নিঃসঙ্গ প্রহরী

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

১৫৩৩

আমাজন জঙ্গলের কাছে, ইনকাদের গ্রাম – সাচা-সাচা

কস্বলের মতো চুসির মধ্যে লুকিয়ে রাখা সূর্যদেবের মূর্তিটাকে বুকের কাছে ভাল করে জড়িয়ে ধরল মিকোস। ওই দূরে এখনও আগুন জ্বলছে। চিৎকার শোনা যাচ্ছে। নিজের চোখের সামনে বাবা, মা আর ভাইদের শেষ হয়ে যেতে দেখেছে মিকোস। মিকোস না-পালালে ওকেও শেষ করে দিত!

মিকোসের বাবা আপিচু ছিলেন ওদের এই গ্রামের মোড়ল ও পূজারি। তার কথাই ছিল এখানকার শেষ কথা। গ্রামের সবাই ভাবত কেউ কোনওদিন আপিচুর ক্ষতি করতে পারবে না। তার নিজের ইচ্ছে না হলে সে মারাও যাবে না! কিন্তু সেই আপিচুকেই যখন বিদেশি বর্বরগুলো সবার সামনে অমন করে তলোয়ার দিয়ে বিদ্ধ করে মেরে ফেলল, গোটা গ্রামটাই যেন কেমন ঘাবড়ে গেল। চারদিন ধরে যারা প্রাণপণে সাহসের সঙ্গে এই বিদেশিদের সঙ্গে লড়াই করছিল তারা আপিচুকে সবার সামনে মারা যেতে দেখে একে-একে অস্ত্র ফেলে দিতে লাগল। পালাতে লাগল।

বিদেশি বর্বরগুলো তো এটাই চেয়েছিল। আসলে মিকোসদের গ্রাম, সাচা-সাচা হল সোনালি পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তার শেষ প্রতিরোধের জায়গা। বিদেশি বর্বরগুলো জানে এটা। জানে এটাকে ধ্বংস করতে পারলেই সোনালি পাহাড় দখল করা যাবে। ইনকাদের মূল স্বর্ণভাণ্ডারের একটা বড় অংশ রাখা আছে ওই সোনালি পাহাড়ে। ইনকারা বিশ্বাস করে যে সোনা হল সূর্যদেবের স্বেদ, মানে ঘাম। এটাই সূর্যের প্রজ্জ্বলিত হয়ে থাকার মূল শক্তি! আর এই বিদেশি বর্বরগুলো কিনা সেসব নিতেই এমন নৃশংস যুদ্ধ লাগিয়েছে! মিকোস অবাক হয়ে যায় এসব দেখে। বিদেশিদের কি সূর্যদেবতার ভয় নেই! ওরা কি জানে না সূর্যদেবতা কুপিত হলে ওদের সব ছারকার করে দেবে!?

বাবাকে মেরে ফেলার পরে বর্বরগুলো সারা গ্রাম খুঁজছিল, আর কী-কী ধনসম্পদ পাওয়া যায়! সেই সময়ই মিকোসের বাকি ভাইদেরও ওরা মেরে ফেলেছে। তখন মা, মিকোসকে আলাদা করে বলেছিলেন এই সূর্যদেবতার মূর্তিটাকে আগলে নিয়ে যেন ও পালিয়ে যায়! এখান থেকে দশ টুপু (দূরত্বের মাপ) দূরে মায়ের বাপের বাড়ির গ্রাম। সেখানে যেন পালিয়ে যায় মিকোস। আর সঙ্গে যেন ওদের এই আরাধ্য সূর্যদেবের পান্নার মূর্তিটা নিয়ে যায়। আর সবকিছু বিদেশিগুলো নিক, কিন্তু ওদের দেবতার এই মূর্তিটা ওরা কিছুতেই ছুঁতে দিতে পারে না ওই রাক্ষসগুলোকে!

মিকোসের ইচ্ছে ছিল না মাকে ছেড়ে যাওয়ার। কিন্তু মায়ের কথা ফেলতে পারেনি। মা, কম্বলের মতো চুসির মধ্যে পেঁচিয়ে দিয়েছিলেন মূর্তিটাকে। তারপর বলেছিলেন, “পালিয়ে যা মিকোস। আর উপেক্ষা করিস না! ওই ওরা এসে পড়ল। আমাদের আবার সূর্যদেবের দরবারে দেখা হবে। ততদিন তুই হবি এই সূর্যদেবের প্রহরী।”

মিকোস পালিয়েছিল ওদের বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে। আর পালাতে-পালাতেই শুনেছিল মায়ের মরণ-আর্তনাদ!

মিকোস আবার পিছনে ফিরে তাকাল। ওদের গ্রাম জ্বলছে। মৃত্যুর চিৎকার ভেসে আসছে। ও অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকল। কোন বর্বররা এল সমুদ্রের পথ দিয়ে! কেন এল? আর কীসব রোগ নিয়ে এল সঙ্গে করে! তাতে মারা পড়ল কত মানুষ! আর তার সঙ্গে ওরা এসেই মারকাট আর লুঠতরাজ শুরু করল! ওদের এতদিনের ইনকা রাজত্ব এখন ধ্বংসের মুখে! কী যে হবে কেউ জানে না! তাও যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ! যে করেই হোক বেঁচে থাকতে হবে মিকোসকে। এই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মামার বাড়ির গ্রামে একবার পৌঁছতে পারলে এখনকার মতো অন্তত ও সুরক্ষিত থাকবে।

মিকোস জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগোতে লাগল। পিছনে ও বুঝতে পারছে কারা যেন ওই অদ্ভুত চারপেয়ে জন্তুগুলো নিয়ে ওকে খুঁজতে আসছে। এমন জন্তু আগে দেখেনি মিকোস। চারটে পা। চুলের গুচ্ছের মতো লেজ। মাথা থেকে ঘাড় অবধি চামরের মতো চুল! আর অদ্ভুত চিঁহিহি করে একটা ডাক দেয়! প্রাণীগুলো খুব জোরে ছোটে। লাফিয়ে ছোটখাটো কোনও বাঁধাও ডিঙোতে পারে।

মিকোস আরও জোরে ছুটতে লাগল। অন্ধকার হয়ে গিয়েছে চারদিকে। ভাল করে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। তাও মাথার উপরের গাছপালার ফাঁক দিয়ে আকাশের তারা দেখে দিক ঠিক রেখে সামনে এগোচ্ছে মিকোস।

পিছনে ওই প্রাণীদের পায়ের আওয়াজ যেন আরও দ্রুত এগিয়ে আসছে। ওদের পিঠে বসা চালকদের হাতে মশাল! তারা নিজেদের মধ্যে কীসব বলছে। মিকোস মাথা নিচু করে দৌড়চ্ছে। আরও কিছুটা গেলে নদী পাবে একটা। সেটা টপকাতে পারলে অনেকটা সুরক্ষিত থাকবে ও।

এবড়োখেবড়ো মাটি-পাথরের জন্য পায়ে লাগছে খুব। তাও উপায় নেই। ওকে যেতেই হবে। মিকোস সামনে একটা গাছের ডাল টপকে ডান দিকে ঘুরল। আর ঠিক তখনই আচমকা সাঁই করে একটা তির ওর প্রায় কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। সর্বনাশ! ওকে কি দেখতে পেল ওরা! নাকি দৌড়নোর সময় গাছপালা নড়ছে দেখে বুঝতে পারল ওর অবস্থান!

আর-একটা তিরও এবার বেরিয়ে গেল ওর কোমর ঘেঁষে! মিকোস বাঁ দিকে বাঁক নিল এবার। এদিকটায় বড়-বড় গাছ বেশি। কিন্তু কয়েক পা এগোনোর আগেই আবার একটা তির এল আর গেঁথে গেল মিকোসের ডান পায়ে। যন্ত্রণার চোটে মুখ থুবড়ে পড়ল মিকোস। আর চুসিতে জড়ানো ঈশ্বরের মূর্তিটা ছিটকে পড়ে গেল সামনের মাটিতে।

খুব কষ্ট হচ্ছে। তাও মিকোস ওর পনেরো বছরের শরীরটাকে টেনে সামনে এগনোর চেষ্টা করল। কিন্তু নিমেষের মধ্যে আরও দুটো তির এসে ফুঁড়ে দিল ওর পিঠ। ওহ মাগো! মিকোসের সারা শরীর নিভে আসতে লাগল দ্রুত। চোখের সামনে কেমন যেন ধোঁয়া! ও বুঝতে পারল, মা যে কাজটা ওকে দিয়েছিলেন সেটা আর পূর্ণ করতে পারল না! সুরক্ষিত রাখতে পারল না সূর্যদেবকে। ও বুঝতে পারল ওর শেষ সময় এসে গিয়েছে। তাও এর মধ্যেও মিকোসের খারাপ লাগল এই ভেবে যে ওদের পবিত্র সূর্যদেবের মূর্তি গিয়ে পড়বে কতগুলো বাজে লোকের হাতে! ও শুনল পিছন থেকে প্রাণীগুলোর পায়ের আওয়াজ এগিয়ে আসছে।

মিকোস শেষবারের মতো দেখল সামনে মাটিতে পড়ে থাকা চুসিতে জড়ানো দেবতাকে। আর ঠিক তখনই সরসর করে শব্দ হল একটা। মিকোস দেখল পাশের বিশাল গাছ থেকে কে একটা নেমে এল, তারপর দ্রুত চুসিতে জড়ানো দেবতার মূর্তিটা তুলে আবার একইভাবে উঠে গেল গাছের উপরে। সবটাই এত দ্রুত হল যে মিকোস অবাক হয়ে গেল!

মিকোস জানে এরা সওনাপাকাহু! প্রায় নির্মূল হতে বসা একটা প্রজাতি। ওরা মাটিতেও যেমন থাকে তেমন গাছেও বসত বানায়! সবার চেয়ে দূরে, নিভৃতে থাকে ওরা। কিন্তু ইনকাদের মতো ওরাও উপাসনা করে সূর্যের। এখন ওদেরই মধ্যে থেকে কেউ তুলে নিয়ে গেল দেবতার মূর্তি!

মিকোস আওয়াজ শুনে বুঝল প্রাণীগুলো সামনে এসে থামল ওর। এবার মানুষের পায়ের শব্দ পেল মিকোস। বুঝল দু’জন মানুষ ওকে ধরে পিঠ থেকে তিরগুলো খুলে নিয়ে শুইয়ে দিল চিৎ করে। মিকোস দেখল চারজন বিদেশি লুঠেরা! মাথায় শিরস্ত্রাণ, গায়ে বর্ম! এদের মধ্যে একজন কোমর থেকে তলোয়ার বের করল। মশালের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল ধাতুর ফলা! মিকোস দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে ওর। তবু তার মধ্যেও আকাশের দিকে মুখ করে নিজের জীবনের অন্তিম মুহূর্তে শুয়ে আবছা চোখে মিকোস দেখল, সবার মাথার উপর দিয়ে বিশাল বড় গাছের ডাল বেয়ে এক ছায়ামানব ওদের দেবতার মূর্তি বুকে করে নিয়ে নিঃশব্দে মিলিয়ে যাচ্ছে বন থেকে আরও গভীর বনে।


১৯৯৫

আমাজনের জঙ্গল

সুমিত আচমকা দাঁড়িয়ে পড়লেন। কার রক্তের দাগ এটা!

বিকেল হয়ে আসছে এখন। আলো কমে আসছে চারদিকে। বড়-বড় গাছপালা বলেই এখানে অন্ধকারটা ঝপ করে পড়ে! তাই আলো থাকতে-থাকতে ওদের ক্যাম্পে ফিরতে হবে। না হলে কখন কী বিপদ আসে কেউ বলতে পারে না। না, সুমিত জংলি প্রাণীদের ভয় পায় না। ও ভয় পায় মানুষকে। আমাজনের এই জঙ্গল যতটা না ভয়ঙ্কর তার বন্য প্রাণীদের জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর এখানে আশ্রয় নেওয়া নানা ধরনের মানুষজনের জন্য।

এ ছাড়া, চোরাশিকারি ও বেআইনিভাবে কাঠ কেটে বিক্রি করার চোরাচালানকারীরাও ঘুরে বেড়ায়। জাগুয়ার, অ্যানাকোন্ডাদের হাতে পড়লে তাও রক্ষা আছে, কিন্তু এই ধরনের মানুষদের হাতে পড়লে আর রেহাই নেই!

সুমিতরা মোট তিনজন এসেছে এই আমাজনে। ওরা ভূতাত্ত্বিক, জিওলজিস্ট। এখানকার মাটি নিয়ে গবেষণা করছে ওরা। আর অবাক হয়ে যাচ্ছে দেখে যে, পৃথিবীর এই সবচেয়ে বড় ‘স্যালাড বোল’-এর মাটিতে ফসফরাস এত কম! তা হলে এমন গাছপালা হল কী করে এখানে!

আজও নানারকম তথ্য সংগ্রহ করে তিনজন ফিরে যাচ্ছে ক্যাম্পে। কিন্তু তখনই সুমিতের চোখে পড়ল এই রক্তের দাগ!

সুমিত পাশে দাঁড়ানো দিনোকে দেখাল দাগটা। দিনো ইতালির লোক। শক্তসমর্থ চেহারা! চৌকো চোয়াল। দাঁত চেপে কথা বলে। ও দাগটা দেখে বলল, “আরে বাদ দাও, কে না কে! কোনও আহত প্রাণীও হতে পারে। বেকার ঝামেলায় পড়ে লাভ নেই!”

“না, আহত প্রাণী নয়, মানুষ!” পাশ থেকে দেখে জন বলে উঠল। জন আর্চার ব্রিটিশ। সামান্য মোটা, মাথায় টাক। কম কথার মানুষ! “কী করে বুঝলে!” দিনো বিরক্ত হল।

“গাঁক-গাঁক করে চিৎকার না করলে তুমিও বুঝতে। ওই শোনো,” জন ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ওদের ক্ষণিকের জন্য চুপ করতে বলল।

সুমিত বিকেল হয়ে আসা জঙ্গলের নিজস্ব শব্দের তলা থেকে যেন আর-একটা মিহি শব্দ শুনতে পেল! গোঙাচ্ছে কেউ! একটা মানুষের গোঙানি! ও দ্রুত তাকাল জনের দিকে।

জন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “সামবডি ইজ় হার্ট আই গেস!” সুমিত আর অপেক্ষা করল না। “চলো!” বলে হনহন করে রক্তের দাগ ধরে এগিয়ে গেল।

“আরে-আরে, করো কী!” দিনো আটকাতে চাইল সুমিতকে। কিন্তু জনও সুমিতের পিছন-পিছন হাঁটতে লাগল। দিনো নিজের মনে বলল, ‘তোমাদের জন্য কোনও জঙ্গির হাতে প্রাণ যাবে আমার।'

সামনে জঙ্গল বেশ ঘন। গোঙানির আওয়াজটা এখানে আরও স্পষ্ট। সুমিত কোমরে ঝোলানো বড় চপারের মতো ম্যাশেটিটা হাতে নিল। তারপর গাছপালা কেটে সামনে এগিয়ে গেল। আর যা দেখল তাতে থমকে গেল একদম!

জন আর দিনোও এগিয়ে এসে একইভাবে থমকে গিয়েছে!

সুমিত দেখল শেষ বিকেলের আলোছায়ায় সামনে মাটির বুকে একটা গর্ত খোঁড়া রয়েছে। আর তাতে পড়ে আছে একটি কিশোর ছেলে! বুকের কাছে ছেলেটা কী যেন একটা জিনিস আঁকড়ে ধরে আছে। ছেলেটার মুখে ভয়। ডান পায়ে একটা গুলির ক্ষত! রক্ত সেখান থেকেই বেরোচ্ছে!

এভাবে রক্তক্ষরণ হলে আর ক্ষতের জায়গায় ওষুধ না-পড়লে ছেলেটাকে বাঁচানো যাবে না! কিন্তু ছেলেটার মুখ-চোখ আর পোশাক

আশাক দেখে সুমিত বুঝল, আমাজনের উপজাতি মানুষ।

ও কাছে এগিয়ে গেল।

ছেলেটা দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু একটা বলে আরও কুঁকড়ে গেল।

সুমিত বুঝল ছেলেটা ভয় পেয়েছে। ও নিজের হাত থেকে ম্যাশেটিটা মাটিতে নামিয়ে রাখল। তারপর টুপিটা খুলে হাতের ইশারায় ছেলেটাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গি করল। ছেলেটা এবার ভীরু চোখে তাকাল ওর দিকে।

সুমিত হাসল। তারপর পিঠের ব্যাগ থেকে অলিভ রংয়ের জলের বোতল বের করে মুখটা খুলে এগিয়ে দিল ছেলেটার দিকে।

ছেলেটা দ্বিধা করল সামান্য। তারপর ধীরে-ধীরে হাত বাড়াল বোতলের দিকে।


২০০৯

জব্বলপুর

মন এত খারাপ হয়ে আছে বুলির যে, সেটা বলার মতো নয়! বারেবারে ওকে এমন হেনস্থা হতে হচ্ছে! তাও কী, না নিজের বোনের জন্য! এতদিন টুকটাক যা হওয়ার হচ্ছিল কিন্তু আজ একদম চুরি! ছি! সজ্জনভাইয়া ওদের কত ভালবাসে। নিজের বোনের মতো দ্যাখে। আর তার দোকান থেকেই জিনিস চুরি করল টুলি! আর সেই দোষ পড়ল কিনা ওর উপর!

মা-বাবা সবাই টুলিকে নিয়ে একদম নাজেহাল হয়ে আছে। মেয়েটা কেন এমন, কে জানে! সারাক্ষণ লোকের অনিষ্ট করে বেড়াচ্ছে! কাউকে মানে না। বাবা-মায়ের মুখে-মুখে কথা বলে! পাড়ার এর-ওর মোটরবাইক, স্কুটার জোর করে নিয়ে দূরে-দূরে চলে যায়! এই সতেরোআঠারো বছর বয়সে এমন দুর্দান্ত হয়ে উঠেছে যে কী বলবে!

বাবা তাই আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বুলির ক্লাস টুয়েল্‌ল্ভের পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে, ওকে এবার আর এখানে রাখবেন না। কলকাতায় সুমিতমামুর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ওকে।

বুলি চোখ মুছল। সুমিতমামু খুব ভাল। তা হলেও জব্বলপুর ছেড়ে ওকে কলকাতায় চলে যেতে হবে ভেবেই কষ্ট হচ্ছে।

“কী রে বুলি? মনখারাপ?” বাবা এসে মাথায় হাত দিলেন বুলির।

বুলি ছলছলে চোখে তাকাল বাবার দিকে। বলল, “টুলি এমন কেন বাবা! ও কেন এমন সজ্জনভাইয়ার দোকানের ক্যাশ থেকে চুরি করল! কেন আমার নামে দোষ চাপাল? ওর কিছু একটা ব্যবস্থা করো। না হলে পরে ঝামেলা হবে, দেখো।”

বাবা মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, “তুই ওসব ভাবিস না। ওর থেকে দূরে থেকে নিজের জীবনটা তৈরি কর। কলকাতায় গিয়ে ভাল কলেজে ভর্তি হ। ভালভাবে লেখাপড়া কর। সুমিতদা খুব ভাল লোক। জ্ঞানী মানুষ। তোকেও নিজের মেয়ের মতো দ্যাখেন! তুই এখানকার কথা ভাবিস না। টুলি যাতে এমন না করে, আমি ওকে বোঝাব। তুই এখানে থাকলে ও তোকে আরও বিপদে ফেলবে। তা ছাড়া কলকাতায় সুযোগ অনেক বেশি!”

বুলি চোখ মুছে বলল, “সে ঠিক আছে। তবে দ্যাখো, টুলি আদৌ কিছু বোঝে কিনা! ওর যা মতিগতি, আমার একটুও ভাল লাগছে না কিন্তু। কিসের থেকে কী করে বসে! ওকে এখনও না-সামলালে ও কিন্তু পরে আরও অনেক বড় ঝামেলা পাকাবে বলে দিলাম!”


এখন

কলকাতা

মাসদশেক হল জয়রাম সেনগুপ্তর বাড়িতে চাকরি করছে কুষাণ। সেই ভবানীপুর থেকে এই ডানলপের কাছে আসতে একটু ঝক্কি হয় বটে, কিন্তু চাকরির জন্য আরও কত দূরে দূরে যায় মানুষ!

জয়রাম খুবই ভাল মানুষ। গতবছর জয়রামকে একটা ব্যাপারে সাহায্য করেছিল কুষাণ। তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কুষাণকে নিজের প্রাইভেট সেক্রেটারির চাকরিটা দিয়েছেন জয়রাম।

সকাল সাড়ে ন'টার মধ্যে কুষাণকে পৌঁছতে হয় এখানে। তারপর যেদিন-যেদিন জয়রাম বেরোন, সেদিন সেদিন জয়রামের সঙ্গে বেরোতে হয়, না হলে বাড়ির বাইরের দিকে যে অফিস আছে সেখানেই কাজ করতে হয়!

জেঠু-জেঠিমার কাছে মানুষ কুষাণ। গত বছর জেঠিমা খুব অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু এখন একদম ঠিক আছেন। অফিসে বেরোনোর সময় জেঠিমা রুটি-তরকারি করে দেন। আজও তাই খেয়ে এসেছে। দুপুরের লাঞ্চটাও জেঠিমা সঙ্গে দিয়ে দিতে চান, কিন্তু তার দরকার পড়ে না। কারণ লাঞ্চটা জয়রামের এখানেই করতে হয় কুষাণকে।

চাকরি করলেও মালিক-কর্মচারীর সম্পর্ক নয় ওদের। জয়রাম খুব ভরসা আর বিশ্বাস করেন কুষাণকে। কুষাণও তার যথাযথ মর্যাদা রাখার চেষ্টা করে।

মাঝে-মাঝে জয়রাম শুধু আফসোস করে বলেন, “এত ভাল অ্যাথলিট তুমি! ন্যাশনালে ডেকাথলন চ্যাম্পিয়ন! কমনওয়েলথ গেমসে রুপো! তাইকোন্ডো জানো! সৎ, সাহসী! তাও এভাবে তোমায় কাজ করতে হচ্ছে! বিদেশে জন্মালে তুমি অনেক দূর এগোতে পারতে!”

কী আর বলবে কুষাণ! যা হয়নি তা তো ভেবে লাভ নেই। এখন এই যা চাকরি করছে এতেই ও খুশি।

জয়রামের বাড়ির বড় গেটটা পার করতে-করতে মোবাইল বের করে সময় দেখল কুষাণ। সাড়ে আটটা বাজে। আজ জয়রাম ওকে একটু আগে আসতে বলেছিলেন। কীসব বিশেষ কাজ আছে। কী কাজ সেটা জানে না কুষাণ। কিন্তু জয়রাম যখন বলেছেন তখন আগেআগেই এসেছে!

বসার ঘরে ঢুকেই থমকে গেল কুষাণ। জয়রাম তো আছেনই, সঙ্গে একজন বয়স্ক মানুষও বসে আছেন। লোকটি রোগা। ফরসা। মাথায় আইনস্টাইনের মতো ঝুরো চুল আর গোঁফ! চোখদুটো উজ্জ্বল।

“এসো কুষাণ,” জয়রাম হাত তুলে কুষাণকে বসার সোফা দেখালেন। তারপর বয়স্ক মানুষটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই হল কুষাণ। এর কথাই আমি আপনাকে বলছিলাম।”

কুষাণ সোফায় বসে হাতজোড় করে ভদ্রলোককে নমস্কার করল।

জয়রাম বললেন, “কুষাণ, উনি অমিতবাবু। অমিত বসু। নামকরা একজন অ্যানথ্রপোলজিস্ট। আমার কাছে এসেছেন বিশেষ একটা কাজে।”

অ্যানথ্রপোলজিস্ট বিষয়টা বিস্তারিত না-জানলেও এটা কুষাণ জানে যে এই বিষয়ে মানুষের সমাজ, তার সংস্কৃতি, তার উন্নত বা পরিবর্তন হওয়ার ধাপের চর্চা করা হয়। এ ছাড়াও মানুষের ক্রমবিবর্তনের মানসিক ও শারীরিক দিকটাও এই অ্যানথ্রপোলজি বিষয়ের অঙ্গ।

কুষাণ আগ্রহভরে তাকাল অমিতের দিকে। তারপর গিয়ে একটা চেয়ারে বসল।

“আসলে কাজে না,” অমিত হাসলেন, “আমি উপকার বা সাহায্য চাইতে এসেছি ভাই! আমি তোমাকে তুমি করেই বলছি কুষাণ। আমার বয়স সাতষট্টি। কেমন?”

“নিশ্চয়ই,” কুষাণ হাসল, “বলুন।”

“আমাকে ভাই একবার আমাজনের জঙ্গলে যেতে হবে।”

অমিত এমন করে কথাটা বললেন যেন বাজারে যাবেন ফুলকপি কিনতে।

কুষাণ কী বলবে বুঝতে পারল না!

অমিত হাসলেন। তারপর একটু গুছিয়ে নিয়ে বললেন, “আমার দাদা, শ্রীসুমিত বসু গত কয়েকদিন হল মারা গিয়েছেন। বয়স হয়েছিল তিয়াত্তর। উনিও বিজ্ঞানী ছিলেন। ভূতাত্ত্বিক। আমাজনের জঙ্গলে গিয়েছিলেন গবেষণার কাজে। সেখানে হারিয়ে যাওয়া এক উপজাতির মানুষকে উনি খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে ধরে রাখেননি। বলা হয় আমাজনে এমন অনেক উপজাতি আছে যাদের সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর যোগাযোগ নেই। এখন একলা এই মানুষটি তেমনই এক উপজাতি, সওনাপাকাহুর অন্তর্গত। আর সে-ই নাকি ওই উপজাতির শেষ জীবিত সদস্য! দাদা বলেছে যে, এই উপজাতির মানুষরা ছিলেন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। মূলত জঙ্গলেই থাকতেন। ইনকাদের উপাস্য সূর্যদেবতার উপাসক ও রক্ষক ছিলেন এই সওনাপাকাহুরাও। ইনকারা সময়ের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে হারিয়ে গেলেও এই সওনাপাকাহুরা নিজেদের বিচ্ছিন্ন রেখেছিলেন চিরকাল। সময়ের সঙ্গে ক্রমশ সওনাপাকাহুরা বিলুপ্ত হয়ে যায়। না, ঠিক বিলুপ্ত নয়। একজন নাকি এখনও জীবিত আছেন। বা বলা ভাল, দাদা যখন গিয়েছিল আমাজনে তখনও জীবিত ছিল!

“আমি কাজ করি এইসব লুপ্তপ্রায় মানুষের প্রজাতি নিয়েই। সত্যি বলতে কী, আমার সঙ্গে দাদার সম্পর্ক ভাল ছিল না। আমি বাইরেবাইরেই থাকতাম। কিন্তু দিনদশেক আগে দাদা ডেকে পাঠায় আমায়। বলে, এই ব্যাপারে। মানে আমি যেহেতু এই নিয়ে কাজ করি সেইজন্যই হয়তো বলেছে! কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, দাদার স্মৃতিভ্রংশ হতে শুরু করেছিল। অনেক কিছুই ভুলে গিয়েছে। প্লাস কিছু নোটসও নেই! যা ছাড়া-ছাড়া বলেছে সেগুলোই তোমায় গুছিয়ে বললাম আমি। দাদা আমায় শুধু বলল, কিছু তো দিয়ে যেতে পারেনি আমায়, তাই এই খবরটা দিল যে আমাজনের জঙ্গলে এমন একটা উপজাতির একজন মানুষ এখনও বেঁচে আছে। সে কখনও গাছে আবার কখনও মাটিতে গর্ত করে থাকে। আর একদম একা থাকে সে। তবে এসব বহুদিন আগের ব্যাপার। প্রায় পঁচিশ বছর! দাদা তাও আমায় বলল কারণ দাদার মতে আমি যদি সেই মানুষটাকে খুঁজে পাই, তা হলে আমার কাজে অগ্রগতি হবে। তার সঙ্গে নাম-যশও হবে আর কী!”

কুষাণ জিজ্ঞেস করল, “বাপ রে, এমন তো শুনিনি আগে! তা, আর কিছু জানেন না এই ব্যাপারে? স্রেফ আমাজনের জঙ্গলে এমন একটা লোক আছে! লোন উল্ফ টাইপ! একা বেঁচে থাকে? আর তার খবর পেয়ে আপনি আমাজনে যাবেন? কিছু মনে করবেন না, আমাজ়ন বিশাল বড় জঙ্গল বলেই আমি জানি। সেখানে আপনি লোকটিকে খুঁজে পাবেন কী করে! এ যে খড়ের গাদায় সুচ! কোনও ফোটো আছে?”

অমিত মাথা নাড়লেন। বললেন, “না, ফোটো নেই। অন্তত আমি পাইনি। তবে আমি খোঁজ করেছি। দাদার সঙ্গে সেই যাত্রায় আরও দু’জন ছিলেন। একজন ইটালিয়ান। দিনো বারেসি। আর অন্যজন, ব্রিটিশ, জন আর্চার। জন কোথায় আমি জানি না। কিন্তু দিনো থাকেন ভেনিসে। না, কোনও যোগাযোগের ফোন নম্বর নেই আমার কাছে। আমি ইমেল

করেছিলাম। রিপ্লাই আসেনি। বাট আই নো ভেনিস। আগেও গিয়েছি। তাই আমি ভেনিস যাব। দিনোর থেকে জঙ্গলের কোথায় যেতে হবে তার হদিশ পাব নিশ্চয়ই।”

জয়রাম এবার বললেন, “আসলে কুষাণ, উনি আমার কাছে এসেছেন তোমার সাহায্য চাইতে। উনি জেনেছেন তুমি সাইবেরিয়ায় আমায় কীভাবে সাহায্য করেছ। এখন তুমি যদি ওঁকে সঙ্গ দাও, ভাল হয়। মানে ওর এই বয়স! সঙ্গে শরীরটাও ভাল নয়। তাই...”

“আমি পারিশ্রমিক দেব তোমায়। যাতায়াতের সব দায়িত্ব তো আমারই। সঙ্গে আরও দু’লাখ টাকা দেব। আমার টাকা-পয়সার অসুবিধে নেই। গবেষণার কাজের পাশাপাশি শেয়ারমার্কেটে আমার টাকা খাটে। ব্যবসাও আছে। আমাদের অভিযানে যা-যা লাগবে, আমি জোগাড় করে নেব। কুড়িদিন মতো ধরে নিচ্ছি সময় লাগবে। অবশ্য যদি তুমি রাজি থাকো।”

কুষাণ মাথা নামিয়ে নিল। আবার একটা কাজ! আমাজনের জঙ্গলে যেতে হবে! এসব তো গল্পে পড়েছে ও! সিনেমায় দেখেছে! সেই জঙ্গলে গিয়ে এবার পড়বে ও!

“চিন্তার কিছু নেই, আমি তোমায় ছুটি দেব। আমার স্কুলের বন্ধু ফুলু, ওর বিশেষ পরিচিত অমিতবাবু। অনেক আশা করে এসেছেন। আর আমাজ়ন যাওয়ার জন্য তোমরা রিও হয়ে গেলে তো সমস্যাও হবে না। আমার ওখানে এজেন্ট আছে! মুরিলো ডি সিলভা। ওর থেকে আমি ইনকা, মায়ান, অ্যাজটেক, টলটেক এদের নানান প্রাচীন জিনিস আনাই। ফলে অসুবিধে হবে না। এখন তুমি রাজি হলেই হয়! ওখানে জঙ্গলে যাওয়ার গাইডও পাওয়া যাবে। কোনও অসুবিধেই হবে না।”

অমিত বললেন, “না-না, কারও সাহায্য চাই না আমার। শুধু কুষাণ গেলেই হবে। আমিই নিজেই সব বন্দোবস্ত করে নেব। আমি না ব্যাপারে বেশি বাইরের লোককে জড়াতে।”

জয়রাম একটু থতমত খেয়ে চুপ করে গেলেন।

কুষাণ কথা ঘোরাতে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, সুমিতবাবুর কোনও সন্তানাদি...”

“দাদা বিয়ে করেনি। আমাদের এক দূরসম্পর্কের ভাগনি থাকে সঙ্গে। নাম বুলি। সে বড্ড ভাল মেয়ে। তার এই অভিযানে আপত্তি ছিল না। তবে ভয় পাচ্ছে এখন,” অমিত হাসলেন, “মানে সম্প্রতি একটা সমস্যা হয়েছে।”

“কী সমস্যা?”

“আরে, আমাকে বলার পাশাপাশি দাদা এইসব তথ্য কোনও একটা পুঁচকে সাংবাদিককেও বলেছিল। সে দাদার কাছে আসত। দাদা তাকে স্নেহও করত খুব। সেই সাংবাদিক নাকি এটা নিয়ে প্রতিবেদন লেখে একটা মাঝারি গোছের কাগজে। গত পরশু দাদার ঘরে চোর এসেছিল। তাই বুলির ধারণা হয়েছে এসব নিয়ে কাজ করলে আরও ঝামেলা হবে। তাই এখন দ্বিধা করছে। তবে তাতে কিছু এসে যায় না আমার! কারণ আমি যাবই। যত দ্রুত সম্ভব বেরোব। তুমি ভাই, আমায় যদি সাহায্য করো তো বিশেষ উপকার হয়। এখনকার দিনে সৎ, পরোপকারী মানুষ তো পাওয়া যায় না!”

কথাটা বলে অমিত আশা নিয়ে তাকালেন কুষাণের দিকে।

কুষাণ একটু ভাবল, তারপর বলল, “আমি যদি কাল সন্ধেবেলা আপনাকে বলি, হবে?”

“কাল?” অমিত যেন একটু নিরাশ হলেন, তারপর বললেন, “ঠিক আছে, তাই বোলো। আমার কার্ডটা রাখো। পিছনে দাদার বাড়ির ঠিকানাও লিখে দিয়েছি। আমি কিন্তু আশায় থাকলাম। এটা একটা বড় আবিষ্কার হবে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার!”

অমিত চলে যাওয়ার পরে জয়রাম জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি সময় নিলে কেন? তুমি তো এমন কাজে পিছিয়ে আসো না!”

কুষাণ বলল, “স্যার, এর আগের বার খুব বিপদে পড়েছিলাম সাইবেরিয়ায় গিয়ে। এবারও শুনছি চোর এসেছে। কী বিপদ আসতে পারে না-জেনে এবার যাব না। আমি আজ একবার বিকেলের দিকে সুমিতবাবুর বাড়িতে যাব। বুলিদেবীর সঙ্গে কথা বলব চুরির ব্যাপারটা নিয়ে। ব্যাপারটা না-দেখে আমি কাজটা নেব না।”

জয়রাম জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি কোনও আশঙ্কা করছ?”

কুষাণ মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ স্যার, করছি। এসব কাজে নানান বিপদ থাকেই। আমার মন বলছে আমাকেও বিপদে পড়তে হবে।”


বুলির ভাল নাম মহামায়া মিত্র। বয়স সাতাশ-আটাশের মতো। গত দশবছর যাবৎ সুমিতবাবুর এখানেই থাকে। ক্রমে-ক্রমে এখন বাড়ির সব ব্যাপার দেখাশোনাও করে।

কুষাণ গত পাঁচ মিনিটের কথায় আপাতত এটুকুই জানতে পেরেছে! গতকাল অমিতবাবুর সঙ্গে কথা হওয়ার পরে ভেবেছিল বিকেলেই আসবে সোদপুরের এই বাড়িতে। কিন্তু পারেনি। আচমকা দুপুর থেকে আকাশ কালো করে এমন বৃষ্টি নেমেছিল যে বলার নয়!

আজ সকালেও গতকালের বৃষ্টির জের আছে! বঙ্গোপসাগরে নাকি নিম্নচাপ হয়েছে। তার জন্য আগামী চারদিন এমন আবহাওয়াই থাকার কথা।

যে ঘরটায় এসে কুষাণ বসেছে সেটার জানলা বন্ধ। তার উপর খুব কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। ফলে আলো খুব কম। বুলির ইদানীং চোখের একটা সমস্যা হয়েছে, তাই আলো একদম সহ্য করতে পারছে না। বুলি অবশ্য সেজন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে।

কুষাণের এতে অসুবিধে নেই। ও তো আর এখানে লেখাপড়া করতে আসেনি। ক’টা কথা বলেই চলে যাবে। তবে বুলির মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। মাথায় জড়ানো ওড়না আর চোখে বড় একটা গগল্স পরে আছে।

বুলি এবার বলল, “আমি শুনে খুশি হয়েছি যে আপনি ছোটমামার সঙ্গে যেতে সম্মত হয়েছেন। একা ওঁকে ছাড়া যেত না।”

“আচ্ছা, শুনলাম আপনাদের বাড়িতে একটা চুরি হয়েছে! তাই আপনি একটু দ্বিধা করছেন!” কুষাণ জিজ্ঞেস করল।

“না চুরি হয়নি, চুরির চেষ্টা হয়েছে!” এই আবছায়াতেও গলার স্বরে বোঝা গেল যে বুলি চিন্তিত! ও বলল, “কিছু নেয়নি। কিন্তু বড়মামা নাকি এক সাংবাদিককে বলেছিল যে আমাজনের জঙ্গলে লুপ্ত প্রজাতির একজন মানুষ আছে আর তার সঙ্গে আছে অমূল্য একটা জিনিস! যে চোর এসেছিল সে কিছুতে হাত দেয়নি। শুধু বড়মামার কাজের জায়গার খাতাপত্র খুব ঘেঁটেছে। বড়মামা গত দু'-তিন বছর কাজ করতে পারছিল না স্মৃতির সমস্যার জন্য। কাগজপত্র সব আমি গুছিয়ে রাখতাম। ব্যাপারটায় আমি ভয় পেয়েছি। তাই দ্বিধা করছিলাম। তবে আপনি যদি যান, তা হলে অসুবিধে নেই।”

কুষাণ জিজ্ঞেস করল, “আপনি এখানে থাকেন, আপনার বাবা-মা...”

“জব্বলপুরে থাকে। আমায় বড়মামার কাছে পাঠিয়েছিলেন কলেজে ভর্তির জন্য। আর কিছু গোলমালও হয়েছিল বাড়িতে। তখন থেকে এখানে আছি। আমার এক বোন আছে। তবে ওর সঙ্গে আমাদের আর যোগাযোগ নেই!”

কেন নেই জানতে ইচ্ছে করলেও কুষাণ সেই নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করল না। কারণ এমন কৌতূহল দেখানো সভ্যতা নয়।

ও জিজ্ঞেস করল, “অমিতবাবু কি এখানে থাকেন না?”

“না, ছোটমামা এখানে থাকেন না। আমি আর একজন কাজের

দিদি, মানে মিনুদি আছি। আসলে আরও দু’জন ছিল, কিন্তু আর দরকার নেই, তাই ছাড়িয়ে দিয়েছি। তবে ভাবছি একজন দারোয়ান রাখব। চোর যদি আবার আসে! ভয় লাগছে আমার!”

“আপনি ভয় পাবেন না। অমিতবাবু আমায় যা বললেন তাতে ওই লুপ্ত প্রজাতির মানুষটিকে খুঁজে পাওয়াই আসল। বাকিটা নয়। যে-কোনও পুরনো ঘটনার সঙ্গে গুপ্তধন জড়িয়ে যাওয়াটা একটা ধারণা মাত্র! তা সবসময় ঠিক নয়।”

বুলি বলল, “যাক, তা হলে আরও নিশ্চিন্ত হলাম।”

কুষাণ দেখল আর বসে থাকার মানে নেই। ও উঠে পড়ল। দেখল একজন কাজের দিদি চা নিয়ে এসেছে!

বুলি বলল, “উঠলেন! চা খাবেন না? মিনুদি আনল যে।”

“ধন্যবাদ। আজ নয়। সব কাজ সেরে ফিরে এসে নিশ্চয়ই আবার আসব। তখন কিছু খাব না হয়। আমি আসি।”

কুষাণ হেসে দরজার দিকে এগোল। বুলিও উঠতে গেল আর তখনই ওর হাতের ধাক্কায় সোফার হাতলে রাখা মোবাইলটা পড়ে গেল মাটিতে। কুষাণ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মোবাইলটা তুলে এগিয়ে দিল বুলির দিকে। বুলি এবার ওড়নার আড়াল থেকে হাতটা বের করে মোবাইলটা নিল। কুষাণ এই আবছায়াতেও দেখল বুলির ডান হাতের কনিষ্ঠাটি কাটা!

বুলি ফোনটা নিয়ে বলল, “ধন্যবাদ! সাবধানে যাবেন। ফিরে এসে আবার কথা হবে। কেমন?”

রাস্তায় বেরিয়ে বাসস্টপের দিকে এগোল কুষাণ। যাক, বিশেষ কোনও ঝামেলা আছে বলে তো মনে হয় না। সামান্য চুরির চেষ্টাকে সাংঘাতিক কিছু হিসেবে দেখার মানে নেই।

বাসস্টপে দাঁড়িয়ে মোবাইলে সময় দেখল কুষাণ। সাড়ে এগারোটা বাজে। এবার অফিসেই যাবে। অমিতবাবুকে বলে দেবে যে, ও যেতে প্রস্তুত! নতুন জায়গায় যাওয়া হবে। নতুন দেশ দেখা হবে। মনটা ভাল হয়ে গেল কুষাণের। ও দেখল বাস আসছে। পায়ে-পায়ে বাসের দিকে এগিয়ে গেল কুষাণ।

চা-দোকানের বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল মাস্টার। তারপর চায়ের খুরিতে চুমুক দিয়ে সেটা ছুড়ে ফেলে দিল ময়লা ফেলার টিনটায়। দাম আগেই দেওয়া ছিল, এবার ও এগিয়ে গেল বাসস্টপের দিকে। কুষাণ দাঁড়িয়ে আছে বাস ধরবে বলে। ও মনে-মনে হাসল, কুষাণ জানেও না যে ওকে কেউ অনুসরণ করছে।

মাস্টারের বয়সপঁয়ত্রিশ মতো। কপালে একটা কাটা দাগ আছে। দুর্ধর্ষ লোক এই মাস্টার! ওর আসল নাম কেউ জানে না। ওর যে আট-ন'টা পাসপোর্ট আছে, সেখানে এক-একটায় এক-একরকম নাম। অন্ধকার জগতে ওকে সবাই মাস্টার বলে। যে-কোনও জটিল আর বেআইনি কাজে ও সিদ্ধহস্ত! এখানেও ও সেরকম একটা কাজই নিয়েছে।

ক'দিন আগে রাতে ওই বসুদের বাড়িতে ও ঢুকেছিল। কিন্তু না, কোনও ম্যাপ বা ডায়েরি কিছু পায়নি। সুমিত বসু লোকটা কি তা হলে ভুল বলেছে সাংবাদিককে? কাগজে ভুল বেরিয়েছে সব কথা!

ও তারপর থেকে অমিত বসুকে লক্ষ রাখতে শুরু করেছে। আর সেই সূত্রেই জানতে পেরেছে কুষাণের কথা।

বাসস্টপের দিকে এগোতে-এগোতেই মোবাইল বের করে একটা নম্বর ডায়াল করল মাস্টার। তারপর কানে লাগিয়ে বলল, “আমি ওর পিছনে যাচ্ছি। দেখি অফিস যায় না অন্য জায়গায়। সেখান থেকে অমিত বসুর বাড়ির কাছে যাব। দেখতে হবে ওরা আসলে কী প্ল্যান করছে!”

ওই প্রান্ত থেকে উত্তর এল, “বেশি কাছে যেয়ো না। কুষাণ সেয়ানা ছেলে। ধরে ফেললে মুশকিল হবে।”

মাস্টার হাসল, “আপনি ভাববেন না।”

ফোনটা কেটে বাসের দিকে দৌড়ে গেল মাস্টার! কুষাণ এতক্ষণে উঠে পড়েছে। বাসটাও ছেড়ে যাবে।

মাস্টার চলন্ত বাসে উঠে দরজার কাছে দাঁড়াল। ভিড়ের মধ্যে কুষাণ এক কোণে দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্ত মনে মোবাইলে কিছু একটা দেখছে।

মাস্টার হাসল নিজের মনে। ভাবল, হেসে নাও কুষাণবাবু। কারণ এমন হাসির দিন আর থাকবে না তোমার। তুমি বুঝবে, না-বুঝে অন্যের কাজে নাক গলালে কী হয়!


এই বাড়ির সমস্ত আলো খুব কমানো থাকে। বুলির চোখের সমস্যার জন্যই এমন ব্যবস্থা। কেন যে এমন একটা সমস্যা হল হঠাৎ! ডাক্তার দেখাচ্ছে বুলি, তাঁরা বলছেন চিন্তার কিছু নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে। এই চোখের সমস্যার পর ওকে চাকরিটাও ছাড়তে হল। কী যে বাজে লাগে! সারাদিন যেন সময় কাটতেই চায় না।

এখন রাত এগারোটা বাজে। আজ খেতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছে। মিনুদি এইমাত্র রান্নাঘরের কাজ শেষ করে নিজের ঘরে শুতে চলে গেল। এবার বুলিও শুয়ে পড়বে।

একসময় শোওয়ার আগে কিছুক্ষণ বই পড়ত বুলি। কিন্তু এখন তা আর পারে না। তার বদলে মোবাইলে গান শোনে। গান শুনতেশুনতেই চোখ লেগে আসে।

বড়মামা আর নেই। মা বলছে জব্বলপুর ফিরে যেতে, কিন্তু আগে চোখের চিকিৎসাটা করানো দরকার। তারপর যা হয় একটা ভেবে দেখবে।

চোখের গগল্সটা খুলে, ওষুধ খেয়ে, চোখে ড্রপ দিয়ে বিছানায় এসে বসল বুলি। তারপর মোবাইলটা খুলে গান চালিয়ে পাশে রাখল। না, ও ইয়ারফোন ব্যবহার করে না। আজকালকার মোবাইলগুলোয় এমনিই ভাল আওয়াজ বেরোয়। বুলি বালিশে মাথা রাখল।

কতক্ষণ যে গান চলছে মনে নেই বুলির। চোখটা জড়িয়ে এসেছিল ঘুমে, আচমকা একটা শব্দ পেল ও। ঘুমের মধ্যে ছিল লই কিনা কে জানে, বুঝতে পারল না ঠিক কিসের শব্দ! তাও শব্দটা পেয়ে উঠে বসল বুলি। ঘরের আলো একদম প্রায় নেই বললেই চলে। তাও তার মধ্যে ঠাহর করার চেষ্টা করল বুলি। মনে হচ্ছে ওর ঘরে কেউ ঢুকেছে! মিনুদি কি!

“কে?” বুলি জোরে বলে উঠল।

“আমি!” উত্তর এল সঙ্গে-সঙ্গে।

আর গলার স্বরটা শোনামাত্র চমকে উঠল বুলি! এ কী করছে এখানে! কী চায়! কিন্তু সেটা জিজ্ঞেস করার আগেই একটা বড় টর্চের আলো কেউ যেন ছুড়ে মারল ওর মুখে!

বুলির মনে হল চোখটার মধ্যে গরম লোহার শিক ঢুকিয়ে দিয়েছে কেউ। যন্ত্রণায় চিৎকার করে বুলি চোখ ঢাকল। আর বুঝল একটা হাত এসে স্পর্শ করল ওর মাথা!


গত কয়েকদিন খুব দৌড়ঝাঁপ গিয়েছে। ভিসার জন্য নানা পেপার আর স্টেটমেন্ট তৈরি করতে হয়েছে ওকে। তারপর সেসব জমা দেওয়ার জন্য ভিসা অফিসেও দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। জয়রাম খুব ভাল মানুষ। তাই এইসবের জন্য ছুটি দিয়েছেন।

অনেকদিন থাকবে না কুষাণ। তাই বাড়ির কিছু কাজকম্মও সেরেছে এই সুযোগে। জেঠু-জেঠিমা তো শুনেই আপত্তি করেছিলেন।

জেঠু বলেছিলেন, “ব্রাজ়িল যাবি? আমাজনে! পাগল নাকি? অতদূর কেউ যায়? ওসব সিনেমায় ভাল। আসলে নয়।”

কুষাণ হেসেছিল খুব, “না-যাওয়ার তো কিছু নেই। কাজ আছে। কী করব!”

ওর হাসি দেখে জেঠিমাও রাগ করেছিলেন, বলেছিলেন, “এমন চাকরি করা কেন বাপু! আদাড়পাদাড়ে ঘুরতে হবে! তুই বলে দে যাবি না।”

অনেক কষ্টে জেঠু-জেঠিমাকে বুঝিয়েছে কুষাণ। না, আসল কথাটা বলেনি। বললে আর রক্ষে থাকত না। ও শুধু বলেছে যে জয়রামের হয়ে কিছু প্রাচীন জিনিস নিয়ে আসতে যাবে ও। দামি জিনিস বলে জয়রাম নিজে কুষাণকে পাঠাচ্ছেন!

জেঠু-জেঠিমা অনিচ্ছা নিয়েও শেষে মত দিয়েছেন। উপরন্তু জেঠু বলেছেন, “পারলে পেলের সঙ্গে দেখা করে আসিস!”

হাসি পেয়ে গিয়েছিল কুষাণের। কিন্তু আর কথা বাড়ায়নি! এমনি সবই ঠিক ছিল, কিন্তু আচমকা আজ বুলির ফোন পেয়ে

আবার সোদপুরে আসতে হয়েছে কুষাণকে। ও বুঝতে পারছে না কেন এভাবে ওকে ডেকে পাঠাল বুলি। ক’দিন আগেই তো গিয়েছিল। কথাও হয়েছে। তা হলে আবার কিসের দরকার পড়ল!

আজও সেই ঘরে বসে আছে কুষাণ। ফ্যান চলছে মাথার উপর। ক’দিনের বৃষ্টির পরে বাইরে আজ রোদ উঠেছে। কিন্তু ঘরের ভিতরটা আজও সেই একদম মৃদু আলোয় মোড়া।

বুলি বসে আছে সামনে। মাথায় ওড়না। কালো গগল্স। গলার স্বর সর্দিতে ভারী। মুখটা আজও ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। ”

কুষাণ জিজ্ঞেস করল, “আপনার শরীর খারাপ?"

“হ্যাঁ, এই ঠান্ডা-গরম লেগে গিয়েছে,” বুলি ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, “আমি যে কারণে আপনাকে ডেকেছি সেটা হল, ছোটমামা শুনছেন না কিছুতেই। কিন্তু আমি আপনাকে বলছি, আপনি এই অভিযানটায় যাবেন না।”

“মানে! সে কী! পরশু বেরোব আমরা। সব ঠিক। সেখানে এখন বলছেন যাব না! এটা সম্ভব নাকি?” কুষাণ অবাক হল, “কেন এমন বলছেন বলুন তো! এই তো বললেন সব ঠিক আছে! তা হলে আবার কী হল!”

“প্লিজ়! যা বলছি শুনুন। আমি সবটা আপনাকে খুলে বলতে পারব না। শুধু জানুন, আমি চাই না আপনার বা ছোটমামার কোনও ক্ষতি হয়ে যাক! আপনি না-গেলে ছোটমামাও যেতে পারবে না। দেখুন আমার সঙ্গে ছোটমামার সম্পর্ক ভাল না। আমি দূরসম্পর্কের ভাগনি। উনি আমার কথা শুনবেন না। আপনি একমাত্র পারেন পুরো ব্যাপারটাকে আটকাতে। প্লিজ।”

কুষাণের বিরক্ত লাগল। এসব একদম ভাল লাগছে না ওর। আচমকা এ কী বেয়াড়া প্রস্তাব রে বাবা! নাহ, এখানে এসে ভুল করেছে ও! কুষাণ আর কথা না বাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল।

“আপনি চলে যাচ্ছেন!” বুলি জিজ্ঞেস করল, “আপনি প্লিজ় একটু ভাবুন। যাবেন না এই অভিযানে। কী হবে বলুন তো গিয়ে! এমন না-জানা, হারিয়ে যাওয়া উপজাতি কত আছে! একটা বেশি-কম আমরা না-জানলে কী অসুবিধে হবে! প্লিজ় যা বললাম ভাবুন। যাবেন না!”

কুষাণ আর কোনও কথা না-বলে বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে। সব ঠিক হওয়ার পরে এখন বলছে, যাবেন না! কোনও মানে হয়! বিরক্তিকর। ও যে অমিতকে কথা দিয়ে দিয়েছে! আর পিছিয়ে আসা যাবে না। ফালতু সময় নষ্ট হল শুধু। বাসস্টপের দিকে এগিয়ে গেল কুষাণ।

মাস্টার আজকেও সেই চায়ের দোকানেই বসে ছিল। কুষাণকে বেরোতে দেখল ও। কিন্তু আজ আর এগোল না কুষাণের পিছনে। বরং দূর থেকে জুম করে কুষাণের ফোটো তুলল ক’টা।

তারপর কুষাণ বাসে উঠে চলে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করল। এবার নিজের মোবাইল ফোনটা বের করে একটা নম্বর ডায়াল করল। কয়েকবার রিং হওয়ার পরে ওদিক থেকে কেউ একটা ধরল ফোনটা।

মাস্টার বলল, “ফোটোটা আমি হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি তোদের। যা বলেছি মনে রাখবি। বাড়াবাড়ি করবি না কিন্তু। চারজন নিয়ে যাবি। কোনও অজুহাত শুনব না। আমি রেজ়াল্ট চাই। কোন রাস্তায় ও যায় সেটা আমি আগেই বলেছিলাম, মনে আছে তো? ভুল যেন না হয়। রাখলাম।”

কলটা কেটে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে নিজের মনে হাসল মাস্টার। কুষাণ যাবে অভিযানে! হুহ, যাওয়াচ্ছে ওকে!


নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশনে বেরিয়ে ফুটপাথ ধরে কিছুদূর এগিয়ে গলিতে ঢুকে গেল কুষাণ। আজ দেরি হয়ে গিয়েছে অফিস থেকে বেরোতে। আসলে সামনে অনেকদিন থাকবে না ও। নানান প্রাচীন জিনিসের ক্যাটালগিংয়ের কাজ করতে হয় ওকে। সেগুলো করতে গিয়ে রাত হয়ে গিয়েছে।

বড় রাস্তা থেকে গলিতে ঢুকে কিছুটা হাঁটার পরে আরও একটা সরু গলিতে ঢুকল কুষাণ। এটাই ওর বাড়ির গলি। ভবানীপুর অঞ্চল কলকাতার প্রাচীন অঞ্চলগুলোর অন্যতম। এখানে এখনও বেশ কিছু পুরনো বাড়িঘর দেখা যায়। তেমনই একটা বাড়িতে থাকে ওরা।

গলিতে ঢুকেই থমকে গেল কুষাণ। রাস্তার সব আলো নেভানো! গলিটা সরু। এঁকেবেঁকে এগিয়ে গিয়েছে সামনে। গলির শেষে ওদের বাড়ি।

কুষাণের অবাক লাগল। এমন তো থাকে না! আশপাশের বাড়ির জানলা বন্ধ হলেও তার ফাঁকফোঁকর দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে! মানে লোডশেডিং নয়। তা হলে কি রাস্তার আলোয় কিছু গোলমাল আছে!

কুষাণ হাঁটতে লাগল। চারদিক নির্জন। দুটো কুকুর শুধু কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমোচ্ছে একটু দূরে।

আচমকা কেমন একটা লাগল কুষাণের। যেন মনে হল কে একটা সরে গেল পিছন থেকে! সম্পূর্ণ প্রতিবর্তের উপর ভর করে আচমকা নিচু হয়ে বসে পড়ল কুষাণ। আর হাওয়ায় শব্দ তুলে একটা রড মাথার উপর দিয়ে ওর চুল ছুঁয়ে সাঁ করে বেরিয়ে গেল। কেউ মারতে চাইছে ওকে! কেন চাইছে! কিন্তু এখন এসব প্রশ্নের সময় নয়, এখন নিজেকে বাঁচানোর সময়।

বসে থাকা অ তেই বাঁ পায়ের গোড়ালির উপর ভর করে ডান পাটাকে মাটির সঙ্গে সমান্তরাল রেখে কাঁটা-কম্পাস দিয়ে গোল করে বৃত্ত আঁকার মতো ভঙ্গিমায় সুইপ করে চালাল কুষাণ। আর সেই মারে ওর পিছনে থাকা দু'জন মানুষ মাটিতে পড়ে গেল। এবার পাশের একটা ছোট্ট বন্ধ দোকানের আবছায়া থেকে একজন বেরিয়ে এল হাতে নানচাকু নিয়ে। এতক্ষণে অন্ধকারে চোখ সয়ে গিয়েছে কুষাণের। ও বসা অবস্থাতেও নানচাকুটা হাত দিয়ে প্রতিহত করে সেই হাতেই পেঁচিয়ে এক ঝটকায় কেড়ে নিল অস্ত্রটা। তারপর লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে, এই সামনে দাঁড়ানো লোক ও মাটি থেকে উঠে দাঁড়ানো বাকি দু’জনকে লক্ষ করে নিমেষে চালাল নানচাকুটা। তিনজনেই মার খেয়ে ছিটকে পড়ল রাস্তায়।

দুটো কুকুর জেগে গিয়ে প্রচণ্ড চিৎকার শুরু করেছে। তিনজন গুন্ডা আবার উঠল। টলমল করলেও আগুপিছু করছে এখন। কিন্তু কুষাণ যেভাবে নানচাকু চালাচ্ছে তাতে এগোতে পারছে না। কুষাণ সময় নষ্ট না-করে এগিয়ে গিয়ে আবার তিনজনকে মারল। আবার ওরা পড়ে গেল মাটিতে। আর কুষাণের মনে হল ওর পিছনে নতুন কেউ এসেছে। কুষাণ দ্রুত ডান দিকে সরে গেল। ওর জামা ঘেঁষে কেউ একজন ছুরি চালাল। ফ্যাঁস করে জামাটা ছিঁড়ে গেলেও কুষাণ বেঁচে গেল অল্পের জন্য। কুষাণ এবার নতুন লোকটার মাথা লক্ষ করে টেনিসের ব্যাক হ্যান্ড ড্রাইভ চালানোর মতো করে চালাল নানচাকুটা! কটাং করে মাথায় লাগার শব্দ হল। লোকটা মার খেয়ে কাটা কলা গাছের মতো পড়ে গেল। আগের তিনজনের দিকে এবার তেড়ে গেল কুষাণ। তিনজন লেংচে-লেংচে পালিয়ে গেল। কুষাণ পিছনে ফিরে দেখল চতুর্থ লোকটাও নেই! এই সুযোগে পালিয়েছে।

আশপাশে বাড়ির জানলা খুলতে শুরু করেছে এবার। নানান বারান্দা থেকেও এবার লোকজন উঁকি মারছে। কুষাণ নানচাকুটা ফেলে দিল। তারপর জামাটা দেখল একবার। অনেকটা ছিঁড়ে গিয়েছে।

কুষাণ আর দাঁড়াল না। কৌতূহলী মানুষজনের প্রশ্নের উত্তর না-দিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।

ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছে। মেরেধরে ওকে পথ থেকে সরাতে চাইছে! ভয় দেখাতে চাইছে! জেদ চেপে গেল কুষাণের। ভয় দেখালে ওর সাহস আরও বেড়ে যায়! কুষাণ ভাবল, এবার দেখবে কী করে কেউ ওকে এই অভিযানে যাওয়া থেকে আটকায়!


ভেনিস, ইটালি

কলকাতা থেকে দোহা আর দোহা থেকে ভেনিস। অনেকটা পথ! প্লেনের ইকনমি ক্লাসে জবুথুবু হয়ে বসে এতটা পথ আসতে বেশ কষ্ট হয়েছে কুষাণের।

ইউরোপের এই দিকটায় কখনও আসেনি ও। তাই কৌতূহল ছিল। ভেনিসে নেমে তো কুষাণ থ হয়ে গিয়েছে পুরো। পৃথিবীতে এমন জায়গা যে থাকতে পারে সেটা ভাবতেই পারেনি। অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের কোলে একশো কুড়িটা ছোট-ছোট দ্বীপ নিয়ে তৈরি এই ভেনিস অনেক পুরনো শহর। গাড়ি চলার রাস্তার বদলে এখানে সব জায়গাতেই ক্যানাল বা খালের মাধ্যমে যাতায়াত করা হয়।

শহরের মধ্যে দিয়ে মূল যে খালটা গিয়েছে তাকে বলে গ্র্যান্ড ক্যানাল। সেখান থেকে শাখা-প্রশাখার মতো আরও অনেক খাল বেরিয়েছে! সবটাই যেন জায়গাটাকে ছোট-ছোট দ্বীপে ভাগে করে রেখেছে। আর এই সব দ্বীপ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত নতুন-পুরনো নানারকম সেতু দিয়ে।

ভেনিসের বাড়িঘরগুলো কী অদ্ভুত সুন্দর দেখতে। কিছু বাড়িঘর মাটির উপর যেভাবে তৈরি করা হয় সেভাবেই বানানো। আর কিছু তো আবার জলের উপর দাঁড়িয়ে আছে। কুষাণ তো বুঝতেই পারছিল না কীভাবে এমনটা হয়েছে!

অমিত হেসে বলেছেন, “আরে জলের তলায় বড়-বড় ওক কাঠের গুঁড়ি পুঁতে তারপর এই বাড়িগুলো বানানো। তাই উপর থেকে দেখলে মনে হয় সবক’টা ভাসছে। দেখো না, এই ধরনের বাড়িগুলোর সামনে ছোট-ছোট জেটি করা। বোট থেকে সোজাসুজি বাড়িতে ঢুকে পড়া যায়!”

কুষাণ জানে এখানে কাজে এসেছে, সেইদিকেই ওকে মন দিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, ভেনিস এমন একটা শহর যে মানুষ অবাক হবেই! তার মন কাজে বসবে না!

ওদের হোটেলটা ভেনিস রেলস্টেশনের কাছে। কুষাণ জানে ওদের সময় নেই ঘুরে-ঘুরে সব কিছু দেখার! তাই হোটেলে গিয়ে আগে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে। তারপর বেরিয়ে ক্যানালের পাশের একটা ছিমছাম রেস্তরাঁ থেকে খেয়ে নিয়েছে ভাল করে।

অমিত মানুষ হিসেবে খুবই ভাল। ব্যবহার যেমন ভদ্র, তেমন জানেনও অনেক কিছু। এই নিয়ে উনি নাকি চারবার এলেন ভেনিসে! রাস্তাঘাট বেশ চেনেন মনে হল।

খাবারদাবার শেষ করে অমিত বললেন, “এখানে দিনো বারেসির যে ঠিকানাটা আছে সেটা রিয়ালতো ব্রিজের কাছে। হেঁটে কুড়িমিনিট মতো লাগবে। আমাদের আর সময় নষ্ট করার মানে হয় না। চলো।”

একটা ছোট ক্যানালের পাশের রেস্তরাঁয় বসেছিল ওরা। সেখান থেকে উঠে অমিতের সঙ্গে হাঁটতে লাগল কুষাণ। বিকেল হচ্ছে। চারদিকে বেড়াতে আসা লোকজনের ভিড়। নানা দেশের মানুষজনে গিজগিজ করছে সব। অক্টোবরের শুরু এখন। হালকা ঠান্ডা আছে। ভালই লাগছে কুষাণের।

সামনেই একটা গিফ্ট শপ। সেখানে সেলস ক্যাপ, ফ্রিজ ম্যাগনেট, টি শার্টসহ আরও কত কী যে ঝুলছে। কাচের নানান পুতুল আর আয়নাও রয়েছে!

অমিত বললেন, “কাছেই মুরানো নামে একটা দ্বীপ আছে। সেখানকার কাচের জিনিস জগৎবিখ্যাত! তবে একটু দামিও বটে। আর এই আয়নাগুলো জানো তো কোথাকার?”

অমিতের প্রশ্নের উত্তর দিল না কুষাণ। কারণ তখনই দোকানের ঝোলানো আয়নায় ও পিছনে একজনকে দেখল। আয়নার মধ্যে দিয়েই লোকটার সঙ্গে ওর চোখাচোখি হয়ে গেল ক্ষণিকের জন্য। আর সঙ্গেসঙ্গে লোকটা কেমন যেন সুট করে ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল।

কী হল ব্যাপারটা! কুষাণ দ্রুত পিছনে ঘুরে তাকাল। চারদিকে লোকজনের জটলা। হাসিখুশি মুখ। দোকানপাট। পথের পাশের স্ট্রিট, মিউজ়িশিয়ানদের থেকে ভেসে আসা গান! কিন্তু লোকটা গেল কই!

কুষাণ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। লোকটাকে প্লেনেও দেখেছিল। বড় চুল। চোখে নীল কাচের চশমা। কপালে একটা কাটা দাগ! এখানে চুল আর চশমাটা নেই! কিন্তু কাটা দাগটা ও ঠিক দেখেছে! লোকটা কি ছদ্মবেশে আছে? নাকি ওর মনের ভুল! টুরিস্ট হিসেবে যে কেউ আসতেই পারে। কিন্তু তা হলে নিজের ভোল বদলানোর দরকার কী! আর চোখাচোখি হয়ে যাওয়ায় লুকিয়ে পড়ার দরকারটাই বা কী!

মনের মধ্যে কু ডাকল কুষাণের। কলকাতার ওর পাড়ার অভিজ্ঞতার কথা ও কাউকেই বলেনি। অমিতকেও নয়। বয়স্ক মানুষ। শুধু-শুধু দুশ্চিন্তা করবেন! কিন্তু ও নিজে তো জানে কেমন বিপদ কাটিয়ে এসেছে!

রিয়ালতো ব্রিজটা বেশ বড়। ওর উপর থেকে বিশাল চওড়া ক্যানালটাকে এই বিকেলের আলোয় কী যে সুন্দর দেখাচ্ছে! কুষাণ একটু দাঁড়িয়ে দেখল দৃশ্যটা। ফোটোও তুলল কয়েকটা। তারপর ব্রিজ পার করে অন্যদিকে গেল।

রাস্তা এখানে পাথরে বাঁধানো। পরপর কিছু হোটেল। তার মাঝে একটা সরু গলি দিয়ে ঢুকে গেলেন অমিত। কুষাণ পিছন-পিছন গেল। বুঝল এটা জনবসতি। সব পুরনো ইট-রংয়ের বাড়িঘর। ঝুলবারান্দা। তাতে ফুলের টব রাখা। সামনে একটা সরু ক্যানাল। সেটার উপর কাস্ট আয়রনের ছোট্ট সুন্দর ব্রিজ। সেটা পার করে একটা বড় বাড়ির সামনে দাঁড়ালেন অমিত।

বড় লাল রংয়ের কাঠের দরজা। ডানদিকে পিতলের পাতে সব নাম লেখা আর পাশে ডোরবেল।

দিনো বারেসির নামটা দেখতে পেল কুষাণ। অমিত বেল টিপলেন। দূরে কোথায় যেন টিং টং হল। মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে থাকার পর দরজাটা খুলে গেল।

একজন মহিলা বেরিয়ে এসেছেন। বয়স ষাটের মতো। বেঁটে, চুল সাদা। মুখে বলিরেখা।

ইতালীয় ভাষায় কিছু জিজ্ঞেস করলেন। অমিত বললেন, “ইটালিয়ান জানি না। আমি এসেছি দিনো বারেসির সঙ্গে দেখা করতে। উনি কি আছেন? আমি ওর বন্ধুর ভাই।”

ভদ্রমহিলা বিরক্ত হলেন। ভাঙা ইংরেজিতে বললেন, “আরে বাবা, সে কবে মরে ভূত হয়ে গিয়েছে! থাকবে কী করে? তার ছেলে আছে, মার্কো! দিনো আমার ভাই। মার্কো বিজ্ঞানী। ধুলো না কীসব নিয়ে গবেষণা করতে চাদে গিয়েছে। সঙ্গে ফোন নেই ওর। ঠিকানা দিতে পারি। তোমরা সেখানে যোগাযোগ করতে পারো।”

“চাঁদ?” কুষাণ ঘাবড়ে গেল। অমিতকে জিজ্ঞেস করল, “এ কী বলছেন? চাঁদ! সেখানে ধুলো নিয়ে গবেষণা করছে? আমাদের চাঁদে যেতে হবে নাকি?”

অমিত হেসে বললেন, “আসলে চ্যাড! একটা দেশ। মিডল টু নর্থ আফ্রিকায়! তুমি ঠিকানাটা একটু লিখে নাও!”

যাক বাবা, তাও ভাল। এখান থেকে সেই দেশটাও যথেষ্ট দূর, তাও চাঁদের চেয়ে তো কাছে!

পকেট থেকে একটা ছোট প্যাড বের করে ভদ্রমহিলার দিকে তাকাল কুষাণ। ভদ্রমহিলা ঠিকানা বলে দিলেন।

মহিলা বললেন, “আর এক ঘণ্টা পরে এলে আমায় পেতে না। আমি নেপল্‌সে চলে যাচ্ছি একটু পরেই। চারদিন পরে আসব। বুঝেছ? এখন যাও বাপু, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

কাজ শেষ করে অমিত বললেন, “আজ তো আর কিছু করা যাবে না। কাল আবার প্লেনের টিকিট, চ্যাডের ভিসার জন্য দৌড়াদৌড়ি করব। এখন চলো, তোমায় ভেনিস দেখাই খানিকটা। হোটেলে বসে থেকে কী করবে? এই বিকেল আর সন্ধের মুখটায় ভেনিস সবচেয়ে সুন্দর। ইংল্যান্ডে পড়ার সময় আমি এসেছিলাম প্রথম! সেই কবেকার ঘটনা! চলো, তোমায় ঘুরে দেখাই। কিছু কেনার হলে কিনতে পারো। অসুবিধে নেই।”

কুষাণ হাসল। অমিতের সঙ্গে হাঁটা শুরু করল। আর মনে-মনে ভাবল, ভগবান! আর যেন কোনও ঝামেলা না হয়।


সান মার্কো স্কোয়্যারটা এখন প্রায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। বিশাল বড় পাথরে বাঁধানো চাতালে, নরম আলোয় কিছু পায়রা বসে ঝিমোচ্ছে। পুরনো দিনের আলোকস্তম্ভগুলোর চারদিকে কেমন যেন একটা বাষ্পের বলয়। মাস্টার দূর থেকে দেখল কুষাণদের।

সান মার্কো স্কোয়্যার ভেনিসের হৃপিণ্ড বলা যেতে পারে। এখানে ডজেস প্যালেস, সেন্ট মার্কস ব্যাসিলিকা থেকে শুরু করে আরও নানান সৌধ আছে। আর আছে প্রচুর রেস্তরাঁ, গিফ্ট শপ, ছোট-ছোট ক্যাফেটেরিয়া। অমিত আর কুষাণ এদিক ওদিক ঘুরেছে। আর ওদের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে ঘুরতে হয়েছে মাস্টারকেও।

আজ বিকেলে কুষাণ তো প্রায় দেখেই ফেলেছিল ওকে। কীভাবে যে ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়েছিল, ও-ই জানে। তারপর তো কুষাণদের হারিয়ে ফেলেছিল ঘণ্টাখানেকের জন্য। আসলে এই সময় এত ভিড় হয় যে কেউ হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।

তাও ঘণ্টাখানেক পরে খুঁজে পেয়েছিল কুষাণদের। আর দেখেছিল একটা নোটবই খুলে কীসব গুজগুজ করছে দু’জনে। মানে কি ওই নোটবইয়ে কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে? ওই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে নিশ্চিত কোনও ঠিকানা জেনেছে ওরা। ওটা হাতাতে পারলেই আমাজন জঙ্গলের কোথায় যেতে হবে সেটা জানা যাবে নিশ্চিত! তখন থেকে ঠিক সময়ের অপেক্ষা করছে মাস্টার। একটা সুযোগ পেলে কুষাণের ওই বুকপকেটে রাখা নোটবইটা তুলে নেবে ও!

সান মার্কো স্কোয়্যার থেকে কুষাণদের একটা বোটে উঠতে দেখল মাস্টার। ছোট-ছোট স্পিড বোট এগুলো। জল কেটে দ্রুত এগোয়। ওয়াটার ট্যাক্সি জাতীয়।

মাস্টার নিজেও একটা বোটে উঠল, তারপর সামনের ওই বোটের পিছনে যেতে বলল। বোটের চালক অবাক হয়ে তাকাল। মানে ভাবটা হল, কেন বেকার ও অন্য বোটের পিছু নিতে যাবে?

মাস্টার আর কথা না-বলে দুটো পঞ্চাশ ইউরোর নোট বাড়িয়ে দিল। এমনিতে বোটের ভাড়া ষাট ইউরো, সেখানে চল্লিশ ইউরো বেশি! চালকটি আর কথা না-বাড়িয়ে বোট চালিয়ে দিল।

রেলস্টেশনের কাছের স্টপে নামল কুষাণরা। মাস্টারও নামল। বেশ রাত হয়েছে এখন। চারদিক ফাঁকা। বড় রাস্তা থেকে বাঁক নিয়ে পাথুরে সরু গলি দিয়ে হোটেলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কুষাণরা। এই পথে কেউ নেই। শুধু পুরনো দিনের বাড়িঘর কেমন ছায়া-ছায়াভাবে দাঁড়িয়ে আছে। দেওয়াল থেকে কাস্ট আয়রনের ব্র্যাকেটে মৃদু আলো ঝুলছে। চট করে দেখলে উত্তর কলকাতার গলির কথা মনে পড়ে।

পথটা একদম নির্জন দেখে মাস্টার পকেট থেকে পিস্তল বের করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। এটাই সময়!

পিছনে পায়ের শব্দ শুনে কুষাণ আর অমিত ঘোরার আগেই মাস্টার ঝাঁপিয়ে পড়ে অমিতকে জাপটে ধরে ওর ঘাড়ে বন্দুকের নলটা ঠেকাল। “আরে, কে আপনি?” কুষাণ ঘাবড়ে গেল।

“তোমার নোটবুকটা দাও আমায়! না হলে এই বুড়োকে এখানেই শেষ করে দেব। দাও!” মাস্টার হিংস্র গলায় বলল।

“না, দেবে না কুষাণ।” অমিত বললেন।

“চোপ,” মাস্টার অমিতের ঘাড়ে পিস্তলের বাট দিয়ে মারল হালকা

করে, “দে বলছি! না হলে...” মাস্টার পিস্তলের সেফটি ল্যাচটা খুলল। “না-না, প্লিজ়! প্লিজ়! এই নাও,” কুষাণ দ্রুত হাতে নোটবইটা পকেট থেকে বের করে ছুড়ে দিল মাস্টারের দিকে।

মাস্টার সেটা লুফে নিল। তারপর দ্রুত শেষ লেখা হওয়া পাতাটা খুলল। অল্প আলোয় দেখল কীসব লেখা আছে। ঠিকানাই মনে হচ্ছে। ও বলল, “এটা যদি ভুল হয় দ্যাখ তোদের কী করি! আর যাতে সহজে ভেনিস ছেড়ে যেতে না-পারিস তার ব্যবস্থা করছি।'

বলেই মাস্টার অমিতের পায়ের গোড়ালি লক্ষ করে প্রচণ্ড জোরে লাথি মারল। যন্ত্রণায় চিৎকার করে অমিত পড়ে গেলেন পাথুরে রাস্তায়! মাস্টার আর দাঁড়াল না। দৌড়ে বেরিয়ে গেল পাশের একটা গলি দিয়ে।

বেশ কিছুটা এদিক ওদিক করে যখন গ্র্যান্ড ক্যানালের পাশে এল মাস্টার, তখন একটু স্বস্তি পেল। যাক, কাজ হাসিল হয়েছে। আর ও নিশ্চিত অমিতের পা ভেঙে দিতে পেরেছে। নাও, এখন কিছুদিন আটকে থাকো ভেনিসে। সেই সুযোগে কাজ হাসিল করে নেবে মাস্টার।

এবার বড় আলোর সামনে নোটবুকটা খুলল ও। প্লেনেও দেখেছিল এতে কীসব টোকাটুকি করছে কুষাণ। এখানেই সব লেখে নিশ্চয়ই! দেখা যাক কী লেখা আছে শেষের পাতায়।

ও দেখল লেখা আছে—

দিনো বারেসি মৃত!

পুত্র – মার্কো বারেসি।

- ঠিকানা – ১৬৬ স্কোলিলিন, মো ই রানা। পিন – ৮৬১০। নরওয়ে। নরওয়ে! সে তো আরও উত্তরদিকে। সেখানে আছে এই দিনো বারেসির ছেলে! ওকে তো বলে দেওয়া হয়েছে যে আমাজন জঙ্গলে যেতে হবে। সাংঘাতিক দামি কিছু জিনিস আছে। কিন্তু তার সঠিক জায়গাটা বের করতে গেলে প্রয়াত সুমিত বসুর পরিচিত কিছু বিজ্ঞানীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে লোকেশন জানার জন্য।

তা হলে ওকে এখন নরওয়ে যেতে হবে!

মাস্টার মোবাইলটা বের করল পকেট থেকে। তারপর কলকাতার একটা নম্বরে ফোন করল, বলল, “হ্যালো, আমি মাস্টার বলছি। ভেনিসের কাজ শেষ। আমার নেক্সট স্টপ নরওয়ে!”


অমিত পা ধরে বসে আছেন হোটেলের ছোট্ট লাউঞ্জে। খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। হোটেল থেকে ডাক্তার ডাকা হয়েছে। কিন্তু কুষাণরা আসলে বলেনি ঠিক কী হয়েছে। কারণ বললেই থানা-পুলিশের ঝামেলা হবে।

কুষাণ জিজ্ঞেস করল, “খুব ব্যথা করছে স্যার? এক্স রে করাতে হবে। যা ফুলেছে তাতে মনে হচ্ছে ভেঙে গিয়েছে!”

অমিত যন্ত্রণা চেপে বললেন, “সে তো হল, কিন্তু তোমার নোটবইটা... ওটা যে চলে গেল। এবার কী হবে? কেউ যে এর পিছনে লেগেছে সেটা তো বুঝতেই পারছি। কী যে বিপদ হল! এটা এখন একটা রেসের মতো হয়ে গেল। কে আগে আমাজনের সেই হারিয়ে যাওয়া উপজাতির মানুষটিকে খুঁজে পাবে, তার রেস! এদিকে দিনোর বোন, ওই ভদ্রমহিলা, নেপল্স-এ চলে গিয়েছেন। আমাদের চারদিন অপেক্ষা করতে হবে আবার ঠিকানাটার জন্য! আর এই সুযোগে শয়তানটা কতদূর এগিয়ে যাবে। ইশ, আমার সব পণ্ড হয়ে গেল!”

কুষাণ হাসল। বলল, “স্যার, ওসব বাদ দিন। আগে পায়ের চিকিৎসা হোক, পরে দেখা যাবে!”

“তুমি হাসছ! আর পরে দেখা যাবে মানে? লোভী, খারাপ লোকেরা এর পিছনে পড়েছে। ভাবতে পারছ কী বিপদটা হল?”

“কিচ্ছু বিপদ হয়নি স্যার। কেউ কিছু জানতে পারেনি। আমি কিছুই লিখিনি নোটবুকে। ইন্টারনেট থেকে একটা ভুল ঠিকানা আগেই টুকে রেখেছিলাম। দুর্ভাগ্যক্রমে কেউ এটা হাতিয়ে নিলে যাতে সে ভুল দিকে চলে যায়! কারণ আমাদের পিছনে যে শয়তান লেগেছে সেটা আমি আগেই বুঝেছিলাম।”

“তাই!” অমিতের মুখ উজ্জ্বল হল। উনি জিজ্ঞেস করলেন, “তা হলে আসল ঠিকানাটা?”

কুষাণ হাসল। তারপর নিজের মাথায় টোকা দিয়ে বলল, “আমার মাথায় লেখা আছে স্যার। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না।”


মো ই রানা, নরওয়ে।

মো ই রানা ছোট্ট, একমুঠো একটা শহর। এর উত্তরেই আর্কটিক সার্কলের শুরু। এখানে বেশ ঠান্ডা। মোটা জ্যাকেটের মধ্যে দিয়ে র‍্যানেলভা নদী আর সল্টফ্যেলে পর্বতের থেকে ভেসে ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ ভালই পাচ্ছে মাস্টার। কিন্তু সেসব দিকে ওর কোনও খেয়াল নেই। বরং বিভ্রান্ত হয়ে মাস্টার এদিক ওদিক ঘুরছে। কারণ একটাই। মার্কো বারেসিকে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না ও।

গত পরশু ও পেয়েছিল এই ঠিকানাটা। আর কালকের মধ্যে নরওয়ে আসার ব্যবস্থা করে আজকে সকালে নরওয়ের রাজধানী অসলোয় এসে পৌঁছেছে ও। সেখান থেকে প্লেনে করে এসেছে মো ই রানায়।

কী যে সুন্দর এই দেশটা। নদীর ধারেও গিয়েছিল মাস্টার। পান্না রংয়ের স্বচ্ছ জল পাথুরে জমি ঘেঁষে বইছে। অন্যদিকে সরলবর্গীয় গাছের অরণ্য! শহরের মধ্যের রাস্তাঘাট খুব পরিষ্কার। জলের ধার সব পাথর দিয়ে বাঁধানো। উঁচু বাড়িঘর প্রায় নেই! আর বরফ পড়ে বলে সব বাড়ির ছাদই ঢালু।

মাস্টারের আরও ঘুরে দেখতে ইচ্ছে করছিল। আসলে ও যতই অন্ধকার জগতের কাজকারবার করুক না কেন, মাস্টারের মধ্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি একটা টান আছেই! এই কাজটা ও নিয়েছে মূলত আমাজনের জঙ্গলে যেতে পারবে বলেই।

কিন্তু না, আর এসব দিকে এখন মন দেবে না। কারণ ও জানে কোনওভাবে আর এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করা যাবে না। এখানে ও কাজে এসেছে। তা ছাড়া যতই ও অমিতের পা ভেঙে দিক না কেন, সেটা প্লাস্টার করে আবার বেরিয়ে পড়া শুধু সময়ের অপেক্ষা! তাই তার আগেই ওকে আমাজনের আসল জায়গার লোকেশন আর দরকারি খবর বের করে সেখানে পৌঁছতে হবে।

কিন্তু বের করবে কী করে সেই খবরটা! মার্কো বারেসির ঠিকানাটাই যে খুঁজে পাচ্ছে না! এই ১৬৬ স্কোলিলিন বলে যে ঠিকানাটা আছে সেটা কারও বাড়িই নয়। মানে ওটা একটা পুরনো কামারশালা। যা এখন বন্ধ হয়ে আছে। তা হলে এটা কী ঠিকানা পেল ও!

মাস্টার হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল! এখন আকাশে কেমন একটা নরম আলো ছড়িয়ে আছে। সামনেই শীতকাল আসছে। তখন আর সূর্য দেখা যাবে না। চারদিকের জল জমে বরফ হয়ে যাবে। আকাশে নর্দান লাইটস আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে! নর্দান লাইটস মানে মেরুজ্যোতি, যাকে সবাই অরোরা বোরিয়ালিস বলে।

মাস্টার কী করবে বুঝতে না পেরে চারদিকে তাকাল। আশপাশের দৃশ্য খুব সুন্দর! ফাঁকা শহর। পরিমিতভাবে সাজানো বলেই যেন বেশি সুন্দর। লোকজনও কম। আর এর মধ্যে গাছের পাতা ঝরে পড়ছে চারদিকে। দূরে একটা গির্জা থেকে গম্ভীর ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে সাদা দেওয়াল আর সবুজ ক্যানোপি ঢাকা টাওয়ারের মাথায় নড়তে থাকা কালো হয়ে যাওয়া গির্জা-বেলটাকে। শান্ত, মনোরম শহর!

কিন্তু মাস্টারের এই দিকে মন দেওয়ার সময় নেই! ও বেশ বুঝতে পারছে ওই কুষাণ ছেলেটার শয়তানি এটা। ছেলেটা কলকাতার অভিজ্ঞতা থেকে আর এখানে ওকে একবার পিছু নিতে দেখে ফেলেই এমন একটা ফন্দি করে ওকে একদম অন্য দিকে পাঠিয়ে দিয়েছে!

‘মূর্খ আমি!’ নিজেকে মনে-মনে গালি দিল মাস্টার। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ও কুষাণকে অবজ্ঞা করেছিল। আর ছেলেটা ওকে ভুল ঠিকানা দিয়ে ভাল বোকা বানিয়েছে! যদি লোভে পড়ে ঠিকানাটা ছিনতাই না করত! যদি কুষাণদের অনুসরণ করত শুধু, তা হলেই তো হত! নিজের বোকামোয় নিজেকেই চড় মারতে ইচ্ছে করল মাস্টারের!

এখন ওরা কোথায় কে জানে! এমন বোকার মতো তড়িঘড়ি কাজ না করে অন্তত ভেনিসের কাউকে একটা যদি ওদের পিছনে লাগিয়ে দিয়ে আসত তা হলে চিন্তা থাকত না! এখন কী যে করবে! মাস্টার আবার হাতের ঠিকানা লেখা কাগজটার দিকে তাকাল। তারপর রাগের চোটে সেটা দলা করে পাঁকিয়ে পাশের একটা ডাস্টবিনে ফেলে দিল।

সামনেই একটা ছোট্ট ফুড ট্রাক দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর খিদে পেয়েছে। ও এগিয়ে গেল সেই দিকে। পেটে কিছু দিয়ে মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে হবে। আর তাড়াহুড়ো করবে না!

নরওয়ের পিকল্ড হেরিং মাছ খুব বিখ্যাত খাবার। এর সঙ্গে রাইব্রেড, কাসুন্দি আর সস দেওয়া হয়। সেটাই একটা অর্ডার করে সামনের সবুজ বেঞ্চে বসল মাস্টার। তারপর পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করল। একবার কলকাতায় কথা বলতে হবে। এখানে যে এমন বোকা বনে গিয়েছে সেটার জন্য গালিও খেতে হবে, ও জানে।

দীর্ঘশ্বাস চেপে ফোনটা ডায়াল করে কানে লাগাল মাস্টার। দেখল সন্ধে আরও একটু গাঢ় হয়েছে। গির্জারে ঘণ্টাধ্বনি থেমে গিয়েছে এখন।


কলকাতা

মিনু বেশ কয়েক বছর হল কাজ করে বুলিদের এখানে। কিন্তু এমন অসহায় অবস্থায় ও কোনওদিন পড়েনি। এমন বন্দিদশায় থাকতে হবে কোনওদিন ভাবেনি।

মিনুকে আর বাড়ি থেকে বেরতে দেওয়া হয় না। ওর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বাড়ির সব কাজ করতে হলেও সারাক্ষণ ওকে নজরে রাখা হচ্ছে। কাজ হয়ে গেলেই ওকে বেঁধে রাখা হচ্ছে!

এখন ওর বাঁধন খোলা। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভয়ে সেটা কাঁপছে একটু-একটু আর কেমন একটা টি-ট্রি-টি শব্দ তুলছে।

সামনে ফোন কানে কথা বলছে ম্যাডাম। বলছে, “সে কী? তুমি নরওয়ে গিয়েছ? তাও ভুল লিড ফলো করে? গবেট তুমি? এই জন্য কাজে রেখেছি তোমায়! এত প্ল্যান এই জন্য করেছি আমি? এই যে ভেনিস থেকে হারিয়ে ফেললে ওদের, এবার কী হবে? কীভাবে খুঁজে বের করবে ওদের? এই পৃথিবী খড়ের গাদা হলে, ওরা সূচ নয়, ব্যাক্টেরিয়া! বুঝেছ ইডিয়ট?”

ওদিক থেকে কী উত্তর এল বুঝল না মিনু। ও দেখল ম্যাডামকে। রাগে ফেটে পড়ছে যেন! এই মুখটা এত চেনা ওর! কিন্তু এর এমন ভয়ঙ্কর ভাব ও মোটেও চেনে না!

ম্যাডাম চেয়ার থেকে উঠে ফোনটা কানে ধরেই খানিক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আর কোথাও যেতে হবে না। ওরা রিও হয়েই ঢুকবে আমাজনে। পেরু হয়ে নয়। কারণ ব্রাজ়িলের দিকের জঙ্গলেই আমাদের লক্ষ্যবস্তু আছে! মামার কথায় তেমনই ছিল। তুমি সোজা রিও চলে যাও। আর লোক লাগাও। এয়ারপোর্টে নজর রাখো। দেখো কারা কবে আসছে। সেখান থেকে ওদের ট্রেলটা ফলো করো! আর একদম ভুল করবে না এবার। এবার ভুল করলে জেনো তুমি মাস্টারই হও আর লেকচারারই হও, আমার হাত থেকে রেহাই পাবে না! বুঝেছ?”


চ্যাড। ফে-লাজো।

আফ্রিকার মানচিত্রের উপরের দিকের দেশ এই চ্যাড! ভেনিসের মার্কোপোলো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এরোপ্লেনে চ্যাডের রাজধানী জ্যামিনাতে পৌঁছতে পাঁচ ঘণ্টার একটু বেশি সময় লেগেছিল কুষাণদের। সেই জ্যামিনা থেকে ওদের আসতে হয়েছে এই ফে-লাব্‌জোয়।

এখন জ্যামিনা থেকে ফে-লাব্‌জোয় প্লেন সার্ভিস আছে। কিন্তু সেটা খুব একটা ঘন-ঘন নয়। তাই অমিত গাড়ি বুক করেছিল।

এই দুই শহরের মধ্যেকার পথের দূরত্ব প্রায় সাড়ে ন'শো কিলোমিটার। ঊষর প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে ছোটখাটো নানান শহর আর গ্রাম ছুঁয়ে রাস্তা গিয়েছে। কুষাণদের গাড়িটা এস ইউ ভি। যে চালাচ্ছে তার নাম একন। কুড়ি-বাইশ বছর বয়স। লেখাপড়া করে। পাশাপাশি রোজগারের জন্য এমন লম্বা ট্রিপে গাড়ি চালায়।

সারাটা রাস্তা বকবক করতে-করতে এসেছে একন। কুষাণ দেখেছে পথে অনেকেই একনকে চেনে। আফ্রিকার মানুষজন ইউরোপের চেয়ে অনেক খোলামেলা। বন্ধুবৎসল। হা হা করে হাসে। চেঁচিয়ে কথা বলে। নানান কষ্ট আর অসুবিধে নিয়ে জীবন কাটালেও মুখের হাসিটা মোছে না।

পথে একন বলেছিল, “আমি দু’দিন থাকব ফে-লাব্‌জোয়। আমার মাসির বাড়ি ওখানে। তোমাদের ফেরার দরকার হলে আমায় বোলো। আমিই নিয়ে আসব।”

ফে-লাজো উত্তর চ্যাডের সবচেয়ে বড় শহর। কুষাণের মনে হল সত্যজিৎ রায় এই শহরকে দেখলে ‘সোনার শহর’ নাম দিতেন নিশ্চয়ই। রাস্তাঘাট থেকে বাড়িঘরের অনেকটাই হলদেটে এখানে। এটা আসলে মরুভূমির মাঝে একটা মরূদ্যান। এর আশপাশে নাকি তিনটে দিঘিও আছে।

এখানেই আপাতত গবেষণার জন্য এসেছে দিনো বারেসির ছেলে মার্কো বারেসি।

আসলে জন আর্চারের কোনও খোঁজ নেই ওদের কাছে। বেঁচে আছেন কিনা তাই জানে না! খোঁজ থাকলে এভাবে দিনো বারেসি আর মার্কো বারেসিকে খুঁজে বের করতে হত না!

এখানে রোদের তেজ খুব বেশি। দিনের বেলায় খুব গরম।

একন এই শহরটা চেনে। তাই ও-ই কুষাণদের নিয়ে এসেছে ছোট্ট একটা হোটেলে।

সেখানে ব্যাগপত্র রেখে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে এখন ওরা বেরিয়েছে মার্কোর খোঁজে। একনই গাড়ি চালাচ্ছে।

কুষাণ জিজ্ঞেস করল, “আপনার পায়ে অসুবিধে হচ্ছে না তো?” অমিত মাথা নেড়ে হাসলেন, “পা ভেঙে গেলেও এখন তো প্লাস্টার করা। অসুবিধে হবে কেন? তবে সন্তু-কাকাবাবু গল্পের কাকাবাবুর মতো ফিল হচ্ছে। এই দ্যাখো না, হাতে ক্রাচ, এদিকে অভিযানে বেরিয়েছি!”

কুষাণ হাসল। আসলে সেদিনের ঘটনার পর এক্স-( করে দেখা গিয়েছিল যে গোড়ালির হাড় সরে গিয়েছে অমিতের। তবে অপারেশনের দরকার নেই। এমনি সেট করে প্লাস্টার করে দিয়েছে। সঙ্গে ওষুধও লিখে দিয়েছেন ডাক্তার।

কুষাণ বলেছিল ক’দিন বিশ্রাম করে যেতে। কারণ ওই যে লোকটা পিছু নিচ্ছিল, তাকে তো ঝেড়ে ফেলা গিয়েছে। কিন্তু অমিতের এক কথা। কাজ পুরো না করে কোনওরকম বিশ্রাম করবেন না।

ঠিকানা অনুযায়ী মার্কোর বাড়িটা খুঁজে পেতে বিশেষ অসুবিধে হল না কুষাণদের। শহরের একপ্রান্তে থাকে মার্কো। ছোট্ট বাড়ি। আশপাশে কিছু গাছপালা আছে। তবে জায়গাটা খুব একটা পরিষ্কার নয়।

বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ি থেকে নামল ওরা। হলুদ পাথরের বাড়ি। সামনে নম্বর লেখা। মিলিয়ে দেখল কুষাণ। তারপর এগিয়ে গিয়ে দরজায় নক করল।

কিছু সময় পরে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। আর দরজা খুলে গেল সামনে। কুষাণ দেখল লম্বা-চওড়া একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার পরনে হাফ প্যান্ট আর একটা টি-শার্ট। গালে সাতদিনের না-কামানো দাড়ি। মাথার কালো-বাদামি চুলগুলো এলোমেলো। চোখদুটো নীল।

“কী চাই?”

অমিত এগিয়ে গেলেন এবার। বললেন, “তুমি মার্কো বারেসি?” লোকটি মাথা নাড়ল, “ইয়েস, আয়াম হি। কেন?”

“আমার নাম অমিত বসু। আমি কলকাতা ইন্ডিয়া থেকে আসছি। আমার দাদার নাম সুমিত বসু। তোমার বাবা দিনো বারেসির সঙ্গে উনি অনেক বছর আগে আমাজনে গিয়েছিলেন! সেই নিয়ে কথা বলতে এসেছি আমি। তুমি যদি একটু সময় দাও!” কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বললেন অমিত।

মার্কো যেন থমকে গেল একটু, তারপর বলল, “আরে আঙ্কল সুমিত! আমার খুব মনে আছে ওঁকে। নাই ম্যান। তবে বহুদি যোগাযোগ নেই। কী খবর! আর তুমি এতদূর এসেছ? আর্জেন্ট কিছু?” অমিত হাসলেন। বললেন, “ক্যান উই স্টেপ ইন?”

“সরি, সরি,” মার্কো হাসল, তারপর সরে গিয়ে বলল, “প্লিজ় কাম। আমার এটা অস্থায়ী ঠিকানা। জাস্ট এসেছি, কিছুদিন হল। সেভাবে বসার জায়গা নেই। ক’টা চেয়ার মাত্র।”

কুষাণরা ঘরে ঢুকল। ছোট ঘর। একটা ক্যাম্প খাট। টেবিল। দু’তিনটে চেয়ার। আলমারি। ফ্রিজ। সামান্যই আসবাব।

ওরা চেয়ারে বসল।

মার্কো বসল ক্যাম্প খাটে। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কি কিছু খাবে?”

“না-না,” ,” অমিত হাসলেন, তারপর কুষাণের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অ্যালবামটা।”

কুষাণ নিজের পিঠের ব্যাগের থেকে অ্যালবামটা বের করে দিল। সুমিতের পুরনো সঙ্গীদের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়েছেন অমিত। তাই পুরনো দিনের একটা ছোট অ্যালবাম সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, যাতে কেউ যদি সন্দেহ করে তা হলে ফোটো দেখিয়ে প্রমাণ করবেন যে উনি সত্যিই সুমিত বসুর ভাই।

অমিতের পায়ে সমস্যা বলে ব্যাগপত্তর বইছে কুষাণ নিজেই। এখনও অবধি অ্যালবামের দরকার পড়েনি। কিন্তু আজ মার্কোর সামনে নিজে থেকেই অমিত এটা বের করলেন।

মার্কো “আরে এসবের দরকার কী,” বললেও ফোটো দেখল খুঁটিয়ে। সেখানে সুমিতের সঙ্গে নিজের বাবার ফোটোটায় গিয়ে আটকে গেল। বলল, “এই ফোটোটা আমার মনে আছে। প্যারিসে তোলা। আমি ছিলাম সঙ্গে। যদিও আমি ফোটোয় নেই। যাক গে। তা বলো যে, কেন এসেছ এতদূর? সামথিং সিরিয়াস?’

অমিত বললেন, “একটা ইনফরমেশন দরকার। মানে খুবই দরকার। আমার দাদা সম্প্রতি মারা গিয়েছেন। উনি আমাজ়নে একটা এক্সপিডিশনে গিয়েছিলেন। আর সেখানে লস্ট ট্রাইবের একজনকে পেয়েছিলেন খুঁজে। কিন্তু যেহেতু ওঁর স্মৃতি খুব একটা ভাল কাজ করছিল না, ফলে উনি আমায় বলতে পারেননি জঙ্গলের এগজ্যাক্ট লোকেশনটা। আমি নিজে এইসব নিয়ে গবেষণা করি। তাই আমি বেরিয়েছি তার খোঁজে। দাদা চেয়েছিলেন আমি যেন সেই মানুষটিকে খুঁজে বের করি। কিন্তু আমাজ়ন তো একটুখানি জায়গা নয়। বিগেস্ট বোল অফ স্যালাড ইন দ্য আর্থ! তাই তোমার বাবার কাছে জানতে আমি গিয়েছিলাম ভেনিসে। শুনলাম উনি মারা গিয়েছেন। তাই তোমার কাছে এসেছি। তুমি কি জানো কিছু?”

মার্কো সবটা শুনে একটু সময় চুপ করে রইল, তারপর মাথা নাড়ল। বলল, “আমি তো জানি না লোকেশনটা। তবে বাবার কাছে এই ব্যাপারে শুনেছি। আমি নিজেও গবেষণা করতে এখানে এসেছি। তাই এর গুরুত্ব বুঝি।”

কুষাণ জিজ্ঞেস করল, “কী নিয়ে গবেষণা করছেনহাসল মার্কো। বলল, “ধুলো নিয়ে।”

“মানে?” কুষাণ অবাক হল।

মার্কো বলল, “এখান থেকে কাছেই হল বোডেলে ডিপ্রেশন বলে একটা জায়গা। পৃথিবীর সবচেয়ে ধূলিধূসর জায়গাও বলতে পারো। সেখানে কয়েক হাজার বছর আগে একটা লেক ছিল। আজ আর নেই সেটা। কিন্তু সেই পুরনো সময়ে লেকের জলে ডায়াটোম বলে একধরনের অতি সূক্ষ্ম শ্যাওলা জন্মাত। লেকের নীচে তাদের অধঃক্ষেপ পড়ত। এমনিতে চোখে দেখা না-গেলেও তারা এক অপরের সঙ্গে ফিউজ় করে লেয়ার তৈরি করে। এখন জল শুকিয়ে গেলেও সেই শ্যাওলার শক্ত হয়ে যাওয়া লেয়ার মাটির উপর বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে পড়ে আছে। বোডেলে ডিপ্রেশন হল সেই জল শুকিয়ে যাওয়া লেক। এখানে প্রাকৃতিক ব্যাপারটাই এমন যে প্রবল হাওয়া দেয় সারাক্ষণ। আর তার ফলে সাদা অধঃক্ষেপ, যা আসলে মিনারেল এনরিচড ডাস্ট, তা হাওয়ায় ওড়ে। আর পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে এই ধুলো আটলান্টিকের উপর দিয়ে ভেসে মেক্সিকান গাল্‌ফে যেমন যায়, তেমন এর একটা বড় অংশ গিয়ে ঝরে পড়ে আমাজনের জঙ্গলে। আটলান্টিকের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় এই ধুলোর একটা ভাগ জলের উপরও ঝরে যায়। তার ফলে সমুদ্রের তলার যে গাছপালা আছে, তারা পুষ্টি পায়। বাঁচে। তাদের রিলিজ় করা অক্সিজেন পৃথিবীর অক্সিজেন সাপ্লাইকে পুষ্ট করে। আমাজনে আমরা জানি প্রচুর বৃষ্টি হয়। তাই আমাজনের মাটির অনেক মিনারেল জলে ধুয়ে বেরিয়ে যায়। এই বোডেলে ডিপ্রেশন থেকে উৎপন্ন খনিজ ধুলো লোহা, ফসফরাস ইত্যাদি নানান খনিজ পদার্থ বহন করে আমাজনের মাটিকে পুষ্ট করে! এই ধুলো না-থাকলে আমাজন রেনফরেস্ট টিকে থাকত না। ভাবলে অবাক লাগে এই বিশাল পৃথিবীতে সবকিছু একে অপরের থেকে এত দূরে দূরে হলেও এই জগৎ কী অদ্ভুতভাবে এক অপরের সঙ্গে যুক্ত! সিমবায়োটিক রিলেশন সবার মধ্যে!”

কুষাণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল! ভাবল, বাপ রে! পৃথিবীতে কত কী হয়!

মার্কো বলল, “আমি তোমাদের একটা সংক্ষিপ্তসার দিলাম। এই ধুলোর আরও অনেক ম্যাজিক আছে। এমনকী, খারাপ এফেক্টও আছে, যা ফ্লোরিডা কোস্টে দেখা যায়। কিন্তু সেসব তুমি নিজে খুঁজে পড়ে নিয়ো। আমার বাবা অ্যালং উইথ আঙ্কল সুমিত আমাজ়নে গিয়েছিলেন সেখানকার মাটি নিয়ে গবেষণা করতে। তারপর আশ্চর্যভাবে তাঁদের সঙ্গে দেখা হয় এক হারিয়ে যাওয়া উপজাতির মানুষের। কিন্তু লোকেশন যারা জানত তাদের মধ্যে...”

মার্কো একটু থামতেই অমিত আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী তাদের মধ্যে? আমি শুনেছিলাম দু’জন নয়, তিনজন গিয়েছিলেন সেই এক্সপিডিশনে। ফোটোও দেখেছি সেরকম।”

“হ্যাঁ। সেটাই বলছি। সেই তৃতীয় মানুষটি এখনও বেঁচে আছেন। আমি জানি না জঙ্গলের মধ্যে সেই লোকেশনটা। কিন্তু সেই তৃতীয় মানুষটি জানেন।”

“কোথায় এখন তিনি? কোথায় পাব তাঁকে?” অমিত ঝুঁকে বসলেন।

মার্কো বলল, “জন আর্চার, ইংলিশ জেন্টলম্যান। তবে ইংল্যান্ডে থাকেন না।”

কুষাণ অ্যালবামটা ফেরত নিয়ে পিঠের ব্যাগে ভরতে-ভরতে জিজ্ঞেস করল, “যদি দয়া করে বলেন তার ঠিকানাটা!”

মার্কো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “উনি খুব চুপচাপ আর একা থাকতে চাওয়া একজন মানুষ। তাই সবার থেকে দূরে, সবার আড়ালে থাকেন পৃথিবীর নির্জনতম দ্বীপে।”


ডুকে ডি ক্যাশিয়াস, রিও ডি জেনেইরো, ব্রাজিল।

ডুকে ডি ক্যাশিয়াস শহরটা রিও ডি জেনেইরো মেট্রোপলিটান এরিয়ার অন্তর্গত একটা শহর। একে কুখ্যাত শহরই বলা যায়। এখানে অপরাধের হার খুব বেশি। এর মধ্যে যেমন খুনের মতো অপরাধ আছে তেমন আছে ছিঁচকে চুরি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধও। এই দ্বিতীয় ধরনের অপরাধ করে মূলত কিশোর বয়সিরা। এখানে পথশিশু ও দরিদ্র কিশোরদের একটা বড় অংশ নানারকম অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত।

অনেক বছর আগে এখানে একবার এসেছিল মাস্টার। তাই এসব মোটামুটি ও জানে। কিন্তু এটাও জানে এখানে এমন অপরাধীদের সঙ্গে কাজ করতে হলে সাবধানে কাজ করতে হবে আর সঠিক লোকের মাধ্যমে কাজ করতে হবে।

সেবাস্তিয়ানো তেমনই একজন ‘সঠিক’ লোক! যেসব কিশোর এমন নানান চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ করে, তাদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় দোকানদাররা মাঝে-মাঝে বড়-বড় ক্রাইম সিন্ডিকেটদের সাহায্য চায়। তারা এই কিশোর বয়সি চোরদের খুন করে। এটা এই অঞ্চলের একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা। কত নাবালক যে এভাবে খুন হয়ে যায় তার ঠিক নেই।

সেবাস্তিয়ানো এসবের থেকে এই নাবালকদের বাঁচানোর জন্য একটা দল করেছে। বাচ্চাদের টুকটাক কাজ দেয় ও। আর বড় ক্রাইম লর্ডদের সঙ্গে কথা বলে রাখে, যাতে কেউ ওদের মেরে না ফ্যালে!

সেবাস্তিয়ানোর দেওয়া সব কাজ যে খুব একটা আইনি পথের হয়, তা নয়। তা হলেও এই কিশোররা এই চরম দারিদ্র আর কষ্টের মধ্যেও কিছুটা ঠিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে অন্তত।

মাস্টার সেবাস্তিয়ানোর দিকে তাকাল। মাজা গায়ের রং। কোঁকড়া বড় চুল আর নীল রংয়ের চোখ। মুখে হাসি লেগেই রয়েছে। সারাক্ষণ একটা নাইন এমএম গ্লক পিস্তল নিয়ে ঘুরে বেড়ায় লোকটা!

সেবাস্তিয়ানো এখনও হাসছে। ছোট্ট ক্যাফেয় বসে ক্যাপুচিনোতে চুমুক দিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

মাস্টার বলল, “কী হল, যা বললাম তুমি বুঝলে কি?”

“হ্যাঁ মাস্টার!” সেবাস্তিয়ানো বলল, “আমি আমার ছেলেদের, তোমার কথামতো চার-পাঁচটা এয়ারপোর্টে ছড়িয়েছিটিয়ে রাখব। ওরা নজর রাখবে চারদিকে। তার সঙ্গে রিও শহরের নানান জায়গাতেও নজর রাখব। কিন্তু তোমায় কথা দিতে হবে যে ওদের কোনও ক্ষতি হবে না। ওরা নানান অপরাধ করত একসময়। আমি ওদের সেখান থেকে সরিয়ে একটা ভাল জীবন দেওয়ার চেষ্টা করছি। ওদের ক্ষতি হয় এমন কিছু আমি করতে দেব না। বুঝেছ?”

মাস্টার হাসল। তারপর টেবিলের উপরে রাখা অমিত আর কুষাণের ফোটোটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “এই দু’জন আমার একটা খুব দরকারি জিনিস চুরি করেছে। এখানেই আস এরা। কিন্তু আমার পক্ষে একা তো খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় এদের। তাই আমি তোমার সাহায্য চাইছি! টাকা নিয়ে চিন্তা নেই। পাবে। আর কোনও ঝুঁকি নেই। স্রেফ ওদের দেখলে আমায় খবর দেবে। সিম্পল। বুঝেছ?” সেবাস্তিয়ানো হাসল আবার। ফোটোটা তুলে পকেটে ঢোকাল। তারপর বলল, “এখন হাজার ডলার দিয়ে যাও। কাজ শেষ হলে আরও চারহাজার নেব।”

মাস্টার নোটগুলো সামনে রেখে বলল, “আমি জানি না ওরা কখন আসবে। তবে আজ থেকেই নজরদারি চালু করো। কেমন?”

সেবাস্তিয়ানো বলল, “একবার বলে দিয়েছ, আর চিন্তা কোরো না।”


ট্রিস্টান দ্য কুনহা দ্বীপ

দক্ষিণ আটলান্টিকের বুকে একদম ফুলস্টপের মতো ট্রিস্টান দ্য কুনহা হল পৃথিবীর নির্জনতম একটা দ্বীপ। এখানে না-এলে কুষাণ জানতেই পারত না পৃথিবীতে এমন একটা দ্বীপও রয়েছে।

দ্বীপটা ছোট্ট! যাতায়াত করা কঠিন!

কুষাণরা চ্যাড থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনে গিয়েছিল। সেখান থেকে ছোট প্লেন ভাড়া করে এসে পৌঁছেছে এই দ্বীপে। মার্কোর কথা অনুযায়ী এখানেই আছেন জন আর্চার!

কেপ টাউন থেকে ট্রিস্টানের দূরত্ব আড়াই হাজার কিলোমিটার। আগ্নেয়গিরির পাদদেশে ছড়িয়ে থাকা ছোট্ট জনপদটি রাজনৈতিকভাবে ইংল্যান্ডের অধীনে। এর পাহাড়টি সমুদ্রতল থেকে দু'হাজার মিটার মতো উঁচু।

আগে এখানে নৌকা বা স্পিডবোট ছাড়া যাওয়া যেত না। আর তাতে আঠারো-উনিশ দিন পর্যন্ত লেগে যেত। কিন্তু ইদানীং এখানে একটা ছোট্ট একটা ল্যান্ডিং স্ট্রিপ বানানো হয়েছে, যাতে ছোটখাটো চার্টার্ড প্লেন নামতে পারে।

প্লেনে বড় ব্যাগপত্তর সব রেখে পাইলটকে অপেক্ষা করতে বলে ল্যান্ডিং স্ট্রিপ থেকে কুষাণরা হাঁটতে-হাঁটতে গ্রামের মধ্যে ঢুকল। ও নিজের ব্যাকপ্যাকটা সঙ্গেই নিয়েছে।

সুন্দর, বাঁধানো রাস্তা। শান্ত, নির্জন। সমুদ্রের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে শুধু। পাহাড়ের খাঁজে-খাঁজে ভেড়া চরে বেড়াচ্ছে। কিছু লোমওয়ালা কুকুর ঘুরছে এদিক ওদিক।

কিন্তু এখানে জন আর্চারকে পাবে কই!

সামনেই একটা ক্যাফে দেখল ওরা। একতলা ঢালু ছাদওয়ালা ক্যাফে। লেখা আছে ‘প্রিন্স ফিলিপ হল’।

দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল কুষাণরা। কাঠের পুরনো ফার্নিচার সাজানো চারদিকে। সিলিংয়ে পুরনো কাঠের কড়িবরগার মতো সাপোর্ট দেওয়া। সেখান থেকে ফ্রস্টেড কাচের ল্যাম্পশেড ঝুলছে। দেখলেই কেমন একটা পুরনো আমলের কথা মনে পড়ে যায়। ওরা দেখল একজন বয়স্ক মহিলা বসে আছেন সামনের ছোট্ট কাউন্টারে!

অমিত জিজ্ঞেস করলেন, “মিস্টার জন আর্চার আছেন?”

মহিলা হাসলেন, বললেন, “ও জন! সায়েন্টিস্ট জন! হ্যাঁ-হ্যাঁ, একটু আগেই ও এসেছিল! পা চালিয়ে গেলে আলুখেতের ওদিকে পেয়ে যাবে। দু’মিনিট আগে বেরোল। রাস্তায় বেরিয়ে বাঁ দিকে এগোলেই দেখতে পাবে! সোজা চলে যাও।”

ধন্যবাদ জানিয়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এল কুষাণরা। এখানে বেশ ঠান্ডা। সমুদ্রের হাওয়ায় কিছুটা ভিজে-ভিজেও যেন। চারদিক কী ফাঁকা! আর কী সুন্দর সবুজ ঘাসে ঢাকা!

বাঁদিকের পথ ধরে এগোল কুষাণরা। পা চালিয়ে যাওয়া অমিতের পক্ষে সম্ভব নয়।

অমিত বললেন, “তুমি দৌড়ে যাও। গিয়ে জনকে আটকাও। আমি আসছি পিছন-পিছন। এখানে তো আর হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই!”

কুষাণ দৌড়ল।

উঁচু-নিচু পথ। দু’-একজন লোক দেখা যাচ্ছে। তারা কুষাণকে দেখেঅবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বাইরের মানুষ তো এখানে দেখা যায় না! দ্বীপের মোট জনসংখ্যা যে শ'তিনেক মতো!

একটু যেতেই পাকা চুলের বয়স্ক একজন মানুষকে দেখতে পেল কুষাণ। আস্তে-আস্তে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন পথ দিয়ে।

পা চালিয়ে বয়স্ক মানুষটিকে পার করে কুষাণ সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বয়স হলেও চিনতে অসুবিধে নেই। পুরনো ফোটো দেখেছে যে! এই তো জন আর্চার!

জন অবাক হয়ে তাকালেন কুষাণের দিকে।

কুষাণ বলল, “হ্যালো স্যার। আমি ইন্ডিয়া থেকে আসছি। আপনার কোলিগ মিস্টার সুমিত বসুর কাছ থেকে!”

জন সময় নিলেন একটু তারপর আস্তে-আস্তে মুখটা খুশিতে ভরে উঠল ওঁর।

কুষাণ বলল, “আমার সঙ্গে সুমিতবাবুর ভাইও এসেছেন। ওই উনি আসছেন। একটা খুব জরুরি ব্যাপারে আমরা এসেছি এখানে।” “ব্রাদার!” জন পিছন ঘুরে তাকালেন।

অমিতকে দেখা গেল। এসেই গিয়েছেন প্রায়! জনের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন অমিত, “হাই জন!”

জন খুশি হয়ে এগিয়ে গেলেন, “হ্যালো! হ্যালো!”

পথের পাশেই একটা ছোট্ট পাথরের বেঞ্চ। সেখানেই অমিত আর জন বসলেন। কুষাণ না-বসে দাঁড়িয়ে রইল।

অমিত সংক্ষিপ্তভাবে বললেন কেন এমন জায়গায় এসেছেন ওঁরা। আর কিসের খবর জানতে চান।

জন চুপচাপ শুনে মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, “সুমিত আর নেই এটা জেনে আমি খুবই আহত হলাম। কিন্তু কী আর করা যাবে! মৃত্যু তো অনিবার্য! তার জন্য কষ্ট পেয়ে লাভ নেই। আমারও বয়স হল, এখানে একা থাকি। আমিও আজ আছি কাল নেই!”

কুষাণ জিজ্ঞেস করল, “এখানে একা থাকেন, অসুবিধে হয় না?”

জন মাথা নাড়লেন, হাসলেন, “না একদম নয়। এখানে আমরা সবাই স্বাধীন। আর যাঁরা এখানে থাকেন সবাই সবাইকে পরমাত্মীয় ভাবেন। সাহায্য করেন। কোনও ঝগড়া-বিবাদ নেই! পৃথিবীর অনেক দেশে গিয়েছি আমি। সেখানে নানা বিধিনিষেধ! হাজারটা কমপ্লিকেশন! কিন্তু এখানে তা নেই! কোনও ভয় নেই! আমরা কেউ দরজা লক করি না!”

অমিত যেন সামান্য অধৈর্য হলেন, “আমরা আসলে আজই ফিরে যাব। আমাদের প্লেন অপেক্ষা করছে, তাই আপনি যদি...”

জন হাসলেন, “হ্যাঁ-হ্যাঁ, বলছি। আসলে বয়স হয়েছে তো, কথা বেড়ে যায়! সরি।”

অমিত কুষাণকে ইশারা করলেন। কুষাণ মোবাইলটা বের করে রেকর্ডারটা অন করে ধরল জনের সামনে।

জন বললেন, “যদি সেই মানুষটিকে খুঁজে পাও তা হলে খুব দারুণ ব্যাপার হবে। এমন একটা এক্সপিডিশন হওয়া খুব দরকার! হারানো সভ্যতা থেকে আমাদের কত কী যে জানার আছে!”

অমিত আবার বললেন, “যদি জঙ্গলের পথটা একটু বলে দিতেন!”

“দ্যাখো, আমাজন তো আর পার্ক নয়! বিশাল তার ব্যাপ্তি। তবে আমরা যা দেখেছিলাম তার থেকে বলছি, বারো কিলোমিটার রেডিয়াসের একটা জায়গা আছে, যার মধ্যে মানুষটি ঘুরে বেড়ায়। আমরা যখন ওকে দেখেছিলাম, তখন পনেরো-ষোলো বছর বয়স ছিল ওর। কিন্তু এখন চল্লিশ তো হবেই! মানে যদি এখনও ও জীবিত থাকে আর কী! ও যে জায়গায় ঘোরে সেখানে জঙ্গল খুব গভীর। ড্রাগ মাফিয়া, অন্য দেশ থেকে এসে আশ্রয় নেওয়া বিদ্রোহী, বা জেলপালানো কয়েদিরা চট করে যায় না। তাই সাধারণত ওই অঞ্চলেই ওর থাকার কথা। কিন্তু তা হলেও একটা সম্ভাবনা তো থাকেই যে অন্য কোথাও লোকটি চলে গিয়েছে!”

“আমাদের চান্স নিতেই হবে!” অমিত বললেন, “আপনি পথটা বলুন!”

জন মাথা নাড়লেন। তারপর সামান্য হেলান দিয়ে বসে বললেন, “সাবধানে যাবে কিন্তু, এটা আমাজ়ন, সেন্ট্রাল পার্ক নয়! বুঝেছ?”

জনের গলার মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যে কুষাণের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ও বুঝল সামনে এবার আসল বিপদ আসছে। কিন্তু আর পিছনোর উপায় নেই। ও মনটাকে শক্ত করল, তারপর তাকাল জনের দিকে।

জন হাসলেন, তারপর শুরু করলেন কথা।


আমাজ়ন, ব্রাজ়িল।

আমাজ়ন এক বিশাল বড় নদী। তার কত যে শাখাপ্রশাখা তার ইয়ত্তা নেই। আন্দিজ় পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে পেরু, বলিভিয়া, ভেনেসুয়েলা, কলোম্বিয়া, ইকুয়েডর হয়ে ব্রাজিলে ঢুকে প্রায় চার হাজার মাইল অতিক্রম করে শেষে আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়ে পড়েছে এই নদী। আর এর প্রবাহপথেই রয়েছে বিশালাকৃতি আমাজনের রেন ফরেস্ট।

কুষাণরা ট্রিস্টান দ্য কুনহা থেকে আবার ফিরে গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেখান থেকে প্লেন ধরে ওরা এসে পৌঁছেছিল ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে। রিওতে একদিন কাটিয়ে ওরা এসেছিল বেলেম শহরে।

বেলেম একটা বন্দর শহর। পুরনো পর্তুগিজ় আমলের বাড়িঘর, গির্জা দিয়ে সাজানো। ইদানীং প্রচুর স্কাইস্ক্র্যাপার তৈরি হলেও শহরের আসল পুরাতনী ছবিটা এখনও বোঝা যায়।

বেলেম শহরটা পারা নদীর পাশে। এই নদীটাই কিছুটা দূরে প্রবাহিত হয়ে মিশেছে আমাজনের মূল স্রোতে।

বেলেম থেকেই বোট ভাড়া করে নিয়েছেন অমিত। কুষাণ জিজ্ঞেস করেছিল, কোনও গাইড নেবেন কিনা!

অমিত বলেছিলেন, “আমাদের কাছে রেশন আছে। তাঁবু আছে। জলের ক্রেট নিয়ে নিয়েছি পর্যাপ্ত পরিমাণে। শুধুমুধু বাইরের একটা লোককে নেব কেন? আমি চাই না আমাদের এই অভিযানের কথা বাইরে বেরোক। আমি বোট চালাতে জানি। তুমিও পারবে, এমন কিছু কঠিন নয়! ফলে আমরা দু'জনই যথেষ্ট! তা ছাড়া ভেনিসে যা হল, তারপর আর কাকে বিশ্বাস করব?”

রিওতে নেমে কুষাণ একটা দরকারি কাজ সেরে নিয়েছিল। জয়রাম ওকে একটা নম্বর দিয়ে দিয়েছিলেন। ব্রাজ়িলে জয়রামের একজন এজেন্ট আছে। মুরিলো।

তার সঙ্গে কথা বলে নিয়েছে কুষাণ।

মুরিলো বলেছে ও এখন রিওতে নেই। ব্যক্তিগত কাজে চিলে-তে এসেছে। তবে দু’-চারদিনের মধ্যে ফিরে যাবে। কোনও দরকারে যেন ওকে জানায়। মুরিলোর স্ত্রী আনা এখানে পুলিশের বড় অফিসার। কোনওরকম সাহায্য লাগলে ওরা করতে পারবে!

কিন্তু কুষাণদের সঙ্গে ফোন থাকলেও আমাজনের জঙ্গলের মধ্যে তো ফোন কাজ করবে না বলেই মনে হয়! তা হলে জানাবে কী করে! অমিত যদিও এসবেরও পক্ষপাতী ছিলেন না!

অমিত বলেছেন, “কারও সঙ্গে যোগাযোগের দরকার নেই। এখানকার পুলিশ তো আরও গোলমেলে! না হলে ক্রাইম রেট এত হাই হয়! কুষাণ, জেনো আমরাই শুধু আমাদের ভরসা! আর ভেনিসেই তো শয়তানটাকে তুমি বোকা বানিয়েছ। ফলে অত চিন্তা কোরো না। আমাদের কাজে আর কোনও বাধা আসবে বলে মনে হয় না!”

পড়ছে ওদের গতকাল সকালে কুষাণরা যাত্রা শুরু করেছিল। মাঝে একটা দিন মানাউস শহরে কাটিয়ে এই বিকেল-বিকেল ওরা অভীষ্ট জায়গায়।

জনের নির্দেশমতো ওরা এসে তাঁবু ফেলেছে জঙ্গলের একটা বিশেষ জায়গায়। এখানে একটা পরিত্যক্ত টাওয়ার আছে। জন বলেছিলেন যে টাওয়ারটা আগে কাজে লাগত নানান পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য। পরে পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছে বলে ও খবর পেয়েছে।

আসলে আমাজন জঙ্গলে নানান দেশের থেকে নানান বিজ্ঞানীরা এসে পরীক্ষানিরীক্ষা করে। ফলে ছোট-ছোট অবজারভেটরি বা পর্যবেক্ষণাগার থাকে জঙ্গলের নানান জায়গায়। এখানেও অমন একটা ছিল একসময়।

জনের কথামতো এই জায়গাটা খুঁজে পেতে অসুবিধে হয়নি কুষাণদের। ওদের জি পি এস ট্র্যাকার স্যাটেলাইট কানেক্টেড। ভালই কাজ করছে।

নদী থেকে এই পরিত্যক্ত টাওয়ারটা কিলোমিটার খানেক দূরে। তাই নদীর পারে বোটটা রেখে সেটাকে ভাল করে ত্রিপল আর ডালপালা দিয়ে ঢেকে রেখে এসেছে কুষাণরা। বলা যায় না, কার চোখে পড়ে যাবে! কারণ চোরাশিকারি আর চোরা কাঠের কারবারিরা তো আসেই এই দিকে।

বোট থেকে একটা হাতে-টানা ট্রলিতে মালপত্র চাপিয়ে, হেঁটে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এসে ওরা পৌঁছেছে এই টাওয়ারের কাছে।

জায়গাটা যে এক সময় ব্যবহার হত, দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তবে এখন আর সেভাবে কিছু নেই! যে ক’টা ঘরবাড়ি বানানো হয়েছিল সাময়িক ব্যবহারের জন্য, সব ভেঙে গিয়েছে। কাঁটাতারের বেড়ার নব্বই শতাংশই আর নেই। কয়েকটা খুঁটি আর তার গায়ে জড়ানো কিছু কাঁটাতার ঝুলে আছে মাত্র।

এখানেই কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করে নিয়েছে কুষাণ। তারপর তাঁবু খাটিয়েছে।

আমাজন বড় ভয়ঙ্কর জায়গা। নানা সাপখোপ তো আছেই, সঙ্গে বিচিত্র সব পোকামাকড়ও রয়েছে। এখানে হাঁটার সময় লং হাইকিং বুট পরতে হয়। সারা গা ঢাকা জামাকাপড় পরতে হয়। আর পোকামাকড় মারার স্প্রে তো নিতেই হয় সঙ্গে। কারণ কখন যে কী কামড়ে দেবে তার ঠিক নেই।

এর উপর নানারকম রোগের প্রকোপ তো আছেই। ফলে এখানে খাওয়ার জলটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ! তাই অনেকগুলো জলের বোতলের ক্রেট নিয়ে এসেছে ওরা! কারণ এখানে নদীর জল খাওয়া খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না!

সারাদিন আজ খুব পরিশ্রম হয়েছে কুষাণের। এখন সন্ধে সাতটা বাজে। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে ওর। এরই মধ্যে ঘুম পাচ্ছে। জেট ল্যাগের জন্য মাথাটাও কেমন যেন ভার!

ওদের তাঁবুর সামনে একটা আগুন জ্বালিয়ে তার উপর তিনটে কাঠের ছোট-ছোট লগ ত্রিভুজের মতো দাঁড় করিয়ে তাতে কফি বসিয়েছে কুষাণ। একটা ছোট্ট ক্যাম্প চেয়ারে বসে সেই আগুনের আলোতেই ম্যাপ দেখছেন অমিত।

অমিত বললেন, “কাল সকাল থেকে খোঁজা শুরু করব। দ্যাখো, কোনও মানুষকে বাঁচতে হলে জল আর খাদ্য পাওয়াটা জরুরি। তাই নদীর ধার ঘেঁষে আমাদের খুঁজতে হবে আর তার সঙ্গে ফল হয় এমন গাছের জায়গা খুঁজতে হবে। জানো তো, আমাজ়ন রেন ফরেস্টের সম্পূর্ণটা কিন্তু এলোমেলোভাবে গড়ে ওঠা জঙ্গল নয়। মোটামুটি দশ হাজার বছর আগে এখানে মানুষের বসতি শুরু হয়। তারা চাষ শুরু করেছিল এখানে। তাদের হোম গার্ডেনের একটা অংশ ছিল এই জঙ্গল। ওরা যেসব গাছ লাগাত তার মধ্যে ব্রাজ়িল নাট, রাবার গাছ, মারিপা পাম আর কোকো গাছ উল্লেখযোগ্য। ফলে সেসব গাছ এখানে প্রচুর পরিমাণে আছে। মানে সেই মানুষগুলোর এক্সটেন্ডেড গার্ডেনের একটা অংশ এখনও আছে এই জঙ্গলে। কিন্তু শ'পাঁচেক বছর আগে যে এখানকার আদি বাসিন্দাদের গণহত্যা করা হয় তারপর আর সেভাবে এসব গাছপালাকে যত্ন করার কেউ ছিল না। কিন্তু উদ্ভিদ আত্মনির্ভর খুব। ফলে যত্ন ছাড়াও গাছপালা নিজের নিয়মেই ছড়িয়েছে। আমাদের সেই খাওয়া যায় এমন ফলের গাছ দেখে এগোতে হবে, বুঝেছ? যাক গে, খোঁজাখুঁজি কাল হবে। আজ তুমি খেয়ে শুয়ে পড়ো। আমি পরে শোব। এই যে জঙ্গলের বিশদ মানচিত্রটা এনেছি তাতে একটু মার্কিং করে রাখি।”

কুষাণ সত্যিই আর পারছিল না। সামনে অনেক খাটনি আছে। তাই ঘুমটা খুব দরকার ওর।

ও আর কিছু না-বলে টিন কেটে টুনা মাছের স্যালাড নিল। আর তার সঙ্গে একটা ব্রেড খেয়ে তাঁবুতে ঢুকে শুয়ে পড়ল। ওরা সঙ্গে করে সৌরশক্তিচালিত ল্যাম্প নিয়ে এসেছে। আমাজনের জঙ্গলের বেশ কিছু অংশ নাকি এমন গভীর যে সেখানে সূর্যের আলো ঠিকমতো ঢোকে না। তাও কোনও না-কোনও জায়গায় তো পাওয়া যাবেই। সেখানে না হয় সকালে ওরা এই ল্যাম্পগুলো চার্জ করে নেবে।

তবে যখন বৃষ্টি হবে তখন মুশকিলে পড়বে একটু। কিন্তু একটানা নিশ্চয়ই বৃষ্টি হবে না। ভরসা একটাই, ল্যাম্পগুলো সব ওয়াটারপ্রুফ।

কুষাণ শুয়ে-শুয়ে ভাবল, কাল ওই পরিত্যক্ত টাওয়ারটায় উঠে ল্যাম্পগুলো রোদে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আর তারপর কেমন আবছা হয়ে গেল সব আর যেন দেখল লম্বা টাওয়ারে উঠে পড়েছে ও! উপর থেকে পান্না-সবুজ জঙ্গলটা দেখতে পাচ্ছে পুরো! দেখতে পাচ্ছে হালকা কুয়াশার একটা পরত যেন ছড়িয়ে আছে চারদিকে। আর তারপরই শুনল কে যেন ডাকছে ওকে। ও নীচের দিকে তাকাল! আরে জেঠু ডাকছেন! জেঠু কী করছেন এখানে!

ও শুনল জেঠু বলছেন, ‘নেমে আয় কুষাণ, পড়ে যাবি। নেমে আয়!’ কুষাণ এগোল জেঠুকে কিছু বলতে, কিন্তু আচমকাই কী করে যেন ওর পা হড়কে গেল। কুষাণ রেলিং ধরেও সামলাতে পারল না নিজেকে। টাওয়ারের মাথা থেকে ছিটকে পড়ল নীচে।

কুষাণ দেখল তাঁবু অন্ধকার! পাশের বিছানা থেকে অমিতের সামান্য নাক ডাকার শব্দ আসছে। ক’টা বাজে এখন? কত রাত হল? বাইরে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে পাচ্ছে ও।

ভয়ের চোটে ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসল কুষাণ। স্বপ্ন দেখছিল! ওহ, মাথাটা কেমন যেন করছে ওর। বুকও ধড়ফড় করছে খুব।

কুষাণ হাত বাড়িয়ে বালিশের তলা থেকে মোবাইলটা নিতে গেল। জঙ্গলে মোবাইলে কথা না-বলা গেলেও সময় দেখা, টর্চের আলোসহ আরও নানান ব্যব্যহার আছে এর!

কিন্তু মোবাইলটা নেওয়ার আগেই কেমন চিড়চিড় করে একটা শব্দ শুনল ও। কিসের শব্দ এটা? তাঁবুর বাইরে থেকে আসছে! কেউ যেন কিছু একটা ছিঁড়ছে!

কুষাণ বিছানার পাশে মাটিতে রাখা বেলেম থেকে কেনা বড় ম্যাশেটিটা তুলে নিল। তারপর খুব সাবধানে বেরিয়ে এল তাঁবুর বাইরে।

আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ প্রাণপণে জ্যোৎস্না ঢালছে বনের শরীরে। সবুজ জঙ্গল যেন হলুদ আলোয় আরও ঘন আর নিবিড় হয়ে আছে! চারদিকে কেমন একটা সোঁদা গন্ধ।

কুষাণ ট্রলির দিকে এগোল। আরে, ওটা কী!

কুষাণ অবাক হয়ে দেখল, ট্রলিতে যে ক্রেটে রাখা জলের বোতলগুলো প্লাস্টিক দিয়ে মোড়া ছিল, সেই প্লাস্টিক প্যাকের নীচের দিকটা ছেঁড়া। আর সেখান থেকে চারটে জলের বোতল নেই! এই প্লাস্টিক ছেঁড়ার শব্দই পাচ্ছিল তবে!

কিন্তু জলের বোতল কে নেবে এখানে! কুষাণ বিভ্রান্ত হয়ে এদিক ওদিক তাকাল। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না!

আর তখনই ও শুনল ভয়ঙ্কর, হাড়হিম করা এক চিৎকার! সমস্ত জঙ্গল একসঙ্গে কেঁপে উঠল যেন!

ত্রস্ত হয়ে চারদিকে তাকাল কুষাণ! তারপরেই শুনল অনেকগুলো পায়ের শব্দ! বেশ কিছু প্রাণী যেন একসঙ্গে দৌড়ে যাচ্ছে কাছের জঙ্গল দিয়েই!

কিন্তু কিসের চিৎকার এটা! কোনও প্রাণীর না মানুষের! আর কারাই বা এই চিৎকার শুনে এমন দল বেঁধে দৌড়ে গেল! ভয়ের একটা ঠান্ডা স্রোত কুষাণের পিঠ দিয়ে সাপের মতো নেমে গেল!


পন্টি সামনের পাতা ফাঁক করে তাকাল কুষাণের দিকে। হাতে ম্যাশেটি নিয়ে তাঁবুর সামনে পায়চারি করছে। কিছুটা যেন বিভ্রান্ত! কিছুটা অস্থির! স্বাভাবিক! কী ভয়ঙ্কর চিৎকার রে বাবা! কিসের চিৎকার এটা? কোন প্রাণীর!

আর কুষাণের তো এখন ঘুমিয়ে থাকার কথা! তা হলে এমন করে জেগে তাঁবুর বাইরে পায়চারি করছে কেন?

পন্টি চোয়াল শক্ত করল। ওর কপালটাই খারাপ। এসব কাজে খুব ঝুঁকি থাকে। কিন্তু সেবাস্তিয়ানো বলেছে বলে ও আসতে বাধ্য হয়েছে। সেবাস্তিয়ানোর অনেক ঋণ যে ওর উপর! ছোট থেকে ওকে একদম নিজের কাছে রেখে বড় করেছে। এই ষোলো বছর বয়স অবধি ওকে রক্ষা করে গিয়েছে। না হলে কবে ওকে ডেথ স্কোয়াড মেরে দিত!

তাই সেবাস্তিয়ানো যখন বলেছিল মাস্টার নামে লোকটাকে সাহায্য করতে, তখন ইচ্ছে না-থাকলেও না করতে পারেনি!

মাস্টার লোকটা ভারতীয়। লম্বা, দোহারা চেহারা। সরু গোঁফ। ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। কুতকুতে চোখ। কপালে কাটা দাগ। মুখ দেখলেই বোঝা যায় খারাপ লোক! আর ওকেও তো খারাপ কাজ করতেই পাঠিয়েছে।

সেই রিওতে প্লেন থেকে নামার পরে এই লোকদুটোকে, মানে কুষাণ আর অমিতের পিছু নিয়েছে ওরা। তারপর বেলেম থেকে জলপথেও পিছু নিয়েছে।

অমিত আর কুষাণ কোথায় বোটটা লুকিয়ে রেখেছে নিজেদের, সেটাও দেখেছে। কিন্তু ওতে হাত দেয়নি। মাস্টার বলেছে, কাজ হাসিল করে পালানোর সময় ওতে আগুন লাগিয়ে দেবে! এখন নষ্ট করতে গেলে সমস্যা হতে পারে।

আজ বিকেলে ও আর মাস্টার এসে দূর থেকে দেখে গিয়েছে কোথায় ক্যাম্প করেছে কুষাণরা। তারপর এই রাতে ওকে পাঠিয়েছে মাস্টার। বলেছে, ওই ক্যাম্পে ঢুকে আগেই এই স্প্রে-টা ছড়িয়ে দিতে হবে ঘুমন্ত কুষাণ আর অমিতের উপর। তারপর ওরা অজ্ঞান হয়ে গেলে ওদের জিনিসপত্র ঘেঁটে যা-যা কাগজপত্র পাওয়া যায় সব তুলে আনতে হবে। কোনও কাগজপত্র ফেলে আসা চলবে না।

কে জানে মাস্টার কী খুঁজছে। কিন্তু কাজটা সোজাই। মাস্টার ওকে এই স্প্রে-টা যেমন দিয়েছে, তেমন সঙ্গে একটা মুখোশও দিয়েছে যাতে স্প্রে থেকে ওর নিজের কোনও ক্ষতি না হয়।

কিন্তু কুষাণ যে ক্যাম্পের সামনে ঘুরছে! তাও হাতে বড় একটা ম্যাশেটি নিয়ে! তা হলে কী করবে এখন!

পন্টির মাথায় হঠাৎ একটা বুদ্ধি এল। ও পাশ থেকে একটা পাথর তুলে জঙ্গলের গভীরে, অন্যদিকে ছুড়ে মারল। খশমশ শব্দ করে পাথরটা গাছপালায় লেগে পড়ে গেল কোথাও।

কুষাণ শব্দটা শুনে ঘুরে তাকাল। তারপর দৌড় দিল ওই দিকে। এটাই সুযোগ। পন্টি আর অপেক্ষা না-করে গাছপালার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে তাঁবুর মধ্যে ঢুকে পড়ল।

তাঁবুর ভিতরটা অন্ধকার। পন্টি আর সময় নষ্ট না-করে কোমরের বেল্টে লাগানো ক্যাচার থেকে স্প্রে-টা বের করল। কিন্তু স্প্রে করার আগেই আচমকা কে যেন প্রচণ্ড জোরে ওর হাতে মারল একটা লাঠি দিয়ে।

যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল পন্টি। মনে হচ্ছে কবজিটাই ভেঙে গিয়েছে! কিন্তু সামলে নিয়ে উঠে পালানোর আগে এবার ওর ডান হাঁটুর পিছনে কে যেন মারল আবার। পন্টি পড়ে গেল মাটিতে!

আর সঙ্গে-সঙ্গে তাঁবুর মধ্যে আলো জ্বলে উঠল। পন্টি মাটিতে শুয়ে দেখল ওর সামনে একজন বৃদ্ধ মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁর হাতে একটা ধাতব ক্রাচ! ও বুঝতে পারল এটার মারই খেয়েছে ও। অমিতকে

চিনতে পারল পন্টি।

“কে তুই, কে বল?” ভাঙা-ভাঙা পর্তুগিজ ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন অমিত, তারপর চিৎকার করে ডাকলেন, “কুষাণ, কুষাণ!”

বাইরে পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল পন্টি। এই সেরেছে, কুষাণ আসছে। ওর খপ্পরে পড়লে যে আর রক্ষে নেই সেটা কুষাণকে দেখেই বুঝতে পেরেছে পন্টি।

ও দ্রুত ভেবে নিল কী করা যায়! যদিও পায়ে আর হাতে বেশ ব্যথা, তাও এখান থেকে না-পালাতে পারলে খুব মুশকিল!

পন্টি তাঁবুর দরজাটার দিকে হাত তুলে আচমকা বলল, “ওই যে...” আর অমিত সামান্য সময়ের জন্য পিছন ঘুরে তাকালেন!

পন্টি সময় নষ্ট না-করে ব্যাক সামারসল্ট দিয়ে উঠে দাঁড়াল, তারপর

কোমরে গোঁজা হান্টিং নাইফ দিয়ে ফড়ফড় করে দরজার উলটো দিকের তাঁবুর ওয়াটারপ্রুফ কাপড়টা কেটে বেরিয়ে গেল বাইরে।

তারপর দৌড়, প্রাণপণে দৌড়। গাছের ধারালো পাতায় হাত কেটে গেল পন্টির। পায়ে কাঁটা বিঁধে গেল ওর। তবু নদীর পারে না-আসা অবধি থামল না!

বাপরে বাপ! খুব বাঁচান বেঁচে গিয়েছে! না বাবা, আর যাবে না। সে সেবাস্তিয়ানো যা-ই বলুক, আর এইসব বিপদে পড়বে না ও!

সামনে নদীর বুকে ওদের মোটরবোটটা দেখতে পেল পন্টি। ওখানে বসে আছে মাস্টার। ওকে এসব স্পষ্ট করে বলে দিতে হবে। দরকার হলে এবার মাস্টার নিজে যাবে।

মার খেয়ে আর এতটা দৌড়ে এসে পায়ে খুব ব্যথা করছে পন্টির! সামান্য খোঁড়াতে-খোঁড়াতে বোটের দিকে এগিয়ে গেল ও।


সকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে আজ। আমাজ়নে বৃষ্টিপাত খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আর একবার শুরু হলে টানা হতেই থাকে।

বোটের জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল মাস্টার! এখন কী করা উচিত! যতবারই চেষ্টা করছে ততবারই বিফল হচ্ছে! কাল পন্টি ভাল একটা সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু বুড়োটা ভেল্কি দেখিয়ে আর-একটু হলে ধরে ফেলেছিল সব।

মাস্টারের কেমন যেন রোখ চেপে গিয়েছে। সচরাচর ও কোনও কাজের মধ্যে এভাবে জড়িয়ে যায় না। কাজটাকে কাজ হিসেবেই দ্যাখে! কিন্তু এখানে এমন নাকানিচোবানি খাচ্ছে যে আর বলার নয়। সেই কলকাতা থেকে শুরু হয়েছে! সেখানে ওর লোকজন কী মারটাই না খেল! তারপর ভেনিস! বুড়োর পা ভেঙে দিলেও শেষ পর্যন্ত ওই কুষাণ নামে ছেলেটার কাছে বোকা বনে গেল! তারপর রিও থেকে ওদের আবার পিছু নিয়েছে। গতকাল রাতে ভেবেছিল সব কাগজপত্র ও পেয়ে যাবে। কিন্তু কালকেও হেরে যেতে হল।

মাস্টার বেআইনি কাজ করে। কিন্তু সেখানেও নামডাক বলে একটা ব্যাপার আছে। কুষাণ নামে ছেলেটার জন্য সেটাও খারাপ হচ্ছে। না, এর একটা হেস্তনেস্ত ও করে ছাড়বে। কিন্তু তার আগে কলকাতায় জানাতে হবে। দু’দিন হল জানানো হয়নি কিছু। আসলে ভেবেছিল কাজ সেরে ভাল খবর জানাবে একেবারে। কিন্তু কাল পন্টি যেভাবে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল! ওরাও নিশ্চয়ই সতর্ক হয়ে গিয়েছে! মাস্টার একা গিয়ে আর কিছু করতে পারবে না। বরং আরও বিপদে পড়বে।

মাস্টার আর সময় নষ্ট না-করে কলকাতায় ফোন করল। কয়েকবার রিং হওয়ার পরে ফোন ধরা হল ওদিক থেকে। “হ্যাঁ, বলো।”

মাস্টার বলল, “কাজটা প্রায় হয়ে গিয়েছিল গতকাল! কিন্তু শেষ অবধি...”

“মানে কাজটা হয়নি তো!” ওদিকে গলায় বিরক্তি টের পেল মাস্টার, “তোমার দ্বারা আদৌ কি হবে? আই ডাউট! এদিকে পার্টি রেডি আছে আমার! ইনকা আর্টিফ্যাক্টের গুরুত্ব বোঝো? মিলিয়ন্‌স অফ ডলারের ব্যাপার! তুমি একটা ইডিয়ট! এবার আমি নিজে আসছি। গিভ মি টু ডেজ়। আমি পৌঁছে যাব! আমি জানতাম এমন কিছু একটা হবে আমি তাই ভিসা, টিকিট সব রেডি করে রেখেছিলাম! এটা বুঝেছি যে নিজে না-করলে কোনও কাজ হওয়ার নয়!'

“মানে আপনি আসবেন? এই জঙ্গলে... আপনি? আমি অন্য লোক নিয়ে কাজটা...’’ মাস্টার ইতস্তত করল।

“কোনও অন্য লোক নয়! কলকাতায় কী হয়েছে মনে নেই! আর কাউকে ভরসা করছি না! ফালতু টাকা আর খরচ করব না। আমি নিজে এবার দেখব... দেখব কী করে আমার থেকে লুকিয়ে ওরা ওই জিনিসটা হাতিয়ে নেয়!”

ওদিক থেকে কেটে গেল ফোনটা।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরের দিকে তাকাল মাস্টার। দেখল বোটের বাইরের ছোট্ট খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে পন্টি। বৃষ্টিতে ভিজছে।

মাস্টার ভাবল, যে আসছে তাকে সঙ্গে করে এখানে নিয়ে আসতে পন্টিকে পাঠাবে! তারপর দু'জনে মিলে ওর হেনস্থার একটা বদলা নেবে। কুষাণকে ও ছাড়বে না কিছুতেই!

চোয়াল শক্ত করে বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল মাস্টার।


বৃষ্টিতে সব আবছা হয়ে আছে! জলের শব্দে অন্য সব শব্দ ঢেকে যাচ্ছে। ভাগ্যিস ওদের তাঁবুটা ওয়াটারপ্রুফ।

কুষাণ ছিঁড়ে যাওয়া তাঁবুর অংশটা দেখল একবার। ভাল একটা অ্যাডহেসিভ টেপ দিয়ে তাঁবুটাকে কাল রাতেই মেরামত করে দিয়েছে ও। তা ছাড়া তাঁবু খাটানোর আগে মাটি কুপিয়ে একটা উঁচু বর্ডার মতো করে রেখেছিল তাঁবুর চারদিকে। ফলে জল ঢোকেনি তাঁবুতে।

কুষাণ শুনেছে এখানে বৃষ্টি শুরু হলে নাকি কয়েকদিন ধরেও চলে! সেরকম হলে তো মুশকিল। এমন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ঘন জঙ্গলের মধ্যে বেরোনো সম্ভব নয়! বেকার বসে-বসে সময় নষ্ট হচ্ছে!

সকালে টোস্ট আর ডিমের পোচ করে খেয়েছে ওরা। এখন নিজের জায়গায় বসে অমিত সব কাগজপত্র খুলে দেখছেন যে কিছু চুরি গিয়েছে কিনা!

কুষাণ উঠে গিয়ে বসল পাশে।

অমিত বললেন, ,“তোমার ব্যাগে যে অ্যালবামটা রেখেছি সেটা ঠিক আছে তো?”

“হ্যাঁ স্যার!” কুষাণ হাত বাড়িয়ে ব্যাগ থেকে ছোট অ্যালবামটা বের করে অমিতের দিকে বাড়িয়ে দিল।

অমিত অ্যালবামের পাতা ওলটালেন। বললেন, “এই দ্যাখো।” কুষাণ ঝুঁকে পড়ে ফোটো দেখতে লাগল।

একটা ফোটোয় গিয়ে থমকে গেলেন অমিত! বললেন, “চিনতে পারছ?”

কুষাণ দেখল ফোটোটা পুরনো। রঙিন। গ্লসি পেপারে ছাপা। সামান্য হলদে হতে শুরু করেছে। দুটো মেয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে আর দু’জনেই দুটো ট্ৰোফি ধরে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছে। অবাক করার মতো ব্যাপার হল যে, দুটো মেয়েকেই দেখতে একদম একরকম! কুষাণ অবাক হয়ে তাকাল অমিতের দিকে।

অমিত হাসল, “চিনতে পারলে না তো? এই তো বুলি আর ওর যমজ বোন টুলি!”

“যমজ!” কুষাণ অবাক হল।

অমিত মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ। যমজ। কিন্তু মিল শুধু দেখাতেই। বাকি সব আলাদা দু’জনের। বুলি যেমন শান্ত, ভদ্র মেয়ে, টুলি তেমন দামাল! বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল অল্প বয়সে। তারপর কিছু গোলমালে পুলিশে ধরে। জেলে যায়! ছাড়া পায় পরে। শেষে আরও কীসব ক্রাইমে জড়িয়ে পড়ে!”

কুষাণ ভাল করে ফোটোটা দেখল। এবার চিনতে পারল। ট্রোফি ধরে থাকা দু’জনের মধ্যে একজনের ডান হাতের কনিষ্ঠা আঙুলটা নেই! আর অন্যজনের আছে!

তাই তো, এইটা ছাড়া তো সব একরকম! এত মিল!

অমিত বললেন, “আইডেন্টিক্যাল টুইন। টুলিটা যে এখন কোথায় কে জানে! দাদা হয়তো জানত। আমি তো দূরে-দূরেই থেকেছি সারাজীবন! তাই আমি জানি না। এসব ফোটো দেখলে ভালও লাগে আবার মনখারাপও হয়! এই সময়ে বুলির পাশে টুলি থাকলে বুলির অনেক সাহায্য হত!”


বুলি দরজা বন্ধের আওয়াজ পেল। ওই মনে হয় গেল! চোয়াল শক্ত করে বুলি উঠে বসল এবার। মাথাটা ঝনঝন করছে এখনও! এমন করে আমচকা ওকে ধাক্কা মেরেছিল যে মাথাটা খাটের কোনায় ঠুকে গিয়েছে।

কিন্তু এভাবে পড়ে-পড়ে আর কতদিন মার খাবে বুলি! এবার ওকেও কিছু একটা করতে হবে। টুলিটা যে এতটা খারাপ হয়ে গিয়েছে ও ভাবতে পারেনি!

সুমিতমামুর মৃত্যুর খবর পেয়ে ও এসেছিল দেখা করতে। তখনও বোঝেনি যে এর পিছনে কোনও অভিসন্ধি আছে। কোনও এক খবরের কাগজের সাংবাদিককে সুমিতমামু বলে গিয়েছিল ইনকাদের প্রাচীন এক মানুষের কথা, তার কাছে কী একটা খুব দামি জিনিস আছে, তার কথা!

টুলি এসেছিল একটা বিশাল চেহারার লোকের সঙ্গে। তার সাহায্যেই ও বুলি আর মিনুদিকে কবজা করে ফেলেছে।

বুলিকে একটা ঘরে আটকে রেখে মিনুদিকে ঘরের কাজকম্ম করার জন্য ছেড়ে রেখেছে। কাজ হয়ে গেলেই আবার বুলির ঘরে মিনুদিকে ঢুকিয়ে দিয়ে যায় বিশাল চেহারার লোকটা।

টুলি প্রথমেই বুলি সেজে বসে অমিতমামুকে আটকাতে চেয়েছিল আমাজ়নে যাওয়া থেকে। সেখানে সফল না হয়ে তারপর চেয়েছিল কুষাণকে ডেকে বাড়িতে নিয়ে এসে নানান কথায় ভুলিয়ে ওকে আটকাতে! কিন্তু সেটাও যে পারেনি সেটা টুলি নিজেই বলেছে! বলেছে, কুষাণ খুব ঠেটা ছেলে! কারও কথা শোনে না।

মেয়েটা যে ওর বোন সেটাই আর মনে হয় না বুলির! এমন লোভী, ক্রিমিনাল ধরনের কী করে হয়ে গেল ও!

একটু আগে টুলি যখন এসেছিল ওর ঘরে এই কথাটাই জিজ্ঞেস করেছিল বুলি।

টুলি এত রেগে গিয়েছিল যে বলার নয়। বলেছিল, “বেশ করব আমি। যা ইচ্ছে করব! ছোটবেলা থেকেই তুই খালি গুড গার্ল হয়ে সবার প্রিয় হবি, না? আর আমি চিরকাল সেকেন্ড হয়ে থাকব? এবার দ্যাখ আমি কী করি! যা করব আমি করব আর বদনাম হবে তোর!”

ঘরের আলোটা কম ছিল। তাই অসুবিধে হচ্ছিল না বুলির। কিন্তু শেষের কথাগুলো বলে ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছিল টুলি। আর চোখটা ব্যথায় টনটন করে উঠছিল বুলির। ও চোখ বন্ধ করে উঠে হাত বাড়িয়ে সুইচটা নেভাতে গিয়েছিল।

টুলি রাগের চোটে এক ধাক্কায় ঠেলে ফেলে দিয়েছিল বুলিকে। বুলির মাথাটা গিয়ে লেগেছিল খাটের পাশে। সারা মাথা ঝনঝন করে উঠেছিল ওর।

টুলি বলেছিল, “একদম চালাকি করবি না। আমি ব্রাজ়িল যাচ্ছি। কাজটা নিজেই সারব। এখানে লোক রেখে যাচ্ছি। বেশি ঝামেলা করলে তোকে আর মিনুদিকে কিন্তু শেষ করে দেবে। জানবি আমাদের দেখতেই শুধু একরকম, আসলে আমরা কিন্তু এক নই। ব্রাজ়িল গিয়ে ওই অমিতমামু আর কুষাণকে আমি শেষ করব। তারপর যা হাসিল করার করব। ততদিন অবধি তোরা বন্দি! বুঝেছিস!”

বন্দি! উঠে বসে কোনওরকমে চোখ বন্ধ অবস্থাতেই হাতড়ে হাতড়ে সুইচবোর্ড ধরে আলোটা বন্ধ করল বুলি! ওহ, এবার ঠিক আছে!

ব্রাজ়িল গেল টুলি! ক’টায় ফ্লাইট ওর! তার মানে বাড়িতে এখন ওই পালোয়ান মতো লোকটা ছাড়া মিনুদি আর ও! বুলি বুঝতে পারল না এই বন্দিদশার যন্ত্রণা থেকে কীভাবে মুক্তি পাবে ও! টুলি ব্রাজ়িল গেলে অমিতমামুদের খুব সমস্যা হবে! কিন্তু কী করবে বুলি! মোবাইলটাও তো ওরা কেড়ে নিয়েছে!

ইলেকট্রনিক হাতঘড়ির ছোট্ট বোতামটা টিপে সময় জানল বুলি। রাত সাড়ে ন'টা বাজে!

দরজায় একটা খটখট শব্দ হল। কে এল এখন!

বুলি তাকাল। আবছায়া ঘরে দরজা খুলে ঢুকল মিনুদি। হাতে ট্রে। রাতের খাবার এনেছে। বুলি দেখল মিনুদির পিছনেই পালোয়ানটা দাঁড়িয়ে রয়েছে! লোকটার নাম ভুটা!

খাবারটা টেবিলে রাখার জন্য ঝুঁকল মিনুদি। তারপর চাপা কিন্তু উত্তেজিত গলায় বলল, “সুপের বাটিতে সুপ নেই, তোমার কালো চশমা আছে। আমি বললেই সেটা তুলে চোখে পরে ঘরের বাইরে দৌড় দেবে দিদি!”

বুলি অবাক হয়ে গেল! কী বলছে মিনুদি! তবে কি উপায় আছে এই নরক থেকে মুক্ত হওয়ার?

ও আলতো করে বাটির মধ্যে হাত দিল। এই তো সানগ্লাস! ও বুঝল আবছায়া ঘরে ভুটা বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে!

ভুটা রাগের গলায় বলল, “এই তাড়াতাড়ি করো। তাড়াতাড়ি...’ কিন্তু কথা শেষ করার আগে মিনুদি আচমকা পিছনে ঘুরল তারপর

ট্রে-র অন্য বাটি থেকে কী একটা ছুড়ে দিল ভুটার দিকে, তারপর চিৎকার করে বলল, “দিদি! পালাও!”

বাতাসে গন্ধ পেয়ে বুলি বুঝল লাল লঙ্কার গুঁড়ো! ও চশমা চোখে পরে ওড়না দিয়ে নাক ঢেকে ঘরের বাইরে দৌড়ল। মিনুদিও পিছনপিছন এল। ভুটা চিৎকার করছে যন্ত্রণায়। কোমর থেকে পিস্তল বের করে এলোপাথাড়ি গুলি চালাচ্ছে ঘরের মধ্যে!

বুলি আর দাঁড়াল না। মিনুদিকে নিয়ে সোজা গেটের দিকে দৌড় দিল। এখানে আর এক মুহূর্ত নয়! ও জানে ওকে এখন কোথায় যেতে হবে। জানে, কোথায় গেলে নিজে সাহায্য পাবে। আর কুষাণদেরও সাহায্য করতে পারবে!

জঙ্গল গভীর হয়েছে এখানে। সামনে বড়-বড় পাতা আর ডালপালায় আচ্ছন্ন জমি! এগোনোই দায়! হাতের ম্যাশেটি দিয়ে জঙ্গল কাটতে-কাটতে এগোতে হচ্ছে। আর তার সঙ্গে খেয়াল রাখতে হচ্ছে এখানকার নানান বিষাক্ত কীটপতঙ্গ ও প্রাণী যেন আক্রমণ না করে! কারণ আজ সকালেই কুষাণরা তাঁবুর সামনে বিপদে পড়েছিল।

দু’দিন টানা বৃষ্টির পরে আজ বৃষ্টি নেই। কিন্তু কেমন একটা ধোঁয়াশা ছড়িয়ে আছে চারদিকে। মনে হচ্ছে কেউ যেন ঘন সাদা রঙের মশারি টাঙিয়ে দিয়েছে গোটা জঙ্গলে।

কুষাণ সকালে উঠে খাবার খেয়ে খাবারের ফাঁকা টিনগুলো তাঁবুর বাইরে রাখতে গিয়েছিল। একটা বড়, পরিত্যক্ত ডাম্পস্টার পেয়েছে ওরা। আগে যারা এই টাওয়ার অঞ্চলে থাকত তারা হয়তো ব্যবহার করত।

সবকিছুর মতো ডাম্পস্টারটাও লতায়পাতায় ঢেকে গিয়েছিল। কিন্তু কুষাণ সেটাকে পরিষ্কার করেছে। এখানেই ওরা ব্যবহৃত জিনিসপত্র ফেলে। কারণ জঙ্গল নোংরা করা অন্যায়!

ময়লা জিনিসপত্র ফেলে সবে কুষাণ ঘুরে দাঁড়িয়েছে এমন সময় দেখেছিল, ওর থেকে একটু দূরে দাঁড়ানো অমিতের দিকে গাছের ডাল বেয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছে একটা আইল্যাশ ভাইপার!

এমন চুনঘোলা জলের মধ্যেও গাছের ডাল বেয়ে এগিয়ে যাওয়া উজ্জ্বল হলুদ সাপটাকে দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট!

এক মুহূর্তের জন্য ভয়ে জমে গিয়েছিল কুষাণ। এই সাপটা খুব বিষাক্ত। এক ধরনের পিট ভাইপার এরা! চোখের উপরে আইল্যাশ বা চোখের পাতার মতো থাকে। আমাজ়ন জঙ্গলের বিষাক্ত প্রাণীদের মধ্যে এই সাপটা অন্যতম!

কিন্তু কুষাণ জানে বিপদে কখনও ভয় পেতে নেই! কারণ তা হলে বিপদ আরও বাড়ে বই কমে না!

ও নিজেকে ঠিক করে নিয়েছিল দ্রুত। তারপর ‘স্যার’ বলে চিৎকার করে অমিতকে সাবধান করে দিয়েছিল। অমিত ওর আচমকা চিৎকার শুনে সামান্য ঘাবড়ে গিয়ে সরে গিয়েছিলেন আর ঠিক তখনই সাপটা নিজের শরীর সংকুচিত করে নিয়ে পরক্ষণেই স্প্রিংয়ের মতো ছিটকে এগিয়ে গিয়েছিল অমিতের দিকে।

কুষাণ আর অপেক্ষা না-করে সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে হাতের ম্যাশেটিটা ছুড়ে দিয়েছিল সাপটাকে লক্ষ্য করে।

অমিত মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। ওঁর ক্রাচ ছিটকে গিয়েছিল। আর কুষাণ মাটিতে পড়ে দেখেছিল সাপটার দ্বিখণ্ডিত দেহ পড়ে আছে অমিতের পাশে। ম্যাশেটিটা একটা বড় গাছের ডালে গেঁথে আছে।

অমিত বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারেননি। বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন গোটা ঘটনায়!

তারপর একটু সময় পরে সামলে নিয়ে বলেছিলেন, “আমি তোমার কাছে ঋণী হয়ে রইলাম। কোনওদিন পারলে এই ঋণ আমি শোধ করব কুষাণ। এই সাপ প্রচণ্ড বিষাক্ত। ছোবল দিলে আর বাঁচতে হত না আমায়।”

ব্যাপারটা ভাবলে এখনও শরীরে কাঁটা দিচ্ছে কুষাণের। ও খালি ভাবছে ম্যাশেটিটা যদি লক্ষ্যভ্রষ্ট হত! ওর তো সেভাবে টিপ নেই। নেহাত ভাগ্য সহায় ছিল আজ ওর। কিন্তু সবসময় যে থাকবে, তা তো নয়।

আজ অমিত আর ও আলাদা-আলাদা দিকে বেরিয়েছে। কারণ একসঙ্গে সেই মানুষটিকে খুঁজতে বেরোনোর মানে নেই। বরং আলাদা গেলে অনেকটা জায়গা খোঁজা যাবে।

অমিতের পায়ের চোট নিয়ে একটা দ্বিধা ছিল কুষাণের। কিন্তু অমিত বলেছেন, “কোনও অসুবিধে হচ্ছে না আমার! চিন্তা কোরো না। তা ছাড়া আমাদের তো ওয়াকিটকি আছেই। যোগাযোগ থাকবে।”


আজ সকালে ক্যাম্প থেকে কিলোমিটারখানেক দূরে একটা জায়গায় ওরা পোড়া দাগ পেয়েছে। মানে ব্যাপারটা দেখেই বোঝা গিয়েছে যে, এখানে কেউ আগুন জ্বালিয়েছিল। বৃষ্টিভেজা নরম মাটিতে কুষাণ দেখেছিল চারটে গোল-গোল দাগ। মানে আগুনের দু'দিকে লাঠির সাপোর্ট তৈরি করে এতে কিছু রান্না করা হয়েছে! পাশে একটা হাতেগড়া, ভাঙা মাটির পাত্রও পড়েছিল। আর পড়েছিল একটা বড় ইঁদুরের ছাল আর হাড়গোড়!

অমিত সেটা তুলে নিয়ে বলেছিলেন, “ক্রুডভাবে তৈরি করা পাত্র। আর এই দ্যাখো, একটা পোড়া লাঠি। এই প্রাণীটাকে এই লাঠিতে গেঁথে পোড়ানো হয়েছে! মানে একজন মানুষের কাজ। এই দ্যাখো, একজোড়া খালি পায়ের ছাপ।”

কুষাণ জানে এই জঙ্গলে নানা ধরনের দুষ্কৃতী থেকে শুরু করে বিপ্লবীদের আড্ডা আছে। কিন্তু তারা সবাই বুট পরে ঘোরে। তা হলে এমন খালি পায়ে ঘোরা লোকটা কে?

সেই আগুন জ্বালানোর জায়গা থেকে দু’দিকে দুটো আবছামতো পথ গিয়েছে। দোমড়ানো গাছপালা দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে কেউ একটা গিয়েছে। কিন্তু দুটো পথেই লতাপাতা দুমড়ে আছে। এদিকে একটাই পায়ের ছাপ যেহেতু পাওয়া গিয়েছে, তাই ধরে নেওয়া যায় লোকটা একাই! তার মানে লোকটা এক পথে এসেছে আর অন্য পথে গিয়েছে। কিন্তু কোন দিকে গিয়েছে? অমিত তাই বলেছিলেন যে দু’জনে আলাদা দু’দিকে যাবেন। একদিকে তো কিছু না-কিছু পাওয়া যাবেই।

প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটছে কুষাণ। আর সেভাবে কোনও চিহ্ন খুঁজে পায়নি মাটিতে। ওর পিঠের ব্যাগটা মাঝে নামিয়েছে দু’বার। জল খেয়েছে। একবার চুইংগাম বের করেও খেয়েছে। আর এসবের মাঝে আশপাশটা দেখেছে ভাল করে। তাতে একটা জিনিস বুঝেছে যে কেউ একটা তো আছেই। কারণ গাছের কিছু লতা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যে কাটা। গাছের কিছু জায়গায় শ্যাওলার পরতে যেন হাতের ছাপ। মানে কেউ কি গাছে-গাছে এমন লতা আঁকড়ে ঝুলে-ঝুলে ঘোরে? গল্পের টারজান তো আফ্রিকার জঙ্গলে ঘোরে। দক্ষিণ আমেরিকার এই আমাজনের জঙ্গলেও কি গল্পের টারজ়ানের মতো সত্যিকারের কোনও টারজান ঘুরে বেড়ায়?

সামনের দিকে এগোতে লাগল কুষাণ। কুয়াশার চাদর যেন আরও ঘন হয়ে এসেছে হঠাৎ! জঙ্গলের মাটি এখানে সামনের দিকে বেশ কিছুটা ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে। ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না কিছু! ।

কুষাণ ভাবল, ফিরে যাবে নাকি আরও এগোবে! কারণ এতক্ষণ যাও দেখা যাচ্ছিল চারপাশ, এখন তো তাও দেখা যাচ্ছে না।

এমন জায়গায় এভাবে এগোনো ঠিক নয়। আমাজনের জাগুয়ার কুখ্যাত। তা ছাড়া আরও হাজারটা বিপজ্জনক প্রাণী আছে! আর আছে নানারকম পোকামাকড়। কিছু জোঁক আর মাকড়সা আছে যারা মানুষকে মেরেও ফেলতে পারে।

কুষাণ ভাবল একবার অমিতের সঙ্গে কথা বলে নিলে ভাল হয়! ও কোমরে ঝোলানো ওয়াকিটকিটা বের করল। কিন্তু কথা বলার আগেই আচমকা পিছন থেকে ভারী কিছু একটার দৌড়ে আসার শব্দ পেল! আর কিছু বোঝার আগেই সেই প্রাণীটা এসে প্রচণ্ড জোরে গুঁতো মারল কুষাণকে।

ভাগ্য ভাল, গুঁতোটা লাগল কুষানের পিঠের ব্যাগে। কারণ এমন ধাক্কা কোমরে লাগলে নির্ঘাত হাড় ভেঙে যেত। কিন্তু তাও এত জোরে লাগল সেই গুঁতো যে, ভেজা পিছল মাটিতে কুষাণ পড়ে গেল। সঙ্গেসঙ্গে খুব জোরে মাথায় লাগল ওর। ঢালু জমি দিয়ে ও গড়িয়ে গেল নীচের দিকে। সেই অবস্থাতেও কুষাণ দেখল প্রাণীটা মাঝারি উচ্চতার, গোলগাল ধরনের। অনেকটা বুনো শূকরের মতো। কিন্তু স্পষ্ট বোঝার আগেই কুয়াশায় অদৃশ্য হয়ে গেল প্রাণীটা।

কুষানের মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। পিছল মাটিতে গড়িয়ে চলেছে। হাত থেকে ছিটকে পড়ে গিয়েছে ওয়াকিটকি! গাছপালা লাগছে ওর গায়ে। ব্লেডের মতো পাতায় কেটে যাচ্ছে হাত-পা-মুখ।

আচমকা কিসের সঙ্গে যেন এবার ধাক্কা খেল কুষাণ। মাথায় লাগল আবার। আর জ্ঞান হারানোর ঠিক আগে ও দেখল পায়ের কাছেই একটা গভীর গর্ত খোঁড়া।

সেই গর্তের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল কুষাণ।


আমাজন নদী আর তার থেকে বেরোনো এতগুলো শাখা নদী মিলে যেন একটা গোলোকধাঁধা তৈরি করেছে। এমনটা সুন্দরবনেও আছে। কিন্তু আমাজনের সঙ্গে আয়তনে তার তুলনা চলে না!

সঙ্গের রোগা ছেলেটাকে দেখল টুলি। অল্প বয়স। নাম পন্টি। দক্ষিণ আমেরিকা এক অদ্ভুত মহাদেশ। এখানে সবকিছুই আলাদা। আফ্রিকায় যেমন চাইল্ড সোলজার খুব সাধারণ ব্যাপার, এখানেও তেমন নাবালক অপরাধী সাধারণ ব্যাপার।

পন্টির বয়স কত হবে? টুলির মনে হচ্ছে, বড়জোর পনেরো। কিন্তু ওর কথাবার্তা, হাবভাব সব পাকা ক্রিমিনালের মতো।

পন্টি ছেলেটা ভাঙা-ভাঙা ইংরেজি বলতে পারে। ও-ই বেলেম থেকে টুলিকে নিয়ে আসছে। আর খুব অবাক হয়ে দেখছে যে, এই গোলোকধাঁধাঁর মতো নদীপথ ওর বেশ চেনা।

এদিকে একটা বাজে খবর পেয়েছে। কলকাতায় ওই বাড়ি থেকে বুলি আর মিনু বলে কাজের মেয়েটা পালিয়েছে। কথাটা শুনে এত রাগ

হয়েছে টুলির। ভুটাটা পুরো মাথামোটা।

বুলির চোখের অসুখ। মিনু মধ্যবয়স্ক মহিলা। ভেবেছিল যতদিন না এই কাজটা হয় ততদিন ভুটার মতো পেশাদার ক্রিমিনাল একাই সামলে দিতে পারবে ওদের।

কিন্তু পারল না। দুটো মেয়ে পালিয়ে গেল!

তবে একটাই ব্যাপার, টুলি এখন অনেক দূরে। ওরা পালিয়ে গিয়েও কিছু করতে পারবে না। কারণ এখান থেকে ওই দামি আর্টিফ্যাক্ট নিয়ে টুলি সোজা উড়ে যাবে দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেখানে ধনকুবের জেরাল্ড গোল্ডবার্গ নামে একজন মানুষ ইনকাদের পুরনো জিনিস কেনে। তার সঙ্গে কথা হয়ে আছে।

আসলে সুমিতের খবরটা জানার পরেই টুলি নিজেই যোগাযোগ করেছিল জেরাল্ডের সঙ্গে। জেরাল্ড ইনকাদের কথা শুনেই আগ্রহী হয়েছিল খুব।

জেরাল্ড বলেছিল, “হ্যাঁ আমি জানি এমন একজন মানুষের ব্যাপারে যে এক হারিয়ে যাওয়া প্রজাতির একমাত্র জীবিত প্রতিনিধি। এই প্রজাতি একসময় ইনকাদের দেবতা সূর্যদেবের প্রহরী হিসেবে কাজ করত। আমি শুনেছি ওই প্রজাতির একজন মানুষ নাকি এখনও আমাজনের গহন জঙ্গলে বেঁচে আছে। আর তার কাছে দামি আর্টিফ্যাক্ট থাকা কিছু আশ্চর্যের নয়!”

টুলি বলেছিল, “আমার মামা সেটার কথাই বলেছেন। আমি যদি এনে দিতে পারি আপনি নেবেন?”

জেরাল্ড হেসে বলেছিল, “তুমি? পারবে? আচ্ছা! পারলে কেন নেব না!”

“আর দাম?” টুলি জিজ্ঞেস করেছিল।

“দাম নিয়ে ভেবো না,” জেরাল্ড হেসেছিল, “শখের জিনিসের দাম নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। আই ক্যান স্পেন্ড আ ফিউ মিলিয়ন! তুমি আগে আনো তো!”

হ্যাঁ, আনবে তো বটেই। তাই তো ষোলো হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব উড়ে এসেছে! এতটা পথ আসা তো বৃথা যাবে না।

পন্টি বোটটা ডান দিকের একটা সরু খাঁড়িতে ঘুরিয়ে দিল। তারপর বলল, “আমি আপনাকে পৌঁছে দিয়ে চলে আসব। আমি থাকব না ওই জঙ্গলে। ওই জঙ্গল শয়তানের জায়গা।”

“শয়তান?” টুলি অবাক হল।

পন্টি বলল, “আমরা বিশ্বাস করি, জঙ্গলের প্রাণ আছে। আর তার শান্তি ভঙ্গ করতে গেলে জঙ্গল জীবন্ত হয়ে ওঠে। সে তখন প্রতিশোধ নেয়। আমি এসেছিলাম সেবাস্তিয়ানোর কথায়। কিন্তু খুব বাঁচান বেঁচে গিয়েছি। আপনারা যাদের পিছু নিয়েছেন তাদের মধ্যে ইয়ং একটা ছেলে আছে। খুব সাংঘাতিক! আর বুড়োটাও কম যায় না। তা ছাড়া জঙ্গলে আরও কেউ আছে। প্রেতাত্মা! তার চিৎকার আমি শুনেছি রাতে! রক্ত জমে যায় ভয়ে। ফলে আমি থাকব না। আপনাকে শুধু পৌঁছে দিয়ে চলে আসব।”

টুলি বলল, “সে ঠিক আছে। কিন্তু ফিরবে কীভাবে?”

পন্টি বলল, “এই বোটে ফিরব। যাওয়ার সময় বড় নদী থেকে টুরিস্ট বোট ধরে বেলেম গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ভাড়া করে এনেছি এই বোট। বড় বোটটা মাস্টারের কাছে আছে। ওটা নিয়ে কাজ সেরে ফিরে আসবেন আপনারা। আমি থাকব না!”

টুলি হাসল। ভাবল, ভালই হবে। যত কম লোক থাকে ততই ভাল। টুলি জানে অমিতের সঙ্গে কুষাণ বলে ছেলেটা দামাল খুব। কিন্তু বন্দুকের সামনে অনেক দামালই কাবু হয়ে যায়।

মাস্টার অনেক করেও কুষাণদের থেকে কোনও পেপার জোগাড় করতে পারেনি। টুলি তাই ফন্দি এঁটেছে যে, অমিতের তাঁবু যখন পাওয়াই গিয়েছে তখন ওদের চোখে-চোখেই রাখবে। তারপর আসল সময়ে একদম ঝাঁপিয়ে পড়বে!

কিন্তু মুশকিল হল আসল সময়টা কখন? অনন্তকাল তো আর অপেক্ষা করবে না টুলি। ও ঠিক করেছে, তিনদিন সময় দেবে ও। তারপর অমিতকে একা সুবিধেমতো বন্দি করে জেনে নেবে ওই লোকটার আসল লোকেশন! তারপর সেই মানুষটিকে বন্দি করে ওই দামি আর্টিফ্যাক্ট সহ নিয়ে যাবে শহরে। বিলুপ্ত প্রজাতির মানুষ ধরে নিয়ে গেলেও অনেক নাম আর টাকা আসবে নিশ্চয়ই! টুলির প্ল্যান সেট একদম। এখন ভাল করে সবটা করতে পারলেই কেল্লাফতে!

সামনে একটা বোট দেখতে পেল টুলি। ও বুঝতে পারল ওরা এসে গিয়েছে গন্তব্যে। মাস্টারকেও দেখতে পেল এবার। ওদের বোট দেখে ও-ই নিজের বোটের ডেকে এসে দাঁড়িয়েছে!

পন্টি বোটটাকে পারের কাছে নিয়ে গিয়ে থামাল। তারপর একটা কাঠের পাটাতন বাড়িয়ে দিল পারের মাটির দিকে। নিজের ব্যাগ নিয়ে সেই পাটাতন বেয়ে নেমে গেল টুলি।

মাস্টার নিজের বোট থেকে নেমে এসে ব্যাগটা নিয়ে নিল টুলির হাত থেকে।

পন্টি আর অপেক্ষা করল না। বোট থেকে একটা বড় খাবারের ব্যাগ ছুড়ে দিল পারের দিকে। তারপর মাস্টারের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই যে বাড়তি খাবার। আর সঙ্গে একটা শটগান আর পেলেট আছে! আমি গেলাম। তাড়াতাড়ি করতে পারলে সন্ধের আগে বেলেমে ফিরতে পারব। আসি!”

মাস্টারের উত্তরের অপেক্ষা না-করে পন্টি নিজের বোটটা চালিয়ে বেরিয়ে গেল।

মাস্টারের দিকে তাকাল টুলি। বলল, “সব ঠিক আছে তো?” মাস্টার হাসল। বলল, “সব ঠিক আছে ম্যাডাম। আপনার কাজ সফল হওয়া এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা!”


কিসের শব্দ এটা! এমন খসখস শব্দটা আসছে কোথা থেকে?

আহ! চোখ মেলতে গিয়ে মাথায় লাগল কুষাণের। বেশ ব্যথা! দু’বার লেগেছে যে! ফেটে যায়নি এই রক্ষে!

কয়েকবার জোরে শ্বাস নিল কুষাণ। নিজেকে সময় দিল ধাতস্থ হওয়ার। চোখটা বন্ধ করে রইল আরও কিছুক্ষণ! আস্তে-আস্তে শরীরে সাড় ফিরছে এবার। ও বুঝল মাথার সঙ্গে পায়েও লেগেছে! কিন্তু সেটা খুব একটা গুরুতর নয়!

এবার সব মনে পড়ছে কুষাণের। সেই কুয়াশা! অদ্ভুত প্রাণীর ধাক্কা! পিছল মাটিতে পড়ে গড়িয়ে যাওয়া! মাথায় লাগা! আর গর্ত! ও গর্তে পড়ে গিয়েছিল না? তা হলে?

এবার আস্তে-আস্তে চোখ মেলে তাকাল কুষাণ। মাথায় সেরকম ভাবে ব্যথা লাগল না! চারদিক অন্ধকার। তার মধ্যেও একটু দূরে আলো দেখতে পেল। ওর মাথার উপর ঘিরে থাকা গাছপালার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। চিকচিক করছে তারা! ওর আচমকা মনে পড়ে গেল সেই বোডেলে ডিপ্রেশনের কথা! সেই ধুলো এখনও ঝরে পড়ছে এই বৃষ্টিবনের মাথায়!

এবার আলোটা যেদিক থেকে আসছে সেই দিকে তাকাল কুষাণ। তারপর উঠতে গেল! আরে এ কী! ওকে মাটিতে চিত করে শুইয়ে মাটিতে খুঁটি পুঁতে হাত-পা ছড়িয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে!

গর্ত থেকে কে তুলল ওকে? কে এভাবে বেঁধে রাখল মাটিতে!

বিরক্তি আর রাগে আ-আ-আ শব্দে চিৎকার করে উঠল কুষাণ। তাতে আলোটা যেন সামান্য নড়ে উঠল দূরে। শুয়ে মাথা ঘুরিয়ে খুব একটা কিছু দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তাও কুষাণ বুঝল আলোটা এগিয়ে আসছে ওর দিকে। কুষাণ আরও চিৎকার শুরু করল। হাত-পা নেড়ে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে লাগল!

আলোটা এবার একদম কাছে এসে থামল। মাথা ঘুরিয়ে থমকে গেল কুষাণ। একটা মানুষ। চাপা নাক। ছোট চোখ। আর কান দুটো

চওড়া ও চ্যাপ্টা। মাথায় বড় চুল। খালি গা, পরনে একটা ছালের মতো কিছু। আর কোমরে একটা বড় ম্যাশেটি। লোকটা তাকিয়ে আছে ওর দিকে। লোকটার এক হাতে মশাল আর অন্য হাতে একটা চকোলেট বার। খোলা। লোকটা খাচ্ছে! এটা তো ওর! তা হলে কি লোকটা ওর ব্যাগ নিয়েছে? খসখস শব্দটা কি তা হলে ওই ব্যাগ ঘাঁটারই ছিল?

কুষাণ আবার চিৎকার করে উঠল। লোকটা ঝুঁকে পড়ে এবার ওর দিকে তাকাল ভাল করে। তারপর মুখে হাত বোলাল ওর। মশালের আলোয় কুষাণ দেখল, লোকটা হাসছে। তারপর হাতের বাকি চকোলেটটা মুখে পুরে পাশে কিছু একটা নিতে হাত বাড়াল।

অ্যালবাম! ওর ব্যাগ থেকে লোকটা অ্যালবাম বের করেছে!

লোকটা হাতের মশালটা মাটিতে গেঁথে রাখল। তারপর অ্যালবামটার একটা পাতা খুলে দেখাল।

ফোটোটা দেখল কুষাণ। সুমিত, দিনো আর জন দাঁড়িয়ে রয়েছে! অনেক পুরনো ফোটো।

লোকটা মাথা নাড়ল। কুষাণ বুঝতে পারল জানতে চাইছে ফোটোটার বিষয়ে।

কুষাণ চোয়াল শক্ত করল। তারপর বলল, “সুমিত, দিনো, জন!”

“জন! সুমিত!” লোকটার মুখটাই পালটে গেল একদম! খুশিতে যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল! তারপর কোমরে আটকানো ম্যাশেটিটা হাতে নিয়ে তাকাল কুষাণের দিকে।

এই রে! এবার কী করবে! কুষাণের ভয় লাগল। হাতে ওই অস্ত্রটা নিয়ে লোকটা এমন করে তাকিয়ে হাসছে কেন? মারবে নাকি!

লোকটা ম্যাশেটিটা নামাল কোপ মারার মতো করে। আর কুষাণের হাত-পায়ের বাঁধন কেটে দিল নিমেষে! ওকে ধরে বসাল। তারপর কোমরের পিছনে বেঁধে রাখা একটা থলির মধ্যে থেকে বের করে দিল একটা যন্ত্র!

ওয়াকিটকি! লোকটা কুড়িয়ে রেখেছে! কুষাণ দেখল ওয়াকিটকির পিছন দিকের ব্যাটারিটা খুলে গিয়েছে!

কুষাণ বিহ্বল হয়ে তাকাল! দেখল লোকটা হাসছে। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “সুমিত! ফ্রেন্ড!”

কুষাণ বুঝল ওদের খোঁজ শেষ হয়েছে। ও পেয়ে গিয়েছে সেই হারানো প্রজাতির অন্তিম মানুষটিকে!


জঙ্গলের মধ্যে চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোল মাস্টার।

সামনে তাঁবুটা দেখা যাচ্ছে। পাশেই জ্বলছে একটা মশাল। আর সেই আলোর পাশে একটা চেয়ার থেকে এবার উঠে দাঁড়ালেন অমিত। এতক্ষণ এই চেয়ারেই বসে ছিলেন তিনি। অমিতকে বেশ অস্থির দেখাচ্ছে আজ। হাতের ওয়াকিটকিটা বারবার দেখছেন। কথা বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পারছেন না।

মাস্টার দেখেছে যে আজ কুষাণ অমিতের সঙ্গে নেই। আর দূরের থেকে যে কথা শোনা যাচ্ছে তাতে বুঝতে পারছে যে অমিত কুষাণের সঙ্গেই যোগাযোগের চেষ্টা করছে! ব্যাপারটা কী! ব্যাটা পালাল নাকি? না জঙ্গলে বেঘোরে মারা পড়ল!

মাস্টার এখন ইচ্ছে করলেই অমিতকে মেরে সব কাগজপত্র হাতিয়ে নিতে পারে। কিন্তু ম্যাডাম এসে পৌঁছেছে এখানে। আর প্ল্যানও পালটে ফেলেছে। এখন কাগজপত্র পেলেই যে ওরা খুঁজে পাবে অভীষ্ট লক্ষ্য, তার নাকি স্থিরতা নেই। তাই ম্যাডাম মানে টুলির মত হল, অমিত যেহেতু এতদিন ধরে ব্যাপারটা দেখেছেন, এই নিয়ে লেখাপড়া করেছেন, তাই শেষটাও ওঁকে করতে দেওয়া হোক। ওরা শুধু আসল সময়ে জিনিসটা হাতিয়ে নেবে।

কিন্তু এত বড় জঙ্গল। সারাক্ষণ তো আর কাউকে এমন ঘন গাছপালা আর শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যে চোখে-চোখে রাখা যায় না! তার পিছনে-পিছনে ঘোরা যায় না! টুলি তাই একটা জিনিস নিয়ে এসেছে।

জি পি এস ট্র্যাকার! ছোট্ট বাটন সেল বা ব্যাটারির মতো দেখতে একটা ইলেকট্রনিক ডিভাইস এটা। কারও সঙ্গে লাগিয়ে দিলে সে যেখানে-যেখানে যাবে তার গতিবিধি দূর থেকেও মোবাইল বা সেরকম কোনও ডিসপ্লে ডিভাইসে দেখা যাবে।

টুলি ওকে বলেছে যে করেই হোক, অমিতের জিনিসপত্রের সঙ্গে এটাকে ফিক্স করে দিতে হবে। কিন্তু যেমন-তেমন কিছুর সঙ্গে লাগালে তো হবে না। ট্র্যাকারটাকে এমন কিছুর সঙ্গে লাগাতে হবে যা অমিত সারাক্ষণ নিয়ে ঘোরেন! আর মাস্টার জানে সেরকম একমাত্র জিনিস হল, ক্রাচ!

অমিত পায়ের জন্য সারাক্ষণ ক্রাচ নিয়ে ঘোরেন। কেবল বাথরুম যাওয়ার সময় ক্রাচটা রেখে যান! তাই সেই সময়ের অপেক্ষা করছে মাস্টার!

জঙ্গলের মধ্যে জলপাই রংয়ের ক্যামোফ্লাজ জামাকাপড় পরে হাতে সরু টর্চ নিয়ে মাস্টার বসে রয়েছে ঘণ্টাচারেক! মশারা কানের কাছে পিনপিন করছে। বসে-বসে এখানে জোঁকের মতো দু’-একটা রক্তচোষা কীটকে ছুরি দিয়ে মেরেছে। প্রায় ওর পাশ ঘেঁষে বিষাক্ত সাপ চলে গিয়েছে গোটাচারেক! তবে সবচেয়ে ভয় পেয়েছে ও ব্রাজ়িলিয়ান ওয়ান্ডারিং স্পাইডার দেখে। ওর বুটের উপর দিয়ে চলে গিয়েছে একটু আগে। এই মাকড়সা সম্পর্কে জানে মাস্টার। একবার কামড়ালে আর রক্ষে নেই!

অমিত দাঁড়িয়ে আবার ওয়াকিটকিটা দেখলেন। নিজের মনেই বললেন,,“কী হল ছেলেটার! বিপদ ঘটল নাকি?”

অমিত মাথা নাড়লেন। তারপর এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে। আড়াল থেকে মাস্টার দেখল অমিত বড় একটা গাছের গায়ে হাতের ক্রাচটাকে হেলান দিয়ে রাখলেন। তারপর বাথরুমের জন্য ত্রিপল দিয়ে ঘেরা জায়গাটায় ঢুকে পড়লেন।

এই সময়ের অপেক্ষাতেই ছিল মাস্টার। ও দ্রুত এগোল। তারপর প্রায় নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়াল ক্রাচের সামনে। ক্রাচের নীচের দিকে কয়েকটা নাটবল্টু আছে। ও ঝুঁকে দুটো বল্টুর মাঝে দ্রুততার সঙ্গে লাগিয়ে দিল ট্র্যাকারটা। ট্র্যাকারটায় আঠা আছে। ফলে পড়ে যাবে না।

তাও একবার পরখ করার জন্য টোকা মারল মাস্টার! না, শক্ত করেই লেগে আছে। ও এবার কোমর থেকে ডিসপ্লে ডিভাইসটা বের করে অন করল। এই তো ডট দেখা যাচ্ছে! যাক, কাজ করছে!

ত্রিপল-ঘেরা জায়গা থেকে জলের আওয়াজ পেল মাস্টার। ও সচকিত হয়ে উঠল। তারপর দ্রুত পায়ে আবার নিঃশব্দে মিশে গেল জঙ্গলে! এবার নদীর ধারে ফিরে যাবে ও। আর চিন্তা নেই! অমিত বসু আর চোখের আড়ালে যেতে পারবেন না ওদের।


সকাল ছ'টায় ফোনটা পেল মুরিলো। চিলে থেকে ফিরে এসে একটু ক্লান্ত ছিল। দু’দিন সেভাবে কাজে বেরোয়নি। আজও নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছিল! তখনই ফোনটা আসে।

ওর স্ত্রী এলেনা এসে ওকে ডাকল, “তোমার ফোন। ধরো। চারবার বাজল এই নিয়ে। ইট মাস্ট বি আর্জেন্ট। ওঠো!”

মুরিলো বিছানায় শুয়েই হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিল পাশের টেবিল থেকে। এত সকালে কে আবার! ও দেখল, কলকাতা থেকে জয়রামের ফোন! আরে এই সময়! কী ব্যাপার!

বিছানায় উঠে বসে ফোনটা রিসিভ করল ও।

জয়রামের গলাটা ফোনের ওপার থেকে বিপন্ন শোনাল। জয়রাম বললেন, “আরে মুরিলো, তুমি কোথায় ছিলে? আমি ক’দিন ধরে ফোন করছি। খুব বিপদে পড়েছি ভাই!”

“বিপদ!” মুরিলোর সামান্য যে ঘুমটুকু চোখে লেগেছিল তা উড়ে গেল নিমেষে।

“কী হল? কী হয়েছে?”

জয়রাম বললেন, “তোমাকে সাহায্য করতেই হবে। আমার খুব পরিচিত দু’জন আমাজ়নে গিয়েছে। মানে জঙ্গলে। বেলেম থেকে এন্ট্রি নিয়েছে ওরা। ইনকাদের কিছু দামি জিনিসের জন্য সেখানে কেউ ওদের মারতে চায়। আমি জানি না কী দামি জিনিস, বা সেরকম কিছু আছে কিনা। কিন্তু কিছু বদমাশ ওদের পিছু নিয়েছে। বদমাশগুলো কলকাতায় একটি মেয়েকে আটকে রেখেছিল। সে কোনওমতে পালিয়ে এসে

আমায় বলেছে। কিন্তু কলকাতায় বসে আমি কী করে সাহায্য করব ওদের? তাই তোমায় জানালাম। তুমি প্লিজ় ভাই, কিছু করো। আমি ওদের নাম, ফোন নম্বরসহ বাকি ডিটেলস আর ফোটো পাঠিয়ে দিচ্ছি। ওদের বাঁচাও! জঙ্গলে আছে বলে ফোনেও পাচ্ছি না ওদের।”

মুরিলো বলল, “আরে হ্যাঁ, আমার সঙ্গে একবার কাজের কথা হয়েছিল বটে, কিন্তু আর যোগাযোগ হয়নি!”

“আর সময় নেই। তুমি প্লিজ় দ্যাখো!” জয়রামের গলায় ভয় ও উৎকণ্ঠা!

মুরিলো আরও কিছুক্ষণ কথা বলল জয়রামের সঙ্গে। আরও বিশদে জেনে নিল সবকিছু। তারপর ফোনটা রাখল। দেখল ওর উত্তেজিত গলার স্বর আর চিন্তিত ভঙ্গি দেখে এলেনা এসে দাঁড়িয়েছে পাশে।

মুরিলো ফোনটা রেখে দিয়েছে দেখে এলেনা জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? এনি প্রবলেম?”

মুরিলো সময় নিয়ে ধীরে-ধীরে বলল সবটা।

এলেনা ব্রাজ়িলিয়ান পুলিশের উচ্চপদস্থ অফিসার। ফলে ক্রাইম আর ক্রিমিনালদের ব্যাপারে ভালই ধারণা আছে। কিছুদিন আগে ও নিজেই আমাজনের জঙ্গলে গিয়েছিল, বেআইনি কাঠ পাচারকারীদের ধরতে।

এলেনা বলল, “সবই তো বুঝলাম। কিন্তু কোনও ফোটো আছে? আইডেন্টিফিকেশন আছে?”

মুরিলো নিজের ফোনটা তুলে ইমেল খুলল এবার। তারপর বলল, “এই যে ফোটো পাঠিয়েছে ওদের। একজন ইয়াং। নাম কুষাণ। আর অন্যজন অমিত বসু। আর যে-মেয়েটি ওদের ক্ষতি করতে চায় তার নাম, সুমেধা এ কে এ টুলি! এই যে ফোটো। এই মেয়েটি নিজের বোনকে আটকে রেখেছিল। সে পালিয়ে গিয়ে সবটা বলেছে। জয়রাম আমার বহুদিনের পরিচিত। প্লিজ হেল্প হিম।”

এলেনা ফোটো ও অন্য ডেটাগুলো নিজের মোবাইলে নিয়ে নিল। তারপর বলল, “আমায় একটু সময় দাও। আমি দেখছি। তুমি ততক্ষণে ফ্রেশ হয়ে নাও। ব্রেকফাস্ট বানিয়ে রেখেছি। আমি পুলিশ স্টেশন যাচ্ছি।”

ঘণ্টাদুয়েক পরে এলেনা নিজেই ফোন করল পুলিশ স্টেশন থেকে। মুরিলো ব্রেকফাস্ট সেরে এই ফোনটার অপেক্ষাই করছিল। ও দ্রুত ধরল ফোনটা, “হ্যালো।”

এলেনা সামান্য উত্তেজিত গলায় বলল, “লোকেশন পেয়ে গিয়েছি। মেয়েটা এয়ারপোর্টে নেমেছে ক’দিন আগে। তারপর পন্টি বলে একটা ছেলে ওকে আমাজনে নিয়ে গিয়েছিল। এয়ারপোর্ট সিকিউরিটিতে মেয়েটার ফোটো পেয়েছি। পন্টিরও ফোটো পেয়েছি স্ট্রিট ক্যামেরা থেকে। সেবাস্তিয়ানোর কাজের ছেলে পন্টি। ওকে আমরা তুলেছি। আর যত দ্রুত পারছি রেসকিউ মিশনে যাচ্ছি। আমার বস ভাল, তাই এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেন। হায়ার অথরিটিকে বললে দেরি হয়ে যেত। আমি জানাব তোমায়। তুমি জয়রামকে বলে দাও আমরা চেষ্টা করছি। বাই।”

মুরিলো ফোনটা রেখে সময় নিল একটু। ভাবল এখনই কি জানাবে জয়রামকে, নাকি পরে জানাবে? তারপর মত পালটাল। না, কাউকে উদ্বেগে রাখতে চায় না ও। দ্রুত মোবাইলটা তুলে জয়রামকে রিং করল।


তাঁবুর সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অমিত। কুষাণকে দেখে ক্রাচ ছাড়াই খোঁড়াতে-খোঁড়াতে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন! বললেন, “আমি ভেবেছিলাম তুমি আর নেই! মানে কী যে ভয় পেয়েছিলাম! কোথায় ছিলে তুমি? ওয়াকিটকিতেও পাওয়া যাচ্ছিল না তোমায়! এভাবে একটা গোটা দিন...”

কিন্তু তারপরেই কথা শেষ না-করে পিছনে একজন উপজাতি

মানুষকে দেখে থমকে গেলেন! অবাক হয়ে তাকালেন।

কুষাণ অমিতকে হাতে ধরে সামনের একটা নিচু পাথরে বসাল। তারপর উপজাতি মানুষটির দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতে তাঁকে আশ্বস্ত করে আর-একটা পাথরে বসতে বলল।

লোকটি বসলেন না। অমিতের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সুমিতের ফোটো দেখেছে কুষাণ। তাই জানে অমিতের বেশ মিল আছে সুমিতের সঙ্গে।

কুষাণ বলল, “স্যার, এই সেই মানুষ যাঁকে খুঁজতে আমরা এসেছি। উনি অ্যালবাম থেকে সুমিতবাবুর ফোটো দেখেই চিনতে পেরেছেন! আমাদের ভাষা উনি জানেন না। স্বাভাবিক। কিন্তু দু’-একটা শব্দ জানেন। হয়তো সেই যে সুমিতবাবুরা ওঁর সঙ্গে দু’-চারটে দিন ছিলেন তখনই শিখিয়ে গিয়েছেন। ওঁর নাম...”

কুষাণ অবাক হয়ে দেখল যে লোকটি ওদের দু'জনের দিকে তাকিয়ে আকারে যেন বোঝার চেষ্টা করছেন ওরা কী বলছে! লোকটি এবার বলে উঠলেন, “সুমিত?”

কুষাণ হাসল। তারপর অ্যালবামটা আবার বের করে আর-একটা পাতা উলটে অমিত আর সুমিতের দুটো ফোটো দেখিয়ে বলল, আকারে-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করল যে অমিত হলেন সুমিতের ছোট ভাই!

লোকটি কী বুঝলেন কে জানে! উনি হাসলেন। তারপর নিজের বুকে হাত দিয়ে বললেন, “হুয়াঙ্কা!”

অমিতও নিজের নাম বলে হাসলেন। কুষাণকে বললেন, “হুয়াঙ্কা মানে গড অব নেচার!” তারপর কুষাণের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যে মানুষ একাকী জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান তার নাম তো এমন হবেই! তিনি তো সত্যি তির মাঝে একক ঈশ্বর!”

কুষাণের মনে হল হুয়াঙ্কার নাম অরণ্যদেব হলে দারুণ হত! হুয়াঙ্কার পেটানো চেহারা। তামাটে রং। মুখে আর শরীরে উল্কি। কানে বাঁশের দুল। নাকটাও বাঁশের শলাকা দিয়ে ফোঁড়ানো। কোমরে ম্যাশেটি আর বাঁশির মতো দেখতে ফুটদেড়েক লম্বা একটা নল!

এর পর অমিত আর হুয়াঙ্কার দু’-একটা যা কথা হল সবই আকারেইঙ্গিতে। তাতে হুয়াঙ্কা এটুকু বুঝলেন যে সুমিত মারা গিয়েছেন! তাতে হুয়াঙ্কা বুকের উপর আড়াআড়িভাবে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের ভাষায় কীসব যেন বললেন!

এখন সকাল। সাড়ে ন'টা মতো বাজে। আকাশ আজ পরিষ্কার! উঁচু জঙ্গলের মাথার উপর নীল আকাশ ছড়িয়ে আছে। হাওয়া দিচ্ছে বেশ। পরিবেশ মনোরম। মনটা ভাল লাগছে কুষাণের। যে কাজে এসেছিল সেটা সফল হয়েছে অবশেষে। ও জানে না এর পর অমিত কী করবেন! হয়ত ফোটোটোটো তুলবেন। ভিডিয়ো করবেন মানুষটির। সবার সামনে দেখাতে হলে কিছু তো প্রমাণ চাই!

ও তাঁবুর দিকে এগিয়ে গেল। খিদে পেয়েছে। তবে তার আগে ফার্স্ট এড লাগবে। মাথায় কেটে গিয়েছে। পায়েও ছাল উঠে গিয়েছে সেখানে ওষুধ লাগাতে হবে।

ফার্স্ট এড করে নিয়ে কুষাণ ব্রাশ করে নিল। তারপর একটা ছোট স্টোভ জ্বালিয়ে টিনের কৌটো থেকে টুনা মাছের স্যালাড বের করে গরম করল। সঙ্গে ব্রেড নিল। তারপর তিনটে প্লেটে খাবার সাজিয়ে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এসে অমিত আর হুয়াঙ্কার সামনে ধরল।

হুয়াঙ্কা প্লেটটা হাতে নিলেন। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলেন সেটাকে। তারপর পাশে রেখে উঠে গেলেন জলের জায়গার দিকে। কুষাণ কিছু বলার আগেই জলের ক্রেটের থেকে দুটো বোতল খুলে নিলেন। তারপর হতের মোচড়ে প্যাঁচ খুলে দু’বোতল জল খেয়ে নিলেন!

কুষাণ বুঝল হুয়াঙ্কাই সেদিন রাতে জলের বোতল নিয়েছিলেন ক্রেটের প্যাকিং কেটে! মানে হুয়াঙ্কা আড়াল থেকে ওদের উপর নজর রাখছিলেন। তাই কি দুর্ঘটনায় পড়ার পরে উনি এসে বাঁচিয়েছিলেন কুষাণকে।

অমিত কুষাণকে বললেন, “এইখানে একটা অবজারভেটারি ছিল। হুয়াঙ্কা নিশ্চিত আড়াল থেকে ওদেরকে দেখে অনেক কিছু শিখেছেন।”

খাওয়াদাওয়া করার পরে অমিত হুয়াঙ্কাকে একটা সফ্ট ড্রিঙ্কসের ক্যান খুলে বাড়িয়ে দিলেন। হুয়াঙ্কা সেটা হাতে নিলেন। তারপর খেয়ে নিলেন এক চুমুকে

খেয়ে যে ভাল লেগেছে সেটা হুয়াঙ্কার মুখ দেখেই বুঝল কুষাণ। ও আর-একটা ক্যান বাড়িয়ে দিল। সেটাও নিমেষে শেষ করলেন হুয়াঙ্কা!

অমিত এরই মধ্যে একটা ক্যামেরা নিয়ে এসেছেন তাঁবুর মধ্যে থেকে। কিন্তু সেটা দেখেই হুয়াঙ্কা কেমন যেন ছিটকে লাফিয়ে উঠলেন। তারপর হাত দিয়ে আকারে-ইঙ্গিতে যা বোঝালেন তাতে কুষাণ বুঝল যে ফোটো তোলার ব্যাপারটা হুয়াঙ্কা জানেন। আর এতে তাঁর প্রবল আপত্তি!

কুষাণ এও বুঝল যে কেন সুমিতের অ্যালবামে এই লোকটির ফোটো নেই!

অমিত হেসে ক্যামেরা সরিয়ে রাখলেন। তারপর কুষাণকে বললেন, “পৃথিবীর বিভিন্ন উপজাতিরই ফোটো তোলার ব্যাপারে এমন আপত্তি আছে।”

“কিন্তু স্যার, ফোটো না-তুললে বাইরের পৃথিবীতে সবাইকে দেখাবেন কী করে?” কুষাণ জিজ্ঞেস করল।

অমিত বললেন, “সে দেখছি। আমি একটা ছোট ভিডিয়ো ক্যামেরা এনেছিলাম। আমার টুপির মধ্যে লাগানো। আমি গেস করেছিলাম এমন কিছু হতে পারে। লুকোনো ক্যামেরা ওটা। টুপিটা পরে নিলে ও বুঝতে পারবে না যে আমি ফোটো তুলছি ওর!”

ব্যাপারটা ভাল লাগল না কুষাণের। যে চায় না ফোটো তুলতে তার ফোটো লুকোনো ক্যামেরায় তোলা ঠিক নয়।

দুপুরের খাওয়াটাও হুয়াঙ্কা খেলেন ওদের সঙ্গে। তারপর তাঁবুর মধ্যে ঢুকে এটা-ওটা হাতে নিয়ে দেখলেন। কুষাণের একটা টি-শার্ট তুলে নিজের গায়ের সঙ্গে ঠেকিয়ে দেখলেন। কুষাণ টি-শার্ট ওর হাতে দিয়ে হাসল।

হুয়াঙ্কার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কুষাণ নিজের ব্যাগ থেকে একগোছা চকোলেট বেরও বের করে দিল। তিনি এসব নিয়ে কাঁধে ঝোলানো একটা গাছের নরম বাকল থেকে তৈরি ঝোলায় ভরে নিলেন। কুষাণ ঠিক বুঝতে পারছে না এখান থেকে ব্যাপারটা কোনদিকে যাবে।

হুয়াঙ্কা আচমকা যেন কিছু মনে পড়ায় তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়ালেন। দুপুরের রোদ সামান্য হেলছে এবার। হুয়াঙ্কা আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর মাটির উপর হাঁটু গেড়ে বসে হাত মুঠো করে বুকের কাছে ধরে নিজের ভাষায় কিছু একটা বললেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকালেন।

কুষাণের মনে হল লোকটার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে যে, কোনও ব্যাপারে দেরি হয়ে গিয়েছে।

হুয়াঙ্কা ওদের দিকে তাকিয়ে এবার জিজ্ঞেস করার ভঙ্গিতে বললেন, “ইন্তি৷”

এ আবার কী! কুষাণ বুঝতে পারল না। কিন্তু ও দেখল অমিত মাথা “হ্যাঁ” বললেন।

কুষাণ অবাক হয়ে তাকাল অমিতের দিকে।

অমিত বললেন, “ইন্তি হল ইনকাদের সান গড়।”

হুয়াঙ্কা জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে ওদের ওর সঙ্গে যাওয়ার ইঙ্গিত করলেন। অমিত ওকে একটু দাঁড়াতে বলে তাঁবুতে গেলেন। সেখান থেকে নিজের টুপিটা পরে বেরোলেন।

কুষাণ নিজে আর ব্যাগ নিল না। ওর কোমরের পাউচ-ব্যাগে দুটো জলের বোতল নিয়ে নিল। আর সঙ্গে একটা ছুরি। ম্যাশেটিটা রাখল হাতে। জঙ্গল কেটে এগোতে এটা লাগে।

হুয়াঙ্কা ওদের ইঙ্গিত করলেন। তারপর গভীর জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেলেন। কোথায় যাচ্ছে ওরা? কুষাণ জানে না। কিন্তু ও দেখল

অমিত ক্রাচ হাতে নির্দ্বিধায় হুয়াঙ্কার পিছু নিয়েছেন।

সামনের গভীর জঙ্গলের দিকে তাকাল কুষাণ। কোথায় যাচ্ছে ওরা এই অজানা মানুষটির সঙ্গে! হালকা একটা ভয় করছে কুষাণের। কিন্তু সেটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিল ও। এখানে কাজে এসেছে। ভয় পেলে চলবে না।

কুষাণ কোমরে ঝোলানো ছুরিটা স্পর্শ করল একবার। তারপর ম্যাশেটিটা হাতে শক্ত করে ধরে হুয়াঙ্কা আর অমিতের পিছু নিয়ে গভীর জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেল।


টুলির হাতে একটা বন্দুক। মাথায় বেসবল ক্যাপ। হাতে ধরা ডিসপ্লে-তে ফুটে ওঠা লাল ডটটা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ও। আর ওর ঠিক পিছনেই আছে মাস্টার।

আজ মাস্টার উত্তেজিত হয়ে আছে। বুঝতে পারছে ওদের অভিযান আজ ক্লাইম্যাক্সের দিকে এগোচ্ছে! আজ নিশ্চিত একটা এসপার ওসপার হয়ে যাবে!

দুপুর এখন। আর একটু পরে সূর্য পশ্চিম আকাশের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যাবে। অন্ধকার নেমে আসবে। তার আগেই নিশ্চিত শেষ হয়ে যাবে ওদের কাজ।

ডিসপ্লে থাকলেও মাস্টার নিজেও অমিতদের উপর নজর রেখেছিল। ও দেখেছে কুষাণ ছেলেটা ফিরে এসেছে একটা উপজাতীয় মানুষকে নিয়ে। একেই কি খুঁজছে ওরা? আর এ যদি সেই লোকটা হয় তা হলে তো ওদের পোয়াবারো।

এখন সেই লোকটি কুষাণদের নিয়ে চলেছে কোথাও। সম্ভবত নিজের আস্তানায়। সেখানে কি মূল্যবান সেই জিনিসটা আছে?

টুলি হাঁটার গতি বাড়াল। নিজের গতি বাড়িয়ে এবার মাস্টারও ওর পাশে-পাশে হাঁটতে লাগল। মাস্টারের পিঠে একটা বড় ব্যাগ। এতে ফোল্ডিং জাল আছে। টুলি নিয়ে এসেছে সঙ্গে করে।

মাস্টার সামান্য ঝুঁকে টুলির হাতে ধরা ডিভাইসটায় দেখল লাল জি পি এস ডটটা ওদের থেকে চারশো মিটার মতো দূরে আছে। আর সেটা ক্রমশ এগিয়ে চলেছে।

কেউ কোনও কথা বলছে না। জঙ্গলের শব্দ, মাটির ভেজা ঘ্রাণ আর আলো-ছায়ার আলপনার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে ওরা।

সামনে যে কী অপেক্ষা করে আছে মাস্টার জানে না। ও কোমরে ঝোলানো পিস্তলটাকে স্পর্শ করল একবার। তারপর চোয়াল শক্ত করে এগোতে লাগল।


বেশ অনেকটা হাঁটার পরে একটা জায়গায় এসে দাঁড়াল কুষাণরা। অন্য জায়গার তুলনায় এখানে গাছপালা একটু কম। পাশেই নদী বয়ে যাচ্ছে। কুষাণ বুঝল এটাও আমাজনের কোনও শাখানদী হবে।

চারদিকে বড়-বড় গাছ থাকলেও মাঝে একটা ফাঁকা পাথুরে জমি। ছোট-বড় নানা পাথর ছড়িয়ে আছে এই ফাঁকা জায়গা থেকে নদীর পার অবধি।

হুয়াঙ্কা এসে দাঁড়ালেন এখানে। তারপর হাসলেন ওদের দিকে তাকিয়ে।

এখানে কেন আনল ওদের? কুষাণ বুঝতে পারল না।

হুয়াঙ্কা সামনে একটা গাছের দিকে এগোলেন। বড়, মোটা গাছ।

ঝুরি নেমেছে চারদিকে। হুয়াঙ্কা সেই দিকে গেলেন। তারপর গাছের গুঁড়ির একটু উপর দিকে একটা কোটরের সামনে দাঁড়ালেন।

হুয়াঙ্কা এবার হাত বাড়াতে গেলেন সেই কোটরে, কিন্তু হাত দেওয়ার আগেই পিছন দিকে কিসের একটা শব্দ শোনা গেল। হুয়াঙ্কা নিমেষে ঘুরে গিয়ে কোমরে হাত দিতে গেলেন। কিন্তু তার আগেই ছপ করে শব্দ হল একটা আর একটা জাল উড়ে গিয়ে জড়িয়ে ফেলল

হুয়াঙ্কাকে! হুয়াঙ্কা মুখ দিয়ে শব্দ করে পড়ে গেলেন মাটিতে। জাল থেকে বেরোনোর জন্য ছটফট করতে লাগলেন। পারলেন না।

কুষাণ ঘুরে দাঁড়িয়ে কোথা থেকে জালটা এল বোঝার আগেই এবার গুলির শব্দ শুনল একটা। শূন্যে ছোড়া হয়েছে গুলিটা। তার ভীষণ আওয়াজে বেশ কিছু পাখি ভয়ে চিৎকার করে উড়তে শুরু করল আকাশে। কুষাণ দেখল জঙ্গলের মধ্যে থেকে ওদের দিকে বন্দুক তাক করে বেরিয়ে আসছে দু'জন।

বুলি! কুষাণ অবাক হয়ে তাকাল। কিন্তু তারপরেই ওর দৃষ্টি পড়ল মেয়েটার হাতের দিকে। না, এর তো সব ক’টা আঙুল আছে! তা হলে!

ও তাকাল অমিতের দিকে। দেখল রাগে অমিতের মুখ লাল হয়ে !”

আছে। অমিত শুধু বললেন, “টুলি! তুই

টুলি এগিয়ে এল। বন্দুকটা কুষাণের দিকে তাক করা। মুখে বাঁকা হাসি।

টুলি বলল, “কুষাণ, তোমাকে আমি বারণ করেছিলাম আসতে। বুলি সেজে দ্বিতীয়বার তোমায় আমিই ডেকেছিলাম। কিন্তু তুমি শুনলে না। তাই আজ বাড়ি থেকে এত দূরে তোমায় বেঘোরে মারা পড়তে হবে। সো স্যাড!”

“টুলি, তুই এসব কী বলছিস? এখানে তুই কী করছিস?” অমিত চেঁচিয়ে বললেন।

“তুমি যা করছ! দামি জিনিসের খোঁজে এসেছি! সঙ্গে উপরি পাওনা এই হারিয়ে যাওয়া উপজাতির মানুষটা!” টুলি আর সময় নষ্ট না করে পাশের লোকটিকে বলল, “মাস্টার, দ্যাখো তো ওই গাছের কোটরে। ওখানেই নিশ্চয়ই কিছু আছে! দ্যাখো!”

“টুলি!” অমিত আবার চিৎকার করলেন।

“শাট আপ! একটা পা ভেঙেছে, এবার আর-একটাও ভেঙে দেব। তারপর ওই নদীতে ফেলে দেবে। জানো তো ওখানে পিরান্হা আছে!”

পিরান্হা! কুষাণ সচকিত হল। সে যে ভয়ঙ্কর মাছ! ব্লেডের মতো ধারালো তাদের দাঁত। কেউ-কেউ বলে এরা প্রাণীদের হাত-পা কেটে নিতে পারে। কিন্তু সেটা সত্যি নয়। তবে মারাত্মক জখম করতে পারে, এটা ও জানে।

“নড়বে না কেউ!” টুলি হাতের বন্দুকটা তুলে ধরল ওদের দিকে, তারপর মাস্টারকে বলল, “যাও দ্যাখো, দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

মাস্টারকে চিনতে পারল কুষাণ! ভেনিসের সেই রাতের গলিতে এই লোকটাই ছিল!

মাস্টার হাসল ওর দিকে তাকিয়ে। অবজ্ঞার হাসি।

কুষাণ কিছু বলল না। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল! যদি একটা সুযোগ পেত তা হলে এই লোকটাকে এমন শিক্ষা দিত!

মাস্টার এগিয়ে গেল বড় গাছটার দিকে। হুয়াঙ্কা ছটফট করছে না আর। বরং কেমন একটা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে কুষাণের দিকে। চোখের ভাষায় কি কিছু বলতে চাইছে?

মাস্টার গাছ বেয়ে উঠে কোটরের সামনে থামল। তারপর গাছের কোটরের মধ্যে ডান হাতটা ঢোকাল! আর কুষাণ দেখল হুয়াঙ্কার মুখে কেমন যেন হাসি ফুটে উঠল একটা!

কিছু বোঝার আগেই মাস্টার পরিত্রাহি চিৎকার করে উঠল। তারপর ছটফট করতে-করতে ডান হাতটা ধরে কাঁপতে কাঁপতে গাছের উপর থেকে মাটিতে পড়ে গেল।

কুষাণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখল একটা সাপ গাছের কোটরের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে। সবজেটে রং সাপটার। এটা ফরেস্ট পিট ভাইপার। কুষাণ পড়েছে এটার সম্বন্ধে।

মাস্টারকে অমন করে পড়ে যেতে দেখে টুলি ঘাবড়ে গেল সামান্য সময়ের জন্য। বন্দুকের মুখটা কুষাণদের থেকে সরিয়ে ঘুরল মাস্টারের মাটিতে পড়ে কাঁপতে থাকা দেহটার দিকে। আর এই সুযোগটাই নিল কুষাণ। প্রায় উড়ে গিয়ে পা দিয়ে মারতে গেল টুলিকে।

কিন্তু টুলি অদ্ভুত দক্ষতার সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে সরে গেল,

তারপর বন্দুকের কুঁদো দিয়ে মারল কুষাণের মাথায়! কুষাণ মাথা সরিয়ে নিল বটে, কিন্তু তাও লাগল ঘাড়ের পাশে। কুষাণ মাটিতে পড়ে গেল। আর ঠিক সেই সময়ে হুয়াঙ্কা কেমন যেন বিকট স্বরে চিৎকার করে উঠল!

টুলি চমকে গেল। কিন্তু ঘাবড়াল না। মাস্টারের দিকে তাকাল একবার। মাস্টার নিথর হয়ে গিয়েছে।

টুলি এবার তাকাল কুষাণের দিকে। তারপর বন্দুক কুষাণের মাথার দিকে তাক করে বলল, “তোমাকে মারব না যদি আমার কথা শোনো। এখনও সময় আছে। আমার দলে এসো। এই বুড়োকে শেষ করে এই লোকটাকে ধরে, ওর কাছের মূল্যবান জিনিসটা নিয়ে আমাকে এখান থেকে বেরোতে সাহায্য করো। কত টাকা পাবে ধারণা নেই তোমার! সারা জীবন আর কাজ করতে হবে না।”

কুষাণ চোয়াল শক্ত করে বলল, “খারাপ কাজ আমি করি না। আমার লোভ নেই। যেটুকু যোগ্যতা আর পরিশ্রম দিয়ে পারি সেটুকুই আমার উপার্জন। আমি আপনার দলে যাব না!”

“তাই! আচ্ছা! দেন ইউ ডাই!” টুলি বন্দুক তুলল। কিন্তু কিছু করার আগেই আচমকা জঙ্গলের দিক থেকে কিসের যেন পায়ের শব্দ শুনতে পেল ওরা।

হুয়াঙ্কা চিৎকার করল আবার! আর জঙ্গল ভেদ করে বেশ কয়েকটা অদ্ভুতদর্শন প্রাণী প্রচণ্ড জোরে দৌড়ে এল টুলির দিকে। প্রাণীগুলোকে দেখতে অনেকটা শূকরের মতো, কিন্তু শুকর নয়! নাকের জায়গায় ছোট্ট একটা শুঁড় যেন শুরু হয়েই শেষ হয়ে গিয়েছে!

অমিত চেঁচিয়ে বললেন, “টাপির আসছে! সরে যাও কুষাণ!” কুষাণও ব্যাক ফ্লিপ করে দ্রুত সরে গেল টাপিরগুলোর পথ থেকে।

কিন্তু টুলি সরতে গিয়েও পারল না। বন্দুক তুলল প্রাণীগুলোর দিকে গুলি ছুড়বে বলে। কুষাণ দ্রুত মাটি থেকে একটা পাথর তুলে ছুড়ে মারল টুলির হাতের দিকে। পাথরটা লাগল বন্দুকের নলে। আর বন্দুকটা ঘুরে গেল। ফলে গুলিটা গিয়ে লাগল পাশের একটা গাছে। আর টাপিরের দল হুড়মুড় করে এসে টুলিকে ধাক্কা মেরে ফেলে পায়ের তলায় পিষে দিয়ে বেরিয়ে গেল হুয়াঙ্কার দিকে! জালে ঘেরা হুয়াঙ্কার সামনে গিয়ে টাপিরগুলো পা ঠুকতে শুরু করল। হুয়াঙ্কা জালের মধ্যে থেকে হাত বাড়িয়ে ওদের মাথায় স্পর্শ করল। আর কুষাণ অবাক হয়ে দেখল ওই স্পর্শে টাপিরগুলো আস্তে-আস্তে শান্ত হয়ে গেল!

কুষাণ বুঝল সেদিন এই টাপিরের ধাক্কাই খেয়েছিল ও! ও দেখল পাথরের উপর পড়ে গিয়েছে টুলি। মাথা ফেটে রক্ত বেরিয়েছে। আর টুলির কোনও সাড় নেই! ও অজ্ঞান!

অমিত ধীরে-ধীরে এগিয়ে এলেন এবার। তারপর কুষাণের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মাস্টার নামে ওই শয়তানটা তো আর নেই ইহজগতে! তুমি দড়ি দিয়ে টুলিকে বেঁধে ফ্যালো। যাক, একটা ঝামেলা শেষ হল।”

কুষাণ দেখল কথা শেষ করে অমিত এবার এগিয়ে গেলেন হুয়াঙ্কার দিকে।


এলেনা পাশে তাকাল। ওদের হেলিকপ্টারে পাঁচজন পুলিশ বসে আছে। সবাই সশস্ত্র। আমাজনের জঙ্গলের উপর উড়ছে ওরা। মোটামুটি জানে কোনদিকে যেতে হবে। পন্টি বলে দিয়েছে ওদের। কিন্তু এত বড় জঙ্গলে নির্দিষ্টভাবে মানুষ খুঁজে বের করা সহজ নয়। শুনেছে কুষাণ নামে একটা ছেলে আছে ওই দু'জনের মধ্যে। তার কাছে মোবাইল আছে। কিন্তু জঙ্গলের ফ্রিঞ্জ এরিয়ায় কোথাও কোথাও ফোনের লাইন পাওয়া গেলেও অধিকাংশ জায়গায়, বিশেষ করে একটু ভিতরের দিকে কোথাও ফোন কাজ করে না। ওদের কিছু একটা উপায় করতে হবে।

নদীর ধারে-ধারে একটা ফাঁকা জায়গায় হেলিকপ্টারটা নামল। এখান থেকে এলেনারা পায়ে হেঁটে ঢুকবে। পন্টির থেকে ওরা জেনেছে

আসলে কোন লোকেশনে তাঁবু ফেলেছিল কুষাণরা। সেখান থেকেই ওরা খোঁজ শুরু করবে।

নদীর পাশ ধরে এলেনা ও পাঁচজন পুলিশ এগোতে শুরু করল। আর তখনই দেখল একটা বোট নদীর পাশে বাঁধা আছে। সাদার উপর সবুজ বর্ডার! পন্টি এই বোটের কথাই বলেছিল! মিলে যাচ্ছে।

এলেনা পার্সি নামে একটা পুলিশম্যানকে বলল, “ড্রোন ডিপ্লয় করো। আমরা পায়ে হেঁটে গেলেও ড্রোন উপর থেকে ফোটোয় আমাদের অনেকটা জায়গা দেখাবে। বুঝতে সুবিধে হবে।”

পার্সি দ্রুত পিঠের স্যাক থেকে ড্রোন বের করে আকাশে উঠিয়ে দিল। চারটে ছোট-ছোট পাখনা ঘুরিয়ে আকাশে উড়তে-উড়তে ড্রোন ক্যামেরা দিয়ে জঙ্গলের ফোটো তুলছে। পার্সি হাতে ধরা স্ক্রিনে মনিটর করা শুরু করল।”

এলেনা সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাদের আর সময় নেই। তোমরা জানো, কিছু বিদেশি আমাদের এই জঙ্গলে বিপদে পড়েছে। তাদের হেল্প করতেই হবে আমাদের। সো কাম অন! স্টে অ্যালার্ট!”

আর সময় নষ্ট না-করে সবাই মিলে ঘন জঙ্গলের মধ্যে এগিয়ে গেল।


জালটা এমন করে তৈরি যে একবার আটকে গেলে বাইরে থেকে চাবি ছাড়া খোলা যায় না। হুয়াঙ্কার কাছে ম্যাশেটি থাকলেও সেটা দিয়েও কাটা যায়নি জালকে। বেশ দামি আর পোক্ত জিনিস!

টুলির পকেট থেকে চাবি বের করে জালটা খোলা হয়েছে। তারপর টুলিকে হাত আর মুখ বেঁধে ওই জালেই আটকে রাখা হয়েছে। টুলি একটু ছটফট লেও বুঝেছে আর উপায় নেই, তাই চুপ করে গিয়েছিল! তারপর হুয়াঙ্কা জঙ্গলের থেকে এমন কিছু পাতা এনে হাতে ডলে ওকে শুঁকিয়েছেন যে টুলির আর জ্ঞান নেই।

কুষাণের মনে হল, টাপিরগুলো কি হুয়াঙ্কার পোষা! তাই কি ওর ডাক শুনে ছুটে এসেছিল! এই হুঙ্কারটাই সেদিন রাতে শুনেছিল কুষাণ। ও বুঝল, হুঙ্কারের পরে যে পায়ের শব্দ শুনেছিল ও, সেটাও এই টাপিরদেরই ছিল!

টাপিরগুলো চলে গিয়েছে এখন। ও জানে টাপির তৃণভোজী প্রাণী হলেও ভয়ঙ্কর! যে কাউকে গুঁতিয়ে বা ধাক্কা দিয়ে ভাল রকম জখম করতে পারে।

হুয়াঙ্কা মাস্টারের দেহটা একপাশে সরিয়ে রেখেছেন।

অমিত এবার হুয়াঙ্কার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে জিজ্ঞেস করলেন, এবার কী?

হুয়াঙ্কা হাসলেন। হাত দিয়ে দাঁড়াতে বললেন ওদের। তারপর এগিয়ে গেলেন গাছের কোটরের দিকে। আবার সেই গর্ত! সেই বিষাক্ত সাপ!

কিন্তু কুষাণ অবাক হয়ে দেখল নির্দ্বিধায় সেই গর্তে হাত ঢুকিয়ে দিলেন হুয়াঙ্কা। আর সাপটা ওর হাত বেয়ে বেরিয়ে এল। কামড়াল না! বরং ওর শরীর বেয়ে বেরিয়ে এসে গাছের অন্য দিকে চলে গেল! হুয়াঙ্কা এবার বের করে আনলেন হাতটা।

কুষাণ দেখল হুয়াঙ্কার হাতে গাছের বাকল জড়ানো কিছু একটা জিনিস!

হুয়াঙ্কা মাটিতে নেমে এসে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তারপর বাকলটা বুকের কাছে ঠেকিয়ে ওদের প্রথামতো প্রণাম করে খুললেন মোড়কটা। আর কুষাণ অবাক হয়ে দেখল এই শেষ বিকেলের আলোতেও ঝলমল করে উঠল একটা মূর্তি।

কিসের মূর্তি এটা?

কুষাণ দেখল হুয়াঙ্কার হাতে চৌকোনো, এক ফুট লম্বা দণ্ডের মতো একটা পান্নার মূর্তি! মূর্তিটি একটি মানুষের। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে রাজদণ্ড আর মাথায় মুকুট। সবটাই একটা বিশাল বড় পান্নার

টুকরো কেটে বানানো। মূর্তির মাথায় সূর্যের শিখার মতো মুকুটটা সোনার তৈরি। হাতের রাজদণ্ডটাও সোনার। আর সারা মূর্তির গায়ে সোনার ছোট-ছোট পাতা জড়ানো। কুষাণ বুঝল অপূর্ব সুন্দর মূর্তিটা সূর্যদেবতার।

ও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। দেখলেই বোঝা যায় মূর্তিটার ঐতিহ্য। ঐতিহাসিক গুরুত্ব। বোঝা যায় এই মূর্তি অমূল্য।

হুয়াঙ্কা মূর্তিটাকে আকাশের দিকে তুলে ধরে নিজের ভাষায় কিছু বললেন। তারপর দু’হাতে ধরে বাড়িয়ে দিলেন অমিতের দিকে।

অমিত এসে নিতে গেলেন মূর্তিটা। হুয়াঙ্কা বিরক্ত হয়ে হাত সরিয়ে ইঙ্গিত করলেন অমিত যেন ঝুঁকে মূর্তির সামনে মাথা নত করে। এই মূর্তি তিনি কাউকে ধরতে দিতে চান না। এ তাঁর আরাধ্য দেবতা!

অমিত চুপ করে তাকালেন হুয়াঙ্কার দিকে। তারপর আচমকা হাতের ক্রাচটা ফেলে দিয়ে সামনে ঝুঁকে এক ঝটকায় কেড়ে নিলেন মূর্তিটা! আর একই সঙ্গে পকেটে হাত দিয়ে বের করে আনলেন একটা পিস্তল।

এ কী! কুষাণ চমকে উঠল। এই পিস্তলটাই তো মাস্টারের কোমরে ছিল! মানে হুয়াঙ্কা যখন মূর্তিটা বের করছিলেন, অমিত তখন পিস্তলটা মাস্টারের থেকে নিয়ে নিয়েছেন।

হুয়াঙ্কা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন অমিতের দিকে। ভাবটা এই, তুমিও লোভী! যাদের থেকে আমি এই দেবতাকে আড়াল করে আগলে রাখছি, তুমিও তাঁদেরই মতো! তোমাকে আমি বিশ্বাস করে দেবতার দর্শন করালাম আর তুমি তাকে লুঠ করতে চাইছ!

কুষাণ দেখল হুয়াঙ্কার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে।

কুষাণ বলল, “স্যার, কী করছেন? এটা করবেন না! এটা অন্যায়!” “ইউ শাট আপ!” অমিত চিৎকার করে উঠলেন। মূর্তিটা বগলে চেপে ক্রাচ তুলে নিলেন আবার। তারপর ক্রাচে ভর দিয়ে পিছু হঠতেহঠতে বললেন, “এত দূরে এসেছি কেন আমি? ফাঁকা হাতে বাড়ি যাব বলে? আমি কি দাদার মতো বোকা? আমি এসেছি সম্পদ নিতে! যবে থেকে দাদা বলেছে মহামূল্যবান ইনকা মূর্তির কথা, তবে থেকে আমি এটার জন্য হন্যে হয়েছি। সারা পৃথিবী ঘুরে, কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা খরচ করেছি কি এমনি? টুলি বাগড়া দিতে এসেছিল, কিন্তু দৈবক্রমে সরে গিয়েছে। আর তুই আমায় ন্যায়-অন্যায় শেখাবি?”

কুষাণ অবাক হয়ে দেখল সভ্য-ভদ্র মানুষের মুখোশ খসে পড়েছে অমিতের মুখ থেকে। লোভী শয়তান একটা যেন ঝলকাচ্ছে!

কুষাণ বলল, “আমি আপনাকে তা করতে দেব না। আপনাকে...” কুষাণ দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল অমিতের দিকে। আর অমিত সময় নষ্ট না-করে গুলি চালালেন।


এলেনা চমকে উঠল! আরে, এ যে বন্দুকের আওয়াজ! ওরা দাঁড়িয়ে পড়ল সকলে৷

জঙ্গলের মধ্যে আওয়াজের অনুরণন হয়ে চলেছে। পাখি উড়ছে কিচমিচ করে। ভয় পেয়েছে পাখিরা!

এলেনা চোখ বন্ধ করে বোঝার চেষ্টা করল কোনদিক থেকে আওয়াজ আসছে। জঙ্গলে এমন আওয়াজ এলে দিক বোঝা সহজ নয়। কিন্তু এলেনারা এই ব্যাপারে অভ্যস্ত!

“পার্সি!” এলেনা চিৎকার করে উঠল, “টু ও'ক্লক! ড্রোনটা ওই দিকে নাও!”

মানে এলেনাদের সামনের দিককে বারোর ঘর ধরে ঘড়ির কাঁটার দুয়ের ঘরের দিক থেকে আওয়াজটা আসছে।

পার্সি দ্রুত ড্রোনটা ওই দিকে ঘোরাল। এলেনা স্ক্রিনের দিকে তাকাল। ওই ফোটো আসছে।

“পার্সি, জুম করো,” এলেনা স্ক্রিনের উপর ঝুঁকে পড়ল। দেখল গাছপালার আড়ালে কারা যেন নড়াচড়া করছে!


গুলিটা কুষাণের পায়ের পাশের একটা পাথরে লাগল! পাথরের কুচি ছিটকে উঠল।

অমিত চেঁচিয়ে পিস্তলটাকে নাড়িয়ে বললেন, “এটা ওয়ার্নিং ছিল! এবার আর-এক পা এগোলে কিন্তু মাথার খুলি উড়িয়ে দেব।”

কুষাণ তাও এগোল। অমিত চিৎকার করে বললেন, “এই... এই, আর এগোবে না! আমি কিন্তু আর বলব না। মূর্তি পেয়ে গিয়েছি। তোমাদের দু'জনকে মেরে এখান থেকে বেরিয়ে যাব! কেউ ধরতে পারবে না আমায়! কেউ না!”

“না, আপনি তা করবেন না। আমি করতে দেব না,” কথাটা শেষ করেই আচমকা অমিতের দিকে লাফ মারল কুষাণ।

অমিত থতমত খেয়ে পিস্তল তুলে ট্রিগার টিপতে গেলেন কিন্তু তার আগেই হুয়াঙ্কা কোমর থেকে বাঁশির মতো জিনিসটা দ্রুত নিয়ে মুখ দিয়ে ফুঁ দিলেন। আর হাওয়ায় শিস তুলে একটা সরু তির গিয়ে খচ করে গেঁথে গেল অমিতের গলায়। ব্লো ডার্ট!

অমিত হেঁচকির মতো একটা শব্দ করলেন। হাত থেকে পিস্তল আর ক্রাচ পড়ে গেল ওঁর। উনি টলমল করে কাঁপলেন কয়েকবার। পিছনের নদীর পারের দিকে সরে গেলেন কয়েক পা। তারপর মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন জলে।

কিন্তু জলে পড়ার ঠিক আগে কুষাণ লাফিয়ে পড়ে অমিতের কাছ থেকে নিমেষের মধ্যে কেড়ে নিল মূর্তিটা!

জলে পড়েও অমিত কাঁপতে লাগলেন। আর কুষাণ দেখল বেশ কিছু পিরান্হা দ্রুত জল কেটে এগিয়ে এল অমিতের দিকে।

কুষাণ মূর্তিটা দেখল। ভারী খুব। আর অসাধারণ সুন্দর। বিকেলের নরম আলোতেও যেন জ্বলজ্বল করছে!

জঙ্গলের থেকে পায়ের শব্দ পাওয়া গেল হঠাৎ। কাদের যেন গলা! কারা যেন আসছে!

কুষাণ সচকিত হল। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মূর্তিটা বাড়িয়ে দিল হুয়াঙ্কার দিকে।

হুয়াঙ্কা হাসলেন। তারপর একবার তাকালেন জঙ্গলের দিকে। আর অপেক্ষা করা যায় না। গাছের বাকল দিয়ে মুড়ে নিলেন মূর্তিটা। তারপর কাঁধের সেই ব্যাগের মতো খোলে হাত ঢুকিয়ে মুঠোয় কিছু একটা বের করে রাখলেন কুষাণের হাতে। তারপর হাত দিলেন কুষাণের মাথায়। এ যেন আশীর্বাদ!

জঙ্গলের মধ্যে থেকে মানুষজন এগিয়ে আসছে আরও কাছে! কুষাণ পিছনে ফিরে তাকাল। গাছপালা নড়ছে। ও আবার সামনে ফিরল! কিন্তু হুয়াঙ্কা কই! এই তো ছিল। আর এখন নেই! কোথায় গেল!

কুষাণ আশপাশে তাকাল। গভীর অরণ্য চারদিকে। ও বুঝল এই অরণ্যের মানুষটি অরণ্যেই হারিয়ে গিয়েছেন!

পিছনে পায়ের শব্দ কাছে এসে পড়ছে একদম। এক মহিলার গলা পাওয়া গেল। ওর নাম ধরে ডাকছে! কে এরা? কারা এল? ওকে চিনল কী করে!

কুষাণ পিছন ফেরার আগে একবার নিজের হাতের মুঠো খুলে দেখল। দেখল, জঙ্গলে মিলিয়ে যাওয়ার আগে ওর হাতে একটা ইঞ্চিচারেক পুতুল দিয়ে গিয়েছে হুয়াঙ্কা! ঘন সবুজ পাথরের তৈরি

পুতুল! কুষাণ বুঝল ওর হাতেও পান্নার তৈরি ছোট্ট এক সূর্যদেবতার মূর্তি রেখে গিয়েছেন হুয়াঙ্কা!


ওই উড়ে যাচ্ছে কলের তৈরি মাছিটা! জঙ্গলে অন্ধকার নেমে আসছে। কিন্তু সূর্যের শেষ আলো এখনও গাছেদের মাথায়-মাথায় লেগে আছে।

হুয়াঙ্কা বড় একটা গাছ বেয়ে উপরের শাখায় এসে উঠে এসেছেন এখন। সূর্যের শেষ আলোয় আজকের মতো ধুয়ে নিতে হবে যে দেবতাকে!

গোলাপি আলোর দিকে হুয়াঙ্কা এবার তুলে ধরলেন সূর্যদেবের মূর্তি। শেষ আলোয় ঝিকিয়ে উঠল সেই মূর্তির সোনার মুকুটটা!

হুয়াঙ্কা বুকের কাছে ধরলেন মূর্তিটা, তারপর উড়ে যাওয়া ওই কলের মাছির দিকে তাকিয়ে মনে-মনে বললেন, ‘ভাল থেকো বন্ধু! সূর্যদেব তোমার মতো সৎ আর নির্ভীক মানুষকে ভাল রাখুন!’

ঠিক সেই সময়ে হেলিকপ্টারের জানলার ধারে বসে জঙ্গলের দিকে তাকাল কুষাণ। ওরা ফিরে যাচ্ছে লোকালয়ে। বড় কপ্টারের পিছনে অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে টুলি। আর পিরান্হাদের কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে থাকা অমিত! মাস্টারের দেহটাও ত্রিপলে মুড়ে রাখা আছে।

এলেনারাই অমিতকে নদী থেকে তুলেছে। কুষাণকে বলেছে যে কিউরারে নামক বিষ মেশানো ছিল ব্লো ডার্টে। এতে মানুষ চলচ্ছক্তিহীন হয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য! আর এর প্রভাবেই এমন স্থবিরের মতো হয়ে গিয়েছেন অমিত! নিজের কৃতকর্মের শাস্তিই পেয়েছেন বলা যায়!

আর যে টুপিতে গোপন ক্যামেরা লাগিয়ে অমিত ভেবেছিলেন হুয়াঙ্কার ফুটেজ তুলবেন, তাতেই তাঁর নিজের কীর্তি আর গলার স্বর রেকর্ড হয়েছে! এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী আছে!

এলেনা বলেছে, “ব্রাজ়িলের আইনে এবার বিচার হবে টুলি আর অমিতের। সহজে ছাড়া পাবে না ওরা।”

কুষাণ আবার তাকাল জঙ্গলের দিকে। আরে ওটা কি ঝিলিক দিয়ে উঠল ওই জঙ্গলের মধ্যে! কিসের সোনালি আলো ওটা! সত্যি কি আলো দেখল কোনও, নাকি ওটা চোখের ভুল ওর! কে জানে! জঙ্গল কত কী যে লুকিয়ে রাখে! কত রহস্য বুকে নিয়ে যে সে বেঁচে থাকে সারা জীবন!

আচমকা মনখারাপ করল কুষাণের। হুয়াঙ্কা তো কেউ নয় ওর! তাও

এমন বন্ধু হারানোর মতো মনে হচ্ছে কেন!

ও ভাবল, বহু দূরের সাহারার ধুলো যেমন জড়িয়ে আছে এই আমাজ়ন অরণ্যের সঙ্গে, সেরকম মানুষও কি দেশ-কাল-জাতি-বর্ণ পার করে, একে অপরের সঙ্গে এমন স্নেহ আর মায়ার বন্ধনেই জড়িয়ে থাকে না! কুষাণ বুঝল এই মনুষ্যত্বের বন্ধনই মানুষের জীবনের পরম পাওয়া!

ও নিজের হাতে ধরা ছোট্ট পান্নার সূর্যমূর্তির দিকে তাকাল একবার। তারপর বিশাল জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে বলল, ‘হে নিঃসঙ্গ প্রহরী, আমার বন্ধু, তুমি ভাল থেকো!’

(গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কোনও ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে মিল থাকলে তা আকস্মিক।)

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%