানুষটাকে নিয়ে পড়ল। ব্যাগে প্রাথমিক চিকিৎসার কিছু ওষুধপত্র ছিল। ক্ষতস্থান যথাসম্ভব ধুয়ে খানিকটা অ্যান্টিবায়োটিক পাউডার ছড়িয়ে দিয়ে একটা অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশনও পুশ করে দিল। মানুষটির শরীরে আগে কখনও অ্যান্টিবায়োটিক পড়েনি। যৎসামান্য চিকিৎসাতেও সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। প্রতাপ এরপর অচৈতন্য মানুষটাকে একটা ঘরে নিয়ে শুইয়ে দিয়ে চলে আসবে, হঠাৎ মনে হল, ক্ষতস্থানে একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলে ভাল হয়।
ফের ব্যাগ থেকে তুলো, গজ বের করে প্রতাপ ক্ষতস্থানে ভাল করে জড়িয়ে বেঁধে দিল এরপর। কাজ শেষ হতে গজের প্রান্ত কাটতে যাবে, অসাবধানে কাঁচিটা মাচার ফাঁক গলে নীচে পড়ে গেল। কী করা যায় ভাবছে। খেয়াল হল, ঘরের ভিতর লাউয়ের খোল হাতড়াতে গিয়ে যে পাথরের টুকরোটা পেয়েছিল, তার ধারগুলো বেশ ধারালো। পকেট থেকে পাথরটা ফের বের করে সামান্য চেষ্টাতেই গজের প্রান্ত কেটে ফেলতে পারল। যেমন ভেবেছিল, পাথরের কানাগুলো তার চাইতে অনেক বেশি ধারালো।
হাতের পাথরটা এরপর উলটে–পালটে দেখছিল প্রতাপ। হঠাৎই ওর মাথায় ভাবনাটা প্রায় ঝিলিক দিয়ে উঠল। কী কাণ্ড! যে-জন্য সে প্রাণ হাতে নিয়ে এখানে হাজির হয়েছে সেই জিনিস অবহেলায় পড়ে রয়েছে লং হাউসের ঝুপড়িগুলোর ভিতর! হংকং-এর হায়াৎ হোটেলে লি পিং জানিয়েছিল, দ্বীপের কোনও এক গুপ্তস্থানে স্তূপীকৃত রয়েছে রাশি রাশি হিরে-জহরত। জংলীরা পুরুষানুক্রমে সেগুলি রক্ষা করে আসছে। ওদের বিশ্বাস উজ্জ্বল এই পাথরগুলো দ্বীপের দেবতা। বিপদে রক্ষাকর্তা।
লি পেং বলতে পারেনি। তবে সম্ভাবনা যথেষ্টই যে, দ্বীপের মানুষগুলো নিজেদের মঙ্গল কামনায় কিছু পাথর ঘরেও রেখে দেয়। সেই হিসেবে পাথরগুলো হিরে–জহরত হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা। জেডের সঙ্গে কাজ করে হিরে কম দেখেনি। কিন্তু রাফ আনকাট হিরে দেখা হয়নি। তবে শুনেছে, রাফ আনকাট হিরে দেখতে নাকি একেবারেই আহামরি নয়। অভিজ্ঞ জহুরিই চিনতে পারে। আনাড়ি সাধারণ মানুষের জন্য চেনার সহজ লক্ষণ একটাই। হিরের মতো কঠিন জিনিস পৃথিবীতে দু’টি নেই। অবসর সময়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ওর বরাবরের সঙ্গী। তাতে পড়েছে, হিরে সাধারণত নিবে যাওয়া আগ্নেয়গিরি অঞ্চলেই পাওয়া যায়। পৃথিবীর জঠরে প্রচণ্ড উত্তাপ আর চাপের কারণে মামুলি কার্বন তথা কয়লার টুকরো হিরেয় পরিণত হয়। অগ্নুৎপাতে সেই হিরে পৃথিবীর জঠর থেকে উপরে উঠে আসে। বেশিরভাগ সময় সেই হিরে লুকিয়ে থাকে জমাট পাথরের ভিতর। হিরের খনিতে ব্লাস্টিং করে পাথর সংগ্রহের পর পাঠানো হয় প্রসেসিং প্লান্টে। রকমারি ক্রাশার দিয়ে সেই পাথর পর্যায়ক্রমে ভেঙে টুকরো করা হয়। সাধারণ পাথর নরম, ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। কিন্তু প্রচণ্ড শক্ত হবার কারণে হিরের টুকরো তেমনই থাকে। তারপর বেছে নেবার কাজ। প্রাথমিক পর্বে সাধারণ পাথর বেছে বাদ দেবার কাজে যন্ত্র ব্যবহার হলেও শেষ পর্বে হিরে বাছাইয়ের কাজটা অভিজ্ঞ জহুরিই করে থাকে।
জিওলজিস্ট হ্যামার সঙ্গেই ছিল। প্রতাপ সেই হ্যামার দিয়ে গোটা কয়েক আঘাত করল পাথরটার উপর। যথেষ্টই জোরে। ভাঙা তো দূরের কথা, ছোটো পাথরটায় সামান্য দাগও পড়ল না।
ঘটনার আকস্মিকতায় প্রতাপ থম হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। এত তাড়াতাড়ি, এত সহজে কার্য উদ্ধার হবে, স্বপ্নেও ভাবেনি। কিছুমাত্র সন্দেহ নেই, পাথরটা হিরে ছাড়া অন্য কিছু নয়। অন্তত হাজার দুই ক্যারেট। বাজার দাম বিশ-তিরিশ মিলিয়ন ডলার। যে খোলের ভিতর পাথরটা পেয়েছিল, সেখানে এর চাইতে বড়ো পাথরও রয়েছে। লং হাউসের গোটা পনেরো ঝুপড়ির ভিতর অমন কত পাথর হেলায় পড়ে আছে, ভাবতে গিয়ে প্রতাপের সারা শরীর শিরশির করে উঠল।
অযথা সময় নষ্ট না করে রুকস্যাক থেকে একটা কাপড়ের থলে বের করে প্রতাপ ছুটল ঝুপড়িগুলোর দিকে। আনকাট হিরে যত বড়ো হয়, দামের হার ততই বেশি। হিরের দাম আরও একটা জিনিসের উপর নির্ভর করে, রং আর স্বচ্ছতা। একশো ক্যারেটের মতো হওয়া সত্যেও ‘কোহিনুর’-এর খ্যাতি সেই কারণে। কিন্তু প্রতাপ জহুরি নয়। আর কাটাই হওয়ার আগে হিরের গুণমানের বিচারও খুব সহজ নয়। তাই তা নিয়ে মাথা ঘামাল না। বড়ো আকারে কিছু পাথর থলেয় ভর্তি করে অল্প সময়ের মধ্যেই যথাস্থানে ফিরে এল।
আহত মানুষটির তখনও জ্ঞান ফেরেনি। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতাপের মনে হল মানুষটি ভয়ানক ক্ষুধার্ত। দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গত কয়েক দিন হয়তো খাবার জোটেনি। চট করে ব্যাগ থেকে দুটো স্যান্ডউইচের প্যাকেট বের করে প্রতাপ তার পাশে রাখল। ভালো হয়ে ওঠো বন্ধু।
রেডিও রয়েছে বোটের ভিতর। গত দু’দিন যে-পথে আসা হয়েছে সেই পথে ফিরে যেতে হবে এবার। বোল্ডারগুলোর আড়ালে বোটের লোকেশন নোট করা আছে। কম্পাস দেখে সংক্ষিপ্ত পথ বের করে নেওয়া যায়। তবু সে ঝুঁকি নিল না। নতুন পথে অন্য বিপদ থাকতে পারে। আসার আগে দ্বীপের প্রধান বিপদ দেহাতি হেড-হান্টারদের কথাই জানা ছিল। কিন্তু তারপর হিসেব অনেক বদলে গেছে। শুধু হিংস্র হেড-হান্টার নয়, জঙ্গলে রয়েছে কোমোডো ড্রাগনও। শুধু বন্যা নয়, দ্বীপের মানুষ যে উঁচু মাচার উপর ঝুপড়ি ঘরে বাস করে তা এই কোমোডো ড্রাগনের হাত থেকে বাঁচার জন্যও। এ-ছাড়া হাজির হয়েছে একদল খুনে হানাদার। তাদের সঙ্গে দ্বীপের দেহাতি মানুষের লড়াইও হয়ে গেছে। তার উপর ওই জাপানি লোকটা! মাঝবয়স হলেও গায়ে যথেষ্টই শক্তি। মার্শাল আর্টেও দক্ষ। গোড়ায় ভেবেছিল, লোকটা হানাদার দলের। কিন্তু পরে তেমন মনে হয়নি। সে-ও এক রহস্য। আর সর্বোপরি প্রথম রাতের সেই ভয়ানক একটানা গর্জন! আওয়াজটা তারপর আর শোনা যায়নি অবশ্য। তবু সব মিলিয়ে এই বিজন দ্বীপ এখন এক কথায় ভয়ংকর বললেও কম বলা হয়। অগত্যা কার্যোদ্ধার যখন সম্পূর্ণ, দ্রুত বিদায় নেওয়াই মঙ্গল।
পরের দিন কিছু বেলায় প্রতাপ যথাস্থানে পৌঁছে বোট রেডি করে অল্প সময়ের মধ্যেই রেডিও অন করে ফেলল। নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি সিলেক্ট করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেই অন্য প্রান্ত থেকে উত্তর ভেসে এল, “ইয়েস, হেড কোয়ার্টার। হেড কোয়ার্টার জেড। হেড কোয়ার্টার জেড।”
লি পেংয়ের কণ্ঠস্বর। একটু অবাকই হল প্রতাপ। এই ফ্রিকোয়েন্সিতে একমাত্র জেডেরই সাড়া দেওয়ার কথা। ও সামান্য ইতস্তত করে বলল, “হ্যাঁ লি পেং, আমি প্যাট। তা জেড কোথায়? ওভার।”
“জেডকে আজ আর পাবে না। কী দরকার বলতে পারো আমাকে। ওভার।”
এমন বড়ো একটা হয় না। যে গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রতাপ বের হয়েছে, তাতে এই ফ্রিকোয়েন্সিতে জেডেরই উত্তর দেবার কথা। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় খুব বেশি সময় নষ্ট করাও যায় না। তা ছাড়া, লি পেং জেডের শুধু কাছের মানুষই নয়, প্রধান পরামর্শদাতাও। প্রতাপ তবু ইতস্তত করছিল। ওদিকে থেকে লি পেংয়ের কণ্ঠস্বর, “হেই প্যাট, চুপ করে রয়েছ কেন? কিছু খবর আছে? ওভার।”
“আছে, আছে বস।” কালক্ষেপ না করে প্রতাপ বলেই ফেলল, “হিরে পাওয়া গেছে কিছু। ওভার।”
“কিছু মানে কত?” ওদিকে প্রায় রুদ্ধশ্বাস কণ্ঠ।
“আনকাট হিরের গোটা কুড়ির মতো টুকরো। তিন হাজার ক্যারেটের কম নয় কোনওটা। তার মানে কয়েক হাজার মিলিয়ন ডলার। ওভার।”
ও প্রান্ত থেকে প্রায় মিনিট-দুয়েক কোনও উত্তর নেই। সন্দেহ নেই, লি পেংয়ের মতো ব্যক্তিরও ব্যাপারটা হজম করতে বেগ পেতে হচ্ছে। অগত্যা প্রতাপকে ফের কথা বলতে হল, “হেই লি, চুপ করে রয়েছ যে! কী, বিশ্বাস হচ্ছে না? ওভার।”
“হেই প্যাট, তা কেন ব্রাদার…।”
কথা শেষ না করে ফের লি পেং থেমে গেল। প্রতাপ ততক্ষণে বুঝে ফেলেছে লোকটা কিছু অন্য কথা বলতে চাইছে। কিন্তু ভরসা করে উঠতে পারছে না। অগত্যা অভয় দিয়ে বলল, “যা বলবার বলেই ফেলো। ঢাকঢাক-গুড়গুড় করার দরকার নেই। ওভার।”
“শোনো প্যাট। কিছু ভিতরের কথা বলি এবার। হিরে-ভর্তি ব্যাগ জেডের হাতে তুলে দিলেও মুক্তি পাবে না তুমি। তোমাকে খুন করার মতলবে রয়েছে সে। জানো সেটা? ওভার।”
“জানি না।” মুহূর্তে প্রতাপের উত্তর, “তবে তেমন সম্ভাবনার কথা ভাবা আছে। আর সে-জন্য প্রস্তুতও রয়েছি। মনে হচ্ছে, জেডের মরণ আমার হাতেই। ওভার।”
“গুড।” ও-প্রান্ত থেকে তৎক্ষণাৎ লি পেংয়ের উত্তর, “সে-ক্ষেত্রে ভাই আমি কিছু হেল্প করতে পারি। অবশ্য যদি রাজি থাকো। ওভার।”
লি পেংয়ের মাথায় যে কিছু অন্য মতলব রয়েছে, ইতিমধ্যে বুঝতে বাকি নেই প্রতাপের। লোকটাকে বিশ্বাস করা যায় না ঠিকই। কিন্তু এই মুহূর্তে জেডকে যখন রেডিওতে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, শোনা যেতেই পারে ওর কথা। সামান্য ভেবে নিয়ে বলল, “তাহলে বলেই ফেলো। ওভার।”
“শোনো প্যাট, জেডের সঙ্গে কাজ করে আমিও খুব স্বস্তিতে নেই। তোমাদের সব জানার কথা নয়। কিন্তু ভিতরের খবর অনেক কিছুই আমার জানা। জেডের বারোটা বাজতে বেশি বাকি নেই। আমরা চুনোপুঁটির দল অযথা তাতে সামিল হই কেন? সেই জন্য কিছু প্রস্তুতিও সেরে রেখেছি। ঠিক করেছি নতুন দল খুলব। কয়েকজন রাজিও হয়েছে। তুমি এই কাজে আর থাকতে চাইছ না জেনে আগে বলিনি। তবু তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম। জানতাম, কাজটা পারবে তুমি। হিরে-ভর্তি ব্যাগ জেডের হাতে তুলে দিতে গিয়ে অকারণে ঝামেলায় পড়বার দরকার কী? আর হিরেগুলো হাতে পেলে জেডের ব্যবস্থা করে ফেলতে আমারও কিছু সুবিধা হয়। তুমিও সহজে দেশে ফিরে যেতে পারো। ওভার।’
একটানা কথা বলে লি পেং থামল। হাতে সময় কম। দ্রুত ব্যাপারটা ভেবে নিল প্রতাপ। লি পেং খুব মিথ্যে বলেনি। জেডের অবস্থা যে তেমন ভাল নয়, কিছুটা তারও জানা। আগের সেই রমরমা আর নেই। দলের অনেকেই বেগড়বাই করছে। মাফিয়া গ্যাংয়ে এটা বিচিত্র নয়। হিরেগুলো পেলে জেড নিজেও হয়তো গা-ঢাকা দেবার মতলবে রয়েছে। চলে যাবে অন্য কোনও দেশে। হাতের বাইরে। তবে সে-জন্য তার মাথাব্যথা নেই। তার মাথাব্যথার কারণ একটাই, হিরের ব্যাগ হাতে পাবার পরে জেড ওকে রেহাই দেবে কি না? কাজটা হাতে নিলেও এ-ব্যাপারে গোড়া থেকেই সন্দেহ রয়েছে। জেডের গ্যাংয়ের অনেক গোপন কথা তার জানা। সে-সব জেডের মৃত্যুঘণ্টা বাজাবার পক্ষে যথেষ্ট। একমাত্র সরিয়ে দিতে পারলেই নিশ্চিন্ত। জেড সেই চেষ্টা যে করবে, তাতে সন্দেহ নেই। ভিতরে একটা প্রস্তুতি ও সেই কারণে নিয়েও রেখেছে।
সেদিক দিয়ে লি পেং কিছু নিরাপদ অবশ্যই। নতুন দল তৈরির মতলব থাকলে প্রতাপকে কিছুতেই ঘাঁটাবে না লোকটা। বরং আপাতত চেষ্টা করবে তোয়াজ করে হাতে রাখতে। ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটা খানিক ভেবে নিয়ে ও শেষ অস্ত্র চালল, “শোনো হে, তুমি যদি নতুন গ্যাং তৈরি করতে চাও, তাহলে আমি আর দেশে ফিরে যাব না। আছি তোমার সঙ্গে। ওভার।”
“অ্যাঁ!” ও প্রান্ত থেকে লি পেংয়ের গলা দিয়ে অস্ফুট শব্দটা ভেসে আসার পর কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধ। সন্দেহ নেই, ব্যাপারটা হজম করতে কিছু সময় লাগল লোকটার। তারপর উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠস্বর, “থ্যাংকস, মেনি থ্যাংকস প্যাট। আমার অনেক দুশ্চিন্তা এক কথায় দূর করে দিলে। তুমি সঙ্গে থাকলে নতুন গ্যাং তৈরি করতে দু’জনের বেশি দিন লাগবে না। মালিকানাও ফিফটি ফিফটি। তুমি অপেক্ষা করো প্যাট। আমি চার্টার্ড প্লেনে এখনই ডাভাও রওনা হচ্ছি। ওখান থেকে হেলিকপ্টার নেব। পৌঁছে যাব বিকেলের মধ্যেই। ওভার অ্যান্ড আউট।”
ও-প্রান্তে লি পেং রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবার পর প্রতাপও বেশি দেরি করেনি। হাতে দাঁড় নিয়ে বোট ছেড়ে দিয়েছিল। লি পেং যখন টোপ গিলেছে নিশ্চিন্ত হওয়াই যায়। নতুন গ্যাং তৈরি, জেডের ব্যবস্থা, এ-সবের জন্য প্রতাপ ছাড়া গতি নেই লোকটার। গত দু’দিন ধরে একের-পর-এক বিপদ মাথার উপর দিয়ে গেছে। এ-ভাবে এত সহজে কার্য উদ্ধার হবে, ভাবতেই পারেনি। এখন বোট নিয়ে কাছেই কোথাও গা-ঢাকা দিয়ে কাটিয়ে দেবার অপেক্ষা।
জেডের ডান হাত লি পেংয়ের অসাধ্য কিছু নেই। খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হল না। পড়ন্ত বিকেলে দূরের আকাশে লি পেংয়ের হেলিকপ্টারের দেখা মিলতেই দ্বীপের আড়াল থেকে বের হয়ে প্রতাপ বোট নিয়ে ফাঁকা সমুদ্রে পৌঁছে রুমাল নাড়তে শুরু করল। একটু পরেই হেলিকপ্টার বোটের উপর অল্প উঁচুতে হোভারিং করে স্থির হয়ে গেল। ককপিটে পাইলটের পাশে বসে স্বয়ং লি পেং।
প্রতাপ হাত নাড়তেই সাগ্রহে হাত নাড়ল লোকটা। নিজেই সাসপেনশন রোপ নামিয়ে দিল। হীরে ভরতি বড়োসড়ো থলিটা প্রতাপ রুকস্যাকে ঢোকাতে পারেনি। বাইরেই ছিল। লি পেং উপর থেকে চিৎকার করে বলল, হিরের ব্যাগটা রোপের সঙ্গে বেঁধে দাও প্যাট। সুবিধা হবে তোমার।’
যুক্তি মন্দ নয়। অযথা সময় নষ্ট না করে প্রতাপ তা-ই করল। আর তারপরেই ঘটল ব্যাপারটা। হীরে বোঝাই থলিটা রোপের সঙ্গে বেঁধে প্রতাপ দুই হাতে সেটা ধরতে যাবে, তার আগেই এক ঝটকায় লি পেং দড়িটা উঁচুতে টেনে নিল। আর সেই মুহূর্তে মেইন রোটারের গতি বাড়িয়ে আকাশযান উঠে গেল উঁচুতে। তারপর দ্রুতবেগে দূরে সরে যেতে থাকল।
ভয়ানক ব্যাপার অবশ্যই। লি পেং লোকটার শয়তানি তখন বুঝতে বাকি নেই প্রতাপের। হীরে বোঝাই থলি দড়িতে বেঁধে দেবার পরে লোকটা সহজেই ওকে গুলি করতে পারত। সে-সুযোগ ছিল। কিন্তু ইচ্ছে করেই করেনি। ফিরে গিয়ে শয়তানটা দিব্যি হাত ঝেড়ে ফেলবে। জেড জানবে প্রতাপ হীরের খোঁজে এখনও ড্রাগন দ্বীপেই পড়ে আছে। হাজার কথা বলেও আসল ব্যাপার জেডকে বোঝানো যাবে না।
জীবনে এমন সংকট মুহূর্তের মোকাবিলা বহুবার করেছে প্রতাপ। তাই কিছুমাত্র হতাশ হল না। জেডের গ্যাংয়ে অপরিহার্য ব্যক্তি হলেও খুন করার প্রয়োজন হয়েছে কমই। তবে যখন দরকার পড়েছে, কিছুমাত্র দ্বিধা করেনি। হেলিকপ্টারের ককপিট ওর উলটো দিকে। লি পেং দৃষ্টির আড়ালে। কিন্তু আকাশযানের পিছনে টেল বুমের গোড়ায় ইঞ্জিন আর ফুয়েল চেম্বার আওতার মধ্যেই রয়েছে। তড়িৎ গতিতে হাতে উঠে এল কাঁধে ঝোলানো কে–৯৮ মাউজার রাইফেল। প্রায় নয় পাউন্ড ওজনের গন্ধমাদন। মাত্র পাঁচ রাউন্ডের ম্যাগাজিন। তবু দূর পাল্লার এমন শক্তিশালী অস্ত্র দু’টি হয় না। অনেকেই টেলিস্কোপ ব্যবহার করে। তেমন ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু কখনো দরকার পড়েনি ওর। সেফটি ক্যাচ তুলে দিয়ে দ্রুত পর পর দুটো ফায়ার করল প্রতাপ। নির্ভুল নিশানায় দুটো গুলিই যথাস্থানে আছড়ে পড়ল।
টেল বুমের গোড়ায় ইঞ্জিন আর ফুয়েল ট্যাঙ্কে আগুন ধরে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল হেলিকপ্টারটা। অল্প সময়ের মধ্যে সমুদ্রের জলে মুখ থুবড়ে পড়ল। জ্বলতে থাকল ঢেউয়ের উপর।

জেডের দলে এই লি পেং-কে কোনও দিনই পছন্দ হয়নি প্রতাপের। কিন্তু তার হাতেই এ-ভাবে লোকটার মৃত্যু হবে ভাবেনি। রাইফেলটা ফের পিঠে চালান করে দিয়ে প্রতাপ অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরে এলো দ্বীপে। ফের গোড়া থেকে শুরু করতে হবে আবার। আপদ লি পেং–টা নিকেশ হয়েছে। রেডিওয় যোগাযোগ করতে হবে জেডের সঙ্গে। কিন্তু তার আগে ফের একবার যেতে হবে জংলি হেড হান্টারদের সেই লং হাউসে। হীরে আরও যথেষ্টই মজুত রয়েছে সেখানে।
বিকেলের আলো রয়েছে এখনও। যথাস্থানে বোট রেখে ঘন অরণ্যের ভিতর দিয়ে দ্রুত চলতে শুরু করেছিল প্রতাপ। বেশিদূর যায়নি তখন, হঠাৎ কাছেই জঙ্গলের ভিতর মৃদু আওয়াজ। নিমেষে লাফিয়ে উঠে সামান্য সরে গিয়ে ঘাড় ফেরাল ও। না, গত কালের মতো দেহাতি জংলিদের ছোঁড়া তীক্ষ্ণ পাথরের টুকরো ছুটে এল না। কিন্তু যা দেখল, তাতেও বিস্মিত কম হল না। গত কালের সেই বয়স্ক জাপানি লোকটা। হাতে পিস্তল উঁচিয়ে গাছপালার আড়াল থেকে এগিয়ে আসছে ওর দিকে।
গতকালই বুঝে ফেলেছে লোকটা আর যাই হোক খুনে নয়। প্রতাপ তাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কাছে এসে লোকটা হাতের অস্ত্র একটুও না সরিয়ে পরিষ্কার ইংরেজিতে বলল, “তুমি ইন্ডিয়ান? আই মিন, গৌতম বুদ্ধের দেশের মানুষ?”
প্রতাপ সামান্য মাথা নাড়ল। নরুনচেরা দুই চোখ কুঁচকে উঠল লোকটার। শ্লেষ মিশিয়ে বলল, “চমৎকার! তা ওই খুনেগুলোর দলে ভিড়লে কী করে?”
প্রতাপ ধীর গলায় বলল, “আমি খুনে নই। তবে মনে হয় ওরাও এখানে হীরের খোঁজেই হাজির হয়েছে। বোধ হয় তুমিও তাই। আর মার্শাল আর্টটাও ভাল জানো। ওটা আমারও কিছু জানা আছে। তাই এরপর আগেরবারের মতো সুবিধা বোধ হয় পাবে না।”
প্রতাপের কথায় লোকটার ভুরু সামান্য কুঁচকে উঠল। “খুনে নও! চোখের সামনেই তো দেখলাম দু-দুটো মানুষকে হেলিকপ্টার-সুদ্ধু জ্যান্ত পুড়িয়ে মারলে!”
“দেখে ফেলেছ!” প্রতাপ কিছুমাত্র অপ্রস্তুত হল না, “তাহলে তো আর্মির বেশিরভাগ মানুষকেই খুনে বলতে হয়। তাই না?”
“বাহ্, বেশ বলেছ! লেখাপড়াও কিছু জানো দেখছি! তা ওই খুনেদের সঙ্গে এই দ্বীপে এসেছ কেন বলো দেখি? বদমায়েশগুলো আমার সব পরিশ্রম মাটি করে দিয়েছে।”
মানুষটির কথায় মুচকি হাসল প্রতাপ। ওর তথাকথিত বিদ্যা যে ক্লাস এইটের বেশি নয়, সে-কথা না ভেঙে বলল, “আপনি ভুল করছেন। আমি ওদের সঙ্গে এই দ্বীপে আসিনি। এসেছি একা। মাত্র দু’দিন আগে। আসার আগে ওদের উপস্থিতির কথা জানা ছিল না। অবশ্য ওদের সঙ্গে এখনও মোলাকাত হয়নি। তবে ওদের একজনের মুন্ডুহীন ধড় নজরে পড়েছে। সেটা এখন অবশ্য কোমোডো ড্রাগনের পেটে। কিন্তু আপনি এখানে কেন? ওই খুনেদের মতো হিরের খোঁজে?”
প্রতাপ যতক্ষণ কথা বলছিল লোকটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। প্রতাপ থামতে সামান্য নীরবতার পর বলল, “আমার কথা পরে। তার আগে তোমার কথা জানতে চাই। তুমিও তো এখানে হিরের খোঁজে এসেছ!”
লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতাপের তখন বুঝতে বাকি নেই, মাঝবয়সী মানুষটা যথেষ্ট অভিজ্ঞ। পোড়-খাওয়া এ-ধরনের মানুষকে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। কিন্তু সব কথা এখনই বলা ঠিক হবে না ভেবে হংকংয়ের মাফিয়া সর্দার জেডের নির্দেশে এখানে হিরের খোঁজে আসার ব্যাপারটা বললেও চেপে গেল লি পেংয়ের কথা।
প্রতাপ থামতে লোকটা বার দুয়েক মাথা ঝাঁকিয়ে বিষণ্ণ গলায় বলল, “ড্যাম ফুল। এই দ্বীপে ডায়মন্ড, হিরে–জহরত কিচ্ছু নেই। তোমার সর্দার ওই জেডের মতো কয়েকজন লোভী মানুষের মস্তিষ্ক প্রসূত উদ্ভট কল্পনা। অ্যান্ড ইউ ম্যান, তুমি হিরে ভেবে হেলিকপ্টারে যা তুলে দিয়েছিলে, সেগুলোও হিরে নয়।”
“হিরে নয়!” দারুণ উত্তেজনায় প্রতাপের সারা শরীর প্রায় টানটান হয়ে উঠল।
লোকটি ফের মাথা নাড়ল, “না ম্যান, হিরে নয়। দেহাতি জংলিদের পরিত্যক্ত ঝুপড়ি থেকে যে আধা-স্বচ্ছ পাথরগুলো পেয়েছিলে, দেখতে কতকটা আনকাট রাফ হিরের মতো হলেও সেগুলো হিরে নয়। গোড়ায় আমিও তাই ভেবেছিলাম। পরে ভুল ভেঙেছে।”
কয়েক মুহূর্ত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল প্রতাপ।
“পাথর... পাথরগুলো দেখেছেন আপনি?”
“দেখেছি তো! তুমি যেখানে ওগুলো পেয়েছ, জংলিদের সেই ঝুপড়ির ভিতরেই।” বলতে বলতে উনি পকেট থেকে একটা ছোটো পাথরের টুকরো বের করে মেলে ধরলেন। প্রতাপ দেখেই চিনল। সেই একই জিনিস। ততক্ষণে অনেকটাই সামলে নিয়েছে ও।
“তাহলে আপনি এখানে কেন এসেছেন? এই ভয়ানক বিপদের ঝুঁকি নিয়ে?”
প্রত্যুত্তরে লোকটা অল্প মাথা নাড়ল। “ম্যান, আমি ও. তাকাসিমা। একজন বৈজ্ঞানিক। সম্প্রতি এই দ্বীপে বৈজ্ঞানিকেরা যে অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন, তার একটা রিপোর্ট আমার হাতে এসেছিল। সেটা পড়ে আমার মনে হয়েছে ওদের কাজটা ঠিকমতো হয়নি। গোড়াতেই গলদ করে ফেলেছে। দ্বীপের যে অংশে সবচেয়ে ভালোভাবে অনুসন্ধান করা দরকার ছিল, সেই অংশটাই এড়িয়ে গেছে ওরা। তাই এই ব্যাপারে আরো এক দফা অনুসন্ধান চালাবার জন্য ইন্দোনেশিয়ার সরকারের অনুমতি চেয়েছিলাম। কিন্তু পাইনি। তবে হাল ছাড়িনি। আসলে বিজ্ঞান আমার কাছে যতটা পেশার, আর চাইতে বেশি নেশার বস্তু। তাই গোপনে একাই চলে এসেছি অনুসন্ধানে। কিন্তু আমার সব পরিশ্রম পণ্ড করে দিয়েছে ওই খুনে হানাদারের দল। আজ ক’দিন হল হাত গুটিয়ে বসে আছি। একদিন তো খুনেগুলোর হাতে প্রাণটাই যেতে বসেছিল। গতকাল তোমার হাতেও মারা পড়তে পারতাম।”
হাঁ-করে শুনছিল প্রতাপ। হঠাৎ ওর মনে হল, এই লোকটার ছবিই ও গত বছর মে মাসে হংকং-এর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেখেছে। হংকং-এ বিভিন্ন দেশের নামীদামি বিজ্ঞানীদের এক কনফারেন্স চলছিল তখন। সেই কারণেই মানুষটির মুখ প্রথম দেখায় কেমন চেনা মনে হয়েছিল। তাড়াতাড়ি বলল, “আপনি কি গত বছর হংকং-এ কোনও কনফারেন্সে এসেছিলেন?”
মৃদু মাথা নাড়লেন উনি, “হ্যাঁ ম্যান। গত বছর মে মাসে হংকং-এ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বৈজ্ঞানিকদের যে কনফারেন্স হয়েছিল তাতে আমি সভাপতিত্ব করেছিলাম। তা বাপু, সন্ধে হতে বেশি দেরি নেই। রাত কাটাবার জন্য এখন একটা নিরাপদ জায়গা খোঁজা দরকার। যদি আপত্তি না থাকে আমার সঙ্গে রাতটা কাটাতে পারো।”
দ্বীপের অনেক কিছুই ইতিমধ্যে ড. তাকাসিমার জানা হয়ে গেছে। পরের দিন ভোরে রওনা হয়ে ওরা ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেল ছোটো এক টিলার কাছে। উঁচুনিচু শ্যাওলা ধরা টিলার ভিজে পিচ্ছিল ঢাল ধরে ড. তাকাসিমা সাবধানে পা ফেলে চলেছেন। পিছনে প্রতাপ। কিছুক্ষণ চলার পর দু’জন সেই টিলার উপর পৌঁছে গেল। নদী এখান থেকে দেখা না গেলেও কলকল আওয়াজে বোঝা যায় খুব দূরে নয়। সম্ভবত টিলার পাদদেশ ধরে বয়ে চলেছে। ড. তাকাসিমা চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে গলা নামিয়ে বললেন, “প্যাট, নদীর কাছে জায়গাটা কিছু দুর্গম বলেই এখানে নৌকো রেখেছি। পৌঁছোবার সহজ পথও আছে। একটা খাত রয়েছে টিলার উত্তর ঢাল দিয়ে। তবে সেই পথ দূর থেকে সহজেই দেখা যায়। বর্তমান অবস্থায় নিরাপদ নয়। তাই কঠিন পথটাই বেছে নিতে হয়েছে। আমাদের কিছু সাবধানে নামতে হবে। যেমন খাড়াই, তেমনই পিছল।”
চূড়ার ছোটো সমতল জমি পার হয়ে টিলার অন্য প্রান্তে পৌঁছে নদীর দিকে নামার খাড়াই পথটা দেখতে পেল প্রতাপ। বৃষ্টির কারণে সবুজ শ্যাওলায় ভর্তি। ড. তাকাসিমা ইতিমধ্যে গলায় ঝোলানো শক্তিশালী বাইনোকুলারে চোখ রেখে চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। হঠাৎ কেমন উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বাইনোকুলার থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন, “প্যাট কয়েক দিন ধরে যা আশঙ্কা করছি, আজ তাই ঘটে গেছে মনে হচ্ছে। সরু খাতের মাঝে ছোটোখাটো যে ঝোপঝাড় রয়েছে, আজ তাদের বেশির ভাগই বেশ অবিন্যস্ত, ভাঙাচোরা। খানিক আগে কয়েকজন খাতের পথ ধরে নদীর দিকে গেছে। যদি তারা মানুষ হয়, তাহলে এতক্ষণে নৌকোটা দেখে ফেলেছে মনে হয়। হুঁশিয়ার হয়ে নামতে হবে।”
প্রতাপ তার বাইনোকুলারে চোখ রেখে চারপাশটা ভাল করে পর্যবেক্ষণ করল। কিছু নজরে পড়ল না। অতঃপর সামান্য পরামর্শ করে দু’জন নিঃশব্দে ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল।
খাড়াই পিছল পথ বেয়ে নামতে কিছু সমস্যাই হচ্ছিল প্রতাপের। প্রায় অর্ধেক নামার পর সামান্য জিরিয়ে নেবার জন্য একটা বড়ো পাথরের আড়ালে বসল ও। ড. তাকাসিমা আগে ছিলেন। তাঁকে দেখতে পেল না। সম্ভবত তিনিও কোনও পাথরের আড়ালে বসে পড়েছেন। প্রতাপ বাইনোকুলারে চোখ রেখে শেষবারের মতো পর্যবেক্ষণ শুরু করল। আর সেটা করতে গিয়ে হঠাৎ ওর চোখ আটকে গেলে নীচে খাতের প্রান্তে একটা বড়ো পাথরের দিকে। আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে দু’জন মানুষ। সাদা চামড়ার ইউরোপিয়ান। দু’জনের হাতেই রাইফেল।
ব্যাপারটা নজরে পড়ার পর কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেল প্রতাপ। সন্দেহ নেই, লোক দুটো ড. তাকাসিমার জন্য ওত পেতে রয়েছে। দলের বাকিরা কোথায় না জেনে নীচে নামার ঝুঁকি নেওয়া যায় না। প্রতাপ কী করবে ভাবছে। হঠাৎ ড. তাকাসিমাকে দেখতে পেল। কী সর্বনাশ! উনি ইতিমধ্যে অনেকটা নেমে গেছেন। লোক দুটোর খুব কাছে। ওদের দু’জনকে নিশ্চয় দেখতে পাননি। নইলে এমন নিশ্চিন্তে নামতেন না। সৌভাগ্য, লোক দুটোও দেখতে পায়নি তাঁকে।
কী করবে ভাবছে। হঠাৎ মনে হল, লোক দুটোর সঙ্গে সম্ভবত আর কেউ নেই। থাকলে এতক্ষণে ড. তাকাসিমা তাদের নজরে পড়ে যেত। ব্যাপারটা মাথায় আসতে ও আর দেরি করল না। কাঁধ থেকে রাইফেল নামিয়ে যথা সম্ভব দ্রুত নামতে শুরু করল।
সামান্য ঘুরে ওদের পিছন দিয়ে নামতে গিয়ে কিছু দেরিই হয়ে গেল প্রতাপের। ইতিমধ্যে ড. তাকাসিমা খাতে নেমে নদীর দিকে এগোতে শুরু করেছেন। প্রতাপ তখন দুই আততায়ী থেকে মিটার তিরিশ দূরে। লোক দু’জন হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠল। সন্তর্পণে হাতের রাইফেল উঁচিয়ে ধরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সন্দেহ নেই, ওরা ড. তাকাসিমাকে দেখতে পেয়েছে। রাইফেল হাতে সুযোগের অপেক্ষায়।
প্রতাপ আর দেরি করল না। রাইফেল ফের কাঁধে চালান করে দিয়ে শিকারি চিতার মতো হামাগুড়ি দিয়ে নিঃশব্দে জমিটা পার হল। রাইফেল হাতে ড. তাকাসিমাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে টের পেল না কেউ। দু’জনের ঠিক পিছনে এসে প্রতাপ নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। বাঁ-হাতে পিস্তল, ডান হাতে খোলা ছোরা। প্রতাপের হাতের দুটো অস্ত্রই এরপর আচমকা এসে ঠেকল দু’জনের গলার পাশে। হিমশীতল গলায় বলল, “বাঁচতে চাইলে হাতের রাইফেল দুটো নামিয়ে রাখো।”
ভয়ানক চমকে উঠতে দু’জনের হাত আপনা থেকেই আলগা হয়ে এল। একসঙ্গে দুটো রাইফেলই খসে পড়ল হাত থেকে।
প্রতাপের কণ্ঠস্বর আগেই কানে গিয়েছিল ড. তাকাসিমার। দু’দুটো ভারী রাইফেল মাটিতে পড়ার শব্দও কানে এল এবার। গোড়ায় চমকে উঠলেও ব্যাপারটা বুঝতে বিলম্ব হল না। প্রতাপ ইতিমধ্যে দু’জনের কোমর থেকে পিস্তল দুটো ছিনিয়ে নিয়েছে। ড. তাকাসিমা কাছে আসতে বলল, “সার, একটু হুঁশিয়ার থাকবেন। বদমায়েশ দুটোকে বেঁধে ফেলি আগে।”
ব্যাগ থেকে শক্ত দড়ি বের করে প্রতাপ এরপর দু’জনের হাত দ্রুত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল। তারপর সংক্ষেপে ব্যাপারটা জানিয়ে বলল, “সার, ওদের সঙ্গীরা এই মুহূর্তে কাছাকাছি না থাকলেও বাকিদের হদিশ ওদের মুখ থেকে আপনিই বের করুন বরং। কাজটা আপনার পক্ষেই সুবিধা হবে।”
উত্তরে ড. তাকাসিমা অল্প হাসলেন, “ওদের সঙ্গীরা আমার নৌকো নিয়ে ভেগে পড়েছে হে। ওদের রেখে গেছে স্রেফ আমাকে নিকেশ করে ফেলতে। প্রাণে বেঁচে গেলাম তোমার জন্যই। কী, তাই তো?” কথা শেষ করে ড. তাকাসিমা দু’জনের ঘাড় ধরে খানিক ঝাঁকুনি দিলেন শুধু।
আশ্চর্য ব্যাপার। সেই ঝাঁকুনিতে দুই জোয়ান চোখ উলটে বিষম খাওয়ার জোগাড়। সামলে উঠতে সময় লাগল। তারপর ঢোক গিয়ে চিঁ–চিঁ করে বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“ভাল। তা কোন দিকে গেছে হে তারা? উত্তরে পাহাড়ের দিকে?”
উত্তরে অপেক্ষাকৃত ঢ্যাঙা লোকটা বলল, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“তা ক’জন ছিলে তোমরা?”
“আজ্ঞে পনেরো জন। এখন সব মিলিয়ে নয়।”
“তা বাকিরা গেছে কোথায়? জাহান্নামে?”
“তা বলতে পারেন। চারজন জংলিদের হাতে। বাকিরা প্লেন থেকে নামার সময় সমুদ্রে হাঙরের পেটে।”
“ভাল। তা এবার সত্যি করে বলো দেখি, তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে কে?”
প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ঢ্যাঙা লোকটা এতক্ষণ সহজভাবে দিলেও এবার থতমত খেয়ে চুপ করে গেল। আড় চোখে পাশে সঙ্গীর দিকে তাকাল।
ড. তাকাসিমা সামান্য অপেক্ষা করে বলল, “কী হে ভালমানুষ, জবাব দেবে, না কি ঘাড়টা মটকে দেব?” উত্তরে লোকটা তাড়াতাড়ি ঢোক গিলে বলল, “আজ্ঞে, আমরা ভাড়াটে।”
“সে তো বুঝেছি। তা নাম কী তোমার?”
“জন।”
“কারা তোমাদের ভাড়া করে পাঠিয়েছে এখানে?”
“আজ্ঞে আমাদের এখানে এনেছে এই হ্যারি। দলের সর্দার। ও বলতে পারবে।”
অন্য লোকটা এতক্ষণ একটি কথাও বলেনি। গোঁজ হয়ে শুনছিল। ড. তাকাসিমা তাকে সামান্য ঠেলা মেরে বলল, “বাহ্, তাহলে তুমিই দলের চাঁই! তা এবার চট করে বলে ফেল দেখি কারা তোমাদের ভাড়া করেছে?”
উত্তরে টুঁ শব্দও বেরুল না হ্যারির মুখ দিয়ে। অযথা সময় নষ্ট না করে ড. তাকাসিমা দুই হাতে তার ঘাড়ের দুই পাশ ধরে বার-কয়েক ঝাঁকুনি দিয়ে ছুড়ে দিলেন শূন্যে।
আঁ-আঁ শব্দে মাটিতে পড়েই লোকটা ফের ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো লাফিয়ে উঠল। তারপর সশব্দে চিৎপাত হয়ে আছড়ে পড়ল। সেই মুহূর্তে তার পকেট থেকে একটা পাসপোর্ট সাইজের ফোটোগ্রাফ ছিটকে পড়ল। কৌতূহলে ছবিটা তুলে নিয়েছিল প্রতাপ। এক পলক দেখেই চমকে উঠল। কী আশ্চর্য! ছবিটা ওর নিজের। তার ছবি এখানে এই খুনেটার কাছে কী করে এল!
ইতিমধ্যে হ্যারি মাটিতে পড়েই চিঁ-চিঁ করে উঠল, “ব-বলছি, বলছি সার। আমাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল ম্যানিলায় মাফিয়া চাঁই বেন ম্যাক্সিমের। মোটা অঙ্কের ডলারে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু এমন ঝামেলা হবে বুঝিনি। এর মধ্যে ছয়জন মারা পড়েছে। শুরু থেকে একের-পর-এক ঝামেলা। অথচ কাজের কাজ কিছুই হয়নি।”
লোকটা থামল। ততক্ষণে প্রতাপের হাতের ফোটোর দিকে নজর পড়েছে ড. তাকাসিমার। ছবিটা প্রতাপের হাত থেকে নিয়ে সামান্য চোখ বুলিয়ে কড়া গলায় বললেন, “তা সত্যি করে বল দেখি, এই ছবিটা তোর পকেটে কী করে এল? কে দিয়েছে?”
পিঠে আচমকা পিস্তলের নল ঠেকতে পিছন ফিরে প্রতাপকে দেখেই চমকে উঠেছিল হ্যারি। দ্বীপে নামার পর এই লোকটাকে খুঁজে বের করার কাজটাও ছিল তাদের উপর। কিন্তু পকেট থেকে ছবিটা যে ইতিমধ্যে প্রতাপের হাতে চলে গেছে, একেবারেই খেয়াল করেনি। চমকে উঠে বলল, “বলছি সার। ছবিটা আমাকে দিয়েছিল ওই বেন ম্যাক্সিম।”
“কেন?” কড়া গলায় এবার প্রশ্ন করল প্রতাপ।
উত্তরে হ্যারি কাঁচুমাচু হয়ে প্রতাপের দিকে চোখ ফেরাল। ঢোক গিলে বলল, “আসলে আপনাকে খুঁজে কিছু কাজের কথা বলেছিল বেন। কিন্তু আপনার সঙ্গে যে আরও একজন রয়েছে, একবারও বলেনি।” কথা শেষ করে দারুণ আক্ষেপে কপাল চাপড়াল লোকটা।
প্রতাপ বা ড. তাকাসিমা কেউ আর প্রশ্ন করল না। পরস্পর মুখের দিকে সামান্য তাকিয়ে মৃদু মাথা নাড়ল। ততক্ষণে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে গেছে প্রতাপের কাছে। সন্দেহ নেই, নদীতে নৌকোটা দেখে সম্ভবত সেটা প্রতাপের বলেই ভেবেছিল ওরা। তারপর তাকাসিমাকে দেখে কিছু হতচকিত হয়ে পড়েছিল। কী করবে বুঝে ওঠার আগেই খোদ প্রতাপের হাতে বন্দি।
ম্যানিলার বেন ম্যাক্সিম লোকটাকে ভালই চেনে প্রতাপ। জেডের মতোই আন্ডার ওয়ার্ল্ডের মানুষ। তবে ওর সঙ্গে কখনও কাজ করেনি। এমন কিছু কেউকেটাও নয়। ছোটোখাটো একটা গ্যাং থাকলেও প্রধান কাজ মিডল ম্যানের। দরকারে লোক ভাড়া করেও ফরমায়েশ তামিল করে থাকে। সেই কারণে যোগাযোগ আছে নানা প্রান্তের মাফিয়া আর খুনেদের সঙ্গে।
মুখে না বললেও হ্যারি যে ওকে খুন করতেই এসেছিল, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বেন ম্যাক্সিমের সঙ্গে তেমন কোনও শত্রুতা নেই ওর। বুঝতে অসুবিধা হয় না, ম্যাক্সিমকে কাজটা দিয়েছিল অন্য কেউ। আর বোঝাই যায়, শুধু ওকে খুন করার জন্য পনেরো জন মানুষ ভাড়া করা হয়নি। হিরে খোঁজার কাজটাও রয়েছে। কিন্তু কারা এই কাজের জন্য বেন ম্যাক্সিমকে দায়িত্ব দিয়েছে, অনেক ভেবেও কিনারা করতে পারল না।
একবার ভেবেছিল, ড. তাকাসিমার সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে কিছু পরামর্শ করবে। কিন্তু আন্ডারওয়ার্ল্ড সম্পর্কে ড. তাকাসিমার তেমন ধারণা নেই বুঝে পরে আর ইচ্ছে হয়নি। তবে বন্দি দু’জনকে নানাভাবে জেরা করতে ছাড়েনি। তাতে ওদের দ্বীপে আসার প্রধান উদ্দেশ্য যে হিরের সন্ধান, সেটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। এর বেশি কিছু জানা যায়নি।
অভিজ্ঞ প্রতাপ অবশ্য বুঝতে পারছিল, যারা বেন ম্যাক্সিমকে কাজটা দিয়েছে তারা এই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কেউ। বেন ম্যাক্সিম এই অঞ্চলের বিভিন্ন গ্যাংয়ের হয়েই কাজ করে। তা ছাড়া আর একটা ব্যাপার, যারাই বেন ম্যাক্সিমকে কাজটা দিক, তারা বড়ো কোনও গ্যাং নয়। তেমন বড়ো গ্যাং হলে এ-কাজে তারা নিজেদের লোক পাঠাত। ভাড়াটে নিয়োগ করত না।
এই গভীর অরণ্যের ঘন অন্ধকার রাতে শত্রুপক্ষের আক্রমণের সম্ভাবনা কম। তবু ঝুঁকি না নিয়ে ওরা নদী থেকে অনেকটা দূরে পাহাড়ের এক খাঁজের ভিতর দুই বন্দিকে নিয়ে তাঁবু ফেলল। রাত কাটল পালা করে পাহারা দিয়ে। তারই মধ্যে পরবর্তী কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা। ড. তাকাসিমাই বললেন, “প্যাট, আমার অনুমান, যে-রহস্যের খোঁজে আমি এখানে এসেছি, তার সমাধান রয়েছে ওই উঁচু পাহাড়টার উপর। দুর্ভাগ্য, মোটা মাথার খুনে হানাদারগুলো দ্বীপের আদিবাসীদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে সব গুবলেট করে দিয়েছে। ঘরছাড়া আদিবাসীরা হন্যে হয়ে তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে এখন। ক’টা দিন প্রায় বসেই কাটাতে হয়েছে। কিন্তু এবার একটা হেস্তনেস্ত করতে চাই। এই দ্বীপে আমাদের দু’জনের আসার উদ্দেশ্য ভিন্ন। তাই জোর করব না। কিন্তু মনে হয় দু’জন একসঙ্গে থাকলে কিছু সুবিধাও হতে পারে।”
ড. তাকাসিমা গুণী মানুষ। তাঁর মুখে প্রতাপ প্রথম যখন শোনে, যে-হিরের খোঁজে সে এখানে এসেছে, তা নেই, নিতান্তই ভ্রান্ত ধারণা, কিছু হতাশই হয়ে পড়েছিল। তবু ঠিক করে ফেলেছিল, যাই হোক না কেন, পাহাড়ের উপরটা না দেখে ও ফিরবে না। তাই তাকাসিমা নিজেই যখন ব্যাপারটা তুললেন, রাজি হয়ে গিয়েছিল।
পরদিন ভোরেই শুরু হল যাত্রা। সামনে ড. তাকাসিমা। মাঝে দুই বন্দি। চলার জন্য দু’জনের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়েছে। পিছনে রাইফেল হাতে প্রতাপ। সে-জন্য নিজের পিঠের ভারী ব্যাগটা চাপিয়ে দিয়েছে ঢ্যাঙা জনের পিঠে।
মূল পাহাড়টা খুব দূরে না হলেও একে ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পথ, তার উপর সঙ্গে দুই বন্দি, পৌঁছোতে যে সময় লাগবে, প্রতাপ বুঝতে পারছিল। তার উপর ড. তাকাসিমা যথেষ্ট হুঁশিয়ার হয়ে এগোচ্ছিলেন। চলার পথে যখনই জংলি মানুষের পায়ের ছাপ, অন্য চিহ্ন নজরে পড়ছে, পথ বদলে আরও ঘন জঙ্গলের পথ বেছে নিচ্ছিলেন।
তবু ঘণ্টা-দুয়েকের মধ্যে ওরা মূল পাহাড়ের কাছে পৌঁছে গেল। পাহাড়ের এদিকের অংশ কিছু ঢালু আর ঘন জঙ্গলে ভরতি হলেও উপরের অংশ ভয়ানক খাড়াই। ড. তাকাসিমা বললেন, “প্যাট, পাহাড়টা আসলে বিশাল এক আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। পায়ের নীচে যে পাথর দেখছ, জমাট লাভা। তাই পাহাড়ের নীচের দিকটা তেমন না হলেও উপরের দিকটা ভয়ানক খাড়াই। তবে আগ্নেয়গিরির এই খাড়াই অংশ খুব বেশি দীর্ঘ হয় না। আর একটা কথা তোমাকে আগেই জানিয়ে রাখি, বহু বছর আগে আগ্নেয়গিরিটা ক্রমাগত লাভা উদ্গিরণ করে যখন নিস্তেজ হয়ে আসতে শুরু করেছে, সেই অন্তিম পর্যায়ে কোনও এক কারণে ভয়ানক এক বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সেই বিস্ফোরণে জ্বালামুখের একটা বড়ো অংশ উড়ে গিয়ে বিশাল এক গহ্বর তৈরি হয়। বৃষ্টির জল জমে সেই গহ্বর পরে বিশাল এক হ্রদে পরিণত হয়েছে। সেই হ্রদই দ্বীপের একমাত্র নদীর উৎস। হ্রদের জল কোনও সুড়ঙ্গ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে সমতলে নেমে বয়ে গেছে। পাহাড়ে ওঠার জন্য নদীর দিকটাই কিছু সুবিধাজনক হবার কথা। আমাদের যেতে হবে ওই দিকেই। তবে আপাতত পাহাড়ের নীচের অংশে এই ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে চলাই সুবিধাজনক।”
ঘন জঙ্গলে পূর্ণ উঁচু–নিচু পাহাড়ি পথে শুরু হল পথ চলা। নিরাপদে চলার জন্য ইতিমধ্যে ওরা নদীর দিকে থেকে অনেকটাই দূরে চলে এসেছিল। একটানা ঘণ্টাখানেক চলার পর মৃদু জলধারার শব্দ কানে এল ওদের। নদী বেশি আর দূরে নয়। ওরা সেই দিকে চলতে শুরু করেছে, হঠাৎ এক ব্যাপার ঘটে গেল।
দুই বন্দি এই পর্যন্ত কোনও ঝামেলা করেনি। বেশ ভদ্রভাবেই আসছিল। স্বভাবতই দু’জনের উপর কড়া নজরে কিছু ভাটা পড়ে গিয়েছিল। দু’জন সেই সুযোগটাই নিল। হঠাৎ স্বমূর্তি ধারণ করে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল সমানে ড. তাকাসিমার উপর।
এ-জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। আচমকা দু’জন তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেই টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। হাতে ধরা পিস্তলের ট্রিগারে চাপ পড়তেই গুলি ছুটল। কারও গায়ে না লাগলেও আচমকা শব্দে নিস্তব্ধ বনভূমি প্রায় গমগম করে উঠল।
পিছনে প্রতাপ তখন সামান্য পিছিয়ে পড়েছে। ব্যাপার দেখে ছুটে এল। ওদিকে ড. তাকাসিমা ততক্ষণে কিছু সামলে নিতে পারলেও বেঁটে হ্যারি ইতিমধ্যে তাঁর হাত থেকে পিস্তল ছিনিয়ে নিয়েছে। তবে ফায়ার করার আগেই প্রতাপের রাইফেলের বাঁট আছড়ে পড়ল তার ঘাড়ের উপর। চাপা আর্তনাদে লোকটা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল। ঢ্যাঙা জন ইতিমধ্যে হাত বাড়িয়েছিল তাকাসিমার কাঁধে রাইফেলের দিকে। সঙ্গীর ওই অবস্থা দেখে আর ঝুঁকি না নিয়ে মাথার উপর হাত তুলে দিল। প্রতাপের হাতে রাইফেলের বাঁট ইতিমধ্যে ফের শূন্যে উঠে গেলেও ব্যাপার দেখে নামিয়ে নিলো।
ড. তাকাসিমা উঠে দাঁড়িয়েছেন ইতিমধ্যে। কিছু অপ্রস্তুত। ভদ্রলোকের আঘাত তেমন গুরুতর না হলেও পাথরের কানায় লেগে কপালের পাশ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়াচ্ছে। বাঁ-চোখের পাশটা ফুলে উঠেছে। প্রতাপ তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে বললেন, “ঘাবড়িও না ম্যান, তেমন কিছু হয়নি আমার।”
প্রতাপ অবশ্য কান দিল না। ব্যাগ থেকে ফার্স্ট এড বক্স বের করে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে চটপট বেঁধে দিয়ে বলল, “সার, আপনার কিছু বিশ্রাম দরকার। ইতিমধ্যে বেলাও হয়েছে। এই ফাঁকে দুপুরের খাওয়ার পর্ব সেরে নেওয়া যায়।”
উত্তরে ড. তাকাসিমা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই দূর থেকে পর পর গোটা কয়েক গুলির আওয়াজ। সামান্য বিরতির পর আরও কয়েকটা।
আজ সকাল থেকে এই আশঙ্কাই করছিল ওরা। হানাদারদের দুই সঙ্গী হ্যারি আর জনের খোঁজ নেই। বাকিদের তাই বসে থাকার কথা নয়। বিশেষ করে হ্যারি ওদের সর্দার। রাতটা অপেক্ষা করে সকাল থেকে নেমে পড়েছে খোঁজে। ড. তাকাসিমার পিস্তলের আওয়াজে হানাদারের দল ওদের অবস্থান টেরও পেয়ে গেছে। ড. তাকাসিমা দারুণ ক্ষোভে মাথা নেড়ে বললেন, “ব্যাপারটা আমার অসাবধানতার জন্যই হয়ে গেল। সরি।”
“তাতে কী সার। এ-সব কাজে এমন হয়ে থাকে। ভাববেন না।” প্রতাপ সামান্য মাথা নাড়ল। “দলে অনেক ভারী হলেও ওরা এখনই হয়তো আক্রমণ করবে না। আগে বুঝে নিতে চাইবে ব্যাপারটা। ওদের দুই স্যাঙাতের অবস্থাও। নিশ্চিন্ত না হয়ে তেমন কিছু করবে না। তবে এখনই এখান থেকে সরে পড়া দরকার।”
আহত হ্যারির জ্ঞান তখনও ফেরেনি। প্রতাপ ঢ্যাঙা জনের পিঠে রাইফেলের বাঁটের গুঁতো দিয়ে বলল, “স্যাঙাতের লাশটা এবার পিঠের উপর তুলে নাও দেখি। চটপট আমাদের সঙ্গে চলতে হবে এবার।”
জন গোড়ায় গোঁজ হয়ে ছিল। দেখে ড. তাকাসিমা হঠাৎ বললেন, “কী দরকার প্যাট। দুটোকে শেষ করেই দেওয়া হোক বরং। ঝামেলা মিটে…।”
ড. তাকাসিমার কথা শেষ হয়নি তখনও। ঢ্যাঙা জন মুহূর্তে হ্যারির অচৈতন্য দেহ কাঁধে তুলে নিল। সন্তর্পণে চলা শুরু হল আবার।
রাইফেলের আওয়াজ শোনা গিয়েছিল নদীর দিক থেকে। এই অবস্থায় ওদিকে এগোনো ঠিক হবে না। ওরা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপর দিকে উঠতে শুরু করল এবার। যথাসম্ভব নিঃশব্দে। সামনে তাকাসিমা। মাঝে অচেতন হ্যারিকে কাঁধে নিয়ে জন। তার পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে প্রতাপ। ঘন গাছপালার ভিতর চড়াই ভেঙে খানিক চলার পর অল্প দূরে পাহাড়ে একটা চমৎকার খাঁজ নজরে পড়ল। দুই দিকে উঁচু দেওয়াল। দুপুরে খাওয়ার পর্ব সেরে নেওয়া, সামান্য বিশ্রামের জন্য চমৎকার। যথাসম্ভব পর্যবেক্ষণ করে ওরা সেই দিকে চলা শুরু করল।
ইতোমধ্যে অন্য পক্ষের কোনো সাড়াশব্দ আর মেলেনি। কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়েছিল ওরা। কিন্তু বিপদটা এল সেই সময়। বড়ো ভয়ানক ভাবে। এতটা ভাবতে পারেনি কেউ।
উপরে পাহাড়ের খাঁজটা তখন অল্পই দূরে। হঠাৎ বাঁ-দিকে খানিক দূরে গাছপালার ভিতর মৃদু পায়ের শব্দ। সন্তর্পণে কেউ এদিকে আসছে। শব্দটা কানে আসতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা। গোড়ায় মনে হয়েছিল বন্য জন্তুও হতে পারে। কিন্তু শব্দের গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করে বুঝতে বাকি রইল না, শব্দ মানুষের পায়ের। সন্দেহ নেই হ্যারির দলবল। ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে ড. তাকাসিমা আর প্রতাপ নিঃশব্দে দৃষ্টি বিনিময় করল।
অচৈতন্য হ্যারির জ্ঞান তখনও ফেরেনি। জন তাকে পিঠে নিয়ে চলেছে। প্রতাপ লক্ষ করল লোকটা হঠাৎ কেমন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। সন্তর্পণে চারপাশে তাকাচ্ছে। রাইফেলের নল পিঠে ঠেকানোই ছিল। জোরে গুঁতো মারল ও। প্রায় সাথে সাথেই মিইয়ে গেল লোকটা। প্রতাপ এবার হাত নেড়ে তাকাসিমাকে সামান্য ইশারা করে পায়ের আঘাতে একটা আলগা পাথর ঢাল বেয়ে গড়িয়ে দিল। হালকা আওয়াজে সেটা গড়িয়ে গেল খানিক।
প্রতিক্রিয়া মিলতে দেরি হল না। প্রায় তৎক্ষণাৎ ওদিকে থেকে গুলির আওয়াজ। পরপর কয়েক ঝাঁক। তারপর সব আবার নিস্তব্ধ। পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়ার জন্য কোনওটাই অবশ্য ওদের গায়ে লাগেনি।
ড. তাকাসিমা বললেন, “প্যাট ওরা এখনও আমাদের উপস্থিতির ব্যাপারে সম্ভবত নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। কিন্তু এই অবস্থা বেশিক্ষণ থাকবে না। খুব কাছেই রয়েছে ওরা।”
“শুধু তাই নয় সার, শত্রুপক্ষ দলেও ভারী। তবে এখনও আমাদের উপস্থিতির ব্যাপারে যখন নিশ্চিন্ত হতে পারেনি অযথা লড়াইয়ে না গিয়ে আমাদের এগিয়ে যাওয়াই ভাল।”
প্রতাপের কথায় ড. তাকাসিমাও সহমত হলেন। সময় নষ্ট না করে ওরা ফের উপরের দিকে চলতে লাগল।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পথ চলেও তেমন বেশি তখনও এগোতে পারেনি। ইতিমধ্যে পিছনে পায়ের আওয়াজ আরও কাছে। কয়েক দফা গুলিও চলেছে। তবে এদিকে থেকে জবাব দেয়নি ওরা। কোনওক্রমেই অবস্থান জানান দেওয়া চলবে না। তবে পাথুরে মাটির কারণে এদিকে জঙ্গল তেমন ঘন নয়। শুধু ঝোপঝাড় আর ঘাস। শত্রুর নজরে পড়ে যাবার সম্ভাবনা। বড়ো সমস্যা বন্দি জনকে নিয়ে। একে তার পিঠের উপর হ্যারির অচৈতন্য দেহ। তার উপর চলার ইচ্ছেও নেই। দলের সঙ্গীরা দূরে নয়। পিছনে রাইফেল হাতে প্রতাপের কড়া নজর না থাকলে অনেক আগেই ছুটে পালাত। প্রতাপকে সেজন্য বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে। অথচ খুব কাছেই হানাদার।
স্বভাবতই ঢ্যাঙা জনের দিকে নজর রাখতে খুব সমস্যা হচ্ছিল প্রতাপের। চেষ্টা করেও সব সময় নজরে রাখতে পারছিল, এমন নয়। ওই সময় জন এক হালকা ঝোপ ভেঙে এগোচ্ছিল। সামান্য চোখের আড়ালে তখন। হঠাৎই কিছু ছিটকে পড়ার শব্দ। ব্যাপার দেখে প্রতাপ দ্রুত রাইফেল বাড়িয়ে দিয়েছে, দেখতে পেল ঢ্যাঙা জন হতভম্বের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। পিঠের উপর হ্যারি নেই। উধাও। চকিতে চারপাশে দৃষ্টি ঘোরাল প্রতাপ। তারপর রাইফেলের নল দিয়ে জোরাল এক খোঁচা মেরে কড়া গলায় বলল, “স্যাঙাতকে কোথায় পাচার করে ফেললে?”
উত্তরে জন আগের মতোই ফ্যালফ্যাল করে খানিক তাকিয়ে থেকে জিব দিয়ে ঠোঁট সামান্য ভিজিয়ে নিয়ে বলল, “আজ্ঞে, আমার দোষ নেই সার। পিঠের উপর হ্যারি হঠাৎ আড়মোড়া ভাঙতে টাল সামলাতে পারিনি। কিছু বেসামাল হয়ে গিয়েছিলাম। হ্যারি পড়ে গিয়েছিল পিঠের উপর থেকে। তারপর কোথায় যে উপে গেল, বুঝতে পারছি না!”
বলা বাহুল্য, এই কৈফিয়ত বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু লোকটার মুখ দেখে প্রতাপের মনে হল, সে মিথ্যে বলছে না। অচৈতন্য হ্যারি তাহলে গেল কোথায়? ড. তাকাসিমা ইতিমধ্যে খানিক এগিয়ে গিয়েছে। প্রতাপ কী করবে ভাবছে। তার মধ্যেই পিছন থেকে ফের এক ঝাঁক গুলি ছুটে এল। প্রাণ বাঁচাতে শুয়ে পড়ল প্রতাপ। বন্দি জনও তার ডান দিকে লতাপাতার বড়ো একটা ঝোপের উপর হুমড়ি দিয়ে পড়ল। মুহূর্তে ঝোপঝাড় ভেঙে ভারী কিছু পড়ার শব্দ। প্রতাপ গুলির আওয়াজে মাটিতে শুয়ে পড়লেও জনের উপর থেকে চোখ সরায়নি। অবাক হয়ে দেখল, মুহূর্তে সে-ও চোখের সমানে থেকে বেমালুম উধাও হয়ে গেছে।
রহস্যটা বুঝতে এরপর আর দেরি হয়নি ওর। ঝোপের নীচে বড়ো গর্ত আছে। গর্তের মুখটা ঝোপঝাড়ে এমন ঢেকে রয়েছে যে, খুব কাছ থেকেও বোঝার উপায় নেই।
গুলির শব্দে ড. তাকাসিমা তখন পিছন ফিরে তাকিয়েছেন। প্রতাপ ইশারায় ডাকল তাঁকে। সংক্ষেপে ব্যাপারটা বুঝিয়ে সাবধানে ঝোপ সরিয়ে নেমে পড়ল গর্তে।
ভিতরে নেমে টর্চ জ্বালতেই দুই বন্দির হদিশ পাওয়া গেল। অচৈতন্য হ্যারি তখন জ্ঞান ফিরে উঠে বসেছে। ঢ্যাঙা জনের হতবুদ্ধি অবস্থা তখনও কাটেনি। টর্চের আলো চোখে পড়তেই ঘাবড়ে গিয়ে দুই হাতে চোখ ঢাকল। একটু পরে ড. তাকাসিমাও নেমে এলেন ভিতরে।
টর্চের আলোয় গর্তের ভিতরে ভাল করে নজর করতে বুঝতে পারল মুখটা ছোটো হলেও ভিতরটা যথেষ্টই প্রশস্ত। মামুলি গর্ত নয়। বরং টানেল বলাই সঙ্গত। এঁকে-বেঁকে অনেক দূর চলে গেছে।
উপরে গুলির আওয়াজ তখনও চলছে। প্রতাপ ড. তাকাসিমাকে বলল, “সার, যা অবস্থা, মনে হয় খানিক এগিয়ে যাওয়া ভাল।”
ড. তাকাসিমা তখন টর্চের আলোয় চারপাশ গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। প্রতাপের কথায় যখন ওর দিকে তাকালেন, ভদ্রলোক যথেষ্টই উত্তেজিত। এমন অবস্থায় মানুষটিকে আগে দেখেনি। খানিক সময় লাগল সেটা দমন করতে। তারপর স্থির গলায় বললেন, “প্রতাপ এটা সামান্য গুহা নয়। সুদীর্ঘ টানেল। বহু বছর ধরে পাহাড়ের ফাটল বেয়ে জলস্রোতের কারণে সৃষ্টি। আজ জলস্রোত নেই। তাই শুকনো। যে কারণে ওই নদীর উৎপত্তি, সেই একই কারণে সৃষ্টি এই টানেলেরও। পাহাড়ের উপরে যে হ্রদ রয়েছে তারই জল এই টানেলের ভিতর দিয়ে একসময় বাইরে এসে পড়ত। হ্রদের জল তখন অনেক উপরে ছিল। জলস্তর নেমে যাবার কারণে জলপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। নিতান্ত দৈবক্রমেই টানেলটার সন্ধান মিলেছে। দৈব আর কিছু সহায় হলে এই সুড়ঙ্গ পথেই আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে হয়তো ও-ধারে হ্রদের কাছে পৌঁছে যেতে পারব।”
ড. তাকাসিমার অনুমান যে অভ্রান্ত, অল্প সময়ের মধ্যে টের পেল প্রতাপ। প্রায় গোলকধাঁধার মতো সুড়ঙ্গ, এককথায় মাকড়শার জাল। নানা দিকে অসংখ্য শাখা প্রশাখা। কোথাও দেড় মানুষ সমান উঁচু। কোথাও এত সরু, ঢুকতে হয় হামাগুড়ি দিয়ে। কোথাও উঠে গেছে উপর দিকে। কোথাও নেমে গেছে নীচে। কোথাও ছাদ বেয়ে টপটপ করে জল গড়াচ্ছে। জমে আছে নীচের মেঝেয়। তাকাসিমা টর্চের আলোয় প্রতি পদক্ষেপ হিসেব করে ফেলছিলেন। ঘনঘন কম্পাস আর অলটিচুড মিটারের উপরে চোখ রাখছিলেন।
এ-ভাবে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা চলার পর ওরা সামনে ঘন অন্ধকারের ভিতর আলোর একটা বড়ো ফোকর দেখতে পেল। আলোর ফোকরটা যে সুড়ঙ্গের অন্যপ্রান্তের মুখ বুঝতে অসুবিধা হল না। দ্রুত পা চালিয়ে ওরা একটু পরে যখন বাইরে খোলা আকাশের নীচে এসে দাঁড়াল, এক অদ্ভুত অনুভূতিতে জুড়িয়ে গেল মন। সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ। প্রতাপ শুধু দেখল, ওদের মাথার উপর খোলা আকাশ। সামনে ন্যাড়া বৃক্ষ-শূন্য পাহাড়-ঘেরা বিশাল এক হ্রদ। নীল জল টলটল করছে। সেই জল প্রায় কাচের মতো স্থির। সামান্য ঢেউ পর্যন্ত নেই। বাইরে এত গভীর জঙ্গল, কিন্তু এখানে যতদূর চোখ যায় গাছপালা তো দূরের কথা, এই বর্ষায় সামান্য ঘাস বা শ্যাওলা পর্যন্ত নেই। নিস্তব্ধ স্পন্দনহীন প্রান্তর। অথচ সারা শরীর জুড়ে এক আশ্চর্য স্নিগ্ধ অনুভূতি। শরীরের প্রতিটি রোমকূপে মনোরম এক শিহরণ! গত ক’দিনের ভয়ানক টেনশন, ভীষণ পরিশ্রম, কষ্ট -মুহূর্তে যেন উপে গেছে সব। অদ্ভুত তাজা লাগছে শরীর। নতুন উদ্যমে চনমন করছে প্রতিটি কোষ। তাকিয়ে দেখল, অদূরে ড. তাকাসিমাও প্রায় শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন। মুখে ওরই মতো কথা নেই।
ব্যতিক্রম শুধু ফ্রাগা। বড়ো শান্ত স্বভাবের পাখি সে। সারাটা পথ ওর কাঁধের উপর নিঃশব্দে কাটিয়ে দিলেও হঠাৎ কেমন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। পালকগুলো ফুলে উঠছে ক্রমশ। মৃদু ডানা ঝাপটে চাপা গলায় ডেকে উঠলেও কাঁধের উপর থেকে বিন্দুমাত্র নড়ল না। ব্যাপারটা একেবারেই ব্যতিক্রম।
শান্ত স্বভাবের পাখিটা ওর কাঁধে বসেই সারাটা সময় কাটিয়ে দেয়। বিপদের সামান্য আঁচ পেলেই সুতীব্র চিৎকারে কাঁধ ছেড়ে উড়তে শুরু করে। এমন অদ্ভুত আচরণ আগে দেখেনি। প্রতাপের মনে হল, ভয়ানক ভয় পেয়েছে পাখিটা। এতটাই ভয় যে, উড়তেও সাহস হচ্ছে না। ভয়ানক বিপদের গন্ধ!
বিকেলের পড়ন্ত আলোয় সেই বৃক্ষহীন, প্রাণহীন পাহাড় ঘেরা নিস্তব্ধ হ্রদের ধারে এ-ভাবে মূক, বাক্যহারা হয়ে ওরা কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, টের পায়নি কেউ। তবে আচ্ছন্ন ভাবটা প্রথমে কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল প্রতাপই। ফ্রাগার জন্য।
মাথার তালুর উপর ফ্রাগার ঠোঁটের গোটাকয়েক ঠোকর খেয়ে আচমকা যেন সম্বিৎ ফিরে পেল ও। তাকিয়ে দেখল অদূরে ড. তাকাসিমার চোখে তখনও শূন্য দৃষ্টি। মরা মানুষের মতো ফ্যাকাসে দুই চোখের তারা স্থির। কতক্ষণ এ-ভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছে, বুঝতে পারল না ও। তবে সময় যে ইতিমধ্যে অনেকটা পার হয়ে গেছে, বুঝতে পারছিল চারপাশে মরা আলোর দিকে তাকিয়ে। দ্রুত হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল ও। ঘড়ি বন্ধ হয়ে রয়েছে। কাঁটা চারটে কুড়ির ঘরে স্থির হয়ে আছে। সম্ভবত এই সময়ে ওরা সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়েছিল। দামি কোয়ার্টজ ঘড়ি। এমন হয়নি আগে। মাত্র কয়েকদিন আগে ব্যাটারি পালটেছে। প্রতাপ পাশে ড. তাকাসিমাকে মৃদু ঠেলা দিল।
নাড়া দিতেই প্রায় ধড়মড়িয়ে জেগে উঠলেন তিনি। অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “প্যাট, মনে হচ্ছে খানিকটা অ্যাবনরমাল হয়ে পড়েছিলাম। তোমার কিছু হয়নি তো?”
প্রতাপ হাসল। “আমারও ওই একই অবস্থা হয়েছিল সার। কিন্তু কেন এমন হল বলুন তো?”
ড. তাকাসিমা সন্তর্পণে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। “মনে হচ্ছে, এখানের বাতাসে অক্সিজেনের প্রভাব খুব বেশি। এটা তারই ফল। অন্য কিছু নয়।”
“সার, আর একটা ব্যাপার, আমার ঘড়িটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ ঘড়ির কাঁটা দেখে মনে হচ্ছে, যে মুহূর্তে আমরা সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়েছি, ঘড়িটা ওই সময় বন্ধ হয়ে গেছ। এমন হওয়ার কথা নয়। আপনার ঘড়িটা দেখুন তো।”
ড. তাকাসিমা তার হাতের ঘড়ির দিকে ঘাড় ফিরিয়েছিলেন। হঠাৎ কেমন থতমত খেয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন।
কারণ বুঝতে বিলম্ব হল না প্রতাপের। কাছে গিয়ে তাঁর হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল। ওই একই সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে ড. তাকাসিমা কিছু সামলে নিয়েছেন। বললেন, “প্যাট, ব্যাপারটা সত্যিই কিছু অদ্ভুত। এ-ছাড়া অন্য কোনও ব্যাখ্যা…।” বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেলেন তিনি। চারপাশে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, “আরে, আমাদের দুই সঙ্গী গেল কোথায়? তাদের তো দেখতে পাচ্ছি না!”
সেই কথায় প্রায় চমকে উঠে প্রতাপ চারপাশে তাকাল। পাহাড় ঘেরা হলেও সামান্য নীচে হ্রদের পাড়ের জমি প্রায় সমতল। গাছপালা হীন ভিজে স্যাঁতসেঁতে জমিতে এবড়ো খেবড়ো কিছু পাথর এখানে–ওখানে ছড়িয়ে রয়েছে। আলো ইতিমধ্যে মরে এসেছে অবশ্য। তবু যতদূর চোখ যায় দুই বন্দি -জন আর হ্যারির চিহ্নমাত্র নেই। সুড়ঙ্গের ভিতর প্রতাপই ছিল সবার শেষে। মাঝে দুই বন্দি জন আর হ্যারি। দু’জন প্রতাপের আগে সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়েছে। তবে কি ওরা যখন আচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েছে সেই সময় ফের সুড়ঙ্গে ঢুকে পালিয়ে গেছে?
জ্ঞান ফিরে এলেও হ্যারি তেমন স্বাভাবিক হয়নি। অনেক স্থানে তাকে কাঁধে নিয়েই চলতে হয়েছে জনকে। শেষ দিকে তো আর চলতে পারছিল না। প্রতাপের রাইফেলের খোঁচায় প্রায় ধুঁকতে ধুঁকতে পা ফেলেছে। সে-কথা জানাতে ড. তাকাসিমা বললেন, “আহত হ্যারিকে সঙ্গী জন ফের যে কাঁধে নিয়ে সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়েছে, ভাবছ কেন? দুই জন রীতিমতো নিজের পায়ে হেঁটেই ভেগেছে। আমার এই বুড়ো বয়সের শরীর দিয়েই টের পাচ্ছি সেটা। বাতাসে অক্সিজেনের প্রাচুর্যের কারণে অস্বাভাবিক নয়।”
ড. তাকাসিমার যুক্তি ছুড়ে ফেলা যায় না। তবু অনেক কিছুই প্রতাপের বোধগম্য হচ্ছিল না। ও বলল, ‘আপনি হয়তো ঠিকই বলেছেন সার। এখানের বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা অনেক বেশি। কিন্তু সেটা কী-ভাবে সম্ভব? পাহাড়ে ঘেরা এই স্থানে গাছপালা নেই। নেই সামান্য তলা-গুল্ম, এমনকী সবুজ শ্যাওলাও। এই অবস্থায় এখানে অক্সিজেনের পরিমাণ বেশি হওয়া কী-ভাবে সম্ভব? বরং উলটোটাই তো হওয়া উচিত।”
“প্যাট, বাতাসে অক্সিজেন শুধু গাছপালাই জোগান দেয় না।” ড. তাকাসিমা অল্প মাথা নাড়লেন, “পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনে সবচেয়ে বড়ো জোগানদার সাগরের সবুজ শ্যাওলা তথা প্ল্যাঙ্কটন। এই হ্রদের জলে প্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ যে যথেষ্ট, তা জলের রং দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তবু অনেক কিছুরই ব্যাখ্যা পাইনি এখনও। কিন্তু থাক সে-সব। সন্ধের অন্ধকার নেমে এসেছে। রাত কাটাবার জন্য আগে একটা আশ্রয় দরকার। খুনে দুটোকে ধরার জন্য তুমি নিশ্চয় এখন ফের সুড়ঙ্গের ভিতর ঢুকতে চাইবে না।”
ড. তাকাসিমার শেষ কথার অর্থ বুঝতে বেগ পেতে হল না প্রতাপের। গতকাল দুই খুনে ধরা পড়ার পর থেকেই ওদের কাছে প্রায় বোঝার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গে নিয়ে চলা মুশকিল। আবার ছেড়ে দেওয়াও যায় না। সেদিক থেকে এ-বরং মন্দের ভাল। অবশ্য রাতে কিছু সাবধান থাকতে হবে।
সুড়ঙ্গের মুখ থেকে প্রায় প্রায় পুরোটাই ভিজে স্যাঁতসেঁতে জমি। সাবধানে পা ফেলে ওরা নামতে শুরু করল এবার। কিছু দূর নামার পরেই নরম মাটিতে হঠাৎই গোটা কয়েক জুতোর দাগ নজরে পড়ল প্রতাপের। দুই জোড়া পায়ের ছাপ সোজা নেমে গেছে নীচে হ্রদের দিকে। আলো খুবই কমে গেছে তখন। টর্চের আলোয় সামান্য দৃষ্টি বুলিয়ে প্রতাপের বুঝতে বাকি রইল না, জুতোর দাগ দুই বন্দি জন আর হ্যারির। সুড়ঙ্গের ভিতরে নয়, খুনে দুটো গেছে হ্রদের দিকে।
ইতিমধ্যে ব্যাপারটা নজরে পড়েছে ড. তাকাসিমারও। দাগগুলোর দিকে অল্প নজর বুলিয়ে চারপাশে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই ভয়ানক আর্ত চিৎকারে খানখান হয়ে গেল চারপাশের যাবতীয় নিস্তব্ধতা। দু’জন ঘাড় তুলতে দেখল হ্রদের শান্ত জলে আলোড়ন তুলে বিশাল এক দানবের মাথা জল ফুঁড়ে ঠেলে উঠেছে। সেদিকে তাকিয়ে প্রতাপের মতো মানুষেরও সারা শরীর আতঙ্কে হিম হয়ে গেল। দু’হাতে চোখ ঢেকে ধুপ করে বসে পড়ল মাটিতে।

চোখের সামনে বহু মৃত্যু দেখেছে। তেমন নাড়া দেয় না আর। কিন্তু এত ভয় আগে পায়নি কখনও। এমন দৃশ্য কোনও দিন চর্ম-চোখে দেখবে ভাবতেও পারেনি।
সন্ধের আলো তখন যথেষ্টই কম। তবু দৃষ্টি চলে। গোড়ায় অল্প দূরে জলের উপর বিশাল মাথার প্রাণীটাকে দেখে চিনতে কিছু অসুবিধাই হয়েছিল। কয়েক কোটি বছর আগে যে ডাইনোসর পৃথিবীর বুক থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে, তাদের কাউকে হঠাৎ চোখের সামনে হাজির হতে দেখলে বিভ্রম হওয়া বিচিত্র নয়। গোটা দুয়েক হাতির মাথা একত্র করলে যা হয়, ততটাই বিশাল সেই মাথা। বিশাল মুখগহ্বরের ভিতর তীক্ষ্ণ ঝকঝকে ছুরির ফলার মতো দুই সারি দাঁতের ফাঁকে অন্তিম আর্তনাদে বৃথাই হাত-পা ছুড়ছে দুই বন্দি। কিন্তু সেই দৃশ্য চোখের পলকের জন্য মাত্র। মুহূর্তেই দু-দুটি জলজ্যান্ত মানুষ জন আর হ্যারি অদৃশ্য হয়ে গেল দানবটার মুখের ভিতর। টপ করে গিলে ফেলল দানবটা। তাদের অন্তিম আর্তনাদই শুধু ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরতে লাগল। তারপর সব ফের নিস্তব্ধ।
প্রাথমিক আঘাত কাটিয়ে প্রতাপ যখন উঠে দাঁড়াল, চারদিকে আবার সেই আগের মতোই নিস্তব্ধ। সামান্য শব্দ বা প্রাণের স্পন্দন নেই। শিকার গলাধঃকরণ করে হিংস্র দানব ফের জলের তলায়। হ্রদের জল সেই আগের মতোই নিস্তরঙ্গ নিস্তব্ধ। সেদিকে তাকিয়ে অনুমান করার সাধ্য নেই, জলের তলায় আত্মগোপন করে রয়েছে সাক্ষাৎ মৃত্যু। প্রতাপ পাশে ড. তাকাসিমার দিকে তাকাল। পলকহীন দৃষ্টিতে তিনি তখনও জলের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। সামান্য ঢোক গিলে প্রতাপ গলা ভিজিয়ে নিয়ে ডাকল, “সার।”
সেই ডাকে প্রায় যেন ঘুম থেকে উঠে জেগে উঠলেন মানুষটি। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে নীরবে তাকিয়ে রইলেন খানিক। তারপর হঠাৎ “ইউরেকা! ইউরেকা!” বলে দুই হাত তুলে প্রায় শিশুর মতো চিৎকার করে উঠলেন। বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে জড়িয়ে ধরলেন ওকে।
“ম্যান, দারুণ বিপদের ঝুঁকি নিয়ে এই দ্বীপে গোপন অভিযান সার্থক হয়েছে। এমন কিছুই অনুমান করেছিলাম। কিন্তু সেই অনুমান এতটা নির্ভুল হবে ভাবিনি। নিয়তির টানে হতভাগ্য খুনে দুটো সুড়ঙ্গের ভিতর না গিয়ে লুকিয়েছিল হ্রদের পাড়ে পাথরের আড়ালে। তা না হলে আগামী কালের ভিতর আমাদেরও ওই অবস্থা হতে পারত। এ-সবই ভগবান বুদ্ধের করুণা।”
হ্রদের জল সেই আগের মতোই শান্ত। সেদিকে তাকিয়ে অল্প আগের দৃশ্য তখন কেমন অসম্ভব মনে হচ্ছিল প্রতাপের। ফস করে বলল, “সার যা দেখলাম, তা কি সত্যি? প্রাগৈতিহাসিক যুগের হিংস্র ডাইনোসর এখনও টিকে আছে এই হ্রদের জলে!”
“নিজের চোখেই তো দেখলে ম্যান। অস্বীকার করবে কেমন করে?”
“সার কী ভাবে সম্ভব এটা? কোটি কোটি বছর আগে যে-প্রাণী পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তারা কী-ভাবে এখনও বেঁচে আছে এখানে?”
ড. তাকাসিমা সামনে হ্রদের দিকে তাকিয়ে গভীর ভাবে কিছু চিন্তা করছিলেন। ঘাড় ফিরিয়ে বললেন, “প্যাট, প্রকৃতির সব রহস্য কি ভেদ করা সম্ভব হয়েছে? হয়নি। মানুষ চেষ্টা করে চলেছে মাত্র। স্কটল্যান্ডে এই রকমই একটা হ্রদ আছে। নাম লকনেস। সেই লকনেসের জলে এখনও দিব্যি টিকে আছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের তৃণভোজী ডাইনোসর প্লিসিওসরাসের কিছু বংশধর। হ্রদের নাম অনুসারে বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন ‘নেসি’। মনে রেখো প্লিসিওসরাস নামের ডাইনোসর কিন্তু পৃথিবীর বুক থেকে অবলুপ্ত হয়ে গেছে অন্তত দশ কোটি বছর আগে।’
ড. তাকাসিমা থামলেন। লকনেস হ্রদের জলদানব নেসির কথা প্রতাপ পড়েছে। অনেকেই সন্দেহ করেন, ব্যাপারটা নিছকই রটনা। কারণ দানব নেসিকে যারা চর্ম চোখে দেখেছেন বলে দাবি করেন, তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু ড. তাকাসিমার মতো মানুষের মুখে অন্য কথা শুনে সে কথা বলতে পারল না। সামান্য দম নিয়ে ড. তাকাসিমা ফের বলতে শুরু করলেন, “প্যাট, নেসি তাই আজকের বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিস্ময়ের বস্তু। কিন্তু আমাদের আজকের এই আবিষ্কার আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্লিসিওসরাস বিলুপ্ত হয়ে যাবার পরে গত কয়েক কোটি বছরে লকনেসের জলে টিকে থাকার তাগিদে বিবর্তনবাদের প্রভাবে নেসির দেহে অনেক পরিবর্তন এসেছে। পাকাপাকি ভাবে জলের তলায় আশ্রয় নেবার কারণে চারটে পা পরিণত হয়েছে পাখনায়। জলের নীচে স্বচ্ছন্দে মাছ ধরার উপযোগী লম্বা গলা। লেজটাও হয়েছে সাঁতারের উপযুক্ত। নেসি অবশ্য খুব ধীরে হলেও ডাঙাতে চলতে সক্ষম। বিবর্তনবাদের এটাই নিয়ম। টিকে থাকতে গেলে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতেই হবে। কিন্তু আজ একটু আগে হ্রদের জলে যে প্রাণীটিকে দেখলাম তারা কিন্তু এক অদ্ভুত কারণে সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। বিবর্তনবাদের নিয়মটাকে ঠেকিয়ে রেখেছে বিগত সাড়ে ছয় কোটি বছর ধরে। ম্যান, হ্রদের জলের এই হিংস্র মাংসাশী ডাইনোসরটি অ্যালোসরাস গোত্রের। হাঁটত পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে। মজবুত লেজ। তীক্ষ্ণ নখযুক্ত সামনের পা দুটো ছিল ছোটো। ভয়ানক হিংস্র।
“অ্যালোসরাস পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ক্রিটেসাস যুগে। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে। অথচ তার পর থেকে বিবর্তনবাদের সামান্য প্রভাব পড়েনি হ্রদের এই প্রাণীটির উপর। অন্তত যেটুকু দেখলাম, তাতে তেমনই মনে হয়েছে। প্রকৃতির জীবন্ত এক যাদুঘর এই পাহাড় ঘেরা হ্রদ। শুধু তাই নয়, অ্যালোসরাস ডাঙার প্রাণী। অথচ কোনও কারণে এখানে হ্রদের জলের তলায় আশ্রয় নিলেও জলের উপযুক্ত হয়ে গড়ে ওঠেনি।”
জল থেকে উঠতে দেখে প্রাণীটিকে জলের বলেই মনে হয়েছিল প্রতাপের। ড. তাকাসিমার কথায় কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। “সার, ওই ভয়ানক দৈত্যটা যদি ডাঙার প্রাণী হয়, তবে তো অত্যন্ত ভয়ের কথা! রাতে যথেষ্ট হুঁশিয়ার থাকতে হবে।”
“সে তো অবশ্যই।” উত্তরে ড. তাকাসিমা বললেন, “তবে একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ? চারপাশের মাটিতে ওদের কোনও পায়ের ছাপ দেখতে পারছি না। এটাও কিছু অদ্ভুত মনে হচ্ছে। পাহাড়ের উঁচুতে সামান্য আলো রয়েছে এখনও। সঙ্গে টর্চও আছে। চলো কিছু ঘুরেই দেখা যাক।”
সাবধানে ঢাল পার হয়ে ওরা খানিক নীচে নেমে চারপাশটা কিছুক্ষণ ঘুরে দেখল এরপর। ড. তাকাসিমার পর্যবেক্ষণে ভুল নেই। প্রাণীটার কোনও পায়ের ছাপ ওদের নজরে পড়ল না। অবশ্য সবখানে যে নরম মাটি, তা নয়। অনেক স্থানে নরম মাটির তলা থেকে বের হয়ে রয়েছে পরিষ্কার সাদা রঙের পাথর। প্রথমে তো মার্বেল বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু খানিক পরে মনে হল, হেড-হান্টারদের লং হাউসের ঝুপড়িতে যে-পাথরকে হীরে ভেবেছিল, অনেকটা সেই রকমের।
ড. তাকাসিমা থেকে থেকেই সেগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। প্রতাপ জিজ্ঞাসা করতে বললেন, “প্যাট, তোমাকে আগে বলিনি, লং হাউসের পাথরগুলো হীরে না হলেও যথেষ্টই ব্যতিক্রমী। কিছু তেজস্ক্রিয় ক্ষমতাও রয়েছে। বর্তমান পাথরগুলো ওই একই গোত্রের বলেই মনে হচ্ছে। হয়তো দ্বীপের হেড-হান্টার মানুষ এখান থেকেই কুড়িয়ে নিয়ে গেছে।”
কৌতূহলী প্রতাপ ইতিমধ্যে নিচু হয়ে একটা পাথরে হাত দিয়েছিল। চমকে উঠে বলল, “পাথরগুলো কিন্তু বেশ গরম সার!”
“ঠিক তাই।” ড. তাকাসিমা বললেন, “খানিক আগে আরও গরম ছিল হয়তো। সূর্যের উত্তাপ পাথরগুলো অন্যদের তুলনায় কিছু বেশি সময় ধরে রাখতে পারে। রাত বাড়লে ঠান্ডা হয়ে যাবে। পাথরগুলো হীরে না হলেও কী জাতের অনেক ভেবেও বুঝে উঠতে পারিনি। তাই গবেষণার বিষয়। সন্দেহ নেই, অগ্নুৎপাতের ফলে উঠে এসেছে পৃথিবীর জঠর থেকে। অদ্ভুত এই পাথরগুলোর জন্যই হ্রদের প্রকৃতি এমন রহস্যময় কি না, গবেষণার বিষয় সেটাও। এই মুহূর্তে কিছুই সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়।”
ইতোমধ্যে চারপাশে ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। অল্প দূরের জিনিষও দেখা যাচ্ছে না। আর দেরি করা ঠিক নয়। রাত কাটাবার জন্য সুবিধামতো কোনও জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে ফেলা দরকার। সুড়ঙ্গের কাছে পাহাড়ের ঢালে ছোটো একটু সমতল জায়গা রয়েছে। স্থানটি হ্রদের কাছ থেকে কিছু উঁচুতেও। অবশ্য অন্য বিপদও আছে। ইতিমধ্যে হানাদারের অন্য দল যদি সুড়ঙ্গের সন্ধান পেয়ে যায়, যে-কোনও সময় এদিকে চলে আসার সম্ভাবনা। সেটা মাথায় রেখেও প্রতাপ ড. তাকাসিমার সঙ্গে কথা বলে সুড়ঙ্গের কাছেই রাতের জন্য তাঁবু খাটানো ঠিক করল।
রাতের মধ্যযাম পার হয়ে গেলেও কৃষ্ণপক্ষের আকাশে তখনো চাঁদের দেখা নেই। পাহাড় ঘেরা বিশাল হ্রদ জুড়ে চাপ–চাপ অন্ধকার। ভয়ানক নিস্তব্ধতা। তাঁবু খাটিয়ে ড. তাকাসিমা আর দেরি করেননি। রাতের খাওয়া সেরে শুয়ে পড়েছেন। বাইরে রাইফেল হাতে প্রতাপ পাহারায়। দুই খুনে বন্দি নেই আজ। তবু নতুন পরিস্থিতির কারণে ঝুঁকি নেওয়া যায় না। রাতের শেষার্ধ ড. তাকাসিমার পাহারায় থাকার কথা। প্রতাপ ঘুমোতে যাবে তখন। সেই সময় অনেকক্ষণ অতিক্রান্ত। কিন্তু বৃদ্ধ মানুষটি তখনও গভীর ঘুমে। সারা দিনের পরিশ্রমের পর সেটাই স্বাভাবিক। বৃদ্ধ মানুষটিকে তাই আর জাগায়নি। তা ছাড়া জেগে থাকতে তেমন কষ্টও হচ্ছিল না। এখানে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে শরীরটা সেই যে মুহূর্তে চাঙা হয়ে উঠছিল, সেই ভাবটা এখনও রয়ে গেছে। অসুবিধা যেটুকু, তা চারপাশের ওই ভয়ানক নিস্তব্ধতা। এতটা সময় পার হয়েছে, একটা সামান্য শব্দও ও শুনতে পায়নি। না একটা রাতজাগা পাখি, না অন্য কিছু।
একটা পাখি, একটা কীট–পতঙ্গও কি নেই এখানে! হ্রদের জলের তলায় প্রাগৈতিহাসিক যুগের ভয়ানক দানবটাকে সেই যে দেখা গিয়েছিল, তারপর কোনও সাড়াশব্দ আর মেলেনি। এরই বা কী রহস্য? কী এক অদ্ভুত কারণে বাতাসও প্রায় স্থির হয়ে রয়েছে এখানে। পাহাড়ের উপরে এত বড়ো খোলা জায়গা, ফাঁকা আকাশ, অথচ বাতাসের সামান্য প্রবাহও টের পাওয়া যায় না। থম হয়ে রয়েছে। সম্ভবত সেই কারণেই হ্রদের জলে সামান্য ঢেউ নেই। পানাপুকুরের মতো স্থির। তাঁবুর বাইরে রাইফেল হাতে অন্ধকারে বসে এ-সব কথাই ভাবছিল প্রতাপ।
ওদের গ্রামের স্কুলে লাইব্রেরী ছিল না। ছোটো একটা কাঠের আলমারিতে কিছু গল্পের বই রাখা থাকত। মাঝেমধ্যে মাস্টারমশাই তার কিছু ক্লাসে এনে ছেলেদের বাড়ি নিয়ে পড়তে দিতেন। দিন সাতেক রেখে পড়া যেত। স্কুলের শেষ বছর প্রতাপের ভাগে একটা বই পড়েছিল এইচ.জি ওয়েলসের লেখা ‘দি টাইম মেশিন’-এর সংক্ষিপ্ত বাংলা অনুবাদ। ভীষণ ভাল লেগেছিল বইটা। অমন রোমাঞ্চকর বই আগে পড়েনি। ছোটো এক যন্ত্র। চড়ে বসে প্যাডেল ঘোরালেই সময়ের বুকে পাড়ি দেওয়া যায়। পৌঁছে যাওয়া যায় কয়েক হাজার বছর আগের অতীত সময়ে। নয়তো আগামী ভবিষ্যতের কোনও দিনে। তারপর যেমন খুশি সেই সময়ের পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াও। শুধু গল্পের রোমাঞ্চ নয়, সময়ের বুকে পাড়ি দেওয়ার ব্যাপারটাও দারুণ নাড়া দিয়েছিল। কতদিন ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখেছে, সময়ের বুকে সত্যি সত্যিই পাড়ি জমিয়েছে ও। পৌঁছে গেছে হাজার, লক্ষ বছর আগের কোনো সময়ে।
বহুদিন পরে আজ হঠাৎ সেই বইটার কথা মনে পড়ল প্রতাপের। টাইম মেশিনে চড়ে নয়, ওই টানেলের ভিতর দিয়ে পায়ে হেঁটে ওরা যেখানে এসে পৌঁছেছে, সময় থেমে রয়েছে সেখানে। কয়েক কোটি বছর ধরে সময় এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে একই জায়গায়। এক চুলও বাড়েনি। তাই ঘড়ির কাঁটা এখানে আপনা থেকেই থেমে যায়। কয়েক কোটি বছর আগের ডাইনোসর দিব্যি টিকে থাকে। বিবর্তনবাদের সামান্য ছোঁয়াও লাগে না। বাতাস তাই এখানে স্থির। হ্রদের জল স্থির।
ড. তাকাসিমা ধারণা বাতাসে অক্সিজেনের ভাগ এখানে বেশি। হয়তো সেই কারণে শরীর-মন চাঙা হয়ে ওঠে। কিন্তু কেন যে এখানে গাছপালা, সামান্য লতাগুল্ম নেই, নেই অন্য পশু–পাখি, ডাঙার ডাইনোসর আশ্রয় নেয় জলের তলায়, অনেক ভেবেও কিনারা করতে পারল না।
গভীর রাতে নিস্তব্ধ অন্ধকারের ভিতর তাঁবুর বাইরে রাইফেল হাতে বসে এই ভাবেই হয়তো রাত ভোর হয়ে যেত প্রতাপের। কিন্তু তার আগেই চিন্তার জাল আচমকাই ছিঁড়ে গেল। হালকা শব্দে কাছেই কোথাও হঠাৎ একটা পাথর গড়িয়ে গেল।
চমকে উঠে মুহূর্তে গুছিয়ে বসল প্রতাপ। সন্তর্পণে চারপাশে চোখ ঘোরাল। পুব আকাশে পাহাড়ের মাথায় কখন এক ফালি চাঁদ দেখা নিয়েছে। সেই হালকা আলোয় চারপাশে দৃষ্টি ঘোরাতে গিয়ে হঠাৎ চোখ আটকে গেল অদূরে হ্রদের দিকে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত শিউরে উঠল। বিশাল ডাইনোসরটা ওর কয়েক মিটার দূরে মাত্র। হিংস্র চোখ দুটো ভাঁটার মতো জ্বলছে। বিশাল মুখগহ্বরে দুই সারি ধারালো দাঁত, সামনে দুই পায়ের তীক্ষ্ণ বাঁকানো ছুরির ফলার মতো নখ সেই সামান্য আলোতেও ঝকমক করছে। পিছনের মজবুত দুই পায়ে ভর দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে প্রাণীটা। থামের মতো মোটা লেজ বাতাসে সাপের মতো নড়ছে। সামান্য অন্যমনস্কতার সুযোগে সাক্ষাৎ মৃত্যু কখন নিঃশব্দে উঠে এসেছে হ্রদের জলের আড়াল থেকে। মাত্র কয়েক হাত দূরে।
আতঙ্কে হিম হয়ে যাওয়া শরীরটা সচল হয়ে উঠতে সময় লাগল না প্রতাপের। দু’হাতে রাইফেল তুলে ধরল। এই বিশাল প্রাণীটাকে ঘায়েল করতে হলে অব্যর্থ লক্ষ্য দরকার। হৃদপিণ্ড, নয়তো চোখ। কিন্তু নিশানা স্থির করতে গিয়েও গুলি চালানো হয়ে উঠল না। আবছা আলোয় হঠাৎ নজরে পড়ল দানো একটা নয়। পিছনে আরও গোটা কয়েক। অন্ধকারে গুনে শেষ করতে পারল না।
হাতের উদ্যত রাইফেল নামিয়ে ফেলল প্রতাপ। এক মুহূর্তে সময় আর নষ্ট করা চলবে না। দ্রুত তাঁবুর ভিতর ঢুকে ড. তাকাসিমাকে ডেকে তুলল। চোখের ঘুম তখনও কাটেনি মানুষটার। দেখে প্রতাপ তাঁকে প্রায় পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে ছুটল অদূরে সুড়ঙ্গের দিকে। তাঁবু থেকে সুড়ঙ্গের মুখ মিটার দশেক মাত্র। অন্ধকারে এবড়ো খেবড়ো পথটা পার হয়ে প্রতাপ যখন সুড়ঙ্গের মুখে পৌঁছলো, পিছনে তখন প্রলয় শুরু হয়ে গেছে। প্রায় বিদ্যুৎ গতিতে সামনের দানোটা লাফিয়ে পড়েছে তাঁবুর কাছে। অন্ধকার কাঁপিয়ে গগণ বিদারী হুঙ্কার।
ড. তাকাসিমাকে নিয়ে প্রতাপ ততক্ষণে সুড়ঙ্গের ভিতর। পিছন ফিরে যে দৃশ্য দেখতে পেল, কেঁপে উঠল অন্তরাত্মা পর্যন্ত। ইতোমধ্যে আরও কয়েকটা দানব হাজির হয়েছে তাঁবুর কাছে। মহা উল্লাসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাঁবুর উপর। শিকার যে ইতিমধ্যে হাতছাড়া, সেটা বুঝে উঠতে যেটুকু সময়। তারপরে দারুণ আক্রোশে মাথা আন্দোলিত করে গাঁ–গাঁ শব্দে রক্ত জল করা গর্জন। চারপাশের পাহাড়ে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত প্রায় মেঘের ডাক যেন। দ্বীপে পা দেবার পর প্রথম রাতে যে ভয়ানক গর্জন শুনে ও উঠে বসেছিল, সে এই আওয়াজ।
সেই রাত বাকি সময়টা প্রতাপ আর ড. তাকাসিমার কাছে একটা দুঃস্বপ্নের মতো। ইতোমধ্যে কয়েকটি দানব ছুটে এসেছে সুড়ঙ্গের মুখে। সৌভাগ্য, সুড়ঙ্গের মুখ তেমন বড়ো নয়। তাই ভিতরে ঢুকতে পারেনি। বৃথা আক্রোশে হামলে গেছে সুড়ঙ্গের মুখের উপর। বিশাল জালার মতো মুখগুলো যখন ভিতরে বাড়িয়ে দিচ্ছিল, যথেষ্ট দূরে বসেও তাদের গরম নিঃশ্বাস প্রায় ঝলসে দিচ্ছিল শরীরে। তীক্ষ্ণ দাঁতের ফাঁকে শিকারের আশায় লকলক করে উঠছিল বিশাল জিব। একটানা গর্জনে সুড়ঙ্গের ভিতর কান স্তব্ধ হবার উপক্রম।
যথেষ্ট দূরে বসেও সারাটা সময় আতঙ্কে কাঠ হয়ে ছিল প্রতাপ। পাশে ড. তাকাসিমারও সেই অবস্থা। কারও মুখে একটি কথাও ফোটেনি।
সুড়ঙ্গের মুখে প্রাগৈতিহাসিক যুগের দানবগুলোর সেই ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা চলল ভোর পর্যন্ত। তারপর একে একে ফিরে যেতে লাগল হ্রদের জলে। শেষ দানবটি যখন হ্রদের জলে ডুব দিল, পুব আকাশে পাহাড়ের পিছনে তখন আলোর আভা যথেষ্টই উজ্জ্বল।
দানবের দল হ্রদের জলে ফিরে যাবার পরেও স্বাভাবিক হতে দু’জনের লেগে গেল বেশ অনেকটা সময়। প্রতাপ দেখল, ড. তাকাসিমা তখনও নির্বিকার দৃষ্টিতে সুড়ঙ্গের বাইরে তাকিয়ে আছেন। দুই চোখে আতঙ্কের ঘোর তখনও কাটেনি। ও মানুষটির কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদু গলায় বলল, “সার, কিছু ভাবছেন?”
প্রত্যুত্তরে ড. তাকাসিমা যেন ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। বড়ো একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “প্যাট, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ভয়ঙ্কর দ্বীপে আমার অভিযান এতটা সফল হবে, ভাবতেই পারিনি। এই আবিষ্কার সারা পৃথিবীতে আলোড়ন ফেলে দেবে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের ডাইনোসর বিবর্তনবাদের পরোয়া না করে এখনও এই পৃথিবীতে টিকে রয়েছে, তা ভাবতে পেরেছে কেউ! কিন্তু সেটাই সব নয়। ভাবছি অন্য কথা। কী ভয়াবহই না ছিল সেই সময়টা! কী ভীষণভাবেই না বেঁচে থাকতে হত সেকালে অন্য প্রাণীদের! তারপর মানুষের পূর্বপুরুষ যখন এল, সন্দেহ নেই, হিংস্র ডাইনোসরের কিছু উত্তরপুরুষ তখনও তো টিকে ছিল। যদিও বিবর্তনবাদের কারণে তারা তখন আর আগের মতো নেই। তবুও ভাবা যায় না।’
ড. তাকাসিমা থামলেন। প্রতাপ সামান্য ইতস্তত করে বলল, “সার, এবার বোধ হয় বের হতে পারি আমরা।”
উত্তরে উনি ঘাড় নেড়ে বললেন, “বোধ হয়। তবে যথেষ্ট হুঁশিয়ার হয়েই থাকতে হবে। আমাদের আগের ধারণা যে ভুল, সে তো বুঝতেই পারছ। এখানে অন্য শিকার নেই বলেই প্রাণীগুলো ডাঙায় বেশি ওঠে না। প্রয়োজন হয় না। জলের মাছ খেয়েই বেঁচে থাকে।’
যথেষ্ট হুঁশিয়ার হয়ে এরপর ওরা বাইরে বের হল আবার। রোদ ওঠেনি এখনও। হ্রদের জল সেই আগের মতোই শান্ত, স্থির। প্রাণের সামান্য স্পন্দনও নেই। সুড়ঙ্গের অদূরে ওদের রাতের তাঁবু শতচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে। ভিতরে ব্যাগও ফুটিফাটা। জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছত্রাকার হয়ে রয়েছে। পায়ের চাপে অনেক কিছুই দুমড়ে মুচড়ে গেছে। খাবার-ভর্তি প্যাকেটগুলো উধাও। চারপাশের নরম মাটিতে দানবগুলোর পায়ের ছাপ শুধু। সবচেয়ে করুণ অবস্থা ড. তাকাসিমার রাইফেলের। দানবগুলোর দাঁতের নিষ্পেষণে ভারী মজবুত রাইফেলটা দুমড়ে–মুচড়ে পড়ে আছে। সেগুলোর দিকে নির্বাক হয়ে খানিক তাকিয়ে থেকে প্রতাপ বলল, “সার, আর এক দিনের খাবারও অবশিষ্ট নেই। এই অবস্থায় এখানে আর একটা দিনও থাকা ঠিক হবে না। এবার ফেরা দরকার।”
“তা ঠিক প্যাট।” ড. তাকাসিমা প্রতাপের দিকে তাকালেন। “কিন্তু তোমার কাজ যে বাকি এখনও। সেই হিরের খনি?”
উত্তরে প্রতাপ অল্প হাসল। “সার, আপনার অনুমান ভুল না হলে আমার ধারণা দ্বীপের এই অদ্ভুত পাথরগুলোই আদিবাসী হেড-হান্টারদের কাছে স্তূপীকৃত হিরে-জহরত। মঙ্গল কামনায় কিছু পাথরের টুকরো তাই ঘরেও রেখে দেয়।”
প্রতাপ থামতে ড. তাকাসিমা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই নিস্তব্ধ উপত্যকায় মৃদু আওয়াজ। এক সঙ্গে অনেক পায়ের শব্দ। খুব মৃদু হলেও ক্রমশ এগিয়ে আসছে এই দিকেই। প্রতাপ লক্ষ করল ওর কাঁধে ফ্রাগাও ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে।
অথচ গতকাল অন্ধকার নামার পর ফ্রাগা অন্য সময়ের মতো সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে গিয়েছিল। এমন কী রাতে ওই ভয়ানক অবস্থার মধ্যেও ব্যতিক্রম হয়নি। এই সকালে ফের কী কারণ ঘটল বুঝে উঠতে পারল না। দুই ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে ড. তাকাসিমাকে থামতে ইঙ্গিত করে ও পাশে বড়ো একটা পাথরের আড়ালে বসে শব্দটা যেদিক থেকে আসছিল, সেই দিকে তাকাল।
গোড়ায় তেমন কিছু নজরে না পড়লেও, একটু পরেই দেখতে পেল দূরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আছে কয়েকটা মানুষ। হাতে রাইফেল। গুনে দেখল মোট সাতজন।
ইতিমধ্যে ড. তাকাসিমারও নজরে পড়েছে ব্যাপারটা। যথাসম্ভব গলা নামিয়ে বললেন, ‘বেন ম্যাক্সিমের পাঠানো খুনে হ্যারির দলের বাকিরা। মনে হচ্ছে ওধারেও সুড়ঙ্গের কোনও মুখ আছে। সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে বের হয়েছে। কিছুক্ষণ নজর রাখতে পারো ওদের উপর। ওরাও হিরের খোঁজেই এসেছে এখানে।’
গাছপালা-বিহীন এই পাহাড় ঘেরা হ্রদের চারদিকে সহজেই অনেক দূর পর্যন্ত নজর রাখা যায়। তবু প্রতাপকে খুব একটা আগ্রহী মনে হল না। কাঁধের উপর ফ্রাগা আরও চঞ্চল হয়ে উঠছে। ঘন ঘন ডানা ঝাপটাচ্ছে। উড়ে যাবার লক্ষণ। কিন্তু তা-ও করছে না।
প্রায় আধঘণ্টার মতো এই ভাবেই কাটল। সূর্যের দেখা না মিললেও ইতোমধ্যে পুব দিকে পাহাড়ের পিছনের আকাশ যে-ভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, তাতে যে-কোনও মুহূর্তে পাহাড়ের ওধারে সূর্যদেব উঁকি দেবেন। ইতিমধ্যে দলটা আরও কাছে। পাথরের আড়ালে থাকায় ওদের দেখতে পায়নি লোকগুলো।
এর খানিক পরে পাহাড়ের মাথায় সূর্যের কিছু অংশ উঁকি দিতে এক ঝলক সকালের কাঁচা হলুদ রোদ ছিটকে এসে পড়ল এ-ধারে হ্রদের পাড় আর পাহাড়ের ঢালে। ওই সামান্য রোদে মুহূর্তে যেন চারদিক ঝলসে উঠল। কয়েক কোটি মেগা ওয়াটের হ্যালোজেন বাতি যেন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে হঠাৎ। ব্যাপারটা কী হল বুঝে ওঠার আগেই পাশ থেকে ড. তাকাসিমা বললেন, “ইউ ম্যান, লুক। ওদিকটা দেখো।” মানুষটি হঠাৎ রীতিমতো উত্তেজিত।
ড. তাকাসিমার কথায় প্রতাপ পাশে পাহাড়ের দিকে চোখ ফেরাতে এক অত্যাশ্চর্য দ্যুতিতে ধাঁধিয়ে গেল চোখ। সকালের হালকা রোদ যেখানে পড়েছে, লক্ষ লক্ষ হিরে–মাণিক সেখানে জ্বলজ্বল করে উঠেছে। পাহাড়ের পিছনে সূর্য যত বাড়ছে, রোদ বিস্তৃত হচ্ছে, কোটি কোটি হিরে–মাণিক ছড়িয়ে পড়ছে আরও নতুন নতুন স্থানে। বাড়ছে ঔজ্জ্বল্য। যেন কোটি কোটি কোহিনুর দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি যেখানে রোদ পড়েনি, কিছু হালকা হলেও সেই স্থানও উজ্জ্বল। বুঝতে অসুবিধা হয় না, রোদ পড়লেই অন্য স্থানের মতো হয়ে উঠবে। মধ্যাহ্নে সূর্য যখন মাথার উপরে, সন্দেহ নেই, হ্রদের চারপাশে পুরো পাহাড় তখন হীরে–মাণিকে সেজে উঠবে। হীরের পাহাড়। বিপুল বিস্ময়ে কোনও কথাই সরল না প্রতাপের মুখে। শুধু তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে।
ইতোমধ্যে সেই অত্যাশ্চর্য দৃশ্য দেখে দূরের মানুষগুলো প্রায় উন্মাদ হয়ে গেছে। হাতের রাইফেল, পিঠের ব্যাগ ছুড়ে ফেলে পাগলের মতো হাসতে শুরু করেছে। তারপর মাটিতে গড়াগড়ি খেল কিছুক্ষণ। তারপর ছুটে গিয়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল হীরে–জহরতের উপর। দুই হাতে সাপটে তুলতে গেল। কিন্তু তেমন সফল হতে পারল না। উজ্জ্বল পাথরগুলোর বেশিরভাগই আলগা নয়। মাটিতে গেঁথে রয়েছে।
প্রতাপের মতো ড. তাকাসিমাও প্রায় চিত্রার্পিতের মতো সেই দৃশ্য দেখছিলেন। হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, “প্যাট, এ যে হিরে–জহরতের পাহাড়। চল কুড়িয়ে আনি কিছু।”
বলতে বলতে প্রায় পাগলের মতো ছুটলেন তিনি।
হীরে-জহরতের আকর্ষণে প্রতাপও হয়তো ছুটত। কিন্তু তার আগেই অন্য এক ব্যাপার হয়ে গেল। প্রতাপের কাঁধে বসে অস্থির ফ্রাগা সেই থেকে সমানে ডানা ঝাপটাচ্ছিল। এবার ড. তাকাসিমাকে ওই ভাবে নীচের দিকে ছুটতে দেখে হঠাৎই আকাশে উড়ল। সমানে তাঁর মাথায় ছোঁ মারতে লাগল। সঙ্গে কর্কশ চিৎকার -ক্রু–ক্রু–উ–উ! ক্রু–ক্রু–উ–উ!
ড. তাকাসিমার ক্ষত–বিক্ষত মাথার চাঁদি দিয়ে রক্ত গড়াতে শুরু করেছে। তবু ভ্রূক্ষেপমাত্র নেই। সম্পূর্ণ উন্মাদ। দুই হাতে প্রাণপণে একটা পাথর খুঁড়ে তোলার চেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু সফল হতে পারছিলেন না। উজ্জ্বল পাথরটা মাটিতে এঁটে রয়েছে।
ফ্রাগার ওই আচরণে হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফিরে এল প্রতাপের। মুহূর্তে মগজের কোষগুলো যেন সক্রিয় হয়ে উঠল। ফ্রাগাকে দেখছে আজ অনেক দিন। গত কাল যখন এখানে পা দিয়েছিল, হঠাৎ কেমন অস্থির হয়ে উঠেছিল পাখিটা। তারপর সন্ধে নামতেই শান্ত হয়ে গিয়েছিল। এমন কী রাতে ওই ভয়ানক অবস্থার মধ্যেও শান্ত ছিল। চারদিকের পাহাড়ে রোদ পড়তে হঠাৎ উষ্ণতাও দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। মুহূর্তে ও চিৎকার করে উঠল, “সার, বিপদ। ভয়ানক বিপদ। ফিরে আসুন সার। ফ্রাগা সেই জন্য অমন করছে।”
কিন্তু প্রতাপের সেই চিৎকার ড. তাকাসিমার কানে গেলেও মগজে পৌঁছল না। পাগলের মতো তিনি তখনও দুই হাতে সমানে মাটি খুঁড়ে চলেছেন। তারই মধ্যে প্রতাপ হঠাৎ লক্ষ করল ফ্রাগা কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। উড়তে গিয়ে মাঝে-মধ্যেই টলে যাচ্ছে শরীর। একটু আগের সুতীব্র চিৎকার কেমন আর্তনাদের মতো শোনাচ্ছে এখন। প্রতাপ আর দেরি না করে ড. তাকাসিমার দিকে ছুটল।
প্রতাপ যখন মানুষটির কাছে হাজির হল, তখনও তিনি দু’হাতে সমানে মাটি খুঁড়ে চলেছেন। হলুদ মুখটা প্রচণ্ড গরমে লাল হয়ে উঠেছে। টপটপ করে ঘাম ঝরছে। ওকে দেখেই বললেন, “প্যাট, প্যাট মাই বয়। একটু হেল্প করো, প্লিজ। কত বড়ো হিরের টুকরো দেখেছ। কোহিনুর, গ্রেট স্টার, আর্লফ, সেন্টেনারি এর নখের যোগ্যও নয়। একটু হেল্প করো প্লিজ।”
প্রতাপ চিৎকার করে বলল, “শান্ত হোন সার। ভাল করে দেখুন, ওটা হিরে নয়। গতকাল যে মার্বেল জাতীয় পাথর দেখেছিলেন, এ-সেই পাথর। দিনের আলোয় রোদ এসে পড়তেই পাথর থেকে ওই অদ্ভুত আলো আর উত্তাপ ঠিকরে বের হচ্ছে। হেড-হান্টারদের ঝুপড়িতে পাওয়া পাথরগুলো আকারে ছোটো বলেই হয়তো ব্যাপারটা বোঝা যায়নি তেমন। তবে দিনের বেলা পাথরগুলো কিছু গরম মনে হলেও রাতে কিন্তু তেমন দেখিনি। আপনি ঠিকই বলেছিলেন সার, এ অন্য কোনও জিনিস। ভয়ানক কিছু। এই সামান্য সময়ের মধ্যে বাতাসের উত্তাপ কতটা বেড়ে গিয়েছে লক্ষ করেছেন? আর দেরি করলে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে হবে। এখানে ওই কারণেই কোন গাছপালা নেই সার। পশুপাখি কীটপতঙ্গ কিছুই নেই। দানব ডাইনোসরগুলো আশ্রয় নিয়েছে জলের তলায়। রাত ছাড়া উপরে আসে না। জলের মাছ খেয়েই বেঁচে থাকে।”
উত্তাপ ইতিমধ্যে প্রায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। শরীরের উন্মুক্ত স্থানগুলি ঝলসে যেতে চাইছে। তারই মধ্যে প্রতাপ খেয়াল করল, শরীর হঠাৎ কেমন গুলিয়ে উঠতে শুরু করেছে। মাথা টলছে। কানে এল চাপা একটা শোঁ–শোঁ আওয়াজ। কতকটা ঝড়ের মতো। প্রতাপ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ড. তাকাসিমাকে এক ঝটকায় কাঁধে তুলে নিয়ে টলতে টলতে ছুটল উপরে সুড়ঙ্গের দিকে। চলতে চলতেই খেয়াল হল ফ্রাগার চিৎকার আর শোনা যাচ্ছে না।
ব্যাপারটা খেয়াল হতেই দ্রুত পিছন ফিরে তাকাল। ঝলসানো তীব্র আলোয় দুই চোখ তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে আসতে শুরু করেছে। ফ্রাগাকে দেখতে না পেয়ে বার কয়েক ডাকল। কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। অগত্যা ফের ছুটতে শুরু করল।
শেষ দিকে প্রায় অন্ধের মতো হাতড়াতে হাতড়াতে প্রতাপ যখন সুড়ঙ্গের ভিতর ঢুকতে পারল, শরীরে কিছুমাত্র শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। মাথা কয়েক টন বোঝার মতো ভারী। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে শরীর। প্রায় বেহুঁশ অবস্থা। তবু হার মানলে চলবে না। বুঝতে তখন বাকি নেই সূর্যাস্তর পরে পাহাড় ঘেরা শান্ত এই উপত্যকা ভোরে রোদের স্পর্শ পেলেই মৃত্যুপুরী হয়ে ওঠে। ফ্রাগা ঠিকই টের পেয়েছিল। বেচারা নিজের প্রাণ দিয়ে ওদের দু’জনের প্রাণ আপাতত বাঁচিয়ে দিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা করতে হলে দ্রুত যতটা সম্ভব সুড়ঙ্গের ভিতর আরও এগিয়ে যেতে হবে।
প্রায় বেহুঁশ অবস্থায় সুড়ঙ্গের ভিতর হামাগুড়ি দিয়ে মিনিট কয়েক চলার পর একসময় পড়ে গেল হুমড়ি খেয়ে। শরীরে তখন আর এক বিন্দু শক্তি অবশিষ্ট নেই। ড. তাকাসিমার অচৈতন্য দেহ নামিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল পাশে। তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে।
প্রতাপের জ্ঞান যখন ফিরে এল মাথা লোহার মতো ভারী। তবে শরীরের সেই ক্লান্তি অনেকটাই কম। কিছু ঝরঝরে মনে হচ্ছে। বাইরে সেই অদ্ভুত শোঁ–শোঁ আওয়াজটাও শোনা যাচ্ছে না। নিস্তব্ধ। তাড়াতাড়ি উঠে বসল ও। সুড়ঙ্গের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, আলো আছে এখনও। পাশে ড. তাকাসিমা প্রায় অসাড় হয়ে পড়ে রয়েছেন। ও ধাক্কা দিতে নড়ে উঠলেন সামান্য। মুখ দিয়ে সামান্য গোঙানির মতো আওয়াজ। মানুষটির জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে জলের ঝাপটা দেওয়া দরকার। ব্যাপারটা মনে হতেই ও টের পেল তার নিজের গলাও শুকিয়ে কাঠ হয়ে রয়েছে। ভয়ানক তৃষ্ণা।
সাবধানে বাইরে বের হয়ে এল ও। আলোর তেজ প্রায় নেই। সূর্য পশ্চিম আকাশে পাহাড়ের ও-ধারে ঢলে পড়েছে। গতকাল যে-সময় ওরা এখানে পা দিয়েছিল, সেই পরিবেশ। বোধ হয় সময়টাও এক। সেই চমৎকার পরিবেশ দেখে ঘুণাক্ষরেও বোঝার উপায় নেই, খানিক আগে কী ভয়ংকর অবস্থা ছিল।
সুড়ঙ্গের বাইরে আসতেই মাথাটা দ্রুত হালকা হয়ে আসছিল প্রতাপের। শরীরের ক্লান্তিও প্রায় উধাও। জল তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে ছিল একটু আগেও। এখন তেমন আর মনে হচ্ছে না। পায়ে পায়ে পাহাড়ের ঢাল ধরে ও নামতে শুরু করল। সামান্য এগোতেই ফ্রাগার প্রাণহীন দেহটা পড়ে থাকতে দেখল। দেহের পালক জ্বলে কুঁকড়ে গেছে। প্রভু আর তার সঙ্গীকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণ আর বাঁচাতে পারেনি বেচারা। ফিরে যেতে পারেনি নিরাপদ স্থানে। সেই কত বছর আগে এক ঝড়ের রাতে পাখিটা মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল জাহাজের ডেকে। সামান্য সেবা-যত্নে সেদিন পাখিটাকে ফের সুস্থ করে তুলেছিল। হতভাগ্য পাখিটা সেই উপকারের প্রতিদান দিয়ে গেল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
নতজানু হয়ে প্রতাপ ফ্রাগার মৃতদেহটা যত্নে করে তুলে নিয়ে বুকের কাছে ধরল। পরম মমতায় সারা গায়ে হাত বুলিয়ে দিল। বিড়বিড় করে বলল, “তুই বড্ড বোকা ছিলি রে ফ্রাগা! তাই এইভাবে আমাদের জন্য প্রাণ দিলি। অথচ এই আমাকে দ্যাখ, প্রতিদানে এই ভয়ঙ্কর উপত্যকায় তোকে ফেলে দিব্যি চলে যাব এবার। বুকের ভিতর একটুও কেমন করবে না।” বলতে বলতে দুই চোখ বেয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল প্রতাপের। কাছেই বড়ো এক পাথরের পাশে মাটি খুঁড়ে পরম মমতায় ফ্রাগার দেহটাকে তার ভিতর শুইয়ে সাবধানে মাটি চাপা দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
হানাদার দলের কথা ইতিমধ্যে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। হঠাৎই সেকথা মনে পড়তে দ্রুত ঘাড় ফিরিয়ে যথাস্থানের দিকে তাকাতে মর্মান্তিক দৃশ্যটা দেখতে পেল প্রতাপ। মৃত্যু কম দেখেনি। কিন্তু এমন ভয়াবহ মৃত্যু দেখেনি আগে। প্রায় জড়াজড়ি করে পড়ে আছে মৃতদেহগুলি। ঝলসে কুঁকড়ে গেছে শরীর। শেষ মুহূর্তে হতভাগ্য মানুষগুলো যখন বুঝতে পেরেছিল, মৃত্যু সন্নিকটে, বাঁচার আশায় আকুল হয়ে আঁকড়ে ধরেছিল পরস্পরকে। সেই ভাবেই মৃত্যু।
প্রতাপ আর দেরি করল না। হ্রদের কাছে ছুটে গিয়ে আগে তৃষ্ণা মেটাল। ঘাড়, মাথা ভিজিয়ে নিলো ভাল করে। গায়ের জামা খুলে ভিজিয়ে নিয়ে ছুটল সুড়ঙ্গের দিকে।
ড. তাকাসিমা ইতিমধ্যে উঠে বসলেও চোখে শূন্য দৃষ্টি। প্রতাপের হাতে ভেজানো জামা থেকে টপটপ করে জল পড়ছিল। প্রতাপ সেটা তাঁর মুখের কাছে ধরে মোচড় দিতেই তৃষ্ণার্ত মানুষটা ঢকঢক করে পান করলেন। অবশিষ্ট জল চোখে–মুখে ছিটিয়ে দিল প্রতাপ।
সামান্য সুস্থ হয়ে ড. তাকাসিমা বললেন, “প্যাট, মনে হচ্ছে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। মাথা এখনও প্রচণ্ড ভারী। যন্ত্রণা।”
প্রতাপ মাথা নাড়ল। সংক্ষেপে খুলে বলল সব।
ড. তাকাসিমা নির্বাক হয়ে শুনছিলেন। প্রতাপ থামবার পরেও মুখে কথা ফুটল না। প্রতাপ বলল, “সার, সন্ধে নামতে এখনো কিছু বাকি আছে। রওনা হয়ে পড়লে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ও-ধারে পৌঁছে যেতে পারব। এখানে আর একটা রাতও থাকা ঠিক হবে না।”
আরও মিনিট কয়েক গুম হয়ে থেকে শেষে মুখ খুললেন মানুষটি, “ম্যান, প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে যে রহস্য এখানে সৃষ্টি করেছে, তা ভেদ করা এখন এই অবস্থায় আর সম্ভব নয়। আরও ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে আবার। তুমি ঠিকই বলেছ, নিরাপত্তার কারণে এখানে আর এক মুহূর্ত থাকা ঠিক নয়।”
প্রস্তুতির তেমন দরকার ছিল না। কম্পাস দু’জনের হাতের কব্জিতেই বাঁধা ছিল। টর্চ পকেটে। তাই অক্ষতই ছিল সেটা। দরকার ছিল আলটিমিটারের। সামান্য চেষ্টায় তাঁবুর ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া গেল সেটা। অক্ষতই রয়েছে। দু’জন রওনা হয়ে পড়ল এরপর।
ফের শুরু হল সেই গোলকধাঁধার রাজ্য। মাকড়শার জালের মতো সুড়ঙ্গ চলে গেছে নানা দিকে। দুর্ভেদ্য ঘন অন্ধকারের ভিতর মামুলি টর্চের আলোয় সঠিক পথ চিনে চলা একেবারেই সহজ নয়। ঘনঘন কম্পাস আর আলটিমিটার দেখে হিসেব করে চলতে হচ্ছে। সমস্যা একটাই, ঘড়ি নেই।
আসবার সময় এক ঘণ্টার বেশি লাগেনি। কিন্তু আনুমানিক ঘণ্টা দেড়েকের বেশি চলার পর সন্দেহটা প্রথম মাথায় এলো প্রতাপের। আসবার সময় ড. তাকাসিমাই গাইড করেছিলেন। নিশ্চয় তাঁর মনে আছে সব। সহজে নিয়ে যেতে পারবেন ভেবেই প্রতাপ ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। ছেড়ে দিয়েছিল ড. তাকাসিমার উপর। কিন্তু আনুমানিক প্রায় ঘণ্টা দেড়েক চলার পরেও যখন সুড়ঙ্গ থেকে বের হওয়া গেল না তখন ড. তাকাসিমাকে বলল ব্যাপারটা, “সার ঠিক পথে চলেছি তো? অনেকটা সময় হয়ে গেল!”
ড. তাকাসিমা একেবারেই আমল না দিয়ে বললেন, “ঘাবড়িয়ো না ম্যান। মাকড়শার জালের মতো এই ধরনের সুড়ঙ্গের ভিতর কখনই নিখুঁত হিসেব সম্ভব নয়। একটু এদিক-ওদিক হতেই পারে। খুব বেশি হলে আর আধঘণ্টার মধ্যেই বেরিয়ে পড়তে পারব।”
কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়। হাতের কম্পাস দেখে যথেষ্ট হিসেব কষেই চলছিলেন উনি। মাকড়শার জালের মতো সুড়ঙ্গের নানা দিকে শাখা–প্রশাখা। হিসেব করেই তিনি পথ বদল করছিলেন। প্রতাপও নিশ্চিন্ত ছিল। কিন্তু আরও প্রায় এক ঘণ্টার মতো চলার পরেও যখন সুড়ঙ্গ পথ শেষ হল না, খেয়াল করল ড. তাকাসিমা নিজেও কিছু বিচলিত হয়ে পড়েছেন। মুখে উৎকণ্ঠার ছাপ। টপটপ করে দুই গাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। সেদিকে তাকিয়ে প্রতাপ বলল, “সার, কিছু গোলমাল হয়েছে কি?”
প্রত্যুত্তরে ড. তাকাসিমা ওর দিকে প্রায় শূন্যদৃষ্টিতে খানিক তাকিয়ে থেকে হাউহাউ করে উঠলেন, “সর্বনাশ, সর্বনাশ হয়ে গেছে প্রতাপ।”
“কেন সার? কী হয়েছে?”
“আমার মাথা মনে হয় ঠিক মতো কাজ করছে না ম্যান। সামান্য একটা ব্যাপার এতক্ষণে মাথায় ঢুকল! হায় ভগবান!”
“কী... কী হয়েছে সার।”
“আগেই বোঝা উচিত ছিল, ঘড়ি যখন বন্ধ হয়ে গেছে, কম্পাস, আলটিমিটারও ঠিক থাকার কথা নয়। দুটোর কোনওটাই ঠিক মতো কাজ করছে না। সম্পূর্ণ ভুল পথে চলে এসেছি। এই গোলকধাঁধার রাজ্যে সঠিক পথ খুঁজে বের করা আর সম্ভব নয় ম্যান। দু’জনকে তিলে তিলে মরতে হবে এখানে। হায় হায়।” বলতে বলতে ড. তাকাসিমা প্রায় শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন।
সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছেন মানুষটি। সম্ভবত মাথারও ঠিক নেই। এই ক’দিন প্রতাপ যে ধীর-স্থির মানুষটিকে দেখে আসছে, ইনি একেবারেই অন্য রকম। আগের দফায় যখন সন্দেহ হয়েছিল, উচিত ছিল তখনই চলার দায়িত্ব নিজের হাতে নেওয়া। সে-কথা না ভেঙে প্রতাপ বলল, “ও-ভাবে বলবেন না সার। মাথা ঠান্ডা রেখে চেষ্টা করলে নিশ্চয় বের হতে পারব।”
“কী, কী বলছ প্যাট!”
“হ্যাঁ সার, আমি প্রতাপ, প্রতাপ ঢালি। সামান্য এক টুকরো কাঠ আঁকড়ে উত্তাল দক্ষিণ চিন সাগরে ভেসে ছিলাম পুরো তিনটে দিন। হার মানিনি। চেষ্টা করলে এখান থেকেও বের হতে পারব। আপনি শান্ত হোন।”
প্রতাপের সেই মুখের দিকে তাকিয়ে ড. তাকাসিমা অনেকটাই যেন ভরসা পেলেন। কিছু বললেন না।
অতঃপর সঠিক পথের সন্ধানে প্রতাপ ড. তাকাসিমাকে নিয়ে সেই সুড়ঙ্গপথে ঘুরে বেড়াল এক সুদীর্ঘ সময়। ঘন অন্ধকারের ভিতর সেই সুদীর্ঘ সময় যেন একটা যুগ। কিন্তু বাইরে বের হবার পথ খুঁজে পাওয়া গেল না।
এদিকে ক্রমাগত ব্যবহারে টর্চের ব্যাটারি নিস্তেজ হয়ে আসছে। টর্চ না থাকলে কী-ভাবে এই ভয়ানক স্থানে পথ খুঁজে বের করবে, ভাবতে পারছিল না প্রতাপ। তার উপর আর এক ব্যাপার। ড. তাকাসিমা ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ছিলেন। গত রাতের পর পেটে কিছুই পড়েনি। তবে সৌভাগ্য সুড়ঙ্গের স্থানে স্থানে মেঝেয় জমা জল রয়েছে। তাই দিয়েই মানুষটাকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষটা প্রবল হতাশা আর পরিশ্রমে একসময় শুয়ে পড়লেন। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “ম্যান, আর পারছি না আমি। এই বুড়োর জন্য অযথা সময় নষ্ট কোরো না। পালাও এবার। নইলে তুমিও বাঁচবে না।”
উত্তরে প্রতাপ অল্প হাসল। “সার, আমার বাবা-ঠাকুরদা মাঠে লাঙল টানতেন। ওই কাজ আমিও করেছি কিছুদিন। কষ্ট, পরিশ্রম, এ-সব সহ্য করার অভ্যাস আছে। আমি সঙ্গে থাকতে আপনি একা এখানে পড়ে থাকবেন, তাই হয়! আমি আছি সার।” বলতে বলতে প্রতাপ তাঁকে কাঁধে তুলে নিল।
ড. তাকাসিমার অচেতন দেহ কাঁধের উপর নিয়ে প্রতাপ এরপর কতক্ষণ সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতর ঘুরে বেড়িয়েছে, খেয়াল নেই। তারই মধ্যে একসময় নিভে গেছে টর্চের আলো। ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে শরীর। ঘন অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতর প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে সমানে এগিয়ে গেছে ও। শেষ দিকে বাহ্যজ্ঞানও প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল। পিঠের উপর ড. তাকাসিমার অচেতন দেহটা ছাড়েনি তবু। ধুঁকতে ধুঁকতে এগিয়ে গেছে ঘোরের ভিতর। মগজের ভিতরে ঝিলিক দিয়ে গেছে কত পুরনো কথা, ফেলে আসা ঘটনা। জেড— লি পেং— ম্যাকডোনাল্ড সাহেব। কোথায় কত দূরে সবুজ গাছপালায় ঘেরা ওদের ফেলা আসা গ্রাম। মায়ের মুখ। সেই কতদিন আগে দারুণ রোদে মাঠের কাজ সেরে ঘরে ফেরার পর মা ওকে যত্ন করে বারান্দায় বসিয়ে এক বাটি দুধ খাইয়েছিল। গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। সব ক্লান্তি সেদিন নিমেষে দূর হয়ে গিয়েছিল। মা তুমি কোথায় এখন? তোমার প্রতাপকে একটু আদর করো না মা। সেই সেদিনের মতো। মাগো শুনতে পাচ্ছ তোমার প্রতাপের কথা? ফ্রাগা তুই আছিস তো সঙ্গে? তাহলে সাড়া দিচ্ছিস না কেন? আমি এবার মায়ের কাছে যাব রে ফ্রাগা। মায়ের মুখ কতদিন যে দেখিনি। ফ্রাগা তুই শুধু উপকারই করে গেছিস আমার। প্রাণ বাঁচিয়েছিস কতবার। আজ একবার মায়ের কাছে ফেরার পথটা দেখিয়ে দে। ও কী রে ফ্রাগা! ও-ভাবে চিৎকার করছিস কেন। দুই কান যে ফেটে যাচ্ছে! এ-ভাবে তো ডাকিসনি কখনও! সামনে ভীষণ বিপদ বুঝি? কিন্তু আমি যে দেখতে পারছি না কিছু। উঃ চারপাশে কী ভয়ানক আলো রে ফ্রাগা! এমন আলো কোনও দিন দেখিনি আগে। এমন মুক্ত বাতাসে বুঝি কোনও দিন নিঃশ্বাস নিইনি! কিন্তু আমি যে আর চোখ মেলতে পারছি না রে ফ্রাগা। পা টলছে। ফ্রাগা, আমাকে একটু সাহায্য করতে পারিস রে? একটু সাহায্য।
প্রতাপের জ্ঞান যখন ফিরল, খুব কাছেই বহু কণ্ঠে চিৎকার। হই-হট্টগোল। দ্রিম-দ্রিম করে জোরালো আওয়াজে ঢাক বাজছে। তবু ও যে বেঁচে আছে, সেটা বুঝতেই কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল। ধীরে ধীরে চোখ মেলে বুঝতে পারল, দ্বীপের আদিবাসী হেড হান্টারদের হাতে বন্দি হয়েছে ওরা।
অবাক চোখে দেখছিল প্রতাপ। একজন আদিবাসী বড়ো একটা কুমড়ো জাতীয় ফলের খোলার ভিতর কী একটা পানীয় নিয়ে এল। ধীরে ধীরে ঢেলে দিল ওর মুখের ভিতর। বিস্বাদ হলেও জিনিসটা ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল ও। প্রচণ্ড ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় অন্য উপায় ছিল না। খাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই কিছুটা শক্তি পেল যেন। ধীরে ধীরে উঠে বসল।
ভালো করে চারপাশে তাকিয়ে দেখল, আদিবাসীদের মস্ত এক লং হাউসের সামনে খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হয়েছে ওকে। দুই পাশে অস্ত্র হাতে জনা কয়েক রক্ষী পাহারা দিচ্ছে। অদূরে ভিড় করে রয়েছে আরও অনেকে। তাদের মধ্যে মেয়েরাও রয়েছে। মেয়ে-পুরুষ সবাই মিলে বিকট চিৎকারে গান জুড়েছে। মোটা মোটা কাঠের কুঁদো পিটিয়ে উৎসাহে আওয়াজ করছে কয়েকজন। ও উঠে বসার অল্প পরেই পাশের একজন চিৎকার করে কী বলল। উপস্থিত অন্যদের চিৎকার চ্যাঁচামেচি তাতে বেড়ে গেল কয়েক গুন। প্রতাপ দেখল লং হাউসের ওদিক থেকে কয়েকজন ড. তাকাসিমাকে নিয়ে আসছে। ইতোমধ্যে মানুষটি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তবে হাত-পা পিছমোড়া করে বাঁধা। প্রতাপের পাশেই রাখা হল তাঁকে।
প্রতাপ নিচু গলায় বলল, “সার, এদের হাতে কী-ভাবে বন্দি হলাম আমরা? সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে বেরই বা হলাম কখন? আপনাকে এ-ভাবে বেঁধে রেখেছে কেন?”
এক সঙ্গে এতগুলো প্রশ্ন শুনে ড. তাকাসিমা শুকনো মুখে বললেন, “কী-ভাবে সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে বের হলাম, সে-কথা বলতে পারব না। চোখে–মুখে জলের ঝাপটায় যখন জ্ঞান ফিরে এল, দেখি কয়েকজন দেহাতি মানুষ ঘিরে আছে আমাকে। খুব চিৎকার চ্যাঁচামেচি চলছে। তোমার জ্ঞানও ওরা জলের ঝাপটা দিয়ে ফেরাবার চেষ্টা করেছিল। পারেনি। তারপর দু’জনকে বয়ে এনেছে এখানে। সে গতকাল শেষ বিকেলের কথা। মনে হয়, তার কিছু আগে সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে বের হয়েছিলে তুমি। আমাকে পিঠে নিয়েই। তারপর ক্লান্তিতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলে।”
“সার।” ড. তাকাসিমা থামতে প্রতাপ রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করল, “আপনার জ্ঞান ফিরেছিল গতকাল বিকেলে। তাহলে কতক্ষণ আমরা সুড়ঙ্গের ভিতর ছিলাম?”
“জানি না ম্যান।” ড. তাকাসিমা অল্প থামলেন। “তবে বোঝাই যাচ্ছে সেটা কম করেও বাইশ ঘণ্টার কাছাকাছি। যাক সে-কথা। তুমি কিছু সুস্থ তো এখন? গত রাতে একই ঘরে রাখা হয়েছিল আমাদের। সারা রাত বেহুঁশ ছিলে। তবে বিপদ কাটেনি আমাদের। বরং বেড়েছে আরও। তুমি তো জানো, এই জংলি আদিবাসীরা হেড-হান্টার। বাইরের মানুষ একেবারেই সহ্য করে না। তার উপর ক’দিন আগে হ্যারির দলবলের সঙ্গে লড়াইও হয়ে গেছে। উদ্ধার মিলবে মনে হয় না।”
উপস্থিত মানুষগুলোর বিপুল উৎসাহ দেখে প্রতাপেরও সন্দেহ হয়েছিল। তার উপর হ্যারির দলের হাতে ওদের কেউ হয়তো মারাও গেছে। একজন আহত মানুষকে তো নিজের চোখেই দেখেছে। পালটা আক্রমণে হ্যারির দলের চারজন খুন হয়েছে ওদের হাতে। তারপর যথারীতি কেটে নিয়েছে মাথা। মুণ্ডহীন সেই মৃতদেহর একটি প্রথম দিনই দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু সে কথা বলার আগেই উপস্থিত মানুষের হই হট্টগোল, চিৎকার চ্যাঁচামেচি হঠাৎই থেমে গেল। মুহূর্তে অদ্ভুত এক নীরবতা।
প্রতাপ দেখল সারা শরীর নানা রঙে চিত্র বিচিত্র করা এক মাঝবয়সী মানুষ চারপাশে জনা কয়েক প্রহরী নিয়ে লম্বা পায়ে এগিয়ে আসছে। জনতার ভিড় সসম্ভ্রমে তাকে পথ করে দিচ্ছে। ভিড়ের একপাশে মাটির এক বেদীর উপর বড়ো এক পাথর। লোকটা সেই পাথরের উপর গিয়ে বসতেই ফের দ্রিম-দ্রিম আওয়াজ। তবে এবার চিৎকার চ্যাঁচামেচি নেই। সঙ্গের প্রহরীরা দুই ধারে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে রইল। অস্ত্রগুলোর বেশির ভাগই পাথরের। কয়েকটা লোহার রড গোছের জিনিসও রয়েছে। সম্ভবত দ্বীপে হানা দেওয়া বাইরের মানুষের ফেলে যাওয়া।
লোকটা যে দ্বীপের দেহাতি মানুষের সর্দার। আর এটা যে বিচারসভা, বুঝতে অসুবিধা হল না প্রতাপের। ড. তাকাসিমার অনুমানে ভুল নেই। তবে একটা জিনিস বুঝতে পারছিল, বিচার সভা যখন ডাকা হয়েছে, নিশ্চয় ওদের বক্তব্য শোনার ব্যবস্থা থাকতেও পারে। ওরা সত্যিই তো এদের ক্ষতি করতে আসেনি। কিন্তু মানুষগুলোর ভাষা জানা নেই। কী-ভাবে বোঝাবে ওদের ভেবে পেল না। ইতিমধ্যে সভার কাজ শুরু হয়ে গেছে। লম্বা একটা পাথরের টুকরো বেদীর সামনে সর্দারের পায়ের কাছে এনে নামিয়ে রাখল একজন।
যথেষ্ট লম্বা পাথরের টুকরোটার দিকে তাকিয়ে প্রায় শিউরে উঠল প্রতাপ। এসব অঞ্চলের কয়েকটি দ্বীপে যাবার সুযোগ হয়েছে আগে। এক দেহাতি গ্রামে এমনই এক পাথরের টুকরো দেখেছিল। জিনিসটার একদিন অসম্ভব ধারালো। প্রায় লোহার মতো কঠিন পাথরটা দিয়ে অবলীলায় গাছের মোটা এক ডাল কাটছিল একজন। প্রায় কুড়ুলের মতোই। অদ্ভুত পাথরটা সে কিনতেও চেয়েছিল। লোকটা রাজি হয়নি। পাথরটা নাকি লোহার মতোই শক্ত। অথচ মরচে পড়ার ভয় নেই। একবার ধার দিয়ে নিলে অনেক দিন বর্তমান থাকে। অস্ত্রটা নাকি তাদের পরিবারে কয়েক পুরুষ ধরে ব্যবহার হচ্ছে। সন্দেহ নেই, সুদূর প্রস্তর যুগের মানুষ এই সব অস্ত্র দিয়ে সহজেই কাজ চালিয়ে নিতে পারত।
সর্দারের পায়ের কাছে রাখা পাথরের অস্ত্রটাও যে সেই জিনিস, দেখেই বুঝতে পারল প্রতাপ। বিচারে দোষী সব্যস্ত হলে এই অস্ত্র দিয়েই ওদের হত্যা করা হবে হয়তো। ইতিমধ্যে ড. তাকাসিমার মতো প্রতাপের হাত-পা পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলা হয়েছে। তাকিয়ে দেখা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। অপেক্ষা করে রইল, কখন তাদের বলবার সুযোগ দেওয়া হয়।
কিন্তু তেমন কোনও সুযোগ না এলেও একটা ব্যাপার ঘটে গেল। বিচার পর্বর শুরুতে সর্দার উচ্চস্বরে কিছু বলল। তৎক্ষণাৎ ভিড়ের ভিতর থেকে চারজন পুরুষ ছুটে এসে সর্দারের সামনে সাষ্টাঙ্গে উপুড় হয়ে তাকে অভিবাদন জানাল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ওদের দু’জনের দিকে আঙুল তুলে সমস্বরে বলে গেল কিছুক্ষণ। ওরা থামতেই সর্দার খানিক নীরব থেকে চারপাশে উপস্থিত মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে উঁচু গলায় কিছু বলতে ভিড় ঠেলে একটা মানুষ সর্দারের সামনে এগিয়ে এল। আগের লোকগুলোর মতোই সাষ্টাঙ্গে অভিবাদন করে দাঁড়াল।
গোড়ায় প্রতাপ তেমন খেয়াল করেনি। তারপর লোকটার দিকে তাকিয়ে প্রায় চমকে উঠল। লং হাউসের সেই আহত মানুষটা। আচমকা পিছন থেকে আক্রমণ করতে এসে ওর রাইফেলের আঘাতে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছিল। সেদিন ওর সেই সামান্য চিকিৎসায় ইতিমধ্যে প্রায় সেরে উঠেছে। ক্ষত সম্পূর্ণ না শুকোলেও হাঁটছে প্রায় সুস্থ মানুষের মতোই। সেই কথা ভেবে কিছু আশ্বস্ত হয়ে উঠলেও হঠাৎ মনে পড়ল, আসবার সময় ওদের ঘর থেকে পাথরের খণ্ডগুলো চুরি করে এনেছিল। তাহলে লোকটা কী সেই কথা বলতেই এসেছে। ভিতরে যেটুকু স্বস্তি হচ্ছিল মুহূর্তে তলিয়ে গেল সব। ইতোমধ্যে লোকটা দারুণ উত্তেজনায় সর্দারের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কিছু বলতে শুরু করেছে।
সেকথা বুঝতে না পারলেও প্রতাপ দেখল, লোকটার কথার মাঝেই সর্দার দু’একবার কী বলল। তারপর লোকটা থামতেই সামান্য নীরবতার পর হাত তুলে উচ্চস্বরে কিছু ঘোষণা করল।
ঘোষণা শেষ হতেই লোকটা উপুড় হয়ে সর্দারকে একবার অভিবাদন জানিয়েই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল প্রতাপকে। তারপর দ্রুত হাত-পায়ের বাঁধন খুলে কাঁধে তুলে নিল ওকে।
ইতিমধ্যে ড. তাকাসিমার বাঁধনও খুলে দেওয়া হয়েছে। দু’জনকে নিয়ে আনন্দে নৃত্য জুড়ে দিল সবাই। ওদের দু’জনের বুঝতে বাকি রইল না, সহজ সরল মানুষগুলোর কাছে ওরা আর শত্রু নয়। বন্ধু।
দেশকাল ভেদে মানুষের ভাষা পালটে যায়। পালটে যায় চেহারা। কেউ কালো, কেউ সাদা। কেউ হলুদ মঙ্গোলিয়ান। কিন্তু যে বৈশিষ্ট্যের জন্য মানুষ অনন্য, সেই মনুষ্যত্ব আর মানবতার কোনও দেশকাল নেই। ভাষা সেখানে অন্তরায় হয় না। প্রতাপ আর ড. তাকাসিমারও হয়নি। এরপর সেই বিজন দ্বীপে দেহাতি মানুষগুলোর সঙ্গে কয়েকটা দিন ওদের যে আনন্দে কাটল, তার তুলনা নেই।
দেহাতি মানুষগুলো নরমুণ্ড শিকারি। শত্রুর মাথা কেটে সাজিয়ে রাখে বাড়ির দরজায়। যার বাড়ির সামনে যত বেশি নর-করোটি, সে তত সম্মাননীয় ব্যক্তি। সমাজে তত বেশি প্রতিপত্তি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ইন্দোনেশিয়ার সারাওয়াক দ্বীপে এমনই এক নরমুণ্ড শিকারিদের গ্রামে আমেরিকান সেনাদের তাড়া খেয়ে এক জাপানি সৈন্য আশ্রয় নিয়েছিল। গ্রামের মানুষ তাকে আশ্রয়ও দিয়েছিল। কিন্তু আমেরিকান বাহিনী তখন হন্যে হয়ে পলাতক জাপানি সেনাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। গ্রামে গ্রামে হানা দিচ্ছে। মানুষগুলো যখন বুঝল, আশ্রয়প্রার্থীকে আর লুকিয়ে রাখা যাবে না। আমেরিকানদের হাতে ধরা পড়বে। তখন পরামর্শ করে নিজেরাই তার মাথা কেটে নিয়েছিল। লোকটাকে আমেরিকান সেনাদের হাতে তুলে দেওয়ার থেকে বরং তার মাথা কেটে নেওয়াই ভাল। একজনের বাড়ির সামনে একটা নরমুণ্ডের সংখ্যা অন্তত বাড়বে।
সেই মানুষগুলোর আশ্রয়ে কয়েকটি দিন বড়ো ভালো কেটেছিল ওদের। জানতে পেরেছিল অনেক কথা। ওদের বিশ্বাস, দ্বীপের ওই পাহাড়ের উপর বাস করেন ওদের দেবতা। স্ফটিকের মতো তাঁর অসংখ্য চোখ। অন্য সময় তিনি ঘুমিয়ে থাকেন। জেগে ওঠেন সকালে রোদ্দুর এসে পড়লেই। তখন তাঁর লক্ষ লক্ষ চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। সেই আগুনের সামনে পড়লে আর রেহাই নেই। জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে হয়ে যাবে। হ্রদের দানবগুলো তাই রাতের অন্ধকার নামার আগে জল থেকে বাইরে আসে না। ব্যতিক্রম বছরে মাত্র কয়েকটি দিন, ঘন মেঘ বর্ষণে যেদিন আকাশে সূর্যের দেখা মেলে না। একবিন্দু রোদও পড়ে না। সেই দিন দানবগুলো দিনের বেলায় জল থেকে উঠে আসে। ওদের প্রধান পুরোহিত বছরে তেমনই এক দিনে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সুড়ঙ্গপথে হাজির হয় পাহাড়ের ওধারে। শুধু পশু নয়, কখনো মানুষও নিবেদন করা হয় দেবতার উদ্দেশে। দানবগুলো তাদের ছিঁড়ে খায়। তারই ভিতর অত্যাশ্চর্য দু-একটা পাথর কুড়িয়ে আনে ওরা। ঘরে রেখে দেয়। ওদের বিশ্বাস, তাতে গৃহস্থের মঙ্গল হয়। বিনাশ হয় অশুভ শক্তির।
দুটো দিন কাটাবার পর ফিরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করতে সর্দার নিজেই একদিন ওদের পৌঁছে দিল ড. তাকাসিমার বোটে। সেটা নদীতে পাহাড়ের এক খাঁজের ভিতর বাঁধা ছিল। হ্যারির দলবল নৌকোটা সেখানে নোঙর করে পাহাড়ের দিকে গিয়েছিল।
দ্বীপের মানুষগুলোর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওরা সেই দণ্ডেই ছেড়ে দিয়েছিল বোট। ছোটো হলেও জলযানটা সমুদ্রে চলার উপযোগী। নদী ধরে অল্প সময়ের মধ্যেই ওরা সমুদ্রে এসে পড়ল। ড. তাকাসিমা হঠাৎ বললেন, “প্যাট, আজ কত তারিখ বলতে পারো?”
ড. তাকাসিমার মতো মানুষ এই সামান্য হিসাব করতে পারছেন না দেখে কিছু অবাকই হল প্রতাপ। তবে সেটা প্রকাশ না করে বলল, “সার আজ মাসের কুড়ি তারিখ।”
প্রতাপের কথায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল ড. তাকাসিমার চোখ। “ঠিক বলছ ম্যান? আর একবার গুনে দেখ তো।”
প্রতাপ অবশ্য তেমন না করেই বলল, “হ্যাঁ সার। একদম। আজ কুড়ি তারিখই।”
“তাহলে আর চিন্তা নেই।” উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে ড. তাকাসিমা বললেন, “একদম ঠিক দিনেই রওনা হতে পেরেছি আমরা। আগামীকাল যখন একুশ তারিখ, ম্যানিলাগামী একটা জাহাজ যাবে এখান দিয়ে। জাহাজের ক্যাপ্টেনকে আগেই জানিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে এই নদীর মোহনায় এখন একটা দিন চুপ করে অপেক্ষা।”
দিন কয়েক ড. তাকাসিমা ম্যানিলায় তাঁর গবেষণা কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। ওখানে যারা রয়েছেন, সন্দেহ নেই যথেষ্ট চিন্তায় রয়েছে সবাই। নদীর মোহনার কাছে সুবিধামতো জায়গায় বোট ভিড়িয়েই তিনি এবার বোটের রেডিও–ট্রান্সমিটার নিয়ে পড়লেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি কিছুতেই মনে করতে পারলেন না। বেমালুম ভুলে গেছেন। শেষে হতাশ হয়ে বলেই ফেললেন, “প্যাট কী হয়েছে বলো তো আমার? হঠাৎই সব যেন ভুল হয়ে যাচ্ছে। অনেক সাধারণ ব্যাপারও মনে করতে পারছি না!” হতাশায় কপাল চাপড়ালেন তিনি।
ব্যাপারটা প্রতাপ আগেই লক্ষ করেছিল। কিন্তু সেটা না ভেঙে বলল, “সার, হানাদার হ্যারির দলবল রেডিওটা খারাপ করে দেয়নি তো?”
ড. তাকাসিমা জবাব না দিয়ে গুম হয়ে রইলেন। প্রতাপও আর কথা বলল না। আসলে তার মাথায় তখন অনেক ভাবনা ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। শয়তান লি পেং সাবাড় হয়েছে। কিন্তু জেডের সঙ্গে শেষ বোঝাপড়াটা এখনও বাকি। প্রতাপের হাতে লি পেংয়ের মৃত্যুর খবর কি জেনে ফেলেছে লোকটা? অবস্থা তাহলে আরও ঘোরালো হয়ে উঠবে। কী-ভাবে সামাল দেবে, কিছুই তারপর ভেবে উঠতে পারেনি। জেডের প্রধান কর্মক্ষেত্র হংকং। তবে ওর মনে হয়, লোকটার সঙ্গে শেষ মোকাবিলা ম্যানিলাতেও হতে পারে। ওখানেও লোকটার ভাল প্রভাব আছে। ওকে ড্রাগন দ্বীপে পাঠিয়ে দিয়ে জেডের মতো মানুষ হংকং–এ পড়ে থাকবে, মনে হয় না। তবে একটাই সুবিধে, মানুষটার প্রধান পরামর্শদাতা লি পেং নেই।
এর মধ্যে কোথা থেকে হাজির হয়েছে বেন ম্যাক্সিম লোকটা। ওকেই বা কাজে লাগাল কে? কেবিনে নিরিবিলিতে বসে সেই সব ভাবতে ভাবতে এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে বার্থে শুয়ে পড়ল ও। হাতে সময় কিছু যখন রয়েছে, অযথা না ভেবে মগজের কিছু বিশ্রাম দেওয়া ভাল।
ক’দিন পর গদি আঁটা চমৎকার বার্থে শুয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল প্রতাপ। আচমকা ড. তাকাসিমার ডাকে ওর সেই ঘুম ভেঙে গেল। সন্ধের অন্ধকার নেমে এসেছে তখন। চারপাশে নিকষ অন্ধকার। অবিরাম সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। চোখ মেলতেই ড. তাকাসিমা ওর দিকে ঝুঁকে পড়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, “খুব খারাপ খবর প্যাট।”
খবর যে যথেষ্টই খারাপ সেটা মানুষটির মুখ দেখেই বুঝতে পারা যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি উঠে বসল। প্রশ্ন কারার আগেই ড. তাকাসিমা বললেন, “প্যাট অনেক চেষ্টায় ফ্রিকোয়েন্সি ঠিক করে ম্যানিলায় অল্প আগে যোগাযোগ করতে পেরেছিলাম। যা খবর পেলাম, খুবই ভয়ানক।”
“কী হয়েছে সার?”
“তোমার বস ওই জেড লোকটা খুব বিপদে ফেলে দিয়েছে আমাকে।”
খানিক আগে এমন একটা সন্দেহ মাথায় পাক খেয়ে গিয়েছিল প্রতাপের। তবু উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, “সে কী সার! কী-ভাবে?”
“প্যাট, লোকটা কী-ভাবে খোঁজ পেয়ে ম্যানিলায় আমার গবেষণা কেন্দ্র দখল করে সেখানে ঘাঁটি গেড়েছে। আমার যে তিনজন সহকারী ওখানে ছিল, তাদের কী অবস্থা হয়েছে কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।”
প্রতাপের ঘুম ততক্ষণে উপে গেছে। তাড়াতাড়ি চোখ কচলে বলল, “সার, কী চায় ও। কিছু বলেছে?”
উত্তরে হতাশায় মাথা নাড়লেন উনি, “আমি তো ভাবতেও পারিনি প্যাট। অনেক চেষ্টায় ফ্রিকোয়েন্সি ঠিক করে ম্যানিলায় আমার গবেষণাগারে যোগাযোগ করেছি, ওদিকে থেকে ভেসে এল ভারী গলায় অচেনা একজনের কণ্ঠস্বর। জিজ্ঞাসা করতেই জানাল সে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের মানুষ। ফরমায়েশ মতো কাজ না করলে শুধু ম্যানিলার গবেষণাগারই নয়, উড়িয়ে দেবে টোকিওতে আমার প্রধান গবেষণাগারও। হা ঈশ্বর, আমার সারা জীবনের পরিশ্রমের ফসল রয়েছে ওই দুই জায়গায়।”
হতাশায় মানুষটি তখন ভেঙে পড়েছেন। অযথা সান্ত্বনা দিয়ে লাভ নেই। প্রতাপ বলল, “সার, লোকটার অসাধ্য কিছু নেই। তার উপর নেটওয়ার্ক বহুদূর বিস্তৃত। কিন্তু কী চায় ও? হিরে–জহরত?”
উত্তরে ড. তাকাসিমা মাথা নাড়লেন, “ঠিক তাই। কিন্তু হীরে ওকে কোথা থেকে দিই বলো দেখি? এই দ্বীপে ওই জিনিসের কোনও অস্তিত্বই তো নেই। আগামীকাল সকাল পর্যন্ত সময় দিয়েছে। এর মধ্যে জবাব চাই ওর। কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”
ড. তাকাসিমা থামলেন। প্রতাপ কোনও উত্তর দিল না। এই দ্বীপে হীরে নেই, সে-কথা কিছুতেই বিশ্বাস করবে না জেড। লং হাউসের সেই কাণ্ডের পর ও নিজেই লি পেংকে হীরের কথা বলেছিল। শয়তান লি পেং কী তারপর জেডকে বলেছে সে-কথা? তা ছাড়া শুধু ওর উপর লোকটা যে ভরসা করেনি, সেটা কিছু অনুমানও করেছে ইতিমধ্যে। হয়তো ম্যাক্সিমকে জেডই কাজে লাগিয়েছে? নয়তো অন্য কোনও সূত্র থেকে খবর পেয়ে বেন ম্যাক্সিম হীরের খোঁজে দলবল সহ হ্যারিকে পাঠিয়েছিল। খবরটা কানে আসতে জেড হয়তো সহজেই বেন ম্যাক্সিমকে কব্জা করে ফেলেছে। কিন্তু যাই হোক না কেন, সেটা সঠিকভাবে জানা দরকার। তাতে অন্তিম মোকাবিলা সহজ হয়।
প্রতাপকে চুপ করে থাকতে দেখে ড. তাকাসিমা বললেন, “কী ভাবছ ম্যান?”
“সার জেড কী আমার কথা জিজ্ঞাসা করেছিল? বেন ম্যাক্সিমও যে হীরের খোঁজে অন্য এক দল পাঠিয়েছে, সেই খবর কি জানে ও?”
প্রতাপের কথায় ড. তাকাসিমার দুই চোখ হঠাৎ যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ওর পিঠে সোল্লাশে ছোটো এক চাপড় মেরে বললেন, “গুড আইডিয়া। গুড আইডিয়া প্যাট। হঠাৎ দারুণ একটা কথা মনে করিয়ে দিয়েছ। মনে হয় শয়তানটাকে এই অস্ত্রেই ঘায়েল করা যাবে।”
“কী-ভাবে সার?” ড. তাকাসিমার কথায় কিছু অবাক হল প্রতাপ।
উত্তরে উনি সামান্য মুচকি হেসে বললেন, “বলছি। তবে তার আগে পুরো ছকটা কষে নিতে সময় দাও একটু।”
পরের দিন ভোরে যথা সময়ে ড. তাকাসিমা বোটের রেডিও রুমে এসে রেডিও চালু করলেন। পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে প্রতাপ। মুখ দেখে বোঝা না গেলেও ভিতরে উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠায় টানটান হয়ে রয়েছে। মানুষটার প্ল্যান চমৎকার। কিন্তু পারবেন তো? শুধু কথার মারপ্যাঁচে জেডকে কাত করতে। একটাই সুবিধে পরামর্শদাতা লি পেং আর নেই। তবু ড. তাকাসিমা আসলে একজন বৈজ্ঞানিক। তার উপর পাহাড়ের উপর হ্রদ উপত্যকা থেকে ঘুরে আসার পর মানুষটার মাথাও আর আগের মতো কাজ করছে না। অতি সামান্য ব্যাপার ভুল হয়ে যাচ্ছে!
ভদ্রলোক কিন্তু প্রতাপের আশঙ্কা সম্পূর্ণ অমূলক প্রতিপন্ন করে দিলেন। মানুষটি যে কূট চালেও অসামান্য সেটা প্রমাণ করে দিলেন একটু পরেই। রেডিও চালু হবার সঙ্গে সঙ্গে অন্য প্রান্ত থেকে জেডের ভারী গলা ভেসে এল, “ড. তাকাসিমা, আমি জেড, জেড বলছি। ওভার।”
উত্তরে ধীর স্থির কণ্ঠে ড. তাকাসিমা বললেন, “তোমার প্রস্তাবে আমি রাজি জেড। কিন্তু কিছু অন্য সমস্যাও আছে। সেগুলোর আশু সমাধান দরকার। ওভার।”
“কী সমস্যা ডক্টর? ওভার।”
“সমস্যা গোটা কয়েক। তুমি নিশ্চয় জানো, হিরের খোঁজে আমি এখানে আসিনি। কিন্তু ঘটনাচক্রে ওই ব্যাপারে অনেক কিছুই জেনে ফেলেছি। এখানে হীরের খনিটা রয়েছে দুর্গম পাহাড়ের মাথায় এক হ্রদের ধারে। হ্রদের চারদিকে ছড়ানো শুধু হীরে আর হীরে। হীরের পাহাড়। দ্বীপের বন্য নরমুণ্ড শিকারি মানুষের দল পাহাড়ের চারদিক ঘিরে রেখে সেগুলো বংশানুক্রমে পাহারা দেয়। তাদের হাতে বিষাক্ত ফলার তির। পাহাড়ের দিকে কাউকে যেতে দেখলেই তির ছুড়ে মেরে ফেলে মাথা কেটে নেয়। সেটা বাদ দিলেও আমার মতো এক বুড়োর পক্ষে একা ওই দুর্গম পাহাড়ের উপর ওঠা সম্ভব নয়। তার উপর রয়েছে ম্যানিলার বেন ম্যাক্সিমের দল। দ্বীপে ওরাও এসেছে হীরের সন্ধানে। তারা দলেও অনেক ভারী। দু’দিন আগে ওদের খপ্পরে পড়ে প্রাণটাই যেতে বসেছিল। ওভার।”
ড. তাকাসিমা থামলেন। ও প্রান্ত থেকে তৎক্ষণাৎ জেডের উত্তর, “ডক্টর, আমি প্যাট নামে এক ছোকরাকেও পাঠিয়েছি ওখানে। ওর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করো। ছেলেটা করিৎকর্মা। হতচ্ছাড়া বেন ম্যাক্সিমের ভবলীলা ইতিমধ্যেই আমি সাঙ্গ করে ফেলেছি। প্যাটকে আগে খুঁজে বের করো। বেন ম্যাক্সিমের পাঠানো গ্যাংয়ের ভবলীলা সে একাই সেরে ফেলতে পারবে। দরকারে জংলিদের ব্যবস্থাও। সে ক্ষমতা ছোকরার রয়েছে। কিন্তু একটা কথা। প্যাটকে আমার কথা ঘুণাক্ষরেও বলা চলবে না। তাতে বরং মুশকিল হতে পারে। ওভার।”
উত্তরে ড. তাকাসিমা আড় চোখে পাশে প্রতাপের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হাসল, “তোমার সে গুড়ে বালি হে জেড। তাহলে বলি শোনো। দিন তিনেক আগে বেন ম্যাক্সিমের দলের একজন জংলিদের বিষাক্ত তিরে ঘায়েল হয়েছিল। গোড়ায় তেমন গুরুত্ব দেয়নি কেউ। কিন্তু পরে লোকটার সারা শরীরে বিষের জ্বালা শুরু হতে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী বুঝে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল।
‘মৃত্যু যন্ত্রণায় লোকটা জঙ্গলের ভিতর পড়ে কাতরাচ্ছিল। দেখতে পেয়ে আমি তুলে এনেছিলাম বোটে। অ্যান্টিভেনাম দিয়ে বাঁচাবার চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু পারা যায়নি। লোকটা আমার ব্যবহারে অভিভূত হয়ে অনেক কথাই বলে গিয়েছে। তার কাছেই তোমার ওই প্যাটের কথা শুনেছি। ছোকরাটাকে আগের দিনই ওরা নিকেশ করে দিয়েছে। বেন ম্যাক্সিম ওদের হীরে খোঁজার দায়িত্ব ছাড়াও প্যাট ছোকরাকে খতম করার কাজও দিয়েছিল। ওই লোকটার কাছেই শুনেছি বেন ম্যাক্সিমের সঙ্গে এ-জন্য চুক্তি হয়েছিল লি পেং নামে একজনের। লোকটা ছিল দলের প্রধান হ্যারির ডান হাত। তাই ভিতরের অনেক কথাই জানা ছিল তার। সবই বলে গিয়েছে আমাকে। ওভার।”
“ক–কী নাম বললে ডক্টর? ওভার।” ও প্রান্ত থেকে জেডের প্রায় রুদ্ধশ্বাস প্রশ্ন।
“লি পেং। কিন্তু সে কথা থাক জেড। কাজের কথা বলি শোন। এই দ্বীপ থেকে হীরে সংগ্রহ করতে হলে খুব সহজ উপায় একটা আছে। আমি ল্যাটিচুড–লগনিচুড সহ জায়গাটার লোকেশন দিয়ে দিচ্ছি। হেলিকপ্টার নিয়ে সোজা চলে এসো পাহাড়ের মাঝে সেই হ্রদের পাড়ে। জংলিরা পাহাড় ঘিরে পাহারা দিলেও ও-ধারে হ্রদের কাছে যায় না। দেরি না করে চলে আসতে পারো। যত খুশি হিরে কুড়িয়ে নিয়ে যাও। যতদূর জানি, বেন ম্যাক্সিমের দলের যে ক’জন বেঁচে আছে, তারা এখনও হ্রদের কাছে পৌঁছোতে পারেনি। ওভার।”
ড. তাকাসিমা থামলেন। কয়েক মুহূর্ত ওদিক থেকে কোনও সাড়া নেই। পিছনে প্রায় রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছে প্রতাপ। চোখেমুখে বিস্ময়ের চিহ্ন। মানুষটি অনেক কথাই ভাঙেননি তার কাছে। বেন ম্যাক্সিমের দলের একজন আহত মানুষের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল, ঘুণাক্ষরেও বলেননি! তাহলে লি পেং! লি পেং তাকে খুন করার জন্য বেন ম্যাক্সিমের দলকে লাগিয়েছিল! ব্যাপারটা জেডের যে জানা ছিল না, তার কথাতেই বোঝা গেছে। সন্দেহ নেই, লি পেং তার মতলব আগেই ফেঁদে রেখেছিল। তারপর প্রতাপের কাছে হীরের কথা জানবার পর জেডের অজান্তে নিজেই হেলিকপ্টার নিয়ে চলে এসেছিল। কিন্তু অতি চতুর মানুষটা প্রতাপের কিছুই জানতে পারেনি এখনও। ভেবেছিল হীরের ব্যাগ নিয়ে চম্পট দেবে। জেডও তার হদিস পাবে না। তারপর নতুন দল খুলে ফেলবে। কিন্তু যত ধুরন্ধরই হোক প্রতাপকে কিছুমাত্র চিনতে পারেনি লোকটা। প্রাণ খোয়াতে হয়েছে। ড. তাকাসিমা টোপ ফেলেছে ভালই। শুধু একটাই চিন্তা। জেড কি গিলবে টোপটা? প্রায় রুদ্ধশ্বাসে ও অপেক্ষা করে রইল।
কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে কেটে যাবার পরে হঠাৎ সচল হয়ে উঠল রেডিওর স্পীকার। ও প্রান্ত থেকে জেড বলল, “ডক্টর, পাহাড়ের উপর হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার মতো জায়গা রয়েছে তো? ওভার।”
উত্তরে ড. তাকাসিমা আড় চোখে একবার প্রতাপের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন, “আছে। ঢালু হলেও হ্রদের চারপাশে অনেক স্থানই বেশ সমতল। হেলিকপ্টার সহজেই নামতে পারবে। তার উপর গাছপালাও নেই। একদম ন্যাড়া উপত্যকা। তবে খুব সকালের দিকে এলে ভাল হয়। রোদ ওঠার আগে। ওভার।”
“কেন? সকালের দিকে কেন? ওভার।” জেডের কথায় সন্দেহের দোলা।
“আসলে সকালের দিকে জংলি হেড হান্টারের দল পাহারায় থাকে না।” চটজলদি উত্তর ড. তাকাসিমার।
“ওহ্ তাই! সে ঠিক আছে ডক্টর। আমি নিজেই যাব। তবে যদি দেখি তুমি মিথ্যে ভাঁওতা দেবার চেষ্টা করছ, মনে রেখো রেহাই পাবে না। ওভার।” কথা শেষ হতেই ও-প্রান্ত থেকে কেটে গেল লাইন।
রেডিও বন্ধ করে ড. তাকাসিমা পকেট থেকে রুমাল বের করে জমে ওঠা মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বড়ো একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, “শয়তানটা নিজেই আসবে তো ম্যান।”
“আসবে সার।” উত্তরে প্রতাপ অল্প হাসল, “ওই লি পেং–এর কথা শোনার পর আসতেই হবে। লি পেং অবশ্য বেঁচে নেই আর। তবে বেঁচে থাকলে তাকে নিকেশ করেই বের হত। যে-ভাবে জেড লি পেংয়ের নাম উচ্চারণ করল, তাতে আমি নিশ্চিন্ত, বেন ম্যাক্সিম হঠাৎ মাঝখানে এসে পড়ায় জেড তাকেই সন্দেহ করতে শুরু করেছিল। আর জেডের কাছে বিশ্বাসঘাতকতার এক মাত্র শাস্তি মৃত্যু।”
“লি পেং বেঁচে নেই!” ড. তাকাসিমা অবাক হয়ে প্রতাপের মুখের দিকে তাকালেন। “কী করে জানলে?”
উত্তরে মুচকি হাসল প্রতাপ, “সরি সার। আপনাকে সেদিন ইচ্ছে করেই বলিনি সব। ক’দিন আগে যে হেলিকপ্টারকে গুলি করে নামিয়েছিলাম, ভেঙে পড়েছিল সমুদ্রে, আপনি বলেছিলেন, হানাদারদের হেলিকপ্টার, আসলে ওটা ছিল লি পেংয়ের। জেডকে ডাবল ক্রস করার ইচ্ছে ছিল লোকটার। তবে সে যে আমাকে খুন করার জন্য বেন ম্যাক্সিমকে দায়িত্ব দিয়েছিল, আগে টের পাইনি।”
প্রতাপের অনুমান মিথ্যে হয়নি। তবে যেমন বলা হয়েছিল তা হয়নি। ড. তাকাসিমা তাকে হেলিকপ্টার নিয়ে সকালের দিকে আসতে বলেছিলেন। কিন্তু হিরের লোভে বোধ হয় পাগল হয়ে গিয়েছিল লোকটা। সকালের দিকে রেডিওয় সেই কথার পর ওরা তখন বোট নিয়ে কয়েক নট দূরে ছোটো এক প্রবাল দ্বীপের কাছে। গা ঢাকা দিয়ে থাকার পক্ষে জায়গাটা চমৎকার। শুধু তাই নয়, দূরে পাহাড়ের মাথাও এখান থেকে চমৎকার নজরে রাখা যায়। সেই কারণেই স্থানটা বেছে নিয়েছিল ওরা। ভেবেছিল পরের দিন ভোরের দিকেই জেড হেলিকপ্টার নিয়ে আসবে। কিন্তু হীরের তাড়নায় তর সয়নি লোকটার।
নিরক্ষীয় অঞ্চলে মালুকা সাগরের আকাশ তখন ঝকঝকে। কিছু পশ্চিমে ঢলে পড়লেও গোল থালার মতো সূর্য শানিত ফলার মতো আগুন ছড়াচ্ছে। ছোট্ট প্রবাল দ্বীপের গায়ে ঢেউ আছড়ে পড়ার ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ। এক ঝাঁক সিগাল শুধু ঢেউয়ের উপর গা-ভাসিয়ে মাছের খোঁজে ব্যস্ত। তারই ভিতর হঠাৎ কানে এল দূর থেকে ভেসে আসা হেলিকপ্টারের মৃদু আওয়াজ।
শব্দটা কানে আসতে একটু ঘাবড়েই গেল দু’জন। হীরের খনির কথা শুনে জেড কি তাহলে আজই ধাওয়া করেছ! একটু পরেই মস্ত একটা হেলিকপ্টার ওদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। সেদিকে তাকিয়ে বুঝতে বাকি রইল না হেলিকপ্টারে কে রয়েছে। লোকটার অসাধ্য বলে কিছু নেই। ম্যানিলা দূর তো কম নয়। এই অল্প সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা করে ছুটে এসেছে! সম্ভবত লি পেংয়ের মতোই চার্টার্ড প্লেনে ডাভাও। তারপর হেলিকপ্টার নিয়ে আকাশে উড়েছে।
ড. তাকাসিমা কিছু উদ্বিগ্ন মুখে বললেন, “এ-যে ঝামেলা হয়ে গেল প্যাট। তর সইল না লোকটার। হীরের নেশায় এই ভর দুপুরে ছুটে এল! এখন ওখানে যা অবস্থা, হেলিকপ্টার নিয়ে তো নামতেই পারবে না!”
ব্যাপারটা প্রতাপের মাথাতেও পাক খাচ্ছিল। সেদিন দিনের আলোয় ওই সামান্য সময়ের মধ্যে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা ভয়ানক বললেও কম বলা হয়। হ্রদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অদ্ভুত পাথরগুলো এক কথায় রহস্যময়। রোদ পড়লেই পালটে যায় চরিত্র। সে নিজে তো সামান্য, তাকাসিমার মতো বৈজ্ঞানিকও ভেবে থই করতে পারেননি। অগত্যা কী ঘটতে পারে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। উত্তর না দিয়ে প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল দূরে আকাশের দিকে।
বিশাল হেলিকপ্টারটা তখন দ্বীপের সেই পাহাড়ের মাথায় পৌঁছে কয়েকটা চক্কর দিয়ে নামতে শুরু করেছে। রোটার ব্লেডের গতি কমে আসছে। দু’জন তাকিয়ে দেখল হঠাৎই গোটা আকাশযানটা রোদের উপর রাখা উঁচু মানের রিফ্লেকটারের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল। তারপর চোখের পলকে গোঁত্তা খেয়ে নেমে গেল নীচের দিকে। কোনো এক বিপুল শক্তি যেন খাবলে ধরে টেনে নিল সেটাকে। ব্যাপারটা কী হল বুঝবার আগেই তীব্র আলোর ঝলক। কান ফাটানো আওয়াজ। গোটা পাহাড়টা মুহূর্তে টুকরো টুকরো হয়ে ছিটকে উঠল। হঠাৎ জেগে ওঠা আগ্নেয়গিরির মতো বড়ো বড়ো পাথরের টুকরো, এমনকি হ্রদের জল লাফিয়ে উঠল অনেক উঁচুতে। ভলকে ভলকে আগুন আর ধোঁয়া উৎক্ষিপ্ত হতে লাগল। ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশ মুহূর্তে কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে গেল। ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল চারপাশ। দূরে প্রবাল দ্বীপের খাঁড়ির ভিতর নৌকোয় বসেও সেটা বুঝতে পারল ওরা।
বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে প্রতাপ তাকিয়ে ছিল সেই দিকে। হঠাৎ ড. তাকাসিমা দুই হাতে মুখ ঢেকে আর্তনাদ করে উঠলেন, “হায় হায়, এ আমি কী করলাম প্যাট! কয়েক কোটি বছর ধরে প্রকৃতির আপন হাতে বাঁচিয়ে রাখা জীবন্ত মিউজিয়াম ধ্বংস করে ফেললাম! হায় হায়।” দুই হাতে কপালে সমানে আঘাত করতে লাগলেন মানুষটি। উন্মাদের মতে কাঁদতে শুরু করলেন।
ঘটনার আকস্মিকতায় প্রতাপ নিজেও হতচকিত হয়ে পড়েছিল। সামলাতে কিছু সময় লাগল। তারপর যথা সাধ্য মানুষটাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা। কিন্তু ফল হল না। দারুণ অনুশোচনায় মানুষটির ভিতরে তখন উন্মাদের লক্ষণ। দিন কয়েক আগে হ্রদের সেই ঘটনার পর থেকেই মানুষটার ভিতর কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছিল। অতি মামুলি ব্যাপারও ভুল করে ফেলছিলেন। স্মৃতি-ভ্রম। এখন উন্মাদ।
অসুস্থ মানুষটাকে নিয়ে প্রবালদ্বীপে দিন তিনেক কাটাবার পর সেই নির্দিষ্ট জাহাজ ধরে প্রতাপ যখন ম্যানিলায় পৌঁছল মানুষটা তখন বদ্ধ উন্মাদ। কাউকেই চিনতে পারছেন না। সমানে ভুল বকছেন। তাঁকে হসপিটালে ভর্তি, চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা করে প্রতাপ প্রথমেই খবর নিল জেডের মাফিয়া দলের।
বেন ম্যাক্সিম খুন হয়েছে জেডের হাতে। লি পেং আগেই দল ছেড়ে চম্পট দিয়েছে। অনেক খুঁজেও জেড তার সন্ধান পায়নি। জেড নিজেও তারপর নিখোঁজ। কোনও সন্ধান নেই। বলা বাহুল্য দলের অবস্থা শোচনীয়। সব খবর নিয়ে দিনকয়েক পরে পুরোনো শহর হংকংয়ে ফিরে এল প্রতাপ।
খবর পেয়ে অনেক পুরনো সঙ্গী ছুটে এল। প্রায় ছেঁকে ধরল তাকে। জেড নিখোঁজ। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে অত বড়ো দলটার খুবই করুণ অবস্থা। ইতিমধ্যে গোটা কয়েক টুকরো হয়ে গেছে। নিজেদের মধ্যে মারদাঙ্গাও চলছে। পুলিশের হাতে ধরাও পড়েছে কয়েকজন। অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এই অবস্থায় একমাত্র প্যাটই পারে দলটার হাল ধরতে। বিরাট প্রতিপত্তি, ক্ষমতা, অর্থ সব কিছুই তখন হাতের মুঠোয়।
কিন্তু এ-সবের কোনও কিছুতে তার আর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই তখন। সে এবার ফিরে যাবে নিজের দেশে। মায়ের কাছে। কলকাতা ছেড়ে চলে যাবে দূরে কোথাও। মাকে নিয়ে কাটিয়ে দেবে সেখানে। তারপরে সেই শান্ত নিরিবিলি দিনগুলো যদি কখনও অসহ্য মনে হয়, ফের যদি মৃত্যুর ডাক পায়। হাতছানি দেয় ফেলে যাওয়া এই উদ্দাম জীবন, তখন হয়তো সব ফেলে আবার ভেসে পড়বে অজানার উজানে। কিন্তু সে তো পরের কথা। এখন যে দেশে ফিরতেই হবে।
-
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন