শ্যামপুর গ্রামে সেদিন নন্দোৎসব৷
শ্যামপুরের পাশের গ্রামে মাতুলালয়৷ চৌধুরিবাড়ির উৎসবে আমার মামার বাড়ির সকলের সঙ্গে আমারও নিমন্ত্রণ ছিল- সুতরাং সেখানে গেলাম৷
গ্রামের ভদ্রলোকেরা একটা শতরঞ্জি পেতে বৈঠকখানায় বসে আসর জমিয়েচেন৷ আমার বড়ো মামা বিদেশে থাকেন, সম্প্রতি ছুটি নিয়ে দেশে এসেচেন-সবাই মিলে তাঁকে অভ্যর্থনা করলে৷
-এই যে আশুবাবু, সব ভালো তো? নমস্কার!
-নমস্কার৷ একরকম চলে যাচ্ছে-আপনাদের সব ভালো?
-ভালো আর কই? জ্বরজারি সব৷ ম্যালেরিয়ার সময় এখন, বুঝতেই পারচেন৷
-আপনার সঙ্গে এটি কে?
-আমার ভাগনে, সুশীল৷ আজই এসেচে-নিয়ে এলাম তাই৷
-বেশ করেচেন, বেশ করেচেন, আনবেনই তো৷ কী করেন বাবাজি?
এখানে আমি মামাকে চোখ টিপবার সুবিধে না পেয়ে তাঁর কনিষ্ঠাঙ্গুলি টিপে দিলাম৷
মামা বললেন-আপিসে চাকরি করে-কলকাতায়৷
-বেশ, বেশ৷ এসো বাবাজি, বসো এসে এদিকে৷
মামার আঙুল টিপবার কারণটা বলি৷ আমি কলকাতায় বিখ্যাত প্রাইভেট ডিটেকটিভ নিবারণ সোমের অধীনে শিক্ষানবিশি করি৷ কথাটা প্রকাশ করবার ইচ্ছা ছিল না আমার৷
নন্দোৎসব এবং আনুষঙ্গিক ভোজনপর্ব শেষ হল৷ আমরা বিদায় নেবার জোগাড় করচি, এমন সময় গ্রামের জনৈক প্রৌঢ় ভদ্রলোক আমার মামাকে ডেকে বললেন-কাল আপনাদের পুকুরে মাছ ধরতে যাবার ইচ্ছে আছে৷ সুবিধে হবে কি?
-বিলক্ষণ! খুব সুবিধে হবে! আসুন না গাঙ্গুলিমশায়, আমার ওখানেই তাহলে দুপুরে আহারাদি করবেন কিন্তু৷
-না না, তা আবার কেন? আপনার পুকুরে মাছ ধরতে দিচ্চেন এই কত, আবার খেয়ে বিব্রত করতে যাব কেন?
-তাহলে মাছ ধরাও হবে না বলে দিচ্চি৷ মাছ ধরতে যাবেন কেবল ওই এক শর্তে৷
গাঙ্গুলিমশায় হেসে রাজি হয়ে গেলেন৷
পরদিন সকালের দিকে হরিশ গাঙ্গুলিমশায় মামার বাড়িতে এলেন৷ পল্লিগ্রামের পাকা ঘুঘু মাছ ধরায়, সঙ্গে ছ-গাছা ছোটো-বড়ো ছিপ, দু-খানা হুইল লাগানো-বাকি সব বিনা হুইলের, টিনে ময়দার চার, কেঁচো, পিঁপড়ের ডিম, তামাক খাওয়ার সরঞ্জাম, আরও কত কী৷
মামাকে হেসে বললেন-এলাম বড়োবাবু, আপনাকে বিরক্ত করতে৷ একটা লোক দিয়ে গোটাকতক কঞ্চি কাটিয়ে যদি দেন-কেঁচোর চার লাগাতে হবে৷
মামা জিজ্ঞেস করলেন-এখন বসবেন, না, ওবেলা?
-না, এবেলা বসা হবে না৷ মাছ চারে লাগতে দু-ঘণ্টা দেরি হবে৷ ততক্ষণ খাওয়া-দাওয়া সেরে নেওয়া যায়৷ একটু সকাল সকাল যদি আহারের ব্যবস্থা...
-হ্যাঁ হ্যাঁ, সব হয়ে গেছে৷ আমিও জানি, আপনি এসেই খেতে বসবার জন্যে তাগাদা দেবেন৷ মাছ যারা ধরে, তাদের কাছে খাওয়া-টাওয়া কিছুই নয় খুব জানি৷ আর ঘণ্টা খানেক পরেই জায়গা করে দেব খাওয়ার৷
যথাসময়ে হরিশ গাঙ্গুলি খেতে বসলেন এবং একা প্রায় তিন জনের উপযুক্ত খাদ্য উদরসাৎ করলেন৷
আমি কলকাতার ছেলে, দেখে তো অবাক!
আমার মামা জিজ্ঞেস করলেন-গাঙ্গুলিমশায়, আর একটু পায়েস?
-তা একটুখানি নাহয়... ওসব তো খেতে পাইনে! একা হাত পুড়িয়ে রেঁধে খাই৷ বাড়িতে মেয়েমানুষ নেই, বউমারা থাকেন বিদেশে আমার ছেলের কাছে৷ কে ওসব করে দেবে?
-গাঙ্গুলিমশায় কি একাই থাকেন?
-একাই থাকি বই কী৷ ছেলেরা কলকাতায় চাকরি করে, আমার শহরে থাকা পোষায় না৷ তা ছাড়া কিছু নগদি লেন-দেনের কারবারও করি, প্রায় তিন হাজার টাকার ওপর৷ টাকায় দু-আনা মাসে সুদ৷ আপনার কাছে আর লুকিয়ে কী করব? কাজেই বাড়ি না থাকলে চলে কই? লোকে প্রায়ই আসচে টাকা দিতে-নিতে৷
গাঙ্গুলিমশায় এই কথাগুলো যেন বেশ একটু গর্বের সঙ্গে বললেন৷
আমি পল্লিগ্রাম সম্বন্ধে তত অভিজ্ঞ না হলেও আমার মনে কেমন একটা অস্বস্তিকর ভাব দেখা দিলে৷ টাকাকড়ির কথা এভাবে লোকজনের কাছে বলে লাভ কী! বলা নিরাপদও নয়-শোভনতা ও রুচির কথা যদি বাদই দিই৷
গাঙ্গুলিমশায়কে আমার বেশ লাগল৷
মাছ ধরতে ধরতে আমার সঙ্গে তিনি অনেক গল্প করলেন৷
থাকেন তিনি খুব সামান্য ভাবে-কোনো আড়ম্বর নেই- খাওয়া-দাওয়া বিষয়েই কোনো ঝঞ্ঝাট নেই তাঁর৷ ...এই ধরনের অনেক কথাই হল৷
মাছ তিনি ধরলেন বড়ো বড়ো দুটো৷ ছোটো গোটা চার-পাঁচ৷ আমার মামাকে অর্ধেকগুলি দিতে চাইলেন, মামা নিতে চাইলেন না৷ বললেন-কেন গাঙ্গুলিমশায়? পুকুরে মাছ ধরতে এসেছেন, তার খাজনা নাকি?
গাঙ্গুলিমশায় জিব কেটে বললেন-আরে রামো! তাই বলে কি বলচি? রাখুন অন্তত গোটা দুই!
-না, গাঙ্গুলিমশায়, মাপ করবেন, তা নিতে পারব না৷ ও নেওয়ার নিয়ম নেই আমাদের৷
অগত্যা গাঙ্গুলিমশায় চলে গেলেন৷ আমায় বলে গেলেন- তুমি বাবাজি একদিন আমার ওখানে যেয়ো একটা ছুটিতে৷ তোমার সঙ্গে আলাপ করে বড়ো আনন্দ হল আজ৷
কে জানত যে তাঁর বাড়িতে আমাকে অল্পদিনের মধ্যেই যেতে হবে; তবে সম্পূর্ণ অন্য কারণে-অন্য উদ্দেশ্যে৷
গাঙ্গুলিমশায়ের সঙ্গে খোশগল্প করার জন্যে নয়!
গাঙ্গুলিমশায় চলে গেলে আমি মামাকে বললাম-আপনি মাছ নিলেন না কেন? উনি দুঃখিত হলেন নিশ্চয়৷
মামা হেসে বললেন-তুমি জানো না, নিলেই দুঃখিত হতেন-উনি বড়ো কৃপণ৷
-তা কথার ভাবে বুঝেচি৷
-কী করে বুঝলে?
-অন্য কিছু নয় বউ-ছেলেরা কলকাতায় থাকে, উনি থাকেন দেশের বাড়িতে৷ একটা চাকর কি রাঁধুনি রাখেন না, হাত পুড়িয়ে এ বয়সে রেঁধে খেতে হয় তাও স্বীকার৷ অথচ হাতে দু-পয়সা বেশ আছে৷
-আর কিছু লক্ষ করলে?
-বড়ো গল্প বলা স্বভাব! আমার ধারণা, একটু বাড়িয়েও বলেন৷
-ঠিক ধরেচ৷ মাছ নিইনি তার আরেকটা কারণ, উনি মাছ দিয়ে গেলে সব জায়গায় সে গল্প করে বেড়াবেন, আর লোকে ভাববে আমরা কী চামার-পুকুরে মাছ ধরেছে বলে ওঁর কাছ থেকে মাছ নিইচি৷
-না মামা, এটা আপনার ভুল৷ এ-কথা ভাববার কারণ কী লোকদের? তা কখনো কেউ ভাবে?
-তা যাই হোক, মোটের ওপর পছন্দ করিনে৷
-উনি একটা বড়ো ভুল করেন মামাবাবু৷ টাকার কথা অমন বলে বেড়ান কেন?
-ওটা ওঁর স্বভাব৷ সর্বত্র ওই করবেন৷ যেখানে বসবেন, সেখানেই টাকার গল্প৷ করেও আজ আসচেন বহুদিন৷ দেখাতে চান, হাতে দু-পয়সা আছে৷
-আমার মনে হয় ও স্বভাবটা ভালো নয়-বিশেষ করে এইসব পাড়াগাঁয়ে৷ একদিন আপনি একটু সাবধান করে দেবেন না?
-সে হবে না৷ তুমি ওঁকে জানো না৷ বড্ড একগুঁয়ে৷ কথা তো শুনবেনই না-আরও ভাববেন, নিশ্চয়ই আমার কোনো মতলব আছে৷
আমি সেদিন কলকাতায় চলে এলাম বিকেলের ট্রেনে৷ আমার ওপরওয়ালা নিবারণবাবু লিখেছেন, খুব শিগগির আমায় একবার এলাহাবাদে যেতে হবে বিশেষ একটা জরুরি কাজে৷ অপিসে যেতেই খবর পেলাম, তিনি আর-একটা কাজে দু-দিনের জন্য পাটনা গিয়েচেন চলে-আমার এলাহাবাদ যাবার খরচের টাকা ও একখানা চিঠি রেখে গিয়েচেন তাঁর টেবিলের ড্রয়ারের মধ্যে৷
আমার কাছে তাঁর ড্রয়ারের চাবি থাকে৷ খুলে চিঠিখানা পড়ে দেখলাম, বিশেষ কোনো গুরুতর কাজ নয়-এলাহাবাদ গভর্নমেন্ট থাম্ব ইমপ্রেশন বুরোতে যেতে হবে, কয়েকটি দাগি বদমাইশের বুড়ো আঙুলের ছাপের একটা ফটো নিতে৷
মি. সোম বুড়ো আঙুলের ছাপ সম্বন্ধে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি৷
এলাহাবাদের কাজ শেষ করতে আমার লাগল মাত্র এক দিন, আট-দশ দিন রয়ে গেলাম তবুও৷
সেদিন সকাল বেলা হঠাৎ মি. সোমের এক টেলিগ্রাম পেলাম৷ একটা জরুরি কাজের জন্য আমায় সেইদিনই কলকাতায় ফিরতে লিখেচেন৷ আমি যেন এলাহাবাদে দেরি না করি৷
ভোরে হাওড়ায় ট্রেন এসে দাঁড়াতেই দেখি, মি. সোম প্ল্যাটফর্মেই দাঁড়িয়ে আছেন৷ আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম, কারণ, এরকম কখনো উনি আসেন না৷
আমায় বললেন-সুশীল, তুমি আজই মামার বাড়ি যাও৷ তোমার মামা কাল দু-খানা আর্জেন্ট টেলিগ্রাম করেছেন তোমায় সেখানে যাবার জন্যে৷
আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম-মামার বাড়ি কারও অসুখ৷ সবাই ভালো আছে তো?
-সেসব নয় বলেই মনে হল৷ টেলিগ্রামের মধ্যে কারও অসুখের উল্লেখ নেই৷
-কোনো লোক আসেনি সেখান থেকে?
-না৷ আমি তার করে দিয়েচি, তুমি এলাহাবাদে গিয়েচ৷ আজই তোমার ফিরবার তারিখ তাও জানিয়ে দিয়েচি৷
আমি বাসায় না গিয়ে সোজা শেয়ালদা স্টেশনে চলে এলাম মামার বাড়ি যাবার জন্যে৷
মি. সোম আমার সঙ্গে এলেন শেয়ালদা পর্যন্ত-বার বার করে বলে দিলেন, কোনো গুরুতর ঘটনা ঘটলে তাঁকে যেন খবর দিই-তিনি খুব উদবিগ্ন হয়ে রইলেন৷
মামার বাড়ি পা দিতেই বড়ো মামা বললেন-এসেছিস সুশীল? যাক, বড্ড ভাবছিলাম৷
-কী ব্যাপার মামাবাবু? সবাই ভালো তো?
-এখানকার কিছু ব্যাপার নয়৷ শ্যামপুরের হরিশ গাঙ্গুলিমশায় খুন হয়েছেন৷ সেখানে এখুনি যেতে হবে৷
আমি ভীত ও বিস্মিত হয়ে বললাম-গাঙ্গুলিমশায়! সেদিন যিনি মাছ ধরে গেলেন! খুন হয়েচেন?
-হ্যাঁ, চলো একবার সেখানে৷ শিগগির স্নানাহার করে নাও৷ কারণ, সারাদিনই হয়তো কাটবে সেখানে৷
বেলা দুটোর সময় শ্যামপুরে এসে পৌঁছুলাম৷ ছোট্ট গ্রাম৷ কখনো সেখানে কারও একটা ঘটি চুরি হয়নি-সেখানে খুন হয়ে গিয়েচে, সুতরাং গ্রামের লোকে দস্তুরমতো ভয় পেয়ে গেছে৷ গ্রামের মাঝখানে বারোয়ারি পূজা মণ্ডপে জড়ো হয়ে সেই কথারই আলোচনা করছে সবাই৷
আমার মামা এখানে এর পূর্বে অনেকবার এসেছিলেন এই ঘটনা উপলক্ষে, তা সকলের কথাবার্তা থেকে বোঝা গেল৷ আমার কথা বিশেষ কেউ জিজ্ঞেস করলে না, বা আমার সম্বন্ধে কেউ কোনো আগ্রহও দেখালে না৷ কেউ জানে না, আমি প্রাইভেট ডিটেকটিভ মি. সোমের শিক্ষানবিশ ছাত্র-এসব অজ পাড়াগাঁয়ে ওঁর নামই কেউ শোনেনি-আমাকে সেখানে কে চিনবে?
মামা জিজ্ঞেস করলেন-লাশ নিয়ে গিয়েচে?
ওরা বললে-আজ সকালে নিয়ে গেল৷ পুলিশ এসেছিল৷
আমি ওদের বললাম-ব্যাপার কীভাবে ঘটল? আজ হল শনিবার৷ কবে তিনি খুন হয়েচেন?
গ্রামের লোকে যেরকম বললে তাতে মনে হল, সে কথা কেউ জানে না৷ নানা লোক, নানা কথা বলতে লাগল৷ পুলিশের কাছেও এরা এইরকমই বলে ব্যাপারটাকে রীতিমতো গোলমেলে করে তুলেচে৷
আমি আড়ালে মামাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললাম-আপনি কী মনে করে এখানে এনেচেন আমায়?
মামা বললেন-তুমি সব ব্যাপার শুনে নাও, চলো, অনেক কথা আছে৷ এই খুনের রহস্য তোমায় আবিষ্কার করতে হবে-তবে বুঝব মি. সোমের কাছে তোমায় শিক্ষানবিশি করতে দিয়ে আমি ভুল করিনি৷ এখানে কেউ জানে না তুমি কী কাজ করো-সে তোমার একটা সুবিধে৷
-সুবিধেও বটে, আবার অসুবিধেও বটে৷
-কেন?
-বাইরের বাজে লোককে কেউ আগ্রহ করে কিছু বলবে না৷ গোলমাল একটু থামলে একজন ভালো লোককে বেছে নিয়ে সব ঘটনা খুঁটিয়ে জানতে হবে৷ গাঙ্গুলিমশায়ের ছেলে কোথায়?
-সে লাশের সঙ্গে মহকুমায় গিয়েছে৷ সেখানে লাশ কাটাকুটি করবে ডাক্তারে, তারপর দাহকার্য করে ফিরবে৷
-লাশ দেখলে বড্ড সুবিধে হত৷ সেটা আর হল না৷
-সেইজন্যেই তো বলছি, তুমি কেমন কাজ শিখেচ, এটা তোমার পরীক্ষা৷ এতে যদি পাশ করো তবে বুঝব তুমি মি. সোমের উপযুক্ত ছাত্র৷ নয়তো তোমাকে আমি আর ওখানে রাখব না-এ আমার এককথা জেনো৷
তারপর গাঙ্গুলিমশায়ের বাড়ি গেলাম৷
গিয়ে দেখি, যেখানটাতে গাঙ্গুলিমশায়ের বাড়ি-তার দু-দিকে ঘন জঙ্গল৷ একদিকে দূরে একটা গ্রাম্য কাঁচা রাস্তা, একদিকে একটি হচ্ছে বাড়ি৷
আমি গাঙ্গুলিমশায়ের ছেলের কথা জিজ্ঞেস করে জানলাম, সে এখনও মহকুমা থেকে ফেরেনি৷ তবে একটি প্রৌঢ়ার সঙ্গে দেখা হল-শুনলাম তিনি গাঙ্গুলিমশায়ের আত্মীয়া৷
তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম-গাঙ্গুলিমশায়কে শেষ দেখেছিলেন কবে?
-বুধবার৷
-কখন?
-বিকেল পাঁচটার সময়৷
-কীভাবে দেখেছিলেন?
-সেদিন হাটবার ছিল-উনি হাটে যাবার আগে আমার কাছে পয়সা চেয়েছিলেন৷
-কীসের পয়সা?
-সুদের পয়সা৷ আমি ওঁর কাছে দুটো টাকা ধার নিয়েছিলাম ও মাসে৷
-আপনার পর আর কেউ দেখেছিল?
গাঙ্গুলিমশায়ের বাড়ির ঠিক পশ্চিমগায়ে যে বাড়ি, সেদিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে প্রৌঢ়া বললেন-ওই বাড়ির রায়পিসি আমার পরও তাঁকে দেখেছিলেন৷
আমি বৃদ্ধা রায়পিসির বাড়ি গিয়ে তাঁকে প্রণাম করতেই বৃদ্ধা আমায় আশীর্বাদ করে একখানা পিঁড়ি বার করে দিয়ে বললেন- বোসো বাবা৷
আমি সংক্ষেপে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম-আপনি একা থাকেন নাকি এ বাড়িতে?
-হ্যাঁ বাবা, আমার তো কেউ নেই-মেয়ে-জামাই আছে, তারা দেখাশুনো করে৷
-মেয়ে-জামাই এখানে থাকেন?
-এখানেও থাকে, আবার তাদের দেশ এই এখান থেকে চার ক্রোশ দূর সাধুহাটি গাঁয়ে, সেখানেও থাকে৷-
-গাঙ্গুলিমশায়কে আপনি বুধবারে কখন দেখেন?
-রাত্তিরে যখন উনি হাট থেকে ফিরলেন-তখন আমি বাইরের রোয়াকে বসে জপ করছিলাম৷ তারপর আর চোখে না দেখলেও ওঁর গলার আওয়াজ শুনেচি রাত দশটা পর্যন্ত-উনি ওঁর রান্নাঘরে রাঁধছিলেন আলো জ্বেলে, আমি যখন শুতে যাই তখন পর্যন্ত৷
-তখন রাত কত হবে?
-তা কি বাবা জানি? আমরা পাড়াগাঁয়ের লোক-ঘড়ি তো নেই বাড়িতে৷ তবে তখন ফরিদপুরের গাড়ি চলে গিয়েচে৷ আমরা শব্দ শুনে বুঝি কখন কোন গাড়ি এল গেল৷
-একা থাকতেন, আর রাত পর্যন্ত রান্না করছিলেন-এত কী রান্না?
-সেদিন মাংস এনেছিলেন হাট থেকে৷ মাংস সেদ্ধ হতে দেরি হচ্ছিল৷
-আপনি কী করে জানলেন?
-পরে আমরা জেনেছিলাম৷ হাটে যারা ওঁর সঙ্গে একসঙ্গে মাংস কিনেছিল-তারা বলেছিল৷ তা ছাড়া যখন রান্নাঘর খোলা হল-বাবাগো!
বলে বৃদ্ধা যেন সে দৃশ্যের বীভৎসতা মনের পটে আবার দেখতে পেয়ে শিউরে উঠে কথা বন্ধ করলেন৷ সঙ্গে যে প্রৌঢ়া আত্মীয়টি ছিলেন গাঙ্গুলিমশায়ের, তিনিও বললেন-ও বাবা, সে রান্নাঘরের কথা মনে হলে এখনও গা ডোল দেয়!
আমি আগ্রহের সঙ্গে বলে উঠলাম-কেন? কেন?-কী ছিল রান্নাঘরে?
বৃদ্ধা বললেন-থালার চারদিকে ভাত ছড়ানো-মাংসের ছিবড়ে আর হাড়গোড় ছড়ানো৷
বাটিতে তখনও মাংস আর ঝোল রয়েচে-ঘরের মেঝেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন-তিনি খেতে বসেছিলেন এবং তাঁর খাওয়া শেষ হবার আগেই যারা তাঁকে খুন করে তারা এসে পড়ে৷
প্রৌঢ়াও বললেন-হ্যাঁ বাবা, এ সবাই দেখেচে৷ পুলিশও এসে রান্নাঘর দেখে গিয়েচে৷ সকলেরই মনে হল, ব্রাহ্মণের খাওয়া শেষ হবার আগেই খুনেরা এসে তার ওপর পড়ে৷
-আচ্ছা বেশ, এ গেল বুধবার রাতের ব্যাপার৷ সেদিনই হাট ছিল তো?
-হাঁ বাবা, তার পরদিন সকালে উঠে আমরা দেখলাম, ওঁর ঘরের দরজা বাইরের দিকে তালা-চাবি দেওয়া৷ প্রথম সকলেই ভাবলে উনি কোথাও কাজে গিয়েচেন, ফিরে এসে রান্নাবান্না করবেন৷ কিন্তু যখন বিকেল হয়ে গেল, ফিরলেন না-তখন আমরা ভাবলাম, উনি ওঁর ছেলেদের কাছে কলকাতায় গেছেন৷
-তারপর?
-বিষ্যুদবার গেল, শুক্রবার গেল, শুক্রবার বিকেলের দিকে বন্ধ ঘরের মধ্যে থেকে কীসের দুর্গন্ধ বেরুতে লাগল-তাও সবাই ভাবলে, ভাদ্রমাস, গাঙ্গুলিমশায় হয়তো তাল কুড়িয়ে ঘরের মধ্যে রেখে গিয়েছিলেন তাই পচে অমন গন্ধ বেরুচ্চে৷
-শনিবার আপনারা কোন সময় টের পেলেন যে, তিনি খুন হয়েচেন?
-শনিবারে আমি গিয়ে গ্রামের ভদ্রলোকদের কাছে সব বললাম৷ অনেকেই জানত না যে, গাঙ্গুলিমশায়কে এ ক-দিন গাঁয়ে দেখা যায়নি৷ তখন সকলেই এল৷ গন্ধ তখন খুব বেড়েচে! পচা তালের গন্ধ বলে মনে হচ্ছে না!
-কী করলেন আপনারা?
-তখন সকলে জানলা খোলবার চেষ্টা করলে, কিন্তু সব জানলা ভেতর থেকে বন্ধ৷ দোর ভাঙাই সাব্যস্ত হল৷ পরের ঘরের দোর ভেঙে ঢোকা ঠিক নয়-এরপর যদি তা নিয়ে কোনো কথা ওঠে৷ তখন চৌকিদার আর দফাদার ডেকে এনে তাদের সামনে দোর ভাঙা হল৷
-কী দেখা গেল?
-দেখা গেল, তিনি ঘরের মধ্যে মরে পড়ে আছেন! মাথায় ভারী জিনিস দিয়ে মারার দাগ৷ মেজে খুঁড়ে রাশীকৃত মাটি বার করা, ঘরের বাক্স-প্যাঁটরা সব ভাঙা, ডালা খোলা-সব তচনচ করেচে জিনিসপত্র৷ ...তারপর ওঁর ছেলেদের টেলিগ্রাম করা হল৷
-এ ছাড়া আর কিছু আপনারা জানেন না?
-না বাবা, আর আমরা কিছু জানিনে৷
গাঙ্গুলিমশায়ের প্রতিবেশিনী সেই বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করলাম-রাত্রে কোনোরকম শব্দ শুনেছিলেন, গাঙ্গুলিমশায়ের বাড়ি থেকে?
-কিছু না৷ অনেক রাত্তিরে আমি যখন শুতে যাই-তখনও ওঁর রান্নাঘরে আলো জ্বলতে দেখেচি৷ আমি ভাবলাম, গাঙ্গুলিমশায় আজ এখনও দেখি রান্না করচেন!
-কেন, এরকম ভাবলেন কেন?
-এত রাত পর্যন্ত তো উনি রান্নাঘরে থাকেন না; সকাল রাত্তিরেই খেয়ে শুয়ে পড়েন৷ বিশেষ করে সেদিন গিয়েছে ঘোর অন্ধকার রাত্তির-অমাবস্যা, তার ওপর টিপ টিপ বৃষ্টি পড়তে শুরু হয়েছিল সন্ধ্যে থেকেই৷
-তখন তো আর আপনি জানতেন না যে, উনি হাট থেকে মাংস কিনে এনেচেন?
-না, এমন কিছুই জানিনে৷ ...হ্যাঁ বাবা, ...যখন এত করে জিজ্ঞেস করচ, তখন একটা কথা আমার এখন মনে হচ্চে-
-কী কী, বলুন?
-উনি ভাত খাওয়ার পরে রোজ রাত্তিরে কুকুর ডেকে এঁটো পাতা, কি পাতের ভাত তাদের দিতেন, রোজ রোজ ওঁর গলার ডাক শোনা যেত৷ সেদিন আমি আর তা শুনিনি৷
-ঘুমিয়ে পড়েছিলেন হয়তো৷
-না বাবা, বুড়ো মানুষ-ঘুম সহজে আসে না৷ চুপ করে শুয়ে থাকি বিছানায়৷ সেদিন আর ওঁর কুকুরকে ডাক দেওয়ার আওয়াজ আমার কানেই যায়নি৷
ভালো করে জেরা করার ফল অনেক সময় বড়ো চমৎকার হয়৷ মি. সোম প্রায়ই বলেন-লোককে বারবার করে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবে৷ যা হয়তো তার মনে নেই, বা, খুঁটিনাটির ওপর সে তত জোর দেয়নি-তোমার জেরায় তাও তার মনে পড়বে৷ সত্য বার হয়ে আসে অনেক সময় ভালো জেরার গুণে৷
সেদিনই আমার সঙ্গে গাঙ্গুলিমশায়ের ছেলে শ্রীগোপালের দেখা হল৷ সে তার পিতার দাহকার্য শেষ করে ফিরে আসছে কাছাগলায়৷
আমি তাকে আড়ালে ডেকে নিজের প্রকৃত পরিচয় দিলাম৷ শ্রীগোপালের চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়তে লাগল৷ সে আমাকে সব রকমের সাহায্য করবে প্রতিশ্রুতি দিলে৷
আমি বললাম-কারও ওপর আপনার সন্দেহ হয়?
-কার কথা বলব বলুন৷ বাবার একটা দোষ ছিল, টাকার কথা জাহির করে বেড়াতেন সবার কাছে৷ কত জায়গায় এ সব কথা বলেছেন৷ তাদের মধ্যে কে এ কাজ করলে কী করে বলি?
-আচ্ছা, কথা একটা জিজ্ঞেস করব-কিছু মনে করবেন না৷ আপনার বাবার কত টাকা ছিল জানেন?
-বাবা কখনো আমাদের বলতেন না৷ তবে, আন্দাজ, দু-হাজারের বেশি নগদ টাকা ছিল না৷
-সে টাকা কোথায় থাকত?
-সেটা জানতাম৷ ঘরের মেজেতে বাবা পুঁতে রাখতেন- কতবার বলেছি, টাকা ব্যাঙ্কে রাখুন৷ সেকেলে লোক, ব্যাঙ্ক বুঝতেন না৷
-গাঙ্গুলিমশায়ের মৃত্যুর পর বাড়ি এসে আপনি মেজে খুঁড়ে কিছু পেয়েছিলেন?
-মেজে তো খুঁড়ে রেখেছিল যারা খুন করেচে তারাই৷ আমি এক পয়সাও পাইনি-তবে একটা কথা বলি-দু-হাজার টাকার সব টাকাই তো মেঝেতে পোঁতা ছিল না-বাবা টাকা ধার দিতেন কিনা! কিছু টাকা লোকজনকে ধার দেওয়া ছিল৷
-কত টাকা আন্দাজ?
-সেদিক থেকেও মজা শুনুন, বাবার খাতাপত্র সব ওই সঙ্গে চুরি হয়ে গিয়েচে৷ খাতা না দেখলে বলা যাবে না কত টাকা ধার দেওয়া ছিল৷
-খাতাপত্র নিজেই লিখতেন?
-তার মধ্যে গোলমাল আছে৷ আগে নিজেই লিখতেন, ইদানীং চোখে দেখতে পেতেন না বলে এক-ওকে ধরে লিখিয়ে নিতেন৷
-কাকে কাকে দিয়ে লিখিয়ে নিতেন জানেন?
-বেশির ভাগ লেখাতেন সদগোপবাড়ির ননি ঘোষকে দিয়ে৷ সে জমিদারী সেরেস্তায় কাজ করে-তার হাতের লেখাও ভালো৷ বাবার কথা সে খুব শুনত৷
-ননি ঘোষের বয়েস কত?
-ত্রিশ-বত্রিশ হবে৷
-ননি ঘোষ লোক কেমন? তার ওপর সন্দেহ হয়?
-মুশকিল হয়েচে, বাবা তো একজনকে দিয়ে লেখাতেন না! যখন যাকে পেতেন, তখন তাকেই ধরে লিখিয়ে নিতেন যে! স্কুলের ছেলে গণেশ বলে আছে, ওই মুখুজ্যেবাড়ি থেকে পড়ে-তাকেও দেখি একদিন ডেকে এনেচেন৷ শুধু ননি ঘোষের ওপর সন্দেহ করে কী করব?
-আর কাকে দেখেচেন?
-আর মনে হচ্চে না৷
-আপনি হিসাবের খাতা দেখে বলে দিতে পারেন, কোন হাতের লেখা কার?
-ননির হাতের লেখা আমি চিনি৷ তার হাতের লেখা বলতে পারি-কিন্তু সে খাতাই বা কোথায়? খুনেরা সে খাতা তো নিয়ে গিয়েচে!
-কাকে বেশি টাকা ধার দেওয়া ছিল, জানেন?
-কাউকে বেশি টাকা দিতেন না বাবা৷ দশ, পাঁচ, কুড়ি- বড়জোর ত্রিশের বেশি টাকা একজনকেও তিনি দিতেন না৷
শ্যামপুরের জমিদারবাড়ি সেবেলা খাওয়া-দাওয়া করলাম৷
একটা বড়ো চত্বর, তার চারিধারে নারিকেল গাছের সারি, জামরুল গাছ, বোম্বাই আমের গাছ, আতা গাছ৷ বেশ ছায়াভরা উপবন৷ ডিটেকটিভগিরি করে হয়তো ভবিষ্যতে খাব-তা বলে প্রকৃতির শোভা যখন মন হরণ করে-এমন মেঘমেদুর বর্ষাদিনে গাছপালার শ্যামশোভা উপভোগ করতে ছাড়ি কেন?
বসলুম এসে চত্বরের একপাশে নির্জন গাছের তলায়৷
বসে বসে ভাবতে লাগলুম:
...কী করা যায় এখন? মামা বড়ো কঠিন পরীক্ষা আমার সামনে এনে ফেলেচেন৷
মি. সোমের উপযুক্ত ছাত্র কি না আমি, এবার তা প্রমাণ করার দিন এসেচে৷
কিন্তু বসে বসে মি. সোমের কাছে যতগুলি প্রণালী শিখেচি খুনের কিনারা করবার-সবগুলি পাশ্চাত্ত্য বৈজ্ঞানিক প্রণালী- স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ডিটেকটিভের প্রণালী৷ এখানে তার কোনোটিই খাটবে না৷ আঙুলের ছাপ নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা তাড়াতাড়ি করা হয়নি-সাত-আট দিন পরে এখন জিনিসপত্রের গায়ে খুনির আঙুলের ছাপ অস্পষ্ট হয়ে গিয়েচে৷
পায়ের দাগ সম্বন্ধেও ঠিক সেই কথা৷
খুন হবার পর এত লোক গাঙ্গুলিমশায়ের ঘরে ঢুকেচে- তাদের সকলের পায়ের দাগের সঙ্গে খুনির পায়ের দাগ একাকার হয়ে তালগোল পাকিয়ে গিয়েচে৷ গ্রামের কৌতূহলী লোকেরা আমায় কী বিপদেই ফেলেচে! তারা জানে না, একজন শিক্ষানবিশ ডিটেকটিভের কী সর্বনাশ তার করেচে!
আর-একটা ব্যাপার, খুনটা টাটকা নয়, সাত দিন আগে খুন হয়ে লাশ পর্যন্ত দাহ শেষ-সব ফিনিশ-গোলমাল চুকে গিয়েচে৷
চোখে দেখিনি পর্যন্ত সেটা-অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন-টিহ্নগুলো দেখলেও তো যা হয় একটা ধারণা করা যেত৷ এ একেবারে অন্ধকারে ঢিল ছোড়া! ভীষণ সমস্যা!
মি. সোমকে কি একখানা চিঠি লিখে তাঁর পরামর্শ চেয়ে পাঠাব? এমন অবস্থায় পড়লে তিনি নিজে কী করতেন জানাতে বলব?
কিন্তু তাও তো উচিত নয়!
মামা যখন বলেচেন, এটা যদি আমার পরীক্ষা হয়, তবে পরীক্ষার হলে যেমন ছেলেরা কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে নেয় না-আমায় তাই করতে হবে৷
যদি এর কিনারা করতে পারি, তবে মামা বলেচেন, আমাকে এ লাইনে রাখবেন-নয়তো মি. সোমের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেবেন, নিয়ে হয়তো কোনো আর্টিস্টের কাছে রেখে ছবি আঁকতে শেখাবেন, বা, বড়ো দর্জির কাছে রেখে শার্ট তৈরি, পাঞ্জাবি তৈরি শেখাবেন৷
তবে শিক্ষানবিশের প্রথম পরীক্ষা হিসেবে পরীক্ষা যে বেশ কঠিন, এতে কোনো ভুল নেই৷...
বসে বসে আরও অনেক কথা ভাবলুম:
হিসেবের খাতা যে লিখত, সে নিশ্চয়ই জানত ঘরে কত টাকা মজুত, বাইরে কত টাকা ছড়ানো৷ তার পক্ষে জিনিসটা জানা যত সহজ, অপরের পক্ষে তত সহজ নয়৷
এ বিষয়েও একটা গোলমাল আছে৷ গাঙ্গুলিমশায় টাকার গর্ব মুখে করে বেড়াতেন যেখানে-সেখানে৷ কত লোক শুনেচে-কত লোক হয়তো জানত৷
একটা কথা আমার হঠাৎ মনে এল৷
কিন্তু, কাকে কথাটা জিজ্ঞেস করি?
ননি ঘোষের বাড়ি গিয়ে ননি ঘোষের সঙ্গে দেখা করা একবার বিশেষ দরকার৷ তাকেই একথা জিজ্ঞেস করতে হবে৷ সে নাও বলতে পারে অবিশ্যি-তবুও একবার জিজ্ঞেস করতে দোষ নেই৷...
ননি ঘোষ বাড়িতেই ছিল৷ আমায় সে চেনে না, একটু তাচ্ছিল্য ও ব্যস্ততার সঙ্গে বললে-কী দরকার বাবু? বাড়ি কোথায় আপনার?
আমি বললাম-তোমার সঙ্গে দরকারি কথা আছে৷ ঠিক উত্তর দাও৷ মিথ্যে বললে বিপদে পড়ে যাবে৷
ননির মুখ শুকিয়ে গেল৷ দেখলাম সে ভয় পেয়েচে৷ বুঝেচে যে, আমি গাঙ্গুলিমশায়ের খুন সম্পর্কে তদন্ত করতে এসেছি- নিশ্চয়ই পুলিশের সাদা পোশাক-পরা ডিটেকটিভ৷
সে এবার বিনয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বললে-বাবু, যা জিজ্ঞেস করেন, করুন৷
-গাঙ্গুলিমশায়ের খাতা তুমি লিখতে?
ননি ইতস্তত করে বললে-তা ইয়ে-আমিও লিখিচি দু-একদিন-আর ওই গণেশ বলে একটা স্কুলের ছেলে আছে, তাকে দিয়েও-
আমি ধমক দিয়ে বললাম-স্কুলের ছেলের কথা হচ্ছে না- তুমি লিখতে কি না?
ননি ভয়ে ভয়ে বললে-আজ্ঞে, তা লেখতাম৷
-কতদিন লিখচ? মিথ্যে কথা বললেই ধরা পড়ে যাবে৷ ঠিক বলবে৷
-প্রায়ই লেখতাম৷ দু-বছর ধরে লিখচি৷
-আর কে লিখত?
-ওই যে স্কুলের ছেলে গণেশ-
-তার কথা ছেড়ে দাও, তার বয়েস কত?
-পনেরো-ষোলো হবে৷
-আর কে লিখত?
-আর, সরফরাজ তরফদার লিখত, সে এখন-
-সরফরাজ তরফদারের বয়েস কত? কী করে?
-সে এখন মারা গিয়েছে৷
-বাদ দাও সেকথা৷ কতদিন মারা গিয়েচে?
-দু-বছর হবে৷
-এইবার একটা কথা জিজ্ঞেস করি-গাঙ্গুলিমশায়ের কত টাকা বাইরে ছিল জানো?
-প্রায় দু-হাজার টাকা৷
-মিথ্যে বোলো না৷ খাতা পুলিশের হাতে পড়েচে-মিথ্যে বললে মারা যাবে৷
-না বাবু, মিথ্যে বলিনি৷ দু-হাজার হবে৷
-ঘরে মজুত কত ছিল?
-তা জানিনে!
-আবার বাজে কথা? ঠিক বলো৷
-বাবু, আমায় মেরেই ফেলুন আর যাই করুন-মজুত টাকা কত তা আমি কী করে বলব? গাঙ্গুলিমশায় আমায় সে টাকা দেখায়নি তো? খাতায় মজুত-তবিল লেখা থাকত না৷
-একটা আন্দাজ তো আচে? আন্দাজ কী ছিল বলে তোমার মনে হয়?
-আন্দাজ আর সাত-আটশো টাকা৷
-কী করে আন্দাজ করলে?
-ওঁর মুখের কথা থেকে তাই আন্দাজ হত৷
-গাঙ্গুলিমশায়ের মৃত্যুর কতদিন আগে তুমি শেষ খাতা লিখেছিল?
-প্রায় দু-মাস আগে৷ দু-মাসের মধ্যে আমি খাতা লিখিনি- আপনার পায়ে হাত দিয়ে বলচি৷ তা ছাড়া খাতা বেরুলে হাতের লেখা দেখেই তা আপনি বুঝবেন৷
-কোনো মোটা টাকা কি তাঁর মরণের আগে কোনো খাতকে শোধ করেছিল বলে তুমি মনে কর?
-না বাবু! ঊর্ধসংখ্যা ত্রিশ টাকার বেশি তিনি কাউকে ধার দিতেন না, সেটা খুব ভালো করেই জানি৷ মোটা টাকা মানে, দুশো-একশো টাকা কাউকে তিনি কখনো দেননি৷
-এমন তো হতে পারে, পাঁচজন খাতকে ত্রিশ টাকা করে শোধ দিয়ে গেল একদিনে? দেড়শো টাকা হল?
-তা হতে পারে বাবু, কিন্তু তা সম্ভব নয়৷ একদিনে পাঁচ জন খাতকে টাকা শোধ দেবে না৷ আর-একটা কথা বাবু৷ চাষি-খাতক সব-ভাদ্র মাসে ধান হবার সময় নয়-এখন যে চাষি-প্রজারা টাকা শোধ দিয়ে যাবে, তা মনে হয় না৷ ওরা শোধ দেয় পৌষ মাসে-আবার ধার নেয় ধান-পাট বুনবার সময়ে চৈত্র-বৈশাখ মাসে৷ এসময় লেন-দেন বন্ধ থাকে৷
কোনো কিছু সন্ধান পাওয়া গেল না ননির কাছে৷ তবুও আমার সন্দেহ সম্পূর্ণরূপে গেল না৷ ননি হয় সম্পূর্ণ নির্দোষ, নয়তো সে অত্যন্ত ধূর্ত৷ মি. সোম একটা কথা সবসময়ে বলেন, 'বাইরে চেহারা বা কথাবার্তা দ্বারা কখনো মানুষের আসল রূপ জানবার চেষ্টা কোরো না-করলেই ঠকতে হবে৷ ভীষণ চেহারার লোকের মধ্যে অনেক সময় সাধুপুরুষ বাস করে-আবার অত্যন্ত সুশ্রী ভদ্রবেশী লোকের মধ্যে সমাজের কণ্টকস্বরূপ দানব-প্রকৃতির বদমাইশ বাস করে৷ এ আমি যে কতবার দেখেচি৷'
ননির বাড়ি থেকে ফিরে এসে গাঙ্গুলিমশায়ের বাড়ির পেছনটা একবার ভালো করে দেখবার জন্যে গেলাম৷
গাঙ্গুলিমশায়ের বাড়িতে একখানা মাত্র খড়ের ঘর৷ তার সঙ্গে লাগাও ছোট্ট রান্নাঘর৷ রান্নাঘরের দরজা দিয়ে ঘরের মধ্যে যাওয়া যায়৷ এসব আমি গাঙ্গুলিমশায়ের ছেলের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখলাম৷
তাকে বললাম-আপনার পিতার হত্যাকারীকে যদি খুঁজে বার করতে পারি, আপনি খুব খুশি হবেন?
সে প্রায় কেঁদে ফেলে বললে-খুশি কী, আপনাকে পাঁচশো টাকা দেব৷
-টাকা দিতে হবে না৷ আমায় সাহায্য করুন৷ আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারিনে৷
-নিশ্চয় করব৷ বলুন কী করতে হবে?
-আমার সঙ্গে সঙ্গে আসুন আপাতত৷ তারপর বলব যখন যা করতে হবে৷ আচ্ছা, চলুন তো বাড়ির পিছন দিকটা একবার দেখি?
-বড্ড জঙ্গল, যাবেন ওদিকে?
-জঙ্গল দেখলে তো আমাদের চলবে না-চলুন দেখি৷
সত্যই ঘন আগাছার জঙ্গল আর বড়ো বড়ো বনগাছের ভিড় বাড়ির পেছনেই৷ পাড়াগাঁয়ে যেমন হয়ে থাকে-বিশেষ করে এই শ্যামপুরে জঙ্গল একটু বেশি৷ বড়ো বড়ো ভিটে লোকশূন্য ও জঙ্গলাবৃত হয়ে পড়ে আছে বহুকাল থেকে৷ ম্যালেরিয়ার উৎপাতে দেশ উৎসন্নে গিয়েছিল বিশ-ত্রিশ বছর আগে৷ এখন পাড়ায় পাড়ায় নলকূপ হয়েচে জেলাবোর্ডের অনুগ্রহে, ম্যালেরিয়াও অনেক কমেচে-কিন্তু লোক আর ফিরে আসেনি৷
জঙ্গলের মধ্যে বর্ষার দিনে মশার কামড় খেয়ে হাত-পা ফুলে উঠল৷ আমি প্রত্যেক স্থান তন্নতন্ন করে দেখলাম৷ সাত-আট দিনের পূর্বের ঘটনা, পায়ের চিহ্ন যদি কোথাও থাকতে পারে-তবে এখানেই তা থাকা সম্ভব৷
কিন্তু জায়গাটা দেখে হতাশ হতে হল৷
জমিটা মুথোঘাসে ঢাকা-বর্ষায় সে ঘাস বেড়ে হাতখানেক লম্বা হয়েছে৷ তার ওপর পায়ের দাগ থাকা সম্ভবপর নয়৷
আমার মনে হল, খুনি রাত্রে এসেছিল ঠিক এই পথে৷ সামনের পথ লোকালয়ের মধ্যে দিয়ে-কখনোই সে-পথে আসতে সাহস করেনি৷
অনেকক্ষণ তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেও সন্দেহজনক কোনো জিনিস চোখে পড়ল না-কেবল একজায়গায় একটা সেওড়াগাছের ডাল ভাঙা অবস্থায় দেখে আমি গাঙ্গুলিমশায়ের ছেলেকে বললাম-এই ডালটা ভেঙে কে দাঁতন করেচিল, আপনি?
গাঙ্গুলিমশায়ের ছেলে আশ্চর্য হয়ে বললে-না, আমি এ জঙ্গলে দাঁতনকাঠি ভাঙতে আসব কেন?
-তাই জিজ্ঞেস করচি৷
-আপনি কী করে জানলেন, ডাল ভেঙে কেউ দাঁতন করেচে?
-ভালো করে চেয়ে দেখুন৷ একরকম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মুচড়ে ভেঙেচে ডালটা-তা ছাড়া এতগুলো সেওড়া ডালের মধ্যে একটিমাত্র ডাল ভাঙা৷ মানুষের হাতে ভাঙা বেশ বোঝা যাচ্চে৷ দাঁতনকাঠি সংগ্রহ ছাড়া অন্য কী উদ্দেশ্যে এভাবে একটা ডাল কেউ ভাঙতে পারে?
-আপনার দেখবার চোখ তো অদ্ভুত! আমার তো মশাই চোখেই পড়ত না!
-আচ্ছা, দেখে বলুন তো, কতদিন আগে এ ডালটা ভাঙা হয়েচে?
-অনেক দিন আগে৷
-খুব বেশি দিন আগে না৷ মোচড়ানো অংশের গোড়াটা দেখে মনে হয়, ছ-সাত দিন আগে৷ এর চেয়েও নিখুঁতভাবে বলা যায়৷ ওই অংশের সেলুলোজ অণুবীক্ষণ দিয়ে পরীক্ষা করলে ধরা পড়বে৷ আমি এই গাছের ভাঙা ডালটা কেটে নিয়ে যাব, একটা দা আনুন তো দয়া করে৷
গাঙ্গুলিমশায়ের ছেলের মুখ দেখে বুঝলাম সে বেশ একটু অবাক হয়েচে৷ ভাঙা দাঁতনকাঠি নিয়ে আমার এত মাথাব্যথার কারণ কী বুঝতে পারচে না৷
সে পিছন ফিরে দা আনতে যেতে উদ্যত হল-কিন্তু দু-চার পা গিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে ঘাসের মধ্যে থেকে কী একটা জিনিস হাতে তুলে নিয়ে বললে-এটা কী?
আমি তার হাত থেকে জিনিসটা নিয়ে দেখলাম, সেটা একটা কাঠের ছোট্ট গোলাকৃতি পাত৷ ভালো করে আলোয় নিয়ে এসে পরীক্ষা করে দেখলাম, পাতের গায়ে একটা খোদাই কাজ৷ একটা ফুল, ফুলটার নীচে একটা শেয়ালের মতো জানোয়ার৷
শ্রীগোপাল বললে-এটা কী বলুন তো?
আমি বুঝতে পারলাম না, কী জিনিস এটা হতে পারে, তাও আন্দাজ করতে পারলাম না৷ জিনিসটা হাতে নিয়ে সেখান থেকে চলে এলাম৷ যাবার আগে সেওড়া গাছের ভাঙা ডালের গোড়াটা কেটে নিয়ে এলাম৷
পরদিন থানায় গিয়ে দারোগাবাবুর সঙ্গে দেখা করে আমার পরিচয় দিলাম৷
তিনি আমায় সমাদর করে বসালেন৷ আমায় বললেন, তাঁর দ্বারা যতদূর সাহায্য হওয়া সম্ভব তা তিনি করবেন৷
আমি বললাম-আপনি এ সম্বন্ধে কিছু তদন্ত করেচেন?
-তদন্ত করা শেষ করেচি৷ তবে, আসামি বার করা ডিটেকটিভ ভিন্ন সম্ভব নয় এক্ষেত্রে৷
-ননি ঘোষকে আমার সন্দেহ হয়৷
-আমারও হয়, কিন্তু ওর বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করা সহজ হবে না৷
-ওকে চালান দিন না, ভয় খেয়ে যাক! খুনের রাত্রে ও অনুপস্থিত ছিল৷ কোথায় ছিল তার সন্তোষজনক প্রমাণ দিতে পারেনি৷
-আপনি ওকে চালান দিতে পরামর্শ দেন?
-দিলে ভালো হয়৷ এর মধ্যে আরেকটা উদ্দেশ্য আছে- বুঝেচেন নিশ্চয়ই৷
দারোগাবাবু হেসে বললেন-এতদিন পুলিশের চাকরি করে তা আর বুঝিনি মশায়? ওকে চালান দিলে সত্যিকার হত্যাকারী কিছু অসতর্ক হয়ে পড়বে এবং যদি গা-ঢাকা দিয়ে থাকে, তবে বেরিয়ে আসবে-এই তো?
-ঠিক তাই-যদিও ননি ঘোষকে আমি বেশ সন্দেহ করি৷ লোকটা ধূর্ত প্রকৃতির৷
-কাল আমি লোকজন নিয়ে গ্রামে গিয়ে ডেকে বলব- ননিকে কালই চালান দেব৷
-চালান দেওয়ার সময় গ্রামের সব লোকের সেখানে উপস্থিত থাকা দরকার৷
দারোগাবাবু বললেন-দাঁড়ান, একটা কথা আছে৷ হিসেবের খাতার একখানা পাতা সেদিন কুড়িয়ে পেয়েছিলাম গাঙ্গুলিমশায়ের ঘরে৷ পাতাখানা একবার দেখুন৷
একখানা হাতচিঠে কাগজের পাতা নিয়ে এসে দারোগাবাবু আমার হাতে দিলেন৷
আমি হাতে নিয়ে বললাম-এ তো ননির হাতের লেখা নয়!
-না, এ গণেশের হাতের লেখাও নয়৷
-সরফরাজ তরফদারও নয়৷ কারণ, সে মারা যাওয়ার পরে লেখা৷ তারিখ দেখুন৷
-তবে, খুনের অনেকদিন আগে এ লেখা হয়েচে-চার মাসেরও বেশি আগে৷
-ব্যাপারটা ক্রমশ জটিল হয়ে পড়চে মশায়৷ আমি একটা জিনিস আপনাকে তবে দেখাই৷
দারোগাবাবুর হাতে কাঠের পাতটা দিয়ে বললাম-এ জিনিসটা দেখুন৷
দারোগাবাবু সেটা হাতে নিয়ে বললেন-কী এটা?
-কী জিনিসটা তা ঠিক বলতে পারব না৷ তবে গাঙ্গুলিমশায়ের বাড়ির পেছনের জঙ্গলে এটা কুড়িয়ে পেয়েচি৷ আরেকটা জিনিস দেখুন৷
বলে শ্যাওড়া ডালের গোড়াটা তাঁর হাতে দিতেই তিনি অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে বললেন-এ তো একটা শুকনো গাছের ডাল-এতে কী হবে?
-ওতেই একটা মস্ত সন্ধান দিয়েচে৷ জানেন? যে খুন করেচে, সে ভোর রাত পর্যন্ত গাঙ্গুলিমশায়ের বাড়ি ছাড়েনি৷ ভোরের দিকে রাত পোহাতে দেরি নেই দেখে সরে পড়েচে৷ যাবার সময় অভ্যাসের বশে শ্যাওড়া ডালের দাঁতন করেচে৷
দারোগামশায় হো-হো কর হেসে উঠে বললেন-আপনারা যে দেখচি মশায়, স্বপ্নরাজ্যে বাস করেন! এত কল্পনা করে পুলিশের কাজ চলে? কোথায় একটা দাঁতনকাঠির ভাঙা গোড়া৷
-আমি জানি আমার গুরু মি. সোম একবার একটা ভাঙা দেশলাইয়ের কাঠিকে সূত্র ধরে আসামি পাকড়েছিলেন৷
দারোগাবাবু হাসতে হাসতে বললেন-বেশ, আপনিও ধরুন না দাঁতনকাঠি থেকে, আমার আপত্তি কী?
-যদি আমি এটাকে এত প্রয়োজনীয় মনে না করতাম, তবে এটা এতদিন সঙ্গে নিয়ে বেড়াই? যে দুটো জিনিস পেয়েচি, তাদের মধ্যে পরস্পর সম্বন্ধ আছে-এও আমার বিশ্বাস৷
-কীরকম?
-যে দাঁতনকাঠি ভেঙেচে-তার বা তাদের দলের লোকেরা এই কাঠের পাতখানাও...
-পাতখানা কী?
-সেকথা পরে বলব৷ আর একটা সন্ধান দিয়েছে এই দাঁতনকাঠিটা৷
-কী?
-সেটা এই: দোষীর বা দোষীর দলের কারও দাঁতন করবার অভ্যাস আছে৷ দাঁতন করবার যার প্রতিদিনের অভ্যেস নেই-সে এরকম দাঁতন নিপুণভাবে মোচড় দিয়ে ভাঙতে জানবে না৷ এবং সম্ভবত সে বাঙালি এবং পল্লিগ্রামবাসী৷ হিন্দুস্থানিরা দাঁতন করে, কিন্তু দেখবেন, তারা শ্যাওড়া ডালের দাঁতন করতে জানে না-তারা নিম, বা বাবলা গাছের দাঁতনকাঠি ব্যবহার করে সাধারণত৷ এ লোকটা বাঙালি এ বিষয়ে ভুল নেই৷
সেইদিন আমি কলকাতায় মি. সোমের সঙ্গে দেখা করলাম৷ সেওড়া ডালের গোড়াটা আমি তাঁকে দেখাইনি-কাঠের পাতটা তাঁর হাতে দিয়ে বললাম-এটা কী বলে আপনি মনে করেন?
তিনি জিনিসটা দেখে বললেন-এ তুমি কোথায় পেলে?
-সেকথা আপনাকে এখন বলব না, ক্ষমা করবেন৷
-এটা অসমে মিসমি জাতির মধ্যে প্রচলিত রক্ষাকবচ৷ দেখবে? আমার কাছে আছে৷
মি. সোমের বাড়িতে নানা দেশের অদ্ভুত জিনিসের একটা প্রাইভেট মিউজিয়াম মতো আছে৷ তিনি তাঁর সংগৃহীত দ্রব্যগুলির মধ্যে থেকে সেইরকম একটা কাঠের পাত এনে আমার হাতে দিলেন৷
আমি বললাম-আপনারটা একটু বড়ো৷ কিন্তু চিহ্ন একই- ফুল আর শেয়াল৷
-এটা ফুল নয়, নক্ষত্র-দেবতার প্রতীক, আর নীচে উপাসনাকারী মানুষের প্রতীক-পশু!
-কোন দেশের জিনিস বললেন?
-নাগা পর্বতের নানা স্থানে এ কবচ প্রচলিত-বিশেষ করে ডিব্রু-সদিয়া অঞ্চলে৷
আমি তাঁর হাত থেকে আমার পাতটা নিয়ে তারপর বললাম-এই সেওড়া ডালটা ক-দিনের ভাঙা বলে মনে হয়?
তিনি বললেন-ভালো করে দেখে দেব? আচ্ছা, বোসো৷
সেটা নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে একটু পরে ফিরে এসে বললেন-আট-ন দিন আগে ভাঙা৷
আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম নিজের বাসায়৷
আমার মনে একটা বিশ্বাস ক্রমশ দৃঢ়তর হয়ে উঠচে৷ গাঙ্গুলিমশায়কে খুন করতে এবং খুনের পরে তাঁর ঘরের মধ্যে খুঁড়ে দেখতে খুনির লেগেছিল সরারাত৷ যুক্তির দিক থেকে হয়তো এর অনেক দোষ বার করা যাবে-কিন্তু আমি অনেক সময় অনুমানের ওপর নির্ভর করে অগ্রসর হয়ে সত্যের সন্ধান পেয়েছি৷
কিন্তু ননি ঘোষকে আমি এখনও রেহাই দিইনি৷ শ্যামপুরে ফিরেই আমি আবার তার সঙ্গে দেখা করলাম৷ আমায় দেখে ননির মুখ শুকিয়ে গেল-তাও আমার চোখ এড়াল না৷
বললাম-শোনো ননি, আবার এলাম তোমায় জ্বালাতে- কতকগুলো কথা জিজ্ঞেস করব৷
-আজ্ঞে, বলুন!
-গাঙ্গুলিমশায় যেদিন খুন হন, সে-রাত্রে তুমি কোথায় ছিলে?
ননির মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল৷ বললে, আজ্ঞে...
-বলো কোথায় ছিলে৷ বাড়ি ছিলে না-
-আজ্ঞে না৷ সামটায় শ্বশুড়বাড়ি যেতে যেতে সেদিন দেবনাথপুরের হাটতলায় রাত কাটাই৷
-কেউ দেখেচে তোমায়?
ননি বললে-আজ্ঞে, তা যদিও দেখেনি-
-কেন দেখেনি৷
-রাত হয়ে গেল দেখে ওখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম৷ তখন কেউ সেখানে ছিল না৷
-খেয়াঘাট পার হওনি দেবনাথপুরে?
-হ্যাঁ বাবু৷ অনেক লোক একসঙ্গে পার হয়েছিল৷ আমায় তো পাটনি চিনে রাখেনি!
-বাড়ি এসেছিলে কবে?
-শনিবার দুপুর বেলা৷
-গাঙ্গুলিমশায় খুন হয়েচেন কার মুখে শুনলে?
-আজ্ঞে, গাঁয়ে ঢুকেই মাঠে কাপালিদের মুখে শুনি৷
-কার মুখে শুনেছিলে তার নাম বলো৷
-আজ্ঞে, ঠিক মনে হচ্ছে না, বোধ হয় হিরু কাপালি-
-তার কাছে গিয়ে প্রমাণ করে দিতে পারবে?
ননি ইতস্তত করে বললে-আজ্ঞে, ঠিক তো মনে নেই; যদি হিরু না হয়?
ননির কথায় আমার সন্দেহ আরও বেশি হল৷ সে-রাত্রে ও ঘরে ছিল না, অথচ কোথায় ছিল তা পরিষ্কার প্রমাণও দিতে পারছে না৷ গোপনে সন্ধান নিয়ে আরও জানলাম, ননি সম্প্রতি কলকাতায় গিয়েছিল৷ আজ দু-দিন হল এসেছে৷ ননিকে জিজ্ঞেস করে কোনো লাভ নেই, ও সত্যি কথা বলবে না৷ একটা কিছু কাণ্ড ও ঘটাচ্ছে নাকি তলে তলে? কিছু বোঝা যাচ্চে না!
দু-দিন পরে শ্রীগোপাল এসে আমায় খবর দিলে, গ্রামের মহীন স্যাকরাকে সে ডেকে এনেচে-আমার সঙ্গে দেখা করবে, বিশেষ কাজ আছে৷
মহীন স্যাকরার বয়স প্রায় পঞ্চাশের ওপর৷ নিতান্ত ভালোমানুষ গ্রাম্য স্যাকরা, ঘোরপ্যাঁচ জানে না বলেই মনে হল৷
শ্রীগোপালকে বললাম-একে কেন এনেচ?
-এ কী বলচে শুনুন৷
-কী মহীন?
-বাবু, ননি ঘোষ আমার কাছে এগারো ভরি সোনার তাবিজ আর হার তৈরি করে নিয়েচে-আজ তিন-চার দিন আগে৷
-দাম কত?
-সাতাশ টাকা করে ভরি, হিসেব করুন৷
-টাকা নগদ দিয়েছিল?
-হ্যাঁ বাবু৷
-সে টাকা তোমার কাছে আছে? নোট, না নগদ?
-নগদ৷ টাকা নেই বাবু, তাই নিয়ে মহাজনের ঘর থেকে সোনা কিনে এনে গহনা গড়ি!
-দু-একটা টাকাও নেই?
-না বাবু৷
-তোমার মহাজনের কাছে আছে?
-বাবু, রাণাঘাটের শীতল পোদ্দারের দোকানে কত সোনা কেনা-বেচা হচ্চে দিনে৷ আমার সে টাকা কি তারা বসিয়ে রেখেচে?
-শীতল পোদ্দার নাম? আমার সঙ্গে তুমি চলো রাণাঘাটে আজই৷
বেলা তিনটের ট্রেনে মহীন স্যাকরাকে নিয়ে রাণাঘাটে শীতল পোদ্দারের দোকানে হাজির হলাম৷ সঙ্গে মহীনকে দেখে বুড়ো পোদ্দারমশায় ভাবলে, বড়ো খরিদ্দার একজন এনেচে মহীন৷ তাদের আদর-অভ্যর্থনাকে উপেক্ষা করে আমি আসল কাজের কথা পাড়লাম, একটু কড়া-রুক্ষস্বরে৷
বললাম-সেদিন এই মহীন আপনাদের ঘর থেকে সোনা কিনেছিল এগারো ভরি?
পোদ্দারের মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠল ভয়ে-ভাবলে, এ নিশ্চয়ই পুলিশের হাঙ্গামা! সে ভয়ে ভয়ে বললে-হ্যাঁ বাবু, কিনেছিল৷
-টাকা নগদ দেয়?
-তা দিয়েছিল৷
-সে টাকা আছে?
-না বাবু, টাকা কখনো থাকে? আমাদের বড়ো কারবার, কোথাকার টাকা কোথায় গিয়েচে!
আমিও ওকে ভয় দেখানোর জন্যে কড়া সুরে বললাম-ঠিক কথা বলো৷ টাকা যদি থাকে আনিয়ে দাও-তোমার ভয় নেই! চুরির ব্যাপারে নয়, মহীনের কোনো দোষ নেই৷ তোমাদের কোনো পুলিশের হাঙ্গামায় পড়তে হবে না-কেবল কোর্টে সাক্ষী দিতে হতে পারে৷ টাকা বার করো৷
মহীনও বললে-পোদ্দারমশায়, আমাদের কোনো ভয় নেই, বাবু বলেচেন৷ টাকা যদি থাকে, দেখান বাবুকে৷
পোদ্দার বললে-কিন্তু বাবু, একটা কথা৷ টাকা তো সব সমান, টাকার গায়ে কি নাম লেখা আছে?
-সে কথায় তোমার দরকার নেই৷ নাম লেখা থাক না থাক-টাকা তুমি বার করো৷
শীতল পোদ্দার টাকা বার করে নিয়ে এল একটা থলির মধ্যে থেকে৷ বললে-সেদিনকার তহবিল আলাদা করা ছিল৷ সোনা বিক্রির তহবিল আমাদের আলাদা থাকে, কারণ, এই নিয়ে মহাজনের সোনা কিনতে যেতে হয়৷
টাকা হাতে নিয়ে দেখবার আগেই শীতল একটা কথা বললে-যা আমার কাছে আশ্চর্য বলে মনে হল৷ সে বললে- বাবু, এগুলো পুরোনো টাকা, পোঁতা-টোতা ছিল বলে মনে হয়, এ চুরির টাকা নয়৷
আমি প্রায় চমকে উঠলাম ওর কথা শুনে! মহীন স্যাকরার মুখ দেখি বিবর্ণ হয়ে উঠেচে৷
আমি বললাম-তুমি কী করে জানলে এ পুরোনো টাকা?
-দেখুন আপনিও হাতে নিয়ে! পুরোনো কলঙ্ক-ধরা রুপো দেখলে আমাদের চোখে কি চিনতে বাকি থাকে বাবু৷ এই নিয়ে কারবার করচি যখন!
-কতদিনের পুরোনো টাকা এ?
-বিশ-পঁচিশ বছরের৷
টাকাগুলো হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম, বিশ বৎসরের পরের কোনো সালের অঙ্ক টাকার গায়ে লেখা নেই৷ বললাম- মাটিতে পোঁতা টাকা বলে ঠিক মনে হচ্চে?
-নিশ্চয়ই বাবু৷ পেতলের হাঁড়িতে পোঁতা ছিল৷ পেতলের কলঙ্ক লেগেচে টাকার গায়ে৷
-আচ্ছা, তুমি এ টাকা আলাদা করে রেখে দাও৷ আমি পুলিশ নই, কিন্তু পুলিশ শিগগির এসে এ টাকা চাইবে মনে থাকে যেন৷
শীতল পোদ্দার আমার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে অনুনয়ের সুরে বললে-দোহাই বাবু, দেখবেন, যেন আমি এর মধ্যে জড়িয়ে না পড়ি৷ কোনো দোষে দোষী নই বাবু, মহীন আমার পুরোনো খাতক আর খদ্দের, ও কোথা থেকে টাকা এনেচে তা কেমন করে জানব বাবু, বলুন?
মহীনকে নিয়ে দোকানের বাইরে চলে এলাম৷ দেখি, ও ভয়ে কেমন বিবর্ণ হয়ে উঠেচে৷ বললাম-কী মহীন তোমার ভয় কী? তুমি গাঙ্গুলিমশায়কে খুন করোনি তো?
মহীন বললে-খুন? গাঙ্গুলিমশায়কে? কী যে বলেন বাবু?
দেখলাম ওর সর্বশরীর যেন থরথর করে কাঁপচে৷
কেন, ওর এত ভয় হল কীসের জন্যে?
আমরা ডিটেকটিভ, আসামি ধরতে বেরিয়ে কাউকে সাধু বলে ভাবা আমাদের স্বভাব নয়৷ মি. সোম আমার শিক্ষাগুরু-তাঁর একটি মূল্যবান উপদেশ হচ্ছে, যে-বাড়িতে খুন হয়েচে বা চুরি হয়েচে- সে বাড়ির প্রত্যেককেই ভাববে খুনি ও চোর৷ প্রত্যেককে সন্দেহের চোখে দেখবে, তবে খুনের কিনারা করতে পারবে-নতুবা পদে পদে ঠকতে হবে৷
ননি ঘোষ তো আছেই এর মধ্যে এ সন্দেহ আমার এখন বদ্ধমূল হল৷ বিশেষ করে টাকা দেখবার পরে৷
কিন্তু এখন আবার একটা নতুন সন্দেহ এসে উপস্থিত হল৷
এই মহীন স্যাকরার সঙ্গে খুনের কি কোনো সম্পর্ক আছে?
কথাটা ট্রেনে বসে ভাবলাম৷ মহীনও কামরার একপাশে বসে আছে৷ সে আমার সঙ্গে একটা কথাও বলেনি-জানলা দিয়ে পাণ্ডুর বিবর্ণ মুখে ভীত চোখে বাইরের দিকে শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে আছে৷ মহীনের যোগাযোগে ননি ঘোষ খুন করেনি তো? দু-জনে মিলে হয়তো এ কাজ করেচে৷ কিংবা এমনও কি হতে পারে না যে, মহীনই খুন করেচে, ননি ঘোষ নির্দোষী?
তবে একটা কথা, ননি ঘোষের হাতেই খাতাপত্র-কত টাকা আসচে-যাচ্চে, ননিই তো জানত, মহীন স্যাকরা সে খবর কী করে রাখবে!...
তখুনি একটা কথা মনে পড়ল৷ গাঙ্গুলিমশায় ছিলেন সরলপ্রাণ লোক, যেখানে-সেখানে নিজের টাকাকড়ির গল্প করে বেড়াতেন, সবাই জানে৷
মহীনকে বললাম-তোমার দোকানে অনেকে বেড়াতে যায়, না?
মহীন যেন চমকে উঠে বললে-হ্যাঁ বাবু৷
-গাঙ্গুলিমশায়ও যেতেন?
-তা যেতেন বই কী বাবু৷
-গিয়ে গল্প-টল্প করতেন?
-তা করতেন বই কী বাবু!
-টাকাকড়ির কথা কখনো বলতেন তোমার দোকানে বসে?
-সেটা তো তাঁর স্বভাব ছিল-সেকথাও বলতেন মাঝে মাঝে৷
-ননি ঘোষের সঙ্গে তোমার খুব মাখামাখি ভাব ছিল?
-আমার দোকানে আসত গহনা গড়াতে৷ আমার খদ্দের৷ এ থেকে যা আলাপ-তা ছাড়া সে আমার গাঁয়ের লোক৷ খুব মাখামাখি ভাব আর এমন কী থাকবে? যেমন থাকে৷
-তুমি আর ননি দু-জনে মিলে গাঙ্গুলিমশায়কে খুন করে টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েচ-কেমন কি না?
এই প্রশ্ন করেই আমি ওর মুখের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চেয়ে দেখলাম৷ ভয়ের রেখা ফুটে উঠল ওর মুখে! ও আমার মুখের দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে বললে-কী যে বলেন বাবু!
কিছু বুঝতে পারা গেল না৷ কেউ কেউ থাকে, নিপুণ ধরনের স্বাভাবিক অভিনেতা৷ তাদের কথাবার্তা, হাবভাবে বিশ্বাস করলেই ঠকতে হয়-এ আমি কতবার দেখেচি৷
শ্যামপুরে ফিরে আমি গাঙ্গুলিমশায়ের ছেলে শ্রীগোপালের সঙ্গে দেখা করলাম৷ শ্রীগোপাল বললে-থানা থেকে দারোগাবাবু আর ইনস্পেক্টরবাবু এসেছিলেন৷ আপনাকে খুঁজছিলেন৷
-তুমি গহনার কথা বিছু বললে নাকি তাঁদের?
-না৷ আমি কেন সেকথা বলতে যাব৷ আমাকে কোনো কথা তো বলে দেননি?
-বেশ করেচো৷
-ওঁরা আপনার সেই কাঠের তক্তামতো জিনিসটা দেখতে চাইছিলেন৷
-কেন?
-সেকথা কিছু বলেননি৷
-তাঁরা ও দেখে কিছু করতে পারেন, আমি তাঁদের দিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি, কিন্তু তাঁরা পারবেন বলে আমার ধারণা নেই৷
বিকেলের দিকে আমি নির্জনে বসে অনেকক্ষণ ভাবলাম৷ ...আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মিসমিজাতির কাষ্ঠনির্মিত রক্ষাকবচের সঙ্গে এই খুনির যোগ আছে৷ সেই রক্ষাকবচ প্রাপ্তি এমন একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা যে, আমার কাছে সেটা রীতিমতো সমস্যা হয়ে উঠচে ক্রমশ৷
ননি ঘোষের সঙ্গেও এর সম্পর্ক এমন নিবিড় হয়ে উঠেচে, যেটা আর কিছুতেই উপেক্ষা করা চলে না৷ শীতল পোদ্দারের দোকানের টাকার কথা যদি পুলিশকে বলি, তবে তারা এখুনি ননিকে গ্রেপ্তার করে৷ কিন্তু সেদিক থেকে মস্ত বাধা হচ্ছে, সে টাকা যে ননি ঘোষ দিয়েছিল মহীনকে, তার প্রমাণ কী?
মহীনের কথার উপর নির্ভর করা ছাড়া এক্ষেত্রে অন্য কোনো প্রমাণ নেই!
শীতল পোদ্দারও তো ভুল করতে পারে!
হয়তো এমনও হতে পারে, মহীন স্যাকরাই আসল খুনি৷ তার দোকানে বসে গাঙ্গুলিমশায় কখনো টাকার গল্প করে থাকবেন- তারপর সুবিধে পেয়ে মহীন গাঙ্গুলিমশায়কে খুন করেচে, পোঁতা-টাকা পোদ্দারের দোকানে চালিয়ে এখন ননির ওপর দোষ চাপাচ্ছে...
ননি ঘোষের সঙ্গে সন্ধ্যার সময় দেখা করলাম৷
ওকে দেখেই কিন্তু আমার মনে কেমন সন্দেহ হল, লোকটার মধ্যে কোথায় কী গলদ আছে, ও খুব সাচ্চা লোক নয়৷ আমাকে দেখে প্রতিবারই ও কেমন হয়ে যায়৷
লোকটা ধূর্তও বটে৷ ওর চোখ-মুখের ভাবেও সেটা বোঝা যায় বেশ৷
ওকে জিজ্ঞেস করলাম-তুমি মহীনের দোকান থেকে তাবিজ গড়িয়েছ সম্প্রতি?
ননি বিবর্ণমুখে আমার দিকে চেয়ে বললে-হ্যাঁ-তা-হ্যাঁ বাবু-
-অত টাকা হঠাৎ পেলে কোথায়?
-হঠাৎ কেন বাবু! আমরা তিনপুরুষে ঘি-মাখনের ব্যাবসা করি৷ টাকা হাতে ছিল, তা ভাবলাম, নগদ টাকা পাড়াগাঁয়ে রাখা-
-টাকা নগদ দিয়েছিলে, না, নোটে?
-নগদ৷
-সব টাকা তোমার ঘি-মাখন বিক্রির টাকা?
-হ্যাঁ বাবু৷
ননিকে ছেড়ে দিয়ে গ্রামের মধ্যে বেড়াতে বেরুলাম৷ ননি অত্যন্ত ধূর্ত লোক, ওর কাছ থেকে কথা বার করা চলবে না দেখা যাচ্চে৷
বেড়াতে বেড়াতে গাঙ্গুলিমশায়ের বাড়ির কাছে গিয়ে পড়েছি, এমন সময় দেখি কে একজন ভদ্রলোক গাঙ্গুলিমশায়ের ছেলে শ্রীগোপালের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা কইচেন৷
আমাকে দেখে শ্রীগোপাল বললে-এই যে! আসুন, চা খাবেন৷
-না, এখন খাব না৷ ব্যস্ত আছি৷
-আসুন, আলাপ করিয়ে দিই...ইনি সুশীল রায়, আর ইনি জানকীনাথ বড়ুয়া, আমাদের পাড়ার জামাই-আমার বাড়ির পাশের ওই বুড়ি-দিদিমার জামাই৷ উনিও একটু-একটু-মানে- ওঁকে সব বলেছিলাম৷
আমি বুঝলাম, জানকী বড়ুয়া আর যাই হোক, সে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী আর একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ৷ মনটা হঠাৎ যেন বিরূপ হয়ে উঠল শ্রীগোপালের প্রতি৷ সে আমার ওপর এরই মধ্যে আস্থা হারিয়ে ফেলেচে, এবং কোথা থেকে আরেকজন গোয়েন্দা আমদানি করে তাকে সব ঘটনা খুলে বলছিল, আমাকে আসতে দেখে থেমে গিয়েচে৷
আমি জানকীবাবু বললাম-আপনি কী বুঝচেন?
-কী সম্বন্ধে?
-খুন সম্বন্ধে৷
-কিছুই না৷ তবে আমার মনে হয়-
-কী, বলুন?
-এখানকার লোকই খুন করেচে৷
-আপনি বলছেন-এই গাঁয়ের লোক?
-এই গাঁয়ের জানাশোনা লোক ভিন্ন এ-কাজ হয়নি৷ ননি ঘোষের সম্বন্ধে আপনার মনে কী হয়?
আমি বিস্মিতভাবে জানকীবাবুর মুখের দিকে চাইলাম! তাহলে শ্রীগোপাল দেখচি ননি ঘোষের কথাও এই ভদ্রলোকের কাছে বলেচে! ভারি রাগ হল শ্রীগোপালের ব্যবহারে৷
আমার ওপর তাহলে আদৌ আস্থা নেই ওর দেখচি৷
একবার মনে হল, জানকীবাবুর কথার কোনো উত্তর আমি দেব না৷ অবশেষে ভদ্রতা বোধেরই জয় হল৷ বললাম-ননি ঘোষের কথা আপনাকে কে বললে?
-কেন, শ্রীগোপালের মুখে সব শুনেচি৷
-আপনি তাকে সন্দেহ করেন?
-খুব করি! তার সঙ্গে এখুনি দেখা করা দরকার৷ তার হাতেই যখন টাকার হিসেব লেখা হত...
-দেখুন না, ভালোই তো৷
হঠাৎ আমার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চেয়ে জানকীবাবু বলেন- আচ্ছা, আপনি ঘটনাস্থলে ভালো করে খুঁজেছিলেন?
-খুঁজেছিলাম বই কী৷
-কিছু পেয়েছিলেন?
আমি জানকীবাবুর এ প্রশ্নে দস্তুরমতো বিস্মিত হলাম৷ যদি তিনি নিজেও একজন গোয়েন্দা হন, তবে তাঁর পক্ষে অন্য একজন সমব্যবসায়ী লোককে একথা জিজ্ঞেস করা শোভনতা ও সৌজন্যের বিরুদ্ধে, বিশেষত যখন আগে থেকেই এ ব্যাপারের অনুসন্ধানে আমি নিযুক্ত আছি৷
আমি নিস্পৃহভাবে উত্তর দিলাম-না, এমন বিশেষ কিছু না৷
জানকীবাবু পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন-তাহলে কিছুই পাননি?
-কিছুই না তেমন৷
কাঠের পাতের কথাটা জানকীবাবুকে বলবার আমার ইচ্ছে হল না৷ জানকীবাবুকে বলে কী হবে? তিনি কি বুঝতে পারবেন জিনিসটা আসলে কী? মি. সোমের সাহায্য ব্যতীত কি আমারই বোঝার কোনো সাধ্য ছিল? মি. সোমের মতো পণ্ডিত ও বিচক্ষণ গোয়েন্দা খুব বেশি নেই এদেশে, এ আমি হলপ করে বলতে পারি৷
জানকীবাবু চলে গেলে আমি শ্রীগোপালকে বললাম-তুমি একে কী বলেছিলে?
-কী বলব!
-ননি ঘোষের কথা বলেচ?
-হ্যাঁ, তা বলেছি৷
আমি ওকে তিরস্কারের সুরে বললাম-আমাকে তোমার বিশ্বাস না হতে পারে-তা বলে আমার আবিষ্কৃত ঘটনা সূত্রগুলো তোমার অন্য ডিটেকটিভকে দেওয়ার কী অধিকার আছে?
শ্রীগোপাল চুপ করে রইল৷ ওর নির্বুদ্ধিতায় ও অবিবেচকতায় আমি যারপরনাই বিরক্তি বোধ করলাম৷
সেদিন সন্ধ্যার কিছু আগে আমি মহীন স্যাকরার সঙ্গে আবার দেখা করতে গেলাম৷ মহীন আমায় দেখে ভয়ে ভয়ে একটা টুল পেতে দিল বসবার জন্যে৷
আমি বললাম-মহীন, একটা সত্যি কথা বলবে?
-কী, বলুন!
-তোমার সঙ্গে ননির ঝগড়া-বিবাদ হয়েছিল কিছুকাল আগে?
মহীন আমার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থেকে বললে-ননি বলেচে বুঝি? সব মিথ্যে কথা ওর বাবু, সব মিথ্যে৷
আমি কড়াসুড়ে বললাম-ঝগড়া হয়েছিল তাহলে? সত্যি বলো!
মহীন চুপ করে রইল অনেকক্ষণ, তারপর আস্তে আস্তে বললে-হয়েছিল বাবু, কিন্তু আমার তাতে কোনো দোষ...
-আমি সে-কথা বলিনি-ঝগড়া হয়েছিল কি না জিজ্ঞেস করচি৷
-হ্যাঁ বাবু৷
-কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল, বলো এবার!
-সোনার দর নিয়ে বাবু৷
-আচ্ছা, তুমি শ্রীগোপালের কাছে ননি ঘোষের তাবিজ গড়ানোর কথা এইজন্যে বলেছিলে-কেমন, ঠিক কি না?
-হ্যাঁ বাবু৷
-তুমি তখন ভেবেছিল যে, ননি ঘোষই খুন করেচে?
-তা-না-
-ঠিক বলো৷
-না বাবু৷
-তাহলে তুমিও যে দোষী হবে আইনত; তাই ভাবচ বুঝি?
মহীন স্যাকরা ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল, বললে- বাবু, তা-তা-
-তোমাকে গ্রেপ্তারের জন্যে থানায় খবর দেব!
মহীন আমার পা জড়িয়ে ধরে বললে-দোহাই বাবু, আমার সব কথা শুনুন আগে৷ আপনি দেশের লোক-আমার সর্বনাশ করবেন না বাবু-কাচ্চা-বাচ্চা মারা যাবে৷
-কী, বলো!
-তখন আমিও লুটের টাকা বলে সন্দেহ করিনি৷ কী করে করব! বলুন বাবু, তা কি সম্ভব?
-তবে, কখন সন্দেহ করলে?
-বাবু, শ্রীগোপালই আমায় বললে, আপনি ননি ঘোষকে সন্দেহ করেন৷ তখন আমি ভাবলাম, গহনার কথাটা প্রমাণ না করলে আমি মারা যাব এর পরে৷ তাই বলেছিলাম৷
শ্রীগোপালের নির্বুদ্ধিতা দেখচি নানা দিক থেকে প্রকাশ পাচ্চে৷ যদি ওর বাবার খুনের আসামি ধরা না পড়ে, তবে সেটা ওর নির্বুদ্ধিতার জন্যেই ঘটবে৷
কথাটা শ্রীগোপালকে বলবার জন্যে তার বাড়ির দিকে চললাম৷
রাস্তাটা বাড়ির পেছনের দিকে-শিগগির হবে বলে শর্ট-কার্ট করে গেলাম বনের মধ্যে দিয়ে৷ সেই বন-যেখানে আমি সেদিন মিসমি জাতির কবচ ও দাঁতনকাঠির গোড়া সংগ্রহ করে ছিলাম৷
অন্ধকারেই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ একটা সাদা মতো কী কিছুদূরে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম৷ জিনিসটা নড়চে-চড়চে আবার৷ অন্ধকারের জন্যে ভয় যেন বুকের রক্ত হিম করে দিলে৷
এই বনের পরেই গাঙ্গুলিমশায়ের বাড়ি-গাঙ্গুলিমশায়ের ভূত নাকি রে বাবা!
হঠাৎ একটা টর্চ জ্বলে উঠল-সঙ্গেসঙ্গে কে কড়া গলায় হাঁকলে, কে ওখানে?
-আমিও তো তাই জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম-কে আপনি?
-ও৷
আমার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল একটা মনুষ্যমূর্তি এবং টর্চের আলো-আঁধার কেটে গেলে দেখলাম, সে জানকীবাবু ডিটেকটিভ!
বিস্ময়ের সুরে বললাম-আপনি কী করছিলেন অন্ধকারে বনের মধ্যে?
জানকীবাবু অপ্রতিভ সুরে বললেন-আমি এই-এই-
-ও, বুঝেচি৷ কিছু মনে করবেন না৷ হঠাৎ এসে পড়েছিলাম এখানে৷
-না না, কিছু না৷
তাড়াতাড়ি পাশ কাটিয়ে চলি এগিয়ে৷ ভদ্রলোক শুধু অপ্রতিভ নয়, যেন হঠাৎ ভীত ও ত্রস্তও হয়ে পড়েচেন৷ কী মুশকিল! এসব পাড়াগাঁয়ে শহরের মতো বাথরুমের বন্দোবস্ত না থাকাতে সত্যিই অনেকের বড়োই অসুবিধে হয়৷
জানকী বড়ুয়া প্রাইভেট ডিটেকটিভকে এই অন্ধকারে গাঙ্গুলিমশায়ের ভূত বলে মনে হয়েছিল ভেবে আমার খুব হাসি পেল৷ ভদ্রলোককে কী বিপন্নই করে তুলেছিলাম!
সেদিন সন্ধ্যার পরে শ্রীগোপালের বাড়ি বসে চা খাচ্ছি, এমন সময় জানকীবাবু আমার পাশে এসে বসলেন৷ তাঁকেও চা দেওয়া হল৷ জানকীবাবু দেখলাম বেশ মজলিসি লোক, চা খেতে খেতে তিনি নানা মজার মজার গল্প বলতে লাগলেন৷ আমায় বললেন- আমি তো মশায় গাঁয়ের জামাই, আজ চোদ্দো বছর বিয়ে করেচি, কাকে না চিনি বলুন গ্রামে, সকলেই আমার আত্মীয়৷
আমি বললাম-আপনি এখানে প্রায়ই যাতায়াত করেন? তাহলে তো হবেই আত্মীয়তা!
-আমার স্ত্রী মারা গিয়েচে আজ বছর তিনেক৷ তারপর আমি প্রায়ই আসি না৷ তবে শাশুড়িঠাকরুন বৃদ্ধা হয়ে পড়েছেন, আমার আসার জন্যে চিঠি লেখেন, না এসে পারিনে৷
-ছেলেপুলে কী আপনার?
-একটি ছেলে হয়েছিল, মারা গিয়েচে৷ এখন আর কিছুই নেই৷
-ও৷
হঠাৎ জানকীবাবু আমার মুখের দিকে চেয়ে আমায় জিজ্ঞেস করলেন-আচ্ছা, গাঙ্গুলিমশায়ের খুন সম্বন্ধে পুলিশ কোনো সূত্র পেয়েচে বলে আপনার মনে হয়?
-কেন বলুন তো?
-আমার বিশেষ কৌতূহল এ সম্বন্ধে৷ গাঙ্গুলিমশায় আমার শ্বশুরের সমান ছিলেন৷ বড়ো স্নেহ করতেন আমায়৷ তাঁর খুনের ব্যাপারের একটা কিনারা না হওয়া পর্যন্ত আমার মনে শান্তি নেই৷ আমার মনে কোনো অহংকার নেই মশায়৷ আমি এ খুনের কিনারা করি, বা আপনি করুন, বা পুলিশই করুক, আমার পক্ষে সব সমান৷ যার দ্বারা হোক, কাজ হলেই হল৷ নাম আমি চাইনে৷
-নাম কে চায় বলুন? আমিও নয়৷
-তবে আসুন-না আমরা মিলেমিশে কাজ করি৷ পুলিশকেও বলুন৷
-পুলিশ তো খুব রাজি, তারা তো এতে খুব খুশি হবে৷
-বেশ, তবে কাল থেকে-
-আমার কোনো আপত্তি নেই৷
-আচ্ছা, প্রথম কথা-আপনি কোনো কিছু সূত্র পেয়েচেন কি না আমায় বলুন৷ আমি যা পেয়েচি আপনাকে বলি৷
-আমি এখানে এখন বলব না৷ পরে আপনাকে জানাব৷
-ননি ঘোষের ব্যাপারটা আপনি কী মনে করেন?
-সেদিন তো আপনাকে বলেচি৷ ওকে আমার সন্দেহ হয়৷ আপনি ওকে সন্দেহ করেন?
-নিশ্চয় করি৷
-আপনি ওর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পেয়েচেন?
-সেই গহনা ব্যাপারটাই তো ওর বিরুদ্ধে একটা মস্ত বড়ো প্রমাণ৷
-তা আমারও মনে হয়েচে, কিন্তু ওর মধ্যে গোলমালও যথেষ্ট৷
-মহীন স্যাকরাকে নিয়ে তো? আমি মহীনকে সন্দেহ করিনে৷
-কেন বলুত তো?
-মহীন তো খাতা লিখত না গাঙ্গুলিমশায়ের৷ ভেবে দেখুন কথাটা৷
-সেসব আমিও ভেবেচি৷ তাতেও জিনিসটা পরিষ্কার হয় না৷
-চলুন না, দু-জনে একবার ননির কাছে যাই৷
-তার কাছে আমি গিয়েছিলাম৷ তাতে কোনো ফল হবে না৷
-হিসাবের খাতাখানা কোথায়?
-পুলিশের জিম্মায়৷
-আপনি ভালো করে দেখেচেন খাতাখানা?
-দেখেচি বলেই তো ননিকে জড়াতে পারিনে ভালো করে৷
-কেন?
-শুধু ননির হাতের লেখা নয়, আরও অনেকের হাতের লেখা তাতে আছে৷
-কার কার?
জানকীবাবু ব্যগ্রভাবে এ প্রশ্নটা করে আমার মুখের দিকে যেন উৎকন্ঠিত আগ্রহে উত্তরের প্রতীক্ষায় চেয়ে রইলেন৷ আমি মৃত মুসলমান ভদ্রলোকটির ও স্কুলের ছাত্রটির কথা তাঁকে বললাম৷
জানকীবাবু বললেন-ও, এই! সে তো আমি জানি- শ্রীগোপালের মুখে শুনেচি৷
-যা শুনেচেন, তার বেশি আমারও কিছু বলবার নেই৷
পরদিন সকালে ননি ঘোষ এসে আমার কাছে হাজির হল৷ বললে-বাবু, আপনার সঙ্গে একটা কথা আছে৷
-কী?
-জানকীবাবু এ গাঁয়ের জামাই বলে খাতির করি৷ কিন্তু উনি কাল রাতে আমায় যে রকম গালমন্দ দিয়ে এসেচেন, তাতে আমি বড়ো দুঃখিত৷ বাবু, যদি দোষ করে থাকি, পুলিশে দিন-গালমন্দ কেন?
-তুমি বড়ো চালাক লোক ননি৷ আমি বুঝি৷ পুলিশে দেবার হলে, তোমাকে একদিনও হাজতের বাইরে রাখব ভেবেচ৷
-বাবুও কি আমাকে এখনও সন্দেহ করেন?
লোকটা সাংঘাতিক ধূর্ত৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ খুন যেই করুক ননি তার মধ্যে নিশ্চয়ই জড়িত৷ অথচ ও ভেবেচে যে, আমার চোখে ধুলো দেবে!
বললাম-সেকথা এখন নয়৷ এক মাসের মধ্যেই জানতে পারবে৷
-বাবু, আপনি আমাকে যতই সন্দেহ করুন, ধর্ম যতদিন মাথার উপর আছে-
ধূর্ত লোকেরাই ধর্মের দোহাই পাড়ে বেশি! লোকটার উপর সন্দেহ দ্বিগুণ বেড়ে গেল৷
সারাদিন অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলাম৷
সন্ধ্যার পরে আহারাদি সেরে অনেকক্ষণ বই পড়লাম! তারপর আলো নিবিয়ে দিয়ে নিদ্রা দেবার চেষ্টা করলাম৷ কিন্তু কেন জানি না-অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম হল না এবং বোধ হয় সেইজন্যই সেই রাতে আমার প্রাণ বেঁচে গেল৷
ব্যাপারটা কী হল খুলে বলি৷
সেও এক কৃষ্ণপক্ষের গভীর অন্ধকার রাত্রি৷ মাঝে মাঝে বৃষ্টি পড়চে আবার থেমে যাচ্চে, অথচ গুমট কাটেনি৷ আমার ঘরটার উত্তর দিকে একটা মাত্র কাঠের গরাদ দেওয়া জানলা, জানলার সামনাসামনি দরজা৷ পশ্চিম দিকের দেওয়ালে জানলা নেই-একটা ঘুলঘুলি আছে মাত্র৷
রাত প্রায় একটা কি তার বেশি৷ আমার ঘুম আসেনি, তবে সামান্য একটু তন্দ্রার ভাব এসেচে৷
হঠাৎ বাইরে ঘুলঘুলির ঠিক নীচেই যেন কার পায়ের শব্দ শোনা গেল! গোরু কি ছাগলের পায়ের শব্দ হওয়া বিচিত্র নয়-বিশেষ গ্রাহ্য করলাম না৷
তারপর শব্দটা সেদিক থেকে আমার শিয়রের জানলার কাছে এসে থামল৷ তখনও আমি ভাবচি, ওটা গোরুর পায়ের শব্দ৷ এমন সময় আমার বিস্মিত দৃষ্টির সামনে দিয়ে অস্পষ্ট অন্ধকারের মধ্যে কার একটা সুদীর্ঘ হাত একেবারে আমার বুকের কাছে-ঠিক বুকের ওপর এসে পৌঁছোল-হাতে ধারালো একখানা সোজা ছোরা, অন্ধকারেও যেন ঝকঝক করচে!
ততক্ষণে আমার বিস্ময়ের প্রথম মুহূর্ত কেটে গিয়েচে৷
আমি তাড়াতাড়ি পাশমোড়া দিয়ে ছোরা-সমেত হাতখানা ধরতে গিয়ে মুহূর্তের জন্য একটা বাঁশের লাঠিকে চেপে ধরলাম৷
পরক্ষণেই কে এক জোর ঝটকায় লাঠিখানা আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলে৷ সঙ্গেসঙ্গে ছোরার তীক্ষ্ণ অগ্রভাগের আঘাতে আমার হাতের কব্জি ও বুকের খানিকটা চিরে রক্তারক্তি হয়ে গেল৷
তাড়াতাড়ি উঠে টর্চ জ্বেলে দেখি, বিছানা রক্তে মাখামাখি হয়ে গিয়েচে৷ তখুনি নেকড়া ছিঁড়ে হাতে জলপটি বেঁধে লন্ঠন জ্বাললাম৷
লাঠির অগ্রভাগে তীক্ষ্ণাস্ত্র ছোরা বাঁধা ছিল-আমার বুক লক্ষ্য করে ঠিক কুড়ুলের কোপের ধরনে লাঠি উঁচিয়ে কোপ মারলেই ছোরা পিঠের ওদিক দিয়ে ফুঁড়ে বেরুত৷ তারপর বাঁধন আলগা করে ছোরাখানা আমার বিছানার পাাশে কিংবা আমার ওপর ফেলে রাখলেই আমি যে আত্মহত্যা করেচি, একথা বিশেষজ্ঞ ভিন্ন অন্য লোককে ভুল করে বোঝানো চলত৷
আমি নিরস্ত্র ছিলাম না-মি. সোমের ছাত্র আমি৷ আমার বালিশের তলায় ছ-নলা অটোমেটিক ওয়েবলি লুকোনো৷ সেটা হাতে করে তখুনি বাইরে এসে টর্চ ধরে ঘরের সর্বত্র খুঁজলাম-জানালার কাছে জুতোসুদ্ধ টাটকা পায়ের দাগ!
ভালো করে টর্চ ফেলে দেখলাম৷
কী জুতো? ...রবার সোল, না, চামড়া? ...অন্ধকারে ভালো বোঝা গেল না৷
এখুনি এই জুতোর সোলের একটা ছাঁচ নেওয়া দরকার৷ কিন্তু তার কোনো উপকরণ দুর্ভাগ্যের বিষয় আজ আমার কাছে নেই৷
আমার মনে কেমন ভয় করতে লাগল, আকাশের দিকে চাইলাম৷ কৃষ্ণপক্ষের ঘোর মেঘান্ধকার রজনী৷
এমনি রাত্রে ঠিক গত কৃষ্ণপক্ষেই গাঙ্গুলিমশায় খুন হয়েছিলেন৷
আমি শ্রীগোপালের বাড়ি গিয়ে ডাকলাম-শ্রীগোপাল, শ্রীগোপাল, ওঠো-ওঠো!
শ্রীগোপাল জড়িত কন্ঠে উত্তর দিলে -কে?
-বাইরে এসো-আলো নিয়ে এসো-সব বলচি৷
শ্রীগোপাল একটা কেরোসিনের টেমি জ্বালিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বিস্মিতমুখে বার হয়ে এসে বললে-কে? ও, আপনি? এত রাত্রে কী মনে করে?
-চলো বসি-সব বলচি৷ এক গ্লাস জল খাওয়াও তো দেখি!
-চা খাবেন? স্টোভ আছে৷ চা-খোর আমি, সব মজুত রাখি-করে দিই!
চা খেয়ে আমি আর বসতে পারচি না৷ ঘুমে যেন চোখ ঢুলে আসচে! শ্রীগোপাল বললে-বাকি রাতটুকু আমার এখানেই শুয়ে কাটিয়ে দেবেন-এখন৷
ব্যাপার সব শুনে শ্রীগোপাল বললে-এর মধ্যে ননি আচে বলে মনে হয়৷ এ তারই কাজ৷
-না৷
-না? বলেন কী?
-না, এ ননির কাজ নয়৷
-কী করে জানলেন?
-এখানকার লোক ছোরার ব্যবহার জানে না-বাংলাদেশের পাড়াগাঁয়ে ছোরার ব্যবহার নেই৷
-তবে?
-এ কাজ যে করেচে, সে বাংলার বাইরে থাকে৷ তুমি কাউকে রাতের কথা বোলো না কিন্তু!
-আপনাকে খুন করতে আসার উদ্দেশ্য?
-আমি দোষী খুজে বার করবার কাজে পুলিশকে সাহায্য করচি-এছাড়া আর অন্য কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে?
ভোর হল৷ আমি উঠে আমার ঘরে চলে গেলাম৷
জানলার বাইরে সেই পায়ের দাগ তেমনি রয়েচে৷ রবার সোলের জুতো বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্চে৷ ক-নম্বরের জুতো তাও জানা গেল৷
বিকেলে আমি ভাবলাম, একবার মামার বাড়ি যাব৷ এ গ্রামে ডাক্তার নেই ভালো-মামার বাড়ি গিয়ে আমার ক্ষতস্থানটা দেখিয়ে ওষুধ দিয়ে নিয়ে আসব৷ ঘরের মধ্যে জামা গায়ে দিতে গিয়ে মনে হল-আমার ঘরের মধ্যে কে যেন ঢুকেছিল৷
কিছুই থাকে না ঘরে৷ একটা ছোটো চামড়ার সুটকেস-তাতে খানকতক কাপড়-জামা৷ কে ঘরের মধ্যে ঢুকে সুটকেসটা মেজেতে ফেলে তার মধ্যে হাতড়ে কী খুঁজেচে-কাপড়-জামা, বা, একটা মনিব্যাগে গোটা দুই টাকা ছিল যেগুলো ছোঁয়নি৷ বালিশের তলা-এমনকী, তোশকটার তলা পর্যন্ত খুঁজেচে৷
আমি প্রথমটা ভাবলাম, এ কোনো ছিঁচকে চোরের কাজ৷ কিন্তু চোর টাকা নেয় নি-তবে কি, রিভলভারটা চুরি করতে এসেছিল? সেটা আমার পকেটেই আছে অবিশ্যি-সে উদ্দেশ্য থাকা বিচিত্র নয়৷
জানকীবাবুকে ডেকে সব কথা বললাম৷ জানকীবাবু শুনে বললেন-চলুন, জায়গাটা একবার দেখে আসি৷
ঘরে ঢুকে আমরা সব দিক ভালো করে খুঁজে দেখলাম৷ সব ঠিক আছে৷ জানকীবাবু আমার চেয়েও ভালো করে খুঁজলেন, তিনিও কিছু বুঝতে পেরেচেন বলে মনে হল না৷
বললাম-দেখলেন তো?
-টাকাকড়ি কিছু যায়নি?
-কিছু না৷
-আর কোনো জিনিস আপনার ঘরে ছিল?
-কী জিনিস?
-অন্য কোনো দরকারি-ইয়ে-মানে-মূল্যবান?
-এখানে মূল্যবান জিনিস কী থাকবে?
-তাই তো!
হঠাৎ আমার একটা কথা মনে পড়ল৷ মিসমিদের সেই কবচ আর দাঁতনকাঠির টুকরোটা আমি এই ঘরে কাল পর্যন্ত রেখেছিলাম, কিন্তু কাল কী মনে করে শ্রীগোপালের বাড়ি যাবার সময় সে জিনিস দু-টি আমি পকেটে করে নিয়ে গিয়েছিলাম-এখনও পর্যন্ত সে দু-টি আমার পকেটেই আছে৷ কিন্তু কথাটা জানকীবাবুকে বলি বলি করেও বলা হল না৷
জানকীবাবু যাবার সময় বললে-ননির ওপর আপনার সন্দেহ হয়?
-হয় খানিকটা৷
-একবার ওকে ডাকিয়ে দেখি৷
-এখন নয়৷ আমি মামার বাড়ি যাই, তারপর ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করবেন৷
কিছুক্ষণ পরে আমি জানকীবাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মামার বাড়ি চলে এলাম৷
আমার মামার বাড়ির পাশে সুরেশ ডাক্তারের বাড়ি৷ সে আমার সমবয়সি-গ্রামে প্র্যাকটিস করে৷ মোটামুটি যা রোজগার করে, তাতে তার চলে যায়৷ ওর কাছে ক্ষতস্থান ধুইয়ে ব্যান্ডেজ করিয়ে আবার শ্রীগোপালদের গ্রামেই ফিরলাম৷ জানকীবাবুর সঙ্গে পথে দেখা৷ তিনি বোধ হয় বেড়াতে বেরিয়েচেন৷ আমায় বললেন- আজই ফিরলেন?
তাঁর কথার উত্তর দিতে গিয়ে হঠাৎ আমার মনে পড়ল, মিসমিদের কবচখানা আমার পকেটেই আছে এখনও-সামনে রাত আসচে আবার, ও জিনিসটা সঙ্গে এনে ভালো করিনি, মামার বাড়ি রেখে আসাই উচিত ছিল বোধ হয়৷
জানকীবাবুর পরামর্শটা একবার নিলে কেমন হয়, জিনিসটা দেখিয়ে?
কিন্তু ভাবলাম, এ জিনিসটা ওঁর হাতে দিতে গেলে এখন বহু কৈফিয়ত দিতে হবে ওই সঙ্গে৷ হয়তো তিনি জিনিসটার গুরুত্ব বুঝবেন না-দরকার কী দেখানোর?
জানকীবাবুর শ্বশুরবাড়ি শ্রীগোপালের বাড়ির পাশেই৷
ওর বৃদ্ধা শাশুড়ি, দেখি, বাইরের রোয়াকে বসে মালা জপ করচেন৷ আমি তাঁকে আরও জিজ্ঞেস করবার জন্যে সেখানে গিয়ে বসলাম৷
বুড়ি বললে-এসো দাদা, বসো৷
-ভালো আছেন, দিদিমা?
-আমাদের আবার ভালোমন্দ-তোমরা ভালো থাকলেই আমাদের ভালো৷
-আপনি বুঝি একাই থাকেন?
-আর কে থাকবে বলো-আছেই-বা কে? এক মেয়ে ছিল, মারা গিয়েচে৷
-তবে তো আপনার বড়ো কষ্ট, দিদিমা৷
-কী করব দাদা, অদেষ্টে দুঃখ থাকলে কেউ কি ঠেকাতে পারে?
আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম৷ বুড়ির সামনের গোয়ালের ছিটেবেড়ায় একটা অদ্ভুত জিনিস রয়েচে-জিনিসটা হচ্চে, খুব বড়ো একটা পাতার টোকা৷ পাতাগুলো শুকনো তামাক পাতার মতো ঈষৎ লালচে৷ পাতার বোনা ওরকম টোকা, বাংলাদেশের পাড়াগাঁয়ে কখনো দেখিনি৷
জিজ্ঞেস করলাম-দিদিমা, ও জিনিসটা কী? এখানে তৈরি হয়?
বৃদ্ধা বললেন-ওটা এ দেশের নয় দাদা৷
-কোথায় পেয়েছিলেন ওটা?
-আমার জামাই এনে দিয়েছিল৷
-আপনার জামাই? জানকীবাবু বুঝি?
-হ্যাঁ দাদা৷ ও অসমে চা বাগানে থাকত কিনা, ওই আর বছর এনেছিল৷
হঠাৎ আমার মনে কেমন একটা খটকা লাগল... অসম! ...চা বাগান! এই ক্ষুদ্র গ্রামের সঙ্গে সুদূর অসমের যোগ কীভাবে স্থাপিত হতে পারে-এ আমার নিকট একটা মস্ত বড়ো সমস্যা৷ একটা ক্ষীণ সূত্র মিলেচে৷
আমি বললাম-জানকীবাবু বুঝি অসমে থাকতেন?
-হ্যাঁ দাদা, অনেকদিন ছিল৷ এখন আর থাকে না৷ আমার সে মেয়ে মারা গিয়েচে কিনা! তবুও জামাই মাঝে মাঝে আসে৷ গাঙ্গুলিমশায়ের সঙ্গে বড়ো ভাব ছিল৷ এলেই ওখানে বসে গল্প, চা খাওয়া-
-ও!
-বুড়ো খুন হয়েছে শুনে জামাইয়ের কী দুঃখ!
-গাঙ্গুলিমশায়ের মৃত্যুর ক-দিন পরে এলেন উনি?
-তিন-চার দিন পরে দাদা!
-আপনার মেয়ে মারা গিয়েচেন কতদিন হল দিদিমা?
-তা, বছর তিনেক হল-এই শ্রাবণে৷
-মেয়ে মারা যাওয়ার পর উনি যেমন আসছিলেন, তেমনই আসতেন, না, মধ্যে কিছুদিন আসা বন্ধ ছিল?
-বছর দুই আর আসেনি৷ মন তো খারাপ হয়, বুঝতেই পার দাদা! তারপর এল একবার শীতকালে৷ এখানে রইল মাসখানেক৷ বেশ মন লেগে গেল৷ সেই থেকে প্রায়ই আসে৷
আমি বৃদ্ধার কাছ থেকে বিদায় নিলাম৷ সেদিন আর কোথাও বেরুলাম না৷ পরদিন সকালে উঠে স্থির করলাম একবার থানার দারোগাবাবুর সঙ্গে দেখা করা দরকার৷ বিশেষ আবশ্যক৷
পথেই জানকীবাবুর সঙ্গে দেখা৷ আমায় জিজ্ঞেস করলেন- এই যে! বেড়াচ্ছেন বুঝি?
আমি বললাম-চলুন, ঘুরে আসা যাক একটু৷ আপত্তি আছে?
-হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলুন না যাই৷
-আচ্ছা জানকীবাবু, আপনি মন্ত্রতন্ত্রে বিশ্বাস করেন?
-হ্যাঁ, খানিকটা করিও বটে, খানিকটা নাও বটে৷ কেন বলুন তো?
-আমার নিজের ওতে একেবারেই বিশ্বাস নেই৷ তাই বলচি৷ আপনি তো অনেক দেশ ঘুরেচেন, আপনার অভিজ্ঞতা আমার চেয়ে বেশি৷
হঠাৎ জানকীবাবু আমার চোখের সামনে এমন একটা কাণ্ড করলেন, যাতে আমি স্তম্ভিত ও হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণের জন্যে৷
কাণ্ডটা এমন কিছুই নয়, খুবই সাধারণ৷
জানকীবাবু পথের পাশে ঝোপের জঙ্গলের দিকে চেয়ে বললেন-দাঁড়ান, একটা দাঁতন ভেঙে নিই৷ সকাল বেলাটা...
তারপর তিনি আমার সামনে পথের ধারে একটা শ্যাওড়া ডাল ঘুরিয়ে ভেঙে নিলেন দাঁতনকাঠির জন্যে৷
আমার ভাবান্তর অতি অল্পক্ষণের জন্যে৷
পরক্ষণেই আমি সামলে নিয়ে তাঁর সঙ্গে সহজভাবে কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম৷
ঘণ্টাখানেক পরে ঘুরে এসে আমি ভাঙা শ্যাওড়া ডালটা ভালো করে লক্ষ করে দেখি, সঙ্গে সেদিনকার সেই দাঁতনকাঠির শুকনো গোড়াটা এনেছিলাম৷
যে বিশেষ ভঙ্গিতে আগের গাছটা ভাঙা হয়েচে, এটাও অবিকল তেমনি ভঙ্গিতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভাঙা৷
কোনো তফাত নেই৷
আমার মাথার মধ্যে ঝিমঝিম করছিল অসম, দাঁতনকাঠি- দুটো অতি সাধারণ, অথচ অত্যন্ত অদ্ভুত সূত্র৷
জানকীবাবুর এখানে গত এক বছর ধরে ঘন ঘন আসা-যাওয়া, পত্নীবিয়োগ সত্ত্বেও শ্বশুরবাড়ি আসার তাগিদ, গাঙ্গুলিমশায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব!
মি. সোম একবার আমায় বলেছিলেন, অপরাধী বলে যাকে সন্দেহ করবে, তখন তার পদমর্যাদা বা বাইরের ভদ্রতা-এমনকী, সম্বন্ধ, সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ইত্যাদিকে আদৌ আমল দেবে না৷
জানকীবাবুর সম্বন্ধে আমার গুরুতর সন্দেহ জাগল মনে৷
একটা সূত্র এবার অনুসন্ধান করা দরকার৷ অত্যন্ত দরকারি একটা সূত্র৷
সকালে উঠে গিয়ে দারোগার সঙ্গে দেখা করলাম থানায়৷
দারোগাবাবু আমায় দেখে বললেন-কী? কোনো সন্ধান করা গেল?
-করে ফেলেচি প্রায়৷ এখন-যে খাতার পাতাখানা আপনার কাছে আছে, সেইখানা একবার দরকার৷
-ব্যাপার কী, শুনি?
-এখন কিছু বলচিনে! হাতের লেখা মেলানোর ব্যাপার আছে একটা৷
-কীরকম!
-গাঙ্গুলিমশায়ের খাতা লিখত যে ক-জন-তাদের সবার হাতের লেখা জানি, কেবল একটা হাতের লেখার ছিল অভাব- তাই না?
-সে তো আমিই আপনাকে বলি৷
-এখন সেই লোক কে হতে পারে, তার একটা আন্দাজ করে ফেলেচি৷ তার হাতের লেখার সঙ্গে এখন সেই পাতার লেখাটা মিলিয়ে দেখতে হবে৷
-লোকটার বর্তমান হাতের লেখা পাওয়ার সুবিধে হবে?
-জোগাড় করতে চেষ্টা করছি৷ যদি মেলে, আমি সন্দেহক্রমে তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেব৷
-আমায় বলবেন, আমি গিয়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসব৷ ওয়ারেন্ট বের করিয়ে নিতে যা দেরি৷
-বাকিটুকু কিন্তু আপনাদের হাতে৷
-সে ভাববেন না, যদি আপনার সংগৃহীত প্রমাণের জোর থাকে, তবে বাকি সব আমি করে নেব৷ এই কাজ করচি আজ সতেরো বছর৷
আমি গ্রামে ফিরে একদিনও চুপ করে বসে রইলাম না৷ এসব ব্যাপারে দেরি করতে নেই, করলেই ঠকতে হয়৷ জানকীবাবুর শাশুড়ির সঙ্গে দেখা করলাম৷ শুনলাম, জানকীবাবু মাছ ধরতে গিয়েচেন কোথাকার পুকুরে-আর মাত্র দু-দিন তিনি এখানে আছেন-এই দু-দিনের মধ্যেই সব বন্দোবস্ত করে ফেলতে হবে৷
আমি বললাম-দিদিমা, জানকীবাবু আপনাকে কিছু কিছু টাকা পাঠান শুনেচি?
-না দাদা, ওকথা কার কাছে শুনেচ? জামাই তেমন লোকই নয়৷
-পাঠান না?
-আরও উলটে নেয় ছাড়া দেয় না৷ মেয়ে থাকতে তবুও যা দিত, এখন একেবারে উপুড়-হাতটি করে না কোনোদিন৷
-যাক, চিঠিপত্র দিয়ে খোঁজখবর নেন তো-তাহলেই হল৷
-তাও কখনো কখনো৷ বছরে একবার বিজয়ার প্রণাম জানিয়ে একখানা লেখে৷
-খাম, না পোস্টকার্ড?
-হ্যাঁ, খাম না রেজিস্টারি চিঠি৷ তুমিও যেমন দাদা! মেয়ে বেঁচে না থাকলেই জামাই পর হয়ে যায়৷ তার উপর কি কোনো দাবি থাকে দাদা? দু-লাইন লিখে সেরে দেয়৷
-কই, দেখি? আছে নাকি চিঠি?
-ওই চালের বাতায় গোঁজা আছে, দেখো না!
খুঁজে খুঁজে নাম দেখে একখানা পুরোনো পোস্টকার্ড চালের বাতা থেকে বের করে বৃদ্ধাকে পড়ে শোনালুম৷ বৃদ্ধা বললেন-ওই চিঠি দাদা৷
আরও দু-একটা কথা বলে চিঠিখানা নিয়ে চলে এলাম সঙ্গে করে৷ জানকীবাবু যদি একথা এখন শুনতেও পান যে, তাঁর লেখা চিঠি সঙ্গে নিয়ে এসেচি, তাতেও আমার কোনো ক্ষতির কারণ নেই৷
থানায় দারোগার সামনে বসে হাতের লেখা দুটো মেলানো হল৷
অদ্ভুত ধরনের মিল৷ দু-একটা অক্ষর লেখার বিশেষ ভঙ্গিটা উভয় হাতের লেখাতেই একইরকম৷
দারোগাবাবু বললেন-তবুও একজন হাতের লেখা বিশেষজ্ঞের মত নেওয়া দরকার নয় কি?
-সে তো কোর্টে প্রমাণের সময়৷ ওসব দরকার নেই৷ আপনি সন্দেহক্রমে চালান দিন৷
-আমায় অন্য কারণগুলো সব বলুন৷
-একে একে সব বলব-তার আগে একবার কলকাতায় যাওয়া দরকার৷
মি. সোমের সঙ্গে দেখা করলাম কলকাতায়৷ সব বললাম তাঁকে খুলে৷
তিনি বললেন-একটা কথা বলি৷ তোমাদের সাক্ষীসাবুদ প্রমাণ-সূত্রাদির চেয়েও একটা বড়ো জিনিস আচে৷ এটা সূত্র ধরে অপরাধী বের করতে বড্ড সাহায্য করে৷ অন্তত আমায় তো অনেকবার যথেষ্ট সাহায্য করেচে৷ সেটা হল-অঙ্কশাস্ত্র, অঙ্ক, Chance-এর আঁক কষে বোঝা যায় যে, একজন লোক যে অসমে থাকে বলবে, অথচ দাঁতন করবে, অথচ তার হাতের লেখার সঙ্গে যাকে সন্দেহ করা হচ্চে তার হাতের লেখার হুবহু মিল থাকবে, এ-ধরনের ব্যাপার হয়তো তিন হাজারের মধ্যে একটা ঘটে৷ এক্ষেত্রে যে সেরকম ঘটেচে, এমন মনে করবার কোনো কারণ নেই- সুতরাং ধরে নিতে হবে ও সেই লোকই৷
সেদিন কলকাতা থেকে চলে এলাম৷ আসবার সময় একবার থানার দারোগাবাবুর সঙ্গে দেখা করি৷ তিনি বললেন, আপনি লোক পাঠালেই আমি সব ব্যবস্থা করব৷
-ওয়ারেন্ট বার হয়েচে?
-এখনও হস্তগত হয়নি, আজ-কাল পেয়ে যাব৷
গ্রামে ফিরে দু-তিন দিন চুপচাপ বসে রইলাম শ্রীগোপালের বাড়িতে৷ খবর নিয়ে জানলাম, জানকীবাবু দু-একদিনের মধ্যেই এখান থেকে চলে যাবেন৷ থানার দারোগার কাছে চিঠি দিয়ে আসতে বলে দিলাম৷
পকেটে মিসমিদের কবচখানা রেখে আমি জানকীবাবুর সন্ধানে ফিরতে থাকি এবং একটু পরে পেয়েও যাই৷ জানকীবাবুকে কৌশল করে নির্জনে গাঁয়ের মাঠের দিকে নিয়ে গেলাম৷
আজ একবার শেষ পরীক্ষা করে দেখতে হবে৷ হয় এসপার, নয় ওসপার!
জানকীবাবু বললেন-আপনার কাজ কতদূর এগোল?
-এক পাও না৷ আপনি কী বলেন?
-আমি তো ভাবচি, ননির সম্বন্ধে থানায় গিয়ে বলব৷
-সন্দেহের কারণ পেয়েচেন?
-না পেলে কি আর বলচি?
-আচ্ছা জানকীবাবু, আপনি বুঝি অসমে ছিলেন?
-কে বললে?
-আমি শুনলাম যেন সেদিন কার মুখে৷
-না, আমি কখনো অসমে ছিলাম না৷ যিনি বলেচেন, তিনি জানেন না৷
আমার মনে ভীষণ সন্দেহ হল৷ জানকীবাবু একথা বলতে চান কেন? তবে কি তিনি মিসমিদের কবচ হারানো এবং বিশেষ করে সেখানা যদি আমার হাতে পড়ে বা পুলিশের কোনো সুযোগ্য ডিটেকটিভের হাতে পড়ে তবে তার গুরুত্ব সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অবহিত?
আমি তখন আমার কর্তব্য স্থির করে ফেলেচি৷ বললাম- মানে, অন্য কেউ বলেনি, আপনার দেওয়া একটা পাতার টোকা সেদিন আপনার শ্বশুরবাড়িতে দেখে ভাবলাম, এ টোকা অসম সদিয়া অঞ্চল ছাড়া কোথাও পাওয়া যায় না-মিসমিদের দেশে অমন টোকার ব্যবহার আছে৷
-আপনার ভুল ধারণা৷
আমি তাঁর মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে পকেট থেকে মিসমিদের কাঠের কবচখানা বের করে তাঁর সামনে ধরে বললাম- দেখুন দিকি এ জিনিসটা কী? ...চেনেন? যে রাত্রে গাঙ্গুলিমশায় খুন হন, সে রাত্রে তাঁর বাড়ির পেছনে এটা কুড়িয়ে পাই৷ অসমে মিসমিজাতির মধ্যে এই ধরনের কাঠের কবচ পাওয়া যায় কিনা- তাই৷
আমার খবরের সঙ্গেসঙ্গে জানকীবাবুর মুখ সাদা ফ্যাকাশে হয়ে গেল-কিন্তু অত্যন্ত অল্পকালের জন্যে৷ পরমুহূর্তেই ভীষণ ক্রোধে তাঁর নাক ফুলে উঠল, চোখ বড়ো বড়ো হল৷ হঠাৎ আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি আমার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়লেন বাঘের মতো এবং সঙ্গেসঙ্গে কবচসুদ্ধ হাতখানা চেপে ধরে জিনিসটা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন৷ তাতে ব্যর্থ হয়ে তিনি দু-হাতেই আমার গলা চেপে ধরলেন পাগলের মতো৷
আমি এর জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলাম৷
বরং জানকীবাবুই আমার যুযুৎসুর আড়াই-পেঁচির ছুটের জন্যে তৈরি ছিলেন না৷
তিনি হাতের মাপের অন্তত তিনি হাত দূরে ছিটকে পড়ে হাঁপাতে লাগলেন৷
আমি হেসে বললাম-এ লাইনে যখন নেমেচেন, তখন অন্তত দু-একটা প্যাঁচ জেনে রাখা আপনার নিতান্ত দরকার ছিল জানকীবাবু৷ কবচ আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবেন না৷ কবচ আপনাকে ছেড়ে দিয়েচে৷ এখন এটা আমার হাতে৷ এখন ভাগ্যদেবী আমায় দয়া করবেন৷
-কী বলচেন আপনি?
-এ কথার জবাব দেবেন অন্য জায়গায়৷ দাঁড়ান একটু এখানে৷
থানার দারোগাবাবু কাছেই ছিলেন, আমার ইঙ্গিতে তিনি এসে হাসিমুখে বললেন-দয়া করে একটু এগিয়ে আসুন জানকীবাবু! খুনের অপরাধে আপনাকে আমি গ্রেপ্তার করলাম ...এই, লাগাও!
কনস্টেবলরা এগিয়ে গিয়ে জানকীবাবুর হাতে হাতকড়ি লাগাল৷
জানকীবাবু কী বলতে চাইলেন৷ দারোগাবাবু বললেন- আপনি এখন যা-কিছু বলবেন, আপনার বিরুদ্ধে তা প্রয়োগ করা হবে, বুঝেসুঝে কথা বলবেন৷
জানকীবাবুর বিরুদ্ধে পুলিশ আরও অনেক প্রমাণ সংগ্রহ করে৷ গাঙ্গুলিমশায় খুন হওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে তিনি জেলার লোন-আফিস ব্যাঙ্কে সাড়ে ন-শো টাকা জমা রেখেচেন, পুলিশের খানা-তল্লাশিতে তার কাগজ বার হয়ে পড়ল৷
তারপর বিচারে জানকীবাবুর যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের আদেশ হয়৷
একটা বিষয়ে আমার আগ্রহ ছিল জানবার৷ জানকীবাবুর সঙ্গে আমি জেলের মধ্যে দেখা করলাম৷ তখন তাঁর প্রতি দণ্ডাদেশ হয়ে গিয়েচে৷
আমাকে দেখে জানকীবাবু ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন৷
আমি জিজ্ঞেস করলাম-কেমন আছেন জানকীবাবু?
-ধন্যবাদ! কোনো কথা জিজ্ঞেস করতে হবে না আপনাকে৷
-একটু বেশি রাগ করেচেন বলে মনে হচ্চে৷ কিন্তু আমায় কর্তব্য পালন করতে হয়েচে, তা বুঝতেই পারচেন৷
-থাক ওতেই হবে৷
-দেখুন জানকীবাবু, মনের অগোচর পাপ নেই৷ আপনি খুব ভালোভাবেই জানেন, আপনি কতদূর হীন কাজ করেচেন৷ একজন অসহায়, সরল বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ-যিনি আপনাকে গাঁয়ের জামাই জেনে আপনার প্রতি আত্মীয়ের মতো-এমনকী, আপনার শ্বশুরের মতো ব্যবহার করতেন, আপনাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে তাঁর টাকাকড়ির হিসেব আপনাকে দিয়ে লেখাতেন-তাঁকে আপনি খুন করেচেন৷ পরকালে এর জবাবদিহি দিতে হবে যখন, তখন কী করবেন ভাবলেন না একবার?
-মশায়, আপনাকে পাদ্রিসায়েবের মতো লেকচার দিতে হবে না৷ আপনি যদি এখনই এখান থেকে না যান-আমি ওয়ার্ডারকে ডেকে আপনাকে তাড়িয়ে দেব-বিরক্ত করবেন না৷
লোকটা সত্যিই অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির৷ নররক্তে হাত কলুষিত করেচে, অথচ এখন মনে অনুতাপের অঙ্কুর পর্যন্ত জাগেনি ওর৷
আমি বললাম-আপনি সংসারে একা, ছেলেপুলে নেই, স্ত্রী নেই৷ তাঁরা স্বর্গে গিয়েচেন, কিন্তু আপনার এই কাজ স্বর্গ থেকে কি তাঁরা দেখবেন না আপনি ভেবেচেন? তাঁদের কাছে মুখ দেখাবেন কী করে?
জানকীবাবু চুপ করে রইলেন এবার৷ আমি ভাবলুম, ওষুধ ধরেচে৷ আগের কথাটা আরও সুস্পষ্টভাবে বললাম৷ জানি না আজ জানকীবাবুর হৃদয়ের নিভৃত কোণে তাঁর পরলোকগত স্ত্রী-পুত্রের জন্য এতটুকু স্নেহপ্রীতি জাগ্রত আছে কি না! কিন্তু আমার যতদূর সাধ্য তাঁর মনের সে দিকটাতে আঘাত দেবার চেষ্টা করলাম-বহুদিনের মরচেপড়া হৃদয়ের দোর যদি এতটুকু খোলে!
বললাম-ভেবে দেখুন জানকীবাবু, আপনার কাছে কত পবিত্র স্মৃতির আধার হওয়া উচিত যে গ্রাম, সেই গ্রামে বসে আপনি নরহত্যা করেচেন-এ যে কত পাপের কাজ তা যদি আজও বোঝেন, তবুও অনুতাপের আগুনে হৃদয় শুদ্ধ হয়ে যেতে পারে৷ অনুতাপে মানুষকে নিষ্পাপ করে, মহাপুরুষেরা বলেচেন৷ আপনি বিশ্বাস করুন বা না-ই করুন মহাপুরুষদের বাণী তা বলে মিথ্যা হয়ে যাবে না৷
জানকীবাবু আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে বললেন- মশায়, আপনি কী কাজ করেন? এই কি আপনার পেশা?
-খারাপ পেশা নয় তা স্বীকার করবেন বোধ হয়!
-খারাপ আর কি!
-দোষীকে প্রায়শ্চিত্ত করবার সুবিধে করে দিই, যাতে তার পরকালে ভালো হয়৷
-আচ্ছা, এ আপনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন?
-নিশ্চয়ই করি৷
-তবে শুনুন বলি, বসুন৷
-বেশ কথা, বলুন৷
-আমার দ্বারাই এ কাজ হয়েচে৷
-অর্থাৎ গাঙ্গুলিমশায়কে আপনি...
-ওকথা আর বলবেন না৷
-বেশ৷ কেন করলেন?
-সে অনেক কথা৷ আমার উপায় ছিল না৷
-কেন?
-আমি ব্যাবসা করতুম শুনেচেন তো? ব্যাবসা ফেল পড়ে কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েছিলাম, চারিদিকে দেনা৷ লোভ সামলাতে পারলাম না৷
-আপনার সান্ত্বনা আপনার কাছে৷ কিন্তু এটা লাগসই কৈফিয়ত হল না৷
-আমি তা জানি৷ দুর্বল মন আমাদের-কিন্তু আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে বড়ো ইচ্ছে হয়৷
-স্বচ্ছন্দে বলুন৷
-আপনি ওই কবচখানা পেয়েছিলেন যেদিন, সেদিন আপনি বুঝতে পেরেছিলেন ওখানা কী?
-না৷
-কবে পারলেন?
-আমার শিক্ষাগুরু মি. সোমের কাছে কবচের বিষয় সব জেনেছিলাম৷ আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
-বলুন!
-আপনি কেন আবার এ গ্রামে এসেছিলেন, খুনের পরে?
-আপনি নিশ্চয়ই তা বুঝেচেন৷
-আন্দাজ করেছি৷ কবচখানা হারিয়ে গিয়েছিল খুনের রাত্রেই-সেখানা খুঁজতে এসেছিলেন৷
-ঠিক তাই৷
-সেদিন গাঙ্গুলিমশায়ের বাড়ির পেছনের জঙ্গলে অন্ধকারে ওটা খুঁজছিলেন কেন, দিনমানে না খুঁজে?
-দিনেই খুঁজতে শুরু করেছিলাম, রাত হয়ে পড়ল৷
-ওখানেই যে হারিয়েছিলেন, তা জানলেন কী করে?
-ওটা সম্পূর্ণ আন্দাজি ব্যাপার! কোনো জায়গায় যখন খুঁজে পেলাম না তখন মনে পড়ল, ওই জঙ্গলে দাঁতন ভেঙেছিলাম, তখন পকেট থেকে পড়ে যেতে পারে৷ তাই-
আমি ওঁর মুখে একটা ভয়ের চিহ্ন পরিস্ফুট হতে দেখলাম৷ বললাম-সব কথা খুলে বলুন৷ আমি এখনও আপনার সব কথা শুনিনি! তবে আপনার মুখ দেখে তা বুঝতে পারচি৷
জানকীবাবু ফিসফিস করে কথা বলতে লাগলেন, যেন তাঁর গোপনীয় কথা শুনবার জন্যে জেলে সেই ক্ষুদ্র কামরার মধ্যে কেউ লুকিয়ে ওৎ পেতে বসে রয়েচে৷ তাঁর এ ভাব-পরিবর্তনে আমি একটু আশ্চর্য হয়ে গেলাম৷ ভয়ে দুঃখে লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেল না কি?
আমায় বললেন-ওখানা এখন কোথায়?
-একজিবিট হিসেবে কোর্টেই জমা আছে৷
-তারপর কে নিয়ে নেবে?
-আপনার সম্পত্তি, আপনার ওয়ারিশান কোর্টে দরখাস্ত করলে-
জানকীবাবু ভয়ে যেন কোনো অদৃশ্য শত্রুকে দু-হাত দিয়ে ঠেলে দেবার ভঙ্গিতে হাত নাড়তে নাড়তে বললেন-না না, আমি ও চাইনে, আমার ওয়ারিশান কেউ নেই, ও আমি চাইনে-ওই সর্বনেশে কবচই আমাকে আজ এ অবস্থায় এনেচে৷ আপনি জানেন না ও কী!
এই পর্যন্ত বলে তিনি চুপ করে গেলেন৷ যেন অনেকখানি বেশি বলে ফেলেচেন-যা বলবার ইচ্ছে ছিল তার চেয়েও বেশি৷ আর তিনি কিছু বলতে চান না বা ইচ্ছে করেন না৷
আমি বললাম-আপনি যদি না নিতে চান, আমি কাছে রাখতে পারি৷
আমার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে চেয়ে জানকীবাবু বললেন-আপনি সাহস করেন?
-এর মধ্যে সাহস করবার কী আছে? আমায় দেবেন?
-আপনি আমায় পুলিশে ধরিয়ে দিয়েচেন, আপনি আমার শত্রু-তবুও এখন ভেবে দেখচি, আমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা করে দিয়েচেন আপনি! আপনার ওপর আমার রাগ নেই৷ আমি আপনাকে বন্ধুর মতো পরামর্শ দিচ্চি-ও কবচ আপনি কাছে রাখতে যাবেন না৷
-কেন?
-সে অনেক কথা৷ সংক্ষেপে বললাম-ও জিনিসটা দূরে রেখে চলবেন৷
আমি যেজন্যে আজ জানকীবাবুর কাছে এসেছিলাম, সে উদ্দেশ্য সফল হতে চলেচে৷ আমি এসেছিলাম আজ ওঁর মুখে কবচের ইতিহাস কিছু শুনব বলে৷ আমার ওভাবে কথা পাড়বার মূলে এই একটা উদ্দেশ্য ছিল৷ অনুনয়ের সুরে কোনো কথা বলে জানকীবাবুর কাছে কাজ আদায় করা যাবে না এ আমি আগেই বুঝেছিলাম সুতরাং আমি তাচ্ছিল্যের সুরে বললাম-আমার কোনো কুসংস্কার নেই জানবেন৷
জানকীবাবু খোঁচা খেয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে বললেন-কুসংস্কার কাকে বলেন আপনি?
-আপনার মতো ওইসব মন্ত্র-তন্ত্র-কবচে বিশ্বাস-ওর নাম যদি কুসংস্কার না হয়, তবে কুসংস্কার আর কাকে বলব?
জানকীবাবু ক্রোধের সুরে বললেন-আপনি হয়তো ভালো ডিটেকটিভ হতে পারেন, কিন্তু দুনিয়ার সব জিনিসই তা বলে আপনি জানবেন?
আমি পূর্বের মতো তাচ্ছিল্যের সুরেই বললাম-আমার শিক্ষাগুরু একজন আছেন, তাঁর বাড়িতে ওরকম একখানা কবচ আছে৷
-কে তিনি?
-মি. সোম, বিখ্যাত প্রাইভেট ডিটেকটিভ৷
-যিনিই হোন, আমার তা জানবার দরকার নেই৷ একটা কথা আপনাকে বলি৷ যদি আপনি তাঁর মঙ্গলাকাঙ্খী হন, তবে অবিলম্বে তাঁকে বলবেন সেখানা গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিতে৷ কতদিন থেকে তাঁর সঙ্গে সেখানা আছে, জানেন?
-তা জানিনে, তবে খুব অল্পদিনও নয়৷ দু-তিন বছর হবে৷
-আর আমার সঙ্গে এ কবচ আছে সাত বছর! কিন্তু থাকগে৷
বলেই জানকীবাবু চুপ করলেন৷ আর যেন তিনি মুখই খুলবেন না, এমন ভাব দেখালেন৷
আমি বললাম- বলুন, কী বলতে চাইছিলেন?
-অন্য কিছু নয়, ও কবচখানা আপনি আপনার গুরুকে টান মেরে ভাসিয়ে দিতে বলবেন-আর, এখানাও আপনি কাছে রাখবেন না৷
-আমি তো বলেচি আমার কোনো কুসংস্কার নেই!
-অভিজ্ঞতা দ্বারা যা জেনেচি, তাকে কুসংস্কার বলে মানতে রাজি নই৷ বেশি তর্ক আপনার সঙ্গে করব না৷ আপনি থাকুন কি উচ্ছন্নে যান, তাতে আমার কী?
-এই যে খানিক আগে বলছিলেন, আমার ওপর আপনার কোনো রাগ নেই?
-ছিল না, কিন্তু আপনার নির্বুদ্ধিতা আর দেমাক দেখে রাগ হয়ে পড়েছে৷
-দেমাক দেখলেন কোথায়? আপনি তো কোনো কারণ দেখাননি৷ শুধুই বলে যাচ্ছেন-কবচ ফেলে দাও৷ আজকাল কোনো দেশে এসব মন্ত্রে-তন্ত্রে বিশ্বাস করে ভেবেচেন? একখানা কাঠের পাত মানুষের অনিষ্ট করতে পারে বলে, আপনিও বিশ্বাস করেন?
-আমিও আগে ঠিক এই কথাই ভাবতাম, কিন্তু এখন আমি বুঝেছি৷ কিন্তু বুঝেছি এমন সময় যে, যখন আর কোনো চারা নেই৷
-জিনিসটা কী, খুলে বলুন না দয়া করে!
-শুনবেন তবে? ওই কবচই আমার এই সর্বনাশের কারণ৷
আমি বুঝেছিলাম এ সম্বন্ধে জানকীবাবু কী একটা কথা আমার কাছে চেপে যাচ্ছেন৷ আগে একবার বলতে গিয়েও বলেননি, হঠাৎ গুম খেয়ে চুপ করে গিয়ে অন্য কথা পেড়েছিলেন৷ এবার হয়তো তার পুনরাবৃত্তি করবেন৷
সুতরাং, আমি যেন তাঁর আসল কথার অর্থ বুঝতে পারিনি এমন ভাব দেখিয়ে বললাম-তা বটে৷ একদিক থেকে দেখতে হলে, ওই কবচখানাই তো আপনার বর্তমান অবস্থার জন্যে দায়ী৷
জানকীবাবু আমার দিকে কৌতূহলের দৃষ্টিতে চেয়ে বললেন-আপনি কী বুঝেছেন, বলুন তো? কীভাবে দায়ী৷
-মানে, ওখানা না হারিয়ে গেলে তো আপনি আজ ধরা পড়তেন না-যদি ওখানা পকেট থেকে না পড়ে যেত?
-কিছুই বোঝেননি৷
-এ ছাড়া আর কী বুঝবার আছে?
-আজ যে আমি একজন খুনি, তাও জানবেন ওই সর্বনেশে কবচের জন্যে৷ কবচ যদি আমার কাছে না থাকত৷ তবে আজ আমি একজন মার্চেন্ট-হতে পারে ব্যাবসাতে লোকসান দিয়েছিলাম- কিন্তু ব্যাবসা করতে গেলে লাভ-লোকসান কার না হয়? আমার বুকে সাহস ছিল, লোকসান আমি লাভে দাঁড় করাতে পারতাম৷ কিন্তু এই কবচ তা আমায় করতে দেয়নি৷ ওই কবচ আমার ইহকাল পরকাল নষ্ট করেচে!
জানকীবাবুর মুখের দিকে চেয়ে বুঝলাম, গল্প বলবার আসন্ন নেশায় তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠেচেন৷ চুপ করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে রইলাম৷
জানকীবাবু বললেন-আজ প্রায় পঁচিশ বছর আমি সদিয়া-অঞ্চলে ব্যাবসা করচি৷ পরশুরামপুর তীর্থের নাম শুনেছেন?
-খুব৷
-ঘন জঙ্গলের পাশে ওই তীর্থটা পড়ে৷ ওখান থেকে আরও সত্তর মাইল দূরে ভীষণ দুর্গম বনের মধ্যে আমি জঙ্গল ইজারা নিয়ে পাটের ব্যাবসা শুরু করি৷ ওখানে দফলা, মিরি, মিসমি এইসব নামের পার্বত্য জাতির বাস৷ একদিন একটা বনের মধ্যে কুলিদের নিয়ে ঢুকেছি৷ জায়গাটার একদিকে ঝরনা, একদিকে উঁচু পাহাড়, তার গায়ে ঘন বাঁশবন৷ ওদিকে প্রায় সব পাহাড়েই বাঁশবন অত্যন্ত বেশি৷ কখনো গিয়েছেন ওদিকে?
আমি বললাম-না, তবে খাসিয়া পাহাড়ে এমন বাঁশবন দেখেচি, শিলং যাওয়ার পথে৷
জানকীবাবুর গল্পটা আমি আমার নিজের ধরনেই বলি৷
সেই পাহাড়ি বাঁশবনে বন কাটাবার জন্যে ঢুকে তাঁরা দেখলেন, এক জায়গায় একটা বড়ো শাল গাছের নীচে আমাদের দেশের বৃষকাষ্ঠের মতো লম্বা ধরনের কাঠের খোদাই এক বিকট-মূর্তি দেবতার বিগ্রহ!
কুলিরা বললে-বাবু, এ মিসমিদের অপদেবতার মূর্তি, ওদিকে যাবেন না৷
জানকীবাবুর সঙ্গে ক্যামেরা ছিল, তাঁর শখ হল মূর্তিটার ফটো নেবেন৷ কুলিরা বারণ করলে, জানকীবাবু তাদের কথায় কর্ণপাত না করে ক্যামেরা তেপায়ার উপর দাঁড় করিয়েছেন, এমন সময় একজন বৃদ্ধ মিসমি এসে তাদের ভাষায় কী বললে৷ জানকীবাবুর একজন কুলি সে ভাষা জানত৷ সে বললে-বাবু, ফটো নিয়ো না, ও বারণ করচে৷
অন্য অন্য কুলিরাও বললে-বাবু, এরা জবর জাত- সরকারকে পর্যন্ত মানে না৷ ওদের দেবতাকে অপমান করলে গাঁসুদ্ধ তির ধনুক নিয়ে এসে হাজির হয়ে আমাদের সবগুলোকে গাছের সঙ্গে গেঁথে ফেলবে৷ ওরা দুনিয়ার কাউকে ভয় করে না, কারও তোয়াক্কা রাখে না-ওদের দেবতার ফটো খিঁচবার দরকার নেই৷
জানকীবাবু ক্যামেরা বন্ধ করলেন-এতগুলো লোকের কথা ঠেলতে পারলেন না৷ তারপর নিজের কাজকর্ম সেরে তিনি যখন জঙ্গল থেকে ফিরবেন, তখন আর-একবার সেই দেবমূর্তি দেখবার বড়ো আগ্রহ হল৷
সন্ধ্যার তখন বেশি দেরি নেই, পাহাড়ি বাঁশবনের নিবিড় ছায়া-গহন পথে বন্যজন্তুদের অতর্কিত আক্রমণের ভয়, বেণুবনশীর্ষে ক্ষীণ সূর্যালোক ও পার্বত্য উপত্যকার নিস্তব্ধতা সকলের মনে একটা রহস্যের ভাব এনে দিয়েচে, কুলিদের বারণ সত্ত্বেও তিনি সেখানে গেলেন৷
সবাই ভীত ও বিস্মিত হয়ে উঠল যখন সেখানে গিয়ে দেখল, কোন সময় সেখানে একটি শিশু বলি দেওয়া হয়েচে! শিশুটির ধড় ও মুণ্ড পৃথক পৃথক পড়ে আছে, কাঠে-খোদাই বৃষকাষ্ঠ-জাতীয় দেবতার পাদমূলে৷ অনেকটা জায়গা নিয়ে কাঁচা আধশুকনো রক্ত৷
সেখানে সেদিন আর তারা বেশিক্ষণ দাঁড়াল না৷...
জানকীবাবু বললেন-আমার কী কুগ্রহ মশায়, আর যদি সেখানে না যাই তবে সবচেয়ে ভালো হয়, কিন্তু তা না করে আমি আবার পরের দিন সেখানে গিয়ে হাজির হলাম৷ কুলিদের মধ্যে একজন লোক আমায় যথেষ্ট নিষেধ করেছিল, সে বলেছিল, 'বাবু, তুমি কলকাতার লোক, এসব দেশের গতিক কিছু জানো না৷ জংলি-দেবতা হলেও ওদের একটা শক্তি আছে-তা তোমাকে ওদের পথে নিয়ে যাবে, তোমার অনিষ্ঠ করবার চেষ্টা করবে-ওখানে অত যাতায়াত কোরো না বাবু৷ কিন্তু কারও কথা শুনলাম না, গেলাম শেষ পর্যন্ত৷ লুকিয়েই গেলাম, পাছে কুলিরা টের পায়৷
কেন যে জানকীবাবু সেখানে গেলেন, তিনি তা আজও ভালো জানেন না৷
কিংবা হয়তো রক্তপিপাসু বর্বর দেবতার শক্তিই তাঁকে সেখানে যাবার প্ররোচনা দিয়েছিল...কে জানে!
জানকীবাবু বললেন-ক্যামেরা নিয়ে যদি যেতাম, তাহলে তো বুঝতাম ফটো নিতে যাচ্ছি-তাই বলছিলাম, কেন যে সেখানে গেলাম, তা নিজেই ভালো জানিনে!
আমি বললাম-সে মূর্তির ফটো নিয়েছিলেন?
-না, কোনো দিনই না৷ কিন্তু তার চেয়ে খারাপ কাজ করেছিলাম, এখন তা বুঝতে পারচি৷
জানকীবাবু যখন সেখানে গেলেন, তখন ঠিক থমথম করচে দুপুর বেলা, পাহাড়ি পাখিদের ডাক থেমে গিয়েচে, বনতল নীরব, বাঁশের ঝাড়ে ঝাড়ে শুকনো বাঁশের খোলা পাতা পড়বার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নাই৷
দেবমূর্তির একেবারে কাছে যাবার অত্যন্ত লোভ হল-কারণ, কুলিরা সঙ্গে থাকায় এতক্ষণ তা তিনি করতে পারেননি৷
গিয়ে দেখলেন, শিশুর শবের চিহ্নও সেখানে নেই৷ রাত্রে বন্যজন্তুতে খেয়েই ফেলুক, বা, জংলিরাই নিজেরা খাবার জন্যে সরিয়ে নিয়ে যাক৷ অনেকক্ষণ তিনি মূর্তিটার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন-কেমন একধরনের মোহ, একটা সুতীব্র আকর্ষণ! সত্যিকার নরবলি দেওয়া হয় যে দেবতার কাছে, এমন দেবতা কখনো দেখেননি বলেই বোধ হয় আকর্ষণটা বেশি প্রবল হল, কিংবা অন্য কিছু তা বলতে পারেন না তিনি৷
সেইসময় ওই কাঠের কবচখানা দেবমূর্তির গলায় ঝুলতে দেখে জানকীবাবু কিছু না ভেবে-চারিদিকে কেউ কোথাও নেই দেখে- সেখানা চট করে মূর্তিটার গলা থেকে খুলে নিলেন৷...
আমি বিস্মিতসুরে বললাম-খুলে নিলেন! কী ভেবে নিলেন হঠাৎ?
-ভাবলাম একটা নিদর্শন নিয়ে যাব এদেশের জঙ্গলের দেবতার, আমাদের দেশের পাঁচজনের কাছে দেখাব! নরবলি খায় যে দেবতা, তার সম্বন্ধে যখন বৈঠকখানা জাঁকিয়ে বসে গল্প করব তখন সঙ্গে সঙ্গে এখানা বার করে দেখাব৷ লোককে আশ্চর্য করে দেব, বোধ হয় এইরকমই একটা উদ্দেশ্য তখন থেকে থাকবে৷ কিন্তু যখন নিলাম গলা থেকে খুলে, তখনই মশায় আমার সর্বশরীর যেন কেঁপে উঠল! যেন মনে হল একটা কী অমঙ্গল ঘনিয়ে আসচে আমার জীবনে৷ ও ধরনের দুর্বলতাকে কখনোই আমল দিইনি- সেটা খুলে নিয়ে পকেটজাত করে ফেললাম একবারে৷ মিসমিদের অনেকে এরকম কবচ গলায় ধারণ করে, সেটাও দেখেচি কিন্তু তারপরে৷ শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাবার সময় বিশেষ করে এ কবচ তারা পরবেই৷
-তারপর?
-তারপর আর কিছুই না৷ সাত বছর কবচ আছে আমার কাছে৷ জংলি জাতের জংলি দেবতার কবচ, ও ধীরে ধীরে আমায় নামিয়েচে এই সাত বছরে৷ এক-একটা জিনিসের এক-একটা শক্তি আছে৷ আমায় জাল করিয়েচে, পাওনাদারের টাকা মেরে দেবার ফন্দি দিয়েচে-শেষকালে মানুষের রক্তে হাত রাঙিয়ে দিলে পর্যন্ত৷ একজন সম্ভ্রান্ত ভদ্র ব্যাবসাদার ছিলুম মশায়-আজ কোথায় এসে নেমেছি দেখুন! এ প্রবৃত্তি জাগাবার মূলে কবচখানা! আমি দেখেচি, যখনই ওখানা আমার কাছে থাকত, তখনই নানারকম দুষ্টুবুদ্ধি জাগত মনে-কাকে মারি, কাকে ফাঁকি দিই৷ লোভ জিনিসটা দুর্দমনীয় হয়ে উঠত৷ গাঙ্গুলিশায়ের খুনের দিনের রাত্রে আমি দশটার গাড়িতে অন্ধকারে ইস্টিশানে নামি৷ কেউ আমায় দেখেনি৷ আমার পকেটে ওই কবচ-কিন্তু যাক সেকথা, আর এখন বলব না৷
-বলুন না৷
-না৷ আমার ঘাড় থেকে এখন ভূত নেমে গিয়েচে, আর সে ছবি মনে করতে পারব না৷ এখন করলে ভয় হয়৷ নিজের কাজ করেই কবচ সরে পড়ল সে-রাত্রেই৷ আমার সর্বনাশ করে ওর প্রতিহিংসা পূর্ণ হল বোধ হয়-কে বলবে বলুন! স্টিমারে আমায় একজন বারণ করেছিল কিন্তু৷ অসম থেকে ফিরবার পথে ব্রহ্মপুত্রের ওপর স্টিমারে একজন বৃদ্ধ অসমিয়া ভদ্রলোককে ওখানা দেখাই৷ তিনি আমায় বললেন, 'এ কোথায় পেলেন আপনি? এ মিরি আর মিসমিদের কবচ, পশু এখানে মানুষের স্থান নিয়েচে, ওরা যখন অপরের গ্রাম আক্রমণ করতে যেত-অপরকে খুন-জখম করতে যেত-তখন দেবতার মন্ত্রপূত এই কবচ পরত গলায়৷ এ আপনি কাছে রাখবেন না, আপনাকে এ অমঙ্গলের পথে নিয়ে যাবে৷'
তখনও যদি তার কথা শুনি তাহলে কি আজ এমন হয়? তাই আপনাকে আমি বলচি, আমি তো গেলামই-ও কবচ আপনি আপনার কাছে কখনো রাখবেন না৷
জানকীবাবু চুপ করলেন৷ যে উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিলাম তা পূর্ণ হয়েচে৷ জানকীবাবুর মুখে কবচের ইতিহাসটা শুনবার জন্যেই আসা৷
বললাম-আমি যা করেচি, কর্তব্যের খাতিরে করেচি৷ আমার বিরুদ্ধে রাগ পুষে রাখবেন না মনে৷ আমায় ক্ষমা করবেন৷ নমস্কার!
বিদায় নিয়ে চলে এলাম ওর কাছ থেকে৷
* * *
যতদূর জানি-এখন তিনি আন্দামানে৷