সৌগত বসু

-প্রাককথন-
মুর্শিদাবাদের এক প্রত্যন্ত গ্রামের জমিদার বাড়িতে নিলাম বসেছে। সেই বংশের স্বর্ণময় গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলো মহাকালের গ্রাসে আজ সুদূর অতীত। বর্তমান শুধু অট্টালিকার জায়গায় জায়গায় কয়েকটা জরাজীর্ণ স্তম্ভ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা আগাছা এবং প্রায় ভেঙে পড়া সিংহদরজা। পাশেই ইন্ডিয়ান আর্মির ছোট্ট ক্যাম্প। সামনেই একটা সরষেখেতের ওপারে দেখা যাচ্ছে আরেকটা গ্রাম যা রাডক্লিফ সাহেবের সার্জারিতে বাদ পড়েছে ভারতের মানচিত্র থেকে।
জমিদার বংশের বর্তমান কুলপ্রদীপ তাঁদের সর্বস্ব জলের দরে বিকিয়ে দিয়ে নিজের মদ খাওয়ার পয়সা জোটাতে উৎসাহী। যে জমিদার বংশের কত কিংবদন্তির কথা গ্রামের লোকজন শুনে আসছে বংশানুক্রমে, আমেরিকার আনিস মদের ফোয়ারা ছুটত যাদের পালাপার্বণে, সেই বংশের অবশিষ্ট কিছু ব্যবহার্য জিনিসপত্র জলের দরে কিনে নেওয়ার এমন সুযোগ গ্রামবাসীরা ছাড়তে রাজি নয়। সেজবাতি, ঝাড়লন্ঠন, দেয়ালগিরি, বাঘের ছালের কার্পেট— সব এক এক করে বিকিয়ে গেল। এবার নিলামে উঠেছে একটি তরোয়াল যা দিয়ে শোনা যায় জমিদার বংশের পূর্বপুরুষরা বাঘ, িসংহী, ফিরিঙ্গি, এমনকী জলদস্যুর গলা পর্যন্ত ঘ্যাচাং ফুঁ করে উড়িয়ে দিতেন। গ্রামের কোন বীরপুঙ্গবের ঘরে এ জিনিস শোভা পাবে? পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে নিলামওয়ালা একশো টাকা অবদি দর নামিয়েছে, কিন্তু তাহলেও একজন গ্রামবাসীও হাত তোলে না। শেষে যাত্রাপার্টির একজন অধিকারীকে ধরে লোহার দরে সেই তরোয়াল বেচে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে হাজির হন এক যুবক। তিনি তরোয়ালটার দর হাঁকেন এক হাজার টাকা। গ্রামবাসীদের কথা বাদ দিলাম, সেই হাঁক শুনে চোলাই মদে ভাসমান জমিদার বংশের কুলপ্রদীপেরও নেশা ছুটে যায়। কত বছর পর কুলপ্রদীপ আবার স্বপ্ন দেখেন হুইস্কি খাওয়ার। কে এই ছেলেটি? গ্রামের লোকজনের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। জানা গেল ছেলেটির নাম সোমনাথ দাস।
সোমনাথ এই গ্রামেরই ছেলে। বাংলার ইতিহাস নিয়ে তাঁর বহু বছরের গবেষণা। বাবা ছোটোবেলায় আর মা বছর তিনেক হল গত হয়েছেন। সোমনাথই একমাত্র সন্তান। বিয়ে করেছেন বছরখানেক হল। কলকাতায় তাঁর বন্ধু আশুতোষ সিংহের বাড়িতে থেকেই তিনি তাঁর পড়াশোনা চালাচ্ছেন। আশুতোষের বাবার একটা স্কলারশিপ প্রোগ্রাম চলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই স্কলারশিপের আওতায় সোমনাথ বর্তমানে বাংলার ইতিহাস নিয়ে একটা নতুন গবেষণা করছেন। সোমনাথ এবং আশুতোষের মতো অভিন্নহৃদয় বন্ধু খুব একটা দেখা যায় না। তাঁদের আলাপ হয় গ্র্যাজুয়েশনের সময়। আশুতোষ িব কম অনাৰ্স। সোমনাথ তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে ইতিহাস নিয়ে মাস্টার্স তারপর পিএইচডি করেন। আশুতোষ গ্র্যাজুয়েশনের পর তাঁর বংশের ব্যাবসায় ঢুকে পড়েন। তিনি কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত বনেদি বংশের সন্তান। তাঁদের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি এবং বিভিন্ন ব্যাবসা থেকে যা আয় তার থেকে এখনও আশুতোষের বাড়িতে অনেক আশ্রিতর দু-বেলা অন্ন জোটে।
সোমনাথের স্ত্রী কুসুম অন্তঃসত্ত্বা। কুসুম গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। সোমনাথ তাঁর গবেষণা নিয়ে এমনই মেতে থাকেন যে কুসুমের যত্ন নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। কুসুমের তা নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাঁর কিছু শারীরিক অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছে। আশুতোষ তাঁর বন্ধুর ওপর ভরসা না রেখে নিজে উদ্যোগ নিয়ে কুসুমকে কলকাতার একজন বড়ো গাইনেকোলজিস্ট দেখিয়েছেন। কুসুমের এই মুহূর্তে দরকার পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম। সোমনাথ তাই তাঁদের মুর্শিদাবাদের গ্রামের বাড়িতে এসেছেন। এই কয়েক মাস তিনি কুসুমের কাছেই থাকবেন। কিন্তু সোমনাথের মতো খেপাটে মানুষ কতক্ষণই-বা সুস্থির হয়ে সংসারধর্ম পালন করতে পারেন। নিলামে সেই তরোয়াল কিনে আনার পর থেকে তাঁর নাওয়াখাওয়া ছুটে গেছে। তিনি প্রায় সারাদিন ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করে বেড়াচ্ছেন তাঁর বাড়ির উঠোনে। কুসুমকে তিনি বার বার বলছেন,
‘কুসুম, এর মূল্য ক-জন বুঝবে?’
এর দু-দিন পরের ঘটনা। সোমনাথের বাড়িতে সেদিন মা মনসার পুজো। গ্রামের প্রতিবেশীরা সব হাজির। একটা ছাই রঙের মার্সিডিজ বেন্জ সোমনাথের বাড়ির সামনে এসে থামে। তার থেকে নেমে এলেন এক মাড়োয়ারি। সোমনাথের বাড়িতে তখন নানান আত্মীয়ের সমাগম। লোকটি তাঁর নাম জানালেন— আমিরচাঁদ মিত্তল। তিনি এসেছেন সোমনাথের কাছে একটা বিশেষ প্রস্তাব নিয়ে। সোমনাথকে আমিরচাঁদ তাঁর লাস্ট অফার দিয়ে গেলেন— দশ লাখ। এর সঙ্গে এক সপ্তাহ সময়।
আমিরচাঁদ মিত্তল সম্পর্কে খোঁজখবর করে সোমনাথ জানতে পেরেছেন যে লোকটি মারাত্মক প্রভাবশালী। নানানরকম ঐতিহাসিক সম্পদের স্মাগলিং-এর সঙ্গে এই আমিরচাঁদ যুক্ত বলে সন্দেহ করা হয়। কিন্তু লোকটি এমনই ধূর্ত যে আজ পর্যন্ত কেউ ওঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ জোগাড় করতে পারেনি। ইতিহাসের ছাত্র সোমনাথ আমিরচাঁদ নামের মিল পায় পলাশির যুদ্ধের আরেক ষড়যন্ত্রকারীর সঙ্গে যাঁকে আমরা জানি উমিচাঁদ নামে। সোমনাথ বুঝতে পারেন যে তাঁর ওপর ক্রমাগত নজর রাখা হচ্ছে। নিজের থেকেও তাঁর বেশি চিন্তা শুরু হল কুসুমকে নিয়ে। এইসব লোকজনদের মায়াদয়া বলে কিছু নেই, নিজের আখের গুছোতে এরা সব পারে। সোমনাথকে কোনো-না-কোনো উপায় একটা বার করতেই হবে।
বহরমপুরে একটা মেজর ইলেকট্রিক কেবল ফল্ট হয়েছে। সেই লাইন সারাতে কমপক্ষে তিনদিন সময় লাগবে। এই সময়টুকুর জন্য পুরো বহরমপুরে লোডশেডিং থাকবে। বহরমপুর থেকে এই খবর নিয়ে এসেছেন সোমনাথের এক পিসতুতো বউদি সুলতা। সোমনাথের পিসতুতো দাদা নরেন ঘোষ ইলেকট্রিক সাপ্লাই অফিসের একজন সিনিয়র ইঞ্জিনিয়র। নরেনের নাজেহাল অবস্থা এই কয়েক দিনে। ফোন তুললেই সারাক্ষণ গ্রাহকদের গালাগাল খেতে খেতে বেচারা জেরবার হয়ে পড়েছেন। বাড়ি ফেরবার উপায় নেই, অফিসেই সারাদিন কাটাতে হচ্ছে, ওখানেই খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। তাই তাঁরই কথায় এই কয়েক দিন সুলতা তাঁর মেয়ে চুমকিকে নিয়ে সোমনাথের গ্রামের বাড়িতেই কাটাতে এসেছেন। দুই জায়ে মিলে এই কয়েক দিন বেশ ভালোই সময় কাটবে। কিন্তু সোমনাথের মাথায় খেলে গেল এক অদ্ভুত পরিকল্পনা। সেদিন গভীর রাতে কাউকে কিছু না জানিয়ে গ্রামের চোরাপথ ধরে সোমনাথ পাড়ি দিলেন বহরমপুরের উদ্দেশে।
সিআইডি অফিসার প্রণব সেন এক বিশেষ কাজে মুর্শিদাবাদ এসেছেন। তাঁর কাছে খবর আছে যে আমিরচাঁদ মিত্তল এখানে এসেছেন একটা ঐতিহাসিক সম্পদের খোঁজে। কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেলে একজন মার্কিন ব্যবসায়ীর সঙ্গে সেই সম্পদ নিয়ে আমিরচাঁদের প্রায় দশ কোটি টাকার ডিল হয়েছে। কী যে সেই সম্পদ সেই বিষয়ে প্রণবের কাছে সবিশেষ তথ্য নেই, শুধু এইটুকুই খবর আছে যে মুর্শিদাবাদের কোনো এক জায়গা থেকে সেই সম্পদ হাতাতে এসেছেন দুর্ধর্ষ স্মাগলার আমিরচাঁদ মিত্তল।
রাত এখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। প্রণব এখন একটা ডাকবাংলোয়। কলকাতায় এসটিডি করে প্রণব তাঁর সিনিয়র অফিসারের সঙ্গে কথা বলছেন। অফিসার তাঁকে কোনোভাবেই এই মিশনে এগোতে দিতে চাইছেন না। আমিরচাঁদের মতো বিত্তবান স্মাগলারদের অঙ্গুলিহেলনে অনেক বড়ো বড়ো নেতা মন্ত্রীরা ওঠাবসা করে। তাই আমিরচাঁদের গ্রেফতারের সম্ভাবনা দেখা দিতেই ওপরমহল থেকে ফোন আসা শুরু হয়ে গেছে। প্রণব কিন্তু একরোখা। তিনি আমিরচাঁদকে হাতেনাতে ধরতে বদ্ধপরিকর। এই নিয়েই প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে ফোনে চাপানউতোর চলছে। ঠিক এমন সময় মার্সিডিজ বেন্জটা এসে থামে ডাকবাংলোর বাইরে। দু-জন সহকারীকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে আসেন আমিরচাঁদ মিত্তল। গাড়ির ভিতরে বসে রইলেন আরেকজন।
ডাকবাংলোর লন পেরিয়ে আমিরচাঁদ এগিয়ে চলেছেন প্রণবের ঘরের দিকে। ফোনে কথা বলতে বলতে জানলা দিয়ে ডাকবাংলোর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মার্সিডিজ বেন্ জর দিকে নজর পড়ে প্রণবের। আমিরচাঁদ কি তাঁর কাছেই আসছেন নাকি? প্রণব যে তাঁকে ধাওয়া করেই এখানে এসেছেন, সেই খবর তাঁর কাছে নিশ্চয়ই পৌঁছে গেছে। প্রণবের মতো দুঁদে অফিসারেরও ভয়ে প্রাণ শুকিয়ে আসে।
ডাকবাংলোর পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাইরের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পালাচ্ছেন প্রণব। তাঁকে ধাওয়া করছেন আমিরচাঁদ এবং তাঁর সঙ্গীদের টর্চের এলোমেলো আলোর রেখা। পালাতে পালাতে প্রণব একটা ডোবার সামনে এসে আর পথ খুঁজে পান না। তাঁর পিছনে মূর্তিমান মৃত্যু। আমিরচাঁদের ভয়ংকর চোখ দুটো যেন অন্ধকার ভেদ করে তাঁকে গিলে খেতে আসছে। পর পর দুটো গুলির শব্দ। প্রণবের নিথর দেহ গড়িয়ে পড়ল ডোবার মধ্যে। লাল রঙে ঘোলাটে হয়ে উঠছে ডোবার জল। জঙ্গলের আরেক প্রান্ত থেকে একটা টর্চের আলো এসে পড়ে আমিরচাঁদের মুখে। আমিরচাঁদ সেদিকে তাকান। পরশু রাত থেকে সোমনাথ আমিরচাঁদের নজর এড়িয়ে বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিলেন।
সোমনাথ যেন ভূত দেখেছেন। পাগলের মতো তিনি ছুটতে থাকেন সেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। আমিরচাঁদ তাঁকে পিছু করতে করতে ক্রমাগত তাঁর সঙ্গীদের নির্দেশ দিয়ে যােচ্ছন, ‘কোই গোলি মত চালানা! কাঁহা লেকে গয়া মালুম করনা হ্যায় উসসে।’
ছুটতে ছুটতে জঙ্গল পেরিয়ে সোমনাথ হাইওয়ে ক্রস করতে যান, এমন সময় একটা ট্রাক ঝড়ের গতিতে ছুটে এসে সোমনাথকে উড়িয়ে দিয়ে চলে যায়।
নিথর সোমনাথের দেহ পড়ে আছে হাইওয়ের মাঝখানে। হতাশায় ফেটে পড়ে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটা নুড়ি পাথরে সজোরে লাথি মারেন আমিরচাঁদ মিত্তল। তাঁর সঙ্গীরাও হতাশ। সেই অমূল্য ধন কোথায় লুকিয়ে গেলেন সোমনাথ?
ত্বরায় চলিল তরি তিলেক না রয়।
চিৎপুর সালিখা এড়াইয়া যায়॥
কলিকাতা এড়াইলা বেনিয়ার বালা।
বেতড়েতে উতরিল অবসান বেলা॥
বালুঘাট এড়াইল বেনের নন্দন।
কালীঘাটে গিয়া ডিঙ্গা দিল দরশন॥
কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের বর্ণনায় ষোড়শ শতাব্দীর চণ্ডীমঙ্গলে ভাগীরথীর গতিপথের এই বর্ণনা পাওয়া যায়। সেই ভাগীরথীর দু-কূল জুড়ে দেওয়া বিদ্যাসাগর সেতুর ওপর দিয়ে একটি ভিন্টেজ অস্টিন গাড়ি চলেছে। গাড়ির চালক বৃষ্টির পাশে বসে তার ইউনিভার্সিটির এক বিশেষ বন্ধু সোহম। বৃষ্টি বাংলা নিয়ে মাস্টার্স করছে। সোহম ইতিহাসে মাস্টার্স শেষ করে পিএইচডি করতে চায়। বর্তমানে সোহম বৃষ্টির গাইডের ভূমিকা পালন করছে। এই কলকাতা শহর সবার খুবই চেনা। রোজই এর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাতায়াত করে হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু এই শহরের প্রতিটা রাস্তার যে ইতিহাস, কীভাবে সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কলকাতা— এই তিনটে গ্রাম মিলিয়ে আজকের কলকাতা গড়ে উঠেছে— সেই গল্পগুলোই সোহম বৃষ্টিকে বলছে।
‘বুঝলি বৃষ্টি, ঔরংজেবের মৃত্যুর সময় এই শহরের বাউন্ডারি ছিল পশ্চিমে ভাগীরথী, উত্তরে সুতানুটি, পূর্বে নোনা জলাভূমি বা খাল আর দক্ষিণে গোবিন্দপুর।’
‘সুতানুটি ঠিক কোন জায়গাটাকে বলা হয় রে সোহম?’ বৃষ্টি জিজ্ঞেস করে।
‘চল, তোকে নিয়ে যাই।’
তাদের গাড়ি এসে পৌঁছোয় বাগবাজারের খালের সামনে। এই বাগবাজার খাল থেকেই সুতানুটি শুরু। তাদের গাড়ি এবং সোহমের কমেন্ট্রি এবার চলতে থাকে চিৎপুর রোড ধরে যা বর্তমানের রবীন্দ্র সরণি।
‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন প্রথম ঘাঁটি গাড়ে তখন কলকাতা ছিল একটা বাণিজ্যিক উপনিবেশ। এই চিৎপুর রোড হচ্ছে কলকাতার আদি রাস্তা। শোনা যায় চিত্তে নামের এক ডাকাত দলের সর্দার বাগবাজারের চিত্তেশ্বরীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এই থেকেই এলাকার নাম হয়েছে চিৎপুর। একটা সময় এখানে নরবলি হত। এই পুরো এলাকাটা ছিল ঘোর জঙ্গল। জঙ্গলের ভিতরের এই রাস্তা ধরে কাপালিক আর সন্ন্যাসীরা কালীঘাট যেতেন।’
‘আচ্ছা সোহম, কালীঘাট মন্দির কবে প্রতিষ্ঠা হয়েছে জানিস?’
‘দেখ বৃষ্টি, কালীঘাট নিয়ে অনেক রকমের জনশ্রুতি শোনা যায়। ‘‘কালীক্ষেত্রদীপিকা’’ থেকে জানা যায় যে ফিফটিন্থ সেঞ্চুরির গোড়ার দিকে যখন দিল্লিতে পাঠানদের শাসন চলছিল, তখন কালীঘাটের আশেপাশে কিছু কিছু মানুষের বসতি শুরু হয়েছিল। চারপাশটা ছিল জঙ্গলে ঢাকা। সেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটা রাস্তা ছিল, এখন সেই রাস্তার নাম ‘‘রসা রোড’’। সেই রাস্তা দিয়ে তীর্থযাত্রীরা কালীঘাটে আসত। প্রথমে কুঁড়েঘরের একটা মন্দির ছিল যা ভেঙে ছোট্ট একটা পাকা মন্দির বানিয়ে দেন যশোরের রাজা বসন্ত রায়। মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা শোনা যায় সেই সময়েই, মানে সিক্সটিন্থ সেঞ্চুরির মাঝামাঝি। পরে বড়িশার রাজা সন্তোষ রায় এই মন্দিরকে সংস্কার করে বর্তমান রূপ দেন।’
‘তবে আমি যে শুনেছিলাম এই মন্দির সাবর্ণ চৌধুরীদের তৈরি?’
‘ঠিকই শুনেছিস। এঁদের বংশের পদবি পরে রায় থেকে রায়চৌধুরী হয়। গোত্র সাবর্ণ। এর থেকেই এই পরিবারকে আমরা পরে জানি সাবর্ণ চৌধুরী পরিবার বলে। তাঁদের জমিদারি ছিল উত্তরে দক্ষিণেশ্বর থেকে দক্ষিণে বাহুলা, যাকে আমরা এখন বেহালা বলি।’
‘হ্যাঁ রে সোহম, সুতানুটি নামটা কীভাবে এল?’
‘সুতোর লুটি— এই কথাটা থেকেই ক্রমে নাম হয়েছে সুতানুটি। এই সুতানুটি ছিল তন্তুবায় মানে তাঁতিদের বাসস্থান। সপ্তগ্রাম হয়ে একটা সময় বইত সরস্বতী নদী। তাই এত বড়ো একটা বন্দর গড়ে উঠেছিল সেখানে। কিন্তু ক্রমশ সরস্বতী নদী শুকিয়ে এল। জোব চাৰ্নক বা তাঁর আগের ডাচ বা পোর্তুগিজ বা আৰ্মেনিয়ান ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সপ্তগ্রাম ছেড়ে চলে আসে চার ঘর বসাক আর এক ঘর শেঠ। সুতানুটিতে ব্যাবসা জমে উঠল। হাট বসল।’
‘তার মানে এই শেঠ বসাকরা তাঁতি ছিল?’
‘নিজেরা তাঁতি হলেও এরা সুতো কিনে লোকাল তাঁতিদের বুনতে দিত।’
গাড়ি এখন চলেছে বড়োবাজার দিয়ে।
‘এই বড়োবাজার পর্যন্ত ছিল সুতানুটি।’ সোহম বলে। ‘মোটামুটি এই চত্বর থেকেই শুরু হত কলকাতা গ্রাম।’
বৃষ্টি বলে, ‘বাবার কাছে শুনেছি চৌরঙ্গিও কলকাতার খুব পুরোনো রাস্তা। তাই না?’
‘হ্যাঁ। প্রাচীনকালে এই চৌরঙ্গি অঞ্চলের জঙ্গলের মধ্যে নাথ সম্প্রদায়ের একজন বেশ নামকরা গুরু সাধক চৌরঙ্গি নাথ নাকি বসবাস করতেন। সেখান থেকেই চৌরঙ্গি নাম হয়েছে। আবার আরেকটা মত বলে চৌরঙ্গি নাথ নয়, তাঁর নাম চৌরঙ্গি গিরি। আবার অন্য মতে এখানকার দেবতার নাম ছিল চৌরঙ্গিনাথ। আবার আরেকটা মতে, এই জঙ্গলে দস্যুদের মধ্যে অনেক ইংরেজ বণিকরাও মিশে গিয়েছিল। সাধারণ মানুষদের কাছে ইংরেজরা ছিল ইঙ্গ-রাজ। চোর ইঙ্গ— সেখান থেকেই নাকি চৌরঙ্গি। চৌরঙ্গির জঙ্গল কাটা শুরু হয় পলাশির পর গড়ের মাঠে ইংরেজদের নতুন কেল্লা, মানে ফোর্ট উইলিয়াম বানানোর সময়। ১৮৭২-এ লেফটেন্যান্ট কর্নেল মার্ক উড কলকাতার যে ম্যাপ বানিয়েছিলেন তাতে ধর্মতলা থেকে পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত চৌরঙ্গির স্ট্রেচ ছিল।’
ময়দানের পাশ দিয়ে রেড রোড ধরে তাদের গাড়ি যাচ্ছে। কাস্টমস হাউস পেরোনোর সময় সোহম জানিয়েছিল যে কলকাতা গ্রামের এলাকা ছেড়ে তারা এবার গোবিন্দপুর গ্রামের এলাকায় ঢুকে পড়েছে।
‘ভাবতে পারিস, বৃষ্টি? এই জায়গার প্রায় সমস্তটা ছিল ঘন বনজঙ্গল, আর মধ্যে মধ্যে কিছু কুটির। জলবায়ু খুবই অস্বাস্থ্যকর ছিল, মহামারি লেগেই থাকত। এর থেকেই নাম হয়েছিল ধাপধারা বা ধ্যাদ্ধ্যারে গোবিন্দপুর। কলকাতার আদি বাসিন্দাদের মধ্যে পড়ে শেঠ আর বসাক, মানে যাদের কথা একটু আগে বললাম। শেঠদের আদিপুরুষ মুকুন্দরাম ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাস করতেন সপ্তগ্রামে। এঁদের গৃহদেবতা গোবিন্দজিউর নাম থেকেই গোবিন্দপুর নাম হয়েছে।’
গাড়ি ফোর্ট উইলিয়ামের পাশ দিয়ে যাচ্ছে।
‘এই ফোর্ট উইলিয়াম চত্বর জুড়ে তখন ছিল গোবিন্দপুর গ্রাম। ১৭৫৬ িখ্রস্টাব্দে সিরাজদ্দৌল্লা যখন কলকাতা দখল করে নেন তখন তিনি ইংরেজদের পুরোনো কেল্লা গুঁড়িয়ে দিয়ে যান। সেই কেল্লার একটা অংশ হচ্ছে বর্তমানের জিপিও। সিরাজের মৃত্যুর পর লর্ড ক্লাইভ এই গোবিন্দপুর চত্বরে তাঁদের দ্বিতীয় কেল্লা বানান যার জন্য এখানকার বাসিন্দাদের এই জায়গা ছেড়ে সুতানুটি যেতে হয়। এই গোবিন্দপুরের স্ট্রেচ ছিল এখনকার ভবানীপুর পর্যন্ত।’
সোহম আরও অনেক কিছু বলেই চলে। এর প্রতিটা কথাই যে বৃষ্টি মন দিয়ে শুনছে তা কিন্তু নয়। সে শুধু সোহমকে একটা অজুহাত দেয় এইসব গল্প বলার। সোহম তার পারিপার্শ্বিক সব কিছু ভুলে এমনভাবে এই গল্পগুলো বলে যেন সে নিজে এইসব ঘটনার সাক্ষী। তার দৃষ্টি তখন এতটাই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যে সেদিকে তাকিয়ে থাকলে বৃষ্টি কেমন যেন হিপনোটাইজড হয়ে পড়ে। সোহমের কণ্ঠস্বর মাঝে মাঝে এমনই উত্তেজিত হয়ে পড়ে যে আশেপাশের লোকজন তাদের দিকে তাকাতে বাধ্য হয়। মাঝে মাঝে রাস্তাঘাটে অদ্ভুত সব কাণ্ড বাধায় সোহম। ফেয়ারলি প্লেসের ফুটপাথের ওপর ব্রিটিশ আমলের একটা পেতলের পাত নাকি এখনও আছে যা পুরোনো কেল্লার সাক্ষ্য বহন করে। সেটা খুঁজতে একদিন সোহম ফুটপাথের ওপর এমন হুটোপাটি শুরু করেছিল যে অফিসফেরত রাস্তার লোকজন নির্ঘাত তাদের পাগল ভেবেছিল। তাই একদিকে যেমন এই মাত্রাতিরিক্ত পাগলামির জন্য মাঝে মাঝে সোহমকে বকাঝকা খেতে হয় বৃষ্টির কাছে, তেমনি আবার এই পাগলামির জন্যই বৃষ্টি পাগল। সে মনে মনে ভাবে, মেপেজুেপ তো আর পাগলামি করা যায় না।
বৃষ্টির বাবা আশুতোষ সিংহর পরিচয় পাঠক আগেই পেয়েছেন। আশুতোষের বয়স এখন পঞ্চাশের কোঠায়। এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে পঁচিশটা বছর। আশুতোষের স্ত্রী মারা গেছেন প্রায় বছর সাতেক হল। মা-মরা মেয়েটাকে ঘিরেই এখন তাঁর জীবন। বাবার যত্ন নিতে মেয়েরও কোনো খামতি নেই। আশুতোষের সামান্যতম প্রয়োজনও বৃষ্টির নজর এড়ায় না।
অস্টিন গাড়ি সিংহবাড়ির সামনে এসে থামল। বৃষ্টি নেমে এল গাড়ি থেকে। ড্রাইভারকে বলা আছে সোহমকে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে নামিয়ে দিতে। দিনের বেশিরভাগ সময়টা সোহম ওখানেই কাটায়।
সদর দরজার সামনেই বৃষ্টিকে ধরলেন সাক্ষীগোপাল।
‘আরে দিদিভাই! কলেজ হয়ে গেল বুঝি? বাঃ! তা সঙ্গে কেষ্ট ঠাকুরটি কে ছিল গাড়িতে?’
বৃষ্টি একটু বিরক্ত হয়েই বলে, ‘আমার কলেজের বন্ধু।’
সাক্ষীগোপাল বেশ মজা পেয়েছেন।
‘শুধুই বন্ধু? সিংহবাড়ির অস্টিন চড়ে বন্ধু চলে গেল, ব্যাপারটা কেমন যেন সন্দেহজনক!’
বৃষ্টি কথাটা এড়িয়ে চলে যায়। এই এক দোষ সাক্ষীগোপালের। অন্যের ব্যাপারে বড্ড নাক গলান।
এই ফাঁকে সাক্ষীগোপালের পরিচয়পর্বটা সেরে ফেলা যাক। বহু বছর ধরে সাক্ষীগোপাল এই পরিবারে আশ্রিত হয়ে আছেন। এই সিংহবাড়িতে সাক্ষীগোপালের মতো আরও আটটি আশ্রিত পরিবার আছে। তাদের সবার ভরণপোষণের দায়িত্ব আশুতোষের। সব ঘটনারই নাকি এক একজন সাক্ষী থাকে, ধরাধামে সাক্ষীগোপালের অবতীর্ণ হবার একমাত্র উদ্দেশ্যই নাকি এই সাক্ষী হয়ে থাকা। বাবা-মা আদর করে নাম রেখেছিলেন গোপাল, তাই বাড়ির সবাই বলে সাক্ষীগোপাল। আশুতোষের বাবার আমল থেকে তিনি এই বাড়িতে আশ্রিত হয়ে আছেন। বর্তমানে আশুতোষের যাবতীয় ফাইফরমাশ খাটা, বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্ব সাক্ষীগোপালের ওপর। ভদ্রলোকের বয়স ষাটের ঘরে। সম্পর্কে উনি বৃষ্টির এক অতি দূর সম্পর্কের পিসেমশাই। এতটাই দূর সম্পর্কের যে সেটা একটানা মুখস্থ উনি বলতে পারেন না।
সাক্ষীগোপালকে পেরিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকতে গেলেই বৃষ্টির সামনে পড়েন জবা পিসি— সাক্ষীগোপালের স্ত্রী। তিনি আলপনা দিচ্ছেন ঠাকুরদালানে। তাঁদের সঙ্গে আশুতোষের সম্পর্কটা একমাত্র এই জবা পিসিই মুখস্থ বলতে পারেন। জবা হলেন আশুতোষের আপন মাসতুতো ভাইয়ের আপন পিসতুতো বোনের ছোটো দেওরের সেজো পিসশাশুড়ি। এই বাড়ির আর সব আশ্রিতদের সঙ্গেও বৃষ্টিদের এমনই লতায়পাতায় আত্মীয়তা। বৃষ্টির ঠাকুরদার আমল থেকে এঁরা সব এখানেই আছেন।
জবা বৃষ্টিকে দেখেই তাঁর অভিযোগের ঝাঁপি খুলে বসেছেন।
‘হ্যাঁরে বৃষ্টি, তোর বাপের কী আক্কেল বল দিকিনি? তোর চাঁদুদার জানিস তো একটু অম্বলের রোগ আছে, তাই ওষুধ খেতে হয়। কাল রাতে বোধ হয় ওষুধটা একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছিল, তাই রাস্তায় নেমে একটু চেঁচামেচি করেছিল, খুব জোরে না, আস্তে আস্তে চেঁচিয়েছিল, অমনি মুখপোড়া পুলিশটা ওকে ধরে নিয়ে গিয়ে থানায় আটকে রেখেছে! আশুকে একটু বল না মা, ওর জামিনটার ব্যবস্থা করে দিতে।’
‘এবার নিয়ে ক-বার হল জবা পিসি?’
‘ওমা! সেই তো দু-হপ্তা আগে পুলিশে ধরেছিল, সেই তখন গিয়ে তোর বাবা ছাড়িয়ে এনেছিল। কই এর মধ্যে তো আর কিছু হয়নি! এক কাজ করলে হয় না? তোর বাবাকে বলে ওই মুখপোড়া কনস্টেবিল-টাকে সুন্দরবনে বদলি করে দেওয়া যায় না? পুলিশ কমিশন তো আশুর বন্ধু!’
বৃষ্টি হেসে বলে, ‘রজতকাকু পুলিশ কমিশন নয়, কমিশনার। দেখো জবা পিসি, বাবাকে এই নিয়ে আমি আর কিছু বলতে পারব না। বাবা খুব রাগারাগি করে। পরিবারের সম্মানহানি হয় এতে। চিন্তা কোরো না, এক দু-দিনের মধ্যেই চাঁদুদাকে ওরা ছেড়ে দেবে। তুমি চাঁদুদাকে এবার একটু বুঝিেয়া।’
বৃষ্টি বাড়ির ভেতরে চলে গেলেই সদর দরজায় সাক্ষীগোপালকে দেখতে পান জবা। পঁাচন-গেলা মুখ করে এই এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। নিরুপায় জবা গোপালের দিকে তাকান। গোপাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
‘কী আর করবে, গিন্নি! কালের অপার মহিমা। নাহলে আজ থেকে দেড়শো বছর আগে এই পরিবারের পূর্বপুরুষরা সারারাত মদ খেয়ে রাস্তার নর্দমায় গড়াগড়ি খেত। পুলিশের ঝুলি থাকত, যাতে করে সকাল বেলা এসব বেহেড মাতালদের তুলে নিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করা হত। তাদেরও আবার সম্মানহানি!’
জবা ঝাঁঝিয়ে ওঠে,
‘এই যে শোনো! আমার চাঁদু মদ খায় না, ওষুধ খায়— অম্বলের। ছেলেটা কি আমার একার? সকাল থেকে না খেয়ে লক-আপে বসে আছে। হাজারটা টাকা দিয়ে ছেলেটাকে ছাড়িয়ে আনতে পারছ না?’
গোপাল যেন কথাটা শুনতেই পাননি। অ্যাবাউট টার্ন করে তিনি ব্যস্তসমস্ত হয়ে রাস্তার দিকে হাঁটা দেন। জবা গজগজ করতে করতে বাড়ির ভেতরে যান, যদি আশুতোষকে বলে-কয়ে কিছু একটা ব্যবস্থা করা যায়।
ছেলের এই অতিরিক্ত আদর পেয়ে বাঁদর হওয়ার জন্য জবাকেই দায়ী করেন গোপাল। ছোটোবেলা থেকে ছেলের প্রতি অন্ধ আসক্তি জবার। বিয়ের প্রায় দশ বছর পরে পঞ্চানন ঠাকুরের কাছে মানত করে পাওয়া এই চাঁদু। তাই নিজে শাসন করা দুরস্ত, বাবা শাসন করতে গেলে তাঁকেও চুপ করিয়ে রাখতেন জবা। যে মানুষের নিজের খুঁটির জোর নেই, কুটুম্বের অন্নে যাঁকে খেয়েপরে বাঁচতে হয়, তাঁর শাসন করা সাজে না। ছেলের এই বখে যাওয়াটা বুকের মাঝে একটা গভীর ক্ষতচিহ্নর মতো গোপালকে সারাজীবন বহন করতে হচ্ছে। বনেদি বংশে আশ্রয় পেয়ে নানান ধরনের বড়োলোকি চাল ঢুকেছে চাঁদুর রক্তে। গোপালের সামনে সেসব বলার সাহস না পেলেও মা-কে দিয়ে সেসব আর্জি পেশ করা হয়। গোপাল এসব কথা শুনলেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। কী যে তাঁর লজ্জা লাগে লোকসমাজে চাঁদুকে নিজের ছেলে বলে পরিচয় দিতে!
বৃষ্টি বাবার ঘরে ঢুকে দেখে ব্লাড প্রেশারের ওষুধের পাতায় সকালে যতগুলো ট্যাবলেট দেখে সে বেরিয়েছিল এখনও ঠিক ততগুলোই আছে। এই নিয়ে প্রথমেই আশুতোষকে মেয়ের কাছে ধমক খেতে হল। এমন ধমক মাঝে মাঝে না খেলে আশুতোষের ভালো লাগে না। ধমকধামকের পালা শেষ হলে বাবাকে ওষুধ খাইয়ে বৃষ্টি এবার তার আর্জি পেশ করে।
‘বাবা, একটা কথা বলব?’
আশুতোষ বুঝতে পারে যে এটা কোনো বিশেষ আবদার। নাহলে মেয়ে বাবার থেকে কখনো কোনো কিছুর জন্য অনুমতি চায় না। আশুতোষ কৌতুকের নজরে বৃষ্টির দিকে তাকান। বৃষ্টি তার ছটফটে ভাবটা যতটা সম্ভব লুকোনোর চেষ্টা করে বলে, ‘বাবা, আমাদের ইউনিভার্সিটিতে দাদুর নামে যে স্কলারশিপ প্রোগ্রামটা চলে তাতে এ বছরের নমিনেশন তো এখনও হয়নি, তাই না?’
আশুতোষ বুঝতে পারেন মোদ্দা কথাটা। তিনি বলেন, ‘কাকে নমিনেট করতে হবে?’
বৃষ্টি ধরা পড়ে যাওয়াতে জোর করে তার উদ্দেশ্য লুকোবার চেষ্টা করে। ছেলেমানুষির একটা চকিত রেখা খেলে যায় বৃষ্টির সহজ সরল মুখের ওপর দিয়ে।
‘না না, আমি নিজে থেকে তোমাকে তো কিছু বলছি না! তুমি নিজে জাজ করো যে ক্যান্ডিডেট ডিজারভিং কি না।’
বৃষ্টি তার ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বার করে আশুতোষকে দেয়। আশুতোষ ফাইল উলটে দেখেন তাতে সোহম নামে একজন স্টুডেন্টের বিভিন্ন মার্কশিট। ‘সোহম’ নামটি আশুতোষের পূর্বপরিচিত। বৃষ্টির কাছে কতবার এই সোহমের গল্প তিনি শুনেছেন। একবার বলতে শুরু করলে আর থামতেই চায় না মেয়ে। আশুতোষ যথাসম্ভব গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললেন,
‘এই হচ্ছে সেই সোহম?’
বৃষ্টি একনিশ্বাসে বলে যায়,
‘জানো তো বাবা, নিজের চেষ্টায় ও এতখানি উন্নতি করেছে। বাংলার অনার্য জাতির ইতিহাস নিয়ে একটা রিসার্চ করতে চায় যার জন্য স্কলারশিপ লাগবে। তোমাকে তো বলেইছি যে ওর আর কেউ নেই, টিউশনি করে নিজের খরচা চালায়। বিশ্বাস করো বাবা, ও আমায় নিজে থেকে এই নিয়ে কিছুই বলেনি, আমিই তোমায় বলছি...’
আশুতোষ বুঝতে পারেন দরকারটা সোহমের থেকে বৃষ্টির বেশি। তিনি দক্ষ অভিনেতার মতো হাসি লুকিয়ে ছদ্মগাম্ভীর্য বজায় রেখে বলেন, ‘ছেলেটাকে একদিন বাড়ি নিয়ে আয়। বাজিয়ে দেখি জ্ঞানের ভাঁড়ারে কতটা জমিয়েছে।’
বৃষ্টি প্রায় নাচতে নাচতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার মুখটা থমথমে। সোহমের বিষয়ে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা কি তার এখনই জানিয়ে রাখা উচিত?
আশুতোষ সিংহর বাংলার আয়না নামে বইটা বাজারে বেস্টসেলারের মধ্যে ধরা হয়। বাংলার ইতিহাসের একটা বিশেষ অধ্যায় নিয়ে এই বই লেখা হয়েছে। এর থেকে একটা ডকুমেন্টারি বানাতে চায় এক তরুণী জাহ্নবী সেন। বেশ কয়েকদিন ধরেই এই ব্যাপারে আশুতোষের সঙ্গে জাহ্নবীর সিটিং চলছে। আজ তেমনই একটা দিন। জাহ্নবী একটা ভিডিয়ো ক্যামেরায় আশুতোষের বক্তব্য রেকর্ড করছে।
‘দেখো জাহ্নবী, পলাশির যুদ্ধের পর কিছু কিছু লোকজন যারা ইংরেজদের বা নবাবদের নায়েব বা মুনশি ছিল, তাদের নানান ধরনের দুর্নীতির কথা, কীভাবে ইংরেজদের তোষামোদ করতে করতে পুরো দেশটাকে তারা বিকিয়ে দিল— আমার মনে হয়েছে এই ইতিহাসটা বাংলার মানুষের জানা দরকার। যেমন তোমায় একজনের উদাহরণ দিই। পোস্তার রাজবংশের আদিপুরুষ লক্ষ্মীকান্ত ধর, যাঁকে লোকে চিনত নকু ধর নামে। ইনি জোব চাৰ্নকের সঙ্গে হুগলি থেকে সুতানুটিতে আসেন। নকু ধর ছিলেন একেবারে যাকে বলে ধনকুবের। পলাশির যুদ্ধের আগে তিনি লর্ড ক্লাইভকে আর্থিক সাহায্য করেন। আবার প্রথম মহারাষ্ট্র যুদ্ধের সময় উনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে নয় লক্ষ টাকা ধার দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। এই নকু ধরই শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণর সঙ্গে লর্ড ক্লাইভের প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন যার থেকে ক্রমশ নবকৃষ্ণর ভাগ্য খুলে যায়। সিরাজের হত্যার পর তাঁর কোষাগার লুট করে কে কত কামিয়েছিলেন তার হিসেব আমার বইতে দেওয়া আছে। ক্লাইভের মুনশি থেকে ক্রমশ কলকাতার রাজা হয়ে বসলেন নবকৃষ্ণ, উপাধি পেলেন ‘দেব’। শোনা যায়, কৃতজ্ঞতার বশে নবকৃষ্ণ পোস্তা রাজবাড়িতে কখনো জুতো পায়ে দিয়ে যেতেন না।’

‘মুসলমান নবাবদের নানান অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পেতেই তো সব হিন্দু রাজারা একত্রিত হয়ে সিরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রও তো ছিলেন সেই ষড়যন্ত্রে।’ জাহ্নবী বলে।
‘হ্যাঁ। আমার বইতে তুমি সব ডিটেলে পেয়ে যাবে। অনেক বনেদি পরিবারের দুর্নীতির কথা আমি এই বইতে লিখেছি।’
‘হ্যাঁ স্যার, আমি আপনার বই পড়েই এসব জেনেছি। তা এসব তথ্য তো সেসব বনেদি পরিবারের লোকজনদের অস্বস্তির কারণ হতে পারে। এই নিয়ে কোনোরকম আপত্তি আপনাকে শুনতে হয়নি?’
‘হয়েছিল তো বটেই। তবে আমি সেসব পাত্তা দিইনি। সত্যের সঙ্গে কোনো আপোশ করিনি বলেই হয়তো আজও বাংলার আয়না বেস্টসেলার।’
আশুতোষের মোবাইল বেজে ওঠে। জাহ্নবী ক্যামেরা বন্ধ করে। আশুতোষ ফোনটা রিসিভ করতে পাশের ঘরে যান। এই ফোনটা তাঁর বড়ো বিড়ম্বনার কারণ হয়ে উঠেছে। রাতের ঘুম কেড়েছে। তিনি কী করবেন সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠতে পারছেন না। ফোনটা ছেড়ে আশুতোষ বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দেন।
ইতিমধ্যে সাক্ষীগোপাল একটা কাগজের প্লেটে লুচি আলুরদম খেতে খেতে বৈঠকখানা দিয়ে যাচ্ছিলেন। সিংহবাড়ির সকালের জলখাবারে গাওয়া ঘিয়ের লুচি আর আলুরদম বাঁধাধরা পদ। লুচি খেতে খেতে সাক্ষীগোপাল গুনগুন করে গাইছিলেন। গানের প্রথম দু-লাইন জাহ্নবীকে আকৃষ্ট করে— ‘ওগো লুচি তোমার মান্য ত্রিভুবনে।’
জাহ্নবী সাক্ষীগোপালের দিকে কৌতূহলের নজরে তাকায়। তাদের দু-জনের মধ্যে আলাপ-পরিচয় ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছিল। গোপাল মানুষটিকে জাহ্নবীর খুব ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে প্রথম দিন থেকেই। পুরোনো কলকাতার কত গান জানেন এই সাক্ষীগোপাল। জাহ্নবী সময় পেলেই গোপালের থেকে সেসব গান শোনে। দুষ্প্রাপ্য তেমন কিছু পেলেই রেকর্ড করে নেয় গোপালের গলায়। তাঁর গানের গলাটাও মন্দ নয়। জাহ্নবীর কৌতূহল দেখে তিনি বলেন,
‘রসরাজ অমৃতলাল বোসের লেখা— লুচির মাহাত্ম্য নিয়ে। তোমার ছবিতে ব্যবহার করতে পারো।’
জাহ্নবী পুরো গানটা গোপালের গলায় রেকর্ড করে নিতে থাকে। গোপাল গাইছেন
ওগো লুচি তোমার মান্য ত্রিভুবনে
তুমি অরুচির রুচি মুখমিষ্টিসূচি
আমরা খাইয়ে ধন্য জীবনে
লুচি তোমার মান্য ত্রিভুবনে
সামাজিক শুভকার্য বিবাহ
তোমা বিনা কিছু হয় না নির্বাহ
পার্বণে-পূজায় রাজায়-প্রজায়
আনে তোমায় ভবনে
লুচি তোমার মান্য ত্রিভুবনে
তব কন্যার নাম কচুরি সুন্দরী
খাস্তা বলে আবার সর্বদা আদুরি
বড়োলোকের বাড়ি দেখি মারামারি
আমরা দেখতে পাইনে
লুচি তোমার মান্য ত্রিভুবনে
তব সহোদর ভাই রুটি ও পরোটা
আর যেজন জানে না বলে ‘পর-ওটা’
আর ডালপুরি বেটা সে যে তোমার জ্যাঠা
ভুলিব বলো কেমনে
লুচি তোমার মান্য ত্রিভুবনে
তব চাঁদসম পুত্র চাঁদসই খাজা
আর সহোদর ভগিনী হন পাঁপড়ভাজা
উপযুক্ত ভাগনে নাম জিভেগজা
ইচ্ছে করে যে বদনে
লুচি তোমার মান্য ত্রিভুবনে
গানটা শুনতে শুনতে জাহ্নবী বেশ মজা পাচ্ছিল। এমন সময় আশুতোষ ভেতরের ঘর থেকে বৈঠকখানায় ফিরে গোপালের দিকে একটু বিরক্ত হয়ে তাকান। গোপাল তাঁর গান থামিয়ে বৈঠকখানা ছেড়ে চলে যান। আশুতোষকে খুবই অস্থির লাগে জাহ্নবীর। সে আবার তার ক্যামেরা অন করতে যায়।
‘স্যার, তাহলে আমরা আবার শুরু করি?’
‘আমায় দু-লাখ টাকা দিতে হবে।’
আশুতোষের মুখে এমন কথা শুনে খুবই অদ্ভুত লাগে জাহ্নবীর। আশুতোষের সঙ্গে তার এই নিয়ে চার নম্বর সিটিং চলছে, এর মধ্যে কোনোদিনও টাকাপয়সার কথা আশুতোষ ওকে বলেননি। জাহ্নবী বলে,
‘স্যার, বাংলার আয়না-র মতো একটা বই নিয়ে কাজ করতে গেলে টাকাপয়সার ব্যাপার তো থাকেই, কিন্তু তাই বলে দু-লাখ টাকা!’
আশুতোষ জাহ্নবীর থেকে চোখ ফিরিয়ে নেন।
‘তোমার ডকুমেন্টারির জন্য আমি আমার মূল্যবান সময় ব্যয় করছি। আমার বহু বছরের গবেষণা করে পাওয়া অনেক অজানা তথ্য এই বইতে আছে। বাংলার আয়না-র মার্কেট ভ্যালু জানো?’
জাহ্নবী তার ক্যামেরা গুটোতে গুটোতে বলে,
‘ঠিক আছে স্যার, আমি দেখছি কতটা কী ম্যানেজ করতে পারি।’
জাহ্নবী ঘর থেকে চলে যাচ্ছিল, দরজায় সে বৃষ্টিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। বৃষ্টি কিছুক্ষণ আগে থেকেই তাদের কথোপকথন শুনছিল। অপ্রস্তুত বৃষ্টিকে জাহ্নবী ইশারায় অনুরোধ করে, যদি সে একটু ম্যানেজ করতে পারে।
আশুতোষ একটা স্কচের বোতল খুলে সোডা দিয়ে পেগ বানাতে থাকে। বৃষ্টি লক্ষ করেছে যে বাবার মদের মাত্রাটা ইদানীং বেড়েছে। ব্লাড প্রেশারের জন্য ডাক্তার মদ কন্ট্রোল করতে বলেছেন। বৃষ্টি টের পাচ্ছে যে আশুতোষ কিছু একটা অশান্তির মধ্যে আছে। বাবার হাত থেকে মদের গ্লাসটা কেড়ে নিয়ে সে বলে, ‘বাবা, জাহ্নবী একজন স্ট্রাগলিং ডকুমেন্টারি ফিল্্ম মেকার, এত টাকা সে কীভাবে দেবে? আর তা ছাড়া তুমি টাকার জন্য এমন করছ কেন? তোমার কীসের অভাব?’
‘প্রত্যেকটা মানুষের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য টাকার দরকার আছে। কারো পাঁচ দশ টাকা, কারো পাঁচ দশ লাখ টাকা।’
আশুতোষ অস্থির হয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে শুরু করেন। বৃষ্টির নজরে পড়ে শ্বেতপাথরের টেবিলের একপাশে পড়ে থাকা একটা চিরকুটের ওপর। সেটা তুলে নেয় সে, তাতে টাইপ করা লেখা— ‘গলায় ক্ষুর চালিয়ে লর্ড ক্লাইভের আত্মহত্যা।’
এই এক উৎপাত বেশ কয়েকদিন ধরে শুরু হয়েছে। মাঝে মাঝেই এমন এক একটা বেনামি চিঠি আসছে আশুতোষের কাছে আর তাতে এক একটা এমন অসংলগ্ন লেখা।
‘আবার একটা এসেছে? কে পাঠাচ্ছে তোমায় এইসব, কিছু বুঝতে পারছ?’
আশুতোষ নিরুত্তর। তিনি সোফায় বসে পড়েন।
বৃষ্টি তাদের বাড়ির চাকরবাকরের থেকে খোঁজ নেয়, কিন্তু কেউই এই ব্যাপারে বিশেষ কিছু বলতে পারে না। বাড়ির লেটার বক্সে মাঝে মাঝেই এমন এক একটা চিঠি পাওয়া যাচ্ছে। অগত্যা বৃষ্টি বাবাকে সান্ত্বনা দিতে বলে, ‘বাবা, আমার মনে হয় কেউ তোমার সঙ্গে মজা করছে। তুমি এগুলো নিয়ে অযথা টেনশন কোরো না।’
কথাটা বৃষ্টি বাবাকে বলল বটে, কিন্তু সত্যিই যে টেনশন করার মতো কিছু নেই, সেকথাও জোর দিয়ে বলা যায় না। সোহমের থেকে একটা অদ্ভুত ব্যাপার সে শুনেছে। সোহমকে বৃষ্টি এই সবকটা চিঠি দেখিয়েছিল। সোহমের বক্তব্য যে এগুলো সবই পলাশির যুদ্ধে সিরাজের সঙ্গে যারা ষড়যন্ত্র করেছিল, তাদের পরিণতির কথা জানিয়ে লেখা হয়েছে। সেই ষড়যন্ত্রকারীদের সকলেরই নাকি অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল। ইতিহাসের এ এক অদ্ভুত সমাপতন। যেমন প্রথম যে চিঠিটা এসেছিল তাতে লেখা ছিল— ‘মিরনের মৃত্যু বজ্রাঘাতে।’
শোনা যায় মিরজাফরের বড়োছেলে মিরনের মৃত্যু হয়েছিল বজ্রাঘাতে। এই মিরনের নির্দেশেই নাকি মহম্মদি বেগ ছুরি মেরে সিরাজকে হত্যা করেছিলেন।
দ্বিতীয় চিরকুটে লেখা ছিল— ‘ঘসেটি বেগমের জলে ডুবে মৃত্যু।’
ঘসেটি বেগম ছিলেন সিরাজের বড়োমাসি, নবাব আলিবর্দির বড়োমেয়ে। ঘসেটি বেগমের সঙ্গে হোসেনকুলি খাঁ নামে একজনের অবৈধ সম্পর্কের কথা কানে আসে সিরাজের। এমনকী সিরাজের মা আমিনা বেগমকে নিয়েও হোসেনকুলির সঙ্গে ঘসেটি বেগমের মনোমালিন্য শুরু হয়। হোসেনকুলিকে মুর্শিদাবাদের প্রকাশ্য রাজপথে খুন করা হয় সিরাজের নির্দেশে। মতিঝিলে ঘসেটি বেগমের কোষাগার লুট করেছিলেন সিরাজ। সিরাজের বিরুদ্ধে আরেকজন ষড়যন্ত্রী এই ঘসেটি বেগম। ছেলে এক্রামদ্দৌলার মৃত্যুর পর ঘসেটি বেগমের স্বামী নোয়াজেসেরও মৃত্যু হয়। রাজা রাজবল্লভ প্রথমে ঠিক করেছিলেন যে সিরাজকে সরিয়ে মসনদে বসানো হবে নোয়াজেসকে। নোয়াজেসের মৃত্যুর পর ঠিক করেন মসনদে বসানো হবে এক্রামদ্দৌলার শিশুপুত্রকে। আর পিছন থেকে রাজ্য শাসন করবেন ঘসেটি বেগম। সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করার পর মিরনেরই নির্দেশে ঘসেটি বেগমকে জলে ডুবিয়ে মারা হয়। ঘসেটি বেগমের সঙ্গে একই নৌকোয় ছিলেন সিরাজের মা আমিনা বেগমও। নদীতে তাঁদের নৌকো উলটিয়ে দিয়ে দু-জনকেই জলে ডুবিয়ে মারা হয়। নৌকোর পাটাতন ধরে ঘসেটি বেগম ওঠবার চেষ্টা করলে মিরন নাকি তাঁর হাত কেটে দেন।
তৃতীয় চিরকুটের লেখা— ‘গলায় ক্ষুর চালিয়ে লর্ড ক্লাইভের আত্মহত্যা।’
পলাশির যুদ্ধে ইংরেজদের দলপতি লর্ড ক্লাইভ শেষ বয়সে হতাশায় ভুগতেন । কলকাতায় থাকাকালীন তিনি রাইটার্স বিল্ডিং-এ নিজের ঘরে বসে টোটা ভরতি রিভলভার নিজের মাথায় ফায়ার করেছিলেন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে একটা গুলিও পিস্তল থেকে বেরোয়নি। এমন সময় তাঁর এক বন্ধু ঘরে এলে তিনি তাঁকে সেই পিস্তল থেকে জানলা দিয়ে বাইরে ফায়ার করতে বলেন। বন্ধুটি পরপর দুটো গুলি জানলার বাইরে ছোড়ে। ক্লাইভ অবাক। এই একই পিস্তল তো তিনি নিজের মাথায় চালিয়েছিলেন! ক্লাইভ তাঁর বন্ধুকে বলেছিলেন,
‘Well, I am reserved for something; That pistol, I have twice snapped at my own head.’
ইংল্যান্ডে ফিরে যাবার পর নিজের গলায় ক্ষুর চালিয়ে ক্লাইভ আত্মহত্যা করেছিলেন।
কিন্তু এসব কথা তার বাবাকে পাঠানোর কী মানে হতে পারে বৃষ্টির মাথায় ঢোকে না। সে বাবার কাছে শুনেছিল যে বাংলার আয়না বইটা প্রকাশ করার আগে বিভিন্ন লোকজনের থেকে কিছু আপত্তি এসেছিল, এমনকী কিছু হুমকি ফোনও। আশুতোষ সেসব পাত্তা না দিয়ে বইটা ছেপে বের করেছিলেন। তাদের মধ্যেই কেউ কি পাঠাচ্ছে এসব?
আমিরচাঁদ মিত্তলেরও বয়স এবং প্রতিপত্তি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে। তিনি বর্তমানে সমাজের একজন বেশ লব্ধপ্রতিষ্ঠ শিল্পপতি। সমাজের বিভিন্ন বড়ো বড়ো মাথাদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত ওঠাবসা। তাঁর ওপর কৃপাদৃষ্টি ‘মা লছমি’র ডিপার্টমেন্ট ছাড়িয়ে কুবেরের আওতায় পৌঁছেছে। আমিরচাঁদরা যুগে যুগে ধনকুবেরই হন। তার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের আইনকানুন, সুযোগসুবিধে সব কিছুর রিমোট কন্ট্রোল তাঁদের হাতে থাকে। সমাজের বড়ো বড়ো মাথারাও আমিরচাঁদদের চটাতে ভয় পায়।
আমিরচাঁদ সেদিন তাঁর বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের ছাদের সুইমিং পুলের পাশে শুয়ে সানবাথ নিচ্ছিলেন, হঠাৎ তাঁর ফোনে একটা হোয়াটসঅ্যাপ ঢোকে। তাতে একটা ছবি। একজন যুবক এবং যুবতী আউট্রাম ঘাটে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে ঝালমুড়ি খাচ্ছে। আমিরচাঁদ ছবিটার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। আরেকটা মেসেজ আসে— link verified। আমিরচাঁদের ঠোঁটের কোণে একটা ত্যাড়াবাঁকা হাসির ঝিলিক খেলে যায়। কী মতলব যে খেলছে এই শয়তানের মাথায় তা আমরা এই মুহূর্তে কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। তাই আপাতত আমরা চলে যাই সিংহবাড়িতে। সেখানে আজ প্রথমবার সোহম এসেছে।
সোহম আশুতোষের সামনে এসে দাঁড়ালে কিছুক্ষণের জন্য আশুতোষ এতটাই মোহিত হয়ে পড়েন যে তিনি সোহমকে বসার কথা বলতে ভুলে যান। বৃষ্টি সেই দেখে নিজে থেকেই সোহমকে বসিয়ে দেয় সোফায়। সে বুঝতে পারে প্রথম দর্শনেই তার বাবাকে কাবু করে ফেলেছে সোহম। কয়েকটা সৌজন্যমূলক কথাবার্তার পরেই আশুতোষ এক অদ্ভুত প্রশ্ন ছুড়ে বসেন,
‘হুতোম পেঁচার ক-টা টিকি ছিল জান?’
বৃষ্টি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। সে অবাক হয়ে বলে,
‘প্যাঁচার আবার টিকি হয় নাকি?’
আশুতোষ মিটিমিটি হেসে সোহমের দিকে তাকায়।
‘একান্নটা।’ সোহমের জবাব।
বৃষ্টি সোহমের দিকে অবাক হয়ে তাকায়। আশুতোষও সপ্রশংস নজরে সোহমের দিকে তাকিয়ে থাকেন। সোহম বলে,
‘হুতোম পেঁচা হচ্ছে কালীপ্রসন্ন সিংহর ছদ্মনাম। যেসব ব্রাহ্মণরা শিষ্যদের ঠকাত, মহিলাদের সর্বনাশ করত, মিথ্যে কথা বলত— সেইসব ব্রাহ্মণদের টিকি তিনি নিজে হাতে কেটে নিয়ে শোকেসে সাজিয়ে রাখতেন। এক একটা টিকির নীচে সেই ব্রাহ্মণের নাম, উপাধি আর তার অপরাধ লেখা থাকত। কালীপ্রসন্নর সংগ্রহে মোট একান্নটা এমন টিকি ছিল।’
বৃষ্টি প্রবল অবিশ্বাসের নজরে একবার সোহম আর একবার তার বাবার দিকে তাকায়। আশুতোষ তাঁর বসবার জায়গা ছেড়ে উঠে এসে সোহমের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেন,
‘ব্রাভো! তোমার স্কলারশিপ এন্ট্রান্স টেস্টের রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে। রেকর্ড মাৰ্কস পেয়ে তুমি পাশ করেছ!’
সোহম আশুতোষকে একটা প্রণাম করতে গেলে আশুতোষ তাকে বুকে টেনে নেন।
‘তুমি থাক কোথায়?’
‘ইউনিভার্সিটি হোস্টেলে।’
‘ওখানে আর তোমার থাকা চলবে না। তুমি এখন থেকে আমাদের বাড়িতেই থাকবে।’
সোহম ইতস্তত করতে থাকে, ‘না মানে, আমার তো কোনো অসুবিধে হচ্ছে না।’
‘আমার মুখের ওপর কেউ এভাবে কথা বলে না।’ আশুতোষ একটা মৃদু ধমক দেন, ‘আমার বাড়িতে অনেক গুড ফর নাথিং আশ্রিত হয়ে থাকে। তুমি থাকলে এ বাড়ির শোভা বাড়বে।’
আশুতোষ গোপালকে ডেকে দোতলার দক্ষিণের ঘরটা পরিষ্কার করার হুকুম জারি করে দেন। আজ থেকেই সোহম ওই ঘরে থাকবে। বৃষ্টি আনন্দে প্রায় লাফিয়ে ওঠে। সোহমকে সে টানতে টানতে বাড়ির শোভা বাড়াতে নিয়ে যায়। বৃষ্টি ঠিক করে যে সে আজই সোহমের সঙ্গে ওর হোস্টেলে গিয়ে সব ব্যাগেজ গুছিয়ে নিয়ে চলে আসবে।
বৃষ্টি আর গোপালের সঙ্গে সোহম দোতলায় উঠল। বৃষ্টির মাত্রাছাড়া উচ্ছ্বাস গোপালের মতো সাক্ষীর নজর এড়ায় না। তিনি বলেন,
‘যাক, হরি ঘোষের গোয়ালে তাহলে আরও একটা নতুন গোরু ঢুকল।’
সাক্ষীগোপালের এমন এক একটা বেয়াড়া কথাবার্তা বৃষ্টির একদম পছন্দ নয়। এর জন্য মাঝে মাঝেই গোপালকে আশুতোষের কাছে ধমক খেতে হয়। বৃষ্টি বলে,
‘কী যা তা বলছ সাক্ষীগোপাল?’
‘যা তা কিছু বলেননি উনি।’ সোহম বুঝিয়ে বলে বৃষ্টিকে,
‘হরি ঘোষ হচ্ছেন কলকাতার আদি বাসিন্দাদের মধ্যে একজন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান হয়ে কাজ করে অনেক সম্পত্তি করেছিলেন। সেই সম্পত্তির বেশিরভাগই তিনি দানধ্যানে ব্যয় করে দিয়েছিলেন। অনেক বেকার, অজ্ঞাতকুলশীল লোকজন তাঁর বাড়িতে আশ্রয় পেত। তাই বাড়িতে সারাক্ষণ শোরগোল লেগেই থাকত। হরি ঘোষের বাড়ির রান্নাঘরে দিনরাত রাবণের চিতার মতো উনুন জ্বলত। আর যে যেখান থেকে যেকোনো সময়ে আসুক না কেন, তার জন্য সবসময় সেখানে অন্ন ব্যঞ্জন প্রস্তুত। সেই থেকেই যে বাড়িতে অনেক লোকজন থাকে তাকে ‘‘হরি ঘোষের গোয়াল’’ বলা হয়। এই বাড়িরও তো মনে হচ্ছে একই অবস্থা।’
সোহম বাড়িতে ঢুকতেই দেখেছিল কত পরিবার এখানে আশ্রিত হয়ে আছে, কত রকমের লোকজনের আনাগোনা। আজ থেকে সেও এই আশ্রিতর লিস্টে নতুন সংযোজন।
সোহমের জ্ঞানের বহর দেখে তাক লেগে গেছে সাক্ষীগোপালের। তিনি বৃষ্টিকে বলেন,
‘বাবা! এ ছোঁড়া যে দেখছি এক কাটি বাড়া!’
দক্ষিণের যে ঘরটা সোহমের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে, তার সামনে তারা এসে পৌঁছোয়। চাবির গোছা থেকে একটা নির্দিষ্ট চাবি বেছে নিয়ে গোপাল সেই ঘর খুলে দেন। এই গোছায় প্রায় খান পঞ্চাশেক চাবি আছে। কোনটা কোন ঘরের চাবি সেটা সাক্ষীগোপাল যে কী করে একবার দেখেই বুঝে যান তা কিছুতেই ভেবে পায় না বৃষ্টি। সোহম ঘরের ভেতর ঢুকে চারপাশ দেখতে থাকে। এমন আলোবাতাস খোলা ঘর কি কারো অপছন্দ হতে পারে? বিশেষ করে সোহম যে পরিবেশে বড়ো হয়ে উঠেছে, ওর কাছে তো এ ঘর স্বর্গ। বৃষ্টির কাছে তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। সোহম বৃষ্টিকে বারণ করেছিল তার হয়ে ওর বাবার কাছে কোনোরকমের সুপারিশ করতে, কিন্তু তাও সে কথা শোনেনি। অবশ্য সোহমের ক-টা কথাই-বা বৃষ্টি শোনে। বৃষ্টির যেটা ঠিক মনে হবে সেটাই করবে।
ইতিমধ্যে গোপাল বাড়ির এক চাকরকে ডেকে ঘরটা সাফসুফ করতে বলে দিয়েছেন। বৃষ্টিকে এক ফাঁকে আড়ালে ডেকে নিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেন,
‘দিদিভাই, এর বংশ পরিচয়-টরিচয় ... সব ঠিক আছে তো? বনেদি বনেদি না মিললে যে প্রজাপতি উড়বে না মা!’
‘আমাদের প্রজাপতি আমরা ঠিক উড়িয়ে নেব সাক্ষীগোপাল! তুমি ঘরটা তাড়াতাড়ি রেডি করিয়ে দাও।’
প্রজাপতির মতোই উড়ে চলে গেল বৃষ্টি। সোহমকে সে এখন পুরো বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাবে। জীবনের প্রবল অনিশ্চয়তার খেলায় খেলতে নামা এই জুটিকে দেখে বহুদিন আগে শোনা ধনঞ্জয় ভটচাযের একটা গানের কথা মনে পড়ে সাক্ষীগোপালের:
ভুল করে তুই চিনলি না তোর প্রেমিক শ্যামরায়
ঝাঁপ দিলি তুই মরণ যমুনায়
বৃষ্টি সোহমকে নিয়ে বাড়ির ঠাকুরদালানে এসেছে। সিংহবাড়ির লক্ষ্মীপ্রতিমা প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো। পুজোর সময় অনেক বহুমূল্য গয়নাগাটি দিয়ে এই প্রতিমা সাজানো হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে দুর্মূল্য যে গয়নাটি সেটি হচ্ছে একটি নাকছাবি। কয়েকটি খুবই দুর্মূল্য হিরে দিয়ে তৈরি এই নাকছাবি। ওয়ারেন হেস্টিংসের থেকে এই নাকছাবি উপহার পেয়েছিলেন সিংহ বংশের এক পূর্বপুরুষ। লক্ষ্মীপ্রতিমা ছাড়াও ঠাকুরদালানে আরও অনেক পুরোনো দিনের ছবি আছে। সেসব ক্যামেরাবন্দি করছে জাহ্নবী। সোহম আর বৃষ্টিকে দেখে সে থেমে যায়। বৃষ্টি সোহমের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয় জাহ্নবীর।
‘জাহ্নবী সেন। ফিল্্মমেকার। বাবার বাংলার আয়না বইটা আর আমাদের পরিবার নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি করতে চায়। আর এ আমার বন্ধু সোহম। বাংলার ইতিহাস নিয়ে রিসার্চ করছে। এখন থেকে আমাদের বাড়িতেই থাকবে।’
জাহ্নবী সেই শুনে খুব উৎসাহিত হয়ে সোহমকে বলে,
‘আমার ডকুমেন্টারিতে কলকাতা আর বাংলার ইতিহাসের বেশ কিছু এপিসোড রাখব ভাবছি। আপনার হেল্প পেতে পারি?’
সোহম লাজুক হেসে যথাসম্ভব নিজের জ্ঞানের গর্বকে ঢাকার চেষ্টা করে।
‘যতটুকু জানি নিশ্চয়ই জানাব আপনাকে।’

বৃষ্টির বন্ধুবান্ধবদের সামনেও মাঝে মাঝে সোহম এমন বিনয়ী হওয়ার চেষ্টা করে। এই সময়গুলোতে সোহমকে দেখে বৃষ্টির খুব হাসি পায়। জাহ্নবী সেই শুনে খুব উৎসাহী হয়ে বলে, ‘এই যেমন ‘‘কলকাতা’’ নামটা কীভাবে এসেছে সেটা আমি এখনও পর্যন্ত ঠিক জানতে পারিনি...’
‘দেখুন এই নিয়ে অনেকগুলো মত আছে।’ জাহ্নবীর কথাটা লুফে নেয় সোহম।
‘সবথেকে জনপ্রিয় যে মত সেটা বলে কালীঘাট বা কালীক্ষেত্র কথাটা ভেঙেই কলকাতা নাম এসেছে। একজন ডাচ পরিব্রাজকের মত ছিল যে দস্যুদের অত্যাচারে এই এলাকা আগে ছিল ‘‘গল-গথা’’ মানে মানুষের মাথার খুলিতে ভরা। সেখান থেকেই কলকাতা। আবার আরেকজন ওলন্দাজ পরিব্রাজকের মতে ‘গোলগাথা’ শব্দ থেকে এসেছে কলকাতা নাম। বর্ষাকালে এক প্রকার রোগ হয়ে অনেক ইয়োরোপীয়র মৃত্যু ঘটিয়েছিল। সেই থেকে কুসংস্কারবশত এই এলাকাকে ‘‘গোলগাথা’’ মানে অপয়া জায়গা বলা হত। আবার রাজা রাধাকান্ত দেবের মত হচ্ছে কলকাতা নাম এসেছে ‘‘কিলকিলা’’ থেকে। হুগলি, বাঁশবেড়িয়া, খড়দহ, শিয়ালদহ— এই সবকটা জায়গা ছিল এককালে কিলকিলা নামে একটা প্রদেশের অন্তর্গত। এ ছাড়া একটা মজার গল্পও আছে। একবার এক ঘেসুড়েকে দেখে একজন সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘What place is this?’’ ঘেসুড়ে ইংরেজি বুঝতে না পেরে ভাবে যে সাহেব তার নধর ঘাসগুলো দেখে জিজ্ঞেস করছেন কবে কাটলে। ঘেসুড়ে জবাব দেয়— ‘‘কাল কাটা।’’ সাহেব সেইমতো জায়গাটার নাম তঁার ডায়েরিতে লিখে নিলেন ‘‘KALKATA’’। এসবের মধ্যে সবথেকে বিশ্বস্ত মত বলে যে ‘‘কলিকাতা’’ একটা খাঁটি বাংলা শব্দ। এর মানে ‘‘কালি’’ বা কলি-চুনের জন্য ‘‘কাতা’’ বা শামুক পোড়া। প্রায় দেড়শো বছর আগেও কলকাতার অনেক অঞ্চল জুড়ে ছিল চুনারিদের একটা বিশাল পাড়া। বর্তমান স্ট্র্যান্ড রোডের ওপর দিয়ে তখন গঙ্গা বইত আর চুনার পাড়া ছিল গঙ্গাতীরের খুব কাছেই...’
বৃষ্টি বুঝতে পারে যে এবার সোহমকে থামাতে হবে।
‘সোহম, আজ এই অবদিই থাক। তুই তো এখানেই থাকবি, পরে নাহয় ঠান্ডা মাথায় এক একটা মত জাহ্নবীকে বুঝিয়ে বলিস।’
সোহম বুঝতে পারে যে সে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। আসলে ইতিহাসের কথা বলতে গেলে ওর কোনো মাত্রাজ্ঞান থাকে না। জাহ্নবীও কেমন যেন ঘাবড়ে গিয়েছিল এই এতগুলো মতের জগাখিচুড়িতে। সেও বোধ হয় স্বস্তি পেল একটু।
বলা হয়নি, এর মধ্যে আশুতোষ জাহ্নবীকে ফোন করে সেদিনের দুর্ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন। জাহ্নবীকে তিনি এ বাড়িতে থেকেই তার বাকি কাজটা শেষ করতে বলেছেন। জাহ্নবীও রাজি হয়ে গেছে।
আজ দিনটা সত্যিই ভালো। গোপালের ছেলে চাঁদুকে পুলিশ কনস্টেবল বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে গেছে। এই কনস্টেবলের সঙ্গে জবার বেশ একটা স্নেহের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। জবা প্রথমে কনস্টেবলের চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করেন, তারপর তাকে ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে সেদিনের যা বিশেষ পদ রান্না হয়েছে তা খাওয়ান। এবার যেমন ধোকার ডালনা খেয়ে কনস্টেবল বিদায় নিল কিছুক্ষণ আগে। প্রত্যেকবার যাওয়ার সময় কনস্টেবলকে জবা শাসান, ‘ফের যদি আমার চাঁদুর দিকে হাত বাড়াবি তো ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেব।’
কিন্তু কয়েকদিন পর আবার যে কে সেই। এ এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা সিংহবাড়ির। তবে চাঁদু ছেলেটা মাতাল হলেও মনের দিক থেকে ভালো। এই কথাটাই সোহমকে এতক্ষণ গল্প করে বুঝিয়ে বলছিল বৃষ্টি। চাঁদুর নানান কাণ্ড আর সাক্ষীগোপাল কীভাবে ছেলেকে শাসন করেন, সেই শুনে সোহম খুব হাসে। থানার ওসির হাতে আইফোন দেখে চাঁদুর একবার শখ হয়েছিল। আইফোনের আর্জি জবার মারফত গোপাল অবদি পৌঁছেছিল। তাতে গোপাল চাঁদুর গালে একটা থাপ্পড় মেরে বলেছিলেন,
‘গাছপাঁঠার হাতে আইফোন! কঙ্কালেরও আবার ফ্রেঞ্চ কাট!’
সিংহবাড়ির আরেক আশ্রিতর নাম বলরাম। বলরাম সারাদিন ধরে হাইকোর্টে কাটান। তাঁর জীবিকা টাকাপয়সার বিনিময়ে বিভিন্ন মামলায় সাক্ষী দিয়ে বেড়ানো। বলরামকে হঠাৎ আজ বিকেলে বাড়ির লেটার বক্স খুলে কিছু চিঠিপত্র ঘাঁটতে দেখার সাক্ষী হলেন সাক্ষীগোপাল।
দু-দিন হল সোহম সিংহবাড়িতে এসেছে। তার এখানে থাকতে বেশ ভালোই লাগছে। বৃষ্টি তো সবসময় আছেই, এ ছাড়া বাড়িতে বসবাস করা এতরকমের লোকজন দেখে, তাদের সঙ্গে কথা বলে সোহমের বেশ সময় কাটছে। এই যেমন একজন আশ্রিত বিকাশবাবু। তিনি বাংলার বিভিন্ন প্রবাদবাক্যের একটা সংকলন করছেন। কত অজানা প্রবাদ যে সোহম তাঁর থেকে জানল। এই যেমন ‘বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ’ কথাটা সবাই শুনেছে, কিন্তু সেই তেরো পার্বণ কী কী? সেসব নিয়ে যে এমন সুন্দর একটা ছড়া আছে তা সোহম এই বিকাশবাবুর থেকেই প্রথম জানল:
চৈত্রমাসে চড়ক পূজা গাজনে বাঁধ ভারা (১)
বৈশাখ মাসে দেয় সকল তুলসীগাছে ঝারা (২)
জ্যৈষ্ঠমাসে ষষ্ঠীবাঁটা জামাই আনাআনি (৩)
আষাঢ় মাসে রথযাত্রা দড়া টানাটানি (৪)
শ্রাবণ মাসে ঢেলাফেলা হয় চড়চড়ি (৫)
ভাদ্র মাসে টকপান্তা খান মনসা বুড়ি (৬)
আশ্বিনে অম্বিকা পূজা কাটে মোষ পাঁঠা (৭)
কাৰ্তিকে কালিকা পূজা (৮) ভাইদ্বিতীয়ার ফোঁটা (৯)
অঘ্রানে নবান্ন নূতন ধান কেটে (১০)
পৌষ মাসে বাউনি বাঁধা ঘরে ঘরে পিঠে (১১)
মাঘ মাসে শ্রীপঞ্চমী ছেলের হাতেখড়ি (১২)
ফাল্গুন মাসে দোলযাত্রা ফাগ ছড়াছড়ি (১৩)
সোহম বরাবরই অন্তৰ্মুখী, নিজের পড়াশোনা নিয়েই থাকতে ভালোবাসে। কিন্তু তাই বলে সে একেবারেই উন্নাসিক নয়, আসলে কথা বলার মতো লোকের খুব অভাব ছিল তার আশেপাশে। তাই তার যাবতীয় কথার একমাত্র শ্রোতা ছিল বৃষ্টি। এ বাড়িতে এসে সোহম আরও কয়েকজন এমন লোক পেয়েছে যাদের সঙ্গে কথা বলতে তার রীতিমতো ভালো লাগে। তার মধ্যে সর্বপ্রথম স্থান পেয়েছেন সাক্ষীগোপাল। ভদ্রলোকের মারাত্মক রসবোধ সোহমকে মজিয়েছে। সাক্ষীগোপালের জীবনটা এমনিতে খুব একটা সুখের বলে মনে হয় না সোহমের। কারো একমাত্র ছেলে যদি এভাবে বখে যায় সুখ আর তিনি কীভাবে পাবেন! কিন্তু কী অদ্ভুত ক্ষমতায় রসিকতার একটা প্রলেপে ভদ্রলোক তাঁর যাবতীয় দুঃখ লুকিয়ে রাখেন।
‘আমার এই বাংলার আয়না বইটার ব্যাপারে আমি আমার এক বন্ধুর কাছে ঋণী।’
আশুতোষের ঘরে সোহম আর বৃষ্টি বসে কথা বলছে। আশুতোষ বাংলার আয়না বইটা খুলে সোহমের হাতে দেন। দেখা যায় বইটা উৎসর্গ করা হয়েছে সোমনাথ দাস নামে এক ব্যক্তিকে।
‘আমার প্রাণের বন্ধু এই সোমনাথ।’ আশুতোষ বলেন, ‘আমাদের এই বাড়িতেই থাকত। বাবার স্কলারশিপ প্রোগ্রামে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চ করত বাংলার ইতিহাস নিয়ে। বিভিন্নভাবে আমায় ও সাহায্য করেছিল তথ্য দিয়ে। বাংলা এবং কলকাতা সম্পর্কে এত ভালো নলেজ আমি আর কারোর দেখিনি। বিভিন্ন লোকজনের থেকে তথ্য জোগাড় করতে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে বেড়াত।’
সোহম বলে, ‘ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করা যায় কোনোভাবে? মানে আমার অনেক কিছু জানার ছিল।’
আশুতোষ ম্লান হেসে বলেন, ‘পঁচিশ বছর হয়ে গেল, সোমনাথ একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে।‘ আশুতোষ কিছুক্ষণ থুম মেরে বসে থাকেন। তারপর তিনি বলেন,
‘তোমায় যে সেদিন হুতোম পেঁচার টিকির কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার একটা বিশেষ কারণ আছে। সোমনাথের মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ও আমায় একবার ফোন করেছিল। আমার জন্মদিন উপলক্ষ্যে ও আমায় একটা গিফট দেবে বলেছিল। গিফটটা কিন্তু এমনিতে পাওয়া যাবে না। ও মুর্শিদাবাদ থেকে আমায় একটা চিঠি পাঠিয়েছিল যাতে লেখা আছে একটা ধাঁধা। সেই ধাঁধার সমাধানে নাকি বাংলার এক ঐতিহাসিক সম্পদের হদিশ পাওয়া যাবে। কী যে সেই সম্পদ, আমি কিছুই জানি না।’
সোহম উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে থাকে। আশুতোষ তাকে অপেক্ষা করতে বলে উঠে গিয়ে তাঁর দেরাজ থেকে একটা পোস্টকার্ড বার করে দেখান। তাতে লেখা,
সেই পথের ঠিকানা স্ত্রী যেথায় সাজে
হুতোম পেঁচার টিকি যত শোকেসে বিরাজে
পাবে হদিশ সেইখানেতেই খোঁজ নিরন্তর
হেস্টিংসের প্রত্যাঘাত পাঁচ আট পঁচাত্তর
আশুতোষ বলেন,
‘দেখো, এই চিঠির মাথামুন্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। হুতোম পেঁচার টিকির ব্যাপারটা যখন তুমি জানো তাই আমি ভাবলাম যদি তুমি এই বাকি লাইনগুলোর কিছু মানে বার করতে পারো। তাহলে অন্তত বন্ধুর শেষ উপহারটুকু আমার ভাগ্যে জোটে।’
সোহম লেখাটার দিকে তাকিয়ে থাকে আনমনে। সে জিজ্ঞেস করে,
‘আচ্ছা, এইখানে যে ‘‘স্ত্রী যেথা সাজে’’ বলা হয়েছে, তার মানে কি আপনার স্ত্রীর কথা বলা হয়েছে বলে আপনার মনে হচ্ছে?’
‘দেখো, আমার স্ত্রী মারা গেছেন প্রায় সাত বছর হল। ওঁর সাজার জায়গা বলতে যেসব দোকান থেকে ওঁর শাড়ি বা গয়না আসত সেখানে আমি খোঁজ করেছি। তারা কেউই এই ধাঁধার মাথামুন্ডু কিছু বুঝে উঠতে পারেনি।’
সোহম লেখাটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে নিজের মনেই বলে ওঠে, ‘ইন্টারেস্টিং!’
আশুতোষের দেওয়া এই ধাঁধা সোহমের কাছে এল একটা নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে। এর সমাধান বার করতে দিনরাত এক করে সে চেষ্টা শুরু করল। ইউনিভার্সিটিতে থিসিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে আরও বেশি করে সময় কাটাতে শুরু করল লাইব্রেরিতে। বৃষ্টির হল মুশকিল। কোথায় সে ভেবেছিল সোহম বাড়িতে আসাতে তারা দু-জনে আরও বেশি সময় একসঙ্গে কাটাতে পারবে, কিন্তু তার বাবা যে এমন ভূত সোহমের ঘাড়ে চাপাবেন তা সে জানত না। আশ্চর্যের ব্যাপার যে বৃষ্টিও সোমনাথ দাসের পাঠানো এই চিঠিটার ব্যাপারে এতদিন কিছুই জানত না। এই কথাগুলোর যে আদৌ কোনো মানে থাকতে পারে, সে-বিষয়েও তার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু সেকথা সোহমের কানে ঢোকে না। লাইব্রেরি থেকে বাংলার ইতিহাসের কয়েকটা নতুন মোটা মোটা বই সোহম নিয়ে এসেছে। টানা দু-রাত জেগে সোহম সেগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করেছে।

‘হেস্টিংসের প্রত্যাঘাত পাঁচ আট পঁচাত্তর’— এই লাইনটার মানে বার করে ফেলেছে সোহম।
সিংহবাড়ির ছাদে বসে আছে সোহম আর বৃষ্টি। এখন সকাল সোয়া আটটা। আজ রবিবার, তাই বাড়িতে ছুটির আমেজ। বৃষ্টি ছুটির দিনে ন-টার আগে বিছানা ছেড়ে ওঠে না। কিন্তু আজ আটটা বাজতে-না-বাজতেই সোহম তাকে ঘর থেকে বের করে ছাদে নিয়ে এসেছে। ঘুমে জড়িয়ে আসা চোখ কোনোমতে খুলে রেখে বৃষ্টি শুনছে সোহমের লেকচার।
‘এখানে মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসির কথা বলা হয়েছে। নন্দকুমার ছিলেন কোম্পানির অধীনে একজন দেওয়ান। তাঁর দায়িত্ব ছিল বর্ধমান, হুগলি আর নদিয়ার রাজস্ব আদায় করা। ওয়ারেন হেস্টিংসকে সরিয়ে নন্দকুমারকে এই পদে বহাল করা হয়েছিল ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে। ওই একই বছরে নন্দকুমারকে ‘‘মহারাজ’’ উপাধি দিয়েছিলেন মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম। ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস আবার বাংলার গভৰ্নর জেনােরল হয়ে এলেন। তখন হেস্টিংসের দুর্নীতির দিকে স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস আর কাউন্সিলের অন্যান্য লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন নন্দকুমার। উনি অভিযোগ করেন যে হেস্টিংস তাঁকে খুব বড়োসড়ো অঙ্কের ঘুস দিতে চাইছেন। এর প্রত্যাঘাতে ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস নন্দকুমারের বিরুদ্ধে জালিয়াতির চার্জ আনেন। নন্দকুমারের বিচার করেন ভারতের প্রথম চিফ জাস্টিস এলিজা ইম্পে। শোনা যায় যে এই ইম্পে এবং হেস্টিংস স্কুলের বন্ধু ছিলেন। তাই বেশ কিছু ঐতিহাসিকদের মতে মহারাজ নন্দকুমারকে অন্যায় বিচারে ফাঁসির সাজা শোনানো হয়। সেই সময় ইংল্যান্ডে পাশ হওয়া Forgery Act, 1728 অনুযায়ী জালিয়াতির সাজা ছিল ফাঁসি।’
‘সে তো ইংল্যান্ডের আইন। ভারতে খাটল কী করে? তখন কি ভারত সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে চলে এসেছিল?’ বৃষ্টি বলে।
‘না। সে তো কুইনস প্রোক্লেমেশনের সময় এল, সিপাই বিদ্রোহের পর। এই কারণেই কেসটাকে আইনের একটা বড়ো পরিহাস হিসেবে জানা যায়। Forgery Act ভারতেও যে খাটবে, এমন কোনো আইন সেইসময় ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও নন্দকুমারকে এই আইনের বিচারে ফাঁসি দেওয়া হয়। ফাঁসির তারিখ ছিল ৫-৮-১৭৭৫। তার মানে পাঁচ আট পঁচাত্তর বলতে সোমনাথবাবু এই নন্দকুমারের ফাঁসির কথাই বলেছেন।’
বৃষ্টি পুরো ব্যাপারটা যতখানি সম্ভব মন দিয়ে শুনে একটা হাই তুলে বলে,
‘কিন্তু এর সঙ্গে হুতোম পেঁচার একান্নটা টিকি আর মা-র সাজের কী সম্পর্ক? তা ছাড়া আরেকটা লাইন আছে— ‘‘খুঁজতে থাক এদিক-ওদিক সেথায় নিরন্তর’’— এই লাইনটার মানেই-বা কী? কী খুঁজতে বলা হয়েছে, আর কোথায়-বা খুঁজতে বলা হয়েছে। তোর রিসার্চ এখনও কমপ্লিট নয় সোহম। তুই শেষ করে নে, আমি এই ফাঁকে আরেকটু ঘুমিয়ে আসি।’
বৃষ্টি ঢুলতে ঢুলতে উঠে পড়ে। সোহম নিজের মনে বলে যাচ্ছে,
‘কলকাতায় ‘‘মহারাজ নন্দকুমার রোড’’ নামে একটা রাস্তা আছে, পূর্ব মেদিনীপুরে ‘‘নন্দকুমার’’ নামে একটা জায়গা আছে। দিঘা বা মন্দারমণি যাওয়ার রাস্তায় সেটা পড়ে। সেসব জায়গার কথা বলা হয়েছে এখানে? বুঝলি বৃষ্টি, আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এই ‘‘স্ত্রী যেথায় সাজে’’-র মধ্যে।’
সোহম তাকিয়ে দেখে ততক্ষণে বৃষ্টি ঢুলতে ঢুলতে ছাদের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেছে।
বৃষ্টির দাদা অভিরাজ আর তার স্ত্রী সুমনা আজ দিল্লি থেকে ফিরেছে। অভিরাজের কথা এখনও অবদি বলা হয়নি কারণ আশুতোষের কাছে অভিরাজের থাকা বা না থাকা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। আশুতোষের দুই সন্তান— অভিরাজ আর বৃষ্টি। বাপ-ছেলের মধ্যে বনিবনা নেই, বিয়ের পর ছেলে আলাদা হয়ে গেছে। অভিরাজের উচ্ছৃঙ্খল জীবন তাকে নানা ঝুটঝামেলার মধ্যে ফেলেছে। অভিজাত বংশে বড়ো হয়ে নানান ধরনের বড়োলোকি বোলচালের জীবাণু তার রক্তে কিলবিল করছে। বছর বছর গাড়ি এক্সচেঞ্জ করে আরও দামি গাড়ি কেনা, ক্লাব, পার্টি, ফরেন টুর— এসব করে নিজেকে সে বেশ অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলেছে। বনেদি বাড়ির সেই ফুটানির দিন যে আর নেই— একথা তার পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব। সোশ্যাল স্টেটাস বজায় রাখতে গিয়ে তাই বেহিসেবি খরচ সামলাতে তার নাজেহাল অবস্থা। বিভিন্ন ব্যাঙ্কের থেকে লোন নিয়ে তা শোধ করতে না পেরে বছরখানেক হল পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ব্যাঙ্কের রিকভারি এজেন্সি থেকে চিঠি এসেছে বেশ কয়েকবার। শুধুমাত্র আশুতোষের পরিচিতির জন্য অভিরাজের হাতে এখনও হাতকড়া পড়েনি। আশুতোষ ছেলের এই দুরবস্থা দেখে কামারহাটিতে তাঁদের একটা লোহার কারখানা ছেলের নামে লিখে দিয়েছিলেন। আশুতোষকে না জানিয়ে সেই কারখানা বন্ধক রেখে টাকা ধার করে অভিরাজ এখন দিল্লি গেছে নতুন ব্যাবসা শুরু করতে। এই বাড়িতে একমাত্র বৃষ্টির সঙ্গেই অভিরাজের যা কিছু কথাবার্তা হয়। বাপের সঙ্গে খুব দরকার না হলে কথা নেই, আর বিভিন্ন আশ্রিতদের তো মানুষ বলেই সে গণ্য করে না। বৃষ্টি অভিরাজকে অনেক করে বোঝাবার চেষ্টা করেছে যাতে সে বাজে খরচগুলো একটু কমাতে চেষ্টা করে। কিন্তু অভিরাজের কাছে এই মুহূর্তে প্রয়োজন এবং বিলাসিতা কথা দুটো সমার্থক হয়ে গেছে।
অনেকদিন পর পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে। আশুতোষ কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না, বৃষ্টি রীতিমতো ধমকে বাবাকে রাজি করিয়েছে। সোহমকেও বৃষ্টি তাদের সঙ্গে বসিয়েছে। সোহমের খুবই অস্বস্তি হচ্ছিল কিন্তু বৃষ্টির কথা অমান্য করার মতো সাহস তার নেই। সোহম বেশি জেদ করলে বৃষ্টির চোখ দুটো কেমন যেন ছলছলে হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সব জেদ উবে যায় সোহমের। আশুতোষ, অভিরাজ আর সোহম খাচ্ছে। বৃষ্টি আর সুমনা খাবার বেড়ে দিচ্ছে। পুত্রবধূকেও খুব একটা পছন্দ নয় আশুতোষের। অভিরাজ নিজে পছন্দ করে সুমনাকে বিয়ে করেছিল। সুমনা এক লোহার ব্যবসায়ীর মেয়ে। এটাও অভিরাজের সঙ্গে আশুতোষের সম্পর্ক তিক্ত হওয়ার আরেকটা কারণ। আশুতোষ চেয়েছিলেন যে তাঁর ছেলের বিয়ে দেবেন কলকাতার সম্ভ্রান্ত দত্তবাড়ির মেয়ের সঙ্গে। পাত্রীর বাবা আশুতোষের বিশেষ বন্ধু। অভিরাজ বেঁকে বসায় আশুতোষের সঙ্গে সেই বন্ধুর সম্পর্ক তিক্ত হয়। বাপ ছেলের সঙ্গে সব সম্পর্ক ত্যাগ করবেন বলে ঠিক করেন। বাড়ির অমতে অভিরাজ বিয়ে করে। সিংহবাড়ি থেকে একমাত্র বৃষ্টি সেই বিয়েতে উপস্থিত ছিল।
সোহমের একটা প্রাথমিক পরিচয় পেয়েছে অভিরাজ। সে বুঝতে পারে যে এ বৃষ্টির খুব বিশিষ্ট একজন বন্ধু। তাই খেতে খেতে অভিরাজ সোহমকে আরও কাল্টিভেট করতে থাকে।
‘ইতিহাস নিয়ে রিসার্চ করছ? এসব করে কী হবে? প্রফেসারি ছাড়া তো কিছুই করার থাকবে না।’
বৃষ্টি বলে, ‘দাদা, সোহম সারাজীবন ছাত্র পড়াতে পারলে আর কিছু চায় না। তা ছাড়া প্রফেসারি কী এমন খারাপ প্রফেশন?’
কিছু কিছু লোকজন থাকে যাদের কাছে বিদ্যাচর্চার মতো বাজে কাজ আর কিছু হতে পারে না। ‘স্কুল মাস্টাররা’ কথাটা তাদের কাছে উপহাসের উপকরণ। অভিরাজ জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার বাড়ি কোথায়? বাবা কী করেন?’
সোহম মাথা নীচু করে বসে থাকে, ইলিশ মাছের টুকরোটা আর তার মুখে উঠতে চায় না। সভ্যসমাজে এই লজ্জা ঢেকে চলতে তার যে কী সংকোচ! বৃষ্টিকে এই কথা সে তাদের সম্পর্কের শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছিল, বৃষ্টি পাত্তাই দেয়নি।
সোহমের সংকোচ দেখে অভিরাজ বলে, ‘আরে, বনেদি বংশ যদি না-ও হও, তাতে লজ্জার কী আছে?’
কথাটার মধ্যে একটা তীব্র শ্লেষ লুকিয়ে আছে। আর সেটা যতটা না সোহমের উদ্দেশে, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি আশুতোষের উদ্দেশে। মেয়ের প্রতি আশুতোষের এই একচোখামি অভিরাজের অসহ্য। তার রোখ চেপে গেছে। সোহমকে সে বিব্রত করেই চলে।
‘বলো না, লজ্জা কীসের? তোমার বাবা কী করেন? কীসের ব্যাবসা তোমাদের? নাকি চাকরি?’
সোহম অসহায় দৃষ্টিতে বৃষ্টির দিকে তাকায়। বৃষ্টি অভিরাজকে আরেক পিস ইলিশ মাছ দিতে দিতে খুব অনায়াসে বলে, ‘সোহম একটা অনাথআশ্রমে মানুষ হয়েছে রে দাদা। ওর বাবা-মার পরিচয় জানা নেই। আর তাতে আমার বা বাবার কিছু যায়-আসে না।’
অভিরাজ তার ব্যঙ্গমিশ্রিত দৃষ্টিতে আশুতোষকে বিদ্ধ করে। আশুতোষ মুখ নীচু করে তার পাতের কয়েকটা ভাত ইলিশের কাঁটা দিয়ে অস্থিরভাবে নাড়াচাড়া করে চলেছে। অভিরাজ বলে, ‘সুমনার বাবা বনেদি পরিবারের না হলেও একজন সেলফ মেড বিজনেসম্যান। তাঁর সঙ্গে একবারের জন্যও তুমি আলাপ করতে রাজি হলে না! স্ট্রেঞ্জ!’
অভিরাজ খাওয়া ফেলে উঠে যায়। সুমনাকে সে খাবার ঘর থেকে ডেকে নেয়। সুমনা ইতস্তত করে চলে যায়। আশুতোষ কিছুক্ষণ এমন ভাব দেখায় যেন কিছুই হয়নি, কিন্তু অন্তঃক্ষয় কতক্ষণই-বা ঢেকে রাখা যায়। আশুতোষও উঠে গেলেন খাবারের টেবিল ছেড়ে। অপরাধীর মতো বসে রইল সোহম। তাকে যেন কেউ চেয়ারের সঙ্গে সেঁটে দিয়েছে। উঠে চলে যাবে, এমন ক্ষমতা তার নেই।
সেদিন সারা বিকেল আর সন্ধেটা সোহম উত্তর কলকাতার বিভিন্ন অলিতে-গলিতে হেঁটে বেড়ায়। মন খারাপ হলেই সে এমন করে। পুরোনো কলকাতার সব অবশিষ্ট স্থাপত্য বা রাস্তাঘাট দেখতে দেখতে সে নিজেকে নিয়ে যেতে চায় সেই সময়ে যখন এইসব অঞ্চলের জঙ্গল কেটে নগর স্থাপনের চেষ্টা চলছে। সে কখনো হয়ে ওঠে সেই জঙ্গলের মধ্যে নরবলি দেওয়া দস্যু, কখনো-বা জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে কালীঘাটের উদ্দেশে হেঁটে চলা তীর্থযাত্রী, কখনো-বা নিমতলার সেই বহু প্রাচীন নিমগাছের তলায় বসা জোব চাৰ্নকের বৈঠকখানায় অপেক্ষারত একজন তাঁতি, কখনো-বা চড়কের মেলার ‘খেঁদা পুতের নাম পদ্মলোচন’ সং দেখতে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একজন চুনের মজুর। এসব যেন সোহম তার চোখের সামনে লাইভ দেখতে পায়।
সোহম মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না। বৃষ্টি সোহমকে একটা মোবাইল গিফট করেছিল, কিন্তু অধিকাংশ সময়ই সেটা অফ হয়ে থাকে কারণ মোবাইলের ব্যাটারি চার্জ করার কথা সোহমের মনে থাকে না। এই নিয়ে বৃষ্টি সোহমকে কিছু বলে না। সে জানে যে সোহম যখন নিজের ঘোরে থাকে তখন সে আশেপাশের জগতের থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝেই এই বিচ্ছিন্ন-ভাব সোহমের অক্সিজেনের মতো কাজ করে। সেই সময়টুকু বৃষ্টি সোহমকে একলা ছেড়ে দেয়।
কিন্তু আজ বৃষ্টি পড়েছে মহা সমস্যায়। রাত প্রায় সাড়ে দশটা বাজতে চলল, সোহম এখনও বাড়ি ফেরেনি। ফোন যথারীতি বন্ধ। আশুতোষ আর সাক্ষীগোপাল দু-বার খবর নিয়ে গেলেন বৃষ্টির থেকে। দু-জনকে খুবই চিন্তিত বলেই মনে হল বৃষ্টির। সে ভাবল একবার গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে খোঁজ করলে কেমন হয়? কিন্তু এত বড়ো শহরে ও কোথায় ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা খুঁজে বের করা তো সহজ কথা নয়। তাই বৃষ্টি অপেক্ষা করতে থাকে।
সোহম কুমোরটুলির কাশি মিত্রর ঘাটের পাশে একটা ছোট্ট দোকান থেকে দুটো রুটি আর সবজি খেয়ে নেয়। প্রতিমা গড়ার কয়েকজন শ্রমিক সেই দোকান থেকেই রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে গেল। সকালে সোহমের খাওয়া হয়নি, তারপর সারাদিন ধরে হেঁটে হেঁটে সে ক্লান্ত। সে যখন সেই দোকানে বসে রুটি খাচ্ছিল, তার থেকে একটু দূরে জাহ্নবীকে দেখা গেল কুমোরটুলির গলির ভেতরে একটা প্রতিমা গড়ার দোকানের ছবি তুলতে। গলিটা এখন নিঝুম হয়ে এসেছে। জাহ্নবী ছবি তুলে তার ক্যামেরাটা বন্ধ করে একবার সোহমের দিকে তাকায়।
কুমোরটুলির কাশি মিত্র ঘাটের পাশের একটা চায়ের দোকানে বাঁশের বেঞ্চে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সোহম। চোখ খুলে দেখে ভোর হয়েছে। দোকানের বাইরের রাস্তা ঝাঁট দিচ্ছে দোকানদার। দু-জন খদ্দেরের আবির্ভাব হয়েছে ইতিমধ্যে যাদের মধ্যে একজন পাশের বেঞ্চে একটা খবরের কাগজে মুখ ডুবিয়েছে। সোহম একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। প্রথমেই তার মনে হয় বাড়ি ফিরে গেলে বৃষ্টি তার কী অবস্থা করবে। ফোন অন করতে গিয়ে দেখে তাতে চার্জ নেই।
সোহম এসে ঘাটের পাশে দাঁড়ায়। এই ঘাট থেকে ডান দিকে তাকালে ভাগীরথীকে একটা বাঁক নিতে দেখা যায়। সোহম ভাবতে থাকে, এই ভাগীরথী বেয়েই ইউরোপীয় বণিকদের জাহাজ এসে সুতানুটির ঘাটে ভিড়ত প্রায় চারশো বছর আগে। কোথায় সেই তখনকার বনজঙ্গলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মাঝে হাতে-গোনা কয়েকটা কুটির, আর কোথায় আজকের এই ইন্টারনেট ওয়াই ফাই-এর যুগের কলকাতা।
পাশের এক মন্দির থেকে একজন বৃদ্ধ পুরোহিত গঙ্গায় স্নান সেরে উঠে আসছিলেন সিঁড়ি বেয়ে, হঠাৎ একটা বাচ্চা ছেলেকে ধরে ধমক দিতে শুরু করলেন তিনি। ছেলেটি একটা বালতি করে কিছু জঞ্জাল গঙ্গার ঘাটে ফেলে কেটে পড়ার ধান্দায় ছিল। কলকাতার এ এক নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আকছার লোকজন এভাবে গঙ্গার ঘাট এবং তার সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গাজল দূষিত করে। কিন্তু পুরুতমশাই সেই দেখে খেপে লাল হয়ে গেলেন।
‘এই লোটন! বেওয়ারিশ ঘাট পেয়ে যা-তা ফেলে যাবি? দূর হ এখান থেকে।’
ছেলেটি তো ধমক খেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে একজন মজুর গঙ্গার পলিমাটি ঝুড়িতে করে তুলে ঘাটের ওপরে নিয়ে যাচ্ছে। তাকে ডেকে পুরোহিত বলেন,
‘নিতাই, এই মাটির কত গুণ বল তো? এর থেকেই মা-র চিন্ময়ী রূপ গড়ে উঠবে। তারপর মা সেজে, ভোগ খেয়ে, নাচ দেখে আবার এই গঙ্গার জলেই মাটি হয়ে মিলিয়ে গিয়ে আবার এই পলিমাটি হয়েই পরের বছর ধরা দেবেন! মা-র লীলা বোঝা ভার ...’
পুরোহিতমশাইকে ভাবে বিভোর দেখে লোটন ইতিমধ্যে তার জঞ্জালের বালতি নিয়ে ঘাটের দিকে এগোতে যাচ্ছিল, কিন্তু পুরুতমশাই আবার দিলেন এক ধমক।
সোহম এক ভাঁড় চা শেষ করে বাড়ির দিকে ফিরছিল, হঠাৎ তার কিছু একটা মনে হওয়াতে সে ফিরে এসে সেই পুরুতমশাইকে ধরে।
‘ঠাকুরমশাই, মা সাজবেন, ভোগ খাবেন ... মানে আপনি কোন মা-র কথা বলছিলেন?’
‘কেন? আমাদের সবার মা! জগজ্জননী দেবী দুর্গা! তোমরা সব আজকালকার ছেলেপিলে, কিছুই তো তোমরা জান না। আমার বৃদ্ধপ্রপিতামহ ... ও বললে তো আবার বুঝবে না— মানে আমার বাবার বাবার বাবার বাবা, ঈশ্বর রমানাথ ভটচায এই কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্তিরের বাড়ির কুলপুরোহিত ছিলেন। সে-বাড়িও আর নেই, আর তাই ওই বাড়ির পুজোর ঘটার কথাও কেউ তোমরা জানো না। সে-বাড়ির দুর্গাপুজোয় প্রতিমার গায়ে রং মাখানো হত না, তার বদলে সোনা আর রুপোর পাত দিয়ে মোড়া থাকত। সারা বাংলা থেকে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা ‘বিদেয়’ নিতে ছুটে আসত। নৈবেদ্যর প্রধান থালাটাই শুধু সাজানো হত তিরিশ থেকে পঞ্চাশ মন চাল দিয়ে। পুজোর পর মিষ্টি বিলেনো হত দু-শো মনের মতো। লোকে বলত, মা দুর্গা খেতেন এই বাড়িতে।’
সোহমের কাছে একটা আবছা ছবি যেন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সে বলে,
‘আচ্ছা ঠাকুরমশাই, মা দুর্গা খেতেন কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্রর বাড়িতে, আর সাজতেন কোথায়?’
‘পুরোনো কলকাতার প্রবাদ— মা দুর্গা এসে গয়না পরেন জোড়াসাঁকোয় শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়িতে, ভোজন করেন কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্রর বাড়িতে আর রাত্রি জেগে নাচ দেখেন শোভাবাজার রাজবাড়িতে। এসব কিসুই তোমরা জান না।’
এখন বেলা দশটা। সোহম আর বৃষ্টি এখন জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনের দিকে যাচ্ছে। সারারাত সোহম কোথায় ছিল, কেন সে বাড়ি ফেরেনি, এসব প্রশ্ন করার ফুরসত পায়নি বৃষ্টি। সকালে বাড়িতে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে কোনোমতে বৃষ্টিকে টেনে বার করেই সে বেরিয়ে পড়েছে। বেরোবার আগে শুধু আশুতোষকে বলে গেছে, ‘স্যার, বোধ হয় সমাধান পেয়ে গেছি।’
সোহম রাস্তার এক দোকানে জিজ্ঞেস করে, ‘দাদা, শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাড়ি কোনটা?’
লোকটি দেখিয়ে দেয় একটা গলি। গলিটা বিবেকানন্দ রোড থেকে দক্ষিণ দিকে ঢুকেছে। ওটাই শিবকৃষ্ণ দাঁ লেন। গলিটা যেখানে বাঁ-দিকে একটা বাঁক নিচ্ছে, সেই বাঁকের মুখে বাঁ-হাতের বাড়িটাই শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাড়ি। সোহমের মাথায় কী চলছে, এখনও পর্যন্ত তার বিন্দুবিসর্গ বৃষ্টি বুঝে উঠতে পারেনি। এতটা রাস্তা সোহম একেবারে চুপ ছিল। বৃষ্টি সোহমকে জিজ্ঞেস করে, ‘আরে, কী ব্যাপার সেটা বুঝিয়ে বলবি তো! শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাড়ি আমরা কেন যাচ্ছি?’
‘কারণ আশুতোষের স্ত্রী সেখানে সাজেন।’ সোহমের সহজ সরল জবাব।
বৃষ্টি সোহমের কাঁধে একটা চাঁটি মেরে বলে, ‘তোর বড্ড সাহস বেড়েছে দেখছি! তুই বাবার নাম ধরে ডাকছিস!’
‘আমি স্যারের কথা বলছি না। শিবের আরেক নাম আশুতোষ, আবার সোমনাথও বটে। আর শিবের স্ত্রী কে?’
‘শিবের স্ত্রী? মানে মা দুর্গা?’
‘হ্যাঁ।’
‘বলিস কী রে সোহম! আচ্ছা এই শিবকৃষ্ণ দাঁ কে?’
‘শিবকৃষ্ণ দাঁ হচ্ছেন জোড়াসাঁকোর দাঁ পরিবারের একজন আদি পুরুষ। তাঁর ছিল কয়লাখনি, বড়োবাজারে লোহার ব্যাবসা আর ইস্ট ইন্ডিয়া আর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের ঠিকাদারির ব্যাবসা। কলকাতার বারোয়ারি পুজোর উনি ছিলেন একজন অন্যতম উদ্যোক্তা। আগেকার দিনে শান্তিপুর, উলো, গুপ্তিপাড়া, কাঁচড়াপাড়া, চুঁচুড়ায় বারোয়ারি পুজো নিয়ে খুব মাতামাতি ছিল। রীতিমতো কম্পিটিশন করে একজন আরেকজনকে খরচায় টক্কর দিত। তারপর সেই হিড়িক কলকাতায় শুরু হয়। শিবকৃষ্ণ দাঁ তাঁর এই বাড়িতে ধুমধাম করে পুজো শুরু করলেন। শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাড়ির দুর্গা প্রতিমার সাজ খুব ফেমাস ছিল। ব্রিটিশ সাজসজ্জা কপি করে unicorn আর royal crest ফ্যাশনে দুর্গাপ্রতিমা সেই সময়কার ট্রেন্ড ছিল।’
সোহম আর বৃষ্টি এখন শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। সোহম বলে,
‘স্ত্রী যেথা সাজে, তার মানে সোমনাথবাবু এই বাড়ির কথাই বলেছেন। কারণ পুরোনো কলকাতার প্রবাদ অনুযায়ী মা দুর্গা এসে গয়না পরেন জোড়াসাঁকোয় শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাড়িতে।’
বৃষ্টি সোহমের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে যায়, সোহম তাকে আটকায়। বৃষ্টি বলে, ‘ও মা! আমরা এই বাড়িতে ঢুকব না?’
‘না। ধাঁধাটায় কী লেখা ছিল মনে কর— সেই পথের ঠিকানা, স্ত্রী যেথায় সাজে/হুতোম পেঁচার টিকি যত শোকেসে বিরাজে। হুতোম পেঁচার টিকির সংখ্যা ক-টা?’
‘একান্নটা!’
‘তাহলে কী বুঝলি?’
বৃষ্টি মাথা চুলকে বলে, ‘তোর মাথা আর আমার মুন্ডু!’
সোহমের ঠোঁটের কোণে একটা মিচকে হাসি খেলে যায়। সে বলে,
‘মা দুর্গাকে ‘‘রূপং দেহি রূপং দেহি’’ বলে ডিস্টার্ব না করে একটু ‘‘বুদ্ধিং দেহি বুদ্ধিং দেহি’’ বলে প্রার্থনা জানাস এবার থেকে।’
বৃষ্টি চটে যায়।
‘বুদ্ধিং দেহি কেন বলব রে? তুই বলতে চাস আমার মাথায় বুদ্ধি নেই?’
হঠাৎ যেন পুরো ব্যাপারটা বৃষ্টির কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। সে খুব উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘সোহম! আমরা কি এখন এই রাস্তার একান্ন নম্বর বাড়িতে যাব?’
সোহম বৃষ্টির পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে, ‘দেখেছিস! একবার ‘‘বুদ্ধিং দেহি’’ বলেছিস, সঙ্গে সঙ্গে মা দুর্গা মাথায় 1 GB বুদ্ধি ট্রান্সফার করে দিয়েছেন।’
‘সে নাহয় হল, কিন্তু এবার, পাবে হদিশ সেইখানেতেই খোঁজ নিরন্তর/হেস্টিংসের প্রত্যাঘাত পাঁচ আট পঁচাত্তর?’
সোহম কোনো উত্তর না দিয়ে এগিয়ে যায়। তারা পৌঁছোয় সেই রাস্তার একান্ন নম্বর বাড়িতে। দরজায় ফলক দেখা যায়, ‘নন্দকুমার ঘোষ, এম এ’। তারা একে অপরের দিকে একবার তাকায়, সোহমের দৃষ্টিতে একটা ফেলুব্যোমকেশসুলভ হাসি। সদর দরজা খোলা, সোহম বাড়ির ভেতর ঢুকে যায়। বৃষ্টিও ঢুকতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ একটা দৃশ্য তাকে থমকে দাঁড় করিয়ে দেয়। সেই বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে দেখা গেল রাস্তার ছবি তুলছে জাহ্নবী। দু-জনের একবার চোখাচোখি হল, কিন্তু জাহ্নবী বোধ হয় খেয়াল করেনি। বৃষ্টিও ব্যাপারটাকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায় সোহমের পিছু পিছু।
নন্দকুমার ঘোষের বাড়িটা পুরোনো কলকাতার গন্ধে ম ম করছে। দোতলা বাড়ি, অযত্নে রং চটে পড়ে আছে গলির এক কোণে। বর্তমানে নন্দকুমার আর তাঁর মেয়ে অনামিকা সেই বাড়ির একতলায় থাকেন। অনামিকাকে সোহম সব কথা জানালে তাদের ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসানো হয়। দোতলায় মনে হল ভাড়াটের বাস। খড়খড়ি দেওয়া জানলাগুলো বড়ো ভালো লাগে বৃষ্টির। গলি থেকে ‘হরেক মাল কুড়ি টাকা’ হাঁক শোনা গেল ফেরিওয়ালার। দূরের একটা মন্দির থেকে কাঁসর ঘণ্টা আর পাশের বাড়ি থেকে একজন বাচ্চা মেয়ের চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ করার শব্দ ভেসে আসছে। কিছুক্ষণ পর নন্দকুমার ঘোষ তাদের কাছে আসেন। কিছু কিছু মানুষ হয় যাঁদের দেখলেই আগে একটা প্রণাম করতে ইচ্ছে হয়। নন্দকুমার ঘোষ তেমনই একজন। নন্দকুমারের বয়স এখন প্রায় আশির কাছাকাছি। দৃষ্টিশক্তিহীন। পরনে একটা ফতুয়া আর পাজামা। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি সোমনাথের কে হন?’
সোহম বলে, ‘আজ্ঞে, আমার বন্ধু বৃষ্টি আমার সঙ্গে এসেছে। তার বাবা আশুতোষ সিংহর বন্ধু সোমনাথ দাস।’
নন্দকুমার জিজ্ঞেস করেন, ‘সিংহবাড়ির আশুতোষ সিংহ? মানে যিনি বাংলার আয়না বইটা লিখেছেন?’
‘হ্যাঁ।’ বৃষ্টি উত্তর দেয়।
নন্দকুমারের কৌতূহল যেন আরও বেড়ে যায়।
‘খুব ভালো বইটা। অনেক অজানা সব তথ্য পাওয়া যায়। ভাষার বাঁধুনিও চমৎকার। তা উনি এমন একজন সুলেখক, তাহলে আর কোনো বই লিখলেন না কেন?’
‘বাবা পারিবারিক ব্যাবসার কাজে এত ব্যস্ত থাকেন যে আর সময় পান না।’
‘ও। তবে উনি আরও লিখলে বাংলার ঐতিহাসিক সাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হত। আচ্ছা, যতদূর মনে পড়ছে, বইটা তো উনি সোমনাথকেই উৎসর্গ করেছিলেন?’
‘হ্যাঁ।’ সোহম বলে, ‘সোমনাথবাবু আশুতোষবাবুর বিশেষ বন্ধু ছিলেন। অনেক বছর হল সোমনাথবাবু মারা গেছেন।’
নন্দকুমার প্রচণ্ড অবাক হয়ে সোহমের দিকে ফেরেন। সোহম বুঝতে পারে যে এই কথাটা তিনি জানতেন না।
‘বাবু, এক প্যাকেট ধূপ নেবেন। খুব ভালো ধূপ।’
একজন ছাপোষা টাকমাথা লোক বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
‘আমাদের কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, তাই ধূপ বিক্রি করে পেট চালাচ্ছি। যদি একটা প্যাকেট নেন তো খুব উপকার হয়। বাড়িতে বিধবা মা, স্ত্রী আর দুই মেয়ে আছে। গরিব মানুষ হলেও ভিক্ষা করতে মন চায় না, তাই এই ধূপ বেচে এতগুলো মানুষের পেট চালাচ্ছি।’
নন্দকুমারের মেয়ে অনামিকা দু-প্যাকেট ধূপ কেনেন। যাওয়ার আগে সোহমের সঙ্গে লোকটার একবার চোখাচোখি হয়। সোহম এর আগে লোকটাকে কোথায় যেন দেখেছে। সেটা মনে করার চেষ্টা করছিল সে, এমন সময় নন্দকুমার বলেন, ‘সোমনাথ মারা গেছে?’
সোহম বলে, ‘হ্যাঁ। মারা যাওয়ার আগে উনি আশুতোষবাবুকে একখানা চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যাতে একটা ধাঁধা লেখা ছিল। এর সমাধানে নাকি একটা ঐতিহাসিক সম্পদ পাওয়া যাবে। এই ধাঁধা তো আপনার বাড়িতেই আমাদের নিয়ে এল।’
‘বড়ো অদ্ভুত ছেলে এই সোমনাথ।’ নন্দকুমারের কণ্ঠস্বর ঈষৎ আৰ্দ্র। ‘এমন ভালো ছাত্র আমি বহুদিন দেখিনি। আমায় খুব শ্রদ্ধা করত। তা বছর কুড়ি হল বোধ হয় ...’

সোহম বলে, ‘পঁচিশ বছর।’
‘তা হবে হয়তো— একটা চিঠি পাই সোমনাথের। তাতে লেখা ছিল যে আমার কাছে যদি কেউ তোমাদের এই ধাঁধাটা নিয়ে আসে তাহলে আমি যেন তাকে এইটে দিই।’
নন্দকুমার উঠে গিয়ে হাতড়াতে হাতড়াতে তাঁর আলমারি অবদি পৌঁছোন। সোহম তাঁকে সাহায্য করতে ওঠে, কিন্তু অনামিকা ইশারায় তাকে বারণ করেন। মানুষের যখন কোনো একটি ইন্দ্রিয় অকেজো হয়ে যায় তখন যেন বাকি ইন্দ্রিয়গুলো আরও সতেজ হয়ে পড়ে। বাড়ির বেশ বড়ো একটা দালান পেরিয়ে নন্দকুমার শুধুমাত্র নিজের লাঠির সাহায্যে তাঁর ঘরে পৌঁছে নিখুঁত আন্দাজে আলমারি খুলে ভেতর থেকে একটা পুরোনো চিঠি বার করে এনে সোহমকে দেন।
‘এত বছর ধরে অপেক্ষা করে গেছি, কিন্তু কেউ আসে না। বছর তিনেক হল চোখের দৃষ্টিও চলে গেল। এই এতদিনে তোমরা এলে।’
সোহম চিঠিটা খুলে দেখে যে তাতে লেখা:
আকাশী আয়না ইংরেজিতে সাহেবের কারাবাস
স্মরণে স্রষ্টা অনুবাদকের জন্মদিনে বাস
সোহম অবাক হয়ে একবার বৃষ্টির দিকে তাকায়। তারপর সে নন্দকুমারকে জিজ্ঞেস করে, ‘সোমনাথবাবু আর কিছু বলেননি আপনাকে?’
‘আর কিছু? কই, না তো!’
বৃষ্টি আর সোহম বাড়ি ফিরেছে। আশুতোষকে সমস্ত ব্যাপারটা তারা জানায়। আবার একটা নতুন ধাঁধা, তার শেষে এবার একটা সংখ্যা। সোমনাথ দাস কী এমন জিনিস উপহার হিসেবে তাঁর বন্ধুকে দিতে চেয়েছিলেন এবং তার জন্য এত সিঁড়ি ভাঙার অঙ্ক কেন?
সোহম আবার তার বইয়ের পাহাড়ে মুখ ডুবিয়েছে। বৃষ্টি তাকে মনে করাতে এসেছিল যে একটু পরেই তাদের বেরোতে হবে। বেহালায় তার বন্ধু রঞ্জনার বাড়িতে তাদের নেমন্তন্ন আছে আজ সন্ধেবলা। তাই সোহম যেন শেভ করে নেয় আর আগের সপ্তাহে বৃষ্টি যে পাঞ্জাবিটা ওকে কিনে দিয়েছে সেটাই যেন পরে। সোহমের এসব পার্টিতে যেতে খুব অস্বস্তি লাগে। সে বরাবরই হইহুল্লোড় এড়িয়ে চলে। কিন্তু বৃষ্টির পাল্লায় পড়ে তাকে মাঝেমধ্যে এসবের মধ্যে ঢুকতে হয়। কিন্তু আজ সোহম অজুহাত পেয়ে গেছে। সে পড়াশোনার দোহাই দিয়ে সন্ধের প্রোগ্রামটা কাটিয়ে দেয়। বৃষ্টি ব্যাজার মুখে চলে যায়।
বাড়ির ঠাকুরদালানে এসে বৃষ্টি দেখে সাক্ষীগোপাল বাড়ির চাকরকে দিয়ে ঝাড়লন্ঠন পরিষ্কার করাতে করাতে জাহ্নবীকে একটা গল্প বলছেন। জাহ্নবী সেটা ভিডিেয়া রেকর্ড করছে। বৃষ্টি চলে যাচ্ছিল সেখান থেকে, কিন্তু গল্পের কয়েকটা লাইন শুনে তার বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল। সেও দাঁড়িয়ে শুনতে থাকে। সাক্ষীগোপাল বলছেন,
‘এইবার দাদাঠাকুর শরৎ পণ্ডিতের একটা মজার ঘটনার কথা বলি। রামকুমার চট্টোপাধ্যায় এই ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন। দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন দাদাঠাকুর গিয়ে পৌঁছোলেন এক সম্ভ্রান্ত বাড়িতে। বাড়ির মালিক শ্রদ্ধেয় নির্মলচন্দ্র। সেখানে নানান অভ্যাগতদের মধ্যে রসরাজ অমৃতলাল বসু উপস্থিত। সবাই বৈঠকখানায় অপেক্ষা করছেন, খাবারদাবার এখনও আসেনি, এমন সময় রসরাজ দাদাঠাকুরকে বললেন, শোনো শরৎ, তুমি শুনেছি মুখে মুখে গান বাঁধতে পারো, তা এই পরিবেশ নিয়ে কিছু একটা গান বেঁধে শোনাও তো।
দাদাঠাকুর রসরাজের আশীর্বাদ নিয়ে মা দুর্গাকে উদ্দেশ করে শোনালেন—
দুটো মনের কথা বলি ওমা জগদম্বে
রসরাজ পাশের লোককে চুপি চুপি বললেন, ‘জগদম্বে’ বলে ছেলেটা মুশকিলে পড়েছে, ওটা আর মেলাতে পারবে না।
দাদাঠাকুর অবলীলায় গেয়ে চললেন—
দুটো মনের কথা বলি ওমা জগদম্বে
বলো দেখি মা দীনের দুঃখ কোন কালে বা কমবে
অমৃতলাল অবাক হয়ে গেলেন। দাদাঠাকুর গেয়ে চললেন-
শোনো মা গো দশভুজা
সেদিন তোমার করব পূজা
যেদিন মা নির্মলের মতো লক্ষ টাকা জমবে
দুটো মনের কথা বলি ওমা জগদম্বে
বাহবা দিয়ে উঠলেন রসরাজ। বললেন, আমি ভেবেছিলাম তুমি জগদম্বে আর মেলাতে পারবে না। তা, তুমি আরও একটা অন্তরা করতে পারো?
দাদাঠাকুর বলেন, তাহলে আমায় আরেকবার আশীর্বাদ করে দিন।
রসরাজ হেসে বললেন, আচ্ছা করেছি, বলো দেখি !
দাদাঠাকুর গেয়ে চললেন—
যত পাওনাদার লাগায় ল্যাঠা
তাই পালিয়ে এসেছি ক্যালকাটা
আর হেথায় যদি ধরে বেটা পালাব মা বম্বে
দুটো মনের কথা বলি ওমা জগদম্বে
সেই সময় একজন বিদেশি বস্ত্র পরিহিত অতিথিকে দেখে দাদাঠাকুর আরও একটা অন্তরা গেয়ে ফেললেন—
দেশের দুঃখ দেখে গাঁধি
পরতে বলে গেল খাদি
যত হারামজাদা হারামজাদি
ঠেকায় না নিতম্বে
দুটো মনের কথা বলি ওমা জগদম্বে
জাহ্নবী আর বৃষ্টি দু-জনেই হেসে ওঠে। এইজন্যেই সাক্ষীগোপালকে বৃষ্টির এত ভালো লাগে। লোকটা কত মজার মজার গল্প জানে।
সন্ধে হয়েছে। জবা পিসি বাড়ির তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে শাঁখ বাজিয়ে সন্ধে দিয়ে গেল। আশ্রিতরা সব সারাদিন বনের মোষ তাড়িয়ে একে একে বাড়ি ফিরছে। চাঁদু মা-র থেকে চুপিচুপি কিছু টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। বৃষ্টি সেজেগুজে বেরোবার জন্য তৈরি, গাড়ির সামনে এসে দেখে সোহম শেভ করে, বৃষ্টির দেওয়া পঞ্জাবিটা পরে সেখানে অপেক্ষা করছে। বৃষ্টি বুঝতে পারে না যে সোহম হঠাৎ নিজে থেকে পার্টিতে যেতে রাজি হয়ে গেল কী করে। কথা না বাড়িয়ে তারা দু-জনেই গাড়িতে ওঠে।
সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, রেড রোড পেরিয়ে খিদিরপুর ধরে গাড়ি তারাতলার দিকে চলেছে। সোহম এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল। এবার সে হঠাৎ বলে ওঠে,
‘আচ্ছা বৃষ্টি, ‘‘আকাশি’’ বলতে তোর প্রথমেই কী মনে হয়?’
‘তুই এখনও সেই পাগলের প্রলাপ নিয়ে পড়ে আছিস? আরে এসবের কোনো মানে নেই, এই সোমনাথ দাস বাবার সঙ্গে ঠাট্টা করেছেন।’
‘আরে, তুই বল না! ‘‘আকাশি’’ বলতে তোর প্রথমেই কী মনে হয়?’
‘কী আবার মনে হবে? আকাশি— স্কাই ব্লু— নীল।’
‘নীল। বেশ। আর আয়নার একটা প্রতিশব্দ বল দেখি।’
‘আয়না ... দর্পণ।’
‘বেশ। নীল দর্পণ।’
‘নীলদর্পণ! নীল বিদ্রোহ নিয়ে দীনবন্ধু মিত্রর বিখ্যাত নাটক?’
‘হ্যাঁ। ব্রিটিশ সরকার সেইসময় এই নাটক নিষিদ্ধ করেছিল। জেমস লং সরণিটা ধর, ফাঁকা পাব।’
তাদের গাড়ি ততক্ষণে তারাতলা পৌঁছেছিল। ড্রাইভার সোহমের কথামতো ডায়মন্ড হারবার রোড না ধরে তার প্যারালাল রাস্তা জেমস লং সরণি ধরে।
বৃষ্টি বলে, ‘কী বলছিলিস, নীলদর্পণ নিষিদ্ধ হওয়া নিয়ে?’
‘নীলদর্পণ নাটকটা প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে। তার মাস ছয়েক পর রেভারেন্ড জেমস লং নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করান। তার কারণ লেফটেনান্ট গভর্নর সহ কয়েকজন রাজকর্মচারী এই নাটকটা পড়তে চান। ফরিয়াদি পক্ষ মামলায় জেমস লং-কেই অনুবাদক হিসেবে ধরে। নীলকর সাহেবরা এই বইটাকে কুৎসামূলক অপপ্রচার বলে মুদ্রাকর সি এইচ ম্যানুয়েলের নামে মামলা করে। লং সাহেব প্রকাশনার সব দায় নিজে নেন। বিচারে তাঁর এক মাসের জেল হয়। এর সঙ্গে এক হাজার টাকা জরিমানা, যা আদায় না হওয়া পর্যন্ত জেলের হুকুম বজায় থাকবে। তখন কালীপ্রসন্ন সিংহ জরিমানার টাকা দিয়ে দেন। সেই মামলার সমস্ত খরচ বহন করেন পাইকপাড়ার রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ। নীলদর্পণের প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে গেলে কালীপ্রসন্ন সিংহ নিজের খরচে দ্বিতীয় সংস্করণ ছেপে বিনামূল্যে বিতরণ করেন। শোনা যায় কালীপ্রসন্ন সিংহর অনুরোধেই নাকি জেমস লং নীলদর্পণের ইংরেজি অনুবাদ করেন। সেই কারণেই কালীপ্রসন্ন জেমস লং-এর জরিমানা দিয়েছিলেন। ‘‘আকাশি আয়না ইংরেজিতে সাহেবের কারাবাস।’’ আমরা কি জেমস লং সরণিতে ঢুকে গেছি?’
‘হ্যাঁ। এইবার বুঝেছি তুই কেন আমার সঙ্গে নিজে থেকে এসেছিস। বেহালা শুনেই তোর মাথায় ব্যাপারটা ক্লিক করেছে, তাই তো?’
‘হ্যাঁ। একটু আস্তে চালাতে বল।’
সোহম জেমস লং সরণির ওপর বিভিন্ন বাড়ির ঠিকানা দেখতে থাকে খুব মন দিয়ে। বৃষ্টি জিজ্ঞেস করে, ‘স্মরণে স্রষ্টা অনুবাদকের জন্মদিনে বাস— জেমস লং স্মরণে জেমস লং সরণি। বুঝলাম। কিন্তু বাকিটা?’
সোহম গাড়ি থামাতে বলে। গাড়ি থেকে নেমে দু-জনে হেঁটে যাচ্ছে জেমস লং সরণি ধরে। সোহম একজনকে জিজ্ঞেস করে ২৫ নম্বর বাড়ি কোনটা। লোকটা সামনে দেখিয়ে দেয়। সোহমের হাঁটার গতিবেগ বেড়ে যায়, বৃষ্টি পাল্লা দিয়ে তার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করে, ‘‘কী রে! ‘স্মরণে স্রষ্টা অনুবাদকের জন্মদিনে বাস’’ ব্যাপারটা কী?’
‘শোনা যায় জেমস লং এই ‘‘নীলদর্পণ’’-এর ইংরেজি অনুবাদ করিয়েছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্তকে দিয়ে। ২৫/০১/১৮২৪ হচ্ছে মাইকেল মধুসূদন দত্তর জন্মদিন। দাঁড়া।’
সোহম আর বৃষ্টি এই মুহূর্তে একটা মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। দোকানের ওপর একটা সাইনবোর্ড— দীনবন্ধু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার— ২৫/১ জেমস লং সরণি।
সোহম বলে, ‘স্মরণে স্রষ্টা অনুবাদকের জন্মদিনে বাস। ২৫/১ জেমস লং সরণিতে দীনবন্ধু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সোমনাথবাবুর মতো পাগল হতে পারলে বর্তে যেতাম রে বৃষ্টি।’
মিষ্টির দোকানের মালিক একজন চ্যাংড়া গোছের যুবক। সে সোমনাথ দাসের নাম শুনে কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘সোমনাথ দাস? ও হ্যাঁ হ্যাঁ, বাবার কাছে শুনেছিলাম বটে লোকটার কথা। কিন্তু সে তো কবেকার ব্যাপার!’
‘আপনার বাবাকে একবার ...’
‘হ্যাঁ, ওই তো ...’
সোহমের কথা শেষ হতে-না-হতেই দেওয়ালে বাবার ছবির দিকে ইশারা করে দোকানদার। ছবিতে মালা টাঙানো। সোহম বৃষ্টির দিকে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। দোকানদার বলে,
‘বাবার কাছে শুনেছিলাম, অদ্ভুত গেঁজুড়ে টাইপের লোক ছিল নাকি ওই সোমনাথ দাস। কী সব মাইকেল মিত্ত, দীনবন্ধু দত্ত আর জেমস লং সরণি মিলে একটা লোচা হয়ে আছে নাকি আমাদের দোকানে। তাই নিজে থেকে এসে আলাপ করেছিল বাবার সঙ্গে। কলকাতার যত রাজ্যের হাঁড়ির খবর নিয়ে হ্যাজাত বাবার সঙ্গে। আমার বাপটাও হ্যাজানো পাবলিক ছিল, তাই একেবারে খাপে খাপ মন্টুর বাপ হয়ে গিয়েছিল।’
সোহম আর বৃষ্টি বিরক্ত হয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, মালিক তাদের ডাকে।
‘একী, চললেন নাকি? আরে দাঁড়ান।’
এই বলে একজন কর্মচারীকে একটা লেডিকেনি আনার হুকুম দেয় সে। সেই শুনে বৃষ্টি বলে, ‘আমরা এখানে মিষ্টি খেতে আসিনি।’
‘আমিও আপনাদের মিষ্টি খেতে বলিনি!’
দোকানের বাইরে রাস্তার পাশে মাটির ওপর একটা ছোট্ট গর্ত খুঁড়ছে দোকানদার। পাশে একজন কর্মচারী প্লেটে একটা লেডিকেনি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সোহম আর বৃষ্টি দাঁড়িয়ে এই অদ্ভুত ব্যাপার দেখছে। গর্ত খোঁড়া হয়ে গেলে দোকানদার কর্মচারীকে সেই লেডিকেনিটা ওই গর্তের মধ্যে ফেলতে বলে। কর্মচারী তাই করে। দোকানদার এবার সেই লেডিকেনি মাটি চাপা দিয়ে দেয়। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বাবা, তোমার কথা রেখেছি।’
বৃষ্টি বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘এর মানে কী?’
‘তা তো বলতে পারি না। বাবার কাছে অনেক বছর আগে ওই সোমনাথ দাসের একটা চিঠি এসেছিল। বাবা শাটডাউন হওয়ার আগে আমায় বলে গিয়েছিল। সেই চিঠিতে নাকি এমনই ইনস্টাকসান ছিল। আর তাতে বলা ছিল— এই লেডিকেনির বাপ যার জন্য বিখ্যাত, সেই জিনিস সাত পিস এর পাশে রেখে দিতে।’ মাটি চাপা দেওয়া লেডিকেনির দিকে ইশারা করে বলে মোদকপুত্র।
বৃষ্টি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘লেডিকেনির বাবা কে?’
‘পান্তুয়াও হতে পারে, দরবেশও হতে পারে, ল্যাংচাও হতে পারে। সে মিষ্টির মিস্টিরি আপনারা সামলান, আমি কমার্শিয়াল লোক, দশ টাকা— লেডিকেনির দাম।’ হাত বাড়ায় দোকানদার।
সোহম আর বৃষ্টি অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এমন সময় সেই দোকান থেকে কিছুটা দূরে একজন টাকমাথা ছাপোষা চেহারার লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার থেকে একটু দূরে আরও একজন ভিডিেয়া ক্যামেরায় রাস্তার ছবি তুলতে তুলতে সেই টাকমাথা লোকটার দিকে তাকায়।
অভিরাজের দিল্লির অফিস সিজ করে দিয়েছে একটা ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক। তার মর্টগেজ করা কারখানা বাঁচানোর আর কোনো উপায় নেই। এক বন্ধুর মাধ্যমে অভিরাজের আলাপ হয়েছিল আমিরচাঁদ মিত্তলের সঙ্গে। অভিরাজ এখন তাঁর কাছেই এসেছে একটা ফাইভ স্টার হোটেলে। আমিরচাঁদের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া সহজ কথা নয়, কিন্তু অভিরাজের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করার পর আমিরচাঁদও ওর সঙ্গে দেখা করতে উৎসাহী হন। এখন আমিরচাঁদের সুটে অভিরাজ একলা।
‘দেখুন আমিরচাঁদজি, বাবার সম্পত্তির এক কানাকড়িও আমি পাব না। সমস্ত সম্পত্তি বৃষ্টি পাবে। টাকাটা না জোগাড় করতে পারলে আমার দোকানটা ব্যাঙ্ক নিয়ে নেবে। কোনো financial institute থেকে আমি লোন পাচ্ছি না।’
আমিরচাঁদ বলেন, ‘দেখো অভিরাজ, তুমহার যা ক্রেডিট হিস্ট্রি তাতে করে আমিই-বা তুমাকে এতগুলো টাকা বিসওয়াস করে দেব কী করে?’
‘দোকানটা নিলাম হয়ে গেলে আমাদের পরিবারের মানসম্মান ধুলোয় মিশে যাবে।’
‘তোমরা বাংগালিদের আর কিছু না থাকুক, মান, সম্মান— এসব খুব আছে। দেখো, হামি বিজনেসম্যান, আমি তুমহাকে open deal দিচ্ছি। তুমি হামায় একহাতে জিনিসটা ডেলিভার করো, অউর এক হাতে টাকাটা লিয়ে যাও। তুমহার ইনকাম হল, লোন করতে হল না।’
অভিরাজের এখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কিন্তু এ অবস্থাতেও আমিরচাঁদের এই প্রস্তাবে রাজি হওয়ার সাহস তার নেই। সে ইতস্তত করতে থাকে, ‘ওটা আমাদের পরিবারের খুব সেন্টিমেন্টাল জিনিস আমিরচাঁদজি।’
‘তাহলে ওই সেন্টিমেন্ট লিয়েই বৈঠে বৈঠে রবীন্দরসংগীত শুনতে থাকো।’
আমিরচাঁদের লোভী চোখ দুটো জ্বলতে থাকে। তিনি অভিরাজের কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘এক চাইনিজ অ্যান্টিক ডিলার আভি কলকাত্তায় আছে, জলদিসে সৌদা হয়ে যাবে। ক্যাশ ট্র্যানজাকশন। ভেবে দেখো।’
জেমস লং সরণির মিষ্টির দোকান থেকে আর বন্ধুর পার্টিতে যাওয়া হয়নি বৃষ্টির। সোহম এই লেডিকেনি পোঁতা নিয়ে এমন গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে পড়েছিল যে তাকে নিয়ে পার্টিতে গেলে বৃষ্টিকে মারাত্মক অপ্রস্তুত হতে হত। সোহমের এই মানসিক অবস্থাটা বৃষ্টি খুব ভালো করে চেনে। ও এখন একদৃষ্টে কোনো অচেনা লোকের দিকে তাকিয়ে থাকবে, হতেই পারে সে কোনো মহিলা। কেউ কোনো প্রশ্ন করলে তার দিকে একটা শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকবে, যেন এই জগৎ ছেড়ে কোনো অন্য জগতে সে বিচরণ করছে। বৃষ্টির বন্ধুরা এই নিয়ে হাসাহাসি করে, সোহমকে তারা বলে ‘তারকাটা’। এইসব অস্বস্তিকর ব্যাপার-স্যাপার এড়াতে বৃষ্টি তার বন্ধুকে ফোন করে শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে পার্টিতে যাওয়াটা কাটিয়ে দিয়েছিল।

গতরাতের ঘটনা শুনে আশুতোষ খুব হাসতে থাকে। বৃষ্টি বাবার চোখে একটা আই-ড্রপ দিচ্ছে। আশুতোষ বলেন, ‘লেডিকেনি মাটিতে পুঁতে দিল? বলিস কী?’
‘তাহলেই বোঝো! তোমার ওই বন্ধুটি, কিছু মনে কোরো না, একদম আস্ত পাগল ছিলেন।’
‘সেটাই-বা মানি কী করে? ওর দুটো ধাঁধা তো বলা যায় ভেলকি দেখাল। কিন্তু তাই বলে লেডিকেনি ...’
‘লেডি ক্যানিং! আমি কী করে ভুলে গেলাম!’
আশুতোষ আর বৃষ্টি চমকে ওঠে। সোহম দাঁত মাজতে মাজতে মুখে ব্রাশ নিয়েই প্রায় লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকে পড়েছে। বৃষ্টি ধমক দিয়ে তাকে বাথরুমে পাঠায়।
কোনোমতে দাঁত মেজে, কুলকুচি করে, ভেজা মুখ না মুছেই সোহম ছুটে আসে আশুতোষের কাছে। আশুতোষ জিজ্ঞেস করেন, ‘লেডিকেনির সঙ্গে লেডি ক্যানিং-এর কী সম্পর্ক?’
‘লেডি ক্যানিং হচ্ছেন লর্ড ক্যানিং-এর স্ত্রী। একটা মত বলে ওঁর ভারতে আসবার অনারে, আবার আরেকটা মত বলে যে ওঁর জন্মদিনে একটা মিষ্টি তৈরি হয়েছিল। লেডি ক্যানিং থেকে সেই মিষ্টির নাম হল লেডিকেনি। লেডিকেনি নাকি লেডি ক্যানিং-এর খুব পছন্দের মিষ্টি হয়ে উঠেছিল।’
আশুতোষ মৃদু হেসে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তবে যে বলছিলিস আমার বন্ধু পাগল?’
বৃষ্টি বলে, ‘কিন্তু লেডিকেনির বাবার বিখ্যাত জিনিস কী?’
সোহমের কাছে সেই উত্তরও প্রস্তুত।
‘লেডিকেনি মিষ্টিটা প্রথম তৈরি করেন ভীমনাগ। তাই ভীমনাগই লেডিকেনির বাবা। আর ভীমনাগের বিখ্যাত জিনিস?’
‘জলভরা সন্দেশ!!!’
লাফিয়ে ওঠে বৃষ্টি।
বউবাজারের নির্মল চন্দ্র স্ট্রিটের ভীমনাগ থেকে সাতটা জলভরা সন্দেশ কিনে বেরোল সোহম আর বৃষ্টি। জেমস লং-এর মোদকপুত্র লেডিকেনি মাটি চাপা দিয়েছিল। তাই সোহম-বৃষ্টির গন্তব্য এখন লেডি ক্যানিং-এর কবর। ব্যারাকপুরের আর্মি ক্যান্টনমেন্ট। তাদের গাড়ি ভীমনাগ ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আরও একটা গাড়ি তাদের পিছু করল।
ব্যারাকপুরের চিড়িয়ামোড় থেকে লাটবাগানের দিকে ওদের গাড়ি ঢুকল। আর্মি ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে লেডি ক্যানিং-এর কবর খুঁজে বার করতে নাজেহাল হয় সোহম আর বৃষ্টি। ওখানকার লোকজন কেউ জানেই না যে এমন কিছু ওখানে আছে। অনেক খোঁজখবর করে তবে ওরা সেই কবরের সন্ধান পায়। গঙ্গার পাশে একটা ছোটো পার্কের মতো জায়গা বেড়া দিয়ে ঘেরা। তার ভেতরেই সেই একটিমাত্র কবর। কবরের ঠিক উলটোদিকে ঘোড়ায় চাপা লর্ড ক্যানিং-এর স্ট্যাচু। গাছগাছালিতে ভরা জায়গাটা এতটাই নির্জন যে সোহম আর বৃষ্টির খুব ভালো লেগে যায়। মিষ্টির প্যাকেটটা সোহম সেই কবরের ওপর রাখে। তারপর একটু দূরে গিয়ে দু-জনে একসঙ্গে বসে— এই নির্জন জায়গায় এই কবরের ওপর রাখা মিষ্টির প্যাকেটের যে কী চমৎকারী ক্ষমতা সেটা পরখ করতে। কিন্তু এই ভরদুপুরবেলা কাউকেই এই কবরের আশেপাশে আসতে দেখা গেল না। বৃষ্টি বলে, ‘পরের চিঠিটা আমরা নিশ্চয়ই কোনো লাল পিঁপড়ের থেকে পেতে চলেছি। এখানে তো লালপিঁপড়ে ছাড়া আর কেউ সন্দেশ খেতে আসবে বলে মনে হয় না।’
সোহম হেসে বলে, ‘জানিস তো বৃষ্টি, ১৮৫৭-র সিপাই বিদ্রোহের পর ভারতের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির থেকে ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের হাতে চলে যায়। পয়লা নভেম্বর ১৮৫৮য় কুইন ভিক্টোরিয়া ভারতের রানি ঘোষিত হন। লর্ড ক্যানিং হলেন ভারতের প্রথম ভাইসরয়। তাঁর স্ত্রী লেডি ক্যানিং বা Charlotte Canning তাই হলেন ভারতের প্রথম ভাইসরাইন। লেডি ক্যানিং খুব বড়ো আর্টিস্ট ছিলেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে উনি বেশ কয়েকটা বিখ্যাত ছবি এঁকেছিলেন। সেই ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখে উনি ইংল্যান্ডে কুইন ভিক্টোরিয়াকেও পাঠাতেন। শেষবার দাৰ্জিলিং থেকে ফেরার পর লেডি ক্যানিং-এর ম্যালেরিয়া হয়। লর্ড ক্যানিং-এর কোলে মাথা রেখে এখানকার Government House-এ উনি মারা যান। ওঁর শোকে কয়েক মাসের মধ্যে লর্ড ক্যানিং-ও মারা যান। এই সামনের গঙ্গা লেডি ক্যানিং-এর খুব পছন্দ ছিল, যে কারণে তাঁকে এখানেই কবর দেওয়া হয়।’
বৃষ্টি গম্ভীর হয়ে বলে, ‘সেই তবে থেকে সাহেব ঘোড়ায় চড়ে তাঁর স্ত্রীর কবর পাহারা দিয়ে যাচ্ছেন ? দেখেছিস ? একেই বলে সত্যিকারের ভালোবাসা!’
প্রায় ঘণ্টাখানেক বসে থাকার পর সোহম আর বৃষ্টি উঠে পড়ে। তারা চারপাশটা ঘুরে দেখতে থাকে। কবরের পশ্চিম দিকে হাঁটতে হাঁটতে তারা গঙ্গার ঘাটে এসে পৌঁছোয়। গঙ্গায় বোধ হয় তখন জোয়ার চলছে, সোহম ছুটে গিয়ে প্যান্ট গুটিয়ে গঙ্গার জলে নেমে পড়ে। বৃষ্টি তার পিছন পিছন এলে সোহম তার গায়ে জলের ছিটে দিতে থাকে। সোহমের এই ছেলেমানুষি বড্ড ভালো লাগে বৃষ্টির।
এক বৃদ্ধ মালি কবরের বাগানের ভিতরের আগাছা পরিষ্কার করতে আসেন। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে কবরের ওপর রাখা একটি মিষ্টির প্যাকেট। কাছে এসে তিনি দেখেন যে প্যাকেটটা ভীমচন্দ্র নাগের। প্যাকেট খুলে তিনি গুনে দেখলেন যে তার মধ্যে ঠিক সাতটা জলভরা সন্দেশই রাখা আছে। বৃদ্ধ মালির এতদিনের অপেক্ষা কি তাহলে শেষ হল? দ্রুত তিনি সেই প্যাকেট নিয়ে বাগান থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাগানের পাশেই তাঁর টিনের চালের একটা ছোট্ট ঘর। সেখানে একটা বাক্সের মধ্যে এতগুলো বছর ধরে যত্ন করে তিনি রেখে দিয়েছেন জিনিসটা।
সোহম আর বৃষ্টি গঙ্গা থেকে উঠে ঘাটের সিঁড়িতে বসেছে। সোহম আনমনে নিজের মাথার চুল আঙুল দিয়ে পাকাচ্ছে। খুব গভীর চিন্তামগ্ন হলেই সোহম এমনভাবে চুল পাকায়। এই অবস্থায় সোহমকে দেখলে বৃষ্টির খুব হাসি পায়। সোহম বলে, ‘এত অবদি এসে যদি এভাবে আটকে যেতে হয় তার থেকে খারাপ আর কিছু হতে পারে না রে বৃষ্টি।’
সোহম লক্ষ করে একজন বৃদ্ধ তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সিঁড়ির ওপরে। সোহম বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়। বৃদ্ধ বলেন, ‘সোমনাথবাবু কেমন আছেন?’
সোহমের মুখে হাসি ফোটে। সে বলে,
‘সোমনাথবাবু মারা গেছেন, প্রায় পঁচিশ বছর হল।’
খবরটা শুনে বৃদ্ধ খুবই মর্মাহত হন। তিনি বলেন, ‘সোমনাথবাবু আমায় খুব ভালোবাসতেন, এখানে মাঝে মাঝে আসতেন। অনেক বছর আগে ওঁর একটা চিঠি পাই। আপনি কে হন সোমনাথবাবুর?’
সোহম বলে, ‘আমি কেউ হই না।’
বৃদ্ধ যেন এই উত্তর আশা করেননি।
‘সেকী! আপনার চেহারা, তারপর এই চুল পাকানোর কায়দা...’
হঠাৎ বৃদ্ধর কথা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি লুটিয়ে পড়েন সোহমের গায়ে। সোহম তঁাকে ধরে কোনোমতে মাটিতে শুইয়ে দেখতে পায় তাঁর পিঠে গুলি লেগেছে, গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে সেই ক্ষত থেকে। এতক্ষণ সোহম খেয়াল করেনি যে তাদের পাশে ঘাটে বসে ছিল একজন টাকমাথা মাঝবয়সি লোক যার হাতে সাইলেন্সার লাগানো রিভলভার। একটা বাইক এসে দাঁড়ায়, লোকটা তড়িঘড়ি সেই বাইকের পিছনের সিটে উঠে পড়লে নিমেষের মধ্যে বাইক সামনের রাস্তায় মিলিয়ে যায়। লোকটাকে সোহম আর বৃষ্টি আগেও দেখেছে। এই লোকটাই নন্দকুমারের বাড়ি ধূপ বিক্রি করতে এসেছিল। সেই বাইকটা বেরিয়ে যেতে আরেকটা ইনোভা ঝড়ের গতিতে সেই একই রাস্তায় ছুটে গেল। বৃষ্টির মনে হল সেই গাড়ির ভেতরে যেন সে তার পরিচিত একজনকে দেখতে পেল।
মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে বৃদ্ধের লাশ। সোহম বৃষ্টিকে নিয়ে আবার সেই বাগানের ভেতরে ঢুকে সেই কবরের ওপরে রাখা মিষ্টির প্যাকেট খোলে। তার ভেতরে আরেকটা চিঠি।
সোহম আর বৃষ্টি স্থানীয় লোকজনদের খবর দেয়। জানা যায় এই বৃদ্ধ ছিলেন ওই কবরের বাগানের মালি। পুলিশ হাজির হয় কিছুক্ষণের মধ্যে। সোহম আর বৃষ্টির স্টেটমেন্ট নেওয়া হয়। বৃষ্টি তার বাবার পরিচয় জানাতে তাদের কয়েকটা প্রশ্ন করেই পুলিশ রেহাই দেয়।
সোহম আর বৃষ্টি তাদের গাড়ি করে ব্যারাকপুর থেকে ফিরছে। যে গোলকধাঁধার নির্মাণ শুরু হয়েছিল নেহাত কিছু ঐতিহাসিক তথ্যকে কেন্দ্র করে তা হঠাৎ রাঙিয়ে উঠল এক বৃদ্ধের রক্তে। মালির এই মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সোহম। কী বলতে চাইছিলেন তিনি যে কথা শেষ করার আগেই তাঁকে মেরে ফেলা হল? ওই টাকমাথা লোকটা কেন ওদের পিছু করছে? একটা জন্মদিনের উপহারে কী এমন রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে যার জন্য একজন বৃদ্ধকে এভাবে খুন হতে হয়?
বৃষ্টি খুব ভয় পেয়ে গেছে। সে সোহমকে বলে,
‘তুই এসব নিয়ে আর মাথা ঘামাবি না সোহম। আমি বাবাকে বলে দিচ্ছি।’
‘এই ঘটনার আগে যদি তুই এই কথাটা বলতিস তাহলে আমি হয়তো তোর কথা শুনতাম। কিন্তু এখন তো আমি এর শেষ দেখেই ছাড়ব।’
মিষ্টির প্যাকেটের মধ্যে পাওয়া চিঠিটা সোহম খোলে। তাতে লেখা—
একান্ন আট জমি সুতোর গুদাম থেকে গান
কোম্পানি পেল বৈষ্ণব হতে বিশ্বনাথের ধাম
দেওয়ানি আদালতে তোপে উড়ে যাওয়া প্রথম অপরাধী
কাজ করে সেথা নাগাল পেলেই আরেক পা পাড়ি দিই
‘চিন্তা কোরো না, আমি রজতের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছি। তোমাদের যাতে কোনো পুলিশি হ্যারাসমেন্ট ফেস করতে না হয় সেটা রজত এনশিয়োর করেছে।’
ব্যারাকপুরের ঘটনার পরের দিনের সকাল। সোহম গতরাতে দু-চোখের পাতা এক করতে পারেনি। বৃষ্টি তার বাবাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে সোহম আর এই ব্যাপারে মাথা ঘামাবে না। আশুতোষ বৃষ্টিকে বলেন, ‘সে ঠিক আছে। কিন্তু খুনটা যে এই উপহারের ব্যাপারটার সঙ্গেই জড়িয়ে সেটাই-বা আমরা ধরে নিচ্ছি কেন? আরও লোকজনের সঙ্গে তো তোরা যোগাযোগ করেছিস, তাঁদের তো কিছু হয়নি।’
সোহম নিঃশব্দে ঘাড় নাড়ে। সে বলে, ‘স্যার, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’
‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই।’ আশুতোষ বলেন।
‘স্যার, আপনার কেন মনে হল যে আমিই এই গোলকধাঁধার সমাধান করতে পারব? আপনি নিজে বাংলার আয়না-র মতো একটা বই লিখেছেন, আপনি নিজে তো চেষ্টা করলেই ...’
‘এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার ফুরসত আছে আমার? ব্যাবসার নানান ঝামেলা সামলাতে সামলাতে জেরবার হয়ে যাচ্ছি।’
‘কিন্তু স্যার, উপহারটা যদি তেমন মূল্যবান হয় আর আমি যদি সেটা আপনার হাতে তুলে না দিই?’
আশুতোষ হেসে বলেন, ‘আমায় যদি নাও দাও আমার মেয়ের হাতে সেটা তুমি তুলে দেবে— এ আমি খুব ভালো করে জানি।’
হেসে ফেলেন আশুতোষ। তারপর সোহমের কাঁধে হাত রেখে তিনি বলেন, ‘আমি মানুষ চিনি, সোহম।’
সোহম আর বৃষ্টি কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায় গেছে। সোহমের একটা বই কেনার ছিল। লাইব্রেরিতে পাওয়া যায়নি, তাই কেনা ছাড়া উপায় নেই। এদিকে বইটার দাম হাজার টাকা। এত টাকা এই মুহূর্তে তার পক্ষে খরচ করা মুশকিল। কথায় কথায় বৃষ্টি সেটা টের পেয়েছে। সোহমকে টানতে টানতে সে কলেজ স্ট্রিট নিয়ে এসেছে। বইটা সোহমকে উপহার দিয়ে তবে বৃষ্টির শান্তি হল। এমন আকছার ঘটে, সোহমের মাঝে মাঝে খুবই লজ্জা লাগে। বৃষ্টির কাছে ধমক খেয়ে সেই লজ্জা আবার তাড়াতাড়ি কেটেও যায়।
বই কেনার পর দু-জনে একসঙ্গে এখন পুঁটিরামে কচুরি-ছোলার ডাল খাচ্ছে। আশুতোষের কাছে আরও একটা চিরকুট এসেছে গতকাল। তাতে লেখা— জগৎ শেঠের হত্যা। কে এই জগৎ শেঠ, সেটাই বৃষ্টিকে এতক্ষণ বুঝিয়ে বলছিল সোহম।
‘জগৎ শেঠ কোনো ব্যক্তিবিশেষের নাম নয়। ‘‘জগৎ শেঠ’’ একটা উপাধি। এঁরা ছিলেন যাকে বলে kingmaker। মুর্শিদাবাদের দরবারে একজন দেশি জমিদারের থেকে তাঁদের সম্মান অনেক বেশি। এঁরা ছিলেন জৈন। এঁদের বংশের ফতেচাঁদ দিল্লিতে দুর্ভিক্ষের সময় মুঠো মুঠো টাকা ধার দিয়ে সেই দুর্ভিক্ষ থেকে লোকজনকে উদ্ধার করেন। খুশি হয়ে তৎকালীন মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহ ফতেচাঁদকে উপাধি দেন ‘‘জগৎ শেঠ’’। ১৭৪৪-এ ফতেচাঁদ মারা গেলে তাঁর নাতি মহাতপচাঁদ ‘‘জগৎ শেঠ’’ উপাধি পেলেন। আলীবর্দি খাঁ মহাতপচাঁদকে খুবই খাতির করতেন। কলকাতায় ইংরেজরা টঁাকশাল স্থাপনের চেষ্টা করছিল সেইসময়। কিন্তু তারা খুব ভালো করেই জানত যে ‘‘জগৎ শেঠ’’ তা হতে দেবেন না। মুদ্রা তৈরির জন্য সোনা বা রুপো যা লাগে তা সবই শেঠরা একা কিনে থাকেন। সেই লাভের ব্যাবসায় তাঁরা অন্য ভাগীদার জুটতে দেবেন না। ১৭৫৬-য় মৃত্যুর আগে সিরাজকে মসনদে বসিয়ে শেঠদের পরামর্শ নিয়ে রাজকাজ করতে বলে যান আলিবর্দি। কিন্তু সিরাজ মসনদে বসার আগে থেকেই সিরাজকে সরানোর ষড়যন্ত্র শুরু হয়। সিরাজ নিজেও খুব হঠকারী আর চঞ্চল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। সময়ে সময়ে জগৎ শেঠ মহাতপকে অনেক অপমানও করেছিলেন। মুসলমান করে দেওয়ার ভয়ও দেখাতেন মাঝে মাঝে।’
‘এ আবার কী? সিরাজের তো এসব করা ঠিক হয়নি!’ বৃষ্টি বলেছিল শেষের কথাটা শুনে।
‘শুধু এই নয়, যৌবনে সিরাজের লাম্পট্যেরও অনেক তথ্য পাওয়া যায় ইতিহাসে। যশোরের রানি ভবানীর বিধবা মেয়ের পিছনে সিরাজ এমনভাবে পড়েছিলেন যে মেয়েটাকে বাঁচাতে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। প্রমাণ দিতে তাঁর ফলস চিতা জ্বালানো হয়।’
‘বলিস কী রে!’ বৃষ্টি আঁতকে ওঠে।
‘দোষ গুণ মিলিয়েই একটা মানুষ হয় রে, বৃষ্টি। আসলে যাদেরকে আমরা হিরো বলে দেখি তাদের যে কোনো দোষ থাকতে পারে তা আমরা বিশ্বাসই করি না। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে এসব ধরা পড়ে। সিরাজের নানান রকমের দোষ, কিন্তু তাও সব ঐতিহাসিকরা সিরাজকে ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে মেনে নিয়েছেন।’
‘বুঝলাম। তা সিরাজ ক্ষমতায় আসার পর কী করলেন জগৎ শেঠ?’
‘আগে নিয়ম ছিল যে নতুন নবাব মসনদে বসলে তাঁর সনদ দিল্লি থেকে এনে দেবেন জগৎ শেঠ। কিন্তু সিরাজ মসনদে বসার পর জগৎ শেঠ সনদ আর আনেন না। এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে সিরাজ জগৎ শেঠকে বিভিন্ন বণিকের থেকে তিন কোটি টাকা তুলে দিতে আদেশ দেন। মহাতপ সেই আদেশ না মানলে সিরাজ নাকি তাঁর মুখে ঘুসি মেরে তাঁকে বন্দি করেছিলেন।’
‘জগৎ শেঠকে? বলিস কী রে! এই করে করেই নিজের সর্বনাশ ডেকেছিলেন সিরাজ।’
‘দিল্লির বাদশারা যাঁদের সম্মান করে এসেছেন এতদিন তাঁরা বাংলার নবাবের থেকে এমন অপমান কেন সহ্য করবেন? ব্যস, শুরু হল বদলা নেওয়ার খেলা। সেই সময় ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজের ঝামেলা শুরু হয়। প্রথমে জগৎ শেঠের মাধ্যমে ইংরেজরা সিরাজের সঙ্গে নেগোসিয়েশনের চেষ্টা চালায়। ফতেচাঁদের ষড়যন্ত্রে আলিবর্দি খাঁ-কে বাংলার নবাব করা হয়েছিল আগের নবাব সরফরাজকে সরিয়ে। এবার এই ফতেচাঁদের নাতি মহাতপচাঁদের গদিতেই শুরু হল আলিবর্দির নাতি সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।’
‘মানে এক জেনারশনে প্রথম দাদু দ্বিতীয় দাদুকে মসনদে বসালেন আর পরের জেনারেশনে প্রথম দাদুর নাতি দ্বিতীয় দাদুর নাতিকে পথে বসালেন? কী ডেঞ্জারাস লোকজন রে সব!’
‘জানবি গোটা পৃথিবীর রাজনীতির কলকাঠি থাকে বড়ো বড়ো ব্যবসায়ীদের হাতে। অর্থ যাদের হাতে, নীতির নির্ণায়ক তারাই। অর্থনীতির চালক তারাই। তারাই সরকার ভাঙে, আবার সরকার গড়ে। ভারতবর্ষে তখন আর কোনো বণিক জগৎ শেঠেদের ধারেকাছেও ছিল না। যাই হোক, পলাশির যুদ্ধের পর মিরজাফর বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হলেন। ইংরেজরা তখন কলকাতায় টাঁকশাল বানিয়ে নিজেদের মুদ্রা বাজারে ছাড়তে শুরু করল। এতে মুর্শিদাবাদের টাঁকশালের ক্ষতি হবে, যার প্রভাব পড়বে জগৎ শেঠের মুনাফার ব্যাবসায়। কিন্তু মুদ্রা প্রচলনের ভার তখনও জগৎ শেঠের ওপর। তাই ইংরেজদের মুদ্রা নিতে লোকজনের তখনও ভয় ছিল। এদিকে ইংরেজদের খাঁই মেটাতে মেটাতে নাজেহাল অবস্থা মিরজাফরের। তাই জগৎ শেঠের থেকে অনেক টাকাপয়সা ধার করতে হয় মিরজাফরকে। এই নিয়ে তাঁদের সম্পর্কে তিক্ততার সৃষ্টি হয়। এইজন্যেই আমি চাই না যে সবসময় তুই আমায় এটা ওটা কিনে দিবি।’
‘এর থেকে বলছিস আমাদের সম্পর্কে তিক্ততার সৃষ্টি হবে? একবার সৃষ্টি করে দেখা দেখি! কেমন তোর ‘‘তিক্ততা’’?’
‘না না দরকার নেই। তার থেকে চল তোর আরও পয়সা খসাই। ডাব শরবত খাওয়া।’
বৃষ্টি আর সোহম এখন কলেজ স্ট্রিটের প্যারামাউন্টে। ডাব শরবতের ওপর ভাসমান তুলতুলে নারকেলের শাঁসটা চামচে করে তুলে নিয়ে তাতে একটা কামড় বসিয়ে সোহম বলে,
‘১৭৬০-এ মিরজাফর ক্ষমতাচ্যুত হলেন। তাঁর জামাই মিরকাশেম মসনদে বসলেন। ইংরেজদের সঙ্গে ট্যাক্স নিয়ে ঝামেলা বাধে মিরকাশেমের। মহাতপচাঁদ গোপনে ইংরেজদের সাহায্য করতেন বলে তাঁকে মুঙ্গেরে বন্দি করা হয়। ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়ে মুঙ্গেরে বন্দি জগৎ শেঠকে হত্যা করেন িমরকাশেম। মুঙ্গেরের দুর্গের ওপর থেকে মহাতপকে গঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়।’
বৃষ্টি হঠাৎ শরবতের গেলাসটা নামিয়ে রেখে বলে, ‘সোহম, বাবার কেউ কোনো ক্ষতি করতে চাইছে না তো?’
সিংহবাড়ির ভাদ্র মাসের লক্ষ্মীপুজো বেশ ঘটা করে করা হয় প্রত্যেক বছর। এ বছরও তার তোড়জোড় চলছে। সাক্ষীগোপাল নিমন্ত্রিতর লিস্ট মিলিয়ে নিচ্ছেন আশুতোষের সঙ্গে বসে। সেই উপলক্ষ্যে বাড়ি আবার নতুন করে সাজানো হচ্ছে। অনেক দুর্লভ জিনিসপত্র যেগুলো স্টোররুমে রাখা থাকে সারা বছর, সেগুলো বের করা হয় এই সময়। পুরোনো কলকাতার এমনই কয়েকটা ছবি জলসাঘরের দেওয়ালে টাঙানো হয়েছে যা ক্যামেরাবন্দি করছে জাহ্নবী। বৃষ্টি সেখানে হঠাৎই হাজির হয়। জাহ্নবীর পাশে দাঁড়িয়ে সে বলে,
‘এই ছবিটা নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরিতে লালবাজার আর পোর্তুগিজ গির্জার ছবি। আমার ঠাকুরদা-র কালেকশন।’
‘তোমার ঠাকুরদা খুব শৌখিন লোক ছিলেন বলতে হয়।’ জাহ্নবী অবাক হয়ে দেখছিল ছবিটা। ‘সত্যি, সেদিনকার কলকাতা আর আজকের কলকাতা— চেনাই যায় না, তাই না?’
বৃষ্টি যেন কথাটা শুনতেই পায়নি। সে বলে, ‘তোমার ডকুমেন্টারির জন্য নানান জায়গায় ঘুরে ঘুরে ফুটেজ জোগাড় করতে হয় তোমায়। তাই না? খুব পরিশ্রমের কাজ।’ বৃষ্টির কণ্ঠস্বর কেমন একটা বেখাপ্পা সুরে বাঁধা।
জাহ্নবী সহজভাবে উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আমার ভালো লাগে।’
‘দু-দিন আগে তুমি ব্যারাকপুরে লেডি ক্যানিং-এর কবরের ওখানে গিয়েছিলে, তাই না?’
জাহ্নবী অবিচলিত, ‘হ্যাঁ, ওটা তো একটা হেরিটেজ প্লেস।’
‘কিন্তু কেউ তার ব্যাপারে জানেই না! অদ্ভুত! তাই না? এর আগে জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাড়ির ওখানেও তো তুমি গিয়েছিলে! তুমি বলবে ওই বাড়িও হেরিটেজ প্লেস।’
‘ডকুমেন্টারির জন্য বিভিন্ন জায়গায় আমায় যেতে হয়, তার শিডিউল করা আছে।’
‘কী আশ্চর্য ব্যাপার। যেখানেই আমি আর সোহম যাই, ঠিক সেইখানে সেইদিনই তোমার শিডিউল পড়ে যায়। আচ্ছা, জেমস লং সরণিতেও নিশ্চয়ই তুমি গিয়েছিলে? তাই না? ঘটনাগুলো বড্ড বেশি কাকতালীয় হয়ে যাচ্ছে না? তাড়াতাড়ি তোমার কাজ শেষ করো। আমাদের বাড়িতে নতুন গেস্ট আসবে।’
খুব কড়াভাবে কথাটা বলে বৃষ্টি জলসাঘর থেকে চলে যায়। জাহ্নবী মৃদু হেসে তার ছবি তোলায় মন দেয়।
অভিরাজের স্ত্রী সুমনা এই বাড়িতে শ্বশুরের অপমান সহ্য করে আর থাকতে চায় না। কিন্তু বর্তমানে ওদের আর কোথাও গিয়ে থাকাও সম্ভব নয়। ব্যাঙ্কের রিকভারি এজেন্সির লোকজন এসে রীতিমতো অপমান করে গেছে অভিরাজকে। বিভিন্ন ধারদেনা মেটাতে মেটাতে অভিরাজের আর্থিক অবস্থা এখন খুব খারাপ। তার একমাত্র অবলম্বন এখন আমিরচাঁদ মিত্তল। সিংহবাড়ির পৈতৃক নাকছাবি আর কয়েকদিনের মধ্যেই আশুতোষের দেরাজ থেকে বের করে লক্ষ্মীপ্রতিমাকে পরানো হবে। এই সময়টা নানান হইহট্টগোলের মধ্যে কাজটা চুপিসারে সেরে ফেলতে হবে। দাঁতে দাঁত চেপে কয়েকদিন তাই কোনোমতে এই বাড়িতে কাটিয়ে দিতে চাইছে অভিরাজ। গয়নাটা কবে বের করা হবে সেটা কথার ছলে জানতে বৃষ্টির ঘরে গিয়েছিল সে। কিন্তু সাক্ষীগোপালের থেকে সে জানত পারল যে সোহম বৃষ্টিকে নিয়ে একটু আগেই খুব তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেছে।
একান্ন আট জমি সুতোর গুদাম থেকে গান
কোম্পানি পেল বৈষ্ণব হতে বিশ্বনাথের ধাম
অস্টিন গাড়ি এখন চলেছে বি টি রোড ধরে। সোহম বুঝিয়ে বলে,
‘এই বৈষ্ণব হলেন বৈষ্ণবচরণ শেঠ। উনি ছিলেন আদি কলকাতার নামকরা একজন বাসিন্দা। ধনী এবং ধার্মিক বলে তাঁর খুব নাম ছিল। তিনি অনেক দানধ্যান করেছিলেন। জোড়াবাগানে পাশাপাশি তাঁর দুটো বাগান ছিল যেখানে ইংরেজদের কামান বসেছিল, যার থেকে জায়গাটার নাম হয়েছে জোড়াবাগান। সেই বাগানের পূর্বদিকের রাস্তার নাম বৈষ্ণবচরণ শেঠ স্ট্রিট।’
বৃষ্টি জিজ্ঞেস করে, ‘একান্ন আট জমি সুতোর গুদাম থেকে গান— এর মানে কী?’
সোহম বলে, ‘এই টালা এলাকায় ৫১ বিঘা ৮ কাঠা জমি বৈষ্ণবচরণ শেঠ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিক্রি করেছিলেন। মেদিনীপুরের কাশীজোড়া নিবাসী দামোদর দাসবর্মার পূর্বপুরুষ কাশীনাথ বর্মার নাম থেকে এই এলাকার নাম হয় কাশীপুর।’
‘কোম্পানি পেল বৈষ্ণব হতে, মানে বৈষ্ণবচরণ শেঠ হতে বিশ্বনাথের ধাম। মানে কাশী, সেই থেকে কাশীপুর?’ বৃষ্টির কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়।
‘রাইট! এখানে আগে ইংরেজদের সুতোর গুদাম ছিল। সেই গুদাম থেকে পরে হয় দুর্গ। তারপর সেখানে এই বাড়ি হয়।’
সোহম আর বৃষ্টি এই মুহূর্তে কাশীপুরের খগেন চ্যাটাৰ্জি রোডে গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরির সামনে পৌঁছেছে। সোহম বলে, ‘সুতোর গুদাম থেকে Gun।’
বৃষ্টি বলে, ‘তারপরের লাইনগুলো?
দেওয়ানি আদালতে তোপে উড়ে যাওয়া প্রথম অপরাধী
কাজ করে সেথা নাগাল পেলেই আরেক পা পাড়ি দিই
‘দেওয়ানি আদালতে তোপে উড়ে যাওয়া প্রথম অপরাধী— লর্ড ক্লাইভের আমলে প্রথম তৈরি হয় দেওয়ানি আদালত। পাঁচজন ইংরেজ এই আদালতের বিচারক। এই পাঁচজনের মধ্যে একজন ছিলেন জজ সাহেব। কুড়ি টাকার ওপর যেসব দেনাপাওনা নিয়ে ঝামেলা হত তার বিচার হত এই দেওয়ানি আদালতে। অপরাধীদের শাস্তি ছিল চাবুক দিয়ে পেটানো। এই চাবুক মারা হত প্রত্যেক শুক্রবার করে। যার অপরাধ যতটা গুরুতর তাকে তত বেশি চাবুক মারা হত। পরে তৈরি হল অপরাধের দ্বিতীয় শাস্তি। আদালতের বিচারে চরম অপরাধে দণ্ডিত অপরাধীকে তোপের মুখে বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া হত। সেই প্রথম দণ্ডিত অপরাধীর নাম— নয়ান ছুতার।’
তারা ফ্যাক্টরির এনকোয়ারিতে গিয়ে খোঁজ নেয়। প্রায় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর জানা যায় নয়ান বারুই নামে একজন মিস্ত্রি এখানে কাজ করতেন, কিন্তু তিনি মারা গেছেন বছরখানেক হল। তাঁর বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করে তারা।
আগরপাড়া স্টেশনের পাশের সরু গলির একটা একতলা বাড়িতে পৌঁছোয় সোহম আর বৃষ্টি। নয়ানের ছেলে চরণ সেখানে থাকে। বাড়ি দেখে মনে হল নয়ান বারুই পয়সাকড়ি কিছু রেখে গেছেন। চরণের বয়স বছর পঁচিশেক। ছেলেটাকে শিক্ষিত বলেই মনে হল তাদের। সোমনাথ দাসের কথা শুনে সে চিনতে পারে। চরণ বলে,
‘বাবা মারা যাওয়ার আগে আমায় সোমনাথ দাসের কথা বলেছিল। বাবার কাছে কোম্পানির আমলের কিছু বন্দুক রাইফেল ছিল, সেগুলো দেখতে এসেছিলেন সোমনাথবাবু। তারপর থেকে দু-জনের মধ্যে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। বাবার কাছে উনি একটা নাম্বার লক নিয়ে এসেছিলেন। বাবা সেই লকটার ওপর একটা বারুদের কোটিং তৈরি করে দিয়েছিল। একমাত্র ঠিক নাম্বার সেট করতে পারলেই সেই লক খুলবে। তা না করে কেউ যদি লকটাকে ভাঙতে যায় তাহলে সেই বারুদের বিস্ফোরণে লকটা বাৰ্স্ট করবে।’
সোহম বলে, ‘তার মানে সেই নাম্বার না জানলে ওই লক কিছুতেই খোলা যাবে না?’
‘না।’
চরণ ড্রয়ার থেকে একটা চিঠি বার করে সোহমকে দেয়।
‘এই চিঠিটা বাবাকে পাঠিয়েছিলেন সোমনাথবাবু। বাবা সবসময় এটা এই ড্রয়ারে রেখে দিত। বাবা আমায় বলে গিয়েছিল, একদিন কেউ-না-কেউ এই চিঠির খোঁজে আসবে।’
চরণের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোহম আর বৃষ্টি গাড়িতে ওঠে। সোহম বলে,
‘এবারের ধাঁধাটা সোজা। চল, পরের চিঠিটা একেবারে নিয়েই বাড়ি ফিরব।’
আরও একটা গাড়ি পিছু করে বৃষ্টির গাড়িকে।
ট্যাংরার চীনেপাড়ার একটা গলিতে একটা Porsche গাড়ি এসে থামে। গাড়ি থেকে নেমে এলেন আমিরচাঁদ মিত্তল। তাঁর মোবাইলে একটা মেসেজ আসে— APC Roy Road। আমিরচাঁদ হেঁটে চলেছেন একটা চাইনিজ রেস্তরাঁর দিকে। কিন্তু রেস্তরাঁয় না ঢুকে আমিরচাঁদ তার পাশের একটা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন দোতলায়। সেখানে মুখোমুখি দুটো ফ্ল্যাট। আমিরচাঁদ সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডান দিকের ফ্ল্যাটের বেল টেপেন। বাড়ির দরজায় ড্রাগনের একটা নকশা।
খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল বৰ্গি এল দেশে
সুতানুটি গোবিন্দপুর পড়ল কাটা শেষে
খাদের পথে উমিচাঁদ আর নেটিভ জমিদার
পথ নিল বাঁক একটুখানি বাগানবাড়ি পার
খুঁজতে থাকো এদিক ওদিক বাগানবাড়ির পাশে
বাগবাজারের নবরত্ন প্রবল ঝড়ের গ্রাসে
সোহম আর বৃষ্টিকে নিয়ে সিংহ বংশের অস্টিন গাড়ি এখন চলেছে বি টি রোড ধরে।
‘ভদ্রলোক কয়েকখানা নিছক ছড়ার বই ছাপিয়ে গেলেও পারতেন রে বৃষ্টি। অদ্ভুত অ্যাবস্ট্র্যাকশন ক্ষমতা।’
‘এই চিঠিতেও একটা সংখ্যা। এগুলো কি ওই অদ্ভুত লকার খোলার নাম্বার কম্বিনেশন?’
‘তাই তো মনে হচ্ছে।’
বৃষ্টি বলে, ‘আমার মনে হয় ওই লকারের মধ্যেই বাবার জন্য গিফটটা রাখা আছে।’
‘হুম, কিন্তু সেই লকারটা আছে কোথায়?’
‘এই সোহম, অনেকদিন গোলবাড়িতে খাওয়া হয়নি। আগে ওখানে খাব, তারপর যেখানে যাবার যাব।’
আমিরচাঁদ এখন একজন চীনে ব্যবসায়ীর সঙ্গে একটা ডিল করছেন। সেই ব্যবসায়ী আমিরচাঁদের কথা ঠিক বিশ্বাস করতে চাইছেন না।
‘Look Mr Mittal, you have been promising this to me for the last twenty years. But you are yet to trace it. It looks like you are completely out of track.’
‘I am very much in Mr Tung. But the price is non-negotiable. Thirty-five crores.’
‘Thirty-five crores is too much.’
‘The grip is of pure gold, with five of the world’s most precious stone— spinnel, ruby, diamond, emerald and saphire. Plus the historical valuation. Thirty-five crores is quite a fair deal. Plus, I have one more offering. A nose ring with many antique diamonds. I shall give it to you at a discounted rate.’
গোলবাড়িতে পরোটা-কষা মাংস খেয়ে সোহম আর বৃষ্টি শ্যামবাজার পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় রোড ধরে। সোহম বলে, ‘১৭৪২ সাল। বাংলার মসনদে তখন আলিবর্দি খাঁ। শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠারা দিল্লির মুসলমান শাসকদের বিরুদ্ধে হিন্দু শক্তির পুনরুত্থানের চেষ্টা চালাচ্ছে সারা ভারত জুড়ে। প্রায় গোটা দাক্ষিণাত্য দখল করে নিল তারা। শিবাজির মৃত্যুর পর মারাঠা নায়ক রঘুজি ভোঁসলে আর তাঁর মন্ত্রী পণ্ডিত ভাস্কররাম কোলহৎকর ঠিক করলেন যে বাংলাদেশকে এবার জয় করে জুড়ে দিতে হবে নাগপুরের সঙ্গে। শিবাজি বেঁচে থাকতে থাকতেই দিল্লির বাদশা স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে রাজস্বের এক চতুর্থাংশ অথবা চৌথ মারাঠাদের দেওয়া হবে। ভাস্কর পণ্ডিত আলিবর্দি খাঁ-র কাছে তা চেয়ে পাঠালে আলিবর্দি নাকচ করে দেন। ব্যস, ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে বিশ হাজার বর্গি সৈন্য হানা দিল বাংলায়। গ্রামের পর গ্রাম পুড়তে লাগল, লুঠ হতে লাগল। প্রাণ বাঁচাতে বাংলার মানুষ পালাতে শুরু করল নিজেদের ভিটেমাটি ফেলে রেখে। কবেকার সেই বর্গিদের নৃশংসতার কথা এখনও শিশুদের ঘুমপাড়ানি ছড়ায় ব্যবহার করা হয়—
খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল বর্গি এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কীসে
বাংলায় তখন কোনো দুর্গ ছিল না। তাই বাংলা জয় মারাঠাদের পক্ষে খুব সহজ ছিল। বাংলাকে বাঁচাতে তখন আলিবর্দি খাঁ উদ্যোগ নিলেন। নবাবের রাজকোষ শূন্য হবার অবস্থা হল। বর্গিদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে গ্রামের লোকজন ছুটে এল কলকাতায়। যদি ইংরেজদের আশ্রয় পাওয়া যায়। কিন্তু ইংরেজরা শুধু নিজেদের বাঁচাতেই ফন্দি করছে। বাংলার মানুষের ভালোমন্দ নবাব বুঝবেন, ইংরেজদের তাতে কী! কিন্তু নেটিভরা মুখ চেয়ে রইল কোম্পানির সাহেবরা কী বন্দোবস্ত করে সেদিকে। কোম্পানি বাগবাজারের ঘাটে একখানা জাহাজ দাঁড় করিয়ে দিল, যার নাম ‘টাইগ্রেস’। পেরিন্স পয়েন্ট, মানে এখনকার বাগবাজারে দাঁড়াল আর একখানা জাহাজ। সাতটা বিভিন্ন জায়গায় বসানো হল কামান। কিন্তু ওই দিয়ে কি আর ওই বিরাট বর্গি সৈন্য ঠেকানো যাবে? তখন নেটিভরা নিজেরাই মিটিং করে ফন্দি করে যে কলকাতা শহরের চারপাশে একটা গভীর খাদ খোঁড়া হবে। শত্রুরা সহজে সেটা পেরিয়ে আসতে পারবে না। খাদ খোঁড়া আর সেইসঙ্গে ইংরেজদের পুরোনো কেল্লাটাকে আরও মজবুত করার আর্জি পাঠানো হল আলিবর্দি খাঁ-র কাছে। আলিবর্দি খাদ খোঁড়ার অনুমতি দিলেন, কিন্তু দুর্গের ব্যাপারটা নাকচ করে দিলেন। ইংরেজদের বেশি তোল্লাই দিতে তিনি কোনোদিনও চাননি।’
‘এটাই তো মারাঠা ডিচ?’ বৃষ্টি জিজ্ঞেস করে।
‘হ্যাঁ। খাদ খোঁড়া শুরু করল লোকাল লোকজন। ‘‘ডিচ’’ কাটার জন্য কলকাতার লোকেদের তখন বলা হত ‘‘ডিচার’’। ঠিক হল যে খাদের পরিধি হবে সাত মাইল আর চওড়ায় বেয়াল্লিশ গজ। বাগবাজার থেকে শুরু করে একটা গোল চক্কর কাটতে কাটতে উত্তর থেকে পূৰ্বদিকে ঘুরে দক্ষিণদিকে যাবে সেই খাদ। মোট পঁচিশ হাজার টাকা লাগবে। আপাতত ইংরেজদের কাউন্সিল টাকা দেবে, পরে দেশি লোকজনদের কড়ায়-গণ্ডায় টাকাটা শোধ দিতে হবে।’
‘তারপর? বর্গি এসে এই খাদে উলটে পড়ল?’
‘না। পুরো পণ্ডশ্রম। আলিবর্দির দাপটে মারাঠাদের দাপাদাপি খানিকটা কমে এল। বৃদ্ধ আলিবর্দি ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে একটা সাময়িক নিষ্পত্তি করতে পারলেন সন্ধির মাধ্যমে। বাংলাদেশ থেকে উড়িষ্যা প্রদেশটাকে প্রাপ্য চৌথ হিসেবে মারাঠাদের শাসনে দিয়ে দিলেন তিনি। শুধু মেদিনীপুরকে ছেঁটে জুড়ে দিলেন বাংলায়। তাই বাগবাজার থেকে প্রায় বেকবাগান অবদি মাত্র মাইল তিনেক খাদ খোঁড়ার পর কাজ বন্ধ হয়ে গেল। প্রায় ষাট বছর সেই খাদ সেভাবেই পড়ে রইল। তারপর সেই খাদের ওপর দিয়ে রাস্তা তৈরি হল। এই সেই রাস্তা।’
‘মানে এই আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় রোড?’
‘হ্যাঁ। এর নাম আগে ছিল আপার সার্কুলার রোড। তা ছাড়া লোয়ার সার্কুলার রোড, মানে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বোস রোড আর বাগবাজারের মারাঠা ডিচ লেন— এ সব রাস্তাই সেই খাদ বুজিয়ে করা হয়েছে।’
‘আমরা কত কম জানি নিজেদের শহরের ব্যাপারে।’ বৃষ্টি অবাক হয়ে যায় এসব গল্প শুনে।
‘খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল বর্গি এল দেশে/সুতানুটি গোবিন্দপুর পড়ল কাটা শেষে— এটুকু বেশ বোঝা গেল। এবার, খাদের পথে দাঁড়িয়ে আছে নেটিভ জমিদার/পথ নিল বাঁক একটুখানি বাগানবাড়ি পার? এই নেটিভ জমিদার আবার কে?’
‘গোবিন্দরাম মিত্র।’
‘উফ! আবার একটা নতুন ক্যারেক্টর। তা এমন একটা শুভকাজে বাধা দিতে এই নেটিভ জমিদার পথ আটকে দাঁড়িয়েই-বা পড়লেন কেন?’
‘১৭২০। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতার জমিদার হলওয়েল সাহেব তাঁর সহকারী বা ডেপুটি রাখলেন গোবিন্দরাম মিত্রকে। দেশি লোক বলে এই গোবিন্দরাম মিত্রকে ইংরেজরা বলত ব্ল্যাক জমিদার, কিংবা কালা জমিদার।’
‘কী রেসিস্ট কথাবার্তা!’
‘তুই রেসিস্ট নোস?’
‘আমি? তার মানে?’ এমন অভিযোগে বৃষ্টি খুব অবাক হয়ে পড়ে। প্রসঙ্গত বৃষ্টিকে ঠিক ফর্সা বলা চলে না। তার গায়ের রং একটু চাপা। সোহম বলে, ‘রেসিস্ট যদি না-ই হবি তাহলে রোজ স্নান করে মুখে ফেয়ারনেস ক্রিম ঘষিস কেন?’
‘আজব কথা বলছিস তো! ফেয়ারনেস ক্রিম মাখলেই রেসিস্ট হয়ে যায় লোকে? আসলে তুই নিজে ফৰ্সা তো, চাপা রঙের চাপ তুই আর কী বুঝবি!’
‘রেসিস্টদের জাত্যভিমান কী নিয়ে হয় বল তো? নিজেদের চামড়ার রং নিয়ে। নিজেকে ফর্সা করে তোলা সেই আদিম রেসিস্ট প্রবৃত্তিরই একটা পার্ট। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব যে যে দেশে পড়েছে সেই দেশের বেশিরভাগ লোকজনই তাদের প্রভুদের মতো ফর্সা হতে চায়। এই কারণেই ফর্সা আর্যরা হল দেবতা, মানে হিরো; আর কালো অনার্যরা হল অসুর, অর্থাৎ ভিলেন। আসলে বংশানুক্রমে এই সংস্কার আমাদের মনে গেঁথে গেছে। অঞ্জন দত্তর গান শুনিসনি? বংশের ইজ্জত রাখতে হলে বউ হতে হবে ফৰ্সা! ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখিস কথাগুলো।’
‘যাব্বাবা! কোন কথা থেকে কোথায় চলে গেলি তুই।’ এসব তর্কের সময় সোহম প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়ে, তাই বৃষ্টি তাকে বেশি ঘাঁটায় না। সে বলে,
‘আচ্ছা, তুই আবার ব্ল্যাক জমিদারের গল্পে ফিরে আয়।’
‘ইংরেজরা তখন নতুন এদেশে এসে ঘাঁটি গাড়ছে, তাই দেশি লোকজনদের সাহায্য তাদের পদে পদে প্রয়োজন। এই গোবিন্দরাম মিত্র যে কতটা প্রভাবশালী দোর্দণ্ডপ্রতাপ লোক ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় লোকমুখে ফেরা এই ছড়ায়:
বনমালী সরকারের বাড়ি
গোবিন্দরামের ছড়ি
উমিচাঁদের দাড়ি
হজুরিমল্লের কড়ি’
‘আবার কতগুলো নতুন ক্যারেক্টর ঢুকে পড়ল। এঁরা সবাই কি কলকাতার বিখ্যাত সব লোকজন নাকি?’
‘না হলে এমনি এমনি তাঁদের নামে ছড়া কাটা হত? বনমালী সরকারের কুমোরটুলির বাড়ি ছিল তখন কলকাতার একটা বড়ো আকর্ষণ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে তিনি পাটনায় কমার্শিয়াল রেসিডেন্টের দেওয়ান ছিলেন আর কলকাতায় ডেপুটি ট্রেডার।’
‘অগাধ ঐশ্বর্যের অধিকারী! তাই তো বলবি?’
‘হ্যাঁ। ১৭৫৬-য় সিরাজের কলকাতা আক্রমণের অনেক আগে এই বাড়ি তৈরি হয়েছিল। সেই বাড়ি এখন আর নেই, কিন্তু পুরোনো কলকাতায় লোকে এই বাড়ি বাইরে থেকে দেখতে আসত।’
‘ব্যস, আর না। এবার উমিচাঁদের দাড়ি।’
‘উমিচাঁদ, বা, আমিরচাঁদ লাহোর থেকে বাংলায় এসেছিলেন আলিবর্দি খাঁ-র সৈন্যদলে ভিড়ে। কলকাতায় শেঠদের বাড়িতে গোমস্তার কাজ করতে করতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দালালি করে কোটিপতি হয়ে উঠলেন। মুর্শিদাবাদে নবাবের দরবারে উমিচাঁদের বিশেষ খাতির ছিল। তাঁর মাধ্যমেই ইংরেজরা বাংলায় বাণিজ্য বিস্তারের সুবিধা পেয়েছিল। উমিচাঁদের যোগাযোগেই বিভিন্ন গ্রামে ইংরেজরা কার্পাস আর পাটের কাপড় বিক্রি করে অনেক লাভ করেছিল। এই উমিচাঁদের দাড়ি নাকি দেখতে খুব আকর্ষণীয় ছিল।’
‘কলকাতায় বেড়াতে এসে লোকজন এই দাড়ি দেখতে যেত? উমিচাঁদ কি নিজের দাড়ির প্রদর্শনী করতেন নাকি?’
‘উমিচাঁদের তো আর খেয়েদেয়ে কাজ ছিল না!’ সোহম বিরক্ত হয় বৃষ্টির কথায়।
‘কী কাজ ছিল তাঁর?’
‘কেন? সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র! ব্রিটিশ আর সিরাজের মধ্যে ডবল এজেন্টের কাজ। তখন পলাশির যুদ্ধর প্রস্তুতি চলছে...’
‘থাক। আপাতত এইটুকুতেই হবে। এরপর হজুরিমল্লের কড়ি।’ বৃষ্টি সোহমকে আবার ফিরিয়ে আনে।
‘হুজুরিমল্ল ছিলেন উমিচাঁদের শ্যালক। আরেক ধনী ব্যক্তি।’
‘অগাধ ঐশ্বর্যের অধিকারী?’
সোহম হেসে বলে,
‘শিয়ালদহর বৈঠকখানা বাজারের সামনে ছিল হজুরিমল্লের বাগানবাড়ি। তার ভেতরে বিরাট একটা পুকুর কাটিয়েছিলেন তিনি। তার থেকেই রাস্তার নাম হয়েছিল হজুরি মল ট্যাঙ্ক লেন।’
এত লোকজনের গল্প শুনতে শুনতে বৃষ্টি কেমন ঘেঁটে যায়। সে আবার সোহমকে ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনে।
‘ব্যস, আবার তুই ওই গোবিন্দরাম মিত্রর গল্পে ফিরে আয়। এখন আমাদের সিলেবাসে শুধু উনিই আছেন।’
সোহম হেসে বলে, ‘তোর একদম ধৈর্য নেই। যাই হোক, এই গোবিন্দরামের কথায় বাঘে গোরুতে এক ঘাটে জল খেত। ইংরেজ অধিকৃত কলকাতায় তিনিই ছিলেন বস। কিন্তু মাইনে পেতেন মোটে তিরিশ টাকা, পরে সেটা কুড়ি টাকা আরও বেড়েছিল।’
‘বলিস কী! ওইটুকু টাকা মাইনেতে উনি এত বড়োলোক হলেন কী করে?’
‘জালিয়াতি করে। সেইসময় ভারতে মোগলদের শাসন। তাই কলকাতায় মোগল ফৌজদারি আদালত চলত মুসলমান আইন মেনে। কিন্তু ইংরেজরা সে-আইন খুব একটা বুঝত না। তাই এই আইন আদালতের পুরো ব্যাপারটা ইংরেজদের হয়ে সামলাতেন গোবিন্দরাম মিত্র। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোম্পানির হিসেবে জল মিশিয়ে প্রচুর টাকা তিনি আত্মসাৎ করে ফেলেন। তাঁর কুমোরটুলির প্রকাণ্ড অট্টালিকায় লেগেই থাকত পুজোপার্বণ। সেকালের তরজা গানে এই গোবিন্দরামের উল্লেখ পাওয়া যায়:
কালো দেশের কালো মানুষ কালো জমিদার
গোবিন্দরাম মিত্র আনে জুড়ি গাড়ির বাহার’
‘তুই আবার সিলেবাসের বাইরের জিনিসপত্র পড়াচ্ছিস সোহম! ধাঁধায় ফিরে আয়।’
‘খাদের পথে দাঁড়িয়ে আছে নেটিভ জমিদার
খাদ নিল বাঁক একটুখানি বাগানবাড়ি পার।
প্রথমে ঠিক ছিল যে সেই মারাঠা ডিচ বা খাদ একেবারে সোজা নাকবরাবর এগোবে। কিন্তু হালসিবাগান পর্যন্ত এসে খাদকে বাঁক নিতে হল।’
‘কেন?’
‘কারণ হালসিবাগানেই ছিল উমিচাঁদ আর গোবিন্দরাম মিত্রর বাগানবাড়ি। এঁরা দু-জন তখন দেশি লোকজনের মধ্যে সবচেয়ে গণ্যমান্য ব্যক্তি, ইংরেজদের খাস লোক। তাই ওঁদের বাগানবাড়ি তো বাঁচাতেই হবে।’
সোহম আর বৃষ্টি এখন এ পি সি রায় রোডের ওপর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বিল্ডিং-এর সামনে দাঁড়িয়ে।
‘এই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ হচ্ছে সেই বাগানবাড়ির একটা অংশ। গোবিন্দরামের বাগানের মধ্যে ছিল রংমহল। চীনে পোর্সিলিনের ইট দিয়ে গাঁথা তিনতলা বাড়ি। আর ছিল একটা দিঘি, জলটুঙি ঘর, সাজানো গোছানো বৈঠকখানা আর আর্টিফিশিয়াল পাহাড়।’
‘ভেরি গুড। এবার খুঁজতে থাক, এদিক ওদিক বাগানবাড়ির পাশে/বাগবাজারের নবরত্ন প্রবল ঝড়ের গ্রাসে?’
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ছেড়ে তারা এগিয়ে চলে।
‘গোবিন্দরাম মিত্র আনুমানিক ১৭৩০ সালে বাগবাজারে একটা মন্দির গড়েন যার নাম রাখেন নবরত্ন মন্দির। সেই মন্দিরের চূড়া নাকি অক্টোরলনি মনুমেন্টের চেয়েও উঁচু ছিল। ১৭৩৭-এর ১১ অক্টোবর রাতে একটা বিরাট ঝড় উঠেছিল গঙ্গাসাগর থেকে। তার সঙ্গে সঙ্গে ভূমিকম্প। কলকাতার বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল এতে। সেন্ট জন গির্জার চূড়া আর এই নবরত্ন মন্দির ভেঙে পড়ে যায় সেই রাতে।’
‘কিন্তু সোহম, সেটা তো বাগবাজারে। এখানে আবার নবরত্ন মন্দির কোথায়?’
সোহম রাস্তার বিভিন্ন লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে থাকে, এই এলাকায় ‘নবরত্ন’ নামে কোনো দোকান বা বাড়ি আছে কি না। কিন্তু কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারে না। সোহম কিন্তু কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারছে না। ‘নবরত্ন’ নামে নিশ্চয়ই এখানে কিছু-না-কিছু আছে।
প্রায় সন্ধে হতে চলেছে। ‘নবরত্ন’ খুঁজতে খুঁজতে তাদের নাজেহাল অবস্থা। এমন সময় একটা সরু গলির মুখে একটা সাইনবোর্ড নজরে পড়ে সোহমের। সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সেই গলির মুখে।
‘বৃষ্টি, ব্রিটিশরা নবরত্ন মন্দিরকে কী নামে ডাকত জানিস?’
‘কী?’
‘ব্ল্যাক প্যাগোডা।’
‘হাঁ, বাপু পরনাম! পৌঁছ গয়ে গাঁও? সব কায়সান বা?...মাইজিকো পরনাম দিজিয়ে।... লছমি দিদিকি অউর এক বাছুয়া হুয়া? পরনাম দিজিয়ে। ...আরে বাছুয়াকো নেহি, লছমি দিদিকো ... বাছুয়া লছমি দিদি পে গয়া? ...’
‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’-য় এসে এক মহা যন্ত্রণায় পড়েছে সোহম আর বৃষ্টি। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের গায়ের রাস্তা নিরোদবেহারি মল্লিক রোড গিয়ে মিশেছে রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটে। নিরোদবেহারী মল্লিক রোডের ওপর একটা লোহার তালাচাবির দোকানের নাম ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’। এই চত্বরে পর পর অনেকগুলো লোহার কারখানা, লোহার সরঞ্জামের দোকান পড়ে। তারই একটাতে এখন সোহম আর বৃষ্টি দাঁড়িয়ে। মোবাইল থেকে ভোজপুরি গান বাজছে। মালিক মাঝবয়সি, তাঁকে সোমনাথ দাসের কথা বলাতে তিনি তাঁর বাপুকে ফোন লাগিয়েছেন। বাপু গতকালই ট্রেন ধরে বিহারে গেছেন তাঁদের গ্রামে। সেই যে মুখে গুটকা ঢেলে ফোনে কথা শুরু করেছেন ভদ্রলোক, পুরো গ্রামের যাবতীয় লোকজনের খোঁজখবর না নিয়ে ছাড়বেন না বলেই মনে হচ্ছে বৃষ্টির। দশ মিনিট হয়ে গেল লছমি দিদির সদ্যোজাত বাছুয়ার খবর নিয়েই চলেছেন ভদ্রলোক।
‘শুনিয়ে না বাপু, বাছুয়াকা এক ফটুয়া নিকালকে হোয়াট্যাপ কর দিজিয়ে, হামারা ব্যালাক পগোডামে টাঙ্গওয়ানা বা ...’
‘আরে বাছুয়া ছোড়িয়ে, চিঠ্ঠিকে বারেমে পুছিয়ে!’ বৃষ্টি আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারে না।
মালিকের কথা থেমে যায় ক্ষণিকের জন্য। তাঁর গুটকাজনিত থুতুর থেকে আত্মরক্ষা করতে সোহম আর বৃষ্টি দু-দিকে ছিটকে সরে যায়। তালাওয়ালার মুখের তালা আবার খুলে যায়।
‘আচ্ছা বাপু, সোমনাথ দাস নামকা কোই বাংগালি বাবুকো আপ জানতে থে কা?... আপকা দোস্ত বা ? ... হাঁ, গোবিন্দ্রামকা লক তো কলকাত্তামে ফেমাস হো গয়া বা!’
‘গোবিন্দরাম? কৌন গোবিন্দরাম?’ সোহম চমকে ওঠে।
‘আরে হামারা বাপু— ইস ব্যালাক পগোডাকা মালিক!’
সোহম অবাক হয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ব্ল্যাক প্যাগোডার মালিক গোবিন্দরাম মিত্র!’
‘আরে মিত্তর নহি, সাহু। গোবিন্দ্রাম সাহু— হামারা বাপুকা নাম।’ খেঁকিয়ে ওঠেন দোকানদার।
‘গোবিন্দ্রামকা কৌনসা লককে বারেমে আপ বোল রহে হ্যায়?’ বৃষ্টি জিজ্ঞেস করে।
‘হামারা বাপু এক ইস্পিশাল টাইপকা নাম্বারওয়ালা লক বনা সাকতে হ্যায়। বহুত সাল পহেলে ইয়ে সোমনাথ দাস কাশীপুর গান শেল ফ্যাকটরি সে এক আদমিকো লেকে আয়ে থে।’
‘নয়ান বারুই?’ সোহম জিজ্ঞেস করে।
বাপুর থেকে কনফার্ম করেন দোকানদার যে সেই ব্যক্তির নাম নয়ান বারুই বটে।
‘নয়ানবাবুকে সাথ মিলকর পেহলিবার বাপু ইয়ে লক বানায়েথে। ফির উয়ো লক বাপু অউর ভি বানায়েথে। বাপুকা বহুত নাম হুয়া উস লক বানানেকে লিয়ে।’
বৃষ্টি সোহমের দিকে একবার উত্তেজিত হয়ে তাকায়, তারপর সে জিজ্ঞেস করে,
‘বারুদকা এক পরত সে উয়ো লক বানাতে হ্যায়? সির্ফ নাম্বার মিলানেসে হি উয়ো লক খুলেগা?’
‘জি। আপ কয়সে জানতে বা?’
বৃষ্টি কথাটা পাত্তা না দিয়ে তাড়া লাগায়, ‘চিঠঠিকে বারেমে পুছিয়ে।’
তাড়া খেয়ে আবার সদ্যোজাত গুটকারসকে তালাক দেন তালাওয়ালা। বৃষ্টি আর সোহম বুঝতে পারে না কোনদিকে দাঁড়ালে তারা বিপদমুক্ত। দিগ্বদিকে এই রসালো আক্রমণ যখন-তখন ঘটছে।
‘হাঁ বাপু, উস সোমনাথ দাসকা কোই চিঠঠি বা আপকে পাস? ... চিঠঠি বা?’
বৃষ্টি আর সোহম লাফিয়ে ওঠে। চিঠঠি বা!
‘বাপু, চিঠঠি লেনেকে লিয়ে এক ম্যাডামজি আয়ি বা।’
বৃষ্টি জিজ্ঞেস করে, ‘গোবিন্দ্রামজি কব লউট রাহা বা?’
‘এক মহিনা বাদ। তব আকে চিঠঠি লেকে যানা।’
সোহম হতাশ হয়ে বৃষ্টির দিকে তাকায়।
‘কী বলছে রে! এক মাহিনা!’
বৃষ্টি ধমক লাগায় আবার।
‘আরে কা এক মাহিনা! কুছ বন্দবস্ত করো না!’
‘চিঠ্ঠি জরুরি বা?’
বৃষ্টি ঘাড় নাড়ে। গুটকার একটা নতুন প্যাকেট দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে উপায় বের করেন দোকানদার।
‘বাপু, এক কাম কিজিয়ে। ম্যায় ম্যাডামজিকা নাম্বার ভেজ রাহা হুঁ। আপকা মোবাইলসে উস চিঠ্ঠিকা এক ফটুয়া নিকালকে উস নাম্বারকা হোয়াট্যাপমে ডালনা বা।’
সোহম আর বৃষ্টি বেরিয়ে যাওয়ার পর আরেকজন লোককে তাদের থেকে কিছুটা দূরত্বে সেই দোকান থেকেই বেরিয়ে যেতে দেখা গেল। লোকটাকে দেখে মনে হল সেই এলাকার কোনো দোকানেরই কর্মচারী, পরনে লুঙ্গি, গেঞ্জি আর মাথায় একটা গামছা পাকিয়ে বাঁধা। গামছা খুলে সে নিজের মুখের ঘাম মোছে, তার মাথায় একটা চকচকে টাক।
সন্ধে হয়েছে। সোহম আর বৃষ্টি এই সবে বাড়ি ফিরল। সোহম নিজের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছে, এমন সময় একটা ডাক শুনে সে দাঁড়িয়ে পড়ে। সিঁড়ির পাশ থেকে খুব সন্তর্পণে উঁকি মেরে তাকে ডাকছে সাক্ষীগোপালের ছেলে চাঁদু। চাঁদুর চোখ-মুখ এমনিতেই বসা, কিন্তু এই কয়েকদিনে যেন আরও বসে গেছে। এর আগে দু-তিনবার সোহমের সঙ্গে তার মুখোমুখি হয়েছিল, কিন্তু সেরকমভাবে কথাবার্তা কোনোদিনও হয়নি। সোহম এগিয়ে গিয়ে বলে,
‘কিছু বলছেন?’
‘হ্যাঁ, হাজারটা টাকা হবে?
‘কেন বলুন তো?’
চাঁদু মাথা চুলকে একবার চারপাশ দেখে নিয়ে চুপিচুপি বলে, ‘আসলে বাংলা খেয়ে খেয়ে লিভারটার বারোটা বেজে গেছে, তাই ডাক্তার বলেছে স্কচ খেতে। বাবা কিছুতেই টাকা দিচ্ছে না। আপনি তো নিশ্চয়ই মাল-টাল খান?’
‘না, আমি ওসব খাই না।’
‘সেকী? মাল খান না? তাহলে কী খান? ল্যাক্টোজেন?’
সোহমের এই আলোচনটা আর ভালো লাগছে না।
‘ওসব বাজে নেশা আপনি ছেড়ে দিন চাঁদুবাবু।’
‘বাজে নেশা? বাজে নেশা হলে এত এত বড়োলোক রোজ রোজ ঢুকু ঢুকু চালাত? ওটা খান!’
এমন সময় একটা হাওয়াই চটি উড়ে এসে পড়ে চাঁদুর ডান গালে। সাক্ষীগোপালকে দেখা যায় সিঁড়িতে আরেক পাটি চটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে।
‘গাছপাঁঠা! বেরো এখান থেকে।’
বাবাকে দেখেই ছেলে পড়ি-কি-মরি করে ছুটে পালিয়েছে। গোপাল সোহমের কাছে এসে বলে, ‘টাকা চাইছিল নিশ্চয়ই? খবরদার ওই গাছপাঁঠাকে একটা টাকাও দেবে না।’
এমন সময় সেখানে জবা পিসি হাজির হন। মনে হল তিনি এতক্ষণ সিঁড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটাই দেখছিলেন এবং উনিই চাঁদুকে সোহমের কাছে পাঠিয়েছেন। সাক্ষীগোপালের কাছে জবা জবাবদিহি চাওয়ার ভঙ্গিমায় বলেন, ‘তাহলে আমার চাঁদুর ওষুধের কী হবে? ওষুধ না খেলে ওর অম্বল হয় যে!’

‘ওষুধ? একটা ভালো ওষুধ বাতলে দিচ্ছি। এ ওষুধ খেলে অম্বলকে বিদায় দিয়ে তোমার চাঁদু একেবারে ভ্যাবলা ভোম্বল হয়ে উঠবে।’ সাক্ষীগোপালের কাছে জবাব মজুত ছিল।
‘তাই নাকি? কী গো সেটা?’
‘গুলি।’
‘গুলি? বাপ হয়ে তুমি এই তো চাইবে! ছেলেটা আমাদের গুলি খেয়ে মরুক।’
‘আরে এ গুলি খেলে লোকে মরে না, ওড়ে।’
জবা ঠিক বুঝতে পারেন না স্বামীর কথা। সাক্ষীগোপাল বলেন, ‘আফিম গরম করে গলিয়ে তার সঙ্গে শুকনো খোলায় ভাজা কুচি করা পেয়ারাপাতা মেশাতে হয়। তারপর তার ছোটো ছোটো গুলি পাকিয়ে কলকেতে ভরে খেতে হয়। এর সঙ্গে চাট হিসেবে কলা চটকে খাওয়ার নিয়ম।’
‘কী যা তা বলছ?’ জবা বুঝতে পারেন যে তাঁর স্বামী আবার রসিকতা করছেন।
‘যা তা-ই বলছি—
দেবের দুর্লভ দুগ্ধ ছানা তা নাহলে গুলি রোচে না
কচুঘেচুর কর্ম নয় রে জাদু
শুঁড়ির দোকানে গিয়া ট্যাক টাক ফেলে দিয়া
ঢুক করে মেরে দিলে শুধু।
একেবারে বনেদি নেশা। এই বংশের পূর্বপুরুষরা খেতেন।’
সাক্ষীগোপাল মুখ টিপে হাসতে থাকেন, জবা গজগজ করতে করতে চলে যান। স্ত্রী-র প্রস্থানে সাক্ষীগোপালের মুখটা আবার বিষাদে ভরে ওঠে। এভাবেই তিনি তাঁর যাবতীয় জ্বালা যন্ত্রণা রসিকতার কলকেতে ফুঁকে উড়িয়ে দেন। তিনি সোহমকে বলেন, ‘ছেলের এই অবস্থার জন্য আমার বউটাই দায়ী। ছোটোবেলা থেকে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে একেবারে বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে।’
সোহম চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ তার কাঁধে হাত রাখেন সাক্ষীগোপাল। বিষাদ কেটে গিয়ে তাঁর চোখ দুটো আবার কৌতুকে পরিপূর্ণ। এই লোকটাকে বোঝা বড্ড মুশকিল।
‘এই বংশের একটা কেচ্ছার খবর দিই তোমায়। আমাদের আশুতোষের বৃদ্ধপ্রপিতামহ ঈশ্বর জগদীশ্বর সিংহ ছিলেন পাক্কা গুলিখোর। সবসময় চোখ বুজেই থাকত তাঁর, পাছে নেশা ছুটে যায়। যে রাস্তা দিয়ে উনি হেঁটে যেতেন সেই রাস্তা আগে পরিষ্কার করে সব ইট পাথর সরিয়ে দেওয়া হত, পাছে হোঁচট খেয়ে তাঁর নেশা ছুটে যায়! ওঁদের নেশার দলের বিভিন্ন সব বাবুরা মিলে নেশা করে এক একটা পাখি সেজে বসে থাকতেন। একবার ঈশ্বর জগদীশ্বর সিংহর বাবা ঈশ্বর পরমেশ্বর সিংহ ছেলেকে খুঁজতে গেছেন ওই গুলিখোরদের নেশার আড্ডায়। সেখানে সব এক একজন মহাত্মারা বসে। চোখ তাদের ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। সবার সামনেই এক একটা কলসির কানার ওপর ডাবা হুঁকো। প্রত্যেকে সেই হুঁকো টানছে আর এক একবার পাশে রাখা বাটির জলে চোবানো শোলা চুষছে। গুলির ধোঁয়ায় মুখ তেঁতো হয়ে যেত বলে পয়সাওয়ালা লোকেরা সঙ্গে মিষ্টি খেত, আর বাকিদের জন্য এক বাটি জলে চিনি গুলে তাতে গোটাকতক শোলা ভিজিয়ে রাখা হত, সেই শোলাই তারা চুষত। ঈশ্বর পরমেশ্বর সিংহ সেখানে যাকেই জিজ্ঞেস করেন ছেলের কথা তারাই এক একটা পাখি সেজে তার মতো ডাকে। কেউ ডাকে শালিক, কেউ টিয়া, কেউ ময়না, কথা আর কেউ কয় না। ছেলেকেও খুঁজে পাওয়া যায় না। শেষে দেখা যায় ছেলে এক কোনায় কাঠঠোকরা পাখি সেজে ঝিমুচ্ছেন, যেমনি বাপ ছেলের কাঁধে হাত দিয়ে ঝাঁকাতে গেছেন, অমনি ঠক করে বাপের হাতে ঠুকরে দিয়েছেন ছেলে।’
সোহমের দু-চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
‘পাখির দল! পক্ষীর দল! অনেক ধন্যবাদ সাক্ষীগোপাল!’
সোহম চলে যাচ্ছিল, আবার তাকে সাক্ষীগোপাল ডাকেন।
‘শোনো সোহম, তোমাকেও তো দেখছি নেশায় পেয়েছে। নেশার চোটে তুমিও আবার হাত ঠুকরে দিয়ো না যেন।’
কথাটা বলেই সাক্ষীগোপাল সেখান থেকে চলে যান গুনগুন করে ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ছবির একটা গানের দু-কলি গাইতে গাইতে—
হয় না বাগান খালি
শুধু বদলে যে যায় মালি
কী বলতে চাইলেন সাক্ষীগোপাল তার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝল না সোহম। কিন্তু পরবর্তী ধাঁধা সমাধানের একটা ক্লু সাক্ষীগোপাল দিয়ে গেলেন।
অভিরাজ এসেছে আমিরচাঁদের সঙ্গে দেখা করতে। আমিরচাঁদের কাছে তার কৃতজ্ঞতা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। সরকারি মহল থেকে চাপ সৃষ্টি করে ব্যাঙ্ককে আপাতত কিছুদিনের জন্য ঠেকিয়ে রেখেছেন আমিরচাঁদ। অভিরাজ খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে যে এর প্রতিদান তাকে কীভাবে দিতে হবে।
সিংহবাড়ির লক্ষ্মীপুজোর একটা নিমন্ত্রণপত্র দিয়ে অভিরাজ বলে, ‘এই মাসের বাইশ তারিখ আমাদের বাড়ির লক্ষ্মীপুজো।’
আমিরচাঁদ তখন স্নুকার খেলায় ব্যস্ত। তিনি একটা stun shot মেরে বলেন, ‘বহুত আচ্ছা। লেকিন লছমি মাতা ঘরে আসবেন কবে?’
‘এর মধ্যেই কোনো একদিন সময় বুঝে সেরে ফেলব।’
‘বহুত আচ্ছা!’
আর একটাও বাক্যব্যয় না করে আমিরচাঁদ তাঁর স্নুকার খেলায় বিশেষ মনোযোগী হয়ে পড়েন। অভিরাজ বুঝতে পারে যে তাকে বিদায় নিতে হবে।
ব্ল্যাক প্যাগোডা থেকে ঘুরে আসার পরের দিন সকালে বৃষ্টির নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপ চলে এল। তাতে পরের চিঠির ছবি, যাতে লেখা—
গোবিন্দজির প্রসাদ যেথায় ফলল প্রথমে
দিঘির জলে পড়ল ছায়া নাম হল সেই রঙে
সেই ছায়াটির কায়ার মধ্যে কৃষ্ট হল খৃষ্ট
যজ্ঞের সেই ঋত্বিকের আজ একী অদৃষ্ট
শোভাবাজারের পক্ষী দলের যিনি দলপতি
তাঁর গান এই অভাগার জোগায় রুজি রুটি
‘এই নেশাখোরদের দলকে বলা হত পক্ষীর দল। পক্ষীর দলের দুটো প্রধান আড্ডা ছিল। একটা শোভাবাজারের জয় মিত্রর বাড়ির উত্তরে, আরেকটা বাগবাজারে। এই বাগবাজারের আড্ডার মূল হোতা ছিলেন শিবচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যাঁকে পক্ষীর দলের সৃষ্টিকর্তা বলে জানা যায়। তিনি আবার শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেবের খুব কাছের লোক ছিলেন। শোভাবাজারের পক্ষীর দলের দলপতি ছিলেন বিখ্যাত গীতিকার আর সংগীতজ্ঞ রামনিধি গুপ্ত, যাঁকে আমরা জানি নিধুবাবু নামে।’
‘নিধুবাবুর টপ্পা! সাক্ষীগোপাল গায়!’
ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে এইমাত্র সোহম আর বৃষ্টি হেদুয়ার পাশের একটা বাড়ি থেকে ঘুরে এল। সোহম খবর পেয়েছে যে ১৮২৮ সালে বিখ্যাত কবি মির্জা গালিব এই বাড়িতে এসেছিলেন। ফেরার সময় নকুড় থেকে সন্দেশ কিনে এনে দু-জনে হেদুয়া পার্কে বসে খাচ্ছে।
‘শোভাবাজারের পক্ষী দলের যিনি দলপতি
তাঁর গান এই অভাগার জোগায় রুজি রুটি
এখানে নিধুবাবুর টপ্পার কথাই বলা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু কোন অভাগার রুজি রুটি জোগাচ্ছে নিধুবাবুর টপ্পা?’
‘তা ছাড়া, ‘‘গোবিন্দজির প্রসাদ যেথায় ফলল প্রথমে’’— কোন প্রসাদ?’ বৃষ্টি বলে।
‘আর সেটা প্রথম কোথায় ফলল? সেটা বোধ হয় স্বয়ং গোবিন্দজিই বলতে পারবেন।’ সোহম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিষ্টির প্যাকেটে পড়ে থাকা শেষ সন্দেশটার দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে দেখে সেটা ইতিমধ্যেই বৃষ্টির গালে চালান হয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে আশুতোষের কাছে আরেকটা চিঠি এসেছে যাতে লেখা— উমিচাঁদ হল উন্মাদ।

সিংহবাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় এবার আড়ম্বর নাকি তেমন হচ্ছে না। এই অনাড়ম্বর অবস্থাতেও নিমন্ত্রিতর সংখ্যা প্রায় হাজারখানেক। সারা বাড়ি ফুল-মালায় সাজানো হয়েছে। বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন, আশুতোষের পরিচিত সমাজের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ভিড়ে বাড়ি আজ সরগরম। সোহম এক অদ্ভুত অস্বস্তি নিয়ে কাটাচ্ছে দিনটা। তার নজর পড়ে আছে লক্ষ্মীপুজোয় দেওয়া বিভিন্ন প্রসাদের ওপর। পেয়ারা, শশা, আখ, জামরুল, কলা, শাঁকালু, সবেদা, পাঁচকড়াই, বাতাসা, নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, পাটালি, তাল আরও কত কী। এর মধ্যে প্রায় সবই তো গোবিন্দ বা রাধামাধবের পুজোতে লাগে। তাহলে কোন নির্দিষ্ট প্রসাদ ফলার কথা বলে গেছেন সোমনাথবাবু?
জবা পিসি পুজোর জোগাড়ে ব্যস্ত। তাঁকে সাহায্য করছে বৃষ্টি আর অভিরাজের স্ত্রী সুমনা। আশুতোষ তাঁর অতিথিদের সামলাতে ব্যস্ত। বাড়ির আর সকল আশ্রিতরা নানান ফাইফরমাশ খাটছে। আজকের দিনটা প্রত্যেক বছর সবার খুব আনন্দে কাটে।
সাক্ষীগোপাল আজ আবার একটা নতুন গান শোনালেন জাহ্নবীকে। মা-লক্ষ্মীর কাছে দাদাঠাকুর শরৎ পণ্ডিতের বর প্রার্থনা:
দে মা আমায় রাজা করি আর কাঙাল হয়ে থাকতে নারি
দন্ত অন্ত হল গো মা কেমনে চিবুই কলাই মুড়ি
এখন হালুয়া ভিন্ন দিন চলে না বরং রাবড়ি হলে খেতে পারি
দে মা আমায় রাজা করি আর কাঙাল হয়ে থাকতে নারি
পেটের জ্বালায় ভিক্ষা মেগে ফিরি লোকের বাড়ি বাড়ি
চরণ যে মা আর চলে না বিনা একখান মোটরগাড়ি
দে মা আমায় রাজা করি আর কাঙাল হয়ে থাকতে নারি
রাজাই যদি করিস মাগো দিস না যেন জমিদারি
খাজনা আদায় ভীষণ ল্যাঠা কেমনে দেব কালেক্টারি
দে মা আমায় রাজা করি আর কাঙাল হয়ে থাকতে নারি
পাওনাদারে পাওনাদারে আছে যে মা দুনিয়া ভরি
আমায় রাজা করার আগে পাঠাস তাদের যমের বাড়ি
দে মা আমায় রাজা করি আর কাঙাল হয়ে থাকতে নারি
খালি পেটে বাতাস ঢুকে কেবল ফুলে যাচ্ছে ভুঁড়ি
টাকা দিতো-কার ভুলে টাক দিলি মা কপাল জুড়ি
দে মা আমায় রাজা করি আর কাঙাল হয়ে থাকতে নারি
আমিরচাঁদ অভিরাজকে ফোনে জানিয়েছে যে সামনের সোমবার মিটিং ফিক্স হয়েছে সেই চীনে অ্যান্টিক ডিলারের সঙ্গে। এর মধ্যে জিনিসটা যেন তাঁর হাতে চলে আসে। নাহলে ব্যাঙ্ককে আমিরচাঁদ আর ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন না। অভিরাজ জানে যে আজ আর আগামীকাল— এই দু-দিনই নাকছাবি লক্ষ্মীপ্রতিমায় পরানো থাকবে। রাতের দিকে বিশেষ কেউ এইদিকে থাকবে না, তখনই কাজটা সেরে ফেলতে হবে তাকে।
পুজোর শেষে দুপুর বেলা সবাই একসঙ্গে বসে গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি খাচ্ছে। সোহমকে বৃষ্টি আশুতোষের কাছে আসা নতুন চিঠিটার কথা বলেছে, যাতে লেখা আছে— উমিচাঁদ হল উন্মাদ। সোহম তাকে বুঝিয়ে বলেছিল, ‘উমিচাঁদের কথা তোকে আগেই বলেছিলাম। এবার তাঁর উন্মাদ হয়ে যাওয়ার গল্পটা শোন। পলাশির যুদ্ধের আগে ক্লাইভ ঠিক করেন যে যুদ্ধে জেতার পর উমিচাঁদকে পঞ্চাশ লাখ টাকা দেওয়া হবে। উমিচাঁদ ভবিষ্যৎ নবাব হিসেবে চেয়েছিলেন ইয়ার লতিফকে। তিনি জানতেন না যে মিরজাফরকে নবাব করার কথা হচ্ছে। একথা জানতে পেরে উমিচাঁদ দাবি করে বসলেন যে সিরাজের রাজকোষ থেকে উদ্ধার করা টাকার ফাইভ পারসেন্ট আর মণিমুক্তোর ওয়ান ফোৰ্থ ভাগ নেবেন। কাউন্সিলের মিটিং-এ ঠিক হয় উমিচাঁদ পাবেন তিরিশ লাখ টাকা। টাকা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি না পেলে উমিচাঁদ সিরাজকে ষড়যন্ত্রের কথা বলে দেবেন বলে ভাবলেন সবাই। সেইমতো সন্ধিপত্রে সই হল।
পলাশির যুদ্ধের পর মিরজাফরকে যেদিন ক্লাইভ বাংলা–বিহার-উড়িষ্যার নবাব হিসেবে বরণ করলেন তার পরের দিন শুরু হল চুক্তি অনুযায়ী টাকাপয়সার হিসেব বুঝে নেওয়া। কিন্তু কোম্পানির প্রাপ্য দু-কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা তখন সিরাজের কোষাগারে ছিল না। জগৎ শেঠের বাড়িতে হিসেবনিকেশের মীমাংসা হল। ঠিক হল ইংরেজদের পাওনার অর্ধেকটা এখন নগদ আর মণিমুক্তো মিলিয়ে দেওয়া হবে আর বাকি অর্ধেকটা ফাইভ পার সেন্ট ইন্টারেস্ট রেটে ইএমআই হিসেবে আস্তে আস্তে চোকানো হবে। এবার উমিচাঁদ তাঁর প্রাপ্য চাইতে গেলে ক্লাইভ তাঁর অনুচর স্ক্রাফটনের মারফত উমিচাঁদকে জানান যে তিনি কিছুই পাবেন না, কারণ সন্ধিপত্রটা জাল।’
‘জাল মানে?’ বৃষ্টি জিজ্ঞেস করে।
‘উমিচাঁদকে ঠকাবার জন্য ক্লাইভ আগেই একটা ফন্দি করেছিলেন। তিনি দু-খানা সন্ধিপত্র তৈরি করেছিলেন। আসল সন্ধিপত্রটা সাদা কাগজে লেখা হয়েছিল আর নকলটা লাল কাগজে। এই লাল কাগজের সন্ধিপত্রে উমিচাঁদের তিরিশ লাখ টাকার কথা লেখা ছিল, আসলটায় ছিল না। উমিচাঁদ বাদে সবাই ওই দুটো কাগজেই সই করেছিলেন। উমিচাঁদ শুধু নকল কাগজে সই করেছিলেন।’
‘বেশ হয়েছে। টিট ফর ট্যাট!’ বৃষ্টি বলে। ‘এই শোক সহ্য করতে না পেরে নিশ্চয়ই উমিচাঁদ পাগল হয়ে গেলেন?’
‘হ্যাঁ। ক্লাইভ উমিচাঁদের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন তীর্থ করতে। কিন্তু ওই তীর্থ করার পর থেকেই ভীমরতি আরও যেন বেড়ে গেল। এইভাবে দেড় বছর উন্মাদ অবস্থায় কাটানোর পর উমিচাঁদের মৃত্যু হয়।’
‘আর তাঁর সেই দাড়িটার কী হল? পাগল হয়ে সেটা টেনে ছিঁড়ে ফেললেন নাকি?’
একথার উত্তর আর সোহমের দেওয়া হল না। খিচুড়ি খেতে খেতে এঁটো হাতে হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তার দৃষ্টি গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ির দিকে। বৃষ্টি বুঝতে পারে যে গোবিন্দজির কোন প্রসাদ কোথায় প্রথম ফলেছে সেটা সোহম বের করে ফেলেছে। কিন্তু বৃষ্টির ধমক খেয়ে সোহম ঠাকুরের ভোগ শেষ না করে উঠতে পারল না। গোগ্রাসে কোনোরকমে গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি নাকেমুখে ঠুসে বৃষ্টিকে নিয়ে সোহম বেরিয়ে পড়ে।
‘জানিস তো বৃষ্টি, এই ধাঁধার প্রথম লাইনটা বাদ দিয়ে বাকিটার সমাধান আমার আগেই হয়ে গিয়েছিল। শুধু গোবিন্দজির প্রসাদের সঙ্গে বাকি লাইনগুলো কীভাবে জুড়ছে সেটাই বুঝতে পারছিলাম না।’
‘তা, ব্যাপারটা বুঝিয়ে বল!’
‘লোকেশনে চল। ওখানে দাঁড়িয়ে বলব। জানিস তো বৃষ্টি, ইতিহাসের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস হয় না বলেই অধিকাংশ ছেলেমেয়েরা ছোটোবেলায় ইতিহাস পড়তে ভালোবাসে না। যদি সেই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে, সেই স্থাপত্যের অলিগলি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গল্পচ্ছলে ছাত্রদের ইতিহাস পড়ানো হয় তাহলে আমার মনে হয় ইতিহাসের মতো ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট আর কিছু হতে পারে না।’
বৃষ্টি আর সোহম লালবাজার পৌঁছোল। প্রায় বিকেল হয়ে এসেছে, অফিস পাড়া ছুটি হচ্ছে।
‘সরস্বতী নদী ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়াতে বাণিজ্যে ভাটা পড়ল। তাই সপ্তগ্রাম থেকে শেঠ আর বসাকরা গোবিন্দপুরে এসে বসবাস শুরু করল। সেই বাসিন্দাদের মধ্যে একজনের নাম লালমোহন শেঠ। এঁর সম্পর্কে অনেকগুলো প্রবাদ চালু আছে। ইনিই নাকি লাল দিঘি কাটিয়েছিলেন। লালমোহন লাল দিঘির আশেপাশে একটা বাজার বসান যার থেকে জায়গাটার নাম হয় লালবাজার। এখনকার জেনারেল পোস্ট অফিসের আশেপাশে প্রায় ১১০ বিঘা জমি জুড়ে ছিল মুকুন্দরাম শেঠের কাছারি বাড়ি। ভিতরে খুব সুন্দর বাগান ছিল যাকে বলা হত শেঠ বাগান। শেঠ বাগানের দক্ষিণে এক ধরনের সুন্দর চাল চাষ করা হত। সেই চাল শেঠদের গৃহদেবতা গোবিন্দজির ভোগে লাগত বলে এর নাম হল ...’
‘গোবিন্দভোগ। বুঝেছি। তা এই লালবাজারের কোথায় যাব আমরা?’ বৃষ্টি বলে।
‘অত তাড়া কীসের? আস্তে আস্তে সব কিছু দেখতে দেখতে আর গল্প শুনতে শুনতে চল।’
সোহম বৃষ্টিকে নিয়ে এখন রাইটার্স বিল্ডিং-এর সামনে দাঁড়িয়ে।
‘জানিস তো বৃষ্টি, ইংরেজদের পুরোনো কেল্লার বাইরে ছিল সেন্ট অ্যান গির্জা। সেই গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৫ জুন ১৭০৯ খ্রিস্টাব্দে। ১৭২৪-এর এক রাতের প্রচণ্ড বজ্রপাতে এই চার্চের প্রায় ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হয়। তারপর সিরাজের কলকাতা দখলের সময় কেল্লার সঙ্গে সঙ্গে এই চার্চও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এইখানেই ছিল সেই চার্চ। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই জমি থমাস লয়নকে কোম্পানির কর্মচারীদের থাকবার একটা বিল্ডিং করার জন্য দেয়।’
‘তার মানে এই রাইটার্স বিল্ডিংই সেটা?’
‘ইয়েস, মাদাম। সেইসময় কোম্পানির চাকরিতে চারটে গ্রেড ছিল। প্রথমে রাইটার, তারপর ফ্যাকটর, তারপর জুনিয়র মার্চেন্ট, তারপর সিনিয়র মার্চেন্ট। চাকরিতে ঢুকতে হত প্রথমে রাইটার হয়েই। চল!’
‘এবার কোথায়?’
‘যেখানে— দিঘির জলে পড়ল ছায়া নাম হল সেই রঙে।’
‘সে আবার কোন চুলোয়?’
সোহম আর বৃষ্টি এখন হেঁটে চলেছে আর এন মুখাৰ্জি রোড ধরে। সেই রাস্তার ওপর অবস্থিত একটা পুরোনো মিশনারি চার্চের সামনে সোহম দাঁড়ায়। চার্চ বলে তাকে আর বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তার জৌলুস একেবারেই হারিয়ে গেছে।
‘এই চার্চটার নাম ওল্ড মিশন চার্চ বা লাল গির্জা। একজন সুইডিশ পাদরি রেভারেন্ড জন জ্যাকারি কায়েরন্যানডার এই গির্জাটি তৈরি করেন। তিনি ১৭৪০-এ দক্ষিণ ভারতের কুড্ডালোরে আসেন প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারি হয়ে। ফরাসি জেনারেল কাউন্ট ল্যালি কুড্ডালোর দখল করে নেওয়ায় কায়েরন্যানডার তাঁর সব সম্পত্তি বিক্রি করে কলকাতায় পালিয়ে আসেন।’
‘আমি বাবার কাছে শুনেছি যে এই ওল্ড মিশন চার্চই হচ্ছে কলকাতার সবথেকে পুরোনো প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ।’
‘হ্যাঁ। যে সেন্ট অ্যান গির্জার কথা বললাম, সেটা ধ্বংস হওয়ার পর কলকাতায় তখনও পর্যন্ত আর কোনো গির্জা ছিল না। সেইসময় কলকাতা থেকে রোমান ক্যাথলিকদের প্রায় তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখন ইংরেজরা প্রেয়ার করতে যেত পোর্তুগিজ চ্যাপেলে, যাকে মুরগিহাটা চার্চ বলে আমরা জানি।’
‘তার মানে ব্রিটিশদের আগে কলকাতায় পোর্তুগিজদের দাপট ছিল নাকি রে সোহম?’
‘পোর্তুগিজ গিজগিজ করত তখন কলকাতায়। সিক্সটিন্থ বা সেভেন্টিন্থ সেঞ্চুরিতে বাংলায় যেসব পোর্তুগিজরা আসে তারা ভারতীয়দের বিয়ে করত, তারা ভাবত এভাবে তাদের শাসন চলবে বংশানুক্রমে। কিন্তু পোর্তুগিজ শাসকরা আবার সরকারি কাজে এইসব বিয়েকে স্বীকৃতি দিত না। তাই এইসব পোর্তুগিজদের এদেশি সন্তানদের অবস্থা হল শোচনীয়। এদের দারিদ্র্য বাড়তেই থাকল। অভাবের চোটে এরা চুরি ডাকাতি শুরু করল।’
‘বাঃ। গল্পটা খুবই ইন্টারেস্টিং কিন্তু তুই আবার সিলেবাসের অনেকটা বাইরে চলে গেছিস। ধাঁধায় ফিরে আয়।’
‘হ্যাঁ। ইংরেজদের নিজস্ব একটা গির্জার খুব প্রয়োজন ছিল। কর্নেল লর্ড ক্লাইভের থেকে অনুমতি পেয়ে কায়েরন্যানডার গির্জাটি বানানো শুরু করেন ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে। কাউন্সিলের অন্যান্য সভ্যদের আর চ্যাপলেন রেভারেন্ড হেনরি বাটলারের সহযোগিতায় মোটামুটি দু-হাজার টাকা তোলা হয়েছিল। বাকি সাতষট্টি হাজার টাকা কায়েরন্যানডার নিজে দেন। তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী অ্যান উলি নিজের সব গয়নাগাটি বিক্রি করে টাকা তুলে দেন কায়েরন্যানডারকে। কিন্তু এই গির্জার কাজ চলাকালীনই স্ত্রীকে হারান কায়েরন্যানডার।
১৭৭০-এর ২৩ ডিসেম্বর বড়োদিনের ঠিক আগে গিৰ্জাটি সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। গির্জার কৰ্তৃপক্ষ হিব্রু ভাষায় এর নামকরণ করেন— বেথ-টেফিল্যা, ইংরেজিতে যার মানে দাঁড়ায় ‘The House of Prayer’। এই চার্চ এখন যেমন দেখছিস আগে তেমন ছিল না। এর আশেপাশে কয়েকজন বিশিষ্ট ইংরেজকে কবর দেওয়া হয়েছিল। এই ওল্ড মিশন চ্যাপেলের জন্য রাস্তাটার নাম হয়েছিল মিশন রো। এখানে সেইসময় একমাত্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ অফিসাররাই থাকত। এই রাস্তাতেই ছিল কোম্পানির কাছারিবাড়ি। তার সামনে ছিল একটা থিয়েটার। এই আমরা যেখানে এখন দাঁড়িয়ে, এই রাস্তাতেই ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিরাজের সঙ্গে কোম্পানির তুমুল যুদ্ধ হয়, ভাবতে পারিস?’
‘আচ্ছা, এবার, দিঘির জলে পড়ল ছায়া নাম হল সেই রঙে?’
‘এই ওল্ড মিশন চার্চের ছায়া পড়ত সামনের দিঘিতে, যাকে এখন বলা হয় ডালহৌসি স্কোয়ার। এই দিঘির এলাকাটা ইংরেজদের বেড়ানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল। দিঘির চারধারে বাগান আর কাঁকরের রাস্তা তৈরি হল। দিঘির জলে মাছ চাষ শুরু হল। তখন এই জায়গাটার নাম ছিল ‘‘ট্যাঙ্ক স্কোয়ার’’, অন্য মতে ‘‘দ্য গ্রেট ট্যাঙ্ক’’। ওল্ড মিশন চার্চের রং তখন ছিল লাল। তাই একটা মত বলে যে সেই লাল রঙের ছায়ার জন্য সেই দিঘির নাম হল লালদিঘি। বেলি সাহেবের এনগ্রেভিং-এ দেখা গেছে যে ‘‘ট্যাঙ্ক স্কোয়ার’’-এর আশেপাশে লাল গির্জা ছাড়া আর কোনো ইমারত তখন ছিল না।’
‘একটা মত মানে? আরও মত আছে নাকি এই লালদিঘির নামকরণের?’
‘হ্যাঁ। সাবর্ণ চৌধুরীদের কাছারিবাড়ি ছিল এই এলাকায়। তার ভেতর ছিল একটা দিঘি। আবার অনেকে বলে সেই কাছারিবাড়ি ছিল শেঠদের। এই লালদিঘির পুকুরটা শেঠদেরই কাটানো। এই দিঘির উত্তর আর দক্ষিণ দিকে নাকি দুটো দোলমঞ্চ ছিল। দক্ষিণের মঞ্চে গোবিন্দজি আর উত্তরের মঞ্চে রাধিকাজিকে প্রতিষ্ঠিত করে দুই পক্ষ একে অপরের সঙ্গে এখানে আবির খেলত। দিঘির জল আবির রঙে রাঙিয়ে উঠত, তার থেকে নাকি নাম হয়েছে লালদিঘি। অনেক দূর থেকে গ্রামবাসীরা এসে এই দোল খেলায় যোগ দিত। তার জন্য বাজার বসত। সেই থেকে রাধারানির উত্তরের বাজারটার নাম হয় রাধাবাজার। আর যেখানে প্রচুর আবির পাওয়া যেত সেই বাজারের নাম লালবাজার।’
বৃষ্টি কিছুক্ষণ ভেবে বলে,
‘সেই ছায়াটির কায়ার মধ্যে কৃষ্ট হল খ্রিস্ট— দিঘির ওপর পড়া ছায়ার কায়া হচ্ছে এই ওল্ড মিশন চার্চ সেটা বুঝে গেছি। এবার ‘‘কৃষ্ট হল খৃষ্ট’’।’
‘১৮৪৩-এর ৯ ফেব্রুয়ারি এই চার্চে একটা বিরাট ব্যাপার ঘটে। গির্জার বাইরে তখন কড়া পুলিশি পাহারা। হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর ইয়ং বেঙ্গল মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে বহু ভারতীয় তখন ধর্মান্তরিত হচ্ছে। সেদিন এই গির্জায় যশোরের সাগরদাঁড়ির গোঁড়া ব্রাহ্মণ রাজনারায়ণ দত্তর উনিশ বছর বয়েসি ছেলে, হিন্দু কলেজের ছাত্র এবং ডিরোজিওর শিষ্য খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হচ্ছেন। পাছে কোনো হিন্দু বাধা দেয় তাই বাইরে পুলিশি পাহারা।’
‘তা, এর সঙ্গে ‘‘কৃষ্ট হল খ্রিস্ট’’-র কী সম্পর্ক?’
‘কৃষ্ট অর্থাৎ কৃষ্ণ। কৃষ্ণের আরেক নাম মধুসূদন। এই ওল্ড মিশন চার্চে সেদিন মধুসূদন দত্ত দীক্ষিত হয়েছিলেন খ্রিস্টধর্মে।’
‘বলিস কী! আর তাহলে— ‘‘যজ্ঞের সেই ঋত্বিকের আজ একী অদৃষ্ট’’ মানে?’
‘মধুসূদন দত্ত খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে।’
সোহম ফুটপাথে একটা ফলের দোকানে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা দাদা, নিধুবাবুর টপ্পা গান, এমন কোনো শিল্পী এই এলাকায় থাকেন? তাঁর নাম কৃষ্ণমোহন।’
‘তার মানে?’ বৃষ্টি অবাক।
‘শোভাবাজারের পক্ষীর দলের ইনিই দলপতি— এর মানে নিধুবাবু। তাঁর গান এই অভাগার জোগায় রুজিরুটি— নিধুবাবুর সবথেকে বিখ্যাত গান টপ্পা।’
বিভিন্ন দোকানে তারা খোঁজ করে, কেউ এর হদিশ দিতে পারে না। ওল্ড মিশন চার্চেও তারা খোঁজখবর করে। এই নামে এখানে কোনো শিল্পী থাকেন বলে কেউ কিছু বলতে পারল না। তা ছাড়া এই এলাকায় প্রায় সবই অফিস কাছারি বা দোকান। বাড়িঘর তো বিশেষ কিছু নেই। কীভাবে এগোবে তারা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। হতাশ হয়ে রাস্তার একপাশে একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে পড়ে সোহম আর বৃষ্টি।
সন্ধে নেমেছে, জনবহুল রাস্তাটা ক্রমশ ফাঁকা হয়ে আসছে। পূর্ণিমার চাঁদ পূর্ণ বিকাশে নিজেকে মেলে ধরেছে। কিন্তু হাজার রকমের ঝলমলে আলোকে টপকে সেই জ্যোৎস্না আর এই কলকাতার মাটিকে ছুঁতে পারে না। এক বৃদ্ধ ভিখিরিকে দশ টাকার একটা কয়েন দিল বৃষ্টি। চা-র সঙ্গে নানখাটাই বিস্কুট খেতে খেতে বৃষ্টি বলে, ‘দেখ সোহম, আমার মনে হয় কৃষ্ণমোহন নামে কাউকে খোঁজাটা আমাদের ভুল হচ্ছে। ধাঁধায় বলা আছে যে ‘‘যজ্ঞের সেই ঋত্বিকের আজ এ কী অদৃষ্ট’’। চার্চে শুনলি তো, অ্যাকচুয়াল ব্যাপটিজম তো আর কৃষ্ণমোহন করেননি, করেছিলেন সেই সময়কার চার্চের পাদরি। তাঁর নামে কেউ আছে কি না খোঁজ করলে হত না?’
‘তাই যদি হবে তো নিধুবাবুর গানের রেফারেন্সটা কীভাবে মিলবে? একজন খ্রিশ্চান কি নিধুবাবুর টপ্পা গাইবে বলে মনে হয়?’
‘হয়তো দু-জন আলাদা লোক...’
এমন যামিনী মধুর চাঁদিনী সে যদি গো কাছে আসিত
আকুল পিয়াসা সে কাছে আসিয়া সে যদি গো ভালোবাসিত
সোহম বৃষ্টির কথা থামিয়ে দিয়েছে। তাদের কানে ভেসে আসা বৃদ্ধ ভাঙা কণ্ঠের এই দু-কলি সোহমের খুব চেনা। রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের রেকর্ডে এই গান সে শুনেছে।
সোহম ছুটে গিয়ে বৃদ্ধকে ধরে ফেলে জিজ্ঞেস করে,
‘আপনার নাম নিশ্চয়ই কৃষ্ণমোহন?’
ইতিমধ্যে বৃষ্টি সেখানে ছুটে এসেছে। বৃদ্ধ সবেমাত্র বৃষ্টির থেকে পাওয়া দশ টাকার কয়েন তাঁর ময়লা ধুতির কোঁচায় গুঁজে আবার কাঁধে ঝোলা হারমোনিয়াম বাজিয়ে নতুন করে গান ধরেছিলেন। ভিখিরি অবাক হয়ে সোহমকে বলেন,
‘আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?’
‘সোমনাথ দাস আপনার কথা বলে গেছেন।’
বৃদ্ধের চালশে ধরা ম্রিয়মাণ চোখ দুটোতে একটা আলোর ঝিলিক খেলে যায়।
‘মুর্শিদাবাদের সোমনাথ?’
সিংহবাড়ির বেশিরভাগ নিমন্ত্রিতরা চলে গেছে। গুটিকয়েক নিকটাত্মীয় বাড়ির ভেতরে জলসাঘরে জমায়েত হয়েছে। সেখানে গানের আসর বসেছে। কলকাতার এক বিশিষ্ট গায়ক আশুতোষের খাস পরিচিত। তিনিই আসর মাতিয়ে রেখেছেন। এই জলসাঘরেই একদিন মুজরো করে গেছেন গওহরজান। আখতারিবাই, সিদ্ধেশ্বরী দেবীর মতো বিদুষীদেরও পায়ের ধুলো পড়েছে এই জলসাঘরে। তখন সিংহবাড়ির প্রতাপ ছিল অন্যরকম। আমোদ আহ্লাদে টাকাপয়সা খরচ করা হত খোলামকুচির মতো। রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলত বিভিন্ন বনেদি পরিবারের মধ্যে কে কত টাকা ওড়াতে পারে।
ঠাকুরদালান এখন ফাঁকা। এই একটু আগে জবা পিসি প্রদীপ জ্বেলে ধুনোয় পাখার বাতাস করে গেলেন। গোপাল খোঁজ করতে এসেছিলেন যে রাতে জবা কী খাবেন। জবা পুজোর রাতে ভাত খান না। তিনি বললেন যে সামান্য একটু ফলার খেলেই তাঁর হয়ে যাবে। গোপাল চোখ গোল গোল করে বলেন, ‘সামান্য ফলার? জানো ফলার কী জিনিস?’
‘কী আবার জিনিস। কয়েকটা ফল খেলেই হয়ে যায়।’
‘অতই সস্তা নাকি? এই ফলার বা ফলাহার নিয়ে পণ্ডিত রামনারায়ণ তর্করত্ন কী লিখেছিলেন শুনে যাও—
ঘিয়ে ভাজা তপ্ত লুচি
দু-চারি আদার কুঁচি,
কচুরি তাহাতে খান দুই,
ছোঁকা আর শাকভাজা,
মতিচুর, বোঁদে, খাজা,
ফলারের জোগাড় বড়োই।
নিখুঁতি, জিলিপি, গজা,
ছানাবড়া বড়ো মজা,
শুনে শক শক করে নোলা,
হরেক রকম মণ্ডা
যদি দেয় গণ্ডা গণ্ডা,
যত খাই তত হয় তোলা।
খুরি পুরি ক্ষীর তায়,
চাহিলে অধিক পায়,
কাতারি কাটিয়া শুখো দই,
অনন্তর বাম হাতে
দক্ষিণা পানের সাথে,
উত্তম ফলার তাকে কই।।
সরু চিঁড়ে শুখো দই,
মর্তমান ফাঁকা খই,
খাসা মণ্ডা পাত পোরা হয়,
বৈদিক ব্রাহ্মণে তবে
মধ্যম ফলার কবে,
দক্ষিণাটা ইহাতেও রয়।
গুমো চিঁড়ে, জলো দই,
তেঁতো গুড়, ধেনো খই,
পেট ভরা যদি নাহি হয়,
রদ্দুরেতে মাথা ফাটে,
হাত দিয়ে পাতা চাটে,
অধম ফলার তাকে কয়।
কবিতা পাঠ শেষ করে গোপাল দেখেন স্ত্রী তাঁকে গালমন্দ করতে করতে সারা দালানময় গঙ্গাজল ছেটাচ্ছেন। গোপাল বেরিয়ে গেলেন বাড়ির বাইরে। তাঁর ওপর হুকুম পড়েছে তিন বোতল স্কচ কিনে আনতে। আজ সারারাত মোচ্ছব চলবে আশুতোষের ইয়ার দোস্ত মিলে।
চাঁদু আজ সারাদিন বাড়িতেই ছিল। বিকেলের দিকে সে তার বন্ধুদের আড্ডায় গিয়েছিল। চাঁদুর এক বন্ধুর মা-র ব্রেন টিউমার ধরা পড়েছে। অপারেশন করাতে অনেক টাকার দরকার। বন্ধুটি গরিব ঘরের। বাবা মারা গেছে, নিজের রোজগারপাতি বিশেষ কিছু নেই। ছেলেটা অনেক করে চাঁদুকে বলেছে যাতে আশুতোষকে বলে-কয়ে কিছু টাকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু চাঁদুর সে সাহস নেই যে আশুতোষের কাছে গিয়ে নিজের বন্ধুর মা-র চিকিৎসার জন্য টাকা চাইবে। এমনিতেই আশুতোষ তাকে খুব একটা পছন্দ করেন না। বাবাকেও সেই কথা বলার সাহস তার নেই। মদ খাওয়ার পয়সা জোটানোর জন্য এতদিন এতরকমের মিথ্যে কথা সে বলেছে যে তার এই কথা বাবা বিশ্বাস করবেন না। মা-কে বলে লাভ নেই, কারণ মা-র হাতে কখনো কোনো টাকাপয়সা দেন না বাবা। আর টাকাপয়সা তাদের তেমন আছেই-বা কোথায়?
আজ বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে ফাঁকা ঠাকুরদালানের দিকে নজর পড়ে চাঁদুর। লক্ষ্মীপ্রতিমার নাকছাবিটা তার দেখতে বড়ো ভালো লাগে। পুজোর জন্য লাগানো রংবেরং-এর আলোর প্রতিফলনে সেই হিরের রূপ ঝলসে ওঠে। চাঁদু শুনেছে যে সেই নাকছাবির দাম অনেক। একটা প্রাণহীন মূর্তি লাখ লাখ টাকার গয়নায় সাজানো, আর ওদিকে টাকার অভাবে একটা জলজ্যান্ত প্রাণ শেষ হতে বসেছে। এই গয়না সেই প্রাণ বাঁচানোর কাজে লাগালে কি খুব অন্যায় হবে?
‘নিধুবাবুই হলেন আখড়াই গানের প্রথম সংস্কারক। উনি শখের আখড়া স্থাপন করে লোকজনকে এই গানও শেখান।’
ওল্ড মিশন চার্চের সামনে ফুটপাথে একটা দোকানের সামনে কৃষ্ণমোহনের একটা পুঁটলি আর একটা বস্তা রাখা আছে। তিনি সারাদিন এই রাস্তাতেই ভিক্ষা করেন নিধুবাবুর টপ্পা গেয়ে। নিধুবাবুর টপ্পা কৃষ্ণমোহনের খুবই প্রিয়।
‘আচ্ছা, এই আখড়াই কি কবিগান?’ বৃষ্টি জিজ্ঞেস করে।
‘না। আখড়াই গান কবিগানের আগের ফর্ম।’ সোহম বলে, ‘ঈশ্বর গুপ্তর মতে এই গানের জন্ম হয় শান্তিপুরে সেভেন্টিন্থ সেঞ্চুরির শেষে বা এইটিন্থ সেঞ্চুরির প্রথম দিকে। দশ-বারোজন মিলে একসঙ্গে এই আখড়াই গান গাইত।’
‘ঠিক।’ কৃষ্ণমোহন বলেন, ‘প্রথমদিকে এর দুটো ভাগ ছিল— খেউড় আর প্রভাতী। এই খেউড়ে অশ্লীল কথাবার্তা ব্যবহার করা হত। এর পর গানে তিনটে ভাগ হয়— ভবানী বিষয়ক, খেউড় আর প্রভাতী। গানের কথাও রুচিসম্মত হয়। আখড়াই গানে কোনো উত্তর প্রত্যুত্তর ছিল না । দুই দলের লড়াই হত, যার সুর ও গাওনা ভালো হত তারাই বিজয়ী হত।’
‘এই আখড়াই থেকে পরে ভেঙে হাফ আখড়াই, কবিগান, এসব হল। তাই না?’ সোহম জিজ্ঞেস করে।
‘হ্যাঁ। আপনি এ যুগের ছেলে হয়েও এসবের খোঁজ রাখেন দেখছি। সোমনাথবাবুরও খুব ঝোঁক ছিল এসবের। এই চার্চে এসেছিলেন, যাবার সময় আমার গান শুনে দাঁড়িয়ে পড়েন। খোঁজখবর করে আমার ঘরেও অনেকবার এসেছেন পুরোনো কলকাতার গানের ব্যাপারে জানতে। এই সামনেই একটা বস্তিতে আমার ঘর। তা হঠাৎ একদিন ওঁর চিঠি পেলাম, চিঠিতে লেখা ছিল যে এই রাস্তাতেই এর খোঁজ করতে একদিন-না-একদিন কেউ আসবে। কিন্তু সোমনাথবাবুর তারপর আর কোনো খোঁজ পাইনি। উনি কেমন আছেন?’
‘উনি মারা গেছেন।’ সোহম বলে।
কৃষ্ণমোহনের চোখের সেই জ্বলে-ওঠা ভাবটা হারিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই চোখ দুটো নিস্তেজ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ থুম মেরে বসে থাকেন তিনি। তারপর জিজ্ঞেস করেন, ‘কী হয়েছিল?’
সোহম উত্তর দেয়, ‘অ্যাক্সিডেন্ট।’
কৃষ্ণমোহন তাঁর হারমোনিয়ামের ওপরের ডালাটা খোলেন। রিড বসানো ওপরের ভাগটা একটা ঢাকনার মতো খুলে গেল। হারমোনিয়ামের ভেতরে পড়ে আছে একটা বহু পুরোনো চিঠি। সোহমের হাতে সেই চিঠি তুলে দেন কৃষ্ণমোহন।
সোহম আর বৃষ্টি চলে যাচ্ছিল সেখান থেকে, হঠাৎ বৃদ্ধ সোহমকে ডাকেন।
‘শুনুন। আপনি সোমনাথবাবুর কে হন? আপনাকে দেখে কেমন যেন ...’

কথাটা শেষ হয় না, লুটিয়ে পড়েন বৃদ্ধ। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা বাইকের পিছনের সিটে উঠে লোকটা চলে যায়। এই ফুটপাথে কোথাও সে এতক্ষণ ঘাপটি মেরে ছিল। তার বন্দুকে নির্ঘাত সাইলেন্সার লাগানো।
সেই বাইক পাশের একটা গলি দিয়ে পালাতে যাচ্ছিল, তার সামনে এসে দাঁড়ায় একটা পুলিশ ভ্যান। পিছনের রাস্তায় আরও একটা পুলিশের গাড়ি। বাইকের আর কোথাও পালাবার জায়গা নেই। ভ্যান থেকে চারজন পুলিশ নেমে এসে মারতে মারতে লোক দুটোকে ভ্যানে তুলল। পিছনের পুলিশের গাড়িতে বসে একজন অফিসার প্রবল আক্ষেপের সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘ইস, যদি আরেকটু আগে আসতে পারতাম!’
কৃষ্ণমোহনের গুলি লেগেছে কোমরে, সোহম আর বৃষ্টি কোনোমতে একটা ট্যাক্সি জোগাড় করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে তাঁকে। পুলিশের একটা গাড়ি যাচ্ছে পিছনে। কৃষ্ণমোহন চূড়ান্ত শ্বাসকষ্টের মধ্যে কিছু একটা বলতে চাইছেন সোহমকে। তাঁর হাত লেগে সোহমের পাঞ্জাবি উঠে গেছে কোমর থেকে। সোহমের কোমরের জন্মদাগটা চোখে পড়ে কৃষ্ণমোহনের। তিনি তাঁর পুরো প্রাণশক্তি জড়ো করে কিছু বলতে চাইছেন। তাঁর চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। গাড়ি একটা সিগনালে দাঁড়ায়।
‘আপনি বলুন, কী বলতে চাইছেন?’ সোহম জিজ্ঞেস করে।
গাড়ির পাশে একজন হেলমেট পরা লোক বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে। সিগনাল গ্রিন হতে আর তিন সেকেন্ড বাকি, এমন সময় লোকটা হঠাৎ গাড়ির ভেতরে ফায়ার করে। তার হাতে একটা সাইলেন্সর লাগানো পিস্তল। কৃষ্ণমোহনের শেষ কথা আর বলা হয়ে ওঠে না। বাইকটা সামনের রাস্তায় মিলিয়ে যায়।
কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুনের ঘটনায় নিজেদের স্টেটমেন্ট দিয়ে এল বৃষ্টি আর সোহম। আশুতোষ স্বয়ং ওদের নিয়ে তাঁর কমিশনার বন্ধু রজতের কাছে গিয়েছিলেন। এর আগে সোহম আর বৃষ্টির বর্ণনা থেকে সেই টাকমাথা লোকটার একটা স্কেচ বানিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু আজ অ্যারেস্ট হওয়া দু-জন দুষ্কৃতির চেহারার সঙ্গে সেই স্কেচ মিলছে না। বৃষ্টির ধারণা, যে লোকটা বাইকে করে গুলি মেরে পালিয়ে গেল সেটাই সেই টাকমাথা লোকটা।
আশুতোষ তাঁর কমিশনার বন্ধুকে একটা আবছা আভাস দেন যে কীসের জন্য সোহম আর বৃষ্টি খোঁজখবর করে বেড়াচ্ছে। কমিশনারের কাছেও ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্যের। একটা সামান্য উপহারের জন্য দু-জন আপাতনিরীহ বৃদ্ধকে খুন করার কী মানে হতে পারে? কমিশনার সোহমকে নির্দেশ দেন, সে যেন একা একা আর কোথাও এই বিষয়ে খোঁজ করতে না যায়।
কিন্তু সোহমের মাথায় রোখ চেপে গেছে। যাঁরা যাঁরা সোমনাথ দাসকে দেখেছিলেন, যেমন লেডি ক্যানিং-এর কবরের মালি, বৃদ্ধ ভিখিরি কৃষ্ণমোহন— তাঁরাই খুন হলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় জোড়াসাঁকোর নন্দকুমারবাবু অক্ষত রয়ে গেলেন। তার কারণও এখন সোহমের কাছে স্পষ্ট। মালি বা কৃষ্ণমোহন সোহমকে দেখে কিছু একটা বলতে চাইছিলেন। নন্দকুমারও হয়তো সেই চেষ্টা করতেন, কিন্তু ভাগ্যিস তিনি তা করেননি। কারণ নন্দকুমার যে অন্ধ। কিন্তু অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?
‘সাক্ষীগোপাল! তুমি সব জানো, তাই না?’
কমিশনারের অফিস থেকে ফিরে সোজা সাক্ষীগোপালের ঘরে এসে ঢুকেছে সোহম। এখন রাত সাড়ে দশটা। ঘরে এই মুহূর্তে তারা দু-জন ছাড়া আর কেউ নেই। চাঁদু এখনও বাড়ি ফেরেনি, জবা বাড়ির ফাইফরমাশ খাটছেন।
‘বলো সাক্ষীগোপাল! তুমি সেদিন কেন বলেছিলে ওই কথাটা?’
‘কোন কথা?’ সাক্ষীগোপাল সোহমকে এড়িয়ে যেতে চান।
‘যেদিন চাঁদু আমার কাছে টাকা চাইতে এসেছিল, সেদিন তুমি একটা গল্প বলেছিলে যে নেশার ঘোরে ছেলে বাবার হাত ঠুকরে দিয়েছিল। তারপর বলেছিলে— নেশার ঘোরে আমি আবার যেন হাত ঠুকরে না দিই। আমার নেশা তো ইতিহাসের নেশা, কিন্তু আমি কার হাত ঠোকরাব সাক্ষীগোপাল?’
অনেক বছর ধরে জমিয়ে রাখা কথাগুলো সাক্ষীগোপালের মুখ থেকে উগরে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু তার পরিণাম তিনি খুব ভালো করেই জানেন। তাঁর মতন অসহায় ক-জন আছে এই পৃথিবীতে?
‘বলো সাক্ষীগোপাল! লুকিয়ে রেখো না আর কিছু! আমার চেহারা, আমার এই কোমরের জন্মদাগ, এগুলো তোমার খুব চেনা, তাই না?’
সোহম তার জামা তুলে কোমরের দাগটা সাক্ষীগোপালকে দেখায়। সাক্ষীগোপাল নতুন করে এ আর কী দেখবেন! তিনি অনেকদিন আগেই সোহমের ঘরের সামনে দিয়ে যেতে যেতে এই জন্মদাগ দেখে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। সোহম তখন স্নান সেরে খালি গায়ে একটা তোয়ালে পরে সেই ঘরে টাঙানো সরস্বতী ঠাকুরের ছবির সামনে ধূপ দিচ্ছিল।
‘আমি যেদিন প্রথম এ বাড়িতে আসি তখন হরি ঘোষের গোয়ালের কথাটা বলার পর তুমি বলেছিলে যে আমি নাকি এককাঠি বাড়া। কার থেকে আমি এককাঠি বাড়া সাক্ষীগোপাল?’
অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে
সাক্ষীগোপালের আর চুপ করে থাকা সইবে না। সত্যিটা জানার অধিকার আছে সোহমের। তিনি ঘরের বাইরে উঁকি মেরে একবার চারপাশ দেখে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। সোহমের দিকে তাকিয়ে একটা ঢোঁক গিলে তিনি বলেন,
‘কথাটা আর কাউকে জানিয়ো না। তাহলে এই বাড়িতে আমার আর ঠাঁই হবে না।’
রাতের খাওয়ার সময় বৃষ্টি সোহমকে তার ঘরে না পেয়ে সারা বাড়ি খুঁজতে থাকে। শেষে ছাদের চিলেকোঠার ঘরের সামনে সোহমকে চুপ করে বসে থাকতে দেখা যায়। তার চোখ-মুখ থমথমে। তার হাতে কৃষ্ণমোহনের থেকে পাওয়া চিঠি। বৃষ্টিকে দেখে সোহম সেখান থেকে উঠে পড়ে, বৃষ্টি তাকে আটকাতে গেলে জোর করে তার হাত ছাড়িয়ে চলে যায় সোহম। বৃষ্টি কোনোদিনও সোহমকে এমন ব্যবহার করতে দেখেনি। কী হল তার? হয়তো দু-জন নির্দোষ মানুষের এমন মৃত্যু সোহম মেনে নিতে পারছে না। বৃষ্টি ভাবে যে সোহম কিছুক্ষণ একা থাকলেই এই গুমোট ভাবটা কেটে যাবে। কিন্তু কী বলতে চাইছিলেন ওই লোকগুলো? সোহমের সঙ্গে সোমনাথবাবুর আবার কী মিল থাকতে পারে? যাই হোক। যখন কথা হয়েছে যে এই উপহারের ব্যাপার নিয়ে সোহম আর মাথা ঘামাবে না তখন আর দুশ্চিন্তার কোনো কারণ বৃষ্টি দেখতে পায় না।
কিন্তু সোহমের কাছে এখন আর এ শুধু নিছক ইতিহাসের মজার খেলা নয়। তার চেয়ে অনেক বড়ো খেলা ঘটে গেছে তার জীবনে। তাই খেলার অন্তিম লগ্নে মাঠ ছেড়ে পালানোর প্রশ্নই ওঠে না। ভোর হতেই সে একা বাড়ি থেকে কাউকে না জানিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। সোহম এখন বিধান সরণি ধরে হাঁটছে। তার হাতে কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া চিঠি যাতে লেখা—
বন্দোবস্ত চিরস্থায়ী হল সাহেবের কাজে
শঙ্করের হৃদয় মাঝে কালী বিরাজে
কত ভক্ত নিত্য সেথা করে মাথা হেঁট
তাঁদের পদতলে পাবে অন্তিম সংকেত
সাক্ষীগোপাল গতকাল সারারাত ঘুমোতে পারেননি। জবা বুঝতে পেরেছিলেন যে স্বামীর কিছু একটা অসুবিধা হচ্ছে। মাথা ধরেছে কি না, পেট ব্যথা হচ্ছে কি না ইত্যাদি নানান বাজে প্রশ্ন থেকে নিজেকে বাঁচাতে গোপাল বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। সারারাত তিনি সিংহবাড়ির উলটো ফুটপাথের একটা রোয়াকে বসে কাটিয়েছেন। ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে যাওয়াতে তিনি লক্ষ করেননি যে সোহম বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। বাড়িতে ঢুকে তিনি ঠাকুরদালানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তিনি দেখতে পেলেন সেই ভয়ংকর দৃশ্য।
বিধান সরণির আগের নাম ছিল কর্নওয়ালিস স্ট্রিট। সেই লর্ড কর্নওয়ালিস, যিনি ছিলেন ভারতের দ্বিতীয় গভর্নর জেনারেল। ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলায় প্রথম আসেন। এই সাহেবের ওপর ব্রিটিশরাজের বিশ্বাস ছিল চরম। তাই যাতে বাংলার রাজকাজ ত্রুটিমুক্তভাবে হয়, সেই হুকুম দেওয়া হয়েছিল লর্ড কর্নওয়ালিসকে। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা পার্মানেন্ট সেটলমেন্টের প্রবর্তন করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর বাংলার জমিদারদের মধ্যে হওয়া এই চুক্তির মাধ্যমে এক চিরস্থায়ীভাবে অপরিবর্তনীয় নির্ধারিত রাজস্বের হারে ভূসম্পত্তির নিরঙ্কুশ স্বত্বাধিকারী হল জমিদাররা। লর্ড কর্নওয়ালিসের স্মৃতিতেই এই রাস্তার নামকরণ হয়েছিল কৰ্নওয়ালিস স্ট্রিট। হেদুয়ার নাম দেওয়া হয়েছিল কর্নওয়ালিস স্কোয়ার। এই রাস্তা এবং হেদুয়ার পুকুর সরকারি অর্থে তৈরি হয়নি। তৈরি হয়েছিল লটারির টাকায়। ইংরেজ সরকার ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে গ্যাসের আলো লাগিয়ে রাস্তাঘাট তৈরি করতে উঠে-পড়ে লেগেছিল। শ্যামবাজারের পোল থেকে মেছুয়াবাজারের মোড় পর্যন্ত ছিল এই রাস্তার বিস্তৃতি। সোহম এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এই রাস্তার অন্যতম আকর্ষণীয় জায়গায় যাকে আমরা চিনি ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের নামে।
কথামৃতর অনুলেখক শ্রীমকে ডাব আর চিনি দিয়ে এই ঠনঠনিয়া মন্দিরেই পুজো দিতে বলেছিলেন রামকৃষ্ণদেব। ১১১০ বঙ্গাব্দে শঙ্কর ঘোষ নামে এই এলাকার একজন বিশিষ্ট বাসিন্দা এই মন্দিরটা এবং বর্তমান কালীমূর্তি তৈরি করিয়ে দেন। মন্দিরের গায়ে এখনও পাথরের ফলকে লেখা আছে—
শঙ্করের হৃদয় মাঝে
কালী বিরাজে॥
ধাঁধায় এর পরের লাইন ছিল—
কত ভক্ত নিত্য সেথা করে মাথা হেঁট
তাদের পদতলে পাবে অন্তিম সংকেত
সেই মন্দিরের মেঝের বিভিন্ন স্ল্যাবে গুরুজনদের শ্রদ্ধা জানাতে নানান লোকজনের এক একটা লেখা দেখা যাচ্ছে। সেগুলোর মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে সোহম দেখতে পেল তার কাঙ্ক্ষিত লেখাটা।
আমিরচাঁদ রাগে ফুঁসছেন। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে অভিরাজ। অভিরাজ কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না যে নাকছাবিটা নকল কী করে হতে পারে। গতকাল রাতেই সে ঠাকুরদালান ফাঁকা পেয়ে লক্ষ্মীপ্রতিমা থেকে নাকছাবিটা খুলে নেয়। তারপর সারারাত সেটা তার নিজের বালিশের তলায় নিয়ে সে শুয়ে ছিল। স্ত্রী সুমনা পর্যন্ত সেই ঘটনার কথা জানে না। তাহলে এই কারচুপি করল কে? আমিরচাঁদ চীনে ডিলারের সঙ্গে কথা বলে আজই মিটিং ফিক্স করেছিলেন। পুরো ট্রানজ্যাকশন আজই হয়ে যেত। সব কিছু ভেস্তে যাওয়াতে আমিরচাঁদ এতটাই চটেছেন যে উনি ব্যাঙ্কে ফোন করে অভিরাজের দোকানের পজেশন নিয়ে নিতে বলছিলেন। অনেক কষ্টে তাঁকে আটকেছে অভিরাজ।
সিংহবাড়িতে হুলুস্থুল পড়ে গেছে। পুলিশ এসে বাড়ির সব আশ্রিতর ঘর সার্চ করেছে। কিন্তু নাকছাবির হদিশ পাওয়া যায়নি। আশুতোষ রাগে ফুঁসছেন। গোপালকে অনেক কটু কথা শুনতে হল আশুতোষের থেকে। এই বাড়ির যাবতীয় জিনিসপত্রের সব দায় যেন অলিখিতভাবে গোপালের কাঁধে। কিন্তু শুধুমাত্র একজন দারোয়ান হিসেবেই। সব কিছু আগলে আগলে চললে কোনোদিনও কোনোরকমের প্রশংসাবাক্য বা সম্মান জোটেনি যাঁর, পান থেকে চুন খসলেই তাঁকে শুনতে হয় চরম অপমানজনক কথাবার্তা। এবারে তো সিংহ বংশের সবচেয়ে মূল্যবান গয়না চুরি গেছে। তার সব দায় যেন গোপালের। এমনকী বাড়ির আর সব লোকজনের সামনে গোপালকে চুরির দায়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকিও দেন আশুতোষ। অসম্মানে মাথা হেঁট হয়ে আসে সাক্ষীগোপালের। তিনি যে আশ্রিত, তাঁর যে এ বাড়ি ছেড়ে আর অন্য কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। জবা লজ্জায় সিঁড়ির এক কোনায় লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।
এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার আগে বৃষ্টি বাড়ি থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে গিয়েছিল সোহমের খোঁজে। এই যে মাঝে মাঝেই সোহম বেপাত্তা হয়ে যায়, এ বড়ো অসহ্য বৃষ্টির কাছে। ফোন যথারীতি বন্ধ। ইউনিভার্সিটি, হোস্টেল, তারপর লাইব্রেরিতে খোঁজ করেও কোনো খবর পাওয়া গেল না। অবশেষে হেদুয়া পার্কে তাকে পেল বৃষ্টি। এটা সোহমের খুব পছন্দের জায়গা। এখানে মাঝে মাঝেই সে একা একা বসে সময় কাটায়।
‘কী রে? কোথায় গিয়েছিলিস সক্কাল সক্কাল?’
‘পরের ধাঁধার উত্তর খুঁজতে।’
‘তার মানে? তোকে যে বারণ করা হল এইসব ব্যাপারে আর মাথা ঘামাতে?’
‘আমার মাথা আমি কখন ঘামাব আর কখন সেই ঘাম শুকিয়ে নেব— সেটা কি তোরা ডিসাইড করবি?’
‘তোর কী হয়েছে রে? কাল রাত থেকে তুই আমার সঙ্গে এমন অদ্ভুত ব্যবহার কেন করছিস?’
সোহম অনেক কষ্টে একটা হাসি আনে তার ঠোঁটের কোনায়।
‘আমার ভুল হয়ে গেছে রে বৃষ্টি। তোরা যেমন চাস, আমি তেমনভাবে তোদের বুঝিয়ে বলি। আমি আজ সকালে কোথায় গিয়েছিলাম শুনবি?’
অভিরাজ প্রচণ্ড মারধর করছে চাঁদুকে। বাড়ির এক আশ্রিতর থেকে সে খবর পেয়েছে যে কাল রাতে চাঁদুকে একা একা ঠাকুরদালানের আশেপাশে ঘুরতে দেখা গেছে। চাঁদুর যে টাকার দরকার, সেকথা গোপাল ছাড়া বাড়ির আর সব আশ্রিতই জানে। তাদের সবার থেকেই চাঁদু টাকা ধার চেয়েছে এবং সবাই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। অভিরাজ বুঝতে পারল সমস্ত সাক্ষী এখন চাঁদুর বিরুদ্ধে। পুলিশ এসে গেছে, তাই এই নিয়ে নাড়াঘাটা হলে সত্যিটা বেরিয়ে আসতেও পারে। তাই আগেভাগেই মেরেধরে চাঁদুর ঘাড়ে দোষটা চাপিয়ে দিতে হবে।
তাই শুরু হল এই অদ্ভুত প্রহসন। বাড়ি ভরতি লোকের সামনে ঠাকুরদালানে মা লক্ষ্মীকে সাক্ষী রেখে চলল অভিরাজের এই পাশবিক অত্যাচার। ঘুসি, চড়, লাথি— কিছুই বাদ রইল না। অসহায় বাবা-মা আশুতোষের সামনে হাতজোড় করে ছেলের প্রাণভিক্ষা চাইছেন। চাঁদুর লিভারের সমস্যা দেখা দিয়েছে, শরীর খুবই দুর্বল। এমনভাবে মারলে ছেলেটার ভালোমন্দ কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু কে কার কথা শোনে। অভিরাজের মারধর করার একটাই উদ্দেশ্য— চাঁদু যেন সবার সামনে স্বীকার করে নেয় যে সে নাকছাবি চুরি করে বাইরে পাচার করে দিয়েছে। কিন্তু চাঁদুর মুখে একটাই কথা— আমি কিছু জানি না গো। আমায় ছেড়ে দাও। অভিরাজ ছুটে বাড়ির ভেতরে যায়।
‘শঙ্কর হৃদয় মাঝে কালী বিরাজে— একই কথার কত রকম মানে হয় তাই না? এই শঙ্কর ‘‘ঘোষ’’ও হতে পারেন আবার ‘‘মহাদেব শিব’’ও হতে পারেন। তেমনি, এই আমি যে কাজটা করছি, এরও তো অনেক মানে হতে পারে? তাই না রে বৃষ্টি?’
বৃষ্টি বুঝতে পারে না এসব কথার মানে। সে কিছু বলবার আগেই সোহম যন্ত্রের মতো আবার কথা বলতে শুরু করে।
তবিলদারি চাইলেন ইনি হিসেব লেখার খাতায়
কবিরঞ্জন হলেন ইনি বিদ্যাসুন্দর গাথায়
বসু বাটীর গ্রন্থাগারে তাকাও ঈশান কোণ
অর্জিত যত সংখ্যা করে নাও সংযোজন
—সোমনাথ দাস
‘তার মানে?’ বৃষ্টি অবাক।
‘ঠনঠনিয়ার মন্দিরের মেঝেতে পেলাম এই লেখা। বুঝতেই পারছিস, এই হচ্ছে শেষ ধাঁধা। বাগবাজারের রিডিং লাইব্রেরির ঈশান কোণে রাখা আছে জিনিসটা। সেই লকারের নাম্বার কম্বিনেশন এইসব চিঠিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এক একটা সংখ্যা জুড়ে পাওয়া যাবে। সংখ্যাটা তাহলে দাঁড়াচ্ছে— ৯২৫৬৪১। এই কেমন সুন্দর তোরা জেনে গেলি সমস্ত কথা।’
‘কিন্তু প্রথম দুটো লাইনের মানে কী?’
‘বলছি বলছি। সব বলছি। বিশ্বাস কর, তোদের আমি ঠকাব না। ‘‘তবিলদারি চাইলেন ইনি হিসেব লেখার খাতায়’’— বাগবাজারের গোকুল মিত্রর দপ্তরে হিসেব রাখার কাজে বহাল হয়েছিলেন শাক্ত কবি রামপ্রসাদ সেন। সেই হিসেবের খাতায় রামপ্রসাদ গান লিখলেন— আমায় দে মা তবিলদারি, আমি নেমকহারাম নই শঙ্করী। ‘‘কবিরঞ্জন হলেন ইনি বিদ্যাসুন্দর গাথায়’’— নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রর অনুরোধে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র ছাড়াও রামপ্রসাদ সেনও ‘‘বিদ্যাসুন্দর’’ কাব্য লেখেন, যার জন্য রাজা তাঁকে উপাধি দিয়েছিলেন ‘‘কবিরঞ্জন’’। তোর বাবাকে জানিয়ে দিস, এখানে রামপ্রসাদ সেনের কথা বলা হয়েছে। আর আমি এখন বাগবাজারের লাইব্রেরিতে যাচ্ছি ঈশান কোণে রামপ্রসাদ সেনের খোঁজে। আশা করছি সেখানেই লকারটা পাব।’
সোহম চলে যাচ্ছিল। বৃষ্টির ধৈর্যর বাঁধ ভাঙছে ক্রমশ।
‘গাড়িটা আছে কী করতে?’
সোহম দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দিকে একবার তাকায়,
‘আমি খুব বোকা, তাই না রে বৃষ্টি?’
অভিরাজের হাতে শ্যামচাঁদ। এই শ্যামচাঁদ হচ্ছে এক রকমের চাবুক যা নীলকুঠির সাহেবরা ব্যবহার করত। বিদ্রোহী নীলচাষিদের পিটিয়ে সিধে করা হত এই শ্যামচাঁদ দিয়ে। আশুতোষের এক পূর্বপুরুষের নীলকুঠি ছিল। সেই শ্যামচাঁদ সিংহবাড়ির সংগ্রহশালায় এতদিন শোভা পেত। আজ তা অভিরাজের হাতে। অভিরাজ এল ঠাকুরদালানে। আবার শুরু হল মারের পালা। শ্যামচাঁদের দু-ঘা পিঠে পড়তেই চাঁদু যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠে। গোপাল এগিয়ে এসে অভিরাজকে আটকাতে যান। আশুতোষ দালানের এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। হয়তো তাঁর মনের কোনো গভীর গোপন ক্ষতয় প্রলেপের কাজ করছিল চাঁদুর আর্তনাদ। মারে বাধা পড়াতে দিগ্বদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অভিরাজ সেই শ্যামচাঁদ ওঠায় গোপালের উদ্দেশে। ছেলেকে বাঁচাতে গোপাল এই শ্যামচাঁদের কয়েক ঘা মুখ বুজে সহ্য করে নিতে পারতেন, কিন্তু চাঁদু চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘বাবাকে মেরো না। আমি চুরি করেছি, চুরি করে বেচে দিয়েছি।’

অভিরাজ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। যে স্বীকারোক্তির জন্য এত আয়োজন তা আদায় হয়েছে। কিন্তু আশুতোষ কেমন যেন থম মেরে যান। পুলিশের লোক চাঁদুকে অ্যারেস্ট করতে চাইলে তিনি বাধা দেন। মাথা নীচু করে আশুতোষ বাড়ির ভেতরে চলে যান।
ছেলে-অন্ত-প্রাণ জবা আজ বাড়িভরতি লোকের সামনে শুনলেন যে তাঁর ছেলে চোর। এই লজ্জা তিনি কোথায় লুকোবেন? ফাঁকা ঠাকুরদালানে লক্ষ্মীপ্রতিমার সামনে নিথর হয়ে বসে আছেন গোপাল, জবা আর চাঁদু। আত্মহত্যা করতেও যে সাহস লাগে, তাও সাক্ষীগোপালের ভাঁড়ারে নেই। তাঁদের ছেলে মাতাল হতে পারে, অকর্মণ্য হতে পারে, কিন্তু তাই বলে চোর? এ অপবাদ কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না গোপাল আর জবা। যে ছেলেকে গোপাল কথায় কথায় দুরছাই করতেন, সেই ছেলেই বাবাকে বাঁচাতে এত বড়ো একটা অপরাধের বোঝা কাঁধে নিয়ে নিল?
তাঁরা ঠিক করেন আজ রাতেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন, দরকার হলে ভিক্ষে করে খাবেন, কিন্তু এই অপমান সহ্য করে আর থাকবেন না। এমন সময় বাড়ির সদর দরজা দিয়ে একজন ঢুকে তাঁদের সামনে দাঁড়ায়।
‘যাওয়ার আগে সত্যিটা জেনে যাও সাক্ষীগোপাল।’
বৃষ্টির সঙ্গে কথা শেষ হওয়ার পর সোহম হেদুয়ার বাসস্ট্যান্ড থেকে একটা বাগবাজারগামী বাস ধরে। তাকে পিছু করে একটা গাড়ি।
আমিরচাঁদের কাছে একটা মেসেজ আসে—
‘Curtain call— Bagbazar Library.’
বাগবাজারের লাইব্রেরি আজ বন্ধ। কিন্তু এই লাইব্রেরিতে বহুদিন ধরে আসা-যাওয়ার ফলে সোহমের সঙ্গে এখানকার লাইব্রেরিয়ান অবিনাশের একটা ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। সোহম এতটাই মনোযোগী পড়ুয়া যে লাইব্রেরির রিডিং টাইম ওভার হয়ে গেলেও স্পেশাল রিকোয়েস্ট করে সোহম আরও পনেরো মিনিট বা আধ ঘণ্টা বা কখনো কখনো এক ঘণ্টা বাড়তি কাটায়। অবিনাশ সোহমকে খুবই স্নেহ করেন বলে এই সুবিধাটা সোহমের ভাগ্যে জোটে। এক একদিন রীতিমতো জোর করে তাকে লাইব্রেরি থেকে বের করে দেন অবিনাশ।
অবিনাশকে অনেক অনুরোধ করার পর সোহম লাইব্রেরিতে আসতে পেরেছে। ফাঁকা লাইব্রেরির সদর দরজা খুলে দু-জনে ভেতরে ঢোকে। বাগবাজারের গ্রন্থাগারে তাকাও ঈশান কোণ— এই সূত্র ধরে লাইব্রেরির ঈশান কোণ মানে উত্তর-পূর্ব কোণে এসে সোহম দেখতে পায় দেওয়ালে টাঙানো রামপ্রসাদ সেনের ছবি। ছবিটা সে দেওয়াল থেকে নামায়। ছবিতে ঢাকা পড়ে থাকা দেওয়ালে দেখা যায় একটা গুপ্ত লকার। তাতে নাম্বার সিস্টেম লক। লাইব্রেরিয়ান অবিনাশ অবাক হয়ে সোহমের দিকে তাকিয়ে বলেন,
‘মাই গুডনেস! আমার আগের লাইব্রেরিয়ান হরিনাথদা-র থেকে আমি শুনেছিলাম যে এই লাইব্রেরিতে এমন একটা সিক্রেট লকার আছে। কিন্তু সেটা কোথায় আছে কেউ তা জানে না। আর এর লকটা একটা স্পেশাল বারুদের কোটিং দিয়ে তৈরি, কেউ যদি এই লক ভাঙতে যায়...’
‘তাহলে এটা বাৰ্স্ট করবে।’ সোহম বলে।
‘হ্যাঁ। কিন্তু তুমি এর কথা জানলে কী করে?’
‘আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে এখানকার লাইব্রেরিয়ান কি ওই হরিনাথবাবুই ছিলেন?’
‘হ্যাঁ। আমারই তো বারো বছর হয়ে গেল। তার আগের পনেরো বছর লাইব্রেরিয়ান ছিলেন হরিনাথদা।’
‘তাহলে আমার বিশ্বাস, ওই হরিনাথবাবু আর সোমনাথ দাস মিলে গোপনে এই লকারটা এখানে ফিট করেন।’
‘সোমনাথ দাসটা কে?’ অবিনাশ অবাক হয়ে তাকায় সোহমের দিকে।
সোহম সে-প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে তার পকেট থেকে পরের পর চিঠিগুলো বার করে একটা টেবিলের ওপর রাখে। তারপর সেগুলো যেমনভাবে একের পর এক পাওয়া গেছে সেভাবে সাজিয়ে ফেলে সে।
‘অর্জিত যত সংখ্যা করে নাও সংযোজন’
সেই চিঠিগুলোর এক একটায় লেখা সংখ্যাগুলো জুড়ে যে সংখ্যাটা দাঁড়াল সেটা হচ্ছে ৯২৫৬৪১। সেই নাম্বার কম্বিনেশন লকারে প্রয়োগ করতেই লকার খুলে গেল। লকারের ভেতরে পড়ে আছে একটা রঙিন নকশা আঁকা কাগজ।
বৃষ্টি বাড়িতে এসে সমস্ত কথা শুনেছে। বিনা প্রমাণে কীভাবে তার বাবা বা দাদা সাক্ষীগোপাল বা চাঁদুদাকে এমন অপমান করতে পারেন তা সে ভেবেই পায় না। এর আগেও সে দেখেছে যে দাদা রেগে গেলে মাথার ঠিক থাকে না। কিন্তু তাই বলে এমনভাবে চাবুক পেটা করবে! বৃষ্টি আশুতোষের ঘরে আসে। সেইসময় ঘরে আশুতোষের সামনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে অভিরাজ। দু-জনের মধ্যে একটা প্রচণ্ড উত্তপ্ত আলোচনা চলছিল বলে বৃষ্টির মনে হল। বৃষ্টিকে দেখেই আশুতোষ চুপ করে যান। বৃষ্টি বলে, ‘বাবা, তোমার চোখের সামনে এমন অমানবিক অত্যাচার হল, আর তুমি দাদাকে আটকালে না? চাঁদুদা বা সাক্ষীগোপাল কখনো চুরি করতে পারে বলে তুমি মনে করো?’
‘না। চুরি করেছে তোর দাদা।’
বৃষ্টি এমন অভিযোগের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। অভিরাজ ফুঁসিয়ে ওঠে, ‘এই এক কথা তুমি তখন থেকে কীসের ভিত্তিতে বলছ? কী প্রমাণ আছে তোমার কাছে?’
আশুতোষ তাঁর মোবাইলে একটা ভিডিেয়া চালিয়ে বৃষ্টির হাতে দেন। অভিরাজ উঠে এসে বৃষ্টির কাঁধের পাশ দিয়ে ঝুঁকে পড়ে সেই ভিডিয়ো দেখছে। তাতে দেখা যাচ্ছে রাত্রিবেলা অভিরাজ চুপি চুপি ঠাকুরদালানে এসে লক্ষ্মীপ্রতিমা থেকে নাকছাবি খুলে নিচ্ছে। বৃষ্টি চূড়ান্ত অবিশ্বাসের নজরে অভিরাজের দিকে তাকায়। অভিরাজ মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে। আশুতোষ তার পকেট থেকে একটা একই রকমের দেখতে নাকছাবি বের করে বলেন, ‘এটা আসল। আমি শুনলাম যে বেশ কয়েকদিন ধরে এই নাকছাবি চুরি করার মতলব করছিল অভিরাজ। আজ সকালে এই ভিডিয়োটা আমার মোবাইলে ফরোয়ার্ড করা হয়। মেয়েটার জন্যেই আমি বেঁচে গেলাম।’
‘কোন মেয়ে?’ বৃষ্টি জিজ্ঞেস করে।
‘জাহ্নবী।’ আশুতোষ তাঁর দেরাজে নাকছাবিটা রেখে দিলেন।
‘নাকছাবির একটা নকল বানিয়ে জাহ্নবী এক ফাঁকে প্রতিমায় পরিয়ে রেখেছিল। নকলটা এই কুলাঙ্গার চুরি করেছে।’
‘কখন পেয়েছ তুমি ভিডিয়োটা?’ বৃষ্টি জিজ্ঞেস করে।
‘আজ দুপুরেই।’
‘তার মানে সব জেনেশুনেই তুমি সাক্ষীগোপালের সঙ্গে এমন ব্যবহার করলে? চাঁদুদাকে মার খেতে দিলে?’ বৃষ্টি কিছুতেই ব্যাপারটা বুঝতে পারে না। তার বাবা তো এমন মানুষ নয়।
আশুতোষ ছটফট করতে থাকেন তাঁর চেয়ারে বসে। কেউ যেন তাঁকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে। তিনি বলেন, ‘বাড়ি ভরতি আত্মীয়স্বজন, পুলিশের লোকজন এসে পড়েছে, তাদের সামনে তো আর নিজের রক্তকে চোর বলতে পারি না...’
‘তাই দোষটা অন্য কারো ঘাড়ে চাপাতে হবে। তাই তো?’
সাক্ষীগোপালের গলা শোনা যায়। তিনি ঘরের দরজা ঠেলে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর স্বভাবসুলভ রসিকতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, চোখে তাঁর জ্বলন্ত প্রতিশোধস্পৃহা। তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারেন না আশুতোষ।
‘নিজের রক্তের বিপদ দেখলেই সব কেমন গোলমাল হয়ে যায়। বিশেষ করে তা যদি বনেদি রক্ত হয়। তাই না আশুতোষ? এবার যে আমার রক্ত ঝরেছে। লাথি ঝ্যাঁটা খেয়ে এ বাড়িতে আর আমরা পড়ে থাকব না। আজই এ বাড়ি ছেড়ে আমরা চলে যাব। কিন্তু যাওয়ার আগে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়ে যাব।’
‘কী বলছ তুমি গোপালদা?’ আশুতোষের চোখে একটা অজানা আশঙ্কা ফুটে উঠেছে। যেন কোনো অশনি সংকেত তিনি টের পাচ্ছেন। সাক্ষীগোপালকে আজ আর থামানো যাবে না। তিনি বলে চলেছেন, ‘এতদিন ধরে অনেক অন্যায়, অনেক অবিচার ঘটতে দেখে চোখ বুজে থেকেছি। শুধু গ্রাসাচ্ছাদনের দায়ে। কিন্তু আজ সাক্ষীগোপালের সাক্ষী দেবার দিন আশুতোষ।’
আশুতোষ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার সাক্ষীগোপালের দিকে তাকিয়েছিলেন। ক্রমশ তাঁর দৃষ্টি মাটির সঙ্গে মিশে যেতে থাকে। সাক্ষীগোপাল বৃষ্টিকে বলেন, ‘শোন মা, তোর বাপের গল্প। স্রেফ বিলাসিতা আর আভিজাত্য বজায় রাখতে এই আশুতোষ সিংহ বহু বছর ধরে ধার করে করে নিজের সব কিছু বন্ধক রেখেছে। এমনকী নিজের পৈতৃক বসতবাটীটা পর্যন্ত। আর সেই খেসারত দিতে হল তার নিজের প্রাণের বন্ধুকে।’
‘চুপ করো গোপালদা!’ আশুতোষের কণ্ঠস্বর প্রায় বুজে আসার মতো অবস্থা।
‘চুপ করেই তো ছিলাম এতদিন, আশুতোষ। সেই অভিশাপ আমাদের শেষ করে এবার যে আমাদের পরের প্রজন্মকে গ্রাস করতে চলেছে। এখনও যদি চুপ করে থাকি তাহলে যে ভগবান কোনোদিনও আমাকে ক্ষমা করবে না আশুতোষ।’
বাগবাজার লাইব্রেরিতে সোহম লকার থেকে রঙিন কাগজটা বের করে। তাতে মুর্শিদাবাদের খোশবাগ আর কাটরা মসজিদের একটা নকশা করা আর অনেক খুঁটিনাটি লেখা আছে। সোহম সেটা খুঁটিয়ে দেখতে গেলে তার পাশে অবিনাশ লুটিয়ে পড়েন। একটা গুলির শব্দ শোনা গেছে। অবিনাশের রক্তে লাইব্রেরির মেঝে ভিজে যাচ্ছে। সোহম কিছু বোঝার আগেই ঠিক তার বাঁ-হাত ছুঁয়ে আরেকটা গুলি বেরিয়ে গেল। সোহমের হাত থেকে সেই নকশা ছিটকে পড়ে যায় মেঝেতে। পর পর আরও দুটো গুলির শব্দ লাইব্রেরির নিস্তব্ধতাকে ছারখার করে দেয়। প্রাণ বাঁচাতে সোহম উলটোদিকের একটা শেল্ফের আড়ালে আশ্রয় নেয়। তার বাঁ-হাতে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে, শার্টের হাতা রাঙিয়ে উঠেছে রক্তে। রিভলভার হাতে লাইব্রেরিতে ঢোকেন আমিরচাঁদ মিত্তল। মেঝেতে পড়ে থাকা নকশাটা তুলে নিয়ে সারা লাইব্রেরিতে একটা সতর্ক নজর হেনে বেরিয়ে যান তিনি। সোহম আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে সেই নকশা আর দেখতে পায় না। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে তার অবিনাশদার নিথর শরীর।

১৯৯২ সালের জুলাই মাসের সকাল। আশুতোষ সিংহ তাঁর এক অবাঙালি বন্ধুর সঙ্গে বাড়িতে বসে কথা বলছেন।
‘দেখো আশুতোষ, দোস্তি দোস্তির জায়গায়, বিজনেস বিজনেসের জায়গায়। আমার রুপিয়া তুমি ওয়াপস করো।’
‘আমি তোমায় পুরো টাকাটা এক্ষুনি কী করে দেব আমিরচাঁদ? আমায় একটু সময় দাও।’
‘আর কত সময় দেব বলো তো তোমায়? রুপিয়া যদি না ওয়াপস করতে পার তাহলে অউর কুছ মর্টগেজ রাক্ষো। তোমাদের ওই অস্টিন গাড়ি, ওর পেপাৰ্স দাও আমায়।’
‘আমিরচাঁদ, গাড়িটা আমাদের পরিবারের খুবই সম্মানের জিনিস।’
‘তো ফির তোমাদের ওই মা লছমির নাকছাবি। ওটা দাও।’
‘এগুলো সবই আমাদের পরিবারের খুবই সম্মানের জিনিস।’
‘বাপরে বাপ! তোমাদের কত সম্মান! কর্জ লিয়ে ওয়াপস না করায় সম্মান নষ্ট হয় না?’
আশুতোষ আরক্ত মুখে তাকিয়ে থাকেন আমিরচাঁদ মিত্তলের দিকে। সুদখোর ব্যবসায়ীরা টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে কতটা নির্দয় হতে পারে তা আশুতোষ ভালো করেই জানেন। এমন সময় আশুতোষের একটা ফোন আসে। ফোন করেছেন মুর্শিদাবাদ থেকে তাঁর প্রাণের বন্ধু সোমনাথ। সোমনাথ তাঁকে এমন একটা খবর দিয়েছেন যা শুনে তাঁর মাথা ঘুরতে শুরু করে। আশুতোষ ফোনে বলছেন, ‘দেখ সোমনাথ, জিনিসটার কথা তুই আর কাউকে বলিস না কিন্তু। সবাই তো আর এর কদর করতে পারবে না। তা এটা কোথায় রেখেছিস? ... তুই কি এখন মুর্শিদাবাদেই আছিস? গ্রামের বাড়িতেই তো? আচ্ছা, ঠিক আছে। সাবধানে থাকিস।’
আশুতোষ ফোনটা রেখে আমিরচাঁদের দিকে তাকান। আমিরচাঁদ সমস্ত কথোপকথন শুনে যা আন্দাজ করার করে নিয়েছেন। পকেট থেকে একটা গুটকার কৌটো বের করে একটা ছোটো চামচে ভরতি গুটকা মুখে দিয়ে আমিরচাঁদ বলেন, ‘আশুতোষ, হামি তুমহার লোনটা ওয়েভ অফ করে দিতে পারি। লেকিন ইসকে বদলে মে হামাকে উয়ো চিজ তোমায় জোগাড় করে দিতে হবে।’
নিরুপায় আশুতোষ অস্থিরভাবে পায়চারি করতে থাকেন তাঁর ঘর জুড়ে।
‘সোমনাথ খুব আদর্শবাদী ছেলে। ওই জিনিস ও দিতে রাজি হবে বলে আমার মনে হয় না আমিরচাঁদ।’
‘আরে অ্যায়সা বহত আদর্শবাদী হামি দেখেছি ভাই। রুপিয়ার সামনে সব আদর্শ ফুস হয়ে যায়। ওর ফিন্যানশিয়াল স্টেটাস কেমন?’
‘গরিব ঘরের ছেলে সোমনাথ। কলকাতায় আমার এখানেই থেকে পড়াশোনা করে। রাতে একটা প্রিন্টিং প্রেসে চাকরি করে নিজের খরচ চালায়। ও খুব সৎ ছেলে আমিরচাঁদ।’
‘ব্যস, তাহলে তো হয়েই গেল। তুমহার দোস্তের মুর্শিদাবাদের অ্যাড্রেস দাও। হামি গিয়ে বাৎচিত শুরু করি। রাজি না হলে তুমি এসে সমঝাও।’
‘ও কিছুতেই রাজি হবে না, আমি সোমনাথকে খুব ভালো করে চিনি।’
‘তব তো অন্য রাস্তা ধরতে হবে। মতলব কি বাত, উয়ো চিজ হামার চাই। সোচ লো।’
আমিরচাঁদ চলে যান। আশুতোষ সারাদিন চূড়ান্ত অস্থিরতায় কাটান। পরের দিন মনস্থির করে তিনি ফোন করেন আমিরচাঁদকে।
এর দিন পাঁচেক পরের ঘটনা। মুর্শিদাবাদের একটা পোস্ট অফিস থেকে কলকাতার বিভিন্ন ঠিকানায় কয়েকটা চিঠি পোস্ট করে বেরিয়ে এলেন সোমনাথ। সামনের একটা এসটিডি বুথে ঢুকে কলকাতার একটা নাম্বারে ফোন করলেন তিনি।
‘হ্যালো ... কে হরিনাথদা ? কেমন আছেন? ... হ্যাঁ, এদিকে সব ঠিক আছে। হ্যাঁ, সেই নয়ান বারুই আর গোবিন্দরাম সাহু এসেছিলেন?... যাক, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। আচ্ছা দাদা, আমি আপনাকে একটা রেজিস্ট্রি চিঠি পাঠিয়েছি। ওতে ম্যাপটা করা আছে। ম্যাপটা ওই লকারে রেখে দেবেন। আর আনলক করার নম্বরটাও ওই চিঠিতে আছে। দাদা, লকারটার ওপর একটা ছবি ঝুলিয়ে দিতে হবে, রামপ্রসাদ সেনের।... থ্যাঙ্ক ইউ দাদা। আপনার মতো মানুষকে এইভাবে বিব্রত করছি। ... আসলে দাদা, বাংলার সম্পদ রক্ষা করতেই যা কিছু করা আর কি। যেকোনো সময় আমার কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। আমি আমার প্রাণের ভয় করি না, আমার চিন্তা শুধু কুসুমকে নিয়ে।... পুলিশকে খবর দিয়ে কোনো লাভ নেই, তা ছাড়া সেই সুযোগও আমার নেই। লোকটা সারাক্ষণ আমার ওপর নজর রাখছে। আমি আমার কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধুদের বিভিন্ন ধাঁধা লিখে এক একটা চিঠি পাঠিয়েছি। যদি কোনোদিনও কোনো যোগ্য লোক এর ঠিক মানে বের করতে পারে তাহলেই সে আপনার লাইব্রেরি অবদি পৌঁছোবে। এটা যার তার কম্ম নয়, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। ... দাদা, আরেকটা কথা। আমার একটা রাফ খাতা আমি মনে হচ্ছে লাইব্রেরিতে ফেলে এসেছি। কোথায় রেখেছি ঠিক মনে করতে পারছি না। খাতাটার প্রথম পাতায় লেখা আছে ‘‘আলিনগরের গোলকধাঁধা’’। একটু খুঁজে দেখবেন?’
ফোন শেষ করে সোমনাথ একটা বিড়ি ধরালেন। পুরো কাজটা তিনি সন্তর্পণে সেরে ফেলেছেন। তাই এবার নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ি ফিরতে পারছেন। তিনি জানেন যে এর জন্য তাঁর জীবনসংশয় দেখা দিতে পারে। নিজের প্রাণের ভয়ের চেয়ে তাঁর কাছে এই সম্পদ বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ার ভয় অনেক বেশি।
ফেরার পথে একটা ওষুধের দোকান থেকে কুসুমের জন্য কয়েকটা ওষুধ কিনলেন সোমনাথ। বাসে করে গ্রামের সবথেকে কাছের বাসস্টপে নামলেন তিনি। রাত হয়ে গেছে। সামনের একটা ধানখেত পেরিয়ে একটা অগভীর জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা ধরে গেলে প্রায় মিনিট কুড়ি সময় বাঁচানো যায়। সোমনাথ সেই পথ দিয়েই চললেন।
সোমনাথ ভাবেন, মানুষ কতটা লোভী হতে পারে। ভারতের ঐতিহাসিক সম্পদ বিদেশে পাচারের যে কত ঝুড়ি ঝুড়ি উদাহরণ আছে তার ইয়ত্তা নেই। চোরাপথে এইসব সম্পদ বিভিন্ন স্মাগলারের হাত ঘুরে বিদেশিদের প্রাইভেট কালেকশনের মিউজিয়মে শোভা পায়। এর প্রথম উদাহরণ পাওয়া যায় একটা প্রাচীন কালো পিতলের তৈরি দেবতার মূর্তি চুরির ঘটনায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লসের পারিষদ উইলিয়াম ফিল্ডিং ভারতের একটা মন্দির থেকে এই মূর্তি চুরি করে রাজাকে উপহার দেন। ভারতবর্ষ তখন ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে একটা জীবন্ত মিউজিয়ম। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এমন অনেক লোহার বা অন্য ধাতুর মূর্তি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোরুমে পাচার হয়ে যায়। ১৯৬৫-৭০ সময়কালে খাজুরাহো থেকে অনেক মূর্তি চুরি হয়েছে। প্রায় ১৩০০ ছবি জয়পুর প্যালেস মিউজিয়ম থেকে চুরি হয়েছে। ১৯৬৮তে দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ম থেকে চুরি হয়েছে অনেক হিরে জহরত। বাংলার চন্দ্রকেতুগড় থেকে যে কত কত ঐতিহাসিক সম্পদ চুরি হয়ে সারা বিশ্বের বিভিন্ন মিউজিয়মে বা প্রাইভেট কালেকশনে শোভা পাচ্ছে তার হিসেব নেই।
এতসব কিছু ভাবতে ভাবতে সোমনাথ একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ একটা গুলির শব্দে তাঁর হুঁশ ফেরে। অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে টর্চ জ্বালিয়ে হাঁটছিলেন তিনি। টর্চের আলোয় তিনি দেখতে পেলেন যে তাঁর থেকে মোটামুটি পনেরো হাত দূরে একটা ডোবার সামনে পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমিরচাঁদ মিত্তল। একজন লোক ডোবার জলে লুটিয়ে পড়েছেন গুলি খেয়ে। আর আমিরচাঁদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন সোমনাথের প্রাণের বন্ধু আশুতোষ সিংহ। সোমনাথের পুরো ব্যাপারটা বুঝে নিতে একটুও অসুবিধে হয় না যে আশুতোষের থেকে খবর পেয়েই আমিরচাঁদ তাঁর পিছনে পড়েছেন। আর আশুতোষকে নিয়ে আসা হয়েছে তাঁকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে জিনিসটা হাত করার জন্য। তা ছাড়া তাঁর বন্ধু যে এমন একটা খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে এ যেন সোমনাথের কল্পনার অতীত। আমিরচাঁদের সঙ্গীরা সোমনাথকে দেখে গুলি চালাতে যায়। আমিরচাঁদ তাদের আটকে সোমনাথকে বলেন, ‘উয়ো চিজ কাঁহা ছুপায়ে রেখেছেন বলে দিন সোমনাথবাবু। নেহি তো আপনারও এই হাল করব।’
সোমনাথ মুখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর চোয়াল ক্রমশ শক্ত হতে থাকে।
আশুতোষ অধৈর্য হয়ে বলেন, ‘বোকামি করিস না সোমনাথ। তুই যা টাকা পাবি তাতে তোর সারাজীবন বসে বসে কেটে যাবে।’
‘বসে খাওয়ার স্বভাব আমার নেই রে আশুতোষ। আর জিনিসটা কোথায় রেখেছি সেটা জানিয়ে তোকে চিঠি পাঠিয়েছি। বুদ্ধি থাকলে খুঁজে নিস।’
সোমনাথ টর্চের আলোয় আমিরচাঁদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পালাতে থাকেন। আমিরচাঁদের লোকজন তাঁকে ধাওয়া করে। আমিরচাঁদ আর আশুতোষ পিছন পিছন ছুটছেন। আমিরচাঁদ ক্রমাগত বলে চলেছেন, ‘কোই গোলি মত চলানা।’
জঙ্গল পেরিয়ে একটা হাইওয়ের ওপারের জঙ্গলের দিকে প্রাণপণে ছুটে যাচ্ছিলেন সোমনাথ। একটা ট্রাক এসে তঁাকে উড়িয়ে দিয়ে চলে গেল।
সোমনাথের রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে হাইওয়েতে। আমিরচাঁদ প্রচণ্ড হতাশ হয়ে নিজের গাড়িতে উঠে চলে যান সেখান থেকে। সোমনাথের মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে আতঙ্কে কাঁপছেন আশুতোষ। একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায় সেখানে। গাড়ির ড্রাইভার সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে গাড়ি থেকে কাঁপতে কাঁপতে নেমে এসে আশুতোষের দিকে তাকান। আশুতোষ তাঁকে বলেন,
‘গোপালদা, মনে রাখবে আমরা কেউ এখানে আসিনি। সোমনাথের মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনায়।’
এই মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হওয়ার মানসিক পরিতাপ নিয়ে পঁচিশটা বছর কাটিয়েছেন সাক্ষীগোপাল। তাঁর যে আর কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। চোখের সামনে একজন ক্রিমিনালকে মাথা উঁচু করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে দেখলেন তিনি এতগুলো বছর ধরে। এখনও মনে পড়ে সোমনাথের কথা। সোহম যে ঘরে এখন থাকে সেই ঘরেই থাকতেন সোমনাথ। গোপালের সঙ্গে কী দারুণ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল তাঁর। কত রকমের গল্প, কত সুখ দুঃখের কথা হত দু-জনের মধ্যে। সোমনাথও স্নানের পর খালি গায়ে গামছা পরে মা সরস্বতীর ছবির সামনে এমন ধূপ জ্বালাতেন। ছবিটা সোমনাথই টাঙিয়েছিলেন ওই ঘরে। সাক্ষীগোপাল লক্ষ করেছিলেন সোমনাথের কোমরের সেই জন্মদাগ। সেই একই জন্মদাগ এখন সোহমের কোমরে। তার ওপর এমন চেহারার মিল।
‘আমার আর কোনো উপায় ছিল না।’ আশুতোষ দু-হাতের তালুর মধ্যে তাঁর মুখ ঢেকে বলেন, ‘যৌবনের উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য দেনায় আমার চুল পর্যন্ত বিকিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এর থেকে আমাকে টাকা ধার দিয়ে বাঁচিয়েছিল আমিরচাঁদ। আর তার খেসারত আমায় সারাজীবন গুনে যেতে হচ্ছে। আমাদের পরিবারের সম্মান বাঁচাতে এই কাজ করতে আমি বাধ্য হয়েছি। ব্যস, আমার আর কিছু বলার নেই।’
‘তোমার না থাকলেও আমার যে এখনও অনেক কিছু বলার আছে আশুতোষ। সাক্ষীগোপালের সাক্ষী দেওয়া যে এখনও শেষ হয়নি। সোহমের আসল পরিচয়টা বৃষ্টি মা-কে জানাই।’
বৃষ্টি আর অভিরাজ চমকে ওঠে। বৃষ্টি বলে, ‘সোহমের আসল পরিচয় মানে?’
‘জানিস তো মা, সোহমকে যেদিন প্রথম তুই এ বাড়িতে নিয়ে আসিস, ওর চেহারা, কথাবার্তা, চালচলন দেখেই আমি একটা সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু ভেবেছিলাম চেহারার এমন মিল তো হতেই পারে। কিন্তু তারপর তার ইতিহাসজ্ঞান আর কোমরের জন্মদাগ দেখে আমি নিশ্চিত হলাম।’
‘কী নিশ্চিত হলে?’ বৃষ্টি অধৈর্য হয়ে পড়ে।
গোপাল মৃদু হেসে আশুতোষের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আশুতোষ বলেন, ‘আমিরচাঁদের চাপ আমার ওপর ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। আমিরচাঁদের সামনেই সোমনাথ সেই চিঠির কথা বলেছিল। বিভিন্ন লোকজনকে আমরা সেই চিঠির ধাঁধা দেখিয়েছিলাম, কিন্তু কেউ কোনো মানে বার করতে পারেনি। তারপর হঠাৎ একদিন আমিরচাঁদ আমাকে তোর আর সোহমের একটা ভিডিয়ো পাঠায়। সোহমের চেহারা, তার হাবভাব— সব যেন আমার খুব চেনা মনে হল। আমিরচাঁদ সোহমের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করল। সোমনাথ মারা যাওয়ার সময় ওর স্ত্রী কুসুম অন্তঃসত্ত্বা ছিল। তাদের একটা ছেলে হয়, প্রসবের সময় কুসুম মারা যায়। শুনেছিলাম ছেলেটাকে একটা অনাথ-আশ্রমে দেওয়া হয়েছিল। যেদিন তুই বললি যে সোহম অনাথ, আর যেদিন ওকে প্রথম দেখলাম আমারও কেমন যেন সন্দেহ হল। আমিরচাঁদ ওর অনাথ-আশ্রমে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে যে এ সেই ছেলে। সোমনাথের ছেলে। সোমনাথের আর কোনো আত্মীয় সেই ছেলের ভার নিতে চাইল না, তাই হাসপাতাল থেকে একে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল অনাথ-আশ্রমে। তা ছাড়া কোমরের জন্মদাগের কথাও শুনলাম গোপালদার কাছে। সব কেমন যেন মিলে যাচ্ছে। আর সবার ওপরে ইতিহাসে এমন দক্ষতা, জিনের মাহাত্ম্য কাকে বলে তা বুঝলাম।’
‘তাই সেই জিনকে বোতলবন্দি করে আরব্য রজনী শুরু করে দিল তোর বাবা।’ সাক্ষীগোপাল বলেন বৃষ্টিকে।
‘কিন্তু যার জন্য এত কিছু সেই জিনিসটা কী?’
‘পলাশির যুদ্ধের আগে সিরাজের সঙ্গে ফরাসিদের একটা সন্ধিস্থাপন হয়। ইউরোপে ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের মধ্যে তখন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তাই ভারতের ইংরেজরা তখন চন্দননগর আক্রমণ করে ফরাসিদের দেশছাড়া করতে চায়। সিরাজ ফরাসিদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ফরাসিরা সিরাজকে একটা বহুমূল্য তরোয়াল উপহার দিয়েছিল। সিরাজের মৃত্যুর পর তাঁর যাবতীয় ধনসম্পত্তি লুঠ হয়। সেই তরোয়াল অনেক হাত ঘুরে মুর্শিদাবাদের এক জমিদারের প্রাইভেট মিউজিয়মে আসে। সেই জমিদারবাড়ির নিলাম থেকে সোমনাথ এই তরোয়াল কেনে। সোমনাথই ফোনে এটা জানিয়েছিল।’ আশুতোষ বলেন।
‘সিরাজদ্দৌল্লার তরোয়াল!’ বৃষ্টি অবাক হয়ে তার বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে।
সোহমের হাতের ক্ষত বেশ যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠছে। কোনোরকমে টলতে টলতে সে লাইব্রেরির একপাশে আসে। এত কিছু করে শেষে সেই শয়তান আমিরচাঁদের স্বার্থসিদ্ধি হয়ে গেল? আমিরচাঁদকে সোহম এর আগে কোনোদিনও দেখেনি, কিন্তু যে লোকটা একটু আগে পিস্তল হাতে এখানে এসেছিল তার চেহারার সঙ্গে সাক্ষীগোপালের বর্ণনায় আমিরচাঁদ মিত্তলের চেহারা হুবহু মিলে যাচ্ছে। বাবার এত কষ্টে আগলে রাখা সিরাজের তরোয়াল তাহলে শেষমেষ এই শয়তানের হাতেই পাচার হয়ে বিদেশে কোনো ধনকুবেরের প্রাইভেট মিউজিয়মে শোভা পাবে? না, এ কিছুতেই হতে দেওয়া যায় না। শেষ চেষ্টা একটা করতেই হবে। কাগজটায় মুর্শিদাবাদের খোশবাগ আর কাটরা মসজিদের নকশা করা ছিল। তার মানে ওই অঞ্চলেই কোথাও একটা জিনিসটা লুকোনো আছে। কিন্তু জায়গা দুটোর মাঝের ব্যাপ্তি তো বিরাট। হতাশ হয়ে সোহম বসে পড়তে যায় পাশের বুকশেল্ফ ধরে। যন্ত্রণায় টাল সামলাতে না পেরে সোহমের হ্যাঁচকা টানে বুকশেল্ফ পড়ে যায়। সোহম কোনোমতে নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়। বিভিন্ন বই সব ছত্রাকার হয়ে পড়ে। বুকশেল্ফের একটা দিক তার পায়ের ওপর পড়েছে। সোহম লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে। তার চোখ বুজে আসে অসহ্য যন্ত্রণায় আর ক্লান্তিতে।
বাবা যে দেশের সম্পদ এইভাবে একটা স্মাগলারের হাতে তুলে দিচ্ছে একথা বৃষ্টি যেন এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না। আশুতোষ বৃষ্টির হাত ধরে বলেন, ‘বিশ্বাস কর মা! আমি এই অনুতাপে দিনের পর দিন ভুগেছি। এ না করলে আমাদের রাস্তায় এসে দাঁড়াতে হত!’
‘সেটা অনেক বেশি সম্মানের হত বাবা!’
‘কতটুকু দুনিয়া দেখেছিস তুই মা? এই সুখস্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে থাকতে পারতিস?’
‘ছোটোবেলা থেকে সেরকম অভ্যেস করালে নিশ্চয়ই পারতাম, বাবা। যেমন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ থাকে। বিলাসিতা, আভিজাত্য রক্ষা করার জন্য যাদের দেনা করতে হয় না। এর কোনো ক্ষমা হয় না বাবা।’
‘মা, আমার কথা শোন। শেষে তুইও আমায় ভুল বুঝবি?’
‘একথা তোমার আগে ভাবা উচিত ছিল বাবা।’
বৃষ্টি তার বাবার হাত ছাড়িয়ে নেয়। আশুতোষ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। সাক্ষীগোপাল বৃষ্টিকে বলেন, ‘মা, সোহমের জন্য আমার খুব চিন্তা হচ্ছে।’
বৃষ্টি ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়। সে জানে সোহম গেছে বাগবাজার লাইব্রেরিতে। আশুতোষ একটা চেয়ারে বসে পড়েন। অভিরাজ বাবার দিকে একটা ত্যারছা হাসি ছুড়ে ঘর ছেড়ে চলে যায়। ফাঁকা ঘরে এখন আশুতোষ আর তাঁর সামনে সাক্ষীগোপাল। বাইরে বোধ হয় বৃষ্টি হবে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সাক্ষীগোপাল ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তাঁর পকেট থেকে একটা চিঠি বার করে আশুতোষকে দেন। তাতে লেখা— মিরজাফরের কুষ্ঠরোগ।
‘মিরজাফর শেষ বয়সে কুষ্ঠরোগাক্রান্ত হয়ে সবার কাছে অস্পৃশ্য হয়ে ছিলেন। তোমারও সেই দশা হবে আশুতোষ।’
আশুতোষ প্রচণ্ড অবিশ্বাসের নজরে গোপালের দিকে তাকান। তাঁর ভেতরটা রাগে ফেটে পড়ছে। কিন্তু সেই রাগ প্রকাশ করার শক্তিটুকু তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে আসে তাঁর মুখ থেকে।
‘তুমি?’
‘হ্যাঁ। তোমার মানসিক যন্ত্রণাই আমার একমাত্র মানসিক পরিতোষ আশুতোষ। যেভাবে হোক প্রতিবাদটা তো করতে হবে। কোনো বেইমান পার পাবে না। সবার শাস্তি হবে।’
সাক্ষীগোপাল ঘর থেকে বেরিয়ে যান। বাইরে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। একা ঘরে বসে রইলেন অসহায় আশুতোষ। একা, এক্কেবারে একা।
সোহম চোখ খোলে। একা লাইব্রেরিতে সে শুয়ে ছিল এতক্ষণ। তার পাশে অবিনাশের লাশ পড়ে আছে। পায়ের কাছে বুকশেল্ফ উলটে পড়ে আছে। সোহম শরীরের যাবতীয় শক্তি জড়ো করে ওঠবার চেষ্টা করে। এমন সময় হঠাৎ তার চোখে পড়ে খাতাটা।
শেল্ফের পিছনে দেওয়ালের দিকে ঝুল আর ধুলো মাখা একটা খাতা পড়ে আছে। খাতার মুখটা সোহমের দিকে ফেরানো ছিল। বাইরে বিদ্যুতের ঝলকানিতে সেই খাতার ওপরের হাতের লেখাটা সোহমের চোখে পড়ল— ‘আলিনগরের গোলকধাঁধা’।
এতে ‘ল’ অক্ষরটা একটা বিশেষভাবে লেখা। সোহম আগেই লক্ষ করেছিল যে চিঠিগুলোতে ‘ল’ অক্ষরটা একটা বিশেষভাবে লিখতেন তার বাবা সোমনাথ দাস। সোহম খাতাটা তুলে নেয়। খাতার ভেতরে হিজিবিজি আরও অনেক কিছু লেখা। দেখে মনে হল এটা একটা রাফ খাতা। চিঠিগুলোর পাশে খাতাটা খুলে হাতের লেখা মিলিয়ে সোহম বুঝতে পারে যে সেগুলো সবই সোমনাথ দাসের লেখা। আরও মজার বিষয়, যে যে ধাঁধাগুলো সোমনাথ বানিয়েছিলেন সেগুলো সবই সেই খাতার এক একটা পাতায় লেখা। কবিতা লিখতে গেলে যেমন অজস্র কাটাকুটির পর ফাইনাল কবিতাটা লেখা হয়, ঠিক তেমনি এখানেও প্রত্যেকটা ধাঁধা তৈরি করার জন্য নানানরকম শব্দের প্রয়োগে এক একটা লাইন তৈরি করা, তারপর সেগুলো কেটে ফেলে আবার নতুন লাইন লেখা— এ সবই আছে। তার মানে এটা সোমনাথ দাসের রাফ খাতা যেখানে উনি এক একটা ধাঁধা তৈরি করেছিলেন। সোহম বুঝতে পারে যে এইসব ধাঁধা সোমনাথ দাস হয়তো এই লাইব্রেরিতে বসেই বানিয়েছিলেন। তারপর এক একজনের কাছে এক একটা ধাঁধা আর এক একটা সংখ্যা দিয়ে তিনি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তাহলে কি শেষ নকশাটার ব্যাপারেও কোনো হদিশ এখানে দেওয়া আছে? সোহম পাগলের মতো একের পর এক পাতা উলটে যেতে থাকে। অবশেষে পাওয়া গেল একটা পাতা। তাতে একটা তলোয়ারের ছবি আর তার সঙ্গে একটা ছড়া—
আলিনগরের প্রতিষ্ঠাতা ঘুমায় যেখানে
কবর যত আছে সেথা একত্রে নাও গুনে
সেখান থেকে এবার চলো নদী ডিঙিয়ে
পৌঁছে যাবে নগরেরই সুদূর ঈশান কোণে
ধুলো মেখে নগরজনক ঘুমায় সিঁড়ির তলে
অদ্বিতীয় দ্বারের নকশা পাবে সে চাতালে
উত্তরে ঘর গুনে পাওয়া সংখ্যা যত ছেড়ে
নকশা আঁকা গুপ্ত পথে পৌঁছোবে ওপারে
সেইখানেতেই মাটির নীচে আলিনগরের ধন
সাবধান তাতে হাত বাড়ালেই সর্বনাশ ভীষণ
এর পরের পাতায় একটা স্কেচ। স্কেচটা পুরোটা শেষ হয়নি। কিন্তু সোহম বুঝতে পারে যে সেটা ওই লকারে পাওয়া স্কেচের প্রাথমিক একটা খসড়া। তার মানে এই ধাঁধার মাধ্যমে সেই গুপ্ত জায়গার কথাই বলা আছে। প্রথম দুটো লাইন থেকেই তার ইঙ্গিত পেয়ে গেছে সোহম। নিশ্চয়ই প্রথমে তার বাবা ভেবেছিলেন যে এটাও ধাঁধার মাধ্যমে জানাবেন, কিন্তু তারপর মত বদলে একেবারে স্কেচটাই করে দিয়ে গেছেন।
সামনের রিডিং টেবিলে এত রাতে কে একা বসে বসে পড়াশোনা করছে? পড়াশোনা করছে না তো, মনে হচ্ছে একটা খাতায় কী-একটা নকশা আঁকছে। লোকটা সোহমের দিকে তাকিয়ে হাসছে কেন? সোহম তাকে ভালো করে দেখে, লোকটার চেহারা যেন একেবারে সোহমের মতো। সোহমের মতোই লোকটা আঙুল দিয়ে তার চুল পাকায়। কী বলতে চাইছে লোকটা সোহমকে? সোহম যেন স্পষ্ট শুনতে পেল লোকটার গলা।
‘আমি এত অবদি করেছি, বাকিটা তোকে করতে হবে সোহম।’
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। বৃষ্টির গাড়ি বাগবাজার লাইব্রেরির গলিতে ঢুকল। সে নিজেই আজ ড্রাইভ করে এসেছে। লাইব্রেরির বাইরে পাথরের মতো বসে বৃষ্টিতে ভিজছে সোহম। বৃষ্টি গাড়ি থেকে নেমে ছুটে গিয়ে সোহমকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ফেলে। সারাজীবন কত কষ্ট পেয়েছে তার সোহম। আর তার জন্য কিনা তার বাবাই দায়ী! সোহম কি তাকে ক্ষমা করতে পারবে? সোহম একবার বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,
আমি জানি এ ধ্বংসের দায়ভাগে
আমরা দুজনে সমান অংশীদার
বৃষ্টি বলে,
অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে
আমাদের ‘পরে দেনা শোধবার ভার’
সুধীন্দ্রনাথ দত্তর ‘উটপাখি’ ওদের দু-জনেরই খুব প্রিয় কবিতা। ছলছলে চোখে তাকিয়ে থেকে সোহম বলে, ‘মুর্শিদাবাদ। আমায় নিয়ে যাবি বৃষ্টি?’
‘আচ্ছা সোমনাথ, সুতানুটি গোবিন্দপুর আর কলকাতা মিলিয়ে যে শহর গড়ে উঠল তার নাম কলকাতাই রাখা হল কেন? সুতানুটি বা গোবিন্দপুর রাখা হল না কেন?’
সিংহবাড়ির ছাদে বসে নকুড়ের সন্দেশ খেতে খেতে গল্প করতেন দুই বন্ধু। তা প্রায় সাতাশ আঠাশ বছর আগেকার ঘটনা।
‘তার কারণ আছে রে আশু। বুঝিয়ে বলি শোন। কলিকাতা নামের সঙ্গে আরেকটা বন্দর নগরের নামের মিল আছে— কালিকট। কালিকটেই ভারতের সঙ্গে পোর্তুগিজদের বাণিজ্য শুরু হয়। তাই কালিকটের থেকে রপ্তানি করা সামগ্রী ইউরোপের বাজারে ভারতের পণ্য হিসেবে বেশ বিখ্যাত হয়। তার দামও বেশি ছিল। ব্রিটিশদের আগে যে আরমানি বণিকরা কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছিল তারা কলিকাতা থেকে রপ্তানি করা জিনিসপত্র কালিকটের নাম দিয়ে চালাত। ইংরেজরাও সেই একই ফন্দি করে। সেইজন্যেই সুতানুটির বদলে কলিকাতা নাম ব্যবহার করার দরকার পড়ে।’
‘কী কী রপ্তানি হত তখন?’
‘বাংলার মসলিন তখন ইউরোপের বাজার কাঁপাচ্ছে। মসলিনের সূক্ষ্মতা ছিল ইউরোপীয়দের কাছে খুব অ্যাট্রাকটিভ একটা ব্যাপার। ২০ গজের একটা মসলিন কাপড় একটা ছোট্ট নস্যির কৌটোর মধ্যে ভরে রাখা যেত। মসলিন ছাড়াও সরস্বতী, মলমল, আলাবালি, তঞ্জীব, তেরিন্দাম, নয়নসুখ, শিরবন্ধানী, ডুরিয়া, জামদানি নামে সূক্ষ্ম কাপড়ও তৈরি হত।’
‘এই ব্যাবসা বন্ধ করতে ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে সিরাজদ্দৌল্লা কলকাতা দখল করে তাঁর দাদু আলিবর্দি খাঁ-র নামে শহরের নাম পালটে করে দেন ‘‘আলিনগর’’। এতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিশাল ক্ষতি হয়েছিল। পলাশির যুদ্ধের আগে মিরজাফরের সঙ্গে ব্রিটিশদের যে চুক্তি হয়েছিল তাতে একটা শর্ত ছিল যে শহরের নাম ‘‘আলিনগর’’ থেকে আবার ‘‘কলিকাতা’’ করে দিতে হবে।’ সোহম বলে।
সকাল হয়েছে অনেকক্ষণ। বৃষ্টি তার গাড়ি চালিয়ে নিয়ে চলেছে। শক্তিগড় পেরিয়ে গাড়ি হাইওয়ে ধরে চলেছে মুর্শিদাবাদের দিকে। ল্যাংচার দোকানগুলোর দিকে তাকানোরও তােদর এখন ফুরসত নেই। বৃষ্টি বলে, ‘আলিনগরের প্রতিষ্ঠাতা তাহলে তো দাঁড়াল সিরাজদ্দৌল্লা। আলিনগরের প্রতিষ্ঠাতা ঘুমায় যেখানে— তার মানে তো সিরাজের কবর।’
‘হ্যাঁ। মুর্শিদাবাদের খোশবাগ।’
বাগবাজার লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আমিরচাঁদ তাঁর গাড়ি ছুটিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে। তাঁর হাতের নকশায় খুব পরিষ্কার করে বলা আছে যে তরোয়ালটা সোমনাথ কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন। সেটা আমিরচাঁদের হাতে ওঠা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আমিরচাঁদ লক্ষ করেননি যে তাঁর গাড়ি থেকে খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে আরও একটা গাড়ি চলেছে হাইওয়ে ধরে।
‘পলাশিতে যুদ্ধে হেরে গিয়ে রাজধানীতে ফিরে এলেন সিরাজ। দ্বিতীয়বার সৈন্যসংগ্রহের জন্য তিনি তাঁর রাজকোষ খুলে দিলেন। প্রত্যেক সৈনিককে আগাম তিন মাসের বেতন দেবেন বলে ঘোষণা করলেন। কাতারে কাতারে লোকজন ছুটে এল সৈন্যের পরিচয় দিয়ে। কিন্তু টাকাপয়সা পাওয়ার পর আর কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল না যুদ্ধে নামার জন্য। ১৭৫৭, ২৪ জুনের রাত। পথের ভিখিরির মতো হিরাঝিলের রাজপ্রাসাদ ছেড়ে গভীর রাতে চুপি চুপি ফকিরের ছদ্মবেশে পালাতে বাধ্য হলেন সিরাজ। তার আগে প্রাসাদের মহিলাদের সবাইকে পাঠিয়ে দিয়েছেন ঢাকার উদ্দেশে। পঞ্চাশটা হাতির পিঠে যাবতীয় ধনসম্পত্তি বোঝাই করে। সিরাজের সঙ্গী হলেন শুধুমাত্র তাঁর চিরসাথি বেগম লুৎফউন্নেসা, শিশুকন্যা ওম্মৎজহুরা আর এক বিশ্বস্ত খোজা প্রহরী। যাবেন রাজমহল। কিন্তু সোজা রাস্তায় গেলেন না। তিনি নৌকো করে মহানন্দার ওপর দিয়ে চললেন।’ সোমনাথ আর আশুতোষ হালসিবাগানের বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে গল্প করতে করতে বেরোতেন। কলকাতা আক্রমণের সময় সিরাজ এখানেই তাঁবু গেড়েছিলেন।
‘তাহলে সিরাজ ধরা পড়লেন কীভাবে?’ আশুতোষ জিজ্ঞেস করেন।
‘মিরজাফর মারফত সব খবর পেলেন ক্লাইভ। শুরু হল সিরাজকে ধরার পরিকল্পনা। রাস্তায় সেই পঞ্চাশটা হাতি ধরা পড়ল। মোহনলাল, সিরাজের ভাই মিরজা মেহেদি আলি ধরা পড়ে কারাগারে বন্দি হলেন। রায়দুর্লভ বিষের পাত্র তুলে দিলেন মোহনলালের হাতে, যা খেয়ে মৃত্যু হল মোহনলালের।
২৯ জুন। দু-শো গোরা সৈন্য আর পাঁচশো দেশি সৈন্য নিয়ে ক্লাইভ এলেন মনসুরগঞ্জে। কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে তিনি মিরজাফরকে অভিবাদন জানালেন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব বলে। এদিকে সিরাজের নৌকো তখন চলছে মহানন্দা আর কালিন্দীর ওপর দিয়ে। কিন্তু রাজমহলের এপারে বড়াল নামে গ্রামের কাছে এসে নৌকো থেমে গেল। সামনেই নজিরপুরের মোহনা, যা পার হলেই বড়োগঙ্গা। আরেকটু এগোলেই রাজমহল। কিন্তু সামনে চড়া পড়েছে, নৌকো আর এগোবে না। খিদেয় ক্লান্ত সিরাজ তখন ডাঙায় নামলেন খাবারের সন্ধানে। সেখানে দানেশ শেখ নামে এক ফকির সিরাজকে চিনতে পেরে তাঁর খবর দেন মিরকাশেমের সৈন্যকে। রাজমহল থেকে নদীর এপারে এলেন মিরকাশেম। সিরাজ বন্দি হলেন। সিরাজ এবং লুৎফার সমস্ত গয়নাগাটি লুট করে নিল মিরজাফরের দলবল। মিরজাফর তখন মতিঝিলে ক্লাইভের সঙ্গে ভবিষ্যতের পরামর্শ করছেন। সিরাজের খবর আসে তাঁদের কাছে। মিরজাফর তাঁর পুত্র মিরণকে সৈন্যসমেত পাঠিয়ে দিলেন সিরাজকে ধরে আনতে।
৩০ জুন। সিরাজকে প্রায় নগ্ন অবস্থায় হাত-পা শিকলে বেঁধে রাজধানীতে নিয়ে আসা হল। জনতা রাস্তায় ভিড় করে তাদের নবাবের এই দুর্দশার সাক্ষী হল।
৩ জুলাই, রবিবার। মাঝরাতে মিরজাফরের সামনে সুবে বাংলার ভূতপূর্ব নবাবকে হাত পা বেঁধে ভিখিরির মতো হাজির করা হল। মিরজাফর সেই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে নবাবকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে আদেশ দেন। মিরজাফর সিরাজকে আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটাও রাজকীয় সম্মানের সঙ্গে। কিন্তু মিরণের দলবল চাইছেন সিরাজকে হত্যা করতে। কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে না পারার জন্য মিরজাফর সিরাজকে মিরণের রক্ষণাবেক্ষণে বন্দি রাখতে নির্দেশ দেন। এর সঙ্গে সঙ্গে এই নির্দেশও জারি করেন যাতে কেউ নবাবের গায়ে হাত না দেয়।
কিন্তু মিরণ একজন হত্যাকারী খুঁজে চলেছেন। সতেরো বছর বয়সি মিরণ ছিলেন মেয়েলি স্বভাবের, কিন্তু পাশবিকতায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। যৌবনের সিরাজ যতই স্বেচ্ছাচারী, উচ্ছৃঙ্খল হোক না কেন, তাঁর বিরুদ্ধে লোকজনের যতই ক্ষোভ থাকুক না কেন, দেশের রাজা, আলিবর্দির স্নেহের সুপুরুষ নাতি, দেশের নবাবের এই পরিণতি দেখে কোনো হত্যাকারী সিরাজকে মারতে রাজি হচ্ছিল না।
৪ জুলাই ১৭৫৭। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল একজনকে। নবাব পরিবারেই তিনি বড়ো হয়েছিলেন। নাম মহম্মদি বেগ। আলিবর্দির বেগম এক অনাথ মুসলমান মেয়েকে মানুষ করেছিলেন। সেই মেয়ের সঙ্গেই মহম্মদি বেগের বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মহম্মদি বেগই অবশেষে অন্ধকার কারাগারে সিরাজের বুকে ছুরি মেরে হত্যা করলেন। মৃত্যুর আগে নাকি হোসেনকুলি খাঁ-র হত্যার অপরাধ স্বীকার করে সিরাজ আল্লার নাম করতে যান, ঠিক তখনই একের পর এক ছুরির আঘাতে তাঁর শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেন মহম্মদি বেগ। কারাগার ভেসে যায় বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের রক্তে।
সিরাজের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ল শহর জুড়ে। তাঁর খণ্ডবিখণ্ডিত মৃতদেহ একটা হাতির পিঠে চাপিয়ে শহরময় ঘোরানো হচ্ছে। শোনা যায় হঠাৎই হাতিটা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ে। সেই জায়গাতেই নাকি আঠেরো মাস আগে সিরাজ হুসেনকুলি খাঁ-র হত্যা করেছিলেন। ঠিক সেই জায়গাতেই সিরাজের শরীর থেকে কয়েক ফোঁটা রক্ত ঝরে পড়ে।’
‘এটা গুলগল্প বলে মনে হয় না তোর?’ আশুতোষ কথাটা বিশ্বাস করতে চান না।
‘এর কোনো ঐতিহাসিক সত্যতা নেই, এটা একটা কিংবদন্তি বলতে পারিস। রাজারাজড়াদের নিয়ে এমন অনেক কিংবদন্তি শোনা যায়। যাই হোক, সিরাজের মৃতদেহ নিয়ে আসা হয় তাঁর মা আমিনা বেগমের রাজভবনের বাইরে। হতভাগ্য মা সন্তানের ছিন্নভিন্ন শরীরের ওপর আছড়ে পড়েন কান্নায়।
শোনা যায় মিরণের সাঙ্গোপাঙ্গরা কেউ সিরাজের দেহ কবর দিতে চায়নি। বাজারের চকের মধ্যে মৃতদেহ নিয়ে এসে টুকরো টুকরো করে হাতির পিঠ থেকে তারা চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলেছিল। সেই মৃতদেহের টুকরোগুলো জড়ো করে তার ওপর একটা চাদর চাপা দিতে কেউ সাহস করে এগিয়ে আসতে পারছিল না। অবশেষে মির্জা জৈন-উল-আবেদিন নামে এক ওমরাহ্ কফিন এনে মৃতদেহটাকে তুলে নিয়ে গিয়ে খোশবাগে দাদু আলিবর্দি খাঁ-র পাশে কবর দিয়েছিলেন। বুঝলি আশু, মিরজাফর বা মিরণরা অমর। তাঁরা যুগে যুগে নতুন নতুন রূপ ধারণ করে আসেন। তাঁদেরকে চেনা খুব মুশকিল।’
মুর্শিদাবাদের ভাগীরথীর পশ্চিমে লালবাগের ঘাট থেকে আড়াই কিলোমিটার পেরিয়ে সোহম আর বৃষ্টি ঢুকল খোশবাগে। জায়গাটায় এক অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করছে। মৃত্যুর শান্তি। মুর্শিদাবাদের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সব শহিদদের কবর পড়ে আছে পরের পর।
‘জানিস তো বৃষ্টি, আলিবর্দি খাঁ এই খোশবাগ তৈরি করেন। তাঁর মাকে এখানে সমাধি দেওয়া হয়েছিল। গোলাপের সুগন্ধে এই বাগান মাতোয়ারা হয়ে থাকত, তাই নাম খোশবাগ। মোগলদের বাগানের আদলে এর বাগান গড়ে তোলা হয়েছিল।’
ঢুকতেই প্রথমে একটা চারদিক ঘেরা আকাশ খোলা কবরখানা চোখে পড়ল তাদের। তার মধ্যে একটা নির্দিষ্ট কবর বৃষ্টিকে দেখায় সোহম।
‘এটা নবাব আলিবর্দি খাঁ-র বেগমের কবর। তারপর সিরাজের খালা ঘসেটি বেগমের আর মা আমিনা বেগমের কবর। দুই বোন পাশাপাশি শুয়ে আছেন। মিরণের নির্দেশে তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল একসঙ্গে জলে ডুবিয়ে।’
এই ঘর ছেড়ে খোশবাগের আরও ভেতরে ঢুকতে গেলে উত্তর দিকে একটা বড়ো জায়গা ঘিরে মোট সতেরোখানা কবর আছে। সোহম সেটা দেখিয়ে বলে, ‘এঁরা সবাই সিরাজের বিভিন্ন উত্তরাধিকারী। মিরজাফরের নির্দেশে এঁদের সবাইকে বিষ খাইয়ে এক রাতে হত্যা করা হয়।’
দক্ষিণ দিকে ঘাসের মাঝে মাঝে আরও কয়েকটা কবর। তার মধ্যে একটা কবর দেখিয়ে সোহম বলে, ‘এই কবরটা দানেশ ফকিরের। লোকে বলে এই দানেশ ফকিরই ছদ্মবেশী সিরাজকে চিনতে পেরে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। এই কবরের ডান দিকেরটা তাঁর স্ত্রী আর পরের একসঙ্গে দুটো কবর যেটা দেখছিস সেটা দানেশ ফকিরের দুই ছেলের।’
তারা আরও ভেতরের দিকে এগিয়ে যায়। একটা ফটক পেরিয়ে আরও একটা বাগান। বাগানের মাঝে একটা ইমারত। সোহম বৃষ্টিকে নিয়ে সেই ইমারতের ভেতরে ঢোকে।
ইমারতের ভেতর যে ক-টা কবর পড়ে আছে তার মধ্যে একেবারেই আলাদা করে চোখে পড়ে না সিরাজের কবরটা। কবরের মাথায় শুধুমাত্র একটা ছোটো প্রস্তর ফলক। সোহম আর বৃষ্টি বাইরের গাছ থেকে ফুল এনে সেই কবরটায় ছড়িয়ে দেয়। কবর ছুঁয়ে তার পাশে কিছুক্ষণের জন্য বসে সোহম।
‘কে বলবে যে এটা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের কবর!’ বৃষ্টি বলে সোহমকে।
‘প্রথম জীবনে সিরাজ লম্পট এবং উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন। তাঁর ঔদ্ধত্য রাজ্যবাসীদের তাঁর বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলেছিল। কিন্তু আলিবর্দি খাঁ-র পরে তাঁর মতো এমন বীর বাংলায় আর কেউ ছিল না রে, বৃষ্টি। এক বছরও রাজত্বকাল ছিল না সিরাজের, তারই মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির টেরর হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর এমন ভয়াবহ মৃত্যু! জাস্ট ভাবা যায় না রে।’
সিরাজের পাশেই বেশ বড়োসড়ো একটা কবর দেখা গেল।
‘এটা নবাব আলিবর্দি খাঁ-র কবর। ওদিকে সিরাজের মেয়ের কবর। সিরাজের ডান দিকে তাঁর পনেরো বছর বয়সি ভাই মির্জা মেহেদির কবর। এই বাচ্চা ছেলেটাকে দুই পাশে দুই তক্তা দড়ি দিয়ে বেঁধে পিষে মেরে ফেলেন মিরণ। আর সিরাজের পায়ের কাছের কবরটা সিরাজের বেগম লুৎফউন্নেসার। লুৎফউন্নেসা কথাটার মানে ভালোবাসার বেগম। লুৎফ মানে ভালোবাসা, নেসা মানে বেগম। সিরাজের মৃত্যুর পর খোশবাগের দেখাশোনা করতেন এই লুৎফউন্নেসা। সিরাজের কবর নিয়মিত ফুল দিয়ে সাজাতেন আর সেখানে প্রদীপ জ্বেলে দিতেন। সিরাজের মৃত্যুর পর মিরণ লুৎফার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, তাতে উনি উত্তর দিয়েছিলেন...’
‘যে সারাজীবন হাতির পিঠে চেপে এসেছে সে কখনো গাধার পিঠে চাপতে পারে?’ বৃষ্টি বলে।
সোহম অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে, ‘তুই কী করে জানলি?’
‘বাবার বাংলার আয়না-য় পড়েছিলাম। ওঠ, কতগুলো কবর আছে গুনতে হবে।’
আলিনগরের প্রতিষ্ঠাতা ঘুমায় যেখানে
কবর যত আছে সেথা একত্রে নাও গুনে
তারা গুনে দেখল সব মিলিয়ে মোট চৌত্রিশটা কবর আছে খোশবাগে।
সেখান থেকে এবার চলো নদী ডিঙিয়ে
পৌঁছে যাবে নগরেরই সুদূর ঈশান কোণে
গঙ্গার ওপারে নগরের উত্তরপূর্ব কোণে আছে কাটরা মসজিদ। সোহম আর বৃষ্টি লালবাগের ঘাট থেকে নৌকো করে চলেছে সেদিকে।
১৭০১ খ্রিস্টাব্দ। বাংলার নবাব তখন আজিম ওসমান। তাঁর দেওয়ান মহম্মদ হাদি। দিল্লির মসনদে ঔরংজেব। দেওয়ানের সঙ্গে নবাবের সম্পর্ক ভালো নয়। বাংলার রাজধানী তখন ছিল ঢাকা। ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে হাদি তাঁর দেওয়ানখানা তুলে নিয়ে এলেন বাংলার এক জায়গায় যার নাম মুখ্সুদাবাদ। বাংলাদেশের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় এই মুখ্সুদাবাদ। ঔরংজেব হাদিকে বিশেষ স্নেহ করতেন। তিনি আজিম ওসমানকে বাংলার নবাবের পদ থেকে বরখাস্ত করে পাঠিয়ে দিলেন পাটনায়।
মুখ্সুদাবাদে বছরখানেক কাটিয়ে হাদি একটা বিরাট অঙ্কের রাজস্ব পেশ করলেন ঔরংজেবের কাছে। সম্রাট খুশি হয়ে তাঁকে উপাধি দিলেন ‘মোতোমন্ উল্ মুল্ক আলাউদ্দৌলা জাফর খাঁ নসিরি নাসিরজঙ্গ মুর্শিদকুলি খাঁ’। সেই থেকেই মহম্মদ হাদি হলেন বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ।
মুর্শিদকুলি ব্রাহ্মণ ঘরের সন্তান ছিলেন। তাঁর বাবা দারিদ্র্যের জ্বালায় ছেলেকে বেচে দেন হাজি সফি নামে একজন পারসিক ব্যবসাদারের কাছে। সফি তাঁকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে নাম রাখেন মহম্মদ হাদি। হাদিকে পড়াশোনা শেখান তিনি। হাজি মারা গেলে তাঁর বংশধররা হাদিকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন। হাদি দাক্ষিণাত্যে হিসেব রাখার চাকরিতে বহাল হন। তাঁর দক্ষতা সম্রাট ঔরংজেবের নজরে পড়ে।
মুর্শিদকুলির মুখ্সুদাবাদ পছন্দ করার কয়েকটা বিশেষ কারণ ছিল। মুখ্সুদাবাদের পাশ দিয়ে ধীর গতিতে বয় ভাগীরথী, পদ্মার মতো তা উদ্দাম নয়। তা ছাড়া জায়গাটা বাংলার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত, তাই বাংলায় বাণিজ্য বিস্তারের জন্য সেটা সবথেকে উপযুক্ত জায়গা। তা ছাড়া গঙ্গা, পদ্মা, জলঙ্গি— এই তিনটে নদীর যোগাযোগ আছে এই চত্বরে। তাই ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি মুখ্সুদাবাদে এসে দেওয়ানখানা স্থাপন করলেন। সঙ্গে আসেন জগৎ শেঠের আদি পুরুষ মানিকচাঁদ। মুর্শিদকুলি খাঁ নিজের নামে মুখ্সুদাবাদের নামকরণ করলেন মুর্শিদাবাদ।
সোহম আর বৃষ্টি ভাগীরথী পেরিয়ে নদীর পূর্বদিকে পৌঁছোল। একটা টাঙ্গা ধরে তারা এখন চলেছে কাটরা মসজিদের দিকে।
‘মুর্শিদাবাদের ঈশান কোণে মানে উত্তর পূর্ব কোণে আছে কাটরা মসজিদ। সেখানে আছে মুর্শিদকুলি খাঁ-র কবর।’ সোহম বলে।
সোহম আর বৃষ্টি কাটরা মসজিদের সামনে পৌঁছোল।
‘কাটরা শব্দের অর্থ বাজার। এখানে নবাবি আমলে বাজার বসত। সেই থেকে এই মসজিদের নাম হয় কাটরা মসজিদ।’ সোহম বলে।
নবাবি স্থাপত্য যেন আজও জীবন্ত হয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সোহম আর বৃষ্টি মসজিদের ভেতরে ঢুকল। মসজিদের দু-দিকে দুটো সত্তর ফিট উচ্চতার মিনার এখনও ভগ্নদশায় মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাতে আছে সাতষট্টিখানা সিঁড়ি।

‘এইরকম চারখানা মিনার, পাঁচখানা গম্বুজ আর ছাতার মতো ডুম সিস্টেমে কাটরা মসজিদ বানিয়েছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ তাঁর শেষ জীবনে। মোরাদ ফরাস নামে একজনকে নিযুক্ত করা হয় এই মসজিদ বানানোর কাজে। সময় দেওয়া হয় এক বছর। শোনা যায় মোরাদ নাকি কাছাকাছি সব হিন্দু মন্দির ভেঙে তার ইট পাথর জোগাড় করে এই মসজিদ বানান। মোরাদের অত্যাচারের কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। এই অপরাধের জন্য মুর্শিদকুলির জামাই বাংলার পরবর্তী নবাব সুজাউদ্দিন মোরাদ ফরাসের প্রাণদণ্ডর আদেশ দিয়েছিলেন। ১৮৯৭-এর বজ্রাঘাতে এই মসজিদের বেশ খানিকটা ক্ষতি হয়েছিল। এই মসজিদে কোনো পিলারের সাপোর্ট নেই।’
‘কিন্তু ‘‘ধুলো মেখে নগরজনক ঘুমায় সিঁড়ির তলে’’ মানে কী?’
‘আয়, দেখাচ্ছি।’
বৃষ্টি আর সোহম মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে মসজিদে ঢোকে। সেখানে একটা চোদ্দো ধাপের সিঁড়ি দেখা যায়। সেই সিঁড়ির নীচে একটা অন্ধকার ঘর। তার মধ্যে একটা সমাধি। সোহম বলে, ‘এই হচ্ছে মুর্শিদকুলি খাঁ-র কবর। ১৭২৫ খ্রিস্টাব্দে উনি মারা যান। তাঁর শেষ ইচ্ছে ছিল যে এই মসজিদে যত তীর্থযাত্রী আসবে এই সিঁড়ি বেয়ে, তাদের সবার পায়ের ধুলো যেন তাঁর কবরের ওপরে পড়ে। মুর্শিদকুলির জীবনের একটা বড়ো কলঙ্ক বিধর্মীদের ওপর অত্যাচার। যেসকল হিন্দু জমিদার বা প্রজারা যথাসময়ে খাজনা দিতে পারত না, তাদের ওপর তিনি অকথ্য অত্যাচার করতেন। সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যই মৃত্যুর আগে তিনি এই আদেশ দিয়ে যান।’
সিঁড়ি বেয়ে সোহম আর বৃষ্টি ওপরে উঠে সামনে একটা বিশাল বড়ো চাতাল দেখতে পায়। বৃষ্টি বলে,
ধুলো মেখে নগরজনক ঘুমায় সিঁড়ির তলে
অদ্বিতীয় দ্বারের নকশা পাবে সে চাতালে
সেই চাতালের তিনদিকে অজস্র ছোটো ছোটো ঘর দেখা যায়। চাতালের ওপর এক একটা স্ল্যাবে নানান রকমের নকশা আঁকা। সোহম সেটা দেখিয়ে বলে,
‘এই চাতালে নিশ্চয়ই এমন কোনো দরজার নকশা আছে যেটা একটাই আছে। তেমন আর কোনো নকশা এখানে নেই। খুঁজতে থাক বৃষ্টি।’
ইতিমধ্যে আমিরচাঁদ আসল জায়গায় পৌঁছে গেছেন। তাঁর সঙ্গে দু-জন লোক। সেখানে জোরকদমে চলছে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি, তাই নিশ্চিন্তে কাজ চলেছে আমিরচাঁদের। দু-জন লোকাল লোককে হাত করে নিয়েছেন তিনি, তারা চারপাশে নজর রাখছে। আমিরচাঁদের চোখ দুটো লালসায় জ্বলজ্বল করছে। তাঁর আর অপেক্ষা সহ্য হচ্ছে না। পঁচিশ বছর ধরে তিনি এই গুপ্তধনের পিছনে পড়ে আছেন। বিকেল গড়িয়েছে, টুরিস্টও বিশেষ নেই। ফাঁকায় ফাঁকায় কাজটা সেরে ফেলতে হবে।
ইতিমধ্যে বৃষ্টি চাতালে সেই দরজার নকশা খুঁজে পেয়েছে। নকশাটার একটা ছবি তুলে নেয় সে।
‘এর পরে ছিল—
উত্তরে ঘর গুনে পাওয়া সংখ্যা যত ছেড়ে
নকশা আঁকা গুপ্ত পথে পৌঁছোবে ওপারে
খোশবাগে মোট কবরের সংখ্যা চৌত্রিশ। তার মানে উত্তর দিকে চৌত্রিশটা ঘর পেরোতে হবে।’ সোহম বলে।
দু-জনে এগিয়ে চলেছে একের পর এক ছোটো ছোটো ঘর পেরিয়ে। সোহম বলে, ‘এই ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছিল বিভিন্ন ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের থাকবার জন্য। তারা এখানে কোরান পড়ত। সব ঘর মিলিয়ে প্রায় সাতশো লোকের থাকার জায়গা ছিল এখানে।’
পরের পর মোট চৌত্রিশটা ঘর পেরিয়ে তারা একটা সুড়ঙ্গ দেখতে পেল। সেই সুড়ঙ্গের মুখে একটা দরজার নকশা আঁকা। বৃষ্টি তার মোবাইলে তোলা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে যে নকশা দুটো মিলে যাচ্ছে। তাদের দু-জনের চোখ জ্বলে উঠল উত্তেজনায়। সোহম বলে,
উত্তরে ঘর গুনে পাওয়া সংখ্যা যত ছেড়ে
নকশা আঁকা গুপ্ত পথে পৌঁছোবে ওপারে
দু-জনে সেই সুড়ঙ্গের পথ ধরে এগিয়ে চলে। তারা বেশ বুঝতে পারছে যে এই পথ তাদের মসজিদ থেকে একটু বাইরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই পথ নবাবি আমলের তৈরি বলে মনে হয় না, কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে হয়তো এই সুড়ঙ্গ কাটা হয়েছিল পরে। সেই সুড়ঙ্গ মাটির নীচে গিয়ে কিছুটা পথ সোজা যায়। তারপর সেই পথ আবার মাটির ওপরে নিয়ে যায়। সোহম আর বৃষ্টি সেই সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আকাশের নীচে দাঁড়াল। তাদের পাশেই কাটরা মসজিদ, সামনে আমিরচাঁদ মিত্তল। সোহম আর বৃষ্টির দিকে তাক করা আমিরচাঁদের দুই শাগরেদের পিস্তল। মাটি খুঁড়ে একটা বাক্স আবিষ্কার করেছে আমিরচাঁদের শাগরেদরা। সেই বাক্স মাটির সঙ্গে গাঁথা। সোহম আর বৃষ্টিকে দেখে আমিরচাঁদ খুবই অবাক।
‘আরে? ইয়েলোগ কাঁহা সে আ টপকা? চলো, আচ্ছাই হুয়া। Thank you very much for your help।’ আমিরচাঁদের হাসি যেন আর ধরে না।
‘আমিরচাঁদজি, জিনিসটা আমার বাবা অনেক পরিশ্রম করে আগলে রেখেছেন। সেটা আপনি এত সহজে নিয়ে নিতে পারেন না।’
‘বাপকা পরিচয় মিল গয়া? তব তো বাপকে পাসহি তুমকো ভেজনা হোগা! লগে হাত আশুতোষের মেয়েটাও খতম হয়ে যাবে? তা, রামজির যা মহিমা!’
আমিরচাঁদ মুচকি হাসে। সোহম এগোতে গেলে তাকে দু-জন শাগরেদ খুব মারধর করে। তার নাক ফেটে রক্ত বেরোতে থাকে। সোহম চিৎকার করতে থাকে আমিরচাঁদের উদ্দেশে।
‘লাইব্রেরি থেকে আপনি নকশাটা পেয়েছেন, কিন্তু আপনি জানেন না যে এর জন্যেও বাবা সাবধান করে গেছেন।
সেইখানেতেই মাটির নীচে আলিনগরের ধন
সাবধান তাতে হাত বাড়ালেই সর্বনাশ ভীষণ’
‘আবার নয়া পোয়েট্রি কাঁহা সে আয়া রে ভাই!’ আমিরচাঁদ প্রচণ্ড বিরক্ত, ‘দেখো ভাই, ওসব কবিতা লিয়ে তোমরা বাংগালি বাবুরা পড়ে থাকো। মেরা আসলি চিজসে মতলব।’
আমিরচাঁদ গর্তে নেমে সেই বাক্স খোলেন।
‘বাবার কোনো ধাঁধা মিথ্যে হয়নি, এটাও হবে না। আমি এখনও বলছি আমিরচাঁদজি, জিনিসটায় হাত দেবেন না।’
‘বহুত ট্যালেন্টেড বাপ থা তুমহারা। বহুত পরেশান কিয়া মুঝে!’
আমিরচাঁদ বাক্স খুললে দেখা যায় তার ভেতরে পড়ে আছে সিরাজদ্দৌল্লার সেই তরোয়াল। কত ইতিহাসের সাক্ষী, পলাশির আগে ফরাসিদের উপহার সেই তরোয়াল। সোনার হাতলে ফরাসি নকশা স্পষ্ট। বহু বছরের অনাদরে দামি পাথরগুলো তাদের জৌলুস প্রদর্শন বন্ধ করে দিয়েছে।
আমিরচাঁদ সেই তরোয়াল তুলে ধরতে যান। উল্লাসে তাঁর চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসার জোগাড়। সোহাম বার বার বারণ করতে থাকে, ‘আমিরচাঁদজি হাত দেবেন না।’
কিন্তু আমিরচাঁদ হাত দিলেন। এবং সঙ্গেসঙ্গে ফল পেলেন। তরোয়াল ছুঁতেই আমিরচাঁদের শরীর জুড়ে খেলে গেল ইলেকট্রিক শক। কাঁপতে কাঁপতে আমিরচাঁদের লোভী শরীরটা নিথর হয়ে পড়ল। আমিরচাঁদের দুই শাগরেদ, যারা মাটি কাটছিল, তারা ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। বাকি দু-জন পিস্তল নিয়ে আমিরচাঁদের দিকে এগোতে যায়, এমন সময় পুলিশ এসে পৌঁছোয় সেই চত্বরে। তাদের নেতৃত্বে পিস্তল হাতে একজন যুবতী। তাকে এতদিন ক্যামেরা হাতেই দেখতে অভ্যস্ত সোহম আর বৃষ্টি। সে আইডি কার্ড বার করে নিজের পরিচয় দেয়— বর্ণালী সেন। সি আই ডি। ১৯৯২-এর একটা মার্ডার কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার।

পঁচিশ বছর আগের ঘটনা। পিসতুতো ভাই মুর্শিদাবাদ ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের চিফ ইঞ্জিনিয়ার নরেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সোমনাথ কেবল ফল্টের ঠিক জায়গাটা বুঝে নেন। কাটরা মসজিদের পাশ দিয়েই গেছে সেই হাই টেনশন কেবল লাইন যেখানে হয়েছে কেবল ফল্ট। সারাতে কমপক্ষে তিনদিন সময় লাগবে। তারপর আমিরচাঁদের চোখে ধুলো দিয়ে ভোরের ট্রেন ধরে সোমনাথ গোপনে কলকাতায় আসেন। নয়ান বারুই, গোবিন্দ্রাম সাহু আর লাইব্রেরিয়ান হরিনাথের সঙ্গে দেখা করেন। বাগবাজারের লাইব্রেরিতে বসে সবকটা ধাঁধা তৈরি করেন। তারপর সেদিন রাতের ট্রেনেই মুর্শিদাবাদ ফিরে দেখা করতে চলে যান নরেনের সঙ্গে। সোমনাথ আর নরেন চুপি চুপি সেই তরোয়াল নিয়ে কাটরা মসজিদে এলেন। সেই হাই টেনশন লাইনের সঙ্গে ঠেকিয়ে ধাতুর তৈরি তরোয়াল একটা বাক্স বন্দি করে রেখে দিয়েছিলেন সোমনাথ আর নরেন।
সোমনাথ তাঁর সাবধানবাণী শুধু ওই রাফ খাতাতেই লিখে যাননি। মার্ক করে দিয়েছিলেন লকারের মধ্যে রাখা সেই নকশাতেও। নকশায় যে জায়গায় তরোয়ালটা আছে বলে মার্ক করা, তার পাশেই একটা সাবধানসূচক চিহ্ন। কুমতলবি লোকজনের জন্যই এই ব্যবস্থা। আমিরচাঁদ সেই সাবধানসূচক চিহ্ন দেখেও দেখেননি। ইনভেস্টিগেশনের জন্য বর্ণালী এই অঞ্চলে নরেনের সঙ্গে দেখা করেছিল। নরেনের বয়স এখন সত্তরের কাছাকাছি। তরোয়াল লুকিয়ে রাখার ঘটনাটা তাঁর থেকেই জানতে পারে বর্ণালী।
সোহম, বৃষ্টি আর বর্ণালী কলকাতায় ফিরেছে। বর্ণালীর কাছে খবর ছিল যে আমিরচাঁদ আশুতোষকে দিয়ে সোহমকে ট্র্যাপ করে এই ঐতিহাসিক তরোয়ালের খোঁজ চালাবে। বর্ণালী তাই জাহ্নবীর ছদ্মবেশে এতদিন সিংহবাড়িতে থেকে সোহমের গতিবিধির ওপর নজর রাখছিল। সে হাতেনাতে ধরতে চাইছিল আমিরচাঁদ মিত্তলকে— যে লক্ষ্যে পঁচিশ বছর আগে প্রাণ হারাতে হয়েছিল তার বাবা সিআইডি অফিসার প্রণব সেনকে। মুর্শিদাবাদের জঙ্গলের ডোবার মধ্যে, আমিরচাঁদের গুলি খেয়ে।
আশুতোষের বন্ধু পুলিশ কমিশনার রজত গাঙ্গুলি সমস্ত ব্যাপারটা শুনে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমিরচাঁদ আজ সব শাস্তির ওপারে, বাকি পড়ে রয়েছেন আশুতোষ সিংহ। আশুতোষ তাঁর সব দোষ স্বীকার করেছেন তাঁর বন্ধু রজতের সামনে।
আশুতোষকে সিংহবাড়ি থেকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাচ্ছে বর্ণালী। বাড়ির বাইরে পুলিশের গাড়ি অপেক্ষা করছে। আশেপাশে কৌতূহলী মানুষের ভিড়, মিডিয়ার উঁকিঝুঁকি। বাড়ির ঠাকুরদালানের সিঁড়ির এক কোণে বসে সোহম। পাশে তার লাগেজ। সেও এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। বৃষ্টি দালানের একপাশে মাথা নীচু করে বসে আছে।
আশুতোষ যেতে যেতে একবার সোহমের সামনে দাঁড়ান। সোহম উঠে দাঁড়ায়। আশুতোষ বলেন, ‘একটা গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি সেরে যাই। সোমনাথের একটা খুব দামি কাজের ম্যানুস্ক্রিপ্ট আমার কাছে ছিল। ওর মৃত্যুর পর সেই সুযোগ আমি নিই। সোমনাথের বহু বছরের অমানুষিক পরিশ্রমের ফল সেই লেখা। বাংলার আয়না-র পরবর্তী এডিশনে লেখকের নামের ভ্রম সংশোধন হয়ে যাবে।’
আশুতোষ তাঁর হাতের বইটা সোহমকে দেন। বইটা বাংলার আয়না-র একটা কপি। তাতে লেখকের নাম ‘আশুতোষ সিংহ’ কেটে ‘সোমনাথ দাস’ লেখা আছে। সোহম এতে অবাক হয় না। নতুন করে অবাক হল বৃষ্টি।
‘স্বীকার করলে নাকি শাস্তি খানিকটা কমে। আমারটা কমল কি?’ বিচারপ্রার্থীর মতো অসহায় নজরে তাকিয়ে থাকেন আশুতোষ। সোহম নিরুত্তর। রক্তেমাংসে গড়া মানুষ কি এতটাই ক্ষমাশীল? বৃষ্টির মুখ তুলে তাকাবার ক্ষমতা চলে গেছে। আশুতোষ বৃষ্টির হাত সোহমের হাতে তুলে দিয়ে বলেন, ‘এ বাড়িতে থাকো— এমন কথা বলার অধিকার আমার নেই। কিন্তু যেখানেই যাও ওকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলে আমি নিশ্চিন্ত হই।’
আশুতোষকে নিয়ে পুলিশের গাড়ি চলে গেল। সোহম তার ব্যাগ থেকে আজকের খবরের কাগজ বার করে। তাতে প্রথম পাতার নীচের দিকে একটা খবর বেরিয়েছে—
ইতিহাস গবেষকের উদ্যোগে সিরাজদ্দৌল্লার বহুমূল্য তরোয়াল উদ্ধার।
নীচে সোমনাথ দাসের ছবিসহ নাম।
ঠাকুরদালানে বসে আছেন সোমনাথ। হাতছানি দিয়ে ডাকলেন সোহমকে। সোহম বৃষ্টিকে নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধর মতো এগিয়ে যায় তার বাবার দিকে। সোমনাথ অনেকগুলো বই নিয়ে বসেছেন। তার মধ্যে বেশ কয়েকটা সোহমের চেনা। সোমনাথ সোহমকে বলেন, ‘জানিস তো সোহম, আমাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। ইতিহাস বলতে কী বুঝি আমরা? নিছক কয়েকটা রাজারাজড়ার গল্প? কে কবে রাজত্বে এল আর কবে গেল? সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার কম্পিটিশনে কে কাকে টক্কর দিয়ে এগিয়ে গেল? না, ইতিহাসের আসল গল্প লুকিয়ে থাকে এসব প্রত্যক্ষ ঘটনার অলক্ষে পরোক্ষ নকশাগুলোতে। একই প্যাটার্ন যা যুগের পর যুগ পুনরাবৃত্তির চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকে। একই ভুল, যা বার বার আমরা করতে থাকি। শিক্ষা নিই না ইতিহাস থেকে। সেই ক্ষমতার লোভ, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু— ইতিহাসের পাতার পর পাতা এই একই প্রবাদবাক্যের সাক্ষ্য বহন করে।’
‘তুমি ইতিহাস বলতে কী বোঝ, বাবা?’ সোহম মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘অতীতের আলোয় বর্তমানকে পরখ করে ভবিষ্যতের পথ খোঁজা। এই বোধেই ইতিহাসের সার্থকতা। অনেকদিন কলকাতার রাস্তাটায় হাঁটিনি। যাবি আমার সঙ্গে?’
আজও কলকাতার রাস্তায় এমন কয়েকজন সোমনাথ হেঁটে বেড়ায়। আজও কয়েকজন সোহম এসব সোমনাথের আদর্শে দীক্ষিত হয়ে অতীতকে জেনে, ব্যাখ্যা করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চায়। আজও কয়েকজন আমিরচাঁদ এসব সোমনাথ এবং সোহমদের দুমড়ে-মুচড়ে স্রেফ মুনাফার কলের ছাঁচে ফেলতে চায়। আজও কয়েকজন আশুতোষ বিকিয়ে গিয়েও বিকিয়ে যায় না। আজও ইতিহাস এসবের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন