বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোট্ট গ্রাম সুন্দরপুর৷
একটি নদীও আছে গ্রামের উত্তর প্রান্তে৷ মহকুমা থেকে বারো মাইল, রেল স্টেশন থেকেও সাত-আট মাইল৷
গ্রামের মুস্তফি বংশ একসময়ে সমৃদ্ধিশালী জমিদার ছিলেন, এখন তাঁদের অবস্থা আগের মতো না থাকলেও আশেপাশের অনেকগুলি গ্রামের মধ্যে তাঁরাই এখনও পর্যন্ত বড়োলোক বলে গণ্য, যদিও ভাঙা পুজোর দালানে আগের মতো জাঁকজমকে এখন আর পুজো হয় না-প্রকাণ্ড বাড়ির যে মহলগুলোর ছাদ খসে পড়েছে গত বিশ-ত্রিশ বছরের মধ্যে, সেগুলো মেরামত করবার পয়সা জোটে না, বাড়ির মেয়েদের বিবাহ দিতে হয় কেরানি পাত্রদের সঙ্গে-অর্থের এতই অভাব৷
সুশীল এই বংশের ছেলে৷ ম্যাট্রিক পাশ করে বাড়ি বসে আছে-বড়ো বংশের ছেলে, তার পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ কখনো চাকুরি করেননি, সুতরাং বাড়ি বসে বাপের অন্ন ধ্বংস করুক, এই ছিল বাড়ির সকলেরই প্রচ্ছন্ন অভিপ্রায়৷
সুশীল তাই করেই আসছে অবিশ্যি৷
সুন্দরপুর গ্রামে ব্রাহ্মণ কায়স্থের বাস খুব বেশি নেই-আগে অনেক ভদ্র গৃহস্থের বাস ছিল, তাদের সবাই এখন বিদেশে চাকুরি করে-বড়ো বড়ো বাড়ি জঙ্গলাবৃত হয়ে পড়ে আছে৷
মুস্তফিদের প্রকাণ্ড ভদ্রাসনের দক্ষিণে ও পূর্বে তাঁদের দৌহিত্র রায় বংশ বাস করে৷ পূর্বে যখন মুস্তফিদের সমৃদ্ধির অবস্থা ছিল তখন বিদেশ থেকে কুলগৌরবসম্পন্ন রায়দের আনিয়ে কন্যাদান করে জমি দিয়ে এখানেই বাস করিয়েছিলেন এঁরা৷
কালের বিপর্যয় সেই রায় বংশের ছেলেরা এখন সুশিক্ষিত ও প্রায় সকলেই বিদেশে ভালো চাকুরি করে৷ নগদ টাকার মুখ দেখতে পায়-বাড়ি কেউ বড়ো একটা আসে না-যখন আসে তখন খুব বড়ো-মানুষি চাল দেখিয়ে যায়৷ পদে পদে মাতুল বংশের ওপর টেক্কা দিয়ে চলাই যেন তাদের দু-এক মাস স্থায়ী পল্লিবাসের সর্বপ্রধান লক্ষ্য৷
আশ্বিন মাস৷ পুজোর বেশিদিন দেরি নেই৷
অঘোর রায়ের বড়ো ছেলে অবনী সস্ত্রীক বাড়ি এসেছে৷ শোনা যাচ্ছে দুর্গোৎসব না করলেও অবনী এবার ধুমধামে নাকি কালীপুজো করবে৷ অবনী সরকারি দপ্তরে ভালো চাকুরি করে৷ অবনীর বাবা অঘোর রায় ছেলের কাছেই বিদেশে থাকেন৷ তিনি এসময় বাড়ি আসেননি, তাঁর মেজো ছেলে অখিলের সঙ্গে পুরী গিয়েছেন৷ অখিল যেন কোথাকার সাব ডেপুটি-পনেরো দিন ছুটি নিয়ে স্ত্রী-পুত্র ও বৃদ্ধ পিতাকে নিয়ে বেড়াতে বার হয়েছে৷
সুশীল অবনীদের বৈঠকখানায় বসে এদের চালবাজির কথা শুনছিল অনেকক্ষণ থেকে৷
অবনী বললে, মামা, তোমাদের বড়ো শতরঞ্চি আছে?
-একখানা দালানজোড়া শতরঞ্জি তো ছিল জানি-কিন্তু সেটা ছিঁড়ে গিয়েছে জায়গায় জায়গায়৷
-ছেঁড়া শতরঞ্চি আমার চলবে না৷ তাহলে কলকাতায় লোক পাঠিয়ে ভালো একখানি বড়ো শতরঞ্জি কিনে আনি, বন্ধুবান্ধব পাঁচজনে আসবে, তাদের সামনে বার করার উপযুক্ত হওয়া চাই তো৷ বড়ো আলো আছে?
-বাতির ঝাড় ছিল, এক-এক থাকে কাচ খুলে গিয়েছে- তাতে চলে তো নিয়ো৷
-তোমাদের তাতেই কাজ চলে?
-কেন চলবে না? দেখায় খুব ভালো৷ তা ছাড়া দুর্গোৎসবের কাজ দিনমানেই বেশি-রাত্রে আরতি হয়ে গেলেই আলোর কাজ তো মিটে গেল৷
-আমার ডে-লাইটের ব্যবস্থা করতে হবে দেখছি৷ কালীপুজোর রাতের আলোর ব্যবস্থা একটু ভালোরকম থাকা দরকার৷ ইলেকট্রিক আলোয় বারো মাস বাস করা অভ্যেস, সত্যি পাড়াগাঁয়ে এসে এমন অসুবিধে হয়!
বৃদ্ধ সত্যনারায়ণ গাঙ্গুলি তাঁর ছোটো ছেলের একটা চাকুরির জন্যে অবনীর কাছে ক-দিন ধরে হাঁটাহাঁটি করে একটু-অবিশ্যি খুব সামান্যই একটু-ভরসা পেয়েছিলেন, তিনি অমনি বলে উঠলেন-তা অসুবিধে হবে না? বলি তোমরা বাবাজি কীরকম জায়গায় থাকো, কী ধরনে থাকো-তা আমার জানা আছে তো৷ গঙ্গাচানের যোগে কলকাতা গেলেই তোমাদের ওখানে গিয়ে উঠি, আর সে কী যত্ন! ঃও ইলেকটিরি আলো না হলে কি বাবাজি তোমাদের চলে?
সুশীল কলকাতায় দু-একবারমাত্র গিয়েছে-আধুনিক সভ্যতার যুগের নতুন জিনিসই তার অপরিচিত-শিক্ষিত ও শহুরে বাবু অবনীর সঙ্গে ভয়ে ভয়ে কথা বলতে হয়৷
তবুও সে বললে, ডে-লাইটের চেয়ে কিন্তু ঝাড়লন্ঠন দেখায় ভালো-
অবনী হেসে গড়িয়ে পড়ে আর কি!
-ওহে যে যুগে জমিদারপুত্রেরা নিষ্কর্মা বসে থাকত আর হাতিতে চড়ে জরদগবের মতো ঘুরে বেড়াত-ওসব চাল ছিল সেকালের৷ মডার্ন যুগে ওসব অচল, বুঝলে মামা? এ হল প্রগতির যুগ-হাতির বদলে এসেছে ইলেকট্রিক লাইট-সেকালকে আঁকড়ে বসে থাকলে চলবে?
বনেদি পুরোনো আমলের চালচলনে আবাল্য অভ্যস্ত সুশীল৷ বয়সে যুবক হলেও প্রাচীনের ভক্ত৷
সে বললে, কেন, হাতি চড়াটা কী খারাপ দেখলে?
-রামোঃ? জবড়জং ব্যাপার! হাতির মতো মোটা জানোয়ারের ওপর বসে থাকা পেটমোটা নাদুস-নুদুস-
সত্যনারায়ণ গাঙ্গুলি বললেন, গোবর-গণেশ-
-জমিদারছেলেরই শোভা পায়, কিন্তু কাজে যারা ব্যস্ত, সময় যাদের হাতে কম, দিনে যাদের ত্রিশ মাইল চক্কর দিয়ে বেড়াতে হয় নিজের কাজে বা আপিসের কাজে-তাদের পক্ষে দরকার মোটরবাইক বা মোটরকার৷ স্মার্ট যারা-তাদের উপযুক্ত যানই হচ্ছে-
সুশীল প্রতিবাদ করে বললে, স্মার্ট কারা জানিনে; মোগল বাদশাহের সময় আকবর আওরঙ্গজেবের মতো বীর হাতিতে চড়ে যুদ্ধ করত-তারা স্মার্ট হল না-তোমাদের কলকাতার আদ্দির পাঞ্জাবি-পরা চশমা-চোখে ছোকরাবাবুর দল, যারা বাপের পয়সায় গড়ের মাঠে হাওয়া খায়-কিংবা শখে পড়ে দু-দশ কদম মোটর ড্রাইভ করে, তারা? অত বড়ো সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিল চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, তারা হাতি চড়ে যুদ্ধ করত, পুরুরাজ হাতির পিঠে চড়ে আলেকজান্ডারের গ্রিক বাহিনীর বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিল-তারা স্মার্ট ছিল না, স্মার্ট হল সিনেমার ছোকরা অ্যাক্টরের দল?
সুশীল সেখান থেকে উঠে চলে এল৷ অবনীর ধরনধারণ তার ভালো লাগেনি-দূর সম্পর্কের মামা-ভাগনে কোনোকালের দৌহিত্র বংশের লোক, এই পর্যন্ত৷ এখন তাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কী যোগ আছে?-কিছুই না৷ জমিদারের ছেলেদের ওপর অবনীর এ কটাক্ষ, সুশীলের মনে হল তাকে লক্ষ করেই করা হয়েছে৷
তা করতে পারে-এরা এখন সব হঠাৎ-বড়োলোকের দল, পুরোনো বংশের ওপর এদের রাগ থাকা অসম্ভব নয়৷
সুশীল জমিদারপুত্র বটে, নিষ্কর্মাও বটে৷ বসে খেতে খেতে দিনকতক পরে পেটমোটা হয়েও উঠবে-এ বিষয়েও নিঃসন্দেহ৷ অবনী তাকে লক্ষ করেই বলেছে নিশ্চয়ই৷
বাড়ি এসে সুশীল জ্যাঠামশায়কে জিজ্ঞেস করলে, আচ্ছা জ্যাঠামণি, আমাদের বংশে কখনো কেউ চাকরি করেছে?
জ্যাঠামশায় তারাকান্ত মুস্তফির বয়স সত্তরের কাছাকাছি৷ তিনি পুজোর দালানের সঙ্গে ছোটো কুঠরিতে সারাদিন বৈষয়িক কাগজপত্র দেখেন এবং মাঝে মাঝে গীতা পাঠ করেন৷ ঘরটার কুলুঙ্গিতে ও দেওয়ালের গায়ের তাকে গত পঞ্চাশ বছরের পুরোনো পাঁজি সাজানো৷ তারাকান্ত বললেন, কেন বাবা সুশীল? এ বংশে কারও কোনো ভাবনা ছিল যে চাকুরি করবে?
-ছেলেরা কী করত জ্যাঠামণি?
-পায়ের ওপরে পা দিয়ে বসে খেয়ে আমাদের পুরুষানুক্রমে চলে আসছে-তবে আজকাল বড়ো খারাপ সময় পড়েছে, জমিজমাও অনেক বেরিয়ে গেল-তা যা-হয় একটু কষ্ট যাচ্ছে৷ কী আবার করবে কে? ওতে আমাদের মান যায়৷
সুশীল কথাটা ভেবে দেখলে অবসর সময়ে৷ অবনীর কথাগুলো হিংসেতে ভরা ছিল এখন দেখা যাচ্ছে৷ অবনীদের বাইরে বেরিয়ে চাকুরি না করলে চলে না-আর তাদের চিরকাল চলে আসছে বাড়ি বসে-এতে অবনীর হিংসের কথা বই কী৷
মামার বাড়ি খেয়ে চিরকাল ওরা মানুষ৷ আজ হঠাৎ বড়োলোক হয়ে চাল দেওয়া কথাবার্তায় সেই মাতুল বংশকেই ছোটো করতে চায়৷
সুশীল এর প্রমাণ অন্য একদিক থেকে খুব শিগগিরই পেলে৷ মুস্তফিদের সাবেকি পুজোর মণ্ডপে দুর্গোৎসব টিমটিম করে সমাধা হল-লোকের পাতে ছেঁচড়া, কলাইয়ের ডাল, খেতের রাঙা নাগরা চালের ভাত, পুকুরের মাছ, জোলো দুধোলো দই ও চিনির ডেলা গোলা মণ্ডা খাইয়ে-কিন্তু অবনীদের বাড়ি যে কালীপুজো হল- সে একটা দেখবার জিনিস৷
কালীপুজোর রাত্রে গাঁসুদ্ধ পোলাও মাংস, কলকাতা থেকে আনা দই রাবড়ি সন্দেশ খেলে৷ টিন টিন দামি সিগারেট নিমন্ত্রিতদের মধ্যে বিলি হল৷ পরদিন দুপুরে যাত্রা ও ভাসানের রাত্রে প্রীতি সম্মেলনে প্রচুর জলযোগের ব্যবস্থা ছিল৷ অবনীর এক বন্ধু আবার ম্যাজিক লন্ঠনের স্লাইড দেখিয়ে স্বাস্থ্য সম্বন্ধে এক বক্তৃতাও করলে৷ গ্রামের লোক সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগল৷ এ গাঁয়ে এমনটি আর কখনো হয়নি-কেউ দেখেনি! সকলের মুখে অবনীর সুখ্যাতি৷
কিন্তু তাতে কোনো ক্ষতি ছিল না, যদি তারা সেইসঙ্গে অমনি মুস্তফি জমিদারদের ছোটো করে না দিত৷
-নাঃ, মুস্তফিরা কখনো এদের সঙ্গে দাঁড়ায়? বলে-কীসে আর কীসে!
-যা বলেছ ভায়া! নামে তালপুকুর, ঘটি ডোবে না-
-শুধু লম্বা লম্বা কথা আছে-আর কিছু নেই রে ভাই৷
এধরনের একটা কথা একদিন সুশীলের নিজের কানেই গেল৷ নিজের পুকুরের ঘাটে বসে সুশীল ছিপে মাছ ধরছে, গাঁয়ের ওর পরিচিত দু-টি ভদ্রলোক কথা বলতে বলতে পথ দিয়ে যাচ্ছেন৷ একজন বললেন, মুস্তফিদের ওপর এবার খুব একহাত নিয়েছে অবনী৷ অপরজন বললে, তার মানে মুস্তফিদের আর কিছু নেই৷ সব ছেলেগুলো বাড়ি বসে বসে খাবে, আজকালকার দিনে কি আর সেকেলে বনেদি চাল চলে? লেখাপড়া তো একটা ছেলেও ভালো করে শিখলে না-
-লেখাপড়া শিখেও তো ওই সুশীলটা বাপের হোটেলে দিব্যি বসে খাচ্ছে-ওদের কখনো কিছু হবে না বলে দিলাম৷ যত সব আলসে আর কুঁড়ে৷
কথাটা সুশীলের মনে লাগল৷ এদিক থেকে সে কোনোদিন নিজেকে বিচার করে দেখেনি৷ চিরকাল তো এইরকম হয়ে আসছে তাদের বংশে, এতদিন কেউ কিছু বলেনি, আজকাল বলে কেন তবে?
পাশের গ্রামে সুশীলের এক বন্ধু থাকত, সুশীল তার সঙ্গে গিয়ে দেখা করলে৷ ছেলেটির নাম প্রমথ, তার বাবা একসময়ে মুস্তফিদের স্টেটের নায়েব ছিলেন, কিন্তু তারপর চাকুরি ছেড়ে মাল-চালানি ব্যাবসা করে অবস্থা ফিরিয়ে ফেলেছেন৷
প্রমথ বেশ বুদ্ধিমান ও বলিষ্ঠ যুবক৷ সে নিজের চেষ্টায় গ্রামে একটা নৈশ স্কুল করেছে, একটা দরিদ্র-ভাণ্ডার খুলেছে-তার পেছনে গ্রামের তরুণদের যে দলটি গড়ে উঠেছে-গ্রামের মঙ্গলের জন্যে তারা না করতে পারে এমন কাজ নেই৷ সম্প্রতি প্রমথ বাবার আড়তে বেরুতে আরম্ভ করেছে৷
সুশীল বললে, প্রমথ, আমাকে তোমাদের আড়তে কাজ শেখাবে?
প্রমথ আশ্চর্য হয়ে ওর দিকে চেয়ে বললে, কেন বলো তো? হঠাৎ একথা কেন তোমার মুখে?
-বসে বসে চিরকাল বাপের ভাত খাব?
-তোমাদের বংশে কেউ কখনো অন্য কাজ করেনি, তাই বলছি৷ হঠাৎ এ মতিবুদ্ধি ঘটল কেন তোমার?
-সে বলব পরে৷ আপাতত একটা হিল্লে করে দাও তো!
-ওর মধ্যে কঠিন আর কী৷ যেদিন ইচ্ছে এসো, বাবার কাছে নিয়ে যাব৷
মাসখানেক ধরে সুশীল ওদের আড়তে বেরুতে লাগল৷ কিন্তু ক্রমশ সে দেখলে, ভুসি মাল-চালানির কাজের সঙ্গে তার অন্তরের যোগাযোগ নেই৷ তার বাবা ছেলেকে আড়তে যোগ দিতে বাধা দেননি, বরং বলেছিলেন ব্যাবসার কাজে যদি কিছু টাকা দরকার হয়, তাও তিনি দেবেন৷
একদিন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আড়তের কাজ কীরকম হচ্ছে?
সুশীল বললে, ও ভালো লাগে না, তার চেয়ে বরং ডাক্তারি পড়ি৷
-তোমার ইচ্ছে৷ তাহলে কলকাতায় গিয়ে দেখে শুনে এসো৷
কলকাতায় এসে সুশীল দেখলে, ডাক্তারি স্কুলে ভরতি হবার সময় এখন নয়৷ ওদের বছর আরম্ভ হয় জুলাই মাসে-তার এখনও তিন-চার মাস দেরি৷ সুশীলের এক মামা খিদিরপুরে বাসা করে থাকতেন, তাঁর বাসাতেই সুশীল এসে উঠেছিল-তাঁরই পরামর্শে সে দু-একটা আপিসে কাজের চেষ্টা করতে লাগল৷
দিন-পনেরো অনেক আপিসে ঘোরাফেরা করেও সে কোথাও কোনো কাজের সুবিধে করতে পারলে না-এদিকে টাকা এল ফুরিয়ে৷ মামার বাসায় খাবার খরচ লাগত না অবিশ্যি, কিন্তু হাতখরচের জন্যে রোজ একটি টাকা দরকার৷ বাবার কাছে সে চাইবে না-নগদ টাকার সেখানে বড়ো টানাটানি, সে জানে৷ একটা কিছু না করে এবার বাড়ি ফিরবার ইচ্ছে নেই তার৷ অথচ করাই-বা যায় কী? সন্ধ্যার দিকে গড়ের মাঠে বসে রোজ ভাবে৷
সুশীল সেদিন গড়ের মাঠের একটা নির্জন জায়গায় বসেছিল চুপ করে৷ বড্ড গরম পড়ে গিয়েছে-খিদিরপুরে তার মামার বাসাটিও ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের চিৎকার ও উপদ্রবে সদা সরগরম-সেখানে গিয়ে একটা ঘরে তিন-চারটি আট-দশ বছরের মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে রাত কাটাতে হবে৷ সুশীলের ভালো লাগে না আদৌ৷ তাদের অবস্থা এখন খারাপ হতে পারে, কিন্তু দেশের বাড়িতে জায়গার কোনো অভাব নেই৷
ওপরে-নীচে বড়ো বড়ো ঘর আছে-লম্বা লম্বা দালান, বারান্দা-পুকুরের ধারের দিকে বাইরের মহলে এত বড়ো একটা রোয়াক আছে যে, সেখানে অনায়াসে একটা যাত্রার আসর হতে পারে৷
এমন সব জ্যোৎস্নারাতে কতদিন সে পুকুরের ধারে ওই রোয়াকটায় একা বসে কাটিয়েছে৷ পুকুরের ওপারে নারিকেল গাছের সারি, তার পেছনে রাধাগোবিন্দের মন্দিরের চুড়োটা, সামনের দিকে ওর ঠাকুরদাদার আমলের পুরোনো বৈঠকখানা৷ এ বৈঠকখানায় এখন আর কেউ বসে না-কাঠ ও বিচুলি, শুকনো তেঁতুল, ভুসি, ঘুঁটে ইত্যাদি রাখা হয় বর্ষাকালে৷
মাঝে মাঝে সাপ বেরোয় এখানে৷
সেবার ভাদ্রমাসে তালনবমীর ব্রতের ব্রাহ্মণ ভোজন হচ্ছে পুজোর দালানে, হঠাৎ একটা চ্যাঁচামেচি শোনা গেল পুকুরপাড়ের পুরোনো বৈঠকখানার দিক থেকে৷
সবাই ছুটে গিয়ে দেখে, হরি চাকর বৈঠকখানার মধ্যে ঢুকেছিল বিচালি পাড়বার জন্যে-সেই সময় কী সাপে তাকে কামড়েছে৷
হইহই হল৷ লোকজন এসে সারা বৈঠকখানার মালামাল বার করে সাপের খোঁজ করতে লাগল৷ কিছু দেখা গেল না৷ হরি চাকর বললে সে সাপ দেখেনি, বিচুলির মধ্যে থেকে তাকে কামড়েছে৷
ওঝার জন্যে রানিনগরে খবর গেল৷ রানিনগরের সাপের ওঝা তিনটে জেলার মধ্যে বিখ্যাত-তারা এসে ঝাড়ফুঁক করে হরিকে সে-যাত্রা বাঁচালে৷ লোকজন খুঁজে সাপও বের করলে-প্রকাণ্ড খয়ে-গোখরে৷ হরি যে বেঁচে গেল, তার পুনর্জন্ম বলতে হবে৷
-বাবু, ম্যাচিস আছে-ম্যাচিস?
সুশীল চমকে মাথা তুলে দেখলে, একটি কালোমতো লোক৷ অন্ধকারে ভালো দেখা গেল না৷ নিম্নশ্রেণির অশিক্ষিত অবাঙালি লোক বলেই সুশীলের ধারণা হল-কারণ তারাই সাধারণত দেশলাইকে 'ম্যাচিস' বলে থাকে৷
সুশীল ধূমপান করে না, সুতরাং সে দেশলাইও রাখে না৷ সেকথা লোকটাকে বলতে সে চলেই যাচ্ছিল-কিন্তু খানিকটা গিয়ে আবার অন্ধকারের মধ্যে যেন কী ভেবে ফিরে এল৷
সুশীলের একটু ভয় হল৷ লোকটিকে এবার সে ভালো করে দেখে নিয়েছে অস্পষ্ট অন্ধকারের মধ্যে৷ বেশ সবল, শক্ত হাত-পাওয়ালা চেহারা-গুন্ডা হওয়া বিচিত্র নয়৷ সুশীলের পকেটে বিশেষ কিছু নেই-টাকা-তিনেক মাত্র৷ সুশীল একটু সতর্ক হয়ে সরে বসল৷ লোকটা ওর কাছে এসে বিনীত সুরে বললে, বাবুজি, দু-আনা পয়সা হবে?
সুশীল বিনা বাক্যব্যয়ে একটা দু-আনি পকেট থেকে বের করে লোকটার হাতে দিলে৷ তাই নিয়ে যদি খুশি হয়, হোক না৷ এখন ও চলে গেলে যে হয়৷
চলে যাওয়ার কোনো লক্ষণ কিন্তু লোকটার মধ্যে দেখা গেল না৷ সে সুশীলের কাছেই এসে সকৃতজ্ঞ সুরে বলল, বহুত মেহেরবানি আপনার বাবু৷ আমার আজ খাওয়ার কিছু ছিল না, এই পয়সা লিয়ে হুটেলে গিয়ে রোটি খাব৷ বাবুজির ঘর কুথায়?
ভালো বিপদ দেখা যাচ্ছে৷ পয়সা পেয়ে তবুও নড়ে না যে! নিশ্চয় আরও কিছু পাবার মতলব আছে ওর মনে মনে৷ সুশীল চারিদিকে একবার তাকিয়ে দেখলে কাছাকাছি কেউ নেই৷ পকেটে টাকা তিনটে ছাড়া সোনার বোতামও আছে জামায়, হঠাৎ এখন মনে পড়ল৷
ও উত্তর দিলে, কলকাতাতেই বাড়ি, বালিগঞ্জে৷ আমার কাকা পুলিশে কাজ করেন কিনা, এদিকে রোজ বেড়াতে আসেন মোটর নিয়ে৷ এতক্ষণে এলেন বলে, রেড রোডে মোটর রেখে এখানেই আসবেন৷ আমি এখানে থাকি রোজ, উনি জানেন৷
-বেশ বাবু, আপনাকে দেখেই বড়ো ঘরানা বলে মনে হয়৷
সুশীলের মনে কৌতূহল হওয়াতে সে বললে, তুমি কোথায় থাক?
-মেটেবুরুজে বাবুজি৷
-কিছু করো নাকি?
-জাহাজে কাজ করতাম, এখন কাজ নেই৷ ঘুরি-ফিরি কাজের খোঁজে৷ রোটি জোগাড় করতে হবে তো?
লোকটার সম্বন্ধে কৌতূহল আরও বেড়ে উঠল৷ তা ছাড়া লোকটার কথাবার্তার ধরনে মনে হয় লোকটা খুব খারাপ ধরনের নয় হয়তো৷ সুশীল বললে, জাহাজে কতদিন খালাসিগিরি করছ?
-দশ বছরের কুছু ওপর হবে৷
-কোন কোন দেশে গিয়েছ?
-সব দেশে৷ যে দেশে বলবেন সে দেশে৷ জাপান লাইন, বিলেত লাইন, জাভা সুমাত্রার লাইন-এস. এস. পেনগুইন, এস. এস. গোলকুন্ডা-এস. এস. নলডেরা, পিয়োনোর বড়ো জাহাজ নলডেরা, নাম শুনেছেন?
'পিয়োনো' কী জিনিস, পল্লিগ্রামের সুশীল তা বুঝতে পারল না৷ না, ওসব শোনেনি৷
-তা বাবুজি, আপনার কাছে ছিপাব না৷ সরাব পিয়ে পিয়ে কাজটা খারাবি হয়ে পড়ল, জাহাজ থেকে ডিসচার্জ করে দিলে৷ এখন এই কোষ্টো যাচ্ছে, মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারিনি৷ কী করব, নসিব বাবুজি!
-জাহাজের কাজ আবার পাবে না?
-পাব বাবুজি, ডিসচার্জ সাটিক-ফিটিক ভালো আছে৷ সরাব-টরাবের কথা ওতে কিছু নেই৷ কাপ্তানটা ভালো লোক, তাকে কেঁদে গোড়-পাকড়ে বললাম-সাহেব, আমার রোটি মেরো না৷ ওকথা লিখো না!
লোকটি আর একটু কাছে এসে ঘেঁষে বসল৷ বললে, আমার নসিব খারাপ বাবু-নয় তো আমার আজ চাকরি করে খেতে হবে কেন? আজ তো আমি রাজা!
সুশীল মৃদু কৌতূহলের সুরে জিজ্ঞাসা করলে, কীরকম?
লোকটি এদিক-ওদিক চেয়ে সুর নামিয়ে বললে, আজ আর বলব না৷ এইখানে কাল আপনি আসতে পারবেন?
-কেন পারব না?
-তাই আসবেন কাল৷ আচ্ছা বাবু, আপনি পুরোনো লিখা পড়তে পারেন?
সুশীল একটু আশ্চর্য হয়ে ওর মুখের দিকে চেয়ে বললে, কী লেখা?
-সে কাল বাৎলাব৷ আপনি কাল এখানে আসবেন, তবে বেলা থাকতে আসবেন-সুরজ ডুবার আগে৷
মামার বাসায় এসে কৌতূহলে সুশীলের রাতে চোখে ঘুমই এল না৷ এক-একবার তার মনে হল, জাহাজি মাল্লা কত দূর কত দেশ ঘুরেছে, কোনো এক আশ্চর্য ব্যাপারের কথা কী তাকে বলবে? কোনো নতুন দেশের কথা? পুরোনো লেখা কীসের? . . .
ওর ছোটো মামাতো ভাই সনৎ ওর পাশেই শোয়৷ গরমে তারও চোখে ঘুম নেই৷ খানিকটা উশখুশ করার পরে সে উঠে সুইচ টিপে আলো জ্বাললে৷ বললে, দাদা চা খাবে? চা করব?
-এত রাত্তিরে চা কী রে?
-কী করি বলো৷ ঘুম আসছে না চোখে-খাও একটু চা৷
সনৎ ছেলেটিকে সুশীল খুব পছন্দ করে৷ কলেজে ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র, লেখাপড়াতেও ভালো; ফুটবল খেলায় এরই মধ্যে বেশ নাম করেছে, কলেজ টিমের বড়ো বড়ো ম্যাচে খেলবার সময় ওকে ভিন্ন চলে না৷
সনৎ-এর আর একটা গুণ, ভয় বলে কোনো জিনিস নেই তার শরীরে৷ মনে হয় দুনিয়ার কোনো কিছুকে সে গ্রাহ্য করে না৷ দু-বার এই স্বভাবের দোষে তাকে বিপদে পড়তে হয়েছিল, একবার খেলার মাঠে এক সার্জেন্টের সঙ্গে মারামারি করে, নিজে তাতে মার খেয়েছিলও খুব-মার দিয়েছিল সেবার৷ ওর বাবা টাকাকড়ি খরচ করে ওকে জেলের দরজা থেকে ফিরিয়ে আনেন৷ আর একবার মাহেশের রথতলায় একটি মেয়েকে গুন্ডাদের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে গুন্ডার ছুরিতে প্রায় প্রাণ গিয়েছিল আর কি৷ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক যুবকদল, ওকে গুন্ডাদের মাঝখান থেকে টেনে উদ্ধার করে আনে!
সুশীল বললে, সনৎ, কতদূর লেখাপড়া করবি ভাবছিস?
-দেখি দাদা৷ বি.এসসি. পর্যন্ত পড়ে একটা কারখানায় ঢুকে কাজ শিখব৷ কলকবজার দিকে আমার ঝোঁক, সে তো তুমি জানোই-
-আমি যদি কোনো ব্যবসায় নামি, আমার সঙ্গে থাকবি তুই?
-নিশ্চয়ই থাকব৷ তুমি যেখানে থাকবে, যা করবে-আমি তাতে থাকি, এ আমার বড়ো ইচ্ছে কিন্তু৷ কী ব্যাবসা করবে ভাবছ দাদা?
-আচ্ছা কাউকে এখন এসব কিছু বলিসনে৷ তোকে আমি জানাব ঠিক সময়ে৷ তোকে নইলে আমার চলবে না৷ চল আজ শুয়ে পড়ি-রাত দুটো বাজে-
পরদিন সুশীল গড়ের মাঠে নির্দিষ্ট জায়গাটিতে গিয়ে একা বসে রইল৷ বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল-তবুও লোকটির দেখা নেই৷
অন্ধকার নামল৷ আসবে না সে লোক? হয়তো নয়৷ কী একটা বলবে ভেবেছিল কাল, রাতারাতি তার মন ঘুরে গেছে৷
রাত আটটার সময় সুশীল উঠতে যাবে, এমন সময়ে পেছনে পায়ের শব্দ শুনে সে চেয়ে দেখলে৷
পরক্ষণেই তার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷
লোকটা ঠিক তার পেছনেই দাঁড়িয়ে৷
-সেলাম, বাবুজি! মাপ করবেন, বড়ো দেরি হয়ে গেল৷ এই দেখুন-লোকটার পায়ের ওপর দিয়ে ভারী একটা জিনিস চলে গিয়েছে যেন৷ সাদা কাপড়ের ব্যান্ডেজ বাঁধা-কিন্তু ব্যান্ডেজ রক্তে ভিজে উঠেছে৷
সুশীল বললে, ঃএ, কী হয়েছে পায়ে?
-এইজন্যেই দেরি হয়ে গেল বাবুজি৷ বাড়ি থেকে বেরিয়েছি, আর একটা ভারী হাতে ঠেলাগাড়ি পায়ের ওপর এসে পড়ল৷ দু-জন লোক ঠেলছিল, তাদের সঙ্গে মারামারি হয়ে গেল আমার সঙ্গের লোকদের৷
-বসো বসো৷ তোমার পায়ে দেখছি সাংঘাতিক লেগেছে! না এলেই পারতে!
-না এলে আপনি তো হারিয়ে যেতেন৷ আপনাকে আর পেতাম কোথায়? রিকশা করে এসেছি বাবুজি, দাঁড়াতে পারছিনে৷
লোকটা ঘাসের ওপর বসে পড়ল৷ বললে, আজ অন্ধকার হয়ে গিয়েছে বাবুজি, আজ কোনো কাজ হবে না৷
লোকটা কথা বলবে, সুশীল শুনবে৷ এতে দিনের আলোর কী দরকার, সুশীল বুঝতে পারলে না৷ বললে, কী কথা বলবে বলেছিলে-বলে যাও না৷
লোকটা ধীরে ধীরে চাপা গলায় অনেক কথা বললে- মোটামুটি তার বক্তব্য এই-
তার বাড়ি ছিল পশ্চিমে, কিন্তু অনেকদিন থেকে বাংলাদেশে আছে এবং বাঙালি খালাসিদের সঙ্গে কাজ করে বাংলা শিখেছে৷ লোকটা মুসলমান, ওর নাম জামাতুল্লা৷ একবার কয়েকজন তেলেগু লশকরের সঙ্গে সে একটা জাহাজে কাজ করে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের বিভিন্ন দ্বীপে নারকোল-কুচি বোঝাই দিয়ে নিয়ে যেত মাদ্রাজ থেকে৷ সেই সময় একবার তাদের জাহাজ ডুবো-পাহাড়ে ধাক্কা লেগে অচল হয়ে পড়ে৷ সৌরাবায়া থেকে তাদের কোম্পানির অন্য জাহাজ এসে তাদের জাহাজের মাল তুলে নিয়ে যাবার আগে সাতদিন ওরা সেইখানে পড়েছিল৷ একদিন সমুদ্রের বিষাক্ত কাঁকড়া খেয়ে জাহাজসুদ্ধ লোকের কলেরা হল৷
এইখানে সুশীল জিজ্ঞেস করলে, সবারই কলেরা হল?
-কেউ বাদ ছিল না বাবু৷ খাবার পাওয়া যেত না, পাহাড়ের একটা গর্তে কাঁকড়া পেয়ে সেদিন ওরা তাই ধরেছিল৷ ছোটো ছোটো-লাল কাঁকড়া৷
-তারপর?
-দু-জন বাদে বাকি সব সেই রাত্রে মারা গেল৷ বাবুজি, সে রাতের কথা ভাবলে এখনও ভয় হয়৷ সতেরোজন দিশি লশকর আর দু-জন ওলন্দাজ সাহেব-একজন মেট আর একজন ইঞ্জিনিয়ার-সেই রাত্রে সাবাড়৷ রইলাম বাকি কাপ্তান আর আমি৷
তারপর জাহাজে কাপ্তান ওকে বললে-মড়াগুলো টান দিয়ে ফেলে দাও জলে-
ও বললে-আমি মুর্দাফরাশ নই সাহেব, ও আমি ছোঁব না-
সাহেব ওকে গুলি করে মারতে এল৷ ও গিয়ে লুকোল ডেকের ঢাকনি খুলে হোল্ডের মধ্যে৷ সেই রাত্রে কাপ্তান সাহেব খুব মদ খেয়ে চিৎকার করে গান গাইছে-ও সেই সময় জাহাজের বোট খুলে নিয়ে নামাতে গেল৷
ডেভিট থেকে বোট নামাবার শব্দে সাহেবের মদের নেশা ভাঙলে না তাই নিস্তার-ডেকের ওপরে তখন দুটো মড়া পড়ে রয়েছে-মরণের বীজ জাহাজের সর্বত্র ছড়ানো, ভয়ে ও কিছু খায়নি সকাল থেকে, পাছে কলেরা হয়৷ সুতরাং অনাহারে ও ভয়ে খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে৷
দূরে ডাঙা দেখা যাচ্ছিল, দুপুরের দিকে ও লক্ষ করেছিল৷ সারারাত নৌকো বাইবার পর ভোরে এসে বোট ডাঙায় লাগল৷ ও নেমে দেখে ডাঙায় ভীষণ জঙ্গল, ওদেশের সব দ্বীপেই এধরনের জঙ্গল-ও জানত৷ লোকজনের চিহ্ন নেই কোনোদিকে৷
বোট ডাঙায় বেঁধে ও জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দু-দিন হাঁটলে, শুধু গাছের কচি পাতা আর একধরনের অম্ল-মধুর ফল খেয়ে৷ মানুষের বসতির সন্ধানে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে জঙ্গলের মধ্যে একজায়গায় এসে হঠাৎ একেবারে ও অবাক হয়ে গেল৷
ওর সামনে প্রকাণ্ড বড়ো সিংহদরজা-কিন্তু বড়ো বড়ো লতাপাতা উঠে একেবারে ঢেকে ফেলে দিয়েছে৷ সিংহদরজার পর একটা বড়ো পাঁচিলের খানিকটা-আরও খানিক গিয়ে একটা বড়ো মন্দির, তার চুড়ো ভেঙে পড়েছে-মন্দিরের গায়ে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি বলে তার মনে হল৷ সে ভারতের লোক, হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি সে চেনে৷ এক্ষেত্রে হয়তো সে ঠিক চিনতে পারেনি, তবে তার ওইরকম বলেই মনে হয়েছিল৷

অবাক হয়ে সে আরও ঘুরে ঘুরে দেখলে৷ জায়গাটা একটা বহুকালের পুরোনো শহরের ভগ্নস্তূপ মনে হল৷ কত মন্দির, কত ঘর, কত পাথরের সিংহদরজা, গভীর বনের মধ্যে বড়ো বড়ো কাছির মতো লতার নাগপাশ বন্ধনে জড়িয়ে কত যুগ ধরে পড়ে আছে৷ ভীষণ বিষধর সাপের আড্ডা সর্বত্র! একটা বড়ো ভাঙা মন্দিরে সে পাথরের প্রকাণ্ড বড়ো মূর্তি দেখেছিল-প্রায় আট-দশ হাত উঁচু৷
সন্ধ্যা আসবার আর বেশি দেরি নেই দেখে তার বড়ো ভয় হয়ে গেল৷ এসব প্রাচীনকালের নগর শহর-জিন পরির আড্ডা, তেলেগু লশকরেরা যাকে ওদের ভাষায় বলে 'বিহ্মমুনি'৷
বিহ্মমুনি বড়ো ভয়ানক জিন, হিন্দুদের পুরোহিত মারা যাওয়ার পর বিহ্মমুনি হয়৷ এই গহন অরণ্যের মধ্যে লোকহীন পরিত্যক্ত বহু প্রাচীন নগরীর অলিতে-গলিতে ঝোপে ঝোপে ধূম্রবর্ণ, বিকটাকার, কত যুগের বুভুক্ষু বিহ্মমুনির দল সন্ধ্যার অন্ধকার পড়বার সঙ্গেসঙ্গে শিকারের সন্ধানে জাগ্রত হয়ে উঠে হাঁক পাড়ে-ম্যায় ভুখা হুঁ! তাদের হাতের নাগালে পড়লে কি আর রক্ষে আছে? অতএব, এখান থেকে পালানোই একমাত্র বাঁচার পথ৷
সুশীল এক মনে শুনছিল; বললে, পালিয়ে গেলে কোথায়?
-সেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আবার দু-দিন তিন দিন ধরে হেঁটে সমুদ্রের ধারে পৌঁছোলাম৷ জাহাজে উঠব এসে-এই তখন খেয়াল৷
-আবার সেই মড়া-ভরতি জাহাজে কেন?
-বুঝলেন না বাবুজি? যদি জাহাজে উঠি, তবে তো দেশে পৌঁছুবার ঠিকানা মেলে৷ নয়তো সেই জংলি মুলুকে যাব কোথায়? চারিধারে সমুদ্র, যদি জাহাজ না পাই, তবে সেই জংলি মুলুকে না খেয়ে মরতে হবে, নয়তো জংলি লোকেরা খুন করে ফেলবে৷ বাবুজি, তখন এমন ডর, যে রাতে ঘুমুতে পারিনে৷ একদিন প্রকাণ্ড এক বনমানুষের হাতে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলাম-নসিবের জোর খুব৷ অমন ধরনের জানোয়ার যে দুনিয়ায় আছে-তা জানতাম না৷ গাছের ওপর একদল বনমানুষ ছিল, ধাড়িটা আমায় দেখতে পেলে না বাবুজি, দেখলে আর বাঁচতাম না৷
সুশীল মনে মনে একবার চিন্তা করে দেখলে-লোকটা মিথ্যা কথা বলচে না সত্যি বলচে, ওর এই বনমানুষের কথা তার একটা মস্ত বড়ো পরীক্ষা৷ সুশীল জন্তুজানোয়ার সম্বন্ধে কিছু কিছু পড়াশোনা করেছিল, বাড়িতে আগে নানারকম পাখি, বেজি, খরগোশ, শজারু ও বাঁদর পুষত৷ গাঁয়ের লোকে ঠাট্টা করে বলত- 'মুস্তফিদের চিড়িয়াখানা'৷ এ সম্বন্ধে ইংরাজি বইও নিজের পয়সায় কিনেছিল
ও বললে, কত বড়ো বনমানুষ?
-খুব বড়ো বাবুজি৷ ইন্দোরের পালোয়ান রামনকীব সিং-এর চেয়ে একটা বাচ্চার গায়ে জোর বেশি৷ নিজের আঁখসে দেখলাম৷
-কী করে দেখলে?
-ডাল ফাঁড়লে হাত আর পা দিয়ে ধরে! আমার মাথার ওপর গাছপালার ডালগুলো তো বনমানুষে বিলকুল ভরতি হয়ে গিয়েছিল৷
-তবে তো তুমি সুমাত্রা দ্বীপে কিংবা বোর্নিওতে গিয়েছিলে, কিংবা ওর কাছাকাছি কোনো ছোটো দ্বীপে৷ তুমি যে বনমানুষ বলছ, ও হচ্ছে ওরাং ওটাং৷ ও ছাড়া আর কোনো বনমানুষ ও দেশে থাকবে না-
লোকটা অত্যন্ত বিস্ময়ে সুশীলের মুখের দিকে চেয়ে বলে উঠল-দাঁড়ান-দাঁড়ান, বাবুজি, কী জায়গার নাম করলেন আপনি?
-সুমাত্রা আর বোর্নিও-
-ঃও, বাবুজি আপনি বহুত পড়ালেখা আদমি! এই নাম কতকাল শুনিনি জানেন? আজ দশ-বারো বছর৷ শেষের নামটা কী বললেন বাবুজি? বোর্নিও-ঠিক৷ সুলু-সির নাম জাহাজি চার্টে দেখবেন৷ সুলু-সির কাছাকাছি, এপার-ওপার৷ কেন জানেন বাবুজি? এই নাম শুনলে আমার বহুত কথা মনে পড়ে যায়৷ তাজ্জব কথা! আজ দেখছেন আমার এই গড়ের মাঠে বসে দু-একটা পয়সা ভিক্ষে করা-কিন্তু আমি আজ . . . আচ্ছা, সেকথা এখন থাক৷
-তারপর কী করলে বলো না! জঙ্গল থেকে এসে উঠলে আবার জাহাজে?
-হ্যাঁ, উঠলাম! সেই কাপ্তেন তখন মদ খেয়ে বেহুঁশ হয়ে নিজের কেবিনে চাবি দিয়ে ঘুমুচ্ছে, আমি আগে তো ভাবলাম- মরে গিয়েছে৷ মড়াগুলো কতক কাপ্তান ফেলে দিয়েছে, কতক তখনও রয়েছে৷ ভীষণ বদ গন্ধ-আর সেই গরম! আমি জাহাজের কিছু খেতে পারিনে কলেরার ভয়ে৷ ডাঙায় গিয়ে মাছ ধরতাম- আর কচ্ছপ৷
-কাপ্তেন বেঁচে ছিল?
-বেঁচে ছিল, কিন্তু বেচারির মগজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল একেবারে৷ তখনকার দিনে বেতার ছিল না, আমাদের জাহাজে যে অমন হয়ে গেল, সে খবর কোথাও দেওয়া যায়নি৷ ওসব দিকের সমুদ্রে জাহাজ বেশি চলাচল করে না-জাহাজের লাইন নয়৷ এগারো দিন পরে সৌরাবায়া থেকে জাহাজ যাচ্ছিল পাসারাপং, তারা আমাদের আগুন দেখে এসে জাহাজে তুলে নিয়ে বাঁচায়৷
-কীসের আগুন?
-ডুবো-পাহাড়ের খানিকটা ভাঁটার সময় বেরিয়ে থাকত৷ পাটের থলে জ্বালিয়ে সেখানে রোজ আগুন করতাম-অন্য জাহাজের যদি চোখে পড়ে৷ তাতেই তো বেঁচে গেলাম৷
এ পর্যন্ত শুনে সুশীল বুঝতে পারলে না লোকটার ভাগ্য কীসে ফিরেছিল৷ তবে লোকটা যে মিথ্যা কথা বলছে না, ওর কথার ধরন থেকে সুশীলের মনে হল৷ কিন্তু এইবার লোকটা যে কাহিনি বললে, তা শেষ পর্যন্ত শুনে সুশীল বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়ে গেল৷ অল্পক্ষণের জন্য সারা গড়ের মাঠ, এমনকী বিরাট কলকাতা শহরটাই যেন তার সমস্ত আলোর মালা নিয়ে তার চোখের সামনে থেকে গেল বেমালুম মুছে-বহু দূরের কোনো বিপদসংকুল নীল সমুদ্রে সে একা পাড়ি জমিয়েছে বহুকালের লুকোনো হিরে-মানিক-মুক্তোর সন্ধানে৷ পৃথিবীর কত পর্বতে, কন্দরে, মরুতে, অরণ্যে অজানা স্বর্ণরাশি মানুষের চোখের আড়ালে আত্মগোপন করে আছে-বেরিয়ে পড়তে হবে সেই লুকোনো রত্নভাণ্ডারের সন্ধানে-পুরুষ যদি হও! নয় তো আপিসের দোরে দোরে মেরুদণ্ডহীন প্রাণীদের মতো ঘুরে ঘুরে সেলাম বাজিয়ে চাকুরির সন্ধান করে বেড়ানোই যার একমাত্র লক্ষ্য, তার ভাগ্যে নৈব চ, নৈব চ৷
এই খালাসিটা হয়তো লেখাপড়া শেখেনি, হয়তো মার্জিত নয়, কিন্তু এ সপ্ত সমুদ্রে পাড়ি জমিয়ে এসেছে, দুনিয়ার মস্ত বড়ো বড়ো নগর বন্দর, বড়ো বড়ো দ্বীপ কিছু বাকি রাখেনি৷ এ একটা পুরুষমানুষ বটে-কত বিপদে পড়েছে, কত বিপদ থেকে উদ্ধার হয়েছে৷
বিপদের নামে ত্রিশ হাত পেছিয়ে থাকে যারা, গা বাঁচিয়ে চলবার ঝোঁক যাদের সারাজীবন ধরে, তাদের দ্বারা না ঘুচবে অপরের দুঃখ, না ঘুচবে তাদের নিজেদের দুঃখ৷ লক্ষ্মী যান না কাপুরুষের কাছে, অলসের কাছে৷ তিনি তাদের কৃপা করেন-যারা বিপদকে, বিলাসকে, আরামপ্রিয়তাকে তুচ্ছ বোধ করে৷
জাহাজ সৌরাবায়া এসে পৌঁছুবার সঙ্গেসঙ্গে ওদের দু-জনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল৷ সত্যিই ক্লান্তিতে, অনিদ্রায়, দুশ্চিন্তায়, অখাদ্য ভক্ষণে ওদের শরীর ভেঙে পড়েছিল৷ দিন পনেরো হাসপাতালে শুয়ে থাকবার পর ক্রমশ ওর শরীর ভালো হয়ে গেল-কাপ্তেনের মস্তিষ্ক-বিকৃতির লক্ষণও ক্রমে দূর হল৷
ওদের জন্য কিছু টাকা চাঁদা উঠেছিল৷ ও হাসপাতাল থেকে যেদি বাইরে পা দিলে, সেদিন এক দয়াবতী মেমসাহেব ওকে টাকাটা দিয়ে গেলেন৷ দুঃস্থ নাবিকদের থাকবার জন্যে গভর্নমেন্টের একটা বাড়ি আছে, সেখানে ওকে বিনি খরচায় থাকবার অনুমতি দেওয়া হল৷
এই বাড়িতে সে প্রায় দু-মাস ছিল, তারপর অন্য জাহাজে চাকরি নিয়ে ওখান থেকে চলে আসে৷ তারপর পাঁচ-সাত বছর কেটে গেল৷ ও যেমন জাহাজে কাজ করে তেমনি করে যাচ্ছে৷ প্রাচ্যদেশের বড়ো বড়ো বন্দরের মদের দোকান ও জুয়ার আড্ডার সঙ্গে তখন সে সুপরিচিত৷
একবার তাদের জাহাজ ম্যানিলাতে থেমেছে৷ ও অন্যান্য লশকরের সঙ্গে গিয়ে এক পরিচিত জুয়ার আড্ডায় উঠেছে, এমন সময়ে এক আড্ডাধারী এসে ওকে বললে, একবার এসো তো! তোমাদের দেশের একজন লোক তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়৷
ও অবাক হয়ে বললে, আমাদের দেশের?
আড্ডাধারী চীনাম্যান হেলে বললে, হ্যাঁ, ইন্ডিয়ার৷ এতকাল দোকান করছি বন্দরে, ইন্ডিয়ার মানুষ চিনিনে?
ও আড্ডাধারীর পিছু পিছু গিয়ে দেখলে-জুয়ার আড্ডার পেছনে একটা পায়রার খোপের মতো ছোটো ভীষণ নোংরা ঘরে একজন লোক শুয়ে৷ লোকটার বয়স কত ঠিক বোঝবার জো নেই- চল্লিশও হতে পারে, আবার ষাটও হতে পারে৷ বিছানার সঙ্গে যেন সে মিশে গিয়েছে বহুদিন ধরে অসুখে ভুগে৷
ওকে দেখে লোকটা ক্ষীণ কন্ঠে তেলেগু ভাষায় বললে, দেশের লোককে দেখতে পাইনে৷ যখন হংকং হাসপাতালে ছিলাম, অনেক দেশের লোক দেখতাম সেখানে৷ বসো এখানে! আহা, ভারতের লোক তুমি! মুসলমান? তা কী? এতদূর বিদেশে তুমি শুধু ভারতের লোক, যে দেশের মাটিতে আমার জন্ম, সেই একই দেশের মাটিতে তোমারও জন্ম৷ এখানে তুমি আমার ভাই৷
ও রোগীর বিছানার পাশে বসল! সেই অপরিচিত মুমূর্ষু স্বদেশবাসীকে দেখে ওর মনে একটা গভীর অনুকম্পা ও মমতা জেগে উঠল-যেন সত্যিই কতকালের আপনার জন৷
রোগী বললে, আমার নাম নটরাজন, ত্রিবেন্দ্রাম শহর থেকে এগারো মাইল দূরে কাটিউম্পা বলে ছোটো একটা গ্রামে আমার বাড়ি৷ কোচিন থেকে যে স্টিমলঞ্চ ছাড়ে ত্রিবেন্দ্রাম যাবার জন্যে, সে স্টিমার আমার গ্রামের ঘাট ছুঁয়ে যায়৷ বেউরা কাপ্পিয়াম নদীর ধারে, চারিধারে বন আর ছোটো পাহাড়-কেটিউম্পা গ্রাম তুমি দেখনি, বুঝতে পারবে না সে কী চমৎকার জায়গা! আমি অনেক দেশ বেড়িয়েছি পৃথিবীর, ভবঘুরে হয়ে চিরদিন কাটিয়ে দিলাম জীবনটা-কিন্তু আমি তোমায় বলছি শোনো, ভারতবর্ষের মধ্যে তো বটেই, এমনকী পৃথিবীর মধ্যে ত্রিবাঙ্কুর একটি অদ্ভুত সুন্দর দেশ৷ কিন্তু আমার দেশের বর্ণনা শোনাবার জন্যে আজ তোমায় ডাকিনি৷ আমার দিন শেষ হয়ে এসেছে, কাল যে সূর্যদেব উঠবে আকাশে, তা আমি চোখে বোধ হয় দেখতে পাব না-তুমি আমার দেশবাসী ভাই, একটা উপকার করবে আমার?
-কী বলুন? আপনি আমার চাচার বয়সি, যা হুকুম করবেন-বলুন৷ সম্ভব হলে নিশ্চয়ই করব৷
রোগীর পাণ্ডুর মুখ অল্পক্ষণের জন্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠল-নিবু নিবু প্রদীপের শিখার মতো৷ ওর দিকে গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে বললে, কথা দিলে? কিন্তু ভীষণ লোভ দমন করতে হবে ভাই!
-আল্লার নামে বলছি, যা করতে বলবেন-তাই করব৷
-আমার মাথার বালিশের তলায় একটা চামড়ার ব্যাগ আছে, সেটা বার করে নাও৷ আমার মৃত্যুর পরে ব্যাগটা আমার গ্রামে আমার স্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেবে৷
ও রোগীর মাথাটা সন্তর্পণে একধারে সরিয়ে আস্তে আস্তে একটা ছোটো চামড়ার ব্যাগ বার করলে৷ ব্যাগের মধ্যে কতগুলো কাগজপত্র ছাড়া আর কিছু আছে বলে মনে হয় না ওর৷
বৃদ্ধ নটরাজন বললে, তোমার কাছে আমি কোনো কথা লুকোব না৷ ব্যাগটার মধ্যে একখানা ম্যাপ আছে-জীবনে অনেক সাহসের কাজ করেছি, অনেক বনে-জঙ্গলে ঘুরেছি-অনেকরকম লোকের সঙ্গে মিশেছি৷ এই ম্যাপখানা এবং ব্যাগের মধ্যে যা যা আছে-তা আমি সৎপথে হস্তগত করিনি৷ সংক্ষেপে কথাটা বলে নিই, কারণ বেশি বলবার আমার সময় বা শক্তি নেই৷ আজ বিশ-বাইশ বছর আগে এই ব্যাগ আমার হস্তগত হয়৷ যে ম্যাপখানা এই ব্যাগের মধ্যে আছে, তার সাহায্যে যেকোনো লোক দুনিয়ার মহা ধনী লোক হয়ে যেতে পারে৷ সুলু-সির একটা খাঁড়ির ধারে নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে প্রাচীন আমলের এক নগরের ভগ্নস্তূপ আছে৷ সেই নগর প্রাচীন যুগের এক হিন্দু রাজ্যের রাজধানী ছিল৷ তার এক জায়গায় প্রচুর ধনরত্ন লুকানো আছে৷ যার কাছ থেকে এ ম্যাপ আমি পাই, সে আমারই বন্ধু, দু-জনে মিলে সুলু সমুদ্রে বোম্বেটেগিরি করেছি, দশ বছর ধরে৷ সে জাতিতে মালয়, ম্যাপ তার তৈরি-সে নিজে ওই শহরের সন্ধান খুঁজে বার করেছিল৷ সেখানে নিজের প্রাণ বিপন্ন করে, সামান্য কিছু পাথর ছাড়া সে বেশি কোনো জিনিস আনতে পারেনি সেখান থেকে৷ তার নিজের লেখা জাহাজের লগ বুকের (Log Book) কয়েকখান পাতা আমি মালয় ভাষা থেকে নিজের সুবিধের জন্যে ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়ে নিই সৌরাবায়াতে এক গরিব মালয় স্কুল মাস্টারকে ধরে৷ সেই অনুবাদের কাগজখানাও এই ব্যাগের মধ্যে আছে৷ তারপর ম্যাপখানা হস্তগত করে আমি নিজে অনেক খোঁজাখুঁজি করি-কিন্তু সুলু সমুদ্র ও ওদিকের বহুশত বসতিহীন ও বসতিযুক্ত ছোটো ও বড়ো দ্বীপ-তাদের প্রত্যেকটিতে ভীষণ জঙ্গল৷ ম্যাপও যা আছে, তা খুব নিখুঁত নয়-মোটের উপর সে দ্বীপ আমি বার করতে পারিনি৷ দেশের গ্রামে আমার ছেলে আছে, তাকে নিয়ে গিয়ে ম্যাপটা আর ব্যাগ দিয়ো৷ এর মধ্যে আর একটা জিনিস আছে-আমার বোম্বেটে বন্ধু সেই প্রাচীন শহরে একটা জিনিস পায়৷ জিনিসটা একটা সিলমোহর বলেই মনে হয়৷ একখানা গোটা পদ্মরাগ মণির ওপর সিলমোহরটা খোদাই করা৷ সেটাও এর মধ্যে আছে৷ সেই মোহরের ওপর যে অদ্ভুত চিহ্নটি আঁকা আছে-আমার বিশ্বাস ছিল, সেটা একটা বড়ো হদিস ওই প্রাচীন নগরীর রত্নভাণ্ডারের৷ তাই ওখানা আমি কবচের মতো গলায় ঝুলিয়ে বেড়িয়েছি এতদিন৷ কিন্তু আজ বুঝেছি আমার দিন শেষ হয়ে এসেছে৷ উনিশ বছর আগে গ্রাম থেকে যখন চলে আসি, তখন আমার ছেলে ছিল দু-বছরের-আর আমার স্ত্রী-পুত্রকে দেখিনি এই উনিশ বছরের মধ্যে৷ বেঁচে থাকলে আজ সে একুশ-বাইশ বছরের যুবক৷ তার হাতে এগুলো সব দিয়ে বলে দিয়ো, বাপের ছেলে যদি হয়, সে যেন খুঁজে বার করে সেই নগরী, তার বাপ যা পারেনি৷ আর আমার কিছু বলবার নেই৷ ব্যাগটা নাও হাতে তুলে৷
রোগী এই পর্যন্ত বলে ক্লান্তিতে চোখ বুজল৷ চীনা আড্ডাধারীর ইঙ্গিতে ও রোগীর ঘর থেকে বেরিয়ে এল৷
সুশীল বললে, তারপর?
-বাবুজি, যখন ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম, নটরাজন বাঁচল কি মারা গেল সেদিকে কোনো খেয়াল করিনি৷ আমার মাথা তখন ঘুরছে৷ ব্যাগ খুলে দেখলাম-কতকগুলো পুরোনো কাগজপত্র ও ম্যাপখানা ছাড়া আর কিছুই নেই৷ পদ্মরাগ মণিটা নেড়েচেড়ে কিছু বুঝলাম না-ওসব জিনিসের আমরা কী বুঝি বলুন! কিন্তু তখন আমার আর একটা বড়ো কথা মনে হয়েছে, নটরাজন যখন ওর গল্প করেছিল, আমার মনে পড়ল সাত বছর আগের সেই ঘটনা৷ জাহাজে সেই কলেরা হওয়া, আমার জাহাজ থেকে পালানো এবং বনজঙ্গলের মধ্যে সেই বিহ্মমুনির দেশের মধ্যে গিয়ে পড়া, বুঝলেন না বাবুজি?
-খুব বুঝেছি, বলে যাও৷
-আমার মনে হল, আমি সেখানে গিয়ে পড়েছিলাম ঘুরতে ঘুরতে৷ সে পুরোনো শহর আমি দেখেছি৷ নটরাজন যা বের করতে পারেনি, আমি সেখানে একটা গোটা দিন কাটিয়েছি৷ এই জায়গা সুলু-সির ধারে তাও আমি জানি৷ যদিও ঠিক বলতে পারব না হয়তো কিন্তু দূর থেকে দেখলে বোধ হয় চিনব৷
-ত্রিবাঙ্কুরের সেই গাঁয়ে গেলে না?
লোকটা বললে, প্রথমে ওর লোভ হয়েছিল খুব৷ পদ্মরাগ মণিটার দাম যাচাই করে দেখা গেল, প্রায় দেড় হাজার টাকা দাম সেটার৷ তা ছাড়া আরও লোভ হল, নটরাজনের ছেলেকে ম্যাপ দেবার কী দরকার? এই ম্যাপের সাহায্যে সে-ই তো জায়গাটা খুঁজে বার করতে পারে৷ বিশেষ করে একবার যখন সেখানে সে গিয়েছিল৷ কিন্তু তিন-চার দিন ভাবার পরে ওর মনে হল, মরবার আগে বিশ্বাস করে নটরাজন ওর হাতে জিনিসগুলো সঁপে দিয়েছে তার ছেলেকে দেবার জন্যে৷ অতএব খানিকটা ইচ্ছা এবং খানিকটা অনিচ্ছাতে সেখানে যেতে সে বাধ্যই হল৷ বড়ো মজার ব্যাপার ঘটল কিন্তু সেখানে৷
সুশীল বললে, কীরকম?
-বাবুজি, অনেক কষ্ট করে বেউরা কাম্পিয়াম নদীর ধারে সেই কেটিউপ্পা গাঁয়ে গিয়ে পৌঁছোলাম৷ দেখলাম-নটরাজন মিথ্যে বলেনি, নদীটা একেবারে ওদের গ্রামের নীচে দিয়েই গিয়েছে বটে৷ নিজের পকেট থেকে যাওয়ার খরচ করলাম৷ গাঁয়ে গিয়ে যাকেই জিজ্ঞেস করি, কেউ নটরাজনের ছেলের খোঁজ দিতে পারে না৷ নটরাজনের কথাই অনেকের মনে নেই৷ দু-একজন বুড়ো লোক বললে-নটরাজনকে তারা চিনতে বটে, তবে অনেকদিন সে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, তার স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে কোথায় চলে গিয়েছে তারা জানে না৷
-তারপর?
-মনে খানিকটা আনন্দ যে না হল, তা নয়৷ ছেলেকে যদি সন্ধান না করতে পারি, তবে আমার দোষ কী? তবুও একে-ওকে জিজ্ঞেস করি৷ শেষকালে গাঁয়ের কাছারিতে কী ভেবে গিয়ে খোঁজ করলাম৷ তারা শুনে বললেন-অনেকদিন আগে নটরাজনের জায়গাজমি নিলাম করতে হয়েছিল খাজনা না দেওয়ার জন্যে৷ নিলামের নোটিশ তারা পাঠিয়েছিল ত্রিবেন্দ্রাম শহরে৷
-পেলে খুঁজে?
-ঠিকানা তো খুঁজে বার করলাম৷ ছোট্ট একটা কাঠের বাড়ি, নারকেল গাছের বাগান সামনে৷ শহরের মধ্যে বাড়িটা নয়, শহর থেকে মাইল খানেক দূরে৷ অনেক ডাকাডাকির পরে এক বুড়ি এসে দোর খুলে দিলে৷ মাথার চুল সব সাদা হয়েছে, অথচ মুখ দেখে খুব বয়স হয়েছে বলে মনে হয় না৷ বললে-কাকে চাও? আমি বললাম-নটরাজনের ছেলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি৷ বুড়ি আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে বললে-ও নাম কোথায় শুনলে? ও নাম তো কেউ জানে না৷ আমি তখন সব কথা বুড়িকে বললাম৷ শুনে বুড়ি কেঁদে ফেলল৷ বললে-আমার ছেলেও আজ নিরুদ্দেশ, তার বাপের মতো সেও বেরিয়েছে, আজ তিন বছর হয়ে গেল কোনো খবর পাইনি৷
-তুমি কী করলে?
-এই কথা শুনে আমার বড়ো কষ্ট হল বাবুজি৷ আমি সেখানে বুড়ির বাড়ি সাত-আট দিন রইলাম৷ তাকে মা বলে ডাকি৷ বুড়িও আমায় যত্ন করতে লাগল৷ বুড়ি বড়ো গরিব, ভাড়াটে ঘরে থাকে৷ তার ছেলে স্কুলে পড়ত৷ সে রাঁধুনিগিরি করে ছেলের পড়ার খরচ ও নিজেদের খরচ চালাত৷ এখনও সে নারকেল তেলের গুদামের শেঠজিদের বাড়ি রাঁধে৷ কোনোরকমে একটা পেট চলে যায়৷ বুড়িকে পদ্মরাগ মণিটা আমি দেখাইনি-
-এত কষ্ট করে ওটার বেলা ফাঁকি দিলে?
-ওই যে নটরাজন বলেছিল, পদ্মরাগ মণির গায়ে একটা আঁকজোক আছে-যা হদিস দেবে হিরে-জহরতের-এই হল ওখানা না দেওয়ার গোড়ার কথা৷ ভাবলাম কী জানেন? ভাবলাম এই-নটরাজনের ছেলে না-পাত্তা, বুড়ির কাজ নয় ম্যাপ দেখে সুলু-সি যাওয়া আর সেই দ্বীপের মধ্যে লুকানো শহর খুঁজে বার করা৷ যদি ওকে দিই এগুলো এখানে পড়ে নষ্ট হবে৷ তার চেয়ে যদি আমি নিই, হয়তো চেষ্টা করলে একদিন না একদিন আমি সেখানে গিয়ে পৌঁছুতেও পারি৷ যদি হিরে-জহরত পাই, বুড়িকে আমি ভালোভাবে খোরপোশ দিয়ে রাখব৷ কিন্তু যদি পদ্মরাগ মণিখানা দিয়ে দিই, তবে হদিসটা হাতছাড়া হয়ে গেল৷ বুড়ি এখুনি অপরকে মণি বিক্রি করবে৷ যে কিনবে, সে মণির গায়ে আঁকা সিলমোহরের কোনো মানেই বুঝবে না৷ লোহার সিন্দুকে আটকে থাকবে জিনিসটা, তাতে কারও কোনো উপকার নেই৷ কী বলেন আপনি?
-তোমার যুক্তি মন্দ নয়৷ যদিও আমার মনে হয়-জিনিসটা দেওয়াই তোমার উচিত ছিল৷ যাদের জিনিস, তারা সেটা নিয়ে যা খুশি করুক না কেন৷ তোমার ওপর শুধু পৌঁছে দেওয়ার ভার৷ সেটা তুমি রাখলে নিজের কাছে৷
-হাঁ বাবুজি৷ এই দেখুন, আমার কাছেই আছে৷ আসুন এই আলোর কাছে৷
সুশীল আলোর নীচে গিয়ে বিস্ময় ও কৌতূহলের সঙ্গে ওর প্রসারিত করতলের ওপর প্রায় ঝুঁকে পড়ল৷ মস্ত একখানা পাথর- একটু চ্যাপটা গড়নের, উজ্জ্বল সবুজ রঙের, তার ওপর খোদাই-কাজ করা৷
সুশীল ওর হাত থেকে সিলমোহরটা নিয়ে দেখলে উলটেপালটে৷ খোদাই করা এত বড়ো পাথর সে কখনো দেখেনি৷ বড়ো সাইজের একটা লেবেঞ্চুসের মতো৷ সিলমোহরের মধ্যে চেয়ে সে অবাক হয়ে গেল-বড়ো একটা ওঁ-কারের 'ওঁ'-র ল্যাজ জড়িয়ে জড়িয়ে পাকিয়েছে একটা বটগাছ কিংবা অন্য কোনো গাছকে৷ তারপর সে আরও ভালো করে চেয়ে দেখলে-আসলে ওটা ওঁ-কার নয়, যদিও সেইরকম দেখাচ্ছে বটে, কোনো নাগ দেবতার মূর্তি হওয়াও বিচিত্র নয়৷ ত্রিভুজাকৃতি কী একটা আঁকা রয়েছে ছবির বাঁ-দিকে৷ কোনো নাম বা সন-তারিখ নেই৷
লোকটা বললে, কিছু বুঝলেন বাবু?
-নাঃ, তবে হিন্দুর সঙ্গে এ জিনিসের সম্পর্ক আছে বলে মনে হয়৷ দেড় হাজার টাকার জিনিসটা তুমি যে বড়ো বিক্রি করে ফেলোনি এতদিন?
-ওই যে নটরাজন বলেছিল এই খোদাই করা আঁকজোকের মধ্যে আসল মালের হদিস পাওয়া যাবে, সেই লোভেই একে হাতছাড়া করে ফেলিনি৷
নটরাজনের স্ত্রী কোথায়?
-তাকে কেটিউপ্পা গাঁয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি৷ মাসে মাসে টাকা পাঠাই৷ শহরে খরচ বেশি, গাঁয়ে খরচ কম৷ ঘর ভাড়া লাগে না৷ সেই সেদিনও পাঁচ টাকা ডাকে পাঠিয়েছি৷ এখন চাকরি নেই- নিজের পেটই চলে না৷
-কাগজপত্র আর ম্যাপগুলো?
-ওই নটরাজনের স্ত্রী-তাকে আমি মা বলি-সেখানে তার কাছেই আছে৷ সঙ্গে নিয়ে বেড়াইনে, বড্ড দামি ও দরকারি জিনিস- আমার কাছে থাকলে হারিয়ে যেতে পারে৷ সে বুড়ি তার বেতের পেটরায় তুলে রেখে দিয়েছে, যখন দরকার হবে নিয়ে আসব গিয়ে৷
-এসব আজ কত বছরের কথা হল?
-বেশি দিনেয় নয়৷ আজ দু-বছর আগে আমি নটরাজনের গাঁয়ে গিয়ে বুড়ির সঙ্গে প্রথম দেখা করি৷
-তোমাকে একটা পরামর্শ দিই শোনো৷ এই মানিকখানা বিক্রি করে ফেলে টাকাটা নটরাজনের স্ত্রীকে দাওগে৷ তার জীবনটা একটু ভালোভাবে কাটবে৷ দেড় হাজার টাকা হাতে পেলে সে খুব খুশি হবে৷ তাদেরই জিনিস ধর্মত দেখতে গেলে, তোমার নিজের কাছে রাখা মানে চুরি করা!
-কিন্তু বাবু, তাহলে হদিস চলে গেল যে৷
-যাবে না৷ প্যারিস প্লাস্টারের ছাঁচে ওটা তুলে নিলেই চলে৷ ওই ছবিটার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক৷ মানিকখানা যার জিনিস, তাকে দাও ফিরিয়ে৷ তুমি যখন মা বলে ডাকো, তখন তার আশীর্বাদ তোমার বড়ো দরকার৷ মানিকখানা যদি বুড়ি বিক্রি করে, যে কিনবে সে ওর খোদাই ছবির কোনো মানে করতে পারবে না, তার কোনো কাজেই লাগবে না৷
-বেশ বাবুজি, আপনি কাজটা করিয়ে দিন না৷
-কাল এটা সঙ্গে করে নিয়ে আমার সঙ্গে এখানেই দেখা কোরো৷ আমার একটা জানাশুনো লোক আছে-সে এইসব কাজ করে, তাকে দিয়ে করিয়ে দেব৷
রাত হয়ে গিয়েছিল৷ সুশীল মাঠ থেকে ফিরতে ফিরতে কত কথাই ভাবলে৷ তার মাথার মধ্যে যেন কেমন করছে৷ এ যেন আরব্য উপন্যাসের কাহিনির মতো অদ্ভুত! এমনভাবে গড়ের মাঠে বেড়াতে বেড়াতে একজন মুসলমান লশকরের সঙ্গে দেখা হবে-সে এমন একটি আজগুবি গল্প বলে যাবে-এ কখনো সে ভেবেছিল? গল্পটা আগাগোড়া গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দিতেও পারত সে, যদি ওই চুনির সিলমোহরখানা সে না দেখত নিজের চোখে৷
লোকটার গল্প যে সত্যি-তা ওই পাথরখানা থেকে বোঝা যাচ্ছে৷ সন-তারিখ ও জায়গা মিলিয়ে এমনভাবে সে গল্প বলে গেল-যা অবিশ্বাস করা শক্ত৷ সুশীল ওকে শেষের দিকে যে প্রশ্নটা করেছিল, অর্থাৎ কতদিন আগে বুড়ির সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়েছিল, সেটা শুধু সময় সম্বন্ধে তাকে জেরা করা মাত্র!
সুশীল বাড়ি গিয়ে সনৎকে বললে, এই কলকাতা শহরেই অনেক মজা ঘটে যায় দেখছি৷
সনৎ বললে, কী দাদা?
-সে একটা অদ্ভুত গল্প৷ যদি বলবার দরকার বুঝি, তবে বলব-
পরদিন গড়ের মাঠে আবার সে নির্দিষ্ট জায়গাটিতে বসে রইল৷ একটু পরে জামাতুল্লা এসে ওর পাশে নিঃশব্দে বসে পড়ল৷ বললে, আমার কথা ভাবলেন বাবুজি?
-চলো আমার সঙ্গে৷ একটা ছাঁচ তোমাকে করিয়ে দিই৷ এনেছ ওটা?
-হাঁ বাবুজি৷ দেখুন, আমি ভিক্ষে করে খাচ্ছি আজ দু-মাস, তবুও এত বড়ো দামি পাথরটা বিক্রি করিনি শুধু বড়ো একটা লাভের আশায়! কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, তত আমার মনে হচ্ছে নসিব আমার খারাপ, নইলে সেই জায়গায় গিয়েও তো কিছু করতে-
-জামাতুল্লা, তুমি লেখাপড়া জানা লোক না হলেও খুব বুদ্ধি আছে৷ একা তুমি কিছু করতে পারবে না তা বেশ বোঝো৷ এ কাজে টাকা চাই, লোক চাই, জাহাজ চাই! অনেক টাকার খেলা সেসব৷ তোমার অত টাকা নেই৷ মিছে কেন নটরাজনের স্ত্রীর পাওয়া জিনিস থেকে বঞ্চিত করবে?
দু-একদিনের মধ্যে প্যারিস-প্লাস্টারে ছাঁচটা হয়ে গেল৷ সুশীল প্রাচীন ধনী বংশের সন্তান, যে ওর ছাঁচ গড়িয়ে দিলে, সে ভাবলে-ওদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি এটা৷ ফেরত দেওয়ার সময় সে বললে-এটা আমার এক বন্ধুকে একবার দেখতে দেবে?
-কেন বলো তো?
-আমার সে বন্ধু মিউজিয়ামে কাজ করে৷ পণ্ডিত লোক৷ যদি গভর্মেন্টের তরফ থেকে এটা কিনে নেওয়া হয়-তাই বলছি৷
-তাকে তোমার স্টুডিয়োতে কাল নিয়ে এসো৷
পরদিন জামাতুল্লাকে নিয়ে সুশীল বন্ধুর স্টুডিয়োতে গিয়ে দেখলে একটি সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক সেখানে বসে আছেন৷
বন্ধুটি বলে উঠল, এই যে এসো সুশীল, ইনি এসে অনেকক্ষণ বসে আছেন, আলাপ করিয়ে দিই-ড. রজনীকান্ত বসু, এম.এ. পিএইচ.ডি.-মিউজিয়ামে সম্প্রতি চাকুরিতে ঢুকেছেন৷
কিছুক্ষণ পরে ড. বসু পদ্মরাগের সিলমোহরের ওপর ঝুঁকে পড়ে ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস দিয়ে পরীক্ষা করতে করতে বিস্ময়ে প্রায় চিৎকার করে উঠে বললেন, এ জিনিসটা আপনি পেলেন কোথায়?
সুশীলের আর্টিস্ট বন্ধু বললে, ওটা ওদের বংশের জিনিস৷ ওর পল্লিগ্রামের প্রাচীন ধনী বংশ৷
ড. বসু সন্দিগ্ধ মুখে বললেন, কিন্তু এ তো তা নয়৷ এ যে বহু পুরোনো জিনিস৷ এ আপনারা পেয়েছিলেন কোথায়-তার ইতিহাস কিছু জানেন? যদি বলতে বাধা না থাকে-
সুশীল বললে, না ড. বসু, আমি এ সম্বন্ধে কিছু বলতে পারব না৷ আপনি কী আন্দাজ করছেন?
ড. বসু বললে, দেখুন সিলমোহরের ওপর এ চিহ্ন আমি নিজে কখনো দেখিনি-তবে এই ধরনের পাথরের ওপর সিলমোহর ওঙ্কারভাটে পাওয়া গিয়েছে৷ ফরাসি ইন্দোচীনের জঙ্গলের মধ্যে পুরোনো নগরের ধ্বংসস্তূপে৷ এর সময় নির্দিষ্ট হয়েছে মোটামুটি খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী৷ আমাদের মিউজিয়ামেও আছে৷ কাল যাবেন, দেখাব৷ কিন্তু আপনার এটা আরও পুরোনো, আমি একে নির্ভয়ে নবম শতাব্দীতে ফেলে দিতে পারি-কিংবা তারও আগে৷
সুশীল বললে, আপনার তাই মনে হয়?
-নিশ্চয়ই৷ নইলে বলতাম না৷ আর সেইজন্যেই আপনাকে জিজ্ঞেস করছি-আপনাদের পূর্বপুরুষ এটা পেলেন কী করে? এ হল সমুদ্রপারের জিনিস৷ বাংলাদেশের পাড়াগাঁয়ের আমগাছের ছায়ায় শান্ত ও নিরীহ জিনিস নিয়ে কারবার-কিন্তু সিলমোহরের পেছনে রয়েছে অজানা সমুদ্রে পাড়ি দেওয়ার দুর্দান্ত সাহস, দুর্জয় বিক্রম, যুদ্ধ, রক্তপাত৷ ভারতবাসী যেদিন সমুদ্রে ওপারে বিদেশে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল, সেইসব দিনের ইতিহাসও সিলমোহরের সঙ্গে জড়ানো৷ তাই বলছি-এটা আপনারা পেলেন কী করে?

ওখান থেকে বার হয়ে আসবার সময়ে সুশীলের মনে টাকার স্বপ্ন ছিল না৷
ছিল সে সুদূরের দুঃসাহসিক অভিযানের স্বপ্ন-জামাতুল্লা খালাসির অত বড়ো পদ্মরাগ মণিখানার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না৷
সে এমন একদিনের স্বপ্ন-যা প্রত্যেক ভারতবাসীর আত্মসম্মানকে জাগ্রত করে, তরুণদের প্রাণে নতুন আশা, উৎসাহ ও আনন্দের সংবাদ আনে বয়ে-
তবু তা সুশীলের মনে যে ছবি জাগাল, তা আদৌ স্পষ্ট নয়-সবই আবছায়া, সবই ধোঁয়া ধোঁয়া৷ সুশীল ইতিহাসের ছাত্র নয়৷ ড. বসুর শেষ কথা ক-টির সঙ্গে যেন এক অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক শক্তি মেশানো ছিল-তাই চোখের সামনে প্রাচীনকালের সুদীর্ঘ অলিন্দ বেয়ে তলোয়ার হাতে বর্মে বর্মে সুসজ্জিত বীরের দল সারি সারি চলেছে, মৃত্যুকে তারা ভয় করে না-অজানা সমুদ্রপথে তাদের বিজয় অভিযান নব উপনিবেশের ইতিহাস সৃষ্টি করে ভাবীকালের অসহায় ও অকর্মণ্য সন্তানদের শিরায় শিরায় নতুন রক্তের আলোড়ন এনে দেয়৷
কোথায় সে পড়ে আছে পাড়াগাঁয়ে, পুরোনো জমিদারঘরের বিলাসপুষ্ট আয়েসি ছেলেটি সেজে-তাদেরই পূর্বপুরুষ একদিন যে অসি হাতে সপ্ত সমুদ্রে পাড়ি জমিয়ে ছিল-তাদেরই স্বজাতি, স্বদেশবাসী-আর সে থাকবে দিব্যি আরামে তাকিয়া ঠেস দিয়ে শুয়ে, তেলে-জলে, দাদখানি চালের ভাত আর মাছের ঝোলে কোনোরকমে পৈতৃক বাঙালি প্রাণটুকু বজায় রেখে চলবে টায় টায়!
চিরকাল হয়তো এমনি কেটে যাবে তার৷ প্রজা ঠেঙিয়ে, খাজনা আদায় করে, পুরোনো চণ্ডীমণ্ডপে বসে তামাক টেনে আর পালাপার্বণে গ্রাম্য লোকজনের পাতে দই মোন্ডা দিয়ে হাততালি অর্জন করবার প্রাণপণ চেষ্টায় মশগুল হয়ে৷
তারপর আছে মামলা-মোকদ্দমার তদারক করতে কোর্টে ছুটোছুটি-ডিক্রি, নালিশ, কিস্তিবন্দি, সইমোহরের নকল সমন জারি-ঃউ! ভাবলে তার গা কেমন করে৷ প্রাচীন ধনী বংশের লাল খেরোবাঁধানো রেকর্ড ও খতিয়ানের চাপে সে নিজের যৌবন ও জীবনকে একদম পিষে মেরে ফেলে শেষের দিকে যখন মহকুমার হাসপাতালে একটিমাত্র রোগী থাকবার স্থানের টাকা জেলাবোর্ডের হাতে দেবে স্বর্গীয় পিতৃদেবের কল্পে-তখন হয়তো সে পাবে রায়সাহেব বা রায়বাহাদুর খেতাব৷
আর সঙ্গেসঙ্গে ভাববে-এই তো জীবনের পরম সার্থকতা সে পেয়ে গেছে৷
না দেখবে দুনিয়া-না দেখবে জীবন, ঠুলিপরা বলদের মতো ঘানিগাছের চারিধারে ঘুরেই জীবন কাটবে৷
রাত্রে সে সনৎকে ডেকে বললে, সনৎ, তোর সাহস আছে?
-কেন দাদা?
-আমি যদি বিদেশে বেরুই, আমার সঙ্গে যাবি?
-এখনি-যদি নিয়ে যাও৷
-অনেক দূর হলেও?
-যেখানে বলো৷
-বাড়ির জন্যে মন কেমন করবে না?
-আমি পুরুষমানুষ না দাদা? ও কথাই ওঠে না!
-আমি এমনি জিজ্ঞেস করছি-
পরদিন সে ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরিতে বসে পড়ল পুরোনো দিনের বৃহত্তম ভারতের ইতিহাস৷ যেসব কথা সে জানত না, কোনোদিন শোনেনি-ড. বসুর কথায় তার ইচ্ছে গেল সেগুলো জানবার ও পড়বার৷
বিজয়সিংহের সিংহল বিজয়ের অভিযান, চম্পারাজ্যের কথা-সুদূর সমুদ্রপারের ভারতীয় উপনিবেশ চম্পা৷ ভারতবাসী অসির তীক্ষ্ণাগ্রভাগ দিয়ে যে দেশের মাটি-পাথরের গায়ে নাগরাজ-বাসুকি, শিব-পার্বতী ও বিষ্ণুমূর্তি অমর করে রেখেছে৷
জামাতুল্লা খালাসিকে সে একশোবার ধন্যবাদ জানাল ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরিতে বসে পড়তে পড়তে৷
সে তো এক পাড়াগাঁয়ে অলস জীবনযাপন করছিল-
কোনোদিন এসব কথা সে জানতেও পারত না, এত বড়ো ছবি তাঁর মনে কোনোদিন জাগতও না-যদি দৈবক্রমে জামাতুল্লা খালাসি সেদিন তার পাশে এসে বসে দেশলাই না চাইত৷
তুচ্ছ এক পয়সার দেশলাই৷
পড়ার টেবিলে বসে বসেই সুশীলের হাসি পেল কথাটা ভেবে৷
ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি থেকে বার হয়েই জামাতুল্লা খালাসির সঙ্গে দেখা করতে গেল৷
মাঠের মধ্যে নির্দিষ্ট জায়গাটিতে বসে আছে৷ সুশীলকে দেখে সে বললে, আসুন বাবু, কাল রাতে এক কাণ্ড হয়ে গেছে-আপনার সঙ্গে দেখা করব বলে-
সুশীল বাধা দিয়ে বললে, কী-কী?
জামাতুল্লা বললে-সে এক আজগুবি কাণ্ড বাবু-
-কীরকম ব্যাপার?
-আপনার সেই বন্ধুর বাড়ি থেকে পাথরখানা নিয়ে কাল ফিরছি বাবু, মেটেবুরুজের কাছে ছোটো মোল্লাখালি বলে যে বস্তি, সেই বস্তির কাছে আমার এক দোস্ত থাকে৷ ভাবলাম, চা খেয়ে যাই৷ সেখানে একেবারে মানুষ নেই-ফাঁকা মাঠ, সিকি মাইল দূরে ছোটো মোল্লাখালি বস্তি৷ হঠাৎ বাবু আমার মনে হল আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে, কে যেন আমার গলা দু-হাত দিয়ে চেপে ধরে আমায় মেরে ফেলবার চেষ্টা করছে-আমি তো চেঁচিয়ে উঠে তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম, কিন্তু পড়ে গেলাম চিতপাত হয়ে মাঠের মধ্যে-পেছনে সে সময় পায়ের শব্দ শুনলাম যেন-
সুশীল ব্যস্ত হয়ে বললে, পাথরখানা আছে তো?
-শুনুন বাবু, তারপর৷ আমি এমন কাণ্ড কখনো দেখিনি৷ চিৎপাত হয়ে পড়ে আর জ্ঞান নেই৷ যখন জ্ঞান হল তখন দেখি আমার চারপাশে দু-তিনজন লোক দাঁড়িয়ে, তারা কেউ পানি এনে আমার চোখে-মুখে দিচ্ছে, কেউ গামছা নেড়ে বাতাস করছে৷ আমার দোস্তের নাম বলতে তারা আমায় ছোটো মোল্লাখালি নিয়ে গেল তার বাড়িতে৷ সেখানে গিয়ে যখন আমার হুঁশ বেশ ভালো ফিরে এল, আমি পকেটে হাত দিয়ে দেখি-পাথরখানা নেই৷
-বলো কী? নেই! গেল সেখানা!
-শুনুন বাবু, আজগুবি কাণ্ড! পাথর নেই দেখে তো আমি আবার অজ্ঞান হয়ে গেলাম৷ দোস্তের বাড়ি তো শোরগোল পড়ে গেল৷ কত লোক দেখতে এলে, আমার দোস্ত কতবার মুখে-চোখে পানি দিয়ে ডাক্তার ডেকে আমায় চাঙ্গা করলে৷ আমি সেই রাত্রেই বাড়ি চলে গেলাম-
-তারপর?
-বাবু, আপনি বলুন একটা কথা৷ আমি কাল আপনার দোস্তের কাছে দেখাতে গিয়েছিলাম কী নিয়ে? যে ছাঁচ তৈরি হয়েছিল তাই নিয়ে-না আসল পাথরখানা নিয়ে? আপনার ওই যে দোস্ত খুব এলেমদার লোক, তার কাছে?
-ও, ড. বসুর কাছে তুমি আসল পাথরখানা নিয়ে গেছলে৷
-ছাঁচখানা নিয়ে যাইনি তো! কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখি আসল পাথরখানা পকেটে রয়েছে, ছাঁচখানা নেই৷
সুশীল হো-হো করে হেসে বললে, এ কোনো আজগুবি কাণ্ড হল না জামাতুল্লা৷ তুমি দু-খানাই নিয়ে গেছলে৷ যে তোমার গলা টিপেছিল সে ছাঁচখানাকে ভুল করে নিয়ে গেছে-আসলখানা তোমার পকেটেই রয়ে গিয়েছিল৷ কোন পকেটে কোনটা রেখেছিলে মনে আছে?
-বাবু, আমি ছাঁচটা নিয়েই যাইনি৷
-আমি বলছি শোনো৷ তুমি ভুলে দুটোই নিয়ে গেছলে৷ কিন্তু এ থেকে আমাদের সাবধান হতে হবে৷ কেউ আমাদের পাথরের খবর পেয়েছে-কলকাতা গুন্ডা-বদমাইসের জায়গা-আমরা ক-দিন ধরে এখানে পাথরের কথা বলেছি, তত সাবধান হইনি৷ এখানেও শুনতে পারে; সেদিন ড. বসুর ওখানে দুটো আরদালি দাঁড়িয়েছিল-আমার সন্দেহ হয়, তাদের মধ্যে কেউ শুনতে পারে৷ যাক, ভালোই হয়েছে যে আসলখানা চুরি যায়নি! আজ তোমার সঙ্গে নেই তো সেখানা?
-না বাবু৷ আমি কি আর তেমনি উজবুক?
-লোক লেগেছে আমাদের পেছনে৷ খুব সাবধানে চলাফেরা করবে৷
জামাতুল্লা হেসে বললে, বাবু, লোক লেগে আমায় হঠাৎ কিছু করতে পারবে না৷ সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়িয়েছি, কত বদমাইস লোকের সঙ্গে কতবার কারবার করেছি৷ এই হাত দুটো যে দেখছেন-এ দুটো ঠিক থাকলে এর সামনে কেউ এগুতে পারবে না জানবেন খোদার দোওয়ায়৷
সুশীল একবার চেয়ে দেখলে, কোনোদিকে কোনো লোক নেই৷ সঙ্গীকে চুপিচুপি বললে, এসব কথা এখন নয়৷ তুমি আমার সঙ্গে যেতে পারবে?
-কোথায় বাবুজি?
-আমার বাসায়৷ সেখানে ঘরের মধ্যে বসে সব কথা হবে এখন৷
জামাতুল্লাকে সঙ্গে নিয়ে সুশীল তাদের বাসায় এল৷ আসার পথে কোনো কিছু অঘটন ঘটেনি দেখে সুশীলের মন থেকে ভয় ও বিপদাশঙ্কা অনেকখানিই চলে গেল৷ জামাতুল্লাকে কিছু খেতে দিয়ে ও তার জন্যে বাইরের ঘরের কোণে বিছানা করে দিলে৷
জামাতুল্লা বললে, বাবুজি, বিছানা কেন?
-রাত্রে এখানে তোমায় রাখব৷ যেতে দেব না মেটেবুরুজে৷ সাবধানের মার নেই৷ খিদিরপুরের মাঠ থেকে মেটেবুরুজ পর্যন্ত জায়গা বড্ড নির্জন-গুন্ডা-বদমাইসদের আড্ডা৷ রাত্রে সে-পথে গেলে বিপদ আছে৷ তোমার যত সাহসই থাকুক, রাত্রে যাওয়া হবে না৷
সুশীলের এ সতর্কতার জন্যে জামাতুল্লাকে বললে, আমার মতলব তোমাকে বলব বলেই তোমায় ডেকেছি৷ আমার মনে হয়েছে-আমরা যে করেই হোক, চলো সেই বনের মধ্যে প্রাচীন নগরের সন্ধানে বেরুই৷ টাকাকড়ির সন্ধান আমি করছিনে-পাই ভালো, তা আমি একা নেব না-নটরাজনের স্ত্রীর শেষ দিনগুলো যাতে সুখে-স্বচ্ছন্দে কাটে, তার ব্যবস্থা করব তা দিয়ে৷ তারপরে তুমি আছ, আমি আছি৷ ভগবানের আশীর্বাদে আমার ঘরে খাবার ভাবনা নেই৷
জামাতুল্লা খালাসি ঘাড় নেড়ে বললে, সে আমি আগেই জানি বাবু, আপনি রইস আদমি-মানুষ দেখেই চিনতে পারি৷ নইলে আপনাকে এত বিশ্বাস করতাম না৷ বড়ো ঘরানা আপনার, আপনাদের নজর হবে বড়ো৷
-তা ছাড়া কী জানো জামাতুল্লা. এই বয়স হচ্ছে বিদেশ বেড়ানোর সময়৷ চিরকাল বাড়ি বসে থাকব যদি, তবে দুনিয়া দেখব কবে? তোমার সাহস আছে আমায় সেখানে নিয়ে যাবার তো?
-এ বাবুজি সাহসের কথা নয়৷ জাহাজ চালানো বিদ্যের কথা-কৌশলের কথা৷ সিঙ্গাপুরে আমার এক দোস্ত আছে তাকে খুঁজে বার করতে হবে৷ সে সুলু-সিতে জাহাজ চালিয়েছে অনেকদিন৷ আপনার কাছে ছিপাবো না, বোম্বেটের কাজ করত সে৷ এখন বড্ড কড়া শাসন, ওলন্দাজ সরকার আর আমাদের ইংরাজ সরকারের৷ মানোয়ারি জাহাজ সর্বদা ঘুরছে৷ বোম্বেটে জাহাজ ধরতে পারলেই ধরে নিয়ে আসবে, আর গুলি করবে৷ সেজন্যে সে কাজ ছেড়ে দিয়ে দোকান করে বসে আছে সিঙ্গাপুরে৷ তাকে সঙ্গে নিতে হবে৷
-তাহলে কীরকম ব্যবস্থা করবে যাবার?
-আপনি টাকা কত নিতে পারবেন বলুন?
-শ-পাঁচেক৷ তার বেশি এক পয়সা নয়৷
-তাও নেবেন না৷ আপনি আমার দোস্ত-দু-শো নিয়ে চলুন৷ আমি পাথর বিক্রি করে ফেলি-সেই টাকায় চালাব৷
-সে টাকা তোমায় আমি নিতে দেব না জামাতুল্লা৷ নটরাজনের স্ত্রীকে বঞ্চিত করে সে পাথর নিয়ে আমাদের ফল ভালো হবে না৷ নটরাজন স্বর্গ থেকে দেখবে আর অভিশাপ দেবে৷
-এইজন্যেই তো বলি, রইস আদমির বুদ্ধি আর আমাদের বুদ্ধি! আপনি যা বলবেন বাবুজি৷
অনেক রাত হয়েছিল৷ জামাতুল্লার বিশ্রামের বন্দোবস্ত করে দিয়ে সুশীল নিজে শোবার জন্যে চলে গেল বটে, কিন্তু তার সারারাত ঘুম এল না চোখে৷ এবার কী ক্ষণে সে বাড়ি থেকে বার হয়েছিল! সাগরপারের যাত্রী হয়ে যদি সেই অজানা দ্বীপে অরণ্যের মধ্যে প্রাচীন যুগের হিন্দু-কীর্তি শুধু চোখের দেখা দেখে আসতে পারে, তবেই সে জীবন সার্থক বিবেচনা করবে৷ চম্পারাজ্যের মতো সেখানেও আর এক হিন্দু উপনিবেশ ছিল নিশ্চয়ই-মহাকালের চব্রনোময় আবর্তনে অরণ্য গ্রাস করেছে সে নগরী৷ তবুও ভারতের সন্তান সে, প্রাচীন যুগের সেই পুণ্যভূমির পবিত্র ধূলি স্পর্শ করে সে ধন্য হতে চায়৷
অর্থের জন্যে সে যাচ্ছে না৷
পরদিন সকালে উঠে সুশীল জামাতুল্লাকে চা ও খাবার খেতে দিয়ে তার সঙ্গে গল্প করতে বসেছে, এমন সময় কাগজওয়ালা খবরের কাগজ দিয়ে গেল; সুশীল কাগজ খুলে সংবাদগুলোর ওপর সাধারণভাবে চোখ বুলোতে গিয়ে হঠাৎ উত্তেজিত সুরে বলে উঠল, জামাতুল্লা! আরে, তোমাদের মেটেবুরুজে খুন!
জামাতুল্লা চা খেতে খেতে উঠে চমকে বললে, কোথায় বাবু, কোথায়!
-দু-নম্বর মফিজুল সর্দারের লেন, একটা কুঠুরিতে নুর মহম্মদ নামে একটা লোককে গলা কাটা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে-
সুশীল কাগজ থেকে মুখ তুলে দেখলে, জামাতুল্লা তালপাতার মতো কাঁপছে৷ অতি কষ্টে সে সুশীলকে জিজ্ঞেস করলে, কী নাম লোকটির বাবুজি?
-নুর মহম্মদ-
জামাতুল্লা চা ফেলে উঠে এসে সুশীলের হাত ধরে বললে, আপনি আমার সবচেয়ে বড়ো দোস্ত, কাল এখানে রেখে আপনি আমার জান বাঁচিয়েছেন! নুর মহম্মদ আমার ঘরেই থাকে৷ এক বিছানাতে দু-জন শুই, কাল আমি থাকলে আমাকেই মারত, আমি ভেবে ভুল করে ও বেচারিকে খুন করে গিয়েছে-
সুশীল বললে, তুমি এখুনি বাড়ি যাও-সেই জিনিসটা-
-না বাবু, সে আমি অন্য জায়গায় রেখেছি, সেখান থেকে কেউ সেটা বের করতে পারবে না৷
সুশীল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললে, তবুও একবার যাও-
-সেটা নিয়ে বাবুজি আপনাদের বাড়িতে রেখে দিন আপনি-মেহেরবানি করে যদি রেখে দিন-
-নিশ্চয় রাখব৷ তুমি একা যেয়ো না-চলো, আমিও সঙ্গে যাচ্ছি৷ আমার ভাই সনৎকে সঙ্গে নেব৷
পাথরখানা এনেই সুশীল কয়েকদিনের মধ্যে তার আরেকখানা ছাঁচ করিয়ে নিয়ে সেখানা ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে এল৷ ওসব জিনিস সঙ্গে রাখলেই যত গোলমাল৷
কিন্তু ব্যাঙ্কে রাখবার কয়েকদিন পরেও ঘটে গেল এক বিপদ৷
সুশীল তখন হাজার দুই টাকার ব্যবস্থা একরকম করে ফেলেছে৷ তার কাকাই টাকাটা তাকে দেবেন, তবে সে বলেছে- ব্যাবসার জন্যই ওটা দরকার৷ বিদেশে যাওয়ার কথা শুনলে কেউ উৎসাহ দিত না৷ ওর সঙ্গে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যেতে রাজি-সনৎ একথা জানিয়েছে৷
সুশীল বউবাজার দিয়ে গিয়ে জামাতুল্লাকে ট্রামে তুলে দিয়ে এল৷ ট্রাম পরবর্তী থামবার জায়গায় যাবার পূর্বেই ট্রামে শোরগোল উঠল৷
জামাতুল্লা ট্রামের বেঞ্চিতে বসবার সঙ্গেসঙ্গেই পাশের একজন লোক নেমে গেল, নেমে যাবার সময় একবার যেন তার হাতখানা জামাতুল্লার পিঠের দিকে ঠেকল-অন্তত জামাতুল্লার তাই মনে হল৷ পরক্ষণেই জামাতুল্লা রক্তাক্ত দেহে চিতপাত ট্রামের মেঝেতে৷
লোকজন হইহই-পুলিশ! পুলিশ! সবাই মিলে ওকে ধরাধরি করে নামিয়ে ফেললে৷
শেষে দেখা গেল ওর বিশেষ কিছু লাগেনি এবারও৷ একখানা ধারালো ছুরি দিয়ে বোধ হয় আততায়ী কোমরের থলে কাটতে চেষ্টা করেছিল৷ ছুরিখানা দৈবাৎ পাশের দিকে লেগে খানিকটা অগভীর রেখা সৃষ্টি করে লম্বালম্বিভাবে কেটে গিয়েছে৷
এই ঘটনার ঠিক সাত দিন পরে সুশীল, সনৎ ও জামাতুল্লা তিন জনে একখানা রেঙ্গুনগামী জাহাজে চড়ে বসল, আপাতত সিঙ্গাপুর এবং সেখান থেকে ব্যাটেভিয়া যাবে-এই হল উদ্দেশ্য ওদের৷
মাস দুই পরের কথা৷ সকাল বেলা৷
সুশীল সিঙ্গাপুরের ভারতীয় পাড়ায় একটি ছোটো শিখ হোটেলের একটা ঘরে বসে সনৎকে বলছিল, আমরা এখানে এসে ভালো করলাম কি মন্দ করলাম, এখনও বুঝিনি সনৎ৷ জামাতুল্লার বোম্বেটে বন্ধু তো দেখা যাচ্ছে অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির লোক; ও হাসতে হাসতে মানুষ খুন করতে পারে৷ ওকে কি খুব বিশ্বাস করা উচিত হল?
-বিশ্বাস না করেই বা উপায় কী দাদা? ও ছাড়া সুলু সমুদ্রে জাহাজ চালাবে কে? তবে আমার মনে হয়-যখন আমাদের কাছে এমন কোনো মূল্যবান জিনিস নেই-তখন সে অনর্থক মানুষ খুনের দায়িত্ব ঘাড়ে নিতে যাবে কেন?
এমন সময় বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল৷ জামাতুল্লা তার বোম্বেটে বন্ধু মি. ইয়ার হোসেনকে নিয়ে ঘরে ঢুকল; ইয়ার হোসেন ভিক্টোরিয়া স্ট্রিটে একটা চুল-ছাঁটা দোকান করে ভাড়াটে চীনে নাপিত দিয়ে চুল ছাঁটায়-রোজগার মন্দ হয় না৷ বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ বছর বয়স হবে, রোগা চেহারা, চোখের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ভালোমানুষ ও নিরীহ ধরনের বলে মনে হয়-পরনে সাহেবি পোশাক৷ লোকটা ভারতীয় নয়, মালয়ও নয়-কোন দেশের লোক তা কখনো বলেনি৷ তবে তার কথাবার্তা থেকে মনে হয় ভারতের ওপর টানটা তার বেশি৷ কথাবার্তা বলে ইংরেজিতে, নয় মালয় ভাষায়৷ তার ভাঙা ইংরাজি জামাতুল্লা বেশ বোঝে৷
এ ধরনের লোকের সঙ্গে কখনো সুশীল বা সনৎ-এর পরিচয় ঘটেনি ইতিপূর্বে৷ বাইরে মোটামুটি ভদ্রলোক, এমনকী বেশ নিরীহ প্রকৃতির প্রৌঢ় ভদ্রলোক, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ইয়ার হোসেন দুর্দান্ত দস্যু৷ মুহূর্তের মনোমালিন্যের ফলে যারা বন্ধুর বুকে অতর্কিতে তীক্ষ্ণধার কিরিচ বসিয়ে দিতে এতটুকু দ্বিধা করে না-এ সেই জাতীয় লোক৷
ইয়ার হোসেন ঘরে ঢুকে বললে, বসে আছেন; আমায় আর দু-শো দিতে হবে-দরকার রয়েছে৷
সুশীল জামাতুল্লার মুখের দিকে চাইলে অতি অল্পক্ষণের জন্যে৷ জামাতুল্লা চোখের ইঙ্গিতে তাকে বলে দিলে-ইয়ার হোসেনকে যেন সে প্রত্যাখ্যান না করে!
-কত টাকা বললেন, মি. হোসেন?
-দু-শো কি আড়াইশো-
-বেশ, নেবেন৷ সেদিন নিয়েছেন একশো-
ইয়ার হোসেন যেন খানিকটা উদ্ধত সুরে বললে, নিয়েছি তো কী হবে? তোড়জোড় করতেই সব টাকা যাচ্ছে-
-জাহাজের কী হল? চার্টার করবেন?
-জাহাজ চার্টার করবার টাকা কোথায়? কিন্তু আচ্ছা, একটা কথা বলি৷ আপনারা সে বিহ্মমুনির দেশে যেতে চাইছেন কেন? টাকাকড়ি হিরে-জহরত সেখানে সত্যি আছে?
-কী করে বলি সাহেব! তবে, তোমার কাছে লুকাব না৷ খুব বড়ো রত্নভাণ্ডার সেখানে লুকানো আছে৷ এই আমাদের বিশ্বাস৷ এই মণির আঁকজোঁক আছে-ওটাই তার হদিস, অন্তত নটরাজন তাই বলেছিল৷
-আমি চেষ্টা করে দেখব-কিন্তু আমার ভাগ-ঠিক তিন ভাগের এক ভাগ চাই৷ ফাঁকি দেবার চেষ্টা করলেই বিপদ ঘটবে৷ এই হাতে অনেক মানুষ খুন করেছি-সেকথা কে না জানে? মানুষ মারাও যা, আমার কাছে পাখি মারাও তা৷
সুশীলের গা যেন শিউরে উঠল৷ কাজের খাতিরে এমন নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোকের সঙ্গে আজ তাকে মিশতে হচ্ছে-ভাগ্য কী জানি কোন পথ তাকে নির্দেশ করছে! মুখে বললে, না সাহেব, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো-ফাঁকি তুমি পড়বে না৷
ইয়ার হোসেন বললে, একটা গল্প বলি, শোনো তবে৷ একবার আমার জাহাজে ছ-সাতজন মাল্লা মদ খেয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে৷ তাদের দলে একজন সর্দার ছিল, সে এসে আমায় জানালে, এই-এই শর্তে আমি রাজি না হলে তারা আমার হাত-পা বাঁধবে-মেরে ফেলতেও পারে৷ আমি ওদের সান্ত্বনা দিয়ে শর্তে সই করে দিলাম৷ তারপর ইঞ্জিনরুমের বড়ো কর্মচারীকে ডেকে বললাম-জাহাজে কয়লা দিয়েই স্টিম ফার্নেসের মুখ খুলে রাখবে৷
ইঞ্জিনিয়ার বিস্মিতভাবে আমার মুখের দিকে চেয়ে বললে, কেন কাপ্তেন সাহেব-এ তো বিপজ্জনক ব্যাপার-সেই ভীষণ উত্তাপে ফার্নেসের মুখ খুলে রাখব?
সে বেচারি আমার মতলব কিছু বুঝলে না৷ আমি সেই বিদ্রোহী সর্দারকে আর তার চারজন অনুচরকে বললাম ফার্নেসে কয়লা দিতে৷ এদিকে ইঞ্জিনরুমে টেলিগ্রাফে ইঞ্জিনিয়ারকে পুরোদমে স্টিম দিতে বলেই ওরা ঘরে ঢুকবার সঙ্গেসঙ্গে পুলি ঘুরিয়ে জাহাজ প্রায় পঁচিশ ডিগ্রি কোণ করে স্টারবোর্ডের দিকে কাত করে ফেললাম৷ টাল সামলাতে না পেরে হঠাৎ গিয়ে পড়ল খোলা ফার্নেসের মুখে৷ লোক ঠিক করা ছিল, তক্ষুনি তারা ওদের ফার্নেসের আগুনে ধাক্কা মেরে ঠেলে দিয়ে ফার্নেসের দরজা ঘটাং করে বন্ধ করে দিলে৷
সনৎ ও সুশীল রুদ্ধনিশ্বাসে বললে, তারপর?
-তারপর? তারপর দু-দিন পরে কতকগুলো আধপোড়া হাড়, পোড়া কয়লার ছাইয়ের সঙ্গে ফার্নেস সাফ-করা কুলি সমুদ্রের জলে ফেলে দিলে৷ মিউটিনি শেষ হয়ে গেল৷
-কেউ টের পেলে না?
-সবগুলো বদমাইস যখন ওপথে গেল-তখন বাকিগুলো আপনাআপনিই চুপ করে গেল৷ ভালোমানষির দিন চলে গিয়েছে জানবেন৷ নিষ্ঠুর হতে হবে, নির্মম হতে হবে-তবে মানুষের অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে পারবেন৷
সুশীল বুঝল না এমন নিরীহ ভালোমানুষটির আড়ালে কী করে এমন দৃঢ় ও নির্মম চরিত্র লুকানো থাকতে পারে!
-আর একটা কথা, অস্ত্রশস্ত্র কেমন আছে আপনাদের?
-কিছু না, একটি করে অটোমেটিক আছে দু-জনের-তার কাট্রিজ নেই৷
-রাইফেল নেই?
-ভারত থেকে রাইফেল কেনা? মি. হোসেন, এবার আপনি হাসালেন৷
ইয়ার হোসেন দ্বিরুক্তি না করে বেরিয়ে চলে গেল এবং কিছুক্ষণ পরে একটা বড়ো রিভলবার নিয়ে এসে সুশীলের হাতে দিয়ে বললে, পছন্দ হয়?
-ঃও, এ তো চমৎকার জিনিস৷
-এই কিনব তিনটি তিনজনের আর একটা পুরোনো মেশিনগান-
-মেশিনগান কী হবে?
-অনেক দরকার আছে৷
সুশীল ও সনৎ দু-জনেই দেখলে, সে অনেকরকম জানেশোনে৷ জাহাজ চালানোর যন্ত্রাদি কিনবার সময়, তার যে কিছু কিছু বিজ্ঞানের জ্ঞানও আছে-এ পরিচয়ও পাওয়া গেল৷ চালচলনে, ধরন-ধারণে-সে সর্বদাই মনে করিয়ে দেয় যে, সে সাধারণ নয়৷
সুশীল জামাতুল্লাকে বললে, তুমি বলেছিলে দু-শো টাকা হলেই হবে-এখন দেখছি পাঁচশো টাকাই মি. হোসেন নিয়ে নিলে নানা ছুতো করে; হাতে কিন্তু এক পয়সাও রইল না-
-কোনো ভয় নেই বাবুজি, আমি যখন আছি৷ ও তেমন লোক নয়!
-লোক নয় কীরকম? ভয়ানক লোক, আমরা বুঝেছি৷ ও দরকার মনে করলে তোমার মতো পুরোনো বন্ধুর গলা কাটতে এতটুকু দ্বিধা করবে না৷
-বাবুজি দেখছি ভয় পেয়ে গিয়েছেন৷
-তা একটু পেতে হয়েছে৷ টাকাটা ও মেরে দেবে না তো? তুমি হুঁশিয়ার হয়ে থাকবে ওর পেছনে৷
-বাবুজি, আমি হাজার পেছনে থেকেও কিছু করতে পারব না-ও যদি ইচ্ছে করে, তবে সিঙ্গাপুর থেকে আজই পালিয়ে যেতে পারে, কেউ পাত্তাই পাবে না! ইয়ার হোসেন ছাঁচটার কথা জিজ্ঞেস করেছিল-
-তুমি কী বললে?
-বললাম, বাবুর কাছে আছে৷
-মতলব কী?
-না বাবু, খারাপ কিছু নয়-ও একবার দেখতে চায়৷
-ভাগ্যিস আসল পদ্মরাগখানা ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে এসেছিলাম কলকাতায়! নইলে সেই পাথর নিয়ে কলকাতাতেই খুন হয়ে গেল মেটেবুরুজে৷ এখানে আনলে সে পাথর আমরা হাতে রাখতে পারতাম না!
জামাতুল্লা গলার স্বর নীচু করে বললে, বাবুজি, এখানেও লোক পেছন নিয়েছে৷
সুশীল ও সনৎ একযোগে সবিস্ময়ে বলে উঠল, কীরকম!
-এখন বলব না, আপনারা ভয় পেয়ে যাবেন৷ সিঙ্গাপুর ভয়ানক জায়গা-এখানে দিনদুপুরে মানুষের বুকে ছুরি বসায়- পরে শুনবেন৷
সিঙ্গাপুরে যেদিকে বড়ো ডক তৈরি হয়েছে, ওর কাছে অনেক দূর পর্যন্ত সামরিক ঘাঁটি৷ সাধারণ লোককে সেসব রাস্তা দিয়ে যেতে দেওয়া হয় না৷ জামাতুল্লাকে পথপ্রদর্শকরূপে নিয়ে দু-জনে সেই দিকে বেড়াতে বেরোল৷ সমুদ্রের নীল দিগন্তপ্রসারী রূপ এখান থেকে যেমন দেখায়, এমন আর কোথাও থেকে নয়৷ দুপুরের কাছাকাছি সময়টা প্রখর রৌদ্রকিরণে সমুদ্রজল ইস্পাতের ছুরির মতো ঝকঝক করছে৷ দু-খানা মানোয়ারি জাহাজ বন্দর থেকে দূরে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে৷
একজন চীনেম্যান এসে ওদের পিজিন ইংলিশে বললে, টি, স্যার, টি?
-নো টি৷
-নো টি স্যার? মাই হাউস হিয়ার স্যার, ভেরি গুড হোম-মেড টি স্যার!
সনৎ বললে, চলো দাদা, চলো জামাতুল্লা, একটু খেয়ে আসি৷
সবাই মিলে রাস্তা থেকে একটু দূরে একটা চীনা বাঁশঝাড়ের আড়ালে একটা অ্যাসবেস্টস-এর ঢেউখেলানো পাত দিয়ে ছাওয়া ছোটো বাড়িতে এল৷ বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বাঁশের টেবিল পাতা আছে বারান্দায়৷ তিনজনে সেখানে বসে দূরে সমুদ্রের দৃশ্য দেখছে, এমন সময় চীনেম্যানটি চা নিয়ে এল৷ ওরা চা খাচ্ছে, সে লোকটা আবার কিছু কেক নিয়ে এসে ওদের সামনে রাখলে৷ ওদের বললে, তোমরা কোথায় যাবে?
সুশীল বললে-বেড়াতে এসেছি৷
-কোথা থেকে?
-কলকাতা থেকে৷
-ভেরি গুড৷ চমৎকার জায়গা সিঙ্গাপুর৷ এখান থেকে আর কোথাও যাবে নাকি?
-না, আর কোথাও যাব না৷
-ভালো কিউরিও কিনবে?
-কী জিনিস?
-এসো না ঘরের মধ্যে৷
ওরা তিনজনে ঘরের মধ্যে ঢুকল৷ বুদ্ধের মূর্তি, মালা, ড্রাগনের মূর্তি, পোর্সিলেনের পেটমোটা চীনে ম্যান্ডারিনের মূর্তি ইত্যাদি সাধারণ শৌখিন জিনিস আলমারিতে সাজানো-ওরা হাতে করে দেখছে, এমন সময়ে সনৎ একটা জিনিস হাতে নিয়ে অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে উঠল, দাদা দেখো!

সুশীল ও জামাতুল্লা দু-জনেই চেয়ে দেখলে-একখানা জেড পাথরে তৈরি ছুরির গায়ে কী আঁকজোঁক কাটা৷ ভালো করে দু-জনেই দেখলে, অবিকল সেই আঁকজোঁক-নটরাজনের পদ্মরাগ মণির গায়ে যে আঁকজোঁক ছিল৷
ওরা সবাই অবাক হয়ে গেল৷
সুশীল বললে, এ ছুরিখানার দাম কত?
-দু-ডলার, মিস্টার!
-এ ছুরি তুমি কোথায় পেলে?
-দেখি ছুরিখানা! ও, এ আমি একজন মালয়ের কাছে কিনেছিলাম৷
-এখানেই?
-হ্যাঁ, একজন মাল্লা ছিল সে৷
-কোথা থেকে সে ছুরিখানা পেয়েছিল তা কিছু বলেনি?
-না মিস্টার, তবে ছুরিখানা সে ভয়ে পড়ে বিক্রি করে৷ সে বলেছিল দু-দু-বার সে প্রাণে মরতে মরতে বেঁচে যায়, ছুরিখানার জন্যে৷ তার পেছনে লোক লেগেছিল৷ লুকিয়ে আমার কাছে বিক্রি করে৷ কেউ জানে না যে এখানা আমার কাছে আছে৷
-আমরা এখানা নেব!
-ওখানা বিক্রি হবে না৷
-আমরা তিন ডলার দেব৷
-নিয়ে বিপদে পড়বে তোমরা৷ ও নিয়ো না৷
-তোমার দোকানের জিনিস বিক্রি করতে আপত্তি কী?
-আমি আমার খরিদ্দারকে বিপদে ফেলতে চাইনে৷ শোনো মিস্টার, আমি জানি ও ছুরি কেন নিতে চাইছ৷ ওই আঁকজোঁকগুলোর জন্যে-ঠিক কি না? প্রাচীনকাল থেকে এ দেশে অনেকে জানে ওই আঁকগুলো কোথাকার এক গুপ্ত নগর আর তার ধনভাণ্ডারের হদিস৷ সকলে জানে না বটে, তবে পুরোনো লোক কেউ কেউ জানে৷ অনেক পুরোনো জেড পাথরের আংটিতে ওই আঁকজোঁক আমি দেখেছি৷ ও নিয়ে একটা গুপ্ত সম্প্রদায় আছে৷ সম্প্রদায়ের বাইরে আর কারো কাছে এই আঁকজোঁকওয়ালা আংটি, কি ছুরি, কি কিরিচ দেখলে তারা পেছনে লেগে গুপ্তহত্যা পর্যন্ত করে ফেলে-তবে তাদের আসল উদ্দেশ্য থাকে, জিনিসটাকে হস্তগত করা৷
-কেন?
-পাছে অন্য কেউ ওই আঁকজোঁকের হদিস পেয়ে সেই প্রাচীন নগর আর তার গুপ্ত ধনভাণ্ডার আবিষ্কার করে ফেলে৷ ওরা নিজেরা যখন বের করতে পারলে না, তখন আর কাউকে ওরা খোঁজ করতেও দেবে না৷ ও জিনিস কাছে রাখা মানে প্রাণ হাতে করে বেড়ানো৷ কিন্তু আমার মনে হয় কী জানো, মিস্টার? ওরকম নগর কোথাও নেই৷ ও একটা মিথ্যা প্রবাদের মতো এ অঞ্চলে প্রচলিত আছে৷ কেউ দেখেছে এ পর্যন্ত বলতে পার? কেউ বলতে পারে সে দেখেছে? কেউ সন্ধান দিতে পারে? ও একটা ভুয়ো গল্প৷
চা খেয়ে বাইরে এসে তিনজনে সমুদ্রের দিকে চলল৷
চীনেম্যানটি পিছন থেকে ডেকে বললে, ওদিকে যেয়ো না মিস্টার, সামরিক সীমানা-যাওয়া নিষেধ৷ সমুদ্রের ধারে এদিকে বসবার জায়গা নেই৷
একটা নির্জন স্থানে গিয়ে সুশীল বললে, জামাতুল্লা, শুনলে সব কথা? এখনও কি তোমার মনে হয় সে নগর আছে কোথাও? আমরা আলেয়ার পেছনে ছুটছিনে? নটরাজনের গল্প ভুয়ো নয়?
জামাতুল্লা বললে, তবে পদ্মরাগমণি এল কোথা থেকে?
-মণিখানা সে কোনোপ্রকার অসৎ উপায়ে হস্তগত করে, যার ওপরে প্রাচীন ও প্রচলিত প্রথানুযায়ী ওই চিহ্নটি আঁকা ছিল৷ এ ছাড়া ওর কোনো মানে নেই৷
জামাতুল্লার ভাব হঠাৎ যেন বদলে গেল৷ কত বৎসর পূর্বের এক স্বপ্নভরা দিন, এক আতঙ্কভরা কৃষ্ণা-রজনীর স্মৃতি তার মুখের রেখায়, চোখের দৃষ্টিতে৷
সে বললে, কিন্তু বাবুজি, নটরাজন হয়তো দেখেনি, আমি তা দেখেছি৷ ভীষণ বনের মধ্যে অন্ধকার রাত কাটিয়েছি৷ আমি কারো কথা শুনিনি৷
-খুব সাবধান জামাতুল্লা, আমাদের প্রাণের দাম এক কানাকড়িও না-যদি একথা কোনোরকমে প্রকাশ হয় যে আমরা ওই আঁকজোঁক-পড়া পাথরের ছাঁচ নিয়ে সেই নগর খুঁজতে বেরিয়েছি৷
-ঠিক বাবুজি৷ সেকথা আমারও মনে হয়েছে৷ এই সিঙ্গাপুর ভয়ানক জায়গা-এখানে পথে পথে রাত্রের অন্ধকারে খুন হয়৷ ভারি সাবধানে থাকতে হবে আমাদের৷ ইয়ার হোসেনকে সাবধান করে দিতে হবে৷ মুশকিল হয়েছে লোকটা মাতাল, মদ খেয়ে কোনো কথা প্রকাশ করে না ফেলে৷ চলো, যাওয়া যাক৷
তিনজনে সতর্ক দৃষ্টিতে চারিদিকে চেয়ে দেখতে দেখতে বাসার দিকে রওনা হল৷
পরদিন ইয়ার হোসেন এসে ওদের বাসায় খুব সকালে উপস্থিত হল৷ সনৎ তখন উঠেছিল৷ চায়ের জন্যে স্টোভ ধরিয়েছে৷ ইয়ার হোসেনকে দেখে বললে, আসুন মি. হোসেন, ঠিক সময়েই এসেছেন-চা তৈরি৷
ইয়ার হোসেন রুক্ষ প্রকৃতির লোক৷ বলে উঠল, চা খাবার জন্যে ঠিক আসিনি৷ আরও দু-শো টাকা চাই৷
হঠাৎ সনৎ-এর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আরও দু-শো! তাহলে তো আমাদের হাতে রইল না কিছু!
-তা আমি কী জানি? এ কাজে এসেছেন যখন, তখন পয়সার জন্যে হঠলে চলবে না৷ নয়তো বলুন ছেড়ে দিই৷
-না-না, দাঁড়ান আমি দাদা ও জামাতুল্লাকে ডাকি৷
সুশীল শুনে বললে, তাই তো ব্যাপার কী! চলো! দেখি ব্যাপার কী?
ইয়ার হোসেন বাইরে বসে আছে৷ সুশীল গিয়ে বললে, গুড মর্নিং মি. হোসেন৷ কী মনে করে এত সকালে?
-সব ঠিক৷ আজ রাত্রে রওনা হতে হবে৷ সব বন্দোবস্ত ঠিক হয়ে গিয়েছে৷
সনৎ ও সুশীল একসঙ্গে বলে উঠল, কীরকম?
ইয়ার হোসেনই গম্ভীর মুখে বললে, সব ঠিক৷ তার আগে সেই ছাঁচখানা একবার দেখি-এখুনি৷ আর দু-শো টাকা- এখুনি৷
সুশীলের ইঙ্গিতে সনৎ বাক্স খুলে প্যারিস-প্লাস্টারের ছাঁচ ওর হাতে দিলে৷ ইয়ার হোসেন ছাঁচখানা উলটে-পালটে দেখেশুনে বললে, নাও৷ এসব বুজরুকি-অন্য কিছুই না৷ কিছুই হবে না হয়তো৷-টাকা?
সুশীল বললে, টাকা রয়েছে জামাতুল্লার কাছে৷ সে আসুক৷
-কোথায় সে?
-তা তো জানিনে৷ সকালে বেড়াতে বেরিয়েছে৷
-আচ্ছা, আমি বসি৷
-এখন কী ঠিক করলেন, বলুন মি. হোসেন৷
-এখান থেকে ডাচ স্টিমার 'বেন্দা' ছাড়ছে আজ রাত দশটায়৷ আমাদের নামতে হবে সাঙ্গাপান বন্দরে-সুলু সমুদ্রের ধারে৷ সাঙ্গাপান মশলার বড়ো আড়ত-সেখান থেকে জাঙ্ক ভাড়া করে যাব৷
-এসব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ডাচ স্টিমারে উঠতে দেবে? মেশিনগান কিনেছেন নাকি?
-সব ঠিক আছে৷ আপনি শুধু দেখুন, ইয়ার হোসেন কী করতে পারে৷
আরও এক ঘণ্টা কেটে গেল৷ জামাতুল্লা আর ফেরে না৷ সুশীল ও সনৎ উৎকন্ঠিত হয়ে পড়ল৷ কাল বিকেলের সেই চীনাম্যানদের কথা বার বার মনে পড়ছিল ওদের৷ কথাটা ইয়ার হোসেনকে বলা ঠিক হবে না হয়তো ভেবেই ওরা বললে না৷ কিন্তু জামাতুল্লা সব জেনেশুনে একা বেরুল কোথায়?
বেলা প্রায় দশটা৷ এমন সময় জামাতুল্লা ঘর্মাক্ত কলেবরে এসে হাজির হল৷ ওর মুখের চেহারা দেখে তিনজনেই একসঙ্গে বললে, কী হল তোমার?
জামাতুল্লা ক্ষীণ হাসি হেসে বললে, কিছুই না৷
-কিন্তু তোমার চেহারা দেখে-
-উনি বলছেন, আজ রাত্রে আমাদের রওনা হতে হবে৷
জামাতুল্লা সেকথায় কোনো উত্তর না দিয়ে বললে, টাকা দিয়ে দিন ওঁকে আগে৷
টাকা নিয়ে ইয়ার হোসেন বিদায় নেবার পরমুহূর্তেই জামাতুল্লা নিম্নসুরে বললে, বড়ো বেঁচে গিয়েছি৷ ডকের পাশে যে গলি আছে ওখানে দু-জন মালয় গুন্ডা আমাকে আক্রমণ করেছিল৷ দু-জন দু-দিক থেকে কিরিচ হাতে৷ ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দিত আর একটু হলে৷ আমি প্রাণপণে ছুটে বেঁচেছি৷ তোমরা অত ছুটতে পারতে না, মারা পড়তে ওদের হাতে৷ কালকের সেই চীনেম্যানের কথাই ঠিক৷ আমরা খুব বিপন্ন এখানে৷ বাড়ি থেকে কোথাও বেরিয়ো না৷ ইয়ার হোসেনকে কিছু বোলো না৷
সনৎ ও সুশীল রুদ্ধনিশ্বাসে ওর কথা শুনছিল৷ কথা শেষ হলে সনৎ তাকে চা ও টোস্ট খেতে দিয়ে বললে, কিছু বলিনি আমরা৷ ও আজই যেতে বলছে-শুনেছ তো?
-যেতে হয়, আজই আমাদের পালাতে হবে৷ এখন প্রাণ নিয়ে জাহাজে উঠতে পারলে বাঁচি!
-বলো কী জামাতুল্লা! এত ভয় নেই! চীনেম্যানটার বাজে গল্পটা দেখছি তোমার মনে বড়ো দাগ কেটে দিয়েছে৷
-বাবুজি, মেটেবুরুজের মাঠে খুনের কথাটা ভেবে দেখুন- সে পাথরখানার জন্য নয়, আঁকজোঁকের জন্যে৷ আমার তাই মনে হচ্ছে৷ অসাবধান হবেন না আজ দিনমানটা৷ জাহাজে উঠলে কতকটা বিপদ কাটে বটে৷
সেদিন বিকেলে ইয়ার হোসেনের লোক আবার এল৷ একটা সিলমোহর করা চিঠি সুশীলের হাতে দিয়ে বললে-এর উত্তর এখুনি চাই৷ সুশীল চিঠিখানা পড়ে দেখলে, আজ কীভাবে কোথা থেকে রওনা হতে হবে, সেই ব্যবস্থা চিঠিতে লেখা৷ ইয়ার হোসেন অন্য পথ দিয়ে যাবে৷ ওদের যেন চেনে না, এভাবে৷ জাহাজে না উঠে এদের তিনজনের সঙ্গে সে কথাবার্তা বলবে না৷
সুশীল চিঠির উত্তর দিয়ে দিলে৷ জামাতুল্লা বললে, আমাদের জিনিসপত্র যদি কিনতে হয়, এইসময় কিনে নিয়ে আসি চলুন৷
ওরা বেরিয়ে এল বাসা থেকে৷ ভিক্টোরিয়া স্ট্রিটের বড়ো বাজারে জিনিসপত্র কিনবে-এই ওদের ইচ্ছা৷ জামাতুল্লা বললে, বাবু, কিছু ভালো জিনিস খেয়ে নেওয়া যাক৷ জানেন, কোনো অজানা রাস্তায় অনেক দূর যেতে হলে, ভালো খেয়ে নিতে হয়৷ অনেকদিন হয়তো ভালো খাবার অদৃষ্টে জুটবে না৷
একটা শিখ রেস্টুরেন্টে ওরা গিয়ে বসল৷ মাংস, কাটলেট, চা, টোস্ট ইত্যাদি আনিয়ে খাওয়া শুরু করেছে, এমন সময় একজন ইউরোপীয় পোশাক-পরা মালয় এসে ওদের টেবিলে বসে বিনীতভাবে বললে-সে কি তাদের সঙ্গে বসে খেতে পারে?
সুশীল বললে, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই৷
সে আর কোনো কথা না বলে খাবার আনিয়ে নিঃশব্দে কিছুক্ষণ বসে খেতে লাগল৷ তারপর আবার ওদের দিকে চেয়ে বললে, আপনারা ভারতীয়?
সুশীল ভদ্রভাবে উত্তর দিলে-হ্যাঁ৷
-এখানে এসেছেন বেড়াতে, না?
-হ্যাঁ৷
-কেমন লাগছে সিঙ্গাপুর?
-বেশ জায়গা৷
-এখান থেকে দেশে ফিরছেন বোধ হয়?
-তাই ইচ্ছে আছে৷
-আপনারা তিনজনে বুঝি এসেছেন?
-না, আমরা এখানে এক হোটেলে থাকি-আলাপ হয়ে গিয়েছে৷
-বেশ, বেশ৷
-আপনারা কোন হোটেলে উঠেছেন জানতে পারি কি? আমাদের একজন ভারতীয় বন্ধুর একটা ভালো হোটেল আছে, সেখানে খাবারপত্র সস্তা৷ ঘরদোরও ভালো৷ যদি আপনাদের দরকার হয়-
সনৎ বলে উঠল, না, ধন্যবাদ৷ আমরা আজই চলে যাচ্ছি৷
সুশীল টেবিলের তলা দিয়ে সনৎকে এক রামচিমটি কাটলে৷ মালয় লোকটার চোখে-মুখে একটা কৌতূহলের ভাব জাগল৷ সেটা গোপন করে সে বললে, ও! আজই যাবেন? কিন্তু ভারতের জাহাজ তো আজ ছাড়বে না!
সুশীল বললে, না, আমরা রেলে উঠে যাচ্ছি কুয়ালালামপুর৷
-ও, কুয়ালালামপুর? দেখে আসুন, বেশ শহর৷
আরও কিছুক্ষণ পরে লোকটা বিল চুকিয়ে দিয়ে চলে গেল৷
সুশীল রাগের সঙ্গে সনৎ-এর দিকে চেয়ে বললে, ছি, ছি, এত নির্বোধ তুমি? ওকথা কেন বলতে গেলে?
সনৎ অপ্রতিভ মুখে বললে, আমি ভাবলাম ওতেই আপদ বিদেয় হয়ে যাবে! অত জিজ্ঞেস করার ওর দরকার কী? আমরা যদি-বা যাই, তোর তাতে কী রে বাপু!
-তা নয়৷ কে কী মতলব নিয়ে কথা বলে, দরকার কী ওদের সব কথা বলার?
জামাতুল্লা বললে, ঠিক কথা বলেছেন বাবুজি৷
সন্ধ্যার কিছু আগে ওরা রেস্টুরেন্ট থেকে বার হয়ে রাস্তায় নেমে দু-একটা জিনিস কেনবার জন্যে বাজারের দিকে চলেছে- এমন সময় জামাতুল্লা নীচু গলায় চুপিচুপি বললে-ওই দেখুন সেই লোকটা!
সুশীল ও সনৎ চেয়ে দেখলে-সেই মালয় লোকটা একটা দোকানে কী একটা জিনিস কিনছে, ওদের দিকে পিছন ফিরে৷
সুশীল বলল, চলো আমরা এখান থেকে চলে যাই, মোড়ের দোকানে জিনিস কিনিগে৷
জিনিস কিনতে একটু রাত হয়ে গেল৷ ওরা বড়ো রাস্তা বেয়ে অনেকটা এসে ওদের হোটেল যে গলিটার মধ্যে, সেই গলিটাতে ঢুকতে যাবে, এমন সময় কী একটা ভারী জিনিস সুশীলের ঠিক বাঁ-হাতের দেওয়ালে জোরে এসে লেগে ঠিকরে পড়ল সামনে রাস্তার ওপরে৷
ওরা চমকে উঠল৷ জামাতুল্লা পথের ওপর থেকে জিনিসটা কুড়িয়ে নিয়ে বললে, সর্বনাশ!
ওরা দু-জনে নীচু হয়ে জিনিসটা দেখতে গেল, কিন্তু জামাতুল্লা বললে, বাবুজি, ছুটে আসুন, এখানে আর দাঁড়াবেন না বলছি!
দু-জনে জামাতুল্লার পিছনে পিছনে দ্রুতপদে চলতে চলতে বললে, কী, কী হয়েছে? কী জিনিস ওটা?
মিনিট পাঁচ-ছয় ছুটবার পর নির্জন গলিটার শেষ প্রান্তে ওদের হোটেলটা দেখা গেল৷ জামাতুল্লা হাঁফ ছেড়ে বললে, যাক খুব বেঁচে যাওয়া গিয়েছে! এখানা মালয় দেশের ছুড়ে-মারা ছুরি! ওরা দশ-বিশ গজ তফাত থেকে এই ছুরি ছুড়ে লোকের গলা দু-খানা করে কেটে দিতে পারে৷ আমাদের তাগ করেই ছুরিখানা ছুড়েছিল, কিন্তু অন্ধকারে ঠিক লাগেনি৷ ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলে-যে ছুড়েছে, তার আরেকখানা ছুরি ছুড়তেই বা কতক্ষণ?
সনৎ সেই ভারী ছোরাখানা হাতে করে বললে, ঃও, এ গলায় পড়লে পাঠা কাটার মতো মুন্ডু কেটে ছিটকে পড়ত! কানের পাশ দিয়ে তির গিয়েছে!
সুশীল বললে, এ সেই গুপ্ত সম্প্রদায়ের লোকের কাজ৷ আমাদের পেছনে লোক লেগেছে৷
জামাতুল্লা বললে, লোক লেগেছে, তবে আমাদের বাসাটা এখনও বার করতে পারেনি৷ আমি বলিনি যে, এখানে আমরা বিপন্ন৷ আমার না বলবার কারণ আছে৷
রাতে ডাচ স্টিমার 'বেন্দা' ছাড়ল৷ ইয়ার হোসেন বড়ো বড়ো কেরোসিন কাঠের প্যাক-বাকসো ওঠালে গোটাকতক জাহাজে- তাদের বাইরে বিলিতি বিয়ার মদের বিজ্ঞাপন মারা৷ ওঠবার সময় অবিশ্যি কোনো হাঙ্গামা হল না, কিন্তু সুশীল ও সনৎ-এর ভয় তাতে একেবারে দূর হয়নি৷ সিঙ্গাপুরের বন্দর ও প্রকাণ্ড নৌঘাঁটি ধীরে ধীরে দিকচক্রবালে মিলিয়ে গেল-অকূল জলরাশি আলোকোৎক্ষেপী ঢেউয়ে রহস্যময় হয়ে উঠেছে৷
চার দিনের দিন সকালে জাহাজ এসে সাঙ্গাপান পৌঁছোল৷ এখানে এসে ওরা নেমে একটা চীনা হোটেলে আশ্রয় নিলে৷
সাঙ্গাপান মশলার খুব বড়ো আড়ত, কতকগুলো নদী এসে সমুদ্রে পড়ছে, নদীর সেই মোহনাতেই বন্দর অবস্থিত-যেমন আমাদের দেশের চট্টগ্রাম৷
ইয়ার হোসেন বাংলা জানে না, উর্দু বা হিন্দুস্থানিও ভুলে গিয়েছে-ও জামাতুল্লার সঙ্গে কথা বলে পিজিন ইংলিশে ও মালয় ভাষায়৷ বললে, জামাতুল্লা, এবার তুমি তোমার সেই দ্বীপে নিয়ে যেতে পারবে তো?
-পারব বলে মনে হচ্ছে, তবে এখনও ঠিক জানিনে-
সুশীল বললে, শুনুন মি. হোসেন৷ যখন আমার সঙ্গে জামাতুল্লার দেখা হয় গ্রামে, ও বলেছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের একটা দ্বীপে ওর জাহাজ নারকেলের ছোবড়া ও কুচি বোঝাই করতে গিয়ে ডুবো পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে যায়৷ কেমন, তাই তো জামাতুল্লা? রাস্তার কথাটা একবার ভালো করে ঝালিয়ে নেওয়া দরকার৷
-ঠিক বাবুজি৷
-তারপর বলে যাও-
-তারপর আমরা সাত দিন সেইখানে থাকি৷
ইয়ার হোসেন বললে, সেখানে থাকি মানে কী বুঝিয়ে বলো৷ দ্বীপে, না সমুদ্রে?
-না সাহেব, দ্বীপে তো নয়-আমরা যাচ্ছিলাম এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে৷ মাঝ দরিয়ায় এ কাণ্ড ঘটে৷ তারপর সৌরাবায়া থেকে জাহাজ এসে আমাদের উদ্ধার করে৷
-কতদিন পরে উদ্ধার করে?
-আট-দশ দিন কি ওইরকম৷
সুশীল বললে, আগে বলেছিলে সাত দিন৷
-বাবু, ঠিক মনে নেই৷ অনেক দিনের কথা৷ সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে৷ সেই সময় সমুদ্রের বিষাক্ত কাঁকড়া খেয়ে সব কলেরা হয়ে মারা গেল-বাকি ছিলাম কাপ্তান আর আমি৷ দ্বীপ ছিল নিকটেই-যেখানে ডুবো পাহাড়ে আমাদের জাহাজ ধাক্কা খেয়েছিল, সেখান থেকে ডাঙা নজরে পড়ে৷ জাহাজের রশির দু-রশি কি তিন রশি তফাতে৷ দ্বীপ দেখলে আমি চিনতে পারব, তার ধারে একটা পাহাড়, পাহাড়ের গা বেয়ে একটা ঝরনা পড়েছে সমুদ্রে৷ বড়ো বড়ো পাথর পড়ে আছে, পাথরগুলো সাদা রঙের৷
সুশীল হেসে বললে, তোমার সেই বিহ্মমুনির দ্বীপ?
জামাতুল্লা গম্ভীর মুখে বললে, হাসবেন না বাবুজি৷ এসব কাজে নেমে এ দেশের সব দেবতাকে মানতে হবে৷ না মানলে বিপদ হতে কতক্ষণ? আমি খুব ভালো করেই তা জানি৷
ইয়ার হোসেন বললে, বুঝলাম, ওসব এখন রাখো৷ সাঙ্গাপান থেকে কোনদিকে যেতে হবে, কত দূরে? একটা আন্দাজ দাও-একটা নটিক্যাল চার্ট করে দেওয়া যাক৷
-আমরা সাঙ্গাপান থেকেই রওনা হয়ে যাই পূর্ব-দক্ষিণ কোণে-আন্দাজ দুশো মাইল-সেখান থেকে পূর্বে উত্তর-পূর্ব কোণে যাই আন্দাজ পঞ্চাশ মাইল৷ এইখানে সেই ডুবো পাহাড়ের জায়গাটা যতদূর আমার মনে হচ্ছে-
ইয়ার হোসেন অসহিষ্ণুভাবে বললে, যতদূর মনে হলে তো হবে না, আমাদের সেদিকে যেতে হবে যে৷ সুলু সমুদ্রের সর্বত্র তো ঘুরে বেড়াতে পারা যাবে না৷ আচ্ছা, তুমি সে দ্বীপ কতদূর থেকে চিনতে পারবে? নেমে, না জাহাজে বসে?
-জাহাজে বসে চিনতে পারব ওই সাদা পাথরের পাহাড় আর ঝরনা দেখে৷
-কত সাদা পাথরের পাহাড় থাকে-
-না সাহেব, তা নয়৷ সে পাথরের পাহাড়ের বন্ধন অন্যরকম, দেখলেই চিনব৷
ইয়ার হোসেন আর সুশীল দু-জনে মিলে মোটামুটি ম্যাপ এঁকে নিয়ে সেদিন রাত্রে আরেকবার মিলিয়ে নিলে জামাতুল্লার সঙ্গে৷ চীনা জাঙ্ক ভাড়া করা হল৷ দু-মাসের মতো চাল, আটা, চা, চিনি বোঝাই করে নেওয়া হল জাঙ্কে-আর রইল বিয়ারের কাঠের বাক্স ভরতি অস্ত্রশস্ত্র ও মেশিনগান৷
ইয়ার হোসেন প্রস্তাব করলে, এখানে বিলম্ব করা উচিত নয়৷ আজ রাত্রেই যাওয়া যাক-শত্রু লাগতে পারে-জামাতুল্লা বললে, সেকথা ঠিক৷ কিন্তু রাত্রে হারবার-মাস্টার জাহাজ কি নৌকো ছাড়তে দেবে না, পোর্ট পুলিসে ধরবে৷ এসব জায়গায় এই নিয়ম৷ বোম্বেটে ডাকাতের আড্ডা কিনা সুলু-সি৷ কড়া নিয়ম সব৷
-তবে?
-কাল সকালে চলুন সাহেব-
ইয়ার হোসেন দ্বিধার সঙ্গে এ প্রস্তাবে মত দিলে৷ সুশীলকে ডেকে বললে, রাতের অন্ধকারে যাওয়া ভালো ছিল৷ দিনের আলোয় সকলের মনে কৌতূহল জাগিয়ে যাওয়া ভালো না৷ যাই হোক, উপায় কী?
সকাল আটটার পরে সাঙ্গাপান থেকে ওদের নৌকো ছাড়ল৷ মাত্র দেড় টনের চীনা জাঙ্ক-সমুদ্রে মোচার খোলার মতো৷ কিন্তু জামাতুল্লা বললে, জাঙ্ক হঠাৎ ডোবে না, এসব তুফান-সংকুল সমুদ্রে পাড়ি দিতে চীনা জাঙ্কের মতো জিনিস নেই৷
জাহাজ বন্দর ছেড়ে অনেক দূর এল, ক্রমে চারিদিকে শুধু সমুদ্রের নীল জলরাশি৷
জামাতুল্লা নাবিক ও কর্ণধার-কিন্তু যে বৃদ্ধ চীনাম্যান জাঙ্কের সারেং, সেও দেখা গেল বেশ জাহাজ চালাতে জানে৷ দু-দিন জাহাজ চলবার পরে জামাতুল্লার সঙ্গে চীনা সারেং-এর ঝগড়া বেধে গেল৷
ইয়ার হোসেন বললে, চ্যাঁচামেচি কেন? কী হয়েছে?
চীনা সারেং বললে, জামাতুল্লা সাহেব জাহাজ চালাতে জানে না, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে-
জামাতুল্লা বললে, বিশ্বাস করবেন না ওর কথা! ও লোকটা একেবারে বাজে৷
ইয়ার হোসেন ও সুশীল পরামর্শ করে জামাতুল্লার ওপরই কিন্তু জাহাজ চালানোর ভার দিলে৷ একদিন সন্ধ্যার সময় দূরে ডাঙা ও আলোর সারি দেখা গেল৷
চীনা সারেং ছুটে গিয়ে বললে, ওহে, বড়ো যে জাহাজ চালাচ্ছ, ও ডাঙা আর আলো কোথাকার ? এদিকে এত বড়ো ডাঙা কীসের?
জামাতুল্লাও একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল৷ চার্ট অনুসরে ওখান থেকে আলো আর ডাঙা দেখবার কথা নয়৷ চীনা সারেং ইয়ার হোসেনকে আর সুশীলকে ডেকে বললে, ওকে বলতে বলুন স্যার, ও আলো আর ডাঙা কীসের?
জামাতুল্লাকে মাথা চুলকাতে দেখে চীনা সারেং বিজয়গর্বে বললে, আমি বলে দিচ্ছি স্যার-সান্ডা প্রণালীর মুখে পিয়েরপং বন্দরের আলো-তার মানে বুঝেছেন? আমরা আমাদের যাবার রাস্তা থেকে একশো মাইল পূর্ব-দক্ষিণে হঠে এসেছি-এইরকম করে জাহাজ চালালে দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছুতে আমাদের আর বেশি দেরি লাগবে না স্যার!
চীনা সারেং সেদিন থেকে হল কাপ্তেন৷
সুশীল বললে, রাগ কোরো না জামাতুল্লা৷ তুমি অনেকদিন এ কাজ করোনি, ভুলে গিয়েছ হে৷
জামাতুল্লা বললে, তা নয় বাবুজি৷ আমি ভুলিনি জাহাজ চালানো৷ আমার চার্ট ঠিক ছিল, আমার মনে হয় কিছু গোলমাল হয়েছে বা চার্টে ভুল করে রেখেছে৷
আরও তিন দিন পরে বিকেলের দিকে চীনা কাপ্তেন বললে- পারা নামছে স্যার, দড়িদড়া সামলে আর জিনিস সামলে আপনারা খোলের মধ্যে নেমে যান-ঝড় উঠবে৷
তিন ঘণ্টার মধ্যে ভীষণ ঝড় এল পূর্ব-দক্ষিণ কোণ থেকে৷ দড়িদড়া ছিঁড়ে পাল উড়িয়ে নিয়ে যায়, জামাতুল্লা চিৎকার করে বললে, সব খোলের মধ্যে যান-ভয়ংকর ঢেউ উঠেছে-
জাঙ্কের ডেকের ওপর বড়ো বড়ো ঢেউ সবেগে আছড়ে পড়ে ক্ষুদ্র দেড় টনের জাঙ্কখানা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙেচুরে সমুদ্রের তলায় ডুবিয়ে দেবে মনে হল সবারই৷ কিন্তু দু-তিন বার জাঙ্কখানা ডুবতে ডুবতে বেঁচে গেল-নাকানি-চুবুনি খেয়েও আবার সমুদ্রের ওপর ঠেলে ওঠে৷ সাবাস মোচার খোলা৷
হঠাৎ চীনা কাপ্তেন চিৎকার করে উঠল, সামনে পাহাড়- সামলাও-
জামাতুল্লা হালে ছিল, ডাইনে সজোরে হাল মারতেই কান ঘেঁষে কতকগুলো বজবজে সমুদ্রের ফেনা ঘুরতে ঘুরতে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে চলে গেল, ফেনাগুলোর মাঝে কালো রঙের কী একটা টানা রেখা যেন ফেনারাশিকে দু-ভাগে চিরে দিয়েছে৷ ডুবো পাহাড়৷
ঝড়ের শব্দে কে কী বলে শোনা যায় না-তবুও সুশীল শুনলে, চীনা কাপ্তেন চিৎকার করছে, খুব বাঁচা গিয়েছে৷ আর একটু হলেই সব শেষ হত আমাদের!
ইয়ার হোসেন ও সুশীল বাইরে একচমক দেখতে পেলে- জলের মধ্যে মরণের ফাঁদ পাতাই বটে! সাক্ষাৎ মরণের ফাঁদ!

জামাতুল্লা দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে হাল ধরে আছে৷ একটু আলগা হলেই এই ভীষণ জায়গায় জাঙ্ক বানচাল হয়ে ধাক্কা মারবে গিয়ে বাঁ-দিকের ডুবে পাহাড়ে৷ খানিকটা পরে জামাতুল্লার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে উঠল ভয়ে-একী! দু-দিকেই যে ডুবো পাহাড়-ডাইনে আর বাঁয়ে!
চীনা কাপ্তেনকে হেঁকে বললে, কোথা দিয়ে চালাচ্ছ গাধার বাচ্চা! পাহাড়ের চুড়ো দিয়ে যে! মারবে এবারে-
ঝড়ের তুফানের মধ্যে চীনা কাপ্তেনের কথাগুলো অট্টহাসির মতো শোনা গেল৷ কী যে সে বললে, জামাতুল্লা বুঝতে পারল না- কিন্তু যারই ভুল হোক, জাহাজ বাঁচাতে হবে৷
সে সামনে পিছনে চেয়ে দেখলে-পাহাড়ের কালো রেখা অতিকায় শুশুকের শিরদাঁড়ার মতো জলের ওপর স্পষ্ট জেগে; মাস্তুলের দিকে চেয়ে দেখলে চীনা সারেং সব পাল গুটিয়ে ফেলেছে৷ কেবল মাঝের বড়ো মাস্তুলে ষোলো ফুট চওড়া বড়ো পালখানা ঝড়ের মুখে ছিঁড়ে ফালি ফালি হয়ে অসংখ্য সাদা নিশানের মতো উড়ছে৷ সে দেখলে নিশানগুলোর জন্যে জাহাজখানা এদিকে-ওদিকে হেলছে ঘুরছে৷ চক্ষের নিমেষে সে কোমর থেকে ছুরি বার করে পালের মোটা শনের কাছি কাটতে লাগল৷ একবার করে খানিকটা কাটে, আবার ছুটে গিয়ে হাল টিপে ধরে৷
অমানুষিক সাহস ও দৃঢ়তা এবং ক্ষিপ্রতার সঙ্গে পাঁচ-ছ মিনিটের মধ্যে সে অত বড়ো মোটা রশিটা কেটে ফেললে৷ ফেলতেই দড়িদড়া ঢিলে পড়ে পাল সড়াং করে অনেকখানি নেমে এল৷
চীনে সারেং চিৎকার করে বললে-কে রশি কাটলে?
-আমি৷
-খুব ভালো কাজ করেছ! এবার সামলাও ঠ্যালা! যদি জানো না কোনো কিছু, তবে সবটাতেই সর্দারি করতে আসো কেন?
চীনা সারেং মিথ্যে বলেনি৷ জামাতুল্লা সভয়ে দেখলে, পালে ঢিলে পড়াতে জাঙ্ক এবার জগদ্দল পাথরের মতো ভারী হয়ে পড়েছে যেন৷ পিছন থেকে বাতাস ঠেলা মেরেও তাকে নড়াতে পারছে না, সুতরাং দু-দিকের মরণ ফাঁদকে অতিক্রম করে বাহির সমুদ্রে পড়তে এর অনেক সময় লেগে যাবে৷ ইতিমধ্যে বাতাস দিক পরিবর্তন করলেই-বিষম বিপদ!
ইয়ার হোসেন পাকা লোক৷ সে বুঝেছিল কিছু একটা গোলমাল ঘটেছে৷ মাথা বার করে বললে-কী হল আবার? জাঙ্ক নড়ে না যে!
চীনা সারেং বললে, নড়বে কী স্যার, নড়বার পথ কি আর রেখেছে জামাতুল্লা? এবার বাঁচাতে পারলাম না বোধ হয়!
কিন্তু সুখের বিষয় আধ ঘন্টার মধ্যে ভয় কেটে গেল৷ বাতাস পিছন হতেই বয়ে চলল একটানা এবং আধ ঘণ্টার মধ্যে জাঙ্ককে ডুবো পাহাড়ের ফাঁদ পার করে বাহির সমুদ্রে তাড়িয়ে দিলে৷
জামাতুল্লা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল৷
চীনা সারেং টিটকিরি দিয়ে বললে, বাঁচলে সবাই আজ নিতান্ত বরাতের জোরে! তোমার হাতের গুণে নয়, মনে রেখো৷
সমুদ্র শান্ত, জ্যোৎস্না উঠেছে-সুশীলদের দল খোলের ঢাকনি খুলে ডেকের ওপর এসে দাঁড়াল৷
হঠাৎ জ্যোৎস্নার মধ্যে কী একটা বিরাট কালো জিনিস দেখা গেল৷ জল থেকে উঁচু হয়ে আছে মাথা তুলে৷
ইয়ার হোসেন বললে, কী ওটা?
সুশীলও জিনিসটা প্রথমে দেখতে পেলে না, তারপর দেখে বিস্মিত হল-অস্পষ্ট কুয়াশা-মাখা জ্যোৎস্নালোকে কিছু ভালো দেখা যায় না, তবুও একটা প্রকাণ্ড কৃষ্ণকায় দৈত্যের মতো আকাশের গায়ে কী ওটা জল থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে?
সনৎও সেদিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেল৷
একমাত্র জামাতুল্লা দু-চোখ বিস্ফারিত করে জিনিসটার দিকে চেয়েছিল৷
ইয়ার হোসেন কথার উত্তর না পেয়ে কী একটা বলতে যাচ্ছিল, জামাতুল্লা তাকে হাতের ইঙ্গিতে থামিয়ে দিয়ে ডেকের সম্মুখভাগে এগিয়ে এসে কালো জিনিসটা ভালো করে দেখতে লাগল৷
চীনা সারেং টিটকিরি দেওয়ার সুরে বললে, দেখছ কী, ওটা ডুবো পাহাড়-বুড়ো বয়সে চোখে ভালো দেখতে পাইনে, তবুও বলছি-
সুশীল বললে, জলের উপর জেগে রয়েছে যে! ডুবো পাহাড় কী করে হল?
চীনা সারেং বললে, ও পাহাড়ের চুড়োটা মাত্র জেগে আছে জলের ওপর স্যার৷ প্রকাণ্ড ডুবো পাহাড় ওটা-
জামাতুল্লা এইবার সুশীলকে একধারে ডেকে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললে, সারেং ঠিক বলেছে৷ এতক্ষণ পরে আমি চিনেছি, এই সেই পাহাড় বাবুজি-এই পাহাড়ে ধাক্কা খেয়েই-
সুশীল অবিশ্বাসের সুরে বললে, চিনলে কী করে?
-আমি এতক্ষণ তাই চেয়ে দেখছিলাম৷ এবার আমার কোনো সন্দেহ নেই-ওই ডুবো পাহাড়ের এক জায়গায় দক্ষিণ কোণে একটা শুয়োরের মুখের মতো ছুঁচলো গড়ন দেখছেন কি? আসুন আমি দেখাচ্ছি-এতকাল আমার মনে ছিল না, কিন্তু এবার দেখেই মনে পড়েছে৷
-ইয়ার হোসেনকে বলি?
-কিন্তু ওই হলদেমুখো চীনাটাকে কিছু বলবেন না, বাবুজি৷ ওটাকে আমার ঠিক বিশ্বাস হয় না, আপনি বলুন হোসেন সাহেবকে-
-যদি ও-ই সেই ডুবো পাহাড়টা হয়, তবে তো ওখান থেকে জমি দেখা যাবে, আর সেই সাদা পাথরের পাহাড়টা-
-সে হল তিন-রশি চার-রশি তফাতে বাবুজি-চাঁদনি রাতে সাদা পাথরের পাহাড় অত দূর থেকে ভালো দেখা যাবে না৷ সকাল হোক-
চীনা সারেং চিৎকার করে উঠল, হাল সামলাবে না গল্প করে সময় কাটাবে-ডুবো পাহাড় সামনে, সে খেয়াল আছে?
জামাতুল্লা বিরক্ত হয়ে বললে, ঃআ, হলদেমুখো ভূতটা বড্ড জ্বালালে দেখছি-দাঁড়ান বাবুজি, আপনি হোসেন সাহেবকে বলুন, আমি দেখি ওদিকে কী বলে-
সুশীল হাসতে হাসতে বললে, তুমি যাই বলো, ও কিন্তু খুব পাকা জাহাজি, এসব অঞ্চল দেখছি ওর নখদর্পণে-ওস্তাদ জাহাজি-এ বিষয়ে ভুল নেই-
কিছু পরে চীনা সারেং তার নাবিকগিরির সুদক্ষতার এমন একটি প্রমাণ দিলে, যাতে জামাতুল্লাকে পর্যন্ত তারিফ করতে হল৷ জামাতুল্লার হাল পরিচালনায় জাঙ্ক যখন ডুবো পাহাড়ের একদিক দিয়ে যাবার চেষ্টা করছে, তখন চীনা সারেং হুকুম দিলে, সামনে এগোও-পাশ কাটাবার চেষ্টা করছ কেন?
-সামনে এগিয়ে ধাক্কা খাবে নাকি?
-এই বিদ্যে নিয়ে মাঝিগিরি করতে এসেছ সুলু-সিতে? নিজের দেশে নদী-খালে ডোঙা চালাওগে যাও গিয়ে৷ ওই পাহাড়ের দু-পাশের ভীষণ চাপা স্রোতের মুখে পড়ে জাঙ্ক পাহাড়ের গায়ে সজোরে ধাক্কা মারবে-সে খেয়াল আছে? তোমার হালের সাধ্যি হবে না সে স্রোতের বেগ সামলানো৷ দেখছ না, জল কীরকম ঘুরছে?
জামাতুল্লা তখন ইতস্তত করছে দেখে চীনা সারেং হেঁকে বললে, জামাতুল্লা এবার সবাইকে মারবে স্যার-ওকে বুঝিয়ে বলুন, একবার ওর থেকে ভগবান বাঁচিয়ে দিয়েছেন, এবার বোধ হয় আর রক্ষে হয় না-
সুশীল আর ইয়ার হোসেন জামাতুল্লাকে বললে, ও যা বলছে, তাই করো না জামাতুল্লা-
-ও কী বলছে তা আপনারা খেয়াল করছেন না? ও বলছে-ওই ডুবো পাহাড়ের দিকে সোজাসুজি হাল চালাতে- মরব তো তাহলে-
চীনা সারেং জামাতুল্লার কথা শুনতে পেয়ে বললে, চালিয়ে দেখোই না কী করি৷ মরণের অত ভয় করলে মাল্লাগিরি করা চলে না সাহেব৷
জামাতুল্লা চোখ পাকিয়ে বললে, হুঁশিয়ার! আমি আর যাই হই মরণের ভয় করি-তা তুমি বলতে পারবে না হলদেমুখো বাঁদর৷
সুশীল ধমক দিয়ে বললে, ও কী হচ্ছে জামাতুল্লা? এ সময়ে ঝগড়া-বিবাদ করে লাভ কী? সারেং যা বলছে তাই করো-
জামাতুল্লা হাতের চাকা ঘোরাতেই জাঙ্ক পাহাড়ের একেবারে বিশ গজের মধ্যে পড়ল-ঠিক একেবারে সামনা-সামনি৷ সবাই দুরুদুরু বক্ষে চেয়ে আছে, সামনে নিশ্চিত মৃত্যুর ঘাঁটি, এ থেকে কী করে চীনা জাঙ্ক বাঁচবে কেউ বুঝছে না৷ দেখতে দেখতে বিশ গজের ব্যবধান ঘুচে গেল-দশ-গজ-
আর বুঝি জাঙ্ক রক্ষা হয় না-মতলব কী চীনাটার?...সবাই বিস্ফারিত চক্ষে চেয়ে আছে, বুকের ভেতর ঢেঁকির পাড় পড়ছে সবারই৷ হঠাৎ সারেং ক্ষিপ্রহস্তে প্রকাণ্ড একটা জাহাজি কাছি সুকৌশলে সামনের দিকে অব্যর্থ লক্ষ্যে ছুড়ে দিয়ে বললে-ডাইনে হাল মারো-
সঙ্গেসঙ্গে একটা আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে গেল-যা ইয়ার হোসেন ও জামাতুল্লা তাদের জাহাজি মাল্লা জীবনের অভিজ্ঞতায় কখনো দেখেনি৷ জাহাজ ডান দিকে ঘুরে পাহাড়ের গুঁড়িটা পেরিয়ে যেতেই সারেং-এর কাছি গিয়ে পাহাড়ের সরু অংশটি জড়িয়ে ধরল এবং পেছন দিক দিয়ে ঘড়ঘড় করে নোঙর পড়ার শব্দে সবাই বুঝল বড়ো সি-অ্যাঙ্কর অর্থাৎ সমুদ্রের মধ্যে ফেলার বড়ো নোঙর তার সুদৃঢ় আঁকশির মুখ দিয়ে সমুদ্রের তলায় পাথর ও মাটি আঁকড়ে ধরলেই জাহাজের অগ্রগতি বাধাপ্রাপ্ত হবে৷
বোঁ করে অত বড়ো জাঙ্কখানা ডিঙি নৌকোর মতো ঘুরে গেল আর পরক্ষণেই স্থির, অচল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল পাহাড় আর তিন-চার গজের মধ্যে৷ জাঙ্ক আর পাহাড়ের মধ্যে কেবল একফালি সরু সাগরজল, একটা বড়ো হাঙর তার মধ্যে কষ্টে সাঁতার দিতে পারে৷
ইয়ার হোসেন বলে উঠল, সাবাস সারেং!
সুশীল ও সনৎ নিশ্বাস ফেলে বললে, খুব বাঁচিয়েছ বটে-
জামাতুল্লা চুপ করে রইল!
চীনা সারেং হলদে দাঁত বার করে হাসতে হাসতে বললে, বিদেশি লোক এখানে জাহাজ চালাতে পারে না, স্যার! জামাতুল্লা মাল্লাগিরি যা জানে, তা খাটে চাটগাঁয়ের বন্দরে-এসব সে জায়গা নয়-এখানে জাহাজ চালাতে হলে পেটে বিদ্যে চাই অনেকখানি-
ইয়ার হোসেন বললে, এখন কী করা যাবে বলো৷ জাহাজ তো আটকে গেল৷
সারেং ওদের অভয় দিয়ে বললে, জাঙ্ক আটকায়নি-জোয়ার এলেই সকালে জাঙ্ক ছাড়া নিরাপদ৷
সকলে দুরুদুরু বক্ষে সকালের প্রতীক্ষায় রইল৷ সুশীল আর জামাতুল্লা ভালো করে ঘুমুতেই পারলে না৷ খুব ভোরে উঠে জামাতুল্লাকে বিছানা থেকে উঠিয়ে সুশীল বললে, এসো, চেয়ে দেখো-চলো বাইরে-
জামাতুল্লা বাইরে এসে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে বললে, ওই সেই সাদা পাহাড় আর সেই দ্বীপ! আমি কাল রাত্রেই বুঝেছিলাম বাবুজি, কাউকে বলিনি-
-কেন?
-কী জানি বাবুজি, চীনা সারেংটা আর এই হোসেন সাহেবকে আমার তেমন যেন বিশ্বাস হয় না, খোদার দিব্যি বলছি ওদের সামনে মুখ খোলে না আমার৷ হোসেন সাহেব আস্ত গুন্ডালোক, বাধ্য হয়ে ওর সাহায্য নিতে হয়েছে, কিন্তু সিঙ্গাপুরে ওর নাম শুনে সবাই ভয় পায়৷
-সেকথা আর এখন ভেবে লাভ কী বলো৷ ওদের নিয়েই কাজ করতে হবে যখন৷ ইয়ার হোসেনকে বলি কথাটা৷
ইয়ার হোসেন সব শুনে জামাতুল্লাকে ডেকে বললে, কোনো সন্দেহ নেই তোমার এই দ্বীপ ঠিক?
-ঠিক৷
-আমরা নেমে কিন্তু জাঙ্ক ছেড়ে দেব-ঠিক করে দেখো এখনও৷
সুশীল ও জামাতুল্লা আশ্চর্য হয়ে বললে-জাঙ্ক ছেড়ে দেবেন কেন?
-আমি ওদের অন্য একটা গল্প বলেছি৷ আমি বলেছি জঙ্গলে মাঠের ইজারা নিয়েছি ডাচ গবর্মেন্টের কাছে-এখানে আমরা এখন থাকব কিছুদিন৷ ওদের বলতে চাইনে-চীনেরা লোক বড়ো ভালো না-
দুপুরের পর জালি বোটে জিনিসপত্র ও দু-টি ছোটো তাঁবু সমেত ওদের সকলকে অদূরবর্তী দ্বীপের শিলাবৃত তীরভূমিতে নামিয়ে জাঙ্কের সারেং তার ভাড়া চুকিয়ে নিয়ে চলে গেল৷
সুশীল ইয়ার হোসেনকে বললে, ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের দ্বীপ তো? ডাচ গভর্মেন্টের কোনো অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল কিন্তু-
-সেসব বড়ো হাঙ্গামা৷ ডাচ গবর্মেন্টের কাছে কৈফিয়ত দিতে দিতে জান যাবে তাহলে; কেন যাচ্ছি আমরা-ও দ্বীপে কতদিন আমরা থাকব? হয়তো আমাদের সঙ্গে পুলিশ পাহারা থাকত-সব মাটি হত!
জামাতুল্লা মাটিতে নেমে কেমন যেন স্বপ্নমুগ্ধের মতো চারিদিকে চেয়ে দেখতে লাগল৷ এতকাল পরে সে যে এখানে আসবে তা মেটেবুরুজের মাল্লাপাড়ার হোটেলে সানকিতে ভাত খেতে বসে কখনো কি ভেবেছিল? সে ভেবেছিল তার দুঃসাহসের জীবন শেষ হয়ে গিয়েছে৷ সেই বিহ্মমুনির দ্বীপ আবার!
সুশীল ভাবছিল কী অদ্ভুত যোগাযোগ! বাংলাদেশের পাড়াগাঁয়ের জমিদারের ছেলে সে, চিরকাল বসেই খাবে পায়ের ওপর পা দিয়ে, নির্বিঘ্নে জমিজমার খাজনা শোধ, দুপুরে লম্বা ঘুম দেবে, বিকেলে দুপুরে মাছ ধরবে, সন্ধ্যায় বৈঠকখানার পৈতৃক তাকিয়া হেলান দিয়ে তাস দাবা খেলবে, রাত্রে পিঠে-পায়েস খেয়ে আবার ঘুম দেবে-এই সনাতন জীবনযাত্রা প্রণালির কোনো ব্যতিক্রম হয়নি তার পিতৃপিতামহের বেলায়৷ তার বেলাতেও সে ধারা অক্ষুণ্ণই থাকত যদি দৈবক্রমে সেদিন গড়ের মাঠে জামাতুল্লা খালাসি তার কাছে 'ম্যাচিস' চাইতে না আসত৷ কত সামান্য ঘটনা থেকে যে জীবনের কত বৃহৎ ও গুরুতর পরিবর্তন শুরু হয়!
সুশীল ও সনৎ দ্বীপের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ এ ধরনের ঘন বনানী এ পর্যন্ত তারা কোথাও দেখেনি-রীতিমতো ট্রপিক্যাল অরণ্য যাকে বলে, তা এতদিন সুশীল ছবিতেই দেখে এসেছে এবং ইংরেজি ভ্রমণের বইয়ে তার বর্ণনাই পড়ে এসেছে- এতকাল পরে তা সে দেখল৷ জলের ধার থেকেই অপরিচিত গাছপালার নিবিড় বন আরম্ভ হয়েছে-বনস্পতি-মাতার বড়ো বড়ো গাছের গায়ে অর্কিডের ফুলগুলি সুগন্ধে বাতাস মাতিয়েছে- মোটা মোটা লতা দুলছে এ গাছ থেকে ও গাছে৷ কত রঙের প্রজাপতি উড়ছে-সামনের সুনীল সমুদ্র প্রস্তরাকীর্ণ তীরভূমিতে এসে সজোরে ধাক্কা মারছে, একেবারে ঘোলা জলরাশি থইথই করছে, দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত একটা ব্রেকওয়াটার নেই কোথাও-যদি কেউ জলে পড়ে, তবে হাঙরের আহার্য হবে এ জানা কথা-এসব সমুদ্রে হাঙরের উপদ্রব অত্যন্ত বেশি, সুশীল আগেই শুনেছে৷ বনের মধ্যে অনেক জায়গায় এখনও অন্ধকার কাটেনি-কারণ প্রভাতের রৌদ্র তার মধ্যে এখনও অনেক জায়গাতেই ঢোকেনি, দুপুরেও ঢোকে কি না সন্দেহ৷
ইয়ার হোসেন দেখেশুনে বললে, এ যে ভীষণ জঙ্গল দেখছি-
জামাতুল্লা বললে, আগে যেমন দেখেছিলাম তার চেয়েও যেন জঙ্গল বেশি হয়েছে৷
সুশীল জানতে চাইলে এ দ্বীপে লোক আছে কি না৷ ইয়ার হোসেন বললে, ম্যাপে তো কিছু দেয় না-এ দ্বীপের কিছুই দেখিনি ম্যাপে-কী জামাতুল্লা, তুমি কী দেখেছিলে?
-কোথাও কিছু নেই৷
-বেশ ভালো জানো?
-আমার যাওয়ার পথে অন্তত তো কিছু দেখিনি-
-এখান থেকে তোমার সে নগর কতদূর হবে আন্দাজ?
-তিন-চার দিনের পথ৷
-এত কেন হবে? এ দ্বীপের প্রস্থ তো খুব বেশি হবার কথা নয়৷
সুশীল বললে, কত বলে আন্দাজ করছেন, মি. হোসেন?
-ত্রিশ মাইলের মধ্যে৷ তবে একটা কথা, এই জঙ্গল ঠেলে যাওয়ার পথ এগোবে না বেশি৷ অনেক জায়গায় পথ কেটে করে নিয়ে তবে এগোতে হবে৷ তিন দিন লাগা বিচিত্র নয়৷
সেদিন তাঁবু খাটিয়ে দুপুরে বিশ্রাম করে বিকেলের দিকে দ্বীপের মধ্যে ঢোকবার জন্যে ইয়ার হোসেন সবাইকে তৈরি হতে বললে৷ মালয় কুলি ওরা এনেছিল সাতজন জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে যাবার জন্যে-এরা সবাই ইয়ার হোসেনের হাতের লোক এবং মুসলমান ধর্মাবলম্বী৷ এদের গতিক বড়ো সুবিধের বলে মনে হয়নি সুশীলের ও সনৎ-এর গোড়া থেকেই৷ দেখে মনে হয় সিঙ্গাপুরে এরা চুরি-ডাকাতি ও রাহাজানি করে চালিয়ে এসেছে এতদিন৷ যেমন দুশমনের মতো চেহারা, তেমনি ধূর্ত দৃষ্টি এদের চোখে৷ ইয়ার হোসেনের কথায় এরা ওঠে বসে৷ জামাতুল্লা এদের বিশ্বাস করত না৷ কিন্তু উপায় কী, ইয়ার হোসেনকে যখন দলে নিতে হয়েছে, তখন এদের রাখতে হবে৷
দু-দিন সমুদ্রের ধারে তাঁবু ফেলে থাকবার পরে সকলে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল৷
সুশীল-সনৎ এমন জঙ্গল কখনো দেখেনি৷ গাছপালা যে এত সবুজ, এত নিবিড়, এত অফুরন্ত হতে পারে-বাংলাদেশের ছেলে হয়েও এরা এ জিনিসটা এই প্রথম দেখলে৷ ভীষণ জঙ্গলের মধ্যে মাঝে মাঝে এক-একটা ছোটো নদী বা খাঁড়ি-তার দু-পাশে যেন গাছপালা ও বনঝোপের সবুজ পর্বত-কত অদ্ভুত ও বিচিত্র ফুল৷
একদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে বন কাটতে কাটতে ওরা মোটে মাইলতিনেক এগিয়ে যেতে সক্ষম হল৷
সন্ধ্যার দিকে ইয়ার হোসেন বললে, এখানে আজ তাঁবু ফেলা যাক৷
কিন্তু তাঁবু ফেলবে কোথায়? সুশীল চারিদিকে চেয়ে দেখলে ভয়ানক ঘন জঙ্গলের মধ্যে বড়ো বড়ো দোলানো লতায় লতায় ভিজে স্যাঁতসেঁতে মাটির ওপর রাত্রে বাস করতে হবে৷ আজ সারাদিনের অভিজ্ঞতায় এরা দেখেছে এখানকার জঙ্গলে তিনরকম জীব সেখানে বাস করে-যে তিনটিই মানুষের শত্রু৷ প্রথম, বড়ো-বড়ো রক্তশোষক জোঁক; দ্বিতীয়, বিষধর সাপ; তৃতীয়, মৌমাছি৷ এই তিনটি শত্রুর কোনোটাই কম নয়-যে-কোনোটার আক্রমণ মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট৷
কোনোরকমে তাঁবু খাটানো হল৷
ঘুমের মধ্যে কখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল-ট্রপিক্যাল অরণ্যের এ অঞ্চলে বৃষ্টি লেগেই আছে, এমন দিন নেই যে বৃষ্টি হয় না৷ ঘুমের মধ্যে সুশীল দেখলে তাঁবুর ফাঁক দিয়ে কখন বৃষ্টির জলের ধারা গড়িয়ে এসে ওদের বিছানা ভিজিয়ে দিয়েছে৷ বাইরে বৃষ্টির বিরাম নেই৷
হঠাৎ চারিদিক কাঁপিয়ে কোথায় এক গুরুগম্ভীর নিনাদ শোনা গেল-সমগ্র অরণ্য যেন কেঁপে উঠল৷
সনৎ চমকে উঠে বললে, কে ডাকে দাদা?
অন্য তাঁবু থেকে ইয়ার হোসেন বলে উঠল, ও কীসের ডাক?
কেউ কিছু জানে না৷ না জামাতুল্লা না ইয়ার হোসেন-কেবল ইয়ার হোসেনের জনৈক অনুচর বললে, ওটা বুনো হাতির ডাক স্যার৷
আরেকজন অনুচর প্রতিবাদ করে বললে, ওটা গণ্ডারের ডাক৷
কিছুমাত্র মীমাংসা হল না এবং আবার সেই ডাক, সঙ্গেসঙ্গে অন্য এক জানোয়ারের ভীষণ গর্জন৷ সেটা শুনে অবশ্য সকলেই বুঝতে পারলে-বাঘের গর্জন৷
এরই ফাঁকে আবার বন-মোরগও ডেকে উঠল, সময়ে সময়ে একপাল বন্যকুকুরের ডাকও৷
সনৎ বললে, ও দাদা, এ যে ঘুমুতে দেয় না দেখছি-
সুশীল উত্তর দিলে, কানে আঙুল দিয়ে থাকো-
ইয়ার হোসেন বলল, রাইফেল নিয়ে বসে থাকতে হবে- কেউ ঘুমিয়ো না-
এটা নিতান্ত প্রথম দিন বলে এদের ভয় ছিল বেশি, দু-একদিনের মধ্যে জন্তুজানোয়ারের আওয়াজ গা-সওয়া হয়ে গেল৷ নিবিড় ট্রপিক্যাল জঙ্গলের মধ্যে প্রতি রাত্রেই নানা বন্য জন্তুজানোয়ারের বিচিত্র আওয়াজ-আওয়াজ যা করে, তাঁবুর আশেপাশেই করে৷ কিন্তু তাঁবুর লোককে আক্রমণ করে না৷
সুশীল দু-দিন ঘুমোতে পারেনি-কিন্তু তিন রাত্রির পরে সে বেশ স্বচ্ছন্দে ঘুমোতে পারল৷
জঙ্গলের কূল-কিনারা নেই-ওরা পাঁচ দিন ধরে জঙ্গলের মধ্যে ঘুরেও কোনো কিছুই দেখতে পেলে না সেখানে-ওই বন আর বন৷
সূর্যের আলো না দেখে সুশীল তো হাঁপিয়ে উঠল৷ এ জঙ্গলে সূর্যের আলো আদৌ পড়ে না৷
আগে দেশে থাকতে সে দু-একখানা ভ্রমণের বইতে পড়েছিল যে মেক্সিকোতে, মালয়ে, আফ্রিকায় এমন ধরনের বন আছে, যেখানে কখনো সূর্যালোক প্রবেশ করে না৷ কথাটা আলংকারিকের অত্যুক্তি হিসেবেই সে ধরে নিয়েছিল, আজ সে সত্যই প্রত্যক্ষ করলে এমন বন, যা চির-অন্ধকারে আচ্ছন্ন, পড়ন্ত বেলায় কেবল সুউচ্চ বনস্পতিরাজির শীর্ষদেশ অস্তমান সূর্যের রাঙ আলোয় রঞ্জিত হয় মাত্র৷ ক্বচিৎ নিবিড় লতাঝোপের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো, চাঁদের আলো সামান্য মাত্র পড়ে, নতুবা সকল সময়েই গোধূলি দিনমানে৷ চিরগোধূলির জগৎ এটা যেন৷
একদিন সনৎ পড়ে গেল বিপদে৷
তাঁবু থেকে বন্দুক হাতে শিকার করতে বার হয়ে সে একটা গাছের ডালে এক ভীষণ অজগর সাপ দেখে সেটাকে গুলি করলে৷ সাপটা দুলতে দুলতে গাছের ডাল থেকে পাক ছাড়িয়ে ঝুপ করে একবোঝা মোটা দড়াদড়ির মতো নীচে পড়ে গেল৷
সনৎ সেটার কাছে গিয়ে দেখলে অজগরের মাথাটা গুলির ঘায়ে একেবারে গুঁড়িয়ে গিয়েছে৷ কিন্তু তার ল্যাজটা হঠাৎ এসে সনৎ-এর পা দু-খানা জড়িয়ে ধরে শক্ত কাঠ হয়ে গেল৷ সরীসৃপের হিমশীতল স্পর্শ সনতের স্নায়ুলোক যেন অবশ করে দিল, নিজের পা দু-খানাকে সে আর মোটেই নাড়তে পারলে না-হাত দুটোকে যখন কষ্টে নাড়ালে তখন লোহার শেকলের মতো নাগপাশের শক্ত বাঁধনে তার পদদ্বয় গতিশক্তিহীন৷
অজগর তো মরে কাঠ হয়ে গেল, কিন্তু সনৎ চেষ্টা করেও কিছুতেই নাগপাশ থেকে পা ছাড়াতে পারলে না৷ পা যেন ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে, এমনকী সনৎ-এর মনে হল আর কিছুক্ষণ এ অবস্থায় থাকলে সে চলৎশক্তি চিরদিনের মতো হারাবে৷ এদিকে বিপদের ওপর বিপদ, বেলা ক্রমশ পড়ে আসছে-এরই মধ্যে গোধূলি নিয়ে যেন সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসছে বনে৷ কিছুক্ষণ পরে দিক ঠিক করে তাঁবুতে প্রত্যাবর্তন অসম্ভব হয়ে পড়বে৷ আরও কিছু সময় কাটল, শেয়ালের দল বনের মধ্যে ডেকে উঠল-একটু পরেই বন্য হস্তীর বৃংহতি অরণ্যভূমি কাঁপিয়ে তুলবে, হায়েনার অট্টহাসিতে বুকের রক্ত শুকিয়ে দেবে৷
সনৎ সবই বুঝেছে-কিন্তু কোনো উপায় নেই৷ বন্দুকটার আওয়াজ করলে তাঁবুর লোকদের তার সন্ধান দেওয়া চলত বটে- কিন্তু বন্দুকে গুলি নেই৷ শেষ দুটো টোটা অজগরের দিকে সে ছুড়েছে৷
তিমিরময়ী রাত্রি নামল৷
অসহায় অবস্থায় চুপ করে কাত হয়ে পড়ে থাকা ছাড়া তার কোনো উপায় নেই৷ প্রথমটা তার মনে খুব ভয় হয়-কিন্তু মরিয়ার সাহসে সাহসী হয়ে শেষ পর্যন্ত সে চুপ করে শুয়েই রইল৷ মৃত অজগরটাকে অন্ধকারে আর দেখা যায় না-কিন্তু তার হিমশীতল আলিঙ্গন প্রতিমুহূর্তে সনৎকে স্মরণ করিয়ে দিতে লাগল যে প্রাণের বদলে সে প্রাণই নিতে চায়৷
সারারাত্রি এভাবে কাটলে বোধ হয় সনৎ সে-যাত্রা ফিরত না-কিন্তু অনেক রাত্রে হঠাৎ সনৎ-এর তন্দ্রা গেল ছুটে৷ অনেক লোক আলো নিয়ে এসে ডাকাডাকি করছে৷ ইয়ার হোসেনের গলা শোনা গেল-হালু-উ-উ-মি. রায়-৷
সনৎ-এর সর্বশরীর ঠান্ডায় অবশ হয়ে গিয়েছিল-সে গলা দিয়ে স্বর উচ্চারণ করতে পারলে না৷ কিন্তু ইয়ার হোসেনের টর্চের আলো এসে পড়ল ওর ওপরে৷ সবাই এসে ওকে ঘিরে দাঁড়াল৷ পাশের মৃত অজগর দেখে ওরা ভেবেছিল সর্পের বেষ্টনে সনৎও প্রাণ হারিয়েছে-তারপর ওকে হাত নাড়তে দেখে বুঝলে ও মরেনি৷
তাঁবুতে নিয়ে গিয়ে সেবা-শুশ্রূষা করতে সনৎ চাঙা হয়ে উঠল৷
ইয়ার হোসেন সেদিন ওদের ডেকে পরামর্শ করতে বসল৷
জামাতুল্লাকে বললে, কই, তোমার সে মন্দিরের বা শহরের ধ্বংসাবশেষ তো দেখিনে কোনোদিকে৷
জামাতুল্লাক বললে, আমি তো আর মেপে রাখিনি মশাই যে, ক-পা গেলে শহর পাওয়া যাবে-সবাই মিলে খুঁজে দেখতে হবে৷
সুশীল একটা নকশা দেখিয়ে বললে, এ ক-দিনে যতটা এসেছি, জঙ্গলের খসড়া ম্যাপ তৈরি করে রেখেছি৷ এই দেখে আমরা যে-যে পথে এসেছি দেখতে হবে, সে পথে আর যাব না৷
আবার ওদের দল বেরিয়ে পড়ল৷ দু-দিন পরে সমুদ্র-কল্লোল শুনে বনঝোপের আড়াল থেকে বার হয়ে ওরা দেখলে-সামনেই বিরাট সমুদ্র৷
সনৎ চিৎকার করে বলে উঠল, আলাট্টা! আলাট্টা!
সুশীল বললে, তোমার এ চিৎকার সাজে না সনৎ৷ তুমি জেনোফনের বর্ণিত গ্রিক সৈন্য নও, সমুদ্রের ধারে তোমার বাড়ি নয়-
ইয়ার হোসেন বললে, ব্যাপার কী? আমি তোমাদের কথা বুঝতে পারছিনে-
সনৎ বললে, জেনোফন বলে একজন প্রাচীন যুগের গ্রিক লেখক-নিজেও তিনি একজন সৈনিক-পারস্য দেশের অভিযান শেষ করে ফিরবার সমস্ত দুঃখ-কষ্টটা 'দশ সহস্রের প্রত্যাবর্তন' বলে একখানা বইয়ে লিখে রেখে গিয়েছেন-তাই ও বলছে-
ইয়ার হোসেন তাচ্ছিল্যের সুরে বললে, ও!
জামাতুল্লা বললে, আমার একটা পরামর্শ শোনো৷ কম্পাসে দিক ঠিক করে চলো এবার উত্তর মুখে যাই-ওদিকটা দেখে আসা যাক৷
সকলেই এ কথায় সায় দিলে৷ সূর্যের মুখ না দেখে সকলেরই প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছিল৷
ওরা প্রথম দিনেই সমুদ্রের বালির ওপর অনেকগুলো বড়ো বড়ো কচ্ছপ দেখতে পেলে৷ ইয়ার হোসেনের একজন অনুচর ছুটে গিয়ে একটাকে উলটে চিত করে দিল, বাকিগুলো তাড়াতাড়ি গিয়ে সমুদ্রে ঢুকে পড়ল৷ মালয় দেশীয় দায়ের (মালয়েরা বলে 'বোলো') সাহায্যে কচ্ছপটাকে কাটা হল, মাংসটা করে রান্না করে সকলে পরম তৃপ্তির সঙ্গে আহার করলে৷ ভাগ করার অর্থ এই যে, ইয়ার হোসেনের দল ও জামাতুল্লার রান্না হত আলাদা, সুশীল ও সনৎ-এর আলাদা রান্না সনৎ নিজেই করত৷
একদিন সমুদ্রের ধারে বালির ওপরে কী একটা জানোয়ার দেখে সনৎ ছুটে এসে সবাইকে খবর দিলে৷
সকলে গিয়ে দেখলে প্রকাণ্ড বড়ো শুয়োরের মতো একটা জানোয়ার বালির ওপর চুপ করে শুয়ে৷ তার থ্যাবড়া নাকের নীচে বড়ো বড়ো গোঁপ-মুখের দু-দিকে দুটো বড়ো বড়ো দাঁত৷
ইয়ার হোসেন বললে, এক ধরনের সিল-সিঙ্গাপুরের সমুদ্রে মাঝে মাঝে দেখতে পাওয়া যায় বটে৷
সিলের মূল্যবান চামড়ার লোভে সনৎ ওকে গুলি করতে উদ্যত হল৷
ইয়ার হোসেন নিষেধ করে বললে, ওটা মেরো না-ও সিলকে বলে সি লায়ন, ও মারলে অলক্ষণ হয়৷
পরদিন তাঁবু তুলে সকলে উত্তর দিকের জঙ্গল ভেদ করে রওনা হল৷
উত্তর দিকের জঙ্গলে সমুদ্রের ধার দিয়ে অনেকটা গেল ওরা৷ এক গাছ থেকে আরেক গাছে বড়ো বড়ো পুষ্পিত লতা সারা বন সুগন্ধে আমোদ করে ঝুলে পড়েছে-সুবৃহৎ লতা যেন অজগর সাপের নাগপাশে মহীরুহকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করেছে-রাশি রাশি বিচিত্র অর্কিড৷ বিচিত্র ও উজ্জ্বল বর্ণের পাখির দল ডালে ডালে -অদ্ভুত সৌন্দর্য বনের৷ সুশীল বললে, মি. হোসেন, ও কী লতা জানেন? যেমন সুন্দর ফুল-লতা দেখা যাচ্ছে না ফুলের ভারে-গন্ধও অদ্ভুত৷ ইয়ার হোসেন লতার নাম জানে না-তবে বললে, সিঙ্গাপুরে বোটানিক্যাল গার্ডেনে ওরকম লতা সে দেখেছে৷
সারা দ্বীপে গভীর বন৷ বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া কঠিন ও অনবরত গাছপালা কেটে যেতে হয় পথ করবার জন্যে৷ কাজেই ওরা সমুদ্রের ধার বেয়ে চলছিল৷ এক জায়গায় একটা নদী এসে সমুদ্রে পড়েছে বনের মধ্যে দিয়ে, নদী পার হয়ে যাওয়া কষ্টকর বলে বাধ্য হয়ে বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল৷ নদী সরু হবার নাম নেই- অনেক দূরে বনের মধ্যে ঢুকে এখনও নদী বেশ গভীর৷
সুশীল বললে, ওহে, নদীটা আমাদের দেশের বড়ো একটা খালের মতো দেখছি৷ এ দ্বীপে এত বড়ো নদী আসছে কোথা থেকে? তেমন বড়ো পাহাড় কোথায়?
-নিশ্চয় বড়ো পাহাড় আছে বনের মধ্যে, সেইদিকেই তো যাচ্ছি-দেখা যাক-
আরও আধ ঘণ্টা সকলে মিলে গভীর জনহীন বনের মধ্যে দিয়ে চলল৷ বনের রাজ্য বটে এটা-সত্যিকার বন কাকে বলে এতদিন পরে প্রত্যক্ষ করল সুশীল-সনৎ৷
হঠাৎ এক জায়গায় একটা নাগকেশর গাছ দেখে সুশীল বলে উঠল, এই দেখো একটা আশ্চর্য জিনিস! এই গাছ কোথাও এদিকে দেখা যায় না৷ নিশ্চয়ই ভারতবর্ষ থেকে আমদানি এ গাছটা৷
খুঁজতে খুঁজতে আশেপাশে আরও কয়েকটা নাগকেশর গাছ পাওয়া গেল৷ এই গভীর বনের মধ্যে নাগকেশর গাছ থাকার মানেই হচ্ছে এখানে কোনো ভারতীয় উপনিবেশের অস্তিত্ব ছিল পুরাকালে৷
সনৎ বললে, কিন্তু এ গাছ তো পুরোনো না, দেখেই মনে হচ্ছে৷ আট-নশো বছরের নাগকেশর গাছ কি বাঁচে?
-তা নয়৷ ঔপনিবেশিক ভারতীয়দের নিজেদের হাতে পোঁতা গাছের চারা এগুলো৷ বড়ো গাছগুলোর থেকে বীজ পড়ে পড়ে এগুলো জন্মেছে৷ এ গাছ অধস্তন চতুর্থ বা পঞ্চম পুরুষ৷
সেদিনই সন্ধ্যার কিছু পূর্বে সনৎ বনের মধ্যে এক জায়গায় একটা কৃষ্ণপ্রস্তর মূর্তি দেখে চিৎকার করে সবাইকে এসে খবর দিলে৷ ওরা ছুটতে ছুটতে গিয়ে দেখলে গভীর জঙ্গলের লতাপাতার মধ্যে একটা ভাঙা পাষাণমূর্তি-মূর্তির মুণ্ডু নেই, তবে হাত-পা দেখে মনে হয় শিবমূর্তি ছিল সেটা৷ দু-হাত উঁচু প্রস্তরবেদীর ওপর মূর্তিটা বসানো, এক হাতে বরাভয়, অন্য হাতে ডমরু, গলায় অক্ষমালা-এত দূর দেশে এসে ভারতীয় সংস্কৃতির এই চিহ্ন দেখে সুশীল ও সনৎ বিস্ময়ে ও আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়ল-সেখান থেকে যেন সরে যেতে পারে না৷ এই দুস্তর সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে তাদের পূর্বপুরুষেরা হিন্দুধর্মের বাণী বহন করে এনেছিল একদিন এদেশে৷ সুলু সমুদ্রের ওই ডুবো পাহাড় অতিক্রম করত চীনা জাঙ্কওয়ালা যে কৌশল দেখালে, এই কম্পাস ও ব্যারোমিটারের যুগের বহু আগে তাদের পূর্বপুরুষেরা সে কৌশল যদি না দেখাতেন-তবে নিশ্চয়ই এ দ্বীপে পদার্পণ তাদের পক্ষে সম্ভব হত না৷ মনে মনে সুশীল তাঁদের প্রণতি জানালে৷ নমো নঃম দিগ্বিজয়ী পূর্বপুরুষগণ, আশীর্বাদ করো-যে বল ও তেজ তোমাদের বাহুতে, যে দুর্ধর্ষ অনমনীয়তা ছিল তোমাদের মনে, আজ তোমার অঃধপতিত দুর্বল উত্তরপুরুষেরা যেন সেই বল ও তেজের আদর্শে আবার নিজেদের গড়ে তুলতে পারে, তুল ধরতে পারে৷ ভারতের নাম বিশ্বের দরবারে৷
জামাতুল্লা ও ইয়ার হোসেনও চমৎকৃত হল৷ এ বনেও একদিন মানুষ ছিল তা হলে! এই যে গভীর বন আজ শুধু অজগর আর ওরাং-ওটাংয়ের বিচরণক্ষেত্র, এখানে একদিন সভ্য মানুষের পদধ্বনি ধ্বনিত হয়েছে, মন্দির গড়েছে, মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছে-এটা সকলের চেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার বলে মনে হল ওদের কাছে৷

জামাতুল্লাকে সুশীল বললে, কেমন, এসব দেখেছিলে বলে মনে হয়?
-এসব দেখিনি৷ তবে এতে বোঝা যাচ্ছে মানুষের বাসের নিকট এসে পড়েছি!
-সে জায়গাটা কেমন?
-সে একটা শহর বাবুজি৷ তার বাইরে পাঁচিল ছিল একসময়ে৷ এখন পড়ে গিয়েছে৷
-কম্পাস দেখে দিক ঠিক করেছিলে? ল্যাটিটিউড লঙ্গিটিউড ঠিক করেছিলে?
-না বাবুজি, ওসব কিছু করিনি! কম্পাস ছিল না৷
সকলের মনে আশার সঞ্চার হল যে এবার নিশ্চয়ই সে প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষের কাছাকাছি আসা গিয়েছে৷ কিন্তু তারপর তিন দিন কেটে গেল, চার দিন গেল, পাঁচ দিন গেল, আবার সামনে সমুদ্রের তীর, আবার, সুনীল সুলু-সি৷ নগর কোথায়, কোথায়ই-বা কী৷ একখানা ইট বা পাথর জঙ্গলের মধ্যে কোথায়ও কারো চোখে পড়ল না আর৷ আবার হতাশ হয়ে পড়ল সকলে৷ জামাতুল্লাকে ইয়ার হোসেন বললে, জামাতুল্লা সাহেব, স্বপ্ন দেখোনি তো হিন্দু-মন্দিরের আর শহরের? জামাতুল্লা গেল রেগে৷ ইয়ার হোসেনের অনুচরেরা নিজেদের মধ্যে কী বিড়বিড় করে বকতে লাগল৷
সুশীল সনৎ ও জামাতুল্লাকে গোপনে ডেকে বললে, ইয়ার হোসেনের ওই লোকগুলোকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে যদি কিছু চিহ্ন না পাওয়া যায়-দেখছি ওগুলো ভারি বদমাইস!
জামাতুল্লা বললে, ভাববেন না বাবুজি, আমি ছুরি চালাব, আপনাদের জন্যে প্রাণ দেব! ওরা কী করবে? কাঠের ভেলা তৈরি করে সুলু সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নিয়ে যাব৷ ওই হলদে-মুখো চীনে জাঙ্কওয়ালা বড়ো বাহাদুরি করে গেল আপনাদের কাছে-দেখব ও কত বাহাদুর!
একদিন সন্ধ্যার ঘণ্টাখানেক আগে সুশীল বনের মধ্যে পাখি শিকার করতে বেরুল বন্দুক নিয়ে৷ কিছুদূর জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে সে অস্পষ্ট গোধূলির আলোয় দূর থেকে একটা লম্বা পাহাড়মতো দেখতে পেলে৷ আরও কাছে গিয়ে সে দেখলে পাহাড় ও তার মধ্যে একটা খাল, তাতে জল আছে-গভীর খাল৷ জলে পদ্মফুল ফুটে রয়েছে৷ ভালো করে চেয়ে দেখে সে বুঝলে ওপারে ওটা পাহাড় নয়, একটা উঁচু পাঁচিল হতে পারে ওটা৷ খাল নয়, মানুষের হাতে কাটা পরিখা হয়তো৷ পাঁচিলের ওপর বড়ো বড়ো গাছ গজিয়েছে, মোটা মোটা শেকড় পাঁচিলের গা বেয়ে এসে মাটিতে নেমেছে-ডালপালার ফাঁক দিয়ে জায়গায় জায়গায় পাঁচিলের গায়ে বড়ো বড়ো পাথরের চাঁইগুলো দেখা যাচ্ছে৷
সুশীল আনন্দে ও বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল!
এই তবে সেই প্রাচীন নগরীর প্রাচীর ও পরিখা৷ এ বিষয়ে ভুল থাকতে পারে না-তবে, হয়তো সে উলটোদিক থেকে এটাকে দেখেছে৷ নগরীর সিংহদ্বার অন্যদিকে আছে কোথাও৷
সে যখন সকলকে গিয়ে খবর দিল তখন সন্ধ্যার অন্ধকার সমগ্র বনভূমিকে আচ্ছন্ন করেছে৷ ইতিমধ্যেই ওরাং-ওটাং ও শৃগালের ডাক শোনা যাচ্ছে৷ দু-একটা নিশাচর পাখি ছাড়া অন্য পাখির কুজন থেমে গিয়েছে৷ ডালপালার ফাঁকে ঊর্ধ্বে কৃষ্ণ আকাশে নক্ষত্রাদি দেখা দিয়েছে৷
ইয়ার হোসেন বারণ করলে, এখন না, এ রাত্রিকালে তাঁবু ছেড়ে কোথাও যেয়ো না৷ কাল সকালে দেখা যাবে৷
সুশীলের আনা পাখি দিয়ে তাঁবুতে ভোজ হল রাত্রে৷
জামাতুল্লা বললে, পাঁচিল যখন বেরিয়েছে-তখন আমায় মিথ্যেবাদী বলে বদনাম আর কেউ দিতে পারবে না৷ পরদিন সকালে গিয়ে দেখলে, সত্যই বিরাট প্রাচীর ও পরিখার অস্তিত্ব-সেখানে কোনো প্রাচীন নগরীর অস্তিত্বের নিদর্শনস্বরূপ বিরাজমান৷
পরিখার জলে পদ্মফুল দেখে সুশীল ও সনৎ ভাবলে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতীক যেন ওই ফুল৷ আটশো বছর আগে যে হিন্দু ঔপনিবেশিকগণ প্রথম পদ্মফুল এনে দুর্গ পরিখার জলে পুঁতে দেয়, তারা আজ কোথায়? কিন্তু জলে একবার শেকড় গেড়ে যে পদ্মলতা বেঁচে উঠেছিল, সে বংশানুক্রমে আজও অক্ষয় হয়ে বিরাজ করছে এই গভীর অরণ্যের মধ্যে৷ ইয়ার হোসেনের আদেশে তার দু-জন অনুচর জল মেপে দেখলে, এখানে পার হওয়া অসম্ভব৷ পরিখার জল বেশ গভীর৷ পরিখার এক বাহু ধরে এক দল ও অন্যদিকে অন্য বাহুর সন্ধানে অন্য দল বার হল৷
শেষের দলে গেল সুশীল৷
উত্তর থেকে দক্ষিণে লম্বা প্রাচীর-পরিখার উত্তরদিকে আধ মাইল ঢাকা৷ ওদের দল সবিস্ময়ে দেখলে প্রাচীরের এক স্থান ভগ্ন৷ মাঝখান দিয়ে বেশ একটা রাস্তা যেন ছিল সুপ্রাচীন কালে, এখন অবিশ্যি ঘন বন৷ দেখে মনে হয় শত্রু দ্বারা দুর্গ বা নগর-প্রাচীর হয়তো এখানে ভগ্ন হয়ে থাকবে, নতুবা এর অন্য কোনো কারণ নির্দেশ করা যায় না৷
দেখা গেল পরিখার সেইখানে প্রাচীনকালে বোধ হয় কাঠের সেতু ছিল, এখন সেটা ভেঙে জলে৷ জলের গভীরতা সেখানে কম৷ কাঠের সেতু প্রথমে দেখা যায়নি৷ ইয়ার হোসেনের জনৈক অনুচর প্রথমে জলের ধারে একটা শেকল দেখতে পায়৷ শেকলটা টেনে জলের মধ্যে থেকে একখণ্ড লোহার পাত বেরুল৷ আন্দাজ করা কঠিন নয় যে এই লোহার পাত কাঠের চওড়া তক্তার গায়ে লাগানো ছিল৷ অনুমানটুকু ছাড়া কাঠের সেতুর অস্তিত্বের জন্য কোনো নিদর্শন এতকাল পরে কীভাবে পাওয়া সম্ভব হতে পারে৷
ইয়ার হোসেন বললে, এখান দিয়ে পার হওয়া যাক-জল গভীর হবে না৷
সুশীল সামান্য একটু আপত্তি করলে-অথচ কেন যে করলে তা সে নিজেই জানে না৷
প্রথমে নামলে ইয়ার হোসেন নিজে-তার পেছনে নামল সুশীল৷ হাত তিন-চার মাত্র জলে যখন ওরা গিয়েছে তখন ওরা দেখলে সামনে জলের যা গভীরতা, তাতে আর অগ্রসর হওয়া চলবে না৷ ঠিক সেই সময় ওদের নিকট থেকে হাত পাঁচ-ছয় দূরে ইয়ার হোসেনের একজন অনুচর যে শিকল টেনে তুলেছিল জল থেকে- সে নামল৷ উদ্দেশ্য, ওদের পাশাপাশি সেও পরিখা পার হবে৷ কিন্তু পরক্ষণেই এক ভয়াবহ কাণ্ড ঘটল৷
সুশীল চোখের কোণ দিয়ে অল্পক্ষণের জন্যে দেখতে পেলে, লোকটার ছ-সাত হাত দূরে ছোট্ট কাঠের মতো কালো কী একটা জিনিস যেন ভেসে আসছে৷ দু-সেকেন্ড মাত্র পরেই হঠাৎ যেন ভূমিকম্পে বিরাট জলোচ্ছ্বাস উঠল, একটা আর্তচিৎকার-ধ্বনি অল্পক্ষণের মধ্যে শোনা গেল...কীসের একটা প্রবল ঝাপটা এসে ওদের জলের ওপর কাত করে ফেললে...ওদের দু-জনকে৷
পরক্ষণেই ইয়ার হোসেনের সেই অনুচর অদৃশ্য৷
কী হল ব্যাপারটা কেউ বুঝতে পারলে না৷ অবিশ্যি এক মিনিটও হয়নি, এর মধ্যে সব ঘটে গেল৷
সঙ্গেসঙ্গে ডাঙায় যারা ছিল তারা চেঁচিয়ে উঠল, শয়তান! শয়তান!
ইয়ার হোসেন আকুলভাবে চিৎকার করে বললে, ডাঙায় ওঠো-ডাঙায় ওঠো৷
হতভম্ব সুশীল কাদা হাঁচড়ে মরি-বাঁচি ডাঙায় উঠল- পাশাপাশি ইয়ার হোসেন উঠল, জলে চেয়ে দেখলে জল কাদা-ঘোলা হয়েছে, ইয়ার হোসেনের অনুচর নিশ্চিহ্ন৷
সুশীল ও ইয়ার হোসেন তখনও হাঁপাচ্ছে; সুশীলের বুকের মধ্যে যেন হাতুড়ি পিটছে৷
সে ভীত কন্ঠে বললে, কী হল?
ইয়ার হোসেন বললে, আমাদের সাবধানে জলে নাম উচিত ছিল৷ এইসব প্রাচীনকালের জলাশয়ে কুমির থাকা সম্ভব, একথা ভুলে গিয়েছিলাম৷ খোঁজো সবাই-
কুমির! সুশীল অবাক হয়ে গেল৷ কে জানত নগরীর পরিখায় কুমির থাকতে পারে! দুর্গপরিখার প্রহরী এরা-হয়তো প্রাচীন দিনেই শত্রুরোধকল্পে জলের মধ্যে কুমির ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, সুবিশ্বস্ত প্রহরীর ন্যায় এখনও তারা বাইরের লোকের অনধিকার প্রবেশে বাধাদান করছে৷
খুঁজে কিছু হল না-জল কিছুক্ষণ পরে হতভাগ্য অনুচরের রক্তে রাঙা হয়ে উঠল৷ ইয়ার হোসেন বললে, আজ থামলে আমাদের চলবে না-এগোও৷ নগরের ফটক খোঁজো-
সুশীল বললে, জলের মধ্যে অজানা বিপদ৷ জল পার হওয়ার দরকার নেই-হেঁটে বা সাঁতরে৷ কোথাও সেতু আছে কি না দেখা যাক৷
আবার উত্তর মুখে সকলে চলল৷ মাইল দুই সোজা চলতে সন্ধ্যা হয়ে গেল-কারণ ভীষণ জঙ্গল কেটে কেটে অগ্রসর হতে হচ্ছে! আগুন জ্বেলে তাঁবু ফেলে সেদিন সকলে সেখানে রাত্রি কাটাবার আয়োজন করলে৷ এমন সময় বহু দূরে একটা বন্দুকের আওয়াজ শোনা গেল-তার উত্তরে ওরাও একটা আওয়াজ করলে৷ দু-টি দলের মধ্যে যোগসূত্র রাখবার একমাত্র উপায় এই বন্দুকের আওয়াজ-অনেক দূর থেকে দক্ষিণগামী দলের এ হল সংকেতধ্বনি৷ পরদিন সকালে আরও এক মাইল গিয়ে প্রাচীরের উত্তর দিক থেকে পূর্ব দিকে মুখ ফেরালে অর্থাৎ এদিকে আর শহর নেই৷ প্রাচীর ধরে সবাই বাঁকতে গিয়ে দেখলে পরিখার এপারে অনেকগুলো স্তূপ, স্তূপের ওপর বিরাট জঙ্গল৷ বড়ো বড়ো পাথর গড়িয়ে এসে পড়েছে স্তূপ থেকে নীচে-সেগুলো বেশ চৌরশ করে কাটা৷ সম্ভবত স্তূপের ওপর কোনো দুর্গ ছিল যা ঠিক নগর-প্রাচীরের উত্তর-পশ্চিম কোণ পাহারা দিত৷
পশ্চিম মুখে কতটা যেতে হবে কেউ জানে না, কারণ তারা দৈর্ঘ্য ধরে যাচ্ছে, না প্রস্থ ধরে যাচ্ছে তা জানবার সময় এখন আসেনি৷ সেদিনও কেটে গেল বনের মধ্যে৷ সন্ধ্যা নামল৷ সন্ধ্যায় যে বন্দুকের আওয়াজ শোনা গেল, তার আওয়াজ খুব ক্ষীণ ও অস্পষ্ট৷
সুশীল বললে, আমরা দৈর্ঘ্য অতিক্রম করেছি-প্রস্থ ধরে চলেছি৷ বুঝেছেন মি. হোসেন?
-এবার বুঝলাম৷ ওদিকে যে দল গিয়েছে তারা ওদিকের শেষ প্রান্তে পৌঁছে বন্দুক ছুড়ছে৷ অন্তত সাত মাইল দূর এখান থেকে৷
পরদিন বেলা দশটার মধ্যে নগরীর সিংহদ্বার পাওয়া গেল৷ সেখানটাতে পরিখার ওপর পাথরের সেতু৷ এপারে সেতু রক্ষার জন্যে দুর্গ ছিল, বর্তমানে প্রকাণ্ড ঢিবি৷
সকলে ব্যস্ত হয়ে সেতু পার হয়ে সিংহদ্বার লক্ষ করে অল্প কিছু দূরে অগ্রসর হয়েই থেমে গেল৷
সিংহদ্বারের খিলান ভেঙে পড়ত-যদি বট-জাতীয় কয়েকটি বৃক্ষের শিকড় আষ্টেপৃষ্টে তাকে না জড়িয়ে ধরে রাখত! সিংহদ্বারের দু-পাশে অদ্ভুত দুই প্রস্তরমূর্তি-নাগরাজ বাসুকী ফণা তুলে আছে সামনে, পেছনে তিনমুখ-বিশিষ্ট কোনো দেবতার মূর্তি৷ সূর্যের আলো ওপরের বটবৃক্ষের নিবিড় ডালপালা ভেদ করে মূর্তি দুটির গায়ে বাঁকাভাবে এসে পড়েছে৷
গম্ভীর শোভা৷ সুশীল শুধু নয়, দলের সকলেই দাঁড়িয়ে মুগ্ধ নেত্রে চেয়ে রইল এই কারুকার্যময় সিংহদ্বার ও প্রাচীন যুগের শিল্পীর হাতের এই ভাস্কর্যের পানে৷
সুশীল হাত জোড় করে প্রণাম করলে মূর্তি দু-টির উদ্দেশে৷ যেন পুরাতত্ত্ব বা দেবমূর্তি সম্বন্ধে অভিজ্ঞ না হলেও আন্দাজ করলে এ দু-টি তিনমুখ-বিশিষ্ট শিবমূর্তি৷
সুলু সমুদ্রের এক জনহীন অরণ্যাবৃত দ্বীপে প্রাচীন ভারতের শক্তি ও তেজ একদিন এই দেবমূর্তিকে স্থাপিত করেছিল৷ আজ ভারত অঃধপতিত দাসত্বের শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত৷ হে দেব, তোমার যে ভক্তগণ তোমাকে এখানে বাহুবলে প্রতিষ্ঠিত করেছিল তারা আজ নেই-তাদের অযোগ্য বংশধরকে তুমি সেই শৌর্য ও সাহস ভিক্ষা দাও, তাদের বীরপুরুষদের বংশধর করে দাও, হে রুদ্রভৈরব!
ইয়ার হোসেন পর্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েছিল৷ এই বিরাট ভাস্কর্যের সম্মুখে দাঁড়িয়ে সে বললে, যদি আমার দিন আসে, এই মূর্তি সিঙ্গাপুরের মিউজিয়ামে দান করবার ইচ্ছে রইল-
সুশীল বললে, তা কখনো করবেন না মি. হোসেন, যেখানকার দেবতা সেইখানেই তাঁকে শান্তিতে থাকতে দিন৷ অমঙ্গলকে ডেকে আনবেন না৷
সিংহদ্বার অতিক্রম করে ওরা নগরীর মধ্যে ঢুকল৷ কিন্তু অল্প কিছুদূর গিয়েই দেখলে, এত দুর্ভেদ্য জঙ্গল যে দশ হাত এগিয়ে যাবার উপায় নেই বন না কাটালে৷ সিংহদ্বারের সামনেই নিশ্চয় প্রাচীন নগরের রাজপথ ছিল, কিন্তু বর্তমানে সে রাজপথের ওপরই তিন-চারশো বছরের পুরোনো বটজাতীয় বৃক্ষ, বন্য রবার, বন্য ডুমুর গাছ৷ এইসব বড়ো গাছের নীচে আগাছা ও কাঁটালতার জঙ্গল৷ ওরাং-ওটাংও ওই জঙ্গল ভেদ করে অগ্রসর হতে পারে না-মানুষ কোন ছার৷
ইয়ার হোসেনের হুকুমে মালয় অনুচরেরা 'বোলো' দিয়ে জঙ্গল কেটে কোনোরকমে একটু সুঁড়িপথ বার করতে করতে সোজা চলল৷
সুশীল বললে, এ জঙ্গল তো দেখছি নগরের বাইরে যেমন ছিল এখানেও তেমনি৷ কেবল এটা পাঁচিলের মধ্যে এই যা তফাত৷ কে একজন চেঁচিয়ে উঠল-দেখুন! দেখুন!
সকলে সবিস্ময়ে চেয়ে দেখল সামনে প্রকাণ্ড একটা মন্দিরের চূড়া, লতাঝোপের আবরণ থেকে অনেক উঁচুতে মাথা বের করে দাঁড়িয়ে আছে৷ মন্দিরের কাছে যাবার কোনো উপায় নেই-অনেক দূর থেকে বড়ো বড়ো দেওয়াল-ভাঙা পাথর ছড়িয়ে জঙ্গলাবৃত হয়ে পড়ে আছে অন্তত দেড়শো হাত পর্যন্ত৷
ওরা ডিঙিয়ে লাফিয়ে কোনো মন্দিরের সামনে বড়ো চত্বরের কাছে এল-কিন্তু সামনেই গোপুরমের মতো উঁচু পাইলন টাওয়ার৷ তার সুবিশাল পাথরের খিলান ফেটে চৌচির হয়ে সিংহদ্বারের মতোই আষ্টেপৃষ্টে বড়ো বড়ো শেকড় আর লতার বাঁধনে আজ কত যুগ যুগ ধরে ঝুলছে-তার ঠিকানা কারো কাছে নেই৷ গোপুরম ছাড়িয়ে মন্দিরের দেওয়াল৷ বিকটাকার দৈত্যের মুখের মতো সারি সারি অনেকগুলো মুখ দেওয়ালের গায়ে বেরিয়ে আছে-সুশীল আঙুল দিয়ে ওদের দেখিয়ে বললে, দেখো কী চমৎকার কাজ! হয় পাথরের কড়ি নয়তো পয়োনালি যাকে ইংরাজিতে বলে গর্গয়েল৷ অর্থাৎ বিকট জানোয়ারের মুখ বসানো নালি৷
সকলেই অবাক হয়ে সেই কল্পনা-সৃষ্ট মুখগুলোর দিকে চেয়ে রইল৷ যে সুন্দরকে গড়ে তোলে সেও যেমন কৌশলী শিল্পী, ভীষণকে যে রূপ দেয়, সে শিল্পীও ঠিক তত বড়ো৷ সুশীলের মনে পড়ল আনাতোল ফ্রান্সের সেই গল্প, শয়তানকে এমন বিকট করে আঁকলে শিল্পী যে, রাতের অন্ধকারে শয়তান এসে শিল্পীকে জাগিয়ে জিজ্ঞেস করলে, তুমি আমাকে এর আগে কোথায় দেখেছিলে যে অমন করে এঁকেছ? শিল্পী বললে, আপনি কে?
শয়তান বললে, আমি লুসিফার৷ যাকে তোমরা বলো শয়তান৷ ও নামটায় আমার ভয়ানক আপত্তি তা জানো? তুমি কী বিশ্রী করে এঁকেছ আমায়! আমি কি অত খারাপ দেখতে? দেখো না আমার দিকে চেয়ে!
শিল্পী দেখলে শয়তানের মূর্তি দেখতে বেশ সুন্দর, তবে মুখশ্রী ঈষৎ বিষণ্ণ৷ ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বললে, আমায় মাপ করুন, আমি এর আগে দেখিনি আপনাকে৷ আমি স্বীকার করছি আমার ভুল হয়েছে৷ আমি ভুল শুধরে নেব-
শয়তান হাসতে হাসতে বলে, তাই শুধরে নাও গে যাও- নইলে তোমার কান মলে দেব-
যাক৷ ওরা সবাই খিলানের তলা দিয়ে অগ্রসর হয়ে মন্দিরের মধ্যেকার প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াল৷ শুধু ভীষণ কাঁটাগাছ আর বেত, যা থেকে মলক্কা বেতের ছড়ি হয়৷
সনৎ ছেলেমানুষ, ভালো বেত দেখে বলে উঠল, দাদা, একটা বেত কাটব?
ইয়ার হোসেন তাকে ধমক দিয়ে কী বলতে যাচ্ছে, এমন সময় একটি সুন্দর পাখি এসে সামনের বন্য রবারের গাছের ডাল থেকে মন্দিরের ভাঙা পাথরের কার্নিসে বসল৷ সবাই হাঁ করে চেয়ে রইল পাখিটার দিকে৷ কী সুন্দর! দীর্ঘ পুচ্ছ ঝুলে পড়েছে কার্নিস থেকে প্রায় একহাত-ময়ূরের পুচ্ছের মতো৷ হলদে ও সাদা আঁখি পালকের গায়ে-পিঠের পালকগুলো ঈষৎ বেগুনি৷
ইয়ার হোসেন বললে, টিকাটুরা, যাকে সাহেব লোক বলে বার্ড অফ প্যারাডাইজ-খুব সুলক্ষণ৷
সনৎ বললে, বাঃ কী চমৎকার! এই সেই বিখ্যাত বার্ড অফ প্যারাডাইজ! কত পড়েছি ছেলেবেলায় এদের কথা-
সুশীল বললে, সুলক্ষণ-কুলক্ষণ দুই-ই দেখছি৷ কুমির নিলে একজনকে, আবার বার্ড অফ প্যারাডাইজ দেখা গেল এটা সুলক্ষণ-
মন্দিরের বিভিন্ন কুঠুরি৷ প্রত্যেক কুঠুরির দেওয়ালে সারবন্দি খোদাই কাজ৷ সুশীল একখানা পাথরের ইট মনোযোগের সঙ্গে দেখলে৷ একজন ভারতবর্ষীয় হিন্দু রাজা সিংহাসনে উপবিষ্ট, তাঁর পাশে বোধ হয় গ্রহবিপ্র পাঁজি পড়ছেন৷ সামনে এক সার লোক মাথা নীচু করে যেন রাজাকে অভিবাদন করছে৷ রাজার এক হাতে একটা কী পাখি-হয় পোষা শুক, নয়তো শিকারে বাজ৷
ভারত! ভারত! কত মিষ্টি নাম, কী প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অমূল্য ভাণ্ডার! তার নিজের দেশের মানুষ একদিন কম্পাস-ব্যারোমিটারহীন যুগে সপ্তমসমুদ্রে পাড়ি দিয়ে এখানে এসে হিন্দুধর্মের নিদর্শন রেখে গিয়েছিল, তাদের হাতে গড়া এই কীর্তির ধ্বংস্তূপে দাঁড়িয়ে গর্বে ও আনন্দে সুশীলের বুক দুলে উঠল৷ বীর তারা, দুর্বল হাতে অসি ও বর্শা ধরেনি, ধনুকে জ্যা রোপণ করেনি- সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে-এই অজ্ঞান বিপদসংকুল মহাসাগর- হিন্দুধর্মের জয়ধ্বজা উড়িয়ে দিগ্বিজয় করে নটরাজ শিবের পাষাণ-দেউল তুলেছে সপ্তসমুদ্র-পারে৷
পরবর্তী যুগের যারা স্মৃতিশাস্ত্রের বুলি আউড়ে টোলের ভিটেয় বাঁশবনের অন্ধকারে বসে বলে গিয়েছিল-সমুদ্রে যেয়ো না, গেলে জাতটি একেবারে যাবে, হিন্দুত্ব একেবারে লোপ পাবে,- তারা ছিল গৌরবময় যুগের বীর পূর্বপুরুষদের অযোগ্য বংশধর, তাদের স্নায়ু দুবর্ল, মন দুর্বল, দৃষ্টি ক্ষীণ, কল্পনা স্থবির৷
তারা হিন্দু নয়-হিন্দুর কঙ্কাল৷
দু-দিন ধরে ওরা বনের মধ্যে কত প্রাচীন দেওয়াল, ধ্বংসস্তূপ, দরজা, খিলান ইত্যাদি দেখে বেড়াল৷ জ্যোৎস্না রাত্রে, গভীর রাত্রে যখন ওরাং-ওটাংয়ের ডাকে চারিপাশের ঘন জঙ্গল মুখরিত হয়ে ওঠে, অজ্ঞাত নিশাচর পক্ষীর কুস্বর শোনা যায়, বন্য রবারের ডালপালায় বাদুড়ে ঝটাপটি করে, তখন এই প্রাচীন হিন্দু নগরীর ধ্বংসস্তূপে বসে সুশীল যেন মুহূর্তে কোনো মায়ালোকে নীত হয়- অতীত শতাব্দীর হিন্দু সভ্যতার মায়ালোকে-দিগ্বিজয়ে বীর সমুদ্রগুপ্ত কবি ও বীণবাজিয়ে যে মহাযুগের প্রতীক, হুনবিজেতা মহারথ স্কন্দগুপ্তের কোদণ্ড-টঙ্কারে যে যুগের আকাশ সন্ত্রস্ত৷
সুশীল স্বপ্ন দেখে৷ সনৎকে বলে, বুঝলি সনৎ, জামাতুল্লাকে যথেষ্ট ধন্যবাদ যে, ও আমাদের এনেছে এখানে৷ এসব না দেখলে ভারতবর্ষের গৌরব কিছু বুঝতাম না!
সনৎ একথায় সায় দেয়৷ টাকার চেয়ে এর দাম বেশি৷
ইয়ার হোসেন কিন্তু এসব বোঝে না৷ সে দিন দিন উগ্র হয়ে উঠছে৷ এই নগরীর ধ্বংসস্তূপে প্রায় দশ দিন কাটল৷ অথচ ধনভাণ্ডারের নামগন্ধও নেই, সন্ধানই মেলে না৷ জামাতুল্লাকে একদিন স্পষ্ট শাসালে-যদি টাকাকড়ির সন্ধান না মেলে তো তাকে এই জঙ্গলে টেনে আনবার মজা সে টের পাইয়ে দেবে৷
জামাতুল্লা সুশীলকে গোপনে বললে, বাবুজি, ইয়ার হোসেন বদমাইস গুন্ডা-ও না কী গোলমাল বাধায়!
সুনীল ও সনৎ সর্বদা সজাগ হয়ে রাত্রে, কখন কী হয় বলা যায় না৷ ইয়ার হোসেনের সশস্ত্র অনুচরের দল দিন দিন অসংযত হয়ে উঠছে৷
একদিন জামাতুল্লা বনের মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে একজায়গায় একটি বড়ো পাথরের থাম আবিষ্কার করলে৷ থামের মাথায় ভারতীয় পদ্ধতি অনুসারে পদ্ম তৈরি করা হয়েছে৷ সুশীলকে ডেকে নিয়ে গেল জামাতুল্লা৷ সুশীল এসব দেখে খুশি হল৷ সুশীল ও সনৎ দু-জনে গভীর বনের মধ্যে ঢুকে থামটা দেখতে গেল৷
সেখানে গিয়ে সুশীল দেখলে থামটার সামনে আড়ভাবে পড়ে প্রকাণ্ড একটা পাথরের চাং-যেন একখানা চৌরশ করা সামনের মেঝে৷ সুশীল ক্যামেরা এনেছে থামটার ফটো নেবে বলে, পাথরটা সরিয়ে না দিলে পদ্মটির ছবি নেওয়া সম্ভব নয়৷
জামাতুল্লা বললে, পাথরটা ধরাধরি করে এসো সরাই-
সরাতে গিয়ে পাথরখানা যেই কাত অবস্থা থেকে সোজা হয়ে উঠল, অমনি সনৎ চিৎকার করে বললে, দেখো, দেখো-
সকলে সবিস্ময়ে দেখলে, যেখানে পাথরটা ছিল, সেখানে একটা সুড়ঙ্গ যেন মাটির নীচে নেমে গিয়েছে৷ জামাতুল্লা ও সুশীল সুড়ঙ্গের ধারে গিয়ে উঁকি মেরে দেখলে, সুড়ঙ্গটা হঠাৎ বেঁকে গিয়েছে, প্রথমটা সেজন্যে মনে হয় গর্তটা নিতান্তই অগভীর৷
সুশীল বললে, আমি নামব-
জামাতুল্লা বললে, তা কখনো করতে যাবেন না, বিপদে পড়বেন৷ কী আছে গর্তের মধ্যে কে জানে!
সুশীল বললে, নেমে দেখতেই হবে৷ আমি এখানে থাকি, তোমরা গিয়ে তাঁবু থেকে মোটা দড়ি হাতচল্লিশ, টর্চ আর রিভলবার নিয়ে এসো৷ ইয়ার হোসেনকে কিছু বোলো না৷
সব আনা হল৷ সুশীল জামাতুল্লা দু-জনে সুড়ঙ্গের মধ্যে নামলে৷ খানিক দূরে নামলে ওরা৷ পাথরে বাঁধানো সিঁড়ি পনেরো-ষোলো ধাপ নেমেই কিন্তু দু-জনে হতাশ হল দেখে, সামনে আর রাস্তা নেই৷ সিঁড়ি গিয়ে শেষ হয়েছে একটা গাঁথা দেওয়ালের সামনে৷
সুশীল বললে, এর মানে কী জামাতুল্লা সাহেব?
-বুঝলাম না বাবুজি৷ যদি যেতেই দেবে না, তবে সিঁড়ি গেঁথেছে কেন?
রাত হয়ে আসছে৷ ওরা দু-জনে টর্চ ফেলে চারিদিক ভালো করে দেখতে লাগল৷ হঠাৎ সুশীল চেঁচিয়ে উঠে বললে, দেখো, দেখো! দু-জনেই অবাক হয়ে দেখলে মাথার ওপরে পাথরের গায়ে ওদের পরিচিত সেই চিহ্ন খোদা-পদ্মরাগমণির ওপর সে-চিহ্ন খোদা ছিল৷ ভারতীয় স্বস্তিক চিহ্ন, প্রত্যেক বাহুর কোণে এক জানোয়ারের মূর্তি-সর্প, বাজপাখি, বাঘ ও কুমির৷
-এই সেই আঁকজোঁক বাবুজি! কিন্তু এর মানে কী, সিঁড়ি বন্ধ করলে কেন, বুঝলেন কিছু?
দু-জনেই হতভম্ভ হয়ে গেল৷ সুশীল সামনের পাথরখানাতে হাত দিলে, বেশ মসৃণ; মাপ নিয়ে চৌরশ করে কেটে কে রেখেছে৷
কিছুই বোঝা গেল না-অবশেষে হতাশ হয়ে ওরা গর্ত থেকে উঠে পড়ে তাঁবুতে ফিরে এল সনৎকে নিয়ে৷ সেখানে কাউকে কিছু বললে না৷ পরদিন দুপুরবেলা সুশীল একা জায়গাটায় গেল৷ আবার সুড়ঙ্গের মধ্যে নামলে৷ ওর মনে একথা বিশেষভাবে জেগে ছিল, লোকে এইটুকু গর্তে ঢুকবার জন্যে এরকম সিঁড়ি গাঁথে না৷ এ সুড়ঙ্গ নিশ্চয় আরও অনেক বড়ো৷ কিন্তু তবে দশ ধাপ নেমেই পাথর দিয়ে এমন শক্ত করে বোজানো কেন?
এ গোলমেলে ব্যাপারের কোনো মীমাংসা করা যায় না দেখা যাচ্ছে৷ সুশীল চারিদিকে চেয়ে দেখলে মাথার ওপরে পাথরের গায়ে সেই অদ্ভুত চিহ্নটি সুস্পষ্ট খোদাই করা আছে৷ চিহ্নই বা এখানে কেন? ভালো করে চেয়ে চিহ্নটি দেখতে দেখতে ওর চোখে পড়ল, যে পাথরের গায়ে চিহ্নটি খোদাই করা তার এক কোণের দিকে আরেকটা কী খোদাই করা আছে৷ সুড়ঙ্গের মধ্যে অন্ধকার খুব না হলেও আলোও তেমন নয়৷ সুশীল টর্চ ফেলে ভালো করে দেখলে-চিহ্নটি আর কিছুই নয়, ঠিক যেন একটি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ রাখবার সামান্য খোল৷ খোলের চারিপাশে দু-টি লতার আকারের বলয় কিংবা অন্য কোনো অলংকার পরস্পর যুক্ত৷ সুশীল কী মনে ভেবে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের খোলে নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে চেপে দেখতে গেল৷
সঙ্গেসঙ্গে সামনের পাথর যেন কলের দোরের মতো সরে একটা মানুষ যাবার মতো ফাঁক হয়ে গেল৷ সুশীল অবাক৷ এ যেন সেই আরব্য উপন্যাসের বর্ণিত আলিবাবার গুহা!
সে বিস্মিত হয়ে চেয়ে দেখলে, সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে গিয়েছে৷ সুশীল সিঁড়ি দিয়ে নামবার আগে উঁকি মেরে চাইলে অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে৷ বহু যুগ আবদ্ধ দূষিত বাতাসের বিষাক্ত নিশ্বাস যেন ওর চোখে-মুখে এসে লাগল৷ তখন কিন্তু সুশীলের মন আনন্দে কৌতূহলে চঞ্চল হয়ে উঠেছে, বসে ভাববার সময় নেই৷ ও তাড়াতাড়ি কয়েক ধাপ নেমে গেল৷
আবার সিঁড়ি বেঁকে গিয়েছে কিছুদূর গিয়ে৷ এবার আর সামনে পাথর নেই, সিঁড়ি এঁকেবেঁকে নেমে চলেছে৷ সুশীল একবার ভাবলে তার আর যাওয়া উচিত নয়৷ কতদূর সিঁড়ি নেমেছে এই ভীষণ অন্ধকূপের মধ্যে কে জানে? কিন্তু কৌতূহল সংবরণ করা ওর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ল৷ ও আরও অনেকখানি নীচে গিয়ে দেখলে একজায়গায় সিঁড়ি হঠাৎ শেষ হয়ে গেল৷ টর্চ জ্বেলে নীচের দিকে ঘুরিয়ে দেখলে, কোনোদিকে কিছুই নেই-পাথর বাঁধানো চাতাল বা মেঝের মতো তলাটা সব শেষ, আর কিছু নেই৷ ইংরাজিতে যাকে বলে dead end, ও সেখানে পৌঁছে গিয়েছে৷ সুশীল হতভম্ব হয়ে গেল৷
যারা এ সিঁড়ি গেঁথেছিল তারা কী জন্যে এত সতর্কতার সঙ্গে এত কষ্ট করে সিঁড়ি গেঁথেছিল যদি সে সিঁড়ি কোথাও না পৌঁছে দেয়?
চাতালের দৈর্ঘ্য হাত তিনেক, প্রস্থ হাত আড়াই৷ খুব একখানা বড়ো পাথরের দ্বারা যেন সমস্ত মেঝে বা চাতালটা বাঁধানো৷ তন্নতন্ন করে খুঁজে চাতালের কোথাও কিছু পাওয়া গেল না৷ সুশীল বাধ্য হয়ে বোকা বনে উঠে চলে এসে জামাতুল্লা ও সনৎকে সব বললে৷ ওরা পরদিন লুকিয়ে তিনজনে সেখানে গেল, সিঁড়ি দিয়ে নামলে৷ সামনে সেই চাতাল৷ সিঁড়ির শেষ৷
জামাতুল্লা বললে, এ কী তামাশা আছে বাবুজি-আমি তো বেকুব বনে গেলাম!
তিনজনে মিলে নানাভাবে পাথরটা দেখলে, এখানে টিপলে, ওখানে চাপ দিলে-হিমালয় পর্বতের মতোই অনড়৷ কোথাও কোনো চিহ্ন নেই পাথরের গায়ে৷ মিনিট কুড়ি কেটে গেল৷ মিনিট কুড়ি সেই অন্ধকার ভূগর্ভে কাটানো বিপজ্জনকও বটে, অস্বস্তিকর বটে৷
সুশীল বললে, ওঠো সবাই, আর না এখানে৷
হঠাৎ জামাতুল্লা বলে উঠল, বাবুজি, একটা কথা আমার মনে এসেছে৷
দু-জনেই বলে উঠল, কী? কী?
-গাঁতি দিয়ে এই পাথরখানা খুঁড়ে তুলে দেখলে হয়৷ কী বলেন?
তখন ওরাও ভাবলে এই সামান্য কথাটা৷ যেকথা, সেই কাজ৷ জামাতুল্লা লুকিয়ে তাঁবু থেকে গাঁতি নিয়ে এল৷ পাথর খুঁড়ে শাবলের চাড় দিয়ে তুলে ফেলে যা দেখলে তাতে ওরা যেমন আশ্চর্য হল তেমনি উত্তেজিত হয়ে উঠল৷ আবার সিঁড়ির ধাপ৷ কিন্তু দশ ধাপ নেমে গিয়ে সিঁড়ি বেঁকে গেল-আবার সামনে চৌরশ পাথর দিয়ে সুড়ঙ্গ বোজানো৷ মাথার ওপরকার পাথরে পূর্ববৎ চিহ্ন পাওয়া গেল৷ বুড়ো আঙুল দিয়ে টিপে আবার সে পাথর ফাঁক হল৷ আবার সিঁড়ি৷ কিন্তু কিছুদূর নেমে আবার পাথর-বাঁধানো চাতাল-আবার সেই dead end-নির্দেশহীন শূন্য৷
অমানুষিক পরিশ্রম৷ আবার পাথর তুলে ফেলা হল-আবার সিঁড়ি৷ সুশীল বললে, যারা এ গোলকধাঁধা করেছিল, তারা খানিকদূর গিয়ে একবার একখানা পাথর সোজা করে পথ বুজিয়েছে, তার পরে সিঁড়ির মতো পেতে বুজিয়েছে-এই এদের কৌশল, বেশ বোঝা যাচ্ছে৷ জামাতুল্লা ওদের সতর্ক করে দিলে৷ বললে, বাবুজি, অনেক নীচে নেমে এসেছি৷ খারাপ গ্যাস থাকতে পারে, দম বন্ধ হয়ে মারা যেতে পারি সবাই৷ তাঁবুতে সন্দেহ করবে৷ চলুন আজ ফিরি৷
তাঁবুতে ফিরবার পথে জামাতুল্লা বললে, বাবুজি, ইয়ার হোসেনকে এর খবর দেবেন না৷
-কেন?
-কী জানি কী আছে ওর মধ্যে৷ যদি রত্নভাণ্ডারের সন্ধানই পাওয়া যায়, তবে ইয়ার হোসেন কী করবে বলা যায় না৷ ওর সঙ্গে লোক বেশি৷ প্রত্যেকে গুন্ডা ও বদমাইস৷ মানুষ খুন করতে ওরা এতটুকু ভাববে না৷ ওদের কাছে মশা টিপে মারাও যা মানুষ মারাও তাই৷
ইয়ার হোসেনের মন যথেষ্ট সন্দিগ্ধ৷ তাঁবুতে ফিরতে সে বললে, কোথায় ছিলে তোমরা?
সুশীল বললে, ফটো নিচ্ছিলাম৷
ইয়ার হোসেন হেসে বললে, ফটো নিয়ে কী হবে, যার জন্যে এত কষ্ট করে আসা-তার সন্ধান করো৷
ইয়ার হোসেনের জনৈক মালয় অনুচর সেদিন দুপুরে একটা পাথরের বৃষমূর্তি কুড়িয়ে পেলে গভীর বনের মধ্যে৷ খুব ছোটো, কিন্তু অতটুকু মূর্তির মধ্যেও শিল্পীর শিল্পকৌশলের যথেষ্ট পরিচয় বর্তমান৷
রাত্রে জ্যোৎস্না উঠল৷
সুশীল তাঁবু থেকে একটু দূরে একটা কাঠের গুঁড়ির ওপর গিয়ে বসল৷ ভাবতে ভালো লাগে এই সমুদ্রমেলা দ্বীপময় রাজ্যের অতীত গৌরবের দিনের কাহিনি৷ রাত্রে যামঘোষী দুন্দুভি বেজে উঠল- ধারাযন্ত্রে স্নান সমাপ্ত করে, কুঙ্কুমচন্দনলিপ্ত দেহে দিগ্বিজয়ী নৃপতি চলেছেন অঃন্তপুরের অভিমুখে৷ বারবিলাসিনীরা তাঁকে স্নান করিয়ে দিয়েছে এইমাত্র-তারাও ফিরছে তাঁর পিছনে পিছনে, কারো হাতে রজত কলস, কারো হাতে স্ফটিক কলস...
আধো-অন্ধকার কালো মতো কে একটা মানুষ বনের মধ্যে থেকে বার হয়ে সুশীলের দিকে ছুটে এল আততায়ীর মতো-সুশীল চমকে উঠে একখানা পাথর ছুড়ে মারল৷ মানুষটা পড়েই জানোয়ারের মতো বিকট চিৎকার করে উঠল-তারপর আবার উঠে আবার ছুটল ওর দিকে৷ সুশীল ছুট দিলে তাঁবুর দিকে৷
ওর চিৎকার শুনে তাঁবু থেকে সনৎ বেরিয়ে এল৷ ধাবমান জিনিসটাকে সে গুলি করলে৷ সেটা মাটিতে লুটিয়ে পড়লে দেখা গেল একটা ওরাং-ওটাং৷
জামাতুল্লা ও ইয়ার হোসেন দু-জনে তিরস্কার করলে সুশীলকে৷
এই বনে যেখানে সেখানে একা যাওয়া উচিত নয়, তারা কতবার বলবে একথা? কত জানা-অজানা বিপদ এখানে পদে পদে৷
পরদিন ছুতো করে সুশীল ও জামাতুল্লা আবার বেরিয়ে গেল বনের মধ্যে সেই গুহায়! সনৎকে সঙ্গে নিয়ে গেল না৷ কেননা সকলে গেলে সন্দেহ করবে ওরা৷
আবার সেই পরিশ্রম৷ আরও দু-ধাপ সিঁড়ি ও দুটো চাতাল ডিঙিয়ে গেল৷ দিন শেষ হয়ে গেল, সেদিন আর কাজ হয় না৷ আবার তার পরের দিন কাজ হল শুরু৷ এইরকম আরও তিন-চার দিন কেটে গেল৷
একদিন সনৎ বললে, দাদা, তোমরা আর দিনকতক যেয়ো না৷
সুশীল বললে, কেন?
-ইয়ার হোসেন সন্দেহ করছে৷ সে রোজ বলে, এরা বনের মধ্যে কী করে৷ এত ফটো নেয় কীসের?
কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আর একদিনের কাজ বাকি৷ ওর শেষ না দেখে আমি আসতে পারছিনে৷
-একা যাও-দু-জনে যেয়ো না৷ জোট বেঁধে গেলেই সন্দেহ করবে৷ হাতিয়ার নিয়ে যেয়ো৷
-তুই তাঁবুতে থেকে নজর রাখিস ওদের ওপর৷ কাল খুব সকালে আমি বেরিয়ে যাব!
সুশীল তাই করলে৷ প্রায় ষাট ফুট নীচে তখন শেষ চাতাল পর্যন্ত নেমে গিয়েছে৷ সেদিন দুপুর পর্যন্ত পরিশ্রম করে সে চাতালটা ভেঙে ফেললে৷
তারপর যা দেখলে তাতে সুশীল একেবারে বিস্মিত, স্তম্ভিত হয়ে পড়ল৷

সিঁড়ি গিয়ে শেষ হয়েছে ক্ষুদ্র একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষে৷
কক্ষের মধ্যে অন্ধকার সূচিভেদ্য৷
টর্চের আলোয় দেখা গেল কক্ষের ঠিক মাঝখানে একটি পাষাণবেদিকার ওপর এক পাষাণ নারীমূর্তি-বিলাসবতী কোনো নর্তকী যেন নাচতে নাচতে হঠাৎ বিটঙ্কবেদিকার ওপর পুত্তলিকার মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে কী দেখে৷
একী!
এর জন্যে এত পরিশ্রম করে এসব কাণ্ড করেছে!
সুশীল আরও অগ্রসর হয়ে দেখতে গেল৷
হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল৷ পাথরের বেদির ওপর সেই চিহ্ন আবার খোদাই করা৷ ঘরের মধ্যে টর্চ ঘুরিয়ে দেখলে৷ তাকে ঘর বলা যেতে পারে, একটা বড়ো চৌবাচ্চাও বলা যেতে পারে৷ স্যাঁতসেতে ছাদ, স্যাঁতসেতে মেজে-পাতালপুরীর এই নিভৃত অন্ধকার গহ্বরে এ প্রস্তরময়ী নারীমূর্তির রহস্য কে ভেদ করবে!
কিন্তু কী অদ্ভুত মূর্তি! কটিতে চন্দ্রহার, গলদেশে মুক্তামালা, প্রকোষ্ঠে মণিবলয়! চোখের চাহনি সজীব বলে ভ্রম হয়৷
সেদিন ও ফিরে গেল৷ জামাতুল্লাকে পরদিন সঙ্গে করে নিয়ে এল-তন্নতন্ন করে চারিদিকে খুঁজে দেখলে ঘরের মধ্যে কোথাও কিছু নেই৷
জামাতুল্লা বললে, কী মনে হয় বাবুজি?
-তোমার কী মনে হয়?
-এই সিঁড়ি আর চাতাল, চাতাল আর সিঁড়ি ষাট ফুট গেঁথে মাটির নীচে শেষে নাচনেওয়ালি পুতুল! ছোঃ বাবুজি-এর মধ্যে আর কিছু আছে৷
-বেশ, কী আছে, বার করো৷ মাথা খাটাও৷
-তা তো খাটাব-এদিকে ইয়ার হোসেনের দল যে খেপে উঠেছে৷ কাল ওরা কী বলেছে জানেন?
-কীরকম?
-আর দু-দিন ওরা দেখবে-তারপর নাকি এ দ্বীপ ছেড়ে চলে যাবে৷ তা ছাড়া আর এক ব্যাপার৷ আপনাকেও ওরা সন্দেহ করে৷ বনের মধ্যে রোজ আপনি কী করেন? আমায় প্রায়ই জিজ্ঞেস করে৷
-তুমি কী বলো?
-আমি বলি বাবুজি ফটো তোলে, ছবি আঁকে৷ তাতে ওরা আপনাকে ঠাট্টা করে৷ ওসব মেয়েলি কাজ৷
-যারা এই নগর গড়েছিল, পুতুল তৈরি করেছিল, পাথরে ছবি এঁকেছিল তারা পুরুষমানুষ ছিল জামাতুল্লা৷ ইয়ার হোসেনের চেয়ে অনেক বড়ো পুরুষ ছিল-বলে দিয়ো তাকে৷
সুশীলকে রেখে জামাতুল্লা ফিরে যেতে চাইলে৷ নতুবা ইয়ার হোসেনের দল সন্দেহ করবে৷ যাবার সময় সুশীল বললে, কোনো উপায়ে এখানে একটা আলোর ব্যবস্থা করতে পার? টর্চ জ্বালিয়ে কতক্ষণ থাকা যায়? আর কিছু না থাক সাপের ভয়ও তো আছে৷
জামাতুল্লা বললে, আমি এক্ষুনি ফিরে আসছি লন্ঠন নিয়ে বাবুজি৷ আপনি ওপরে উঠে বসুন, এ পাতালের মধ্যে একা থাকবেন না-
সুশীল বললে, না, তুমি যাও, আমি এখানেই থাকব৷ পকেটে একটুকরো মোমবাতি এনেছি-তাই জ্বালাব৷
একটুকরো বাতি জ্বালিয়ে সুশীল ঘরটার মধ্যে বসে ভাবতে লাগল৷ বাইরে এত বড়ো রাজ্য যারা প্রতিষ্ঠা করেছিল, কোনো জিনিস গোপন করবার জন্যে তারা এই পাতালপুরী তৈরি করেছিল, এত কষ্ট স্বীকার করে নর্তকী-মূর্তি প্রতিষ্ঠা করবার জন্যে নয় নিশ্চয়ই৷
হঠাৎ নর্তকী পুতুলটার দিকে ওর দৃষ্টি পড়তে ও বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে গেল! কী ব্যাপার এটা?
এতক্ষণ মূর্তিটার যতখানি তার দিকে ছিল, সেটা যেন সামান্য একটু পাক খেয়ে খানিকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে৷
সুশীল চোখ মুছে আবার চাইলে৷
হ্যাঁ, সত্যিই তাই৷ এই বাতিটার সামনে ছিল ওই পা-খানা- এখন পায়ের হাঁটুর পেছনের অংশ দেখা যায় কী করে? সে তো এতটুকু নড়েনি নিজে, যেখানে, সেখানেই বসে আছে৷
সুশীলের ভয় হল৷ শ্মশানপুরীর ভূগর্ভস্থ কক্ষ, কত শতাব্দীর পুঞ্জীভূত দৈত্যদানোর দল জমা হয়ে আছে এসব জায়গায় কে বলতে পারে? কীসে মৃত্যু আর কীসে জীবন, এ বার্তা পৌঁছে দেবার লোক নেই৷ সরে পড়াই ভালো৷
এমন সময় ওপর থেকে লন্ঠনের আলো এসে পড়ল, পায়ের শব্দ শোনা গেল৷ জামাতুল্লা লন্ঠন নিয়ে ঘরের মধ্যে ওপর থেকে উঁকি মেরে বললে, বাবুজি, ঠিক আছেন?
-তা আছি৷ ঘরের মধ্যে নামো জামাতুল্লা-
জামাতুল্লা ঘরের মেঝেতে নেমে ওর পাশে দাঁড়াল৷ সুশীল ওকে মূর্তির ব্যাপারটা দেখিয়ে বললে, এখন তুমি কী মনে করো?
-কিছু বুঝতে পারছিনে বাবুজি-খুব তাজ্জব কথা!
-তুমি থাকো এখানে-বোসো-
কিন্তু জামাতুল্লা দাঁড়াল না৷ দু-জনে এখানে বসে থাকলে ইয়ার হোসেনের দলের সন্দেহ ঘোরালো রকম হয়ে উঠবে, সে থাকতে পারবে না৷ জামাতুল্লা চলে যাবার পর সুশীল অনেকক্ষণ মূর্তিটার দিকে চেয়ে বসে রইল৷ মূর্তিটা এবার বেশ ঘুরে গিয়েছে, এ সম্বন্ধে আর কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না৷ ওর আগের ভয়ের ভাবটা কেটে গিয়েছিল জামাতুল্লা লন্ঠন নিয়ে আসবার পর থেকে, এখন ভয়ের চেয়ে কৌতূহল বেশি৷
খুব একটু একটু করে ঘুরছে, ঘূর্ণমান রঙ্গমঞ্চের মতোই, মূর্তির পদতলস্থ বিটঙ্কবেদিকা৷
কেন? কী উদ্দেশ্য? অতীত শতাব্দীগুলো মূক হয়ে রইল, এর জবাব মেলে না৷ বেলা গড়িয়ে এল, সুশীলের হাতঘড়িতে বাজে পাঁচটা৷
হঠাৎ সুশীল চেয়ে দেখলে আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার৷
নর্তকী-মূর্তির সরু সরু আঙুলগুলির মধ্যে একটা আঙুল থেকে মুদ্রা রচনা করার দরুন অন্য সব আঙুল থেকে পৃথক এবং একদিকে কী যেন নির্দেশ করবার ভঙ্গিতে ছিল৷ এবার যেন আঙুলের ছায়া পড়েছে দেওয়ালের এক বিশেষ স্থানে৷
এমন ভঙ্গিতে পড়েছে যেন মনে হয় মূর্তিটি তর্জনী-অঙ্গুলির দ্বারা ভিত্তিগাত্রের একটি স্থান নির্দেশ করছে৷
তখনই একটা কথা মনে হল সুশীলের৷ লন্ঠনের আলোর দ্বারা এ ছায়া তৈরি হয়েছে, না কোনো গুপ্ত ছিদ্রপথে দিবালোক প্রবেশ করছে ঘরের মধ্যে?
তা-ই বলে মনে হয়, লন্ঠনের আলোর কৃত্রিম ছায়া এ নয়৷ লন্ঠনের আলো কমিয়ে দিয়ে দেখলে-তখন অস্পষ্ট আলো-অন্ধকারের মধ্যেও তর্জনীর ছায়া ভিত্তিগাত্রে পড়ে একটা স্থান যেন নির্দেশ করছে৷
অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে উঠে ও জায়গাটা দেখতে গেল৷
দেওয়ালের সেই জায়গা একেবারে সমতল, চিহ্নহীন- চারিপাশের অংশের সঙ্গে পৃথক করে নেওয়ার মতো কিছুই নেই সেখানে৷ তবুও সে নিরাশ না হয়ে দেওয়ালের জায়গাটাতে হাত বুলিয়ে দেখতে গেল৷
হাত দেবার সঙ্গেসঙ্গে একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল৷ ঠিক যেখানে আঙুলের অগ্রভাগ শেষ হয়েছে সেই স্থানের খানিকটা যেন বসে গেল-অর্থাৎ ঢুকে গেল ডেকে৷ একটা শব্দ হল পেছনের দিকে-ও পেছন ফিরে চেয়ে দেখল বিটঙ্কবেদিকার তলাটা যেন ঈষৎ ফাঁক হয়ে গিয়েছে৷
ও ফিরে এসে ভালো করে লক্ষ করে দেখলে, গোলাকার বেদিকাটি তার নর্তকী-মূর্তিটা সুদ্ধ যেন একটা পাথরের ছিপি৷ বড়ো বোতলের মুখে যেমন কাচের স্টপার বা ছিপি থাকে, এ যেন পাষাণ-নির্মিত বিরাট এক স্টপার৷ কীসের চাড় লেগে স্টপারের মুখ ফাঁক হয়ে গিয়েছে৷
ও নর্তকী-মূর্তির পাদদেশে এবং গ্রীবায় দুই হাত দিয়ে মূর্তিটাকে একটু ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টা করতেই সেটা সবসুদ্ধ বেশ আস্তে আস্তে ঘুরতে লাগল৷ কয়েকবার ঘুরবার পর ক্রমেই তার তলার ফাঁক চওড়া হয়ে আসতে লাগল৷ কী কৌশলে প্রাচীন শিল্পী পাথরের উপরটাকে ঘূর্ণমান করে তৈরি করেছিল?
এই মূর্তিসুদ্ধ বেদিকা টেনে তোলা তার একার সাধ্যে কুলুবে না৷ জামাতুল্লা ও সনৎ দু-জনকেই আনতে হবে কোনো কৌশলে সঙ্গে করে, ইয়ার হোসেনের দলের অগোচরে!
সন্ধ্যার অন্ধকার নামবার বিলম্ব নেই৷ বহু দিন-রাত্রির ছায়া অতীতের এ নিস্তব্ধ কক্ষে জীবনের সুর ধ্বনিত করেনি, এখানে গভীর নিশীথ রাত্রির রহস্য হয়তো মানুষের পক্ষে খুব আনন্দদায়ক হবে না, মানুষের জগতের বাইরে এরা৷
সুশীল লন্ঠন হাতে উঠে এল আঁধার পাতালপুরীর কক্ষ থেকে৷ তাঁবুতে ঢুকবার পথে ইয়ার হোসেন বড়ো ছুরি দিয়ে পাখির মাংস ছাড়াচ্ছে৷
সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে বললে, কোথায় ছিলেন?
-ছবি আঁকতে, মি. হোসেন৷
-লন্ঠন কেন?
-পাছে রাত হয়ে যায় ফিরতে৷ বনের মধ্যে আলো থাকলে অনেক ভালো৷
-এত ছবি এঁকে কী হয় বাবু?
-ভালো লাগে৷
-আসল ব্যাপারের কী? জামাতুল্লা আমাদের ফাঁকি দিয়েছে৷ আমি ওকে মজা দেখিয়ে দেব৷
-আমরা সকলেই চেষ্টা করছি! ব্যস্ত হবেন না মি. হোসেন-
-আমি আর পাঁচ দিন দেখব৷ তারপর এখান থেকে চলে যাব-কিন্তু যাবার আগে জামাতুল্লাকে দেখিয়ে যাব সে কার সঙ্গে জুয়োচুরি করতে এসেছিল!
-জামাতুল্লার কী দোষ? আপনি বরং আমাকে দোষ দিতে পারেন-
-আরে আপনি তো ছবি-আঁকিয়ে পুরুষমানুষ৷ এসব কাজ আপনার না৷
সুশীল রাত্রে চুপিচুপি জামাতুল্লাদের নর্তকী পুতুলের ঘটনা সব বললে৷ ওদের দু-জনকেই যেতে হবে, নতুবা ছিপি উঠবে না৷
জামাতুল্লা বললে, কিন্তু আমাদের দু-জনের একসঙ্গে যাওয়া সম্ভব নয় বাবুজি৷
-কেন?
-জানেন না,-এর মধ্যে নানারকম ষড়যন্ত্র চলছে৷ ওরা আপনাদের চেয়ে আমাকেই দোষ দেবে বেশি৷ আপনাকে ওরা নিরীহ, গোবেচারি বলে ভাবে-
-সেটা অন্যায়৷
-আপনারা ভালো মানুষ, আমার হাতের পুতুল-পুতুল যেমন নাচায়, তেমনি আমার হাতে-
শেষের কথাটা শুনে সুশীলের আবার মনে পড়ল নর্তকী-মূর্তির কথা৷ কাল হয়তো বেরুনো যাবে না, ইয়ার হোসেনের কড়া নজরবন্দির দরুন৷ আজই রাত্রে অন্য দল ঘুমুলে সেখানে গেলে ক্ষতি কী?
সনৎকে বললে, সনৎ, তৈরি হও৷ আজ রাত্রে হয় আমাদের জীবন, নয়তো আমাদের মরণ৷ পাতালপুরীর রহস্য আজ ভেদ করতেই হবে৷ আজ আঁধার রাত্রে চুপিচুপি বেরুবে আমার সঙ্গে- দিনের আলোয় সব ফাঁস হয়ে যাবে৷
জামাতুল্লা বললে, কেউ টের না পায় বাবুজি, জুতো হাতে করে সব যাবেন কিন্তু৷
আহারাদির পর্ব মিটে গেল৷ দাবানল জ্বলে উঠেছে আজ ওদের মনে, বনের সাময়িক দাবানলকেও ছাপিয়ে তার শিখা সমস্ত মনের আকাশ ব্যেপে বেড়ে উঠল৷
দুটো রাইফেল, একটা রিভলবার, একটা শাবল, একটা গাঁতি, খানিকটা দড়ি, চার-পাঁচটা মোমবাতি, কিছু খাবার জল, এক শিশি টিংচার আইডিন, খানকতক মোটা মোটা রুটি-তিনজনের মধ্যে এগুলো ভাগ করে নিয়ে রাত একটার পর ওরা অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে তাঁবু ফেলে বেরুল৷
ইয়ার হোসেনের একজন মালয় অনুচর উলটোমুখে দাঁড়িয়ে 'বলো' (রামদাও) হাতে পাহারা দিচ্ছে! অন্ধকারে এরা বুক ঘেঁষে চলে এল...সে লোকটা টের পেল না৷
সনৎ বললে, আমি সে পুতুলটা একবার দেখব-
অদ্ভুত রাত্রি! বনের মাথায় অগণিত তারা, বহুকালের সুপ্ত নগরীর রহস্যে নিশীথ রাত্রির অন্ধকার যেন থমথম করছে, সমস্ত ধ্বংসস্তূপটি যেন মুহূর্তে শহর হয়ে উঠতে পারে-ওর অগণিত নরনারী নিয়ে৷ লতাপাতা ঝোপঝাপ, মহীরুহের দল খাড়া হয়ে সেই পরম মুহূর্তের প্রতীক্ষায় যেন নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে৷
অন্ধকারে একটা সরসর শব্দ হতে লাগল সামনের মাটিতে৷
সকলে থমকে দাঁড়াল হঠাৎ৷ সনৎ ও সুশীল একসঙ্গে টর্চ টিপলে-প্রকাণ্ড একটা অজগর সাপ আস্তে আস্তে ওদের পাঁচ হাত তফাত দিয়ে চলে যাচ্ছে৷ সকলে পাথরের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল, সাপটা বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ তারপর ওরা আবার চলল৷
গহ্বরের মুখ ওরা লতাপাতা দিয়ে ঢেকে রেখে গিয়েছিল, তিনজনে মিলে সেগুলো সরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে লাগল৷
সনৎ বললে, এ তো বড়ো আশ্চর্য ব্যাপার দেখছি-
কিন্তু পাতালপুরীর কক্ষের সে নর্তকী-মূর্তিটা দেখে ওর কথা সরল না৷ শিল্পীর অদ্ভুত শিল্পকৌশলের সামনে ও যেন হতভম্ভ হয়ে গেল৷
সুশীল বললে, শুধু মূর্তিটা কিউরিও হিসাবে বিক্রি করলে দশ হাজার টাকায় যেকোনো বড়ো শহরের মিউজিয়ম কিনে নেবে- তবে, আমাদের দেশে নয়-ইউরোপে৷
জামাতুল্লা বললে, ধরুন বাবুজি নাচনেওয়ালি পুতুলটা সবাই মিলে-পাক খাওয়াতে হবে একে বারকয়েক এখনও৷
মিনিট দুই সবাই মিলে পাক দিয়ে মূর্তিটাকে ঘোরাল, যেমন স্টপার ঘোরায় বোতলের মুখে৷ তারপর সবাই সন্তর্পণে মূর্তিটাকে ধরে উঠিয়ে নিলে৷ স্টপারের মতোই সেটা খুলে এল৷
সঙ্গেসঙ্গে বিটঙ্কবেদির নীচের অংশে বার হয়ে পড়ল গোলাকার একটা পাথরের চৌবাচ্চা৷ সুশীল উঁÍকি মেরে দেখে বললে, টর্চ ধরো, খুব গভীর বলে মনে হচ্ছে-
টর্চ ধরে ওরা দেখলে চৌবাচ্চা অন্তত সাত ফুট গভীর৷ তার তলায় কী আছে ওপর থেকে ভালো দেখা যায় না৷
সনৎ বললে, আমি লাফ দিয়ে পড়ব দাদা?
জামাতুল্লা বারণ করলে৷ এসব পুরোনো কূপের মধ্যে বিষধর সর্প প্রায়ই বাসা বাঁধে, সমীচীন হবে না৷
দু-একটি পাথর ছুড়ে মেরে ওরা দেখলে, কোনো সাড়াশব্দ এল না আধো-অন্ধকার কূপের মধ্যে থেকে৷ তখন জামাতুল্লাই ধুপ করে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল ওর মধ্যে৷
কিছুক্ষণ তার আর কোনো সাড়া নেই৷
সুশীল ও সনৎ অধীর কৌতূহলের সঙ্গে বলে উঠল, কী-কী -কী দেখলে?
তবুও জামাতুল্লার মুখে কথা নেই৷ সে যেন কী হাতড়ে বেড়াচ্ছে চৌবাচ্চার তলায়৷ একটু অদ্ভুতভাবে হাতড়াচ্ছে- একবার সামনে যাচ্ছে, আবার পিছু হটে আসছে৷
সুশীল বললে, কী হল হে? পেলে কিছু দেখতে?
জামাতুল্লা বললে, বাবুজি, এর মধ্যে কিছু নেই-
-কিছু নেই?
-না বাবুজি! একেবারে ফাঁকা-
-তবে তুমি ওর মধ্যে কী করছ জামাতুল্লা?
-এর মধ্যে একটা মজার ব্যাপার আছে৷ নেমে এসে দেখুন-
সুশীল ও সনৎ সন্তর্পণে একে একে পাথরের চৌবাচ্চাটির মধ্যে লাফিয়ে পড়ল৷ জামাতুল্লা দেখালে, এই দেখুন বাবুজি, এই লাইন ধরে একবার সামনে, একবার পিছনে গিয়ে দেখুন-তাহলেই বুঝতে পারবেন-
-সামনে পেছনে গিয়ে কী হবে?
সুশীল লক্ষ করে দেখলে চৌবাচ্চার ডানদিকের দেওয়ালে একটা কালো রেখা আছে; সেইটে ধরে যদি সামনে বা পেছনে যাওয়া যায় তবে চৌবাচ্চার তলাটা একবার নামে, একবার ওঠে৷ ছেলেদের ‘see-saw’ খেলার তক্তাটার মতো৷
সনৎ বললে, ব্যাপারটা কী?
সুশীল বললে, অর্থাৎ এটা যদি কোনোরকমে ওঠানো যায়, তবে এর মধ্যে আর কিছু রহস্য আছে৷ কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব বুঝতে পারা যাচ্ছে না৷
জামাতুল্লা বললে, বাবু, গাঁতি দিয়ে তলা ভেঙে ফেলতে পারি তো-অন্য কোনো পথ যদি না পাওয়া যায়৷ কিন্তু আজ থাকলে হত না বাবুজি? বড্ড দেরি হয়ে গেল আজ-সকাল হয়-হয়-
হঠাৎ সুশীল চৌবাচ্চার এক জায়গায় টর্চের আলো ফেলে বলে উঠল, এই দেখো সেই চিহ্ন-
সনৎ ও জামাতুল্লা সবিস্ময়ে দেখলে, চৌবাচ্চার কালো রেখার ওপরে উত্তরদিকের কোণে দু-খানা পাথরের সংযোগস্থলে তাদের অতিপরিচিত সেই চিহ্নটি আঁকা৷
সুশীল বললে, হদিস পেয়েছি বলে মনে হচ্ছে-
-অর্থাৎ?
-অর্থাৎ এই চিহ্নের ওপর টিপলেই চৌবাচ্চার তলার পাথরখানা একদিকে খুব বেশি কাত হয়ে ভেতরে কী আছে দেখিয়ে দেবে৷ কিন্তু আজ বড্ড বেলা হয়ে গেল৷ আজ থাক, চলো৷
জামাতুল্লাও তাতে মত দিলে৷ সবাই মিলে তাঁবুতে ফিরে এল যখন, তখনও ভোরের আলো ভালো করে ফোটেনি৷ ইয়ার হোসেনের মালয় ভৃত্য 'বলো' হাতে তাঁবুর দ্বারে চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়ে আছে৷ জামাতুল্লার ইঙ্গিতে সুশীল ও সনৎ উপুড় হয়ে পড়ে বুকে হেঁটে নিজেদের তাঁবুর মধ্যে ঢুকে পড়ল৷
জামাতুল্লা বললে, ঘুমিয়ে পড়ুন বাবুজিরা-কিন্তু বেশি বেলা পর্যন্ত ঘুমুবেন না, আমি উঠিয়ে দেব সকালেই৷ নইলে ওরা সন্দেহ করবে৷
সুশীল বললে, আমাদের অবর্তমানে ওরা ঘরে ঢোকেনি এই রক্ষে-
সনৎ অবাক হয়ে বললে, কী করে জানলে দাদা?
-দেখবে? এই দেখো৷ তাঁবুর দোরে সাদা বালি ছড়ানো, যে-কেউ এলে পায়ের দাগ পড়ত৷ তা পড়েনি৷
ওরা যে যার বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল৷
সুশীলকে কে যেন বললে, আমার সঙ্গে আয়৷
গভীর অন্ধকারের মধ্যে এক দীর্ঘাকৃতি পুরুষের পিছু পিছু ও গভীর বনের কতদূর চলল৷ ইয়ার হোসেনের ভৃত্যগণ ঘোর তন্দ্রাভিভূত, ঊষার আলোকের ক্ষীণ আভাসও দেখা যায় না পূর্ব দিগন্তে৷ বৃক্ষলতা স্তব্ধ, স্বপ্নঘোরে আচ্ছন্ন৷ সারি সারি প্রাসাদ একদিকে, অন্যদিকে প্রশস্ত দিঘিটার টলটলে নির্মল জলরাশির বুকে পদ্মফুল ফুটে আছে৷ সেই গভীর অন্ধকারের মধ্যে দেউলে দেউলে ত্রিমূর্তি মহাদেবের পূজা হচ্ছে৷ সুগন্ধ দীপবর্তিকার আলোকে মন্দিরাভ্যন্তর আলোকিত৷ প্রাসাদের বাতায়ন বলভিতে শুসার তন্দ্রামগ্ন৷
সুশীল বললে, আমায় কোথায় নিয়ে যাবেন?
-সেকথা বলব না৷ ভয় পাবি-
-তবুও শুনি, বলুন-
-বহুদিনের বহু ধ্বংস, অভিশাপ, মৃত্যুর দীর্ঘশ্বাসে এ পুরীর বাতাস বিষাক্ত৷ এখানে প্রবেশ করবার দুঃসাহসের প্রশংসা করি৷ কিন্তু এর মূল্য দিতে হবে৷
-কী?
-একজনের প্রাণ৷ সমুদ্রমেখলা এ দ্বীপের বহু শতাব্দীর গুপ্ত কথা ঘন বন ঢেকে রেখেছিল৷ ভারত মহাসমুদ্র স্বয়ং এর প্রহরী, দেখতে পাও না?
-আজ্ঞে, তা দেখছি বটে৷
-তবে সে রহস্য ভেদ করতে এসেছ কেন?
-আপনি তো জানেন সব৷
-সম্রাটের ঐশ্বর্য গুপ্ত আছে এর মধ্যে৷ কিন্তু সে পাবে না৷ যে অদৃশ্য আত্মারা তা পাহারা দিচ্ছে, তারা অত্যন্ত সতর্ক৷ অত্যন্ত হিংসুক৷ কাউকে তারা নিতে দেবে না৷ তবে তুমি ভারতবর্ষের সন্তান, তোমাকে একেবারে বঞ্চিত করব না আমি-রহস্য নিয়ে যাও, অর্থ পাবে না৷ যা পাবে তা সামান্য৷ তারই জন্যে প্রাণ দিতে হবে৷
-আপনি ব্রহ্মমুনি?
-মূর্খ! আমি এই নগরীর অধিদেবতা ধ্বংসস্তূপ পাহারা দিচ্ছি শতাব্দীর পর শতাব্দী৷ অনেকদিন পরে তুমি ভারতবর্ষ থেকে এসেছ-আটশো বছর আগে তোমাদের সাহসী পূর্বপুরুষরা অস্ত্র হাতে এখানে এসে রাজ্যস্থাপন করেন৷ দুর্বল হাতে তাঁরা খড়্গ ধরতেন না৷ তোমরা সে দেশ থেকেই এসেছ কি? দেখলে চেনা যায় না কেন?
-সেটা আমাদের অদৃষ্টের দোষ, আমাদের ভাগ্যলিপি৷
তারপরেই সব অন্ধকার৷ সুশীল সেই অদৃষ্টপূর্ব পুরুষের সঙ্গে সেই সূচীভেদ্য অন্ধকারের মধ্যে কোথায় যেন চলেছে...চলেছে... মাথার ওপর কৃষ্ণা নিশীথিনীর জ্বলজ্বলে নক্ষত্রভরা আকাশ৷
পুরুষটি বললেন, সাহস আছে? তুমি ভারতবর্ষের সন্তান-
-নিশ্চয়ই, দেব৷
নগরী বহুদিন মৃতা কিন্তু বহু যুগের পুরাতন কৃষ্ণাগুরুর ধূপগন্ধে আমোদিত অরণ্যতরুর ছায়ায় ছায়ায় অজানা পথযাত্রার যেন শেষ নেই৷
বিশাল পুরী, প্রেতপুরীর সমান নিস্তব্ধ৷ রাজপ্রাসাদের বিস্তৃত কক্ষে, দামি নীলাংশুকের আস্তরণে ঢাকা স্বর্ণপালঙ্ক কোনো অপরিচিতের অভ্যর্থনার জন্য প্রস্তুত৷ সুশীলের বুক গুরুগুরু করে উঠল, গুহার রত্নপ্রস্তরের ভিত্তিতে যেন অমঙ্গলের লেখা৷ ভবনদর্পণে প্রতিফলিত হয়ে উঠবে এখনই যেকোনো বিভীষণা অপদেবীর বিকট মূর্তি!
পুরুষ বললে, ওই শোনো-
সুশীল চমকে উঠল৷ যেন কোনো নারীকন্ঠের শোকার্ত চিৎকারে নিশীথ নগরীর নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল৷ সে নারীর কন্ঠস্বরকে সে চেনে৷ অত্যন্ত পরিচিত কন্ঠস্বর! খুব নিকট আত্মীয়র বিলাপধ্বনি৷ সুশীলের বুক কেঁপে উঠল! ঠিক সেই সময় বাইরে থেকে কে ডাকল, বাবুজি-বাবুজি-
তার ঘুম ভেঙে গেল৷ বিছানা ঘামে ভেসে গিয়েছে৷ জামাতুল্লা বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ডাকছে৷ দিনের আলো ফুটছে তাঁবুর বাইরে৷
জামাতুল্লা বললে, উঠুন বাবুজি৷
সুশীল বিমূঢ়ের মতো বললে, কেন?
-ভোর হয়েছে, ইয়ার হোসেনের লোক এখনও ওঠেনি- আমাদের কেউ কোনো সন্দেহ না করে৷ সনৎবাবুকে ওঠাই-
একটু বেলা হলে ইয়ার হোসেন উঠে ওদের ডাকলে৷ বললে, পরশু এখান থেকে তাঁবু ওঠাতে হবে৷ জাঙ্কওয়ালা চীনেম্যান আমার নিজের লোক৷ ও অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে৷ আর থাকতে চাইছে না৷ এখানে আপনারা এলেন ফটো তুলতে আর ছবি আঁকতে৷ এত পয়সা খরচ এর জন্যে করিনি৷
সুশীল বললে, যা ভালো বোঝেন মি. হোসেন৷
সনৎ বললে, তাহলে দাদা আমাদের সেই কাজটা এই দু-দিনের মধ্যে সারতে হবে-
ইয়ার হোসেন সন্দেহের সুরে বললে, কী কাজ?
সুশীল বললে, বনের মধ্যে একটা মন্দিরের গায়ে পাথরের ছবি আছে, সেটা আমি আঁকছি৷ সনৎ ফটো নিচ্ছে তার৷
ইয়ার হোসেন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হেসে বললে, এই করতেই আপনারা এসেছিলেন আর কি! করুন যা হয় দু-দিন৷
সনৎ বললে, তাহলে চলো দাদা আমরা সকাল-সকাল খেয়ে রওনা হই৷
ইয়ার হোসেনের অনুমতি পেয়ে, ওদের সাহস বেড়ে গেল৷ দিনদুপুরেই ওরা দু-জন রওনা হয়ে গেল-শাবল, গাঁতি, টর্চ ওরা কিছুই আনেনি, সিঁড়ির মুখের প্রথম ধাপে রেখে এসেছে৷ শুধু ক্যামেরা আর রিভলবার হাতে বেরিয়ে গেল৷
জামাতুল্লা গোপনে বললে, আমি কোনো ছুতোয় এরপর যাব৷ একসঙ্গে সকলে গেলে চালাক ইয়ার হোসেন সন্দেহ করবে! আজ কাজ শেষ করতে হবে মনে থাকে যেন, হয় এসপার নয় তো ওসপার৷ আর সময় পাব না৷
সনৎ বললে, মনে থাকে যেন একথা৷ আজ আর ফিরব না শেষ না দেখে৷
সুশীলের বুকের মধ্যে যেন কেমন করে উঠল সনৎ-এর কথায়৷ সনৎ-এর মুখের দিকে ও চাইলে৷ কেন সনৎ হঠাৎ একথা বললে?
আবার সেই অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে রহস্যময় গহ্বরে সুশীল ও সনৎ এসে দাঁড়াল৷ আসবার সময় সিঁড়ির প্রথম ধাপ থেকে ওরা গাঁতি ও টর্চ নিয়ে এসেছে৷ পাথরের নর্তকী-মূর্তি দেওয়ালের গায়ে এক জায়গায় কাত করে রাখা হয়েছে৷ যেন জীবন্ত পরি দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হয়৷ সুশীল সেদিকে চেয়ে বললে, আর কিছু না পাই, এই পুতুলটা নিয়ে যাব৷ সব খরচ উঠে এসেও অনেক টাকা লাভ থাকবে-শুধু ওটা বিক্রি করলে৷
তারপর দু-জনে নীচের পাথরের চৌবাচ্চাতে নামল৷
সনৎ বললে, উত্তর কোণের গায়ে চিহ্নটা দেখতে পাচ্ছ দাদা!
-এখন কিছু কোরো না, জামাতুল্লাকে আসতে দাও৷
সনৎ ছেলেমানুষ, সে সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছিল৷ বাংলাদেশের পাড়াগাঁয়ে জন্মগ্রহণ করে একদিন যে জীবনে এমন একটা রহস্যসংকুল পথযাত্রায় বেরিয়ে পড়বে, কবে সে একথা ভেবেছিল? সুশীল কিন্তু বসে বসে অন্য কথা ভাবছিল৷
গত রাত্রের স্বপ্নের কথা তার স্পষ্ট মনে নেই, আবছাভাবে এটুকু মনে আছে, সে যেন গত রাত্রে এক অদ্ভুত রহস্যপুরীর পথে পথে কার সঙ্গে অনির্দেশ যাত্রায় বার হয়েছিল, কত কথা যেন সে বলেছিল, সব কথা মনে হয় না৷ তবুও যেন কী এক অমঙ্গলের বার্তা সে জানিয়ে দিয়ে গিয়েছে; কী সে বার্তা, কার সে অমঙ্গল কিছুই স্পষ্ট মনে নেই-অথচ সুশীলের মন ভার ভার, আর যেন তার উৎসাহ নেই৷ এখন ফিরবার পথও তো নেই৷
ওপরের ঘর থেকে জামাতুল্লা উঁকি মেরে বললে, সব ঠিক৷
-এসেছ?
-হাঁ বাবুজি৷ অনেকটা দড়ি এনেছি লুকিয়ে-
-নেমে পড়ো৷
-আপনার ক্যামেরা এনেছেন?
-কেন বলো তো?
-ইয়ার হোসেনকে ফাঁকি দিতে হলে ক্যামেরাতে ফটো তুলে নিয়ে যেতে হবে-
-সব ঠিক আছে৷
জামাতুল্লা ওদের সঙ্গে এসে যোগ দেবার অল্পক্ষণ পরেই সনৎ হঠাৎ কী ভেবে দেওয়ালের উত্তর কোণের সেই চিহ্নটা চেপে ধরলে এবং সঙ্গেসঙ্গে পাথরের চৌবাচ্চার তলা একদিকে কাত হয়ে উঠতেই ফাঁক দিয়ে সনৎ নীচের দিকে অতলস্পর্শ অন্ধকারে লাফিয়ে পড়ল৷
সুশীল ও জামাতুল্লা দু-জনেই চিৎকার করে উঠল৷ অমন অতর্কিতভাবে সনৎ লাফ মারতে গেল কেন, ওরা ভেবে পেল না৷
কিন্তু লাফ মারল কোথায়?
জামাতুল্লা সভয়ে বললে, সর্বনাশ হয়ে গেল বাবুজি!
তারপর ওরা দু-জনেই কিছু না ভেবেই পাথরের চৌবাচ্চার তলার ফাঁক দিয়ে লাফ দিয়ে পড়ল৷
ওরা ঘোর অন্ধকারের মধ্যে নিজেদের দেখতে পেলে৷
সনৎ অন্ধকারের ভেতর থেকেই বলে উঠল, দাদা, টর্চ জ্বালো৷ আগে জায়গাটা কীরকম দেখতে হবে-
ওরা টর্চ জ্বেলে চারদিক দেখে অবাক হয়ে গেল৷ ওরা একটা গোলাকার ঘরের মধ্যে নিজেদের দেখতে পেলে-ঘরের দু-কোণে দুটো পয়োনালির মতো কেন রয়েছে ওরা বুঝতে পারলে না৷ ছাদের যে জায়গায় কড়িকাঠের অগ্রভাগ দেওয়ালের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবার কথা, সেখানে দুটো বড়ো বড়ো পাথরের গাঁথুনি পয়োনালি, একটা এদিকে, আর একটা ওদিকে৷ সমস্ত ঘরটায় জলের দাগ, মেঝে ভয়ানক ভিজে ও স্যাঁতসেতে, যেন কিছুদিন আগে এ ঘরে অনেকখানি জল ছিল৷
জামাতুল্লা বললে, এ ঘরে এত জল আসে কোথা থেকে বাবুজি?
সুশীল কিছু বলতে পারলে না; প্রকাণ্ড ঘর, অন্ধকারের মধ্যে ঘরের কোথায় কী আছে ভালো বোঝা যায় না৷
সনৎ বললে, ঘরের কোণগুলো অন্ধকার দেখাচ্ছে, ওদিকে কী আছে দেখা যাক-
টর্চ ধরে তিনজনে ঘরের একদিকের কোণে গিয়ে দেখে অবাক চোখে চেয়ে রইল৷
ঘরের কোণে বড়ো বড়ো তামার জালা বা ঘড়ার মতো জিনিস, একটার ওপর আর একটা বসানো, ঘরের ছাদ পর্যন্ত উঁচু৷ সেদিকের দেওয়ালের গা দেখা যায় না-সমস্ত দেওয়াল ঘেঁষে সেই ধরনের রাশি রাশি তামার জালা-ওরা এতক্ষণ ভালো করে দেখেনি, সেই তামার জালার রাশিই অন্ধকারে দেওয়ালের মতো দেখাচ্ছিল৷
জামাতুল্লা বললে, এগুলো কী বাবুজি?
সুশীল বললে, আমার মনে হয় এটাই ধনভাণ্ডার৷
সনৎ বললে, আমরা ঠিক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছি-
জামাতুল্লা হঠাৎ অন্য দেওয়ালের দিকে গিয়ে বললে, এই দেখুন বাবুজি-
সেদিকে দেওয়ালের গায়ে বড়ো বড়ো কুলুঙ্গির মতো অসংখ্য গর্ত৷ প্রত্যেকটার মধ্যে ছোটো-বড়ো কৌটোর মতো কীসব জিনিস৷
সুশীল বললে, যাতে-তাতে হাত দিয়ো না; এসব পাতালঘরে সাপ থাকা বিচিত্র নয়৷ এই ঘোর অন্ধকারে পাতালপুরী বিষাক্ত সাপের রাজ্য হওয়াই বেশি সম্ভব৷
কিন্তু চারিদিকে ভালো করে টর্চ ফেলে দেখেও সাপের সন্ধান পাওয়া গেল না৷
সনৎ ও জামাতুল্লা কুলুঙ্গি থেকে একটা কৌটো বার করে দেখলে৷ ভেতরে যা আছে তা দেখে ওরা খুব উৎসাহিত হয়ে উঠল না৷ এ কী সম্ভব, এত বড়ো একটা প্রাচীন সাম্রাজ্যের গুপ্ত ধনভাণ্ডারে এত কাণ্ড করে পাতালের মধ্যে ঘর খুঁড়ে তাতে পুরোনো হতুÍকি রাখা হবে?
ওদের হতভম্ব মুখের চেহারা দেখে সুশীল বললে, কী ওর মধ্যে?
সনৎ বললে, পুরোনো হরতুকি দাদা৷
-দূর পাগল-হরতুকি কী রে?
-এই দেখো-
সুশীল গোল গোল ছোটো ফলের মতো জিনিস হাতে নেড়েচেড়ে বললে, আমি জানিনে এ কী জিনিস, কিন্তু যখন এত যত্ন করে রাখা হয়েছে, তখন এর দাম আছে৷ থলের মধ্যে নাও দু-একটা বাকসো-
সব দস্তুরমতো হতাশ হয়ে পড়ল৷ এত কষ্ট করে পুরোনো হরতুকি সংগ্রহ করতে ওরা এতদূর আসেনি৷
হঠাৎ সুশীল বলে উঠল, আমার একটা কথা মনে হয়েছে-
সনৎ বললে, কী দাদা?
-এ জিনিস যাই হোক, এ-ই ছিল পুরোনো সাম্রাজ্যের প্রচলিত মুদ্রা কারেন্সি-এই আমার স্থির বিশ্বাস৷ সঙ্গে নাও কিছু পুরোনো হরতুকি-
জামাতুল্লা অনেক কৌশল করে একটা তামার জালা পাড়লে৷ কিন্তু বহু চেষ্টা করেও তার ঢাকনি খোলা গেল না! জামাতুল্লা বিরক্ত হয়ে বললে, এ কী রিবিট করে এঁটে দেওয়া বাবুজি? এ খুলবার হদিস পাচ্ছিনে যে-
টানাটানি করতে গিয়ে একটা ঢাকনি খটাং করে খুলে গেল৷
সনৎ বললে, দেখো ওর মধ্যে থেকে আবার পুরোনো আমলকী না বার হয় দাদা-
কিন্তু জালাটা উপুড় করে ঢাললে তার মধ্যে থেকে বেরুল রাশি রাশি নানা রংবেরঙের পাথর৷ দামি জিনিস বলে মনে হয় না৷ সাঁওতাল পরগনা অঞ্চলে যেকোনো নদীর ধারে এমনি নুড়ি অনেক পাওয়া যায়৷
জামাতুল্লা বললে, তোবা! তোবা এসব কী চিজ বাবুজি?
কতকগুলো কৌটোর মধ্যে শনের মতো সাদা জিনিসের গুলির মতো৷ মনে হয় বহুকাল আগে শনের নুড়িগুলিতে কোনো গন্ধদ্রব্য মাখানো ছিল-এখনও খুব মৃদু সুগন্ধ শনের নুড়িগুলোর গায়ে মাখানো৷
সনৎ বললে, দাদা, এটা তাদের ওষুধ-বিষুধ রাখার ভাঁড়ার ছিল না তো?
জামাতুল্লা বললে কী দাওয়াই আছে এর মধ্যে বাবুজি?
-তা আমি কী জানি? প্রাচীন যুগের লোকের কত অদ্ভুত ধারণা ছিল৷ হয়তো তাদের বিশ্বাস ছিল এই সবই অমর হওয়ার ওষুধ৷
হঠাৎ সুশীল একটা জালার মুখ খুলে বলে উঠল, দেখি, বোধ হয় টাকা! জালা উপুড় করলে তার মধ্যে থেকে পড়ল একরাশ বড়ো বড়ো চাকতি, বড়ো বড়ো মেডেলের আকারের প্রায় সিকি ইঞ্চি পুরু৷
সুশীল একখানা চাকতি হাতে করে বললে, সোনা বলে মনে হয় না?
জামাতুল্লা বললে, আলবত সোনা-তবে টাকা বা মোহর নয়৷
সুশীল বললে, কোনোরকম ছাপ মারা নেই৷ মুদ্রা করবার জন্যে এগুলো তৈরি করা হয়েছিল-কিন্তু তারপর ছাপ এতে মারা হয়নি৷ এ অনেক আছে-
সনৎ বললে, সবরকম কিছু কিছু নাও দাদা-
জামাতুল্লা বললে, এ যদি সোনা হয়-এই এক জালার মধ্যেই লাখ টাকার সোনা-
সুশীল আর একটা জালা পেড়ে ঢাকনি খুলে উপুড় করে ঢাললে৷ তার মধ্যেও অবিকল অমনি ধাতব চাকতি ওই আকারের, একই মাপের৷
জামাতুল্লা বললে, শোভানাল্লা! দু-লাখ হল-যদি আমরা দেখি সব জালাতেই এরকম-
এই সময় সুশীল প্রায় চিৎকার করে উঠল, শিগগির এদিকে এসো-
ওরা গিয়ে দেখলে অন্ধকার ঘরের কোণে কতকগুলো মানুষের হাড়গোড়-ভালো করে টর্চ ফেলে দেখা গেল, দুটো নরকঙ্কাল৷
সেই সূচীভেদ্য অন্ধকার পাতালপুরীর মধ্যে নরকঙ্কাল দুটো যেন ওদের সমস্ত আশা ও চেষ্টাকে দাঁত বার করে উপহাস করছে৷ কাল রাত্রের স্বপ্নের কথা ওর মনে এল, মৃত্যুর চেয়ে মহারহস্য জগতে কী আছে? মূঢ় লোকে চারিপাশে মৃত্যু অহরহ দেখছে, অথচ ভাবে না, কী গভীর রহস্যপুরীর দ্বারপাল-স্বরূপ ইহলোক ও পরলোকের পথে মৃত্যু আছে দাঁড়িয়ে...
নরকঙ্কালটি কী কথা না জানি বলত যদি এরা এদের মরণের ইতিহাস ব্যক্ত করতে পারত? সে হয়তো দুর্নিবার লোভ ও নৃশংস অর্থলিপ্সার ইতিহাস, হয়তো রক্তপাতের ইতিহাস, জীবন-মরণ নিয়ে খেলার ইতিহাস, ভাই হয়ে ভায়ের বুকে ছুরি বসানোর ইতিহাস...

জামাতুল্লা কঙ্কালগুলো সরিয়ে রাখতে গিয়ে বললে, হাড় ভেঙে যাচ্ছে বাবুজি, বহুত পুরোনো আমলের হাড়গোড় এসব৷ কমসে কম একশো-দেড়শো বছরের পুরোনো-কিন্তু দেখুন বাবুজি মজা, হাড়ের গায়ে এসব কী?
ওরা হাতে করে নিয়ে দেখলে৷
প্রায় এক ইঞ্চি করে লবণের স্তর শক্ত হয়ে জমাট বেঁধে আছে কঙ্কালের ওপরে৷ সুশীল ভালো করে টর্চের আলো ফেলে বললে, চোখের কোটরগুলো নুনে বুজানো-দেখো চেয়ে!
এটা যে কী কারণে ওরা কিছুই ঠিক করতে পারলে না৷
অন্ধকার পাতালপুরীর শহরে ওদের হাড়ে নুন মাখাতে এসেছিল কে?
সে সময়ে সনৎ বললে, দেখো দাদা, দেখো জামাতুল্লা সাহেব-এটা কীসের দাগ?
ওরা পেছন ফিরে চেয়ে দেখলে সনৎ টর্চ ফেলে দেওয়ালের গায়ের একটা সাদা রেখার দিকে চেয়ে কথা বলছে৷ রেখাটা লম্বা অবস্থায় দেওয়ালের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত টানা৷ জামাতুল্লা বললে, এ দাগ নোনা জলের দাগ৷
সুশীল ও সনৎ হতভম্ব হয়ে বললে, তার মানে?-তার মানে? জল আসবে কোথা থেকে?
জামাতুল্লা বললে, বড্ড অন্ধকার জায়গা, ভালো করে কিছুই তো মালুম পাওয়া যাচ্ছে না৷ কিন্তু একবার ভালো করে ঘরের চারিধারে দেখা দরকার৷ অজানা জায়গায় সাবধান থাকাই ভালো৷ এত স্যাঁতসেতে কেন ঘরটা, আমি অনেকক্ষণ থেকে তাই ভাবছি৷
জামাতুল্লা ও সনৎ হাতড়ে হাতড়ে সোনার চাকতি বের করে থলের মধ্যে একরাশ পুরে ফেললে-পাথরের নুড়িও কিছু নিলে-বলা যায় না যদি এগুলো কোনো দামি পাথর হয়ে পড়ে! বলা যায় কি! সনৎ ছেলেমানুষ, সে এত সোনার চাকতি দেখে কেমন দিশেহারা হয়ে গেল-উন্মত্তের মতো আঁজলা ভরে চাকতি সংগ্রহ করে তামার জালার মধ্যে ভরতে থাকে, আর থলের ভেতর পুরে নেয়৷ যেন আরব্য উপন্যাসের একটি গল্প-কিংবা রূপকথার মায়াপুরীর ধনভাণ্ডার! বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় বেলা দশটা থেকে বিকেল ছ-টা এন্তেক কলম পিষে সাঁইত্রিশ টাকা ন-আনা রোজগার করতে হয় সারা মাসে৷ সেই হল রূঢ় বাস্তব পৃথিবী- মানুষকে ঘা দিয়ে শক্ত করে দেয়৷ এখানে কী, না-হাতের আঁজলা ভরে যত ইচ্ছে সোনা নিয়ে যাও, হিরে নিয়ে যাও-এ আলাদা জগৎ-পৃথিবীর অর্থনৈতিক আইন-কানুনের বাইরে৷
বহু প্রাচীনকালের মৃত সভ্যতা এখানে প্রাচীন দিনের সমস্ত বর্বর প্রাচুর্য ও আদিম অর্থনীতি নিয়ে সমাধিগর্ভে বিস্মৃতির ঘুমে অচেতন-এ দিন বাতিল হয়ে গিয়েছে, এ সমাজ বাতিল হয়ে গিয়েছে-একে অন্ধকার থেকে টেনে দিনের আলোয় তুলে বিংশ শতাব্দীর জগতে আর অর্থনৈতিক বিভ্রাট ঘটিয়ো না৷...
হঠাৎ কীসের শব্দে সুশীলের চিন্তার জাল ছিন্ন হল-বিরাট, উন্মত্ত, প্রচণ্ড শব্দ-যেন সমগ্র নায়েগ্রা জলপ্রপাত ভেঙে ছুটে আসছে কোথা থেকে-কিংবা শিবের জটা থেকে যেন গঙ্গা ভীমভৈরব বেগে ইন্দ্রের ঐরাবতকে ভাসিয়ে মর্ত্যে অবতরণ করছেন৷
জামাতুল্লার চিৎকার শোনা গেল সেই প্রলয়ের মধ্যে, জল! জল! পালান-ওপরে উঠুন-
জামাতুল্লার কথা শেষ না হতে সুশীলের হাঁটু ছাপিয়ে কোমর পর্যন্ত জল উঠল-কোমর থেকে বুক লক্ষ করে দ্রুতগতিতে উঠবার সঙ্গেসঙ্গে জামাতুল্লা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললে, ওই দেখুন বাবু!
সুশীল সবিস্ময়ে ও সভয়ে চেয়ে দেখলে ঘরের ছাদের কাছাকাছি সেই দুটো পয়োনালি দিয়ে ভীষণ তোড়ে জল এসে পড়ছে ঘরের মধ্যে৷ চক্ষের নিমেষে ওরা ইঁদুরকলে আটকা পড়ে জলে ডুবে দম বন্ধ হয়ে মরবে! কিন্তু উঠবে কোথায়! উঠবে কীসের সাহায্যে? এ ঘরে সিঁড়ি নেই আগেই দেখে এসেছে৷
সুশীল চিৎকার করে বললে, সনৎ-সনৎ-ওপরে ওঠো- শিগগির-
সনৎ বললে, দাদা! তুমি আমার হাত ধরো-হাত ধরো-
তারপর হঠাৎ সব অন্ধকার হয়ে গেল-পুরোনো রাজাদের পোষমানা বেতাল যেন কোথায় হা-হা করে বিকট অট্টহাস্য করে উঠল-সম্মুখে মৃত্যু! উদ্ধার নেই! উদ্ধার নেই!
এ জলে সাঁতার দেওয়া যাবে না সুশীল জানে-এ মরণের ইঁদুরকল৷ বুক ছাপিয়ে জল তখন উঠে প্রায় নাকে ঠেকে ঠেকে-
কে যেন অন্ধকারের মধ্যে চেঁচিয়ে উঠল, দাদা-দাদা আমার হাত ধরো-দাদা-
একজোড়া শক্ত বলিষ্ঠ হাত ওকে ওপরের দিকে তুললে টেনে! ঘন অন্ধকার৷ টর্চ কোথায় গিয়েছে সেই উন্মত্ত জলরাশির মধ্যে৷ সুশীলের প্রায় জ্ঞান নেই৷ কে ডাকছে-কে? সনৎ?
কোনো উত্তর নেই৷ কেউ কাছে নেই৷
সুশীলের ভয় হল৷ সে চেঁচিয়ে ডাকলে, সনৎ! জামাতুল্লা!
তার পায়ের তলায় উন্মত্ত গর্জনে যেন একটা পাহাড়ের মাথায় হ্রদ খসে পড়েছে! উত্তর দেয় না কেউ-না সনৎ, না জামাতুল্লা৷
প্রায় দশ মিনিট পরে জামাতুল্লা বললে, বাবু, জলদি আমার হাত পাকড়ান-
-কেন?
-পাকড়ান হাত-উপরে উঠব-সাবধান!
-সনৎ, সনৎ কোথায়? তাকে রেখে এলে উপরে!
-জলদি হাত পাকড়ান-হুঁ-
কত যুগ ধরে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে ঘুরে ঘুরে সে ওঠা প্রলয়ের অন্ধকারের মধ্য দিয়ে-তারপর কতক্ষণ পরে পৃথিবীর ওপর এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচা পাতালপুরীর গহ্বর থেকে! বনের মধ্যে সন্ধ্যার অন্ধকার যেন ঘনিয়ে এসেছে৷ সুশীল ব্যগ্রভাবে বললে, সনৎ কই? তাকে কোথায়-
জামাতুল্লা বিষাদ-মাখানো গম্ভীর সুরে বললে, সনৎবাবু নেই-আমাদের ভাগ্য বাবুজি-
সুশীল বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে বললে, নেই মানে?
-সনৎবাবু তো পাতালপুরী থেকে ওঠেননি-তাঁকে খুঁজে পাইনি৷ আপনাকে তুলে ওপরে রেখে তাঁকে খুঁজতে যাব এমন সময়ে ঘরের মেঝে দুলে উঠে এঁটে গেল৷ তিনি থেকে গেলেন তলায়-আমরা রয়ে গেলাম ওপরে৷ তাঁকে খুঁজে পাই কোথায়?
-সে কী? তবে চলো গিয়ে খুঁজে আনি!...
জামাতুল্লা বিষাদের হাসি হেসে বললে, বাবুজির মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে, এখন কিছু বুঝবেন না৷ একটু ঠান্ডা হোন, সব বলছি৷ সনৎবাবুকে যদি পাওয়া যেত তবে আমি তাঁকে ছেড়ে আসতাম না৷
-কেন? সনৎ কোথায়? হ্যাঁরে, আমি তাকে ছেড়ে বাড়ি গিয়ে মার কাছে, খুড়িমার কাছে কী জবাব দেব?-কেন তুমি তাকে পাতালে ফেলে এলে?
জামাতুল্লা নিজের কপালে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললে, নসিব, বাবুজি৷
উদভ্রান্ত সুশীলের বিহ্বল মস্তিষ্কে ব্যাপারটা তখনও ঢোকেনি৷ জলের মধ্যে হাবুডুবু খেয়ে দম বন্ধ হয়ে সনৎ ওপরে উঠবার চেষ্টা করেও উঠতে পারেনি৷ অন্ধকারের মধ্যে জামাতুল্লাও ওকে খুঁজে পায়নি৷ ওরই হাত ধরে টেনে তুলবার পরে ঘরের মেজে এঁটে গিয়ে রত্নভাণ্ডারের সঙ্গে ওদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে৷ ওই ঘরে ছাদ পর্যন্ত জল ভরতি হয়ে গিয়েছে এতক্ষণ-সেখানে মানুষ কতক্ষণ থাকতে পার!...
সুশীল ক্রমে সব বুঝলে ওপরে উঠে এসে মাথায় ঠান্ডা হাওয়া লাগানোর পরে৷ একটা গভীর শোক ও হতাশায় সে একেবারে ডুবে যেত হয়তো, কিন্তু ঘটনাবলির অদ্ভুতত্ত্বে সে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ল৷ কোথায় অন্ধকার পাতালপুরীতে পুরাকালের ধনভাণ্ডার অসাধারণ উপায়ে সুরক্ষিত...এমন কৌশলে, যা একালে হঠাৎ কেউ মাথায় আনতেই পারত না৷
জামাতুল্লা বললে, পানি দেখে তখন আমার সন্দেহ হয়েছে৷ আমি ভাবছি, এত নোনা পানি কেন ঘরের মধ্যে?
সুশীল বললে, আমাদের তখনই বোঝা উচিত ছিল জামাতুল্লা৷ তাহলে সনৎ আজ এভাবে-
-তখন কী করে জানব বাবুজি? এ নালি দুটো গাঁথা আছে- ও দিয়ে জোয়ারের সময় সমুদ্দুরের নোনা পানি ঢোকে-দিনে একবার রাতে একবার৷ আমার কী মনে হয় জানেন বাবুজি, ওই দুটো নালি এমন ফন্দি করে গাঁথা হয়েছিল যে-
সুশীল বললে, আমার আর একটা কথা মনে হয়েছে জানো? ওই দুটো নরকঙ্কাল যা দেখলে, আমাদেরই মতো দুটো লোক কোনোকালে ওই ধনরত্ন চুরি করতে গিয়ে সমুদ্রের নোনা জলে হাবুডুবু খেয়ে ডুবে মরেছে৷ মূর্খের মতো ঢুকেছে, জানত না৷ যেমন আমরা-সনৎ যেমন-
-কী জানত না?
-যে স্বয়ং ভারত মহাসমুদ্র প্রাচীন চম্পারাজ্যের রত্নভাণ্ডারের অদৃশ্য প্রহরী৷ কেউ কোনোদিন সে ভাণ্ডার থেকে কিছু নিতে পারবে না, মানমন্দিরের রত্নশৈল তার একখানি সামান্য নুড়িও হারাবে না-সুশীল বললে, কিন্তু জল যায় কোথায় জামাতুল্লা? এত জল? আমার কী মনে হয় জানো-
-আমারও তা মনে হয়েছে৷ ওই ঘরের নীচে আর একটা ঘর আছে, সেটা আসল ধনভাণ্ডার৷ বেশি জল বাধলে ঘরের মেঝে একদিকে ঢাল হয়ে পড়ে জলের চাপে-সব জল ওপরের ঘর থেকে নীচের ঘরে চলে যায়৷
সুশীল বললে, স্টিম পাম্প আনলেও তার জল শুকোনো যাবে না, কারণ-তাহলে গোটা ভারত মহাসাগরকেই স্টিম পাম্প দিয়ে তুলে ফেলতে হয়-ওর পিছনে রয়েছে গোটা ভারত সমুদ্র৷ সে জামাতুল্লার দিকে চেয়ে বিষাদের সুরে বললে-এই হল তোমার আসল বিহ্মমুনি-সমুদ্র, বুঝলে জামাতুল্লা?
ওরা সেই বনের গভীরতম প্রদেশের একটা পুরোনো মন্দির দেখলে৷ মন্দিরের মধ্যে বিরাট দেবমূর্তি, সুশীলের মনে হল, সম্ভবত বিষ্ণুমূর্তি৷
যুগযুগান্ত কেটে গেছে, ওপরকার আকাশে শত অরণ্যময়ূরীদের নর্তন শেষ হয়ে আবার শুরু হয়েছে, রক্তাশোকাতুর তলে কত সুখসুষুপ্ত হংসমিথুনের নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে-সাম্রাজ্যের গৌরবের দিনে ঘৃতপক্ব অমৃতচরুর চারু গন্ধে মন্দিরের অভ্যন্তর কতদিন হয়েছে আমোদিত-কত উত্থান, কত পতনের মধ্যে দেবতা অবিচল দৃষ্টিতে বহুদূর অনন্তের দিকে চেয়ে আছেন, মুখে সুকুমার সব্যঙ্গ মৃদু চাপা হাসি-নিরুপাধি চেতনা যেন পাষাণে লীন, আত্মস্থ৷
সুশীল সসম্ভ্রমে প্রণাম করল, দেবতা, সনৎ ছেলেমানুষ- ওকে তোমার পায়ে রেখে গেলুম-ক্ষমা কোরে তুমি ওকে!
সুশীল কলকাতায় ফিরেছে৷
কারণ যা ঘটে গেল, তার পরের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত৷ ইয়ার হোসেন সন্দেহ করেনি৷ সনৎ একটা কূপের মধ্যে পড়ে মরে গিয়েছে শুনে ইয়ার হোসেন খুঁজে দেখবার আগ্রহ প্রকাশ করেনি৷ চীনা মাঝি জাঙ্ক নিয়ে এসেছিল-তারই জাঙ্কে সবাই ফিরল সিঙ্গাপুরে৷ সিঙ্গাপুর থেকে অস্ট্রেলিয়ান মেলবোট ধরে কলম্বো৷
কলম্বোর এক জহুরির দোকানে জামাতুল্লা সেই হরতুকির মতো জিনিস দেখাতেই বললে, এ খুব দামি জিনিস, ফসিল অ্যাম্বার- বহুকালের অ্যাম্বার কোনো জায়গায় চাপা পড়েছিল৷
দু-খানা পাথর দেখে বললে, আনকাট এমারেল্ড, খুব ভালো ক্যারেটের জিনিস হবে কাটলে৷ আন্নামালাইয়ের জহুরিরা এমারেল্ড কাটে, সেখানে গিয়ে কাটিয়ে নেবেন৷ দামে বিকোবে৷
সবসুদ্ধ পাওয়া গেল প্রায় সত্তর হাজার টাকা৷ ইয়ার হোসেনকে ফাঁকি না দিয়ে ওরা তাকে তার ন্যায্য প্রাপ্য দশ হাজার টাকা পাঠালে-সেই মাদ্রাজি বিধবাকে পাঠালে বিশ হাজার- বাকি টাকা তিন ভাগ হল জামাতুল্লা, সনতের মা ও সুশীলের মধ্যে৷
টাকার দিক থেকে এমন কিছু নয়, অভিজ্ঞতার দিক থেকে অনেকখানি৷ কত রাত্রে গ্রামের বাড়িতে নিশ্চিন্ত আরাম-শয়নে শুয়ে ওর মনে জাগে মহাসমুদ্রপারের সেই প্রাচীন হিন্দুরাজ্যের অরণ্যাবৃত ধ্বংসস্তূপ...সেই প্রশান্ত ও রহস্যময় বিষ্ণুমূর্তি...হতভাগ্য সনতের শোচনীয় পরিণাম...অরণ্যমধ্যবর্তী তাঁবুতে সে রাত্রির সেই অদ্ভুত স্বপ্ন৷ জীবনের গভীর রহস্যের কথা ভেবে তখন সে অবাক হয়ে যায়৷
জামাতুল্লা নিজের ভাগের টাকা নিয়ে কোথায় চলে গেল, তার সঙ্গে আর সুশীলের দেখা হয়নি৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন