রেহান কৌশিক
জাদুকর ওত পেতে আছে৷ এক মুহূর্তের জন্যও তার চোখ সরায়নি গুহামুখ থেকে৷ রাতেও দু-চোখের পাতা এক করেনি৷ গুহামুখ থেকে মহুলগাছের দূরত্ব খুব বেশি হলে পঞ্চাশ-ষাট গজ৷ সুতরাং মরা-জ্যোৎস্নাতেও সেখান থেকে কেউ বেরোলে তার অন্তত চোখ এড়াত না৷
দু-দিন হল এভাবেই গাছের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে আছে জাদুকর৷ পরশুদিন দুপুর নাগাদ এক যুবক নিঃশব্দে গুহায় ঢুকেছে৷ বেরোনোর নামই নেই৷ দুনিয়ায় কত লোক কত জায়গায় যাচ্ছে, কত কিছু করছে, তা নিয়ে এত ভাবার কী আছে? নাহ্, জাদুকরও ভাবত না৷ আসলে ওই যুবকের চালচলন ঠিক সুবিধের ঠেকছিল না তার৷ যথেষ্ট সন্দেহজনক৷ নির্জন জঙ্গলের ভিতর গুহার কাছে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে টুক করে গুহার ভিতর ঢুকে পড়েছিল৷ সে জাদুকরকে দেখতে পায়নি৷ কিন্তু জাদুকর তাকে স্পষ্ট দেখেছিল৷
অপেক্ষা করতে-করতে বেশ কয়েকবার মনে হয়েছে—সে কি আত্মহত্যা করতে এসেছে এখানে? কিন্তু পরক্ষণেই মনের স্বাভাবিক যুক্তিবোধ এ-আশঙ্কাকে নসাৎ করে দিয়েছে৷ আত্মহত্যা করতে হলে গুহায় ঢুকবে কেন? নির্জন এই জনবিরল জঙ্গলের যে-কোনো জায়গাই তো তার জন্য উপযুক্ত৷ দু-আড়াই ক্রোশের মধ্যে কোনো গ্রামের অস্তিত্ব নেই৷ লোকজনের চলাচল নেই৷ নিরিবিলি এই পাহাড়িয়া জঙ্গলমহল ছেড়ে গুহার ভিতরে ঢোকার কী দরকার ছিল?
ছেলেটা কি চোর-ডাকাত? চোরাই জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখতে এসেছে? তাই-বা কী করে হয়? চোরাই জিনিস লুকিয়ে রাখতে কি দু-দিন সময় লাগে?
হয়তো দাগি আসামি৷ জেল-ভেঙে পালিয়েছে৷ গুহার ভিতর ঢুকে আত্মগোপন করে বসে আছে৷ সে যাইহোক, একসময় তো বেরোতে হবেই৷ অন্ধকার গুহার ভিতরে এমন একটা জল-জ্যান্ত মানুষ তো অনন্তকাল বসে থাকতে পারে না!
অনন্ত শব্দটা ভেবে নিজেই চমকে উঠল জাদুকর৷ অনন্ত, মানে শেষ নেই যার৷ কার শেষ নেই? সময়ের? সময়কে কি দেখা যায়? সময়কে কি স্পর্শ করা যায়? নাহ্।
যদি দেখা না যায়, ছোঁয়া না-যায়, তাহলে তার শুরুই-বা কী আর শেষই-বা কী? সময় নিয়ে কুনচেনের ব্যাখাকেও অস্বীকার করার কথা ভাবতে পারে না জাদুকর৷ কুনচেন বলেছিলেন, ‘সময় হল এক ভৌতরাশি৷ আমাদের মহাবিশ্বের যে মৌলিক কাঠামোর কথা আমরা ভাবি, সময় হল তার একটি বিশেষ মাত্রা৷ যে-বিশেষ মাত্রায় সমস্ত ভৌত ঘটনাগুলো একটি ক্রমধারা মেনে চলে৷ তুমি যদি স্যার আইজ্যাক নিউটনের কথাকে মূল্য দাও, তিনিও কিন্তু সময় সম্পর্কে এই ধারণাই পোষণ করতেন৷’
আর পাঁচজন যা-ভাবে, জাদুকর সে-সব ভাবনার সঙ্গে নিজের ভাবনা মেলাতে পারে না৷ মাঝে-মাঝে নিজেকে কেমন যেন খাপছাড়া, পাগলাটে মনে হয়৷ নিজেই নিজের আচরণকে অনেকবার কাটাছেঁড়া করে বুঝেছে—তার মধ্যে দস্তুরমতো একধরনের খ্যাপাটেপনা আছে৷ তা না হলে, এই অচেনা-অজানা ছেলেটাকে দু-দিন ধরে পাহারা দেওয়া—পাগলামি ছাড়া আর কী!
তবে এটা ঠিক, এই পাগলামি থেকে সে বেরোতে চায় না৷ বরং এই পাগলামি সে তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করে৷ আনন্দ পায়৷ আশ্চর্য সুখের কণা বুকের ভিতর জমা হতে থাকে৷ কত মানুষের কত কিসিমের চাওয়া থাকে! কেউ চায় মস্ত বড় বাড়ি৷ বাড়ির সামনে দামি গাড়ি৷ কেউ চায় তার সুন্দরপানা বউ হবে৷ সন্তান হবে৷ ছোট্ট সংসার হবে৷
জাদুকরের কাছে এসব কিছুই অর্থহীন৷ এ-সবের প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই৷ কোনো চার দেওয়ালের ঘর তাকে বন্দি করতে পারেনি৷ রাস্তাই তার ঘরবাড়ি৷ দেশ থেকে দেশান্তরে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ানোতেই আনন্দ৷ তার কাছে রাস্তার মতো জ্যান্ত আর কিছু নেই৷ প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে নতুন, বর্ণময়৷ রাস্তার কোনো স্থবিরতা নেই৷ জড়ত্ব নেই৷ জগতে পথের চেয়ে প্রাণবন্ত আর কিচ্ছুটি নেই৷
আর হ্যাঁ, একটি গোপন শখ আছে৷ রহস্যময় মানুষ খুঁজে বেড়ানো৷ রূপকথার গল্পে যেমন কোনো-কোনো মানুষ আজীবন হন্যে হয়ে পরশপাথর খুঁজে বেড়ায়, ঠিক তেমনই৷ জাদুকর সন্ধান করে আশ্চর্য মানুষের৷ রহস্যময় মানুষের৷ যে মানুষেরা অদেখা সমুদ্রের তলদেশের মতো৷ আকাশ-ছোঁয়া পাহাড়ের গায়ে লুকিয়ে থাকা বিপজ্জনক বরফ-খাদের মতো৷
তার এই যাত্রাপথে যাকেই একটু অন্যরকম বলে মনে হয়, জাদুকর তারই তত্ত্বতালাশ শুরু করে৷ কিন্তু যখন বুঝতে পারে লোকটা তার মনের মতো তেমন রহস্যময় নয়, তখন তার কাছ থেকে সরে আসে৷ তবে দু-একজন তেমন মানুষের সন্ধান যে পায়নি, এমন নয়৷ পেয়েছে৷ বন্ধুত্ব করেছে৷ কিন্তু সত্যিকারের যে মানুষকে সে চায়, যার সন্ধানে আশমান-জমিন এক করে ফেলছে, তারই দেখা নেই৷ তার টিকিটিরও হদিশ মিলছে না৷ অথচ বছরের পর বছর গড়িয়ে যাচ্ছে৷ একটা ঋতু থেকে আর-এক ঋতুর মাথায় পা ফেলে সময় দৌড়ে চলেছে৷
বসন্তের প্রথম৷ পাতাঝরা জঙ্গল৷ এখনো সব গাছের শাখায় নতুন পাতা আসেনি৷ অধিকাংশ গাছই নগ্ন৷ তারা যেন প্রার্থনার ভঙ্গিতে আকাশের দিকে শাখা ছড়িয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে৷ মাঝে-মাঝে সামান্য হাওয়ায় মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো-পাতায় সরসর শব্দ হচ্ছে৷ শুকনো পাতার মৃদু শব্দ বেশ রোমাঞ্চকর৷ যেন থ্রিলার-মুভির আবহসংগীত৷
ঠিক এইসময়েই ঘটনাটা ঘটল৷ জাদুকর দেখল—গুহার ভিতর থেকে ছেলেটি বেরিয়ে এসেছে। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে৷ ওকে দেখেই জাদুকর মহুলগাছের আড়ালে নিজেকে আরও নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিল৷
ছেলেটি জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হাঁটতে লাগল পাহাড়ি ঝরনার দিকে৷ জাদুকর তফাত রেখে অনুসরণ করতে লাগল তাকে৷
কিছুক্ষণ পরেই সে নীচু খাদের ঢালুপথ বেয়ে নেমে গেল ঝরনার কাছে৷ জাদুকর কাছেই একটি পাথরের আড়াল থেকে লক্ষ করছে তার গতিবিধি৷
সে ঝরনার কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল৷ তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে জামাকাপড় খুলে পাথরের ওপর ফেলে দিল৷ তারপর ধীরে ধীরে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা জলধারার নীচে এসে দাঁড়াল সে।
তার রুখো নগ্ন-শরীর ভিজে যাচ্ছে ঝরনার জলে৷ পেশিবহুল না-হলেও বেশ সুঠাম দেহ৷ হলদে রোদের নীচে ঝরনার সাদা জল একটি কালো শরীরকে যেন পরম মমতায় আদর করছে! শুনশান পাহাড়-জঙ্গলের ভিতর এই স্নানদৃশ্য মন ভালো করে দিল জাদুকরের৷ সে যেন নিজের শরীরেও স্নানের স্পর্শ পেল৷
ছেলেটি জলের নীচে দাঁড়িয়ে কখনো দু-দিকে তার হাতদুটো মেলে দিচ্ছে৷ কখনো পাখির ডানার মতো দু-হাত নাড়াচ্ছে৷
তার এই ভঙ্গি দেখে জাদুকরের মনে হল—যেন এক দেবদূত, পাখির মতো ডানা ঝাপটে উড়ে এসে জলের নীচে দাঁড়িয়ে পড়েছে৷ আহ্, বড় পবিত্র ও আনন্দময় এই স্নানদৃশ্য!
পরক্ষণেই মনে হল, দেবদূতের দেহ কি কালো হয়? কালো রং কি সুন্দর শব্দটাকে কোনোদিন ছুঁতে পেরেছে? রূপকথার কোনো বইয়ে কি একজন কালো মানুষ নায়কের মর্যাদা পেয়েছে? পৃথিবীর সব দেশের সব রূপকথা পড়া নেই৷ যতটুকু পড়েছে তাতে কালো মানুষের জন্য তেমন সম্মান কেউ দেখায়নি৷ আব্রাহাম লিঙ্কন, নেলসন মেন্ডেলা, পল রবসন অথবা পেলের মতো চরিত্ররা তো রূপকথা থেকে উঠে আসেননি৷ বরং নিজেদের অতিমানবিক ক্ষমতায় তাঁরা নিজেদের অস্তিত্বকে রূপকথার চেয়েও রোমহর্ষক করেছেন৷
কিছু ধান্দাবাজ ব্যবসায়ী সুকৌশলে সারা দুনিয়াতে সৌন্দর্যের ভুল-ধারণা তৈরি করে দিয়েছে৷ পাউডার, স্নো, ক্রিম, লোশন—হাজার কসমেটিকসের বাজারে লক্ষ-কোটি ডলার ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ শতাব্দীর পর শতাব্দী সেই ভুল ধারণা মানুষের ভিতর জাঁকিয়ে বসেছে৷ সুন্দর মানেই সাদা৷ আলো মানেই শুভ৷ সাদা মানুষের হাতে থাকবে শাসনের ব্যাটন৷ কালো মানুষের মধ্যে যেন তিলমাত্র সুন্দরের স্পর্শ নেই৷ তারা দাসত্ব করবে৷ ক্রীতদাস হওয়াই যেন তাদের নিয়তি!
বাজার-নিয়ন্ত্রিত শিল্পসাহিত্য, সংস্কৃতিতে আলোকিত পৃথিবীর জয়গান৷ পৃথিবীর বাইরে যে অন্ধকার মহাশূন্য রয়েছে, কোথাও সেই শান্ত-অন্ধকারের জন্য আদরগাথা নেই৷ যত স্তুতি আলোর জন্য৷ দিনের জন্য৷ অন্ধকারের জন্য, রাত্রির জন্য অন্তরের দরদ নেই৷
জাদুকরের মনে সারাক্ষণ এইসব যুক্তি ও প্রতিযুক্তির দোলাচল চলে৷ দিনদিন যেন নিজের সঙ্গে নিজের মতান্তর ক্রমশ বাড়ছে৷ তাই মাঝে-মাঝে সে নিজের প্রতিই যথেষ্ট বিরক্ত হয়ে ওঠে৷ কিন্তু পরক্ষণে ভালোও লাগে এমন নানান চিন্তায় ডুবে যেতে৷
নিজের ভাবনায় কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল জাদুকর৷ সম্বিত ফিরতেই দেখল—ঝরনার নীচে যুবক নেই৷ খনিকের অন্যমনস্কতায় এ কী করে বসল সে? হঠাৎ বুক ধড়পড় করে উঠল৷ সে বুঝতে পারল তার হৃৎপিণ্ড অস্বাভাবিকভাবে লাফাচ্ছে৷
দ্রুত পাথরের আড়াল থেকে ঢালুপথ ধরে উপরে উঠে এল জাদুকর৷ ভালো করে নজর করতেই দেখতে পেল—বেশ খানিকটা দূরে একটু আগে হারিয়ে যাওয়া সেই যুবক পুনরায় গুহার দিকে হেঁটে চলেছে৷
অদ্ভুত ব্যাপার তো! আবার কি গুহার ভিতর ঢুকে দু-দিন আত্মগোপন করে থাকবে? দূর থেকে গুহায় নজর রাখতে-রাখতে ভাবল জাদুকর৷ মনের ভিতর আনন্দ ক্রমশ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে৷ এ আনন্দ রহস্যময় একটি মানুষের খোঁজ পাওয়ার আনন্দ৷ এমন সব মানুষের সন্ধান পেতেই তো তার পথে নামা৷
বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর জাদুকর সিদ্ধান্ত নিল সে গুহায় ঢুকবে৷ নিঃশব্দে জানার চেষ্টা করবে গুহার ভিতর কী এমন করছে সে?
জাদুকর নিজের ছোট্ট ঝোলাটি কাঁধে নিয়ে গুহার ভিতর ঢুকে খানিকক্ষণ দাঁড়াল৷ ভিতরে ঘন অন্ধকার৷ অন্ধকারে ক্রমশ চোখ সয়ে গেল৷ তারপর গুহার একপাশ ঘেঁষে পাথুরে দেওয়ালে হাত ছুঁইয়ে নিঃশব্দে এগোতে লাগল৷
জাদুকর নিশ্চিত, যে গুহার অন্ধকারে কোনো হিংস্র জীবজন্তু নেই৷ কারণ, ছেলেটি তাহলে এই দুদিন এখানে থাকতে পারত না৷
অন্ধকারে হাঁটতে-হাঁটতে জাদুকর বুঝতে পারল গুহার ভিতর বেশ কয়েকটি বাঁক রয়েছে৷ ভিতরে একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ৷ সরু একটি সুড়ঙ্গের মুখ পেরিয়ে যেতেই জাদুকর চমকে উঠল৷ দেখল, বেশ কিছুটা দূরে একটি আলোর বিন্দু নড়াচড়া করছে৷ থমকে গেল জাদুকর৷
হাঁটার গতি আরও ধীর হয়ে গেল জাদুকরের৷ যত কাছাকাছি গেল, আলোর বিন্দুটা ক্রমশ বড় হতে লাগল৷
কিছুক্ষণ পর একদম নিঃশব্দে আলোর খুব কাছে পৌঁছে গেল জাদুকর৷ কয়েক ফুট দূর থেকে যা-দেখল, তাতে স্তব্ধ হয়ে গেল সে৷ কয়লাখনির ভিতরে শ্রমিকদের মাথায় যে-হেলমেট থাকে, সেই আলো-জ্বলা হেলমেট মাথায় পরে ছেলেটি গুহার দেওয়ালে ছবি আঁকছে! হেলমেটের আলো দেওয়ালের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পড়ছে৷ যুবক সেই আলোকিত অংশে ছবি আঁকছে৷ আর, ঠিক তার পাশেই বসে রয়েছে একটি বাঁদর৷ মাঝে-মাঝে বাঁদরটা কখনো রংয়ের পাত্র, কখনো প্রয়োজনীয় তুলি শিল্পীর দিকে এগিয়ে দিচ্ছে৷ বাঁদরটা যেন মুহূর্তে শিল্পীর মন পড়তে পারছে! বুঝতে পারছে কখন কী দরকার!
এমন অদ্ভুত দৃশ্য দেখে জাদুকর স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷ তার পা দুটো গুহার পাথুরে মেঝেয় কে যেন শক্ত করে পুঁতে দিয়েছে৷
জাদুকর নিঃসংশয় হল৷ পাহাড়-পর্বত-নদী-মরুভূমি-অরণ্য তোলপাড় করে খুঁজতে-খুঁজতে সে এতকাল পরে তাহলে ঠিক মানুষের কাছেই পৌঁছেছে!
কুনচেনের কথাগুলো মনে পড়ে গেল৷ কুনচেন বলেছিলেন, ‘যুবকটি মেধাবী৷ চমৎকার শিল্পী৷ এই যুবকের হাতেই রয়েছে সময়কে পুনর্নিমাণের ক্ষমতা৷ ওর চিন্তাশক্তির ভিতরেই লুকিয়ে রয়েছে আগামীর ভবিষ্যৎ৷ তুমি ওর সন্ধান করো৷ ওর সন্ধান পাওয়াটা খুব জরুরি৷ ওকে চিহ্নিত করো৷ ওর কাছে যাও৷ এই পৃথিবীর আজ সেই যুবককে ভীষণ দরকার৷’
‘আপনি তো ইচ্ছে করলেই একনিমেষে ওর সন্ধান দিতে পারেন৷ নাহলে এই বিপুল জন-অরণ্যে ওকে কোথায় খুঁজব?’
জাদুকরের কথায় মৃদু হেসেছিলেন কুনচেন৷ তারপর বলেছিলেন, ‘একজন শিক্ষক যখন তাঁর পাঁচজন ছাত্রকে পাঠদান করেন, তখনই বুঝে যান কোন ছাত্রের মান কেমন৷ মান অনুযায়ী পাঁচজনের ক্রম কী হবে, এক দুই তিন চার পাঁচ স্থানগুলোয় কোন ছাত্রের কোথায় থাকা উচিত৷ কিন্তু তিনি কি তা করেন? করেন না৷ পরীক্ষা নেন৷ তারপরে ক্রমের ঘোষণা করেন৷
কিংবা ধরো, সময়ের কথা৷ সময় তো জানে কার কখন অন্তিম মুহূর্তটি ঘনিয়ে আসবে৷ কিন্তু সময় কি আগাম ঘোষণা করে কারও মৃত্যুর বার্তা? প্রত্যেককে জীবনব্যাপী নিজের কাজ করে যেতে হয়৷ নিজের দায়িত্ব পালন করতে হয়৷ তারপর যার যখন কাজ ফুরোয়, সময় কাছে এসে তখন তাকে মৃত্যুদান করে৷ এই হচ্ছে শাশ্বত পথ৷ চিরন্তন নিয়ম৷ এই নিয়মের বাইরে আমরা কেউ নই৷
আসলে কী জানো, সময় নিয়ন্ত্রিত এই জীবন, এই জগৎ প্রতিনিয়ত আমাদের পরীক্ষা চায়৷ প্রতিনিয়ত আমাদের যাচাই করে প্রকাশ্যে ফল ঘোষণা করতে চায়৷ এই অন্বেষণও তেমনই এক পরীক্ষা৷ সুতরাং আমি চাইলেও সময়ের এই পরীক্ষাকে অস্বীকার করতে পারব না৷ তুমি পথে নামো৷ অন্বেষণে অগ্রসর হও৷’
এরপর আর কথা চলে না৷ জাদুকর পথে নেমেছিল৷ সহস্র পথ, পথের ধুলো, আকাশভাঙা মেঘ-বৃষ্টি-জল, ক্ষুধা আর কষ্টের দিনলিপি লিখতে-লিখতে এই গুহায় পৌঁছেছে৷ এবং মনে হচ্ছে তার এতকালের অন্বেষণ বোধহয় এতদিন পর সত্যিই সাফল্যের মুখ দেখতে চলেছে৷
ওদিকে শিল্পী তার কাজে এতই মগ্ন যে কোনোদিকে হুঁশ নেই৷ জাদুকর ইতস্তত বোধ করল৷ ভাবল—এখন কি তাকে ডাকা উচিত হবে? নাকি অপেক্ষা করবে?
নির্জন জঙ্গলের ভিতর গুহা৷ গুহার অন্ধকারে শিল্পী৷ শিল্পীকে সাহায্য করছে একটি বাঁদর৷ আর শিল্পী সামান্য আলোয় পাথুরে দেওয়াল সাজিয়ে দিচ্ছে রংয়ে৷ এমন রহস্যময় আবহ এবং এমন রহস্যময় মানুষের সন্ধান পেয়ে জাদুকর স্তম্ভিত৷ বুকের ভিতর সে যেন যুদ্ধজয় করা ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি শুনতে পাচ্ছে৷
বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর শিল্পীর হাত থেমে গেল৷ সে হাতের তুলিটা পাথুরে মেঝের ওপর রাখল৷ জাদুকর এই সুযোগ আর হারাতে চাইল না৷ বলল, ‘তুমি তো দুর্দান্ত ছবি আঁকো!’
চমকে উঠল শিল্পী৷ মুহূর্তে হেলমেটের আলোটা নিভিয়ে দিল৷ মনে হয়, ত্রস্ত হয়ে কাছের পাথরের আড়ালে সরে গেল৷ জাদুকর বলল, ‘ভয় নেই, আমি তোমার শত্রু নই৷’
কয়েক মুহূর্ত গুহার ভিতর নিস্তব্ধ৷ অন্ধকারের আড়াল থেকে শিল্পী জিগ্যেস করল, ‘তুমি কে?’
‘সামান্য এক লোক৷ তুমি নিশ্চিন্তে আলো জ্বালতে পারো৷ তোমার কোনো ক্ষতি করার জন্য আসিনি৷’
আরও কিছুক্ষণ ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না৷ জাদুকর বলল, ‘মানুষের প্রতি অবিশ্বাস আঁকড়ে রেখে কেউ শিল্পী হয়?’
কথায় কাজ হল৷ আলো জ্বলে উঠল৷ হেলমেটের আলো এসে পড়ল জাদুকরের মুখে৷ বেশ অস্বস্তি হচ্ছে জাদুকরের৷ তবুও নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে রইল জাদুকর৷
আবার আলো নিভে গেল৷ জ্বলে উঠল দেশলাই৷ শিল্পী সেই আগুন থেকে একটি বড় মোমবাতি জ্বালাল৷ জায়গাটা মৃদু আলোয় ভরে উঠলেও চারপাশ তেমন স্পষ্ট হল না৷ শিল্পী জাদুকরকে ইশারা করল আলোর অন্যপ্রান্তে বসতে৷
মাঝখানে মোম জ্বলছে৷ আলোর দুইপ্রান্তে দু-জন৷ বাঁদরটা দৌড়ে গুহার বাইরে চলে গেল৷ জাদুকর মৃদু হেসে বলল, ‘বাঁদরটাও কি ছবি আঁকা শিখছে?’
‘আমি ছবি আঁকতে শুরু করলেই ও চলে আসে৷ হাতে-হাতে এগিয়ে দেয়৷’
‘এতখানি পোষ মেনেছে?’
‘ঠিক উলটো৷ শুধু ছবি আঁকার সময় হলেই ও চলে আসে৷ অন্যসময় আমার কাছে তো আসেই না, উলটে এমন ভাব করে যেন আমাকে কোনোদিন চোখেই দেখেনি৷’
জাদুকর শিল্পীর কথায় বিস্মিত হল৷ তারপর প্রসঙ্গ পালটে বলল, ‘আজ থেকে চল্লিশ বা পঞ্চাশ হাজার বছর পর এই ছবিগুলো থাকবে? রং নষ্ট হয়ে যাবে না?’
শিল্পী জাদুকরের কথায় চমকে উঠল৷ তাহলে লোকটা সব বুঝতে পেরেছে৷ বলল, ‘এগুলো সাধারণ রং নয়৷ বিশেষ ভেষজ থেকে বানানো৷ নষ্ট হবে না৷ স্পেনের আলতামিরা কিংবা আমাদের ভীমবেঠকার গুহার ছবিতে তো রং নষ্ট হয়নি৷ সে ছবির বয়স তো প্রায় তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার বছর হবে৷’
‘তোমার ছবিতে তো এইসময়ের সব কথা বলা নেই!’
‘ঠিক৷ নেই৷ রাখিনি৷’
‘কেন?’
‘আগামী পৃথিবীকে আমাদের মন্দ কথাগুলো জানাতে চাই না বলে৷ আমাদের যা-কিছু ভালো, সেই ভালো দিয়ে আগামী সময় আমাদের চিনুক৷ তাই যুদ্ধের কথা, দখলের কথা, হিংসার কথা আমি ছবির শরীরে তুলে আনিনি৷’
‘হুম৷ তাই তো দেখলাম৷ ছবির ভিতর নারী আছে৷ পুরুষ আছে৷ চুম্বন আছে৷ সংগম আছে৷ ফুল আছে৷ সংগীত আছে৷ বাদ্যযন্ত্র আছে৷ বই আছে৷ কিন্তু কোনো যুদ্ধাস্ত্র নেই৷ যুদ্ধমহড়া নেই৷’
‘এত নিখুঁতভাবে লক্ষ করেছ!’ বিস্ময় শিল্পীর কণ্ঠে৷
‘তোমাকে কয়েকদিন ধরে অনুসরণ করছি৷ শুধু ছবি কেন, ঝরনার জলে তোমার নগ্ন-স্নানও দেখেছি৷’ অম্লানবদনে বলল জাদুকর৷
লোকটা ঝঞ্ঝাট পাকানোর মতো কেউ নয়৷ বরং কথাগুলো খুব আন্তরিক—ভাবল শিল্পী৷
‘ধরো, মানুষের এই সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেল৷ পরে, আবার মানুষ বা মানুষের মতো প্রাণীরা এই পৃথিবীর দখল নিল, নতুন ধরনে নতুনভাবে সভ্যতার সূচনা করল, তোমার এই যুদ্ধহীন সংঘর্ষহীন ভাবনা থেকে গড়ে ওঠা ছবিগুলো কি সেদিনের মানুষকে পথ দেখাতে পারবে? নিছক আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে বলো৷’ শিল্পীর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জাদুকর৷
এমন প্রশ্নের কী উত্তর হয় জানা নেই শিল্পীর৷ চুপ করে থাকে৷ জাদুকর বলল, ‘চলো, গুহার বাইরে যাওয়া যাক৷’
শিল্পী ও জাদুকর বাইরে বেরিয়ে আসে৷ জাদুকর জিগ্যেস করল, ‘কী নাম, তোমার?’
‘রুহ৷’ বলল শিল্পী৷
‘রুহ!...আত্মা...’
‘এমন অদ্ভুত নাম কেন!’
‘অদ্ভুত মনে হচ্ছে কেন? কোনো শিশুর নাম কি সে নিজে নেয়? কেউ হয়তো আমার এই নাম দিয়েছিল!’
কথাগুলো বলার সময় রুহর কণ্ঠে খানিক রুক্ষতা প্রকাশ পেল৷ অচেনা মানুষের কাছে এত জবাবদিহি করতে কারই-বা ভালো লাগে? তবে লোকটার মুখ-চোখে আলাদা একটা সারল্য আছে৷ ফলে ভিতরের খারাপ লাগাটা কয়েক মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল৷
রুহ আকাশের দিকে তাকাল৷ পাহাড়ের মাথায় পড়ন্ত দিনের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে গোলাপি আভা৷ পাহাড়ের গা থেকে নেমে আসা পাতাঝরা জঙ্গলে দু-একটি পাখি ওড়াউড়ি করছে৷ কয়েকটা কাঠবেড়ালি এ-পাথর থেকে ও-পাথরে ছোটাছুটি করছে৷ এইসব চেনা দৃশ্যের মাঝে অচেনা হলেও লোকটাকে তেমন বেমানান মনে হচ্ছে না৷
রুহ ভাবল, লোকটার কথা ফেলনা নয়৷ ঠিকই তো বলেছে—কত বড় এই পৃথিবী, কত নদনদী, কত সমুদ্র, কত মহাদেশ! সেখানে একটি গুহার ভিতর কী ছবি আঁকা হল তা দিয়ে আগামী পৃথিবীর নতুন জনজাতিকে সত্যিই কি পথ দেখানো যাবে? লোকটার কথাই ঠিক৷ যে-স্বপ্ন নিয়ে এই গুহাচিত্রের কাজ সে শুরু করেছিল, প্রকৃতপক্ষে এ-যেন সামান্য এক আবেগ৷ বৃহত্তর জগতের নিরিখে এ-যেন এক খামখেয়ালিপনা ছাড়া আর কিছুই নয়৷
রুহ চুপ করে আছে দেখে জাদুকর বলল, ‘ছবিতে তোমার যে-ভাবনা ফুটে উঠেছে তা খুব ইতিবাচক৷ এমনটাই তো হওয়া উচিত৷ কিন্তু আগামী পৃথিবীকে তোমার ছবির মাহাত্ম্য চেনাতে গেলে, উপলব্ধি করাতে গেলে এমন পথ এবং পদ্ধতির সন্ধান করা উচিত যাতে আগামী সময়ের মানুষ কার্যত দখলদারিত্বের মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়৷ সংঘর্ষহীন, দ্বেষহীন এক সময়কাল নির্মাণ করতে পারে৷ এই ছবিকে যদি তত্ত্ব হিসেবে ধরি, তাহলে একে বাস্তবায়িত করার জন্য ব্যবহারিক পথের সন্ধান করাটা জরুরি৷’
‘কিন্তু তা কি সম্ভব? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা এত বড় একটা পৃথিবীর চিন্তাভাবনার বদল কি কার্যত সম্ভব?’ সংশয় রুহর গলায়৷
‘সম্ভব করে তোলার পথটাকে খুঁজে বার করাই তো একজন শিল্পীর কাজ৷’ বলল জাদুকর৷
‘কিন্তু আমি তো ছবি আঁকা ছাড়া আর কিছুই পারি না!’
‘পারো৷ তোমার ভিতর কল্পনা আছে৷ পৃথিবীকে নতুন করে গড়ার স্বপ্ন আছে৷ একজন সত্যিকারের শিল্পীর যা গুণ—সব তোমার রয়েছে৷ শুধু স্বপ্নটাকে আরও বড় করতে হবে৷ স্বপ্নটাকে গুহায় নয়, সমস্ত পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে দিতে হবে৷ হয়তো দেখবে তুমি যে দখলমুক্ত সময়ের স্বপ্ন তোমার ছবির ভিতর আঁকতে চেয়েছ, যে যুদ্ধহীন দ্বন্দ্বহীন পৃথিবীর কথা বলতে চেয়েছ...তা একদিন সত্যি হবে৷ শিল্পী হিসেবে তার চেয়ে বড় সার্থকতা আর কী হতে পারে?’
‘তোমার কথা আমাকে সম্মোহিত করছে৷ তুমি যেন কথার জাদুকর!’
‘জাদুকরই তো৷’
বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে যায় রুহর, ‘জাদুকর!’
জাদুকর তার ঝোলা থেকে একটা কাঠের কৌটো বার করে৷ ঢাকনা খুলে দেখায়৷ কৌটোটার ভিতরটা ফাঁকা৷ আবার ঢাকনা আটকে দেয়৷ তারপর মাথার চারপাশে শূন্যে একপাক ঘুরিয়েই ঢাকনা খোলে৷ কাঠের কৌটো থেকে একটা কবুতর উড়ে যায় আকাশের দিকে৷
বিস্ময়ে হাঁ করে চেয়ে থাকে রুহ৷ ঘোর কাটলে বলে, ‘তুমি তো দুর্দান্ত মানুষ!’
‘না৷ অতি সাধারণ একজন৷’
‘কেন, কী আশ্চর্য জাদু জানো!’
‘এগুলোকে জাদু বলে না৷ হাত-সাফাইয়ের খেলা৷ আসল জাদু অন্য৷’
‘কীরকম?’ ছেলেমানুষের মতো কৌতূহল দেখায় রুহ৷
জাদুকর মুচকি হেসে আকাশের দিকে ইশারা করে৷ তারপর বলে, ‘দেখতে পাচ্ছ, পাহাড়ের চুড়ো ডিঙিয়ে ভেসে যাচ্ছে মেঘ?’
রুহ সেদিকে তাকিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ, তা তো দেখতে পাচ্ছি৷’
জাদুকর এবার পায়ের কাছে পড়ে থাকা জারুলগাছের একটি পাতা তুলে ধরে বলে, ‘লাল-হলুদ রংয়ের কী আশ্চর্য মিশ্রণ দেখতে পাচ্ছ?’
‘পাচ্ছি৷’
‘এবার বল তো কে এই আশ্চর্য কাণ্ডগুলো ঘটায়?’
রুহ চুপ করে থাকে৷ জাদুকর বলে, ‘যে আকাশজুড়ে মেঘের পানসি ভাসায়, যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বৃক্ষপাতায় রং নিয়ে খেলা করে, যে অঝোরধারায় বৃষ্টি নামিয়ে নদীকে জীবিত রাখে, যে পাখির কণ্ঠে সুর আর পাথরের বুকে নৈঃশব্দ্য জমা রাখে, সে-ই তো সত্যিকারের জাদুকর৷ আমি কে?
আমি পথকে ভালোবাসা এক মানুষ৷ শরীর আছে, তাই খিদে আছে৷ জীবন বাঁচাতে খাবার দরকার৷ তাই মানুষকে ভেলকি দেখিয়ে নিজের খাবার জোগাড় করি আরও বহুদূর হেঁটে যাব বলে৷ তাহলে এবার ভেবে দেখো, আমাকে কি জাদুকর বলা চলে?’
জাদুকরের অকপট স্বীকারোক্তি ও সারল্য মুগ্ধ করল রুহকে৷ রুহ ভাবে, কী অদ্ভুতভাবে ভিন-ঠিকানার দু-জন মানুষ কাছাকাছি আসে! কথা বলে! নিবিড় হয়ে ওঠে! এ-ও তো কম বড় ম্যাজিক নয়!
জাদুকর বলে, ‘শিল্পীর ক্ষমতা অসীম৷ একটি সরলরেখা একজন শিল্পীর হাতে বাঁক নিয়েই জীবন্ত হয়ে ওঠে৷ এ কি কম বিস্ময়ের?’
রুহ মুগ্ধ হয়ে জাদুকরের দিকে তাকিয়ে থাকে৷ জাদুকর বলে, ‘আবার দেখো, যারা কেবল মাত্র ছবি আঁকতে পারে, ভাস্কর্য গড়তে পারে—শুধুমাত্র এ-কারণেই তাদের আমি শিল্পী বলে মনে করি না৷’
‘কেন?’ প্রশ্ন করে রুহ৷
জাদুকর উত্তর দেয়, ‘তারা শিল্পী ঠিকই, কিন্তু মহৎ শিল্পী নয়৷’
‘মহৎ শিল্পী কারা?’
‘যারা চেনা পথে হাঁটে না৷ যারা পথ নির্মাণ করে৷ যারা প্রচলিত ধারণার ভুলগুলো, খামতিগুলো চিহ্নিত করে তা থেকে মানুষকে, সভ্যতাকে, পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যায়—তারাই মহৎ শিল্পী৷ তাদের শিল্পই মহৎ৷’
‘যেমন?’
কথা বলতে-বলতে অন্যমনষ্ক হয়ে গিয়েছিল জাদুকর। রুহর কথা শুনতে পেল না সে৷ তার দৃষ্টি এখন সুদূরে পাড়ি জমিয়েছে। রুহর মনে হাজারও প্রশ্নের ঝড় উঠছে এই মুহূর্তে, কিন্তু জাদুকরকে আনমনা দেখে সে-ও চুপ করে থাকে৷
সমতলের চেয়ে পাহাড়-জঙ্গলের নিয়ম আলাদা৷ এখানে সূর্য দেরিতে দেখা দেয়৷ চলেও যায় তাড়াতাড়ি৷ সন্ধে নেমে আসা নির্জন জঙ্গলের ভিতর দুজন মানুষ শুধু স্তব্ধ হয়ে বসে আছে৷ সন্ধের আবছায়া অন্ধকার ক্রমশ তাদের মুছে ফেলছে চোখের সামনে থেকে৷
গোল আকারের পিণ্ডের রং সবুজ৷ আর চ্যাপটা আকারের বস্তুটার রং লাল৷ গুহার দেওয়াল জুড়ে এরকম নানান আকারের স্কেচ করে রং দিয়ে ভরিয়ে তুলছে রুহ৷ গর্ভাবস্থা থেকে মানব-ভ্রূণের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ওঠা এবং বীজ থেকে বৃক্ষে রূপান্তরের নানা ধাপগুলো আঁকছিল সে৷
গতকাল কাজটা যখন শুরু করে, জাদুকর জিগ্যেস করেছিল, ‘মানুষ সবুজ আর গাছ রক্তাভ কেন, রুহ?’
রুহ মুচকি হেসে বলে, ‘আমাদের চেনা ধারণার উলটো পথ নিয়েছি৷ ওই যে তুমি গতকাল বলছিলে—যারা চেনা পথে না-হেঁটে, নতুন পথ নির্মাণ করে তারা মহৎ শিল্পী হয়, তাই৷’
জাদুকরের মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে৷ তা লক্ষ করে রুহ বলে, ‘একটু মজা করলাম৷ কিছু মনে করলে?’ পরক্ষণেই রুহর গলা স্বাভাবিক, ‘জাদুকর, আমি মানুষ ও প্রকৃতিকে অভিন্ন সত্তায় দেখতে চাই৷ আমার শেষ ছবিটা লক্ষ করো, দেখো—রক্তাভ শিরা-উপশিরাময় বৃক্ষের পাশে শাখা-প্রশাখা ধারণ করে একটি মানুষ কেমন নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ এই হল বৃক্ষ ও মানুষের অবিভাজ্যতা৷ ভ্রূণ ও বীজের পর্যায়ক্রমিক ধারা আমি অজস্র চিত্রের মধ্যদিয়ে ধরে রাখতে চেয়েছি৷ আগামী পৃথিবীর মানুষ যেন এই সখ্য উপভোগ করে৷’
রুহর ব্যাখায় চমৎকৃত হয়েছিল জাদুকর৷ সাধারণ আঁকিয়ে নয়, সে যেন সত্যিকারের এক শিল্পীকে খুঁজে পেয়েছে৷
সকালবেলা সদ্য আঁকা ছবিগুলোতে চোখ বুলিয়ে গুহার বাইরে এসে জাদুকরকে দেখতে পেল না রুহ৷ এদিক-ওদিক খোঁজাখুঁজি করল কিন্তু কোথাও জাদুকরের সন্ধান মিলল না৷ মনখারাপ হয়ে গেল রুহর৷ আজব মানুষ তো! নিঃশব্দে উদয় হয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল?
দিন তিনেকের সঙ্গ, তাতেই এত মনখারাপ? নিজের মনের কাছেই যেন জবাবদিহি করল রুহ৷ সারাদিন আর নতুন কিছুই আঁকা হল না৷ জঙ্গলের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াল৷ তারপর ঝরনায় স্নান করে গুহার কাছে ফিরে পাথরে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল৷
শুকনো পাতার মড়মড় শব্দে ঘুম ভেঙে গেল৷ বিকেল হয়ে এসেছে প্রায়। চোখের ঘোলাটে ভাব পরিষ্কার হতেই সে দেখল, তার খুব কাছটিতে দাঁড়িয়ে জাদুকর মিটমিট করে হাসছে৷ রুহর বেশ রাগ হল৷ বলল, ‘না-বলে কোথায় গিয়েছিলে?’
‘না-বলে!’ হো হো করে হেসে উঠল জাদুকর৷ বলল, ‘কেন, তোমার সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি হয়েছে নাকি যে আমাকে কোথাও যেতে হলে তোমাকে বলে যেতে হবে?’
রুহ থমকে গেল৷ জাদুকরকে এমন বলাটা বোধহয় সমীচীন হয়নি ওর৷
জাদুকর বলল, ‘আগের দিন তুমি আমার সঙ্গে মজা করেছিলে, আজ আমি মজা করলাম৷ শোধবোধ হয়ে গেল!’
রুহর পাশে হাত-পা ছড়িয়ে জাদুকর আরাম করে বসল৷ তারপর বলল, ‘এই হচ্ছে অন্তরের টান৷ দু-জন মানুষ সামান্য কিছুক্ষণ কাছাকাছি হয়েছে, অমনি ভিতরে-ভিতরে নিঃশব্দ এক টানের জন্ম হয়েছে!’
জাদুকরের দেখা পেয়ে রুহর মন এখন বেশ হালকা৷
জাদুকর বলল, ‘তাহলেই বোঝো, কোটি-কোটি বছর ধরে যে সৌরজগতের সৃষ্টি হয়েছে, সূর্যকে মাঝখানে রেখে গ্রহের দল, গ্রহদের কেন্দ্র করে উপগ্রহের দল যে নিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে, তা কি এমনি? ওই টান—নিঃশব্দ টান৷ ভালোবাসার টান৷ অন্তরের টান৷’
‘মানুষে-মানুষে টানের সঙ্গে নক্ষত্র-গ্রহ-উপগ্রহদের টানের তুলনা করছ? ও তো মহাজাগতিক ঘটনা৷ ওর মধ্যে ভালোবাসা কোথায়? অন্তরের উপলব্ধি কোথায়?’
জাদুকর মুচকি হাসে৷ বলে, ‘মানুষ তার নিজের বানানো ইঞ্চি-ফুট-মিটারের স্কেলে মাপে বলেই ভালোবাসাকে এত ছোট আকারে দেখতে পায়৷ মানুষ যেদিন সত্যিকারের উপলব্ধি দিয়ে এই জগৎকে বুঝতে চাইবে, সেদিন মানুষ দেখতে পাবে—এই ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছুর ভিতর ভালোবাসা আছে বলেই সবকিছু সংযুক্ত হয়ে আছে৷’
এবার বোধহয় জাদুকরের কথায় খানিকটা সন্তুষ্ট হল রুহ৷ কিন্তু পরক্ষণেই বলল, ‘আমি তাহলে কেন এত চিৎকার শুনতে পাই, জাদুকর? মানুষে-মানুষে চিৎকার৷ রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে চিৎকার৷ প্রতিশোধের জন্য চিৎকার৷ প্রতিরোধের জন্য চিৎকার৷ কখনো আবার আশ্রয়ের জন্য চিৎকার?’
‘এটাই তো ট্রাজেডি, রুহ৷ মানুষের ভিতর যতদিন দখলের মানসিকতা জন্মায়নি ততদিন এই চিৎকার শোনা যেত না৷ মানুষ যখন থেকে পৃথিবীকে দখলের উদ্যোগ নিল, কব্জা করার কৌশল গ্রহণ করল, তখন থেকেই দিনে-দিনে এই চিৎকার গগনভেদী হতে শুরু করেছে৷
গোষ্ঠী গড়ল৷ অঞ্চল ভাগ করল৷ ক্রমশ ভূখণ্ডকে রাজ্যে বাটোয়ারা করল, দেশে ভাগ করল৷ বিভাজনের যেন আর শেষ নেই!’
‘জাদুকর, একবার ভাবো সেই প্রৌঢ়ের মুখ৷ ১৯৩৩ সাল, বয়স চুয়ান্ন৷ কপালের তিনটে সমান্তরালরেখায় ঘন-চিন্তার ভাঁজ৷ সে চিন্তা—বাঁচার, নিজের অস্তিত্বের, নিজের একটা নিরাপদ ঠিকানার৷ যে-মানুষটা মহাবিশ্বের ঠিকানা খুঁজে বেড়িয়েছে, সেই মানুষটারই নিজের ঠিকানা হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ!’
‘আইনস্টাইনের কথা বলছ?’
‘ঠিক৷ ভোরের নরম কুয়াশা তখনও লিন্ডেন, কাস্তানিয়া, আহর্ন, বির্খদের শাখায়-শাখায় চোখ বন্ধ করে ঝিমোচ্ছে৷ তখনও স্প্রে নদীর নীলচে জলে সোনালি রোদ জেগে ওঠেনি৷ সকাল হওয়ার বেশকিছু দেরি আছে৷ সমস্ত বার্লিন ঘুমোচ্ছে৷ শুধু প্রৌঢ় বিজ্ঞানীর চোখে ঘুম নেই৷ নির্ঘুম রাত্রেই স্থির করে ফেললেন—আর নয়, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে৷
বেশ কয়েক বছর আগেই বুঝতে পেরেছিলেন—এ-দেশের মাটিতে ইহুদি-বিদ্বেষ দ্রুত শিকড় ছড়াচ্ছে৷ অস্ট্রিয়ার লোকটা সারা জার্মানি জুড়ে বোঝাচ্ছিল—প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের কারণ ইহুদিরা৷ ওদের জন্যই জার্মানির এই দৈন্য, এই অবক্ষয়৷
কী আশ্চর্যভাবে মানুষ সেই মিথ্যের ফাঁদে পা দিল! জাতিবাদের বিষাক্ত আগুনে নিজেদের তাতিয়ে তুলল! আর ১৯৩৩ সালে লোকটা বিপুল জনসমর্থন নিয়ে জার্মানির চ্যান্সেলর হয়ে বসতেই দেশের সমস্ত ইহুদির ভবিষ্যৎ অন্ধকার খাদের মুখে দাঁড়িয়ে দিল৷’
‘উনি সেদিন দেশ থেকে চলে না-গেলে কে বলতে পারে ওঁকেও হলোকাস্টের শিকার হতে হতো না? আমি নিশ্চিত দেশকে নোবেল এনে দিয়েছেন বলে নাতসিরা ওঁকে ছাড় দিত না৷’ জাদুকরের গলায় বিষণ্ণতা ঝরে পড়ল৷
‘একটা মানুষ যে-মাটিতে জন্মাল, বোধ হওয়ার পর যে-পারিপার্শ্বিককে চিনল, যে-ভাষায় কথা বলতে শিখল, যে-নদী-সমুদ্র-আকাশকে নিজের বলে জানল, একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখল—সে-সব কোনোকিছুই আর তার নিজের নয়! যে-মাটিকে সে তার জন্মভূমি হিসাবে জেনেছে, সেটা তার দেশ নয়৷ সেই জলমাটি, গাছপালা তার নয়৷ মুহূর্তে সে নিজ জন্মভূমিতে পরবাসী হয়ে গেল! এ পৃথিবীতে তার নিজের দেশ কোথায়? সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? নাহ্, সে নিজেই আর জানে না৷ জানে না—পৃথিবীর কোথাও তার জন্য একটুকরো ঠিকানা বরাদ্দ আছে কিনা? সে কিচ্ছুটি জানে না৷’
রুহ একটানা কথা বলে চুপ করে থাকে৷ বসে থাকে মাথা নীচু করে।
‘সত্যিই তো এর চেয়ে বড় ট্রাজেডি আর কী হতে পারে!’ জাদুকর বিমর্ষ হয়ে পড়ল, ‘আশ্চর্যের বিষয় হল—অস্ট্রিয়ার লোকটা কিন্তু তোমার মতোই শিল্পী ছিল! রং-তুলি দিয়ে সাদা ক্যানভাসকে একদিন সে বর্ণময় করে তুলত!’
‘খুবই বিস্ময়ের৷ রং-তুলি আর ক্যানভাসে যে সারা পৃথিবীর মানুষকে স্বপ্নজগতের সন্ধান দিতে পারত, যে-শিল্পী হয়ে উঠতে পারত রঙিন দুনিয়ার অন্যতম নায়ক, সে হয়ে গেল লক্ষ-লক্ষ মানুষের নির্মম ঘাতক!’
‘রুহ, তুমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কথা বলছ৷ গত শতাব্দীর তিনের দশকের কথা৷ অথচ এই তো ক-বছর আগে, নয়ের দশকে যা হয়েছিল—সেসব কিছু জানা আছে তোমার? পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসনের রাশ আলগা হতেই জাতীয়তাবাদকে হাতিয়ার করে যুগোস্লাভিয়ায়ও একই ঘটনা ঘটাল৷ দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে কমিউনিস্ট নেতা মার্শাল টিটো সম্প্রীতির যে বাতাবরণ ধরে রেখেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর সার্ব-জাতীয়তাবাদকে সামনে রেখে স্লোবোদান মিলোসেভিচ গৃহযুদ্ধে ইন্ধন দিয়ে সেদিন কত গণহত্যায় শামিল হয়েছিল!
সার্বরা কীভাবে মুসলিমদের হত্যা করেছিল—সেসব কথা ভাবলেই মন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে৷’
‘মনে আছে, জাদুকর৷ সব মনে আছে৷ মিডিয়ায় উঠে আসা সেই মেয়েটির মুখ আজও আমার চোখের সামনে স্পষ্ট জেগে আছে৷’
‘কার মুখ?’
‘নুসরেতা সিবাজ৷ বসনিয়ার প্রিয়োডোর শহরে বিচারকের কাজ করতেন৷ ১৯৯২ সালের এপ্রিলে যুগোস্লাভিয়ায় যুদ্ধ শুরু হলে সার্ব-মিলিট্যান্টরা প্রিয়োডোরের দখল নেয়৷ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রেফতার করা হয় নুসরেতাকে৷ কারণ, নুসরেতা সিবাজ ছিলেন বসনিয়াক মুসলিম৷
তার মতো বহু মেয়েকে বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় ওমারস্কা নির্যাতন শিবিরে৷ খনি অঞ্চলের সেই শিবিরে নুসরেতা দেখেছেন—সার্বরা কীভাবে দিনের পর দিন মেয়েদের ধর্ষণ করেছে৷ কীভাবে নৃশংস অত্যাচার করে হত্যা করেছে৷ ওই বছরের আগস্টে রেডক্রশের দল ওমারস্কা শিবির পরিদর্শনে গেলে নুসরেতাসহ তিরিশ জন মেয়ে মুক্তি পায়৷ নিজে বিচারক বলে নুসরেতা আইনি লড়াইয়ে আদালতকে স্বীকার করতে বাধ্য করেছিলেন যে গণহত্যার মতো গণধর্ষণও একটি জঘন্য যুদ্ধাপরাধ৷
নুসরেতার মতো আরও একটি মুখ আমার চোখের ঘুম কেড়ে নেয়৷ সে হল আয়লান৷ সিরিয়ার শিশু আয়লানের মৃত শরীর মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল তুরস্কের সমুদ্রসৈকতে৷ মনে পড়ে সেই মর্মান্তিক দৃশ্যের কথা? কেন এই নুসরেতা, আয়লানরা নিজেদের বাঁচার মতো ভূখণ্ড পেল না, জাদুকর?
আমার প্রশ্ন হল—এই পৃথিবী কার? এ-পৃথিবীকে, এই মাটিকে এভাবে ভাগ করার অধিকার কে কার হাতে কবে দিল?’
‘পৃথিবীকে জবরদখল করে অন্যের অধিকারকে খর্ব করা, অস্ত্রশক্তির সাহায্যে একটা ভূখণ্ডের সীমানা নির্দিষ্ট করে অন্যদের উচ্ছেদ করা—এসব মানসিক বিকৃতি৷ আর এই মানসিক বিকৃতির ফলেই পৃথিবী জুড়ে লাখো-লাখো শরণার্থী, উদ্বাস্তু মানুষের দল দিশেহারা হয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ রাস্তায় পড়ে মরছে৷’
‘জাদুকর, একবার ভাবো তো রোহিঙ্গাদের কথা৷ আজ লক্ষ-লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী৷ না-খেতে পাওয়া গরিব, প্রান্তিক এই বিপুল জনগোষ্ঠী আজ কোনো দেশের নাগরিক নয়৷ এত বড় পৃথিবীতে তাদের কোনো দেশ নেই৷ নিজের মাটি নেই৷ রাষ্ট্রসংঘের মতে বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত মানুষ এরা৷ নির্বিচারে গণহত্যার সাক্ষী এরা৷ এদের নারীরা প্রতিদিন গণধর্ষণের শিকার হয়৷ দুর্ঘটনায়, জলে ডুবে, রাস্তায় না-খেতে পেয়ে তারা মারা যাচ্ছে৷ এই পৃথিবী তো চাই না, জাদুকর! সীমান্তহীন একটা পৃথিবী চাই৷ শরণার্থীহীন একটা গ্রহ চাই৷’
‘সে জন্যই বুঝি তুমি আত্ম-প্রবঞ্চনায় মেতেছ, রুহ?’ জাদুকরের গলায় কটাক্ষের সুর৷
রুহ বিস্মিত হল৷ ‘আত্ম-প্রবঞ্চনা করছি? আমি?’
‘তা নয় তো কী? গুহার ভিতর তোমার ছবি এক শান্ত ও ভালোবাসাময় পৃথিবীর কথা বলছে৷ আগামী জনজাতির কাছে বর্তমান সময়ের মানুষের কুৎসিত মুখের আদল লুকোনোর চেষ্টা করছে৷ বর্তমান সময়ের অসুন্দর ও নিষ্ঠুর অসূয়াকে আড়াল করে সুন্দর একটা সময়ের বয়ান গুহার দেওয়ালে তুমি তুলে ধরার চেষ্টা করছ—এটা আত্ম-প্রবঞ্চনা নয়? বাস্তব সত্যকে লুকোনোর অপরাধ নয়?’
জাদুকরের ভর্ৎসনায় রুহ চুপ করে যায়৷ বুঝতে পারে জাদুকরের কথাগুলো অমূলক নয়৷ সত্যিই তো, সে আগামী সময়ের কাছে ভালোবাসাময় সুন্দরের অবয়ব রেখে যেতে চায়৷ চূড়ান্ত বাস্তব হলেও নিজের রং-তুলিতে অসুন্দরকে গেঁথে রাখতে চায় না সে৷
জাদুকর বলল, ‘তোমার উদ্দেশ্য মহৎ, এ নিয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই৷ কিন্তু রুহ, বর্তমান সময়ের অন্যায়, অসাম্য আর দখলদারির বাস্তবতাকে অস্বীকার করার অর্থ—বিপদে পড়ে উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে নিজেকে নিরাপদ ভাবার মতো বোকামি৷
তোমাকে তো আগেই বলেছি, রং-তুলি দিয়ে যে ক্যানভাসকে রঙিন করে তোলে বা পাথর কুঁদে যে ভাস্কর্য নির্মাণ করে, তাকে আমি শিল্পী মানলেও, মহৎ শিল্পী বলে মনে করি না৷ মহৎ শিল্পী সে-ই, যে নতুন করে এই পৃথিবীকে নির্মাণ করবে৷ যে জনজাতির চরিত্রকে ইতিবাচক পথে বদলে দেবে৷ যে অসূয়াশূন্য এক সাম্যের বোধজাত জনজাতির জন্ম দেবে, সে-ই হবে মহৎ শিল্পী৷
আমি মনে করি, তোমার মধ্যে সেই মহৎ শিল্পের গুণ রয়েছে, মহৎ শিল্পী হয়ে ওঠার সততা রয়েছে৷ আমি বিশ্বাস করি, তুমি চাইলে হয়তো একদিন তোমার ভাবনায়, তোমার সামর্থে এই পৃথিবী স্বপ্নের পৃথিবীতে রূপান্তরিত হতে পারে৷’
‘কীভাবে?’
‘পথ৷ পথ শেখাবে৷ রুহ, পথের মতো বড় শিক্ষক আর কেউ নেই৷ পথে নামো৷ পথ তোমাকে নিয়ে যাবে৷’
জাদুকর ঝোলা থেকে একটা কাগজের ঠোঙা বার করল৷ তারপর রুহর সামনে তুলে ধরে বলল, ‘খাও৷’
‘কী আছে?’
‘ছাতুমাখা আর জিলিপি৷ সোনালি রংয়ের জিলিপি দেখে ভারি লোভ হল৷ তাই আনলাম৷’
‘তুমি এগুলো আনতে গিয়েছিলে?’
‘ধুর৷ সারাদিন পথে-পথে ভেলকি দেখালাম৷ দুটো পয়সা রোজগার হল৷ তাই দিয়ে কিনলাম৷’
‘ভেলকি মানে তো লোক ঠকানো!’
‘তা কেন? মানুষ নিজে যা পারে না, তা দেখে আমোদ পায়৷ আর সে আমোদ পাওয়ার জন্য খরচ করতে দ্বিধা করে না৷ এমনিতে তুমি দশজনের কাছে খাবার চাও, ন’জন তোমাকে দেবে না৷ কিন্তু কৌশলে আমোদ দাও, দশজনের ন-জন সেই আমোদ পাওয়ার জন্য নিজের টাকা খরচ করবে৷ জগতে এটাই সত্য৷ ভেলকির কসরতে আমি এই সত্যটারই সুযোগ নিই৷ আর কিছু না৷ নাও, খেয়ে নাও৷’
চাঁদ আজ অনেক দেরিতে উঠল৷ অনর্গল ঝিঁঝি ডাকছে৷ গাছপালার ভিতর থেকে ডাক দিচ্ছে রাতচরা পাখিদের দল৷ পাতাঝরা জঙ্গলে মৃদু চাঁদের আলোয় যে-কোনো মানুষের গা ছমছম করবে৷ কিন্তু জাদুকর ও রুহ নির্বিকার৷ এমন নির্জন আবহ তাদের চিরচেনা৷ গা-সওয়া৷
জাদুকর ও রুহ গুহার একটা বেশ বড়সড় পাথরে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল৷ শোয়ার আগে জাদুকর একটা গোল চাকতি রুহর হাতে দিয়ে বলল, ‘এটা রেখে দাও৷ আগামী সময়ে কাজ দেবে৷’
গোল চাকতিটার ভিতর ঘড়ির মতো একটা কাঁটা অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করছে৷ রুহ বলল, ‘কম্পাস নিয়ে কী করব?’
জাদুকর রসিকতা করে বলল, ‘কম্পাস দার্শনিকের মতো সত্যদ্রষ্টা, জ্ঞানী৷’
জাদুকরের কথায় হেসে উঠল রুহ, ‘মানে?’
‘মানুষ মানুষকে অনেকসময় ভুল দিকে নিয়ে যায়, কিন্তু দার্শনিক ও কম্পাস মানুষকে কখনো ভুল দিকে নিয়ে যায় না৷ একদম ঠিক দিকের নিশানা স্থির করে দেয়৷’
‘দিক তো নাহয় চিনিয়ে দিল, পথটা বলে দেবে কে?’
‘আমি৷ কাল তোমাকে আশ্চর্য এক পথের হদিশ দেব৷ এখন ঘুমিয়ে পড়ো৷ তোমার কথায়—সারাদিন লোক ঠকিয়ে আমি খুব ক্লান্ত৷’
গভীর রাত্রি৷ ভোর হতে অনেক বাকি৷ সমাধিক্ষেত্রের মরচে-পড়া লোহার দরজায় একটু জোরেই চাপ দিল রুহ৷ নিস্তব্ধ রাত্রিতে সামান্য শব্দও জোরে শোনায়৷
দরজা পেরিয়ে প্রাচীন সমাধিগুলোর পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল দক্ষিণ কোণে৷ অনেক বছর রক্ষণাবেক্ষণ হয় না৷ ফলে চারপাশ অগাছায় ভরে গেছে৷ অথচ একসময় বটলব্রাশ, দেবদারু আর ঝাউগাছে ঘেরা সমাধিক্ষেত্রে কত মানুষ আসত! নিঃশব্দে তাদের প্রিয়জনের সমাধিতে ফুল দিত৷ দু-দণ্ড বসত৷ হয়তো মনে-মনে প্রিয়জনের স্মৃতিচারণ করত৷ তারপর একসময় উঠে চলে যেত৷
তিনটে পাহাড়ের ওপারে নতুন তামার খনি খুঁজে পাওয়ায়, এই অঞ্চল শুনশান হয়ে যায়৷ ভাঙা গির্জাটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়৷ গির্জার মতো প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় সমাধিক্ষেত্রটিরও৷ এখানে শেষ কফিনটি এসেছিল ফাদার জনের৷
ভাঙা গির্জা ছেড়ে একমাত্র তিনিই কোথাও যাননি৷ আর, যায়নি রুহ৷ রুহ তখন কিশোর৷ চাইলে নতুন তামার খনিতে কাজের অভাব হতো না৷ কিন্তু আশ্রয়দাতাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো অকৃতজ্ঞ সে নয়৷
পাহাড়তলির শুনশান চত্বরে একাই ঘুরে বেড়াতেন ফাদার৷ সঙ্গে রুহ৷ মাঝে-মাঝেই আপশোস করতেন৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন, ‘সবাই একদিন চলে যায়, তাই না, রুহ?’
অনেকদিন অনেকবার কথাটি শোনার পর রুহ একদিন বলেছিল, ‘আপনি জ্ঞানী মানুষ৷ আপনার মুখে এমন কথা মানায় না, ফাদার৷’
রুহর কথায় হাঁটার-ছড়িতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন ফাদার জন৷ ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘কেন?’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রুহ বলল, ‘খাদ্য হল জীবনের মৌলিক প্রয়োজন৷ ধর্ম হল জীবনের বিলাস৷ স্বাভাবিকভাবেই প্রয়োজনের তুলনায় বিলাসের গুরুত্ব কম৷
‘মানুষ যখন জন্মায়, তখন খিদে নিয়ে জন্মায়৷ ধর্ম নিয়ে নয়৷ খিদের অনুভব জন্মগত৷ একান্ত ব্যক্তিগত৷ সেক্ষেত্রে ধর্ম বহিরাগত৷ এবার আপনিই বলুন, মানুষ কাকে বেশি গুরুত্ব দেবে?
‘আপনি হয়তো ভাবছেন, ধর্মকে তুচ্ছ করে সবাই চলে গেছে, সবাই অধার্মিক হয়ে গেছে? প্রত্যেকেই তার বিশ্বাসকে হৃদয়ে লালন করে৷ বুকের ভিতর বসত বানিয়ে রাখে৷ তাই সবাই, সেই বসত সঙ্গে করেই নিয়ে গেছে৷ বাইরে যে বসত দেখছেন তা স্থূল জীবনের বসত৷ অন্তরের সূক্ষ্ম বসত কেউ কোনোদিন কোথাও ফেলে রেখে যায় না৷’
ফাদার চুপ করে রুহর কথাগুলো মন দিয়ে শুনলেন৷ তারপর বললেন, ‘রাইট, মাই বয়৷ সবই জানি৷ বুঝিও সব৷ কিন্তু...’
‘সবই আপনার কাছ থেকে শেখা, ফাদার৷ আমার খারাপ লাগছে এই ভেবে যে আপনার শেখানো কথা আজ আপনার কাছেই আমাকে উচ্চারণ করতে হচ্ছে৷’
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বৃদ্ধ ফাদার৷ তারপর হঠাৎ বললেন, ‘তুমি রয়ে গেলে কেন? তুমিও তো চলে যেতে পারতে৷’
রুহ মাথা নীচু করল৷ বলল, ‘আপনাকে ছেড়ে আমার যে যাওয়ার উপায় নেই, ফাদার৷ যখন রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে লোকের এঁটোকাঁটা খেয়ে দিন কাটছিল, তখন কে আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল? কে আমার মুখে রুটি দিয়েছিল? সেই মানুষকে ছেড়ে আমি কখনো যেতে পারি? কক্ষনো না, কক্ষনো না৷’
কথাগুলো বলতে-বলতে চোখের পাতা ভিজে উঠল রুহর৷ ফাদার অশক্ত শরীরেই বুকে টেনে নিলেন রুহকে৷ বললেন, ‘আমি নয়, রুহ৷ যা করেছেন, সব যেশাস৷’
‘আমার যিশু আপনিই ফাদার৷ আপনার ভিতরেই আমি তাঁকে প্রত্যক্ষ করেছি৷ তাই তাঁকে আলাদা করে আর চিনতে চাই না৷’
একটি কথাও বিস্মৃত হয়নি রুহ৷ মধ্যরাতের নির্জনে কত কথা জেগে উঠছে মনের ভিতর৷ রুহ খুব আলতো করে হাত বোলাচ্ছে ফাদারের সমাধির ওপর৷ চোখ থেকে ফোঁটা-ফোঁটা অশ্রুবিন্দু শিশিরের মতো ঝরে পড়ছে সমাধিবেদির ওপর৷ যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে ফাদারকে৷ তুষার-শুভ্র কসাক পরিহিত ফাদার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন৷ পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকা পোশাকে সৌম্যসুন্দর প্রৌঢ়৷ বুকের কাছে ঝুলছে পবিত্র ক্রশ৷ প্রথম যেদিন গির্জায় দেখা হয়েছিল, সেদিন খুব মৃদুস্বরে বলেছিলেন, ‘তোমাকে আর কোথাও যেতে হবে না৷ তুমি আমার সঙ্গে থেকো৷’
সেই প্রথম একাত্ম হওয়া৷ অপত্য স্নেহে বড় করেছেন রুহকে৷ অজস্র বই পড়তে শিখিয়েছেন৷ বলতেন, ‘রুহ, পড়ো৷ অবিরাম পড়ো৷ যত পড়বে পৃথিবীর রহস্যময় পথ তোমার সম্মুখে তত স্পষ্ট হয়ে উঠবে৷’
কতরকমের বই যে তাঁর সংগ্রহে ছিল! জ্ঞান-পিপাসু মানুষটির সমস্ত বই পড়ে শেষ করেছে রুহ৷ যে-সব বই পড়ে ঠিকমতো বুঝতে পারত না, রাত জেগে সেই সব বইয়ের জটিল বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে কত সহজভাবে বুঝিয়ে দিতেন রুহকে৷ পৃথিবীজুড়ে অপার শান্তিময় জীবনের স্বপ্ন তিনিই প্রথম দেখতে শিখিয়েছিলেন৷
একদিন এক নিঃসঙ্গ দুপুরে ফাদার রুহকে বললেন, ‘চলো একবার প্রার্থনাকক্ষে যাই৷’
কক্ষে প্রবেশ করতেই জরাজীর্ণ, ভাঙা দেওয়ালের ফাঁক থেকে উড়ে গেল পায়রা ও চড়াইয়ের দল৷ বৃদ্ধ ফাদার বললেন, ‘রুহ দেওয়ালগুলো ভালো করে দেখো৷’
রুহ দেখল দেওয়ালের গায়ে চিত্রমালা৷ যিশুর জীবনের নানা মুহূর্ত আঁকা রয়েছে সমস্ত দেওয়াল জুড়ে৷ কিন্তু সে-সব ছবির রং ভীষণ মলিন৷ অস্পষ্ট, ফ্যাকাসে৷ ফাদার বললেন, ‘তুমি পারবে ছবির ওপর রং বুলিয়ে আবার নতুন করে তুলতে?’
ফাদারের কথায় রুহ বিস্মিত৷ সে জীবনে কোনোদিন রং-তুলি হাতে নেয়নি৷ তাকেই কিনা ফাদার ছবির ওপর রং বোলানোর কথা বলছেন! রুহ বলল, ‘আমি কি পারব, ফাদার? আমি যে কোনোদিন ছবি আঁকিনি!’
‘আমিও তো কোনোদিন কারও কাছে ছবি আঁকা শিখিনি৷ কিন্তু এগুলো তো আমিই একা-একা এঁকেছি৷ মন্দ হয়েছে ছবিগুলো? জানো রুহ, যে প্রকৃত শিল্পী হয়, সে কোনোদিন কোনো ব্যক্তিবিশেষের কাছে কিছুই শেখে না৷ শেখার দরকারও নেই৷ তাকে শিখতে হয় প্রকৃতির কাছে৷ আর, শিখতে হয় নিজের কাছে৷’
‘নিজের কাছে? মানে?’
‘নিজের বোধের কাছে, জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত চেতনার কাছে৷’
রুহর যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল এই অপূর্ব চিত্রমালা ফাদারের আঁকা৷ কিন্তু রুহ জানে, ফাদারের জীবনে কোনো অসত্য নেই৷ ফাদারের প্রতিটি দিন যেন খোলা বইয়ের পৃষ্ঠা৷ কোথাও কোনো আড়াল নেই৷ মিথ্যের কোনো চিহ্ন নেই৷
প্রথমে অসুবিধে হলেও, পরে ওই রং আর তুলিই হয়ে উঠেছিল রুহর প্রতিটি দিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ৷ বেশ কয়েক বছর লেগেছিল সমস্ত ছবিকে পুনরায় নতুন করে তুলতে৷ জীর্ণ দেওয়ালে ছবিগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠায় খুব খুশি হয়েছিলেন ফাদার৷ বলেছিলেন, ‘রুহ, দেখো, আবার সবাই একদিন ফিরে আসবে৷ ক্যারোলে মুখরিত হয়ে উঠবে এই উপাসনা গৃহ৷’
‘নিশ্চয় ফিরবে৷ একদিন আপনার এই আশা, এই স্বপ্ন নিশ্চিত পূরণ হবে৷’
সত্যিই কেউ কোনোদিন আর ফিরবে কি ফিরবে না, তা জানা নেই রুহর৷ কিন্তু এই মুহূর্তে বৃদ্ধ ফাদারের স্বপ্নকে অনিশ্চয়তার কথা বলে আহত করতে মন সায় দিল না৷ বরং সমর্থন করায় ফাদারের মুখে যে নিঃশব্দ-হাসি বিচ্ছুরিত হল তা দেখে রুহর অন্তর এক আশ্চর্য আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠল৷
ক্রমশ জীর্ণ গির্জার মতো ফাদারের শরীরও ভেঙে পড়ল পুরোপুরি৷ রুহ সারাক্ষণ ফাদারের ওপর তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখে৷ সাধ্যমতো সেবাযত্নের ত্রুটি রাখে না৷ শীতের এক পড়ন্ত বিকেলে রুহকে কাছে ডাকলেন ফাদার৷ ফাদারের হাতে একটি হলুদ ক্রিসেনথিমাম৷ রুহ কাছে গিয়ে দাঁড়ালে, চেয়ার থেকে বসেই ফুলটি বাড়িয়ে দিলেন রুহর দিকে৷ তারপর বললেন, ‘আমি জানি তুমি কোনোদিন গাছ থেকে ফুল তোলো না৷ এমনকী কারও কাছ থেকে ফুল গ্রহণও করো না৷ কিন্তু আজ এই ফুলটি তুমি নাও, রুহ৷’
ফুলটা হাতে নিয়ে খুব আশ্চর্য হল রুহ৷ ফাদার এই ফুল পেলেন কোথায়? কাছে পিঠে তো চন্দ্রমল্লিকা ফুলের কোনো গাছ নেই! তাছাড়া, ফাদারের যা শারীরিক অবস্থা, তাতে নিজে থেকে কোনোভাবেই ফুল সংগ্রহ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব৷ রুহ জিগ্যেস করল, ‘আপনি এই ফুল কোথায় পেলেন, ফাদার?’
রুহর কথায় তাঁর পাণ্ডুর ঠোঁটে ফুটে উঠল মৃদু হাসি৷ কোনো জবাব দিলেন না৷ বললেন, ‘গুড বাই, মাই চাইল্ড৷ গুড বাই৷’
পুরো ব্যাপারটাই রুহর কাছে হেঁয়ালি বলে মনে হল৷ কিছুই আন্দাজ করতে পারল না৷
পারল মধ্যরাতে৷ যখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন ফাদার জন৷ পরদিন দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন সংগ্রহ করে ফাদারের কফিনটি এনেছিল এই সমাধিক্ষেত্রে৷ সেই থেকেই রুহ মাঝে-মাঝে এসে দেখা করে যায় ফাদারের সঙ্গে৷
তবে আজকের আসার কারণটা সম্পূর্ণ ভিন্ন৷ সমাধিবেদিতে হাত বোলাতে-বোলাতে রুহ বলল, ‘আপনাকে ছেড়ে আমাকে আজ চলে যেতে হচ্ছে, ফাদার৷ একদিন আপনি আমাকে যে-স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, একদিন আমাকে শিল্পী হওয়ার পথে নামিয়ে পায়ে ধুলো মাখতে বলেছিলেন, আমি সেই পথে রওনা হচ্ছি৷ আপনি আশীর্বাদ করুন আমি যেন সফল হতে পারি৷’
এখনো পুরোপুরি ভোর হয়নি৷ তবে গাছপালায় পাখিদের ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেছে৷ রুহ চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল৷ বেরোনোর সময় দেখে এসেছে গুহার ভিতর জাদুকর অকাতরে ঘুমোচ্ছে৷ এখনো তো ভোর হয়নি৷ এত তাড়াতাড়ি নিশ্চয় ঘুম ভাঙবে না জাদুকরের৷ আর যদি ঘুম ভেঙে যায়? যদি ঘুম ভেঙে তাকে দেখতে না-পায়? সাতপাঁচ ভাবনায় মন অস্থির হয়ে উঠল রুহর৷ রুহ সমাধিক্ষেত্র ছেড়ে বাইরে এল৷ অল্প সমতল পার হয়ে একটা পাথুরে টিলার বাঁক ঘুরে জঙ্গলের দিকে দ্রুত হাঁটতে থাকল৷
পা দুটো বেশ ফোলা৷ ব্যথায় অসাড় হয়ে গেছে৷ কে যেন শরীর থেকে সমস্ত শক্তি শুষে নিয়েছে৷ আলতো করে চোখ মেলল রুহ৷ কমলা রংয়ের আকাশে উড়ে আসা পাখিদের দল পাহাড়ের গায়ে গাছপালার মধ্যে মিশে যাচ্ছে৷ এইসব স্বপ্ন নাকি সত্যি—স্পষ্ট বুঝে উঠতে পারছে না রুহ৷ শুধু জলের শব্দই যেন তাকে এখন জাগিয়ে রাখতে চাইছে৷
নির্জন এই পাহাড়ের তলদেশে যে গাছের নীচে রুহ পড়ে আছে, তার ঠিক পাশেই পাহাড়ি নদীটা বয়ে যাচ্ছে৷ জল খুব কম নয়৷ স্রোতও তীব্র৷ পাথুরে নদীখাতে জলের ঝাপটা দিতে-দিতে দূরের পাহাড়ি বাঁকে নদীটা উধাও হয়ে গেছে৷
ঠিক কতদিন হল জাদুকরের নির্দেশ করা গন্তব্যের উদ্দেশে পথ চলা শুরু হয়েছে—এই মুহূর্তে মনে পড়ল না৷ চিন্তাশক্তিও যেন ঘোলাটে হয়ে গেছে৷ শুধু এইটুকু মনে আছে—তিনটে পাহাড় পার হয়ে প্রথম নদীর কাছে পৌঁছেছে৷ পথশ্রমে, ক্লান্তিতে শরীর যেন চলছিল না৷ দুপুরে এই গাছের নীচে এসে দাঁড়াতেই সারা শরীর কাঁপছিল৷ কোনোরকমে গাছের নীচে বসতেই জ্ঞান হারিয়ে ছিল রুহ৷ একবার মাথা তোলার চেষ্টা করল৷ পারল না৷ মাথাটা অসম্ভব ভারী৷ ক্রমশ চোখের সামনে দৃশ্যগুলো যেন কাঁপছে৷ চোখ বন্ধ করল রুহ৷
চোখ যখন খুলল, দেখল তার ওপর আবছায়া একটি মুখ ঝুঁকে আছে৷ সেই আবছায়া মুখটি জিগ্যেস করল, ‘এখন কেমন লাগছে?’
রুহ কোনো উত্তর দিল না৷ বলা ভালো কণ্ঠ থেকে কোনো আওয়াজ বেরোল না৷ অস্ফুটে কেবল ঠোঁট দুটো নড়ল৷ পরক্ষণে টের পেল তার দু-ঠোঁটের ফাঁকে কে যেন কিছুটা হালকা গরম তরল ঢেলে দিল৷ চোখ দুটো আবার বন্ধ করল রুহ৷
তিনদিন পর ভালো করে চোখ মেলল৷ চোখের সামনে সমস্ত কিছু স্পষ্ট হল ক্রমশ৷ কিন্তু এখানকার সবকিছু অচেনা লাগছে কেন? সে দেখল, একটা তাঁবুর ভিতর খাটিয়ায় শুয়ে আছে সে৷ গলা পর্যন্ত কম্বলে ঢাকা৷ বাইরে কীসের যেন কোলাহল ভেসে আসছে৷ কিছুক্ষণ পর একটি মেয়ে তাঁবুর ভিতর এল৷ রুহ উঠে বসার চেষ্টা করতেই মেয়েটি তাকে ধরে বসিয়ে দিল৷ আচ্ছন্নদশা কাটলেও রুহ বুঝল তার শরীর যথেষ্ট দুর্বল৷ মাথা ঝিমঝিম করছে৷ মেয়েটি পাশে বসে জিগ্যেস করল, ‘কেমন লাগছে?’
রুহর শুকনো ঠোঁটে আলতো হাসি দেখা দিল৷ বলল, ‘ভালো৷’
মেয়েটি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘এত জ্বর এসেছিল, মনে হচ্ছিল তুমি বাঁচবে না৷ নদীর ধারে পড়ে থাকলে নির্ঘাত মরেই যেতে! তোমার ভাগ্য ভালো যে ভুট্টা তোমাকে দেখতে পেয়েছিল৷’
‘ভুট্টা?’
‘আমার কুকুর৷ সাপের সন্ধানে গিয়েছিলাম৷ সাপের বদলে তোমাকে পেলাম৷ তারপর তোমাকে আমাদের তাঁবুতে নিয়ে এলাম৷’
মেয়েটির কথা শুনতে-শুনতে কৃতজ্ঞতায় চোখে জল চলে এল রুহর৷ রুহ জিগ্যেস করল, ‘কী নাম তোমার?’
‘জেমিনি৷’ জবাব দিল মেয়েটি৷
ফরসা রং৷ টিকালো নাক৷ নাকে ঝিকমিকে সাদা ছোট্ট নাকফুল৷ কালো সালোয়ারের ওপর লাল দোপাট্টায় জেমিনি বেশ সপ্রতিভ৷
এমন সুন্দর চেহারার মেয়েটির সঙ্গে সাপ খোঁজার ব্যাপারটা কিছুতেই মেলাতে পারছিল না রুহ৷ জিগ্যেস করল, ‘সাপ নিয়ে কী যেন বলছিলে?’
‘সাপ খুঁজতে বেরিয়েছিলাম৷’
‘সাপ! কেন?’
রুহর কথায় জেমিনি হো-হো করে হেসে উঠল৷ তারপর বলল, ‘অবাক হওয়ার কী আছে? আমরা সাপ ধরি৷ সাপের বিষ বিক্রি করি৷ সাপ নিয়েই তো আমাদের জীবন! তাছাড়া এই পাহাড়-মরুভূমি সংলগ্ন জনপদ থেকে জনপদে গানবাজনা করি৷ নাচ দেখাই৷ সাপের খেলা ছাড়াও আরও কতরকমের খেলা আমাদের জানা! সেইসব খেলা দেখতে মানুষ ভিড় করে৷ আমোদ পায়৷ আমাদের রোজগার হয়৷ তবে কোনো জায়গায় আমরা বেশিদিন থাকি না৷ খুব বেশি হলে এক পক্ষকাল৷ তারপর তাঁবু গুটিয়ে আবার অন্য জনপদের দিকে রওনা হই৷’
বাইরে কে একজন ডাক দেওয়ায় জেমিনি বাইরে চলে গেল৷ রুহ জেমিনির কথাগুলো ভাবতে থাকল৷ ক্রমশ তার কাছে স্পষ্ট হল—এরা সাপুড়ে-যাযাবরের দল৷
রুহ নিজেই উঠে বসল৷ সকালে সেই যে জেমিনি বেরিয়ে গেছে, এখনো আসেনি৷ মাঝের কয়েক ঘণ্টায় রুহ অনেক সুস্থবোধ করছে৷ সবচেয়ে বড় কথা মনের জোর ফিরে এসেছে৷
দুপুর নাগাদ জেমিনি এল৷ এসেই বলল, ‘তিনদিন সেভাবে পেটে কিছুই পড়েনি৷ চলো, তোমাকে স্নান করিয়ে দিই৷ তারপর কিছু খাও৷ শরীরে বল পাবে৷’
রুহ জেমিনির সঙ্গে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এল৷ সঙ্গে ঝোলাটা নিতে ভুলল না৷ জেমিনি বলল, ‘ঝোলা নিচ্ছ কেন? এমন অসুস্থ শরীর নিয়ে তুমি তো আর এক্ষুনি চলে যাচ্ছ না৷’
‘অভ্যেস৷ আর কিছু না৷’ বলে মৃদু হাসল রুহ৷
বাইরে বেরিয়ে বুকটা আনন্দে ভরে উঠল৷ যেন কতকাল বন্দি হয়ে কোনো গরাদের ভিতর আটকে ছিল৷ এইমাত্র মুক্তি পেল৷ একদিকে পাহাড়৷ পাহাড়ের ঢালে গাছপালা৷ অন্যদিকে মরুভূমি৷ ধু-ধু বালির ওপর ছোটখাটো কাঁটাঝোপ৷ অল্পবিস্তর ক্যাকটাস৷ রুহ মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল৷ মাথার ওপর ঘন নীল আকাশ৷ আকাশে শিমুলতুলোর মতো পেঁজা মেঘ৷ চারপাশ ঝলমল করছে সোনালি রোদে৷ রুহর মনে পড়ল—জাদুকর বলেছিল, তিনটে পাহাড়ের পর প্রথম নদী, নদী পার হলে মরুভূমি৷ তবে এই মরুভূমি কচ্ছপের মতো৷ শুধু গলার অংশটাই আড়াআড়ি পার হতে হবে৷ ফলে মরুভূমি পার হতে বেশি সময় লাগবে না৷ খুব বেশি হলে দু-দিনের পথ৷ মাঝে একটা মরুদ্যানও রয়েছে৷ মরুভূমির সরু অংশটা পার হওয়ার সময় সেখানে সবাই বিশ্রাম নেয়৷
রুহ বুঝল, সে জাদুকর নির্দেশিত মরুভূমির প্রান্তে এসে পৌঁছেছে৷ পাহাড় ঘেঁষা বালির ওপর তাঁবু৷ পাহাড়ের গা থেকে শুরু হয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত বালির সাম্রাজ্য৷ মাঝখানে অনেকটা জায়গা ফাঁকা রেখে তার চারপাশে গোলাকার তাঁবুগুলো টাঙানো হয়েছে৷ মাঝের ফাঁকা জায়গাটা উঠোনের মতো৷ সেখানেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সবাই নানান কাজে ব্যস্ত৷
রুহ একটা ব্যাপারে বিস্মিত হল, সচরাচর দেখে এসেছে গৃহস্থালির কাজ মেয়েরা করে৷ বাইরের কাজগুলো পুরুষদের জন্য বরাদ্দ৷ কিন্তু এখানে ঠিক উলটো৷ দু-জন পুরুষ বড় চুলোয় চাপাটি বানাচ্ছে৷ একজন পুরুষ রান্নার সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখছে৷ অন্য কয়েকজন শুকনো কাঠ জড়ো করছে, তাঁবুর বাইরে জিনিসপত্র গোছগাছ করছে৷ অন্যদিকে দু-জন তরুণী ছোটছোট ছেলেমেয়েদের সাপ নিয়ে খেলা শেখাচ্ছে৷ কিছু বয়স্কা মহিলা গোল হয়ে বসে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে৷ ব্যাপারটাতে বিস্ময়বোধ করলেও জেমিনির কাছে তা প্রকাশ করল না৷ বরং লক্ষ করল জেমিনিরি সঙ্গে তাকে দেখে কারও চোখে তেমন কোনো কৌতূহলের চিহ্ন নেই, জিজ্ঞাসা নেই৷ কৌতূহল নেই দেখে রুহ স্বস্তিবোধ করল৷ নাহলে অচেনা সব চোখের কাছে সংকোচ হতো৷
জেমিনি বলল, ‘চলো, নদী থেকে স্নান করিয়ে আনি৷ গায়ে জল পড়লে শুধু শরীর নয়, মনও সতেজ হবে৷’
রুহর সঙ্গে জেমিনিকে তাঁবুগুলোর ফাঁক দিয়ে হাঁটতে দেখেই কোথা থেকে যেন ভুট্টা দৌড়ে এসে সঙ্গী হল! জেমিনির সঙ্গে বালুর অংশটা অতিক্রম করে পাহাড়ের ঢালে উঠে এল রুহ৷ নীচে নদী৷ জলের শব্দ শোনা যাচ্ছে৷
নদীর কিনারে পৌঁছে জলের পাশে একটি পাথর দেখিয়ে জেমিনি বলল, ‘এখানে বসে স্নান করে নাও৷ জলে টান আছে, নেমো না৷ তুমি স্নান করো, আমি একটু পরে আসছি৷’
রুহর পাশে ঝোলাটা রেখে জেমিনি চলে গেল৷ পিছনে দৌড় দিল ভুট্টাও৷ জেমিনির গমনপথের দিকে নিশ্চুপভাবে তাকিয়ে থাকল রুহ৷ আশ্চর্য এক কৃতজ্ঞতা ও ভালোলাগায় তার মন আর্দ্র হয়ে উঠল৷ মনে মনে ভাবল, এই পৃথিবীতে আপাতভাবে সবকিছুকে আলাদা-আলাদা মনে হলেও, সমস্ত কিছুর ভিতরেই একটা টানের সম্পর্ক রয়েছে৷ তা না-হলে, তার মতো মৃতপ্রায় এক যুবককে কেন এক তরুণী নির্দ্বিধায় নিজের তাঁবুতে তুলে নিয়ে গিয়ে শুশ্রূষা করবে? সুস্থ করে তুলবে? এ কি তবে প্রাণের গভীরে থাকা প্রাণের টান?
এই মুহূর্তে জাদুকরের কথাটা আবার মনে পড়ল৷ প্রবলভাবে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হল তার কথাগুলো৷ জাদুকর বলেছিল, কোটি-কোটি বছর ধরে যে সৌরজগতের সৃষ্টি হয়েছে, সূর্যকে মাঝখানে রেখে গ্রহের দল, গ্রহদের কেন্দ্র করে উপগ্রহের দল যে নিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে, তা কি এমনি? ওই টান, নিঃশব্দ টান৷ ভালোবাসার টান, অন্তরের টান৷
স্নান করার পর রুহ যেন শরীরে শক্তি ফিরে পেল৷ খুব আরামবোধ হচ্ছে৷ কিন্তু কাছেপিঠে কোথাও জেমিনিকে দেখতে পাচ্ছে না৷ রুহর ঠোঁটে অজান্তেই মৃদু হাসি খেলে গেল৷
নিজের ঝোলা থেকে রং-তুলি আর একটুকরো কাগজ বার করল৷ তারপর চোখ বন্ধ করে জেমিনির মুখটা মনে করে কাগজের ওপর তুলির টান দিতে শুরু করল৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখল—কাগজের ওপর জেমিনি পাতলা ঠোঁট বাঁকিয়ে অদ্ভুত মিষ্টি চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে৷
রুহ আঁকায় এতই মগ্ন ছিল যে খেয়াল করেনি কখন জেমিনি তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে৷
‘তুমি এত সুন্দর ছবি আঁকতে পারো?’ জেমিনির গলায় চূড়ান্ত উচ্ছ্বাস৷
ঘাড় ফেরাল রুহ৷ জেমিনি মাটি থেকে ছবির কাগজটা হাতে তুলে উচ্ছল ভঙ্গিতে তিন পাক নেচে নিল৷ নির্জন এই পাহাড়ি নদীর চরে, শব্দময় এই জলের কিনারে যেন এই মুহূর্তে এক অলৌকিক দৃশ্যের জন্ম হল সামান্য এক ছবিকে কেন্দ্র করে৷ রুহর ভিতরে প্রবল আনন্দ হল, সাধারণ একখানা ছবিতে জেমিনি এত খুশি হয়েছে বলে৷ রুহ বলল, ‘তোমাকে আরও একটা ছবি এঁকে দেব৷ সেই ছবিতে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে দেখতে পাবে৷ এখানে তো অর্ধেক রয়েছ৷’
চোখ বড়-বড় করে জেমিনি বসে পড়ল রুহর পাশে৷ তারপর বলল, ‘আরও আঁকবে?’
‘হ্যাঁ৷’
স্পষ্টতই খুব খুশি হল জেমিনি৷ রুহ ভাবেনি তার ছবি পেয়ে এত উচ্ছল হয়ে উঠবে মেয়েটি৷ জেমিনি গাছের পাতায় বানানো একটা মোড়ক রুহর সামনে রাখল৷ মোড়ক খুলতে দেখা গেল তার ভিতর চাপাটি ও আচার রয়েছে৷ জেমিনি বলল, ‘খাও৷’
এমনিতেই খিদে পেয়েছিল৷ সামনে গরম চাপাটি দেখে খিদে যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল৷ রুহ খাওয়া শুরু করল৷ জেমিনি নিজের ছবিটির দিকে তাকিয়ে রুহকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি হাওয়া নাকি সূর্য?’
‘মানে?’ এমন অদ্ভুত প্রশ্নে বিস্মিত রুহ।
জেমিনির ঠোঁটে রহস্যময় হাসি৷ বলল, ‘হাওয়া ও সূর্য হল দু-জন পুরুষ৷ ওরা প্রেমিক৷ আর, ভূমি হল নারী৷ ওদের প্রেমিকা৷ আমাদের কাছে সমস্ত সৃষ্টিই হল এই তিনজনের প্রেমের ফসল৷ সঙ্গমের শস্য৷’
এমন অদ্ভুত কথা রুহ আগে কখনো শোনেনি৷ রুহ বলল, ‘কার কাছে এমন আজগুবি গল্প শুনেছ!’
‘আজগুবি কেন হবে! একদম সত্যি৷’ জেমিনির চোখে খেলা করছে সরল বিশ্বাসের আলো৷
তর্ক করে জেমিনির সরল বিশ্বাসে আঘাত দিতে রুহর ইচ্ছে করল না৷ অন্যদিকে কথাগুলো মেনে নিতেও মন সায় দিচ্ছে না৷ রুহ চুপ করে খেতে থাকে৷ জেমিনি বলে, ‘গোষ্ঠীর পরম্পরায় এটাই আমাদের বিশ্বাস৷ হাওয়া হল মিষ্টি প্রেমিক৷ কাছে আসে৷ নরম স্বরে প্রণয় জানায়৷ ভালোবাসে৷ তারপর চলে যায়৷
আর, সূর্য হল রুদ্র প্রেমিক৷ বলশালী৷ খানিক কর্কশ৷ কিন্তু হৃদয়ে খুব খাঁটি৷ রোদ্দুর হয়ে কাছে আসে৷ ভালোবাসে৷ তারপর চলে যায়৷ আসলে পুরুষ মাত্রেই হল অস্থিরমতি৷ নারীদের মতো এত ধৈর্য ওদের নেই৷ দেখো না—ভূমি কত শান্ত, কত স্থৈর্য নিয়ে জীবজগৎকে লালন করে, আশ্রয় দেয়!
সূর্যের রোদ আর হাওয়ার আদরেই এই ভূমি সকল সৃষ্টির আধার৷ সুজলা, সুফলা৷’
জেমিনির কথা শুনে রুহ কৌতুক করে বলল, ‘সূর্য আর হাওয়ার মধ্যে ভূমিকে নিয়ে বিরোধ হয় না? দু-জন প্রেমিক কিন্তু প্রেমিকা তো ওই একজন? ধরো, ভূমির সঙ্গে কেউ ঘর বাঁধতে চাইল, গৃহস্থালির স্বপ্ন দেখল, তখন তো স্বাভাবিকভাবেই বিরোধ অনিবার্য, তাই না?’
‘ভূমি বিবাহে বিশ্বাস করে না৷ তাই আমরাও করি না৷ আমাদের জনজাতির মধ্যে বিবাহের চল নেই৷’
‘তোমাদের পূর্বপুরুষ কেউ বিবাহ করেনি?’ এবার সত্যিই রুহ স্তম্ভিত।
‘না৷ আমরা মনে করি, বিবাহ যৌন-মালিকানার জন্ম দেয়৷ শৃঙ্খলিত করে৷’
‘তাহলে তোমাদের প্রজাতি রক্ষিত হয় কীভাবে?’
‘ভালোবাসার সঙ্গমে৷ পারস্পরিক ইচ্ছে থেকে জাত যৌনতায়৷ আমাদের সমাজে নারী-পুরুষ, উভয়কেই অন্যের ইচ্ছে-অনিচ্ছেকে পূর্ণ সম্মান দিতে হয়৷ তা না-হলে একমাত্র শাস্তি সাপের ছোবল৷ অনিবার্য মৃত্যু৷
সাপ হচ্ছে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ৷ আমরা বিশ্বাস করি—আমাদের জন্ম, আমাদের মৃত্যু সবই সাপ নিয়ন্ত্রণ করে৷’
‘অর্থাৎ বেদে সম্প্রদায়?’
রুহর কথায় খানিক ক্ষুণ্ণ হল জেমিনি৷ বলল, ‘না, আমরা বেদে নই৷ ওরা আমাদের চেয়ে অনেক নীচু সম্প্রদায়৷ আমরা তা নই৷ আমাদের এক অন্য ইতিহাস আছে৷’
‘কীরকম?’
‘আমরা সূর্যসাপ উপজাতি৷ বিষকন্যাদের কাহিনি জানো?’
‘অল্প শুনেছি৷’
‘আমাদের সম্প্রদায়ের নারীরা জগতের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী ছিল৷ ছিল কেন, এখনো আছে৷ আমাদের শিশুকন্যাদের জন্মের পর একদিন বয়স থেকে নির্দিষ্ট মাত্রায় বিষপান করানো হতো৷ সে যখন পূর্ণ যুবতী হয়ে উঠত, তখন তার চুম্বন বিষধর সাপের চেয়েও মারাত্মক হয়ে উঠত৷ রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য শত্রুপক্ষের রাজা, রাজ-প্রতিনিধিদের ধ্বংস করার জন্য তারা কাজ করত৷’
‘অর্থাৎ এক-অর্থে তোমাদের নারীরা ব্যবহৃত হতো৷’
‘না৷ এটা আমাদের সম্প্রদায়ের গৌরবময় অতীত৷ নিজেদের ভূখণ্ড, নিজেদের স্বাধীনতা, নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে আমাদের সংগ্রামের কৌশল৷’
জেমিনির কথাগুলোকে আর হালকাভাবে নিতে পারল না রুহ৷ ক্রমশ মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল জেমিনির কথায়৷ রুহ আচমকা বলল, ‘তুমি বিষকন্যা নও তো?
রুহর কথায় খিলখিল করে হেসে উঠল জেমিনি৷ তারপর বলল, ‘আমাদের মধ্যে এখন আর বিষের সন্ততি নেই, সব নারীরাই ভূমির সন্ততি৷ বিষকন্যাদের কাহিনি অনেক পুরোনো৷
এখন আমরা বাউন্ডুলে রোদ আর হাওয়ার মতো পছন্দসই প্রেমিক পেলে তাদের ভালোবাসার শস্য ধারণ করে ভবিষ্যৎ সময়ের দিকে এগিয়ে যাই৷’
কথাটা শেষ হতে না হতেই দূরে নদীর বাঁকের দিকে আঙুল তুলে রুহর দৃষ্টি আকর্ষণ করল জেমিনি৷ নদীর ওপর দিয়ে একটি নৌকো ভেসে চলেছে৷ নৌকোটা দেখিয়ে জেমিনি বলল, ‘নৌকোটা ভালো করে দেখো৷’
রুহ দেখল নৌকোয় তিনজন সওয়ারি৷ সওয়ারিসহ নৌকোটা ভেসে চলেছে নদীর স্রোতে৷ জেমিনি জিগ্যেস করল, ‘কী দেখলে?’
রুহ বলল, ‘একটা নৌকো তিনজন সওয়ারিকে নিয়ে জলস্রোতে ভেসে চলেছে৷ এতে দেখার কী আছে!’
হাসল জেমিনি৷ তারপর বলল, ‘নৌকোটা হচ্ছে মাতৃলিঙ্গ৷ আর, সওয়ারিরা হল প্রাণের সংকলন৷ আমরা নারীরা এভাবেই জগৎময় সৃষ্টির স্পন্দনকে ধারণ করে সময়ের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছি৷’
রুহ স্তব্ধ হয়ে গেল৷ ভালো করে তাকাল জেমিনির মুখের দিকে৷ রুহর চোখজোড়া যেন এই মুহূর্তে সম্মোহিত হয়ে আটকে গেল জেমিনির দুই চোখে৷ পড়ন্ত বিকেলের হলদে আলোয় কয়েক মুহূর্ত পর জেমিনির দুই চোখের পাতা নিভে এল৷ পাহাড়ি নদীর পাশে নির্জন উপত্যকায় রুহ যেন অন্য আর-এক রূপে জেমিনিকে আবিষ্কার করল—এই নারী যেন চেনা পৃথিবীর কেউ নয়, অচেনা এক অলৌকিক নগরের অপার্থিব কোনো নারী!
রুহর সম্বিত ফিরলে জেমিনি বলল, ‘চলো, তাঁবুতে ফেরা যাক৷’
জেমিনির পাশে রুহ হাঁটছে৷ পাহাড়ের ঢাল ধরে ধীরে-ধীরে এগোচ্ছে মরুর দিকে৷ সঙ্গে ভুট্টা৷ পিছনে পড়ে থাকল একাকী নদী, গাছপালাময় পাহাড়ি উপত্যকা, পড়ন্ত বিকেল৷ পড়ে থাকল ভিনদেশি এক তরুণীর চোখে চোখ রেখে আর-এক ভিনদেশি যুবকের মুগ্ধ হওয়ার কয়েকটি লাবণ্যময় মুহূর্ত৷
‘সূর্য প্রেমিক হিসাবে খুব খর৷ বছরের একটা সময় তো এই মরু, এই পাহাড়-জঙ্গল, গাছপালাকে প্রায় ঝলসে দেয়! অবশ্য আমরা তাতে কিছু মনে করি না৷ আচ্ছা, দুনিয়াতে এমন কী আছে বলো তো, যার সমস্ত কিছুই ভালো, তিলমাত্র মন্দ নেই?’ প্রশ্ন করল জিজা-আম্মা৷
বয়স, আন্দাজ একশোর কাছে৷ অথচ শরীরে সেভাবে বার্ধক্যের চিহ্ন নেই৷ কপালে কয়েকটি বলিরেখা৷ শরীরের ত্বক শিথিল হয়নি৷ কেবল চোখ দুটো অন্ধ৷ জিজা-আম্মা কোনো ব্যক্তি-বিশেষের নাম নয়৷ সূর্যসাপ উপজাতির সবচেয়ে বয়স্কা নারীকে জিজা-আম্মার সম্মান দেওয়া হয়৷ জন্মসূত্রে পাওয়া নামটি তখন সাপের খোলসের মতোই তাকে পরিত্যাগ করতে হয়৷
জিজা-আম্মা হয়ে ওঠে জনজাতির প্রধান৷ তার কথাই গোষ্ঠীর কাছে শেষ কথা৷ তার বিচারই শেষ বিচার৷ ভ্রাম্যমান এই জনজাতি পক্ষকাল অন্তর কোথায় তাঁবু ফেলবে, সেজন্যও জিজা-আম্মার নির্দেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়৷ এমনিতে এই উপজাতি যে কতখানি শৃঙ্খলাপরায়ণ তা এদের সঙ্গে থেকেই রুহ বুঝেছে৷ ফলে জিজা-আম্মার দায়িত্ব পালনে গোষ্ঠীর প্রবীণ নারীটিকে তেমন ঝক্কি পোহাতে হয় না৷ রেওয়াজ শুধু একটাই—এই উপজাতির প্রধান কোনো পুরুষ হতে পারে না৷ দলের সবচেয়ে প্রবীণ মহিলাই জিজা-আম্মা হয়৷ তার মৃত্যু হলে পরবর্তী বয়স্কা মহিলা জিজা-আম্মার দায়িত্বে আসবে৷
জিজা-আম্মার প্রশ্নের উত্তরে রুহ চুপ করে থাকে৷ কারণ কথাটা তো সত্যি—পৃথিবীতে এমন কিছুই নেই যার সমস্তটা ভালো অথবা যার সবটুকুই মন্দ৷ রুহর কাছে উত্তর নেই বুঝে জিজা-আম্মা বলল, ‘আমরা যদি প্রেমিকের আদরকে অন্তর থেকে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে তার রাগকে গ্রহণ করার মতো সহ্য-ক্ষমতা থাকবে না কেন? অবশ্য আমাদের জনজাতিতে এটা শুধু প্রেমিকের ক্ষেত্রেই নয়, প্রেমিকার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য৷
এই তো দেখো না—ভূমি কত শান্ত, কত সহনশীল কিন্তু রাগ হলে সে-ও তো কেঁপে ওঠে৷ কত পাহাড়-জঙ্গল, কত গ্রাম কত জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে যায়৷ যায় না?’
‘কিন্তু সাপের ব্যাপারটা তো বুঝতে পারলাম না!’ প্রসঙ্গ তুলল রুহ৷
জিজা-আম্মার অন্ধচোখের বন্ধ-পাতার নীচে চোখের তারা নড়াচড়া করল৷ ফলে চোখের পাতার পাতলা ত্বক অল্প আন্দোলিত হল৷ জিজা-আম্মা বলল, ‘তোমাকে তো আগেই বলেছি কীভাবে সাপ আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে৷ আমাদের কাছে সাপের চেয়ে সুন্দর আর কিছুই নেই৷ ফণা তোলা সাপের দুলুনি দেখেছ? দুনিয়ার যে-কোনো নর্তকী হেরে যাবে৷
ফণা-মেলা সাপের সৌন্দর্য আমাদের শরীরে যুগের পর যুগ ধরে প্রবাহিত৷ শুধু তাই নয়, সাপকে আমরা ভাবি আমাদের দীর্ঘ আয়ুরেখার প্রতীক৷ তাই দেখো—কী নারী কী পুরুষ—আমাদের এই সূর্যসাপ জনজাতির মানুষেরা শারীরিকভাবে যেমন বলিষ্ঠ ও সুন্দর, তেমনই দীর্ঘায়ু৷’
‘আর হাওয়া? হাওয়াকেও তো তোমরা প্রেমিক বলে মনে করো!’
‘তা করি৷ আমাদের জনজাতির প্রাচীন গল্পে হাওয়াও আমাদের প্রেমিক৷ কিন্তু সে অদৃশ্য থাকে৷ স্পর্শ করে, কিন্তু দেখা দেয় না৷ তার এই স্বভাবের জন্যই আমাদের পূর্বজরা তাকে সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করলেও, তাকে প্রেমিক হিসাবে স্বীকার করলেও, জনজাতির নামের সঙ্গে যুক্ত করে তাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়নি৷’
এতক্ষণে রুহ তার কৌতূহলের উত্তর পেল৷ জেমিনিকে জিগ্যেস করেছিল, কিন্তু সে এত প্রাঞ্জলভাবে তাদের জনজাতির প্রাচীনগাথা বলতে পারেনি৷ জেমিনিই তাকে জিজা-আম্মার কাছে জিজ্ঞাসা করতে বলেছিল৷
প্রায় বারোটি পক্ষকাল পার হয়ে গেছে৷ ভিনদেশি রুহ যেন এখন এই জনগোষ্ঠীরই গুরুত্বপূর্ণ একজন৷ বিপদে-পড়া বহিরাগতদের এরা আশ্রয় দেয়, কিন্তু তার মেয়াদ স্বল্প৷ বিপদমুক্ত হলেই জিজা-আম্মার নির্দেশে তাদের চলে যেতে হয়৷ কিন্তু রুহর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটল অন্য৷ তার একমাত্র কারণ রুহর আঁকার দক্ষতা৷
খেয়ালের বশে রুহ একদিন একটি তাঁবুর ওপর ছবি আঁকছিল৷ হলদে-ফ্যাকাসে তাঁবু রঙিন হয়ে উঠেছিল৷ রুহর এই ক্ষমতার কথা জিজা-আম্মার কানে পৌঁছাতে সময় লাগেনি৷ তখন জিজা-আম্মাই অনুরোধ করে বাকি তাঁবুগুলোকে রঙিন করে দেওয়ার জন্য৷
জিজা-আম্মার অনুরোধ শুনে রুহ নিজস্ব একটা পরিকল্পনা করে৷ সে ভাবে এই উপজাতির যে-কাহিনি শুনেছে, সেগুলোই ধারাবাহিকভাবে তাঁবুগুলোর গায়ে আঁকবে৷ রুহর পরিকল্পনা জেনে জেমিনি খুশিতে আটখানা৷ তার পর জেমিনির পরামর্শেই রুহ জিজা-আম্মার কাছে যায়৷ জিজা-আম্মার কাছে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে প্রাচীন আখ্যানগুলো জেনে রুহ একের পর এক তাঁবু রঙিন করতে থাকে৷
গোষ্ঠীর সকলের কাছে রুহর মর্যাদা বেড়ে যায়৷ তাঁবুগুলোকে রঙিন করার পাশাপাশি রুহ গাছের বাকল সংগ্রহ করে, তা শুকিয়ে রং দিয়ে নানান মুখোশ তৈরি করেছে৷ রংবাহারি সেইসব মুখোশ পরে দলের লোকজন যখন গানবাজনা করে, সাপের খেলা দেখায়, শারীরিক কসরত প্রদর্শন করে, তখন দর্শক হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ে৷ ফলে আগের চেয়ে দলের রোজগারও বেড়ে গেছে বহুগুণ৷ তাই রুহ আজ তাদের খুব কাছের মানুষ৷ ভিনদেশি, ভিনগোষ্ঠীর মানুষ হওয়া সত্ত্বেও রুহ আজ তাদেরই একজন৷
সবমিলিয়ে প্রায় সত্তরটি তাঁবু আছে৷ এত তাঁবু রুহর একার পক্ষে রং করা অসম্ভব। তাই সে দলের বেশ কয়েকজনকে ছবি আঁকার তালিম দিচ্ছে৷ মুখোশ বানিয়ে রং চড়ানোর কৌশল শেখাচ্ছে৷ কোনোকিছু শেখার ব্যাপারে এদের সহজাত দক্ষতা দেখে রুহ বিস্মিত৷ দ্বিগুণ উৎসাহে সে একটি বিশেষ শিল্পীদল গঠন করেছে৷ যারা আগামী সময়ে নিজেদের বেঁচে-থাকা, নিজেদের জীবনধারাকে রঙিন করে রাখবে৷
বিশেষ করে, এই ক-দিনে আলামিন ও সুমাইয়া খুব দক্ষ শিল্পী হয়ে উঠেছে৷ এরা শুধু রুহর ইশারার অপেক্ষায় থাকে৷ সহজেই রুহর ইঙ্গিত বুঝতে পারে৷ ফলে রুহর পরিশ্রম অনেক কমে গেছে৷
শুধু যে রুহই এদের শেখাচ্ছে, তা নয়৷ নিজেও শিখেছে৷ আলামিনের বাজনায় দর্শক মোহিত হয়ে যায়৷ ঢোলকের ওপর সে এত মিষ্টি করে আঙুলের টোকা দিতে পারে যে, যারা আলামিনের বাজনা শুনেছে তারা সবাই একবাক্যে স্বীকার করে—হ্যাঁ, ছোকরার এলেম আছে বটে!
আলামিন রুহর কাছে ছবি আঁকা শেখে৷ রুহ আলামিনের কাছে শেখে ঢোলক বাজানো৷
রুহ এদের একটি বিশেষত্ব লক্ষ করেছে—এরা কখনো মরুর গভীরে যায় না৷ কোনো জনপদের কাছাকাছি অথচ জনপদে নয়—এমন স্থান নির্বাচন করে নিজেদের ক্ষণস্থায়ী আস্তানা গড়ে তোলে৷ মরুভূমির প্রান্তভাগে তাঁবু টাঙায়৷ এবং অবধারিতভাবে সেই আস্তানার কাছাকাছি কোনো পাহাড় থাকবে৷ পাহাড়ে থাকবে কোনো নদী বা ঝরনা৷
অন্যদিকে লোকালয় থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের সম্প্রদায়ের ওপর এরা সাধারণ মানুষের কৌতূহল জিইয়ে রাখে৷ অথচ লোকালয় কাছাকাছি হওয়ায় খেলা দেখিয়ে বা সাপের বিষ বিক্রি করে নিজেদের ডেরাতে ফিরতেও বেশি সময় লাগে না৷ রুহ বুঝতে পারে—এরা অনেক চিন্তাভাবনা করেই নিজেদের জীবনযাপনের এমন রেওয়াজ গড়ে তুলেছে৷
জিজা-আম্মার তাঁবু থেকে বেরিয়ে রুহ কাছের পাহাড়ের দিকে হাঁটতে লাগল৷ মাথার ওপর নির্মেঘ আকাশে দুপুরের সূর্য৷ ঝলমলে রোদে ঝিকমিক করছে মরুর বালু৷ বালির ওপর ধীর পায়ে রুহ এগোতে থাকে৷ দলের সবাই সকাল-সকাল স্নান করে নেয়৷ রুহ দুপুর নাহলে গায়ে জল নিতে পারে না৷ ইচ্ছেও করে না৷ হাঁটতে-হাঁটতে হঠাৎ জেমিনির কথা মনে পড়ল৷ সেই সকালে একবার দেখেছিল, তারপর আর চোখে পড়েনি৷ অবশ্য পড়ার কথাও নয়৷ কারণ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জিজা-আম্মার তাঁবুতেই তো সময় চলে গেল৷
ঝরনার জলে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করে পাহাড়ের ঢালে একটি গাছের নীচে এসে বসল রুহ৷ গাছটার ডালপালা অল্প৷ কিন্তু সামান্য যা ছায়া পড়েছে, তাতে একজন মানুষের বিশ্রামের জন্য যথেষ্ট৷ গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে রুহ দেখল কিছুদূরে নীচের বালুতে তাদের তাঁবুগুলো কী সুন্দর লাগছে৷ এখান থেকে তাঁবুর গায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ নকশার কাজগুলো বোঝা না-গেলেও প্রতিটি তাঁবুকেই মনে হচ্ছে অনেকদূর থেকে উড়ে আসা এক-একটি রঙিন পাখি৷ যারা হাজার-হাজার মাইল পথ উড়ে এসে এক-এক করে তাদের বর্ণময় ডানা গুটিয়ে কোনো জলাশয়ের কাছে বসে পড়েছে৷ স্থির হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে৷
রুহ যেন এই দৃশ্যের মধ্যে তার নিজের পাহাড়ি হ্রদটিকে দেখতে পেল৷ যে-গুহায় সে ছবি আঁকত, তার অনতিদূরে জঙ্গলের মধ্যে ঝরনা৷ সেই ঝরনার চোয়ানো জল একটি নদীর জন্ম দিয়েছে৷ নদীর পাশেই গড়ে উঠেছে ডিম্বাকার একটি খুব ছোট হ্রদও৷ রুহ লক্ষ করত সেই হ্রদে শীতকাল এলেই ঝাঁকে-ঝাঁকে পাখি উড়ে আসত৷ পাখিগুলো যে ভিনদেশি, সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল রুহ৷ কারণ, শীত ফুরোলে বছরের অন্যকোনো সময়েই আর তাদের দেখা মিলত না৷ তাছাড়া, চেনাজানা পাখিদের সঙ্গে তাদের মিলও খুঁজে পেত না৷
তাঁবুগুলোর দিকে তাকিয়ে রুহ ভাবল জীবন কী বিচিত্র! বেঁচে-থাকার পথ কী বৈচিত্রময়! অনেকটা পাহাড়ের ফাটল থেকে জন্মানো নতুন ঝরনার মতো৷ ঝরনার জল ক্রমশ নদী হয়ে বইতে থাকে৷ সে জানে না কোথায় যাবে৷ নিজের বয়ে চলার গতিও সে নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না৷ সময় এবং পরিস্থিতি যে-পথ নির্মাণ করে, যে-দিকে তাকে নিয়ে যেতে চায়, সেই দিকেই শর্তহীন এগিয়ে যাওয়া যেন তার নিয়তি৷ তার নিজের পছন্দের কোনো প্রান্তর নেই৷ পছন্দের জনপদ নেই৷ শুধু থেমে না-থাকাই তার কাজ৷ একদিন অন্যকোনো নদীর শরীরে অথবা কোনো সমুদ্রের দেহে নিজেকে সমর্পণ করাতেই বোধহয় সমস্ত গতির শেষ, নিজের জীবনের পরিসমাপ্তি৷
এই ভাবনার ভিতর রুহ যেন নদী নয়, নিজের জীবনকেই ছুঁতে চাইল৷ ঝোলার ভিতর থেকে জাদুকরের দেওয়া কম্পাসটা হাতে নিল৷ দেখল যে-পথে তার পাড়ি দেওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকে অনেকটাই পুবদিকে সরে এসেছে৷ সে তো অনেকদিনই সুস্থ হয়ে উঠেছে, তার তো এই দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো কাজ নয়৷ তাহলে সে এখানে সময় নষ্ট করছে কেন? রুহ নিজের দিকে প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিল৷
ওই যে সময় এবং পরিস্থিতি, একারণেই তো এই দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো৷ অসুস্থ না-হয়ে পড়লে কি জেমিনির সঙ্গে তার দেখা হতো, নাকি সে এই দলের সঙ্গে থাকত? নিজের সমর্থনে সওয়াল করল রুহ৷
এখন তো তুমি সুস্থ৷ এখন কেন সময় অপচয় করছ? তোমার সামনে দীর্ঘ পথ৷ সামনে কত কাজ! রুহ যেন নিজের ভিতর জাদুকরের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল৷
আবার সওয়াল সাজাল রুহ—তাঁবুগুলোর রং এখনো শেষ হয়নি৷ তাছাড়া শিল্পীদলটিকে আরও খানিক মাজাঘষা করে দক্ষ করে গড়ে দিতে পারলেই সে আর এখানে থাকবে না৷
এটা তোমার বাইরের কথা, রুহ৷ অন্তরের নয়৷ তুমি নিজেই বুঝতে পারছ না তুমি ঠিক কী চাও৷ তাঁবু নয়, শিল্পীদলও নয়৷ তোমাকে নিয়ে জেমিনির উচ্ছলতা, তোমার মুগ্ধ দৃষ্টির সামনে ধীরে-ধীরে জেমিনির চোখের পাতার নিভে আসার মায়াই তোমাকে এখান থেকে নোঙর তুলতে দিচ্ছে না৷ নতুন পথের ওপর পা রাখতে সায় দিচ্ছে না। নিজের অন্তরকে ভালো করে জিজ্ঞাসা করে দেখো, উত্তর হয়তো পাবে। পুনরায় যেন জাদুকরের সুস্পষ্ট কণ্ঠস্বর নিজের ভিতর শুনতে পেল রুহ৷
হঠাৎ রুহর মনখারাপ হয়ে গেল৷ জেমিনির জন্য বুকের ভিতর কেমন যেন আশ্চর্য এক মনকেমন-করা অনুভূতি লাফ দিয়ে উঠল৷
সূর্য পশ্চিমে সরে যাওয়ায় ছায়াও সরে গেছে৷ রুহ গাছের তলা থেকে ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়াল৷ তাঁবু, মুখোশ, বিচিত্র এই উপজাতির প্রাচীন আখ্যান নাকি শুধুমাত্র জেমিনি—ঠিক কী কারণে তার পা এত শ্লথ হয়ে উঠেছে? ঠিক কী কারণে সে কাঁধে ঝোলা ফেলে কম্পাসের দেখানো পথে পা রাখতে পারছে না?
অনেক ভেবেও নির্দিষ্ট কোনো জবাব রুহর সামনে উঠে এল না৷ রুহ ধীর পায়ে পাহাড়ি ঢাল ধরে নামতে থাকল৷ তাকে যেন অমোঘ হাতছানি দিচ্ছে অদূরে মরুর বুকে সারবাঁধা রঙিন তাঁবুর মহল্লা৷
রুহ ধীর পায়ে পৌঁছে গেল নিজের তাঁবুর কাছে৷ তাঁবুর ভিতর প্রবেশ করে তার মনে হল—এই তাঁবুর ঘর, এই বসত একান্তই তার৷ সে এই বসত ছেড়ে আর কোথাও যাবে না৷ তাছাড়া, বুকের ভিতর জেমিনি যেন মায়াবী নক্ষত্রের মতো ছড়িয়ে দিয়েছে ভালোবাসার আলো৷ এই আলো ছেড়ে নতুন পথের বুকে পা রাখতে পারবে না৷ রুহ বুঝতে পারে অদ্ভুত এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে সে আজ স্বেচ্ছাবন্দি৷ বন্দিত্ব হোক বা নির্বাসন—সে এখন ভীষণ খুশি৷
আকাশে গোল চাঁদ৷ গাঢ় জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর৷ অনুচ্চ পাহাড়ের ওপর থেকে দেখা যাচ্ছে—ডানদিকে দিগন্ত বিস্তৃত বালুরাশি৷ দিনের আলোয় যা স্বর্ণাভ, তা এখন রুপোলি৷ এই মুহূর্তে তা যেন মরুভূমি নয়৷ অদৃশ্য কারও ইঙ্গিতে থমকে যাওয়া সমুদ্র! জ্যোৎস্নামাখা বালির উঁচু-নীচু ঢেউগুলো স্তব্ধ হয়ে আছে রাত্রির চরাচরে৷
বাঁ-দিকে পাহাড়ি উপত্যকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গাছপালার শাখাপ্রশাখার ফাঁক দিয়ে নেমে আসা জ্যোৎস্না যেন হাজার-হাজার রুপোর ভল্ল৷ সটান গেঁথে আছে পাহাড়ি-ঢালের তরঙ্গায়িত পাথুরে মাটিতে৷
যদিও রাত্রির এই অপরূপ নিসর্গ উপভোগ করার মতো মন নেই রুহর৷ কিছু আগে যে-ভয়ংকর বিভীষিকার মুখোমুখি হয়েছিল সে, তারপর নিজেকে স্বাভাবিক রাখার জন্য ইস্পাত-কঠিন স্নায়ুর জোর লাগে৷
ঠিক সময়ে জেমিনি ঝাঁপিয়ে না-পড়লে নিশ্চিত ছিল মৃত্যু৷ রুহ যেন চোখের সামনে দেখতে পায়—চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া নিস্তব্ধ বালুরাশির ওপর নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে তার মৃতদেহ!
রাতে খাওয়ার পর আকাশে চাঁদ দেখে কেন জানি না মন বেশ ফুরফুরে হয়ে গিয়েছিল৷ তাঁবু থেকে খানিক দূরে রুহ ও আলামিন ঢোলক নিয়ে বালির ওপর বসেছিল৷ আলামিনের কাছ থেকে শিখে নিচ্ছিল নতুন বোল৷ তারপর সেই বোল আশ্চর্য দক্ষতায় রপ্ত করছিল রুহ৷ রাত্রি ঘন হলে আলামিন উঠে পড়ে৷ জিগ্যেস করে, ‘চলো, ডেরায় ফিরি৷ রাত অনেক হল৷’
রুহর ওঠার ইচ্ছে নেই৷ বলল, ‘আমি আজ এখানেই খোলা আকাশের নীচে ঘুমোব৷ তুমিও আমার সঙ্গে থাকতে পারো৷ নাহলে তুমি যাও৷’
রুহ জানত আলামিন থাকবে না৷ আলামিন তাঁবুতে না ফিরলে সুমাইয়ার দু-চোখের পাতা এক হবে না৷ আলামিন ইতস্তত করছে দেখে রুহ বলল, ‘তুমি যাও, আলামিন৷ আমি একাই থাকব৷’
আলামিন আর দাঁড়ায় না৷
আলামিন চলে গেলে রুহ আরও কিছুক্ষণ ঢোলক বাজিয়ে বালির ওপর টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে৷ তখন মাঝরাত। জেগেই ছিল রুহ৷ হঠাৎ গায়ের ওপর কী যেন পড়ল৷ ছিটকে লাফিয়ে উঠল রুহ৷ তার দেহ থেকে ছিটকে গিয়ে একটা গোখরো বালির ওপর লেজে ভর দিয়ে ফণা তুলেছে৷ অল্প-অল্প ফণা দোলাচ্ছে৷
জিজা-আম্মা বলেছিল, ফণা দোলানো সাপের কাছে দুনিয়ার তুখোড় নর্তকীও হেরে যাবে৷ এই মুহূর্তে রুহর তা মনে হচ্ছে না৷ বরং সে যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতকে৷ ঠিক এই সময়েই ঘটল অভাবনীয় ঘটনাটা৷ কোথায় ছিল জেমিনি, ঝাঁপ দিয়ে পড়ল গোখরোর ওপর৷ চোখের পলকে নিজের হাতে তুলে নিল সাপটাকে৷ তারপর বেশকিছুটা দূরে গিয়ে ছেড়ে দিল৷
চকিতে ঘটে যাওয়া ঘটনায় রুহ স্তম্ভিত৷ বুকের ভিতর কাঁপছে৷ সাপটাকে ছেড়ে দিয়েই জেমিনি ঊধর্বশ্বাসে দৌড়ল অল্প দূরে থাকা একটি বালির ঢিবির দিকে৷ রুহ সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে বিস্ময়ে৷ পরপর ঠিক কী যে ঘটছে, তার মাথায় কিছু ঢুকছে না৷ কয়েক মুহূর্ত পর গোঙানির শব্দ পেল৷ রুহ সম্বিত ফিরে পেয়ে তড়িঘড়ি ছুটে গেল গোঙানির শব্দ লক্ষ্য করে৷
পৌঁছে দেখল এক হাড়হিম করা দৃশ্য—বালির ঢিবির আড়ালে একটা লোক উপুড় হয়ে পড়ে আছে৷ মুখের অর্ধেকটা বালিতে গোঁজা৷ লোকটার হাত দুটো পিঠের দিকে মুচড়ে, সেই পিঠে নিজের হাঁটু দিয়ে চাপ দিচ্ছে জেমিনি৷ লোকটা ক্রমাগত পুঁতে যাচ্ছে বালির ভিতর৷ লোকটার দুই পা মরণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে বালির ওপর৷
এই জেমিনিকে যেন চেনে না রুহ৷ ক্রোধে উন্মত্ত জেমিনি বলছে, ‘আমার সূর্যকে হত্যা করতে চেয়েছিলি তুই! আজ তোকে বালির ভিতর জ্যান্ত কবর দেব, সিকান্দার!’
জেমিনি রুহকে লক্ষ করেনি৷ রুহ বুঝল, লোকটা সিকান্দার৷ রুহ দ্রুত জেমিনিকে জাপটে ধরে সরিয়ে নিল৷ মুহূর্তে বালির ওপর ভেসে উঠল সিকান্দারের মুখ৷ বালিমাখা শরীর নিয়ে সিকান্দার হাঁফাচ্ছে৷
ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়াল সিকান্দার৷ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে অমন জোয়ান চেহারা নিয়েও জেমিনির সঙ্গে পেরে ওঠেনি৷ শরীর যথেষ্ট নিস্তেজ হয়ে গেছে৷ রুহ ও জেমিনির দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নীচু করল৷ তারপর তাঁবুর দিকে কয়েক পা বাড়িয়ে থমকে দাঁড়াল৷ মুখ ফিরিয়ে জেমিনির উদ্দেশে বলল, ‘তোর হাতে মরণ হলেও জানতাম আমার নসিবটা খুব চওড়া রে, জেমিনি৷’
কথাগুলো বলেই সিকান্দার অবসন্ন শরীরে টলতে-টলতে তাঁবুর দিকে চলে গেল৷
জেমিনি এতক্ষণ পর রুহর দিকে তাকাল৷ তারপর রুহর হাত ধরে অনুচ্চ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে এসে একটি বড় পাথরের ওপর চুপ করে বসল৷
চাঁদ প্রায় পশ্চিমে ঢলে গেছে৷ রুহ বলল, ‘সিকান্দার যে আমাকে হত্যার মতলব করেছে আমি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি৷ কী ভালো ব্যবহার করত আমার সঙ্গে!’
‘আমি ওর মতলব আঁচ করেছিলাম৷ তোমার সঙ্গে ওর অত ভালো আচরণটাই আমার সন্দেহ বাড়িয়ে দিয়েছিল৷ আমার মন বুঝেছিল ওর মতলব সুবিধের নয়৷’
‘কিন্তু কেন?’
‘আমাদের দলের অনেকেই আমাকে প্রণয়ের প্রস্তাব দিয়েছে৷ আমি এতদিন কাউকেই প্রশ্রয় দিইনি৷ দলের নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যাখ্যাত হয়ে নিজেরা নিজেদের অন্য সঙ্গী খুঁজে নিয়েছে৷ কিন্তু সিকান্দার তা করেনি৷ বারবার নানা কৌশলে আমাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করত৷ কিন্তু আমার সাড়া ও কোনোদিনই পায়নি৷
ইদানীং দেখেছে, আমি তোমাকে গুরুত্ব দিই, তোমাকে আগলে রাখি৷ ফলে ও আন্দাজে বুঝতে পেরেছে মনে-মনে আমি তোমাকে আমার সূর্য ভেবেছি, মানে প্রেমিক হিসাবে বরণ করেছি, তাই তোমাকে ও সাপ দিয়ে হত্যার মতলব করেছিল৷
সাপের কামড়ে মৃত্যু হলে কেউ আর কাউকে সন্দেহ করত না৷ সবাই ভাবত, এটা খুব সাধারণ দুর্ঘটনা৷ কিন্তু ও বুঝতে পারেনি যে আমি তোমাকে আমার সমস্ত কাজের মাঝেও সারাক্ষণ লক্ষ্য রাখি৷’
তাকে দু-বার নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে বাঁচাল জেমিনি৷ তারপর রুহ যখন জানল, যে জেমিনি তাকে প্রেমিক হিসাবে অন্তরে বরণ করেছে, রুহর মন কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে উঠল৷ কিছুক্ষণ আগের মৃত্যু বিভীষিকার আতঙ্ক মন থেকে মুছে গেল৷ সমস্ত ঘটনাটাই যেন দুঃস্বপ্ন হয়ে ক্রমশ মিলিয়ে গেল৷ বরং সেই জায়গায় অবাধ্য এক আবেগ বুকের ভিতর আদিম ঘোড়ার মতো হ্রেষাধ্বনি তুলল৷
রুহ জেমিনির চিবুকে আলতো হাত দিয়ে মুখখানি তুলে ধরল৷ রুহর গাঢ় শ্বাস ছুঁয়ে যাচ্ছে জেমিনির মুখ৷ ত্রস্ত হরিণীর মতো কেঁপে উঠল জেমিনি৷ রুহ দেখল ছুটন্ত চিতল হরিণ থেমে যাওয়ার পর যেভাবে শ্বাস নেয়, যেভাবে তার চিকণ পেট শ্বাসের জন্য ওঠানামা করে, ঠিক তেমনই জেমিনির বুক ওঠানামা করছে৷
জেমিনি ক্রমশ ঘন হয়ে আসে৷ ঘোর লেগে যায় দুই শরীরে৷ নির্জন পাহাড়ি ঢালের গায়ে আটকে থাকা মস্ত চ্যাটাল কালো পাথরের ওপর শুয়ে আছে জেমিনির হাতির দাঁতের মতো সফেদ নির্মেদ-সুঠাম দেহ৷ গাছপালার ফাঁক গলে পশ্চিম আকাশ থেকে নেমে আসা টুকরো-টুকরো জ্যোৎস্না ও খণ্ড-খণ্ড ছায়ায় নির্মিত আশ্চর্য এক সূক্ষ্ম নকশিকাঁথায় ঢাকা হয়ে আছে নিরাভরণ দুই নারী-পুরুষের দেহ।
দীর্ঘসময় আদি-আদরে ভেসে যাওয়ার পর শান্ত হল দু-জন৷ রুহ দেখল—তখনও দুই স্তন জেমিনির বুকের ওপর প্রদীপ হয়ে জ্বলছে৷ বাদামি স্তনবৃন্তে তখনও তিরতির করে কাঁপছে জ্যোৎস্নাময় আগুনের শিখা৷
পাথরের ওপর পাশাপাশি উঠে বসল রুহ ও জেমিনি৷ জেমিনি পুনরায় দুহাত প্রসারিত করে দিল রুহর দিকে৷ প্রবল আশ্লেষে নিজের বুকে আশ্রয় দিল রুহ৷
এই আলিঙ্গন যেন সময়শূন্য! কালরহিত৷ চেনা গণিতের সূত্র মেনে এমন মুহূর্তের যেন কোনো হিসাবনিকাশ চলে না৷ ভালোবাসাময় আদরের এমন নিবিড় মুহূর্তে কে যে কাকে আশ্রয় দেয়, আর, কে যে কার আশ্রয় হয়ে ওঠে—এ প্রশ্নের মীমাংসা আদিকাল থেকে আজও হয়ে ওঠেনি৷
জ্যোৎস্না প্রায় ফিকে হয়ে গেছে৷ পুব আকাশে স্ফটিকের মতো জ্বলজ্বল করছে শুকতারা৷ মৃদুমন্দ হাওয়ায় শান্ত এক ভোর ক্রমশ ফুটে উঠছে৷ শান্ত ও স্নিগ্ধ ভোরে আলিঙ্গনাবদ্ধ দুই নরনারী যেন পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ভাস্কর্য! ভাস্কর্যটি স্থির, অচঞ্চল৷ মাঝরাত্রির আতঙ্ক কাটিয়ে এই পার্বত্যময় মরু অঞ্চলে আজ যেন অন্য এক ভোর, অন্যরকম এক পৃথিবীর জেগে ওঠা!
তাঁবুর ভিতর মুখোমুখি দু-জন৷ জিজা-আম্মার সামনে একটি সুদৃশ্য উলের আসনে পা-মুড়ে বসেছে রুহ৷ রুহর ঊর্ধ্বাঙ্গ নগ্ন৷ একটি কুপি থেকে মৃদু আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে৷ ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে দলের বয়স্কা কয়েকজন৷ তাদের মাঝে রয়েছে জেমিনিও৷ কারও মুখে কোনো কথা নেই৷
রুহর মাথায় এবং বুকে আলতো করে হাত রেখে বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকল জিজা-আম্মা৷ তারপর তাঁবুর স্তব্ধতা ভেঙে বলল, ‘এ সূর্যস্বরূপ৷ উপযুক্ত৷ নির্বাচনে কোনো ভুল নেই, জেমিনি৷’
জিজা-আম্মার কথায় স্বস্তির শ্বাস ফেলল সবাই৷ উজ্জ্বল হয়ে উঠল সবার চোখমুখ৷ সবাই একবার জেমিনির দিকে, আর-একবার রুহর দিকে তাকাল৷ রুহর মনে হল, ক্ষণিকের জন্য ঈষৎ লজ্জা পেল জেমিনি৷
এটাই রেওয়াজ৷ দলের কোনো নারীর কোনো পুরুষকে পছন্দ হলে জিজা-আম্মা সেই পুরুষকে ছুঁয়ে একবার পরখ করে নিজের মতামত দেয়৷
বিবাহের চল না-থাকলেও এই প্রথম-পছন্দের পর্বটি দলের কাছে বিশেষ আনন্দের৷ তার মানে এই নয় যে আমৃত্যু একটি নারী একটি পুরুষের প্রতিই ভালোবাসায় দায়বদ্ধ৷ দলের পুরুষদের কাছেও তা একইরকম সত্য৷ তবে কোনো নারী বা পুরুষ যখন প্রথম তার যৌনসঙ্গী পছন্দ করে, জিজা-আম্মার সম্মতির পর দলের সবাই তা বিশেষভাবে পালন করে৷ গানবাজনা, খাওয়াদাওয়া৷ গোষ্ঠীর মধ্যে বেশ কয়েকদিন ধরে উৎসবের মেজাজ চলে৷
এখানে এদের অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্য হল—এক দলের পুরুষ অনেকসময় সূর্যসাপ উপজাতির অন্য কোনো দলের নারীকে পছন্দ হলে, পুরোনো দল ছেড়ে সেই নারীর দলে যোগ দেয়৷ তাদের দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়৷ নারীদের ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয় না৷ নারীরা কখনো তাদের দলবদল করে না৷ এ-কারণে গোষ্ঠীর প্রধান অর্থাৎ জিজা-আম্মা সবসময় দলের সবচেয়ে প্রবীণা নারীই হয়ে থাকে৷ পুরুষ কখনো দলের প্রধান হতে পারে না৷ তাছাড়া দলের কোনো নারীর গর্ভে জন্মানো কোনো সন্তানেরই কোনো পিতৃ-পরিচয় থাকে না৷ দলের কোনো নারী কাউকেই তাদের সন্তানদের পিতৃ-পরিচয় জানায় না৷ অনেকসময় তারা হয়তো নিজেরাও জানে না—কে তাদের সন্তানের প্রকৃত পিতা৷ দলের সব সন্তানই ভালোবাসার সন্তান৷ মাতৃ-পরিচয়ই শিশুদের একমাত্র পরিচয়৷
আরও চার পক্ষকাল পেরিয়ে গেল৷ শুধু তাঁবু বা মুখোশ নয়, দলের জিনিসপত্র ও শিশুদের বহন করার জন্য দুচাকার যে-ক্যারাভানগুলো রয়েছে সেগুলোও দিনেদিনে রঙিন হয়ে উঠেছে৷ মরুভূমির ওপর দিয়ে উটগুলো যখন রঙিন ক্যারাভানগুলোকে সারবেঁধে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টেনে নিয়ে যায়, সূর্যসাপ উপজাতির অন্য গোষ্ঠীর লোকজনও হাঁ করে তাকিয়ে থাকে৷
আর এ-সবই সম্ভব হয়েছে রুহর জন্য৷ রুহর নিত্যনতুন চিন্তাভাবনার জন্যই এই গোষ্ঠীর খোলনোলচে বদলে গেছে৷ এতে রুহর যেমন সম্মান বেড়েছে, অন্যদিকে দলের লোকজনদের ভিতরেও একটা অন্যরকমের গর্ব ও চাপা-অহংকারের জন্ম হয়েছে৷
শুধু আলামিন নয়, পাকা বাজিয়ের মতো আজ রুহও সমানতালে ঢোলক বাজিয়েছে৷ সূর্যাস্তের সময় খেলা দেখানো শেষ হলে তাঁবুর দিকে ফিরছিল সবাই৷ দলের একদম শেষভাগে ছিল রুহ ও জেমিনি৷ দূরে তাঁবুগুলো দেখা যাচ্ছে৷ এমনসময় জেমিনি বলল, ‘একটু ধীরে চলো, আমার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে৷’
চিন্তিত হল রুহ৷ বলল, ‘কেন, কী কষ্ট হচ্ছে আমাকে বলো? প্রায় চলেই তো এসেছি৷’
শুকনো মুখে একটু হাসল জেমিনি৷ বলল, ‘বলব৷ দলের সবাই একটু এগিয়ে যাক৷’
জেমিনির কথায় বিস্মিত হল রুহ৷ দলের সবাই অনেকটা এগিয়ে গেলে বালির ওপর বসে পড়ল জেমিনি৷ জেমিনির পাশে বসে রুহ বলল, ‘কই, বললে না তো কী কষ্ট হচ্ছে তোমার?’
জেমিনি রুহর হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল৷ তারপর নিজের পেটের ওপর রাখল৷ রুহ একটু অবাক হয়েই তাকিয়ে আছে জেমিনির দিকে৷ কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছে না৷ জেমিনি বলল, ‘বুঝলে না?’
না-বোঝার সাদা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে জেমিনির চোখের দিকে রুহ৷ জেমিনি বলে, ‘আমাদের বলার নিয়ম নেই, কিন্তু তোমাকে আমি বলব—তোমার সন্তান এসেছে আমার পেটে৷’
জেমিনির কথায় আনন্দে লাফিয়ে উঠল রুহ, ‘সত্যি!’
হাসল জেমিনি৷ রুহ জড়িয়ে ধরল জেমিনিকে৷
সন্ধে নামলে ধীর পায়ে রুহ ও জেমিনি তাঁবুতে ফিরেছে৷ কথাটা শোনার পর থেকে রুহ যেন বুকের ভিতর আনন্দের তিরতিরে ঝরনার জলশব্দ শুনতে পাচ্ছে৷ জেমিনিকে বারবার প্রবলভাবে আদর করতে ইচ্ছে করছে৷
রাতে রুহ বলল, ‘চলো, আজ তাঁবুতে নয়, তারাভরা আকাশের নীচে আমরা শোব৷ সারারাত গল্প করব৷’
তাঁবু থেকে বেরিয়ে বেশ খানিকটা গিয়ে বালির ওপর পাশাপাশি শুয়ে পড়ল দু-জন৷ হঠাৎ জেমিনি রুহর সামনে কম্পাসটা তুলে ধরে বলল, ‘এটা কী গো? এমন জিনিস আমি কোনোদিন দেখিনি৷ কতবার জিগ্যেস করব ভেবেও ভুলে গেছি৷ তাই আজ ঝোলা থেকে বার করে এনেছি৷
দেখো, অন্ধকারেও সবুজ রংয়ের সরু কাঁটা কেমন জ্বলজ্বল করছে, নড়ছে!’
কম্পাসটা দেখে রুহর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল৷ বিস্মৃত-প্রায় জাদুকরের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল৷ মনে পড়ল যাত্রা শুরু করার আগের রাত্রিতে বলা জাদুকরের কথাগুলো৷ জাদুকর বলেছিল—মানুষ মানুষকে অনেকসময় ভুল দিকে নিয়ে যায়, কিন্তু দার্শনিক ও কম্পাস মানুষকে কখনো ভুল দিকে নিয়ে যায় না৷ একদম ঠিক দিকের নিশানা স্থির করে দেয়৷ ঠিক দিক চিহ্নিত করে দেয়৷
রুহ চুপ করে আছে দেখে জেমিনি আদুরে গলায় বলল, ‘কী হল, বলছ না কেন—এটা কী?’
রুহ যেন ঘোর সঙ্কটে পড়ে গেল৷ জেমিনির প্রশ্নের কী উত্তর দেবে সে! আশ্চর্য এক দ্বন্দ্ব মনের ভিতর তোলপাড় করতে থাকল৷ একদিকে জেমিনির হৃদয়-উজাড় করা ভালোবাসা, জেমিনির গর্ভজাত সন্তানের টান, অন্যদিকে পৃথিবী বদলের স্বপ্ন, সাধারণ শিল্পী নয়, জাদুকরের ধারণায় মহৎ শিল্পী হয়ে ওঠার সাধনা—এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে? জেমিনি নাকি অজানা পথ? জেমিনির গর্ভে তার সন্তান নাকি মহৎ শিল্পী হয়ে ওঠার বাসনা? গোষ্ঠীর এই ভ্রাম্যমাণ জীবনের নিশ্চিন্ত আশ্রয় নাকি পৃথিবী পালটে দেওয়ার অনিশ্চিত ঠিকানা?
জেমিনি অবাক হয়ে গেল৷ এমন সাধারণ একটা প্রশ্নের উত্তর জানা নেই রুহর? নাকি, আশ্চর্য এই জিনিসটা সম্পর্কে তাকে জানাতে চায় না রুহ? এমন কী গোপনীয়তা আছে গোলাকার এই যন্ত্রটার ভিতর?
রুহ নিজেকে সূর্যসাপ গোষ্ঠীর কাছে স্বেচ্ছাবন্দি করেছে৷ সমস্ত স্বপ্ন থেকে মনে-মনে চির-নির্বাসন নিয়েই ফেলেছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে জাদুকরের মুখ, তার নিজস্ব স্বপ্ন ও সুদূর পথের টান আরও একবার মনে এল৷ শেষমেশ সমস্ত মানসিক দ্বন্দ্বকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে স্থির করল, জেমিনিকে ছাড়া তার চলবে না৷ জেমিনিও তো তার নিজস্ব স্বপ্ন৷ হাতের কাছে, হৃদয়ের কাছে এমন স্বপ্নকে ছেড়ে কোন সুদূরের অনিশ্চিত কোনো স্বপ্নের পিছনে ধাওয়া করবে না সে৷
হঠাৎ রুহ জেমিনির হাত থেকে কম্পাসটা নেয়৷ তারপর মরুর বুকে হা-হা শূন্য বালির দিকে কম্পাসটা ছুড়ে দিয়ে বলে, ‘ওটা একটা ভুল-স্বপ্নের প্রতীক, জেমিনি৷ তাই ওটাকে বালির ভিতর হারিয়ে দিলাম৷ যাতে ওই যন্ত্রটা কখনও আমাকে আর মিথ্যে-স্বপ্নের পথে প্ররোচিত করতে না পারে৷’
রুহর কথার মাথামুণ্ড কিছুই বুঝল না জেমিনি৷ আর কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে শুয়ে পড়ল৷ রুহর চোখে ঘুম এল না৷ মৃদু স্বরে বলল, ‘আমাদের সন্তানের কী নাম দেবে, জেমিনি?’
‘আমিও ভাবছি৷ তুমিও ভাব৷ দুটো নাম ঠিক করব৷ একটা ছেলের, একটা মেয়ের৷’
রুহ আর কথা বলল না৷ কথা বলল না জেমিনিও৷ দু-জনেই খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকল৷ ভোরের দিকে চোখে আলতো ঘুম জড়িয়ে গিয়েছিল৷ হঠাৎ বালির ওপর যেন কারও পায়ের শব্দ শুনতে পেল জেমিনি৷ দেখল এক ছায়ামূর্তি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে৷ তৎক্ষণাৎ রুহকে ঠেলা দেয় জেমিনি৷ রুহ তড়িঘড়ি উঠে বসে বালির ওপর৷ ভোরের আবছা আলোয় মানুষটাকে দেখে চমকে ওঠে রুহ৷ চেনা মানুষটার মুখে সেই চেনা হাসি! কাঁধে সেই চেনা ঝোলা৷
জেমিনি দেখল লোকটার হাতে গতকালের যন্ত্রটা৷ যেটা রুহ গতরাতে মরুভূমির বালিতে বহুদূরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল৷ লোকটা মৃদু হেসে রুহকে বলল, ‘তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর খাটাতে আমি আসিনি, রুহ৷ আমি শুধু তোমাকে একটা গল্প শোনাতে এসেছি৷ কথা দিচ্ছি গল্পটা শুনিয়েই আমি এখান থেকে চলে যাব৷ আর কোনোদিন তোমার মুখোমুখি হব না৷’
রুহকে উঠতে হল না৷ জাদুকরই ওদের পাশে বালির ওপর বসে পড়ল৷ তারপর রুহর চোখে চোখ রেখে জাদুকর বলল, ‘কপিলাবস্তুর সেই রাজপুত্রের কথা মনে আছে, রুহ?’
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর রুহ বলল, ‘সিদ্ধার্থের কথা মনে না-থাকার তো কথা নয়, জাদুকর৷ কিন্তু তুমি যে স্বপ্নের কথা বলেছ, সেই স্বপ্নের...’
রুহকে কথা শেষ করতে না-দিয়েই জাদুকর বলে উঠল, ‘ভুল৷ একদম ভুল কথা বলছ, রুহ৷ মনে করে দেখো, আমি তোমাকে কোনো স্বপ্নের কথা বলিনি৷ গুহার অন্ধকারে ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে স্বপ্নের সূচনা তুমিই করেছিলে৷ আমি শুধু তোমার স্বপ্নের বৃত্তটাকে বাড়িয়ে নিতে বলেছিলাম৷
‘আমি একবারও তোমাকে কোনো স্বপ্ন দেখাইনি৷ আরে, শিল্পী তো তুমি, স্বপ্ন তো তুমি দেখাও, আমার মতো সাধারণ মানুষেরা তোমার দেখানো স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে!’
রুহ চুপ করে থাকে৷ জাদুকর বলে, ‘রুহ, ভাবো৷ একবার ভেবে দেখো—আড়াই হাজার বছর আগে কপিলাবস্তু প্রাসাদের শয়নকক্ষে ঘুমন্ত যশোধরা ও রাহুলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে প্রধানফটক পার হয়ে সেদিন পথে নামতে কিন্তু কোনো দ্বিধা করেননি সেই মানুষটি! মধ্যরাত্রির অন্ধকার পথে সারথি ছন্দককে নিয়ে বনের প্রান্তে পৌঁছে, তরবারি দিয়ে নিজের মাথা মুড়িয়ে রাজবেশ ত্যাগ করে মুহূর্তে নিজেকে নিঃস্ব করেছিলেন তিনি! সেই ত্যাগ কি বৃথা ছিল, রুহ? সেদিনের সেই সিদ্ধান্ত কি ব্যর্থ হয়েছিল তাঁর?’
জেমিনি শুধু প্রবল বিস্ময়ে এদের কথপোকথন শুনছে৷ কিন্তু তার মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে—এইসব কথার বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারছে না সে৷
রুহ বলল, ‘এ কথা কে অস্বীকার করছে, জাদুকর! বুদ্ধের শাশ্বত ভাবনাকে ছড়িয়ে দিতে বিক্রমশীলা বিহারের আচার্য দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানও তো প্রথম দেশ ছেড়ে বিদেশের অচেনা মাটিতে পা দিয়েছিলেন এবং সার্থক হয়েছিলেন৷’
‘একটু ভুল বললে, রুহ৷ আচার্য দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান একাদশ শতাব্দীতে তিব্বতে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু তাঁরও আগে অষ্টম শতাব্দীতে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য শান্তরক্ষিত গিয়েছিলেন তিব্বতে ওই একই কারণে৷
‘প্রসঙ্গটা তুমি তুললে বলে বলছি—সপ্তম শতাব্দীতে স্রোঙচেন সগেম-পো যখন তিব্বতের সম্রাট, তখনই প্রথম বৌদ্ধদর্শন ওদেশে ঢোকে৷ তার প্রায় একশো বছর পর অষ্টম শতাব্দীতে সম্রাট হন স্রোঙ-লদে-বচন৷ তাঁরই আমন্ত্রণে আচার্য শান্তরক্ষিত অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ওদেশে পাড়ি দেন বৌদ্ধদর্শনকে সাধারণের মধ্যে আরও প্রসার করার জন্য৷ তারও প্রায় তিনশো বছর পর আচার্য দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বতের মাটিতে পা রাখেন৷
‘আসল কথা কী জানো, আচার্য শান্তরক্ষিত, আচার্য দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের মতো মানুষেরা নিজেদের জীবন চেনা বৃত্তের সীমানায় আটকে রাখেননি৷ জগতের বৃহত্তর কল্যাণে সমস্ত পথের বাধা তুচ্ছ করে অচেনার পথকে আপন করে নিয়েছিলেন৷ অচেনা পথের ধুলোর সুগন্ধকে বুকের মধ্যে ধারণ করেছিলেন৷ তোমাকে শুধু এই কথাটাই বলতে এসেছিলাম৷’
রুহ নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে৷ জেমিনি জাদুকরের উদ্দেশে বলল, ‘এটা বুঝেছি যে তুমি রুহকে খুব ভালো করে চেনো৷ কিন্তু তোমাদের সত্যিকারের সম্পর্কটা ঠিক কী?’
জেমিনির কথায় জাদুকর মৃদু হাসল৷ তারপর রুহর গুহার ভিতর ছবি আঁকা থেকে কম্পাস নিয়ে পথে নামার সমস্ত বৃত্তান্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করল৷ সমস্ত কথা বলে জাদুকর রুহকে বলল, ‘হয়তো আবার কোনোদিন এমন কোনো পথের প্রান্তে তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, আবার এ-জীবনে কোনোদিন দেখা না-ও হতে পারে, কিন্তু তোমাকে একজন ভালো বন্ধু হিসাবে মনে রাখব৷ এখন চলি৷’
কথাক’টা বলেই জাদুকর উলটো দিকে পা বাড়ায়৷ জেমিনি পিছন থেকে বলে, ‘জাদুকর, তুমি একটু অপেক্ষা করো, আমি আসছি৷’
জাদুকর বিস্ময়ে জেমিনির দিকে তাকিয়ে থাকে৷ জেমিনি তাঁবুর দিকে চলে যায়৷
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসে৷ তার হাতে রুহর ঝোলা৷ কাছে এসে রুহকে বলল, ‘তাঁবু আঁকিয়ে নয়, মুখোশের কারিগর নয়, তোমাকে আমি জাদুকরের ভাষায় মহৎ শিল্পী হিসাবে দেখতে চাই৷’
জেমিনি বুঝতে পারছে কথাগুলো উচ্চারণ করার সময় তার বুকের ভিতর আশ্চর্য এক কাঁপুনি হচ্ছে৷ তবুও গলার স্বর যথাসম্ভব শান্ত রেখে রুহকে বলে, ‘আমি ও তোমার সন্তান এমনই কোনো এক পার্বত্যময় মরু অঞ্চলে তোমার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করব৷ তুমি মহৎ শিল্পী হয়ে যদি কোনোদিন ফিরে আসো আমরা পুনরায় মিলিত হব৷
‘জানি না, সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগের মুহূর্তে জেগে থাকলে যশোধরা সিদ্ধার্থকে নিষেধ করতেন কিনা৷ আমি কিন্তু তোমাকে আজ বাধা দেব না৷ তুমি যাও, রুহ৷ তুমি যাও...’
শান্ত কণ্ঠে কথাগুলো বললেও জেমিনির দু-চোখ অশ্রুপূর্ণ হয়ে উঠল৷ নিঃশব্দে ফোঁটায়-ফোঁটায় সেই জল তার গাল বেয়ে নেমে এল৷
জেমিনির দৃঢ়তায় জাদুকর ও রুহ স্তম্ভিত৷ রুহর কাছে এই জেমিনি যেন নিতান্ত অচেনা এক মেয়ে৷ এই অচেনা মেয়ের ভিতর সে মহাকাশের মতো অনন্ত এক উদারতার সন্ধান পেল৷ উলটো দিকে এই মুহূর্তে নিজের কাছে নিজেকে ভীষণ ছোট মনে হচ্ছে তার৷ ইচ্ছে হল, জাদুকরের পায়ে হাত দিয়ে একটা প্রণাম করার৷ ইচ্ছে করছে, জেমিনিকে প্রবলভাবে আদর করতে৷
জেমিনি রুহর হাতে ঝোলাটা তুলে দিল৷ রুহ আবেগের স্বরে বলল, ‘জেমিনি, আর যদি কোনোদিন না-ফিরতে পারি?’
‘ফিরবেই৷ এবং ফিরবে মহৎ শিল্পী হয়ে৷’ জেমিনির গলায় তীব্র আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ছে৷
দিগন্তহীন মরুর দিকে পা বাড়াল রুহ এবং জাদুকর৷ মরুভূমির সুদূর বালির ওপর ক্রমশ ছোট হতে-হতে একসময় মিলিয়ে গেল দুটো চলন্ত-শরীর৷
সেদিকে পলকহীন তাকিয়ে রয়েছে জেমিনি৷ দু-গালের ওপর শব্দহীন কান্নার সুস্পষ্ট দাগ৷ এইমুহূর্তে জেমিনি যেন সেই দুরন্ত ক্যাকটাস৷ যে-ক্যাকটাস রঙিন ফুল ফুটিয়ে একাকী দাঁড়িয়ে থাকে নির্জন মরুভূমির বুকে৷ যার বর্ণময় রূপকে দেখার মতো, অতুলনীয় সৌন্দর্যকে তারিফ করার জন্য সামনে কেউ থাকে না, কেবল শূন্যতা ছাড়া৷
অন্তরময় বিরহ ও বিষাদের কাঁটা৷ অথচ, দু-চোখে প্রেমিকের স্বপ্নপূরণের সম্ভাবনার রংটুকু সম্বল করে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে জনহীন বালুর প্রান্তরে৷ একা, একদম একা৷
মস্ত দুটো কালো ডানা৷ দু-দিকে ছড়ানো৷ ডানাগুলোর নীচের অংশ ফ্যাকাসে সাদা৷ ঠোঁট দুটো লম্বা ও বাঁকানো৷ বাদামি দুই চোখে আদিম হিংস্রতা ঝকঝক করছে৷ অতিকায় পাখিটা মাথার ওপর চক্কর দিচ্ছে৷ কোনোরকমে মাথা তুলে পাখিটার দিকে তাকাল রুহ৷
ক্লান্তি থাকলেও জাদুকর স্বচ্ছন্দে বালির ওপর পা ফেলে হাঁটছে৷ কিন্তু রুহ যেন আর পেরে উঠছে না৷ পা ভারী হয়ে গেছে৷ তার ওপর মেঘমুক্ত আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে ঝলসানো রোদ৷ রুহ পাখিটাকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে উঠল৷ মনে হচ্ছে যেন পেটের কাছে গোটানো পা নামিয়ে নখ দিয়ে তাকে গেঁথে উড়িয়ে নিয়ে যাবে৷ তারপর তাকে ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে দেবে৷
রুহ বালির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল৷ জাদুকর থমকে ঝুঁকে পড়ল রুহর ওপর৷ জাদুকর জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে, রুহ?
রুহ জড়ানো স্বরে বলল, ‘পাখিদানব৷’
জাদুকর নিজের কোলের ওপর রুহর মাথাটা তুলে কাঁধের ঝোলা থেকে চামড়ার থলি বার করে অল্প জল দিল রুহর মুখে৷ তারপর নিজের হাতে কয়েক ফোঁটা জল নিয়ে রুহর চোখে-মুখে বুলিয়ে দিল৷
আচ্ছন্নদশা কাটল রুহর৷ খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর রুহ বলল, ‘কী পাখি, জাদুকর?’
জাদুকর বিস্মিত হয়ে জিগ্যেস করল, ‘কোথায়?’
রুহ মাথার ওপর চোখ তুলে তাকাল৷ কই, কোথাও তো কিছু নেই! জাদুকর বুঝল দীর্ঘসময় বালির ওপর হাঁটার ফলে পথশ্রমে রুহর দৃষ্টি-বিভ্রম হয়েছে৷ জাদুকর বলল, ‘হিসাব অনুযায়ী আমাদের আরও আগে মরুদ্যানে পোঁছে যাওয়া উচিত ছিল৷ কিন্তু তোমার অভ্যাস না থাকায় আমরা ঠিকমতো হাঁটতে পারিনি৷ তবে আর একটু কষ্ট করো, সম্ভবত আমরা মরুদ্যানের কাছাকাছি চলে এসেছি৷
রুহ উঠে দাঁড়াল৷ হঠাৎ জাদুকরের চোখ পড়ল ঈশানকোণে হাওয়ায় বালি উড়ছে৷ এই বালু-ওড়ার অর্থ জাদুকর জানে৷ সে সচকিত হয়ে উঠল৷ বলল, ‘রুহ, ভয় পাবে না৷ মরুদস্যুর দল আসছে৷ তুমি চুপ করে থাকবে৷ ওরা যা বলবে বিনা দ্বিধায় তা করবে৷ যা কথার বলার আমি বলব৷
জাদুকর আশ্বস্ত করলেও রুহ ভয় পেল৷ দেখতে-দেখতেই ছুটন্ত উটের পিঠে সাতজনের একটা দল কাছে চলে এল৷ গায়ে জোব্বার মতো একধরনের পোশাক৷ মাথায় পাগড়ি৷ পিঠে দোনলা বন্দুক৷ তবে বন্দুকগুলো দেখেই মনে হচ্ছে অনেককালের পুরোনো৷ মরচে পড়া৷
ওরা রুহ ও জাদুকরকে একটু তফাত রেখে গোল করে ঘিরে ফেলল৷ দেখেই বোঝা যাচ্ছে লোকগুলো আকারে বেঁটে৷ গালে সামান্য দাড়ি৷ খুদে খুদে চোখ৷ কিন্তু দৃষ্টি বড় ক্রূর৷ ওদের মধ্য থেকে একজন কী যেন বলল৷ অচেনা ভাষা৷ রুহ বুঝল না৷ জাদুকর কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে তার উত্তর দিল৷
দুটো লোক উট থেকে নেমে এল৷ তারপর রুহ ও জাদুকরের ঝোলা তল্লাশ করল৷ যে দুজন তল্লাশ করছিল জাদুকর তাদের আঙুলে থাকা আংটি দেখে মনে-মনে খুশি হল৷ ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে গেল৷ তল্লাশ শেষ হলে জাদুকর ওদের ভাষায় বলল, ‘আমাদের নিয়ে চলো৷’
জাদুকরের কথায় দস্যুগুলো অবাক৷ জাদুকর নিজের পোশাকের গুপ্ত জায়গা থেকে একটা লুকোনো আংটি বের করল৷ আংটিটা দেখেই ওরা চমকে উঠল৷ সঙ্গে-সঙ্গে একজন তার উটটা জাদুকরকে দিয়ে দলের অন্য আর-এক উটের পিঠে উঠে গেল৷
ব্যাপারটা বেশ তাজ্জব৷ রুহর মনে হল, জাদুকর কি জীবনের যে-কোনো পরিস্থিতিতেই জাদু দেখাতে পারে!
জাদুকর বালির ওপর শুয়ে পড়া উটের ওপর উঠে পিছনে বসিয়ে নিল রুহকে৷ দস্যুদল সামনে৷ পিছনে জাদুকর ও রুহ৷
রুহ বলল, ‘কিছুই বুঝলাম না!’
জাদুকর হেসে বলল, ‘জীবনে কত দেশ কত রাজ্য কত ভালো মানুষ কত মন্দ মানুষের যে সঙ্গ করেছি তা তোমার ধারণারও অতীত, রুহ৷ এই পথ আমি চিনি৷ এই বালি এই রোদ্দুর আমি চিনি৷ কিছুদূরে যে মরুদ্যান আছে, সেখানে আমি আগেও বিশ্রাম নিয়েছি৷ আসলে কী জানো, মরুভূমিকে সাদা চোখে যতটা শূন্য মনে হয়, তা কিন্তু নয়৷ বালুময় এই প্রান্তরে অনেক দস্যুদল আছে৷ তাদের নিজেদের আলাদা-আলাদা সীমানা আছে৷ কিন্তু তাও মাঝেমধ্যে এদের মধ্যে সংঘর্ষ লেগেই থাকে৷ আমি বুঝতে পারছিলাম না এরা কোন দলের৷ প্রত্যেকটা আলাদা-আলাদা দলের দস্যুদের কাছে তাদের গোষ্ঠীর নিশান দেওয়া আংটি থাকে৷
মরুভূমিতে পা দিয়েই আমার আঙুলের আংটিটা আমি লুকিয়ে ফেলেছিলাম৷ বলা তো যায় না কোন দলের মুখোমুখি হতে হয়৷ ওরা যখন আমাদের তল্লাশ করছিল, তখন ওদের আংটির নিশান দেখে বুঝতে পারি, আমি যে দস্যুসর্দারকে জাদু দেখিয়ে মুগ্ধ করেছিলাম, এরা সেই দলের৷ দস্যুসর্দার আমাকে এই আংটি দিয়েছিল। ওটা দেখেই ওরা আমাদের সঙ্গে নিল৷ এইসঙ্গে এটাও বুঝলাম যে আমরা যে মরুদ্যানে যাচ্ছি, সেটা এখনো এদেরই দখলে রয়েছে৷ ফলে আমাদের চিন্তার কিছু নেই৷ খাদ্য, পানীয় ও বিশ্রামের কোনো অসুবিধে হবে না৷’
সামনে বালির উঁচু স্তূপ৷ স্তূপ না-বলে পাহাড় বলাই সংগত৷ আড়াইশো-তিনশো ফুট তো হবেই৷ পাহাড়টা যেন পথ রোধ করে আছে৷ উটের দলটি ক্রমশ বালি ভেঙে-ভেঙে ওপরে উঠছে৷ বালির পাহাড়ে ওঠার পর চোখের সামনে রুহ যা দেখল, তাতে মরুভূমিতে এত পথ হেঁটে আসার প্রাণান্তকর শ্রম নিমেষে মন থেকে মুছে গেল৷
মুখোমুখি কিন্তু বেশ খানিকটা দূরে আরও একটি এমনই উচ্চতার বালির পাহাড়৷ মাঝখানে নিচু উপত্যকা৷ উপত্যকায় টলটলে নীলাভ জলের হ্রদ৷ গোলাকার এই উপত্যকার ঠিক মাঝখানে থাকা হ্রদটিকে মনে হচ্ছে নীলকান্ত মণি৷ আর সমস্ত মরুদ্যানটি যেন নীলকান্ত মণি বসানো দুর্লভ এক আংটি!
হ্রদের চারপাশে অসংখ্য খেজুরগাছ৷ চোখ জুড়োনো সবুজ মাথাগুলো হাওয়ায় দুলছে৷ ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে নলখাগড়ার ঝোপ৷ গাছপালার ফাঁকে ওড়াউড়ি করছে কতরকমের পাখি৷
হঠাৎ রুহর মনখারাপ হয়ে গেল৷ বুকের ভিতর উথলে ওঠা আনন্দটা নিমেষে উবে গেল৷ মানুষের স্বভাবই হয়তো এমন—অতল সৌন্দর্যের মুখোমুখি হলে হৃদয় বেশিক্ষণ আনন্দ ধরে রাখতে পারে না৷ অব্যবহিত পরেই বিষাদ আচ্ছন্ন করে!
রুহর মনখারাপ অবশ্য অন্য কারণে৷ এমন সৌন্দর্যের মাঝে জেমিনিকে মনে পড়ছে খুব৷ এ-সৌন্দর্য একা উপভোগ করার নয়৷ এ-সৌন্দর্য ভাগ করে নিতে হয় সবচেয়ে প্রিয়জনের সঙ্গে৷ রুহর অকিঞ্চিৎকর জীবনে জেমিনি ছাড়া নিকটজন আর কে আছে?
পাথুরে ইঁদারার ঠান্ডা জলে স্নান করে শরীর জুড়িয়ে গেল৷ আদর, অভ্যর্থনার কোনো খামতি হল না৷
দস্যুদলপতি যে জাদুকরকে বিশেষ খাতির করে তা দলপতির কথা থেকেই রুহ বুঝেছে৷ কিন্তু তার একটা উদ্ভট প্রশ্নে জাদুকর এই মুহূর্তে একটু বিব্রত৷
বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না৷ কিন্তু ভিতরে ঢুকলে বোঝা যায় তাঁবুগুলো বেশ রাজকীয়৷ মোটা কাপড়ের তাঁবু গরম থেকে রক্ষা করে৷ মেঝেয় নরম মখমলের গালিচা৷ দলপতি বেশ কয়েকজন অনুচর নিয়ে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে আছে৷ কিছু আগে তার কালচে মাড়ি বার করে নিজের জীবন সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলে একটি অদ্ভুত প্রশ্ন করেছে জাদুকরকে৷ জিগ্যেস করেছে, ‘জাদুকর, আমার বয়স হয়েছে৷ দলের দায়িত্ব এবার অন্য কাউকে দিয়ে আমি সরে যাব৷ সারা জীবন দস্যুবৃত্তি করেছি দলের জন্য৷ বুক দিয়ে আগলে রেখেছি আমার গোষ্ঠীকে৷ স্বাভাবিকভাবেই অনেক রক্ত মাখতে হয়েছে আমার দু-হাতে৷ ইদানীং আমার মনে প্রশ্ন জাগে—আমি মানুষটা কেমন? ভালো না মন্দ? আমার জীবনে ভালোর ভাগ বেশি নাকি মন্দের ভাগ বেশি?’
প্রশ্ন করে খুদে-খুদে তীক্ষ্ম চোখে জাদুকরের দিকে তাকিয়ে আছে দলপতি৷ রুহ ভাবে, এদের মতিগতি বোঝা ভার৷ জাদুকরের উত্তরে যদি অসন্তুষ্ট হয়, নিমেষে গুলি করে হত্যা করাও অসম্ভব কিছু নয়৷
জাদুকর অল্পক্ষণ চুপ করে দঁড়িয়ে রইল৷ তারপর বলল, ‘আটটা পাত্র আনাও৷ তার মধ্যে একটা পাত্রে খানিকটা জল থাকবে৷ এক্ষুনি স্থির হয়ে যাবে তুমি ভালো নাকি মন্দ মানুষ৷’
দলপতি একটু অবাক হল—‘পাত্র!’
‘হ্যাঁ৷ আটটা পাত্র৷’
কিছুক্ষণের মধ্যেই সাতটা খালি এবং একটা পাত্রে জল এল৷ জাদুকর এবার তার ঝোলা থেকে একটা সরু নল বার করল৷ যে-পাত্রে জল, সেই জল দলপতিকে দেখিয়ে জিগ্যেস করল, ‘জলের কী রং?’
‘সাদা।’
‘বেশ৷ এবার দেখো...’
জাদুকর তার সরু নলের ভিতর দিয়ে প্রত্যেকটা পাত্রে একটু করে জল ঢালল৷ দেখা গেল সাতটি পাত্রের জলের রং সাতরকম৷ জাদুকর এবার সেই পাত্রগুলো দেখিয়ে বলল, ‘একজন মানুষের ভিতর কাম, ক্রোধ, লোভ, মায়া, ঘৃণা, হিংস্রতা সব থাকে৷ এই রংগুলো হচ্ছে তার প্রতীক৷ তোমার মধ্যেও আছে৷ এবার দেখো...’
সেই প্রত্যেক পাত্রের জল আবার অন্য আর-এক সরু নল দিয়ে খালি পাত্রে জমা করল৷ দেখা গেল আগেকার মতোই জল স্বচ্ছ ও সাদা৷ তাতে কোনো রং নেই৷
জাদুকরের জাদুতে সবাই মোহিত৷ দলপতি তো বটেই, এমনকী রুহও৷ এবার জাদুকর বলল, ‘এই জলটা হচ্ছ তুমি৷ সাদা৷ অর্থাৎ বেশিরভাগটাই ভালো মানুষ, তাই জলের রংটা আবার সাদা হয়ে গেছে৷ তোমার মধ্যে যদি ভালোর চেয়ে মন্দ বেশি থাকত, তাহলে জলের রং সাদা থাকত না৷ অন্যরংয়ের হয়ে যেত৷’
জাদুকরের খাতির ও সম্মান যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল৷ রুহ কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারল না৷ নক্ষত্রখচিত আকাশের নীচে শুয়ে একান্তে রুহ বলল, ‘তুমি কীভাবে খুনি ওই দস্যু লোকটাকে ভালো মানুষ বানিয়ে দিলে?’
রুহর কথায় জাদুকর হাসল৷ বলল, ‘রুহ, আমাকে তুমি খারাপ ভাবতে পারো, কিন্তু পরিস্থিতি বিশেষে কখনো-কখনো মিথ্যের আশ্রয় নিতে হয়৷ আর, আমি মনে করি—যে-মিথ্যে অন্যের ক্ষতি করে না অথচ নিজেকে ভালো রাখে, সে-মিথ্যেয় দোষ নেই৷’
‘মিথ্যেটা কী?’
‘মিথ্যেটা হল—ভালো-মানুষ বা মন্দ মানুষ বিচারের ক্ষেত্রে এই জলের কোনো ভূমিকাই নেই৷’
‘তাহলে?’
‘কিছু রাসায়নিক পদার্থের ভেলকি৷ আর কিচ্ছু নয়৷’
রুহ জাদুকরের উপস্থিত বুদ্ধিতে খুশি হয়৷ জাদুকর বলে, ‘আসলে, তোমার স্বপ্নটা অনেক বড়, রুহ৷ সেই বড় স্বপ্নটাকে সফল করতে হলে আমাদের অনেক পথ হেঁটে যেতে হবে৷ আর পথে, এই ধরনের নানা লোকজনের মুখোমুখি হতেই হয়৷ তাই বড় কিছু অর্জনের লক্ষ্যে এমন ছোটখাটো কিছু কৌশলের আশ্রয় নেওয়ার মধ্যে আমি অন্তত কোনো অন্যায় দেখি না৷’
‘অন্যায়ের কথা নয়, আমি ভাবছি অন্য কথা...’
‘কী?’
‘ভাবছি, গুহার ভিতর তুমি আমার হাতে একখানা কম্পাস দিয়ে পথে নামিয়ে দিয়েছিলে৷ মাঝে যদি তোমার সঙ্গে আমার না-দেখা হতো, এই দস্যুদলের মুখোমুখি হয়ে আমি কী করতাম? এরা তো ওই মরুর মাঝে গুলি করে মেরে ফেলে রেখে যেত!’
‘কে বলেছে তুমি একা পথে নেমেছিলে? কেন নিজেকে একা ভাবছ?’
‘তাহলে?’
জাদুকর এ-প্রশ্নের সোজাসুজি কোনো উত্তর দিল না৷ শুধু বলল, ‘তুমি যে একা নও, একসময় ঠিক বুঝতে পারবে৷ সেই সময় তোমার এখনো আসেনি, রুহ৷’
তারপর প্রসঙ্গটা খানিক ঘুরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই যে এখন তোমার মনে হতে পারে জেমিনির কাছ থেকে তুমি দূরে রয়েছ, কিন্তু সত্যিই কি তাই? নাহ্, জেমিনি তোমার সঙ্গেই আছে৷ তোমার অন্তরে তার আসন এ-জন্মের মতো খোদাই হয়ে গেছে৷
‘আসলে, আমি বা জেমিনি কেন, পৃথিবীর কোনোকিছুই কোনোকিছুর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়৷ আমরা পরস্পর গেঁথে আছি কার্য-কারণ সূত্রে৷ আমরা কেউই পৃথক কিছু নই৷ আমরা এক মহা-এককের অংশমাত্র৷’
রুহ চুপ করে জাদুকরের কথা শোনে৷ জাদুকর একটু থেমে বলে, ‘তুমি বারুখ স্পিনোজার নাম শুনেছ?’
‘না৷’
‘সপ্তদশ শতাব্দীর একজন গুরুত্বপূর্ণ ওলন্দাজ দার্শনিক৷ যাঁর দর্শন আরও অনেকের মতো অ্যালবার্ট আইনস্টাইনকেও আকর্ষণ করত৷ উনি বলেছিলেন—শুধু পৃথিবী কেন পৃথিবীর বাইরেও যা কিছু রয়েছে তা এক মহা-এককের অংশ৷ আমি একক বলতে অন্তঃসার বা সাবস্টেন্সের কথা বলছি৷ আমাদের এই অন্তঃসার বা সাবস্টেন্স আসলে একটাই৷ আমরা যে নিজেদের পৃথক অস্তিত্বের কথা ভাবি, তা এক ভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়৷
সুতরাং নিজেকে কখনো একা ভাববে না৷ আমরা কেউ কারও থেকে দূরে নেই৷ অনুভব করবে আমরা ছুঁয়ে আছি একে অন্যকে৷’
রুহ বলল, ‘বিষয়টা খুব গভীর এবং চমৎকার!’
জাদুকর হঠাৎ জিগ্যেস করল, ‘রুহ, তোমার মাথায় এই গুহার ভিতর ছবি আঁকার পরিকল্পনা এল কেমন করে?’
রুহ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল৷ তারপর বলল, ‘আঁকা ব্যাপারটার মধ্যে আমি ঘটনাচক্রে জড়িয়ে পড়ি৷ ফাদার জন আমাকে একটি গির্জায় আঁকার কাজে যুক্ত করেন৷ সেই থেকেই আঁকার প্রতি ভালোবাসা জন্মায়৷ তিনি মারা যাওয়ার পর গির্জায় থাকিনি৷ কাছের জঙ্গলে এসে নিজের আঁকার জায়গা হিসাবে ওই গুহাকে বেছে নিই৷ তবে আঁকার বিষয়ের পিছনে ফাদার জনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে৷ কারণ সাম্য, সৌহার্দ্যময় পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে তিনিই আমাকে শেখান৷ তিনিই আমার হাতে রং-তুলি আর কাপড়ের ক্যানভাসের বদলে গির্জার পাথুরে দেওয়াল তুলে দিয়েছিলেন৷’
রুহর কথা শুনে জাদুকর আর কোনো প্রশ্ন করে না৷ শুধু বলে, ‘বেশ ঠান্ডা নামছে৷ রুহ, বাইরে থাকা যাবে না৷ চলো তাঁবুর ভিতরে যাই৷’
জাদুকর ও রুহ খেজুরবীথির মাঝপথ দিয়ে তাঁবুর দিকে হাঁটতে থাকে৷
বুকের ভিতর তীব্র ঝড়৷ অথচ, বাইরে যেন নিষ্কম্প দীপাধার৷ শিখার মতো দুই চোখ স্থির, অচঞ্চল৷ কুনচেনকে এতখানি স্তব্ধ দেখে ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠে নালজোর৷ বলল, ‘আপনি এভাবে নিশ্চুপ থাকবেন না৷ আপনার সাহায্য না-পেলে আমরা এগোব কী করে?’
নালজোরের চোখে শান্ত চোখ রেখে কুনচেন লামা বললেন, ‘আমি অমিতাভের উপাসক৷ অহিংসাই আমার অন্তরের ধর্ম৷ আমি কীভাবে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে তোমাদের সাহায্য করতে পারি বলো? ওরা হিংস্র দখলদার, ওরা হত্যাকারী—সব জানি৷ কিন্তু...’
কুনচেন লামার কথা শেষ করতে না-দিয়েই নালজোর বলল, ‘সায়গন নদীর তীরে কুচি-টানেল খুঁড়ে ভিয়েতনামী গেরিলারা যেমন মার্কিনিদের পর্যুদস্ত করে দক্ষিণ ভিয়েতনাম ছাড়া করেছিল, আমাদের কৌশলও তাই৷
আমাদের তো টানেল খুঁড়তে হবে না৷ আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের গুহাগুলোকেই টানেলের মতো ব্যবহার করতে পারব৷ ভিয়েতনামীদের মতো সংগঠিত গেরিলা যুদ্ধের কৌশল নেওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ নেই৷ যদিও আমার দু-জনের দলে ভাগ হয়ে গেরিলা আক্রমণ অব্যাহত রেখেছি৷ কিন্তু তা আরও তীব্র করতে হবে৷ আর সেজন্য আমাদের মারাত্মক বিধ্বংসী অস্ত্র দরকার৷
আসলে মুখোমুখি যুদ্ধে আমাদের পূর্বপুরুষ চিনাদের তাড়িয়ে দিলেও বারবার ওরা ফিরে এসেছে৷ সামরিক শক্তির জোরে আমাদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে৷ আমরা চাইলেও এখন মুখোমুখি যুদ্ধে ওদের সঙ্গে পেরে উঠব না—এটাই বাস্তব৷ সুতরাং এইসময়ে গেরিলা কৌশল ছাড়া ওদের তাড়ানো সম্ভব নয় এ-কথা আপনিও জানেন৷ আপনি দেশকে, আমাদের নির্যাতিত জনজাতিকে বাঁচান৷ আমাদের হাতে যুদ্ধাস্ত্র তুলে দিন৷’
আগের মতোই চুপ করে থাকলেন কুনচেন৷ কুনচেনের মতো বিজ্ঞানের নানা শাখায় দক্ষ লামা তিব্বতে বিরল৷ চিকিৎসা-শাস্ত্রে যেমন সুপণ্ডিত, তেমনই প্রযুক্তি বিজ্ঞানে প্রখর মস্তিষ্ক! অবশ্য পাশ্চাত্য বিজ্ঞান-ধারণা দিয়ে কুনচেন লামার মতো মানুষের বিচার চলে না৷ হিমালয়ের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত এই দেশ চিকিৎসা ও প্রযুক্তি বিজ্ঞানের নানা শাখায় যে এত উন্নত তা বাইরের পৃথিবী আজও টের পায়নি৷ মূলত ভৌগলিক দুর্গমতার কারণেই তিব্বতি মানুষের জ্ঞানের চর্চার সঙ্গে বাইরের দুনিয়া পরিচিত হতে পারেনি৷
বছর কুড়ি আগে চিনা সৈন্যরা কুনচেন লামাকে বন্দি করে জেলে পাঠিয়েছিল৷ সেখানেই নালজোরের সঙ্গে আলাপ৷ একসময় নালজোরের বুদ্ধিতেই চিনাদের ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছিল দু-জন৷ তখনই কুনচেনের চেনা এই গুপ্ত ঠিকানাটা কাজে লেগে যায়৷ একসময় বছরের পর বছর কুনচেন উধাও হয়ে যেতেন৷ এবং এই গুহায় এসে তাঁর নানান আবিষ্কারের কাজে মগ্ন হয়ে থাকতেন৷
চিনাদের জেল থেকে পালানোর পর আত্মগোপনের জন্য এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর দ্বিতীয়টি ছিল না৷ তাই কুনচেন লামা নালজোরকে নিয়ে এখানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন৷
এ-এক বিস্ময়কর গুহা৷ চিনারা কেন তিব্বতিরাও এ-গুহার হদিশ জানে না৷ হয়তো কুনচেন লামাই প্রথম কোনো মানুষ যাঁর পায়ের চিহ্ন প্রথম পড়েছিল এই গুহার ভিতর৷ প্রথম কয়েক সপ্তাহ তো গুহাটাকে ঘুরে দেখতেই কেটে গিয়েছিল৷ দুঃসাহসী অভিযাত্রীর মতো কুনচেন তন্নতন্ন করে এই গুহার রহস্যকে জেনেছেন৷ এবং ধীরে-ধীরে এই গুহাকে তিনি নিজের গবেষণার জগতে পরিণত করেছেন৷
এ-যেন পৃথিবীর ভিতর আর-এক পৃথিবী! দুর্গম পাহাড়ের বরফের নীচে এত বড় গুহা যেন প্রকৃতির এক মস্ত বড় বিস্ময়! কী নেই এই হাজার-হাজার ফুট উঁচু ও দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে কয়েক মাইল বিস্তৃত গুহায়?
অবিশ্বাস্য হলেও এই গুহার নিজস্ব আবহাওয়ামণ্ডল আছে৷ নিজস্ব আকাশে ধোঁয়াটে মেঘ আছে৷ স্থানে-স্থানে কুয়াশার আস্তরণ আছে৷ উষ্ণ ও শীতল জলের ঝরনা আছে৷ নানান শ্রেণির উদ্ভিদ আছে৷ কুনচেন বছরের পর বছর পরীক্ষা করে এদের অসীম ভেষজ গুণের সন্ধান পেয়েছেন৷
জেল থেকে পালানোর পর নালজোর ও পরে তার গেরিলা নেতানেত্রীদের এখানেই আশ্রয় দিয়েছেন৷ নিজে বিজ্ঞানের সাধক হলেও নিজের পরাধীন দেশের এই যুবক-যবতীদের বুকে টেনে নিয়েছেন৷ এখান থেকেই তিব্বতের নানা জায়গায় এরা বিদ্রোহের জন্য খুব গোপনে সবাইকে সংগঠিত করে৷ পরে আবার এই গুহায় ফিরে আসে৷
কুনচেন নিশ্চুপ দেখে জায়পো তার ওভারকোটের পকেট থেকে হাত বের করে খানিকটা রুক্ষস্বরেই বলল, ‘আপনি জানেন, চিনা সরকার আমাদের সত্তর শতাংশ বনভূমি কেটে শেষ করে দিয়েছে? শুধু নিজেরা নয়, ইউরোপের নানা দেশের কাছে ডলারের বিনিময়ে আমাদের দেশকে তেজস্ক্রিয় আবর্জনা ফেলার আস্তাকুঁড় বানিয়েছে?
ক্রমশ আমাদের দেশ মরণ-ফাঁদে পরিণত হচ্ছে৷ এ-সময় আর চুপ করে থাকার সময় নয়৷ তীব্র লড়াইয়ের পথটাই আমাদের বেছে নিতে হবে৷’
‘জায়পো’ শব্দের তিব্বতি অর্থ হল সুন্দরী স্ত্রীলোক৷ নামের মতোই সে সুন্দরী৷ কিন্তু কথা বলার ধরন বেশ রুক্ষ৷ একইসঙ্গে কঠোর পরিশ্রমী ও বুদ্ধিমতী৷ না-হলে চিনা গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে একদম নেপাল সীমান্তের কাছাকাছি থোঙসা থেকে লাসার অদূরে গ্যাংচী পর্যন্ত মহিলাদের সংঘটিত করার কাজটা করতে পারত না৷
অবশ্য শুধু জায়পো নয়, লোলহা ও সাংমুও অসমসাহসী৷ মৃত্যুর পরোয়া করে না৷ এই তরুণীদের দেখে কে বলবে এরা এক-একজন দুর্ধর্ষ গেরিলা নেত্রী! নালজোর, জিগমে, দেনজিন, জাময়াং, অনটেনদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়৷ বরং জায়পোর সাহসই যেন সবচেয়ে বেশি৷
কুনচেন জায়পোর ক্ষোভের আঁচটা বুঝলেন৷ তারপর শান্তভাবে বললেন, ‘এ আর নতুন কথা কী, জায়পো! মাও জে দং-এর সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তো আজ প্রমাণিত সত্য৷ তিব্বতের সম্পদ তো ওদের অন্যতম লক্ষ্য৷ ক্রোমিয়াম, কয়লা, সোনা, হিরে, কোবাল্ট, তামা, গ্রাফাইট, টাইটেনিয়াম—এদেশ থেকে কী লুঠ করতে বাকি রেখেছে ওরা?
‘তাছাড়া ওদের ফাইভ-ফিঙ্গার পলিসিকে আমরা যদি একটা মানুষের হাত বলে কল্পনা করি, তাহলে তিব্বত হল হাতের তালু৷ আর আঙুলগুলো হল লাদাখ, নেপাল, সিকিম, ভূটান, অরুণাচলপ্রদেশ৷
‘প্রাকৃতিক সম্পদের লুঠতরাজ ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনই তো চিনের একমাত্র লক্ষ্য৷ তাই তোমার কথায় আমি মোটেই অবাক হচ্ছি না৷’
‘তাহলে আপনি কিছু করুন৷ আমরা প্রাণ দিতে প্রস্তুত কিন্তু চিনের কাছে এই পরাধীনতার জীবন আর মেনে নিতে পারছি না৷’
কুনচেন বললেন, ‘কিন্তু আমাদের নেতারা তো সেই ১৯৫১ সালেই সেভেনন্টিন পয়েন্ট এগ্রিমেন্টে সাক্ষর করেছিল৷ ভুলে গেলে?’
এবার লোলহা বলল, ‘না, এই ইতিহাস আমরা জানি৷ ভুলিওনি৷ কিন্তু আপনার মুখে এই চুক্তির কথা শুনে একটু অবাকই হলাম৷’
‘কেন?’ জিগ্যেস করলেন কুনচেন৷
‘ওই চুক্তি কি আমাদের নেতারা ইচ্ছেয় সই করেছিলেন নাকি সই করতে বাধ্য করা হয়েছিল? অর্ধেক তিব্বত গায়ের জোরে দখল করে রেখে আমাদের বাধ্য করা হয়েছিল৷ ওই চুক্তিকে আজকে দাঁড়িয়ে আমরা কোনো চুক্তি বলেই মনে করি না৷’ লোলহা স্পষ্ট মত জানাল৷
‘তা ঠিকই বলেছ৷’ লোলহার মত মেনে নিলেন কুনচেন৷ বললেন, ‘আমি আর একটু ভাবি, তথাগত নিশ্চয় কোনো পথ দেখাবেন৷’
নালজোর বলল, ‘আমি, লোলহা, দেনজিন ও সাংমু আজ চলে যাব৷ হয়তো পক্ষকাল পর ফিরব৷ আপনি অনুমতি দিন৷’
মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন কুনচেন৷
বেশ রাত্রি হয়েছে৷ যবের ছাতু ও ইয়াকি দুধ থেকে তৈরি মাখনের চা খেয়ে রাতের খাওয়া শেষ করেই ওরা তিনজন বেরিয়ে গেল৷ তিনজনের হাতে তিনটে সাদা-রেশমের তৈরি ঘুড়ি৷
গুহার গোপন মুখের বরফ সরিয়ে ওরা বরফের প্রান্তরে এসে দাঁড়াল৷ হাড়হিম করা ঠান্ডা৷ কিন্তু বাতাসের গতি দেখে নালজোর বলল, ‘বাতাস আমাদের অনুকূলে৷ আর দেরি নয়৷’
কাঠের কাঠামোয় রেশমের কাপড় দিয়ে কুনচেনের বানানো এই ঘুড়ির কাছে হেলিকপ্টার তুচ্ছ৷ পাহাড়ি খাদের কিনারার অল্প দূর থেকে ঘুড়ি নিয়ে দৌড়ে গিয়ে উঠলেই হল৷ ছোট বাক্সের মতো ঘুড়ির ভিতর গতি নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল রয়েছে৷ হাওয়ার অনুকূলে তীব্রগতিতে এই ঘুড়ি উড়ে চলে নিঃশব্দে৷ শুধু একজন নয়, একসঙ্গে দু-জনকে নিয়েও এই ঘুড়ি তীব্র গতিতে উড়ে যেতে পারে৷
চিনাদের চোখ এড়িয়ে নালজোররা যাতায়াতের জন্য এই ঘুড়িই ব্যবহার করে৷ পাহাড়ি উপত্যকা ও পাহাড়চুড়োগুলো বরফ-ঢাকা বলে মানুষের চোখকে ধুলো দেওয়ার জন্য এরা ঘুড়িতে সাদারংয়ের রেশম কাপড়ই ব্যবহার করে৷ ঘুড়ির সাদা রং আর বরফের সাদা রংয়ে কোনো পার্থক্য থাকে না৷ ফলে শত্রুপক্ষের নজরে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে না৷
এদের এই যাতায়াতের কৌশল ভারি অদ্ভুত! ঘুড়িতে সওয়ার হয়ে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল পেরিয়ে এরা জনপদের বেশ কিছু দূরে কোনো পাহাড়ি গুহায় ঘুড়িগুলো লুকিয়ে রাখে৷ তারপর পায়ে হেঁটে নির্দিষ্ট জনপদে পৌঁছে নিজেদের দলের লোকজনদের কাছে কখনো ইয়াক কখনো ঘোড়া সংগ্রহ করে জনসংগঠনের কাজ করে পুনরায় লুকোনো ঘুড়ি নিয়ে আবার এই গুহায় ফিরে আসে।
সন্ধে থেকে নালজোর, জায়পো, লোলহাদের কথাগুলো খুব ভাবাচ্ছে কুনচেনকে৷ কুনচেনের চোখে ঘুম নেই৷ গুহার ভিতর স্বাভাবিক নানা ভেষজগুণ সম্পন্ন উদ্ভিদ থাকলেও কুনচেন নানা জায়গা থেকে আরও প্রয়োজনীয় ভেষজের গাছ এনে লাগিয়েছেন৷ হঠাৎ মনে পড়ল বিশেষ সেই গাছটার কথা৷ যে গাছটার বীজের আরক মানুষের মস্তিষ্কের মৃতকোষকে পুনরায় সজীব করতে পারে৷ হিমালয়ের একটি বিশেষ জায়গা রয়েছে, একমাত্র সেই জায়গাতেই এই গাছটির সন্ধান মেলে৷ বহুদিন ধরে গুহার ভিতর তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু বাঁচেনি৷ কিন্তু কিছু বছর আগে গাছটির স্থান পরিবর্তন করায় গাছটি বেঁচেছে৷ কিছুদিন আগে তার হলুদ-বেগুনি মেশানো ফুলও দেখা গেছে৷
কুনচেনের ইচ্ছে হল সেই গাছটির কাছে যেতে৷ কুনচেন একা-একা পাথুরে পথের ফাঁক দিকে সেই বিশেষ ভেষজ উদ্যানের দিকে এগোতে লাগলেন৷ গুহার নিঃশব্দ মেঘে তখন আশ্চর্য এক নীলাভ আলো উজ্জ্বল হয়ে আছে৷
ঘন দেবদারুর জঙ্গলে ছুটে যাওয়ার সময় গাছের গায়ে ধাক্কা লাগল৷ মোটা গাছের গুঁড়িতে পা আটকে গেল দেনজিনের৷ ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠল৷ ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়ল দেনজিন ও সাংমু৷ ঘোড়াটা কিছুদূর গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল বটে৷ কিন্তু সেদিকে না-তাকিয়ে দেনজিন সাংমুর কাছে উঠে যেতে গিয়ে দেখল সে আর দাঁড়াতে পারছে না৷ বাঁ-পায়ে ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে৷ হাত দিয়ে বুঝল বাঁ পা-টা ভেঙে গেছে৷
ওদিকে সাংমুও যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে৷ কনুই থেকে ডানহাত উড়ে গেছে ঘণ্টা দুই আগে৷ গ্রেনেড বিস্ফোরণে৷ মুহূর্তে দেনজিন ঠিক করল—ঘোড়াটার আর দরকার নেই৷ অন্ধকার নেমেছে৷ সুতরাং ঘোড়া নিয়ে আর বেশিদূর যাওয়া যাবে না৷ বরং ডানদিকের পাহাড়ি জঙ্গল আড়াআড়ি পার হয়ে যেতে পারলে নিশ্চিত কোনো জনপদের দেখা মিলবে৷
প্রায় বুকে হেঁটে সাংমুর কাছে পৌঁছে গেল দেনজিন৷ নিজের হাড়ভাঙা যন্ত্রণা চেপে জিগ্যেস করল, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে, সাংমু?’
সাংমুর মুখ থেকে উত্তর এল না৷ কেবল গোঙানি শোনা গেল৷ দেনজিন সাংমুর গায়ের জ্যাকেট দিয়ে ডানহাতে আরও শক্ত বাঁধন দিল৷ কিন্তু বুঝতে পারল রক্ত বার হচ্ছে৷ জ্যাকেটের গায়ে লেগে থাকা রক্ত থকথকে হয়ে চ্যাটচ্যাটে হয়ে গেছে৷
অন্ধকারে হাতড়ে একটা গাছের মোটা ডাল ভেঙে ছোট করে নিল৷ তারপর পিঠের রুকস্যাকে থাকা দড়ি দিয়ে নিজের বাঁ পা ভালো করে বাঁধল৷ তারপর সাংমুকে মাটি থেকে তুলল৷ পাহাড়ি উপত্যকার ঢালু জঙ্গলের ভিতর দুই আহত গেরিলা যোদ্ধা পরস্পরকে ধরে কোনো রকমে উঠে দাঁড়াল৷ তারপর নিজেদের টেনে-হেঁচড়ে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পাহাড়ের ওপর দিকে উঠতে লাগল৷
যত দ্রুত সম্ভব এই এলাকা ছেড়ে পালাতে হবে৷ কারণ চিনা-সেনাদের ছাউনি তারা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দিয়েছে ঠিক কথা, কিন্তু এতক্ষণে অন্য সেনা ছাউনিতে খবর পৌঁছে গেছে৷ সুতরাং চিনা সেনারা এখন চুপ করে বসে নেই৷ খ্যাপা কুকুরের মতো তল্লাশে নেমেছে৷
ঘটনাস্থল থেকে পঞ্চাশ-ষাট মাইল দূরে পালিয়ে এসেছে ঠিকই, তবু নিরাপদ নয়৷ তবে এই অন্ধকারে এত ঘন জঙ্গলের ভিতর তাদের খুঁজে পাওয়া শক্ত৷ তাই আর গভীরে চলে যাওয়ার দরকার৷ উঠে যাওয়া উচিত আরও ওপরের দিকে৷ তাহলেই আপাতভাবে কোনো দুর্গম স্থানে কিছুটা নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হতে পারে৷
একটানা হাঁটা যাচ্ছে না৷ কিছু দূর গিয়ে গিয়ে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে৷ পাহাড়ি ঢালে ইতস্তত বড়-বড় পাথরের টুকরো ছড়িয়ে রয়েছে৷ সেইসব পাথরে মাঝে-মাঝে সাংমুকে বসিয়ে দিলেও দেনজিন নিজে বসছে না৷ কারণ বসার পর দাঁড়াতে গেলে বাঁ পায়ের যন্ত্রণাটা যেন দ্বিগুণ বেড়ে যাচ্ছে৷ মনে হচ্ছে যন্ত্রণায় প্রাণ বেরিয়ে যাবে৷
মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে৷ এখানে জঙ্গল তুলনায় পাতলা৷ অল্প-অল্প আকাশ দেখা যাচ্ছে৷ দেনজিন দেখল দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশে একফালি চাঁদ৷ তার ফ্যাকাসে-হলুদ আলো মাটি পর্যন্ত আসছে না৷ এলে হয়তো হাঁটতে একটু সুবিধে হতো৷ হঠাৎ সাংমু পায়ে হোঁচট খেয়ে পাথুরে মাটিতে লুটিয়ে গেল৷ দেনজিন তৎক্ষণাৎ তার পাশে বসে পড়ল৷ ক্ষীণস্বরে সাংমু বলল, ‘আমাকে গুলি করো, দেনজিন৷ আর পারছি না৷ আমাকে তুমি হত্যা করো৷’
সাংমুর কথায় অন্তর কেঁপে উঠল দেনজিনের৷ সাংমুর মাথার লম্বা চুলে হাত বুলিয়ে দেনজিন বলল, ‘তোমার মতো, সাহসিনীর মুখে এ-কথা মানায় না, সাংমু৷ একটু সহ্য করো৷ সব ঠিক হয়ে যাবে৷ ক-দিনের মধ্যেই আমরা আবার কুনচেনের গুহায় ফিরতে পারব৷’
‘না, দেনজিন৷ আমি আর ফিরতে পারব না৷ আমাকে গুলি করো৷’
দেনজিনের হাত সাংমুর আহত স্থানের কাছে এসে থমকে গেল৷ অন্ধকারেও বুঝতে পারল গ্রেনেডের স্প্লিন্টার সেখানে গেঁথে আছে৷ দেনজিন সেই লোহার টুকরোটা টেনে বার করে দিল৷ আবার কঁকিয়ে উঠল সাংমু৷
চিনা সেনা ছাউনি উড়িয়ে দেওয়ার পর কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ছিল দেনজিন ও সাংমু৷ কয়েক পলকের জন্য দেখে নিচ্ছিল কত মারাত্মক হয়েছে ধ্বংসলীলা৷ ঠিক সেই মুহূর্তে পুড়তে থাকা ছাউনির পাশ থেকে একজন চিনা সেনা বন্দুক তাক করে ছিল দেনজিনের দিকে৷ দেনজিন তৈরিই ছিল৷ সঙ্গে-সঙ্গে তার রিভলভার গর্জে উঠেছিল৷ একইসঙ্গে সাংমু হ্যান্ডগ্রেনেডের রিং খুলে ছুড়ে ছিল সেই সেনার দিকে৷ কিন্তু গ্রেনেডটা হাত ফসকে খুব কাছেই বিস্ফোরিত হয়৷ মারাত্মক জখম হয় সাংমু৷ ডানহাতের কনুই থেকে উড়ে যায়৷ সারাগায়ে স্প্লিন্টারের টুকরো বিঁধে যায়৷ ভাগ্য ভালো, প্রাণ যায়নি৷ কিন্তু তখন এত ভালো করে দেখার সময় ছিল না৷ নিজের ঘোড়ায় সাংমুকে তুলে পাহাড়ি জঙ্গলের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছিল দেনজিন৷
পুনরায় একই কথা খুব ক্ষীণ গলায় বলল সাংমু, ‘দেনজিন, তুমি দয়া করে আমাকে গুলি করো৷ এত কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না৷’
বুকের ভিতর হাহাকার৷ কিন্তু গলায় দৃঢ়তা ফেরালো দেনজিন৷ বলল, ‘বিপ্লবীদের মৃত্যু নিজেদের কার্তুজে নয়, লেখা থাকে শত্রুর কার্তুজে৷ ওঠো৷ দাঁড়াও৷ আমাদের পথ এখনো অনেক বাকি৷ সামনে এখনো অনেক লড়াই অপেক্ষা করে আছে৷’
প্রায় অসাড় হয়ে আসা সাংমুর বাঁ হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল দেনজিন৷ তারপর ভাঙা পায়ের যন্ত্রণা নিয়েই ইঞ্চি-ইঞ্চি করে উঠতে লাগল ওপরের দিকে৷
রাত শেষে ক্রমশ ভোর জাগছে৷ ওরা ডানদিকের পাহাড়ি উঁচু ঢালের ওপর চলে এল৷ দেনজিন যা ভেবেছিল ঠিক তার উলটো হল৷ ভেবেছিল—উঁচু থেকে দেখলে নিশ্চয় কোনো জনপদের হদিশ মিলতে পারে৷ কিন্তু তা হল না৷ এখানে তো আরও গভীর জঙ্গল৷ তবে আবছায়া আলোয় পাহাড়ের এই ঢালে একটা সুড়ঙ্গ চোখে পড়ল৷ সাংমুকে বসিয়ে দেনজিন খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে সেই সুড়ঙ্গে নামল৷ সুড়ঙ্গটা বেশি গভীর নয়৷ ঢালের গায়ে হওয়ায় চট করে কারও চোখে পড়ার ভয় নেই৷
সুড়ঙ্গের ভিতর কিছু ডালপালা ভেঙে জড়ো করল দেনজিন৷ তারপর সাংমুকে এনে সেই ডালপালার বিছানায় শুইয়ে ডানহাতের শক্ত বাঁধন খুলে দিল৷ রক্ত চোয়ানো বন্ধ হয়েছে ঠিকই, তবে বীভৎসভাবে ছেঁড়া মাংস ঝুলছে৷ দেনজিন প্রথমেই হাতের ও সারা শরীরের ক্ষতস্থানগুলো পরিষ্কার করল৷ রুকস্যাকে থাকা ভেষজ ওষুধের গুঁড়ো ক্ষতস্থানগুলোর ওপর ছড়িয়ে দিল৷ সাংমুর কোনো সাড়া নেই৷ চোখ বন্ধ৷ শুধু নিঃশ্বাস পড়ছে৷ বুক ওঠানামা করছে৷ প্রাণের স্পন্দন বলতে এটুকুই৷ নিঃসাড়ে ডালপালার বিছানার ওপর শুয়ে আছে৷
রোদ উঠেছে৷ তবে এখানে সরাসরি রোদ পড়ছে না৷ গাছপালার ফাঁক দিয়ে বর্শার ফলার মতো রোদ কোথাও-কোথাও ছুঁয়েছে জঙ্গলের পাথুরে মাটি৷ দেনজিন কয়েকবার আলতো করে ডাক দিল সাংমুকে৷ কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না৷
দুপুরের দিকে তিনবার চক্কর দিল চিনা হেলিকপ্টার৷ দেনজিন বুঝল সুড়ঙ্গ থেকে বেরোনো নিরাপদ নয়৷ সুড়ঙ্গের ভিতরে থাকা কিছু ডালপালা দিয়ে বন্ধ করে দিল সুড়ঙ্গের ছোট্ট মুখ৷
ভাঙা পায়ের জন্য তেমন কষ্ট হচ্ছে না৷ ভয় পাচ্ছে না চক্কর দেওয়া চিনা-হেলিকপ্টারগুলোকেও৷ চিন্তা হচ্ছে সাংমুর জন্য৷ দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামল৷ তিনবারের বেশি হেলিকপ্টার চক্কর দেয়নি৷ দেনজিন কপালে হাত রাখল সাংমুর৷ চমকে উঠল৷ জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে৷ এবার সত্যিই ভয় করতে লাগল দেনজিনের৷ সূর্যাস্তের আগে সাংমু একবার চোখ খুলেছিল৷ রক্তের মতো লাল৷ সে চোখের মণিতে কোনো ভাষা ছিল না৷
সাংমুর মাথা নিজের কোলের ওপর নিয়ে বসে আছে দেনজিন৷ ভাবতেই পারছে না—এমন প্রাণোচ্ছল মেয়েটা গভীর জঙ্গলের ভিতর একটা সুড়ঙ্গে এমন সাড়হীন হয়ে শুয়ে আছে৷
দ্বিতীয়দিন দুপুরে সাংমু নিঃশব্দে চলে গেল৷ সাংমুর মুখের ওপর ঝুঁকে আছে দেনজিনের মুখ৷ চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল সাংমুর নিথর কপালে৷ আকাশে তখনও চক্কর কাটছে চিনা সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার৷
সাংমুর শোক বুকের ভিতর পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে৷ দেনজিন ভাবতে পারছে না—এখন তার কী করণীয়৷ গভীর শোক মানুষকে স্থির করে৷ দিন হলেই আকাশে হেলিকপ্টার৷ আর রাত্রিতে এত অন্ধকার যে দুহাতের দূরত্বেও কিছু নজরে আসে না৷ রুকস্যাকে যা খাবার ছিল ফুরিয়ে গেছে৷ সাংমুর দেহেও পচন শুরু হয়েছে৷ ক্রমশ দুর্গন্ধে ভরে গেছে ছোট্ট সুড়ঙ্গ৷ অথচ বাইরে বেরোনো যাচ্ছে না৷ দুর্বিষহ সময়৷ কোথা থেকে বড়-বড় মাছি এসে জুটেছে৷ সাংমুর শরীরে পোকা কিলবিল করছে৷
সাতদিন পর জঙ্গলের মাথায় আর কোনো হেলিকপ্টারকে চক্কর দিতে দেখা গেল না৷ পরদিন খুব ভোরে তাই সুড়ঙ্গ থেকে বেরলো দেনজিন৷ তার আগে সুড়ঙ্গের ভিতর সাংমুর গলিত শবদেহকে যত্ন করে সমাধিস্থ করল৷ সাংমুর রুকস্যাক থেকে রিভলভারটা নিয়ে ভরে নিল নিজের রুকস্যাকে৷ বিপ্লবীদের কাছে খাবারের চেয়েও অস্ত্র অনেক বেশি মূল্যবান৷
মনের জোরে বেরলো ঠিকই, কিন্তু ভাঙা পা-টা মাটিতে ফেলতে পারছে না৷ কাঠের শক্ত বাঁধন দিয়ে আটকে রাখলেও ভাঙা পায়ে কোনো জোর নেই৷ দেনজিন মাটিতে বসে পড়ল৷ পাহাড় বলে ভূমিতল অসমান৷ ছোট-বড় পাথরে পূর্ণ৷ দেনজিন নিজের শরীরটাকে মাটিতে ঘষটে-ঘষটে টেনে নিয়ে যেতে থাকল৷ সুবিধে একটাই—এখন চড়াই ভাঙতে হচ্ছে না৷ ক্রমশ পাহাড়ের ঢালু গা ধরে নামছে৷
কয়েকদিন খাওয়া জোটেনি, সাংমুর মৃত্যু, গলিত শবদেহ নিয়ে সাতদিন ছোট্ট সুড়ঙ্গে কাটানো, তারপর বীভৎসভাবে ফুলে ওঠা ভাঙা পায়ের কেটে যাওয়া অংশ থেকে পুঁজ গড়াচ্ছে—সব মিলিয়ে দেনজিন যেন নিজেকে আর মানুষ ভাবতে পারছে না৷ বিকলাঙ্গ জন্তুর মতো যন্ত্রণাকাতর শরীরটাকে কোনোরকমে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চলেছে৷ নিজেও জানে না, কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে৷
জঙ্গল যেন গোলকধাঁধা৷ কোনদিকে গেলে স্বদেশি মানুষের মুখ দেখা যাবে বুঝতে পারছে না৷ দু-দিন ধরে বোধহয় একমাইল পথও এগোতে পারেনি৷ মাঝে-মাঝেই চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে উঠছে৷ খিদেয় পেট মোচড় দিচ্ছে৷ হঠাৎ দেনজিন দেখল, সে যে-গাছের নীচে পড়ে আছে, সেই গাছের গোড়ায় সাদা-সাদা ছত্রাক ফুটেছে৷ হাত বাড়িয়ে সেই ছত্রাক তুলে চিবোতে লাগল৷ কয়েকমুহূর্ত পরেই তীব্রভাবে গা গুলিয়ে উঠল৷ ভীষণ বমি পেতে শুরু করল৷ পেটে কিছু নেই যে বার হবে৷ কিন্তু বমির দাপটে যেন প্রাণ যায় যায় অবস্থা! বমির তীব্রতা কমলে সেই গাছের নীচেই পড়ে থাকতে-থাকতে ঘুমিয়ে পড়ল একসময়৷
কতক্ষণ ঘুমিয়েছে জানে না৷ ঘুম ভাঙতেই বুঝল তার চোখে ও মনে আশ্চর্য ঘোর৷ ক্রমশ যেন বোধবুদ্ধি হারিয়ে যাচ্ছে৷ নিজেকেই নিজে সজাগ করার চেষ্টা করল৷ কিন্তু বেশিক্ষণ মনের জোর ধরে রাখতে পারল না৷ শুধু মনে হচ্ছে আর বাঁচবে না৷ সময় ফুরিয়ে আসছে৷ দেনজিন খুব কষ্ট করে মাটির ওপর সোজা হয়ে বসল৷ এভাবে পড়ে থাকার অর্থ স্বেচ্ছায় নিজেকে মৃত্যুর কাছে সমর্পণ করা৷
মধ্যরাতে আবার পাথুরে মাটির ওপর ঢাল বেয়ে গড়াতে শুরু করল৷ কোনোভাবে যদি বাঁ পা-টা কেটে বাদ দেওয়া যেত হয়তো স্বস্তি মিলত৷ ঠিক সেই সময়েই একটা পাথরখণ্ডে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল সে৷ মুহূর্তে ভয়ংকর যন্ত্রণায় সমস্ত শরীর বেঁকে গেল৷ দেনজিন জ্ঞান হারাল৷ তার সংজ্ঞাহীন শরীর গড়িয়ে যেতে থাকল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে৷
জ্ঞান ফিরতে দেখল সে পড়ে আছে ঝোপঝাড়ের মাঝে৷ গায়ের পোশাক ছিঁড়ে গেছে৷ সমস্ত শরীর পাথুরে মাটি ও গাছপালায় ঘষা লেগে কেটে গেছে৷ কাটা জায়গাগুলো বেশ জ্বালা করছে৷ তবে পিঠে বেঁধে রাখা রুকস্যাকটা হারিয়ে যায়নি৷
জায়গাটা প্রায় সমতল৷ কিছুক্ষণ ধাতস্থ হওয়ার পর শুনতে পেল বয়ে চলা জলের শব্দ৷ কাছেপিঠে কোথাও নদী আছে নিশ্চয়৷ ঝোপের ভিতর চোয়াল শক্ত করে উঠে বসল৷ দেখল অল্প দূরে নদী৷ নদীর জল চাঁদের মরা-আলোয় চিকচিক করছে৷ ঠিক তার ওপারে দিগন্তজোড়া পাহাড়ের ছায়া৷ তার গায়ে একটি আলোর বিন্দু৷
মুহূর্তে মনের জোর শতগুণ বেড়ে গেল৷ নিজেকে গড়াতে-গড়াতে নদীর দিকে নিয়ে চলল৷ নদীর কাছে পৌঁছে দেখল, সরু জলধারার ওপর দুটি কাঠ পাশাপাশি শোয়ানো—পারাপারের সরু সাঁকো৷
সাঁকো দিয়ে জলধারা পার হল দেনজিন৷ এবার আবার ওঠার পালা৷ প্রায় শেষরাতে সেই আলোর বিন্দুর কাছে পৌঁছে জ্ঞান হারাল সে৷
ঘরটা প্রায় পুরোটাই অন্ধকার৷ ছোট্ট ঘুলঘুলির মতো জানালা দিয়ে অল্প আলো আসছে৷ ঘুম অনেক আগেই ভেঙেছে৷ কিন্তু বুঝতে পারছিল না সে বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে!
ছোট্ট জানালার বাইরে দিয়ে যখন কয়েকটি মেষকে চলে যেতে দেখল, তখন মনে হল—না, সে মরেনি৷ দিব্যি বেঁচে আছে৷ তবে শরীরের বামদিকটা প্রায় অসাড়৷ নড়াতে পারছে না৷
আবছায়া মনে পড়ল নদীর পেরোনোর কথা৷ আলোর বিন্দু দেখে জন্তুর মতো বুকে হেঁটে আসার কথা৷ এমন সময় ছাদের একটি কোণ থেকে কাঠের চৌকো পাটাতন সরে গেল৷ সেখানে রাখা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে একজন নেমে এল৷ লোকটা দেনজিনের শুয়ে থাকা খাটিয়ার কাছে এল৷ জানালা দিয়ে আসা আলোয় লোকটাকে দেখা যাচ্ছে৷ মুখে আপাত কাঠিন্য লেগে আছে৷ দেনজিনের আপাদমস্তকে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘যাদের হাতে অত্যাধুনিক বন্দুক, মেশিনগান, ট্যাংক তাদের সঙ্গে পুঁচকে রিভলভার নিয়ে লড়াই করার সাহস কোথা থেকে পাও?’
লোকটা কি জ্যোতিষী? কী করে বুঝল সে চিনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে? দেনজিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না৷ বুকের ভিতর মরণপণ সাহস থাকতে হয়৷ হার-না-মানা আবেগ থাকতে হয়৷
যারা দখলদার তারা অন্যের মাটি দখলে রাখার জন্য যুদ্ধ করে, ফলে তাদের সেই সাহস ও আবেগ—কোনোটাই থাকে না৷ তারা বেতনভোগী সেনা৷ আর, আমরা যুদ্ধ করি নিজের মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার জন্য৷ আমাদের বুকে সাহসের যে আগুনপিণ্ড জেগে আছে, তার উত্তাপে ওরা একদিন ছাই হবে৷ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে৷’
ছাদ থেকে সিঁড়ি বেয়ে একটি তরুণী নেমে এল৷ তার হাতে একটি পাত্র৷ তরুণী বলল, ‘বাবা, এনেছি৷’
লোকটা দুধের পাত্রের দিকে ইশারা করে দেনজিনকে বলল, ‘নাও৷ বহুদিন কিছুই তো জোটেনি বুঝতে পারছি৷’
মেয়েটি দুধের পাত্র এগিয়ে দিল৷ দেনজিন ধীরে-ধীরে পান করতে থাকল৷
দুধের পাত্র শেষ হলে লোকটি বলল, ‘তুমি কি জানো, তুমি আমাকে কতখানি বিপদে ফেলেছ?’
দেনজিন চুপ করে থাকে৷
লোকটা বলে, ‘গত কয়েকদিনে চিনা সেনারা তিনবার তল্লাশ করে গেছে৷ সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে ফিরে গেছে৷ তবে যে-কোনোদিন আবার আসতে পারে৷ তখন তোমাকে যদি এখানে দেখে, তোমাকে তো নিয়ে যাবেই, তার আগে আমাদের বুক গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিয়ে যাবে৷’
দেনজিনের মনে হল, সত্যিই সে এদের বিপদে ফেলেছে৷ বলল, ‘আমাকে একটা ইয়াক দিতে পারেন? আসলে এই পা নিয়ে তো হাঁটতে পারব না, তাই ইয়াক পেলে চলে যাব৷ রাত্রি নামলেই বেরিয়ে পড়ব৷’
লোকটা তীক্ষ্ণ চোখে দেনজিনকে ভালো করে দেখে নিয়ে তার ওপর প্রায় ঝুঁকে পড়ল৷ তারপর স্কার্টের ভিতর থেকে একটা ছুরি বের করল৷ ছুরি দিয়ে দড়ির বাঁধনগুলো কেটে কাঠটা সরিয়ে দিল৷ ভাঙা পায়ে দগদগ করছে ঘা৷ ক্ষতস্থানে দুর্গন্ধ৷ লোকটার কিন্তু কোনো বিকার নেই৷ মেয়ের দিকে ইশারা করল৷ মেয়েটি চলে গেল৷
কিছুক্ষণ পরেই একটি বড় পাত্রে গরম জল নিয়ে এল সে৷ সঙ্গে একটা কাঠের বাক্স৷ লোকটা বাক্সে রাখা একটা কাঠের বয়াম থেকে সবুজ রংয়ের থকথকে ভেষজ বার করে সেই গরমজলে মিশিয়ে দিল৷ তারপর সেই সবুজ জলে পুরো ক্ষতস্থানটা পরিষ্কার করে দিল৷ মেয়েটি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এগিয়ে দিচ্ছে বাবার হাতে৷
কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্ষতস্থানে নতুন আর-এক ধরনের ভেষজের প্রলেপ দিল৷ প্রলেপ দেওয়ার পর একটি লোহার পাত পায়ের গোড়ালি থেকে হাঁটু পর্যন্ত রেখে রেশমের নরম কাপড় দিয়ে মুড়ে ভালো করে বেঁধে দিল৷ তারপর বলল, ‘এক মাস এই পায়ে ভর দেওয়া যাবে না৷ এক মাস পর পা আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে৷’
কথাগুলো বলেই ঘরের কোনায় থাকা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন৷ সিঁড়ি দিয়ে ওঠার আগে একবার থমকে দাঁড়ালেন৷ তারপর বললেন, ‘মুখ দিয়ে শব্দ করবে না৷ বাইরে যেন কোনো আওয়াজ না-যায়৷ জানালা সবসময় বন্ধ থাকবে৷
আর হ্যাঁ, যদি চলে যেতে চাও, যেতে পারো৷ ইয়াকের ব্যবস্থা আমি করে দেব৷’
লোকটা যতক্ষণ ছিল তরুণীটি সেভাবে কথা বলেনি৷ গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিল৷ লোকটা ছাদে চলে যেতেই মুচকি হাসল মেয়েটি৷ তারপর বলল, ‘আমার বাবা এইরকমই৷ গতকাল আপনি জ্ঞান হারিয়ে আমাদের ঢালু সিঁড়ির ধাপে পড়েছিলেন৷ বাবাই আপনাকে তুলে এনে এই গোপন ঘরে শুইয়ে দিয়েছিল৷ আমাদের মূল বাড়ির নীচে এই কুঠুরি৷ গুদামঘর বলতে পারেন৷ দেখছেন না, কত বাতিল জিনিসপত্র ঘরময় ছড়িয়ে রয়েছে!’
‘মাটির তলায় এই কুঠুরি হলে জানালা দিয়ে বাইরের আলো আসছে কী করে?’
‘মাটির তলায় ঠিকই৷ তবে পাহাড়ের ঢালে তো৷ তাই দেওয়ালের একপাশ ফাঁকা৷ তবে ওপাশ দিয়ে লোকজন চলাচল করে না৷ দু-একটা মেষ, গাধা হয়তো চরতে-চরতে চলে আসে৷ আপনি এ-নিয়ে ভাববেন না৷
আপনার রুকস্যাকের জিনিসপত্র দেখে বাবা আপনার সম্পর্কে সবই বুঝতে পেরেছিলেন৷ আপনাকে শোয়ানোর পর বাবা আমাকে বলেছিলেন, ‘এই বেপরোয়া, দামাল, বদমাইস ছেলেগুলো আছে বলে এই দুঃসময়েও স্বপ্ন দেখি আমার মাতৃভূমি একদিন স্বাধীন হবে৷ আমরা মুক্ত আকাশ পাব৷ দখলদার চিন-সরকার বাধ্য হবে আমাদের মাটি থেকে সরে যেতে৷’
লোকটার জন্য কৃতজ্ঞতায় মন আর্ত হয়ে উঠল দেনজিনের৷ দেনজিন জিগ্যেস করল, ‘ওঁর নাম কী?’
‘রিনচেন৷’
‘তোমার?’
‘পেমা৷’
‘তুমি তোমার নামের মতোই সুন্দর৷ পদ্মফুলের মতোই স্নিগ্ধ৷’
দেনজিনের কথায় লজ্জা পেল পেমা৷ পেমা বলল, ‘আমার বাবা মানুষটা বাইরে যতটা কঠিন, ভিতরে ততটাই নরম৷’
‘ওঁর কথা এবং কাজের ফারাক দেখেই বুঝেছি৷ কিন্তু আমি অবাক হয়েছি—কী করে উনি বলে দিলেন একমাসের মধ্যেই পা স্বাভাবিক হয়ে যাবে?’
‘বাবা যা বলেছেন, তার একবিন্দু নড়চড় হবে না৷ ভেষজ-চিকিৎসায় ওঁর মতো জ্ঞান এই তল্লাটে আর কারও নেই৷ যাক গে, আপনি চেষ্টা করুন তো পাশ ফিরতে, আমি আপনাকে সাহায্য করছি৷’
‘কেন?’
‘কেন মানে? গরমজল দিয়ে বাবা আপনাকে পরিষ্কার করতে বললেন যে!’
পেমা দেনজিনকে প্রায় নগ্ন করে দিল৷ তারপর সমস্ত শরীর থেকে ধুলোময়লা মুছে পরিষ্কার করল৷ এমনকী ধারাল ক্ষুর দিয়ে মাথার ও দাড়ির চুল চেঁছে দিল৷ তারপর নতুন পোশাক পরিয়ে দিল৷ ভাঙা পা ছাড়া কে বলবে—কয়েক ঘণ্টা আগে এই মানুষটাই মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিল? অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল বেঁচে থাকা? মৃত্যু এসে দাঁড়িয়ে ছিল সামনে?
দেনজিন বলল, ‘আপনার বাবা কিন্তু ভারি অদ্ভুত মানুষ৷ মুখে বলেন এক, আর, কাজে করেন আর-এক!’
হাসে পেমা৷ বলে, ‘ঠিক৷’
‘আমাদের মতো গেরিলা যোদ্ধাদের জন্য ওঁর ভিতরে যে এত ভালোবাসা তা ওঁর কথা থেকে বিন্দুমাত্র আন্দাজ পাওয়া যায় না৷’
‘আসলে কী জানেন—আমার ঠাকুরদা লাসায় ব্যবসা করতেন৷ ১৯৫৯ সালে লাসার রাজপথে যখন আমাদের মতো মানুষেরা চিনা-সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ দেখায়, সেইসময় সেই বিক্ষোভে আমার ঠাকুরদাও ছিলেন৷’
‘তারপর?’
‘কত হাজার-হাজার মানুষকে চিনা-সেনা গুলি করে খুন করেছিল সেদিন, আমার ঠাকুরদাও খুন হয়েছিলেন৷ তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র তিরিশ৷’
দেনজিন চুপ করে থাকে৷ পেমা বলে, ‘সেই বিদ্রোহীর রক্ত বইছে বাবার শরীরে৷ তাই বাবা যদি আপনার মতো গেরিলা-যোদ্ধাদের প্রতি সহানুভূতিশীল না-হন, তাহলে আর কে হবেন?’
পেমা তার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল৷ যাওয়ার আগে দেনজিনের হাতে ছোট একটা লোহার দণ্ড দিয়ে বলল, ‘কোনোকিছুর প্রয়োজন হলে এই দণ্ডটা দিয়ে আপনি খাটিয়ার গায়ে টোকা দেবেন৷ কিন্তু খুব আস্তে৷ আমি চলে আসব৷ আমাদের বাড়িতে নানা লোকজন আসে৷ জোরে শব্দ হলে মানুষের সন্দেহ হতে পারে৷ আপনি এখন একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করুন৷ আমি কিছুক্ষণ পর আপনার খাবার আনব৷’
পেমা ঘুমোনোর কথা বলে গেলেও, ঘুম এল না৷ বরং মনের ভিতর হুহু করে কেঁপে উঠল৷ মনে পড়ে গেল সাংমুর মুখ৷ রক্তাভ চোখের মণি৷ মনে পড়ছে, যন্ত্রণা সহ্য করতে না-পেরে তাকে গুলি করে হত্যা করার অনুরোধ, ক্রমশ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া৷ বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে—মৃত্যুর পর কীভাবে শরীর ফুলে ওঠে, কীভাবে পচন ধরায় গায়ের চামড়া গলতে শুরু করে, তারপর সেই গলতে থাকা শরীর থেকে দুর্গন্ধময় পচা কালচে রক্ত বেরিয়ে এসে ভিজিয়ে দেয় সুড়ঙ্গের পাথুরে মেঝে৷ সেই অবর্ণনীয় মুহূর্তগুলো যেন এই মুহূর্তে একদম সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ছে৷ অজান্তেই চোখের কোণ ভিজে উঠল দেনজিনের৷
এই ঘরের অন্ধকার যেন সাধারণ অন্ধকার নয়৷ কে যেন তাদের বিপ্লবের স্বপ্নকে ভেঙে টুকরো-টুকরো করে এই অন্ধকার কফিনে বন্দি করে দিয়েছে! আর সে? সে যেন এই অন্ধকার-কফিনের অসহায় পাহারাদার হয়ে নিঃশব্দে বসে আছে অনন্তকাল৷
‘সাংমু আমার চেয়েও সুন্দরী?’ প্রশ্নটা শুনে বেশ অবাক হয়ে গেল দেনজিন৷
‘মানে?’ ভ্রু কুঁচকে পালটা প্রশ্ন করে দেনজিন৷
পেমা চুপ করে থাকে৷
প্রায় এক সপ্তাহ হল দেনজিনের পায়ের বাঁধন খোলা হয়েছে৷ হাড় জুড়ে গেছে৷ তবে এখনো আগের মতো জোর আসেনি৷ রিনচেন বলেছে সকালে-বিকেলে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে৷ তাতে নাকি পায়ের স্বাভাবিক শক্তি ফিরে আসবে৷ সাতদিন পায়চারি করে দেনজিন সুফল পেয়েছে৷
দেনজিন হাঁটতে-হাঁটতে থমকে দাঁড়াল ঘরের ভিতর৷ জিগ্যেস করল, ‘হঠাৎ এ-কথা বললে কেন?’
‘এমনি৷’
বেশ কিছুদিন ধরেই দেনজিন লক্ষ করেছে, পেমার বেশভূষায় বদল এসেছে৷ এখন প্রায়ই পেমা নিজেকে নানাভাবে সাজায়৷ মাথায় কখনো ধনুকাকৃতি শিরোভূষণ ব্যবহার করে৷ সেই শিরোভূষণ রঙিন কাপড়ে মোড়া৷ তাতে মুগার সুতো দিয়ে বিচিত্র নকশা করা৷ কখনো আবার ত্রিভুজাকৃতি শিরোভূষণ পরে৷ সেগুলোর কোনোটাতে মুক্তো বসানো৷ কোনোটাতে আবার প্রবাল৷
এমনিতেই পেমা খুব সুন্দরী৷ প্রসাধন করলে আরও চমৎকার দেখায়৷ দেনজিন ভালো করে তাকাল পেমার দিকে৷ আজ পরনে গরম-কাপড়ের ছুপা৷ ছুপার নীচে সুতির সুন্দর ঘাঘরা৷ ছুপার ওপর রেশমের রঙিন জ্যাকেট৷ মাথায় ত্রিভুজাকৃতি শিরোভূষণ৷ প্রবাল বসানো৷ গলায় চৌকো তাবিজ দেওয়া হার৷ ডানহাতে নকশাকাটা শঙ্খ৷ ভারি স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে পেমাকে৷
মাসখানিকের ওপর এখানে রয়েছে দেনজিন৷ এতদিনে সে বুঝে গেছে রিনচেনের অবস্থা যথেষ্ট স্বচ্ছল৷ ডাক্তারি করে৷ তার ওপর ইয়াক ও ঘোড়া ভাড়া দেওয়ার ব্যবসাও রয়েছে৷ সব মিলিয়ে শুধু স্বচ্ছল নয়, যথেষ্ট ধনীই বলা চলে৷ সুতরাং রিনচেনের একমাত্র কন্যা হিসাবে পেমা যে বিলাসী হবে—এটাই স্বাভাবিক৷
গোপন কুঠুরির যে-খাটিয়ায় দেনজিন ঘুমোয়, সেখানেই বসে আছে পেমা৷ দেনজিন কাছে এসে বসে৷ তারপর বলে, ‘আমি কারও সঙ্গে কারও সৌন্দর্যের তুলনা করি না, পেমা৷ দুনিয়ার প্রত্যেকটি মানুষ তার নিজের মতো করে সুন্দর৷ সুতরাং একের সঙ্গে অন্যের সৌন্দর্যের তুলনা করাটা আমার কাছে অর্থহীন বলে মনে হয়৷ তাছাড়া আমার কাছে, সৌন্দর্যের ধারণা অন্যরকম৷’
পেমার চোখের তারায় কৌতূহল খেলা করে৷ দেনজিন বলে, ‘সাংমু যখন জীবিত ছিল, দেখেছি—নিজের মাটির প্রতি তার কী অসম্ভব ভালোবাসা! স্বাধীনতার জন্য কী আকুলতা! পাশাপাশি দেশের দখলদারদের বিরুদ্ধে কী অসীম ঘৃণা!
দেশের প্রতি যতখানি গভীর ভালোবাসা, শত্রুদের প্রতি ঠিক ততখানি তীব্র ঘৃণা—এই দুই মিলে সাংমুর হৃদয়ে তৈরি হয়েছিল সৌন্দর্যের এক আশ্চর্য নকশা৷ সেই কারুকার্যময় সৌন্দর্যকে শুধু অনুভব করা যায়, তাকে দেখা যায় না৷ সাংমুর সেই সৌন্দর্যেরও কোনো তুলনা চলে না৷
আবার, তোমার ভিতর রয়েছে অন্যরকম সৌন্দর্য৷ আমার মতো একজন মৃতপ্রায় মানুষকে যে নিপুণ দক্ষতা দিয়ে, পরম মমতা দিয়ে সুস্থ করেছ তুলেছ, বলা ভালো পুনর্জীবন দান করেছ—এ-ও এক অপরূপ সৌন্দর্য৷ একেও চোখে দেখা যায় না, শুধুমাত্র অন্তর দিয়ে অনুভব করতে হয়৷
তাই শারীরিক সৌন্দর্য নয়, আমি দেখি মানুষের অন্তরের সৌন্দর্য৷ সেই সৌন্দর্যই আমাকে আকর্যণ করে৷’
পেমা তার স্নিগ্ধ চোখের তারা স্থির করল দেনজিনের চোখে৷ তারপর স্পষ্ট ভাষায় বলল, ‘দেনজিন, আমি যে আপনাকে শারীরিক সৌন্দর্যে নয়, হৃদয়ের সৌন্দর্যের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে চাই৷’
মৃদু হাসল দেনজিন৷ বলল, ‘পেমা, পাখিকে ভালোবাসলে, নিজের করে পেতে চাইলে, তাকে শিকল দিয়ে বাঁধতে চেয়ো না৷ বরং নিজেকে শিকল-মুক্ত করে আকাশে উড়িয়ে দাও৷ তখন দেখবে যাকে বন্দি করে নিজের কাছে পেতে চেয়েছিলে, তাকে বন্দি না-করেও সবসময় তাকেই নিজের কাছে পাচ্ছ, স্বাধীন এক উন্মুক্ত আকাশে৷ সেখানে বন্দিত্বের যন্ত্রণা নেই৷ ভালোবাসার অনাবিল নিবিড়তা আছে৷’
দেনজিনের কথায় থরথর করে কেঁপে উঠল পেমা৷ বুকের ভিতর উথলে ওঠা আবেগ বশে থাকল না৷ পাশে বসা দেনজিনের মাথাটি নিজের বুকের ভিতর চেপে ধরে অস্ফুটে বলল, ‘শুনতে পাচ্ছ, দেনজিন, আমার হৃদয় কী বলতে চায়? কোন আকাশে তোমার সঙ্গে উড়ে যেতে চায়?’
নিজের দুই স্তনের মাঝে দেনজিনের মাথাটি পরম যত্নে ধরে রেখেছে পেমা৷ কয়েকমুহূর্ত পর দেনজিনের মাথাটি অল্প উঁচু করে গাঢ় চুম্বন এঁকে দিল তার দুই ঠোঁটে৷ দেনজিন নিঃশব্দে সেই চুম্বন গ্রহণ করল৷
তারপর পেমা আবার চোখ রাখল দেনজিনের চোখে৷ জিগ্যেস করল, ‘কী শুনতে পেলে, দেনজিন?’
দেনজিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল৷ তারপর বলল, ‘তোমার বুকে আমি আমার দেশমাটির শব্দ শুনতে পেলাম, পেমা৷ তোমার চুম্বনে আমি আমাদের স্বদেশের শস্যখেতের সুগন্ধ পেলাম৷’
এমন উত্তর আশা করেনি পেমা৷ পেমা চোখ নামিয়ে নেয়৷ তারপর ধীর পায়ে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে যায়৷ কিছুক্ষণ পর চা নিয়ে নীচে নেমে আসে৷ দেনজিনের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নীচু করে বলে, ‘সম্ভব হলে আমাকে ক্ষমা কোরো৷’
‘কী অপরাধ করেছ তুমি? কী অন্যায় করেছ যে ক্ষমা চাইছ?’
দেনজিন কাছে সরে এসে বলে, ‘হাত পাতো৷’
পেমা বিস্ময়ে তাকায় দেনজিনের দিকে৷ তারপর হাত পাতে৷ দেনজিন দেখল পেমার হাত কাঁপছে৷ দেনজিন সেই হাতে সাংমুর রিভলভারটি রেখে দেয়৷’
‘এ-নিয়ে আমি কী করব?’
‘যদি আমাকে সত্যিই তুমি ভালোবেসে থাকো৷ তাহলে আজ থেকে তুমি দেশের কাজ করবে৷’
‘আমাকে তোমার দলে নেবে?’
‘নেব৷ তবে তুমি এখানেই থাকবে৷ ক্রমশ তোমার কাছের মেয়েদের মধ্যে দেশের প্রতি ভালোবাসার জন্ম দাও৷ স্বদেশ প্রেমের মন্ত্রে তাদের দীক্ষিত করো৷ পাশাপাশি চিন-সরকারের প্রতি তীব্র ঘৃণার মনোভাব তৈরি করো৷ কিন্তু খুব গোপনে৷ এইভাবে সমস্ত অঞ্চলে দেশের জন্য ভালোবাসার আবহ রচনা করো৷’
‘কিন্তু এতে কি দেশের কোনো মঙ্গল হবে?’
‘হবে৷’
কিন্তু আমার তো এখন ইচ্ছে করছে আমিও তোমাদের মতো চিনাদের সেনাছাউনি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উড়িয়ে দিই৷’
হেসে উঠল দেনজিন৷ বলল, ‘তোমাকে যে কাজ দিয়েছি, তাতে যদি একশো জনকে শামিল করতে পারো, জেনো—সেটা একশো সেনাছাউনি ওড়ানোর সমান কাজ৷’
কিছুক্ষণ পর রিনচেন নীচে নেমে এল৷ বলল, ‘তোমার কথামতো ইয়াক নয়, একটা ঘোড়া রেখেছি৷’
‘আমিও তৈরি৷’ বলল দেনজিন৷
পেমার চোখ ছলছল করে উঠল৷
পেমার হাতে রিভলভার দেখে রিনচেন দেনজিনকে বলল, ‘আমার আর কত সর্বনাশ করবে হে, ছোকরা? নিজে তো উচ্ছন্নে গেছ, আমার মেয়েটাকেও উচ্ছন্নে পাঠানোর ব্যবস্থা করলে? যত্তসব বদমাইসের দল!’
কথাগুলো বলেই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে গেল রিনচেন৷ রিনচেনের কথা শুনে মুচকি হাসল দেনজিন৷ তারপর নিজের রুকস্যাক গুছিয়ে নিল৷
সন্ধে পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ৷ পেমা বেশকিছু খাবার একরকম জোর করেই দেনজিনের রুকস্যাকে ভরে দিল৷ দেনজিন সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে এল৷ তারপর উঠোনের সিঁড়িধাপ ধরে নেমে এল নদীর দিকে৷ সঙ্গে পেমা ও রিনচেন৷ নদীর পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি কালো ঘোড়া৷ রিনচেন পথ বুঝিয়ে দিল৷ কোন পথে গেলে উত্তরের পাহাড়ে সহজে পৌঁছাতে পারবে৷ কারণ ওই পাহাড়ের একটি গুহার ভিতরেই লুকোনো রয়েছে সেই বিশেষ ঘুড়ি৷ যেটা নিয়ে আকাশে উড়তে হবে দেনজিনকে৷
আকাশে তৃতীয়া তিথির চাঁদ৷ জ্যোৎস্নায় পথঘাট দেখা যাচ্ছে৷ তবে আবছায়া চারপাশ৷ দেনজিন ঘোড়ার ওপর উঠে বসল৷ পেমা আর দাঁড়াল না৷ মুখ ফিরিয়ে উঠে যেতে থাকল নিজের বাড়ির দিকে৷ সেদিকে কয়েকমুহূর্ত তাকাল রিনচেন৷ তাকিয়ে রয়েছে দেনজিনও৷ এই প্রথম দেনজিনের বুকের ভিতর একটা অজানা ব্যথা মোচড় দিয়ে উঠল৷ রিনচেন যেন এখন অনেক শান্ত ও নরম একটা মানুষ৷ বলল, ‘চিকিৎসা যে আমি খারাপ করি না, সেটা নিশ্চয় বুঝেছ?’
মাথা নেড়ে সায় দিল দেনজিন৷ রিনচেন বলল, ‘এপাশে তোমাদের কেউ কোনো অসুবিধেয় পড়লে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়ো৷ সাধ্যমতো তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করব৷’
কৃতজ্ঞতায় মাথা নীচু করল দেনজিন৷ তারপর হঠাৎ নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলল, ‘তাহলে আর দাঁড়িয়ে আছ কেন? ভাগো৷ যত্তসব আপদ এসে আমার কপালেই জোটে৷ নিজেরাও বিপদে পড়বে আর আমাকেও ফেলবে!’
দেনজিনের ঘোড়া ছুটে চলল নদীর সমান্তরাল তীর বরাবর৷ কয়েকমুহূর্তের মধ্যেই আবছায়া অন্ধকারে মিলিয়ে গেল দেনজিন ও তার কালো ঘোড়া৷
ইস্পাত-কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে অনটেন৷ তীব্র যন্ত্রণায় বেঁকেচুরে আছে নালজোরের মুখও৷ এদের মাঝখানে একটি পাথরের ওপর বসে আছেন কুনচেন৷ কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকার পর মৃদুস্বরে কুনচেন জিগ্যেস করলেন, ‘ঠিক কী হয়েছিল?
অনটেন বলল, ‘ব্রহ্মপুত্রের তীরে শীগর্চীর কাছে চিনারা একটা আর্মি বেসক্যাম্প করেছিল৷ নানা ছুতোয় আর্মির লোকজন স্থানীয় তিব্বতি মানুষেদের ওপর অত্যাচার করত৷ বিশেষ করে মেয়েদের ওপর৷ তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ওই ক্যাম্প আমরা উড়িয়ে দেব৷
দীর্ঘদিন ধরে লোলহা একজন আর্মি অফিসারের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করে৷ নিয়মিত ক্যাম্পে যাতায়াত শুরু করে৷ তারপর পরিকল্পনামতো সমস্ত ক্যাম্পের নকশা তৈরি করে৷ এবার এখান থেকে গিয়ে নিঃশব্দে বিস্ফোরক দিয়ে পুরো ক্যাম্প ধ্বংস করে দিয়েছে৷ কিন্তু আমাদের হারাতে হয়েছে লোলহার মতো সাথীকে৷
তাছাড়া, গত রাতে দেনজিন ফিরেছে৷ কিন্তু সাংমু ফেরেনি৷ সে-ও লোলহার মতো শহিদ হয়েছে৷ চিনা-সেনাদের ছাউনি উড়িয়ে দিয়েছিল৷ কিন্তু গ্রেনেড বিস্ফোরণে সাংমুর ডান হাত উড়ে গিয়েছিল৷ ভয়ংকরভাবে জখম হয়েছিল দেনজিনও৷ পা ভেঙে গিয়েছিল৷ দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে ফিরেছে৷’
‘সে কোথায়?’ জিগ্যেস করলেন কুনচেন৷
অনটেন বলল, ‘বিশ্রাম নিচ্ছে৷ ওকে কয়েকদিন একান্তে বিশ্রাম নিতে বলেছি৷’
নালজোর বলল, ‘লোলহা, সাংমুদের এই আত্মদান ব্যর্থ হতে দেব না৷ আমরা এবার লাসায় ওদের কনস্যুলেট উড়িয়ে দেব৷’
কুনচেন বললেন, ‘এরকম করে কি সত্যিই চিনাদের তাড়ানো যাবে, নালজোর?’
নালজোর চুপ করে থাকে৷ অনটেন বলে, ‘পালটা আঘাত জারি রাখতেই হবে৷ চিনারা যেন মনে করে তিব্বতিদের ওপর নির্যাতন করলে তাদের জন্যও তিব্বতি ভূখণ্ড আর নিরাপদ নয়৷
আমাদের হাজার-হাজার ভিক্ষু-ভিক্ষুনিদের হত্যা করেছে৷ ছ-হাজার মনাস্ট্রি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে৷ সেখান থেকে আমাদের প্রাচীন পুঁথি, মূল্যবান মূর্তি চুরি করে বিদেশের চোরা-বাজারে বিক্রি করেছে৷ লক্ষ-লক্ষ সাধারণ মানুষকে খুন করেছে৷ আমাদের দেশের সম্পদ লুঠ করছে৷ ওদের মাফ নেই৷ ওদের কিছুতেই ছাড়া যাবে না৷’
‘সমস্ত কথাই সত্য৷ কিন্তু তবুও বলছি, এরকমভাবে তোমরা আঘাত করতে থাকলে সারা বিশ্ব তোমাদের সন্ত্রাসবাদীর চোখে দেখবে৷’ বললেন কুনচেন৷
কুনচেনের কথায় ভিতরে-ভিতরে ঈষৎ ক্ষুণ্ণ হলেও যথেষ্ট বিনয়ের সঙ্গে নালজোর বলল, ‘বিশ্ব কী ভাবল তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না৷ বছরের পর বছর ধরে চিনা সরকার আমাদের ওপর যে হত্যা ও লুঠতরাজের আবহ তৈরি করেছে, সব জেনেও বিশ্বের কোনো দেশ কি তার প্রতিবাদ করেছে? করেনি তো! তাহলে বিশ্বভাবনাকেই-বা আমরা গুরুত্ব দেব কেন?
‘১৯৫৯ সালে লাসার রাস্তায় চিনা নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিব্বতিরা বিদ্রোহে শামিল হলে দশহাজার বিদ্রোহীকে চিনা সৈন্যরা কুকুরের মতো গুলি করে মেরেছিল৷ শান্তি-প্রিয় তিব্বতি জনতার রক্তে সেদিন ভিজে উঠেছিল লাসার রাজপথ৷
‘তারপরই নিজের পোতালা ছেড়ে আশি হাজার অনুগামী নিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন দলাই লামা৷ প্রায় ষাট বছর হতে চলল আজও তিনি হিমাচলে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন৷ নিজের ভূখণ্ডে থাকতে পারেননি৷
‘সারা বিশ্ব এর কোনো প্রতিবিধান করেছে? চিনের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করেছে? করেনি৷ অর্থনৈতিক বিশ্বে চিন আজ দৈত্য৷ আর সে-কারণেই বিশ্বের কোনো দেশ চিনের সঙ্গে সখ্য নষ্ট করতে চায় না৷ কেউ কোনো প্রতিবাদ করে না৷ তাই নিজেদের স্বাধীনতা নিজেদেরই ছিনিয়ে নিতে হবে৷ ইতিহাস সাক্ষ্য—অনুনয়-বিনয় করে, ভিক্ষের হাত বাড়িয়ে কোনোদেশ কোনোদিন স্বাধীন হয়নি৷ মারের বদলে মার, লড়াইয়ের বিরুদ্ধে পালটা লড়াই-ই একমাত্র স্বাধীনতার পথ৷ তাই বিশ্ব কী বলল, তার তোয়াক্কা আমরা করব না৷’
এই ইতিহাস তো অজানা নয় কুনচেনেরও৷ তবুও এদের মুখে নতুন করে শুনতে খারাপ লাগছে না৷ বরং বিস্মিত হলেন, পুরোনো দিনের ইতিহাস আজও কীভাবে এই তরুণ প্রজন্মকে স্বাধীনতার জন্য প্রতিজ্ঞায় অটল ও প্রত্যয়ী করে তুলেছে৷ উজ্জীবিত করছে৷ তিনি উপলব্ধি করলেন, সামান্য একটা জন্তুর নরম হাড়ও মাটির তলায় কোটি-কোটি বছর থাকার পর শক্ত পাথরের জীবাশ্মে পরিণত হয়, হয়তো সুদীর্ঘ পরাধীনতার গ্লানিই এই প্রজন্মকে এমন কাঠিন্য দিয়েছে, এতখানি ঋজু ও মরিয়া করে তুলেছে৷
অনটেন বলল, ‘আপনি তো শুধু একজন বিশিষ্ট লামা নন, আপনার মতো এত বড় বিজ্ঞানী আমাদের দেশে তো নয়ই, সারা বিশ্বে এই মুহূর্তে দ্বিতীয় কেউ আছে কিনা সন্দেহ৷ আপনি আমাদের লড়াই করার মতো অস্ত্রের সন্ধান দিন৷ দেশকে আমরা স্বাধীন করবই!’
কুনচেন ঠিক আগেকার কথাটাই পুনরায় বললেন, ‘ভগবান বুদ্ধ নিশ্চয় কোনো পথের সন্ধান দেবেন৷’
প্রথমে আত্মগোপনের জন্য নালজোরকে নিয়ে তিনি এই গুহায় এসেছিলেন৷ পরে নালজোরের অনুমতি নিয়ে তার আরও পাঁচজন সঙ্গীকে নিয়ে এসেছিল৷ এখন ওদের সংখ্যাটা প্রায় সত্তর৷ হিমালয়ের দুর্গম স্থানে বরফের গভীরে থাকা এই গুহাটি যেন দিনে-দিনে কুনচেনের গবেষণার জায়গা ছাড়াও তিব্বতি গেরিলা বাহিনীর আস্তানা হয়ে উঠছে৷ সব বুঝতে পেরেও কুনচেন কিছুই বলছেন না৷ বরং পরোক্ষভাবে এই তরুণ গেরিলাদের প্রশ্রয়ই দিচ্ছেন৷
গুহার ভিতর একটি বিশেষ কক্ষ রয়েছে৷ সেখানে কুনচেন দিনরাতের বেশিরভাগ সময়টাই কাটান৷ নিজের মতো করে গবেষণায় বুঁদ হয়ে থাকেন৷
এখানকার সবাই জানে, গুহার সব জায়গায় অবাধ যাতায়াত থাকলেও ওই বিশেষ কক্ষে কুনচেনের অনুমতি ছাড়া কারোর প্রবেশ নিষেধ৷
কুনচেন ধীরে-ধীরে সেই গবেষণাগারে পৌঁছে, তার একটি বিশেষ পাথরের লম্বা বেদির ওপর টানটান হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করলেন৷ মনের ভিতর অনটেন ও নালজোরের কথাগুলো যেন মাঝে-মাঝেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে৷ তিব্বতি জনগণের ওপর চিন-সরকারের নিপীড়নের করুণ ইতিহাস তাঁর অজানা নয়৷ এই গেরিলা তরুণদের ক্ষোভ সংগত৷ কিন্তু ক্ষোভের ভিতরেই তো লুকিয়ে আছে হিংসাশ্রয়ী পথ৷ একদিকে হিংসার এই পথ, অন্যদিকে পরম বুদ্ধের অহিংসার শাশ্বত দর্শন—আশ্চর্য এক দ্বন্দ্ব যেন দিনে-দিনে অন্তরকে দুলিয়ে দিচ্ছে!
পাথরের বেদি থেকে উঠে পদ্মাসনে বসলেন কুনচেন৷ বহুদিন পর নিজের তৃতীয় নয়নকে উন্মুক্ত করলেন তিনি৷ কয়েকমুহূর্ত পরেই চমকে উঠলেন—এ কী দেখছেন তিনি!
দেখতে পাচ্ছেন—গিরিখাতের গা বেয়ে সঙ্কীর্ণ একটি পথ ধরে একটি তরুণ হেঁটে আসছে৷ হাতে লাঠি৷ কাঁধে ঝোলা৷ তার পাশেই হাঁটছে জাদুকর৷ আরও গভীরভাবে মনোনিবেশ করলেন তরুণের দিকে৷ চিনতে পারলেন, জাদুকর ঠিক তরুণকেই নিয়ে আসছে৷ তরুণের চারপাশে সাদা কুয়াশার মতো এক আশ্চর্য দ্যুতি ঘূর্ণায়মান৷ বুঝতে পারলেন, এই তরুণের সঙ্গেই তাঁর সুদীর্ঘকালের সম্বন্ধ৷ এতদিন এই তরুণের জন্যই তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে বসেছিলেন৷
কুনচেন হিসাব করলেন, এখানে এসে পৌঁছাতে তরুণের কমপক্ষে আরও দু-পক্ষকাল সময় লাগবে৷
এই মুহূর্তে আশ্চর্য এক সুন্দর অনুভূতিতে মন পূর্ণ হয়ে উঠল কুনচেন লামার৷ মনে হল, অন্তরের যে-দ্বন্দ্ব তাঁকে ক্রমশ অস্থির করে তুলছিল, বোধহয় এবার সেই অস্থিরতার অবসান আসন্ন৷
মাকড়সার জালের মতো মুখময় বলিরেখা৷ কিন্তু খুদে-খুদে চোখের মণি দুটো বেশ উজ্জ্বল৷ শরীরে যে এখনো যথেষ্ট তাগদ জমা আছে তা তার দাঁড়ানো থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে৷ শেরপাদের শরীরে বার্ধক্য দেরিতে আসে৷ বার্ধক্য থাবা বসালেও চট করে শক্তিহীন করে দিতে পারে না৷
শেরপা-জীবন থেকে অবসর নিলেও বৃদ্ধ তালাইয়ার প্রতিটি দিনের বিবরণ মুখস্থ৷ নিজের অতীত জীবনের গল্পগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে বলছিল৷ জাদুকর যেন মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা৷ রুহও যেন তালাইয়ার সঙ্গে মনে-মনে বিদেশি পর্বত অভিযাত্রীদের মতোই এভারেস্টের চূড়া থেকে ঘুরে এল৷ গল্প শেষ করে মাখন মেশানো চায়ে চুমুক দিতে-দিতে বৃদ্ধ বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘শুধু তো পাহাড়চুড়ো নয়, এই পর্বতের একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চল আমি চিনি৷ কিন্তু বরফের নির্জন অঞ্চলে জড়িবুটির বাগান আছে—এমন কথা তো কখনো শুনিনি!’
জাদুকর খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, ‘আছে৷’
‘হতে পারে৷ পাহাড়ের চুড়ো, তৃণভূমি, বরফঢাকা গাছপালা, ছড়িয়ে থাকা পাথরের বিস্তৃত প্রান্তর—প্রতিদিন আমার চোখে নতুন হয়ে ধরা দেয়৷ আশ্চর্য এক রহস্যময় জগৎ বুকে নিয়ে বসে থাকে৷ একজীবনে তার কতটুকুই-বা চেনা যায়? কিছুই চেনা হয়ে ওঠে না৷’ শেষ বাক্যটায় বৃদ্ধের সরল কণ্ঠ থেকে যেন এক করুণ হাহাকার ঝরে পড়ল৷ নিজের অজ্ঞতার কথা মেনে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল তালাইয়া৷
এইসব অঞ্চলে বছরের প্রায় আট মাসই বরফপাত হয়৷ দেবদারু গাছগুলো যেন সাদা স্তম্ভের মতো স্থির হয়ে থাকে আর মনে-মনে প্রার্থনা করে কখন গরমকাল এসে বরফের আস্তরণ খুলে নেবে৷ এখন সেই গরমকাল৷ কিন্তু তবুও গরম পোশাক পরে থাকতে হয়৷ ভেড়ার চামড়া থেকে তৈরি জোব্বার মতো পোশাক খুব আরাম দেয়৷ হাড়হিম করা ঠান্ডা কাকে বলে তা এইসব অঞ্চলে না-এলে কল্পনাও করতে পারত না রুহ৷ মরুদস্যুদের ডেরা থেকে একশো কিলোমিটার হেঁটে এসেই আবহাওয়ার কী অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ল!
শুধু তালাইয়ার গ্রাম কেন পথের মাঝে-মাঝে পড়া অন্যান্য গ্রামগুলোও ভারি চমৎকার৷ একতলা-দোতলা কাঠের বাড়ি৷ বাড়িগুলোর ছাদের গড়ন এমন যেন সহজে বরফ না জমতে পারে৷ গাছপালার ফাঁকে পাহাড়ের গায়ে গ্রামের বাড়িগুলোকে দূর থেকে কাঠের খেলনাবাড়ি বলে মনে হচ্ছে৷ পাহাড়ি ঢালে নিশ্চিন্তে চড়ে বেড়াছে ভেড়া, চমরিগাই, ঘোড়াদের দল৷
আর সেই ঝোলা নেই৷ দু-জনের পিঠেই রুকস্যাক৷ ঝোলাসহ অন্যান্য জিনিসগুলো এখন রুকস্যাকে বন্দি৷ রুকস্যাকগুলো ভারীও হয়েছে যথেষ্ট৷ হাঁটতে-হাঁটতে জাদুকর বলল, ‘তালাইয়া অনেক উপকার করেছে৷ ওর কাছে কাঁটাওয়ালা জুতো, চশমা, দড়ি, তাঁবু ও রুকস্যাক না পেলে খুব মুশকিলে পড়ে যেতাম৷’
রুহ বলল, ‘কাঁটাওয়ালা জুতোর দরকার পড়বে কেন? আমরা তো আর পাহাড়চুড়োয় উঠব না৷’
জাদুকর হাসল, ‘সময়ে বুঝবে৷’
জাদুকরের কথায় ভিতরে-ভিতরে খানিক সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল রুহ৷ পাহাড়ে চড়ার শিক্ষা নেই, শুধুমাত্র সরঞ্জাম থাকলেই কি চলে নাকি?’
‘ঘাবড়ানোর কিছু নেই৷ আমরা পাহাড়চুড়ো জয় করতে যাচ্ছি না ঠিকই, কিন্তু আমাদের পথটা খুব সহজও নয়৷’
রুহ জাদুকরের পাশে নিঃশব্দে হেঁটে চলে। ভাবে, জাদুকর যে ঠিক কোথায় তাকে নিয়ে যাচ্ছে তার কিছুই জানে না সে৷ শুধু জানে, তার স্বপ্ন সফল করতে হলে পথে হেঁটে যেতে হবে৷ পথই নাকি পথ দেখাবে!
জাদুকর রুহকে চুপ করে থাকতে দেখে বলল, ‘আমার ভারি অবাক লাগে জানো রুহ?’
‘তা কী নিয়ে অবাক লাগে তোমার?’
‘বিদেশি অভিযাত্রীরা পাহাড়চুড়ো জয় করলেই তাদের দেশ থেকে কত সম্মান, কত অর্থ, কত সংবর্ধনা পায়৷ খবর কাগজে ছবি ছাপা হয়৷ টেলিভিশনে মুখ দেখা যায়৷ অথচ, তালাইয়ার মতো শেরপারা অভিযাত্রীদের সঙ্গে যে কত-কত শৃঙ্গে কত-কত বার ওঠানামা করেছে তার ইয়ত্তা নেই৷ কিন্তু সেই অর্থে এদের কথা কেউ মনে রাখে না!’
চড়াই থাকলে একদিনে বেশি পথ হাঁটা যায় না৷ উৎরাই পেলে হাঁটার খানিক সুবিধে হয়৷ প্রথম কয়েকদিন তবু গ্রামের কোনো-না-কোনো বাড়িতে আশ্রয় মিলছিল৷ এখন আর সে উপায় নেই৷ কারণ জাদুকর মানুষের স্বাভাবিক চলার পথ বর্জন করেছে৷ প্রায় দু-সপ্তাহ হয়ে গেল পথে কোনো মানুষজনের মুখ দেখা যায়নি৷
পথ চলার ক্লান্তি সাংঘাতিক৷ কিন্তু এই সমস্ত পাহাড়ের গায়ে, উপত্যকার নির্জন বাঁকে-বাঁকে এমন এক স্তব্ধতা থাকে, এমন একধরনের নির্জনতা থাকে, যে তার স্পর্শ না-পায় সে অনুভব করতে পারবে না শব্দহীনতার সৌন্দর্য ঠিক কাকে বলে৷ লোকালয়ে, মানুষের ভিড়ে যে-আমিটি কোলাহল আর কথার জঞ্জালে লুকিয়ে থাকে, এই নির্জনতা ও স্তব্ধতার রাজ্যে যেন সেই আমিটিই চোখের সামনে, একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে৷
ক্রমশ পাথর নিশ্চিহ্ন হয়েছে৷ সম্মুখে দীর্ঘ সমতল৷ কিন্তু সমস্তটাই বরফে ঢাকা৷ সেই বরফের ওপর রোদ্দুর পড়ায় চোখ যেন ঝলসে যাচ্ছে৷ জাদুকরের পরামর্শে অভিযাত্রীদের চশমা পরেছে ঠিকই কিন্তু হাঁটার গতি ধীর হয়ে গেছে৷ জুতোর কাঁটা বরফের গায়ে গেঁথে যাওয়ার ফলে পা ফেলতে অসুবিধে হচ্ছে রুহর৷ কিন্তু এখন রুহ বুঝেছে এই পথে কাঁটাওয়াল জুতোর কতখানি প্রয়োজন৷ জুতোর তলায় কাঁটা থাকায় পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই৷ যদিও জাদুকরের যেন কোনোকিছুতেই কোনো অসুবিধে হচ্ছে না! জাদুকর অদম্য প্রাণশক্তিতে পূর্ণ৷
পথচলার ক্লান্তি শরীরে জাঁকিয়ে বসলেও বাঁ দিকে তাকিয়ে রুহ হতবাক হয়ে গেল৷ বরফ আচ্ছাদিত পাহাড়ের ঢালু গা থেকে প্রায় পাদদেশ পর্যন্ত এক আশ্চর্য তুষারের ভাস্কর্য উদ্যান! একটু কল্পনাশক্তির ব্যবহার করলেই দেখা যাচ্ছে কত গাছপালার অবয়ব৷ তার মাঝে কত পশুপাখির আদল৷ কত বিচিত্র ধরনের তুষার নকশায় কে যেন নিপুণভাবে উদ্যানটি রচনা করেছে৷ রুহকে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জাদুকর বলল, ‘হিমানী সম্প্রপাতের ফলে প্রাকৃতিকভাবে অমন দেখতে হয়েছে৷ পাহাড়ের গা থেকে নরম বরফ গড়িয়ে নেমেছে, তারপর স্থানে-স্থানে তা শক্ত হয়ে ওইরকম দেখাচ্ছে৷’
জাদুকর প্রাকৃতিক ঘটনার কথা জানালেও রুহর ভিতর মুগ্ধতা কমে গেল না৷ বরং বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে সে এই শুভ্র তুষারের উদ্যানটি প্রাণভরে দেখতে লাগল৷
আজ সন্ধে নামার বেশ খানিকটা আগেই জাদুকর তাঁবু টাঙিয়ে ফেলল৷ দু-পাহাড়ের মাঝে যেখানে তাঁবু টাঙানো হল, তুলনায় সেখানে হাওয়ার গতিবেগ কম৷ নাহলে দূরে দেখা যাচ্ছে—হাওয়ার সঙ্গে ধোঁয়ার মতো সূক্ষ্ম বরফকণা পাক খেতে-খেতে উড়ে যাচ্ছে৷ মাঝরাত্রিতেও জাদুকরের চোখে ঘুম নেই৷ জেগে আছে রুহও৷ আকাশে গোল চাঁদ৷ ফিনফিনে জ্যোৎস্নায় বরফঢাকা এই প্রান্তর যেন রূপকথার দেশ! জাদুকর বলল, ‘রুহ, খুব কষ্ট হচ্ছে না?’
এই পথচলার যে কী কষ্ট তা মুখে বলার মতো নয়৷ কিন্তু জাদুকরের এমন আন্তরিক জিজ্ঞাসায় রুহর কষ্টের পরিমাণ যেন মুহূর্তের জন্য অনেকটাই লাঘব হয়ে গেল৷ বলল, ‘কষ্ট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তোমার মতো সঙ্গী থাকলে এর চেয়েও আরও বেশি কষ্ট মেনে নেওয়ার মতো মনের জোর নিজে থেকেই তৈরি হয়ে যায়৷’
রাত্রির অন্ধকারে পাশে শুয়ে থাকা রুহকে জড়িয়ে ধরল জাদুকর৷ ক্ষণিকের জন্য জাদুকর যেন অদ্ভুত এক আবেগে ভেসে গেল৷ যে-আবেগ জাদুকরের স্বভাব-বিরুদ্ধ৷ তারপর বলল, ‘আমাদের যাত্রার শেষ পর্যায়ে আমরা চলে এসেছি, রুহ৷’
রুহ চমকে উঠল, ‘মানে?’
‘কাল৷ আগামীকালই আশা করছি পৌঁছে যাব৷ শুধু একটা কথা বলি, মাঝে একটা বরফের খাদ পড়বে৷ সেটা দেখে ভয় পাবে না৷ ওই বরফের খাদ পেরোতে পারলেই জানবে আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের গন্তব্যে চলে যেতে পারব৷’
আনন্দে উচ্ছল হয়ে উঠল রুহ৷ জাদুকর বলল, ‘এখন একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করো৷ সময় হয়ে এসেছে৷ আমরা ভোর নাগাদ এখান থেকে রওনা দেব৷’
জাদুকর মুখ ফিরিয়ে চোখ বন্ধ করল৷ রুহর চোখে ঘুম এল না৷ তাঁবুর তলায় সামান্য ফাঁক দিয়ে যে-রুপোর পাতের মতো প্রান্তর দেখা যাচ্ছে, সেই সফেদ প্রান্তরে মনের তুলি দিয়ে এই মুহূর্তে সে যে ছবি আঁকল, তা আর কারও নয়—জেমিনির৷
বিস্ময়কর গুহার ভিতর কুনচেনের ব্যক্তিগত গবেষণা-কক্ষটি দেখলে যে-কেউ চমকে উঠবে৷ চিকিৎসা ও প্রযুক্তি বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করার কী উপকরণ নেই সেখানে! সমস্ত কিছুই রয়েছে৷
তিব্বতি আচার অনুযায়ী কোনো মানুষের মৃত্যু হলে তাকে দাহ করা হয় না৷ দেওয়া হয় না কবরও৷ পরিজনরা মৃতদেহটিকে কয়েকদিন বাড়িতে রেখে দেয়৷ পুরোহিত এসে মৃতের কপালে চৌকো করে কিছু অংশ কেটে ফুটো করে দেয়৷ তাদের বিশ্বাস—ওই বর্হিগমনের পথ দিয়ে মৃতের আত্মা মুক্তি পাবে৷ তারপর সেই মৃতদেহকে পাহাড়ের নির্জন স্থানে পাথরের ওপরে শুইয়ে টুকরো-টুকরো করে কাটা হয়৷ মৃতদেহের খণ্ডগুলো শকুনেরা খেয়ে নেয়৷ তিব্বতি মানুষের ধারণা—শকুনেরা মৃত মানুষটিকে স্বর্গে নিয়ে যাবে৷
প্রাচীন পুঁথি থেকে জ্ঞান অর্জন করলেও কুনচেনের ইচ্ছে ছিল নিজের হাতে শব-ব্যবচ্ছেদ করে পুরো বিষয়টি আয়ত্ত করা৷ কিন্তু মুশকিল হল সাধারণ তিব্বতিদের ধর্মীয় ধারণাকে আঘাত করে তিনি কিছুতেই মৃতদেহ সংগ্রহ করতে পারছিলেন না৷
দিনের পর দিন পাহাড়ি বরফ-সঙ্কুল-পথে ঘুরে বেড়ানোর সময় তিনি একদিন এক মৃত অভিযাত্রীর দেহ দেখতে পান৷ পরে এভাবেই বেশকিছু মৃতদেহ সংগ্রহ করে তিনি এই গবেষণাগারে রেখেছেন৷ শব-ব্যবচ্ছেদ করেছেন৷ বছরের পর বছর গবেষণা করেছেন৷
কতকাল ধরে যে তিলে-তিলে সবকিছু সংগ্রহ করে এই গবেষণাগারকে গড়ে তুলেছেন তা এই জ্ঞান-পিপাসু ভিক্ষু হয়তো নিজেই ভুলে গেছেন৷
কুনচেনের মন আজ বেশ চঞ্চল৷ এই চঞ্চলতা তার স্বভাব-বিরুদ্ধ৷ সমস্ত পরিস্থিতিতেই তিনি পাহাড়ি হ্রদের মতো শান্ত৷ বরফ-আচ্ছাদিত বৃক্ষের মতো স্থির৷ নিজের ভিতর তৈরি হওয়া চঞ্চলতা থেকে মুক্ত হতে নিজের গবেষণা-কক্ষে নির্ধারিত পাথরের বেদির ওপর ধ্যানে বসেন৷ ক্রমশ উন্মুক্ত করেন তাঁর তৃতীয় নয়ন৷ বুঝতে পারলেন নিজের চঞ্চলতার কারণ৷
স্পষ্ট দেখলেন, পাহাড়ের গা থেকে ঝরনার মতো নেমে আসছে তুষার কণা৷ সেই সঙ্গে প্রচণ্ড হাওয়া৷ রুহ ও জাদুকর পাহাড়ের একটি সংকীর্ণ ঢালে পাথরের খাঁজে নিজেদের আটকে রেখেছে৷ জাদুকর বরফের গায়ে লোহার খিলগুলো পুঁতে নিজেদের দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে বলে কোনোরকমে আটকে আছে, তা না-হলে ছুটন্ত বরফ ও হাওয়ার সঙ্গে তলিয়ে যেত কোনো গভীর খাদের ভিতর৷
স্পষ্ট শুনলেন—জাদুকর বলল, ‘রুহ, সাহস হারিয়ো না৷ সমস্ত শুরুরই শেষ থাকে৷ এই ঝড়ও একসময় থেমে যাবে৷’
রুহ দাঁতে দাঁত চেপে বরফঝড়ের মোকাবিলা করতে থাকে৷ জাদুকর রুহর দিকে কিছুটা সরে এসে আরও একটা লোহার খিল পুঁততে থাকে৷
শরীরে ক্রমশ শক্তি যেন ফুরিয়ে আসছে রুহর৷ জাদুকর কিন্তু নির্বিকার৷ রুহর কাছে এখন প্রতিটি মুহূর্ত যেন দীর্ঘসময় বলে মনে হচ্ছে৷ জাদুকরকে দেখে মনের ভিতর ভাঙতে থাকা শক্তিকে পুনরায় সংহত করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে রুহ৷
জাদুকরের কথাই ঠিক৷ একসময় বরফপাত বন্ধ হয়ে গেল৷ কমে এল হাওয়ার বেগও৷ কিছু আগে যাকে যুদ্ধক্ষেত্র বলে মনে হচ্ছিল, সেটাই এখন কী আশ্চর্য শান্ত ও স্থির! ধীরে-ধীরে লোহার খিলগুলো খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে জাদুকর ও রুহ৷ জাদুকর বলল, ‘আর সামান্য পথ, রুহ৷ সামনের উপত্যকাটা পেরোলেই সেই খাদ আসবে৷ তবে এখন এই উপত্যকায় খুব সর্তক হয়ে হাঁটতে হবে, ওপরের বরফ বেশ নরম৷’
নরম বরফে পা ডুবে যাচ্ছে৷ সামনে জাদুকর৷ পিছনে রুহ৷ তাদের হাঁটার গতি খুব ধীর৷ এভাবে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর সামনে দেখা গেল সেই খাদ৷ খাদের সামনে এসেই রুহর বুক শুকিয়ে গেল৷ কারা যেন খাদের ওপর আড়াআড়ি একটি সিঁড়ি ফেলে রেখেছে৷ কিন্তু সিঁড়িটি বেশ সরু৷ পাশাপাশি দুটো পা ফেলে হাঁটা খুব মুশকিল৷
রুহ মুখ বাড়িয়ে দেখল, খাদের তলা ঘন অন্ধকার৷ সেই অন্ধকার ফাটল থেকে বরফের ধোঁয়া উঠছে৷ একবার পড়ে গেলে কোথায় যে যাবে তার কোনো ঠিক নেই৷ চারদিক বরফসাদা বলে হালকা আলোয় একটা নীলচে আভার দ্যুতি ছড়িয়ে রয়েছে৷ জাদুকর বলল, ‘চিন্তার কিছু নেই৷ আমি তিনটে খিল এপাশে পুঁতে দড়ি টাঙিয়ে দিচ্ছি৷ তুমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকো চুপ করে৷’
জাদুকর নিজের কোমরে দড়ি বেঁধে সেটা এবং আরও দুটো দড়ি বাঁধা খিল বরফের ওপর পুঁতে দিল৷ তারপর সিঁড়ির ওপর দিয়ে বুকে হেঁটে আস্তে-আস্তে পার হয়ে গেল৷
জাদুকরের এভাবে পার হওয়া দেখে বুক কাঁপছিল রুহর৷ যে-কোনো মুহূর্তে সামান্য এদিক-ওদিক হলেই অনিবার্য মৃত্যু৷ কোনোভাবে কেউই বাঁচাতে পারবে না৷
খাদের অপর প্রান্তে পৌঁছে জাদুকর হাসছিল৷ রুহ শুধু অবাক হয়ে যায় এই মানুষটাকে দেখে৷ জীবনের যে-কোনো কঠিন পরিস্থিতিই আসুক না কেন, একে কখনো তেমন বিচলিত হতে দেখেনি৷ বরং সমস্ত পরিস্থিতিকে মসৃণভাবে পেরিয়ে যাওয়ার এক আশ্চর্য দক্ষতা রয়েছে৷ রুহ যেন উপলব্ধি করল, এত দিন এত কাছে থেকে, এত পথ একসঙ্গে অতিক্রম করল ঠিকই, মানুষটাকে তবু যেন সত্যিকারের চেনা হয়ে উঠল না!
জাদুকর অপর প্রান্তে তিনটে দড়ি বাঁধা খিল গভীরভাবে পুঁতে দিল৷ সিঁড়ির সেতুর ওপর টানটান হয়ে শক্ত হয়ে গেল দড়িগুলো৷ এবার জাদুকর বলল, ‘খুব সাবধানে দড়ি ধরে পা ফেলে-ফেলে এসো৷ মন কিন্তু শুধু ওই সিঁড়িতেই থাকবে৷ রুহ, এটা পরীক্ষা তোমার৷ এবং আমি জানি তুমি ঠিক সফল হবে৷’
রুহ জাদুকরের নির্দেশমতো এগোতে লাগল৷ একসময় পৌঁছে গেল অন্যপ্রান্তে৷ পৌঁছে যেতেই তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল জাদুকর৷
কুনচেন নিজের তৃতীয় নয়ন বন্ধ করে চোখ মেললেন৷ তারপর বেদি থেকে নেমে গবেষণা-কক্ষের বাইরে এসে একজনকে ডেকে নালজোরকে দেখা করতে বললেন৷
কুনচেন কিছুদূর হেঁটে গিয়ে বসলেন গুহার ভিতরে থাকা নীলজলের হ্রদের পাশে৷ এই হ্রদ উষ্ণ জলের৷ হ্রদের পাশে বসে পা-দুটো ডুবিয়ে দিলেন জলে৷ শরীর জুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে আরামের বোধ৷ সকালের চঞ্চলতা আর তিলমাত্র নেই মনের ভিতর৷
কিছুক্ষণ পর নালজোর এলে কুনচেন বললেন, ‘বহুদূর দেশ থেকে দু-জন বন্ধু আমার কাছে আসছে৷ তুমি গুহার বাইরে গিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে যাও৷ ওদের সঙ্গে করে এখানে নিয়ে এসো৷’
রুহ এবং জাদুকর এখন ঠিক কোথায় আছে নালজোরকে তা বুঝিয়ে দিলেন কুনচেন৷ কুনচেনের কথায় ভিতরে-ভিতরে বেশ বিস্ময়বোধ করল নালজোর৷ কুনচেন লামার যে বিদেশেও বন্ধু আছে এমন তো কোনোদিন শোনেনি! বিস্ময়ের সঙ্গে আশঙ্কাও হল এই ভেবে যে, তাদের যে বিপ্লবের জোর প্রস্তুতি চলছে, বাইরের দু-জন আসায় তা বিঘ্নিত হবে না তো!
কুনচেন যেন নালজোরের মনের কথাটি পড়তে পারলেন৷ বললেন, ‘তোমার শঙ্কার কোনো কারণ নেই৷ তুমি নির্ভাবনায় ওদের নিয়ে এসো৷’
নালজোর লজ্জা পেল, মহাত্মা কুনচেন লামা তার মনের কথাটি জানতে পেরেছেন জেনে৷ নালজোর মাথা নীচু করে সম্মতি জানিয়ে চলে গেল৷ দু-জন সঙ্গী নিয়ে বরফের তৈরি গুহার বিশেষ গোপন দরজা সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল নালজোর৷ তারপর কুনচেনের নির্দেশিত পথে এগিয়ে চলল৷
এদিকে রুহ ও জাদুকর খাদ পেরিয়ে কিছু দূর হেঁটে আসার পর বরফ-ঢাকা উপত্যকার মাঝখানে খানিকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়াল৷ জাদুকরকে কিছুটা চিন্তিত মনে হল৷ যতদূর চোখ যায় বরফ আর বরফ৷ ঢেউ খেলানো উপত্যকা জুড়ে মসৃণ বরফ৷ মাথার ওপর এখন গনগনে সূর্য৷ বরফের ওপর পড়া রোদের বিচ্ছুরণে চোখে ধাঁধা লেগে যাচ্ছে৷
রুহ জিগ্যেস করল, ‘কী ব্যাপার, জাদুকর? আমরা কি ভুল পথে এসেছি৷’
‘না৷ আমাদের নিশানা ঠিকই আছে৷ তবে সামান্য একটু বিভ্রম যে হচ্ছে না, তা নয়৷’
এতদিন ধরে এত কষ্টকর পথ পার হয়ে এসে এমন দিগ্ভ্রান্ত অবস্থা রুহর ভালো লাগার কথা নয়৷ জাদুকর বলল, ‘আমাদের বোধহয় আরও কিছুটা দক্ষিণে এগিয়ে যেতে হবে৷’
‘বোধহয়?’ সংশয় রুহর গলায়৷
রুহর এই সংশয় জাদুকরকে ক্ষণিকের জন্য বিভ্রান্ত করল৷ কিন্তু পরমুহূর্তেই সমস্ত দ্বিধা মুছে ফেলে জাদুকর বলল, ‘চলো, আর খানিকটা দক্ষিণেই যেতে হবে৷’
রুহ ও জাদুকর দক্ষিণ মুখে হাঁটা শুরু করল৷ কিছুক্ষণ পর রুহই প্রথম দেখতে পেল তিনজন মানুষ এগিয়ে আসছে তাদের দিকে৷ প্রথমে রুহ ভাবল তার চোখের ভুল৷ মরুভূমির বুকে যেমন মাথার ওপর এক অতিকায় পাখিকে উড়তে দেখেছিল, মনে হল—এ-ও তেমনই৷ কিন্তু পরমুহূর্তে চোখের চশমা সরিয়ে চোখ কচলে দেখল—ভুল নয়, সে ঠিকই দেখছে৷ তিনজন অচেনা মানুষ এগিয়ে আসছে তাদেরই দিকে৷ রুহ বলল, ‘জাদুকর, সামনে তাকাও৷ দেখো, কারা যেন আসছে৷’
জাদুকরও দেখতে পেল৷ জাদুকর একটু অবাকও হল৷ এমন নির্জন প্রান্তরে মানুষের দেখা পাওয়ার তো কথা নয়! জাদুকর থমকে দাঁড়াল৷ দাঁড়িয়ে পড়ল রুহও৷
কিছুক্ষণের মধ্যে তিনজন কাছে এসে পড়ল। তাদের মধ্যে একজন বলল, ‘আপনারা কুনচেন লামার বন্ধু?’
জাদুকর এবার নিশ্চিন্ত হল৷ জাদুকর বলল, ‘হ্যাঁ।’
সেই ব্যক্তিই আবার বলল, ‘আসুন আমাদের সঙ্গে৷’
রুহ কোনো কথা বলল না৷ ওদের পিছনে হেঁটে যেতে লাগল৷ কিছু পরে একটি বরফের স্তূপের কাছে এসে পৌঁছাল সবাই৷ ওদের একজন অদ্ভুত কৌশলে একটু চাপ দিতেই বরফের বিশাল চাঙড় সরে গেল৷ তার নীচে পাথুরে সিঁড়ির ধাপ৷ সিঁড়ি না বলে এলোমেলোভাবে থাকা মস্ত-মস্ত পাথরের খণ্ড বলাই সমীচীন৷
পাঁচজন সেই সুড়ঙ্গে প্রবেশ করতেই পুনরায় লোকটি হাতের অল্প চাপে বন্ধ করে দিল বরফের গুহামুখ৷
‘ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে যে-কমিউনিস্টরা আপসহীন সংগ্রামের দাবি করে, সেই কমিউনিস্টরা তিব্বতের ক্ষেত্রে কী করছে? মাও জে দং তিব্বতের ক্ষেত্রে যে-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন তা একনায়কতন্ত্রী মনোভাব নয়?
তিনি চিনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে লক্ষ-লক্ষ তরুণ-তরুণীদের নিয়ে রেডগার্ড গঠন করলেন৷ ভেবেছিলেন আগামীদিনে এরাই কমিউনিস্ট মতাদর্শকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে৷ সর্বহারার সংগ্রামকে নেতৃত্ব দেবে৷ কিন্তু বাস্তবে কী হল? স্পষ্ট কথায়, দেশের যৌবনশক্তিকে একটা ঠাঙাড়ে বাহিনীতে পরিণত করলেন৷
দেশের যা কিছু পুরোনো—সমস্ত কিছুকে ভেঙে তছনছ করে দিতে লাগল৷ আপামর চিনা-নাগরিকদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন নামিয়ে আনল৷ এমনকী কারও বাড়িতে পুরোনো আসবাব দেখলে সেগুলো পর্যন্ত ভেঙে নষ্ট করে দিতে লাগল৷ কারও মাথার চুল কিছুটা লম্বা দেখলে, প্রকাশ্যে তা ছেঁটে দিত৷ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও এদের হাত থেকে নিস্তার পায়নি৷ জনসমক্ষে অপমান করা হতে লাগল৷ মাথায় পরিয়ে দেওয়া হতো গাধার টুপি৷ অর্থাৎ রেডগার্ডদের চিন্তাভাবনার সঙ্গে কারও জীবন যাত্রার অমিল খুঁজে পেলেই তাকে শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনার শিকার হতে হতো৷
কাউকে বিরোধী মনে হলে তাকে হত্যা করতেও এদের কোনো সংকোচ থাকত না৷ ঠিক সেই সাংস্কৃতিক বিপ্লব ১৯৬৬ সালে তিব্বতে আমদানি করল চিনা সরকার৷ কমিউনিস্টদের বিপক্ষে কারও মুখ খোলার অধিকার ছিল না৷ প্রকাশ্য রাস্তায় চূড়ান্ত শারীরিক হেনস্থার শিকার হতো৷ এই ঘৃণ্য মানবাধিকার লঙ্ঘন কখনো কমিউনিজম হতে পারে?’ ক্ষোভে-ক্রোধে ফুঁসছে অনটেন৷ তার কণ্ঠ থেকে থেকে যেন আগুনের ঝলক বেরিয়ে এল৷
গুহার ভিতর গেরিলাদের জমায়েত গর্জে উঠল—চিনা সরকার হাত গোটাও! চিনা সরকার নিপাত যাক!
কুনচেন বিব্রত হলেন৷ শান্তভাবে দু-হাত তুলে সবাইকে শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত করলেন৷ তারপর বললেন, ‘এটা আলোচনা সভা৷ প্রকাশ্য জমায়েত নয়৷ এত চিৎকার করে শ্লোগান দেওয়ার জায়গা নয় এটা৷ তোমরা এমন হঠকারিতা করলে এই গুহা আর গুপ্তস্থান থাকবে না৷’
কুনচেনের তিরস্কারে সবাই চুপ হয়ে গেল৷
অনটেনের ক্ষোভের সংগত কারণ আছে৷ সে অতিরঞ্জিত করে একটি কথাও বলেনি—একথা রুহ ছাড়া সবাই জানে৷ রুহ হঠাৎ বলে উঠল, ‘আমি তো নানা জায়গায় পড়েছি তিব্বত চিনেরই অংশ৷ তিব্বতের মানুষ যদি সংঘর্ষের পথ বেছে না-নিত, তাহলে কি চিনা সরকার এমন নিপীড়ন চালাত?’
রুহর এমন প্রশ্নে জাদুকর খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেল৷ জমায়েতের ভিতর গুঞ্জন উঠল—তিব্বত সম্পর্কে যার এমন ধারণা, সে কী করে কুনচেন লামার বন্ধু হতে পারে?
জাদুকর মুহূর্তে পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল, ‘তোমরা কিছু মনে কোরো না৷ আসলে বিশ্বের কাছে চিনারা চিরকাল এই ধারণাই তৈরি করে দিতে চেয়েছে৷’
তারপর জাদুকর রুহর দিকে ফিরে বলল, ‘চিনারা যাই দাবি করুক, তাতে ইতিহাসের সত্য মুছে যায় না৷ তোমার সত্যিটা জানা উচিত—তুমি মোঙ্গলদের নাম নিশ্চয় জানো? যাযাবর এই গোষ্ঠীর প্রধান নেতা ছিলেন চেঙ্গিস খান৷
এই মোঙ্গলরা দ্বাদশ শতাব্দীতে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারে মন দেয়৷ ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই তারা এই তিব্বত দখল করে নেয়৷ আবার এই ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে অর্থাৎ ১২৮০ সালের আশেপাশে তারা চিন দখল করে৷
এই মোঙ্গলদের কাছ থেকে দেড়-শতাধিক বছর পর তিব্বত নিজেদের মুক্ত করে৷ চিন মোঙ্গল শাসন থেকে মুক্ত হয় তিব্বত মুক্ত হওয়ার দশ বছর পর৷
এই যে একসময় তিব্বত ও চিন একইসঙ্গে মোঙ্গলদের শাসনের আওতায় ছিল, ঠিক সেই জায়গা থেকেই চিন দাবি করে তিব্বত তাদের অংশ৷
কী অদ্ভুত যুক্তি ভেবে দেখো! ধরো, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত শাসন করেছে৷ একই সঙ্গে শাসন করেছে মায়ানমার, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ৷ এই কারণের ওপর দাঁড়িয়ে কি ভারত দাবি করতে পারে যে—যেহেতু ব্রিটিশ শাসনের আওতায় মায়ানমার ও অস্ট্রেলিয়াও ছিল, তাই মায়ানমার ও অস্ট্রেলিয়া ভারতের অংশ?
‘এ তো রীতিমতো গা-জোয়ারি!’ বলল রুহ৷
‘ঠিক এমনই যুক্তি দিয়ে চিন বিশ্বের কাছে নিজের দাবি বারবার তুলে ধরছে৷ আর আশ্চর্যের বিষয় হল, সমস্ত বিশ্ব চিনের এই দখলদারি মানসিকতার কাছে নিশ্চুপ৷’
‘কেন?’
‘তার একটাই কারণ—চিন এইসময়ে অর্থনৈতিকভাবে অন্যতম শক্তিশালী দেশ৷ কে আর ইচ্ছে করে নিজের শক্তিশালী শত্রু বাড়াতে চায়?’
‘কিন্তু, তিব্বতের লক্ষ-লক্ষ মানুষ যে চূড়ান্ত দমনপীড়নের শিকার এ নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই? মানবিকতা বলে তো একটা শব্দ আজও লুপ্ত হয়ে যায়নি, জাদুকর? বলো, লুপ্ত হয়ে গেছে?’ আবেগপ্রবণ এই প্রশ্নের কাছে জাদুকর নিশ্চুপ৷ শুধু অস্ফুটে বলল, ‘এই একই প্রশ্ন তো আমারও, রুহ৷’
রুহর প্রশ্নে কুনচেনও যেন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন৷ তিনি শান্তস্বরে বললেন, ‘রুহ যে মানবতার কথা বলল, সেই মানবতা যেন ক্রমশ পৃথিবীর বুকে বিরল থেকে বিরলতম হয়ে উঠছে৷ এই মুহূর্তে তাহলে আমাদের করণীয় কী?’
সবাই বিস্মিত৷ এমন প্রশ্নের উত্তর তো মহাত্মা কুনচেনের কাছেই থাকা উচিত৷ তিনি জানতে চাইছেন কেন? সবাই নিশ্চুপ৷ নালজোর স্তব্ধতা ভেঙে বলল, ‘প্রত্যাঘাত ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই৷ শত্রুদের মানবিক বোধের জাগরণের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকলে আমাদের মাতৃভূমি কসাইখানায় পরিণত হতে বেশিদিন লাগবে না৷ কথাটা অপ্রিয় হলেও, সত্য৷’
কুনচেন তাঁর স্বাভাবিক শান্তস্বরে বললেন, ‘আচ্ছা, ভেবে দেখি৷’
নালজোর বলল, ‘আপনি আমাদের তেমন কোনো যুদ্ধাস্ত্রের সন্ধান দিন, যার ভয়ে চিনারা এদেশ থেকে পালানোর পথ পাবে না৷ আমরা লড়াই করব৷ প্রাণের বিনিময়ে হলেও তিব্বতকে তার পুরোনো অবস্থানে ফেরাতেই হবে৷
আমরা তো শান্তভাবে আমাদের চিন্তাচেতনা, আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে ভালো ছিলাম৷ আমাদেরকে এভাবে ছিন্নমূল করে দেওয়ার স্পর্ধা চিনা-সরকার পায় কীভাবে? সে-কেবল আমাদের সামরিক অসহায়তাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের গোলামির নাগপাশে বন্দি করেছে৷ এই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে গেলে আমাদের পালটা আঘাত করতেই হবে৷ আর সেই সংগ্রামের জন্য চাই রসদ৷ যুদ্ধাস্ত্রের রসদ৷ আপনার মতো জ্ঞানী পুরুষই আমাদের সেই সন্ধান দিতে পারেন৷ সুতরাং, ভাবুন৷ আমাদের অনুরোধ—একটু দ্রুত ভাবুন৷’
সভা ভেঙে গেল৷ গুহার ভিতর পাহাড়ি পথে যেতে-যেতে রুহ সরাসরি কুনচেনকে বলল, ‘শুধু তিব্বত কেন, সারা পৃথিবী কি শক্তিশালী কিছু দেশের গোলামি করছে না? আমার কথা হল—তিব্বতের সঙ্গে-সঙ্গে সমস্ত পৃথিবীর কথাই আমাদের ভাবা উচিত৷ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের ভাষা পৃথক হতে পারে, গায়ের রং পৃথক হতে পারে, তাদের সংস্কৃতি আলাদা হতে পারে, কিন্তু কান্নার জলের রংটা কিন্তু এক৷’
কুনচেন রুহর কথায় হাঁটতে-হাঁটতে থমকে দাঁড়ালেন৷ স্থির চোখে রুহর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ তারপর বললেন, ‘ঠিক, রুহ৷ একদম ঠিক বলেছ৷
এ নিয়ে আমি যেমন ভাবছি৷ তুমিও ভাব৷ কীভাবে জগৎজোড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব৷’
রুহ সম্মতি জানাল মাথা নেড়ে৷ তারপর কুনচেন তার গবেষণাগারের দিকে চলে গেলে, রুহ ও জাদুকর বাঁ দিকে ঘুরে নীলরংয়ের হ্রদের পাশে গিয়ে চুপ করে বসল৷ নীল হ্রদের জলের ভিতর থেকে হলদে রংয়ের কয়েকটা কুমির কখনো ডুবছে, কখনো ভাসছে৷
জাদুকর দেখল একটি গেরিলা যোদ্ধা তাদের দিকেই আসছে৷ একদম কাছে এসে যোদ্ধাটি বলল, ‘একটা মজা দেখবে?’
‘কী রকম?’ প্রশ্ন করল রুহ৷
গেরিলা যোদ্ধাটি হ্রদের কিনারায় দাঁড়িয়ে মুখ দিয়ে এক অদ্ভুত শব্দ করল৷ আর সেই শব্দে হ্রদের জলে ভাসতে থাকা হলদে রংয়ের কয়েকটা কুমির কাছে চলে এল৷ যোদ্ধাটি নির্দ্বিধায় একটি কুমিরের ওপর চড়ে বসল৷ কুমিরটি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলল দূর জলের দিকে৷
হ্রদের তীরে বসে রুহ ও জাদুকর এই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ৷ রুহ বলল, ‘কুমির তো হিংস্র প্রাণী, সে কোন জাদুতে একটা মানুষকে পিঠে নিয়ে ডিঙির মতো ভেসে বেড়াচ্ছে?’
জাদুকর বলল, ‘আমিও তো তাই ভাবছি৷ এটা কিন্তু কিছুতেই জাদু নয়৷’
লোকটি কিছুক্ষণ পর কুমিরের পিঠে চড়ে কিনারায় এল৷ লোকটা হাসছে৷ রুহর প্রশ্নের উত্তরে লোকটা বলল, ‘এ হচ্ছে মহাত্মা কুনচেনের জাদু৷’
‘জাদু!’ বিস্ময় জাদুকরের কণ্ঠে৷
‘জাদু মানে, মহাত্মা কুনচেন এদের একধরনের ওষুধ খাইয়েছেন৷ যার ফলে, এদের মধ্যে আর সেই হিংস্রতা নেই৷ শুধু তাই নয়, মানুষের বিশেষ ভাষাও এরা বুঝতে পারে৷ কুনচেন লামা আমাদের সেই ভাষা শিখিয়ে দিয়েছেন৷ ফলে আমরা যখন এই গুহার অন্য কোনো পথ দিয়ে বাইরে বেরোই, জলপথে এই কুমিরগুলোই আমাদের সেই গুহামুখ পর্যন্ত জলে ভাসিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসে৷’
লোকটি চলে যাওয়ার পর মুখ দিয়ে আর কথা সরছে না জাদুকর ও রুহর৷ রুহ শুধু ভাবছে—কী আশ্চর্য এই লামা? কী আশ্চর্য এঁর শক্তি!
হ্রদের দিকে তাকাল রুহ ও জাদুকর৷ নীল জলের ওপর দলবেঁধে কী স্বছন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে কুনচেনের জীবন্ত ডিঙিরা!
গুহার ভিতরেও যে ঋতু পরিবর্তন হয় তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করত না রুহ৷ সুদূর বিস্তৃত গুহার নানা জায়গায় বহুরকমের গাছপালা দেখেছে৷ কয়েকমাস অন্তর তাদের নানা রূপান্তর লক্ষ করেছে৷ খোলা আকাশের নীচে যে-ঋতুর বদল দেখেছে, অবিকল সেরকম না-হলেও এখানেও সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে আবহাওয়ার বদল ঘটে৷
তাপমাত্রার তারতম্য হয়৷ কোনো-কোনো গাছে একটি বিশেষ সময়ে ফুল আসে৷ ফল হয়৷ পুনরায় সেই আবহাওয়া ফিরে না-এলে সেইসব গাছপালায় ফুল ফোটে না৷ ফল হয় না৷
কুনচেনের কাছ থেকে জেনেছে—এইসব গাছপালার কিছু প্রজাতি আগে থেকেই এখানে ছিল৷ বাকি নানান উদ্ভিদ তিনি সংগ্রহ করে এনে অনেক যত্নে বাঁচিয়েছেন৷
গুহার সুউচ্চ ছাদের ভিতর বায়ুস্তর যেমন আছে, তেমনই রয়েছে বিচিত্র মেঘের দল৷ সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, সেই মেঘ থেকে সময় বিশেষে বৃষ্টিপাত যেমন হয়, তেমনই নানান আলো দেখা যায়৷ মেঘেদের আলোতেই মূলত এই গভীর ও সুবিশাল গুহা আলোকিত হয়ে থাকে৷
দেখতে-দেখতে প্রায় দু-বছর পার হয়ে গেল কিন্তু তাদের সমস্যার সমাধানের কোনো পথ সামনে এল না৷ গেরিলারা তাদের মতো বাইরে যায়৷ সংগঠনের কাজ করে নিঃশব্দে গুহায় ফিরে আসে৷ তারা বুঝতে পারে না, তাদের বিপ্লবের জন্য মহাত্মা কুনচেন কবে অস্ত্র তুলে দেবেন৷ তাদের কথাবার্তা থেকেই আন্দাজ করা যায়, তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে কুনচেনের সাফল্যের জন্য৷ তাদের ধারণা—কুনচেন মারাত্মক কোনো অস্ত্র আবিষ্কারের গবেষণায় মগ্ন হয়ে আছেন৷
রুহ ও জাদুকরও বুঝতে পারে কুনচেন তাঁর গবেষণার কাজে ভীষণ ব্যস্ত৷ রুহর মনে মাঝে-মাঝে প্রশ্ন জাগে—জাদুকরের সঙ্গে এত পথ পাড়ি দিয়ে এসে সত্যিকারে তার কি কোনো লাভ হল!
নিজের গুহায় থাকলে অন্তত সে ছবিগুলো আঁকতে পারত৷ ভিতরে-ভিতরে হতাশা জন্মায়৷ নিজেই সে-হতাশাকে মুছে ভাবতে শুরু করে—কীভাবে পৃথিবী থেকে মানুষে-মানুষে বিভাজন, দখলদারিত্বের মনোবিকলনকে মুছে দেওয়া যাবে৷ সংশয় জাগে মনে—আদৌ কোনোদিন তার এই স্বপ্নপূরণ হবে তো? নাকি শুধু ব্যক্তিগত কল্পনা হয়েই থেকে যাবে? সাধারণ শিল্প নয়, কীভাবে সে মহৎ শিল্পের জন্ম দেবে?
এখন সমস্ত গুহাটি রুহর নখদর্পণে৷ গুহার ভিতর সমস্ত বাঁক, সমস্ত রাস্তা৷ গুহা থেকে বেরোনোর সব গুপ্ত পথগুলো তার চেনা হয়ে গেছে৷ আজ জাদুকরের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ উষ্ণ জলের ধারায় স্নান করেছে৷ এ-এমন এক জলধারা, যাতে স্নান করলে শরীরে-মনে আশ্চর্য শক্তি জেগে ওঠে৷
স্নানের পর কুনচেনের নিজস্ব যে বাগান রয়েছে, তার একটির কাছে জাদুকরের সঙ্গে বসে আছে রুহ৷ গুহার ভিতর নানা জায়গায় কুনচেন যে কত রকমের বাগান করেছেন তা না-দেখলে কারও বিশ্বাস হবে না৷ কোনো বাগান শুধুই গুল্মের৷ সেখানে শুধু গুল্মশ্রেণির উদ্ভিদই রয়েছে৷ কোনো বাগান কেবলমাত্র লতার৷ নানান লতার সন্ধান মিলবে সেখানে৷
তবে যে-উদ্যানটি রুহকে বেশি টানে তা বড় অভিনব৷ এই উদ্যানটি দেখলে কুনচেনকেই যেন অন্যভাবে আবিষ্কার করা যায়৷ বিষয়টা তেমন আহামরি কিছু না-হলেও কুনচেনের কল্পনা ও দক্ষতার তারিফ করতেই হয়৷ ভিন্নধর্মী গাছগুলোকে নানাভাবে জুড়ে-জুড়ে বিচিত্র সব গাছের জন্ম দিয়েছেন৷ একটি ফলের গাছের সঙ্গে একটি ফুলের গাছের জোড় বেঁধে নতুন একটি গাছ তৈরি করেছেন৷ হয়তো একটি ক্যাকটাসের সঙ্গে নাশপাতির মতো ফলের গাছের মিলন ঘটিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি গাছ সৃষ্টি করেছেন৷
রুহ ঝুঁকে একটি গাছকে লক্ষ করল৷ কয়েকদিন আগেও যে-গাছটি তার চোখে পড়েনি৷ দেখল মাঝারি মাপের গাছটিতে সাত রংয়ের ফুল ফুটেছে৷ এবং ফুলগুলোর আকারও পৃথক-পৃথক৷ হঠাৎ গাছটি দেখে রুহ চমকে উঠল৷ জাদুকরকে বলল, ‘আমি এক্ষুনি একবার কুনচেনের সঙ্গে দেখা করতে চাই৷’
জাদুকর বিস্মিত, ‘কেন!’
‘তুমিও চলো৷ জরুরি৷’
রুহ ও জাদুকর উদ্যান থেকে বার হয়ে ডানদিকের সুড়ঙ্গপথ ধরে এগিয়ে চলল৷ এই পথ ধরে গেলে কুনচেনের গবেষণা-কক্ষের কাছে দ্রুত পৌঁছানো যাবে৷ সুড়ঙ্গ ধরে কিছু পথ এগোতেই কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়ে গেল কুনচেনের সঙ্গে৷ কুনচেনও ওই পথ ধরেই আসছিলেন৷ কাছাকাছি হতেই রুহ বলল, ‘আপনার কাছেই যাচ্ছিলাম৷’
কুনচেনের চোখে জিজ্ঞাসা৷ রুহ বলল, ‘এভাবে দাঁড়িয়ে নয়, চলুন, নিরিবিলিতে কোথাও বসা যাক৷ আপনাকে কিছু কথা বলার আছে৷’
জাদুকর, রুহ ও কুনচেন কিছু দূর হেঁটে এসে শীতল ঝরনার পাশে বসল৷ পাহাড়ের কালচে রংয়ের পাথরগুলোর ফাটল থেকে মুক্তোর মতো সাদা জলরাশি পাথরের গা বেয়ে নেমে আসছে৷ নীচের পড়ে থাকা নুড়ি-পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে প্রায় নিঃশব্দে৷ রুহ বলল, ‘প্রথমেই আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই৷’
রুহর চোখের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে কুনচেন বললেন, ‘করো৷’
রুহ বলল, ‘গেরিলা যোদ্ধারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে৷ ওরা অপেক্ষা করে আছে, আপনি কবে চিনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো মোক্ষম মারণাস্ত্র তুলে দেবেন৷ আপনি কি এ-ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে এসেছেন?’
রুহর কথা শেষ হতেই কুনচেন কিছু বলার আগে জাদুকর বলল, ‘রুহ, গেরিলা যোদ্ধাদের আবেগকে আমি ছোট করছি না৷ মাতৃভূমি পরাধীন থাকলে তার যে কী যন্ত্রণা আমরাও তা হাড়ে-হাড়ে জানি৷
কিন্তু কুনচেনের মতো এমন প্রজ্ঞাবান একজন লামার কাছে প্রাণঘাতী মারণাস্ত্র দাবি করাটা অন্যায়৷ লামা কথার অর্থ হল শিক্ষক৷ যে-শিক্ষকরা সমগ্র মানবজাতিকে শান্তি ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেন, চেতনা-সঞ্চারী পথের সন্ধান দেন, তাঁদের কাছে ধ্বংসের নিদান চাওয়াটা কিন্তু অযৌক্তিক৷ আমার অন্তত এটাই মত৷’
‘এটাই আমার কাছে চূড়ান্ত এক সংকট, জাদুকর৷ আমি গবেষণা করে তেমন অস্ত্র আবিষ্কারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি৷ সেই অস্ত্র ব্যবহার করলে তিব্বত থেকে চিনকে হঠাতে কয়েকদিন সময়ও লাগবে না৷ ঠিক যেভাবে হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিনীদের বোমা বিস্ফোরণের পর কয়েকদিনের মধ্যে জাপান সরকার বাধ্য হয়েছিল আত্মসমর্পণ করতে, ঠিক তেমনই৷
কিন্তু তথাগত যেন বারবার আমাকে নিরস্ত্র করছেন৷ বারবার যেন তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন—প্রতিহিংসা দিয়ে শান্তির ভূখণ্ড লাভ করা যায় না৷’
রুহর গলায় বিস্ময়, ‘আপনি পারমাণবিক অস্ত্রের মতো ভয়ংকর অস্ত্র তৈরির মতো সক্ষমতা অর্জন করলেন কীভাবে? এই গুহার ভিতর সেই পরিকাঠামো কোথায়? আবিষ্কারের মতো অত্যাধুনিক গবেষণাগার কোথায়?’
রুহর কথায় স্মিত হাসলেন কুনচেন৷ বললেন, ‘চাইলে, আমি তোমাদের পরীক্ষা করে দেখাতে পারি৷ আসলে কী জানো, সারা দুনিয়া এখন বিজ্ঞানকে বিচার করে পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারণা থেকে৷ সমস্ত কিছুকেই গবেষণাগারের টেবিলে শুইয়ে যাচাই করে৷ বিজ্ঞানের সীমানা তারও বাইরে৷ অনেক বৃহৎ৷ শুধু মস্তিষ্কের জগৎ নয়, বুকের ভিতর যে অনুভবের জগৎ আছে—এই দুই জগৎকেই অসামান্য দক্ষতায় কাজে লাগিয়ে প্রাচ্যের বিজ্ঞান অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে৷ বিশেষত, আমি আমাদের দেশের লামাদের কথা জানি, যাঁরা দুনিয়াখ্যাত বিজ্ঞানীদের চেয়ে কম কিছু নন৷’
জাদুকর মাথা নেড়ে কুনচেনের কথাকে সমর্থন জানাল৷ কুনচেন বললেন, ‘পাশ্চাত্য কত বছর আগে বেতারতরঙ্গ আবিষ্কার করেছে? কতবছর আগে তারা তরঙ্গকে ব্যবহার করে যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছে? তারও বহুপূর্বে তিব্বতের মানুষ অনুভবের তরঙ্গের সাহায্যে কথার আদানপ্রদান করত৷ পাশ্চাত্য যাকে টেলিপ্যাথি বলে হেসে উড়িয়ে দেয়৷
তিব্বতের বিজ্ঞান উন্নতির কোন স্তরে রয়েছে, তার প্রমাণ আমি তোমাকে দেব৷ কিছুদিন অপেক্ষা কর৷’
রুহ বলল, ‘বেশ৷ আমি প্রতীক্ষায় থাকলাম৷ অস্ত্র নিয়ে আপনি কী যেন বলছিলেন?’
কুনচেন প্রসঙ্গে ফিরে এলেন৷ বললেন, ‘বাস্তবটা একবার ভেবে দেখ, এইসময়ে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর অন্যতম চিন৷ গেরিলাদের যদি আমি তেমন কোনো অস্ত্রও তুলে দিই, চিনারা হয়তো ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে৷ তিব্বত ছেড়ে পালানোর পথ পাবে না৷ কিন্তু তাতে কি শুধু চিনই ক্ষতির মুখে পড়বে? তিব্বতকে তার ফল ভুগতে হবে না? অস্ত্রের তেজস্ক্রিয়তা তো চিন বা তিব্বতের মানুষ বুঝবে না৷ ভয়ংকর এক ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে যাবে এই দুই দেশ৷ পরোক্ষে প্রভাব পড়বে বিশ্বের ওপরেও৷
‘তাছাড়া যুদ্ধ শুরু হলে তা শুধু চিন ও তিব্বতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না৷ ক্রমশ সমস্ত পৃথিবী এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে৷ আর বিশ্বের দেশগুলোর হাতে যে-পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র মজুত আছে, তাতে এই পৃথিবীকে যে কতবার ধ্বংস করা যাবে তার ঠিক নেই৷ পৃথিবী আজ বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে৷ সামান্যতম আগুন লাগলে কয়েক মুহূর্তে এই গ্রহ ভষ্মীভূত হয়ে যাবে৷ আশঙ্কাটা ঠিক এখানেই৷’
‘আমার বক্তব্যও কিন্তু ঠিক এটাই৷ অস্ত্র দিয়ে এই সঙ্কটের মোকাবিলা করার ভাবনার মধ্যে ভুল রয়েছে৷ তাছাড়া আমি আগেও বলেছি—শুধু তিব্বত নয়, আমার ভাবনা সমগ্র পৃথিবীর জনজাতি নিয়ে৷
‘গুহার ভিতর আমি যে পৃথিবীর ছবি আঁকছিলাম তা যুদ্ধবিহীন এক সময়ের ছবি৷ অস্ত্রহীন এক পৃথিবীর স্বপ্নের ছবি৷ মানুষে-মানুষে যে দখলদারি গড়ে উঠেছে, ভূখণ্ড নিয়ে যে অস্থিরতা, যে হানাহানি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তাকে মুছে দেওয়ার স্বপ্নই আমার গুহাচিত্রকলার মূল বিষয় ছিল৷ আমি সেই স্বপ্ন নিয়েই আপনার কাছে ছুটে এসেছি৷’
কুনচেন চুপ করে রুহর দিকে তাকিয়ে থাকে৷ বুঝতে পারে রুহর চোখের তারায় যেন এক স্বপ্নময় সুসময়ের আলো খেলা করছে৷
কুনচেন বললেন, ‘তোমার স্বপ্ন সম্পর্কে আমার কিছুই অজানা নেই, রুহ৷ কিন্তু তার পথটা ঠিক কী? তোমার ভাবনার সঙ্গে আমিও একমত যে—পৃথিবীতে সভ্যতার সূচনার সময় দখলদারিত্বের জন্ম হয়নি৷ পৃথিবী রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়নি৷ পৃথিবীতে সীমান্তের জন্ম হয়নি৷ কিন্তু সভ্যতা সৃষ্টির এত হাজার বছর পর সেই সময়ের চেতনায় কি পুনরায় ফেরা সম্ভব? যুদ্ধহীন, সংঘর্ষহীন, শোষণহীন, শরণার্থীহীন, ক্ষুধাহীন একটা বিশ্ব কি আদৌ গড়ে তোলা সম্ভব?’
‘আমার কাছেও এক সময় অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল৷ কিন্তু আজ মনে হচ্ছে সম্ভব৷’
রুহর কথায় চমকে ওঠে কুনচেন৷ চমকে ওঠে জাদুকরও৷ রুহ বলে, ‘একসময় পৃথিবীতে প্রাকৃতিকভাবে জীববৈচিত্র বিকশিত হতো৷ এখনো হয়৷ তবে মানুষ আজ তার অভিজ্ঞতা ও গবেষণা দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও গড়ে তুলেছে—একথা আপনিও জানেন৷ প্রযুক্তির নৈপুণ্যে মানুষের মতো কর্মক্ষম রোবটের সৃষ্টি হয়েছে৷
‘কিন্তু আমি একটু অন্যকথা বলতে চাই—আপনার একটি উদ্যানে দেখলাম নানান উদ্ভিদকে আপনি নিজের পছন্দমতো ভিন্ন শ্রেণির উদ্ভিদে রূপান্তরিত করেছেন৷’
‘এ তো খুব সাধারণ একটা ব্যাপার৷ গ্রাফটিং পদ্ধতিতে এসব করা যায়৷ মামুলি ব্যাপার৷’
‘হ্রদের কুমিরগুলোর স্বভাব আপনি বদলে দিয়েছেন৷ এক গেরিলা যোদ্ধা বলছিল—আপনি নাকি কী সব ওষুধ খাইয়ে ওদের হিংস্রতা দূর করে দিয়েছেন? তাছাড়া ওরা নাকি মানুষের ভাষাও বোঝে?’
‘ওষুধ নয়৷ একধরনের হরমোন প্রয়োগ করে ওদের স্বাভাবিক হিংস্রতা নষ্ট করে দিয়েছি৷ আর, ওরা মানুষের ভাষা বোঝে না৷ ওদের বিভিন্ন শব্দজাত ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে আমি একধরনের শব্দমালা তৈরি করেছি৷ সেই বিশেষ শব্দ প্রয়োগ করে ওদের নির্দেশ পালন করানো যায়৷ এ তো তেমন কিছুই নয়৷ তবে হ্যাঁ, এ-কথা বলতে পারো যে—আমাকে অনেক দিন সময় দিতে হয়েছে৷ দীর্ঘদিন গবেষণা করে এই পথ আমি উদ্ভাবন করেছি৷’
রুহর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷ বলল, ‘ঠিক এই জায়গাটাতেই আমি আসতে চেয়েছি৷ এমন একটা অস্ত্র আবিষ্কার করতে হবে যা আমাদের স্বপ্নের অস্ত্র আবার সাধারণভাবে তা অস্ত্রও নয়৷’
‘মানে?’ কুনচেনের গলায় তীব্র কৌতূহল৷
রুহ বলল, ‘সে অস্ত্র অদৃশ্য হবে কিন্তু তার কার্যকারিতা হবে তীব্র৷’
জাদুকর বলল, ‘স্পষ্ট করে বলো, কী বলতে চাও৷’
‘এমন একটা ভাইরাস সৃষ্টি করতে হবে, যে-ভাইরাস মানুষের মস্তিষ্কের বিশেষ-বিশেষ স্মৃতিকে নষ্ট করে দেবে বা নির্দিষ্ট কিছু স্মৃতিকে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেবে৷ এবং সেই ভাইরাস দিয়ে যদি সমস্ত মানুষকে আমরা সংক্রমিত করতে পারি তাহলে তো মানুষের মস্তিষ্ক থেকে চিরতরে যুদ্ধের কথা, দখলদারিত্বের কথা মুছে দেওয়া সম্ভব৷ তাই না?’
জাদুকর বলল, ‘ভাইরাসের ল্যাটিন অর্থ তো বিষ৷ সেই বিষ দিয়ে কি সত্যিই এমন অসাধ্যসাধন সম্ভব?’
কুনচেন রুহর কাছে সরে এলেন৷ তারপর নিবিড়ভাবে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন৷ তারপর মৃদুভাবে বললেন, ‘রুহ, তুমি কোনো সাধারণ শিল্পী নও৷ তুমি মহৎ শিল্পী৷
‘আমি আজ থেকে, ঠিক এই মুহূর্ত থেকে এই বিষয় নিয়ে কাজ করব৷ সফলতা আসবে, নাকি বিফল হব জানি না৷ তবে আমি নিশ্চিত তথাগত তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন৷ গভীর অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতর তুমি বিন্দুর মতো হলেও আলোর পথ খুলে দিলে৷ তবে এনিয়ে নিরন্তর আমাদের ভাবতে হবে৷ এই কাজ খুব গোপন থাকবে৷ শুধুমাত্র এই তিনজন ছাড়া যেন কারও কাছে প্রকাশ না-পায়৷’
কুনচেন উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর নিজের গবেষণা-কক্ষের দিকে যাওয়ার পথ ধরলেন৷ কুনচেনকে দেখলেই ফাদার জনের কথা মনে পড়ে যায় রুহর৷ দুজনেরই প্রায় একইরকম পোশাক৷ কুনচেন পরেন পায়ের গোড়ালি অব্দি ঢাকা ইয়াকের পশমে বানানো স্কার্ট৷ স্কার্টের রং কখনো সোনালি, কখনো রক্তাভ লাল৷ আর ফাদার জন পরতেন কশাক৷ সেই পোশাকও পায়ের গোড়ালি অব্দি৷ তবে সেই পোশাকের রং সবসময় বকফুলের মতো সাদা৷ বুকের কাছে ঝুলত রুপোর ক্রশ৷ দু-জনেই খুব স্নেহপ্রবণ মানুষ৷ দু-জনের কাছ থেকেই সমান ভালোবাসা পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করে রুহ৷ কেবল চেহারায় কিছু অমিল রয়েছে৷ কুনচেন লামার চোখগুলো ছোট ও নাক চ্যাপটা৷ সেদিক থেকে ফাদার জনের চোখ দুটো টানা-টানা ও নাক খুব তীক্ষ্ণ৷ কিন্তু দু-জনেরই দৃষ্টি খুব স্নিগ্ধ, ঠোঁটে নরম হাসি৷ দু-জনেই মৃদুভাষী এবং জ্ঞানী৷
এ যেন অজ্ঞাতবাস! সাতদিন কুনচেনকে গুহার কোথাও দেখা গেল না৷ নালজোরসহ গেরিলাদের অনেকেই চিন্তিত৷ শুধুমাত্র রুহ এবং জাদুকরের মনে তেমন কোনো ভাবান্তর নেই৷
সাতদিন পর ডাক পড়ল রুহ এবং জাদুকরের৷ রুহ ও জাদুকর দাঁড়াল কুনচেনের বিশেষ গবেষণা-কক্ষে৷ কুনচেনের নির্দেশ অনুযায়ী ইতোপূর্বে আর অন্য কেউ কোনোদিন কুনচেনের এই বিশেষ কক্ষে প্রবেশাধিকার পায়নি৷
রুহ ও জাদুকর হাজির হলে কুনচেন বললেন, ‘বসো৷’
রুহ ও জাদুকর কুনচেন নির্দেশিত পাথরের মসৃণ দুটি খণ্ডের ওপর বসল৷ কুনচেন বললেন, ‘রুহ, তোমার ভাবনা অনন্য৷ এ নিয়ে আমার কোনো সংশয় নেই৷ কিন্তু তাকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক জটিল ধাপ আমাদের পেরোতে হবে৷ আচ্ছা, ভাইরাস সম্পর্কে তোমার ধারণা আছে?’
জাদুকর মুখ ফেরাল রুহর দিকে৷ রুহ বলল, ‘আমি আপনার মতো বিজ্ঞানী নই৷ তবে এটা জানি যে—নিউক্লিক অ্যাসিড হল ভাইরাসের কেন্দ্রীয় বস্তু৷ মূলত তার চারপাশে প্রোটিনের আস্তরণ থাকে৷ কখনো অবশ্য তা থাকেও না৷ তাছাড়া এই কেন্দ্রীয় বস্তুর প্রকারভেদ অনুযায়ী দু-রকমের ভাইরাস হয়—ডি.এন.এ ভাইরাস এবং আর.এন.এ ভাইরাস৷’
কুনচেন বললেন, ‘এদের নানান আকার হয়—গোলাকার, দণ্ডাকার, ঘনক্ষেত্রাকার ইত্যাদি৷ কিন্তু মূল যে ভাইরাস নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে, সেটা হল প্রাণী ভাইরাস৷ আমাদের কাজে উদ্ভিদ ভাইরাসের কোনো দরকার নেই৷
শুধু প্রাণী ভাইরাসও নয়, পশুপাখিদের জীবকোশে যে ভাইরাস কাজ করে, সেটাকেও আমরা গবেষণার বাইরে রাখব৷’
রুহ বলল, ‘কিন্তু পশুপাখির মধ্যে যে ভাইরাসকে সক্রিয় দেখি, ইদানীং তো সেই ভাইরাস মানব শরীরের সক্রিয় হয়ে উঠছে!’
‘ঠিকই বলেছ৷ বার্ড ফ্লু, এইচ.আই.ভি, ইবোলা, সার্স তেমনই ভাসরাস৷ এগুলো আসলে ইমার্জিং ভাইরাস৷ আমাদের পথ কিন্তু ভীষণ জটিল৷ আমাদের এমন এক ভাইরাস সৃষ্টি করতে হবে যা চরিত্রগতভাবে হবে তীব্র সংক্রামক৷ মূলত জল ও বায়ুবাহিত হতে হবে৷ এছাড়া মানুষ থেকে মানুষে যাতে তা দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে৷’
জাদুকর বলল, ‘ভাইরাস তো মানবজাতির ক্ষতিই করেছে৷ ব্যাকটেরিয়া বরং দুই ধরনের হয়—উপকারী ব্যাকটেরিয়া যেমন আছে, অপকারী ব্যাকটেরিয়াও রয়েছে৷ কিন্তু আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা যত ভাইরাসকে চিহ্নিত করেছে—চরিত্রগতভাবে তারা সবাই অপকারী৷ তাই সংশয় জাগছে—এই ভাইরাস কি উলটো কাজ করবে? মানবজাতির কল্যাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবে?’
‘সেটাই তো আমাদের পরীক্ষা৷’ বললেন কুনচেন৷
রুহ বলল, ‘কাজটা যে কতখানি জটিল তা মুখে বলে বোঝানো যাবে না৷ কোনো সিনেমায় বা উপন্যাসের কাহিনিতে মনগড়া একটা ভাইরাস আবিষ্কারের কথা লিখে দেওয়া সহজ কথা৷ কিন্তু এখানে তো তা নয়৷ এ-এক চূড়ান্ত বাস্তব৷
আমাদের স্বপ্নকে সফল করতে তা আবিষ্কার করা কার্যত এক জটিল সাধনা৷ তবে আমরা সফল হলে এই পৃথিবীকে আমরা নতুনভাবে তৈরি করতে পারব—একথা নিশ্চিত৷ আমরা এই গ্রহের বুকে নতুন এক ইতিবাচক সময়ের জন্ম দিতে পারব—একথা হলফ করে বলতে পারি৷’
কুনচেন বললেন, ‘জাদুকর, রুহর চিন্তাভাবনাকে আমি এতদিন ধরে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছি, তাত্ত্বিকভাবে যাচাই করেছি, রুহর স্বপ্নে-দেখা-পথ কিন্তু অব্যর্থ, নির্ভুল৷
এখন আমি কতটা সেই কাজে সফল হতে পারব কি পারব না, তা সময় বলবে৷ আগাম কোনোকিছুই ঘোষণা করা সম্ভব নয়৷ শুধু জানি—রুহর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে, মানব-পৃথিবী সম্পূর্ণই বদলে যাবে৷ এবং তা নিঃশব্দে৷ আমি বিশ্বাস করি, মানুষ আত্মকেন্দ্রিকতা ছেড়ে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে পুনরায় নিয়োজিত হবে৷’
রুহ বলল, ‘সভ্যতার যে সংস্কৃতি, তার সূচনাই হয়েছিল পারস্পরিক সাহায্যের ওপর ভিত্তি করে৷ আজ এইসময়ে দাঁড়িয়ে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা নয়, প্রতিযোগিতা নয়, বরং মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথাই ভাবতে হবে৷ এ-সম্পর্কে নৃতত্ত্ববিদ মার্গারেট মিডের একটা অদ্ভুত গল্প আছে---‘years ago, anthropologist Margaret Mead was asked by a student what she considered to be the first sign of civilization in a culture. The student expected Mead to talk about fishooks or clay pots or grinding stones.
But no. Mead said that the first sign of civilization in an ancient culture was a femur (thighbone) that hadbeen broken and healed. Mead explained that in the animal kingdom, if you break your leg, you die. You cannot run from danger, get to river for a drink or hunt for food. You are meat for prowling beasts. No amimal survives a broken leg long enough for the bone to heal.
A broken femur that has healed is evidence that someone has taken time to stay with the one who fell, has bound up the wound, has carried the person to safety and has tended the person through recovery. Helping someone else through difficulty is where civilization starts, Mead said.’
অর্থাৎ সভ্যতার সত্যিকারের সূচনাই হয়েছে অন্যকে সাহায্য করার মধ্য দিয়ে৷ অথচ, পরে কী দেখলাম—গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, বিভাজন৷ মানুষ সমষ্টিগত অধিকারকে নসাৎ করে ব্যক্তিগত অধিকার ও ব্যক্তি-মালিকানার সংস্কৃতি শুরু করল! সীমান্তের জন্ম হল৷ রাষ্ট্রের সূচনা হল৷ অনিবার্যভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু হল৷ শুরু হল পারস্পরিক সংঘর্ষের ইতিহাস৷ পৃথিবী দেখল শোষক ও শোষিতের শ্রেণিকরণ৷
অথচ, একটি মানুষ জন্মের পর কেন এই বিভাজনের শিকার হবে? কেন একদল মানুষের ওপর অন্য মানুষদের বাঁচা-মরা নির্ভর করবে? এই পৃথিবীর ভূখণ্ড, জল, বাতাস তো সবার৷ সবারই তো নিজের মতো করে ভোগ করার অধিকার থাকা উচিত অন্যকে বিব্রত না-করে৷ তবুও কেন এত যুদ্ধের হুংকার? কেন এত অস্ত্রের আস্ফালন? কেন এত ধন-বৈষম্য? কেন একদল মানুষকে শরণার্থী হয়ে দেশ থেকে দেশে পালিয়ে বেড়াতে হবে?
আমার মনে হয়, এই সংস্কৃতির অবসান দরকার৷ এবং এজন্যই আমাদের এমন একটা ভাইরাসের দরকার যা মানুষের মস্তিষ্কে থাকা যুদ্ধের স্মৃতিকে ভুলিয়ে দেবে৷ যা মানুষের মস্তিষ্কে থাকা দখলদারির চেতনা, অন্য মানুষের ওপর শোষণের বোধকে লুপ্ত করে দেবে৷ সুদীর্ঘ সভ্যতায় যে সংঘর্ষের ইতিহাস রচিত হয়েছে তা যেন মানুষ চিরতরে ভুলে যায়৷ মানুষের মন থেকে যেন মুছে যায় সীমান্ত ধারণা৷
আমার বিশ্বাস তাহলেই এক নতুন পৃথিবী, নতুন এক মানবজাতির জন্ম হবে৷ সমস্ত পৃথিবীটাই আমূল বদলে যাবে৷’
কুনচেন ও জাদুকর এতক্ষণ একাটাও কথা বলেনি৷ কেবল মুগ্ধ হয়ে শুনছিল একজন স্বপ্নসন্ধানী শিল্পীর ভাবনার কথা৷ রুহর কথা শেষ হওয়ার পর দীর্ঘসময় গবেষণা-কক্ষে কেউ কোনো কথা বলল না৷ সমস্ত গবেষণা-কক্ষটি যেন স্তব্ধ হয়ে আছে৷ আশ্চর্য এক নীরবতায় স্থির হয়ে আছে চারপাশ৷
দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে কুনচেনই প্রথম কথা বললেন৷ কুনচেন বললেন, ‘আমাদের গবেষণার পথ আজ একটি স্থির লক্ষ্যে পৌঁছাল৷ কিন্তু রুহ, তুমি বুঝতেই পারছ এ-গবেষণা একদিকে যেমন জটিল, তেমন ভয়ংকরও৷’
জাদুকর জিগ্যেস করল, ‘ভয়ংকর কেন?’
কুনচেন বললেন, ‘মানবজাতির মঙ্গলের জন্য আমরা যে-কাজ করতে চলেছি, তাতে এমনও তো হতে পারে—আমাদের আবিষ্কৃত ভাইরাস শুধু যুদ্ধ-স্মৃতি নয়, দখলদারির চেতনা নয়, সীমান্ত-সংঘর্ষের বোধ নয়—সমস্ত স্মৃতিকেই ধ্বংস করে দিল, তখন? তখন তো সমগ্র মানবজাতি এক স্মৃতি-শূন্য প্রাণীকুলে পরিণত হয়ে যাবে৷ বোধহীন, চেতনাহীন মাংসপিণ্ড হয়ে পথে-প্রান্তরে, জলে-জঙ্গলে, গ্রাম-শহর-জনপদে ঘুরে বেড়াবে! এ কি ভয়ংকর অবস্থা নয়? এমন দৃশ্য কল্পনা করতেও ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে৷’
রুহ বলল, ‘ঠিক বলেছেন৷ সেই জন্যই আমাদের গবেষণাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে৷ ভালো করতে চেয়ে আমরা যেন মন্দ না-করে ফেলি৷’
‘মানুষের মস্তিষ্ক এক জটিল বিন্যাস৷ সেখানে দু-রকম ভাবে স্মৃতি গড়ে ওঠে৷ একটি তাৎক্ষণিক স্মৃতি এবং অন্যটি স্থায়ী স্মৃতি৷ স্থায়ী স্মৃতিগুলো আমৃত্যু সঞ্চিত থাকে কর্টেক্সে৷ আমাদের ভাইরাস এমন বৈশিষ্ট্যের হবে যা স্থায়ী স্মৃতিদের ভিতর অশুভ স্মৃতিদের চিহ্নিত করে সেই নিউরোনদের নিস্ক্রিয় করে তুলবে এবং তা দ্রুত৷’ বললেন কুনচেন৷
কুনচেনের কপালে গাঢ় চিন্তার ভাঁজ৷ রুহ বলল, ‘ঠিক এটাই আমাদের সফলভাবে করতে হবে৷’
কুনচেন খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে মৃদু হাসলেন৷ তারপর বললেন, ‘রুহ, এটা তো কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয় যে মুহূর্তে আমাদের চাওয়ার মতো করে ভাইরাসটি তৈরি হয়ে গেল, আর তা দিয়ে মুহূর্তে আমরা জগৎকে বদলে দিতে পারলাম! অত্যন্ত জটিল এই গবেষণা৷ ধাপে-ধাপে খুব সতর্কতার সঙ্গে আমাদের পা ফেলতে হবে৷’
রুহ চুপ করে থাকে৷ তারপর বলে, ‘ঠিক তাই৷’
কুনচেন বললেন, ‘সময় লাগবে৷ আজ থেকে আমার সমস্ত সময় শুধু এই গবেষণার জন্যই ব্যয় করব৷ দেখা যাক, তথাগত কীভাবে আমাদের পথ দেখান৷’
রুহ ও জাদুকর কুনচেনের গবেষণা-কক্ষ থেকে নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এল৷ দেখল কয়েকজন গেরিলা যোদ্ধা গম্ভীর মুখে বেরিয়ে যাচ্ছে৷ বোঝাই যাচ্ছে তারা গুহা ছেড়ে নিজেদের নির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্যই কোথাও চলে যাচ্ছে৷
এদের দেখে মনখারাপ হয়ে গেল রুহর৷ সে দীর্ঘদিন ধরে দেখছে, যারা এভাবে যায় তাদের অনেকেই আর ফেরে না৷ অনেকেই শহিদ হচ্ছে৷
রুহর মুখচোখ দেখে জাদুকর যেন আন্দাজ করতে পারল রুহর মনের কথাটি৷ বলল, ‘পরাধীন জাতির তরুণদের প্রাণের মূল্য আর কে দেয়, রুহ! স্বার্থসর্বস্ব এই পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রশক্তিই অন্যের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না৷ তারা চায় বাকি মানবজাতি শুধু তাদেরই হুকুমে চলুক৷ বশ্যতা স্বীকার করুক৷ প্রতিটি রাষ্ট্রশক্তিই নিজেকে এই জগতের প্রভু ভাবতে পছন্দ করে৷
গেরিলা দলটির পাশ কাটিয়ে রুহ ও জাদুকর উলটো দিকে হাঁটছে৷ জাদুকরের কথায় রুহর ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বার হয়ে এল৷
শীত শেষের মিষ্টি রোদ৷ বালির ওপর হাঁটছে রুহাইল৷ এখন যেখানে তাঁবু পড়েছে, সেখান থেকে ক্রোশখানিক মরুভূমির ভিতর সে একটা ক্যাকটাসের বন আবিষ্কার করেছে৷ নানাজাতের ক্যাকটাসের ফুল ফুটেছে সেখানে৷ কিছুটা দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কে যেন নিজের অদ্ভুত খেয়ালে দিকশূন্য হলুদ-বালির ক্যানভাসে হরেক রংয়ের এলোমেলো নকশা এঁকেছে৷ ভারি চমৎকার লাগে এই এক-টুকরো রঙিন বালুভূমি৷
প্রথম দেখার পর থেকেই জায়গাটা মনে ধরেছে৷ তাই সময় পেলেই একা-একা চলে আসে৷ এসে বাঁশি বাজায়৷ মনে আশ্চর্য শান্তি নেমে আসে৷ রুহাইল এখন সেদিকেই হাঁটছে৷
জায়গাটার প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে, এমনসময় একটি উটের ডাকে চমকে উঠল৷ এ-ডাক বেদনার৷ এ-ডাক যন্ত্রণার৷ যারা জানে, তারা বোঝে, মানুষ যেমন কথা বলে আনন্দ বিষাদ দুঃখ যন্ত্রণা জানায়, জীবজন্তুরাও জানায় তাদের ডাকের ভিতর৷ তাদের আওয়াজের ভিতরেই লুকিয়ে থাকে—কোন ডাক হর্ষের, কোন ডাক দুঃখের৷
রুহাইল ডাক শুনেই বুঝতে পেরেছে উটটার কষ্ট হচ্ছে৷ কিন্তু কাছাকাছি তো কোথাও উটটাকে দেখা যাচ্ছে না! উটটা আবার ডেকে ওঠে৷ রুহাইল এবার বুঝতে পারে ডাকটা আসছে ক্যাকটাসের ঝোপঝাড়গুলোর ওপার থেকে৷ রুহাইল ডাক লক্ষ করে দ্রুত হাঁটতে থাকে৷
ঝোপঝাড়ের ওপারে পৌঁছেই রুহাইল চমকে ওঠে৷ দেখল, উটটা বালির ওপর শুয়ে আছে৷ মাঝে-মাঝেই পিছনের পা দুটো বালির ওপর ঘষছে আর মুখ দিয়ে করুণ-স্বরে ডাকছে৷ একদম সামনে এগিয়ে গেল রুহাইল৷
উটের যোনিপথ থেকে বাচ্চার দুটো পা ও মাথাটা অল্প বেরিয়ে এসেছে৷ প্রসব-বেদনায় খুব কষ্ট পাচ্ছে উটটা৷
তাদের আস্তানায় দেখেছে, উটের বাচ্চা হওয়ার সময় তাদের মেয়েরা অদ্ভুত কৌশলে বাচ্চাটার দুটো পা ও মাথা ধরে টান দেয় এবং একসময় বাচ্চাটা বেরিয়ে আসে৷ কিন্তু নিজের হাতে সে কখনো এ-কাজ করেনি৷ ভীষণ আতান্তরে পড়ল রুহাইল৷
চারদিকে চোখ চারিয়ে দেখল কোনো মানুষ নজরে এল না৷ আসবেই বা কী করে? মরুভূমির ভিতরে কে আর অকারণে ঘুরে বেড়াবে? রুহাইল বাঁশিটা বালিতে রেখে চেষ্টা করল, কিন্তু বাচ্চাটা কিছুতেই বেরিয়ে আসছে না৷ মা-উটটার কষ্ট দেখে বুকের ভিতর ব্যথায় মোচড় দিতে লাগল তার৷
উটের কাতর মুখের ভিতর এই মুহূর্তে রুহাইল যেন নিজের আম্মির মুখ দেখতে পেল৷ আম্মির মুখ দেখলে বুঝতে পারে কখন তার মনখারাপ৷ সে-সময় কাছে গিয়ে দাঁড়ালে আম্মি বলে, ‘তোর বাঁশিটা বাজা তো, রুহাইল৷’
‘বাঁশি বাজাব? কেন? তোমার কি মনখারাপ, আম্মি?’
ম্লান হাসে জেমিনি৷ বলে, ‘সংগীত হচ্ছে ধাবমান নদীর জল৷ সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়৷ মনখারাপ, দুঃখ, যন্ত্রণা, কষ্ট—সব, সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়৷ আমাদের মন, আমাদের শরীর আবার সুস্থ হয়ে ওঠে৷ স্থির ও শান্ত হয়ে যায়৷’
আম্মির কথা শুনে অবাক হয়ে যায় রুহাইল৷ তবু মনে যেন সামান্য সংশয় খেলা করে৷ বলে, ‘সত্যি আম্মি?’
‘দুনিয়ায় সমস্ত কিছুর সীমাবদ্ধতা রয়েছে৷ নেই কেবল শিল্পের৷ শিল্পের অসীম ক্ষমতা৷ অপার শক্তি৷ শিল্পের প্রকৃত সাধনা করে কেউ যদি সত্যিকারের শিল্পী হয়ে ওঠে, তার অসাধ্য কিছুই থাকে না৷ সে সব পারে, সব৷’
রুহাইল তার আব্বুকে কোনোদিন চোখে দেখেনি৷ আম্মির মুখ থেকে অজস্র প্রসঙ্গে সহস্রবার শুধু তার কথা শুনেছে৷ রুহাইল বুঝতে পারে এই কথাগুলোর ভিতর আসলে লুকিয়ে আছে তার আব্বুই৷
উটটা আবার ডেকে উঠল৷ ছিন্ন হয়ে গেল রুহাইলের চিন্তাসূত্র৷ সে কাতর চোখে আবার চোখ বোলাল চারদিকে৷ নির্জন বালুভূমির মাঝে কাউকেই দেখতে পেল না৷ সে বালির ওপর থেকে বাঁশিটি কুড়িয়ে নিয়ে উটটার মাথার দিকে গিয়ে বসল৷ চোখ বন্ধ করে মন স্থির করল৷ তারপর বাঁশিতে ফুঁ দিল৷ ক্রমশ রুহাইল যেন সুরের জগতে অন্ধ হয়ে গেল! নরম সুরের পাখি যেন ছোট্ট দুটো ডানা মেলে উড়তে লাগল রঙিন ক্যাকটাসের বনে, মরুভূমির হলুদ নির্জনে৷
ওদিকে দুই কিশোরী তাদের দলের হারিয়ে যাওয়া উটের সন্ধান করছে মরুভূমির ভিতর৷ দলের অন্যান্যরা খুঁজতে বেরিয়েছে অন্যদিকে৷ হারিয়ে যাওয়া উট খুঁজতে-খুঁজতে তারা হঠাৎ শুনতে পেল বাঁশির সুর৷ উট খুঁজতে-খুঁজতে হয়রান দুই কিশোরী মরুভূমির এমন জনহীন প্রান্তরে বাঁশির সুর শুনে বেশ অবাক৷ তারা পরস্পরের দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টি বিনিময় করল৷ তারপর হাঁটতে লাগল বাঁশির সুর লক্ষ্য করে৷
সময়ের কোনো হিসাব নেই রুহাইলের৷ হঠাৎ উটটা একবার জোরে ডাক দিল৷ নিমেষে বন্ধ হয়ে গেল ফুঁ৷ চোখ মেলে রুহাইল দেখল, সদ্য বেরিয়ে আসা বাচ্চাটা উটের পায়ের পিছনে পড়ে আছে৷ আর উটটা তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল৷ আনন্দে মন ভরে উঠল রুহাইলের৷ রুহাইল ভাবল, এর চেয়ে পবিত্র দৃশ্য কি কোনো চিত্রশিল্পী কোনোদিন তার ক্যানভাসে এঁকেছে? হলুদ মরুভূমির নির্জন বুকে নানাবর্ণে ফুটে থাকা অজস্র ফুলের পাশে একটি নতুন প্রাণের প্রথম চোখ মেলা! আর সেই প্রাণকে স্বাগত জানাচ্ছে সংগীত! এর চেয়ে পবিত্র মুহূর্ত আর কী? এর চেয়ে শুদ্ধতম দৃশ্য আর কী হতে পারে?
রুহাইল জানে না কখন দুই মরুকিশোরী তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে৷ তারা সমস্ত দৃশ্যটি দেখে বাকরুদ্ধ৷ কে যেন তাদের পাগুলো বালির ভিতর গেঁথে দিয়েছে৷ তাদের নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে গেছে৷
রুহাইল বালির ওপর বাঁশিটি রেখে দ্রুত উঠে গেল বাচ্চাটার কাছে৷ তারপর খুব যত্ন করে পরিষ্কার করতে লাগল৷ হঠাৎ মাথা উঁচু করতেই দেখতে পেল অদূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই কিশোরী৷ রুহাইল হাসল৷ মৃদু হেসে উঠল দুই কিশোরীও৷ তাদের হাসিতে রুহাইলের জন্য কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ছে৷
কিশোরী দুজন কাছে এল৷ বলল, ‘আমাদের উট হারিয়ে গিয়েছিল৷ কখন যে এতদূর চলে এসেছে আমরা বুঝতেই পারিনি৷’
রুহাইল বাচ্চাটাকে পরিচ্ছন্ন করে একমুঠো বালি তুলে নিজের হাত পরিচ্ছন্ন করে নিল৷ জিগ্যেস করল, ‘কী নাম তোমাদের?’
একজন বলল, ‘আমি সারহা৷’ তারপর পাশের জনকে দেখিয়ে বলল, ‘এ নৌশিন৷’
নৌশিন জিগ্যেস করল, ‘তোমার?’
স্মিত হেসে রুহাইল নিজের নাম জানাল৷ তারপর বালির ওপর বসে বলল, ‘এবার তোমরা নিয়ে যেতে পারো৷ হারিয়েছিলে একটা, আর ফেরত পেলে দুটো৷ কী মজার জাদু না?’
সারহা স্বভাবে নৌশিনের চেয়ে কিছুটা চঞ্চল৷ লজ্জাশরমও তুলনায় কম৷ চোখ মটকে বলল, ‘ভুল বললে৷ হারিয়েছিলাম এক৷ আর ফেরত পেলাম অতিরিক্ত দুই৷’
‘মানে?’
‘তোমার মতো বাঁশিওয়ালার সঙ্গে দেখা হওয়া কি আলাদা পাওনা নয়?’
‘আমি বাঁশিওয়ালা?’
নৌশিন মৃদু ধমক দিল সারহাকে৷ বলল, ‘রুহাইল কি বাঁশি বিক্রি করে যে বাঁশিওয়ালা হবে? ও তো শিল্পী৷ বংশীবাদক৷’
জিভ কামড়াল সারহা৷ বলল, ‘আমি কি তোর মতো অত কিছু জানি?’
সারহার কথা শুনে হেসে ফেলল রুহাইল৷ নৌশিনও৷ রুহাইল বলল, ‘সারহা ভুলও কিছু বলেনি৷ যে বাঁশি বিক্রি করে তাকে যেমন বাঁশিওয়ালা বলে, তেমনই যে বাঁশি বাজায় তাকেও বাঁশিওয়ালা বলা যায়৷’
‘তারমানে, আমি কোনো-কোনো সময় ঠিক কথাও বলি, কী বলো, বাঁশিওয়ালা?’
সারহা ধপ করে রুহাইলের মুখোমুখি বসে পড়ল৷ তারপর বকবক করে জেনে নিল রুহাইলের পরিচয়৷ নিজেদের কথা জানাতে গিয়ে বলল, ‘আমরাও সূর্যসাপ উপজাতির৷’
নৌশিন মুগ্ধ স্বরে বলল, ‘শুনেছি, তোমাদের গোষ্ঠীকে দেখেই আমাদের অন্যান্য গোষ্ঠীর তাঁবুগুলোও রঙিন হয়ে উঠেছে৷’
রুহাইলের বলতে ইচ্ছে হল তার আব্বুর কথা৷ তার শিল্পী আব্বুই এই রঙিন করে তোলার কাজ শুরু করেছিল৷ কিন্তু সূর্যসাপ উপজাতির রীতি অনুযায়ী নিজের পিতৃপরিচয় দেওয়া নিষেধ৷ তাই ইচ্ছে থাকলেও সে-কথা জানাতে পারল না৷
সারহা গলায় কৃত্রিম বিষণ্ণতা এনে বলল, ‘আমার যে উপায় নেই৷ অন্য জায়গায় মন বাঁধা পড়ে আছে, নাহলে তোমাকে চুরি করে নিয়ে যেতাম৷’ বলেই মুখের গাম্ভীর্য সরিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল৷
রুহাইল ঈষৎ সংকোচবোধ করল৷ তা দেখে সারহা বলল, ‘তোমার যদি কেউ থাকে তাহলে কিছু বলার নেই, কিন্তু আমার নৌশিনের কিন্তু অনেকগুণ৷ তাছাড়া দেখতেই তো পাচ্ছ কী অপরূপ সুন্দরী৷’
‘বকবকানি থামাবি?’ নৌশিনের কণ্ঠে ছদ্মরাগ৷
রুহাইল দেখল নৌশিনকে৷ সারহার অনেক কথার ভিড়ে এটা কিন্তু একদম খাঁটি কথা৷ পড়ন্ত রোদে নৌশিনের মুখ থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না৷ নৌশিনের দীঘলকালো চোখ৷ সাদা মেঘের গায়ে দুপুরের রোদ পড়লে যেমন আশ্চর্য এক আভার জন্ম হয়, তেমন গায়ের রং৷ সবমিলিয়ে যেন অপূর্ব এক ক্যাকটাসের ফুল৷
রুহাইল ও নৌশিন—কেউ কোনো কথা বলছে না৷ দুজনের চোখেই পরস্পরের প্রতি মুগ্ধতা ঝরে পড়ছে৷ সারহা পরিস্থিতিটা অনুমান করেই বলল, ‘তা, বাঁশিওয়ালা, আমার নৌশিনকে একটু বাঁশি শোনাবে নাকি?’
রুহাইল দেখল নৌশিন কিছুই বলল না৷ এই চুপ করে থাকা নিশ্চয় সম্মতি৷ রুহাইল আস্তে-আস্তে ফুঁ দিল বাঁশিতে৷ সুর যেন অদৃশ্য মাদক৷ এ-সুরের মাদকতা থেকে কারও যেন মুক্তি নেই৷ অন্তত নৌশিনের তো নয়ই৷
নৌশিন ভাবল—সে এতদিন জেনেছে, মানুষ মুক্তিতে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়৷ কিন্তু আজ এই প্রথম টের পেল—সুরের বন্দিত্বে স্বাধীনতার চেয়েও সুখ অনেক বেশি৷
সন্ধে নেমে গেছে৷ কারও খেয়াল নেই৷ রুহাইলের চোখ বন্ধ৷ চোখ বন্ধ নৌশিন এবং সারহারও৷ অন্ধকারাচ্ছন্ন নির্জন মরুভূমির বুকে এই সুরপাগল তিনজনকে পাহারা দিচ্ছে দুটো উট, ক্যাকটাসের বন আর মাথার ওপর তারাভরা অনন্ত আকাশ৷
আঁকায় মন নেই৷ রং-তুলি সরিয়ে রাখল৷ সরিয়ে রাখল না-রং করা মুখোশগুলোও৷ ঘুম-ঘুম লাগছে কিন্তু ঘুমও আসছে না৷ ভোররাতে তাঁবুতে ফেরার পর থেকে বুকের ভিতর কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে৷ বারবার মনে পড়ছে নৌশিনের মুখ৷ তার পরিমিত কথা বলার ধরন৷ স্মিত হেসে ওঠা গোলাপি দুই ঠোঁট৷ দীঘলকালো চোখের রহস্যময় মায়া৷
দুপুরে আর স্থির থাকতে পারল না৷ অমোঘ এক টানে ঘোরগ্রস্থ রুহাইল হেঁটে চলল ক্যাকটাস বনের দিকে৷ নিজের ওপর যেন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই৷ কে যেন অদৃশ্য জাদুতে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মরুভূমির ভিতর৷
ক্যাকটাস বনে পৌঁছে গেল রুহাইল৷ ফুটে থাকা ফুলের বর্ণচ্ছটা আজ তাকে তেমন আকর্ষণ করল না৷ কিছুই যেন ভালো লাগছে না৷ শূন্য বালুভূমির মতোই নিজেকে শূন্য মনে হচ্ছে৷ বাঁশিটিকে বালির ওপর রেখে চুপ করে বসে থাকতে থাকে একটা সময় শুয়ে পড়ল এবং অচিরেই ঘুমিয়ে পড়ল৷
হঠাৎ গায়ে কীসের যেন স্পর্শ পেল৷ কেউ যেন তাকে আলতো ঠেলা দিল৷ চোখ মেলেই চমকে উঠল রুহাইল৷ দেখল তার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে নৌশিনের মুখ৷ তড়িঘড়ি উঠে বসল৷ চোখের সামনে নৌশিনকে দেখেও যেন তার বিশ্বাস হচ্ছে না নৌশিন এসেছে৷ না না, এ তার চোখের ভুল৷ মরুভূমিতে মরীচিকা সাধারণ ঘটনা৷ মরুপথিকেরা প্রায়ই মরীচিকার কবলে পড়ে পথের দিশা হারিয়ে ফেলে৷
রুহাইলের অবস্থা দেখে হেসে ফেলে নৌশিন৷ রুহাইল খানিকটা ধাতস্থ হয়ে জিগ্যেস করল, ‘তুমি জানলে কী করে আমি এখানে আসব?’
‘সারহা বলেছে৷’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল নৌশিন৷
‘সারহা?’
‘হ্যাঁ৷’
‘কী বলেছে?’
‘বলেছে, তুমি নাকি গতরাতে ওকে চুপিচুপি বলেছ আমাকে এখানে পাঠানোর জন্য৷’
‘কী সাংঘাতিক মিথ্যে! না না, আমি বলিনি তো৷’
‘ওহ্, তাহলে আমি বোধহয় এসেই ভুল করেছি৷ বেশ তবে চলে যাই?’ কপট কণ্ঠ নৌশিনের৷
‘না৷’
‘এই তো বললে—তুমি আমাকে আসতে বলোনি!’
‘আমি বললে তুমি বুঝি আসতে?’
এবার চুপ করে যায় নৌশিন৷ তারপর মৃদুস্বরে বলল, ‘আসতাম৷ তুমি না-বললেও আসতাম৷ আমার বোধহয় না-এসে উপায় ছিল না, রুহাইল৷’
কী সুন্দর করে আত্মসমর্পণ করল নৌশিন৷ রুহাইল বলল, ‘আমারও৷ না-দেখা করে আর উপায় ছিল না৷’ আত্মসমর্পণ করল রুহাইলও৷
ক্যাকটাসগুলো কী সুন্দর দেখাচ্ছে এখন! ফুলগুলো যেন আরও রঙিন হয়ে উঠেছে! কে বলে মরুভূমি শূন্য? এ মুহূর্তে মরুভূমি যেন তাকে ক্রমশ পূর্ণ করে দিচ্ছে৷ রুহাইলের মতো নৌশিনের মনও ক্রমশ বর্ণময় হয়ে উঠছে৷ পূর্ণতার আনন্দে টলটল করছে৷
আলতো হাওয়ায় একটি শুকনো ফুলের পাপড়ি খসে পড়ল৷ ঘটনাটি দুজনের চোখের সামনেই ঘটল৷ রুহাইল বলল, ‘ইচ্ছে করছে দূরে কোথাও চলে যেতে৷ যাবে আমার সঙ্গে?’
‘তুমি আমাদের নিয়ম জানো না৷ আমরা বাইরে কোথাও যেতে পারি?’
‘সবকিছুতে এত নিয়ম কেন, নৌশিন? এই যে পাপড়ি খসে পড়ল, পাপড়ি কি তার গাছের কাছে অনুমতি নিয়েছে?’
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল নৌশিন৷ তারপর বলল, ‘এই ঝরে পড়ার ভিতর আনন্দ নেই, রুহাইল৷ এ-হল অন্তিম ঝরে পড়া৷ এই ঝরে-পড়া কারও অনুমতির তোয়াক্কা করে না৷’
‘বুঝলাম৷ পাখিদের ক্ষেত্রে কী বলবে? তাদের অমন ডানা মেলে আকাশে হারিয়ে যাওয়াকে?’
‘হয়তো নিঃশব্দে কারও অনুমতি নেয়৷ হয়তো নেয় না৷ আমি শুধু জানি—একজগতে প্রতিটি প্রাণীগোষ্ঠী নিজেরাই নিজেদের পৃথক-পৃথক নিয়মে বেঁধেছে৷’
‘অন্তরের বাঁধন ছাড়া আর অন্য কোনো বাঁধনেই যে আমার বিশ্বাস নেই, নৌশিন৷’
নৌশিন রুহাইলের বুকে মাথা রাখল৷ তারপর বলল, ‘সব বাঁধনকেই ছোট করে দেখছ কেন? মানুষ তার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই আরও ভালো করে বাঁচবে বলে নিজেদের নিয়মে বেঁধেছে৷ সুতরাং সব নিয়মকে, সব বাঁধনকে হীনদৃষ্টিতে দেখো না৷
যেমন ধরো, তুমি কী সুন্দর বাঁশি বাজাও, তুমি তো বাঁশির ছিদ্রে নিয়ম মেনেই ফুঁ দাও, তা যদি না-দিতে বাঁশিতে কি সুরের জন্ম হতো? অথবা, ধরো—শিশু কি জন্মের পরেই হাঁটতে শেখে? ধুপ ধুপ করে মাটিতে পড়ে যায়৷ তার পা যখন মাটিতে দাঁড়ানোর নিয়ম রপ্ত করে, চলার ছন্দ আয়ত্ত করে, তখন সে আর পড়ে যায় না৷
যাকে তুমি নিয়ম বলছ, বাঁধন ভাবছ—তা কিন্তু পরোক্ষে ভালো থাকার ছন্দ৷ এই ছন্দ না-থাকলে কোনো সুন্দরেরই জন্ম হতে পারে না৷ দুনিয়ার এমন একটা বিষয় তুমি দেখিয়ে দাও যা ছন্দহীন অথচ সুন্দর, নিয়মবিহীন অথচ ইতিবাচক৷ পারবে না৷
কেন পারবে না জানো? শৃঙ্খলাহীনতা রুক্ষতার জন্ম দেয়৷ সমস্ত কিছুকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়৷ অন্যদিকে, শৃঙ্খলা বেঁচে-থাকাকে লাবণ্যময় করে তোলে৷ ছন্দ জীবনের সমস্ত কিছুকে লাবণ্যের তাঁবুতে পৌঁছে দেয়৷’
রুহাইল মুগ্ধ হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে আছে নৌশিনের মুখের দিকে৷ কিছুক্ষণ পর রুহাইল বলল, ‘তুমি আমার আম্মির মতো সুন্দর করে বুঝিয়ে কথা বলতে পারো৷’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ৷’
কথা বলতে-বলতে সূর্য ডুবে গেছে৷ ক্রমশ অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে৷ হঠাৎ সম্বিত ফিরতে নৌশিন বলল, ‘গতকাল সঙ্গে সারহা ছিল, আজ একা এসেছি, তাই সারহা তাড়াতাড়ি ফিরতে বলেছে৷’
রুহাইল বলল, ‘আমি তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসব৷’
‘জিজা-আম্মার সঙ্গে দেখা করবে?’
‘করব৷’
আচমকা রুহাইল নৌশিনের পেটের ওপর মাথা রাখে৷ নৌশিন শুয়ে পড়ে বালির ওপর৷ নৌশিনের পেটের ওপর মাথা রেখে আকাশের দিকে মুখ করে রুহাইল বাঁশিতে ফুঁ দেয়৷ সুর জেগে ওঠে৷
নৌশিন যেন তার চূড়ান্ত আশ্রয়৷ রুহাইল সুরের জগতে আবার অন্ধ হয়ে যেতে থাকে৷
নৌশিনের মনে হয়, রুহাইলের পাগল-করা বাঁশির জাদু এই নির্জন মরুভূমির ভিতর নদীর জন্ম দিয়েছে৷ যার স্বচ্ছ ও গতিময় জলের ওপর সে আর রুহাইল একটি ডিঙির মতো ভেসে চলেছে৷ গন্তব্যের কথা তাদের কারও জানা নেই৷
হঠাৎ নৌশিনের মনে হল, সে বোধহয় রুহাইলকে ভুল বুঝেছে৷ রুহাইল হয়তো সেই অর্থে নিয়ম বা বাঁধন ভাঙার কথা বলেনি৷ হয়তো বলতে চেয়েছিল—এমনই এক নিরুদ্দেশ যাত্রার কথা৷ অজানার ভিতর রোমাঞ্চময় ভ্রমণের কথা৷
রুহাইলকে ভুল বোঝার জন্য এমন নিবিড় ও সুন্দর মুহূর্তেও নৌশিনের ভিতর অনুতাপ জমা হতে থাকে৷ একইসঙ্গে আরও গভীর আরও নিজের করে পেতে ইচ্ছে করছে তার শিল্পীকে৷ সারহার ভাষায়—বাঁশিওয়ালাকে৷
সময় এক আশ্চর্য জাদুকর৷ যার মনমতি সাধারণ দৃষ্টিতে বোঝা বেশ কঠিন৷ কী প্রকৃতি কী জীবজন্তু বা মানুষ—দিনবদলের সঙ্গে-সঙ্গে কখন যে কার ভিতর নিঃশব্দে সে পরিবর্তনের বাজনা বাজায়, সে-ই জানে৷ যে-প্রকৃতি শস্যশ্যামলা, সময়ের ব্যবধানে সেই হয়তো একসময় ঊষর প্রান্তরে রূপান্তরিত হয়ে যায়৷ সময়ের জাদুতে চেনা পথে চলতে-চলতে হঠাৎ একসময় নদীও তার গতিপথ বদলে ফেলে৷ মানুষও অমন৷
যৌবনের ক্রূরতা, জেমিনিকে অধিকার করার কৌশল হয়তো এই জাদুকর-সময়ই সিকান্দারের অন্তরে চিরকালের জন্য নিভিয়ে দিয়েছে৷ সিকান্দারের হঠকারিতার জন্য যে-জেমিনি লোকটাকে একদম সহ্য করতে পারত না, সেই সিকান্দারকে আজ এতবছর পরে বন্ধু হিসাবে মেনে নিতে অসুবিধে হয় না৷ তবে সেই বন্ধুত্ব নির্দিষ্ট একটা সীমা অবধি৷ রুহর স্থান দেয়নি৷ সিকান্দারও সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে বুঝেছে—সে কোনোদিন জেমিনির প্রেমিক হতে পারবে না৷ বরং হৃদয়ের গভীরে জমে ওঠা ঈর্ষা ও ক্ষোভের চেয়ে সহজ-সরল বন্ধুত্বের সুগন্ধ অনেক মনোরম, স্বাদু৷
না-পাওয়ার খতিয়ান আঁকড়ে যারা আজীবন বসে থাকে, জীবনের পাওয়াগুলোও তাদের কাছে শূন্য বলে মনে হয়৷ তাদের কাছে জীবন শুধুই রুক্ষতার স্বরলিপি৷ সংগীতের মাধুর্য থেকে যায় অধরা৷ জীবন তো আসলে তা নয়—পাওয়া ও না-পাওয়ার বিচিত্র ফুল একত্র করেই সে বর্ণময়, জীবন্ত ফুলদানি৷ দেরিতে হলেও এই সত্য সিকান্দার বুঝেছে৷ ফলে জেমিনিকে একান্ত নিজের করে না-পাওয়ার দুঃখ সে নিজেই মুছেছে৷
বেশ কিছুক্ষণ হল জেমিনি ও সিকান্দার তাঁবু থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে এসেছে৷ পাথরের ফাটল থেকে কয়েকটি গাছ মাথা তুলেছে৷ তার ছায়ায় পাশাপাশি বসে কথার ফাঁকে মাঝে-মাঝে মরুভূমির দিকে চোখ রাখছে৷
সিকান্দার বলল, ‘এত দেরি তো হওয়ার কথা নয়৷’
‘ঠিকই৷’ সায় দিল জেমিনি৷ ক্ষণিকের জন্য তার মুখে চিন্তার ছাপ পড়েই মিলিয়ে গেল৷ সিকান্দার একবার দেখে নিল পাথরের আড়ালে রাখা ঝাঁপিটার দিকে৷
জেমিনি তা লক্ষ করে মুচকি হাসল৷ বলল, ‘নিজের হাতে ওর সব বিষ আমি বের করে নিয়েছি৷’
‘তাই হয়তো কোনো সাড়াও দিচ্ছে না৷ নিস্তেজ হয়ে ঝাঁপির ভিতর শুয়ে আছে৷’ বলে, হাসল সিকান্দারও৷
হঠাৎ জেমিনি দূর মরুভূমির দিকে দেখিয়ে সিকান্দারকে বলল, ‘দেখো তো, কিছু দেখতে পাচ্ছ?’
মরুর বালির ওপর ঝলমল করছে রোদ৷ স্থির ভাবে না তাকালে চোখে ঝিলমিল লেগে যায়৷ সিকান্দার চোখের ওপর হাত ঘেরা দিয়ে তাকাল দূর মরুভূমির দিকে৷ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘মনে হচ্ছে কিছু যেন নড়াচড়া করছে৷’
জেমিনিও আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে তাকল৷ ক্রমশ স্পষ্ট হতে লাগল বালির বুকে একটি উট এগিয়ে আসছে৷ মুখে হাসি ফুটল জেমিনির৷
উটটি কাছে আসতেই উঠে দাঁড়াল জেমিনি ও সিকান্দার৷ লাজুক হেসে উঠের পিঠ থেকে নামল রুহাইল৷ রুহাইলের চোখের ইশারায় নেমে এল নৌশিন৷
জেমিনি এগিয়ে গেল নৌশিনের দিকে৷ ঠিক এই সময়েই আচমকা নৌশিনের গায়ে পড়ল পাঁশুটে রংয়ের খরিশটা৷ দীর্ঘ সাপটা নৌশিনের গায়ে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়েই ফুঁসে উঠল৷ মস্ত ফণা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ নৌশিন পলকের জন্য একবার জেমিনির দিকে তাকাল৷ তারপর চোখ রাখল মস্ত খরিশের চোখে৷ এবং মুহূর্তে সাপটাকে নড়ার সুযোগ না-দিয়ে মুঠো-বন্দি করে নিল৷ তারপর সিকান্দারের দিকে ছুড়ে দিয়ে একটু মোলায়েম স্বরে বলল, ‘মুঠোতে নয়, এমন সাপ আমি আঙুলে নাচাতে পারি৷’
খানিকটা অপ্রস্তুত দেখাল সিকান্দারকে৷ তারপর বলল, ‘সূর্যসাপ গোষ্ঠীর মেয়ে হয়ে তুমি তো জানো—এই আমাদের রেওয়াজ৷’
মিষ্টি চোখে হাসল নৌশিন৷ বলল, ‘একটা নয়, একসঙ্গে দশটা সাপকে নিয়ে আমি খেলা দেখাই৷’
নৌশিনের তেজ ও আত্ম-প্রত্যয় মুগ্ধ করল জেমিনিকে৷ নৌশিনের ভিতর নিজের কিশোরীবেলাকেই যেন খুঁজে পেল জেমিনি৷ মনে-মনে ভাবল—রুহাইল মন্দ প্রেমিকা পছন্দ করেনি৷
পরক্ষণেই রুহাইলের কথা ভেবে মনখারাপ হয়ে গেল৷ কারণ জিজা-আম্মার আশীর্বাদ নিয়ে রুহাইল তাকে ছেড়ে অন্য গোষ্ঠীতে চলে যাবে৷
জেমিনি নৌশিনকে জিগ্যেস করল, ‘তোমাদের জিজা-আম্মা রুহাইলকে সম্মতি দিয়েছেন তো?’
নৌশিন মাথা নেড়ে সায় দিল৷ সিকান্দার বলল, ‘তাহলে চলো, এবার আমাদের তাঁবুতে যাওয়া যাক৷ আমাদের জিজা-আম্মার সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দিই৷’
রুহাইল উটের দড়ি হাতে সামনে এগিয়ে চলল৷ পিছনে জেমিনির সঙ্গে নৌশিন ও সিকান্দার৷
যে জিজা-আম্মা জেমিনি ও রুহকে আশীর্বাদ করেছিল৷ সেই অন্ধ জিজা-আম্মা কয়েক বছর হল মারা গেছে৷ তার পরে যে জিজা-আম্মা হয়েছে, সে খুব আয়েশি৷ অধিকাংশ সময়ই তাঁবুর বাইরে বেরোয় না৷ বসে-বসে কয়েকজনকে কাছে ডেকে নিজেদের পুরোনো দিনের গল্প বলে চলে৷ হারানো সময়ের গল্প বলতে-বলতে কখনো হাসে, কখনো মনভারাক্রান্ত করে চুপ করে থাকে৷
জেমিনি, রুহাইল ও নৌশিনকে তাঁবুর মধ্যে ঢুকতে দেখে নিজের গল্প থামিয়ে কয়েকমুহূর্ত নৌশিনের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল৷ তারপর রুহাইলকে বলল, ‘তুমি তাহলে এই গোষ্ঠী ছেড়ে চলে যাচ্ছ?’
রুহাইল উত্তর দেয় না৷ চুপ করে থাকে৷ জিজা-আম্মা বলল, ‘দেখবে, আমার দলের সুনাম যেন অক্ষুণ্ণ থাকে৷’
রুহাইল ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিল৷ জিজা-আম্মা নৌশিনকে ইঙ্গিতে কাছে ডাকল৷ নৌশিন কাছে গিয়ে সামনে একটি উলের আসনে বসতেই জিজা-আম্মা নৌশিনের মাথায় হাত রেখে খানিকক্ষণের জন্য চোখ বন্ধ করল৷ তারপর চোখ খুলে বলল, ‘আগামী শুক্লপক্ষে এখানে এসে রুহাইলকে নিয়ে যেয়ো৷’
জিজা-আম্মার কথা শুনে জেমিনির বুকের ভিতর আশ্চর্য ব্যথায় হু-হু করে উঠল৷ মুহূর্তের জন্য যেন বুকের ভিতর একদম ফাঁকা বোধ হল৷ তারপর নিজেকেই মনে-মনে সান্ত্বনা দিল—কী আর করা যাবে? গোষ্ঠীর রীতি-রেওয়াজকে তো আর অস্বীকার করা যায় না৷ সে তো জানতই—নিজের দলের কোনো মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে না-উঠলে রুহাইল একদিন অন্য দলের কাছে চলে যাবে৷
রাতে নিজের তাঁবুতে শুয়ে শুয়ে জেমিনি কত আকাশপাতাল চিন্তা করে চলেছে৷ বিশেষ করে, মনে পড়ছে রুহর কথা৷ রুহর সঙ্গে কাটানো নানা মুহূর্ত৷ রং তুলি নিয়ে রুহর সেই মগ্ন হয়ে যাওয়া, রুহর সেই নিবিড় করে তাকানোর মুহূর্তগুলো৷ মানুষটার ভিতর যে অদ্ভুত এক সম্মোহনী জাদু ছিল, রুহ চলে যাওয়ার পর তা যেন আরও বেশি করে উপলব্ধি করেছে জেমিনি৷ রুহর কাছে না-থাকা—এক আশ্চর্য শূন্যতা নিয়ে তাকে দোল দিয়েছে বছরের পর বছর৷ রুহ যেন মারাত্মক এক ঝড়ো হাওয়া৷ যার ভিতর পড়ে জেমিনি কেবল শুকনো পাতার মতো ওড়াউড়ি করেছে৷ তার যেন নিজের কিছুই করার নেই, রুহর ঝড়ো সম্মোহনই তার স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করেছে৷
বাবার পরিচয় জানানোর রীতি না-থাকলেও দলের সবাই জানে রুহাইল রুহর সন্তান৷ কারণ জেমিনি রুহ ছাড়া আর কোনো পুরুষকেই কোনোদিন কাছে ঘেঁষতে দেয়নি৷ তাই জেমিনি যখন রুহর সঙ্গে মিলিয়ে সন্তানের নাম রুহাইল রাখল, কেউ বিস্মিত হয়নি৷ শুধু জিজা-আম্মা একবার জিগ্যেস করেছিল, ‘রুহাইল নামের অর্থ কী?’
জেমিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, ‘যাযাবর, ভ্রমণকারী৷’
জিজা-আম্মা বুঝতে পেরেছিল এই নাম রাখার পিছনে জেমিনির অন্তরে এক হাহাকার লুকিয়ে আছে৷ জিজা-আম্মা জিগ্যেস করেছিল, ‘তুমি কি মনে করো, রুহ আর কোনোদিন ফিরবে না?’
আম্মার অন্ধ দুই চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে জেমিনি বলেছিল, ‘ও যে মহাপথিক, জিজা-আম্মা৷ আসবে কি আসবে না—তা কি নিশ্চিত করে কিছু বলা যায়? হয়তো আসবে৷ হয়তো আসবে না৷
হয়তো ফিরে কিছুদিন থাকবে৷ তারপর যেই মনের ভিতর নতুন কোনো স্বপ্নময় পথ ডাক দেবে, আবার নিজের ঝোলা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়বে৷ পিছনের কোনো বাঁধনই তাকে আর আটকে রাখতে পারবে না৷’
জিজা-আম্মা চুপ করে থাকে৷ জেমিনি উদাসস্বরে বলে, ‘বিশেষ ঋতু এলে পরিযায়ী পাখির দল হ্রদের কাছে ফিরে আসে৷ হ্রদকে মুখরিত করে৷ জল মাখে৷ দূর দেশের গল্প শোনায়৷
হ্রদ ভাবে তার হারানো দোসর ফিরে এসেছে৷ খুশি হয়৷ আনন্দযাপন করে৷ হ্রদ জানে—এই আনন্দ ক্ষণিকের৷ এই সুখ ক্ষণস্থায়ী৷ তবুও সে অন্তরের দীর্ঘ বিরহ, গাঢ়তর বিষাদ ভুলে সেই ক্ষণস্থায়ী সুখেই ঘরসংসার করে৷ তারপর সেই বিশেষ ঋতুকাল পার হলে পাখিরদল উড়ে যায়৷ শূন্য হ্রদ অনাথিনীর মতো স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে৷’
জিজা-আম্মা দুহাত বাড়ায়৷ অন্ধ আম্মার দুহাত কাঁপতে-কাঁপতে জেমিনিকে কাছে চায়৷ জেমিনি কাছে গিয়ে নিজের মাথাটি রাখে আম্মার বুকে৷ আম্মা বলে, ‘তাহলে তুই যেতে দিলি কেন? সে কি নিজে থেকে যেতে চেয়েছিল?’
‘না৷ সে একবারও নিজে থেকে যেতে চায়নি৷’
‘তাহলে?’
‘সে যে স্বপ্নসন্ধানী পুরুষ, আম্মা৷ সে না গেলে যে ওই স্বপ্নের সন্ধান আর কেউ পাবে না৷ যতদূর জানি—সেই মহামূল্যবান স্বপ্ন এই দুনিয়াকে বদলে দিতে পারে৷ তাই তাকে আমিই এগিয়ে দিয়েছি৷ নিজের তুচ্ছ আনন্দ, সামান্য সুখের জন্য অমন স্বপ্নসন্ধানী শিল্পীকে আমি আটকে রাখতে পারিনি৷
আমরা সূর্যসাপ উপজাতির মানুষ৷ গ্রহণের চেয়ে দানেই যে আমাদের আনন্দ৷ বিলিয়ে দেওয়াই যে আমাদের ধর্ম৷ আমরা তো জীবনের উদারতায় বিশ্বাস করি৷ তুমি বলো না, আমরা কি স্বার্থপরের মতো কোনো কাজ করতে পারি, আম্মা?’
জিজা-আম্মা জেমিনির রেশমকোমল দীর্ঘ চুলে হাত বোলাতে-বোলাতে বলল, ‘ঠিক করেছিস৷ একদম উচিত কাজ করেছিস৷’
চোখে ঘুম নেই৷ কত পুরোনো সব সময়ের কথা, প্রাচীন মুহূর্তগুলো নির্ঘুম চোখের তারায় ভিড় করে আসছে৷ জেমিনি উঠে দাঁড়াল৷ তারপর তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে দেখল, রুহাইলের তাঁবুর ভিতর আলো জ্বলছে৷ রুহাইল ফিরেছে৷
জেমিনি তাঁবুগুলো ছেড়ে বালুভূমিতে বেশকিছু দূরে হেঁটে গেল৷ সুদূর দিগন্তে ক্ষয়াটে হলুদ-চাঁদ৷ যেন সুদীর্ঘ এই মরুভূমির ওপর এই রাত্রিকালে একটিই অলৌকিক ক্যাকটাস জ্বলে আছে৷ মৃদু আলো ছড়াচ্ছে৷
জেমিনি সেই দিকে মুখ করে হাঁটুমুড়ে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ল৷ নির্জন মরুর বুকে এই কান্নার শব্দ তাঁবুতে পৌঁছাবে না৷ জগতের কারও কাছেই হয়তো পৌঁছাবে না৷
কান্না জড়ানো গলায় জেমিনি বলল, ‘রুহ, তোমার চিহ্নকে বুকে জড়িয়ে আমি এতগুলো বছর তো নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছি, আজ সেই সান্ত্বনার চিহ্নটুকুও হারাতে বসেছি৷ তুমি যেদিন জাদুকরের সঙ্গে চলে গেলে সেইদিনই তো আমি ভেঙে গিয়েছিলাম৷ ক-দিন পরে রুহাইল চলে যাবে৷ আমি যে ক্রমশ টুকরো-টুকরো হয়ে যাচ্ছি, রুহ৷ তুমি কি সত্যিই কোনোদিন ফিরবে? তুমি তো শিল্পী, তুমি পারো না, ফিরে এসে আমার ভাঙাগুলো পুনরায় জুড়ে দিতে? আমার পুরোনো আমিকে আবার আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে?’
হঠাৎ অস্ফুট শব্দে চমকে উঠে মুখ ফেরাল জেমিনি৷ দেখল তার ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে রুহাইল৷ চকিতে কান্না মুছে উঠে দাঁড়াল জেমিনি৷ রুহাইল হাত বাড়িয়ে নিজের আম্মাকে টেনে নিল তার প্রশস্থ বুকে৷
মরুভূমির সুদূর দিগন্তে হলুদ-চাঁদের ক্যাকটাস তখন প্রায় মিশে যাচ্ছে সুদীর্ঘ বালির ভিতর৷
সূর্যসাপ উপজাতির জনজীবন এক আশ্চর্য খাতে বয়! পার্বত্য অঞ্চলের পাশে যে বিস্তীর্ণ মরুভূমি শুয়ে আছে, তারই মাঝে পাহাড় সংলগ্ন জায়গাগুলোতে পক্ষকাল পরপর নতুন-নতুন জনপদের অদূরে এদের তাঁবু পড়ে৷ মরু-পার্বত্য অঞ্চলের বাইরে এরা পা রাখে না৷ যাযাবর বলে নিজেদের কোনো স্থায়ী বসতভিটেও নেই৷ অথচ, এই বালুরাশি, সামান্য গাছপালাময় পাহাড়ের পাথুরে ভূমির অলিখিত মালিকানা এদেরই হাতে৷
বিচ্ছিন্ন এক-দুটো ঘটনা ছাড়া এদের মধ্যে কোনো মনোমালিন্য নেই৷ সূর্যসাপ গোষ্ঠীরই বিভিন্ন দল শত-শত মাইল বিস্তৃত এই মরুঅধ্যুষিত পাহাড়িয়া এলাকায় ঘুরে বেড়ায়৷ লোকালয়ে-লোকালয়ে রুজি-রোজগার করে৷
বালির ওপর জন্মায়৷ যৌবন অতিবাহিত করে৷ ক্রমশ বালির ওপরেই নেমে আসে জীবনের সায়াহ্ণকাল৷ একসময় চিরঘুমে ঘুমিয়ে পড়ে৷
গত প্রায় দু-দশক কালে এদের মধ্যে একটি বিষয়ে পরিবর্তন হয়েছে৷ তা হল—ক্যারাভানগুলোকে এরা রঙিন করেছে৷ নিজেদের তাঁবুগুলো বর্ণময় করেছে৷ লোকালয়ে শারীরিক কসরত দেখানোর সময় এরা আগে মুখোশ ব্যবহার করত না৷ এখন রঙিন মুখোশ পরে বাজনার তালে-তালে লাফঝাঁপ দেয়৷ দড়ির ওপর ভারসাম্যের খেলা দেখায়৷ মানুষ আরও অধিক আমোদ পায়৷ ফলে তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে রোজগারও হয় বেশি৷
রুহর তাঁবু রং করার মধ্য দিয়েই প্রায় বছর কুড়ি আগে এই রঙিন হয়ে ওঠার রেওয়াজ শুরু হয়৷ ক্রমশ তা সমস্ত দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে৷ এখন সুবিস্তৃত এই মরু-পার্বত্য অঞ্চলে একটি দলকেও বেরঙিন দেখা যায় না৷ জেমিনির কাছে এই রঙিন হয়ে ওঠার বৃত্তান্ত যে রুহাইল কতবার শুনেছে তার শেষ নেই৷ প্রতিবার কথাগুলো বলবার সময় জেমিনির মুখচোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত৷ রুহাইলের ভিতরেও এ-নিয়ে প্রচ্ছন্ন গর্ব রয়েছে৷ কারণ, উপজাতির নিয়ম অনুযায়ী বাবার পরিচয় লুকিয়ে রাখা হলেও জেমিনির কাছে নিজের জন্মের কথা জেনেছে৷ সে জানে তার জন্মদাতা রুহ নামের আশ্চর্য এক শিল্পী৷
রুহাইল মনে-মনে তার আব্বুর মুখ কল্পনায় ভাবতে চেষ্টা করে৷ আব্বুর পূর্ণ শরীরটাকে মনের চোখে দেখার চেষ্টা করে কিন্তু সুস্পষ্ট কোনো অবয়ব চোখের সামনে জেগে ওঠে না৷ কারণ, আব্বুর কথা ভাবলেই নিজেদের উপজাতির যে-সমস্ত পুরুষের অবয়ব ভেসে ওঠে, তাদের সঙ্গে তার আব্বুর মুখের বা শরীরের মিল খুঁজে পাওয়া অসম্ভব৷ কারণ, আম্মির কাছে শুনেছে তার আব্বু সূর্যসাপ উপজাতির পুরুষ নয়৷ দূর দেশের অন্য এক অজানা জাতির মানুষ৷ ফলে মনের ভিতরে এক গোপন লোভ কাজ করে তার—একবার সে তার জন্মদাতা আব্বুর মুখোমুখি হতে চায়৷ নিজের এই ইচ্ছের কথা যখনই গোপনে আম্মিকে জানিয়েছে, আম্মি শুধু নিশ্চুপ থেকেছে৷ আসলে জেমিনি নিজেই জানে না—রুহ আর কোনোদিন ফিরবে কিনা?
তাঁবুর গায়ে ছবি আঁকতে-আঁকতে কেন জানি না আজ আব্বুর কথা খুব মনে পড়ছে রুহাইলের৷ কারণ, সে যখন ছোটবেলা থেকে আলামিনের কাছে ছবি আঁকা শিখে নিজেদের তাঁবুতে ছবি আঁকত, জেমিনি কাছে এসে কানে-কানে বলত, ‘তোর আব্বুর মতো হচ্ছে না৷ আরও মন দিয়ে আঁকা শেখ, আব্বুর মতো আঁকতে হবে তোকে৷’
কতবার গোপন ঝোলা থেকে রুহর আঁকা তার প্রতিকৃতিটি রুহাইলকে দেখিয়ে জেমিনি বলত, ‘দ্যাখ, তোর আব্বু কীরকম ছবি আঁকত৷’
রুহাইল বিস্ময়ে দেখত—তার আব্বু কী আশ্চর্য দক্ষতায় তার আম্মাকে কাগজের বুকে জীবন্ত করে তুলেছিল! তবুও মুখে হার মানত না৷ চোখ বড়-বড় করে বলত, ‘আমি একদিন আব্বুর চেয়েও তোমার ভালো ছবি এঁকে দেব, দেখে নিয়ো৷’
জেমিনি আদর করে বুকের ভিতর জড়িয়ে ধরে বলত, ‘তার মতো আঁকতে হলে জীবনকে যে রং আর তুলির কাছে নিঃশর্তে জিম্মা দিতে হয়, রুহাইল৷’
নতুন দলে এসে রুহাইল তাঁবুগুলোকে আরও সুন্দর করে রং করতে শুরু করেছে৷ দলের সবাই রুহাইলের প্রশংসা করছে৷ রুহাইলের তারিফ শুনে নৌশিনের বুক গর্বে ফুলে ওঠে৷ সে রুহাইলকে একদম কাছ ছাড়া করে না৷ ছায়ার মতো সঙ্গে-সঙ্গে ঘোরে৷ লোকালয়ে খেলা দেখানোর সময় ছাড়া রুহ বেশিরভাগ সময়টাই রং-তুলি নিয়ে কাজে লেগে পড়ে৷ নৌশিন রুহাইলের কাজের সময় বিরক্ত করে না৷ বরং রং-তুলি পরিষ্কার করে দেয়৷ নতুন রং এনে দেয়৷ হাতের কাছে প্রয়োজনীয় মাপের তুলি এগিয়ে দেয়৷ রুহাইল যখন তাকে কোনো ফাঁকা অংশ রং দিয়ে পূরণ করতে বলে, সে তখন আহ্লাদে আটখানা হয়ে ওঠে৷
রুহাইল আঁকতে-আঁকতে বামদিকে না-তাকিয়েই বুঝতে পারল, তার মাথার পাশে নৌশিনের মাথা ঝুঁকে আছে৷ এক মনে তার তুলি বোলানো দেখছে৷ হঠাৎ মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি জেগে উঠল৷ রং-মাখানো তুলিটা হঠাৎ নৌশিনের গালে বুলিয়ে দিল৷ রুহাইল যে এমনভাবে আচমকা তার গালে রং মাখিয়ে দেবে বুঝতে পারেনি নৌশিন৷ হাত দিয়ে রংটা মুছতে যেতেই রুহাইল হাতের তুলি রেখে নিজের বুকের ভিতর টেনে নিয়ে নৌশিনকে বলল, ‘মুছো না৷ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে৷’
নৌশিন রুহাইলের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে বলল, ‘সত্যি?’
‘সত্যি৷’ বলেই আলতো করে নৌশিনের চিবুক তুলে ধরে ঠোঁটে গাঢ় একটা চুমু দিল রুহাইল৷ রুহাইলের ঘন-চুমুতে চোখ বন্ধ নৌশিনের৷
কিছু পরে নৌশিন রুহাইলের বুক থেকে সরে আসে৷ রুহাইল বলল, ‘আজ খুব মনকেমন করছে৷’
‘কেন?’
‘কতদিন হল ওদের ছেড়ে এসেছি৷ আজ আম্মুর জন্য মনখারাপ লাগছে৷ আচ্ছা নৌশিন, আজ আম্মুর কাছে যাবে?’
‘হুম৷ তবে তো জিজা-আম্মাকে একবার জিগ্যেস করতে হয়৷’
‘বেশ৷ তুমি জিগ্যেস করে এসো৷’
দুপুর ঢলে গেছে৷ রুহাইল আজ উটটাকে সুন্দর করে সাজিয়েছে৷ উটের পিঠে তার হাতে আঁকা রঙিন কাপড়ের চাদর বিছিয়েছে৷ উটের গলার দুপাশে ঝুলিয়েছে গোলাপি-রংয়ের দুটো ক্যাকটাসের ফুল৷ উটের বাহারি সাজ দেখে নৌশিন বেজায় খুশি৷
দুপুরের রোদ খানিক পড়ে এলে দু-জন উঠের পিঠে চড়ে রওনা দিল রুহাইলের ফেলে আসা দলের ঠিকানায়৷ নৌশিন উট চালাচ্ছে৷ পিছনে বসে নৌশিনকে আদর করে জড়িয়ে ধরে বসে আছে রুহাইল৷
ওদের কোনো তাড়া নেই৷ উটও চলছে ধীরেসুস্থে৷ সামনে নির্জন বালির দিগন্ত৷ কখনো বালির স্তূপ, কখনো সমতল৷ ছড়িয়ে থাকা বালির প্রান্তরে কত রকমের নকশা৷ বাতাসে একজায়গার বালি অন্য জায়গার বালির ওপর পড়লে এমন নকশার সৃষ্টি হয়৷
পড়ন্ত রোদ্দুর গায়ে মাখতে-মাখতে ওরা এগিয়ে চলেছে৷ সূর্য যত পশ্চিমের দিগন্তে ঝুঁকেছে, উটসহ সওয়ারিদের ছায়া তত দীর্ঘ হয়ে বালির ওপর পড়েছে৷ সওয়ারিদের সঙ্গে সওয়ারিদের ছায়াও ক্রমশ সরে-সরে যাচ্ছে৷
রুহাইল উটের পিঠে আটকানো ঝোলা থেকে তার প্রিয় আড়বাঁশিটা বার করে৷ তারপর ধীরে-ধীরে ফুঁ-দেয়৷ বাঁশির ফোকর থেকে আশ্চর্য সুর ছড়িয়ে পড়তে থাকে ধু-ধু মরুভূমির পড়ন্ত বিকেলে৷ সুরের ছোঁয়ায় আলতো দুলতে থাকে নৌশিন৷ বাঁশি শুনতে-শুনতে নৌশিনের মনে প্রশ্ন জাগে—সুর কি শুধুই মানুষ শোনে?
দীর্ঘক্ষণ পর বাঁশি থামলে মনের মধ্যে জেগে ওঠা প্রশ্নটি করে রুহাইলকে৷
রুহাইল বলে, ‘শুধু মানুষ কেন, সুর এই দুনিয়ার সবাইকেই মোহিত করতে পারে৷ দেখো না, পাখিরা কেমন সুর করে শিস দিয়ে চারপাশে শূন্যতাকে আরও নিস্তব্ধ করে তোলে! ঝরনা কেমন শিস দিতে-দিতে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে বলে পাহাড় শান্ত হয়ে চুপ করে বসে থাকে! গাছগাছালির শুকনো পাতারা কেমন হাওয়া ছুঁয়ে সুর ছড়িয়ে দেয় বলে চরাচরের শব্দহীনতা আরও বেশি করে উপলব্ধি করা যায়! জগতের মসৃণ নৈঃশব্দ্যকে বুঝতে হলে সুরের কোনো বিকল্প নেই৷’
নৌশিন চুপ করে রুহাইলের কথা শুনতে থাকে৷ রুহাইলের কথা শেষ হলে বলে, ‘তোমার ওই বাঁশির সুরই প্রথম আমাকে নিশ্চুপ করিয়ে দিয়েছিল, রুহাইল৷ সেই স্তব্ধতার ভিতর আমি কেমন যেন বিবশ হয়ে গিয়েছিলাম৷ ওই সুরের ভিতরেই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার চিরসঙ্গীকে৷ আমার মনের মানুষকে৷’
রুহাইলের কণ্ঠে উচ্ছ্বাস, ‘সামনে তাকাও৷ দেখো৷’
সামনে অন্ধকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে আলোর সারিসারি বিন্দু৷ নৌশিন বুঝতে পারল রুহাইলের পুরোনো তাঁবুগুলোর কাছে পৌঁছতে আর বেশি দেরি নেই৷
মূর্তি বললে ভুল হবে৷ বরং বিভিন্ন আকারের পাথর বলাটাই সংগত৷ সেই নানা আকারের পাথরের খণ্ডগুলোর সামনে জ্বলছে সোনার প্রদীপ৷ এমনিতেই দীর্ঘ কক্ষটিতে ভালো করে আলো প্রবেশ করে না৷ তার ওপর গেরিলা যোদ্ধারা সমবেত হয়ে প্রার্থনার সময় যে অজস্র ধূপ জ্বালায়, তার ধোঁয়ায় কক্ষটি আরও আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে৷ কাছের মানুষকেও অস্পষ্ট দেখায়৷ তার সঙ্গে বেজে ওঠে নানা বাদ্যযন্ত্র৷
প্রায় দু-দশক ধরে বহুবার রুহ ও জাদুকর দূর থেকে দাঁড়িয়ে এদের প্রার্থনা দেখেছে৷ কিন্তু এদের মন্ত্র ও প্রার্থনা সংগীতের অর্থ বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারেনি৷ শুধু এটা মনে হয়েছে যে—অদৃশ্য এক শক্তির কাছে এরা নিজেদের শান্তি ও শক্তির জন্য আবেদন করছে৷
বিগত বছরগুলোতে সময়ের বদলের সঙ্গে-সঙ্গে কতকিছুই না বদলে গেছে! প্রায় দু-দশক আগে শেষবার যখন কুনচেন তাঁর গবেষণার কক্ষে প্রবেশ করেন, তখন গম্ভীর অথচ শান্ত ও সুস্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘আমি নিজে থেকে না-বেরিয়ে এলে আমাকে যেন কোনো কারণে আহ্বান করা না-হয়৷ আমি কিন্তু আমার গবেষণা-কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসব না৷ সবাই যেন আমার কথা মনে রাখে৷’
সেই থেকে বছরের পর বছর গড়িয়ে গেছে কুনচেন তাঁর গবেষণা-কক্ষের বাইরে আসেননি৷ কুনচেনের অনুপস্থিতিতে নালজোর এই গুহার দেখভাল করে৷ গুহার ব্যাপারে যাকে যা প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার, তা একমাত্র নালজোরই দেয়৷
দু-জন গেরিলা যোদ্ধা শুধু পালা করে বছরের পর বছর কুনচেনের কক্ষের কাছে দু-বেলা কখনো জাম্পা কখনো গাজর, বিনস, কখনো আখরোটের চাটনি ও মাখনের চা রেখে আসে৷ তারা লক্ষ করে কোনোকোনো দিন কুনচেন তা তাঁর নিজের সময়মতো গ্রহণ করেন, কখনো করেন না৷ খাবার না-ফুরোলে বাসি খাবারের জায়গায় টাটকা খাবার রেখে আসে যোদ্ধারা৷
খাবার গ্রহণ করেন বলেই বোঝা যায় মানুষটি জীবিত রয়েছে৷ নাহলে বোঝাই যেত না—কুনচেন লামা জীবিত নাকি মৃত?
রুহ বিস্ময়ে ভাবে, এতকাল নিজের গবেষণা কক্ষে মানুষটি কী করছে? এতই গবেষণায় মগ্ন? কোনো মানুষের যে এত ধৈর্য থাকতে পারে, এই কুনচেন লামাকে না-দেখলে বিশ্বাসই হত না৷
দীর্ঘ এই সময়কালে কত গেরিলা যোদ্ধা কুনচেনের অস্ত্র আবিষ্কারের ওপর আস্থা না-রাখতে পেরে চলে গেছে৷ হতাশ হয়ে বিপ্লবের মোহ ছেড়ে নিজেদের গ্রামে, নিজেদের বসতিতে ফিরে গেছে৷ বদলে আবার নতুন-নতুন মুখের আগমন ঘটেছে৷ তবে এটা ঠিক, যা-কিছুই হয়েছে—তা নালজোরের নজরদারিতে এবং অনুমতিতে৷ যারা ফিরে গিয়েছে, নালজোর তাদের আটকায়নি৷ শুধু এই গোপনগুহাটির কথা প্রকাশ করতে নিষেধ করেছে৷ তারাও কথা রেখেছে৷ নাহলে এতদিনে অন্য কেউ না-হোক চিনারা ঠিক এই গুহার হদিশ পেয়ে যেত৷
রুহর মনে যে হতাশা আসেনি, এমন নয়৷ এত-এত বছর ধরে এমন গুহাবন্দি জীবন অথচ যে-স্বপ্ন নিয়ে সে পথে নেমেছিল—তার কোনো ইতিবাচক সম্ভাবনার বিন্দুমাত্র আলোককণাও নজরে পড়ছে না৷ সে যখনই জাদুকরের কাছে তার হতাশার কথা জানিয়েছে, জাদুকর তাকে সেই হতাশা থেকে মুক্ত করেছে৷ বলেছে, ‘রুহ, কুনচেন সাধারণ মানুষ নন, তুমি আস্থা হারিয়ো না৷ হয়তো দীর্ঘ সময় লাগছে, কিন্তু ফল মিলবেই৷’
জাদুকরের কথায় বছরের পর বছর নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছে রুহ৷ বরং নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য সে এই গুহার ভিতর একটি দীর্ঘ মসৃণ দেওয়াল বেছে নিয়ে ছবি আঁকছে৷ রুহ কোনোদিন লাসা দেখেনি৷ দেখেনি দলাই লামার পোতালা প্রাসাদও৷ এক গেরিলা যোদ্ধা দিনের পর দিন পোতালা প্রাসাদ ও সংলগ্ন প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনা করে গেছে৷ সেই বর্ণনা শুনে-শুনে রুহ দেওয়ালের গায়ে লাসায় অবস্থিত পোতালার ছবি এঁকেছে৷ বছরের পর বছর ধরে শুধু এই একটিই ছবি এঁকে চলেছে৷ সেই ছবিও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে৷
সমস্ত গেরিলা যোদ্ধাই সুদীর্ঘ দেওয়ালে এমন ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়৷ তারা দেখেছে—কীভাবে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে রুহর নিপুণ তুলির টানে তাদের প্রাণপ্রিয় পোতালা প্রাসাদটি দেওয়ালের গায়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে!
ছোট্ট পাহাড়ের ওপর মস্ত প্রাসাদ৷ নীচ থেকে ঘোরানো পাথুরে সিঁড়ি উঠে গেছে প্রাসাদ চত্বরে৷ প্রাসাদের মাথায় সোনার চুড়ো৷ রোদ্দুর পড়ে ঝকমক করছে৷ তার ওপর ঘননীল আকাশ৷ সাদা মেঘের টুকরো ভাসছে৷ অদূরে নানান পাহাড় চুড়োগুলো স্পষ্ট৷ উপত্যকায় সবুজ ঘাসের ভূমি৷ কিছু দূরে বয়ে যাচ্ছে কাই নদী৷ রুহর তুলির গুণে মনে হচ্ছে যেন কাই নদীতে স্বচ্ছ জলের ধারা বয়ে চলেছে৷ আর এই ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল—পোতালা প্রাসাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে রয়েছেন মহান দলাই লামা৷ পরনে সাধারণ লামাদের মতোই পোশাক৷ মাথায় শুধু গাঢ় হলুদ-রংয়ের টুপি৷
কয়েকদিন আগে নালজোর খুব তারিফ করে গেছে৷ সে ভাবতেই পারেনি—এক গেরিলা যোদ্ধার মুখের বয়ান থেকে রুহ এমন অবিশ্বাস্য ছবি গুহার পাথুরে দেওয়ালে ফুটিয়ে তুলতে পারে৷
শুধু একজনই এই ছবিকে সুনজরে দেখেনি৷ সে হল দেনজিন৷ নালজোর বলে, ‘দেনজিনের মতো সাহসী যোদ্ধা পাওয়া বিরল৷ যেমন সাহস, তেমনই ক্ষুরধার বুদ্ধি৷’
হয়তো নালজোরের কথা ঠিক৷ কিন্তু রুহ ভাবে, সাহসী ও বুদ্ধিমান যোদ্ধা হলেই যে সে মানুষ হিসাবে ভালো হবে—এমন নয়৷ এই গুহায় আসা থেকেই রুহ লক্ষ করেছে দেনজিনের আচার-আচরণ তেমন ভালো নয়৷ বেশ রুক্ষ৷ রুহ বুঝতে পারে না—প্রথম থেকেই কেন রুহ এবং জাদুকরকে সে পছন্দ করে না! অথচ, দেখতে পেলেই খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে নানা কথা জিগ্যেস করে৷ শুধু যে রুহর ক্ষেত্রেই, তা অবশ্য নয়৷ এই গুহার প্রতিটি অংশ, দলের সমস্ত মানুষ সম্পর্কে তার অপার কৌতূহল৷ এমনকী একই কথা বারবার জিগ্যেস করে মিলিয়ে নেয় কেউ অসত্য বলেছে কিনা৷ রুহ বেশ বোঝে, সন্দেহের বাতিক আছে দেনজিনের৷ তবু কেন যে নালজোর ওকে অত পাত্তা দেয়, সেটাই মাথায় ঢোকে না রুহর৷
দেনজিনের একটি গুণ অবশ্য কদর করার মতো৷ গুহার ভিতর পাথুরে আঁকাবাঁকা পথে অসম্ভব দ্রুত গতিতে চলা ফেরা করতে পারে৷ একসময় নাকি দেনজিনের পা ভেঙে গিয়েছিল৷ অথচ, সে তো দিব্যি সবসময় রণপা নিয়ে স্বাভাবিক ছন্দে হাঁটাচলা করে৷ রুহ বুঝতে পারে, নালজোর দেনজিনের এই গুণটির প্রতিও বিশেষভাবে দুর্বল৷ কারণ, যোদ্ধাদের মধ্যে খবর আদানপ্রদানের কাজটি মূলত দেনজিনই করে থাকে৷
উপাসনা কক্ষের ভিতর থেকে এখন আর কোনো শব্দ আসছে না৷ রুহ বুঝতে পারল উপাসনা শেষ হয়ে গেছে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই পাথুরে মাটিতে খটখট শব্দ শুরু হল৷ এতক্ষণ রুহ যার কথা ভাবছিল, সে-ই আসছে৷
দেনজিন রুহর কাছে এসে দাঁড়াল৷ তারপর আগের মতোই তীক্ষ্ণ চোখে ছবিটাকে দেখল৷ ছবিটা দেখতে-দেখতে স্বগতোক্তি করল, ‘পোতালার ভবিষ্যৎ এই মাটির গভীরে গুহার অন্ধকারেই থেকে যাবে৷ আলোর মুখ আর দেখতে পাবে না৷’
নিজে গেরিলা যোদ্ধা হয়ে এমন হতাশাময় বিপরীত মনোভাব যে কেন পোষণ করে তা বুঝতে পারে না রুহ৷ রুহ যেন দেনজিনের কথাগুলো শুনেও না-শোনার ভান করে৷ সে যেমন মন দিয়ে ছবি আঁকছিল তেমনই আঁকতে থাকে৷
দেনজিন খানিকটা রুক্ষ চোখে রুহর দিকে তাকিয়ে খটখট শব্দ তুলে গুহার বাঁকে অদৃশ্য হল৷ দেনজিন চলে গেলে রুহর মন বড় বিষণ্ণ হয়ে উঠল৷ নিজের আঁকা লাসার দৃশ্যটি দেখতে-দেখতে মনে পড়ল ফেলে আসা জঙ্গলের কথা৷ বিশেষ করে ছবি আঁকার সঙ্গী বাঁদরটির কথা৷
আজও দুটো বিষয় তার কাছে রহস্য হয়েই রয়ে গেছে৷ প্রথমটা—মৃত্যুর দিন শীতের পড়ন্ত বিকেলে ফাদার জন তাকে যে হলুদ ক্রিসেনথিমামটি দিয়েছিলেন তা তিনি কোথায় পেয়েছিলেন? কারণ, গির্জার চত্বরে চন্দ্রমল্লিকা ফুলের কোনো গাছ ছিল না৷ তাহলে শারীরিকভাবে অসমর্থ ফাদার ওই ফুল পেলেন কোথা থেকে?
দ্বিতীয়টি হল—গুহায় ছবি আঁকার সময় বাঁদরটি কেন তাকে অমনভাবে সাহায্য করত? সে কী করে বুঝত আমার কোন রং দরকার, কোন সাইজের তুলিটি চাইছি? অথচ, ঠিক সেটাই এগিয়ে দিত, যা আমি মনে-মনে চাইছি৷
একজনের পায়ের শব্দে রুহর চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয়ে গেল৷ রুহ দেখল, জাদুকর প্রায় দৌড়তে-দৌড়তে তার দিকে আসছে৷ এসেই কোনো কথা না বলে রুহকে জড়িয়ে ধরল৷ জাদুকরকে তো এমন আবেগপ্রবণ হতে কোনোদিন দেখেনি! খুব অবাক হয়ে গেল রুহ৷
আলিঙ্গন ছিন্ন করে জাদুকর হাসছে৷ রুহ বলল, ‘কী হয়েছে? এমন করছ কেন?’
‘তোমাকে এক্ষুনি যেতে হবে৷’
‘কোথায়?’
‘গবেষণা-কক্ষে৷ কুনচেন ডেকে পাঠিয়েছেন৷’
হাতে ধরা তুলিটা খসে গেল৷ বিস্ময়ে রুহর মুখ হাঁ হয়ে গেছে৷ এত-এত বছর পর, অবশেষে কুনচেনের ডাক এল! নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না রুহ৷ দ্রুত জাদুকরের সঙ্গে এগিয়ে চলল কুনচেনের গবেষণা কক্ষের দিকে৷
মানুষ নাকি অন্য কোনো প্রাণী? মাথার চুলে বাদামি জট৷ মুখ ভর্তি দাড়িতেও সেই একইরকম জট বুক ছাড়িয়ে নেমে গেছে৷ বহুকাল পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই আর চিনতে পারছে না কুনচেন লামা৷ নিজেকে প্রাগৈতিহাসিক কোনো প্রাণীর মতো মনে হচ্ছে৷
ধীরে-ধীরে নিজের মাথা মুড়িয়ে ফেললেন৷ দাড়ি কামালেন৷ তারপর সুড়ঙ্গের গভীরে থাকা উষ্ণ ঝরনাজলে স্নান করলেন৷ স্নানের পর ইয়াকের পশমে তৈরি মেরুন-রংয়ের স্কার্ট পরলেন৷ পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকা পড়ে গেল৷ তার ওপর হলুদ রংয়ের একটি জ্যাকেট পরে আবার এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালেন৷ এবারে বোধহয় তাকে আর চিনতে অসুবিধে হবে না রুহ ও গেরিলাবাহিনীর লোকজনদের৷
অনেকক্ষণ আগে তিনি খবর পাঠিয়ে ছিলেন রুহকে৷ এতক্ষণে সে নিশ্চয় গবেষণা-কক্ষে চলে এসেছে৷
কুনচেনের ধারণাই ঠিক৷ গবেষণা-কক্ষে এসে কুনচেনকে দেখতে না-পেয়ে ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিল রুহ ও জাদুকর৷ সঙ্গের গেরিলা যোদ্ধাটি তাদের অপেক্ষা করতে বলে চলে গিয়েছিল৷
কুনচেন কক্ষে ঢুকতেই পাথরের দুটি আসন থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল রুহ ও জাদুকর৷ রুহ স্তম্ভিত হয়ে গেল কুনচেনকে দেখে৷ এ কী অবস্থা হয়েছে লামার! আগের চেহারা আর নেই৷ গালগুলো বসে গেছে৷ চোখের কোণে কালি৷ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে শরীরে মেদ বলে যেন কিছুই নেই৷ শুধু কপালে লালচে কাটা দাগ আর ঠোঁটে সেই শান্ত হাসিটি লেগে না-থাকলে সত্যিই কুনচেনকে বোধহয় আজ চেনা যেত না৷
কুনচেনও দেখছেন এতগুলো বছর কীভাবে ছোবল মেরেছে রুহকে৷ মাথার চুলে সাদা রং লেগেছে৷ আগের তুলনায় শরীরে আর ততখানি তেজদীপ্ত ভাব নেই৷ তবে চোখ দুটো আগের মতোই নির্মল ও দীপ্যমান৷
পরস্পর পরস্পরের দিকে সুদীর্ঘকাল পর কেবল বিস্ময়ের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে৷ তারপর কুনচেনই প্রথম কাছে এগিয়ে এলেন৷ দুহাত বাড়িয়ে দিলেন রুহর দিকে৷ রুহ ধরা দিল কুনচেনের শীর্ণ বুকে৷ কুনচেন খুব মৃদুস্বরে বললেন, ‘তুমি সত্যিই মহৎ শিল্পী, রুহ৷ তোমার দেখানো পথেই সাফল্য এসেছে৷ এই পৃথিবী বদলে যাবে৷ এই সময়ও বদলে যাবে৷ পৃথিবীর মানুষ আবার নতুন করে ইতিহাস রচনা করবে৷ সময় আবার নতুন করে নির্মিত হবে৷ শুধুমাত্র তোমার স্বপ্নের জোরেই৷’
রুহকে আলিঙ্গন মুক্ত করে কুনচেন বললেন, ‘এসো৷’
গবেষণা-কক্ষের দক্ষিণ কোণে পাথরের আড়ালে যে আর-একটি সুড়ঙ্গ আছে, প্রায় বছর কুড়ি আগে প্রথমবার এসে টের পায়নি রুহ৷ কুনচেন একটি মশাল জ্বলিয়ে নিলেন৷ তারপর সামনের অন্ধকার সিঁড়ির ধাপে আলো ফেলতে-ফেলতে নীচে নামতে লাগলেন৷ পিছনে রুহ ও জাদুকর৷ বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর আলোর দেখা মিলল৷ কুনচেন মশালটি নিভিয়ে পাথুরে দেওয়ালের ফাটলে রেখে দিলেন৷
তারপর অল্প পথ নামতেই রুহর চোখ বিস্ময়ে বড়-বড় হয়ে গেল৷ রুহ ও জাদুকরের যেন পলক পড়ছে না৷ সামনে গোলাকার এক হ্রদ৷ ওপর থেকে অদ্ভুত আলোর জ্যোতি সেই হ্রদের জলে পড়েছে৷ পুরো হ্রদটির জল হালকা নীল৷ হ্রদের চারপাশে নাম-না-জানা গাছপালার রাজত্ব৷ তবে বেশিরভাগই লতা ও গুল্মশ্রেণির উদ্ভিদ৷ রুহ দেখল হ্রদের জলের কিনারায় বেশ বড় একটি গোলাকার ডিঙি রয়েছে৷ কুনচেনের ইশারায় সেই ডিঙিতে গিয়ে উঠল তারা৷ কুনচেন ডিঙি বেয়ে ভেসে চললেন হ্রদের অপর প্রান্তে৷
কুনচেন হ্রদের অপর প্রান্তে নেমে ঢুকে পড়লেন আশ্চর্য এক কক্ষে৷ নীলচে আলোয় ভরে আছে সেই কক্ষ৷ কত রকমের যে সূক্ষ যন্ত্রপাতিতে সে ঘর পূর্ণ, তা না-দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত৷
কুনচেন বললেন, ‘এই হচ্ছে আমার আসল গবেষণা-কক্ষ৷ রুহ জিগ্যেস করল, ‘তাহলে ওপরেরটা?’
‘ওটাও৷ তবে গবেষণার প্রধান-কক্ষ এটাই৷ এই কক্ষের কথা পৃথিবীর কেউ জানে না৷ এমনকী গেরিলা-যোদ্ধারাও এর হদিশ জানে না৷ বলতে পারো, আমি কাউকেই জানতে দিইনি৷
একটি পাথরের খাঁজকাটা অংশের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালেন কুনচেন৷ তারপর বললেন, ‘ওই হচ্ছে তোমার স্বপ্নকে সত্যি করার ভাইরাস, রুহ৷’
রুহ দেখল, একটি মস্ত বড় কাচের বয়াম৷ যার ভিতরে সাদা-রংয়ের বুদবুদে পূর্ণ৷ কুনচেন বললেন, ‘রুহ, এই বয়ামের ভিতর যত বুদবুদ রয়েছে৷ ওই বুদবুদগুলো দিয়ে দশটি পৃথিবীর মানুষের মস্তিষ্ক থেকে যুদ্ধের স্মৃতি, অন্যায়ভাবে দখলদারিত্বের চিন্তা, রাষ্ট্রের সীমান্ত ভাবনার স্মৃতি চিরকালের মতো মুছে দেওয়া সম্ভব৷’
রুহর মুখ দিয়ে কথা সরছে না৷ সে শুধু অপলক চোখে কাচের বয়ামটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে৷ রুহর তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকা দেখে কুনচেন বললেন, ‘রুহ, এসো৷ এখানে বসো৷’
কুনচেন রুহর মুখোমুখি মেঝের ওপর বসলেন৷ তারপর বললেন, ‘কিছু জরুরি কথা শোনো—প্রথমেই তোমাকে একটি প্রতিষেধক নিতে হবে৷’
‘কেন?’
‘কারণ, না-হলে তোমার মস্তিষ্ক থেকেও সমস্ত যুদ্ধ-স্মৃতি, সীমান্ত-ধারণা মুছে যাবে৷ পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর জনজাতির বদল তুমি আর প্রত্যক্ষ করতে পারবে না৷’
‘ও!’
কুনচেন উঠে গিয়ে একটি বাদামি-রংয়ের ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জে একটি সাদা তরল সাবধানে ভরে আনলেন, তারপর রুহর বাহুতে সেই তরল সূচ ফুটিয়ে ঢুকিয়ে দিলেন৷ রুহ পাশে বসা জাদুকরকে দেখিয়ে বলল, ‘আপনি জাদুকরকেও এই প্রতিষেধক দিন৷ আর, আপনিও নিন৷’
রুহর কথায় কুনচেন হেসে উঠলেন৷ তারপর বললেন, ‘আমি অনেক বছর পূর্বে এই গবেষণা করার সময়ই প্রতিষেধক নিয়ে নিয়েছি৷ আর, জাদুকরের প্রতিষেধক লাগবে না৷’
‘জাদুকরের প্রতিষেধক লাগবে না!’ বিস্ময় রুহর গলায়৷
রুহর কথার উত্তর না দিয়ে আবারও রহস্যময় হাসি হাসলেন কুনচেন৷ রুহ দেখল, একইরকম রহস্যময় হাসি জাদুকরের ঠোঁটেও৷ কুনচেনকে এবার চিন্তিত মনে হল৷ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘পুরো পৃথিবীটাই বদলে যাবে, রুহ৷ শুধু যে মানুষের বদল হবে, এমন নয়৷ মানুষের সঙ্গে-সঙ্গে সারা পৃথিবীর অর্থনৈতিক সামাজিক সম্পর্কগুলোর ওপরেও কিন্তু প্রভাব ফেলবে এই ভাইরাস৷’
‘কীভাবে?’
‘ধরো যুদ্ধ সংক্রান্ত যত বইপত্র, সীমান্ত সম্পর্কে যত রাজনৈতিক দলিল, শরনার্থীদের সম্বন্ধে যত রকমের হিসাব-নিকাশের খতিয়ান—সমস্তই তো অর্থহীন হয়ে যাবে৷ মানুষ বুঝতেই পারবে না—এই সব লেখাজোকার মানে৷ তাছাড়া, পৃথিবীতে যত যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে—এক কথায় সমস্ত আবর্জনায় পরিণত হবে৷ কারণ, মানুষ এই সমস্ত মারণাস্ত্রের ব্যবহার ভুলে যাবে৷
উন্নত দেশগুলো বলতে আমরা যাদের বুঝি, তাদের অর্থনীতি কিন্তু শুধুমাত্র কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়৷ বরং তাদের অর্থনীতির বেশিরভাগটাই নির্ভর করে অস্ত্র ব্যবসার ওপর৷ সারা পৃথিবীকে তারা ধীরে-ধীরে একটা অস্ত্রের খোলা বাজারে পরিণত করেছে৷ এদের পররাষ্ট্র নীতি, বৈদেশিক কূটনীতি এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় যেন উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভিতর পারস্পরিক অবিশ্বাস, হিংসা ও সামরিক প্রতিযোগিতার আবহকে ধরে রাখা যায়৷ তা না হলে তো, সেই রাষ্ট্রগুলো সামরিক শক্তিতে একে অন্যকে টেক্কা দিতে চাইবে না, অন্যের চেয়ে নিজেকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে চাইবে না, তাই না?
ভারত-পাকিস্তানের কথাই ধরো, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যদি নিবিড় বন্ধুত্বের জায়গা গড়ে ওঠে, তাহলে কি ভারত বা পাকিস্তান নিজেদের সামরিক খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাছে কোটি-কোটি মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে অস্ত্র কিনবে? কিনবে না৷ বরং অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা এইরকম দেশগুলো দেশের কোটি-কোটি মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্যের দিকে নজর দিত বেশি করে৷ সামরিক খাতে বরাদ্দ কমিয়ে দিত৷
এই ভাইরাস যখন মানুষকে যুদ্ধের কথা ভুলিয়ে দেবে, সীমান্তের কথা ভুলিয়ে দিয়ে বিশ্ব-মানবতার চিন্তাকে সতেজ করে তুলবে, দখলদারিত্বের ধারণা ভুলে মানুষ মনে করবে—এই পৃথিবী সবার, এই পৃথিবীর যেখানে খুশি যে-যার নিজের ইচ্ছেমতো অন্যকে বিব্রত না-করে বাস করা যায়৷ ভাব তো—পৃথিবীর চিরাচরিত সামাজিক, অর্থনৈতিক চিন্তা ও চেতনায় কী আশ্চর্য বদল নিঃশব্দে সংঘটিত হয়ে যাবে!’
রুহ বলল, ‘ঠিক এটাই তো চাই৷ এই পৃথিবীকেই চাই৷ এমনই হোক এই গ্রহ, এই গ্রহের সমস্ত জনজাতি—এটাই তো আমার স্বপ্ন৷’
‘তোমার মতো করে এভাবে আগে কেউ ভাবেনি, রুহ৷ এই চিন্তাটাই মহা-মূল্যবান৷ আজ মহাকর্ষের যে টান আছে, তা কে না জানে? কিন্তু প্রথম যিনি চিন্তা করেছিলেন সেই নিউটনকেই কিন্তু আমাদের কুর্নিশ জানাতে হয়৷
‘আজ তো কত কোম্পানি উড়োজাহাজ বানাচ্ছে, এটা তো খুব সাধারণ কাজ এখন৷ কিন্তু যিনি প্রথম ওড়ার কথা চিন্তা করে কাজে নেমেছিলেন, অরভিল রাইট ও উইলবার রাইট—এই দুই ভাইকেই তো আমরা কুর্নিশ করি, তাই না?
‘ওই যে বললাম, প্রথম চিন্তাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মহামূল্যবান৷ আমি কেবল তোমার সাধারণ সৈনিক হয়ে চেষ্টা করেছি সেই স্বপ্নকে সফল করতে৷ তাই আগেও বলেছি, আবারও বলছি—তুমি সাধারণ শিল্পী নও৷ তুমি মহৎ শিল্পী৷’
এতক্ষণ একনাগাড়ে কথা বলে কুনচেন হাঁপাচ্ছেন৷ রুহ আগেও দেখেছে, কুনচেন কী আশ্চর্য শক্তিতে বলীয়ান হয়ে থাকতেন৷ এখন যেন সেই শক্তি অস্তমিত৷ মাঝের কুড়ি বছর সময়কালটা মহাজাগতিক সময়ের বিচারে হয়তো কিছুই নয়, কিন্তু একজন মানুষের আয়ুর নিরিখে অনেকটাই—ভাবল রুহ৷
কুনচেন যেন রুহর মনের কথাটি পড়তে পারলেন৷ বললেন, ‘ঠিকই ভাবছ, রুহ৷ আমার অন্তর্গত শক্তি এখন শেষের পথে৷ তবে তোমাকে সুচিন্তিত ভাবে এবং লক্ষ্য ঠিক রেখে কাজগুলো করে যেতে হবে৷
কুনচেনের কথায় মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল রুহর৷ বলল, ‘আপনি এরকম বলবেন না৷ নিজেকে খুব অসহায় লাগছে৷’
‘সত্যকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে সান্ত্বনা খোঁজার কোনো অর্থ নেই, রুহ৷ নিজেকে প্রস্তুত করো৷’
‘তাহলে আমাদের এখন কী করণীয়?’
‘পরীক্ষা করতে হবে৷’
‘পরীক্ষা?’
‘হ্যাঁ৷ মানুষের ওপর এই ভাইরাসের প্রভাব৷’
‘কীভাবে? কার ওপর করা যাবে?’
‘কেন, আমাদের গুহায় তো কতজন গেরিলা যোদ্ধা আছে, তাদের ওপরেই পরীক্ষা হবে৷ তুমি সঙ্গে থেকে, দেখতে থাকো—আমি কী করি৷’
গবেষণা কক্ষ থেকে বেরিয়ে পুনরায় ডিঙিতে গিয়ে উঠলেন কুনচেন৷ সঙ্গে রুহ ও জাদুকর৷ সমস্ত হ্রদের জলে আশ্চর্য আলোর রশ্মি পড়ায় যেন অপরূপ এক মায়াজগতের জন্ম হয়েছে৷ তবে রুহর এই মায়াজগৎও খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছে কুনচেনের কথা ভেবে৷ ধীর হাতে কুনচেন দাঁড় বাইছেন৷ রুহ বলল, ‘আমি সাহায্য করব?’
কুনচেন মৃদু হাসলেন৷ বললেন, ‘আমাকে নয়, সমস্ত জগৎ তোমার সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে রয়েছে, রুহ৷ তাদের সাহায্য করার জন্য নিজেকে তৈরি করো৷ আমার কথা ভেবে নিজেকে ভারাক্রান্ত করো না৷’
মাঝজলের ওপর ভেসে যাচ্ছে ডিঙি৷ ডিঙিতে এখন স্তব্ধ হয়ে বসে আছে তিনজন৷
নালজোরের কণ্ঠে তীব্র উচ্ছ্বাস, ‘এবার বিশ্বাস হল তো? আমি এত বছরেও আস্থা হারাইনি৷ আমি জানতাম—মহান কুনচেন লামা আমাদের হাতে বিজয়ের অস্ত্র তুলে দেবেনই৷ আমাদের গুহা থেকে যে-সব সহযোদ্ধারা চলে গেছে, পুনরায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব৷ নতুন অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে আমরা পূর্ণশক্তি নিয়ে চিনাদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ব৷
আমাদের মাতৃভূমির স্বাধীনতার আর দেরি নেই৷ বিদেশিদের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে আমরা নতুন দেশ গঠন করব৷ আমাদের দীর্ঘকালের স্বপ্ন আজ আমাদের হাতের মুঠোয়৷ তোমরা সাহস হারিয়ো না৷ আগামী সময়—আমাদের সময়৷ বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত৷’
নালজোরের বক্তব্যে সমস্ত গেরিলা সদস্যরা যেন তেতে উঠল৷ যেন এক্ষুনি অস্ত্র হাতে পেলে চিনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে৷ কুনচেন খুব শান্ত স্বরে বললেন, ‘তোমার দলে এখন কতজন গেরিলা যোদ্ধা আছে, নালজোর?’
‘বিরাশি জন৷ তবে এখান থেকে যারা চলে গেছে, তাদের অনেকের সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ রয়েছে৷ তাদের ধরলে সংখ্যাটা পাঁচ শত ছাড়িয়ে যাবে৷’
‘দরকার নেই৷ যারা গেছে, তারা যাক৷’ কুনচেনের কণ্ঠ হিমশীতল এবং গম্ভীর৷
কুনচেনের এমন গম্ভীর স্বরে নালজোর যেন ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল৷ তারপর অবিশ্বাসী গলায় বলল, ‘মাত্র বিরাশি জন যোদ্ধা নিয়ে আমরা সমগ্র চিনা সেনাবাহিনীকে তিব্বতের ভূখণ্ড থেকে তাড়িয়ে দিতে পারব?’
‘পারবে৷’ কুনচেনের কণ্ঠ আগের মতোই গম্ভীর ও প্রত্যয়ী৷
সভার মাঝখান থেকে উঠে দাঁড়াল দেনজিন৷ তারপর গলায় খানিকটা শ্লেষ মিশিয়ে বলল, ‘আপনার কথা না-হয় মেনে নিলাম, কিন্তু নালজোর যে-অস্ত্রের জোরে এত বড়াই করল, সেই অস্ত্রটা তো একবার দেখান, দেখি সেই অস্ত্র কতখানি মারাত্মক! সেই অস্ত্র কতখানি বিধ্বংসী!’
কুনচেন লামা অত্যন্ত সম্মানীয় মানুষ৷ তার দিকে এমন শ্লেষ ছুড়ে দেওয়াতে সবাই দেনজিনের দিকে ফিরে তাকাল৷ কুনচেন বললেন, ‘সেই অস্ত্র চোখে দেখা যায় না৷’
দেনজিন বুঝতে পারছে সে অপ্রিয় কথা বলায় সবাই তাকে দেখছে৷ কিন্তু সে কারও তোয়াক্কা করল না৷ বলল, ‘চোখেই যদি না-দেখা যায়, সেই অস্ত্র দিয়ে চিনাসেনাদের বুক লক্ষ করে গুলি ছুড়ব কী করে? কী করে ওদের অতসব মারাত্মক অস্ত্রের মোকাবিলা করব?’
কুনচেন বললেন, ‘নালজোর, তোমাদের মধ্যে অস্ত্র চালনায় যারা সুদক্ষ, তাদের মধ্যে থেকে পাঁচজনকে তুমি বেছে দাও৷ আমি কয়েক মিনিট পর তাদের আবার তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব৷’
সবাই বিস্ময়ে কুনচেনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে৷ কুনচেন উঠে তার গবেষণা-কক্ষের দিকে চলে গেলেন৷ সঙ্গে চলল রুহ ও জাদুকর৷ ওদের চলে যাওয়ার দিকে সক্রোধে তাকিয়ে রইল দেনজিন৷
সভা থেকে বেরিয়ে গলিপথ ধরে গবেষণা-কক্ষের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে রুহ বলল, ‘যুদ্ধের উন্মাদনা আমাদের রক্তে-মজ্জায় শিকড় ছড়িয়ে বসে আছে৷ আমি শুধু লক্ষ করছিলাম—আপনার বানানো মারণাস্ত্র সম্পর্কে জানতে সবাই কী উদ্গ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে! দেনজিনের কথার ভিতর তা আরও স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছিল৷’
কুনচেন বললেন, ‘দেনজিনের কথায় আমি কিছুই মনে করিনি, রুহ৷ কারণ, ও খুব সাহসী যোদ্ধা এবং নিজের প্রাণের চেয়েও দেশকে ভালোবাসে৷ দেশের প্রতি ভালোবাসায় ওর কোনো খাদ নেই৷ তাই, ওর ক্ষোভ সংগত৷ কোন মানুষ নিজভূমে পরবাসীর মতো জীবন কাটাতে পছন্দ করে, বলতে পারো?
রুহ, আমরা তো কোনো দেশের দিকে, কোনো জনজাতির সম্পদের দিকে কোনোদিন হাত বাড়াইনি৷ আমরা আমাদের দুর্গম ভূখণ্ডে আমাদের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিলাম৷ নিজেদের বিদ্যাকে আরও শাণিত করে শান্তিময় এক জীবনের সন্ধানে জীবন অতিবাহিত করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তা আর হল কই? বারবার সাম্রাজ্যবাদী ও সম্পদলোভী শক্তির কাছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে৷ মোঙ্গলরা আমাদের পরাজিত করে শাসন করেছে৷ চিনারা আমাদের দখল করে আমাদের ওপর চূড়ান্ত নিপীড়ন, নির্যাতন করে চলেছে৷ তাহলে এই তিব্বতের মানুষ যদি স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, তা কি অসংগত? তারা যদি ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে তা কি অন্যায্য?’
গবেষণা-কক্ষে ঢুকে কুনচেন, রুহ ও জাদুকর মুখোমুখি বসল৷ কুনচেন বললেন, ‘তোমাকে কিছু জরুরি কথা বলা দরকার৷ মন দিয়ে শোনো—আমি পাঁচজন গেরিলা যোদ্ধার মধ্যে একজনকে ভাইরাস দিয়ে সংক্রমিত করব৷ বাকি চারজন সংক্রামিত যোদ্ধার সঙ্গে কয়েক মুহূর্ত থাকলে ওরাও নিজে থেকেই সংক্রমিত হয়ে যাবে৷’
‘কীভাবে?’ প্রশ্ন করল রুহ৷
‘সংক্রমিত যোদ্ধার প্রশ্বাসবায়ু থেকে৷ এই ভাইরাস মারাত্মক সংক্রামক৷ আমি তো আগেই বলেছি—তুমি যে বয়াম দেখেছ, তাতে দশখানা পৃথিবীর জনজাতিকে সংক্রমিত করা যায়৷ বরং তারও বেশি৷
এখন পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা সাড়ে সাতশো কোটির কিছু বেশি৷ এই জনসংখ্যাকে সংক্রমিত করতে মাত্র কয়েক দিন লাগবে৷’
‘কেমন করে?’
‘প্রথমত, এই ভাইরাস জল ও বায়ু বাহিত৷ জল ও বায়ুবাহিত হয়ে যে-কোনো প্রাণীদেহে সজীব হয়ে উঠবে৷ তবে পশু-পাখিদের জীবকোষে এই ভাইরাস প্রবেশ করলেও, তা তাদের মস্তিষ্কে কোনো কাজ করবে না৷ বরং তারা বাহক হিসাবে কাজ করবে৷ তাদের সংস্পর্শে আসা মাত্রই মানুষ মুহূর্তে সংক্রমিত হয়ে যাবে৷ আর মানুষ সংক্রমিত হলেই এই ভাইরাস মানুষের মস্তিষ্কের নিউরোন অর্থাৎ মানব-মস্তিষ্কের স্নায়ুকলার এককে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠবে৷
নিউরোনের তিনটি অংশ আছে৷ তাদের আবার পৃথক-পৃথক কাজ আছে—বিজ্ঞানের এতসব পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয় তোমার না জানলেও চলবে৷ শুধু জেনে রেখো—মানুষের স্মৃতি তৈরি হয় মস্তিষ্কের দুটো অংশে৷ হিপোক্যাম্পাস অংশে স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি ও কর্টেক্স অংশে দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি৷
এই ভাইরাস মানব-স্মৃতির ভিতর থেকে যুদ্ধসহ মানবকল্যাণের পরিপন্থী যে-সব স্মৃতি আছে, তাদের চিহ্নিত করে চিরকালের জন্য নিষ্ক্রিয় করে দেবে৷ অথচ এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মানবদেহে তৈরি হবে না৷ সমস্ত বিশ্বের মানব জাতি সম্পূর্ণ নতুন এক মানবজাতিতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে৷’
রুহ ও জাদুকর শুধু মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল আর যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল—কী নিঃশব্দে এই পৃথিবীর ভিতর থেকে এক নতুন পৃথিবী ক্রমশ জেগে উঠছে সৌরজগতের ভিতর! যে পৃথিবীতে মানুষ মানুষকে হত্যা করে না৷ একে অন্যের সম্পদ কেড়ে নেয় না৷ একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে নিজের রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করে না৷ পাসপোর্ট-ভিসার নামে মানুষকে সীমান্তে আটক করে না৷ যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করে না৷ যুদ্ধের আবহ নির্মাণ করে প্রতিবেশি মানুষের ভিতর ভীতির সঞ্চার করে না৷
এই নতুন পৃথিবী যেন সবার৷ সমস্ত জল, ভূমি, শস্য প্রত্যেকের৷ সম্পদের ওপর কিছুজনের দখলদারি নেই বলে কেউ অনাহারে থাকছে না৷ এই গ্রহ তন্নতন্ন করে খুঁজে একজনও শরণার্থীর দেখা মিলছে না৷ এর চেয়ে বড় স্বপ্ন আর কী হতে পারে? এর চেয়ে বড় সার্থকতা আর কাকে বলে?
কুনচেন বললেন, ‘বয়ামে যে ভাইরাস দেখেছ, ওই এক-একটি বুদবুদে কয়েক কোটি করে ভাইরাস রয়েছে৷’
‘একটা বুদবুদে এত!’ বিস্ময় রুহর গলায়৷
কুনচেন খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন৷ তারপর বললেন, ‘এত জটিল বিষয়, তোমাকে বোঝানো মুশকিল৷ তবু তোমাকে ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই, হয়তো তুমি বুঝতে পারবে—টি২ নামে একটা ভাইরাস আছে৷ যাকে ফাজ ভাইরাসও বলা হয়৷ এই ভাইরাসের দুটো অংশ৷ একটা হল মাথা, অন্যটা লেজ৷ মাথায় থাকে ডি.এন.এ, ৬০ হাজার নিউক্লিওটাইড ও ১৫০ টি জিন৷ এই মাথার দৈর্ঘ্য হল ৯৩ থেকে ১০০ ন্যানোমিটার৷ আর লেজে থাকে স্পর্শক তন্তু, বেসপ্লেট, স্পাইক বা কাঁটা৷ এই লেজের দৈর্ঘ্য হল ৯৫ থেকে ১১০ ন্যানোমিটার৷ আর প্রস্থ হল ১৫ থেকে ২০ ন্যানোমিটার৷
‘এর থেকে বুঝতে পারবে একটি ভাইরাস কতখানি ছোট৷ আমাদের ভাইরাস আকারে এই টি২ ভাইরাসেরও অর্ধেক৷ আর সবচেয়ে মজার কথা কী জানো?’
‘কী?’ জিজ্ঞাসা করল রুহ৷ সে যেন এই মুহূর্তে কুনচেন লামার বাধ্য ছাত্র৷
কুনচেন বললেন, ‘এ পর্যন্ত মানুষ ভাইরাসকে শুধুই রোগ সৃষ্টিকারী এক আণুবীক্ষনিক বস্তু বলেই জেনে এসেছে৷ এবং তা একদম ঠিক৷ আমরাই প্রথম এমন এক ভাইরাস সৃষ্টি করলাম যা মানুষের অপকারী নয় বরং ঠিক উলটো৷ এটাই একমাত্র ভাইরাস যা মানবকল্যাণকারী৷
‘সেই প্রথমদিনের কথা মনে করো—যখন জাদুকর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিল যে আজ পর্যন্ত অপকারী ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াও পাওয়া গেছে, কিন্তু আজ অব্দি এমন কোনো ভাইরাসের অস্তিত্ব মেলেনি যা মানুষের উপকার করেছে৷ জীবজগতের ভালো কোনো কাজে লেগেছে৷ বরং সমস্ত ভাইরাসই জীবজগতের ক্ষতি করেছে৷
‘ওর আশঙ্কার যুক্তিও ছিল৷ কিন্তু আমাদের গবেষণা চিরাচরিত ধারণাকে আজ বদলে দিয়েছে৷’
‘আমি রোমাঞ্চিত৷ বিস্মিত হয়ে যাচ্ছি আপনার প্রগাঢ় পাণ্ডিত্যে!’
কুনচেন মুখ দেখে বোঝা গেল তিনি সংকোচ বোধ করছেন৷ পরে বললেন, ‘শোনো রুহ, তোমাকে এতগুলো কথা বললাম তার অন্য এক কারণ রয়েছে৷’
‘বলুন৷’
‘সাড়ে সাতশো কোটি মানুষকে বদলে দিতে এত ভাইরাস লাগবে না৷ আমি অর্ধেক ভাইরাস একটি বিশেষ আধারে বন্দি করে তোমার হাতে তুলে দেব৷ সেই আধার তুমি তোমার গুহায় ফিরে গিয়ে যত্ন করে ভবিষ্যতের জন্য লুকিয়ে সংরক্ষণ করবে৷ এবং যেখানে সংরক্ষণ করবে, সেখানে গুহার গায়ে এই ভাইরাসের উপকারিতা তুমি খোদাই করে রাখবে৷ খোদাই করবে---কেন এই ভাইরাসের জন্ম হল৷ ধরো, কোনো কারণে এই গ্রহ একদিন মানব-শূন্য হয়ে গেল৷ পরে কখনো মানবের মতো কোনো জাতির জন্ম হল এবং পরে কোনো একসময় এই গ্রহের আজকের দিনের মতো সংকট তৈরি হল—হয়তো সেদিন সেই মানুষেরা এই ভাইরাস থেকে আবার এক নতুন যুগের সূচনা করলেও করতে পারে৷ আগামী কয়েক হাজার বছর পর কী হবে, তা তো আমরা কেউ জানি না৷ হয়তো সেদিন এই ভাইরাস মানুষের কল্যাণে কাজে আসতে পারে৷’
কুনচেনের এই পরিকল্পনার কথা শুনে রুহ স্তম্ভিত হয়ে গেল৷ বলল, ‘আপনার নির্দেশ অক্ষরে-অক্ষরে পালিত হবে৷’
কুনচেন হঠাৎ খুব নীচুস্বরে বললেন, ‘রুহ, পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি৷ পাঁচজন গেরিলা যোদ্ধা বোধহয় আসছে৷ শোনো, তোমাকে একটি ছোট আধারে একটি বুদবুদ দিচ্ছি, তুমি আধারটি সঙ্গে রাখো৷’ বলে কুনচেন রুহর হাতে একটি ছোট্ট আধার দিলেন৷ রুহ তা সযত্নে লুকিয়ে রাখল৷
কুনচেন বললেন, ‘আমার ধারণা—পরীক্ষার পর এই যোদ্ধারা যখন যুদ্ধাস্ত্রের কথা ভুলে যাবে, তখন অন্যান্য যোদ্ধাদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে৷ সেই সম্ভাবনা দেখলেই তুমি এই আধারটি ভেঙে দেবে৷ কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে যাবে৷ কারণ, তখন সবাই সংক্রমিত হয়ে যাবে৷’
মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল রুহ৷
নালজোর বাছাই করা পাঁচ গেরিলা যোদ্ধাকে পাঠিয়েছে৷ কুনচেন, রুহ ও জাদুকর উঠে দাঁড়াল৷ তারপর কুনচেন সেই যোদ্ধাদের একটি বিশেষ কক্ষে নিয়ে চললেন৷
আলোছায়াময় বিশেষ কক্ষে একজন গেরিলা যোদ্ধার মাথায় ধাতব-টুপি পরালেন কুনচেন৷ তারপর একটি ছোট্ট জায়গায় অল্প চাপ দিয়ে সেই টুপিটি খুলে নিলেন৷
মাত্র কয়েক মুহূর্ত৷ তারপর কুনচেন বললেন, যাও, তোমরা ফিরে যাও৷ গেরিলা যোদ্ধারা পুনরায় ফিরে গেল তাদের সঙ্গীদের কাছে৷
কিছুক্ষণ পর কুনচেন, রুহ ও জাদুকর গেরিলাদের কাছে পৌঁছালেন৷ গিয়ে যা দেখলেন, তাতে কুনচেনের আশঙ্কা মিথ্যে প্রমাণিত হল৷ যে দেনজিনকে কুনচেনকে অবজ্ঞা করতে দেখা গিয়েছিল, সে এখন একদম অন্য মানুষ৷ কারও মধ্যে অস্ত্র সম্পর্কে আর কোনো জিজ্ঞাসা নেই৷
কুনচেন ইশারায় রুহকে নিয়ে পৌঁছে গেলেন গেরিলা যোদ্ধাদের অস্ত্রাগারে৷ সেখান থেকে কয়েকটি অস্ত্র নিয়ে এসে গেরিলা যোদ্ধাদের দিকে এগিয়ে দিলেন৷
রুহ চমকে উঠল৷ দেখল, তারা অস্ত্রগুলো নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছে৷ যেন কোনো অচেনা বস্তু কেউ তাদের হাতে তুলে দিয়েছে৷ রুহর দিকে তাকিয়ে কুনচেন তখন মৃদু-মৃদু হাসছেন৷
সামান্য নাড়াচাড়া করে অস্ত্রগুলো ফেলে দিয়ে গেরিলা যোদ্ধারা রসুইখানায় চলে গেল৷ রুহ কুনচেন ও জাদুকর তাদের অনুসরণ করল৷ দেখল, তারা বার্লি ভেজে জাতায় গুঁড়ো করতে শুরু করল৷ গুঁড়ো হলে সেই বার্লিকে আবার ভাজল৷ এভাবেই তাদের প্রিয় খাবার জাম্পা তৈরি করতে লাগল৷
কুনচেন হেসে রুহকে বললেন, ‘চলো, তোমাকে আমার ভেষজ উদ্যানের কিছু অমূল্য গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই৷’
ভেষজ-উদ্যানে এসে কুনচেন একটি লতার দিকে ইঙ্গিত করলেন৷ রুহ দেখল একটি নিরীহ লতা৷ তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই৷ কুনচেন বললেন, ‘এই লতাটির নাম অ্যলিয়াম স্যার্টিভাম৷ আমি ল্যাটিন নামই বলছি, যাতে তোমার বুঝতে সুবিধে হয়৷ এই লতাটি চমৎকারভাবে জীবানু নাশ করতে পারে৷ কেউ যখন শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যায় ভোগে, মূলত যাদের হাঁপানি হয়, তাদের অসুখ নিরাময়ে এই লতা দুর্দান্ত কাজ করে৷’
কুনচেনের প্রগাঢ় জ্ঞান প্রতি মুহূর্তে রুহকে রোমাঞ্চিত করছে৷ কুনচেন এবার অন্য একটি লতা দেখালেন৷ লতাটি লম্বা৷ তার গায়ে ফুটে আছে ঘিয়ে-রংয়ের ফুল৷ কুনচেন বললেন, ‘এই লতাটির রস যদি তুমি গায়ে মেখে নাও, কোনো কীটপতঙ্গ তোমাকে কামড়াবে না৷ এর নাম হচ্ছে—বিকোনিয়া কর্কাটা৷
আবার ধরো, ওই গাছটা...’ কুনচেন আঙুল তুলে দূরের একটি গাছের দিকে ইশারা করলেন৷
রুহ সেই গাছটির দিকে তাকাল৷ কুনচেন বললেন, ‘এই গাছটির নাম—এফেড্রা সিনিকা৷ এই গাছের শুকনো ডাল ও শিকড়ের গুঁড়ো হাঁপানিতে যেমন ব্যবহার করা যায়, তেমনই মানুষের শরীরে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও ভীষণ কার্যকরী৷’
কুনচেনের ভেষজ-বিবরণ শুনতে-শুনতে একটা কথা রুহর মনে হল৷ সে কুনচেনকে বলল, ‘আপনাকে একটা কথা বলব?’
কুনচেন রুহর দিকে তাকালেন৷ বললেন, ‘বলো৷’
‘আমাদের আবিষ্কৃত ভাইরাসের একটা নাম দিলে হয় না?’
‘বাহ্! এ কথা তো আমার মনে আসেনি৷ ভাবো তো কী নাম দেওয়া যায়৷’
‘স্বপ্নবীজ৷’
‘স্বপ্নবীজ!’
‘এক্ষুনি মাথায় এল৷ ছোট্ট একটি বীজ থেকেই তো মহিরুহের জন্ম হয়, তেমনই আমাদের এই বীজ পৃথিবীর কলুষতা মুছে দিয়ে নতুন স্বপ্নের মহিরুহ গড়ে তুলবে৷ তাই মনে হল আমাদের এই ভাইরাসের নাম স্বপ্নবীজ হলে কেমন হয়?’
‘চমৎকার হবে, রুহ৷ এরচেয়ে ভালো ও উপযুক্ত কোনো নাম আমার মনে আসছে না৷ আমার মনে হয়, স্বপ্নবীজই হোক৷’
রুহর মুখে হাসি ফুটল৷ কুনচেনের উদাস দৃষ্টি যেন কোনো সুদূর সময়কে প্রত্যক্ষ করার চেষ্টা করল! যেন অস্ফুটে বললেন—স্বপ্নবীজ আগামীদিনের পৃথিবীকে স্বপ্নময় করে তুলুক৷
শৈশবের কথা খুব মনে পড়ছে রুহর৷ গির্জার কার্নিশ থেকে সুনীল আকাশের ঝকমকে রোদ্দুরে যখন পাখির দল উড়ে যেত, রুহ মনে-মনে আপশোস করত৷ ইশ! আমারও যদি দুটো ডানা থাকত! আমিও সুদূর শূন্যের ভিতর ছড়িয়ে থাকা নীল স্পর্শ করতে পারতাম৷ উড়ন্ত মেঘেদের খবর নিতে পারতাম৷ তাদের সঙ্গে বসে দু-দণ্ড গল্প করতে পারতাম৷
ভাইরাস আবিষ্কারের পর এখন ঠিক তেমনই অনুভূতি হচ্ছে তার৷ সমস্ত জগৎ, সমস্ত জনজাতির ভিতর মহাশূন্যের অনাবিল উদারতা ছড়িয়ে দেওয়া যাবে৷ মানুষ এখন মাটির বুকে আকাশের মেঘেদের মতো ঘুরে বেড়াবে৷ নির্দিষ্ট কোনো সীমান্ত মেনে চলার দায় তাদের থাকবে না৷
শীতল ঝরনার পাশে বসে ভাবছে৷ দূর থেকে কুনচেন রুহকে দেখতে পেয়ে কাছে এসে বসলেন৷ জাদুকরও কিছু পরে তাদের কাছে দাঁড়াল৷ কুনচেন বললেন, ‘এখন তোমাকে একটি পরীক্ষা দিতে হবে৷ সে পরীক্ষা অত্যন্ত যন্ত্রণাময়৷ পারবে?’
কুনচেনের কথায় বিস্মিত হল রুহ৷ বলল, ‘কীরকম পরীক্ষা?’
‘ধরো, তোমার ওপর আমি যদি কোনো শল্য চিকিৎসা করি, তুমি কি রাজি হবে?’
‘শল্য চিকিৎসা! কিন্তু আমার তো কোনো অসুখ নেই৷’
কুনচেন হাসলেন৷ বললেন, ‘কে বলেছে শুধু অসুস্থ হলেই চিকিৎসা প্রয়োজন? নীরোগ শরীরেও অনেক সময় চিকিৎসার দরকার পড়ে৷ সবচেয়ে বড় কথা—আমি তোমার জন্যই যেন বহু জন্ম ধরে অপেক্ষা করেছিলাম, কবে তুমি আসবে, কবে আমাদের পুনরায় দেখা হবে৷’
‘কী বলছেন, আপনি! আমি এই গুহায় আসার আগেও আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল? আপনি আমাকে আগে থেকে চিনতেন?’
রুহর কণ্ঠে এমন কৌতূহল দেখে পাশে বসে জাদুকর মিটিমিট করে হাসছে৷ কুনচেন বললেন, ‘একবার নয়, বহু জন্ম আমরা একসঙ্গে অতিবাহিত করেছি৷ দু-জনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানুষের জন্য কাজ করেছি৷’
রুহর মুখে আর আর কথা সরছে না৷ শুধু বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে কুনচেন লামার প্রশান্তিময় মুখের দিকে৷ কুনচেনের কথা বলার ভঙ্গিতে কোথাও মনে হচ্ছে না তিনি তিলমাত্র মিথ্যে উচ্চারণ করছেন! তাঁর দু-চোখে কোনো অসত্যের ছায়া নেই৷ বরং চোখের তারায় সততার দ্যুতি জেগে আছে৷
রুহকে স্তব্ধ দেখে কুনচেন বললেন, ‘আমি এই জন্মেও তোমার মধ্যে সমস্ত লক্ষণ সুস্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করেছি৷ তুমি অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার অধিকারী হবে৷ কিন্তু তার জন্য আমার একটা ভূমিকা আছে, আমি শুধু সেই দায়িত্বটুকুই পালন করতে চাই৷’
‘কী দায়িত্ব?’
নিজের কপালে লালচে কাটা চিহ্নটা দেখিয়ে কুনচেন বললেন, ‘এটা কী জানো?’
‘না৷’
‘তৃতীয় নয়ন৷’
‘মানে?’
‘এই তৃতীয় নয়ন নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী উন্মুক্ত করা যায়৷ এই চোখের অশেষ শক্তি৷ আমাদের দেশের উচ্চস্তরের কোনো-কোনো লামা এই তৃতীয় নয়নের অধিকারী হন৷ এই চোখের সাহায্যে তাঁরা অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ—সমস্ত দেখতে পারেন৷ তবে এটা দিয়ে তারা সাধারণ জাদু দেখান না, মানবকল্যাণের কাজ করেন৷ সাধারণ মানুষের কাছে ভেলকি দেখিয়ে এই ক্ষমতার অপব্যবহার করেন না৷’
‘আপনি কি আমাকেও তৃতীয় নয়ন দান করতে চান?’
‘তৃতীয় নয়ন কেউ কাউকে দান করতে পারে না৷’
‘তাহলে?’
‘যার নিজের ভিতরে তৃতীয় নয়নের শক্তি রয়েছে, আমার মতো শল্যবিদ তাদের সেই তৃতীয় নয়ন উন্মোচন করে দেন৷ আর কিছু না৷’
রুহ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে৷ তারপর বলে, ‘বেশ, আপনি যা চাইবেন...’
‘আমি চাইছি বলে নয়, তুমি কি চাও—আমার প্রশ্ন এটাই৷ আসলে তোমার তৃতীয় নয়ন উন্মুক্ত হলে এই জগৎ উপকৃত হবে৷ এই মানবজাতির কল্যাণ হবে৷’
‘বেশ, আমি রাজি৷’
‘মনে রেখো, এই পদ্ধতি কিন্তু যন্ত্রণাময়৷ কষ্ট সহ্য করতে হবে৷’
‘আমি পারব৷’ রুহ প্রত্যয়ের সঙ্গে বলল৷
কুনচেন খানিকক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থাকলেন রুহর দিকে৷ যেন রুহ সম্পর্কে নিজের প্রত্যক্ষ করা ধারণাগুলোকে পুনর্বার যাচাই করে নিলেন৷ তারপর বললেন, ‘চলো, তোমাকে একটা জায়গা দেখিয়ে দিই৷’
রুহ ও জাদুকর কুনচেনের সঙ্গে ঝরনার পাশ থেকে উঠে ভেষজ-উদ্যানের পাশের পথ ধরে এগিয়ে চলল৷ কিছুক্ষণ হাঁটার পর তারা কয়েকটি জমাট বাঁধা ধাতুর ঢিবির কাছে এল৷ ঢিবিগুলো দেখে চমকে উঠল রুহ৷ এত কাছে অথচ এত বছর এই গুহায় থেকেও তার নজরে পড়েনি! দেখল পাথরের ফাঁকে-ফাঁকে গলানো মোমের মতো ধাতুর তরল ঢিবিগুলোর সৃষ্টি করেছে৷ রুহকে মনোযোগ দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কুনচেন বললেন, ‘ওগুলো সোনার ঢিবি৷ এরকম তামা ও রুপোর ঢিবিও এইগুহার ভিতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে৷ আসলে এই দেশটাই তো খনিজধাতুর ভাণ্ডার৷’
সোনার ঢিবির পাশ দিয়ে যে জায়গাটায় পৌঁছাল, সেখানে আলো প্রায় নেই বললেই চলে৷ কুনচেন জানেন কোথায় মশাল রয়েছে৷ পাথরের খাঁজে আটকে থাকা একটা মশাল নিয়ে জ্বালালেন৷ রুহ ও জাদুকর সেই আলো লক্ষ করে এগিয়ে চলল৷ একসময় একটা জায়গায় পাথরের আড়ালে একটা সরু গলিমুখ চোখে পড়ল৷ কুনচেন আলো দেখিয়ে বললেন, ‘সাবধানে এসো৷ ঢোকার পথটা খুব অপ্রশস্থ৷’
রুহ ও জাদুকর এক-এক করে ভিতরে ঢুকে দেখল—জায়গাটা এক অন্ধকার ছোট্ট কোটর৷ কোনো রকমে মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে৷ কিন্তু হাত তুললে ওপরের পাথুরে ছাদে ধাক্কা খাবে৷ জায়গায়টায় খুব বেশি হলে জন সাতেক লোক ঢুকতে পারবে৷
কুনচেন বললেন, ‘রুহ, দেখে নাও৷ তোমার তৃতীয় নয়ন স্থাপনের পর এখানে তোমাকে একা মাসাধিক কাল থাকতে হতে পারে৷ অবশ্য তার আগেও তুমি সুস্থ হয়ে উঠতে পারো৷ সবটাই নির্ভর করবে তোমার শারীরিক সক্ষমতার ওপর৷
‘তবে একবার শল্যক্রিয়া হয়ে গেলে যত কষ্টই হোক তুমি কিন্তু এখান থেকে বেরোতে পারবে না৷ তোমাকে একজন নিয়ম করে খাদ্য ও পানীয় দিয়ে যাবে৷ তুমি তা গ্রহণ করেই ততদিন জীবনধারণ করবে৷ উপযুক্ত সময় হলে আমি এসে তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাব৷ আমি নিজে এসে যতক্ষণ না তোমায় এখান থেকে নিয়ে যাব, বলতে পারো, তোমাকে একরকম বন্দি হিসাবেই এখানে থাকতে হবে৷’
কথা শেষ করে কুনচেন বাইরে বেরিয়ে এলেন৷ তারপর ফিরতে-ফিরতে বললেন, ‘আজ থেকে ঠিক ছ-দিন পর তোমার তৃতীয় নয়ন উন্মোচনের শল্যক্রিয়া হবে৷ তুমি ওইদিন সূর্যাস্তের আগে এখানে এসে এই কক্ষের ভিতর আমার জন্য অপেক্ষা করবে৷’
সামনে একটা রাস্তার বাঁক৷ সেখানে এসে কুনচেন তাঁর গবেষণা-কক্ষের দিকে চলে গেলেন৷ রুহ ও জাদুকর সেই নীলচে হ্রদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ যেখানে কুনচেনের জীবন্ত ডিঙিরা সাঁতার কাটছে৷
কুনচেনের নির্দেশমতো রুহ মাথা মুড়িয়েছে৷ তারপর স্নান করছে৷ রুহ জানে, বেশকিছু দিন আর স্নানের সুযোগ পাবে না৷ তাই অনেকক্ষণ ধরে ঝরনার নীচে একটি পাথরের ওপর বসে গায়ে জল নিচ্ছে৷ কাছ দিয়েই যাচ্ছিল নালজোর৷ রুহকে দেখে বলল, ‘স্নান করে এসো৷ খুব ভালো জাম্পা বানিয়েছি৷ মাখন চায়ের সঙ্গে পেট ভরে খাওয়াব৷’
রুহ নালজোরের কথায় হাসল৷ নালজোরও হেসে চলে গেল৷
এই গোপন গুহার পরিবেশটা একদম বদলে গেছে৷ আগের মতো গেরিলা যোদ্ধাদের সেই ব্যস্ততা নেই৷ মাঝে-মাঝেই গোপন আলোচনা সভা বসছে না৷ কাউকে ঘুড়ি হাতে শশব্যস্ত হয়ে গুহার বাইরে যেতে দেখা যাচ্ছে না৷ বরং সবাই যেন এখানে বেড়াতে এসেছে—তাদের দেখে কয়েকদিন ধরে ঠিক এমনটাই মনে হচ্ছে রুহর৷
ঠিক সূর্যাস্তের পূর্বেই রুহ রওনা হল৷ পরনে তিব্বতি লামাদের মতো ইয়াকি পশমের স্কার্ট৷ স্কার্টের রং সোনালি৷ সোনালি রং তিব্বতিদের কাছে খুব পবিত্র৷
রুহ মশাল জ্বালিয়ে কক্ষের ভিতর প্রবেশ করে মশাল নিভিয়ে দিয়েছে৷ তারপর নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে নিশ্চুপ হয়ে বসেছে৷ মনে যে আতঙ্ক নেই—এমন নয়৷ কিন্তু এখন আর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অবকাশ নেই৷ সুতরাং নিজেকে মহান কুনচেন লামার ওপর শর্তহীন ন্যস্ত করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই৷ সে এখন অপেক্ষা করছে, কখন কুনচেন লামা আসবেন৷
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না৷ সন্ধে নাগাদ কুনচেন লামা কক্ষে প্রবেশ করলেন৷ হাতে একটি সুদৃশ্য কাঠের বাক্স৷ কুনচেনের সঙ্গে নালজোর ও দেনজিনকেও দেখা গেল৷ একে-একে তারা কক্ষের ভিতর ঢুকে এল৷
প্রথমেই দেনজিন মশাল থেকে একটি বড় প্রদীপ জ্বালিয়ে নিল৷ তারপর মশালটি নিভিয়ে বাইরে রেখে এল৷ নালজোর ততক্ষণে কুনচেনের নির্দেশমতো কিছু ভেষজের আরক রুহর কপালে লাগিয়ে দিল৷ আরক শুকিয়ে এলে আবার আরক লাগাল৷ এইভাবে পরপর তিনবার আরক লাগিয়ে কপালের ত্বক শুকিয়ে নিল৷ এরপর কুনচেন বললেন, ‘রুহ, সময় হয়েছে৷ মন ঠিক করে নাও৷ শান্ত হয়ে বসো৷’
নালজোর রুহর ঠিক পিছনে গিয়ে মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরল৷ কাঠের বাক্স থেকে কুনচেন একটি সোনার লম্বা টুকরো বার করল৷ যার প্রান্তভাগ অর্ধচন্দ্রাকৃতি এবং খাঁজকাটা৷ যন্ত্রটা প্রদীপশিখায় খানিকক্ষণ উতপ্ত করল৷ তারপর ঠান্ডা হলে কুনচেন সেই সোনার যন্ত্রটি ঠিক দুই ভ্রুয়ের মাঝখান থেকে ওপরে কপালের মাঝখানে বসিয়ে চাপ দিতে লাগলেন৷
প্রথমে তেমন কষ্ট হচ্ছিল না৷ মৃদু জ্বালা হচ্ছিল৷ কিন্তু এখন চামড়া ও মাংস ভেদ করে যন্ত্রটি কপালের হাড়ে গিয়ে ঠেকল৷ সঙ্গে-সঙ্গে অভিজ্ঞ কুনচেন লামার হাতও ক্ষণিকের জন্য থেমে গেল৷ ঠিক পরের মুহূর্তে হঠাৎ জোরে চাপ দিলেন কুনচেন৷ রুহর চোখ মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল৷ পরমুহূর্তেই সে চোখে নানান আলোর ফুলকি উড়ে বেড়াতে দেখল৷ দেখল, কে যেন কুয়াশার এক ফিনফিনে পর্দা তার দু-চোখে বেঁধে দিচ্ছে৷
ঠিক এই সময়েই কুনচেন যন্ত্রের ওপর আর চাপ দিলেন না৷ আলতো ধরে রাখলেন৷ তারপর একটি ছুঁচলো কাঠের টুকরো সেই যন্ত্রের মাঝের চন্দ্রাকৃতি অংশটি দিয়ে রুহর মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে সোনার যন্ত্রটি বের করে নিলেন৷
দেনজিন সঙ্গে-সঙ্গে আলাদা করে রাখা কিছু ভেষজ সেই কাঠের টুকরো ঢেকে দিয়ে পুরো কপালে বিছিয়ে দিল৷ তারপর কুনচেন নিজের হাতে সুন্দর করে কপালে সোনালি পশমের ফিতে দিয়ে বেঁধে দিলেন৷
ফিতে বাঁধা হলে নালজোর রুহর মাথা আস্তে-আস্তে শিথিল করে দিল৷ কুনচেন বললেন, ‘রুহ?’
রুহর পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে৷ রুহ সাড়া দিল৷ কুনচেন বললেন, ‘এখানে তোমাকে চোদ্দো দিন থাকতে হবে৷ তোমার কাছে কেউ আলো নিয়ে প্রবেশ করবে না৷ তোমার খাদ্য ও পানীয় নিয়ে যে আসবে সে পাথরে শব্দ করে তোমার খাবার রেখে যাবে৷ তুমি সেই সংকেত শুনে নিজের খাবার সংগ্রহ করে গ্রহণ করবে৷ সময় হলে, আমি এসে তোমাকে এখান থেকে বাইরে নিয়ে যাব৷’
রুহ চুপ করে বসে রইল৷ ক্রমশ ক্লান্তি আসছে৷ চোখে ঘুম নামছে৷ কুনচেন, নালজোর ও দেনজিন তাদের সমস্ত জিনিস নিয়ে কক্ষ ছেড়ে চলে গেল৷ রুহ আস্তে-আস্তে পাথুরে মেঝের ওপর ঘুমিয়ে পড়ল৷
কতক্ষণ ঘুমিয়েছে জানে না৷ ঘুম ভাঙল খাবার দিতে আসা যোদ্ধার শব্দে৷ রুহর খিদে পেয়েছে৷ কিন্তু খাবারের থালা নিয়ে দেখল খুব সামান্য পরিমাণ জাম্পা রয়েছে তাতে৷ সঙ্গে খুব ছোট একটি পাত্রে জল৷
রুহর খিদে মিটল না৷ আবার ঘুমোনোর চেষ্টা করল৷ অন্ধকারে সময়ের কোনো হিসাব নেই৷ কখন দিন আর কখন রাত্রি তার কোনো পার্থক্যই বোঝার উপায় নেই৷ মাঝে-মাঝে পাথরের মেঝেয় খাবারের পাত্র রাখার শব্দ হয়, তাতেই জেগে ওঠে৷ খাওয়া হয়ে গেলে ঘুমিয়ে পড়ে৷
কখনো ঘুম না-এলে মনে হয়—সে যেন অনন্তকাল এক অন্ধকূপের ভিতর শায়িত রয়েছে৷ এর থেকে পরিত্রাণের কোনো সম্ভাবনা নেই৷
একদিন দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হল৷ কক্ষের মুখে একটি আলোর বিন্দু দেখা দিল৷ রুহ তখন জেগেই ছিল৷ ভাবল, মনের ভুল৷ পরমুহূর্তেই শুনতে পেল চেনা কণ্ঠের ডাক, ‘রুহ?’
রুহ মেঝের ওপর সোজা হয়ে বসল৷
কুনচেন লামা এসেছেন! কুনচেন একদম কাছে এসে মেঝের ওপর প্রদীপ ও কাঠের বাক্সটি রেখে বললেন, ‘এই প্রদীপটি আজ থেকে তোমার কাছে থাকবে৷ ক্রমশ তোমার চোখ আবার আলোতে অভ্যস্ত হবে৷’
তারপর কুনচেন রুহর কপালে বাঁধা সোনালি ফিতেটা খুলে ফেললেন৷ ফিতে খোলার পর কাঠের বাক্স থেকে একটি তামার সরু চিমটে বের করলেন৷ কপালের ভেষজগুলো সরিয়ে কপালে গেঁথে থাকা কাঠের টুকরোটি ধরে আলতো টান দিয়ে বের করে নিলেন৷ তারপর পুনরায় নতুন ভেষজ দিয়ে সোনালি ফিতেটা পুনরায় বেঁধে দিলেন৷
রুহ দেখল, সোনালি কাঠের টুকরোটির রং আর সোনালি নেই৷ পোড়া কাঠকয়লার মতো কালো হয়ে গিয়েছে৷ কুনচেন বললেন, ‘তুমি পূর্ণজ্ঞান লাভ করেছ, রুহ৷ বাইরের জগতে বেরলেই টের পাবে৷ কিন্তু এক্ষুনি নয়৷ আরও তিনদিন তোমাকে এখানেই থাকতে হবে৷’
রুহ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল৷ কুনচেন আর কথা না-বাড়িয়ে নিঃশব্দে চলে গেলেন৷ রুহ দেখল আগের চেয়ে ব্যবস্থাটা চমৎকার৷ অন্তত আলোর প্রদীপটাকে সঙ্গী হিসাবে পাওয়া গেল৷
আগের মতো সবসময় আর ঘুমোনোর চেষ্টা করে না৷ বরং প্রদীপের আলোয় পাথুরে মেঝের ওপর যে আঁকাবাঁকা রেখা রয়েছে, সেগুলোকে মনেমনে জুড়ে নানান ছবির কল্পনা করে৷ চোখের সামনে সেই ছবিগুলো দেখতেও পায়৷ একা-একা ভারি মজার এই খেলা৷
অবশেষে তিনদিনও ফুরিয়ে গেল৷ ঠিক সতেরো দিনের মাথায় অন্ধকার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল রুহ৷ সামনে কুনচেন৷ হঠাৎ রুহ যেন আঁতকে উঠল৷ সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে—সামনে কুনচেন লামার শরীর জুড়ে তীব্র এক সোনালি জ্যোতির বলয়! রুহ আঁতকে মুখ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করতেই কুনচেন থমকে দাঁড়ালেন৷ তারপর পিছন ফিরে রুহকে জিগ্যেস করলেন, ‘কী হয়েছে, রুহ?’
রুহ বলল, ‘আপনার শরীরের চতুর্দিকে একটা উজ্জ্বল সোনালি জ্যোতির বলয় চক্রাকারে আবর্তন করছে!’
রুহর কথা শুনে মৃদু হেসে কুনচেন বললেন, ‘তোমার তৃতীয় নয়ন কাজ করছে, রুহ৷ এখন থেকে কে কেমন মানুষ, তুমি বুঝতে পারবে৷ শোনো, এক্ষুনি কাউকে দেখে তুমি কোনো কথা বলো না৷ আমার সঙ্গে এসো৷’
কুনচেন রুহকে নিয়ে তাঁর গবেষণা-কক্ষে ঢুকলেন৷ তারপর বললেন, ‘রুহ, এখন পদ্মাসনে বসো৷’
রুহ নির্দেশ পালন করল৷ কুনচেন বললেন, ‘তৃতীয় নয়ন সবসময় খুলে রাখা উচিত নয়৷ এতে মনের ও শরীরের কষ্ট বাড়ে৷ এসো, তোমাকে তৃতীয় নয়ন বন্ধ রাখার কৌশলটা শিখিয়ে দিই৷ এর ফলে তুমি নিজের ইচ্ছেমতো তৃতীয় নয়ন খুলতে পারবে৷ বাকি সময় বন্ধ রাখতে পারবে৷’
কুনচেনের কক্ষ থেকে বিকেলে বের হয়ে রুহ রসুইখানার দিকে গেল৷ তার বেশ খিদে পেয়েছে৷ পথে যাদের দেখল, সবাইকেই আজ অন্যরকম মনে হচ্ছে! সবার শরীর জুড়ে আলাদা-আলাদা রংয়ের বলয়৷ কুনচেনের কাছে জেনেছে—এইসব বলয়ের রংগুলোর অর্থ৷ এই রং থেকেই সে এখন চিনতে পারছে কে কেমন মানুষ৷
পেট ভরে খাওয়ার পর রুহ কুনচেনের বাইরের গবেষণা-কক্ষের ভিতর দিয়ে সুড়ঙ্গের সিঁড়ি পার হয়ে গোপন গবেষণা কক্ষের কাছে যে নীলচে হ্রদ রয়েছে, তার তীরে গিয়ে দাঁড়াল৷ কুনচেন আজই তাকে অনুমতি দিয়েছেন এই গোপন গবেষণা-কক্ষে যেতে।
হ্রদের তীরে দাঁড়িয়ে আশ্চর্য সমস্ত ছবি দেখতে পেল সে৷ একটি ভেষজের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল—তরুণ কুনচেন লামা সুদূর দুর্গম এক পাহাড়ি জায়গা থেকে কীভাবে এই ভেষজ সংগ্রহ করে এনে হ্রদের তীরে স্থাপন করছেন৷ ঠিক এমন সময়েই কুনচেনের গম্ভীর কণ্ঠ শুনতে পেল রুহ৷ রুহ দেখল—কুনচেন কাছে এসেছেন৷ সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘রুহ, আজই তোমায় বলেছি সবসময় তোমার তৃতীয় নয়ন খোলা রাখবে না, অদরকারে খোলা রেখেছ কেন?’
রুহ বকুনি খেয়ে সঙ্গে-সঙ্গে তার তৃতীয় নয়ন বন্ধ করল৷ তারপর কুনচেনকে জিগ্যেস করল, ‘আজ জাদুকরকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না৷ রসুইখানায় গেলাম, সেখানে নেই৷ ঝরনার কাছে গেলাম সেখানেও তাকে দেখিনি৷ চারপাশে খুঁজলাম কিন্তু দেখতে পেলাম না৷
আপনি তাকে দেখেছেন?’
রুহর কথা শুনে কুনচেন হাসলেন৷ বললেন, ‘পিছন ফেরো৷’
রুহ পিছনে মুখ ফেরাতেই দেখল—জাদুকর মৃদু-মৃদু হাসছে৷ রুহ জাদুকরকে দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল৷ যাকে এতক্ষণ ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছে, সে কিনা এত কাছে দাঁড়িয়ে আছে! জাদুকর দু-হাত বাড়িয়ে রুহকে বুকে টেনে নিল৷ বলল, ‘রুহ, মানুষ হিসাবে তুমি সার্থক৷ এবার সামনে তোমার অনেক কাজ৷ সেগুলো সম্পন্ন করতে হবে৷’
মাত্র একজন গেরিলা যোদ্ধা থেকে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে গুহার সমস্ত যোদ্ধারা যেভাবে সংক্রমিত হয়েছে, তাতে কুনচেন লামা যে তার কাজে একশো শতাংশ সফল এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই৷ মাঝখানে এতগুলো দিন পার হয়ে গেল, কিন্তু কারও কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চোখে পড়ল না৷
কুনচেনের কথাটা আবার মনে পড়ল—মানব ইতিহাসে এটাই প্রথম ভাইরাস, যা উপকারী৷ কারণ এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সমস্ত ভাইরাসই মানুষ, পশুপাখি বা উদ্ভিদের রোগের কারণ হয়েছে৷ দুনিয়ার ক্ষেত্রে ভালো করার একটিও নজির নেই৷ সেদিক থেকে আমার আবিষ্কার সম্পূর্ণ উলটো৷
চমৎকৃত হয়েছিল আগেই৷ এখন এমন ফলাফল দেখে রুহর মন আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠল৷ যে স্বপ্নের খোঁজে জাদুকরের পরামর্শে বহুবছর আগে সে পথে নেমেছিল, এত পথ পাড়ি দিয়েছিল—আজ তা পূর্ণ৷ আজ তা সম্পূর্ণ সার্থক৷
সুতরাং আর দেরি নয়৷ এবার পৃথিবীব্যাপী এই ভাইরাস ছড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে৷ ফিরে যেতে হবে নিজের গুহায়৷ মনে পড়ছে জেমিনির মুখ৷ সে নিশ্চয় তেমনটি আর নেই৷ নিশ্চয় বদলে গেছে তার শরীর৷ মন কি বদলেছে? কে জানে!
রুহ কুনচেনের অনুমতি নিয়ে এবার যাত্রা করবে৷ এদিক-ওদিক নানা জায়গায় খুঁজল কিন্তু কুনচেনের হদিশ মিলল না৷ বাইরের গবেষণা-কক্ষও ফাঁকা৷ কেউ কোথাও নেই৷ কয়েকজন গেরিলা যোদ্ধা উষ্ণ জলের স্রোতে সাঁতার কাটছে৷ হইহল্লা করছে৷ তাদেরকে জিগ্যেস করেও কুনচেনের সন্ধান মিলল না৷
রুহ বাইরের গবেষণা-কক্ষ পার হয়ে গোপন গবেষণা-কক্ষের দিকে এগিয়ে চলল৷ সঙ্গে জাদুকর৷ নীলাভ হ্রদের কাছে পৌঁছে দেখল হ্রদের জলে গোলাকার ডিঙিটি ভাসছে৷ ভাসমান সেই ডিঙির ওপর চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন কুনচেন৷
রুহ ইতস্তত করছে ডাকবে কিনা৷ জাদুকর বলল, ‘রুহ, ডাক দাও৷’
রুহ খুব আস্তে করেই ডাকল৷ রুহের ডাকে সামান্য কেঁপে উঠল ডিঙি৷ চোখ মেললেন কুনচেন৷ তারপর দাঁড়ের অল্প-অল্প টানে কিনারায় এলেন৷ কুনচেন বললেন, ‘উঠে এসো৷’
রুহ ও জাদুকর ডিঙিতে উঠলে কুনচেন বললেন, ‘রুহ, দাঁড় বাও৷ ডিঙি নিয়ে ওপারে চলো৷ গবেষণা-কক্ষে জরুরি দরকার আছে৷’
গবেষণা কক্ষে এলে, কুনচেন গোপন পাথর ঢাকা খাঁজের ভিতর থেকে দুটো আধার নিয়ে এলেন৷ সঙ্গে খুব ছোট-ছোট শতাধিক আধার৷ তারপর রুহর হাতে দিয়ে বললেন, ‘এই সোনার আধারটি ভবিষ্যতের জন্য তোমার গুহায় সংরক্ষণ করবে৷ আর, এই তামার আধারটি থেকে সমস্ত পৃথিবীতে ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে৷ আর সঙ্গে যে খুব ছোট-ছোট সোনার আধারগুলো দিচ্ছি, প্রথমে এগুলো থেকে ভাইরাস ছড়াবে বিভিন্ন মানুষকে দিয়ে৷ কাজটা এই গেরিলা যোদ্ধাদের দিয়েই শুরু করতে পারো৷
‘ছোট-ছোট আধারগুলো ফুরিয়ে গেলে তামার আধার খুলবে৷ ওখানেও দেখবে এমন ছোট-ছোট আধারে পূর্ণ৷’
রুহ বুঝতে পারল, কুনচেন লামা সমস্ত পরিকল্পনা আগাম করে রেখেছেন৷ তাকে কেবল নির্দেশমতো কাজ করে যেতে হবে৷ রুহ বলল, ‘তাহলে আমি কবে যাত্রা করব?’
এই প্রথম রুহর কথায় অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন৷ তারপর মৃদু হাসি ফুটে উঠল তাঁর ঠোঁটে৷ বললেন, ‘ইচ্ছে হলে আগামীকালই যাত্রা করতে পারো৷’
এত বছর পর গুহার বাইরে আবার পা রাখবে ভাবতে আনন্দ যেমন হল, পাশাপাশি এত বছরের গুহা থেকে বিদায় নেওয়ার কথা ভেবেও মন খুব বিষণ্ণ হয়ে উঠল৷
তিনজন সমস্ত আধারগুলো নিয়ে হ্রদের অন্য প্রান্তে পৌঁছে গেল৷ হ্রদের কিনারায় দাঁড়িয়ে কুনচেন একটি আশ্চর্য কাণ্ড করলেন! ডিঙিটির খোল জলপূর্ণ করলেন৷ রুহ জিগ্যেস করল, ‘আপনি ডিঙিতে জল ভরে দিচ্ছেন কেন?’
রুহ ও জাদুকর দেখল হ্রদের জলে ডিঙিটি তলিয়ে গেল৷ ডিঙিটি ডুবে যাওয়ার পর কুনচেন বললেন, ‘এখন নয়৷ একদিন তুমি নিজেই এর কারণ খুঁজে পাবে৷’
রুহ ও জাদুকর বাইরের গবেষণা-কক্ষ থেকে বিদায় নিলে কুনচেন তাঁর পাথরের বেদিতে টানটান হয়ে শবাসনের ভঙ্গিতে শুয়ে পড়লেন৷ উন্মুক্ত করলেন তাঁর তৃতীয় নয়ন৷
ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে সুদীর্ঘ এক মহাকাশ৷ কত গ্রহ কত নক্ষত্র কত সৌরজগৎ সেই অনন্ত শূন্যে ঝলমল করছে! কুনচেন নির্বাক হয়ে তাদের আলোর খেলা দেখতে লাগলেন৷ তারপর হঠাৎ দেখলেন একটি সাদা আলোর বলয় ওপরের দিকে উঠছে৷ সেই আলোর বলয় থেকে সোনালি রংয়ের একটি অতিসূক্ষ্ম সুতো পাথরের বেদিতে নিজের শায়িত শরীরের সঙ্গে জুড়ে আছে৷
আলোর বলয়টি যখন আরও কিছুদূর শূন্যে উঠে গেছে, ঠিক সে-সময় হঠাৎ বুকে একটা তীব্র চাপ অনুভব করলেন৷ হাত, পা, সমস্ত শরীর দৃঢ় হয়ে উঠল৷ পরমুহূর্তেই মাথার ভিতর কে যেন জোরাল বিদ্যুতের ঝলক ছুঁয়িয়ে দিল৷ সঙ্গে-সঙ্গে চোখের সামনে কালো কুয়াশার আস্তরণে ঢেকে গেল৷
কয়েক মুহূর্ত চোখের সামনে শুধুই কালো রংয়ের শূন্যতা৷ ক্রমশ সেই অন্ধকারের কুয়াশা ফিকে হতে থাকল৷ কুনচেন এখন অনেক ওপরে৷ কখন যেন অতিসূক্ষ্ম সোনালি সুতোটি দেহবিযুক্ত হয়ে নিজস্ব আলোর বলয়ে মিশে গেছে! ওপর থেকে তাকিয়ে দেখলেন ভূগর্ভস্থ গুহার একটি কক্ষের পাথুরে বেদিতে তাঁর নিঃশব্দ শরীর সাড়হীন হয়ে পড়ে আছে৷
মধ্যরাতে কুনচেনের দেহ যখন সাড়হীন জড়ত্ব গ্রহণ করল, ঠিক সেই সময় রুহ ও জাদুকর তাদের রুকস্যাকে কুনচেনের দেওয়া আধারগুলো সযত্নে গুছিয়ে রাখছে৷ রুহ বলল, ‘আমাদের যাত্রার প্রস্তুতি তো সম্পূর্ণ৷ সকালের আলো ফুটলেই আমরা কুনচেনের সঙ্গে দেখা করে সমস্ত গেরিলা সদস্যদের নিয়ে বেরিয়ে যাব৷ খুব নিষ্ঠার সঙ্গে সমস্ত দুনিয়ায় স্বপ্নবীজগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে৷’
জাদুকর এ-কথার কোনো সরাসরি উত্তর দিল না৷ বলল, ‘সকাল হোক৷ তখনকার ভাবনা তখন ভাবলেই চলবে৷’
নতুন উত্তেজনায় রুহর দুচোখের পাতা এক হল না৷ রুহ দেখল, জাদুকর নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে৷ ঘুমন্ত জাদুকরকে দেখে বেশ অবাক হল রুহ৷ খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে তার অবয়বকে যখন দেখছে, তখন একবার খুব চেনা মনে হচ্ছে, পরক্ষণেই এমন মনে হচ্ছে যে, এই মানুষটিকে সে পূর্বে কোনোদিন দেখেনি!
রুহ ভাবল, এমনই হয়তো হয়৷ জগৎ জুড়ে অচেনার ভিতর সমস্ত চেনা যেমন জেগে থাকে, একইভাবে সমস্ত চেনার ভিতর অচেনাও সন্তর্পণে থেকে যায়৷ অনেকটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বকেই কখনো-কখনো খুব অচেনা মনে হয়—সেরকম৷
গুহার ভিতর আলো ফুটে উঠেছে৷ কিছু আগে জাদুকর ঘুম থেকে উঠে চুপ করে বসে আছে৷ রুহ বলল, ‘জাদুকর, তৈরি হয়ে নাও৷ যাত্রার সময় আসন্ন৷’
জাদুকর বলল, ‘নতুন করে তৈরি হওয়ার আর কী আছে? চলো, আগে মহান কুনচেন লামার অনুমতি নিয়ে আসি৷ তারপর বেরিয়ে যাব৷’
‘বেশ৷ আমি কিন্তু সমস্ত গেরিলা সদস্যদের বলে রেখেছি৷ ওরাও তৈরি হয়ে আমার নির্দেশের অপেক্ষা করবে৷ চলো, এখন কুনচেনের কাছে যাই৷’
রুহ ও জাদুকর গবেষণা-কক্ষের দিকে হাঁটতে থাকল৷ গবেষণা-কক্ষের কাছে এসে প্রথম ভিতরে ঢুকল রুহ৷ পিছনে জাদুকর৷ রুহ দেখল, নগ্ন কুনচেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন৷ তাঁর পাথরের বেদির ওপর টানটান হয়ে ঘুমিয়ে রয়েছেন৷ পায়ের দিকে তার পোশাক খুলে রাখা আছে৷
রুহ ইতস্তত করছে। একে নগ্ন, তার ওপর এত গভীর ঘুমে থাকা কুনচেন লামাকে ডাকা উচিত হবে কী হবে না ভেবে৷ জাদুকর বলল, ‘রুহ, তিব্বতের কোনো মানুষ পোশাক পরে ঘুমোয় না৷ তোমার দ্বিধা থাকা উচিত নয়৷ এটা খুব সাধারণ ব্যাপার৷ তুমি একবার ডেকে দেখো৷’
রুহ খুব মৃদুস্বরে ডাক দিল৷ কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া মিলল না৷ জাদুকর বলল, ‘রুহ, এবার ওঁর পায়ে হাত দাও৷’
রুহ জাদুকরের দিকে একবার মুখ ফিরিয়ে তাকাল৷ তারপর আলতো হাত রাখল কুনচেনের পায়ে৷ হাত রেখেই চমকে উঠল৷ হিমশীতল পা৷ রুহর ভ্রু কুঁচকে উঠল৷ পিছন থেকে জাদুকর বলল, ‘কুনচেন লামা আর কোনোদিন ঘুম থেকে উঠবেন না৷ উনি এখন অন্য জগতের বাসিন্দা৷’
জাদুকরের কথায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হল রুহ৷ জাদুকর রুহকে বলল, ‘এসো আমার সঙ্গে৷’
গেরিলা যোদ্ধারা সমস্ত দেখার পর আলোচনায় বসল—কীভাবে কুনচেনের সৎকার করা হবে৷ গুহা এখন শোকস্তব্ধ৷ নালজোর বলল, ‘নিয়ম অনুযায়ী লামার দেহটি আমরা একটি সাদা কাপড়ে মুড়ে ওই গবেষণা-কক্ষেই রেখে দেব৷ তারপর কপালে ছিদ্র করে ওঁর আত্মাকে বাইরের জগতে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করে দেব৷’
সবাই সম্মতি দিল৷ সবাই সম্মত দেখে দেনজিন বলল, ‘কয়েকদিন পর আমরা গুহার বাইরে বরফের প্রান্তরে একটি পাথরের খণ্ডের ওপর রেখে টুকরো-টুকরো করে শকুনদের আহ্বান করব৷ শকুনরা আমাদের দেবদূত৷ ওরাই কুনচেনকে তাঁর নির্ধারিত স্বর্গে পৌঁছে দেবে৷’
এতক্ষণ রুহ ও জাদুকর একটিও কথা বলেনি৷ দেনজিনের কথা শেষ হতেই জাদুকর অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বলে উঠল, ‘না৷’
রুহ জাদুকরের এমন গম্ভীর কণ্ঠস্বর আগে কোনোদিন শোনেনি৷ জাদুকরের গলার শব্দে গুহার কক্ষটি যেন গমগম করে উঠল৷ সবাই বিস্ময়ে জাদুকরের মুখের দিকে তাকাল৷ জাদুকর বলল, ‘কুনচেন কোনো সাধারণ দেহ নয়৷ অবতারের দেহ৷ আর অবতার লামার কখনো এমন সাধারণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হতে পারে না৷’
নালজোর বলল, ‘তাহলে?’
‘অবতার লামাদের ক্ষেত্রে যা হয়, ঠিক সেটাই হবে৷ মহান কুনচেন লামার দেহ সংরক্ষিত করে সোনার অবয়ব দান করা হবে৷ তারপর তা কাচের আধারে রেখে এই গুহায় স্থাপন করতে হবে৷’
দেনজিন বলল, ‘এই সংরক্ষণের তো বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে, আমাদের মধ্যে সেই পদ্ধতি তো কেউ জানে না৷ তাহলে?’
‘আমি জানি৷’ বলল জাদুকর৷
সবাই গভীর বিস্ময়ে তাকাল জাদুকরের দিকে৷
জাদুকর সভা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তোমরা আমাকে সাহায্য করো৷ দেহ সংরক্ষণের সমস্ত সরঞ্জাম সংগ্রহ করে আমি দ্রুত ফিরে আসছি৷’
কথাটি বলেই জাদুকর সভাস্থল ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷
প্রায় দশ দিন লাগল কুনচেনের পার্থিব দেহকে সংরক্ষিত করতে৷ রুহ শুধু প্রবল বিস্ময়ে এই ক-দিন জাদুকরের কার্যকলাপ খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখেছে৷ শুধু রুহই নয়, গুহার সবাই বিস্ময়ে হতবাক! দেহ সংরক্ষণের এমন জটিল পদ্ধতি ও জ্ঞান ভিনদেশি এক জাদুকর অর্জন করল কী করে?
রুহ জানতে চেয়েছিল৷ জাদুকর মৃদু হেসে এড়িয়ে গেছে৷ কোনো প্রশ্নেরই কোনো সদুত্তর দেয়নি৷ নিজের হাতেই তুখোড় শল্যবিদের মতো কুনচেনের দেহের ভিতর থেকে সমস্ত অংশ বার করে একটি কাচের আধারে রেখে শরীরের খোলের মধ্যে নানান ভেষজ ও খনিজ পদার্থ দিয়ে পূরণ করেছে, শরীরে যাতে পচন না হয় এবং শরীরের আকৃতির যাতে কোনো বদল না ঘটে৷ তারপর বিশেষ এক ধরনের খনিজগুঁড়ো সেই মৃতদেহে মাখিয়ে এক সপ্তাহ ধরে গুহার একটি বিশেষ প্রকোষ্ঠে নির্দিষ্ট মাত্রার আগুনে সেঁকেছে৷ এর ফলে শরীরটা শক্ত হয়ে গেছে৷ দেখে মনে হচ্ছে কুনচেন যেন পদ্মাসনে বসে হাসছেন!
জাদুকর সোনার ঢিবি থেকে সোনা সংগ্রহ করে তা গলিয়ে পাতলা পাত তৈরি করেছে৷ এসময় রুহ খুব সাহায্য করেছে জাদুকরকে৷ রুহ তার শৈল্পিক দক্ষতায় নিপুণভাবে কুনচেনের দেহ সেই সোনার পাত দিয়ে আচ্ছাদিত করে দিয়েছে৷ তারপর মস্ত কাচের আধারে কুনচেনের স্বর্ণমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে৷ এখন সোনালি-রংয়ের ঝলমল করা মূর্তিটি দেখে মনে হচ্ছে কুনচেন যেন পুনরায় জীবিত হয়ে উঠেছেন৷ যেন জীবন্ত কুনচেন লামা পদ্মাসনে বসে জগতের সমস্ত জটিলতাকে তুচ্ছ করে পবিত্র হাসি দিয়ে জগৎকে আলোকিত করছেন!
নালজোর জিগ্যেস করল, ‘জাদুকর, এই মূর্তি স্থাপন করা হবে কোনখানে? একটা উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করতে হবে৷’
জাদুকর বলল, ‘স্থান নির্বাচন করা আছে৷’
‘কোথায়?’
‘রুহ গুহার যে-দেওয়ালে লাসার পোতালার ছবি এঁকেছে৷ কুড়ি বছরের অক্লান্ত শ্রমে যে ছবিকে রুহ প্রাণবন্ত করে তুলেছে, সেই ছবির সম্মুখে কুনচেনের এই জীবন্ত মূর্তি স্থাপন করা হবে৷ মনে হবে যেন—মহান কুনচেন লামা দু-চোখ ভরে লাসার পবিত্র পোতালা প্রাসাদ দেখছেন৷’
জাদুকরের পরামর্শ অনুযায়ী পোতালা প্রাসাদের ছবির সামনে কুনচেনের মূর্তি স্থাপন করার পর রুহ সবার উদ্দেশে বলল, ‘এবার আমরা সবাই এই গুহা ত্যাগ করব৷ তোমরা কি কেউ এই গুহায় থাকতে চাও?’
কেউই আর এখানে থাকতে চায় না৷ রুহ বলল, ‘শোনো, মহাত্মা কুনচেন আমাকে কিছু বিশেষ আধার দিয়েছেন৷ সেই আধারগুলোর ভিতর আবার অসংখ্য বুদবুদের মতো ছোট-ছোট গোলাকার বল পাবে৷ সেই প্রত্যেকটি বলের মধ্যে রয়েছে এক আশ্চর্য জাদু৷ আমাদের কাজ হবে আধার থেকে একটি-একটি বল বার করে তা ভেঙে বাতাসে, নদী-সমুদ্র-ঝরনার জলে এবং পশুচারণের ভূমিতে যে দলে-দলে পশু চরে বেড়াচ্ছে তাদের মাঝে ভেঙে দেওয়া৷’
নালজোর বলল, ‘এ আর এমন কী কঠিন কাজ?’
রুহ বলল, ‘আমাদের এখানে যারা আছে, তারা সবাই ঘুড়ি ওড়ানোয় দক্ষ৷ প্রত্যেকের কাছে আমি একটি করে আধার দেব৷ তোমরা ঘুড়ি নিয়ে যে-যতদূর পারবে শূন্যে উঠে যাবে৷ যখন বুঝবে সর্বোচ্চ শূন্যে পৌঁছেছ, তখন সেই বাতাসের মধ্যে একটি বা দুটি বল ভেঙে বাতাসের সঙ্গে মিশিয়ে দেবে৷
‘পরে ঘুড়ি থেকে নেমে তোমাদের এক-একজনকে শত-শত মাইল হেঁটে যেতে হবে৷ পথে যত নদী, জলাশয়, ঝরনা পাবে, চারণরত পশুদের দল পাবে, সেখানে একটি করে বল ভেঙে দিতে হবে৷
‘আর শেষ কথা হল—সবাই একদিকে গেলে হবে না৷ বিভিন্ন দিকে যাত্রা শুরু করতে হবে৷ যতদিন না আধারের বলগুলো সমস্ত খরচ হচ্ছে ততদিন ফেরা চলবে না৷ এই হচ্ছে মহান কুনচেন লামার আদেশ৷’
দেনজিন বলল, ‘বেশ মজার খেলা৷ কত নতুন-নতুন জায়গায় আমাদের যাওয়া হবে!’
রুহর নির্দেশমতো পরদিন সকালেই সবাই গুহার বাইরে বেরিয়ে এল৷ বহু বছর পর গুহার বাইরে বেরিয়ে আশ্চর্য এক আনন্দময় অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল রুহর দেহ মনে৷ সুদীর্ঘ পাহাড়ি প্রান্তর৷ বড়-বড় পাহাড়ের গায়ে সাদা বরফের ছেঁড়া-ছেঁড়া টুকরো লেগে আছে৷ এখন বোধহয় গরমকাল! তাই সেভাবে জমাট বরফ কোথাও নেই৷ রুহ যখন প্রথম এই গুহায় প্রবেশ করেছিল, তখন ছিল শীত৷ তাই তখনকার প্রকৃতি ছিল ভিন্ন৷ এখন বাইরের প্রকৃতি অন্যরকম৷ নির্জন পাথুরে প্রান্তরে বরফের দাপট ততখানি নেই৷ তবে হিমেল হাওয়ার প্রকোপ যথেষ্ট৷
রুহ প্রত্যেককে একটি করে ছোট-ছোট সোনার আধার দিয়েছে৷ গুহার বাইরে দাঁড়িয়ে রুহ শেষবারের মতো গুহার প্রবেশ পথের দিকে তাকাল৷ ক্ষণিকের জন্য বেশ মনখারাপ হয়ে গেল৷ গুহার ভিতর বহুবছর পূর্বে যেমন কুনচেন লামার একক রাজত্ব ছিল, এখনও তাই থাকল৷ আজ সবাই গুহা ছেড়ে চলে যাচ্ছে৷ কেবল কুনচেন লামাই যেন একা চিরকালের জন্য গুহার ভিতর পদ্মাসনে বসে থাকলেন নিজের গবেষণার জন্য! থেকে গেলেন তাঁর প্রিয় গুহার ভিতর নিজস্ব জগৎ নিয়ে৷ জ্ঞান-তপস্বী এই মহান লামার জন্য মনের ভিতর গভীর বেদনা অনুভব করল রুহ৷
এদিকে রুহর নির্দেশ পেয়ে ছোট-ছোট দলে ভাগ হয়ে ঘুড়ি নিয়ে নীল আকাশের বুকে উঠে যাচ্ছে গেরিলা যোদ্ধারা৷ ঝকঝকে রোদ্দুরময় নির্জন আকাশের বুকে উড়ন্ত মানুষের দল! সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণির চুড়োগুলোর ফাঁক দিয়ে ঝাঁক বেঁধে উড়তে-উড়তে সুদূরের দিকে ক্রমশ নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছে—এ এক অদ্ভুত ও চমৎকার দৃশ্য৷
উড়ন্ত মানুষগুলোর দিকে হাত তুলে কুর্নিশ জানাল রুহ৷ সবাই দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে রুহ বলল, ‘চলো জাদুকর, এবার আমাদের পথচলা শুরু হোক৷
জাদুকর বলল, ‘আমরা যে-পথ দিয়ে এই পাহাড়ি প্রান্তর অতিক্রম করে গোপনে এসেছিলাম, এবার সেই পথ দিয়ে যাব না৷ বরং বামদিকে সরে গিয়ে লোকালয় ছুঁয়ে-ছুঁয়ে যাব৷ তাহলে একদিকে আমাদের আশ্রয় যেমন মিলবে, তেমনই আমাদের উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হবে৷’
‘বেশ, তবে তাই হোক৷’ সম্মতি জানাল রুহ৷
রুহ ও জাদুকর ফেরার পথে নামল৷ দুদিন হাঁটার পর দেখতে পেল প্রথম জনপদ৷ পাহাড়ের গায়ে ধাপে-ধাপে কাঠের ঘরবাড়ি৷ শস্যখেত৷ তুষারহীন গাছপালায় ঝকঝক করছে রোদ্দুর৷ পাহাড়ের ঢালে সবুজ তৃণভূমি জুড়ে নিশ্চিন্তে চরে বেড়াচ্ছে পশুদের দল৷ দু-একজন মেষপালক সবুজ তৃণভূমির ওপর গা এলিয়ে রোদ্দুর পোহাচ্ছে৷
রুহ ও জাদুকর এভাবেই পার হয়ে যাচ্ছে একের পর এক জনপদ, পাহাড়ি গ্রাম, নিত্যনতুন মহল্লা৷ সূর্যাস্তের আগে পর্যন্ত বিশ্রামের অবকাশ নেই৷ কেবল সন্ধে নামলে কাছে যে জনপদ পড়ে সেখানেই রাত্রিটুকু বিশ্রামের জন্য কাঁধের ঝোলা নামিয়ে রাখে৷
সপ্তাহ পার হয়ে গেল৷ আজ একটা সুন্দর জায়গায় এসে পৌঁছেছে রুহ ও জাদুকর৷ সুন্দর এই জন্য যে এখানে ঠান্ডার প্রকোপ তুলনায় কম৷ কারণ বরফ আচ্ছাদিত দীর্ঘ পাহাড়শ্রেণির চুড়োগুলো ক্রমশ দূরে সরে গেছে৷ নাহলে পাহাড়ি জনপদগুলো অল্পবিস্তর একই ধাঁচের৷ পাহাড়ি উপত্যকা আলোতে ঝকঝক করছে৷ এখানে বরফের চিহ্নমাত্র নেই৷ পপলার, উইলো, জুনিপারের শাখায়-শাখায় ঝলমল করছে মিষ্টি হলুদ রোদ৷ ঢেউ খেলানো তৃণভূমির ওপর পশুদের দল নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ পাহাড়ের গায়ে শান্ত গ্রামগুলোকে রঙিন ছবির মতো মনে হচ্ছে৷ বিশেষত একতলা-দোতলা কাঠের বাড়িগুলোর রঙিন কার্নিশের জন্য৷ প্রায় একই দৃশ্য পথের দুপাশে।
দিনের পর দিন পথ চলা৷ তবে শরীরে সেভাবে ক্লান্তি আসেনি৷ পথ যখন অচেনা থাকে, তখন আসল দূরত্বের চেয়ে সেই পথকে দীর্ঘ মনে হয়, কিন্তু ফেরার সময় সেই পথই আবার হ্রস্ব হয়ে ওঠে—পথিকদের মনের এ-এক আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য!
কুড়ি বছর আগের রুহ এবং আজকের পথিক রুহের মধ্যে অনেক পার্থক্য৷ সময়, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শুধু ভিতরে নয়, মানুষের বাইরেও অনেক পরিবর্তন আনে৷ সেদিনের রুহ ছিল অপেক্ষাকৃত চঞ্চল৷ তরুণ-বয়সের দীপ্তিতে উজ্জ্বল রোমাঞ্চপ্রিয় যুবক৷ আজকের রুহের মধ্যেও উজ্জ্বলতা আছে৷ কিন্তু তা অনেক চিন্তাশীল৷ গভীর ও পরিমার্জিত৷ সে যেন দীর্ঘ তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করা কোনো এক সৌম্য সন্ন্যাসী৷ যে কেবল নিজের জন্য নয়, জগতের কল্যাণে বাকি থেকে যাওয়া কাজের জন্যই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে৷ শান্ত ভঙ্গিতে পার হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি নির্জনতা৷ গিরিসংকট, ঝরনা, তৃণভূমি৷ লোকালয় থেকে আর-এক লোকালয়৷
পাহাড়ের পর পাহাড়ে ভিন্ন পথ ধরে এলেও অবশেষে সেই পুরোনো মরুভূমির প্রান্তে এসে হাজির হল রুহ ও জাদুকর৷ কারণ, ওপারে পৌঁছানোর জন্য এ-পথেই সবচেয়ে কম বালুভূমি পার হতে হবে৷ এখান দিয়ে গেলে পথের মাঝে পুরোনো মরুদ্যানে বিশ্রাম নেওয়া যাবে৷ মরুদ্যান রুক্ষ পথের কষ্ট অনেক লাঘব করে দেয়৷ পরের দিনের যাত্রার জন্য সতেজ করে তোলে৷ তাছাড়া, এই পথ দিয়ে পার হলে সূর্যসাপ উপজাতির গোষ্ঠীগুলোর সন্ধান মিলবে৷ তাই অনেক ভেবেচিন্তে জাদুকর এই পথটাই বেছে নিল৷
যে-পাহাড়ি উপত্যকার পর থেকে মরুভূমি শুরু হচ্ছে, সেখানে জায়গাটা খুব রুক্ষ৷ গাছপালা বিশেষ নেই৷ সামনে শুধুই বালির সাম্রাজ্য৷ পথ সামান্য হলেও পাহাড়ি পথের তুলনায় বালিতে হেঁটে যেতে কষ্ট হয় বেশি৷ তবে রুহ ঠিক করেছে—মাঝের মরুদ্যানে একদিনের বেশি বিশ্রাম নেবে না৷ জেমিনিরি জন্য মনের ভিতর এক বিশেষ আকুলতা তৈরি হয়েছে৷
মরুর বুকে পা রাখার আগে একটি গাছের নীচে খানিক জিরিয়ে নিচ্ছে রুহ ও জাদুকর৷ রুহ একটু আফশোশের সুরে বলল, ‘আমার একটা ভুল হয়ে গেছে, জাদুকর৷’
‘কী ভুল?’ জাদুকর কৌতূহলী হল৷
‘কুনচেন আমাকে শ্বাস-প্রশ্বাসের বিশেষ কিছু ক্রিয়া শিখিয়ে ছিলেন৷ আমি যদি তোমাকে সেইসব ক্রিয়াগুলো শিখিয়ে দিতে পারতাম, তাহলে এই পথ-চলা অনেক সহজ হয়ে যেত৷’
‘তাই! তাহলে এখন তো শিখিয়ে দিতে পারো৷’
‘এই পথ চলতে-চলতে তা সম্ভব নয়৷ অনেকদিন সময় লাগে৷ তাছাড়া নিষ্ঠা ভরে দীর্ঘদিন অভ্যাস করলে তা একজন মানুষের আয়ত্তে আসে৷’
বেশ হাওয়া বইছে৷ রুহ ও জাদুকর দেখতে পাচ্ছে সেই হাওয়ায় মাঝে-মাঝেই বালির হালকা ঢেউ উড়তে-উড়তে কিছুদূরে গিয়ে পড়ছে৷ আবার নতুন বালির ঝাঁক হাওয়ার সঙ্গে কিছুদূর ভেসে যাচ্ছে৷ রুহ ইশারা করল জাদুকরকে৷ জাদুকর তার রুকস্যাকে রাখা ছোট একটি আধার বার করে একটি বল হাওয়ার ভিতর ভেঙে দিল৷ তারপর পুনরায় আধারটি রুকস্যাকে রেখে বলল, ‘শ্বাস-প্রশ্বাস কীভাবে আমাদের পথ-চলাকে সহজ করে দিত?’
রুহ বলল, ‘শ্বাস-প্রশ্বাসের অসীম ক্ষমতা৷’
‘কী রকম?’
‘ধরো কোনো একটি ভারী বস্তু তুমি মাটি থেকে দু-হাত দিয়ে টেনে তুলতে পারছ না, তুমি বুকের ভিতর বেশকিছুটা বাতাস ভরে দম আটকে বস্তুটাকে টান দাও, দেখবে তোমার গায়ের জোর বহুগুণ বেড়ে গেছে৷’
‘হুম৷ ঠিকই বলেছ৷ ব্যাপারটা তো আগে ভেবে দেখিনি৷’
‘ঠিক সে-রকম শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে অনেক দুরূহ কাজ করা যায়৷ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ষোলো-সতেরো হাজার ফুট উচ্চতায় শুধু এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বহু তিব্বতি লামা নগ্ন শরীরে তাপ-সঞ্চার করে পাথর-কঠিন বরফ গলিয়ে দিতে পারত৷’
রুহর কথা শুনে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে যায় জাদুকরের মুখ৷ রুহ বলে, ‘আবার এই শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল আয়ত্ত করেই একশ্রেণির লামা দ্রুত পথ পার হতে পারত৷
‘তারা ঝড়ের গতিতে ছুটে যেতে পারত৷ মাটিতে পা পড়ত না, এত গতি! তৃতীয় নয়ন দিয়ে দেখে নিজেদের গন্তব্য স্থির করে দৌড় শুরু করত৷ তখন কিন্তু তারা অর্ধচেতন অবস্থায় থাকত৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টার দৌড়েও তারা মোটেই ক্লান্ত হতো না৷’
‘অবিশ্বাস্য!’
‘ঠিকই৷ অবিশ্বাস্য মনে হবে সাধারণ মানুষের কাছে৷ সাধারণ মানুষ ভাববে এ-বোধহয় রূপকথার গল্প! কিন্তু তা নয়৷ এ-ও এক বিজ্ঞান৷ যা প্রচুর অনুশীলন করে অধিগত করতে হয়৷ প্রাচ্যের এমন অভাবনীয় বিজ্ঞানকে পাশ্চাত্য কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেয়—এটাই আমাকে আজকাল দুঃখ দেয়৷ বিমর্ষ করে তোলে৷ দৌড়বাজ ওই লামাদের কী বলে, জানো?’
‘কী?’
‘আর্জোপা৷’
‘ঠিক সময়ে আমাকে শেখানোর কথা যখন তোমার মনে পড়েনি, এখন আপশোস করে কী করবে! তবে জীবনের অন্য সময়ে এই জ্ঞান নিশ্চয় তোমার কাজে লাগবে৷’
মৃদু হাসল রুহ৷ তারপর জাদুকর বলল, ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, তোমার একটু ভুল হচ্ছে, রুহ৷’
‘কেন?’
‘যাঁরা আর্জোপা, তাঁরা গন্তব্য ঠিক করতেন তাঁদের তৃতীয় নয়নের সাহায্যে৷ অমি যদি তোমার কাছে শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল শিখেও নিতাম, গন্তব্য ঠিক করতাম কীভাবে? আমি তো আর তোমার মতো তৃতীয় নয়নের অধিকারী নই৷’
রুহ চুপ করে গেল৷ জাদুকরের কথা যুক্তিপূর্ণ৷ রুহ বলল, ‘ঠিকই বলেছ, জাদুকর৷’
জাদুকর হেসে বলল, ‘তাহলে আর আপশোস করে লাভ নেই৷ চলো, ওঠো৷ সকালের এই মিঠে রোদকে কাজে লাগাই৷ দেরি করলে রোদের তেজ বাড়বে৷ যত দ্রুত সম্ভব পা চালিয়ে দুপুরের মধ্যেই চেষ্টা করতে হবে মরুদ্যানে পৌঁছানোর৷’
উঠে দাঁড়ায় দু-জন৷ দিগন্ত বিস্তৃত বালির বুকে শুরু হয় আবার পথ চলা৷
বেশ কয়েক ঘণ্টা পথ চলার পর, যখন চতুর্দিকে শুধু বালি আর বালি, তখন জাদুকর মজা করে বলল, ‘রুহ, আজ আর মাথার ওপর অতিকায় কোনো পাখি দেখতে পাচ্ছ না তো?’
রুহ জাদুকরের রসিকতা বুঝল৷ সেদিন ছিল চোখের ভুল৷ আজ শরীর ও মন অন্যরকম৷ যেন সদ্য স্নান করে উঠেছে, এতটাই ক্লান্তিহীন৷ কিছুক্ষণ পর রুহ বলল, ‘পাখি দেখতে না-পেলেও, বালির পাহাড়টা দেখতে পাচ্ছি৷ দেখ তো, আমরা বোধহয় মরুদ্যানের কাছাকাছি চলে এসেছি৷’
জাদুকর চোখ তুলে তাকাল৷ তার মুখে স্বস্তির হাসি৷ বলল, ‘ঠিক৷ ওটা মরুদ্যানের এ-প্রান্তের বালির পাহাড়৷’
খালি চোখে পাহাড়কে যত কাছে দেখা যায়, যত দ্রুত তার কাছে পৌঁছানো যাবে বলে আন্দাজ করা যায়, বাস্তবে তা হয় না৷ মরুভূমিতেও তাই৷ বালির পাহাড়কে যত কাছে বলে মনে হচ্ছিল, কার্যত সেখানে পৌঁছতে প্রায় বিকেল হয়ে গেল৷
মরুদ্যানে সেই দস্যু-দলপতি আর বেঁচে নেই৷ কিন্তু তার সাকরেদরা জাদুকরকে চিনতে পারল৷ ফলে আদর-আপ্যায়নের কোনো অভাব হল না৷ কিন্তু রুহ বুঝল এদের অনেক বদল ঘটে গেছে৷ দস্যুতা নিয়ে কেউ একটাও কথা বলছে না৷ বরং মরুদ্যানের খেজুরবীথির পরিচর্যা করছে৷ নীলকান্ত মণির মতো অপরূপ হ্রদের পাশে স্থায়ী কুটির বানাচ্ছে৷ সবাইকেই উচ্ছল ও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে৷
হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে রুহ শিহরিত ও চমৎকৃত হল৷ সঙ্গে-সঙ্গে জাদুকরকে ডেকে এনে দৃশ্যটি দেখাল৷ জাদুকর ও রুহ দেখল—হ্রদ থেকে কিছুদূরে একটি পাথুরে সমতল জায়গায় কয়েকজন যুবক শক্ত করে কাপড়ের বল বানিয়ে খেলছে৷ কেউ পা বা হাত দিয়ে বলটি খেলছে না৷ তারা দো-নলা বন্দুকগুলো দিয়ে সেই বল খেলছে আর মাঝে মাঝেই আমোদে চিৎকার করে উঠছে৷ অর্থাৎ বন্দুকগুলো আর বন্দুক নেই৷ সাধারণ দণ্ডে পরিণত হয়েছে৷ সামান্য খেলার সরঞ্জাম হয়ে উঠেছে৷
সন্ধে পার হয়েছে৷ হ্রদের অদূরে খেজুরবীথির ফাঁকে একটা সমতল জায়গায় রুহ ও জাদুকর আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে৷ রুহর হঠাৎ উড়ন্ত গেরিলাদের কথা মনে পড়ল৷ রুহ জাদুকরকে বলল, ‘তুমি শুয়ে থাকো, আমি একটু আসছি৷’
রুহ খেজুরবীথির ফাঁক দিয়ে বেশকিছু দূর হেঁটে গেল৷ যখন দেখল মরুদ্যানের খুব নির্জন একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছে, তখন চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে পদ্মাসনে বসল৷ খানিকক্ষণ স্থির হয়ে বসে থেকে উন্মুক্ত করল তার তৃতীয় নয়ন৷
কয়েক মুহূর্ত পর রুহ দেখল—গেরিলা যোদ্ধারা কী নিষ্ঠার সঙ্গে হেঁটে চলেছে ক্রোশের পর ক্রোশ! এবং তারা দূর-দূর জনজাতির মধ্যে, পাহাড়-ঝরনার মধ্যে, বাতাসের মধ্যে মিশিয়ে চলেছে ভাইরাস! তার স্বপ্নবীজ৷
দেখে মন খুব তৃপ্ত হয়ে উঠল৷ এরপর রুহ মন দিল ফেলে আসা গুহার দিকে৷ দেখল—খাঁ-খাঁ করছে গুহা৷ কেউ কোথাও নেই৷ কেবল ভেষজ-উদ্যানের গাছপালার শাখা-প্রশাখা অল্প হাওয়ায় কাঁপছে৷ নীল হ্রদের জলে খেলে বেড়াচ্ছে কুনচেনের জীবন্ত ডিঙি—সেই কুমিরশ্রেণির প্রাণীর দল৷ আর গুহার দেওয়ালে তার আঁকা পোতালা প্রাসাদের সামনে পদ্মাসনে বসে থাকা মহান কুনচেন লামা যেন সমস্ত গুহাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দিয়ে!
ফেলে আসা গুহার জন্য সামান্য মন কেমন করে উঠল৷ তারপরেই তার চোখের সামনে জেগে উঠল জেমিনির মুখ৷ মাথার চুলে অল্প পাক ধরেছে৷ কিন্তু সেই অর্থে বয়স সামান্যতমও থাবা বসাতে পারেনি তার শরীরে৷ উল্লেখ্য করার মতো তেমন কোনো পরিবর্তনই হয়নি৷ জেমিনি তার তাঁবুর ভিতর বসে একটি সাপের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে৷ সাপটির ফণায় ডান হাত আলতো করে বোলাচ্ছে৷ সাপটি কিন্তু কিছুই করছে না৷ অল্প-অল্প মাথা দোলাচ্ছে৷ যেন জেমিনির দৃষ্টির সামনে সাপটি অসহায়৷ নিরীহ ও সম্মোহিত এক সাধারণ জীব৷
অনেকদিন পর জেমিনিকে এত স্পষ্ট করে দেখল৷ এরপর সমস্ত মরুদ্যানটি দেখল—প্রায় সবাই তাঁবু ও নতুন গড়ে ওঠা কুটিরের ভিতর ঘুমিয়ে পড়েছে৷ কেউ-কেউ জেগে আছে৷ একে-অন্যের সঙ্গে গল্প করছে৷ জাদুকরকে যে জায়গায় রেখে সে উঠে এসেছিল, সেখানে জাদুকরকে দেখা যাচ্ছে না৷ রুহর ভ্রু কুঞ্চিত হল৷ জাদুকর কোথায় গেল? তার এই দৃষ্টির বাইরে তো কারও অদৃশ্য হয়ে থাকা অসম্ভব, তাহলে? রুহ কিন্তু কোথাও জাদুকরকে দেখতে পেল না৷
রুহ তৃতীয় নয়ন বন্ধ করে পদ্মাসন থেকে উঠে আবার ফিরে এল৷ দেখল, জাদুকর সেখানেই শুয়ে আছে৷ রুহ জিগ্যেস করল, ‘তুমি কি কোথাও গিয়েছিলে?’
জাদুকর আকাশের দিকে মুখ রেখে একইভাবে শুয়ে থেকে জবাব দিল, ‘না তো!’
রুহ আর মুখে কিছু বলল না৷ বরং আজ তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন৷ এতদিন সে যে-স্বপ্ন দেখেছে, কুনচেন যে-আবিষ্কার করেছেন, তার বাস্তব প্রয়োগ চোখের সামনে দেখে মন ও হৃদয় আজ কানায়-কানায় পূর্ণ৷ যে-বন্দুক এই রুক্ষ বালির রাজ্যে পথিকের সমস্ত কিছু কেড়ে নিত, যে বন্দুকের নল সোনালির বালুর বুক রক্তে লাল করে দিত, যে-আগ্নেয়াস্ত্র দিগন্ত ও আকাশকে মানুষের মরণ-চিৎকার শুনিয়ে-শুনিয়ে ক্লান্ত করে দিত, সেই মারণাস্ত্রগুলো আজ শুধুই খেলনা! এরচেয়ে বড় আনন্দের আর কী হতে পারে?
জাদুকর যেন রুহর মনের কথাটি পড়তে পারল৷ পাশ থেকে বলল, ‘রুহ, সত্যিই আজ আমাদের খুশির সীমা নেই৷ কিন্তু প্রকৃত খুশির দিন তখনই আসবে যখন সমস্ত দুনিয়ার সমস্ত আগ্নেয়াস্ত্র এইরকমই তুচ্ছ খেলনা হয়ে যাবে বা অর্থহীন আবর্জনায় পরিণত হবে৷
‘আমাদের সেই দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে৷ তবে আমার ধারণা—সেই দিন আর খুব বেশি দূরে নেই৷’
জাদুকরকে আজও ঠিক চেনা হয়ে উঠল না—ভাবে রুহ৷ কীভাবে তার মনের বর্তমান অবস্থা সে নির্ভুলভাবে উপলব্ধি করল?
রুহ মাথা তুলে জাদুকরের দিকে তাকাল৷ জাদুকর রুহর কাণ্ড দেখে মনে-মনে হাসল৷ রুহ ভাবল—কী আশ্চর্য এক মানুষ!
জাদুকর পাশ ফিরে শুতে-শুতে বলল, ‘আশ্চর্যের কিছু নেই৷ অত না ভেবে ঘুমোও৷ কাল খুব ভোরে আমাদের রওনা হতে হবে৷’
জাদুকরের কথায় রুহ আবারও চমকে উঠল৷ মানুষটা কি অন্তর্যামী?
জাদুকর ঘুমোলেও রুহর চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই৷ রাত্রির আকাশে হাজার-হাজার তারা যেন জোনাকির মতো জ্বলছে৷ রুহর মন এই সুদীর্ঘ বালির প্রান্তর ছেড়ে মুহূর্তে যেন ওই অপার্থিব আলোর জগতেই মিশে গেল৷
ঠিক গোলাকার নয়৷ সামান্য ডিম্বাকৃতি গাঢ় সবুজ বলগুলোর শিরা থেকে বেরিয়েছে সোনালি কাঁটার গুচ্ছ৷ আর, তার গা থেকেই ফুটে উঠেছে কমলা-রংয়ের পাপড়ি৷ পাপড়ির প্রান্তভাগ লালচে৷ আকারে কী বড়-বড় আকারের ফুলগুলো! রুক্ষ এই মরুভূমির বুকে যেন রংয়ের আবির ছড়িয়ে দিচ্ছে!
রুহ খুব কাছে গিয়ে মন দিয়ে ফুলগুলো দেখছে৷ মাথার ওপর রোদের তাত বাড়ছে—এ-নিয়ে তার কোনো হেলদোল নেই৷ জাদুকর বলল, ‘এই ক্যাকটাসের কী নাম জানো?’
‘কী?’
‘ক্রাউন ক্যাকটাস। যাক গে, নাম বাদ দাও৷ বুঝলে রুহ, বসন্তকাল হচ্ছে বহুগামী প্রেমিকের মতো৷ কী অরণ্য, কী পাহাড়, কী উপত্যকা, কী সমতল—সমস্ত জায়গায় তার অকৃপণ ভালোবাসার স্পর্শ রেখে যায়৷ অন্তর থেকে জাত প্রেমের রঙিন স্পর্শ থেকে সে কাউকে বঞ্চিত করে না৷’
রুহ তন্ময়তা ভেঙে জাদুকরের দিকে তাকাল৷ তারপর বলল, ‘বহুগামিতা কি আদর্শ প্রেমিকের লক্ষণ হতে পারে, জাদুকর?’
হা হা শব্দে হেসে উঠল জাদুকর৷ বলল, ‘অতশত বুঝি না৷ বসন্ত ঋতুর হৃদয় জুড়ে থাকে সৌন্দর্যের সাধনা৷ থাকে সমস্ত রুক্ষতাকে মুছে পেলব করে তোলার অদম্য শক্তি৷ থাকে রঙিন করে তোলার অক্লান্ত স্বপ্ন৷ তাই বুঝি সে যেখানেই স্পর্শ রাখে তাকেই বিচিত্র-বর্ণে রঙিন করে তোলে৷’
প্রেমিকের প্রশ্নে রুহ সহমত না-হলেও বাকি কথাগুলো মেনে নিল৷ তারপর বলল, ‘সবাই মরুভূমিকে প্রাণঘাতী দৈত্য ভাবে৷ যারা মরুকে বুকের ভিতর ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নিতে জানে, তারাই কেবল বুঝতে পারে এই আপাত রুক্ষ দৈত্যের ভিতরেও নিজেকে সুন্দর রাখার কী আপ্রাণ প্রয়াস রয়েছে! তাই মনে হয়—ধু-ধু বালির সমুদ্রে এমন শত-শত রকমের ক্যাকটাস রং ছড়ায়৷ নিজেকে নিজের মতো করে সাজিয়ে মৃদু-মৃদু হাসে৷’
‘ঠিক বলেছ, রুহ৷ দেখবে—আমাদের তথাকথিত সভ্য-শিক্ষিত মানুষেরা আজও আফ্রিকার নানান উপজাতির মানুষকে অসুন্দর বলে মনে-মনে চিহ্নিত করে৷ কারণ, তাদের গায়ের রং কালো৷ মুখ-চোখ-নাক, শরীরের গঠন তাদের চেনা-চোখের চেনা-ধারণার সঙ্গে মেলে না বলে৷ এই তথাকথিত অভিজাত মানুষদের কাছে তাদের মন-গড়া যে ভ্রান্ত-সৌন্দর্যের সংজ্ঞা রয়েছে তার বিচারে তারা সুন্দর-অসুন্দরের তফাত করে৷
কিন্তু আমি যখন মাসাই জাতির কোনো আফ্রিকান তরুণীকে কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে তার মাটির ঘরের দাওয়ায় বসে রঙিন নুড়ি-পাথরের অলংকার পরে নিজেকে সাজাতে দেখি, নিজেকে সাজানোর পর তার ঠোঁটের কোনায় যখন পরিতৃপ্তির হাসি ফুটে উঠতে দেখি—তখন তাকেই আমার এই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সুন্দরী বলে মনে হয়৷
সুতরাং আপাতদৃষ্টিতে অসুন্দর বলে দাগিয়ে দেওয়ার মানসিকতাটাকেই আমার একধরনের মূর্খতা বলে মনে হয়৷’
‘তাছাড়াও, আসল সৌন্দর্যের হদিশ পেতে হলে অন্তরের সন্ধান জরুরি৷ শারীরিক বয়ান সৌন্দর্যের প্রকৃত উজ্জ্বলতাকে সবসময় যে বিম্বিত করে—এমনও নয়৷ আসল সৌন্দর্য তো থাকে ভালোবাসায়, সহিষ্ণুতায়, মানবিকতায়—আর এগুলোর জন্মঘর কিন্তু মানুষের হৃদয়৷ গায়ের রং, চোখ-হাত-পা-কানের গঠনে নয়৷’ বলল রুহ৷
জাদুকর মুচকি হেসে বলল, ‘আর কয়েক ঘণ্টা পরেই তো জেমিনির সঙ্গে দেখা হবে৷ কয়েকটা ফুল নিয়ে যাবে নাকি প্রেমিকার জন্য? প্রেমিকের হাতে এমন ফুল পেতে মনে হয় সব প্রেমিকাই পছন্দ করে৷’
জেমিনির প্রসঙ্গে ঈষৎ লজ্জা পেল রুহ৷ মুখে আশ্চর্য এক মৃদু হাসি খেলা করল৷ তারপর রুহ বলল, ‘না৷ আমি জীবনে কোনোদিন কোনো ফুল তুলিনি৷ প্রকৃতির এমন অপরূপ সৃষ্টিকে কেবল দু-চোখ ভরে দেখতে শিখেছি, শিল্পের মহত্মকে আজীবন অনুভব করতে শিখেছি এবং বুঝেছি এই সৃষ্টি সবার৷ তাকে নিজের করে দখল করার, ব্যবহার করার মন আমার কোনোদিন তৈরি হয়নি, জাদুকর৷’
রুহর জবাবে জাদুকর অল্প গম্ভীর হয়ে গেল৷ তা দেখে রুহ বলল, ‘আমার প্রেমিকা নিজেই এত সুন্দর যে তাকে খুশি করার মতো আর কোনো সুন্দর বস্তুর সন্ধান আমি পাইনি৷ সত্যিই পাইনি৷ বরং আমার অন্তর দিয়ে তার উপাসনা করব৷ নিজেকে নিঃস্ব করার দৃষ্টি দিয়ে তাকে আদর করব৷ আমার সততার স্পর্শ দিয়ে তাকে বন্দনা করব—এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে, জাদুকর?
ওই যে তুমি বহুগামিতার কথা বলছিলে না, তাই আমি ওই প্রসঙ্গে একমত নই৷’
জাদুকর মুখে কিছু বলল না৷ সামান্য হেসে বলল, ‘হে প্রেমিক, তোলো গাঁঠরিয়া৷ সামনে যে এখনো অনেক পথ৷ তারপর জেমিনিকে আবার খুঁজতে হবে৷ আজ দেখা হবে কিনা, তারও কোনো ঠিক নেই৷ ওরা তো আর একজায়গায় থাকে না৷’
‘খুঁজে পেতে অসুবিধে হবে না৷ ওরা দল স্থানবদল করতে-করতে আবার সেই পূর্বের জায়গায় ফিরে এসেছে, যেখান থেকে আমি ওকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম৷’
‘তাই!’
‘হ্যাঁ৷’
সূর্যাস্ত হয়েছে অনেক আগেই৷ তাঁবু তো দূরের কথা, পাহাড়ের কোনো চিহ্নও চোখে পড়ছে না৷ তবে আলো কমে যাওয়ায় বেশিদূর দেখা যাচ্ছে না৷ ক্রমশ আকাশে স্পষ্ট হচ্ছে চাঁদ৷ আকারে গোল৷ অর্থাৎ কিছু পরেই পূর্ণ জ্যোৎস্না ফুটলে আবার অনেকটা দূর অবধি দৃষ্টি যাবে৷
চেনা পথ বলে থামার প্রশ্ন নেই৷ নির্জন বালুর প্রান্তর ধরে দু-জন গল্প করতে-করতে এগিয়ে চলল৷ আরও কয়েক ঘণ্টা পথ চলার পর জাদুকরের চোখে পড়ল সামনে দিগন্তের বুকে পাহাড়ের আবছায়া আঁকাবাঁকা রেখা৷ ফলে, উৎসাহিত চলার গতি বেড়ে গেল৷
তাঁবুর কাছে যখন পৌঁছাল তখন রাত্রির প্রথম প্রহর পার হয়ে গেছে৷ নিঃশব্দ মরুভূমির ওপর সারি-সারি রঙিন তাঁবু৷ সবাই ঘুমোচ্ছে৷ শুধু মাথার ওপর জেগে আছে পূর্ণ চাঁদ৷ রুপোলি জ্যোৎস্নার অকৃপণ ধারা চরাচরকে স্নান করিয়ে দিচ্ছে৷ রুহর কিন্তু চিনতে কোনো ভুল হল না৷ নির্ভুলভাবে সে ঠিক জেমিনির তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে ডাকল, ‘জেমিনি৷’
প্রথমে কোনো সাড়া এল না৷ দ্বিতীয়বার আবার ডাক দিল রুহ৷ মুহূর্তে বাইরে এসে দাঁড়াল জেমিনি৷ সে যেন স্বপ্ন দেখছে৷ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না৷ রুহ কাছে এগিয়ে গেল৷ তারপর জেমিনির হাতটি নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল, ‘আমি ফিরেছি, জেমিনি৷ আমি সত্যিই ফিরেছি, আমাকে ভালো করে ছুঁয়ে দেখো!’
ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল জেমিনি৷ নিঃশব্দে তার গাল বেয়ে নেমে আসছে মুক্তোর মতো অশ্রুকণা৷ জেমিনির কান্না দেখে স্তব্ধ রুহ৷ অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা জাদুকরের ঠোঁটে কেবল মৃদু হাসির ঝিলিক৷
জাদুকর যে অদূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে খেয়াল নেই জেমিনির৷ সে রুহর বুকে হাত বোলাচ্ছে৷ পরখ করে দেখছে তার সামনে সত্যিই রুহ নাকি অন্যান্য দিনের মতো এ-ও এক স্বপ্ন!
কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হলে জেমিনি জাদুকরকে বলল, ‘আসুন৷’
তাঁবুর ভিতর ঢুকে জেমিনি জাদুকরকে বলল, ‘আপনারা ক্লান্ত৷ আমি আপনাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করছি৷ আপনারা একটু অপেক্ষা করুন৷’
জেমিনির কথায় হাঁ হাঁ করে উঠল জাদুকর৷ বলল, ‘কিছুক্ষণ আগেই আমরা পেট ভরে জাম্পা খেয়েছি৷ এখন আর কিচ্ছু খাব না৷ বরং ঘুমোব৷ আমার বেশ ঘুম পেয়েছে৷’
‘জাম্পা!’ অচেনা খাবারের নাম শুনে বিস্ময় প্রকাশ করল জেমিনি৷
রুহ তাড়াতাড়ি সামাল দেওয়ার জন্য বলল, ‘ও তুমি বুঝবে না৷ চলো, তুমি-আমি বরং বাইরে যাই৷ জাদুকর তোমার খাটিয়ায় ঘুমোক৷’
জাদুকর কোনো প্রতিবাদ করল না৷ নিজের রুকস্যাকটি খুলে তাঁবুর এককোণে রেখে হাত-পা ছড়িয়ে জেমিনির খাটিয়ায় শুয়ে পড়ল৷ রুহও তার রুকস্যাকটি রেখে জেমিনিকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল৷ রুহ বলল, ‘কী আশ্চর্য ব্যাপার না! যে জায়গায় তোমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়ে ছিল, এত বছর পরে আবার সেই একই জায়গায় আবার দেখা হল!’
‘জানো, আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না, তুমি সত্যিই এসেছ!’
‘তাহলে বোধহয় আমি তোমার রুহ নই৷ রুহর প্রেত৷’
‘কী যে, বলো!’ জেমিনি মুখ লুকোল রুহর বুকে৷
রুহ বলল, ‘আমাকে সেই নদীতে নিয়ে চলো৷ প্রথমদিনের মতো আমি স্নান করতে চাই জেমিনি৷’
রুহ ও জেমিনি তাঁবু ছাড়িয়ে বালির সামান্য পথ পেরিয়ে পাহাড়ের ঢাল পার হয়ে চলে এল নদীতে৷ জেমিনি বলল, ‘এতরাতে স্নান করবে?’
‘করব৷’
জেমিনি বলল, ‘তাহলে আমিও স্নান করব৷’
জেমিনির কথায় হাসল রুহ৷ নেমে গেল জলে৷ অতি-নির্জন মরুর পাশে ততধিক শান্ত পাহাড়ি উপত্যকায় পাথরের গায়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে জল৷ যেন মধ্যরাতে আপন খেয়ালে নদীটি বাজিয়ে চলেছে তার জলের বাঁশি৷ আর সেই সুরে সম্মোহিত দুই মধ্যবয়সি প্রেমিক-প্রেমিকা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে পরস্পরকে চিনে নিচ্ছে সুদীর্ঘ বিরহের পর৷ যেন এ-কেবল বিরহের পর শুধুমাত্র নতুন করে চেনা নয়, তারা এই জ্যোৎস্নামুখর মধ্যরাতে, নিবিড় মুগ্ধতার মনকেমন আবির দিয়ে উদ্যাপন করছে তাদের বসন্ত-উৎসব!
দীর্ঘক্ষণ স্নানের পর উঠে এল দু-জন৷ রুহ তার পোশাকের ভিতর থেকে ছোট্ট একটি সোনার আধার খুলে কয়েকটি স্বপ্নবীজ নদীর জলে ভেঙে মিশিয়ে দিল৷ জেমিনি জিগ্যেস করল, ‘কী ওটা?
রুহ মৃদু হেসে উত্তর দিল, ‘স্বপ্নবীজ৷’
‘মানে?’
‘ওপরে চলো বলছি৷’
রুহ ও জেমিনি তাদের সেই পুরোনো পাথরের ওপর বসল৷ জেমিনির মনে পড়ে গেল তাদের প্রথম সঙ্গমের স্মৃতি৷ মনে-মনে বেশ লজ্জা পেল৷ মুখে বলল, ‘জলে কী করলে বললে না তো?’
রুহ তার দীর্ঘ সময়ের সমস্ত কথা জেমিনিকে ধীরে-ধীরে বলল৷ কিন্তু জেমিনি যুদ্ধ, অস্ত্র, সীমান্ত, দখলদারি প্রভৃতি শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে পারল না৷ কথার মাঝে বারবার প্রশ্ন করতে থাকল৷ রুহ বোঝানোর চেষ্টা করতে গিয়ে থমকে গেল৷ নিজের ভুল বুঝতে পারল৷ সত্যিই তো এই শব্দগুলোর অর্থ তো জেমিনির আর বোঝার কথা নয়৷
রুহ বুঝল, কী দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে গিয়েছে তার স্বপ্নবীজ৷ জেমিনি বলল, কীভাবে কেটেছে তার এতগুলো বছর৷ জানাল রুহাইল ও নৌশিনের কথা৷
ক্রমশ ভোরের আলো ফুটছে৷ গাছপালার ফাঁকে পাখিরা জেগে উঠছে৷ শিস দিচ্ছে৷ রুহর মনে হল, ইশ! কী মিষ্টি ডাক! কত বছর সে পাখিদের ডাক শোনেনি৷ আজ যেন পাখিদের শিস তার কানে পেলব সংগীতের মূর্ছনা ছড়িয়ে দিচ্ছে৷
পাথর থেকে উঠে দাঁড়াল রুহ ও জেমিনি৷ জেমিনিই প্রথম দেখতে পেল জাদুকরকে৷ জাদুকর তাঁবু ছাড়িয়ে কিছুদূরে বালির ওপর একা দাঁড়িয়ে আছে৷ রুহ একটু অবাক হল জাদুকরের অমন একাকী দাঁড়িয়ে থাকা দেখে৷
তাড়াতাড়ি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে তারা চলে গেল জাদুকরের কাছে৷ রুহ বলল, ‘তুমি এখানে কেন?’
জাদুকর রুহর কথার সরাসরি কোনো উত্তর না-দিয়ে জেমিনিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘একদিন তোমার কাছ থেকে রুহকে নিয়ে গিয়েছিলাম৷ আজ আবার তোমার কাছেই ফিরিয়ে দিয়ে যাচ্ছি, জেমিনি৷ আজ আমার ছুটি হয়ে গেল৷’
জাদুকরের কথায় কেঁপে উঠল রুহ৷ বলল, ‘চলে যাবে বললেই হয় নাকি? তুমি জানো না, আমাদের কত কাজ বাকি?’
‘আমাদের আর নয়, রুহ৷ শুধু তোমার কাজ বাকি৷ আমার আজ সত্যিই ছুটি৷’
‘এ-হয় না, জাদুকর৷ এ-হয় না৷ আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না৷’
হাসল জাদুকর৷ বলল, ‘শিল্পীরা কি ছেলেমানুষ হয়? এমনভাবে কাউকে আঁকড়ে ধরতে নেই, রুহ৷ পৃথিবীর সব বাঁধন একদিন খুলে যায়৷ বন্ধন যেমন সত্য৷ বন্ধন মুক্তিও তেমন সত্য৷ আর সত্যি বলতে কী, আমরা কেউ-ই কোথাও যাই না৷ আমাদের সমস্ত কিছুই পরস্পরের বুকের ভিতর বসত বেঁধে থাকে৷ একদিন আমার কথার অর্থ তুমি ঠিক বুঝতে পারবে৷
তাছাড়া, আমি কি চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছি নাকি? পথের মাঝে, অচেনার ভিড়ে আবার কোথাও-না-কোথাও ঠিক দেখা হয়ে যাবে৷ শোনো, তুমি আমাকে এখন তামার আধারটি দিতে পারো৷ আমার চলার পথে তাহলে তোমার স্বপ্নবীজ ছড়িয়ে-ছড়িয়ে হেঁটে যেতে পারি৷’
জাদুকরকে সেই অর্থে জেমিনি চেনে না৷ সাকুল্যে দু-বার দেখা৷ কিন্তু সে-ও রুহর মতো ভিতরে-ভিতরে যেন শিকড় ছেঁড়ার যন্ত্রণা অনুভব করল৷ এতবছর একসঙ্গে থেকেছে, জাদুকর কোনোদিন রুহকে এতখানি বিচলিত হতে দেখেনি৷ কেউ কোনোদিন রুহর চোখ ভিজে উঠতে দেখেনি৷ আজ সেই রুহর চোখ বাষ্পাকুল হয়ে উঠল৷ রুহ বুকের ভিতর মনখারাপকে আড়াল করে তাঁবুর ভিতর থেকে তামার আধারটি এনে তুলে দিল জাদুকরের হাতে৷ জাদুকর বলল, ‘তোমার কাছে ছোট-ছোট আধারগুলোতে যা রইল, সেগুলো তুমি ব্যবহার কোরো৷’
কথা শেষ হতেই জাদুকর আর দাঁড়াল না৷ মুহূর্তে মুখ ফিরিয়ে হেঁটে যেতে থাকল৷ রুহ ও জেমিনি পলকহীন চোখে তাকিয়ে রয়েছে মানুষটির চলে যাওয়ার দিকে৷
রুহ যেন এই মুহূর্তে এক আশ্চর্য ধাঁধার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে৷ তার মনে হল, এতবছর একসঙ্গে থেকেছে, তাদের এত বছরের সখ্য, কিন্তু আজও সে যেন এই অদ্ভুত মানুষটিকে প্রকৃত-অর্থে চিনতে পারেনি৷ কেন যে কাছে এসেছিল, সহযাত্রী হয়েছিল, কেন-ই-বা সঙ্গে থেকেছিল, আর কেন-ই-বা পথের ভিতর হারিয়ে গেল—এ এক অতল রহস্য৷ যে রহস্যের অস্তিত্ব বেশ স্পষ্ট, কিন্তু সে-রহস্যকে উন্মোচিত করার কোনো সূত্র তার জানা নেই৷
কাঠের চারটি দণ্ড৷ চারটি দণ্ডের ওপর সমান্তরালভাবে দুটি মোটা দড়ি টানটান করে বাঁধা৷ চোখ-বাঁধা অবস্থায় মেয়েটি এক দড়ি থেকে অন্য দড়িতে লাফ দিচ্ছে৷ শুধু লাফ দিচ্ছে না৷ লাফের সঙ্গে-সঙ্গে শূন্যে তার পুরো দেহ একবার পাক খেয়ে এক দড়ি থেকে অন্য দড়িতে সটান দাঁড়িয়ে পড়ছে৷ প্রতিটি লাফের সঙ্গে মাটিতে বসে থাকা বাদ্যকরের দল ঢোলকে বোল তুলছে৷ আর তাদের মধ্যে একটি যুবক বাঁশি বাজিয়ে চলেছে৷
জায়গাটায় ভয়ানক ভিড়৷ মেয়েটির প্রতিটি লাফের সঙ্গে বিপুল হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ছে জনতা৷ ভিড়ের এককোণে দাঁড়িয়ে রয়েছে জেমিনি৷ জেমিনি ইশারা করে রুহকে বলল, ‘ওই হচ্ছে নৌশিন৷ আর যে-বাঁশি বাজাচ্ছে, ও তোমার সন্তান রুহাইল৷’
জেমিনি রুহাইলকে দেখাল ঠিকই, কিন্তু মুখোশ থাকার জন্য সন্তানের মুখ দেখতে পেল না রুহ৷ তবে বুকের ভিতর এক অজানা আনন্দ মোচড় দিয়ে উঠল৷ এ-এক অন্যরকমের উত্তেজনা৷ ভিন্নরকমের আনন্দ৷ যার সঙ্গে বুঝি অন্য কোনো কিছুর তুলনা চলে না৷
পাহাড়ি উপত্যকার গা ঘেঁষে মরুভূমির ধু-ধু প্রান্তর ক্রমশ হলদে থেকে লালচে হয়ে উঠছে৷ পশ্চিম আকাশের সূর্য পাহাড়ের দিক থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছে মরুভূমির বালির দিকে৷ রুহর হাত ধরে জেমিনি ভিড় থেকে বেরিয়ে এসে একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়াল৷ বলল, ‘এখানে দাঁড়াও৷ খেলা শেষ হলেই ওদের ডেকে আনব৷’
কথাটি বলেই জেমিনি চলে গেল৷ রুহ দাঁড়িয়ে থাকে৷ মনে পড়ে যায়, জাদুকরের সঙ্গে পাড়ি দেওয়ার পূর্বের দিনগুলোর কথা৷ আলামিনের কাছে ঢোলকে তালিম নেওয়া আঙুল উত্তেজিত হয় ঢোলকের বোলে৷ দিনের পর দিন লোকালয় থেকে লোকালয়ে সেই ভ্রাম্যমান দিনের সোনালি মুহূর্তগুলো তাকে ক্ষণিকের জন্য বিহ্বল করে তোলে৷
কিছুক্ষণ হল খেলা শেষ হয়েছে৷ লোকজন ফিরে যাচ্ছে৷ দেখা গেল, জেমিনির সঙ্গে কথা বলতে-বলতে রুহাইল ও নৌশিন হেঁটে আসছে৷ রুহর মুখে স্মিত হাসি৷ রুহাইল কাছে আসতেই রুহ কোনো কথা না-বলে দু-হাত বাড়িয়ে দিল৷ রুহাইল ধরা দিল বুকে৷
আত্মজের সঙ্গে তার আব্বুর এই আলিঙ্গন চোখ ভিজিয়ে দিল জেমিনির৷ রুহাইলের পাশে কাছে টেনে নিল নৌশিনকেও৷ রুহর দুই বুকে দু-জনের মাথা৷ কী অপার শান্তি, কী আশ্চর্য ভালোলাগা! রুহ যেন বুক ভরে শুষে নিচ্ছে এই শান্তি ও ভালোবাসার আবেশ৷ কিছুক্ষণ পর শান্ত-স্বরে রুহ বলল, ‘তোমাদের যে আমার সঙ্গে যেতে হবে, নৌশিন৷’
নৌশিন জিগ্যেস করল, ‘কোথায়?’
‘আমি যেখানে যাব৷ অন্য কোথাও৷ অন্য কোনো ঠিকানায়৷’
‘এখানে আর ফিরব না?’
‘হয়তো নয়৷’
‘কিন্তু জিজা-আম্মা কি চলে যাওয়ার অনুমতি দেবে?’
রুহ কিছু বলল না৷ জেমিনি বলল, ‘দেবে৷ তোমাদের যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে এখন আর কেউ কাউকে নিষেধ করবে না৷’
কথাটা বলেই জেমিনি তাকাল রুহের দিকে৷ রুহ নিঃশব্দে সম্মতি জানাল৷ জেমিনিও কিছু আগে তাদের দলের জিজা-আম্মার কাছে চলে যাওয়ার সম্মতি পেয়েছে৷ প্রথমে জেমিনিরও সংশয় ছিল৷ কিন্তু রুহর কথা অক্ষরে-অক্ষরে ফলে গেছে৷ সেই কথাগুলোই এখন নৌশিনকে বলল জেমিনি৷
রাত্রিতে নৌশিন জিজা-আম্মার কাছে চলে যাওয়ার সম্মতি চাইতেই সে সানন্দে অনুমতি দিল৷ বরং পথে খাওয়ার জন্য বেশি করে চাপাটি ও আচার সঙ্গে দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিল৷
ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগেই রুহর সঙ্গে জেমিনি, রুহাইল ও নৌশিন রওনা হয়ে গেল তাদের অচেনা ঠিকানার উদ্দেশে।
পথ চলতে মন্দ লাগছে না৷ তাদের দল ভ্রাম্যমান হলেও এতদিন পার্বত্যময় মরুদেশের বাইরে তারা পা রাখেনি৷ রুক্ষ, ধূসর, স্বল্প গাছপালাময় জগতের চৌহদ্দি ডিঙোয়নি৷ তাই পথ চলার ক্লান্তি থাকলেও ভিন্নতর এই জগৎ, দৃশ্যাবলি তাদের মুগ্ধ করে দিচ্ছিল৷ এক্ষেত্রে নৌশিন, রুহাইলের মতো জেমিনিরও উত্তেজনা ও কৌতূহল বিন্দুমাত্র কম নয়—এটা কী পাখি? এই গাছ এত বড় কেন? খেতজুড়ে যে হলদে-রংয়ের ফসল—এর-ই বা কী নাম? তাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে-দিতে হেঁটে চলে রুহ৷ তবে সমস্ত কাজের মধ্যেও রুকস্যাক থেকে ছোট-ছোট সোনার আধার খুলে স্বপ্নবীজ ছড়িয়ে দিতে তার ভুল হয় না৷ সংরক্ষণের জন্য বড় সোনার আধারটি পৃথক জায়গায় সযত্নে রাখা আছে৷
কয়েকদিনের মধ্যে চাপাটি ও আচার শেষ৷ এখন রুহর কাছে থাকা জাম্পাই সম্বল৷ পথের মাঝে লোকালয় পড়লে মুখের স্বাদবদল হয়৷ লোকজন নিজে থেকে খাবারদাবার দেয়৷ নাহলে জাম্পা৷ তবে সে সঞ্চয়ও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে৷
পথে লোকালয়ে লোকজন দেখলে রুহ খানিকটা আগবাড়িয়েই কথা বলে, দু-দণ্ড গল্প করে৷ কথার মাঝে বুঝে নেয় মানুষগুলোর ভিতর পরিবর্তন এসেছে কিনা৷ এখনো পর্যন্ত নিশ্চিন্ত৷ যত জনের সঙ্গে কথা বলেছে, গল্প করেছে তারা কেউই যুদ্ধ, অস্ত্র প্রভৃতি শব্দগুলো শনাক্ত করতে পারেনি৷
সুদীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে দু-দশক পর কালো পাথরের বুক থেকে নেমে আসা ঝরনার পাশে দিয়ে জঙ্গলে ঢোকার সুঁড়িপথের মুখে এসে দাঁড়াল রুহ৷ দাঁড়িয়ে পড়ল জেমিনি, রুহাইল, নৌশিনও৷ ঘন জঙ্গল দেখে সবাই বিস্মিত৷ জেমিনি বলল, ‘এর ভিতরে যেতে হবে নাকি?’
হাসল রুহ৷ বলল, ‘ভয়ের কিছু নেই৷ আমার সঙ্গে এসো৷’
বসন্তের জঙ্গল বর্ণময়৷ বড়-বড় জারুল গাছে বেগুনি ফুলের ঝাঁক৷ কৃষ্ণচূড়ায় লাল-হলুদ আগুন৷ জঙ্গলের ভিতর ঢুকতেই বড় করে শ্বাস নিল রুহ৷ জেমিনিকে বলল, ‘সুগন্ধ পাচ্ছ?’
‘হ্যাঁ৷ কিন্তু গাছপালার ভিতর এমন সুগন্ধ কীসের?’
‘এটা একটা ফুলের সুগন্ধ নয়৷ শাল, মহুয়া ও ছাতিম ফুলের মিলিত সুবাস৷ জেমিনি, তোমাদের ধারণা কেবল মানুষই বুঝি নিজেকে সুন্দর কারা জন্য প্রসাধন করে৷ আসলে তা নয়, এই বনভূমিও ঋতুভেদে নিজেকে সাজায়, প্রসাধিত করে৷ সমস্ত শরীর জুড়ে সুগন্ধি মেখে নিজেকে জগতের আছে আকর্ষণীয় করে তোলে৷’
জেমিনিও রুহর মতো বড়-বড় শ্বাস নিল৷ জেমিনিকে দেখে রুহাইল ও নৌশিনও৷ সত্যিই কী সুন্দর গন্ধ! গাছপালার ভিতর যে এমন মনকেমন করা সুগন্ধ লুকিয়ে থাকে, তারা আজ প্রথম টের পেল৷
খানিকদূরে পাহাড়িয়া এই জঙ্গলের ছোট্ট একটা টিলা পেরতেই সেই গুহা দেখা গেল৷ গুহার সামনে পৌঁছে রুহ বলল, ‘জেমিনি, আজ একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হল৷ একদিন এই গুহা থেকেই জাদুকরের সঙ্গে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল৷’
‘এই গুহাতেই তুমি ছবি আঁকতে?’
‘হ্যাঁ৷’ ছবি আঁকার কথায় পলকের জন্য অতীত সময়কে ছুঁয়ে ফেলল রুহ৷ তারপর সবাইকে গুহার একটি আলোকিত ফাঁকা অংশে ঝোলা নামিয়ে রাখতে বলে, নিজে ঢুকে গেল অন্ধকারে৷ এই গুহার অলিগলি রুহর নখদর্পণে৷ সে একটি অন্ধকার পাথরের খোপে নিজের রুকস্যাকটি সযত্নে রাখল৷
বাইরে দাঁড়িয়ে নৌশিন রুহাইলকে জিগ্যেস করল, ‘আমরা থাকব কোথায়৷ এই ঘন-জঙ্গলে কি থাকা যায়?’
গুহার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে-আসতে রুহ বলল, ‘কয়েকদিন একটু কষ্ট হবে৷ তারপর আমি সুন্দর ব্যবস্থা করে দেব৷’
রুহ সবাইকে ঝরনায় স্নান করে নিতে বলল৷ তারপর নিজে বেরিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এল বেশকিছু খাবারদাবার নিয়ে৷ সন্ধের পর গুহার ভিতর রুহাইল ও নৌশিন ঘুমিয়ে পড়লে, জেমিনি জিগ্যেস করল, ‘নৌশিন তো ঠিকই বলেছে—এই নির্জন জঙ্গলে আমরা থাকব কী করে?’
রুহ বলল, ‘ও ভাবনা আমার৷ দেখো না, কী ব্যবস্থা করি৷’
জেমিনি আর কোনো কথা বলল না৷ জানে—রুহ বলেছে মানে নিশ্চয় কোনো পরিকল্পনা করেছে৷ জেমিনি আলতো করে রুহর বাহুর ওপর মাথা রাখল৷ পথশ্রমে শ্রান্ত শরীর বেশিক্ষণ চোখ খোলা রাখতে পারল না৷ ঘুমিয়ে পড়ল৷
রুহর চোখে ঘুম নেই৷ জেমিনির ঘুমন্ত দেহের অর্ধেক অংশ নিজের কোলের ওপর নিয়ে চুপ করে বসে থাকল৷ আজ আকাশে চাঁদ নেই৷ ঘন অন্ধকারে ঢাকা অরণ্য৷ চারদিকে শুধু ঝিঁঝির অবিশ্রাম ডাক আর লক্ষ-লক্ষ জোনাকির আলো৷ চেনা এই অন্ধকারকে কতকাল পর ছুঁতে পেরে বুকের পাঁজর যেন খুশিতে তিরতির করে কাঁপছে৷
নৌশিন যেন আনন্দের রঙিন প্রজাপতি! এমন আশ্চর্য বন্দোবস্ত হবে সে আগাম কল্পনা করতে পারেনি৷ নৌশিনের আনন্দ দেখে জেমিনি ও রুহাইলও খুশি৷
জেমিনি বলল, ‘তোমার সব কিছুই খুব অদ্ভুত, রুহ! কী সুন্দর করে গড়েছ৷ এতদিন শুধু রুক্ষতা দেখেছি৷ সেই রুক্ষতার ভিতর নিজেকে রঙিন রাখার চেষ্টা করেছি৷ এখানে চেষ্টার কোনো প্রয়োজন পড়ছে না৷ এমনিতেই সময় যেন রঙিন হয়ে উঠেছে৷’
জেমিনির তারিফে স্মিত হাসছে রুহ৷ হাসছে রুহাইলও৷
গুহার পাশে কিছুটা দূরত্ব রেখে দুটো গাছ বেছে নিয়েছিল রুহ৷ একটা শালগাছ৷ অন্যটা কুসুমগাছ৷ এই দুটো গাছে মাটি থেকে ফুট কুড়ি ওপরে দুটো গাছবাড়ি বানিয়েছে৷ মাটি থেকে গাছবাড়িতে ওঠার সুন্দর দুটো ঘোরানো সিঁড়ি আছে৷ এমনকী একটি বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাওয়ার জন্য বানিয়েছে ঝুলন্ত সাঁকো৷ ফলে দরকার মতো মাটিতে না-নেমেই এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে অনায়াসে যাতায়াত করা যাবে৷ বাড়ি দুটোর সামনে ছোট্ট বারান্দা৷
নীচ থেকে এত সুন্দর দেখাচ্ছে বাড়ি দুটো যে খুশিতে নৌশিন একটু নেচে নিল৷ তা দেখে জেমিনি ও রুহাইল মনে-মনে রুহর তারিফ না-করে পারল না৷
জেমিনির কথার উত্তরে বলল, ‘শুধু আমি কেন, সবার ভিতরেই শৈল্পিক সত্তা থাকে, জেমিনি৷ কেউ-কেউ তা প্রকাশ করতে পারে৷ কেউ পারে না৷ পারে না, তার কারণ তারা তাদের এই গুণকে লালন করার মতো যত্ন নেয় না৷’
জেমিনি বলল, ‘হয়তো ঠিকই৷ কিন্তু শিল্পের জন্য তোমার মতো আজীবন বাজি ধরার মতো সাহস ক-জন দেখাতে পারে, বলো? ক-জন নিজেকে উজাড় করে দিতে পারে শিল্পের সাধনায়৷ আমাদের সামনে বৈষয়িক প্রলোভনের নানান রঙিন ফাঁদ পাতা৷ আমরা ক-জন মনের জোরে তা সরিয়ে রেখে ডুবে যেতে পারি শিল্পের গভীর সাধনায়?’
‘তার দরকারটাই বা কী?’
‘জগতে সমস্ত কাজের মধ্যেই শিল্পের উপাদান লুকিয়ে রয়েছে৷ নিজেদের কাজের প্রতি আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধাটাও কিন্তু শিল্পেরই সাধনা৷’
এমনিতে বসন্তকাল৷ কুসুমগাছের পাতাগুলো তামাটে-লাল৷ ভারি সুন্দর দেখাছে তামাটে-লাল ডালপালার ভিতর কাঠের গাছবাড়ি৷ রুহ নৌশিন ও রুহাইলকে এই বাড়িতে থাকতে বলল৷
দুপুরে সবাইকে কাছে ডাকল রুহ৷ বলল, ‘আজ থেকে আমাদের নতুন অন্য এক জীবনের শুরু হবে৷’
নৌশিন জিগ্যেস করল, ‘কী রকম?’
‘শুধু আমি ও রুহাইল নয়, তুমি ও জেমিনিও এই গুহার দেওয়ালে ছবি আঁকবে৷’
‘আমরা আঁকতে পারব?’
‘আমি শেখাব৷ প্রকৃতপক্ষে, আঁকা কাউকে শেখানো যায় না৷ শেখানো যায় শুধুমাত্র কিছু কৌশল৷ আমি সেই কৌশলগুলো শিখিয়ে দেব৷’
‘বেশ৷ আমরা চেষ্টা করব৷’ বলল নৌশিন৷
‘ধরো, এই গুহা একটি সাদা খাতা৷ যার প্রতিটি দেওয়াল হল পৃষ্ঠা৷ এই প্রতিটি পৃষ্ঠায় আমরা আমাদের এই সময়ের কথা লিখে রাখব৷ এবং এই লেখা হবে চিত্রভাষায়৷ লক্ষ করে দেখবে—এই গুহার ভিতর অন্ধকার অংশ যতটুকু আছে, তার চেয়ে ঢের বেশি রয়েছে আলোকিত খোলা-দেওয়াল৷ আমি গোপনভাবে কাজ করব বলে গুহার অন্ধকার অংশটিকে বেছে নিয়েছিলাম৷ সেই কাজও সম্পূর্ণ হয়নি৷ এখনো অনেকটা অংশ ফাঁকা পড়ে আছে৷ সেখানে আমি কাজ করব৷
আর, তোমরা কাজ করবে গুহার আলোকিত দেওয়ালগুলোতে৷ দেখেছ কি কত বিশাল-বিশাল আলোকিত দেওয়াল ফাঁকা পড়ে আছে? এই সমস্ত ফাঁকা দেওয়ালগুলো ছবি এঁকে পূরণ করতে হবে৷ কাজটা খুব কঠিন৷ কিন্তু অসম্ভব নয়৷ শুধু দরকার—শ্রম ও একাগ্রতা৷
জানবে, এই কাজ আমাদের জগতের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ৷ একসময় এই গুহাচিত্র ঐতিহাসিক ও পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসাবে পরিগণিত হবে৷ ফলে আমাদের দায়িত্বের গুরুত্বটা তোমরা বুঝতে পারছ?
আগামী সময়, আগামী প্রজন্ম আমাদের এই গুহাচিত্রকলা থেকে জানতে পারবে আমাদের সময়ের ইতিহাস৷ জানতে পারবে আমাদের চিন্তাভাবনা, সাংস্কৃতিক চেতনা ও জীবনের প্রতি আমাদের বিশ্বাসের কথা৷ আর, এই জানানোটাই হবে আমাদের লক্ষ্য৷ তবে জেনো—আমার এই ভাবনা কিন্তু নতুন কিছু নয়৷ প্রাচীনকালে মিশরীয় মানুষেরা তাদের বিশ্বাস, জনজীবনের নানান ঘটনা, উপজাতির কথা ও কাহিনি চিত্রময় লিপি ব্যবহার করে লিখে গেছে৷ সেই লিপির নামছিল হায়ারোগ্লিফিক৷
আমাদের কিন্তু তা নয়—আমরা সম্পূর্ণ ছবিই আঁকব৷ যে-সব ছবিতে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠবে আমাদের দেখা এই পৃথিবী ও সময়৷ এবং এই পৃথিবী ও সময়ের সঙ্গে মানুষ হিসাবে আমাদের সম্পর্কের নানা বৃত্তান্ত৷’
ব্যাপারটা আরও সহজ করে বোঝানোর জন্য রুহ সবাইকে নিয়ে গেল গুহার ভিতর৷ দেওয়াল জুড়ে তার এঁকে রাখা ছবিগুলোর সম্মুখে৷ জাদুকরকে যেভাবে ছবির ব্যাখ্যা করেছিল, একইভাবে এদের সামনেও ছবিগুলোর ব্যাখ্যা করল রুহ৷ রুহাইল, নৌশিন ও জেমিনি স্তম্ভিত৷
একটা বিষয় লক্ষ করে রুহর ভালো লাগল—ছবির রংয়ে কোনো মালিন্য আসেনি৷ যেন সবেমাত্র ছবিগুলো এঁকে সে তুলি নামিয়ে রেখেছে! রুহ বলল, ‘দেখো, কত দেওয়াল ফাঁকা রয়েছে৷ এই সমস্ত দেওয়াল আমাদের ভরিয়ে তুলতে হবে৷ অনেক কাজ৷ তোমরা এই কাজ সম্পূর্ণ করো৷’
ঘন অরণ্যের ভিতর নির্জন গুহার দেওয়ালে একটি বসন্তকালে কাজ শুরু হয়৷ দিনে-দিনে রুহ দেখতে পায়—আশ্চর্য এক স্বপ্ন যেন পূরণের পথে এগিয়ে চলেছে৷ দেওয়ালের পর দেওয়াল চিত্রে সাজিয়ে চলেছে রুহাইল ও নৌশিন৷ রুহ মাঝে-মাঝে গিয়ে তাদের কাজ দেখে আসে৷ বুক তৃপ্তিতে ভরে ওঠে৷
অবশ্য তার নিজের কাজ অন্য৷ রং-তুলির নয়৷ ছেনি, হাতুড়ির৷ কুনচেনের নির্দেশমতো গুহার সবচেয়ে নিরাপদ দেওয়ালটি বেছে নিয়ে সোনার আধারটির মাপে একটি কোটর খুঁড়ে, সোনার আধারটি রেখে পুনরায় পাথর দিয়ে সুনিপুণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে৷ ঠিক তার পাশে যে দীর্ঘ দেওয়াল, সেখানে ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে খুব যত্ন করে লিখে চলেছে স্বপ্নবীজের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যায়ক্রমিক ইতিহাস৷ লিখে রাখছে স্বপ্নবীজের গুরুত্ব এবং পৃথিবী বদলের ক্ষেত্রে এই বীজের ভূমিকার কথা৷ জাদুকর ও কুনচেনের সঙ্গে তার সুদীর্ঘ যাপন বৃত্তান্ত৷
দিনরাত্রি বলে যেন কিছু নেই৷ সমস্ত সময় শুধু কাজ, কাজ আর কাজ৷ বোধহয়, মানুষ যখন তার জীবনের প্রিয়তম স্বপ্নপূরণের ডাক শুনতে পায়, স্বপ্নকে স্পর্শের পথ খুঁজে পায়, জীবনের বাকি সব প্রলোভনকে তুচ্ছ করে সে স্বপ্নের দিকে হেঁটে যায়৷ কোনোকিছুর তোয়াক্কা না-করে বন্ধনহীন ডিঙির মতো নিজেকে ভাসিয়ে দেয় মোহনার দিকে৷ কারণ, সে বুঝতে পারে—প্রতিটি মোহনাই খুব শান্তভাবে নদীর সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দিয়ে বৃহত্তর জল-জীবনের আনন্দে বিলীন হওয়ার স্বপ্ন সাজিয়ে রাখে৷
দেওয়ালের গায়ে একটি বাক্য সম্পূর্ণ করেছে৷ পাশ থেকে জেমিনি বলল, ‘এবার চলো, খানিক বিশ্রাম নেবে৷ তোমার হাতের কব্জির ফোলাটা বেড়েছে৷’
জেমিনির দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসল রুহ৷ হাতের ছেনি-হাতুড়ি রেখে বলল, ‘বেশ, চলো৷’
হঠাৎ জেমিনি বলল, ‘ফেরার পথে রুহাইল ও নৌশিনের নতুন দেওয়ালটা দেখে যাবে, কতদূর এগোল ওরা?’
‘চলো৷’
রুহ ও জেমিনি তিনটে গলি ঘুরে রুহাইলদের আঁকা শুরু করা নতুন দেওয়ালটার দিকে এগিয়ে চলল৷ হঠাৎ রুহর বামহাতে টান দিল জেমিনি৷ তারপর খুব নীচুস্বরে বলল, ‘চলো, আজ নয়৷ কাল দেখব৷’
‘কেন?’ জিজ্ঞাসা করে সামনে তাকাতেই রুহ দেখল—রুহাইল ও নৌশিন সম্পূর্ণ নগ্ন৷ সেদিনের মতো আঁকা শেষ করে রং-তুলি সরিয়ে রেখেছে৷ ঠিক তারপাশে দীর্ঘ একটি পাথরের ওপর রুহাইল ও নৌশিন সঙ্গমরত৷
নিঃশব্দে সরে এল রুহ ও জেমিনি৷ অন্যপথে গুহার বাইরে বেরিয়ে এল দু-জন৷ জেমিনি কোনো কথা বলছে না৷ রুহ বুঝতে পারল জেমিনি যথেষ্ট বিব্রত৷ রুহ বলল, ‘তুমি বিব্রতবোধ করছ কেন, জেমিনি?’
জেমিনি বলল, ‘হয়তো এটাই স্বাভাবিক কিন্তু...’
জেমিনিকে কথা শেষ করতে না-দিয়ে রুহ বলল, ‘হয়তো, কিন্তুর কিছু নেই, জেমিনি৷ এই মৈথুন দৃশ্য বড় পবিত্র৷ এই নগ্নতা বড় সুন্দর৷ এই সঙ্গমক্রিয়া আসলে আমাদের জ্ঞান আর সঠিক পথে জীবনকে অতিবাহিত করার যে উচ্ছ্বাস—তার প্রতীক৷ এই নগ্নতা কোনো লজ্জার বিষয় নয়৷ এই শারীরিক সম্পর্ক হৃদয়কে আলোয় প্লাবিত করে৷ এ-এক অনাবিল জীবনবোধের প্রকাশ৷ সুতরাং তোমার বিব্রত হওয়ার মতো কিছু হয়নি৷ বরং মনে করে দেখো—আমাদের সেই জ্যোৎস্নারাত্রির কথা৷ ঝরনার পাশে পাহাড়ি উপত্যকায় আমাদের সেই পরম মুহূর্তগুলোর কথা৷’
জেমিনি এবার স্পষ্ট করে তাকাল রুহর দিকে৷ তারপর দু-জনে কাঠের ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল শালগাছের ওপর তাদের গাছবাড়িতে৷ বাইরে এখন গোধূলির আলো৷ অদূরে মহুলগাছের ডালের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে একফালি অস্পষ্ট চাঁদ৷
ঘন নীল জল৷ লক্ষ-লক্ষ ঢেউয়ের চুড়োয় সকালের রোদ৷ যেন আদিগন্ত জলের ওপর ঢেউগুলো প্রদীপ হয়ে ভাসছে৷ জল-প্রদীপের ওপর রোদের নরম শিখাগুলো ঝিকমিক করছে৷ সেইসঙ্গে সিগালের ঝাঁক ডুবছে, ভাসছে৷ কখনো জল ছেড়ে সাদাকালো ডানা মেলে আকাশে এক চক্কর কেটে আবার জলে নেমে আসছে৷ তারই মাঝ দিয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটে যাচ্ছে নাওকির স্পিডবোট৷
নাওকি চোখের রোদ চশমা কপালের ওপর তুলে দিয়ে বোটের গতি আরও বাড়িয়ে দিল৷ পিছনে বসে থাকা কেইকো বললেন, ‘আরও স্পিড বাড়াচ্ছিস কেন? আমার বয়সের কথাটা তো মাথায় রাখ!’
ঠাম্মার দিকে একবার হাসিমুখ ফিরিয়ে বোটের গতি অল্প কমিয়ে দিল৷ তারপর বলল, ‘তোমার জন্যই তো দ্রুত যাচ্ছি৷ যত দ্রুত সম্ভব যৌবনের স্মৃতির কাছে তোমাকে পৌঁছে দিতে চাই৷’
নাওকির কথায় বৃদ্ধার বলিরেখাময় মুখে যেন লালচে আভা ঝিলিক দিল৷ ভাবল, সারাজীবন জুড়ে যত স্মৃতি জমা হয়, কৈশোর আর যৌবনের স্মৃতিই বোধহয় মানুষ তার মৃত্যু অবধি সোনার ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখতে চায়৷
সামনের আবছায়া দ্বীপটি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে৷ স্পিডবোট কিছুক্ষণের মধ্যে আরও কাছাকাছি হতেই দেখা গেল পাথুরে দ্বীপের গায়ে প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জল ঝাপটা দিচ্ছে৷ পরিত্যক্ত দ্বীপটি আগাছায় পূর্ণ৷ তারই ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে নোনা হাওয়া ও সময়ের ছোবলে কতখানি জরাজীর্ণ হয়ে গেছে দ্বীপ-শহরটি৷
স্পিডবোট থামল৷ নাওকি ঠাম্মাকে ধরে নামিয়ে নিল দ্বীপের ওপর৷ বৃদ্ধা কেইকো মাটিতে পা দিয়েই দু-দিকে দুহাত মেলে দিয়ে বললেন, ‘আমার হাশিমা, আমার হাশিমা, আমার জন্মমাটি!’
তিনি যেন এই মুহূর্তে আর বৃদ্ধা নন৷ পঁয়ষট্টি বছর বয়সটাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে কিশোরীবেলার উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে দিলেন৷ ঠাম্মার এতখানি আবেগ দেখে নাওকির চোখে জল চলে এল৷
নাগাসাকি শহর থেকে হাশিমার দূরত্ব মাত্র চোদ্দো কিলোমিটার৷ ১৯৫৫ সালে এখানেই কেইকো জন্মেছিলেন৷ বয়স যখন উনিশ, তখন এই দ্বীপ ছেড়ে জাপান সরকারের নির্দেশে চলে যেতে হয়৷ এক সময় এই হাশিমা জনশূন্যই ছিল৷ কিন্তু যখন এই দ্বীপে কয়লার সন্ধান মেলে তখন জাপানের মিতসুবিসি কোম্পানি সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেয়৷ ধীরে-ধীরে গড়ে ওঠে শহর৷ কয়লা উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মচারিরা এখানে থাকতে শুরু করে৷ তৎকালীন জাপানের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু বহুতল এখানেই গড়ে উঠেছিল৷ ন-তলার সেই বাড়ি হাশিমার মুকুটে ছিল উজ্জ্বল পালক৷
একসময় কয়লার উৎপাদন অলাভজনক হয়ে দাঁড়ায়৷ ফলে, এখানকার কয়লা উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়৷ সবাইকে দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে হয়৷ সরকার এই দ্বীপে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে৷
কিছুদিন ধরেই সরকারি নিষেধাজ্ঞার কথা আর মনে পড়ছে না৷ যেন নিজের কাজের কারণে এতদিন এই দ্বীপে ফিরে আসতে পারেনি৷ বুকের মধ্যে এতদিন নিজের মেয়েবেলা ও যৌবনের যে-সব স্মৃতি আগলে রেখেছিলেন কেইকো, ইদানীং সেই স্মৃতি তাঁকে তাড়িয়ে ফিরছিল৷ নাওকিকে তাগাদা দিয়ে আজ সকাল-সকাল বেড়িয়ে পড়েছিলেন৷ নিজের জন্মমাটিতে পৌঁছে তাঁর আনন্দের সীমা নেই!
নাওকির হাত ধরে একটি বড় বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন কেইকো৷ দ্বীপ জুড়ে এত অবিন্যস্ত আগাছার জঙ্গল গজিয়ে উঠেছে যে সব জায়গা ঠাওর করা মুশকিল৷ কিন্তু দ্বীপটির আনাচকানাচ নিজের হাতের তালুর মতো চেনেন বলে কেইকোর তেমন অসুবিধে হল না৷ বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে কেইকো বললেন, ‘এই বাড়ির দোতলায় আমরা থাকতাম৷ জানিস, ছোটবেলায় বাড়ির সবাই যখন কাজে চলে যেত, আমি আমার বেডরুমে বসে জানালা দিয়ে সমুদ্রের সঙ্গে গল্প করতাম৷’
কেইকোর কথায় হেসে ওঠে নাওকি৷ সারাক্ষণ বকবক করে যাচ্ছেন কেইকো৷ সমুদ্র থেকে উঠে আসা হাওয়ার দাপটে সব কথা কানে না-পৌঁছলেও ঠাম্মার উচ্ছ্বাস দেখে ভীষণ খুশি নাওকি৷
কেইকো তার হাত ধরে আবার একটা অন্য জায়গায় নিয়ে চললেন৷ জায়গাটা একদম দ্বীপের পুবে৷ সমুদ্র কিনারায়৷ সেখানে পাথুরে একটি ঢিবির পাশে একতলা ছোট্ট প্যাগোডার ধ্বংসাবশেষ৷ এখন দেওয়াল ভেঙে গেছে৷ ছাদ নেই৷ দু-পাশের দুটো দেওয়াল কাত হয়ে কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে৷ সেগুলো আবার জংলি লতায় ঢাকা৷ সেই প্যাগোডার কাছে একটি মস্ত বড় পাথর৷ সামুদ্রিক ঢেউগুলো পাথরটার কিছুদূরে আছড়ে পড়ছে৷ মাঝে-মাঝে নোনা জলের গুঁড়ো পাথরের দিকে উড়ে আসছে৷ কেইকো খুব মনোযোগ দিয়ে পাথরটিকে দেখতে লাগলেন৷ বেশ কিছুক্ষণ পর, চিৎকার করে বললেন, ‘পেয়েছি, পেয়েছি...’
নাওকি সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘কী পেয়েছ?’
এবার বৃদ্ধা যেন সাংঘাতিক লজ্জা পেলেন৷ চুপ করে গেলেন৷ তাঁর চোখে আনন্দ ও বিষাদের মিলিত অশ্রু৷ মুখের অভিব্যক্তিই যেন তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে!
নাওকি খুব অবাক হয়ে গেল ঠাম্মার আচরণে৷ বলল, ‘কী হল, বলছ না কেন, কী পেয়েছ?’
কেইকো মুখে না কিছু বলে পাথরের গায়ে খোদাই করা একটি লেখার ওপর হাত বোলালেন৷ নাওকি একটি টুকরো পাথর কুড়িয়ে এনে শ্যাওলার স্তরটি তুলে ফেলতে লাগল৷ একসময় স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল জাপানি অক্ষরগুলো৷ যার অর্থ দাঁড়াল—কেইকি আমার হৃদয়৷ আমার হৃদয়কে আমি ভালোবাসি৷ তার নীচে লেখা মাকোতো৷
বুঝতে আর কিছুই বাকি রইল না নাওকির৷ নাতির দিকে মুচকি হেসে কেইকো বললেন, ‘এখানে তোর ঠাকুরদা দেখা করতে আসতেন৷ তখনও আমাদের বিয়ে হয়নি৷ একদিন ড্রিল মেশিন দিয়ে এই কথাগুলো গভীরভাবে খোদাই করে ছিলেন৷ সেটা ছিল আমার সতেরোতম জন্মদিন৷’
কথাগুলো বলে দূর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইলেন কেইকো৷ হয়তো পরিত্যক্ত এই দ্বীপভূমিতে দাঁড়িয়ে মৃত স্বামীর রেখে যাওয়া স্মৃতির ভিতর আরও নিবিড়ভাবে মিশে যেতে চাইছেন এই মুহূর্তে৷
আবেগঘন এই দৃশ্যটি যেন মুহূর্তের জন্য বিচলিত করল রুহকেও৷ রুহ শুধু সান্ত্বনা পেল এই ভেবে যে—সুদূর জাপানেও মানুষ এখন মানুষের বিরুদ্ধে জারি করা সব নিষেধাজ্ঞা মনে করতে পারছে না৷ আর পারছে না বলেই কেইকো বিনাবাধায় তার নাগাসকি শহর থেকে চলে যেতে পেরেছে তাঁর জন্মমাটি হাশিমা দ্বীপে৷ পৌঁছে যেতে পেরেছে তাঁর বুকের ভিতর আগলে রাখা প্রিয় স্মৃতিগুলোর কাছে৷
পরের দৃশ্যটি দেখে চমকে উঠল রুহ৷ দিগন্তজোড়া পাহাড়গুলো ন্যাড়া৷ সবুজের চিহ্নমাত্র নেই৷ নীচের সমতলে তৃণভূমি৷ সেখানেই মেষের পাল চরছে৷ পাশে কয়েকটি কিশোর ছেলে মেষের পাল দেখভাল করতে-করতে নিজেরা খেলাধুলো করছে৷ সামনে একটি বড় পাথরের গায়ে পাথর ছুড়ে লক্ষ্যভেদ করছে৷
অন্যদিকে, সামনের পাহাড়িগুহায় কয়েকটি ছেলে গল্প করছে৷ তাদের মধ্যে একজন দেখতে পেল গুহার একপাশে বেশকিছু জিনিস পড়ে আছে৷ অনেকটা ঘটির মতো৷ ঘটির মুখে অনেকগুলো লোহার ফলা৷ ছেলেটি সেখান থেকে দুটো জিনিস তুলে নিতেই রুহর বুকের ভিতর কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল৷ রুহ বুঝল ওগুলো একধরনের বোমা৷ ছেলেগুলো একসময় নিশ্চিত এই মারাত্মক অস্ত্রগুলো চিনত৷ আজ চিনতে পারছে না৷
ছেলেটি সেই দুটো বোমা নিয়ে নীচে নেমে এল৷ নীচের ছেলেদের মতো সে-ও লক্ষ্যভেদের জন্য একটা বোমা ছুড়ে মারল পাথরের দিকে৷ আতঙ্কে চোখ বন্ধ হয়ে গেল রুহর৷ চোখ খুলে দেখল বেশ কয়েকটি ছেলে বোমা থেকে ছিটকে আসা স্প্লিন্টারে আহত হয়েছে৷ তবে জীবনহানির সম্ভাবনা নেই৷ সমস্ত কিশোরের মুখে-চোখে আতঙ্ক৷ অন্য বোমাটি হাত থেকে গড়িয়ে গেছে মাটিতে৷ কিন্তু বিস্ফোরিত হয়নি৷ একটি ছেলে সেই বোমাটি কুড়িয়ে দূরে পাহাড়ে উঠে একটি পাথরের ফাটলে ভয়বিহ্বল কাঁপা-কাঁপা হাতে রেখে এল৷
রুহ বুঝল, ওই গুহা ছিল তালিবানি জঙ্গিদের ডেরা৷ জঙ্গিরা যুদ্ধের কৌশল আর অস্ত্রের ব্যবহার ভুলে যেতে অদরকারী জিনিসের মতো ওগুলো ফেলে গেছে৷ আহত কিশোরদের জন্য আশ্চর্য এক মনখারাপে ঢেকে গেল রুহর মন৷
নিজের মনকে সরিয়ে নিল রুহ৷ চোখের সামনে খুলে গেল অন্য আরেক দৃশ্য৷ জায়গাটা রাশিয়ার এক নির্জন জঙ্গল৷ জঙ্গল না বলে সাধারণ বন বলাই ভালো৷ গাছপালা বেশ ফাঁকা-ফাঁকা৷ মাস তিন হল বরফ পড়া বন্ধ হয়েছে৷ এখন চারপাশ ঝলমলে সবুজ৷ জায়গাটায় রাশিয়ান প্রতিরক্ষা বিভাগ ট্যাংক বানানোর কারখানা করেছিল৷ বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ট্যাংকের উৎপাদন এখান থেকেই হতো৷ এখন জায়গাটা জনশূন্য৷ পরিত্যক্ত৷ বেশ কিছু ট্যাংক এমনি পড়ে রয়েছে৷ পাশে একটি ছিমছাম হ্রদ৷ হ্রদের জলে গাছপালাদের ছায়া অল্প হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে৷ হঠাৎ একটি কুড়া ঈগল ছোঁ মারল জলে৷ হ্রদের জল কেঁপে উঠল৷ ভেঙে গেল হ্রদের জলে কাঁপতে থাকা গাছপালাদের ছায়া৷
অব্যর্থ লক্ষ্যে একটি মাছ শিকার করে ঈগলটি উড়ে এসে বসল একটি ট্যাংকের নলের ওপর৷ সঙ্গে-সঙ্গে নলের ভিতর থেকে দুটো কচি মুখ হাঁ-হাঁ করে উঠল খাওয়ার জন্য৷ ছানাগুলো তাড়াহুড়ো করলেও মা-ঈগলটির কোনো তাড়াহুড়ো নেই৷ সাদাটে মাথা ও গাঢ় বাদামি শরীর নিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে তার বাঁকা এবং ধারাল হলুদ ঠোঁট ও হলুদ পায়ে থাকা তীক্ষ্ম নখ দিয়ে মাছটিকে টুকরো-টুকরো করে, এক-একটি টুকরো ঈগলটি তার ছানাদের মুখে ফেলে দিতে লাগল৷
এই দৃশ্যটি কিছু আগের মনখারাপকে খানিকটা মুছে দিল৷ রুহর কাছে এই দৃশ্যটি সামান্য কোনও দৃশ্য নয়৷ তার কাছে দৃশ্যটির একটি বিশেষ তাৎপর্য ধরা দিল৷ ভাবল, যে ট্যাংকের নল কেবল গোলা উগরে দিয়ে আগুন আর তীব্র শব্দে ধ্বংসের কর্কশ জয়গান গাইত, সেই ট্যাংকের নলই আজ সৃষ্টির আঁতুড়ঘর৷ সমস্ত কর্কশতার দানবীয় গান মুছে, মৃদু হয়ে বাজছে জীবনের সরল-সংগীত৷
এদিকে দুপুর থেকে জেমিনির বুকের ভিতর অজানা আতঙ্কে কাঁপছে৷ কোনোদিন তো রুহ তাকে না-বলে কোথাও যায় না! সারা দুপুর তন্নতন্ন করে খুঁজেছে গুহার আশেপাশে৷ এই জঙ্গলের বিশেষ কিছুই চেনে না৷ রুহ যেখানে নিয়ে গেছে সে-সব জায়গাই কেবল চেনে৷ চারপাশ খুঁজে আসার পর জেমিনি ঝরনার কাছাকাছি পৌঁছে চমকে গেল৷ দেখল, ঝরনার পাশে একটি কালো চ্যাটালো পাথরের ওপর পদ্মাসনে বসে আছে রুহ! নিঃশব্দে এগিয়ে গেল কাছে৷
রুহর দু-চোখ বন্ধ৷ শরীর নিস্পন্দ৷ যেন একটি পাথরের মূর্তি৷ রুহর এমন রূপ দেখে ভয় পেয়ে গেল জেমিনি৷ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর দেখল রুহ যেন অল্প নড়ে উঠল৷ তখন আরও কাছে এগিয়ে গেল৷ পিছনে পায়ের শব্দ পেয়ে মুখ ফেরাতেই রুহ দেখতে পেল জেমিনিকে৷
রুহ স্মিত হেসে উঠে দাঁড়াল৷ বলল, ‘তুমি! তুমি এখানে কেন?’
জেমিনি বিস্ময়ে তাকিয়ে রয়েছে রুহর দিকে৷ তারপর বলল, ‘তুমি কে, রুহ?’
‘কেন! আমি তো আমিই৷’
‘তোমাকে আজ ভীষণ অচেনা লাগছে, রুহ৷’
রুহ জেমিনির একটি হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে উদাসীন স্বরে বলল, ‘সমস্ত চেনার মাঝেই যে অন্যরকম অচেনা লুকিয়ে থাকে, জেমিনি৷ কিংবা, সমস্ত অচেনার ভিতরে খোঁজ করলেই মেলে নিজের চেনার আদল৷’
জেমিনি বলল, ‘আমি তোমার এমন শক্ত কথার মানে বুঝি না৷ আমি শুধু বলতে চাইছি—তোমার অমন পদ্মাসনে বসা দেহভঙ্গির সঙ্গে আমার চিরচেনা রুহর কোনো মিল নেই৷ মনে হচ্ছিল তুমি যেন অন্য কেউ, অন্য এক অচেনা পুরুষ৷’
রুহ জেমিনির কথায় হেসে উঠল৷ নিজের হাতের মুঠোয় জেমিনির হাতটি আরও শক্ত করে ধরে বলল, ‘আমি যাই হই, আমি শুধুই তোমার৷’
রুহর কথায় জেমিনি যেন খানিক স্বস্তি পেল৷ তারপর বলল, ‘কিন্তু তুমি ওরকম পদ্মাসনে বসে কী করছিলে?’
‘দুনিয়াকে দেখছিলাম৷ দেখছিলাম, এই পৃথিবী কোন পথে এগিয়ে চলেছে৷ শিল্পী হিসাবে আমার সাধনা সার্থকতা পাচ্ছে কিনা!’
রুহর কথার স্পষ্ট অর্থ বুঝতে না-পারলেও জেমিনি জিগ্যেস করল, ‘কী দেখলে?’
‘সবকিছু ঠিক দিকে, ঠিক পথে এগিয়েছে৷ আগামী সময় পৃথিবীর জন্য শুভ৷ ইতিবাচক৷’
গাছের আড়াল থেকে কোথাও যেন পিকপিক শব্দ করে একটা পাখি ডেকে উঠল৷ খুব মিষ্টি ডাক৷ রুহ ও জেমিনি ধীরে-ধীরে এগোতে লাগল তাদের গুহার দিকে৷ ক্রমশ জঙ্গলের গাছপালায় আড়াল হয়ে গেল তারা৷
‘অপ্রাণী জগতে সবচেয়ে জীবন্ত হল আকাশ, নদী ও ঝরনা৷ আর, সবচেয়ে বেশি কথা বলে জঙ্গল, গাছপালা৷’ বলল জেমিনি৷
‘কীভাবে?’ জিগ্যেস করে রুহ৷
‘মাথার ওপর তাকাও, সারা দিনমানে আকাশ জুড়ে সারাক্ষণ আলোর বদল, রংয়ের বদল৷ মেঘেদের বুকে নিয়ে লুকোচুরি খেলে৷ আর রাত্রি নামলে কত তারা কত নক্ষত্রদের আলো জ্বালিয়ে তাঁবু ফেলে আমাদের সূর্যসাপ গোষ্ঠীর মতো৷
ওদিকে, ঝরনার মতো উচ্ছল আর কে? নদীর মতো এমন বুকে হেঁটে দেশ থেকে দেশান্তরে পাড়ি জমায় আর কে?’
জেমিনির কথায় রুহ হাসে৷ বলল, ‘এসব কথা কখন ভাব তুমি?’
তোমার কাজ দেখার ফাঁকে আমি আকাশ দেখি৷ প্রতিদিন স্নানের সময় ঝরনার সঙ্গে কথা বলি৷ নদীর গল্প শুনি৷ আমাদের সেই মরু ও প্রায় রুক্ষ পার্বত্য অঞ্চলে ঋতুর পরিবর্তন সেভাবে চোখে পড়ত না৷ বছরের প্রায়সময়ই দিনে যেমন তীব্র গরম, রাতে তেমনই কনকনে ঠান্ডা৷ বছরের কোনো একসময় সামান্য বৃষ্টি আর কখনো বালুর বুকে ক্যাকটাসদের ফুল ফোটাতে দেখেছি৷ কিন্তু এখানে এসে বুঝেছি, ঋতুর বদল কাকে বলে! প্রতিটি ঋতুতে গাছপালার রং বদলায়৷ নানান সুগন্ধে ভরে ওঠে এই বনভূমি৷ তারা যেন রংয়ের বদল ও সুগন্ধ ছড়িয়ে নিজের হৃদয়ের কথাগুলো চুপিচুপি কানে-কানে বলে যায়!’
জেমিনি কোনোদিন সমুদ্র দেখেনি৷ দেখেনি আগ্নেয়গিরিও৷ ফলে তার কথার ভিতর এই দুইয়ের প্রসঙ্গ এল না৷ জেমিনি যখন কথা বলছিল, গলায় সাত-রংয়ের নুড়ির মালাটি দুলে-দুলে উঠছিল৷ রুহ মুগ্ধ হয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জেমিনিরি দিকে৷ যতখানি তার কথা শুনছিল, তারচেয়ে বেশি করে দেখছিল জেমিনিকে৷ বয়স বাড়লেও জেমিনির শরীরে সময় সেভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি৷
রুহ প্রতিদিন ঝরনায় স্নানের পর নীচে নদীর চরে নেমে যায়৷ চরে পড়ে থাকা অজস্র রঙিন নুড়ি-পাথর কুড়িয়ে এনে অবসর সময়ে মালা গাঁথে৷ জঙ্গলের মাটি থেকে বিচিত্র বর্ণের পাতা কুড়িয়ে মুকুট বানায়৷ তারপর গুহার একটি জায়গায় রেখে দেয়৷ নৌশিন ও জেমিনি নিজেদের পছন্দমতো সেগুলো তুলে নিয়ে পরে৷ ওদের প্রসাধনে রুহর মনে আনন্দ জাগে৷ দিনেদিনে এমন কত যে গহনা বানিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই৷
রুহাইল, নৌশিন ও জেমিনিকে নিয়ে যে-বসন্তে রুহ ফিরে এসেছিল, তারপর আরও সাতটি বসন্ত পার হয়ে গেছে৷ গুহার সমস্ত দেওয়ালকে এখনো রং দিয়ে সাজিয়ে তোলা যায়নি৷ এখনো অনেক কাজ বাকি৷ সে-দিকে তাকিয়ে মাঝে-মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুহ৷ রুহাইলকে বলে, ‘আমি একদিন থাকব না৷ তুমি কিন্তু কাজ বন্ধ কোরো না৷’
রুহাইল মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়৷ আসলে নতুন করে তাকে এ-কথা বলার কোনো অর্থ হয় না৷ কারণ, রুহাইল এখন ঘোরগ্রস্ত৷ রক্তে যাদের রং আর তুলির জাদু লুকিয়ে থাকে, প্রথমে তারা সাধারণ অভ্যেসে রং-তুলি হাতে তুলে নেয়৷ পরে রং আর তুলিই তাদেরকে জাদু দিয়ে বেঁধে ফেলে৷ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত যে-বাঁধন থেকে কোনো শিল্পীই আর মুক্ত হতে পারে না৷
এখন অবশ্য নৌশিন রুহাইলকে সবসময় কাজে সঙ্গ দিতে পারে না৷ কারণ, ছোট্ট ইবাদত খুব দুষ্টুমি করে৷ রং আর তুলির ওপর তার সাংঘাতিক নজর৷ আব্বুর কাজের জায়গায় একটু সুযোগ পেলেই সে রং উলটে দেয়৷ তুলিতে কামড় বসায়৷
জেমিনি কিংবা নৌশিনের চোখ পড়ে গেলেই খিলখিল করে হেসে ওঠে৷ ছোট্ট ইবাদতকে পেয়ে চারটি মানুষের এই অরণ্যবাস যেন আরও রঙিন হয়ে উঠেছে৷
শুধু গুহা নয়৷ গুহার আশেপাশের জঙ্গলে রুহ এক আশ্চর্য জগৎ গড়ে তুলেছে৷ গুহার দেওয়ালে সুদীর্ঘ ইতিহাস খোদাইয়ের অবসরে সে গাছপালার শুকনো ডালপালা ও জংলি লতা সংগ্রহ করে ছোট-ছোট পাখিদের বাড়ি বানিয়ে গুহার আশেপাশে, জঙ্গলের গাছপালায় টাঙিয়ে দিয়েছে৷ ফলে কত বিচিত্র রংয়ের পাখি এসে সেইসব বাসায় ঘরসংসার করে৷ শিস দেয়৷ সবাই শুধু মুগ্ধ হয়ে কতরকম পাখিদের ডাক শোনে৷ কারও ভিতর আর একাকিত্ব আসে না৷ যেন তারা কেবল পাঁচটি মানুষ নয়, মস্ত এক জনপদে বাস করে৷
রুহ কাছে সরে এসে জেমিনির কপালে চুমু দেয়৷ লজ্জা পায় জেমিনি৷ ঝরে পড়া শাল আর জারুলের পাতা কুড়িয়ে গতকাল যে মুকুটটি রুহ বানিয়ে ছিল, সকালে সেটাই মাথায় পরেছে জেমিনি৷ রুহ বলল, ‘তোমাকে আজ অরণ্যকন্যার মতো লাগছে!’ তারপর নিজের মাথার সাদা চুলে হাত বুলিয়ে রুহ যোগ করল, ‘দেখো, দেখতে-দেখতে আমি কত বুড়ো হয়ে গেলাম, তোমার শরীরে কিন্তু সেভাবে বয়সের কোনো আঁচ লাগেনি৷’
অভিমানে ঠোঁট বাঁকাল জেমিনি৷ বলল, ‘চুল সাদা হলেই কেউ বুড়ো হয় না৷ যার অন্তরজুড়ে রংয়ের বসত, সে কোনোদিন বুড়ো হতে পারে? এমন কথা আর বলবে না৷’
‘কেন, বুড়ো হওয়া মন্দ নাকি! এ-ও তো দেহের ওপর সময়ের ছবি৷’
‘ও আমি জানি না৷ আমি শুধু জানি তুমি বুড়ো নও, ব্যস৷’
সরলতা বোধহয় সূর্যসাপ উপজাতির মানুষজনের একান্ত নিজস্ব বৈশিষ্ট্য৷ দু-একজন ছাড়া, সবার চোখের মধ্যেই সেই সরলতা ও আন্তরিকতা গাঢ় হয়ে ছায়া ফেলে৷ জেমিনির চোখজোড়াতেও সেই শিশুর মতো সারল্য সারাক্ষণ ছায়ার মতো জেগে থাকে৷ রুহ মৃদু-মৃদু হাসছে দেখে জেমিনি বলল, ‘জানো, আমাদের গোষ্ঠীর কি নারী কি পুরুষ—কেউ কোনোদিন প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছায় না৷ বয়স বাড়ে ঠিকই কিন্তু দেখে মনে হয় যেন যৌবন অটুট রয়েছে৷ তারা যেন যৌবন বুকে নিয়েই মারা যায়৷’
মৃত্যুর কথা ওঠায় ক্ষণিকের জন্য রুহর মন বিষণ্ণ হয়ে উঠল৷ হঠাৎ বলল, ‘আমি যদি চলে যাই, তুমি কী করবে, জেমিনি?’
রুহর কথায় থমকে গেল জেমিনি৷ তারপর বলল, ‘কোথায় যাবে?’
‘আজ অথবা কাল, যেতে তো সবাইকেই হয়, জেমিনি৷ এটাই তো জগতের সবচেয়ে সত্য৷ এরচেয়ে গভীর সত্য আর দ্বিতীয়টি নেই৷’
‘চুপ করো৷ কী হয়েছে বলো তো? এমন কথা বলছ কেন? মৃত্যু চিরন্তন সত্য জানি৷ কিন্তু তোমাকে হারিয়ে আমিও থাকতে চাই না৷’
‘ধুর, পাগলি! কারও শোকে নিজেকে ধ্বংস করতে নেই৷ মৃত্যু যেমন শাশ্বত, একইভাবে স্বাভাবিক মৃত্যু আসার আগে নিজের মৃত্যুকে বেছে নেওয়ায় কোনো মহত্ব নেই৷ বরং যদি অন্যভাবে ভেবে দেখো, দেখবে—বেঁচে থাকার চেয়ে বড় শিল্প কিন্তু এই জগৎ-সংসারে আর দ্বিতীয়টি নেই৷
তাছাড়া, প্রকৃত অর্থে মানুষের মৃত্যু কখন হয় জানো?’
‘কখন?’
‘যখন দেহগত মৃত্যুর পর তার সবচেয়ে নিকটজনদের স্মৃতি থেকে একজন লুপ্ত হয়ে যায়৷ তখনই তার প্রকৃত মরণ হয়৷ জেমিনি, আমি থাকি বা না-থাকি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তোমার স্মৃতি থেকে, রুহাইল নৌশিনের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়ার ভয়টাই আমাকে বিষাদগ্রস্ত করে৷’
‘চুপ৷ একদম চুপ করো তুমি৷ তোমার এ-সব কথা শুনতে আমার একদম ভালো লাগছে না৷ তুমি আজ গুহায় খোদাই করবে না?’
রুহ ধীরে-ধীরে গাছবাড়ির সিঁড়ি ধরে মাটির দিকে নামতে থাকে৷ মাটিতে নেমে সোজা গুহার ভিতর তার নির্দিষ্ট দেওয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়৷ দেওয়ালের গায়ে নিজের খোদাই করা ইতিহাসের গায়ে হাত বোলায়৷ বেশ কিছুদিন ধরে নিজের ভিতর ভাঙনের ডাক শুনতে পাচ্ছে৷ এতদিন জেমিনিকে কিচ্ছুটি বলেনি৷ আজ হঠাৎ প্রসঙ্গ উত্থাপিত হল বলে, বলে ফেলল৷ তার কথায় জেমিনি নিশ্চয় দুঃখ পেয়েছে৷ জেমিনির মতো প্রাণোচ্ছ্বল সঙ্গিনীর তিলমাত্র দুঃখ তার বুকেই শতগুণ ভারী হয়ে পাথরের মতো চেপে বসল৷
গতকালই লেখা শেষ হয়ে গিয়েছিল৷ পৃথিবীর সমস্যা, পৃথিবীর দুঃখ এবং তা থেকে পরিত্রাণের যে-পথ আবিষ্কৃত হয়েছে—তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বৃত্তান্ত ধরা আছে দেওয়ালের গায়ে৷ লেখা আছে সংরক্ষিত করা স্বপ্নবীজের স্বর্ণ-আধারের কথাও৷
এই মুহূর্তে রুহ ভাবল, যেখানে স্বর্ণ-আধারটি সংরক্ষিত করা আছে, ঠিক তার ওপর কুনচেনের একটি রেখাচিত্র এঁকে রাখবে৷ দেখলে মনে হবে যেন—কুনচেন তাঁর দু-হাত দিয়ে আধারটি বুকের কাছে ধরে আছেন, আগামী পৃথিবীর জন্য৷ যদি কখনো আবার দুঃসময় ফিরে আসে, কুনচেন যেন সেই দুঃসময়ে এই ত্রাণ তুলে দেবেন বলেই আধারটি বুকের কাছে ধরে বসে রয়েছেন৷
তবে রুহ নিশ্চিত—তেমন দুঃসময় আর পৃথিবীর বুকে কোনোদিন ফিরবে না৷ ইদানীং প্রায়ই সে জঙ্গলের গভীরে গিয়ে তার তৃতীয় নয়ন উন্মুক্ত করে৷ সমস্ত পৃথিবী তন্নতন্ন করে খোঁজ করে কোথাও আজও সেই দখলদারি, যুদ্ধহিংসা, সীমান্তের বৈরিতা থেকে গেছে কিনা৷ নাহ্, এখন সে নিশ্চিত সমস্ত পৃথিবী আমূল বদলে গেছে৷ কোথাও আর কোনো সমস্যা নেই৷
রেখাচিত্রের কাজ শুরু করল রুহ৷ কখন যে জেমিনি এসে পাশে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি৷ জেমিনির দিকে তাকিয়ে হাসল রুহ৷ দেখল সে হাসিতে সাড়া দিল না জেমিনি৷ তার মুখ থমথমে৷
কিছুক্ষণ পর ইবাদতকে কোলে নিয়ে নৌশিন এল৷ নৌশিন কাছে এসে বলল, ‘ইবাদত, কোনো কথাই শুনছে না৷ কাছের ঝোপে একটা খরগোশ দেখেছে৷ বায়না করছে খরগোশটাকে কাছে এনে দিতে হবে৷’
নৌশিনের কথায় হাতের ছেনি-হাতুড়ি বন্ধ করল রুহ৷ জেমিনি ইবাদতকে বলল, ‘দেখাও তো আমায়, কোথায় তোমার সেই প্রিয় খরগোশ?’
জেমিনি হাত বাড়িয়ে নৌশিনের কাছ থেকে ইবাদতকে কোলে নিয়ে গুহা ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷
নৌশিনও গুহার ভিতর তিনটে বাঁক ঘুরে রুহাইলের দেওয়ালের দিকে চলে গেল৷ রুহ আবার নিজের কাজ শুরু করল৷ দুপুর পর্যন্ত কাজ করার পর রুহ গুহা থেকে বেরিয়ে গভীর জঙ্গলের দিকে চলে গেল৷
এখন আর ঝরনার কাছে যায় না৷ ও জায়গায় জেমিনি তাকে খুঁজে পেয়েছিল৷ রুহ চায় না তৃতীয় নয়ন দিয়ে পৃথিবীর জনজাতির পরিবর্তন লক্ষ করার সময় তাকে কেউ দেখুক৷ এমনকী জেমিনিও নয়৷ খুব অস্বস্তি হয়৷ কারণ, এটা তার একান্তই ব্যক্তিগত৷ একান্তই নিজস্ব কাজ৷
সামনে দুটো মস্ত শালগাছ৷ তার মাঝে দীর্ঘ একটি পাথর৷ পাথরটির উপরিভাগ মসৃণ এবং বর্তুলাকার৷ অনেকটা কচ্ছপের পিঠের মতো৷ বেশ ক-বছর এখানে এসেই রুহ তার তৃতীয় নয়ন উন্মুক্ত করে৷ সারা পৃথিবীর খোঁজ নেয়৷
আজ সবে পাথরের ওপর পদ্মাসনে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে হঠাৎ শুকনো পাতার ওপর দিয়ে কারও হেঁটে আসার শব্দে বামদিকে তাকাল রুহ৷ দেখেই চমকে উঠল৷ দেখল জাদুকর হেঁটে আসছে৷ তার মুখে সেই ভুবনভোলানো হাসি৷
মুহূর্তে প্রগাঢ় বিস্ময় ও তীব্র আনন্দে হৃদয় পূর্ণ হয়ে উঠল৷ বুঝতে পারল না—সে চোখের সামনে যাকে দেখছে সে সত্যিই জাদুকর নাকি মরুভূমিতে অতিকায় পাখি দেখার মতো দৃষ্টি-বিভ্রম?
জাদুকর মুখে কিছুই বলল না৷ কাছে এসে নিজের বুকে রুহকে জড়িয়ে ধরল৷ জাদুকরের স্পর্শে ধাতস্থ হল রুহ৷ জাদুকর বলল, ‘চলো, বসি৷’
জাদুকর ও রুহ সেই বর্তুলাকার মসৃণ পাথরের ওপর পাশাপাশি বসল৷ রুহ বলল, ‘কুনচেনের নির্দেশ অনুযায়ী সেই স্বর্ণ আধার আমি গুহার দেওয়ালে সংরক্ষণ করেছি৷’
‘জানি৷ গতকাল তুমি তার পূর্ণ ইতিহাস খোদাইয়ের কাজও শেষ করেছ৷’
রুহ বিস্মিত৷ এত বছর যে মানুষটা নিরুদ্দেশ ছিল, এত বছর যে-মানুষটার ছায়া পর্যন্ত গুহার ত্রিসীমানায় দেখা যায়নি, সে তার কাজের বৃত্তান্ত জানল কী করে? জাদুকর যেন মুহূর্তে রুহর মনের কথাটি পড়তে পারল৷ বলল, ‘তোমার সব কৌতূহলের নিরসন হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে৷ এই মুহূর্তে এত আকাশ-পাতাল ভেব না৷’
কথাটি বলেই জাদুকর মুচকি হাসল৷ বলল, ‘তোমার সঙ্গে এই জঙ্গলের গুহায় যখন প্রথম দেখা হয়, তুমি নাতসিদের দ্বারা ইহুদিদের নির্যাতনের কথা বলেছিলে মনে আছে? আইনস্টাইনের কথা বলেছিলে৷ বলেছিলে ঘৃণ্য হলোকাস্টের কথা৷’
‘মনে আছে৷ যুগোস্লাভিয়ার কথাও বলেছিলাম৷ বলেছিলাম বসনিয়াক মুসলিমদের ওপর সার্ব-মিলিট্যান্টদের অত্যচারের কথা৷ নুসরেতা সিবাজের কথা৷ কিছুই ভুলিনি, জাদুকর৷’
‘কিন্তু তুমি তো রোহিঙ্গাদের কথাও বলেছিলে৷ এতগুলো বছর ধরে তাদের কেন খোঁজ নাওনি, রুহ? সারা পৃথিবীর খোঁজ রাখছ, অথচ আমাদের ভূখণ্ডের এত কাছে মায়ানমার, সেখানের লক্ষ-লক্ষ ওই হতভাগ্য শরণার্থীদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তুমি এতদিন উদাসীন থাকলে কীভাবে?’
জাদুকর যেন এই মুহূর্তে বেশ গম্ভীর৷ সে যেন রুহকে কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়ে দুঁদে উকিলের মতো জেরা করছে৷ তাকে পরোক্ষে অভিযুক্ত করছে৷
জাদুকরের চোখের দিকে তাকাতে পারল না রুহ৷ জাদুকর সঠিক কথাই বলছে৷ সত্যিই তার খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল৷ রুহর মনে আশঙ্কা তৈরি হল—তাহলে কি স্বপ্নবীজ রোহিঙ্গাদের সমস্যার সমাধান করতে পারেনি? রুহ মৃদুস্বরে জিগ্যেস করল, ‘তাহলে কি রোহিঙ্গারা আজও সেইভাবে সামরিক সরকারের হুমকি আর সামরিক বাহিনীর বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে?’
‘আমার কথার অর্থ কি তাই দাঁড়াল? আমি শুধু বলতে চেয়েছি—রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তোমার অনুসন্ধান করা উচিত ছিল৷ স্বাভাবিক আগ্রহ থাকা উচিত ছিল—এখন তারা কেমন আছে৷’
‘এত বড় দুনিয়ার খোঁজ করতে-করতে আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে, জাদুকর৷’
‘তা বুঝেছি৷ শোনো, ওদের আর কোনো সমস্যা নেই৷’
জাদুকরের কথায় রুহর বুক থেকে যেন পাষাণভার নেমে গেল৷ হালকা লাগছে বুক৷ জাদুকর বলল, ‘তোমার ওপর আমার অভিমান হয়েছিল, কারণ এত সংখ্যক নিপীড়িত মানুষদের দুর্দশার কথা এতদিন তুমি ভুলে থাকলে কীভাবে! আসলে পৃথিবীর সমস্ত মানুষই কোনো-না-কোনো সূত্রে পরস্পরের রক্ত-সম্পর্কিত৷ হয়তো ভৌগলিক দূরত্ব এবং দীর্ঘ সময় সেই রক্তের সম্পর্ককে অনেকটাই ফিকে করে দিয়েছে, তার বেশি তো কিছু নয়৷ কিন্তু এই রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আমাদের রক্তের সম্পর্ক কিন্তু তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত নিবিড়৷’
রুহ চুপ করে থাকে৷ জাদুকর আবার বলল, ‘আরাকান রাজসভায় দৌলত কাজি ও সৈয়দ আলাওলের মতো কবির উপস্থিতিই তার প্রমাণ৷ দৌলত কাজির লেখা লোর চন্দ্রাণী বা সতী ময়না এবং আলাওল রচিত পদ্মাবতী শুধু সাহিত্য নয়, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ঐতিহাসিক দলিলও৷’
‘ঠিক বলেছ, জাদুকর৷ অথচ ওই স্বাধীন আরাকান রাজ্যের মানুষগুলোই নিজভূমে পরবাসী!’
‘ছিল৷ এখন অতীতকাল৷’ কথাটা বলে হাসল জাদুকর৷ মুখের সেই গম্ভীর ভাব এখন উধাও৷ রুহ বলল, ‘শাসকেরা কত নৃশংস হতে পারে, তাই না?’
‘তাই তো৷ স্বাধীন আরাকান ১৭৮৫ সালে পরাধীন হল৷ বর্মিরা দখল করে নিল৷ যুক্ত হয়ে গেল বার্মার সঙ্গে৷ পরে আবার ইংরেজরা বার্মার স্বাধীনতা হরণ করে৷
একসময় বার্মার নাম বদলে হল মায়ানমার৷ আরাকানও আর আরাকান থাকল না৷ হয়ে গেল রাখাইন৷ ১৯৪৮ সালে ইংরেজদের কবল থেকে মুক্ত হল বর্তমানের মায়ানমার৷ কিন্তু আপামর মানুষের জীবন বদলাল কি? বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের? একদম না৷ ১৯৬২ সালে সামরিক সরকার গোপনে জাতিবিনাশের পরিকল্পনা করল৷ আর ১৯৮২ সালে নতুন নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের সমূলে বঞ্চিত করা হল৷’
‘নিজের জন্মভূমিতে নিজেরাই হয়ে গেল পরবাসী! শরণার্থী! কী আশ্চর্য শাসন, কী স্বৈরাচারী শাসক! অথচ জাদুকর, কী ঐতিহাসিক কী ভৌগলিক কী নৃতাত্ত্বিক—যে দিক থেকেই দেখো না কেন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বকে অস্বীকার করার কিন্তু কোনো যুক্তি নেই৷’
‘শুধু কি তাই? সামরিক সরকার সেনাদের হিংস্র কুকুরের মতো ছেড়ে দিল রোহিঙ্গাদের ওপর৷ গণহত্যা ও গণধর্ষণের চিৎকারে কেঁপে উঠল রোহিঙ্গাদের বসতভিটে৷
প্রাণভয়ে নারী-পুরুষ-শিশুদের বুকে করে ভিটে ছেড়ে বসত ফেলে পালাতে শুরু করল৷ বাংলাদেশের নানা জায়গায় আশ্রয় নিতে শুরু করল৷ অবশ্য এখানে বিশ্ব দেখেছে বাংলাদেশের মানবিক মুখ৷ তারা কিন্তু জোর করে বহিরাগত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দেয়নি৷ রাষ্ট্রসংঘের চাপে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয় মায়ানমার সরকার৷ কিন্তু মায়ানমারের আন্তরিক সদিচ্ছাই ছিল না৷ বাধ্য হয়ে কিছু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়েছিল৷ কিন্তু অধিকাংশ রোহিঙ্গা মায়ামমারে ফেরার সাহস করেনি৷ দিনের পর দিন যে নির্যাতন দেখেছে, তারপরে কারই-বা সাহস থাকবে? স্থলপথে, জলপথে আসার সময় কত রোহিঙ্গা যে মারা গেছে, সে হিসাব পৃথিবীর কোনো খতিয়ানে নেই৷’
‘এত জাতিবিদ্বেষ! এত ঘৃণা মানুষ হয়ে মানুষের দিকে ছুড়ে দিতে পারে?’
‘পারে, রুহ৷ আসলে জাতিবিদ্বেষ তো ছিলই, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল চূড়ান্ত লোভ৷’
‘লোভ কেন?’
‘২০০৪ সালে ভূবিজ্ঞানীরা রাখাইনের মাটির তলায় প্রচুর পরিমাণ প্রাকৃতিক তেল ও গ্যাসের সন্ধান পায়৷ তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল—পৃথিবীর মহার্ঘতম যে-খনিজ, সেই ইউরেনিয়ামের খোঁজ মেলে৷ যার ফলে মায়ানমার সরকার পরিকল্পনা করে ২০১৩ সালের মধ্যে যেভাবেই হোক রাখাইনকে জনশূন্য করতে হবে৷
এবং সেই পরিকল্পনার ফলশ্রুতিতে সেনাবাহিনী অপারেশানের জন্য গোপনে একটি সাংকেতিক নাম তৈরি করে৷ সেই গোপন-সাংকেতিক নাম হল—এরিয়া ক্লিয়ারেন্স৷
রুহ, আজ যখন ওই নিপীড়িত নির্যাতিত লাঞ্ছিত লক্ষ-লক্ষ মানুষগুলো অন্য সকলের মতো সুন্দরভাবে বাঁচার ঠিকানা পেয়েছে৷ তখন এই বুকের ভিতর আনন্দের ঝরনা জল ছড়ায়৷ যখন দেখি—একজন রোহিঙ্গা রমণী ধর্ষণের ভয়মুক্ত হয়ে রাতে ঘুমোয়, নিজের সদ্যোজাত সন্তানের মুখে নিজের স্তন্য দান করে—আমার মনে হয়, এর চেয়ে পবিত্র ও সুন্দর দৃশ্য আমি কোথাও দেখিনি৷ জানো, তখন আমার এই হৃদয়ে শরৎকালের রোদ্দুর যেন খুশিতে ঝিলিক দিয়ে ওঠে৷’
নিজের বুকের ওপর হাত বোলায় জাদুকর৷ রুহ তন্ময় হয়ে জাদুকরকে দেখে৷ তারপর রুহ বলে, ‘এই বদলটাই তো চেয়েছিলাম, জাদুকর৷ এই পৃথিবীকেই তো দেখতে চেয়েছিলাম৷
সেই সঙ্গে আরও একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে, জাদুকর?’
‘কী?’
‘মানুষের মধ্যে সমস্ত অর্থনৈতিক লেনদেন বন্ধ হয়ে গেছে৷ কিন্তু এতে কোনো অসুবিধে হচ্ছে না৷’
‘কী রকম?’
‘ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই৷ ধরো, একজন পাইলট, তিনি বিমান উড়িয়ে যাত্রীদের অন্য দেশে নিয়ে গেলেন৷ বিমানবন্দরে বিমান রেখে আগের মতো কোনো হোটেলে বিশ্রাম নিলেন৷ কিন্তু তার থাকা-খাওয়ার জন্য একটি টাকাও দিতে হল না৷ সেই হোটেল কর্তৃপক্ষ, যেখান থেকে তাদের সামগ্রী সংগ্রহ করত, আজও তারা সেইসব জায়গা থেকেই তাদের রসদ সংগ্রহ করে, কিন্তু তার বিনিময়ে কোনো অর্থ দিতে হচ্ছে না৷
সমাজের সবক্ষেত্রেই তাই হচ্ছে৷ প্রত্যেকে নিজের দক্ষতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করছে আনন্দের সঙ্গে৷ কিন্তু তার জন্য তারা যেমন কোনো পারিশ্রমিক পাচ্ছে না, একইভাবে তাদের জীবনধারণের রসদ সংগ্রহের জন্যও তাদের কোনো অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে না৷ যুদ্ধাস্ত্রের মতো টাকা, রুবেল, ডলার, ইউরোর ছাপানো কাগজগুলো সব গুরুত্বহীন হয়ে গেছে৷ এর ফলে কিন্তু কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে না৷ দুনিয়ার মানুষ অর্থনৈতিক লেনদেনকে ছুড়ে ফেলে নিজস্ব প্রয়োজন মতো বেঁচে থাকার রসদ সংগ্রহের এক আশ্চর্য শৃঙ্খলার মধ্যে প্রবেশ করে গেছে৷
এর ফলে অসুবিধে তো হচ্ছেই না, বরং মানুষের ভিতর অর্থনৈতিক বৈষম্য একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে৷ ধনী ও গরিব মানুষের যে ব্যবধান ছিল—তা আজ আর নেই৷’
‘তাহলে অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সারাবিশ্ব জুড়ে যে এত মানুষ যুক্ত ছিল, তাদের ভবিষ্যৎ কী?’
‘তাদের অভ্যেসগত কাজের বাইরেও তারা ভালোবেসে যে কাজ করত, সেই কাজ আরও মন দিয়ে করছে৷ মানুষ নিজের দক্ষতা অনুযায়ী ভালোবেসে কাজ করছে৷ শ্রমদান করছে৷ সেই শ্রমদানের ফলে সমস্ত পৃথিবীতে কোনো বস্তুরই অভাব হচ্ছে না৷ কোনো উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে না৷
ফলে জগৎব্যাপী মানুষের জীবনযাপনের কোনো অসুবিধে হচ্ছে না৷ বেঁচে থাকার জন্য কোনো মানুষেরই তো আলাদা কোনো খরচ নেই৷ খরচ নেই বাসস্থানের জন্যও৷ তাহলে অসুবিধে কোথায়?’
‘কী আশ্চর্য এক পৃথিবী, তাই না?’
জাদুকরের কথায় পরিতৃপ্তিতে ভরে ওঠে রুহর বুক৷ তারপর জাদুকর বলে, ‘আমি কিন্তু স্বপ্নবীজের একটা অন্য প্রভাবও লক্ষ করেছি৷’
‘কী?’
‘শিল্প-সাহিত্যে-সংগীতের ক্ষেত্রে একটা অন্যরকম প্রভাব পড়েছে৷’
‘কীরকম?’
‘রুহ, তুমি শিল্পী৷ ফলে তুমি আরও বেশি করে উপলব্ধি করতে পারবে৷ জীবনে দুঃখ ছাড়া, বিষাদ ছাড়া, বেঁচে-থাকার সংকট ছাড়া সত্যিকারের শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের জন্ম হয় না৷
মানুষের জীবনে সংকট না থাকলে, তা থেকে পরিত্রাণের প্রয়াস থাকে না৷ আর, সেই প্রয়াস না থাকলে বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ দাবানলের জন্ম দেয় না৷ আর, সেই আগুন ছাড়া বিপ্লবের সূচনা হয় না৷ তুমি যদি গভীরভাবে লক্ষ করো, দেখবে—কী ব্যক্তিগত কী সমষ্টিগত ক্ষেত্রে জীবনের সংকটই কিন্তু মানুষের ভিতর শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে৷’
রুহ উপলব্ধি করল জাদুকরের এই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ৷ এক্ষেত্রে সত্যিই তো বলার কিছু থাকে না৷ রুহ চুপ করে থাকে৷ রুহকে চিন্তান্বিত দেখে জাদুকর হো-হো করে হেসে ওঠে৷
নির্জন এই বনভূমি যেন জাদুকরের প্রাণ-খোলা হাসিতে কেঁপে ওঠে৷ জাদুকর বলে, ‘এ নিয়ে ভাবার কিছু নেই৷ তুমি একটু অন্যভাবে ভাব৷ ভাব, এমন এক মহৎ শিল্প পৃথিবীর বুকে সময়কে নির্মাণ করেছে যে দুঃখজাত শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের প্রয়োজন ফুরিয়েছে৷’
কথাটা বোধহয় জাদুকর তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই বলল৷ জাদুকরের মুখ-চোখ দেখে তা বুঝতে পারল না রুহ৷ দু-জনেই খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে৷ ক্রমশ জাদুকরের মুখে বিষাদ ঘনাতে থাকে৷ আরণ্যক নির্জনতায় দিনের আলো কমে আসার সঙ্গে-সঙ্গে জাদুকরের মুখের রেখায় জন্ম নেওয়া বিষাদময়তাও যেন ক্রমশ গাঢ় হতে থাকে৷
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর জাদুকর বলল, ‘রুহ, সমস্ত শুরুর একটা শেষ থাকে৷ জীবনেরও রয়েছে৷ আমার মনে হয়, তোমার এবার খেলা ভাঙার সময় এসে গেছে৷’
রুহর মুখও বিষণ্ণ৷ কিন্তু বুঝতে অসুবিধে হল না—জাদুকর কী ইঙ্গিত করছে৷ রুহ বলল, ‘আমিও তা বুঝতে পারছি, জাদুকর৷’
‘প্রতিটি মানুষের কাছেই তার আসন্ন অন্তিমের সংকেত ভেসে আসে৷ সেই সংকেত কেউ বুঝতে পারে৷ কেউ পারে না৷’
‘আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি, জাদুকর৷’
‘স্বাভাবিক, রুহ৷ যে-মানুষ যত বেশি সংবেদনশীল হয়, সেই মানুষ তত স্পষ্টভাবে এই অন্তিমের ইঙ্গিত অনুধাবন করতে পারে৷ তুমি তো তোমার কাজ শেষ প্রায় করেই ফেলেছ৷ সামান্য যেটুকু বাকি আছে তা শেষ করে জীবনের অন্তিম প্রব্রজ্যায় বেরিয়ে পড়ো৷’
রুহ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল, ‘চলো, গুহায় ফিরি৷ দেখেছ, কীরকম অন্ধকার নেমে এসেছে?’
কথা বলতে-বলতে কখন যে বিকেল পেরিয়ে সন্ধের অন্ধকার চতুর্পাশের গাছপালাগুলো প্রায় মুছে দিয়েছে তা খেয়াল করেনি কেউ৷ আকাশে চাঁদ নেই৷ চারপাশে ঝিঁঝির একটানা ডাক৷ লক্ষ-লক্ষ জোনাকি অন্ধকার গাছপালাগুলোর শাখা-প্রশাখাকে আলোর মণিমানিক্যে সাজিয়ে তুলেছে৷
রুহর আহ্বানে জাদুকর বলল, ‘আমার যে এখন যাওয়ার সময় নেই, রুহ৷’
‘কেন? এতদিন পর দেখা, আজ রাত্রিতে আমার কাছে থাকলে কী এমন অসুবিধে হবে, জাদুকর? চলো, দেখবে কেমন গাছবাড়ি বানিয়েছি৷’
রুহর কথায় জাদুকর মৃদু হাসল৷ কিন্তু অন্ধকারের জন্য তা রুহর নজরে এল না৷ জাদুকর বলল, ‘আবার দেখা হবে, রুহ৷ তুমি হাতের কাজটা দ্রুত শেষ করো৷ নাহলে কিন্তু খুব দেরি হয়ে যাবে৷’
সেই মরুভূমি থেকে বিদায় নেওয়ার মতো এখানেও জাদুকর রুহকে আর কথা বলতে না দিয়ে অন্ধকার অরণ্যের ভিতর হেঁটে গেল৷ রুহ নিশ্চুপ হয়ে দেখল—নিমেষের মধ্যে জাদুকরের আবছায়া অবয়ব অন্ধকার গাছপালার ভিতর হারিয়ে গেল৷ শুকনো পাতার ওপর হেঁটে যাওয়ার শব্দগুলো কেবল কয়েক মুহূর্ত জেগে রইল৷
জীবন্ত রেখাচিত্র! স্বর্ণ-আধারটি বুকের কাছে ধরে পদ্মাসনে বসে আছেন মহান কুনচেন লামা৷ ছেনি ও হাতুড়ির যুগলবন্দিতে রুহ খুব যত্ন করে ফুটিয়ে তুলেছে দেওয়ালের গায়ে৷ মাস দুই রাতদিন কাজ করেছে৷
জেমিনি অভিমান করেছে, একনাগাড়ে এত পরিশ্রম মানুষের শরীরে সহ্য হয়? রুহ খানিক সময়ের জন্য কাজ থামিয়ে জেমিনির দিকে তাকিয়ে মৃদু-মৃদু হেসেছে৷ রুহর হাসিতে জেমিনির অভিমান ভাঙেনি৷ বরং ক্রমশ বেড়েছে৷
তিনদিন হল কাজ শেষ করে রুহ একটানা বিশ্রাম নিয়েছে৷ জেমিনি তবুও ভালো করে কথা বলছে না৷ চোখের সামনে দেখেছে মানুষটা যেন এই ক-দিনেই অর্ধেক হয়ে গেছে৷ রুহর শরীরের রং কালো৷ সেই সুন্দর কালো ত্বকের ওপর আশ্চর্য এক দ্যুতি খেলা করত৷ এই দু-মাসে সেই দ্যুতি উধাও৷ লাবণ্যের ছিটেফোঁটা নেই৷
গতকাল রুহ গভীর জঙ্গলে দুটি শালগাছের মাঝে বর্তুলাকার পাথরের ওপর যখন তার তৃতীয় নয়ন উন্মুক্ত করেছিল, তখনই জাদুকরের আগাম সতর্কতা চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে জেগে উঠেছিল৷ রুহ স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিল—তার পদ্মাসনে বসা শরীর থেকে একটি ছায়াদেহ শূন্যে ভাসছে৷ ছায়াদেহের চারপাশে অসংখ্য নক্ষত্রের আলো৷ শুধু একটি সূক্ষ্ম সোনালি সুতো পদ্মাসনে বসে থাকা শরীরের সঙ্গে ছায়াদেহের সংযোগ রক্ষা করছে৷ রুহ দেখল, সুতোর রংটি ক্রমশ সোনালি থেকে ফ্যাকাসে সাদা হয়ে যাচ্ছিল৷ রুহ এর অর্থ জানে৷ শরীর থেকে ছায়াদেহটির ছিন্ন হওয়ার সময় হয়ে গেছে৷ তাই সুতোর রং ক্রমশ অমন মলিন হয়ে যাচ্ছিল৷
এতে অবশ্য রুহর আপশোস নেই৷ তার যা কাজ করার ছিল—সমস্তই শেষ৷ যেটুকু বেদনা, সে কেবল জেমিনির জন্য৷ রুহাইল কতখানি কষ্ট পাবে আন্দাজ করতে পারে না৷ কারণ নৌশিন আছে, ইবাদত আছে৷ গুহার খোলা দেওয়ালগুলোয় এখনো অনেক কাজ বাকি৷ সুতরাং তার চলে যাওয়ার জন্য বেশিদিন হয়তো রুহাইল বিষাদগ্রস্থ থাকবে না৷ তাকে নিরন্তর কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকতে হবে৷ কিন্তু জেমিনি? জেমিনি তো একদম একা হয়ে পড়বে৷
সে কি তবে জেমিনি, রুহাইল, নৌশিনদের সূর্যসাপ গোষ্ঠীর কাছ থেকে নিজের কাছে এনে ভুল করেছিল? ওদের তো জীবন ছিল খোলা আকাশে পাখির মতো৷ এখানে এসে কী পেল? কী দিতে পেরেছে সে? নির্জন অরণ্যবাস৷ গুহার দেওয়ালে নিজের স্বপ্নপূরণ করার জন্য সে কি স্বার্থপরের মতো কাজ করেছে? ভিতরে-ভিতরে এমন নানা প্রশ্ন রুহকে অস্থির করে তুলছে৷ যদিও ভিতরের অস্থিরতাকে বাইরে আনছে না৷ জেমিনি বুঝতে পারলে আরও বিচলিত হয়ে পড়বে—এই আশঙ্কায় নিজের ভিতরে সমস্ত ভাবনার দোলাচলকে দমিয়ে রেখেছে৷ রুহ জানে—জেমিনি তাকে কোনোদিন এসব নিয়ে অভিযুক্ত করবে না৷ জেমিনির ওপর তার প্রগাঢ় আস্থা রয়েছে৷ কিন্তু আজ যেন নিজেকেই সে কাঠগোড়ায় তুলে নিজের বিরুদ্ধে সওয়াল করছে৷ নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করছে৷
রুহ গাছবাড়ির ওপর চুপ করে বসে আছে৷ হঠাৎ দেখল জেমিনি হেঁটে আসছে৷ গুহার অন্ধকার সুড়ঙ্গে বহুদিন আগেই কাজ শেষ হয়ে গেছে৷ গুহার যে-দেওয়ালগুলো খোলা এবং আলোকিত, সেই দেওয়ালে কাজ করছে রুহাইল৷ গাছবাড়ির ওপর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রুহাইল তন্ময় হয়ে ছবি আঁকছে৷ কিছুদূরে ইবাদতকে ছোট একটি পাথরের ওপর রং করে পাখি এঁকে দিচ্ছে নৌশিন৷
জেমিনি এতক্ষণ সেখানেই ছিল৷ সেখান থেকেই জেমিনি এখন আসছে৷ দূর থেকে জেমিনিকে এমন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন? জেমিনি ধীরে-ধীরে সিঁড়ি দিয়ে গাছবাড়ির ওপর উঠে এল৷ রুহ বলল, ‘তোমার কি মনখারাপ?’
জেমিনি রুহর পাশে বসল৷ তারপর রুহর বাহুতে মাথা রেখে বলল, ‘কেন জানি না, আমার মন ভালো নেই৷’
‘কেন? কী হয়েছে?’
‘তা জানি না৷ কিন্তু কিছুই যেন ভালো লাগছে না৷’
রুহ জেমিনির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল৷ তারপর বলল, ‘একটা জায়গায় যাবে?’
‘কোথায়?’
‘আগে বলব না৷ আমার সঙ্গে চলো৷ তখন দেখতে পাবে৷’
কিছুক্ষণ পর রুহ ও জেমিনি গাছবাড়ি থেকে নেমে জঙ্গলের সুঁড়িপথ ধরে ঝরনার কাছে পৌঁছাল৷ ঝরনাকে বাঁ দিকে রেখে ছোট্ট পাহাড়ি টিলা পার হয়ে গির্জার দিকে এগিয়ে চলল৷
রুহ যেন হাঁপাচ্ছে৷ এতদিন ধরে কত পথ পার হতে হয়েছে৷ মাসের পর মাস পথিকের জীবন কাটিয়েছে কিন্তু তেমন কষ্ট হয়নি৷ কিন্তু আজ এই সামান্য পথ হাঁটতেই বেশ কষ্ট হচ্ছে৷ রুহ আড়চোখে দেখল আগের চেয়ে জেমিনির মুখ অনেক উজ্জ্বল৷ তার চোখমুখের রেখাতেই স্পষ্ট—সুদীর্ঘ অরণ্যবাসের পর এই সামান্য পথ চলাতেই জেমিনি যেন গভীর প্রশান্তি অনুভব করছে৷ তাই নিজের কষ্ট দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছে রুহ৷ মনে কেবল ভয় হচ্ছে, তার কষ্টের জন্য জেমিনির এই প্রশান্তি যেন কোনোভাবেই না-বিঘ্নিত হয়৷
সমতলভূমি পার হয়ে রুহ একটি গাছের নীচে বসে পড়ল৷ জেমিনি খানিকটা অবাকই হল৷ রুহকে তো এত ক্লান্ত দেখেনি কোনোদিন? জেমিনি পাশে বসে বলল, ‘তোমার কি হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে?’
‘না না৷’ রুহ জেমিনিকে আশ্বস্ত করল৷ কিছুক্ষণ বসার পর শরীরের ক্লান্তি সাময়িকভাবে দূর হয়ে গেল৷
রুহ খুব আশ্চর্যবোধ করল গির্জার কাছে মানুষজনের আনাগোনা দেখে৷ দীর্ঘকাল এপাশে আসেনি৷ সেই বছর তিরিশ আগের ছবিই তার চোখে ধরা আছে৷ চারপাশ শুনশান৷ তামার খনিতে লোকজন চলে যাওয়ার পর পুরো এলাকাটা শুনশান হয়ে গিয়েছিল৷ বিস্তীর্ণ এই পাহাড়ি অঞ্চলটাকে সে ক্রমশ খণ্ডহরে পরিণত হতে দেখেছিল৷ দিনের পর দিন শুনেছিল ফাদার জনের আক্ষেপ৷ মানুষজনের জন্য আপশোস৷
এতদূর থেকে শুধু মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে৷ চিনতে পারার কথা নয়৷ শরীর-খারাপ নিয়েও রুহর বুকের ভিতর আনন্দের চোরা স্রোত বয়ে গেল৷ ফাদার জনের স্বপ্ন এবার সত্যি হতে চলেছে৷ তাঁর আশাপূরণ হচ্ছে৷ এ কী কম খুশির কথা?
জেমিনিকে নিয়ে রুহ পৌঁছে গেল গির্জার কাছে৷ দেখল শুধু গির্জা নয়৷ আশেপাশের পুরো পাহাড়তলির চেহারা অনেক বদলে গেছে৷ কত নতুন-নতুন বাড়ি বানিয়েছে মানুষজন৷ কত নতুন বাড়ি গড়ে তোলার কাজ চলছে৷ বেশ কয়েকজনকে চোখে পড়ল যারা ভেঙে-পড়া গির্জাটিকে মেরামত করছে৷
প্রায় ফিসফিসিয়ে রুহ জেমিনিকে বলল, ‘এই যে গির্জা দেখছ, তারপাশে ওই যে ঘর৷ আমি একসময় এখানে থাকতাম৷ এই গির্জার ফাদারের কাছে৷’
জেমিনি বিস্ময়ে চোখ বড়-বড় করে৷ বলে, ‘তুমি ছেলেবেলায় এখানে থাকতে?’
‘ঠিক ছেলেবেলায় নয়৷ কৈশোরকাল থেকে বলতে পারো৷ ফাদার জন আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন৷’
জেমিনিকে নিয়ে নিজের পুরোনো ঘর পেরিয়ে গির্জার ভিতর ঢুকে গেল৷ ঢুকে স্তম্ভিত হয়ে গেল রুহ৷ দেখল, একদিন ফাদার জনের আঁকার ওপর রং আর তুলি বুলিয়ে তার যে শিল্পী-জীবন শুরু হয়েছিল, সেই ছবিগুলো আজ প্রায় ফ্যাকাসে৷ সেই মলিন হয়ে যাওয়া ছবিগুলোর ওপর একদল যুবক নতুন করে রং বোলাচ্ছে৷ তাদের মগ্ন-তুলিগুলো কী সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলছে প্রায় মুছে যাওয়া চিত্রমালাকে৷
জেমিনি মুগ্ধ হয়ে যুবকদের ছবি আঁকা দেখছে৷ রুহ তা লক্ষ করে বলল, ‘জেমিনি, তুমি এখানে থাকো৷ আমি অল্পক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসছি৷’
রুহ গির্জা থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে চলে গেল সমাধিক্ষেত্রে৷ ইচ্ছে করলে সে জেমিনিকে সঙ্গে নিতে পারত৷ কিন্তু তাতে অসুবিধে হতো৷ জেমিনির সামনে কী করে সে ফাদার জনের কাছে শেষবারের মতো বিদায় চাইত?
সমাধিক্ষেত্রে ঢুকে সে ফাদার জনের সমাধির কাছে চলে গেল৷ ফাদার জনের সমাধির গায়ে অজস্র ফাটল৷ ভাঙা কংক্রিটের ফাটলে কত আগাছা জন্মেছে৷ তবে সেই আগাছার ভিতর দেখল একধরনের ছোট লাল-হলুদ বুনো ফুল ফুটেছে৷
বেশ কিছুক্ষণ সে চুপ করে সমাধির পাশে বসে থাকল৷ তারপর সমাধির গায়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল, ‘ফাদার, আমার তো সময় শেষ৷ আগেরবার আপনার কাছে স্বপ্নের সন্ধানে পাড়ি দেব বলে বিদায় চাইতে এসেছিলাম৷ এবার তা নয়৷ এবার চিরকালের মতো চলে যাওয়ার অনুমতি নিতে এসেছি৷’
কথাগুলো বলার সময় রুহর চোখের পাতা ভিজে উঠল৷ ফাদার জন কি রুহর কথা শুনলেন? তিনি কি অনুমতি দিলেন? কে জানে!
রুহ বিদায় নিয়ে উঠে দাঁড়াল৷ হঠাৎ চমকে উঠল৷ দেখল তার পায়ের কাছে একটি কুকুরছানা নিঃশব্দে লেজ নাড়ছে৷ সমস্ত শরীর কালো কুচকুচে৷ বুকের আড়াআড়ি কিছুটা অংশ ধবধবে সাদা৷ যেন বুকে সাদা ক্রশ আঁকা৷ তারচেয়েও বিস্ময়ের হল যে—কুকুরছানাটি ঠিক ভুট্টার মতো৷ অবিকল যেন জেমিনির সেই কুকুর৷ ভুট্টার সঙ্গে এর তিলমাত্র ফারাক নেই!
রুহ কুকুরছানাটিকে হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিল৷ গির্জায় ফিরে যখন জেমিনির হাতে তুলে দিল৷ জেমিনি কুকুরছানাটিকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে হঠাৎ ঝরঝর করে কেঁদে উঠল৷
রুহ জেমিনিকে নিয়ে গির্জার বাইরে বেরিয়ে এল৷ ফেরার পথে হাঁটতে-হাঁটতে জেমিনি বলল, ‘রুহ, তুমি আমাকে আমার জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান দ্বিতীয় উপহারটি দিলে৷’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ গো৷ প্রথমটি রুহাইল৷ আর দ্বিতীয় হল আমার ভুট্টা৷’
‘এর নামও ভুট্টা রাখলে?’
‘কী বলছ তুমি! এ তো ভুট্টাই৷ নতুন জন্মে আমার কাছে আবার ফিরে এসেছে৷’
জেমিনির এই উচ্ছ্বাস রুহর ভিতরে অপার স্বস্তি এনে দিল৷ প্রায় দু-মাস জেমিনি তার ওপর অভিমান করে কাটিয়েছে৷ রাতদিন অমানুষিক পরিশ্রম করেছে বলে৷ আজ এই মুহূর্তে সেই অভিমানের লেশমাত্র নেই৷
হাঁটতে-হাঁটতে রুহ গলায় কৃত্রিম গাম্ভীর্য এনে বলল, ‘জীবনে আমি তোমাকে মাত্র দুটো উপহার দিয়েছি!’
জেমিনি ঘন-চোখে রুহর দিকে তাকাল৷ জেমিনির নিবিড় করে তাকানোতে রুহ তার ছদ্ম-গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারল না৷ মুচকি হেসে বলল, ‘আমি তোমার জীবনে মূল্যবান উপহার নই?’
জেমিনি পালটা হাসি ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘তুমি আমার জীবনে খুব আদরের একটা খারাপ উপহার৷ হয়েছে তো? তাড়াতাড়ি চলো, ভুট্টার খিদে পেয়েছে৷ ওকে গিয়েই খেতে দেব৷’
‘কী করে বুঝলে ওর খিদে পেয়েছে?’
‘মেয়েরা মুখ দেখলেই সবার সব কথা বুঝতে পারে৷ আমি ভুট্টার মুখ দেখেই বুঝেছি, ও অনেকক্ষণ কিছুই খায়নি৷’
‘মেয়েরা মুখ দেখে সব বুঝতে পারে?’
‘পারে বই কি৷’
‘আমার মুখ দেখে কিছু বুঝতে পারছ?’
‘আমি এখন তোমার মুখ দেখে কিছুই বুঝতে চাইছি না৷ আমি এখন শুধু আমার ভুট্টাকে দেখছি৷’
রুহ আর মুখে কিছু বলল না৷ মনে-মনে বলল, হয়তো সত্যিই তুমি সব বুঝতে পারো, জেমিনি৷ কিন্তু আমি নিশ্চিত, আজ তুমি আমার মুখ দেখে কিছুই বুঝতে পারোনি৷
বাইরে যথেষ্ট আলো৷ কিন্তু জঙ্গলের ভিতর প্রবেশ করতেই যেন ঝুপ করে অতর্কিতে অন্ধকার ঘনিয়ে এল৷
নিবিড় পার্বত্য-জঙ্গলের মাথার ওপর বিন্দু-বিন্দু আলোকময় বিচিত্র নক্ষত্ররাজি৷ কালপুরুষের অদূরে শুয়ে আছে রহস্যঘন ছায়াপথ৷ কিন্তু রুহর চোখ বারবার চলে যাচ্ছে আকাশে জ্বলজ্বল করা শুকতারার কাছে৷ যেন লাল-হলুদ মেশানো কোনো এক সাংকেতিক ফুল অনন্ত থেকে নিঃশব্দে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে!
রুহর চোখে ঘুম নেই৷ ঘুমোনোর কথাও নয়৷ বরং সে শোয়ার সময় থেকে নিঃশব্দে অপেক্ষা করে ছিল কখন জেমিনি গভীর ঘুমের ভিতর ডুবে যায়৷ জেমিনি এখন নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে৷ রুহ একবার ঘন-চোখে জেমিনিকে দেখল৷ মধ্যরাত্রির ঘুমন্ত জেমিনি তার ইহজীবনের সবচেয়ে নিবিড় আশ্রয়৷ আজ তাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে৷ এই যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই৷
ঘুমন্ত জেমিনিকে নিবিড়ভাবে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিল রুহ৷ কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে নিজের মনকে শক্ত করল৷ তারপর খুব সন্তর্পণে গাছবাড়ি থেকে সিঁড়ি ধরে নীচে নেমে এল৷
মনে পড়ল—মরুভূমির সেই ভোরের কথা৷ যে-ভোরে নিজের জৈব-জীবনের ঐহিক সুখ ও সাধারণ ঐশ্বর্যের মোহকে খড়কুটোর মতো তুচ্ছ করে, হেলায় উড়িয়ে দিয়ে জেমিনি তাকে পথের বুকে সঁপে দিয়েছিল৷ কারণ, তখন জেমিনির মনে ক্ষীণ হলেও আশা ছিল যে রুহ কোনোদিন ফিরবে৷ রুহও মনের গহিনে জেমিনির কাছে পুনরায় ফিরে আসার স্বপ্ন লালন করেছিল৷ কিন্তু আজ প্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন৷ এই চলে যাওয়া সেদিনের চলে যাওয়ার সঙ্গে মেলে না৷ বরং ঠিক উলটো৷ কোনো-কোনো যাওয়ার পথ মুখ ফিরিয়ে ফেরে না কক্ষনো৷ এই যাওয়া তেমনই৷ তাই, এই চির-বিদায়ের সময় জেমিনির মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস নেই রুহর৷
মনে পড়ল শান্ত-সমাহিত একটি মানুষের মুখ৷ সেই মানুষটিও হয়তো এমনই এক মধ্যরাতে নিজের সাহস হারিয়ে ফেলে ছিলেন৷ তাই বোধহয় বিদায়কালে স্ত্রী যশোধরা ও পুত্র রাহুলকে জানিয়ে বিদায় নেওয়ার সাহস পাননি৷ এ-কারণেই হয়তো সেদিন সিদ্ধার্থ মধ্যরাত্রিতে কেবল তার অশ্বকণ্টক ও বিশ্বস্ত সারথি ছন্দককে নিয়ে প্রাসাদ ত্যাগ করেছিলেন৷
মাটিতে নেমে গুহার ভিতরে গিয়ে তার খোদাই করা ইতিহাস, নিজের ও রুহাইলের আঁকা ছবিগুলোর কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়াল৷ দেখল, রুহাইলের রং-তুলি রাখা আছে পাথরের খোপে৷ অন্য আর-এক খোপে তার ছেনি, হাতুড়ি ও আঁকার সরঞ্জাম৷ অন্য সময় হলে নিজের আঁকার সরঞ্জাম কাঁধের ঝোলাতে ভরে নিত৷ আজ সে দায় নেই৷ এখন কেবল নিজেকে বহন করার দায়৷ নিজের দেহটিকে তুলে নিয়ে চলে যাওয়ার দায়৷
ভোর হয়নি৷ তবে ভোর হতে বেশি দেরি নেই৷ রুহ চোখ বন্ধ করে একটি বিশেষ কৌশলে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে শুরু করল৷ ক্রমশ রুহর শরীর অর্ধচেতন দশায় চলে এল৷ জাদুকর গভীর জঙ্গলে দেখা করে সতর্ক করে যাওয়ার পরেই রুহ তার অন্তিম গন্তব্যস্থান নির্বাচন করে রেখেছিল৷ এখন অর্ধচেতন দশায় সেই দিকেই দৌড় শুরু করল৷ আর্জোপা লামাদের মতো প্রায় হাওয়ার গতিবেগে দৌড়তে লাগল৷
পিছনে পড়ে রইল—জেমিনি, রুহাইল, নৌশিন, ইবাদত, ভুট্টা৷ পিছনে পড়ে থাকল—ফাদার জনের স্মৃতি, প্রিয় জাদুকরের মুখ, স্বপ্নের সন্ধানে পাড়ি দেওয়া সুদীর্ঘ পথের বৃত্তান্ত৷ পিছনে রয়ে গেল—মহান কুনচেন লামার সঙ্গ-মুহূর্তগুলো, স্বপ্নবীজের আখ্যান৷ পিছনের অন্তরালে ক্রমশ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে তার এই-জন্মের খণ্ডিত আয়ুষ্কাল৷
দুটো পাহাড় ডিঙিয়ে সে এসে দাঁড়াল একটি হ্রদের পাদদেশে৷ গোলাকার হ্রদের পাড়ে শাল-সেগুন, মহুয়া-অর্জুন, বহেড়া-অশ্বত্থ ও বট৷ চারদিকে ছেয়ে আছে পাহাড়িয়া জঙ্গলের গাঢ় নির্জনতা৷ গাছপালার ভিতর দিয়ে একদম পাড়ের ওপর উঠতে লাগল রুহ৷ পাহাড়ের ওপরে হ্রদটির জলে এসে মিশেছে একটি ঝরনা৷ আবার অন্যদিকে সেই হ্রদের জল পাহাড়ের অন্য ফাটল দিয়ে নিঃশব্দে মিলিয়ে যাচ্ছে৷ অথচ ঝরনার জন্য জলে আলাদা কোনো আলোড়ন নেই৷ বরং হাওয়ায় কারণে তিরতির করে কাঁপছে হ্রদের জল৷ স্বচ্ছ জলের নীচে হ্রদের তলদেশ কে যেন পরম যত্নে হরেক রংয়ের রঙিন নুড়িপাথর দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে! সকালের রোদ ফুটে উঠতে সব স্পষ্টভাবে দেখতে পেল রুহ৷
হঠাৎ বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেল সে৷ দেখল হ্রদের পশ্চিম পাড়ে জলের ওপর একটি ডিঙি ভাসছে৷ অবিকল কুনচেনের ডিঙি৷ যে-ডিঙিকে তিনি গোপন গবেষণা-কক্ষের কাছে হ্রদের জলে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন৷ ডিঙিটি ডোবানোর সময় রুহ কুনচেনকে প্রশ্ন করেছিল, ‘আপনি ডিঙিটি ডুবিয়ে দিলেন কেন?’
সেদিন কুনচেন তার প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো জবাব দেননি৷ শুধু বলেছিলেন, ‘আজ নয়, একদিন তুমি নিজেই বুঝবে৷’
সেই ‘একদিন’ কি আজ? মহান কুনচেন লামার প্রতি কৃতজ্ঞতায় রুহ যেন মনে-মনে নুয়ে পড়ল৷ কী আশ্চর্য দূরদর্শিতা মানুষটির! রুহ ধীরে-ধীরে জলের কিনারে গেল৷ খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ডিঙিটি দেখল৷ নাহ্, দৃষ্টি বিভ্রম নয়৷ এটা সেই ডুবিয়ে দেওয়া কুনচেনের ডিঙিই৷ রুহ ডিঙির ওপর পদ্মাসনে বসল৷
কিছুক্ষণ পর জীবনের শেষবারের মতো নিজের তৃতীয় নয়ন উন্মুক্ত করল৷ দেখল, এল পাসো সীমান্তের কাছে বর্ডার পেট্রলের একটি গাড়িও নেই৷ উঠে গেছে সমস্ত নজরদারি৷ মেক্সিকো থেকে আমেরিকায় যাওয়ার আর কোনো বাধা নেই৷
একসময় আমেরিকা-মেক্সিকোর নয়টি সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশকারীরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আমেরিকার ভিতর ঢোকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠত৷ এই মেক্সিকো থেকে আমেরিকায় ঢোকার জন্য অনেকে সোনোরান মরুভূমির পথ বেছে নিত৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভয়াল মরুভূমির মাঝপথেই প্রাণ হারাত অনেকে৷ রুহ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে এখন আর কোনো নিষেধ নেই৷ আমেরিকা ও মেক্সিকোর মধ্যে মানুষ নিজেদের খুশিমতো অবাধে যাতায়াত করছে৷
মেক্সিকো, গুয়েতামালা, হন্ডুরাস, এল সালভাদরের মানুষজনের সঙ্গে বহু ভারতীয় দিব্যি গল্প করতে-করতে আমেরিকার মাটিতে পা রাখছে৷ তাদের দেখে মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীর কোথাও যেন কোনো সীমান্তের চিহ্ন নেই৷ যেন কোথাও কোনো নিষেধ নেই৷ কে কোন দেশের মানুষ কোন দেশে কেন যাচ্ছে—এ নিয়ে কারও কোনো মাথা ব্যথা নেই৷
রুহ দেখল—উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে আর কোনো সীমান্ত নেই৷ উত্তর কোরিয়ার বুক থেকে স্বেচ্ছাচারী শাসনের অবসান হয়েছে৷ উত্তর কোরিয়ার মানুষ যেন নতুন জগৎ দেখছে৷ নতুন জীবনের সন্ধান পেয়েছে৷ পৃথিবীর মুক্ত হাওয়ায় ফুসফুস ভরে মুক্তির শ্বাস নিচ্ছে৷ রুহ স্পষ্ট দেখতে পেল, উত্তর কোরিয়ার দুই তরুণী নিশিন্তে হেঁটে বেড়াচ্ছে সিওলের রাস্তায়৷
রুহ এই সমস্ত দৃশ্য থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকাল নিজের গুহার দিকে৷ রুহাইল একাগ্র হয়ে ছবি আঁকছে৷ এই মুহূর্তে ইবাদত যেন আশ্চর্যরকম শান্ত৷ চুপ করে নৌশিনের কোলে বসে-বসে রুহাইলের আঁকা দেখছে৷
শুধুমাত্র জেমিনি ভীষণভাবে বিষণ্ণ৷ ভুট্টা মাঝে-মাঝে কখনো তার কোলে উঠছে, কখনো কোল থেকে নেমে কিছুদূর দৌড়ে গিয়ে আবার ফিরে আসছে৷ কিন্তু জেমিনির তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই৷
জেমিনির এমন বিষণ্ণতা আর সহ্য হল না রুহর৷ রুহ তার তৃতীয় নয়ন চিরদিনের জন্য বন্ধ করে ডিঙির ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল৷ রুহ এবার ঘুমোবে৷ শেষ ঘুম৷
একে কি আত্মহত্যা বলা যায়? না, একদম নয়৷ বুকের ভিতর টুকরো-টুকরো যন্ত্রণা ও অভিমান ভারী হয়ে উঠলে মানুষ একসময় সেই ভার বহন করতে পারে না, তখন আত্মঘাতের কথা ভাবে৷ পৃথিবীর আলো থেকে নিজেকে মুছে ফেলতে চায়৷ রুহর তো এ-রকম কোনো ব্যাপার নয়৷ বরং উলটো৷ গভীর প্রশান্তিতে মন উচ্ছল৷ তার চোখের সামনে মাটি ও আকাশ এই মুহূর্তে শান্ত ও অমলিন৷ সে এখন জেমিনিকেও প্রবলভাবে ভুলে যেতে চাইছে৷ সমস্ত মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইছে৷ সামনে আর সামান্য কয়েক মুহূর্ত মাত্র৷
মানুষ প্রতিবার ঘুমোতে যাওয়ার আগে পুনরায় জেগে ওঠবার আশা নিয়ে বিছানাতে যায়৷ জেগে ওঠার পর বাকি থেকে যাওয়া কোন-কোন কাজগুলো শেষ করা জরুরি, তার কথা ভাবতে-ভাবতেই মানুষ চোখ বন্ধ করে৷ তারপর তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে৷
এতবছর প্রত্যেকটি মানুষের মতো রুহও তাই করেছে৷ কিন্তু আজ সমস্ত পরিকল্পনার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে৷ ফলে ঘুমের ভিতর সে চিরকালের মতো এবার স্থির হতে চায়৷
দেশ থেকে দেশে, জনপদ থেকে জনপদে, একটি রাস্তা থেকে সহস্র রাস্তায় তার ঘুরে বেড়ানোর জীবন সার্থক হয়েছে৷ সুতরাং রুহ এবার ঘুমোবে৷ ক্রমশ ঘুম নেমে আসবে চোখ জুড়ে৷
ডিঙির ওপর শুয়ে রুহ দেখল হ্রদের পাড়ে গাছপালার শরীরে সূর্যাস্তের আলো৷ এখন প্রতিটি গাছই যেন নরম লাল-হলুদ আলোর বাতিস্তম্ভ!
টানটান করল শরীর৷ তারপরেই চমকে উঠল রুহ৷ মাথায় যেন কারও স্পর্শ পেল! ঘাড় বাঁকিয়ে অবাক হয়ে গেল৷ দেখল তারই মাথায় মাথা ঠেকিয়ে জাদুকর শুয়ে আছে৷ ঠোঁটে মৃদু হাসি৷
রুহর যেন বিস্ময়ের শেষ নেই! বলল, ‘তুমি?’
‘কেন, তোমাকে তো বলেছিলাম আমাদের আবার দেখা হবে৷’
‘কিন্তু এখন তো আমার...’
রুহকে কথা শেষ করতে না-দিয়ে জাদুকর বলল, ‘জানি৷ সব জানি৷ রুহ, মানুষের মনের স্তরবিন্যাস থাকে—এ তুমিও জানো৷ আমি তোমার দ্বিতীয় এক মন৷ যা একদিন মহান কুনচেন লামা জাগিয়ে তুলেছিলেন৷ আমি ছিলাম তাঁর আজ্ঞাবহ মাত্র৷ তিনিই আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়ে ছিলেন৷’
জাদুকরের কথায় শায়িত রুহ চমকে ওঠে৷ জাদুকর বলে, ‘মনে আছে প্রতিষেধক নেওয়ার সময় তুমি কুনচেনকে বলেছিলে আমাকেও প্রতিষেধক দেওয়ার কথা?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে৷’
‘সেদিন তিনি আমাকে আলাদা করে প্রতিষেধক দেননি৷ কারণ, আমি তো তোমার ভিতরেই রয়েছি৷ আমার আলাদা করে প্রতিষেধক লাগবে কেন? আসলে জৈবজীবনের স্থূল দৃষ্টিতে আমি সবার কাছে পৃথক হলেও তৃতীয় নয়নের অধিগত শক্তির কাছে তুমি ও আমি অভিন্ন৷ আমাদের পৃথক কোনো সত্তা নেই৷ আমাকে কখনো-কখনো মানুষের অহেতুক কৌতূহল এড়ানোর জন্য পৃথক সত্তার ভান করতে হয়েছে মাত্র৷ আর কিছু নয়৷’
‘তৃতীয় নয়ন যদি সবাইকে চিহ্নিত করতে পারে, সবকিছু দেখার ক্ষমতা দেয়, তাহলে আমি তোমাকে দেখতে পাইনি কেন?’
‘নিজের অন্তরকে কেউ কখনো বাইরের স্থূল-দৃশ্যের মতো করে দেখতে পায়, রুহ? পায় না৷ এ-কেবল অনুভব করে উপলব্ধি করতে হয়৷ সাধারণ আর পাঁচটা দৃশ্যের মতো দেখা যায় না৷ তাই তুমি অনেকবার দেখার চেষ্টা করেও কোনোদিন আমাকে দেখতে পাওনি৷
আসলে কী জানো, এই পৃথিবীর পরিণতি মহান লামাকে খুব বিচলিত করেছিল৷ তিনি বুঝতে পারছিলেন পৃথিবীতে দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেছে, বিশ্বের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে কী ভয়ংকর তার পরিণাম৷ লক্ষ-লক্ষ মানুষের মৃত্যু৷ হাহাকার, ধ্বংস৷ কত বড়-বড় শহর-নগর-জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে৷ আণবিক বোমার ব্যবহারও দেখেছে এই বিশ্ব৷ এরপর যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়, মানবজাতিই আর থাকবে না৷ একদল অন্যদলকে নিশ্চিহ্ন করতে গিয়ে তাদের যেমন পৃথিবী থেকে মুছে ফেলবে, তেমনই নিজেরাও মুছে যাবে৷ তাহলে অন্তিম পরিণতি কী? এই গ্রহ পুনরায় প্রাণহীন এক জড়ভূমিতে পরিণত হবে৷ গ্রহ জুড়ে এত পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়বে যে হয়তো লক্ষ-লক্ষ বছর লেগে যাবে আবার প্রাণের স্ফুরণ হতে৷ তাই সবার আগে পৃথিবীকে রক্ষা করতে হবে৷ পৃথিবীর এই মানবসভ্যতা, এই জনজাতিকে রক্ষা করতে হলে যুদ্ধের জিঘাংসা থেকে, দখলদারির মানসিকতা থেকে, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার ভাবনা থেকে মানুষকে মুক্ত করতে হবে৷ তাই মহান কুনচেন লামা অনেক পূর্বেই তোমার মতো একজন শিল্পীকে বেছে নিয়েছিলেন৷
মহান কুনচেন হচ্ছেন শান্তির সৌম্য-অনুভব৷ প্রকৃত জ্ঞানের দীপ্যমান শিখা৷ প্রজ্ঞার অনন্ত-জ্যোতি৷ তিনি তাঁর সমস্ত কিছু তোমাকে দান করেছেন এই পৃথিবীর কল্যাণের জন্য৷ সমগ্র মানবজাতিকে বিপদমুক্ত করে সুন্দর ও সৌহার্দ্যময় পৃথিবীর জন্মদানের জন্য৷ সময়ের চেনা-ছক ভেঙে নতুন করে সময়কে পুনর্নিমাণের জন্য সুনিপুণ যে চিত্রনাট্য তিনি রচনা করেছিলেন তুমি এবং তোমার ভিতর এই-আমি, সেই চিত্রনাট্যের কুশীলব ছাড়া আর কিচ্ছু নই, রুহ৷’
রুহ মুখ ফিরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে৷ জাদুকরও তাই৷ এখন কেউ কারও মুখ দেখতে পাচ্ছে না৷ দু-জনেরই চোখ আকাশে৷ রুহ বলল, ‘চলো, এবার ঘুমিয়ে পড়ি৷’
জাদুকর বলল, ‘নির্দিষ্ট সময় চলে এসেছে৷ আসলে, জীবনের চূড়ান্ত এবং শেষ স্বপ্নপূরণের পর জীবিত থাকবার ইচ্ছেটাও আর থাকে না৷ থাকবার কথাও নয়৷ প্রতিটি মানুষ বেঁচে থাকে তার না-পাওয়া স্বপ্নকে ছুঁতে চাওয়ার বাসনায়৷
প্রতিদিন স্বপ্নকে ছোঁয়ার জন্যই মানুষ ঘুম থেকে জেগে ওঠে৷ ঘুমের অসাড় সময় থেকে চেতন-জগতে ফিরে আসে৷ যেদিন, যে-মুহূর্তে চূড়ান্ত স্বপ্নের পূরণ হয়, ঠিক সেইদিন, সেই-মুহূর্তে মানুষের বেঁচে থাকবার অর্থও ফুরিয়ে যায়৷ তাই এরপর জেগে থাকা অহেতুক৷’
রুহ চোখ বন্ধ করে শেষবারের মতো কথা বলল৷ জাদুকরকে জিগ্যেস করল, ‘মানুষ কি কোনোদিন মৃত্যুকে জয় করতে পারবে?’
‘নিশ্চয় পারবে৷ যদি কেউ অমরত্বের স্বপ্ন দেখে৷ যদি কেউ সেই স্বপ্নের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে৷ নিরন্তর সাধনা করে৷ মহান কুনচেনের মতো বিজ্ঞানী ও তোমার মতো মহৎ শিল্পী যদি একসঙ্গে কাজ করে, মৃত্যুকে জয় করে অমরত্বের সূত্র আবিষ্কার করাও সম্ভব৷’
হ্রদের পাড় থেকে মনে হচ্ছে, নির্জন হ্রদের জলে যেন গোলাকার একটা ঘড়ি ভাসছে৷ দু-জন মানুষ ঘণ্টা ও মিনিটের দুটি কাঁটা হয়ে শুয়ে আছে৷ সেই জলঘড়ির মতো ডিঙিটি হালকা হাওয়ায় জলের ওপর ধীরে-ধীরে ঘুরতে শুরু করল৷ ক্রমশ তার গতি বাড়ছে৷ ঘূর্ণনের ফলে হ্রদের জলে তীব্র আলোড়ন শুরু হয়েছে৷ একসময় তীব্র গতির জন্য চারপাশের জল ডিঙির ওপর উঠে আসতে লাগল৷ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জলপূর্ণ ডিঙিটি তলিয়ে গেল৷
ডিঙিটি তলিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আবার সমস্ত স্বাভাবিক৷ যেন কিছুক্ষণ পূর্বে হ্রদের বুকে কিছুই ঘটেনি৷ শুধুমাত্র সময়, পশ্চিম আকাশের অস্তগামী সূর্য, সংলগ্ন পাহাড় এবং হ্রদের পাড়ে দাঁড়ানো জঙ্গল জানে—এই হ্রদ আর সাধারণ জলাধার নয়৷ একজন মহৎ শিল্পীর চিরঘুমের আধার৷ জলের সমাধিক্ষেত্র৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন