অভীক মুখোপাধ্যায়
ছুম ছনন ছম ছুম ছনন ছম ছুম ছনন ছম ছুম...
ছনননন ছনননন ছনননন ছনননন ছুম ছনন ছম ছুম...
ছম...ছম...ছম...ছম...ছুম...ছনন ছম...ছুম...
রাত্রির নিবিড় স্তব্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করে বেজে চলেছে এক অদৃশ্য ঘুঙুরের ধ্বনি। সেই ধাতব স্বর-লহরা ধীরে ধীরে আমাকে যেন তার মায়াপাশে বেঁধে ফেলছে। নিজের অজান্তেই বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়েছি আমি। এক-পা দু-পা করে সেই শব্দের উৎস লক্ষ করে এগিয়ে চলেছি, এমন সময় এক নারীকণ্ঠ বাধা দিল আমায়, ‘দাঁড়ান, ওদিকে যাবেন না!’
আমি পিছনে ফিরে তাকালাম। দেখলাম, এক অপরূপা হাতের ইশারায় আমাকে থামতে বলছেন। কিন্তু তখনও আমার কানে বেজে চলেছে সেই ঘুঙুরের মধুর ছন্দ। সে এক অমোঘ আকর্ষণ। নেশার মতো। আবারও আমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম। নিষেধ না-মেনে পা-বাড়াতেই কখন যেন সেই নারী আমার বাঁ হাতটাকে শক্ত ভাবে চেপে ধরলেন।
‘বললাম না, ওদিকে যাবেন না!’
মুহূর্তের জন্য মনে হল, আমার হাতটা যেন কোনো হিমশীতল লতা আঁকড়ে ধরেছে। আমি এক ঝটকায় হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে বললাম, ‘কেন?’
‘কারণ তাতেই আপনার মঙ্গল। ওই যে ঘুঙুরের শব্দ শুনছেন, ওটা দেবদাসী-নৃত্য। দেবতা ছাড়া আর কেউ দেবদাসীর লাস্য দেখার অধিকারী নন। তাছাড়া আপনি ওখানে গিয়ে কিছুই দেখতে পাবেন না। আপনি বরং এখানেই থাকুন। কানে যেটুকু শব্দ আসছে আসুক। ওটুকুই প্রাপ্তি বলে ধরে নিন। কেমন?’
‘কিন্তু...’
‘কোনো কিন্তু নয়। আপনি এটাকে অনুরোধ ভাবলে অনুরোধ, আদেশ ভাবলে আদেশ। দেখুন, আপনার সঙ্গে আমার কোনও শত্রুতা নেই। আপনি আমাকে চেনেন না, আমিও আপনাকে চিনি না। আপনার ভালোর জন্যই বলছি, ওদিকে যাওয়া ঠিক হবে না। আসুন, আমরা ওই শিমুল গাছটার নীচে গিয়ে বসি। আসুন না!’
ওই ঘুঙুরের ধ্বনি, ওই নিক্কন আমাকে যেন সম্মোহিত করে ফেলেছিল। তাই সেই অপরিচিতার আহ্বানে সাড়া দিতে আমার ঠিক মন চাইছিল না। ওই কিঙ্কিণীর শব্দই এখন আমার মনের বিলাস, প্রাণের আরাম। আমাকে আরও একবার অবাক করে দিয়ে ওই রূপসী নিঃসঙ্কোচে আমার হাতটা আঁকড়ে ধরলেন। আমি আবারও সেই কনকনে স্পর্শে শিউরে উঠলাম। তার হাতের বজ্রমুঠি থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, চলুন।’
মাঘ মাস। শুক্ল সপ্তমীর চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। শীতল চন্দ্রাতপ। অবিরত হিমেল হাওয়া বয়ে চলেছে। আশেপাশে কুয়াশা এসে জমাট বেঁধেছে। তারই মধ্যে চাঁদের আলো পড়ে এক মোহময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। মোহিনী রূপবতী ওই রমণীকে নীল শাড়িতে মানিয়েছে বেশ। সে যেন নীল-সরোবরের মাঝে ফোটা শ্বেতপদ্ম। আশ্চর্য! এতক্ষণে খেয়াল হল যে, এই শীতের রাতেও ওই রূপসীর গায়ে কোনো গরম পোশাক নেই। পায়ে নেই জুতো জোড়াও! তাকে যত দেখছি, আমার শীত-শীত অনুভূতিটা যেন ততই বাড়ছে। আমি না-পেরে তাকে জিজ্ঞেস করে বসলাম, ‘আজ বেশ ঠান্ডা পড়েছে। আপনার শীত করছে না? আমার তো এই জ্যাকেট চাপিয়েও শীত করছে!’
‘ও আমার অভ্যেস আছে। সমুদ্রের কাছাকাছি এলাকায় কখনো তেমন ভয়ানক শীত পড়ে না। আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। আচ্ছা, এবার আমি কি একটা প্রশ্ন করতে পারি?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, করুন না! প্রশ্ন-উত্তরের হাত ধরেই তো অচেনা মানুষ চেনা হয়ে যায়।’ আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, এই অল্প সময়েই তার প্রতি আমার একটা আকর্ষণ বোধ তৈরি হয়েছে। আমি চাইছিলাম, আমাদের মধ্যে অনেক কথা হোক।
‘এত রাতে আপনি এখানে কী করছেন? সবাই যখন ঘুমোতে ব্যস্ত, তখন এই ভাঙা দেউলে কী খুঁজে বেড়াচ্ছেন শুনি?’
‘হ্যাঁ, খুঁজতেই তো এসেছি। অতীত খুঁজে বেড়াচ্ছি। এটা আমার নেশা। আচ্ছা, আপনার করা এই প্রশ্নটাই যদি আমি আপনাকে করি?’
‘হ্যাঁ, সে আপনি করতেই পারেন। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এই ঘুরে বেড়ানোটা নেশা নয়, নিয়তি। আগে বলুন, অতীতে আপনি কী খুঁজে বেড়ান?’
‘কী খুঁজি, তা নিজেও জানি না। একটা ব্যাকুল মন বর্তমানের সংঘর্ষ আর ভবিষ্যতের স্বপ্নের থেকেও বেশি ব্যস্ত করে তুলে আমাকে বলে, ইতিহাসেই তুই সব খুঁজে পাবি। ওখানেই সবকিছুর উত্তর আছে। আর তাই বোধহয় আমার মনটা এমন অতীতমুখী হয়ে গেছে।’
‘তবুও...কোনো একটা আকর্ষণের বিষয় তো নিশ্চয়ই আছে। তা বলা যাবে না বুঝি?’
‘আকর্ষণের কারণ যে একেবারে নেই, তা বলব না। আমি ইতিহাসের গল্প খুঁজি। পাষাণে নিঃশ্বাস খুঁজি, স্পন্দন খুঁজি, প্রেম সন্ধান করি। বলতে পারেন, আমি একজন কল্পনাজীবি। ইতিহাসের কাহিনি লিখি।’
‘বেশ বেশ। আপনার মতো অনেক মানুষই এখানে ছুটে আসেন লেখালিখি করার টানে। তা পেলেন কোনো কাহিনি? নতুন কিছু?’
‘না, এখনও কিছু পাইনি। আর প্রতিবার খুঁজতে বেরিয়ে যে পেতেই হবে এমন তো কোনও কথা নেই! তবে একটা কথা বলি, ওই লিখে ফেলা হাজার-হাজার গল্পের পরেও এমন অনেক গল্প থেকে যায়, যা শুধু মানুষের মুখে-মুখে ফেরে। আমি সেই গল্পগুলোই খুঁজি।’
‘সত্যিই আপনি কল্পনাজীবি! এই নিশুতি রাতে, প্রাচী নদীর তটে কেমন গল্পের টুকরো কুড়োতে বেরিয়েছেন! কুড়োনো হয়ে গেলে আবার ঘরে ফিরে যাবেন...।’
‘তা কেন হবে? গল্প কি আর ওভাবে মেলে? তবে ওই ঘুঙুরের শব্দ...আমার মন বলছে ওর পেছনে কিছু-না-কিছু কাহিনি তো আছেই। কিন্তু আপনি যে আবার ওইদিকে আমাকে যেতেই দিচ্ছেন না!’
‘বেশ বুঝতে পারছি, এই এলাকায় আপনি নতুন। আপনার গল্প সন্ধানে আমি বাধা দিয়ে ক্ষতি করেছি বটে, কিন্তু জানবেন যা করেছি আপনার ভালোর জন্যেই করেছি। তবে...’
‘তবে?’
‘আপনি চাইলে আমি কিন্তু আপনার লোকসানের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে পারি।’
‘ক্ষতিপূরণ? কিন্তু কীভাবে?’
‘একটা গল্প বলে...যে গল্পটা আগে কেউ বলেনি, কেউ শোনেনি।’
‘অ-পূ-র্ব! তবে ওটা ক্ষতিপূরণ নয়, আপনার অনুগ্রহ।’
‘বেশ, তা-ই। তবে আপনার কথা শুনে আপনার সম্পর্কে আমার মনে যে ধারণা তৈরি হয়েছে তাতে আপনি এই কাহিনির একজন উপযুক্ত দাবিদার। আসলে এখানে যারা আসে, তারা কেউ এভাবে গল্প খোঁজে না। তারা সাদা চোখে ইতিহাস খোঁজে। কিন্তু আপনাকেই প্রথম দেখলাম, আপনি পাষাণে শ্বাস, স্পন্দন আর প্রেম খুঁজছেন। আমার এই কাহিনিতে আপনি এসবের চেয়েও অনেক বেশি কিছু খুঁজে পাবেন। আমারও লাভ বইকি। কতদিন হয়ে গেল কারো সঙ্গে মন খুলে গল্প করিনি। আপনাকে এই কাহিনি শোনাতে পারলে আমিও শান্তি পাব।’
‘সবই তো বুঝলাম। কিন্তু এই কাহিনি শোনাতে নিশ্চয়ই অনেক সময় লাগবে। এমন নির্জন জায়গায় একজন অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে এভাবে গল্প করতে আপনার ভয় করবে না? যদি আপনাকে খুঁজতে কেউ এসে পড়ে? আমাদের দেখে তারা কিছু বলবে না? আমাকে মাফ করবেন। আমার নিজেকে নিয়ে চিন্তা নেই। এখানে আমি পর্যটক। কিন্তু দেখবেন, আমার জন্যে আপনাকে অপবাদের পাত্র না হতে হয়। এত কথা বলছি কারণ, এটা আপনার পরিচিত এলাকা।’
‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। কোনো সমস্যা হবে না। প্রথম কথা হল, এদিকে কেউ আসবেই না, আর কেউ দেখলেও আমার তাতে কিচ্ছু যায়-আসে না। আমার কোনো পরিবার নেই। একটা সময়ে অবশ্য ছিল। স্বামী, শাশুড়ি-মা, দেওর...সবাই মারা গেছেন।
‘আপনার কথায় আর আপনার বাহ্যিক রূপে তো বিস্তর ফারাক দেখছি। কপালে সিঁদুর পরে আছেন, আর বলছেন আপনার স্বামী মারা গেছেন। স্বামী মারা যাওয়ার পরে কি কোনো ভারতীয় বিধবা নারী সিঁদুর পরেন?’
‘আমি মনে করি, আমার স্বামী তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে বেঁচে আছেন। এই সৌভাগ্য-সিঁদুর তাই আজও আমার সিঁথি আলো করে থাকে।’
‘আর সমাজ? সমাজকে ভয় করেন না?’
‘আপনার সমাজ আর আমার সমাজের মানসিকতায় কয়েক শতাব্দীর পার্থক্য, বন্ধু। আপনার সমাজ আমার মানসিকতাকে স্পর্শ করতে পারবে না। আমি আপনার সমাজের মানসিকতা নিয়ে চিন্তিতও নই। আসুন না, বসি। দুটো গল্প করি।’
একটা মিষ্টি গন্ধে মন মাতাল হয়ে উঠছে বারবার। ঝরনা ধারায় চাঁদের আলো ঝরে পড়ছে। চারিদিক থেকে ভেসে আসছে অদ্ভুত তালে লয়ে বেজে চলা সুমধুর শব্দ...
ছুম ছনন ছম ছুম ছনন ছম ছুম ছনন ছম ছুম...
ছনননন ছনননন ছনননন ছনননন ছুম ছনন ছম ছুম...
শিমুল গাছটার নীচে দুজনে বেশ ঘনভাবেই বসলাম। এতটাই কাছাকাছি যে তার শাড়ির আঁচল আমাকে অবিরত স্পর্শ করে চলেছে। না, এর মধ্যে কোনো কামনা নেই। যেন ভাইয়ের সঙ্গে বহু বছর পরে দিদির দেখা। এই ভালোবাসা অনন্য। সম্ভবত এটাই বন্ধুত্ব। অপরিচিত দুটি মানুষ সহসা জড়িয়ে পড়েছে একটা না-বলা কাহিনির রজ্জুতে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই বসে থাকার পর আমিই বললাম, ‘এবার শুরু করুন তাহলে শুনি!’
‘সেটাই তো ভাবছি, কোথা থেকে যে শুরুটা করি।’
‘একেবারে গোড়া থেকে—’
অপরূপা অদ্ভুত সুন্দরভাবে হাসলেন। মনে হল, এক নিমেষে চাঁদ নেমে এসেছে মাটিতে।
আমার চোখে চোখ রেখে তিনি বললেন, ‘আপনি লেখক মানুষ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনার লেখনীতে আমার এই কাহিনি জীবন্ত হয়ে উঠবে। কাহিনিটা কিন্তু দ্বাপর যুগের...। সেই যুগ তো আর আমি দেখিনি, কেবল তার গল্প শুনেছি।’
দ্বাপর যুগ! আমার গায়ে শিহরন খেলে গেল। যাক, আমি নিশ্চিন্ত, আমার সুন্দরী বন্ধুনীটি তাহলে গল্প-বলার প্রথম বিন্দু পেয়ে গেছেন।
‘এতদিনে কোনার্ক মন্দির নিশ্চয়ই ঘুরে দেখে ফেলেছেন? পাশেই একটা আশ্রম আছে। জনশ্রুতি আছে, এই আশ্রম দ্বাপর যুগের। কৃষ্ণের পুত্র শাম্ব এই আশ্রম তৈরি করেছিলেন। কৃষ্ণের আট পাটরানি ছিলেন—রুক্মিণী, জাম্ববন্তী, সত্যভামা, কালিন্দী, মিত্রবিন্দা, নগ্নজিতি, ভদ্রা এবং লক্ষ্মণা। এঁদের মধ্যে জাম্ববন্তীর গর্ভজাত সন্তান শাম্বকে নাকি অবিকল কৃষ্ণের মতোই দেখতে ছিল। একবার নাকি রুক্মিণীর পুত্র প্রদ্যুম্ন অপহৃত হয়েছিলেন বলে এই আটজন মা জাম্ববন্তীর পুত্রসন্তানটিকে কখনো নিজেদের চোখের আড়াল করতেন না। এবং এই কারণেই কৃষ্ণ মজা করে শিশুটির নাম রাখলেন সাম্ব। স-অম্ব; অম্বা বা অম্ব মানে মা। অর্থাৎ সাম্ব মানে যে সর্বদা মায়ের কাছে থাকে। সেই নামটাই লোকের মুখে–মুখে হয়ে গেল শাম্ব।
‘কৃষ্ণ নিজের জীবদ্দশাতেই একজন কিংবদন্তী যুগপুরুষে পরিণত হয়েছিলেন। তবে কৃষ্ণ বলুন বা আজকের রথী-মহারথী রাজনেতা, যুগপুরুষদের জীবনের সবথেকে বড় বিড়ম্বনা হল সাধারণ মানুষের সামনে তাঁদের মহিমা যত প্রবল হয়, ততই তাঁদের জীবনে আত্মীয়-কুটুমের প্রভাব ক্ষীণ হতে থাকে।
‘কৃষ্ণ তখন আর্যাবর্তের রাজনীতি নিয়ে ভয়ানক ব্যস্ত। স্ত্রী-পুত্রদের জন্য সময় নেই হাতে। আট মায়ের অতিরিক্ত স্নেহপ্রশ্রয়ে শাম্ব কিছুটা উদ্ধত হয়ে উঠেছিল। আগেই বললাম, শাম্ব আর কৃষ্ণকে আলাদা করে চেনা যেত না। শোনা যায়, সে নাকি কৃষ্ণের থেকেও বেশি সুদর্শন হয়ে উঠেছিল। আর কৃষ্ণপুত্র হওয়ায় গর্বে সে ছেলের মাটিতে নাকি পা পড়ত না। কিন্তু শাম্ব ছিল অবোধ শিশুর মতোই সরল।
মহর্ষি নারদ একদিন দ্বারকায় গেলেন। উদ্ধত শাম্ব তাঁকে যথোচিত সম্মান দিল না। নারদ ভারি অপমানিত বোধ করলেন।
পৌরাণিক কাহিনিতে আমরা নারদের ভূমিকা দেখেছি। তিনি কুচক্রী, তাল লাগাতে পারলে আর কিছু চান না। নারদ এই অপমানের প্রতিশোধ নিলেন অত্যন্ত ক্রূরভাবে। তিনি কৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাতে এক মোক্ষম চাল চাললেন, ‘দ্বারকাধীশ, আপনার পুত্র শাম্ব অজাচার করছে।’
কৃষ্ণ বললেন, ‘তাই নাকি? প্রমাণ দাও।’
নারদ এবার তাঁর প্রিয় খেলাটা খেললেন। তিনি শাম্বকে বললেন, ‘তোমার পিতা কৃষ্ণ রৈবতক পর্বতে তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।’
শাম্ব তৎক্ষণাৎ রওনা হল সেখানে। রৈবতক পর্বতে পৌঁছে সে দেখল, সেখানে এক জলাশয়ে গোপিনীরা জলকেলি করছে। শাম্ব কিন্তু গোপিনীদের মাতৃজ্ঞানেই শ্রদ্ধা করত। কিন্তু সমস্যা বাধল অন্য জায়গায়। প্রেমভাবে মূহ্যমান গোপিনীরা শাম্বকে দেখে ভুল করে কৃষ্ণ ভেবে বসল। তারা শাম্বকে টেনে জলে নামিয়ে আলিঙ্গনে-চুম্বনে ভরিয়ে তুলল। শাম্ব কিন্তু গোপিনীদের আচরণকে মাতৃস্নেহ বলেই ভেবেছিল। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই তার দিক থেকে কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ আসেনি।
গোপিনীদের মাতৃপ্রেমে শাম্ব ডুবে গেল। সেই অবস্থাতেই কৃষ্ণকে রৈবতকে এনে নারদ সব দেখালেন, পুরো ঘটনাটাকেই নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করলেন। যুগপুরুষ কৃষ্ণের গর্জনে সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। ক্রুদ্ধ কৃষ্ণ নিজের ডান হাতের তর্জনী তুলে শাম্বকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘শাম্ব, তুমি মাতৃসমা গোপিনীদের সঙ্গে প্রণয়লীলা করছ, লজ্জা করছে না? যদি তুমি আমার পুত্র না-হতে, তবে আমার সুদর্শন চক্রে এতক্ষণে তোমার মুণ্ডচ্ছেদ হয়ে যেত। পুত্রমোহ আছে বলেই আজ তা সম্ভব হল না।
‘আমি তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি শাম্ব, তোমার যে রূপ তোমার ঔদ্ধত্যের কারণ, সেই রূপই তোমার বিদ্রুপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তোমার এমন অবস্থা হবে যে, তুমি লজ্জায় কারো সামনে দাঁড়াতেই পারবে না। তোমার এই রূপ, এই সৌন্দর্য থাকবে না, শাম্ব। যতদিন বাঁচবে, ততদিন নিজের অহংকারের স্মৃতি নিয়ে বাঁচবে। যদি জীবনের প্রতি মুহূর্তে আমি রাধাকে সত্যিই স্মরণ করে থাকি, যদি আজীবন আমি মাতা দেবকী এবং মা যশোদার মধ্যে কোনো বিভেদ না-করে থাকি, যদি রমণের কোনো মুহূর্তে আমার আট স্ত্রী’র মধ্যে কোনও ভেদাভেদ না–করে থাকি, এবং সর্বোপরি, আজকের আগে যদি কখনো কোনো অনৈতিক কাজ না-করে থাকি, তবে আজই, এই মুহূর্তে, তোমার শ্বেত কুষ্ঠ হোক! শাম্ব, যুগন্ধর কৃষ্ণ তোমাকে এই অভিশাপ দিল...’।
কৃষ্ণের এই অভিশাপের ফলস্বরূপ তৎক্ষণাৎ শাম্বের শ্বেত কুষ্ঠ দেখা দিল।
কৃষ্ণের হুঙ্কারে বাতাস স্তম্ভিত হল। দশ দিক কেঁপে উঠল। নারদ মুনি গ্লানিতে জড়ভরত হয়ে গেলেন। গোপিনীরা হায় হায় করে উঠল, ‘ক্ষমা...ক্ষমা করো কৃষ্ণ! ক্ষমা নন্দলাল! ক্ষমা করো শাম্বকে। পুত্রবৎ শাম্ব নির্দোষ, নিরপরাধ! হে মাধব, তুমি জীবনে কখনো কোনো অনুচিত কাজ না-করলেও তোমার আজকের এই অভিশাপে অন্যায় হল। তোমার ভুল ভাঙো, দামোদর। ওরে, কেউ রাধিকাকে ডেকে আন। হে মধুসূদন, ব্রজবালাদের আমরণ বিরহজ্বালায় জ্বালিয়েও কি তোমার শান্তি হয়নি যে, গোপিনীদের জুড়ে এই কলঙ্কের কথা সময়ের কপালে লিখে দিলে? যদি শাম্ব অপরাধী হয়ে থাকে, তাহলে গোপিনীরাই বা অপরাধ-মুক্ত থাকে কীভাবে? যদুকুলশিরোমণি, তোমার এই অভিশাপ ফিরিয়ে নাও। এই ভুলের মার্জনা করো, রাধাবল্লভ। আমরা শপথ করে বলছি, তোমার নামে শপথ করে বলছি, শাম্ব নির্দোষ।’
কৃষ্ণ বুঝে গেলেন যে, তিনি মস্ত বড় ভুল করে বসেছেন। তিনি পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলেন, ‘আমি নিজের অভিসম্পাত ফিরিয়ে নিতে পারব না। তবে শাম্বকে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ বলে দিচ্ছি। শাম্ব, সময় নষ্ট না-করে তুমি এখনই মৈত্রেয়বনে চলে যাও। সেখানে গিয়ে উপবাসে থাকো, জিতেন্দ্রিয় হও, অখণ্ড ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমে সূর্যদেবের উপাসনা করো। যদি সূর্যদেব কৃপা করেন, তাহলে অচিরেই তুমি সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করবে।’
‘ব্রহ্মচর্য? জিতেন্দ্রিয়? হা কৃষ্ণ, তুমি কি রুক্মিণীর আঁচলে নিজের মন, মতি, বুদ্ধি বেঁধে রেখে এসেছ? কুষ্ঠ-বিগলিত এই দেহ দেখে কে-ই বা শাম্বকে প্রলুব্ধ করতে আসবে? কোন রমণী শাম্বকে এই অবস্থায় দেখে লালায়িত হবে যে ওর ইন্দ্রিয়–নিগ্রহে বাধা আসতে পারে? জীবাত্মা এবং ব্রহ্মের মতো, পদ্ম এবং সূর্য বা অর্কের মতো, প্রাণবায়ু এবং জীবনের মতো আমাদের কাছে কৃষ্ণই স-ব। কৃষ্ণ ভিন্ন অপর কোনো পুরুষ আছে বলেও আমরা বিশ্বাস করি না। শাম্বকে অভিশাপ দেওয়া মানে আমাদের সেই বিশ্বাসকে অপমান করা, কৃষ্ণ। যদি শাম্বকে দেওয়া অভিশাপ ফিরিয়ে নিতে না-পারো, তাহলে আমরা, গোপিনীরাও, তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি যে, যে রাধার নামকে প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করার শক্তিতে তুমি অভিশাপ দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছ, সেই রাধার নামও তুমি ততদিন পর্যন্ত মনে করতে পারবে না, যতদিন অবধি না শাম্ব সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।
‘যাও কৃষ্ণ, আমরা তোমাকে ভুলব না, কিন্তু তুমি একমাত্র তখনই আমাদের মুখ দেখার অধিকার পাবে, যখন তোমার পুত্র শাম্ব নীরোগ হয়ে ফিরে আসবে। হতে পারো তুমি যুগন্ধর, হতে পারো তুমি এই জগতের পুরুষোত্তম, কিন্তু যদি তুমি ব্রজভূমির একবিন্দু দুধ-মাখনের প্রতিও ঋণী থেকে থাকো, তবে পুত্র শাম্বর রোগমুক্তির জন্য চেষ্টা করো।
‘আর, দেবর্ষি নারদ, আপনি...এখানে আপনার উপস্থিতি এবং আপনার গ্লানিভরা মুখ একথাই প্রমাণ করছে যে, এই কুচক্রের মূল পাণ্ডা আপনিই। যদি কৃষ্ণের প্রতি আমরা একনিষ্ঠ হয়ে থাকি, তবে আমরা আপনাকে অভিশাপ দিচ্ছি, দেবর্ষি, মহর্ষি ইত্যাদি শত অভিধায় ভূষিত হলেও আপনি কখনো ঋষি রূপে পূজিত হবেন না।
‘পুত্র শাম্ব, তুমি যাও। রুক্মিণী সমেত আট মাতা এবং রাধা সমেত তোমার এই সকল গোপিনী মায়েদের আশীর্বাদ তোমার সঙ্গে থাকবে। তোমার তপশ্চর্যা সফল হবে। রোগমুক্ত হয়ে ফিরে এসো। আমরা সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করব, পুত্র। তোমার রোগ-মুক্তির মাধ্যমেই আমাদের কলঙ্ক-মুক্তি ঘটবে।’
সবথেকে বড় বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দুটাকে মন দিয়ে লক্ষ করলে তারও একটা কেন্দ্র পাওয়া যায়। জগতের কেন্দ্র যদি কৃষ্ণ হয়ে থাকেন, তবে তাঁর কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন রাধা। রাধা কিন্তু শুধু কোনো নাম নয়। রাধা একটি মন্ত্র। ‘রা’-এর অর্থ—‘প্রাপ্ত হোক’ এবং ‘ধা’ মানে ‘মুক্তি’। এই বিশেষ মন্ত্রই কৃষ্ণের প্রত্যেক শ্বাসপ্রশ্বাসে অজপা জপ হয়ে উচ্চারিত হতো। কিন্তু গোপিনীদের অভিশাপের ফলে সেই মন্ত্রই ভুলে গেলেন কৃষ্ণ। পিতা-পুত্র উভয়েই একইসঙ্গে অভিশপ্ত হয়ে গেলেন।
ব্যাধিগ্রস্ত, অনুতপ্ত, ব্যথিত শাম্ব রৈবতক পর্বত থেকে মৈত্রেয়বনের উদ্দেশে যাত্রা করল। চন্দ্রভাগা নদীর তটে আরম্ভ করল জিতেন্দ্রিয়, উপবাসী, ব্রহ্মচারী জীবনের তপস্যা। আজকের চন্দ্রভাগাই প্রাচীনকালের চিত্রোৎপলা এবং প্রাচী নামে পরিচিত ছিল। অঙ্গদেশের সিহাবা পর্বতশ্রেণী থেকে জন্ম নিয়ে সাগরে মোহানা অবধি নিজের অববাহিকাকে চন্দ্রভাগা সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। আজ নাহয় নদীর জলের স্রোত কম। একটা সময়ে এই ধারাই চিরস্রোতা ছিল। গতিপথের স্থানভেদে ভিন্ন-ভিন্ন নামে পরিচিত এই নদী। গতিপথের শেষে এই নদীই চন্দ্রভাগা নাম ধারণ করে কটকের কাছে বঙ্গোপসাগরে মিশে গিয়েছে।
ওদিকে কিন্তু কৃষ্ণ নিজেও শাম্বর রোগ-মুক্তির জন্যে চিন্তাভাবনা করতে শুরু করেছিলেন। সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় ছিল ইন্দ্রের সাহায্য চাওয়া, কারণ অতীতে ইন্দ্রের সহায়তাতেই অপালা এই কুষ্ঠরোগ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে আবার কৃষ্ণই ইন্দ্রের ক্ষমতা খর্ব করেছিলেন। গোবর্ধন পূজার মাধ্যমে ইন্দ্রের দেবত্ব হরণ এবং কৃষ্ণের দেবত্ব লাভ হয়েছিল। আপনি অনেক পড়াশোনা করেন, তাই একথা নিশ্চয়ই আপনাকে বুঝিয়ে বলতে হবে না, বন্ধু। আর এই রাজনৈতিক বিরোধের কারণেই কৃষ্ণের পক্ষে ইন্দ্রের কাছে সাহায্য চাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। অনেক ভেবেচিন্তে কৃষ্ণ অবশ্য একটা উপায় বের করলেন।
নিজের গুরু সান্দীপনি মুনির পুত্র পুনর্দত্তকে উদ্ধার করার সময়ে কিছু মগদেশীয় ব্রাহ্মণের সঙ্গে কৃষ্ণের পরিচয় হয়েছিল। এই মগ ব্রাহ্মণেরা আবার ছিল তন্ত্র-মন্ত্র এবং ওষধি-বিদ্যায় পারদর্শী। কৃষ্ণ মগদেশ থেকে সতেরোজন ব্রাহ্মণকে আহ্বান করলেন। উদ্দেশ্য একটাই—পুত্র শাম্বর রোগমুক্তি। এভাবে শাম্বর তপশ্চর্যার পাশাপাশি সতেরোজন মগ ব্রাহ্মণের চিকিৎসাও আরম্ভ হয়ে গেল।
এক-এক করে পল, ক্ষণ, প্রহর, দিন, পক্ষ, মাস, বছর গুনে গুনে চিকিৎসা ও তপস্যা চলল। দেখতে দেখতে বারো বছর কেটে গেল। একদিন চন্দ্রভাগাতে স্নান করার সময়ে শাম্ব নদীর জলে সূর্যদেবতার একটি মূর্তি কুড়িয়ে পেল। পাথরের মূর্তি। সে মূর্তিটা নিয়ে নদী থেকে উঠে এল সে।
সেই রাতেই সূর্যদেবের স্বপ্নাদেশ পেল কৃষ্ণ-তনয়, ‘নিজের সতেরো চিকিৎসক ব্রাহ্মণ দিয়ে নদী থেকে প্রাপ্ত মূর্তিটিকে প্রতিষ্ঠা করাও, শাম্ব। এই মূর্তির নির্মাণ স্বয়ং দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা করেছেন। আমার প্রিয় অস্ত্র তেজোপ্রভ নির্মাণ করার পরে অবশিষ্ট পাথরের খণ্ড থেকে এই মূর্তি সৃষ্টি করেছেন দেবশিল্পী। এই মূর্তিটির স্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠা আমার পুত্র কর্ণের করার কথা ছিল, কিন্তু তোমার পিতা কৃষ্ণের ছলনাতেই কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে তার মৃত্যু ঘটে। যুগ যুগ ধরে সূর্য-পুত্রের বিরুদ্ধে এবং ইন্দ্র-পুত্রের পক্ষে বিষ্ণুর অবতারের ছলনা চলে আসছে। ত্রেতা যুগে আমার পুত্র বালির বিরুদ্ধে ইন্দ্র-পুত্র সুগ্রীবের হয়ে শ্রীরামচন্দ্র ছলনার আশ্রয় নিয়েছিলেন। দ্বাপরে সূর্য-পুত্র কর্ণের বিরুদ্ধে এবং ইন্দ্র-পুত্র অর্জুনের পক্ষে কৃষ্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। তাই আমি চাই, আমার এই মূর্তির স্থাপনা কৃষ্ণ-পুত্রের হাতে হোক। এবং এর নামকরণ হোক আমার পুত্র কর্ণের নামে—কর্ণার্ক। আমার এই মূর্তি কর্ণার্ক নামেই বিখ্যাত হবে। আমারই আদেশে চিত্রোৎপলা নিজের জলধারার মাধ্যমে এই মূর্তিটিকে অঙ্গ থেকে কলিঙ্গে বয়ে নিয়ে এসেছে। এই কর্ণার্ক মূর্তির স্থাপনা হলেই তুমি নীরোগ হয়ে যাবে। আমি সূর্যদেব, এই বর দিলাম যে, আজকের পর থেকে এই মর্ত্যলোকে যে ব্যক্তিই আমার নামে মন্দির নির্মাণ করে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করবে, সে-ই তিরোধানের পরে সনাতনলোকের অধিবাসী হবে।’
যে স্থানে শাম্ব তপস্যা করেছিল, ঠিক সেখানেই সে একটা ছোট মন্দির বানিয়ে সূর্যদেবতার ইচ্ছানুসারে তাঁর মূর্তি স্থাপনা করল। মন্দিরটার নাম দিল কর্ণার্ক মঠ। আজও ওই মঠে নিরাকার–ওঙ্কার ব্রহ্মের প্রতীক রূপে কালো, মসৃণ পাথরে নির্মিত সূর্যদেবতার মূর্তির পুজো করা হয়। মঠের পিছনদিকে অবস্থিত একটি পর্ণকুটিরে আজও অখণ্ড ধুনি জাজ্বল্যমান। শাম্ব নিজের হাতে ওই ধুনিতে বৈষ্ণবাগ্নি জ্বালিয়েছিলেন। মঠের প্রাঙ্গণে সতেরোটি সমাধি-মন্দির রয়েছে—সেই সতেরোজন মগ ব্রাহ্মণের সমাধিস্থল।
দ্বাপর যুগে এই জায়গাটারই নাম ছিল মৈত্রেয়বন। সূর্যমন্দির নির্মাণের পরে কর্ণার্ক মঠের অনুসরণে এরই নাম হয়ে গেল কর্ণার্ক ক্ষেত্র। কিন্তু কর্ণ নিজেই একটি অভিশপ্ত চরিত্র ছিলেন। তাঁর ভাগ্যে অপযশ ছাড়া আর কখনো কিছুই জোটেনি। তাই তাঁর নাম থেকে এই স্থানের নামকরণ হলেও মানুষ ভুলে গেল কর্ণ থেকেই কর্ণার্ক শব্দটি এসেছে। এমনিতেই বাংলা ‘কথা’কে উড়িষ্যায় বলে ‘কোথা’। সবকিছুই একটু টেনে-টেনে উচ্চারণ করা হয় এদিকটায়। স্থান, কাল আর পাত্রের ভেদে এভাবেই ‘কর্ণার্ক’ হয়ে গেল ‘কোর্ণার্ক’। পরে মূর্ধন্য-ণ-এর মাথায় বসা রেফটুকুও জিভের সুখে উঠে গেল। পড়ে রইল কোণার্ক।
আমি অবাক হয়ে তার বলা প্রত্যেকটা বাক্য শুনে চলেছি। অপশ্রুতির অগুনতি জাল ছিন্ন হয়ে চলেছে পরের পর। শরীরে-মনে শিহরন জেগে উঠছে। না, ঠান্ডায় নয়, কথার উষ্মায় শীত তো কখন বিদায় নিয়েছে। এই শিহরনের কারণ সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু ঠিক কী কারণে, তা-ও আমি বলে বোঝাতে পারব না।
আমার বন্ধুনীটি একই ভঙ্গিতে দীর্ঘক্ষণ বসে ছিলেন। মাঝে মাথা থেকে আঁচলটা একবার খসেও পড়েছিল। দেখলাম সঙ্গে সঙ্গে তিনি আঁচল দিয়ে মাথা ঢেকে নিলেন।
আমি বললাম, কই, বলতে শুরু করুন—।
মুখে স্মিত হাসি টেনে তিনি শুরু করলেন, আমার কাহিনিতে কিন্তু উড়িষ্যা বা উৎকল রাজ্যের ইতিহাস এসে পড়বে। আপনি কল্পনাপ্রবণ মানুষ, তাই আশা করি, কথায়-কল্পনায় মিলেমিশে যাওয়া এই কাহিনির মধ্যে যে পৌরাণিক আখ্যান, ঐতিহাসিক তথ্য, মানুষের হাসি-কান্নার মতো বিষয়গুলো আছে, সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দেবেন। নইলে কিন্তু ঠিকঠাক স্বাদ পাবেন না।
প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ হয়ে এখনকার এই উড়িষ্যাকে কলিঙ্গ, উৎকল, উৎ্করাত, ওড্র, ওদ্র, ওড্রদেশ, ওড, ওড্ররাষ্ট্র, ত্রিকলিঙ্গ, দক্ষিণ কোশল, কঙ্গোদ, তোষালি, চেদি, মৎস ইত্যাদি বহু নামে ডাকা হয়েছে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে কোনো নামই সম্পূর্ণ উড়িষ্যাকে ইঙ্গিত করে না। প্রতিটা নামই বিভিন্ন সময়ে উড়িষ্যা রাজ্যের খানিকটা করে অংশের প্রতিনিধিত্ব করেছে।
সংস্কৃত শব্দ ‘ওড্র’ থেকে উড়িষ্যা শব্দটি এসেছে। ওড্র রাজ্যের স্থাপনা করেছিলেন ভগীরথের বংশজাত রাজা ওড্র। সময়-সারণীর দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাব যে, খ্রিস্ট-পূর্ব তৃতীয় শতক থেকে ওড্র রাজ্যে মহামেঘবাহন বংশ, মাঠর বংশ, নল বংশ, বিগ্রহ এবং মুদ্গল বংশ, শৈলদ্ধোব বংশ, ভৌমকর বংশ, নন্দোদ্ধব বংশ, সোম বংশ, গঙ্গ বংশ এবং সূর্য বংশের রাজাদের রাজত্ব ছিল।
প্রাচীনকালে উৎকলের অধিকাংশটাই কলিঙ্গ নামে পরিচিত ছিল, কারণ সেইসময়ে কলিঙ্গই ছিল উৎকল রাজ্যের রাজধানী। ২৬১ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে সম্রাট অশোক কলিঙ্গ জয় করলেন। ইতিহাস বলছে, ভয়ানক যুদ্ধের শেষে চতুর্দিকে হতাহত মানুষের সংখ্যা দেখে অশোকের মনে বিরাট পরিবর্তন আসে। তারপর তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তী জীবনে একজন প্রজাবৎসল সম্রাট রূপে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার-প্রসারেই তাঁর জীবন কাটে।
অশোক নানা স্থানে শিলালেখ উৎকীর্ণ করালেন। ধৌলি কিংবা জগৌদার মতো জায়গায় নিজের ধর্মীয় সিদ্ধান্ত খোদাই করালেন অভিলেখগুলোতে। শিল্পের মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারে গতি আসতে পারে, এটা বুঝেই সম্রাট অশোক ললিতগিরি, রত্নগিরি, উদয়গিরি এবং লগুন্ডীর মতো স্থানে বোধিসত্ত্ব আর অবলোকিতেশ্বরের অনেক মূর্তি নির্মাণ করালেন। ২৩২ খ্রিস্ট-পূর্বে সম্রাট অশোকের মৃত্যু ঘটে। এরপরেও অবশ্য কিছু সময় জুড়ে কলিঙ্গে মৌর্য সাম্রাজ্যের আধিপত্য ছিল, কিন্তু ১৮৪ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ থেকে এখানে চেদি বংশের শাসন আরম্ভ হয়ে যায়। মহামেঘবাহন প্রথম চেদি রাজা রূপে কলিঙ্গের শাসক হন।
৪৯ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে কলিঙ্গের শাসনভার হাতে তুলে নিলেন চেদিরাজ খারবেল। তাঁর হাত ধরে কলিঙ্গের সেনাবাহিনীর গতিবিধি অতিরিক্ত মাত্রাতেই বৃদ্ধি পেল। তাঁরই ক্ষমতাবলে চেদি শাসন ভারতের পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তার লাভ করল। উত্তরে মথুরা থেকে দক্ষিণের পাণ্ড্য বংশের কোনো রাজাই খারবেলের তরবারির সামনে দাঁড়াতে পারেননি। খারবেলের রাজত্বে জৈন ধর্ম প্রতিপত্তি লাভ করল। খারবেল বিভিন্ন মাধ্যমের দ্বারা জৈন ধর্মের প্রসার ঘটিয়েছিলেন, তারই প্রমাণ উদয়গিরি এবং খণ্ডগিরির গুহা।
১৭৪ খ্রিস্টাব্দে গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী কলিঙ্গ অধিকার করলেন। এরপর এই বংশ ২০২ খ্রিস্টাব্দ অবধি শাসন বজায় রাখল। এই বংশের অন্তিম রাজার নাম যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণী।
এই পর্যন্ত ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণীর মৃত্যুর পরে কলিঙ্গের রাজনীতির আকাশে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। বারংবার সংঘাত চলল। উত্তর ভারতের কয়েকটি ছোট ছোট রাজবংশ—কুষাণ, মুরুণ্ড, নাগ এই মাটিতে শাসন করতে এল এবং অল্প সময়ের মধ্যে চলেও গেল। তখনও অবশ্য সমুদ্রগুপ্তের দক্ষিণ ভারত অভিযান আরম্ভ হয়নি।
সমুদ্রগুপ্তের পর পরই নতুন একটি শক্তি উঠে এল—মাঠর বংশ। তাঁদের শাসন চলল ৪৯৮ খ্রিস্টাব্দ অবধি। কলিঙ্গ এই সময়টাতে নানাক্ষেত্রেই বিরাট সমৃদ্ধ হয়েছিল।
মাঠরদের পর ৫০০ খ্রিস্টাব্দে নল বংশের শাসন আরম্ভ হল। এই রাজবংশের শাসনের সময়ে ভগবান বিষ্ণুর পুজো প্রচলিত ছিল। নল বংশের বিষ্ণুভক্ত রাজা স্কন্দবর্মণ পোডাগোড়াতে একটি বিষ্ণুমঠ নির্মাণ করেছিলেন। নলদের পর এল বিগ্রহ এবং মুদ্গল বংশ, শৈলোদ্ধব বংশ এবং তারও পরে ভৌমকর বংশ কলিঙ্গ বিজয় করল। ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতকে উড়িষ্যার তটে শৈলোদ্ধব বংশ শাসন করছিল। উত্তরের মহানদী থেকে আরম্ভ করে দক্ষিণে মহেন্দ্রগিরি অবধি তাঁদের রাজত্ব ছড়িয়ে পড়েছিল। এই সময়পর্বেই দেশবিদেশের সঙ্গে উৎকলের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেল। সুবর্ণদ্বীপের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হল। সুবর্ণদ্বীপ বুঝলেন তো? আজকের ব্রহ্মদেশ। ষষ্ঠ–সপ্তম শতকে কলিঙ্গ রাজ্যের শিল্পকলায় উন্নতির জোয়ার এল। সর্বোৎকৃষ্ট! এই সময়েই জন্ম নিয়েছে স্বর্ণজলেশ্বর, রামেশ্বর, লক্ষ্মণেশ্বর, ভরতেশ্বর, শত্রুঘ্নেশ্বর কিংবা পরশুরামেশ্বরের মতো মন্দির।
ভৌমকর বংশের সম্রাট দ্বিতীয় শিবাকর দেবের রানি মোহিনীদেবী ভুবনেশ্বরে মোহিনী মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। এই দ্বিতীয় শিবাকর দেবের ভাই প্রথম শান্তিকর দেবের শাসনকালে উদয়গিরি-খণ্ডগিরির পাহাড়ে অবস্থিত গণেশ গুহা আবার তৈরি হয়েছিল। ধৌলগিরির পাহাড়ে একটি বৌদ্ধমঠও এই সময়েই নির্মিত হয়। রাজা প্রথম শান্তিকর দেবের রানি হিরা মহাদেবী হিরাপুরে চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরের নির্মাণ করান।
৬২১ খ্রিস্টাব্দে উত্তর-ভারতের স্থানেশ্বরের রাজা হর্ষবর্ধন উৎকল আক্রমণ করে বসলেন। চিলকা হ্রদ অবধি অধিকারও করে ফেললেন হর্ষ। ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে হর্ষের মৃত্যুর পরে উন্মত্ত সিংহ শৈলোদ্ধব রাজ্য আক্রমণ করলেন। উন্মত্তের আরেক নাম ছিল শিবাকর দেব। যাই হোক, এর পর থেকে উৎকল ভূমিতে ভুয়াম কাল শুরু হল। ভুয়ামরা বৌদ্ধদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। এই রাজত্বের সময়ে বেশ কিছু স্বাধীন রাজ্যক্ষেত্রের উদ্ভব হয়েছিল। সেগুলোকে মণ্ডল বলা হতো।
মধ্যযুগের একেবারে শুরুতেই কলিঙ্গে আরম্ভ হয়ে গেল সোমবংশী রাজাদের শাসন। রাজা দ্বিতীয় মহাশিবগুপ্ত যযাতি ৯৩১ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেই কলিঙ্গের ইতিহাসকে গৌরবময়ী করে তোলার জন্য ভগবান জগন্নাথের মুক্তেশ্বর, সিদ্ধেশ্বর, বরুণেশ্বর, কেদারেশ্বর, বেতাল, সিসরেশ্বর, মার্কণ্ডেশ্বর, বরাহ এবং খিচ্চাকেশ্বরী সমেত মোট আটত্রিশটি মন্দিরের নির্মাণ করালেন। সত্যি বলতে কী, ওই সময়টা উড়িষ্যার ইতিহাসের সবথেকে বেশি উজ্জ্বল পর্ব। সোমবংশীদের সময়েই মন্দির স্থাপত্য কলার উৎকর্ষের পরম শিখর স্পর্শ করে। এবং এর কেন্দ্রে ছিল ভুবনেশ্বর। বলা হয়, রাজা দ্বিতীয় মহাশিবগুপ্ত যযাতি ভুবনেশ্বরে মহাপ্রভু জগন্নাথ দেবের এই আটত্রিশটি মন্দির নির্মাণ করার পাশাপাশি বিখ্যাত লিঙ্গরাজ মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
১০৩৮ খ্রিস্টাব্দ। তখন গঙ্গ বংশের ক্ষীণশক্তির পুনরুত্থান ঘটল পঞ্চম বজ্রহস্তের হাত ধরে। সোমবংশের রাজা কামদেবকে হারিয়ে তাঁরা কলিঙ্গ পুনর্দখল করলেন। তবে তখনও অবশ্য সম্পূর্ণ উৎকলে আধিপত্য লাভ করতে পারেননি। অবশেষে ১১১২ খ্রিস্টাব্দে চোডগঙ্গ দেব সম্পূর্ণ উৎকল দখল করলেন। রাজা চোডগঙ্গ দেব আবার ছিলেন পরম বৈষ্ণব। তিনি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের নির্মাণ করালেন এবং লিঙ্গরাজ মন্দির তাঁর হাত ধরেই পূর্ণতা পেল। তিনি রাজরানি মন্দির নির্মাণ করালেন। নির্মিত হল লোকনাথ এবং গুণ্ডিচা মন্দিরও। গুণ্ডিচা মন্দিরেই পুরীর জগন্নাথ দেবের বিশ্ববিখ্যাত রথযাত্রা বিরতি নেয়। মাসির বাড়ি বলে সকলে। গঙ্গ বংশ তিন শতাব্দী ধরে উৎকল প্রদেশ শাসন করল। দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতকে ভাস্করেশ্বর, মেঘেশ্বর, যমেশ্বর, কোটিতীর্থেশ্বর, সারিদেউল, অনন্তবাসুদেব, চিত্রকর্ণী, নিয়ালি মাধব, শভনেশ্বর, দক্ষ-প্রজাপতি, সোমনাথ, জগন্নাথ, সূর্য–কাষ্ঠ মন্দির এবং বিরজা মন্দির নির্মাণের কৃতিত্ব কিন্তু এঁদেরই।
চোডগঙ্গ দেবের মৃত্যুর পরে তাঁর বংশের মোট পনেরোজন শাসক উৎকলে নিজের কীর্তি বৃদ্ধি করেছেন। ওই বংশের সপ্তম নৃপতি তৃতীয় অনঙ্গভীম দেব ১২১১ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের নির্মাণকার্য উনিই সম্পন্ন করান। ওঁর আমলেই মহানদী এবং কাঠজোড়ির সঙ্গমে কেশরী বংশের রাজাদের সময়ে কটাসিন নামক একটি সৈনিক স্কন্ধাবারের নামে কটক নগরীর পত্তন হয়। ১১৩৫ সনে কলিঙ্গের বদলে কটকই হয়ে উঠল উৎকল রাজ্যের রাজধানী। কটককে অভিনব-বারাণসীও বলা হতো। তৃতীয় অনঙ্গভীম দেবের আবার দুই রানি ছিলেন। সোমল দেবী ও কস্তুরী দেবী। সোমল দেবীর কন্যা ছিলেন কুমারী চন্দ্রা, এবং কস্তুরী দেবীর পুত্রের নাম ছিল নৃসিংহ দেব। কুমারী চন্দ্রার বিয়ে হয়েছিল হৈহয় বংশের পরমার্দি দেবের সঙ্গে। এই পরমার্দি দেব কিন্তু চান্দেলা রাজা পরমার্দি দেব নন। তিনি আলাদা মানুষ। নিজের প্রবল পরাক্রমী রাজা পরমার্দি দেবকে তৃতীয় অনঙ্গভীম দেব নিজের প্রধান সেনাপতির পদে ভূষিত করেছিলেন।
তৃতীয় অনঙ্গভীম দেবের পরে উৎকলের শাসন-সূত্র হাতে তুলে নিলেন তাঁর পুত্র নৃসিংহ দেব। ১২৩৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২৬৪ খ্রিস্টাব্দ অবধি চলেছিল অরিন্দম নৃসিংহ দেবের শাসনকাল তথা উৎকল ভূমির চরম উৎকর্ষের যুগ। সেই সময়ে অবশিষ্ট প্রায় সম্পূর্ণ ভারতই যবন আক্রমণে বিধ্বস্ত। মরুভূমিতে মরুদ্যানের মতো কেবল উৎকল আর কাশ্মীর ওই কঠিন সময়েও হিন্দু রাজ্য হিসেবে নিজেদের রক্ষা করে চলেছিল।
উৎকলকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলছিল ম্লেচ্ছ শত্রুর দল। অনঙ্গভীম দেব যখন রোগশয্যায়, শাসনের অঘোষিত ভার গিয়ে পড়েছিল নৃসিংহ দেবের হাতে। কাশ্মীরের মালব নরপতির কন্যা, কুমারী সীতা দেবীর জন্য তৎকালীন ভূ-ভারতে নৃসিংহ দেবের মতো উপযুক্ত পাত্র আর কই? ওই সময়ে বংশ গরিমা, কান্তি, বীরত্ব, পাণ্ডিত্য, মহানুভবতা, এবং মানবিকতার মতো শ্রেষ্ঠ পুরুষোচিত গুণের অধিকারী হিসেবে নৃসিংহ দেবের নাম সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল। সত্যি বলতে কী, জীবিত কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। বলা হয়, ভারতের নানা রাজ্যের রাজকুমারীরা তাঁকে নিজেদের স্বপ্নের পুরুষ রূপে কামনা করতেন, তাঁর গলায় বরমালা দেওয়ার জন্য নাকি শত শত হাত উন্মুখ হয়ে থাকত। কিন্তু একমাত্র সীতা দেবীর ঐকান্তিক কামনা এবং নিষ্ঠাপূর্ণ ভাবনার ফলেই তিনি আশুতোষ শিবের আশীর্বাদ স্বরূপ নৃসিংহ দেবকে স্বামী রূপে পেলেন। আমি যেটুকু বললাম, তা ভূমিকা মাত্র। অধৈর্য হয়ে পড়লেন কিনা জানি না, কিন্তু নৃসিংহ দেব আমার এই কাহিনির এমন এক চরিত্র যে এই কথাগুলো বলে না-নিলে কাহিনি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল।
শব্দগুলো আমার, কিন্তু কথাগুলো আসলে আমার অপরূপা বান্ধবীটির। আমার বারবার মনে হচ্ছে, এই কাহিনির মধ্যে একজন পাত্র হিসেবে ঢুকে পড়ে আমি অপরাধ করছি। আমি তো আর এই কাহিনির লেখক নই, একজন লিপিকার মাত্র। আর তাই, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে এই কাহিনিতে চরিত্র রূপে আমার নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া উচিত। আগামীতে তা-ই করব। কিন্তু কাহিনিটাও এত অদ্ভুত যে এর মধ্যে নিজেকে চরিত্র রূপে দেখতে লোভ হয়।
যাই হোক, কাহিনিতে ফেরা যাক—
সেই রাতে নৃসিংহ দেব এবং সীতাদেবীর ফুলশয্যা ছিল। রাজমহলের কোনায়–কোনায় জ্বলছিল গন্ধতেলে ভরা অগুনতি প্রদীপ। সুগন্ধী তেলের সুবাসে ভরে উঠেছিল প্রাসাদের আবহ। দ্বারে, গবাক্ষে, স্তম্ভে এবং ভিত্তিতে শেকলের মতো করে সাজানো হয়েছিল মনোহারী পুষ্পহার। একাধিক স্থানে তালপাতা, অশোক পাতা, আমের পল্লব এবং কদলী-স্তম্ভ দিয়ে স্বাগত-দ্বার বানানো হয়েছিল। সেজে উঠেছিল প্রজাদের ঘর-গেরস্থালি। নিজেদের যুবরাজ তথা ভাবী রাজার জীবনের এমন মাঙ্গলিক ক্ষণে প্রসন্ন চিত্তে তারা অকাল দীপাবলি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
অন্তঃপুরে চন্দ্রাদেবী নিজের নবাগন্তুকা ভ্রাতৃজায়া সীতাদেবীর সামনে বসেছিলেন। বিশেষ রাত্রির জন্য তখন যুবরাজ্ঞীর শৃঙ্গার চলছে। ননদিনীর রঙ্গকৌতুকে অধরের হাসি ধরে রাখতে পারছেন না সীতাদেবী। নবপরিণীত যুগলের জন্য চন্দ্রাদেবী নিজের হাতে শয্যা সাজিয়েছিলেন। পর্যঙ্কে রজনীগন্ধা ফুলের চন্দ্রবিতানটিও তাঁর নিজের হাতে বোনা।
ওই শুভ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় সভাকক্ষে উৎসব–মণ্ডপে নৃসিংহ দেব নিজের সমবয়েসি, শাসনে সহায়ক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে বসে অভিনন্দন এবং উপহার গ্রহণ করছিলেন। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি গিয়ে পড়ল কক্ষের দ্বারে সদ্য উপস্থিত হওয়া এক প্রহরীর ওপরে। দ্বিধাগ্রস্ত মুখ, সঙ্কুচিত মন নিয়ে সে যেন কিছু বলব-বলব করেও বলে উঠতে পারছিল না। হয়তো যুবরাজের জীবনের এমন শুভক্ষণে কোনো গুরুতর সংবাদ দেওয়া সঠিক হবে কিনা সেই চিন্তায় ভুগছিল। তার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে নৃসিংহ দেব নিজের হাতের মুদ্রায় তাকে ভেতরে আসার সঙ্কেত দিলেন।
কক্ষে প্রবেশ করেই প্রহরী উপস্থিত সকলকে মূক অভিবাদন জানাল। তারপর নিজের কোমরবন্ধ থেকে একটা পাতলা বাঁশের নল বের করে সেটাকে দু-হাতে ধরে নিঃশব্দে সামনের দিকে এগিয়ে দিল। নৃসিংহ দেবের আবুত্ত অর্থাৎ চন্দ্রাদেবীর স্বামী তথা রাজ্যের প্রধান সেনাপতি পরমার্দি দেব বেশ চিন্তা আর সন্দেহ নিয়েই সেই বাঁশের নলটিকে নিজের হাতে নিলেন।
নৃসিংহ দেবের চোখে তখন একরাশ প্রশ্ন। দৃষ্টি সশঙ্ক। তিনি পরমার্দি দেবকে চোখে চোখে ওই বাঁশের নলটি খোলার নির্দেশ দিলেন। নলটির দুই মুখই লাক্ষার মুদ্রা দিয়ে বন্ধ করা। পরমার্দি দেব ক্ষিপ্র হাতে নলের একটি মুখের মুদ্রা ভঙ্গ করে ভেতরে রাখা পত্রটিকে বের করে এনে দ্রুত পড়তে শুরু করে দিলেন। তাঁর মুখ ক্রমশ গম্ভীর, রক্তিম ও থমথমে হয়ে উঠল। প্রধান সেনাপতি হাত নেড়ে প্রহরীকে বিদায় দিলেন। প্রহরী আবার উপস্থিত সকলকে মূক অভিবাদন নিবেদন করে বিদায় নিল।
এতক্ষণে নৃসিংহ দেব প্রশ্ন করলেন, ‘পত্রে কী লেখা আছে? কোনো অশুভ সংবাদ?’
‘অশুভ বলা চলে না, কিন্তু চিন্তার কারণ তো বটেই,’ পরমার্দি দেব উত্তর দিলেন।
‘বলুন, কী লেখা আছে।’
‘আমি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। আপনি চিন্তিত হবেন না। কুমার, এ ব্যাপারে আগামীকাল আপনার সঙ্গে কথা হবে।’
‘না! এখনই বলুন। কী ব্যাপার?’
‘তেমন গুরুতর কিছু নয়।’
‘আপনি অযথা সময় ব্যয় করছেন। দিন দেখি, পত্রখানা আমার হাতে দিন!’ কথা শেষ করেই নৃসিংহ দেব নিজের হাত বাড়িয়ে দিলেন। অগত্যা বাধ্য হয়েই পরমার্দি দেব চিঠিটা তুলে দিলেন তাঁর হাতে।
“মহারাজ অনঙ্গভীম দেবের প্রতি,
সবিনয় নিবেদন সহকারে জানানো যাচ্ছে যে, কটাসিনের কাছাকাছি যবন সৈনিকদের সৈন্য–গতিবিধি হঠাৎই তীব্র হয়ে উঠেছে। যবনদের বাহিনী সংখ্যায় বিশাল। সম্ভবত উৎকল আক্রমণই তাদের পরবর্তী লক্ষ্য। কটাসিনের সুরক্ষা শিবিরে এত সৈন্য নেই, যাদের মাধ্যমে দীর্ঘকালীন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। অতএব, প্রতিরক্ষার জন্য এখানে অতিশীঘ্র যুদ্ধে পারদর্শী সৈন্যের ভীষণ প্রয়োজন। আমি কথা দিলাম—যদি এর মধ্যে যবন শিবিরের পক্ষ থেকে আক্রমণ করা হয়, তাহলেও উৎকল–বাহিনীর প্রত্যেক পাইক নিজের দেহে রক্তের শেষ বিন্দু পর্যন্ত শত্রুর সৎকার খড়্গ দিয়েই করবে। পরিস্থিতি বিচার করার জন্য এই সংবাদ আপনার নিকটে প্রেরিত হল।
সাদর,
গুল্ম-নায়ক, কটাসিন সুরক্ষা শিবির।”
‘প্রধান সেনাপতি, যত শীঘ্র হোক, সৈন্যদের যুদ্ধযাত্রার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিন। আজকের উৎসব-অবকাশ এই মুহূর্তে নিরস্ত করা হল। এই উৎসবের জন্য যে খাদ্য তৈরি করা হয়েছে, তা এখনই পরিবেশিত হোক। এখন থেকে ঠিক চার ঘণ্টা পরে সৈন্যরা যেন কটাসিনের উদ্দেশে যাত্রা আরম্ভ করে। প্রাথমিক সৈন্যদলটি শুধুমাত্র অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রওনা দিলেই চলবে।
মন্ত্রী শিবেই সান্তারা, একটি সৈন্যদল যেন খাদ্যদ্রব্য নিয়ে আগামীকাল ভোরেই যুদ্ধস্থলের দিকে যাত্রা করে। তবে আমার দেওয়া কোনো আদেশই যেন আজ রাত্রে প্রজাদের মধ্যে ছড়িয়ে না-পড়ে সেটাও দেখবেন। আমার হস্তীপালকে নির্দেশ দিন—সে যেন গজরাজ নিঃশঙ্ককে পেট ভরে ঘি-মাখানো ভাত খাইয়ে সৈন্য শিবিরে প্রস্তুত করে রাখে। আমার দুই প্রিয় ঘোড়া চঞ্চল ও চপলকেও রণসাজে সজ্জিত করার আদেশ দিয়ে রাখুন। কটাসিনের গুল্ম-নায়ককে আমি হতাশ করব না,’ এই বলে নৃসিংহ দেব নিজের আসন ত্যাগ করে উঠে গেলেন।
‘কিন্তু আপনি কেন যাবেন? আজ যে আপনার মধুযামিনী, কুমার! সৈন্যরা আমার সঙ্গে চলুক, আমি এই রাজ্যের প্রধান সেনাপতি। আজই আপনার ওখানে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। যদি একান্তই প্রয়োজন পড়ে আপনি আগামীকাল যুদ্ধভূমিতে অবতীর্ণ হয়ে উৎকলকে গৌরবাণ্বিত করুন,’ পরমার্দি দেবের কণ্ঠে প্রবল প্রতিরোধ প্রকাশ পেল।
‘না, আপনি কেবল উৎকল রাজ্যের প্রধান সেনাপতিই নন, আপনি আমার আবুত্ত, আমার ভগিনীর স্বামী। আমার ভগিনীপতি যুদ্ধযাত্রা করবেন, আর আমি মধুযামিনী করব, এ তো হতে পারে না। আমি এখনি একবার অন্তঃপুর থেকে ঘুরে আসছি। আপনিও ভগিনী চন্দ্রার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে নিন। আমরা দুজনে মিলে যুদ্ধস্থলের উদ্দেশে যাত্রা করব। যত শীঘ্র সম্ভব...! ভাস্করের প্রথম রশ্মির অভ্যর্থনা আমি কটাসিনের গুল্ম-নায়কের সঙ্গেই করতে চাই। ঈশ্বরের কাছে কেবল একটাই প্রার্থনা—যবন সৈন্যরা যেন আজ রাতেই না আক্রমণ করে বসে!’
‘ধন্য...ধন্য, কুমার নৃসিংহ দেব, ধন্য!’ সভায় উপস্থিত রাজপুরুষেরা নৃসিংহ দেবের জয় জয়কার করতে লাগল, কিন্তু সাধুবাদ শোনার ইচ্ছা বা অবকাশ কোনোটাই কুমারের নেই। দীর্ঘ পদক্ষেপে ব্যক্তিগত শস্ত্রাগারের দিকে চললেন তিনি।
উৎসবের দিন। স্বাভাবিক ভাবেই কুমার নৃসিংহ দেবের ব্যক্তিগত শস্ত্রাগারের কপাট রুদ্ধ। শস্ত্রাগারের প্রহরী বসে বসে রাজকীয় পাকশালার এক মুখরা দাসীর সঙ্গে মস্করা করছে, ‘আজকের এই শুভদিনে কী কী রাঁধছিস, সুন্দরী?’
‘আ ম’লো যা! নোলা একেবারে সক সক করছে। কত্ত কী খাবার হয়েছে—লাড্ডু, রসগোল্লা, রসমালাই, ছানাপোড়া, ক্ষীরমোহন, রাজভোগ, রাবড়ি, চিঞ্জাহিলি, রসবালি; সুষ্কুলি, পুরি, মুকুন্দি, ভাত, শাক এমন অনেক খাদ্যখাবার; নারকেলের টক চাটনি, পেস্তার মিষ্টি চাটনি, পকোড়ায় থালা ভরে গেছে। রাঁধুনি বড়ঠাকুর গোলা ক্ষীর বানিয়েছেন। তবে এখনও আশকে পিঠেটা হয়ে ওঠেনি। এবার তুই বলবি, এট্টুখানি খেতে দে। ছাড় মুখপোড়া, আমার রাস্তা ছাড়! ভাঁড়ার থেকে খেজুরের গুড় বের করতে হবে আমায়।’
‘হায় হায় সুন্দরী, এত মণ্ডামিঠাইয়ের মাঝে শুধু একটু ঝালের অভাব ছিল, সেটাও তুই নিজের কথা দিয়ে পূরণ করে দিলি! দিনরাত আমি তোর রূপের প্রশংসা করি, আর আসার সময় খানকয়েক রসগোল্লা নিয়ে আসতে পারলি না?’
‘আমি ঠিক জানতাম, এসব খাবারের নাম শুনলে তোর মুখ থেকে লালঝোল পড়ে যাবে। যা, গিয়ে দাঁত মেজে আয়। মুখ ধো ভালো করে! প্রভু জগন্নাথের ভোগ লাগেনি এখনও, আর ইনি রসগোল্লা খাবেন! ওলাউঠো হয়ে মর! ছাড় রাস্তা ছাড়!’
‘খাওয়ার জন্য সকাল থেকে কুড়ি বার দাঁতন করেছি। মালাকার আমাকে কেতকীর পাপড়ি মেশানো জল দিয়েছিল, তাতেই কুলকুচি করেছি, সুন্দরী। দেখ না, মুখটা শুঁকে দেখ—।’
‘ঘরে আয়না না-থাকলে কোনো পুকুরে গিয়ে জলে নিজের ছবি দেখে নে। আমাকে বলে কিনা মুখ শুঁকতে! সাহস তো মন্দ নয়, তুই নিজেকে কী ভাবিস বলতো?’
‘শুঁকবি শুঁকবি! সেই দিন আসছে। তোর ভাইকে আমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে বলিস। নইলে তোর এই যৌবন চলে যাবে, কুমারীই থেকে যাবি। মেয়েপক্ষের দিক থেকে আগে প্রস্তাবটা আসুক, তারপর বাবাকে সামলানোর দায়িত্বটা আমার।’
‘দেখ, জ্বালাস না! আমার ভাল্লাগছে না। রাস্তা ছাড়! দেরি হয়ে যাচ্ছে। আজ আমি ভয়ানক ব্যস্ত।’
‘কে আটকে রেখেছে তোর পথ? আমার সঙ্গে পীরিতের কথা বলতে তোর ভালোই লাগে, আমি বুঝি? তুই যা না! আমি আজ রাতেই বাবাকে বলব, কুমার নৃসিংহ দেবের তো বিয়ে হয়েই গেল, এবার আমার বিয়েটাও ঠিক করে ফেলুক। ছোটবেলায় নাকি কোন এক গ্রামভট্টের মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ের জন্য কথা বলে রেখেছিল। ওখানেই কথা পাকা করতে বলব।’
‘আরে যা! আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে নিজের বউ করবি এই স্বপ্ন দেখছিস তো, হাতে নারকেল ছাপানোর ছাঁচ ধরা আছে, নাকে মারলে এক ঘায়ে অক্কা পাবি। এখন আসি, দেরি হলে রাঁধুনি বড়ঠাকুর খেপে যাবেন।’
‘দেখ কেমন লাগে? গা-জ্বলল তো? রসগোল্লা না হয় না-ই দিলি, তোর রসাল ঠোঁটের একটা চুমু তো দিতে পারিস। সকাল-সকাল যে কোনো মিষ্টি হলেই হল। আর এখন এদিকে কেউ আসবে না, ধরা পড়ার ভয়ও নেই।’
‘নিতান্তই ছ্যাঁচড়া তুই। আচ্ছা ঠিক আছে, বাড়ি ফেরার সময় আমার সঙ্গে ফিরিস। আজ কুমারের ফুলশয্যে। আজকের দিনে কাউকে ফিরিয়ে দিয়ে মনে কষ্ট দেব না। কিছু–না–কিছু উপহার দেবই। তবে হ্যাঁ, একলা পেয়ে কিন্তু অসভ্যতা করবি না। আগে থেকে বলে দিলুম!’
‘এর থেকে ভালো ছিল সরাসরি না বলে দিতে পারতিস। তুই কি জানিস না যে আমি এই জায়গা ছেড়ে দিন বা রাত কখনোই নড়তে পারব না?’
‘তুই গোবর-গণেশ হয়ে থাক! আজ আমাদের রাজকুমার কামদেবের দেওয়া অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহার করবেন। আজকের খড়্গ, বাণ, বল্লম এসবই অন্যদিনের থেকে আলাদা হবে।’
‘আচ্ছা, এখন বিদায় নে। এখন তো দেরি হচ্ছে না তোর? আর বাড়ি ফেরার সময় সভার ওই বামন ভাঁড়টাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাস। ওকেই চুমু দিস। তোর চুমুর লোভে আমি নিজের কর্তব্যে অবহেলা করতে পারব না।’
এই ব্যঙ্গোক্তি প্রণয়িনীকে সরাসরি আঘাত করল। প্রেমিকের প্রতি তার মনে করুণা জন্মাল। ডাঁয়ে–বাঁয়ে দেখে যেই না সে এগিয়ে এল, অমনি শোনা গেল কারো ভারী পায়ের শব্দ। সাবধান হয়ে একে অন্যের থেকে দূরে সরে গেল দুজনেই। মনের কথা মনেই রয়ে গেল, অধরের চুম্বন রয়ে গেল অধরাই। কুমার নৃসিংহ দেবের কণ্ঠের আদেশ ভেসে এল, ‘প্রহরী, শস্ত্রাগার খোলো! আমাকে রণ-সাজে সজ্জিত হতে সাহায্য করো।’
বিন্দুমাত্র সময় ব্যয় না-করেই অজ্ঞাত এক আশঙ্কা মনে নিয়ে শস্ত্রাগারের রক্ষী দরজার আগল খুলে দিল। নৃসিংহ দেব শস্ত্রাগারের ভিতরে প্রবেশ করলেন। কুমারের পিছনেই একটি প্রমাণ মাপের উল্কাদণ্ড নিয়ে প্রবেশ করল প্রহরীও। সুবিশাল কক্ষ। সেখানে নির্দিষ্ট ক্রম মেনে যত্ন সহকারে রক্ষিত রয়েছে অস্ত্রের বিপুল সম্ভার। বিশাল কুন্ত, ভল্ল, কৃপাণ, অসি, বড়–ছোট নানা মাপের ধনুক, সূচীমুখ, চন্দ্রমুখ, ভল্লমুখ, এবং নারাচের মতো বাণ-পুরিত অনেক নিষঙ্গ, লোহা আর তামার কবচ–শিরস্ত্রাণ, লৌহ তন্তু দিয়ে বোনা তথা মৎস্য–শল্কের আকৃতি সম্পন্ন লঘু লৌহ–কুর্তক এবং ভুজা–বাহু রক্ষক, সামুদ্রিক কচ্ছপের পিঠের আবরণ থেকে নির্মিত ঢাল, যার উপরে কালায়স নির্মিত অর্ধ–কন্দুক জড়িত রয়েছে। বিবিধ শস্ত্রাস্ত্র অস্ত্রাগারের ভিত্তির আশ্রয় নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কোনোটা আবার টাঙানো। কোনোটার জন্য নির্দিষ্ট করা রয়েছে কাঠের আসবাব।
নৃসিংহ দেব অত্যন্ত দ্রুত নিজের শরীর থেকে রাজবস্ত্র খুলে একপাশে রাখলেন। প্রহরী তাঁকে একটি কার্পাস নির্মিত কুর্তক দিয়ে নিজের হাতে করে একটি লৌহ–কুর্তকের বাঁধন খুলতে লাগল। নৃসিংহ দেব কার্পাস–কুর্তকটির উপরে লৌহ–কুর্তক ধারণ করে নিলেন। তার উপরে পরিধান করলেন চারটি ভাগে নির্মিত একটি লৌহ কবচ। প্রহরী নীরবে তাঁর ভুজায় ভুজা-রক্ষক এবং বাহুতে বাহু-রক্ষক বাঁধল। সাদরে কুমারের শিরস্ত্রাণ হাতে নিয়ে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। নৃসিংহ দেব বীরাসনে বসে নিজের গ্রীবা প্রহরীর সামনে নত করে দিলেন। প্রহরী উদঘোষ করল, ‘মাতৃভূমির হিতার্থে...’
কুমার বললেন, ‘...তুমি উৎসর্গীকৃত!’
শিরস্ত্রাণ মাথায় পরাতে গেলে যুবরাজের মস্তক স্পর্শ করতে হবে। তাই রক্ষী এবার বলল, ‘অপরাধ ক্ষমা করুন, কুমার!’
নৃসিংহ দেব বললেন, ‘যুদ্ধকালের জন্য সবকিছুই ক্ষমার্হ।’
প্রহরী এগিয়ে গিয়ে তাঁর মাথায় সসম্মানে শিরস্ত্রাণটিকে পরিয়ে দিল। শিরস্ত্রাণের নিম্নভাগ থেকে ঝুলতে থাকা লৌহ-শৃঙ্খলগুলি কুমারের দুই কাঁধে ছড়িয়ে গেল। তিরে ভরা একটি তূণীর নিয়ে প্রহরী নৃসিংহ দেবের পিঠে কষে বেঁধে দিল। এরপর সপ্রশ্ন চোখে সে কুমারের চোখের দিকে তাকাল, ‘কুমার, এবার?’
নৃসিংহ দেব বললেন, ‘কটিনক!’ প্রহরী তখনই দেওয়ালে টাঙানো একটা ধনুক নামিয়ে আনল। প্রায় একমানুষ উচ্চতা সেটার। দেহ বাঁশের, তামার তন্তু লেপটে রয়েছে শরীর জুড়ে। বাঁশের গাঁটগুলো ধরার জায়গাতে স্পষ্ট। শূকরের অন্ত্র দিয়ে ধনুকটির ছিলা নির্মিত হয়েছে। কুমার ধনুকটিকে নিজের বাম কাঁধে ঝুলিয়ে দিলেন।
কুমার এবার বললেন, ‘রুদ্রহাস!’
শস্ত্রাগারের প্রহরী এবারে ভিত্তি থেকে ঝুলিয়ে রাখা রত্নজড়িত, রক্তবর্ণ কৌশেয় কোষ যুক্ত, সাত আঙুল চওড়া, বাহান্ন অঙ্গুলি লম্বা, দুই ধার বিশিষ্ট রুদ্রহাস হাতে তুলে নিল। সাম্ভর হরিণের চামড়া দিয়ে তৈরি কটিবন্ধনীর সাহায্যে নৃসিংহ দেবের কোমরের বাম দিকে ঝুলিয়ে দিল রুদ্রহাস।
এবার নৃসিংহ দেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মেয়েটি কে ছিল?’
‘ক্ষমা করুন, কার কথা বলছেন, প্রভু?’ থতমত খেয়ে বলল প্রহরী।
‘মেয়েটি কে ছিল?’ আবার একই সুরে প্রশ্ন করলেন কুমার।
‘অপরাধ মার্জনা করুন, কুমার! ও পাকশালার প্রধান দাসীদের মধ্যে একজন। ছোটবেলাতেই ওর পিতা মারা গিয়েছেন। আমার বাগদত্তা। কিন্তু ওর ভাইটা খুব একগুঁয়ে। এদিকে ঘরে খাবার জোটে না, আর ওদিকে বোনের বিয়ে ধুমধাম করে দেবে বলে বিয়ের দিন পিছিয়েই চলেছে। আজ উৎসবের আবহে আমি একটু কৌতুক করছিলাম। তবে বিশ্বাস করুন, নিজের কর্তব্যে কোনো অবহেলা করিনি। আপনি এসে পড়বেন কে তা জানত? আমি স্বপ্নেও কল্পনা করিনি যে, যার মধুযামিনী যাপনের জন্য সমগ্র উৎকল আজ আমোদে মগ্ন হয়ে রয়েছে, তিনি রণবেশ ধারণ করার জন্য শস্ত্রাগারে আসবেন।’
‘কটাসিনের গুল্ম–নায়ক বার্তা পাঠিয়েছেন—যুদ্ধ আসন্ন। মাতৃভূমি উৎকল-বীরদের কাছে রক্ত দাবি করছেন। তুমি, আমি—আমরাই যে উৎকলের সন্তান। আমাদের সামনে এখন কঠিন লড়াই। যদি আমরা যুদ্ধ শেষে সকুশল ফিরে আসতে পারি, তবে তোমার বাগদত্তার সঙ্গে তোমার শুভ পরিণয়ে আমিই অভিভাবক হব, প্রহরী। কথা দিলাম—তোমার শ্যালকের ইচ্ছামতোই ধুমধাম করে হবে তোমাদের বিবাহ।
এবার কর্তব্যের কথায় ফিরে আসি। সেনাপতির পাঠানো শকট এখুনি এসে উপস্থিত হবে। তোমাকে দায়িত্ব দিলাম—অন্যান্য অস্ত্র এবং শস্ত্র সেই শকটে বোঝাই করে, নিজেও রণসাজে সজ্জিত হয়ে শিবিরে উপস্থিত হবে তুমি। কিছু খেয়েছ?’
‘না, কুমার।’
‘আচ্ছা। ভোজন নিয়ে চিন্তা কোরো না, তবে তোমার আজকের ভোজন পথে নৃসিংহ দেবের সঙ্গে ঘোড়ার পিঠে বসে হবে।’ নিজের কথা শেষ করেই কুমার ক্ষিপ্র পদক্ষেপে শস্ত্রাগার থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁর প্রত্যেক পদক্ষেপণে তাঁর দেহের কবচের সঙ্গে শিরস্ত্রাণ থেকে দোদুল্যমান লৌহ-শৃঙ্খলগুলি ধাক্কা খেয়ে ঝঙ্কার তুলছে। ঝঙ্কার তো নয়, যেন সিংহের গর্জন!
ওদিকে রক্ষীটির প্রেমিকা যখন কুমার নৃসিংহ দেবকে শস্ত্রাগারে প্রবেশ করতে দেখেছিল, তখন সে নিজের কৌতূহল সংবরণ করতে পারেনি। যা হওয়ার তা-ই হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক মুখ থেকে আরেক মুখে, সেখান থেকে আবার আরেকজনের মুখে এই আশঙ্কা মহল-পরিসরে ছড়িয়ে পড়ল যে, কুমার রণসাজে সজ্জিত হয়ে যুদ্ধযাত্রা করতে চলেছেন। এই সংবাদ গিয়ে পৌঁছাল অন্তঃপুরেও। সকলের মুখে যখন একই গুঞ্জন, তখনই দেখা গেল—রণসজ্জায় সজ্জিত কুমার নৃসিংহ দেব মধুযামিনী-কক্ষের দিকে হেঁটে আসছেন।
চন্দ্রাদেবী আর সীতাদেবী একসঙ্গে কুমারকে স্বাগত জানালেন। নৃসিংহ দেব চন্দ্রাদেবীকে সম্বোধন করে বললেন, ‘উৎকলের মাটি আমাকে আহ্বান করেছে, প্রিয় ভগিনী। আবুত্তও তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন, তাই এই মুহূর্তে তোমার নিজের কক্ষে উপস্থিত থাকা উচিত।’
‘অবশ্যই ভ্রাতা, কিন্তু আপনার প্রতি আমার একটি আবেদন আছে। আমি ফিরে না-আসা অবধি আপনি এই কক্ষ ত্যাগ করবেন না। আমি শীঘ্রই ফিরে আসছি,’ এই কথা বলে চন্দ্রাদেবী প্রস্থান করলেন।
নৃসিংহ দেব নিজের সদ্যপরিণীতা স্ত্রীকে বললেন, ‘দেবী, বস্তুস্থিতি এখন আপনার সামনেও স্পষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে বলার মতো কিছু নেই। আমার কাছে রাজধর্ম সবথেকে বড়। এবং আপনি জানেনই যে, তা পালন করা কত কঠিন কাজ। মাতৃভূমির সম্মান অপ্রতিহত রাখা ব্যক্তির কর্তব্য। সেই ব্যক্তি রাজা হোক বা রাজকুমার কিংবা সাধারণ নাগরিক। রাজ্যের সীমান্তে যবন আক্রমণের সম্ভাবনা এই মুহূর্তে প্রবল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উৎকলের সেনা সীমাপ্রান্তের উদ্দেশে রওনা দেবে। দুই মাতার কাছে আজ্ঞা নিয়েই এসেছি। এবার আপনার অনুমতিরও প্রয়োজন। জন্মসূত্রে আপনি একটি স্বাধীন হিন্দু রাজ্যের রাজকুমারী এবং বিবাহসূত্রে এক স্বাধীন হিন্দু রাজকুলের বধূ তথা ভাবী রানি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার এই যুদ্ধযাত্রায় আপনি আমাকে সহর্ষে অনুমতি দেবেন।’
সীতাদেবী চোখের সামনে নিজের সৌম্য, সুদর্শন স্বামীকে রণবেশে দেখে মনের কোণে ফুটতে থাকা কোমল চিন্তার ফুলগুলিকে দলন করে স্থির কণ্ঠে বললেন, ‘কুমার, সৌভাগ্যই বলতে পারেন যে কিছুক্ষণ আগেই প্রধান পুরোহিত দুর্গের আরাধ্যা চণ্ডিকাদেবীর পূজা শেষে নিবেদিত ভোগ এবং সিঁদুর পাঠিয়েছেন। মধুযামিনীতে আপনাকে বরণের জন্য। ওই যে ওখানে আরতির থালায় রাখা রয়েছে সেই ভোগ ও সিঁদুর। আসুন, ওই সিঁদুর দিয়েই আপনার যুদ্ধযাত্রার মঙ্গল তিলক এঁকে দিই।’
নৃসিংহ দেবের বুক গর্বে ফুলে উঠল। সেই ভাব লুকিয়ে তিনি কৃত্রিম অভিমানের সুরে বললেন, ‘আজ আমাদের দাম্পত্য জীবনের প্রথম রাত্রি। যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। আমাকে বিদায় জানানোর মধ্যে আপনার কোনো কুণ্ঠা বা গ্লানি নেই তো?’
‘কুমার, উৎকল আমার জন্মভূমি নাহলেও এখন থেকে কিন্তু এটাই আমার কর্মভূমি। তাকে রক্ষার জন্য আমি নিজের সর্বস্ব আহুতি দিতে পারি। আর এখন যে আমার সর্বস্ব শুধুই আপনি। এই যে মা চণ্ডিকার প্রসাদ আর সিঁদুর আপনার তিলকের মুহূর্তে এসে উপস্থিত হয়েছে, এও যে দেবী মায়ের আশীর্বাদ। তিনি বিজয়ের বরই দিয়েছেন। আমার মনে কোনো কুণ্ঠা, গ্লানি বা শঙ্কা নেই।
আশুতোষ শিবের বরে আমি আপনার মতো স্বামী লাভ করেছি, কুমার। জগন্নাথ স্বামীর সেবক নৃসিংহ দেবের অহিত করতে পারে এমন কোনো শত্রু এখনও জন্মায়নি। আমি এই কক্ষেই আপনার বিজয়-বরণের জন্য অপেক্ষা করব!’
মানীর ললাটে তিলক এঁকে দিলেন মানিনী। পঞ্চপ্রদীপে সাজানো আরাত্রিক-থালিকা দিয়ে আরতি করলেন। এরই মধ্যে চন্দ্রাদেবী নিজের স্বামী পরমার্দি দেবকে নিয়ে কক্ষে এসে উপস্থিত হলেন। রণবেশে সজ্জিত পরমার্দি দেবের কপালেও বালার্ক সমান বিজয় তিলক শোভা পাচ্ছিল। চন্দ্রাদেবী নিজের ভ্রাতার আরতি করলেন। সীতাদেবী নিজের হাতে করে কুমার নৃসিংহ দেব এবং পরমার্দি দেবের হাতে তুলে দিলেন প্রসাদ-সিঁদুর লিপ্ত একটি করে জবাকুসুম পুষ্প। দুই বীর ফুল হাতে নিয়ে নিজের নিজের কপালে ঠেকালেন। আর তখনই সৈন্য-অভিযানের আনুষ্ঠানিক প্রতীক রূপে বেজে উঠল রণতূর্য–‘তূ...তূতূ...তূতূ...তূ...তূ...’। বীরদর্পে স্নাত কুমার নৃসিংহ দেব ও পরমার্দি দেব শিবিরের দিকে হেঁটে চললেন। দূর থেকে তাঁদের দেখে মনে হচ্ছিল গিরি-কন্দর থেকে বেরিয়ে সিংহদ্বয় ময়দানে নামছে।
নৃসিংহ দেব এবং পরমার্দি দেবের নেতৃত্বে উৎকলের পাইক বীরেরা কটাসিনের প্রান্তরে যবন সৈন্যদের অভিমান চূর্ণ–বিচূর্ণ করে দিল। কিন্তু প্রত্যেক বারের মতো এবারে আর বিজয়ী উৎকল সেনারা রাজ্যে ফিরে এল না। নৃসিংহ দেব নিজের সৈনিকদের বিজয়োন্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে গেলেন বঙ্গের দিকে। বাংলার লখনৌতি আক্রমণ করলেন। অবশ্য এই আক্রমণ একেবারে অকারণ ছিল না।
বাংলার তৎকালীন শাসক তুঘা খাঁ উৎকল আক্রমণের সুযোগ সন্ধান করে চলেছিল। কটাসিনে যবন সৈন্যদের পরাজয়ের পরেই তুঘা খাঁ সেই সুযোগ পেয়েও গিয়েছিল, কিন্তু নৃসিংহ দেব বুঝে গিয়েছিলেন যে, তুঘা খাঁয়ের আক্রমণের জন্য অপেক্ষা না-করে স্বয়ং আক্রমণাত্মক নীতি নিলে ফল ভালো হবে। লখনৌতি সহজেই অধিকার করলেন নৃসিংহ দেব। লখনৌতি বিজয়ের পরে বঙ্গভূমির বেশ কয়েকটি অঞ্চল তাঁর অধীনে চলে আসে।
উৎকলের এই বিজয়ী বাহিনী এবার এগিয়ে চলল রাঢ়ভূমির দিকে। পাইক বীরদের পরাক্রমের সামনে তুঘা খাঁয়ের সেনাবল হাতির পায়ে পিঁপড়ের মতোই দলিত মথিত হয়ে শেষ হয়ে গেল। তুঘা খাঁয়ের সেনাপতি করিমুদ্দিন লাঘরি, যাকে নিয়ে তুঘা খাঁয়ের বিশেষ গর্ব ছিল, পরমার্দি দেবের ভল্লের ঘায়ে যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হল।
তুঘা খাঁ দেহলির কাছে সাহায্য চেয়ে বসল। তখন দেহলির বুকে শাসন করছিল ইলতুৎমিশের ছোট ছেলে নাসিরুদ্দিন। অবশ্য শাসনের সূত্রধর হয়ে আঙুল নাড়াচ্ছিলেন অন্য একজন—তাঁর নাম গিয়াসুদ্দিন বলবন। দেহলি থেকে সাহায্য আসার আগেই রাঢ়ভূমি দখল করে ফেলল নৃসিংহ দেবের বাহিনী। উৎকল বাহিনীর এই রাঢ়-বিজয় বেশ কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তুঘা খাঁয়ের পরাজয়ের পর দেলহির সুলতান নাসিরুদ্দিন মালিক ইখতিয়ারুদ্দিন উজবেগকে বাংলার শাসক রূপে নিযুক্ত করে পাঠাল। এই ইখতিয়ারুদ্দিন উজবেগ ইলতুৎমিশের সময়ে তাঁর প্রিয় পাত্র ছিল। গৌড় পুনঃঅধিকারের উদ্দেশে দেলহি থেকে আসা যবন সৈন্যরা নৃসিংহ দেব–পরমার্দি দেব যুগলের নেতৃত্বে পাইক বীরদের তরবারির প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ল। ভয়ভীত হয়ে পলায়ন করল দেলহির বাহিনী। এই যুদ্ধে নৃসিংহ দেবের বিজয় লাভের পরে বাঁকুড়া, বীরভূমি এবং হুগলী-ক্ষেত্র উৎকল রাজ্যের অংশে পরিণত হল।
১২৪৩ সালে কটক থেকে বেরোনো উৎকল-বাহিনী ১২৪৬ সালে বিজয় দুন্দুভি বাজিয়ে আবার যখন নিজের রাজধানীতে পা-রাখল, তখন বর্ষাকাল আরম্ভ হয়ে গেছে। নৃসিংহ দেব সহ সমগ্র বাহিনীকে আদ্য-আষাঢ়ের প্রথম বর্ষা আকাশের অর্ঘ্যপালে বিদ্যুৎ-রশ্মির প্রদীপ জ্বালিয়ে অভ্যর্থনা জানাল। বৃষ্টি-বিন্দু যেমন মাটিকে সিক্ত করে তুলছিল, তেমনি আনন্দাশ্রুতে ভিজে উঠল সীতাদেবীর দুই নয়ন।
বিজয়ী পাইক বীরদের সম্মানে সমগ্র উৎকল অকাল–দীপাবলি পালন করল। প্রত্যাবর্তনের দিনেই সন্ধ্যায় নৃসিংহ দেব নিজের শস্ত্রাগারের রক্ষীর সঙ্গে তার বাগদত্তার বিবাহ সম্পাদনা করলেন। পরিণয়ের তিন বছর পরে, সেই রাতে, চন্দ্রা দেবী সোল্লাসে নৃসিংহ দেব ও সীতা দেবীর মধুযামিনী যাপনের শয্যা আবার সাজালেন। সকলে ভাবল, প্রণয় আর বিলাসের বাগানে তিন বছর ধরে বিরহের যে কাঁটা বিঁধে ছিল, তা বেছে তুলে নিলেন বিধাতাপুরুষ।
উৎকল–ভূমিতে পরদিনের সকালটা ছিল আলস্যে ভরা, কিন্তু দ্বিপ্রহর ছিল স্ফূর্ত। অনঙ্গভীম দেবের আদেশে নৃসিংহ দেবের রাজ্যাভিষেক ঘোষিত হল। গঙ্গ-বংশের সূর্য ইতিহাসের আকাশে আরও প্রখর হয়ে উঠল। মনে হল, কেটে গেছে আষাঢ়ের মেঘ।
গৌড় এবং রাঢ় বিজয়ের পর নৃসিংহ দেব এখন উৎকলের অধিপতি। সমগ্র উৎকল উৎকর্ষে উন্মুখ। প্রজারা সদাই সন্তুষ্ট। কিন্তু নৃসিংহ দেবের মন বিচলিতই রয়ে গেল। কোনো একটি বিষয় তাঁকে উদ্বিগ্নই করে চলেছিল। কিন্তু কী? সম্ভবত উনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন না এই মানসিক অস্থিরতার কারণ।
সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশে শুধুই মেঘ। বায়ু নিস্তব্ধ, চতুর্দিক অদ্ভুত স্থবির। এক অবুঝ উদ্বিগ্নতা গ্রাস করেছে সমগ্র চরাচরকে। শয়নকক্ষে সীতাদেবীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে আছেন নৃসিংহ দেব, কিন্তু মন অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে। একজন নারী কিন্তু উষ্মার পরশেই পুরুষের মন পড়ে ফেলতে পারেন। সীতাদেবী অনুভব করলেন যে, তাঁর দক্ষিণ পার্শ্বে শায়িত প্রণয়ী পতিদেবের শরীর শয্যায় থাকলেও মন অন্যত্র পড়ে রয়েছে। নৃসিংহ দেবের সিংহবক্ষে হাত বোলাতে বোলাতে তিনি বললেন, ‘মহারাজ, আপনার মন এখানে নেই। আমি আপনার অর্ধাঙ্গিনী, আপনার এই চিন্তার কারণ জানার অধিকার কি আমার নেই?’
‘অবশ্যই দেবী, অধিকার অবশ্যই আছে! আমি নিজেই আমার এই উদ্বিগ্নতার কথা আপনাকে বলার জন্য সুযোগের সন্ধান করছিলাম। যুদ্ধ এবং বিজয় মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য আবশ্যকীয় বিষয়, কিন্তু এটুকুতে আমার মনে শান্তি আসছে না। যুদ্ধের দ্বারা স্বাধীনতা রক্ষা করা গেলেও জাতিগৌরবকে কালজয়ী করে তুলতে গেলে পরম্পরা, সংস্কৃতি, শিল্পকলা এবং সঙ্গীতের সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এটাও যে রাজধর্ম। হাজার হাজার বছর পরে গঙ্গ-বংশের গরিমা কীভাবে অপ্রতিহত থাকবে তার কোনো উপায় ভেবে পাচ্ছি না, প্রিয়ে। তাই আমার মন এমন উচাটন হয়ে আছে। যবনদের বিরুদ্ধে বার-বার যুদ্ধ করে রক্তপাত দেখে দেখে মন গ্লানিতে ভরে গেছে। কবে হবে সেই গ্লানির মোচন? আমি মুক্তির পথ খুঁজে চলেছি। মন ব্যথিত হয়ে আছে। প্রিয়তমা, আপনার নৃসিংহ দেবের নাম কি তার চিতায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই লুপ্ত হয়ে যাবে?’
‘শান্তং পাপং! আপনি এসব কেন ভাবছেন? আমি আপনার স্ত্রী। আপনি আপনার মনের এই কথাগুলো আমাকে আগে কেন বলেননি, মহারাজ? কেশরী বংশের রাজা পুরন্দর কেশরী দ্বারা পূজিত, কৃষ্ণ–তনয় শাম্ব দ্বারা নির্মিত সূর্যমন্দিরে আপনার পূর্বপুরুষেরা পূজা করে এসেছেন। রাজমাতা কস্তুরীদেবীও অনেক বছর নিঃসন্তান থাকার পর ওই মন্দিরে সূর্যদেবতার উপাসনা করেছিলেন এবং সূর্যদেব তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছিলেন যে, ওই মন্দিরে অধিষ্ঠিত মহাবীরের আরাধনা করলে তাঁর পুত্রপ্রাপ্তি ঘটবে। শ্রাবণ মাস অবধি প্রতিদিন সওয়া মণ সিঁদুর অর্পণ করে রাজমাতা মহাবীর হনুমানকে প্রসন্ন করে আপনাকে পুত্র রূপে পান।
আপনার অন্নপ্রাশনের সময় রাজমাতা পণ করেছিলেন যে, তিনি একটি বিশাল সূর্যমন্দিরের নির্মাণ করাবেন এবং সেখানে সূর্যদেবতার মূর্তি স্থাপনা করবেন। রাজমাতার এই সাধ আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে, মহারাজ। আপনি একটি এমন সূর্যমন্দিরের নির্মাণ করতেই পারেন, যা হবে অপ্রতিম, অদ্বিতীয় তথা স্থাপত্যের দিক থেকে উৎকলের গৌরবের প্রতিমান। তাহলে রাজমাতার ইচ্ছাকে সম্মান দেওয়া হবে, তাঁর প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হবে এবং আপনার নিজের গ্লানির ভারও কমবে। আমার মতে...’
সীতাদেবীর মুখের বাক্য সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই শয়নকক্ষ প্রচণ্ড উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। পুষ্করাবর্তক মেঘের প্রিয়া সৌদামিনী কোন এক অজানা অভিলাষে শব্দ তুলল, ‘গড়ড়...ড়...ড়...ড়...!’ মনে হল কাছেই ঝাউয়ের বনে বজ্রপাত হল। ভয়ে কেঁপে উঠে সীতাদেবী স্বামীর বুকে নিজের মুখ লুকিয়ে ফেললেন। বুকের মধ্যে সুন্দরী রানিকে পেয়ে যেন চুম্বনের বর্ষাই করে দিলেন মহারাজ নৃসিংহ দেব। শয্যার পাশেই কাঁসার একটি বড় জলপূর্ণ পাত্রে ক্ষুদ্র নৌকার মতো ভাসমান সুবর্ণ-প্রদীপ যেন এই দৃশ্য দেখে হেসে উঠল।
টিমটিম করে জ্বলতে থাকা কম্পমান দীপশিখার দিকে তাকালেন অসহায় সীতাদেবী। তাঁর দৃষ্টি দেখে সবকিছু বুঝেও নৃসিংহ দেব যেন না-বোঝার অভিনয় করলেন। গবাক্ষ দিয়ে ঘূর্ণি বাতাস ঢুকে নির্লজ্জ ভাবে হরণ করে নিয়ে গেল প্রদীপের শিখার শীল, সরিয়ে দিয়ে গেল সীতা দেবীর বুকের কাপড়। বাইরে টপটপ ধ্বনিতে মুখর হয়ে মেঘ থেকে বৃষ্টি ঝরে পড়ল।
কক্ষের বাইরে পুরুষ আর প্রকৃতির অভিসার শুরু হয়ে গিয়েছিল। দিগন্ত ভরে উঠছিল পুলকে। ওদিকে কক্ষের বাইরে ধরিত্রী নিজের সমস্ত রন্ধ্র অনাবৃত করে অনন্তের ধারাপ্রেমকে সর্বাত্মক ভাবে গ্রহণ করছিল, আর এদিকে সীতাদেবীর শয্যায় নৃসিংহ দেবের শরীরে যেন প্রথমবারের জন্য অবতীর্ণ হলেন স্বয়ং মদন। কক্ষ মৃদু প্রহরণ, অস্ফুট শ্বাসধ্বনি, দমিত শীৎকারে ভরে উঠল। বাইরে প্রকৃতি যেন নিজের নেত্র বন্ধ করে অস্ফুট স্বরে কালিদাস বিরচিত কুমারসম্ভবম-এর পঞ্চম সর্গ পাঠ করে চলল।
খণ্ডগিরির কাছেই একটি গ্রামের শিল্পীদের কুল-গৌরব হল সুবল মহারানা। বিশ–বাইশ বছরের হৃষ্টপুষ্ট, সুশোভন এক যুবক। সুঠাম দেহ, গোধূম বর্ণ, উন্নত নাসিকা, সৌম্য মুখমণ্ডল, ঘন শ্যাম-কুঞ্চিত কেশ। গ্রামের বধূদের প্রিয় দেবর। খুব ছোটবেলাতেই কাছের একটি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক সুন্দরী কন্যার সঙ্গে তার বিয়েও হয়ে গিয়েছে। এই অঘ্রাণেই দ্বিরাগমন। গ্রাম-বধূরা এই নিয়ে তার সঙ্গে মশকরা করে, এবং সে লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে।
সুবলের বধূর দ্বিরাগমনের তিথি এগিয়ে আসছে। সুবল মাঝে মাঝে বউয়ের কথা ভাবে। ভাবে সে বুঝি শিল্পীর চোখে লালিত স্বপ্নের মতো সুন্দর। নিজের স্ত্রীর কথা মনে পড়লেই সুবলের চোখের স্বপ্ন শরৎ ঋতুর নীলাভ আকাশের থেকেও বেশি সুন্দর আর সাগরের থেকেও বেশি গভীর হয়ে যায়। তার স্ত্রীর নাম বিনোদিনী। বিধাতার হাতে গড়া শ্বেতপাথরের সেই প্রতিমাকে কোন ছোটবেলায় সে দেখেছে। এখন না-জানি সেই রূপ কীরূপে বিকশিত হয়েছে!
আজ হয়তো বিনোদিনীকে দেখলে চিনতেও পারবে না সুবল। তার সৌন্দর্য নিষ্কলুষ ফুলের সুগন্ধ হয়ে গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে চলে আসে সুবলের কাছে। সুবলের শিল্পীমন তাকে দেখার জন্য উৎকণ্ঠিত। সে ভাবে, বিনোদিনীকে দেখার পর, তাকে স্পর্শ করার পর সে আরও...আরও বেশি সুন্দর মূর্তি গড়তে পারদর্শী হয়ে উঠবে। তার রূপ-কল্পনার সময় সুবলের চোখে আধফোটা পদ্মের অনুরাগ-রঞ্জিত এক লজ্জাবতীর ছবি জন্ম নেয়।
সুবলের মা নববধূর জন্য গেরস্থালি সাজায় আর বলে, ছেলের সুখ, সৌভাগ্য, যশ, কীর্তি, স্বাস্থ্য, সন্তোষ আর দীর্ঘ আয়ুর বর নিয়ে লক্ষ্মী প্রতিমা বধূ বিনোদিনী এই ঘরে পা রাখবে। বধূর চরণই শ্রীদেবীর চরণ। শুভাগমনের তিথি, বার, নক্ষত্র এবং লগ্ন ইতিমধ্যে সবই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে।
সুবলের বন্ধু রজত সুবলের মনের খবর রাখে। তার পরিণীতা স্ত্রী বিনোদিনীদের পাশের গ্রামের মেয়ে। সে এখন বাপের বাড়িতেই রয়েছে। কয়েক মাস আগে সে একটি পুত্রসন্তানের জননী হয়েছে। রজতকে তাই নিজের স্ত্রী-পুত্রকে গ্রামে ফেরানোর জন্য শ্বশুরগৃহে যেতে হবে। রজত সুবলকে জিজ্ঞাসা করে, ‘যাবে, সুবল? আমার বউ তোমাকে দেখলে খুব আনন্দ পাবে।’
‘বলছ, ভাই? আচ্ছা, দাঁড়াও। আমি মায়ের সঙ্গে একটু কথা বলে নিই।’
সুবলের মা গোড়াতেই ‘না’ করলেন না, তবে একটু মিষ্টি ভাবে ঘুরিয়ে বললেন, ‘দিনকাল যা পড়েছে! এত ইয়ে বাপু আমাদের সময় দেখিনি। এ বাড়িতে বউমার আসতে মাত্র আর বারোদিন বাকি আছে। দ্বিরাগমনের আগে এভাবে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া কি মানায়?’
‘মা, আমি শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা বলিনি। রজত নিজের বউ-ছেলেকে আনতে ওর শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে। সেটা অন্য গ্রামে, বিনোদিনীদের পাশের গ্রাম। তুমি তো জানোই, রজতের প্রথম সন্তান হয়েছে। আমি সঙ্গে থাকলে হয়তো পথে সুবিধা হবে বলেই আমাকে যেতে বলছে।’
‘কিন্তু পথে যে তোর শ্বশুরবাড়ির গ্রামটা পড়বে? আমি কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি? আমার চুলগুলো রোদে পাকেনি! যাক গে, রজতের বউটা বাপু খুব মিষ্টি। ওরকম বউ ঘরে ঘরে আসুক। অমন লক্ষ্মীমন্ত বউ আর বাচ্চাটাকে ঘরে আনতে যাচ্ছে, সেই কাজে বাধা দিয়ে তো আর পাপ বাড়াতে পারি না। যাবি যখন বলছিস, যা। কিন্তু মনে থাকে যেন সুবল, তোর শ্বশুরবাড়ির গ্রামের উত্তরদিক দিয়ে যে পথটা আছে, সেটা ধরে ফিরবি। ওই গ্রামে যেন দ্বিরাগমনের আগে তোর পা না-পড়ে, সুবল! এসব রীতি একটু মেনে চলতে হয় বাবা।’
রজতের স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে সুবলরা যখন তার শ্বশুরবাড়ির গ্রামের উত্তরদিকের পথটা ধরল, তখনই রজতের স্ত্রী চঞ্চলা বলল, ‘শোনো না, সামনেই একটা পদ্মপুকুর পড়বে। তার পাশেই বিরাট আমবাগান। ওখানে ছায়ায় একটু বিশ্রাম নেব। ছেলেকে দুধ খাওয়াতে হবে।’ নিজের কথা শেষ করেই চঞ্চলা রজতের দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে চোখ টিপল।
শেষ দুপুরের পড়ন্ত নরম রোদে প্রতিটা গাছ, প্রতিটা গুল্ম কমলা হয়ে উঠেছে। দুটো গ্রামের মাঝামাঝি পদ্মে ভরা পুকুরটা নিজের আর আশপাশের শোভাবর্ধন করছে। দুই গ্রামেরই মেয়ে-বউরা এসে এখানেই স্নানপর্ব সারে। এই অসময়েও কয়েকজন কিশোরী পদ্মপুকুরে নাইতে নেমেছে। সুবল তেরছা চোখে ওই জলে কাউকে খুঁজে চলেছে। কোনো সরসীর অন্বেষণে সে ব্যাকুল।
চঞ্চলা সুবলের উদ্দেশে বলে উঠল, ‘যদি মিষ্টি খাওয়াবে কথা দাও, তবে একজনের সন্ধান দিতে পারি।’
‘আগে সন্ধান দাও, তারপর মিষ্টিমুখ করাব।’
‘ভাইটি আমার, মেয়েদের চোখ কখনো ভুল বস্তুর সন্ধান দেয় না।’
‘ভুল বা ঠিক তো বলিনি। সন্ধান দিলেই মিষ্টি বাঁধা।’
‘তাহলে অমন বাঁকা চোখে না-তাকিয়ে একটু সোজাসুজি দেখো দেখি। ওই যে, পরনে লাল শাড়ি, ওটাই তোমার হৃদয়েশ্বরী বিনোদিনী।’
সুবল এবার দুচোখ মেলে দেখল, গায়ে লাল শাড়ি জড়িয়ে উদ্ভিন্নরূপা এক কিশোরী পদ্মপুকুরে কোমর-জলে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় আঁচল চাপা। দূর থেকে দেখলে পদ্মপুষ্পের বনে তাকেও পদ্ম বলেই ভ্রম হয়। রক্তিম শাড়ির পাপড়িতে আবৃত একটি পদ্মকেশরী মুখ। কাজল কাজল দুটি চোখ সত্যিই যেন ভ্রমরের মতো পদ্ম-কেশরে বসে মধুপান করছে।
তখনই পুকুরে স্নানরতাদের মধ্যে কেউ বলে উঠল, ‘ও রে ও সখী, ওই দ্যাখ—যাকে দিনরাত স্বপ্নে দেখিস, মনে সাজাস আর সোহাগ করিস, দ্বিরাগমনের দিন গুনিস, সেই সুবল মহারানা নিজেই চলে এসেছেন। দ্যাখ লো মুখপুড়ি! ওই যে...মাথায় জগন্নাথি প্রসাদবস্ত্রের পাগড়িতে ওটাই সুবল মহারানা। আমি চিনি। চান সেরে উঠে প্রণাম কর!’
বিনোদিনীর সখীরা সবাই একসঙ্গে খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসি তো নয়, পুকুরের জলে যেন জলতরঙ্গ উঠল। সুবল কাঁপা-কাঁপা হৃদয়ে নিজের সদ্যস্নাতা বালিকাবধূর মুখচ্ছবি দুচোখে ধরার চেষ্টা করছিল এমন সময়ে, লাল শাড়ি পরিহিতা ছপাক করে পুকুরের জলে ডুব দিল। কিশোরীর স্থানে জলে শুধু ঘূর্ণি দেখা গেল।
বিনোদিনীর সখীদের ওপরে বেশ রেগে গেল সুবল। হতাশ সুবল একদৃষ্টে জলের দিকে তাকিয়ে রইল, তার লাবণ্যবতী কখন উঠবে, জলের তলায় শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে না তো?
‘আজ নাহয় লজ্জা পেয়ে জলে ডুব দিয়ে দিল, বারোদিন পরে এ-ই তোমার গলার মালা হবে গো,’ চঞ্চলা সুবলকে উদ্দেশ্য করে বলল কথাটা। সুবল একবার কপট রাগের দৃষ্টি নিয়ে চঞ্চলার দিকে তাকাল। চঞ্চলা আবার বলল, ‘যাক গে, যেটুকু দেখা গেছে তাতে করে কি মিষ্টিমুখ করানো চলে?’
‘মিষ্টিমুখ তো হবেই, আজ আমার বন্ধু রজত তোমায় মিষ্টিমুখ করাবে। ওর মুখেও তো মিষ্টির স্বাদ লাগা চাই। আমাকে এই পথে ও-ই এনেছে, ওর দিকটাও আমার দেখা দরকার।’
‘নির্লজ্জ কোথাকার!’ চঞ্চলার এই ছদ্ম রাগ দেখে রজত আর সুবল জোরে–জোরে হাসতে লাগল।
ওরা আবার পথচলা আরম্ভ করল। কিছুটা দূরে গিয়ে কোনো এক অদম্য আকর্ষণের বশে সুবল পিছনে ফিরে তাকাল। বিনোদিনী জল থেকে মাথা তুলে সিক্ত লাল বস্ত্রে তাকে একদৃষ্টে দেখে চলেছিল। সুবল সেদিকে তাকাতেই সে আবার জলে ডুব দিল। পিছনে সখীদের কথার স্রোত আর কলকল হাসির রব উঠল।
চঞ্চলা ভ্রূ নাচিয়ে হাসি হাসি মুখে মৌন প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ‘কেমন দেখলে?’
‘চলো চলো, আমরা এবার এগোই। নইলে আমার বিনোদিনী শুধু ডুবই দিতে থাকবে,’ সলজ্জভাবে সুবল উত্তর দিল।
পদ্মপুকুরের অন্যান্য পদ্মপ্রসূনের মধ্যে একটি সজীব পদ্মফুলের মনমোহন ছবি মনে গেঁথে নিয়ে সুবল ঘরে ফিরে এল।
মহারাজা নৃসিংহ দেবের মনে এখন একটাই চিন্তা—একটি বিশাল সূর্য মন্দিরের নির্মাণ করাতে হবে। তিনি নিজের মনের কথা মন্ত্রী সদাশিব সামন্ত রায় মহাপাত্রকে বললেন। এবং মন্ত্রী সদাশিব সামন্ত রায় মহাপাত্র ওরফে শিবেই সান্তারা মনপ্রাণ ঢেলে উদ্যোগী হয়ে পড়লেন।
শিবেই সান্তারা নির্মাণ বিভাগের মন্ত্রী তথা সমকালের একজন দক্ষ অভিযন্তা এবং স্থপতি। যোজনাটিকে বাস্তবায়িত করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি নিজের কল্পনাশীল মেধা এবং প্রযুক্তিগত বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে সূর্য মন্দিরের মানচিত্র তথা প্রাক-কলন তৈরি করলেন। নৃসিংহ দেবের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পরে কার্যপদ্ধতি নির্ধারিত হয়ে গেল। অনুমান করা হল যে, এই নির্মাণে উৎকল রাজ্যের বারো বছরের সকল রাজস্ব লেগে যাবে। বারোশো কুশল শিল্পীদের সহায়তায় এই মন্দিরের মূল সংরচনার নির্মাণে বারো বছর সময় লাগার সম্ভাবনার কথাও অনুমান করা হল। সহায়ক স্থাপত্যের জন্য আরও চারটি বছর।
বয়ালিসবাটির ভ্রমরবর হরিচন্দন আয়–ব্যয়ের নিরীক্ষক রূপে নিযুক্ত হলেন। রূপাশগড়ের দলবেহরাকে দক্ষ শিল্পী আনয়নের ব্যবস্থার দায়িত্ব দেওয়া হল। কুশল শিল্পীর অভাব অবশ্য উৎকলে কোনোদিনই ছিল না। আগে থেকেই ভুবনেশ্বরের শত শত মন্দির, পুরীধামের বিশ্ববিখ্যাত জগন্নাথ মন্দির এবং রাজ্যের অন্য বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক ছোট-বড় মন্দির উৎকলের শিল্পীদের দক্ষ স্থাপত্য-শিল্পের উদাহরণ তৈরি করেছিল। পদ্মতোলা গণ্ড নামক পুষ্করিণী বুজিয়ে সেখানেই মন্দির নির্মাণ করা হবে—এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে-সঙ্গেই স্থাপত্যের জন্য ভূমির সমস্যার নিদানও পাওয়া গেল।
ওদিকে যখন থেকে মালিক ইখতিয়ারুদ্দিন উজবেগ বাংলার শাসক বনেছিল, তখন থেকেই সে গৌড় তথা রাঢ়ভূমিকে আবার নিজের অধীনস্থ করার জন্য উৎকল রাজ্যকে বার বার আঘাত হানছিল। প্রতিটা ছোটখাটো যুদ্ধে উৎকল এখনও বিজয়ীই হচ্ছিল। বিবশ, পরাজিত উজবেগ এবার দেহলি থেকে বড় ধরনের সৈন্য-সাহায্য চাইল, এবং বলবন উজবেগকে সাহায্য করার জন্য সত্যি সত্যিই বিরাট সৈন্যসাহায্য পাঠিয়ে দিল।
এবারে পরিস্থিতি অন্যরকম দাঁড়াল। নৃসিংহ দেব এক বিশাল সূর্য মন্দিরের নির্মাণে ব্যস্ত, একই সময়ে তাঁর মাতৃভূমির শিয়রে শমন।
রাজ্যের প্রত্যেক গ্রামেগঞ্জে ঢেঁড়া পিটিয়ে ঘোষণা করা হতে লাগল—
‘শোনো...শোনো...শোনো...মহারাজ নৃসিংহ দেবের আদেশ...মহারানি সীতা দেবীর ইচ্ছা...রাজমাতা কস্তুরি দেবীর মনোকামনা! পদ্মক্ষেত্রে পদ্মতোলা গণ্ডে একটি অদ্বিতীয় সূর্য মন্দিরের নির্মাণ করা হবে। এই মন্দির উৎকলীয়-শিল্পের পরাকাষ্ঠার চরম নিদর্শন হওয়া চাই। উৎকল নিজের সবথেকে কুশল শিল্পীদের আবাহন করছে...এই ঐশ্বরিক ইচ্ছার পূরণে অংশীদার হও। এই মন্দিরের নির্মাণকালে শিল্পীদের পরিবারের সম্পূর্ণ উত্তরদায়িত্ব স্বয়ং মহারাজ নৃসিংহ দেব বহন করবেন বলে কথা দিয়েছেন।
শোনো...শোনো...শোনো...উৎকলের বলিদানী বীরেরা শোনো...মাতৃভূমির উপরে সংকট আসন্ন। যবনদের অহংকারকে যথাযথ উত্তর দেওয়ার জন্য মাতৃভূমির উৎকলীয় বীরদের রক্ত প্রয়োজন। উৎকল সেনাদলে সম্মিলিত হওয়ার জন্য যুবকদের আহ্বান জানাচ্ছে—মাতৃভূমির ঋণ শোধ করার এই তো সুযোগ! শোনো...শোনো...শোনো...’
একদিকে মাতৃভূমির সুরক্ষার জন্য যবনদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ আসন্ন ছিল, অন্যদিকে শিল্পকলা এবং স্থাপত্যের অক্ষয় কীর্তি স্থাপনার প্রস্তুতি-পর্ব।
যুদ্ধ এবং নির্মাণের এই দুই মহাপর্ব সমান্তরাল ভাবে চলতে পারা বিস্ময়কর হলেও নৃসিংহ দেবের পক্ষে তা অসম্ভব কিছু ছিল না। কারণ উৎকলের প্রজারা নৃসিংহ দেবকে ঈশ্বরের মতোই বিশ্বাস করত। অখণ্ড আস্থার কেন্দ্র ছিলেন তিনি। নৃসিংহ দেব যোদ্ধা পুরুষ, বীর, কিন্তু যুদ্ধোন্মাদ ছিলেন না। তাঁর মনেপ্রাণে বসত করত সাহিত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত এবং ভাস্কর্য। তরবারির ঝংকার আর নূপুরের নিক্কন সমানভাবে প্রিয় ছিল তাঁর। তিনি পরমশিল্পী বিধাতা পুরুষের এমন এক অদ্ভুত সৃষ্টি ছিলেন যে, তাঁর মধ্যে অদ্ভুত সুন্দর সব পরস্পর বিরোধী গুণের সমাহার ছিল। অপূর্ব এক সমন্বয়! তাঁর উদার শাসননীতি এমনিতেই তাঁকে জনপ্রিয় শাসক করে তুলেছিল।
একদিকে যুদ্ধের জন্য যুবকদের আবাহন, অন্যদিকে শিল্পের জন্য শিল্পীদের আমন্ত্রণ। প্রতিটি গ্রাম, প্রত্যেক নগর থেকে যুবকেরা দলে দলে নিজেদের ঘরসংসার ত্যাগ করে নৃসিংহ দেবের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সংকল্পে তৎপর হয়ে উঠল। কেউ যবনদের সঙ্গে শক্তির পরীক্ষায় নিজের তরবারিতে, আবার কেউ পাষাণের বুকে শিল্প সৃষ্টির তাগিদে ছেনিতে ধার দিতে শুরু করল। কারো মনে কোনো গ্লানি নেই। যুদ্ধ এবং মন্দির-নির্মাণ দুটোই উৎকলবাসীদের কাছে সমান রুচিকর। জীবনের আদর্শ। রাজা এবং জাতি, উভয়ের গৌরবই উৎকলীয়দের আত্মার অঙ্গ, কারণ উৎকলের রাজা নিজের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের বলে শুধুমাত্র রাজ্যে নয়, উৎকলের প্রত্যেক প্রজার হৃদয়ে শাসন করেন।
পরমার্দিদেব সামন্তরায় যবনদের বিরুদ্ধে অনেক বার নিজের ক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছিলেন, কিন্তু এবারে যুদ্ধের বিভীষিকায় নিহত হলেন তিনি।
আবুত্তের এই বীরগতি প্রাপ্তির সংবাদ শুনে নৃসিংহ দেবের মাথায় যেন বাজ পড়ল! এবারের যুদ্ধে বাংলার বিজিত ক্ষেত্রের অধিকাংশটাই যবনদের অধিকারে চলে গেল। সিংহের গুহামুখে যবনদের এই পদনিক্ষেপ রণ-কেশরীকেও বিচলিত করে তুলল। কিন্তু নৃসিংহ দেব যুদ্ধ থেকে মুখ ফেরালেন না। আহত পশুরাজের মতোই উৎকলের সেনাদল যবন বাহিনীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাঢ় তথা বারেন্দ্র ভূমির যবন রমণীদের ক্রন্দনে তাঁদের চোখের কাজল বয়ে গিয়ে ঘোর কালো করে তুলল গঙ্গার জলকেও। নৃসিংহ দেবের পরাক্রমে দশ দিক স্তম্ভিত হয়ে গেল। শেষ অবধি যবন সেনাদের আর উৎকলের মাটিতে পা-রাখার সাহস হল না।
লক্ষ্মণাবতীর যুদ্ধে বাংলার শাসক তথা দেহলির সংযুক্ত সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ রূপে পরাজিত করে নৃসিংহ দেব হাম্মির মানমর্দক এবং দেহলি-বিভঞ্জকের মতো দু-দুটি গর্ব-গৌরব উপাধিতে অলংকৃত হলেন। অনেকানেক তাম্রপত্রে তাঁর কীর্তি খোদিত হল। কবি বিদ্যাধর একাবলী নামক কাব্যে, এবং কবি ডিণ্ডম দেব আচার্য ভক্ত ভাগবত মহাকাব্যম্-এ রাজা নৃসিংহ দেবের শৌর্যের কথা লিপিবদ্ধ করলেন।
উৎকল রাজ্যের এই ঐতিহাসিক মহাবিজয় উপলক্ষ্যে চন্দ্রভাগার মোহানায় বিশ্বের সর্বোচ্চ, আপাদমস্তক শিল্পখচিত, বিশ্ববিশ্রুত সূর্য মন্দির কোণার্কের ভিত্তি স্থাপনও সুনিশ্চিত হয়ে গেল।
বারোশো শিল্পী। প্রত্যেককে বারো বছর ধরে ব্রহ্মচারী থেকে, একাগ্রচিত্তে, নিজের গৃহ, পরিবার, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, প্রেম-প্রীতি, রাগ-বিরাগ, সুযোগ–সুবিধা, মোহ, লোভ, লালসা এবং কামনা—এই সব কিছুকে বিস্মৃত করে, নিজেকে ভুলে অবিরাম কাজ করে যেতে হবে। কোণার্ক মন্দিরের কলস স্থাপনার আগে ঘরে ফেরার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
বারো বছর ধরে অখণ্ড ব্রহ্মচর্য পালনের প্রতিজ্ঞা করার পরে উৎকলের বারোশো শিল্পী এই অভূতপূর্ব স্থাপত্যের নির্মাণের জন্য একত্রিত হল। তাঁদের সোনালি সংসার, পুত্র-কন্যাদের ক্রন্দন, প্রিয়া-পরিণীতাদের বিরহ বেদনা, পরিবারের বৃদ্ধজনদের দীর্ঘ উচ্ছ্বাস, সব পিছনে পড়ে রইল। একযুগ সময়ব্যাপী পিতা নিজের পুত্রের, স্ত্রী নিজের স্বামীর মুখ দেখতে পারবে না। পুত্র নিজের মাতা-পিতার অন্তিম সময়ে মুখে জলটুকুও দিতে পারবে কি? মুখাগ্নি করতে পারবে? এমন শত শত অনুচ্চারিত প্রশ্ন গৌণ রয়ে গেল।
শিল্পীদের জন্য আশীর্বাদের রূপ ধরে এল আদেশ, ‘যাও, এই কাজে পিছু হটবে না। শিল্প-সাধনার পথে কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মাৎসর্যের কোনো ভূমিকা নেই। কোণার্ক কালজয়ী হোক! উৎকলের শিল্প, উৎকলের শিল্পী অমর হোক! উৎকলের খ্যাতি দিগন্তে প্রসারিত করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে রওনা দাও।’
অখণ্ড ব্রহ্মচর্য পালন না-করলে পদ্মক্ষেত্রে সূর্য মন্দিরের নির্মাণ সম্ভবই ছিল না। পদ্ম আর সূর্যের প্রেমই ছিল এই নির্মাণের আদর্শ। বারো বছর ধরে প্রত্যেক রাগ-অনুরাগ এবং শরীরী আকর্ষণের তিলাঞ্জলি দিয়েই এই প্রক্রিয়াকে সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল। এই নির্মাণ আসলে নিজের গহনে এক নিষ্কলুষ প্রেমের মন্দির, একাগ্র সাধনার পূণ্যপীঠ, এবং উৎসর্গ তথা পবিত্রতার স্মৃতি সৌধ হয়ে ওঠার কথা ছিল।
রূপাশগড়ের দলবেহরা নির্মাণ সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করছিলেন। এই মহানির্মাণের কাজে নিজের কুলাগত জ্ঞান-গরিমা নিয়ে যোগ দিল সুবল মহারানা। নিজের প্রিয়া-পরিণীতার দ্বিরাগমনের অপেক্ষা না-করে সুবল বারো বছর অখণ্ড ব্রহ্মচর্য পালনের মহাব্রত নিয়ে নিজের দ্বিরাগমনের তিথির সাতদিন আগেই বাপ–পিতামহর ছেনি, হাতুড়ি সম্বল করে উৎকলের পদ্মক্ষেত্রে গিয়ে উপস্থিত হল।
দলবেহরা মহাশয় যখন তাকে সঙ্গে নিয়ে পদ্মক্ষেত্রের উদ্দেশে রওনা দিলেন, তখন সে মুখ ফুটে এটুকুও বলতে পারল না যে, বিশ্ববিখ্যাত সূর্য মন্দির নির্মাণের জন্য পাষাণের বুকে ফুল ফোটানোর আগে একটি বার নিজের বিনোদিনীর পদ্মমুখখানি দেখে নিতে দিন। বলবেই বা কীভাবে? সে তো আর একলা নয়। তার মতো আরও বারোশো জন শিল্পী ছিল। কেউ নিজের মধুযামিনী ছেড়ে এসেছিল, কেউ উঠে এসেছিল বিবাহ-বেদী থেকে, কেউ নিজের অজাত শিশুর মুখ দেখার ইচ্ছে দমন করে আসতে বাধ্য হয়েছিল, কেউ বা মৃত্যুশয্যায় নিজের মা’কে ফেলে রেখে এসেছিল।
সত্যিই তো, সুবল মহারানা বলবেই বা কীভাবে? যদি যুদ্ধের ডাক শুনে একজনও সৈনিক অকুণ্ঠ ভাবে সবকিছু ত্যাগ করে দিয়ে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে দেওয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠতে পারে, তাহলে উৎকলের কীর্তি-কথা লেখার জন্য তার মতো একজন শিল্পীই বা কেন এই সামান্য আত্মত্যাগ করতে পারবে না?
সবার মনে একটাই কথা ছিল, ‘এ তো রাজার আদেশ নয়, আহ্বান! রাজা হলেন জগন্নাথ মহাপ্রভুর রাউত, তিনি সেবক মাত্র। এই নির্দেশ আসলে মহাপ্রভু জগন্নাথ স্বামীর। শিল্পীকে দেওয়া এই নির্দেশ আসলে পরমশিল্পী বিধাতার নির্দেশ।’
দলবেহরার সঙ্গে আসার পথে ওই পদ্মপুকুরখানা আবার পড়ল। সুবল আরও একবার বড় সাধ নিয়ে পুকুরের দিকে তাকাল। জলে একটিও পদ্ম ফুটে নেই। যেন তার পরিণীতার অভিমানের প্রতীক হয়ে সব পদ্মপুষ্পই নিজেদের ঠোঁট বন্ধ করে নিয়েছে—কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু পদ্মপাতায় অশ্রুবিন্দুর মতো জমে থাকা শিশিরকণারা যেন বলছিল, ‘প্রিয়, ক্ষত দেখা যাচ্ছে না বলে ভেবো না যে ক্ষত নেই। ক্ষত আছে, ব্যথাও আছে।’
সুবল আর দ্বিরাগমনের তিথি পিছোনোর কথা তোলেনি। এ তো কয়েকদিনের গল্প নয়। তাই দ্বিরাগমন যথাসময়ে হল। সুবল অবশ্য উপস্থিত রইল না। তার ভাই ধবল মহারানা ভ্রাতৃবধূকে নিয়ে এল। সুবল অবশ্য নিজের ভাইয়ের হাত দিয়ে একটি স্মৃতিচিহ্ন পাঠিয়েছিল—সোনার পদ্মে সাতটি পাপড়ির কেন্দ্রস্থলে গাঢ় পীতাভ বর্ণের পুষ্পরাগ মণি জড়িত একটি আংটি, যার সুবল-পাপড়ির প্রত্যেকটিতে একটি করে অক্ষর খোদিত ছিল—‘সু’ ‘ব’ ‘ল’ ‘ম’ ‘হা’ ‘রা’ ‘ণা’।
উপহার, উপহার! শুধু কি এটুকুই? সুবলের পক্ষ থেকে বিনোদিনী উপহার হিসেবে পেল এক নয়, দুই নয়, বারোটি বছরের অপেক্ষা! একজন শিল্পী নিজের প্রাণপ্রিয়াকে আর কী-ই বা দিতে পারে?
সুবল মহারানার কুল উৎকলের বিখ্যাত শিল্পীদের কুল ছিল। সুবলের ঠাকুরদা সুবলকে তক্ষণ শিল্প, বাস্তু শাস্ত্র, নৃত্যকলা, স্থাপত্যবিদ্যা এবং বিবিধ পাষাণের গুণধর্ম খুব ভালোভাবেই শিখিয়েছিলেন। শিবেই সান্তারা নিজের সমকালের অপ্রতিম শিল্পী বিশ্বনাথ মহারানা বা বিশু মহারানাকে কোণার্ক মন্দিরের ভাস্কর্য নিয়ন্তা রূপে নিযুক্ত করলেন। সুবলের গুণ এবং শিল্পজ্ঞান দেখে বিশু মহারানা তাকেই নিয়োগ করলেন নিজের সহায়ক রূপে। সুবল মহারানা এবার হয়ে উঠল কোণার্ক ভাস্কর্যের সহ-নিয়ন্তা। বাইশ বছরের যুবক সুবলের অধীনে এবার বারোশো শিল্পীর নিজ নিজ শিল্পকে প্রতিষ্ঠা করার পালা।
দূর–দূরান্তের বিভিন্ন পাহাড় থেকে নানা ধরনের পাষাণ খণ্ড আনানো হল। কী বিচিত্র তাদের নাম—চিত্রঙ্কুদা, করান্দিমাল্যা, মাঙ্কড়া, রেগড়া ইত্যাদি। বিচিত্র তাদের বর্ণ—সাদা, কালো, নীলাভ। নবগ্রহের নির্মাণ করার জন্য আনা হল ছ’শো বিয়াল্লিশ মণ ওজনের একটি শিলাখণ্ড। মন্দিরের উপরে কলস স্থাপনা করার জন্য ছাপ্পান্ন হাজার মণ ওজনের একটি বিশাল পাথর হাজার যোজন দূরত্বের জলপথ অতিক্রম করে আনা হচ্ছিল।
বেদপুরের বিদ্বান বেদপাঠী ব্রাহ্মণদের দ্বারা ভূমিপূজা এবং ভূমিশুদ্ধির পরে মঙ্গল-ধ্বজা রোপণ করা হল। ভিত্তি স্থাপনা হয়ে গেল। শিবেই সান্তারার আঁকা মানচিত্রকে মূল মেনে প্রত্যেক শিল্পীকে তার উপযুক্ত কাজ ভাগ করে দেওয়া হল। নির্দিষ্ট সময়ে কার্য সম্পূর্ণ করতেই হবে, দেওয়া হল এই আদেশ। পরিকল্পনা করা হল যে, বারোশো শিল্পীর দ্বারা নির্মিত পৃথক পৃথক অংশগুলিকে একসঙ্গে জুড়ে, তাদের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে এক অদ্বিতীয় ভাস্কর্যকে দাঁড় করাতে হবে।
এই কাজ সহজ ছিল না। আত্মার সঙ্গে আত্মার সামঞ্জস্য বিধানের মতোই কঠিন। আজকের পৃথিবী, মন আর হৃদয়ের দিক থেকে ক্ষুদ্র, সীমিত, কুণ্ঠিত। আজকের অহংকার, অসহিষ্ণুতা, উপেক্ষা এবং অবিশ্বাস করতে শেখায়। কিন্তু রাজা নৃসিংহ দেবের শাসনকালে সম্পূর্ণ উৎকল এক নব-চেতনায় প্রমত্ত ছিল। রাজা, পারিষদ, সামন্ত, প্রজা, শিল্পী, ভাস্কর, কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, বাস্তুকার, ভূগোলবেত্তা, জ্যোতিষী প্রত্যেকে একে অন্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। একটি সমন্বিত, শুভ, সুন্দর দিব্যদৃষ্টি নিয়ে, উদ্যম এবং সাধনার বলে কালজয়ী সৃষ্টির পথে অগ্রসর হচ্ছিল উৎকল।
মূর্তি, প্রতিমা গড়ার কাজ আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। ছেনির মৃদু আঘাতে পাষাণ সজীব হয়ে উঠছিল। কোণার্কের পরিকল্পনা ক্রমশ শ্বাস নিতে শুরু করেছিল।
সামনে বিছানো আছে নির্মাণের মানচিত্রের প্রতিলিপি। সুবল একমনে দেখে চলেছে মানচিত্রের প্রতিটি রেখা। মূল মানচিত্রটি মন্ত্রী সদাশিব সামন্তরায় মহাপাত্রের কাছে সুরক্ষিত রয়েছে। এক-এক করে সম্পূর্ণ ভাস্কর্যের রূপরেখা তার মানসচক্ষে ভেসে উঠতে লাগল—‘বিশালাকার সূর্য-রথ রূপে নির্মিত হবে মন্দির। রথের বারো জোড়া চাকা, বারো মাসের চব্বিশটি পক্ষের প্রতীক। গায়ত্র, ভ্রাতি, উষ্ণীক, জগতি, ত্রিস্তপ, অনুস্তপ এবং পঙক্তি সূর্যদেবের রথে জুতে থাকা এই সাতটি অশ্ব বা সপ্তাশ্ব সম্মিলিত রূপে সপ্তাহের প্রতীক।
পশ্চিমে আয়তাকার পীঠে সর্বমুখী মহাপ্রশস্ত গর্ভস্থল, পূর্বে প্রশস্ত মুখশালা, বিমানের দক্ষিণে, পশ্চিমে এবং উত্তরে ভিত্তি সংলগ্ন মিত্র, পূষণ এবং হরিদশ্ব নামক তিন পার্শ্ব-দেবতার মন্দির। মুখশালার পূর্বে, উত্তরে এবং দক্ষিণে তিনটি দ্বার। প্রত্যেক দ্বারের শেষে সোপান শ্রেণী, প্রত্যেক সোপান শ্রেণীর দুইধারে শিল্পখচিত স্তম্ভ।
পূর্ব দিকের সোপান শ্রেণীর স্তম্ভদ্বয়ের উপরে বিরাট সজীব গজসিংহের মূর্তি। দক্ষিণ সোপানের প্রান্ত ভাগে স্তম্ভের উপরে আরোহণ করে থাকবে দুটি সমরাশ্ব, উত্তর দিকে স্তম্ভের উপরে রণহস্তী।
পূর্ব দিকের সোপান শ্রেণী এবং নাট্য-মণ্ডপের পিছনের সোপান শ্রেণীর মধ্যে পঞ্চাশ হাত উঁচু অরুণ স্তম্ভ। মুখশালা থেকে দেউলের অভিমুখে যেতে শিল্পসজ্জিত দ্বার। গর্ভগৃহে পঞ্চরথের আকৃতির সিংহাসন, তাতে রত্নখচিত রত্নবেদী। রতনবেদীতে দেবপ্রতিমা, কুট্টিম থেকে সিংহাসন অবধি কলাখচিত সিঁড়ির শ্রেণী, সিংহাসনের নীচে হস্তী, তার পায়ের কাছে লতা এবং মধ্যে–মধ্যে অন্য পশুদের চিত্র। সিংহাসনের মধ্যে উপাসনার চিত্রে পূর্ণ বেশে নতজানু হয়ে মহারাজ নৃসিংহ দেব এবং সীতা দেবী। রাজ-দম্পতির সামনে–পিছনে পাঁচজন মন্ত্রী, ফুল দেওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়েছে একজন সেবক।
সিংহাসনের সামনে দুইদিকে পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে উলট-সিংহ, পিছনের দুটি কোনায় একটি করে হাতি এবং তাদের উপরে উলট-সিংহ। নৈঋত কোণে ছায়া দেবীর এবং তারও নৈঋতে মায়া দেবীর মন্দির।’
মানচিত্র দেখতে দেখতে সুবল মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছিল। মানচিত্রটা গুটিয়ে হাত নিয়ে এবার সুবল নিজের শিবিরের বাইরে এসে দাঁড়াল। এখন পদ্মতোলা গণ্ডের ভূভাগটা সম্পূর্ণরূপে ওর চোখের সামনে ফুটে উঠছে। কিন্তু কী যেন চিন্তা করেই শিহরিত হল সে। চমকে উঠল সুবল, ‘না না, এ কিছুতেই হতে পারে না! এই নির্দিষ্ট ভূমিতে নির্ধারিত পরিকল্পনার মধ্যে যে অনেক বাস্তুদোষ আছে!’
ঠাকুরদার আশীর্বাদে, জ্ঞান ও গরিমার বলে সুবল মহারানা উৎকল ভূমির অদ্বিতীয় বাস্তুবিশারদ। ধারার রাজা ভোজ একাদশ শতাব্দীর পূর্বাব্দে বাস্তু শাস্ত্রের আকর গ্রন্থ ‘সমরাঙ্গনসূত্রধা’র রচনা করেছিলেন। সেই মহাগ্রন্থের তিরাশিটি অধ্যায়ের সবক’টাই সুবলের কণ্ঠস্থ। সে বিচলিত হয়ে উঠল। সময় নষ্ট না-করে সে তখনই মন্দিরের ভাস্কর্য–নিয়ন্তা বিশু মহারানার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলল, ‘ক্ষমা করবেন বরেণ্য, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, এই মহামন্দিরের নির্মাণের পরিকল্পনায় কিন্তু অনেক বাস্তুদোষ আছে। মন্ত্রীবর শিবেই সান্তারা মহাশয়কে বার্তা পাঠান।’
‘বাস্তুদোষ? কেমন বাস্তুদোষ, সুবল?’ বিশু মহারানার চোখে কৌতূহল খেলে গেল।
‘একটা নয়, একাধিক আছে।’
‘সে কী?’
‘প্রথমটা আস্থা এবং পরম্পরাজনিত। সূর্যদেবের গতির দিশা কী? পূর্ব থেকে পশ্চিমে। কিন্তু এই মন্দিরে সূর্যদেবের রথের অভিমুখ দেখুন। পূর্ব দিকে মুখ করে রয়েছে। বরেণ্য, আপনিই বলুন, সূর্য কবে পূর্ব দিকে যান?’
‘বুঝলাম। আর?’
‘মন্দিরের নির্মাণ রথের আকৃতির হওয়ার ফলে পূর্ব, অগ্নি এবং ঈশান কোণ খণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে।’
‘আর?’
‘মন্দিরের পিণ্ড ঈশান ও অগ্নি কোণে কাটা এবং বায়ু ও নৈঋত কোণে এগিয়ে রয়েছে। প্রধান মন্দিরের পূর্ব-দ্বারের মুখে নৃত্যশালা। তার ফলে পূর্ব-দ্বারটি অবরুদ্ধ হয়ে যাবে। এ তো দ্বারবেধ! নৈঋত কোণে ছায়া দেবীর মন্দিরের ভিত প্রধান দেবায়তনের তুলনায় নীচে অবস্থান করছে। এবং তারও নৈঋতে মায়া দেবীর মন্দিরের ভিত্তি আরও নীচুতে থাকবে। অথচ বাস্তুশাস্ত্র বলছে, যে কোনো ধরনের নির্মাণের ক্ষেত্রে নৈঋত ভাগই সর্বাধিক উঁচু হওয়া উচিত। অগ্নি কোণে একটি গভীর কূপ থাকার কথা। বাস্তুবিদ্যার অনুসারে এই কুয়োর অবস্থান কেবল দোষই নয়, মহাদোষ। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্নি কোণে জলস্রোত কীভাবে থাকতে পারে, মাননীয়?’
‘শুনছি আমি। আর কিছু?’
‘হ্যাঁ শ্রীমান, আরও আছে বইকি। দক্ষিণ এবং পূর্ব দিকে বিশাল দ্বার থাকবে। এর ফলে মন্দিরের খ্যাতি অম্লান থাকলেও বৈভব কিন্তু শীঘ্রই ক্ষীণ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। আমার মনে হয়, এই সমস্ত বাস্তুদোষ দূর করতে না-পারলে এই মন্দির সেই উদ্দেশ্য কখনোই সফল করতে পারবে না, যার জন্য এর নির্মাণ সংঘটিত হতে চলেছে।’
‘সূর্য-রথটির মুখ পূর্ব দিকে কেন থাকবে—তোমার এই শঙ্কার উত্তর হল এই যে, উদীয়মান সূর্যের রশ্মি মন্দিরে স্থাপিত সূর্যদেবের অভিষেক করবে বলেই এই মন্দিরকে পূর্বমুখী রূপে নির্মাণ করা হচ্ছে। এবং মন্দিরের সকল দ্বার বছরের বিভিন্ন ঋতুতে তথা দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে—এই উদ্দেশ্যেই পরিকল্পনা করা হয়েছে। সূর্যের গতির সাপেক্ষে প্রতিদিন সূর্যের প্রথম রশ্মি নাটমন্দিরের দ্বার হয়ে রত্নবেদী এবং সিংহাসনে আসীন দেববিগ্রহকে স্পর্শ করুক, এটাই উদ্দেশ্য। এই পরিকল্পনা অনুসারে দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যরশ্মি মুক্ত ভাবে নাটমন্দিরে প্রবেশ করতে পারবে।’
‘কিন্তু স্বয়ং সূর্যদেব, মর্ত্যের মানুষের দ্বারা স্থাপিত নিজের বিগ্রহকে নিজেরই কিরণে অভিষিক্ত করবেন—এর ঔচিত্য নিয়ে আমার মনে প্রশ্ন আছে, মহাশয়!’
‘জানি না! উচিত এবং অনুচিতের নির্ণয় না আমি করব, না তুমি। এবং বাকি সমস্ত বাস্তুদোষের ক্ষেত্রেও একটাই কথা তোমাকে বলতে পারি, এই ভূমিটাই মন্দিরের জন্য পাওয়া গিয়েছে। তোমার হাতে যে মানচিত্র আছে, আমাকেও তা-ই দেওয়া হয়েছে। এমতাবস্থায় না এই ভূমিটিকে পরিবর্তন করা সম্ভব, না এই মানচিত্র!’
‘কিন্তু আমরা শিবেই সান্তারা মহাশয়কে জানাতে তো পারিই? মন্দিরের মুখ্যদ্বার পশ্চিমমুখী হয়ে গেলেই কিন্তু অনেক দোষ আপনা আপনিই কেটে যাবে।’
‘শোনো সুবল, মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনা হয়ে গিয়েছে। যদি তা না-ও হয়ে থাকত, তাহলেও এই পরিবর্তন করা অসম্ভবই হতো। হয়তো বাস্তুশাস্ত্রে আমি তোমার মতো পারদর্শী নই, কিন্তু রাজসেবায় তোমার থেকে আমার অভিজ্ঞতা অনেক অনেক বেশি। আমার এবং তোমার কাজ মানচিত্রের অভিকল্পনাকে শিল্পের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলা, তাতে ত্রুটি সন্ধান করা নয়। অভিকল্পনের দায়িত্ব মন্ত্রী সদাশিব সামন্তরায় মহাপাত্র মহাশয়ের। বিশ্বনাথ মহারানা এবং সুবল মহারানার দায়িত্ব তাকে বাস্তবায়িত করা। এবং তাই আমি তোমাকে তোমার উপরে অর্পিত দায়িত্বটুকু পালন করার আদেশই দেব।’
‘কিন্তু...’
‘কোনো কিন্তু বা পরন্তুর স্থান নেই, সুবল। একটা কথা মন দিয়ে শোনো, যা যা বলেছ, তা তোমার আর আমার মধ্যেই থাকবে। ভুলেও অন্য কাউকে এই কথাগুলো বলতে যেও না। এখন যাও, মন দিয়ে নিজের কাজ করো।’
সুবল হতাশ হয়ে পড়ল। তাহলে কি বিশু মহারানা সমেত এই বারোশো শিল্পী বারো বছর যাবৎ যে ব্রহ্মচর্য পালন করবে তা শুধুমাত্র বাস্তুদোষের কারণে ধূলি-ধূসরিত হয়ে যাবে? সহায়ক ভাস্কর্যের পদে আসীন সুবলও নিজের সমস্ত কামনা-বাসনার গলা টিপে ষোল বছর ধরে ছেনির মৃদু আঘাতে পাথরের বুক কেটে যে কালজয়ী শিল্পের জন্ম দেবে, তা কালের কলেবরে বিলীন হয়ে যাবে। কারণ, তা আগে থেকেই অভিশপ্ত।
তাহলে কি ফিরে যাবে সুবল?
ফিরবে না-ই বা কেন?
যদি তার জ্ঞানের সদ্ব্যবহারই না হয়, তাহলে সে কেন তার শ্রম ব্যর্থ করবে? কেন? কেন?
বিদ্যার অহংকার তার নেই, কিন্তু গর্ব সে অবশ্যই করে। রাজকার্য যদি পূর্বনির্ধারিত যন্ত্রচালনা হয়ে থাকে, তাহলে সুবল সেই যন্ত্রের এক মূক দন্তুর-চক্র হয়ে বেঁচে থাকতে অপারগ।
সারা দিন ধরে সুবল ওই চিন্তাতেই ডুবে রইল। বার বার সে মানচিত্র খুলে খুলে দেখতে থাকল। ইশ, যদি আর কিছুদিন আগে আসতে পারত! যদি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনার আগেই তার হাতে এসে পড়ত এই মানচিত্রখানি, তাহলে হয়তো সে বিশু মহারানা এবং শিবেই সান্তারা মহাশয়কে বুঝিয়ে ঠিক সম্মত করিয়ে ফেলতে পারত। কিন্তু বিশু মহারানা বললেন, আর কিছু করার নেই। তাহলে? তাহলে এই নির্মাণের কাজে সহকারী হওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। সে ফিরে যাবে! ফিরে যাবে সে! ফিরে যাবে!
চন্দ্রভাগার তটে অস্তাচলগামী সূর্যদেব সন্ধ্যার আলোককে যেন সিঁদুর রঙের কাপড় পরিয়ে দিয়েছেন। ক্ষুব্ধ সুবল মানচিত্র হাতে তুলে নিয়ে হাঁটা দিল বিশু মহারানার শিবিরের দিকে। শিবিরে প্রবেশ করতেই তার চোখে পড়ল যে বিশু মহারানা নিজেও শ্যেনদৃষ্টিতে মানচিত্রটাকেই দেখে চলেছেন। সুবলের পায়ের শব্দে তাঁর হুঁশ ফিরল। স্নেহভরা কণ্ঠস্বরে তিনি সুবলকে প্রশ্ন করলেন, ‘ব্যাপার কী, সুবল? আবার নতুন কোনো সমস্যা?’
‘না মহাশয়। এখন আর কোনো সমস্যা নেই। আর আগের সব সমস্যার একটা সহজ সমাধান আমি বের করে ফেলেছি। আমি এই নির্মাণকার্যের সঙ্গে কোনো ভাবেই যুক্ত থাকতে চাই না। আমি নিজের গ্রামে ফিরে যেতে চাই।’
মুহূর্তের জন্য যেন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন বিশু মহারানা। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সুবল, কী বলছ তুমি?’
‘দেখুন, মহারাজা নৃসিংহ দেব যে মনকামনা নিয়ে মন্দির নির্মাণ করাতে চাইছেন, তা সিদ্ধ হবে না। এই স্থাপত্য চিরস্থায়ী হবে না, মাননীয়। যদি আমার জ্ঞানের ব্যবহারই না করতে পারলাম, তবে আমার শিল্প এবং শ্রমকে পণ্ড করে কী হবে? আমাকে ফিরতেই হবে।’
‘আচ্ছা, এখন বোসো! এ নিয়ে আমার যা বলার, তা পরে বলব। আগে আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দাও।’
‘প্রশ্ন? করুন। জানা থাকলে অবশ্যই উত্তর দেব।’
‘বলো তো দেখি, বিধাতা এই সংসারে সৃষ্টির দায়িত্বভার কাকে দিয়েছেন?’
‘নারীকে।’
‘একা নারী কি সৃজন করতে সক্ষম?’
‘না। সৃজনে পুরুষ এবং প্রকৃতি এই দুইয়ের সমাহার প্রয়োজন। সৃষ্টি করতে হলে নারীকে নরের সাহায্য নিতেই হবে।’
‘তাহলে কি একাকী সৃজন বা সৃষ্টি করা সম্ভব নয়?’
‘সম্ভব। শুধুমাত্র একজন শিল্পী একাকী সৃষ্টি করতে পারেন।’
‘বাহ্! এবার বলো, এমন কী আছে, যার বিস্তৃতি সাগরের থেকেও বেশি?’
‘মানুষের মন। মানবমনের বিস্তার সাগরের থেকেও বেশি।’
‘এত বড়, বিস্তীর্ণ মনকে, মনের ভাবকে, কয়েকটি শব্দে, কিছু রেখায়, কিছু পাথরের বুকে কে বাঁধতে পারে, সুবল?’
‘একজন শিল্পী। সে নিজের শব্দে, নিজস্ব রেখায়, কিছু পাথরের বুকে মানুষের মনকে, মনের ভাবকে, অনুভূতিকে বেঁধে ফেলে, সমাহিত করে।’
‘সুন্দর! অতি সুন্দর! আচ্ছা, এবার বলো, মানুষের এমন কী আছে, যাকে আগুন পোড়াতে পারে না?’
‘মানুষের ধর্মকে। মানুষের ধর্ম তার চিতার আগুনেও পুড়ে ছাই হয় না।’
‘তাহলে সুবল, একজন শিল্পীর ধর্ম কী?’
‘তার শিল্প, তার কলার মাধ্যমে সত্য, শুভ এবং সুন্দরের নিরূপণ করা।’
‘সা-ধু! সা-ধু! এবার শেষ প্রশ্ন, সর্বভুক, সর্বগ্রাসী কাল বা সময়ও কাকে গিলে খেতে পারে না, সুবল?’
‘মাননীয়, অপরাধ ক্ষমা করবেন, কিন্তু আমি আপনার এসব প্রশ্নের অভিপ্রায় বুঝতে পারছি না।’
‘তাতে কোনো সমস্যা নেই। এখন বুঝতে না-পারলেও পরে ঠিকই বুঝে যাবে। যে প্রশ্নটা করলাম, তার উত্তর দাও। সময়ও কাকে গিলে খেতে পারে না? যদি উত্তর দিতে না-পারো সেটাও বলো, আমিই উত্তরটা দিয়ে দেব।’
‘কীর্তি! কীর্তিকে সর্বগ্রাসী কালও গিলে খেতে পারে না।’
‘তাহলে যদি এই জগৎ সংসারে একমাত্র কীর্তিই কালের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হয়ে থাকে, তুমি এত উদ্বিগ্ন হচ্ছ কেন? আটশো আর আট হাজার বছরের মধ্যে কী তফাত? এই দিন, সপ্তাহ, মাস কিংবা বছর, এগুলো সব সময়ের হিসেব করার জন্য মানুষের দেওয়া সংজ্ঞা। কাল অনাদি, কাল অনন্ত! তার চেয়েও আদি ও অনন্ত হল শিল্পের সম্ভাবনা। যদি এই নির্মাণ প্রলয়কাল অবধি টিকে থাকে, এবং প্রলয়কালে নষ্ট হয়, তাহলেও জানবে কীর্তি অক্ষয় অমর হয়ে রয়ে যাবে। উৎকলের কীর্তি! উৎকলের শিল্পের কীর্তি!
উৎকলের শিল্পীদের কীর্তি! আর উৎকলের শিল্পীদের এই কীর্তি নির্মাণের দায়িত্ব ছেড়ে তুমি ফিরে যেতে চাইছ, সুবল? কিন্তু যেতে পারবে কি? এই যে তুমি এখানে এসেছ, এ কি রাজার আদেশে? না, সুবল! তুমি এখানে এসেছ অদৃষ্টের আদেশে। তোমার নিয়তি তোমাকে এখানে টেনে এনেছে। আর নিয়তি অটল!
সুবল, তুমি উৎকলের শিল্পের আশা, ভবিষ্যৎ। তুমি নাহয় এখান থেকে চলেই গেলে, কিন্তু গিয়েও কি শান্তি পাবে? তোমার আত্মার কশাঘাতে অহরহ আহত হবে তুমি। এই রাজ্য, এই সমাজ এবং তোমার অন্তরাত্মা তোমাকে প্রতিদিন অগুনতি প্রশ্ন করবে। তোমাকে তোমার বিবেক জিজ্ঞাসা করবে যে, যখন এই উৎকলের শিল্পীরা কঠিন পাষাণকে নিজেদের ঘামে কোমল করে তারই বুকে কুঁদে কুঁদে কলাকৃতি নির্মাণ করছে, তখন তুমি কী করছ?
ব্যক্তি বলো, বস্তু বলো বা বাস্তুই বলো, দীর্ঘকালীন অস্তিত্বে কারো কোনো গুরুত্ব নেই। গুরুত্বপূর্ণ শুধু তার কীর্তি। এই ভাস্কর্যের কীর্তিও এর দীর্ঘ অস্তিত্বের দ্বারা নয়, এর অদ্বিতীয় শিল্পসৌকর্য দ্বারা অর্জিত হবে। আর সেই কীর্তির আলেখ্য এক এবং একমাত্র তোমারই ছেনিতে উৎকীর্ণ করা সম্ভব, সুবল মহারানা। যে মহান পুরুষ শাম্বের জন্য এই পদ্মক্ষেত্র অর্কক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, সেই শাম্বের পিতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রণভূমিতে দাঁড়িয়ে এই রাষ্ট্রকে এক অমূল্য মন্ত্র শিখিয়ে গিয়েছিলেন—কর্ম করো, ফলের চিন্তা কোরো না। পরিণামের চিন্তা কেন করছ, সুবল?
কর্মণ্যেবাধিকারাস্তে—ভুলে গেছ, সুবল? তাহলে আবার স্মরণ করো! তুমি কেবল কর্ম করার অধিকারী। ফল তোমার হাতে নেই। ফলের আশায় আসক্ত হোয়ো না। নিরন্তর কর্মরত থাকো। শুধুই কর্ম করো। তোমার ছেনিই এই পাষাণের বুকে পদ্মের পাপড়ি ফুটিয়ে তোলার অদ্বিতীয় সামর্থ্য রাখে, সুবল। সেই ক্ষমতার সঙ্গে ন্যায় করা তোমার ধর্ম। নিজের সৃজনীশক্তির সবটা ব্যবহার করতে পারাই তোমার ধর্ম। সাগর যাকে বাঁধতে পারে না, সেই মানবমনকে নিজের শিল্পের রেখায় বেঁধে অমর করে দেওয়াই তোমার ধর্ম। তোমার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারে পাওয়া উৎকলীয় শিল্পের দ্বারা তোমার এবং তোমার পিতৃপুরুষদের কীর্তি শিলালেখে উৎকীর্ণ করাই তোমার ধর্ম।
যদি এর পরেও তুমি চলে যেতে চাও, তো যেও। কোণার্কের সূর্যমন্দির তারপরেও তৈরি হবেই! হ্যাঁ, হয়তো তোমার শিল্পের অভাবে সেই মন্দির অদ্বিতীয় হবে না, কিন্তু তোমার পিতার বয়েসি আমি, এই বিশু মহারানা, নিজের অন্তিম শ্বাস পর্যন্ত এই মন্দিরকে অদ্বিতীয় করে তোলার সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাব!’
সুবল স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার মস্তিষ্ক শূন্য, জিহ্বা অসাড়। দুই শিল্পীর মধ্যে শুধুই নিবিড় মৌনতা। সুবলের কানে গুঞ্জরিত হতে লাগল বিশু মহারানার উক্তি, ‘তুমি কেবল কর্ম করার অধিকারী। ফল তোমার হাতে নেই। ফলের আশায় আসক্ত হোয়ো না। নিরন্তর কর্মরত থাকো। শুধুই কর্ম করো।’
মৌন ভঙ্গ হল না। সুবল অধোমুখ হয়ে বসে রইল। তার চিন্তারা এবার পথ পরিবর্তন করে ফেলেছিল। সত্যিই তো, যদি সে ফিরে যায়, তাহলে সারা উৎকল কী বলবে? বলবে, সুবল প্রেমের সঙ্গে পবিত্রতা, ত্যাগ এবং উৎসর্গের পরীক্ষায় অসফল হয়ে গেছে। কী ভাববে তার বুড়ি মা? কী-ই বা ভাববে তার থেকে আট বছরের ছোট ভাই ধবল? উৎকলের জাতীয় গৌরবের নাম শোনামাত্র তার কল্পে নিজের সমস্ত সাধ, কামনা, বাসনা, অভিলাষার বলিদানকে সৌভাগ্য মনে করে যে বিনোদিনী, সে-ই বা কী ভাববে? যখন বিনোদিনীকে বাইরের কেউ এই নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবে; বলবে যে, সুবল ফিরে এল কেন; তখন কী হবে?
স্বামীর অক্ষয় কীর্তির কামনায় সে শূন্য শয্যায় নিজের মধুযামিনী কাটিয়েছে। স্বামীর কোণার্ক-শিল্পী হয়ে ওঠার যূপকাষ্ঠে এই যে তার ত্যাগ, পতির কল্যাণ-কামনায় প্রতিদিন নীরবে তুলসীমণ্ডপে তার জলসিঞ্চন, সান্ধ্যপ্রদীপ প্রজ্জ্বলন, গৃহের সমস্ত অন্ধকারকে নিজের মনের কোণে লুকিয়ে রেখে স্বামীর গৌরবময় প্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষা করা—সেই অক্ষয় কীর্তি, সেই গৌরব, সেই শিল্পীসত্তাকে এভাবে হত্যা করে সুবল গৃহে ফিরলে কেমন লাগবে তার?
বিশু মহারানাই ঠিক বলছিলেন। নিয়তিই তাকে নিয়ে এসেছিল। তার ফেরার পথ ছিল না। সে ফিরতে পারবে না। সুবল মনে মনে বলতে থাকে, ‘আমি ফিরব না, বিনোদিনী। তোমার স্বামী একজন কোণার্ক-শিল্পী, এই গৌরব থেকে তোমাকে বঞ্চিত করার অধিকার আমার নেই। বারো বছর পরে আমি ঠিক ফিরে আসব। ষোল বছর লাগে লাগুক! কিংবা হয়তো ফিরবই না। আমি জানি না। হয়তো তখন আর আমাদের প্রেমের প্রতিমায় চক্ষুদান করার মতো প্রাণশক্তি না তোমার থাকবে, না আমার। প্রেমের পরিণতি তো জরা, ব্যাধি এবং মৃত্যুতেও মেলে। আমি তোমাকে জীবন আর মৃত্যুর ঊর্ধ্বে নিয়ে যাব, বিনোদিনী। তোমাকে আমি অনন্ত-যৌবনা করে দেব। অমর করে দেব তোমাকে। তোমাকে আমি পাথরের মতো কঠোর করে দেব। আমিও পাথর হয়ে উঠব। পাষাণের মতো মন নিয়ে পাথরের বুকে তোমায় আমি উৎকীর্ণ করব। এই কোণার্কের শিলায় শিলায় তোমার মুখই পদ্ম হয়ে ফুটে উঠবে। সুবল মহারানা ফিরবে না। সে কোণার্কের পাষাণে পদ্ম ফোটাবে।’
চিন্তার জালে আবদ্ধ সুবলের মনের কথা কখন যে মুখে ফুটে উঠেছে সে খেয়ালই করেনি। কিন্তু তার এই কথাতেই বিশু মহারানা আশ্বস্ত হলেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল তাঁর। তিনি উঠে সুবলের দুই কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘ওঠো, সুবল। স্বাভাবিক হও। নিজের জ্ঞানগৌরবের বাস্তব বোধ তোমার এতক্ষণে হয়েছে দেখছি। কোন জ্ঞানের ব্যবহার কখন আর কোথায় করবে সেটা জানাও প্রয়োজন। বাস্তুশাস্ত্রজ্ঞ সুবল মহারানাকে নয়, শিল্পী সুবল মহারানাকেই আজ উৎকলের প্রয়োজন। তোমার ছেনির আঘাতে এই ভাস্কর্যকে এমন শিল্প দিয়ে যাও, যার কথা একদা সারা বিশ্ব বলবে।
ওঠো, হে কোণার্ক-শিল্পী। আজ রাতে অথবা কাল ভোরে এই রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যাচার্য সৌম্য শ্রীদত্ত তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এখনও পর্যন্ত তুমি যত মূর্তি, যত প্রতিমা গড়েছ, তাদের দেখে তিনি উচ্ছ্বসিত। কোণার্ক মন্দিরের গায়ে প্রতিমা ও মূর্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি তোমাকে কিছু নির্দেশ দেবেন।
মূর্তি সংক্রান্ত যোজনার দেখাশোনা করছেন নাট্যাচার্য। এবং তাই ওঁর পরিকল্পনা অনুসারেই মূর্তি নির্মাণ এবং স্থাপনা করা হবে। আনন্দের কথা হল, তোমার কাজ দেখে মূর্তির নৃত্য ভঙ্গিমা এবং ধ্বনির আকার দেওয়ার জন্য তিনি তোমাকেই চয়ন করেছেন। তোমার উপরে আমার অনেক আশা, সুবল। মনে আর কোনো ক্ষোভ, কোনো রোষ রেখো না। যে কোনো ধরনের মানসিক অসন্তোষ কিন্তু তোমার শিল্পনৈপুণ্যের প্রতিকূলে যাবে। সমস্ত গ্লানিকে মন থেকে দূর করে কাজে লেগে পড়ো।’
‘মাননীয়, আমার মনে আর কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো গ্লানি নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, আপনার আশানুযায়ী আমি নিজেকে শিল্পের মাধ্যমে স্বয়ংসিদ্ধ করতে পারব। আমার হেতু আপনাকে যে মানসিক উদ্বেগ সহ্য করতে হল, তার জন্য আমি আপনার ক্ষমাপ্রার্থী। যুদ্ধক্ষেত্রে আগামী শোকে কাতর সব্যসাচী অর্জুনকে উদ্বোধিত করেছিলেন যোগীরাজ শ্রীকৃষ্ণ। আজ ভাবে কাতর সুবল মহারানাকে মানসিক ঝঞ্ঝাবাত থেকে উদ্ধারের কাজে আপনি স্বয়ং মাধবের রূপ ধরে এসেছেন আমার কাছে। আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। বিশ্ববাসী সুবল মহারানার ছেনির চমৎকার যুগ-যুগান্তর ধরে দেখবে। অবশ্যই দেখবে! আমি আপনাকে কথা দিলাম!’
বিশু মহারানার শিবির থেকে সুবল বেরিয়ে এসেছে তা প্রায় অনেকক্ষণ হল। চন্দ্রভাগার পাড়ে দূরে ঝাউবনের দিকে মুখ করে আপন মনে কি যেন ভেবে চলেছে সুবল। হঠাৎ মনে হল যেন মুক্ত আকাশ হতে তারার দল পুষ্পবৃষ্টির মতো নেমে আসছে ঝাউয়ের বনে ওপর। অচিরেই ভুল ভাঙল সুবলের। আসলে অসংখ্য জোনাকির জ্বলা-নেভা দেখে আকাশের তারা বলে ভ্রম হয়েছিল।
জোনাকিদের নরম আলোর খেলা দেখতে দেখতে একটা সময় পদ্মপুকুরে স্নানরতা বিনোদিনীর মুখটা ভেসে উঠল সুবলের মানসপটে। সুবলের মন প্রিয়া-পরিণীতার স্মরণে কেঁদে উঠল। আর তার শিল্পী মন অস্ফুটে বলে উঠল, ‘আমি পাষাণে পদ্ম ফোটাব, বিনোদিনী!’
প্রেয়সী বিনোদিনীর স্মরণে উচ্চারিত এই কথাগুলো নদী চন্দ্রভাগার কলকল ধ্বনিতে বয়ে চলল তার গতিপথ ধরে। বহু দূরে বিনোদিনী তখন স্বামীবিহীন গৃহের এক কোণে স্থাপিত জগন্নাথ স্বামীর প্রতীক-মূর্তির সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে, জোড়হাতে আঁচলের খুঁট ধরে, চোখ বন্ধ করে কোণার্ক-শিল্পীর জন্য মঙ্গলকামনা করছে।
‘নাট্যাচার্য সৌম্য শ্রীদত্তকে সুবল মহারানার সাদর প্রণাম!’ করজোড়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করল সুবল।
নাট্যাচার্য সৌম্য শ্রীদত্ত। বয়স আনুমানিক ষাট–বাষট্টি বছর। দীর্ঘ, ধপধপে সাদা কেশরাশি দুই কাঁধে ছড়ানো। নিয়মিত ক্ষৌরকর্মের ফলে মুখের দাড়িগোঁফের চিহ্নমাত্র নেই। উন্নত নাসিকাখানি শুকপাখির ঠোঁটের মতো ঈষৎ বাঁকা। আয়ত চক্ষু দুটি টানা। ঈশ্বর এমন চোখ সাধারণত পুরুষদের দেন না।
সৌম্য শ্রীদত্তের চলা, বলা এমনকী হাতের মুদ্রা তথা সঙ্কেতেও একটা অদ্ভুত ছন্দ আছে। লালিত্যের অবিকল প্রতিকৃতি সৌম্য শ্রীদত্তর ব্যক্তিত্বে এক সূক্ষ্ম কমনীয় আভার দেখা মেলে। সম্ভবত এইসব কারণেই রাজা অনঙ্গভীম দেব তাকে ‘সৌম্য’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। বাস্তবে তাঁর নাম শ্রীদত্ত দীক্ষিত। নৃত্যকলা এবং নাট্যের জগতে উৎকল তো বটেই, সমগ্র ভূভারতে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অমিল। বলা হয়, ভরতমুনির নাট্যশাস্ত্র সৌম্য শ্রীদত্ত দীক্ষিতের দেহ ধারণ করে ভারত-ভূমিতে অবতীর্ণ হয়েছে।
সৌম্য শ্রীদত্ত এই কয়েকদিনেই সুবল মহারানার শিল্পচাতুর্যে মুগ্ধ হয়েছেন। বারোশো শিল্পীর ছেনি যখনই, যেখানে অবরোধে ভোগে, তখনই সেখানে সুবল মহারানার হাতের ছেনি গিয়ে সেই অবরোধকে মুক্ত করে। এই কথা সৌম্য শ্রীদত্ত খুব ভালো করেই বুঝে গিয়েছেন।
সুবলকে দেখেই সৌম্য শ্রীদত্ত পুলকিত কণ্ঠে বললেন, ‘দীর্ঘায়ু ভবঃ! যশস্বী ভবঃ! তুমি উৎকলের গৌরব, শিল্পী। আমি আশা করছি, কোণার্কের প্রতিটা পাষাণ খণ্ড তোমার শিল্পের স্পর্শ পেয়ে নৃত্য-বাদ্য-সঙ্গীতে বিশারদ হয়ে উঠবে। এদের দেখেই নীরব চন্দ্রভাগার তট নূপুরের ধ্বনি শুনবে। তোমার গড়া মূর্তির মধ্যে আমি সঙ্গীতের গুঞ্জন শুনেছি। আমি নিশ্চিত, তোমার তৈরি সমস্ত মূর্তি, সকল প্রতিমার সঙ্গীতের মূর্ছনায় একদিন মুখর হয়ে উঠবে এই অর্কক্ষেত্র। তুমি মহান শিল্পী! আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি, একসময়ে সমগ্র বিশ্বে তোমার শিল্পকর্মের বন্দনা হবে!’
‘এই শিল্প-মাধুরীর জনক তো আপনি, আচার্য। আপনি উৎকলের শিল্পীদের কাছে যা আশা করছেন, তার সবটাই আপনার অবদান। আপনার নির্দেশমতোই কাজ করছে সকলে। আপনি যে অদ্ভুত চিত্রপট আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে কাজ করে গেলে যে কোনো অনভিজ্ঞ ব্যক্তিও শিল্পীর গৌরব লাভ করবে। উৎকলের প্রত্যেক শিল্পী শুধুমাত্র আপনার নির্দেশের অনুপালন করে তাকে সাকার করে তুলছে, আর এতেই তারা ধন্য। আপনার নির্দেশ বিনা এই মহাযজ্ঞ সম্পাদন করা অসম্ভব,’ বিনয়ের সঙ্গে সুবল উত্তর দিল।
সুবলের কথার মাধুর্যে অভিভূত হয়ে উঠলেন সৌম্য শ্রীদত্ত। মনের প্রসন্ন ভাব হাসি হয়ে ফুটে উঠল মুখে। দীর্ঘ পদক্ষেপে তিনি নতুন মূর্তিগুলিকে নিরীক্ষণ করতে আরম্ভ করলেন।
এক-একজন দক্ষ শিল্পীর অধীনে অনেক অর্বাচীন শিল্পী কাজে নিমগ্ন। তাদের একনিষ্ঠ, একাগ্রচিত্ত শিল্পকর্মের তপ অনবরত পাষাণের বুকে উৎকীর্ণ করছে অবিরাম সঙ্গীত। মন্দিরের জগমোহনের উপরিভাগে ভৈরবের ছ’টি জীবন্ত মূর্তি স্থাপনার কথা আছে। তাদের তক্ষণ-কার্যও শেষ হয়ে গিয়েছে। ভৈরব-মূর্তিগুলির হাতে ডমরু, কুঠার, ত্রিশূল এবং বিষপাত্র; কণ্ঠে রুদ্রাক্ষমালা এবং মুণ্ডমালিকা। তেজদীপ্ত রূপ। নাট্যশাস্ত্রের মতে নৃত্যের সূচীপাদ ভঙ্গিমায় এই সমস্ত মূর্তি হবে চতুর্ভুজ এবং খপ্পরধারী।
যুগ-যুগান্ত ধরে কোণার্কের শিল্পকে কালের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য জগমোহনের পূর্ব, উত্তর এবং দক্ষিণ দিকে দুটি-দুটি করে ভৈরব মূর্তিকে রক্ষক রূপে স্থাপনা করার কথা। ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন শিবিরে গড়া হলেও মূর্তিগুলিকে দেখলে একে অপরের অবিকল প্রতিকৃতিই মনে হচ্ছিল। সব এ-ক! কোথাও কোনো পার্থক্য ছিল না।
জগমোহনের উপরের দুটি স্তরে মাদল, মঞ্জীর, ঝাঁঝর, বীণা, বেণু এবং তূর্য বাদনে মগ্ন জীবন্ত নারী-মূর্তি স্থাপিত হবে, যাদের নির্মাণের কাজ এখনও আরম্ভ হয়নি।
নাট্যাচার্যের চিন্তা তাঁর মুখের কথায় ফুটে উঠল, ‘সুবল, কঠোর পাষাণের বুকে ননীর মতো কোমল নারীমূর্তি গড়তে হবে। কোমলাঙ্গীদের দেহে সজ্জিত বস্ত্র আর অলংকারকে দেখে যেন আসল বলে ভ্রম হয়। তাদের কেশবিন্যাস হবে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। তাদের যৌবনদীপ্ত সুগঠিত অবয়ব এবং লম্বিত মুদ্রাকে উৎকলের শিল্পী আপন নৈপুণ্যে অমর করে দেবে—এটুকুই আমার অভিলাষা। সম্ভব হবে তো, শিল্পী?’
‘আপনার আশীর্বাদ সঙ্গে থাকলে অবশ্যই সম্ভব হবে, আচার্য।’
‘শোনো সুবল, দক্ষিণের নৃসিংহনাথ মন্দিরের সেবার নিমিত্তে মহারাজ একশোজন নৃত্য-নিপুণ দেবদাসীকে নিযুক্ত করেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই কোণার্কের জন্য এই নিযুক্তি আরও বাড়বে। মহারাজের ইচ্ছা, নাট্য-মণ্ডপে নৃত্যরতা ওই সকল দেবদাসীও যেন উৎকল–শিল্পীদের খোদাই করা মূর্তিগুলির বিভঙ্গের সামনে পরাজিত অনুভব করে। এবং জানবে, এটা আমারও সাধ! কোথাও যেন কোনো ত্রুটি না-থাকে, বৎস।’
‘আচার্য, কোণার্ক-মন্দিরের নির্মাণে রত প্রত্যেক শিল্পীই উৎকলের নৃত্যকলার সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিত। চিত্রশিল্প এবং মূর্তিকলার প্রারম্ভিক জ্ঞানই নৃত্যকলা পাঠের সঙ্গে আরম্ভ হয়। নৃত্যকলার জ্ঞান ব্যতীত নৃত্যরত মূর্তি গড়ার সাহস কোন শিল্পী করবে? মহারাজের ইচ্ছা এবং আপনার সাধ—এই দুই-ই পূরণ করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
‘আচ্ছা সুবল, মূর্তিকলা অনুযায়ী নৃত্য-ভঙ্গিমার সংজ্ঞা কী? বলো তো দেখি...’
‘আচার্য, আমার সীমিত জ্ঞানে আমি যেটুকু বুঝেছি, নৃত্যের মৌলিক বিলাসপূর্ণ ললিত মুদ্রাই হল ভঙ্গিমা। ভঙ্গিমার রচনা একমাত্র সমস্ত অবয়বের সাহায্যেই প্রকাশ করা সম্ভব। এবং নৃত্যে রূপ তথা সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ভঙ্গিমা অত্যাবশ্যকীয়। নৃত্য-ভঙ্গিমায় একটি পাশের নিতম্ব সামান্য উন্নত এবং মাথা সামান্য ঢলে থাকে। এই সময়ে পা ছন্দাকৃতি স্থিতিতে অবস্থান করে।’
‘উত্তম! অতি উত্তম! তাহলে এবার বলো, উৎকলীয় নৃত্যশৈলীতে কোন–কোন বিশেষ ভঙ্গিমা আছে?’
‘উৎকলীয় নৃত্যের বিশেষ ভঙ্গিমা হল অলসা, দর্পণ, পার্শ্ব-মর্দলা, মর্দলা, অর্ললা, বিরাজ, প্রণমা, মানিনী, ত্রিভঙ্গি এবং চৌভঙ্গি। নাট্য-মণ্ডপের মূর্তিগুলিতে এই সমস্ত ভঙ্গিমার ব্যবহার করা হবে, আচার্য।’
হাতে মিঠে গুড় পেলে ছ-সাত বছরের বালক যেভাবে আনন্দে নেচে ওঠে, ঠিক সেভাবেই উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন নাট্যাচার্য। তাঁর মুখ থেকে নিঃসৃত হল—‘তা থৈ, তত্ থৈ, থৈ থৈ তত্ থৈ...’
নিজের উৎফুল্লতা দমন করে আবার গুরুভঙ্গিতে ফিরলেন আচার্য সৌম্য শ্রীদত্ত, ‘নৃত্যের আনুষঙ্গিক বাদ্য কী কী থাকবে?’
‘উৎকলীয়-নৃত্যে ব্যবহৃত সমস্ত বাদ্যযন্ত্রই থাকবে, আচার্য। বীণা, করতাল, ঝাঁঝর, মাদল, মঞ্জীর, বেণু, পটহ, তূর্য, মৃদঙ্গ এবং মহুঅর।’
‘মহুঅর-ও থাকবে? সাধু, সুবল...সাধু! আর মুদ্রা?’
‘মূর্তির মুদ্রা না-থাকলে ভঙ্গিমা কীভাবে খেলবে, আচার্য? ভরতমুনির নাট্যশাস্ত্রে বর্ণিত পতাকা, অর্ধ-পতাকা, অরাল, পঞ্জলি, কপিত্থ, পুষ্পপুট ইত্যাদি মুদ্রার বিন্যাসে প্রতিটা মূর্তিকে প্রাণবন্ত করে তোলার ইচ্ছা আছে।’
‘তোমার উপরে আমার পূর্ণ আস্থা আছে, সুবল। শুধু তোমার কথা বললে অবশ্য পাপ হয়, এখানে উপস্থিত বারোশো শিল্পীর উপরেই আমি সমান ভাবে বিশ্বাস করি। তবুও নাট্যমন্দিরের নৃত্য–মূর্তিগুলির নির্মাণের দায়িত্ব আমি তোমাকেই অর্পণ করতে চাই। আমি জানি যে, উৎকলের নৃত্যকলা সম্পর্কে তোমার সম্যক ধারণা আছে। তাই আমি চাই, এই মূর্তিগুলি তোমার উপস্থিতিতে এবং সর্বাঙ্গীণ নির্দেশনায় তৈরি হোক।’
‘আচার্য, এখানে উপস্থিত বারোশো শিল্পীর প্রত্যেকেই এক-একজন সুবল মহারানা। তবুও আপনার আদেশ এবং সম্মান রক্ষা করা আমার কর্তব্য। আপনার কথামতোই আমার নির্দেশনায় এই কাজ সম্পন্ন হবে।’
‘হ্যাঁ বৎস সুবল, তাই করো। নাট্যমন্দিরে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় অবস্থিত নৃত্যরত-মূর্তিগুলি এবং বাদ্যযন্ত্রধারী নর-নারীর মূর্তিগুলি উৎকলীয় নৃত্য-সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন হয়ে উঠবে। আমি, নাট্যাচার্য সৌম্য শ্রীদত্ত দীক্ষিত এবং আমার শিষ্যরা কালের প্রভাবে একদিন এই পৃথিবী থেকে ধুয়েমুছে গেলেও উৎকলের নৃত্য-গীতের এই পরম্পরা সুবল মহারানার ছেনির স্পর্শ পেয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উৎকল রাজ্যের গৌরবগাথা শোনাবে এবং এরই মাধ্যমে অমর হয়ে যাবে সকল কোণার্ক-শিল্পী। কোণার্ক কেবল কোনো দেবমন্দির রূপে নয়, শিল্পের অধিষ্ঠান এক কলামন্দির রূপে যুগ-যুগান্তর ধরে সম্মানিত হবে। একইসঙ্গে চিত্রকলা, সঙ্গীত, নৃত্যকলা এবং শিল্পকলার এই অদ্বিতীয় সম্মেলন আগামী যুগের কাছে শিক্ষকের ভূমিকা গ্রহণ করবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এর সম্মোহনে বাঁধা পড়বে। শুধু একটাই দিক অচ্ছুৎ রয়ে গেল, সুবল।’
‘কোন দিকের কথা বলছেন, আচার্য?’
‘উৎকলের লোকনৃত্য। তার পাশাপাশি একধার ধরে উৎকলের পাইক বাহিনীকেও হাতে ঢাল-তরোয়াল দিয়ে নৃত্যরত অবস্থায় চিত্রিত করতে হবে। উৎকলের সৈনিকদের কিন্তু তাদের গৌরবের ভাগ থেকে বঞ্চিত করলে চলবে না, সুবল। কী, পারবে তো?’
‘আপনার নির্দেশনা পেলে আমরা সব করতে পারব, আচার্য! তবে এই সকল মূর্তি নির্মাণ করার আগে আমাকে আরেকটি মূর্তি উৎকীর্ণ করার আদেশ দিন। আপনার মূর্তি! নাট্যমণ্ডপের ঊর্দ্ধভাগে অবস্থিত পাষাণ প্রতিমাদের মাঝে খচিত নর্তক–নর্তকীদের নির্দেশ প্রদানকারী নাট্যাচার্যের মূর্তি! উৎকলের নাট্যাচার্য সৌম্য শ্রীদত্তর মূর্তি বিনা নাট্যমণ্ডপ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, কোণার্ক অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, আমার শিল্পসাধনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মহারাজের পৃষ্ঠপোষকতায় আপনি উৎকলের নৃত্য-পরম্পরাকে উৎকীর্ণ করার ক্ষেত্রে যে তৎপরতা এবং সংলগ্নতা দেখিয়েছেন, তার উচিত সম্মানের জন্য গুণগ্রাহী মহারাজ আপনার মূর্তি নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। এবং বিশু মহারানা এই উত্তরদায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন, আচার্য,’ কথা শেষ করে সুবল নিজের দুই হাত জোড়বদ্ধ অবস্থায় সৌম্য শ্রীদত্তের সামনে মাথা নত করল।
‘তাই নাকি? তাহলে বলতে হয়, এ হল মহারাজের বদান্যতা, কিন্তু...’
‘কোণার্ক নির্মাণে কাজে কোনো কিন্তুর গুরুত্ব নেই, আচার্য। আপনি উৎকলের শিল্পীদের উপরে আস্থা রাখুন।’
‘ভরসা আমার আছে সুবল। কিন্তু এই নাট্য-মণ্ডপের শিল্পে যেন অশ্লীলতার লেশমাত্র চিহ্ন না-থাকে। ওখানে দেবার্চনার জন্য দেবদাসীদের নৃত্য হবে। জীবিত নর্তকী হোক বা পাষাণ-খচিত, তার মুদ্রা-বিন্যাসে এবং ভাব প্রকাশে নৈসর্গিক মানবের নিষ্কলুষ আনন্দের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলতে হবে। নর্তকীর রূপ-লাবণ্য যেন ভক্তি-ভাবনার সূর্যরশ্মি হয়ে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। নারী মূর্তির তক্ষণের জন্য শিল্পীদের প্রতিরূপ লাগবে। প্রতিরূপ না-পেলে নৃত্যের ভঙ্গিমার ও মুদ্রার অবিকল উৎকীর্ণন সম্ভব হবে না। এখন সমস্যা হল তোমার জন্য প্রতিরূপ রূপে কোন দেবদাসীকে নিয়োগ করা হবে? কিন্তু তোমার মতো রূপবান, সুদর্শন যুবকের সামনে নৃত্য-প্রতিরূপ হয়ে কোনো নারী কি নিজেকে সংযমিত করে রাখতে পারবে? এই যে কিন্তুর কথা বললাম, এই কিন্তু কোনো ক্ষুদ্র কিন্তু নয়, সুবল।’
‘কিন্তু এই কিন্তুর কোনো অস্তিত্বই নেই, আচার্য। প্রতিরূপকে জ্ঞানচক্ষু ছাড়া অন্য কোনো চোখে দেখাই হবে না—এটা কেবল আমার নয়, এই কোণার্ক পরিসরে কর্মরত বারোশো শিল্পীরও মূলমন্ত্র। আগামী বারো বছরের জন্য নিজেদের প্রত্যেক আবেগদ্বারের কপাট আমরা রুদ্ধ করে এসেছি। প্রত্যেক কোণার্ক-শিল্পীর হয়ে আমি কথা দিচ্ছি—আমাদের মধ্যে কেউ, হ্যাঁ কেউই ব্রহ্মচর্যের পথ থেকে বিচ্যুত হব না! নারী আর পুরুষের মধ্যে কিন্তু নৈসর্গিক প্রেমও হওয়া সম্ভব এবং সূর্যের সঙ্গে পদ্মের প্রেম এই সত্যেরই প্রতীক। এই অঞ্চল একাধারে যেমন পদ্ম-ক্ষেত্র, অন্যদিকে এটা অর্ক-ক্ষেত্রও বটে। এই মাটিতে দাঁড়িয়ে আমাদের আদর্শ কোনো ভাবেই খণ্ডিত হতে পারে না।
আপনাকে সবিনয়ে জানাই, ব্যক্তিগত রূপে আমার কোনো প্রতিরূপের প্রয়োজনই নেই। সুবল মহারানার হৃদয়ে স্বয়ং কোণার্ক-সুন্দরী প্রতিষ্ঠিত। তার প্রেরণাতেই আমি পাষাণের রাগসঙ্গীত আর কাব্যছন্দের জন্ম দিই। আমি যখনই নিজের চোখ বন্ধ করি, তখনই তাকে দেখতে পাই। যে রূপে দেখতে চাই, সেই রূপেই দেখি। এই প্রণয়ী শিল্পীর মানসপ্রিয়া সে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন আচার্য—আমি কোনো ধরনের প্রতিরূপ ছাড়াই নিজের শিল্পকে মূর্ত রূপ দিতে প্রস্তুত।’
সৌম্য শ্রীদত্ত সুবল মহারানার প্রতিটি কথায় বিশ্বাস রাখলেও তার আবেগের প্রতি আস্থা রাখতে পারলেন না। প্রতিরূপ ছাড়াই শিল্প? এও কি সম্ভব?
‘তুমি নিজের বক্তব্যে ঠিক হতে পারো, কিন্তু প্রতিরূপ অবশ্যই প্রয়োজন বৎস। আচ্ছা ঠিক আছে, আমি কোনও–না-কোনও পথ ঠিক বের করব। সুবল মহারানা, তোমার জয় হোক! তোমার মনের জোর দেখে আমিও মনোবল পেলাম।’
আচার্য সৌম্য শ্রীদত্ত নাট্যশাস্ত্রে পারদর্শী হলেও এই ভাবুক, প্রণয়ীর কল্পনাশক্তির সঙ্গে তিনি পরিচিত নন। বিধাতার সৃজনীশক্তির অদ্ভুত প্রতিরূপ বিনোদিনী সুবল মহারানার মানসিক প্রতিরূপ এবং নিজের ছেনির ঘায়ে সে তার মানসিক প্রতিরূপকেই পাষাণের বুকে খোদাই করে চলে। সুবল বিধাতার এই প্রতিরূপের কাছে জিততেও চায়, আবার হারতেও চায়। এক অনির্বচনীয় নেশায় মত্ত হয়ে সে পাষাণ খণ্ডে আঘাত করে চলে। সৌম্য শ্রীদত্ত এই কথা জানেন না। জানার কথাও নয়। এই জগতে কে-ই বা কবে প্রেমিকের মন পড়তে পেরেছে?
গৌড়ের শাসক ইখতিয়ার বেগের সঙ্গে নৃসিংহ দেবের সংঘর্ষের বিরাম নেই। উৎকলের উত্তর সীমান্তে অমর্দন দুর্গ দখল করে নিয়েছিল যবন সৈন্যের দল। দেশপ্রাণ উৎকলীয় সেনার সাহায্যে নৃসিংহ দেব তাদের উচিত শিক্ষা দিয়ে রাজধানীতে ফিরে এসেছেন। এদিকে সূর্যমন্দিরের নির্মাণকাজও সমান তালে চলছে।
দিনমানে মন্দিরের নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ দেখাশোনার পরে মহলে ফিরে এসেছেন মহারাজ। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। আজ বেশ কয়েকদিন পরে নৃসিংহ দেব আমজনতার ছদ্মবেশ ধারণ করে ভ্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাজ্যের শান্তিকালে এটাই তাঁর প্রিয় কাজ। কখনো দণ্ডপাণি, কখনো গ্রামভট্ট, কখনো সাধারণ সৈনিক, কখনো পুরোহিত, আবার কখনো বা পথ হারিয়ে ফেলা পথিক সেজে তিনি প্রজাদের মধ্যে বিচরণ করেন। তাদের সমস্যা, তাদের সুখদুঃখের কথা শোনেন। পরে সেইমতো সাহায্যও করেন।
চাঁদনী রাত। ধবল জ্যোৎস্নায় ফুল, ফল, পাতা, লতা প্রতিটি জিনিস আলাদা করে চিনে ফেলা যাচ্ছে দূর থেকেই। মহারাজ আজ এক পুরোহিতের বেশ ধারণ করেছেন। নিজের প্রিয় অশ্বের বদলে বাহন হিসেবে সঙ্গে নিয়েছেন একটা বুড়ো ঘোড়া। লক্ষ্য নিশ্চিত নয়। ঘোড়া নিজের ইচ্ছামতো প্রধান পথ ছেড়ে পাকদণ্ডী ধরে নেমে চলল গ্রামের দিকে। কে জানে, অদৃষ্টের কোন সঙ্কেত পেয়ে সে এগোচ্ছে?
সামনে এক নাম না-জানা গ্রাম। গ্রামের সীমানায় একটা ছোট আমবাগান। রাত্রির দ্বিপ্রহর শেষ হতে চলেছে। গ্রামের মাঝখানে একটি দেবালয়ের শিখরে লাগানো ধবল পতাকাখানি গ্রামের বাইরে থেকেও স্পষ্ট দৃশ্যমান। বাগানের একটা গাছেই নৃসিংহ দেব নিজের ঘোড়াটাকে বেঁধে দিলেন। ভয়ের কিছু নেই। নৃসিংহ দেবের শাসন মানে রামরাজত্ব। এই রাজত্বে চুরি হয় না। তার উপরে এই বুড়ো ঘোড়া, কে নিতে যাবে?
কোন এক অদৃশ্য আকর্ষণে রাজা নৃসিংহ দেব মন্দিরটির দিকে এগিয়ে চললেন। দেবালয়ের দ্বারে দাঁড়িয়ে অধিষ্ঠিত অজ্ঞাত, অনাম দেবতার উদ্দেশে প্রণাম জানালেন উৎকল-রাজ। হঠাৎই তাঁর চোখে পড়ল এক কিশোরী ঘোমটা টেনে, কাঁখে ভারী কলস নিয়ে দেবালয়ের দিকেই আসছে।
মন্দির প্রাঙ্গণে ভালো ভাবে দৃষ্টি ফেরাতেই একটা কুয়ো চোখে পড়ল মহারাজের। কিন্তু যে শূন্য কলসিই এত কষ্ট করে বয়ে নিয়ে আসছে, ভরা কলস নিয়ে সে ফিরবে কেমন ভাবে? ছদ্মবেশী নৃসিংহ দেব একটি বকুলগাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালেন।
কিশোরী ওই পথটুকু কোনোক্রমে এসেই কাঁখের ভারী কলসখানা কুয়োর পাড়ে তুলে দিল। তারপর মন্দিরের চাতালটাকে লতার মতো আঁকড়ে ধরে বুকভরে বেশ কয়েকটা টানা শ্বাস নিল। কিছুক্ষণের চেষ্টায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতেই চাতালের ওপরে বসে পড়ল সে।
‘কী আশ্চর্য, সময় বয়ে যাচ্ছে অথচ সে যে কাজে এসেছে সেটাই করছে না! তবে কি সে এখানে অন্য কোনও কাজে এসেছে? যদি তাই না হবে, এত গভীর রাতে কি কেউ জল ভরতে আসে? সে নিশ্চিত অভিসারে বেরিয়েছে। কিন্তু ঘোমটা? তবে তো সে বিবাহিত! হে জগন্নাথ স্বামী, এ আমি নিজের রাজ্যেই কোন অনাচার দেখছি? ভুল ভেবে পাপ করছি না তো?’ নৃসিংহ দেব মনে মনে ভয়ঙ্কর দ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন।
কিশোরী সেই থেকে একটি নির্দিষ্ট দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে। হঠাৎ কিশোরী বধূটি তার মাথার ঘোমটা সরিয়ে দিল। ঘোমটার আড়াল সরে যেতেই ললাটে চাঁদের আলো এসে পড়ল তার। কপাল তো নয়, যেন আধফালি চাঁদ। না-ফোটা বকফুলের মতো স্ফুরিত অধর। কিন্তু কে এই অভিসারিকা? কার প্রেয়সী? কোন হৃদয়হীনের মিথ্যা আশ্বাসে নিন্দা আর অপবাদের ভয় তুচ্ছ করে এই কিশোরী বধূ এত রাতে ঘর ছেড়ে পথে নেমেছে?
সাতপাঁচ ভাবছিলেন মহারাজ নৃসিংহ দেব, এমন সময় কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল। রাজা সতর্ক হয়ে উঠলেন। কিশোরীর মুখেচোখে উৎকণ্ঠা দেখা দিল। এবার কি ছদ্মবেশী নৃসিংহ দেব সেই গোপন অভিসারের সাক্ষী হতে চলেছেন? তিনি কি দণ্ড বিধান দেবেন? কাকে দেবেন? প্রেয়সীকে নাকি তার প্রীতমকে? প্রেমজালে আবদ্ধ এই নিষ্পাপ কিশোরীকে ছেড়ে দেবেন নাকি এই কিশোরীকে প্রণয়পাশে আবদ্ধকারী সেই প্রণয়ীকে? নাকি দুজনকেই? কী করবেন তিনি?
পায়ের শব্দ ক্রমশ ঘন হয়ে এল। চোখের পলকে ওই কিশোরী যেন মানিনী নায়িকাতে রূপান্তরিত হয়ে গেল। সম্ভবত প্রেমিকের আগমনে বিলম্ব হওয়াতে রুষ্ট হওয়ার অভিনয় করতে চাইছে কিশোরী। কোমরে আঁচল বেঁধে নিয়ে দ্রুত হাতে কলসের কণ্ঠে রশির ফাঁস পরিয়ে কলসটাকে কুয়োর ভিতরে নামিয়ে দিল সে।
কিশোরীর এ কেমন ছলনা! একটু আগেই শূন্য কলস বয়ে আনতে যার কষ্ট হচ্ছিল, ভরা কলসি কুয়ো থেকে টেনে তুলবে কেমন করে সে? জলের ভারে কুয়োতেই না পড়ে যায়! বধূটি কি তবে আত্মহত্যা করতে উদ্যত? না, না। হয়তো প্রেমিক এসে ক্ষিপ্র হাতে তাকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই কুয়ো থেকে টেনে তুলবে জলভরা কলস। প্রেমিকার এই অসহায় দশা তার মনকে বিচলিত করে তুলবে। তারপর শুরু হবে মানভঞ্জন পর্ব। কিন্তু যদি তার এই কুয়ো অবধি পৌঁছাতে বিলম্ব হয়? তখন? তখন তো এই কিশোরী নির্ঘাত কুয়োর মধ্যেই গিয়ে পড়বে!
এতটা তফাতে দাঁড়িয়েও মহারাজ নৃসিংহ দেব স্পষ্ট বুঝতে পারছেন, কলস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। কিশোরী নিজের সর্বশক্তি দিয়ে সেটাকে টেনে রেখেছে। জলে ডুবে থাকা কলসের ভার কিছুটা কম হয় বলে সম্ভবত সে এখনও নিজেকে আটকে রাখতে পেরেছে। কিন্তু কোথায় গেল তার কামনার পুরুষ?
কিশোরীর বঙ্কিম গ্রীবা, তার চোখ আর কান সেই পদশব্দের পথ চেয়ে ছিল, কিন্তু সম্ভবত তার গণনায় কোনো ভুল হয়ে গিয়েছে। পায়ের শব্দ ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে দূরে সরে গেছে। হয়তো বা কোনো পথিক নিজের পথ ধরে চলে গিয়েছে। এবার কী করবে কিশোরী?
বধূ এতক্ষণে বেশ বুঝে গেছে তার গণনায় কোথাও ভুল হয়েছে। এখন কলসিটাকে জলভরা অবস্থায় তুলে আনা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু সেই পথও সহজ নয়। ক্ষীণ দেহ নিয়ে অমন ভার বহন করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। জল আর কলসের সম্মিলিত ভারে আর রশির টানে সে এবার কুয়োর দিকে ঝুঁকে পড়তে লাগল।
কিশোরীর প্রাণ-সংকটাপন্ন। চোখের সামনে এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে দেখে নৃসিংহ দেব আর নিজেকে আড়াল করে রাখতে পারলেন না। বকুল বৃক্ষের আড়াল থেকে দ্রুত ছুটে তিনি কূপের কাছে এসে দাঁড়ালেন। তারপর বাম হাতে কলসে বাঁধা রশিখানি ধরে ডান হাতে কিশোরীকে পিছন দিকে টেনে আনলেন। অপ্রত্যাশিত এই ঘটনায় বিহ্বল হয়ে কিশোরী মূর্ছিত হয়ে পড়ল। তবে ভয়ের আর কোনো কারণ নেই, নৃসিংহ দেবের বলিষ্ঠ ভুজার আশ্রয় ঈশ্বরের বরাভয়েরই সমান। ডান হাতে কিশোরীকে ধরে রেখে বাম হাত দিয়ে খুব সহজেই মহারাজ কলসিটিকে টেনে তুলে এনে মাটিতে নামিয়ে রাখলেন।
এতক্ষণে কিশোরীর মুখের দিকে ভালো করে চেয়ে দেখলেন ছদ্মবেশী পুরোহিত। যেন আকাশের ওই চাঁদ নেমে এসে তাঁর বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। কিশোরীর ছলছল চোখ কোনো এক অজানা গ্লানিতে ভরে উঠতে দেখলেন মহারাজ। সেই জল কপোল বেয়ে গড়াতেই ভিজে উঠল চাঁদমুখখানি। লজ্জা ভয় দুঃখে তার দেহলতা কম্পিত হয়ে উঠল। নাকের ডগায় তিলফুলের মতো নাকছাবিতে ক্ষুদ্র কাচের খণ্ডটি নক্ষত্রের মতো কাঁপতে লাগল। আলুলায়িত চিকুরের গোছা ঢেউ তুলে নৃসিংহ দেবের বুকে ছড়িয়ে পড়ল।
কিশোরীর চোখ থেকে দুফোঁটা জল এসে পড়ল নৃসিংহ দেবের হাতের উপর। শিশির বিন্দুর মতো ওই দুফোঁটা জলের উষ্ণতা যে এতখানি তা মহারাজের জানা ছিল না। এক অবুঝ অনুভূতির প্রবাহে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন তিনি। কিন্তু তাঁর বিবেক তাঁকে সজাগ করে তুলল, ‘তুমি রাজা! তুমি প্রজাপালক! তুমিই রক্ষক! মাতৃজাতির রক্ষা করা তোমার কর্তব্য। নৃসিংহ দেব, মাতৃতত্ত্বের তিন চরম মাত্রা হল নারী, সংস্কৃতি আর মাতৃভূমি। তাদের রক্ষা এবং সম্মান করা প্রত্যেক পুরুষের পরম দায়িত্ব।’
উদার স্বরে মহারাজ এবার কিশোরীকে অভয় দিলেন, ‘ভয় পেয়ো না। বিপদ কেটে গিয়েছে। নির্ভয়ে থাকো।’
মহারাজের অভয় বাণী শুনে কিশোরী কিছুটা সংযত হল। কোমর থেকে আঁচল খুলে এনে ঘোমটা দিল মাথায়। মাটিতে নেমে আসা চাঁদের মুখ আবরণে ঢাকা পড়তেই ধরার বুকে যেন আঁধার নেমে এল। মহারাজ আকাশের দিকে চোখ তুলে চাইলেন। চাঁদ আছে যথাস্থানেই, তবে? হয়তো কিশোরীর এই রূপ, এই সৌন্দর্য দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছে চাঁদও।
নৃসিংহ দেব শুধোলেন, ‘কে তুমি, কিশোরী? কার কন্যা? কার প্রিয়া?’
সম্বিৎ ফিরে পেয়েছে কিশোরী বধূ। ঝরে গিয়েছে তার ভাবমূর্ছনা। সে উত্তর দিল, ‘এই প্রশ্ন করে আপনি আমাকে অপমান করলেন মাননীয়! আমি কিশোরী নই, প্রেমিকা নই, কারো বিবাহিত স্ত্রী। কারো কূলের বধূ আমি।’
এমন নির্ভীক উত্তর শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন নৃসিংহ দেব। যে মেয়ে এমন নির্ভীকভাবে সত্যি কথা বলতে পারে, তার তো কোনো গোপন অভিসারে লিপ্ত থাকার কথা নয়। ছদ্মবেশী এবার অনুতাপের স্বরে বললেন, ‘ক্ষমা করুন, দেবী! অজ্ঞজন দয়ার পাত্র। কে আপনি? কার কূলের বধূ? এই চাঁদনি রাতে মন্দিরের চাতালে দাঁড়িয়ে আপনি কার জন্য অপেক্ষা করছেন?’
‘আপনি তো দেখছি বার বার আমায় অপমান করছেন, ব্রাহ্মণ। একজন বিবাহিতা নারী কেবল তার স্বামী ছাড়া আর কার অপেক্ষায় থাকবে? সেই অপেক্ষায় জন্ম–জন্মান্তর বয়ে গেলে যাক, প্রতীক্ষা বিফল হোক, তবু আমার কাছে তা গৌরবের বিষয়।’ ঘোমটার ভিতর থেকে আসা উত্তরের সুর এবার আরও দৃঢ় এবং স্পষ্টভাবে শোনা গেল।
মুগ্ধ হয়ে গেলেন নৃসিংহ দেব। উল্লসিত ভাব চেপে রেখেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘স্বামীর জন্য অপেক্ষা বুঝি এমন গভীর রাতে, নির্জন মন্দির প্রাঙ্গণে করতে হয়? তার জন্য তো ঘর রয়েছে আপনার। এত রাতে কুয়ো থেকেই বা কেন জল তুলতে এসেছেন? আপনার কথায় মনে সন্দেহ জাগছে, দেবী। সম্ভব হলে আমার সন্দেহের নিরসন করুন।’
কিশোরী দুই আঙুলে ঘোমটা টেনে একটু চওড়া করে নিল, ‘আচ্ছা, আপনি কে বলুন তো মশাই? জগন্নাথ স্বামীর পাঠানো দূতের মতোই আজ আপনি আমাকে মৃত্যুর হাতে থেকে রক্ষা করেছেন, এই উপকার আমি মানতে বাধ্য। সেক্ষেত্রেও একটি কথা জেনে রাখুন, আপনি একজন সামর্থ্যবান পুরুষের ধর্ম পালন করেছেন। কিন্তু তাই বলে আমার নাড়ীনক্ষত্র, মনের ভেদ আর ঘরের ছেদ আপনার মতো অপরিচিত মানুষকে কেন বলব? প্রথমত, দয়া করে নিজের পরিচয় দিয়ে আমাকে উপকৃত করুন। যদি তার পরে আপনাকে আমার কথা বলা উচিত মনে হয়, আমি বলব। অবশ্যই বলব! এমনিতেও আপনার স্পর্শে আমার শরীর কলঙ্কিত হয়েছে। দুর্ঘটনাবশত যদি কুয়োর ভিতরে পড়ে যেতাম, তাহলে নাহয় আলাদা কথা ছিল। কিন্তু এবার দেখছি অন্যত্র কোনো কুয়ো খুঁজে তার মধ্যেই ঝাঁপ দিয়ে মরতে হবে। এই কূপ এই দেবদেউলের, তাই এতে ডুবে মরে এর জল অপবিত্র করতে পারি না। তাহলে নরকেও ঠাঁই হবে না আমার। মরে যখন যাবই, তখন আর আমার মনের ভেদ বাইরের লোকে জানুক, না-জানুক আমি দেখতে আসব না। আপনার দেওয়া এই জীবনদান আমার কাছে মৃত্যুর নামান্তর বলেই জানবেন।’
নৃসিংহ দেব কেঁপে উঠলেন, ‘কী বলছেন দেবী? আমি, জগন্নাথ স্বামীর এক সেবক, একজন সামান্য পুরোহিত, তাঁর চরণের এক রাউত। দেবী, আপনাকে স্পর্শ করা আপদধর্ম ছিল। জগন্নাথ স্বামীর আদেশ। আমার স্পর্শ কোনো পরপুরুষের স্পর্শ নয়, এই স্পর্শ পিতার, এই স্পর্শ ভ্রাতার। আপনি এভাবে ভাববেন না। আমার বাড়ি দূরের এক গ্রামে। এক বন্ধুর গৃহে যাচ্ছিলাম। আপনাকে বিপদগ্রস্ত দেখেই আমি এগিয়ে এলাম। এ জগন্নাথ স্বামীরই নির্দেশ। তাঁর কৃপা! আমি আপনাকে রক্ষা করিনি, তিনিই করেছেন। আমি তো নিমিত্ত মাত্র।’
ঘোমটার আড়ালে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল, ‘আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বিপত্তি কেটে গেল। আপনার রূপ ধরে জগন্নাথস্বামীই আমাকে উদ্ধার করেছেন।’
‘হ্যাঁ দেবী, এটাই সত্য! যেকোনো শুভ কাজ সম্ভব করার জন্য জগন্নাথ মহাপ্রভুর ইচ্ছা এবং কৃপার প্রয়োজন। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনি নিষ্কলঙ্কই আছেন। কিন্তু আপনি এখনও আমার উৎকণ্ঠা আর সন্দেহের নিরসন করতে পারেননি। এই গভীর রাতে, এমন নির্জন স্থানে আপনি কার জন্য অপেক্ষা করছিলেন? এমন সময়ে জল নিতে আসার কারণই বা কী? ভোরের আলো ফুটলে এলেই তো হতো?’
অবগুণ্ঠনবতীর গ্রীবা নত হয়ে গেল, ‘শাশুড়ি মায়ের আদেশ, প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই যেন ঘর নিকোনো হয়ে যায়। তার জন্যই জল নিয়ে যেতে হয়।’
‘কুয়োর জল দিয়ে ঘর লেপা হবে? আশ্চর্য! আবার সেই কাজের জন্য এই এ-ত বড় কলসি? আপনার ওজনের দ্বিগুণ ওজন হবে নিশ্চয়ই কলসিটার। প্রতিদিন কী করে বয়ে নিয়ে যান? আপনি এই কলসিতে জল ভরার পরে দু-পা চলতে পারবেন কিনা সন্দেহ আছে। অহেতুক মিথ্যে কেন বলছেন আমাকে?’
‘আপনি না-জেনে আমাকে সমানে অপমান করে চলেছেন। আমি জল নিতে আসি একথা ঠিকই, কিন্তু জল নিজে ভরিও না, এবং বাড়ি অবধি নিয়েও যাই না। এই কাজে আমার ভ্রাতৃসম দেওর আমাকে সাহায্য করে। আমি কলসখানা নিয়ে আসি। পিছনেই আমার দেওর আসে। ওর আসার আগে আমি কলসিটা কুয়োতে নামিয়ে দিই। সময় বাঁচে। সে জল ভরে বাড়ির পিছনদিকের পথ ধরে। আমি ঘর নিকোই। এ সবই হয় শাশুড়ি মার অগোচরে। আজও তা-ই করেছিলাম, কিন্তু ওর না-আসাতেই বিপত্তি বাঁধল। আপনি ঠিক সময়ে এসে উপস্থিত না-হলে আজ কলসি আর আমি দুজনেই কুয়োর মধ্যে গিয়ে পড়তাম। একদিকে অবশ্য ভালোই হতো—এই যন্ত্রণার জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে যেতাম।’
‘আচ্ছা, সব বুঝলাম, কিন্তু আপনি কলসিটাকে ছেড়ে দিলেন না কেন? আপনার প্রাণের থেকেও কি কলসিটা বেশি দামি?’
‘হ্যাঁ, আমার শাশুড়ি মায়ের চোখে আমার জীবনের থেকে কলসিটার দামই বেশি।’
‘আপনাকে দিয়ে এভাবে কাজ করানো তো এক ধরনের প্রতারণা। কোন অপরাধের শাস্তি দিচ্ছেন আপনার শাশুড়ি মা?’
‘উনি আমাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে বড় আনন্দ পান। তবে এই প্রতারণার মূলে আমার শাশুড়ি নন, আছেন অন্য আরেকজন।’
‘কে সেই নরাধম? আপনার স্বামী?’
‘আপনি নিজেই প্রশ্ন করেন, নিজেই তার উত্তর বলে দেন। উলটোদিকের মানুষটার উত্তরের অপেক্ষা অবধি করেন না। আমার স্বামী কেন এমন কাজ করবেন?’
‘তাহলে কে সেই দুষ্ট? বলুন দেবী, সে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করে চলেছে।’
‘নাহয় বললাম তাঁর নাম, কিন্তু আপনি তাঁর কিচ্ছুটি করতে পারবেন না।’
‘উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা অবশ্যই করব।’
‘আপনার সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলোবে না, মহাশয়,’ ঘোমটার ভিতর থেকে তির্যক উত্তর এল।
‘আমার হয়তো নেই, কিন্তু আমি জগন্নাথ স্বামীর সেবক, পুরোহিত। আমি মহাপ্রভু জগন্নাথ স্বামীর কাছে সেই নরাধমের জন্য দণ্ড প্রার্থনা করব এবং মহারাজা নৃসিংহ দেবকে দিয়ে সেই দণ্ড দেওয়াব।’
‘তাঁকে না তো জগন্নাথ স্বামী দণ্ড দিতে পারবেন, না আপনার মহারাজা নৃসিংহ দেব।’
‘কী বলছেন আপনি?’
‘কারণ স্বয়ং মহারাজা নৃসিংহ দেবই আমার অপরাধী। এই রাজ্যের ভাগ্যবিধাতাই আমার দুর্ভাগ্যের বিধিলিপি লিখেছেন। তিনি মহাপ্রভু জগন্নাথের কাছের মানুষ, আপনি তাঁর কী শাস্তি বিধান করবেন?’
ভারি আশ্চর্য হয়ে কিশোরীর দিকে তাকালেন মহারাজ, ‘বলে কী এই ননীর পুতুলের মতো মেয়ে? আমি এর কষ্টের কারণ? কেন? কীভাবে?’ নৃসিংহ দেব কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না। আবার প্রশ্ন করাই তিনি সঙ্গত মনে করলেন, ‘কিন্তু তা কী করে সম্ভব? মহারাজ নিজের প্রজার কষ্ট নিবারণ করার জন্য সবসময়েই যত্নবান, দেবী। আপনার কথার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে। খুলে বলুন।’
‘কোনো রহস্য নেই। উনি কেবল আমার একার নন, আমার মতো বারোশো শিল্পীবধূর দুঃখের এক এবং একমাত্র কারণ। আমার স্বামী একজন কোণার্ক-শিল্পী। দ্বিরাগমনের মাত্র কয়েকদিন আগে তাঁকে কোণার্ক-নির্মাণের জন্য রাজাদেশ দিয়ে ডেকে নেওয়া হয়। আজ তিনি পাষাণের বুকে প্রাণ সঞ্চার করতে ব্যস্ত। আমার শাশুড়ি মায়ের চোখে আমি অলক্ষ্মী। সংসারে আমার পা পড়ার আগেই সংসার থেকে তাঁর পুত্রকে বিদায় নিতে হয়েছে। বৃদ্ধা হয়তো এ জীবনে আর নিজের নাতি নাতনির মুখও দেখতে পাবেন না। তাঁর বড় ছেলে হয়তো তাঁর চিতায় আগুনটুকুও দিতে পারবে না। মনের দিক থেকে বড় অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি। আমাকে গালমন্দ, ভর্ৎসনা করে একটু শান্তি পান। তাঁর কোনও দোষ নেই, দোষ আমার ভাগ্যের, আর দোষ আপনার মহারাজ নৃসিংহ দেবের।’
‘কিন্তু দেবী, আপনার স্বামী একজন কোণার্ক-শিল্পী, এই কথায় আপনার বা আপনার শাশুড়িমায়ের গর্ব হয় না?’
‘হয়। খুব গর্ব হয়! কিন্তু আমার বুকের জ্বালা তাতে জুড়োয় না। শাশুড়ি মায়ের মানসিক বেদনা যত তীব্র হয়ে উঠছে, ততই আমার উপরে অত্যাচার বেড়ে চলেছে। আর সহ্য করতে পারি না।’
‘যদি আপনার স্বামী কোণার্ক-নির্মাণ ছেড়ে আবার গৃহে ফিরে আসেন? আমি জগন্নাথ মহাপ্রভুর কাছে আপনার এই প্রার্থনা নিবেদন করব। তিনি আপনার প্রার্থনা স্বীকার করবেন বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।’
‘না মহাশয়। এ আমি কখনোই চাইব না। আজ যদি বারোশো শিল্পীর স্ত্রী এই একই কামনা করে, তবে মন্দির কীভাবে তৈরি হবে? আর যদি মন্দির নির্মাণে বাধা পড়ে, তাহলে উৎকলের শিল্পকলার বিজয়গাথা রচিত হবে কী করে? না, না। আমি কখনো তা চাই না। আমি চাই, আমার স্বামীর কীর্তি কোণার্কের পাষাণখণ্ডে অমর হয়ে থাক। যুগ-যুগান্ত ধরে ওঁর হাতের শিল্প উৎকলের অভিমান হয়ে বিশ্ববাসীর কাছে জীবিত হয়ে থাকবে। প্রত্যেক স্ত্রী-ই চায় তার স্বামী অক্ষয় হোক, অমর হোক। আমিও তাদের মতোই। একমাত্র কোণার্কই পারবে আমার স্বামীকে অমর করে দিতে।’
‘সাধু, সাধু! মহান আপনার চিন্তা, মহৎ আপনার ভাবনা দেবী! কিন্তু অমন ভাবলে আপনার দুঃখ থেকে যে নিস্তার পাবেন না?’
‘আমার স্বামীও দুঃখেই দিন কাটাচ্ছেন। পতি দুঃখে থাকলে, সতীর জীবনে সুখ কি শোভা পায়?’
নৃসিংহ দেব স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন। তাঁর মনে একটাই ভাবনা ঘুরপাক খেতে লাগল, ‘এই সরলা কিশোরী বারবার আমাকে ধিক্কার জানিয়ে চলেছে। একজন উৎকৃষ্ট শাসক রূপে আমার যে গর্ব ছিল, তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে চলেছে এই বধূ। আজ অবধি আমি পরাজয়ের স্বাদ পাইনি, কিন্তু আজ এই মেয়ে বারংবার আমাকে পরাস্ত করে চলেছে।’
মনের কথা মনেই চেপে রেখে মহারাজ মুখে বললেন, ‘কিন্তু আপনি কীভাবে জানলেন যে আপনার স্বামী কষ্টে আছেন, দুঃখে আছেন? বারোশো শিল্পী এবং সংলগ্ন শ্রমিকদের আহার, আবাস, বস্ত্র, স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষার নিখুঁত ব্যবস্থা করেছেন মহারাজ নৃসিংহ দেব। কোনো কিছুরই অভাব নেই।
বলাই নায়ককে ব্যয় সংক্রান্ত বিষয়ের এবং আল্লু নায়ককে ভাণ্ডারের অধীক্ষক করা হয়েছে। গঙ্গা নায়ক ওখানকার লেখাকার। বয়ালিস বাটীর শ্রী ভ্রমরবর হরিচন্দন আয়-ব্যয়-রক্ষক। রূপাশগড়ের দলবেহরা শিল্পীদের প্রত্যেক প্রয়োজনীয় বিষয়ের খেয়াল রাখছেন। যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে অবকাশ পেলেই মহারাজ নিজে শিল্পীদের দেখাশোনা করতে যাচ্ছেন। স্বয়ং মহারানি সীতা দেবী নির্মাণস্থলে গিয়ে শিল্পী, শ্রমিকদের সুখ–দুঃখের দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেছেন। সন্তানের খিদের ধরন যেমন মা চিনে নেয়, ঠিক তেমন ভাবেই মহারানি প্রতিদিন প্রখর নিরীক্ষণ করে চলেছেন।’
‘কিন্তু আপনি এত কথা জানলেন কীভাবে? আপনি তো বললেন যে, আপনি দূর গ্রামের বাসিন্দা?’
‘যে গ্রামেরই বাসিন্দা হই না কেন, সে তো এই রাজ্যেরই অংশ। পুরোহিত মানুষ আমি। অসংখ্য যজমান। সংবাদ হেঁটে এসে কানে পৌঁছে যায়।’
‘হেঁটে-আসা সংবাদের মধ্যে কোণার্ক শিল্পী, শ্রমিকদের বার্তাও থাকে বুঝি?’
‘থাকে, দেবী। এত বড় নির্মাণকাজ চলছে! তার সংবাদ চাপা থাকে নাকি?’
‘তাহলে শুনুন পুরোহিত মশাই, আপনার কাছে শুধু তাদের সুখের কথাই এসে পৌঁছেছে। দুঃখের কথাগুলো কেউ বলেনি। তাদের কষ্টের কথাগুলো কেউ শুনতেও চায়নি। সে দুঃখ সে কষ্ট সে ব্যথা শরীরের নয়, মনের। তাদের মনের খবর আপনার রাজাও জানেন না, রানিও জানেন না, আর আপনিও জানেন না।’
‘রাজার কাছে কারো কোনো কথা চাপা থাকে না। শুনেছি, তিনি নাকি ছদ্মবেশে রাজ্যের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ান।’
‘সে হয়তো ঘোরেন, কিন্তু এই দুঃখের কথা কখনোই জানতে পারবেন না তিনি। তিনি হয়তো যুদ্ধের সৈনিক কিংবা কোণার্কের শিল্পী-কারিগরদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাবের কথা জিজ্ঞাসা করেন এবং তাদের অভাব পূরণ করেন। কিন্তু জানেন কি সেইসব সৈনিক বা শিল্পীর বধূর কথা? জানেন তাঁদের অন্তরের হাহাকার, মনের কষ্ট? কেউ বলে নাকি এইসব কথা আপনার রাজাকে? বলুন না, বলে কেউ?’
‘কী তাঁদের মনের বেদনা? কীসের হাহাকার?’
‘আপনি ব্রাহ্মণ মানুষ। জ্ঞানে, অভিজ্ঞতায় আমার থেকে অনেক বেশি পরিপক্ক। আপনাকে আর আলাদা করে কী বলি বলুন তো? এই অসময়ে, একান্তে, একজন পরপুরুষের সামনে নিজের মনকষ্টের ব্যাখ্যা দিতে আমি অপারগ। আপনি জগন্নাথ দেবের সেবক জেনে এটুকু যে বলতে পেরেছি এটাই অনেক।’
‘ভয় পেও না, মা! সঙ্কোচ কোরো না! এতে তোমার মনের বোঝা কমবে। তোমার দুঃখের কাহিনি জগন্নাথ স্বামীর সেবকের কাছে বলছ মানে এটুকু জেন স্বয়ং জগন্নাথ মহাপ্রভুই তা শুনছেন। হতেও তো পারে যে আমি তোমার কোনো উপকারে লাগলাম?’
‘পুরোহিত মশাই, খাদ্য, বস্ত্র, পরিবারকে ভূমিদান, কিছু মাসিক দ্রব্য, এইটুকুতেই কি এই পরিবারগুলোর সমস্ত কষ্ট দূর হয়? বারো বছরের বিরহ বেদনার উপশমের জন্য মহারাজ নৃসিংহ দেব কী দেবেন? তার কোনো মূল্য হয় কি? এই দারুণ বিরহের একটি মুহূর্তের মূল্য দেওয়ার ক্ষমতাও আপনার মহারাজার নেই।’
নৃসিংহ দেবের মুখ দিয়ে একটি কথাও সরল না। কিন্তু অন্তরে ঝড় উঠেছে যে, তাই নিরুত্তরও থাকতে পারলেন না। নির্বিকার ভাবেই বললেন, ‘দেবী, জাতির বৃহত্তর লক্ষ্য স্পর্শের খাতিরে ব্যক্তির নিজস্ব সুখ ত্যাগ বাঞ্ছনীয়। এই জগতের অনেক অমর কীর্তিকথার নেপথ্যে অসংখ্য ব্যক্তি জীবনের পবিত্র ত্যাগের কথা জড়িয়ে আছে।
আপনি সম্ভবত জানেন না যে, কোণার্ক বাস্তবে একটি সন্ন্যাস-পীঠ। জিতেন্দ্রিয়তার পীঠ। ত্যাগের পীঠ। উৎসর্গের পীঠ। পদ্মক্ষেত্র কোণার্কে সূর্য এবং পদ্মের নিষ্কাম প্রেমকে আদর্শ মেনে অখণ্ড ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমে যদি শিল্পীরা নিজেদের শিল্পের প্রতি চরম পরাকাষ্ঠা দেখাতে পারেন, তবেই কোণার্ক মন্দির নির্মাণ সম্ভব হবে। উৎকলের ভবিষ্যৎ আজ উৎকলের শিল্পীদের সংযম ও জিতেন্দ্রিয়তা এবং শিল্পী-বধূদের নিষ্ঠার উপর নির্ভর করছে। আশা করি, মহারাজের এইটুকু কামনা অনুচিত বলে আপনি গণ্য করবেন না।’
‘অবশ্যই...অবশ্যই উৎকলের ভবিষ্যৎ উৎকলের শিল্পী এবং তাঁদের প্রিয়তমাদের কাছে এই আশা করতেই পারে। অধিকার আছে বইকি। কিন্তু প্রজার আদর্শ হলেন রাজা। উৎকলের ভবিষ্যতের জন্য সব বলিদানই কি প্রজাদের দিতে হবে? এক্ষেত্রে কি রাজার কোনো ভূমিকা থাকবে না?’
‘ঠিক বুঝতে পারলাম না।’
‘জানি বুঝবেন না।’
‘আপনি যদি বোঝান, ঠিক বুঝব।’
‘বারো বছর ধরে একজন কোণার্ক-শিল্পী তাঁর সাধনার চরম পরাকাষ্ঠা নিয়ে, অখণ্ড ব্রহ্মচর্য পালন করে, নিজের কামনা-বাসনাকে উৎসর্গ করবেন। বারো বছর ধরে নিজের আশ-উচ্ছ্বাসের গলা টিপে তাঁদের বধূরা নিজেদের সমস্ত যৌবন, নিজেদের ঋতুক্ষমতাকে সময়ের আগুনে নিবেদন করবেন। কিন্তু স্বয়ং মহারাজ কি এই বারোটা বছরের মন্দির নির্মাণের পর্বে সংযম, ব্রহ্মচর্য আর নিষ্ঠার পালনে নিজের কামনা, বাসনা, ভোগের সমস্ত আবেগকে কোণার্কের ধুলোয় অর্পণ করতে পারবেন? আছে আপনার মহারাজের এত সাহস?
আর যদি তা না-ই থাকে, তবে তিনি কীভাবে শিল্পীদের কাছে, তাঁদের পরিবারের কাছে এত কিছু আশা করেন? যা একজন রাজার পক্ষে সম্ভব নয়, তা প্রজারা করবে কীভাবে? কেনই বা করবে? রাজার শরীরেই একমাত্র রক্ত-অস্থি-মজ্জা-বীর্য আছে, আর পাষাণের বুকে খোদাই করে করে শিল্পীর শরীর পাষাণের হয়ে গেছে বুঝি? শিল্পীদের কামনা-বাসনারাও কি পাথর হয়ে গেছে? আপনি একজন বিচক্ষণ মানুষ। একটি বার আমার কথাগুলো বিবেচনা করে দেখুন,’ গভীর উদ্বেগে কিশোরীর তনু তখন থরথর করে কাঁপছে।
কিশোরীর সামনে দাঁড়িয়ে প্রবল পরাক্রমী নৃসিংহ দেব চকিত, মর্মাহত। সত্যিই তো, তিনি এর আগে এই কথাগুলো কখনো ভেবেই দেখেননি, বিচার করেননি। তাঁর কাছে এতদিন একজন শিল্পী শুধুই স্রষ্টা হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন। সে-ও যে একজন মানুষ, তারও কামনা-বাসনা-দেহ ভোগের লিপ্সা থাকতে পারে, তা তিনি আগে কখনো উপলব্ধিই করেননি। এই বালিকাবধূ বয়সে ছোট হলেও তার কথায় বিন্দুমাত্র মিথ্যে নেই।
নৃসিংহ দেব তার সামনে নতজানু হয়ে বললেন, ‘আমার প্রণাম স্বীকার করুন, দেবী! আমি আপনার থেকে বয়সে অনেক বড়, আপনি কিশোরী, কিন্তু আপনি অনেক বেশি বিবেচক ও বিচক্ষণ। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি—আপনার মনের সব ক্ষোভ আমি জগন্নাথ স্বামীর কাছে পৌঁছে দেব। তারপর তিনি যা নির্দেশ দেবেন, রাজাও সেইমতো চলবেন।’
‘ক্ষমা করুন, পুরোহিত মশাই। রাজার প্রতি কিন্তু আমার কোনো অভিযোগ নেই। আপনাকে অত্যন্ত সহৃদয় ব্যক্তি বলে মনে হয়েছে আমার, তাই এতগুলো কথা বলে ফেললাম। যা বলেছি, তা এখনই ভুলে যান। মহাপ্রভু জগন্নাথ স্বামীর কাছে আপনি মহারাজের মঙ্গল কামনা করবেন। প্রার্থনা করবেন যেন কোণার্ক-মন্দিরের নির্মাণ শীঘ্রই সম্পন্ন হয়।’
‘অবশ্যই মা। আর আমি আপনার স্বামীর মঙ্গল কামনাও করব। কী নাম তাঁর?’
‘নিজের স্বামীর নাম এই মুখে কী করে আনব পুরোহিত মশাই? তাছাড়া শুধুমাত্র আমার স্বামীর নাম জেনেই বা কী হবে? এই ব্যথা, এই বেদনা তো আমার একার নয়, বারোশো শিল্পীর আর তাদের প্রিয়ার।’
‘আপনি ধন্য, দেবী! আপনাকে একটাই কথা বলতে পারি, এই কঠিন সময়ে পাষাণের মতো ধৈর্য ধরুন। সুখী হোন। জগন্নাথ স্বামী আপনার কল্যাণ করুন!’
যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে স্বামী ফিরে এসেছেন। সীতাদেবী শয়নকক্ষে অভিসারিকার সাজে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু স্বামীর মুখেচোখে হতাশার ছায়া দেখে চিন্তায় পড়ে গেলেন মহারানি, ‘এ কী দশা আপনার? মহারাজ, সব কুশল তো?’
‘হ্যাঁ রানি, জগন্নাথ দেবের কৃপায় এখনও অবধি সব ঠিকই আছে।’
‘কিন্তু আপনাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে মহারাজ?’
‘কিছুই হয়নি, দেবী। আপনাকে আমার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল তাই না? বিলম্বের জন্য ক্ষমা চাইছি।’
‘আপনার প্রতীক্ষায় এই জীবন শেষ হয়ে গেলেও আমার মনে কোনো দুঃখ, কোনো গ্লানি থাকবে না। আপনাকে পেয়ে আমি পূর্ণতা লাভ করেছি।’
‘কিন্তু কোণার্ক এখনও অসম্পূর্ণ রানি। আর যতক্ষণ না অবধি কোণার্ক সম্পূর্ণ হচ্ছে, ততক্ষণ আমিও অপূর্ণ থেকে যাব।’
‘কোণার্কও পূর্ণ হবে মহারাজ। আমি নিজে কোণার্কের কাজ সম্পূর্ণ হতে যা যা প্রয়োজন, সব করব।’
‘আমি জানি মহারানি, আমি জানি। আপনি স্বয়ং রোদ–জল–বৃষ্টি মাথায় নিয়ে নির্মাণস্থলে গিয়ে শিল্পীদের সুখ-সুবিধার খেয়াল রাখছেন। আমি সব জানি। কিন্তু কোণার্ক অন্য কিছু চায়।’
‘কী চায় কোণার্ক? বলুন মহারাজ। আপনি আদেশ করুন।’
‘আমি একটা স্বপ্নাদেশ পেয়েছি মহারানি। কোণার্কের কাজ নিষ্ঠাভরে পূর্ণ করার জন্য আমাদের দুজনকেই একটি ব্রত পালন করতে হবে।’
‘ব্রত? কী ব্রত? বলুন মহারাজ, আগামীকালই পুরোহিত ডেকে ব্রত পালনের সমস্ত ব্যবস্থা করা হবে।’
‘আমার কথা সম্ভবত আপনি বুঝতে পারেননি মহারানি। শ্রীকৃষ্ণ–পুত্র শাম্ব বারো বছর ধরে ব্রহ্মচর্য পালন করে সূর্যদেবের উপাসনা করেছিলেন। তখন থেকেই অর্কক্ষেত্র জিতেন্দ্রিয় পীঠ। কোণার্কের শিল্পীরা বারো বছর ধরে ব্রহ্মচর্যের ব্রত নিয়ে মন্দিরের নির্মাণকাজ করবেন। সেইসঙ্গে তাঁদের পত্নীরা আগামী এক যুগ ধরে এই ভাগ্যলিখন মানতে বাধ্য হবেন। আমি রাজা, আমার উচিত তাঁদের সমুখে আদর্শ রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। মহারানি, আমাদের দাম্পত্যে আমি আপনার কাছে আগামী বারো বছরব্যাপী সন্ন্যাস চাইছি। এর অন্যথা হলে কোণার্ক পূর্ণ হয়েও অপূর্ণ থেকে যাবে।’
‘কোণার্ক পূর্ণ হবে মহারাজ। সর্বতোভাবেই পূর্ণ হবে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।’
সীতাদেবী এক এক করে নিজের অভিসারিকা বেশ খুলে ফেললেন। কিছুক্ষণের মধ্যে এক সন্ন্যাসিনীর বেশে এসে দাঁড়ালেন নৃসিংহ দেবের সমক্ষে। মহারাজা নিজের দুই হাত জোড় করে তাঁকে বললেন, ‘আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই দেবী। আপনার এই ত্যাগ শিল্পীদের জীবনের প্রেরণা হবে। প্রভুরও তা-ই ইচ্ছা।’
মহারাজ মন্থর গতিতে অন্তঃপুর থেকে বেরিয়ে এলেন।
দূরে সৈন্যশিবিরের বাইরে একটি কম্পমান দীপশিখা প্রাসাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। মহারাজ দেখলেন বৈধব্যের শ্বেত চিহ্ন গায়ে নিয়ে তাঁর ভগিনী চন্দ্রাদেবী দ্রুতপায়ে মহলের দিকেই আসছেন। চন্দ্রাদেবীর পিছনে বারো খড়্গধারী পাইক। তারা তাঁকে মহল পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসছে। চন্দ্রাদেবী যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা সৈনিকদের কুশল সংবাদ নিতে শিবিরে গিয়েছিলেন।
মনে মনে স্বস্তি পেলেন নৃসিংহ দেব। উৎকলের বীরত্ব এবং উৎকলের শিল্পকলা দুই-ই, চন্দ্রাদেবী ও সীতাদেবীর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। উৎকল অবিজিতই থাকবে। কোণার্ক পূর্ণ হবে। উৎকলের সন্তানেরা নিজেদের কীর্তির কথা অমল অক্ষরে লিখে রেখে যাবে ভবিষ্যতের জন্য। কোণার্ক যেমন একধারে হবে সূর্যের শক্তির নিবাসস্থল, ভাস্কর আরাধনার মন্দির তেমনি অন্যদিকে হবে পরমার্দি দেবের নৈপুণ্য, শৌর্য, বীরত্ব এবং বিজয়ের স্মৃতির সৌধও।
আমার অপরূপা বান্ধবী গল্প বলতে বলতে এবার একটু বিরাম নিলেন। তাঁর কথা থেমে যেতে আমিও যেন এক অদেখা কালখণ্ড থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। কাহিনির অর্কক্ষেত্রে বিচরণ করতে করতে মনে হচ্ছিল আমিও যেন ওই পর্বের এক চরিত্র।
এই গল্পটা আমার মুখে শুনতে আপনাদের কেমন লাগছে তা জানি না, কিন্তু আমি কথকঠাকুরণের কথার গুণে বিভোর হয়েই শুনছিলাম। কথার মাধুরীতে স্তম্ভিত এক পাষাণের মতোই। ইশ, যদি সুবল মহারানার হাতে পড়ে আমিও কোণার্কের ভিতেই কোথাও মিশে থাকতে পারতাম!
‘কী হল শুরু করুন এবার!’
আমার বন্ধুনীটি স্মিত হেসে আবার বলতে আরম্ভ করলেন...
‘দেখেছেন কিনা জানি না, নাটমন্দিরের পীঠে পূর্ব দিকের দ্বারের সিঁড়িতে একটি মূর্তি আছে। সেই মূর্তির পায়ের কাছে শিলালেখতে খোদাই করা আছে–সো মাহ চৈ। অন্য কোনো মূর্তির নীচে কিন্তু এই ধরনের কোনো শিলালেখ কিছু লেখা মেলে না। ওটা আসলে সৌম্য শ্রীদত্তর মূর্তি। সুবল মহারানা মনপ্রাণ উজাড় করে ওই মূর্তিটা গড়েছিল।
সোয়া হাত উঁচু আর আধ হাত চওড়া একটি আসনের উপরে দণ্ডায়মান মূর্তিকে ঘিরে নৃত্যভঙ্গিমায় উৎকীর্ণ নর্তক–নর্তকীর দল। নৃত্য-গুরুর পরিধেয় বস্ত্রটিও কোমর থেকে পা অবধি খোদাই করে সৃষ্টি। মাথায় পাগড়ি, কানে মকরাকৃতি কুণ্ডল, বুকে পদক খচিত রত্নহার। হাতে গিনি বাজিয়ে তিনি নৃত্যের নির্দেশনা করছেন। বাঁ হাতে ধরা গিনি বুকের নীচে অবস্থান করছে। ডান হাতেও একটা গিনি আছে। কপিত্থ মুদ্রায় বাম হাতের গিনিতে ঠাপ দেওয়ার জন্য উদ্যত ডান হাতে গিনি ধরা।
এখন সময়ের গ্রাসে ধূলিস্মাৎ হয়েছে নাটমন্দিরের ছাদ। নাটমন্দিরের শীর্ষে নির্মিত গর্ভমুদ্রাও রোদে–জলের আঘাত সহ্য করে মুক্ত আকাশের নীচে পড়ে রয়েছে। এই গর্ভমুদ্রা সুবল মহারানার স্পর্শধন্য। দুটি স্তরের পাপড়ি সম্পন্ন পূর্ণ বিকশিত পুণ্ডরীক। এক মহান শিল্পীর শিল্প নৈপুণ্যের নিদর্শন।’
‘আচ্ছা, গর্ভমুদ্রা কী?’ শিল্পকলা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না বলে প্রশ্নটা করতে বাধ্য হলাম।
‘মন্দিরের ছাদের ভিতরের দিকে কেন্দ্রে একটা অধোমুখ পুষ্পের আকৃতি খোদাই করা হয় দেখেছেন? বাস্তুশিল্পের প্রতিমান প্রত্যেক মন্দিরে এটা দেখা যায়। আজকাল যেসব মন্দির তৈরি হয় সেখানে এধরনের কাজ করাই হয় না, আর এখনকার দর্শনার্থীরা প্রাচীন মন্দিরে শুধু বিনোদনমূলক ভ্রমণের জন্য যান। মন্দিরে, ধর্মে বা মন্দিরের শিল্পে তাঁদের আগ্রহ না-থাকায় গর্ভগৃহে প্রবেশ করেন না। তাই গর্ভমুদ্রার ব্যাপারে জানতেও পারেন না। কিন্তু যারা প্রবেশ করেন, তাঁরা দেখতে পান।
আকাশে সূর্য থাক বা না-থাক, এই শিলাপদ্ম অনন্ত প্রতীক্ষা নিয়ে গর্ভগৃহে প্রবেশ করা দর্শনার্থীদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সূর্যদেব নিজে কখনো পৃথিবীর বুকে নেমে আসেন না। তিনি নিজের দুই পত্নী সংজ্ঞা এবং ছায়ার সঙ্গে বিশ্ব-পরিক্রমা করেন। কিন্তু তাঁদের নৈসর্গিক প্রেমের প্রতীক এই শিলাপদ্ম। ভারতীয় নারী পদ্মের এই নিষ্ঠা রাখেন নিজের স্বামীর জন্য, এই নিষ্ঠা নিয়েই একজন ভারতীয় রমণী নিজের স্বামীর অনুপস্থিতিতে তাঁর জন্য অপেক্ষা করেন। সেই স্বামী দেবতা হোক বা রাক্ষস, স্ত্রী’র কিছুই যায় আসে না। সেই নারী এই একনিষ্ঠ প্রেম নিয়েই বাঁচে, এবং এই একনিষ্ঠ প্রেমকে আলিঙ্গন করেই তার মৃত্যু হয়।
এই গর্ভমুদ্রা আসলে কোণার্ক মন্দিরের ওই বারোশো শিল্পীদের প্রিয়তমাদের একনিষ্ঠ প্রেমের পাষাণ প্রতিরূপ, যার মহিমায় বশীভূত হয়েই কোণার্ক-শিল্পীদের ঘরণীরা বারো বছর ধরে নিজ নিজ স্বামীর পথ চেয়ে নির্নিমেষ ভাবে কাটিয়ে দিয়েছিলেন।’
‘আপনার কথা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে এই ভগ্ন কোণার্ক, সুবল মহারানার ত্যাগ এবং বেদনার অবিকল প্রতিরূপ। সুবল, তাঁর স্ত্রী, এবং কোণার্ক-মন্দিরের নির্মাণের কাজে লিপ্ত ওই বারোশো শিল্পী ও তাঁদের প্রিয়তমাদের কথা ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’
‘এইটুকুতেই মনখারাপ হয়ে গেল? এখনও তো আমি কাহিনির অর্ধেকটাও বলিনি। শুনুন শুনুন, আগে একটু ধৈর্য ধরে ঘটনাটা শুনুন...
সূর্যদেবতা তখনও সাগর-স্নান সেরে ওঠেননি। সুবল মহারানা একটা বিশাল বেলেপাথরের সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন ভেবে চলেছে। সম্ভবত নাটমন্দিরের জন্য একটি নৃত্যমূর্তি খোদাই করার আগে আগে সে নিজের কল্পনাশক্তিকে ধার দিয়ে নিচ্ছে। কীভাবে গড়ব? সুডৌল দেহযষ্টি, কমনীয় দেহবল্লরী, অথবা অলংকার জড়ানো? কীভাবে গড়া ঠিক হবে? সুগঠিত দেহের ওপর অলংকরণের উৎকর্ষতা সম্পন্ন এক অপূর্ব লাস্যময়ীর ভঙ্গিমায় চিরন্তন শিল্পও বিস্ময়কর হয়ে উঠবে। হয়ে উঠবে অপার আনন্দের খনি। স্থাপত্য আর ভাস্কর্য একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠবে তখন।
দেহে অলংকরণের একটা কাল্পনিক চিত্র সুবলের মনে এসে গিয়েছে, কিন্তু নৃত্যমূর্তির অঙ্গসৌষ্ঠবের নিখুঁত বিবরণী এখনও কল্পনার সঙ্গে লুকোচুরি খেলে চলেছে। এমন সময় শব্দ ভেসে এল ছম...ছম...! ছম...ছম...! ছম...ছম...! দূর থেকে ক্রমশ কাছে আসতে থাকা ধ্বনি শুনে সুবল অবাক হল। একটি সুন্দর লয়-তাল আবর্তিত হচ্ছে। সেই ধ্বনি উত্তরোত্তর তীব্র হচ্ছে, আরও তীব্র।
কে? কোনো দেবদাসী বুঝি? তবে কি আচার্য শ্রীদত্ত সুবলের জন্য কোনো প্রতিরূপের ব্যবস্থা করেছেন? নাহলে কী-ই বা হবে, কে-ই বা হতে পারে? কে জানে তাকে কেমন দেখতে? তার ভাবে, মুদ্রায় কি স্বর্গীয় আভা বিচ্ছুরিত হবে? বাস্তবের লালিত্য কি কল্পনার মাধুর্যকে পরাজিত করতে পারবে? আচার্য শ্রীদত্ত কি তবে সুবল মহারানার কল্পনায় আস্থা রাখতে পারলেন না? কল্পনার অসীম বৈভবের সামনে বাস্তব সদা দরিদ্র—একথা কি আচার্য বোঝেন না?
মনে মনে এসব চিন্তায় মগ্ন থাকলেও আগত ধ্বনির উদ্দেশে কান খাড়া করে, দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে ছিল সুবল। এমন সময় যেন একটি নৃত্যমূর্তিই সশরীরে বায়ুতে ভেসে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
সুবল মহারানা হতবাক হয়ে গেল। মনে তার একটাই প্রশ্ন, তবে কি আমার কল্পনা স্বয়ং সাকার হয়ে উঠল? কল্পনা কি এভাবে প্রাণ পেয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে? কে এই দেবকন্যা? অন্য কোনো শিল্পীর প্রতিরূপ হতে আসা কোনো দেবদাসী নয় তো? না, তা-ও নয়। সুবল তাদের প্রত্যেককেই দেখেছে। খুব ভালো করে নিরীক্ষণ না-করলেও তাদের মুখ ভুলে যাওয়ার কথা কিন্তু নয়।
তবে কি এই অপ্সরা আজ সুবল মহারানার শিল্পকর্মের প্রতিরূপ হতে উপস্থিত হয়েছে? এ জগতে কি কোনো নারীর এমন রূপ থাকাও সম্ভব? যা দেখছে, তা স্বপ্ন নাকি সত্য যাচাই করতে নিজের হাতের ছেনির ছুঁচলো মুখটা নিজের আঙুলে বিঁধে দেখল সুবল। রক্তের একটি ফোঁটা আঙুলের মাথায় বিনবিন করে উঠল। নাহ্, এ তো স্বপ্ন নয়! সত্যিই এক অপ্সরা দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।
সুবল সর্বপ্রথম তার দুই নূপুরধারী পায়ের দিকে তাকাল। পা-জোড়া তো নয়, আধফোটা দুটি পদ্ম-প্রসূন যেন! পদ্ম কোরকের সাহায্যে উদিত সূর্যের আভায় দুটি লঘু আলতারেখা। সুবলের সঙ্কুচিত দৃষ্টি ক্রমশ উপরে উঠতে লাগল এবং ওই অপ্সরার সুঠাম দেহকে স্পর্শ করতে করতে তার মুখের উপর গিয়ে নিবদ্ধ হল। দৃষ্টি স্থির হল বটে, কিন্তু অন্তরের নিঃসঙ্গতা যেন কোনো এক তীব্র আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। এত রূপ, এত রূপ, বুকের মাঝে কোলাহল পড়ে গেল! এত লাবণ্য! এমন স্বর্গীয় ভাবমুদ্রা! সুবলের মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল, এ কি আমার জন্য প্রতিরূপ হবে? আমার হাতে কি এমন সামর্থ্য আছে যে এই রূপকে আমি পাষাণের বুকে জীবন্ত করে তুলতে পারব?
সুবল নিজেই পাষাণে পরিণত হয়ে গেল—স্তম্ভিত, হতবাক। তার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল। ওই অপলক দৃষ্টি নিয়ে সে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল সজীব মূর্তিটির পানে।
ব্যাপারটা কঠিন হলেও নিজের মনের উদ্দাম দোলনকে দ্রুত বশে এনে ফেলল সুবল। সে এখন তপস্বী। সূর্যপীঠে আগামী বারো বছর অখণ্ড ব্রহ্মচর্য পালনে ব্রতী এক সন্ন্যাসী। এখন যদি সে তপভ্রষ্ট হয়, ইন্দ্রিয় নিগ্রহে অসফল হয়, বিচলিত হয়, উদ্বেলিত হয়, শিল্পের উৎকর্ষ সাধনার পথে স্খলিত হয়, তাহলে তার শিল্পী-ধর্ম আহত হবে। আর ওদিকে, তার প্রাণপ্রিয়ার গহন বিশ্বাস, অকল্পনীয় বিরহ এবং অখণ্ড সতীত্ব...তার কী হবে? তাই এই বিচলন অনুচিত। সুবল মহারানা নিজেকে সংযত করে ফেলল।
তবে কি সে মানা করে দেবে? না, না! তা হয় না। এই ব্রহ্মচর্যের দাবদাহে স্পর্শ করতে না-পারি, প্রতিরূপকে দেখার সুখ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে কেন?’ ভয়ানক দোলাচলে ভুগতে থাকা সুবলের মনে একের পর এক প্রশ্ন জাগতে থাকে, ‘কে এই কিশোরী? এই কোমল ফুলের মতো মেয়েটিকে পাথরের দেবতার কাছে অর্পণ করে কোন পাষণ্ড একে দেবদাসী হতে বাধ্য করেছে?’
কিশোরী মৌন হয়েই দাঁড়িয়েছিল। তবে কি মেয়েটি মূক ও বধির? নাকি মৌন ব্রত ধারণ করেছে সে? হায় রে দেবদাসীর জীবন! পাষাণের দেবতাকে অর্পিত প্রাণ! যৌবনের উদ্দাম আকাঙ্ক্ষা, কামনা, বাসনা, প্রণয়, পরিণয়, মাতৃত্ব সব কিছু বর্জিত। স-ব কিছু নিষিদ্ধ! দেবতাদের মনোরঞ্জনের জন্য যাদের জীবন উৎসর্গীকৃত, তাদের কি মন বলে কিছু থাকতে পারে না? তাদের হৃদয়ের ভাবনার কি কোনো মূল্য নেই? মানুষ হয়েও আর পাঁচটা মানুষের মতো চাহিদা রাখাটা কি পাপ? কিন্তু কেন?
অনেক অনেক প্রশ্ন আছে, কিন্তু একটার উত্তরও সুবলের জানা নেই। মানুষ নিজের আরাধ্য দেবতাকে সবসময়েই পবিত্রতম, স্নিগ্ধতম এবং অন্যতমটুকুই সমর্পণ করার কামনা রাখে, তবুও সুবল এটা মেনে নিতে পারে না যে, দেবদাসী দেবার্পণীয়।
মহারাজা চোড়গঙ্গ দেবের শাসনকাল থেকেই জগন্নাথ দেবের মন্দিরে দেবতাদের সমক্ষে নৃত্য–গীত পরিবেশনের জন্য দেবদাসী নিয়োজিত হয়ে এসেছে। মন্দিরের পক্ষ থেকে দেবদাসীদের আবাসস্থল, ভূমি এবং সমস্ত আবশ্যকীয় বস্তুর বন্দোবস্ত করা হয়ে থাকে। অন্যান্য সম্পত্তিও যথেষ্ট দান করা হয় তাদের। দাস-দাসীর অভাব থাকে না তাদের। কিন্তু এটুকুই কি পর্যাপ্ত? আর এই দেবদাসীরা কারা? কোথা থেকে নিয়ে আসা হয় এদের? আচার্য শ্রীদত্ত একে কোন রহস্য-মঞ্জুষা থেকে বের করে এনেছেন ভগবান জানে? কিন্তু এই কিশোরী এমন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে কেন? মনে মনে ভাবল সুবল। সুবলের বড় কৌতূহল হল। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘ওহে, কিছু বলছ না কেন? কে তুমি?’
হাওয়ার পরশে যেভাবে ফুলের পাপড়ি তিরতির করে কাঁপতে থাকে সেভাবেই কেঁপে উঠল সুন্দরীর অধর, ‘আপনি কে? প্রথমে আপনার পরিচয় দিন।’
সুবল আশ্চর্য হয়ে ভাবে, ‘অদ্ভুত! আমারই শিবিরে এসে আমাকেই আমার পরিচয় জানতে চাইছে? কে এই বালিকা?’ মুখে সে বলে, ‘আমি মন্দির নির্মাণের কাজ নিয়োজিত একজন সামান্য শিল্পী। আমার নাম সুবল মহারানা।’
এক বিরল বিলাসময় লাস্যের ভঙ্গিমা মুখে এনে কিশোরী বলল, ‘তাহলে আমি শিল্পা, শিল্পী। শিল্পীর শিল্পা।’
অজানা এক আবেগে সুবলের সারা দেহে শিহরন খেলে গেল। কিশোরীর উত্তরে লুকিয়ে রয়েছে এক গূঢ় ব্যঞ্জনা। মন থেকে ভাবনার জাল ছিন্ন করে সুবল বলল, ‘বাহ, ভারি অপরূপ কথা বললে তো! শিল্পের প্রতিরূপ হলে তাকে শিল্পা-ই বলা হবে বইকি। কিন্তু তোমার আসল নাম কী? কী পরিচয়? কোন মন্দিরের দেবদাসী তুমি?’
কিশোরী মুখ খুলতেই যেন বেজে উঠল বীণার মধুর স্বরলহরী, ‘আমার নাম সত্যিই শিল্পা। আমি নৃত্যগুরু আচার্য সৌম্য শ্রীদত্তের কন্যা। এবং সূর্যদেবের চরণে স্বেচ্ছায় সমর্পিতা।’
সুবলের তরুণ হৃদয়ের মৃদুল তরঙ্গ স্তম্ভিত হয়ে গেল। আচার্য শ্রীদত্তর দুহিতা হবে কিনা সুবল মহারানার শিল্পের প্রতিরূপ? মন এক অদ্ভুত সম্ভ্রমে ভরে উঠল। এই ফুলের মতো কোমল কন্যা কি শিল্পের প্রতিরূপ হওয়ার মতো কষ্টসাধ্য কাজ করতে পারবে?
‘শিল্পের প্রতিরূপ হয়ে ওঠার কাজ কিন্তু খুব কঠিন, কিশোরী। ধৈর্য, নিষ্ঠা, একাগ্রতা এবং গভীর অনুরাগ নিয়ে দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে, একই ভঙ্গিমায় স্থিরভাবে বসে থাকতে হবে। পারবে তুমি?’
কিশোরী মৃদু হাসল। মনে হল, কোনও এক কোমল পুষ্প অতি সন্তর্পণে তার পাপড়িগুলো মেলে ধরল। তারপর বলল, ‘তা পারব না কেন? অবশ্যই পারব।’
‘কিন্তু প্রতিরূপ হিসেবে আচার্য তোমাকেই কেন পাঠালেন? এই কাজ তোমার যোগ্য নয়, কিশোরী।’
‘আমি এখানে স্বেচ্ছায় এসেছি। আমার পিতা এই সম্বন্ধে কিছুই জানেন না।’
‘অন্যায় করেছ। আচার্যকে না-জানিয়ে অন্যায় করেছ তুমি, কিশোরী।’
‘কিশোরী! এ আবার কেমন সম্বোধন? শিল্পা! শিল্পী, আমার নাম শিল্পা! সম্ভবত নিয়তি কোনো বিশিষ্ট প্রয়োজনেই আমার নাম শিল্পা স্থির করেছে।’
‘আমার নামও শিল্পী নয়। সুবল...সুবল মহারানা!’
‘না...তুমি শিল্পী...আর আমি শিল্পা!’
সুবলের মনে হল যেন বঙ্গোপসাগর থেকে পূবের হাওয়া উড়ে এল চন্দ্রভাগার তটে। কেতকী বনের সুরভীতে ম’ম’ করে উঠল চারিপাশ—তুমি শিল্পী...আর আমি শিল্পা!
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। কিন্তু তোমার পিতার অজ্ঞাতে এইভাবে তোমার প্রতিরূপ হতে চাওয়া অনুচিত। আগে আচার্যের অনুমতি নিতে হবে।’
‘আমি মনে মনে নিজেকে একজন দেবদাসী রূপে সূর্যদেবতার চরণে অর্পণ করেছি। আমার পিতা বলেন যে, তোমার ছেনিতে পাষাণে শিল্প ফোটে, তোমার হাতে কোণার্কের পাষাণ-বাগিচায় উৎকলের শিল্প অমর হতে চলেছে। শিল্পী, আমিও অমর হতে চাই। তোমার শিল্পের প্রতিরূপ হয়ে আমিও এই পাথরের বুকে উৎকীর্ণ হতে চাই। কোণার্কের এইসব শিলাখণ্ডে সমাহিত হয়ে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকতে চাই আমি! আমার পিতা আমার ইচ্ছার কথা শুনলে আমাকে অনুমতি দেবেন না। আমি নিজের সমস্ত কামনা, সকল বাসনা, সব ভাবনা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে দিয়েছি, কারণ তাদের কেন্দ্র হয়ে ওঠার যোগ্য ব্যক্তি আমার পরিধির বাইরে ছিল। এখনকার এই জীবনে তোমার শিল্পের প্রতিরূপ হয়ে অমর হয়ে যাওয়াই আমার এক এবং একমাত্র কামনা, শিল্পী। আমার এই কামনাকে পূর্ণ করার ক্ষমতা কেবল তোমারই আছে। এই অনুপম নির্মাণে যদি আমার যৎকিঞ্চিত অবদানও থাকে, তবে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব। তোমার শিল্পের প্রতিরূপ হয়ে ওঠার জন্য আমার পিতার আজ্ঞা নয়, তোমার অনুমতি এবং সহমত প্রয়োজন। বলো না শিল্পী, আমাকে অমর করে দেবে তো?’
‘শাস্ত্রীয় নৃত্যের জ্ঞান আছে তোমার?’
‘বিধিবত কোনো শিক্ষা আমার নেই, কিন্তু আমি নাট্যাচার্য সৌম্য শ্রীদত্ত দীক্ষিতের কন্যা। আমার পিতা নিজের শিষ্যদের যা শেখাতেন, আমি তা-ই অভ্যাস করে গিয়েছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, আমি আমার পিতার পরিকল্পিত নাট্যমন্দিরের যোগ্য নৃত্যমূর্তির জন্য উপযুক্ত প্রতিরূপ হয়ে উঠতে পারব। এছাড়াও তুমি তো আছই। তাই না? কোথাও কোনো ভুল-ত্রুটি হলে তুমিই বুঝিয়ে দেবে। পিতা বলেন যে, তুমি নাকি নৃত্যশাস্ত্রেও সমান প্রাজ্ঞ।’
‘কিন্তু তোমার এই পদক্ষেপে যদি আচার্যের আপত্তি থাকে? যদি তিনি ক্ষুণ্ণ হন?’
‘আমি আমার পিতা, নৃত্যগুরু সৌম্য শ্রীদত্ত দীক্ষিতের কাছে সাকার নৃত্যকলা। আমাকে না-দেখতে পেলে তিনি তাঁর নৃত্যের বিদ্যাই ভুলে যাবেন। আমার মুখ, আমার চোখ, আমার চলার ছন্দ দেখেই তাঁর মনে সঙ্গীত ফোটে। তিনি বলেন, যেদিন নাকি আমি তাঁর থেকে দূরে চলে যাব, সেইদিন তাঁর শিল্পশক্তি লোপ পাবে। পিতা আমাকে দূরে সরিয়ে রাখতেই পারবেন না। আমি স্বেচ্ছায় নিজেকে সূর্যদেবতার পায়ে অর্পণ করে দিয়েছি। এই সূর্যমন্দিরের কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেলে এখানেই দেবদাসী রূপে থেকে যাব। পিতা জানেন আমি সূর্যদেবের কাছে সমর্পিতা, তাই আমাকে ফেরানোর চেষ্টা তিনি করবেন না। এমতাবস্থায় তিনি আজীবন আমারই সঙ্গে থেকে যাবেন। আমার শুধু তোমার অনুমতি চাই, শিল্পী। শুধু তোমার...’
সুবলের মন এখন ভিন্ন এক দোলাচলে বিচলিত, ‘এই আবেগপ্রবণ কিশোরী এখনও নিজের পিতার স্নেহজালে আবিষ্ট হয়ে আছে। কাল যদি যৌবনের ঢেউ এসে ওর হৃদয়কে আলোড়িত করে তোলে, তখন কী হবে? যখন ওর মনের শ্রাবণ-মেঘ কোনো সাগরের বুকে বৃষ্টি হয়ে ঝরার জন্য আতুর হয়ে উঠবে, তখন? ও নিতান্তই কিশোরী, তাই আবেগে বশে এমন কঠিন পণ করে বসেছে। ওকে বোঝাতে হবে, বোঝাতেই হবে!’
‘শিল্পা, তোমায় কিছু কথা বলি। জীবনের বহু রূপ, অনেক স্তর। কতটুকুই বা দেখেছ তুমি? জীবনের সঙ্গীতের কতটাই বা শুনেছ তুমি? যেদিন সেই সঙ্গীত তোমার কানে প্রবেশ করবে, তোমার হৃদয়কে স্পর্শ করবে, সেইদিনই জেগে উঠবে তোমার প্রাণ। তোমার করা প্রতিজ্ঞা সেইদিন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। জীবনকে না-জেনে, না-বুঝে এ ধরনের কোনো প্রতিজ্ঞা করে ফেলা মুর্খামির কাজ। ফিরে যাও। আমার কোনো প্রতিরূপের প্রয়োজন নেই। আমার প্রতিরূপ আমার মনে মণিকোঠায় সাজানো রয়েছে।’
পুবের রক্তিম আভায় নীল আকাশ যেভাবে ধীরে ধীরে আলোকরঞ্জিত হয়ে ওঠে, ঠিক সেভাবেই শিল্পার লাজুক হাসিতে ভরে উঠল তার মুখ। ফুটে উঠল এক অনির্বচনীয় মাধুর্য।
‘আমি জানি শিল্পী, তুমি একজন বিবাহিত পুরুষ। তাই তো আগেই বলেছি, আমার কামনার কেন্দ্র আমার পরিধির বাইরে...। কিন্তু আমাকে একটা কথা বলো, তুমি বা তোমার মতো এই বারোশো শিল্পীর মধ্যে অনেকেই তাদের পরিণীতা, প্রিয়তমাদের ছেড়ে এখানে কেন এসেছে? তাছাড়া, যারা অবিবাহিত, তাদের কামনার ফুল কি শুকিয়ে গিয়েছে? এই বারোশো শিল্পী যখন নিজের নিজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে, তখন ওদের দেহ থেকে অনঙ্গ, আর মন থেকে বসন্ত বিদায় নেবে। তোমার কিংবা ওদের এই ত্যাগে আর উৎসর্গে কি আমার মতো একজন কলিঙ্গ-কন্যার এইটুকু ভাগ থাকতে পারে না? একজন মেয়ে বলেই কি আমার কোনো কর্তব্য নেই? কোনো অধিকার নেই?’
সুবল আত্মবিস্মৃত হয়ে গেল। ভুলে গেল তার নিজের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, কর্তব্য, পণ-প্রতিজ্ঞা সবকিছু। চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হতে লাগল সমগ্র চরাচর। চতুর্দিকে ফুটে উঠতে লাগল শুধু শিল্পারই মুখ। শিল্পা...শিল্পা...শিল্পা...শিল্পা...। বিভিন্ন নৃত্য-মুদ্রায় ও ভঙ্গিমায় শুধুই শিল্পা।
‘শিল্পা, তোমাকে জন্ম দিয়ে এই উৎকল ধন্য হয়েছে। তোমার রূপ, গুণ এবং মহান চিন্তাধারার কথা সাধারণ বাক্যে প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। যদি সুবল মহারানার হাতের ছেনি তোমার এই রূপের এক কণাও পাথরের বুকে খোদাই করতে পারে, তাহলে জানবে সুবল মহারানা নিজেই ধন্য হবে। তোমার এই সুন্দর দেহের ললিত ভঙ্গিমা, কোমল ভাবমুদ্রা যদি তুমি নিজে দেখতে পেতে, তাহলে হয়তো তুমি অনুভব করতে পারতে যে তুমি কী বা তুমি কে? আমি আমার মানসী বিনোদিনীর পাশাপাশি প্রত্যক্ষ শিল্পাকেও এই পাষাণে ঢেলে দিতে চেষ্টা করব।’
এরপর থেকে সুবল মহারানার কল্পনা মনে বিনোদিনী আর চোখে শিল্পাকে রেখে পাষাণকে নিত্য নতুন রূপ দিতে লাগল। তার মনের অনুরাগ এবং প্রেম তার হাতের ছেনি দিয়ে জীবন্ত করে তুলতে লাগল পাষাণকে। পাথরের বুকে ছেনির আঘাতে সঙ্গীত জন্ম নিতে লাগল ছন...ছন...ছন...ছন...ছন...ছন...।
মহারাজ নৃসিংহ দেবের শাসনে শুধু নৃত্য-গীতই নয়, সাহিত্যও চরম উৎকর্ষতা লাভ করেছিল। কাব্য, ব্যাকরণ, দর্শন, বিজ্ঞান, অলঙ্কার-কোষ, জ্যোতিষ শাস্ত্র, স্মৃতি, আয়ুর্বেদ এবং যুদ্ধবিদ্যা ইত্যাদি নানান বিষয়ের উৎকৃষ্ট সব গ্রন্থে ভরে উঠেছিল উৎকল-সাহিত্যের ভাণ্ডার।
নির্মাণপর্বেই কোণার্কের খ্যাতি দূর দেশে পৌঁছে গেল। দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ীরা উৎকলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। শুধু শিল্প এবং সাহিত্যেই নয়, কৃষি ও বাণিজ্যেও নিরন্তর প্রগতি হয়ে চলেছিল। লোকমুখে তখন একটাই কথা—উৎকলের মাটি স্বর্ণগর্ভা; যেখানেই খুঁড়বে, সেখানেই পাবে হিরে, নীলা, মণি-মাণিক্য। আর সত্যি বলতে কী, এ শুধু কথার কথা ছিল না। হিরের ব্যবসায় উৎকলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দূর-দূরান্তে। সম্বলপুরের খনি থেকে এত হিরে উঠত যে, হয়তো এক-একবারেই তাতে গাঁথা হয়ে যেত তিন-সাড়েতিন ভরির হার। বহু স্থানে লৌহ আকরিকের খনির সন্ধান মিলল। ভুবনেশ্বরে আরম্ভ হল লৌহ-ধাতুকর্ম। পাটবস্ত্র, সৈন্ধব লবণ, কার্পাস, এলাচ–লবঙ্গ ইত্যাদি মশলাদ্রব্য, সুপারি, পিতলের তৈজসপত্র এবং উৎকলীয় হস্তির চাহিদা দেশ-বিদেশে বেড়েই চলেছিল। সমুদ্রপথে উৎকলের হাতি বিদেশে পাঠানো হতো। সিংহল, স্বর্ণদ্বীপ, জাভা, ব্রহ্মদেশ, চিন থেকে ব্যবসায়ীরা উৎকলে এসে ব্যবসা করতে শুরু করল।
উৎকলের শিল্প এবং ভাস্কর্যের আদরও দিনে দিনে বাড়ছিল। বিদেশিরা সোনার দামে উৎকলের শিল্পীদের শিল্পকর্ম কিনছিল। বিদেশি অতিথিরা উৎকলে এলে আতিথেয়তা দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতেন। রাজনৈতিক সম্বন্ধকে সুদৃঢ় করে তোলার জন্য উপহারের আদান-প্রদান ক্রমশ বেড়ে চলেছিল উৎকলে। নৃসিংহ দেব নিজেই বেশ কয়েকজন রাজাকে শ্বেত হস্তী উপহার দিয়েছিলেন। আর ওদিকে সুবলের সাহায্যে বিশ্বমৈত্রীকে শিলাবক্ষে অমর করে তুলছিলেন বিশু মহারানা। তিনি সুবলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন—যেন কিছু চিত্রে বিদেশি অতিথিদের দ্বারা উৎকলের উপহার প্রাপ্তির ঘটনাও দর্শিত হয়। বেশ কয়েকটি পটে রাজার উপহার-প্রাপ্তির ঘটনাও চিত্রিত হল।
কিন্তু বিশু মহারানা ওইসব চিত্রে উৎকলের রাজার দ্বারা বিদেশিদের শ্বেত-হস্তী উপহার দানের দৃশ্য চিত্রিত করালেন না। ব্যাপারটা শিবেই সান্তারার দৃষ্টি এড়াল না। তিনি মহারাজের সামনেই বিশু মহারানাকে এই নিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘বিশু মহারানা, আপনি উত্তর দিচ্ছেন না কেন? মহারাজ দ্বারা প্রদত্ত উপহারের দৃশ্য কেন চিত্রিত করা হল না?’
বিশু মহারানা গম্ভীরভাবে বললেন, ‘ক্ষমা করবেন, মন্ত্রীমশাই। এটা করা উচিত হবে না।’
‘কিন্তু কেন? কী এর কারণ?’ শিবেই সান্তারার কণ্ঠে ক্ষোভ স্পষ্ট। তাঁর মনে হল, বিশু মহারানা যেন তাঁর কথা শুনতেই পাচ্ছেন না।
‘ব্যক্তি কার থেকে কী উপহার পাচ্ছে, তা হৃদয়ে গাঁথা থাকার কথা, আঁকা থাকার কথা, শিলায় খোদিত হওয়ার যোগ্য। কিন্তু সে কাকে, কী দান করছে, তা বিজ্ঞাপনের বিষয় হতে পারে না, মাননীয়। গ্রহীতা যদি দাতাকে স্মরণ করে, তবেই গ্রহীতা এবং দাতা উভয়ের মাহাত্ম্য থাকে, কিন্তু দান করে তা ভুলে গেলেই দাতার মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়। উৎকল-নরেশ কর্তৃক উপহার রূপে শ্বেত হস্তী প্রদান কোণার্কের বুকে চিত্রিত করলে তা হবে উৎকলের অতিথিপরায়ণতার অপমান। সবিনয় নিবেদন করছি, এই কাজ উৎকলের কোনো শিল্পীকে করতে বাধ্য করবেন না,’ এবারে উত্তরটা দিল সুবল মহারানা।
এই উত্তর শুনে নৃসিংহ দেব অভিভূত হয়ে গেলেন, ‘ধন্য তুমি শিল্পী, ধন্য! তোমার যথাযোগ্য সম্মান করতে পারিনি আমি।’
‘মহারাজের স্নেহই আমার সম্মান,’ সুবল মহারানার কণ্ঠে বিনয় প্রকাশ পেল।
‘এ তোমার মনের ঔদার্য, শিল্পী। শিল্পীর মন আকাশের মতো বিরাট না-হলে কোণার্কের দৃশ্য মহাকালের আঁচড় সহ্য করে যুগ-যুগান্ত ধরে কীভাবে তার অস্তিত্ব বজায় রাখবে? কিন্তু আমার মনে অন্য একটা প্রশ্ন আছে—।’
‘কী প্রশ্ন, মহারাজ?’
‘কোনো চিত্রেই শিল্প উৎকীর্ণকারী শিল্পীকে দেখতে পাচ্ছি না। ইতিহাস কোণার্ক-নির্মাতা রূপে নৃসিংহ দেবকে স্মরণে রাখবে, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তো শিল্পীর নাম থাকাটাও দরকার? এবং সেই পাতার ছবিটাও কিন্তু শিল্পীই আঁকবে। একদিন–না–একদিন এই পৃথিবীর বুক থেকে বারোশো শিল্পীর নাম মুছে যাবে। আমি জানি, অতজনের নাম ও ছবি এঁকে বা লিখে যাওয়াও সম্ভব নয়। তাই বলছি, তোমার এবং বিশু মহারানার কীর্তির ছাপ এখানে রেখে যাও। এ কোনো রাজ-আজ্ঞা নয়। এ হল উৎকলের ইচ্ছা। এ নৃসিংহ দেবের ব্যক্তিগত অনুরোধ!’
‘রাজার অনুরোধও তাঁর আজ্ঞাই হয়, মহারাজ। কিন্তু এই আদেশ পালন করা অসম্ভব। এ ধরনের কাজের অর্থ উৎকলের সংস্কৃতির অপমান,’ রাজাকে দেওয়া প্রত্যুত্তরে এবারে সুবলের স্বর যথেষ্ট দৃঢ়।
‘সংস্কৃতির অপমান? তা কীভাবে সম্ভব? এ তো শিল্পীর সম্মান! গুণীকে উচিত সম্মান দেওয়া সংস্কৃতির অপমান হতে পারে না।’
‘শিল্পীর কুলগৌরব এ ধরনের প্রথাকে আজ্ঞা দেয় না, মহারাজ। জগন্নাথ মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ইন্দ্রদুম্ন্য মহারানা মহাপ্রভুর কাছে বর চেয়ে বলেছিলেন—হে প্রভু, আমার বংশ যেন আমার সঙ্গেই সমাপ্ত হয়ে যায়, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই দাবি না-করতে পারে, আমার পিতা-পিতামহ-প্রপিতামহ এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সেই একই যুক্তিতে কোনো কোণার্ক-শিল্পীই চাইবে না যে, শিলাখণ্ডের কোথাও তার নাম অঙ্কিত হোক। কেউ চাইবে না যে, ভবিষ্যতে কেউ এই দাবি করুক যে তার পিতা–পিতামহ কিংবা পূর্বপুরুষের কেউ এই মন্দিরের নির্মাণকল্পে নিজের শিল্পশ্রম দান করেছিলেন।
এ হল উৎকলের শিল্পীর শিল্প, তাদের গৌরব। নাম উৎকীর্ণ হলে এই গৌরব বংশ-গরিমায় আবদ্ধ থেকে যাবে। কিন্তু তা যদি নামহীন হয়, সেই গৌরব হয়ে উঠবে সমগ্র জাতির গৌরব। জাতি, রাজ্য সবার উপরে। তার নাম অখণ্ড থাকাই বাঞ্ছনীয়। তাই কোণার্কের ভাস্কর্যে কোথাও, কোনো শিল্পীর নামোল্লেখ করা হবে না, মহারাজ। কোণার্ক-শিল্পী আপনার এই আদেশ পালনে অক্ষম। অপারগ। আমাকে ক্ষমা করুন!’ কথা শেষ করে একপায়ে নতজানু হয়ে নমস্কার জানাল সুবল।
বিমুগ্ধ মহারাজ নৃসিংহ দেব, শিবেই সান্তারা এবং বিশু মহারানা সুবলকে দেখেই চললেন। ভাবে বিহ্বল মহারাজ আবেগ ভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আমি এখনও সঙ্কুচিত মনোবৃত্তি নিয়েই জীবনধারণ করছি। তাই তোমার, আমার করে চলেছিলাম। কিন্তু তুমি ঠিক বলেছ, শিল্পী। উৎকলের জাতীয় গৌরবের ক্ষেত্রে কোনো সঙ্কুচিত মনোভাবের স্থান নেই। এই স্থাপত্য সমগ্র উৎকলের সমস্ত শিল্পীর পরিচয় বহন করবে এবং শিল্পের উৎকর্ষে মানুষের চোখে যখন অপার বিস্ময় জাগবে, তখন তা-ই হবে শিল্পীদের সোনালি স্বাক্ষর। ইতিহাসের পাতায় নৃসিংহ দেবের নাম হয়তো থাকবে, কিন্তু জনতার হৃদয়ে থেকে যাবে উৎকলের শিল্পীদের কীর্তি। তুমি ধন্য, শিল্পী। এবং ধন্য এই উৎকলের মাটি, যে তোমায় জন্ম দিয়েছে!’
শিবেই সান্তারা ভাবছিলেন, ‘এত অল্প বয়সে কী উচ্চ এবং পরিপক্ক চিন্তাধারার অধিকারী এই শিল্পী।’ আর বিশু মহারানার মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল, ‘এ-ই কি সেই সুবল মহারানা যে বাস্তুশাস্ত্র অনুসারে এই মন্দিরের চিরস্থায়ীত্বের প্রশ্ন তুলে মন্দির নির্মাণে অস্বীকার করেছিল? আর আজ দেখো, যেদিকে তাকাবে, সেদিকেই সুবলের হাতের ছোঁওয়া। কোণার্কের প্রত্যেক ভাস্কর্যে, প্রতিটি মূর্তিতে, প্রতি চিত্রে সুবল মহারানার চমৎকার। সুবল সেইদিন সত্যই বলেছিল—এই বিশ্ব সুবল মহারানার ছেনির চমৎকার অবশ্যই দেখবে, মাননীয়। অবশ্যই দেখবে!’
দিনেরবেলায় সুবল, বিশু মহারানার সঙ্গে বিভিন্ন শিবিরে গিয়ে-গিয়ে অন্য শিল্পীদের সাহায্য করে, আর রাতে সে নিজের শিবিরে আপন মনে পাষাণ কোঁদে। প্রতি রাত্রির অন্ধকারে শিল্পা সুবলের প্রতিরূপ হয়ে আসে। সুবল মহারানা পাথরের বুকে অপ্সরার রূপ আঁকে। শিল্পাকে সামনে রেখে সে পাথরের পুঁথির প্রত্যেক পাতায় জীবনের বিবিধ কথা লেখে। নারীর বিভিন্ন রূপ, বেশবাস, কেশ-বিন্যাস, প্রসাধন, বেণীবন্ধন, রান্নাশালায় রাঁধা-বাড়া, দাম্পত্য, স্বামীর হাতে হাত রেখে জীবন-সংঘর্ষের পথে চলা নারী, শিশুকে স্তন্যদান, জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি জীবনের অনেক কিছুই চিত্রিত হল শিল্পীর ছেনিতে, শিল্পার সাহায্যে। কিন্তু আজ সুবল মহারানার মন বড় উদাস হয়ে আছে। তার মুখে হাসি নেই। সুবলের হাতের ছেনি আজ স্থির, মূক।
‘শিল্পী!’
‘বলো শিল্পা।’
‘আজ তোমার ছেনি স্তব্ধ কেন? কতক্ষণ ধরে একই মুদ্রায় বসে রয়েছি আমি! এবার কি অন্য কোনো ভঙ্গিমায় বসব? নাকি আজ আর তক্ষণের কাজ করবে না?’
‘আমার মন ভালো নেই শিল্পা। আজ অপরাহ্নে শিল্পী নীলকমল মহারানা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। তার হাতের অসমাপ্ত একটি মূর্তির দায়িত্ব এবার আমারই।’
‘কিন্তু এটাই যে জীবনের বিধান, শিল্পী। কারো জন্য কোনো কাজ থেমে থাকে না। কেউ–না–কেউ তাকে পূর্ণ করেই। কোণার্কও কারো জন্য থেমে থাকবে না, কেউ হারিয়ে গেলে অন্য কেউ এসে তার স্থান পূরণ করে দেবে।’
‘হ্যাঁ, কোণার্ক অবশ্যই পূর্ণ হবে! নীলকমল মহারানার কাজ সম্পূর্ণ করবে সুবল মহারানা, সুবল মহারানার কাজ অন্য কেউ সম্পূর্ণ করে দেবে। কোণার্ক পূর্ণ হবেই! অসম্পূর্ণ রয়ে গেলে কেবল নীলকমল মহারানার স্বপ্ন, তার কামনা, মনোবাঞ্ছা, আশা-আকাঙ্ক্ষা। আজ যদি নীলকমল মহারানার অকালমৃত্যু না-হতো, তবে সে ফিরে গিয়ে বিয়ে-থা করে সংসারী হতো। তার বাগদত্তার কাছে এখনও সংবাদ পৌঁছায়নি। সে হয়তো আজকের সন্ধ্যাপ্রদীপটিও ও নীলকমল মহারানার নাম করেই জ্বেলেছে।’
‘শুনেছি, তাঁর রাজরোগ হয়েছিল। রোগের লক্ষণ ফুটে উঠতেও বিলম্ব হয়েছে। এমনও হতে পারে যে, নীলকমল মহারানা নিজের রোগের কথা জেনেও তা কাউকে বলেননি। হয়তো বা লুকিয়ে রেখেছিলেন। চিকিৎসা সময়মতো হয়নি। রাজবৈদ্য আপ্রাণ চেষ্টা করেও তাকে সারিয়ে তুলতে পারেননি বলে দুঃখ প্রকাশ করছিলেন।’
‘জানো শিল্পা, এই যক্ষ্মা রোগটা যেন আমাদের, মানে শিল্পীদের কেনা-রোগ। পাথর কাটতে-কাটতে আমরা যখন শ্বাস নিই, তখন প্রচুর পরিমাণে ধুলো আমাদের বুক ভরিয়ে দেয়, নষ্ট করে দেয়। নীলকমল মহারানা সম্ভবত ভয়েই তার রোগের কথা পাঁচকান করেনি। সে ভেবেছিল, একবার তার যক্ষ্মার কথা কারো কানে গেলেই তাকে এখান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কোণার্ক-মন্দিরের কাজ সম্পূর্ণ না-হওয়া অবধি সে ফিরতে চায়নি।’
‘ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, ওঁর আত্মার সদ্গতি হোক!’
‘অকালে নিহত কোনো মানুষের অতৃপ্ত আত্মার সদ্গতি হয় না, শিল্পা। নীলকমল মহারানার আত্মা, তার অতৃপ্ত কামনার বশীভূত হয়ে মোক্ষ পাবে না। অনন্তকাল ধরে তার অশরীরী আত্মা ঘুরে মরবে। আজ নীলকমল মহারানার ক্ষেত্রে হচ্ছে, কাল অন্য কারো, পরদিন আবার অন্য কেউ। আমরা কেউ জানি না যে, আজ থেকে বারো বছর পরে কতজন শিল্পী আদতে নিজের ঘরে ফিরতে পারবে? এমনও হতে পারে আমারও ওই একই দশা হল—তখন তুমি আমার আত্মার সদ্গতির জন্যেও একটু প্রার্থনা করে দিও, কেমন?’
‘এমন কথা বলতে নেই শিল্পী। নীলকমল মহারানা একজন দক্ষ শিল্পী ছিলেন। তোমার হাতে পূর্ণ কোণার্ক দেখলে ওঁর আত্মার শান্তি হবে।’
‘না শিল্পা, শান্তি নয়, কষ্ট হবে। কষ্ট!’
‘এ কেমন কথা? নীলকমল মহারানাও তো কোণার্ককে পূর্ণ অবস্থায় দেখতে চেয়েছিলেন, সেই কৃতিত্বের সহভাগী হতে চেয়েছিলেন। তার আত্মা কষ্ট কেন পাবে?’
‘কারণ নীলকমল মহারানার বাসনা কেবল কোণার্ক সম্পূর্ণ হওয়া অবধি সীমিত ছিল না। সে বারো বছর ধরে ব্রহ্মচর্য পালনের ব্রত রেখেছিল ঠিকই, কিন্তু সে তো কোনো সন্ন্যাসী ছিল না। তার কামনা-বাসনাগুলো দমিত হয়ে ছিল মাত্র। সে নিজের এই অতৃপ্তির কারণ কাকে মানবে জানো? এই কোণার্ককে...। তার অতৃপ্ত আত্মা কোণার্ককে যে দৃষ্টিতে দেখবে তা কোণার্কের পক্ষে অশুভই হবে।
নীলকমল এবং তার মতো এমন অনেক অমোক্ষ আত্মাদের অশুভ দৃষ্টির ফলে কোণার্ক ধ্বংস হয়ে যাবে একদিন। এই অতৃপ্ত আত্মারা কোণার্ক নির্মাণের দেবার্চনা এবং ধর্মকার্যে পদে–পদে বাধা উৎপন্ন করবে। এইসব অতৃপ্ত আত্মাদের পরিতোষ করা আমাদেরই দায়িত্ব। এ কোণার্ক-শিল্পীর কর্তব্য। আজ অবধি শুধু তোমাকেই শিল্প-শাস্ত্রসম্মত প্রত্যেক নৃত্য-মুদ্রার প্রতিরূপ করে মূর্তি গড়েছি আমি, কিন্তু এবার অতৃপ্ত আত্মাদের অশুভ দৃষ্টি থেকে কোণার্ককে রক্ষা করতে আরও কিছু ভাস্কর্য কোণার্কের দেহে উৎকীর্ণ করতে হবে আমাকে।’
‘আমি সেই কাজে কীভাবে সাহায্য করতে পারি? বলো শিল্পী, কোন ভঙ্গিমায়, কোন মুদ্রায় দেখতে চাও আমাকে? আদেশ দাও, আমি প্রস্তুত!’
‘না শিল্পা!’ সুবলের স্বর কুণ্ঠিত মনে হল। ‘সেইসব ভাস্কর্যের জন্য আমি তোমাকে কোনো নির্দেশ দিতে পারব না। প্রত্যেক চিত্র এবং প্রতিটি মূর্তির প্রতিরূপ পাওয়া যায় না। কিছু ছবি শিল্পী নিজের কল্পনার চোখে দেখেই আঁকে। তবে তোমাকে একটাই অনুরোধ, এই ভাস্কর্য নির্মাণের সময়েও তুমি আমার চোখের সামনেই থেকো। আমার প্রেরণা হয়ে যদি তুমি আমার সামনেই থাকো, তাহলে আমার কল্পনা আধার পাবে। তোমার চোখ, ঠোঁট, মুখ, সুগঠিত দেহ, এবং তোমার রূপ-লাবণ্য আমার কল্পনার নায়িকার দেহেও ঢেলে দিতে চাই।’
‘কিন্তু চিত্রগুলো কী নিয়ে আঁকবে সে কথা তো বললে না?’
শিল্পীর কণ্ঠ বিভোর হয়ে উঠল, ‘নর ও নারীর মধুর মিলনের যথার্থ চিত্র। যেসব মিথুনমূর্তি দেখে ভূত-প্রেত-পিশাচেরা আনন্দ পাবে। শিল্পীদের অতৃপ্ত আত্মারা মৈথুনদৃশ্য দেখে তৃপ্ত হবে। নীলকমল মহারানার অতৃপ্ত আত্মাও সন্তুষ্ট হবে।’
‘কিন্তু শিল্পী, এই ধরনের দৃশ্য মন্দিরের ভাস্কর্যে অঙ্কিত হলে কলিঙ্গের শিল্পীদের যে বড় মানহানি হবে! অপমান হবে মহারাজেরও। ভবিষ্যতের দর্শক ভাববে, কলিঙ্গের শিল্পীরা পাষাণের বুকে নিজেদের কামনার ছবি খোদাই করে গিয়েছে। আবার তারা এটাও ভাবতে পারে যে, বিকৃত কাম প্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ করার জন্যই কোণার্কের নির্মাণ করা হয়েছিল। আর এই ভাবনাটাও খুব ভুল কিছু হবে কি? কোণার্ক নির্মিত হয়ে যাওয়ার পরে তা কিন্তু একা কলিঙ্গের সম্পত্তি নয়, সারা বিশ্বের সম্পদ হয়ে উঠবে কোণার্ক। এই ধরনের ভাস্কর্য কোণার্কের নামে, কোণার্ক-শিল্পীদের নামে, কোণার্ক-নির্মাতার নামে কলঙ্ক হয়ে দাঁড়াবে।’
সুবল অকুণ্ঠ ভাবেই বলে চলল, ‘যে উৎকলভূমির এক কিশোরী কোণার্ক এবং কোণার্ক-শিল্পীকে অমর করে তুলতে, নিন্দা ও অপবাদের চিন্তাকে বিসর্জন দিয়ে, নিজের পিতার অজ্ঞাতসারে, নির্জন-গহন রাতে সুবল মহারানার সামনে শিল্পের প্রতিরূপ হতে রাজি হয়, সেই উৎকলভূমির শিল্প কখনোই কলঙ্কিত হতে পারে না। মন্দিরের ভিত্তিতে এবং অন্য উচিত স্থানে কামকলারত মূর্তির স্থান দেওয়া একেবারে শাস্ত্রসম্মত কাজ।
শিল্পশাস্ত্রের মতে—দেবতা মন্দিরে দেবার্চন, ধ্যান এবং ধর্মচর্চার দৃশ্য দেখে হর্ষিত হন; গন্ধর্ব নৃত্য তথা বাদ্যের চিত্র দেখে প্রসন্ন বোধ করেন; কিন্নরগণ নর-পশু, অর্ধনর ও অর্ধেক পশু-পক্ষীর মূর্তি এবং চিত্র দেখে সুখ লাভ করেন; অসুরেরা ভয়ংকর মূর্তি দেখে আনন্দ পায়; যক্ষ খুশি হয় নিজের প্রতিরূপ দেখে; মানুষ নিজের বিগত ইতিহাসের সুন্দর, সমৃদ্ধ সময়ের দৃশ্য দেখে প্রসন্ন হয়ে ওঠে; অশ্ব এবং হস্তী আনন্দ পায় অশ্ববন্ধ, গজবন্ধের চিত্রে এবং পাখির পুলক জাগে পক্ষীবন্ধের দৃশ্যে; কিন্তু ভূত-প্রেত-পিশাচ মৈথুন দৃশ্য, কামমূর্তি দেখে তৃপ্ত হয়। ভূত-প্রেত-পিশাচ মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না বলে তাদের সন্তুষ্টির জন্য মন্দিরের বাইরের অংশে কামকেলিরত মূর্তি তথা মৈথুনদৃশ্য অঙ্কনের বিধান রয়েছে।
ভূত-প্রেত-পিশাচদের সন্তুষ্ট করতে না-পারলে মন্দিরে অতৃপ্ত আত্মাদের অশুভ দৃষ্টি পড়বে। তাই মন্দিরের বাহ্য-ভিত্তিতে এমন কিছু মূর্তি স্থাপিত করতে হবে যাতে সমস্ত জীবধারীদের পাশাপাশি ভূত-প্রেত-পিশাচরাও সন্তুষ্ট হয়। বৃহৎ সংহিতাতেও বলা আছে যে, সবৎসা গাভী, নকুল, পাখি, শ্রীবৃক্ষ, স্বস্তিক, পূর্ণকুম্ভ, পত্রাবলী, মীন-যুগল, শঙ্খ এবং মিথুন-দৃশ্য এই সবই মঙ্গলসূচক। সৌন্দর্যের তৃষ্ণা প্রত্যেক আত্মার মধ্যেই থাকে, শিল্পা। আর কোণার্ক তো স্বর্গ–মর্ত্য–পাতালের সৌন্দর্য আর আনন্দের সর্বশ্রেষ্ঠ পীঠস্থল হয়ে উঠতে চলেছে।’
‘শিল্পী, মন্দির নির্মাণের গূঢ় তত্ত্ব বা তথ্য কোনওটাই আমার জানা নেই। কিন্তু এটুকু জানি যে, মন্দির হল সাধনার কেন্দ্র। সাধনার স্থলে এমন দৃশ্যাবলী সাধকের মনকে চঞ্চল করে তুলবে।’
‘মন্দির সাধনার নয়, ভক্তির কেন্দ্রস্থল, শিল্পা। দুর্গম গিরি-কন্দর থেকে আরম্ভ করে নির্জন শ্মশানে...যেকোনো স্থানেই মগ্ন সাধক নিজের সাধনা করতে পারে। তার মগ্ন ভাবের জন্য কোনো অশরীরী আত্মা তার মনকে বিচলিত করতে পারে না, তাকে কষ্টও দিতে পারে না। আর সাধনার একটি ভাগে ত্রিপুরসুন্দরীর কামকলার আরাধনাও পড়ে। মন্দিরের ভিত্তিতে, প্রাচীরে যৌনমূর্তি এবং কামদৃশ্যগুলি আসলে এই কামকলা বিদ্যারই উৎকীর্ণ রূপ। মন্দিরে কামকলার পূজা-বিধানও রয়েছে।’
‘কিন্তু সে তো তান্ত্রিক-উপাসনার অঙ্গ?’
‘তন্ত্র বিনা কোনো ধরনের উপাসনাই সফল হতে পারে না, শিল্পা। তন্ত্র কী? তন্ত্র আসলে একটি পদ্ধতির নাম, এবং অতি অবশ্যই প্রত্যেক উপাসনারই নিজস্ব একটি তন্ত্র বা পদ্ধতি বিদ্যমান। এবং কামকলার উপাসনা প্রত্যেক তন্ত্রের একটি অত্যাবশ্যকীয় ভাগ। তাছাড়াও এসবের পাশাপাশি মন্দিরের বাইরের দিকে এই ধরনের যৌন-দৃশ্য উপাসকদের পরীক্ষার বস্তুও বটে। তাঁদের ভক্তি, নিষ্ঠা, মনোভাব, ইন্দ্রিয় সংযম এসবই কামকেলির দৃশ্যের মাধ্যমে অতিসূক্ষ্মতার সঙ্গে বিচার করা যায়। ওইসব দৃশ্য দেখে যারই মনে সামান্যতম বিকার জন্মাবে, সে দেবতার কাছেই পৌঁছাতে পারবে না। যদিও বা পৌঁছায়, তাহলে পৌঁছাবে শুধুই তার স্থূল দেহ; তার মন তখনও কামনার অরণ্যে পথ হারিয়ে ফেলবে। আর যে উপাসক এই সব কিছু দেখেও অবিচলিত থাকবে, সে এগিয়ে যাবে ভক্তির পথে, মুক্তির মার্গে।’
‘আমার এত জ্ঞান নেই শিল্পী। তবে আমি চাই, তুমি যা কিছু গড়বে, তার মধ্যে আমার ছায়া থাকুক। আমি তোমার প্রত্যেক শিল্পরূপে নিজেকে দেখতে চাই। তোমার শিল্পের জন্য প্রতিরূপ হয়ে উঠতে আমি উন্মুখ হয়ে আছি।’
‘না শিল্পা, আমি আগেও বলেছি এবং এখনও বলছি, আমার এই কাজের জন্য কোনো ধরনের প্রতিরূপের প্রয়োজন নেই। এই ধরনের দৃশ্যের প্রতিরূপ শিল্পীর মনেই থাককে।’ কথা বলতে বলতেই সুবলের চোখের সামনে একটি অস্পষ্ট মুখের ছবি ফুটে উঠল। তার স্ত্রী বিনোদিনীর পদ্ম-মুখ। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আজ বিনোদিনীর চাঁদমুখখানি বার বার মনে পড়ছে তার। বড় ব্যাকুল লাগছে। বারংবার তার মন একটাই প্রশ্ন করছে আজ, ‘এই জন্মে কি আর বিনোদিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সম্ভব হবে? যদি এখানে থাকতে থাকতেই নীলকমল মহারানার মতো আমারও মৃত্যু হয়? তাহলে তো আমার আর বিনোদিনীর, দুজনের অতৃপ্ত আত্মাই চন্দ্রভাগার তটে, কোণার্কের আকাশে কেঁদে কেঁদে ফিরবে। অশরীরী অবস্থায় কি মিলন সম্ভব?’
সুবল অন্যমনস্ক হয়ে উঠেছে। আর অন্যমনস্ক অবস্থায় কোনো শিল্পীর পক্ষেই কাজ করা সম্ভব নয়। সে নিজেকে সংযত করল। ছেনি হাতুড়িকে তাদের কাজে ব্যস্ত করে তুলল সুবল। পাষাণখণ্ডে মূর্তির অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে লাগল। শিলাখণ্ডে সূক্ষ্ম অলঙ্কার এবং পরিধানে সজ্জিত নিজের প্রিয়তমার দেহ উৎকীর্ণ করতে করতে সুবল ডুবে গেল অনন্ত ঊর্মিল কল্পনার সাগরে। বয়ে চলল তার লহরে। তার শিল্প হয়ে উঠল একমাত্র সত্য, শিব এবং সুন্দর!
এখন শিল্পা প্রতিদিন আসে। সুবলের সামনে বসে। তবে প্রতিরূপ রূপে নয়। এমনিই। আর কোণার্কের চক্রে সুবল নিজের সূক্ষতম কারিগরি বিদ্যা দিয়ে জীবন-চক্র, কাল-চক্র, সৃষ্টি-চক্রের অদ্ভুত দৃশ্য আঁকতে থাকে।
রথের আকারে নির্মিত মুখশালার পীঠে দক্ষিণ এবং উত্তর দিকে রথ-চক্র তৈরি করার কথা ছিল। বড় দেউল বা প্রধান মন্দিরের দক্ষিণ ও উত্তরে চারটি করে, পূর্বে সিঁড়িতে ডানে-বামে দুটি-দুটি করে চক্র—যার ফলে শিল্পখচিত মন্দিরকে বিশাল রথের মতোই দেখায়। এবং সাতটি অশ্ব এই রথকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মুদ্রায় ব্যস্ত থাকবে।
সূর্য-রথের বারোটি চক্র, বছরের বারোটা মাসের প্রতীক। প্রত্যেক চক্রে আটটি করে কাঠি অষ্ট প্রহরের প্রতীক এবং সপ্তাশ্ব সপ্তাহের সাত দিনের প্রতীক। মন্দিরটিকে আসলে জীবন, কাল এবং সৃষ্টি-চক্রের অনন্তকাল অবধি প্রবাহমান হওয়ার প্রতীক হতে হবে।
সুবল ঠিক করল, দক্ষিণ দিকের চক্র শুক্লপক্ষের সংকেতবাহী হবে এবং সেখানে আধ্যাত্মিক জীবনের দৃশ্য উৎকীর্ণ করবে। বিষ্ণুর বিভিন্ন অবতার, গজলক্ষ্মী, অন্যান্য দেবী-দেবতা, গজারোহী এবং অশ্বারোহী, দেব-উপাসনার চিত্র দক্ষিণ পার্শ্বের চক্রের উপরে চিত্রিত হবে। উত্তর দিশার চক্রে রাত্রির স্পর্শ থাকবে। অন্ধকারে চলা জীবন-ব্যাপার সেই চক্রে উৎকীর্ণ করা হবে। দিন আর রাতের আলো-আঁধারের খেলাই তো জীবন। এটাই যে এই পৃথিবীর মূল রহস্য। তাই উত্তরের পার্শ্ব-চক্রে থাকবে অলস নর্তকী, নারীর কেশবিন্যাস, রমণীর প্রসাধনী এবং নারীর বিবিধ রূপ। এবং সবশেষে থাকবে সৃষ্টির রহস্য—ভোগশয্যা। নারী ও পুরুষের মিলনের দৃশ্য।
সূর্য আলোর উৎস। সূর্যই শক্তি তথা পৌরুষের আধার। সূর্যরশ্মি সত্যের উদ্ঘাটন করে। কোণার্ক-শিল্পীরাও সূর্যমন্দিরকে জীবনের পরম সত্য হিসেবে প্রতিপন্ন করতে দৃঢ়সংকল্প হয়ে কাজে নেমে পড়ল। শিলাগুলির প্রতি কণায় বসন্তের রোমাঞ্চ জেগে উঠল। মহাভারতে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, ‘পাষাণের হৃদয় থাকে না।’ তিনি ভুল বলেছিলেন। কোণার্কে পাষাণের বুকেও হৃদয় স্পন্দিত হয়ে উঠল। হৃদয়ের স্পন্দন যদি না-থেকে থাকে, তাহলে তা ছিল দুজনের—এক, শিল্পীর শিল্পার এবং দুই, সমকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী সুবল মহারানার।
সুবলের মুখমণ্ডল একটি স্বর্গীয় উজ্জ্বল আভায় প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে। নিজের শিল্পকে উৎকীর্ণ করার কাজে মগ্ন হয়ে আছে সে। শিল্পা স্থিরচিত্রের মতো বসে কিংবা দাঁড়িয়ে থেকে সুবলকে দেখে চলেছে, ‘কী অদ্ভুত! এই তরুণ শিল্পী এভাবে জীবনের চরম এবং পরম সত্যকে উৎকীর্ণ করার সময়েও কতটা নির্বিকার, কতখানি অবিচল এবং কত একনিষ্ঠ! নিজের শিল্পসাধনায় নিমগ্ন এই শিল্পী জিতেন্দ্রিয়। মহান!’
হঠাৎই একটি নীল দীপশিখা হাতে নিয়ে এক রমণী শিবিরে প্রবেশ করলেন। ‘ধন্য তুমি শিল্পী! ধন্য তোমার একনিষ্ঠ সাধনা! যদি তুমি বিরহকাতর ভাব নিয়ে বিকারগ্রস্ত মনে নিজের অবদমিত বাসনাকে ফুটিয়ে তুলতে, তাহলে মূর্তিগুলোর মধ্যে তোমার শিল্পের পরাকাষ্ঠা এভাবে উদ্ভাসিত হতে পারত না। তোমার ছেনি-হাতুড়ি তাহলে হয় বাচাল হয়ে উঠত, নয়তো মূক হয়ে যেত। জিতেন্দ্রিয় পীঠে তুমি চরমতম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ। কামনা–বাসনার আগুনে ঝলসে মৈথুন-মূর্তি গড়লে কোনও শিল্পীই তার মধ্যে এমন দিব্য ভাব আনতে পারবে না। মানব জীবনে যে নবরসের অস্তিত্বের কথা আছে, তাদের মধ্যে আদিরস প্রণয়কে উপেক্ষা করলে জীবন-চক্রেরই অবহেলা করা হয়, শিল্পী। প্রত্যেকটি রসকে দিব্য ভাবে ফুটিয়ে তুলে তুমি কোণার্ক-শিল্পী রূপে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিয়েছ।’
কথা শুরু হতেই শিল্পীর দৃষ্টি গিয়ে পড়েছিল বক্তার ওপরে। সুবলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বীর পরমার্দি দেবের বিধবা পত্নী চন্দ্রাদেবী। তাঁর হাতে ধরা আছে একটি প্রজ্জ্বলিত দীপ। ওই প্রদীপের আলোক নিয়েই চন্দ্রাদেবী যেন শিল্পীকে তার আগামী পথ দেখাতে এসেছেন। যে মাতৃভূমির হিতার্থে চন্দ্রাদেবীর স্বামী নিজেকে যুদ্ধভূমিতে উৎসর্গ করে দিয়েছেন, সেই মাতৃভূমির গৌরব নির্মীয়মাণ কোণার্ককে সম্পূর্ণ হতে দেখাই এখন তাঁর জীবনের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা। এমন নারী বরেণ্য।
সুবল মহারানা চন্দ্রাদেবীকে ভক্তিভরে প্রণাম জানাল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা কথা মনে পড়তে চমকে উঠল সে, ‘কী সর্বনাশ! এখন যে এখানে শিল্পাও উপস্থিত রয়েছে! চন্দ্রাদেবী ওকে দেখে ফেললে কী হবে? শিল্পার নামে তখন কুৎসা রটবে। আচ্ছা, চন্দ্রাদেবীর মতো একজন মহীয়সী নারী কি এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবেন?’
শিল্পার দিকে তাকাল সুবল। কিন্তু কোথায় শিল্পা? তার বসার স্থান তো শূন্য! স্বপ্ন ভেঙে গেলে যেভাবে মানুষ স্বপ্ন আর সত্যির অন্তর বুঝতে চেষ্টা করে, সেভাবেই নিজেকে বোঝানোর প্রয়াস করতে লাগল সুবল মহারানা। তবে কি শিল্পা সত্য নয়? কুহেলিকা? কল্পনামাত্র? নাহলে কোনো মানুষ কি এত দ্রুত চোখের সামনে থেকে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে? তাহলে কি সুবল যাকে শিল্পা বলে মনে করছিল, সে আসলে তার শিল্পীমনের ঘোর, যা সাকার হয়ে উঠে এসে তার কাজের প্রতিরূপ হতে চাইছিল? তবে কি তার কল্পনাশক্তি এত প্রবল, এত প্রগাঢ় যে, তা এইভাবে সাকার রূপ ধারণ করতে পারে? নাহ্, একথা সুবল কখনো ভাবতেও পারেনি। সুবল মনে মনে বলতে থাকে, ‘ওহ্, তাহলে শিল্পা সত্য নয়! কিন্তু তার কথাগুলো? সেগুলোও কি কল্পনা? নিজেরই নিজেকে বলা? না, না! এ হতে পারে না। শিল্পা শুধু কল্পনার ফসল হতেই পারে না! সে নৃত্যাচার্য সৌম্য শ্রীদত্ত দীক্ষিতের কন্যা। সে আছে! সে অবশ্যই আছে!’
সাময়িক ভাবে কোণার্কই যেন নৃসিংহ দেবের রাজধানীতে পরিণত হয়েছে। নৃসিংহ দেব অত্যন্ত সচেতন ভাবেই সীতাদেবীর থেকে দূরে-দূরে থাকেন, যাতে তাঁদের ব্রহ্মচর্য ব্রতের পালনে কোনো বিঘ্ন না-ঘটে। তিনি কখনওই ওই কিশোরীর কাছে সত্যভ্রষ্ট হতে চান না। ওদিকে রাজ্যের সীমান্তে শত্রুদের হুঙ্কার, আর এদিকে সূর্য মন্দিরের মহানির্মাণ। সময় নিজের গতিতে বয়ে চলেছে।
নৃসিংহ দেব আজ আবার ছদ্মবেশ ধারণ করে রাজ্য ভ্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আজ তিনি মহাদণ্ডপাশের বেশবাস ধারণ করেছেন। একটি সবল অশ্বের পিঠে চড়ে গ্রামীণ অঞ্চল ভ্রমণের উদ্দেশে বেরিয়েছেন। ঘোড়াটি নিজের চালে এগিয়ে চলেছে। বেশ খানিকটা পথ পেরিয়ে এসে সামনে একটা আমবাগান পড়ল। বাগানের দুই পাশে দুটি গ্রাম। বাগানের কাছে একটা সুন্দর জলাশয়ও আছে। পুষ্করিণীর জল পদ্মবনে ঢাকা পড়ে গিয়েছে।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি নেমেছে, পদ্মকুঁড়ি প্রস্ফুটিত হতে ঢের দেরি। তবুও পদ্মের সৌরভকণার এমনই গুণ যে পদ্মগন্ধে ম’ম’ করছে বাতাবরণ। চন্দ্রোদয় আজ বিলম্বিত হয়েছে। মলিন জ্যোৎস্নায় পদ্মের না-ফোটা কুঁড়ির ওপর টুপটাপ ঝরে পড়ছে শিশিরের বিন্দু।
এখানে একটু বিশ্রাম নিতে দাঁড়িয়ে পড়লেন নৃসিংহ দেব। বুক ভরে টেনে নিলেন পদ্মফুলের সৌরভ। তাঁর মনে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, ‘এই পুষ্করিণীর উত্তর দিক হয়ে যে পথ চলে গিয়েছে, তা ধরেই এগোব নাকি পাশের গ্রামে যাব? আরেকটা কাজও করা চলে অবশ্য—পুষ্করিণীর অপর পাড়ের দিকে যে গ্রাম পড়ছে সেদিকে গেলেও হয়।’
এমন সময় কারো দ্রুত পায়ের শব্দ মহারাজের কানে এল। পুকুরের উল্টোদিকের পাড়ে একটি নারীমূর্তিকে পুকুরের দিকে প্রচণ্ড বেগে ছুটে আসতে দেখলেন নৃসিংহ দেব। মহারাজ দেখলেন, ছায়ামূর্তিটি জলতরঙ্গের মতো ভেসে আসছে।
নৃসিংহ দেবের বুঝতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব হল না যে, ছায়ামূর্তিটি পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে জলে ডুবে আত্মহত্যা করতে চলেছে। নিজের দুই গোড়ালি দিয়ে তিনি ঘোড়ার পেটের দুদিকে আঘাত করতেই তাঁর ঘোড়া পক্ষীরাজের মতো উড়ে চলল।
মুহূর্তে পুকুরের অপর পাড়ে পৌঁছে গেলেন মহারাজ। তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝুঁকে নিজের বলিষ্ঠ হাতে জলে ঝাঁপ দিতে উদ্যত সেই নারীর কটিদেশ ধরে তাকে অশ্বপিঠে তুলে নিলেন। মহারাজ বুঝলেন যে, আঘাত এবং ঘটনার আকস্মিকতায় ওই নারী সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছেন। অশ্ব আপন বেগে ছুটে চলল।
আমবাগান, পুকুর কিংবা গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে চলে এসেছে নৃসিংহ দেবের ঘোড়া। মহারাজের দৃঢ় বাহুবন্ধনে ধরে থাকা রমণীর দেহ শিথিল হয়ে এসেছে। সামনেই একটি ভগ্নপ্রায় মন্দির দেখতে পেলেন রাজা। মন্দিরের পিছনেই শুরু হয়েছে গহন জঙ্গল। নৃসিংহ দেব নিজের বাহনটিকে থামালেন। মন্দিরের প্রাঙ্গণে ভূমি সমতল। ভাঙা পাঁচিল দেখেই বোঝা যায় যে এটাই একটা সময়ে প্রাঙ্গণের সীমা নির্ধারণ করত। প্রাচীরের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কিছু গৃহের ভগ্নাবশেষ। একপাশে একটি কূপ। কুয়োটা হয়তো কয়েক যুগ ধরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। নৃসিংহ দেব সমস্ত পর্যবেক্ষণ করে অনুমান করলেন—একটা সময়ে এখানে ক্ষুদ্র জনপদের মতো কিছু তো ছিল বটেই।
ওই নারীকে নিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে সাবধানে নামতে বেশ অসুবিধাই হল মহারাজের। তবুও তিনি খুব সাবধানে ওই রমণীকে নিয়ে নেমে তাকে যত্ন সহকারে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। ভগ্ন গৃহগুলোর মধ্যে থেকে তিনি বন্য লতা ছিঁড়ে আনলেন। তারপর নিজের উত্তরীয় খুলে তার সঙ্গে ওই লতাগুলিকে একের পর এক বেঁধে উত্তরীয়টিকে কুয়োর ভিতরে নামিয়ে দিলেন। সৌভাগ্য এই যে, কুয়োর জলস্তর বিশেষ নামেনি। জলস্তরের সংস্পর্শে আসতেই উত্তরীয় জলে ভিজে উঠল। মহারাজ ভেজা বস্ত্র থেকে জল নিংড়ে ফেললেন জ্ঞান হারানো নারীর মুখেচোখে। তারপর ভেজা উত্তরীয়টিকে নিয়ে তার মাথার কাছে চামরের মতো দোলাতে লাগলেন। অন্ধকারে নিজের পথ খুঁজে নিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ল সেই নারীর মুখে। রাজা বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেলেন, ‘এত চেনা লাগছে কেন এই মুখ? কোথায় যেন দেখেছি? কবে? কোথায়...’
কোমল ননীর মতো মৃদুল করতলে চোখ গেল মহারাজের। সেখানে উল্কি আঁকা রয়েছে। যুগলে রাধা এবং কৃষ্ণ। তার নীচে লেখা আছে ‘রাধাকৃষ্ণ’। উৎকল রাজ্যে উল্কি আঁকার প্রচলন আছে। উল্কি আঁকার প্রক্রিয়া বেশ কষ্টের। হঠাৎই নৃসিংহ দেবের মনে হল, কোন নিষ্ঠুর মানুষ এত নির্দয় ভাবে ননীর মতো এমন কোমল হাতে ছুঁচ ফুটিয়ে–ফুটিয়ে উল্কি এঁকেছে কে জানে!
যুবতীর চৈতন্য ফিরে আসতে লাগল। ধীরে ধীরে সে উঠে বসল। এইভাবে নির্জন স্থানে নিজেকে একজন অজ্ঞাতপরিচয় পুরুষের পাশে বসে থাকতে দেখে সে-ও অবাক হয়ে গেল। তবে সে দ্রুত বুঝে গেল যে কী ঘটেছে। নৃসিংহ দেব মৌন ভঙ্গ করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে আপনি?’
‘আপনি? আপনি কে? আর আপনি আমাকে বাঁচালেন কেন?’
‘আত্মহত্যা যে ঘোর পাপ!’
‘এই পাপীনির সামনে আর যে কোনো পথ খোলা নেই। কেন রক্ষা করলেন আমাকে? কেন? কেন? কেন?’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ল যুবতী।
‘কী এমন পাপ করেছেন আপনি যে আত্মহত্যা ছাড়া তার আর অন্য কোনো প্রায়শ্চিত্ত নেই?’
‘আমি কোনো পাপ করিনি, কিন্তু আমি পাপের ভাগী হয়েছি। আমার স্বামী কোণার্ক মন্দির নির্মাণ করতে গিয়েছেন। সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। আর সেটাই আমার পাপ!’
মহারাজের মাথায় বিদ্যুতের মতো একটা নাম খেলে গেল—নীলকমল মহারানা। তিনি বললেন, ‘নীলকমল মহারানা? কিন্তু তিনি যে অবিবাহিত ছিলেন? হ্যাঁ, এই কথা সত্যি যে তাঁর বিবাহের ঠিক হয়েছিল। বিবাহ সম্পন্ন হয়নি। তবে কি আপনি তাঁর বাগদত্তা ছিলেন?’
‘নীলকমল মহারানা? না, নীলকমল মহারানার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’
‘তাহলে আস্থা রাখুন, আপনার স্বামী জীবিতই আছেন।’
‘কিন্তু এক ব্যক্তি কোণার্ক থেকে ঘুরে এসে আমার শাশুড়ি-মাকে বলেছে যে, তাঁর মৃত্যু হয়েছে।’
‘বললাম তো, যদি আপনার স্বামীর নাম নীলকমল মহারানা না হয়, তাহলে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।’
‘মহাশয়, আপনি কে তা বললেন না তো? আপনি কি আমার স্বামীর সন্ধান দিতে পারবেন? আপনি কি তাঁর কুশল সংবাদ জানেন?’ যুবতীর কণ্ঠে উৎকণ্ঠা, বিস্ময়, পুলক আর করুণার মিশ্রিত রাগিণী ঝঙ্কার দিয়ে
উঠল।
‘আমি কোণার্কের মহাদণ্ডপাশ। নগরের শান্তিশৃঙ্খলা অব্যাহত রাখার দায়িত্ব আমারই উপরে অর্পিত হয়েছে। আমি মহারাজ নৃসিংহ দেবের সেবক। এবং মহারাজ স্বয়ং উৎকল রাজ্যের সেবক, জগন্নাথ মহাপ্রভুর সেবক। অর্থাৎ, আমি জগন্নাথ স্বামীর সেবকের সেবক। তাই আমি কখনো মিথ্যে কথা বলি না। কোণার্কে কেবল একজন শিল্পীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর নাম নীলকমল মহারানা। মহারাজ নিজে তাঁর মৃত্যুর শোকসংবাদ একজন বিশেষ দূতের মাধ্যমে তাঁর পরিবারের কাছে পাঠিয়েছেন। আপনার স্বামীর সম্বন্ধে যা রটেছে, তা সর্বৈব মিথ্যা! ভিত্তিহীন। নীলকমল মহারানাকে ব্যতিরেকে অন্য সকল শিল্পী সুস্থ আছেন। আচ্ছা, একটা কথা বলুন, রাজার কোনো দূত এসেই কি আপনাদের এমন মিথ্যা সংবাদ দিয়ে গিয়েছে?’
‘না, কোনো দূত আসেনি। লোকের মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়েছে এই সংবাদ। আর আমার শাশুড়ি-মা তা শুনে বিশ্বাসও করে নিয়েছেন।’
‘এই ধরনের মিথ্যা সংবাদের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। একেবারেই বিশ্বাস করবেন না। আপনার স্বামী দেবতার জন্য কাজ করছেন। আসুন, আমি আপনাকে আপনার গৃহে ছেড়ে আসি।’
যুবতী নিজের দুই হাত শূন্যে তুলে অদৃষ্টকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘হে প্রভু, আমার যা হয় হোক, কিন্তু আমার স্বামীর যেন কোনো ক্ষতি না হয়। ওঁর উপরে তোমার দয়ার দৃষ্টি বজায় রেখো। ওঁর যেন কোনো অমঙ্গল না হয়। ওঁর ভাগের দুঃখ আমাকে দিয়ে দাও, ওঁকে ভালো রেখো।’
নৃসিংহ দেবও অদৃষ্টের সামনে হাত জোড় করে বললেন, ‘হে পুরুষোত্তম! নীলকমল মহারানার আত্মার শান্তি হোক। অন্য সব শিল্পীদের দীর্ঘায়ু করুন, প্রভু! তাঁদের সবার পরিবারের মঙ্গল হোক! আপনিই সবার ভরসা, হে জগন্নাথস্বামী!’
‘আপনার মতো ভালো মানুষ কমই দেখেছি। অজানা, অচেনা মানুষের জন্যেও আপনার মনে কতখানি করুণা!’
‘অনুমতি দিন দেবী। শুক্রোদয় হতেই চলেছে। রাত্রি শেষ হওয়ার আগেই রাজধানী পৌঁছানো আবশ্যক। এবং তার আগে আপনাকে ঘরে ফিরিয়ে দিয়ে আসা আমার কর্তব্য।’
‘ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন! আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, আমাকে এখানেই রেখেই আপনি ফিরে যান। আমার স্বামী জীবিত আছেন, তিনি দেবকার্যে রত রয়েছেন—এটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট। এরপর আমি নিশ্চিন্তে নিজেকে স্বয়ং মৃত্যুদেবতার কাছে সঁপে দিতে পারব।’
নৃসিংহ দেব মনে মনে ভাবলেন, ‘এই যুবতী বড় বিচিত্র! নিজের স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ শুনে আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়, আবার স্বামীর জীবিত থাকার সূচনা শোনার পরে গৃহে না-ফিরে গিয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে চায়! এমন কেন?’
এবার মহারাজের সুর সামান্য কঠোর হল, ‘আমি মহাদণ্ডপাশ! একজন কুলবধূকে এত রাতে, বিপদের মুখে ফেলে রেখে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। চলুন, আপনার শ্বশুরগৃহে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।’
‘আমি এখন শ্বশুর বাড়িতে থাকি না। সেখানকার দ্বার আমার জন্য চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে গেছে।’
‘সে কী, কেন?’
‘কারণ আমি কলঙ্কিনী! পাপিষ্ঠা!’
‘পাপ! কীসের পাপ?’
‘আজ আর আমার বলতে দ্বিধা নেই। তবে শুনুন, আমার পাপ—আমার ওপর আমার দেওরের স্নেহ, মমতা এবং সহানুভূতি। দ্বিরাগমনের মাত্র কয়েকদিন আগে স্বামীকে বাধ্য হয়ে কোণার্কের উদ্দেশে যাত্রা করতে হল। শাশুড়ি মা ভেবে নিলেন যে, আমি অলক্ষ্মী। দিনরাত গঞ্জনা দিতে লাগলেন। দেওর, ভাইটি আমার, সেইসব দেখে বিরোধ করত। সে সকলের অজ্ঞাতসারে আমাকে নিত্যদিনের বেশকিছু কাজে সাহায্য করত।
তবে ব্যাপারটা বেশিদিন চাপা থাকল না। এর মুখ তার মুখ মারফত শাশুড়ির কানে উঠল। তারপর এক রাতের একটি ঘটনার পর সবকিছু বদলে গেল। ভোররাতে ভারী কলসি করে জল ভরে আনার বিধান দিয়েছিলেন শাশুড়ি। একরাতে কুয়োতে জল ভরতে গিয়ে পড়েই যাচ্ছিলাম তার ভেতর, কপালের জোরে বেঁচে যাই। জগন্নাথ স্বামী এক পুরোহিত ঠাকুরের ছদ্মবেশে আমাকে রক্ষা করেছিলেন সেদিন। কিন্তু আমার পোড়া কপাল...পরদিন থেকে গ্রামে রটে গেল, আমি নাকি রাতের অন্ধকারে মন্দির প্রাঙ্গণে আমার দেওরের সঙ্গে...’ বলতে বলতে ডুকরে উঠল যুবতী, ‘হে ভগবান, আমার মতো অভাগীর জীবন রক্ষা করতে গিয়ে তুমি আমার দেওরটাকেও কলঙ্কিত করে দিলে! কী দোষ করেছিল সে? আমাকে সাহায্য করাই কি তার অপরাধ?’
নৃসিংহ দেবের সামনে এতক্ষণে সবকিছু জলের মতো স্বচ্ছ হয়ে গেল। তিনি যুবতীকে চিনতে পেরেছেন। এই নারীর দেহের এমন পদ্ম-সৌরভ তিনি আগেও অনুভব করেছিলেন। শুধু মনে করতে পারছিলেন না—কবে, কোথায়, কোনখানে? যুবতীর বেদনার কাহিনি শুনে তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। স্বামী দূরে চলে গেলে যে একজন নারীকে এতকিছুর সম্মুখীন হতে হয়, মহারাজের মনে তার আভাসটুকুও ছিল না।
‘তারপর? তারপর কী হল?’
‘শাশুড়িমা আমার দাদাকে ডেকে পাঠালেন। পিতার গৃহে ফিরিয়ে দেওয়া হল আমাকে। বলা হল, আমি কুলটা। আমাকে যেন আর শ্বশুরবাড়িতে না-পাঠানো হয়। আমার নামে অপবাদ দেওয়া হলেও আমার বাবা তা বিশ্বাস করলেন না। কিন্তু ভয়ানক মনোকষ্ট পেলেন। আমার সঙ্গে যা ঘটেছিল, তার পীড়া বাবাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। একসময় হৃদয়পীড়ায় তাঁর মৃত্যু হল।
মিথ্যে কলঙ্কের বোঝা আমাকে সবার স্নেহ-সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত করেছে। বাবার মৃত্যুর পরে দাদা-বউদির সংসারে আমি গলগ্রহের সমান হয়ে উঠলাম। দাদা আমারই কারণে গ্রামে মাথা তুলে কথা বলার অধিকার হারিয়েছিল। এত লাঞ্ছনা এত গঞ্জনা সহ্য করেও আমি স্বামীর পথ চেয়ে ছিলাম। হয়তো তিনি সব কথা শোনার পরে আমাকে বিশ্বাস করবেন। কে জানে, হয়তো আপন করে নেবেন তারপর। কিন্তু আজ যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ এল, তখন মাথা ঘুরে গেল আমার। শাশুড়ি মা বলে পাঠিয়েছেন, তোর পাপের ফলেই আমার ছেলের মৃত্যু হয়েছে।
একথা শোনার পর আমি আর নিজেকে স্থির রাখতে পারিনি...ওই পদ্মপুকুরে স্নানরত অবস্থায় একবার আমি আমার স্বামীকে দূর থেকে দেখেছিলাম। ওই পুকুরটা আমার বড্ড প্রিয়। তাই ওই পদ্মপুকুরেই মুক্তির পথ খুঁজতে চলেছিলাম, কিন্তু নিয়তি...আপনি এসে আমার মুক্তির পথে বাধা দিয়ে দিলেন। আর আমি মরতেও পারব না। ঘরেই বা ফিরব কীভাবে? মরার পথ বন্ধ, বাঁচার পথও খোলা নেই। সারা গ্রাম আমাকে দেখে ছিঃ ছিঃ করবে। আমার মতো পোড়াকপাল যেন চরম শত্রুরও না-হয়!’
নৃসিংহ দেবের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই বধূটি অন্ধ সামাজিক অন্যায় ভোগ করা নারীর প্রতিরূপ। এই নিষ্পাপ যুবতীর কোনো দোষ নেই, কিন্তু সমাজের সামনে এই সত্যকেই স্থাপনা করার সাহস বা সামর্থ্য কোনও রাজারও নেই। রাজা রূপে তিনি আদেশ দিতেই পারেন—এই যুবতীকে কেউ কোনো ভাবেই বিরক্ত করবে না। হয়তো সবাই সেই আদেশ মানবে, কিন্তু সকলে মিলে অলিখিত ভাবে একজোট হয়ে মেয়েটিকে একঘরে করে
দেবে।
এভাবে কি একজন সুস্থ মানুষ বেঁচে থাকতে পারে? সমাজের চিন্তাভাবনাকে এই যুবতীর অনুকূলে না-করতে পারলে রাজার ক্ষমতাও মূল্যহীন? এই সমাজের জন্যই ভগবান শ্রীরামচন্দ্রকে মাতা সীতাকে পরিত্যাগ করতে হয়েছিল। বাস্তবে এই যুবতীর ঘরে ফেরা নিয়ে রাজা নিজেও সন্দিহান, কিন্তু এভাবে তাকে একা মৃত্যুর মুখে ছেড়ে যাওয়াও তাঁর পক্ষে কার্যত অসম্ভব। নির্জন বনপ্রান্তে দিশাহীন অন্ধকারে ভরা আকাশের দিকে তাকিয়েও নৃসিংহ দেব নিজের কর্তব্যপথ খুঁজে পেলেন না।
উদার আকাশ নিজের রঙ বদলাতে শুরু করেছে। যুবতীর মুখ অরুণরাগে রঞ্জিত হয়ে উঠছে। নৃসিংহ দেবের চোখের সামনে সে যেন একটি সদ্য ফোটা শ্বেতপদ্ম, যার তনুতে অবসাদ আর মনোমালিন্যের ক্লেদ লেগে আছে। জ্যোৎস্নালোকে যে মুখ দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন, আজ ভোরের ধবল আলোয় সেই একই মুখ তাঁকে মুগ্ধ করে তুলল। সেদিনের সেই কিশোরী আজ যৌবনবতী হয়ে উঠেছে। এক পবিত্র কোমল প্রেমের ভাবে মানুষের মনের সকল সংকীর্ণতা কীভাবে দূর হয়ে যেতে পারে, তা অনুভব করলেন মহারাজ।
‘আমি আপনাকে ওই পদ্মপুকুরের কাছে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেব, দেবী। ভোরের আলো ফুটতে এখনও কিছুটা বিলম্ব আছে। পুকুরে স্নান সেরে আপনি বাড়ি ফিরে যাবেন। এখনও লোক জানাজানি হয়নি। সবাই জানবে আপনি স্নান সেরে বাড়ি ফিরছেন, এখনও কেউ জাগেনি। আসুন, আমার ঘোড়ায় উঠুন।’
‘মহাদণ্ডপাশ মহাশয়, আমি একজন বিবাহিত নারী। আমি সজ্ঞানে আপনার ঘোড়ার পিঠে উঠি কীভাবে? আপনি বরং দেখুন গ্রামে আমার নিরুদ্দেশ হওয়ার সংবাদ রটেছে কিনা। যদি কিছু না ঘটে থাকে, তবে আমি গ্রামে ফিরে যাব। আপনি যান, আমি এখানেই আপনার জন্য অপেক্ষা করব। কথা দিলাম।’
‘কিন্তু সময় বয়ে যাচ্ছে। আমার যাওয়া আসার মাঝে যদি সকাল হয়ে যায়, আপনি আর ফিরতে পারবেন না। অযথা কথা না-বাড়িয়ে উঠে আসুন।’
‘যা হয় হবে, কিন্তু আমি আপনার সঙ্গে ঘোড়ায় যেতে পারব না। অসম্ভব! আমার সতীত্ব আমাকে এই কাজ করতে অনুমতি দেয় না, আর যদি কারো চোখে পড়ে তাহলে আমার কলঙ্কের বোঝা বাড়বে বই কমবে না। আপনি আর সময় ব্যয় করবেন না, এখনই রওনা দিন, তাহলে হয়তো আমি সকাল হওয়ার আগেই গ্রামের সীমায় পৌঁছে যেতে পারব। অবশ্য এসব বলছি বটে, কিন্তু জানি না আমাকে আপনি কতদূরে নিয়ে চলে এসেছেন।’
‘ভয় নেই, আমি বেশিদূর নিয়ে আসিনি আপনাকে। আমি রওনা দিচ্ছি, কিন্তু আপনি এখান থেকে একদম নড়বেন না। এবং আরও একটি শর্ত দিচ্ছি, যদি দেখা যায় গ্রামে কোনো সমস্যা হচ্ছে, আপনার ফেরা সম্ভব হচ্ছে না, তাহলে আপনি আমার সঙ্গে এখান থেকেই কোণার্ক চলে যাবেন। আর সেখানে গেলে আপনার স্বামীর সঙ্গেও আপনার দেখা হয়ে যাবে। তখন আপনার সমস্ত মনকষ্ট দূর হয়ে যাবে।’
‘না, না। ওই কাজ করবেন না। তাহলে হয়তো রাজা নৃসিংহ দেব আমার স্বামীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে বসবেন। নৃসিংহ দেবের কাছে মানুষের চেয়ে দামি পাথর। পাথরকে প্রাণবন্ত করে তোলার তাগিদে রাজা জীবন্ত মানুষকে তার প্রাণের ভাষা ভুলিয়ে দিয়ে পাথরে পরিণত করেছেন। আমার কোণার্ক যাওয়া কোনোমতেই সম্ভব নয়। এতে আমার স্বামীর নিশ্চিত অমঙ্গল হবে।’
জড়বৎ হয়ে গেলেন উৎকলের রাজা নৃসিংহ দেব। এই গ্রামবধূর মনে তাঁর এ কী ছবি গড়ে উঠেছে? এই যুবতী আগেও তাঁকে আঘাত করেছে, আজ আরও একবার। রাজা মনে মনে ভাবলেন, ‘যার কথায় আমি বারো বছরের জন্য ব্রহ্মচর্যের সিদ্ধান্ত নিলাম, সে এখনও আমার জন্য মনে এতখানি ঘৃণা পুষে রেখেছে? সে রাজা রূপে আমাকে সম্মান করে, কিন্তু মানুষ হিসেবে...শুধুই ঘৃণা? এই কি আমার প্রাপ্য ছিল?’ ভয়ংকর বিচলিত হয়ে পড়লেন রাজা।
‘রাজাও একজন রক্তমাংসের মানুষ। আপনার বা আমার মতোই। তাঁর মনেও দয়া, মায়া, মমতা, স্নেহ, করুণা, ক্ষমা আর ভক্তি আছে। আমি নিজে নৃসিংহ দেবকে খুব কাছ থেকেই চিনি। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য তাঁর মনে অপার করুণা। আপনি তাঁর সম্পর্কে এভাবে বলছেন জানলে তিনি মনে মনে ভীষণ আহত হবেন।’
হা হা করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল যুবতী, ‘রাজার আবার দুঃখ?’
নৃসিংহ দেব মনে মনে ভাবলেন, ‘রাজার জীবনের সবথেকে বড় দুঃখ—লোকে ভাবে যে রাজার জীবনে কোনও দুঃখই নেই। কিন্তু এই দুঃখী রাজার মনের খবর কেউ রাখে না।’
তিনি যুবতীকে প্রশ্ন করলেন, ‘এই নির্জন বনভূমিতে অপেক্ষা করতে আপনার ভয় করবে না তো?’
‘যে সাগরে শয্যা বেঁধে এসেছে, সে কি আর শিশিরে ভয় পায়? আমি মরতে বেরিয়েছিলাম। এখনও জীবিত আছি এ আমার বিধিলিপি।’
‘আপনি সাবধানে থাকবেন। আমি শীঘ্র ফিরে আসব।’ কথা শেষ করেই নৃসিংহ দেব ঘোড়ার পিঠে চড়ে যুবতীর গ্রামের দিকে চললেন। ঘোড়া উড়ে চলল বিদ্যুৎগতিতে।
যুবতী বধূ ছদ্মবেশী নৃসিংহ দেবকে মনে মনে প্রণাম জানিয়ে বলল, ‘আপনি নমস্য! আমি আপনাকে ঠিকই চিনেছি। আপনিই সেই রাতে পুরোহিতের বেশে আমাকে কুয়োতে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন। কাল পুকুরে আত্মহত্যা করার আগে আপনি এসে না-পড়লে আমার জীবন শেষ হয়ে যেত। মৃত্যু আমাকে টানে, আর আপনি বার বার দেবদূতের মতো আমাকে রক্ষা করতে চলে আসেন। কিন্তু আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার আর গ্রামে ফেরা হবে না।’
যথাসময়ে নৃসিংহ দেব যুবতীর গ্রাম থেকে ফিরে এলেন। কিন্তু কই, কেউ কোত্থাও নেই। মন্দিরের ভগ্ন প্রাঙ্গণ, বিলুপ্ত জনপদের খণ্ডহরে যুবতীর দেখা মিলল না।
‘তাহলে কি যুবতী আত্মহত্যা...নাকি বনের কোনো হিংস্র পশু...কিন্তু তেমন কোন চিহ্নও তো নেই। মাটির বুকে ধ্বস্তাধ্বস্তির দাগ নেই কোথাও। আশেপাশের লতা-পাতা-ঘাস সবই দেখছি অক্ষত রয়েছে। বনেও কোথাও কোনো শব্দ পাচ্ছি না। তাহলে যুবতী গেল কোথায়? ওই কুয়োটাতে ঝাঁপ মারেনি তো?’ সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই মহারাজ কূপের ভিতরে উঁকি মেরেও দেখলেন। কিন্তু কোথাও কোনো সূত্র মিলল না। কোথায় অন্তর্হিত হল সে ভগবানই জানেন।
নিজের বাম হাতের তালুতে ডান হাতের মুঠি দিয়ে আঘাত করতে করতে আক্ষেপ করলেন মহারাজ, ‘কোথায়...কোথায়...কোথায়?’ ব্যর্থ দৃষ্টি নিয়ে তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। সুনীল আকাশে যেন ফুটে উঠল সর্বদুঃখহারী নীলাদ্রি-বিহারীর নীল চক্র, যার উপরে পতিতপাবন ধ্বজা বায়ুর বেগের বিপরীত দিকে উড়ে চলেছে। ‘এ কি ভ্রম?’ দুই চোখ কচলে আবার তাকালেন গগন পানে। কোথাও কিছু নেই। ভাবে আবিষ্ট রাজা বলে উঠলেন, ‘তাহলে কি প্রভু ওই যুবতীর সকল কষ্ট মুছে দিলেন? হে প্রভু, যদি তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় জানাবার জন্যই স্থির করে রেখেছিলেন, তাহলে পদ্মপুকুরে ঝাঁপ দেওয়ার আগে আমার হাতে তাকে বাঁচালেনই বা কেন? আপনিই রাখলেন, আপনিই মারলেন! এ কেমন বিচার আপনার? এ কেমন পরীক্ষা? কারই বা পরীক্ষা নিলেন? ওই যুবতীর নাকি আমার? এই অপরাজেয় নৃসিংহ দেবের গর্বের মর্দন করালেন ওই যুবতীর হাতে? আমার পরাজয়ই যদি আপনার অভীষ্ট হয়, তবে আমি নতি স্বীকার করলাম। ফিরিয়ে দিন ওই বধূকে। আপনার এই সেবককে আপনি কেমন রহস্যের মধ্যে জড়ালেন আজ?’
অপরাজেয় নৃসিংহ দেবের মন এক অসহ্য পরাজয়ের গ্লানিতে ভরে উঠল। ভয়ানক অবসাদ তাঁকে গ্রাস করে ফেলল। ‘সমস্ত শৌর্য, সমস্ত বীর্য, পৌরুষ এবং ঐশ্বর্যকে আজ এক অবলা যুবতী পদদলিত করে দিয়ে চলে গেল! গঙ্গ-বংশের ইতিহাসে এই কথা কোথাও, কেউ লিপিবদ্ধ করবে না, কিন্তু আমার হৃদয়ে এই পরাজয়ের কাহিনি মৃত্যু-অবধি লেখা থাকবে। কোণার্ক-মন্দির নির্মাণের ইতিহাসে কোথাও ওই যুবতীর নামোল্লেখ থাকবে না ঠিকই, কিন্তু ওঁর আত্মা কোণার্কের আকাশে নিজের শিল্পীকে খুঁজে ফিরবে, নিজের কোণার্ককে খুঁজে ফিরবে...।’
আজকাল নৃসিংহ দেব যেন কোনো এক অজ্ঞাত দুঃখে মনমরা হয়ে থাকেন। কেউ জানে না এই মনোব্যথার কারণ কী। বিশাল দুর্গের প্রাচীর ভেদ করে দুঃখ কীভাবে প্রবেশ করল সেই সংবাদ কারো জানা নেই।
বারাবাটি দুর্গের উত্তরে মহানদী তথা বিরূপার মাঝে চৌবেদারের অভেদ্য দুর্গ, পশ্চিমে মহানদী এবং কাঠজোড়ির প্রাকৃতিক সুরক্ষা এবং বিডানাসির দুর্গ, দক্ষিণে কাঠজোড়ির অপর পারে সারঙ্গগড়ের অত্যুচ্চ দুর্গ, স্বয়ং বারাবাটি দুর্গের বহির্ভাগে বৃহৎ পরিখা আর পাথর দিয়ে তৈরি অভেদ্য উঁচু প্রাচীর, বাহ্য প্রাচীরের ভিতরেও আরেকটি সুরক্ষা-ভিত্তি। দুর্গের দ্বারে ঢাল-তরবারি, ভল্ল নিয়ে সতর্ক পাইকের দল সুরক্ষায় নিযুক্ত রয়েছে অষ্টপ্রহর। অন্ধকারে সামান্য আলো পড়লেই ঝিকিয়ে উঠছে তাদের হাতের খোলা তলোয়ার। ঢালের উপরে থাকা কালো লৌহ-কীলক কালো মেঘের মতোই রাত্রির আঁধারকে আরও গহন করে তুলছে। দুর্গের বাসিন্দারা তাই নিশ্চিন্ত।
তবে এত পাইক, এত সুরক্ষার আয়োজন, তবুও বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছেন নৃসিংহ দেব। মহারানির চোখেও ঘুম নেই। কত বছর ধরে চলবে এই তপস্যা, এই ব্রহ্মচর্য? কোণার্ককে উৎসর্গ করা রাজার এই দেহের সঙ্গে কি তাঁর মনটাও পাথরে পরিণত হয়েছে? ভগবান আদিত্যের কৃপায় পুত্র ভানুদেব নিজের পিতার অবিকল প্রতিকৃতি হয়ে উঠছে। সে পিতার বৈভবের যোগ্য উত্তরাধিকারী হতে চলেছে। ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে কোণার্ক-মন্দির। দক্ষিণ-পশ্চিমে গুলবর্গা ও বিদর নৃসিংহ দেবের আয়ত্তে এসে গিয়েছে। তাহলে? এখনও মহারাজ এমন বিচলিত কেন? গঙ্গ-বংশের স্বর্ণযুগ চলছে, তবুও কীসের চিন্তায় মগ্ন মহারাজ?
কোণার্কের নির্মাণকাজে বিরাম নেই। বৈশাখের বেলা-দ্বিপ্রহর। সূর্যের তেজ দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো খ্যাপা ষাঁড় রুদ্র হুঙ্কার দিয়ে চলেছে। সুবল মহারানা এইমাত্র নাট্যশালার দক্ষিণ পাশে এক প্রতীক্ষারত যুবতীর মূর্তি স্থাপন করেছে। এখন শেষ পর্বের কাজ চলছে। একাগ্র চিত্তে, ব্যস্ত ভাবে মূর্তির গায়ে ছেনির আলতো ঘায়ে পাথর কাটছে তার হাত। প্রখর রোদের তাপে সুবলের বলিষ্ঠ শরীর থেকে কোণার্কের অভ্যর্থনায় ঝরে পড়ছে মুক্তোর মতো ঘামের বিন্দু।
নৃসিংহ দেব আজ নৃত্যগুরু সৌম্য শ্রীদত্তের সঙ্গে মন্দির প্রাঙ্গণ নিরীক্ষণে বেরিয়েছেন। নির্মাণকাজ দেখতে দেখতে তাঁরা দুজনেই সুবলের পাশে এসে দাঁড়ালেন। এই প্রখর রৌদ্রতাপে সুবল একাগ্রচিত্তে কাজ করে চলেছে দেখে মহারাজ নিজের সেবককে চোখের ইঙ্গিতে কিছু নির্দেশ দিলেন। সে সঙ্গে সঙ্গেই মহারাজের মাথার উপরে মেলে ধরে থাকা ছাতা সুবলের মাথার উপরে মেলে ধরল।
অবশ্য এসবে সুবলের হুঁশ নেই। এক মনে সে একজন প্রতীক্ষারত নারীর শিলাবয়বকে শিল্পের পূর্ণতা দিতে ব্যস্ত। অর্ধউন্মুক্ত দ্বারের চৌকাঠে নিজের হাত রেখে প্রতীক্ষারত এক নারীর মনমোহিনী মূর্তি। অবগুণ্ঠন মাথা থেকে সামান্য সরে গিয়েছে। পানপাতার মতো ত্রিকোণ মুখ। চিবুক অবধি ঘোমটায় ঢাকা। আধখোলা দরজার মুখে নিজের প্রিয়তমের জন্য আকুল প্রতীক্ষার একটি সজীব চিত্রণ।
পাথরের মন নিয়ে শিল্পী নিজের পরিণীতাকেও পাথরের মূর্তি বানিয়ে দিয়েছে। পাষাণ মূর্তির অধরে যেন স্পন্দন জেগে উঠল। সুবল স্পর্শ করে দেখল সেই কোমল অধর। ‘বিনোদিনী, এত দূর থেকে কি তুমি আমার স্পর্শ অনুভব করতে পারছ? আমার মনে হয় পারছ। কারণ এই একই ভাবে তোমার প্রতীক্ষার দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন, প্রতি প্রহরে বয়ে নিয়ে আসে চন্দ্রভাগার বাতাস। তা আমাকে ছুঁয়ে যায়। আমি জানি, আমার জন্য তুমি অনন্তকাল ধরে প্রতীক্ষা করে যেতে পারো। আর তাই আমি তোমার প্রতীক্ষার ছবি এঁকে দিলাম কোণার্কের বুকে। বিশ্ববাসী কখনো–না–কখনো এই মূর্তির মাধ্যমে ঠিক তোমাকে চিনে নেবে। সুখী হও। প্রতীক্ষার দিন একটা–একটা করে কমে আসছে। আমাদের দেখা হবেই।’
নৃসিংহ দেব বেশ কিছুক্ষণ ধরে মূর্তিটিকে দেখার পর স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এ কার মূর্তি? কার অপেক্ষার ছবি তুলে ধরেছে সুবল মহারানা? তিনি ভাবতে লাগলেন, ‘রাজা নাকি শিল্পী, কে বড়? রাজা একমাত্র তখনই রাজা, যখন তাঁর কাছে সিংহাসন থাকবে। আর শিল্পী নিজের ভাবনার সাম্রাজ্যের সার্বভৌম সম্রাট। শিল্পীর সামনে সমগ্র জগৎ মাথা নত করতে বাধ্য।’
মূর্তিতে শিল্পের অন্তিম স্পর্শ দিয়ে সুবল সোজা হয়ে দাঁড়াল। এবার সে খেয়াল করল তার মাথার উপরে রাজছত্র ধরা আছে। অভিভূত হয়ে সে বলে উঠল, ‘অপরাধ ক্ষমা করবেন মহারাজ! আমি আপনার উপস্থিতির কথা বুঝতেই পারিনি। আর এ কী! এই তুচ্ছ সেবকের মাথার উপরে রাজছত্র ধরার আদেশ কেন দিয়েছেন, প্রভু?’
‘শিল্পী, মহাপ্রভু জগন্নাথের ছায়ায় সকলেই তাঁর সেবক। কেউ ছোট, কেউ বড়।’
‘মহারাজ, আপনার ঔদার্যের কোনো তুলনা হয় না।’
‘আচ্ছা শিল্পী, এই প্রতীক্ষারত মূর্তির নারী চরিত্রটিকে কিছু প্রশ্ন করতে পারি?’
‘প্রশ্ন নয়, আদেশ করুন মহারাজ। কোনো ত্রুটি?’
‘কলিঙ্গের কোনো শিল্পীর শিল্পকর্মে ত্রুটি খুঁজে বের করার ক্ষমতা এই বিশ্বে কারো নেই। আজ উৎকলের শিল্পীদের হাতের কাজ স্বর্ণদ্বীপ, জাভা, সুমাত্রা, বালি, মলয়দ্বীপ এবং সিংহল দেশে পূজিত হচ্ছে। ত্রুটি মনে হলে তা আমার দৃষ্টির বিভ্রম হলেও হতে পারে, কিন্তু শিল্পীর শিল্পে ত্রুটি থাকতে পারে না। শুধু কিছু জানার আগ্রহ ছিল। কে এই প্রতীক্ষারত নারী? কারো চরিত্রকে মাথায় রেখেই কি কাজ এগিয়েছ? নাকি এ কেবল শিল্পীর কল্পনা?’
‘মহারাজ, এর কিছুটা সত্য, বাকিটা কল্পনা।’
‘তাহলে বলো, এই শিল্পের সত্য অংশটুকু কতখানি?’
‘এই অধমের স্ত্রী। তার নাম বিনোদিনী।’
কেন কে জানে, নৃসিংহ দেবের মন ছুটে ফিরে গেল সেই নির্জন বনপ্রান্তের ভগ্ন মন্দিরের আশেপাশে, ‘সে-ও তো কারো ঘরণী ছিল? যখন তার স্বামী ঘরে ফিরে গিয়ে তাকে আর দেখতে পাবে না, তখন কি সে অভিশাপ দেবে? তার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রীকে? আমাকে? এই কোণার্ককে?’ স্মৃতির জুঁই বাগিচায় একটি ফুল গন্ধমান হয়ে উঠল। রাজার চিন্তার জাল ছিন্ন হল। নিজের মনকে মিথ্যা আশ্বাস জোগানোর জন্য খুব অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করে বসলেন তিনি, ‘শিল্পী, এই ধরনের প্রতীক্ষায় কি তুমি বিশ্বাস করো?’
‘এই বিশ্বাসই প্রত্যেক কোণার্ক-শিল্পীর মনের নিধি, প্রাণের সুধা। এই আস্থাই আমাদের শক্তি। যদি এই বিশ্বাস ভঙ্গ হয়, তাহলে শিল্পীও ভেঙে পড়বে।’ বলতে বলতে সুবল মাথা নীচু করে নিল। চোখে আসা জল আলতো হাতে মুছে সে বলল, ‘ক্ষমা করবেন মহারাজ, দিনরাত পাথরের কাজ করে চলেছি। চারদিকে পাষাণরেণু-ধূলিকণা উড়ছে। চোখে এসে পড়েছিল।’
‘তোমার এই বিশ্বাস অটল থাক শিল্পী। তবেই তুমি বা তোমরা সকলে মিলে কোণার্কের কপালে মাহাত্ম্যের, তপস্যার এবং ত্যাগের কথা উৎকীর্ণ করতে পারবে।’
কথা শেষ করে নৃসিংহ দেব অন্যান্য শিল্পীদের কাজ নিরীক্ষণের উদ্দেশে এগিয়ে চললেন।
সুবল মহারানা নাট্যমন্দিরের দক্ষিণ পার্শ্বে একটি অপূর্ব দৃশ্য চিত্রিত করেছে। স্নানরতা এক নারীর মূর্তি। লম্বা বেণী সুপক্ক জোড়া বেলফলের মতো বুকের উপত্যকা বেয়ে সর্পিল ছন্দে জলধারার মতো একদিক থেকে অন্যদিকে নেমে গিয়েছে। জলসিক্ত বেণী থেকে ঝরে পড়ছে জলের কণা, আর একটি তৃষ্ণার্ত মরাল নিজের চঞ্চু বাড়িয়ে দিয়ে বেণী থেকে ঝরে পড়া জল পান করছে। অপূর্ব কল্পনা! শিল্পী চায়নি রূপসীর বেণী থেকে ঝরে পড়া দেহগন্ধ সুবাসিত জলের বিন্দুগুলি মাটিতে পড়ুক। সুন্দরীর কোমল চরণে যাতে মাটি না-লাগে, তার জন্য শিল্পী তার পায়ে তুলে দিয়েছে কাষ্ঠপাদুকা। এসবই পাষাণে তক্ষণ করা। কিন্তু কে এই নারী? প্রতীক্ষারত নারীর মূর্তি এবং স্নানরত নারীর এই মূর্তির মধ্যে অন্তর আছে। এ কোনো যুবতী নয়, কোনো কিশোরী কন্যার বিলাসপূর্ণ স্নান।
নৃসিংহ দেব এবং সৌম্য শ্রীদত্ত দুজনেই সশরীর প্রশ্ন হয়ে মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মূর্তি দেখে সৌম্য শ্রীদত্ত চমকে উঠেছেন, ‘কে এই কিশোরী কন্যা, যাকে শিল্পী নিজের ছেনির স্পর্শে পাষাণের বুকে এঁকেছে? সে প্রতিরূপ হয়ে এই অবস্থায় শিল্পীর সামনে দাঁড়ালই বা কীভাবে? এ কোনো দেবদাসীর মুখ নয়। কারণ এখানে তো এত অল্পবয়েসি কোনো দেবদাসীই নেই। এর আকার-প্রকার, মুখ, নাক, চোখ সবকিছু আমার শিল্পার সঙ্গে বড় মিলে যাচ্ছে। তাহলে কি শিল্পাই সুবল মহারানার সামনে প্রতিরূপ হয়ে দাঁড়ায়? আর সেই কারণেই কি সুবল অন্য কোনো দেবদাসীকে প্রতিরূপ হিসেবে নিতে চায় না? কিন্তু শিল্পাই বা প্রতিরূপ হবে কী করে? কবেই বা প্রতিরূপ সেজে সে সুবলের সামনে এসে দাঁড়াল? কবে? কীভাবে?’
নৃসিংহ দেব এগিয়ে গেলেন। তাঁকে অনুসরণ করলেন সৌম্য শ্রীদত্ত। কিন্তু এ কী? যত এগোচ্ছেন, ততই চোখে পড়ছে ভিন্ন-ভিন্ন মুদ্রা-ভঙ্গিমার মূর্তি, আর প্রতিটা মূর্তির মুখ অবিকল শিল্পার মুখেরই মতো। শিল্পাই ভিন্ন রূপে, ভিন্ন ছন্দে সর্বত্র দাঁড়িয়ে রয়েছে। শিল্পী কি তবে নিজের কল্পনায় শিল্পাকে দেখে মূর্তির মুখের আদলকে শিল্পার মুখের ছাঁচে ঢেলে দিয়েছে? তা-ই হয়েছে, মনে মনে আশ্বস্ত হলেন শ্রীদত্ত।
সৌম্য শ্রীদত্তের মুখ থেকে অস্ফুটে উচ্চারিত হল কয়েকটি বাক্য, ‘অদ্ভুত! সুবল মহারানা, তোমার কল্পনা অদ্ভুত! শিল্পী তুমি যশস্বী হও! তোমার শিল্প যশস্বী হোক! কোণার্ক যশস্বী হোক!’ তিনি মুখে এই কথাগুলো উচ্চারণ করলেন বটে, কিন্তু মনের কোনো একটা কোণ থেকে ধোঁয়া উঠতে লাগল, ‘এতগুলো মূর্তির একই মুখ? বিনা প্রতিরূপে এই কাজ করা কি সম্ভব? তবে কি শিল্পাই প্রতিরূপ হিসেবে সুবলের কাছে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থেকেছে!’ আবার পরক্ষণেই আচার্যের মন বলে উঠল, ‘না, না! এ যে অসম্ভব!’
নৃসিংহ দেব এবার অন্য একটি মূর্তির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। এই শিল্পকর্মটি একটু বিচিত্র। মহারাজ প্রশ্ন করলেন, ‘এ কেমন কল্পনা, নৃত্যগুরু?’
‘এই মূর্তি শিল্পীর অদ্ভুত কল্পনা আর শিল্পগৌরবের প্রতিভূ, মহারাজ। একজন দক্ষ শিল্পী নিজের কল্পনার মাধ্যমে দূর কোনো স্থানে থেকেও নিজের স্ত্রীর মনের কথা পড়ে ফেলতে পারে। বিরহিণী সেই নারীর মনে মাতৃত্বের বাসনা জাগবেই, কিন্তু উপায় নেই। দাম্পত্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। কাজের সূত্রে স্বামী ভিনদেশে। সন্তানাদি নেই। তাই বাড়িতে, খাঁচায় পোষা শুকপাখিটাকেই সন্তানের মতো পালন করেছে সেই নারী। তাকেই স্তন্যপান করায়। এই ছবি অপূর্ণ এবং অপূর্ব সুন্দর মাতৃত্বের ইচ্ছা পূরণের। এর মাধ্যমে সুবল মহারানা নিজের কল্পনাশীলতা এবং কলাবৈভবের চরম উৎকর্ষ স্থাপন করেছে। দেখুন মহারাজ, ওই দেখুন, শিল্পী কিন্তু শুধু নিজের প্রিয়তমার ধ্যানেই মগ্ন হয়ে থাকেনি, ব্যবসা-বাণিজ্যের, শিকারের, যুদ্ধের, নাগরিক জীবনের বহু চিত্র এঁকে গিয়েছে পাথরের বুকে। পাষাণের পৃষ্ঠায় অঙ্কিত হতে থাকা কোণার্ক যেন সমগ্র উৎকলের দৈনন্দিনী হয়ে উঠেছে।’
আরেকটু এগোতেই নৃসিংহ দেবের চোখে পড়ল, একটি দৃশ্যে একজন ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির কেশ সমূলে কেটে দিচ্ছে। মহারাজ আর নিজের কৌতূহল চাপতে না-পেরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচার্য, এই দৃশ্যটা? এটা কীসের?’
‘এই দৃশ্য আসলে উৎকলের বর্তমান এবং তার ভবিষ্যতের প্রতি প্রকাশিত আশঙ্কার চিত্র, মহারাজ। এখন উৎকলের যুবকেরা শিল্পের জন্য, বাণিজ্যের জন্য, যুদ্ধের জন্য নিজেদের ঘরবাড়ি ত্যাগ করে বিভূমে কাজ করে চলেছে। প্রত্যেকের ঘরে রয়ে গিয়েছে একাকী, বিরহিণী যুবতী বধূ। এমন অবস্থার সুযোগ নিয়ে যদি কোনো পাপী তাদের কারো প্রিয়তমার শীলহরণ করে, অপবিত্র করে? বিদেশ থেকে ঘরে ফিরে স্বামী নিজের স্ত্রীর সঙ্গে হওয়া অপরাধের দণ্ড সেই পাপীকে দিচ্ছে। এখানে সেই গল্পই বলা আছে।’
পশ্চিম দিকে এগোতে লাগলেন নৃসিংহ দেব। আবার থমকে দাঁড়ালেন। এই ছবি? এই ছবির সাক্ষী যে তিনি নিজেই! এক নারী অপর নারীর কানে-কানে কোনো কথা বলছে। পাশেই এক বৃদ্ধা চণ্ডীর মতো রণংদেহী রূপ নিয়ে নিজের পুত্রবধূকে গালিগালাজ করে চলেছে। যুবতী সেই বধূর মুখ অবসাদে মলিন। রাজা মনে মনে ভাবতে লাগলেন, এভাবেই সেই যুবতীর অপবাদও এক মুখ থেকে অন্য মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। এভাবেই সমাজ তার বিরুদ্ধে হয়ে গিয়েছে। এভাবেই সে নিজের শাশুড়ির কাছে প্রতারিত হয়েছে। আর এইসব কিছু একসময়ে সহ্যের সীমা ছাড়াতেই সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আচ্ছা, সুবল কি নিজের কল্পনার মাধ্যমে প্রত্যেক শিল্পীর মনের কথা, ঘরের মানচিত্র জেনে ফেলেছে? এত দূর স্থানে থেকেও সে কীভাবে ওই যুবতীর ব্যথার কথা উৎকীর্ণ করে ফেলল?
মহারাজ কোনো প্রশ্ন না-করলেও সৌম্য শ্রীদত্ত নিজেই এই চিত্রের বিবরণ দিয়ে চললেন, ‘এখানে এক নারী নিজের সখীর কানে গ্রামের অন্য এক নারীর সম্পর্কে রটা কুৎসার কথা বলছে, যার স্বামী বিদেশে চলে গিয়েছে...’
‘থাক আচার্য। আর বলার প্রয়োজন নেই। এই ছবিটিকে দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি। চলুন। আজ আর ভালো লাগছে না।’ রাজার মন আবার বিচলিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু সুবল মহারানার প্রতি তাঁর সম্মান বেড়ে গিয়েছে। কী অদ্ভুত প্রতিভা এই তরুণ শিল্পীর! কী মহান এঁর কাজ! কত দক্ষতা! কল্পনা হলেও তা কত বাস্তববাদী!
ফেরার পথে নৃসিংহ দেব একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। তাঁর মনের ভিতরে একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খেতে লাগল, ‘ওই যুবতী এখন কেমন আছে, কোথায় আছে কে জানে? আদৌ জীবিত আছে কিনা তাও জানা নেই। কোনো-না-কোনো শিল্পীর স্ত্রী সে। যখন সেই শিল্পী গৃহে ফিরে যাবে, তখন কী হবে?’
নৃসিংহ দেবের বাহ্যিক আচরণে একথা স্পষ্ট যে, কোনো ব্যথা তাঁকে নাগাড়ে মন্থন করে চলেছে। শিবেই সান্তারার সঙ্গে পথিমধ্যে সাক্ষাৎ হয়ে গেল। রাজার রণক্লান্ত, চিন্তাক্লিষ্ট, মলিন মুখের ছবি তাঁকে ভাবিয়ে তুলল। তিনি মনে মনে স্থির করলেন, মহারাজের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করা উচিত, ‘কিন্তু দিনমানে কী উপায়? নৃত্য তো রাত্রির অবসরে মনোরম লাগে। তাহলে কী করা যায়?’
নৃসিংহ দেব সর্বজনবিদিত সাহিত্যরসিক। যুদ্ধ এবং সাহিত্য, নৃত্য এবং শিল্প, কলা এবং কাব্য, সবকিছুই তাঁকে স্পর্শ করে। শিবেই সান্তারা তৎপর হয়ে কবি সম্মেলনের আয়োজন করলেন। বর্ধমান মহাপাত্র, কবিরাজ রঘুবীর, গোবিন্দ ভুজ, রঘুনাথ পারিছা এবং রাজকবি বিদ্যাধরকে আহ্বান করা হল। কাব্যপ্রতিভায় ধনী এই পঞ্চরত্নকে শিবেই সান্তারা বললেন, ‘রাজা কোনো কারণে উদ্বিগ্ন, অন্যমনস্ক থাকছেন, তাঁকে উৎফুল্ল করে তুলতে হবে।’
প্রথম চারজন কবি নিজের কাব্যসম্ভার মেলে ধরলেন। পাঠ হলে একে-একে। শেষে এলেন রাজকবি বিদ্যাধর। তিনি নৃসিংহ দেবকে কেন্দ্র করে লেখা ‘একাবলী’ কাব্য পাঠ করতে আরম্ভ করলেন। একাবলী কাব্য রাজকবি বিদ্যাধর বিরচিত নৃসিংহ দেবের প্রশস্তিমূলক কাব্য। তিনশো চোদ্দটি শ্লোকে গাঁথা এই কাব্যের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠল রাজবন্দনা। কিন্তু নৃসিংহ দেব আজ এত প্রশস্তি শুনেও শান্তি পাচ্ছেন না। তাঁর শুধুই মনে হচ্ছে, শ্লোকগুলিতে শুধুই চাটুক্তি লেখা হয়েছে, ‘শ্লোকে বর্ণিত সেই শৌর্য, বীর্য, পরাক্রম, ওজঃ, কর্তব্যপরায়ণতা আজ কোথায়? এক সাধারণ গ্রামবধূ যুক্তির খড়্গে আমার মিথ্যা পৌরুষকে খণ্ডিত করে দিল! তাকে কী দিতে পেরেছি আমি? ন্যায়, বাঁচার অধিকার, সুরক্ষা? রাজার ন্যূনতম দায়িত্ব পালনেও আজ আমি ব্যর্থ হয়েছি। এই প্রশস্তি সর্বৈব মিথ্যা। এই যশোগান যেন আমাকে উপহাস করছে।’
ওই যুবতী শুধু মহারাজা নৃসিংহ দেবের ভোগবিলাসেই নয়, তাঁর সমস্ত সুখ, অহংকার, আত্মবিশ্বাসের উপর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে। বিদ্যাধরের কাব্যপাঠ কে শুনছে? আর যেই শুনুক-না-কেন, মহারাজ নৃসিংহ দেব তো নিশ্চিত ভাবেই শুনছেন না। তাঁর মন এখন সেই ভগ্ন দেবদেউলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে, যেখানে সেই রূপসী যুবতী অট্টহাসি করে তাঁকে বলেছিল, ‘রাজার আবার দুঃখ?’
রাজা পাঠ শোনেননি একথা সত্য, কিন্তু রাজকবির মনোবল নষ্ট করার অভিপ্রায় তাঁর নেই। তিনি আদেশ দিলেন ‘একাবলী’র কাব্য রাজকবির কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে বহেড়ার আঠা, কদলী রস, জলৌকা ভস্ম এবং লাজবর্ত রত্নের চূর্ণ থেকে প্রস্তুত মসির দ্বারা অভিলিখিত করে রাজ্যের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত করা হোক। রাজা এত কথা বললেন বটে, কিন্তু তাঁর মন যে অস্থির সেকথা বুঝতে কারো সমস্যা হল না।
দিনমানের মনোরঞ্জনের অবসান হল। রাজার অন্যমনস্কতা কাটিয়ে তাঁকে উৎফুল্ল করার অভিপ্রায়ে রাতের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা হল। শিবেই সান্তারার নির্দেশে রাত্রে ‘গোপীবল্লভ’ নাটিকা মঞ্চস্থ হল।
নাটিকার দর্শকাসনে উপস্থিত হল কোণার্ক-শিল্পীরাও।
রঙ্গমঞ্চ খোলা আকাশের নীচে। মঞ্চের একপাশে বসে আছেন মহারাজ নৃসিংহ দেব, রানি সীতা দেবী, রাজভগিনী চন্দ্রাদেবী। মঞ্চের সামনে বিদেশ থেকে আগত অতিথিবৃন্দ এবং শিল্পী সম্প্রদায়। রঙ্গমঞ্চের আরেক পাশে নৃত্যাচার্য সৌম্য শ্রীদত্তের কন্যা শিল্পা এবং শিবেই সান্তারার পুত্রী কলাবতী সহ অন্যান্য সখীরা। সেখানেই আসন গ্রহণ করেছেন নাট্যাচার্য নিজেও। বাদ্যকারদের বসার ব্যবস্থাও সেখানেই করা হয়েছে।
রাধা এবং কৃষ্ণের প্রেমলীলার অদ্বিতীয় কাব্য মঞ্চস্থ হচ্ছে। উপস্থিত সকলে যখন নাটিকার কলাকুশলীদের অভিনয়ে মগ্ন, সুবল মহারানার মন তখন অন্য কোথাও। এক সরসীই এখানে তার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। তার দৃষ্টি শিল্পার উপরে নিবদ্ধ। শিল্পার মুখের আভা যেন সুন্দর, কোমল পদ্মের পাপড়ি হয়ে প্রাতঃকালীন সূর্যের অরুণিমাকেও হার মানায়। সুবলের প্রিয়তমা বিনোদিনীর মুখ তার কাছে অঙ্কিত চিত্রের মতো, অস্পষ্ট। কিন্তু শিল্পা? সে বাস্তব। স্পষ্ট। লীলায়িত দেহ নিয়ে বর্তমান। এক সুন্দর, সুকুমারী মুখ। এই কিশোরীই প্রতি রাতে সুবলের কল্পনায় সমাহিত হয়ে সে যে রূপে চাইত সেই রূপেই এসে দাঁড়াত। আর সুবল একের পর এক মূর্তি গড়ে চলত। একদিনের একটি ঘটনার কথা সুবলের মনে পড়ে গেল।
সুবলকে নাট্যাচার্য একটি চিত্রপট পাঠিয়েছিলেন। তা নিয়ে বিশেষ কিছু আলোচনার প্রয়োজন ছিল। ভোর হওয়া মাত্রই সুবল তাঁর আবাসে গিয়ে পৌঁছাল। সৌম্য শ্রীদত্ত অন্যান্য দিনের মতোই ব্রাহ্মমুহূর্তে নৃত্যাভ্যাস করতে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করা মাত্রই স্তম্ভিত হয়ে গেল সুবল। চতুর্দিক কেতকী-জলের সুবাসে ম’ম’ করছিল। আঙিনার এক কোণে দাঁড়িয়েছিল সদ্যস্নাতা কিশোরী শিল্পা। এক অপূর্ব লীলায়িত ভঙ্গিমায় নিজের চিকুর-জালকে হাতে ধরে জল নিংড়ে ফেলছিল সে। তার পোষ্য মরাল তার কেশরাশি থেকে ঝরে পড়া জলবিন্দু শূন্য থেকেই ঠোঁটে করে লুফে নিচ্ছিল। শিল্পার অলক্তক-রঞ্জিত পায়ে কাঠের পাদুকা। আচমকাই শিল্পা চোখ তুলে তাকাল। সে দেখল এক সুন্দর তরুণ তার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে রয়েছে। দ্রুতপদে সে কক্ষের দিকে রওনা দিল। কিন্তু সেই সুন্দর মুহূর্তের রেশ সুবলের মনে রয়ে গেল, আঁকা হয়ে গেল তার হৃদয়ের পাতায়।
এরপর সুবলের সঙ্গে আচার্য সৌম্য শ্রীদত্তর সাক্ষাৎ হয় এবং কাজ বুঝে নিয়ে সে ফিরে আসে। সেইদিন শিবিরে ফিরেই সে গড়তে আরম্ভ করে এক সদ্যস্নাতা কিশোরীর মূর্তি। আর তারপর থেকেই তার প্রত্যেক শিল্পকর্মে, প্রতিদিন একটাই মুখ ফিরে-ফিরে আসতে থাকে, শিল্পা...শিল্পা...শিল্পা! শিল্পার রূপ তার অবচেতনকে গ্রাস করে ফেলে। বিবিধ বেশভূষায়, ভাবভঙ্গিমায় এবং মুদ্রাতে শিলার বুকে সুবল শিল্পাকেই উৎকীর্ণ করতে থাকে। শিল্পার রূপ সুবলকে এমন ভাবে আচ্ছাদিত করে ফেলেছিল যে, সে হাতে ছেনি আর হাতুড়ি তুলে নিলেই তার কল্পনালোক থেকে সাকার হয়ে উঠত শিল্পার আকৃতি। সুবল তার কল্পসুন্দরীর সঙ্গে কথা বলত, তার মূর্তি গড়ত, তাকে সত্য বলে মনে করত। কিন্তু সবটাই কি তার কপোল-কল্পনা ছিল?
না। তা ছিল না। শিল্পা প্রতি রাতে সবার অগোচরে সুবলের শিবিরে যেত, কিন্তু সুবল বাস্তবের শিল্পাকে দেখেও তার কল্পনার শিল্পার থেকে আলাদা করতে পারত না। মায়া আর কায়ার মধ্যে পার্থক্য করার মতো বোধই থাকত না শিল্পসাধক সুবলের। শিল্পা নীরবে তার শিবিরে যেত, সুবল তার ভঙ্গিমা দেখে মূর্তি গড়ত। কাজ সমাপ্ত হলে শিল্পা আবার ফিরে আসত তার আবাসে।
কখনো–কখনো সুবল মহারানা নিজের কল্পনার শিল্পাকে প্রশ্ন করত, কথা বলত তার সঙ্গে, আর বাস্তবের শিল্পা সুবলের প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর দিত, প্রতিপ্রশ্ন করত তাকে। কতটা বাস্তব, কতখানি মিথ্যা সব বোধ হারিয়ে গিয়েছিল সুবলের। সব একাকার। নিজের প্রগাঢ় কল্পনাকে সাক্ষাৎ উপলব্ধি করতে পেরে সুবল নিজেকে ধন্য মনে করত, আর সুবলের কল্পনার সাম্রাজ্যের রাজ্ঞী হয়ে নিজেকে ধন্য মনে করত কিশোরী শিল্পা। এই অদ্ভুত, অবুঝ রহস্য অন্য কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব ছিল না। সুবল এবং শিল্পা পরস্পর, একে অপরের সঙ্গে যতটা নিবিড় ভাবে পরিচিত ছিল, ঠিক ততটাই ছিল অপরিচিত, অজ্ঞাত।
মঞ্চে অভিনয় চলছে। সুবল শিল্পার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে মনে মনে বলে চলেছে, ‘আমি তোমার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব, শিল্পা। তোমার অবদান না-থাকলে নাট্যমন্দিরের কাজ শেষ করতে পারতাম না। তোমার জন্যই প্রতিটা মূর্তি এত প্রাণবন্ত, এত লাস্যময়ী হয়ে উঠতে পেরেছে। তোমারই জন্য নৃত্যগুরুর কল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে পেরেছি। সুবল মহারানা চিরকাল তোমার কাছে ঋণী থাকবে। এবার বিদায় জানাই। এখন থেকে আমার কল্পনার পিঞ্জর থেকে তোমাকে আমি মুক্ত করে দিলাম। তোমার রূপের নেশা থেকে এবার আমিও মুক্তি চাই। শিল্পীকে মুক্ত আকাশের মতোই উন্মুক্ত এবং উদার হতে হয়, নাহলে সে নিজের শিল্পের ঔদার্য হারিয়ে ফেলে। বিদায় আমার কল্পনা! কোণার্ক তোমাকে নিজের বুকে স্থান দিয়ে অমর করে রাখবে। আমার স্বপ্নে তুমিও এটাই চেয়েছিলে।’
ওদিকে শিল্পাও কিন্তু শিল্পী সুবল মহারানাকেই দেখে চলেছে। সে ভাবছে, ‘প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের চরণ স্পর্শ করে পাষাণ পর্যন্ত জীবন্ত নারীতে পরিণত হয়েছিল। যদি আজ তোমার চরণ স্পর্শ করে আমার এই নারীদেহ তোমারই কোনো শিল্পকর্মের উপযুক্ত পাষাণখণ্ড হয়ে যেতে পারত! তাহলে তোমার হাতের ছেনিতে কেটে–কুঁদে আমার প্রত্যেক শিরা-ধমনীর যন্ত্রণাকে সমাহিত করে তুমি আমাকে তোমার শিল্পকর্মে পরিণত করতে। কী দুর্লভ হতো সেই মুহূর্ত! আমি শুধু এটাই চাই।’
আর এই দুজনের নয়নাভিসার সকলের অলক্ষ্যে একজন দেখে চলেছেন। নৃত্যাচার্য সৌম্য শ্রীদত্ত দীক্ষিত। তিনি মনে মনে নিশ্চিত, ‘অতি অবশ্যই এই দুজনের মধ্যে কোনো গোপন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। অবশ্যই হয়েছে। শিল্পাই সুবলের সামনে দিনের পর দিন প্রতিরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কোণার্ক অখণ্ড ব্রহ্মচর্য এবং সন্ন্যাসের পীঠস্থান। সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে আমার কন্যা শিল্পা মহারাজের প্রিয় শিল্পী সুবল মহারানার স্থির হৃদয়ে বিচলনের তরঙ্গ সৃষ্টি করছে। শিল্পার এই কাজ, এই আচরণ সাধনা এবং পবিত্রতার এই পীঠকে কলঙ্কিত করার পথে নিয়ে চলেছে। যখন রাজা স্বয়ং এই কথা জানবেন, তখন কী হবে? এবং শিল্পা নিজেও বাগদত্তা। সেক্ষেত্রে পরপুরুষের কল্পনাও যদি তাকে স্পর্শ করে, তাহলে তার কৌমার্য এবং নারীত্ব কলঙ্কিত হবে। হবে কী? এতদিনে তা হয়ে গিয়েছে।’
আবাসে ফেরামাত্রই শ্রীদত্ত শিল্পার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করলেন, ‘পাপিষ্ঠা, কী করে এই কাজ করলি? কেন করলি? নিজের কপালে কলঙ্ক লাগালি, আমার মুখ পোড়ালি, কোণার্ককে অপবিত্র করলি! তুই কেন সুবলের শিল্পের প্রতিরূপ হয়েছিস দিনের পর দিন? কেন? সম্পূর্ণ নাট্যমন্দির আর কোণার্কের ভিত্তি তোর বিলাসময় প্রতিকৃতিতে ভরে গিয়েছে। কেন করলি এমন কাজ? কেন করলি?’
শিল্পার মনে প্রথম প্রতিক্রিয়া এল, ‘শিল্পী তোমাকে ধন্যবাদ। তাহলে কি সত্যিই আমাকে একটি বার স্নানরত অবস্থায় দেখে তুমি নিজের হৃদয়ে স্থান দিয়েছিলে? তাহলে কি সত্যিই কোণার্কের নাটমন্দিরের প্রত্যেক মূর্তির মুখ আমারই মুখের আদলে গড়া হয়েছে? তাহলে কি সত্যিই শিল্পী আমার রূপ, যৌবন, জীবনকে ধন্য করে দিল? আমার অমরত্বের কামনা কি তাহলে সফল হয়েছে? নাহলে বাবা মূর্তিতে আমার মুখের আদল দেখে চিনলেনই বা কীভাবে? আহা শিল্পী, যদি তোমার চরণ দুটি পেতাম, এই বুকে ধরে লুটিয়ে পড়তাম আমি! কিন্তু তুমি আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়েও জীবন-পরিধির বাইরে থাকো।’
সৌম্য শ্রীদত্ত বলেই চলেছেন, ‘তুই প্রতি রাতে সুবলের শিবিরে গিয়ে তার সামনে প্রতিরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছিস। এতে যেমন আমার সম্মান আহত হয়েছে, তেমনই নিজেকে কলঙ্কিত করেছিস তুই। আঘাত দিয়েছিস সুবলের নিষ্ঠায়, একাগ্রতায়, শুচিতায়, তার ব্রহ্মচর্যে, সন্ন্যাসে। সবকিছু জানার পরে মহারাজ তোকে এবং আমাকে কঠোর সাজা দেবেন। আর সব কথা জানাজানি হলে তোর বিবাহ দেওয়াও আমার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।’
‘কিন্তু বাবা, এই কথা কে বলল যে আমি শিল্পীর শিল্পের জন্য প্রতিরূপ হতাম?’
‘সুবল নাট্যমন্দিরে যে কটা মূর্তি গড়েছে তার প্রত্যেকটার নাক, চোখ, মুখের আদল, অঙ্গ সৌষ্ঠব অবিকল তোরই দেহ বিবরণের সঙ্গে মিলে যায়। বিনা প্রতিরূপে এধরনের কাজ করা অসম্ভব!’
‘তাহলে কি ওই মূর্তিগুলোকে গড়ার ফলে কোণার্কের শিল্প কলঙ্কিত হয়েছে?’
‘কোণার্কের শিল্প নয় মূর্খ, তুই কলঙ্কিত হয়েছিস! তুই...তুই...তুই...! সুবলের শিল্প মহান। পাপ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।’
‘যদি আমার প্রতিরূপ দেখে সৃষ্ট শিল্প মহান হয়, যদি আমার প্রতিরূপ হওয়াতে কোণার্কের শিল্পের উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা আমার জন্যও গর্বের বিষয়, কলঙ্কের হতে যাবে কেন?’
‘কারো বাগদত্তা হয়েও তুই এই কাজ কীভাবে করলি?’
‘আমার হৃদয়ে কেবল একজন দেবতাই বাস করেন। সেখানে অন্য কারো স্থান পাওয়া অসম্ভব। শিল্পীর পূজা করে এই শিল্পা ধন্য হয়ে গিয়েছে।’
‘তুই কোণার্ক-শিল্পীর শিল্পকে কলঙ্কিত করছিস। কোণার্ককে কলঙ্কিত করছিস তুই। সুবল বিবাহিত পুরুষ। তুই কারো বাগদত্তা। তোদের দুজনের এভাবে একান্তে মেলামেশা করা মহাপাপ। সুবল মহারাজের প্রিয় পাত্র, কিন্তু ন্যায়ের সামনে ব্যক্তিগত ভাবনার কোনো মূল্য নেই। একথা কোনোভাবে রাজার কানে উঠলে তোর আর আমার সঙ্গে সুবলেরও শিরচ্ছেদ হবে। লোকে কোণার্কের নাম শুনলে ছিঃ ছিঃ করবে। মূর্খ, কেন বুঝতে পারছিস না যে কোণার্ক পীঠের ব্রহ্মচর্য আর একাগ্রতা ভঙ্গ করা অক্ষম্য অপরাধ?’
‘শিল্পীর একাগ্রতা যদি ভঙ্গই হয়ে থাকে, তাহলে সে এমন সুন্দর শিল্প গড়ল কীভাবে? বিচলিত মন আর অস্থির হৃদয় নিয়ে কি এধরনের শিল্পকর্মের জন্ম দেওয়া সম্ভব? কোণার্কের অমর্যাদা যদি কেউ করে থাকে, তাহলে সে আমি। শিল্পী নির্দোষ! আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি, সে জানতই না যে আমি তার কাছে যেতাম। নিজের শিল্পের জগতে সে লীন হয়ে থাকত। কল্পনার চরিত্রদের সঙ্গে কথা বলত। যখন মনে হতো ওর কোনো প্রশ্নের উত্তর আমার দেওয়া উচিত, তখনই আমি উত্তর দিতাম। কিন্তু ভাবে বিভোর শিল্পী বুঝতেই পারত না যে রক্ত-মাংসের শিল্পাই তাকে উত্তর দিচ্ছে। সে ওই উত্তরগুলোকেও কল্পনার জগৎ থেকেই পাওয়া বলে ধরে নিয়ে নিজের কাজে বিলীন হয়ে যেত। শিল্পীর অসাধারণ প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়েই আমি ওর প্রেমে পড়েছি। কিন্তু সেই কথাও ওকে জানাইনি। দোষ আমার। শিল্পীর কোনো ভুল নেই। সে নিষ্পাপ।’
নৃত্যগুরু নিজের স্পষ্টবাদী কন্যাকে দেখে এবং তার কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন, ‘এত স্পষ্টবাদীতা?’ কোণার্কের নির্মাণ এখন অর্ধেকেরও বেশি এগিয়ে গিয়েছে। এত বছরেও সুবলের স্বভাবে, আচরণে, ব্যক্তিত্বে কোনো বিচলন তিনি দেখেননি। সৌম্য শ্রীদত্ত অনুধাবন করলেন যে, সুবলের প্রতি শিল্পার এই প্রেম আসলে একপক্ষীয়। মনে জাগা ব্যথার পাশাপাশি একটু শান্তিও জন্ম নিল—কোণার্কের শিল্পী নিজের ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়নি। নিজেই নিজের মনকে প্রবোধ দিলেন নাট্যগুরু। মুখে বললেন, ‘শিল্পা, তুই স্পষ্টবাদী। সত্যি কথা বলেছিস। তাই অতি অবশ্যই তোর দণ্ড কিছুটা হলেও লাঘব হওয়া উচিত। নাহলে সুবল বিবাহিত জেনেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে তুই তার স্ত্রীর প্রতিও অন্যায় করেছিস, এই যুক্তির ভিত্তিতে আমিই মহারাজের কাছে তোর মৃত্যুদণ্ড দাবি করতাম।’
‘বাবা, মৃত্যুর ভয় আমার নেই। কোণার্কের শিল্পের সঙ্গে শিল্পী এই শিল্পাকে অমর করে দিয়েছে। আজই আমার মৃত্যু হোক বা কয়েক বছর পরে, এখন আর কী আসে যায়? আমি, আপনি, রাজা নৃসিংহ দেব, স্বয়ং শিল্পী সবাই কালের করাল গ্রাসের সামনে অসহায়। আজ নাহয় কাল মৃত্যু আমাদের প্রত্যেককে আলিঙ্গন করবে। কিন্তু কোণার্কের শিল্পের সঙ্গে অমর হওয়ার সৌভাগ্য সবার নেই। আমারই কি ছিল? রাজা নৃসিংহ দেব নাহয় কোণার্ক-নির্মাতা রূপে অমর হয়ে থাকবেন। আপনি অমর হয়ে থাকবেন নাটমন্দিরের মূর্তি-যোজনার জন্য, শিল্পী অমর হয়ে থাকবে তার অদ্বিতীয় ভাস্কর্যের কারণে। কিন্তু আমি? আমার জন্য কোনো কারণ, কোনো আয়োজন ছিল না। সবটাই নিয়তি। এই অকিঞ্চন শিল্পা অমর হয়ে গেল কেবলমাত্র শিল্পীর কল্পনায় স্থান পাওয়ার কারণে। এক্ষেত্রে আমার কোনো গুণ নেই। সবটাই রূপের ফল। সেই রূপ বিধাতার দেওয়া। তাতে আমার কোনো ভূমিকা নেই।
নৃত্য আপনি আমাকে শেখাননি। বিশ্ববাসী একসময়ে শুনে অবাক হবে যে, যেটুকু নৃত্য আমি শিখেছি, তা নিজের পিতাকে অভ্যাসরত অবস্থায় লুকিয়ে দেখার ফলেই শিখেছি—একলব্যের মতো। আর শিল্পীর কল্পনায় আমার স্থান পাওয়ার কারণ কী জানেন? শিল্পীর প্রতি আমার একান্ত অনুরাগ, যা স্বয়ং শিল্পীও জানে না। যদি আমার মৃত্যুতে শিল্পীর শিল্প-সাধনার পথ সুগম হয়, আপনার সম্মান ফিরে আসে, কোণার্ক-পীঠের পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ থাকে তবে আমি হাসিমুখে মৃত্যুবরণ করব।
লোকে বলে, হৃদয়ের স্পন্দনেরও নাকি এক ধরনের অনুনাদ থাকে, যা সেই হৃদয়ের অনুরণনে পরিণত হয়, যার নাম করে হৃদয় স্পন্দিত হয়েছে। আমার হৃদয়-স্পন্দনের অনুনাদ শিল্পীর হৃদয়ের অনুরণনে পরিণত হলে তা কি আমার অপরাধ? তবুও আমি মহারাজ নৃসিংহ দেবের দণ্ডের প্রতীক্ষায় নিজেকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করে ফেলেছি, বাবা। তিনি রাজা হিসেবে আর যা-ই করুন না কেন, ওই মূর্তিগুলোকে নষ্ট করতে পারবেন না।
এই নিয়তি। এই বিধির বিধান। এটাই আমার ললাটের লিখন। আমার অমরত্ব এতেই। কোনো যোগ্যতা না-থাকা সত্ত্বেও আমি শিল্পীর হাতে অমর হয়ে গেলাম। আর আমার কোনো মৃত্যুভয় নেই। আর মানসিক পাপকে এই জগতের কোনো শাস্ত্রে পাপ হিসেবে মানা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। চিন্তা করলে কারও শাস্তি হতে পারে না, তবুও মহারাজ যদি আমাকে শাস্তি দিতে চান—দেবেন, আমার কোনো আপত্তি নেই। যেটুকু জীবন যাপন করার ছিল, তা আমি করে নিয়েছি। আমার প্রাপ্য আমি বুঝে নিয়েছি। আপনি নৃসিংহ দেবকে সংবাদ দিন, বলুন, শিল্পা রাজ-বধীকদের হাতে মৃত্যুদণ্ড ভোগ করার জন্য সর্বতোভাবে প্রস্তুত।’
‘এই জন্যই, এই জন্যই তোকে প্রাণদণ্ড দেওয়া যাবে না। যে শাস্তি ভোগ করার সময় অপরাধীর দেহে, মনে কোনো কষ্ট অনুভূত হয় না, সেই শাস্তি তার জন্য যথেষ্ট নয়। আর তোকে মৃত্যুদণ্ড দিলে কোণার্ক অভিশপ্ত হয়ে যাবে। আর এই কথা মহারাজকে জানিয়ে বিচলিত করার কোনো অর্থ হয় না। যে মাতৃহারা কন্যাকে আমি পিতা আর মাতা দুইয়ের ভূমিকা পালন করেই বড় করে তুলেছি, সেই মেয়ে আজ আমার গর্বে আঘাত করেছে। তাই তার অপরাধ নির্ণয় করে দণ্ড বিধানের অধিকার আমারই। তোকে আমি নির্বাসন দিলাম!
কাল মধ্যরাত পেরিয়ে কোণার্ক বন্দর থেকে সিংহল দ্বীপের উদ্দেশে একটি বহিত্র যাত্রা করবে। তুই নিজেকে নির্বাসিত জেনে ওই জলযানে চড়ে সিংহল দ্বীপে চলে যা! সিংহল দ্বীপ, বালি দ্বীপ, যবদ্বীপ, মলয়দ্বীপে কলিঙ্গবাসীরা ক্লিঙ্গ নাম ধারণ করে বসবাস করে। সিংহল দ্বীপে তাদেরই একজন হয়ে তুই বাস করবি, আর বাকি জীবনটা সুবল মহারানার মানসিক অভ্যর্থনা করে করেই কাটাবি। উৎকলীয় শিল্পীরা সাগরপথে বিভিন্ন দ্বীপে আসা যাওয়া করে। তোর কাকা প্রদত্ত এখন কয়েকজন নর্তক–নর্তকীদের সঙ্গে সিংহল দ্বীপে অবস্থান করছে। সিংহল দ্বীপের শাসক নৃত্যশিক্ষার একটি প্রয়োগশালার আয়োজনে প্রদত্তকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই সূত্রেই সেখানে কয়েকজন প্রস্তর-শিল্পী এবং তাদের পরিবারও রয়েছে। তাই সিংহলে বাস করতে তোর কোনো সমস্যা হবে না। যেহেতু তোর হবু স্বামীর প্রতি আর তোর কোনো আকর্ষণ নেই, তাই জোরে করে বিবাহের আয়োজন করলে তা দুজনের জন্যই নরক যন্ত্রণার সমান হয়ে দাঁড়াবে। তাই তোর ভাবী শ্বশুরবাড়িতে আমি জানিয়ে দেব যে, সাপের দংশনে তোর মৃত্যু হয়েছে। কেউ কোনোদিন জানতে পারবে না যে, শ্রীদত্ত দীক্ষিতের কন্যা মানসিক অভিসার করেছিল, নিজের হবু স্বামীর প্রতি নিষ্ঠাচ্যুত হয়েছিল এবং নিজেকে ও নিজের বংশকে কলঙ্কিত করেছিল।’
‘আমার জন্য আপনি ওদের মিথ্যে কথা বলবেন?’
‘বংশকে কলঙ্কিত হতে দেওয়ার থেকে মিথ্যা বলা ভালো নয় কি? শিল্পা, তোর জন্য আজ আমার কুলপুরুষের সম্মান, কীর্তি, মর্যাদা মাটিতে মিশে যেতে চলেছে। সেইসব কিছুকে রক্ষা করার জন্য যদি আজ মিথ্যে বলে আমাকে পাপী হতেও হয়, তবুও তা-ই শ্রেয়। অবশ্য আমি এসব কথা বলছিই বা কেন? আমার মনে যে ঝড় উঠেছে, তার মুখোমুখি হওয়া সহজ কাজ নয়। যে সৌম্য শ্রীদত্ত সকালে নিজের মেয়ের মুখ না-দেখে জলস্পর্শ করত না, সে-ই আজ তার মেয়েকে নির্বাসন দিচ্ছে—এই কথাটা একটু ভেবে দেখিস তুই। এই শাস্তি যে একা তুই ভোগ করবি তা নয় কিন্তু, এই দণ্ডের সমান ফলভোগ আমাকেও করতে হবে। তোর এই বৃদ্ধ পিতার বেঁচে থাকার জন্য তোর বেঁচে থাকাটা খুব দরকার।
আবার কোণার্কের প্রতিষ্ঠার জন্য তোর দেশত্যাগও সমান ভাবে প্রয়োজনীয়। এখন সুবলের চোখে শুধু স্ফুলিঙ্গ দেখা দিয়েছে, কিন্তু সেই আগুনকে নিয়ন্ত্রণে না-আনলে পরে তা-ই হয়ে উঠবে আগ্নেয়গিরি এবং একসময়ে লেলিহান অগ্নিশিখা কোণার্ককে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। আমার কাছে তোর এই নির্বাসন তোর মৃত্যুর থেকেও বেশি নিদারুণ, কিন্তু কোণার্কের জন্য এই শাস্তি তোকে ভোগ করতেই হবে।’
‘যখন আপনার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি শিল্পকে ভালোবাসতে শিখেছিলাম, তখন নিপাট বালিকাই ছিলাম, বাবা। আর সেই আমিই আজ একই আদর্শ থেকে একজন শিল্পীকে ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আমি শিল্পা নাম্নী কোনো স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব নই, আমি নাট্যাচার্য সৌম্য শ্রীদত্তর কন্যা মাত্র। ভালোবেসে আমি ভুলই করেছি বাবা। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন! আমি আপনার দেওয়া শাস্তি স্বীকার করলাম। আমার পিতার গর্ব অক্ষুণ্ণ থাক! শিল্পীর গৌরব অক্ষুণ্ণ থাক! কোণার্কের প্রতিষ্ঠা অক্ষুণ্ণ থাক!’
‘সাগর-যাত্রার জন্য প্রস্তুত থেকো। এবং এই কথা যেন পাঁচকান না হয়!’ সৌম্য শ্রীদত্তর কণ্ঠস্বর মৃত্যুর মতো শীতল মনে হল।
‘অবশ্যই। আমি প্রস্তুত থাকব। একটাই অনুরোধ—আমি কি একবার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারি? অন্তিম বার। আর হয়তো দেখা হবে না।’ শিল্পার স্বর করুণার্দ্র হয়ে উঠল।
জন্ম দিতেই যে সন্তানের মা পৃথিবীর মোহমায়া ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল, সেই সন্তান যদি মায়ের কথা বলে তাহলে কি কেউ না করতে পারে? কিন্তু কে শিল্পার মা?
বয়ালিশবাটিতে গঙ্গেশ্বরী দেবীর শিখরহীন মন্দির। কোণার্ক নির্মাণের কয়েক বছর আগের কথা—তখন দেবী অমোক্ষ, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত এবং অপূজিত অবস্থায় বিরাজ করতেন। গাভীদের বাঁটে মুখ দিয়ে তিনি নাকি তাদের সব দুধ শুষে পান করতেন। রাখালরা ধরতে পারত না যে ঠিক কী ঘটছে। একদিন এক রাখাল ঠিক করলে, ‘আমার গোরুর দুধ কে চুরি করে খায় আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব।’ গোরুগুলোকে বনে ছেড়ে দিয়ে সে অল্প দূরেই একটা অশ্বত্থ গাছের পিছনে লুকিয়ে দেখতে লাগল। সে দেখল এক অপূর্ব সুন্দরী নারী গাভীর স্তনে মুখ দিয়ে বাছুরের মতো দুধ পান করছে। আগুপিছু ভাবনাচিন্তা না-করেই রাখাল সেই সুন্দরী নারীর মাথায় নিজের হাতের লাঠি দিয়ে এক ঘা মারল। ফেটে গেল সেই নারীর মাথা। সেই রাতেই ওই গোপালকের একমাত্র পুত্র আচমকাই ধড়ফড়িয়ে মারা গেল। না কোনো রোগ, না কোনো অপঘাত।
পুত্রের পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন করার পর রাখাল ভাবতে বসল যে, সে এমন কী কাজ করল যার পাপের ফল পেল! কোনো ভুল করেছে কি? তখন তার মনে পড়ে গেল সেই সুন্দরী নারীর কথা, তার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করার ঘটনা। সে সেই স্থানে ফিরে গেল যেখানে ওই নারীর দর্শন পেয়েছিল। গিয়ে দেখে মাথা থেকে পড়া রক্তের বিন্দু জমাট বেঁধে স্থানে স্থানে পড়ে আছে এবং সেই রক্তের দাগ একটি নির্দিষ্ট দিকে এগিয়েছে। এভাবেই চিহ্ন ধরে এগিয়ে গিয়ে সে দেবীর সন্ধান পেল। দেবীর ধড় তখন লুপ্ত হয়েই গিয়েছিল। শিরটুকু অবশিষ্ট ছিল। মাথা থেকে রক্তের তিনটি ধারা নেমে শুকিয়ে দাগ সৃষ্টি হয়েছিল। রাখাল শ্রদ্ধাভরে সেই মস্তকটাকেই তুলে এনে একটি কুটিরে স্থাপন করল, দেবী রূপে। তার পর থেকেই দেবীর পূজা আরম্ভ হয়।
দেবী গঙ্গেশ্বরীর ভগিনী দেবী যজ্ঞেশ্বরী। তিনি অনঙ্গভীম দেবকে স্বপ্নাদেশ দিলেন, ‘এক রাতের মধ্যে দেবী গঙ্গেশ্বরীর মন্দির নির্মাণ করতে হবে’। ভয়ে হোক বা ভক্তিতে অনঙ্গভীম দেব ব্যবস্থা করলেন। এক রাতের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল মন্দির, কিন্তু ওই অল্প সময়ের মধ্যে মন্দিরের শিখর বা চূড়া স্থাপন করা সম্ভব হল না। দেবীর মন্দির তখন থেকেই শিখরবিহীন অবস্থায় রয়েছে। দেবী গঙ্গেশ্বরী অবশ্য এখনও কুটিরেই পূজিত হন।
শিল্পার মা এই দেবী গঙ্গেশ্বরীকেই নিজের ইষ্ট জ্ঞান করতেন। শিল্পার জন্মের সময় তাঁর মৃত্যু হয়। শিল্পা ছোটবেলায় যখন তার মায়ের জন্য কান্নাকাটি করত তখন তার বাবা শ্রীদত্ত একবার তাকে বলেছিলেন, ‘দেবী গঙ্গেশ্বরীই তোর মা!’
ছোট্ট শিল্পা একবার জেদ ধরে বসল, ‘আমি মা’কে দেখতে চাই।’
নিরুপায় নৃত্যগুরু তখন শিল্পাকে দেবী গঙ্গেশ্বরীর মন্দিরে এনে বললেন, ‘যা, ভিতরে গিয়ে দেখ, তোর মা বসে আছেন। তোর মা ডাকলে দেখা দেয় না, কিন্তু না-চাইতেই সব দেয়। মানুষের ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই। তোর মায়ের ইচ্ছাই সব। তিনি চাইলে সব সম্ভব। যা, ভেতরে যা!’
শিল্পা মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করার পর রুদ্ধ কণ্ঠে শ্রীদত্ত প্রার্থনা করেছিলেন, ‘মা, তুমি জগন্মাতা! এই শিশুর কোনো দোষ নেই। মা-হারা সন্তানের কান্না সহ্য করতে না-পেরে আমিই বলেছি তুমি ওর মা। সবই তোমার ইচ্ছা মা। এই শিশুকে তুমিই সামলিও মা।’
শিল্পা যখন মন্দির থেকে বেরিয়ে এল, তখন তার ঠোঁটে দুধের বিন্দু লেগে ছিল। সে বেরিয়ে এসেই শ্রীদত্তকে বলেছিল, ‘আমার মা খুব ভালো। মায়ের মতো ভালো কেউ হতে পারবে না।’ এরপর থেকে শিল্পা আর কখনো নিজের মায়ের জন্য জেদ করেনি। যখনই মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য তার মনখারাপ করত, তখনই সে দেবী গঙ্গেশ্বরীর মন্দিরে চলে যেত। মায়ের উষ্ণ আশিস দেবী গঙ্গেশ্বরীর আশীর্বাদ হয়ে তার সঙ্গেই থাকে সদাসর্বদা। সেই মা গঙ্গেশ্বরীর সঙ্গে তার কন্যা শিল্পার সাক্ষাৎ কে আটকাবে?
মেয়ের মুখে মা গঙ্গেশ্বরীর দর্শনের কথা শুনে শ্রীদত্ত বললেন, ‘কাল ভোরে চলে যাস। কিন্তু মনে রাখবি, শুধু তোর মায়ের সঙ্গেই দেখা করার অনুমতি দিলাম। অন্য কারো সঙ্গে নয়। শুধু মায়ের সঙ্গে...।’
এই গঙ্গেশ্বরী এবং যজ্ঞেশ্বরী দেবী শিল্পী-সম্প্রদায়েরও আরাধ্যা। প্রত্যেক শিল্পী প্রতিদিন স্নান সেরে গঙ্গেশ্বরী ও যজ্ঞেশ্বরী দেবীর দর্শন করে তবেই হাতে ছেনি-হাতুড়ি তুলে নেয়।
সূর্যোদয়ের অনেক আগেই শিল্পা গঙ্গেশ্বরী দেবীর মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত হল। কেউ তাকে দেখে ফেলার আগেই তাকে সরে পড়তে হবে। দেবীর দর্শন করতে-করতে শিল্পা মনে মনে ভাবতে লাগল, ‘জন্মদাত্রী মা জন্মের পরেই আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আজ তুমিও ত্যাগ করে দিলে মা? তুমিও দূরে ঠেলে দিলে? সঙ্গী-সাথীদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছি, চন্দ্রভাগার তট হারিয়ে যাচ্ছে আমার বুক থেকে। কিন্তু কেন? সাগরপাড়ের একটি অপরিচিত দ্বীপে আমাকে কেন নির্বাসন দিলে, মা?’
দেবীর বিগ্রহের সামনে নিষ্কম্প দীপশিখার মতো বসে মৃদু, মধুর স্বরে সে মন্ত্রপাঠ করে চলেছে। তার মন্ত্রোচ্চারণে তারই হৃদয় সজল হয়ে উঠছে এক পবিত্র আনন্দে, ব্যথার বারিধারায়। মনের অশান্ত সাগরকে উদ্বেলিত করতে থাকা প্রশ্নরা উত্তরের কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে। ছোটবেলায় রাজজ্যোতিষী তার জন্মছক দেখে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, ‘দীক্ষিত মশাই, এই কন্যা দেবীর অংশ। জগৎ সংসারে এর আগমন কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই হয়েছে। যতদিন এই ধরায় থাকবে, ততদিন হাসি-আনন্দে কাটাবে। নিজের উদ্দেশ্য পূর্ণ হলেই নিজের ধামে ফিরে যাবে দেবী। এই মেয়েকে নিয়ে বিশেষ চিন্তা করবেন না।’
শিল্পা ভাবতে থাকে, ‘তবে কি আমি যে দেবীর অংশ, সেই দেবীর নিবাস সিংহল দ্বীপেই? তবে কি তিনিই আমাকে সেখানে ডাকছেন? তাহলে কি এটাই ঠিক মা? তুমি সেখানেও আমার মা হয়ে আমাকে আগলাবে তো? আসি, মা। সিংহল দ্বীপে আবার দেখা হবে।’
শিল্পা মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে নিজের আরাধ্যাকে প্রণাম জানাল। মাথা তুলতেই মনে একটা কামনাও জাগল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তা মন থেকে ছুড়ে ফেলে দিল শিল্পা, ‘না, আর কোনো কামনা নয়, আর কোনো চাহিদা নেয়।’ দেবীর দিকে মুখ করে উলটো পায়ে পিছু হাঁটতে আরম্ভ করল সে। তার চোখ দেবীর বিগ্রহের উপরে স্থির। এভাবে পিছু হঠতে গিয়েই কারো সঙ্গে তার ধাক্কা লেগে গেল।
কেউ একজন বলে উঠল, ‘ক্ষমা করবেন দেবী, আমি বুঝতে পারিনি। আমার কোনো দোষ নেই।’ গলা শুনেই পিছনে ফিরে তাকাল শিল্পা। বলিষ্ঠ দেহ, আয়ত নেত্র, সৌম্য বপুর যুবক স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। মন্দিরদ্বারে তার সঙ্গে সুবল মহারানার ধাক্কা লেগেছে। সুবল মহারানা...শিল্পার শিল্পী। যার প্রতিমার পূজারিণী হওয়ার অপরাধেই আজ সে নির্বাসনের দণ্ড ভোগ করতে বাধ্য হয়েছে, সেই সুবল মহারানা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ‘মা গো, যা চাওয়া হয় না, তুমি তাও মন পড়ে দিয়ে দাও!’ মনে মনে বলল শিল্পা।
সুবল বলল, ‘দয়া করে আমার পথ ছেড়ে দিন, দেবী। নাহলে এখান থেকে ফিরে কাজ আরম্ভ করতে বিলম্ব হবে। আকাশে মেঘ করে এসেছে। বৃষ্টি শুরু হলে ফেরা কঠিন হবে।’
শিল্পা মুখে কিছু না-বললেও মনে মনে ভাবল, ‘শিল্পী, আমার জন্য কি তোমার দুদণ্ড সময়ও নেই? অবশ্য তোমার কাছে কোণার্ক ছাড়া আর কোনো কিছুর জন্যই সময় নেই। শিল্পা, তুই নিজে সেই পথ ছেড়ে এসেছিস। এবার এই পথও ছেড়ে শিল্পীকে যেতে দে।’
শিল্পা শিল্পীর পথ ছেড়ে দাঁড়াল। সুবল এগোতেই শিল্পা মাটিতে বসে পড়ে তার দাঁড়ানো জায়গাটাতেই মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে নিল। শিল্পীর তা চোখ এড়াল না। অবগুণ্ঠনের আড়ালে থাকা মুখটাকে চেনার চেষ্টা করল সুবল। তার চোখমুখের অভিব্যক্তি দেখে শিল্পার সারা দেহ, মন, আত্মা শিহরিত হয়ে উঠল, ‘তাহলে শিল্পী আমাকে চেনার চেষ্টা করছে। হয়তো বা চিনেও ফেলেছে। ও কি জানে আমার বিদায়ের সময় উপস্থিত? বিদায়বেলায় আলিঙ্গনই তো রীতি।’
শিল্পা অনুভব করল—শিল্পী তাকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করছে। না, এ ভ্রম মাত্র। তা ভাঙতেও বিলম্ব হল না। আর সঙ্গে সঙ্গেই শিল্পার ঠোঁট থেকে অস্ফুট ধ্বনি বেরিয়ে এল, ‘বিদায় শিল্পী!’
প্রকৃতিও যেন তার এই শেষ উচ্চারিত কথাটা সহ্য করতে পারল না। ঝমঝম করে একরাশ অভিমান নিয়ে ঝরে পড়ল ধরার বুকে। সেই শব্দে ঢাকা পড়ে গেল শিল্পার কণ্ঠ।
তুমুল বর্ষা মাথায় নিয়েই শিল্পা নিজের পথ ধরল। একবার পিছনে ফিরে তাকাল, মনে হল যেন শিল্পীও তাকে অনুসরণ করছে। কিন্তু এসবই ভ্রম। আগের বারের মতোই।
শিল্পার নিঃশব্দ ক্রন্দন বর্ষার ধারাপাতে মিশে গেল। জলধারা আরও তীব্র হল।
নির্ধারিত সময়েই বহিত্র বন্দর থেকে রওনা দিল। নির্বাসিত কলিঙ্গ-কন্যা সহ অন্যান্য যাত্রীদের নিয়ে সেই জলযান বিদায় জানাতে আসা স্বজনদের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। শ্রীদত্তের এই নিষ্ঠুর ত্যাগ, শিল্পার এই নিদারুণ নির্বাসনের কথা কেউ জানতেও পারল না। সুবল মহারানা বুঝতেও পারল না যে তার প্রেরণা, তার প্রতিরূপ, তার শিল্পা চিরদিনের জন্য উৎকল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হল।
শ্রীদত্ত মহাশয়ও বন্দরে এসেছিলেন শেষবারের মতো কন্যাকে বিদায় জানাতে। বন্দর থেকে ফেরার আগে তিনি জোড়করে সাগরকে প্রণাম করে বললেন, ‘হে মহোদধি, আমি আমার কন্যাকে জনক-দুহিতার থেকেও কঠিন শাস্তি দিলাম। তুমি সাক্ষী থাকলে। আমি নিজের সকল শিল্প, সমস্ত প্রেরণার উৎস, নিজের পুত্রী শিল্পাকে তোমায় অর্পণ করলাম, রত্নাকর!’
সৌম্য শ্রীদত্ত সাগরতট থেকে ফিরে এলেন বটে, কিন্তু নিজের কন্যাকে চিরদিনের জন্য নির্বাসিত করা পিতার মন ওই সাগরের পাড়েই কোথাও রয়ে গেল।
নিয়তি যেমন নিজের ছন্দে চলে, সেভাবেই চলছিল। মনে বিঁধে থাকা কাঁটা কাকে, কখন, কোথায় এবং কতখানি ব্যথা দেয় তার আভাস অন্য কেউ পায় না। কারও থাকায় বা না-থাকায়, কারও চলে যাওয়ায় বা থেকে যাওয়ায় জাগতিক প্রপঞ্চে কোনো বাধা পড়ে না।
দিনে–প্রতিদিনে কোণার্ক সম্পূর্ণ হওয়ার পথে এক পা–এক পা করে এগিয়ে চলেছিল। ওদিকে বাইরে থেকে আপাত শান্ত সমাহিত সাগরের ভিতরে হিল্লোল জাগছিল। ইখতিয়ার বেগ আবার উৎকল আক্রমণ করে বসল এবং এবারে রাজা নৃসিংহ দেব ইখতিয়ার বেগ নামক কাঁটাগুল্মটিকে সমূলে উৎপাটন করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
সেনাপতি তুলসী, সেনাপতি রাজগোবিন্দ, সেনাপতি সুরু এবং সেনাপতি বিষ্ণুদেবকে সঙ্গে নিয়ে প্রধান সেনাপতি রূপে স্বয়ং রাজা নৃসিংহ দেব উৎকল-বীরদের বাহিনী সহ রণক্ষেত্রে যবন সৈন্যদের কালান্তক রূপে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। প্রলয় আরম্ভ হল।
ইখতিয়ার বেগ কোনোভাবে আজকের দিনটা উতরে হওয়ার অপেক্ষা করছেন, আর নৃসিংহ দেব ভাবছেন আজকেই এই যুদ্ধ শেষ করে দেবেন, ‘আর একটা সাংঘাতিক আঘাত দিলেই ইখতিয়ার বেগ যুদ্ধে টিকতে পারবে না।’
নিজের প্রিয় হস্তী নিঃশঙ্ক’র পিঠে চেপে মহারাজ নিজেই যুদ্ধ সঞ্চালনা করছেন। প্রতিপক্ষও কম যায় না। আজকের ভীষণ সংগ্রামে নিঃশঙ্ক’র পিঠের হাওদাখানা ভেঙে তছনছ হয়ে গিয়েছে।
সূর্য অস্ত যাচ্ছে, সন্ধ্যা নামবে। নৃসিংহ দেব তখন ভীষণ যুদ্ধে ব্যস্ত, এমন অবস্থায় হাওদা বদলানো অসম্ভব। ওদিকে ভাঙা হাওদার মধ্যে থেকে অস্ত্রচালনা করতেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পক্ষ-বিপক্ষ সকলেই ভাবছে এখন হয়তো রাজা রক্ষণাত্মক ভাবে লড়াই চালিয়ে যাবেন। কিন্তু সকলের সমস্ত ভাবনায় জল ঢেলে মহারাজ নিজের দলের সমস্ত সুরক্ষিত সৈন্যদের যুদ্ধে নামিয়ে দিলেন। ‘জগন্নাথ স্বামীর জয়!’ বলে শত শত পাইক বীর শত্রুদলের সেনার উপরে সমুদ্রের উন্মত্ত ঢেউয়ের মতোই আছড়ে পড়ল। ইখতিয়ার বেগ এমন অবস্থার কথা স্বপ্নেও কল্পনা করেনি।
এক যবন সেনাপতি নিজের ঘোড়ার পিঠে চড়ে নৃসিংহ দেবের হাতির সামনে এসে দাঁড়াল। নৃসিংহ দেব যতক্ষণে নিজের ভল্ল নিয়ে তাকে তাক করে ছুড়ে মারবেন, ততক্ষণে নিঃশঙ্ক নিজের শুঁড় দিয়ে যবন সেনাপতির গলা ধরে তাকে শূন্যে ছুড়ে দিল। পূর্বানুমান মতো অভীষ্ট লক্ষ্যের উদ্দেশে ততক্ষণে ছুটে গিয়েছে নৃসিংহ দেবের হাতের বল্লম। অস্ত্র গিয়ে আঘাত করল যবন সেনাপতির ঘোড়াকে। আহত ঘোড়া লাফিয়ে উঠে নিজের সামনের দুই পা-দিয়ে নিঃশঙ্কের মাথায় প্রচণ্ড জোরে আঘাত করে বসল। হাতি কেঁপে উঠল। মহারাজের ভারসাম্য বিঘ্নিত হল এর ফলে। হস্তীপাল মাটিতে পড়ে গেল। হাওদা না-থাকায় নৃসিংহ দেবও নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি মাটিতে পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই জ্ঞান হারালেন।
মহারাজকে পড়ে যেতে দেখেই নিঃশঙ্ক তাঁকে নিজের চার পায়ের আড়ালে সুরক্ষিত করে ফেলল। উৎকলের চার সেনাপতির সঙ্গে তাঁদের প্রধান সেনাপতির সমস্ত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। বন্ধ হয়ে গেল নির্দেশ পাওয়া। অবস্থা ভালো নয় দেখে সেনাপতি রাজগোবিন্দ যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য সঙ্কেত দিতে বললেন। বেজে উঠল তূর্য।
কেউ রাজাকে খুঁজেই পাচ্ছে না। নিঃশঙ্ককে চেনাও এখন দুষ্কর। কারণ তার গা থেকে রাজকীয় বেশ খুলে গিয়েছে যুদ্ধের আঘাতে। হাওদা অবশিষ্ট নেই। উড়ে গিয়েছে রাজকীয় পতাকা। উৎকলের ভাগ্যাকাশকে ঢেকে দিল দুর্ভাগ্যের মেঘ। বিশেষ দূত রাজধানীতে সংবাদ নিয়ে গেল, ‘শত্রু-বিমর্দক মহারাজ নৃসিংহ দেব যুদ্ধে বীরের মৃত্যু বরণ করেছেন। তাঁর শব এখনও মেলেনি। সন্ধান চলছে। নিঃশঙ্ককেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’
রাজশোক পালনের উদ্দেশে উৎকলের রাজকীয় ধ্বজা নামিয়ে দেওয়া হল। রাজপ্রাসাদে এই নিদারুণ সংবাদ পৌঁছানো মাত্রই সীতাদেবী মূর্ছিত হয়ে পড়লেন। চন্দ্রাদেবী বিষাদে পাষাণ হয়ে গেলেন। কোণার্ক-শিল্পীদের ছেনি আর হাতুড়ির শব্দ থেমে গেল। প্রজারা অবসন্ন। মন্ত্রী শিব সামন্তরায় হতপ্রভ, ‘এবার উৎকলের কী হবে? কোণার্কের কী হবে? উৎকল পরাধীন হয়ে যাবে! যুবরাজ কুমার ভানুদেব এখনও নিতান্তই বালক, যবন শত্রুর সম্মুখীন হতে পারা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। রাজপরিবারের গরিমার কী হবে? তবুও রাজার অন্ত্যেষ্টির আগে যুবরাজের রাজ্যাভিষেক করাই বাঞ্ছনীয়। উৎকলের সিংহাসন শূন্য থাকতে পারে না। সীতাদেবীর অভিভাবকত্বে এবং কুশল মন্ত্রীদের সহযোগিতায় শাসনকাজ সামলাবেন ভানুদেব। যবনদের প্রতিরোধ করতে না-পারলে ওই বর্বরের দল উৎকলের বুকে মরণ-নাচন শুরু করবে, পাপ নাচবে আমাদের অঙ্গনে। সূর্যমন্দিরের প্রতিষ্ঠা হবে না। কোণার্কের শিল্পকলা ধুলোয় মিশে যাবে।’
বিশু মহারানা ভাবছিলেন, ‘তাহলে কি সুবলের ভবিষ্যৎবাণীই সত্য হতে চলেছে? বাস্তুদোষের জন্যই কি এই প্রতিকূল অবস্থার মুখে পড়তে চলেছে কোণার্ক তথা সমগ্র উৎকলের ভবিষ্যৎ? কোণার্ক কি আর সম্পূর্ণ হবে না?’
সুবল সব শুনেও নির্লিপ্ত। তার মনে এখন বিশু মহারানার বলা কথাগুলো ভেসে উঠছে, ‘তুমি কেবল কর্ম করার অধিকারী। ফল তোমার হাতে নেই। ফলের আশায় আসক্ত হয়ো না। নিরন্তর কর্মরত থাকো। শুধুই কর্ম করো।’ তার হাতের ছেনি একবার কেঁপে উঠল। কিন্তু ওই একবারই। আর নয়। মন স্থির করে সে আবার নিজের কাজে লেগে পড়ল, ‘মহারাজ দেশের জন্য নিজের প্রাণ দিয়েছেন। তাঁর আশা পরিপূর্ণ না-হওয়া পর্যন্ত সুবল মহারানার হাত কাজ থামাবে না। ইখতিয়ার বেগ আমার হাত কেটে নেবে? নিক! প্রাণে মেরে ফেলবে? মেরে দিক! কিন্তু কোণার্কের কাজ আমি থামাব না। মন্দিরের চূড়া স্থাপিত হবে না? না-ই হোক! অনেক দেবতাই চূড়াবিহীন মন্দিরে বিরাজ করেন। এই তো স্বয়ং মা গঙ্গেশ্বরী দেবীর মন্দিরেরই শিখর নেই। উৎকলের আকাশ থেকে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার আগে কোণার্কের রত্নবেদীতে সূর্যদেবকে প্রতিষ্ঠা করবই করব। মহারাজ নৃসিংহ দেবের আত্মার শান্তির জন্য সূর্যদেবতার বিগ্রহ শীঘ্রাতিশীঘ্র প্রতিষ্ঠা করা অনিবার্য। সুবল মহারানার থামা মানা। সে থামবে না। তার হাতের ছেনি বিরতি দেবে না। শোকে জড়বৎ হয়ে যাওয়া কোনো শিল্পীর ধর্ম নয়। জিতেন্দ্রিয় হয়ে ওঠার অর্থ শুধু বাসনাকে অর্গলবদ্ধ করা নয়। লোভ, ক্রোধ, মোহ, শোক, মদ, মাৎসর্য এদের কোনোটারই এই জিতেন্দ্রিয় পীঠে কোনো স্থান নেই।’
এক-এক করে সব শিল্পীরা সুবলের কাছে এল। প্রত্যেকে দেখে গেল সুবলের হাত চলছে। ছেনি কথা বলছে পাথরের সঙ্গে। সুবল মুখ তুলে তাকিয়ে তাদের দেখল। বিশু মহারানা অনর্গল কেঁদে চলেছেন। কাঁদছে প্রত্যেক শিল্পীই। নিঃশব্দে। সুবল চোখ নামিয়ে নিল। মুখ ফিরিয়ে নিল কাজের দিকে। রাতের নৈঃশব্দ্যে সুবলের ছেনি পাথরের বুকে নয়, প্রত্যেক কোণার্ক-শিল্পীর হৃদয়ে অনুপম ভাস্কর্য খোদাই করে চলল।
নিঃশঙ্ক একটি বিশালকায় রণহস্তী। অগুণতি যুদ্ধে সে নৃসিংহ দেবের সঙ্গী থেকেছে। তাকে কোনো কথা বোঝানোর জন্য নৃসিংহ দেবকে সঙ্কেত দিতে হয় না, মহারাজের মনের কথাই সে বুঝতে পারে। নিজের শুঁড় প্রভুর দেহে বুলিয়ে বুলিয়ে সে এতক্ষণে বুঝে ফেলেছে যে আঘাত সাংঘাতিক। হয়তো রাজা আর জীবিত নেই। তার ছোট ছোট চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। নিজের প্রভুকে যুদ্ধভূমিতে ছেড়ে সে পালিয়ে আসতে পারে না। সে অপেক্ষা করছে। কেউ তো আসবে রাজার শব নিতে।
অসংখ্য তারায় ভরে উঠেছে আকাশ। উৎকলের পুণ্যাত্মাদের আত্মারা অনন্তের বুকে নক্ষত্র হয়ে জ্বলজ্বল করছে। এমন সময় আকাশ মেঘে ঢেকে গেল। বৃষ্টি আরম্ভ হল আচমকাই। অসময়ের এই বর্ষণ কি তবে নৃসিংহ দেবের বলিদানে আকাশের করুণ অভিষেক কিংবা মূক রোদন? নৃসিংহ দেবের রক্তাক্ত শরীর রণভূমিতে, ধরিত্রীর উদার আলিঙ্গনে নিশ্চল হয়ে পড়ে রয়েছে। অগুনতি বীর মাতৃভূমির হিতার্থে নিজেদের প্রাণের বলিদান দিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত। মৃত্যুর শীতল ঔদার্যে শত্রু, মিত্র দুপক্ষের রক্তই মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে।
এই অন্ধকারে এখন আর কে আসবে? কী করবে নিঃশঙ্ক? অনবরত কেঁদে চলেছে অবলা জীবটা। সে ভাবছে, রাজার শবদেহটাকে যুদ্ধভূমির বাইরে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু কীভাবে? দেহটাকে শুঁড়ে ধরে তুলে নিয়ে যদি নিজের পিঠের উপরে রাখে, তাহলেও চলাফেরার ছন্দে তা মাটিতে পড়ে যাবে। কী করবে এবার নিঃশঙ্ক? আশেপাশে পড়ে থাকা অন্যান্য সৈনিকদের শবদেহগুলোকে শুঁড়ে করে সরিয়ে সরিয়ে নিঃশঙ্ক কিছুটা জায়গা বের করল। তারপর নিজে একটা দিকে সরে গিয়ে শুঁড়ে করে রাজার দেহের উপর মোলায়েম পরশ দিল সে। বৃষ্টি ঝরে চলেছে।
স্নেহস্পর্শ আর জলের ধারায় চেতনা ফিরে এল রাজার দেহে। তিনি সামান্য কেঁপে উঠলেন। আস্তে আস্তে লুপ্ত জ্ঞান ফিরে পাচ্ছেন রাজা। তাঁর মনে হচ্ছে—যেন কোনো বালক তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে চলেছে। চোখ মেলে তাকালেন তিনি। তার অনুমান সত্যি। মনে হল পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে আরও এক জন। সে এক গৌরাঙ্গ কিশোর। তারা দুজনে মিলে ধরে তাঁকে ওঠানোর চেষ্টা করছে। তবে কি জগন্নাথ স্বামী নিজে তাঁর ভ্রাতা বলরামকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধভূমিতে এসেছেন? আর কীসের চিন্তা? স্বয়ং জগন্নাথ মহাপ্রভু নিজের ভাইকে নিয়ে নৃসিংহ দেবকে নিয়ে যেতে এসেছেন।
নিঃশঙ্কও দেখল—এক বালক আর একটি কিশোর। সে বুঝতে পারল যে, তারা দুজনে রাজার কোনো অনিষ্ট করবে না। অবশ্য এখন আর রাজার কোন ভয়টাই বাকি আছে? বালক নিঃশঙ্কর গা চাপড়ে আদর করতেই সে সামনের দুই পা ভাঁজ করে মাটিতে উবু হয়ে বসল। হাতির শুঁড় ধরে বালক উঠে গিয়ে বসল তার পিঠের উপর। এরপর হাতিটা উঠে দাঁড়াল। মন্ত্রাবিষ্টের মতো সে অত্যন্ত সাবধানে রাজাকে পিঠের উপরে তুলে নিল। বালক নৃসিংহ দেবকে ধরে রাখল। নীচে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরটি হাঁটা দিল। তাকে লক্ষ্য করে এগোতে শুরু করল নিঃশঙ্ক।
কিছুটা পথ এভাবে চলার পরে কিশোরের কোমর শুঁড়ে করে জড়িয়ে ধরে তাঁকে নিজের মাথায় বসাল নিঃশঙ্ক। নিঃশঙ্কর পিঠে এই প্রথমবার নৃসিংহ দেব এবং তার হস্তীপাল ছাড়া অন্য কেউ বসেছে। অবশ্য তা নিয়ে গজরাজের কোনো আপত্তি নেই। নৃসিংহ দেব এখন গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। এত নিবিড় ঘুম তিনি বহু বছর পরে ঘুমোলেন।
নৃসিংহ দেবের ঘুম ভেঙেছে। সামান্য নড়াচড়া করতেই তিনি অনুভব করলেন—সাগরতটের বালুকারাশির উপরে শুয়ে আছেন তিনি। দৃষ্টি স্বচ্ছ হতে মাথা তুলে এদিক ওদিকে দেখতেই নজরে পড়ল একটি পর্ণকুটির। প্রদীপের ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে।
‘আমি এখন কোথায় আছি? যুদ্ধস্থল থেকে কত দূরে?’ মনে মনে ভাবলেন মহারাজ। খিদেও পেয়েছে। তীব্র খিদে! পাশেই বসে রয়েছে তাঁর প্রিয় গজরাজ। ‘আহা রে, নিঃশঙ্করও হয়তো খুব খিদে পেয়েছে,’ প্রিয় হাতিটার কথা ভাবতেই ব্যথায় মুচড়ে উঠল মহারাজের বুক। তিনি আরেকবার পাতার কুটিরের দিকে তাকালেন, ‘কে থাকে ওখানে? সে কি কোনো ভাবে আমাকে সাহায্য করতে পারবে?’
দুই হাতে ভর দিয়ে কোনো ক্রমে উঠে দাঁড়ালেন নৃসিংহ দেব। পর্ণকুটিরের দ্বারে পৌঁছে দেখলেন, বায়ুর বেগে যাতে প্রদীপখানা নিভে না-যায়, তার জন্য একটু আড়াল করে সেটাকে বসানো হয়েছে। কিন্তু টিমটিম করে জ্বলতে থাকা ওই প্রদীপশিখার আলোতেই আলোকিত হয়ে উঠেছে কুটিরের ভিতর ও বাহির।
‘কেউ আছেন?’ নৃসিংহ দেব যেন দশ দিকের উদ্দেশে এই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন।
ঘোমটায় মাথা ঢাকা এক নারী পর্ণকুটিরের দ্বারে এসে দাঁড়াল, ‘আপনি কে? কী চাই আপনার?’
‘আমি একজন আহত সৈনিক। আমাদের উৎকলের বাহিনী যবন সেনার বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। সেখানেই আমি ভীষণ আহত হই, কোনোক্রমে নিজের প্রাণটুকু রক্ষা করতে পেরে যুদ্ধভূমি থেকে ফিরেছি। ক্ষুধায় তৃষ্ণায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। কিছু খেতে না-পেলে আমাদের দুজনেরই প্রাণ যাবে,’ কথার মধ্যেই হাত তুলে নিঃশঙ্ককে দেখালেন তিনি, ‘কোনো ব্যবস্থা করা কি সম্ভব?’
‘আপনি যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন? আমাদের মহারাজ নৃসিংহ দেব যুদ্ধভূমিতে বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেছেন, আর আপনি প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছেন? উৎকলের কোনো সৈনিক এইভাবে যুদ্ধের আঙিনা থেকে পালিয়ে আসে না। আমি জানি না, মহারাজ জীবিত থাকলে আপনাকে ক্ষমা করতেন কিনা, তবে আমি আপনাকে ক্ষমা করতে পারলাম না।’
‘যদি রণভূমিতে আমার মৃত্যু ঘটত, তাহলে আমার থেকে সুখী কেউ হতো না, দেবী। যুদ্ধ করতে করতে আহত হয়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। ওই যে হাতিটাকে দেখছেন, ও মহারাজের প্রিয় হাতি—নিঃশঙ্ক। ও-ই আমাকে তুলে এখানে নিয়ে এসেছে। আমি সজ্ঞানে যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়ে আসিনি। তবে আপনাকে কথা দিচ্ছি, যদি আজ প্রাণরক্ষা করতে পারি, তবে উৎকলের রণভূমিতে যবনের দল আমার তাণ্ডব দেখবে। যবন সৈন্যরা এখন মহারাজের মৃত্যুর আনন্দে উৎসব পালন করছে নিশ্চয়ই। তাদের এই আনন্দই শেষ আনন্দ হবে—আমি আপনাকে কথা দিলাম। কিন্তু তার জন্য আগে কাল সুস্থ অবস্থায় আমার যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়া প্রয়োজন। আমাকে এবং রাজহস্তী নিঃশঙ্ককে জীবিত থাকতেই হবে। আপনি নিজে কোনো ভাবে আমাদের সাহায্য করতে পারলে করুন দেবী। নাহলে উপায় বলুন। আমরা চেষ্টা করব। আমাদের সাহায্য করলে সমগ্র উৎকল আপনার কাছে চিরঋণী থাকবে।’
‘ক্ষমা চাইছি। অজ্ঞাতে কটুকথা বলে ফেললাম। আসলে মহারাজের মৃত্যুর সংবাদ শুনে থেকে বড় অস্থির হয়ে পড়েছি। মহারাজের হাতি আমার কুটিরে এসেছে, এ তো আমার পরম সৌভাগ্য! আপনি কাল ভোরেই যুদ্ধক্ষেত্রের উদ্দেশে যাত্রা করবেন, তাই তো?’
‘হ্যাঁ দেবী, বিশ্বাস করুন, যদি আজ রাতটা জীবিত থাকতে পারি, কাল উৎকলে বিজয়-পর্ব হবে!’
‘আপনি আমার অতিথি হলেন। এই অভাগীর কুটির পবিত্র হল। আমি ধন্য হলাম। আসুন, আসুন।’
নৃসিংহ দেব কুটিরে প্রবেশ করলেন। মাটিতে পাতা ছেঁড়াখোড়া আস্তরণে বসে তিনি নিজের শিরস্ত্রাণ নামিয়ে রাখলেন। এই ক্ষীণ আলোতেও তাঁকে দেখে ওই নারী চমকে উঠল, ‘আরে, এ তো সেই পুরুষ, যে আমাকে পদ্মপুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার সময় রক্ষা করেছিল! তখন বলেছিলেন যে, ইনিই নাকি উৎকলের মহাদণ্ডপাশ। না, না, এঁর কাছে আগেকার সেইসব ঘটনার উল্লেখ করা চলবে না। করলে বিপদ। জিজ্ঞাসা করবেন, সেইদিন কেন পালিয়েছিলাম। শাস্তিই যে দেবেন না তা-ই বা কে জানে? এ কী বিপত্তিতে ফেললে প্রভু?
এখন কী করি? আজ মহাদণ্ডপাশ বিপন্ন অবস্থায় আমার অতিথি হয়েছেন। ইনি একসময়ে আমার জীবন রক্ষা করেছিলেন। নিয়তি সম্ভবত এঁর জীবন রক্ষা করে আজ সেই ঋণ শোধ করার একটা সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু তা-ই বা করবে কীভাবে? সারা দেহেই দেখছি ক্ষতচিহ্ন। ইনি ভয়ানক খিদেতে কাতর হয়ে আছেন। বাইরে মহারাজের হাতি ক্ষুধার্ত হয়ে বসে আছে। উৎকলের কন্যা কি আজ যথাযথ ভাবে অতিথি সৎকারটুকুও সারতে পারবে না?
সাধ থাকলেও সাধ্য নেই। মাটির হাঁড়িতে অল্প কিছুটা ভাত বসিয়েছিলাম। জলকলমির শাক রেঁধেছি। কিন্তু তা আমার নিজের জন্যই যথেষ্ট নয় তো এই মহাদণ্ডপাশকে অতিথি হিসেবে কীভাবে দেব? আচ্ছা, সে নাহয় শাক-ভাতটাই খাওয়ালাম, কিন্তু রাজার হাতিকে? সে-ও যে অতিথি! কীভাবে ভরাব তার পেট? হে জগন্নাথ স্বামী, পথ দেখাও! উপায় বলো। এই শ্রীক্ষেত্রে জগন্নাথ মহাপ্রভুর কৃপায় কেউ কোনোদিন অভুক্ত শোয় না। আজ যদি তিনজনের মধ্যে একজনও না-খেয়ে থাকে, তবে শ্রীক্ষেত্রের মর্যাদা ভঙ্গ হবে।
এ কেমন পরীক্ষা নিচ্ছ প্রভু? আমার মতো নির্ধন, অভাগী তোমার এই পরীক্ষায় কীভাবে উত্তীর্ণ হবে? এই মাটিতেই তো কত ধনী-মানী-মহাজনের নিবাস, কতই না মঠ আর আশ্রম, স্বয়ং তোমার শ্রী-মন্দিরও এখানেই, আর তুমি এই যুবককে মহারাজার হাতি সমেত আমার মতো দরিদ্রের কুটিরে পাঠিয়ে দিলে? কেন?
শ্রীক্ষেত্রে শ্রীক্ষেত্রেরই একমুঠো মাটির আশ্রয় নিয়ে মাটির প্রদীপ তৈরি করে দিন-কাটানো এক দুঃখিনীর মান কী আর অপমানই বা কীসে? যদি এই অভাগী অভুক্ত থাকে, তবে তা আপনার অপমান। এই যুবক আর রাজার হাতি আমার নয়, আপনার অতিথি, হে নাথ। কৃপা করো! দ্রৌপদীর অক্ষয় পাত্র থেকে শাক খেয়ে দুর্বাসা এবং তাঁর শিষ্যদের ক্ষুধার নিবৃত্তি তুমিই করিয়েছিলে, আমার এই অতিথিদের ক্ষুধা মিটিয়ে তুমিই পথ দেখাও।’
নৃসিংহ দেব আস্তরণের উপরেই অবসন্ন অবস্থায় পড়ে আছেন। কুটিরের ভিতরের দুর্দশা দেখে তিনি স্পষ্ট বুঝেছেন যে এখানে দারিদ্রের সাম্রাজ্য। মনে মনে লজ্জাই পেলেন তিনি। তাঁর রাজ্যে মানুষ এভাবে দুর্দশায় জীবন কাটাচ্ছে, আর তিনি মনে করেন যে তিনি এক গর্বিত প্রজাপালক। অন্ন এখানে দুর্লভ। তাঁর ভুল ভেঙেছে। আর লজ্জা কীসের? গর্ব এমনিও বিলীনই হবে। প্রাণ চলে গেলে আর কীসের গর্ব?
ভারতবর্ষ অলৌকিকতায় ভরা। এখানে কবে, কোথায়, কার সঙ্গে এবং কীভাবে চমৎকার ঘটবে, তা কেউ জানে না। ওই বালক এবং কিশোর নিঃশঙ্ককে সঙ্গে নিয়ে শ্রীক্ষেত্রে এসে উপস্থিত হয়েছিল। জগন্নাথ স্বামীর শ্রীমন্দিরের এক অদ্ভুত মাহাত্ম্য—এই মন্দিরে যত ভক্তই এসে উপস্থিত হোক না কেন, মন্দিরের ভাণ্ডারে প্রসাদ কখনো কমও পড়ে না, আবার বেশি হয়ে নষ্টও হয় না। আজ মন্দিরের প্রসাদের বিতরণ পর্ব সমাপ্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কী আশ্চর্য! আজ প্রায় সব প্রসাদটুকুই রয়ে গিয়েছে অবিতরিত।
কী বিপদ! শ্রী-প্রসাদ ফেলাও চলবে না। পূজারিরা আজকের এহেন ঘটনা দেখে একটু অবাকই হয়েছেন। দেবতাকে শয়ান করিয়ে প্রধান পূজারি যখন নিজের কক্ষে শয়নে গেলেন, তখনও তাঁর মনে চিন্তা চলছে, ‘হে জগন্নাথ স্বামী, আজ যে শ্রী-প্রসাদের মর্যাদা রক্ষা হল না’ এইসব ভাবতে ভাবতেই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। স্বপ্ন দেখলেন! জগন্নাথ মহাপ্রভু বলছেন, ‘যত প্রসাদ বেঁচে গিয়েছে, তার সবটাই ছাঁদা বেঁধে একটি গোশকটে চাপিয়ে নগরীর বাইরে রেখে এসো। এই কাজে যেন বিলম্ব না হয়।’
পূজারি তৎক্ষণাৎ জগন্নাথ দেবের আদেশ পালন করলেন। জগন্নাথ মহাপ্রভুর আদেশের কারণ দেখার জন্য তিনি খাদ্যে বোঝাই ওই গোশকটের পিছু-পিছু চললেন। গোশকটে জোতা বলদগুলো স্বেচ্ছায় একটি পর্ণকুটিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বলদ জোড়া আর এগোয়ও না, পিছোয়ও না। এবার কী হবে? পূজারি দেখলেন, পাশেই একটি পর্ণকুটির। তিনি কুটিরে গিয়ে সেখানে ওই নারীকে দেখে নিবেদন করলেন, ‘দেবী, এখানে শ্রী-প্রসাদ আছে। কোনোভাবেই এর যেন অপমান না-হয়। আজ রাতে এই শ্রী-প্রসাদকে আপনার কুটিরেই স্থান দিতে হবে। যদি কাল সকাল অবধি এই প্রসাদ কেউ না-খায়, তবে সাগরের জলে বিসর্জন দেওয়া হবে। সেই ব্যবস্থা আমরাই করব।’
বিনোদিনী বলল, ‘হে প্রভু, তোমার মতো দয়াময় আর কে আছে? শ্রীমন্দিরে বসে-বসেই তুমি জগৎ সংসারের দুঃখ–দুর্দশার কথা শুনে ফেল। এই অভাগীর কথাও রাখলে তুমি, ধন্য প্রভু! তোমার লীলার কথা কে-ই বা কবে বুঝতে পেরেছে?
পূজারি মশায়, শ্রী-প্রসাদের অপমান স্বয়ং জগন্নাথ মহাপ্রভুই হতে দেবেন না। আপনাকে তিনিই পাঠিয়েছেন। কোণার্কের মহাদণ্ডপাশ এই মুহূর্তে রাজা নৃসিংহ দেবের হাতিকে সঙ্গে নিয়ে আমার শরণাপন্ন হয়েছে। তাঁরা দুজনেই ক্ষুধার্ত। এই প্রসাদের যথাযোগ্য সৎকার হবে। আপনি চিন্তা করবেন না। এই প্রসাদ স্বয়ং জগন্নাথ স্বামী আপনার হাত দিয়ে তাঁর ভক্তদের জন্য পাঠিয়েছেন।’
পুরো প্রসাদটাকেই সেখানে নামিয়ে রেখে মনে মনে জগন্নাথ স্বামীর জয় জয়কার করে পূজারি ফিরে গেলেন। এখন বিনোদিনীর সামনে রাখা আছে মহাপ্রসাদে ভরা কুড়ুয়া আর হাণ্ডি। রাজাকে বেড়ে দেওয়া হল জগন্নাথ প্রভুর ভুক্তাভুক্ত—মিষ্টি ভাত, পাঁচমেশালি ডাল, বেসনের বড়া, সর্ষে মেশানো তরকারি-বেসর, চাটনি, ক্ষীর, বড় গোলকের মতো নাড়ু। তার পর নৃসিংহ দেব আর বিনোদিনী দুজনে মিলে নিঃশঙ্কর মুখের সামনে সাজিয়ে দিলেন প্রসাদে ভরা হাঁড়িকুঁড়ি। গজরাজ মহাপ্রসাদ পেয়ে চেটেপুটে খেল। একটা বড় মাটির কলসে ভরা ছিল ঘোল। জলের অভাব পূরণ হয়ে গেল।
বিনোদিনী বলল, ‘এই যুবক সত্যিই জগন্নাথ দেবের বরপুত্র। নাহলে কি এভাবে না-চাইতেই কেউ মহাপ্রভুর মহাপ্রসাদ পেয়ে যায়?’
খেয়েদেয়ে তৃপ্ত হয়ে নিঃশঙ্ক বিনোদিনীর মাথায় নিজের শুঁড় বুলিয়ে দিল। স্নেহের পরশ পেয়ে সে-ও অভিভূত হয়ে উঠল। ঘুম পেয়ে যেতেই নিঃশঙ্ক দেহ ছড়িয়ে দিল মাটির উপর।
নৃসিংহ দেব এবার বিনোদিনীকে বললেন, ‘দেবী, এবার আপনি কুটিরের মধ্যে বিশ্রাম করুন। নিঃশঙ্ক ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছে। ওর বিশ্রাম প্রয়োজন, নাহলে আগামীকাল যুদ্ধে লড়তে পারবে না। এখানে কিছুক্ষণ বিরাম নিয়ে আমরা যুদ্ধভূমির উদ্দেশে রওনা দেব। এবং যাওয়ার আগে যদি আপনার কোনো আপত্তি না-থাকে, আমি আপনার পরিচয় জানতে চাইব। আপনাকে একটি গোপন সংবাদ দিচ্ছি, মহারাজ নৃসিংহ দেব জীবিত আছেন। আমি চাই, আপনি এই সংবাদ রাজধানীতে পৌঁছে দিন। আপনার মঙ্গলকামনা নৃসিংহ দেবের জন্য বরদায়ী হবে এবং আপনার রাজভক্তি, উৎকলের প্রতি প্রেম তথা অতিথিপরায়ণতার উচিত সম্মান করে রাজা নিজেও গৌরবান্বিত অনুভব করবেন।’
মৌন হয়ে গেল বিনোদিনী। পাষাণের মতো নীরব। স্থবির। তাঁর মনে প্রশ্ন চলছে, ‘কীভাবে বলি এঁকে? আমি রাজধানী যাব কীভাবে? মহারাজ জীবিত আছেন, এর থেকে আনন্দের কথা আর কিছু হতেই পারে না। কিন্তু আমার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এক মুখ থেকে অন্য মুখ, সেখান থেকে আরেক মুখ হয়ে আমার পরিচয় আমার স্বামীর কাছে গিয়ে পৌঁছাবে। সমাজ আমাকে কুলটা, অলক্ষ্মী মনে করে। সেসব শুনে আমার স্বামী অপমান আর গ্লানিতে ভয়ানক আহত হবেন। সে যতই নিষ্পাপ হোক না কেন একজন গৃহত্যাগী নারীকে সমাজ মেনে নিতে পারে না। এই সমাজ তাকে কুলবধূর সম্মান কখনোই দেবে না। কিছু করার নেই আমার। আমি কোথাও যেতে পারব না।’
তার কাছ থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে নৃসিংহ দেব বেশ আহত অনুভব করছেন, ‘দেবী, আমি বুঝতে পারছি যে আপনার হয়তো আমার কথায় বিশ্বাস করতে শঙ্কা হচ্ছে। আচ্ছা সেসব কথা ছাড়ুন, আমি কি আপনার শুভনাম জানতে পারি?’
বিনোদিনী নিজের দুই হাত জোড় করে বলল, ‘ভদ্র, অভাগীর কোনো নাম হয় না। নেইও।’
নৃসিংহ দেব স্পষ্ট দেখলেন—তার ডান হাতে রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তির উল্কি আঁকা রয়েছে। ছবির নীচে লেখা আছে ‘রাধাকৃষ্ণ’। ‘আরে, এ তো সে-ই, যাকে একবার কুয়োর ভিতরে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিলাম, আরেকবার পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করা থেকে রক্ষা করেছিলাম।’
তিনি মুখে বললেন, ‘ঠিক আছে, দেবী। সম্ভবত আমি আপনার কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি। এ আমার দুর্ভাগ্য! আপনি এখন বিশ্রাম করুন। আর কিছুক্ষণ পরে নিঃশঙ্ক একটু সুস্থ অনুভব করলেই আমরা দুজনে যুদ্ধভূমির উদ্দেশে যাত্রা করতে চাই। উৎকলের এক কন্যা তথা উৎকলের এক বধূ যদি আমাকে বিজয়-প্রদীপ দেখিয়ে বিদায় জানান, তাহলে আমি ধন্য বোধ করব।’ কথা শেষ করে নৃসিংহ দেব নিঃশঙ্কর পাশেই মাটিতে শুয়ে পড়লেন। সাগরের বুকে চিরে আসা শীতল বাতাসে কখন যে তাঁর চোখে ঘুম নেমে এল, তা তিনি জানতেও পারলেন না।
অর্ধরাত্রির পর চার ঘটিকা অতিক্রান্ত। নিঃশঙ্ক এবার উঠে দাঁড়াল। শুঁড় দিয়ে আলতো ছোঁয়ায় সে নৃসিংহ দেবের ঘুমও ভাঙাল। বিদায়ের মুহূর্ত উপস্থিত হয়েছে। তিনি পর্ণকুটিরের সামনে এসে গলাখাঁকারি দিলেন। কোনো সাড়া মিলল না। এবার একটু কিন্তু কিন্তু ভাব নিয়েই কুটিরের মধ্যে প্রবেশ করে দেখলেন বিধবার সিঁথির মতোই শূন্য পড়ে আছে কুটির। কোথায় সেই নারী? শুধু কুটিরের ঠিক মাঝখানে একটি মাটির থালায় রাখা আছে একটি প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ। কুটিরের স্বামীনির কোনো চিহ্ন নেই।
এখন আর ওই নারীকে খোঁজার মতো সময় নৃসিংহ দেবের হাতে নেই। উৎকলের স্বাধীনতা মহারাজ নৃসিংহ দেবকে ডাকছে। তিনি স্বয়ং প্রদীপের পবিত্র উষ্মা নিয়ে নিঃশঙ্কর পিঠে চড়ে যুদ্ধভূমির উদ্দেশে রওনা দিলেন।
ভোরের সূর্য এবার আলো ছড়াতে আরম্ভ করেছে। চারজন সেনাপতি—সেনাপতি তুলসী, সেনাপতি রাজগোবিন্দ, সেনাপতি সুরু এবং সেনাপতি বিষ্ণুদেব শিবিরে বসে শলাপরামর্শ করছিলেন। হঠাৎই নিঃশঙ্কর বৃংহিত শুনে তাঁরা চমকে উঠলেন। চারজনেই খুব ভালো করে নিঃশঙ্কর ডাক চেনেন। তাঁরা একসঙ্গে শিবির থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। নিঃশঙ্কর পিঠে আরূঢ় রাজা নৃসিংহ দেবকে দেখে একসঙ্গে জয়-নিনাদ করলেন তাঁরা, ‘জগন্নাথ স্বামীর জয়! মহারাজ নৃসিংহ দেবের জয়!’
জয়জয়কার শুনে উৎকলের সেনা সজাগ হয়ে উঠল। উৎকলের পাইকেরা দলে দলে নিজেদের শিবির থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল। গগনভেদী উল্লাসে তূর্য বেজে উঠল, ‘তূ..তূ..তূ..তূ..তূ..তূ..!’ ওদিকে বিপক্ষ শিবিরে বিশ্রামরত যবন বাহিনী তূর্যের এই উল্লাসধ্বনি শুনে চঞ্চল হয়ে উঠল, ‘এখন আবার বাজনা কীসের? কী হল?’
নৃসিংহ দেব আদেশ দিলেন, ‘এখুনি সৈন্য সজ্জা করো! ইখতিয়ার বেগকে তার বাহিনীর প্রস্তুত হয়ে ওঠার আগেই ঘিরে ফেলো। কাল দুপুরের আগেই প্রত্যেক যবন সৈন্যের দ্বিখণ্ডিত দেহ যেন এই মাটিতে পড়ে থাকে। তরবারির কোনো আঘাতই যেন ব্যর্থ না-হয়। সৈনিক নয় তো তার ঘোড়াকেই, ঘোড়া না-পেলে তাঁদের হাতিকেই মারো। কিন্তু মারো। মারতে থাকো। মারো অথবা মরো! আজ আর কোনো যুদ্ধবিরাম হবে না, কাল আর কোনো যুদ্ধ হবে না। মা গঙ্গেশ্বরীর নামে শপথ করে বলছি, আজ এই যুদ্ধের শেষ দেখে ছাড়ব। সন্ধ্যা নামার আগেই যুদ্ধ শেষ হওয়া চাই। আজ এই যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি নৃসিংহ দেব নয়, স্বয়ং জগন্নাথ স্বামী!’
‘জগন্নাথ স্বামীর জয়! মা গঙ্গেশ্বরীর জয়! নৃসিংহ দেবের জয়!’ পাইক সৈন্যদের জয়জয়কারে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল। তাদের প্রস্তুত হয়ে ওঠার জন্য আধঘণ্টা সময়ই যথেষ্ট ছিল। আসলে নৃসিংহ দেবের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরে হতাশ হয়ে পড়া সৈনিকদের কাছে তাঁকে সাক্ষাৎ দেখার ব্যাপারটা রণোন্মাদনাকে বহু মাত্রায় বাড়িয়ে দিল।
অর্ধ ঘটিকার মধ্যেই উৎকলের সেনাবাহিনী নিজেদের শিবির থেকে বেরিয়ে এল। এরই মধ্যে ইখতিয়ার বেগের বাহিনীও যুদ্ধভূমিতে এসে দাঁড়াল। সূর্যোদয় হওয়ার আগেই শুরু হয়ে গেল মহাসমর।
যুদ্ধকে আর যুদ্ধ বলে মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে নৃশংস এক শিকার। রণভূমি তো নয়, যেন এক বধ্যভূমি। ফলমূলের মতোই কাটা পড়তে থাকল যবন সৈন্যদের মাথা। ইখতিয়ার বেগ উন্মাদের মতো আচরণ করতে লাগল। করবে না-ই বা কেন? তার শত্রু যে মৃত্যুঞ্জয় হয়ে ফিরে এসেছে!
আজ নিঃশঙ্কও যেন বিচিত্র রণরঙ্গে মত্ত হয়ে উঠেছে। কোনো শত্রু সৈনিককে শুঁড়ে করে পাকড়ে ধরে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে, কাউকে ধরে সামনের পা-দিয়ে একটা পা চেপে ধরে তার অন্য পা’টাকে শুঁড়ে করে টেনে দেহটাকেই চিরে ফেলছে, কারো মাথাটাকে তরমুজ ফাটানোর মতোই ফাটিয়ে বের করে দিচ্ছে রক্ত আর ঘিলু। গজরাজের দুই পাশে চপল আর চঞ্চলও রণসাজে সজ্জিত হয়ে সমান তালে নিজেদের সামনের দুই পা দিয়ে শত্রুদের আঘাত করে আহত করে চলেছে।
ইখতিয়ার বেগ দেখল, তার সেনা পর্যুদস্ত হয়ে চলেছে। পিছু হটা ছাড়া তার সামনে এখন আর কোনো পথ খোলা নেই। কিন্তু এবারে নৃসিংহ দেবের রণনীতি একটু ভিন্ন। যুদ্ধের শুরু হওয়ার আগেই সেনাপতি রাজগোবিন্দ এবং সেনাপতি বিষ্ণুদেব ইখতিয়ার বেগকে পিছন দিকে থেকে ঘিরে ফেলেছেন। এবার তাঁরা একযোগে আক্রমণ করলেন। জাঁতার ভিতরে গম পেষাই হওয়ার মতো অবস্থা হয়ে দাঁড়াল যবন সেনার।
ইখতিয়ার বেগ নিজের জীবন রক্ষার্থে পালাচ্ছিল, কিন্তু সেনাপতি সুরুর দৃষ্টি এড়াতে পারল না। তিনি ইখতিয়ার বেগের ঘোড়ার পিছু নিলেন। মুহূর্তের মধ্যে তার নাগালে পৌঁছে গেলেন সেনাপতি সুরু, ইচ্ছে করলেই তরবারির এক আঘাতে নামিয়ে দিতেন পারেন বেগের মাথা। এমন সময় কোনো কিছুতে ঠোক্কর খেয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল ইখতিয়ারের ঘোড়া। নিজের অশ্বের গতি রুদ্ধ করলেন সেনাপতি সুরু। ভূপতিত ইখতিয়ার এবার উঠে দাঁড়াল। তার ঘোড়ার সামনের পা দুটো ভেঙে গিয়েছে। পালানোর পথ নেই।
সেনাপতি সুরু নিজের ঘোড়ার গা থেকে খুলে নিলেন লাগামখানা। তার একটা প্রান্ত ইখতিয়ার বেগের পায়ে জড়িয়ে দিলেন। এবার লাগাম ছাড়াই তিরবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে সুরু ইখতিয়ার বেগকে মাটিতে ঘষটাতে ঘষটাতে নিয়ে চললেন নৃসিংহ দেবের কাছে। রাজার পায়ের কাছে উৎকলের শত্রুকে সুরু আছড়ে ফেললেন। নৃসিংহ দেব প্রশ্নবাচক দৃষ্টি নিয়ে সুরুর দিকে একবার তাকাতেই তিনি বললেন, ‘ইখতিয়ার বেগ!’
গর্জন করে উঠলেন উৎকল-সিংহ, ‘আমি তোমাকে যুদ্ধাপরাধী বলে ঘোষণা করছি! আর সেনাপতি সুরু, আপনি থামলেন কেন? আমার আদেশ ছিল, মারো অথবা মরো! থামলেন কেন? আমার আদেশের সম্পূর্ণ পালন কিন্তু এখনও হয়নি।’
‘তাহলে একেই আগে শেষ করি, মহারাজ!’ বলেই নিজের হাতের তলোয়ার দিয়ে সুরু ইখতিয়ারকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন।
‘না সেনাপতি, ইখতিয়ার বেগ এখন একজন ঘোষিত যুদ্ধবন্দি। এবং যুদ্ধবন্দিকে হত্যা করা পাপ। অধর্মও। একে চোরের মতোই বেঁধে যুদ্ধভূমির একটা কোণে ফেলে রাখুন। যদি অশ্বের খুরে পিষ্ট হয়ে মরা থেকে বেঁচে যায়, তাহলে নাহয় একে নিয়ে বিচার করার ব্যাপারে ভাবনাচিন্তা করব। আপনি প্রতিপক্ষের বাহিনীর ওপরে আক্রমণের মাত্রা আরও তীব্র করে তুলুন।’
যুদ্ধে যখন প্রতিপক্ষের সর্বোচ্চ পদাসীন ব্যক্তি বন্দি হয়ে যান, তখনও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আসলে আনুষ্ঠানিকতার নামান্তর। যবন বাহিনীকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে কচুকাটা করল পাইক বীরের দল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রণভূমিতে কমতে কমতে একসময় শূন্য হয়ে গেল তাদের সংখ্যা। যুদ্ধ শেষ হল। রাজা নৃসিংহ দেব নিজের হাতে ইখতিয়ার বেগের বাঁধন খুলে দিয়ে বললেন, ‘যাও ইখতিয়ার বেগ, উৎকলের বন্দিগৃহ শত্রুদের ভোজন করানোর কোনো ব্যবস্থা রাখে না। উৎকলের মর্যাদায় আবার আঘাত করার দুঃসাহস কোরো না!’
সেই রাতেই সংজ্ঞাহীন অবস্থাতেই সীতাদেবী স্বপ্নে দেখলেন যে, মা গঙ্গেশ্বরী নিজের হাতে করে তাঁর সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর সম্বিৎ ফিরল। উঠে বসেই তিনি শিবেই সান্তারাকে ডেকে পাঠালেন। তাঁকে বললেন, ‘মা গঙ্গেশ্বরীর স্বপ্নাদেশ পেয়েছি। মহারাজ সকুশল রয়েছেন। রাজধ্বজাকে আবার যথাযোগ্য মর্যাদায় উত্তোলিত করে দিন। এখনই!’
শিবেই সান্তারা ভাবলেন, ‘শোকে রানি অসংলগ্ন আচরণ করছেন। অবশ্য এমন বিক্ষিপ্ত ভাব অস্বাভাবিক কিছুও নয়।’ কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ না-করেই তিনি উৎকলের ধ্বজা উত্তোলনের ব্যবস্থা করলেন। আশার দুর্নিবার শক্তিতে ভর করে সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বলে উঠল। কোনো নতুন সংবাদ আসেনি, উদাস মনকেই শক্ত করতে চাইল প্রত্যেকে। রাজধানী এক অবুঝ মানসিকতার টানাপোড়েনে জেরবার।
অর্ধরাত্রির সামান্য আগে এক পাইক ঘোড়া ছুটিয়ে বারাবটি দুর্গের সামনে এসে দাঁড়াল। সে সজোরে চিৎকার করে দুর্গপালকে বলল, ‘দুর্গের দ্বার খুলে দিন, দুর্গপাল! আনন্দ সংবাদ! দুন্দুভি বাজাতে বলুন। মহারাজ জীবিত আছেন। সুস্থ আছেন। উৎকলের বিজয় হয়েছে। বিজয়ী সেনা রাজধানীতে ফিরে আসছে।’
দাবানলের মতোই এই খবর ছড়িয়ে পড়ল। শাঁখ, কাঁসর, ঘণ্টা, কাড়ানাকাড়া বেজে উঠল। সীতাদেবী আর চন্দ্রাদেবী একে অপরকে আলিঙ্গন করে কাঁদতে লাগলেন। আসলে এর আগে এঁরা একে অপরকে সাহস দিয়ে আড়ালে গিয়ে চোখের জল ফেলছিলেন। তবে তা ছিল বিলাপ, আর আজকের এই কান্না তা থেকে একেবারে ভিন্ন। আনন্দাশ্রু আবেগের বানে ভাসিয়ে নিয়ে গেল দুই রাজ-রমণীকে। উৎকলের জন্য যা কিছু অশুভ, তা বয়ে গেল। সমগ্র উৎকলের মুখে এখন হাসি, আনন্দ আর চোখে জল।
এই সংবাদ সুবলের কানেও গেল, ‘রাজা জীবিত আছেন। বিজয়ী হয়েছেন। ফিরে আসছেন।’ তার মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। নির্বিকার ভাব নিয়ে সাতশো বিয়াল্লিশ মণ ওজনের শ্যামল শিলার বুকে নবগ্রহ মূর্তি খোদাই করতে থাকল।
সাগরের অতল জলরাশিতে দুলতে দুলতে বহিত্র নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছিল। মধ্যরাত্রি। অগণিত নক্ষত্র সাগরের জলে নিজেদের প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করেছে। আকাশ আর জল জুড়ে যেন টানা হয়েছে এক ঝিলমিলে চাদর। শিল্পা নিজের বিগত অতীত এবং আগামী ভবিষ্যতের মাঝে এক নিস্তব্ধ বর্তমানে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড় একাকী অনুভব করছে। আর সবথেকে বড় পরিচালক—নিয়তি? সে নিজের নাটকের পরবর্তী দৃশ্য মঞ্চনের পরিকল্পনায় অত্যন্ত ব্যস্ত।
যাত্রা আরম্ভ করার পরই বহিত্রের প্রধান নাবিক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। দুপুর থেকেই তিনি উদরশূলের ভয়ানক বেদনায় অস্থির হয়ে ওঠেন। সমুদ্রযাত্রা চলাকালীন যতখানি চিকিৎসা হওয়া সম্ভব, তা করাও হয়। বৈদ্য বলেছিলেন, প্রধান নাবিকের উণ্ডুক পুচ্ছ ফুলে উঠেছে। সেটাই বেদনার উৎস। নয় ঘণ্টা অসহ্য উদরপীড়া সহ্য করার পর অবশেষে প্রধান নাবিকের মৃত্যু ঘটে। এখন এই বহিত্র সাধারণ নাবিকদের ভরসায় ভেসে চলেছে।
দ্বিতীয় দিন থেকে হাওয়ার দিক বদল হয়েছে। পালগুলোকে বহিত্রের লক্ষ্যস্থল এবং বায়ুর দিশার অনুরূপে সমন্বিত করে তোলার যোগ্যতা সাধারণ নাবিকদের নেই। বহিত্র এখন পথ হারিয়েছে। সাগরদেবতার কৃপায় এবং পবনদেবের আনুকূল্যে মহাজলধির বুকে ভাসতে-ভাসতে জলযানটি চলেছে কোনো এক অজ্ঞাত লক্ষ্যের উদ্দেশে। যাত্রীদের মনে এখন একটাই প্রার্থনা—কোনোভাবে পাড় পাওয়া গেলেই হল, স্থলভাগের দেখা মিললে কোনো একটি বন্দরে বহিত্র গিয়ে থামুক। আগে প্রাণ বাঁচুক। তার পর নাহয় যাত্রা, লক্ষ্য এবং যাত্রাপথ নিয়ে মাথা ঘামানো যাবে।
বিপদ কখনো একলা আসে না। আচমকাই সাগরের জল ফুঁসতে আরম্ভ করেছে। উঁচু উঁচু ঢেউ দেখলে বুক শুকিয়ে যায়। পশ্চিমের আকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। আগামী ভয়ানক এক ঝড়ের সম্ভাবনায় ভয়ভীত হয়ে উঠেছে প্রত্যেক যাত্রী। সাগরের জলের একেবারে উপরিস্তরে দেখা যাচ্ছে তিমি, তিমিঙ্গিল, মহামৎস্য, অষ্টপদ এবং বিশাল-বিশাল আকারের মকর। একটি বিশালকায় তিমিঙ্গিল ভয়াবহ ভাবে হাঁ-করে এসে বহিত্রের পেটে ধাক্কা মারল। কেঁপে উঠল জলযান।
সব যাত্রী নিজের নিজের ইষ্ট স্মরণ করতে লাগল। তাঁরা বুঝতে পারছেন সঙ্কট ঘনিয়ে আসছে।
সাগর ক্রমশ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। প্রতি মুহূর্তে আগের থেকে বেশি। সাগরের ঢেউ এখন বহিত্রের পাটাতনের উচ্চতারও উপর দিয়ে যাচ্ছে। ঝঞ্ঝা বেগমান হয়ে চলেছে। আর তারই সঙ্গে থেকে–থেকে বহিত্রের পেটে ধাক্কা মেরে যাচ্ছে তিমিঙ্গিল। হয়তো প্রকৃতি সহায় হলে ঝড় থেমে যাবে। কিন্তু তিমিঙ্গিল? সে তো থামবে না। ঝড়ে কোনো বিপদ হওয়ার আগেই না তিমিঙ্গিলের ধাক্কায় বহিত্রখানা ডুবে যায়—এই হাহাকারে যাত্রীরা সরব হয়ে উঠল।
বহিত্রের জলসমাধি এখন প্রায় নিশ্চিত। কলিঙ্গ থেকে যাত্রা আরম্ভ করা, দুচোখে সুখস্বপ্ন নিয়ে ভেসে চলা উৎকলের শিল্পী, নর্তক, বাদ্যকার, বণিকরাই কলিঙ্গের শিল্প, সংস্কৃতি এবং পরম্পরার মেরুদণ্ড। আজ কি ওদের সলিল সমাধি হবে? শিল্পা কিন্তু নির্বিকার। প্রত্যেকে যখন আসন্ন মৃত্যুর ভয়ে ব্যাকুল, তখন শিল্পার মনে কোনো ভয় নেই। সে একদৃষ্টে তিমিঙ্গিলটিকে দেখে চলেছে।
সবাই ভাবছে, ঈশ্বরই একমাত্র ভরসা। প্রত্যেকে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, যেন অপর ব্যক্তির হাতেই রয়েছে জীবনরক্ষার চাবিকাঠি। শেষমেশ কেউ একজন প্রশ্ন করল, ‘এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার কি কোনো উপায় নেই? এখন কি তবে শুধু নিশ্চিত মৃত্যুর জন্যই অপেক্ষা করতে হবে? আমরা কেউই কি শেষ কোনো চেষ্টা করে দেখতে পারি না?’
এক মধ্যবয়স্ক বণিক বললেন, ‘উপায় একটা আছে বটে, কিন্তু ভীষণ কঠিন। অত্যন্ত নিষ্ঠুর। কষ্টদায়ক।’
‘এই আসন্ন মৃত্যুর থেকে বেশি নিষ্ঠুর বা কঠিন কিংবা কষ্টদায়ক আর কিছু হতে পারে কি? আপনি সবকিছু জেনেও এতক্ষণ কিছুই বলেননি কেন? বলুন, এখুনি বলুন। মরার আগে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক,’ কেউ একজন চেঁচিয়ে বলল কথাটা।
‘প্রকৃতিকে তো কোনো ভাবেই বশে আনা সম্ভব নয়, তাই এই সামুদ্রিক ঝঞ্ঝার কোনো প্রতিকারও নেই। দৈব সহায় থাকলে হয়তো ঝড় থামবে কিংবা বায়ু নিজের গতির অভিমুখ পরিবর্তন করলে আর আমাদের বহিত্র ডুববে না, কিন্তু তিমিঙ্গিলের হাত থেকে বাঁচার উপায় আগে করা দরকার। এই সর্বভুকটির হাত থেকে বাঁচলে তবেই আমরা ঝড় থেকে বাঁচার কথা ভাবব।’
‘আরে মশায়, আপনি উপায় বলুন। এটা উপদেশ দেওয়ার সময় নয়। কিছু করা গেলে বলুন, আমরা চেষ্টা করি।’
‘তাহলে শোনো, কাজের কথাটা বলি—এই সাগর বলিদান চায়। কোনো পবিত্র, নিষ্পাপ, কুমারীর বলি। যদি কোনো এমন বালিকা বা কিশোরীকে সাগরজলে উৎসর্গ করা যায়, তবে সাগর বলি পেয়ে শান্ত হয়ে যাবে। তিমিঙ্গিল তাকে আহার হিসেবে গ্রহণ করে আর বহিত্রকে আক্রমণ না-করে গভীর জলে ফিরে যাবে। তখন বহিত্রের পাল নামিয়ে নিয়ে তাকে ঢেউ আর নিয়তির ভরসায় ভাসতে দিলে সে-ও আমাদের কোনো না কোনো তটে নিয়ে গিয়েই তুলবে। এটাই বাঁচার একমাত্র উপায়। কিন্তু প্রশ্ন হল এমন আত্মবলিদান দেবে কে?’ বণিক উপায় বললেন বটে, কিন্তু কথাগুলো সকলের বুকে যেন হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করল।
এই নিদানের সত্য-মিথ্যা, উচিত-অনুচিত, ন্যায়-অন্যায় ইত্যাদির বাছবিচার করার মতো ক্ষমতা, ধৈর্য, মানসিকতা বা সময় কোনোটাই যাত্রীদের মধ্যে নেই। সবাই মরার থেকে একজনের বলিদান অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান। সকলেই বলতে শুরু করল, ‘আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার যদি এটাই একমাত্র উপায় হয় তবে এখুনি এটাই করা উচিত।’
কিন্তু কে আত্মবলিদান দেবে? কার বলি দেওয়া হবে?
প্রত্যেক মা নিজ নিজ কন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরল, ‘না, না। আমি মরলে মরব, কিন্তু আমার মেয়ের জীবন অমূল্য। মরলে সবাই একসঙ্গে মরুক, তখন আমি, আমার মেয়ে সকলেই একসঙ্গে চলে যাব। সেটা তবু মানা যায়। কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে আমার মেয়েকে মরতে দিতে পারি না।’
মরুভূমিতে জন্ম নেওয়া একাকী পানলতার মতো শিল্পাকে নিজের বুকে টেনে নেওয়ার জন্য কোনো মা নেই। নিজের কোলে টেনে নিয়ে সুরক্ষা দেবে এমন পিতাই তাকে নিজের থেকে অনেক–অনেক দূরে নির্বাসন দিয়েছেন। একে একে সবার দৃষ্টি শিল্পার উপরে গিয়ে পড়ল। প্রত্যেকের চোখে অসহায় ভাব। প্রতিটা দৃষ্টিই কাতর, অনুনয়-বিনয়ে ভরা। এই প্রথম শিল্পার মনে হল, এই মুহূর্তে তার থেকেও অসহায় কেউ আছে। আসন্ন মৃত্যু থেকে তাদের অব্যাহতি দিতে একজনই পারবে—শিল্পা।
শিল্পার মন এখন ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। নির্ভয় হয়ে সে বিশাল, ভয়ঙ্কর তিমিঙ্গিলটাকে দেখতে থাকে। মনে মনে মা গঙ্গেশ্বরীকেও স্মরণ করে। তার চোখ বুজে এল। সে নিজের দুই বাহু মেলে দিল যেন দেবী তাকে নিজের কোলে তুলে নিচ্ছেন। নিজের ওড়নাটাকে ঝোড়ো হাওয়ার মুখে আর সামলাতে চেষ্টা করল না শিল্পা। সেটা উড়ে গেল আপন খেয়ালে। বহিত্রের পাটাতনের একদম ধারে দাঁড়িয়ে শিল্পা নিজেকে সাগরজলে বিসর্জন দিয়ে দিল। সফেন জলরাশির মধ্যে মুহূর্তে তার দেহটা হারিয়ে গেল। তিমিঙ্গিল কখন যে তাকে নিজের মুখে নিয়ে অন্তর্হিত হল, পালিত পশুর যেভাবে খাদ্য পেয়ে ফিরে যায়, সেভাবে কখন যে তিমিঙ্গিল ফিরে গেল, কখন যে শিল্পার রক্তে জল লাল হয়ে উঠল, কখন যে সেই লালিমা মুছে গিয়ে আবার ফিরে এল সফেন ভাব, তা কেউ টেরও পেল না।
বহিত্রে উপস্থিত সকল নর-নারী এই বলিদানে অভিভূত হয়ে পড়ল, আর তার কিছুক্ষণ পরেই নিজেদের জীবন রক্ষার আনন্দে উৎফুল্লও। হায় রে মানুষ! হায় রে তার স্বার্থপরতা!
নিয়তি যেন শিল্পাকে সাগরে বিলীন করার জন্যই এত আয়োজন করেছিল। মুহূর্তের মধ্যে শান্ত হয়ে গেল সাগরের জল, যেন কিছুক্ষণ আগে কিছুই ছিল না, কিছুই ঘটেনি।
সাগরের ঢেউ আর নিয়তির ভরসায় ভাসতে ভাসতে পাল-নামানো বহিত্রটি একসময় কামাম্বুজ দেশের একটি বাণিজ্যতরীর প্রধান নাবিকের দৃষ্টিতে আসে। সেই জলযান থেকে যথাসাধ্য সাহায্য করার পর অবশেষে সাতান্ন দিন পরে কলিঙ্গ থেকে যাত্রা করা বহিত্র সিংহল দ্বীপে গিয়ে ভেড়ে। সিংহল দ্বীপের বন্দরে যখন যাত্রীরা নামল, তখন সেখানে শিল্পা রইল না বটে, কিন্তু প্রত্যেক যাত্রীর জীবন হয়ে সে বেঁচে রইল। প্রত্যেকের অন্তঃকরণে শিল্পাই থেকে গেল। সিংহলের শাসক দ্বারা নিয়োজিত বিশেষ নাবিক দলের অধীনে যখন ওই বহিত্র উৎকলে ফিরে গেল, তখন আচার্য সৌম্য শ্রীদত্ত নিজের কন্যার বলিদানের কথা জানতে পারলেন। আর কাউকে কোনো মিথ্যাভাষণের প্রয়োজন পড়ল না।
সৌম্য শ্রীদত্ত নিজের পুত্রীকে সাগরদেবতার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সাগরদেবতাও সেই দান সর্বাত্মক ভাবে গ্রহণ করেছিলেন। শিল্পার শোকে সাগর তটে দাঁড়িয়ে শ্রীদত্ত দীক্ষিতের চোখ ভিজে উঠেছিল। প্রতিটি অশ্রুকণা সাগরদেবতা নিজের বুকে সেভাবেই স্বীকার করে নিচ্ছিলেন, যেভাবে তিনি শিল্পাকে স্বীকার করেছিলেন। হয়তো এক পিতার চোখের জলে সাগরের জল আরেকটু বেশি লবণাক্ত হল। হয়তো বা কিছুই হল না। অমন কত চোখের জলই সে পান করেছে এবং আগামী দিনেও করবে।
উৎকলের পাইক বীরেরা নিজেদের বিজয়ী মহারাজকে নিয়ে বিজয়দুন্দুভি বাজাতে–বাজাতে রাজধানীতে ফিরল। আগেও অনেক যুদ্ধ হয়েছে, যুদ্ধজয়ও হয়েছে, কিন্তু এমন বিজয়ের উল্লাস একেবারে অনন্য। রাজ্যে উৎসবের আয়োজন শুরু হয়ে গিয়েছে। নৃসিংহ দেবের জীবনে অবশ্য বিরাম নেই, বিশ্রাম নেই। তিনি যথাশীঘ্র সম্ভব মন্দির নির্মাণের কাজ দেখাশোনা করার জন্য পৌঁছে গেলেন প্রাঙ্গণে।
বিশু মহারানা এখন মহারাজের রণবেশে সজ্জিত একটি মূর্তি তক্ষণ করতে ব্যস্ত। পাশে দাঁড়িয়ে সুবল মহারানা একটি শিলাখণ্ডকে মনোযোগ দিয়ে দেখেই চলেছে। এই প্রস্তরখণ্ডটিকে কোন মূর্তি নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা যাবে, তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে ভালো করে দেখে-বুঝে নেওয়া দরকার। সুবলের ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি বালক। এগারো বছর বয়স তার। নাম ধর্মপদ মহারানা।
ধর্মপদ মহারানা হল বিশু মহারানার একমাত্র পৌত্র। কয়েক দিন আগেই বিশু মহারানার গ্রামে বিসূচিকা রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। মড়ক লেগে যায়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার তফাতে বিশু মহারানার পুত্র এবং পুত্রবধূ দুজনেরই মৃত্যু ঘটে। গ্রামে বিশু মহারানার জ্ঞাতিগুষ্ঠির লোকেরা তাদের পারলৌকিক কাজ সারে। নাতি ধর্মপদকে তারা কোণার্কে বিশু মহারানার কাছে পৌঁছে দিয়ে যায়। এই ক’দিনের মধ্যেই সুবল মহারানা আর ধর্মপদের মধ্যে ভারি ভাব হয়ে গিয়েছে। স্নেহের একটা বন্ধন গড়ে উঠেছে দুজনের মধ্যে। দিনের বেশিরভাগ সময়টাই ধর্মপদ সুবলের কাছে কাটায়। সুবলও এমন এক সহচর পেয়ে খুশি, এতটুকু বিরক্তি নেই। সুবল নিজের স্নেহের পাত্র ধর্মপদকে খোদাইকর্মের প্রাথমিক শিক্ষাটুকু দিতে আরম্ভ করেছে। আর এই সবকিছু দেখে বিশু মহারানাও অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন। ধর্মপদ যদি সুবলের মতো কাউকে গুরু হিসাবে পায় তাহলে তার চেয়ে ভালো আর কিছু হতেই পারে না।
নিজের মূর্তি গড়তে দেখে মহারাজ নৃসিংহ দেব গম্ভীর স্বরে বিশু মহারানাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘বিশু মহারানা মহাশয়, এই জয় আসলে নিঃশঙ্কের বিজয়। আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন যে যুদ্ধভূমিতে ভয়ানক ভাবে আহত হয়ে আমি মৃত্যুর অপেক্ষা করছিলাম। আমার এই নতুন জীবন আসলে নিঃশঙ্কের অবদান। ও কিন্তু আমার থেকেও অনেক বড় যোদ্ধা। কোণার্কে আমার মূর্তির আগে ওর মূর্তি স্থাপন করা উচিত। নিঃশঙ্ক না-থাকলে আমার এই পুনর্জন্ম সম্ভব হতো না। আর একটা কথা, আমি চাই নিঃশঙ্কর মূর্তির পাশাপাশি এই যুদ্ধে নিহত হাতি ও ঘোড়াদের স্মরণে কোণার্কে গজবন্ধ এবং অশ্ববন্ধ স্থাপিত হোক।’
মহারাজের আদেশ মতো বিশু মহারানা এবার নিজের অধস্তন শিল্পীদের নির্দেশিত করে বিদায় নিলেন। নিঃশঙ্কের মূর্তি নির্মাণের কাজটা বিশু মহারানা মহারাজের ব্যক্তিগত ইচ্ছানুসারে সুবল মহারানাকেই অর্পণ করলেন।
মুখশালার উত্তর দ্বারে সিঁড়ির দুই দিকে নিঃশঙ্কর স্মরণে দুটি বিশালকায় গজ-মূর্তি স্থাপিত হল। যুদ্ধের আভরণে সজ্জিত মূর্তি দুটির পেটের নীচের দিকে খোদাই করে পাথর দিয়ে তৈরি শিকল এমনভাবে বানানো হল, যাদের দেখলে সত্যিকারের লৌহশৃঙ্খল বলে ভ্রম হয়। দুটি হস্তিমূর্তিই নিজের-নিজের শুঁড়ে শত্রুপক্ষের সেনাকে পাকড়ে ধরে আছে। এবং তাদের পায়ের নীচে পিষ্ট হচ্ছে বিপক্ষের অন্যান্য সৈনিক।
নিঃশঙ্কর মূর্তি দেখে মহারাজ মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর মুখ থেকে অনায়াসে বেরিয়ে এল, ‘নিঃশঙ্ক নিঃসন্দেহে যুদ্ধে এভাবেই বীরের মতো লড়েছিল। কিন্তু সুবল, ওর শিকল তো খুলে দাও! আমার প্রিয় গজরাজ কখনো অবিশ্বস্ত, স্বেচ্ছাচারী হয়নি। শৃঙ্খলার প্রয়োজন পড়েনি। প্রত্যেক যুদ্ধে ও আমার বিশ্বস্ত অনুচর, সহায়ক হিসাবেই কাজ করেছে। ওকে এভাবে লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ দেখে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।’
‘ক্ষমা করবেন মহারাজ! পাথর দিয়ে তৈরি এই শেকলের খোদাই কিন্তু নিঃশঙ্কর মূর্তির সঙ্গেই করা হয়ে গিয়েছিল। এখন যদি এই শৃঙ্খলকে খোলার বা ভাঙার চেষ্টা করি, তাহলে আপনার প্রিয় গজরাজের মূর্তি একেবারে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে।’ নতজানু হয়ে থাকা সুবল মহারানার এই কথাগুলো শুনে মহারাজ নৃসিংহ দেব একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলেন, ‘আরে না না! ক্ষমাপ্রার্থী হওয়ার মতো কিছু হয়নি। তবে থাক, শিল্পী। নিঃশঙ্কর এই মূর্তি দুটো ক্ষতবিক্ষত হলে আমার মনও ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে। তোমার বলার পর আমি আবার ভালো ভাবে দেখলাম। ভাস্কর্যের এই চরম উৎকর্ষতার নিদর্শনের মধ্যে এই শিকলে কোনো সমস্যা নেই। বরং সুন্দর লাগছে।’
ধর্মপদ নিতান্তই বালক। শিষ্টাচারে অনভিজ্ঞ। রাজার সঙ্গে সুবলের কথোপকথন সে কৌতূহল নিয়ে শুনছিল। যখন নৃসিংহ দেব তার উপস্থিতি খেয়াল করলেন, তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘শিল্পী, এই বালকটি কে? এই পাষাণপুরীতে কোথা থেকে এল এইটুকু ছেলেটা? যদি কোনো বিপদ-আপদ ঘটে যায়?’
‘মহারাজ, এই বালক কলিঙ্গের শিল্পকলার ভবিষ্যৎ। এর নাম ধর্মপদ মহারানা। মহান শিল্পী বিশু মহারানার পৌত্র।’
‘কিন্তু এ এখন এখানে কী করছে? এখন ওর লেখাপড়া, খেলাধূলা করার বয়স।’
‘পৈতৃক শিল্পটাকে একেবারে বালক বয়স থেকেই আত্মসাৎ করা হয়, মহারাজ। আর ওর খেলাধূলো করার দিন আর নেই। কয়েকদিন আগেই বিসূচিকা রোগে ওর পিতা-মাতা গত হয়েছেন। গ্রামবাসীরা ওকে এখানে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছে। ও কিন্তু নিজের ঠাকুরদার সঙ্গে থাকার তুলনায় আমার সঙ্গেই দিনের বেশিরভাগ সময়টা কাটায়। মহারাজ, দয়া করে ওকে এখান থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো আদেশ দেবেন না। আমার এই অনুরোধটুকু রক্ষা করলে আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।’ সুবল অতি সংক্ষেপে নৃসিংহ দেবকে সম্পূর্ণ বস্তুস্থিতি সম্পর্কে অবগত করিয়ে দিল।
আর নৃসিংহ দেব? তাঁর কী অবস্থা? তাঁর কানে যেন কেউ গরম সীসে ঢেলে দিল! এ কী শুনলেন তিনি? বিশু মহারানার পুত্র আর পুত্রবধূ বিসূচিকা রোগে মারা গিয়েছে? তাঁর পৌত্র ধর্মপদ অনাথ হয়ে গিয়েছে? আর বিশু মহারানা শোক-তাপ রহিত হয়ে আমার মূর্তি খোদাই করে চলেছেন। ধন্য কোণার্ক! ধন্য কোণার্কের প্রত্যেক শিল্পী! কর্তব্যে কেউ বিন্দুমাত্র অবহেলা করছেন না।
নৃসিংহ দেব স্নেহভরে ধর্মপদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, ‘দীর্ঘজীবী হও! উৎকলের শিল্পকলা তোমার হাত ধরে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক। আমি মন্ত্রী শিবেই সান্তারাকে বলে দিচ্ছি, আজ থেকে ধর্মপদ মহারানাকেও কোণার্ক-শিল্পীদের সমান পারিশ্রমিক এবং সমস্ত প্রকার সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে।’
কোণার্কে এখন সাতশো বিয়াল্লিশ মণের ঘন কালো বর্ণের শিলায় উৎকীর্ণ নবগ্রহ মূর্তির স্থাপনা করার কাজ চলছে। তিন–তিনবার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু কোনোবারেই পাট-শিলাটিকে তার আধারে সঠিক ভাবে স্থাপন করা সম্ভবপর হয়নি। তৃতীয় বারের প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হওয়ার পর বিশু মহারানা এবং সুবল মহারানার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এত ভারী পাথরের খণ্ডে উৎকীর্ণ নবগ্রহ-পাটকে বার বার তোলা আর নামানো ভয়ঙ্কর রকমের শ্রমসাধ্য ব্যাপার। আবার একটা চেষ্টা করা হল। কিন্তু সম্ভবত নবগ্রহ শিলায় উৎকীর্ণ সকল গ্রহই বারোশো কোণার্ক-শিল্পীর উপরে অসন্তুষ্ট হয়ে আছে—কোনো লাভ হল না।
ধর্মপদ দূর থেকে পুরো ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিল।
অনেক সময়েই খুব কাছ থেকে দেখলে সত্যিটাকে দেখা যায় না, কিন্তু দূর থেকে দেখলে তা স্পষ্ট ধরা পড়ে। যে বিষয়টা বিশু মহারানা আর সুবল মহারানারা কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না, সেটাই দূর থেকে দেখে ধর্মপদ মহারানা ধরে ফেলল। নবগ্রহ-শিলাটিকে তোলার জন্য তৈরি করা উত্তোলক যন্ত্রের কিছু অংশের গঠনের কৌণিক বিন্যাসে সমস্যা হচ্ছিল এবং খুব কাছ থেকে দেখে তা ধরা দুরূহ ছিল।
ধর্মপদ সোজা সুবল মহারানার কাছে চলে এল।
‘ধর্ম, এদিকে কেন এলে? কোনোভাবে চোট লেগে গেলে একেবারে সাংঘাতিক কাণ্ড হয়ে যাবে!’
‘সুবল কাকা, তুমি আমার সঙ্গে এসো। আমি তোমাকে আর ঠাকুরদাকে কিছু দেখাতে চাই।’
‘এখন? কী দেখাবে? এখানেই বলো। আর না-হলে একটু অপেক্ষা করো। দেখছ তো আমরা কত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে ব্যস্ত!’
‘কাকা, আমার সঙ্গে একটিবার এসো। আমি জানি তোমাদের সমস্যা হচ্ছে। আর আমি যা দেখাতে চাইছি, সেটা দেখলে হয়তো তোমাদের সমস্যার সমাধানও হয়ে যাবে।’
সুবল অবাক হয়ে ধর্মপদের দিকে তাকাল, ‘বলে কী এই বালক? বড়–বড় স্থপতি যেখানে মাথা ঘামিয়ে একটা সমাধান বের করতে পারছে না, সেখানে এই ছেলে পথ খুঁজে বের করেছে? তবে গুণ অবশ্য বয়স দেখে আশ্রয় নেয় না। কী বলতে চাইছে, তা দেখা উচিত। যদি কোনো সফল উপায় নাও বেরোয়, তাহলেও ক্ষতি তো আর বাড়বে না। কিন্তু যদি সত্যিই সফল হওয়া যায়, তাহলে শুধুই লাভ।’
সুবল বিশু মহারানাকে সঙ্গে নিয়ে ধর্মপদের পিছনে হাঁটা দিল। ধর্মপদ আবার সেই স্থানেই ফিরে এল, যেখানে সে কিছুক্ষণ আগে অবধি দাঁড়িয়ে ছিল। সে সুবল আর বিশু মহারানাকে বলল, ‘আমার ঠিক পিছনে তোমরা দাঁড়াও।’ একেবারে সঠিক অবস্থানে তাদের দুজনকে দাঁড় করিয়ে সে নিজের তর্জনী তুলে বিশালকায় উত্তোলকটির উদ্দেশে দেখাল। প্রথম কয়েক মুহূর্ত দুজনেই কিছু বুঝতে পারলেন না, কিন্তু যখন বুঝতে পারলেন যে ধর্মপদ ঠিক কী দেখাতে চাইছে, তখন সুবল আনন্দে তাকে কোলে তুলে নিল।
‘ধর্ম, তোর কত বুদ্ধি রে! আহা, কী আনন্দ! মহারাজের দেওয়া পারিশ্রমিক আর সুযোগ–সুবিধার মর্যাদা রক্ষা করলি তুই,’ বলতে বলতে সুবল তাকে নিয়ে গোল-গোল ঘুরে-ঘুরে নাচতে লাগল।
‘কাকা ছাড়ো! নামাও আমাকে! এভাবে কোলে নিয়ে ঘোরাতে থাকলে নীচে তাকালে আমার মাথা ঘোরে, ভয় করে। নামাও আমাকে।’
‘হাহাহাহা হাহাহাহা হা হা হা হা! আরে ধর্ম, তুই-ই আমার মাথা আজ ঘুরিয়ে ছাড়লি।’ কুম্ভকার ঘুরন্ত চাক থেকে কাঁচা মাটির তৈরি পাত্রকে ঠিক যেমন ভাবে নামিয়ে রাখে, সুবল ধর্মপদকে তার কোল থেকে ঠিক সেভাবেই মাটিতে নামিয়ে রাখল।
উত্তোলক যন্ত্রের নির্দিষ্ট অংশের কৌণিক অবস্থান ঠিক করে ফেলার পর নবগ্রহ-পাটটিকে পুনঃস্থাপনার চেষ্টা করা হল। এবং এবারে তা আধারশিলার উপরে অনায়াসে স্থাপিত হল। প্রত্যেক শিল্পী ধর্মপদের কাছে এসে-এসে তাকে সাধুবাদ জানাল। ধর্মপদ মহারানাকে কোণার্ক-শিল্পীরা ‘ছোট মহারানা’ বলে ডাকতে আরম্ভ করে দিল।
মদ্র দেশের এক মল্লবীর কুকা। তার বিশাল বপু। কুকা ভারতভূমির অনেক মল্লবীরের গর্ব দলিত করে উৎকলে এসে পৌঁছেছে। এখন উৎকলের রাজকীয় মল্লকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করে নিজের মুকুটে আরেকটি পালক গোঁজাই তার লক্ষ্য। কিন্তু উৎকলের দুই পরম বীর রাজকীয় মল্লদ্বয় বিষ্ণু সান্তারা ও দীনবন্ধু বেহরা শেষ যুদ্ধেই বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেছেন। তার পর থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো নতুন রাজমল্লের নিযুক্তি হয়নি।
নৃসিংহ দেব কুকাকে বললেন, ‘এই মুহূর্তে উৎকলে কোনো রাজমল্লই নেই। তুমি আমার আমন্ত্রণ স্বীকার করে উৎকলের রাজমল্ল হয়ে যাও।’
কুকা রাজি হল না। সে দিগ্বিজয় অভিযানের নেশায় প্রমত্ত। কুকা স্পষ্ট বলল, ‘আমি কারো বশ্যতা স্বীকার করার জন্য জন্মাইনি। উৎকলের মল্লবিদ্যা লোপ পেয়েছে—আপনি নিজের মুখে একবার এই কথা বলুন, তাহলে এটাকেই আমি আমার জয় বলে ধরে নিয়ে ফিরে যাব।’
কুকার কথা শুনে মহারাজ নৃসিংহ দেব ভয়ানক আহত হলেন। কিন্তু তাঁর কাছে দেওয়ার মতো কোনো উত্তরও নেই। সেনাপতি বিষ্ণুদেব এই মানহানি দেখে আর সহ্য করতে না-পেরে মহারাজকে বিনম্র ভাবেই বললেন, ‘মহারাজ, উৎকলের এ ধরনের অপমান আমরা সহ্য করতে পারব না। মহান মল্লবীর কুকা মহাশয়কে রাজ অতিথির মর্যাদা দিয়ে অতিথিশালায় থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক। এরপর আপনার অনুমতিক্রমে রাজত্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মল্লযোদ্ধাদের আহ্বান করা হবে। যেসব মল্লবীরেরা আসবেন, তাঁদের সঙ্গে কুকার মল্ল প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকবে। কুকা জয়লাভ করলে একথা প্রমাণিত হবে যে উৎকলের মল্লবিদ্যা লুপ্ত হয়েছে। আর যদি আগত মল্লযোদ্ধাদের মধ্যে কেউ জিতে যান, তাহলে তাঁকেই উৎকলের রাজমল্ল রূপে আমরা বরণ করে নেব।’
মহারাজ শুনে বললেন, ‘বাহ, উত্তম প্রস্তাব! মহাশয় কুকা, আপনাকে উৎকলের রাজঅতিথির আমন্ত্রণ রক্ষা করার অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনার যোগ্য প্রতিস্পর্ধীকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব আমাদের। এতেই উভয় পক্ষের সম্ভ্রম রক্ষা হবে।’
কুড়ি দিন সময় লাগল। মাতৃভূমির গরিমা রক্ষার জন্য অবশেষে দুজন মল্লবীরকে খুঁজে বের করলেন সেনাপতি বিষ্ণুদেব। পুরো রাজ্যেই এই আগামী মল্লযুদ্ধ নিয়ে চর্চা হচ্ছিল। কুকার আতঙ্ক তার প্রসিদ্ধি রূপেই উৎকলে এসে গিয়েছিল। প্রত্যেক রাজ্যবাসী এই প্রতিযোগিতা নিয়ে উৎসুক হয়ে উঠছিল। দিন নির্ধারিত হল।
প্রতিযোগিতার দিনে অপরাহ্নে মল্লযুদ্ধ নিশ্চিত করাই ছিল। কোণার্ক-শিল্পীদের দর্শক হিসেবে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। তারা অর্ধদিবসের অবকাশ পেয়েছেন। সুবলও মল্লযুদ্ধ দেখতে এসেছে। ছোটবেলা থেকেই মল্লবিদ্যা ব্যাপারটাকে দারুণ ভাবে রপ্ত করেছে সে। অত্যন্ত প্রিয় বিষয়। সুবলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা দেখতে এসেছে ছোট মহারানা।
বিশাল বর্গক্ষেত্রের মতো ভূভাগ। তার কেন্দ্রে অক্ষবাট বানিয়ে চতুর্দিকে দর্শনার্থীদের বসার জন্য সিঁড়িযুক্ত দর্শকদীর্ঘা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে তিল ধারণের জায়গা নেই। কুকা অক্ষবাটে তাল ঠুকতে-ঠুকতে ঘুরছে। সে যে সদ্য ব্যায়াম করে এসেছে, তা তার স্ফীত মাংশপেশি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। শরীরের চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে শিরা-উপশিরাগুলি। উৎকলের দুই মল্লই তাকে দেখে বেশ ভয় পেয়েছে।
প্রতিযোগিতা আরম্ভ হল। কুকা নিজের প্রতিপক্ষের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু প্রতিপক্ষ কোনো রকম সুযোগ না-দিয়ে ঘুরে গিয়ে দাঁড়াল কুকার ঠিক পিছনে। কুকা কখন যে তাকে নিজের ডান হাত দিয়ে ধরে, বাঁ কাঁধের উপরে টেনে তুলে শূন্যে একটা পাক খাইয়ে মাটিতে চিৎ করে ফেলে দিল তা কেউ বুঝতেই পারল না। ধোপা যেভাবে কাপড়কে আছাড় দেয়, সেভাবে আছাড় মারতে–মারতে কুকা নিজের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে দিল।
দর্শকেরা নির্বাক হয়ে দেখল, প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বীর বুকে পা-রেখে কুকা নিজের বিজয় ঘোষণা করছে। দর্শকরা বেশ গম্ভীর হয়ে গেল।
দ্বিতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী অবশ্য কিছুক্ষণ ধরে কুকাকে প্রতিরোধ করতে সফল হল। কিছুক্ষণ মানে কিছুক্ষণই। পাকা খেলোয়াড় কুকার মারাত্মক প্যাঁচে পড়ে সেও অবশেষে হার মানল। এবার নিজের বিজয়গৌরব প্রদর্শন করার সময়ে কুকা সমস্ত মর্যাদা অতিক্রম করে ফেলল। নিজের ডান হাত দিয়ে ডান জঙ্ঘায় তাল ঠুকে বলল, ‘আছে আর কেউ? আছে কি? আছে কেউ কুকার মোকাবিলা করার মতো...?’
কুকার প্যাঁচপয়জার দেখতে সুবলের এতক্ষণ বেশ ভালোই লাগছিল। কিন্তু তার এই অহংকার সুবলকে ভীষণ আহত করল। এ তো অপমান! সে নরম ভাবেই বলল, ‘কুকা, আপনি মল্লশ্রেষ্ঠ। কিন্তু এমন উন্মাদের মতো আচরণ আর প্রদর্শন কেন করছেন? ক্রীড়ায় আজ আপনি বিজয়ী হয়েছেন, কাল আপনার পরাজয় হতে পারে। এত অহংকার করবেন না। আপনাকে মানাচ্ছে না।’
‘হা হা হা হা...। এটা অহংকার নয়, গর্ব। তুমি বুঝবে না।’
‘আমি সবই বুঝছি। আপনার মল্লবিদ্যাও আমি দেখলাম। আপনি আমার মাতৃভূমির মল্লবীরদের হারিয়েছেন, তবুও আমি আপনার প্রশংসা করছি। কিন্তু আপনার এই আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়। অশোভনীয়। অহংকারের চূড়ামণি আপনি। আপনার এই অহংকার আমি সহ্য করতে পারব না।’
‘সহ্য করতে পারবে না? তাহলে কী করবে শুনি? আমার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ লড়বে? আমাকে হারাবে?’
‘তা আমি বলিনি। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখুন, আমার সামনে অহংকার দেখালে সে কোনোভাবেই পার পাবে না।’
কুকা অট্টহাসি দিল, ‘ভাষণ তো ভালোই দাও দেখছি। তোমাকে আমি স্পর্ধা দেখালাম। এসে আমার সঙ্গে লড়ে দেখাও। আমাকে হারাও। নিজে না-পারলে অন্য কাউকে নিয়ে এসো।’
‘স্পর্ধা কীসের? কোনো স্পর্ধা প্রতিস্পর্ধার ব্যাপারই নেই। আপনি শ্রেষ্ঠ। বিজয়ী। শুধু অহংকারটুকু না-দেখালেই হল।’ সুবল মহারানার স্বর এখনও শান্ত, স্বাভাবিক।
‘তুমিই এগিয়ে এসো। এসো...এসো, এসো। আমার হাত ধরো। এসো? এসো না! আসবে না? কী হল?’ এবার কুকা সুবল মহারানাকে উপহাস করতে লাগল।
এবার সুবল আপনি থেকে তুমিতে নেমে এল, ‘শোনো কুকা, অহংকার জগন্নাথ স্বামীর ভোজন। আর তোমার অহংকার তাঁর ভূমিতেই ভঙ্গ হবে। বিধির বিধান।’ সুবলের কণ্ঠস্বর এবার আগের থেকে একটু ভিন্ন মনে হল। শান্ত অথচ দৃঢ়। কোমল অথচ কঠোর। সুবলের গলা শুনে কুকা একটু অবাকই হল। সে সুবলের দিকে ভালো করে দেখল। কোনো কোণ থেকেই সুবলকে দেখে মল্লযোদ্ধা মনে হয় না। সে মনে মনে ভাবল, ‘এর পাঁজরের দু-চারটে হাড় ভেঙে দেওয়া খুব দরকার।’ লাল–লাল চোখ নিয়ে সে ডান হাত বাড়িয়ে সুবলকে মল্লযুদ্ধের জন্য আহ্বান জানাল। দর্শকেরা নিস্তব্ধ ভাবে সবটাই দেখতে লাগল।
মহারাজ নৃসিংহ দেব হস্তক্ষেপ করলেন, ‘না সুবল, তুমি মল্লযোদ্ধা নও। তুমি শিল্পী। মল্ল-শিরোমণি কুকা যখন উৎকলের মল্লবীরদের পরাস্ত করেছেন, তখন তাঁর আনন্দ করার অধিকার আছে বইকি।’
‘ক্ষমা করবেন মহারাজ। আনন্দ করার অধিকার আছে বইকি, কিন্তু অহংকারে অন্ধ হওয়ার অধিকার নেই। পরিণাম যাই হোক না কেন, উৎকল কোনো স্পর্ধার সামনে চুপ থাকতে পারবে না। শক্তিপরীক্ষা হয়ে যাক, দেখেই নিই না উনি কত বড় মল্লবীর! আপনি আদেশ দিন। মা গঙ্গেশ্বরী, আমার বাল্যকালের মল্লগুরু তথা আমার স্বর্গত পিতার নামে শপথ করে বলছি, জয়-পরাজয়ের গুরুত্ব আমার কাছে কিছুই নেই, এবং পিতার মৃত্যুর পর থেকে আমি আখড়া স্পর্শও করিনি, কিন্তু একজন মহান মল্ল হয়েও কুকা আজ যে অহংকার দেখিয়েছে, তা আমাকে আখড়ার মাটিতে নামতে বাধ্য করছে। দয়া করে আজ্ঞা দিন, মহারাজ।’
নৃসিংহ দেব আর কোনো উত্তরই দিতে পারলেন না। একদিকে রাজ্যের সম্মান, অন্যদিকে প্রিয় শিল্পীর জীবনের প্রশ্ন। তিনি মৌন হয়ে গেলেন। আর মৌনং স্বীকৃতি লক্ষণম্ ধরে নিয়ে নিজের পোশাক খুলে ধর্মপদের হাতে দিয়ে সুবল আখড়ার উদ্দেশে এগিয়ে গেল। পরনের ধুতিটাকে সাপটে সে কাছার মতো করে বেঁধে নিল। অক্ষবাটের মাটি স্পর্শ করে প্রথমে সে প্রণাম করল। তারপর গিয়ে দাঁড়াল কুকার সামনে। কুকা এখনও ডান হাত বাড়িয়ে আমন্ত্রণের ভঙ্গিতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার বিশাল দেহের সামনে সুবল মহারানাকে নিতান্তই এক বালক বলে মনে হচ্ছে। জরাসন্ধের সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করার জন্য এক সুকুমার বালক যেন আখড়ায় নেমে এসেছে।
মূর্তি গড়ার সময়ে ছেনিকে ধরার একটা বিশেষ নিয়ম আছে, যাতে হাতুড়ির আঘাতে তা পিছলে না-যায়। এত বছর ধরে পাথর কাটতে–কাটতে খোদাই করতে–করতে এবং লোহার ছেনি হাতে ধরে–ধরে সুবল মহারানার হাতগুলোও পাথরের মতোই কঠোর হয়ে গিয়েছে। যবে থেকে সুবল কোণার্কে এসেছে, তবে থেকে সে একটি দিনও বিশ্রাম নেয়নি। নিয়মিত ছেনি, হাতুড়ি আর পাথরের ঘষা খেতে–খেতে তার হাতের পাঞ্জাটা গোসাপের থাবার মতোই খরখরে, রুক্ষ্ম, কঠিন হয়ে গিয়েছে।
সুবল কুকার ডান হাতের কাছে নিজের ডান হাত বাড়িয়ে দিল। কুকা সুবলকে ধরবে কী, সুবলই কুকার হাত এমনও ভাবে পাকড়ে ধরল যেন সে নিজের হাতে পাথর-কাটার মোটা ছেনি ধরেছে, এখুনি হাতুড়ি দিয়ে সজোরে আঘাত করবে। কুকা নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু সফল হল না। তার মনে হল যেন কোনো সাঁড়াশির মুখে হাতটা আটকা পড়েছে। সে অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। তার অসহজ অবস্থার সুযোগে সুবল তার ডান হাতের পাঞ্জাটাকে ধরে উলটে দিল। কুকা সর্ব শক্তি প্রয়োগ করল। অবস্থার সামান্য উন্নতি হল। সুবলের হাত থেকে কুকার পাঞ্জাটা আলগা হয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল। কুকার আঙুলগুলো এখনও সুবলের মুঠোর মধ্যে ধরা আছে। আর একটু এদিক-ওদিক হলেই কুকার হাতটা সুবলের হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে আসবে। তখন পাশার দান উলটো পড়বে, সুবলের জন্য বিপদ বাড়বে।
আপ্রাণ চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি কুকা প্রচণ্ড খেপে উঠেছে। ছেনির উপরে হাতুড়ির প্রচণ্ড আঘাত পড়লে যেমন ছেনিটা ঘুরে যায়, তেমন ভাবেই সুবল কুকার আঙুলগুলোকে উলটোদিকে ঘুরিয়ে দিল। তারপর সামান্য একটা হ্যাঁচকা টান দিল সুবল। আঙুলগুলো ভেঙে গেল। কুকাকে ঠেলে মাটিতে ফেলে দিল সুবল মহারানা।
‘কুকা, অহংকারে মত্ত মল্লবীরেরা আমার হাত ধরতে এলে, তাদের পাঁজরগুলো আমি ঠিক এভাবেই ভেঙে দিই। তোমার শুধু আঙুল ক’টা ভাঙলাম। আমি জানি, তুমি স্বপ্নেও কল্পনা করোনি যে উৎকলকে অপমান করার মূল্য তোমাকে এভাবে নিজের মল্লজীবনের সমাপ্তি দিয়ে চোকাতে হবে। আজকের পর থেকে আর কোনো আখড়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে, তুমি কোনো মল্লযোদ্ধার সঙ্গে লড়তে পারবে না। সেই ক্ষমতা তুমি হারিয়ে ফেলেছ। উৎকল অন্যের গর্বকে সম্মান করে, আর অহংকারকে...আমি আর কী বলব, নিজেই তো দেখে নিলে আজ।’ সুবলের কণ্ঠস্বরে এখন বনকেশরীর গর্জন শোনা যাচ্ছে।
কুকার এই দুর্দশা দেখে দর্শকদের পাশাপাশি মহারাজ নৃসিংহ দেবও প্রসন্ন হলেন। সবথেকে বেশি আনন্দ পেল ধর্মপদ মহারানা। সে লাফাতে–লাফাতে হাততালি দিতে লাগল।
নৃসিংহ দেব রাজবৈদ্যকে ডেকে কুকার চিকিৎসা করার আদেশ দিলেন। তিনি বললেন, ‘সম্পূর্ণ সুস্থ না-হয়ে ওঠা পর্যন্ত কুকাকে উৎকল-রাজার অতিথিশালায় বাস করার অনুমতি দেওয়া হল।’
দর্শকেরা নিজের নিজের ঘরে ফিরে গেল। সুবল মহারানাও ধর্মপদকে সঙ্গে নিয়ে অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে ফিরে গেল মন্দির প্রাঙ্গণের শিবিরে। তারা কেউ লক্ষ্য করল না যে একজনের আগুন ঝরানো দৃষ্টি এগারো বছরের ধর্মপদকে প্রায় ভস্ম করে ফেলছে। কুকার দুই চোখ ধর্মপদকে গিলে খাচ্ছিল। তার দুর্দশার সময়ে ধর্মপদ মহারানা আনন্দে লাফাতে-লাফাতে করতালি দিচ্ছিল এই দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠলেই কুকার মনটা গোখরোর বিষের মতো নীল হয়ে যাচ্ছিল।
মাঝে তিনটি সপ্তাহ অতিবাহিত হয়েছে। কুকার ভাঙা আঙুলগুলো এখন প্রায় ঠিকঠাক। শারীরিক ব্যথা-বেদনা প্রশমিত হয়ে গেলেও মনের একটা ব্যথা যে এখনও মেলায়নি। এখনও ধর্মপদের করতালির শব্দ কুকার কানে বাজছে। আজকাল মল্লবীর কুকা কোণার্ক মন্দিরের ভাস্কর্য দেখার অছিলায় প্রতিদিন গিয়ে ধর্মপদের সঙ্গে দেখা করে। সুবল প্রথম দিকে ব্যাপারটা জানত না। যখন জানল, তখন ধর্মপদকে সাবধান করে বলল, ‘ধর্ম, আহত ষাঁড়ের আশেপাশে ঘোরাফেরা করা কিন্তু বুদ্ধিমানের পরিচয় নয়। কুকার থেকে তোর দূরে থাকাই ভালো।’
ধর্মপদের বালক-বুদ্ধি। সোজা সরল মনোভাব। জগতের ষড়রিপু কিংবা নীতি-নিয়ম সম্পর্কে সে অনভিজ্ঞ। কুকা ক্রমশ তার কৃত্রিম স্নেহপাশে ধর্মপদকে আবদ্ধ করে ফেলছিল। একদিন সে ধর্মপদকে বলল, ‘কতবার কোণার্ক-মন্দিরটাকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করি, কিন্তু অসুবিধা হয়। দিনেরবেলায় এত শিল্পী এখানে কাজ করে, ঠকাঠক শব্দ। বড় কোলাহল। ধর্মপদ, আজ রাতে আমি মন্দির প্রাঙ্গণটাকে ভালো ভাবে ঘুরে দেখতে চাই, তুমি আমাকে ঘুরিয়ে দেখাবে?’
‘কেন দেখাব না? নিশ্চয়ই দেখাব।’ কুকার এক কথাতেই ধর্মপদ রাজি হয়ে গেল।
রাত্রি দুই প্রহর অতিক্রান্ত। সুবল মহারানা ভাবছে যে ধর্মপদ এখন বিশু মহারানার শিবিরে ঘুমোচ্ছে, আর বিশু মহারানা ভাবছেন যে তাঁর নাতি এখন সুবল মহারানার শিবিরে গল্প করছে। আর ধর্মপদ? সে এখন নির্মীয়মাণ কোণার্ক-মন্দিরের জগমোহনে কুকার জন্য অপেক্ষা করছে।
কুকা কাছেই লুকিয়ে বসে আছে। সে অনুকূল সময়ের অপেক্ষ করছে। সুবল মহারানার শিবির ব্যতিরেকে অন্যান্য সব শিবিরেরই প্রদীপ নিভে গিয়েছে এখন। নিঃশঙ্কর মূর্তির পিছন থেকে কুকা আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল। সে ধর্মপদের কাঁধে এসে হাত রাখল। বালকসুলভ হাসি খেলে গেল ধর্মপদের মুখে। এবার ধর্মপদ আর কুকা দুজনে মিলে এক-একটা মূর্তির সামনে গিয়ে গিয়ে কোণার্কের সৌন্দর্য দেখতে আরম্ভ করল। দুজনেই দেখতে লাগল বটে, কিন্তু কুকার মনোযোগ কোণার্কের ভাস্কর্যের দিকে নেই।
অরুণ স্তম্ভের কাছে পৌঁছে কুকা একবার চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিল। চরাচর নিস্তব্ধ। শুধু সুবল মহারানার শিবির থেকে পাথরের বুকে ছেনি ঠোকার শব্দ ভেসে আসছে—ছন্ন্...ছন্ন্...ছন্ন্...।
ধর্মপদ অরুণ স্তম্ভ সম্পর্কে সুবল মহারানার কাছে যা যা শুনেছিল, সেই সব কথা কুকাকে নাগাড়ে বলে চলেছে। কিন্তু সেসবে কুকার মন নেই। আচমকাই সে নিজের বাঁ-হাত দিয়ে ধর্মপদের একটা পা ধরে নিজের ডান হাতে ধর্মকে কষে পাকড়ে নিজের মাথার উপরে তুলে নিল। ধর্মপদ এতটাই হকচকিয়ে গেছে যে কী ঘটছে বুঝে উঠতে পারছে না। এবার কুকা পাশেরই একটা পাথরে ধর্মকে এমন সজোরে আছাড় মারল যে এক আঘাতেই তার মাথাটা ফেটে চৌচির হয়ে গেল। চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল মাথার ঘিলু, রক্ত। মুহূর্তের মধ্যে নিথর হয়ে গেল ছোট মহারানার দেহ। কোণার্ক নির্মাণে অমূল্য যোগদানকারী, সকলের প্রিয় ধর্মপদ মহারানার জীবনাবসান হল। অহংকার আর অসূয়াতে ভরা কুকা এক নিরীহ বালকের প্রাণ কেড়ে নিল।
কুকা সেই রাতেই উৎকল ছেড়ে পালিয়ে গেল।
পরদিন পৌত্রের শবদেহ দেখে বিশু মহারানা শোকে মূর্ছিত হয়ে পড়লেন।
চন্দ্রভাগার তটে ধর্মপদের চিতা সাজানো হয়েছে, কিন্তু বিশু মহারানা কিছুতেই ধর্মর মুখাগ্নি করতে রাজি হচ্ছেন না। নৃসিংহ দেব এবার বললেন, ‘পৌত্রর মুখাগ্নি করুন, বিশু মহারানা। যা হওয়ার, তাকে কে আটকাবে? এখন নিজের ধর্ম পালন করুন। কোণার্কের সর্বকনিষ্ঠ তথা মহান শিল্পীর অন্তিম সংস্কার যে করতেই হবে।’
‘কীভাবে এই কাজ করব মহারাজ? ওই ছেলের মুখে একসময় দুধ তুলে দিয়েছি, আর আপনি আজ বলছেন ওই মুখেই আগুন দিতে?’
এবারে রাজা নৃসিংহ দেব সুবলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শিল্পী, তাহলে তুমিই এই কাজ সম্পন্ন করো।’
‘আমাকে এই অনুরোধ করবেন না। আমার কর্তব্য যে আরও বড়...’ সুবলের স্বর এতটুকু কাঁপল না, কিন্তু অশ্রু ঠিকরে বেরিয়ে এল তার চোখ থেকে।
‘আরও বড় কর্তব্য? কী বলছ তুমি?’
‘মুখাগ্নি করলে আমার অশৌচ আরম্ভ হবে। তারপর ষোলো দিনের জন্য কোণার্কের ভাস্কর্যে ত্যাজ্য হয়ে যাব। ছেনি অবধি স্পর্শ করতে পারব না। আমাকে মুখাগ্নি করতে বলবেন না। আমি পারব না! আমি পারব না!’ প্রত্যাখ্যান নয় বেদনাই তার কথার গোপন কারণ।
‘আমি ধর্মপদের মুখাগ্নি করব!’
এই কণ্ঠস্বর শুনে সকলে চমকে তাকাল। ‘আমি রক্তের সম্পর্কে ধর্মপদ মহারানার কেউ নই, কিন্তু ব্রাহ্মণ হওয়ার কারণে এই অধিকার আমার আছে। আমিই ওকে মুখাগ্নি দেব! ওর সকল পারলৌকিক ক্রিয়ার সমস্ত দায়দায়িত্বও আমিই নিলাম।’ বক্তা আর কেউ নন স্বয়ং আচার্য সৌম্য শ্রীদত্ত দীক্ষিত মহাশয়। নিজের কন্যা শিল্পার অন্তিম সংস্কার, শ্রাদ্ধাদি করতে না-পারা শ্রীদত্ত ধর্মপদের শব সৎকার করার মধ্যে দিয়ে মনের সান্ত্বনা খুঁজে চলেছেন।
লেলিহান চিতার অগ্নিরথে শায়িত ধর্মপদ ইহলোক ত্যাগ করল।
আষাঢ় মাসের শুক্ল দ্বিতীয়া। প্রভু জগন্নাথ দেবের বিশ্ববিখ্যাত ‘ঘোষ-যাত্রা’ অর্থাৎ রথযাত্রার দিন। তিন দেবতাই বাইশ বেহারার পিঠে চেপে নাচতে-নাচতে চলেছেন সিংহদ্বারে। সিংহদ্বার থেকে বলগণ্ডি অবধি ভ্রাতা ভগিনী সহ প্রভুকে আসীন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য ষোল চাকা, চোদ্দ চাকা আর বারো চাকার তিনটি রথ ইন্দ্রদ্যুম্ন পাটনায় অপেক্ষা করছে। মালিনী নদীর উত্তরে জগন্নাথ দেবের মাসিমা গুণ্ডিচা দেবীর নিবাসস্থল—আড় মণ্ডপ। বলগণ্ডিতে রথ পৌঁছালে পরে তিন ঠাকুরই দোলচাপ-এ চেপে নদীর ওপারে যাবেন, ওপারে দাঁড়িয়ে থাকবে চারচাকার পাটনা রথ। সেই রথে উঠে সোজা গুণ্ডিচা দেবীর মন্দির প্রাঙ্গণে পৌঁছাবেন তাঁরা।
রথযাত্রায় সবার আগে থাকে তালধ্বজ নামক রথ। চোদ্দটা চাকা। তালধ্বজে চড়েন শ্রী বলরাম। তার ঠিক পিছনে বারো চাকার পদ্মধ্বজ রথে থাকেন দেবী সুভদ্রা ও সুদর্শন চক্র, এবং সবার শেষে ষোল চাকার নন্দীঘোষ নামক রথে শ্রী জগন্নাথ দেব বিরাজ করেন। সন্ধে নামার আগেই এই তিন দেবতা গুণ্ডিচা দেবীর মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত হন। পরদিন রথ থেকে নেমে ভগবান মন্দিরে প্রবেশ করেন। এবং আগামী সাতদিন সেখানেই বিরাজ করেন।
বড়দাণ্ডে আজ বিপুল জন সমাগম হয়েছে। নীলাদ্রি-বিহারী গোলোকনাথকে একটি বার স্বচক্ষে দেখার জন্য ভক্তিবিহ্বল মানুষের ঢল ছলছল চোখে প্রতীক্ষা করছে। আজ নীলাদ্রিনাথের এই রথযাত্রা মহারাজ নৃসিংহ দেবের সঙ্গে সমগ্র উৎকল জাতির বিজয়যাত্রাতে পরিণত হয়েছে। যখন সম্পূর্ণ ভারতবর্ষ ম্লেচ্ছদের পায়ে দলিত, মথিত, রক্তরঞ্জিত হয়ে উঠছে, তখনও স্বাধীন হিন্দু রাজ্য রূপে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার গর্ব বহন করে চলেছে উৎকল। আর এই গর্বের স্বামী শ্রী জগন্নাথ মহাপ্রভু।
যুদ্ধজয়ের উল্লাস, নৃসিংহ দেবের পুনর্জীবন প্রাপ্তি, কোণার্ক মন্দির গড়ে ওঠার অন্তিম পর্বের পুলক, আজকের এই রথযাত্রার উল্লাস মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। সীঙ্গি, পটহ, তূর্য, ডমরু, ঘণ্টা, শঙ্খ, ঘড়িয়াল, করতাল, ঝাঁঝর, বীণার সম্মিলিত ঝঙ্কারে গুঞ্জরিত হতে থাকা বেদবাণী, ভক্তদের কীর্তন আর জগন্নাথ স্বামীর নামে দেওয়া জয়ধ্বনির উদঘোষ এক মহাঘোষে পরিণত হয়ে আকাশ–বাতাস কাঁপিয়ে তুলছে। সুখ–দুঃখ, মিলন–বিরহ, জয়–পরাজয়, প্রাপ্তি–অপ্রাপ্তি, আশা–নিরাশা এই সবকিছু ভুলে বিমুগ্ধ ভক্তদের আত্মা দারুব্রহ্মের পুরুষোত্তম বিগ্রহ দর্শনের জন্য আকুল প্রতীক্ষা করে চলেছে।
প্রলয় প্রয়োধি সংসার-পারাবারের অগাধ জলরাশিতে আমস্তক নিমজ্জিত আত্মারা নিজেদের করুণপ্রবণ আরাধ্যকে দর্শনের জন্য আতুর। কামনা, বাসনা, ভোগ, লালসা সবই এখন বিস্মৃত। জ্ঞান, গরিমা, স্বাভিমান, অহংকার সব ত্যাগ করে চরম উন্মাদনা নিয়ে সকল ভক্ত এখন পরমপদকমলে লীন হতে ব্যাকুল। উৎকলের গর্ব, গৌরব, ত্রাতা, ওই রহস্যময় পুরুষোত্তমের পতিত পাবন বেশ দেখার জন্য জনসমুদ্র আজ ভাবতরঙ্গে উদ্বেলিত। ভক্তমানসে একটাই বাক্য গুঞ্জন তুলছে—‘রথেতু বামনম্ দৃষ্টবা পুনর্জন্মম্ ন বিদ্যতে!’
চোড়গঙ্গ দেবের আমল থেকে অমরাবতী-কটক থেকে কাঠ এনে রথ বানানো হতো। কিন্তু মহারাজ নৃসিংহ দেব এবারে সুন্দরবন থেকে কাঠ আনয়ন করিয়েছেন। নায়ক দামোদর মহাপাত্র রাজার আজ্ঞা অনুসারে নদীপথে বড় ভেলায় চাপিয়ে ভাসিয়ে এনেছেন সেই কাঠ। রথকে যে চিত্রকাররা চিত্রকারী দিয়ে সাজায়, তাদের জন্য চিত্রকারসাহী এবং যারা ফুল দিয়ে রথসজ্জা করে, সেইসব মালাকারদের জন্য মালাকারসাহী নৃসিংহ দেবই বসিয়েছেন হরবংশপুর গ্রামে।
কাশ্মীর রাজ্যে দূত পাঠিয়ে সীতাদেবীর পিতৃগৃহ থেকে সুরুবুলী শালের চাঁদোয়া আনিয়ে সাজানো হয়ছে রথ। দখিনা বাতাসে পতপত করে উড়ছে রথের পতাকা। আজ নৃসিংহ দেব স্বয়ং রথের পথ ঝাঁট দেবেন। তারপর রজ্জু স্পর্শ করবেন।
জগন্নাথ দেবের মন্দিরে এক ধরনের বিশেষ সেবক সম্প্রদায় আছে, যারা রথ টানে। তাদের বলা হয় ভগতগণ। এই ভগতগণই তারপর বত্রিশ হাত টেনে নিয়ে যাবে রথকে। সেখান থেকে ছয়টি শ্বেত হস্তী রথকে টেনে নিয়ে যাবে বলগণ্ডি। আর তারপর দোলচাপে চড়ে ভগবান নদী পার করে যাবেন মাসির বাড়ি।
রথের অভীষব ধরে টান দিলেন মহারাজ নৃসিংহ দেব। হরিবোল, হুলধ্বনি আর বাদ্যযন্ত্রের নিনাদে রথদাণ্ড কেঁপে উঠল, মেদিনী দুলে উঠল, থরথর করে উঠল দশদিক, বায়ুতে উঠল গুঞ্জন। মন–প্রাণ–হৃদয় স্পন্দিত হল। নন্দীঘোষের চাকার ঘর্ঘর শব্দে মুখর হয়ে উঠল পরিসর। উল্লসিত হয়ে উঠল স্বর্গ–মর্ত্য–পাতাল। কোটি কোটি মানুষ যেন এক প্রাণ নিয়ে বলে উঠল—হে অচল মহামেরু, তুমি যদি স্বেচ্ছায় না-চলো, তবে কার সাধ্য আছে যে তোমাকে চলমান করে তুলবে? আর সেই তুমিই আজ ভক্তদের ইচ্ছানুসারে এগিয়ে চলেছ। কত কামনা নিয়ে ভক্তরা আজ তোমার দ্বারে এসেছিল, কিন্তু সেইসব কামনা এখন বিস্মৃত, স্মৃতি লুপ্ত এখন। আজ সবাই শোক–দুঃখ ভুলে গিয়েছে। মৃত্যুও এখানে অমৃতময়।
এই রহস্যময় দারুব্রহ্মের এ কেমন সম্মোহন? আচার্য শঙ্কর লিখে গিয়েছিলেন, আমি রাজ্য কামনা করি না। স্বর্গ কিংবা মণিমাণিক্যের প্রয়োজন আমার নেই। সর্বজন বাঞ্ছিত মনোহারিণী কামিনীর অভিলাষীও আমি নই। প্রমথপতি মহেশ্বর যুগ যুগ ধরে নিরন্তর যার চরিত্র বন্দনা করেন, সেই প্রভু জগন্নাথ আমার নয়নপথগামী হোন।
ন বৈ প্রার্থ্যং রাজ্যং ন চ মাণিক্য বিভবং,
ন য়চেহং রম্যং নিখিলজনকাম্যাং বরবধূং।
সদা কালে কালে প্রমথপতিনা গীতচরিতো,
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতুমে।।
আষাঢ়ের মেঘ আকাশ ঘিরে ফেলেছে। দেবলোক থেকে ঝরে পড়ছে আশিসের মধুবারি। নৃসিংহ দেবের চোখ দিয়েও অঝোরে বয়ে চলেছে আনন্দাশ্রু। মনে এখন একটাই প্রার্থনা, ‘এই জীবনে একটি বার, কেবল একটি বার ওই যুবতী নারীর দর্শন করিয়ে দাও প্রভু, যে মৃত্যুর কোলে শুয়ে থাকা নৃসিংহ দেবের মুখে তোমার প্রসাদ তুলে দিয়েছিল। তুমি না-চাইলে আমি কীভাবে তাকে খুঁজে বের করব বলো তো? তার স্বামীর কঠোর পরিশ্রমেই কোণার্ক গড়ে উঠছে। প্রায় পূর্ণ হতে চলেছে আমার স্বপ্নের মন্দির। সেই শিল্পী যখন ঘরে ফিরে যাবে, তখন সেখানে তার স্ত্রীকে দেখতে না-পেলে তার কী হবে প্রভু? হে দীনবন্ধু, একটি বার তার সাক্ষাৎ করিয়ে দাও, একটি বার...!’
হঠাৎই নৃসিংহ দেবের দৃষ্টি একজন রমণীর উপরে পড়ল। চোখ নিবদ্ধ হয়ে গেল সেখানেই। ভাবসমুদ্রে ডুবে সেই নারী বিশাল জনসমুদ্রকে দেখে চলেছিল, এবং তার চোখাচুখি হয়ে গেল মহারাজের সঙ্গে। ‘ওই তো! ও-ই তো!’ ধড়ফড় করে এগিয়ে গেলেন মহারাজ, কিন্তু কোথায় কী? এই মহাজনপারাবারে কি আর একটি জলকণাকে আলাদা করে ধরতে পারা সম্ভব? সে ততক্ষণে ভিড়ে বিলীন হয়ে গিয়েছে।
নৃসিংহ দেবের মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল, ‘এ কেমন লীলা তোমার? সব শুনলে, তবু প্রার্থনা স্বীকার করলে না? তুমি তো মন পড়ে ফেল? এ কেমন বর দিলে? অবশ্য যা করেছ বুঝেই করেছ, প্রভু। ওই নারী তোমার শরণাগত, এই দীন হীন নৃসিংহ দেবের আশ্রয়ের কি আর কোনো প্রয়োজন আছে ওঁর? তোমার মনে কী আছে তুমিই জানবে। শুধু প্রার্থনা করি, ওই নারী এবং ওঁর স্বামীর একটিবারের জন্য সাক্ষাৎ করিয়ে দিও প্রভু।’
ওদিকে বিনোদিনী দেখে ফেলেছিল মহারাজ রথের পথে ঝাঁট দিচ্ছেন। মনে আবেগের সাগর তোলপাড় হয়ে চলেছিল, ‘তাহলে যে পুরোহিত আমাকে কুয়োতে পড়ে যাওয়ার সময় রক্ষা করেছিল, যে মহাদণ্ডপাশ আমাকে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার সময়ে আটকে দিয়ে নতুন জীবন দিয়েছিল, এবং যে আহত সৈনিককে আমি নিজের কুটিরে আশ্রয় দিয়েছিলাম, সে আর কেউ নয়, স্বয়ং মহারাজ নৃসিংহ দেব? ছিঃ ছিঃ! আমি ওঁর সামনেই ওঁকে কত ভর্ৎসনা করে গিয়েছি, কিন্তু উনি একটি কথাও অন্যথা নেননি। প্রত্যেক বার আমি ওঁর কৃপা পায়ে ঠেলে পালিয়ে বেড়িয়েছি, আর নিয়তি বার বার আমাকে ওঁরই সামনে এনে ফেলেছে। কিন্তু আজ কীভাবে পালাব?
আজ মহারাজ আমাকে দেখলেই ধরে নিয়ে যাবেন কোণার্কে। আমি সমাজ থেকে বহিষ্কৃতা, স্বামী আমার এই অবস্থা দেখলে মনোকষ্টেই মরে যাবে। তখন শাশুড়ি মা বলতেন, তুই কুলটা, অলক্ষুণে। তুই মরলেই একটা পয়মন্ত মেয়েকে বউ করে আনব। নিশ্চয়ই বাড়ি ছেড়ে আসার পর আমার স্বামীর কাছে আমার সংবাদ গিয়েছে, আমার নামে অপবাদ গিয়েছে। এখন আর তাঁকে কীভাবে এই মুখ দেখাব? তাঁর জন্য আমি যে এখন মৃত। বরং তিনি কোণার্ক থেকে বাড়ি ফিরলে দ্বিতীয় বিয়ে করবেন। নতুন সংসার পাতবেন। আমি সেই পথে বাধা দিতে চাই না। না, না রাজার দৃষ্টি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে হবে।’
নিজের মনে জন্ম নিতে থাকা চোরা স্রোতে ডুবে বিনোদিনী নিজেকে ভিড়ের মধ্যে লুকোতে চেষ্টা করল। তখনই তার চোখে পড়ল রাজপথের পাশের একটি সংকীর্ণ গলিপথ। সেখানেও অবশ্য মানুষ কম নেই। বিনোদিনী গলির দিকে এগোল। কিছুটা দূর অবধি হেঁটে চলার পরে সে বুঝল গলির অন্য মাথাটা আসলে বন্ধ। অসহায় ভাবে সে নিজের চারিপাশে তাকাল। হঠাৎই তার কানে এল এক অমৃত স্বরলহরী। মনে হল নতুন প্রাণের সঞ্চার হল আবহে।
গলির একটা দিকে, একখানা ছোট্ট বাড়ি। বাড়ির সামনে আঙিনা। সেখানে তুলসীর মণ্ডপ। আঙিনার একটি কোণে, ছায়ায় বসে এক তরুণী করুণ স্বরে তন্ময় হয়ে গীতগোবিন্দ পাঠ করে চলেছে।
নিভৃতনিকুঞ্জগৃহম্ গতয়া নিশি রহসি নিলীয় বসন্তম্।
চকিতবিলোকিতসকলদিশা রতিরভসরসেন হসন্তম্।।
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
সখী হে কেশিমথনমুদারম্
রময় ময়া সহ মদনমনোরথভাবিতয়া সবিকারম্।।
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
প্রথমসমাগমলজ্জিতয়া পটুচাটুশতৈরনুকূলম্।
মৃদুমধুরস্মিতভাষিতয়া শিথিলীকৃতজঘনদুকূলম্।।
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
কিশলয়শয়ন নিবেশিতয়া চিরমুরসী মমৈব শয়ানম্।
কৃত পরিরম্ভণ-চুম্বনয়া পরিরভ্য কৃতাধরপানম্।।
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
অলসনিমীলিতলোচনয়া পুলকাবলিললিতকপোলম্।
শ্রমজলসকলকলেবরয়া বরমদনমদাদতিলোলম্।।
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
কোকিলকলরবকূজিতয়া জিতমনসিজ-তন্ত্রবিচারম্।
শ্লথকুসুমাকুলকুন্তলয়া নখলিখিতঘনস্তনভারম্।।
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
চরণরণিতমণিনূপুরয়া পরিপূরিতসুরতবিতানম্।
মুখরবিশৃঙ্খলমেখলয়া সকচগ্রহচুম্বনদানম্।।
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
রতিসুখসময়-রসালসয়া দরমুকুলিতনয়নসরোজম্।
নিঃসহনিপতিততনুলতয়া মধুসূদনমুদিতমনোজম্।।
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
মালব রাগে গাওয়া গীতগোবিন্দ-এর এই পদাবলী একতারার তন্ত্রী-নিনাদের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে অপূর্ব মধুক্ষরণ করে চলেছে। তৃষ্ণায় বিনোদিনীর কণ্ঠ শুকিয়ে আসছিল, কিন্তু এই পদাবলী শোনার পর যেন তিরোহিত হয়েছে সেই তেষ্টা। মনে কিছুটা সঙ্কোচ রেখেই বাঁশের জাল-দরজা খুলে সেই বাড়ির আঙিনায় ঢুকে পড়ল বিনোদিনী।
ভিতরে পা-রাখতেই অনির্বচনীয় এক আহ্লাদে তার দেহ পুলকিত হয়ে উঠল। একটা বিরাট তুলসী মঞ্চে তুলসীর একাধিক চারা রোপিত হয়েছে। প্রতিটা চারাগাছের ফাঁকে ফাঁকে একটি করে দমনকের গুল্মলতা। মঞ্চের চারটি কোণে, মাটিতে পোঁতা আছে বৈজয়ন্তী লতাগাছ। ফুলও ফুটে রয়েছে। বাঁশের জাল-দরজা থেকে বাড়ির মূল অংশে প্রবেশের মধ্যেকার পথটা আট হাত চওড়া। সেই পথের দুধারের মাটিতে লকলক করছে অপরাজিতার লতা। বাঁশ দিয়ে ভরদণ্ড তৈরি করা আছে তাদের বেড়ে ওঠার জন্য। বছরের এই সময়টাতেই অপরাজিতার ফুল ফোটে, চারিদিকে নীল আর সাদা অপরাজিতার এত ফুল দেখে মণিমাণিক্যের ছড়াছড়ি বলে ভ্রম হয়।
বিনোদিনী কোনো রকমের শব্দ করতে চায়নি। কিন্তু না-জানি কেন সেই যুবতী নিজের গান থামিয়ে দিল। শান্ত হয়ে গেল একতারার ঝঙ্কার। চোখ মেলতেই সেই যুবতী দেখল এক নারী তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুখেচোখে অসহায় একটা ভাব। গীতগোবিন্দের এই পদাবলী গাইতে গাইতে যুবতীর চোখ আনন্দাশ্রুতে ভরে গিয়েছিল। জল পুঁছতে পুঁছতেই সে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, ‘সখী, কে তুমি? কী চাই?’
‘আমি এক অভাগী, বোন। অসহায়। আশ্রয়হীন। এই জগতে মাথাটুকু গোঁজার মতো জায়গাও আমার কাছে নেই। তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে। খিদেতে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। একটু জল হবে?’
‘কী বলছ, সখী? এটা শ্রীক্ষেত্র! এখানে কেউ নিরাশ্রয় হয় না। সবার নাথ শ্রী জগন্নাথ স্বামী। এসো, দাওয়াতে উঠে এসো। কুশ-তল্পিতে এসে বোসো। আমি এখুনি আসছি।’ কথা শেষ করেই যুবতী গৃহের ভিতরে চলে গেল। যখন সে ফিরে এল, তখন তার হাতে কাঁসার থালায় চাল আর গুড় দিয়ে তৈরি অন্নরসা, আর একটা মাটির কটোরায় জল।
‘নাও সখী। জগন্নাথ দেবের প্রসাদ মনে করে খেয়ে নাও দেখি।’
প্রসাদ পেয়ে বিনোদিনী একটু তৃপ্ত হলে পরে যুবতী জিজ্ঞাসা করল, ‘তা যাবে কোথায়? আজ যে পথে বিষম ভিড়?’
‘কোথায় আর যাব? জগন্নাথ মহাপ্রভুই আমার রক্ষক, তিনিই আমার পথ-প্রদর্শক। তিনি যেদিকে নিয়ে যাবেন, চলে যাব। তোমার মুখে গীতগোবিন্দের অমৃতময় পদাবলী শুনে ধন্য হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল রোজ এমন পদাবলী শুনেই বাকি জীবনটা কেটে যাক।’
‘সত্যিই তোমার কেউ নেই? তাহলে তুমি আমার কাছেই থেকে যাও। আমি প্রভু জগন্নাথের দেবদাসী। আমার নাম পেখম। আমার সহচরী রূপে যে দাসীটি ছিল, সে বিয়ের পর নিজের স্বামীর গৃহে চলে গিয়েছে। একা একা সবদিক সামাল দেওয়া এবং একইসঙ্গে প্রতিদিন নৃত্যগীতের অভ্যাস করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তুমি এখানে থেকে গেলে আমারও সুবিধা হবে, আবার তোমারও আশ্রয় মিলবে। কি, থাকবে আমার সঙ্গে?’
অন্ধ আর কী চায়? শুধু দুটি চোখ।
‘যদি প্রভু জগন্নাথ আমার নিয়তিতে এই কথাই লিখে থাকেন, তাহলে তাকে খণ্ডন করার সাধ্য আমার নেই। আমার মন চিনে নিয়ে তিনিই আমাকে এখানে, তোমার এই নির্ভয় আশ্রয়ে এনেছেন।’
‘সত্যিই তা-ই। জগন্নাথ দেবের মহিমা অপার!’
‘কিন্তু তুমি আমাকে তাহলে সখী বলে ডেকো না। আমি তোমার দাসী হয়েই থাকব। সখীর বাড়িতে কি আর দীর্ঘদিন থাকা যায় নাকি?’
‘আমি তোমায় সখী বলেই ডাকব। তুমি আমার সখী, আমি তোমার স্বামীনি। সম্পর্ক আসলে মনের বন্ধনে তৈরি হয়। এসো, ভিতরে এসো।’
এই নিরাপদ আশ্রয়েই জগন্নাথ মহাপ্রভুর সেবা অর্চনা করে বিনোদিনীর দিন কাটতে লাগল। মাঝেমধ্যেই সে ভাবে, তার জীবন কী ছিল, আর কী হল। পতিতপাবন জগন্নাথ দেবের রথারূঢ় বিগ্রহ দেখে নেওয়ার পর এই দুঃখ–বেদনা আর হাহাকারে ভরা জগৎ সংসারে আর জন্ম নিতে হয় না। কিন্তু রথের উপরে অধিষ্ঠিত দেবতার মুখ দর্শন হল কই? তার আগেই তো দেখা হয়ে গেল মহারাজ নৃসিংহ দেবের সঙ্গে। পালিয়ে আসতে হল। জগন্নাথ স্বামীর ইচ্ছা না-থাকলে তাঁর মুখ দেখার সাধ্যি কারো নেই।
জীবনভর যে পুরুষটি তার মনের নদীতে শক্তি, সম্ভ্রম, মমতা এবং মাধুর্যের ধারা শুকোতে দিল না, সে আসলে পরম পুরুষ, জগন্নাথ স্বামীর সেবক, উৎকলের অপরাজেয় নরপতি। স্বামী কোণার্কের শিল্পী, স্থপতি। আর এত সৌভাগ্যের পরেও সে একজন ভাগ্যহীনা, পরিত্যক্তা, স্বামী-স্নেহ বঞ্চিতা এক নিরাশ্রিতা নারী, যার নিয়তিতে সবার থেকে মুখ লুকিয়ে রাখা, পরিচয় গোপন রাখাই লেখা রয়েছে। ‘হে জগন্নাথ, এ কেমন বিড়ম্বনা? এই কষ্টের শেষ কোথায়? চলার পথে আর কত কাঁটা বাকি রয়েছে, তুমিই বলো, প্রভু?’
নৃসিংহ দেবের শিল্পানুরাগের সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন, কোণার্কের সূর্য মন্দির সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। রাজত্বের বারো বছরের সকল রাজস্ব ব্যয় করে, বারোশো শিল্পীর অকল্পনীয় পরিশ্রমের ফলে এই শিল্পসাধনা সম্পন্ন হতে পেরেছে। মহারাজ নৃসিংহ দেবের সবচেয়ে কঠিন ব্রতটিকে উদ্যাপনের তিথি ক্রমশ এগিয়ে আসছে। নৃসিংহ দেবের হাতে বার বার পরাজিত গৌড়ের মুসলিম শাসক ইখতিয়ারউদ্দিন বেগের মৃত্যু হয়েছে। বারোশো ছেচল্লিশ সন থেকে মুসলমানদের সঙ্গে চলে আসা সংঘর্ষের অবসান ঘটেছে এখন। উৎকল এবার নিষ্কণ্টক। এবং কোণার্ক এখন সম্পূর্ণ। যবন শাসনে আক্রান্ত ভারতভূমির একমাত্র স্বাধীন রাজ্য উৎকলের প্রত্যেক ঘরে এখন প্রতিদিনই উৎসব পালিত হয়। বীর, লড়াকু পাইকেরা মুসলমান শাসকের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। এখন আর ম্লেচ্ছদের পক্ষ থেকে প্রতি-আক্রমণের কোনো প্রশ্নই নেই। স্বাধীনতার সূর্য উৎকলকে আলোকিত করে চলেছে অবিরত।
সন ১২৫৮। মাঘ শুক্ল সপ্তমী। বিক্রম সম্বতের হিসাবে সম্বৎ ১৩১৪। রবিবার। সাধ্য যোগ। মেষ রাশি, অশ্বিনী নক্ষত্র, রাশি অধিপতি মঙ্গল, নক্ষত্র অধিপতি কেতু, মকর লগ্ন। শুক্র ধনুতে, তুলায় বৃহস্পতি অর্থাৎ শুক্র আর বৃহস্পতি পরস্পর রাশি বিনিময় করেছে, স্থাপত্য এবং নির্মাণের কারক স্বগৃহী শনি কুম্ভে এবং তুলা রাশিতে মঙ্গল আর বৃহস্পতির চন্দ্রের উপর তথা মেষ রাশিস্থ চন্দ্র মঙ্গল তথা বৃহস্পতির উপর পরস্পর পূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করছে অর্থাৎ গজকেশরী যোগ। সঙ্গে রবিবার তথা অশ্বিনী নক্ষত্রের যোগের ফলস্বরূপ সমস্ত কাজে সিদ্ধিদায়ক সর্বার্থসিদ্ধি যোগের শুভ মুহূর্ত।
মাঘমাসের শুক্ল পক্ষের সপ্তমী তিথিতে অচলা সপ্তমী পর্ব পালিত হয়। এছাড়াও এর অনেক নাম—সূর্য সপ্তমী, রথ আরোগ্য সপ্তমী, সূর্যরথ সপ্তমী, পুত্র সপ্তমী। শাস্ত্রের মতে, সূর্যদেবতা এই দিনেই সমগ্র জগৎকে নিজের আলোয় আলোকিত করেছিলেন, তাই এই মাঘ শুক্ল সপ্তমী তিথিকেই সূর্য-জয়ন্তী রূপে পালন করা হয়। যদি কখনো এই সপ্তমী রবিবারে পড়ে, তখন তাকে ভানু সপ্তমীও বলা হয়। পরম বৈষ্ণব নৃসিংহ দেবের শাসনকালে এই মহাযোগ এবারেই প্রথম এসেছিল। তা-ও আবার এক অদ্ভুত সময়ে—যখন কোণার্কের সূর্যমন্দিরের কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। রাজগুরু ভাব সদাশিবের কথা অনুসারে অর্কক্ষেত্রে সূর্যদেবের জন্মদিনের এই মহামুহূর্তে বিশ্ববাসীর হাতে বিশ্ববিখ্যাত সূর্যমন্দির তুলে দিতে পারলে তার থেকে বড় কোনো উপহার আর হতেই পারবে না। অতএব, কোণার্কের সূর্য মন্দিরের প্রতিষ্ঠাদিবস নিশ্চিত হয়ে গেল।
কোণার্ক ক্ষেত্রে এখন আনন্দ আর উল্লাসের আবহ। মহেন্দ্রগিরি স্থিত গোকর্ণেশ্বর মন্দির, মুখলিঙ্গম, শ্রীকূর্ম এবং সিংহাচলের বিষ্ণু মন্দিরগুলিতে অখণ্ডদীপ জ্বলে উঠেছে। জাজপুরের গঙ্গেশ্বর তথা বয়ালিশবাটির গঙ্গেশ্বরী মন্দিরে, বেগুনিয়ার প্রাচীন দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে, রেমুণার গোপীনাথ মন্দিরে এবং পুরী জগন্নাথ দেবের মন্দিরে কোণার্কের সফল প্রাণ প্রতিষ্ঠার জন্য পূজা-অর্চনা করা হচ্ছে। কপিলাশ্ব পর্বতের শিখরেশ্বর মন্দিরে বারো লক্ষ বিল্বপত্র এবং বারো লক্ষ চাঁপাফুল দিয়ে করা হয়েছে অখণ্ড রুদ্রাভিষেক।
কোণার্কের প্রতিষ্ঠার উৎসবে সম্মিলিতে হওয়ার জন্য সাগরপথে অনেক দ্বীপের রাজা, ধর্মবেত্তা, বিদ্বান, জ্যোতিষী, পণ্ডিত, কবি, সঙ্গীতজ্ঞ তথা গুণীজনেরা অতিথি হয়ে এসেছেন। পুরী, কৃত্তিবাস, রেমুণা, বারাণসী, নারায়ণপুর, দেবকূট, দ্বারকাপুরী, প্রভাস, পাটন, শূর্পারক ক্ষেত্র, কোথা থেকে আসেনি মানুষ? দেশের প্রত্যেক কোণ থেকে আসা জনতা ভিড় করেছে কোণার্কে। কোণার্কের প্রসিদ্ধি শুনেই এসেছেন, ‘চলো, একবার দেখে আসি—কী আছে কোণার্কে?’
কোণার্কের প্রতিষ্ঠার আগেই মহারাজ নৃসিংহ দেব সকল কোণার্ক–শিল্পীকে সর্বোত্তম পারিতোষিক দিয়েছেন। প্রত্যেক শিল্পীর জন্য আজীবন বৃত্তির ব্যবস্থা স্বীকৃত হয়েছে। সুবল মহারানাকে নিজের হাতে রত্ন পদক পরিয়ে দিয়ে শিল্পী–শিরোমণির উপাধি দিয়েছেন রাজা নৃসিংহ দেব। তিনি নিজের ভূমি রাজস্ব মন্ত্রীকে এই নির্দেশ দিয়েছেন যে, সুবলের ইচ্ছা ও পছন্দ অনুসারে রাজ্যের যে কোনো অঞ্চলে তাকে ভূমি দানের ব্যবস্থা করা হোক।
প্রতিষ্ঠা–সমারোহে প্রত্যেক শিল্পীর পরিবারকে বিশেষ ভাবে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। সুবলের বাড়ি থেকে এসেছে তার মা আর ভাই ধবল মহারানা। তাদের দেখে সুবল আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়ল, কিন্তু তার চোখ খুঁজতে লাগল তার মনোনিধি বিনোদিনীকে। ‘তবে কি মা ওকে বাড়িতেই রেখে চলে এসেছে? ও যদি এখানে আসত, তাহলে আমাকে সম্মান প্রদান দেখে ওর মনের বিরহ ব্যথা হয়তো কিছুটা কমত। গর্ব করে বলতে পারত, আমার স্বামী শুধু একজন কোণার্ক-শিল্পী নয়, সে শিল্পী-শিরোমণি।’
সুবলের মায়ের অভিজ্ঞ চোখ। তিনি পুত্রের মনোভাব বুঝতে পেরেছেন। তিনি বললেন, ‘আর কী করা যাবে, সুবল? সব তাঁরই ইচ্ছা। বিনোদিনী একবার জেদ ধরল, বাপের বাড়ি যাব। আমিও ভাবলাম, ঠিক আছে যাক। মন ভালো থাকবে। তুই নেই, একা একা কি আর ওর ভালো লাগে? তারপর ওখানে না-জানি কী ঘটল? সব শেষ হয়ে গেল। আমরা তোকে আর কোনো খবর পাঠাইনি। তাহলে এখানে কাজে মন বসাতে পারতিস না, বাবা। আমার সংসারটা শূন্য করে দিয়ে চলে গেছে সে।’
সুবল মহারানা স্তম্ভিত হয়ে গেল। পাশেই কোলাহল চলছে। কিন্তু সুবলের কানে এসে কিছুই প্রবেশ করছে না। শুধুই প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে দুটি শব্দ—‘সব শেষ’, ‘সব শেষ’, ‘সব শেষ’!
‘এতদিন ধরে যে পদ্মগন্ধা কিশোরীর প্রতীক্ষা-মূর্তি মনের মধ্যে স্থাপন করে কোণার্কের পাষাণে সে ফুল ফুটিয়ে চলেছিলাম, সে তাহলে কবেই মিলন-বিরহ, সুখ-দুঃখের ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছে। ভালোই হয়েছে যে আমি এই সংবাদ পাইনি। পারতাম কি বিশু মহারানার মতো পাথর হয়ে থাকতে? কোণার্কের প্রত্যেক শিল্পীর বাড়ি থেকেই যদি সংবাদ আসত, তাহলে কি আর কোণার্কের কাজ সম্পূর্ণ হতো? কিন্তু তাই বলে এভাবে সব শেষ হয়ে যাবে? এত সহজে সবকিছু শেষ করে চলে যাওয়া কি মানায়?’
সুবলের মা ছেলের মনের ব্যথাটা টের পেয়েছেন, ‘সুবল, সংসার বড় অনিত্য। ভাঙা গড়া লেগেই থাকে। তুই বেঁচে থাক, তোর আবার বিয়ে দেব, সংসার করবি। ওর থেকেও সুন্দরী বউ পাবি। আর এখন তুই উৎকলের শিল্পী-শিরোমণি। তোর আবার চিন্তা কীসের? ধবলের জন্য মেয়ে দেখছিলাম। তোর জন্যেও একটি মেয়ে দেখেছি। বছর দশেক বয়স। তুই বাড়ি ফিরলেই এক মণ্ডপে দুই ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে দেব। আবার আমার সংসার ভরে উঠবে। যে চলে গেছে, তার জন্য কেঁদে আর কী হবে!’
সুবল কোনো উত্তর দিল না। বারো বছরের একাগ্র সাধনায় সে সুখ–দুঃখের অনেক উপরে উঠে গিয়েছে। কায়া-মন-প্রাণে সে আজ একজন বিবাগী। প্রিয়া পরিণীতার সঙ্গে মিলনের কামনায় সে বিভোর হয়েছে বটে, কিন্তু অধীর কখনো হয়নি। সে স্বর্গীয় প্রেমের ভাবনা মনে নিয়ে পাথরের বুকে ছবি এঁকে গিয়েছে, শিব-জগন্নাথের ভক্তিগাথা লিখেছে, নবগ্রহ–পাটে কুঁদেছে নিজের ভক্তির প্রমাণ।
আজও সে অধীর হল না। ভাবল, ‘সবই জগন্নাথ দেবের ইচ্ছা। এটাই হয়তো তাঁর সঙ্কেত যে কোণার্ক ছেড়ে যেও না।’ গিয়ে করবেই বা কী? ঘর আর ঘরণীর মোহেই তো কোণার্ক থেকে ঘরে ফেরার তাগিদ ছিল। পার্থিব সুখের জন্য অপার্থিব কামনা থেকে বিমুখ হতো। এখন আর কোনো বন্ধন নেই, সে মুক্ত বিহঙ্গ। ‘মায়ের জন্য ধবল তো রয়েইছে। শিল্পা আমাকে বেঁধেছিল, নিজেই মুক্তি দিয়ে গিয়েছে। ধর্মপদ আমাকে বেঁধেছিল। সেও বন্ধনমুক্তি ঘটিয়ে চলে গিয়েছে। আর সবথেকে বড় বাঁধন ছিল বিনোদিনী। সে যে কবে সেই বাঁধন ছিন্ন করে চলে গিয়েছে তা আমি জানতেই পারিনি। আমি নিজেই নিজের পায়ের বেড়ি হয়ে ফিরছিলাম, আর নয়, আর নয়...।’
সুবল এবার শিবেই সান্তারার সঙ্গে দেখা করল। তিনি ভয়ানক ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু সুবলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য সময় দিলেন। সুবল স্পষ্ট জানাল যে সে কোণার্ক ছেড়ে ফিরে যেতে ইচ্ছুক নয়। কোণার্কের পাশেই কোথাও তাকে ভূমি দান করা হলে মহারাজের দ্বারা প্রদত্ত আজীবন বৃত্তির সাহায্যে সে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে চায়।
শিবেই সান্তারা বললেন, ‘তোমার জন্য উপযুক্ত ভূমির সন্ধান করা হবে, সুবল।’
‘আমার নিজস্ব একটি পরিকল্পনা আছে। অভয় দিলে বলি।’
‘বলো, সুবল...’
‘কুশভদ্রার তীরে বেগুনিয়া গ্রাম। সেখানে পাতাল ফুঁড়ে উঠে এসেছে একটি শ্বেতবর্ণের শিবলিঙ্গ। মহারাজ সেই শিবলিঙ্গটির জন্য দক্ষিণেশ্বর মহাদেবের মন্দির নির্মাণের ঘোষণা করেছেন। দক্ষিণেশ্বর মহাদেবের সেই মন্দিরের নির্মাণস্থলের পাশেই রয়েছে একটি কেতকী বন। আমাকে সেই বনের ধারেই একটি কুটির বানিয়ে থাকার মতো ভূমি প্রদান করে দিন, মন্ত্রী মশাই।
বহুবার ওই শিবলিঙ্গকে দর্শন করার জন্য গিয়েছি। এবং প্রতিবারই কেয়া বনের সৌন্দর্য আমাকে আকৃষ্ট করেছে। জানেন মন্ত্রী মশাই, আমি আমার স্ত্রী’কে শেষবার একটি পুকুরে স্নানরত অবস্থায় দেখেছিলাম। আমার খুব ইচ্ছে করত কোণার্কের কাজ মিটলে আমি আর আমার স্ত্রী বিনোদিনী দুজনে মিলে ওই বনের ধারে বাসা বেঁধে থাকব। মা আর ভাই সমারোহ অনুষ্ঠানে এসেছিল, তারা জানাল আমার স্ত্রী আর জীবিত নেই, তাই এখন আমি একাই ওখানে কুটির বানিয়ে থাকতে চাই। যদি মহারাজের অনুমতি থাকে, তবে আমি দক্ষিণেশ্বর মহাদেবের মন্দিরের ভাস্কর্যে নিজের সেবাও দিতে পারব। যখন কোনো কাজকর্ম থাকবে না, তখন কুশভদ্রায় স্নান করে প্রতিদিন ধূসর দিগন্তের চিত্রপটে কোণার্ককে দেখব। কেয়া ফুল দিয়ে বিরিঞ্চিনারায়ণের পূজা করতে পারব। এটুকুই। এর থেকে বেশি আর কোনো কামনা আমার নেই। আমার এই প্রার্থনা কি স্বীকার করা সম্ভব?’
যখন নৃসিংহ দেব কোণার্ক মন্দিরের প্রতিষ্ঠার জন্য সীতাদেবীর সঙ্গে রথে উঠতে যাবেন, তখন শিবেই সান্তারা তাঁর কাছে সুবলের প্রার্থনার অবিকল রূপটিকে তুলে ধরলেন। মহারাজ কিছু বলার আগেই রানিমা বলে উঠলেন, ‘সান্তারা মশাই, সুবল মহারানার ইচ্ছা পূরণ করার আমাদের কর্তব্য। এতে মহারাজের কোনো আপত্তি থাকতেই পারে না।’
মহারাজ বললেন, ‘মহারানির ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। কিন্তু একটা ব্যাপার ভেবে বড় অবাক হচ্ছি, কেতকী বনের ধারে অমন নির্জন একটা স্থান বেছে নেওয়ার কারণ কী থাকতে পারে?’
‘সুবল ওর স্ত্রীকে শেষ বার একটি পুকুরে স্নানরত অবস্থায় দেখেছিল। সে ঠিক করেছিল দুজনে মিলে একসঙ্গে ওই বনের ধারে সংসার বাঁধবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তাঁর স্ত্রী এখন আর জীবিত নেই। তাই এখন সে একাই ওখানে বাস করতে চায়।’
‘পুকুরে স্নানরত অবস্থায় দেখেছিল...? তাহলে কি?’ কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন মহারাজ। পুরোনো কিছু কথা তাঁর স্মৃতির ঝাঁপিটাকে নাড়া দিয়ে গেল। বহু দিন আগে যখন তিনি ওই অনামিকা নারীকে পুকুরের জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করা থেকে বাঁচিয়েছিলেন, তখন সে-ও বলেছিল যে, তার স্বামী নাকি তাকে ওই পদ্মপুকুরেই স্নানরত অবস্থায় শেষবার দেখেছিল। তাই পুকুরটা তার কাছে খুব প্রিয়। ‘তাহলে কি...তাহলে ওই নারীই ছিল সুবল মহারানার স্ত্রী! কিন্তু তাকে যে কিছুদিন আগেও আমি জগন্নাথ দেবের ঘোষযাত্রায় দেখেছি? কবে মৃত্যু হল তার? কীভাবে? সত্যিই, জীবন বড় অনিত্য! কবে যে কী হয়ে যায় তার নেই ঠিক। যাক, যা হয়ে গিয়েছে তা নিয়ে আক্ষেপ করে কী লাভ? যে চলে গিয়েছে, তাকে ফেরানো সম্ভব নয়। সুবলের ইচ্ছার কথা মেনে নিলে বরং তার আবেগটাকে সম্মান দেওয়া হবে।’
মহারাজ শিবেই সান্তারাকে স্পষ্ট আদেশ দিলেন, ‘সুবল মহারানাকে তার ইচ্ছামতো ভূমির অধিকারপত্র কাল সন্ধ্যার মধ্যেই দিয়ে দেওয়া হোক।’
সুবলকে জানিয়ে দেওয়া হল যে তার প্রার্থনা স্বীকার করেছেন মহারাজ। সুবল ফিরে গিয়ে তার মা’কে বলল, ‘মা, প্রভু জগন্নাথ যা করেন, তার পিছনে অবশ্যই কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। তুমি ধবলের বিয়ে দিয়ে দাও। আজ কোণার্কের জন্য সংসার ত্যাগ করে এখানে না-এলে আমার নিজেরই প্রায় দশ বছরের একটি সন্তান থাকত। তাই যে মেয়েটিকে আমার বিয়ের জন্য পছন্দ করেছিলে, সে আমার কন্যাসমা। আমার আর বিয়ে করা ঠিক হবে না। এখন আমি সন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছি। তোমার বউমা আমাকে মুক্ত করে দিয়ে গিয়েছে, এবার তুমিও আমাকে মায়ার বাঁধন থেকে মুক্তি দাও।’ নিজের কথা শেষ করে সুবল মাকে প্রণাম করে কোণার্ক মন্দিরের শিখরের দিকে তাকিয়ে দুই হাত জোড়া করে নমস্কার জানাল।
মন্দিরের নবগ্রহ-পাটের সামনে দাঁড়িয়ে একশত এক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের কণ্ঠে বিভিন্ন গ্রহ এবং সূর্যদেবতার প্রাণপ্রতিষ্ঠার মন্ত্র মন্দিরের প্রস্তর-ভিত্তিতে ধাক্কা খেয়ে গুঞ্জরিত হয়ে ভুবন-ভাস্করের উদ্দেশে যাত্রা করছে—ওম্ আং হৃং ক্রৌং যং রং লং বং শং ষং সং হং সঃ সোৎহম্ প্রাণা ইহ প্রাণাঃ। ওম্ আং হৃং ক্রৌং যং রং লং বং শং ষং সং হং সঃ জীব ইহ জীব স্থিতঃ। ওম্ আং হৃং ক্রৌং যং রং লং বং শং ষং সং হং সঃ সর্বেন্দ্রিয়াণী ইহ সর্বেন্দ্রিয়াণী। বাঙমনস্ত্বক্ চক্ষুঃ শ্রোত্র জিহ্বা ঘ্রাণ বাকপ্রাণ পাদ্-পায়ুপস্থানি ইহৈবাগত্য সুখং চিরং তিষ্ঠন্তু স্বাহা...।
মন্দিরে ঘণ্টা, ঘড়িয়াল, পটহ, তূর্য, মুরুজ, শঙ্খ ইত্যাদি বিবিধ শুভ-বাদ্য সহযোগে বেদপাঠী পণ্ডিতেরা পুরাণোক্ত সূর্যস্তোত্র গাইতে শুরু করতেই শোক-ক্লেশ রহিত সুবলও নিজের শিবিরে দাঁড়িয়ে দুই কর জোড়া করে তাঁদের কণ্ঠস্বরে নিজের কণ্ঠ মেলাতে লাগল—
ওম্ বিকর্তনো বিবস্বাংশ্চ মার্তণ্ডো ভাস্করো রবিঃ।
লোকপ্রকাশকঃ শ্রীমান্ লোকচক্ষুর্গ্রহেশ্বরঃ।।
লোকসাক্ষী ত্রিলোকেশঃ কর্তা হর্তা তমিস্রহা।
তপনতাপনশ্চৈব শুচিঃ সপ্তাশ্ববাহনঃ।।
গভস্তিহস্তো ব্রহ্মা চ সর্বদেবনমস্কৃতঃ।
একবিংশতিরিত্যেষ স্তব ইস্টঃ সদা রবেঃ।।
অর্থাৎ, বিকর্তন, বিবস্বান, মার্তণ্ড, ভাস্কর, রবি, লোকপ্রকাশক, শ্রীমান্, লোকচক্ষু, গ্রহেশ্বর, লোকসাক্ষী, ত্রিলোকেশ, কর্তা, হর্তা, তমিস্রহা, তপন, তাপন, শুচি, সপ্তাশ্ববাহন, গহস্তিহস্ত, ব্রহ্মা তথা সর্বদেবনমস্কৃত, এই একুশটি নাম দিয়ে করা স্তব সূর্যদেবের সদা প্রিয়।
কোণার্ক-মন্দিরের প্রতিষ্ঠা সমারোহের একটি অনুষ্ঠান হিসাবে রাতে মহাভোগ দানের শেষে দেবদাসীদের নৃত্য পরিবেশনও রাখা হয়েছে। সেই উদ্দেশে জগন্নাথ মহাপ্রভুর মন্দির থেকে দেবদাসীদের পদ্মক্ষেত্র কোণার্কে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। চয়ন করা দেবদাসীদের মধ্যে পেখমও একজন। কোণার্ক চলে গেলে তার সখী একাকী কীভাবে থাকবে তা ভেবে পেখম বিনোদিনীকেও নিজের সঙ্গে করে এনেছে।
আসার পথে বিনোদিনীর মন অতীতকে ছুঁয়ে ফেলছিল বার বার, ‘কোণার্কে সেই যেতেই হচ্ছে? এটাই কি তবে জগন্নাথ স্বামীর ইচ্ছা? কিন্তু কী পাব ওখানে গিয়ে? স্বামীর কাছে আমি এখন মৃত। কোণার্ক দর্শনটা হবে? হ্যাঁ, তা অবশ্য হবে। আমার স্বামীর হাতেই গড়ে উঠেছে কোণার্ক-মন্দির। সেটাই নাহয় দেখে আসি। এমনও তো হতেই পারে যে দূর, থেকে আমার স্বামীকেই দেখতে পেয়ে গেলাম? চন্দ্রভাগা তীর্থে স্নান করলে জন্ম জন্মান্তরের পাপ অবশ্য ধুয়ে মুছে যাবে। সবটাই লীলা–পুরুষোত্তমের ইচ্ছা!’
পেখমের সঙ্গে বিনোদিনীও কোণার্কে এসেছে। চন্দ্রভাগা মুক্তিতীর্থে স্নান সেরে সে পুণ্যলাভ করেছে।
ওদিকে ভানু-সপ্তমীর দিনে বেদপুরের বিদ্বান ব্রাহ্মণেরা প্রাণপ্রতিষ্ঠা করার পরদিন সকালে দেবতার নিদ্রাভঙ্গ হতেই প্রথমে বালারুণকে পঞ্চামৃতে স্নান করানো হল। তার পরে হল শুদ্ধোদক স্নান। এবং সব শেষে বাল-ভোগ। অপরাহ্নে বিশ্রামের আগে অবকাশ-ভোগ এবং তার পরে প্রৌঢ়-বিশ্রাম। সন্ধ্যার সময়ে সান্ধ্য-আরতি, লঘুভোগ ও তারপরে সান্ধ্যভোগ। রাত্রে মহৎ-শৃঙ্গারের মাধ্যমে সূর্যদেবকে অষ্ট অলংকারে সজ্জিত করে রাজ-ভোগ। এসব মিটলে দেবতার পূজার অঙ্গ রূপেই দেবদাসীদের নৃত্য এবং সবশেষে শয়ান।
এই সবকিছুই হয়ে চলেছে দর্শনার্থীদের চোখের সামনে। তারা মহা উল্লাসে সমস্ত আয়োজন দেখে চলেছে। কিন্তু বিনোদিনীর চোখ এসব দেখতে আগ্রহী নয়, সে খুঁজে চলেছে একজনের মুখ। সূর্যদেবতা তার কাছে গৌণ, আর মুখ্য হল তার হৃদ্কমলের সূর্য সুবল মহারানা।
যখন তার এবং সুবলের বিয়ে হয়, তখন সে একেবারেই অবোধ বালিকা ছিল। তার পর ওই এক পলকের একটু দেখা। মাঝে কেটে গেছে বারো বছর। আর দেখা হয়নি। কবে হবে সাক্ষাৎ? কীভাবে হবে? সে মনে মনে ভাবে, ‘দেখা হলেও চিনব কীভাবে?’
রাত্রে দেবতার শয়ানের পর সকলেই ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু দুজনের আঁখিপাতে নিঁদ নেই। একজন সুবল মহারানা। এবং দ্বিতীয় ব্যক্তির নাম সৌম্য শ্রীদত্ত। আচার্য সৌম্য শ্রীদত্ত নাট্যমণ্ডপে শিল্পার স্নানরতা মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত কাতর ভাবে সেই মূর্তিটিকে স্পর্শ করে কেঁদে চলেছেন, ‘তোর সাগর-স্নান কি এখনও শেষ হল না, মা? তুই কি আর সত্যিই ফিরে আসবি না? আমি সাগরদেবতাকে এমন কথা তো বলিনি যে তিনি তোর প্রাণটাই নিয়ে নেবেন? দ্যাখ মা, দ্যাখ...আজ কোণার্ক সম্পূর্ণ হয়েছে। তোর সমর্পণ সার্থক, কিন্তু তুই এসবের কিছুই দেখতে পেলি না। যুগ–যুগ জীয়ে সুবল মহারানা! সুবল তোর এই প্রতিমাখানা বানিয়ে না-রাখলে তোকে আর কোথায় খুঁজে পেতাম আমি? এখন এটাই আমার সম্বল। এটুকুই সান্ত্বনা। আমার বড় ভুল হয়ে গেল রে মা! আমাকে ক্ষমা করে দিস!’
নাট্যমণ্ডপের উত্তরে অম্লান চন্দ্রালোকে একটি ছায়ামূর্তি নিশ্চল ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে রয়েছে সেই প্রতীক্ষারত নারীমূর্তিখানি। নিশ্চল মানুষটা আসলে সুবল মহারানা। সে নিজের হাতে সৃষ্টি করা রচনার মধ্যে নিজের জন্য নতুন কিছু খুঁজে চলেছে। সুবল মহারানার প্রেমের নদীর দুই কূল। এক পাড়ে বিনোদিনী, অন্য তীরে শিল্পা। প্রতিক্ষারত নারী অর্থাৎ বিনোদিনীর মূর্তির কাছে নিজের চোখের জল ফেলে সে হাঁটা দিল নদীর অপর কূলে—শিল্পার স্নানরতা মূর্তির কাছে। আর তখনই আচমকা অম্লান জ্যোৎস্নায় মুখোমুখি হয়ে গেলেন নৃত্যগুরু আচার্য সৌম্য শ্রীদত্ত দীক্ষিত এবং শিল্পী-শিরোমণি সুবল মহারানা।
দুজনে একে অপরকে দেখলেন। দুজনেই বর্তমানে থেকেও ডুব দিলেন নিজের নিজের অতীতে। যেন কোনো কিছুর অনুসন্ধান চলছে। কিন্তু সেই অন্বেষণের অন্ত নেই। আর সকলের মতোই সৌম্য শ্রীদত্তও সুবল মহারানার স্ত্রীর মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছেন। হঠাৎই তাঁর মনে হল, স্নানরতা মূর্তির শিল্পা যেমন তাঁর কন্যা, তেমনই প্রতীক্ষারতা মূর্তির বিনোদিনীও তাঁরই মেয়ে। স্নেহের একই স্রোত আছড়ে পড়ছে দুই তটে। কী অদ্ভুত! জীবিত প্রিয়জনের অভাবে আজ পাষাণ প্রতিমাদের বুকে স্পন্দন এবং নিজের হৃদয়ের অবলম্বন খুঁজে বেড়াচ্ছে মানুষ।
সৌম্য শ্রীদত্ত কোনো কথা না-বলেই সুবলকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। জমে হিমখণ্ড হয়ে যাওয়া দুটি হৃদয় একে অন্যের সান্নিধ্যে এসে গলে জল হয়ে গেল। সুবল মহারানা আর সৌম্য শ্রীদত্তর চোখের জলে একাকার হয়ে গেল বিনোদিনী আর শিল্পা—এক পতির হৃদয় আর এক পিতার হৃদয়ে কোনো তফাত রইল না। দুজনে একে অপরকে একটি কথাও বলতে পারলেন না, তাঁদের অশ্রু কথা বলে চলল। আজ শব্দের কোনো প্রয়োজন নেই, অর্থ নেই। নীরবতাই আজ বাঙ্ময়।
কোণার্ক প্রতিষ্ঠার পর দ্বিতীয় দিন। এখনও পূর্ব দিগন্তে সূর্যদেবতার দেখা মেলেনি। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। দেশ-দেশান্তর থেকে আসা যাত্রীরা আরও একবার চন্দ্রভাগার জলে স্নান করে সূর্যমন্দির দর্শন করার জন্য রাতটা কোণার্ক চত্বরেই কাটিয়ে দিয়েছেন। এমন পুণ্যলাভের সৌভাগ্য আবার কবে পাওয়া যাবে কে জানে? বাড়ি ফেরার আগে আর একটি বার দেব বিগ্রহের দর্শন পেতে তাদের মন ব্যাকুল। গতকাল প্রতিষ্ঠার আয়োজনের মহা সমারোহে ভাস্কর্যগুলোকে দেখার মতো সুযোগ হয়নি, আজ সেই সাধ পূরণ হবে। আবার কখনো আসা হয়তো সম্ভবই হবে না।
সুবল মহারানাও ভাবছে, ‘আর শুধু আজকের দিনটা। মহারাজ ভূমির অধিকারপত্র আজই দিয়ে দেবেন। আগামীকাল গিয়ে কেয়াবনের ধারে নিজের মতো করে কুটিরটা বানিয়ে ফেলব। কুটিরেরই বা কী দরকার? একটা বড় মাচার মতো বানিয়ে নিতে পারলেই তো হল। নিজের হাতে খোদাই করে সৃষ্টি করা দেবতার বিগ্রহকে আজ দর্শন করে আসব। কাল পর্যন্ত ওটা ছিল পাথরের মূর্তি মাত্র, কিন্তু এখন তা প্রাণ-প্রতিষ্ঠিত দেবতা। আগামীকাল থেকে কুশভদ্রার তীরে কেতকী-বনের ধারে শুরু হবে আমার নতুন জীবন।’ এসব ভাবতে ভাবতেই সুবল স্নান করার জন্য চন্দ্রভাগার তটের দিকে এগিয়ে চলল।
নদীর তীরে গিয়ে থমকে দাঁড়াল সুবল। চন্দ্রভাগার প্রশস্ত নীল জলরাশি দেখে সে মুগ্ধ হয়ে গেল, ‘এই জলরাশি ঠিক যেন আমার বিনোদিনীর বুকে ফেলা নীল শাড়ির মতোই।’ বারো বছর ধরে তাকে নিজ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নিজ-অবগাহন করাতে থাকা এই নদীই তার প্রিয়া। সুবলের কানে হঠাৎ গুনগুন করে ভেসে এল কারো মন্ত্রোচ্চারণ, ‘এহি সূর্য সহস্ত্রাংশো তেজোরাশে জগত্পতে। অনুকম্পয় মাং দেব গৃহাণার্ঘ্যং দিবাকর।।’
কেউ একজন সূর্যদেবতাকে অর্ঘ্য দিচ্ছেন। পুরুষের নয়, নারীর কণ্ঠ! কোমর অবধি জলে নিমগ্ন এক ধ্যানস্থ রমণী নিজের পদ্ম-কোরকের মতো অঞ্জলিতে নদীর জল নিয়ে মন্ত্রপাঠ করতে করতে অর্ঘ্য দিয়ে চলেছে ভুবন ভাস্করকে। অপরূপা নারীর কমল-মুখের উপর দুটি চোখ যেন দুই ভ্রমর। মন্ত্রোচ্চারণের ফলে স্পন্দিত হচ্ছে বকফুলের মতো অধরোষ্ঠ। ওই ধ্যানমগ্ন সজীব প্রতিমায় চোখ পড়তেই সুবলের চেতনা এক অদ্ভুত মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। জেগে উঠল তার শিল্পীসত্তা। দৃষ্টি ওই নারীর উপরেই নিবদ্ধ হয়ে গেল, ‘কে এই পদ্মগন্ধা? এই অদ্ভুত সৌম্য, সুন্দরী সন্ন্যাসিনীর রূপ যে ধরা গেল না কোণার্কের পাষাণবক্ষে? মুখে পবিত্রতার এক অদ্ভুত লালিমার স্পর্শ, যার দর্শনে সমস্ত কামনা, বাসনা, লালসা যেন হোমাগ্নিতে পূর্ণাহুতির ফলে ঊর্দ্ধগামী ভস্মের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
কে এই নারী? একে দেখে কেন জানি না মনে হচ্ছে যে, এর সঙ্গে আমার জন্মজন্মান্তরের বন্ধন রয়েছে। আজ আমার মনে সত্য, শুভ আর সুন্দরের একত্রিত এক বিগ্রহ সজীব হয়ে উঠছে যেন। দেবী, আপনি যে-ই হোন না কেন, এই সুবল মহারানার হৃদয়ের স্পন্দন হয়ে আপনি জীবিত থাকবেন।’
ওই নারী অর্ঘ্যদান পর্ব সমাপ্ত করে চোখ মেলল। জলে ছলছল করুণ দুই নেত্র। সম্ভ্রম, শঙ্কার দোলাচলে কেঁপে উঠল সুবলের মন, ‘এমন বরনারীর কীসের অভাব? সিঁথিতে সিঁদুর বলছে, ইনি সধবা। ঘন, কুঞ্চিত কেশ ঘোষণা করছে যে ইনি অখণ্ড সৌভাগ্যবতী। তাহলে কীসের অভাব? কী সেই কারণ, যার জন্য দুচোখের দৃষ্টিতে অমন অপার শূন্যতা?’
হঠাৎ মেঘের ঘোর কাটিয়ে সূর্যদেবতা উঁকি দিলেন। যেন এ জগতের শ্রেষ্ঠতম নারীরত্নের দর্শন করার লোভ সংবরণ করতে পারেননি ভগবান দিবাকর। সূর্যের আলোতে ওই নারীর শোভা সহস্রগুণ বেড়ে গেল। কিন্তু মাত্র এক মুহূর্তের জন্যই...সূর্যদেব আবার অন্তর্হিত হলেন নীল-শ্যাম মেঘের অন্তরালে। ‘তবে কি এই নারীর দেওয়া জলের অর্ঘ্য স্বীকার করার জন্যই তিনি একটিবার দেখা দিলেন?’ মনে মনে ভাবল সুবল।
ঈশ্বর নারীদের এক অদ্ভুত, অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা দিয়েছেন—যদি কেউ কোনো নারীকে একদৃষ্টে দেখতে থাকে, তাহলে সেই দৃষ্টিকে নারী অনুভব করতে পারে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। ওই নারী বুঝতে পারল যে কেউ তাকে এক নাগাড়ে দেখে চলেছে। অনুমানে ভিত্তি করেই সেই নারী সেদিকে তাকাল এবং তার দৃষ্টিপথে ধরা দিল এক সুদর্শন পুরুষ, যার নাম সুবল মহারানা। পিতলের মূর্তির মতো প্রাণবন্ত, পুরুষালী, সুন্দর, নিশ্চল। ঘন কুঞ্চিত কেশ, কানে কুণ্ডল, লোমশ বক্ষে দোদুল্যমান রত্নপদক, শিল্পীসুলভ গভীর মর্মস্পর্শী দৃষ্টি। চার চোখ এক হল। নারী বুঝতে পারল, ‘এ কোনো সাধারণ পুরুষ হতেই পারে না! কিছু বিশেষত্ব আছেই।’
ওই নারীর পা যেন আর সরে না। কিছুতেই জল থেকে উঠে তটে আসতে পারে না সে। এক লজ্জা, এক ভয়, এক সঙ্কোচ তাকে মুড়ে ফেলেছে। নিজের চোখ নামিয়ে নিয়ে ওই নারী জলের গভীরতায় নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে চাইল। চোখের সামনে এই দৃশ্য দেখে সুবলের মনে পড়ে গেল বিনোদিনীর লজ্জা পেয়ে পদ্মপুকুরের জলে ডুব দেওয়ার সেই দৃশ্য। ‘একি, এই নারী যে আমাকে দেখে লজ্জা পেয়ে আরও গভীর জলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে! হে ভগবান! ডুবে মরবে নাকি?’ সে নিজের চোখ সরিয়ে নিল। আর তখনই কেউ সুবলকে চিনতে পেরে বলে উঠল, ‘আরে, আপনিই সুবল মহারানা না? উৎকলের শিল্পী-শিরোমণি? ধন্য আপনি, ধন্য আপনার শিল্প!’
এই কথা যখনই ওই নারীর কানে প্রবেশ করল, মনে হল যেন এক বিদ্যুল্লতা তার সমস্ত শরীরটাকে ঝনঝন করে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। সে আবার চোখ তুলল। সুবলের দিকে তাকিয়ে বিনোদিনী মনে মনে ভাবল, ‘তাহলে উনিই? উনিই তো? কত পুণ্য করেছিলাম আমি! নাকি চন্দ্রভাগায় স্নানের পর আমার সব পাপ ধুয়ে গেল? একটি বার দুচোখ ভরে ওঁকে দেখতে চাই। জানি না আর দেখতে পাব কিনা, জানি না আর আমাদের দেখা হবে কিনা?’
ভালো করে সুবলকে দেখবে কি, এমন সময় এক বৃদ্ধা স্নান করার জন্য তীরে এসে পৌঁছাল। আর তাকে দেখেই চমকে উঠল বিনোদিনী। বৃদ্ধা আর কেউ নয়, স্বয়ং সুবল মহারানার মা। বৃদ্ধাও তাকে দেখতে পেল। দেখেই চমকে উঠল। দেখামাত্রই সুবলের মা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘ওরে কুলটা মাগী, আবার আমার ছেলের জীবনে বিষ ঢালতে চলে এসেছিস? দূর হ আমার চোখের সামনে থেকে...দূর হ আমাদের জীবন থেকে! আমার ছেলের জীবনের সুখের পথে এখন একমাত্র বাধা তুই-ই...। ছিঃ-ই ছিঃ-ছিঃ-ছিঃ-ছিঃ! অলক্ষুণে মেয়েছেলের মরণও হয়নি!’
বৃদ্ধার দৃষ্টিতে থাকা ঘৃণা, স্বরে থাকা ভর্ৎসনা, ভঙ্গিমায় থাকা অসহিষ্ণুতা দেখে বিনোদিনীর সারা দেহ যেন অবশ হয়ে এল। বীভৎস যে দৃষ্টি সে দেখে চলেছিল, তার তুলনায় বৃদ্ধার মুখের ভাষা অনেক শালীন মনে হচ্ছিল। চোখের ভাষায় পরম প্রেম এই জীবনে দেখার সুযোগ বিনোদিনী কখনো পায়নি, কিন্তু নেত্রের ভাষায় চরম ঘৃণা আজ তাঁর দেখা হয়ে গেল।
বিনোদিনী নদীর অপর পারে দূর দিগন্তে দৃষ্টি স্থির করে দাঁড়িয়ে রইল। বিরহী নেত্র থেকে জল গড়িয়ে চন্দ্রভাগার জলে মিশে যেতে লাগল। ওই অশ্রুবিন্দুর তাপে ভয় পেয়েই সম্ভবত সূর্যদেব মেঘের আচ্ছাদনে নিজেকে আরও বেশি করে মুড়ে ফেললেন। বিনোদিনী নদীর মধ্যভাগের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। এগোতেই থাকল। এখন আকাশে শুধু মেঘ আর মেঘ। এত সকালেই চরাচরে আঁধার নেমে এসেছে।
সুবল মহারানা নদীর তীর থেকে ফিরে আসছে বটে, কিন্তু তার চেতনে–অবচেতনে এখনও অনামিকা ওই নারীর রূপ ধরা রয়েছে। বাস্তবে বিনোদিনীর অপার পবিত্র সৌন্দর্যের সামনে সুবল মহারানার শিল্পী মন পরাজিত হয়েছে। নিজের ইচ্ছাটাকে কোনো ভাবেই সংবরণ করতে না-পেরে সে আরও একবার ফিরে তাকাল। কিন্তু বিনোদিনীকে দেখতে পাওয়ার আগেই তার বৃদ্ধা মা হন্তদন্ত হয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল, ‘সুবল রে, তাড়াতাড়ি চল বাবা! আকাশ ঘিরে মেঘ করে এসেছে। মনে হচ্ছে প্রবল জোরে ঝড় আসবে। ঘোর অমঙ্গলের লক্ষণ। আমার কথা শোন, এখুনি আমার সঙ্গে বাড়ি ফিরে চল। কোণার্কে থাকা আমাদের জন্য আর শুভ হবে না।’ আসলে বৃদ্ধা আকাশ দেখে এসব বলেনি, বলছিল বিনোদিনীকে দেখতে পেয়েই। তার মনে ভয় ছিল যদি সুবল আর বিনোদিনীর সাক্ষাৎ হয়ে যায়, তবে মহা বিপদ হবে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে সুবলকে বিনোদিনীর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছিল।
‘মা, কিছু ভাঙলে নতুন কিছু গড়েও ওঠে; আর যখন কিছু গড়ে ওঠে, তখনও কিছু–না–কিছু ভাঙেই। এত বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
‘আর যাই ভাঙুক বা গড়ে উঠুক, আমার ছেলের যেন কোনো সমস্যা না-হয়। চল, চল। এখান থেকে চল, এখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ানো যাবে না।’
‘তুমি যাও, মা। সুবল মহারানা কোণার্ক ছেড়ে যাবে না। এই পাষাণ-শিল্পী এবার পাষাণ-হৃদয় নিয়ে সবকিছু সহ্য করবে।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই কোণার্কের আকাশ চক্রবাত-ঝঞ্ঝায় ভরে উঠল। ঊনপঞ্চাশ বায়ু একযোগে নিজের সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে ঝাউ আর কেতকীর বনকে, নগরের ছোট-বড় ঘরবাড়িকে, ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ বৃক্ষকে নাড়া দিতে লাগল। বিনোদিনীর চোখ থেকে ঝরে পড়া অশ্রুকে নিজের সহানুভূতি দেওয়ার জন্য বৃষ্টি প্রবল থেকে প্রচণ্ড হয়ে উঠল। নদীর জলে এক অসহায় নারীকে এভাবে অপমানিত হতে দেখেই মনে হয় বিচলিত ইন্দ্রের বজ্র নিরন্তর অশনিপাত করতে আরম্ভ করে দিল।
সাগরে অসময়ে জোয়ার উঠল, দুকূল ছাপিয়ে যেতে লাগল নদীজল। ধরিত্রী, অম্বর, সাগর, পবন সবাই আজ এক সাক্ষাৎ প্রেমের বিগ্রহস্বরূপ নারী বিনোদিনীর চোখে অপমানের অশ্রু দেখে ব্যথিত, রুষ্ট হয়ে উঠেছে। বিনোদিনী নাম্নী নারী নিজের ইতি খুঁজে নিয়েছে চন্দ্রভাগা নামক নদীর বুকে। নদী নারীকে নিজের মধ্যে সমাহিত করে নিয়েছে। এখন দুজনে মিলেমিশে একাকার।
রুষ্ট প্রকৃতির এই রুদ্র রূপকে শান্ত করার জন্য কোণার্কের মন্দিরে সমবেত স্বরে শান্তিপাঠ শুরু হল—ওম্। গ্রহাঃ শান্তিঃ। অন্তরীক্ষ শান্তিঃ। পৃথিবী শান্তিঃ। আপঃ শান্তিঃ। ওষধেয়ঃ শান্তিঃ। বনস্পতয়ঃ শান্তিঃ। বিশ্বেদেবাঃ শান্তিঃ। কামঃ শান্তিঃ। ক্রোধঃ শান্তিঃ। ব্রহ্মঃ শান্তিঃ। সর্বঃ শান্তিঃ। শান্তিরেব শান্তিঃ। সামঃ শান্তিরেভিঃ। যতো যতসমিহসে ততো নং অভয়ং কুরু। সন্নঃ কুরু প্রজাভ্যোৎভয়ং নঃ পশুভ্যঃ।। ওম্ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।
একটি পূর্ণ দিনের শেষে যখন শান্তিপাঠ শেষ হল, তখন কোণার্ক নগরী ধ্বস্ত হয়ে গিয়েছে। অনেক বিশালকায় সব ভবন ধরাশায়ী। আকারে ছোট ঘরগুলি তো একেবারে ধুয়ে মুছে গিয়েছে, যেন সেখানে কিছু ছিলই না। পথে, বাগানে, বনে যত্র তত্র সর্বত্র বিশাল বিশাল সব বৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত হয়ে পড়ে রয়েছে। নগরে যেদিকেই চোখ যায়, সেদিকেই ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে অগুণতি নর-নারীর মৃতদেহ। এক মূক সত্যদ্রষ্টার মতো অবিচল, স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল শুধু কোণার্কের বিশ্ব বিশ্রুত মন্দির।
পরিচয়হীন অনেক যাত্রী, শ্রমিক, গ্রাম-নগরের অনেক নাগরিক যত্র তত্র মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন। নৃসিংহ দেব সকল শবদেহের অন্তিম সংস্কারের ব্যবস্থা করালেন। রাজ কর্মচারীদের পর্যবেক্ষণে বেশ কয়েকটি গণচিতায় স্তূপের আকারে শব রেখে ব্রাহ্মণদের দিয়ে অন্তিম সৎকারের ব্যবস্থা করানো হল। মৃত্যু এখানে জাতি, ধর্ম এবং অর্থের ভেদাভেদকে শেষ করে দিল। মৃতদেহের খোঁজ করে তাদের অন্তিম সংস্কারের এই প্রক্রিয়া পরদিন পর্যন্ত চলল।
সুবলের মা আর ভাই ধবলের কিছু হয়নি। পারিপার্শ্বিক অবস্থা সামান্য স্বাভাবিক হলে সুবল তার মা এবং ভাইকে বুঝিয়ে গ্রামে পাঠিয়ে দিল। সুবল রয়ে গেল কোণার্কেই। তার জীবনে আর কোনো বন্ধন রইল না। কিন্তু বাস্তবেই কি সে বন্ধনমুক্ত হল? কিছু বন্ধন যে কিছুতেই খোলে না।
এই আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় এসে পড়ায় নিজের ইচ্ছামতো ভূমিটির অধিকারপত্র পেতে সুবল মহারানার সামান্য দেরি হল। অবশ্য তার আগেই সে ওই ভূমিতে কুটির বানানোর জন্য মৌখিক সম্মতি পেয়ে গিয়েছিল। তবুও ওই বিষম পরিস্থিতির পরেই কুটির নির্মাণ সম্ভব ছিল না। কোণার্ক-শিল্পীরা একে একে ঘরে ফিরে গেলে, তাদের বাস করার জন্য নির্মিত শিবিরগুলিকে সরিয়ে দেওয়া হল। বাকি নগরীকে মুছে দেওয়ার দায়িত্ব একা ওই প্রলয়ঙ্কর চক্রবাতই নিয়ে রেখেছিল।
চতুর্দিকে এত হাহাকারের মাঝে সুবলের মনের সমস্ত ব্যথা-বেদনা বোধ ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। সে দিন রাত এক করে রাজ্যের কর্মচারী এবং স্বয়ংসেবকদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করছিল। গতকালের প্রাকৃতিক উপদ্রবের পরে আজ তৃতীয় প্রহর কেটে গিয়েছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত সুবল বিশ্রাম নেওয়ার সময় পায়নি।
মাঘ শুক্ল নবমীর সূর্য এবার ধীরে ধীরে নিজের আভাজাল গুটিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।
রাজ্যের পক্ষ থেকেই করা হয়েছিল দুর্যোগ কবলিত মানুষের জন্য অস্থায়ী আবাস এবং ভোজনের ব্যবস্থা। উৎকল ধীরে ধীরে নিজের বিষাদে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ আনতে পেরেছিল। নিজের ব্যস্ততার শেষে ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য হাত-পা ধুয়ে একটু বিশ্রাম নেবে বলে সুবল নদীর দিকেই যাচ্ছিল। এমন সময় বেগুনিয়া গ্রামের গ্রামণীর পাঠানো এক প্রতিনিধির সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। সারা দুপুর ধরে ওই ব্যক্তি সুবলকে খুঁজে চলেছিলেন। আসলে শিবেই সান্তারা মহাশয়ের নির্দেশে সুবলের আবাসের ব্যবস্থা বেগুনিয়া গ্রামের দক্ষিণেশ্বর শ্বেতলিঙ্গ মহাদেবের নির্মীয়মাণ মন্দিরের কাছেই একটি কুটিরে করা হয়েছিল এবং রাজ্যের পক্ষ থেকে ওই কুটিরের নির্মাণের জন্য যাবতীয় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বেগুনিয়া গ্রামের গ্রাম-প্রধান বা গ্রামণীকেই।
এই সংবাদ শোনা মাত্রই সুবল ওই ব্যক্তির সঙ্গে বেগুনিয়া গ্রামের উদ্দেশে রওনা দিল। কারণ এই পরিবেশে সে কোণার্কে রাত্রিযাপন করতে ভয়ানক অস্বস্তি বোধ করছিল। ওই অবস্থায় রাজকীয় অতিথিশালায় সকল কক্ষে লোক গমগম করছিল, ধর্মশালায় মাথা গোঁজার জায়গা ছিল না, অস্থায়ী শিবিরে বিপদগ্রস্ত মানুষের ভিড়ে তিল ধারণের স্থানটুকুও অমিল ছিল এবং এই আপদকালে কোণার্ক নগরে কাউকে নিজের জন্য বলে ব্যবস্থা করার জন্য ব্যতিব্যস্ত করে তোলা সুবলের নিজের কাছেই অত্যন্ত অপমানজনক।
দক্ষিণেশ্বর শ্বেতলিঙ্গ মহাদেবের নির্মীয়মাণ মন্দির একেবারে কেতকীবনকে আলিঙ্গন করেই দাঁড়িয়ে ছিল। এমনকী সম্পূর্ণ বেগুনিয়া গ্রামটি কেতকীবনের কোলে অবস্থিত। চন্দ্রভাগার ফেলে যাওয়া গতিপথে একটি অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ। এই হ্রদ আজও ওই মন্দিরের সামনে পদ্মপুকুরে পরিণত হয়ে টিকে রয়েছে। হ্রদের নাম ছাড়ন ঝিল। নদী গতিপথ বদলেছে বটে, কিন্তু তার সঙ্গে ঝিলের সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি।
ঝিলের শান্ত জলে পদ্ম ফুটে ছিল, আর বনের মধ্যে কেতকী। সুবল মহারানার হৃদয়ে এই দুই ধরনের ফুলের জন্যই একটা আলাদা আবেদন ছিল। পদ্মফুল তার মনে বিনোদিনীর স্মৃতিকে সজীব করে তুলত, আর কেতকীর গন্ধে তার প্রিয় শিল্পার স্মৃতি মানসপটে এঁকে যেত যাবতীয় বিভঙ্গের ছবি। সুবলের হৃদয়ে এই দুই নারীর মূর্তি আসলে দুটি ফুলের মতোই গেঁথে বসেছিল।
সন্ধ্যা নামছে। চন্দ্রভাগার ছাড়ন ঝিলের ধার দিয়ে হেঁটে চলেছে সুবল মহারানা। সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে ফেলার জন্য সুবল ঝিলের পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল। দুই হাতে জল তুলে মুখে দেবে মাথাটা নীচু করেছে এমন সময় তার দৃষ্টি একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে গিয়ে থমকে গেল। হাত থেকে গড়িয়ে পড়ল সবটুকু জল। সে যে স্থানে দাঁড়িয়ে ছিল, তার থেকে সামান্য দূরত্বেই ঝিলের জলে এক নারীর শবদেহ ভাসছে। যেখানে শবদেহটা ভাসছে, সেই জায়গাটা একটা বাঁকের মুখ, নদীর সঙ্গে ঝিলের সংযোগের স্থল।
সুবল সামান্য এগিয়ে গেল। কাছে গিয়ে উপুড় হয়ে থাকা শবদেহটাকে চিত করে দিতেই সে চমকে উঠল। মাত্র একদিন আগেই যে সৌম্য, সুন্দরী, সন্ন্যাসীনিকে সে চন্দ্রভাগার বুকে সূর্যদেবতাকে জলার্ঘ্য দিতে দেখেছিল, এ যে সেই নারী! এলোমেলো বাতাসে খানিক কেতকীর ফুল এসে অপরিচিতার মুখে, বুকে পড়ল, কিছু ফুল পড়ল আশেপাশের জলের উপরে।
‘এই অদ্ভুত ফুলশয্যায় কেমন শান্তিতে শুয়ে আছে এই নারী!’ হাওয়ার গতি আরও বেড়ে গেল। আরও অনেক ফুল উড়ে এসে পড়তে লাগল। মনে হল চক্রবাত পৃথিবীবাসীর পাপ ধুয়েমুছে দিয়ে কমনীয় ফুলেদের বৃন্তচ্যুত করে নদীর ধারায় তাদের ভাসিয়ে দক্ষিণেশ্বর মহাদেবের চরণ অবধি পৌঁছে দিয়েছে।
হঠাৎ সুবলের মনে হল তার পায়ে যেন বিন্দুমাত্র শক্তিও অবশিষ্ট নেই। পাশেই মাটির টিলার উপর ধপ করে বসে পড়ল সে।
গ্রামণীর পাঠানো ওই ব্যক্তি, যে তার সঙ্গেই পথ চলছিল, সে দৌড়ে এল তার কাছে। সে ভেবেছে, হয়তো সুবলের মাথা ঘুরে গিয়েছে। কাছে এসে সে-ও দেখল, এক নারীর শবদেহ নদী বাঁকের কাছে চিত হয়ে পড়ে আছে। তার পা নদীর জলধারাকে স্পর্শ করে আছে, আর মাথার দিকটা ঝিলের শান্ত জলশয্যায়। নিষ্ঠুর ঝঞ্ঝা নিজের নির্লজ্জ হাতে মৃতার পরিধেয় বস্ত্রটাকে অবধি হরণ করে নিয়েছে। কিন্তু কী আশ্চর্য, তার অনাবৃত দেহের উপরে এসে পড়ছে অসংখ্য কেতকীর পাপড়ি। সৃষ্টি হয়েছে এক অপার্থিব আস্তরণ। প্রকৃতি নিজেই তার লজ্জা নিবারণের সমস্ত ব্যবস্থা করেছে। এই জগতে একজন নারীর সম্মান কীভাবে অক্ষুণ্ণ রাখা যায়, সে কথা প্রকৃতি জানে, খুব ভালো ভাবেই জানে।
সুবল সঙ্গে থাকা ব্যক্তিটিকে বেগুনিয়া গ্রামের গ্রামণীর কাছে খবর দেওয়ার জন্য পাঠিয়ে দিল। কারণ এই অঞ্চল স্পষ্ট ভাবেই বেগুনিয়া গ্রামের সীমান্তে অবস্থিত। তাই এর পরবর্তী যাবতীয় দায়দায়িত্ব বেগুনিয়া গ্রামের গ্রামণীকেই পালন করতে হবে। আবার শবটিকে অরক্ষিত অবস্থায় ছেড়ে যাওয়া মানবিক হবে না। আবার রাজ্যের কর্মচারীদের অনুপস্থিতিতে এই শবদেহকে জল থেকে তুলে আনাটাও উচিত হবে না। সুবল তাই ওই ব্যক্তিকে পাঠিয়ে শবদেহ আগলে বসে রইল।
গ্রামণী এলেন। সঙ্গে এলেন গ্রামভট্টও। সব কিছু দেখে শুনে নিয়ে তাঁরা দুজনে নিকটস্থ দণ্ডপাণি–চতুষ্কীতে সংবাদ দিতে চলে গেলেন। ঠায় বসেই রইল সুবল।
স্তব্ধ হয়ে বসে সুবল ওই নারীর শবখানিকে দেখতে লাগল। মাত্র এক হাত দূরে পড়ে আছে একটি নিথর দেহ। রমণীর ঘন কেশের উন্মুক্ত অগ্রভাগ জলে ভাসছে। যেন শৈবালদাম। হাতে উল্কিতে আঁকা রয়েছে রাধাকৃষ্ণের ছবি। সুবল ভাবে, ‘এমন নরম হাতে সুচ ফুটিয়ে ফুটিয়ে উল্কি আঁকতে পারল কেউ? কীভাবে করল কে জানে? তার কষ্ট হল না? এই নারীই কাল পর্যন্ত জীবনের স্পন্দনে পরিপূর্ণ ছিল, আর আজ পূতিঃগন্ধময়। হয়তো এর পরিজনেরা একে কোণার্ক-মন্দিরের আশেপাশে খুঁজে বেড়াচ্ছে, আর সে এখানে এসে পড়েছে।
যদি তার পরিজনেরা তাকে খুঁজে না-পেয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে চলে যায়, তখন তার দেহ সৎকারের সব দায়িত্ব রাজ্যের হবে। তাহলে তো এই নারীর শবটিকে অজ্ঞাত পরিচয় মনে করে দাহ করা হবে, কিন্তু এর অপর কোনো পরিচিত থাকুক বা না-থাকুক আমার সঙ্গে যে একদিন আগেই পরিচয় ঘটে গিয়েছে। যদি এর কোনো স্বজন দেহ দাবি করার জন্য উপস্থিত না-হয়, তাহলে আমিই এই নারীর দেহের অন্তিম সৎকার করব! প্রয়োজন পড়লে মহারাজের কাছে গিয়ে আবেদন জানাব। অধিকার চাইব।
গতকাল যখন একে প্রথমবারের জন্য দেখলাম, তখনও মনে হয়েছিল যেন ওঁর সঙ্গে আমার জন্মজন্মান্তরের একটা সম্পর্ক রয়েছে। শুধু চোখে চোখে দেখা ছিল না, শিল্পীর আত্মার সঙ্গে সৌন্দর্যের স্বামীনির আত্মার সম্পর্ক ছিল। তাহলে, এই মুহূর্তে আমিই এখন এর একান্ত আপন।’
নিয়তিও যেন চাইছিল, সুবলই বিনোদিনীর দেহের সৎকার করুক। নাহলে কোণার্ক থেকে দূরে চলে আসার পরেও তার কাছেই বা কেন তার শব ভেসে এল? কেনই বা তাকে দেখে সুবলের মনে প্রথমে মমতা এবং কর্তব্য বোধ জাগবে? সুবল ঠিক করেই ফেলল যে, যদি ওই শব অনাথ বলে ঘোষিত হয়, তবে তার অন্তিম সংস্কার সে-ই করবে।
দণ্ডপাশি এসে উপস্থিত হল। মহাদণ্ডপাশকেও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সমেত সূচনা দেওয়া হয়েছিল। জানা গেল যে, ওই নারী আসলে দেবদাসী পেখমের দাসী ছিল। পেখম তার অতীত বা আত্মীয়পরিজন সম্পর্কে কিছুই জানে না। তাই সবদিক দেখে শবদেহটিকে অনাথ বলেই ঘোষণা করা হল। যেহেতু শবটিকে অজ্ঞাত পরিচয় বলে মেনে নেওয়া হল, তাই রাতে সেটার সুরক্ষার দায়িত্ব বেগুনিয়া গ্রামের গ্রামভট্টকে দিয়ে এবং পরদিন সকালে দাহকার্যের আদেশ গ্রামণীকে দান করে দণ্ডপাশি বিদায় নিলেন।
সুবল ওই রাতেই পথ চলে আবার কোণার্কে ফিরে এসে শিবেই সান্তারার সঙ্গে দেখা করল। সবটা খুলে বলতেই শিবেই সান্তারা মহাশয় সুবলকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন মহারাজ নৃসিংহ দেবের কাছে। মহারাজ শবের বিবরণ শুনেই চমকে উঠলেন, ‘কুঞ্চিত, ঘন কালো কেশ! ডান হাতে রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি আঁকা রয়েছে? পায়ে আঁকা আছে পদ্মফুলের উল্কি? বহুদিন আগে ভাঙা মন্দিরপ্রাঙ্গণে যে নারীকে দেখেছিলেন, সে নয় তো? কিন্তু পরশুই তো শুনলাম সে আর জীবিত নেই? তাহলে...?
যদি ওই নারী সত্যি সত্যিই সুবল মহারানার স্ত্রী হয়ে থাকেন, তবে তাঁর দেহ সৎকার সংক্রান্ত সমস্ত ক্রিয়াকর্ম করার অধিকার সুবলেরই রয়েছে। এবং যদি তা না-ও হয়, তাহলেও সুবলের আবেগকে সম্মান জানিয়ে সেই অধিকার তাকে দেওয়া উচিত। সুবল এখন আর কোনো সাধারণ শিল্পী নয়, সে রাজকীয় মর্যাদা প্রাপ্ত শিল্পী–শিরোমণি। আর সে কোনো পার্থিব সম্পত্তি দাবি করছে না, শুধু নিজের আবেগের কথাটুকু নিবেদন করছে। এটুকু শুনতেই হবে।’
নৃসিংহ দেব মুখে কিছু বললেন না, ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন যে সুবলের প্রার্থনা স্বীকৃত হয়েছে।
তৎক্ষণাৎ এক বিশেষ দূতকে এই সংক্রান্ত আদেশ দিয়ে বেগুনিয়া গ্রামে গ্রামণীর কাছে পাঠানো হল। সুবলের আবেগকে সম্মান দেওয়ার জন্য মহারাজ এই কথাও লিখে পাঠালেন যে মৃতার মুখাগ্নি করার সময়ে তিনি নিজেও সুবলের পাশে উপস্থিত থাকতে চান। আসলে তিনি নিজের চোখেই দেখতে চাইছিলেন, ‘এই মৃতা সেই নারীই কিনা?’
ব্যক্তি এক ভাবে ভাবে, আর নিয়তির ছকটা থাকে অন্যরকম। মাঘের হিমশীতল রাতে ঝিলের পাড়ে বসে গ্রামভট্ট ওই শবদেহটিকে রক্ষা করবে—এমন নির্দেশই ছিল। সে কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বালল, মদ নিয়ে জেঁকে বসল তাপ পোয়াতে। রাত এক প্রহর এভাবে মৌতাতে কাটল। নেশা কাটতেই হঠাৎই তার ভয় করতে আরম্ভ করল। সে ভাবল, ‘এখানে কেউ আমাকে দেখতে আসছে না, আর মড়াও তো আর পায়ে হেঁটে উঠে চলে যাবে না। আশেপাশে বন্য পশু থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই যে মৃতদেহটাকে ছিঁড়ে খাবে। যদি এখন চুপি চুপি বাড়ি চলে যাই, আর ভোরের আলো ফোটার আগেই ফিরে আসি, তাহলে কেমন হয়?’
সে এবার একটা জ্বলন্ত কাঠের টুকরো নিয়ে উঠে ঝিলের মোহানার দিকে এগোল। জল এনে জ্বালিয়ে রাখা আগুনটা নেভাতে হবে যে।
জ্বলন্ত কাঠ নেভানোর মুহূর্তে শবদেহটার হাতে থাকা একটা অলঙ্কার চকচক করে উঠল। মৃতদেহটার দিকে এগিয়ে গেল গ্রামভট্ট। শবের হাতের আঙুলে থাকা একটি সোনার আঙটির লোভে পড়ে গেল সে। সে আংটিটাকে খুলে আনার চেষ্টা করল, কিন্তু মরদেহটা জলে ভিজে স্ফিত হয়ে যাওয়ায় মুদ্রিকাটাকে সহজে খোলা গেল না। বেশ বলপ্রয়োগ করতে হল। এই জোর প্রয়োগ করা, ধাক্কাধাক্কির ফলে শবদেহটা জলের দিকে খানিকটা নেমে গেল। গ্রামভট্ট অবশ্য বেশ কসরত করে আঙটিটাকে বাগিয়ে ফেলল।
অপরদিকে চন্দ্রভাগার ধারা ঝিলের জলে প্রবেশের ফলে তৈরি হওয়া ঘূর্ণিতে পড়ে গেল মৃতার শরীর। এবার জলের ধারায় বয়ে বিনোদিনীর শরীর সাগরের দিকে এগোতে লাগল। গ্রামভট্টের নেশা ততক্ষণে কেটে গিয়েছে। সে কপাল চাপড়ে হায় হায় করে উঠল। এবার কর্তব্যে গাফিলতির দায়ে তার প্রাণদণ্ড অবধারিত জেনে সে পালিয়ে যাওয়া স্থির করল। আবার পরক্ষণেই তার মনে হল, ‘যদি পালিয়ে যাই, তাহলে আমার অপরাধ আরও প্রবলভাবে প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। ঠান্ডা মাথায় অন্য কোনো উপায় বের করতে হবে।’ সে বাড়ি চলে গেল। এবং মুদ্রিকাটাকে যত্ন করে নিজের অধীনে লুকিয়ে রাখল।
ওদিকে ভোর হতে-না-হতেই বেগুনিয়া গ্রামের গ্রামণী শ্মশানে চিতা সাজিয়ে ফেললেন। সুবল মহারানার সঙ্গে এসে উপস্থিত হয়েছে স্বয়ং উৎকল-নরেশ নৃসিংহ দেব। তাঁদের পিছনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে শাসক বিভাগের গণ্যমান্য কর্মচারীরা। সূর্যোদয় হতেই শবদেহটিকে এনে চিতায় শোয়ানোর আদেশ দেওয়া হল। কিন্তু শব কোথায়? থরথর করে কাঁপতে–কাঁপতে হাতজোড় করে গ্রামভট্ট এসে উপস্থিত হল, ‘মহারাজ, শব তো নেই!’
‘নেই মানে?’
‘লুপ্ত হয়ে গিয়েছে।’
‘কী বলছ তুমি? কীভাবে? তুমি তখন কী করছিলে?’
‘আমি তখন সামনেই ছিলাম, মহারাজ। নিজের চোখে সবটাই দেখেছি। সে এক আশ্চর্য ব্যাপার! মধ্যরাতে শবদেহটা ধীরে-ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠল। আমি দেখেই ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিলাম। স্পষ্ট দেখলাম, ওই নারীর দুটো হাত ক্রমশ দুটো ডানায় পরিণত হল। জল থেকে উঠে ওই রমণী হেঁটে এল ঝিলের পাড় ধরে। আমি ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলাম, দেবীর মতো সুন্দরী ওই নারী আমাকে বলল—ভয় পেও না। তুমি এতক্ষণ আমাকে সযত্নে সুরক্ষিত রেখেছিলে। আমি তোমার উপরে যথেষ্ট প্রসন্ন হয়েছি...। তারপর সে বরাভয় দিয়ে আমাকে কাছে ডাকল।’
সবাই স্তব্ধ হয়ে শুনছে। গ্রামভট্ট বলে চলল, ‘আমি ভয়ে-ভয়ে একটু এগিয়ে গেলাম।’
মহারাজই বললেন, ‘তারপর?’
‘তারপর পরির মতো ওই নারী নিজের হাতের আঙুল থেকে একটি সোনার আঙটি খুলে আমার হাতে দিয়ে বলল, এটা তোমাকে উপহার দিলাম। তারপর পলক ফেলতেই ডানা মেলে আকাশে উড়ে গেল। দেখলাম, আকাশের বুকে শূন্য থেকেই জন্ম নিল একটা সোনার রথ। ওই রথে চেপেই শূন্যে মিলিয়ে গেল ওই দেবী। মহারাজ, ওই নারী কোনো সাধারণ মানবী ছিল না। নিশ্চয়ই কোনো অপ্সরা বা দেবকন্যা ছিল। হয়তো কোনো অভিশাপের ফলে মর্ত্যে জন্ম নিতে বাধ্য হয়েছিল। সব দেখেশুনে আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম মহারাজ। এইসব কিছু ঘটে যাওয়ার পরেই আমি গ্রামণী মশায়ের বাড়িতে ওঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু উনি ততক্ষণে শুয়ে পড়েছিলেন; তাই আর জ্বালাতন করিনি।’
নৃসিংহ দেব একেবারে অবাক হয়ে গিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘কই সেই আঙটি? দেখাও দেখি।’
গ্রামভট্ট সযত্নে সেই মুদ্রিকাটাকে বের করে অঞ্জলিতে রেখে সাদরে মহারাজের সামনে প্রস্তুত করল। আঙটিটাকে হাতে তুলে নিয়ে ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন মহারাজ। সোনার পদ্মের সাতটি পাপড়ির কেন্দ্রে ঘন নীল রঙের পুষ্পরাগ মণি বসানো একটি অঙ্গুরীয়। প্রতিটি পদ্ম-পাপড়িতে খোদাই করা আছে একটি করে অক্ষর—‘সু’ ‘ব’ ‘ল’ ‘ম’ ‘হা’ ‘রা’ ‘না’।
মহারাজের হাত থেকে মুদ্রিকাটা খসে পড়ল। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সুবল। সে হাতে তুলে আংটিটাকে। মুদ্রিকাখানা দেখামাত্রই এত বছরের জমাট বাঁধা আবেগ বেরিয়ে এল চোখের জল হয়ে। পাষাণ তরল হয়ে গেল। কপাল চাপড়াতে লাগল সে, ‘হায় রে, আমি কেমন অভাগা, যাকে গত পরশু নদীতে অর্ঘ্য অর্পণ করতে দেখে আমার মনে হয়েছিল যে এর সঙ্গে জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক আছে, তার পরিচয় জানার জন্য সামান্য চেষ্টাও করলাম না? কতক্ষণ তার সামনে বসে রইলাম, তবুও বিনোদিনীকে চিনতে পারলাম না? কেন? কেন? কেন?’
সুবল বিশ্বাস–অবিশ্বাসের দোলাচলে ভুগে নিজেই নিজের সব প্রশ্নের জন্য উত্তর তৈরি করতে লাগল, ‘ওর অনাবৃত দেহটাকে চিতা অবধি তুলে আনার জন্য অনেকেই ওকে স্পর্শ করত। বিনোদিনী কখনোই তা মেনে নিতে পারত না। তাই এমন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সে চলে গিয়েছে। সে কারো অনুগ্রহ চায়নি—না জীবিত অবস্থায়, না মরার পরে। যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে।’
কান্নায় ভেঙে পড়েছে সুবল। তার এই অবস্থা দেখে এবার নৃসিংহ দেবের চোখও জলে ভরে উঠল। এই নারীর কাছেই তিনি বারংবার পরাজিত হয়েছেন, একথা তিনি ছাড়া আর কেউ যে জানেই না। আজও সেই নারী শবদেহ রূপে নৃসিংহ দেবের অন্তিম অনুগ্রহ অস্বীকার করে চলে গিয়েছে।
ওদিকে মাটিতে পড়ে পড়ে নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন করে চলা সুবলকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো সাহস কারো হল না। শ্মশানে উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তির চোখেই এখন জল।
চিতা যখন একবার সাজানো হয়েই গিয়েছে, তখন তার কাঠ সরানো যাবে না। সুবল ওই মুদ্রিকাখানা গ্রামভট্টকে ফিরিয়ে দিল। বিরহী প্রেমিকের মতোই সে আবার সেই স্থানে চলে গেল, যেখানে বিনোদিনীর শবটিকে শেষবারের জন্য দেখেছিল। সে ঝিল থেকে তুলে নিয়ে এল কয়েকটি পদ্মফুল। কেতকীবন থেকে আনল কিছু কেতকীর পুষ্প। ফুল তুলে আনতে গিয়ে কেতকীর পাতায় হাত কেটে গিয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হল। কিন্তু সেদিকে যে তার হুঁশ নেই। এবার হাতে কেতকী আর পদ্মের ফুল নিয়ে সে চিতার কাছে ফিরে এল। চিতায় সাজিয়ে দিল পুষ্পরাজি। তারপর ডোমের হাত থেকে অগ্নি-শলাকা নিয়ে চিতায় অগ্নি সংযোগ করল সুবল।
সৌম্য শ্রীদত্ত সব দেখলেন। এবং তিনি ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তিই জানল না যে, সুবল মহারানা একই চিতায় বিনোদিনী আর শিল্পা দুজনেরই সাংকেতিক অন্তিম সৎকার করল। এই দুজনেই একসঙ্গে তার হৃদয়ে বাস করত। দুজনের মৃত্যুই হয়েছিল জলসমাধিতে, এবং দুজনেই চিতাগ্নি পায়নি।
শ্মশান থেকে ফিরে এসে রাজা নৃসিংহ দেব স্থির করলেন, বিনোদিনীর বলার ফলেই যেহেতু এই ব্রত আরম্ভ করেছিলেন, তাই আমৃত্যু এই ব্রত পালন করে যাবেন।
সারা উৎকল জুড়ে লোকের মুখে-মুখে দাবানলের মতো একটাই খবর ছড়িয়ে পড়ল—সুবল মহারানার স্ত্রী বিনোদিনী একজন দেবকন্যা ছিলেন। মৃত্যুর পর তিনি স্বর্গরথে করে অন্তর্হিত হয়ে যান। ক্রমশ এই কথা সুবলের ভাই ধবল এবং তার বন্ধু রজতের কানেও গিয়ে পৌঁছাল।
খোঁজখবর নিয়ে তারা সুবলের সঙ্গে দেখা করতে এসে উপস্থিত হল বেগুনিয়া গ্রামে। রজত সঙ্গে করে নিজের স্ত্রীকেও এনেছিল। রজতের স্ত্রী, বিনোদিনীর প্রতি সুবলের মায়ের প্রত্যেক অন্যায় আচরণের কথা, তার প্রতি ধবলের অনুকম্পা তথা সহানুভূতির কথা, গ্রামে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা অপবাদের কথা, বিনোদিনীকে বিতাড়িত করার কথা, তার অন্তর্ধানের ঘটনা এই সবই সুবলকে জানাল। সবশেষে সে বলল, ‘ভাই সুবল, তোমার সঙ্গে বিনোদিনীর বিয়ের ফলে সবথেকে বেশি খুশি আমি হয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল ভগবান শ্রীরামচন্দ্র এবং মাতা সীতার মতোই তোমাদের ভারি সুন্দর জুটি হবে। কিন্তু নিয়তির খেলা, বিনোদিনীর কপালে মা সীতার মতোই সুখ জুটল না। তুমি নিজের হাতে করে কোণার্ক-মন্দির গড়েছ। কোণার্ক হয়তো অমর হয়ে যাবে, কিন্তু ওই মন্দির তৈরিতে আমাদের বিনোদিনীর অবদানের কথা কেউ জানবে কি? কোণার্কের নির্মাণের সঙ্গে উচ্চারিত হবে রাজা নৃসিংহ দেব, মন্ত্রী শিবেই সান্তারা, প্রধান শিল্পী বিশু মহারানার নাম। খুব বেশি হলে শিল্পী-শিরোমণি সুবল মহারানা বা বারোশো জিতেন্দ্রিয় শিল্পীর কথাও হয়তো বলা হবে, কিন্তু বিনোদিনী ওই মন্দিরের জন্য কী পেয়েছে আর কী ত্যাগ করেছে, সেই কথা কি ইতিহাস মনে রাখবে?’
সুবলের কাছে কোনো উত্তর রইল না। ধবল মুখ নীচু করে নিল। তার চোখের জল বাঁধ মানছে না।
সুবল মহারানা নির্বিকার ভাবে দূরে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ সে বলল, ‘কোণার্কের মন্দিরে প্রতীক্ষারত নারীর মূর্তির মধ্যে দিয়ে আমার বিনোদিনী অমর হয়ে গিয়েছে। নৃসিংহ দেব একদিন এই পৃথিবী থেকে চলে যাবেন, মন্ত্রী শিবেই সান্তারাও দেহ রাখবেন একসময়ে, প্রধান শিল্পী বিশু মহারানার মৃত্যু ঘটবে, শিল্পী–শিরোমণি সুবল মহারানা কিংবা মন্দিরের জন্য প্রাণপাত করে কাজ করা বারোশো জিতেন্দ্রিয় শিল্পীও সময়ের প্রকোপে একদিন মুছে যাবে, কিন্তু সুবল মহারানার ছেনি-হাতুড়ি যে অমরত্ব বিনোদিনীকে দিয়েছে তা কেউ পাবে না। ছেনির কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। এবার সুবল নিজের বিনোদিনীর কথা লিখে যাবে।’
সুবল কী বলল, তা অন্যরা কেউই কিছু বুঝে উঠতে পারল না। সুবল তাদের বিদায় জানাল।
শৈলে শৈলে ন মাণিক্যং, মৌক্তিকং ন গজে-গজে—প্রত্যেক পাথর মানিক হতে পারে না এবং প্রত্যেক হাতির মাথায় গজমুক্তা থাকে না। সর্বসুলভ মুক্তা হল শুক্তি-মুক্তা। এবং এই শুক্তির মুক্তার আবির্ভাব শুক্তি বা ঝিনুকের পক্ষে কিন্তু বেশ বেদনাদায়ক। যদি কোনও কারণে শুক্তির আবরণের মধ্যে কোনো কঠিন বস্তু, বালুকণা ঢুকে যায় তা প্রাণীটির পক্ষে ভীষণ কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তখন শুক্তি সেই বস্তুকণাকে কেন্দ্র করে একধরনের রস নিঃসরণ করে সেটিকে মসৃণ মোড়কে মুড়ে ফেলে। এই প্রক্রিয়া বেশ পীড়াদায়ক। শুক্তি সমানে এক আভাময় আবরণে মুড়ে ফেলতে থাকে অবাঞ্ছিত বস্তুকণাটাকে। মুড়তেই থাকে...মুড়তেই থাকে।
একটা কষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আরেকটা কষ্ট অল্প থেকে অধিক, অধিক থেকে অধিকতর হতেই থাকে ক্রমশ। একমাত্র যখন কেউ সেই শুক্তির কবচ ভেঙে ভিতর থেকে ওই বস্তুকণাকে ঘিরে থাকা মনমোহন আচ্ছাদনটিকে বাইরে বের করে আনে, তখনই তার কষ্ট থেকে সে মুক্তি পায়। অর্থাৎ, একমাত্র শুক্তির মৃত্যুর মাধ্যমেই এই কষ্ট থেকে নিবৃত্তি পাওয়া সম্ভব হয়। সুবল মহারানা যেন শুক্তির মতোই কষ্ট ভোগ করে চলেছিল।
সুবল কখনও রাতের পর রাত জেগে কেতকী-বনে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে নিজের হারানো চাঁদের সন্ধান করতে লাগল। কখনও সকাল-সন্ধ্যায় সে ঝিলের বুকে বৃন্তচ্যুত পদ্মফুল খুঁজে বেড়াত। আবার কখনও দিনের বেলায় বনে কুড়িয়ে ফিরত কেতকীর ফুল। সুবল আসলে বিনোদিনীর স্মৃতি সন্ধান করত, শিল্পার কথা স্মরণ করত, যদিও সে জানতে যে, কেউ কোত্থাও নেই। হতাশ সুবল একসময়ে নিজের বাসায় ফিরে তালপাতা খুলে লিখতে বসত। একান্তে নিজেরই লেখা বারংবার উচ্চস্বরে পড়ত। সেই পাঠ শুনত শুধু শুক, পিক, তোতা, প্রজাপতি আর ভ্রমরের দল।
কিন্তু কিছুতেই সুবল ঠিক শান্তি পেত না। তার শান্তি যে ছেনি হাতুড়িতেই ছিল। কুশভদ্রার তীর থেকে সে কুড়িয়ে নিয়ে এল একখানা বেলেপাথর। সেই পাষাণের বুকে খোদাই করতে লাগল বিনোদিনীর মূর্তি। প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর উপবিষ্ট বিনোদিনী। দেবীর মতো। কারণ উৎকলের মানুষজন বিনোদিনীকে দেবকন্যা ভাবতে শুরু করেছিল।
সুবল আরও একটি বার জনগণের চিন্তাভাবনাকে পাষাণের বুকে স্থান করে দিতে চেয়েছিল। এভাবেই সে দিনে পাথর কুঁদত, আর রাতে লিখত তার জীবনের কথা। আটমাস সময় লাগল। দুটো কাজই একইসঙ্গে সম্পূর্ণ হল। তার লেখা জীবনগাথাকে সম্মান প্রদান করার মতো মানুষ একজনই ছিলেন—মহারাজ নৃসিংহ দেব।
কেতকীর শুকনো পাতাকে পিষে সুতো বানিয়ে সুবল একটার পর একটা তালপাতাকে বিঁধে পুঁথির আকার দিয়েছিল। সুবল যখন ওই পুঁথি মহারাজকে নিয়ে গিয়ে দেখাল, তখন তিনি করুণায় অভিভূত হয়ে গেলেন। নিজের হাতে নিয়ে মহারাজ পুঁথিটিকে উলটে পালটে দেখতে থাকলেন। কিন্তু আচমকাই তাঁর একটা কথা মনে পড়ে গেল—যখন তিনি সুবলকে ভাস্কর্যের নীচে শিল্পীর নাম খোদাই করার কথা বলেছিলেন, তখন সে বলেছিল, কোণার্কের কোনো ভাস্কর্যের নীচেই কোনো শিল্পীর নাম খোদিত থাকবে না।
নৃসিংহ দেব হাতের পুঁথি মুড়ে রাখলেন।
তিনি বললেন, ‘শিল্পী-শিরোমণি সুবল মহারানা, তোমার এই জীবনকথার মতো অনন্য আর কিছুই নেই। কিন্তু মনে পড়ে কি, তুমি নিজেই বলেছিলে এধরনের উল্লেখ তোমার কুলের গৌরবের পৃষ্ঠাকে কলঙ্কিত করে তুলবে? তুমিই বলেছিলে যে, কোণার্কের ইতিহাসে কোনো শিল্পীর নামোল্লেখ করা থাকবে না! যদি তুমি বিনোদিনীর কথা মেলে ধরতে চাও, তাহলে যে শিল্পী সুবল মহারানার ইতিহাসও এসে পড়বে। তার ছবি আঁকা হয়ে যাবে সময়ের পটে। আমি এই জীবনগাথাকে সম্মান এবং স্বীকৃতি দিলে তোমারই গৌরব আহত হবে। এবার বলো, এরপরেও তুমি কি সেটাই চাও?’
গত আটমাস যাবৎ সুবল ভাবের উথালপাতাল সাগরে সাঁতরে বেড়িয়েছে। এবার যেন সেই ঢেউই তাকে সৈকতে এনে আছড়ে ফেলল। নৃসিংহ দেবের কথা তার ভিতরের সেই কঠোর শিল্পীসত্তাকে আবার জাগিয়ে তুলল, যা বারো বছরের জন্য তার হৃদয়কে পাষাণ বানিয়ে দিয়েছিল।
হাতজোড় করে সে বলল, ‘না মহারাজ, আর আমি তা চাই না। আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি ভুল করে ফেলেছি। দিন মহারাজ, দয়া করে পুঁথিটা আমাকে ফিরিয়ে দিন।’
‘সুবল, কী করবে এই পুঁথি ফিরিয়ে নিয়ে? এটা বরং রাজকীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত থাক। তোমার লেখা শব্দেরা বিখ্যাত নাহলেও অক্ষয় তো হোক।’
‘এই পুঁথিতে লেখা ব্যথা-বেদনার কথা একান্তই আমার। বিশ্ববাসীকে এসবের সাক্ষী করার কোনো প্রয়োজন নেই। জীবনের লালসা দুর্দম্য। জীবন নিজেও জানে যে সে ভঙ্গুর, তবুও সে অক্ষয় হতে চায়, অমরত্বের দাবি করে। সেই খেয়ালেই লিখে বসেছিলাম এইসব কথা। এখন আমার একটাই ইচ্ছা, মহারাজ—আমার শব্দেরা আমারই সঙ্গে যেন চিতাগামী হয়। আর কোনো দাবিদাওয়া নেই।’
মহারাজ পুঁথিখানা সুবলকে হস্তান্তরিত করলেন। সুবল পুঁথি নিয়ে, মহারাজকে প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিল।
সন্ধ্যা নাম্নী বালিকা এখন রজনীর কৈশোর লাভ করেছে। তার উন্মুক্ত কেশের কালিমা অন্ধকার হয়ে ঢাকা দিয়েছে চরাচরকে। সামনে সুন্দরীর শাড়ির মতো পড়ে রয়েছে ভাদ্র মাসের চন্দ্রভাগা। নদীর বুকে একটা মাছধরা ডোঙা দেখা যাচ্ছে।
ডোঙায় করে নিজের কুটিরে ফিরছে সুবল মহারানা। সে নিজেই নৌকা বাইছে। আচমকা জলে একটা আলোড়ন হল। ঝপ করে শব্দ। সুবল ভাবল, ‘কোনো বড় মাছ বোধ হয়!’ সে ঝুঁকে দেখতে যেতেই হাত থেকে বৈঠাখানা জলে পড়ে গেল। আর সেটাকে ধরতে গেল সুবল। টাল সামলাতে পারল না, অমনি হালকা ডোঙাটাও জলে উলটে গেল।
মহারাজের কাছ থেকে পুঁথি ফিরিয়ে নিয়ে ফিরছিল সুবল। বৈঠা, সুবল আর নৌকার সঙ্গে সেই পুঁথিও গিয়ে পড়ল চন্দ্রভাগার জলে।
সুবল মহারানা নিজের লেখা পুঁথিটাকে বাঁচানোর জন্য জল তোলপাড় করতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ তার অনুসন্ধান চলল, কিন্তু ফল হল না। পুঁথির দেখা মিলল না। ওভাবে নদীর জলে সাঁতরে আর কতক্ষণ টিকে থাকা যায়? দম শেষ হয়ে আসছে দেখে হাল ছেড়ে দিয়ে সুবল উলটে যাওয়া ডোঙাটাকে জাপটে ধরতে চেষ্টা করল, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হতেই ডিঙিনৌকার একটা মাথায় সুবলের মাথাটা প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খেল। সঙ্গে সঙ্গে সংজ্ঞা হারাল সুবল।
অজ্ঞান অবস্থায় তার দেহটা ধীরে ধীরে জলের চাদর ভেদ করে নীচে নামতে শুরু করল। তার প্রাণপ্রিয়া বিনোদিনীর মতোই চন্দ্রভাগার বুকে সমাহিত হয়ে গেল তার শরীর। নদীর কিন্তু তাতেও কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে আপন বেগে পাগলপারা বয়ে চলল।
বেশ কয়েকদিন পর যখন রাজকীয় কোষাধিকারীর দূত সুবল মহারানাকে মাসিক বৃত্তি দেওয়ার জন্য তার কুটিরে গিয়ে উপস্থিত হলেন, তখন জানতে পারলেন যে সুবল মহারানা বেশ কিছুদিন ধরে ঘরেই ফেরেনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সুবলের কোনো সন্ধান মিলল না। কেউ খেয়ালও করল না যে, কুশভদ্রার তীরে বেলেপাথরকে খোদাই করে গড়া বিনোদিনীর মূর্তিটাও সুবলের জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে।
কত ঋতু কাটল! কেটে গেল কত বছর! নদীতে জল বাড়ল-কমল, বন্যা এল। মূর্তি চাপা পড়ে গেল বালুরাশির নীচে। এভাবেই চাপা পড়া অবস্থায় থেকে গেল বছরের পর বছর। একসময় নদীও নিজের গতিপথ বদল করতে শুরু করল। তার চলার ভঙ্গি তো এমনই।
বালির নীচে চাপা পড়া ওই মূর্তি অষ্টাদশ শতকে প্রথমবার লোকসমক্ষে আসে। কয়েকটি বাচ্চা ছেলে বালির চর খুঁড়ে জল বের করার চেষ্টা করছিল। সেই সময়ে তারা এই মূর্তি দেখতে পায়। দেবীমূর্তি ভেবে তার চরণের কাছে দু-চারটে ফুল সাজিয়ে আর কপালে সিঁদুর লেপে দিয়ে তারা প্রতিমার সৎকার করে। প্রতিমার নীচে লেখা ছিল—‘বিনোদিনী, যার মুখশোভা অনন্য।’ কেউ জানতেও পারল না যে, বিনোদিনী নাম্নী কোনো রক্তমাংসের তরুণী ছিল, এবং তাকে মাথায় রেখেই এই মূর্তি গড়া হয়েছিল। দেবদ্বিজে ভক্তি রাখা ভারতবর্ষে কোনো দেবদেবীসুলভ প্রতিমা দেখলে কেউই ভাবতে পারে না যে তার পিছনে কোনো মানুষের কাহিনিও থাকতে পারে।
শোনা যায়, সুবল মহারানার নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার বেশ কয়েক বছর পরে কোণার্কের মন্দিরের কাছে এক বিশালদেহী পুরুষ কুষ্ঠরোগীকে দেখা গিয়েছিল। খসে খসে পড়ে যাচ্ছিল তার অঙ্গ। সারা গায়ে মাছি ভনভন করত। কেউ জানতে পারেনি যে ওই কুষ্ঠরোগী আসলে একসময়ের মল্লবীর কুকা। তার জঘন্য অপরাধের জন্য প্রকৃতিই তাকে শাস্তি দিয়েছিল। যদিও কুকা কারো কাছে কখনওই নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেনি, কিন্তু মনে মনে সে জানত তার কোন পাপের ফল তাকে ভোগ করতে হচ্ছে। সবসময়েই তার মনে হত যেন ধর্মপদ তাকে দেখে হাততালি দিচ্ছে, হাসছে।
কোণার্কের মন্দির উদ্বোধনের পরেই পরিত্যক্ত হয়ে যায়। কিন্তু সেখানে দলে দলে পর্যটক আসতে আরম্ভ করে। তারা কুষ্ঠরোগীদের ভিক্ষাও দিত। কুকা, একসময়ের বিখ্যাত মল্লবীর সেই ভিক্ষুকদের পঙক্তিতে দাঁড়িয়ে রোজ হাত পাতত। এভাবে দীর্ঘ রোগদশা ভোগ করার পর তার মৃত্যু হয়।
এই কাহিনির তিন প্রধান পাত্র—বিনোদিনী, শিল্পা এবং সুবল মহারানা, তিনজনেরই অপঘাতে মৃত্যু ঘটেছিল। সলিল সমাধি। তিনজনের দেহই চিতার আগুন পায়নি। এই তিনজনের অতৃপ্ত, অশরীরী আত্মা আজও কোণার্ক চত্বরে ঘোরাফেরা করে। বছরে একটি বার, মাঘ শুক্ল সপ্তমীতে, সূর্যদেবতার জন্মদিনে শিল্পা নিজেকে দেবদাসী রূপে সজ্জিত এবং সমর্পণ করে কোণার্ক পরিসরের বাইরে নৃত্য পরিবেশন করে।
সেই নাচ কিন্তু সকলে দেখতে পায় না, কিংবা সবাই তার নূপুরের ধ্বনি শুনতে পায় না। আজই সেই রাত—মাঘ শুক্ল সপ্তমীর রাত। সূর্য সপ্তমীর রাত। যে নূপুরের শব্দ শুনে আপনি আকৃষ্ট হয়ে এগিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, তা আসলে শিল্পার নূপুরের ধ্বনি। আমি প্রথমে এই কথা ভেবে অবাক হচ্ছিলাম যে, যা সকলে শুনতে পায় না, তা আপনি কীভাবে শুনলেন? কিন্তু আপনার সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, আপনিও সাধারণ মানুষ নন, একজন লেখক। এবং আপনার মধ্যে কিছু বিশেষত্ব আছে।
‘যেমন?’ আমিও আশ্চর্যের সুরে জিজ্ঞেস করলাম।
যেমন আপনি অশরীরী আত্মাদের দেখতে বা শুনতে পান। তবে তাদের খুব কাছাকাছি চলে গেলে আপনার অনিষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই আমি আপনাকে ওদিকে এগোতে নিষেধ করলাম। সুবল মহারানার আত্মাও এই রাতে এখানে আসে। কোণার্ক মন্দিরকে দু-চোখ ভরে দেখে, শিল্পার নূপুরের সুরলহরায় মুগ্ধ হয়। এই তিনটি আত্মা কীসের জন্য অপেক্ষা করছে জানেন? তারা চায়, বিশ্ব তাদের কথা জানুক। এটাই তাদের বাসনা। যতদিন তাদের এই কামনার পূর্তি হবে না, ততদিন তাদের সদ্গতি হওয়া অসম্ভব।
তবে এখন আমার মনে হচ্ছে, আপনি নিজের কলমের মাধ্যমে তাদের কথা সকলের সামনে মেলে ধরবেন। তাহলেই তাদের আত্মার মুক্তি ঘটবে। সত্যিই এই কাহিনিটা লিখবেন তো?
আচমকাই অদূরে কোথাও বনমোরগের কর্কশ ডাকে সূর্যোদয়ের ঘোষণা হল। আমি টের পেলাম সহসাই থেমে গেল সম্মোহনী নূপুরের ধ্বনি। আশপাশটা কেমন কুয়াশাঘন হতে থাকল। সুন্দরী বন্ধুটি আমাকে আবার প্রশ্ন করল, ‘আপনি ইতিহাসের গল্প খুঁজছিলেন, তাই না? আমি যে কাহিনিটা বললাম, সেটা লিখবেন তো বন্ধু?’
এবার আমার তরফ থেকে প্রশ্ন ধেয়ে গেল, ‘কিন্তু এতসব কথা আপনি জানলেন কী করে? আপনি যা কিছু বলেছেন তা অদ্ভুত, কিছুটা অলৌকিকও। কিন্তু এগুলো যে সত্যি, তারই বা প্রমাণ কী? আমি সত্যিকারের কাহিনি লিখতে চাইছি। যদি এধরনের গল্প বুনি, তাহলে সেই তো মিথ্যে কাহিনি লেখার সুবাদে হয়তো পুরষ্কার পাব, কিন্তু নিজের মনকে সান্ত্বনা দেব কীভাবে? পারলে এই কাহিনির সত্যতার প্রমাণ দিন।’
‘তাহলে আপনাকে একটা কথা দিতে হবে যে?’
‘যদি প্রমাণ দেবেন বলেন, তাহলে আমিও কথা দিতে রাজি।’
‘আমি এই কাহিনির সত্যতার প্রমাণ।’
‘কী বলছেন ঠিক বুঝলাম না। আমি মানছি যে গল্পটা আপনিই আমাকে বলেছেন, কিন্তু তাই বলে কয়েকশো বছর আগের কাহিনির প্রমাণ আপনি কী করে হবেন?’
‘কাঠ জ্বলে আংরা হয়,
আংরা জ্বলে ছাই।
আমি জ্বলি বিরহজ্বালায়
কেউ বোঝে না তা-ই।।
আপনি সম্ভবত এখনও আমাকে চিনতে পারেননি। আচ্ছা, ঠিক আছে। আমিই নিজের পরিচয় দিই। আমিই বিনোদিনী, সুবল মহারানার সেই অভাগী স্ত্রী।’
নিজের কথা শেষ করেই ওই সুন্দরী নিজের ডান হাতখানা আমার সামনে মেলে ধরলেন। দেখলাম দুধসাদা হাতের উপরে রাধাকৃষ্ণের যুগলচিত্রের উল্কি আঁকা আছে। আমার মাথাটা ঘুরে গেল, সারা শরীর দুলে উঠল। আগের বারের থেকে আরও বেশি জোরে শোনা গেল বনমোরগের উদ্ঘোষ। পাশে বসে থাকা অপরূপার দেহ ঘিরে কুয়াশা আবর্তিত হতে থাকল। আমি নীল এক অন্ধকারে হারিয়ে গেলাম।
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
ছুম ছনন ছম ছুম ছনন ছম ছুম...
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
ছুম ছনন ছম ছুম ছনন ছম ছুম...
‘শাম্ব, তুমি মাতৃসমা গোপিনীদের সঙ্গে প্রণয়লীলা করছ, লজ্জা করছে না? যদি তুমি আমার পুত্র না-হতে, তবে আমার সুদর্শন চক্রে এতক্ষণে তোমার মুণ্ডচ্ছেদ হয়ে যেত।’
‘জাস্ট প্রিপেয়ার দ্য ইঞ্জেকশন! ফাস্টার!’ কথাগুলো কানে আসছিল। মনে হল কোমরে কেউ কিছু ফোটাল।
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
‘তাই আমি চাইছি, আমার এই মূর্তির স্থাপনা কৃষ্ণ-পুত্রের হাতে হোক। এবং এর নামকরণ হোক আমার পুত্র কর্ণের নামে—কর্ণার্ক। আমার এই মূর্তি কর্ণার্ক নামেই বিখ্যাত হবে।’
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
‘দেবী, বস্তুস্থিতি এখন আপনার সামনেও স্পষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে বলার মতো কিছু নেই। আমার কাছে রাজধর্ম সবথেকে বড়। এবং আপনি জানেনই যে, তা পালন করা কত কঠিন কাজ। মাতৃভূমির সম্মান অপ্রতিহত রাখা ব্যক্তির কর্তব্য। সেই ব্যক্তি রাজা হোক বা রাজকুমার কিংবা সাধারণ নাগরিক।’
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
‘ভাইটি আমার, মেয়েদের চোখ কখনো ভুল বস্তুর সন্ধান দেয় না।’
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
‘অক্সিজেন! ড্রিপ! হেড পোর্শনটা তোলো। ফাস্টার!’
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
‘এ তো রাজার আদেশ নয়, আহ্বান! রাজা হলেন জগন্নাথ মহাপ্রভুর রাউত, তিনি সেবক মাত্র। এই নির্দেশ আসলে মহাপ্রভু জগন্নাথ স্বামীর। শিল্পীকে দেওয়া এই নির্দেশ আসলে পরমশিল্পী বিধাতার নির্দেশ।’
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
‘পাল্স্?’
‘হেভি!’
‘বি পি?’
‘ভেরি লো। সিক্সটি!’
‘নার্স, ইঞ্জেকশন!’
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
‘গ্রহীতা যদি দাতাকে স্মরণ করে, তবেই গ্রহীতা এবং দাতা উভয়ের মাহাত্ম্য থাকে, কিন্তু দান করে তা ভুলে গেলেই দাতার মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়।’
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
‘যে সাগরে শয্যা বেঁধে এসেছে, সে কি আর শিশিরে ভয় পায়? আমি মরতে বেরিয়েছিলাম। এখনও জীবিত আছি এ আমার বিধিলিপি।’
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
‘তুমি শিল্পী...আর আমি শিল্পা!’
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
বিঁপ...বিঁপ...বুং...বিঁপ...বিঁপ...বুং...
‘রেয়ার কেস! পেশেন্টের অজ্ঞানও নয় বা ঘুমিয়েও নেই অথচ চোখ মেলছে না। বাট হিজ ব্রেইন ইজ ওয়ার্কিং সো ফাস্ট। হয়তো কোনো ট্রমায় আছে। ট্রাংকুইলাইজার! একে ঘুম পাড়াও।’
আধো-আচ্ছন্ন অবস্থা থেকে কখন যে ঘুমের মধ্যে হারিয়ে গেলাম বুঝতে পারলাম না। জ্ঞান ফিরতে দেখি আমার বউ মন্দিরা বেডের পাশেই বসে আছে। আমার ছোট ছেলেটা কাঁদতে কাদতেই ওঁর কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হয়। বড় ছেলে মায়ের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার দুচোখ ভরা জল। মন্দিরা তাকে সমানে বুঝিয়ে চলেছে, ‘কাঁদিস না বাবু, তোদের বাবা ঠিক হয়ে যাবে।’
‘দুদিন হয়ে গেছে মা, বাবা ঘুমিয়েই রয়েছে। বাবাকে বলো, আমি আর দুষ্টুমি করব না। ভাইকেও করতে মানা করব। বাবা যখন গল্প লিখবে, তখন লেখার ঘরে ঢুকে লাফালাফি করব না। বায়নাও করব না আমরা। প্লিস মা, বাবাকে এবার উঠে বসতে বলো। বাবা কি এখনো রাগ করেই থাকবে?’
একজন নার্স ধমক দিল, ‘কথা বলবেন না! বাইরে যান! বাইরে গিয়ে বসুন।’
ওরা আমার চোখ মেলাটাকে খেয়াল করেনি। আমি আস্তে-আস্তে ডান হাতটা তুললাম। হাতে অজস্র চ্যানেল গাঁথা আছে। ব্যথা লাগল। মন্দিরা আমার নড়াচড়া দেখেই চেঁচিয়ে উঠল, ‘ডক্টর, ওর সেন্স ফিরেছে।’ ও এসে আমার হাতে হাত রাখল। আমি সর্বশক্তি দিয়ে ওর হাতটাকে আঁকড়ে ধরলাম।
ডাক্তার বলে উঠলেন, ‘আরেকটা ইনজেকশন!’
‘অলসনিমীলিতলোচনয়া পুলকাবলিললিতকপোলম্।
শ্রমজলসকলকলেবরয়া বরমদনমদাদতিলোলম্।।
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!
সখী হে কেশিমথনমুদারম্!’
‘চেক দ্য বি পি আগেইন!’
‘নর্মাল, স্যার।’
‘পালস্?’
‘এখন স্টেবল।’
‘ওকে। চোখের তারাও এখন স্থির হয়েছে। ইটস্ গেটিং বেটার।’
‘ওম্ আং হৃং ক্রৌং যং রং লং বং শং ষং সং হং সঃ সোৎহম্ প্রাণা ইহ প্রাণাঃ। ওম্ আং হৃং ক্রৌং যং রং লং বং শং ষং সং হং সঃ জীব ইহ জীব স্থিতঃ। ওম্ আং হৃং ক্রৌং যং রং লং বং শং ষং সং হং সঃ সর্বেন্দ্রিয়াণী ইহ সর্বেন্দ্রিয়াণী। বাঙমনস্ত্বক্ চক্ষুঃ শ্রোত্র জিহ্বা ঘ্রাণ বাকপ্রাণ পাদ্-পায়ুপস্থানি ইহৈবাগত্য সুখং চিরং তিষ্ঠন্তু স্বাহা।’
‘পেশেন্ট ইজ আউট অব ডেঞ্জার নাউ। ইউ আর টু লাকি ম্যাম। ইট ইজ ভেরি রেয়ার। ইয়োর হাজব্যান্ড হ্যাজ রিটার্নড ব্যাক। এখন আর ভয় নেই। তবে আমরা আরও দু-তিনদিন অবজার্ভেশনে রাখব। আপনি এখন বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। ওদের-ও তো কষ্ট হচ্ছে এখানে। বরং কাল সকালে আসুন। ডাক্তার বা স্টাফেরা সব সামলে নেবে। চিন্তার কোনো কারণ নেই।’
‘প্লিস ডক্টর! প্লিস অ্যালাও আস টু স্টে হেয়ার। প্লিস!’
‘ওকে। বাট ওঁকে কথা বলাবার চেষ্টা করবেন না। এই সময়ে কোনো ধরনের এক্সাইটমেন্টই ওঁর পক্ষে ভালো নয়। নো নয়েজ প্লিস!’
‘ওহ ইয়েস ডক্টর। থ্যাঙ্কস! থ্যাঙ্কস আ লট!’
‘সিস্টার, পেশেন্টের ড্রিপ আর অক্সিজেন সারা রাত ধরে চলবে। বি পি আর পালস রেট নোট রেগুলার ইন্টারভ্যালে মনিটরিং আর নোট করবেন। সবকিছু নর্মাল থাকলে ভোর পাঁচটায় ড্রিপ বন্ধ করে দেবেন।’
‘এই পুঁথিতে লেখা ব্যথা-বেদনার কথা একান্তই আমার। বিশ্ববাসীকে এসবের সাক্ষী করার কোনো প্রয়োজন নেই। জীবনের লালসা দুর্দম্য। জীবন নিজেও জানে যে সে ভঙ্গুর, তবুও সে অক্ষয় হতে চায়, অমরত্বের দাবি করে। সেই খেয়ালেই লিখে বসেছিলাম এইসব কথা। এখন আমার একটাই ইচ্ছা মহারাজ, আমার শব্দেরা আমারই সঙ্গে যেন চিতাগামী হয়। আর কোনো দাবিদাওয়া নেই...’
আমার চারিদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। নিস্তব্ধতা। শান্তি! শান্তি!
ওম্। গ্রহাঃ শান্তিঃ। অন্তরীক্ষ শান্তিঃ। পৃথিবী শান্তিঃ। আপঃ শান্তিঃ। ওষধেয়ঃ শান্তিঃ। বনস্পতয়ঃ শান্তিঃ। বিশ্বেদেবাঃ শান্তিঃ। কামঃ শান্তিঃ। ক্রোধঃ শান্তিঃ। ব্রহ্মঃ শান্তিঃ। সর্বঃ শান্তিঃ। শান্তিরেব শান্তিঃ। সামঃ শান্তিরেভিঃ। যতো যতসমিহসে ততো নং অভয়ং কুরু। সন্নঃ কুরু প্রজাভ্যোৎভয়ং নঃ পশুভ্যঃ।। ওম্ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।
চারদিন পরে অবশেষে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারি। তবে জীবনে প্রথমবারের জন্য আমি খুব লজ্জিত বোধ করেছিলাম। নিজের বোকামির জন্য নিজের সংসারটাকেই ভাসিয়ে দিতে বসেছিলাম আমি। গল্প খোঁজার নেশায় নিজের প্রাণটাকেই হারিয়ে ফেলতাম। কিন্তু বিনোদিনী, শিল্পা আর সুবল মহারানার এই কাহিনি আপনাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াটাও আমার কর্তব্য। আমি যে বিনোদিনীর অতৃপ্ত আত্মাকে কথা দিয়েছিলাম!
কোণার্ক ভগ্ন হয়েও অমর, এবং অমরই রয়ে যাবে। কোণার্ক প্রমাণ করে দিয়েছে যে, পাষাণের বুকেও প্রাণ থাকে। কোণার্ক কোনো সাধারণ মন্দির নয়, একটি স্পন্দন। এক গহন উচ্ছ্বাস। সেখানকার প্রতিটি পাষাণখণ্ড সুবল মহারানার স্পর্শের সঞ্জীবনীতে অমর হয়ে গিয়েছে। কোণার্কের প্রত্যেক মূর্তিই জাগ্রত। পাষাণের বুকে খোদিত হাতি, ঘোড়া, পশু-পাখি, লতাপাতা, গাছপালা, দেবী-দেবতা, নর-নারী সব, সবই রক্ত-মাংসের কায়া নিয়ে জেগে ওঠে। তারা কথা বলে, ডাক দেয়, নাচে, গায়, মন্ত্রের উচ্চারণে আরাধনা সম্পূর্ণ করে। নর্তকীদের নূপুর–নিক্কণে মন হরণ করে কোণার্ক। পাথরের বুকে আঁকা ফুলও একসময়ে সজীব হয়ে উঠলে নাসাপুটে প্রবেশ করে তাদের সৌরভ।
আজ আপনিও যদি বিনোদিনীর এই কাহিনি শোনার পর কোণার্ককে দেখতে যান, তাহলে হয়তো মনে হবে, কোণার্ক শতাব্দীর নিদ্রা কাটিয়ে আড়মোড়া ভাঙছে। সে যেন এখুনি তার গল্প শোনাতে বসবে। সময়কে কোনো এক মায়াবলে থমকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে সে নিজের সুখদুঃখের ঝাঁপি খুলে বসবে আপনার আমনে। বলবে, এসো দুটো কথা বলি। আপনার মনে শুধু সেই কথাকে শোনার ধৈর্য আর বোঝার ক্ষমতা থাকা চাই।
তবে এই কাহিনি লেখার সময় আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, যখন আপনি এই শেষ ক’টা লাইন পড়বেন, ততক্ষণে সুবল মহারানা, শিল্পা কিংবা বিনোদিনীর অতৃপ্ত আত্মার মুক্তি ঘটে যাবে। তাদের আত্মার মোক্ষলাভের বিনীত প্রার্থনা নিয়ে ভগ্ন শব্দ কোণার্কের কথা আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। এই কাহিনিতে আপনি নারীবাদ খুঁজলে খুঁজুন, সর্বহারার ব্যথা খুঁজুন, নিজের দেশের বিগত ইতিহাসের গরিমা খুঁজুন, প্রেম খুঁজুন, ত্যাগ আর বলিদানের কথা খুঁজুন, গল্পবাজের গল্প খুঁজুন, শব্দের খেলা খুঁজুন অথবা না-বলা কথার সঙ্কেত খুঁজুন...আমার কোনো শর্ত নেই। কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন, তা আপনার ওপরে নির্ভর করছে।
কিছু কাহিনি কখনোই শেষ হয় না বা বলা ভালো যে, আমরা বলে তাদের শেষ করতে পারি না। আসলে ওই কাহিনিগুলোকে ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
তাই না?

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন