শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য

খালারি স্টেশনের পাশ দিয়ে বেঁকে যাওয়া রাস্তা ছয় কিলোমিটার অতিক্রান্ত হবে যখন, গঞ্জে ঢোকার মিনিট পাঁচেক আগে রাস্তার ডান পাশ দিয়ে একটা টিলা উঠে যেতে দেখা যাবে। তার অন্যদিকের গা বেয়ে জঙ্গল ভর্তি খাদ। এই জায়গায় ঢেউ খেলানো পথ বাঁ-দিকে একটা বাঁক নিয়েছে। অঞ্চলটাকে মন দিয়ে লক্ষ্য করা দরকার। লোকে বলে, এখানে পাহাড়ি ভূতের দল বাসা বেঁধে আছে অনেকদিন হয়ে গেল। সেই যেদিন থেকে রেভারেন্ড ওয়েসলি গঞ্জে প্রথম মিশনারি স্কুল তৈরি করেছিলেন, তা সে আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগের কথা, অথবা, তারও আগে হতে পারে, যেহেতু মানুষ ভুলে গেছে। রাত্রিবেলা সেসব ভূতের ফুটিফাটা আত্মার গহ্বর থেকে বেরোনো সাঁই সাঁই গাঢ় নিশ্বাসকে আশপাশের মুন্ডা ওরাওঁ গ্রামগুলোর অভুক্ত কাঠকয়লা চোরের হাঁপানি হিসেবে ভুল করার কারণ দেখেনি কেউ। একপাশে আধভাঙা বেথেল মিশন চার্চ ভূতের গল্পে সারজল জুগিয়েছে। অন্ধকারে ফিসফিসানি, চাপাগলায় অট্টহাসি, অথবা, অকস্মাৎ ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ সবাই পেত সেখানে। দিনের বেলা জায়গাটা সাফসুতরো থাকত। আদিবাসী রমণীরা খোলা জায়গায় বসে রোদ পোয়াত। আচার শুকোতে দেওয়া হত পাথরের গায়ে। কিছুদূর দিয়ে বয়ে গেছে একটা পাহাড়ি ঝোরা। তার জলে নিঃসংকোচে স্নান করার সময়ে পথচলতি টুরিস্টের হাঁ চোখকে নির্লিপ্ত অবহেলায় ঝরিয়ে দেওয়া যায়। শিশুরা ধুলো, পাথর অথবা বল নিয়ে অক্লেশে লাফালাফি করে, লুকোচুরি খেলে চার্চের ভেতর। মায়েরা অলস চোখে তাকায়। মাঝে মাঝে গলা উঁচু করে ধমক দিলেও তার ভেতর নিষেধ ছিল না। পাথুরে চ্যাটালো চত্বর, তাকে ঘিরে শাল, সেগুন, পিয়ালের পুঞ্জ আর অবিরল সূর্যোদয় নিশ্চিন্তির উষ্ণতা দেয়। অনতিদুরে গঞ্জের প্রান্তভাগ তাকে স্তিমিত করতে পারবে না।
এখানে দুপুর বেলা আসে কিশোরীর দল। তারা বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে থাকা বান্ধবীরা, যারা মিলনস্থল হিসেবে জায়গাটাকে বেছে নিয়েছে। ছোটো থেকে তারা এই স্থানকে ‘জোহার হালে' বলে জানে। শব্দটা মুন্ডারি, যদিও এই মুহূর্তে এখানে, শুধু এই মুহূর্তে কেন, যেদিন থেকে কোল বিদ্রোহে অংশ নেওয়া মানকি মুন্ডাদের নির্মমভাবে দমন করেছিল ব্রিটিশ সরকার, সেদিন থেকে সমগ্র ছোটোনাগপুর জুড়ে আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য কমছে। তবু সংস্কৃতি মাথা নোয়ায় না। ফলত, তাকে নিরুপায় হয়ে মেনে নিয়েছে রাজতন্ত্র, তার পরের রাতু মহারাজরা, তার পরের অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা, তারও পরের বাঙালিহিন্দি পাঁচমিশেলি উপনিবেশ ও তারও পরের, পরের ও পরের—শব্দের মৃত্যু নেই। অন্য যে নামে ডাকো না কেন, নাছোড় স্মৃতি তবু ‘জোহার হালে' নামেই জায়গাটাকে চিনবে। ‘জোহার হালে' মানে, দু-জন মানুষ মুখোমুখি দেখা হলে যেভাবে একে অপরকে অভ্যর্থনা জানায়। যেমন, ইংরেজিতে ‘হ্যালো’। কিশোরীরা এখানে আসে নিজেদের রহস্যময় কাহিনিগুলোর ভাগবাটোয়ারা করতে। কোন তরুণকে তাদের ভালো লেগেছিল অথবা নিভৃত চুমুর বিনিময়ে কে দিল হৃদয়প্রস্তাব, সেই সমস্তকে শোনে পাথুরে শ্যাওলা, ঝরনা, শালবন।
অবশ্য, বিকেল থেকে অঞ্চলটা নির্জন হয়ে যায়। শীতকালে তো ছায়া ঘনাবে বেলা চারটে থেকেই—সেই স্তব্ধ রাতগুলোয় দুম করে একটা শালগাছ মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে থপ শব্দে অনেকটা জল ঝরিয়ে দিল, চাপাকান্নার আওয়াজ ভেসে এল যেন, অথবা, কোথাও কেউ নেই পায়ের আওয়াজ এগিয়ে আসছে তোমার দিকে—এতে তোমার ভয় লাগবেই। তখন নিকটবর্তী গঞ্জের গায়ে ছড়িয়ে থাকা মিটমিটে আলোগুলো থেকে তুমি আশ্বাস খুঁজতে গিয়ে ব্যর্থ হবে, কারণ মনে হবে ঘাড়ের কাছে কেউ চাপা নিশ্বাস ফেলছে। অন্ধকারে মুখ ফিরিয়ে তাকে দেখতে পাবে না। হা-হা বাতাস, শাল, সেগুনের প্রহরা ও নির্জন টিলা তোমাকে মনে করাবে মৃত সমাধিদের কাহিনি। জবুথবু জোহার হালে তখন কুয়াশায় নিজেকে মুড়ে ফেলে। গাছেরা পাতা ঝরিয়ে রিক্ত হয়। দরিদ্র গ্রামগুলোর মাটির নীচে জলস্তর নেমে যায় অনেকটা। কাছেপিঠের বেআইনি ইটভাটাদের ধোঁয়া ও কুয়াশা একত্রে মিশে গিয়ে অঞ্চলটাকে আচ্ছন্ন করে। দূষণমাত্রা বিপজ্জনক সীমার ওপরে যায়। বনবাংলো, পরিত্যক্ত সাহেবি কটেজ এবং আশপাশের হোমস্টেগুলো গ্রিলড চিকেন আর হুইস্কির সুগন্ধে আমোদিত হয়। জলের অভাবে ধুঁকতে থাকা গ্রামের ঘোলাটে চোখের মণিতে দপদপিয়ে ওঠে বারবিকিউ। মুরগির উদ্ধত ঊরু ও তেজি ঘাড় ধিকিধিকি আগুনে জ্বলে।
তারপর ক্রমে ফেব্রুয়ারি, মার্চ আসে। বসন্তে উচ্ছল সামগানে পরিণত হয় জোহার হালে। পলাশ, শিমুলের দল পাহাড়ের গায়ে আগুন ছেটায়। বনমোরগ, তিতির ও ঢাবপাখিদের তালবাদ্যে জায়গাটা অস্থির হয়। এখানে বসন্তকাল মানে টুরিস্টের আগমন বেড়ে যাওয়া। রাঁচি থেকে আগত অস্থায়ী খাবারের ঝুপড়ি, ভাত-রুটি-চিকেন-ডিমের ঝোলের দোকান—মানুষের হাতে কিছু পয়সা আসবে। সকালগুলো তখন অবিরল সূর্যের আশ্বাসে মুখর হয়। শুকনো হাওয়ার হিমেল স্পর্শ গরিব মানুষকে দুঃখ ভোলায়। এরকম দিনে শিশুদের কলরোল বাড়ে। তারা টিলার ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে হারিয়ে যায়। ছুটতে ছুটতে নেমে আসে দূরবর্তী জঙ্গলের শিরদাঁড়া বরাবর। চার্চের অন্ধকার থেকে ক্বচিৎ ভেসে আসে ক্যারল। কিশোরীদের আগমনও বাড়ে কারণ তাদের স্বপ্ন, কামনা ও শঙ্কাগুলো কালার প্যালেটের বিভিন্ন খোপে জমে থাকা রঙের মতো আলাদা ও স্পষ্ট রূপ নেয়। এইরকমই হয়ে আসছে বছরের পর বছর, প্রতি বসন্তে। জোহার হালে-র কোলে শুয়ে শিশুরা তারুণ্যে যায়, কিশোরীরা যায় প্রৌঢ়ত্বে। কিন্তু, কখনো তার ব্যতিক্রম ঘটে। কোনো কোনো কিশোরীর বয়েস সেসব বসন্তকালে আর বাড়ে না। সেই মেয়েদের হোঁচট খাওয়া গল্পরা পা রাখে না যৌবনের চৌকাঠে। বসন্ত তাদের জন্য নিজের আস্তিনে অন্য পরিকল্পনা লুকিয়ে রাখে।

আমি মরিয়াছিলাম, আর দেখ, আমি যুগপর্যায়ের যুগে যুগে জীবন্ত; আর মৃত্যুর ও পাতালের চাবি আমার হস্তে আছে।
Book of Revelation 1 : 18
‘জীবনে বহুবার এমন হয়, অফিসার। সব রহস্যের উত্তর মেলে না। আমি সেগুলোকে নিয়ে বাঁচতে শিখেছি। আপনাদের পেশায় আরও ভালো বুঝবেন। যাকে বলা হয় রেবেকা কেস। অমীমাংসিত রহস্য।' সোফার আরামে আমার চোখ বুজে আসছিল। বহুদিনের সঞ্চিত ঘুম শোধ তুলছে। আঙুলের জ্বলন্ত সিগারেটে টান না-মেরে অ্যাশট্রেতে ঘষে দিলাম। ‘কেন আপনারা ক্লোজার চান বলুন তো? পেশাগত বাধ্যবাধকতা?'
ইনচার্জ-এর ঘরটা সাজানো ও পরিষ্কার। থানা বলতে যে অগোছালো, হট্টগোলের পরিবেশ চোখে ভাসে, এই কক্ষের সঙ্গে তার সাদৃশ্য নেই। এসি বন্ধ রাখা হয়েছে আমারই কথা ভেবে। নাহলে সিগারেট খেতে পারব না। যদিও অনুমতি নেই, সম্ভবত অক্ষয় মাহাতোর অনুরোধে একসময়কার নামি সাংবাদিককে এটুকু ছাড় দিতে রাজি হয়েছিল পুলিশ। বলেছিলাম, সিগারেট খেতে না-পারলে টানা অতক্ষণ কথা বলে যাওয়া সম্ভব নয়।
‘বারবারা ব্রাউন আর অবিনাশ যাদব, এই দু-জনের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব হয়েছিল কীভাবে?' বললেন অক্ষয়।
‘বারবারা! আমি ওকে প্রফেসর স্প্রাউট বলে ডাকতাম।’
‘স্প্রাউট?’
‘বাদ দিন। আছে একটা বইয়ের চরিত্র। বারবারাকে ওরকম
দেখতে।'
অক্ষয় হাসলেন, ‘আপনার বেশ কল্পনাশক্তি তো! লেখালেখি করতে গেলে লাগে হয়তো।'
‘লেখালেখি প্রায় কিছুই করিনি গত দুই বছর। ক্লাস নিই কলেজ ইউনিভার্সিটিগুলোতে, এখানে-ওখানে ওয়ার্কশপ করি, আর ন্যূনতম ফ্রিলান্সিং। গতকালও আপনারা যখন ফোন করলেন, অনলাইন ক্লাস নিচ্ছিলাম একটা। তাই ধরিনি তখন।
আমার উলটোদিকে অক্ষয় মাহাতো। তাঁর পাশে গল্প শোনার কৌতূহলে বসে ছিলেন থানার ইনচার্জ সোমেন কর্মকার, যাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল আজ বিকেলের সমস্ত কাজ আলমারিতে তালাবন্দি করে বিলম্বিত লয়ের মৌতাতে বসেছেন। বেঁটেখাটো অক্ষয়ের ক্লিন শেভেন পঞ্চাশোর্ধ্ব মুখে কৌতূহল নয়, প্রশ্রয়ের ঝিকিমিকি। আপাতত আকাশে মেঘ। কলকাতার বুকে স্যাঁৎসেঁতে সন্ধে গল্পের অবকাশ জোগাচ্ছে।
‘বারবারা সম্বন্ধে কী বলছিলেন—'
‘২০২২ সাল। অক্টোবর মাসের শেষে ছুটি নিয়ে গঞ্জ বেড়াতে গিয়েছিলাম। আসলে তার আগে একটা লম্বা স্টোরি করেছিলাম ঝাড়খণ্ডের কাঠ মাফিয়াদের ওপর। সেই কারণে বেশ কিছুদিন রাঁচি পালামু বেল্টে কাটাতে হয়েছিল। স্টোরি ফাইল করতে আমি দিল্লি ফিরিনি, রাঁচি থেকে ই-মেল করেছিলাম। প্রচুর পরিশ্রমও হয়েছিল স্টোরিটা করবার জন্য। ঠিক ছিল, এটার পর দিন দশেক ছুটি নেব। অফিসকে আগে থেকেই জানানো ছিল। কলকাতায় ফেরার কথা, কিন্তু মনে হল স্বাদ বদলানো যাক। তাই গঞ্জে চলে আসি। প্রথমে ভেবেছিলাম পাঁচদিন এখানে কাটিয়ে বাকি ছুটিটা কলকাতায় থাকব। তারপর এখানেই থেকে গেলাম, দশদিন কাটিয়ে আরও পাঁচদিন। আমার এডিটর মহেশ প্রচুর চেঁচামেচি করেছিল, এত ছুটি দেওয়া যাবে না বলে। কিন্তু তখন আমি জড়িয়ে গেছি।' হাসলাম। মহেশ এখন পুনে-তে থাকে। মাঝে মাঝে রাতবিরেতে ভিডিয়ো কল করে। আবোল-তাবোল গল্প করি দু-জন। সেসব দিনগুলোতে আমার ওয়াইনের মাত্রা চড়ে যায়। মহেশ নিজের বইয়ের দোকান নিয়ে দিব্যি আছে। মিডিয়াতে আর ফিরবে কিনা জানি না।
‘উঠেছিলেন স্যাংচুয়ারিতে?'
‘মেকমাই ট্রিপ থেকে সন্ধান পেয়েছিলাম। বারবারার হোমস্টে। ছবি দেখে ভালো লেগে গিয়েছিল। একটা ওল্ড স্কুল চার্ম ছিল বাড়িটার ভেতর। বারবারা কীরকম ছিল জানেন ? এখানে-ওখানে ভূত দেখত। ওর বিশ্বাস ছিল কেউ ছেড়ে যায় না। সবাই টাউনে থেকে গেছে। মৃত সহপাঠী। ছোটোবেলার মালি। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে বললাম, ‘আর অবিনাশ যাদব?' ‘ক্রিস।’
‘আপনারা গল্পটা শুনবেন বলেছিলেন।’
‘অবশ্যই। কিন্তু, আগে এই দু-জন সম্পর্কে ধারণা করতে চাই।’
‘অবিনাশকে লোকে মাতাল হিসেবে চিনত। সকাল থেকে খাচ্ছে। এদিকে ওই শরীর, আর বয়েসটাও তো—নিজেই বলত, যা কিছু অ্যাচিভমেন্ট ওর, সব বোতলের জল হয়ে ড্রেন দিয়ে বয়ে গেছে। অবিনাশ কি আমার বন্ধু ছিল? ঠিক বলতে পারব না। মনে হত, যেন আমাকে চ্যালেঞ্জ করছে—নিজেকে এত বুদ্ধিমান ভাবো, দেখো এই ধাঁধাটার সমাধান পারো কি না। ও-ই তো জোর করে আমাকে কেসটা শুনিয়েছিল।'
‘রেভারেন্ড পরিতোষ গরম্যানও কি— মানে, রিপোর্টে তাঁর উল্লেখ আছে।
‘দেখুন, বড়ো গল্প। অলৌকিক বলব কি না জানি না, কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে আজও নেই। সমাধানও আসেনি। আগেই বলেছি, আমি ব্যর্থ হয়েছিলাম।' অক্ষয়কে বললাম আমি ৷
‘তবু বলুন। সমাধান পাওয়া যায়নি আমিও জানি।
‘আপনি তো পরিচিত নাম। দার্জিলিঙের কেসটা তো—' সোমেন হাসলেন। ‘সেসব আমি ভুলে গেছি। প্লিজ!' বারে বারে মনে করালে বিরক্ত লাগে। ‘আপনারা সব ছেড়ে কেন অবিনাশ আর বারবারাকে নিয়ে উৎসাহী হলেন?
‘সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। হাতে সময় আছে তো।' অক্ষয় মাহাতো আবার হাসলেন। কোঁকড়া চুল, পুরু ঠোঁটের ভদ্রলোককে ইউনিভার্সিটির সৌম্য প্রোফেসর হিসেবে বেশি মানাত। টিপটিপে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, কাচের জানালা দিয়ে দেখলাম।
‘কিন্তু মিস ভটচাজ,’ সোমেন কর্মকার বললেন, ‘আপনি তো দীর্ঘ সময় তদন্তমূলক সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একটা রহস্যকে আধাখ্যাচড়া অবস্থায় ছেড়ে আসার পরেও এতদিনে আপনার মনে হল না, আরেকটু খোঁজখবর করে দেখি?’
‘যে রহস্যের সমাধান নেই, তার পেছনে ছোটার অর্থ হয় না। আমি অলৌকিক বলেছিলাম, সেটা অন্য ব্যাখ্যা না-পেয়ে। ওই যে, রেবেকা কেস! ক্লোজার পেতেই হবে সব কিছুর, এই পণ করে থাকলে আপনার হৃদয়ভঙ্গ হতে বাধ্য। আপনাকে জানতে হবে, কোথায় দৌড় থামাবেন। তাতে গন্তব্য আসুক অথবা না-আসুক।'
‘সেই সমাধান না-হওয়া রহস্যের গল্পটা শুনব বলেই এতদূর আসা। শুরু থেকে এবং কিচ্ছু বাদ না-দিয়ে।' বললেন অক্ষয়। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বুজলাম।
গঞ্জে প্রবেশ করার পর গাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলাম, কারণ আমার কাছে একটা বড়ো লাগেজ আর একটা ল্যাপটপ ব্যাগ বাদে কিছু ছিল না। ঠিক করেছিলাম বাকি রাস্তা হেঁটে অথবা টোটোতে যাব। একটা ধূসর চায়ের দোকানে বসে আমি কফি খেলাম। তখন ধুলোটে দুপুর। দূরে জঙ্গলের ওপর পাতলা ধোঁয়াটে আস্তরণ পড়েছে। জনহীন রাস্তায় মাটি চাটছে একটা কুকুর। কাছে দূরে নিঝঝুম দোকানপাটের ডালা ফেলা। পূর্বদিকের বনের মাথা দিয়ে পাহাড়ের মাথা দেখা যায়। বেশি দুধ দিয়ে বানানো বাজে কফি খেয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম হেঁটে যাব, কারণ স্যাংচুয়ারি হোমস্টে কাছেই দেখাচ্ছে। দোকানদার মরা চোখ মেলে দেখছিল আমাকে। সে জিজ্ঞাসা করল আমি টুরিস্ট কি না। তাকে জানালাম, ডেভিড ব্রাউনের হোমস্টে যাব। স্যাংচুয়ারির কথা শোনায় বিষম খেল সে। বিড়বিড় করল, ‘সাক্ষাৎ শয়তানের বাড়ি।’
তার কাছে আর কিছু জানতে চাইনি। ছোটো টাউনে হরেক লোককথা জন্মায় ও মরে যায়। আমি উঁচু-নীচু রাস্তা ধরে হাঁটা লাগালাম। দুই পাশের পিটিস মহুয়ার জঙ্গল ঘন হল। সেই রাস্তায় আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, পরে নাম জেনেছি দীপিকা সরেন। ফ্যাশন সচেতন ঘন কৃষ্ণবর্ণের দীপিকা কামিজের ওপর ম্যাচিং জ্যাকেট পরেছিল, সঙ্গতে নীলবর্ণের টর্ন জিন্স। অকারণ হাসিতে লুটিয়ে যেত তার পানপাতা গড়নের মুখ। চিবুকের ডৌল দেখে মনে হয়েছিল এখানে বাল্বের আলো পড়লে উজ্জ্বল অন্ধকার তৈরি হবে। কিন্তু এসব আমি পরে জেনেছি। প্রথমদিন তাকে দেখেছিলাম রাস্তা দিয়ে নিজের মনে হাঁটতে—সতেরো-আঠেরো বছরের বাচ্চা মেয়ে, হাতে একটা বেতের কঞ্চি, তা দিয়ে দুমদাম ঝোপের গায়ে পেটাচ্ছে আর আপনমনে গুনগুনিয়ে গান। তাকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম সেন্ট জন'স চার্চ কোথায়। ওটাই স্যাংচুয়ারির ল্যান্ডমার্ক ছিল।
‘আমার সঙ্গে চলো।' দীপিকা ঝকঝকে হাসল। রাস্তা নীচে নামে সোজা, কিন্তু ওপর উঠতে গেলে কসরত করতে হয়। দিনটা ছিল মরা হেমন্তের যখন তপ্ত হাওয়া অবসাদের মতো কানের কাছে ফিসফিস করে। কেন এখানে এসেছি আমি জানি না। ছোটোবেলায় বাবার কাছে শুনতাম এখানে একসময় একটুকরো ইংল্যান্ড ছিল। আপাতত ভাঙা কটেজ, বারান্দায় বসে থাকা ক্বচিৎ ঝিমন্ত বুড়ো, জঙ্গল ধেয়ে এসেছে বাড়িগুলোর চিমনির ওপর। ফাঁকা রাস্তায় নিজেদের পায়ের আওয়াজ কানে গুমগুম বাজে। ‘এখানে থাকার ভালো হোটেল নেই?'
‘বানানো হবে বলে শুনি আজকাল। তবে, আমরা কিছু কষ্টে নেই।’
‘কিন্তু সব বাড়িঘর ভাঙাচোরা। কেউ কি থাকে না এখানে?’
‘সবাই চলে গেছে। আমরাও এরকম একটা ভাঙা কটেজের দখল নিয়েছি জানো ! ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক থেকে একবার এসে ছবি তুলেছিল আমার। ইন্টারভিউ নিয়েছিল।' টলটলে রোদে চরাচর কাঁপছিল। ঝিমুনি আসছিল আমার। দীপিকা নিজের মনে গুনগুনিয়ে গাইছে। এবার আমাকে জিজ্ঞাসা করল কোথায় উঠেছি।
‘স্যাংচুয়ারি। কনফার্মেশন ই-মেল এসেছিল ডেভিড ব্রাউনের ই-মেল আইডি থেকে। চেনো?'
‘ওহ্!’ সে আমার দিকে আড়চোখে তাকাল। তারপর হঠাৎ হাত তুলল সামনে, “ওই দেখো, ভূত।’
চমকে দেখি, সামনে কিছুটা দূরে একটা মেয়ে সাদা লং ড্রেস পরে হাঁটছে। তখন নির্জন রাস্তা। মেয়েটার ড্রেস ময়লাটে, নীচের দিকে কাদা মাখামাখি। ‘ভূত কেন হবে?”
‘সেজেছে ওরকম। আমাদের টাউনে সত্যি সত্যি ভূত বেরোয় দুপুর বেলা।' মেয়েটা এবার মুখ ফেরাল আমাদের গলা শুনে। মধ্যবয়স্ক, দূর থেকে হাসি দেখে বুঝলাম হলুদ দাঁত। মাথার চুলও উলোঝুলো। কিছুদূর হেঁটে পাশের জঙ্গলে ঢুকে গেল। দীপিকা বলল, ‘এখানে কিছু নেই। পোড়ো ঝোপ, মুসলমানদের কবরখানা, কিছুদূরে ভাগাড়। এখানেই আস্তানা গেড়েছে।' মেয়েটা না দীপিকা, কে পাগল স্থির করতে পারলাম না।
‘বললে না তো, ডেভিড ব্রাউনকে চেনো কি না?' আমরা চড়াইতে ছিলাম, ফলত দূর অবধি দেখা যাচ্ছিল। আমার চোখে পড়ল জঙ্গলের মাথায় অনেক কাক একযোগে ঘুরছে। রৌদ্রের ধূসর জলছবিতে তাদের কাঁপতে দেখেছিলাম।
দীপিকা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। লাগেজ কাঁধে আমাকে হাঁফাতে হাঁফাতে তার পেছন পেছন যেতে হচ্ছিল। মুখ ফিরিয়ে বলল, “ও বাড়িতে শাপ লেগেছে। কেন যেতে চাও? ওকে মেকমাই ট্রিপ-এর কথা মনে করালাম। দীপিকা বুনোঝোপের গায়ে সশব্দে বেতের বাড়ি মারল, এবং হাওয়া স্তব্ধ। সামনের রাস্তার দু-পাশে ভাঙা কটেজ। আমি দেখলাম সামনের দিকটা প্রসারিত, যেন রাক্ষসের হাঁ। আর দেখলাম একটা চার্চের চূড়া। তার ক্রস ঘিরেই কাকের দল, যাদের উড়তে দেখেছিলাম। রাস্তার মধ্যিখানে ধুলোরা পাক খেয়ে উঠছিল। দীপিকা হাত তুলল, “ওই যে। এটা কিন্তু শহরের বাইরে। আমি আর এগোব না। দেখো গিয়ে, তোমার জন্য অভ্যর্থনার মালা সাজিয়ে রেখেছে। ‘কে? ডেভিড ব্রাউন ?
‘কেউ থাকে না আমাদের টাউনে।’
‘আর ডেভিড?’
‘ডেভিড ব্রাউন বহু বছর আগে মারা গেছে।'
এমন দুপুরে বুড়োরা ঘরে ঢুকে থাকে আর তরুণেরা কাজে। সেজন্য ছোটো শহর নিস্তরঙ্গ হয়। কিন্তু, তা বলে মরে যায় কি? সেন্ট জন'স-এর মাথা ঘিরে বিচিত্র আকৃতিতে কাকের দলের ঘুরপাক। জঙ্গলে কাঠপোকার কিড়কিড় বাদে অন্য শব্দ আমি পাচ্ছি না। জায়গাটায় জিপিএস কাজ করছে না, তাই দরজাবন্ধ চার্চের সামনে দাঁড়িয়ে আমি এদিকওদিক তাকালাম। ‘গোটা টাউনে ভূতেরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো রাজ বসিয়েছে। এখানে আমরা কয়েক জন বাদে কেউ বেঁচে নেই। তুমি যাকে ভাববে বেঁচে, সে মরে আছে। আর যাকে মরা ভাববে, সে আসলে জ্যান্ত।' যাবার আগে দীপিকা বলেছিল আমাকে। আরও জানিয়েছিল একদিন জাদুবলে জঙ্গল ও পোড়োবাড়িদের দল উধাও হয়ে সেখানে মাথা তুলবে রিসর্ট, সুইমিং পুল, স্পা সেন্টার। ‘ওই যে দেখছ চার্চ, ওটাই সেন্ট জন'স। রবিবার করে লোকজন আসে, কিন্তু বাকি সময়ে থমথমে। রাজ্যের সাপখোপের আড্ডা ওর অলটারের নীচে। আর আমার নাম দীপিকা সরেন।' আলগোছে, যেন অবহেলায় কাঁধ থেকে ঝাঁকিয়ে ফেলছে সে, যেভাবে অগ্রাহ্য করে এলোমেলো চুলের অবাঞ্ছিত ঝামরানো, জানিয়েছিল আমাকে। ‘মনে রাখবে, এখন যতই গরম লাগুক, বিকেল থেকে কীভাবে তোমার হাড়ের ভেতর হিম ঢুকে যায়।' তবু আমার মনে হল সবাই আছে এখানে, জানালার ফাক দিয়ে আমাকে দেখছে ।
আমি দেখলাম সাদা ড্রেস পরা মেয়েটাকে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসতে। সামনের একটা দাঁত ভাঙা ছিল তার। মাথায় বুনোফুলের মালাকে মুকুটের মতো পরেছে দেখে আমার মনে দুম করে শব্দবন্ধ এল—জিপসিদের রাজকন্যা। অবশ্য, রাজকন্যা হবার বয়েস তার গেছে। তাকে আমি স্যাংচুয়ারির কথা জিজ্ঞাসা করলাম। সে নাক খুঁটে হলুদ শিকনি হাতে মন দিয়ে দেখল, তারপর বাঁ-দিকে হাত তুললে চোখে পড়ল দূরে ঝোপঝাড়ের আড়ালে ঢাকা পড়া সাইনবোর্ডে ‘ctuary’। তারপর মেয়েটা দুদ্দাড় চার্চের পেছনে ছুটে গেল, যেদিকে ফলসা আর আমলকীর দঙ্গল জড়িয়ে-মড়িয়ে আচ্ছন্ন রেখেছে। পাশের কটেজের জানালার ভাঙা শার্সি বেয়ে একটা আদারং বেড়াল বেরিয়ে আমার দিকে রাগী চোখে তাকাল, মাটিতে নাক ঘষল দুবার। তারপর দৌড়োল জিপসি রাজকন্যার পেছনে। আমি এগিয়ে গেলাম কারণ এমন নৈঃশব্দ্যে অভ্যস্ত নই। স্যাংচুয়ারির ভাঙা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম সামনের আগাছা ভরতি বাগানে চাপ চাপ অন্ধকার ইতিমধ্যে বাসা বেঁধেছে। তাদের পেছনে যে বিশালাকৃতির দোতলা বাড়ি, সেটার দরজা-জানালাগুলো বন্ধ। গা বেয়ে উঠে যাওয়া ঘোরানো সিঁড়ির অর্ধেকটা ভেঙে ঝুলছে। বাড়ির শরীরে গজিয়েছে নিঃশব্দ ছত্রাক। পাঁচিলের গায়ে ঠেস দিয়ে একটা পুরোনো অলটো বিশ্রাম নিচ্ছে। কাকের বিষ্ঠা ও শুকনো পাতার ভিড়ে মলিন তার ছাদ। গেটের উলটোদিকের কাঁঠালগাছ থেকে কাপড়ে বানানো দুটো পুতুল ঝুলছে। ওদের নাক, চোখ কালি দিয়ে আঁকা। চোখে পড়ল, বাড়ির ডান দিকের অংশটা ভাঙা হয়েছে। সেই ভগ্নস্তূপে এখনও অবশ্য সটান দাঁড়িয়ে রয়েছে দুটো থাম, তাদের মাথায় একফালি ছাদ। ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর ভাঙা কাচ দিয়ে ভেতরের লাউঞ্জের অন্ধকার চোখে পড়ল। বাড়ি থেকে প্রেশার কুকারের সিটি ভেসে এল যখন, বুঝলাম ভেতরে লোক আছে। বাগানের দোলনাও অবশ্য অক্ষত। সেখানে এক বৃদ্ধা বসে ছিলেন। তাঁর পায়ের কাছে কুচকুচে কালো ছাগল, পরে নাম জেনেছি লালুরাম। ছাগলের চোখগুলো কুচফলের মতো লাল। বৃদ্ধা মোটাসোটা চশমা পরা। একটা কটকি শাড়ি পরে দোল খাচ্ছিলেন। এবার হাত তুলে বললেন, ‘এসো।' আর আমি স্যাংচুয়ারির পেটে ঢুকে গেলাম।
আমি স্যাংচুয়ারিতে থেকে গিয়েছিলাম, দশদিন ছাড়িয়ে আরও পাঁচদিন। বাড়িটাকে তামার পয়সা ঘষা কাচের মতো অস্বচ্ছ মনে হত আমার। বাড়ির ডান দিকের ভগ্নস্তূপে চোখ চালালে ঘর, স্টোররুম, গাড়িবারান্দার অনুপস্থিত ছায়া। বামদিকের যে অক্ষত অংশে আমরা ছিলাম, তার বন্ধ ঘরগুলোর দরজায় কান পাতলে নৈঃশব্দ্যকে অন্তর্ভেদী ও হাহাকারময় লাগতে পারত। সস্তা পর্দার দল প্রবল হাওয়ায় ওড়াউড়ি করত। বাড়ির পেছনে পাঁচিল ভেঙে পড়েছে। তার ওপাশে নাকি কোনো একসময়ে একটা জঙ্গল ছিল, একশো বছর আগে পুড়ে যায়। এখন একটা আগাছা ভরতি দিগন্তবিস্তৃত বিরাট মাঠের আকার নিয়েছে যার বেশিরভাগ অংশ জুড়ে গভীর কাদা, জলাভূমি, বুকসমান বুনোঘাসের সারি। একটা অ্যাম্বাসাডর গাড়ির কঙ্কাল জলার অপরপ্রান্তে বসে আছে। মাঠ ও জলার ভেতর ইতিউতি মাথা উঁচু করে থাকে গাছের গুঁড়ি, আমগাছের হাত মেলা কঙ্কাল। অঞ্চলটা আকারে এতই বিশাল ও স্থানে স্থানে অগম্য যে, তার অপরপ্রান্তের জঙ্গলকে আকারে বামন লাগে, শালগাছকে মনে হয় কোমরসমান। স্যাংচুয়ারির অক্ষত অংশের মাথায় টালি। সেখান দিয়ে বুনো লতা নেমেছে। বাড়ির সামনে, পেছনে অনেকটা জায়গা ঘিরে বাগান। সেখানে যত্নের অভাবে আগাছা। শিশু কোলে মেরির ছোট্ট মন্দির, মুরগির ঘর। জায়গাটা টাউনের বাইরে। এখান থেকে লাতেহার ফরেস্টের একটা অংশ শুরু হচ্ছে। কিছুটা এগোলে চামা। আশেপাশে অনেক পোড়ো কটেজ। মহুয়ার্টাড়ের জঙ্গল তাদের অধিকার করতে এগিয়ে আসছে। কয়েকটা কটেজ ভাঙাভাঙি হচ্ছে। দূরবর্তী নাট্টা পাহাড়কে এখান থেকে দেখা যায় না। পরিবর্তে ধু-ধু বিকেল জুড়ে সারাদিন পাতা ঝরে। ডেগাডেগি নদীর বুক থেকে উঠে আসা হিমাভ ভাপ জায়গাটাকে অধিকার করে। বাড়ির সামনের শিশিরভেজানো পাহাড়ি পথ ধুলোয় ঢাকা। প্রতি সন্ধেবেলা গম্ভীর মোষের সারিকে সেই পথ দিয়ে ঘরে নিয়ে যায় এক আদিবাসী ছেলে। পশুদের খুরের আঘাতে ধুলোময় সূর্যাস্ত দেখে আমার মনে হয় তাদের এই মেলাংকলিক যাত্রার গন্তব্য বুঝি কোনো সমাধিস্থলই হবে।
দিগন্ত থেকে মাঠ পেরিয়ে একলা আগন্তুককে হেঁটে আসতে দেখি— তার ডান পাশে ভেড়ার সারি, বামপাশে ছাগল। তারপর সে কুয়াশায় ঢেকে যায়। বাড়িতে আমি বাদে টুরিস্ট নেই। বাকি ঘরগুলো ভেজানো থাকে। বারবারা বকবক করে তার রাঁধুনি পুনমের সঙ্গে, আমি দোতলা থেকে শুনতে পাই। কুকুরেরা বেড়া টপকে বাগানে ঢুকে পড়লেও কেউ কিছু বলে না। আমার ঘরে দুটো জানালা ছিল। পেছনেরটা খুলত জলাভূমির দিকে, ব্যালকনির দিকের জানালা দিয়ে চোখে পড়ত টুকটাক খেতভূমি, ঝাঁটিফুলের ঝোপ। সেখানে নির্ভয়ে বহুরঙা পাখিরা উড়ে আসে। প্রৌঢ় হেমন্তের থকথকে কুয়াশা দৃষ্টিকে দূরে যেতে দেয় না অনেকটা বেলা পর্যন্ত। ভোরবেলা ব্যালকনিতে কফির কাপ নিয়ে বসলে ঝিম আর্দ্রতা আর আচ্ছন্ন করে আমার শরীরকে। মনে হয়, অনেক মদের সম্ভার অবিরল প্রকৃতির ঢালে, যারা সুপ্ত ও ইশারাপ্রবণ, আমার ইনসমনিয়ার ত্বক বেয়ে গলা মোমের মতো গড়িয়ে নামছে।
পরদিন থেকে আমি টাউনে নিজের মতো ঘুরব ভেবেছিলাম, এলোমেলো উদ্দেশ্যহীন। আমি নিশ্বাস ফেলে চারপাশে তাকিয়ে দেখেছিলাম, গঞ্জ তার গলিঘুঁজি চোরাপথে নিজের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে অনেকগুলো আলাদা গঞ্জ। কুবলাই খানের কাছে মার্কো পোলো যেরকম কিছু কিছু শহরের বর্ণনা দিয়েছিলেন যাদের ভেতর জেগে আছে এক বা একাধিক প্রতিরূপ, সেই হিডন সিটিদের মতোই গঞ্জ যেন আমাকে ইশারা পাঠাত। প্রলুব্ধ করত তার পেটের ভেতর আততায়ীর প্রেমের মতো সযত্নে লুকোনো অতিকথা ও গল্পদের খুঁজে বার করতে। পরিত্যক্ত বাংলো, রাত্রের জোনাকি ও ঝিঁঝির কনসার্ট, কুমারপাত্রা নদীর কলোরাডো ভূমিরূপ, ভগ্ন চার্চের অন্দরে বাতাসের ফিসফিসানি, ফাঁকা টেনিস কোর্ট, প্ল্যাটফর্মবিহীন ছোট্ট স্টেশন, তার ওপারের বেরিয়াল গ্রাউন্ড যেখানে আমি এক অ্যাংলো তরুণীকে প্রতি বিকেল বেলা বসে থাকতে দেখি, এখানে-ওখানে বেখাপ্পা হনুমান মন্দির, তাদের মাথায় উড়ছে গেরুয়া ঝান্ডা, বাদামি চামড়ার অ্যাংলো বৃদ্ধর শরীরজোড়া মাকড়সার জাল। কখনো দেখেছি খেতের প্রান্তে বসে গমের শিষ ছিঁড়ে খাওয়া শ্রান্ত পথিক, ওরাওঁ রমণীর চোখের নীচে স্থায়ী অন্ধকার, মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাঙা অটো, বিকেলের মরা আলো যেন দেশি কইয়ের পেটের মতো হলুদ— এই সমস্তই গঞ্জকে সিপিয়া টোনে রাঙায়। রাত ঘনায় যখন, ঘুমের চাদরে টাউনকে মোড়ানোর পরিকল্পনা বানচাল করে আচমকা স্থানীয় ক্যারম দলের ম্যাচ জেতার উল্লাস ছিটকে আসে জীর্ণ ক্লাবঘর থেকে। মহুয়াবনের ভেতর মাথার কাঠকুটো একপাশে নামিয়ে হাফপ্যান্টের পকেটে আঙুল গলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে দেহাতি মেয়ে, একপাশে হেলানো তার গাল, হাতে ভর রেখে, টুরিস্টের চোখে এ সমস্তই ক্যামেরার সম্পদ। কিন্তু ফ্রেম ছাড়িয়ে যেটুকু, তাদের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকে লোকালয়ের ইতিহাস। তার গড়ে ওঠার মুখে আদিবাসীদের সঙ্গে সাহেবদের সংঘাতের ইতিহাস। অরণ্যের ভেতর থেকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে থাকা ভাল্লুক ও চিতাবাঘের অসহায় ক্রোধের ইতিহাস। অনতিঅতীতে যাদের শিকারের মহোৎসব শুরু করেছিল সেটলাররা। অসংখ্য নামগোত্রহীন মুন্ডা ওরাওঁদের গল্পের গায়ে জন্মানো ঘাস, মরা গাছ, খ্যাতা কুয়াশা আর জঙ্গলের মধ্যে মধ্যে খুদে গ্রামগুলো, আরও অনেক কিছু যাদের অবহেলায় ঝরিয়ে দিই রোজ আমাদের স্মার্টফোনের ফ্রেম থেকে। সে-ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখে গঞ্জ। তার নাগাল টুরিস্টরা পাবে না।
বারবারা আমাকে না-চিনেও হাত নেড়ে ডেকেছিল, ‘এসো।’ কারণ, বহুকাল এখানে কেউ আসেনি। বারবারার পেছন পেছন অন্ধকার প্যাসেজ ডিঙিয়ে হেঁটে যেতে গিয়ে দেখেছিলাম একটা ঘরের দরজা খোলা। তার ভেতর পরিচ্ছন্ন সাজানো সোফা, চেয়ার, টেবিল। দাঁড়িয়ে পড়তে বারবারা পেছনে ঘুরে বলেছিল, ‘এটা বাবার ঘর।' কিন্তু, তার নিজের বয়েস সত্তরের কাছাকাছি। দু-জন আমাকে বলেছে বাড়িটায় গণ্ডগোল আছে, শয়তানের বাসা অথবা অভিশপ্ত। তাদের কথায় কান দেবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু, বাড়ি জুড়ে গভীর নিশ্বাসপতনের আওয়াজ আমি পাচ্ছিলাম। স্যাঁৎসেঁতে দেওয়াল, ঠান্ডা মেঝেতে ফাট, সিলিং থেকে আদ্যিকালের ঝুলকালি নেমেছে। আধো আলোতে বারবারার ছায়া বিশাল লাগছিল। ‘আর কোনো বোর্ডার নেই?'
‘অনেকদিন হল। আমারও বয়ে গেছে। ন্যাস্টি লোকজন সব। তুমি একলা মেয়ে, তাই দিচ্ছি। এই যে তোমার ঘর।' ছোট্ট কিন্তু ছিমছাম। একটা কাঠের টেবিল, প্লাস্টিকের চেয়ার। বেডকভারে ঝোলের দাগ নজর এড়াল না। ফ্যান চালাতে প্রতিবাদের ঘ্যাঁচঘোঁচ করল শুরুতে। তবে, লাগোয়া ব্যালকনিটা সুন্দর। আমার কিছু লাগত না। ক্লান্তিতে শরীর ছেড়ে দিচ্ছে। রাত্রে কী খাব জিজ্ঞাসা করাতে মাথা নেড়ে যা খুশি বলে দিলাম।
সারাদিন ঘরে ছিলাম। দেখেছিলাম ধোঁয়াটে সন্ধে নেমে আসার সময়টুকু। স্যাংচুয়ারি নিঝুম। তার বাগানের আলোর ফিলামেন্ট কেটে গেছে অনেকদিন। মুরগির ঘর থেকে অস্পষ্ট নড়াচড়ার আওয়াজ আসছিল। কুচকুচে কালো ছাগল লালুরাম অন্ধকারেও বাগান পেরিয়ে এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছিল বলে বকতে বকতে তাকে ডেকে আনল পুনম। নীচে বারবারার অস্পষ্ট গলার স্বর, মাঝে মাঝে উচ্চগ্রামে চিৎকার। অনেক দূরে জোহার হালে-র ভাঙা বেথেল মিশন গির্জা অন্ধকারে জেগে। নতুন গজানো হনুমানজির মন্দিরের দেওয়াল সিঁদুরল্যাপা। সেখান থেকে দেহাতি ঢোলের আওয়াজ আসছে আর সঙ্গতে ফুর্তির গান সন্ধের মধ্যেই নৈঃশব্দ্যর চাদর মুড়ি দিয়ে গঞ্জ ঘুমিয়ে পড়ল। ঝুপঝাপ আলো নিভল কাছে, দূরে। তখন একান্ত নিজের সময়টায় আমি ব্যালকনিতে গিয়ে বসলাম। দূরে অন্ধকার টিলার ঢালে মিটমিটে আলো দেখে আকাশের গয়না কল্পনা করলাম। মেঘ গর্জনের গুমগুম আওয়াজ এল। দিগন্তের আকাশকে লালচে লাগে। নিঃশব্দ বিদ্যুৎ কখনো। কিছু করার নেই জেনে কফির কাপে ঠোঁট ঘষি। কার্ডিগানটা আরেকটু মুড়িয়ে নিতে গিয়ে শুনি, সার সার শূন্য ঘরে গভীর শ্বাসপতনের শব্দ। তাকে আসন্ন বজ্রপাত হিসেবে ভুল হয় না।
রাত্রে ঘুম আসছিল না। খাটের পাশে যে জানালা, তার ওপারে অস্পষ্ট শব্দ হচ্ছিল। ভেবেছিলাম কিচ্ছু করব না এখানে। ল্যাপটপ খুলব না, অফিসের ই-মেল দেখব না, এমনকী বইও নয়। শুধু বসে থাকব আর ঘুরব আলস্যে। তাই খাটে শুয়ে অন্ধকারে চোখ মেলে আকাশকুসুম ভাবছিলাম। কিন্তু, শব্দটা ক্রমাগত হয়েই যাচ্ছিল। মানুষের গলার আভাস পেলাম তার মধ্যে। তাই জানালা খুললাম। তখন রাত সাড়ে বারোটা।
অন্ধকার পোড়ো মাঠ। তার বুকসমান ঘাস, কাদার সাম্রাজ্যের বুকে ইতস্তত জলার অবশেষ। তাদের মধ্যে শূন্যে হাত ওঁচানো গাছের কঙ্কালকে ভিক্ষুকের মতো লাগে। ভাঙা চাঁদের আলো জলকাদার ভেতর পড়ে চিকচিক করছিল। চারপাশ মৃত্যুর মতো নিথর। কিন্তু, আমি প্রকৃতি দেখছিলাম না। মাঠের প্রান্তে একটুকরো পাথরের ওপর সর্বাঙ্গে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে বারবারা। বসে আছে-র থেকে বলা ভালো, হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফোঁপাচ্ছে রুদ্ধস্বরে। তার পাশে দাঁড়িয়ে এক পুরুষমূর্তি। কিন্তু, তার দৃষ্টি বারবারার দিকে নয়। বরং, যেরকম মনোযোগের সঙ্গে কল্পবিজ্ঞান কাহিনির নায়ক পর্যবেক্ষণ করে নতুন গ্রহের মাটি, সেভাবে ঝোঁকা ভঙ্গিতে— না দেখতে পেলেও অনুমান করলাম, সুতীব্র চোখে সে তাকিয়ে আছে জলাভূমির দিকে। বারবারা তবু সেদিকে আগ্রহ নাদেখিয়ে নিজেতে মগ্ন। গাছের পাতা নড়ছে না কারণ হাওয়ারা স্তব্ধ ছিল আর মেঘ, সতর্ক।
কয়েক মিনিট তাকিয়ে থাকার পর সাবধানে জানালা বন্ধ করলাম।
সোমেন কর্মকার উশখুশ করছেন দেখে হাসি পেল। লম্বা বর্ণনা শোনার ধৈর্য পুলিশের থাকে না। এদিকে আসল গল্প শুরুই হয়নি। সহানুভূতির কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সংক্ষেপে বলব?'
‘না। সেটার জন্য পুলিশ ফাইলই ছিল।' বললেন অক্ষয় মাহাতো। ‘তিন বছর আগে পুলিশের কাছে যা স্টেটমেন্ট দিয়েছিলেন আপনি, আমি পড়েছি। কিন্তু, আমি আপনার স্টেটমেন্ট না, ভার্শন শুনতে চাই। তাই অনুরোধ করেছিলাম, সন্ধেটা ফাঁকা রাখবেন। বুঝতেই পারছেন, বিশেষ কারণ না-থাকলে ঝাড়খণ্ড সিআইডি আমাকে কলকাতায় পাঠায় না।'
সোমেন হতাশ মুখে ফোন ঘাঁটছিলেন। বাইরে মৃদু কোলাহল শুনে দেখি, দুটো পার্টি ডায়েরি লেখাতে এসে নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করছে। একজন কনস্টেবল হুংকার দিচ্ছেন তাদের থামাতে। সাড়ে ছ-টা বাজে। কুরুশ করতে করতে নেটফ্লিক্স দেখার সময়। দুটো অ্যাবসল্যুট উইথ লাইম নিয়ে সন্ধে কেটে যাবে। গভীর রাত্রে গতকালের পাস্তা গরম করে খেয়ে নেব। তারপর বিছানায় যাব নিল গাইম্যানের নতুন বই হাতে। যেটুকু যেখানে স্মৃতির অবশেষ, তাদের বন্ধ দরজার ওপাশে দাঁড় করিয়ে রাখব, কারণ অন্ধকার ঘরে আমার ঘুম হবে নিশ্ছিদ্র। অক্ষয় মাহাতো বুঝবেন না, বিবর্ণ দিন কীভাবে ঝরে যায়।
‘সেই সময়েই কি অ্যারনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আপনার? অ্যারন ব্রাউন, এডওয়ার্ড ব্রাউনের ছেলে। তারপর, জেনিফার গর্ডন?' টেবিলে রাখা একটা ফাইল থেকে নামগুলো পড়লেন অক্ষয়।
‘কয়েক দিন পর। আমি যখন গঞ্জ ছেড়ে চলে আসি, তখন অবশ্য কারোর থেকে বিদায় নিইনি। পালিয়ে এসেছিলাম বলতে পারেন। অথবা, আপনারা আমাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়েছিলেন, যেভাবে ভাবেন।' হেসে সিগারেটের প্যাকেট তুলে হতাশ হলাম। শেষ। কাঁধ ঝাঁকালে সোমেন বললেন, ‘আনিয়ে দিচ্ছি। চা, কফি কিছু বলি?’
“চা খাই না। কফি হলে কালো, চিনি ছাড়া। আপনি অ্যারনের কথা বললেন। অ্যারন আমার গল্পের এমন একটা চরিত্র যে আমাকে বার বার বলত, আমরা ঠিক প্রশ্ন করছি না। আমরা ভাবছি—কীভাবে। আসল প্রশ্ন হল-কেন। কিন্তু, সে যাই হোক, আপনারা তো শুরু করেছিলেন বারবারা আর অবিনাশকে নিয়ে হঠাৎ অ্যারন বা জেনিফার কেন? নাকি, এরা সকলেই আপনাদের তদন্তের কেন্দ্রে?’
‘অ্যারন এখানে গুরূত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তার সম্পর্কে বিশদে জানতে হবে তো বটেই। তবে আগে বলুন, বারবারার সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব কীভাবে শুরু হল?’
স্যাংচুয়ারিতে প্রথম দু-দিন আমি কাউকে আসতে দেখিনি। বারবারার সঙ্গেও কথা হয়নি তেমন। খাবার ঘরেই আনিয়ে নিতাম। বুঝেছিলাম, বাড়িটার বেশিদিন নেই। ছাদ ধসে পড়ার মুখে। নোনা-তে খেয়ে নিচ্ছে দেওয়াল। বারবারা একাচোরা থাকত। মাঝে মাঝে উচ্চকণ্ঠে পুনমকে বকত। বাকি সময়টুকু কুরুশ করত নিজের ঘরে বসে। রাত হলে ডাইনিং টেবিলে গেলাস আর বোতল সাজিয়ে বসত, হাতে উল-কাঁটা। আমি থাকলেও গ্রাহ্য করত না। বরং, একবার গেলাস নিয়ে বসে যেতে বলেছিল। আমি হেসে প্রত্যাখ্যান করি। সে মাঠের ধারে বসে কেঁদেছিল কেন? টাউনটাও যেন, আমাকে সন্দেহের চোখে না-দেখুক, আড় হয়ে আছে, যেদিন থেকে জেনেছে আমি স্যাংচুয়ারিতে থাকি। এমনিতেই থাকে হাতে-গোনা লোক। সন্ধের মুখে টিমটিমে দু-চারটে দোকান খোলে। তাসের আড্ডায় ম্লানচোখে বসে মাফলার জড়ানো দেহাতি বুড়োরা। ক্বচিৎ কোনো শ্বেতাঙ্গ সাহেব ছাতা পড়া ত্বক ও ঘোলাটে চোখ নিয়ে নড়বড়ে হেঁটে যায়। গালে হাত দিয়ে বসে থাকে গোমসের চায়ের দোকান। তারা আমাকে দূর থেকে দেখে, কানাকানি করে নিজেদের ভেতর- বেশ বুঝতে পারি। আমার হাতে কাজ থাকে না। দিনের বেলা এখানে-ওখানে ঘুরি। কখনো চলে যাই জোহার হালের জঙ্গলে। সন্ধে হলে জলাভূমির দিকে মুখ করে চেয়ারে বসি। দেখতে পাই, অনেক কাক দিনশেষে উড়ে বেড়াচ্ছে নির্জন জলার ওপর দিয়ে। দিগন্তের কালিমাখা জঙ্গল আকাশের গায়ে মিশে যাচ্ছে। অ্যাম্বাস্যাডারের কঙ্কালকে ধোঁয়ার মতো লাগে তখন। ধু-ধু শূন্যপুরাণ, নির্জনতার ইনস্টলেশন।
তৃতীয় দিনে সকাল থেকে মেঘলা ছিল আকাশ। শীতও করছিল। দুপুর বেলা টিপটিপে বৃষ্টি দেখে বুঝিনি। হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। ফেরার সময়ে জোর বৃষ্টিতে ভিজে গেলাম। একটা দোকানের ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে হাত নিশপিশ করছিল সিগারেট ধরাতে। কিন্তু, কোভিড হবার পর নিজেকে কথা দিয়েছি, দিনে একটার বেশি নয়। আমি অন্যমনস্কভাবে দেখছিলাম দোকানে নানা জাতের আচারের সম্ভার। কলকাতায় যাবার সময়ে নিয়ে গেলে হয়। যেদিন রান্না করতে ইচ্ছে করবে না, একথালা ভাত উড়িয়ে দেওয়া যাবে। এদিকে গা বেয়ে জল ঝরছে। বিরক্ত লাগছিল কারণ শীতের বৃষ্টিতে টনসিল ফুলবে। তখন সামনে এসে দাঁড়াল লাড়ে অলটো। বারবারা মুখ বাড়াল, ‘আটকে পড়েছ?'
‘ছাতা আনিনি। বুঝিনি এত জোরে নামবে।’
‘উঠে এসো।”
এই রাস্তা ওই রাস্তা, গির্জার উঠোন ও ঘেঁষাঘেঁষি গাছেদের আবছায়া পেরিয়ে বারবারা আমাকে নিয়ে এল। তখন মেঘ ঝুঁকে এল, ঝিমিয়ে এল বৃষ্টি। ফুটিফাটা রাস্তার গর্তগুলোর ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে ভাঙা গাড়ি এগোচ্ছিল, আর সেই ফাঁকে আমি রোগা, মাঝারি উচ্চতার একটা ধূসর টাউনকে দেখছিলাম। মাঠে ফুটে থাকা লিলি ফুলের মতো সে সাজায় না নিজেকে। অপরিশ্রমী, আন্তরিক তাই। পোড়ো কটেজের সম্ভার পেরিয়ে টিলার জানুদেশ। সেখানে গাছের দল একত্রে জঙ্গলের ছায়া বানিয়েছে। বারান্দায় বসে থাকা অশীতিপর বৃদ্ধা, তাঁর চারপাশ জনহীন—পোস্টকার্ডের ছবি হতে পারে। দূর থেকে অস্ত মোরগের ডাক ভেসে আসছে, ভিজে যাবার ভয়। তারপরেই দেহাতি বস্তি। একটা ধাবার সামনে দাঁড়ানো ট্রাক । তরুণী মেয়ে ঠোঁটে আঁচল টেনে উবু হয়ে বসে মোবাইল দেখছে। তার শিশু কাদার ওপর লাফালে ছপাক শব্দে ছিটকোচ্ছে জল। কয়েকটা শুয়োর দূরে দাঁড়িয়ে টিপটিপ বৃষ্টি গায়ে মেখে নিচ্ছে। অনুমান করলাম আমরা গঞ্জের বহির্ভাগ দিয়ে যাচ্ছি।
‘একটা প্রশ্ন ছিল। ডেভিড ব্রাউন কে?’
‘আমার বাবা।’
কী বলব বুঝছিলাম না। ‘আসলে ই-মেল পেয়েছিলাম, তাই—'
‘তাতে কী? মেল করবে না তো কি প্লেনে উড়ে গিয়ে খবর দিয়ে আসবে?' কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ থাকার পর বলল, ‘আমার বন্ধু অবিনাশ যাদব জানিয়েছে তুমি নাকি নামকরা সাংবাদিক। খুনের তদন্ত করো।' তাকে জানালাম আমি খবর করি মাত্র। ঝাড়খণ্ডের জঙ্গল মাফিয়ার স্টোরির কথাও জানালাম। বারবারা উত্তর দিল, ‘হাতে চাকরি না-থাকলে কী করবে ছেলেপুলেরা? জঙ্গল চিবিয়ে খাবে? বেশ করেছে মাফিয়া হয়েছে।' ফলত, আমি নিরুত্তর হলাম। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমেছে। গুম হয়ে ছিল প্রকৃতি। নুয়ে পড়া গাছের পাতা থেকে টুপ টুপ জল পড়ে এক-একটা জায়গায় কাদা বানিয়ে তুলেছে। আচমকা হাওয়ায় গাছের মাথা থেকে ঝরঝর করে অনেকটা জল পড়ছিল।
‘ভয় পেয়ো না। তোমার গায়ে কেউ হাত দেবে না তা বলে। তুমি আমার শেষ বোর্ডার।’ বুঝতে না-পেরে ওর দিকে তাকিয়েছিলাম। ‘তুমি চলে যাবার পর আমি ব্যাবসা তুলে দেব, কারণ বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে। এরপর ভাঙা হবে। এখানে সব বাড়ি ভাঙছে ওরা।' ‘কারা?’
‘তোমার স্টোরির ভিলেনরা। জঙ্গল মাফিয়া। আমাদের শহরকে টুরিস্ট স্পট বানাবে। এখানে ইতিউতি অনেককে দেখবে, যারা বহুদিন আগে মরে গেছে। সারাদিন তাদের ফিসফিসানি শুনবে। তবে, টুরিস্ট স্পট হলে এরা কেউ থাকবে না।' বারবারার মুখ থেকে হালকা অ্যালকোহলের গন্ধ পেলাম ।
বারবারা আমার বন্ধু হয়েছিল। থপথপে চেহারায় শাড়ির ওপর কার্ডিগান জড়িয়ে সে জলাভূমির দিকে মুখ করে বসে থাকত আর কুরুশ করত সারাদিন। মাঝে মাঝে কপালে চশমা তুলে ভুরু কোঁচকাত, কিছু কি দেখা যাচ্ছে জঙ্গলের গা ঘেঁষে? নিজের এলোমেলো কাঁচা-পাকা চুল মুঠোয় ধরে বিড়বিড় করত বারবারা, ‘আমি ভুল দেখিনি।' বাড়ির পড়োপড়ো অবস্থা, বাগানময় আগাছা, পুনমের দুই মাসের মাইনে বাকি- কিন্তু তার গ্রাহ্য নেই। তখন থেকে আমি রাতের খাওয়া বারবারার সঙ্গে সারতাম। মুরগির ঘর থেকে ছানাপোনাদের ক্বচিৎ ডাক, একটানা ঝিঁঝির আওয়াজ চরাচরকে নীরব করত। গাঁজানো রাত হিমেল স্পর্শ নিয়ে জেঁকে বসত। বারবারা রুম হিটার পরখ করে অসন্তুষ্ট মাথা নাড়ত, ‘একদম কাজ করছে না।' আমাকে ধমকাত, ‘ফালতু ক্রাইম রিপোর্টার তুমি। কলকাতার স্টোনম্যান মার্ডার সলভ করতে পেরেছ?' সম্পর্কের গড়ানে ঢাল বেয়ে আমাদের হিন্দি সম্বোধন ততদিনে তুমিতে নেমেছে। আমি হাসতাম—কে তাকে বোঝাবে যে আমি গোয়েন্দা নই?
‘তুমি বরাবরই এরকম—একলা ছিলে?' আলাপের সপ্তাহখানেক পরে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
‘বিয়ে হয়েছিল কিনা? পুরুষেরা ব্লাডি অফুল, বুঝলে? এক ছাদের তলায় থাকা অসম্ভব। অবশ্য, মেয়েরাও ব্লাডি অফুল। মানুষমাত্রেই অফুল।' আমরা চেয়ার পেতে জলাভূমির সামনে বসেছিলাম। তখন বিকেল ঘনাচ্ছে। পাখিদের কর্কশ চিৎকারে কান পাতা দায়। কুয়াশা গেঁজেছে জলার ওপর। বারবারা বিরক্ত হল, ‘একদিন পয়জন গ্যাস স্প্রে করে দেব। যারা নেচারকে ভালোবাসতে বলে তারা ব্লাডি লুজার। প্রেমে ছ্যাকা খেয়েছে অথবা কেরিয়ারে গাড্ডু, আমার মতো। '
‘শুধু বিয়েই নয়—’
‘তাহলে আবার কী? লিভ টুগেদার? আমরা ধর্মপ্রাণ প্রোটেস্টান্ট।'
‘আর প্রেম?’
‘ভালো লাগেনি কাউকে। তোমরা যাকে বলো, কী বলো যেন—' গেলাস নামিয়ে বারবারা কথা হাতড়াল। তার কণ্ঠস্বর জড়িয়ে এসেছে। ‘ধুর ব্লাডি! ফর্নিকেট করার ইচ্ছে রে, বাবা!’
‘ডিজায়ার?”
‘ইয়েস। ডিজায়ার। আমার হয়নি। ভাগ্যিস! আমি যেরকম মোটা, ছেলেগুলোর কী অবস্থা হত ভেবেছ?' কিন্তু, মেয়েও তো হতে পারত! বারবারা মাথা নাড়ল, ‘দুর্ভাগ্যবশত, হোমোসেক্সুয়ালদের দেখে আমার দুঃখ বাদে কিছু আসে না। ছেলেগুলো জানল না কী হারাল আর মেয়েগুলো শাড়ির নীচে সাদা কেডস পরে বেড়াল পুষে গেল সারাজীবন।' বারবারা একচুমুকে অনেকটা মদ খেয়ে হাসল, ‘আমি প্রাউড অ্যান্টি-রোমান্টিক ছিলাম। শেলি-কিটস পড়ে খ্যাকখেঁকিয়ে হাসি পেত। তবে, এই ছেষট্টি বছর বয়েসে কী এসে যায়!' জলাভূমির ওপারে শালমহুয়ার জঙ্গল আন্দোলিত হচ্ছে। ততদিনে আমি কল্পনা করতে শিখেছি, টাউন জুড়ে অগুনতি ফিসফিসানি। কারণ, মৃত মানুষেরা এখানে আটকা পড়ে আছে।
“তুমি কেন দাঁড়িয়ে থাকো জলাভূমির ধারে? এখনও?' প্রশ্নটা করতেই হত।
‘তুমি কি ভাবো যে কিছু দেখতে পাবে?’
‘আমার তো দাঁড়িয়ে থাকাটাই কাজ। আমাদের।' বারবারা স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো হাসল । ‘একবার যদি ও এসে দাঁড়ায়, শুধুমাত্র এটুকুই তো—।'
‘এতদিন পরেও?'
‘আশা বাদে আমার আছেটা কী এই বয়েসে? তুমি দার্জিলিঙে পঁয়তাল্লিশ বছরের পুরোনো রহস্য খুঁড়তে গিয়েছিলে। আশা না-থাকলে, পারতে ওটার সমাধান বার করতে?' ‘কোনো গতিকে হয়ে গিয়েছিল। আমারও জেদ চেপে গিয়েছিল যে, শেষ দেখে ছাড়ব। তাও, কপিবুক সমাধান করতে তো পারিনি! অন্ধকারে ঢিল ছুড়েছি কয়েকটা, ভাগ্যক্রমে লেগে গেছে।' বারবারা জানতে চাইল আমি ডিটেকটিভ ওয়ার্ক বিষয়ে এত উদাসীন কেন। তাকে বললাম, যেটা আমি বিশ্বাস করি। সব অপরাধ দিনের শেষে এক। জাগতিক লাভ, প্রতিশোধ, সাক্ষ্য হাপিস, আর বেসিক ইনস্টিংকট, এই চারটে মোটিভের বাইরে ক্রাইম বেরোয় না। এগুলো নিয়ে দিনের পর দিন লিখতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, ইনোভেশন শব্দটা হয়তো শুধুমাত্র প্রযুক্তিতেই থাকে। আমাদের সময় শেষ। এই পৃথিবীতে আর মাস্টার ক্রিমিনাল জন্ম নেবে না। হাসলাম, ‘ভাগ্যিস নেবে না! তাই রহস্যরা আমাকে আলাদা করে সমাধানে আকৃষ্ট করে না।'
‘তাহলে কেন এখানে এসে ক্রিসের রহস্যের সমাধানে উদগ্রীব হলে?”
‘প্রফেসর স্প্রাউট, তোমার স্মৃতিভ্রংশ হচ্ছে। তুমিই চেয়েছিলে, আমি যেন এগিয়ে আসি। এখন কি চাও না?
‘আমার ভয়, তুমি ব্যর্থ হবে।'
‘আমার ভয়, তোমরা চাও যে, আমি ব্যর্থ হই।'
যে বৃষ্টির দুপুরে বারবারা আমাকে গাড়িতে করে তুলে নিয়ে এল, সেই রাত্রেই টোকা পড়েছিল আমার দরজায়। অল্প মাতাল, দুলছে। খপ করে আমার হাত চেপে বলল, ‘তুমি তো রহস্যের সমাধান করেছ, পারবে এটার হিল্লে করতে?' বলে আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল নীচে। চাদর জড়াবার সময়টাও দেয়নি। অবাক লাগছিল কারণ আজ দুপুর বেলা বৃষ্টির ভেতর গাড়িতে লিফ্ট দেবার আগে তার সঙ্গে বিশেষ বাক্যবিনিময় হয়নি। এই কয়েক ঘণ্টায় সেই মানুষ এত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল যে, রাতবিরেতে দরজায় টোকা মারছে? বারবারা পেছনের দরজা খুলে বাগানের ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে আমাকে জলাভূমির সামনে দাঁড় করাল। আঙুল তুলল দূরে। ঘাসের প্রাচীর ডিঙিয়ে সেদিকে তাকালে আমি কিছু বুঝলাম না। ঝড়ো হাওয়ায় জঙ্গলের আন্দোলনে নতুনত্ব কী আছে?
‘এখানে, এই জলাভূমিতে ক্রিস লুকিয়ে আছে। তুমি পারবে খুঁজে বার করতে?” 'ক্রিস?”
‘আমার ভাই এডওয়ার্ড। এডওয়ার্ড আর মনীষার প্রথম সন্তান ক্রিস। ক্রিস্টোফার। বত্রিশ বছর বয়েস, কারণ ও বেঁচে আছে।'
‘আমি কিছু বুঝছি না, বারবারা!' মাথার ওপর রাতপাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ পেলাম। ঝোড়ো হাওয়া দিল অকস্মাৎ। জলাভূমির ওপর চাঁদটা ভেঙে যাচ্ছে। ডাইনিদের উপত্যকা— ভেজা ডুমুরগাছ, মৃত্যুর মতো শান্ত৷
“ক্রিস হারিয়ে গিয়েছিল। কেউ খুঁজে পায়নি। কিন্তু, সবাই জানে, ও সারাদিন এখানে লুকিয়ে থাকে। রাত্রে বেরোয়। ঘুরে বেড়ায়। হাঁটে জলের পাশ দিয়ে। জঙ্গলের ভেতরেও ঢুকে যায়। আমি ওকে দূর থেকে দেখেছি। কিন্তু, ক্রিস বলে ছুটে যেতে গেলে দৌড়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেছে।' বারবারা মাটির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ফুঁপিয়ে উঠল মাতাল স্বরে, ‘আমার দমবন্ধ লাগে, জানো! একটা গুদাম ঘর, ঘুটঘুটে অন্ধকার, পচা চামড়ার গন্ধ— ,
কালকেই বাসস্থান পালটাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। এখানে থাকা অসম্ভব। কিন্তু, এখন পাগলকে সাঁকো নাড়াবার কথা বলা যাবে না। তাকে জানালাম কাল সকাল বেলা সব শুনব, কিন্তু এখন আমার ঠান্ডা লাগছে। টনসিল ফুললে জ্বর আসতে পারে, সেক্ষেত্রে তদন্ত সম্ভব নয়। এতে কাজ হল। বারবারা আমাকে জড়িয়ে কাঁদল একটু। কয়েক বার সরি বলল। প্রমিস করাল কাল আমি পুরোটা যেন শুনি। তারপর আমরা বাড়ির ভেতরে গেলাম। কিন্তু, যাবার আগে অভ্যেসবশত আমি পেছনে ফিরে তাকিয়েছিলাম। কেউ কি জলাভূমির ওপারে দাঁড়িয়ে দেখছিল আমাদের? এই পরিস্থিতিতে মন অনেক কিছু বানিয়ে নেয় জানি। অন্ধকারে বোঝা সম্ভব নয়। তবু কেন আমার মনে হল, শান্ত অপেক্ষায় কেউ জঙ্গলের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে, কোনো যুক্তিতেই বুঝলাম না।
‘তখন আপনি জড়াতে চাননি?”
‘ইন্টারেস্ট পাইনি। দু-দিন বাদেই চলে যাব, অফিস শুরু হবে। কেন এসবে মাথা ঘামাতে যাব? আমার তো কাজও নয় এটা।'
বাইরে ঝগড়াঝাঁটি স্তিমিত। লক-আপ থেকে করুণ কান্নার আওয়াজ আসছে, সম্ভবত কোনো মাতাল। কফি এল। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে অক্ষয়ের দিকে তাকালাম। ‘১৯ মার্চ, ২০২৫। গঞ্জে একটা মার্ডার ঘটেছে। সেই কেস তদন্ত করতে এসেছেন, তাই তো?’
অক্ষয় ও সোমেন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। ‘কলকাতার কাগজে ও বেরিয়েছে?
‘নাহ্। যখন চাকরি করতাম, ফোনে রিজিওনাল নিউজপেপারের অনেক অ্যাপ রাখতে হয়েছিল। সেগুলোকে ডিলিট করিনি। মন দিয়ে স্ক্রোল করতাম এমনও নয়। এই খবরটা চোখে আটকায় কারণ “দৈনিক ভাস্কর”-এর ফিডে শুরুতেই গঞ্জের নাম ছিল।’
অক্ষয় টেবিল থেকে একটা ফাইল তুললেন। ‘যদিও নিয়ম নেই, তবু চাই আপনি দুটো ছবি দেখুন।
রোদ ঝলসানো দুপুর। একটা জঙ্গুলে জায়গায় ভাঙা দেওয়াল। তার গায়ে আটকানো দেহটা। পরনে পোশাক ছেঁড়াখোঁড়া। শরীরটাকে দুই হাত ছড়িয়ে ক্রুশবিদ্ধ করার স্টাইল দেওয়া হয়েছে। অনুমান করলাম, বড়ো পেরেক দিয়ে হাত দুটো আটকানো। পা যদিও মাটি ছুঁয়েছে। মাথা ঝুঁকে পড়েছে বুকে। দ্বিতীয় ছবিতে মুখের ক্লোজ-আপ। চোখ বন্ধ, বিস্ফারিত ঠোঁট। নীলচে আভা সারামুখে। কপালে একটা ফুটো। বুলেটের তাপে আশপাশের চামড়া পুড়েছে।
অনেকটা সময় সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে ছিলাম। হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জানতাম, কিন্তু নিউজে বলা হয়নি যে, দেহটাকে এভাবে স্টেজ করা হয়েছে। অক্ষয় এই ছবিটা আমাকে কেন দেখালেন? আমি তো নিজেকে বার বার বোঝাতাম, আর ফিরে যাব না!
‘জোহার হালে-র চার্চ।' উত্তর দিলেন অক্ষয়। ‘বেথেল মিশন।
ছবি দুটো ফেরত দিয়ে বড়ো নিশ্বাস ফেললাম। ‘রিচুয়াল কিলিং হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হল – '
‘তিন বছর আগে যে রহস্যের তদন্ত করতে গিয়ে আপনি ব্যর্থ হয়েছিলেন, তার সঙ্গে গতমাসের এই হত্যাকাণ্ডর যোগাযোগ কোথায়।' স্মিতস্বরে অক্ষয় বললেন।

তখন ভ্রাতা ভ্রাতাকে ও পিতা সন্তানকে মৃত্যুতে সমর্পণ করিবে; এবং সন্তানেরা আপন আপন মাতাপিতার বিপক্ষে উঠিয়া তাহাদিগকে বধ করাইবে ।
- Mark 13:12
এই কাহিনির শুরু এমনভাবেও হতে পারত যে, ব্রাউনদের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে আমি তুলে নিচ্ছি একটা হারানো ছবি। স্মৃতির খননে উপযোগী দৃশ্য, সন্দেহ নেই।
যে রাত্রে বারবারা আমাকে পোড়ো মাঠের ধারে টেনে নিয়ে গেল, তার পরদিন ভোরে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, স্যাংচুয়ারি হয়তো ছাড়তে হবে, কিন্তু একদিন দেখে। হাজার হলেও আমি একজন সাংবাদিক। যদি গল্পের সম্ভাবনা দেখি কোথাও, সে যত তুচ্ছ হোক না কেন, তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কাজের কথা নয়। স্থানীয় মানুষেরা বলেছে এই বাড়ি অভিশপ্ত। কেন, তাকে খতিয়ে দেখিনি। একটা বড়ো স্টোরি করার পরে আলস্য আসা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু, তাই বলে গল্পগুলোর থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকব কেন? শুধুমাত্র স্টোরি লেখার খাতিরেই তো নয়! একজন সাংবাদিকের মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হল তার কৌতূহল। স্বাভাবিকের থেকে কোনোরকম বিচ্যুতি তাকে যদি কৌতূহলী নাকরে, সে প্রশ্ন না-করে যদি, তাহলে বুঝতে হবে তার পেশাগত জীবন শেষের মুখে।
অফিস থেকে মহেশ হোয়াটসঅ্যাপ করেছে। রেগেমেগে জানতে চেয়েছে, আমি ছুটিতে আছি ভালো কথা কিন্তু কয়েকটা লেখা এডিট করব কি না। এখানে একটা ভুল করেছি। আমি এখন সিনিয়ার সাবএডিটর। ছুটি নিলেও সব কানেকশন অফ করে দেওয়া উচিত হয়নি। মহেশকে মিষ্টি করে উত্তর দিলাম, বললাম মাধুরীর জন্য এখান থেকে হ্যান্ডলুমের সুন্দর একটা কাঁথা কিনেছি। যদিও ভবি ভোলবার নয়। ফোন করলেই গাল পাড়বে, তাকে অথই জলে ফেলে আমি ভেগে গিয়েছি। মহেশ কাজপাগল। তাকে বোঝানো সম্ভব নয় যে, কখনো মানুষের এমন ফেজ আসে যখন তার ভেতরের সিস্টেমগুলো শাট ডাউন করে যায়। টানা দুই বছর আমি ছুটি নিইনি, কলকাতায় যাইনি। কোভিডের সময়ে বাড়ি থেকে সারাদিন কাজ করেছিলাম। এই দশদিনের কথাও আগে থেকে বলা ছিল—স্টোরিটা ফাইল করেই আমি ছুটিতে যাব। কিন্তু, মহেশ বুঝলে তো! ল্যাপটপে অফিসের টুকটাক কাজগুলো সেরে হাঁটতে বেরোলাম। বারবারার সঙ্গে একঝলক দেখা হল। কিন্তু, সে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বাগানের দোলনায় বসে। আমাকে যেন চিনতে পারল না। গতরাত্রে যা বলেছিল, হয়তো তার মদের খেয়াল। বৃষ্টির পর মিঠে হিম নেমেছে চরাচরে। আকাশ এখনও মেঘে ঢাকা। কাপড়ের পুতুল দুটো কাঁঠালগাছের ডাল থেকে আমার দিকে স্থির তাকিয়ে। মনে পড়ল গতরাতের জলাভূমির দৃশ্য। কেউ কি দেখছিল আমাদের? আজ সকালে জানালা খুলে আবার দেখেছি। একইরকম ম্লান ও নিস্পন্দ। নিষ্পত্র গাছের কঙ্কালে কয়েকটা পাখি বসে ছিল। নীচের কাদায় ঘোরাঘুরি করছিল একটা মোরগ। সে আমার দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে স্থির হয়ে ছিল। ওপাশের জঙ্গল লেপাপোঁছা মুখে নিশ্চুপ।
গোমসের চায়ের দোকানে বসে আমার চোখে পড়ল, দীপিকা সরেন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। হাতে তার কঞ্চি। সামনে চার-পাঁচটা ছাগল। চোখাচোখি হতে হাসল, ‘বেঁচে আছ? পালাওনি এখনও?' তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে তিতিরকান্নার মাঠে চলে এলাম। ছাগলগুলোকে খুঁটিতে বেঁধে দীপিকা মাথার চুল হর্সটেল করে বাঁধল, আড়চোখে আমাকে দেখে বলল, “অনেক প্রশ্ন আছে মনে হয়? দেখো যা করবার ঝটপট করে ফেলো। আমাকে এখান থেকে পঞ্চায়েত যেতে হবে। ওখানে সেল্ফ হেল্প গ্রুপগুলোর ভিডিয়োও মিটিং আছে আজ।' আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন ও বাড়িতে শাপ আছে বলেছিল।
‘আছে তো। অনেক বছর আগে ওদের বাড়ি থেকে একটা বাচ্চা নিখোঁজ হয়ে যায়। লোকে বলে, বাড়ির লোকেরাই নাকি গলা টিপে মেরে ফেলেছিল। তারপর জলাভূমিতে পুঁতে দেয়। তারপর ওদের বাড়ির একটার পর একটা লোক মরেছে। আরও কত গল্প! সবাই জানে এখানে।' প্রান্তর তন্দ্রালু, আবছায়া গুমোটে প্লাবিত। এখান থেকে সার সার ভাঙা বাড়িদের দেখা যায় দূরে। মনে হয়, অন্ধচোখে ঘাড়গোঁজা বৃদ্ধের দল। ‘ওদের লোকে এড়িয়ে চলে। তার অ্যাংলো, খুব অহংকার ওদের। কিন্তু, এখন দেখো, পুরো ধ্বংসস্তূপ। ওই বাগানে কত যে সাপ! বাড়ির পেছনদিকটা দেখেছ? ভেঙে দিয়েছে। আমার বাবারা ওদের বাড়িতে ফাইফরমাশ খাটত। এখন কেউ যায় না। তুমি কেন এসেছ? এখানে কিছু পাবে না। আমাদের ছবি তুলে দু-পয়সা কামাবে যদি ভাবো, লাভ নেই। ওসব ছবি পচে গেছে। লোকে ভাবে ট্রাইবাল মানেই ধামসা, মাদল নিয়ে নাচবে আর মেঠো ইঁদুর ধরে মাংস খাবে। এখানে পিৎজার একটা দোকান হয়েছে, কিন্তু কেউ যায় না। সেটা বাদে ভালো খাবার কোথাও পাবে না, বুঝলে? পুনমদি ওখানে কাজ করে না? রান্না মুখে তুলতে পারো?' বকবক করতে করতে দীপিকা এগিয়ে গেল। চেঁচিয়ে বলল, ‘আমরা থাকি ওসমান সাহেবের বাংলোতে। কিন্তু, সেখানে খবরদার এসো না। আমরা তোমাদের পছন্দ করি না, বুঝলে? তোমাদের দেখলেই বুঝি, শহরের লোক আমাদের উৎখাত করে কটেজ কিনে নেবে।'
‘তাহলে তোমার সঙ্গে যদি আবার দেখা করতে চাই? ফোন নাম্বার আছে?'
‘স্টেশনে গিয়ে খোঁজ করবে। অচেনা লোককে ফোন নম্বর দিই না। বাচ্চা মেয়ে না আমি?' চোখ ঘুরিয়ে রহস্যের ইঙ্গিত করে দৌড়ে পালাল দীপিকা। তার পায়েরা অদৃশ্য হল ধুলোর মেঘে।
ফিরতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। সেন্ট জন'স চার্চ-এর পেছনের জঙ্গল দিয়ে শর্টকাট করছিলাম। দেখলাম কিছুদূর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক বৃদ্ধ। তাঁর পরনে পাজামা, কিন্তু খালি গা। সাদা দাড়ি, মাথায় এখানে-ওখানে খাপচা খাপচা চুল, জরাগ্রস্ত মুখ। বাম হাত কাঁপছে, ডান হাতে ধরে আছেন একটা টকটকে লাল রঙের ল্যান্ডফোনের রিসিভার। সেটার তার নেমে গেছে মাটিতে। তারে আটকানো ফোনের ক্রেডল মাটিতে ঘষটানি খেতে খেতে বৃদ্ধকে অনুসরণ করছে। মহুয়া, পিটিসের বাধা ও ঝোপঝাড় পেরিয়ে নড়বড় করতে করতে তিনি জঙ্গলের ভেতর ঢুকে যাচ্ছেন। এই ঠান্ডায় খালি গায়ে ঘুরছেন কেন? পাগল নাকি? বাড়ির লোক হয়তো এতক্ষণে খোঁজ শুরু করেছে। ইতস্তত করছিলাম, কাছে যাব কি? কিন্তু, বৃদ্ধ ততক্ষণে একটা ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয়েছেন।
স্যাংচুয়ারিতে ঢুকতে গিয়ে দেখি, বেশ কিছু লোক বাগানে ঘুরছে। বারবারা এগিয়ে এল আমাকে দেখে। শুনলাম, আজ বাড়ির ভেঙে দেওয়া অংশটার জিনিসপত্র বার করা হচ্ছে। মালিকেরা চাইলে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাখতে পারে, নাহলে ফেলে দেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে পেছনের বাগানে জরিপের কাজ। মূল বাড়ি ভাঙা হতে অবশ্য দেরি আছে। ইতস্তত মিস্ত্রি, মজুরেরা ছড়িয়ে। তার মধ্যে আবার টিপটিপে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। স্যাঁৎসেঁতে মেঘলা দিন বিষণ্ণ করে তুলেছে গঞ্জের সকাল। বড়ো বড়ো পিচবোর্ডের বাক্সভরতি জিনিস এনে বাইরে রাখছে মজুরের দল। এক প্রৌঢ় সেগুলোকে অলস চোখে দেখছেন। মনে হল না একটাকে নিয়েও উৎসাহ আছে। বারবারা আলাপ করাল। এডওয়ার্ড ব্রাউন। লম্বা ও ছিপছিপে, তবে সুদর্শন মুখে অত মোটা গোঁফ থাকার দরকার ছিল না। এডওয়ার্ড হাসেন না। কথা বলেন মেপে। আমার সঙ্গেও মাপা ভদ্রতা করে হাত বাড়ালেন, ‘আপনার নাম শুনেছি বারবারার কাছে।' তারপর কথা ফুরিয়ে গেল তাঁর। ভুরু কুঁচকে একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স থেকে বাতিল বিয়ারের বোতল তুলে লেবেল ঘুরিয়ে দেখলেন। বিড়বিড় করলেন অসন্তুষ্ট গলায়। ভদ্রলোকের ইংরেজি উচ্চারণ খাঁটি অক্সফোর্ডের স্টাইলে। বারবারার মতো দেশি অ্যাক্সেন্ট না। কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন নাকি? পাজামা-পাঞ্জাবিতে যদিও রাজকীয় অ্যাংলো আভিজাত্য ফুটে বেরোবার প্রয়াস ছিল, কিন্তু তখন তাঁর ফোন বাজল। শুনতে পেলাম ‘চিকনি চামেলি'। তাড়াতাড়ি মুখ না-ফেরালে বিপদ হত, হেসেও ফেলতাম হয়তো।
একটা রংচটা ছাতা তুলে বারবারা বলল, ‘মনে আছে, বাবা এটা দিয়ে তোকে পিটিয়েছিল একবার? হাফইয়ার্লিতে ফেল করার পর বাড়িতে রেজাল্ট লুকিয়েছিলি। বাবাকে রেক্টর জানিয়ে দিয়েছিলেন।'
‘রেক্টর না, ওটা তুই।’ এডওয়ার্ডের ভুরু কুঁচকে গেল। ‘কলেজে উঠে নিজেকে বিশাল কেউকেটা ভাবতিস। ভাবতিস বাবার কাছে চুকলি না কাটলে ভাই মানুষ হবে না।’ ‘আমি না, আপন গড। আমি কি জেনিফার নাকি?”
‘তো, কী করতে চাস ছাতাটাকে নিয়ে? আমার মার খাবার স্মারক হিসেবে রেখে দিবি?” ‘অ্যারনকে দেব। তার বাপ ছোটো বয়েসে কেমন বাঁদর ছিল দেখবে। সে কোথায়?'
এডওয়ার্ড অসন্তুষ্ট গলায় ছেলের কীর্তিকলাপের বিবরণ দিচ্ছিলেন। এমবিএ শেষ করার পর দুটো চাকরি ছেড়েছে। ঘুরে বেড়ায় এদিক-ওদিক। দিল্লিতে কোন বন্ধু আছে, সে আবার তার থেকে বয়েসে অনেক বড়ো, তার বাড়িতে মাঝে মাঝে কয়েক সপ্তাহ কাটিয়ে আসে। ‘আমি বুঝছি না, এর পেছনের গল্পটা কী! এত বড়ো ছেলের কোনো বান্ধবী নেই! ওই বন্ধুর সঙ্গে অত খাতিরদারি কীসের?”
“তুইও তো গঞ্জে এসে মিলন চতুর্বেদীর মতো একটা ব্লাডি ওয়াইফ-বিটারের সঙ্গে গুজগুজ করিস সারাসন্ধে। কেউ কি তোকে জিজ্ঞাসা করে, কেন করিস?'
‘অ্যারন হোমোসেক্সুয়াল নয় তো? ছোটোবেলা থেকে দেখেছিস, পুতুল নিয়ে খেলত।
মারধর করে অনেক কষ্টে সে-স্বভাব ছাড়িয়েছিলাম। এত বড়ো ছেলের হবি কী, রান্না করা ! আমি ইতস্তত এদিক-ওদিক ঘুরছিলাম। আজকেই অন্য হোমস্টে-তে চলে গেলে ভালো হত। সারাদিন এখানে হইহট্টগোল লেগে থাকলে আমার পোষাবে না। অথবা, যদি কলকাতায় চলে যাই এখান থেকে? পুরোনো বাড়ির একপাশ কাত হয়ে ধসে গেছে মাটিতে। শ্যাওলা ধরা ইট, কাঠ, পাথর, সিমেন্টের টুকরোতে জায়গাটা ধুলোময়। গাছগাছড়ার জঙ্গল চারপাশে। ডুমুরের কচি ডালে পাতা আসার সময় হয়নি। ফলত, স্যাঁৎসেঁতে শীত ঘাড়গোঁজা আমাদের আর্দ্র ও ভারাক্রান্ত করেছিল। আমি হলে প্রাণে ধরে বাস্তুভিটে বিক্রি করতে পারতাম না । কিন্তু, এত বড়ো বাড়ি আমার হবেও না কখনো।
তখন আমি দেখলাম একপাশে অনাদরে পড়ে আছে একটা বাক্স, যার ভেতর থেকে লাল চামড়ার মলাটে বাঁধানো ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট' উঁকি মারছে। সোনালি অক্ষরে বাহারি ক্যালিগ্রাফি। এডওয়ার্ড অভিযোগ করছিলেন, বাড়িতে এত ফালতু বই ডাই হয়ে আছে যে, সেগুলো সরাতেই দু-দিন সময় যাবে। সব কিলোদরে বেচে দেবেন নাকি। বই তুলে দেখলাম, পাতাগুলোর প্রান্তভাগও সোনালি রঙের, পোকায় কাটেনি। বইটা খুলে কয়েকটা পাতা ওলটাতে গিয়ে কী যেন খসে পড়ল ভেতর থেকে। নীচু হয়ে চোখে পড়ল, একটা ছবি। সাদাকালো ও বিবর্ণ, হলদে আভায় যেন সিপিয়া টোন। পাতার ভাঁজে রাখা ছিল। এক কিশোরী গাছের ডালে হেলান দিয়ে বসে। পরনে ফুলছাপ ড্রেস হাঁটু অবধি। সানগ্লাস পরে হাসছে মেয়েটা। একটা হাত হাঁটুতে রাখা। অপর হাত আলস্যে ঝুলছে। ছবি দেখে মনে হয় সুন্দরী। কত বয়েস হতে পারে? হয়তো পনেরো বা ষোলো। আরও দেখা যাচ্ছে, ময়ূর ডিজাইনের ফুলস্লিভ সোয়েটার পরা একটা হাতের অংশ ছবির বাম দিক থেকে বাড়িয়ে ধরেছে। যেন মেয়েটাকে কিছু নিষেধ করতে চায় হাতের মালিক। গার্টার দিয়ে কিছুর সঙ্গে আটকানো ছিল ছবিটা। তুলে দেখলাম, পেছনে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট। প্যাকেটের ভেতর সম্ভবত চকোলেটের রাংতা গিঁট পাকানো এবং একটা চিঠি জাতীয় কিছু। প্যাকেটের মুখ খুলে চিঠিটা বার করতে গিয়ে দেখলাম সেটাকে জড়িয়ে রেখেছে একটা লম্বা লাল চুল। আশ্চর্য, এত বছর পরেও অবিকৃত থেকে যায়! লাল চুল কি ছবির মেয়েটার? সাদা-কালো ফটোতে চুলের রং বোঝা যায় না। চিঠি খুলে দেখলাম চার্চের লেটারহেড। বামদিকের একপাশে ক্রসচিহ্ন, ডান দিকে ইংরেজিতে লেখা লাতিন ফ্রেজ, প্যাক্স ভবিসকাম। এই কথাটার মানে আমি জানি। পিস বি উইথ ইউ। মেয়েলি হস্তাক্ষরে একটা অসম্পূর্ণ চিঠি। ‘Forgive me, father, for I have sinned. Two days back...', এটুকুই। কনফেশন লিখতে গিয়ে লেখেনি মেয়েটা, হয়তো সাহস হয়নি। অথবা, তার ক্যাথলিক চার্চের পুরোহিতকে বিশ্বাস করতে পারেনি সে।
মুখ ফিরিয়ে উঁচু স্বরে বারবারাকে বললাম, ‘ছোটোবেলায় আপনি দারুণ সুন্দরী ছিলেন তো!'
বারবারা আর এডওয়ার্ড এগিয়ে এল। কিন্তু বারবারা অবাক হল, ‘এ তো অ্যাগনেসের ছবি। এখানে কী করে এল?’
‘আমার অবশ্য বোঝা উচিত ছিল, এটা আপনি না।' বললাম আমি। ‘আপনারা প্রোটেস্টান্ট ক্রিশ্চান। কিন্তু, এ মেয়ে ক্যাথলিক কনফেশন লিখেছে।'
বারবারা বিড়বিড় করল, ‘অ্যাগনেস! কতদিন বাদে ওর ছবি দেখলাম। তোর মনে আছে এডওয়ার্ড?' কিন্তু, এডওয়ার্ড দূরে অন্যমনস্ক দাঁড়িয়ে। বারবারা তাঁকে আবার অ্যাগনেসের কথা জিজ্ঞাসা করল। এডওয়ার্ড মাথা নেড়ে অস্পষ্ট কিছু বললেন, তারপর অনির্দেশ্য তাকালেন আকাশের দিকে।
“চিঠি কি মেয়েটাই লিখেছে? আবার লাল চুলে জড়ানো।' চিঠি, চুল আর চকোলেটের রাংতা বারবারার হাতে তুলে দিলাম।
‘অ্যাগনেসের চুল ছিল লাল।’
‘আপনাদের আত্মীয়? ’
মাথা নাড়ল বারবারা, ‘টাউনের একটা মেয়ে। হারিয়ে যায়। কেউ তাকে খুঁজে পায়নি।' তারপর বিড়বিড় করল, ‘ক্রিসের মতো।’ আমার দিকে পূর্ণদৃষ্টি মেললে তার ভেতর পাগলাটে বুড়িকে আমি খুঁজে পেলাম না, সম্ভবত প্রথমবার। ‘আমি বলেছিলাম আজ তোমাকে ক্রিসের গল্প বলব। তুমি কি শুনবে?' আমি তাকে বললাম যে, এটা আমার কাজ নয়। তার ওপর চিনি না কাউকে। ‘অবিনাশ তোমার কথা বলেছে। ও পুলিশে চাকরি করত। জানে সব। একটা রহস্য, একটা—' বিভ্রান্তভাবে বারবারা কথা হাতড়াচ্ছিল। অসহায় চোখে তাকাল আমার দিকে, ‘তুমি কি জানো, সমাধান না-হওয়া রহস্যের অভিঘাত কী হয় একটা পরিবারে?’
আমার মনে হল, এখনই হোমস্টে পালটাবার উত্তম সময়। কিন্তু সাংবাদিক সত্তা যাবে কোথায়? উত্তর দিলাম, ‘বেশ, শুনব নাহয়। তবে, কোনো কথা দিচ্ছি না। এই অ্যাগনেস, এর কী গল্প ছিল?’
‘কিছুই না। হারিয়ে যায়, আর ফেরেনি। লোকে এখনও ওর ভূত দেখে। এই টাউনে অ্যাগনেসের ভূত বিখ্যাত । '
মিস্ত্রি, মজুরদের কেউ কেউ এসে দাঁড়িয়েছিল। তারা বাইরের লোক, অ্যাগনেসকে তাদের জানার কথা নয়। তবে, সকলে একবাক্যে স্বীকার করল, মেয়েটা সুন্দরী। ছবিটা হাতে হাতে ফিরছিল। ফলত, খবর ছড়াল। টুকটাক একজন দু-জন এসে দেখে যাচ্ছিল ছবিটাকে। কেউ কেউ স্থানীয় লোক, তারা অ্যাগনেসকে চিনতে পারল। সে নাকি প্রায় চল্লিশ বছর আগে হারিয়ে যায়। চিঠি দেখে কেউ কিছু বলতে পারল না। বারবারা ছবি ও প্লাস্টিকের প্যাকেট ব্যাগে ঢোকাবার আগে কী মনে হল আমার, ফোনে সবক-টার ছবি তুলে নিলাম। তখন চারপাশ অন্ধকার করে শীতের ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি নেমেছে ঝুপঝাপ। চোখে পড়ল, সামনে যে মাঠ, তার একপাশে উঁচু ঝোপজঙ্গল আবছায়া বানিয়েছে। তার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে ছাতা মাথায় একজন। লোকটার পাশে একটা কুকুর বসে। দু-জনেই নিস্পন্দ। জায়গাটায় ঘন গাছের ছায়া। তার ওপর মেঘলা দিন বলে লোকটার মুখ বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু সে এবং তার পোষ্য যে আমাদেরই দেখছে, বেশ বোঝা যায়। তবু কাছে আসছে না। আলাপ করার বাসনা আছে বলে মনে হল না। ওভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা অস্বস্তিকর। আমি বারবারার দিকে মুখ ফেরালাম, ‘লোকটাকে দেখলেন?’ বারবারা ভুরু তুলল। হাত তুলে দেখাতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, জায়গাটায় কেউ নেই ।
‘এতক্ষণে একটা রোমাঞ্চের আবহ আসছে। পুরোনো বাড়ি, রহস্যময় ছবি, অচেনা ছায়ামূর্তি।' হালকা গলায় বললেন সোমেন কর্মকার।
কফিতে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরালাম। ‘ছায়ামূর্তি অচেনা ছিল না তো। সেদিনই আলাপ হয়েছিল। রকির বাবা । ”
‘রকি কে?’
‘পোষা কুকুরটার নাম রকি। আমি ভদ্রলোকের নাম জানতাম না বলে রকির বাবা বলে ডাকতাম।’
‘পুলিশের কাছে আপনার স্টেটমেন্টে রকির বাবার উল্লেখ নেই।' বললেন অক্ষয় মাহাতো।
‘আমি তাঁর নাম জানতাম না। তিনি কে, সেই পরিচয়ও জানিনি। কিন্তু, আমার তদন্তে তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।' অনিশ্চিত গলায় উত্তর দিলাম।
‘বুঝলাম না। কীরকম গুরুত্বপূর্ণ? তাঁর পরিচয় পাওয়া তো অসম্ভব ছিল না। ওইটুকু ছোটো শহর—'
‘আমি বাদে তাঁকে কেউ দেখেনি।'
অবিশ্বাসের চোখে দু-জন তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে। চোখ সরিয়ে কফির কাপে চুমুক দিলাম। । অনেক জিনিসের ব্যাখ্যা আমার কাছে আজও নেই।
‘দেখেনি মানে? একটা জলজ্যান্ত মানুষ, কুকুর আছে—
‘বারবারা, অবিনাশ, টমাস অ্যাক্টায়ার, সবাইকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমি। সেরকম চেহারার কাউকে চেনে না এলাকার মানুষ। কুকুরটাকেও দেখেনি। কিন্তু, প্রায়ই রাত হলে তাঁর সঙ্গে দেখা হত আমার। রকিকে হাঁটাতে বেরোতেন। তাঁর নাম জিজ্ঞাসা করেছি, উত্তরে হেসেছেন। অবশ্য কোথায় থাকেন সেটা আমি জানতাম। শহরের বাইরে একটা পুরোনো কটেজে। কিন্তু, একদিন দুপুরে তাঁর খোঁজে গিয়ে সে-কটেজ আমি তালাবন্ধ দেখেছি।' সোমেন আর অক্ষয় একে অপরের দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকালেন। ‘দেখুন, যা ঘটেছে, কোনো ব্যাখ্যায় না-গিয়ে আমি সেটুকুই বলব, শুনতে যত অবিশ্বাস্য লাগুক না কেন। এতদিন পরে বানিয়ে বলে আমার লাভ নেই। কেসটা আপনারা শুনতে চেয়েছেন। আমি নিজে থেকে বলতে তো আসিনি !”
‘আপনি পুলিশের স্টেটমেন্টে উল্লেখ করলে হয়তো তাঁকে খুঁজে বার করা যেত তখন।’ ‘কী বলতাম? একজন মানুষ যাঁর সঙ্গে আমি কথা বলতাম, আমার তদন্ত নিয়ে আলোচনা চালাতাম, কিন্তু তাঁর নাম ঠিকানা জানি না? আপনারা ভুলে যাচ্ছেন, পুলিশ দায়সারাভাবে আমার স্টেটমেন্ট নিয়েছিল, মূলত অন্যদের চাপে। সেইসময়ে আমি শহর ছাড়লে তারা বাঁচে। কেন তারা এত পুরোনো কেস নিয়ে মাথা ঘামাবে? আমার উৎসাহ ছিল, কিন্তু তাদের তো থাকার কথা নয়।'
অক্ষয় মাহাতো বড়ো নিশ্বাস ছাড়লেন। ‘তার থেকেও বড়ো কথা, পুলিশ তখন কীভাবে জানবে যে, তিন বছর পরে একটা খুন হবে যা হয়তো এসবের সঙ্গে সম্পর্কিত।'
‘আপনি এখনও বললেন না, কেন আমাকে জড়াচ্ছেন। আমি নিশ্চয় সন্দেহভাজন নই ? সেইসময়ে আমি কলকাতায় এবং কুশীলবদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই গঞ্জ ছেড়ে আসার পর থেকে। চাইলে কল রেকর্ডও চেক করতে পারেন। অবশ্য আমার ধারণা, সেসব আপনি জানেন। তাহলে, কেন?”
‘ছবি দুটো দেখে কী মনে হল?’
‘ইন্টারেস্টিং। হত্যাকারী যখন একটা মৃতদেহকে এভাবে সাজিয়ে রাখে, সে হয়তো কোনো বার্তা দিতে চায়। আর—', বলব না ভেবেও বলে ফেললাম, ‘আশ্চর্য লাগছে এটা ভেবে, এই টাউনে যখন যে অপরাধ ঘটে, সেটা কি সর্বদাই এরকম বিদঘুটে মার্কা হয়?”
‘আপনার মনে হচ্ছে না, তিন বছর আগেকার ঘটনাগুলোর সঙ্গে এর যোগ আছে?'
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকলাম। কী উত্তর দেব এর? যদি যোগ থাকেও-বা, আমি কি নিজেকে এসব থেকে সরিয়ে নিইনি? মাথা নামিয়ে মৃদুগলায় বললাম, ‘সেগুলো আপনাদের খতিয়ে দেখার কথা। আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি বলুন?’
সোমেনের ফোন এল। ‘হ্যাঁ স্যার’, ‘করে দিচ্ছি স্যার' বলতে বলতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেলে মিনিটখানেক আমরা দু-জন চুপ করে থাকলাম। আমি সিগারেট খেতে খেতে বারবারার কথা ভাবছিলাম। গঞ্জ ছেড়ে আসার পর একবার ফোন করেছিলাম, কিন্তু বারবারা ফোন তোলেনি। রিংব্যাকও করেনি। বহুদিন হল আমি ঔদাসীন্যকে বর্ম বানিয়েছি। যা হোক, কিছু আসে-যায় না।
অক্ষয় মাহাতো আমাকে নিবিষ্টচোখে দেখছিলেন। চোখাচোখি হতে সেই হাসিটা দিলেন, যা এতক্ষণ হেসেছেন। সহৃদয় মানুষের সহানুভূতির হাসি, যাতে চোখ ছোটো হয়ে কুঁচকে যায় কপাল। ‘একটা জিনিস জানার কৌতূহল আছে। আপনি সাংবাদিকতা ছাড়লেন কেন?’
‘ভাববেন না, এই ঘটনার কারণে ছেড়েছি। তারপরে দিল্লি ফিরেছি, চাকরি করেছি মাস ছয়েক। কিন্তু, তারপর ইচ্ছে করছিল না। আমার বলার মতো গল্প শেষ বলে মনে হয়েছিল। তাই মিডিয়াকে “টা টা” করে কলকাতায় চলে আসি। সিম্পল। আপনি সিগারেট খান? ' ‘ছেড়ে দিয়েছি। ষোলো বছর আগে কন্যা জন্মেছিল যখন।'
‘আজ একটা খেতে পারেন। লম্বা গল্প। বাইরে দেখুন, আকাশ কালো করে বৃষ্টি হচ্ছে। এই সময়টুকুর জন্য আমাদের কোথাও যাবার নেই। ফলত—', প্যাকেট বাড়ালাম। ইতস্তত করলেন অক্ষয়, তারপর একটা সিগারেট তুলে নিলেন।
দুপুরের পর থেকে গুমগুমে নৈঃশব্দ্য নেমে এল বাড়িতে। মিস্ত্রি-মজুরদের দল চুপচাপ পায়ে হাঁটছিল, যেন তারা কারোর ঘুম ভাঙাতে চায় না। এত লোক দেখে বারবারার সম্ভবত প্রেশার বেড়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে তার উচ্চ গলার চিৎকার বাড়ির নির্জনতাকে আরও জমাট বানাচ্ছিল। ঝোড়ো বাতাস জলাভূমির ওপর দিয়ে পচা গন্ধ বয়ে আনল যখন, জানালার সামনে বসে আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম— কেন আছি এখানে? কলকাতায় না-ফিরে এরকম চাপা অবসাদের জায়গায়, যেখানে বাড়ির মালকিনের কথাবার্তা ঠিকঠাক লাগছে না। হাজাররকম গুজব দাঁতচাপা ফিসফিসানিতে ছায়া নামিয়ে আনছে আমার ওপর, তবু সেখানে আজও থেকে গেলাম শুধুমাত্র পুরোনো কিছু গল্প শোনার আশায়? কী আসে-যায়, এটা তো আমার স্টোরি মেটিরিয়াল হবে না! অমীমাংসিত রহস্য বিষয়ে আমার লেখা সিরিজ তিন বছর আগে পাট গুটিয়ে ফেলেছে। ঠিক করলাম, আজকের সন্ধেটা দেখি। কাল চলে যাবার বন্দোবস্ত করব।
বিকেল বেলা হাঁটতে বেরিয়েছিলাম, কারণ হাতে কাজ ছিল না। এখন বেলা মরে আসে তাড়াতাড়ি। বৃষ্টি থেমে হাওয়ায় চোরাটান উঁকি দিচ্ছে। লাইটপোস্ট ঘিরে পুঞ্জ রচনা করেছে মশাদের দল। ধু-ধু মাঠ হেমন্তের থিতোনো আলোয় নৈশ অপেরা নিঃঝুম। কাছেপিঠে ভাঙা কটেজের দল এক-একটা গল্পের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়ে। স্যাংচুয়ারি থেকে ডাইনে বাঁক নিয়ে কিছুদূর হেঁটে গেলে রাস্তার একটা মোড় আসে। সেখানে যে কটেজটা দাঁড়িয়ে, তার গল্প গতকাল আমাকে শুনিয়েছিল বারবারা, যখন গাড়িতে করে নিয়ে এল। তাদের স্কুলের এক শিক্ষক লি স্যামুয়েলস-এর কটেজ। লি ছিলেন কেরলের ক্রিশ্চান। কামিনী-কাঞ্চন থেকে দূরে সারাজীবন ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক কষে কাটাবার পর পঁচাত্তর বছর বয়েসে পৌঁছে এক আঠেরো বছরের তরুণীকে বিয়ে করেছিলেন। সেই মেয়েটার ওজন ছিল তিরিশ কেজি। সে ফলের রস বাদে কিছু খেত না। তার ফ্যাকাশে চামড়া এত পাতলা ছিল যে, স্পষ্ট বোঝা যেত রক্তচলাচল। মেয়েটিকে ঘরে তালাবন্ধ রেখে বৃদ্ধ মিস্টার স্যামুয়েলস থুথুড়ে পায়ে স্কুলে আসতেন। ক্লাস নিতেন, ঘুমিয়ে পড়তেন ক্লাস নিতে নিতে, ছেলেদের ওপর রাগ করে ডাস্টার ছুড়ে মারতেন। বিকেল হলে টলায়মান পায়ে বাড়ির তালা খুলতেন, তখনও অন্ধকার ঘর। একটু পরে দেখা যেত, দু-জনে ছাদে বসে। মিসেস স্যামুয়েলস মুখ হাঁ করে রেখেছে জ্যোৎস্নার উৎসে, যেন পান করবে। আর বুড়ো ঘুমিয়ে পড়েছেন বউয়ের কাঁধে মাথা রেখে শোনা যায়, মেয়েটি মাঝে মাঝে স্বামীর সামনে পোশাক খুলে নগ্ন হত। তার ফিনফিনে হাওয়ায় গড়া কোমর দু-হাতে জড়িয়ে পায়ের ফাঁকে মুখ গুঁজে দিতেন স্যামুয়েলস। সেভাবে বসে থাকতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাঁর বৃদ্ধ পিঠ কাঁপত। মাথায় অল্প যে কয়েক গাছি পাকা চুল ছিল, সেগুলোতে হাত বুলিয়ে দিত মিসেস স্যামুয়েলস। সে কারোর সঙ্গে মিশত না। সারাসকাল শুয়ে থাকত। তারপর একদিন স্যামুয়েলস মরে গেলেন। দরজা হা-হা করছিল দু-দিন ধরে। পচা গন্ধ এসেছিল। কৌতূহলী প্রতিবেশীরা উঁকি মেরে দেখেছিল, সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় খোলা চোখে মাটিতে পড়ে আছেন মিস্টার স্যামুয়েলস। তাঁর শরীর কুঁচকে গেছে। লিঙ্গ করুণ ও অজস্র বলিরেখাময়। শুকিয়ে যাওয়া ঊরু দেখে বাজপড়া ফলসার ডাল মনে হচ্ছিল। ডাক্তার বলেছিলেন, হার্ট অ্যাটাক। সেই মেয়েটিকে আর কেউ কখনো দেখেনি। লোকে বলে, সে নাকি হাওয়ায় মিশে গিয়েছিল। জ্যোৎস্না উঠলে তিতিরকান্নার হলুদ মাঠে কেউ দেখেছে, কুচফলের গাছেরা গা জড়াজড়ি করে যে ঝোপ বানিয়েছে, তার পাশে কাঠির মতো রোগা এক নগ্ন মেয়েমানুষকে শুয়ে থাকতে। কৌতূহলী হয়ে কাছাকাছি এগোতে গেলে সে ঢুকে গেছে ঝোপের ভেতর, খুঁজে পাওয়া যায়নি। এডওয়ার্ডরা তখন কৈশোরে পদার্পণ করেছেন। তাঁরা কয়েক জন বন্ধু দেখতে গিয়েছিলেন মিস্টার স্যামুয়েলস-এর কটেজ। খাঁ-খাঁ করছে। দরজা খোলা ছিল। মাঝে মাঝে একটা শুকনো হাওয়া বইছিল দীর্ঘশ্বাসের মতো। ধুলোর দল টোপর হয়ে পাকিয়ে উঠছিল শূন্যে। বাড়ির ভেতর সব একরকম। চেয়ার-টেবিলখাট শান্ত শুয়ে আছে। টপ টপ করে ভাঙা কলের জল পড়ার আওয়াজ আসছিল। সিলিং ঘেঁষে একটা মোটা টিকটিকি স্থির। তার চোয়ালে আটকানো খয়েরি আরশোলা মাঝে মাঝে ফরফর করছিল। ভয় পেয়ে ছেলের দল পালিয়ে আসে।
‘মেয়েটাই হয়তো খুন করেছিল। করে পালিয়ে গিয়েছিল।'
‘অথবা, মরে গিয়েছিল সে নিজেও। তাই লোকে ওর ভূত দেখত। প্রেম করলি কিনা বুড়ো বয়েসে এসে, যখন কলকবজা কাজ করছে না। ব্লাডি পুরুষগুলো বোঝেও না, ভালোবাসার থেকে ইউটিআই বেশিদিন স্থায়ী হয়।' গাড়িকে স্যাংচুয়ারিতে ঢোকাবার সময়ে বারবারা উত্তর দিয়েছিল।
এই গল্পগুলো মাটি পাবে চিরতরে, যেদিন বারবারাদের প্রজন্ম থাকবে না। এখনই অনেকে ভুলে গেছে, কারণ বেশিরভাগ কটেজ পরিত্যক্ত। লোকজন চলে গেছে কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া। কোনোটার হয়তো দখল নিয়েছে কেয়ারটেকারের ফ্যামিলি। অথবা স্থানীয় দেহাতি কি মূলনিবাসীরা ঢুকে গেছে। আবার, অনেক কটেজ এমনিই পড়ে আছে, ঝোপজঙ্গলে ঢাকা। এখন পরিকল্পনা চলছে এগুলো ভেঙে হোটেল, স্পা সেন্টার, পুলপার্টির স্থান বানাবার। ধানবাদের একটা রিয়েল এস্টেট এগিয়ে এসেছে, যারা বারবারাদের বাড়িটাকেও কিনেছে। জায়গাটাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয় না-করলে স্থানীয় অর্থনীতিতে জোয়ার আসবে না।
অন্ধকারে নিজের মনে হাঁটছিলাম। হঠাৎ পায়ের কাছে ফোঁস আওয়াজ শুনে চমকে চোখ নামালাম। একটা বাদামি ল্যাব্রাডর আমার হাঁটু শুঁকছে। কুকুরটার গলার লিস লুটোচ্ছে মাটিতে। কুকুর আমি ভালোবাসি। কিন্তু, এভাবে অন্ধকারে হুট করে এল, কামড়ে দেবে না তো, ভাবতে ভাবতে এদিক-ওদিক চোখ চালাচ্ছিলাম তার মালিকের খোঁজে। দেখলাম জঙ্গল থেকে একটা লোক রাস্তায় নেমে আসছে। মৃদুস্বরে ডাকছে ‘রকি!’ কুকুরটা তড়বড় করে তার দিকে ছুটে গেলে লিস ধরে বকুনি দিল মালিক। ভদ্রতার ঘাড় নেড়ে হাঁটতে শুরু করেছি, তখন ডাক এল, ‘তনয়া ভট্টাচার্য?'
পিছু ফিরলাম। লোকটা এগিয়ে এসে হাসিমুখে মাথা ঝোঁকাল। একমুখ দাড়িগোঁফ, পঞ্চান্ন মতো বয়েস। ভারি কাচের চশমা, মাথায় কানঢাকা টুপি। জোব্বা ধরনের সোয়েটার পরে আছেন বলে ভাল্লুকের মতো লাগছে। চেহারা দেখে মনে হল, এঁকেই আজ বারবারাদের বাগানের অপরপ্রান্তে দেখেছি।
‘আপনার কথা অনেক শুনেছি। জানি শহরে এসেছেন। আলাপ করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু সংকোচ হচ্ছিল, জানেন! আজ রকির কল্যাণে আলাপ হয়ে গেল। ও যদি দুষ্টুমি করে দৌড় না-লাগাত—,' ভদ্রলোক কথা শেষ না-করে হাঁমুখে বড়ো নিশ্বাস ছাড়লেন আর হিম ধোঁয়া বেরিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোর বিপরীতে বিচিত্র ডিজাইন বানাল।
তিনিই আজ বাগানের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন কি না, প্রশ্নের উত্তরে হাসলেন। দেখলাম রকির লিস ধরে আমার পাশাপাশি হাঁটছেন। অনেক কথা বলে গেলেন ভদ্রলোক ৷ অমীমাংসিত রহস্য বিষয়ে আমার লেখা সিরিজটা পড়তেন মন দিয়ে। যখন জেনেছেন আমি এসেছি, ভেবে রেখেছিলেন একদিন দেখা করে অনেক প্রশ্ন করবেন। কোথায় থাকেন জিজ্ঞাসা করাতে জঙ্গলের ভেতর হাত তুললেন, ‘আহমেদ সাহেবের বাংলো বলে লোকে। ' কখন বিদায় হবেন, ভাবতে ভাবতে এগোচ্ছিলাম। নিজের সময়টুকুতে অন্যের সঙ্গে ভ্যাজর ভ্যাজর ভালো লাগে না। তখন ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি কিন্তু খুব খুশি হয়েছি জানেন, আপনি ব্রাউনদের বাড়ি উঠেছেন বলে। ওখানে না-থাকলে ওই ছবিটা তো আপনি পেতেন না!'
লোকের মুখে খবর ছড়িয়েছে তাহলে। ‘অ্যাগনেস বলে কোনো মেয়ের ছবি শুনলাম।' ‘এমন একটা মেয়ে, যে হারিয়ে গেছে। মনে রাখেনি কেউ। তাই না?' নিরুত্তর ঔদাসীন্যে ফোন দেখলাম। এই ইঙ্গিতেও বিদায় না-নিলে আজকের সন্ধেটা গেল। এবং বিদায় নিলেন না। উলটে বললেন, ‘দেখুন না খোঁজ নিয়ে একবার। হয়তো অভূতপূর্ব কোনো রহস্যের সন্ধান পাবেন।' কত মানুষ যে আমাকে এরকম হাবিজাবি রহস্যের সন্ধান দেয় ! কাঁধ ঝাঁকালাম ভদ্র হেসে। ‘সত্যিই দেখবেন, না, কথার কথা? আপনারা বিখ্যাত মানুষ মিস ভট্টাচার্য! আমি জানি, আমাদের মতো আম-আদমিরা অনেক আবোল-তাবোল প্রত্যাশা রাখে আপনাদের কাছে। ফলত, সবাইকেই স্তোকবাক্য দিয়ে থাকেন আপনারা। কিন্তু, আমি সত্যিই চাই, জানেন, ছবির মেয়েটার ব্যাপারে আপনি খোঁজ নিন। ভীষণভাবে চাই।' হাসিমুখে বলছিলেন, কিন্তু গলায় কিছু ছিল, ফলত, ফোন থেকে আমার চোখ উঠল। ‘কেন বলুন তো?’
ভারী কাচের ওপার থেকে চোখ দুটো বড়ো লাগছিল। যেন ঝিকমিক করছিল নক্ষত্রের দল। ভুরু উঁচিয়ে বললেন, ‘রকিও চায়। আপনার হাতে ছবিটা গেছে বলে ও খুশি হয়েছে। আজ বলল আমাকে।”
‘অ্যাগনেসকে চিনতেন আপনি?
‘আমি এখানে নতুন এসেছি। এটুকু জানি, অ্যাগনেস বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটা মেয়ে ছিল, যে নিজেকে মেডুসা বলে ডাকত।’
‘মেডুসা?’
‘ছোটো শহর, কিছু ঘটে না এখানে। সবাই ভাবে আমাদের জীবন খুব ম্যাড়ম্যাড়ে। কিন্তু, অনুত্তেজক জীবনের ভেতরেই আসল রহস্যগুলো লুকিয়ে থাকে, জানেন!” ‘কীরকম রহস্য?’ ,
রকি দূরের দিকে তাকিয়ে গোঁ গোঁ করল। কুয়াশায় ভালো বোঝা যায় না। তার মালিক লিসে টান দিয়ে পিঠে চাপড় মারলেন দুটো। ‘রকি বুড়ো হয়ে গেছে। নয় বছর হল। কিন্তু, খুব ভীতু। নির্ঘাত বেড়াল-টেড়াল দেখে ভয় পেয়েছে।”
আমার চলে যাওয়া উচিত, কিন্তু তার বদলে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ‘আপনি কি এই মেডুসা সম্পর্কিত রহস্যের সমাধান আমাকে দিয়ে করাতে চান?’
‘তিন বছর আগে দার্জিলিঙে এক অমীমাংসিত হত্যার সমাধান আপনি করেছিলেন। তাই এটুকু প্রত্যাশা করা কি অন্যায়?”
‘এখানে কার হত্যা হয়েছে?'
‘হয়তো কারোর নয়। কিন্তু আপনি যদি খুঁজে পান, এই ছবিটা ওই বাড়িতে গেল কীভাবে, সেটাও একটা বড়ো ব্যাপার, না?' আবার ঝিকিমিকি চোখ হেসে উঠল। ‘আমি গোয়েন্দা নই।'
‘পারলে আপনিই তো পারবেন, মিস ভট্টাচার্য। গত চল্লিশ বছর ধরে যে রহস্যের সমাধান হয়নি,' ভদ্রলোক থেমে গেলেন।
‘তার মানে আপনি জানেন এই ছবির পেছনের রহস্য। তাহলে আমাকে খুঁজতে বলছেন কেন?'
‘কারণ, আমি তো সমাধান জানি না! আর নিজে খুঁজতেও পারব না!' করুণ কণ্ঠে উত্তর দিলেন। ‘বয়েস হয়েছে। দ্রুত হাঁটতে গেলে হাঁফাই। সুগার, কোলেস্টেরল খেয়ে ফেলছে আমাকে। রকিরও চোখে ছানি। দিনের আলোতে দেখলে বুঝবেন। একদিন আসুন না আমার কটেজে! রকি খুব খুশি হয় অতিথি দেখলে। আসে না তো কেউ!’
‘আমি দুঃখিত। রহস্যের সমাধান আমার পেশা বা হবি নয়।’
‘আচ্ছা, আচ্ছা। আমিও দুঃখিত, যদি জোর করে থাকি। বয়েস হচ্ছে তো, কথাবার্তায় তালজ্ঞান থাকে না। কিছু মনে করবেন না, প্লিজ। কিন্তু আপনি অবশ্যই একদিন আসুন। আমার খুব লোভ, বাস্তব জীবনে রহস্যের সমাধান করেছেন এমন কাউকে মিট করব।’
বিরক্ত হবার কথা কারণ সময় নষ্ট হচ্ছে। তবু খারাপ লাগছিল না। অমায়িক টাইপের মানুষটা হয়তো বকবক করতে ভালোবাসেন। রকি আমার পা শুঁকছে। লেজ নাড়ছে ঘন ঘন। হেসে বললাম, ‘আসব একদিন। কিন্তু, আপনার পরিচয়টাই তো জানা হল না।’
‘আমিই নিয়ে যাব আপনাকে। সেদিন পরিচয়পর্বটাও হবে নাহয়? যদি বেকন ভালোবাসেন, তাহলে নিরাশ হবেন না। আমার স্টকে নানারকমের সঞ্চয় আছে।' ভদ্রলোক রকিকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলেন। মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘কথা হবে মিস ভট্টাচার্য! ভালো থাকবেন।' তারপর হারিয়ে গেলেন ভেজা অন্ধকারে। সন্ধের আকাশে কয়েকটা নিশাচর পাখি ওড়াউড়ি করছে। জঙ্গলের ভেতর থেকে বুড়ো পেঁচা ডেকে উঠল একবার। আমার মনে হল, লোকটা পাগল, অথবা, বৃদ্ধ বয়েসের মতিভ্রম। নিজের পরিচয় দেব না, কীসের রহস্য তা বলব না, এদিকে চাইব আদ্যিকালে কে নিখোঁজ হয়েছিল তার সমাধান করবে অন্য কেউ!
কিন্তু, বাড়ি ফিরে অস্বস্তি যাচ্ছিল না। এ যেন হারানো ইতিহাস খুঁড়ে বার করা। তেমন ইচ্ছে আমার নেই, কেননা প্রতিটা মানুষের জীবনেই এমন রহস্য থাকে যাদের প্রত্যেকটার ওপর সার্চলাইটের দপদপে আলো ফেলা প্র্যাকটিকাল নয়। তবুও অচেনা এক মানুষ চায় আমি তার সমাধান করি। কেন আমাকেই, তার উত্তর জানি না। দার্জিলিঙেও আমি তো সমাধান করতে যাইনি, একটা গল্প লিখতে গিয়েছিলাম। নিজের ঘরে ফোন খুলে আবার ছবিটা দেখলাম। ঝলসানো রোদে পোড়া হলুদ ছবি। অচেনা হাতের মালিক। কিশোরীর হাস্যমুখ। নুয়ে থাকা গাছের ডাল। এগুলো পেরিয়ে একটা ধু-ধু বিষণ্ণতা ছবিকে অধিকার করেছে। কিশোরী কী কনফেস করতে গিয়েছিল? কী ছিল তার পাপ? এর সঙ্গে কি যোগ ছিল তার অন্তর্ধান রহস্যের?
টোকা পড়ল আমার দরজায়। বারবারা।

তোমাদের কেমন বোধ হয়? কোন ব্যক্তির যদি এক শত মেষ থাকে, আর তাহাদের মধ্যে একটী হারাইয়া যায়, তবে সে কি অন্য নিরানব্বইটা ছাড়িয়া পর্বতে গিয়া ঐ হারান মেষটীর অন্বেষণ করে না?
- Matthew | 18:12
সেদিন রাত্রে অতিথিরা বিদায় নিলে আমি পোড়ো মাঠের দিকে মুখ রেখে জেগে ছিলাম অনেকটা সময়। আমার হাতে ধরা ছিল একটা বাইবেল। শীতের রাত্রে জমাট মেঘ অবসাদের মতো ঘনিয়ে এসেছিল। মশাদের কোরাস বাড়িটাকে নিঃসঙ্গতায় ফাঁপিয়ে তুলছিল। কে দাঁড়িয়ে ছিল জলাভূমির ওপাশে? হাওয়ার গুঞ্জন বাদে অন্য কিছু কানে আসেনি। এখানে আসার পর থেকে রোদের তাপ কমে গিয়েছিল। শান্ত গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ফিসফিস আমার চারপাশ ভরিয়ে তুলেছিল অবোধ্য গুঞ্জনে। তাদের আমি কান পেতে শুনতে চেয়েছিলাম। সত্যিই কি আমি এগোব? আমার কী লাভ এতে? আমি তো গোয়েন্দা নই। এসেছি নিছক ঘুরতে। একটা অ্যাবসার্ড রহস্য, অবিনাশ যাদব যেমন বলে গেলেন, আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটা পূর্বশর্তকে যা হা-হা স্বরে উড়িয়ে দেয়, তার পেছনে ছুটে কী লাভ? কেন আমরা সবাই ইতিহাসে বাঁচব? সময়, যে যতই বলুক, কোনো চ্যাপটা বৃত্ত নয় যার ভেতর ঘুরে ঘুরে আমাদের সেই কাজ, একই কাজ এবং আবার ও বার বার একই কাজ করে যেতে হবে। ক্রিস ব্রাউন হারিয়ে গিয়েছে চিরতরে। তার রহস্যের সমাধান হয়নি। ফলত, এতদিন পরে কেন নাড়াঘাঁটা করব তাকে? আমি একজন পোড়খাওয়া ইনভেস্টিগেটিভ সাংবাদিক। আমার কী এসে যায় বহু বছর আগের এক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নিয়ে? হাতে ধরা বাইবেলের পাতা উলটিয়ে আমার চোখে তখন ঘুম ঝাঁপিয়ে নেমেছিল। দেখেছিলাম, আমি শুয়ে আছি নিজের সল্টলেকের বাড়ির সোফায়। অকেজো একটা ফ্রিজ আমার মাথার পেছনে বসানো। তার ভেতর থেকে ফিসফিস ভেসে আসছিল। ফ্রিজের পেছন থেকে শুরু হয়েছে একটা জঙ্গল, যার পেটের ভেতর গোলকধাঁধা। আমার মাথার কাছে পায়ের শব্দ। তবু কাউকে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। চাপাস্বরে আনাগোনা করছিল। শোক। ক্রমে দুর্ভেদ্য কুয়াশায় ঢেকে গেল জলা ও জঙ্গল। মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, জঙ্গলে ঢাকা আমাদের ঘর দরজাবন্ধ। সোফা থেকে উঠে ঘরের দিকে আমি হেঁটে যাচ্ছি। ধুলো জমা টেবিল পেরিয়ে, দেওয়ালের ছবিতে শুকনো ফুলের মালা অতিক্রম করে, বেডরুমের বন্ধ দরজায় ধাক্কা মারছি। কান পেতে শুনছি ভেতরের নৈঃশব্দ্য তীব্র চিৎকারে দীর্ণ হচ্ছে। আমি তখন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকছি। বিছানায় শুয়ে এক কিশোরী। অন্ধকার ঘর হলেও তার চোখে রোদচশমা, পরনে ফুলছাপ ড্রেস। কিন্তু, তার গলায় ফাঁস। যেন ঘাড়ভাঙা পুতুল। আমি হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে যাচ্ছি আর দেখছি আমার গায়ে উঠে এসেছে ফুলস্লিভ সোয়েটার, তার হাতায় সাদা ময়ূরের ডিজাইন। তবু তাকে ছুঁতে পারছি না আমি।
যখন ভোরের আলো গাছের পাতা বেয়ে চুঁইয়ে পড়ল এবং অরণ্যের অপর প্রান্ত থেকে জেদি মোরগের কঁক ধ্বনি ভেসে এল ; তখন আমি চোখ মেললাম। আমার মনে হল'রাত্রির কাফন সরিয়ে আমি শেষবারের মতো পৃথিবীকে দেখব যদিও তা অসম্ভব, কারণ অনেক আগে ওরা আমাকে মেরে ফেলেছে, মনে হল আমার। আমি বুঝলাম, বারবারা না-ডাকলে ও গতকাল আমি সন্ধেবেলা নীচে যেতাম। কারণ, একটা অমীমাংসিত গল্পকে শেষ করার দায় থেকে আপাতত আমার মুক্তি নেই।
বারবারা যখন আমাকে ডাকতে এসেছিল তখন ছায়ার সুতোরা বারান্দার বাল্ব থেকে গড়িয়ে নামা চিলকে আলোর সঙ্গে জট পাকিয়ে থমথমে বিভ্রম গড়ে তুলেছে। একতলায় বারবারার বন্ধুরা এসেছে। বারবারা চেয়েছিল আমি যেন সেই আড্ডায় যোগ দিই। এই শহরে বারবারার বন্ধু বলে কেউ আছে, সেটাই জানতাম না। মোবাইলে দেখলাম সাড়ে আটটা। বৃষ্টি থেমেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝপ করে তাপমাত্রা নেমে গেছে অনেকটা। দোনোমনো করলাম, কারণ চিনি না কাউকে। তারপর হাতে কাজ ছিল না বলে রাজি হয়ে গেলাম।
এর আগে বারবারার ড্রয়িং রুম দেখিনি, কারণ সেটা ছিল বাড়ির যে অংশ ভাঙা হচ্ছে তার একপাশে। সেদিকে দরকার না-পড়লে কেউ যায় না। আজ সেখানে অন্যেরা বসে ছিল। সেখানে মরা বাল্বের হলুদ আলোয় আমি এক প্রাগৈতিহাসিক শহর আবিষ্কারের মতো দেখলাম— বিরাট হল ঘরে অনাদরে উলটে রাখা সোফাদের দল, এখানে-ওখানে ইতস্তত চেয়ার, বাহারি মোমদানিতে মাকড়সার ঝুল, দেওয়ালের গায়ে ড্যাম্পের রাক্ষুসে মুখোশ। একপাশে ঘেঁষাঘেঁষি চেয়ারে কয়েক জন বয়স্ক মানুষ বসে। হল ঘরের ওপাশে ফ্রেঞ্চ উইন্ডো, যা খুলেছে সামনের বাগানের দিকে। তার কাচ ফুটিফাটা। হল ঘরের পেছনদিকে পরিত্যক্ত কিচেনের সামনে আমরা বসে ছিলাম। ঘরের বাকি অংশে গাদাগাদি করে রাখা প্যাকিং বাক্সের দল। কিচেনের অপরপ্রান্তে আরেকটা খোলা দরজা। পরে অবশ্য বুঝেছি, সে-দরজা বন্ধ করা যায় না, কারণ পাল্লার কবাট ভেঙে একপাশে ঝুলছে। সেদিক দিয়ে চোখে পড়ে জলাভূমি। ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে বলে আমার শীত করছিল। কার্ডিগানের ওপর চাদর টেনে নিলাম। উপস্থিত লোকেদের অবশ্য ভ্রূক্ষেপ নেই। তারা এই আবহাওয়ায় অভ্যস্ত। তাদের কোথাও যাবার নেই সম্ভবত। এখানে এসেছে কারণ ব্রাউনদের বাড়ি থেকে আজ টেনে বার করা হয়েছে পুরোনো স্মৃতিদের দল। তাই অতীতভারাক্রান্ত বুড়োরা ফেলে-আসা দিনের অবশেষ দেখতে এসেছিল। ঘরময় ছড়িয়ে থাকা প্যাকিং বাক্সগুলোতে রাখা প্রাচীন সামগ্রীদের দেখে তারা দীর্ঘশ্বাস ফেললেও আমাকে জানায়নি। এডওয়ার্ড ঘাড় গুঁজে চুপচাপ বসে ছিলেন। আমাকে দেখে শুকনো হাসলেন এবং আবার তাঁর ফোনে ‘চিকনি চামেলি' বেজে উঠল। আমার মুখ দেখে এডওয়ার্ড বুঝেছেন। অপ্রস্তুত গলায় তাঁর স্ত্রী মনীষাকে বললেন, ‘টোনটা বিরক্তিকর। পালটে দিচ্ছ না কেন বলো তো? আগেও বলেছি।'
‘কবে বললে!’ অবাক গলায় মনীষা জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, খেয়াল নেই আমার।'
মনীষাকে সেই প্রথম দেখলাম। তাঁরা রাঁচিতে থাকেন, কিন্তু এখানে এসে স্যাংচুয়ারিতে ওঠেননি। এডওয়ার্ড নাকি এখানে থাকতে চান না। মনীষার এক তুতোভাইয়ের কটেজে উঠেছেন। মনীষা তাঁর স্বামীর উচ্চতায় সঙ্গত রেখে লম্বা, তবে ভারী চেহারার। ইতিমধ্যে ডাবল চিন ধরা দিয়েছে। তাঁর চেহারায় খাঁটি ভারতীয় ছাপ এডওয়ার্ডের অ্যাংলো কাঠামোর বিপ্রতীপ। চোখের কোনায় কালিকে কেন লুকোলেন না, নাকি দেখাতেই চেয়েছেন, বুঝে পেলাম না।
চোরাচোখে হুইস্কির বোতল দেখছেন, তারপরে তাকাচ্ছেন স্বামীর দিকে। কখনো অস্বাভাবিক হেসেও উঠছেন, চুপচাপ হয়ে যাচ্ছেন পরক্ষণে, ভাবনায় নিমীলিত চোখ সেইসময়ে কেউ যদি কিছু প্রশ্ন করে তাঁকে, উত্তরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন মনীষা। তাঁর ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু মুখে উত্তর আসে না। তারপর আবার হেসে ফেলেন বোকার মতো । এডওয়ার্ডকে দেখলাম স্ত্রী-র দিকে বার দুয়েক বিরক্ত চোখে তাকাবার পর বারবারার সঙ্গে বাড়ির দলিল সংক্রান্ত আলোচনা চালাচ্ছেন।
হঠাৎ খচমচ শব্দে চমকে চোখ ফিরিয়ে দেখি, হল ঘরের একপ্রান্তের অন্ধকারে জ্বলজ্বলে চোখ। ছাগলের চোখ যে রাত্রে এরকম জ্বলে, কে জানত! লালুরাম ডাই করে রাখা প্যাকিং বাক্সের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে আর মাঝে মাঝে চিবিয়ে দেখছে স্বাদযোগ্য কিছু মেলে কি না। সারাঘরে ইতস্তত আলো-ছায়া, বাল্বের বিভা সেই পর্যন্ত যাচ্ছে না, স্তূপীকৃত বাক্স সেই অন্ধকারকে ঘনীভূত করেছে। তাদের ভেতর গুপ্তধন আবিষ্কারের আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছে হেমন্তরাত্রির ছাগল জানালার পর্দা ধরে চিবোচ্ছে, পটি ফেলছে এখানে-ওখানে। দেখে আমার অস্বস্তি লাগছিল। ছাগলটা কি এখানেই থাকে? আজ বাক্সগুলো রাখা হয়েছে বলে নিজের জায়গা খুঁজে যাচ্ছে হয়তো! দিনের বরাদ্দ সিগারেট খাবার অছিলায় পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে মাঠের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। এখানে রাত্রির রং বেগুনি। বেগুনি জলায় পড়ে থাকা চাঁদকে পা দিয়ে মাড়ালে ভেজা ঘাসের গন্ধ ধেয়ে আসে। ভেতরে টুকটাক গল্প করছে বাকিরা, কিন্তু সেগুলো দানা বাঁধছে না যেন। এই লোকগুলোকে চিনি না। এদের গল্পগুলোও আনইন্টারেস্টিং। এদিকে বারবারা ডেকে এনেছে যেহেতু, এখনই নিজের ঘরে ফিরে যাওয়া অভদ্রতা হবে। ভালো লাগছিল না, মাঠের দিকে এগিয়ে গেলাম কয়েক পা। তখন আমার কানের কাছে মৃদুস্বরে কেউ বলল, ‘আপনিও কি এখানে ভূত দেখার আশা করছেন নাকি?’
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে সাতাশ-আটাশ বছরের এক তরুণ। লম্বা একহারা চেহারা। ব্যাকব্রাশ করা চুল, ছোটো কিন্তু তীক্ষ্ণ চোখ, মোটা নাক, পুরু ঠোঁট। চিবুকের ঘন ডৌল দেখে মনে হয়, গাঁট্টাগোট্টা হলে মুষ্টিযোদ্ধা হতে পারত। না-বললেও মনীষার সন্তান হিসেবে অ্যারনকে চিনে নেওয়া যায়। সে এককোনায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। তাকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম এই হল ঘরটাই লালুরামের ঘর কিনা। অ্যারন বলল লালুরাম যেদিন যেখানে ইচ্ছে হয়, রান্নাঘর হোক বা হল ঘর অথবা বারবারার বিছানা, শুয়ে পড়ে। টুকটাক কথায় জানলাম সে দিল্লিতে এমবিএ পড়েছিল। আমি দিল্লিতে থাকি শুনে চোখ তুলল, তারপর প্রশ্ন করল, ‘নিশ্চয় এই কয়েক দিনে শুনে ফেলেছেন আমরা কার্সড? আমাদের এই বাড়ি?'
‘তাতে আমার কী! আমি তো কয়েক দিনের জন্য থাকতে এসেছি মাত্র।’
‘স্থানীয় মানুষদের অনেকেই আমাদের এড়িয়ে চলে। আমরাও অবশ্য মিশিনি কোনোদিন। অ্যাংলো রক্তের অহংকার বলতে পারেন।' অ্যারন ফিকে হাসল। আমি তাকে জানালাম বারবারা আমাকে ক্রিসের গল্প বলবে বলেছে। অ্যারন ঘাড় নাড়ল, ‘শুনবেন না। নিজের হতাশা বাড়বে। মনে হবে এই তো সমাধান সামনেই, এদিকে করতে পারবেন না। পিসি অনেককেই বলেছে এই গল্প। কলেজে পড়ার সময় আমার বন্ধুদের মাঝে মাঝে রাঁচি থেকে এনে এখানে তুলতাম, যদিও বাবা পছন্দ করত না। লুকিয়ে আসতাম। কেউ কেউ উৎসাহ দেখিয়ে শার্লক হোমস সাজতে গিয়েছিল। দু-দিন বাদে তারা বুঝেছে হালের তুলনায় পানি অনেক গভীর। তারপর বিরক্ত হয়ে, নাহলে হতাশায়, আমার সঙ্গেই আর সম্পর্ক রাখেনি। বলেছে আমরা সবাই নাকি এত ডিপ্রেসিভ যে, সেটা ছোঁয়াচে রোগের মতো।' কিন্তু, অ্যারনের স্বরে তিক্ততা ছিল না। স্মিতমুখে বলছিল।
‘আপনার ইচ্ছে হয়নি কখনো?' অ্যারন উত্তরে জানাল সে এদের হাড়ে-মজ্জায় চেনে। বেশি চিনলে কি নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টি ব্যাহত হয়?
‘উঁহু। আমি মানুষের আত্মার কথা বলছি।’
‘আত্মা?’
“মিস ভট্টাচার্য, ওই একটা ঘটনা, যেটা আমাদের পরিবারকে তছনছ করে দিয়েছে বলে সবাই মনে করে, কেন করেছে? কারণ, তারা তছনছ হতে চেয়েছে। তারা এগোতে চায়নি, বরং চেয়েছে সেই রহস্যকে বুকে জড়িয়ে একজায়গায় গেঁড়ে থাকতে। আপনার কি মনে হয় এরা সত্যিই চাইবে এক মধুর সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ক্রিস ব্রাউনের অন্তর্ধান রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে, সেটা দেখতে? তাহলে এদের জীবনে রহস্যের সার্থকতা কোথায়? এতটা বলে হিপফ্লাস্ক থেকে কিছুটা মদ গলায় ঢালল অ্যারন। ঠোঁট মুছে বলল, “আপনার ধারণা এরা অভিশপ্ত বাড়ি নিয়ে মরমে মরে আছে? বরং, এই ট্যাগলাইন আমার পিসির জীবনের সর্বস্ব। গর্বের মতো সেটাকে গলার লকেট করে ঘুরে বেড়ায়।’
‘তাহলে সবাইকে রহস্য সমাধানের জন্য পীড়াপীড়ি করে কেন?' বিরক্ত লাগছিল অচেনা মানুষকে এতটা জ্ঞান দেওয়া। কে রে ভাই তুই, মানুষের জীবনরহস্য নিয়ে লেকচার মারছিস?
‘কারণ জানে, কেউ পারবে না। পারলে পুলিশ পেরে যেত। এই যে, কেউ পারবে না, এটা দেখানোতেই ওদের সুখ। মালিকানা বলে না? আত্মার মালিকানা হয়, তেমন গল্পেরও মালিকানা হয়।’
ভালো করে অ্যারনকে দেখলাম। চোখের নীচে একটা কাটা দাগ। মোটা ঠোঁটজোড়া একে অন্যের ওপর চেপে বসলে ভয়ংকর গম্ভীর লাগে। সে তাহলে এই আড্ডায় এসেছে কেন? বাবার হুকুম, নাকি, কিছু করার নেই বলে? অ্যারন মাথা নাড়ল, ‘আমি সব কিছুর সাক্ষী থাকতে চাই। সেটাই আমাদের একমাত্র কাজ। বেয়ারিং টেস্টিমনি।'
‘মানে, ক্যাথলিক সেন্সে?'
‘আমি ক্রিশ্চান নই ।
“তাহলে?” সে উত্তর দিল না, যেন অনেকটা বলার পর কথা ফুরিয়ে গেছে। বেয়াড়া ইচ্ছে হল আমার, অ্যারনের কানের গোড়ায় দুটো থাবড়া মারি। একে অচেনা লোকেদের মাঝে বসে থাকতে হচ্ছে যাদের কেউ কেউ হয়তো পাগল, বারবারা তো বটেই। তার ওপর আধসেদ্ধ দার্শনিক কথাবার্তা একটা বাচ্চাছেলের মুখে শুনে মেজাজ আরও খাট্টা লাগছে। আজকালকার দিনে কে হিপফ্লাস্ক থেকে মদ খায়? সবথেকে ভালো হত কলকাতা চলে গেলে। অ্যারন ফ্লাস্কে চুমুক দিয়ে ফোন দেখছিল। বেশিক্ষণ এখানে থাকলে ঠান্ডা লাগবে, তাই ঘরে এসে ঢুকলাম। আমার পেছন পেছন সে-ও। চোখে পড়ল, এডওয়ার্ড ভুরু কুঁচকে অ্যারনের দিকে তাকিয়ে। ভঙ্গিটা রাগত। কিন্তু, অ্যারন বাবার দিকে ফিরে তাকাল না ।
বাকিরা একঘেয়ে স্মৃতিচারণা করছিলেন। এই বাড়িতে কে কতবার এসেছেন, কী ঘটেছিল সেবারের ক্রিসমাস পার্টিতে ইত্যাদি। টমাস অ্যাক্টায়ার বারবারা স্কুলজীবনের বন্ধু। থাকেন কঙ্কায় একটা পুরোনো বাড়িতে। তাঁর স্ত্রী মেরিল আবার এডওয়ার্ডের ক্লাসমেট, যদিও তিনি আসেননি। টমাস লাতেহারে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার ম্যানেজার ছিলেন। ছোটোখাটো চেহারা, আথ্রাইটিসের ব্যথায় মাঝে মাঝেই মুখ বিকৃত করে হাঁটুতে হাত বোলাচ্ছেন। সবাইকে ডিনারের নিমন্ত্রণ করলেন, মেরিলের নাকি ইচ্ছে। ভদ্রতাবশত আমাকেও। কেউ জানে না যে, আমি কালই চলে যেতে পারি ।
অবিনাশ যাদব গঞ্জ থানার প্রাক্তন ইনস্পেকটর, সাত বছর আগে অবসর নিয়েছেন। তারপর জমানো টাকা দিয়ে লাপড়াতে এক সাহেবের কটেজ কিনে উঠে এসেছেন। ভারী চেহারা, বয়েসের তুলনায় বেশি বৃদ্ধ লাগে। হাঁটাচলায় অসুবিধে, তবু লাঠি নেন না। সেই নিয়ে আজ বারবারা বকাবকি করছিল। সারামুখে অস্বাস্থ্যকর কালো ছোপ। মাথার চুল এখানে-ওখানে খাবলা খাবলা উঠে গেছে। হার্টের সমস্যা থাকতে পারে অথবা সিওপিডি। টয়লেট থেকে ফিরে বড়ো শ্বাস নিচ্ছিলেন, হাঁফাচ্ছিলেন হালকা। এক পেগ হুইস্কি খেয়ে মুখ লাল করে ফেলেছেন। আমার মনে হল, সেই রাত্রে জলাভূমির ধারে এঁকেই বারবারার সঙ্গে দেখেছি। পরিচয় হবার পর একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন। অবিনাশ আমার নাম জানেন। বারবারাকে আমার কথা তিনিই বলেছেন। কিন্তু, সে-প্রসঙ্গ এখানে না উঠলেই ভালো।
দলটার সম্ভবত প্রবীণতম মানুষ হলেন জেনিফার গর্ডন। দেখে মনে হল আশি। হুইলচেয়ারে বন্দি খিটখিটে বৃদ্ধা। বারাবারা জানিয়েছিল জেনিফারের মা স্কটিশ, বাবা ছাপড়া জেলার। আমি ঘরে ঢোকার পর থেকে তীক্ষ্ণ চোখে জরিপ শুরু করেছিলেন। আড্ডা শেষ হওয়া পর্যন্ত থামেনি। অবশেষে দমবন্ধ গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনাকে কি আগে দেখেছি?'
‘নাহ্, কোথায় আর দেখবে!' কাটা কাটা ইংরেজিতে জবাব দিলেন। ঠোঁটের প্রান্ত সবসময়ে বিদ্রূপে বেঁকে আছে বলে মনে হয়। হাতে পাকিয়ে সিগারেট খাচ্ছেন একটার পর একটা। শণের মতো চুল ঝাঁকিয়ে বললেন, “গত কুড়ি বছর গঞ্জ ছেড়ে বেরোইনি। এখানে সব ড্যাম আনকালচারড। না আছে সিনেমা হল, না ভালো বইয়ের দোকান। যা ছিল সেসবের পাট উঠেছে। কার সঙ্গে মিশব? আমাকে দেখার সম্ভাবনা কম।’
টমাস অ্যাক্টায়ার হাঁটুতে হাত বোলাচ্ছিলেন মুখ ভেটকে। জেনিফার আমাকে ঠেলা দিলেন, ‘দেখে মনে হয় ভাজা মাছ উলটে খেতে পারে না, তাই না?'
‘কে?’
‘কে আবার! ওই টমাস। অবশ্য বউটাও কম যায় না। মেরিল অল্প বয়েসে আর্মির এক ছোকরা সুবেদারের সঙ্গে প্রচুর লটরপটর করেছে। তারপর সময় বুঝে তাকে টা টা করে ঝুলে পড়েছে বেচারি টমাসের গলায়। বিয়ের পরেও কিন্তু সুবেদারের আনাগোনা ছিল ওদের বাড়িতে। এদিকে ভাব দেখবে, যেন বর বাদে কাউকে চেনে না! টমাসকেও ধোয়া তুলসিপাতা ভেবো না। ব্যাঙ্কের চাকরিটা একবার যেতে বসেছিল টাকাপয়সায় গণ্ডগোল করার জন্য। আসলে, রেসের নেশা। নিয়ম করে কলকাতা যায়।' নীচুগলা হলেও শঙ্কিত চোখে টমাসের দিকে তাকালাম। আড্ডার প্রথমদিনেই তুমুল ঝগড়ার পার্টি হতে চাই না। কিন্তু, অবিনাশ শুনতে পেয়েছিলেন। আমাকে বাঁচাবার জন্য তড়িঘড়ি এমন একটা কথা বলে বসলেন যাতে আমি প্রমাদ গণলাম ।
‘আপনার লেখা কিন্তু আমি পড়েছি। এখানে অনেকেই জানে না, আপনি একজন ভালো ডিটেকটিভ। অনেক ক্রাইম সলভ করেছেন।'
‘এ কী, একদমই না! আমি ক্রাইম লিখতাম, ব্যস। কোনো রহস্যের সমাধান করিনি, সেটা আমার কাজও নয়।' কিন্তু, অবিনাশ তখন অন্যদের দার্জিলিংএর ঘটনার ফিরিস্তি দিতে ব্যস্ত। এডওয়ার্ডকে দেখলাম তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখছেন আমাকে। চোখাচোখি হতে দৃষ্টি ফেরালেন। মনীষা হাসিমুখে আমার দিকে ঝুঁকেছেন, ‘একদিন বসে সব গল্প শুনব, মিস ভট্টাচার্য! আমি ক্রাইম কাহিনির ফ্যান।'
“বাজে কথা বোলো না। তুমি গত দশ বছরে একটা বইয়ের পাতা উলটে দেখোনি।' এডওয়ার্ড চাপাগলায় বললেন। মনীষার মুখ লাল হচ্ছে। কানের কাছ থেকে চুঁইয়ে নামা গরম আগুনকে চোয়ালে সইয়ে নিতে গিয়ে জিভ বোলালেন ঠোঁটে, ‘বইয়ের কথা তো বলিনি ! বলেছি? নেটফ্লিক্স দেখি না রোজ?' বারবারার দিকে তাকালেন, ‘বলো না ওকে! তুমিই তো অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিলে।' তাড়াতাড়ি গ্লাসে চুমুক দিয়ে অনেকটা ওয়াইন গিলে ফেললেন মনীষা। তখন চোখে পড়ল, অবিনাশ ফ্যালফ্যাল করে মনীষার দিকে তাকিয়ে। সে-তাকানো, যেন কাঙালের মতো, বোকার মতো তাকানো। বুঝলাম, অ্যারনেরও চোখে পড়েছে, মাথা নামাল। আমার অবিনাশের ওপর রাগ হচ্ছিল। এরকম দুমদাম সার্টিফিকেট দেবার বিপদ ভালোই বুঝি। সঙ্গেসঙ্গে লোকে তাদের জীবনের অমীমাংসিত রহস্যের ঝাঁপি খুলে বসবে। দুই ঘণ্টা ধরে আমাকে শুনে যেতে হবে কার মাসির আংটি হারিয়েছিল আজ থেকে কুড়ি বছর আগে, অথবা, কে নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে অজানা নম্বর থেকে তিনবার করে মিসড কল পায়।
‘আমার মেয়ে জার্নালিজম পড়তে চেয়েছিল। দিইনি।' মুখ ভেটকে হাঁটুতে হাত বোলালেন টমাস। ‘অনেক ঝুঁকির কাজ। এই বয়েসে আমার এত টেনশন পোষাবে না। মেয়েদের ওসব পেশায় না যাওয়াই ভালো।' সমর্থনের আশায় বারবারার দিকে মুখ ফেরালেন।
‘ছেলেদেরও যাওয়া উচিত না।' বারবারা গ্লাসে চুমুক দিল।
‘তবে, এত কম বয়েসে এরকম নাম করা—' অবিনাশ প্রশংসার ঘাড় নাড়লেন। বারবারা ফুট কাটল, ‘তাও আবার মেয়ে হয়ে।’
‘সে কপাল ভালো থাকলে লেগে যায়।' যেন জেদ করেই বললেন টমাস। ‘তা বলে গুন্ডা মাফিয়াদের কাছাকাছি যাওয়া, উলটোপালটা লোকের ইন্টারভিউ নেওয়া, কে কখন মুখ চিনে রাখে বলা যায়? টিভিতে তো দেখি, এই তো আগের বছর পাটনার ওই ছেলেটাকে শুট করে দিল। একদম বাচ্চা। একটা অনলাইন পোর্টালের রিপোর্টার ছিল। আমি তো বলেই দিয়েছিলাম মেয়েকে স্কুল-কলেজে পড়াও, নাহলে আইটি-তে ঢোকো, নিদেনপক্ষে সরকারি জব। কিন্তু, রাতে ফিরল-কি-ফিরল না, কোথায় কোথায় চষে বেড়াচ্ছে, এদিকে আমাদের ঘুম নেই, ওসব হবে না।' -
‘আসলে ব্যাপার হল,' জেনিফার কার্পেটে ছাই ঝেড়ে হাতের লাঠি দিয়ে দ্রুত ঘষেও দিলেন, ‘আমরা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমকে গুরুত্ব দিই কারণ আমরা রহস্য রোমাঞ্চ ভালোবাসি। আমাদের জীবন বোরিং। সেই একঘেয়েমির ভেতর যদি দুপুর বেলা ঘুমোতে গিয়ে মামুলি ভয়ের স্বপ্নও দেখি, সেটাকেই বিরাট রহস্য বলে ভাবি আমরা। এদিকে হয়তো বেশি ডিম খেয়ে পেটগরম হয়েছিল সেদিন।”
‘ননসেন্স!’ বিরক্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন অবিনাশ। ‘তাহলে শার্লক হোমস থেকে আগাথা ক্রিস্টি সবাইকে বাতিল করতে হয়।'
‘সেসব গল্পে ঘটে। বাস্তবে ক-টা খুন দেখেছ তুমি? আমাদের গঞ্জে স্ক্যান্ডাল বলতে তো এর বউ ওর বরের সঙ্গে পালাল আর শিরিন দুবের বিধবা মেয়েটা পেট বাধিয়ে বসল। হাউ পেটি! আসল ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো লুকিয়ে আছে পৃথিবীর ওপারে পরপারের যে জগৎ, তার ভেতর। তার সন্ধান করতে গেলে এক হাজার জীবনও যথেষ্ট নয়।'
‘আহ্, নাম নেবার দরকার কী!' অবিনাশ বললেন।
“কেন নেব না শুনি? ভয়টা কাকে? আমি বলতে চাইছি, এসব ফালতু জিনিসকে ফুলিয়েফাঁপিয়ে রহস্যের আকার দাও তোমরা। নাহলে সবাই জানে শিরিনদের মেয়েটার লাভার কে।’
‘সবাই জানে, কারণ আপনিই জনে জনে বলে বেড়িয়েছেন।' অ্যারন নীচুগলায় বলল। এডওয়ার্ড তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তর্জনী তুললেন, কঠিন হল তাঁর মুখ, ‘ম্যানার্স।’ অ্যারন শান্তিরক্ষার ভঙ্গিতে দুই হাত ওপরে তুলল।
‘ড্যাম ইট! আমি না-বললে কেউ যেন জানত না! সবাই চোখ বুজে থাকে। এটাই আমার সঙ্গে তফাত তোমাদের। আমি সত্যিটা বলতে ভয় পাই না।' জেনিফার উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাত ঘোরালে আগুনের ফুলকিসুদ্ধ ছাই জানালার দিকে উড়ে গেল।
‘ধুর বুড়ি!’ বারবারা গাল দিল। জেনিফার রেগে-মেগে উত্তর দিতে গেলেন, কিন্তু সেইসময়ে একটা ঝোড়ো হাওয়া উঠল। ঝন ঝন শব্দে বাজল জানালার কাচ। বারবারা ক্রস আঁকল। আজ মনে হচ্ছে আবার বৃষ্টি পড়বে। রাত্রির সঙ্গে ঠান্ডা বাড়ছে দ্রুত। দূরের লাল আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। রুম হিটার যথেষ্ট নয়। চাদরে পা ঢেকে চেয়ারে বাবু হয়ে বসলাম। ঘুরে দেখলাম লালুরাম জানালার কবাটে দুই পা তুলে ঝড় দেখছে।
তখন আধবোজা চোখে অবিনাশ যাদব বললেন ‘ক্রিস!’ এবং উপস্থিত অন্যেরা সচকিত হল। চোখ খুলে অবিনাশ আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ‘আপনি জানেন, কেন এখানে অপরিচিত মানুষদের মধ্যে বসে আছেন। কারণ, বারবারা ডেকে এনেছে আপনাকে। ওর ধারণা এই রহস্যের সমাধান আপনি পারবেন।'
‘সেরকম কিছুই আমি বলিনি। গল্পটা শুনতে রাজি হয়েছি, এটুকুই।’
‘গল্প, অথবা, অ্যাবসার্ড রহস্য। যা বলবেন। আমি ক্রিসের তদন্তের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার ছিলাম। ক্রিস হারিয়ে গিয়েছিল এই ঘর থেকে।’
কয়েক মুহূর্ত সকলে চুপ থাকলাম। জলাভূমি থেকে হিমেল হাওয়া আসছে। সড়সড় শব্দ হচ্ছে বাইরে, নারকেল গাছের পাতার ভেতর ঢুকে পড়া বাতাসের কারুকার্য।
‘ক্রিসের ঘটনা পুরোনো হয়ে গেছে বার্বি, সবাইকে বার বার বলে কী আনন্দ পাও?’ বললেন জেনিফার। বারবারা তেজি ঘোড়ার মতো ঘাড় বাঁকিয়ে তাঁর দিকে তাকালেন। দেখলাম, মনীষা চোখ বুজে আছেন। গ্লাসের ওপর চেপে ধরা আঙুলের গাঁটগুলো ফুলে উঠেছে তাঁর।
ঝোড়ো বাতাস বইল ঘরে। কিচেনে ধড়াম আওয়াজ হল। একটা খোলা জানালা এদিকওদিক করছে। পুনম আড়মোড়া ভাঙল। দূর থেকে ওউউ আর্তনাদ করছে এক কুকুর। বারবারা উদ্বিগ্ন মুখ বাড়াল সোফার ওপর দিয়ে, ‘পুনম, মুরগির ঘরটা নজরে রাখ। তেমন হলে ভেতরে নিয়ে আয়। ঠান্ডায় জমে যাবে।' ঠোঁটের ওপর তার হালকা গোঁফের রেখা, সময়ে অসময়ে সেখানে হাত বোলানো পুনমের মুদ্রাদোষ। এখনও হাত বুলিয়ে জানাল সে এর মধ্যে ঘরটাকে কার্নিশের তলায় এনেছে। চোখের ভুল হতে পারে, জানালার পাল্লা যখন হাওয়ায় খুলে গিয়েছিল, তখন দেখলাম বাগানের ওপাশে রাস্তার ওপর ছাতা মাথায় একটা ছায়ামুর্তি দাঁড়িয়ে। পাশে বসা চারপেয়ে একটা জীব। একপলক মাত্র, তারপর সশব্দে বন্ধ হল পাল্লা। সেই সময়টুকুতে মনে হল, সে যেন আমাদের বসার ঘরের দিকে তাকিয়ে আছে। বারবারা হাত তুলল জলাভূমির দিকে, ‘ক্রিস ওখানে লুকিয়ে থাকে। আমি ওকে দেখতাম। বিকেল হলে মাঝে মাঝে বেরোয়। বনের ধারে বসে আমাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু প্রায় বছর দশেক হল ওকে দেখিনি।'
‘যেমন তোমার বাবাকে দেখতে? বা, হিল্ডাকে?' হাসার চেষ্টা করলেন টমাস। এডওয়ার্ড মুখ দিয়ে বিরক্তির আওয়াজ করলেন। শুধু মনীষা একা চোখে তাকিয়ে থাকলেন বারবারার দিকে।
‘আমাদের গঞ্জে কিছু ঘটে না।' জেনিফার বললেন। ‘সেই একবার ক্রিস ঘটেছে, সেটাকেই মানুষ মনে রেখেছে।
‘ঘটেনি এমন নয়। টুকটাক তো হয়েছেই। মায়াপুর জঙ্গলে সেই রহস্যময় আগুন? ১৯৫৮ সালে, মনে নেই?' টমাস বললেন।
“তার সমাধানও হয়েছে, কিন্তু চেপে দিয়েছিল সরকার। ওরাওঁ মজুরদের দল কাজে আসতে একদিন লেট করেছিল বলে রেঞ্জারবাবু রেগে গিয়ে তাদের ঝুপড়িগুলো ভাঙার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার প্রতিশোধে রেঞ্জার বাংলোতে আগুন লাগায় মজুরেরা। তারপর বাগে আনতে পারেনি। অবশ্য, জঙ্গল পুড়ে সরকারের লাভই হয়েছিল। খাতায়-কলমে ফরেস্ট ল্যান্ড রেখে রাতারাতি জায়গাটাকে ফিক্সড ডিমান্ড হোলডিং-এর আওতায় এনে লোকালয় পত্তন করে দিয়েছিল।' বললেন অবিনাশ।
‘আর, অ্যাগনেসের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া?' টমাস বললেন।
সকলে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। অ্যাগনেসের ছবির কথা সবাই জেনে গেছে এতক্ষণে। অবিনাশ মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ, আরেকটা অমীমাংসিত কেস। সেটারও ইনভেস্টিগেশন আমি করেছিলাম। যদিও ভৌতিক হতে পারে।’
‘হয়তো ভূত নয়। মানুষ হয়তো। অনেকে দেখেছে এখানে-ওখানে। বেথেল মিশনে, শপিং সেন্টারে—' বারবারা বলল।
‘আমি দেখেছি অনেক বছর আগে।' বললেন মনীষা। ‘বছর কুড়ি তো হবেই। বাবার কাছে এসেছিলাম রাঁচি থেকে কী-একটা কাজে। দূর থেকে দেখেছি, পাগলি অ্যাগনেস দুপুর বেলা ডাফরিনপাড়ার নিঃঝুম কবরখানায় বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল।’
‘অ্যাগনেসের প্রেত প্রতি গুড ফ্রাইডেতে ফিরে আসে। অতৃপ্ত আত্মার অশান্তি তাকে জায়গাটার মায়া কাটাতে দেয় না।' জেনিফার চোখ বুজে বললেন।
‘এসব কুসংস্কার আপনি রটাতেন, না?' এডওয়ার্ড রাগতস্বরে বললেন। ‘অনেকে বিশ্বাসও করেছে। ভূত, প্রেত, এসব কী? অ্যাগনেস পালিয়ে গিয়েছিল সবাই জানে।’
“দেখো ছোকরা, তোমার নাক টিপলে দুধ বেরোয়। তুমি এসব বুঝবে না। সেদিনের বাচ্চা—'
‘আর, আপনি ওইসব রাবিশ তন্ত্রমন্ত্র অকাল্ট বুজরুকি করে জায়গাটাকে নোংরা করছেন না?' এডওয়ার্ড তেড়ে উঠলে মনীষা তাঁর হাত চেপে ধরলেন।
‘হাউ ডেয়ার ইউ কল ইট রাবিশ—' জেনিফার দাঁত চেপে টেবিলে ঘুসি মারলে সিগারেট ছিটকে গেল হাত থেকে।
‘আরে ধুর, আবার ঝগড়া শুরু করে এরা।' অবিনাশ উঁচু গলায় ধমকালেন, ‘দু-জনেই ছেলেমানুষ হয়ে গেলে নাকি? এখানে অশান্তি কোরো না। আমার সিওপিডি, উত্তেজনা সহ্য হয় না।'
‘আরেকটা ঘটনা এখনও তাড়া করে।' টমাস চিন্তিত মুখে বললেন। ‘২০০২ সালে সরস্বতী বিদ্যামন্দির স্কুলের হেডমাস্টার সহদেব তিওয়ারি আত্মহত্যা করেছিল। মনে আছে তোমাদের? সহদেব একা মানুষ। আমার বন্ধু ছিল। তাসের পার্টনার। তার ঝুলন্ত দেহ আবিষ্কার করেছিল বাড়িওয়ালা। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সে আত্মহত্যা করেনি। খুন হয়েছিল।'
‘একজন নিরীহ মাস্টারকে কে খুন করবে?’
‘সহদেব কিছু জেনে ফেলেছিল। শেষদিকে ভয়ে মনমরা থাকত। আমাকে একবার বলেছিল, অনেক কথা আছে, একদিন বাড়ি এসে বলবে। কী জেনেছিল জানি না। কিন্তু, এই দিকটা পুলিশ খতিয়ে দেখেনি।'
“আপনি পুলিশকে জানাননি?
‘বলেছিলাম। পাত্তা দেয়নি। তখন আপনি হাতিয়াতে পোস্টেড। এই কেস জানেন না। '
‘আমার মনে আছে,’ মনীষা বললেন। ‘আমার কাজিন আর্চি সহদেব স্যারের ছাত্র ছিল। ভালো চিনতাম ওঁকে। ইতিহাস পড়াতেন। কিন্তু তিনি তো—' এডওয়ার্ডের দিকে তাকালেন । ‘হ্যাঁ, আমরা শুনেছিলাম পরকীয়া-জনিত ব্যাপার। বেতলার এক বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল নাকি।' এডওয়ার্ড সমর্থন করলেন স্ত্রী-কে।
‘আমি বিশ্বাস করিনি তাতে।’ বারবারা বলল। ‘প্রেম-টেম মাই ফুট! সেদিন সকালে এক কিলো মুরগির মাংস কিনে ফ্রিজে রেখে কেউ গলায় দড়ি দেবে না।' ‘তুমি জানলে কী করে?' বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন টমাস।
‘আরে ব্লাডি, কিনেছিল তো সবিতা মুন্ডার থেকে।
‘আর কিছু মনে হয় কখনো আমাদের শহরে ঘটেনি। খুবই ম্যাড়ম্যাড়ে জীবন আমাদের।'
“তাহলে আবার আমরা ফিরে এলাম সেই ক্রিসের আখ্যানেই, যেটাকে সবাই একবাক্যে রহস্য বলে স্বীকার করবে, যার সমাধান হয়নি।' অবিনাশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘ক্রিস।' বলল বারবারা। কয়েক মুহূর্ত আবার সকলে চুপ। তারপর বাজ পড়ার আওয়াজ এল এবং অ্যারন বলল, ‘নো এগজিট।'
অনেকক্ষণ চুপ থাকলাম। গলা খাঁকড়ালেন সোমেন কর্মকার। অন্ধকার জাঁকালো হয়েছে। ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি। উঠে দাঁড়ালাম, ‘ঘুরে আসছি। বদ্ধঘরে মাথা ধরছে।'
থানার গেটের ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে জোরে শ্বাস নিলাম। হুড়মুড়িয়ে স্মৃতির দল ভাংচুর হচ্ছিল তাসের ঘরের মতো— আমি কি মাথার ভেতর বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়ার অনুভূতি পাচ্ছি? অন্ধকার রাস্তায় ছাতামাথা মানুষদের দেখে বাদুড় মনে হয়। সল্টলেক ধুয়ে যাচ্ছে এপ্রিলের অকালবর্ষণে। অক্ষয় মাহাতো আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। হাত বাড়িয়ে সিগারেট চাইলেন একটা।
‘আবার জিজ্ঞাসা করছি, আমাকে দিয়ে গল্পটা কেন বলাচ্ছেন?'
‘আপনি একা নন। আমি গঞ্জ থেকে আসছি। অন্যদের স্টেটমেন্টও নিয়েছি। তাঁরা নিজেদের মতো করে গল্প করেছেন।'
‘মানে, ক্রিস ব্রাউনের অন্তর্ধান রহস্যের সঙ্গে আজকের হত্যার যোগাযোগ আছে। তাহলে পুরোনো ফাইল ওপেন হবে।'
‘একটা কথা আপনি আমি দু-জনেই জানি। দেড় মাস আগে যে খুন হয়েছে সেটা সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়। সাধারণ হত্যায় অপরাধী তার ভিক্টিমকে এভাবে সাজিয়ে রাখে না। রাখে তখনই, যখন সে কোনো মেসেজ দিতে চায়। এরকম মেসেজ কি আপনার মাথায় আসছে?' কী চায় লোকটা? বারে বারে আমাকে এভাবে টোপ দিচ্ছে কেন?
‘হত্যাকারী কে হতে পারে বলে আপনাদের মনে হয়? যদি কাউকে সন্দেহ করেন, তাহলে তাকেই জিজ্ঞাসা করতে পারেন তো। সমাধান পেয়ে যাবেন।'
‘আপনিও তাহলে সমাধানটুকুকেই পাখির চোখ করেছেন!' অক্ষয় হাসলেন। তিনি পুলিশ, তাঁর কী এসে যায় সমাধান বাদে অন্য কিছু দিয়ে? ‘আমি আবেগি মানুষ নই, মিস ভট্টাচার্য। কেস থেকে দূরত্ব বজায় রাখার ট্রেনিং আমাদের দেওয়া হয়। কিন্তু—সবসময়ে
সেটা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না, আমি জানি। আমরা অপরাধকে দেখি। কিন্তু একজন ডিটেকটিভের আত্মার কী ঘটে, তার হিসেব রাখে না কেউ।’
‘আপনি অবিনাশের মতো কথা বলছেন। কিন্তু যেটা বুঝছেন না, আমার কি এসে যায় কিছু? আমি তো গোয়েন্দা ছিলাম না, একটা রহস্যের সমাধান করতে পারিনি তো কী? সেটা আমার কাজও নয়। আমি ভুলতে শিখেছি। এবং, শিখিনি। তাই আজও মনীষার কথা ভাবলে, বারবারার কথা ভাবলে, এডওয়ার্ডের কথা ভাবলে, আমি ওদের জীবনে যা করেছি সেই চিন্তায় আমার গা হিম হয়। ওরা আমাকে দোষারোপ করেছিল সবাই। তাতে ভুল ছিল না কারণ ক্যান অফ ওয়ার্মস আমিই খুলেছিলাম আর ভুলে গিয়েছিলাম বন্ধ করতে। আমি সত্যিই ভালো গোয়েন্দা হতে পারব না মিস্টার মাহাতো!'
‘থাকুক বরং।” মনীষা ফিসফিস করলেন। তারপর চুমুক দিলেন গ্লাসে। বারবারা মাথা নাড়ল, ‘কী এসে যায় !”
বেখাপ্পা হেসে উঠলেন এডওয়ার্ড। হাহাকারের মতো লাগল। ‘একদম ঠিক। ক্রিসের অন্তর্ধান রহস্যের সমাধান আজও হয়নি। আর আপনার কেরিয়ারে,' অবিনাশ যাদবের দিকে ফিরলেন, ‘সেটা বরাবরের ক্ষতচিহ্ন হিসেবে থেকে গেছে।'
অবিনাশ নিশ্বাস ফেললেন, ‘বছরের পর বছর এই একটা কেস তাড়া করেছে আমাকে । আমাকে ঘুমোতে দেয়নি। শাস্তিতে মদ খেতে দেয়নি। আমার মানসিক স্থৈর্যকে চুরমার করে দিয়েছে।'
‘আর, আজ আপনি এখানে বসে ওয়াইন খাচ্ছেন।' মৃদুস্বরে মনীষা বললেন। চোখ নামালেন অবিনাশ ।
‘অন্য কথা হোক তাহলে।’ টমাস বললেন। ‘আবার খুঁচিয়ে তোলার কী দরকার?'
‘না, অন্য কথা কেন হবে?' এডওয়ার্ড গোঁয়ার গলায় বললেন, ‘উঠল যখন, কথা এগোক। অনেকদিন ক্রিসকে নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। সবাই ভুলেই গেছে ওকে। মানুষের স্মৃতি? টমাস? হ্যাঁ, সেটা তো থাকবে! মানুষ তো মনে রাখুক যে, ক্রিসকে খুঁজে পাওয়া যায়নি!' মনীষা তাঁর হাত ধরলেন, কিন্তু এডওয়ার্ড ফিরে তাকালেন না।
‘কেন? কী লাভ?” বললেন টমাস।
‘হয়তো রিডেমশন। হয়তো কিছুই নয়। শুধু শুনে যাওয়া।’
‘এভাবে হয় না। মনীষাকে কষ্ট দিয়ে—'
‘না না, আমার সয়ে গেছে।' দু-হাতে শক্ত করে ওয়াইনের গ্লাস চেপে ফ্যাকাশে হাসলেন মনীষা। ভয় হল গ্লাসটা ভেঙে যাবে।
‘কেউ বিশ্বাস করে না, ক্রিসকে আমি দেখতাম। মনীষাও না।' বারবারা মাতাল হয়েছে এতক্ষণে।
‘আমি বিশ্বাস করতে চাই। যদি ওকে দেখতে পাই—যদি—' মনীষা অ্যারনের দিকে তাকালেন। সে-দৃষ্টি ভিক্ষুকের মতো। কিন্তু, অ্যারনের চোখে মমতা ছিল না।
‘কী করবে দেখতে পেলে?' ব্যঙ্গের স্বরে হাসলেন এডওয়ার্ড। ‘ফটোসেশন করবে?'
‘শাট আপ, ইউ বেবুন! ব্লাডি পুরুষেরা বড়ো হলে জানোয়ার হয়ে যায়।' গরগর করল বারবারা। কিন্তু, মনীষা হাসলেন। সে-হাসিতে বিষণ্ণতা না, বরং খোলামেলা রোদের আভাস ছিল।
‘ওর কাছে চলে যাব। যেভাবে যায় মানুষ। ভালোবেসে।' দেখলাম, অবিনাশের চোখ করুণ হল। একপ্রকার বিষণ্ণ হাসিতে তিনি তাকিয়ে আছেন মনীষার দিকে। কিন্তু, মনীষা ফিরে দেখছেন না। এডওয়ার্ড কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেলেন।
হাত তুললেন অবিনাশ যাদব, ‘আমার মনে হয়, এডওয়ার্ড এবং মনীষার আপত্তি নাথাকলে মিস ভট্টাচার্য শুনতেই পারেন একবার। আপনি রহস্য সমাধানে দক্ষ। একবার চেষ্টা করে দেখবেন নাকি? '
‘রহস্যের সমাধান? যা কেউ করতে পারেনি সেটা মিস ভট্টাচার্য করবেন?' হালকা বিদ্রূপের হাসি ছুঁয়ে গেল এডওয়ার্ডের ঠোঁট, ‘দেখুন! আমি তো এত বছর পরে লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে।
‘আমি চাই না। মিস্টার অ্যাক্টায়ার ঠিকই বলেছেন। একটা রহস্যকে মাটি খুঁড়ে তুললে সমাধান নয়, শুধু বেদনাই আসে।' বললাম আমি।
‘তাহলে একটা গল্প হিসেবেই শুনে দেখুন নাহয়। অন্যদের আপত্তি যদি না থাকে।’ ‘যে গল্পে পুলিশ ব্যর্থ হয়েছিল?' হাসলাম আমি। অবিনাশও হাসলেন।
‘হ্যাঁ, আপনার পাঠকদের জন্য আদর্শ সেট-আপ।’
‘আমি সামান্য সাংবাদিক।'
‘আপনাকে জড়াতে হবে না। তবু, আমি বলতে চাই। ধরে নিন আবার একবার কনফেশন দিচ্ছি অনেকের সামনে।'
‘আচ্ছা, শুনব। তবে, মতামত দেব না। আশা করি, আমার দিক থেকে কোনো ভূমিকার দাবি আপনাদের নেই।' উপস্থিত অন্যেরা চোখ নামাল। জেনিফার বড়ো টান দিলেন সিগারেটে।
কুকুরের কান্না থামল। হাওয়া স্তব্ধ হল অবশেষে। অবিনাশ গ্লাসে হুইস্কি ঢাললেন। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে গল্প শুরু করলেন।

আর তাহারা উত্তর করিয়া বলিবে, আমাদের হস্ত এই রক্তপাত করে নাই, আমাদের চক্ষু ইহা দেখে নাই ;
- Deuteronomy | 21 : 7
ওই চেয়ারটায় বসবেন না অফিসার, প্লিজ। জানালার ধারের পাশের আরামকেদারাটা নিন। এখানে বসতে দিলাম না, কারণ আজকাল সিওপিডির ঝামেলাটা ভোগাচ্ছে। দুই পা হাঁটতে গেলে হাঁফাই। হাত কাঁপে। তাই এমন জায়গায় বসতে চাই, যেখানে হাতের কাছে জরুরি জিনিসপত্র মেলে। এক পাত্তর গুছিয়ে এই চেয়ারে বসলে ডান হাতের নাগালের মধ্যে, ওই যে দেখছেন পুরোনো টেপ রেকর্ডার, হ্যাঁ এখনও চলে, ওটার নাগাল পাই। বসে বসেই পালটে দিতে পারি, মল্লিকার্জুন মনসুর থেকে ওঙ্কারনাথ ঠাকুর। আমার দুপুর এবং রাতের বিলাস। এক পেগ চলবে নাকি, অফিসার? আরে, ডিউটির কথা রাখুন, আমরাও করেছি ওরকম। আচ্ছা বেশ, জোর করব না। আমি একটা সাজিয়ে বসলে কিছু মনে করবেন না, আশা করি? জানি, আপনাদের চোখে আমি সন্দেহভাজন। কিন্তু, সন্দেহভাজনের কি মাতলামি করার স্বাধীনতা নেই, বলুন?
গল্পটা, স্বীকার করছি, তিন বছর আগে আমি শুনিয়েছিলাম মূলত টিনার কথা মাথায় রেখে। ওহ্, আপনি জানেন না। তনয়া ভট্টাচার্যর ডাকনাম। বুদ্ধিমতী মেয়ে। বারবারার মনে হয়েছিল টিনাকে বলা যায়, যেমন বিভিন্ন লোককে দেখে মাঝের বছরগুলোতে ওর মনে হয়েছে। সে-পাগলামিতে সায় দিয়েছিলাম। কিন্তু, আসলে সাংবাদিকদের আমার পছন্দ নয়, জানেন! ওরা সবসময়ে পুলিশকে অপদার্থ দেখায়। কেন নকশালিদের মতো ওদেরও সবসময়েই মনে হয় যে স্টেট আসলে দুশমন? টিনার অমীমাংসিত রহস্যের সিরিজটার কথা আপনি জানেন তো? গল্পগুলো এমনভাবে লিখেছে যাতে পুলিশকে সর্বদাই ব্যর্থ মনে হয় । ফলত, গায়ে তো লাগবেই। তাই মনে হয়েছিল, শুনে দেখ, বাস্তব ক্রাইম কীরকম হয়। দেখি তোর বুদ্ধির দৌড় কত। বকবক শুরু করলে আমি থামতে পারি না, অফিসার মাহাতো। বিরক্ত লাগছে না তো? দাঁড়ান, একটা আমির খাঁ সাহেব চালিয়ে দিই। লো ভল্যুমে বাজবে। ডিটেকটিভ গল্প শুনবেন এদিকে আবহ তৈরি হবে না, এ হয় নাকি?
১৯৯২ সালের ২০ এপ্রিল সন্ধে সাড়ে সাতটায় গঞ্জ থানায় ফোন আসে। ফোন ধরেছিল কনস্টেবল অর্জুন সিং। গুলমোহর রোডে ডেভিড ব্রাউনের বাড়ি থেকে ফোন গিয়েছিল। বাড়ির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য, দুই বছরের শিশু ক্রিসকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ডেভিড ব্রাউন রাঁচি হাজারিবাগ জুড়ে হোটেল ব্যাবসা চালান। তাঁরা প্রথম যুগের সেটলার, গঞ্জে এসেছিলেন বাবা টিমোথি ব্রাউনের হাত ধরে, সেটা ১৯৩৫ এবং কলোনাইজেশন সোসাইটির শেয়ার কিনে প্রায় পাঁচ একর জমির মালিক হয়ে বসেন। ব্যাবসার শুরু হয়েছিল টিমোথির হাত ধরে। তখন রাঁচিতে একটাই হোটেল ছিল। ছেলে সেটাকে প্রসারিত করেন। ডেভিড ব্রাউনের বয়েস তখন বাষট্টি। স্ত্রী আগাথা, আটান্ন। দুই ছেলেমেয়ে। বড়ো বারবারা, অবিবাহিতা, ছত্রিশ বছর বয়েস। বাবার ব্যাবসায় আগ্রহ নেই। ছোটো এডওয়ার্ড, তিরিশ, বাবার সহকারী হলেও নিজস্ব গারমেন্টসের ব্যাবসা খোলবার জন্য তখন উদ্যোগ নিচ্ছে। এডওয়ার্ড চার বছর আগে বিয়ে করেছিল তার ছোটোবেলার বান্ধবী মনীষাকে। বেথেল মিশনের প্যাস্টর পরিতোষ গরম্যানের মেয়ে হলেন মনীষা। তাঁর বয়েস এখন আটাশ, গৃহবধূ। ১৯৯০ সালের ২৭ মার্চ এডওয়ার্ড ও মনীষার পুত্রসন্তান ক্রিস্টোফার জন্ম নেয়। এ ছাড়াও, বাড়িতে আছে কুক, মালি, দারোয়ান, সর্বক্ষণের গৃহভৃত্যরা।
আমি তখন অ্যাসিস্ট্যান্ট সাবইনস্পেকটর। সেকেন্ড অফিসার আমাকে যেতে বললেন। আপনি নিশ্চয় বাড়িটা দেখেছেন? টিমোথি ব্রাউন নাম দিয়েছিলেন স্যাংচুয়ারি, এখন ধ্বংসস্তূপ। বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, মাঝের নানা জটিলতায় এখনও ভাঙা পড়েনি। আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখন বাড়িটা দেখে মনে হত পোস্টকার্ডের কভার থেকে উঠে এসেছে। বাগানের ধার ঘেঁষে নানা কিসিমের গাছের সারি। খোলা চত্বরের একপাশে ব্যাডমিন্টন কোর্ট। দোতলা বাড়ি তারপর, যার টালির চাল বেয়ে উঠে যাওয়া লতানে গাছ, চিমনি, দেওয়ালের গায়ে লেখা ‘জগতের পিতা'। বাড়িটাকে আমি ছোটোবেলা থেকে চিনতাম কারণ এদের ক্রিসমাস পার্টি এলাকায় বিখ্যাত ছিল। ডিসেম্বর এলে শুরু হত উৎসবের প্রস্তুতি। আগাথা ঘরদোর পরিষ্কার শুরু করতেন। কাচ ও ধাতব বাসনপত্র আলমারি থেকে সাবধানে নামিয়ে চকচকে করা হত। বাড়িটা আলোর মালা, মোমবাতি, ফুল, ঝালর, রঙিন কাগজে সেজে উঠত। রোস্ট চিকেন, পুডিং, কেকের সুরভি। গেটের বাইরে আমরা স্থানীয় শিশুদের দল ভিড় করে জুলজুলে চোখে দেখতাম। শীতের সবজিতে বাগান ভরে উঠত ব্রাউনদের, টমেটো, মটরশুঁটি, ফুলকপি, ধনেপাতা, কচি শিম, মাচায় ফলফলে পালংশাক। স্টেশনের পাশে ওদের একটা বেকারিও ছিল। একচোখ কানা আবদুল মজিদ সেখানে কাজ করত। মাখনের গন্ধে ম-ম করত জায়গাটা। যদিও আমাদের, মানে আশপাশের স্থানীয় মানুষদের নিমন্ত্রণ ছিল না এসব পার্টিতে। ১৯৯২ সালে যখন সে-বাড়িতে পা দিই, আমার বয়েস সাঁইত্রিশ। সেই প্রথম ভেতরে যাওয়া। দেখলাম একই আছে, বাহারি গাছগুলো বাদে। বাড়ির পেছনে আদিগন্ত পোড়োমাঠও অবিকল, আজ যে অবস্থায় দেখছেন। আগাছায় পূর্ণ মাঠের ভেতর এখানে-ওখানে জলাজমি, বিরাট ঘাসবন, বুনো শুয়োরের আড্ডা, মরা গাছের কঙ্কাল। আগাথা তখনও জ্যাম আর অ্যাপল পাই বানাতেন, কারণ তাঁকে আমি খ্রিস্টউৎসবের মেলায় সেগুলো নিয়ে এসে বিক্রি করতে দেখেছি।
আমরা যখন ঢুকছি, দেখলাম বাড়ির গেটে উদ্বিগ্ন মুখের দল ভিড় জমিয়েছে। ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে ড্রয়িং রুম দেখা যায়। সেখানে মনীষাকে মুখ ঢেকে বসে থাকতে দেখলাম, অন্যেরা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। বাইরে দাঁড়িয়ে ডেভিড, এডওয়ার্ড, রেভারেন্ড পরিতোষ গরম্যান, আরও চেনা-অচেনা মানুষজন ।
রেভারেন্ড গরম্যান বেথেল মিশনে আছেন তদ্দিনে প্রায় তিরিশ বছর। আদতে কলকাতার বাঙালি। গির্জার কাজ ছাড়াও সপ্তাহে দু-দিন রাঁচি কলেজে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব পড়াতে যেতেন। বছর পঞ্চান্নর মানুষটিকে দেখলাম ভেঙে পড়েছেন। তাঁকে প্রশ্ন করলেও উত্তর বেরোচ্ছিল না মুখ দিয়ে। বারে বারে পাশে দাঁড়ানো এডওয়ার্ডের দিকে তাকিয়ে বলছেন ‘আমার জন্য তিনটে জীবন— ওই তিনজন।' বলছেন, আর এডওয়ার্ডের কাঁধ খামচে ধরছেন, অস্থিরভাবে জিজ্ঞাসা করছেন মনীষা কোথায়, সে কেমন আছে। কিন্তু আমরা প্রশ্ন করলে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছেন। একবার ইংরেজিতে বললেন ‘দিজ নেগেটস অল গুড ওয়ার্কস।' অসংলগ্ন বকছেন দেখে অন্যদের জেরা করে ব্যাপারটা জানা গেল।
রেভারেন্ড গরম্যান মাঝে মাঝে বিকেল বেলা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে আসতেন। নাতির সঙ্গে সময় কাটিয়ে এককাপ চা খেয়ে যেতেন। তাঁর স্ত্রী অনেকদিন আগে মারা গিয়েছিলেন, তাই বিপত্নীক মানুষটিকে একমাত্র সন্তান মনীষা চাইতেন যতটা সম্ভব কাছাকাছি রাখতে। আজকেও এসেছিলেন বিকেল পাঁচটায়। ডেভিড তখন নিজের অফিসে। এডওয়ার্ড গেছেন অ্যাকাউন্ট্যান্টের বাড়ি। বারবারা তখন কিছুদিনের জন্য একটা স্কুলে পড়াচ্ছিলেন। তিনি সেইসময়েই স্কুল থেকে ফিরেছিলেন। ড্রয়িং রুমে বসে চা খাচ্ছিলেন রেভারেন্ড গরম্যান, আগাথা আর মনীষা। ক্রিস তখন হাঁটতে শিখেছে। সে নাকি দুরন্তপনা করছিল বাড়ি জুড়ে, একটু আগেই একটা ডিশ ভেঙেছিল। মনীষা সারাদিন তার পেছনে ছোটাছুটি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। রাগের মাথায় একটা থাপ্পড় কষিয়েছিলেন ছেলেকে। আগাথা সঙ্গেসঙ্গে ক্রিসকে কোলে তুলে আদর করেছিলেন এবং বকাবকি করেছিলেন মনীষাকে। ক্রিস কাঁদতে কাঁদতে আগাথার কোলে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমোবার আগে আধো আধো কথায় জানিয়েছিল যে, সে মায়ের থেকে পালিয়ে যাবে। কোথায় পালাবে? কেন, পেছনের মাঠে? ওই মাঠের ভূতের গল্প ক্রিসকে শুনিয়ে ঘুম পাড়ানো হত। তখন রেভারেন্ড গরম্যান আসেন। ঘুমন্ত ক্রিসকে কাউচে শুইয়ে আগাথা এবং মনীষা রেভারেন্ডের সঙ্গে বসে ছিলেন। ক্রিসের পাশে বসে ছিল আয়া নিমৰলা দুবে। এ ছাড়া, রান্নাঘরে কুক বিশাল সিং ছিল। মালি ও দারোয়ান ছিল নিজেদের ঘরে। বারবারা এসে চায়ের আড্ডায় যোগ দিলেন। কিছু সময় পর আগাথা চলে গেলেন একতলায় নিজের ঘরে। সন্ধের প্রার্থনার সময় হয়েছিল তাঁর। বরাবর এই সময়টায় আগাথা ঘরে ছোট্ট অলটারের সামনে আধঘণ্টা প্রার্থনা করেন। তখন তাঁর বাহ্যজ্ঞান থাকে না। বারবারা দোতলায় নিজের ঘরে গেলেন। বলে গেলেন তাঁর নামতে সময় লাগবে কারণ স্কুলের খাতা দেখা আছে। প্রসঙ্গত, ভাই-বোন দোতলায় থাকতেন। বাবা-মা, আয়া, বাড়ির ভৃত্যদের জন্য বরাদ্দ ছিল একতলা। আগাথার হাঁটুর ব্যথার কারণে সিঁড়ি ভাঙতে পারতেন না, একতলায় থাকার কারণ সেটাও। দারোয়ান আউটহাউসে থাকত। মালি ও কুক যে যার কাজ সেরে বাড়ি ফিরে যেত।
সন্ধে ছ-টা নাগাদ মনীষার একটা ফোন এসেছিল। তিনি কর্ডলেস নিয়ে নিজের ঘরে গেলেন। ড্রয়িং রুমে তখন রেভারেন্ড গরম্যান এবং নির্মলা দুবে। রেভারেন্ড হাতে একটা কাঠের জপমালা নিয়ে মনে মনে প্রার্থনা করছিলেন। মনীষা চলে যাবার পর নির্মলা রেভারেন্ডকে জানান যে তাঁকে পনেরো মিনিটের জন্য একবার বাইরে যেতে হবে। বাড়িতে প্রতি পনেরো দিন অন্তর মাইনে দেওয়া হত। ২ তারিখ এবং ১৮ তারিখ। নির্মলার ভাই রাজেশ এসে সেই টাকা নিয়ে যেতেন। রাজেশ বাড়ির কাছে একটা চায়ের দোকানে অপেক্ষা করতেন, নির্মলা টাকা দিয়ে আসতেন তাঁর হাতে। নির্মলা চলে যাবার পর প্রার্থনা করতে করতেই রেভারেন্ডের তন্দ্রা এসেছিল। কয়েক দিন ধরে শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না তাঁর। ভাইরাল জ্বর থেকে উঠেছিলেন, তাই দুর্বলতা ছিল। সোফায় বসে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। পরে আমরা হিসেব করে দেখেছি রেভারেন্ড মিনিট দশ বারোর জন্য ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তারপর মনীষা ফোন শেষ করে ঘরের বাইরে এসে রেভারেন্ডের ঘুম ভাঙান। ক্রিসের কাউচ তখন খালি, কিন্তু কেউ তখনও খেয়াল করেনি সেটা, কারণ কাউচের মুখ ছিল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর দিকে। সোফায় বসে টুকটাক কথার পর মনীষা দেখেন ঘড়িতে সাড়ে ছ-টা বাজতে চলেছে (পরে মনীষা বলেছেন তখন ছ-টা পঁচিশ বেজেছিল), ক্রিসের খাবার সময়। নির্মলা তখনও ফেরেনি দেখে বিরক্ত হন মনীষা এবং খাবার আনতে কিচেনে যান। তাঁর নির্দেশমতো কুক বাটি নিয়ে আসে। সে প্রথম আবিষ্কার করে ক্রিস কাউচে নেই। মনীষাকে সেকথা জানালে তিনি প্রথমে গলা তুলে কয়েক বার ক্রিসকে ডাকেন। তারপর একতলায় আগাথা আর দোতলায় বারবারাকে জিজ্ঞাসা করেন ঘুম থেকে উঠে ক্রিস তাঁদের ঘরে গেছে কি না। সেখানে কিছু না-পেয়ে গৃহভৃত্যদের ঘরে ঢুঁ মারেন। বাথরুমগুলো দেখেন। তারপর তিনি ও রেভারেন্ড যান দারোয়ানের ঘরে। মালি ও দারোয়ান দিব্যি কেটে বলে নির্মলা বেরোবার পর থেকে গেট বন্ধ ছিল। রেভারেন্ড আবার বাড়ির ভেতর গিয়ে প্রতিটা ঘর খোঁজেন। কোথাও যখন ক্রিসকে পাওয়া যায় না, তখন রেভারেন্ড মনীষাকে বলেন স্বামী ও শ্বশুরকে খবর দিতে।
আমরা যখন এলাম, ততক্ষণে বাইরের লোকজন ঢুকে গেছে বাগানে। চিৎকার, চেঁচামেচিতে কমপ্লিট কেওস। কেউ চেঁচাচ্ছে, ‘এদিকটা দেখো', তো, অপরজন বলছে, ‘আরে, ফলসাগাছের ঝোপটা সার্চ করলে না?' বাগানময় ঘুরছে এদিকওদিক লোক। বাড়ির ভেতর থেকে কেউ আবার চেঁচাচ্ছে ‘সামনের গেট দিয়ে কে যেন চলে গেল।' সঙ্গেসঙ্গে সবাই সেদিকে ছুটল। আমি আর অর্জুন সিং মাত্র দু-জন পুলিশ দিয়ে এত লোককে সামলানো যাবে না। পুরো ঘটনা সংক্ষেপে জেনে আমরা প্রথমে বাগানটা একটা চক্কর মারলাম। তারপর ঢুকলাম বাড়ির ভেতরে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর আমরা তিনটে কাজ করলাম। অর্জুন থানায় ফোন করে জানাল চেকপোস্টগুলোতে নজরদারি বাড়াতে।
আমরা অ্যাডিশনাল তিনজনকে এনে বাড়ি এবং আশেপাশের এলাকা ছানবিন করলাম। লাভ হল না। এবং সবশেষে, বাড়ির যে অংশে এই ঘটনা ঘটেছে সেই অংশের ম্যাপ এবং ঘটনার আগে-পরে প্রত্যেকের অবস্থান ছকবন্দি করা হল। সেই ম্যাপের একটা ফটোকপি আমার কাছে এখনও আছে। আপনার জন্য বার করে রেখেছি। সাবধানে ধরবেন। পুরোনো কাগজ তো, ভাঁজে ভাঁজে ভেঙে গেছে।

নীচের তলা খেয়াল করে দেখুন। মুখোমুখি সোফায় রেভারেন্ড আর মনীষা বসে ছিলেন। ক্রিসের চেয়ারের মুখ ছিল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর দিকে। আগাথার ঘর বলতে, এই ঘরে ডেভিডও থাকেন। কিন্তু, বাড়ি থাকলে সিংহভাগ সময় তাঁর কাটে স্টাডি-তে। অনেক সময়ে রাত্রেও সেখানে কাটিয়ে দেন।
রাঁধুনি বিশাল সিং। বয়েস তিরিশ। সে গোটা সময়টা রান্নাঘরে কাটিয়েছে। মাঝে একবার বাথরুমে গিয়েছিল, সেইসময়ে ড্রয়িং রুমের প্যাসেজ তাকে অতিক্রম করতে হয়েছে। ম্যাপ দেখে বুঝতেই পারছেন, লিভিং রুমের ডান দিক দিয়ে সে কমন টয়লেটে গিয়েছিল। ক্রিসের চেয়ারের হাতল ছিল উঁচু। ফলত, ক্রিস সেখানে শুয়েছিল কি না, অতদূর থেকে বিশাল সিংএর দেখা সম্ভব ছিল না। কিচেনের শেষপ্রান্তের একটা দরজা পেছনের মাঠমুখে খোলে, আপনি নিশ্চয় দেখেছেন। ম্যাপেও দেখুন, দরজাটা দেওয়া আছে। কিন্তু, সেই দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ ছিল। অনেকদিন ধরেই খোলা হত না বলে জ্যাম হয়ে গিয়েছিল। ফলত ক্রিস সেখান দিয়ে বেরোতে পারে না অথবা রাঁধুনির অন্তত ক্রিসকে কিচেন দিয়ে সরাবার সম্ভাবনা ছিল না, সে-ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হলাম।
আগাথা, মনীষা এবং বারবারার ব্যাপারে আগে বলা হয়েছে।
নির্মলা দুবে ছ-টা বেজে পাঁচ মিনিটে বাড়ির বাইরে বেরোয়। দারোয়ান গেট খুলে তাকে বার করে, তারপর আবার বন্ধ করে দেয়। নির্মলা ফেরে ছ-টা চল্লিশে। সে বলেছিল পনেরো মিনিট লাগবে, কিন্তু ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে খেয়াল ছিল না। তারপর একজন তাকে খবর দেয়, ব্রাউনদের বাড়িতে বাচ্চা হারিয়ে গেছে। সে তখন ছুটতে ছুটতে ফেরে। রামচরণের চায়ের দোকানে রাজেশের সঙ্গে তাকে একাধিক লোক দেখেছে। চায়ের দোকান গেট থেকে হেঁটে মিনিট তিনেকের রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময়ে তাকে যেতে এবং ফিরতে অনেকেই দেখেছে, কারণ ব্রাউনদের বাড়ির সামনে রাস্তা মেরামতির একটা বড়ো কাজ হচ্ছিল। অনেকটা জায়গা খুঁড়ে রাখা ছিল। তখন সন্ধে হয়েছে, কাজ বন্ধ করে মজুর-মিস্তিরিদের দল রাস্তার ওপাশে তাঁবু খাটিয়ে গল্পগুজব করছিল। তারা সাক্ষী দিল, নির্মলাকে বেরোতে দেখেছে খালি হাতে।
মালি আদেশ যাদব এবং দারোয়ান সমর দোসাদ, দু-জনেই গোটা সময়টা দারোয়ানের ঘরে কাটিয়েছে। মাঝে সমর বেরিয়ে নির্মলার জন্য গেট খুলেছিল। তারপর আবার নিজের ঘরে চলে আসে। তারপর ঘরের বাইরে বেরোয় সাড়ে ছ-টায়, যখন মনীষা তাকে গেট খুলতে বলেন, কারণ তখন ক্রিসের খোঁজ চলছিল।
একমাত্র রেভারেন্ড গরম্যান গোটা সময়টায় ক্রিসের পাশে ছিলেন। এ ছাড়া, ছিল বাড়ির দু-জন গৃহভৃত্য। তাদের একজন আগাথার ঘরে তাঁর সঙ্গে প্রার্থনায় ছিল। অন্যজন বাসন মাজছিল রান্নাঘরে। প্রথমজনের সাক্ষী আগাথা, দ্বিতীয়জনের সাক্ষী বিশাল সিং।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, ছ-টা থেকে, যে সময়ে মনীষা উঠে গেলেন এবং নির্মলা দুবে বাইরে গেল, সাড়ে ছ-টার মধ্যে বাড়ির বাইরে বেরিয়েছে একমাত্র নির্মলা। যদিও দারোয়ান দিব্যি গেলে বলেছে যে, একটা ছোটো ওয়ালেট বাদে নির্মলার হাতে সে কিছু দেখেনি। রাস্তা খুঁড়ছিল যে মজুররা, তারাও একই কথা বলেছে। চায়ের দোকানের সাক্ষীরাও। এ ছাড়াও, রেভারেন্ড তখন জেগে। তাঁর চোখের সামনে একটা বাচ্চাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। বাকিরা বাইরে বেরোয়নি। দারোয়ান ও মালি বাদে সবাই এমনকী বাড়ির ভেতরেই ছিল। তাহলে কি দারোয়ানের ঘরে বাচ্চাটাকে রেখেছিল নির্মলা? কিন্তু, তার ঘরেও কিছু পাওয়া যায়নি। তার থেকেও বড়ো কথা, সেখান থেকে বাচ্চাটাকে বাইরে বার করা হল কীভাবে সবার চোখের ওপর দিয়ে?
যুক্তি যতই অন্য কিছু বলুক না কেন, এই পরিস্থিতিতে সন্দেহ পড়বে নির্মলার ওপর, কারণ সে একমাত্র বাইরে বেরিয়েছিল। তাই তাকে আটক করা হল। দারোয়ানকেও আটক করা হল এবং তার সঙ্গে নির্মলার যোগসাজশের সমস্ত সম্ভাবনা খুঁটিয়ে দেখে ব্যর্থ হল পুলিশ। এরপর সন্দেহ পড়বে খোদ ক্রিসের ওপর কারণ সে বলেছিল পালিয়ে যাবে। কিন্তু, ওইটুকু বাচ্চা পালাবে কোথায়? বাড়ি ও বাগান তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে। লুকিয়ে থাকার জায়গা কিছুই বাদ দেওয়া হয়নি। স্পষ্টতই ক্রিস নিখোঁজ হয়েছে ছ-টা পাঁচ থেকে ছ-টা বাইশ তেইশ নাগাদ— আমরা হিসেব করে দেখেছিলাম যে, মনীষা ফোন শেষ করে ঘর থেকে বেরোবার পর দুই-তিন মিনিট বসে বাবার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তারপর আবিষ্কার করেছিলেন ঘড়িতে ছ-টা পঁচিশ—এই সময়টুকুর মধ্যে। এই টাইম স্প্যানটাকেও কমিয়ে আনা যায়। রেভারেন্ডের ঘুম আসতে মিনিট পাঁচেক সময় লাগে ধরলে, ছ-টা দশ থেকে ছ-টা বাইশ, এই বারো-তেরো মিনিটের মধ্যে অপরাধ ঘটেছিল। ক্রিস যদি নিজে না-পালায়, তাহলে কি বাড়ির লোক? কিন্তু প্রত্যেকের ঘর, বাগান, চিলেকোঠা, কিছু বাদ রাখিনি আমরা। বলে রাখা ভালো যে, আজ যদি আপনি সে-বাড়িতে যান তাহলে দেখবেন পেছনের পাঁচিল ধসে গিয়েছে, কিন্তু সেইসময়ে পাঁচিল অক্ষত ছিল। সেখানে আরেকটা গেট ছিল মেথরের যাতায়াতের জন্য। সেটার বাইরে পোড়োমাঠ ও জলাভূমি। মেথর গেট দিয়ে ঢুকে বাড়ির পেছনের ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উঠত। যদি গেট খোলা থাকত তাহলে অন্তত অনুমান করা যেত যে, ক্রিস সেখান থেকে বেরিয়ে গেছে অথবা কেউ তাকে নিয়ে চলে গেছে। কিন্তু, সেই গেট তালাবন্ধ। ব্রাউনদের বাড়িতে গিয়ে আমরা সবার প্রথমে সেই গেট খোলাই এটা পরীক্ষা করতে যে, তালা সত্যিই লাগানো ছিল কি না অথবা মরচে ধরেছে কি না, অথবা, টিপলক কিনা। সেসব কিছুই নয়। ঝকঝকে স্টিলের নতুন তালা, তার চাবি বাড়ির ভেতর আগাথার দেরাজে থাকে। সেটাকে ভাঙা হয়নি, এমনকী বলপ্রয়োগের চিহ্নও পেলাম না। আগেই বলেছি, তখন অনেক লোক ঢুকে জায়গাটায় কেওস হয়েছিল। তাদের দিয়েও তালা পরীক্ষা করালাম। সকলেই একবাক্যে জানাল চাবি ছাড়া এ খোলা অসম্ভব। তার মানে, পেছনের গেট বন্ধ ছিল গোটা সময়টা। পাঁচিল প্রায় সাতফুট উঁচু, যদিও তাকে টপকানো অসম্ভব এমন বলছি না। কিন্তু, বাচ্চা নিয়ে? তা সত্ত্বেও আমরা পাঁচিলের বাইরের জমি পরখ করে দেখলাম, কোথাও কোনো চিহ্ন নেই। অন্তত কেউ লাফালে ঝোপঝাড় দুমড়ে যেত!
পরদিন ভোরের তদন্ত শুরুর আগে দুটো কথা বলে দিই যা ভুলে গিয়েছি। এক, কনস্টেবল অর্জুন সিং আবিষ্কার করেছিল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর ছিটকিনি খোলা। পাল্লাকে বাইরে থেকে টানলে ফাক হয়। তার মানে কেউ চাইলে বাগান থেকে হেঁটে এসে ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকতে পারে। মনীষা জানিয়েছিলেন যে, রাত্রিবেলা ছিটকিনি দেওয়া হয়, অন্য সময়ে আলগা ভেজানো থাকে কারণ এডওয়ার্ড সুবিধের জন্য মাঝে মাঝে এখান দিয়ে যাতায়াত করেন। দুই, গৃহভৃত্যদের একজন, পেলজম ভুজেল, সে বলেছিল একবার যেন খুব ক্ষীণকণ্ঠে এক শিশুর কান্না সে পেয়েছিল। সে আগাথার ঘরে প্রার্থনা করছিল। স্বীকার করেছে যে, এই সময়টায় বসে বসেই টুক করে একটা ছোট্ট ঘুম সে দিয়ে নেয়। আধো তন্দ্রার মধ্যে সে কান্না শুনেছিল। তার মনে হয়েছিল, বার দুই হয়ে থেমেও গিয়েছিল কান্নাটা। তার ঘুম তখন ভাঙেনি, কিন্তু জাগার পরেও কথাটা মনে ছিল। কিন্তু, ঘুমিয়ে থাকার দরুন কান্না শোনার এগজ্যাক্ট সময় জানাতে পারল না।
সেদিন শহর থেকে নিয়ে আসা হল এল সার্চডগের দল। অত ছোটো শহরে দুম করে সাচডগ তখন পাওয়া যেত না, ডেভিড তাঁর যোগাযোগ খাটিয়ে এনেছিলেন। তাদের নিয়ে পাহাড়, জঙ্গল আমরা ছানবিন শুরু করলাম। আমার মনে আছে, সেদিন একটা বিশ্ৰী ধোঁয়া আসছিল কোথা থেকে জানি না। শহর ঢেকে গিয়েছিল ধোঁয়ার চাদরে। তাকে ভেদ করে দৃষ্টি চালানো কঠিন ছিল। সেই প্রতিকূলতা নিয়ে কুকুরদের চেন হাতে আমরা এগিয়ে গেলাম মাঠ, জলাভূমি ভেদ করে, এবং ব্যর্থ হলাম। দুপুর বেলা শ্রান্ত পুলিশের দল যখন স্যাংচুয়ারির পেছনের মাঠ ভেঙে ফিরছে, আমার চোখে পড়ল জলাভূমির ধারে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন ডেভিড ব্রাউন। ডেভিড বিশালদেহী ছিলেন। গালপাট্টা ও দাড়িসমেত তাঁর অবয়বকে ছোটোবেলায় আমরা ভয় পেতাম। শুনেছি, শিকার করতে ভালোবাসতেন তাঁর যৌবনে এবং সেটা সবসময়ে বুনো পশু নয়। সেদিন তাঁর চোখ রক্তাভ ছিল। মাথার চুল উশকোখুশকো। আমি গিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়ালে বাড়ির ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ পেলাম। ডেভিড বিতৃষ্ণা আনলেন মুখে, ‘মেয়েরা কান্না ছাড়া অন্য কিছু জীবনে পেরেছে?” তিনি আমাদের দেখে বুঝেছিলেন বিফলকাম হয়েছি, ‘বাড়ির চাকর-বাকরদের জেরা করছেন না কেন? কড়া শাসানি কেন দিচ্ছেন না?' ততক্ষণে আমরা নির্মলা দুবে ও দারোয়ানকে আটক করেছি, সেকথা জানাতে তিনি মাথা নাড়লেন, ‘আপনারা অত্যন্ত নরম। লক-আপে ও বাবা-বাছা করেন।' তাহলে কী করতাম আমরা? লাল চোখে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ‘আপনার বাড়ি ও এখানেই ছিল না? দেহাতিদের গ্রামে—ছোটোবেলায় দেখেছি।'
সম্মতির মাথা নাড়ায় বিড়বিড় করলেন, ‘স্বজাতি!’ উত্তর দিইনি, কারণ শোকের মাথায় মানুষ আবোল-তাবোল বকে। ঝাঁ-ঝাঁ সূর্য মাথার ওপর লাফিয়ে উঠেছিল, ডেভিডের গাল বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছিল। তিনি দাঁত বার করে গরগর আওয়াজ করলেন, ‘বিট দেম হার্ড!’ আবার কান্নার আওয়াজ ভেসে এল বাড়ি থেকে। মাথা উঁচিয়ে চিৎকার করলেন ডেভিড, ‘এই শাট আপ!’
আগাথা টেনশন সহ্য করতে না-পেরে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর প্রেশার বেড়েছিল। বারবারা আর মনীষা, আমার মনে আছে, হতভম্বের মতো আচরণ করছিলেন। তুলনায় শক্ত ছিলেন এডওয়ার্ড। তিনি ওপরমহলে কথা বলে আমাদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল আমরা পুরোটা দিচ্ছি না। তাঁর কথামতো ব্রাউনদের সম্ভাব্য শত্রুদের লিস্ট বানানো হল— প্রতিযোগী হোটেলিয়ার, চাকরি থেকে বহিষ্কৃত কর্মচারী ইত্যাদিরা। কিন্তু, তাদের একে একে জেরা করে দেখা গেল সবার শক্ত অ্যালিবাই আছে। পরদিন বিকেল বেলা ইনচার্জ গিরীশ ভুজবলের কাছে রিপোর্ট দেবার সময়ে ভুজবলজি সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা রেভারেন্ড গরম্যানকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ রাখছ কেন?' হকচকিয়ে গেলাম। রেভারেন্ড নিরীহ অজাতশত্রু মানুষ। প্রোটেস্টান্ট ক্যাথলিক হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে তাঁকে শ্রদ্ধা করে। লোকের আপদ-বিপদে চিকিৎসা, অর্থসাহায্য, চার্চের লোকবল দিয়ে পাশে থাকা, সমস্তভাবে জনজীবনে মিশে আছেন। এরকম মানুষকে সাসপেক্ট ভাবতে গেলে জোরদার কারণ দরকার। ‘প্রায় পনেরো মিনিট রেভারেন্ড বাচ্চাটার সঙ্গে একা ছিলেন। সেইসময়ে তাঁর পক্ষে যা খুশি করা সম্ভব ছিল না কি?' ভুজবলজি আমার মুখ দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়েও উঠলেন না। ‘কিছু বলতে চাও?'
‘স্যার, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যদি বাচ্চাটাকে খুঁজে না পাওয়া যায়, আপনি বুঝতে পারছেন—' ভুজবলজি চুপ করে গেলেন। জানতেন আমি কী ইঙ্গিত করছি। অন্তর্ধান রহস্যে ভিকটিমকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে খুঁজে না-পেলে, অথবা, কোনো সূত্র যদি না-আসে, যেমন মুক্তিপণ চেয়ে ফোন, তাহলে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায়।
‘আপাতত গরম্যানকে তোলো। কড়া গ্রিল করো। বাকিটা দেখা যাবে।'
রেভারেন্ড বেথেল মিশন সংলগ্ন নিজের কোয়ার্টারেই ছিলেন। আমরা গিয়ে দেখলাম, প্রায় শয্যাশায়ী। তাঁর পাশে বসে আছেন ডেভিড। শুধু আত্মীয় নয়, ডেভিড ব্রাউন বেথেল মিশন চার্চের অন্যতম পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন, প্রচুর অর্থসাহায্য করতেন। রেভারেন্ড দু-হাতে মুখ ঢেকে ছিলেন। নরম স্বরে বললাম, তাঁকে আসতে হবে থানায়। রেভারেন্ড লাল চোখে আমার দিকে তাকালেন। অস্ফুটে বললেন ‘আমার পাপে তিনটে জীবন শেষ হয়ে গেল।' ডেভিড বললেন সেদিন থেকে রেভারেন্ড একই কথা বলে যাচ্ছেন। আমাদের সঙ্গে ছিল কনস্টেবল বিকাশ কুমার, সে ক্রিশ্চান। সহানুভূতির স্বরে বলল, ‘এডওয়ার্ড স্যার আর মনীষা ম্যাডামের কথা ভাববেন না, রেভারেন্ড। ওঁদের বয়েস কম, নিজেরা সামলে নিচ্ছেন। আপনাকে শক্ত থাকতে হবে।' রেভারেন্ড নির্নিমেষে তাকিয়ে থাকলেন বিকাশের দিকে। তারপর আর্ত ডাক ছেড়ে হাহাকার করলেন। মনে হল তাঁর হৃৎপিণ্ড ফেটে চৌচির হবে। তারপর মাটিতে আছড়ে পড়ে চিৎকার করলেন, “দিজ নেগেটস অল গুড ওয়ার্কস। লেট মাই সিনস নট গেট পাউনড।' আমরা সবাই স্থাণু। তাঁকে স্পর্শ করতে সাহস পাচ্ছিলাম না। দুই হাতে মাথা ঢেকে বসে আছেন ডেভিড। তখন চোখ তুলে দেখলাম, ঘরের দরজায় মনীষা এসে দাঁড়িয়েছেন। বিষাদপ্রতিমা। তাঁর চোখে অশ্রু নয়, শূন্যতা ছিল। তিনি অপলকে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বোবা সে-দৃষ্টিকে পরিমাপ করবার সাধ্য ছিল না বলে একটা সময়ের পর চোখ নামাতেই হয়। রেভারেন্ড তখনও চিৎকার করছেন, কপাল ঠুকছেন মাটিতে। আমি মনে মনে বললাম, ‘মনীষা ম্যাডাম, আপনার জন্য ক্রিসকে আমি ফিরিয়ে আনবই। আমার কেরিয়ার বাজি থাকল। '
বুঝতেই পারছেন, কত বোকা ছিলাম। মনীষার মধ্যে নারীর শোক দেখেছিলাম আমি, যুগ যুগ ধরে যাকে আমরা ছুঁতে পারি না। আমার পা কাঁপিয়ে দিয়েছিল, বিশ্বাস করুন, অফিসার মাহাতো। সেবারের আড্ডায় কথাটা বলিনি কারণ এডওয়ার্ড ছিলেন। কিন্তু, আজ এত বছর পর স্বীকার করতে বাধা নেই— না না, ভুরু কুঁচকোবেন না, আমি সেই সেন্সে বলছিও না—আমি মনীষার প্রেমে পড়েছিলাম। সেজন্যেই বছরের পর বছর, এমনকী বুড়ো বয়েসেও, লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁকে দেখেছি। দাঁড়িয়ে থেকেছি গাছের আড়ালে, তৃষ্ণার্তের মতো তাকিয়ে থেকেছি, যখন রাঁচি থেকে এসে তিনি বাগানে বসে থাকতেন অথবা এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতেন। হয়তো এর মধ্যে কামগন্ধ নেই। একটা মেয়ের অবিশ্বাস্য শোকের সামনে অবনত হয় যে ভালোবাসা, অনেকটা সেরকম। আজ পেছন ফিরে দেখলে নিজেকে নির্বোধ লাগতে পারে। আপনিও জানেন, সেই অনুভূতি কীভাবে আমার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াল।
মনীষা বুঝতেন হয়তো, মাঝে মাঝে তাঁর চোখ-মুখ লাল হত আমার উপস্থিতিতে। কিন্তু অফিসার, আপনি হাসবেন না প্লিজ, এ আমার ছেলেমানুষি নয়। আপনারা দু-বার আমাকে থানায় ডেকেছেন, জেরা করেছেন দীর্ঘ সময়। চাইলেই গ্রেপ্তার করতে পারেন, হয়তো প্রাক্তন কলিগ বলে আলগা দিচ্ছেন। আপনার কি মনে হয় এই অবস্থায় আমি তরল কথা বলতে পারি, সে যতই মাতাল হই না কেন? দেখুন, হাত কিন্তু কাঁপছে না। ভগবানের দিব্যি, আমার সঙ্গে মনীষার কখনো একান্তে দেখা পর্যন্ত হয়নি, বাক্যবিনিময় হয়েছে হাতে গুণে। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এসেছি, সঙ্গে মহিলা কনস্টেবল রেখেছি। শুধু গত তিরিশ বছর ধরে কখনো মুহূর্তের খেয়ালে আমার ওই লুকিয়ে দেখাটুকু— আর্চির কটেজের গা-
ঘেঁষা ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা, যদি একবার বাইরে বেরোন, অথবা, সন্ধেবেলায় প্যাটিওতে বসে থাকেন যখন মনীষা, তখন কয়েক মিনিটের জন্য নিজেকে অন্ধকারে মিশিয়ে তাঁকে দেখে যাওয়া, মাত্র এটুকুই, আমার চাইবার অন্য কিছু ছিল না। ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি লাগছে, না? ওই একটা দুপুরের কয়েক মুহূর্তের চোখাচোখি, যখন সময় মনে হল স্তব্ধ আর, আমাদের প্রতিটা শোকের গ্রন্থি গিঁট পাকিয়ে অনিরাময়ের জাল তৈরি করছে যার একপ্রান্তে আমি এবং অপরপ্রান্তে মনীষা, দু-জনেই এই জাল থেকে বেরোতে পারব না কখনো। তবু সেটা জেনেও একে অপরের দিকে অপলক তাকিয়ে আছি, এটুকু আমার সমস্ত স্মৃতি, তার আগে-পরে কিছু নেই। আপনি বুঝবেন, যদি আমি উন্মোচিত করি এক ডিটেকটিভের ব্যর্থ আত্মাকে?
রেভারেন্ডকে থানায় নিয়ে আসা হল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করেও লাভ হল না। উলটে এডওয়ার্ড থানায় এসে চেঁচামেচি শুরু করলেন, তাঁর শ্বশুরমশায়কে হ্যারাস করা হচ্ছে। ওপরমহলে অভিযোগ করলেন যে, ভারতীয় পুলিশ অ্যাংলো কমিউনিটির ওপর গায়ের ঝাল মেটাচ্ছে। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের ক্লাব থেকে চাপ বাড়ানো হল। রেভারেন্ডের কোয়ার্টার, বেথেল মিশনের অলিগলি তন্নতন্ন করে খোঁজা বিফলে গেল। রেভারেন্ড নিজেকে দায়ী করছেন সত্যি, কিন্তু তা দিয়ে তদন্তের সুরাহা হয় না। আমার কাছে কোনো ক্লু ছিল না, একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ বাদে। আর একটা জিনিস, আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ, কিন্তু অদ্ভুত বলে আমার মনে ছিল। ক্রিসের ঘরে তার দোলনার নীচে একটা চিরুনি পেয়েছিলাম। সাদা রঙের, হাতির মুখ খোদাই করা। মনীষা, নির্মলা, বারবারা সকলে জানিয়েছিল, এটা তাদের নয়। হতেই পারে অনেক মানুষ তখন সে-ঘরে ঢুকছিল, কারোর পকেট থেকে পড়ে গেছে। যদিও কেউ পরে দাবি জানায়নি। কী করব বুঝিনি, ফাইলের মধ্যে সেটাকে গুঁজে পাঠিয়ে দিলাম। ঘটনাটা মনে আছে আমার, কারণ অদ্ভুত ছিল।
এত ছোটো টাউনে এরকম অপরাধ ঘটলে তার প্রভাব পড়বেই। নানা কারণে ব্রাউনদের পরিবারের ওপর অনেকের রাগ ছিল। শহরে রটে গেল যে, পরিবারের লোকেরাই ক্রিসকে হত্যা করেছে। রোজ আমরা ফোন পেতাম, কারোর থিয়োরি হল ক্রিসকে অনেক আগেই হত্যা করে দেহ সরিয়ে ফেলা হয়েছে, পুলিশ ডাকার ব্যাপারটা চোখে ধুলো দেবার জন্য। কেউ আবার ওদের পরিবারের ওপর অশুভ আত্মার প্রভাবের প্রমাণ পেয়েছে। ক্রিসকে লাতেহারের অমুক পার্কে দেখা গিয়েছে, অথবা, কেউ তাদের উলটোদিকের কটেজ থেকে এক অচেনা শিশুকণ্ঠের কান্না শুনেছে, এমন ফোনও পেয়েছি। প্রথমদিকে প্রতিটা ফোন পেয়ে পুলিশ ছুটেছে। তারপর দেখেছে সবই ভুয়ো। আমরা সংবাদপত্র, রেডিয়ো, টিভির মাধ্যমে আবেদন করতাম, যদি কেউ কিছু জানেন ক্রিসের ব্যাপারে, যেন আমাদের কাছে আসেন।
মনীষাকে দিয়েও একবার আবেদন করানো হয়েছিল। হাবিজাবি ফোন অনেকটা সেইসূত্রেও বটে। ডিপার্টমেন্ট নিরাশ হতই। একসময়ে কথা উঠল ভেতরে, আমি একটা কেস নিয়ে অবসেসড হয়ে গেছি। সেটা ভুল নয়। তখন আমার ঘুম, স্বপ্ন, জাগরণ ও স্মৃতি, সমস্ত কিছু জুড়ে ক্রিস। জুড়ে আছে মনীষার শোকভারানত মুখাবয়ব, যার সামনে আমি নতজানু হই রোজ। রোজ নিজেকে মনে করাই, এই কেস আমি সলভ করব। কিন্তু, ডিপার্টমেন্ট বিরক্ত হয়। নতুন ভুয়ো কলের পেছনে ধাওয়া করতে বললে অনির্দেশ্য ঘাড় নাচায় তারা, তারপর অনিচ্ছুক ঔদাসীন্যে হুকুম তামিল করে। তখন চার মাস কেটে গেছে, আপডেটের অভাবে ঝিমিয়ে গেছে ডিপার্টমেন্ট। শহরময় কানাঘুসোর ছায়াপুঞ্জ, ব্রাউনরা একটা শিশুকে মেরে ফেলেছে। তাদের বাড়ির দেওয়ালে চক দিয়ে লিখে আসে ‘খুনি’। ডেভিড ভূতের মতো বসে থাকেন বেথেল মিশনে রেভারেন্ডের সঙ্গে। বাইরে বেরোন না, খাওয়া-দাওয়া করেন না। বাড়ি ফিরলে নাকি প্রবল চিৎকার করেন কেউ কান্নাকাটি করলে। এডওয়ার্ড নিয়মিত থানায় আসেন। মাঝে মাঝে আসেন মনীষা। কখনো বারবারাও আসে তাঁদের সঙ্গে। আমরা তাঁদের চা অফার করি খান না। প্রথম প্রথম সহানুভূতির সঙ্গে তাঁদের দেখত ডিপার্টমেন্ট। এলে ওসি সাহেব নিজের ঘরে নিয়ে যেতেন, আলোচনা চালাতেন, জানাতেন প্রোগ্রেসের খুঁটিনাটি। তারপর সময় ঢলল, আর আমরাও বীতস্পৃহ হলাম। তাঁদের সামনে দিয়ে যেতে হলে ফাইলে মুখ গুঁজে চলে গেলাম। ওসি সাহেব বলে পাঠালেন তিনি ব্যস্ত, দেখা করতে পারবেন না। মনীষার ওজন মনে হয় ততদিনে অর্ধেক হয়েছে, দেখে ছোট্ট স্কুলবালিকা মনে হয়। এডওয়ার্ড ও বারবারার চোখের তলায় কালি। একদিন মনীষা বমি করে দিলেন থানার ভেতর, দীর্ঘ সময় ধরে অনাহার অথবা খাবার অনিয়ম শোধ তুলছিল। আমাকে সেদিন ভুজবলজি ঘরে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইয়ে, মানে এরা কতদিন আসবে, এনি আইডিয়া?'
‘আমি কী করে জানব, স্যার! বাচ্চা এদের হারিয়েছে, আমার নয়।' আমার গলার তিক্ততা আন্দাজ করে ভুজবলজির গলাতেও ইস্পাতের কাঠিন্য এল।
‘তুমি ব্যর্থ হয়েছ। এবার কি এটাকে গোটাবার সময় আসেনি?’
‘আমি বোঝাতে পারব না ঠিক। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে, কিছু একটা আছে যাকে আমরা মিস করে যাচ্ছি।'
‘এটুকু বোঝার জন্য সিক্সথ সেন্সের দরকার নেই। মিস অবশ্যই করেছ, নাকরলে বাচ্চাটাকে পেয়ে যেতে। তোমার বিশ্বাস, ক্রিস এখনও বেঁচে আছে? অসম্ভব!' ‘সেটা এডওয়ার্ড ব্রাউনকে কে বলবে? আপনি, না আমি?'
ধড়াম করে দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেলেন ভুজবলজি। তাঁর অস্ফুট স্বর শুনলাম, ‘ইডিয়ট!’
সেদিন আমি স্যাংচুয়ারিতে গিয়ে এডওয়ার্ডকে বললাম থানায় আসতে হবে না, কিছু আপডেট পেলে আমরা আসব। কিন্তু, এডওয়ার্ড মাথা নীচু করলেন, ‘এসে লাভ নেই জানি, বারবারার জোরাজুরিতে আসা। সে ক্রিসকে দেখতে পায়।’
এবার আমার চমকাবার পালা, যদিও এই আশঙ্কা ছিলই। ‘পেছনের মাঠে, ক্রিস নাকি জলাভূমির ওপারে বসে থাকে। হাঁটে।' এডওয়ার্ডের গলা ধরে এল।
আমি দেখলাম বারবারা এসে দাঁড়িয়েছে ঘরের এক কোনায়। এলোমেলো পা, জড়ানো স্বর, হাসার চেষ্টা করছে। মুখ মুছে বলল, ‘সত্যিই দেখেছি।’ এডওয়ার্ড আমার দিকে হতাশ চোখে তাকালেন।
ক্রমে দিন গেল এবং মানুষ ক্লান্ত হল চর্বিতচর্বণে। ভুয়ো ফোন আসা বন্ধ হল। একদিন সকালে আমরা আবিষ্কার করলাম, গত এক সপ্তাহে এডওয়ার্ডরা একবারও আসেননি। তখন থেকে তাঁদের আসা সপ্তাহে একবার, সেখান থেকে মাসে বড়োজোর একবার, শেষমেষ বছরে একবারে দাঁড়াল। ব্রাউনদের পতনের শুরু তখন থেকে। এডওয়ার্ড ও মনীষা বছর দুয়েক পরে রাঁচি চলে যান। ব্রাউনদের ব্যাবসা বন্ধ হয়ে যায়, বিক্রি হয় হোটেল। বারবারা চাকরি ছাড়ে। ডেভিড বাড়ি বসে মদ খান সারাদিন। সামাজিক জীবন শেষ হয়ে যায় তাঁদের, কারোর সঙ্গে মেশেন না, বেরোন না বাড়ি থেকে। বারবারাকে এলোমেলো পায়ে রাস্তায় ঘুরতে দেখা যায়, দেখা যায় সন্দেহজনক শুঁড়িখানায় বসে থাকতে, পুরুষের দল তার ধারেকাছে ঘেঁষে না। অধস্তন কর্মীদের ছাড়িয়ে দেওয়া হয়। বাড়ি অধিকার করে আগাছা। ভাঙতে শুরু করে। সন্ধেবেলা আলো জ্বালানো হয় না, কারণ বাবা, মা, মেয়ে যে যার ঘরে শুয়ে থাকে। টাউনের লোক আঙুল দেখিয়ে বলে, ‘ভূতে পাওয়া বাড়ি।’
১৯৯৯ সালের অগাস্ট মাসে আবার ফোন এসেছিল এবং আমরা আবার স্যাংচুয়ারিতে ঢুকেছিলাম। ঝুপঝুপে বৃষ্টি হচ্ছে তখন, মশার দল আমাদের ঘিরে বিষণ্ণ ঝাঁক রচনা করেছে। ছাতা মাথায় আমরা গেলাম পেছনের মাঠে। ছাই মেঘের দল অনেকটা নীচে নেমে এসেছে, আর মরা আমগাছের ডাল থেকে ঝুলছেন ডেভিড ব্রাউন। তাঁর আধখোলা ঠোঁট, নিমীলিত চোখ, কালো মুখ, কপালে ল্যাপটানো চুল থেকে নেমে আসা বৃষ্টির ধারা নাকি ঘাম, সাত বছর আগের দিনটার মতো— বারবারা মাটিতে বসে ছিল, গালে হাত দিয়ে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে বলল ‘ক্রিসকে খুঁজতে গিয়েছিল।'
গলা শুকিয়ে গেছে, অনেকটা সময় বকবক করলাম তো! আরেকটু হুইস্কি নিই? আমাকে গ্রেপ্তার করতে এলে এভাবেই দেখবেন, পাশে খাঁ সাহেব। না, এ প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমি ক্লান্ত। খুন করেছি কি না সে নিয়ে বহুবার নিজের ব্যাখ্যা দিয়েছি, আর দেব না। তাতে আপনারা সন্তুষ্ট না-হলে, কী বলব বলুন! একাত্তর বছরে পৌঁছে নিজেকে
বীতস্পৃহ হতে শেখাচ্ছি। আজ অন্তত ক্রিসের গল্পটা আমাকে শেষ করতে দিন, প্লিজ। একটা ছোটো পেগও নেবেন না? সত্যিই আপনি কড়া অফিসার !
আগাথার মৃত্যুর সময়ে অবশ্য আমি এখানে ছিলাম না। তখন হাতিয়াতে পোস্টেড। সেখানে কিছুদিন কাটাবার পর ধানবাদ, তারপর সদর, আবার হাতিয়া, শেষে সিনিয়রিটির বিচারে ফিরে এলাম নিজের জায়গায়। কিন্তু, আমি ক্রিসকে ভুলিনি একটা দিনও। বছরের পর বছর আমি পড়ে থেকেছি। বার বার উলটেপালটে দেখেছি সমস্ত সাক্ষীর বক্তব্য এবং বাড়িটার ম্যাপ খুঁটিয়ে দেখে বোঝার চেষ্টা করেছি, কী মিস করে গেলাম। কোথা দিয়ে ঢুকেছিল অপরাধী? কীভাবে বেরোল সে? আমার বাড়ি ছিল খালারি স্টেশনের কাছে, সেখানে আছে পরিবার, বাবা, মা। কিন্তু, বেশিরভাগ দিনই যাই না। থানার ঘরে অনেক রাত কাটিয়ে দিই। আমার স্ত্রী প্রথমে সন্দেহ করেছিল অন্য মেয়েমানুষ, তার ভুল আমিও ভাঙালাম না। সে শ্বশুরালয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে নিজস্ব আবাদ বানিয়ে ফেলল। ছেলেরা আমাকে চিনত না। বাড়ি গিয়ে বসে থাকতাম খেতের ধারে, ছাগলগুলো নিয়ে জঙ্গলে চরাতে যেতাম। দাম্পত্য বাক্যালাপ কমে শূন্যের কাছাকাছি গিয়েছিল। ফাঁকা সময়ে এলোমেলো ঘুরে বেড়াতাম টাউনের আনাচকানাচ, গলিঘুঁজি, দিশি মদের ঠেক, চাইনিজ মালের খুচরো দোকানিদের আড্ডাখানা। ছায়ামূর্তির মতো এক পুলিশ অফিসার, যে আচমকা উদয় হয়, বসে থাকে কিছুটা সময়, তারপর উধাও হয়, সে আমাদের ছোটো শহরে কানাকানি তৈরি করে। ভবিষ্যতের অপরাধীরা অস্বস্তিতে পড়ে। বর্তমানের আইনভঙ্গকারীর দল ক্রুদ্ধ হয়। হাওয়ায় গুমগুমে গুঞ্জন ওঠে, পুলিশ নতুন ফাঁদ পাতছে? তখন আমি উঠে বেরিয়ে যাই পানশালা থেকে, হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারি শ্বাপদের বহু চোখ, আততায়ীর চোখ, বিশ্বাসঘাতকের চোখ, প্রতিশোধকামীর চোখ আমাকে লক্ষ করে যাচ্ছে। ভয় লাগে না। বিফল মদের দিকে তাকালে অনেক রাত্রির প্রত্যাখ্যান ও যুগান্তের ধোঁকাময় অপরাধী স্রোত আমাকে ঘিরে ব্যূহ রচনা করে। আমি তাদের ভেতর দাঁড়িয়ে কল্পনা করি, সবার চোখের সামনে থেকেও গায়েব হওয়া সম্ভব, ব্যক্তিগত ব্যর্থতার কম্বল মুড়ি দিয়ে নিজেকে লুকোনো সম্ভব। সম্ভব?
আরেকটু নিই, বুঝলেন? কথা জড়ানো অবধি চালিয়ে যাওয়া আমার অভ্যেস।
এই ঘটনার কুশীলবেরা অনেকে জীবিত, আপনি তাঁদের অনেককে জেরা ও করেছেন। রেভারেন্ড গরম্যান বেঁচে আছেন। প্রায় পঁচাশি, গত বছর দশেক তাঁর স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে। অসংলগ্ন কথা বলেন, বেথেল মিশনের কোয়ার্টার থেকে মাঝে মাঝে বেরিয়ে যান। উদ্দেশ্যহীন হাঁটেন এখানে-ওখানে। মনীষা বাবাকে রাঁচি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু রেভারেন্ড যেতে চান না। মিলা দুবে মারা গিয়েছে ২০১৬ সালে। রাঁধুনি বিশাল সিং ভালো জীবনের আশায় দিল্লি পাড়ি দিয়েছিল, তারপর খবর নেই। মালি আদেশ যাদব বহুদিন বেপাত্তা, তার পরিবারের খবরও আমি পাইনি। দারোয়ান সমর দোসাদ এখনও বেঁচে, অশক্ত শরীর, কিন্তু পেট তো চালাতে হবে, একটা শুঁড়িখানায় কাজ করে। এই ঘটনার পর এদের সবাইকেই ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন ব্রাউনরা। পেলজম ভুজেল, আগাথার খাস লোক, নিজেই কাজ ছেড়ে চলে যায় কলকাতায় ছেলের কাছে। কনস্টেবল অর্জুন সিং, যে শুরু থেকে আমার সঙ্গে ছিল, ২০০৯ সালে একটা কেসের তদন্তে কোডারমা যাবার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায় । ভুজবলজি বেঁচে আছেন যদিও, নাগরিতে নিজের পৈতৃক ভিটেতে চলে গেছেন অবসরের পর। দুই-একবার তাঁর বাড়ি গিয়েছি। গেলে পুরোনো দিনের গল্পে মেতে ওঠেন। চুরাশি বছর বয়েস, কিন্তু অবিশ্রান্ত বকবক করে যাবেন, আমাকে পুরোনো ফাইল দেখিয়ে বলতে থাকবেন কত কী করা যেত, কিন্তু হল না। বুঝতে পারি, পরিবারে অন্যেরা তাঁর বকবকানিতে অতিষ্ঠ, হ্যাঁ-হুঁ করে কাটিয়ে দেয়। আমি গেলে লাঞ্চের আগে কিছুতে ছাড়বেন না। তারপর দাওয়ায় বসে স্মৃতিচারণ করবেন টানা। মালভূমিতে সন্ধে নামবে এবং আমরা দুই বাতিল পুলিশ অফিসার নিজেদের অসার্থকতার সামনে সমর্পণের ভঙ্গিতে বসব।
আমার গল্প শেষ, অফিসার। আমি এক হতমান ডিটেকটিভ, যার ব্যর্থতাও তত মহনীয় নয় যা উদযাপনযোগ্য, আপনার সামনে দাঁড়িয়ে একটাই কথা বলব। তিন বছর আগে বারবারার বাড়িতে বলেছিলাম, আপনাকেও বলব। আজকের হত্যারহস্যে আপনারা ব্যস্ত, আপনাদের সময় নেই তিরিশ বছর আগেকার এক কাহিনি নিয়ে মাথা ঘামানোর। ক্রিস বেঁচে আছে কি না সেটাও জানি না। কিন্তু আমি বলছি, তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আপনাদের। স্মৃতি, যা আততায়ীর আনুগত্যে এবং বিশ্বাসঘাতকের মসৃণতায় নিজেকে প্রশ্নময় রাখে, তাকে হত্যা করা পাপ। আপনারা মনে রাখুন, মনে রাখুন, এবং মনে রাখুন।

কারণ জীবিত লোকেরা জানে যে, তাহারা মরিবে ; কিন্তু মৃতেরা কিছুই জানে না, এবং তাহাদের আর কোন ফলও হয় না, কারণ লোকে তাহাদের বিষয় ভুলিয়া গিয়াছে।
— Ecclesiastes । 9:5
পরদিন সকাল বেলা তনয়া অবিনাশ যাদবের বাড়ি গেল, একে ওকে জিজ্ঞাসা করে বাড়ি খুঁজে নিয়েছিল। ফিরে এল দুপুর বেলা। আজকের দুপুরের মতো সেদিনও আমরা বাগানে বসে ছিলাম। তনয়ার ছায়া বড়ো ঘাসগুলোর ওপর পড়ে কাঁপছিল, হাওয়া এলে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছিল বাগানময়।
বাবা বাড়ি ফিরে চিৎকার করছিল কারণ গতকাল আমি হিল্ডার গালে চুমু খেতে গিয়ে কামড়ে দিয়েছি। খুব কেঁদেছিল হিল্ডা, তিতিরকান্নার মাঠ বেয়ে ছুটে গিয়েছিল বুনোকুলের জঙ্গলে, সারাটা দুপুর একটা ঝোপের ভেতর ঢুকে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। ওকে আমি অনুনয় সাধ্যসাধনা করেও বার করে আনতে পারিনি। আজ হিল্ডার বাবা আমার বাবার কাছে গিয়েছিল। এরপর থাপ্পড়, থাপ্পড়— ভেবেছিলাম পেছনের মাঠে লুকিয়ে থাকব, কিন্তু রামদাসকাকা ‘এই যে পেয়েছি' বলে কবজি ধরল—এডওয়ার্ড খিলখিল করে হাসছে বাড়ির ভেতর থেকে, ওর ছোট্ট গোলাপি ফুলো ফুলো আঙুল, ছুঁলে বালিশের মতো লাগে, কিন্তু আমাকে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে নিয়ে যাচ্ছে বাবা আর রামদাসকাকা, কোথায় যে—
‘আমি তো শুনতে চাইনি, আমাকে তবু কাল তোমরা গল্পটা শুনিয়েছ। এরপর আমি যদি কৌতূহলী হই, তার দায় তোমাদেরও নিতে হবে বই কী। আমি জানতে গিয়েছিলাম, অবিনাশ যাদবের কাছে কেসের ডিটেলস আছে কি না।’ ‘তুমি’ করে বলছে আজ। কী জ্বালা, ছুঁড়ি কি ভাই-বেরাদরি পাতাবে নাকি? নাকি, সত্যিই ক্রিস নিয়ে উৎসাহ জাগল? তনয়া জানাল দুটো জিনিসে তার খটকা লাগছে। প্রথমটা শুনে আমি হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। চিরুনি ?
অ্যাংলো ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, বেথেল মিশন গভর্নিং বডির আজীবন সাম্মানিক সেক্রেটারি, ওল্ড কোর্ট লাইব্রেরির ফাউন্ডিং বডির সভাপতি-আরও কী কী যেন সব পোস্ট— আউটহাউসে লোকের এত ভিড় আমার ভালো লাগে না—এখন আমি বাইবেল জানি, বাবা হল পরাক্রম ও বীর আত্মার সুসমাচার। এডওয়ার্ড কয়েক বার উঁকি মেরে এসে জানিয়েছে শক্ত ইংরিজিতে মিটিং চলছে। এডওয়ার্ড বাবার মতো লম্বা হবে, কিন্তু রাগলে ওর ঠোঁট বাবার মতো বিচ্ছিরিভাবে বেঁকে যায় না। ওর খুব দয়ামায়া। এডওয়ার্ড আগের মাসে বাবার এয়ারগান মাটিতে ঠুকে ভেঙে ফেলেছে, কারণ ও খুব কাঁদত বাবা শিকার থেকে ফিরলে। এডওয়ার্ড বলেছে মরা খরগোশের চোখ দেখলে ওর ভয় লাগে। আজ দিনটা খারাপ কারণ বাবা রাঁচি বা হাজারিবাগের হোটেলে যাবে না আজ। সারাদিন বাড়ি থাকা মানে ওয়াইন, শ্যাম্পেন, গ্রামোফোনের মিঠে সুর, সন্ধের ঝাড়বাতি। এডওয়ার্ড আর আমি ব্যাডমিন্টন খেলব বিকেল বেলা। সিগার আর ওডিকোলনের মিঠে গন্ধ, কারণ আমরা ক্ষুধার্তকে খেতে দিয়েছি, পিপাসিতকে দিয়েছি পান করবার জল, পরনের কাপড় দিয়েছি আতুরকে, অসুস্থর সেবা করেছি আর কারাগারে - পিতার আশীর্বাদ আমাদের নিশ্চিন্ত ছায়ার মতো ঢেকেছে। দিয়েছে নিটোল মাছের স্বপ্ন—আর দ্রাক্ষেখেতের মজুরদল তৃপ্তমনে বাড়ি ফিরেছে—
তনয়া। ‘অবিনাশ যাদব একটা চিরুনি খুঁজে পেয়েছিলেন ক্রিসের ঘর থেকে, মনে নেই?' বলল
‘হ্যাঁ, তাতে কী হল? '
‘চিরুনি নিয়ে কে বাচ্চা চুরি করতে আসে? ছুরি না, সিগারেট না, চিরুনি! মানে, সিগারেটের টুকরো বা কাপড়ের ছেঁড়া অংশ, এসব থাকতে পারে। কিন্তু, চিরুনি কেন?’ ‘আমরা কেউ পাত্তাও দিইনি। তোমার কী মনে হয়?’
‘আমি জানি না। হয়তো কিছুই নয়। হয়তো বাড়ির কারোর। কিন্তু, অন্য কথা ভাবতে গেলেও ঘুরে-ফিরে চিরুনিতে এসে আটকে যাচ্ছি। সাধারণ বুদ্ধিতে দেখলে এটা আমাকে ট্রিগার করার কথা নয়, কিন্তু এটার ভেতর কিছু একটা আছে, যা আমি ধরতে পারছি না। সেটাই ভাবাচ্ছে। কিছু একটা, ভুলে যাচ্ছি যেন। কেন ট্রিগার করছে, জানি না, কিন্তু করছে।'
অক্ষয় মাহাতোকে দেখে আমার এককালের ছাত্র অ্যালান রোজারিওর কথা মনে পড়ে। অ্যালান ওভাবে হাসত, চোখ ছোটো করে কপাল কুঁচকে। যেন শিশুসন্তানের দুষ্টুমি দেখে আমোদ পাচ্ছে। সেইসময়কার ছেলে অ্যালান, যখন আমাদের জীবনে লোডশেডিং বলে বস্তু ছিল, আমার ছিল একটা স্কুল, তার বিশাল মাঠ, সকাল বেলার প্রেয়ার, আরও কী কী— ব্লাডি ভুলে যাই কেন আজকাল? কেউ আমাদের সঙ্গে মেশে না। বলে আমরা অভিশপ্ত পরিবার। রাস্তায় বেরোলে আমার দিকে আঙুল তুলে দেখায়। ড্যাম ইট, আমি যেন খুব কেয়ার করি! কিন্তু অক্ষয় কি শুনেছে এগুলো?
বাড়ির বাগানে আমরা দু-জন বসে ছিলাম, আমি দোলনায় আর অক্ষয় চেয়ারে। তখন সূর্যের তাপ অনেক ছিল, কিন্তু অন্ধকার ঘরগুলোয় আমার ঢুকতে ইচ্ছে করেনি। ওগুলোতে একমাত্র লালুরাম থাকে কারণ ও বুড়ো হয়ে গেছে। তাই জানালার পর্দা চিবোতে চিবোতে সূর্যাস্ত দেখা ওর প্রিয় অবসর। বেচারা, আমাদের শোককে কত আপন করেছে ও! জানোয়ারেরা তাড়াতাড়ি বোঝে। বাড়িটাও তো আর বাড়ি নেই, মুমূর্ষু মোষের মতো ঘাড়, মাজা ভেঙে কাত হয়ে পড়েছে একপাশে। কবে যে ভাঙা হবে! তিনবছর ধরে গড়িমসি করেই চলেছে রিয়েল এস্টেট। অনেককাল আগে, রাঁচি চলে যাবার সময়ে একদিন বাড়ির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এডওয়ার্ড বলেছিল ‘আই অলওয়েজ হেটেড দিস প্লেস।' দিস প্লেস। বাবার বাড়ি। বাবার ঘর, চেয়ার, সিগারের বাক্স-
‘আপনি বলুন, যা মনে আসে আপনার। আবোল-তাবোল হলেও থামবেন না। আমার হাতে সারাদিন আছে।' অক্ষয় বলল।
‘তোমার কোনো প্ৰশ্ন নেই?'
‘আছে। তবে, আপনার বক্তব্য আগে শুনতে চাই। হয়তো এর পর কলকাতায় গিয়ে তনয়া ভট্টাচার্যের সঙ্গেও কথা বলতে হবে আমাদের।’
‘এখানে কেউ থাকে না, বুঝলে? তনয়াও চলে গিয়েছিল। ওকে আমার ভালো লাগত, কারণ ও ভারি সুন্দর করে চুপ থাকত। মাথাটা বুকের কাছে ঝুঁকিয়ে, ঠোঁটটা একে অন্যের ওপর চাপ দিয়ে বসিয়ে। তবে, ও আরও অনেক কিছু সুন্দর পারত, যেমন আশা উসকে দেওয়া, অথবা, গভীর ভাবনার সময়ে ভুরু কুঁচকে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরা। আর, সবসময়েই তোমাকে ও প্রশ্ন করছে, এটার পর ওটা। তখন আমাদের বৃষ্টি, শীতের হিম কুয়াশা, চাপা কান্না বৃষ্টির ফোঁপানির সঙ্গে মিশে যেত, বুঝলে! তনয়া কিন্তু কান পেতে শুনে নিত, ও বুঝে যেত কে কাঁদছে, আমি ক্রিসকে খুঁজতে চেয়ে, নাকি, অ্যাগনেসের ভূত—ওহ্ আমারই মাথাটা গেছে, অ্যাগনেসের ভূত তো আজকাল আসেই না। তাহলে তনয়া কী যে বুঝেছিল—একটার সঙ্গে আরেকটা সুতো, যেন কুঁচকে জট পাকানো সময়, দুটো আলাদা সময়, বুঝলে, অ্যাগনেসের সময় আর ক্রিসের সময়, তবু ও কুরুশের মতো সে দুটোকে জট পাকাবেই! বোকা! অবিনাশ যেদিন গল্পটা বলেছিল তার পরদিনই তো তনয়া প্রথমে মনীষা, তারপরে রেভারেন্ড গরম্যানের কাছে গিয়েছিল। কিন্তু, তাদের কথা ও বুঝতে পারেনি কারণ আমরা সবাই অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। নিশ্চয় আমাকে ওর মনে আছে, না? কিন্তু চলে যাবার পর ফোন করেনি একবারও। সবাই চলে যায়।'
‘সবাই মানে?”
‘এই, সব কিছু।’ হাত দিয়ে চারপাশ ঘোরালাম। ‘যা দেখছ, সব পরিত্যক্ত। আমাদের মতো।' তারপর আমার কান্না পেল আবার, হি হি করে কাঁদলাম। অক্ষয় ভেবেছিল শোক, তাই চুপচাপ বসে ছিল। কিন্তু, আসল কারণ হল আমার মদ খেতে ইচ্ছে করছিল। বাবা যেদিন ঝুলছিল, সেদিনও খেয়েছিলাম অনেকটা। তবে, আজ পূর্বের পাহাড় রোদে জমজম করছে। বুনো টিয়ার দল সার বেঁধে নামছে বেগুন খেতে। যত নষ্টের গোড়া ওই ছুঁড়িটা, সবাইকে খালি প্রশ্ন করে যেত আবোল-তাবোল। কিন্তু, ও আর কখনো ফিরে আসবে না কারণ আমাদের সবাইকে ও ঘেন্না করত মনে হয়। নিজেকে আমি যে কতবার বলেছি, আমাদের সব শেষ, এখানে বড়োদিন আসবে না। আমার গোড়ালি বেয়ে একদিন শ্যাওলা উঠবে। ভারতবর্ষে লর্ড কর্নওয়ালিস পা না-রাখলে আমাদের গঞ্জ বানানো হত না, কিন্তু অক্ষয় অবাক চোখে তাকাল। কর্নওয়ালিস তো এসেছিলেন ১৭৮৬ সালে, আর গঞ্জের জমি রাতুর মহারাজদের কাছ থেকে তার দেড়শো বছর পর কেনা হয়েছিল!
‘হঠাৎ কেন তনয়াকে নিয়ে পড়লে?”
‘সম্ভবত কানেকশন আছে। সব তো এখনই জানাতে পারব না আপনাদের, তবে আমরা সবক-টা অ্যাঙ্গলই খুঁটিয়ে দেখছি। আচ্ছা, অবিনাশ যাদবের সঙ্গে আপনার অনেকদিনের আলাপ নিশ্চয়?’
উত্তর না-দিয়ে চায়ের কাপে হাত বোলালাম। সব কথা অক্ষয়কে জানানো যায় না। করুণা ও আক্ষেপ আমার স্মৃতির ছায়ায় হাঁটু গেড়েছে, তাদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করব কীভাবে? মোটা মানুষদের কেউ ভালোবাসে না। কতদিন হল, অবিনাশ রাত্রিবেলা আমার পাশে দাঁড়িয়ে পোড়োমাঠ দেখছে?
অক্ষয় জোরাজুরি করল না। ব্লাডি নেটিভ, তাই বুদ্ধিমান। বদলে অন্য প্রশ্ন করল, ‘একটা জিনিসে কৌতূহল জাগছে, কারণ পুলিশ রিপোর্টে নেই। কীভাবে তনয়া ক্রিসের ঘটনায় আকৃষ্ট হলেন? অবিনাশ যাদব তো বললেন প্রথমে শুনতেই চাননি।'
অবিনাশ মুখ বাড়াল। বাসুদেব মুন্ডার শুঁড়িখানা তখন জমজমাট। সন্ধের আড্ডা, মাতাল চিৎকার, হাসি, ঝগড়া, বাকিটা ঝাপসা আমার কাছে। গালাগালি, লাথি, ঘুসি, বোতল ভাঙা, চুল ছেঁড়াছেঁড়ি, কপালে ডান্ডার বাড়ি— আমার মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে গিয়েছি কিন্তু ওরা বলল আমি নিছক বদমাইশ। ওরা কেউ মরা মানুষকে গুমরোতে দেখেনি, তাই খুব সুখী ছিল ওরা। ওরা আমাকে টেরিয়ে দেখত। শুঁড়িখানার পেছনের গুমটিতে রক্তাক্ত মুখ নিয়ে বসে আছি তো আছিই, কখন বেরোতে দেবে কে জানে! ওই যে তিনটে যা, যতই পাহারার ভান করুক না কেন, ওদের একজন অণ্ডকোষে হাত বোলাচ্ছে মাঝে মাঝে। যন্ত্রণায় কাতরে আমার দিকে বিষদৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। কেন যে অবিনাশ এল! আমার ওকে চোখ তুলে দেখার দরকার পড়ে না কারণ ছয় মাস হল ক্রিস হারিয়ে গেছে, তবু ওরা কেউ কিচ্ছু করতে পারেনি।
-মদ কিনতে এসে হঠাৎ গালাগালি শুরু করল। তারপর বোতল ছুড়ে ভাঙ্গল একটা। মারপিট শুরু করল—বাসুদেব কুকুরের মতো গরগর করছে। হঠাৎ আমার হাসতে ইচ্ছে করল হি-হি করে।
সবাই সেই রাত্রে বিদায় নেবার পর তনয়া আমার পাশে এসে বসেছিল জানালার সামনে শান্ত বৃষ্টির ফিসফিসে গুঁড়ি পড়ছিল। আকাশে চমকাচ্ছিল নীরব বিদ্যুৎ। নেশাগ্রস্ত মাথায় কুরুশ করার চেষ্টা করছিলাম আমি, কিন্তু হাত কাঁপছিল। ভারী ফোঁটাগুলো সাদাটে সর্দির মতো বিরক্তিকর লাগছিল। নাক ফোঁত করছিলাম বার বার। তনয়া আমার হাত থেকে উলকাঁটা নিয়ে বুনল কিছুটা, ‘ছোটোবেলার শখ। এখনও কাজ না-থাকলে বসে পড়ি।' আমার চোখ লাল দেখে কিছু বলল না, ভালো মেয়ে। সম্ভবত চলে যাবে কালকেই, মুখে নাবললেও সেন্স করছি। কিন্তু, তনয়া তখন বলল যে, তার ক্রিসের ঘটনাকে অদ্ভুত মনে হয়েছে, এই কারণে নয় যে, একটা অবিশ্বাস্য অপরাধ ঘটেছিল। ওর আশ্চর্য লেগেছে কারণ ওই যে মেয়েটা, অ্যাগনেস, সে নিখোঁজ হয়েছিল ক্রিসের মতোই। আবার যে বাড়ি থেকে ক্রিস নিখোঁজ হয়েছে সেখানেই অ্যাগনেসের ছবি। কিন্তু, আমার অস্বাভাবিক লাগল না। এতগুলো বছর পেরিয়ে পাগলি অ্যাগনেসকে আমি ভুলে গেলেও একসময়ে প্রবল জীবন্ত ছিল তার উপস্থিতি। ভালো মেয়ে ছিল অ্যাগনেস। মাঝে মাঝে কাছে-দূরে পালিয়ে যেত আর ফিরে এসে কী হচ্ছেনা-হচ্ছে সব বলত আমাদের। কোন গ্রামে গিয়ে দেখে এসেছিল আড়াইশো বছর বয়েসের এক বুড়োকে। একবার খালারির মেলায় সে নাকি দেখেছিল একটা কুকুরের ধড়ে শুয়োরের মাথা, সেই নিয়ে দিব্যি হাঁটছে, চলছে, খাচ্ছে। এসব বকবক করত অ্যাগনেস, কথা বলতে পারলে তাকে তখন পায় কে! আমাদের সঙ্গে মাঝে মাঝে বেথেল মিশন চার্চে চলে যেত। কাজকর্ম করত সেখানে। বাড়িতে এলে রাঁধুনির কাছ থেকে রান্না শিখতে চাইত। আমাদের বাগানে নিজের মনে খেলত। রোদ বাড়লে চলে আসত ঘরের ভেতর। মায়ের নেলপালিশ, কাজল, পাউডার বাক্স নিয়ে খুটখুট করত। অবাক চোখে সেগুলো ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখত। আমি একবার ওর গালে ক্রিম ঘষে দিয়েছিলাম বলে সে কী ভয় মেয়েরওদের বাড়িতে নাকি কসমেটিক্স ব্যবহার হয় না, ওর মা পছন্দ করে না। জানলে কুরুক্ষেত্র হবে। ঘষে ঘষে গাল পরিষ্কার করল অনেকক্ষণ ধরে। আমি বলতাম, ‘অ্যাগনেস, তুই আজ বাদে কাল কলেজ যাবি, এখনও মা-কে ভয় পাস এত?' সেই শুনে অ্যাগনেস নীরবে মাথা নীচু করত যখন, আমার আচমকা মনে পড়ত, অ্যাগনেসের মা উন্মাদ। তখন আমার মুখে কথা জোগাত না। আমরা জানতাম, অ্যাগনেস মায়ের পাগলামিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল, কারণ সেই পাগলামির রোগ তার ভেতরেও এসেছিল। দিনে দিনে তারও মাথার দোষ বাড়ছিল। তবু সেই জেনেই তাকে পছন্দ করতাম আমরা। আবার কখনো আমার বাবা অসময়ে বাড়ি ফিরে হুংকার দিত, ‘আগাথা, এত হট্টগোল কেন?’ ‘অ্যাই রাসকেল, চাবকে ছাল ছাড়াব।' গোটা বাড়ি ভয়ে একপায়ে খাড়া হয়ে যেত তখন। সেসব সময়ে অ্যাগনেস ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে ফিসফিসিয়ে জানাত ‘আমার ভয় লাগে', এই বলে ছুটে পেরিয়ে যেত গেট। কিন্তু, বড়ো হবার সঙ্গেসঙ্গে অ্যাগনেসের চোখ কঠিন হতে শুরু করেছিল। একবার স্কুল থেকে ফেরার রাস্তায় আমাকে একা পেয়ে ও জানিয়েছিল, ‘আমি বুনো হাঁসের মতো সাইবেরিয়া পালিয়ে যাব।' আমি বলেছিলাম, ‘তাহলে পালা।' আর, অ্যাগনেস পালিয়ে গেল। কোনোদিন ফিরে আসেনি। কিন্তু, তনয়া জিজ্ঞাসা করল অ্যাগনেসকে কেউ মেডুসা বলে ডাকত কি না। মাথামুন্ডু নাবুঝে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম। তনয়া দোনোমনো করছে, তারপর বড়ো নিশ্বাস ফেলল। ‘এই অ্যাগনেস কি ক্রিসের আগে হারিয়ে গিয়েছিল?'
‘হ্যাঁ, বছর পাঁচ আগে তো বটেই, তার বেশিও হতে পারে। এডওয়ার্ড তখন বাবার ব্যবসায় ঢুকেছে, এটুকু মনে আছে।' তনয়া জেনিফারের প্রসঙ্গ তুলল— কোনো অস্বস্তি ছাড়াই গল্পটা বেশ উপভোগ করছিল।
—টিটকিরি দিয়েছিল, ব্লাডি সোয়াইনস! আমরা নাকি ক্রিসকে মেরে ফেলেছি—কাঁদতে কাঁদতে অবিনাশকে জানালাম, কিন্তু আমার এখন কাঁদতে ভালো লাগছে না। একটু আগেই হাসি পেয়েছিল। আপাতত এখান থেকে বেরোতে হবে।
-মেয়েছেলে বলে বেশি কিছু করিনি। অন্য কেউ হলে—এর আগেও অনেকবার মদ কিনে নিয়ে গেছে। মেমসাহেব বলে পার পেয়ে যাবে নাকি?
অবিনাশ কোমরে হাত দিয়ে চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখছে। বাসুদেবের কথা ওর গ্রাহ্যে আনার দরকার নেই।
–নেহাত ওদের বাড়িতে অমন ঘটনা ঘটে গেছে, তাই থানায় যাচ্ছি না। নাহলে যে ক্ষতি আজ করেছে—চার-পাঁচটা বিলিতির বোতল ভেঙেছে—
আমি ওকে জেনিফার সম্পর্কে বললাম, যেটুকু জানি। তিনকুলে কেউ নেই এক ভাইঝি বাদে, তারও বছর পঁয়তাল্লিশ বয়েস হল। চাকর-বাকরের মতো খাটায়। রাতে ভূত নামায় জেনিফার। একটা ছোটো দল আছে ওর, বলে অকাল্ট চৰা করে। তনয়া অবাক স্বরে জিজ্ঞাসা করল যে, ওকে পছন্দ না-করলে বাড়িতে ডাকি কেন। কী করে বোঝাব ওকে, এগুলো পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারই নয়। আমরা জানি জেনিফার এটাই। মেরিলকে নিয়ে তনয়ার কাছে যা বলল, পরিষ্কার শুনেছি। আমি জানি, টমাসও শুনেছে। জানি, আমার পেছনেও আমার সম্বন্ধে বলে বেড়াবে। কিন্তু, যদি এটা না-করত, তাহলেই বরং অস্বাভাবিক লাগত। ও নিজেও জানে যে, আমরা এগুলো জানি। কিন্তু, তার পরেও ও বলে বেড়াবে আর আমাদের আড্ডায় আসবে। এগুলো তনয়া বুঝবে না। কিন্তু, ও জিজ্ঞাসা করল আমি সত্যিই ক্রিসকে দেখতে পাই কি না। এমন প্রশ্নের উত্তর হয় না।
এখন অনেক রাত, অতিথিরা বাড়ি চলে গেছে। বাবার দেরাজ থেকে চাবুক বেরিয়েছে বলে আমি আর এডওয়ার্ড স্টাডির আলমারির পেছনে লুকিয়ে। চাবুক সপাং আওয়াজ করলে আমার সেটাকে সাপের মতো লাগে। বাবা বাড়ি আর বাগান জুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। দোতলার জানালায় কি মা এখন দাঁড়িয়ে? সকালে এডওয়ার্ড বমি করছিল। মা ওকে ওষুধ খাওয়াচ্ছিল। বাইরের ঘরে রসে দাঁত চিপে বাবা বলল, দ্যাট হোর অ্যান্ড হার বাস্টার্ড। মা কেঁপে উঠল। কিন্তু, বাবার দিকে ফিরল না। কাঁদছিল। আমার কিন্তু দুঃখ হয়নি। তুই না কলেজে উঠবি, তাহলে বাবাকে ভয় পাস কেন এত? কিন্তু, আমি স্ স্ করে এডওয়ার্ডকে থামালাম, কারণ পায়ের শব্দ এবার আমাদের জানালার কাছে এগোচ্ছে। দাঁত ঘষা আর বিড়বিড় গালি কান পাতলে শুনতে পাব। বেডরুমের দরজা আধভেজানো। আমি জানি, মা কাঠের মতো বসে আছে বিছানায়। আমাদের কথা হয়তো মনেও নেই কারণ বাবা টলতে টলতে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে দেবে একটু বাদেই। মাত্র এটুকু সময়, দরজা বন্ধ হলেই আর ভয় নেই।
তনয়া আমার কাঁধে হাত রাখল, চোখ তুলে দেখলাম মুরগির ঘর লো হিট ল্যাম্পের হলুদ আলোয় ম্লান, ছানাদের দল পালকে মুন্ডু গুঁজে ঘুমোচ্ছে। ঘাড় নামিয়ে তনয়াকে উলের দুটো ঘর দেখালাম কারণ মনে হচ্ছিল আবার ছাড়িয়ে লম্বা বানাতে হবে। আমি যদি হ্যাঁ বলি, ও আমাকে পাগল ভাববে। তনয়া কুরুশ থামিয়ে চুপচাপ বসে থাকল অনেকক্ষণ। একসময়ে হাই তুলে ঘুমোতে গেল, কিন্তু সিঁড়ির মুখে উঠতে গিয়ে ফিরে এল বাইবেল চাইতে। ‘ঘুম আসে না, পড়ব। ধর্মের বই ভালো ঘুমপাড়ানি ওষুধ।’
‘চিরুনিটা আপনি দেখেছিলেন?' অক্ষয় প্রশ্ন করল।
“মানে?’
‘তনয়া যে চিরুনিটার কথা বললেন। যেটা পাওয়া গিয়েছিল ক্রিস নিখোঁজ হবার দিনে । আপনি দেখেছিলেন? কেমন দেখতে, মনে আছে?’
‘ভুলে গেছি। সাদা। মাঝে হাতির মুখ খোদাই। এটুকুই। চা খাবে আরেক কাপ? খাও
না! কেউ আসে না আমাদের বাড়ি। শুধু অ্যারন মাঝে মাঝে এসে থেকে যায়। তুমি যদি সন্ধে অবধি থাকো, তোমাকে ক্রিসের গল্প শোনাব। তুমি পারবে, ক্রিসকে খুঁজে বার করতে?' ‘আমি কাল অবিনাশ যাদবের বাড়ি গিয়েছিলাম। তাঁর বক্তব্য শুনেছি।' চা খেতে খেতে নিবিষ্টমনে শুনছিল অক্ষয়। এবার প্রশ্ন করল। ‘প্রমিসড ল্যান্ডে নেটিভ বনাম মূলনিবাসী বনাম অ্যাংলো, এই সমীকরণ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?'
‘মূলনিবাসীদের ওপর সবার রাগ কারণ সরকার থেকে তাদের জমিজির দিয়েছে, চাকরিতে অনেক কোটা। তুমি নিজেও তো তাই, আমাকে দিয়ে এসব বলাচ্ছ কেন?” ‘আপনাদের কমিউনিটি? তারা কী ভাবে?
‘হু কেয়ারস! কী যেন বলে, জীবনের উদ্দেশ্য সবার প্রতি সহনশীল হওয়া, সেটাই হবার চেষ্টা করছি আজকাল। অ্যাংলো ট্রাইবাল মাতাল প্রতিবন্ধী সবাইকে ক্ষমার চোখে দেখি।' অক্ষয় আবার হাসে। কথায় কথায় হাসে ছেলেটা, অ্যালান রোজারিওর মতো। চায়ে চিনি খায় না, নাকি ডায়াবেটিস। মাত্র একান্ন পুরেছে, নিজেই জানাল। কথায় কথায় বলল, মেয়ে রাঁচির লোরেটো কনভেন্টে পড়ে। বউ কাজ করে রেডিয়োতে। মনীষার ইচ্ছে ছিল, ক্রিস বড়ো হলে তাকে সেন্ট জেভিয়ার্সে দেবে। টাউনের সবাই বলে, আমরা ক্রিসকে মেরে ফেলেছি। আর আমাদের কে মেরেছে?’ ‘এই প্রশ্নগুলো কেন করছ? প্রথমে চিরুনি, তারপর এসব। তোমার কেসের সঙ্গে কী সম্পর্ক? '
অবিনাশ সময় নিল চারপাশ জরিপ করতে। আমাকে ধরে বাইরে বার করল তারপর।— ওদের টাকা মিটিয়ে দিতে যেন না ভোলে, ফেরার সময়ে অবিনাশকে মনে করালাম। স্মার্ট, তাজা জোয়ান ও, কিন্তু এত বোকা— আমার হাতে কাজ নেই তাই গোটা রাস্তা কাঁদলাম, এত অ্যাংলো পুলিশ থাকতে একজন দেহাতিকে কেসের ভার দিল? জাতভাইদের ছেড়ে দিল, আমাদের ফ্যামিলি সবার কাছে হাসির খোরাক হয়ে উঠল। অবিনাশ নির্বিকার মুখে জিপ চালাচ্ছে। ও পুলিশ, এসবে কিছু এসে যায় না।
‘আমি একটা পার্সপেকটিভ চাইছি। এখানকার জীবন, সমাজ, সংকট। এই কেসের সঙ্গে এগুলো জড়িয়ে। হয়তো আপনাদের এমন বিপর্যস্ত সময়ে এত কথা বলানোটা ঠিক হচ্ছে না, কিন্তু যেহেতু আমি বাইরের মানুষ, তাই এরকম গল্প আমার নিজের বোঝার জন্য কাজে লাগে।' আমি নিশ্বাস ফেললাম। আমাদের বিপর্যস্ত সময় তেত্রিশ বছর আগে শুরু হয়েছে। আজ নতুন করে কী ই-বা ঘটবে! ‘তনয়া দুটো খটকার কথা বলেছিলেন। দ্বিতীয়টা কী?’
‘গুড ওয়ার্কস, বারবারা? গুড ওয়ার্কস?’
‘মানে?’
‘রেভারেন্ড পরিতোষ গরম্যান দু-বার বলেছেন, দিজ নেগেটস অল গুড ওয়ার্কস। দ্বিতীয়বার বলেছেন, তাঁর পাপের ক্ষমা যেন না হয় এর জন্য। আর একবার জানিয়েছেন যে, তাঁর পাপে তিনটে জীবন শেষ হল। সেই তিনজন কারা? কারা কী পাপ করেছিল? এই কথাটাই-বা উঠল কেন?”
‘এর উত্তর কি তুমি পাওনি? রেভারেন্ড ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ক্রিস, এডওয়ার্ড ও মনীষা, তিনজনের জীবন বিধ্বস্ত হল তাঁর ঘুমের কারণে, কারণ তাঁর জিম্মায় ছিল ক্রিস এবং তিনি অবহেলা করেছেন। অবশ্যই সেটা ভালো কাজ ছিল না।’
তনয়া হাসল, ‘তুমি যতই চার্চে যাও না কেন, ধর্মকর্মে মন নেই একদম।'
‘বাজে কথা যত! কী বলতে চাইছ?’
আজ ভেবেছিলাম এডওয়ার্ডকে নিয়ে দোলনায় দোল খাইয়ে ঘুম পাড়াব, কারণ এখন আমি বড়ো হয়ে গেছি, ওকে সামলাতে পারি। কিন্তু, হিল্ডা-ও আমাকে বলেছিল তিতিরকান্নার মাঠের ওপর হরিয়ালের ঝাঁক নেমে আসে বিকেল বেলা, আমাকে দেখাবে। আমি ওকে চুমু খেলাম কারণ সূর্য নেমে আসছিল মাথার ওপর। হলুদ ছায়া আমাদের ঘিরে ধরছিল। আমি কি এখন রামদাসকাকার হাতে কামড়ে দেব? কিন্তু, বাবা প্রচণ্ড মারবে।
‘বারবারা, আমি ক্যাথলিক কনভেন্টে পড়াশোনা করেছি। সেখানে বাইবেলের ক্লাস করতে হয়েছিল বাধ্য হয়ে। কাল শুনে কানে লেগেছিল তাই। তারপর গুগল করলাম। বেথেল মিশন অ্যাংলিকান চার্চের সেই অংশটার প্রতিনিধি যারা প্রোটেস্টান্ট সংস্কারের পাঁচটা মন্ত্রকে কট্টর মেনে চলে। সোলা স্ক্রিপচুরা, সোলা ফাইদ, সোলা গ্রাসিয়া, সোলাস ক্রিস্তাস আর সোলি দেও গ্লোরিয়া। রেভারেন্ড যখন গুড ওয়ার্কসের কথা বললেন, সেটার মানে ভালো কাজ নয়। সেন্ট পল বর্ণিত ওয়ার্কস অফ ল, যা মানুষকে পাপমুক্ত করে। কিন্তু, সেটা ক্যাথলিক চিন্তা। তার বিপরীতে প্রোটেস্টান্টিজমের পাঁচটা মন্ত্রের দ্বিতীয়টা, সোলা ফাইদ, তার মানে হচ্ছে জাস্টিফিকেশন বাই ফেইথ অ্যালোন। শুধুমাত্র ঈশ্বরে বিশ্বাসই মানুষকে স্যালভেশন দেয়, তার জন্য গুড ওয়ার্কসের দরকার নেই। বেথেল মিশন ১৫৭১ সালে প্রকাশিত থার্টি নাইন আর্টিকলস অফ রিলিজিয়ন, যা চার্চ অফ ইংল্যান্ডের মূলমন্ত্র, তার অনুগামী। এই দেখো, ওয়েবসাইটে আছে।' তনয়া ফোন বাড়াল। ‘We are accounted righteous before God, only for the merit of our Lord and Savior Jesus Christ by faith and not for our work or deservings। এগারো নম্বর অনুশাসন।'
বাবা ঘরে ঢুকে যাবার পরে এডওয়ার্ড বড়ো নিশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে হি-হি হাসল— তুই কি ভীতু রে, বার্বি! এত বড়ো হয়ে গেছিস, তাও লুকিয়ে থাকিস। —চুপ কর, তুই লুকোলি কেন?
দেখ— —আমি ছোটো না? বাবা তোকে বেশি ভালোবাসে, তাই কম মারে, আর আমাকে
–হুঁ, তোর মনে নেই, সেই যেবার আটকে রাখল, তখন তোর দু-বছর বয়েস। এডওয়ার্ডের কবজির দিকে আমি তাকাব না। চোখ ঘুরিয়ে নিলাম। শেষবারেরটা ঘটেছিল একমাস আগে, এডওয়ার্ড যেবার বাবার এয়ারগান ভাঙল। জায়গাটা শুকিয়ে গেছে। ওর বিছানায় হিসি করাও বন্ধ হয়েছে। জোজোর কথা ভুলে গেছে ও। বাইরে ঘুরঘুট্টে অন্ধকার। ফেলু ধোপার দলবল দূর বস্তিতে ঢোল বাজাচ্ছে, অল্প হাওয়া দিচ্ছে বলে আওয়াজটা বেশ পরিষ্কার। স্টাডির টেবিলে হেলান দিয়ে এডওয়ার্ডের দিকে তাকালাম— তোর মনে আছে, দোদোর কথা? তোকে কোলে নিয়ে ঘুরত। তুই বুকের ওপরেই ঘুমিয়ে পড়তিস।
-দোদোর একমুখ সাদা দাড়ি ছিল, না রে? আমার ওটুকু মনে আছে। ফ্রুটকেক খাওয়াত আমাকে, ওই গন্ধটা—
–তোর পায়ের আঙুলগুলো ফুলো ফুলো গোলাপি ছিল। বাবা বলত, ভাল্লুকের আঙুল। কাঁঠালগাছের ছায়া এঁকেবেঁকে আমাদের ঘরে ঢুকে পড়েছে, থিরথির কাঁপছে। —আজ এখানেই ঘুমিয়ে পড়বি? কী সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে, দেখ!
–না, তারপর ভোরবেলা বাবা দেখলেই হয়েছে আর কি!
—তুই আমার থেকে ভীতু বেশি, কলেজে উঠবি তবু কত ভয় তোর! মারলে লাগে না জানিস, পিঠটাকে শক্ত করে নিতে হয়।
‘রেভারেন্ড থিয়োলজির শিক্ষক, তিনি তো জানেন যে গুড ওয়ার্কস হোক অথবা নাহোক, তাঁর পাপের ক্ষমা পাবার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। এটা সাধারণ মানুষ বললে আমার কানে লাগত না; কিন্তু, রেভারেন্ড কেন ক্যাথলিকদের ভাষ্য বলবেন, যিনি নিজে প্রোটেস্টান্টিজমের পাঁচটা মন্ত্রকে মেনে চলেন? কেন তিনি ভাববেন যে, তাঁর কাজের ফলে স্যালভেশন ঘটবে না? নাকি, তিনি অন্য কোনোদিকে ইঙ্গিত করছেন?' তনয়া অস্থিরভাবে বারান্দাজুড়ে হাঁটতে শুরু করল। ‘রেভারেন্ড যদি বলতেন তাঁর দোষে এই ঘটনা ঘটল, বুঝতে অসুবিধে হত না। কে পাপ করেছে? কেউ তো না। আর, গুড ওয়ার্কসের কথা রেভারেন্ড প্রথম বলেছেন ক্রিস হারিয়ে যাবার সন্ধেবেলায়। তখনও পুলিশ তদন্ত আরম্ভ করেনি। তার আগে রেভারেন্ড কীভাবে ধরে নিচ্ছেন যে, ক্রিসকে আর পাওয়া যাবে না এবং তার বাবা-মায়ের জীবন শেষ হয়ে যাবে?' কিন্তু, আমি বা তনয়া আর কী বুঝব এসবেরআমাদের সন্তান নেই। নিজের সন্তানের জীবন বিপর্যস্ত হতে দেখলে মানুষের মাথার ঠিক থাকে?
অক্ষয় আমাদের গঞ্জকে চেনে না। আমাদের গঞ্জ এক ঘুমিয়ে পড়া টাউন, যেখানে কুড়ি ঘর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মাত্র, আর বাকিরা স্থানীয় মানুষ, নয়তো কলকাতার বাঙালি কিছু। কটেজগুলো হয় পরিত্যক্ত, নয়তো বিক্রি হয়ে গেছে, অথবা নয়তো দখল। সবাই একে একে ছেড়ে চলে গেল। আমাদের অধিকার করল উপকথা, স্মৃতি ও রহস্যময় ফিসফাসের দল। শীতের থকথকে কুয়াশা ক্লান্তির মতো, আমাদের ভাঙা রাস্তা, ঘুপচি দোকানঘরের অন্ধ চোখ, পিয়ালের জঙ্গল, ভিখিরিদলের কাঁচা কাঠের আগুনের ওম, জবুথবু বালিকার পিঠে বাঁশের ঝুরিভরতি হিমবর্ণ মুলো, দিনের একটা ট্রেন, অকস্মাৎ গাঁজার গন্ধের ঝিম মৌতাত মিশে যায় অবৈধ ইটভাটার ধোঁয়ার সঙ্গে, দীর্ঘশ্বাসের মতো আমাদের অভ্যন্তরে চারিয়ে ওঠে। এখানে সবাই সবাইকে চেনে, অঢেল অবসর, আমরা সেগুলোর ফাঁকফোকর ভরিয়ে তুলি গল্পে। কর্নওয়ালিসের গল্প। অবৈধ সন্তানের প্রতি পিতার বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। পাহাড়ের গল্প। অরণ্যের গল্প। জোহার হালে-র গল্প।
ক্রিসের গল্প।
নয়। অক্ষয় বুঝবে না। অ্যাংলোদের কেউ পছন্দ করে না। মোটা অ্যাংলো বুড়িদের আরওই
‘নাহ্, সাধারণ মানুষ আর একজন প্র্যাকটিসিং থিয়োলজিস্ট যিনি তাঁর বাইবেল জানেন, তাঁরা সমান না। দ্বিতীয়জনের পুরো জীবন এটাই। তিনি হাজার বিপর্যয়েও নিজের বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে কথা বলবেন না।'
‘শোনো, হতেই পারে রেভারেন্ড সন্দেহজনক আচরণ করেছেন। ক্রিশ্চান পাদরি যখন, তার ওপর গায়ে অ্যাংলো রক্ত, ফলত খারাপ কাজ করা স্বাভাবিক। কিন্তু, খারাপ কাজ এভাবে করবার ধাত তাঁর ছিল না। ক্ষতি করতে হলে তিনি কারোর কানে মন্ত্রণা দিয়ে, তাকে ব্রেনওয়াশ করে ড্যামেজ করতেন, কিন্তু নিজের হাত নোংরা করতেন না। এক-একটা মানুষের ধরন এক-এক রকমের হয়।'
‘কিন্তু, কাউকে তোমার সন্দেহ হয়েছিল।' তনয়া চোখ সরু করল। একটা কাঠপোকা ক্রির ক্রির শব্দে ডেকে চলেছিল। এইসময়ে পেছনের পোড়োমাঠে গেলে পা টেনে টেনে চলা অনেক ছায়াদের দেখা যাবে। কাছে গেলে দেখবে কেউ নেই সব ভোঁ-ভাঁ। ওরা দুপুরে জলাভূমির ধার ঘেঁষে ঘুরে বেড়ায় আর বিকেলে ঘুমোতে যায় জোহার হালে-তে। আমার মনে পড়ল, অ্যাগনেসের ভূতকে এক দুপুর বেলা দূর জঙ্গলে দেখে বাবা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তারপর আমরা যখন মুখে জলের ছিটে দিয়ে চেতনা ফেরালাম, বাবা বিড়বিড় করেছিল ‘আছে হাওয়া, আছে রোদ, আছে নীল আকাশের নীচে মর্মর পৃথিবী—যা করুণায় আচ্ছন্ন রাখে আমাদের দুঃখশোক।' বাবার চোখ থেকে জল গড়াচ্ছিল। দোমড়াচ্ছিল শরীর। এমন কথা শুনব আমরা ভাবিনি। বাবা চোখ খুলে বলেছিল করুণা, দুঃখশোক বলেছিল, তারপর বুড়ো হয়ে গেল। তখনও ক্রিস হারিয়ে যায়নি। বাবা কি দেখেছিল, আলোর ফোঁটার মতো শরীরের চারধারে ঝরে পড়া ঈশ্বরের অনাবিল নিরাময়, অ্যাগনেসের ভূতকে আমাদের টাউন যেভাবে জেনে এসেছে?
‘আমার সন্দেহ হয়েছিল তো। এডওয়ার্ডকে। ও এটা করতে পারে, নিজে না হলেও লোক লাগিয়ে।' তনয়া কি অবাক হল? ‘বাবা,' বলল মৃদুস্বরে। বোগাস! বাবা যেন নিজের সন্তানকে অপরহরণ করে না! মোটিভও ছিল এডওয়ার্ডের। ও নিজের ব্যাবসা শুরু করেছিল। ধার হয়েছিল অনেক জায়গায়। আমি জানি, ওর একলপ্তে অনেক টাকা দরকার ছিল। মুক্তিপণ চাইলে বাবা সঙ্গেসঙ্গে দিয়ে দিত। আমি অপেক্ষা করছিলাম কবে মুক্তিপণ চেয়ে ফোন আসে। কিন্তু যখন এল না, বুঝলাম এডওয়ার্ড করেনি। তনয়া হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। ‘আরে ব্লাডি আমাদের বয়েস হয়েছে অনেক। সন্তানের মাথার চুলের বদলে টাকার বান্ডিলে নাক ডোবালে কখনো কখনো গন্ধ বেশি সুন্দর লাগে, আমরা জানি।'
‘তোমার হৃদয়, বারবারা—' তনয়া হাসতে শুরু করল।
‘আমার হৃদয়, কী?’
‘প্রাক্তন প্রেমিকের চুমুর থেকেও শীতল।' কিন্তু ও সত্যিই ইন্টারেস্টেড এটার ভেতর ঢুকতে? আমি বাধা দেব না, কারণ আমিই তো ওকে বলেছি, তবে সাবধান করে দেব। এই একটা কেস শুধু আমাদের জীবনকেই বিপর্যস্ত করেছে এমন না। অবিনাশ নিজের মুখে জানিয়েছে তার কী অবস্থা হয়েছে। আগামী সাত কি দশদিনে ও যদি সমাধান খুঁজে না-পায়, তারপর? নিজেকে সামলাতে পারবে তো? ক্রিসের অন্তর্ধান রহস্য বিষের মতো, যে স্পৰ্শ করেছে তার জীবন আর একরকম থাকেনি। তবু, তনয়া যেন এ সতর্কবাণী কানে না-তোলে।
জোজো পালিয়ে যাবার পর থেকে এডওয়ার্ড চুপচাপ হয়ে গেছে। হাতের তালু মেলে তাকিয়ে থাকে। গোনে, কতগুলো হল। শেষ ফোসকাটা কিছুতেই শুকোচ্ছে না। দগদগ করছে জায়গাটা। আমাদের বাগানে কাঁঠাল গাছে ম-ম করছে গন্ধ, বোলতার দল ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসে। এডওয়ার্ড গাছের নীচে বসে থাকে দুপুর বেলা। ছায়ার ভেতর থেকে টলটলে মুখ উঁকি মারে ওর।
‘আমার হৃদয়ও কি হিমশীতল নয়?’
‘কিন্তু, কেন চাও? এটা জানা দরকার, যেহেতু নিজে বার বার বলেছ রহস্য সমাধান তোমার কাজ নয়।'
‘ধরে নাও, টাইমপাস।'
দোলনায় লাথি মেরে উঠে দাঁড়ালাম আমি। কান গরম হচ্ছে। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে নিজেকে বললাম, অচেনা একটা পুঁচকে মেয়ের সামনে ধৈর্য হারাব না। ‘হাউ ডেয়ার ইউ! ক্রিস তোমার টাইমপাস, ভাবলে কী করে!'
তনয়া স্থিরচোখে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে বলল, ‘যে বাচ্চাটাকে নিয়ে তুমি আজও এত সংবেদনশীল, তার পরিণাম জানতে কি তুমি ভয় পাবে? অ্যারন আমাকে বলেছে, তুমি আসলে জানতে চাও না।'
‘কী এসে যায় তোমার? ড্যাম ইউ!’
‘তোমার এই রাগটা দেখতে চেয়েছিলাম বারবারা, দেখতে চেয়েছিলাম—' কী দেখতে চেয়েছিল ও? আমরা ওর গিনিপিগ কিনা? ‘দেখতে চেয়েছিলাম তোমার হৃদয়ে উত্তাপ আছে কি না।'
‘দেখে তোমার লাভ?'
‘সেটুকু উত্তাপ আর একবার, শেষবারের মতো দাও। একটা শিশুর জন্যে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আর কী তুমি করতে পারো, বারবারা?'
এবার সত্যিই চোখে জল এল। অবাক হলাম, বিরক্তও। আমি কি শেষে মদ না-খেয়েই ন্যাকা হয়ে যাচ্ছি? মুখ ফিরিয়ে নিজেকে সংযত করলাম, কিন্তু গলা কেঁপে গেল। ‘কেন চাইছ তুমি? নিজেই তো বলেছিলে উৎসাহী নও। টাইমপাস, সত্যিই?'
এডওয়ার্ড চাইলেও আমি পারব না। কোথায় পালাব? ও বোকা, তাই ভাবে বাবাকে ফাঁকি দিতে পারবে।
—খবরদার এমন কথা ভাবিস না কিন্তু, বাবাকে বলে দেব।
–তাহলে আমি লুকিয়ে পড়ব, দেখিস।
-কোথায় লুকোবি?
-কেন? ওই তো জলাভূমি, ওখানে সবাই লুকিয়ে থাকে।
-ভূতেরা থাকে ওখানে, তুই ভূত দেখতে চাস? এডওয়ার্ড ঢোক গিলল।
—তাহলে অন্য কোথাও চল। বম্বে চল। ওখানে রাজেশ খান্না থাকে।
—এডওয়ার্ড, আমার কথা শোন। আমি ওর সামনে বসলাম, কিন্তু আমার কান্না পাচ্ছে। ‘না। সত্যিই না। কিন্তু, আমি আমার জগতে ব্যাখ্যাহীনতা অপছন্দ করি। যে কেসের মীমাংসা হয় না, সেটার কেন মীমাংসা হল না, তার ব্যাখ্যা আমার কাছে থাকে। যখন প্রশ্নের উত্তর পাই না, কেন পেলাম না সেটুকু জানা থাকলেও আমি সন্তুষ্ট। কিন্তু, এখানে জানা নেই। আমি আজ সারাদিন ধরে ভেবেছি, কেন এই কেসের সমাধান হল না। কিন্তু, ওই দুটো জায়গায় এসে আটকে যাচ্ছি। চিরুনির মতো অদ্ভুত একটা জিনিস যা আমাকে ট্রিগার করছে কেন জানি না, আর গুড ওয়ার্কস।'
একটা অন্ধকার ঘর, ড্রাম, দড়িদড়া ছড়ানো, স্যাঁৎসেঁতে, সাপ বেরোবে এবার, ওদের বড়ো বড়ো দাঁত থাকে, রাগে চোখ জ্বলে ওদের- এডওয়ার্ডের ঠোঁটের কোনায় কালশিটে।
—তুই তো বড়ো হয়ে গেছিস, বল? আট বছর কম বয়েস না।
—সেজন্যেই তো চলে যাব। তোকেও নিয়ে যাব।
–শোন না, বাবা যেমন সংসারের দায়িত্ব সামলায়, তোকেও তো এরপর থেকে সামলাতে হবে। আমাকে, মা-কে দেখে রাখতে হবে। এডওয়ার্ড ভুরু কুঁচকে ভাবল। সব ছেলেরাই খুশি হয় কেমন, ওদের যদি মনে করিয়ে দিই যে ওরা ছেলে।
—তুই বম্বে পালালে আমাদের কে দেখবে? এডওয়ার্ড খুব কঠিন চিন্তা করছে।
‘আমি জানি না। আমার এত শক্তি নেই, সত্যিই।' ফিসফিস করে বললাম আমি। ‘নেই, তবু ক্রিসকে তুমি জলাভূমিতে দেখতে পাও, বনের ধারে দেখতে পাও, রাত্রে মাঠে বসে তার জন্য কাঁদো। আমরা কি শেষবার, ধরে নাও শেষবারই, আমি আর তুমি, চেষ্টা করে দেখব? সাহায্য করবে তুমি আমাকে?”
এই প্রথম কেউ এমনভাবে বলছে, যার চাওয়ায় হুজুগ ছিল না, অথবা ডিটেকটিভ সাজার খেলা। তবু উত্তর দিতে অনেকটা সময় নিলাম। তনয়া নির্নিমেষে তাকিয়ে আমার দিকে। সে-দৃষ্টির অর্থ বোঝার সাধ্য আমার ছিল না। প্রত্যাশা, আকুলতা অথবা ব্যগ্রতা নয়, একমাত্র কাছাকাছি অর্থ হতে পারে, অপেক্ষা। তার জন্য এক-একটা মুহূর্তকে অনন্তকাল বানিয়ে তাদের ভেতর সে দাঁড়িয়ে থাকতে রাজি।
অনন্তকাল পরে আমি উত্তর দিলাম, ‘করব।’

যদি কেহ মনে করে, সে কিছু জানে, তবে যেরূপ জানিতে হয়, তদ্রূপ এখনও জানে না ;
- 1 Corinthians । 8:2
‘ও বলেছিল, সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবে। আমি দরজা খুলেছিলাম আবার, আর ও ঢুকে এসেছিল।'
‘কিন্তু, তারপর—’ নিজের মনে অক্ষয় মাথা নাড়ল। আমি বুঝিনি, ওর আক্ষেপ হচ্ছে কি না।
‘তারপর আমরা একে একে সবাইকে প্রশ্ন করেছিলাম। আমি তনয়াকে ক্রিসের ঘর খুলে দেখিয়েছিলাম। বহুকাল পর সেখানে আমি ঢুকেছিলাম, যখন হা-হা শূন্যতা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে মনে হয়েছিল। অ্যারন বাইরে দাঁড়িয়ে তখন মদ খাচ্ছিল। ওই সময়টায় ও সারাদিন মদ খেত।'
অ্যারন আজকাল স্যাংচুয়ারিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়। লালুরামের পাশে বসে থাকে, আবার কখনো মাঠের বুক চিরে হেঁটে অনেক দূর চলে যায়। ফিরে আসে ধুলোমাখা পায়ে, ক্লান্ত লাল চোখ তখন ওর। সন্ধেবেলা পুনমের কিচেনে যায়। এটা- ওটা রান্নার নতুন পদ দেখায়। সরষেবাটা দিয়ে গ্রিলড ব্রকোলির একটা দারুণ ডিশ বানিয়েছে গতকাল। ও কি এখানেই থেকে যাবে? কয়েক দিন আগে আমাকে বলেছিল, ‘আমরা এমন কেউ যাদের হওয়াই উচিত ছিল না।' ওকে আমি বলতে পারিনি যে, শুধু মরে যাওয়াটা কোনো ব্যাপার ছিল না আমার কাছে কারণ আমরা কেউ সত্যিই বেঁচে নেই। ওর চোখের তলায় কালি জমেছে। ছোটোবেলায় আমার কোল থেকে নামতে চাইত না যখনই আসত রাঁচি থেকে। আমি ওকে ইশপের গল্প শোনাতাম। অবাক অ্যারনের হাঁ-ঠোঁট থেকে লালা গড়িয়ে নামত রামদাসকাকাকে লাথি মারলাম, উফ করে হাত আলগা করল।
-দেখেছেন দাদা, কী জোর হয়েছে?
বাবা লাল চোখে তাকাল— বেয়াড়াপনা আজকেই ঘোচাচ্ছি।
কয়েক দিন আগে বিকেল বেলা অ্যারন আমার সঙ্গে বেথেল মিশন চার্চে গেল, কারণ বহুদিন পরে মাস হচ্ছিল। অন্য যারা গিয়েছিল, আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল না, কিন্তু নিজেদের ভেতর ফিসফিস করছিল। আমি পিঠ দিয়ে দেখছিলাম, অনেক চোখ, ওরা আমাদের বলছে শয়তানের বাড়ি, নরক— সেদিন বসন্তের একটানা হাওয়া আমাদের সমবেত চাপাকান্নার গায়ে মলম বোলাচ্ছিল। আমি শুনলাম, ‘আমাদের পাপের ক্ষমা আর শরীরের পুনরুত্থান। আমেন।' রেভারেন্ড গরম্যান অলটারের সামনে অনেকক্ষণ ঝুঁকে ছিলেন। তাঁর জীর্ণ শরীরকে হয়তো টানতে চাইছিলেন না। ক্লান্তচোখ আকাশে রেখে যদি বলতেন ‘হায় প্রভু’, তবু মানে দাঁড়াত। কিন্তু তার বদলে, পাপের ক্ষমা। রেভারেন্ড আজকাল কিছু মনে রাখতে না-পেরে অলটারের সামনে ঝুঁকে থাকেন, বৃদ্ধ মোমবাতি যেমন। অ্যারন দুই হাতে মাথার ভর দিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। ও সারাক্ষণ চিন্তা করে কিন্তু তাদের ভাগ কাউকে দেয় না।
জোরে শ্বাস টেনে মনীষা বলল, ‘অনেকবার বলেছি। তবু, জানতে চাইছেন যখনসেদিন আমি ফোন রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় বাইরে থেকে হুড়কো লাগিয়ে দিই । দরজা খোলা রাখলে যখন-তখন নির্মলা দুবে ঢুকে আসত, প্রিভেসির বালাই ছিল না তার। আমার পছন্দ হত না। তাই আমি বাইরে থেকে হুড়কো লাগাতাম ওকে দেখিয়ে, যেন দরজা খোলার আগে আমাকে জিজ্ঞাসা করে। তারপর নীচে নেমে দেখি বাবা ঘুমোচ্ছে। বাবাকে জাগাই, জিজ্ঞাসা করি নির্মলা কোথায় গেল। বাবা বলে ভাইকে টাকা দিতে গেছে। মিনিট পাঁচেক পর আমি সময় দেখি, আর নির্মলার ওপর রাগ হয়। বাবাকে বলেছিলাম, ও ফিরলে কড়া করে বলব। ক্রিসের খাবার আনতে রান্নাঘরে যাই, ওখানে বেবিফুড ছিল। বাটিতে ঢেলে রাঁধুনিকে বলি, জল গরম করে যেন মেশায়। তারপর আমি নীচের টয়লেটে গিয়েছিলাম। বেরিয়ে দেখি, কাউচের সামনে রাঁধুনি আর বাবা দাঁড়িয়ে। তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করছে ক্রিস কোথায়। আমি উত্তর দিয়েছিলাম, বেশ মনে আছে, হয়তো বারবারা বা আমার শাশুড়ির ঘরে। গলা তুলে কয়েক বার ক্রিসকে ডাকাডাকি করে তারপর নীচে শাশুড়ির ঘরে টোকা দিই। উত্তর আসে না। দরজা অল্প ফাঁক করে দেখি মাটিতে বসা পেলজম খাটে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে। আমার শাশুড়ি খাটে বাবু হয়ে বসে খাটের মাথায় যে ছোট্ট অলটার সেখানে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছেন, ভঙ্গিটা কুঁজোমানুষের মতো চোখ বুলিয়ে ঘরে ক্রিসকে পেলাম না। ওপরে উঠে দরজা ধাক্কাই। বারবারা দরজা খুললে তাকে জিজ্ঞাসা করি। সে বলে, ঘর থেকে বেরোয়নি। তবু আমি অভ্যেসবশত ঘরের ভেতর চোখ চালিয়েছিলাম। ক্রিস নেই। তখন আমার মনে হয় নির্মলা ফিরে হয়তো ক্রিসের ঘরে ঢুকেছে। কিন্তু, ক্রিসের ঘর শূন্য ছিল। তারপর দোতলার একটা স্পেয়ার ঘর, যেটা গুদোম হিসেবে ব্যবহার হত, সেখানে গিয়েও পেলাম না। নীচে নেমে একতলার অন্য ঘরগুলো দেখলাম। বাবা ও রাঁধুনি ততক্ষণে বাইরে বেরিয়েছে, যদি বাগানে ক্রিস বেরিয়ে যায়। সেসব জায়গা খোঁজার পর তারা দারোয়ানের ঘরে ঢুকেও দেখে নিয়েছে। আমি যখন বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছি, তখন বাবা আসছে দারোয়ানের ঘর থেকে, তার পেছনে দারোয়ান আর মালি। রাঁধুনি তখন দৌড়ে দৌড়ে বাড়িটা একপাক ঘুরে এসে জানান দিচ্ছে, বাচ্চাকে পাওয়া যাচ্ছে না। দৃশ্যটা ছবির মতো গেঁথে আছে মনে। বাবা তারপর বলল এডওয়ার্ডকে ফোন করতে। দারোয়ান ও মালি বাড়ির মেইন গেট খুলে বাইরে বেরোল, যদি কেউ কিছু দেখে থাকে। আমি তখন ওপরে উঠেছি কারণ ফোন করার পর কর্ডলেস নিজের ঘরে রেখে এসেছিলাম। দরজা খুলে কর্ডলেস নিয়ে বেরোই, আবার দরজা লাগিয়ে ফোন করতে করতে নীচে নামি। তখন আমার হাত-পা কাঁপছে, তবু মাথা ঠান্ডা ছিল। নীচে নেমে ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে দেখি, নির্মলা দুবে ঢুকছে। সেই প্রথম আই লস্ট ইট। চিৎকার করে তার দিকে দৌড়ে যাই এবং গালাগালি দিই, বলি তাকে পুলিশে দেব। এ-ও বলি, তার জন্য ক্রিসকে আজ পাওয়া যাচ্ছে না। নির্মলা ভয়ে থরথর করছিল, তার মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল, চোখে জল। বাবা ও দারোয়ান আমাকে সামলাচ্ছিল। আমাকে ধরে ড্রয়িং রুমে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বারবারা আমাকে তারপর থেকে জড়িয়ে বসে ছিল। অনেক লোক ঘুরছিল আশপাশে, এডওয়ার্ড ও তার বাবা এসেছিল, তারপরে পুলিশ, কিন্তু কখন কী ঘটেছিল তারপর থেকে আমার মাথায় ছিল না।'
ঘরটাকে বাতিল-ঘর হিসেবে ব্যবহার করি আমরা। বাগানের একধারে। হোটেলের বাতিল জিনিসপত্র থাকে। অনেক ড্রাম, দড়িদড়া, উঁচু টুল, মই, প্যাকিং বাক্স, আরও কী কী—দরজাটা অবশ্য ভারী কাঠের, বন্ধ করলে বাইরে থেকে আলো ঢোকে না। আমার একবার মনে হল, পেছনে দাঁড়িয়ে মা গুনগুন করে কাঁদছিল, যখন আমাকে ঘরে ঢোকানো হচ্ছিল। কিন্তু, মা এখনই আবার অলটারে মাথা কুটবে, ফুঁপিয়ে কাঁদবে, ঘুমিয়ে পড়বে তারপর।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মনীষা যোগ করল, ‘আসলে এতবার নানারকম জেরায় আমাকে এগুলো বলতে হয়েছে যে, মুখস্থ হয়ে গেছে। চাইলেই সেইদিনের সমস্ত ঘটনা, বাগান থেকে ড্রয়িং রুমে ফিরে আসার আগে পর্যন্ত, ছবির মতো দেখতে পাই। মনে হয় আধঘণ্টা আগের ঘটনা।' সেদিন চরম বিশৃঙ্খলা চলছিল। যে পারছে, ভেতরে ঢুকে পড়ছে। চিৎকার, চেঁচামেচি। আমার মনে আছে ওই হট্টগোল। ওই টেনশনে এমনিই মাথার ঠিক থাকে না। আগের দিন অবিনাশ গল্প করল যেরকম- -ওরা যখন পেছনের বাগানের গেট খুলে তালা পরীক্ষা করছে, বাড়ির জানালা থেকে কে যেন চিৎকার করে বলল, ‘সামওয়ান ইজ ক্রসিং দ্য ফ্রন্ট গেট।' সঙ্গেসঙ্গে সব ফেলে সবাই ছুটল সেদিকে। এদিকে কে যে বলল, সেটাই আর খুঁজে পাওয়া গেল না। নির্মলা বলেছিল, গলাটা মনীষার। সেই কয়েকটা ঘণ্টার মুহূর্তগুলো যেন একসঙ্গে জট পাকিয়েছে। কোনটা কখন ঘটেছে কিছুতেই আলাদা করা যায় না। ‘নাহ্, আমি তো তখন ড্রয়িং রুমে বসে। আমিও চিৎকারটা শুনেছি, ভেবেছি তুমি চেঁচিয়েছ।' মনীষা বলল আমাকে। কিন্তু, আমিই কি? হতেও পারে। তখন যা চলছে, মাথা ঠিক রাখা মুশকিল। কোথায় যাচ্ছি, কাকে কী বলছি, নিজেরই মনে নেই। ‘অবিনাশ যাদব বলেছিলেন, দোতলার একটা অন্ধকার জানালায় দাঁড়িয়ে কেউ একজন চেঁচিয়েছিল। তিনি মুখ তুলে একটা ছায়ামুর্তির বেশি কিছু দেখেননি। বারবারাই হবে হয়তো।' মনে পড়ল, তারপরেই আরেকটা তীব্র চিৎকার। নির্মলা দুবে আর্তনাদ করে অজ্ঞান হয়ে গেল।
গুদামঘরটার ভেতরে ভ্যাপসা গরম লাগার কথা, কিন্তু কেমন স্যাঁৎসেঁতে। মাটি ভেজা। পচা চামড়ার গন্ধ। মাটির এখানে-ওখানে ফুটো ছিল, কেঁচোর দল মুখে মাটি তুলে আনত। কাঠি দিয়ে কেঁচো, নাকি কেন্নো, কী জানি বাবা, একবার ছুঁয়ে দিলে গুটলি পাকায় কেমন। সেগুলোকে কাঠিতে তুলে এনে গোল পাক করে আকাশে ছুড়ে দেওয়া যায়. ভাসতে ভাসতে নেমে আসবে, কিলবিলে শরীরটা টান করে দেবে। কিন্তু আজ ভয় লাগছে। একসময়ে অনেক কেন্নোর ওপর অত্যাচার করেছি এভাবে। যদি এখন শোধ নেয়? পা বেয়ে উঠে আসে কিলবিল করে, তারপর আমার প্যান্টের ভেতর ঢুকে যায়? আমি ঘরের এককোনায় গুটিশুটি মেরে বসলাম। ওরা দুপুর বেলা নিশ্চয় আমাকে খেতে ডাকবে? বাবার তো রাগ পড়ে যাবে
তখন! হিল্ডাকে কাল গিয়ে ‘সরি’ বলব। চোখ ছুঁয়ে বলে দেব, আর করব না, প্রমিস।
আমরা কথা বলছিলাম ক্রিসের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে। মনীষা সেদিন দুপুরে এসেছিল আমাদের বাড়িতে একটা দরকারে। তখন তনয়া তাকে ধরেছিল। অ্যারনও ছিল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে একপাশে ছিল আমার ঘর। সিঁড়ির অপরপাশে এডওয়ার্ডদের বেডরুম। তনয়া এখন থাকে আমার পাশের ঘরে। বাদবাকি বেশিরভাগ ঘর তালাবন্ধ। এডওয়ার্ডদের বেডরুম খুলে তনয়াকে দেখালাম, বেডরুমের অপরপ্রান্তে ছোট্ট ব্যালকনি, যা দিয়ে মাঠ ও জলাভূমি দেখা যায়। অ্যাটাচড টয়লেট আগের মতোই আছে, তবে বাথটাবটাকে ভেঙে জমি সমান করে দিয়েছিল এডওয়ার্ড। এককোনায় আরেকটা সবুজ দরজা, ওর লাগোয়া ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে মেথরেরা নীচে নামত ।
দুম দুম ধাক্কা দিয়ে লাভ হবে না জানি, হয়তো বাবা আবার মারবে। দোদো ভালো থাকার সময়ে আমাকে অনেকবার বাঁচিয়েছে, লুকিয়ে রাখত নিজের ঘরে। কিন্তু, দোদো এখন নিজের ঘরে সারাদিন শুয়ে থাকে, আমাকে সেখানে ঢুকতে দেয় না। নার্স দিদি, আর ওষুধের গন্ধ। হাঁটুতে মাথা গুঁজলে থাকলে ভয় কম লাগবে, না? কিন্তু, যদি সাপ বেরোয়? ওরা অন্ধকারেও দেখতে পায়। নাক দিয়ে রাগের আওয়াজ করে ওরা। ইশকুলে একবার বেরিয়েছিল। দেহাতি গ্রাম থেকে সাপুড়ে এসে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, এই লম্বা আর কালোর ওপর লালের ছিটে। আমরা দালানে ভিড় করে দেখেছি। আমার আবার কান্না পেল, গলার কাছে গুটলি পাকাচ্ছে। মা তো কিছু বলতে পারত! আমি ইচ্ছে করে কামড়াইনি ওকে।
বাথরুমের মাটি স্যাঁৎসেঁতে, নীচ থেকে জল উঠছে। দেওয়ালের ড্যাম্প অদ্ভুত মুখের আকৃতি নিয়েছে। ছোটোবেলায় এই বেডরুমটা ছিল আমার ঘর। একবার এক রাত্রিবেলা, জ্বর হয়েছে, সন্ধে থেকে দরজা-জানালা বন্ধ করে শুয়ে আছি একা। ঘুমিয়েও পড়েছিলাম, সেদিন ছিল অল সোলস ডে। বেশ রাতের দিকে সাদা মুখোশ পরে এডওয়ার্ড বাথরুম থেকে মুখ বাড়িয়েছিল। ‘আঁ আঁ' করে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম, চিৎকার থামতেই চায় না। তারপর বাবার সে কী মার এডওয়ার্ডকে! লাঠি দিয়ে পিটিয়েছিল। এডওয়ার্ড রাগ করে মুখ ঘুরিয়ে থেকেছিল পরের দু-দিন, কথা বলেনি। আমিই অপরাধীর মতো মুখ করে শুয়ে থাকতাম। শেষমেষ রাগ ভাঙাতে আমার একটা প্রিয় প্যাস্টেল কালারের সেট দিতে হয়েছিল ওকে। এই বেডরুমের লাগোয়া ক্রিসের ছোট্ট ঘর। দুটো ঘরের মাঝে দরজা, যা দিয়ে মনীষা ওর কাছে চলে যেত। সে-ঘরে ক্রিস থাকত ছোট্ট খাটে, তার পাশে নির্মলা। একটা বাহারি ওয়ার্ডরোব ছিল, যেখানে ক্রিসের খেলনা, জামাকাপড়, পুতুল ইত্যাদি সাজানো থাকত। অবশ্য, বেশিরভাগ দিনই রাত হলে মনীষা দোলনা থেকে তুলে ক্রিসকে নিজের কোলের কাছে এনে শুত। এখন ঘরটা ন্যাড়া। রংচটা ওয়ার্ডরোব খাঁ-খাঁ করছে। খাট বা দোলনা কিছু নেই। সব ফেলে দেওয়া হয়েছিল। মনীষা বাধা দিয়েছিল, এডওয়ার্ড শোনেনি। একটা শুকনো হাওয়া ঘরটার ভেতর পাক দিচ্ছিল। অনেকদিন পরে খোলা হলে ভ্যাপসা গন্ধ কাটতে সময় লাগে। মনীষা হাসল, ‘অনেক বছর পরে ঢুকলাম।’
‘আর কিছু মনে পড়ে, মনীষা?' তনয়া নীচুগলায় নাম ধরে ডাকল তাকে। মনীষা বড়ো চোখ মেলে তাকাল, বুঝতে পারছে না প্রশ্নটা। ‘এমন কিছু সেদিন ঘটেছিল, যা আপনি পুলিশকে জানাতে ভুলে গিয়েছিলেন, অথবা, খুব তুচ্ছ কিছু, যা হয়তো অস্বাভাবিক, কিন্তু জানাবার মতো মনে হয়নি?”
‘কেন? কী হবে এতদিন পর এসব প্রশ্ন করে? ঘর তো দেখেই নিয়েছেন। সেদিন কী ঘটেছিল সেসবও বললাম।' মনীষা বড়ো নিশ্বাস ফেলে অপরাধীর মতো হাসল। ‘জানেন, ক্রিসকে যদি কখনো আবার ফিরে পাই— আমি চাই না ও আসুক কারণ আমি হয়তো সেই ধাক্কায় পাগল হয়ে যাব। অথবা, হয়তো হব না, কী জানি! হয়তো ওর কাছে চলে যাব সব ছেড়ে।' ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ওর দুলুনি অস্বাভাবিক লাগছিল। পায়ে ভর দিয়ে শরীর আগু-পিছু করতে করতে নিজের মনে কথা বলছিল মনীষা। মাতালেরা এভাবে টলে। ওর চোখ চকচক করছে। ‘আমি সেদিন ওকে থাপ্পড়টা যদি না-মারতাম! ও বলেছিল, পালিয়ে যাবে। আর দেখুন, সেই তো পালিয়েই গেল! বারবারা ঠিক বলে। ও লুকিয়ে আছে। ওই জলাভূমিতে।'
‘হয়তো এমন কিছু, সামান্য হলেও দৈনন্দিনের মধ্যে পড়ে না, তেমন অস্বাভাবিক কিছু কি মনে পড়ে আপনার?
‘যেমন, একটা চিরুনি।' দরজায় হেলান দিয়ে বলল অ্যারন। তনয়ার চোখ বিস্ফারিত হল। সে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল অ্যারনের দিকে।
আর একবার এমন হয়েছিল, আমি তখন অনেক ছোটো, এখন তো অনেক বড়ো হয়ে গেছি। ঘাসবনের ভেতর হারিয়ে গেছিলাম। তখন আমার হাউ হাউ কান্না, আর মা-কে দেখতে পাব না, বাবাকে না, দোদোকে না। তখন দিনের আলো মরে আসছে, ভয় লাগছে, আমি যদি মরে যাই? বাড়ি দেখতে পাচ্ছি না, মাঠ না, জলা না, শুধু লম্বা লম্বা ঘাস। তারপর কোথা থেকে কিছু নেই, বাবা, হুড়মুড়িয়ে এসে আমাকে কোলে তুলে নিল। হাঁফাচ্ছিল। লাল চোখ। হা-হা করে হেসে উঠল আমাকে বুকে জড়িয়ে। আমি ভয় পেয়ে আবার কেঁদেছিলাম।
‘এর মধ্যে চিরুনি আসছে কোথা থেকে?' বিভ্রান্তস্বরে বলল মনীষা। অ্যারন উত্তর নাদিয়ে ফ্লাস্ক থেকে গলায় মদ ঢালল। ‘আচ্ছা, আপনি সত্যিই পারবেন, ক্রিসকে খুঁজে বার করতে? কেউ তো পারল না এতদিনে!' মনীষা ঢোঁক গিলল। চোরাচোখে তনয়ার দিকে তাকালে তনয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল—অস্বস্তি অথবা দ্বিধা—তবু, ও তো চেষ্টা করবে বলেছে! আমি যে ক্রিসকে দেখেছি, একমাত্র মনীষা বিশ্বাস করে।
আমাদের কিছু বলার ছিল না। অপেক্ষা করারও নয়। ক্রিসের শূন্যঘর মনীষা নিজের মতো করে সামলাক। কিন্তু, সিঁড়ির দিকে এগোবার সময়ে মনীষা বলে উঠল, ‘বালিশ।’ আমরা পিছু ফিরলাম।
‘একটা বালিশ। এডওয়ার্ড মাথায় দিত।' থেমে থেমে বলল মনীষা, কুণ্ঠিতস্বরে। যেন লজ্জিত। ‘মানে, কিছুই নয় এটা। তবে, ক্রিস নিখোঁজ হবার পরদিন এডওয়ার্ড চেঁচামেচি করছিল। বালিশ পাচ্ছে না। আমিও খুঁজেছিলাম। নেই।' অ্যারন সবার পেছনে ছিল। মনীষা তার হাত শক্ত চেপে ধরেছে, ‘বাবাকে বলিস না এসব। আবার চেঁচামেচি করবে।' অ্যারন মনীষার হাতে চাপ দিয়ে সরে গেল একপাশে। পুলিশকে জানায়নি ও? আমিও তো বালিশের কথা জানতাম না, অথবা, ভুলে গেছি। অবশ্য, একটা বোকা ঘটনা, তখন এগুলো নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় কার থাকে? কিন্তু আশ্চর্য, এত বছর পেরিয়েও মনীষার মনে আছে?
সেদিন তো তাও হারিয়ে গেছিলাম, আজ কিন্তু বাড়ির মধ্যেই আছি। তবু কান্না পাচ্ছে। খিদে পাচ্ছে। যদি দরজা খুলে দিত, অন গড়, পালাতাম না, বলতাম আমি এখানেই বসে আছি, আমাকে ভাত দাও। পিঠের কাছে সরসর আওয়াজ শুনছি না? প্রাণপণে চোখ বুজে হাঁটুতে মাথা ঢোকালে আওয়াজটা চলে যাবে। ওসব কিচ্ছু না, বাবা বলে মনের ভুল। আর মা খালি বুকে ক্রস আঁকে।
‘বালিশ! সত্যি?’ অক্ষয় অবাক হল।
‘তুমি দেখি ছোটো ছোটো জিনিস নিয়ে পড়ে আছ। চিরুনি, বালিশ! তনয়াও এমন ছিল। ছায়ার পেছনে ছুটে সময় নষ্ট কোরো না। ওই করে তিন বছর আগে তনয়া ডুবেছিল। তারপর আর ফিরে আসেনি। শোনো, আমার প্রায় সত্তর হতে চলল, তাই অনেক কিছু দেখেছি। যদিও তোমরা বিশ্বাস করবে না, কিন্তু সত্যিই আমাকে শক্ত মানুষ মনে হয় না? দেখো, সেই সেদিন থেকে গত এক মাসে সবাই কেঁদেছে, আমি কিন্তু একবারও কাঁদিনি। এমনকী রাতগুলো যখন বিভীষিকার হয়, পোড়োমাঠের মুখোমুখি দাঁড়ালে যখন তুমি অজস্র ফিসফিস শুনবে, নাকে এসে লাগবে মেয়েমানুষের গায়ের গন্ধ, পুরোনো হাসি আর ক্লান্ত স্বরের ভাংচুর, তখনও আমার কান্না বা ভয় কিছু পাবে না। কারণ, ওরা আমাকে অনেকদিন চেনে। তুমি বলো আমাকে, ক্রিসকে খুঁজে বার করবে কি না। আমার সঙ্গে রাত্রিবেলা জলাভূমির ধারে দাঁড়াবে? অন্ধকারে তোমার চোখে জোর লাগবে কিন্তু। ওপাশের বন আঁতিপাঁতি করে খুঁজলে হয়তো দেখতে পাবে, ক্রিস পা ছড়িয়ে বসে আছে। কিন্তু, দিনের বেলা ও জলাভূমিতে লুকিয়ে পড়ে। গল্পগুলো না-জানলে খুঁজবে কীভাবে?'
‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করব? আপনার কি মনে হয় খুনটা মিস্টার যাদব করতে পারেন?” “শোনো, প্রত্যেকটা লোক পোটেনশিয়াল খুনি, পাগল আর পারভার্ট। কিন্তু, অবিনাশ এটা করেনি। করলে তিন বছর অপেক্ষা করত না।' আবার কান্না পাচ্ছিল আমার। দীর্ঘ চেষ্টায় চাপা দিতে চাইলেও গলা কেঁপে যাচ্ছিল। ফলত, বিরক্ত হলাম নিজের ওপর। উলটোদিকে মুখ ঘোরালাম। অক্ষয় ঘাঁটাল না। এই ছেলেটা অন্যদের মতো নয়। অনেক কিছু যেন বোঝে। ‘অবিনাশ আমার বন্ধু। ওকে অনেকদিন চিনি। সেই একদিন, আমাকে যেদিন ও তুলে নিয়ে এসেছিল শুঁড়িখানা থেকে—,' কিন্তু সব কথা সবাইকে বলা যায় না। বাকিটুকু আমি মনে মনে বলব।
বাগানে ফিরে তনয়া অ্যারনের হাত চেপে ধরল, ‘আপনি চিরুনি নিয়ে কী বলছিলেন?’ তনয়া আমার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু, অ্যারনকে আমি এ বিষয়ে কিছু বলিনি। তনয়ার সঙ্গে ওর চিন্তার সাদৃশ্য দেখে বরং অবাক লাগছে।
‘আপনারও মাথায় এসেছে তার মানে! একটা চিরুনির ওখানে থাকা—অদ্ভুত লাগে আমার। যেন মিসফিট।' রোদ নেমে এল, ছায়া অধিকার করল বাগান, উত্তুরে আচমকা হাওয়ায় কাঁঠাল গাছের পাতা খড়মড় করল। অ্যারনের বুকের ওপর একটা সানগ্লাস ঝুলছিল, এগিয়ে গিয়ে সেটাকে লালুরামের চোখে পরিয়ে দিল। লালুরামও আপত্তি করল না, সানগ্লাস পরে গটগট হেঁটে যাচ্ছিল বাগানের মুড়ো দিয়ে। ‘ও কী হচ্ছে,' বলে থেমে গেলাম কারণ আমার ভালো লাগছে না। বাড়িটার একটা দিক তো ভাঙা পড়েছেই। অন্যদিকের সার সার বন্ধ ঘরগুলো এই কারণে খুলতে চাই না। অ্যারন হাত তুলল লালুরামের দিকে, ‘ওখানে চিরুনি থাকা ঠিক এরকম অ্যাবসার্ড।’
‘যা-ই ভাবি না কেন, ঘুরে-ফিরে সেই চিরুনির জায়গায় চলে আসছি আমিও। খচখচ করছে কাল থেকে। আর, একটা ছবি। ঝাপসা, যেন কোথায় দেখেছি।' ‘কী ছবি?’
‘সেটাই ভালো দেখতে পাচ্ছি না যে। একটা অসংগতি যেন।' ভুরু কুঁচকে ঠোঁট কামড়াল তনয়া। তারপর নিশ্বাস ফেলল, ‘জোর করে মনে করা যায় না। কোভিড হবার পর এমনিও বোকা হয়ে গেছি।’
‘আপনাদের কাছে এগুলোর কিছুই অ্যাবসার্ড লাগে না, তাই না? এই যে, কোমর বেঁধে কেস সমাধান করা, সেটা নিয়ে দিনরাত পড়ে থাকা, এই সমস্ত কিছু?' অ্যারন প্রশ্ন করল তনয়াকে।
‘অ্যাবসার্ড কেন লাগবে?”
‘কারণ এই কমিউনিটি, আমরা, মানুষ হিসেবে আমাদের ক্ষয়, এগুলোর কিছুই আকৃষ্ট করছে না আপনাকে। বরং, একটা সাধারণ রহস্য ও তার সমাধানের পেছনে এত শক্তিক্ষয় করছেন।'
‘তোমার ভাইপো আসলে পেছনপাকা।' সেদিন রাত্রে আমার সামনে, গ্র্যানি স্কয়ার তুলতে গিয়ে তনয়া বলেছিল। কিন্তু, অ্যারন ছোটোবেলায় বোকা ছিল। খেলাধুলোয় কাঁচা বলে এডওয়ার্ড রাগ করত। বই মুখে বসে থাকত সারাদিন। এখানে এলে আমার পেছন পেছন ঘুরত। আমার সেসব দিন মনে পড়ে যখন রাত্রিবেলা বিছানায় কান পেতে আমি অ্যারনকে বলতাম, “ক্রিসের পায়ের আওয়াজ শুনছিস?' চোখ বুজে বালিশে মুখ গুঁজত, ও কিন্তু ভয় পেত না। সত্যি করে কীভাবে দাদাকে শুনতে পাবে, অ্যারন আমাকে জিজ্ঞাসা করত খালি। তখন ওকে নিয়ে জানালার কাছে দাঁড়াতাম। শূন্যমাঠের দিকে হাত বাড়িয়ে খুঁজতে বলেছি তন্নতন্ন, কিন্তু কিছুই না—একটা পাখিও ছিল না কোথাও। ওর মাথা ক্রিসের অনুপস্থিতিতে ভরে আছে, আর সেটা ওকে ভয় পাওয়ায় না। আমার মাথাও তাই। শুনতে পাই ক্রিস হাসছে, তনয়া, আমি তাকে হাসতে দিই কারণ আমি জানি ক্রিস নেই। হিমঝরা রাতে জানালা দিয়ে আমি দেখি জলাভূমির ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু, আমি তো ভালো করেই জানি এগুলো আমার চোখের ভুল, অন্যদের কাছে স্বীকার না- করলেও। আমাদের টাউনের মানুষ খুব অনুপস্থিত হয়, তনয়া। তাই তাদের গলার স্বর, চকিত কথা, অথবা অস্পষ্ট হাসিকে তুমি গ্রীষ্মের শুনশান দুপুরে শুনতে পাবে, যেন ওরা কোনো পোড়োকটেজের ফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসছে। ওরা কেউ নেই এখানে, তবু ওদের ফিসফিসানিতে আমাদের লোকালয় ভরে আছে। এই সমস্ত ফিসফিসানিকে শুয়োরের পালের ভেতর আমরা ঢোকাতে পারি না, তনয়া। ঢোকালে হয়তো হ্রদের ঢাল দিয়ে দৌড়ে যেত ওরা। ওরা জলে ডুবে মরত। তখন নীরব হত আমাদের টাউন।
‘তুমি কি ওকে অপছন্দ করো?'
‘না। তেমনভাবে চিনলাম কোথায়? তবে, ওর চিন্তাগুলো তোমার মাথা ঘেঁটে দেবার জন্য যথেষ্ট। ও আমার সঙ্গে ঘুরতে চাইছে। মুখে দেখাচ্ছে এই রহস্য বিষয়ে ইন্টারেস্ট নেই, কিন্তু ওর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তুমিও দেখেছ। চিরুনির কথা ওর মুখে শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম, জানো! ভেবেছিলাম তুমি ওকে বলেছ। যাই হোক, আমি একটামাত্র শর্তে ওকে সঙ্গে রাখতে পারি। মুখ বন্ধ রাখতে হবে, যতক্ষণ না আমি কিছু জিজ্ঞাসা করি। ধ্যাত!” গ্র্যানি স্কোয়ারের বুনোট খুলে গিয়েছিল, বিরক্ত তনয়া কোলের ওপর উল-কাঁটা ফেলে বলল, ‘জলাভূমির ওপর দিয়ে ওপাশের জঙ্গলে যাবার রাস্তা নেই? নাকি, ঘুরে যেতে হয়?’
‘ভেতর দিয়ে আছে, ঘাসবনে ঢাকা, কিন্তু স্থানীয়রা জানে।' বাবা তো ওখান দিয়েই হেঁটে গিয়েছিল। তনয়া বলল সে দিনের আলোয় একবার—ক্রিস যদি সত্যিই কোনোভাবে ওদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়, আমি জানি অসম্ভব, তবু একবার গোটা রাস্তাটুকু যাচাই করতে চায়।
পায়ের কাছে ফোঁস আওয়াজে নীচু হয়ে লালুরামের মাথায় হাত বোলাতে হল। সে এখনও কালো চশমা পরে ঘুরছে। অ্যারন হাত ঘুরিয়ে দেখাল চারপাশ, ‘এই সব কিছু, এই ভূতুড়ে শহর, এরা কেউ বেঁচে নেই। আমাদের কারোরই বেঁচে থাকার কথা ছিল না। উচিত নয়।’
‘উচিত নয়?” তনয়া বিরক্তস্বরে বলল।
‘না। মা-কে দেখুন। এভাবে গুমরে গুমরে সারাজীবন বাঁচার বদলে অনেক আগেই আত্মহত্যা করা উচিত ছিল না কি? আমরা আসলে, আমাদের এই হয়ে-ওঠা, পুরোটার একমাত্র যুক্তিগ্রাহ্য পরিণতি যদি হয় এই সাফারিং, সেটাই বলে দেয় আমাদের ইতিহাস কতটা প্রবঞ্চক ছিল।'
পিঠের কাছে আওয়াজটা তবু বেড়েই চলেছে। নির্ঘাত সাপ। আমার গলা শুকিয়ে গেছে, দম আটকে মরে যাব কি এবার? এত কালো, একটুও কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না। আমাকে কামড়ে চলে গেলেও দেখতে পাব না। নাক চুলকোচ্ছে, কিন্তু হাত তুললেই কামড়ায় যদি? টপ করে একফোঁটা ঘাম মাটিতে পড়ল। আমি সাবধানে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে ঘষে দিলাম। ঘামের গন্ধে ওরা বেশি আসে।
অ্যারনের হাত থেকে ফ্লাস্কটা ছুড়ে বাগানের ঝোপে ফেলে দিলাম, দিনরাত মদ গিলে অলক্ষুণে বকছে। ওর হাতে কি কাজকম্ম নেই? এখানে পড়ে আছে কেন? অ্যারন নির্বিকার মুখে ফ্লাস্কটা কুড়িয়ে ছিপি আঁটতে আঁটতে বলল, ‘সাক্ষী থাকব বলে।’ তনয়া অন্যমনস্কভাবে গেটের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অ্যারনকে পাত্তা দিলে আমার রাত্রের ঘুম বরবাদ হবে হাবিজাবি চিন্তায়। তনয়ার কাছে গেলাম, ওর মাথায় কিছু এল কি না জানতে।
বুকের ওপর কান পাতলে যে কেউ এখন দুম দুম ঘণ্টা বাজাবার আওয়াজ পাবে। আমি তো কাঁপতে চাই না, তবু কেন—আমি ভয় পাব না, আমি বড়ো হয়ে গেছি। অন্ধকারকে ভয় পায় এডওয়ার্ড, ও ন্যাপি ভিজিয়ে দেয় আর ভ্যাঁ ভ্যাঁ কাঁদে। আমি কেন পাব, আমি তো ভালো! তবু কী অন্ধকার, পেছনে সড়সড় আওয়াজ—আমাকে কি দেখছে এখন? কুচি কুচি চোখ, টুনি বাল্ বের মতো জ্বলে-নেভে, ধারওলা দাঁত, ছুঁচের মতো, খুব রেগে যাচ্ছে, আর করব না প্রমিস –
‘এত সহজে? আমি শার্লক হোমস না। তবে ওই যে, কী-একটা যেন খচখচ করছে। একটা ছবি, মনে আসছে কিন্তু চোখে আসছে না। একটা অসংগতি।' মাথা ঝুঁকিয়ে ভাবল, তারপর বড়ো নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘আপাতত চলো।'
‘কোথায়?’
‘রেভারেন্ড গরম্যান। '

আর তাহাদের সহিত বিবাহসম্বন্ধ করিবে না ; তুমি তাহার পুত্রকে আপনার কন্যা দিবে না, ও আপন পুত্রের জন্য তাহার কন্যা গ্রহণ করিবে না।
- Deuteronomy। 7 : 3
গলার আওয়াজে এডওয়ার্ড পেছন ফিরল। উবু হয়ে বসে আছে ঝাঁটিফুলের মাঠে। এদিকে আমরা ওকে খুঁজে খুঁজে সারা।
-কী করছিস তুই এখানে, বাড়ি চল, মা আজ তোর পিঠে ছাতা ভাঙবে। কিন্তু এডওয়ার্ড হাতছানি দিয়ে ডাকল।
—এই দেখ, এর নাম রেখেছি জোজো। দেখ কেমন কুটকুট করে বাদাম খাচ্ছে। —একে নিয়ে বাড়ি ঢুকবি?
—লুকিয়ে রাখব, জুতোর বাক্সে। লেজটা দেখেছিস? এটা দিয়ে কানে সুড়সুড়ি দিলে কেমন আরাম বল?
আমিও বসলাম ওর পাশে।
—বাড়িতে যদি ওর খিদে পায়? বাবা কিন্তু দেখে ফেলবে।
-ওরা ফল খায় তো, আর বাদাম। অনেক খাইয়ে পেট ভরিয়ে তারপর নিয়ে যাব। -আর জল? সেটা খাওয়াবি কী করে? আচ্ছা তুই পোষ মানালি কী করে? ওরা তো পালিয়ে যায়।
—এখানে কয়েক দিন আমার কাছ থেকে খাবার নিয়ে পালাচ্ছিল। গতকাল থেকে সামনে বসে খাচ্ছে। ওর খুব দুঃখ রে বার্বি, সবাই ওকে ছেড়ে চলে গেছে।
আমার চোখে পড়ল এডওয়ার্ডের কবজির ফোসকার চামড়া উঠে গেছে। রস গড়াচ্ছে। —ইস! সেপটিক হয়ে যাবে কিন্তু। বাড়ি চল, ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেব। এডওয়ার্ড উত্তর দিল না। বাবা পরশু রাত্রে ওর কবজিতে আবার জ্বলন্ত সিগারেট—এডওয়ার্ড বাবার এয়ারগান ভেঙে দিয়েছিল। মা কাঁদছিল। সেদিকে তাকিয়ে বাবা বিড়বিড় করল, দ্যাট হোর অ্যান্ড হার বাস্টার্ড। কিন্তু, এডওয়ার্ডের মুখে ব্যথার চিহ্ন দেখলাম না। মন দিয়ে জোজোর সামনে একটার পর একটা বাদাম রাখছে।
বেথেল মিশন চার্চ জোহার হালে-তে। তার পেছন থেকে জঙ্গল শুরু হয়ে টিলার ওপর উঠে গেছে। সেন্ট জন্স-এর তুলনায় আকারে ছোটো, মূলত আদিবাসীরাই এখানে আসত। এখন ভেঙে পড়েছে কারণ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। সুসময়ে এখানে মেলা হত প্রতি বছর খ্রিস্ট উৎসবে। আদিবাসী নাচগান, সার্কাস, নাগরদোলা, নিজেদের আচার ও পাঁপড় বানিয়ে বিক্রি করা হত, প্রোটেস্টান্ট ক্যাথলিক হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে যোগ দিত মেলায়। আজকাল জঙ্গল ঢেকেছে চার্চের একাংশ। একটা কোয়ার্টারের ছাদ ধসে পড়েছে। বাইরের পাঁচিল ফাটিয়ে তরুণ কাঁঠালগাছের মোটা গুঁড়ি এঁকেবেঁকে আকাশে উঠতে চায়। শুকনো পাতা খসে উঠোনে গালিচা, তার ওপর নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায় বিষাক্ত সাপ। টাউনের যাবতীয় ভূতেদের আড্ডাস্থল, তাদের বুকে নিয়ে জেগে আছে চার্চ ও তার সেবায়েত। দুটো কোয়ার্টার এখনও অক্ষত, তার একটায় রেভারেন্ড থাকেন। অন্য আরেকজন মিনিস্টার আছেন, স্টিফেন মান্ডি। তিনি মূল ভবনের দেখাশোনা করেন। মাঝে মাঝে মাস হয়, যদিও লোক আসে হাতেগোনা রেভারেন্ড গরম্যান কোয়ার্টারে বসে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকেন। অথচ, বেথেল মিশন তাঁর প্রাণ ছিল। নিজের হাতে একটা করে ইট গেঁথে তৈরি করেছেন। আগে লক্ষ করিনি, বা, করলেও অর্থ বুঝিনি, আজ তনয়া দেখাল, অলটারের দুই পাশের দেওয়ালে বাহারি ক্যালিগ্রাফিতে লেখা ‘সোলা স্ক্রিপচুরা’, ‘সোলা গ্রাসিয়া’, ‘সোলা ফাইদ’, ‘সোলা ক্রিস্তাস' আর 'সলি দিও গ্লোরিয়া'। বটের চারা উঁকি দিচ্ছে দেওয়াল ফুঁড়ে। সিলিং-এ প্রাগৈতিহাসিক ঝুল জমে রাক্ষসের মুখের আকৃতি নিয়েছে। ‘এখানে লর্ডস সাপার হত দেখার মতো। ওই যে অলটার দেখছ, ওর পেছনের দেওয়াল, ওগুলো সব পরে বানানো। আগে অলটারের পেছনের সিঁড়ি বেয়ে বেসমেন্টে নামা যেত, যাবতীয় কাজের জিনিস থাকত সেখানে। আমি আর এডওয়ার্ড ছোটোবেলায় সেখানে বসে ক্রিসমাস উপলক্ষে চার্চ সাজাবার জন্য বাহারি কাগজের শিকলি বানিয়েছি কত! তারপর দেওয়াল বসে গেল এক ঝড়বৃষ্টির রাতে। তার মাটি নাকি ফোপরা হয়ে গিয়েছিল। সে-দেওয়াল ফেলে আবার নতুন করে সব বানানো হল । বাবা অনেক সাহায্য করেছিল তখন।' ডায়াসের ওপর রাজ্যের জঞ্জাল স্তূপীকৃত। ভাঙা টেবিল চেয়ার, তাদের ভেতর দিয়ে মাতা মেরির মুখ টুকি মারছে। ডায়াসে রেভারেন্ড মান্ডি টুকটাক কাজ করছিলেন। এবার মুখ তুলে হাসলেন, ‘রেভারেন্ড গরম্যানের কাছে এসেছেন তো?' বেঁটেখাটো বলিষ্ঠ চেহারার মধ্য-চল্লিশের হাসিখুশি মানুষটাকে আমার ভালো লাগে। কথায় কথায় রেভারেন্ড গরম্যানের মস্তিষ্কবিকৃতির আখ্যান শোনালেন। রাত্রে কোয়ার্টারে থাকতে চান না। বেসমেন্টে শুতে চলে যান। অনেকবার আটকানোর চেষ্টা করে লাভ হয়নি। বেসমেন্টে সাপখোপ থাকতে পারে, লতাপাতায় ঢাকা স্যাঁৎসেঁতে মেঝে, কিন্তু রেভারেন্ড কোনো কথাই শুনতে চান না। নিজের মনে বেরিয়ে যান এখানে-ওখানে, উদ্দেশ্যহীন হাঁটেন, চেনাশোনা লোক দেখতে পেলে টেনে নিয়ে আসেন।
অথচ, এডওয়ার্ড যা ভেবেছিল, হল না। কিছুতেই ধরা গেল না জোজোকে এডওয়ার্ড ভেবেছিল পকেটে রাখবে আর লেজটা বেরিয়ে থাকবে বাইরে। কিন্তু, জোজো বাদাম খেয়ে মুখ মুছে দৌড়।
রেভারেন্ডের ঘরে গিয়ে দেখলাম, অ্যারন সেখানে বসে। রেভারেন্ডের সামনে মাথা নীচু করে একটা মোড়ায়। রেভারেন্ড তার মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে কিছু বলছেন। আমাদের দেখে অ্যারন জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তনয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল রেভারেন্ডের দিকে। আমাকে ফিসফিস করে জানাল, তাঁকে একদিন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছে।
ছোট্ট ঘরে ঠাসা বইপত্র, হলুদ কাগজের ভিড়। মেঝে থেকে জল উঠে আসছে। জানালার মুখ ঝোপে বোঝাই ছিল। টুকরো আকাশ ছাইরঙা। হলুদ ল্যাম্পের আলো ঘিরে পোকাদের ভিড় জমেছিল। রেভারেন্ডের মুখ আলো-অন্ধকারের কাটাকুটিতে লাগছিল প্রাচীন মমির মতো। তাঁর হাত কাঁপছিল সারাক্ষণ। তনয়া তাঁকে বাংলায় জিজ্ঞাসা করল কলকাতার বাড়ির কথা।
‘চাঁদনি। আছে এখনও।'
‘এখনও আছে?’
‘এখনও আছে। ওখান থেকে কলেজ যাই।'
‘আচ্ছা। আপনার বন্ধুরা তাহলে আছে ওখানে?'
‘বন্ধুরা আছে। মেল স্যামুয়েলস আছে। প্যাট্রিক ঘোষ আছে। ওদের মিউজিক ব্যান্ড আছে। ১৯৭৮ সালের প্রোগ্রাম আছে।'
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে তনয়া বলল, ‘মেল মারা গেছে। প্যাট্রিক ঘোষও। তবে, ওদের একটা ব্যান্ড তৈরি হয়েছিল শেষের দিকে, সেটা এখন মেল-এর ছেলে সল চালায়। মেল স্যামুয়েল ব্লুজ ব্যান্ড।'
চোখ বুজলেন রেভারেন্ড। কী মনে হল, জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনার বয়েস কত হল?’ ‘একুশ বছর চার মাস সতেরো দিন।' একটা ক্লান্ত উত্তুরে হাওয়া জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পুরোনো কাগজপত্রের ওপর ফরফর করছিল। ‘কেননা ঈশ্বরের বাক্য জীবন্ত ও কার্যসাধক এবং সমস্ত দ্বিধার খড়্গ অপেক্ষা তীক্ষ্ণ এবং প্রাণ ও আত্মা, গ্রন্থি ও মজ্জা, এই সকলের বিভেদ পর্যন্ত মর্মভেদী এবং হৃদয়ের চিন্তা ও বিবেচনার সূক্ষ্ম বিচারক।' আবার বললেন রেভারেন্ড। তনয়া আমার দিকে ফিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আসার উদ্দেশ্য জানাল রেভারেন্ডকে।
স্কুলে গিয়ে কিন্তু ভাব হয়ে গেল। আমি হিল্ডাকে বলিনি, কী হয়েছিল। আমার মনে ছিল না শেষের কথা, আমি কি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম? জ্বর এসেছিল রাত্রিবেলা, তিনদিন পর কমেছে। অথবা, আমি হয়তো চিৎকার করেছিলাম, তখন গুদামঘরের দরজা খুলেছিল ওরা? কিন্তু, হিল্ডাকে বললে ও ভয় পাবে। ও ভীতু, কথায় কথায় কাঁদে। তবে, আমি ওকে বলেছি আর ওরকম করব না। হিল্ডা কথা দিল, নিয়ে যাবে আবার। ফিক করে হাসল তারপর, ওর গালে কোনো দাগ নেই।
‘ক্রিস নেই। কলকাতায় ক্রিস নেই।' তনয়া তাঁকে মনে করাল তিনি এখন বেথেল মিশনে। রেভারেন্ড চোখ খুলে তাঁর অলটারের কথা জিজ্ঞাসা করলেন।
‘অলটার ভেঙে পড়েছে।' জানালার ধার থেকে অ্যারন উত্তর দিল। তনয়া তীব্রচোখে তাকাল তার দিকে।
‘আর মুরগিগুলো?’
‘পালিয়ে গেছে।’
‘দুটো গোরু ছিল।’
‘মরে কঙ্কাল হয়ে গেছে।' অ্যারনের মুখে বিকার ছিল না। আমার ইচ্ছে করছিল গিয়ে ওর গলা চেপে ধরি, চুপ কর হারামজাদা! কিন্তু রেভারেন্ড শূন্যচোখে তাকিয়ে ছিলেন।
‘ক্রিস নিখোঁজ হবার দিনে, তার পরেও, আপনি বলেছিলেন আপনার পাপে তিনটে জীবন নষ্ট হল। পাপ কেন? আপনি তো ঘুমিয়ে পড়েছিলেন মাত্র।' উত্তর আসবে না জেনেও জিজ্ঞাসা করল তনয়া। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার বলল, ‘সবে তো পুলিশ এসেছে তখন। তদন্তের আগেই আপনি ধরে নিলেন ওর সন্ধান পাওয়া যাবে না?' রেভারেন্ড আমার দিকে ফিরলেন এবং দেখলাম তাঁর ঘোলাটে চোখ চকচক করছে।
‘আমার পাপ ছিল। আমি জানি। ছিল।' স্পষ্ট গলায় এবার বললেন রেভারেন্ড, তনয়া আগ্রহভরে তাঁর দিকে ঝুঁকল। কী সেই পাপ? শুধুমাত্র ঘুমিয়ে পড়া?
‘সেজন্যই কি তুমি তিনজনের কথা বলেছিলে? বাবা, মা আর ক্রিস?' অ্যারন প্রশ্ন করল, কিন্তু, তার ভুরুতে চিন্তার ভাঁজ, যেন বিশ্বাস করছে না। রেভারেন্ড উত্তর না-দিয়ে হাত বাড়ালে অ্যারন সে-হাত নিল নিজের মুঠোয়। তারপর উবু হয়ে রেভারেন্ডের সামনে বসে বলল, ‘তুমি যা বলছ সেটাই ঠিক, ডোডো। প্রত্যেককে নিজের ক্রুশকাঠ নিজেকে বইতে হয়। তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে, সেটা তোমার পাপ ছিল। সেটার দায় তোমাকেই বইতে হবে।'
হিল্ডাকে জোজোর গল্প করায় হেসে লুটিয়ে পড়ল—তোর ভাইটা এগারো পুরল না? এখনও একদম বাচ্চা কিন্তু। ওরা পোষ মানে কখনো? উলটে কামড়ে দিলে কিন্তু চোদ্দোটা ইঞ্জেকশন।
—জোজো মনে হয় বুঝেছে ওকে ধরবে, তাই আর আসে না। এডওয়ার্ড পকেটে বাদাম নিয়ে বসে থাকে মাঠে, জানিস! তোর কাকা তো ভেট ডাক্তার। একটা ওরকম কাঠবেড়ালি এনে দিতে বল না! এডওয়ার্ডকে বলব জোজোকে ধরে এনেছি। পরশু ওর জন্মদিন।
রেভারেন্ড অবিশ্বাসের চোখে ‘কী’ বলে আর কিছু বলতে পারলেন না। অ্যারনের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে আমি ফিসফিস করলাম। বললাম, ওর লজ্জা লাগা উচিত। অ্যারন আমার দিকে না-তাকিয়ে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়াল আবার।
তনয়াকে দেখে মনে হচ্ছিল অ্যারনের মতো জন্তু সে আগে দেখেনি। তারপর কাঁধ ঝাঁকাল। গুড ওয়ার্কস সংক্রান্ত প্রশ্ন করল রেভারেন্ডকে। রেভারেন্ড অসহায় চোখে তাকালেন। তাঁর স্মৃতি আবার মুছে গেছে। তনয়াকে আমি কিছুটা ইতিহাস বললাম। এডওয়ার্ড আর মনীষা ছোটোবেলা থেকে একে অপরকে চিনত। বাবা এডওয়ার্ডকে পাঠাত বেথেল মিশনের কাজ করতে। অলটারে টুকিটাকি করত, প্রতি রবিবার যে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল সেখানে সার্ভিস দিত। মনীষাও সেখানে কাজ করত পড়াশোনার ফাঁকে। সেই থেকে তাদের পরিচয়। বেথেল মিশন মূলনিবাসীদের মধ্যে কাজ করে। এখানে অ্যাংলো পরিবার আসতে চায় না। কিন্তু, বাবা ছিল রেভারেন্ডের বন্ধু, তাই আমরা আসতাম এখানে। বাবা বলেছিল, বিয়ের যৌতুক হিসেবে বেথেল মিশনের সংস্কার করবে। কথা রেখেছিল। বাবা সাহায্য না-করলে তখন মিশনের কাজ বন্ধ করে দিতে হত। এডওয়ার্ডের বিয়ের বছর দুই আগে বড়ো মেরামতির কাজ করতে হয়েছিল। মূল ভবনকে নতুন করে বানাতে হয়েছিল। দেওয়ালে নোনা ধরে খেয়ে নিচ্ছিল বলে সেগুলো ফেলে মাটির গভীর পর্যন্ত চেঁছে তুলে ফেলা হয়েছিল একটা বড়ো চত্বর। নতুন সিমেন্ট ঢেলে তার ওপর অবশেষে নতুন দেওয়াল তোলা, এসবে প্রচুর টাকা চলে গিয়েছিল। এটুকুই মনে আছে। কিন্তু, শেষমেষ কিছু থাকল না। চার্চ আবার ভেঙে পড়েছে, এবার বাঁচাবার কেউ নেই।
‘ডেভিড। গ্রেট ম্যান। ভাঙা হৃদয়।' রেভারেন্ডের গলা কফবসা, কাঁপা হাতে বুকে ক্রস আঁকলেন।
তারপর বিকেল বেলা, হলুদ রঙের আলো। জলাভূমি আর ঘাসবনকে অলৌকিক লাগছিল। দিগন্তের কাছে দাঁড়ানো ভাঙা অ্যাম্বাসাডরকে খেলনা গাড়ি মনে হয় এমন আলোতে। অনেকটা সময় চুপ ছিলাম বলে গলাখাঁকারি দিল অক্ষয়। আমরা মাঠের সামনে বসে ছিলাম। আমি বাবার কথা ভাবছিলাম। রেভারেন্ড বাবাকে গ্রেট ম্যান বলেছিলেন, কিন্তু আমি চোখ বুজলে বাবার মুষ্টিবদ্ধ হাতের বেশি কিছু দেখতে পাই না। আমি ভুলে গেছি বাবাকে কেমন দেখতে ছিল। কিন্তু বাবার ঘর, কেদারা, সিগারের ছাই ঝাড়বার অ্যাশট্রে রেখে দিয়েছি অবিকল। অন্যেরা বুঝবে না কেন।
বৎস, সদাপ্রভুর শাসন তুচ্ছ করিয়ো না, তাঁহার অনুযোগে ক্লান্ত হইয়ো না; কেননা সদাপ্রভু যাহাকে প্রেম করেন, তাহাকেই শাস্তি প্রদান করেন, যেমন পিতা প্রিয় পুত্রের প্রতি করেন।
‘আপনি নাকি রাতের বেলা বেসমেন্টে ঘুমোচ্ছেন?’ বললাম আমি। ‘শরীর আরও খারাপ হবে তো! মনীষা জানলে কিন্তু বকাবকি করবে।'
অন্ধকার জেঁকে আসছে, জানালার বাইরে ঝোপের ভেতর কাঠপোকার একঘেয়ে আওয়াজ—
নাহ্, হিল্ডা ঠোঁট উলটে মাথা নাড়ল।
–কাকা চলে যাচ্ছে। মা বাবার সঙ্গে খুব ঝগড়া। কথা বন্ধ আমাদের। -কেন রে?
–কাকা মেলবোর্ন চলে যেতে চায়। ভিসা হয়ে গেছে। বলছে এখানে কিছু নেই, সবাই চলে যাচ্ছে। তাই বাড়ির নিজেদের অংশটা বিক্রি করে দিতে চাইছে। বাবা তাতে গেছে রেগে।
-তোরাও চলে যাবি ?
যাব।
আমার হঠাৎ মন খারাপ হল। হিল্ডা চলে গেলে আমি পুরো একা হয়ে
—তুই পাগল, না? আমি কোথায় যাব? ভূত হয়ে তোর ঘাড় মটকাব।
আমার গালে চুমু খেল হিল্ডা।
রেভারেন্ড এবার উঠলেন। নড়বড় করতে করতে সারাঘর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কখনো একটা বইয়ের পাতা উলটে দেখছেন, পরক্ষণে হাতে উঠিয়ে নিচ্ছেন জীর্ণ খাতা। তারপর অবহেলায় ফেলে দিচ্ছেন। ছেঁড়া পাতাগুলো ঘর জুড়ে উড়ছে।
‘রেভারেন্ড গরম্যান, আমি কয়েক দিন পরেই দিল্লি চলে যাব। হয়তো ক্রিসের রহস্যে আলো ফেলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বলতে পারেন, আমার মনের কিছু খটকা পরিষ্কার করার জন্য এগুলো জানতে চাইছি, আর কিছু নয়। কিন্তু আমারই তো মন, তাই আমি একটা জিনিসই চাই। পারলাম না, ঠিক আছে, তাতে আমার দুঃখ নেই। কিন্তু, কেন পারলাম না সেটা বুঝে নিতে চাই। আপনার কি কখনো কিছু সন্দেহজনক লেগেছে, যা পুলিশকে জানাননি? হয়তো কিছুই নয় সেটা। তবুও আমি সব কিছু খতিয়ে দেখতে চাই।' তনয়া হতাশ গলায় যেন দেওয়ালকে শোনাচ্ছে এভাবে কথাগুলো বলল।
রেভারেন্ড তনয়ার দিকে ফিরে মৃদু হাসলেন। স্বচ্ছ হল তাঁর দৃষ্টি। কেটে কেটে বললেন, ‘যখন ক্রিসকে খোঁজা হচ্ছে পেছনের বাগানে, পুলিশ এসেছে, তখন বাড়ির ভেতর থেকে কেউ একজন চেঁচিয়েছিল সামনের গেট দিয়ে কে যেন বেরিয়ে যাচ্ছে। সবাই সামনের গেটে ছুটেছিল, কিন্তু কিছু দেখেনি। যেন ছায়ার মতো সরে গেল, তাই না? যেন দিব্য প্রেত এসে ক্রিসকে নিয়ে গেল। তাই না?’
বড়ো নিশ্বাস ফেললাম। এতক্ষণে কিছুটা অর্থপূর্ণ বাক্য বললেন রেভারেন্ড।
‘গেটের কাছে গিয়ে কেউ দেখতে পায়নি তাকে, যে বেরিয়ে গেল। তাহলে কি সে হাওয়ায় উধাও হয়ে গেল, নাকি, আসলে কেউ দেখেনি? বাড়ির ভেতর থেকে ভুল দেখেছে হয়তো? অথবা, হয়তো সত্যিই দিব্য প্রেত?’ তনয়া হাসল, ‘বারবারা তখন এত উত্তেজিত ছিল যে, সম্ভবত ওর মস্তিষ্ক ওকে ভূত দেখিয়েছে। কিন্তু, রেভারেন্ডের এই চিন্তাটা আমার কাছে ইন্টারেস্টিং লাগছে। কে চেঁচাল?' হয়তো সেটা আমিই, যেমন সবাই বলে। কী যে দেখেছিলাম তখন সামনের গেটে, কে জানে! একটা অদ্ভুত জিনিস আমার বার বার মনে হচ্ছিল সেদিন। এই মুহূর্তে যদি লোডশেডিং হয়ে যায় তাহলে কেওস আরও বাড়বে। লোকে তখন একে অন্যকে জাপটে ‘ছেলেধরা” বলে চেঁচাতেও পারে। লোকে বলে, তারা দোতলার একটা জানালায় ছায়ামূর্তি দেখেছিল, যে চেঁচিয়েছিল। আমি তখন দোতলায় কিনা, মনে নেই। চেঁচিয়ে ওঠার কোনো স্মৃতিই নেই আমার কাছে। রেভারেন্ডের সব ইন্টারেস্ট আবার ফুরিয়ে গেছে। একটা তার ছেঁড়া ল্যান্ডলাইনের রিসিভার হাতে তিনি জানালার ধারে হেঁটে গেলেন। ক্রেডলটা ভেজামাটিতে খ্যাড়খাড় শব্দে এগোচ্ছে, দাগ কাটছে আঁকিবুকি। তনয়াকে চোখের ইঙ্গিত করলাম, এবার উঠতে হবে। সাড়ে আটটা বাজে, রেভারেন্ডের খাওয়ার সময় হয়েছে।
আমরা বেরোচ্ছি, তখন রেভারেন্ডের গলা পেলাম, ‘হ্যালো!’ পিছু ফিরে দেখি কানে রিসিভার চেপে বলছেন, ‘লালু? মেল মরে গেছে। ওর কবরখানায় আমার নাম করে একগোছা ফুল রেখে আসবি?' অল্প আলোয় রেভারেন্ডের মুখের বলিরেখারা কোঁচকানো কাগজের আভাস আনছিল। আমার মনে হচ্ছিল, একটা টোকা মারলে সেই মুখ ভেঙেচুরে জল হয়ে যাবে।
তনয়া আবিষ্টের মতো তাকিয়ে ছিল রেভারেন্ডের দিকে। কয়েক সেকেন্ডের বিহবল দৃষ্টির পর অ্যারনের ডাকে ঘোর ভাঙল তার। চাপাগলায় উত্তর দিল, ‘কলকাতায় গিয়ে রেখে আসব। অনেক ধন্যবাদ রেভারেন্ড।' রেভারেন্ড জানালা দিয়ে আকাশ দেখছেন। কানে তখনো রিসিভার।
‘তোমার কি মনে হয়, এতদিন পরে এসে তুমি ক্রিসের রহস্যের কূলকিনারা পাবে?” ‘আমাদের কেসের সঙ্গে ক্রিস জড়িয়ে আছে কি না জানি না, তবে আমার আগ্রহ অ্যাগনেসকে নিয়ে।'
স্তম্ভিতচোখে অক্ষয়ের দিকে তাকালাম। ও কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছে? ‘অ্যাগনেস? তুমি কি সিরিয়াস?' কিন্তু ওর মুখে তারল্য পেলাম না।
‘আমাদের কেসের সঙ্গে সম্ভবত অ্যাগনেস জড়িয়ে।'
‘এতদিন পর! অথবা, তুমিও তনয়ার মতোই ভুল
রাস্তায় হাঁটছ।’
‘এবার রাস্তা ভুল হবার সম্ভাবনা নেই। অ্যাগনেসের অন্তর্ধান রহস্যের তদন্তকারী অফিসার ছিলেন সেই অবিনাশ যাদব। সমস্ত কিছু একে একে দুই হচ্ছে। না ম্যাডাম,' অক্ষয় ঘাড় নাড়ল, ‘আমাদের ভুল হচ্ছে না। অবিনাশ যাদব অপরাধী কি না আমি জানি না, কিন্তু অ্যাগনেসের সঙ্গে যে কানেকশন আছে, সেটা নিয়ে আমি নিশ্চিত। '
কিন্তু, আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে, তনয়া ভুল। তাহলে কি ও ভুল ছিল না? আমি অক্ষয়ের হাত খামচে ধরলাম, ‘তনয়াই কি তাহলে আসল জায়গাটা ধরতে পেরেছিল, অক্ষয়? আমরা তাকে ভুল বুঝেছিলাম? কী হবে, যদি ও ঠিক হয় আর আমরা ভুল? অনেকটা সময় তো কেটে গেল, না?'
গাড়ির হেডলাইটের আলো শুষে নিচ্ছিল পিচরাস্তার অন্ধকার। দু-পাশে শাল, শিশু, মহুয়ার বন হুড়মুড় ঝেঁকে আসতে চাইছে। আমি চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছিলাম। পেছনের সিটে অ্যারন নিজের ভাবনায় মগ্ন। কিন্তু মাঝপথে তনয়া বলল, কয়েক পা হাঁটতে চায়। মাথায় হুডি চাপিয়ে নীরবে আমাদের দু-জনের মধ্যিখানে হাঁটছিল। ল্যাম্পপোস্টের আলো ঘিরে জমাট কুয়াশা। পাশের ঝোপে অস্পষ্ট খচমচ, বোধ হয় রাতপাখি। তনয়া একটা কাটা গাছের গুঁড়ির ওপর বসল। সিগারেট জ্বালিয়ে জোরে টান দিল কয়েকটা। বেথেল মিশন থেকে বেরোনোর পর থেকে এমন ভূতগ্রস্তের মতো আচরণ করছে কেন?
তনয়া ফিসফিস করল, ‘কবরখানা।’ তারপর বড়ো নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘সেই ছবিটা, যাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না, এতক্ষণে পেয়েছি। একটা মেয়ের ভূত কবরখানায় বসে চুল আঁচড়াচ্ছে।'
‘সে আবার কী?’
“তোমরা বলেছিলে সেদিন, অ্যাগনেসের ভূতকে দেখা যায়, নিঝুম দুপুরে কবরখানায় বসে চুল আঁচড়াচ্ছে। কী অ্যাবসার্ড একটা ছবি, তাই না?”
‘অ্যাগনেস। হ্যাঁ, শহুরে লোককথা। কিন্তু তার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?' আছে হাওয়া, আছে রোদ, আছে নীল আকাশের নীচে মর্মর পৃথিবী—'
‘নেই, এবং সেটাই অ্যাবসার্ড। চিরুনি থাকবে কেন ক্রাইম সিনে? এটা আমাকে কেন ট্রিগার করছিল, এখন বুঝছি। কারণ, আমার অবচেতনে অ্যাগনেসের ভূতের কবরখানায় বসে চুল আঁচড়াবার ছবিটা ভাসছিল।'
‘চিরুনি ততটাই অ্যাবসার্ড, যতটা একটা মেয়ের কবরখানায় বসে চুল আঁচড়ানো।' বলল অ্যারন। ‘আমার মাথায় এটা কেন এল না?' ভুরু কুঁচকে বলল, ‘দুটো ছবি, নাকি, একটাই?’ ‘তোমার পয়েন্টটা কী?' তনয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম।
“দেখো, অ্যারন যা বলল সেটার সঙ্গে আমি একমত। চিরুনি একটা অ্যাবসার্ড ব্লু। আমার মাথায় প্রথমেই যেটা আসছে, সেটা হল, চিরুনিটা অপরাধী ফেলে রেখে গিয়েছিল অ্যাগনেসকে দোষী দেখাবার জন্য, যেহেতু সে সারাক্ষণ চুল আঁচড়াত। যাকে বলে “ইমপ্লান্টিং দি এভিডেন্স”। কিন্তু, অ্যাগনেসকে কেন কেউ দোষী দেখাবে? সে তো অনেকদিন আগে নিখোঁজ। এখানেই প্যাটার্ন বুঝতে পারছি না। ধরো, আমি কারোর সঙ্গে গোপনে প্রেম করছি, আমি চাই না সেটা অন্যেরা জানুক, কারণ আমি বিবাহিত। এবার, আমাকে যদি আমার প্রেমিকের সঙ্গে কেউ দেখে থাকে এবং পরে হয়তো কথায় কথায় জানায় যে, আমাকে একটা ছেলের সঙ্গে দেখেছে অমুক দিনে, তাহলে আমি সেটাকে ঢাকা দেবার জন্য কী বলব? আমি বলব ওটা আমার স্বামী ছিল অথবা ভাই ছিল, নিদেনপক্ষে অফিসের সহকর্মী ছিল। কিন্তু আমি নিশ্চয় বলব না যে, ওটা শাহরুখ খান ছিল! মানে, ডাইভার্ট করার জন্য এমন কাউকে আমি ব্যবহার করব যে, আমাদের চেনা বৃত্তের মধ্যে থাকে। এমন মানুষকে ব্যবহার করব না যে অ্যাবসার্ড। চিরুনিও তাই। ধরো, এডওয়ার্ডকে বা তোমাকে বা মনীষাকে অথবা নির্মলা দুবেকে কেউ দোষী দেখাতে চায়। সে হয়তো এডওয়ার্ডের ব্যবহার করা সিগারেটের প্যাকেট, বা, তোমার একটা উলের বল, অথবা, নির্মলার বাড়ির চাবি ফেলে রাখতে পারে। যদি বাইরের কাউকেও দোষী বানাতে চায় তাহলে এমন জিনিস ফেলে রাখবে যেটা দিয়ে তাকে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু, এমন জিনিস রাখবে না যেটা দিয়ে কারোর ঘাড়েই দোষ চাপানো সম্ভব নয়। চিরুনি হল, কী বলব, ভুল জায়গায় ভুল জিনিস। আমি আজ সারাদিন নানা জিনিস ভেবেছি আর বারে বারে চিরুনিতে ফিরে আসছি। এটাই আমাকে কাল থেকে জ্বালাচ্ছিল, কী যেন উত্তর আসছে না। হয়তো না-বুঝেই আমি তাই বার বার অ্যাগনেসের কথা খুঁচিয়ে যাচ্ছিলাম তোমার কাছে।' অ্যাগনেসের কথাই-বা ভাবছে কেন ওরা? চিরুনি তো বহু লোক ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু, অ্যারন আমাকে মনে করাল বাড়ি থেকে অ্যাগনেসের ফটো এবং চিঠি পাবার কথা। ‘কষ্টকল্পনা হত, যদি না অ্যাগনেসের ছবি পাওয়া যেত তোমাদের বাড়ি থেকে। আমি বলছি না এই ঘটনার সঙ্গে অ্যাগনেস জড়িত। বরং উলটোটা বলছি। অ্যাগনেসকে কেউ জোর করে জড়াচ্ছে। সম্ভবত সেই কারণেই বাড়ির ভেতর অ্যাগনেসের ছবি ও চিঠি ইমপ্লান্ট করেছিল। হয়তো সে জোর করে অ্যাগনেসের দিকে আমাকে ডাইভার্ট করতে চাইছে। আর সেটা একটা অ্যাবসার্ড রেড হেরিং। কারণ, যার অস্তিত্ব নেই তাকে ফাঁসানোর মানে নেই। কিন্তু, তা সত্ত্বেও অ্যাগনেসকে কেন জড়ানো হচ্ছে, সেই ধাঁধার সমাধান না-করলে সত্যিতে পৌঁছোনো যাবে না।'
‘চিরুনি আর অ্যাগনেসের চুল আঁচড়ানো, দুটো আলাদা দৃশ্য দিচ্ছে। কিন্তু দুটো দৃশ্যের মধ্যে সংযোগ, একটা সংযোগ—' অস্থির ভঙ্গিতে মাথায় হাত বোলাল অ্যারন। ‘দৃশ্য মানে তার অর্থ আছে। এবং, অর্থ আছে মানে তার ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসটা কী?’
‘পুলিশ সন্দেহ করেছিল অ্যাগনেস পালিয়ে গেছে। উনিশশো ছিয়াশি বা সাতাশি সালের ঘটনা। তবে—' এবার মনে পড়ল। এডওয়ার্ডকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল অ্যাগনেস নিখোঁজ হবার পর। তবে একা এডওয়ার্ড নয়, অনেককেই, ওর স্কুলের বন্ধুদেরও সবথেকে বেশি সন্দেহ তো ওই ছেলেটাকে করা হয়েছিল, ব্লাডি কী যেন নাম, সে নাকি অ্যাগনেসের প্রেমিক ছিল। বিহারি ছেলে। মুখটাই মনে পড়ছে না। ছোঁড়া শহর ছেড়ে পালাচ্ছিল, অবিনাশ গ্রেপ্তার করে। ছোটো শহরের গুজব অন্যরকম হয়। কয়েক বছর পর থেকে আমরা শুনতে থাকলাম অ্যাগনেসকে নাকি এখানে-ওখানে রাতবিরেতে দেখা গেছে। লোকে বলতে শুরু করল, অ্যাগনেস খুন হয়েছে। তার অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়ায়। অনেকেই তাকে দেখেছে নাকি। অ্যাগনেসের ভূত ক্রমে টাউনের এক পাকাপাকি অস্তিত্ব হয়ে উঠেছিল।
পর পর দুই রাত এডওয়ার্ড আঁ আঁ চিৎকার করে জেগে উঠেছে। জোজো পালিয়ে যাবার পর থেকে— আমি দেখেছি, হিসু করে ফেলেছিল প্রথম রাতে। মা-কে দেখালাম। মা বলল, হিসুমাখা পাজামায় নুন মাখিয়ে এডওয়ার্ডকে চাটাতে, কিন্তু আমি পারব না। এগারো বছরের ছেলেকে ওভাবে কিছু করা যায় নাকি? এডওয়ার্ড বলল, ও আবোল-তাবোল স্বপ্ন দেখে, ভয় পায়। ওর হাতের ফোসকা ফেটে আবার রস গড়াচ্ছে।
‘কিন্তু জেনিফার বলেছিল, গুড ফ্রাইডের রাতে অ্যাগনেসকে দেখা যায়। গুড ফ্রাইডে কেন? হ্যালোউইন বললে বুঝতাম।' তনয়া বোঝে না, জেনিফারের মাথায় ছিট আছে। নিজেও ভূত নামায় তো, তাই কল্পনা করে যে অ্যাগনেসের ভূত নামে। ‘অ্যাগনেস কে ছিল বারবারা?'
‘টাউনের একটা মেয়ে। ওরা দুই বোন। ছোটোবোনের নাম ডলোরেস। বাবা ছিল টাউনের চোখের ডাক্তার শিবপ্রকাশ শর্মার অ্যাসিস্ট্যান্ট, আর মা উন্মাদ ছিল। ছিল কেন, মা এখনও বেঁচে। তবে হ্যাঁ, দেখতে কিছু সুন্দরী ছিল! মায়ের সেরূপ পেয়েছিল বড়ো মেয়ে। হাঁটু অবধি গড়ানো লাল চুল, ঘন নীল চোখ, ডিমের আকৃতির মুখ, পাকাগমের মতো গায়ের রং। যেন তুলি ডুবিয়ে চোখের মণিদুটো আঁকা হয়েছে। তাকালে মনে হয় আভা বেরোচ্ছে চোখ দিয়ে। অ্যাগনেস মায়ের রূপ পেয়েছিল, সঙ্গে উন্মাদনাও। তারও নাকি মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিয়েছিল ছোটো বয়েসে। কয়েক দিন চাঞ্চল্য হয়েছিল শহরে, যখন ও নিখোঁজ হয়। কিন্তু, তারপর সব থিতিয়ে গেল।' জোরে নিশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘যা জানতাম সব বলে দিলাম। কৌতূহল মিটেছে?'
‘ডলোরেস বেঁচে আছে?'
‘তুমি ক্রিসের ব্যাপারে খোঁজ করছ, না, অ্যাগনেসের ব্যাপারে?'
হিল্ডা আমার পাশে হাঁটছিল। ডেগাডেগি নদীর ওপর বাঁধের ধারে যাচ্ছিলাম আমরা, কারণ হিল্ডার কামিজের নীচে একটা লুকোনো রামের বোতল ছিল। ওখানে গেলে কেউ আমাদের দেখতে পাবে না।
–তোর কলেজ অনেক দুরে, আমার ভালো লাগে না। সময়ই পাস না তুই আজকাল।
–এই তো আজ পেয়েছি। জোহার হালে যাবি?
-না বাবা, ওখানে অনেকে বসে থাকে, কে দেখে ফেলবে!
–তোকে একজনের কথা বলতাম। আমি বুঝলাম, হিল্ডার বয়ফ্রেন্ড হয়েছে।
ডলোরেস ডন বসকোর লাইব্রেরিতে কাজ করে। বহুকাল দেখা হয় না যদিও। বিয়েথা করেনি, মা-কে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকে। অবশ্য এমনিতেও ওরা কম মিশত সবার সঙ্গে। অ্যাগনেস বাদে। তার ওপর গোঁড়া ক্যাথলিক। আমাদের কোনো অনুষ্ঠানে থাকতে দেখিনি ওদের। ওদের একটা ছোটো চার্চও ছিল টাউনের বাইরে। ‘চিরুনিটাকে তুমি পাত্তা দিচ্ছ না কেন?' অ্যারন জিজ্ঞাসা করল আমাকে। ‘ক্রিসের বোরিং গল্পে ওটা একমাত্র কোয়ার্কি ছিল।' নিজের দাদার নিখোঁজ হবার গল্প ওর বোরিং লাগছে কেন? ও কি বাবার মতো পাকা অ্যাংলো হয়ে উঠল?
-থাক, আমাকে বলবি না।
-কেন?
-শুনতে চাই না বললাম তো। আমি ওকে ছেড়ে হনহন করে হাঁটা লাগালাম, হিল্ডা পেছন থেকে ডাকছে। পিছু ফিরে দেখলাম, নদীর ধারে দাঁড়িয়ে, জঙ্গল ঝেঁপে আসছে, হাওয়ায় ওর চুল উড়ছে এলোমেলো। ওর কাছে ফিরে গেলাম, কামিজ তুলে বার করলাম বোতলটা। গলায় দু-ঢোঁক ঢেলে বললাম, ‘হ্যাপি? নাউ গো টু হেল।’ হিল্ডা অবাক তাকিয়ে, কিন্তু ছোটোবেলার মতো কথায় কথায় ভ্যাঁ করে না। অনেক বড়ো হয়ে গেল। কত দূরের কলেজে যায়!
‘আমার মাথায় প্রথমেই যেটা স্ট্রাইক করছে, দু-জন নিখোঁজ হয়েছিল যাদের অন্তর্ধান রহস্যের সমাধান হয়নি।' পকেট থেকে মোবাইল বার করে খুটখাট বোতাম টিপল তনয়া, মুখ থেকে বিরক্তির আওয়াজ করল, ‘এখানে নেটওয়ার্ক এত স্লো...', তারপর উদ্ভাসিত হল মুখ। ‘১৯৯২ সালের গুড ফ্রাইডে ছিল ১৭ এপ্রিল।’
তো?’
‘ক্রিস নিখোঁজ হয়েছে ২০ এপ্রিল। দুটো দিন কাছাকাছি না?'
‘কিন্তু অ্যাগনেসের সঙ্গে গুড ফ্রাইডের কী সম্পর্ক?' আমি নিশ্চিত ছিলাম তনয়া ভুলপথে হাঁটছে। যেখানে রহস্য নেই, সেখান থেকে জোর করে রহস্য টেনে আনছে।
অ্যারন বলল, সে আজ স্যাংচুয়ারিতে থাকবে। ওর জন্য একটা ঘর রাখাই থাকে, কিন্তু সেখানে খাট বিছানা রাখতে দেয়নি। মাটিতে একটা চাদর বিছানো থাকে। তার ওপর বসে ও সারারাত সিগারেট খায়, মদ খায়। নীচে থাকলেও আমি বুঝতে পারি, অ্যারন রাত্রিবেলা ঘরজুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। তনয়া শুতে চলে যাবার পরে আজ মাঝরাত পর্যন্ত আমি বসে ছিলাম খাবার টেবিলে। অ্যাগনেসকে মনে করার চেষ্টা করছিলাম। সত্যিই কি সে ছিল কোথাও? নাকি, এ সবই তনয়ার কল্পনা? অ্যাগনেসের পড়াশোনায় মন ছিল না। এর গাছে চড়ছে, ওর বাগানের ফল চুরি করছে, দুরন্ত মেয়ে। স্বাভাবিক অবস্থায় হাসিখুশি। কিন্তু, মাঝে মাঝে মাথায় পাগলামি চাপত নাকি ওর। তখন মারধর করত একে-তাকে, চিৎকার করে অশ্লীল গালি দিত। ফেল করেছিল দু-বার। তবে বাইবেলের ক্লাস নাকি মন দিয়ে করত, কে যেন বলেছিল। ধর্মভীরু ছিল অ্যাগনেস। পড়াশোনায় ভালো ছিল ওর বোন ডলোরেস। বাধ্য, শান্ত, সারাদিন বই মুখে পড়ে থাকত। ডলোরেসের থেকে অ্যাগনেসের পাগলামির ব্যাপারে শুনেছিলাম। বাড়িতে নাকি ঢেঁকা যেত না যখন অ্যাগনেসের মাথায় ভূত চাপত। ডলোরেস পালিয়ে স্কুলের লাইব্রেরিতে চলে যেত।
ব্যাগ থেকে বার করে ছবিটা আবার দেখলাম। কোনো এক বাগানে গাছের একটা নীচু ডালে হেলান দিয়ে অ্যাগনেস বসে। হাঁটুর কাছে থেমে যাওয়া বাহারি ফুলছাপ ড্রেস আর চোখে স্টাইল করে পরা সানগ্লাস। একটা হাত আলস্যে রাখা মাথার চুলে। অন্য হাত দিয়ে ডাল ধরে আছে। হাসছে অ্যাগনেস। এই ফটো কে তুলেছিল? সোয়েটার পরা ওই রহস্যময় হাত কি চেনা লাগছে আমার? কোথায় দেখেছি তাকে? ওই ময়ূরছাপ ডিজাইন—
স্মৃতি অনুদার। রুক্ষ শীতের মতো নিজের ডালপালা ছেঁটে ফেলতে চায়।

তখন স্ত্রীলোকটা এলিয়কে কহিল, হে ঈশ্বরের লোক, আপনার সহিত আমার বিষয় কি? আপনি আমার অপরাধ স্মরণ করাইতে ও আমার পুত্রকে মারিয়া ফেলিতে আমার এখানে আসিয়াছেন।
-1 Kings 17:1
‘অনেকটা সময় কথা বলে গেলাম কিন্তু আপনি কিছুই জানালেন না। এটাও বললেন না কেন আমার থেকে গল্পটা শুনতে চাইছেন।'
অক্ষয় হাসলেন। ‘হতেও তো পারে আপনি সন্দেহভাজনদের একজন।'
‘কিন্তু, সেটা আপনি মনে করছেন না। আমিও বহুদিন ক্রাইম বিট করেছি. পুলিশের বডি ল্যাংগুয়েজ আমার জানা। এই কারণেই ধৈর্য ধরে এতক্ষণ কথা বলে যাচ্ছি কারণ আমি বুঝি, খুঁটিনাটি সমস্ত কিছু পুলিশ জানতে চায় নিজেদের সুবিধের জন্য। কিন্তু, শুধু আমিই কথা বলে যাব আর আপনারা স্পিকটি নট থাকবেন, তা তো হয় না।' অন্ধকার ঘন হয়েছে বাইরে। আমার মুখ বিস্বাদ, সিগারেটে তেতো আমেজ।
সোমেন কর্মকার বললেন, ‘যদি এমন হয় যে, আপনার সাহায্য চাইতে ঝাড়খণ্ড সিআইডি এতদূর এসেছে?’
‘আমি কীভাবে সাহায্য করব? বার বার সবাইকে যেটা বুঝিয়ে আমি পারি না, রহস্যের সমাধান আমার পেশা নয়। নেশাও নয়। আমিও বোকা, এত কিছু বলে তারপর নিজেই জড়িয়ে যাই।'
‘কিন্তু আপনি যতই অস্বীকার করুন, দার্জিলিং-এর কেসটা অদ্ভুত সমাধান করেছিলেন।” ‘কী কুক্ষণে করেছিলাম! সেই থেকে গোটা পৃথিবী পেছনে পড়ে আছে আমার আর আমিও,' সিগারেট ধরাতে গিয়ে বিরক্ত লাগল, লাইটার জ্বলছে না, ‘ধ্যাত’ বলে ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে বললাম, ‘আমিও তাদের কথায় নাচছি। শুনুন, বারবারা, ক্রিস, অবিনাশ, কাউকে নিয়ে আমার লেনাদেনা নেই। আমি ব্যর্থ হয়েছি। এখন ভুলে গেছি ওদের।' সিগারেটটা দুমড়ে দিলাম। আমার অসাফল্যে সবার এত ইন্টারেস্ট কেন?
‘এই ছবিগুলো দেখেও আপনার ইন্টারেস্টিং লাগছে না?’
‘লাগলেও-বা কী করতে পারি বলুন? আমার তো ফেরার কারণ নেই। আমি পুলিশ না, রহস্যভেদীও নই। কোন ক্যাপাসিটিতে ফিরব?'
‘আপনাকে জড়াতে হবে না। আমরা গল্পটা শুনে নিয়ে আপনাকে ছেড়ে দেব। বিদায় নেবার আগে অবশ্যই খুলে বলব, কেন এসেছি এখানে। কিন্তু, আপনার কথা শেষ হবার আগে নয়। তার কারণ, আমাকে নিশ্চিত হতে হবে সত্যিই যে কারণে এতদূর এলাম, সেটা হাওয়ায় ভাসানো ছিল না। মিস ভট্টাচার্য, আমি একটা অ্যাজাম্পশন থেকে চলছি, যার সূত্র আমাকে দিয়েছিল অ্যারন। যদি আমার অ্যাজাম্পশন ঠিক হয়, তাহলে অবশ্যই তিন বছর আগে আপনি যা তদন্ত করেছিলেন তার সঙ্গে আজকের ঘটনার সম্পর্ক আছে। কিন্তু, ঠিক না হলে আমার আসা পণ্ডশ্রম ধরে নিতে হবে।'
চাপান-উতোর বিরক্ত লাগছিল। হাল ছেড়ে সোফায় হেলান দিলাম।
এখানে হেমন্ত আসে রিক্ত সন্ন্যাসীর আগমনবার্তার মতো, যখন ভোরের রং লাল হয় আর গাছেরা পাতা ঝরিয়ে কঙ্কাল অবয়ব আকাশের বুকে মেলে। ডেগাডেগি নদীর ওপর ছোট্ট ব্রিজে বসে তুমি তখন দেখবে শেষ দুপুরে ছায়া ঘনায়, মাঠ ফেরত মোষেদের দল গম্ভীর পায়ে এগিয়ে যায়। কোথায় জানি না। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় এক আদিবাসী ছেলে। কুচকুচে কালো রং। মুখে হাসি নেই। কথাও বলে না সে। গলা দিয়ে কঠোর হুম হুম আওয়াজ করে। তার তালবাদ্যে মোষেরা বুঝে নেয় অভ্রান্ত পথ। আমি রোজ বিকেল বেলা ব্যালকনি থেকে দেখি ।
পরের দুইদিন আমি একটানা ভেবে গিয়েছিলাম, ক্রিস নয়, অ্যাগনেসের অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে। টাউনের এর-ওর কাছে জানতেও চেয়েছি। তারপর মনে হয়েছে দেওয়ালে মাথা ঠুকি। কারণ, কেউ কিছু জানে না। তারা শুধু জানে যে, অ্যাগনেস বলে কেউ এককালে এখানে ছিল, এখন আছে তার ভূত। উদাসীন কাঁধ ঝাঁকিয়েছে তারা। কেউ কিছুই বলবে না, কারণ সবাই জানে এমন রহস্যদের কূলকিনারা এতদিন পরে পাওয়া অসম্ভব। তবু আমি কেন খুঁজছি? এমন বোকামিকে প্রশ্রয় দেবার মতো মেয়ে ছিলাম না, তাও আবার অফিস ছুটি নিয়ে। মহেশ মাঝে মাঝেই ফোন করে, এটা-ওটা কাজ দেয়। কাজ না-থাকলে আবোলতাবোল বকি দু-জনে, কলিগদের নিয়ে পিএনপিসি করি। ফোন রাখার আগে মহেশ বলে, ‘এবার ফেরো।” আমিও বুঝি, ছায়ার পেছনে ঘুরে লাভ নেই। সবার চোখে সন্দেহ, আমি কেন পুরোনো ঘটনা খুঁচিয়ে অশান্তি বাড়াচ্ছি। আমাকে শুনিয়ে টিকটিকি বলে বিদ্রূপ করেছে স্থানীয় মানুষ। খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। সত্যিই তো আমার কাজের পেছনে যুক্তি নেই। দু-দিন ধরে নিজের মতো গেছি এখানে-ওখানে। অ্যারনও আমার সঙ্গে ঘুরেছিল। আমরা হেঁটে হেঁটে চলে যেতাম, বেথেল মিশন চার্চ, অন্যদিকে দয়াপুর বা খালারি, কখনো পূর্বের পাহাড় পর্যন্ত। শুধুই একে-ওকে জিজ্ঞাসাবাদ নয়, আমি ঘুরতেই চাইছিলাম। অ্যারনের মনে কী ছিল আমি জানি না। আমরা অবিনাশের বাড়ি গেলাম পুরোনো ফাইলপত্র আবার দেখতে। তারপর বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঝাঁটিফুলের মাঠ, কারণ সেখান থেকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা পথ গিয়ে উঠেছে স্যাংচুয়ারির পেছনের পোড়োমাঠে। তখন বিকেল। স্টেশনের বাইরে মিটমিটে চায়ের দোকান আলস্যের হাই তুলছে। দোকানিরা ব্যস্ত ক্যারাম খেলতে, কারণ খদ্দের নেই।। উনুনে আঁচ দিয়েছে কেউ। মলিন ধোঁয়া শীতের গঞ্জকে ঝাপসা বানিয়েছে। সেখান থেকে হেঁটে এলে র্যামসে সাহেবের বাংলো। আগাছায় ভরতি। শরীর ঢেকেছে লতাপাতা। জানালার ভাঙা কাচের ভেতর থেকে অন্ধকার উঁকি মারে। নিঃশব্দ কুয়াশা শিকারি বেড়ালের মতো গুঁড়ি মেরে তার ভেতর সেঁধিয়ে যায়। বাগানে একটা দোলনা, আশ্চর্য, এত বছর পরেও অক্ষত। একা একা দোল খাচ্ছে। তাকে ঘিরে এগিয়ে আসছে পিয়াল, সেগুন, ফলসা গাছের বাহিনী। কিছু দূরে একটা আদিবাসী বেকারি। তার সামনে ক্লান্ত মুখেদের সারি, হাওয়ার প্রাচীন সমাবেশ। হেমন্তের ঝাপসা গোধুলিতে ভূতুড়ে সাইরেন ভেসে আসছে দূর থেকে। সম্ভবত বন্ধ কারখানার পেটের ভেতর থেকে, যারা কোনোদিন এ পৃথিবীর বুকে দ্বিতীয়বার নেমে আসবে না। আকাশে ইটভাটার কালো ধোঁয়া এখান থেকে দেখা যায়। হিম চাতুর্যে প্রবাদ ও লোককথার দল আমাকে ঘেরে। বাঁ-দিকে হাঁটলে গঞ্জের থানা। সেখান থেকে আরও এগোলে গঞ্জের পশ্চিমে পাহাড়ের দিকে যাওয়ার রাস্তা। পথে আদিবাসী পল্লির মধ্যে পড়বে একহার্ট সাহেবের বাংলো, লতিফ সাহেবের বাংলো, যারা সবাই ভগ্নস্তূপ। সারাদিন পাতা ঝরে এখানে। দেওয়ালে ছায়া সরে সরে যায়। কার একলা মুখ ভেসে থাকে জানালায়। গঞ্জ মানে ছেড়ে যাবার শীতকাল।
‘এখানে স্বপ্নেরা তোমাকে রোগা করে দেবে।' অ্যারনের কথায় আমি হাসলাম, কারণ দুঃস্বপ্নকে স্বপ্ন বলা যায় না। ‘আমাদের টাউন আর তার প্রতিটা লোক যারা এখনও ছেড়ে গেল না, তারা সবাই একটা লকড রুমের ভেতর আছে, আমিও। আমাদের স্মৃতি কাতরতা, অভিমান, আনন্দ, এমনকী একাকিত্ব পর্যন্ত, সেই ঘরের ভেতর ঘুরে ঘুরে আবর্তিত হয় যাকে আমরা নাম দিই স্বপ্ন।'
‘ঠিক আছে, নিটশে, এবার থামো।
‘তুমি কি দেখতে পারছ না যে, ক্রিসের নিরুদ্দেশ এবং তার তদন্ত সমান অ্যাবসার্ড? পিসি ক্রিসকে দেখতে পায় কেন? বেঁচে থাকলে তার বয়েস বাড়ার কথা। কিন্তু, আমাদের লকড রুমে সময় সরলরেখা নয়, বৃত্তাকার। তাই শিশু ক্রিস ফিরে আসে। তোমার আগেও এসেছে। তুমি যখন সাতদিন পরে চলে যাবে, তখনও আসবে অন্য কারোর সামনে।’ ‘সেজন্য তোমার মনে হয়নি কখনো, মন দিয়ে খুঁজে দেখি?”
‘এই খোঁজা তোমাকে হতাশ করবে, রাগিয়ে দেবে। গতকাল যেমন দিয়েছিল। কিন্তু, তুমি জানালে না কাল রাত্রে কোথায় ছিলে। কাল তুমি বলেছিলে আর তদন্ত চালাবে না। তার পরে কেন মত পালটালে, আমি বুঝিনি।' ভুরু কোঁচকাল অ্যারনের।
‘তোমার মায়ের কি সত্যিই শরীর খারাপ হয়েছে?'
‘মাঝে মাঝেই হয়। সেদিন তোমার সঙ্গে কথা বলার পর থেকে জানালার ধারে একঠায় বসে, নয়তো বিছানায় শুয়ে। খাচ্ছে না। জোর করে খাওয়ালে বমি করছে। বলছে মাইগ্রেন। সেটা হতেও পারে। কিন্তু, চোখ লাল। কাঁদছে সম্ভবত।'
‘অ্যারন, আমি জানি না কী বলব। মানে, আমি যদি জানতাম-
‘এর জন্য তোমার নিজেকে দায়ী করার দরকার নেই। তুমি অন্য কিছু করতে পারতে না। শোনো, বাবা একসময়ে চাইত আমি যেন আর্মিতে ঢুকি। তারপর যখন দেখল সেসব হবে না, তাহলে যেন আইটি-তে যাই। সেটাও যখন হলনা, তখন চাইল নিদেনপক্ষে তার ব্যাবসায় আমি যেন ঢুকি। মা চাইত আমি যেন প্রফেসর হই। মায়ের ফ্যাসিনেশন ছিল কলেজের শিক্ষকদের প্রতি। আমি যেদিন বাড়িতে ঘোষণা করলাম যে, আমি শেফ হতে চাই, বাবা প্রথমে হা-হা করে হাসল। হাসতে হাসতে রেগে গেল। যথেচ্ছ গালাগালি দিল ইংরেজিতে। আমি কিছু না-বলে চুপচাপ বসে ছিলাম। বাবা তখন ভাবল আঁতে ঘা দিয়ে কথা বলবে। অপমান করল। আমার ইন্টেলেক্ট, পৌরুষ, যা পারে তাই নিয়ে। আমি তাতেও প্রতিক্রিয়া না-দেখানোয় “ড্যাম ইট” বলে বেরিয়ে গেল। মায়ের সেদিন থেকে আবার মাইগ্রেন। বমি করছে আর শুয়ে আছে ঘর অন্ধকার করে। আজকের মতোই অবস্থা। এগুলো ঘটবে আমি জানতাম। তাহলে কি আমার না-বলা উচিত ছিল? তোমার কী মনে হয়?' আমি নীরব থাকলাম। ‘মায়ের কথা ছাড়ো। তুমি নিজে কি হতাশ হয়ে পড়ছ? বিশেষত কালকের ঘটনার পর?'
‘অনেকগুলো প্রশ্ন আছে, অ্যারন। তোমার বাবা কেন গতকাল রেগে গেলেন, কেন আমাকে ওভাবে আক্রমণ করলেন, সেটা কি শুধুই জেনিফারের খোঁচা? আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, কেউ কেউ আরও বেশি কিছু জানে, যা তারা বলবে না। যেমন, রেভারেন্ড গরম্যান। গুড ওয়ার্কস –
‘অবশ্যই জানে। ধর্ম নিয়ে যার ব্যবসা-
‘ব্যবসা? আমি অত কঠিন শব্দ ব্যবহার করব না।'
‘ব্যবসা তো অবশ্যই, মানুষকে বোঝানো যে সে মহিমা ও গ্রেস নামক কিছু সান্ত্বনা পাবার যোগ্য। আমি নিশ্চিত যে ডোডো অনেক ঘটনাই জানে, কারণ মানুষ তার কাছে আসে নিজের অপরাধী মনকে খুলে ধরতে। অ্যাগনেস বা ক্রিস সংক্রান্ত ঘটনার অপরাধীরা আসেনি,
আমি বিশ্বাস করি না। প্রশ্ন হল, ডোডোকে মুখ খোলাবে কে? অথবা, মুখ খোলার মতো স্মৃতি কি তার অবশিষ্ট আছে?'
গতকাল রাত্রিবেলা আমরা টমাস অ্যাক্টায়ারের বাড়িতে ডিনারের নিমন্ত্রণ রক্ষায় গিয়েছিলাম, তবে মনীষা আসেননি। নতুনদের ভেতর দেখলাম টমাসের স্ত্রী মেরিল, আর ডন বসকো স্কুলের শিক্ষক আলফ্রেড হেমব্রমকে। টমাস ছোটোখাটো, কিন্তু মেরিল ছিপছিপে হবার কারণে লম্বা লাগে। চোখের কোনায় শ্বেতির আভাস, ঈষৎ বাদামি চুলের গোছা মুদ্রাদোষে পাক দেন অবিরত। ঢাকাই কটনটা মনে হয় অনেকদিন পর আলমারি থেকে বেরোল, পাটভাঙার চিহ্ন পরিষ্কার। আমার পরিচয় শুনে অবাক হলেন। এত কমবয়েসি বলে নাকি ধারণা করেননি। ‘কিন্তু কিন্তু’ করে জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন একবার, 'মানে, আপনাদের মনে হয় অনেক কানেকশন, না? আমরা সাধারণ মানুষ তো, ওই পেশায় গিয়ে দুম করে এত বড়ো ব্রেক পাব না!' পেশাদারি হাসি ঝুলিয়ে নীরব থাকার কৌশল আমি শিখে গেছি।
টমাসের কটেজের একদিক ভাড়া দেওয়া হয় ডন বসকোর ছাত্রদের জন্য। অপেক্ষাকৃত প্রাচীন অন্যদিকটায় তাঁরা থাকেন। দেওয়ালে যিশুর ছবি, সেখানে মালা পরানো, সামনে জ্বলছে ধূপ। উঁচু কাঠের চেয়ারে বসলে পা মাটি থেকে উঠে যায়। ডাইনিং টেবিলে অজস্র ফাটল, কিন্তু আতিথেয়তায় কমতি ছিল না। সুস্বাদু কাবাব দিয়ে শুরু হল, তারপর নান, পনির, পোলাও, মাটন, পায়েস। সব নাকি মেরিল নিজের হাতে বানিয়েছেন।
খাবার টেবিলে আমার পাশে জেনিফার পিঠে খোঁচা দিলেন। ‘শুনলাম তুমি নাকি ক্রিসের ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছ?' খাচ্ছেন না কিছুই প্রায়। একটা রুটি নিয়ে বসে আছেন। ‘তোমার কি মনে হয়, পারবে? আমি অনেক খুঁজেছি। আশপাশের গ্রামেও লোক লাগিয়েছিলাম। একটা পার্টি তো হলফ করে বলেছিল সোনাহাটুতে এক কিশোরের সন্ধান পেয়েছে। অবিকল ক্রিস। তা, সে ধরো কুড়ি বছর আগে তো হবেই। টাকাও নিল আমার থেকে বেশ কিছু। তারপর উধাও।' দু-জনে নীচু তারে কথা বলছিলাম, অন্যেরা নিজেদের মধ্যে গল্পে মগ্ন বলে কান দেয়নি।
‘ফোন করেননি?’
‘ধরত না। ল্যান্ডলাইন নাকি ডিসকানেক্টেড।'
মায়া লাগল। মাথাপাগলা বুড়িকে যে যা পেরেছে বুঝিয়ে টুপি পরিয়েছে।
‘তোমাদের একটা খবর দেওয়া হয়নি। ধানবাদের ওই রিয়েল এস্টেটের লোক আমাদের কাছে এসেছিল গতকাল। ভালো দাম দেবে জানাল। এই জায়গাটা নাকি সানসেট ভিউয়ের জন্য আদর্শ। কে জানে বাবা, আমি তো কোনোদিন দেখতে পেলাম না।' মেরিল বললেন।
‘কিন্তু আমি রাজি হইনি।' টমাস বললেন। ‘এই বয়েসে যাব কোথায়!' তারপর অনেক কথা বলে গেলেন টমাস, কেন লোভনীয় অফারকে প্রত্যাখ্যান করলেন। এই বাড়িতে অনেক স্মৃতি তাঁদের, মেরিল প্রথমে এসে ভূতের ভয়ে রাত্রে ঘুমোতে পারতেন না, তাঁদের মেয়ের হাত ভেঙেছিল ওই জামগাছের ডাল থেকে পড়ে, এসব গল্প। পিতৃভিটে বিক্রি করা পাপ, কথাচ্ছলে দুই-তিনবার বললেন টমাস। শেয়ালের গর্ত এবং আকাশের পাখিদের বাসার মতোই তিনি নাকি নিজস্ব কোটর বেছে নিয়েছেন। আমি দেখলাম শক্ত মুখে এডওয়ার্ড গ্লাসের পানীয়র দিকে তাকিয়ে। অন্যেরা টমাসের গল্প শুনলেও জেনিফার হাসিমুখে এডওয়ার্ডকে দেখছেন।
‘আশ্চর্য ব্যাপার, পরের পর প্রপার্টি কিনছে। টুরিস্ট স্পট করলে থাকা যাবে না অবশ্য। মালিক নাকি সরকারের কাছের লোক।' অবিনাশ এর মধ্যে অনেকটা হুইস্কি খেয়ে ফেলেছেন, মুখ লাল এবং হাঁফাচ্ছেন অল্প। ‘অতীত রেকর্ড স্বচ্ছ নয় শুনেছি। প্রচুর গুন্ডাগর্দি করেছে, কাঠমাফিয়াদের সঙ্গে কানেকশন আছে। তাও ভালো, এখানে ভদ্রভাষায় কিনতে চাইছে। জোরজুলুম করছে না।' মেরিল মালিকের নাম জিজ্ঞাসা করলেন। অবিনাশ চট করে বলতে পারলেন না, মুখ ফেরালেন এডওয়ার্ডের দিকে।
‘পবন সিং বা পবন কুমার। আমি দেখিনি। কোম্পানির উকিলের সঙ্গে সইসাবুদ হয়েছে।' ‘কিন্তু মরতে এখানে কেন!' বারবারা বিড়বিড় করল। ‘শান্তিতে আছি, সহ্য হয় না ব্লাডি—কী যে মধু আছে কে জানে। একটা ভূতুড়ে শহর, তাকে নাকি ঢেলে সাজাবে। সকালে উঠে দেখতে হবে পাশের বাগানে ন্যাংটো মেম শুয়ে আছে।'
জেনিফার গলা উঁচিয়ে বললেন, ‘অবশ্য কালো সাদা যাই হোক, ভালো দাম দিচ্ছে সেটাও পয়েন্ট। এডওয়ার্ডের খুশিই হবার কথা।' এডওয়ার্ডের মনোযোগ টাল খেল না। তিনি আলোর সামনে গ্লাস ধরে হুইস্কির রং পরীক্ষা করছিলেন।
‘আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে। যেদিন ক্রিস হারিয়ে যায়, দোতলা থেকে কে চেঁচিয়েছিল? বারবারা হতে পারে না কারণ তাহলে তার স্মৃতিতে থাকত। পরের প্রশ্ন, অ্যাগনেস কেন ওরকম একটা চিঠি লিখতে গেল। তৃতীয় প্রশ্ন—'
‘এগুলো সবই ভালো। কিন্তু, একটাও আসল প্রশ্ন নয়।' অ্যারন সিগারেট ধরাল।
‘আসল প্রশ্ন তাহলে কোনটা?”
“ক্রিস কেন হারিয়ে গেল, এটাই আসল। তনয়া, আমরা সবাই মাথার চুল ছিঁড়ি অপরাধ কীভাবে ঘটল আর কীভাবে অপরাধীকে ধরা হবে সেই নিয়ে। কিন্তু, কেন একটা অপরাধ ঘটল, তার ফলশ্রুতি কী হতে পারে, একটা খুন করার পরে মানুষ একইরকম থাকে কি না, সেগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি তোমাকে বলেছি, আমি মানুষের ক্ষয় নিয়ে ইন্টারেস্টেড। কেন একজন মানুষ এত নৈরাশ্যের মধ্যে ক্ষয়ে যেতে যেতেও নিজেকে গ্রেস পাবার সান্ত্বনায় ভোলায়। যদি ভোলায়-বা, সে তার পরে একটা অপরাধ কীভাবে করতে পারে? কীভাবে অপরাধী তৈরি হয়?'
‘শুধু ক্রিস নয়, অ্যাগনেস কেন হারিয়ে গেল? তুমি তো ভাবছ অ্যাগনেসকে নিয়েও, আমি জানি—'
‘আমার ভাবার কারণ তোমার থেকে আলাদা। তুমি যুক্তির আশ্রয় নিচ্ছ। কিন্তু, আমি দেখেছি যে, যুক্তি দিয়ে ক্রিসের রহস্যের সমাধান গত তিরিশ বছরে কেউ করতে পারেনি। তাই অ্যাবসার্ডিটিকে কাউন্টার করতে আমি অ্যাবসার্ডের সাহায্য নিচ্ছি। চিরুনিটা যেমন। এটাই রাস্তা বলব না, কিন্তু পরীক্ষা করা যেতে পারে। কিন্তু তুমি বললে না, কাল রাত্রে কোথায় ছিলে।'
‘স্যাংচুয়ারিতে ছিলাম না সেটাই-বা জানলে কী করে?'
‘আমি রাত্রে ঘুমোই না, তুমি জানো। তোমার দরজা খোলার আওয়াজ আমি পেতাম। তা ছাড়া, ভোরবেলা গিয়ে সে-ঘর তালাবন্ধ দেখেছি।'
অবিনাশকে দেখলাম আলফ্রেড হেমব্রমের দিকে ঝুঁকে কিছু বলছেন। একমাত্র এঁর সঙ্গেই প্রাথমিক ‘হ্যালো' বাদে অন্য কথা হয়নি। মধ্যবয়স্ক গম্ভীর মানুষটার গায়ের রং কুচকুচে কালো এবং দড়িবাঁধা চশমা ঝুলছে বুকে। দেখে মনে হয় গির্জার ফাদার। সাদা জামা পরা, কাঁচা-পাকা দাড়িগোঁফ। তবে, সবার আগে চোখে পড়ে গভীর দুটো চোখ। মোটা ঠোঁট, কোঁকড়া চুল এবং চওড়া কাঁধ দেখে ভাবছিলাম, কোথায় দেখেছি আগে! তারপর বুঝলাম, ‘সেভেন' সিনেমাটা মর্গান ফ্রিম্যানের বদলে এই লোকটাও করতে পারত। আমার কী মনে হল, আলফ্রেডকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি ডন বসকোতে আছেন। ডলোরেস ও'ব্রায়েনকে চেনেন?'
ভুরু তুললেন আলফ্রেড। ‘অবশ্যই। আপনি চেনেন নাকি?'
আমি উত্তর দেবার আগে জেনিফার বললেন, ‘আলফ্রেডের বিশেষ বন্ধু তো ডলোরেস!” এবং, আলফ্রেডের ভুরু কুঁচকে গেল। ভালো বিপদ হয়েছে! এমন মানুষকে লোকসমাজে বার করাও ঝামেলার। তাড়াতাড়ি বললাম, ‘আপনাদের লাইব্রেরির অনেক নাম শুনেছি। একদিন দেখতে যাব?”
জেনিফারের থেকে চোখ সরিয়ে কোঁচকানো ভুরু সোজা হল। স্বাভাবিক স্বরে হাসলেন আলফ্রেড, ‘আসবেন। আগের দিন ফোন করে নেবেন একটা।' এডওয়ার্ডের দিকে ফিরলেন, ‘কালেকশন আরও বাড়বে। রেভারেন্ড গরম্যান তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি আমাদের লিখে দিচ্ছেন।'
‘সুস্থ মস্তিষ্কে দিচ্ছেন আশা করি!' এডওয়ার্ডের মুখ বেঁকে গেল।
‘সে তো মৃত্যুর পর লাইব্রেরির ভাগ পাবে।' খিকখিক হাসলেন জেনিফার। ‘এডওয়ার্ড মরতে দিলে তো।'
স্যালাড তুলছিলেন এডওয়ার্ড নিজের পাত্রে, হাত থেমে গেল। ‘মানে?
‘বেতলাতে পাঁচকাঠা জমি কিনে রেখেছিলেন তো। মিশনের নামে লিখে দেবেন বলেছিলেন। দানপত্রও প্রস্তুত। কিন্তু, একমাত্র মেয়ে থাকতে তা কি হয়? দানপত্র নাপালটানো পর্যন্ত—' জেনিফার চোখের ইঙ্গিত করলেন। শক্ত হল এডওয়ার্ডের মুখ। গালের পেশি দপদপ করছিল তাঁর। মেরিল সুযোগ বুঝে অদৃশ্য হলেন কিচেনে ।
‘আপনাকে এগুলো কে বলল? আপনি জানেন কী বলছেন?’
জেনিফার নির্বিকার মুখে রুটির টুকরো চিবোলেন। ‘আহা, এতে তো দোষের কিছু নেই।
বাপের রক্ত-জল-করা প্রপার্টি কেনই-বা মিশনে যাবে, সন্তান যেখানে বেঁচে!
অবিনাশ গলা খাঁকড়ালেন, ‘থাক এসব কথা ।’
‘থাকবে না।’ এডওয়ার্ড তীব্রকণ্ঠে বললেন। ‘আপনি অনেকক্ষণ ধরে খুঁচিয়ে যাচ্ছেন, কারণ আমি বাবার বাড়ি বেচে দিয়েছি। আপনারা সবাই, আপনারাও সেটাই ভাবেন তো?” ‘ঠিকই ভাবে,’ অ্যারন বলল। এডওয়ার্ড আচমকা অ্যারনের কাঁধ খামচে হাত তুললেন, বারবারা বলে উঠল, ‘ও কী হচ্ছে!’ হাত নামালেন এডওয়ার্ড। দাঁত ঘষলেন।
‘ভাগ্যিস অনেক বড়ো হয়ে গেছিস, ইউ ড্যাম ফুল! বেতলার ওই জমির ব্যাপারে আগেও শুনেছি, কিন্তু আমার ইন্টারেস্ট ছিল না। তোর মা বরং কয়েক বার আমার কাছে বলেছে কারণ সে লোভী, আর আমি তাকে ধমকেছি—' এডওয়ার্ডের চোখের কোনায় রক্তের ছিটে জমতে দেখছি।
‘অ্যাই, তুই থামবি?’ চেঁচাল বারবারা।
‘আমাকে জ্ঞানের বাণী শোনাস না। বাড়ি আমি একা বেচিনি, তুইও মত দিয়েছিস, কিন্তু আঙুল আমার দিকেই ওঠে। সেদিন তুইও গিয়ে বললি, বাবার বই, ঘড়ি, ফটো সব অকাতরে দিয়ে দিচ্ছি, তুই হলে নাকি পারতিস না? হ্যাঁ দিচ্ছি, কারণ আমি চাই না কিছু রাখতে।' এডওয়ার্ডও চেঁচালেন। অবিনাশ মাথা নীচু করে বসে, টমাসের চোখ ছাদের সিলিং-এ। আলফ্রেড বুকে চিবুক ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন। ‘এই সমস্ত স্মৃতি আমার কাছে জঞ্জাল, এরা আমাকে কিচ্ছু দেয়নি। সব কেড়ে নিয়েছে আমার থেকে।
‘কেউ তোর কাছে জবাবদিহি চায়নি। তুই নিজে গিল্ট থেকে এগুলো বলছিস। আর এই যে জেনিফার, এর আসল সমস্যা হল সেক্স পায়নি বহুকাল। ওকে আমি বলতাম গেট লেইড—' বারবারা টলোমলো গলায় চিৎকার করল। ‘গেট লেইড বাবা!' জেনিফার আমার দিকে ফিরে ফিসফিস করলেন, ‘পাগলামির ভান করছে, আসলে সেয়ানা।”
‘শাট আপ, ফালতু কথা বলিস না। আমার গিল্ট? একটা গোটা টাউন যে আমার ছেলের কথা ভুলে গিয়ে দিব্যি স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছে আর পার্টি করছে আর এই যে,' চায়না বোল তুলে ধরলেন এডওয়ার্ড, ‘সুপ খাচ্ছে, মদ খাচ্ছে হাসছে, তারা কেউ গিলটি নয়? রেভারেন্ডের ওই বেতলার জমিতে আমি থুতু ফেলি। ওদের সবার জন্য আমার ছেলে— আমার ছেলে—' এডওয়ার্ড হাঁফিয়ে উঠেছিলেন, অনেকটা হুইস্কি গিলে মুখ মুছলেন, সবার দিকে তাকিয়ে বিকৃত মুখে হাসলেন এবার, আঙুল তুলে বললেন, “আমি জানি, আপনাদের ভেতরেই অপরাধী লুকিয়ে ছিল যারা আমার ছেলেকে অপহরণ করেছে। আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে আপনাদের প্রত্যেককে ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে যেতাম। কে দোষী আর কে নির্দোষ তা দিয়ে আই উড গিভ আ ড্যাম!' এবার ফিরলেন আমার দিকে, ‘এবং, আপনিও নিজের বুদ্ধিতে শান দেবার খাতিরে মনীষাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার অবসাদ বাড়িয়ে তুলেছেন, তাকে শয্যাশায়ী করেছেন, তারপর লেপাপোঁছা মুখে এখানে বসে মাটনের হাড় চিবোচ্ছেন। ভাগাড়ে কারা মাংসের হাড় খোঁজে জানেন তো?’
কান ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠল কারণ আমার হাতে তখন একটা মাটনের টুকরো রুটিতে জড়ানো। রুটি ফেলে বললাম, ‘আপনিও প্রথমদিন চেয়েছিলেন আমি যেন শুনি, তাই না?’ এডওয়ার্ড চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ‘আপনাদের সবার সঙ্গে আমার দেখা হবে। আই উইল মিট ইউ অল!' তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন।
কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর টমাস জেনিফারকে ক্রুদ্ধ গলায় বললেন, ‘সব আপনার জন্য। বয়েস তো অনেক হল! লোককে খুঁচিয়ে কী আনন্দ পান আপনি?'
জেনিফার ওয়াইনে চুমুক দিলেন। কাঁধ ঝাঁকিয়ে মুখে আনলেন বালিকার সারল্য, ‘সরি।’
টমাস অন্যদের অনুরোধ করলেন, আমরা ডিনার যেন শেষ করি। শুকনো হাসি দিয়ে একে অপরকে আমরা ঘাড় নাড়লাম। আলফ্রেড জিজ্ঞাসা করলেন, আমি ডলোরেসকে চিনলাম কীভাবে।
‘ওর দিদি অ্যাগনেসের গল্প শুনলাম। যে হারিয়ে গিয়েছিল। তার সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছিলাম একটা বিশেষ দরকারে।'
আলফ্রেড শুষ্ককণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেন?
‘ধরে নিন, এডওয়ার্ড যা বলে গেলেন, বুদ্ধিতে শান দেবার খাতিরে।' তিক্তকণ্ঠে উত্তর দিলাম। ‘আপনি অ্যাগনেসকে চিনতেন? '
‘স্কুলে আমার দুই ব্যাচ সিনিয়র ছিল।'
‘আমি দুঃখিত, আপনাদের অনেক খুঁচিয়েছি। এসব প্রশ্ন যে অবাঞ্ছিত, বোঝা উচিত ছিল আমার।'
আলফ্রেড উত্তর না-দিয়ে বিশাল চোখে আমাকে দেখলেন। সে-দৃষ্টিতে বিষণ্ণতা, নাকি, হতাশা, জানি না। জেনিফারকে কেউ যেন দেখতেই পাচ্ছে না এবং তিনিও নির্বিকার। সিগারেট খাবার অছিলায় আমি ও অবিনাশ বাইরে এলাম। বাগানের হিম অন্ধকারে কাঁপুনি ধরছিল। জ্বর না-এলে বাঁচি। চোখে পড়ল দালান থেকে পা ঝুলিয়ে অ্যারন একলা বসে। কখন সবার অজান্তে বেরিয়েছে জানি না। অবিনাশ চাপাগলায় বললেন, ‘এডওয়ার্ড ভুল বলেনি। আমাদের সবার হাতে রক্ত লেগে।'
‘আমি বিশ্বাস করি না। আপনারা কে কী করতে পারতেন?'
‘অন্তত মনে রাখতে পারতাম। তিরিশ বছর ধরে টাউন ছানবিন করতে পারতাম। ভুলতে দিতাম না মানুষকে।' যেন ফুঁপিয়ে উঠলেন অবিনাশ, ‘কিছুই করিনি আমি। শুধু বাগানের ধারে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে দেখে গেছি—', কী দেখেছেন জিজ্ঞাসা করায় মাথা নাড়লেন। ‘আমি একা কী করতে পারতাম? অন্যেরা এই কেস হিমঘরে পাঠিয়ে দিল। ভোলাতে বাধ্য করল।’
অ্যারন উঠে দাঁড়াল। ঘর থেকে আলো এসে তার মুখের একপাশে পড়েছে, অন্যদিক অন্ধকার। ‘কেউ ভোলেনি। ক্রিসকে মনে রেখেছে, আমার বাবা, মা, পিসি, আপনি, সবাই। ক্রিস একটা অসহ্য স্মৃতির ভার হয়ে আপনাদের ওপর চেপে বসেছে। সেই কারণে ওকে আপনারা খুঁজে পাবেন না, কারণ বন্ধ ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে চাবির সন্ধান করতে নেই।’
‘তুমিও কি মনে করো আসল অপরাধী এই চেনাজানাদের মধ্যেই ছিল?' অবিনাশ সিগারেটে টান দিলেন। তাঁর পা টলছে। ভ্যাবলা মুখে বিড়বিড় করলেন আবার, ‘আমি যদি খুঁজে পেতাম, কুকুরের মতো গুলি করে মারতাম। অথবা, পিটিয়ে থেঁতলে দিতাম। নাকি,
কী যে করতাম—' কথা হারিয়ে গেলে অসংলগ্ন হাত নাড়ালেন, যেন ম্যালফাংশন করা রোবট। ভেতরের ঘর থেকে বারবারার গুনগুনিয়ে কান্না ভেসে এল। আবার নেশা হয়ে গেছে।
চোখে পড়ল আলফ্রেড অন্ধকারে এসে দাঁড়িয়েছেন। নীরবে তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে। কিছুক্ষণ আমরা চুপচাপ সিগারেট খেলাম। দূর থেকে ভেসে আসা ভজন স্তিমিত হল। আমার কানে এল শীতার্ত কুকুরের কান্না। আলফ্রেড বললেন, ‘শুকনো ঘা খুঁচিয়ে দগদগে করলে বেদনা ছাড়া কী আসে, মিস ভট্টাচার্য? কেন করছেন এমন? '
হয়তো শেষ প্রশ্নটার দরকার ছিল ট্রিগার হিসেবে। আমি পৃথিবীতে আগুন বা তরবারি, কিছুই দিতে আসিনি। ‘শুনুন মিস্টার হেমব্রম, আমি নিজে থেকে শুনতে চাইনি। আমাকে গল্পটা শোনানো হয়েছিল। বারবারা তার আগের রাত্রে আমাকে ঘর থেকে টেনে নিয়ে এসে বলেছিল আমি যেন এই কেস সমাধান করি। এখন শুনে ফেলার পরে সত্যিই যখন আমি চাইলাম, তখন আমাকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে কেন আমি খোঁড়াখুঁড়ি চালাচ্ছি। দু-দিন বাদে সবাই আমাকেই দোষ দেবে যে, নতুন করে অশান্তি টেনে এনেছি।' আমার আর ভালো লাগছে না এসব, এমনকী সামান্য ভদ্রতা করতেও মন চাইছে না। সিগারেটে জোরে টান দিয়ে বাগানে ছুড়লে কয়েকটা ফুলকি অন্ধকার ঝোপের মধ্যে ছড়িয়ে গেল।
‘আমি চাই তুমি এর সমাধান করো।' বললেন অবিনাশ।
‘আপনারা সবাই কী চান সেটাই আমাকে শুনে যেতে হচ্ছে। কিন্তু আমি কী চাইছি, সেটা? কেন? আমার কী সম্পর্ক এসবের সঙ্গে? কিছু এসে যায় না, আমি দু-দিন বাদেই চলে যাব।’
‘তাহলে আমার বাড়ি এসে কেন অতগুলো কথা বলেছিলে?' অবিনাশের ক্রুদ্ধস্বর আমার পিঠে আছড়ে পড়লে অবহেলায় গা থেকে ঝরিয়ে দিলাম। ‘বলেছিলে, আমার এতগুলো বছর নাকি একটা শেষ চেষ্টা ডিজার্ভ করে। আমাকে তুমিই রাজি করিয়েছিলে। এখন এডওয়ার্ডের কথায় সব ছেড়ে দিচ্ছ। এটাই তোমার রেজলিউশন?” হঠাৎ রেগে চেঁচিয়ে উঠলেন অবিনাশ, মুখ থেকে থুতু ছিটকে এল, ‘ক্রিসের অপরাধীকে খুঁজে পেলে ওর পেট চিরে আমি নাড়িভুঁড়ি বার করে আনব, টিনা! তোমাকে খুঁজতে হবে, বুঝলে? খুঁজতে হবে তোমাকে।'
“ফাক ইট অল! এর কোনো সমাধান নেই আমি বুঝে গেছি। সবাই সব জানে এবং কেউ কিচ্ছু জানে না। কেউ অ্যাগনেসের কথা জানে না। ক্রিসের কথা জানে না। ক্রিসের বাড়িতে কেন অ্যাগনেসের ছবি, তা জানে না। জানলেও বলবে না। বরং, গুমরে মরবে। এখানে কেউ বুঝবে না যে, নিজের বুকের রক্তের ভেতর শুয়ে থাকা অপরাধ, আর আমি, এই আমি কি হা-হা শূন্যতাকে শেষমেষ মুঠোতে পুরব? পারব না।' ঘরে ঢুকলাম, কারোর দিকে দৃকপাত না-করে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। অভদ্রতা হলে হবে। টমাস কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু হাতের ইশারায় বারণ করলেন আলফ্রেড।
মেঠো রাস্তা ধরে হনহন করে হাঁটছিলাম। আগামীকাল কলকাতা চলে যাব কি না ভাবছিলাম আমি, কারণ এডওয়ার্ড যেটা অকথিত রাখলেন, সেটাই মারাত্মক। কথাগুলো বলার সময়ে তিনি আমার ও জেনিফারের দিকে পর্যায়ক্রমে দৃষ্টি ঘোরাচ্ছিলেন। ভাবছিলেন আমার সঙ্গে জেনিফারের তফাত নেই ।
হঠাৎ চোখে পড়ল, মহুয়ার জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছে প্রথমদিনের দেখা সেই মেয়েটা। জিপসিদের রাজকন্যা। একইরকম সাদা ড্রেস পরা, মাথায় খড়কাঠির মুকুট। তার পেছনে আদারং বেড়াল হেলতে-দুলতে হাঁটছে। মেয়েটা পাত্তাই দিল না আমাদের। সামনে দিয়ে হেঁটে গেল দুই হাতে ড্রেসটা একটু উঁচুতে তুলে। কাদায় মাখামাখি পোশাক, হাঁটুর নীচ থেকে। অ্যারনকে বললাম আমি, এই মেয়েটাই হয়তো অ্যাগনেসের ভূত। অ্যারন হাসল, ‘আমাদের টাউনে অনেকেই অ্যাগনেসের ভূত হতে চায় কারণ এই গল্প লোককথা হয়ে গেছে।' মেয়েটা বেড়াল নিয়ে রাস্তার দিকে চলে গেল। ‘অথবা এই মেয়েটাও বাস্তবে নেই, হতেই পারে। পিসি একটা জিনিস ঠিক বলেছে। এখানে অনেক ফিসফিসানি তুমি শুনবে। দেওয়ালের ফোকর থেকে। চিমনির মুখ থেকে। স্যাংচুয়ারির সামনের কাঁঠাল গাছ থেকে যে ঝোলানো পুতুল দুটো দেখেছ তারাও অস্ফুটে কথা বলে।’
‘কে মেয়েটা? মাঝে মাঝেই দেখি।'
‘চিনি না। আমি রাঁচি থেকে কম আসি, জানাশোনা কমে গেছে। তবে, অ্যাগনেসের ব্যাপারে ছোটো থেকে শুনে আসছি। সরস্বতী ওরাওঁ বলে একজনকে চিনতাম। সে ওকে দেখেছে রাত্রিবেলা ডাফরিনপাড়ার কবরখানায় ঘুরতে। ঝাঁ-ঝাঁ রোদের দুপুর বেলা বেথেল মিশনের পেছনের লাগোয়া জঙ্গলে বসে চুল আঁচড়াতে দেখেছে স্টিফেন চৌবে। মা-ও দেখেছে। এখানে এক বাঙালিবাবুর বড়ো ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ছিল। আমরা বলতাম ঘোষবাবুর মুদিখানা। ২০১০ সালে উঠে গেছে। সেখানে একদিন সন্ধেবেলা একা ঘোষবাবু বসে ঢুলছেন। তখন কিটি গোমসের মেয়ে, ওই স্টেশনের বাইরে যার চায়ের দোকান, সে ঢুকেছিল। হরলিক্সের শিশি তুলতে গিয়ে দেখে দুরের আইলে একটা ছায়া সরে গেল। অত খেয়াল করেনি, আনমনে আইলের শেষপ্রান্তে গিয়ে দেখে, অ্যাগনেস হেঁটে যাচ্ছে। পেছন থেকে দেখেছিল, কিন্তু ওই চেহারা আর লাল চুল— কিটির মেয়ে ভয়ে চেঁচিয়ে ওঠায় দ্রুতপদে ব্যাকইয়ার্ডের দরজা খুলে অ্যাগনেস বেরিয়ে যায়। জ্যোৎস্না ওঠা গ্রীষ্মের সন্ধেবেলা খুব হাওয়া দিলে মানুষের চোখে পড়েছে তিতিরকান্নার মাঠে সাদা গাউন পরে কাপাস গাছের নীচে বসে আছে অ্যাগনেস। চুল আঁচড়াচ্ছে বসে বসে, কানে গোঁজা শ্বেতপলাশ। দূর থেকে দেখেছে তারা, কাছে যাবার সাহস করেনি। সবথেকে বেশিবার তো ওকে দেখা গেছে জোহার হালে-তে। লোকে বলে ওখানে রাত হলে অতৃপ্ত আত্মারা ঘুরে বেড়ায়।’
‘এটাও তোমার প্রশ্নের লিস্টে ঢুকবে। অ্যাগনেসকে কেন মানুষ দেখে? '
‘কেন দেখে? কী মনে হয় আপনার?' অক্ষয় আমাকে থামালেন।
‘দেখে, কারণ দেখতে চায়। অ্যারন প্রথমদিন যা বলেছিল, মানুষ তার রহস্যকে ভালোবাসে।’
‘অথবা, যদি সত্যিই অ্যাগনেস এখনও থাকে।
‘অ্যাগনেসকে নিয়ে জানতে চাইছেন কেন? সে তো ক্লোজড চ্যাপ্টার।'
‘আপনি তাই মনে করেন?’
‘আপনারা ক্রিসের প্রসঙ্গ জানতে চান, তার একটা কারণ অনুমান করছি যেহেতু ক্রিস এডওয়ার্ড-মনীষার সস্তান ছিল। কিন্তু, অ্যাগনেসের সঙ্গে তো কোনো যোগসূত্রই নেই বলে আমাকে বোঝানো হল তখন। আর আমিও মেনে নিয়ে চুপচাপ চলে এলাম। ক্রিসের ব্যাপারে যা ভুল করেছি সেগুলো শুনতে চাইলেও একটা কারণ বুঝি। কিন্তু, অ্যাগনেস কেন?”
অক্ষয় মাথা নাড়লেন, ‘আপনি ভুল করেননি।
“মানে?’
‘আমাদের কেসের সঙ্গে অ্যাগনেস জড়িয়ে।'
কতক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে অক্ষয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম জানি না। সিগারেটের গরম ছাই টুপ করে পায়ের পাতায় পড়লে চমকে সোজা হলাম।
চিন্তার ঘোর কাটল একসময়ে, কারণ বুঝছিলাম রাস্তার অন্য ধার দিয়ে কেউ হাঁটছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, রকি চাপাস্বরে ডেকে উঠল আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে। তার লেজ নড়ছে দ্রুত। পেছনে লিস হাতে রকির বাবা।
‘কেমন আছেন?’
সামান্য হেসে পা চালালাম দ্রুত। কিন্তু, ভবি ভোলবার নয়। পেছন থেকে ডাক দিলেন, ‘আপনি তো আসবেন বলেছিলেন আমার কটেজে। এলেন না কিন্তু।'
ঘুরে দাঁড়িয়ে কঠিন কিছু বলতে গেলাম, কারণ ততক্ষণে বিরক্তির চরমসীমায় গেছি। কিন্তু রকিকে দেখি, রাস্তায় উপুড় হয়ে শুয়ে দুই পা সামনে বাড়িয়েছে। চোখে করুণ দৃষ্টি। কুকুররা যে কী সাংঘাতিক ম্যানিপুলেটিভ হয়! রকির বাবা বললেন, ‘ও আপনাকে জিজ্ঞাসা করছে, রেগে আছেন কেন।'
হেসে ফেললাম না-চাইতেও। ‘কী দেখে মনে হল আপনার?”
‘আমার না, রকির মনে হয়েছে। ও অনুভূতির গন্ধ পায়।’
‘আজ মাথাটা ধরে আছে। পরে একদিন কথা বলি?”
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়। তবে মাথা ধরলে তার অভ্রান্ত ওষুধ আছে আমার কাছে। একপ্রকার ক্বাথ বাসক পাতা, যষ্টিমধু, বাদামি চিনির দানা, তেজপাতা—'
ভদ্রলোকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ‘আপনি চাইছেনটা কী বলুন তো? সেদিন থেকে আমার পেছনে পড়েছেন। কটেজে নিয়ে যেতে চাইছেন বার বার, কেন? নাকি, একলা মেয়েকে দেখে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে?' বলার পর কিন্তু খারাপ লাগল। রকির বাবার ভেতর সেরকম ইঙ্গিত পাইনি। এতদিন মানুষ চরিয়ে খেয়ে এগুলোর ভাইব আমার চেনা।
‘আমি খুবই দুঃখিত,’ রকির বাবা উত্তর দিলেন। ‘হয়তো সত্যিই আপনাকে বিরক্ত করা হচ্ছে, কিন্তু কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। রকি আপনাকে পছন্দ করেছে খুব। তাই আমি একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি।'
কী মনে হল জানি না। হয়তো মাথা ঘেঁটে আছে বলে, অথবা, রকির বাবার গলায় কিছু ছিল, আমি বলে ফেললাম, ‘চলুন, আপনার কটেজে। মাথা ধরার কী আছে বলছিলেন—' আশা করেননি এত সহজে রাজি হব। অনাবিল হাসিতে তাঁর মুখ ভরে গেল। আমরা হেঁটে চললাম জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। রকি এত খুশি যে ছুটতে ছুটতে লিস ছাড়িয়ে নেয় আর কি! কয়েক বার ধমক দিয়ে ফল হল না ।
অনুমান করলাম জায়গাটা টাউনের শেষপ্রান্তে। চারপাশে জঙ্গল ঘেরা ছোট্ট একতলা বাড়ি। সামনে কাঠের বারান্দা। বাড়ির মাথায় ঝোঁকে এসেছে, অন্ধকারে বুঝলাম না কী গাছ। ভেতরে পা দিয়ে দেখলাম, অনাড়ম্বর ড্রয়িং রুম। দুটো সোফা, একটা কাঠের টেবিল। লাগোয়া ওপেন কিচেনে অল্প আঁচে একটা কড়াই বসানো। সেদ্ধ মাংসের গন্ধ বেরোচ্ছে। রকির জন্য নাকি ভেষজ মেশানো মাংস ঘণ্টাখানেক ধরে মৃদু আঁচে রান্না হয়। ও ভাত দিয়ে দু-বেলা খায়। আর সন্ধেবেলা ছানা। আমার পায়ের কাছে রকি বসল। ভেজা নাকে ঘষে দিল পায়ের পাতা। তারপর পায়ের ওপর মুখ রেখে চোখ বুজল। রকির বাবা জানালেন ওষুধটা বানাতে সময় লাগবে। তার মধ্যে চা, কফি কিছু নেব কি না। ইতস্তত করছিলাম কারণ সত্যিই তো মাথা ধরেনি। কড়া কিছু খেলে বরং ভালো হয়। মুখ দেখে যে কীভাবে বুঝলেন! কিচেনের শেলফ থেকে হোয়াইট ওয়াইনের একটা বোতল বার করে আনলেন রকির বাবা। ‘এটাই আছে। যদি ইচ্ছে হয়।'
ঠোঁটের কাছে গ্লাস এনে বললাম, ‘কেন চান, একটা কেস সমাধান করি? অন্যরা কিন্তু চায় না।'
‘যারা চায় না, তাদের হয়তো উদ্দেশ্য আছে।'
‘আর আপনার?'
আমার মুখোমুখি আরাম করে বসে একটা সিগারেট ধরালেন। এই ব্র্যান্ড আমি চিনি না। সম্ভবত ঝাড়খণ্ডের স্থানীয় সিগারেট। বেশ কড়া ধোঁয়া। ‘আমি এখানে নতুন। কেউ আমাকে চেনে না। আমিও কাউকে না। ফলত, আমার উদ্দেশ্য থাকার কিছু নেই।
‘কিন্তু, আপনি অ্যাগনেসকে চিনতেন। তাকে মেডুসা নামে ডেকেছিলেন কেন?'
রকির বাবা হাসলে ভারী চশমার কাচের ওপারে তাঁর চোখ দুটো আবার ঝিকমিকিয়ে উঠল। ‘আপনি সন্ধান করেছিলেন?'
‘করেছিলাম, তবে আপনার কথায় নয়। অন্য একটা ঘটনার সঙ্গে যোগসূত্র অনুমান করে। কিন্তু, এখন হাত ঝেড়ে ফেলছি। আজকের পর থেকে এসবে আমি নেই।’
‘আর হয় না, মিস ভট্টাচার্য। যতক্ষণ আপনি এটার ভেতর ঢোকেননি, সে একরকম ঠিক ছিল। কিন্তু, একবার যখন ঢুকে পড়েছেন, আর বেরোনো সম্ভব নয়।' সোফায় হেলান দিলেন রকির বাবা, অন্ধকার জানালায় চোখ রেখে বললেন, ‘আমি বাজি ফেলতে পারি, আপনিও এই রহস্য সমাধান করতে চান।'
‘আপনি বাজি ফেলার কে? আমি আপনার হাতের তাস হতে যাব কেন, আমার নিজের এজেন্সি নেই? আপনি আসলে কে আমাকে বলবেন? এরকম জোরাজুরিই-বা করছেন কেন?' ‘আমি খুব চাইতাম কেউ একজন অ্যাগনেসকে নিয়ে মাথা ঘামাক। সবাই ভুলেই গেছে তাকে।'
‘আপনি কীভাবে চেনেন তাকে? এই তো বললেন এখানে আপনি নতুন।' অল্প ওয়াইনেই আমার নেশা হয়েছে। ঝিম লাগছে মাথার ভেতর। সোফায় পা গুটিয়ে বসলাম। রকি মৃদু প্রতিবাদ করে লাফিয়ে উঠে এল সোফায়। আমার কোল ঘেঁষে আবার চোখ বুজল। রকির বাবা ঝুঁকে পড়লে তাঁর জ্বলজ্বলে চোখ দেখে সম্মোহনের মতো লাগল আমার,
‘কেন ব্রাউনদের বাড়িতে অ্যাগনেসের ছবি, আপনার অদ্ভুত মনে হল না?'
‘বাদ দিন এসব। আমার ভালো লাগছে না। ওরা নিজেরাই চাইছে না যেখানে— যার বিয়ে তার হুঁশ নেই, পাড়াপড়শির ঘুম নেই।' বিরক্তিতে একচুমুকে ওয়াইন শেষ করে গ্লাস বাড়ালাম। রকির বাবা বিনা বাক্যব্যয়ে ওয়াইন ঢেলে দিচ্ছেন যখন, আমার মনে হল এঁকে বলা যায়। ‘আপনি জানেন, কেন অ্যাগনেস আমাকে আকর্ষণ করেছিল? ব্রাউনদেরই অন্য একটা ঘটনা নিয়ে।' আমি ক্রিসের গল্প করে গেলাম তারপর। বুঝছিলাম জেঁকে ঘুম আসছে। রকি আরও কোল ঘেঁষে এসেছে আমার ।
‘এত বড়ো রহস্য আপনি ছেড়ে দেবেন, তনয়া?' এই প্রথম নাম ধরে ডাকল আমাকে লোকটা। কিন্তু, ওর নাম কী?
‘কী করব বলুন, আমি এদের সবার মাথাব্যথার কারণ হয়েছি। মনীষাকে ডিপ্রেশনে পাঠিয়েছি—' ছাড়া ছাড়া স্বরে উত্তর দিলাম ।
না।' ‘অন্যদের কী হবে তা ভাবলে দার্জিলিং-এর ঘটনার সমাধান আপনি করতে পারতেন
‘দার্জিলিং?’ স্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া নাম ভাসিয়ে তুলতে সময় নিলাম। “ওহ্, হ্যাঁ। সে হয়ে গেছে কবে! ওই ভূত কাঁধে চেপে আমি ঘুরি না।
‘আর অ্যাগনেসের ভূত? সে কি আপনার মনোযোগ পাবার যোগ্য নয়? একবারও ভাববেন না, একটা ষোলো-সতেরো বছরের মেয়ের কী ঘটেছিল?' ‘সে পালিয়ে গেছে। যাক।'
আমার যেটুকু এর পরে মনে ছিল, মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসে জ্বলজ্বলে চোখে রকির
বাবা বলছেন, ‘পালায়নি। অ্যাগনেস খুন হয়েছিল। আপনাকে খুঁজে বার করতে হবে, তনয়া।’ সোফার উষ্ণ ঘুম আমাকে পেয়ে বসল। এর বেশি মনে নেই। চোখ মেললাম যখন, আমার গায়ে কম্বল ফেলা। তখন ভোরের আলো ফুটেছে। রকি বা তার বাবা, কেউ নেই । ফাঁকা ঘরে টেবিলের ওপর একটা ফ্লাস্ক রাখা। খুলে দেখি, গরম কফি। পাশে কাপ। আমি কয়েক বার রকির নাম ধরে ডাকলাম। সাড়া পেলাম না। বাইরে শুনশান। দলা দলা কুয়াশায় অন্ধকারের অবশেষ বনাঞ্চলে। উত্তুরে হাওয়া এসে আমার পায়ে মাথা কুটছিল। এখানে একা আমি কী করছি, গতকাল স্বপ্ন দেখেছি কি না, বুঝিনি। তার পরেও অনেকবার এই রাত নিয়ে ভেবেছি, আবার দেখা হলে রকির বাবাকে প্রশ্ন করেছি শেষমেষ কী ঘটেছিল। তিনি হেসে জানিয়েছেন যে, আমি কথা বলতে বলতেই ঘুমিয়ে পড়ি। তিনি নাকি রকিকে হাঁটাতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখেন, আমি চলে গেছি।
‘আশ্চর্য, কে ছিল লোকটা?' বিড়বিড় করলেন অক্ষয়।
‘তার পর থেকে আমিও আর পরিচয় জানতে চাইনি। রকির বাবা হিসেবে চিনেছিলাম, সেটাই কমফর্টেবল লাগত। মনে হত, এটুকু অপরিচয় বেশ রোমাঞ্চের আবহ আনছে। তার পরেও আমি তাকে তদন্তের ব্যাপারে বলতাম। সে চুপচাপ শুনত। হয়তো টুকরোটাকরা মন্তব্য করত। তেমন বিশাল কিছু না কিন্তু, আমার বলতে পারলে স্বস্তি লাগত। যেন অচেনা একজন, বা, একটা দেওয়ালকে বলছি।'
‘পরদিন আপনার মনে হল নিজের তদন্ত থেকে সরে যাবেন না?'
‘মনে হল। রকির বাবা সম্ভবত কিছু বলেছিল যা আমার মত পরিবর্তন করায়। অথবা হয়তো, অ্যাগনেস খুন হয়েছিল যে, সেই কথাটা। পরদিন বাড়ি ফেরার সময়ে ওটাই মনে হয়েছিল— কই, দার্জিলিং-এর সময়েও তো সাহায্য করেনি কেউ। তাতে তো পিছিয়ে আসিনি !”
‘কিন্তু লোকটার কথা অন্যদের জানাননি তখনও?'
‘পরে জানিয়েছিলাম। বারবারা প্রথমে অবাক হয়েছিল, কারণ লোকটাকে তারা কেউ চিনত না। পরে তুচ্ছ ব্যাপার হিসেবে উড়িয়ে দেয়। অবিনাশও।

–আমরা যাহা দেখিয়াছি ও শুনিয়াছি, তাহার সংবাদ তোমাদিগকেও দিতেছি, যেন আমাদের সহিত তোমাদেরও সহভাগিতা হয়। আর আমাদের যে সহভাগিতা, তাহা পিতার এবং তাঁহার পুত্র যীশু খ্রিস্টের সহিত।
-1 John 1:3
ঝাঁটিফুলের মাঠের প্রান্ত ঘেঁষে শুরু হয়েছিল শাল, মহুয়ার জঙ্গল। সেটার ভেতর দিয়ে আমরা হাঁটছিলাম। তখন হাওয়ার গায়ে ধীরে ধীরে সিসে রং আসছিল। হেমন্তের দিন ছোটো হচ্ছে দ্রুত। ঝোপঝাড়, শুকনো খাল, পাতায় ঢাকা একটা ঘর অথবা চারটে দেওয়াল মাত্র, এসব অতিক্রম করে এগোতে গিয়ে কানে শুনতে পাওয়া যায় অনেক ফিসফিসানি, বারবারা যেমন বলেছিল। ভাবা যেতে পারে গাছপালার পাতার ফাঁক দিয়ে হাওয়ার সরসর। কিন্তু যখন বড়ো গাছ নেই, সামনে হাঁটুসমান ঝোপ, তখন তুমি গাছপালা দেখতে পাচ্ছ না, অথচ শুনতে পাচ্ছ অনেক কথা। আর, সবসময়েই তোমার মনে হবে কান পাতলে স্পষ্ট বুঝবে। তারপর জঙ্গলটা পাতলা হতে হতে ঢালু জমি দিয়ে আমরা নেমে এলাম বুকসমান উঁচু ঘাসের বনে। তার ভেতর দিয়ে সরু পায়ে চলার পথ বানিয়েছে বুনো ছাগলের দল। পেছন ফিরে দেখলে বোঝা যাবে না কোন পথ দিয়ে এলাম। যেন জঙ্গলটা ঝপ করে নিজের দরজা বন্ধ করে ফেলেছে। অ্যারন বলল, সে রাস্তা চেনে। এদিক দিয়ে অনেকবার হেঁটেছে। ঘাসের দলকে বুক দিয়ে ঠেলে আমরা এগোলাম। আমাদের মাথার ওপর আচ্ছাদন করে এল সবুজ। আমি দেখলাম আলো ম্লান হচ্ছে।
‘এই মাঠ এরকমই পড়ে আছে?'
‘আমার বাবারাও ছোটো থেকে এমন দেখে আসছে।'
‘জায়গাটা ভালো নয়। আমি জানালা থেকে রোজ জলাভূমি দেখতে পাই। মনে হয় বিষাক্ত। মনে হয় ওপাশের জঙ্গলের ধারে কেউ দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছে।' আমি অ্যারনকে প্রথমদিনের কথা বললাম, যেদিন বারবারাকে দেখেছিলাম অবিনাশের পাশে বসে থাকতে। আর বললাম সেই একদিনের কথা, বারবারা রাত্রিবেলা আমাকে টেনে নিয়ে এল জলাভূমির ধারে, সেদিন আমার মনে হয়েছিল দূরের বনে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল। ‘আমি জানি এগুলো ভ্রম। কিন্তু, এরকম জায়গা পিঠে নিয়ে বাস করলে তুমি ঝোপেঝাড়ে বাঘ দেখবেই।'
‘হয়তো ভ্রম নয়। হয়তো সত্যিই দাঁড়িয়ে ছিল কেউ। হয়তো ক্রিস, পিসি যেমন বলে।' “তুমি কি বিশ্বাস করো ক্রিস বেঁচে আছে?’
‘কিছু এসে যায় না ও বেঁচে আছে কি নেই, তা দিয়ে। আমাদের টাউন একটা স্মৃতি, আর ক্রিস সেই স্মৃতির অন্যতম উপাদান। আমাদের ভয়, শঙ্কা, অপরাধবোধ, ঘৃণা, সবার ওপরে আমাদের দুঃস্বপ্ন, এই সব কিছুর একটা মূর্ত রূপ দরকার ছিল। ক্রিস হল সেটা। হয়তো অ্যাগনেসের ভূতও সেটাই।’
হিম হাওয়ার পিঠে চেপে সূর্যালোক ম্লান হচ্ছিল। আমাদের সামনে ঘাসবন বুজে দিয়েছে রাস্তা। আকাশে এর মধ্যেই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে নক্ষত্রের দল জায়গা বানাচ্ছে। একটা বুড়ো নিমগাছ মাথার ওপর অনেকটা ছায়া বিস্তার করে দাঁড়াবার ফলে জায়গাটাকে আরও অন্ধকার লাগে। ‘যদি অ্যাগনেস বেঁচে থাকে, তাহলে একটা সম্ভাবনা কি হতে পারে না যে, সে ক্রিসকে চুরি করেছিল?'
‘কিন্তু, কেন? কীভাবে ক্রিস সবার চোখের সামনে দিয়ে উধাও হয়েছে তার ব্যাখ্যা আমার কাছে ইন্টারেস্টিং নয়। ম্যাজিকের খেলায় এর থেকে কঠিন ভোজবাজি আমি দেখেছি। কিন্তু, কেন উধাও হল? অ্যাগনেস করলেও, কেন?' আমি ওকে মনে করিয়ে দিলাম যে, অ্যাগনেসের মাথায় গণ্ডগোল ছিল। অ্যারন সন্তুষ্ট হল না। ‘যে মানসিকভাবে নড়বড়ে, সে বাচ্চা চুরি করতেই পারে, কিন্তু তিরিশ বছর ধরে সেটাকে চেপে রাখতে পারে না।' অ্যারন জোরে নিশ্বাস ফেলল! ‘আমাদের সমস্যাটা কী জানো? আমরা আউট অফ দ্য বক্স ভাবতে পারছি না, কারণ নিজেরা এই কেসের সঙ্গে এতকাল ঘর করে এটার ভেতর ঢুকে গেছি। আমি বলেছিলাম, দৃশ্য আছে মানে তার ইতিহাস আছে। কিন্তু সেই ইতিহাসটা কী, এই প্রশ্নটা কেউ করেনি এতকাল। আমার বাবার, ঠাকুরদার, অ্যাগনেসের বাবার, মায়েরআমাদের কি সেই ইতিহাস খুঁড়তে খুঁড়তে শেকড়ে পৌঁছোবার কথা ছিল না, তনয়া?’
‘পৌঁছে কী দেখতে? খুঁজে পেতে, কেন অ্যাগনেস হারিয়ে গেল, বা, ক্রিস?'
‘অন্তত অ্যাবসার্ডিটিটুকুকে চিনতাম— কোথা থেকে এল ব্যাখ্যাহীন অপরাধ, যদি অপরাধ বলো একে। অ্যাগনেসের চুল আঁচড়াবার ইতিহাস। তার চিঠির ইতিহাস। ছবির ইতিহাস। সে কী কনফেস করছিল, তার ইতিহাস। এগুলো কি আলাদাভাবে হলেও ইন্টারেস্টিং নয়? শুধুমাত্র অ্যাগনেস হারিয়ে গেল, এটুকুতেই তার অস্তিত্বকে আমরা নামিয়ে আনব, নাকি, তার গোটা জীবনটাকে আমাদের কমিউনিটির ইতিহাসের ব্যাকড্রপে দেখব? ' সামনে তাকিয়ে দেখলাম ঘাসের বন শেষ হয়েছে। সামনে বিস্তৃত জলাভূমি, যাকে ঘিরে আছে কোথাও ফাকা প্রান্তর, কোথাও-বা ঘাসের বন। গোধূলির পাতলা অন্ধকার চরাচরে জলরঙের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে। বহুদূরে অ্যাম্বাস্যাডারের খেলনা কঙ্কাল, কড়ে আঙুলের সাইজের। অপরপ্রান্তে মিটমিটে আলো, স্যাংচুয়ারির ছোট্ট অবয়বকে এখান থেকে বোঝা যায়। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, ক্রিস নাকি সেইখানে এসে দাঁড়ায়, বলেছে বারবারা। কিন্তু, স্যাংচুয়ারির পেছনে বারবারা আসে যদি এখন, তাকে আমি আলাদা করে চিনতে পারব কি? বহুদূর এখান থেকে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় কোনো শিশুকে দেখে বারবারা ক্রিস বলে ভুল করে, এমনটা কি হতে পারে না? অ্যারন মাথা নাড়ল, ‘পিসি পাগল হতে পারে, কিন্তু বোকা তো নয়। তার মাথায় এটা আসেনি, তোমার মনে হয়? এর দুটো ব্যাখ্যা। এক, এখানে কেউই আসে না, পিসি খোয়াব দেখে। আর দুই, এখানে ক্রিস আসে। কিন্তু, ক্রিসের বদলে অন্য বাচ্চা আসে, এটা অসম্ভব।'
‘প্রথম ব্যাখ্যা, হতে পারে, হয়তো বারবারার মস্তিষ্ক এই জায়গাটায় ডেলিউশনাল। দ্বিতীয়টার মধ্যে ঢুকছিই না।'
‘ঢুকছ না কারণ তোমার যুক্তিবাদী মন এখানে ধাক্কা খাচ্ছে। এত তো যুক্তির প্রয়োগ তোমরা করে এলে এতগুলো বছর ধরে, পারলে সমাধান করতে?' কিন্তু, অ্যারন এবং আমার রাস্তা আলাদা। একটা অ্যাবসার্ডকে কাউন্টার করার জন্য অন্য অ্যাবসার্ডের হাত ধরা ওর পদ্ধতি হতে পারে, আমার নয়। অ্যারন হিপফ্লাস্ক বার করে গলায় ঢালল। তারপর বসে পড়ল ঝোপের ওপরেই। ইতস্তত করে আমিও বসলাম। হিম হাওয়ার ভেতর, যখন কুয়াশা দিগন্তকে ধুইয়ে দেয়নি, এক আকাশ তারা মাথায় নিয়ে বাধাহীন প্রান্তরে বসে থাকতে ভালো লাগে। আমার দিকে ফ্লাস্ক এগোলে মাথা নাড়লাম। অ্যারন আর একটা চুমুক দিল ফ্লাস্কে। তারপর সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘ধরে নাও ক্রিস আসে। এটার কি কোনো জাগতিক ব্যাখ্যাই তোমার কাছে নেই? অসম্ভব নয়, কিন্তু অসম্ভাব্য, এমন ব্যাখ্যা?”
‘নেই। থাকা সম্ভব নয়।”
‘আমার কাছেও নেই। কিন্তু, অ্যাবসার্ডের আশ্রয় নিচ্ছি মানে ভেবো না, আমি অলৌকিক ভাবছি। ক্রিসের ভূত বা সেরকম কিছু। আমি সেই অ্যাবসার্ডকে আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার স্তরে নামিয়ে আনতে চাইছি, যাকে ধরাছোঁয়া যাবে। ইন্দ্রিয় মানে তার অনুভব আছে, আর অনুভব মানে তার ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু আমি এখনও জানি না, সেটা কী।'
আমাদের পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছিল শামুকের খোলা, ছেঁড়া প্লাস্টিক, মৃত পশুর হাড়, একটা মাথাভাঙা পুতুলের ধড়। শেষেরটাকে হাতে তুলে অ্যারনকে দেখালাম, এটাও কি অ্যাবসার্ড নয়? কোনো শিশু কেন এখানে পুতুল খেলতে আসবে? জলাভূমি চিকচিক করছিল। জোনাকির দল তার ওপর ওড়াউড়ি করছিল ইতস্তত। ক্রিসকে আমি একটা গল্প হিসেবে দেখলে বরং স্বস্তি পেতাম, তাতে সমাধানের দায় নেই ।
হঠাৎ খচমচ শব্দে আমি চমকে উঠলাম। আমাদের পাশে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। মুখ তুলে দেখি, রেভারেন্ড গরম্যান। শূন্য চোখে তাকিয়ে আছেন জলাভূমির দিকে, হাত কাঁপছে। ঠান্ডাতেও খালি গা। জীর্ণ দেহ বেঁকে পড়েছে, পাজামা কাদামাখা। অ্যারন ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল। রেভারেন্ড মুক চোখে তাকালেন। তারপর বললেন ‘তিনিই ঈশ্বর, তাঁহার পথ সিদ্ধ ; সদাপ্রভুর বাক্য পরীক্ষাসিদ্ধ, তিনি নিজ শরণাগত সকলের ঢাল।’
‘পেছনের রাস্তা দিয়ে ফেরানো কঠিন।' অ্যারন বলল আমাকে। ‘অন্ধকারে জঙ্গল বিপজ্জনক। সামনে এগোতে হবে।' বিরক্তস্বরে ভুরু কোঁচকাল, ‘বেথেল মিশনে কি সত্যিই দেখার কেউ নেই? যেকোনোদিন অ্যাক্সিডেন্টে মরবে।'
‘ওরা অপেক্ষা করছে আমার জন্য। ওরা দু-জন।' বললেন রেভারেন্ড। ‘কারা?’
‘ওই যে। ওখানে। আর্থার শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। আমি আসিনি বলে। আমাকে ওদের কাছে যেতে হবে।' অনির্দিষ্ট আঙুল তুললেন রেভারেন্ড। তাঁর গাল বেয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল, ভিজিয়ে দিচ্ছিল সাদা দাড়ি। আমরা তাঁকে ধরে এগিয়ে গেলাম। অ্যারন রাস্তা দেখাচ্ছিল। জলাভূমি পেরোতে গিয়ে দেখলাম মরা গাছের কঙ্কাল। কারণ ছাড়াই আমার গা ছমছমিয়ে উঠল। এখান থেকে বারবারার বাবা- -পায়ের নীচের ভেজা মাটি পচা পাঁক আর ঘাসের মৃতদেহ বুকে ঘোলানো গন্ধ ছাড়ছিল, তার বুক থেকে হিমাভ বাষ্প উঠে আসছিল। ঘন হচ্ছিল কুয়াশা। গাড়িটাকে দেখা যাচ্ছে না। স্যাংচুয়ারির আলো কুয়াশার বুক চিরে জ্বলজ্বলে হয়ে উঠছে। -
‘আর্থার কে?' জিজ্ঞাসা করলাম।
‘আর্থার। মানবশিশু।'
‘কোথায় থাকে?’
হাঁটতে হাঁটতে আমার দিকে ফিরে তাকালেন রেভারেন্ড, অনবরত তাঁর ঠোঁট নড়ে কিন্তু শব্দ বেরোয় না। অ্যারনের দিকে তাকালাম।
‘এই নাম প্রথম শুনছি। হয়তো ডোডোর কলকাতার চেনা কেউ। পুরোনো স্মৃতি জেগেছে আবার।'
‘আমার সমস্যাটা কী, জানেন রেভারেন্ড? আপনার অনেক কথা অসংলগ্ন ঠেকেছে, অথবা, উলটো করে বললে অর্থময়, কিন্তু সেই অর্থ জানবার জন্য আপনি বাদে কারোর কাছে যাবার নেই। আপনি তিনজনের জীবন নষ্ট হবার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন গুড ওয়ার্কসের কথা। এগুলোর ব্যাখ্যা কার কাছে পাব বলুন?' আক্ষেপের গলায় বললাম, 'চলে যাবার দিন এগিয়ে আসছে, আর কী করতে পারতাম আমি? '
‘ডোডো কিছুই শুনছে না। তবু, তুমি বলে যাও।' অ্যারনের মুখ আমি অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছিলাম না ভালো করে। অনেক ছায়া সেখানে কাটাকুটি খেলছে কারণ আবার আমরা ঢুকেছি বুকসমান ঘাসের বনে যাদের ধারালো পাতাগুলো আলোকে কেটে দিচ্ছে। ‘অন্তত শব্দগুলো রেজিস্টার্ড থাকুক। কারণ, প্রশ্নগুলো কেউ প্রথম করছে।' ‘বোকা লাগছে?'
‘আমার কাছে কিছুই বোকা লাগে না। দুই হাজার বছর আগে একটা লোক অন্যদের ডেকে বলেছিল, “এই দেখো, আমি একটা ক্রুশকাঠ থেকে ঝুলছি, কাজেই তোমরা এরপর থেকে আমার পুজো করবে।” তাকে তখন সবাই বোকা ভাবলেও পৃথিবীর বৃহত্তম ব্যাবসার সূত্রপাত সেদিন সেই লোকটার হাত ধরেই হয়েছিল।'
‘ফাকিং হেল! তুমি কি লোকজনকে এভাবেই সারাদিন রাগিয়ে মজা পাও? এটা তোমার কাছে খেলা?’
‘না, তোমরা সকলে অনন্তের সন্ধানে থাকো যা জীবনকে মহনীয় বানায় বলে তোমাদের বিশ্বাস। কিন্তু আমি বলছি তোমাকে, বেঁচে থাকার জন্য চূড়ান্ত এক ম্যাড়ম্যাড়ে চেষ্টা, কোনোরকমে দিনান্তের খুদকুঁড়ো জুটিয়ে নিজের কুটিরে মাথা গুঁজে থাকা, আর কিচ্ছু নয়, শুধু এটুকুর বয়েস মার্কস অথবা খ্রিস্টের থেকে বেশি।'
‘ব্যস হয়েছে। তুমি আগামী একঘণ্টা আর ডায়ালগ দেবে না। আমার মাথা ঘেঁটে যায় এসব শুনলে।' অ্যারন গম্ভীর মুখ অন্যদিকে ফেরাল। রেভারেন্ড চকচকে চোখে স্যাংচুয়ারির দিকে তাকালেন। ‘বারবারা থাকে এখানে। মনীষা থাকে। আপনার মেয়ে।' বললাম তাঁকে।
‘মনীষা তো রাঁচিতে থাকে।'
‘হ্যাঁ, কিন্তু এসেছে এখানে। আপনার সঙ্গে দেখা করেনি?' স্মৃতি ফিরেছে, ফলত আমি তাঁকে আবার সেদিনকার প্রশ্নগুলো করলাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করলেন, ‘তুমি বুঝবে না।' তাহলে তো বোঝাতে পারেন! কিন্তু রেভারেন্ড আবার চুপ। ঠোঁট নড়ছে শুধু। মনে হল, দেওয়ালে মাথা ঠুকি।
বারবারা গাড়ি করে রেভারেন্ডকে বেথেল মিশনে পৌঁছে দিল। সঙ্গে আমি আর অ্যারন ও ছিলাম। আমরা চার্চের সামনে ঘুরছিলাম। রেভারেন্ডকে ধরে ধরে বারবারা ভেতরে নিয়ে গেল। জঙ্গলের ভেতর জোনাকি ও ঝিঁঝিপোকার সঙ্গত চার্চকে ঘিরে। মিটমিটে কয়েকটা আলো অন্ধকারকে আরও ঘন করেছে। চোখে পড়ল, চার্চের ভগ্নচূড়ায় ঝুলতে থাকা ক্রস ঘিরে জোনাকির দল ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রথমদিনকার কাকের দল যেমন ঘুরছিল। চার্চের পেছনের বুনোকুলের জঙ্গল থেকে মিষ্টি ঘ্রাণ আসছিল। তাদের ভেতর মাথা তুলে আছে নিঃসঙ্গ থাম। বারবারা জানিয়েছে, এখানে রান্নাঘর ছিল। এখন সব গ্রান্ট বন্ধ। স্থানীয় দুয়েকজনের সামান্য অনুদান বাদে কিছু নেই। থামের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভিনদেশের প্রাণী মনে হচ্ছিল। অ্যারন পাশে এসে বলল, ‘আমরা ছোটোবেলায় এখানে খেলেছি অনেক। মেয়েদের দল আসত আড্ডা মারতে। তবে চার্চটা ভূতুড়ে হয়ে আছে অনেকদিন।'
‘এরকম জঙ্গলের মধ্যে ভাঙা চার্চে কেন থাকে দু-জন পুরোহিত?’
‘ডোডোর কোথাও যাবার নেই। মা রাঁচি নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবা তাতে খুব একটা খুশি হত বলে আমার মনে হয় না। আর দ্বিতীয় কথা, অভ্যেস বলে একটা ব্যাপার আছে। ষাট বছর ধরে একটা জায়গায় থেকে গেলে সেটা থেকে বেরোনো কঠিন। রেভারেন্ড মান্ডির ব্যাপার অবশ্য জানি না। বয়েস অল্প, চাইলেই অন্য কোথাও যেতে পারেন। হয়তো বিভ্রম, একদিন জায়গাটার হাল ফেরাবেন ।
‘কিন্তু, তোমার দাদুর দেখাশোনা—'
‘মা পয়সা দেয়। এক দেহাতি বুড়ি রান্নাবান্না করে, খেয়াল রাখে। সে-খেয়াল রাখার নমুনা তো নিজের চোখেই দেখলে।' অ্যারনকে জিজ্ঞাসা করলাম ডেভিড ব্রাউন বিষয়ক স্মৃতি তার আছে কি না। “আবছা। সারাদিন বুকে মাথা গুঁজে বসে থাকা এক বুড়ো। আমায় কখনো কোলে নেয়নি। লাল চোখে তাকাত। বিড়বিড় করত নিজের মনে। ঘর থেকে বেরোত না। আমি কাছে ঘেঁষতাম না চট করে। বাড়িটা সবসময়ে ঝিমিয়ে থাকত। ডেভিড, আগাথা নিজের নিজের ঘরে শুয়ে থাকতেন। বাইরে আলো জ্বালানো হত না। পিসি এদিক-ওদিক ঘুরত আপন খেয়ালে। তারপর ফিরে এসে নিজের খাবার নিয়ে ঘরে চলে যেত। ওরা কেউ কারোর সঙ্গে কথা বলত না। সেই থেকে মা আমাকে এখানে রাখতে চায়নি। আমরা আর্চি আঙ্কলের কটেজে উঠতাম।’
‘এতটা ক্ষয় কীসের কারণে, অ্যারন? শোকেরও তো আয়ু থাকে।
‘আমি সে-শোককে মানি না। আমার বিশ্বাস, অন্য কোনো অন্ধকার- আমরা অবসাদগ্রস্ত, বলেছিলাম তোমাকে।'
‘তাহলে তুমি এখানে আছ কেন? দিল্লিতে কেন চলে যাচ্ছ না, বা, অন্য কোথাও?”
চট করে জবাব দিল না অ্যারন। ফ্লাস্ক থেকে এক ঢোক মদ খেল। ও কি সারাদিন মদ খায়? অন্য খাবার খেতে দেখিনি, এমনকী গতকাল টমাসের বাড়িতে গিয়েও মুখে তোলেনি কিছু। চার্চের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি একটা সময় পর্যন্ত চাইতাম শেফ হতে। এখন চাই না। কী চাই, সেটা পরের কথা। আপাতত কিছুদিন এখানে থাকতে চাই, কারণ তুমি আছ।'
‘আমি আছি তো কী? '
অ্যারনের স্বরে আবেগ ছিল না, উত্থানপতনও নয়। ‘আমি দেখতে চাই, তুমি একটা কমিউনিটিকে কতদূর খুঁড়তে পারো। কারণ, এই প্রথম আমাদের মধ্যে একজন এসেছে যে কিছু নতুন প্রশ্ন করেছে। সেই প্রশ্ন তাকে কতদূর নিয়ে যাবে, সেটা আমি জানব। আগেও বলেছি, আই হ্যাভ টু বেয়ার টেস্টিমনি।'
নিশ্বাস ফেললাম, ‘আমি আর মাত্র তিনদিন আছি।'
‘ছুটি বাড়াও। শুধু ক্রিসের জন্য বলছি না। আমাদের জন্য। আমি অনুভব করছি কিছু একটা। যেন আমরা সবাই গলার কাছে দম আটকে অপেক্ষা করছি, কিছু একটা ঘটবে। এখন তুমি সব ছেড়ে চলে গেলে আগামী তিরিশ বছরের জন্য আবার অন্ধকার নেমে আসবে।'
‘আমার অত ক্ষমতা নেই, অ্যারন। আমিও চাই জানতে, কিন্তু এখানে কেউ বিচ্ছু জানাতে প্রস্তুত নয়। তুমি কেন চাও? প্রথমদিন তো উলটো কথা বলেছিলে।'
অ্যারন ওভারকোটের হাতা গোটাল। এগিয়ে দিল কবজি। আধো অন্ধকারে ঝুঁকে দেখতে গিয়ে আমি সশব্দে শ্বাস টানলাম। অসংখ্য পোড়া দাগ হাতের তালু থেকে শুরু হয়েছে। শুকিয়ে কালো, কোনোটা গভীর গর্ত করেছে। কালো ছোপ পড়ে গোটা হাত বীভৎস আকৃতি নিয়েছে। সিগারেটের ছ্যাকা এরকম হয় ।
‘তোমার বাবা?’
‘বাবার হাতেও ছিল। ডেভিড ব্রাউনের অবদান।'
মুখে হাত চাপা দিলাম। এমন বাস্তবে দেখিনি ।
‘গল্পটার এবার শেষ হোক, তনয়া। যে কাজ একদা করেছিল মানুষ, সেই একই কাজ আবার এবং আবার এবং আবারও করে যাওয়ার মতো অভিশাপ আর হয় না।' ‘অ্যারন, আমি সরি—
‘কিছু আসে-যায় না। আমি চাই একটা রেজোলিউশন— আমাদের এই বিশ্রী ছ্যাতলাপড়া ইতিহাসটার, কোনদিকে যাবে সেটা না-বুঝে বিভ্রান্ত দাঁড়িয়ে আছে বহু বছর।’ বারবারা বেরিয়ে এল চার্চ থেকে। ‘ব্লাডি আরতিকে এবার তাড়াব। খেয়াল রাখে না বুড়োর। আর, বুড়োর শখও কম না। বিকেল হলে পাড়া চরতে বেরোবে। কেন, কী মধু আছে তোর ঝোপেঝাড়ে?'
‘ঘরে গেল?’
‘না, মাথায় পোকা নড়েছে। বেসমেন্টে শুতে চলে গেল। খাবে না বলল আজ। অনেক আটকাবার চেষ্টা করলাম, লাভ নেই। থাক ওখানে। সাপে কাটুক, ঠেলা বুঝবে। খালি বলছে, কে ছাতার মাথা আর্থার না কে, তার কাছে যাবে।'
‘আমাদেরও বলেছেন। আর্থার আবার কে? স্থানীয় কেউ?’
“ছিল একজন। আর্থার মরিসি। পুরোনো যুগের সেটলার। সে তো কুড়ি বছর আগে মরে গেছে। বুড়োর ছেলেপুলে ছিল না। কটেজটা ওদেরই দেহাতি কেয়ারটেকার ভোগদখল করছে।'
‘নাহ্। এক বৃদ্ধকে মানবশিশু বলবেন না রেভারেন্ড। অন্য কেউ হবে হয়তো।'
‘আর কাউকে মনে করতে পারছি না, বাবা। রেভারেন্ডের মাথায় পোকা নড়েছে।'
জোহার হালে-র নির্জন বনপথ ধরে আমরা গাড়ির দিকে ফিরছিলাম। শিকারি বেড়ালের মতো গুঁড়িপায়ে কুয়াশা নামছে। গাছপালা হিমে ভিজে জবজবে। বুনোফুল ঝরে বনাঞ্চলে মিষ্টি কটু গন্ধ আমাদের ঘিরেছে। দূর থেকে শীর্ণ ঝোরার ক্ষীণ শব্দ পেলাম। আমার চোখ বার বার অ্যারনের হাতের দিকে চলে যাচ্ছিল। বুঝতে পেরে নিঃশব্দে দু-দিকে ঘাড় নাড়ল অ্যারন। তখন আমার সামনে ঝুপ করে শুকনো পাতার ওপর যেন কিছু পড়ল। গাছের ফল ভেবে নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে আমার চোখ চলে গেল মাটিতে। আমি দেখলাম বিকেলে জলাভূমির ধারে যে মাথা-ভাঙা পুতুলটাকে হাতে তুলে নিয়েছিলাম, সেটা এখন আমার পায়ের সামনে।
চিত্রার্পিতর মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম কয়েক মুহূর্ত। তার মধ্যেই অ্যারন ছিটকে গেল সামনে। কুয়াশায় অদৃশ্য হয়ে যাবার পর আমার সংবিত ফিরল। দেখলাম বারবারা বোবাচোখে পুতুলটাকে হাতে তুলে দেখছে। আমার দিকে মুখ তুলল, ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ‘ক্রিস।’ ‘বাজে কথা বোলো না!' কিন্তু, আমার স্বরে জোর ছিল না। দুর্বল গলায় বললাম, ‘কেউ প্র্যাঙ্ক করছে।’
‘ক্রিসের পুতুলের শখ ছিল। খেলতে ভালোবাসত।'
‘তিরিশ বছর আগেকার পুতুল এতদিন পরে—' অস্থিরভাবে আমি বারবারার হাত ধরলাম, ‘জলাভূমিতে আজ এটাকে আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম।'
অ্যারন ফিরে এল হাঁফাতে হাঁফাতে, ‘কেউ নেই। কুয়াশায় দেখাও যাচ্ছে না কিছু।' কোমরে হাত রেখে তীব্রদৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে, ‘আমরা যখন জলাভূমির ধারে বিকেল বেলা বসে ছিলাম, অন্য কেউ আমাদের দেখছিল।'
‘ক্রিস।' আবার বলল বারবারা। ঠিক সেই সময়টায় আমার মনে হল, কাছে কেউ দাঁড়িয়ে। পেছন ফিরলাম এবং কাউকে দেখতে পেলাম না। ফিসফিসে হাওয়া গাছেদের ভেতর দিয়ে চলাচল করছিল, আওয়াজ হচ্ছিল সিঁ সিঁ। হাওয়ায় দুলছিল পাতাগুলো। কিন্তু, সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য জীবনের স্পন্দন ছিল না।
‘১৮ মার্চ এডওয়ার্ড ব্রাউন রাত্রিবেলা বাড়ি ফেরেননি। তার দু-দিন আগে গঞ্জে এসেছিলেন, কারণ তাঁদের বাড়িটা ভাঙাভাঙির কাজ আটকে ছিল কোনো এক আইনি জটিলতায়। ফলত, এডওয়ার্ডের বাকি টাকা আটকে থেকেছিল। রিয়েল এস্টেট থেকে জানিয়েছিল, এই ল্যান্ড নাকি ডিসপিউটেড, আগের মালিকের বংশধর, তিনি রাতুর মহারাজার দেওয়ানের উত্তরাধিকারী, মিউটেশন সংক্রান্ত একটা মামলা তুলে গত তিন বছর ধরে আটকে রেখেছেন। এডওয়ার্ড রাঁচি থেকে আসেন, তারপর নিখোঁজ হয়ে যান। কেউ তখন গা করেনি, কারণ একটা রাত অনেক জায়গাতেই কাটাতে পারেন তিনি, বোনের কাছেও। পরদিন বেলা এগারোটা নাগাদ রেভারেন্ড স্টিফেন মান্ডি এডওয়ার্ডের দেহ আবিষ্কার করেন চার্চ সংলগ্ন জায়গাটায়। তিনি টাউনের বাইরে গিয়েছিলেন, নাহলে ভোরবেলাই বডি পাওয়া যেত।’
‘অ্যালিবাই?’
‘বারবাবার ছিল। আগের রাত্রে ঘরে বসে আপনমনে বকবক করছিলেন ভোর অবধি, রাঁধুনি সাক্ষী। ময়নাতদন্ত অনুযায়ী খুনের সময় রাত একটা থেকে তিনটের মধ্যে। সেইসময়ে বারবারা একাধিক বার ঘর থেকে বেরিয়েছেন আর ঢুকেছেন, পুনমের তাতে ঘুম ভেঙেছে।' অক্ষয় হাসলেন। ‘অ্যারনের ছিল না।’
‘অ্যারন? আপনাদের তাই মনে হয়?'
হয়?' ‘অ্যারনের অ্যালিবাই ছিল না। কিন্তু, আমরা মোটিভ খুঁজে পাইনি। আপনার কী মনে
‘অ্যারন করতে পারে না এমন নয়। কিন্তু কেন করবে? ওকে আপনি তো দেখেছেন নিশ্চয়! জীবনকে ও যেভাবে দেখে, সেখানে একটা খুন নিজের হাতে করা যুক্তিগ্রাহ্য ঠেকছে না আমার। করলেও, ওর যা স্বভাব, স্বীকারোক্তি দেবে। আচ্ছা, আর্চি কোথায় ছিলেন? মনীষার কাজিন।'
‘দিল্লিতে ফিরে গেছেন অনেকদিন আগে। ওই লাইনে এগিয়ে লাভ হত না। এই ঘটনার সঙ্গে আর্চির সম্পর্ক নেই, সেটা আমরা খতিয়ে দেখে নিয়েছি।'
সোমেন প্রশ্ন করলেন, ‘একটা কথা বলুন। আপনি একে-ওকে প্রশ্ন করলেন, কথা বললেন এত। তাতে প্রচুর তথ্য এল আপনার হাতে, সবই বুঝলাম। কিন্তু, দুই-তিনদিনের মধ্যে আপনি ফিরে যেতেন। সেক্ষেত্রে এত তথ্য ঘেঁটে সত্যিই এত কম সময়ে আপনি সমাধানে আসবেন ভেবেছিলেন?”
‘না, জানতাম সেটা সম্ভব নয়। আমি ভেবেছিলাম দিল্লি ফিরে সময় নিয়ে এগুলোকে এক সুতোয় বাঁধব। কারণ, প্রচুর ব্লু তো ততদিনে এসে গেছে। একটা বাড়ি, তার ভেঙে পড়া পরিবার, তাদের ধীরে ধীরে উন্মাদ হয়ে যাবার কাহিনি, একটা অদ্ভুত চার্চ, তার জরাগ্রস্ত পুরোহিত, একটা ভূতুড়ে টাউনঅনেক সূত্র আমার সামনে ছিল। গোটাবার পালা ছিল আমার। ওখানে থাকার সময়টা জুড়ে সমাধানের কথা আমি ভাবিইনি, বরং একটা কমিউনিটি কীভাবে আস্তে আস্তে শেষ হয়ে গেল তার আখ্যানটা যেন পেয়ে বসেছিল আমাকে। আমি অ্যাগনেস বা ক্রিসের ঘটনার থেকে এই নিয়তিটা, এই সার্বিক পতনের গল্প যেটুকু, তাকে আলাদা করতে পারছিলাম না। সেটা গল্প লেখার জন্য ভালো, কিন্তু সমাধান তো একমুখী মনন ডিজার্ভ করে। সেটাকে দিল্লি ফিরে নিজের জায়গায় গুছিয়ে না-বসলে পাব না জানতাম।'
‘কিন্তু, অ্যাগনেসের ব্যাপারে আপনার কথা তখন কেউ বিশ্বাস করেনি।'
‘অ্যারন বাদে। আজ ওর কী মনে হয় আমি জানি না,' জোরে শ্বাস নিলাম। ‘একটা মেয়ে, যাকে সবাই ভুলে গেল, তাকে ভোলা অতটা সহজ ছিল না আমার কাছে। সে ভূত হয়ে মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে, এটুকুই আসল ইতিহাস, তাই না? বাকিটা তো সরকারি নথি, যাকে কথনে পাওয়া যাবে না।'
‘আপনার কাউকে সন্দেহ হয়? এডওয়ার্ড ব্রাউনের ব্যাপারে?'
‘এত দূরে বসে? অসম্ভব! মাঝে কী ঘটে গেছে, আমি কিছুই জানি না। হয়তো অন্য কারণ, যার সঙ্গে এসবের সম্পর্ক নেই। সত্যি বলতে কী, আমার ইন্টারেস্টও ছিল না আগেও বলেছি।' হাসলাম। ‘আমি এখন প্রাক্তন সাংবাদিক। গল্পের পেছনে ছোটার কাজ থেকে অবসর নিয়ে ফেলেছি।'
‘সত্যের পেছনে ছোটার থেকে?' অক্ষয় হালকা স্বরে প্রশ্ন করলেন। মাথা নাড়লাম আমি ।
‘ক্রিসকে দেখা গিয়েছিল। অ্যাগনেসের ভূতকে দেখা যায়। এগুলো সত্যি, না, গল্প? কার পেছনে ছুটব অফিসার?'

তুমি অপবাদকারী হইয়া আপন লোকদের মধ্যে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিও না, এবং তোমার প্রতিবাসীর রক্তপাতের জন্য উঠিয়া দাঁড়াইও না ; আমি সদাপ্রভু।
- Leviticus | 19:16
একটা ঝুলজমা ঘর, আর টেবিলের ওপর ধুলো জমে ছিল। সেখানে মাদার ডেয়ারির কার্ড, ওষুধের ছেঁড়া স্ট্রিপ, জলের খালি বোতল, মিষ্টির প্যাকেট, অকেজো পালস অক্সিমিটার। দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের পাতা ছিঁড়ে ঝুলছিল। আমি যখন একটা জানালা খুলে দিলাম, তখন শুকনো হাওয়া ঢুকে ফড়ফড় করেছিল ছেঁড়া অংশটা। ফ্রিজের দরজা খুলে দেখলাম খাঁ-খাঁ মরুভূমি। দীর্ঘদিন সুইচড অফ থাকায় ভেতরে সবুজ ফাঙ্গাস জমেছে। সোফায় বসেই আমি উঠে পড়েছিলাম, কারণ ধুলোর দল ঘর আচ্ছন্ন করেছিল। দেওয়ালে হাত রাখলে হিম লাগে। আমি তাদের ফেলে এগিয়ে গেলাম। লাগোয়া বন্ধ দরজার গায়ে আমি কান পেতেছিলাম, ওপারের জমাট নৈঃশব্দ্য ফেটে পড়ছিল সমুদ্রগর্জনের মতো। ওভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। কিন্তু, একসময়ে আমি দরজা ঠেললাম। তখন বুঝলাম, যাকে আমি নৈঃশব্দ্য ভেবেছিলাম তা অজস্র ফিসফিসানি জুড়ে তৈরি হয়েছিল। সেগুলো নেমে আসছিল দেওয়ালের ফাঁকফোকর বেয়ে। সেগুলো ছিল চুঁইয়ে আসা মানুষের কণ্ঠ। কিন্তু, তাদের অর্থ বুঝতে পারছিলাম না। অন্ধকার ঘরের দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালে অর্থহীন গুঞ্জনগুলো একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নীরবতা বানাচ্ছিল, ঠিক যেন একটা জঙ্গলের ভেতর, যেখানে একটাও গাছ নেই, তবু তুমি পাতাদের মর্মরধ্বনি শুনতে পাবে, দেখবে অনেক ছায়া, গাছ, ঝোপঝাড় আর জ্যোৎস্নারাত্রের হাওয়াতে বাঁশবনের মাথা দোলানো, যারা সবাই তোমার চারপাশে একটা জঙ্গল বানাবে। ঘরে ছিল বিছানা, বালিশ, চাদর, একপাশে গুটিয়ে রাখা মশারি। একটা টেবিল যার ওপর কিচ্ছু রাখা ছিল না। ন্যাড়া চেয়ার, তার একটা পা ভাঙা ছিল।
অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিতে গিয়ে বুঝেছি, খাটের ওপর কেউ শুয়ে। আমি তখন তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তার ওপর ঝোঁকাতে চাইছি নিজের মুখ। আমি বুঝতে পারছি, কেউ নিষেধ করছে আমাকে। তাকে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু, বিছানার লোকটা কে ছিল আমি জানতাম। ঘরে ঢোকার আগে থেকেই যেন জানতাম। সেই বিছানা রাখা ছিল একটা জঙ্গলের ভেতর, যার অজস্র সুড়ঙ্গ আর গলিঘুঁজিগুলো একটা গোলকধাঁধা বানিয়েছিল। মরা আমগাছের নীচে সেই খাট শোয়ানো ছিল, তার মাথার কাছে রাখা ছিল ফ্রিজ। সেটা যদিও কাজ করত না, কারণ জঙ্গলের ভেতর ইলেকট্রিক লাইন ছিল না, কিন্তু মাঝে মাঝে ফ্রিজটার ভেতর থেকে অস্পষ্ট নড়াচড়া অথবা কচিগলায় কান্নার আওয়াজ পেতাম। কখনো গোঁ গোঁ শব্দে ফ্রিজটা নড়ত, যেন ভেতরের মানুষজন বাইরে আসার জন্য ঠেলাঠেলি লাগিয়েছে। সারাদিন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ত। স্যাঁৎসেঁতে থাকত জঙ্গল। মশাদের দল ছুটে আসত। তখন আমি দেখলাম, খাটের নীচে একটা পুতুল পড়ে। তার মাথা ভাঙা, শুধু ধড়। আমি অস্থির হয়ে মুন্ডু খুঁজতে চাইলাম। নীচু হয়ে খাটের তলা দেখলাম। টেবিলের দিকে গেলাম কিন্তু সেটা ন্যাড়ামাথা ছিল। অন্ধকারে চোখ চালাতে অসুবিধে হচ্ছিল যখন, আমি বিরক্ত হয়ে ভাবলাম, গোল্লায় যাক। আমি আবার ফিরে এলাম। মাথার ওপর আকাশ দেখা যেত না, কারণ ন্যাড়া আমগাছের ডাল ছাড়িয়ে আরও ওপরে সব ধোঁয়া কিন্তু, কোথা থেকে ধোঁয়াটা আসছিল আমি বুঝিনি। বৃষ্টির ফোটাগুলো সেই ধোঁয়ার ভেতর থেকে নেমে আসছিল বলে সেগুলো গরম ছিল। তাদের গায়ে লেগে ছিল পোড়া গন্ধ। খাটের চারপাশে ফোঁটাগুলো পড়ে পড়ে ছোটো-বড়ো গর্ত তৈরি করেছিল। সেখানকার মাটি এত নরম ও আলগা ছিল যে, আমি বুঝতে পারছিলাম, খাটটা ধীরে ধীরে গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। আমার হাত থেকে কাদামাখা পুতুলটার ধড় নীচে পড়ে গেল—
অনেকদূর হেঁটে আমি সেই জায়গায় পৌঁছোলাম যেখানে রকিদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ধূসর গাছের দল রাস্তাকে ছায়াচ্ছন্ন রেখেছে, মিঠে হাওয়াতে মহুয়ার গন্ধে ঝিম ধরে। আশেপাশে কিছু নেই। যতদূর চোখ যায় জনহীন। ভনভনে মাছির দলের কুচকাওয়াজ বাদ দিলে অন্য শব্দও নেই। মরা হেমন্তের গাছ, হলুদ আলোয় নতমুখ যারা। পিচরাস্তার গায়ে অজস্র খানাখন্দ। কয়েক মিনিট পেরিয়ে রাস্তার মোড় ঘুরলে পর পর কটেজগুলো পড়ে। এখানে কিছু মানুষজন আছে যারা মূলত মিস্ত্রিমজুর। তারা কটেজ ভাঙার কাজ চালাচ্ছে। গেটের সামনে হলুদ প্ল্যাকার্ডে লেখা পি কে রিয়ালটর্স। অদূরে আরও দুই-একটা কটেজ ঝোপজঙ্গলে ঢাকা।ধানবাদের রিয়েল এস্টেট তাদের এখনও কিনতে পারেনি। তারাও কি পেটের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে কোনো হারানো কিশোরীর চিঠি?
তখন চেনা গলায় নিজের নাম শুনে বুঝলাম, আমাকে কেউ অনেকক্ষণ ডাকছে, কিন্তু খেয়াল করিনি। চোখে পড়ল, রাস্তার অপর প্রান্তে ছড়ানো জায়গা জুড়ে একটা গথিক প্যাটার্নের বাংলো, যার গায়ে বয়েসের প্রাচীন হিজিবিজি। শেষ দুপুরে বারান্দায় আলো জ্বলছে আর তার নীচে চেয়ারে বসে একলা সিগারেট খাচ্ছেন জেনিফার। বাগান পেরিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়ালে ইঙ্গিতে পাশের চেয়ারে বসতে বললেন। পাশে কয়েকটা কমিক্সের বই রাখা।
‘পরশু এডওয়ার্ড ওরকম অভদ্রতা করার পর তুমি কি সত্যিই হাত গুটিয়ে নিলে নাকি?” চোখে পড়ল, দরজার ফাঁক দিয়ে সেই মেয়েটার মুখ উঁকি মারছে, যাকে সাদা লংড্রেস পরে টাউনের এখানে-ওখানে প্রায়ই দেখি। হলুদ চকচকে চোখ। গালের একপাশে কালি লেগে। গলায় অ্যাপ্রন। বুঝলাম, বয়েস চল্লিশ পেরিয়েছে অনেক আগে। আমাকে দেখে চিনতে পারল না, ভাবলেশহীন মুখ আকাশ দেখছে। আমি ঠোঁট নেড়ে হ্যালো জানাতে গেলে জেনিফার পিছু ফিরে ধমকালেন ‘জামাকাপড়গুলো ইস্তিরি করতে বললাম যে?' মুখ দ্রুত অন্তর্হিত হল পর্দার আড়ালে।
‘আপনার ভাইঝি? '
‘আমার বোন আমার কাঁধে অ্যালিসকে চাপিয়ে সেই কবে ওপারে চলে গেল। তিরিশ বছর কেটে গেল দেখতে দেখতে! আমার হয়েছে যত জ্বালা। আমার নিজের হার্টের অসুখ উত্তেজনা সহ্য হয় না। তার ওপর এই ফাঁকিবাজ অকম্মার ঢেঁকিকে বইতে হচ্ছে। একটা কাজ করতে বললে সাত বাহানা দেখাবে। আর কত দিকে সামলাব! আজকাল নাকি ব্লাডি দেহাতিগুলোর সঙ্গে লুকিয়ে বিড়িও খাচ্ছে। হাউ ডিজগাস্টিং!’
‘খুবই কঠিন জীবন তাহলে আপনার।' গলায় যতটা পারা যায় দরদ ঢাললাম।
‘আর জীবন! যেতে পারলে বাঁচি। আমার লেট হাজব্যান্ড মাঝে মাঝে আসে, কান্নাকাটি করে, কতদিন আর অপেক্ষা করবে! এদিকে অ্যালিসের জন্য ঈশ্বর আমাকে ফেলে রেখেছেন।'
টুকটাক কথার পর আমি অ্যাগনেসের প্রসঙ্গ তুললাম।
‘অনেকদিন আগের কথা। অ্যাগনেসকে তো লোকে ভুলেই গেছে, সেই দুঃখে ঘুরে বেড়াত। তাকেও দেখি না অনেকদিন। বার দুই আমার ঘরেও এসেছে। কথা বলত না। চুপচাপ বিমর্ষমুখে বসে থাকত। তবে কথা বলাবার উপায় ছিল। কে ওকে মেরেছে জানার তরিকা বার করেছিলাম। তোমাকে ট্রিকটা বলি, গুহ্য কথা পাঁচকান কোরো না। একটা আয়নার চারপাশে গঁদের আটা চিপকে দেবে। তার ওপর মন্ত্রপূত জল ছেটাবে। তারপর একটা দাঁড়কাকের পালক পুড়িয়ে—’
‘আমি লিখে নেব। নাহলে এখন শুনলে মনে থাকবে না।'
‘মোবাইল আছে তো। লেখো না।' কী জ্বালা! বাধ্য হয়ে বলতে হল ফোন হ্যাং করেছে। ভাগ্যিস সাইলেন্ট ছিল! জেনিফার হতাশ হয়ে আরেকটা সিগারেট জ্বালালেন, মার্ভেল কমিক্স তুলে ওলটালেন আনমনে। ‘আমার কী! লোকের সাতে-পাঁচে থাকি না বাবা!’
তারপর খিলখিল করে হেসে উঠলেন। ‘হাওয়ার্ড দ্য ডাক কিডনি লেডিটাকে যা শায়েস্তা করেছে না!'
‘অ্যাগনেস কে ছিল?'
সিগারেটের ছাই ঝাড়তে গিয়ে জেনিফারের খেয়াল হল অ্যাশট্রে নেই, এতক্ষণ মাটিতেই ছাই ঝাড়ছেন। রেগে চিৎকার করলেন অ্যালিসের নাম ধরে। অ্যালিস দৌড়ে এসে অ্যাশট্রে রেখে গেল। তারপর অবাধ্য ঘোড়ার মতো ঘাড় ঝাঁকিয়ে ঢুকে গেল ঘরের ভেতর। ‘অ্যাগনেস ও'ব্রায়েন। ওদের পূর্বপুরুষ আইরিশ ছিল। তবে ওর দাদু, দেরাদুনে পোস্টমাস্টার, স্থানীয় একটা মেয়েকে বিয়ে করে সমাজ থেকে ব্রাত্য হয়। অ্যাগনেসের বাবা মাইকেল এখানে এসেছিল, তা সে ১৯৬৩/৬৪ হবে। জলের দরে একটা কটেজ কিনেছিল বাপের জমানো টাকা দিয়ে। নিজে তো খুব বড়ো কিছু করত না। শিব শর্মার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ছোটোখাটো ডাক্তার হয়ে উঠেছিল। ওতেই যা রোজগার, আর নিজেদের ফুল, ফলের বাগান ছিল বড়ো। সেগুলো বেচে একটা টাকা আসত। এই টাউনের অনেক বাড়িতে ওদের ফুল সাপ্লাই হত। তোমার ব্রাউনদের হোটেলও ওদের ফুল দিয়ে সাজানো হত, কারণ অত বড়ো সাইজের আর বিচিত্র রঙের ডালিয়া বলো বা চন্দ্রমল্লিকা কি গোলাপ এই টাউনে অন্য কোনো বাগানে হত না। কিন্তু মাইকেলের বউ মার্গারেট, আমরা ম্যাগি বলে ডাকতাম, তার মাথার গণ্ডগোল প্রথমে ধরা যায়নি। এমনিতে ঠিক আছে, কিন্তু সময়ে অসময়ে চোখ লাল হয়ে উঠত। ঘর অন্ধকার করে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে থাকত। বিড়বিড় করত দুলতে দুলতে। কী রূপ ছিল ম্যাগির! রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে পুরুষের দল বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ত। মাইকেল ডাক্তার বদ্যি দেখিয়েছিল। তারা বলেছিল হাসপাতালে রাখতে। ওরা রাজি হয়নি। ক্যাথলিক ছিল, গির্জার মন্ত্রপুত জল তিনবেলা ম্যাগির গায়ে ছেটাত। তার মধ্যেই অ্যাগনেস হল। তার চার বছর পর ডলোরেস। অ্যাগনেসের ছিল মায়ের রূপ, কিন্তু ওরও মাথায় নাকি গোলমাল ধরা পড়েছিল। অ্যাগনেসের লাল চুল থেকে যেন আগুনের ধোঁয়া বেরোত। চুল ছিল ওর প্রাণ, কেউ চুলে হাত দিলে পাগলের মতো রেগে উঠত। আঁচড়েকামড়ে দিত, নয়তো গাছের মগডালে উঠে বসে থাকত সারাদিন। বসে চেঁচিয়ে ভোজপুরি গান গাইত। বদ ছেলেপুলে তাই ইচ্ছে করে ওর চুলে টান মেরে পালিয়ে যেত আর অ্যাগনেস গালাগালি দিতে দিতে মুখ থেকে থুথু ছেটাত। তারপর উঠে যেত গাছের মাথায়। সবই শোনা কথা অবশ্য- অমন বাঁদর মেয়েকে আমি বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দিইনি। একবার তো মারামারি করে স্কুল থেকে সাসপেন্ডও হয়েছিল। ডলোরেস বলত, দিদির পাগলামি মায়ের ওপর দিয়ে যায়। তার ওপর চরিত্রেরও তো ঠিক-ঠিকানা ছিল না। মাইকেল ছোটোখাটো মানুষ। বউ, মেয়ের জন্য আরও যেন মিশে গিয়েছিল মাটিতে। মাথা নীচু করে হাঁটত। কথা বলত না বিশেষ। ডলোরেস অবশ্য বাধ্য মেয়ে ছিল। পড়াশোনাতেও ভালো। তবে ওরা অন্যদের সঙ্গে তেমন মিশত না। একটেরে হয়ে থাকত।’
‘চরিত্রর কথা কী বললেন? বুঝলাম না।’
‘সবার হাল-হকিকত তো জানি। দুই মেয়েকেই জন্মাতে দেখেছি। অ্যাগনেস একটু বয়েস হতেই নষ্ট হয়ে গেল। শহর জুড়ে ওর প্রেমিক ছিল। ওই বয়েসে কম কেলেঙ্কারি করেনি। ওর রূপ দেখে পটাপট প্রেমে পড়ত ছেলেরা। ঢি ঢি পড়ে যেত ওর কীর্তিকলাপে। এই কারোর বাগানে কোনো ছোকরার সঙ্গে ওকে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে। আবার দু-দিন পরেই হয়তো অন্য কেউ দেখল মাঝরাতে ব্যাচমেটের বাড়ি থেকে চুপিসারে সিঁড়ি বেয়ে নামছে জামার বোতাম লাগাতে লাগাতে। মাঝে মাঝেই শুনতাম, অ্যাগনেস এই করেছে, ওই করেছে। ডলোরেস কান্নাকাটি করত চার্চে গিয়ে—দিদির জন্য বাড়িতে অশান্তি হচ্ছে।' ‘কিন্তু, অ্যাগনেসের হয়েছিলটা কী?'
‘সেটাই তো জানার চেষ্টা করছি এতদিন,' মনের ভুলে আবার মেঝেতে ছাইঝাড়লেন জেনিফার, ‘কিন্তু অ্যাগনেস তো আসেই না।'
‘আর, অ্যাগনেসের অন্তর্ধান?'
‘১৯৮৬ সালে। একদিন স্কুল থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরেনি। সারাদিন মেঘলা, কয়েক দিন ধরেই বৃষ্টি পড়ছিল। ছাতা মাথায় ওকে নাকি দেখা গিয়েছিল স্টেশনের অন্য পারে যে কবরখানাটা আছে সেখানে উত্তেজিতভাবে মুন্না নামের একটা দেহাতি ছেলের সঙ্গে ঝগড়া করতে। পরে শুনেছিলাম ছেলেটা ওর বয়ফ্রেন্ড। কে জানে বাবা, কত যে বয়ফ্রেন্ড ছিল! তারপর হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় অ্যাগনেস। সেই শেষ। আর কেউ ওকে দেখেনি। ছাতাটা এক সপ্তাহ পরে জোহার হালে-র একটা ঝোপের ভেতর খুঁজে পেয়েছিল পুলিশ। ওরা মুন্নাকে তুলেছিল। মারধরও করেছিল। লাভ হয়নি। এটাই বুঝিনি এতদিন। মুন্নাই কি ওকে খুন করেছিল? নাকি, অন্য কেউ?'
‘অ্যাগনেস খুন হয়েছে নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে?'
“আরে বাবা, বললাম তো, আমার কাছে এসেছিল। সিঁয়াসে ডেকে পাইনি। সেদিন রাতে এল, তখন আমি শুয়ে পড়েছি। মাথার কাছে বসল। চোখে জল টলটল করছে। আমি ক্রস আঁকতে গেলে মাথা নেড়ে নিষেধ করল। অ্যাগনেসের পেছনে তিনটে ডাইনি দাঁড়িয়ে, একজনের নাম অলিপর্বা, একজন—' মাথা ঝুঁকিয়ে মনোযোগী ছাত্রীর মতো শুনছিলাম বলে আমার মুখের ভাব জেনিফারের চোখে পড়ল না। তিনিও এত নিবিষ্ট শ্রোতা সম্ভবত বহুদিন পাননি। ‘হতেই পারে, মুন্না। নেটিভদের পক্ষে কিছু অসম্ভব নয়। আবার ম্যাগিও হতে পারে।
পাগল ছাগল মানুষ, কখন মাথায় ভূত চেপেছে! তবে, অ্যাগনেসের দেহ জোহার হালে-তে পুঁতে দিয়েছে ওর খুনি। বলেছে আমাকে।
‘এই মুন্না এখানে আছে?'
‘নাহ্, ছাড়া পেয়ে সেও তখনই উধাও হয়ে গেছে। তা, ছত্রিশ বছর তো হলই। বেঁচে থাকলে অ্যাগনেসের তিপ্পান্ন হত।’
‘ডলোরেসের সঙ্গে ভাবছি দেখা করব।' লুকিয়ে লাভ নেই, জেনেই যাবে এমনিতে। ‘কেসটা খুবই ইন্টারেস্টিং লাগছে।”
‘তাহলে ক্রিসের ব্যাপারটা কী হবে?'
‘দেখি। খুব একটা বুঝছি না। আমার বিদ্যেতে কুলোবে না মনে হয়।’
উলটোদিকে লোকটাকে বোকা দেখলে মানুষ খুশি হয়। জেনিফার তৃপ্তমুখে বললেন, ‘ওদের পরিবারটা ওপর থেকে সহজ-সরল লাগে, ভেতরে প্যাঁচ। ওই যে এডওয়ার্ড, ওর অনেক কাদা, ওইজন্যেই গতকাল বাজিয়ে দেখলাম। যার মনে পাপ নেই, সে অত রাগবে না। তুমি জানো, রাঁচিতে ওর মেয়েমানুষ রাখা। সে আবার এক মুসলমান। বারবারা আরেক চিজ। বাবার কানে মন্ত্রণা দিত এডওয়ার্ডের বিরুদ্ধে। এমনি এমনি এডওয়ার্ড রাঁচি চলে যায়নি। এদিকে মনীষার দোষ হল টাকা ওড়ানো। পাগলের মতো খরচ করে। বাজারে এডওয়ার্ডের প্রচুর ধার আছে ওর জন্য।' সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, ‘ক্রিসের ব্যাপারে খোঁজখবর তাহলে বন্ধ রাখছ? অবশ্য, পরশু এডওয়ার্ড যেমন করে বলল— তোমার আর দোষ কী !
‘আপনার কী মনে হয়, ক্রিসকে কে এমন কাজ করতে পারে?
চোখের পলক ফেলার আগে জেনিফার বললেন, ‘এ তো সবাই জানে। আগাথা বাচ্চাটাকে সরিয়ে দিয়েছিল।'
‘আগাথা? কিন্তু, পুলিশ তো তেমন কিছু বলেনি?'
‘পুলিশ বোকা পাঁঠা, তাই ধরতে পারেনি। অবিনাশের দৌড় তো জানি! ছোটোবেলায় ল্যাং ল্যাং করে ঘুরত এখানে-ওখানে। খেতে পায় না। পাঁজরার হাড় বেরিয়ে পড়েছে। নাকের শিকনি চিবুক বেয়ে গড়াচ্ছে। সারাগায়ে ঘা। কবচ, তাবিজ পরিয়ে রাখত ওর মা, ব্লাডি সুপারস্টেশাস। কেউ ওকে পাত্তাই দিত না। মুখ চুন করে রাউন্ড দিত। সবাই জানে আগাথার কাজ, কিন্তু কেউ কিছু বলে না। অন্যের পাঁক ঘাঁটার দরকারটাই-বা কী!'
“ঠিকই তো। সবাই যদি আপনার মতো বুঝত! কিন্তু, আগাথা কেন করবেন এরকম?’ আমার মুখের সামনে মুখ ঝুঁকিয়ে খি-খি হাসলেন জেনিফার। সাদাচুল কপালের ওপর নেমে তাঁর মুখ ঢেকে দিল। ‘বাচ্চাটা তো এডওয়ার্ডের ছিল না!' ‘তাই বুঝি?’
‘নয়তো কী? মনীষার তুতোভাই আর্চি দিল্লিতে বড়ো অফিসার ছিল। ওদের কটেজেই তো এডওয়ার্ডরা রাঁচি থেকে এসে ওঠে। আর্চি মাঝে মাঝেই দিল্লি থেকে আসত। এখন রিটায়ার করার পর পাকাপাকি আস্তানা গেড়েছে। বিয়ের আগে থেকেই দুপুর বেলা ওর কটেজে মনীষা চুপিসারে যেত। আগাথা মানতে পারেনি। কোথাকার রক্ত, নষ্ট জন্ম। সেপাপের প্রমাণ বাড়িতে থাকবে কেন! আগাথাকেও ডেকেছিলাম। দু-বার এসেছিল। বলে গেল, এখন অনুতাপ হয় ওর। না-করলেই পারত। কিন্তু, কোথায় সরিয়ে দিয়েছিল ক্রিসকে, শত চাপাচাপিতেও বলল না। দেখি, আরেকবার ডাকব।'
‘আচ্ছা। দেখুন, কিছু বলেন কী না। ডলোরেসদের বাড়ি কতদূরে?’
‘বাড়ি কেন, স্কুলে যাও। ওখানেই সারাদিন পড়ে থাকে। সে আবার আরেক কাঠি সেয়ানা, জানো তো! পড়াশোনায় ভালো, বাধ্য মেয়ে, কিন্তু দেখতে খারাপ। তাই সবার মনোযোগ যেত দিদির দিকে। ওদের ফুলের বাগান দেখভাল করত সুশান্ত বলে একটা ছেলে। সে গল্প করত, ডলোরেস নাকি বাবার কান ভাঙিয়ে অ্যাগনেসকে মার খাওয়াত। অ্যাগনেস কোন ছেলের সঙ্গে গা ঘষাঘষি করছিল, ডলোরেসের চোখে পড়েছে। ব্যস, দাও বাবাকে বলে! অ্যাগনেস ক্লাস টেস্টে ফেল করেছে, বাবাকে দিয়ে মার খাওয়াও। একবার বাগান থেকে নাকি লাঠি দিয়ে সাপ তুলে এনে অ্যাগনেসের ইস্কুলের বুটের ভেতর ঢুকিয়ে রেখেছিল। এসব আমার জানার কথা নয়। সুশান্ত বলেছে। আমি জেরা করতে মাইকেল নিজেও স্বীকার করেছিল একদিন— সে অ্যাগনেসকে বেশিই মারধর করে। কিন্তু, সারাদিন খাটনির পর বাড়ির ওই গুমরানো পরিবেশে ফিরে যদি মেয়ের কীর্তি শোনে, তারও মেজাজ ঠিক থাকে না। এখন ডলোরেস কেমন হয়েছে, জানি না। এখানে বসে থাকি, রাস্তা দিয়ে ওকে চলে যেতে দেখি, এই অবধিই। তবে স্বভাব কি শোধরায়? ওই যে পরশু যাকে দেখলে, আলফ্রেড হেমব্রম, ওর স্কুলের শিক্ষক। ডলোরেসের সঙ্গে খুব পিরিত। আশনাই চলে নাকি জানি না। বয়েস তো হল অনেক দু-জনেরই, আর কত ঢলানি করবে! আলফ্রেডের গায়ের রং জামের খোসার মতো কালো না? ডলোরেসকে, বলতে নেই, বয়েসকালে দেখতে, শুনতে দিব্য হয়েছিল। ওই ট্রাইবালটার মধ্যে কী যে দেখেছে! সারাক্ষণ একসঙ্গে ঘোরে, অফ টাইমে এখানে-ওখানে বসে গুজগুজ করে। এদিকে নাকি ক্যাথলিক। জানি না বাবা ব্যাপার-স্যাপার। ফ্যামিলিটাই নোংরা।'
‘কিন্তু, ডলোরেস যদি দিদিকে হিংসেই করত, সেও তো খুন করতে পারত?’ জেনিফারের মুখ দেখে মনে হল, সেটা হলেই খুশি হতেন। বিমর্ষমুখে মাথা নাড়লেন, ‘সেদিন ডলোরেস এখানে ছিলই না। মাইকেল ওকে নিয়ে জামশেদপুর গিয়েছিল কী সব জানি চিকিৎসার ব্যাপারে। নাহলে তো একদম শুরুতেই পুলিশ ধরত ওকে।
‘পুলিশ অ্যাগনেসকে খোঁজেনি ?
‘প্রথমদিকে অনেক খুঁজেছে। অ্যাগনেসের বাবা, মা, বন্ধুবান্ধবদের বার বার জেরা করেছে। পায়নি কিছুই। তোমাদের এডওয়ার্ডকেও তো জেরা করেছিল। এদিকে যখন অ্যাগনেস নিখোঁজ হয়, গোটা দুপুর এডওয়ার্ড নিজের ঘরে শুয়ে। কনজাংটিভাইটিস হয়ে চোখ লাল, কষ্ট পাচ্ছিল খুব। আমি জানি, কারণ সেদিন দুপুরে ওদের বাড়িতে আমার বর গিয়েছিল একটা কাজে। সে দরজা থেকে এডওয়ার্ডকে “হ্যালো” বলেছিল। এডওয়ার্ড খাটে শুয়ে চোখে হাত চাপা দিয়ে বলেছিল, কাছে এলে যেন চোখ ঢেকে কথা বলে। তবুও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে ছাড়েনি।'
‘মুন্নার বক্তব্য কী ছিল?'
‘বলেছিল যে, তাদের তুচ্ছ কারণে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে। পরে অনুতাপ হওয়াতে সন্ধেবেলা সে অ্যাগনেসের বাড়িতে যায় এবং জানতে পারে যে, অ্যাগনেস ফেরেনি। তারপর তো রাত্রিবেলা থানা-পুলিশ হল। পরদিন খবর পেয়ে মাইকেল আর ডলোরেস ফিরে এল।' ‘আচ্ছা, আপনি তো পুরোনো মানুষ, সবাইকে চেনেন। এখানে আর্থার বলে কেউ আছে, বা, ছিল?'
‘নাহ্।’ ভুরু কুঁচকে মাথা নাড়লেন জেনিফার। ‘চেনাজানা কাউকেই তো মনে করতে পারছি না। এক হতে পারে আর্থারকাকা, আর্থার মরিসি। সে তো কবেই ফৌত। তবে, খালারিতে কয়েক ঘর থাকে। খুবই ন্যাস্টি, গরিব। ওদের নাম-ধাম জানি না বাবা !”
আর কিছু জানার ছিল না। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম দরজা ঘেঁষে অ্যালিস উবু হয়ে বসে। তার হাতে ডালপালা দিয়ে বানানো মুকুট। সেটাকে মাথায় পরলে কেমন লাগবে হাত-আয়নায় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছে। যদিও আজ পরনে লংড্রেস ছিল না, সাধারণ ম্যাক্সি। তাকে বললাম, ‘হাই, আমি তনয়া।' অ্যালিস ফিরেও তাকাল না আমার দিকে। জেনিফার নাক দিয়ে অসন্তুষ্ট ঘোঁত আওয়াজ করলেন। হাতে তুলে নিলেন কমিক্সের বই।
বেরোতে গিয়ে মনে পড়ল, আসল প্রশ্নটাই করা হয়নি। ‘আপনি কেন বলেছিলেন গুড ফ্রাইডের দিন অ্যাগনেসের আত্মা আসে? গুড ফ্রাইডে কেন?'
জেনিফার আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন। ‘তুমি জানো না? সত্যিই? গুড ফ্রাইডের দিন ও নিখোঁজ হয়েছিল।'
‘আপনারা কাকে সন্দেহ করছেন? কাউকে করছেন কি?'
কিছুক্ষণ চুপ থেকে অক্ষয় বললেন, ‘আমি শিয়োর নই। কিন্তু, অন্য ক্যান্ডিডেট পাচ্ছি না।’
“কে?”
‘আমাদের তদন্ত বিষয়ে এত কথা ফাঁস করে দেওয়া কি উচিত হবে, মিস ভট্টাচার্য? আপনিও নিশ্চয় স্কুপ পেলে ছাড়তেন না অন্য কাউকে?”
‘এতক্ষণ ধরে এত কিছু শেয়ার করেছেন, সেটা নিশ্চয় জেনে বুঝেই করেছেন।' ‘অবিনাশ যাদব।’
‘অসম্ভব। অ্যারনের ক্ষেত্রে তাও “কিন্তু কিন্তু” করছিলাম, কিন্তু অবিনাশ যাদবকে গ্রেপ্তার করার মানে একজন নিরপরাধকে শাস্তি দেওয়া।’
‘এত দূরে বসে এত নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে?'
‘কারণ, অবিনাশকে আমি দেখেছি। এরকম পোস্ট মার্ডার স্টেজিং, মৃতদেহ সাজিয়ে রাখা, তাঁর চরিত্রের সঙ্গে যায় না। তিনি খুন করলে তখনই করবেন। অতদিন অপেক্ষা করবেন না।' অক্ষয়ের দিকে ঝুঁকলাম, ‘কিন্তু, অবিনাশের কথা আপাতত বাদ দিন। যেটার উত্তর এতক্ষণেও দিলেন না, এবার সেটা আপনার বলার সময় এসেছে। আমাকে বলুন, অ্যাগনেস কীভাবে আপনাদের কেসের সঙ্গে জড়িয়ে।'
ঋতু বদল হচ্ছে। তাই বাতাস ভরে উঠেছে হিমের চাবুকে। আকাশে হাঁসুয়ার মতো ধারালো চাঁদ। জেনিফারের বাড়ি থেকে ফেরার রাস্তায় চোখে পড়ল, মাঠে ব্যাডমিন্টনের জাল টাঙিয়েছে স্থানীয় ছেলের দল। ধু-ধু প্রান্তরে নিঃসঙ্গ সাদা নেট হাওয়ায় দোল খায়। ফোন বার করে গতকালকের মাথাছেঁড়া পুতুলের ছবিটা আবার দেখলাম। সাধারণ প্লাস্টিকের পুতুল যেমন হয়। লাল শার্ট আর হাফপ্যান্ট পরা, হাতে আবার বাহারি ঘড়ি। কেমন দেখতে ছিল তাকে? ছেলে, না, মেয়ে পুতুল? কেন একটা পুতুল এই গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হল? তাকে কেউ প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছে কি? এলোমেলো দিকহারা ক্রিস ঘুরে বেড়াচ্ছে ভূতুড়ে টাউনে, এমন ভাবনা অলীক। বারবারা জানিয়েছে, মনীষা সত্যিই অসুস্থ। আমাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর থেকে শুয়ে আছেন। কিছু খেলেই বমি হচ্ছে। সেই কারণে এডওয়ার্ড রেগে গিয়েছিলেন হয়তো। কিন্তু, সেটুকুই সব নয়। এডওয়ার্ডের জীবন তিক্তবিরক্ত হয়েছে। বিভীষিকা ও আতঙ্কের এক জীবন। হয়তো এভাবেই নরকদর্শন হয়ে গেছে তাঁর। কী ছিল সেই নরকের প্রকৃতি? সে কি নিরুদ্দিষ্ট ক্রিসের অসহনীয় ভার, নাকি, গাছের ডাল থেকে ঝুলতে থাকা পিতার নির্জন মৃতদেহ? আমি জানি না। ক্রিসের জন্ম বিষয়ে জেনিফারের ইঙ্গিত সত্যি কি না সেটাও জানি না, কিন্তু সত্যি হলেও-বা কী? এডওয়ার্ডের রাঁচির প্রেমিকা থাকাও অসম্ভব নয়। বিয়েতে খুচখাচ এসব লেগেই থাকে। এগুলো কি সত্যিই একটা শিশুকে নিখোঁজ করে দেবার পেছনে গুরুতর ফ্যাক্টর হতে পারত?
ভেবেছিলাম আজ রকিদের দেখা পাব। কিন্তু, চারপাশ ধু-ধু করছিল। আমি চাইলে ওদের কটেজে যেতে পারি, কিন্তু সেটা ভালো দেখায় না, কারণ এমনকী নামটুকুও জানি না ভদ্রলোকের। তাই মাথা নীচু করে হাঁটার গতি বাড়ালাম কারণ, শীত করছিল। তারপর আমি রাস্তা হারালাম। সব রাস্তাই সোজা যায় না, এবং কোন বাঁকটা ঘুরে কোন বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে যেতে হবে সেটা অন্ধকারে বোঝা একজন বহিরাগতর পক্ষে সহজ নয়। রাস্তায় অটো বা রিকশার নামগন্ধ ছিল না। তারা সন্ধে হলে পাট গুটিয়ে ফেলে। এই সময়ে রাস্তা নির্জন হয়। ফলত পথচারীদের ভরসায় না-থেকে আমি নিমগাছে ঘেরা একটা জঙ্গলের ভেতর এসে পড়লাম। ভ্রম হল এখান দিয়ে ডান দিকে ঘুরলেই স্যাংচুয়ারির রাস্তা পাব। কিন্তু, সেদিকে বেঁকে আরও ঘন বনের ভেতর ঢুকে গেলাম যেখানে বাইরের আলো ঢোকে না। কুয়াশার পুঞ্জ গাছ থেকে ঝুলতে ঝুলতে এগিয়ে আসছিল আমার দিকে। পেছন ফিরে আগের রাস্তায় পড়লাম, তারপর যা থাকে কপালে ভেবে হেঁটে গেলাম সোজা। কোথাও-না-কোথাও জঙ্গল ফুরোবে, আমাজন তো নয়। সত্যিই কিছুদূর হাঁটার পর বনাঞ্চল পাতলা হল। আমার চোখে পড়ল জমিটা ঢালু হতে হতে কাদা আর পাঁকে ভরা জলায় নেমে গেছে। কিন্তু, সেটা যে কোনোমতেই স্যাংচুয়ারির পেছনের জলাভূমি নয় তা বেশ বুঝছি। আকারে নিতান্তই ডোবা। একটা ধোঁয়া উঠছে কোথা থেকে জানি না। তার ওপর চাঁদের ভাঙা আলো পড়েছিল, বিক্ষিপ্ত জলের ওপর ছিল তারাদের ঝিলমিল। সেদিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেলাম, কারণ যুক্তিহীনভাবে আমার মনে হচ্ছিল যে, ফেরার পথ পাব না। জঙ্গলে সবাই বৃত্তাকারে ঘোরে। ফোনের নেটওয়ার্ক এখানে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলত, ম্যাপ দেখার সম্ভাবনা নেই। চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস নিলাম। খুব একটা সাংঘাতিক পরিস্থিতি নয়। পিছু ফিরে অন্য রুট নিলেই সমাধান হয়ে যাবে।
কিন্তু পেছন ফিরে কয়েক পা এগিয়ে বুঝলাম কুয়াশা চাপ হয়ে বসেছে, ফলে সমস্ত দিকই একরকম লাগছে। চতুর্দিকে উঁচু গাছেরা, তাদের ভেতর দিয়ে কয়েক টুকরো গলি এদিক-ওদিক চলে গেছে, জায়গাটা হিম নির্জন। পৃথিবীর সমস্ত শব্দ ব্লটিং পেপার দিয়ে শুষে নিয়েছে যেন কেউ। এক মৃত উপত্যকার বুকে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি হল। আন্দাজমতো এগিয়ে মনে হল মাটি চড়াইতে যাচ্ছে, টিলা? তবু ওপরে উঠলে আন্দাজ পাব এই আশায় হেঁটে গেলাম সেদিক। কয়েক মিনিট পর একটা ফাঁকা জায়গায় এসে চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম ঘন অরণ্যের মাথায় কুয়াশার সর। টিলার নীচে যেন একটা উপত্যকা যা বাটির মতো ছড়িয়েছে। তার কানা বেয়ে আবার প্রাচীরের মতো উঠে গেছে শালপিয়ালের স্তর। হতভম্ব চোখে দেখলাম ভেজা মাটি, যার ওপর দিয়ে উঠে এলাম, সেটাকে এখন সাদা কাপড়ে আচ্ছাদিত শবদেহ লাগছে। বাটপট শব্দে চমকে উঠলাম— কয়েকটা রাতপাখি উড়ে গেল অন্ধকারের মধ্যে। সেই জলাভূমিটা কিন্তু বুঝতে দেখা যাচ্ছিল দূর থেকে। রাত বেশি নয়, মাত্র সাড়ে সাতটা। কিন্তু, থমথমে অন্ধকার ঝড়ের মেঘের মতো জমাট বেঁধেছে। হাওয়া আরও হিম হয়েছে, আমার চামড়ায় ছুরির মতো কেটে বসছে। আমার ভয় লাগল। সত্যিই কি জঙ্গল গিলে ফেলল আমাকে, অথবা, আমার অবস্থা ক্রিসের মতো হবে? কাউকে ফোনও করা যাবে না, কারণ সিগনাল নেই। যা থাকে কপালে ভেবে আমি টিলা বেয়ে আবার নামতে শুরু করলাম এবং তার পরেই আছাড় খেলাম একটা পাথরে। কয়েক ধাপ গড়িয়ে কাঁটাঝোপে জিন্স আটকে গেল। বিষব্যথায় চোখে জল এল আমার। হাঁটুর কাছে সম্ভবত কেটেছে, কিন্তু সেদিকে দেখার সময় এখন নেই। অসহায় দিগ্ভ্রান্তর মতো হাঁটতে লাগলাম। এখন কোনদিকে যাচ্ছি আর খেয়াল নেই। এরকম পরিস্থিতি গল্পে পড়েছি। কিন্তু, জঙ্গলের ভেতর পথ হারানো আসলে কী ভয়াবহ, তাও আবার এমন শীতের রাতে, কল্পনা করতে পারিনি। তখন চোখে পড়ল, কুয়াশা ফুঁড়ে বিশাল কয়েকটা পাথরখণ্ড পাশাপাশি মাথা উঁচু করে আমার পথরোধ করেছে। তাদের ফোকর দিয়ে নেমে আসছে ক্ষীণ ঝরনা। তার তিরতির শব্দ নীরবতাকে ঘন করেছে। আমার নিশ্বাস বন্ধ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এই পাথরের দল গড়িয়ে নেমে আসবে আমার ওপর আর-একটা ঘর, অন্ধকার, একটা অগোছালো বিছানা, একজন শুয়ে আছে, সিলিং থেকে—
মাথা ঘুরে গিয়েছিল। সম্ভবত আমি পড়েও যাচ্ছিলাম, কিন্তু তখন একটা শক্ত হাত আমাকে ধরে নিল। আবিষ্টর মতো পেছন ফিরে বুঝলাম আমার পা থরথরিয়ে কাঁপছে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে যে, তাকে যেন কোথায় দেখেছি। দেখেছি কি? এক দীর্ঘকায় অ্যাংলো নারীমূর্তি, কালো চাদর জড়িয়ে, মাফলারে কান ঢাকা, আমার কাঁধ ধরে একঝটকায় ঘুরিয়ে দিল। তীব্রস্বরে বলল, “খাদে হাড়গোড় ভেঙে পড়ার ইচ্ছে হয়েছে, না, নেশা করেছ?' “আমি, রাস্তা— রাস্তা হারিয়েছি।'
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, ‘আমার পিছু পিছু আসুন। এত রাত্রে এখানে কেউ আসে! আপনি মনে হয় টুরিস্ট। দেখিনি এর আগে।' জঙ্গল ভদ্রমহিলার কাছে জলভাত মনে হল। অনায়াসে এই বাঁক, ওই গাছতলা, সেই ঝোপের ধার দিয়ে আমাকে একটা প্রকাণ্ড প্রান্তরের ধারে নিয়ে এলেন। সেখানে আচমকা বন শেষ হয়ে আকাশটাকে মনে হচ্ছে ছুট লাগিয়েছে শূন্যের দিকে। তার শরীরে জড়োয়ার গয়নার মতো অসংখ্য নক্ষত্রের দল আমার কয়েক মিনিট আগেকার ভয়কে অলীক ছেলেমানুষির বোধ দিল। ত্রাসে পায়ের ব্যথা ভুলেছিলাম। এখন আবার জ্বালা করল ভয়ানক। মাঠের এখানেওখানে অসংখ্য ছোটো-বড়ো ঝোপঝাড়, হু-হু করে ঠান্ডা বাতাস তাদের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে। উঁচু গাছের পাতারা এমন হাওয়ায় ছিঁড়ে যায়। দূরে মিটমিটে আলো দেখে লোকালয় বুঝলাম। পাশ ফিরে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে দেখি, আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি স্যাংচুয়ারিতে উঠেছেন?
‘হ্যাঁ। ঘুরতে এসেছি কয়েক দিনের জন্য।'
‘তাহলে আপনার কাছে এমনিতেই যেতাম। আমার নাম ডলোরেস ও'ব্রায়েন।’

আর যে ব্যক্তি পরের ভার্য্যার সহিত ব্যভিচার করে, যে ব্যক্তি প্রতিবাসীর ভার্য্যার সহিত ব্যভিচার করে, সেই ব্যভিচারী ও সেই ব্যভিচারিণী, উভয়ের প্রাণদণ্ড অবশ্য হইবে।
— Leviticus। 20:10
অ্যাগনেসকে আমার মনে পড়ে না আজকাল। হ্যাঁ জানি, আমি ইনভেস্টিগেটিং অফিসার ছিলাম ওর কেসের। কিন্তু, যতই ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকান না কেন অফিসার, আপনাকে মনে রাখতে হবে, আমি একজন ব্যর্থ পুলিশ যে সারাজীবনে ছিঁচকে চোর বাদে বিশেষ কিছু ধরেনি এবং যার বয়েস এখন সত্তর। তাই তার স্মৃতি সতেজ থাকবে এমন আশা করতে পারেন না। বরং, অনেক স্মৃতিকে সে জোর করেই চাপা দিতে চায়। কিন্তু, তা হলেও বারবারা ও টিনার চাপাচাপিতে ওদের পুলিশ ফাইলগুলো জোগাড় করেছিলাম। আপনি অ্যাগনেসকে নিয়ে কৌতূহলী, তার মানে এডওয়ার্ড ব্রাউনের হত্যার সঙ্গে অ্যাগনেসের যোগ আছে বলে আপনার অনুমান। অ্যাগনেসকে নিয়ে আমার লেনদেন ছিল না কিছু, ফলত তার কানেকশন থাকলে আমি আপনাদের সন্দেহের তালিকায় থাকব না, তাই না? ওহ্, তাতেও থাকব? কেন, তদন্তকারী অফিসার ছিলাম বলে, শুধুমাত্র এটাই? দুর্বল কার্যকারণ না? এডওয়ার্ডের সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়েছে তিন বছর আগে, দু-জনেই দু-জনকে দেখে নেবার হুমকি দিয়েছিলাম, কারণ এডওয়ার্ড ছিল শোকগ্রস্ত এবং আমি মাতাল। তিন বছর পরে আমি রাগ মেটালাম কারণ আমার নামে পুলিশে অভিযোগ জানিয়েছিল এডওয়ার্ড—এতদূর তাও মানা যায়। তা বলে অ্যাগনেস? দেখুন, আমার পুলিশি বুদ্ধি বলে, যেকোনো একটা কারণকে ধরে আপনারা এগোতে পারেন। হয় আমার সঙ্গে শত্রুতা, অথবা, অ্যাগনেসের নিখোঁজ হবার সঙ্গে কানেকশন। কিন্তু, দুটোকে একসঙ্গে মেলানো বুদ্ধিমানের পরিচয় নয়।
আগেও অনেকবার বলেছি, এডওয়ার্ড ব্রাউনকে আমি কিছু করিনি। তার আগের সারাসন্ধে আমি এইখানে বসে মদ খেয়েছি আর ভীমপলশ্রী শুনেছি। আরে, আমার স্ত্রী কী বলবে, তার হার্টের সমস্যা, আগের বছর বাইপাস হয়েছে, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। অ্যালিবাই না-থাকলে আমি তো বানাতে পারব না! হ্যাঁ, তার দু-দিন আগে জোহার হালে-তে ঘোরাঘুরি করছিলাম, কেউ কেউ দেখে থাকতেই পারে। কিন্তু, সেরকম অনেক জায়গাতেই আমি হাঁটাহাঁটি করি। জোহার হালে হাঁটাহাঁটির জায়গা নয় সেটাই-বা আপনি জানলেন কেমন করে? কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। আর যদি থাকেও, তার সঙ্গে এডওয়ার্ড ব্রাউনের যোগ ছিল না সেকথা বলতে পারি। ব্যক্তিগত নয়, গিয়েছিলাম রেভারেন্ড গরম্যানকে দেখতে। কিন্তু, তারপর মনে হয়েছিল, সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বৃদ্ধকে বিরক্ত করা উচিত নয়। তাই দেখা নাকরে ফিরে আসি। যে বা যারা আমাকে দেখেছে বেথেল মিশনের সামনে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে, তারা ভুল দেখেছে। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ভেবেছিলাম যাব কি যাব না, তারপর পিছু ফিরি। বাজি ফেলতে পারি, আমার আচরণ তাদের চোখে সন্দেহজনক ঠেকত না দুদিন পর এডওয়ার্ডের মৃতদেহ ওখানে আবিষ্কার না হলে
দেখুন, আমি সরাসরি টিনার তদন্তে যোগ দিইনি, কারণ মনে হয়েছিল আমি পারব না। এতদিনেও পারিনি যখন—এখন ও ফ্রেশ চোখ দিয়ে দেখছে, তার মধ্যিখানে আমার বিচারধারা ঢুকিয়ে ওর সেই দেখাটাকে গুলিয়ে লাভ নেই। যদিও অবাক হয়েছিলাম, এটার মধ্যে অ্যাগনেসকে কেন টেনে আনা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে যোগসূত্র— হ্যাঁ হ্যাঁ জানি, এডওয়ার্ডকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, আমার মনে ছিল না, বারবারা মনে করিয়েছিল। তার কারণ, নিখোঁজ হবার কিছুদিন আগে থেকে যাদের যাদের সঙ্গে অ্যাগনেস কথা বলেছিল, বা, যে যে বাড়িতে গিয়েছিল, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা। অ্যাগনেস মাঝে মাঝেই যেত ব্রাউনদের বাড়িতে। হারিয়ে যাবার দিন পাঁচেক আগেও গিয়েছিল। ডেভিডকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি অবাক হয়েছিলেন কারণ, অ্যাগনেস যে তাঁর বাড়িতে যায় সেটাই জানতেন না মনে হল, অ্যাগনেসকে চিনতেও পারছিলেন না প্রথমে। অ্যাগনেস যেত হয় বারবারা অথবা আগাথা অথবা এডওয়ার্ডের কাছে, মনীষার প্রসঙ্গ বাদ কারণ তখনও তাদের বিয়ে হয়নি। কিন্তু, গত দুই মাস আগাথা টাউনে ছিলেন না, দেরাদুনে অসুস্থ মায়ের কাছে থাকছিলেন। বারবারা বলেছিল গত একমাস অ্যাগনেসের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। তাহলে পড়ে থাকে এডওয়ার্ড। সে জানিয়েছিল অ্যাগনেস তার কাছে একটা ব্যাডমিন্টন র্যাকেট ধার করতে এসেছিল। সেটা সত্যি কথা, অ্যাগনেসের সংগ্রহে সেরকম র্যাকেট আমরা পেয়েছি। এর বেশি কথাবার্তা এডওয়ার্ডের সঙ্গে তার হয়নি। অ্যাগনেসের হারিয়ে যাবার পেছনে এডওয়ার্ড ছিল কি? সেদিন এডওয়ার্ড যে নিজের ঘরে কনজাংটিভাইটিস হয়ে শুয়ে ছিল, সেটা জেরাতেও জানিয়েছে। ফাইলে পেলাম। এডওয়ার্ডের শুয়ে থাকার বক্তব্যে সিলমোহর দিয়েছে তার স্থানীয় বন্ধুরা। প্রতিবেশীদের ছেলে বেনেডিক্ট দেখা করতে এসেছিল, কিন্তু এডওয়ার্ড ঘরের ভেতর থেকে জানিয়েছিল, সে যেন না-ঢোকে। এডওয়ার্ড তার কলেজের একজন বন্ধুকে, সে রাঁচি থাকে, দু-দিন আগে ফোন করে জানিয়েছিল তার চোখ থেকে জল পড়ছে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনও তার ঘরে আমরা পেয়েছি। ফলত, এডওয়ার্ড অ্যাগনেসকে অপহরণ করতে পারে না। কাউকে দিয়ে করাবে এমন বিশ্বাস আমার হয়নি। বড়োলোক বাপের বখে যাওয়া ছেলে গুন্ডা পাঠিয়ে কোনো মেয়েকে তুলে আনছে, এ জিনিস হিন্দি সিনেমার বাইরে হয় না। তাহলে টিনা কেন একটামাত্র চিরুনির ওপর ভিত্তি করে অ্যাগনেসকে টেনে আনছে? গতকাল পর্যন্ত বিশ্বাস করেছি ও এই যোগসূত্রটা জোর করে টানছে। আজ, জানি না।
বরং, আমরা জোর খাটিয়ে জেরা করেছিলাম একমাত্র মুন্নাকে, ওর যে বয়ফ্রেন্ড ছিল। দেহাতিদের ছেলে। বাড়ি বাড়ি দুধ দিত। এখানে আমার একটা স্বীকারোক্তি আছে। মুন্নাকে পুলিশ প্রচণ্ড মেরেছিল। কাশতে গেলে মুখ দিয়ে রক্ত উঠছিল ওর। কিছু একটা ইনজুরি হয়েছিল যতদূর মনে পড়ছে, যা থেকে ওর জ্বর এসেছিল প্রচণ্ড, শুনেছিলাম সেপটিক হয়েছে। আমরা বলেছিলাম যে, মুন্না ডাকাত। সেসময় আশেপাশের গ্রামগুলোতে কয়েকটা ডাকাতি হয়েছিল। মুন্না ছিল জাতে কুর্মি। আর তখন পুলিশের ওসি, তিনি ছিলেন ঠাকুর। ডাকাতিগুলোর একটা হয়েছিল ঠাকুরদের গ্রামে। ডাকাতদের একজনের মুখ থেকে গামছা সরে যায়, তাকে চিনতে পেরেছিল সে-বাড়ির একজন। কুর্মিদের একটা ছেলে। পুলিশ তাকে পায়নি, সে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল। মুন্নাকে সেই ওসি নিজের হাতে মারধর করেছিলেন কারণ, কুর্মি-কুর্মি ভাইভাই। কুর্মিরা নীচু জাত, তারা ঠাকুরদের ঘরে ডাকাতি করছে, সেটা ডাকাতির থেকে অনেক গর্হিত অপরাধ ছিল। মুন্নার কপাল খারাপ, মাঝে পড়ে ফেঁসে গেল। মিস্টার ঠাকুর কয়েক বছরের জন্য এখানে এসেছিলেন, ১৯৮৭ সালে বদলি হয়ে যান। আমি মাত্র কয়েক বছর ডিউটিতে ঢুকেছি তখন। মুন্নাকে এত মেরেছিলাম যে, হাসপাতালে রাখতে হয়েছিল। বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছিল কয়েক দিন পর। অ্যাগনেসের কেস নিয়ে কারোর মাথাব্যথা ছিল না। এরকম বহু ছেলেমেয়ে হারিয়ে যায়। আমরা ধরে নিয়েছিলাম অ্যাগনেসও পালিয়েছে। অ্যাগনেসের ফাইলে বেশ কিছু কাগজ মিসিং ছিল, তার মধ্যে মুন্নার ডিটেইলসও পড়ে।। কোথায় গেল জিজ্ঞাসা করাতে কেউ গা করল না। অন্য অনেক পাতাও অবশ্য নেই, যেমন কিছু সাক্ষীদের বক্তব্য ইত্যাদি। এত বছরের পুরোনো ফাইলে এরকম হামেশাই হয়। কেউ কেউ বলেছিল ছাড়া পাবার কয়েক দিনের মাথায় মুন্না আবার অসুস্থ হয়। ওকে নাকি রাঁচির হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল, কারণ ওর সেই সেপটিক আবার ফিরে এসেছিল। কয়েক মাস পরে কার কাছে যেন শুনেছিলাম মুন্না হাসপাতালেই মারা গেছে। অন্যমনস্ক ছিলাম, অত গা করিনি, তবে কথাটা মনে ছিল—সেই যে মেয়েটা হারিয়ে গিয়েছিল, তার কেসে মূল সন্দেহভাজন মৃত। তবে লক-আপে যে মরেনি, আমাদের বাপের ভাগ্য।
দেখুন অফিসার, অ্যাগনেস একটা ষোলো-সতেরো বছরের মেয়ে। খুব একটা বুদ্ধিমান বলে মনে হয়নি। পড়াশোনাতে মাথা নেই তেমন। আছে শুধু রূপ, যার ফলে বহু মানুষের মনোযোগের কারণ হয়েছিল। শুনেছি, মাথায় গণ্ডগোল ছিল। ওর বোন ডলোরেস আমাদের কাছে এ ব্যাপারে স্টেটমেন্ট দিয়েছিল, যদ্দূর মনে পড়ে। আমার মাথায় যেটা আসেনি, তার পালিয়ে যাওয়া অথবা হারিয়ে যাওয়া, এত অভিঘাত কীভাবে তৈরি করতে পারে যার ফলে মানুষ তার ভূতকে দেখতে শুরু করবে? এ তো মাস হ্যালুসিনেশন। তখন নিজেকে বুঝিয়েছিলাম যে, এই কেস আমাদের আওতার বাইরে, হয়তো রেভারেন্ড গরম্যান এর আসল ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। অ্যাগনেস আমাকে আকর্ষণ করেনি, যেমন করেছিল ক্রিস। আপনিও জানেন, হত্যা মামলায় এরকম ঘটনা মাঝে মাঝেই ঘটে, আমিও তেমন কেস পেয়েছি, যেখানে মৃত ব্যক্তিকে পরে দেখা গেছে বলে কেউ কেউ দাবি করেছে। কিন্তু, সেখানে একটা মৃতদেহ থাকে যা নিজের গল্পটাকে সুচারুভাবে বলে। আমাদের সবথেকে বড়ো সমস্যা হল, দুদুটো রহস্য, যদি অ্যাগনেসের ঘটনাকে রহস্য বলেন, কিন্তু একটাও বডি নেই। নেই গল্প বলতে পারে এমন কোনো ফিজিক্যাল উপাদান। এটাই এই আখ্যানকে প্রায় অসম্ভব এবং সমাধানের অযোগ্য বানিয়েছে, মাঝের অতিবাহিত তিরিশ বছর বাদও যদি দিই।
এখানে আপনি হয়তো ভুল বুঝছেন। আমি বারবারাদের নিরুৎসাহিত করব কেন? তাহলে তো প্রথমদিন গল্পটাই বলতাম না। কিন্তু টিনা এবং বারবারা, ওরা ছিল আইডিয়ালিস্ট। ওরা মনে করে যে, অপরাধ যেহেতু আমাদের স্টেটাস কুয়োকে লঙ্ঘিত করে, আক্রমণ করে ব্যক্তিগত সম্পত্তির পবিত্র ধারণাকে, তাই শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় জগতের স্থিতাবস্থাকে ফিরিয়ে আনার জন্য একটা ডেটারেন্ট দরকার। কী সেই ডেটারেন্ট? নিয়মের গাণিতিক বেড়াজাল ও শৃঙ্খলার বজ্রআঁটুনি, যা দিয়ে মানুষ এবং তার অপরাধকে এক-একটা গাণিতিক সমস্যায় পরিণত করা যায়। অপরাধীর উচ্চতা, ওজন, ডান হাতের ক্ষতর বয়েস, অথবা চুলের রং বিচার করে তার ব্যবহারের প্রোফাইলিং করা যায়। কিন্তু আমি, যে কখনো কোনো অপরাধের সমাধান করেছে বলে নিজেই বিশ্বাস করে না, সেই আমি জানি, এভাবে কিচ্ছু হয় না। পুলিশে এত বছর কাজের সুবাদেই জানি, অপরাধীর ধরা পড়া অথবা না-পড়া দুটোই স্বাভাবিক। বাস্তব মানে অসংখ্য আলাদা আলাদা ফ্যাক্টর, অযুত সম্ভাবনা, তাদের নিযুত ব্যখ্যা। একটা লোক হত্যার সময়ে অকুস্থলে ছিল আর তার হাতে মৃতর রক্ত লেগে ছিল, এর কয়েক হাজার আলাদা ব্যাখ্যা হতে পারে যাদের সবক-টায় সেই ব্যক্তি এবং ওই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। তবু আমরা নিজস্ব ব্যাখ্যার সুবিধের জন্য ওই একটাই সমাধান বেছে নিই, ভুলে যাই য, মানুষ আসলে অসীম সম্ভাবনাময়। তার ভেতর লুকিয়ে আছে বিপুল শক্তি ও উদ্দীপনা, আর সেই কারণেই, ক্ষণে ক্ষণে অপ্রত্যাশিত কাজের মাধ্যমে আমাদের চমকে দেবার ক্ষমতা। তবু টিনা বিশ্বাস করে যে, পাপ সম্পর্কিত প্রোটেস্টান্ট ধারণার প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে রেভারেন্ড গরম্যানকে সন্দেহ করা যায়। এই যান্ত্ৰিক অভ্যাসে মানুষ এবং মানবিক অভ্যাসগুলোকে যেভাবে রিডাকশন করা হয়, সেটা আমাদের একার ব্যর্থতা নয়, ব্যর্থতা আমাদের অপরাধবিজ্ঞানের, শাস্তি, সংশোধন ও জেলখানা সম্পর্কিত ধারণার। এবং, ব্যর্থতা অতি অবশ্যই সোনালি যুগের ডিটেকটিভ ফিকশনের, যারা এই রিডাকশনিস্ট অ্যাপ্রোচকে তাত্ত্বিক বৈধতা দিয়েছে, যারা মনে করেছে ডিটেকটিভ এক ঈশ্বরপ্রতিম অস্তিত্ব যিনি ওপর থেকে মরজগতের পাপ দেখেন, বিশ্লেষণ করেন, কিন্তু তার অংশীদার হন না। প্রতিটা গল্পের শেষে একটা ঘরের ভেতর সবাইকে বসিয়ে অপরাধ বিশ্লেষণ তো যেন শেষ ভোজসভা— জুডাসের মতো এখানেও উপস্থিত সকলের মধ্যে লুকিয়ে আছে আসল অপরাধী। ওরা দু-জন, টিনা আর বারবারা, ওরা এই সেট-আপের ভেতরেই নিজেদের কমফর্ট জোন খুঁজে নিয়েছিল। তাই আমি ভয় পাচ্ছিলাম, কারণ এই প্রত্যেকটাই— অপরাধ, তদন্ত, সমাধান এবং শাস্তি, এর প্রতিটা অধ্যায় আমার কাছে ক্লান্তিকর আর অর্থহীন এক-একটা প্রক্রিয়া। তাই সেখানে সাফল্য পেল, নাকি, পেল না তা দিয়ে কিছু আসে-যায় না, অন্তত আমার কাছে। মাতাল হয়ে আবোল-তাবোল বকছি বলছেন? হতেও পারে। অথবা, যেহেতু আমি ক্রিসকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছিলাম, তাই আঙুরফলকে টক বলছি, এটাও সম্ভব। কিন্তু, আমার সেই আত্মবিশ্বাস ছিল না যা ছিল ওদের সেই আত্মবিশ্বাসকে আমি ভয় পাই, কারণ জানি সে অন্ধ।
যেদিন টমাসের বাড়ি থেকে প্রথমে এডওয়ার্ড আর তারপর তনয়া রেগেমেগে বেরিয়ে গেল, সেদিন তার কিছু পর আমিও বেরিয়ে পড়েছিলাম, কারণ মেজাজ খিঁচড়ে ছিল এসব দেখে। বাড়ি ফিরে শান্তিতে বোতল নিয়ে বসব বলে অন্ধকার রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। ডাক্তার হাঁটতে বলেছিল, তাই বেশি হাঁটা হবে বলে ঘুরপথ নিয়েছিলাম। তাড়া তো নেই। ডাফরিনপাড়ার রাস্তা দিয়ে যেতে আমার ভালো লাগে। রাস্তার দুই পাশের গাছেরা ঝুঁকে মাথার ওপর চাঁদোয়া রচনা করেছে মনে হয়। হিমশীতল ও নির্জন। টর্চ হাতে হেলতে-দুলতে এগোচ্ছি। তখন দেখি, সামনের একটা কটেজে আলো জ্বলছে। এই কটেজটা আর্চির। মনীষার তুতো ভাই। এইদিকটার সব কটেজ পরিত্যক্ত, আর্চির আর শ্যাডওয়েলের কটেজ বাদে। শ্যাডওয়েলরা হংকং চলে যাবার সময়ে ওদের বাড়িতে কাজ করত ভগত বাসুদেব, তার পরিবারের হাতে কটেজের মালিকানা দিয়ে গিয়েছে। তারা একদিকে থাকে, অন্যদিকটা হস্টেল হিসেবে ভাড়া দিয়েছে। স্থানীয় স্কুলের এক মাস্টারনি আর এক ডিমবিক্রেতা মহিলা, তাদের কাউকেই আমি চিনি না, তারা দু-জন নাকি সম্প্রতি একটা ভাঙা বাংলোর ভেতর পরিষ্কার করে থাকতে শুরু করেছে। সেটা বাদ দিলে, এই জায়গাটা জনহীন। আমি এখান দিয়ে হাঁটি, এডওয়ার্ডরা যখন রাঁচি থেকে আসে। সেদিনও টর্চের আলো নিভিয়ে জঙ্গুলে বেড়ার ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলাম।
কটেজের একদিক ধসে গেলেও ডান পাশটা অক্ষত। দেওয়াল বেয়ে বটের শেকড় উঠেছে ঠিকই, বাগানে হাঁটুসমান ঘাস, কিন্তু বাইরে থেকেও বোঝা যায় যে, অন্তত দুটো ঘর বাসযোগ্য আছে। বাইরে মিটমিটে বাল্ব জ্বলছে যার আলো আমি দূর থেকে দেখেছি। মুখ বাড়িয়ে দেখি, লনে দুটো চেয়ার পাতা। দু-জন বসে। এই ঝোপঝাড় মাথায় নিয়ে, তার ওপর মশার কামড়, হিম পড়ছে, তবু বসে আছে ওরা। আরেকটু এগোলাম। খচমচ শব্দ হচ্ছে, তবু দু-জনের কেউ নড়ল না। সরতে সরতে এমন জায়গায় এলাম যেখান দিয়ে মুখের পাশটুকু দেখা যায়। একটা চেয়ারে বসে আছে মনীষা। পাশের চেয়ারে আর্চি। মাঝে কেউ থাকত না বলে তালাবন্ধ ছিল অনেকদিন, বছরখানেক আগে আর্চি ফিরে এসে আবার থাকতে শুরু করেছে। এই কটেজটা আর্চির বাবা কিনেছিল। রেভারেন্ড গরম্যান মধ্যস্থতা করেছিলেন। তবে, ওরা পাকাপাকি থাকত না। ছুটি কাটাতে আসত। আর্চি একাও আসত অনেক সময়ে। বেশ কিছুদিন বাদে দেখলাম ওকে। কত বুড়ো হয়েছে আর্চি! মাথার সব চুল সাদা। বলিরেখাময় মুখ। হাত দুটো মুরগির ঠ্যাঙের মতো সরু, শিরা-ওঠা। কতই-বা বয়েস, সবে হয়তো ষাট হয়েছে। একটা ছাই রঙের ফুলহাতা সোয়েটার পরে আর মাফলার গলায় গুঁজে বসে আছে। সামনের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু কথা বলছে না। মনীষাও সামনে তাকিয়ে। তার হাতে ধরা আর্চির হাত।
বহুবার এই দৃশ্য দেখেছি, তবু ক্লান্ত হই না। বেশ কয়েক মিনিট ওখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছিলাম! নড়াচড়ার শব্দ ওরা শুনতে পাবে, সে-কারণে নয়। মনে হত, এই নিঃশব্দ আড়ালকে আমি নষ্ট করব না। বার বার মনে হত, নির্লজ্জের মতো বলছি, মনীষা কি আমার হাত এরকম ধরে বসে থাকতে পারত না কখনো? তার মুখের ভাব আমি বুঝতে পারি না, শোক, নাকি, হাহাকার অথবা বিগত দিনের আক্ষেপ, অথবা, কিছুই নয় হয়তো, এক চুপচাপ প্রেমই শুধু। সেটুকুর জন্য তো একসময়ে আমি নিজের কেরিয়ার বাজি রেখেছিলাম। রেখেছি আর ব্যর্থ হয়েছি। তবু মনীষাকে ঘুণাক্ষরে জানাতে দিইনি। তবু এত নীরবতা, আপনারা যাকে বলেন শেয়ারিং দ্য সাইলেন্স, সে কি আর্চির জন্যে তোলা থাকল? আর আমি, বিগত যুগের হতাশ ডিটেকটিভ এক, সে উঁকি মেরে দেখবে, এই ভূমিকাই কি নির্দিষ্ট ছিল তার জন্য? তাহলে আমার সেই খোঁজাটুকুর কী হবে? হ্যাঁ, অফিসার? ক্রিস? আমাদের স্মৃতি? মনীষার ভেতরে কোথাও ওর জন্য কি শোক বেঁচে নেই ?
আমি মাতাল হইনি। আরেকটা পেগ নিই। ভাবতে গেলে হিংসে হচ্ছে জানেন, ইচ্ছে হচ্ছে প্রবল মাতলামি করি, সেই শেষদিন হিংসেতে জ্বলেপুড়ে এডওয়ার্ড আর মনীষার সামনে যেমন করেছিলাম। স্বীকার করি, শয়তান ভর করেছিল আমার মাথায় সেদিন। কিন্তু, সে-গল্প পরে আসবে। আমার অপরাধ আমার মুখ থেকে শুনবেনই-বা কেন? আমি নিশ্চিত যে আপনি এরপর বারবারার সঙ্গে কথা বলবেন, হয়তো কলকাতায় গিয়ে টিনার সঙ্গেও। তারা বিস্তৃতভাবে জানাবে আমার নির্লজ্জতার কাহিনি। কিন্তু, সেদিন ঝোপের ধারে দাঁড়িয়ে হিংসে নয়, হিংসের সময় কয়েক দিন পরে এসেছিল, সেদিন আমি নিজের ভূমিকাটুকু দেখে কাতর দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি মাত্র, আর কিছু নয়, যে অন্যের জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত স্থানগুলোতে সন্ধানী সার্চলাইটের দপদপে আলো ফেলবার পেশাতেই আমাকে অভিনয় করে যেতে হচ্ছে, অবসরের বহু পরেও।
এই ঘটনার দিন তিনেক পর আমাকে বারবারা জানায় যে, জেনিফার নাকি টিনাকে ক্রিসের জন্মরহস্য বিষয়ে কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে। শুধু জানায়নি, আমাকে উপহাস করেছিল বারবারা। তখন সেই প্রবল হিংসে, যাকে আপনারা বলবেন ব্যর্থ আক্ষেপ, ফিরে এসেছিল। তার পরিণাম আপনারা জানেন। কিন্তু ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে গিয়েও, বারবারার মুখে শোনার পর একটা ভ্যালিড প্রশ্ন আমার মাথায় এসেছিল। হাজার হলেও আমি একজন পুলিশ, হয়তো খারাপ পুলিশ, কিন্তু পুলিশ, তাই প্রশ্নটা আসতই। জেনিফার যদি ঠিক কথা বলে, তাহলে তিনদিন আগে আর্চি আর মনীষার পাশাপাশি বসে থাকা কী বার্তা দিয়েছিল?
হয়তো আমরা অনেকেই আর্চি ও মনীষাকে এর আগে একসঙ্গে দেখেছি। কিন্তু, তখন জেনিফার আমাদের কানে কানে বলে যায়নি দু-জনের সম্পর্কের কথা। এখন জানি বলে সোজা চোখে সেই দৃশ্যকে ভাবা সম্ভব নয়! ক্রিস যদি সত্যিই আর্চির সন্তান হয়? এতদিন ধরে সম্পর্ক দু-জনের, আমরা কেউ জানলাম না কিছুই, এত ছোটো টাউনের ভেতরেও কানাকানি হল না, ভেবে অদ্ভুত লাগছিল। অবশ্য, মনীষারা বহুদিন হল রাঁচি চলে গেছে, আর্চিও কালেভদ্রে আসত। কিন্তু, ক্রিসের অন্তর্ধান রহস্যে যদি এই দু-জন জড়িত হত, তাহলে তো হাত ধুয়ে ফেলতে পারত না! এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরস্পরের হাত ধরে নীরবে বসে থাকতে ক্লান্ত হয় না যে যুগল, তারা নিজেদের পেটে কতটা রহস্য লুকিয়ে রাখতে পারে আর কতদিন ধরে, অফিসার মাহাতো? কিন্তু, এসব ভাবনা আমি ভেবেছিলাম তিনদিন পর। যেদিন আমি মনীষা আর আর্চিকে দেখেছিলাম, তার গল্প শেষ হয়নি।
কয়েক মিনিট পর আমার মনে হল, বেরোতে হবে। ওরা থাকুক বসে, আমি আর কতক্ষণ দাঁড়াব? মশা কামড়াচ্ছে, কেউ দেখলে সেটা ভালোও হবে না। সাবধানে কয়েক পা পিছিয়ে এলাম। কিন্তু, থমকে গেলাম আবারও। আমি যেদিকে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে ডান দিকে ঘাড় ঘোরালে দেখা যায় মহুয়ার জঙ্গুলে ভূমি, যা বাড়ির পেছনদিক থেকে শুরু হচ্ছে। জঙ্গলটা ঘন নয়, দুই-তিনটে সারি দেওয়া গাছ মাত্র, কিছু ঝোপঝাড়, তার পেছনে ঢালু জমি অনেকটা, দুই পাশে দেহাতি বস্তি। জঙ্গলের ধার ঘেঁষে একটা ল্যাম্পপোস্ট লাগিয়েছিল পঞ্চায়েত থেকে, তার আলো মাঝে মাঝে জ্বলা-নেভা করে। এখন সেরকম দপদপিয়ে ওঠায় চোখ চলে গেল। দেখলাম পোস্টের নীচে নিঃসাড়ে দাঁড়িয়ে আছে এডওয়ার্ড। তার চোখ মনীষা ও আর্চির দিকে। সে আমাকে দেখেনি কারণ আমার অবস্থান ছিল ঝোপের সঙ্গে মিশে। কিন্তু, আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও খেয়াল করত কি না সন্দেহ, এত নিবিষ্ট তার দৃষ্টি। তার মুখের ভাব আমি বুঝিনি। বেদনা না আক্ষেপ, অথবা ঈর্ষা। প্যান্টের দুই পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এডওয়ার্ডের মূর্তির অর্থোদ্ধার করা, সে তখন কী ভেবেছিল অথবা হিংসেতে দগ্ধ হচ্ছিল কি না, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তার আশপাশ থেকে জগৎ মুছে গিয়ে শুধু দুটো মূর্তিই যেন টিকে ছিল, এক ক্লান্ত ভঙ্গিমায় এডওয়ার্ড দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে যাচ্ছিল যাদের। টমাসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ইস্তক এখানে এভাবেই দাঁড়িয়ে আছে কি? মনীষা ও আর্চি হয়তো ভেবেছিল, এডওয়ার্ড যেহেতু টমাসের বাড়ি নিমন্ত্রণ রক্ষায় গিয়েছে, তাই এটুকু সময় তারা নিজস্ব পাবে। বেচারা এডওয়ার্ড! আমি অনেকবার মনীষাকে দেখেছি, কখনো একা বসে থাকতে, কখনো এডওয়ার্ড, অ্যারন বা আর্চির সঙ্গে। কিন্তু, এডওয়ার্ডকে আড়াল থেকে উঁকি মারতে এই প্রথম দেখলাম।
বারবারা আমায় বলেছিল এডওয়ার্ড তাদের বিয়েটা নিয়ে উদাসীন হয়ে গেছে। এটাও বলেছিল যে, ক্রিস চলে যাবার কিছুকাল পরে মনীষা নাকি প্রায় জোর করেই কনসিভ করে। তখন থেকেই এডওয়ার্ডের চোখ কঠিন এবং গলা কর্কশ হতে শুরু করেছিল।সত্যি? নাকি, এডওয়ার্ড এখনও তীব্র আবেগি, যাকে সহ্য করা মনীষার পক্ষে সম্ভব ছিল না বলে সে আর্চির দিকে ধেয়ে যায়? কিন্তু, এডওয়ার্ডের তো প্রেমিকা আছে বলেছিল জেনিফার, তাই তো? কল্পনা করতে পারি, রাতের পর রাত মনীষা আর আর্চি পাশাপাশি বসে থাকে, রাতের পর রাত এডওয়ার্ড দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের দেখে যায়। তারপর নিশ্বাস ছেড়ে এডওয়ার্ড ফিরে যায় তার প্রেমিকার কাছে। তারপর আবার ফিরে আসে পরের রাতে। নাকি, যদি এমন ভাবা যায়—এডওয়ার্ডের সবার আগে অনুমান করার কথা, সন্তানের পিতা সে কিনা। হয়তো বুঝেছিল। তাই রাগ হোক অথবা রক্তসম্পর্কের জটিল সমীকরণ, যেটা থেকেই হোক না কেন, ক্রিসকে সে নিজেদের জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছে। হয়তো মনীষার ওপর একপ্রকার প্রতিশোধও হতে পারে। তারপর থেকে এখনও সে মাঝে মাঝে দেখতে আসে, মনীষা আর আর্চি সন্তান হারাবার শোককে কেমনভাবে মোকাবিলা করছে। হতে পারে না এটা? হতেও তো পারে। কিন্তু, এটা হলে অ্যাগনেস সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। তাতে টিনা হতাশ হলেও আমার অবশ্য আপত্তি নেই। যাই হোক, এগুলো সবই আমার কল্পনা। আমি সেজায়গা থেকে সরে আসি কারণ বুকের ভেতর একটা কষ্ট, রাগ, অভিমান, যা বলবেন তাকে— আশ্চ্যৰ, এডওয়ার্ডকে কিন্তু আমি হিংসে করিনি! করলাম কিনা আর্চিকে, সে একটা হিংসে করার মতো মানুষ হল?
রাত হল। আপনি বার বার মোবাইলে সময় দেখছেন বুঝছি। বুড়ো হয়েছি তো, পেটে মদ পড়লে বকবকানি বাড়ে। আমার বউ এতক্ষণে শুয়েই পড়ল হয়তো। উঠছেন? তাহলে বাকি গল্পটার কী হবে? কাল, পরশু, যেদিন খুশি আসুন আমি কোথাও যাচ্ছি না, এই বয়েসে পালানোও সম্ভব নয়। বরং, একটা বন্দিশ চালিয়ে দিই। সারারাত এখানে বসে ধু-ধু বনাঞ্চলে ঢেকে যাওয়া একটা পোড়ো শহরকে দু-চোখ ভরে দেখে যাই যদি, তাতেই-বা কার কী! আসুন অফিসার, সাবধানে যাবেন। অনেক রাত হল আমাদের সকলের। চারপাশ ধূসর হয়েছে। হয়তো কুয়াশায়। আপনার দেরি হয়ে গেল। দেরি হয়ে যায়, বরাবর।

কারণ তাহারা পড়িলে এক জন আপন সঙ্গীকে উঠাইতে পারে ; কিন্তু ধিক্ তাহাকে যে একাকী, কেননা সে পড়িলে তাহাকে তুলিতে পারে, এমন দোসর কেহই নাই ।
— Ecclesiastes | 4:10
আর রোদ মরে এল। বাগানের আম পেকে টসটস করছিল। সেই গন্ধে খিদে পাচ্ছিল আমার। কিন্তু আমি ঢোঁক গিলে নিজের লালা খেলাম, স্বাদ ষাটে। হিল্ডা পাশে বসে ছিল, হাত চেপে ধরলাম ওর। খেতে গেলে বমি হয়ে যাবে। যেভাবে এডওয়ার্ডকে ওরা—ওর নাক, চোখ, মুখ বোঝা যাচ্ছে না, ফুলে বিকট, লাল টসটসে। বাবা দুমদুম করে বাগানে ঘুরছে আর মা থমথমে মুখে ইজিচেয়ারে শুয়ে। বাবা বলছে, গাছটাই রাখবে না। কিন্তু, ওদের কী দোষ ছিল! এডওয়ার্ড আমাকে বলেছিল আগুনে পড়পড় করে পুড়িয়ে মারবে ওদের। ওর নাকি পোড়া গন্ধ শুঁকতে ভালো লাগে।
বহু বছর আগেকার গুদামঘরের স্মৃতিতে আমি হয়তো সত্যিই একা ছিলাম না। ক্রিস সেখানে ছিল, অ্যাগনেস, আরও অন্যেরা, যাদের তখনও জন্ম হয়নি। যারা ভবিষ্যতে ধু-ধু একা হয়ে যাবে, একা একা হারিয়ে যাবে যারা। এমনকী তাদের স্মৃতিরাও এত নির্জন হয়ে উঠবে যে, সেগুলোর সামনে দাঁড়ালে আমাদের বুক কেঁপে উঠবে ভয়ে। সেই নিঃঝুম অস্তিত্বগুলোর কাছে আমার একটা দিনের গুদামঘরের স্মৃতি ফিকে হয়ে যায়। তারা হয়তো ভবিষ্যৎ থেকে এসে আমার পাশে হাঁটু মুড়ে বসেছিল, কারণ ওটাই তারা পারত। যেমন আজ এই যে আমি পোড়োমাঠের দিকে তাকিয়ে বসে, কে বলতে পারে জঙ্গলের ওপার থেকে ক্রিসও একইভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বসে নেই? কিন্তু, আমাকে সবাই পাগল ভাবত, কারণ আমি ক্রিসকে দেখতে পাই। বহু বছর দেখিনি যদিও, তবু জানতাম ও ওখানেই লুকিয়ে থাকে সারাদিন। সন্ধেবেলা কাপাস, মহানিম, অশ্বত্থ আর বাবলা গাছেরা হাওয়ায় লুটোপুটি খায় যখন, যখন ভাঙা চাঁদ জলাভূমির ওপর পড়ে শত টুকরো হয়, ফিসফিসে ধ্বনিতে আমাদের টাউন ঢেকে যায়, সেইসময়ে ক্রিস বেরোয়, ঘুরে বেড়ায় জঙ্গলের ভেতর অথবা বেতবনের ধারে শুয়ে থাকে। কিন্তু, কেউ একথা বিশ্বাস করত না, কারণ তারা ক্রিসকে দেখেনি কেউ, আমি বাদে।
ওকে শুইয়ে রাখা হয়েছে, ব্যান্ডেজ সর্বাঙ্গে। হিল্ডা আমার পাশে দোলনায় বসে মাথা হেলাল।
—তুই আমাদের বাড়ি চল আজ রাতে।
–না রে, মা-কে দেখতে হবে আজ।
–আগেও বলেছি, তোর ভাইয়ের বয়েস বাড়েনি।
—কিন্তু ও তো ভীতু ছিল, খুব নরম মনের
—তাহলে কেন এভাবে পুড়িয়ে মারতে যাবে?
–নাকি, মৌমাছিগুলো ওর জানালার কাছে ভোঁ ভোঁ করে, ঘুমোতে দেয় না ওকে। যখন মাটিতে আছড়ে পড়ছে, আমরা ছুটে যাচ্ছি ওর দিকে, তখনও চেঁচিয়ে বলেছে, আই উইল বার্ন দেম অল !
আমি দিব্যি গেলে বলতে পারতাম ক্রিস সেই সোয়েটারটা পরে ছিল যেটা আমি ওর জন্য বুনেছিলাম। সোয়েটারটাকে পরে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবু কাউকে বোঝানোর দায় তো আমার নেই! বাবাকে তবু বলেছিলাম। ততদিনে বাবা একা বসে মদ খায় সারাদিন, ঘরের আলো জ্বালালে চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু আমার কথা শুনে উশকোখুশকো চুলে তাকিয়েছিল, চোখ ছিল লাল, বাবা গ্লাস তুলে শুধু বলেছিল, ‘উল্লাস’। আমাকে অবিশ্বাস করার সাধ্য বাবার ছিল না, কারণ তার বছর কয়েক আগে অ্যাগনেসের ভূতকে জলাভূমির ধারে ঘুরে বেড়াতে দেখে বাবা অজ্ঞান হয়ে যায়, চোখের কোলভাগ দিয়ে গড়িয়ে এসেছিল জল। তার পর থেকে বাবাও আর বাবার মতো ছিল না, নুয়ে যাচ্ছিল, একা হয়ে যাচ্ছিল যেন, ঘরের ভেতর নিজের ছায়াকে ভয় পেত। মায়ের ওপর চিৎকার করে উঠেই চমকে নিজের হাতের দিকে তাকাত, ফ্যাকাশে হত তার মুখ। আমি সাহস করে উঁচু গলায় দুটো কথা বললে স্থির হয়ে যেত তখন থেকে। এটাই সম্ভবত বয়েসের পরিণতি। আর, ক্রিসের ঘটনা ছিল কফিনে শেষ পেরেক। যখন শুনেছিল ক্রিসকে আমি দেখি, তখন সন্ধে হয়েছিল, বারান্দার ডুমবাল্ব ঘিরে জমা হয়েছিল মথপোকাদের দল। বাবা ছিল লম্বা চেহারার দশাসই মানুষ। নিঃসঙ্গ ঘরে বসে বসে নিজের গলা টিপে ককিয়ে উঠতে চাইত। অনেক মদের অন্ধচোখ নীরবে আর্তনাদ করত, বাবার দিকে তাকিয়ে।
কিন্তু, সে ছিল বুড়োমানুষের দুর্বলতা। বাকিরা আমায় পাত্তা দিত না। হয়তো মুখ লুকিয়ে হাসত, বা, ভুরু কুঁচকে হতাশ মাথা নাড়ত আমার কথা শুনে, অথবা, এডওয়ার্ডের মতো রেগে যেত। তখন আমার মনে হত, আমি সারাজীবনের জন্য ওই গুদামঘরেই আটকে থেকেছি, আর বেরোইনি। কিন্তু, অক্ষয়কে এত কথা বলে কী লাভ? আমি মোটা বুড়ি, মুখ খারাপ করি আর মদ খাই। আমার মনের ভেতর কী চলে সেসব জেনে ও কী করবে?
তনয়ার পায়ের কাটা জায়গাগুলো ডলোরেস ড্রেসিং করতে করতে জানাল কালকেই যেন একটা টেটভ্যাক নেয়। তনয়া সংকুচিতভাবে বসে ছিল। ‘সরি’ বলল অনেকবার। হল ঘরে রাখা বাক্সগুলোর ভেতর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে লালুরাম এসে তনয়ার হাতে নাক ঘষে গেল। ও-ও বুঝেছে, মেয়েটা ব্যথা পেয়েছে। তনয়া লজ্জিত মুখে ডলোরেসকে বাধা দিল। ‘আচ্ছা, হয়েছে! বললাম না, আমি নিজেই তোমার কাছে আসব ভাবছিলাম। কারণ, একাধিকজন আমায় জানিয়েছিল তুমি অ্যাগনেসের ব্যাপারে খোঁজ চালাচ্ছ। তাই কৌতূহল হয়েছিল। কিন্তু আগে বলো তো, ভর সন্ধেবেলা একা একা পাগলের মতো জঙ্গলের ভেতর ঘুরছিলে কেন?' কুরুশকাঁটা হাতে তুলে আমি নিজের অনুমান জানালাম— ছুঁড়ি বয়ফ্রেন্ড জুটিয়েছে, তাই মিট করতে গিয়েছিল। তনয়া ভর্ৎসনার চোখে তাকালেও গ্রাহ্য করি না। গতকাল যখন বেথেল মিশনের সামনে পুতুলটাকে পেয়েছিলাম, আমি ওকে যতবার বলেছি ক্রিসের কথা, ও উড়িয়ে দিয়েছে। নাকি, সবই আমার কল্পনা। তাহলে আমার কী দায় পড়েছে ও ছুঁড়ির প্রতি নরম হবার? ‘ভাগ্যিস, আমি তখন ফিরছিলাম ওখান দিয়ে! আমার এক বাল্যবন্ধু বহুবছর হল মুম্বাইতে থাকে, ওর দাদা সেখানকার স্টুডিয়োপাড়ায় কাজ করেন। ওরা ছুটিতে বাড়ি এসেছে। ওর সঙ্গে দেখা করতে দয়াপুর গিয়েছিলাম, ফেরার পথে ওই রাস্তাটা শর্টকাট হয়। হাঁটতে হাঁটতে দেখি পাগলের মতো ঘুরছে, আবার দৌড়ে গেল খানিকটা, শেষমেষ খাদের দিকে পা বাড়িয়েছে যখন, ছুটে গেলাম।' ডলোরেস জানাল আমাকে।
“ভালো হয়েছে। বহুকাল আসিস না এদিকে। আজ খেয়ে যাবি।' ডলোরেস আপত্তি করছিল, ধমক দিলাম। ‘বাড়ি গিয়ে করবি তো পাগল-ছাগলের সেবা, সেই করে করে বুড়ো হয়ে গেছিস। একটা লাভার পর্যন্ত জোটাতে পারিসনি। অত ব্যস্ততার কী আছে রে? কে থাকবে তোর পথ চেয়ে? থাক এখানে! খেয়ে যাবি।' ডলোরেসকে বলতে পারি এসব, কত ছোটো থেকে দেখছি ওকে! মাঝে কত বছর কথা হয়নি যে, ভুলেই যেতাম আমরা এক টাউনে থাকি।
‘ডলোরেসকে দেখে আমার কী মনে হচ্ছিল, জানো?' রাত্রিবেলা আমার পাশে বসে কুরুশ করতে করতে তনয়া বলল। ততদিনে ওরও কুরুশের শখ জন্মেছে। ‘মনে হচ্ছিল, একটা বিশাল লাইব্রেরি ঘরে আমি যেন হারিয়ে যাচ্ছিলাম। ঠাসাঠাসি বইয়ের দল সার সার শেলফ থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে, তাদের বাদামি স্পাইনে সোনালি জল করা ক্যালিগ্রাফি দেখে মনে হচ্ছিল, আমরা মধ্যযুগের কোনো বেনেডিকটাইন মঠে বসে আছি। এক্ষুনি হয়তো অন্ধ লাইব্রেরিয়ান জর্জে সরু গলিপথ দিয়ে আবির্ভূত হবেন, হাতে কালান্তক মোমবাতি। আমাদের সামনে বসে আছেন এক সন্ন্যাসিনী। ঋজু, গম্ভীর, শান্ত।' ডলোরেস
লম্বায় প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট, বসন্তলাঞ্ছিত ফর্সা মুখ, চওড়া কপালে জোড়া ভুরু, বয়েসের ছাপ চামড়াকে হালকা কুঁচকেছে। কপালের ওপর চশমা তুলে কথা বলছিল। ওর উচ্চারণ বেশ অভিজাত, কোথা থেকে শিখল? অ্যাগনেসের তো এমন ছিল না? ম্যাগি তো কঅক্ষর গোমাংস মনে হয়। তনয়া বেশ কাব্যি করে বলছে আবার, ‘এমন উচ্চারণ কণ্ঠস্বরকে শ্রুতিমধুর করে, ঠোঁটের চলনকে গাম্ভীর্য দেয়।' বাবা, কী কঠিন সব উপমা! তবে ডলোরেসকে অনেকদিন পর কাছ থেকে দেখেছি—ব্যস্ত, আত্মবিশ্বাসী। ভালো লাগে। কেউ তো তবু কাজ নিয়ে আছে! কিন্তু এ ছুঁড়ি লেসবিয়ান নাকি?
—আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই, জানিস, কিন্তু কোথায় সেটা জানি না। আমি জানি তুইও চলে যাবি তাড়াতাড়ি। তোর তো মাস্টার্স করার শখ। কিন্তু, হিল্ডা বড়ো চোখে আমাকে নীরবে দেখছিল।
—অনেক বছর আগে তুই আমাকে কামড়ে দিয়েছিলি, মনে আছে?
—হঠাৎ এই কথা?
হিল্ডা মাথা নাড়ল নিজের মনে, আমি একই জায়গায় আটকে ঘুরে যাচ্ছি, বার্বি।
-কী হয়েছে তোর, এত নিঝুম থাকিস কেন আজকাল ?
হিল্ডা মৃদু হাসল।
‘এসব শুনে এই মনে হল তোমার, প্রফেসর স্প্রাউট?’
‘জানি না বাপু! ওসব হলে আমার দিকে নজর-ফজর দিয়ো না যেন! আর দাঁত মাজো তো? ওরা খুব নোংরা শুনেছি।'
‘উফ।’ তনয়া কুরুশ কাঁটা ফেলে দিল কোলে। তারপর যেন কেঁপে উঠল একবার। ‘বারবারা, আজ ওই জঙ্গলের কুয়াশা—আমার মনে হচ্ছিল চারধারে সব কিছু মরে গেছে, এমনকী গাছেরাও, মনে হচ্ছিল আমি কোনোদিন এখান থেকে বেরোবার রাস্তা খুঁজে পাব না।' চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাঁকাল জোরে। ‘ছাড়ো এসব। তোমার কী মনে হয়? ডলোরেস যা যা বলে গেল, দেখে তো মনে হল না ও বিশ্বাস করে অ্যাগনেসের ভূত বলে কিছু আছে।' আমি ওকে আমার ধারণা জানালাম। ডলোরেস জানে যে, অ্যাগনেস পালিয়েছে। মায়ের পেটের বোন, পিঠোপিঠি বয়েস, না-জানাটাই অস্বাভাবিক ছিল। হয়তো দিদির মুখ চেয়ে বলেনি কাউকে। কিন্তু, তনয়া আমার এই তত্ত্বকে গ্রহণ করল না। ‘তাহলে ওরকম ব্যাকুলভাবে আমার হাত চেপে ধরেছিল কেন?' হয়তো নিজে মুখ ফুটে বলতে পারছে না। তাই চায় তনয়া খুঁজে বার করুক।
সারারাত আমি বাগানে বসে, ঘরে এডওয়ার্ডের তখন জ্বর এসেছে। আমগাছ থেকে ঝুলে থাকা চাকটা ফোপরা খটখটে। বাবার হুকুমে ধোঁয়া দিয়ে তাড়ানো হয়েছে ওদের।
আমার ছেলেকে এভাবে—বাবার মুখে রাগ থমথম করছিল। এডওয়ার্ড প্রি-টেস্টে ফেল করেছে। বাবা জানে না। মা ভয়ে কাঁপে, বাবাকে বলতে বারণ করে, নাহলে ছেলেটাকে মেরে ফেলবে।
এদিকে ওই লোকটা, রকির বাবা, সে নাকি তনয়াকে জানিয়েছে যে, অ্যাগনেস খুন হয়েছিল। এসব কথায় পাত্তা দেবার প্রশ্ন নেই। ছোটো শহরে গুজব যেভাবে কানাকানি ভিড় করে, তনয়া যদি জানত! কথায় কথায় বলল, মেডুসার চুল ছিল সাপ দিয়ে তৈরি। আমার ওসব মনে আসেনি বাবা! সাপ না আরও কিছু! আমার ঠাকুমার লাল চুল ছিল। তাঁকে আমি বছর তিনেক বয়েস পর্যন্ত দেখেছি। খরখরে ইটরঙা নুড়ির মতো লাগত, মনে হত পরচুলো। ‘খুব দুরন্ত ছিল? অ্যাগনেস?' জিজ্ঞাসা করল তনয়া।
‘খুব। আমাদের বাড়ি এসে কম দুষ্টুমি করেছে? একবার তো মই থেকে পড়ে গেল। দোতলা সমান উঁচু। আমরা ভয়ে কাঠ। পরের মেয়ে, যদি কিছু হয়ে যায়। ও মা, দেখি হিহি করে হাসতে হাসতে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। তবে, একটা গুণ ছিল ওর। বাইবেল পড়তে ভালোবাসত।' আস্তে আস্তে সব মনে পড়ছে কারণ স্মৃতির ঘোলাজল ঝাঁকানি খেয়েছে। ‘এক-একটা প্যাসেজ মুখস্থ বলে যেতে পারত। এদিকে অন্য পড়ায় মন নেই কিন্তু '
‘এত সুন্দর দেখতে—ধরো, ওকে কেউ বিক্রি করে দেয় যদি?'
‘কী জানি! আমরা ভেবেছিলাম পালিয়ে গেছে।'
‘কিন্তু, জেনিফার বলল অ্যাগনেসের অনেক বয়ফ্রেন্ড ছিল। তাদের কারোর সঙ্গে পালায়নি তো?' তবে, তনয়াকেও বুঝতে হবে যে, জেনিফারের সব কথা ধরতে নেই। ওইটুকু মেয়ে, তার আবার বয়ফ্রেন্ড! অবশ্য থাকতেও পারে, আমার মনে নেই সব। দুইএকটা ছেলেকে নিয়ে অশান্তি হয়েছিল মনে হয়। নাকি, ওই বিহারি ছোঁড়াটাকে নিয়ে এতদিন আগের কথা, ভুলে গেছি।
গলার ভেতর শুলোচ্ছে, মনে হচ্ছে লুকিয়ে একটোক—বাবার দেরাজে থাকে, কিন্তু বাবা এখন নিজের চেয়ারে জেগে বসে আছে। মা চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। এখন আবার অলটারের সামনে মাথা কুটবে। বাবা বলেছে এডওয়ার্ডকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেবে। ও নাকি লুকিয়ে সিগারেট খাচ্ছে।
আমার একটা জিনিসে খটকা লাগল। ডলোরেস এই শহরে থাকে, এডওয়ার্ডও থাকত । অন্যদের কথা বলার সময়ে একবারও ডলোরেসের স্মৃতিবিভ্রম হয়নি। কিন্তু মনীষার নাম মনে করতে পারল না। এদিকে মনীষা ছোটো থেকে এখানে আছে, সবাই তাকে রেভারেন্ডের মেয়ে হিসেবে ভালোমতোই চেনে। গঞ্জ তো খুব ছোটো জায়গা। সেখানে অ্যাংলো পরিবার হাতে-গোনা। তাদের একজন সদস্য আরেকজন কাছাকাছি বয়েসি মহিলার নাম ভুলে যাবে, যেখানে দু-জনেই বহু বছর এখানে কাটিয়েছে, এটা অদ্ভুত না?’
‘আমিও আজকাল অনেকের নাম মনে রাখতে পারি না। বয়েস হয়েছে, বুঝলে?’ ‘আমাকে অনেকগুলো জিনিস ভাবাচ্ছে, বারবারা! কালকের পুতুলটা দেখে ইস্তক মনে হচ্ছে—' কিন্তু আমি ওকে থামালাম।
‘তোমার থিয়োরি আমি শুনতে চাই না। কারণ, তুমি কখনোই মানবে না এর সঙ্গে ক্রিস জড়িয়ে।'
‘কোনো যুক্তিতেই মানব না।' তনয়ার স্বর হঠাৎ কঠিন হল, তারপর যেন হারিয়ে গেল অন্ধকারে। ভাসা ভাসা স্বরে বলল, ‘যা আমার লজিকাল সিস্টেমের বাইরে, তাকে আমি মেলাব কীভাবে?’
‘তাহলে ক্রিসের সঙ্গে অ্যাগনেসকে কোন লজিকে জড়াচ্ছ? শুধুমাত্র তোমার ষষ্ঠেন্দ্রিয়, আর কী?' তনয়া উত্তর দিল না।
স্মিতমুখে মাথা নাড়ল ডলোরেস। ‘তবু ভালো কেউ মনে রেখেছে! আমি কিছু নাবললেও এসব কেস তো চাইলেই পুলিশের মহাফেজখানা থেকে বার করা যায়।' কিন্তু সব কিছু আর্কাইভে থাকে না, থাকে মানুষের স্মৃতিতে, সেটা ডলোরেসও জানত। অ্যাগনেস কেমন ছিল? প্রশ্নটা শুনে ডলোরেস চট করে উত্তর দিল না। চায়ের কাপ নাড়াচাড়া করছিল। ফোন করে কাউকে একটা বলল মায়ের ওষুধের ব্যাপারে। তারপর মুখ তুলে ফিকে হাসল, ‘যতই সময় বয়ে যাক, এরকম ক্ষত তো মেলায় না!' ডলোরেসের স্মৃতির অ্যাগনেসের সঙ্গে জেনিফারের স্মৃতির অ্যাগনেসের বিশেষ তফাত নেই দেখলাম। উন্মাদনা, পুরুষসঙ্গ এসব ডলোরেসও বলল। তবে, ডলোরেস বাড়তি যেটা জানাল, অ্যাগনেসের চিকিৎসা শুরু হয়েছিল। কারণ, তার রাগ এবং অস্থিরতাকে থামানো যাচ্ছিল না শেষের দিকে। হুমকি দিত, বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবে। অনেক সময়েই গাছ থেকে নামতে চাইত না। ‘এখানে গোপন করার কিছু নেই। আমার মায়ের সম্বন্ধে নিশ্চয় শুনেছ। মায়ের সিজোফ্রেনিয়া। মায়ের দিদিমা শুনেছি উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। এগুলো জিনের মধ্যে থাকে। তবে, মা ভায়োলেন্ট হয়নি কখনো। অ্যাগনেস মাঝে মাঝেই হিংস্র হয়ে উঠত। একবার আমার মুখোমুখি বসে কথা বলতে বলতেই খোলা ফাউন্টেন পেন আমার হাতে গেঁথে গর্ত করে দিয়েছিল। শিরা পর্যন্ত ঢুকে গিয়েছিল। তার দাগ আছে এখনও।' কুর্তির হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে হাত পাতল। কবজির চামড়ায় কোঁচকানো দাগ, তিন ইঞ্চি লম্বা। দাগের পায়ের কাছে একটা গর্ত এখনও চোখে পড়ে, হাতের তালুর ঠিক নীচেই গর্তটা। সেখান থেকে দাগটা উঠে গেছে ওপরদিকে ‘এইখানে গেঁথে গর্ত করে দিয়েছিল। তারপরেও ছাড়েনি, টেনে দিয়েছিল অনেকটা। সেলাই পড়েছিল।' হেঁটে দরজার সামনে দাঁড়াল ডলোরেস। সামনে হা-হা মাঠ। লালুরাম সেখানে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছিল। ডলোরেসকে দেখে একবার ম্যা করে ডেকে উঠল। ‘মনে আছে তোমার? আমরা ঘাসবনের ভেতর লুকোচুরি খেলতাম। আমি অবশ্য কম এসেছি এ বাড়িতে। বাবা যেতে দিত না কোথাও। অ্যাগনেস বার দুয়েক নিয়ে এসেছিল।' নীচু হয়ে ঝুঁকে লালুরামের গলায় আদর করল ডলোরেস। ‘অ্যাগনেস আমাকে ভালোবাসত কিন্তু। ওর থেকে পাঁচ বছরের ছোটো আমি, আগলে রাখত স্কুলের বুলিদের থেকে। আমার খাতা মলাট করে দেওয়া, স্কুলের ক্রাফটের কাজে সাহায্য করা, জ্বর হলে, আর তো কেউ করার ছিল না, জলপটি, ওষুধ সবই ও করত। শুধু রেগে গেলে—' ডলোরেস আনমনা হয়ে জলাভূমি দেখছিল। ‘ছোটোবেলায় আমি ভাবতে ভালোবাসতাম, অ্যাগনেস এখানে লুকিয়ে আছে।’ ডলোরেসকে আমি জানালাম, ক্রিস এখানে লুকিয়ে। সে ঠোঁট টিপল। একটু আগে আমার পাশে বসে ক্রিসের ঘটনা নিয়েই জানতে চাইছিল, কোনো সুরাহা এতদিনে হল কি না। কিন্তু এখন সেরকম চোখে তাকাল, যেন বিশ্বাস করছে আমায়। বহুকাল কেউ করে না।
‘অ্যাগনেসের কোনো ছবি আছে? এমনি, কারণ নেই, ইচ্ছে হল দেখি।' বলল তনয়া । ‘বাড়িতে আছে অনেক। আসতে পারো। তবে মায়ের শরীর তো, কখন বিগড়োয় জানি না। সেসব সময়ে বাইরের কাউকে পছন্দ করে না। নাহলে এমনিতে ঠিক আছে। কেউ তো আসেও না। আমরাও অসামাজিক হয়ে গেছি নানা কারণে। ‘আমার বাড়িতে আসতে পারিস তো। সবাই চলে গেল, এই গুটিকয় তো আছি আমরা।'
‘আসব। এর আগে তোমার মতো করে কেউ তো বলেনি এরকম আসতে! সেটাও হয়তো খুব অস্বাভাবিক নয়। আমি সোজাসুজি কথা বলতে ভালোবাসি। বাড়িতে এরকম ইতিহাস থাকলে তারা সমাজে গ্রহণীয় হয় না বিশেষ। আমরা হতে চেয়েছি কি না, সেটাও জানি না। বাবা চায়নি জানি। আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছের দাম সেই ছোটো বয়েসে কে দেবে ! অ্যাগনেস চলে যাবার পর তো আরওই ছন্নছাড়া হয়ে গেল সব। বাবা রাত করে ফিরত। সকাল হলে বেরিয়ে যেত। আমি চাইলে সামাজিক হতেই পারতাম। অ্যাগনেসের মতো প্রচুর বন্ধুবান্ধব বানাতে পারতাম। কিন্তু, সেই ফর্মেটিভ বছরগুলোতে আমার কোনো বন্ধু হয়নি। স্কুল থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে আসতাম, কারণ ভাবতাম মায়ের দেখাশোনা করতে হবে, ওটাই একমাত্র কাজ। অন্য কোথাও যেতে ভালোও লাগত না আমার। সেটা যে আসলে অবসাদ, বড়ো হয়ে বুঝেছি। নিজের চেষ্টায় কাটিয়েছি তখন। রাঁচির কলেজে পড়তে গেছি। ফিরে এসে খালারির একটা স্কুলে চাকরিতে ঢুকলাম। কিন্তু, আমি জানতাম এখান থেকে বেরোতে হবে। শোক আমার সারাক্ষণের সঙ্গী হতে পারে না। বহু বছর পর একটা সুযোগ পেয়েছিলাম, কলকাতায় একটা স্কুলে চাকরি নিয়ে চলে গেলাম, সেটা ২০১২। কিন্তু, ভুল ভেবেছিলাম। পাকাপাকি ছিঁড়ে বেরোনো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। মা যা-ই হোক না কেন, তাকে কী করে অস্বীকার করতাম আমি? ফিরে এলাম তিন বছর পর, কারণ বাবা মারা গেল। কিন্তু, বাইরে একা থাকার সময়টা আমাকে মানসিকভাবে শক্ত করেছিল।' বলতে বলতে দরজা থেকে তনয়ার দিকে ঘাড় ফেরাল ডলোরেস। মুখে একদিকে আলো পড়েছে, অন্য পাশ অন্ধকার, মোমের মূর্তি মনে হয়। ‘অনেক বেশি কথা বলে ফেললাম, তাই না? এত কিছু তো শুনতেও চাওনি তোমরা।'
‘না, আপনি বলুন। আমার অন্তত শুনতে ভালো লাগছে। ভালো লাগছে বলাটা হয়তো অসংবেদী শোনাচ্ছে কারণ স্মৃতিগুলো তো সুখের নয়। কিন্তু, আপনার মতো মন খুলে সোজাসুজি কথা বলা মানুষদের আমার ভালো লাগে।'
হেসে ঘাড় নোয়াল ডলোরেস। ‘তুমি পারবে, অ্যাগনেসের কী হয়েছিল খুঁজে বার করতে?'
‘আমার ক্ষমতা সীমিত। তবে—
“না, আমি জানি। কিচ্ছু বলতে হবে না। তুমি যদি গল্প শোনার জন্যেও আসো তাতেও আমার ভালো লাগবে কারণ বহু বছর পর অ্যাগনেসের নাম কেউ উচ্চারণ করল।' ‘আচ্ছা, ওকে নাকি মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে দেখা গিয়েছে বলে একটা জনশ্রুতি আছে। আপনি নিশ্চয় জানেন!”
‘জানব না আবার! মানুষ কত কিছু বানায়! আমি যখন ছোটো ছিলাম, এসব শোনার পর জোহার হালে-তে চুপি চুপি গিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত বসে থাকতাম। যদি অ্যাগনেসের দেখা মেলে। কবরখানাতেও। কিচ্ছু দেখিনি। তবে, সেও তো বহুদিন হয়ে গেল। খেয়াল করে দেখবে, অ্যাগনেসকে তারাই দেখত, যারা পুরোনো দিনের মানুষ ছিল, যারা ওকে মনে রেখেছে। আর, নতুন প্রজন্ম', হাসল ডলোরেস, ‘তারা জানে না কে ছিল অ্যাগনেস, তাই তারা দেখেওনি। ও যেন এক বিগত যুগের স্মৃতির অবশেষ, আমাদের গঞ্জের মতোই, যাকে সবাই ভুলে গিয়েছে। এমনকী তার প্রেতও অপ্রাসঙ্গিক। তাই না?’
‘ও চলে যাবার পর আপনাদের বাড়িতে কী হল? মানে, আপনারা সেই পরিস্থিতিকে সামলালেন কীভাবে? খুবই ইনসেন্সিটিভ প্রশ্ন হয়ে যাচ্ছে কি?”
সারাদিন গিটার, ঝ্যাং ঝ্যাং, বাড়িতে আমার অস্থির লাগছে। মা লুকিয়ে টাকা দিয়েছিল, কলকাতার নিউ মার্কেট থেকে আনিয়েছে। ওর ঘরের দরজা বন্ধ। সিগারেটের ধোঁয়ায় দমবন্ধ লাগে। বাবা বেশিরভাগ সময় হোটেলে থাকে বলে বাঁচোয়া। একদিন বাবার পুরোনো অ্যাম্বাসাডার চালিয়ে বন্ধুদের নিয়ে রাঁচি পর্যন্ত ঘুরে এল, এদিকে লাইসেন্স নেই। বাবা বাড়ি ফিরে সব শুনে আবার চাবুক বার করল। কিন্তু এবার ও কাঁদল না, চেঁচাল না, ঠোঁট টিপে বাবার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। তাতে খেপে গিয়ে আরও জোরে চাবুক—পাশের ঘরে মা কানে দুই হাত চেপে বসে, কিন্তু আমার কষ্ট, দুঃখ হচ্ছিল না। আজ মাথা ধরে যাচ্ছে আওয়াজে, সুর নেই, তাল নেই, যেন দড়াম করে মাটিতে আছড়াচ্ছে। কিন্তু, আমি ওকে কিছু বলব না। আমাকে দাঁত চিপে গালাগালি দেয়, বেরিয়ে যেতে বলে। ওকে থাপ্পড় মারার জন্য হাত তুলি যদি, হাত ধরে ফেলে। ওর গায়ে কী জোর! আমি কি আবার গুদামঘরে গিয়ে বসব? বসব, বন্ধ করে দেব দরজা, আর অন্ধকার গিলে খাবে আমাকে। ওখানে আওয়াজ যায় না, আমি দু-চোখ বন্ধ করে লুকিয়ে পড়তে পারি।
চায়ে চুমুক দিয়ে ডলোরেস বলল, ‘এতদিন পরে এগুলো ইনসেন্সিটিভ লাগে না। জন্ম থেকে মা-কে দেখে আসছি, অধিকাংশ সময়ে বিছানায় শুয়ে নিজের মনে আবোল-তাবোল বকছে। ঘর অন্ধকার করে রাখত, আলো সহ্য হত না। বাবা আমাদের যেতে দিত না মায়ের কাছে। যতদিন পয়সা ছিল, ন্যানি রেখেছিল। তারপর আর টানতে পারছিল না। অ্যাগনেসকে আমি দোষ দিই না। ওরকম পরিস্থিতিতে অনেকেই চাইবে বাইরে গিয়ে বাঁচতে। কিন্তু, আমার যাবার উপায় ছিল না, কারণ এক তো আমি ছোটো, অনেক সময়েই বাইরে একা যাবার অনুমতি পেতাম না। তার ওপর আমার স্বভাবটাও ছিল বই মুখে পড়ে থাকা। ওকে আমার হিংসে হত খুব, সেই বয়েসে যা হয়! ওর এত ছেলেবন্ধু, কারণ সুন্দর দেখতে। কিন্তু, আমার দিকে কেউ ফিরে তাকায় না। এড়িয়ে যায়, নয়তো উপেক্ষা করে। এদিকে অ্যাগনেসের মাথায় অত বুদ্ধি ছিল না কিন্তু, যে যা বলে সেটাকেই বিশ্বাস করত। মিলিটারি মান্ডির ঝাড়ফুঁক বলো অথবা জেনিফার গর্ডনদের ভূতের গল্প, সরল বিশ্বাসে মানত অ্যাগনেস। প্রায় বারো বছর বয়েস অবধি বিশ্বাস করেছে সান্তাক্লজ আছে, ব্যাপারটা অদ্ভুত নয়? আমার মনে হয় ছেলেরা ওর এই সারল্যের সুযোগটাই নিয়েছিল। কিন্তু, আমার থেকে তো তেমন সুযোগও চায়নি কেউ। সেই বয়েসে রাগ হত। মনে হত, আমিও ওর মতো উচ্ছল হব কাল থেকে। কিন্তু, কার সঙ্গে? আমি তখন বেঁটে রোগা ফড়িং-এর মতো একটা মেয়ে, মুখ ভরতি ব্রণ। তার ওপর নার্ভাস হলে তোতলাতাম। দিনে দিনে স্ট্যামারিং বেড়ে যাচ্ছিল, কারণে-অকারণে নার্ভাসনেস ট্রিগার করছিল। বড়ো হয়ে অনেক কষ্টে কাটিয়েছি। বাবা মা, তাদের যেটুকু এলোমেলো মনোযোগ, ভালোবাসা, এমনকী রাগও, সে যত ছন্নছাড়া ধরনের হোক না কেন, সবই যেন অ্যাগনেসের ওপর। বাবা বাড়িতে থাকত না, নিজের মতো করে পালাবার জগৎ বেছে নিয়েছিল, তার ডাক্তারখানার চেম্বার। মা ভালো থাকলে বসার ঘরে আসত, সেলাই করত অথবা রেডিয়ো চালিয়ে গান শুনত। সেইসময়গুলো আমার মনে হত, সব ঠিক হয়ে গেছে। রোদে ঝলমল করছে ফ্রন্টইয়ার্ড। তারপর সেসব দিন আসত, মায়ের কনফিউশন, আমাদের চিনতে না-পারা, নিজের মনে বকবক করা। মায়ের এক দাদা স্কুলে পড়ার সময়ে টাইফয়েডে মারা গিয়েছিল। মা তাকে দেখতে পেত। তার সঙ্গে কথা বলেছে অনেকদিন। তখন অবশ্য আমাদের কিছু করতে হত না, মা নিজেই ঘরের দরজা বন্ধ করে দিত, ভেতর থেকে দাদার সঙ্গে মায়ের কথাবার্তার আওয়াজ পেতাম আমরা। ওষুধ, খাবার কিছু খেত না। অনেক অনুনয়, বিনয় করলে দরজা ফাঁক করে নিয়ে নিত। এরকম হয়তো টানা দু-দিন, তিনদিন। তারপর দরজা খুললে আমি ভয়ে ভয়ে ঢুকে দেখতাম খাটের এককোনায় বসে আছে জড়োসড়ো হয়ে। আমাকে তখনও চেনে না। অ্যাগনেসকে ডলোরেস বলে ডাকছে আর আমাকে অ্যাগনেস। ঘরের আলো জ্বালাতে দিত না। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর আমি আবার ফিরে যেতাম, বাইরের ঘরে বই নিয়ে পড়তে বসতাম। অ্যাগনেস সন্ধের আগে ফিরত না। ওর ছেলেবন্ধুরা ওকে পৌঁছে দিত। আমি দেখতাম গেট খুলে ঢোকার সময়ে হাসতে হাসতে ঠোঁটের লিপস্টিক হাত দিয়ে মুছে ফেলছে। বাবা ফিরত আরও রাতে। আমি আর অ্যাগনেস তখন নিজেদের ঘরে পাশাপাশি খাটে শুয়ে পড়েছি। বাবা নিঃসাড়ে খেয়ে চোরের মতো নিজের ঘরে চলে যেত। এরকম একটা বাড়ি থেকে পরিবারের বড়ো মেয়ে একদিন চলে গেল। কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে তোমার মনে হয়?’
‘জানি না। কারণ, এরকম বাড়ি আমি দেখিনি।'
কিন্তু, আমি দেখেছিলাম। নেতারহাটে বাবার বন্ধু ছিলেন মিস্টার মালহোত্রা, টিম্বার মার্চেন্ট। ছোটোবেলায় তাঁর ওখানে বার দুই ঘুরতে গিয়েছি। মিস্টার মালহোত্রার ভাইও দাদার ব্যাবসার পার্টনার ছিলেন, তাঁদের বাড়ি ছিল পাশেই। সেখানে শারীরিক অসুস্থতার দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। পরিবারের মা ও মেজোছেলে দু-জনের ক্যান্সার ধরা পড়েছিল ছয় মাস আগে-পরে, এবং দু-জনেই লম্বা সময় ধরে ভুগেছিলেন। তখন চিকিৎসা এত উন্নত হয়নি। দীর্ঘ অসুস্থতা একটা পরিবারকে কী করে দিতে পারে সেই ছোটো বয়েসেই বুঝেছিলাম। বাড়ি নিঃশব্দ, লোকে পা টিপে হাঁটে, নীচুগলায় কথা বলে। দিনের বেলা আলো জ্বালানো থাকে বড়ো বড়ো ঘরগুলোতে। কেউ জোরে হাসলে বা উঁচুগলায় কথা বললে অন্যেরা ভর্ৎসনার চোখে তাকায়। প্রচুর ঠাকুর-দেবতার ছবি! প্রায় প্রতিমাসে নাকি ওদের বাড়িতে ভজন, নামগান এসব হত।
‘প্রথমে ভেবেছিলাম, অ্যাগনেস পালিয়ে গিয়েছে। শুরুতে ওকে হিংসেও করেছি তাই। ও সফলভাবে পালাতে পারল। আমি তো আটকে গেলাম!'
‘কিন্তু, এখন ভাবেন না?”
‘পালিয়ে গেছে? এতদিনে একটা খবর তাহলে দিত না? সমস্ত শিকড় উপড়ে এভাবে চলে যাওয়া সম্ভব?'
‘সেটাই যদি উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে সম্ভব।'
‘জানি না। হতেও পারে। লোকে তো দেখেছিল ওকে রেললাইন ধরে হেঁটে যেতে, নীল চুড়িদার পরে ছিল—ওর শখের চুড়িদার ছিল ওটা, কাঁথা স্টিচের আর সানগ্লাস। তারপর থেকে ওকে আর কেউ দেখেনি। আমি আর বাবা ছিলাম না শহরে। খবর পেয়ে পরদিন এলাম। আমাদের বাড়িতে পুলিশ এসেছিল তারপর, স্থানীয় লোকেরাও। কী হচ্ছে, মা কিছুই বুঝছিল না। হাঁ করে তাকিয়ে আছে। বিড়বিড় করে অ্যাগনেসের নাম বলে যাচ্ছে। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু পায়নি। আমি ছোটো ছিলাম, আমাকেও জিজ্ঞাসা করেছিল। আমি কয়েক জনের নাম বলেছিলাম যারা ওর বন্ধু ছিল। পুলিশ মাথা ঘামায়নি। অ্যাগনেস পালিয়ে গিয়েছিল ধরে নিয়েছে। বাবাও সম্ভবত সেটাই ভেবেছিল। তার পর থেকে আমি আরও বেশি করে বাড়ির ভেতর ঢুকে যাচ্ছিলাম। অ্যাগনেস চলে যাবার পর মায়ের ঘন ঘন অ্যাটাক হতে শুরু করল। ঘরের ভেতরেই থাকত প্রায় সারাটা সময়। আমাকে অ্যাগনেস বলে ডাকত। বাবা চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। তবে, মাঝে মাঝে অ্যাগনেসের ছবির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি। যতই উদাসীন হোক না কেন, অ্যাগনেসের প্রতি তাদের ভালোবাসা বলুন বা মনোযোগ, যেটুকু থাকার সেটা অ্যাগনেসের প্রতিই ছিল। আমি ছিলাম এক্সট্রা।” আমাদের দিকে ফিরছিল না ডলোরেস, মাঠের থেকে ছুটে আসা খোলা হাওয়া মুখে মাখছিল। ডলোরেস আর লালুরাম দাঁড়িয়ে ছিল পাশাপাশি, মনে হচ্ছিল অন্ধকার দিয়ে খোদাই করা দুটো মূর্তি। ‘মায়ের এখন বিরাশি বছর বয়েস। শারীরিকভাবে সুস্থ, কিন্তু বাকিটুকু একই আছে। আমি, আমার তো রিগ্রেট আছেই। নেই বললে মিথ্যে বলা হবে। কিন্তু, সেসব নিয়ে বাঁচতে পারি। এখন এই ভাবনাগুলো আমাকে আনসেটল করে না। আগে করত।’
তনয়া ব্যান্ডেজ পরা পা সোফায় ছড়িয়ে মাথা নীচু করে বসে ছিল। ঘেঁটে গেছে মেয়েটা এসব শুনে, বেশ বুঝছি। আমার কী আসে-যায়! বাবা মেঘ মাথায় নিয়ে ঝুলছিল, খোলা চোখ তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। ডলোরেসকে চাঁছাছোলা গলায় প্রশ্ন করলাম, ‘এডওয়ার্ডের সঙ্গে অ্যাগনেসের আলাপ ছিল? মানে, ওর এত ছেলেবন্ধু বললি, এডওয়ার্ড কি তাদের মধ্যে ছিল? জানিস কিছু?'
‘ঠিক জানি না।’ কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে উত্তর দিল ডলোরেস। ‘অ্যাগনেসের থেকে তো বড়ো ছিল অনেকটা। এডওয়ার্ডেরও তো অনেকদিন আগে থেকেই বান্ধবী ছিল। রেভারেন্ডের মেয়ে। যাকে বিয়ে করেছে। নামটা ভুলে গেছি। কিন্তু, আমাদের বাড়িতে একবার এডওয়ার্ড এসেছে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে।'
‘আচ্ছা, অ্যাগনেসকে মেডুসা বলে ডাকত কেউ?' তনয়ার এই প্রশ্নে ডলোরেস চমকাল।
‘ডাকত তো! তুমি কী করে জানলে? অ্যাগনেস নিজেকে মেডুসা বলত শেষের দিকে। তুমি বলায় মনে পড়ল এতদিন বাদে। আমাকে বলেছিল, “আমি মেডুসা হয়ে যাচ্ছি।” ডায়েরিতেও নিজেকে এই নাম দিয়েছে –
‘ডায়েরি লিখত?’
‘হ্যাঁ। সেসব আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। মাঝে মাঝে পড়তাম। মাথামুন্ডু নেই, এলোমেলো, আবোল-তাবোল লেখা । ’
‘আমাকে দেবেন? আমি পড়েই ফেরত দেব, বা, ফটোকপি করে নেব।'
‘নিয়ো। বাড়িতে আসবে যেদিন। কিন্তু, মেডুসার কথাটা তুমি জানলে কী করে?' ‘শহরের একজন পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছিল।’
‘অ্যাগনেসের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রেমে পাথর হয়ে যেত যুবকের দল, এরকমটা ও ভাবত হয়তো। অন্যেরাও ওর এই ভাবনা ভাঙায়নি। কিন্তু, ওদের কাছে আমি ছিলাম অদৃশ্য।' হাসল ডলোরেস। তারপর ফিরে এল ঘরের ভেতর। তনয়ার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে থাকল। আচমকা তার হাত ধরে বলল, “তুমি সত্যিই পারবে? কেউ তো পারল না! অ্যাগনেসের সত্যিটা বার করতে পারবে তুমি? অনেক সময় কেটে গেছে।' গলা ধরে এল ডলোরেসের।
অন্ধকারে সাপ বেরোয়। ঢুকে দেখি, এডওয়ার্ডের গিটার ঝুলমাখা হয়ে এককোনায় পড়ে আছে। তার ছিঁড়ে ঝুলছে। ওর খোলে সাপ গুটিয়ে শুয়ে থাকতেই পারে। কিন্তু তাতে কী! দরজা বন্ধ করে, দড়িদড়া আর প্যাকিং বাক্সগুলো সরিয়ে গুটিশুটি মেরে বসব। মাথা গুঁজে দেব হাঁটুতে, বরাবর যেমন দিই। তখন কেউ আমাকে খুঁজে পাবে না। হিল্ডা কি খুঁজতে পারে, আমাকে? কিন্তু এখন ওকে অনেকটা রাস্তা পাড়ি দিতে হবে, আমার গুদামঘরে ঢুকতে গেলে, কারণ এখন ও অযুত মাইল দূরত্বে—অযুত মাইল, অথবা, আস্ত একটা জীবন। আমি যে ওকে গত কয়েক দিনে দেখেছি, মাঠের ধারে, জঙ্গলের আবছায়ায় আর জোহার হালের ঝরনার নীচে, কেউ বিশ্বাস করে না।
কয়েকটা মুহূর্ত, আমার তখন মনে হয়েছিল অনন্ত সময় থেকে কেটে আনা সেই কয়েক টুকরো স্থির থাকবে আজীবন। আমরা কেউ নিশ্বাস ফেলিনি। ডলোরেসের চোখ আর্দ্র, তারপর সজল, আর সেখান থেকে সাবুর দানার মতো সাদা অশ্রু কোলভাগ বেয়ে গড়িয়ে নামছিল। সাবধানে ডলোরেসের হাত নিজের মুঠিতে নিল তনয়া, ফিসফিস করল, “আমি চেষ্টা করব।’

আমার হাত ও আমার পা দেখ, এ আমি স্বয়ং ; আমাকে স্পর্শ কর, আর দেখ ; কারণ আমার যেমন দেখিতেছ, আত্মার এরূপ অস্থি-মাংস নাই।
- Luke 24:39
পরের দু-দিন তনয়া এখানে-ওখানে ঘুরল। ফিরত যখন, পরিশ্রান্ত লাগত ওকে। রুক্ষ চুল হাওয়াতে উড়ত, চোখে ক্লান্তি নামত ওর। টেটভ্যাক নিয়ে একদিন জ্বর এসেছিল, তার মধ্যেই ক্যালপল খেয়ে বেরিয়ে যেত। অ্যারন থাকত ওর সঙ্গে। অ্যারনের মুখে নির্বিকার নৈরাশ্য বাদে অন্য কিছু দেখিনি। অ্যারন পরে আমাকে জানিয়েছিল, ওরা টাউনে ঘুরত। জিজ্ঞাসা করত অ্যাগনেস সম্পর্কে, ক্রিস সম্পর্কে। যত লোককথা ছিল, প্রবাদ বলো, তাদের ওরা শুনত। অ্যারন আমাকে বলেছিল, গতকাল ওরা সমর দুসাদের সঙ্গে দেখা করেছে। ক্রিস হারিয়ে যাবার সময়ে আমাদের বাড়ির দারোয়ান ছিল, পুলিশ তুলেছিল ওকে। আমরা চাকরিতে রাখিনি। অনেক বয়েস হয়েছে ওর। অবিনাশের সঙ্গে মদ খায় শুঁড়িখানায় বসে, যেখানে ও কাজ করে। অবিনাশই তনয়াদের নিয়ে গিয়েছিল নাকি। অ্যারন তাকিয়েছিল আমার দিকে। ওর চোখে করুণা নয়, একপ্রকার বিষাদ, যেন অনেক ভুল হয়ে গেছে আমাদের সবার। তনয়া সেই দিনটায় আমার সামনে এসে বসেছিল। সেই শেষ, যেদিন ও পাকাপাকি বিদায় নিয়েছিল। সেই যে চলে গেল, তনয়া তার পরে আর কখনো ফেরেনি।
‘জেনিফারকে কখনো তোমার সন্দেহ হয়নি, না?' তনয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। তখন শেষদুপুর। হেমন্তের মেঘ আমাদের বাগানে ঘনিয়ে এসেছিল। ও বলেছিল যে, সমর দুসাদের কাছ থেকে জেনিফারের ব্যাপারে জেনেছে। কিন্তু এখানে যত গুজব ঘোরে, তার সব কিছুকে পাত্তা দিতে নেই। সমর ব্লাডি বুড়ো, আমার মতো মাতাল, ওর কথা ধরতে আছে? তনয়া মাথা নাড়ল, ‘জেনিফার অকাল্টচর্চা করেন। ভূত নামানো শুধু না, অন্যান্য ব্ল্যাক ম্যাজিকও। অকাল্ট চর্চার জন্য অনেক সময়েই সুলক্ষণযুক্ত শিশুর দরকার—' তনয়া বাক্য শেষ করার আগে আমি ওর মুখে হাত চাপা দিলাম। অ্যারন চোখ বুজে বারান্দায় বসে ছিল, সেই অবস্থায় আমাকে বলল, তনয়াকে যেন কথা শেষ করতে দিই। কিন্তু, আমি কী করে বোঝাব যে, কাল রাতে আমি দেখেছি—
‘ক্রিস মরেনি।' ফিসফিস করলাম। ‘তোরা অশুভ। তোরা সবাই।' এমন তো না যে, জেনিফারকে আমি এত ভালোবাসি যে, সন্দেহ করতে পারব না! কিন্তু, ক্রিসের শেষ পরিণাম আমি মানি না। তাই হেলেদুলে বাগানের আমগাছের গোড়ায় চলে গেলাম। খুরপি দিয়ে খুঁচিয়ে মাটি তুলতে হবে, পাতায় অনেক শীতের পোকা, সেগুলোতে স্প্রে করতে হবে। আমি জোরে জোরে খুরপি দিয়ে মাটি চালাচ্ছিলাম। পেছনে তনয়া এসে দাঁড়াল, নীরবে প্ৰশ্ন করছে, আমি কি সত্যিটা জানতে চাই না? ‘ক্রিস বেঁচে আছে। তোমরা বুঝবে না।' ওর দিকে নয়, কারোর দিকে তাকাবার প্রয়োজন পড়ে না আমার। বলতে পারতাম, ‘কাল রাত্রে ওকে দেখেছি, অনেকদিন পর, কিন্তু চিনতে ভুল হয়নি।' তবু বলব না, কারণ এরা বুঝবে না কিচ্ছু। তনয়ার দিকে আমি তাকাব না, কথা বলব না ওর সঙ্গে। ওর জন্য গতকাল রাত্রে আমার—কিটি গোমস আর অবিনাশ আর বাকি সবাই, আমাকে ঘেন্না করে, আমাদের, শুধুমাত্র ওর জন্য। ও ব্লাডি অশুভ, তাই আমি মাটি খুঁচিয়েই যাব।
ধড়াম শব্দে চমকে আমার হাত থেকে খুরপি পড়ে গেল। প্রচণ্ড স্পিডে এসে এডওয়ার্ডের গাড়ি ধাক্কা মেরেছে গেটে। আমরা তিনজন স্থাণু হয়ে থাকলাম যেটুকু মুহূর্ত, তার মধ্যে এডওয়ার্ড ছিটকে বেরোল। হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামাল মনীষাকে। গর্জন করল ‘বার্বি!’ মনীষা হাঁফাচ্ছিল আর টলছিল অল্প। ও কি নেশা করেছে? ভেজা মাটির গন্ধ বাতাসে। বিকেলের কিনারায় ঝোড়ো হাওয়া দিচ্ছে। গাছের পাতায় সিসে রং।
‘আগের দিন রাত্রে ক্রিসকে আপনি দেখেছিলেন?' অক্ষয় অবাক হল। ‘এর আগে কোথাও বলেননি তো!
‘বলিনি, কারণ পরের দিনেই তো অত কিছু ঘটল, আর আমরা সবাই এতটাই তছনছ হয়ে গেলাম যে, অন্য সব কথা ভুলে গেলাম।' বেশ রাত হয়েছে। গাছপালার গা ঘেঁষে মিটমিটে জোনাকি। বুড়ো লালুরাম আমার পায়ে মুখ গুঁজে শুয়ে ছিল। আজকাল অ্যারনের পাশে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে সূর্যাস্ত দেখা ওর প্রিয় অবসর। ‘জানো, সমর দুসাদের সঙ্গে তনয়াদের মোলাকাতের পর অ্যারন আমাকে বলেছিল যে, আমরা নাকি সমরকে খুন করেছি। আমরা এবং আমি। আচ্ছা, তুমি মদ খাবে? মদ না খেলে চা, কফি? না থাক, তার থেকে বরং ডিনার করে যাও। '
‘আমি কলকাতা যাচ্ছি। সমরের সঙ্গে কথাবার্তা তনয়া ভট্টাচার্যর মুখ থেকে শুনব। আপনি আগে বলুন, আগের রাত্রে কী দেখেছিলেন। এটা হয়তো আমাদের কেসের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, কিন্তু তবুও জানতে চাই কারণ একটা টোটালিটি পাব।'
ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে ঢেকে যাওয়া মাঠ ও জলাভূমি দেখতে দেখতে মনে হল, হাওয়া বার করে দেওয়া হয়েছে পৃথিবী থেকে, গোপন নীরবতা আমাদের মুড়ে ফেলেছে। বিশ্রী গরম লাগছিল, কুকুর খেপানো গরম, যেখানে গাছেদের মনে হয় কার্ডবোর্ড পিস। ‘তোমাকে যদি সব বলি, তুমি খুঁজে আনবে তো? আমি কিন্তু জানি, ক্রিস এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে।' ‘আপনি ভাইয়ের হত্যা নিয়ে বিচলিত নন?
উত্তর দিতে অনেকটা সময় নিলাম। এত স্থির ছিলাম যে, লালুরাম অবধি জ্বলজ্বলে চোখ ফেরাল, বেঁচে আছি কি না পরখ করতে। বড়ো নিশ্বাস নিয়ে বললাম, ‘আমি জানি, অবিনাশ এডওয়ার্ডকে খুন করেনি।
হিল্ডা ম্যাকিনলে বেথেল মিশনে প্রার্থনা করে গিয়েছিল। ক্রিসমাসের আগের রাত সেটা। হিল্ডা আমার বন্ধু হয়েছিল, যখন স্কুলের নির্জন বারান্দা অথবা জ্যোৎস্না-ওথলানো প্রান্তর বেয়ে আমরা হাঁটছি। হিল্ডা ম্যাকিনলে, যার স্মৃতি এখন অবহেলার ধূসর কোলাজে একটা টুকরো, হিল্ডা— সিলিং ফ্যান থেকে, কোনো এক ডিসেম্বরে—ক্রিসমাসের পরদিন— আর কিটি গোমসের চায়ের দোকানে সন্ধেবেলা হিল্ডার মতো দেখতে একটা মেয়ে, হিল্ডাকে তার পরেও আমি দেখতে পেতাম, কিন্তু কেউ বিশ্বাস করেনি, সেদিন আবার তখন বাকি মুখেদের ভিড় আমার দিকে নীরবে তাকিয়ে, দল বেঁধে এগিয়ে আসছে, লোডশেডিং-এর রাত, মোমবাতির কাঁপা আলোয় জমাট হিম, ক্লান্ত মুখ, ক্রুদ্ধ মুখ, সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মুখ, নিথর তাকিয়ে আমার দিকে, একমাত্র হিল্ডা তাকিয়ে ছিল না। সে দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে। ‘কী হলটা কী! আমি খুনি নাকি?'
কিন্তু কেউ উত্তর দিল না, যেহেতু আমি চায়ের দোকানে ঢোকার পরেই সব আলোচনা বন্ধ হয়েছিল, মুখগুলো ঘুরে গিয়েছিল আমার দিকে, সেই একবার, তিরিশ বছর না তারও বেশি আগে, বাসুদেব মুন্ডার শুঁড়িখানা— সেবার অবিনাশ আমাকে তুলে এনেছিল, কিন্তু আজ ও কি বৃদ্ধ হয়ে গেছে?
‘বাড়ি যাও বারবারা।’ কিটি গোমস বলল।
‘কেন? পয়সা দিয়েছি বিস্কুট কিনব, না কি?' হিন্ডা কেন সিলিং ফ্যান থেকে— আমাদের কাউকে বলেনি।
‘এই নাও বিস্কুট। বাড়ি যাও। কিটির গলা শুকনো কাঠ। ওর মুখে ওঠাপড়া ছিল না। একটা রেখাও কোঁচকায়নি ওর। নিরাবেগ স্বরে বলল, ‘কেউ কিছু বলছে না, ভাবছে না । '
বাজে কথা! যেভাবে সব্বাই তাকিয়ে, ওদের ভঙ্গি আমি চিনি। আমাদের বাড়ির দেওয়ালে ওরা ‘খুনি’ লিখে আসত। আজ আবার বহুদিন পরে সেরকম লাগছে আমার। কিন্তু, এবার তো কেউ হারিয়ে যায়নি! ‘আরে, সব্বাই পাগল হয়ে গেছে মনে হয়।' কিটি মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিছু হয়নি এমন ভাব করে অন্যেরা কেউ কেউ ঘাড় ফেরাল, অস্বস্তিতে চোখ নামাল কেউ। কতদিনের চেনা এরা! এখন ভাব করছে এমন, যেন আমার উপস্থিতিটাকেই অগ্রাহ্য করছে। আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। এলোমেলো হাত ঝাঁকিয়ে চেঁচালাম, ‘ব্লাডি বাস্টার্ডস!’
‘কেন অশান্তি করছ বলো তো? মদ খাবে আর এখানে এসে ঝামেলা পাকাবে।
‘কবে পাকালাম? মিথ্যুক! তুমি দেখছ না সকলে কেমন—আমি পাগল, না, অপরাধী!” বিস্কুটের প্যাকেট ছুড়ে ফেললাম। যাক সব চুলোয়। কিটি আমার পিঠে হাত রাখল, ‘এসো।’ বাইরে এসে আমি আকাশের দিকে হাঁ-মুখ করে শ্বাস নিলে— হয়তো আমিই ভুল বুঝেছি, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি জানি কিছু একটা ঘটেছে। ‘কী হয়েছে কিটি? এরকম করছে কেন ওরা?'
‘অ্যাগনেসকে তোমরা খুন করেছ, সবাই বলাবলি করছে। ওর ছবি নাকি খুঁজে পাওয়া গেছে। পুলিশ আসছে ওর লাশ খুঁজতে। ওইজন্যেই ওই মেয়েটা যে তোমাদের বাড়ি থাকে সে খোঁজাখুঁজি চালাচ্ছে- "
‘শাট আপ! শাট আপ! মাথা গেছে তোমাদের।'
‘বাড়ি যাও, বারবারা। কানাকানি চলছে, সময় ভালো নয়। তারপর তোমাদের পরিবার – "
‘কী? আমাদের পরিবার কী?”
‘এডওয়ার্ডের বাচ্চাটাকে নিয়ে অনেক গুজব আছেই। তোমার বাবার ওরকম—এখন অ্যাগনেস— তুমি বাড়ি যাও। রাস্তাঘাটে মদ খেয়ে ঝগড়া কোরো না । '
‘অ্যাগনেসের ছবি, কিটি? আমি নিজেই জানতাম না আমাদের বাড়িতে অ্যাগনেসের ছবিটা আছে। এডওয়ার্ডও জানত না। দু-দিন বাদেই ও বাড়ি ভাঙা হবে। মাটি খোঁড়াখুঁড়ি হবে। তখন কি তোমরা ভাবো অ্যাগনেসের লাশ বেরোবে?'
‘অনেকে ভাবছে।’ কিটির ভাঙাচোরা নির্লিপ্ত মুখে অসময়ের ঘাম জমেছে। শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছে বলল, “আমার দোকানে নানা কিসিমের লোক আসে, দেহাতিরা বেশি তুমি জানো। একবার এদের মধ্যে গুজব রটলে সেবিশ্বাস ভাঙা কঠিন।'
‘আর তুমি? তুমিও বিশ্বাস করো? আমাদের যে কয়েক ঘর আছে—
‘কী এসে যায়!’ কিটি ফিকে হাসল, ‘আমি তোমাদের সমাজ থেকে অনেকদিন ব্রাত্য তো! যেদিন থেকে ভীম যাদবকে বিয়ে করেছি সেদিন থেকে—তুমি ও তো কথা বলতে না, দোকানের সামনে দিয়ে নাক উঁচিয়ে তোমরা হেঁটে যেতে। আমি বহুদিন হল দেহাতি হয়ে গেছি।'
‘এখন এসব কথা তুলে তুমি সিম্প্যাথি নেবে ভাবছ, কিটি? আমাদের বাড়ির কী হবে?’
কিটির চোখ কঠিন হল। আমরা কথা বলছিলাম দোকানের বাইরে রাস্তার ধারে। চোখে পড়ল অনেক মুখ আমার দিকে তাকিয়ে। ওরা রাগছে না, গালাগালি দিচ্ছে না, এমনকী দুঃখও পাচ্ছে না, শুধু অপেক্ষা করছে কবে আমাদের বাড়ি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে। ‘বললাম তো, যাও এখন। লোকে কী ভাবল, তা দিয়ে কবে তোমাদের কিছু এসে গেছে?”
‘তোমাদের ভাবনায় আমি ব্লাডি হিসি করি।'
‘বাড়ি যাও, বারবারা।'
‘অ্যাগনেস মরেছে, বেশ হয়েছে। আমাদের ওই যে গুদামঘরটা দেখেছ, ওটার নীচে ওর লাশ পোঁতা। আমিই মেরেছিলাম, ঘাড় মটকে দিয়েছিলাম। পুলিশ সব জানে, কিন্তু কিচ্ছু করবে না, বুঝলে?”
‘বাড়ি যাও, বারবারা। এভাবে চেঁচিয়ো না।'
‘শুনলে কী হবে? কে কী করবে আমার? অ্যাগনেস এতদিনে কঙ্কাল থেকে ধুলো হয়ে গেছে।'
‘বাড়ি যাও, বারবারা।'
‘হিল্ডা দাঁড়িয়েছিল ওখানে। ও সত্যিটা জানে। তাই তোমাদের চোখে চোখ রাখতে ঘেন্না পাচ্ছিল।'
‘বাড়ি যাও, বারবারা।'
‘তোমরা কী ভাবো? কিচ্ছু ফুরোয় না। হিল্ডা জানে—হিল্ডা–সিলিং ফ্যান থেকে— হিল্ডা– আস্তে, ঘাড়ে লাগছে, অত জোরে টেনো না, ব্লাডি মেয়েছেলে, তোর চায়ের দোকানে আমি থুতু ফেলি, হিল্ডা থুতু ফেলে—
কিটি গোমসের দোকান থেকে বেরিয়ে আমি এখানে-ওখানে ঘুরলাম। আমার মনে পড়ল, টাকা দিয়ে বিস্কুটের প্যাকেট ফেলে এসেছি। কিন্তু ফিরব না, ওরা যেভাবে- এদের সবাইকে আমি বুঝে নেব একদিন। আর ওই যে তনয়া, ব্লাডি টিকটিকি, ওর জন্য আজ এমন হল, কারণ ও ক্রিসকে ফেলে অ্যাগনেস নামের কঙ্কালকে আবার মাটি খুঁড়ে বার করছে। এই নির্বুদ্ধিতার দাম ও দেবে না, দেব আমি। এখন হাতের কাছে পেলে ওকে চড়থাপ্পড় মেরে দিতে পারি।
‘তোমাদের জন্য—শুধু তোমাদের— তার বদলে তুমি কী পেলে? বাগানের ধার ঘেঁষে চোরের মতো মনীষাকে দেখে যাও। তুমি জানো, সত্যিটা কি? বলব?' বিকৃত গলায় হিসহিসে হাসলে অবিনাশ চোখ বন্ধ করল। ওর কষ্ট হলে হোক, আমার কী?
আধো হিম রাস্তাঘাট, বন, প্রান্তরে ঘুরতে ঘুরতে আমার মাথায় অ্যাগনেসের ছবিটা আবার ফিরে এল। গাছের ডালে বসা, আর কেউ একজন হাত বাড়িয়েছে। একটা সোয়েটার পরা হাত, হাতায় ময়ূরের নকশা। এই ডিজাইনটা আমি দেখেছি কোথাও? এত চেনা লাগছে কেন? অ্যাগনেসের বাবা কি এমন সোয়েটার পরত? সে যা হোক, আমরা ওকে খুন করেছি, ঠিক যেভাবে ক্রিসকে মেরেছিলাম। হয়তো আমিই, ক্রিসকে জলাভূমিতে চুবিয়ে দিয়েছি বলে এখন আমার অপরাধী মন ক্রিসকে ওখানে দেখায়, তাই না? এই সমাধানে সবাই তৃপ্তি পাবে। আর, ওই যে টিকটিকি ছুঁড়িটা বোদ্ধা মুখ করে আবোলতাবোল প্রশ্ন করে যাচ্ছে, ও হয়তো জম্পেশ একটা ক্রাইম স্টোরি পেয়ে যাবে ওর ম্যাগাজিনের জন্য। এবার গাছের ডাল থেকে ঝুলবে অন্য কেউ, হয়তো এডওয়ার্ড অথবা অ্যারন— আমাদের নিয়তি— কারণ আমাদের পরিবার অভিশপ্ত, আমিও অভিশপ্ত— এডওয়ার্ড, বাবা প্রচণ্ড মারত এডওয়ার্ডকে, চাবুক হাতে ওকে তাড়া করত বাগানের গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে। হাউহাউ কান্নায় ভেঙে পড়েও প্রাণপণে পা ঘষটে এগোতে চাইত। এডওয়ার্ড।
‘বাবা জানত, মা জানত, আমি জানতাম। বুঝলে? আমরা সবাই জানতাম। তোমার দিকে তাকিয়ে আমরা হেসেছি নিজেদের মধ্যে। মনীষাও জানত আমরা জানতাম যে, তবু ও পুলিশকে জানায়নি। বোকা বানিয়েছে তোমাকে।' অবিনাশ কাঁপছিল থরথর করে। ওর চোখ কুঁচকে যাচ্ছিল, সেখানে রক্তের ছিটে জমা হয়েছে। এই চেয়ারটায় বসে থাকা ওর বরাবরের প্রিয় বিলাস আমি জানি। আজ বিলাসখানি টোড়ি বাজছে, কিন্তু কে শুনবে ওসব? পাত্তা দেবার দরকার পড়ে না। আমাকে বসতে বলেছিল, বসিনি। মদ খেতে বলেছিল, খাইনি। ও সেদিন গল্পটা না-বললে এত কিছু হত না। কিন্তু, ওকে তো আমিই বলেছিলাম তনয়াকে যেন জানায়। জলাভূমির ধারে আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে, আমার কান্না শুনতে শুনতে ও ক্ষয়ে গিয়েছিল কি? আমার কাউকে দরকার নেই। তনয়াকে তাড়াব, অ্যারনকে তাড়াব, অবিনাশকে জানাতে হবে ও আসলে কী ছিল, এতগুলো বছর ধরে কী ভূমিকা পালন করে গিয়েছে। বাগানের ধার ঘেঁষে চোরের মতো। আমাদের বাড়ির সামনের কাঁঠালগাছ থেকে ঝোলানো ওই পুতুল দুটো, কাপড়ের ওপর কালো চোখ-নাক-মুখ আঁকা, জল্লাদের মতো পাহারা দিয়ে যাচ্ছে আজীবন যারা আমাদের, কারা ওদের টাঙিয়ে গিয়েছিল? বাবা কি ওদের দেখতে পেত? কিন্তু, পুতুল দুটো দেখে আমার বাবা, মায়ের কথাই মনে পড়েছে বরাবর। আছে হাওয়া, আছে রোদ, আছে মর্মর পৃথিবী, আর আমাদের করুণা আছে— বাবা বলেছিল। অ্যাগনেসের ভূত দেখে জ্ঞান হারাবার পর যখন চেতনা ফিরেছিল বাবার, তখন জলাভূমির ওপারে স্থির দাঁড়ানো অ্যাগনেসের সাদা গাউন, ওর লাল চুলে আগুন ঝলসে যাচ্ছিল। বাবার চোখ বেয়ে সেই প্রথম অশ্রু গড়াতে দেখেছিলাম আমি । তারপর থেকে ওরা পুতুল হয়ে গাছ থেকে ঝুলছে। যেমন ঝুলছিল বাবা, হিল্ডা ঝুলছিল সিলিং ফ্যান থেকে। এই প্রথম অবিনাশ কথা বলল জড়িত স্বরে।
‘আমার অনেক বয়েস বেড়েছে। এগুলো শুনে কী করব, বারবারা? যে যেভাবে সুখী থাকে থাকুক।'
‘কিন্তু এখন বুঝেছ তো, কেন ক্রিসকে খুঁজে পাওনি? লোকে তোমাকে বুদ্ধু গোয়েন্দা ভেবেছিল। কারণ, মনীষা সব জেনেও তোমাকে বাঁদর নাচিয়েছে।' মুখ দিয়ে হুস করে আমি ধোঁয়া ছাড়ার ভঙ্গি করলাম।
‘বাড়ি যাও।’
আমার মা ক্রিসকে লোপাট করেছে। আমার বাবা মানুষ খুন করেছে। আর, আমি অ্যাগনেসকে। অ্যারন আমাদেরই রক্ত যেহেতু তাকেও কিছু-না-কিছু খুন করতে হবে। এই দেখো না কেমন হাতের তালুতে বিঁধিয়ে দিয়েছি কুলগাছের কাঁটা, তবু আমার কিছুই মনে হচ্ছে না, ব্যথাও লাগছে না। বাবা শেষমেষ কাউকে না-পেয়ে নিজেকেই খুন করেছিল। এসবের সন্ধান পুলিশ পাবে না, আর তনয়া তো সেদিনকার মেয়ে! আমাকে কনফেস করতে হবে কারণ মানুষের বিশ্বাস, ঘেন্না, সন্দেহ আর বাকি যা কিছু সেগুলোই সত্যি। তাদের পিঠে করে বইতে গিয়ে স্থায়ী ক্ষত বানিয়ে ফেলেছি আমরা। ‘যাব না। তোমাকে আজ জানতে হবে, মনীষা আর আর্চির পাশাপাশি বসে থাকার ভেতরের রহস্যটুকু। কী নিরীহ ছবিটা। না? যদি না পেছনে এডওয়ার্ড দাঁড়িয়ে থাকত, তাহলে অনায়াসে ভাইবোনের ছবি— তুমি যদি জানতে অবিনাশ, ওহ্, এতদিনেও কেউ বলেনি তোমাকে—'
‘জেনিফারের কথায় বিশ্বাস করার কারণ নেই।' নিজেকে শোনাল। আমি হেসে উঠলাম। কারণ না-থাকলে নিজের কাছে বলতে হয় না। দেহাতি মানেই বোকা। শুধু বোকা না, কুত্তার বাচা। যেমন অ্যাংলো মানেই কুত্তার বাচ্চা। বাঙালি মানেই কুত্তার বাচ্চা। গুজরাতি মানেই, মারাঠি মানেই— ‘আমি জানতে চাই না! জ্বালিয়ো না আমাকে।'
আদিম হাওয়ার ফিসফিসের মতো টাউন আমার কানে বলে গেল, বিশ্বাসঘাতক, খুনি, প্রবঞ্চক আর অনেক শব্দ। মেঠোরাস্তার চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, পূর্বের পাহাড়ের গায়ে ফুটে থাকা বাজরা এবং ডেগাডেগি নদীর হাতছানি পেরিয়ে, কুন্তী ফলসের অবিশ্রাম মর্মর পেরিয়ে আমি হেঁটে গেলাম। এই ইতিহাস ভূগোল, জালিম ও প্রপঞ্চনাময় — ধূসর আগাছায় ঢাকা কটেজের ভাঙা শার্সির ভেতর থেকে লাফ দিয়ে একটা বেড়াল বেরিয়ে এল। জ্বলজ্বলে সবুজ চোখে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। রাগী চোখ। একটা ঢিল কুড়িয়ে ছুড়লাম ‘যাহ্, পালা ৷ হারামজাদি, নাহলে কুচ করে কেটে খেয়ে ফেলব।' ভয়ের নামগন্ধ নেই। তখন চোখে পড়ল, কটেজটার সামনের বাগানে লতাপাতায় ভরতি একটা কুয়ো, তার ওপর পায়ে পা তুলে বসে অ্যালিস। সাদা ড্রেস, মাথায় ডালপালার মুকুট, সামনের ভাঙা দাঁতও অবিকল। চিবুকে হাত দিয়ে, আমাকে দেখছে না। গভীর ভাবনায় মগ্ন। বেড়ালটা তার পায়ের কাছে। অ্যালিসকে
এভাবে দেখতে আমি অভ্যস্ত। কিন্তু, আজ ও আমাকে জেনিফারের কথা মনে পড়াল। জেনিফার, যে সব জানে। জানে ক্রিসের ক্ষতি আমরা করেছি, হয়তো অ্যাগনেসের ক্ষতিও I জানে মনীষা এবং আর্চির গোপন অন্ধকার। জেনিফার সবাইকে বলে বেড়িয়েছে। সবাই জানে সব, জানে না একমাত্র অবিনাশ! বোকা অবিনাশ, অপদার্থ। আমাকে অবিনাশের বাড়ি যেতে হবে। বলতে হবে ওকে, সব জানাতে হবে। আর কতদিন ইডিয়টের ভূমিকা পালন করবে ও?
অবিনাশের বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্যাংচুয়ারি ফিরে এলাম। তনয়া ফেরেনি। নাফিরুক, আজ আমার থেকে দূরে থাকলে ভালো করবে। অবিনাশের মুখ বিধ্বস্ত, যেন এখনই কেঁদে ফেলবে, কিন্তু সেগুলো ভাবার দরকার পড়ে না। আমি জানি, কাল ও আবার এসে আমার পাশে বসে মদ খাবে। রাত হলে জলাভূমির দিকে তাকিয়ে কাঁদব আমি। বরাবর হয়ে এসেছে। ওকে গালমন্দ করেছি মাথা গরম হলে, তাতে কার কী!
পোড়োমাঠ পাতলা কুয়াশায় চুবে আছে, তাকে ভেদ করে ওপাশের অরণ্য দেখলে মনে হবে, কুয়াশার চাদরে টোকা দিলে কেঁপে উঠবে। একটা-দুটো গাছের অবয়ব তার ভেতর থেকে মাথা তুলেছে। তাদের গা থেকে টপটপ করে চুঁইয়ে নামছে কুয়াশা। আজ বরফ মেশাব না। উফ, জ্বলছে! চারপাশে আলো নেই কোথাও, কিন্তু অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিতে গিয়ে দেখলাম, টুকরো মেঘের ওপর থেকে লাফিয়ে উঠল চাঁদ। পোকায় কামড়ানো, রক্তাক্ত। হিম প্রান্তরে ভাঙা আলো ছড়িয়ে গেল। তখন আমার চোখে পড়ল, দূরের জঙ্গলে কিছু একটা নড়ছে। শেয়াল ভেবে এগিয়ে গেলাম দুই পা। তখন আমি ক্রিসকে দেখলাম।
ভালো বোঝা যায় না, আবছা। কিন্তু, এই অবয়ব আমার চেনা। এভাবেই স্থির দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। সে কতদিন হয়ে গেল! গত প্রায় দশ বছর আমি ওকে দেখিনি, কিন্তু বিশ্বাস করতাম যে ও আছে, যেকোনোদিন আবার আসবে। আজ অবিকল একরকম ও। কী পরে আছে এখান থেকে বুঝতে পারছি না এই অন্ধকারে। দিনের বেলা যখন দেখতাম, তখন আমার হাতে বোনা একটা জামা পরে থাকত ও। সেই জামাটা পরেই ও হারিয়ে গিয়েছিল, এতগুলো বছর পেরিয়ে নিজের হাতের কাজ আমি বুঝতে পারি। আজ কি ওটাই পরে আছে? ওর ঘাড় আমার দিকে ফেরানো। নাকি আমাকে দেখতে পাচ্ছে না, দেখছে আসলে বাড়িটাকে? আমি ফিসফিস করলাম, ‘আসছি আমি। তুই দাঁড়া ওখানেই।' তারপর আমি ঘাসবনের দিকে এগোলাম।
বেশিদূর যেতে হল না কারণ উঁচু ঘাসে আমার দৃষ্টি রুদ্ধ হয়েছিল। সেগুলোকে সরিয়ে দেখলাম, ক্রিস নেই। এমন আগেও হয়েছে। যতবার যেতে চেয়েছি ওর কাছে, পালিয়ে গেছে ক্রিস। আমি ঘাসবনের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকলাম কতক্ষণ জানি না। আমার গাল ভিজে যাচ্ছিল, হিমের স্পর্শে হতে পারে, কারণ কোনো কষ্ট অনুভব করছিলাম না। কিটি গোমস, হিল্ডা, অবিনাশ, জেনিফার, অ্যালিস, নাহ্। বস্তুত, আমার শূন্য লাগছিল। তাই খাঁ-খাঁ চোখে পাথরের মতো আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর একটা বিশ্রী কালো মেঘ এসে চাঁদকে আবার ঢেকে দিল আর চরাচর ব্যাখ্যাহীন অন্ধকারে ডুবে গেল।

সূর্য্যের নীচে যত কার্য্য করা যায়, তাহার মধ্যে ইহা দুঃখের বিষয় যে, সকলের প্রতি একরূপ ঘটনা হয় ; অধিকন্তু মনুষ্য-সন্তানদের অন্তঃকরণ দুষ্টতায় পরিপূর্ণ, এবং যাবজ্জীবন উন্মাদনা তাহাদের হৃদয়মধ্যে থাকে, পরে তাহারা মৃতদের নিকটে যায়। কারণ কে অব্যাহতি পায়?
- Corinthians | 9:3
পর পর কয়েকটা ছবি আমার সামনে টেবিলের ওপর রাখা। স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম। অক্ষয় মাহাতো আর সোমেন কর্মকার চুপচাপ তাকিয়ে। হয়তো আশা করছেন আমি প্রতিক্রিয়া দেব। কিন্তু আমার আনন্দ, উত্তেজনা অথবা রাগ, কিছুই হচ্ছে না। শুধু মনে হচ্ছে, কেন ছেড়ে চলে এসেছিলাম তিন বছর আগে!
রোদে জ্বলা জোহার হালে। ক্রুশবিদ্ধ মৃতদেহ। তার পায়ের কাছে রাখা একটা সাদা চিরুনি। হাতির দাঁতের কাজ করা।
‘অ্যারন আমাদের বলেছিল আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। এর ব্যাখ্যা একমাত্র আপনিই দিতে পারবেন।' বললেন অক্ষয়।
‘ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। এতক্ষণ ধরে সেই গল্পই বলে গেলাম।'
‘কিন্তু, এখন তো আপনি নিশ্চিত যে, অ্যাগনেসের সঙ্গে এই সমস্ত কিছুর যোগ আছে।’ ‘না-ও থাকতে পারে। চিরুনি তো একা অ্যাগনেসের ছিল না।' অনিশ্চিত গলায় উত্তর দিলাম।
‘কাম অন, মিস ভট্টাচার্য!' এই প্রথম অধৈর্য দেখাল অক্ষয়কে। ‘আপনি জানেন আমি কী বলতে চাইছি। ক্রিস এবং অ্যাগনেস, এবং ব্রাউনদের বাড়ি, কোনো এক সূত্রে গাঁথা হয়ে গেছে। একটা চিরুনি গল্পে ফিরে আসছে বার বার, এর অন্য কী ব্যাখ্যা হতে পারে?' ‘আমি কী বলব বলুন?'
‘কিন্তু এখন কি আপনার মনে হচ্ছে না যে, আপনি মাঝপথে চলে না-এলে এটার সমাধান পাওয়া যেত?'
‘অ্যাগনেস কেন হারিয়ে গেল? ক্রিস কেন হারিয়ে গেল? একটা প্রায় ভূতুড়ে ঘটনার সামনে দাঁড়িয়ে আমি হাল ছেড়ে দেওয়া বাদে কী করতে পারতাম? তবু চেষ্টা তো করেছিলাম, মহেশকে বলে ছুটি বাড়িয়েছিলাম পাঁচদিন। মহেশ প্ৰথমে রাজি হয়নি, ওকে বোঝাতে হয়েছিল, টোপ দিতে হয়েছিল যে একটা ভালো স্টোরি আমি পেয়েছি। আমাকে শর্ত দিয়েছিল ওখান থেকে অফিস করতে হবে, তাতেও রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু যখন দিল্লি ফিরে গেলাম, মহেশ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। নির্মমভাবে হেরে যাবার সমস্ত চিহ্ন আমার সর্বাঙ্গে দগদগ করছিল। আমি ওকে স্টোরি তো দিতে পারিইনি, পরে যখনই ও জিজ্ঞাসা করেছে এই পনেরো দিন কী করেছিলাম, এড়িয়ে গেছি। নিজের ভেতরেও না-ভাবার চেষ্টা করেছি। আপনার মনে হয় এতদিন পরে আমি আবার এটার মধ্যে ঢুকতে চাইব?'
‘আপনাকে ঢুকতে হবে না। আমরা তো তদন্ত চালাচ্ছিই। আমাদের প্রাথমিক সন্দেহ হল, এটা প্রতিশোধ হতে পারে। অতীতের সঙ্গে যোগ আছে এ তো পরিষ্কার। অবশ্য, কেউ ভুলপথে চালিত করার জন্য চিরুনিটা রেখে গেছে সেটা হতে পারে, যেমন আপনি ক্রিসের ক্ষেত্রে ভেবেছিলেন। কিন্তু, তাহলে চিরুনি কেন? এটা দিয়ে তো অ্যাগনেস বাদে অন্য কাউকেই কানেক্ট করা সম্ভব নয়। ঠিক যেমন অ্যাবসার্ড ক্লু হিসেবে আপনি ভেবেছিলেন তিন বছর আগে, ক্রিসের ক্ষেত্রে।’
‘অ্যাবসার্ড নয়।” আমি মাথা নাড়লাম। ‘আমার তদন্ত কিছু একটা খুঁচিয়েছিল, যে কারণে চিরুনি ফিরে এল।
‘কিন্তু, তিন বছর পরে কেন? কেন তখনই নয়?' এবার প্রশ্ন করলেন সোমেন কর্মকার। ‘আমি কৌতূহলী শ্রোতা হিসেবে এই প্রশ্নটা করছি, পুলিশ হয়ে নয়। ধরুন, মিস ভট্টাচার্যর তদন্ত হয়তো তাঁর অজ্ঞাতসারে কোনো সূত্রের সন্ধান দিল, অথবা, কাউকে ভয় পাইয়ে দিল যে, সত্যিটা বেরিয়ে আসবে। সেক্ষেত্রে কেন কেউ তখনই অপরাধটা ঘটাবে না? '
উত্তর কারোর কাছেই ছিল না। বাইরে বৃষ্টি থেমে গুমোট রাত নেমেছে। দমচাপা বাতাস বুকে ধরে আছে কলকাতা।
‘আচ্ছা, চিরুনিটা কি ওভাবেই রাখা ছিল?' কিছুক্ষণ পর আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
‘হ্যাঁ। পুলিশ প্রথমে গ্রাহ্য করেনি। ভেবেছি এডওয়ার্ডের পকেট থেকে পড়েছে। কিন্তু, প্লেস অফ অকারেন্সে অ্যারন আসে। চিরুনিটা দেখার পর অ্যারন ওদের বলে আপনার কথা। পুলিশ গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু, এক মাস কেটে যাবার পরে যখন হালে পানি এল না, ওপরমহল থেকে চাপ এল কারণ এডওয়ার্ড ব্রাউনের কানেকশন ছিল প্রচুর। কেস সিআইডি-র হাতে গেল। আমরা এসে রিপোর্টগুলো পড়তে গিয়ে অ্যারনের স্টেটমেন্ট পাই। লোকাল পুলিশ এতই ক্যালাস যে, ক্যাজুয়ালি লিখে রেখেছিল। অ্যারনকে আমরা যোগাযোগ করি, তারপর তিন বছর আগেকার রেকর্ড ঘেঁটে ঘটনাটা জানতে পারি।’
চিরুনিটার কথা এতদিন শুধু শুনে এসেছি। আজ ছবিতে প্রথম দেখলাম। সাদা রঙের, ডাঁটির মধ্যভাগে একটা গোলাপ ফুলের ডিজাইন। দেখে বোঝা যায়, চিরুনিটা হাতির দাঁতের কাজের। বাঁ-দিকের দুটো মোটা দাঁত অদৃশ্য।
‘স্থানীয় মানুষ বলেছিল, ওরা অভিশপ্ত পরিবার। যখন এডওয়ার্ড ব্রাউনের খুন হবার খবর দৈনিক ভাস্করের ফিডে পেয়েছিলাম, প্রথম ওই কথাটাই মনে হয়েছিল। কিন্তু, তারপর মনে হল, আমি মাথা ঘামাব না। ভুলে থেকেছিলাম আপনারা আসার আগে পর্যন্ত। আচ্ছা, মোডাস অপারেন্ডি কী ছিল?'
‘হাত-পা বেঁধে ঝোলানো হয়েছে, তার কিছুক্ষণ পর গুলি। সম্ভবত মাঝের সময়টায় জেরা করে হয়েছিল বা অত্যাচার। কিন্তু, গুলি বাদে অত্যাচারের বাকি বিশেষ প্রমাণ নেই। কয়েকটা চড়থাপ্পড়, একটা মনে হয় ঘুসি মারা হয়েছিল ঠোঁটের পাশে। তবে, পেটে অনেকটা মদ পাওয়া গিয়েছিল। একটা কথা বলুন আমাকে। অ্যাগনেসের সঙ্গে এডওয়ার্ডের যোগাযোগ ছিল কি? থাকলে কীরকম? আমরা জানি, অ্যাগনেস নিখোঁজ হবার পরে এডওয়ার্ডকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল।'
‘কিন্তু, সেরকম আরও অনেককেই তো করেছিল। তার বাইরে আলাদা করে এডওয়ার্ড—জেনিফার সবার খুঁটিনাটি খবর রাখেন, মানে বুঝতেই পারছেন কী বলতে চাইছি। এডওয়ার্ডের ব্যাপারে কিছু জানাননি। আচ্ছা, আপনারা কি অন্য সম্ভাবনাগুলো সব বাদ দিয়ে ফেলেছেন? যেমন, ব্যাবসায় শত্রুতার কারণে হত্যা, অথবা, নিছক ডাকাতি বা ছিনতাই, আরও যা যা মোটিভ থাকতে পারে?'
‘খুন করে এভাবে টাঙিয়ে রাখবে কেন? চিরুনির ব্যাখ্যা কী? না, আমরা অন্য দিকগুলো খতিয়ে দেখেছি। এডওয়ার্ড ব্রাউনের কানেকশন ভালোই ছিল রাজনৈতিক মহলে। যে কারণে আমাদের ওপর বার বার চাপ আসছে, এমনকী সিআইডির হাতে তুলে দেওয়াও এইজন্য। নাহলে আমি কলকাতায় আসতাম না। বলতে পারেন, অন্য দিশা না-পেয়ে অ্যারনের কথায় আপনার কাছে এসেছি।'
দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, ‘গল্প কিন্তু এখনও কিছুটা বাকি। ধৈর্য আছে তো?’
ডলোরেসকে দেখে আমার মনে হয়েছিল, নিজের ভেতর শোক, অপেক্ষা আর অন্যান্য রহস্যময় অনুভূতিগুলোকে স্তরে স্তরে ঢেকে রেখেছিলেন। সেই রাত্রে আমি কীভাবে জঙ্গলে পথ হারালাম, নাকি মাথা কাজ করেনি, অথবা ক্লান্ত ছিলাম, জানি না। কিন্তু, নিরীহ বনাঞ্চলকে একলহমায় রাক্ষুসে হাঁ-মুখ মনে হয়েছিল। ডলোরেস না বাঁচালে বিশ্রী দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী ছিল, কারণ আমি একটা শুকনো গভীর খাদের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়েছিলাম, যার ওপার থেকে টিলা উঠে গেছে। ধন্যবাদ জানানো একটা কারণ তো বটেই, তার থেকে বেশি ছিল কৌতূহল, তাই ডলোরেসকে ফোন করে পরদিন জিজ্ঞাসা করলাম সেদিন দুপুর বেলা তাঁদের বাড়ি যেতে পারি কি না। আমার চলে যাবার দিন এগিয়ে আসছে, ছুটি বাড়ানো যাবে না ।
জাগৃতি বিহারের পেছনের রাস্তায় কিছুটা হাঁটলে ডলোরেসদের কটেজ। ক্ষয়ে যাওয়া দোতলা বাংলো, যার চারধারে ছাগল ও মুরগি চরে বেড়াচ্ছে। জঙ্গলে ঘেরা শান্ত ও নির্জন। আশেপাশের অন্যান্য কটেজগুলো পরিত্যক্ত। বাড়ির একদিকের দেওয়াল ভেঙেছে, তার গায়ে সোনালি অক্ষরে লেখা ‘তাহার মহিমা’ এখনও পড়া যায়। একটা বৃদ্ধ পলাশ গাছ সবার মাথা ছাড়িয়ে উঁচুতে দাঁড়িয়ে। তেলাকুচোর জঙ্গল হয়ে আছে এখানে-ওখানে। টিলাপাহাড়ের দিক থেকে একটা শুকনো বাতাস এসে ধুলোর চাদর ছড়িয়ে যায় মাঝে মাঝে
ডলোরেস গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁকে দূর থেকে দেখে মনে হল, নিজের সম্পর্কে যা বলুন না কেন, যথেষ্ট সুন্দরী এবং আকর্ষণীয়া, এই বয়েসেও। আলফ্রেড প্রেমে পড়লে তাঁকে দোষ দেওয়া যাবে না। অ্যাগনেসের ছবি আমি পুলিশ ফাইলে দেখেছি, হলুদ বিবর্ণ সে-ছবি দেখে আলাদা করে উচ্ছল বালিকাকে বোঝা সম্ভব ছিল না।
বাড়ির ভেতরে পুরোনো দিনের গন্ধ, গুমোট ও বিষণ্ন। আমরা বসার ঘরে এলাম। কাগজপত্র, ট্রাঙ্ক, ছেঁড়া ফাইল, বিবর্ণ বইতে ঠাসাঠাসি। সোফার গদি ফেটে তুলো বেরিয়ে পড়েছে। তবু শৌখিন কেটলিতে অপেক্ষারত চায়ের স্বাদ ডলোরেসের রুচি বোঝায়। বেকারিতে বানানো কুকিতে মাখনের টাটকা গন্ধ।
‘এই ঘরটা অ্যাগনেসের প্রিয় ছিল। অনেকদিন রাতে এখানেই ঘুমিয়েছে। এই যে জানালা থেকে বাগান দেখা যেত, বসে বসে দেখত সারাদিন। বাগান খুব প্রিয় ছিল ওর।' দেওয়ালে একটা ধূসর ছবি। চারজনের। সুখী সময়কার। ‘আমরা ঘুরতে গিয়েছিলাম ভাইজ্যাগ। আমি তখন ছয়। সেই আমাদের শেষবার চারজন একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়া। খুব আনন্দ হয়েছিল।’
‘আপনার কখনো মনে হয়নি, মানে বড়ো হয়ে, যে, অ্যাগনেসকে খুঁজে বার করবেন?’ ‘হয়নি যে, তা নয়। দুই-একবার পুলিশ স্টেশনেও গিয়েছি। কিন্তু, কেউ বিশেষ উৎসাহ দেখায়নি। আমার মনে হত, নিজের জীবনটাকে গুছিয়ে নেব এবার। অ্যাগনেসের ছায়ায় থাকব না। তাই নিজেকে বোঝালাম যে, ও পালিয়ে গিয়ে বেঁচে গেছে। আবার তাকে ফেরানোর চেষ্টা করলে কোনো পক্ষের ভালো হবে না।'
‘আমাকে ক্রিসের গল্প করা হয়েছিল। অ্যাগনেসকে নিয়ে সত্যিই কারোর ইন্টারেস্ট নেই।
‘অদ্ভুত, না? অ্যাগনেস নাহয় পালিয়েছে, অন্তত সেরকমই মনে করি আমরা। কিন্তু, অত ছোটো শিশু পায়ে হেঁটে তো কোথাও যেতে পারবে না।' ডলোরেস আমাকে বাগান দেখালেন। দেখার কিছু নেই, চারদিক ঝোপেঝাড়ে ভরতি, তবে অনেকটা জায়গা জুড়ে। এখানে ফুল চাষ হত অনেক। বুড়ো পলাশের নীচে একটা টুল। মুরগির ঘরের পাশ থেকে আরেকটা টুল বার করে আনলেন ডলোরেস। দু-জনে মুখোমুখি বসার পর হাসলেন, “এই জায়গাটা আমার সবথেকে প্রিয়। পারলে সারাদিন বসে থাকি এখানে। মাটিও অন্যরকম এই গাছের নীচে, দেখো! শীতকালে ঊষ্ণ থাকে, গরমে ঠান্ডা। কত ফুল হয়! সময় আসবে কিছুদিন পর। ঝড়ের মতো পাপড়ির দল সারা বাগানে বইবে।' মরে আসা রোদের ভাপে চোখ জুড়িয়ে আসছিল আমার। কত রাত ঘুমোইনি ভালো করে! টেটভ্যাক নিয়ে গা ম্যাজম্যাজ করছে। বাড়ির ভেতর থেকে চায়ের কাপ নিয়ে এলেন ডলোরেস। ‘এখানে বসলে আরাম লাগে। মায়ের শরীর ভালো থাকলে শাল মুড়িয়ে নিয়ে আসি বাগানে। বসে বসে ঢোলে।’
কঁক কঁক শব্দে মুরগির দল হেলেদুলে চরে বেড়াচ্ছিল। একটা ছাগল এসে সন্দিগ্ধমনে আমার প্যান্ট চেটে দেখল, চিবোনো যায় কি না। লালুরামের কথা মনে পড়তে অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসলাম আমি। ‘ডলোরেস, আপনার কখনো মনে হয়েছে, এই দুটোর মধ্যে যোগ থাকতে পারে?’
‘না!’ ডলোরেস অবাক চোখে মাথা নাড়লেন। ‘কীসের যোগ! মানে, আমরা তো এডওয়ার্ডদের চিনতামও না ভালো করে।
‘কিন্তু, অ্যাগনেস ওদের বাড়ি যেত।’
‘আমরা বলতে আমি বাবা-মায়ের কথা বলেছি। অ্যাগনেসের গোটা শহর জুড়ে বন্ধু। তোমার কি মনে হয়, সত্যিই যোগাযোগ আছে?' এটুকু বলে ডলোরেস আর প্রশ্ন করলেন না। আনমনে চা খাচ্ছিলেন। তখন বিকেল ঢলে পড়ল। যেখানে যেটুকু রোদ, তাকে শীতের চাদরে মুড়িয়ে সূর্য ঝরবার পালা এল এবং তার দীর্ঘ অবসান আমাকে মনে করাল, অ্যাগনেসের ডায়েরির কথা ডলোরেসকে বলতে হবে। ডলোরেস জানালেন, সে-ডায়েরি ছিঁড়েখুঁড়ে বিবর্ণ। তারপর বাড়ির ভেতর ঢুকে গেলেন। কয়েক মিনিট পর বেরোলেন একটা ব্যাগ হাতে। ‘ন্যাপথলিন দিয়ে রেখেছি, তাও তো পোকা লেগেছে, পাতা ঝুরঝুর করছে।' সেক্ষেত্রে ফটোকপি করানো বিপজ্জনক না? সাধারণ যেকোনো ডায়েরি যেমন হয়, বাদামি চামড়ায় বাঁধানো। সাল ১৯৮৫। অ্যাগনেস নাকি শেষদিকে মাঝে মাঝে ডায়েরি লেখা ধরেছিল, কিন্তু সেগুলো যে আসলে কী, ডায়েরি, না, গল্প, না, তার উন্মাদনার হ্যালুসিনেশন, পড়ে কিছু বোঝা যাবে না। ‘আমি বুঝিনি, দেখো তুমি যদি পারো।' ভেতরের পাতাগুলো হলুদ, আঙুলের চাপে ভেঙে যেতে পারে ভয় হল। ডলোরেস সাবধানে পাতা ওলটাচ্ছিলেন। খাপছাড়া টেক্সট, অনেক জায়গায় বাজারের হিসেব, অথবা, চেনা হিন্দি গানের লাইন টুকে রেখেছে। তবে, হাতের লেখা পরিচ্ছন্ন। সবক-টা পাতার দরকার নেই, তাই আমি ডলোরেসকে বললাম সাবধানে একটা করে পাতা খুলতে। ফোনের স্ক্যানার দিয়ে তুলে নিচ্ছিলাম। বাড়ি গিয়ে পিডিএফে কম্পাইল করে নিলেই হবে। ডলোরেস জানালেন, তাঁর স্কুলে প্রিন্টার আছে। পিডিএফটা পাঠালে প্রিন্টআউট করে কারোর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেবেন। প্রায় চল্লিশ পাতা মতো। অ্যাগনেসের জীবনের শেষ এক বছর অনিয়মিতভাবে লিখেছিল। পাতা বেছে বেছে স্ক্যান করতে গিয়ে সন্ধে হয়ে গেল। জিজ্ঞাসা করলাম, মার্গারেটের সঙ্গে দেখা করা যাবে কি না। ডলোরেস ইতস্তত করছিলেন প্রথমে, ‘মা কেমনভাবে রিঅ্যাক্ট করবে জানি না। অনেকদিন তো অচেনা কেউ আসে না!' তারপর কী ভেবে বললেন, ‘আচ্ছা, চলো। সবই তো বলেছি তোমাকে। মা আবোলতাবোল বকলে কিছু মনে কোরো না।'
‘আপনি কেন খুলে বলছেন না বলুন তো? সেদিন ভোরবেলা আমাকে একলা রেখে উধাও হয়ে গেলেন?'
রকির বাবা হাসলেন। ‘উধাও হইনি। রকিকে হাঁটাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু, সেসব ছাড়ুন। আপনি দিশা পেলেন কিছু?'
‘অ্যাগনেস খুন হয়েছে বলেছিলেন কেন?’
হাসি মুছল না রকির বাবার। ‘এমন কিছু বলেছি বলে তো মনে পড়ে না। বলেছি নাকি, রকি?' রকি কান ঝাড়া দিয়ে হুঁ-হুঁ স্বরে কিছু জানাল। গা ঘেঁষে এল আমার, আদর খেতে চায়। নীচু হয়ে পিঠে হাত বোলালাম।'
'আপনি ঘুমের মধ্যে ভুল শুনেছিলেন সম্ভবত।'
কথা কাটাকাটি করতে ইচ্ছে করল না। নির্জন রাস্তা। তরল অন্ধকারে বনাঞ্চলকে মায়াবী লাগছে। ‘আজ আমি ডলোরেসের বাড়ি থেকে আসছি। চেনেন ওকে? অ্যাগনেসের বোন। উত্তর দিলেন না। পাশাপাশি কিছুদুর নীরবে হাঁটার পর বললেন, ‘আপনি সমাধান করতে না-পারুন, অন্তত লিখুন এই গল্প। মানুষ যাতে ভুলে না যায়—'
‘মানুষের কিছু এসে যায় না চল্লিশ বছর আগে কী ঘটেছিল। শুধু কয়েকটা পরিবার স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন পিঠে নিয়ে ধুঁকে যায়। এই গল্পের সম্ভাবনা কতদূর?'
‘ততদূর, যতটা আপনি একে নিয়ে যেতে চান। কথকের দায় তার কাহিনিকে বাঁচিয়ে রাখা। শ্রোতা তো উপলক্ষ্য মাত্র। আপনি কি নিজের কাছেও এই গল্প জ্যান্ত রাখবেন না? নাহলে বৃথাই আপনার খুঁড়ে চলা, মিস ভট্টাচার্য।'
‘মাঝে মাঝেই দেখা হয় আপনার সঙ্গে। অদ্ভুত সব কথা বলেন। আগ্রহটা কীসের, বলবেন?'
‘অ্যাগনেস নিজেকে মেডুসা বলত, এটা শোনার পরে আগ্রহ জেগেছিল বলতে পারেন। একটা সাধাসিধে মেয়ে, অল্প বয়েস, সে নিজেকে মেডুসা কেন বলবে?'
‘কারণ, তার লাল চুল ছিল। সে স্কুলে পড়েছিল পুরাণের কাহিনি, হয়তো
‘অথবা, তার রূপে মানুষ পাথর হয়ে যেত। এই ব্যাখ্যাগুলো সেদিন শুনেছি আপনার মুখে, কিন্তু এগুলোই কি যথেষ্ট? আপনার কী মনে হয়? কোনো মানুষের গলায় জন্মগত নীল জড়ুল থাকলে সে নিজেকে মহাদেব বলবে, এটা কষ্টকল্পনা না?”
‘আপনার বক্তব্যটা কী?'
‘এবার আমাকে জঙ্গলের পথ ধরতে হবে, মিস ভট্টাচার্য। রকির খিদে পেয়েছে। দেখুন, কেমন করুণ চোখে তাকাচ্ছে আমার দিকে। আবার দেখা হবে। কালই হতে পারে।'
‘আমি বেশিদিন এখানে নেই।'
‘যাবার আগে তো অবশ্যই দেখা হবে। আসবেন আমার কটেজে। আপনাকে একটা স্পেশাল অ্যাপল পাই খাওয়াব, রেসিপি আমার সিক্রেট।' রকির পিঠে মৃদু চাপড় মেরে ডান দিকে বেঁকে গেলেন। ‘চলি, মিস ভট্টাচার্য। ভালো থাকবেন।'
দোতলার প্রায়ান্ধকার ঘর। দুটো চেয়ার, তাদের গদি ফাটা। টেবিলে ধুলোর আস্তরণ। তার ওপর রাখা রাজ্যের ওষুধপত্র, লিথোসান থেকে শুরু করে সাইজোডন—বোঝা যায় এই বাড়িতে এক মনোরোগী থাকেন। খাটে হেলান দিয়ে বসে আছেন যে বৃদ্ধা, এই বয়েসেও তাঁর অসামান্য রূপ দেখে বোঝা যায়, অ্যাগনেসের প্রেমে পড়া কত স্বাভাবিক ছিল। ডলোরেস আলো জ্বালালে দেখলাম, মার্গারেটের নাক, চোখ, গালের হাড়, ও চিবুকের নিখুঁত ভাস্কর্য বিগত দিনের গ্রিক দেবীদের মনে করায়। জীর্ণ, ঝুলঝুলে ত্বক, মুখের চামড়া ঝুলেছে, হাত কাপে, তবু মনে হল পোর্ট্রেটের প্রতিমা। চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে বসে ছিলেন। ডলোরেস আলাপ করালে হাসলেন, দেখে গণ্ডগোল লাগল না। হিন্দি-ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলেন। ‘ডলোরেস বলেছে তোমার কথা। এখানে ঘুরতে এসেছ। আমাদের বাগানে অনেক ফুল হত, জানো! গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, হাসনুহানা, ডালিয়া, গাঁদা। কলকাতায় নিউ মার্কেটে পাঠাতাম। আমাদের কথা লিখবে?”
‘লিখলে আপনার ভালো লাগবে?’
‘এই যে কটেজ, এটাও কিন্তু ঐতিহাসিক। এক স্কটিশ সাহেব, খাঁটি সাহেব, আমাদের মতো দো-আঁশলা নন, এখানে নিজের বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যা করেছিলেন ১৯৪৩ সালে। তাঁর ভূতকে নাকি তারপরেও অনেকে দেখেছে। হাতে লণ্ঠন নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, গলায় ফুটো। রাতের ট্রেনকে লণ্ঠনের আলো দেখাতেন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে। এই গল্পগুলো লিখো, নাহলে হারিয়ে যাবে সব।'
‘মনে রাখব। এই জায়গার তো সমৃদ্ধ ইতিহাস।'
‘মুলুকের ইতিহাস।’ মার্গারেট চোখ বুজে ধীরে ধীরে বলতে থাকলেন, যেন মন্ত্ৰ পাঠ করছেন। ‘নির্জন ঢেউ খেলানো অরণ্য পাহাড়। নদীনালায় ভরতি এ অঞ্চলে আবহাওয়া সারাবছর শুষ্ক ও মনোরম থাকত। গঞ্জ, আমাদের মিনি ইংল্যান্ড। গথিক স্থাপত্য। পিয়ানো, ফ্রুটকেক, ওয়াইন গ্লাস। ক্যারলের ঝংকার। টেনিস কোর্ট। গির্জার দেওয়ালে অপূর্ব ফ্রেসকো। সুগন্ধি ফুলের সমারোহ। আমি চোখ বুজলে সিনেমার দৃশ্যের মতো পর পর এগুলো চলতে থাকে!'
‘আমরাও শুনে আসছি এই জায়গার কথা। যেন এক ইউটোপিয়া ।’
‘কিন্তু, ছোটো হয়ে আসছে। সবাই চলে গেল। শুনছি নেটিভরা দখল করে নিচ্ছে বাড়িঘর। হেরিটেজ ভ্যালু নাকি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আমার মেয়ে বলে। '
ডলোরেস জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ফিরে বললেন, “কিছু করার নেই, মা! আমাদের টাকা ছিল না।'
ডলোরেসের দিকে তাকিয়ে অসন্তোষে বেঁকে গেল মার্গারেটের ঠোঁট। তাঁকে কুশ্রী লাগল সেই মুহূর্তে। ‘তা বলে পুরোনো সব কিছুকে শেষ করে দিয়ে? তুই অদ্ভুত কথা বলিস, ডল! তোর মায়াদয়া নেই। আমি জানি, চোখ বুজলে বাড়িঘরদোর বেচে দিবি। অবশ্য, অ্যাগনেস বেচতে দেবে না তোকে। এ বাড়ি তার প্রাণ। আজ সকালে দালিয়ার খিচুড়ি খাব বলেছিলাম। ভুলে মেরে দিয়েছিস। তোর শরীরে কবে ভালোবাসা ছিল?’
ডলোরেসের মুখে বিকার নেই। জানালার শিক ধরে বাইরে তাকিয়ে আছেন। ‘অ্যাগনেস কি এখানেই থাকে?'
‘নাহ্, থাকে তো কোথায় যেন একটা। মাঝে মাঝে আসে। আজকাল কমে গেছে আসা। ডল, দিদির একটু খোঁজখবর নিতে পারিস তো। কেমন আছে, কোথায় আছে।' ‘খুব সুন্দর দেখতে অ্যাগনেসকে।’
হাসলেন মার্গারেট। ‘লোকে বলে, আমার মুখ কেটে বসানো। মাথায় এখনও কী চুল! কোমর ছাপিয়ে যায়। এমন মেয়ে নিয়ে কার গর্ব হবে না, বলুন! '
‘আজ আলাপ হল না। পরে একদিন এসে আলাপ করব।'
‘আসবেন। তবে, অ্যাগনেস যে কবে আসে! যেদিন মেজাজ হল, এসে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে গেল। আবার দিনের পর দিন এলই না।' বলতে বলতে মার্গারেটের চোখ ঘোলাটে হল। ফুঁপিয়ে উঠলেন রুদ্ধগলায়, ‘কে যে ওকে দূরে সরিয়ে দিল! কতকাল হয়ে গেল, এই বাড়িতে থাকে না ও। আসতে চায়, কিন্তু ভয় পায়। লোকে যদি জেনে যায়, যদি মেরে ফেলে ওকে! ওহ্, শয়তান, শয়তান!' নিজের বুক চেপে হাহাকার করলেন, ‘যারা ওকে আসতে দেয় না, দূরে সরিয়ে রাখে, তাদের পাপ, পাপ—
ডলোরেস এগিয়ে এলেন। ‘ওষুধ খাবার সময় হল।' আমাকে চোখের ইশারা করলেন। মার্গারেট খেয়াল করলেন না। মাথা ঝুঁকিয়ে তখন বিড়বিড় করে চলেছেন।
বাইরে বেরিয়ে ডলোরেসকে বললাম, ‘সরি, আমার কথাবার্তা থেকেই হয়তো‘না, না। এরকম প্রায়শই হয়। কোন কথা থেকে যে ট্রিগার করবে কেউ জানে না।' ‘অ্যাগনেস কি আপনি?”
হাসলেন ডলোরেস। ‘এমনি সময়ে আমাকে পছন্দ করে না। বলে, তার দুর্ভোগের জন্য আমি দায়ী। কিন্তু, মাঝে মাঝে আমাকে অ্যাগনেস বলে ডাকে, কাছে বসিয়ে গায়ে, মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে। বলে এই কটেজ লিখে দিয়ে যাবে বড়োমেয়ের নামে। আমাকে, মানে ডলোরেসকে, কিচ্ছু দেবে না, সে নাকি তার মেয়ে নয়। ওষুধ খাইয়ে মেরে ফেলার চক্রান্ত করছে। আমি চুপ করে শুনে যাই, মাথা নাড়িয়ে হুঁ-হাঁ করি, আদর খাই। মাকে জড়িয়ে চুমু খাই। তারপর মা আবার সেন্সে ফেরে। আমাকে দেখলে ভুরু কুঁচকে যায়। কথা বলে না, গুম হয়ে থাকে। কথা বললেই হরেক অভিযোগ। এই চলছে আজ বছরের পর বছর।’
‘আপনার রাগ হয় না? কষ্ট হয় না?’
‘কার ওপর রাগ করব? তার কি যুক্তি দিয়ে বোঝার ক্ষমতা কোনোকালে ছিল? আজকাল কিছুই হয় না। সত্যি বলতে কী, মায়ের অসুস্থতাতেও যন্ত্রের মতো কাজ করে যাই, বিকার হয় না মনে। তুমি বলবে ঔদাসীন্য। কিন্তু, এটুকু নাথাকলে তো আমিও পাগল হয়ে যেতাম।’
‘আমার বাবা বলত, একটা সময়ের পর সবাইকে ছেড়ে দেওয়া শিখতে হয়। টু লেট গো।'
“ঠিকই বলতেন। আমি ছোটো থেকেই শিখিয়েছি নিজেকে। কীভাবে নিজের আবেগকে কাটছাঁট করতে হয়, ইমোশনাল দূরত্ব তৈরি করতে হয়। ওটা আমার আত্মরক্ষার উপায় ছিল।'
‘মা মাঝে মাঝেই অ্যাগনেসকে দেখেন, না?'
‘আজকাল কমেছে বরং। আগে খুব হত। আসলে মা কখনোই বিশ্বাস করেনি অ্যাগনেস হারিয়ে গেছে। বাবাও দিনে দিনে নীরব হয়ে গিয়েছিল। মা যা বিশ্বাস করত, তাতে প্ৰতিবাদ করেনি। আমি প্রথম প্রথম মা-কে বোঝাবার চেষ্টা করেছি, অ্যাগনেস নেই। তারপর হাল ছেড়ে দিয়েছি।' আমি আবার অ্যাগনেসের ভূতের কথা তুললাম। ডলোরেস বলছিলেন, তাঁর চেনা কারা কারা দেখেছে। কারোর মত হল অ্যাগনেস সারাদিন লুকিয়ে থাকে জঙ্গলে. রাত হলে বাইরে বেরোয়। খিদে পেলে বনের সাপ, ব্যাং মেরে পুড়িয়ে খায়। তাকে জোহার হালে-তে অনেকে দেখেছে। ডলোরেসদের বাড়িতে কাজ করত একদা রামচরণ, তার ছেলে দেখেছে। এক দুপুর বেলা সাইকেল চালিয়ে ঘরে ফিরছিল, তখন ওর বাচ্চা বয়েস, দেখে দূরে বেথেল মিশনের উঁচু পাঁচিলের ওপর বসে আছে। লাল চুল সাপের মতো হাওয়াতে উড়ছে। সাইকেল থামিয়ে রামনাম জপতে থাকল, তারপর দেখল পাঁচিল থেকে নেমে কোথায় চলে গেল। ‘এত লোক দেখল, তবু আমি তো দেখলাম না! কতদিন বসে থেকেছি এখানে ওখানে, যদি একবার দেখা দেয়।’
হোয়াটসঅ্যাপের ভাইব্রেশনে ফোন খুলে দেখলাম, অ্যারন মেসেজ করেছে। আজ ওর সঙ্গে আমার জোহার হালে-তে রাত্রিবেলা যাবার কথা। কোনো কারণে নয়, তবু রাত্রে জায়গাটা কেমন হয়, এত যে প্রবাদ আর ভূতের গল্প ওটাকে ঘিরে, আমি একবার দেখতে চেয়েছিলাম। সেদিন ওখানে আমার দিকে যে পুতুলটা ছুড়ে মারা হয়েছিল, সেটা এখন আমার টেবিলে বসানো আছে। ভূত হোক বা মানুষ, তার গমনপথে কিছুক্ষণ বসে থাকতে চাই। ‘আজ আসি তাহলে? আবার দেখা হবে, যদি থাকি এখানে।' ডলোরেসের সঙ্গে আর দেখা হবে কি না জানি না। তবে, অ্যাগনেসের ডায়েরিটা পড়ে শেষ করব এখানে থাকার মধ্যেই। ‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করে যাই। যদি কিছু মনে না-করেন। অ্যাগনেস সময় কাটাত কী করে? সেলাইফোড়াই, বই পড়া, রেডিয়ো শোনা, বা, অন্য কিছু?”
‘বইপত্রের ধার দিয়ে ওকে যেতে দেখিনি।' ডলোরেস হেসে ফেললেন। ‘সেলাই-টেলাই তো কস্মিনকালেও করেনি। ওর সময় কাটাবার উপকরণ ছিল বন্ধুবান্ধব, মূলত ছেলেরা। বাড়ি থাকলে, যখন মাথার ঠিক থাকত আর কি, আমার কানের পোকা খেত নতুন বয়ফ্রেন্ডদের গল্প করে। বাকি সময়টা বাগানের কাজ করত, নয়তো হাঁ করে বসে থাকত,
কল্পনার জাল বুনত। তবে, এসবই ও সুস্থ থাকার সময়ে। মাথা বিগড়োলে, আগেও বলেছি, তখন ও অন্য মানুষ। '
ডলোরেসের থেকে বিদায় নিয়ে ডেগাডেগি নদীর রাস্তা ধরলাম। বাগানের বুড়ো পলাশের নীচে গিয়ে আবার বসেছেন ডলোরেস, চলে যাবার সময়ে দেখলাম। সেই চেয়ারে হয়তো রাত অবধি একা একা বসে থাকবেন। কয়েক পা হেঁটে চোখে পড়ল, আলফ্রেড হেমব্রম এগিয়ে আসছেন। গন্তব্য বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়। আমাকে দেখে মাথা নাড়লেন, কিন্তু তাঁর চোখে প্রশ্ন ছিল। জানালাম, ডলোরেসের সঙ্গে দেখা করে আসছি। জঙ্গলের মধ্যে আমাকে উদ্ধার করেছেন, বললাম সেটাও। আলফ্রেড কথা কম বলেন, তাঁর মুখে শঙ্কার ছাপ দেখলাম। এই লোকটার সঙ্গে ডলোরেসের সম্পর্কের কানাঘুসো শুনেছি, কিন্তু দু-জন গম্ভীর মানুষের প্রেম কীভাবে হয়?

আর প্রভুগণ, তোমরা তাহাদের প্রতি তদ্রূপ ব্যবহার কর, ভর্ৎসনা ত্যাগ কর, জানিও, তাহাদের এবং তোমাদেরও প্রভু স্বর্গে আছেন, আর তিনি কাহারও মুখাপেক্ষা করেন না ৷
- Ephesians | 6:9
সমর দোসাদকে তাঁর বস্তিতে পাওয়া গেল না। লোকে জানাল তিনি নাকি শুঁড়িখানাতেই রাত কাটান। টাউন ছাড়িয়ে পাকারাস্তার পাশের দিশি মদের দোকানে তাঁর সন্ধানে হানা দিতে হল। বাঁশের ঝাঁপ তুলে মুখ বাড়ালেন সমর। চোখ লাল, মাথার চুল উশকোখুশকো। মুখে অন্তত সাতদিনের না-কাটা দাড়ি বছর পঁয়ষট্টি হবে। ছেলেরা নাকি দেখে না, তাই এই বয়েসেও শুঁড়িখানায় কাজ করেন। ঘরে আছে বউ, বুড়ি পিসি, আইবুড়ো মেয়ে যার একটা পা খুঁতো হবার কারণে বিয়ে হচ্ছে না। তাদের কাঁইকিচির থেকে বাঁচতে রাত্রে এখানে থাকেন। আমার আর অ্যারনের পরিচয় পেয়ে অবাক হলেন প্রথমে, তারপর অবিনাশকে দেখে হাসলেন। সেই ঘটনার পর কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর থেকে খবর রাখেনি, জানিয়েছিল বারবারা। অবিনাশ সমরের কাছে খোঁজ করলেন এখন দিশি, বিলিতি কিছু পাওয়া যাবে কি না। হেঁ-হেঁ করে হাসলেন সমর। এত ভোরে? আমার বা অ্যারনের প্রতিবাদ কাজে এল না। কিছু দূরে একটা শালগাছের নীচে বেঞ্চি পেতে মুখোমুখি বসে পড়লেন দু-জন। সঙ্গতে প্লাস্টিকের গ্লাস, মদ, লিমকা। কোথা থেকে কয়েকটা পেয়ারা কেটে বিটনুন মাখিয়ে নিয়ে এলেন সমর। অবিনাশ বায়না ধরলেন ফুলুরি পকোড়ার, কিন্তু সমর দুঃখিতমুখে জানালেন এত সকালে বানানো হয় না। ভাব দেখে মনে হল তাঁর বুক যেন ফেটে যাচ্ছে অবিনাশের আবদার রাখতে না-পেরে। অবিনাশ আমাদেরও অফার করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আমার মুখ দেখে কিছু বলতে সাহস পেলেন না। অবশ্য, আমাদের সম্মান দেখিয়ে দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার সমর জোগাড় করে এনেছিলেন। তারপর দু-জনে মেতে উঠলেন মদের আড্ডায়। অ্যারন ভাবগম্ভীর।
‘তোকে কোথায় মেরেছিলাম যেন?’
‘কোনবার, স্যার?'
‘যা শালা! অনেকবার মেরেছি নাকি?’
‘চারবার। ১৯৯৫ সালে শেষবার তুললেন। আমরা ততদিনে গুরুজির অ্যান্টিলবি হয়ে গেছি। গুরুজির অত মাখামাখি কংগ্রেসের সঙ্গে, মানতে পারিনি অনেকে। তাই ওরা যে যেখানে পারে পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছিল আমাদের বিরুদ্ধে। সেটা পার্লামেন্ট ভোটের আগে আগে। আমি কিন্তু বরাবরই এ কে রায়ের ফ্যাকশনের লোক ছিলাম, সেই মোর্চা শুরুর দিন থেকে। বোকারোতে আমাদের ইউনিয়নে রায়বাবুর অবদান ভোলার না।' দু-হাত তুলে নমস্কার করলেন দোসাদ। ‘তো, ১৯৭৫ সালের চিরুদি কেস দিয়ে তুলিয়েছিল। এদিকে আমি তখন এলাকাতেই ছিলাম না, যখন ওই দাঙ্গাহাঙ্গামা ঘটে। পরে আমার নাম ঢুকিয়ে দিয়েছিল ওরা। ভগত মারান্ডিকে মনে আছে? ও শালা উসকেছিল।’
‘খুব মনে আছে ভগতকে। এখন দেওঘরে থাকে। ওখানকার কেবল অপারেটরদের সবক-টা কোম্পানিতে শেয়ার আছে ওর। ২০০০ সালের পর থেকে কোল মাফিয়ারা যখন ওদের ব্যাবসার টাকা বৈধ খাতে ঢেলে সাদা করতে শুরু করল, জলের সাপ্লাই, কেবল টিভি, সিডির ব্যাবসা এসবে, তখন ও মিডলম্যানের কাজ করেছিল। ভালোই গুছিয়ে নিয়েছে এখন। পলিটিক্স ছেড়ে দিয়েছে অনেকদিন। আমার সঙ্গে বার দুয়েক দেখা হয়েছিল।’
‘কোথায়? জেলে নাকি?'
‘আরে না, ওরা বড়োসড়ো ব্যাপার। দেওঘরে একবার ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে গেছি, আমাকে দেখে বোলেরো থামিয়ে মুখ বাড়াল। তারপর সে কী খাতির! একটা হোটেল আছে ওর। সবাইকে সেখানে বেসিক রেটে ডিলাক্স রুমে রাখল, এলাহি খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। রাতে আমার সঙ্গে মদ খেতে বসে ভোর অবধি টেনেছিল। পুরোনো দিনের কথা। কান্নাকাটিও করল, মনে সুখ নেই। বউ ছেড়ে গেছে। একটা ইয়াং মেয়েকে রেখেছে, ভোজপুরি সিনেমার পার্টটাইম অ্যাকট্রেস। কিন্তু, মেয়েটা নাকি ওকে লুকিয়ে বাইরে প্রেম করে বেড়ায়। আমাকে ধরেছিল শেকড়বাকড়ের জন্য। বিছানায় টানতে পারে না বেশিক্ষণ, তাই মেয়েটা ওকে ধোঁকা দিচ্ছে। মিলিটারি মান্ডির ফোন নাম্বার দিলাম।' অবিনাশ কিছুক্ষণ স্মৃতিচারণা করলেন তারপর। আমার হাই উঠছিল। সত্যিই কি তাঁর আসল বিষয়ে ঢোকার ইচ্ছে আছে? ‘তখন হাতিয়াতে পোস্টেড। লক-আপে ভগতকে এমন মেরেছিলাম যে দুই পা ফাঁক করে হাঁটত। ও-ও শোধ নিয়েছিল উলটে। কানেকশন খাটিয়ে আমার নামে হিউম্যান রাইটস ঠুকে দিল। ব্যস, শোকজ, কমিশন— এখন নাকি কোলেস্টেরল নিয়ে নাকানিচোবানি খাচ্ছে। সে যাক। তোকে কি ১৯৯৫ সালে পিটিয়েছিলাম? খেয়াল থাকে না সব।'
‘অতটা না। হালকা চড়থাপ্পড়। আসল মার তো ‘৮৩ সালে। ঘুসি মেরে নাক ফাটালেন। ঝরঝর করে রক্ত, আর তা দেখে আমার সে কী কান্না! মনে হচ্ছিল, শরীরের সব রক্ত বেরিয়ে মরে যাব এবার। তাতে খেপে গিয়ে আরও মারলেন। নাকটা ঠিক হয়নি। মাঝেমাঝেই কাঁচা জল বেরোয়, ভেতরে সুড়সুড় করে। এই দেখুন,' আঙুল দিয়ে নাকের কাছে ফোলা জায়গা দেখালেন।
চুকচুক করে মাথা নাড়লেন অবিনাশ। ‘কত পাপ যে করলাম জীবনে! তবে, ১৯৯২ সালে তোকে মারিনি, না?'
সমর চোখ পিটপিট করলেন। ‘ঠিক মনে পড়ছে না, স্যার!'
‘কেন তুলেছিলাম সেটা মনে পড়ছে?' উত্তর না-দিয়ে মদে চুমুক দিলেন সমর, আড়চোখে আমার দিকে তাকালেন। অবিনাশ আবার প্রশ্ন করলেন, 'কী রে, সেবারের কথা মনে আছে তো?'
‘অনেকদিন হয়ে গেল, বাদ দিন না, স্যার! কী জন্য এসেছেন, বলুন।'
‘এইজন্যই এসেছি।’ আমি বললাম। যেভাবে ঢিলেগতিতে এগোচ্ছে, আজ সারারাতেও কথা শেষ না হতে পারে। ‘তখন আপনাকে পুলিশ তুলেছিল, সন্দেহ করেছিল, সেসবের মধ্যে ঢুকছি না। কিন্তু, কয়েকটা প্রশ্ন আছে, করেই চলে যাব।'
‘আর কীসের প্রশ্ন দিদি! আমার গোটা জীবনটা ভেঙেচুরে গেল। কারখানার কাজটা যাবার পর ওখানে ঢুকেছিলাম, মন দিয়ে করছিলাম, কারোর সাতেপাঁচে থাকিনি। কিন্তু গরিব মানুষ তো, তাই আমাদের সবাই প্রথমে টার্গেট করে। তারপর থেকে আর কোথাও ঠিকঠাক কাজ পাইনি। পলিটিকাল লাফড়ায় জড়িয়ে পুলিশের কেস খাওয়া এক ব্যাপার, কিন্তু বাচ্চাচুরির দাগ একবার লেগে গেলে সবাই সন্দেহের চোখে তাকাবে। আমার সব কিছু বরবাদ হয়ে গেল। নাহলে এই বয়েসে এমন ঘষটে যেতে হয়?' আক্ষেপের ভঙ্গিতে অদূরে শুঁড়িখানার দিকে হাত তুললেন সমর। ‘পরশু রাতেও গায়ের ওপর বমি করে দিল একটা চুতিয়া।'
‘সব চুকেবুকে গেছে। আর আক্ষেপ করে কী করবি?'
‘দাগ তো থেকেই যায়, স্যার। নির্মলা দুবের কথা মনে নেই আপনার? তার কী হয়েছিল শেষতক?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবিনাশ নীচুগলায় বললেন, 'জানি।'
‘এই তদন্ত চালাবার সময়ে কি আপনি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, ক্রিসের নিরুদ্দেশ হবার সঙ্গে অ্যাগনেসের নিরুদ্দেশ হবার যোগ আছে?'
‘না। বরং, জেনিফারের বাড়ি থেকে ফেরার পরে আমার ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, ক্রিসের ঘটনার সঙ্গে ইচ্ছে করে অ্যাগনেসের নাম জড়িয়েছিল কেউ। সাদা চিরুনি আর অ্যাগনেসের নিখোঁজ হবার দিন, যা ক্রিসের নিখোঁজ হবার দিনের কাছাকাছি। তখন আমার মনে একটাই প্রশ্ন জেগেছিল, তা হল— কেন? যে মেয়েটা ছয় বছর আগে হারিয়ে গেছে, তাকে টেনে আনলে কার কীসে লাভ? অথবা, সে বিশ্বাস করাতে চেয়েছিল যে, অ্যাগনেসের প্রেত এসে ক্রিসকে নিয়ে গেছে! এতজন থাকতে ক্রিসের ওপর কেন নজর পড়েছিল সেই ভূতের অপরাধী একটা স্মোকস্ক্রিন তৈরি করেছিল ঠিকই, যাতে পুলিশের নজর অন্যদিকে ঘুরে যায় এবং সে গা-ঢাকা দিতে পারে।'
‘কিন্তু, সেটা এতই অ্যাবসার্ড একটা স্মোকস্ক্রিন যে, পুলিশের নজর টানতে ব্যর্থ হল।’ বললেন অক্ষয়।
‘একদমই তাই। বারবারা ভুল বলেননি, একটা চিরুনি দিয়ে অ্যাগনেসকে কানেক্ট করতে গেলে অন্য উচ্চতার কল্পনাশক্তি লাগে।' বললেন সোমেন। ‘কিন্তু, এখানে একটা স্ববিরোধ আছে। ভেবে দেখুন, ব্রাউনদের বাড়িতে অ্যাগনেসের ছবি? চিঠি? সেগুলোও কি ইমপ্লান্ট? যদি সেটাই হয়, সেগুলো দক্ষভাবেই করেছিল কিন্তু। সেক্ষেত্রে একই লোকের চিরুনি ফেলে যাওয়াকে ব্যাখ্যা করা যায় না, কারণ সেটা নজর ঘোরানোর কাঁচা চেষ্টা। একই মানুষ প্ৰথম চাল দক্ষ দিয়ে পরের চাল কাঁচা দেবে, এ কি বিশ্বাসযোগ্য?’
এই দিকটা তখন আমিও ভাবিনি। তিনজন নীরব থাকলাম খানিকটা সময়।
‘অ্যাগনেস নিখোঁজ হবার পর পুলিশ এডওয়ার্ডকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তাহলে কি এডওয়ার্ড অ্যাগনেসের কোনো ক্ষতি করেছিলেন, যার প্রতিশোধ এত বছর পর নেওয়া হল? বারবারা বলেছিল, ক্রিসকে অপহরণ এডওয়ার্ডের পক্ষে অসম্ভব ছিল না। তাহলে অ্যাগনেসের ক্ষতি কেন অসম্ভব হবে? বাড়ি থেকে অ্যাগনেসের ফটো খুঁজে পাবার পর আমরা যখন সেটা নিয়ে কথা বলছিলাম, এডওয়ার্ডকে অন্যমনস্ক দেখেছি। তারপর বারবারার বাড়ির আড্ডায় যখন অ্যাগনেসের প্রসঙ্গ উঠল, এডওয়ার্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। যেন এই আলোচনা তিনি চান না। সেটাই-বা কেন? কিন্তু, ধরা যাক, এডওয়ার্ড অ্যাগনেসের ক্ষতি করেছিলেন। তারপর? এডওয়ার্ডকে খুন করল কে?'
তাহলে ক্রিসকে অপহরণের সঙ্গে অ্যাগনেসের যোগ থাকার কথা মানতে হলে, হয় অ্যাগনেসকে বেঁচে থাকতে হবে, অথবা, অ্যাগনেসের হয়ে অন্য কেউ এডওয়ার্ডের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছিল, সেই তত্ত্ব মানতে হবে। কিন্তু, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না— ক্রিসকে অপহরণের পর অপরাধী টানা এতগুলো বছর চুপচাপ ছিল, তারপর কি ঘুম ভেঙে জেগে উঠল? তার মনে হল, আরে এডওয়ার্ডের ওপর প্রতিশোধ তো নেওয়া হল না! যাই, ওকেও খুন করে আসি। এটা প্রচণ্ড কষ্টকল্পনা হচ্ছে। প্রথমত, অ্যাগনেস আর ক্রিসের ঘটনার ব্যবধানই ছয় বছরের, কোনো সংযোগ টানতে গেলে এই প্রশ্ন উঠবেই যে, প্রতিক্রিয়া ঘটতে এত সময় লাগল কেন। সে যদি মেনেও নেওয়া যায়, কিন্তু তার পরের এই পঁয়ত্রিশ বছরের ব্যবধানকে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।'
কী? ’ ‘তাহলে এডওয়ার্ডের হত্যার সঙ্গে অ্যাগনেসের যোগ নেই। সেক্ষেত্রে চিরুনির ব্যাখ্যা
‘ডাইভারশন। কিন্তু, ক্রিসের সময়ে ব্যবহার হয়েছিল যে চিরুনি, সেটার কথা কে কে জানে? সবাই ভুলেই গিয়েছিল, অবিনাশ যাদব মনে না-করালে চিরুনির প্রসঙ্গ উঠত না। সেক্ষেত্রে সেই হাতে-গোনা লোকজনের কেউ এডওয়ার্ডকে হত্যা করেছেন ধরে নিতে হয়, যারা আপনার অনুমান শুনেছিলেন যে, চিরুনি চোখ ঘোরানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল।’
‘সেক্ষেত্রে অবিনাশ নিজে, বারবারা, অ্যারন, জেনিফার যদিও হুইলচেয়ারে বন্দি, হয়তো ডলোরেস- অন্য তো কেউ নেই! যদি না বাইরের কেউ, যে ক্রিস আর এডওয়ার্ড, দুই অপরাধই ঘটিয়েছে একই পদ্ধতি ব্যবহার করে।'
‘সেক্ষেত্রে আবার আগের প্রশ্নে ফিরে যেতে হবে। এতদিন পরে কেন?'
‘কয়েক বছর আগে এক অঙ্কের শিক্ষিকা আমাকে ওকাম’স রেজর থিয়োরি বলেছিলেন। একটা সমস্যার একাধিক সমাধান থাকলে সবথেকে সহজটা আগে যাচাই করে দেখা উচিত, কারণ সিংহভাগ সময়ে সেটা আসল সমাধান হয়।' আরেকটা সিগারেট জ্বালালাম। ‘এক্ষেত্রে সহজতম সমাধান হল, অ্যাগনেস, ক্রিস এবং এডওয়ার্ড ব্রাউন একে অন্যের সঙ্গে কানেক্টেড। সবথেকে সহজ বলছি কারণ এক্ষেত্রে তিনটে অপরাধের একটা কমন সূত্র থাকে। এটা না হলে প্রত্যেকটাকে আলাদাভাবে তদন্ত করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিটার জন্য আলাদা পাত্রপাত্রী আর মোটিভ চলে এসে পুরোটা সাংঘাতিক জটিল রূপ নেবে। অক্ষয়ের দিকে ফিরলাম, ‘আপনারা কি অতটা সময় এই কেসের পেছনে খরচ করবেন, নাকি হাতের কাছে যাকে সন্দেহভাজন মনে হয়, তাকেই তুলবেন ?
‘আমাদের কেস ক্লোজ করতে হবে, মিস ভট্টাচার্য! আপাতত অবিনাশ যাদবের মতো সাসপেক্ট অন্য কেউ নয়। তিনি হুমকি দিয়েছিলেন, এডওয়ার্ডকে দেখে নেবেন। খুনও করবেন বলেছিলেন। এডওয়ার্ড খুন হবার কয়েক দিন আগে জোহার হালে-তে তাঁকে সন্দেহজনকভাবে ঘুরতে দেখা গেছে। এমনকী অ্যালিবাইও ছিল না।' অক্ষয় বললেন।
‘আপনারা যদি নিশ্চিত থাকেন অবিনাশই অপরাধী, কলকাতায় এসে আমার কাছে গল্পটা শুনতে চাইলেন কেন? অবিনাশকে তো গ্রেপ্তার করতে পারতেন।'
‘আমি নিশ্চিত নই।' অক্ষয় মৃদুস্বরে বললেন।
‘আমি নিশ্চিত। অবিনাশ অপরাধী নন। কেন, সেটা আগেই বলেছি। তিনি খুন করে মৃতদেহ ওভাবে স্টেজ করবেন না। আর, অ্যাগনেসের চিরুনি ওখানে রাখা? অসম্ভব।'
অক্ষয়কে প্রায় অনুনয়ের সুরে বললাম, ‘আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না, পার্প ইজ স্টিল অ্যাট লার্জ? আসল অপরাধী এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে যে হয়তো ক্রিস এবং অ্যাগনেসের রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে!'
‘পুলিশ যখন এডওয়ার্ডের বডি খুঁজে পেল, স্থানীয়রা সবাই ভিড় করেছিল, কিন্তু, অবিনাশ আসেননি। নিজের বাড়িতে বসে ছিলেন।'
উঠে দাঁড়ালাম। ‘মোটামুটি সবই বলে দিয়েছি। আর মনে হয় আপনাদের কিছু জানার নেই। শেষদিন কী ঘটেছিল, পুলিশ ফাইলে সমস্তটা আছে। এবার কি আমি যেতে পারি?’
অক্ষয় বাধা দিলেন না। রাস্তায় পা রেখে হতাশায় মাথা ঝাঁকালাম। কত বড়ো ভুল— কী সাংঘাতিক অন্যায় করতে যাচ্ছে ওরা, কেউ যদি জানত! নিরপরাধ একজনকে শাস্তিই শুধু নয়। আসল অপরাধী একটা মৃতদেহকে ওভাবে স্টেজ করে নীচে চিরুনিটা রেখে দিল, শুধুমাত্র একটা মেসেজ দেবার জন্য। সেটাকে ও অগ্রাহ্য করল ওরা। তবু, আমার কিছু যায় আসে না। আমি বাড়ি ফিরব, ভুলে যাব সমস্ত কথা। কিন্তু, রাস্তার সামনে এসে আমি থমকে দাঁড়ালাম। জোলো বাতাস রাত্রের ফাঁকা শহরের ওপর দিয়ে উড়ে গেল। কেঁপে উঠল খানাখন্দে জমানো জল। অনেকটা সময় ধরে আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেবে গেলাম, কীভাবে রাস্তা পেরোব।
‘নির্মলার বর আত্মহত্যা করেছিল। বউ গ্রেপ্তার হবার পর সবাই ভাবত ও বাচ্চা চুরি করেছে। এমনকী খালাস পেলেও লোকের সন্দেহ যায়নি। গ্রামবস্তির সমীকরণ অন্যরকম হয়, শহরের মতো না। এখানে একবার গায়ে দাগ লেগে গেলে ওঠে না। ওদের একঘরে করে দিয়েছিল অন্যেরা। কথা বলত না। দোকান, বাজার, মুদিখানা বন্ধ। দু-মাইল দূর থেকে বাজার করে আসতে হত। এমনকী সামান্য তেল কি নুন ফুরিয়ে গেলেও হাঁটো দু-মাইল। ওর বর চাপ নিতে পারেনি। মাসতিনেক পরে গলায় দড়ি দেয়।' অবিনাশ বললেন।
'নির্মলার কী হয়েছিল?'
‘ওর মেয়ের বিয়ে হয়েছিল রায়গড়ে। মা-কে সে নিতে চায়নি। সম্ভবত শ্বশুরবাড়ির চাপে। নির্মলার বাপের বাড়ি, বুড়ো বাপ-মা, তার ভাইয়ের সংসার, সেখানেও নির্মলা টাকা দিত। কিন্তু, তারা বলেছিল সংস্রব রাখবে না মেয়ের সঙ্গে। নির্মলা গঞ্জ ছেড়ে মুর্শিদাবাদ চলে গিয়েছিল, সেখানে নাকি বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করত। শেষ বয়েসে ফিরে আসে, কারণ শরীর অশক্ত হয়ে যাবার পর কাজগুলো হারিয়েছিল। অন্য কোথাও যাবার ছিল না। বছর দশেক বেঁচে ছিল তার পরেও। কেউ দেখত না। টুকটাক কাজ করত, যা পারে। প্রায় বিনা চিকিৎসায় মরেছিল বলা যায়। টিবি হয়েছিল। ঘর থেকে শেষদিকে বেরোত না। ছোঁয়াচের ভয়ে লোকে এড়িয়ে চলত। ডাক্তার দেখাবার সামর্থ্য তার ছিল না ।'
‘আপনি তো টাকাপয়সা দিয়েছিলেন।' সমর বললেন অবিনাশকে। অবিনাশ না-শোনার ভান করলেন।
কিছু বলার সাহস আমার ছিল না। মাথা ঝুঁকিয়ে কাঠ হয়ে বসে ছিলাম। অ্যারনও চুপ। অবিনাশ বললেন, ‘এসব বাদ দে। অনেকদিন হয়েছে। এরা খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি। বাচ্চাটার কী হয়েছে জানলে তুইও স্বস্তি পেতি, ঠিক কিনা? ওইটুকু শিশু, সে তো শত্রুতা করেনি কারোর সঙ্গে।'
‘তা ঠিক, কিন্তু এখন কি মনে আছে অত কিছু?'
‘আমি একটা জিনিস জানতে চাই, সমরদাদা।' বললাম। ‘বাচ্চাটা নিখোঁজ হয়েছে শোনার কিছুক্ষণ আগে থেকে কিছুক্ষণ পরে, আপনি কাকে কোথায় দেখেছিলেন। মনে আছে?' কিন্তু, সমরের স্মৃতি থেকে নতুন কিছু পাওয়া গেল না। তবে, কেউ একজন দোতলা থেকে ইংরেজিতে চিৎকার করেছিল, সেটা তাঁরও মনে আছে দেখলাম।
‘আপনার কাউকে সন্দেহ হয়নি?”
‘কী হবে এখন এসব বলে?’
‘তবুও, একটা মিথ্যে অপবাদ আপনার ওপর এসেছিল। আপনার তো মনে হতেই পারত, অমুক লোককে আমি দেখেছিলাম, আমার মনে হয়েছিল সে এমন কাজ করতে পারে, কিন্তু তাকে কেউ ধরল না, ধরল আমাকে। এরকম হয় তো, তাই না? সেরকম কাউকে মনে হয়েছিল?'
‘দেখুন দিদি, আমার মতো অন্য নিরপরাধ মানুষ শাস্তি পাক, সেটা চাই না। পুলিশ আমাকে বিনা দোষে অনেকবার তুলেছে। তাই জানি, কেমন লাগে। আমি আজ রাগ মেটাতে বলে দিলাম ওই লোকটার ব্যবহার সন্দেহজনক ছিল, তারপর তার জীবনটা নরক হল।' পুলিশ কিছু করবে না, একথা সমরকে বলে লাভ নেই। তিনি অনেক বেশি জীবন দেখেছেন। ‘আর সাধারণ মানুষের সন্দেহ? নির্মলাদিকেও তো পুলিশ ছেড়ে দিয়েছিল। তাতে কি সে তার হারানো জীবন ফিরে পেয়েছিল?’
‘তোর অ্যাগনেসকে মনে আছে?' হঠাৎ প্রশ্ন করলেন অবিনাশ ।
সমর ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। ‘অ্যাগনেস আবার কে? এমন নামের কাউকে তো শুনিনি! ‘একটা মেয়ে, যে হারিয়ে গিয়েছিল। তার ভূতকে সবাই দেখে।’
‘ওহ্, সেই পাগলি মেমসাহেব! সে তো হারিয়েছিল আমি শহরে আসার আগে। তাকে আমি চোখে দেখিনি। তবে, তার ভূতকে দেখেছি।'
‘কোথায় দেখলেন?'
পেয়ারায় কামড় বসিয়ে কচমচ চিবোচ্ছিলেন সমর, সেই অবস্থায় মাথা নামিয়ে চিন্তা করলেন। ‘অনেক বছর আগে, তা ধরুন কুড়ি তো হবেই, আমি বড়োরাস্তা দিয়ে ফিরছিলাম। তখন সন্ধে যায় যায়, গরমকাল, ভালো বাতাস দিচ্ছে। তো, জোহার হালে পেরোবার সময়ে দেখি আলো জ্বলছে। অত রাত্রে ওখানে কেউ যায় না, আলো কে জ্বালাবে? এক হতে পারে কাঠের চোরাকারবারিরা। সাইকেলটা সাবধানে নামিয়ে বাইরে থেকে উঁকি মারলাম। জায়গাটা তো দেখেছেন, ঢালু হয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে। মাঝামাঝি ঢালে দেখি কে একজন দাঁড়িয়ে। তার পায়ের দিক থেকে আলো বেরোচ্ছে। অন্য কেউ হলে সেখানেই ভয়ে চেঁচিয়ে উঠত। কিন্তু, আমরা রায়বাবুর চ্যালা। রায়বাবু বলেছিলেন, ততক্ষণ সাহস ধরে রাখতে যতক্ষণ বোকা অ্যাডভেঞ্চারে পরিণত না হয়। তাই ভাবলাম, আরেকটু দেখি। কয়েক পা সরে গিয়ে দেখলাম, পায়ের কাছে একটা হ্যারিকেন রাখা। তার থেকে আলো বেরোচ্ছে। দেখলাম, দাঁড়িয়ে এক লম্বা মেমসাহেব। সাদা গাউন পরা, লাল চুল। শুকনো পাতায় মনে হয় পায়ের আওয়াজ হয়েছিল, তাতে হ্যারিকেন হাতে তুলে মেমসাহেব মুখ ফেরাল। তখন সন্ধেবেলা, তবু হ্যারিকেনের আলোয় দেখেছিলাম, কী নীল সে-চোখ! ওই চুল আর চোখ দেখেই বুঝেছি, কাকে দেখছি। আমি এগোইনি, সেভাবেই দাঁড়িয়ে— মিথ্যে বলব না, রায়বাবু যা বলে থাকুন, তখন একটু ভয় ভয়ই লাগছে। শুধু জানি, মেমসাহেব ক্ষতি করে না। তো, সে-ও দাঁড়াল না। হ্যারিকেন হাতে দ্রুতপায়ে জোহার হালের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে গেল। কোথায় গেল, দেখিনি, কারণ ওপরের দিকটা গাছপালায় ঢাকা। আলো ক্ষীণ হয়ে গেল। আমিও বড়ো নিশ্বাস ফেলে সাইকেলে উঠে বসলাম।’
‘শুধু দাঁড়িয়েই ছিল, না, কিছু করছিল? হাতে কিছু দেখেছিলি?'
‘মনে তো হল দাঁড়িয়েই ছিল। হাতে কিছু দেখিনি, দেখলেও মনে নেই এখন। কিন্তু, সেই মেমসাহেবের কথা কেন আনছেন এখানে? তাঁর সঙ্গে কিছু যোগ ছিল?” ‘নাহ্। আসলে, দু-জনেই হারিয়ে গেছে তো, তাই।'
‘কী আশ্চর্য ব্যাপার দেখুন। আপনারা বলায় মনে পড়ল। বছর দুয়েক আগে এক ভদ্রলোক এই শুঁড়িখানার কাছে গাড়ি থামিয়ে একে, ওকে মেমসাহেবের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করছিলেন। কেউ ইদানীংকালে ওর ভূতকে দেখেছে কি না। একজন জিজ্ঞাসাও করল, কেন জানতে চাইছেন। তাতে বললেন, ভূত থাকলে নাকি টুরিস্ট স্পটের দাম বাড়ে। তারপর চলে গেলেন।'
আমরা পাথর। অ্যারনের নিশ্বাস পড়তে ভুলে গেছে।
‘আমাকে অবশ্য জানতে চাননি কিছু। তবে, কাছে ডেকে দুই হাজার টাকা দিয়েছিলেন। এমনিই। আমাকে চেনেনও না। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কিছু লাগবে কি না। তাতে জানালেন, কিছু লাগবে না। যেন নিজের খেয়াল রাখি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমাকে কি চেনেন? তাতে বললেন, চেনার দরকার লাগে না।'
‘আর এসেছিলেন তার পরে?' অবিনাশ চাপাস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন।
‘নাহ্। ওই একবারই।’ কেমন দেখতে জিজ্ঞাসা করায় সমর বিভ্রান্ত চোখে মাথা নাড়লেন। ‘সাধারণ মানুষের মতোই। মাঝারি উচ্চতা, কামানো চৌকো মুখ। কপালে একটা কাটা দাগ ছিল।’
নীরবে মদ খেলেন কিছুক্ষণ, অবিনাশ আর সমর। তারপর সমর হাসলেন, “তবু আপনারা খোঁজখবর নিলেন। কেউ জানতেও চায় না, মরে আছি না বেঁচে। ছেলে দুটোও তো অমানুষ হয়েছে। অবিনাশ স্যারকে বলেছিলাম, ছোটোটাকে পুলিশে ঢুকিয়ে দিন। তা বলেন, অন্তত স্কুল পাশ না হলে হবে না। গণ্ডমূর্খ হয়েছে এদিকে। বখাটে, নেশা করে। আমিও করি, তবে হাঙ্গামা পাকাই না। এদিকে এ চুতমারানির ব্যাটা দু-বার লক-আপে গেছে। বাড়িতে সারাক্ষণ বউ আর মেয়ের খ্যাচখ্যাচ। সাধে কি এখানে পড়ে থাকি?'
অ্যারন উঠে দাঁড়াল। দেখাদেখি আমিও। ‘থ্যাঙ্ক ইউ, সমরদা। অনেক উপকার করলেন আমাদের। আজ আসি। দরকারে আবার আসব।' কয়েক পা হেঁটে ঘুরে দাঁড়াল অ্যারন। অবিনাশ ততক্ষণে গেলাস শেষ করে মুখ মুছছেন। ‘যা বলেছিলাম আপনাকে তখন—যদি এমন কিছু অস্বাভাবিক দেখেছিলেন যা মনে থেকে গেছে, আমাদের বলতে পারেন।'
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে আমাদের দেখলেন সমর। তারপর বললেন, ‘একজনের চালচলন আমার সুবিধের মনে হয়নি। কিন্তু, সেটা আমার বোঝার ভুল হতে পারে।' আমরা সমরের দিকে এগোলাম।
“দেখুন, বাড়িতে নতুন বাচ্চা হয়েছে, সবাই দেখতে আসবে, আদর করবে, তাকে নিয়ে আনন্দ করবে, সে তো স্বাভাবিক। কিন্তু একজনকে দেখেছি, ও বাড়িতে দুইবার এসেছিল। ক্রিসবাবাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। আঙুলের গড়ন, কানের লতি, নাক। ঝুঁকে পড়ে মনোযোগ দিয়ে দেখছে আর বিড়বিড় করে বলছে, ‘মিলে যাচ্ছে। মিলতেই হবে'। তাকানোর ধরনটা আমার ভালো লাগেনি। কেমন যেন অস্বাভাবিক। তিনি এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুইবার এসেছিলেন। আমি যদিও বাইরে থাকতাম, কিন্তু দুইবারই বাড়ির ভেতরে নানা উপলক্ষে থাকতে হয়েছিল সেইসময়টায়। দুইবারই দেখেছিলাম বিড়বিড় করে নিজের মনে কথা বলতে বলতে ক্রিসকে খুঁটিয়ে দেখছেন। আমরা গ্রামগঞ্জের মানুষ। বাচ্চার ওপর নজর পড়া, ডাইন, এসব মেনে চলি। আমাদের গ্রামে যদি এরকম করে কেউ বাচ্চা দেখে, তাহলে সঙ্গেসঙ্গে গালাগালি দেব তাকে, নাহলে জিজ্ঞাসা করব, কেন ওভাবে নজর দিচ্ছে। তেমন বেচাল দেখলে দুই ঘা দিয়ে দিতে পারি। কিন্তু বড়োলোকের বাড়ি, আপনারা শিক্ষিত মানুষ, আপনাদের তো এসব বলা যায় না! আমি জানি, বাড়ির অন্য কেউ খেয়ালও করেনি। আমারই চোখে লেগেছিল। আমি আদেশ যাদবকে বলেওছিলাম। সে এসবে জড়াতে বারণ করেছিল। শেষে আমার ঘাড়ে দোষ পড়বে।' গ্লাসের অবশিষ্ট মদ শেষ করে ঠোঁট মুছলেন সমর। ‘দুইবার এসেছিল। দ্বিতীয়বার এসেছিল ক্রিসবাবা হারিয়ে যাবার তিনদিন আগে ।
‘কে?’
’‘ওই যে পাগলি বুড়ি, যে ভূত নামায়। তখন অবশ্য জোয়ান ছিল।‘জেনিফার!
'হ্যাঁ হ্যাঁ, জেনিফার ম্যাডাম। চোরের মতো ভঙ্গিতে তাকাচ্ছিল
চারপাশে। ওই তাকানো দেখেই ভালো লাগেনি আমার।'
‘তখন আমাদের জানাসনি কেন?' অবাক গলায় অবিনাশ বললেন।
‘আমার ঘাড়ে ক-টা মাথা, স্যার! এডওয়ার্ড স্যাররা বড়োলোক মানুষ, জেনিফার ম্যাডামও তাই। তার ওপর অ্যাংলো। আমাদের মানুষ বলে জ্ঞান করত না। আমি যদি বলতাম একথা, ওদের পুলিশ তো কিছু বলতই না, উলটে আমার সব জায়গায় কাজকম্ম বন্ধ হয়ে যেত। আপনারাও ভাবতেন, অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছি। আমি যদি নিৰ্মলাদি বা আদেশ যাদবের ঘাড়ে সন্দেহ চাপাতাম, তাহলে কিছু বলতেন না। কিন্তু, জেনিফার ম্যাডামকে দোষী বলব, আর আপনারা তারপর আমার গায়ে আঁচড় অবধি কাটবেন না, এতটা বোকা আমি নই। আমাকেও তো অনেকবার তুলেছেন আপনারা। এখন বলছি কারণ আর কিছু এসে যায় না।’
অন্যমনস্ক স্বরে অ্যারন বলল, ‘জেনিফার !
‘তবে আমার ভুলও হতে পারে, বললাম তো। শুধুমাত্র সন্দেহের বশে একজনকে ‘তবু, কেন নয়? হতেই তো পারে!”
‘সেসব ভাবিস না। শুধু, তুই যদি আগে বলতিস, কাজ কমে যেত আমাদের।' গাড়ির কাছে এগিয়েছে অ্যারন, নিজের চিন্তায় মগ্ন। আমি পেছন ফিরে দেখলাম, সমরের বুকপকেটে কিছু গুঁজে দিচ্ছেন অবিনাশ ।
‘এভাবে কত দেবেন, স্যার! ফুটো নৌকা কি আর মেরামত হয়! বরং, ছেলেটাকে যদি কিছু জুটিয়ে দিতেন—
‘জুটিয়ে দিয়ে লাভ নেই। তোর ছেলে তোকে তাতেও দেখবে না। বউয়ের হাঁপের একটা টান ওঠে বললি না? লাতেহারে ভালো ডাক্তার বাঁসে, দেখিয়ে নিস এটা দিয়ে। ওদের দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র, শুধু ওষুধের পয়সা দিবি।'
‘জেনিফার! আগে কেন মাথায় আসেনি!' অ্যারন আক্ষেপের ভঙ্গি করল। অবিনাশ শালগাছের গায়ে হেলান দিয়ে সিগারেট খাচ্ছেন। আমি ফিসফিস করে ‘স্যাক্রিফাইস’ উচ্চারণ করলাম। মাথা নাড়ল অ্যারন। ‘জেনিফার দুইবার যে বলেছিলেন, “সব মিলে যাচ্ছে”, সেটা হয়তো লক্ষণ মেলাবার কথা বলেছিলেন।
‘তুমি কী বলছ, জানো? এত ক্যাজুয়ালি বলছ কী করে?'
‘শুনতে ভালো লাগবে না তোমাদের। অবশ্য আমি জানি না, জেনিফার কতদূর যেতে পারেন। মানে, তাঁর চরিত্রে সেরকম পাগলামি ছিল কি না যে কারণে একটা বাচ্চাকে অপহরণ করা যায়।' অ্যারনের হাত চেপে ধরলাম আমি। কথাটা যদি মনীষার কানে যায়—কিন্তু ওর কি এসে যায় কিছু? ‘জেনিফারের নামে আগেও কোনো ফাউলপ্লে-র অভিযোগ উঠেছিল কি—' অ্যারন অবিনাশের দিকে ফিরল। তিনি নিজের ভাবনায় মগ্ন। দু-বার ডাকার পর হুঁশে এলেন, কিন্তু কিছু বলতে পারলেন না। তিনি যতদিন এখানে পোস্টেড ছিলেন, শোনেননি কিছু।
‘জেনিফার অন্যের জীবনের কাদা ঘেঁটে লোককে বলে, জাস্ট ফর ফান। এটুকুও যথেষ্ট খারাপ। কিন্তু, এর বাইরে— আমার বিশ্বাস হচ্ছে না অ্যারন। কিন্তু '
‘অবিশ্বাস করতে ভরসা পাচ্ছ না, তাই তো?”
‘কী করা যায় এখন? জেনিফারকে জিজ্ঞাসা?' অবিনাশ প্রশ্ন করলেন।
‘অস্বীকার করবে। তারপর ঝগড়াঝাঁটি চিৎকার করবে। শহরময় ছড়িয়ে বেড়াবে মিথ্যে কেচ্ছা। অন্যভাবে ধরতে হবে ওকে।' আমার ভুরু কুঁচকে গেল। ‘শুধু জেনিফারকে নিয়েই ভাববে? দুই বছর আগে একটা লোক এসে অ্যাগনেসের খোঁজ নিয়েছিল, সেটা তোমাদের ভাবাচ্ছে না? আমরা ছাড়া আরও কেউ কেউ তাহলে অ্যাগনেসকে নিয়ে ইন্টারেস্টেড! অ্যাগনেস বেঁচে থাকতে অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। হারিয়ে যাবার এত বছর পরেও করছে। অথবা, অ্যারন মনে করাল, তার ভূত করছে। কিন্তু, এই গুজবে আমি পাত্তা দেবই-বা কেন? ‘ভূতের পয়েন্টটায় আমার ইন্টারেস্ট নেই। থাকলে থাকবে, না-থাকলে থাকবে না। মানে, যতক্ষণ না অলৌকিক কোনো অস্তিত্ব আমার কাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, সে ভূত, ভগবান যা-ই হোক না কেন, তাকে নিয়ে আমার কিছু এসে যায় না। আমি বেশি ইন্টারেস্টেড মানুষ অ্যাগনেসকে নিয়ে। এখনও কেউ কেউ তাকে নিয়ে কৌতূহলী। কেউ কেউ চায় না তাকে নিয়ে চর্চা হোক। ক্রিসের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক কী? আদৌ কিছু কি আছে, নাকি, পুরোটাই আমার কল্পনা?’
‘একটা জিনিস আমার মনে হয়।' বলল অ্যারন। ‘ওরকম লাল চুল আমাদের টাউনে কারোর ছিল না। নীল চোখ অবশ্য অনেকেরই আছে, জেনিফারের প্রয়াত বরের ছিল, কিটি গোমসের আছে, আমার ঠাকুরদার ছিল। ম্যাকিনলের বড়োমেয়ে হিল্ডার শুনেছি ছিল বেড়ালের মতো কটা চোখ। কিন্তু তাদের চুল ছিল হয় কালো, নাহলে ধূসর, বড়োজোর বাদামি। ডলোরেসের চুল, চোখ দুটোই কুচকুচে কালো। তো, ওই নীল চোখ আর লাল চুলের মেয়েকে একবার দেখলে একজন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে একজন ভারতীয়, সে বার কয়েক ফিরে তাকাবেই। আর, এরকম মেয়েদের ব্যবহারে সামান্য উত্থানপতন, হয়তো চেঁচিয়ে কিছু বলল কাউকে বা রাগ করল, কয়েকগুণ বড়ো আকারে দেখা দেবে তাদের চোখে। তারা ভাববে এ বদরাগী। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। আমাদের ছোটোবেলায় হিন্দি সিনেমা দেখে ধারণা হয়েছিল যে, ফ্রেঞ্চকাট, দাড়িওয়ালা, টাকমাথা লোক মানে, সে বদ । রাস্তায় এরকম লোক দেখলে আমি বার বার তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতাম। সে হয়তো পার্কে বসে তার ছেলেকে বকছে, কিন্তু আমার মনে হত লোকটা এবার ছেলেটাকে গলা টিপে খুন করবে। লাল চুল, নীল চোখের সুন্দরী মেয়ের ক্ষেত্রে সেটা হয়ে দাঁড়ায় অতিজাগতিক কিছু। মেয়েটা যেন এ পৃথিবীর নয়, তার অস্তিত্ব এবং আচার-ব্যবহার আমাদের সঙ্গে মেলে না। এটা সচেতনভাবে কেউ ভাববে না, কিন্তু মনের ভেতর এগুলো আসতেই পারে। তাই এই মেয়েটার সঙ্গে উন্মাদনা বলো বা বহু প্রেমিক, এগুলো কানেক্ট করে দেওয়া সহজ। হয়তো তাকে পর পর দু-দিন দুটো আলাদা ছেলের সঙ্গে দেখা গেল, একজনের সঙ্গে স্কুল যাচ্ছে, আরেকজনের সঙ্গে টিউশনি। কিন্তু, লোকে ভেবে নিল দু-জনেই ওর প্রেমিক। ডলোরেসের বেলায় কিন্তু ভাববে না। তাকেও দেখতে-শুনতে মন্দ নয়, রূপও আছে। কিন্তু, তার চেহারায় এমন ব্যাপার নেই যা আউট অফ দ্য বক্স, ভারতীয় চোখে অন্তত। তাই এখানে, তনয়া, তোমার প্রশ্নের একটা উত্তর হতে পারে যে, রূপ নয়, বরং অন্যরকম ফিচারগুলো ওর সম্পর্কিত অতিকথা উসকে তুলেছে।'
এভাবে ভাবিনি। আমি মনের ভেতর যে অ্যাগনেসকে বানিয়ে নিয়েছিলাম সে রহস্যের প্রতিমূর্তি। কিন্তু, অ্যাগনেস আসলে তো একজন কিশোরী মাত্র, তাকে ভুলব কী করে?
‘একটা সমাধান না-হওয়া রহস্য কীভাবে অনেকগুলো জীবন নষ্ট করে দেয়, সেটাই আসল গল্প, তনয়া।’ বলল অ্যারন। ‘এটার কথা তোমাকে বার বার বলেছি। একটা কমিউনিটির ওপর কী প্রভাব পড়ে। ডিটেকটিভ গল্পগুলো অসম্পূর্ণ, কারণ সেখানে এই কাহিনিগুলো নেই।’
‘এমন কাহিনি, যেখানে তোমার পরিবার একইসঙ্গে ভিক্টিম এবং অপরাধী।' তখন চোখে পড়ল, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দীপিকা সরেন হেঁটে যাচ্ছে। গুনগুনিয়ে গান করছিল, নাম ধরে ডাকায় থমকাল। তারপর এগিয়ে এল কাছে।
‘তুমি নাকি গোয়েন্দা?'
‘তেমন কিছু না। তোমার বাড়ির ঠিকানা দিলে না তো! তাই খুঁজে পেলাম না সেদিনের পর।'
‘তাতে কী হল! শহর তো ঘুরে নিয়েছ।' অ্যারনের দিকে সোজাসুজি তাকাল। ‘তোমার বয়ফ্রেন্ড?' অ্যারনের মুখে বিকার নেই, সে সিগারেট ধরিয়ে অবিনাশের দিকে হেঁটে গেল। ‘না। পরিচিত একজন। ব্রাউনদের বাড়ির ছেলে।'
“ওহ্! অ্যাংলোদের আমরা পছন্দ করি না, জানো তো! ওদের চার্চ নাকি আমাদের ধরে ধরে খ্রিস্টান বানাবে। তাই এখানে স্কুল খুলবে, মিশনারিরা হাসপাতাল বানাবে।' কিন্তু দীপিকার মুখ দেখে মনে হল না সত্যিই কাউকে অপছন্দ করার তীব্রতা তার ভেতর আছে। ‘এই ছেলেটাও তো অ্যাংলো, কিন্তু দেখতে গুন্ডাদের মতো। এরকম কাউকে বয়ফ্রেন্ড বানালে কী করে?'
‘আবার বাজে কথা? স্কুল তো এখানে অনেক আগে থেকে ছিল। মিশনারিরা এসে ১৯৩৫ সালে স্কুল বানিয়েছিল।'
‘তখন থেকেই নাকি সবাইকে খ্রিস্টান বানাচ্ছে? তাই তো ওরা পালটা মন্দির তৈরি করছে এত। আমাদের বলেছে চার্চের মেলায় যেন না-যাই। আমাদের নাকি লাঠিখেলা আর ক্যারাটে শেখাবে।'
দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ‘দীপিকা, তুমি অ্যাগনেসের ভূতকে দেখেছ?'
‘না। তবে এখানে অনেকে ভূত। মানুষের ছদ্মবেশে ঘোরে। জোহার হালে-তে রাত্রিবেলা গেলে দেখবে, ফিসফিস করে কথা বলছে অনেকে, ছায়ার মতো ঘুরছে। তাদের হয়তো সকাল বেলা বাজারে স্টেশনে দেখেছ, দিব্যি চা খাচ্ছে ক্যারম পিটছে, কিন্তু রাত বাড়লে জঙ্গলে ফিরে যায়।'
‘সবাই অ্যাংলো ভূত?'
‘তা কেন হবে! আমরা তো ওদের আগে থেকে আছি এখানে। আমাদের ভূত অনেক। আমরা রাতুর মহারাজের প্রজাদের বংশধর, জানো তো! টুরিস্ট পার্টি আসার পর আমাদের গ্রামের মেয়েরা ধামসা মাদল নিয়ে নাচতে যাবার বরাত পায়।' মিচকি হাসল দীপিকা। ‘মানুষ কম যায়, ভূতের দল যায় বেশি। মানুষ যাবেই-বা কেন! আমরা কেউ নাচতে-ফাচতে পারি না। মাদল আমি ছুঁয়েও দেখিনি কোনোদিন। ওরা মেয়েদের ছবি তুলে রাখে, যেন চিড়িয়াখানা এসেছে। তারপর যখন বাড়ি ফিরে ফোন খুলে বসবে, দেখবে ছবি আছে কিন্তু মেয়েরা গায়েব। ভূতেদের ছবি ওঠে না।'
“ব্রাউনদের বাড়ি থেকে যে বাচ্চাটা হারিয়ে গিয়েছিল, তাকে কে গায়েব করেছিল, তোমরা কখনো কিছু শোনোনি?
“তুমি এত জানতে চাও কেন বলো তো? সিনেমা বানাবে আমাদের নিয়ে? নাকি, ডকুমেন্টারি? ইউটিউবে তুলবে?”
‘কেন, নিজের ইচ্ছেতে জানতে পারি না?
‘তুমি সেই পাবলিকগুলোর মতো। একবার একটা দোকান থেকে বার্গার কিনে খাচ্ছিলাম আমি আর আমার এক বান্ধবী, দেখি কয়েকটা টুরিস্ট পার্টি এসে চোখ গোল করে দেখছে। সাঁওতালদের বার্গার খেতে দেখেনি মনে হয়। আবার ছবি তুলছিল। চুতিয়ার বাচ্চাদের ওপর অ্যায়সান রাগ ধরল যে বার্গার ছুড়ে ফেলে মা, বোন তুলে খিস্তি করলাম। তখন বলে, নিজেদের ইন্টারেস্ট থেকে ছবি তুলছিল। ইন্টারেস্টের মা কি আঁখ! তোমারই-বা এত ইন্টারেস্ট কেন? ওসব কতদিন আগের কথা, আমরা ভালোই আছি সবাই।'
দীপিকাকে দেখতে দেখতে অ্যালিসের কথা মনে পড়ল। একটা মেয়ে, যে কথা বলে না, জিপসিদের রাজকন্যা। অন্যমনস্ক স্বরে বললাম, ‘তবু আমাকে খুঁজতে হবে।'
‘খোঁজো তাহলে। আমি যাই। তবে, উত্তর তুমি পাবে না।' ফিক করে আবার হাসল দীপিকা। ‘এখানে সবাই পেটে কথা লুকিয়ে রাখে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না।' দৌড়ে দীপিকা এগিয়ে গেল, পিছু ফিরে চেঁচাল আবার, ‘যখন চলে যাবে, আমাকে ভুলো না কিন্তু ! আমিই তোমাকে রাস্তা চিনিয়েছিলাম প্রথমদিন।' তারপর হি-হি হেসে জঙ্গলে ঢুকে গেল।
অবিনাশ গেলেন অন্য একটা কাজে। আমি আর অ্যারন বাড়ির পথে হাঁটা লাগালাম। শিশিরের দল শুকিয়ে গেছে। পাশের জঙ্গলে মহুয়া গাছের তলায় পাতা পোড়াচ্ছে একদল আদিবাসী। কাঁচা ফুল সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করবে তারা। আমাদের দেখে কপালে হাত ঠেকাল একজন। হিন্দিতে বলল, ‘মাই বাপ ভগবান'। দূরে পূর্বের পাহাড়ে সবুজ রং ধরেছে। জোয়ার, বাজরা, গম কাটার মরসুম। একঝাঁক বটের উড়ে যাচ্ছে মাঠের ওপর দিয়ে। কী অনর্থক অপচয়, হাঁটতে হাঁটতে মনে হল আমার। ক্রিস চলে গেছে, তার খোঁজ করে এতদিন পরে কী ইতরবিশেষ হবে? কেন অ্যারনেরা অন্য পাঁচটা স্বাভাবিক মানুষের মতো বাঁচবে না? বর্তমানে বাঁচবে না? সেই একই কাজ, অন্তর্ধান রহস্যের তদন্ত, সেই এক, আবার এবং আবার এবং আবার করে যেতে হবে, যেন সময় এক চ্যাপটা বৃত্ত যার ভেতর আমরা ফিরে ফিরে আসব সেই এক বিভীষিকার কাছে, আর তবু, এ সমস্তই এক অন্ধগলি। অ্যাগনেসের স্মৃতির মতো অন্ধগলি। নির্মলা দুবের মরে যাবার মতো।

‘কারণ আমার এই পুত্র মরিয়া গিয়াছিল, এখন বাঁচিল ; হারাইয়া গিয়াছিল, এখন পাওয়া গেল। তাহাতে তাহারা আমোদপ্রমোদ করিতে লাগিল।'
- Luke | 15:24
সমর দোসাদের কাছ থেকে ফিরে আসার রাত্রে আমার আবার দেখা হয়েছিল রকির বাবার সঙ্গে। তাঁকে আমি জানিয়েছিলাম যে অ্যাগনেস পালিয়ে যাবার বদলে তাকে পাচার করে দেওয়া হয়েছিল, এটাও ভাবা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এমন জায়গায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল যেখান থেকে সে যোগাযোগ করতে পারেনি। তার ছিল অল্পবুদ্ধি, মাঝে মাঝেই এখানে-ওখানে পালিয়ে যেত, এমন মেয়েকে লোভ দেখিয়ে পাচার করা অস্বাভাবিক নয়। অ্যাগনেস মাইনর ছিল। ভারতীয় আইনে এর শাস্তি যত বড়োই হোক না কেন, যথেষ্ট ডেটারেন্ট যে নয়, আক্ষেপ করেছিলাম আমি। আমি কি তাহলে মৃত্যুদণ্ড চাই? এরকম একএকটা ঘটনা একটা পরিবারকে কীভাবে সারাজীবন ট্রমায় রাখে, কাজের সূত্রে দেখেছি। তাই তাদের দুঃস্বপ্নকে লেভেল আউট করতে পারে এমন কী শাস্তি হতে পারে, আমি জানি না। কথাগুলো নিজের মনে বলছিলাম। রকির বাবা চুপচাপ শুনছিলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ‘হয়তো আমরাই ভুল। এত বছর পেরিয়ে এসে আবার নতুন করে ফিরে দেখতে গেলে কিছু মেলে না, ধোঁয়াশা বরং বাড়ে। তবু, আপনি তো চেষ্টা করেছিলেন!' তিনি জানেন, আমার ফিরে যাবার সময় হয়ে এসেছে।
তার পরদিন সকাল বেলা ডলোরেসের লোক এসে অ্যাগনেসের ডায়েরির প্রিন্টআউট দিয়ে গেল আমাকে। এবার সব গোটানোর পালা। নতুন করে জানার কিছু নেই। এখানে এর থেকে বেশিদিন থাকলে কোনো সূত্র পাওয়া যেতে পারে বলে আমার বিশ্বাস হয়নি। এখান থেকে যদিও অফিসের কাজ করছিলাম, কিন্তু তাতে সব হয় না। সাবিং-এর অনেক কাজ থাকে, ডিজাইনারদের সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলতে হয়, দরকারে ইনডিজাইনে নিজেকেও হাত লাগাতে হয়। আমি মহেশকে ফোন করে কনফার্ম করলাম, পরশু রাঁচি থেকে ফ্লাইট ধরছি। তার পরদিন জয়েন করব অফিসে। বারান্দায় এসে দেখি, অ্যারন আর বারবারা বসে আছে। অ্যারন তাকে জানাচ্ছে গত দুইদিনের বিবরণ। বারবারাকে আমি তখন জেনিফারের কথা বললাম। বারবারা আমার দিকে তাকাচ্ছিল না, অদ্ভুত আচরণ করছিল। আমি ওকে বলতে চাইনি, কিন্তু মুখ দিয়ে বেরিয়েই গেল শিশুবলির কথা। ওর মুখ ফ্যাকাশে হল, কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে বাগানে বসে পড়ল বারবারা। ও কি এখন আমাকে ঘেন্না করছে? অ্যারন পিসির দিকে তাকিয়ে ছিল, ঘাড় ঘোরানো অবস্থায় আমাকে বলল, ‘রেভারেন্ড গরম্যানের দয়া আর ঐশ্বরিক অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি এসে শেষ হল জেনিফারের ব্ল্যাক ম্যাজিকে। এরপরেও তুমি দাবি করবে, মানুষ বাস্তববাদী?”
‘এখন এগুলো না-বললেই নয়? এমপ্যাথি বলে শব্দ কি তোমার অভিধানে নেই?'
‘একটা টাউন, টাউনও নয়, তার স্মৃতি, তার ঘনিয়ে আসা জঙ্গল, তার ভেতর গুটিকয় মানুষের পাগলামো আর নৃশংসতা, এর কোনটা আমাদের এমপ্যাথির যোগ্য ছিল বলে তোমার মনে হয়? আমার হাতে সিগারেটের ছ্যাকাগুলো তুমি দেখেছ। আমার বাবাকে দেখেছ। জেনিফারকে দেখেছ। এরা চার্চে যায় প্রভুর করুণা পাবার আশায় কারণ একটা দিনকে কাঁধে বয়ে টেনে নিয়ে যাবার জন্য এর থেকে বড়ো উপকরণ এদের কাছে কিছু নেই। তারপর দিনের শেষে এরা সেই ডিভাইন গ্রেসকে টেনে আনে অলৌকিকতা আর ঝাড়ফুঁকের চৌহদ্দিতে, কারণ সেটা এদের কমফর্ট জোন। তারপরও তোমরা আশা করো এমপ্যাথি নামক শুশ্রূষা বর্ষিত হোক মানুষের ওপর? প্লিজ গিভ মি আ ব্ৰেক !”
মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হল আমার। জিভের ডগায় চলে এসেছিল ‘অ্যাসহোল’, নিজেকে সামলে বারবারার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। একবার মনে হল, ওকে বলি যে, ক্রিস মরে গেছে একথা আমিও বিশ্বাস করি না। কিন্তু, আকাশে সিসে রঙের মেঘ এসেছিল, ঝোড়ো হাওয়ায় কেঁপে উঠেছিল চরাচর, আর তীব্রবেগে এসে এডওয়ার্ডের গাড়ি স্যাংচুয়ারির গেটে ধাক্কা মারল। এডওয়ার্ড ছিটকে বেরোলেন। তার কয়েক মিনিট পর টাউনের লোকেরা দেখল আমি আর অ্যারন এডওয়ার্ডের গাড়ি চালিয়ে তিরের মতো ছুটে চলেছি লাতেহারের দিকে।
আর্চির কটেজের সামনে একটা লেবুগাছ। সেখান থেকে টুপটাপ ফুল ঝরে মাদকতাময় গন্ধে ভরিয়ে দিয়েছে শেষ দুপুর। সোঁদা হাওয়ায় তারা এদিকওদিক উড়ে বেড়াচ্ছিল। গেট ঠেলে ঢোকার সময়ে একটা জোর বাতাস বইল। ঝপ করে বাতাবি ফল পড়ল মাটিতে বিছানো শুকনো পাতার ওপর। কটেজের মাথায় একটা দাঁড়কাক বসে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার কামড়ে ধরা ঠোঁটের অভ্যন্তর থেকে একটা ল্যাজ ঝুলছে। মেঠো ইঁদুর। দেখলাম, ল্যাজটা একবার কেঁপে উঠল। খিঁচুনির মতো গুটিয়ে গেল একবার, পরক্ষণে টান টান সোজা হল। কিন্তু, কাক তাকে গিলছে না। আমাদের পায়ের শব্দে রক্তাভ চোখ তুলে অবিনাশ হাসলেন, ‘আমি স্যাংচুয়ারিতে যাব। এক্ষুনি।'
হল ঘরের চেয়ার, টেবিল ওলটানো। সেরকম একটা চেয়ারে পিঠ দিয়ে মেঝেতে বসে আছেন আর্চি, মনীষার তুতোই। বাসন, জামাকাপড়, বইপত্র ছত্রখান চারদিকে। ইতস্তত ছড়ানো ভাঙা কাচের টুকরো। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে আছেন আর্চি। অবিনাশ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে হাত মুঠো করছেন আর খুলছেন। কবজিতে রক্তের দাগ দেখলাম। এডওয়ার্ড আর মনীষা হল ঘরে বসে চা খাচ্ছিলেন। একপাশে বসে ফাইল বার করে দরকারি কিছু কাজ সারছিলেন আর্চি। হঠাৎ ঘরে ঢুকে আসেন অবিনাশ। আঙুল তুলে এডওয়ার্ড আর মনীষাকে বলেছিলেন বেরিয়ে যেতে, আর্চির সঙ্গে নাকি তাঁর বোঝাপড়া আছে। এডওয়ার্ড বারবারাকে ফোন করতে গেলে হাত মুচড়ে ফোন নিয়ে ছুড়ে ফেলেছিলেন। এডওয়ার্ড ভয় পেয়েছিলেন কারণ অবিনাশের এই রূপ আগে দেখেননি। তিনি মনীষাকে নিয়ে বারবারার কাছে আসেন। তাঁর মনে হয়েছিল অবিনাশ শারীরিক ক্ষতি করতে পারেন। আসার পথে মনীষার ফোন থেকে পুলিশ স্টেশনে ফোন করেছিলেন, বারবারাকেও। কিন্তু, কেউ ফোন ধরেনি। একবার ভেবেছিলেন থানায় যাবেন, কিন্তু মনীষা বললেন, দেরি হলে আর্চির ক্ষতি হয়ে যাবে কারণ পুলিশের দীর্ঘসূত্রিতা তাঁদের অজানা ছিল না।
এডওয়ার্ডের ফোন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। স্ক্রিন ফেটে চৌচির। তীব্র মদের গন্ধে আমার গা গুলিয়ে উঠল। অবিনাশের দিকে তাকিয়ে দেখি টলছেন। গতরাত থেকে খাচ্ছেন কি না জানি না। আমি আর্চির দিকে এগিয়ে গেলাম। ঠোঁটের কোনায় কাটা দাগের চারপাশে কালশিটে বাদে অন্য আঘাত চোখে পড়ল না। কিন্তু, দৃষ্টি হতবুদ্ধিকর। এই প্রথম আর্চিকে দেখছি। রোগা ছিপছিপে, এই বয়েসেও মুখে তারুণ্যের অবশেষ। কিছুটা নারীসুলভ কমনীয়তা থেকে গেছে। কিন্তু, এগুলো এখন ফিরে ভাবছি। সেইসময়ে এসব ভাবনার অবকাশ ছিল না। ঠিক আছেন কি না জিজ্ঞাসা করাতে মাথা নাড়লেন। অবিনাশ জড়ানো গলায় বললেন, ‘বেশি মারিনি, আই সোয়ার।' আর্চি অবাক চোখে তাকালেন তাঁর দিকে। মুখে নীরব জিজ্ঞাসা—কেন? অ্যারন তাঁর ঘাড়, হাত, মুখ পরখ করে নিশ্বাস ফেলল, আঘাত জোরদার নয়। আর্চিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু, আর্চি মাথা নাড়লেন। ফিসফিসিয়ে বললেন, তিনি ধাতস্থ হতে চান। চান নিজের সঙ্গে একা থাকতে। আমি আপত্তি জানাচ্ছিলাম, অ্যারন চোখের ইশারায় ছেড়ে দিতে বলল। অবিনাশকে নিয়ে বাইরে এসে জিজ্ঞাসা করল, কী ব্যাপার।
‘কিচ্ছু ব্যাপার নয়। স্যাংচুয়ারিতে সবাই আছে, সেখানে গিয়ে যা কথা হবার হবে। ‘আপনার কি মাথাটা গেছে? এই বয়েসে এরকম মারপিট, আপনার সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল নাকি?' মোবাইলে দেখলাম বারবারা মিসড কল মেরেছে দুটো। ‘আমি জানি না এই ঝামেলায় বারবারা আর এডওয়ার্ড নিজেকে জড়াতে চাইবেন কি না, তবে আর্চি সম্ভবত ডায়েরি করবেন আপনার নামে। সেটা করা উচিতও। সম্ভবত পুলিশ আসবে। এখানে আপনাকে না-পেয়ে আপনার বাড়িতে যাবে। আপনি যদি স্যাংচুয়ারিতে যেতে চান, অন্যেরা রাজি হবে কি?’
‘সব তোমার জন্য হয়েছে।' অবিনাশ এলোমেলো আঙুল তুলে টলে পড়তে যাচ্ছিলেন, অ্যারন ধরে নিল তাঁকে। ‘খুব শখ ছিল, না? গোয়েন্দা হবে!”
‘আমি কিছুই হতে চাইনি, মিস্টার যাদব। আপনারা আমাকে গল্পটা—' কিন্তু অ্যারন আমার কাঁধে চাপ দিল, অবিনাশকে এখান থেকে বার করতে হবে। আমার ইচ্ছে করছিল না এসবে নিজেকে জড়াতে। সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে। আর্চিকে দেখলাম একইভাবে বসে আছেন মাথা ঝুঁকিয়ে। কতটা তাণ্ডব চালালেন অবিনাশ, আর কেনই-বা? আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম ডাক্তার নিয়ে আসব কি না। কিন্তু, আর্চি জানালেন তাঁর কাছে ফার্স্ট এইড বক্স আছে, আপাতত সেটা দিয়ে কাজ চালিয়ে তারপর প্রয়োজনে কাউকে দেখাবেন। একপ্রকার বাধ্য হয়ে অবিনাশকে গাড়িতে তুললাম। কাচে মাথা ঠেকিয়ে হুঁ হুঁ হাসলেন অবিনাশ। তারপর চোখ বুজলেন।
এর পরের ঘটনাগুলো দ্রুত ঘটেছিল। আমি পরের পর সিগারেট খেয়ে যাচ্ছিলাম। স্যাংচুয়ারিতে ফিরে আসার পরের ঘটনা মনে করতে গেলে প্রথমেই মনে আসে অনেক চিৎকার আর ক্রুদ্ধ গাঁ গাঁ গর্জন। মুখে হাত চাপা দিয়ে মনীষা কাঁপছিলেন। বারবারা চিৎকার করে উঠল। দৌড়ে এসেছিল পুনম। এডওয়ার্ড আর অবিনাশ দু-জনেই তার দিকে সাবধানসূচক আঙুল তুলে বলেছিলেন ‘খবরদার'। অ্যারন কী করছিল গোটা সময়টা? ও কি দু-জনকে আটকাচ্ছিল, নাকি, দোলনায় বসে দেখে যাচ্ছিল চুপচাপ? অবিনাশ চিৎকার করলেন, ‘আপনাদের জন্য আমি কেস সলভ করতে পারিনি।' আমার দিকে ফিরলেন আবার, ‘সব তোমার জন্য।’ এডওয়ার্ডের ধাক্কায় অবিনাশ মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর চোখের কোনা কেটে গিয়েছিল, জল বেরোচ্ছিল ক্রমাগত। এডওয়ার্ড বার বার চিৎকার করছিলেন আর জানতে চাইছিলেন, এর অর্থ কী। অবিনাশের ঠোঁট বেঁকে গেল নিষ্ঠুরের মতো। তিনি জানালেন, বাচ্চাটা আর্চির ছিল বলে আগাথা সরিয়ে দিয়েছিলেন। এদিকে তাঁরা মানে পুলিশের দল, বিশেষত তিনি নিজে, বোকার মতো ঘুরে গেলেন এতগুলো বছর। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য এডওয়ার্ড স্থির হয়ে গেলেন। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন অবিনাশের ওপর। পাগলের মতো এলোপাথাড়ি কিলচড় মারছিলেন। আমরা তাঁকে থামাতে পারছিলাম না। অবিনাশ মার খেতে খেতে চেঁচালেন, ‘একজন রাঁচি গিয়ে মেয়েমানুষ পুষবে আর একজন লুকিয়ে আর্চির সঙ্গে প্রেম করবে। তার গুনাগার কে দেবে? কে দেবে?' তারপর আঁক করে থেমে গেলেন, কারণ তাঁর মাথা মাটিতে ঠুকে দিয়েছেন এডওয়ার্ড। অ্যারন হ্যাঁচকা টানে বাবাকে টেনে তুলল, ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল দেওয়ালের দিকে। ভারসাম্য সামলাতে না-পেরে এডওয়ার্ড পড়ে গেলেন। অবিনাশ বিকৃত গলায় বললেন আবার, ‘কেউ জানে না আবার কী কথা? দেখাই তো যাচ্ছে সবাই জানে, আমি বাদে।'
‘ইউ ব্রুট!’ মনীষা চেঁচিয়ে উঠলেন।
‘আর, তুমি একটা কুত্তি।' এডওয়ার্ড মনীষার দিকে ফিরে হিসহিস করলেন। যেন চাবুক খেয়েছেন, এমন ভঙ্গিতে মনীষা পিছিয়ে গেলেন দুই পা। আমি মনীষাকে ধরবার জন্য এগোতে গেলে এডওয়ার্ড চিৎকার করলেন, ‘ডোন্ট টাচ হার ইউ ডার্টি স্লিউথ। তুমি যত নষ্টের গোড়া। আমি পুলিশে যাব।'
‘সবার ভালোবাসা, ওহ্ ভগবান, ভালোবাসা এভাবে—' বারবারাকে ঘিনঘিনিয়ে কাঁদতে দেখে এডওয়ার্ড হাসলেন।
‘ভালোবাসা থাকলে, যখন আর্চির পাশে বসে থাকত, একবার পেছন ফিরে দেখত মেয়েরা কুত্তির জাত। তুই নিজেও তাই। তাই আমার পেছনে টিকটিকি লেলিয়েছিস।' আমার দিকে তাকিয়ে থুতু ফেললেন। রক্তমেশানো সাদা কফ। মনীষা ভূতগ্রস্তর মতো ধীরপায়ে পিছু হটে অদৃশ্য হলেন বাড়ির অন্ধকারে। বুঝতে পারছিলাম না কী করব। অ্যারন বাবার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করতে বলছে। আমি তখন বারবারাকে সামলাচ্ছিলাম, কারণ ও হাতের কাছে একটা গেলাস পেয়ে ছুড়ে মেরেছে। হতভম্ব দাঁড়িয়ে পুনম।
অবিনাশ আবার বললেন, ‘কেউ কিচ্ছু জানত না। অথচ, সবাই সব জানত। আমরা শালা চুতিয়া, সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে খি খি করে হেসেছে। আগাথা যখন ক্রিসকে হাপিশ করছে- ,
‘চুপ,’ অ্যারন ধমকে উঠল।
‘যখন হাপিশ করছে, আমরা তখন বাড়ির ঘরদোর, বাগানে টর্চ মারছি। যখন বাচ্চাটার হাত-পা বেঁধে দিয়েছে যাতে চেঁচাতে না-পারে—
‘শাট-আপ,’ এডওয়ার্ড চেঁচালেন এবার। অবিনাশ হেসে উঠলেন।
‘তখন লোকাল থানা শহরের বর্ডারগুলোতে লোক পাঠাচ্ছে। আর আমি? আমি তার পরের তিরিশ বছর ধরে লুকিয়ে দেখে যাচ্ছি আপনাদের। আপনারা বসে থাকেন বাগানে। মনীষা বসে থাকেন। আর্চি থাকেন। বসে বসে ক্রিসের কথা ভাবেন। ভাবেন আগাথা বেঁচে থাকলে তার পেট থেকে কথা বার করতেন। আমি গাধার মতো দাঁড়িয়ে থাকি।'
এডওয়ার্ড উঠতে চেষ্টা করলেন কিন্তু অ্যারনের ধাক্কায় আবার পড়ে গেলেন মাটিতে, ‘তোকে আমি মাটিতে পুঁতে ফেলব। নোংরা দেহাতি ছোটোলোক।’
অবিনাশ উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন কিন্তু পুনমের চিৎকারে থমকে গেলেন। সে আর্তনাদ করছে ওপরের দিকে তাকিয়ে। আমরা সবাই বাগানে নেমে এলাম।
বাড়ির যে অংশটা ভাঙা হয়েছে, তার একদিকের কিছুটা ছাদ নড়বড়ে ভাঙা থামের ওপর বেঁচে ছিল। আমরা দেখলাম, সেই ছাদের একপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন মনীষা। তাঁর দৃষ্টি দূরে। বারবারা চেঁচাল, ‘মনীষা, নেমে আয়!' নীচের থাম নড়ছে, একটা মানবশরীরের ভার কতক্ষণ নেবে কেউ বলতে পারে না। মনীষা একবার মাথা নীচু করে আমাদের দিকে তাকালেন। তাঁর মুখে কোনো কষ্ট আমি দেখিনি। বরং, সে-মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি ছিল, চোখ দেখে মনে হচ্ছিল মোহের ঘোর আঁকা। তিনি আবার দূরের দিকে তাকালেন। ভাঙা থামের গা থেকে খসে পড়ল সিমেন্টের চাঙড়। ছাদটা যেন কাঁপছে। বারবারা আবার অবোধ্য স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, তার মুখ ছাইয়ের মতো। এডওয়ার্ড ফিসফিস করলেন, ‘ভেঙে পড়বে।' অ্যারনের শরীরটা বাড়ির ভেতর ছুটে যাবার জন্য সবে স্প্রিন্ট নিয়েছে, কিন্তু তখন মনীষা তাঁর হাত বাড়িয়ে ধরলেন জঙ্গলের দিকে। স্পষ্ট গলায় উচ্চারণ করলেন, ‘ক্রিস দাঁড়িয়ে আছে।' আর না-চাইতেও আমাদের চোখ সেদিকে ঘুরে গেল।
আকাশ কালো। উথালপাথাল জঙ্গলের মাথা। জলাভূমির ওপর দিয়ে হা-হা শব্দে ছুটে যাচ্ছে হাওয়া। ঘাসবনের ভেতর সরসর আওয়াজ হচ্ছে। দূর সীমান্তের যে জঙ্গলরেখা, তার প্রেক্ষাপটে উঠে আসছে শেষ বিকেলের কুয়াশা। তারা দিগন্তকে আবছা করে দিচ্ছে। কুয়াশা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে, জমাট বেঁধে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে, ঝোড়ো বাতাস তার চাদরকে ছিঁড়তে পারছে না। তিন বছর পেরিয়ে এসে আমি দেখতে পাই, একটা কয়েক মুহূর্তের সচল ফ্রেম। ফ্রেমটার ডান দিক থেকে গুঁড়ি মেরে লাফ দেবে কুয়াশার পুঞ্জ। বাঁদিকে, আলো যেখানে স্বচ্ছ এবং বাতাস হাহাকার, সেই জায়গাটায় আমি দেখলাম, এক শিশু দাঁড়িয়ে জঙ্গলের সেই জায়গায়, যেখানে দিন তিনেক আগে আমি আর অ্যারন বসে ছিলাম। তার মুখ ঘোরানো আমাদের দিকে কিন্তু বাকিটা বোঝা যাচ্ছে না। আমার গায়ে কাঁটা দিল। ধড়াস করে উঠল বুকের ভেতর—আমরা কি মাস হ্যালুসিনেশন করছি? চোখ কচলে আবার দেখলাম, স্পষ্ট এবার, সেই শিশু আমাদের বাড়ির দিকেই তাকিয়ে। তার পরনে লাল জামা, প্যান্টের রং এত দূর থেকে বুঝিনি। আমাদের সবার বুক থেকে সশব্দ নিশ্বাস বেরোল। মড়ার মতো মুখে আমরা একে অন্যের দিকে তাকালাম। মনীষা ওপর থেকে দেখেছেন, কী দেখেছেন আমি জানি না। কিন্তু, নীচে দাঁড়িয়ে আমরা সকলে একই জিনিস প্রত্যক্ষ করেছিলাম। এডওয়ার্ডের মুখ সাদা। আতঙ্কে তাঁর গলা দিয়ে ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বেরোল। অবিনাশ ফিসফিস করলেন, ‘তাহলে যেকোনো মুহূর্তে—' এটুকুই, আর কথা বেরোল না। অ্যারন ঘাড় নেড়ে চাপাগলায় বলল, ‘অসম্ভব, অসম্ভব।' কিন্তু, তার গলা আটকে গেল কারণ, আমাদের চোখ আবার চলে গেল মনীষার দিকে। তিনি হাসছেন। ক্রিসের দিকে হাত বাড়ালেন আবার। ককিয়ে উঠলেন, ‘ক্রিস!” তারপর ঝাঁপ দিলেন নীচে, আর মাথা উঁচিয়ে থাকা একখণ্ড লোহার রড তাঁর বুক ফুঁড়ে দিল।
কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতা। সেই কয়েকটা মুহূর্তে আমরা নিজেদের হৃৎপিণ্ড মুঠোতে পুরে রেখেছিলাম। তারপর মনীষার গেঁথে থাকা দেহ একবার লাফিয়ে উঠল। কালচে লাল রক্ত ধীরে ধীরে বেরোচ্ছিল। তখন কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল লালুরাম, তীব্র বিস্ফোরণে যেন স্থির মুহূর্তগুলোর প্রাচীর ফাটল, আর সময় দৌড়োতে শুরু করল স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত।
পুনম চিৎকার করল সবার আগে। আমরা মনীষার কাছে দৌড়ে গিয়ে দেখলাম তাঁর দেহ প্রাণহীন। মুখে তখনও আলগা হাসি ঝুলছে। এডওয়ার্ড মনীষার হাত ধরলেন, মাথা নীচু করে বসে থাকলেন কয়েক মুহূর্ত, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হিংস্র মুখে তাকালেন অবিনাশের দিকে। তাঁর চোখ থেকে জল গড়াতে দেখলাম। তিনি বিকৃত গলায় জানালেন যে, অবিনাশকে শেষ করে দেবেন। পালটা চিৎকার করলেন অবিনাশ, বললেন এডওয়ার্ডকে খুন করবেন কারণ মনীষাকে তিনি কুত্তি বলেছেন, এবং তারপরেই— আমি দেখলাম দু-জনেই কাঁদছেন। তাঁরা একে অপরকে আঘাত করতে গিয়ে এলোমেলো হাত চালাচ্ছেন। তারপর দু-জনেই মাটিতে বসে পড়লেন। আমার পা চলছিল না, গলার কাছে শুকনো লাগছিল, কিছুক্ষণের জন্য যেন অসাড় হয়ে গিয়েছিলাম। নিজেকে সামলে আমি অ্যারনের হাত আঁকড়ে ধরলাম। অ্যারনের পিঠ আমার দিকে ফেরানো ছিল বলে ওর মুখ আমি দেখতে পাইনি, কিন্তু ও কাঁপছিল বোঝা যায়। মায়ের পাশে উবু হয়ে বসে মুখে হাত ঢাকল। আমি ওর পেছনে দাঁড়িয়ে জলাভূমির দিকে মুখ তুলে দেখলাম, সেই শিশু অদৃশ্য হয়ে গেছে। তার শূন্যস্থান পূরণ করতে আরও এগিয়েছে কুয়াশা, আবার কখনো সেটা ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে ছিঁড়েখুঁড়ে যাচ্ছে। দগদগে অভিশাপের মতো শূন্য জঙ্গল। সে আদৌ ছিল কি? ওটুকু মুহূর্তের মধ্যে কোথায় গেল তাহলে? একটা চাপা ভয় আমার তলপেট থেকে উঠে আসছিল। এ কেমন ভৌতিক ঘটনা? কিন্তু, তখন গুছিয়ে চিন্তা করতে পারছিলাম না, কারণ ততক্ষণে আর্তনাদ ও ছোটাছুটি শুরু হয়েছে বারবারার আঙুল তুলে ধরল আমার দিকে, ‘তোমার জন্য এত কিছু।' অ্যারন আমার কাঁধে হাত রাখল, ‘তুমি নিজের ঘরে যাও, তনয়া।' আমি একমাত্র যা করতে পারতাম তখন, পিছু হটে বাগানের এক কোনায় চলে যাওয়া। আমার জন্যই তাহলে এত কিছু? সেই অসাড় ভাবটা আবার ফিরে আসছিল। বাগানের দিকে হেঁটে যাবার সময়ে গাছের শেকড় পায়ে জড়িয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম, আমার কাঁধ ধরে শক্ত হাতে দাঁড় করাল কেউ। পুলিশি গলায় নির্দেশ দিল, ‘আপনাকে থানায় আসতে হবে।'
পুলিশ আমার জবানবন্দি নিয়ে প্রাথমিকভাবে নির্দেশ দিয়েছিল, স্যাংচুয়ারি ছেড়ে অন্য হোটেলে চলে যাবার। কিন্তু, এটাও বলেছিল যে, আগামী দিন দুয়েক টাউন যেন আমি নাছাড়ি। আমি ওই হট্টগোলে একটাই কাজের কাজ করতে পেরেছিলাম। মহেশকে ফোন করে বলেছিলাম, আমাকে এখান থেকে বার করে আনে যেন। কারণ, আমাকে যদি টাউন ছেড়ে যেতে না-দেয়, তাহলে আগামী বহুদিন নষ্ট হবে। শুধু সেটাই নয়, এই টাউনে আমি থাকতে পারতাম না—কারণ, সবাই আমাকে বলেছে যে, আমি নাক না গলালে এত কিছু হত না। যেহেতু আমি একজন সাংবাদিক, নামকরা এক পত্রিকায় কাজ করি, তাই গঞ্জের মতো ছোটো থানার পুলিশ জানত যে, চাইলেও দুম করে আমার গায়ে হাত দেওয়া সহজ হবে না। কিন্তু, এডওয়ার্ড ব্রাউন তাঁর বয়ানে বার বার আমার কথা বলেছিলেন—আমি নাকি খোঁচাখুঁচি করতে গিয়ে অশান্তি ডেকে এনেছি। মনীষার অবসাদ কি আমিই বাড়িয়ে তুলেছিলাম? এই জায়গাটায় আমি বিপদে পড়তাম যদি না অ্যারন সাক্ষ্য দিত। সে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন আর ওষুধের লিস্ট দেখিয়েছিল পুলিশকে, জানিয়েছিল তার মায়ের দীর্ঘদিনের সমস্যা ছিল। এমনকী আর্চিকে যে আমি আর অ্যারনই বাঁচিয়েছিলাম, অ্যারন সেটাও জানাল । পুলিশ সম্ভবত রিপোর্টে অবসাদজনিত আত্মহত্যার কথা লিখেছিল, যদিও আমি নিশ্চিত নই যেহেতু তখন আমি শহর ছেড়ে চলে গেছি। মনে আছে, থানায় আমি বারান্দার বেঞ্চে চুপচাপ বসে ছিলাম। তখন ইন্টেরোগেশন রুম থেকে বেরিয়ে অ্যারন চাপাস্বরে বলল, ‘প্রথম সুযোগে বেরিয়ে যাও এখান থেকে।’
‘আর তুমি?’
‘আমাকে তো থাকতেই হবে। কিছু করার নেই।'
‘বারবারা কি আমার বিরুদ্ধে- ,
‘পিসি পাগল হতে পারে, কিন্তু শয়তান নয়। তোমাকে নিজেই জোর করেছিল, সেটুকু বোধ তার আছে। পিসিকে আমি সামলে নেব। তুমি চলে যাও। আর যোগাযোগ রেখো না আমাদের সঙ্গে।'
‘রাখব না?’
‘না। তনয়া, আগেও বলেছিলাম, আমরা কার্সড। ভেবেচিন্তেই বলছি, এই জায়গা থেকে না-বেরোলে তোমার ক্ষতি। আমাদেরও ভালো হবে না।' আমি মাথা নীচু করে তার সামনে থেকে সরে গেলাম। সেই আমাদের শেষ কথা। বারবারার সঙ্গেও কথা হয়নি আর।
মহেশের যোগাযোগ কাজে এসেছিল। সেদিন সারারাত আমরা থানায় ছিলাম, তার পরদিন দুপুর বেলা পুলিশ আমাকে জানাল যে অনুমতি পাওয়া গেছে, কালবিলম্ব না-করে যেন আমি চলে যাই। প্রায় হুমকির স্বরে বলেছিল তারা— আমি বড়ো শহরের সাংবাদিক,
ছোটো টাউনের ব্যাপার-স্যাপার না-বুঝে বিপদ বাড়িয়েছি। এক কনস্টেবল তখন হেসে হেসে পাশের জনকে বলছিল, আমরা নাকি একটা বাচ্চার ভূতকে দেখেছি। তাদের দোষ ছিল না, তাদের জায়গায় আমি থাকলে আমিও বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু, বারবারা দিব্যি করে বলেছিল যে, ক্রিসের ওই লাল সোয়েটার তার হাতে বোনা। অন্য সময় হলে তার কথা উড়িয়ে দিতাম, তিরিশ বছর আগেকার সোয়েটার—কিন্তু এখন ওড়াব কী করে? যে শিশুকে দেখেছি, সে কি অন্য কেউ ছিল? তাহলে সে কেন ওখানে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল— অত দূর থেকে সেটুকু তো স্পষ্ট বোঝা যায়— সে উবেই-বা গেল কেন? আমার মাথা বলছিল, এর হাজারটা অন্য ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু মন অন্য কিছু ভাবতে চাইছিল না। অলৌকিকে বিশ্বাস করার কারণে নিজের ওপর আবার রেগে উঠলাম। পুলিশের হাসিকে কাঁধ থেকে ঝরিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম থানা থেকে। স্যাংচুয়ারিতে গিয়ে নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। থমথম করছিল বাড়ি, সেখানে কেউ ছিল না। সিগারেট খেয়ে খেয়ে আমার মুখ তেতো। বমি বমি লাগছে, জ্বালা করছে পায়ের কাটা জায়গাটা। লালুরাম একা বাগানে ঘুরছিল। দৃকপাত না-করে বেরিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু, রাঁচি থেকে ফ্লাইট সেদিন দিল্লি ছাড়েনি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। তাই আমাকে পরদিন অবধি অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
অবিনাশের বিরুদ্ধে এডওয়ার্ড অভিযোগ আনায় তাঁকে আটক করেছিল পুলিশ। কিন্তু, আর্চিকে মারধর বাদে অন্য সারবত্তা সে-অভিযোগে ছিল না। অ্যারন আগেই জানিয়েছিল যে, মনীষার অবসাদের ইতিহাস পুরোনো। আচিৰ এফআইআর করতে রাজি হননি। তিনি নাকি মনীষার খবরে এতই মুহ্যমান ছিলেন যে, নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ছিলেন। অবিনাশ থানাতেই পাগলের মতো চেঁচিয়ে জানান দিয়েছিলেন যে, ছাড়া পেয়ে এডওয়ার্ডকে তিনি খুন করবেন। আমি জানতাম, অবিনাশকে আটকে রাখবে না পুলিশ। প্রথমত, তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, তিনি পুলিশ ছিলেন। শুনেছিলাম, সরকারি হাসপাতালের মর্গ মনীষার বড়ি তখনও ছাড়েনি। অ্যারন সেখানে ভোর থেকে পড়ে আছে। বারবারার পাত্তা নেই। এডওয়ার্ড পুলিশের ডেরায়। আমি মনে মনে বলেছিলাম, ‘গোল্লায় যাক সবাই,' আর ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে এসেছিলাম। রেভারেন্ড গরম্যান কি মেয়ের খবর শুনেছিলেন? শুনলেও তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম তিনি করতে পারতেন কি না, জানি না।
আজ এতগুলো দিন পেরিয়ে এসে যখন আমাকে আবার সেই স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসতে হয়েছিল, একটাই কথা মনে হয়েছিল। কী অবিশ্বাস্য অপচয়! সময়, শ্রম, ভাবনা, এমনকী দুঃখেরও। পুলিশ তাদের সমস্ত প্রকার শক্তি ও দক্ষতা প্রয়োগ করে শেষে কিনা অবিনাশ যাদবকে গ্রেপ্তার করতে যাচ্ছে। আমিও সাংবাদিকতা কিছুকাল করেছি, খুনির ধরন আমি বুঝি। অবশ্যই অবিনাশ খুন করবার ক্ষমতা রাখেন, কিন্তু সেটা তাহলে ছাড়া পেয়েই করবেন, অথবা মাথা গরম করে, যেভাবে আর্চিকে আঘাত করেছিলেন। তিন বছর ধরে পরিকল্পনা ও আটঘাট বেঁধে খুন করা তাঁর ধরন নয়। অনেক কিছুর উত্তর নেই। অক্ষয়কে দেখে বুঝেছি তিনিও কনভিন্সড নন। কিন্তু, কেস ক্লোজ করার চাপে—মানে, আবার সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি, যা সমর দোসাদ অথবা নির্মলা দুবের সঙ্গে ঘটেছিল। এদিকে আসল পার্পেট্রেটর গত তিরিশ-চল্লিশ বছর ধরে টাউনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু, আমি কি এবার চুপ থাকব? কী করতে পারি আমি? তিন বছর আগে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বেরিয়ে এসেছিলাম। এতদিন পরে নতুন করে কী দিতে পারি? একথা তো সত্যি যে, ওই কয়েক দিনের মধ্যে কিছু গল্প জোগাড় করা বাদে অন্য কিছুই আমি পারিনি। জেনিফার আঙুল তুলেছিলেন আগাথার দিকে, সমর আঙুল তুলেছিলেন জেনিফারের দিকে, সবাই শেষমেষ আঙুল তুলেছিল আমার দিকে। আর, অ্যাগনেসের ব্যাপারে সকলে চুপ থেকেছিল। এতগুলো ধোঁয়াশার জাল ছেঁড়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
অনর্গল কফি আর সিগারেটে জিভ অসাড় লাগছে। কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। সোফাতে বসে ল্যাপটপ খুললাম আমি। গুগল ড্রাইভে গঞ্জের ফোল্ডারে গেলাম। খুলে বসলাম পুরোনো ছবিগুলো। একটা ছবিতে বারবারা বিরক্ত হয়ে লালুরামকে ধমকাচ্ছে। একটায়, ধুধু রোদের মধ্যে একলা স্যাংচুয়ারি। আরও অনেকগুলো ছবি। একটায় অ্যারন দোলনায় বসে আছে। বেথেল মিশন, জঙ্গলে ঢাকা। ঝাঁটিফুলের মাঠে দীপিকা সরেন দৌড়ে যাচ্ছে একটা ছাগলের পেছনে। অ্যাগনেসের সেই পুরোনো ছবি, গাছের ডালে হেলান দিয়ে।
আর একটা ছবি, শেষ বিকেলের জলাভূমির। মাথার ওপর উড়ছে কাকের দল। এখানে ক্রিস দাঁড়িয়ে ছিল।
তন্ময় হয়ে দেখছিলাম। তারপর রাস্তার কুকুরের চিৎকারে চমকে উঠলাম। রাত আড়াইটে। আমি ভাবব না, কেন এত ভাবছি? আমি ভালো আছি নিজের জীবন নিয়ে? কেন এত রাত অবধি ছবিগুলো দেখছি আমি, কী আসে-যায়? এরকম অপরাধ অনেক ঘটে। তাদের সমাধানের জন্য পুলিশ আছে। আমি ফিরে যার না সেখানে। আমার ঘুম হবে নিশ্ছিদ্র। আমি ভুলে যাব সবাইকে।
কিন্তু, গুগল ড্রাইভ খোলা রইল সারারাত। এবং, আমি ল্যাপটপের সামনে বসে ছবিগুলো বার বার দেখে গেলাম। সারারাত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন