অভিজিৎ সেনগুপ্ত

ভীষণ উৎকন্ঠা
ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং.....
রাতের স্তব্ধতা খান খান হয়ে যায় কয়েললেস ফোনের মিষ্টি কিন্তু তীব্র ধাতব শব্দে৷
কে ফোন করে এত রাতে? ঘুমের মধ্যে ধড়ফড় করে উঠে বসেন গীর্বাণ সেন৷ এশিয়ান স্পেস রিসার্চ সেন্টারের সবচেয়ে তরুণ কিন্তু প্রতিভাবান মাইক্রোবায়োলজিস্ট ড. গীর্বাণ সেন৷
ঝমঝম করছে বাইরে নিবিড় শীতের রাত৷ ঘন কালো পর্দার মতো টানা আকাশটা৷ তার গায়ে অজস্র অসংখ্য ফুটো৷ সেই ফুটোর ভিতর দিয়ে যেন পর্দার ওপারের এক বিশাল জ্যোতির্ময় বিশ্বের জ্যোতির আভাস ফুটে বেরোচ্ছে৷ বৃশ্চিক, ক্যাসিওপিয়া, কালপুরুষ৷ আকাশের অতি দূর কোণে অভিজিৎ নক্ষত্র৷ কিন্তু তাও এত স্পষ্ট যেন হাত দিয়ে ছোঁয়া যায়৷
শিয়রের টেবিলে রাখা ফোনের রিসিভারটা তুলে নেন হাতে৷
—হ্যালো, আমি হিকোহিতা বলছি এশিয়ান স্পেস রিসার্চ সেন্টার থেকে-শিগগির চলে এসো এখানে৷
—কী ব্যাপার? এত রাতে?
—নো কোশ্চেন৷ শিগগিরই চলে এসো৷ একটা সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটতে চলেছে৷ তোমার সমস্ত জীবনটাই পালটে যেতে পারে৷
—আমার সমস্ত জীবন?
—হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ আর প্রশ্ন নয়৷ গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি অফিসের৷ নো ডিলে৷
কট করে একটা শব্দ হয় ফোনে৷ অর্থাৎ ওদিকে ফোনটা ছেড়ে দিয়েছেন এশিয়ান স্পেস রিসার্চ সেন্টারের ডাইরেক্টর এবং মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর প্রতিভা-অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট প্রফেসার হিরোশিমা হিকোহিতা৷
চুপ করে বিছানায় খানিকক্ষণ বসে থাকেন ড. গীর্বাণ সেন৷ মাথার মধ্যে কীরকম ঝাঁ ঝাঁ করছে৷ এখনও কি তিনি স্বপ্নই দেখছেন! উঠে ফ্রিজ থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা জল বের করে খেয়ে জানালার কাছে এসে ঠান্ডা গ্রিলের গায়ে কপাল ঠেকিয়ে বসেন৷ গীর্বাণের মনে পড়ল ছোটোবেলা থেকেই তো কত শীতের রাত তিনি হ্যাংলা শিশুর মতোই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছেন ছায়াপথে ঢাকা ওই মহাশূন্যের অন্ধকার৷ ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মতো ওই ছায়াপথের ভিতরে নাকি আছে কোটি কোটি সূর্য আর তাদের নিজস্ব সৌরলোক; কত—কত বড়ো তাহলে এই বিশ্বটা! প্রফেসর হিকোহিতা একবার বলেছিলেন এই মহাবিশ্ব নাকি অসীম কিন্তু সান্ত অর্থাৎ এর শেষ আছে কিন্তু কোনো সীমা নেই৷ কথাটা খুবই ভাবিয়ে তুলেছিল মাইক্রোবায়োলজিস্ট গীর্বাণ সেনকে৷ মহাবিশ্বের শেষ আছে? যদি শেষ থেকেই থাকে তাহলে শেষের ওপারে কী আছে? কিচ্ছু না? সেটা কী করে সম্ভব?
কথাটা ড. হিকোহিতাকে জিজ্ঞেস করাতে তিনি একতাল ময়দামাখা নিয়ে ভিতরে আঙুল ঢুকিয়ে একটা অদ্ভুত আকারের গর্ত তৈরি করে মহাশূন্যের বক্রতা বিষয়ে প্রায় একঘণ্টা ধরে লেকচার দিয়েছিলেন৷ সেই সঙ্গে ব্ল্যাকবোর্ডে কয়েকটা বড়ো বড়ো ক্যালকুলাসের ইকোয়েশন কষে মহাশূন্যের জ্যামিতি বিষয়ে একটা ধারণা জন্মাবার চেষ্টা করেছিলেন অন্য সব বৈজ্ঞানিকদের ভিতরে৷ মাইক্রোবায়োলজির লোক ড. গীর্বাণ সেন৷ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণু জীবকণা নিয়ে তাঁর কারবার৷ উচ্চতর গণিতের এইসব জটিল সূত্র কিছুই বোধগম্য হওয়ার কথা নয় তার৷ কিন্তু মনে আছে হিকোহিতা ময়দার তালটা নিয়ে doughnut doughnut* কথাটা অনেকবার আউড়েছিলেন৷ অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের আকারটা হল doughnut-এর মতো এবং সে-কারণেই নাকি এর সীমা নেই কিন্তু শেষ আছে৷
তত্ত্বটা ঠিক বুঝতে পারেননি ড. গীর্বাণ সেন আর বুঝতে পারেননি বলেই তার রহস্যের অনুভূতিটা মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল৷ জাপানি বৈজ্ঞানিক হিকোহিতার প্রশান্ত ট্যারা চোখ আর মাথাভরতি পাকা চুলের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল ওই মাথাটার ভিতরেই কত জটিল ভাবনাচিন্তার কোটি কোটি নীহারিকা নেবুলা অনবরত পাক খাচ্ছে৷ সৌরজগতের থেকে কি তা কম বিস্ময়ের? শ্রদ্ধায় বিস্ময়ে মন ভরে গিয়েছিল তার৷
হিকোহিতা বলেছেন এমন একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে যাতে তার সমস্ত জীবন পালটে যেতে চলেছে৷ কিন্তু ঘটনাটা কী? এই বয়সে কীই বা এমন ঘটতে পারে যাতে তার জীবনটা পালটে যেতে পারে?
সারাজীবন দুটো জিনিসের বড়ো শখ ছিল ড. গীর্বাণ সেনের৷ এক, উত্তর মেরু অভিযানে যাওয়া-দুই, চাঁদের মাটিতে পা দেওয়া৷ মনে হয়েছে এ দুটোর যে কোনো একটা ঘটলেই তার জীবনটা একেবারে অন্যরকম হয়ে যেতে পারে৷
প্রথম মেরু অভিযানে যখন গেল ভারতীয় বৈজ্ঞানিকের দল তখন মাইক্রোবায়োলজির টিম তৈরি হয়েছিল একটা৷ জুনিয়র সায়েন্টিস্ট হিসেবে ড. গীর্বাণ সেনের নাম তাতে রাখা হয়েছিল কিন্তু শেষ অবধি অর্থের অভাবে বৈজ্ঞানিকদের সংখ্যা কিছু কমিয়ে দেওয়ার ফলে ড. গীর্বাণ সেনের নামটাও বাদ পড়ে যায়৷ কেননা বয়সে, অভিজ্ঞতায় গীর্বান সেন তখন নিতান্তই কনিষ্ঠ৷ হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন মাইক্রোবায়োলজির রিডার হিসাবে কাজ করার পর ড. গীর্বাণ সেন চলে যান এশিয়ান স্পেস রিসার্চ সেন্টারে৷ মনে ক্ষীণ আশা যদি কখনো চাঁদে মানুষ পাঠায় আর সেই মহাকাশযানে যদি মাইক্রোবায়োলজিস্ট হিসেবে তিনি জায়গা করে নিতে পারেন তাহলে জীবনের সবচেয়ে বড়ো ইচ্ছেটা পূর্ণ হবে তার৷
সেই ঘটনাই ঘটতে চলেছে৷ আগামী বছরের প্রায় এই সময়েই প্রোগ্রাম অনুযায়ী চাঁদে পাঠানো হবে অনেকটা আমেরিকার মহাকাশযানের আদলে তৈরি এশিয়ার প্রথম মহাকাশযান৷ দু-জন মহাকাশচারীও থাকবে সেই মহাকাশযানে৷ গত এক বছর ধরেই তার প্রস্তুতি চলছে৷ কিন্তু না, আর যারই হোক, গীর্বাণ সেনের জায়গা হবে না সেই মহাকাশযানে৷
গীর্বাণ সেন অবশ্য চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেননি৷ চাঁদে রকেট পাঠানোর প্রস্তাবটা যেদিন গভর্নিং বডিতে পাকাপাকি অনুমোদন পেল সে রাতেই আগাম খবরটা পেয়ে তিনি আর কালব্যয় না করে সোজা চলে গিয়েছিলেন ড. হিকোহিতার কোয়ার্টারে তাঁর সঙ্গে একান্তে দেখা করতে৷
ড. গীর্বাণ সেনের প্রস্তাব শুনে হিকোহিতা ওর দিকে শান্ত চোখ তুলে ব্যথিত গলায় বলেছিলেন—আমি তোমার অ্যাডভেঞ্চার—স্পৃহা, তোমার সাহস আর উৎসাহের তারিফ না করে পারছি না ইয়ং ম্যান৷ বিজ্ঞানীর জীবনের মূল দু-টি প্রেরণা বিস্ময়বোধ আর কৌতূহল৷ তোমার ভিতরে এ দু-টিই প্রবল পরিমাণে আছে৷ আমাদের গবেষণা সংস্থা তোমার মতো বিজ্ঞানীকে পেয়ে নিশ্চয়ই গর্বিত; কিন্তু তবু তোমাকে এবারের প্রোগ্রামে নেওয়া যাবে না৷ আমরা দুঃখিত৷
—কেন স্যার? অধৈর্য স্বরে প্রশ্ন করেছিলেন ড. গীর্বাণ সেন৷ ব্যথিত স্বরেই হিকোহিতা বলেছিলেন—উত্তরটা খুব সহজ ড. সেন৷ এটা নিশ্চিত ভাবেই প্রমাণ হয়ে গেছে চাঁদের মাটিতে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব নেই৷ সেখানে জল নেই, বাতাস নেই, সুতরাং প্রাণের কোনো অস্তিত্বই সেখানে সম্ভব নয়৷ আর্মস্ট্রং চাঁদ থেকে যে ধুলো মাটি পাথর নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছে তাতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি৷ সুতরাং এই প্রাণহীন রাজ্যে একজন তোমার মতো মাইক্রোবায়োলজিস্টের কী প্রয়োজন পড়বে? মাইক্রোবায়োলজিস্টদের কাজ তো প্রাণ নিয়েই, তাই না?
ওর হতাশ মনের অবস্থাটা আঁচ করতে পেরেই বোধ হয় হিকোহিতা প্রায় পিতৃসুলভ স্নেহে ওর পিঠে মৃদু চাপড় মেরে বলেন—ডোন্ট বি ডিপ্রেসড, মাই বয়৷ এখনও তোমার বয়স অল্প আর মানুষের বিজ্ঞান সাধনার দুরন্ত অগ্রগতিও বিস্ময়কর৷ সেদিন বোধ হয় খুব দূরে নয় যেদিন অন্যান্য গ্রহেও মহাকাশচারী পাঠানো হবে সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না তাঁর সন্ধান চালাতে৷ সেদিন তোমার মতো একজন ইয়ং প্রতিভাবান মাইক্রোবায়োলজিস্টের দরকার নিশ্চয়ই পড়বে৷ নাউ গো অ্যান্ড হ্যাভ এ গুড স্লিপ?
মনক্ষুণ্ণ হয়ে ফিরে এসেছিলেন গীর্বাণ সেন৷ কিন্তু হিকোহিতা যা যুক্তি দেখালেন তাকে তো লঙ্ঘন করার কোনো উপায় নেই৷ সত্যি তো! তিনি মাইক্রোবায়োলজিস্ট৷ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী আর প্রাণ নিয়ে তাঁর কাজ৷ যেখানে প্রাণের কোনো অস্তিত্বই নেই সেখানে গিয়ে কী করবেন তিনি?
তীক্ষ্ণ হর্নের শব্দে চমক ভেঙে গেল গীর্বাণ সেনের৷ সেন্টারের এয়ার কন্ডিশনড কালো টয়োটা গাড়িটা কখন নিঃশব্দে এসে হর্ন দিচ্ছে একবারে দরজার গা ঘেঁষে৷ ভীষণ কৌতূহল আর উৎকন্ঠায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটা উইন্ডচিটার গায়ে চাপিয়ে দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে পড়ে গীর্বাণ সেন৷ চীনা ড্রাইভারের মুখ পাথরের মতো গম্ভীর, ভাবলেশহীন৷ সেদিকে একবার তাকিয়ে গীর্বাণ সেন জিজ্ঞেস করেন—মি. চিয়াং, তুমি কিছু জান কী হয়েছে সেন্টারে?
চিয়াং অল্প মাথা নাড়েন৷ তাতে পরিষ্কার কিছুই বোঝা যায় না৷ কিন্তু প্রশ্নটার আর পুনরাবৃত্তি করেন না গীর্বাণ সেন৷ সেন্টারে পা না দেওয়া অবধি এই অসহ্য উৎকন্ঠা তাকে সহ্য করতেই হবে৷
স্পেস রিসার্চ সেন্টার
শহর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে ওড়িশার এক অখ্যাত নির্জন সমুদ্র সৈকতে এশিয়ান স্পেস রিসার্চ সেন্টারের এই অফিস৷ জায়গাটা আসলে একটা ব-দ্বীপ৷ চারদিকে ঠাসা ম্যানগ্রোভের জঙ্গল৷ চারপাশে ধু-ধু ফাঁকা৷ একটা লোকও চোখে পড়ে না কোথাও৷ অনেকটা দূরে একটা দরিদ্র জেলেদের বস্তি৷ বাঁশের খুঁটি পুঁতে তারা বালির উপরে ফ্যাসা, বোমলা, চ্যালা মাছ শুকোয়৷ বাতাসের হু-হু শব্দ ছাড়া সেখানে আর কিছু শোনা যায় না৷ এরকম নির্জন জায়গা বেছে নেওয়া হয়েছে হিকোহিতার পরামর্শেই, যতদূর সম্ভব সেন্টারের কাজকর্মের নিশ্ছিদ্র গোপনীয়তা রক্ষার জন্য৷
মিটিং-এ সেমিনারে অনেকবার হিকোহিতা বলেছেন তাঁর অধীনস্থ বিজ্ঞানীদের—আমাদের এ মহাকাশ গবেষণা সংস্থার যা কিছু কাজ সবই শান্তির জন্য, মানুষের মঙ্গল ও তার অগ্রগতির জন্য৷ কিন্তু সভ্য নামের মুখোশের আড়ালে অনেক জাতি রয়ে গেছে যারা আজও মারণাস্ত্র তৈরি করছে৷ একটা সুইচ টিপে আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীটাকে ধ্বংস করে দিতে যে কোনো সময় তারা প্রস্তুত৷ এইসব যুদ্ধোন্মাদ সভ্য নামধারী বর্বরদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্যই গোপনীয়তা রক্ষা আমাদের একান্ত প্রয়োজন৷ কথাগুলি বলতে বলতে গলা ভারী হয়ে আসে হিকোহিতার৷ গীর্বাণ সেন জানেন কেন৷ কোনো কোনো দুর্বল আবেগের মুহূর্তে নিজের দুঃখজনক শৈশবের কাহিনি তাকে বলে ফেলেছেন হিকোহিতা৷

হিরোশিমার একেবারে পাশেই ছিল ওদের গ্রাম ফুমিশোরা৷ উনিশ-শো পঁয়তাল্লিশে যখন বোমা পড়ে হিরোশিমায় তখন হিকোহিতা চার বছরের শিশু মাত্র৷ কিন্তু এখনও মনে পড়ে সেই ভয়ানক দৃশ্য৷ সেই কালো কালির মতো ঘন থকথকে ধোঁয়া পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠছে আকাশে৷ আর নীচে দু-হাত তুলে ছুটছে যেন সারা গায়ে ফসফরাস মাখা জ্বলন্ত মানুষ৷ পঞ্চাশ বছর পর আজও সেই দৃশ্যটা স্বপ্নের মধ্যে হানা দেয় তাকে৷ হিকোহিতা অক্ষত বেঁচে গিয়েছিলেন বটে কিন্তু মারা গিয়েছিল তার বাবা আর তার অত্যন্ত প্রিয় ছোটো বোনটি৷ হিরোশিমায় ওদের আরও অনেক বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনও নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়েছিল৷ চিরজীবনের মতো পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল কত৷
এসব গল্প টুকরো টুকরো ভাবে হিকোহিতার কাছ থেকেই শোনা৷ শুনতে শুনতে হিরোশিমা নামে সেই না দেখা জায়গাটাকে গীর্বাণ সেনও ভালোবেসে ফেলেছিলেন৷
বড়ো বড়ো মার্কারি ভেপারের উজ্জ্বল আলোয় সমস্ত অঞ্চলটাই আলোকিত৷ ছোটো-বড়ো নানা আকারের সব বিল্ডিং৷ তার গায়ে নানা আকারের তামা, এ্যালুমিনিয়াম, লোহার পাইপ, রেলিং, ইস্পাতের স্ট্রাকচার, কংক্রিটের প্ল্যাটফর্ম৷ তিনতলা সমান একটা উঁচু বাড়ির মাথায় বসানো অতিকায় ছাতার মতো এক-শো ফুট ব্যাসার্ধের একটা অ্যান্টেনা-ইংল্যান্ডের জরডেল ব্যাঙ্কের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স-এর অ্যান্টেনার চেয়েও নাকি অনেক বেশি বড়ো ও শক্তিশালী৷ গীর্বাণ সেন একথা জেনেছে প্রফেসর হিকোহিতার কাছ থেকেই৷
বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট অনুযায়ী সাজানো বিল্ডিংগুলি৷ ভূ-বিদ্যা, খনিজ বিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা, উদ্ভিদবিজ্ঞান, যন্ত্রবিদ্যা, আবহাওয়াবিদ্যা, টেলিকমিউনিকেশন, ইলেকট্রনিক্স, শারীরবিজ্ঞান এমনকী মনস্বত্ত্ব বিভাগ অবধি৷
এইসব ডিপার্টমেন্টের বাড়িঘর ল্যাবরেটরি পেরিয়ে গেলেই আবার ধু-ধু মাঠ-প্রান্তর৷ আর সেই প্রান্তরের শেষে হঠাৎ চোখে পড়ে অতিকায় কোনো জিরাফের মতো ঘাড় উঁচু করে দাঁড়ানো বিরাট ইস্পাতের তৈরি একটি ভারা৷ উঁচু বাড়ি তৈরি করতে গেলে রাজমিস্ত্রিরা যেরকম ভারা বাঁধে প্রায় সেইরকমই৷ মাটির ভিতরে প্রায় তিনতলা নীচু থেকে উঠে এসেছে ত্রিশ তলা উঁচু ভারাটা৷ ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ঢালাই কংক্রিটের ঢালু রাস্তা নেমে গেছে মাটির নীচে সেই গহ্বরের মেঝে অবধি৷ কাজ শেষ হয়নি এখনও৷ বিরাট বিরাট কংক্রিটের মিক্সার মেশিন, কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো মাটি কাটার গ্রাব যন্ত্র, লোহা ঝালাই করার যন্ত্রপাতি সব ছড়ানো ছিটানো চারদিকে৷ বোঝা যাচ্ছে কাজ চলছে পুরোদমে৷
গীর্বাণ সেন একবার তাকান ওদিকে৷ ওটাই হল রকেট লঞ্চিং প্যাড বা রকেট উৎক্ষেপণ মঞ্চ৷ আগামী বছর প্রায় এসময়েই ওই লঞ্চিং প্যাড থেকে এশিয়ার প্রথম মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা হবে চাঁদের দিকে—সেই সুদূর রহস্যময় চাঁদ৷ দু-জন মহাকাশচারীর জায়গা হবে সেই মহাকাশযানে, কিন্তু গীর্বাণ সেন থাকবে না তাদের মধ্যে৷
ছোটো একটা নিশ্বাস ছাড়েন গীর্বাণ সেন৷
রহস্যময় ব্যাকটিরিয়া
ইলেকট্রনিক্স ডিপার্টমেন্টের কাছে গাড়ি যেতেই ড. সেন দেখতে পেলেন প্রফেসর হিকোহিতা দাঁড়িয়ে আছেন৷ তাঁর চোখেমুখে প্রচণ্ড উত্তেজনার ছাপ৷ মনে হচ্ছে কোনো একটা আশ্চর্য ঘটনা ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে গেছে তাঁকে৷
—স্টপ, স্টপ দি কার, চেঁচিয়ে ওঠেন হিকোহিতা৷ ঘ্যাঁচ করে গাড়ি ব্রেক কষতেই প্রফেসর হিকোহিতা নির্দেশ দেন গীর্বাণকে—ফলো মি৷
মন্ত্র মুগ্ধের মতো হিকোহিতাকে ইলেকট্রনিক্স ডিপার্টমেন্টের ভিতর অনুসরণ করতে করতে দেখেন গীর্বাণ নাইট ডিউটিতে ছিল যেসব বিজ্ঞানী যন্ত্রবিৎ কারিগররা সবাই সেন্ট্রাল কম্পিউটার হলে জড়ো হয়েছে৷ আশ্চর্য ঘটনার উৎপত্তি তাহলে ওখানেই!
প্রায় শ-খানেক নানা সাইজের কম্পিউটার, পার্সোনাল কম্পিউটারে হলঘরটা ঠাসা৷ রিসার্চ সেন্টারে কম্পিউটার সংক্রান্ত যা কিছু কাজ তা সবই পরিচালনা করা হয় এখান থেকে৷ ঢুকেই বাঁ-দিকে দেওয়ালে একটা বড়ো প্যানেল৷ চল্লিশ ইঞ্চির একটা কম্পিউটার স্ক্রিন তাতে লাগানো৷ উপরে বড়ো বড়ো হরফে লেখা MICROBE DETECTOR; সেন্টারের সব কর্মী বিজ্ঞানী তার সামনে বসে গেছে চেয়ার নিয়ে৷
গীর্বাণকে দেখে জায়গা করে দেয় সবাই৷ হিকোহিতা বলেন—লুক দেয়ার, -লু-উ-ক-আমাদের রেডিয়ো টেলিস্কোপ কিন্তু চাঁদের দিকে ফিট করা আছে৷ চাঁদ থেকে পাচ্ছি আমরা এ সিগন্যাল৷ হতবুদ্ধির মতো কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকান গীর্বাণ সেন৷ কালো স্ক্রিন৷ হঠাৎ তার গায়ে ফুটে ওঠে বিন্দু বিন্দু সবুজ আলো কোনো সংকেত চিহ্নের মতো৷ কাঁপতে থাকে এলোমেলো বিন্দুগুলো, ছোটাছুটি করতে থাকে সমস্ত স্ক্রিন জুড়ে৷ তারপর হঠাৎ সব বিন্দুগুলি মিলেমিশে হাতির ঢালু পিঠের রেখার মতো দেখতে সাইক্লয়েড আকারের স্পষ্ট লেখচিত্র ফুটে ওঠে সমস্ত স্ক্রিন জুড়ে৷ সে লেখচিত্র কাঁপতে কাঁপতে মিলিয়ে গিয়েই আবার ফুটে উঠে সেইরকম অজস্র বিন্দু৷ মুহুর্মুহু কয়েকবার একই ঘটনা ঘটে যায়৷
পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন গীর্বাণ সেন৷ এ ধরনের সংকেতের অর্থ তো একটাই৷ কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব? যদি তাই সম্ভব হয় তাহলে এতদিন যাবৎ প্রাণের উৎপত্তি ও ঠিকানা সম্বন্ধে তিনি যা শিখে এসেছেন এবং অন্যকে যা শিখিয়ে এসেছেন তা সব ভুল? সমস্ত জীববিদ্যা ভুল? হিকোহিতা পিছন থেকে আবেগরুদ্ধ গলায় বলেন—দেয়ার ইজ লাইফ ইন দি মুন! দেয়ার ইজ লাইফ! দেখো চাঁদের মতো এত বিরুদ্ধ প্রতিকূল পরিবেশেও জীবন জন্ম নিচ্ছে৷
গীর্বাণ সেন পিছন ফিরে বলেন—ভুল, ভুল, প্রফেসর হিকোহিতা৷ আমরা ভুল দেখছি—চাঁদে কখনোই জীবন জন্মাতে পারে না৷ সেখানে জল নেই, বাতাস নেই, অক্সিজেন নেই—জীবন জন্মাবে কী করে সেখানে?
হিকোহিতা শান্ত হেসে বললেন—তাহলে তুমি বলতে চাও আমরা সবাই মিলে ভুল দেখছি? আমাদের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং কি এরকমই করা ছিল না যে, ক্ষুদ্র জীবাণু-জাতীয় প্রাণের আবির্ভাব ঘটলেও কম্পিউটারে এরকম গ্রাফ ফুটে উঠবে?
গীর্বাণ উত্তেজিতভাবে বলে—কিন্তু স্যার কম্পিউটারে যে গ্রাফ ফুটে উঠেছে তা অনেকটা সাইক্লয়েড রেখার মতো৷ আমাদের কম্পিউটারে জীবাণুদের যেরকম প্রোগ্রামিং করা ছিল তাতে তো ওরকম কোনো রেখা ফুটে ওঠার কথা নয়৷ নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে প্রফেসর হিকোহিতা৷ কম্পিউটার কাজ করছে না ঠিকমতো৷
হিকোহিতার শান্ত ঠোঁটের কোণে যেন একটা বিষণ্ণ শ্লেষের হাসি ফুটে উঠল৷
—তুমি বলতে চাও ড. সেন, জাপানের মিতসুবিতো কোম্পানির কম্পিউটার ভুল রিডিং দিচ্ছে? না, ড. সেন, মানুষের প্রতিভাকে অতটা অপমান কোরো না৷
নিজের দেশের কথা উঠলেই এই সৌম্য পক্বকেশ বিজ্ঞানী শিশুর মতো উত্তেজিত হয়ে পড়েন৷ শৈশবের সেই ভয়ানক স্মৃতিই আসলে এই মানুষটিকে নিজের দেশ সম্বন্ধে বোধ হয় এরকম স্পর্শকাতর করে তুলেছে৷
গীর্বাণ সেন চুপ করে থাকেন৷ হিকোহিতা বলেন—তুমি কি বলতে চাও ড. সেন, পৃথিবীতে যতরকম ব্যাকটেরিয়া কিংবা মাইক্রোব সম্ভব তা সমস্তই আমাদের এই কম্পিউটারে সংকেতবদ্ধ হয়েছে? আমি অবশ্য জীবাণুবিজ্ঞানী নই৷ আমি জ্যোতির্বিজ্ঞানী৷ কিন্তু এ নিয়ে সামান্য পড়াশোনা যা করেছি তাতে জেনেছি লক্ষ লক্ষ প্রজাতির ব্যাকটিরিয়া আর মাইক্রোব ছড়িয়ে রয়েছে সমস্ত পৃথিবীতে৷ আর তার অতি সামান্য অংশই আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি এ যাবৎ৷
তা হোক—উত্তেজিত গলায় বলেন গীর্বাণ—তবুও সমস্ত ব্যাকটিরিয়াই এককোষী প্রাণী৷ কোষের খাদ্যগ্রহণ, শ্বসন বা বিভাজন প্রক্রিয়ার মূল নীতিটা কিন্তু একই৷ আমি মাইক্রোবায়োলজিস্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বলছি প্রফেসর হিকোহিতা, সেই মূল সূত্রটাকে কম্পিউটারে এমনভাবে 'কোডবদ্ধ' করা হয়েছে যে, যেকোনো ধরনের ব্যাকটিরিয়াই হোক না কেন তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধরা পড়বেই এই কম্পিউটারে৷ আপনা থেকেই তার শনাক্তকরণ হয়ে যাবে৷
বিজ্ঞানই তার জীবনের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান, ফলে কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা বিজ্ঞানের এই তর্কে শিশুর মতো উত্তেজিত হয়ে পড়েন গীর্বাণ সেনও৷ হিকোহিতাও একরকম শিশু, গীর্বাণ সেনও আর একরকম৷
উত্তেজনায় গীর্বাণ সেন পিছন ফিরে বলেন—কি ডক্টর রাবানল, অ্যাম আই নট রাইট?
অন্যান্যদের সঙ্গে ফিলিপাইনসের পৃথিবীবিখ্যাত ইলেকট্রনিক্স-বিশেষজ্ঞ ডক্টর রাবানলও বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে ছিলেন কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে৷ অসংখ্য এলোমেলো রেখার আঁকিবুঁকি সেখানে৷ কিছুই বোধগম্য হয় না তা থেকে৷ তাদের সমস্ত কম্পিউটার প্রোগ্রামিংই তাহলে ভুল?
গীর্বাণের প্রশ্নের উত্তরে রাবানল স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বলেন—বুঝতে পারছি না, কিছুই বুঝতে পারছি না৷ কিন্তু শতকরা এক-শো ভাগ গ্যারান্টি দিচ্ছি আমি ডক্টর সেন—কম্পিউটার যন্ত্রে আমাদের কোনো ত্রুটি নেই৷ যদি কোনো ত্রুটি কোনো কারণে ঘটে থাকে তাহলে কম্পিউটার নিজেই তো তা বাতলে দেবে৷ সেরকম ব্যবস্থাও তো রাখা আছে৷
হিকোহিতা বলেন—তোমরা একটা জিনিস বুঝতে পারছ না ডক্টর সেন, মহাবিশ্বে এরকম কোনো মাইক্রোবও তো থাকতে পারে যাদের বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না৷ কত কিছুই তো আজও জানে না মানুষ৷ গীর্বাণ উত্তেজিত গলায় বলেন—কিন্তু যে কোনো ব্যাকটিরিয়াই হোক, সেও তো একটা প্রাণ৷ তার জন্য তো জল হাওয়া চাই৷ চাঁদে তো এর কিছুই নেই৷
—এমন কোনো ব্যাকটিরিয়া যদি থেকে থাকে যার জন্য এসব কিছুই দরকার হয় না?
উত্তেজনায় সারা ঘরে পায়চারি করতে থাকেন গীর্বাণ সেন৷ তাহলে কি হিকোহিতার এই কথাই মেনে নিতে হবে যে, মহাবিশ্বের কোথাও এরকম কোনো প্রাণ থাকা সম্ভবপর যার জীবনধারণের জন্য জল হাওয়া অক্সিজেন এসব কিছুরই দরকার নেই? অর্থাৎ প্রাণের উৎপত্তি সম্বন্ধে জীববিজ্ঞানীদের এতদিনের সিদ্ধান্ত সব ভুল? আর তা যদি না হয়, তাহলে স্বীকার করতে হবে যে, তাদের কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়েই আসলে ভুল ছিল৷ কিন্তু তাই বা কী করে স্বীকার করবেন গীর্বাণ সেন? Microbe Detector নামে এই আশ্চর্য কম্পিউটার তৈরির পিছনে প্রধান যে দু-টি মাথা তা হল তাঁর নিজের আর ডক্টর রাবানলের৷ শুধু এই কম্পিউটার তৈরি করবেন বলেই আজ পনেরো বছর ধরে শুধু জীবাণুবিজ্ঞান, কোষবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে গেছেন৷ ল্যাবরেটরিতে দিন নেই রাত নেই গবেষণা করেছেন৷ রাবানলকে তিনি জীবাণুবিজ্ঞানের নানা সূত্র জুগিয়ে গেছেন আর ইলেকট্রনিক্সের ক্ষেত্রে পৃথিবীর এযাবৎ সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক রাবানল সেই সূত্রকে কম্পিউটারের বোধগম্য কোডে ফেলে পুরো মডেল তৈরি করার পর জাপানের মিৎসুবিতো কোম্পানি থেকে সেই কম্পিউটার তৈরি করিয়ে এনেছেন৷
দীর্ঘদিনের জীবাণু গবেষণায় চমকপ্রদ সব ব্যাপার লক্ষ করেছেন গীর্বাণ সেন৷ একটা কোষ যখন ভেঙে দুটো হয়—দুটো থেকে চারটে তখন তাপ আর বিদ্যুৎ শক্তির সৃষ্টি হয় তা থেকে৷ অর্থাৎ জীবাণু যখন বাড়তে থাকে তখন তা সমানে তাপ উৎপাদন করতে থাকে৷ এই তাপের তীব্রতা কখনো কখনো প্রায় অকল্পনীয় হয়ে দাঁড়াতে পারে৷ ব্যাপারটা গীর্বাণ সেন আবিষ্কার করেছিলেন বড়ো অদ্ভুতভাবে৷ ভেজা খড়ের গাদায় এক বিশেষ ধরনের ধুনষ্টংকারের জীবাণুর বংশবৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন তিনি৷ জীবাণুর বংশবৃদ্ধির অনুকূল তাপমাত্রা রক্ষার জন্য ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করা ছিল৷ পাশের ঘরে দুপুর বেলা একদিন বিশ্রাম নিচ্ছেন, হঠাৎ সেই বন্ধ ঘরের ঘুলঘুলি থেকে ঝলকে ঝলকে ধোঁয়া ধোঁয়ায় সব অন্ধকার৷ হতভম্ব গীর্বাণ সেন দরজা খুলেই দেখেন সমস্ত খড়ের গাদায় দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন৷ অবাক কাণ্ড! দরজা জানলা বন্ধ ঘরের৷ বাইরে থেকে কেউ বিড়ি সিগারেটের টুকরো ফেলবে তার সম্ভাবনাই নেই৷ তাহলে আগুন এল কোত্থেকে? এই অদ্ভুত ব্যাপারটা নিয়ে আরও গবেষণা চালাতে চালাতে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন গীর্বাণ সেন—তা বড়ো চমকপ্রদ৷ জীবাণুর দ্রুত বংশবৃদ্ধির ফলে এতই প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি হয়েছিল যে তার ফলেই আগুন ধরে গিয়েছিল খড়ের গাদায়৷ দারুণ আবিষ্কার! আনন্দে প্রায় লাফ দিয়ে ওঠার মতো অবস্থা গীর্বাণ সেনের৷ তাপ যদি উৎপন্ন হয় তাহলে তা থেকে তাপ তরঙ্গের সৃষ্টি হচ্ছে৷ বিভিন্ন জীবাণুর ক্ষেত্রে তাহলে এই তাপ তরঙ্গের দৈর্ঘ্যও বিভিন্ন হবে৷ তাপ ছাড়াও গীর্বাণ লক্ষ করলেন অত্যন্ত মৃদু বৈদ্যুতিক তরঙ্গেরও সৃষ্টি হয় কোষ বিভাজনের সময়৷ এই মৃদু বিদ্যুৎতরঙ্গকে যদি প্রচণ্ড শক্তিশালী ইলেকট্রন টিউবের মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়ে এর তীব্রতাকে কয়েক-শো গুণ বাড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে তা থেকে জীবাণু বিশেষে যে নানা ফ্রিকোয়েন্সির বিদ্যুৎ তরঙ্গের সৃষ্টি হবে তাই হয়ে দাঁড়াবে কোনো জীবাণুর অস্তিত্ব ও তার চরিত্রের সংকেত৷

রাবানলকে আবিষ্কারের কথাটা বলতে রাবানলও লাফিয়ে উঠলেন—ইউ আর এ জিনিয়াস ড. সেন৷ আমার সফটওয়্যারের মূল চাবিকাঠি আমি পেয়ে গেছি৷ আর বছর কয়েক সময় দাও আমাকে৷ ইয়োর সফটওয়্যার উইল বি রেডি৷
জাপানে গিয়ে সফটওয়্যারটা বানিয়ে আনতে আর বছর চারেকই মাত্র সময় লেগেছিল রাবানলের৷
এই সেই সফটওয়্যার, এ ভুল করবে কী করে? কিন্তু ভুল যদি নাও করে কম্পিউটার স্পষ্ট নির্দেশ সে দিচ্ছে না কেন?
অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে হলের ও-মাথায় চলে গেছেন গীর্বাণ৷ হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে রাবানল—লুক লুক ডক্টর সেন!
পিছন ফিরে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখেন গীর্বাণ সবুজ আলোয় লেখা অক্ষর দপদপ করে জ্বলছে—Not Known. Not Known. Mysterious.
চিৎকার করে ওঠে রাবানল—দেখো দেখো ডক্টর সেন৷ আমার সফটওয়্যারে কোনো ভুল নেই—কম্পিউটার নিজেই খুব অনেস্টলি জানিয়ে দিচ্ছে এধরনের জীবাণুর কোনো অস্তিত্ব তার জানা নেই৷
চুপ করে থাকেন গীর্বাণ৷ কিছুই বলেন না তিনি৷ সমস্ত ব্যাপারটাই তাঁর কাছে প্রহেলিকার মতো লাগছে৷
হিকোহিতা এগিয়ে এসে তার কাঁধ চাপড়ে বলেন, দিশেহারা হয়ে যেয়ো না ড. সেন৷ এই তো বিজ্ঞান-সত্যের অনুসন্ধান৷ সারাজীবন ঠকতে ঠকতে ভুল করতে করতে তবে সত্যকে জানতে হয়৷ তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে—অত্যন্ত জরুরি কথা৷ ফোনে আমি তোমাকে কী বলেছিলাম মনে আছে?
গীর্বাণ ঘাড় নাড়েন৷
কম্পিউটারে সেই বিচিত্র সবুজ রেখার কাটাকাটি সমানে চলছে৷ গীর্বাণকে নিয়ে হিকোহিতা তাঁর চেম্বারে ঢুকে যান৷
অভাবনীয় প্রস্তাব
গীর্বাণ সেন হিকোহিতার প্রস্তাব প্রথমটা শুনে চেয়ার ছেড়ে প্রায় লাফিয়ে ওঠেন৷ নিজের কানকেই যেন তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না৷
হিকোহিতা শান্ত হেসে বলেন—না, ডক্টর সেন, আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই৷ এটা বলতেই এত জরুরি ডেকে পাঠিয়েছি৷ তোমাকেই এখন সবচেয়ে বেশি দরকার আমার৷ চাঁদে যাওয়ার জন্য আগামী অভিযানে তোমার নামই প্রস্তাব করছি আমি গভর্নিং বডিতে৷ প্রথমে মোটামুটি ঠিক ছিল একজন ভূতাত্ত্বিক আর একজন খনিজ বিজ্ঞানীকে পাঠানো হবে চাঁদে৷ কিন্তু কম্পিউটারের এই অদ্ভুত রিডিংয়ের পর সমস্ত ব্যাপারটাই নতুন করে ভাবতে হচ্ছে আমাদের৷ প্রাণ—প্রাণের চেয়ে অদ্ভুত বিস্ময়কর ব্যাপার ব্রহ্মাণ্ডের আর কোথাও নেই৷ সেই প্রাণের যখন সন্ধান পাওয়া গেছে চাঁদে, তখন সে বিষয়ে অনুসন্ধান চালানোই হবে চন্দ্র অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম৷ আর তোমার চেয়ে যোগ্য মাইক্রোবায়োলজিস্ট আর কে আছে এ মুহূর্তে যে অনায়াসে এ বিষয়ে গবেষণার জন্য চাঁদে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারে! মনে রেখো চাঁদে যদি সত্যি প্রাণের একটি ক্ষুদ্র কণারও সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে মানুষের চিন্তাভাবনার জগতে তা এমন বিপ্লব এনে দেবে যে, আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বও সে তুলনায় মনে হবে তাৎপর্যহীন৷ আর সে মহা বিপ্লবের একজন পথপ্রদর্শক হবে তুমি৷
তার এতদিনের পড়া বিজ্ঞানের মৌলিক তত্ত্ব সব ভুল৷ জল এবং অক্সিজেন ছাড়াও তাহলে জীবন সম্ভব? সংশয়টা হিকোহিতার কাছে প্রকাশ করতেই তিনি বলেন—সেজন্যেই তো তোমার চাঁদে যাওয়া দরকার ড. সেন৷ হাতেনাতে প্রমাণের চেয়ে বড়ো প্রমাণ তো আর কিছু নেই৷ গীর্বাণ তাকিয়ে থাকেন তাঁর মুখের দিকে৷ এখনও তার কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না৷ চাঁদ, তার এতদিনের স্বপ্নের চাঁদ, তার এক সময়ের রাতদিনের ভাবনার চাঁদ—সত্যি সেখানে পা রাখবেন তিনি?
—কী ভাবছ ইয়ংম্যান! এক্ষুনি মনে হচ্ছে যেন তুমি চাঁদে চলে গেলে? না, চাঁদে যাওয়ার চিন্তাটা যতই মনোরম হোক না কেন, যাওয়া অত্যন্ত পরিশ্রম আর কষ্টের৷ দীর্ঘদিনের অনুশীলন আর ট্রেনিং চাই তার জন্য—
—আমি সে-ট্রেনিংয়ের জন্য কাল থেকেই প্রস্তুত প্রফেসর হিকোহিতা৷
—ও কে৷ আশা করি সামনের বছর এসময় রেডিয়ো টেলিফোনে তুমি চাঁদ থেকে কথা বলছ আমার সঙ্গে৷ গুড নাইট৷
চলে যাচ্ছিলেন গীর্বাণ সেন৷ হঠাৎ হিকোহিতা ওকে আবার ডাকেন৷
—হ্যাঁ, ড. সেন৷ আর একটা কথা৷
গীর্বাণ সেন ফিরে তাকাতে হিকোহিতা ওর দিকে আর একবার তাঁর সরল কিন্তু অন্তর্ভেদী দৃষ্টি ফেলে বলেন—আর একবার ভেবে দেখো তুমি প্রস্তুত তো? চার লক্ষ মাইল দূরের একটি গন্তব্যের দিকে পাড়ি দেওয়াটা কিন্তু কলকাতা থেকে নিউইয়র্ক যাওয়া নয়৷ অজস্র তার ঝুঁকি৷
—আমি জানি, প্রফেসর হিকোহিতা৷ ওনার আশঙ্কা দেখে মনে মনে হাসেন গীর্বাণ সেন৷ প্রফেসর ওকে সত্যি খুব ভালোবাসেন৷
—না, ডক্টর সেন৷ সবটা জানো না৷ দেখো তো একে চিনতে পার কি না?
ড্রয়ার থেকে একটা লাল রঙের 'গোপনীয়' লেখা ফাইল বের করে তার ভিতর থেকে একটা হলুদ হয়ে যাওয়া পুরোনো খবরের কাগজের কাটিং বের করেন হিকোহিতা৷ আমেরিকার ইভনিং পোস্ট পত্রিকা৷ কাগজের মাথায় অনেকটা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার বিদ্রোহের মাস্টারদার মতো দেখতে একটি লোকের ফোটো৷ মাথা ভরতি টাক, জ্বলজ্বলে চোখ, কোট, প্যান্ট টাই পরা৷
—চেনো একে?
এক মুহূর্ত দেখে গীর্বাণ সেন বিস্ময়ে বলে ওঠেন—হ্যাঁ, চিনি তো, ইনি রবার্ট বয়েড৷ উইসকনসিন ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজির প্রফেসর৷ উইসকনসিনে ও তো ছিল আমার সহপাঠী৷ খুব প্রতিভাবান কিন্তু ভয়ানক উচ্চাকাঙ্খী আর আত্মকেন্দ্রিক ছিল ও৷
—হুঁ৷ আমার মনে হচ্ছিল তুমি ওকে চিনবে৷
—কিন্তু হঠাৎ ওর ফোটো কেন? ও এখন কোথায়?
—সেটাই তো কেউ জানে না৷ সেটা নিয়েই তো বিভিন্ন খবরের কাগজে দিনের পর দিন লেখালেখি চলেছে৷
—তার মানে?
—দেখো আমরা জানি ১৯৬৯ সালের জুলাইতে আমেরিকা তিনজন মানুষ পাঠায় চাঁদে৷ কিন্তু ঠিক এক কুড়ি বছর পর ১৯৮৯ সালেও যে চাঁদে আবার একটা মহাকাশযান পাঠানো হয়েছিল তা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ জানে না, কেননা সেটা পাঠানো হয় প্রায় যুদ্ধকালীন গোপনীয়তা রক্ষা করে৷ এর আগে আর কোনো কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপনের বেলায় আমেরিকা এরকম রহস্যজনক নীরবতা অবলম্বন করেনি৷ যাই হোক রাশিয়ার রাডারযন্ত্রে সন্দেহজনক কিছু ধরা পড়ায় তারা যখন প্রশ্ন তোলে, তখন আমেরিকাকে দায়সারা গোছের স্বীকার করতে হয় যে, এটা আগের অ্যাপোলো উৎক্ষেপনেরই পুনরাবৃত্তি মাত্র এবং এতে কোনো মানুষ নেই৷ কিন্তু ব্যাপারটা ভীষণ গোলমেলে হয়ে দাঁড়ায় কেননা আমেরিকার একটি বিখ্যাত সরকারি নীতিবিরোধী পত্রিকায় একটা চমকপ্রদ খবর বেরোয় যে, এই মহাকাশযানে নাকি আসলে দু-জন মানুষ ছিলেন এবং এই দু-জনের একজন প্রফেসর বয়েড৷
—বয়েড?
—হ্যাঁ৷ অর্থাৎ আমেরিকার বিজ্ঞানীদের মনেও একটা সন্দেহ ছিলই যে চাঁদে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণের অস্তিত্ব থাকলেও থাকতে পারে, না হলে একজন মাইক্রোবায়োলজিস্টকে পাঠানো হবে কেন সেখানে?
—তারপর? রুদ্ধনিশ্বাসে জিজ্ঞাসা করেন গীর্বাণ৷
—তারপর প্রফেসর বয়েড নিশ্চিতভাবে আর ফিরে আসতে পারেননি সেখান থেকে৷ কেননা তার ফিরে আসার কোনো খবর আর কোথাও পাওয়া যায়নি৷ আর আমেরিকার সরকারও এ বিষয়ে মুখে একেবারে কুলুপ এঁটে রাখে৷ এর আগেও ১৯৬৭ সালে অ্যাপোলো মহাকাশযানে অতর্কিতে আগুন লেগে তিন মহাকাশচারীর শোচনীয় মৃত্যু হয়৷ এবারও বয়েডের মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানীর মৃতদেহ পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে এসে তারা নিজেদের বদনাম আর বাড়াতে চায়নি৷
—মানে? আপনি বলতে চান বয়েড মারা গেছেন?
—হ্যাঁ৷ খুবই দুঃখজনক কিন্তু ওর মানে ওই একটিই দাঁড়ায়৷ এক বছরেও একজন মানুষের চাঁদ থেকে না ফিরে আসার আর কী অর্থ থাকতে পারে?
হঠাৎ ভারী হয়ে যায় গীর্বাণ সেনের মনটা৷ মানুষ হিসেবে প্রফেসর বয়েড অত্যন্ত বেশি উচ্চকাঙ্খী ও আত্মকেন্দ্রিক ছিলেন৷ কিন্তু বিজ্ঞানী হিসেবে সত্যই তার প্রতিভা আর অনুসন্ধান স্পৃহার কোনো তুলনা নেই৷ এই দুটো বিরুদ্ধ চরিত্র একই সঙ্গে কী করে একজনের ভিতরে থাকতে পারে ভেবে কতবার আশ্চর্য হয়েছেন গীর্বাণ সেন৷
হিকোহিতা গম্ভীর গলায় বলেন—তাই বলছিলাম ডক্টর সেন, এ অভিযানের ঝুঁকি বড়ো সাংঘাতিক—এখনও ভেবে দেখার সময় আছে৷
গীর্বাণ সেন বলেন—একজন না একজনকে তো ঝুঁকি নিতেই হবে৷ আমিই না হয় সেই একজন হলাম৷
হিকোহিতা শান্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলেন—না, তোমাকে আমি একা পাঠাব না সেখানে৷ সেই ভীষণ নির্জন রাজ্যে একজন মানুষ সঙ্গী তুমি অবশ্যই পাবে৷ জিয়োলজিস্ট ড. রমন যাবেন তোমার সঙ্গে৷ চাঁদের মাটি পাথর আমরা আরও ভলো করে পরীক্ষা করতে চাই, যদি কিছু অপ্রত্যাশিত পাওয়া যায় সেখানে৷ রমনের নিজস্ব অনুমান ওখানে তেজস্ক্রিয় কিছু ধাতু পাওয়া উচিত৷ কম্পিউটারে নীল আঁকিবুঁকি রেখা যা পাওয়া যাচ্ছে তা হয়তো ওই তেজস্ক্রিয় রশ্মির জন্য যাকে আমরা জীবাণুর শরীরের তাপতরঙ্গ বলে ভুল করছি৷
মহাশূন্যের উদ্দেশে
এর ঠিক নয় মাস পনেরো দিন পর৷ উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে চাঁদ তখন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি—জ্যোৎস্না গলানো সোনার মতো উজ্জ্বল৷ ড. গীর্বাণ সেন আর ড. রমন মহাকাশচারীদের উপযুক্ত 'প্রেসারাইজড স্যুট' পরে উৎক্ষেপণ মঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে চন্দ্রযানের দিকে এগোতে থাকেন৷ ঠিক রাত বারোটায় তাদের lift off অর্থাৎ যাত্রা শুরু হবে৷
লঞ্চিং প্যাডের গোড়ায় এসে হিকোহিতা দাঁড়ালেন৷ তিনতলা উঁচু বিরাট রকেটটা খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উৎক্ষেপণ মঞ্চের গায়ে৷ হিকোহিতা গীর্বাণের সঙ্গে করমর্দন করে বলেন-তোমরা চার লক্ষ কিলোমিটার দূরের একটি জনপ্রাণীহীন নির্জন উপগ্রহের দিকে রওনা দিচ্ছ ইয়ংম্যান৷ সেখানে পৌঁছে প্রথম যে ভয়ানক অভিজ্ঞতা তোমাদের হবে তা হল তোমরা একা, ভয়ানক একা৷ এ সাহারা মরুভূমি কিংবা দক্ষিণ মেরুর নির্জনতা নয়৷ এ তার চেয়েও অনেক ভয়ংকর, এখানে কোনো শব্দ নেই, প্রাণ নেই৷ এ একাকিত্ব কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করা সহজ নয়, কিন্তু তোমরা তো দিনের পর দিন একা থাকারও ট্রেনিং নিয়েছ৷ তবু যদি কখনো একা লাগে তাহলে মনে রেখো এই গ্রহের কয়েক-শো কোটি মানুষ তোমাদের সঙ্গে রয়েছে৷ তারা অপেক্ষা করছে কখন এক আশ্চর্য প্রাণের সংবাদ নিয়ে তোমরা ফিরে আসবে সেখান থেকে-তাই হবে এ পর্যন্ত মানব সভ্যতার অগ্রগতির পথে সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার৷ গো ইয়ংম্যান! হ্যাভ কারেজ৷

'লুনার মডিউল' অর্থাৎ চন্দ্রযানে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কি নিতে পারবেন ডক্টর সেন তা অন্যান্য ডাক্তার, বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়াররাই ঠিক করে দিয়েছে৷ মডিউলে পরিসর খুবই কম, তা ছাড়া ওজনও বেশি বাড়ানো যাবে না, সুতরাং জিনিসপত্র একেবারে যা না নিলেই নয়৷ চন্দ্রযানে ঘুমোনোর সময়টুকু ছাড়া আর প্রতিমুহূর্তে নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে৷ অনবরত যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে পৃথিবীর সঙ্গে৷ সুতরাং ফুরসত খুব পাবেন না তারা, তবুও কাজসংক্রান্ত কাগজপত্র ছাড়াও বিশেষ অনুমতি নিয়ে তিনি সঙ্গে নিয়ে নিলেন একখণ্ড গীতবিতান আর কয়েকটা রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেট৷ সেই ভয়ানক শব্দহীন রাজ্যে ওই গানই সঙ্গ দেবে তাকে৷ তার বিশেষ অনুরোধে একটা অদ্ভুত যন্ত্র তৈরি করে দিয়েছে রাবানল৷ সেই বাতাসহীন রাজ্যে যেখানে শব্দ সঞ্চালনের কোনো মাধ্যম নেই সেখানে কথা বললে সেই শব্দ বৈদ্যুতিক তরঙ্গে রূপায়িত হয়ে কানের কাছে রাখা একটা পাতলা ধাতব পর্দায় কম্পন সৃষ্টি করবে ফলে তৈরি হবে শব্দ৷ লুনার মডিউলের বাইরে ওরা দু-জনও এভাবেই কথা বলবে নিজেদের মধ্যে৷
চন্দ্রযানে ঢোকার আগে আত্মীয়স্বজন সহকর্মীদের সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ সমাপ্ত হয় ডক্টর সেন ও ডক্টর রমনের৷ তারপর সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তাঁরা দু-জন বায়ুনিরোধক নিশ্ছিদ্র দরজা বন্ধ করে ভিতরে বসেন৷ ব্যস সব আয়োজন শেষ৷ এখন কাউন্টডাউন৷ ওরা প্রস্তুত হয়৷
...টেন ...নাইন ...এইট ...সেভেন .....ইলেকট্রনিক ঘড়িতে লাল সংকেত জ্বলতে থাকে৷ টু... ওয়ান... জি...রো...৷ সঙ্গে সঙ্গে যেন হাজারটা সূর্যের আলো আর সেই সঙ্গে কানের পর্দা ফাটানো একটা শব্দ৷ কিন্তু তা মুহূর্তের জন্যই তারপর আর কোনো শব্দ নেই-শুধু গীর্বাণের মনে হচ্ছিল তার শরীরের ওজন যেন কয়েক লক্ষ হাতির ওজনের সমান৷ এত ওজন যে মনে হচ্ছিল চন্দ্রযান ফুটো করে তিনি নীচে চলে যাবেন৷ আশ্চর্য এক রকমের অনুভূতি, কিন্তু এর জন্যও প্রস্তুত ছিলেন তিনি, কেননা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় দুই কিলোমিটার করে বেগ বাড়ছে ওই ৩০ লক্ষ কিলোগ্রাম ওজনের রকেটের৷ সুতরাং এরকম ভীষণ চাপেরই তো সৃষ্টি হবে পদার্থবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী৷ শব্দের চেয়েও দ্রুতবেগে রকেট সামনে এগিয়ে যাওয়ার দরুণ পিছনে ভীষণ বেগে যে জ্বালানি পুড়ে যাচ্ছে তারও কোনো শব্দ আসছে না তাদের কানে৷ এরকম ভীষণ বেগে ছুটতে ছুটতেই রকেট একসময় চলে যাবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের বাইরে তখন আবার তাদের শরীর হয়ে যাবে ভারহীন৷ তারপর আবার যখন চাঁদের দিকে নামতে থাকবে তখন শরীরের ভারবোধ আবার কিছুটা ফিরে আসবে আস্তে আস্তে৷
জানলার পাশের সিটে বসেছেন গীর্বাণ সেন৷ জানলাটা অবশ্য গীর্বাণের অনুরোধেই এমনভাবে তৈরি যাতে আসনে বসে থেকে তিনি জানলা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখতে পান৷ এই ব্রহ্মাণ্ডের রূপ রস রং তার কাছে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মতোই সমান আকর্ষণীয়৷ সুতরাং শুধুই তত্ত্বের অনুসন্ধান নয়, এই যাত্রাটাকেও তিনি ভ্রমণবিলাসীদের মতোই উপভোগ করতে চান৷
কৌতূহলী শিশুর মতো কাচের গায়ে চোখ ঠেকিয়ে দেখতে থাকেন গীর্বাণ সেন৷ বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ থেকে নিষ্ক্রমণ-বেগজনিত ঘর্ষণে প্রায় সাড়ে ছয়-শো সেলসিয়াস তাপ উৎপন্ন হওয়ার কথা কিন্তু তাদের মডিউলের চারপাশে মোটা কর্কের একটা আস্তরণ এই ভীষণ তাপের হাত থেকে তাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে৷ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই রকেটের মাথায় যে 'নিষ্ক্রমণ মঞ্চ' (Escape Tower) রয়েছে তার সঙ্গে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া কর্কের আস্তরণটিও খসে পড়ে যাবে৷ কিন্তু এটা বলতে যত সময় লাগল তার আগেই পৃথিবীর ধুলো জলকণা মেঘ ভরতি বায়ুমণ্ডল বিদ্যুৎগতিতে পেরিয়ে রকেট অনেক অনেক উপরে উঠে গেছে৷ মডিউলের ভিতরে বসানো সৌর-ব্যাটারি চালিত ঘড়িতে দেখলেন গীর্বাণ সেন নিষ্ক্রমণ মুহূর্তের পর মোটে ১২ মিনিট পেরিয়ে গেছে৷ কিন্তু এর মধ্যেই তারা হিসেবমতো ১৮৫ কিলোমিটার উঁচু দিয়ে ঘণ্টায় ২৮,০০০ কিলোমিটারের মতো ভয়ংকর বেগে পৃথিবীকে বৃত্তাকারে পাক খেতে শুরু করেছে৷
জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন গীর্বাণ সেন৷ অন্ধকার... নিশ্ছিদ্র অন্ধকার৷ পৃথিবীর কারোর পক্ষে এরকম অন্ধকারের ধারণা করাও অসম্ভব৷ মোটা অন্ধকারের একটা দমচাপা ভারী কম্বল যেন চোখের উপর চাপা দেওয়া ওদের৷ জায়গায় জায়গায় যেন ফুটো আছে তার৷ সেই ফুটো দিয়ে বাইরের আলোর মতো দেখা যাচ্ছে ঝকঝকে কিছু গ্রহ নক্ষত্র৷ রৌরবের বর্ণনার মতো এই অন্ধকারের কারণ যে জানেন না গীর্বাণ সেন, তা নয়৷ এই পরিষ্কার নিষ্কলঙ্ক মহাশূন্যে ধুলো জলকণা দূরের কথা সামান্য বাতাসেরও একটি কণা নেই, যার উপর প্রতিফলিত হয়ে সূর্যের আলো ওদের চোখে পড়বে৷ জানলায় একেবারে চোখ চেপে ধরলে পিছনে অবশ্য দেখা যায় রকেটের লেজের একটুখানি৷ আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত করার মতো কোনো গ্যাস বা বায়ুমণ্ডলের অস্তিত্ব না থাকায়, সূর্যের আলো সেই ধাতব পাতের উপর সরাসরি পড়ে প্রতিফলিত হওয়ার দরুণ মনে হচ্ছে যেন সূর্য খসে পড়া একটা জ্বলন্ত টুকরোই যেন ওটা৷ অদ্ভুত এই জগতের রূপ৷ চড়া সাদা-কালোয় আঁকা কাঠ খোদাইয়ের ছবির মতো৷ এই জ্বলন্ত অগ্নির মতো উজ্জ্বল আলো-ঠিক তার পাশেই নিকষ অন্ধকার৷ পৃথিবীর সেই মায়াময় আলো-আঁধারি মাখা নরম গোধূলির কোনো অস্তিত্বই নেই এখানে৷ খালি চোখে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা শক্ত সেই চড়া আলো অন্ধকারের দিকে৷ তাই সেন্টারের ডাক্তারদের কড়া নির্দেশ ছিল কালো চশমা ছাড়া যেন খালি চোখে তারা দেখতে না যায় এই জগতের রূপ৷ ফলে চোখ অন্ধও হয়ে যেতে পারে৷
আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছিল এই বস্তুহীন শব্দহীন ঘটনাহীন জগতে৷ গীর্বাণ সেন যেন তার সময়ের বোধ হারিয়ে ফেলছিলেন৷ ঘড়িতে সেকেন্ডের কাঁটাটা লাফিয়ে লাফিয়ে সময় দেখিয়ে চলেছে৷ কিন্তু সেটা শুধু ঘড়ির সময়৷ আর কোথাও যেন সময়ের কোনো সাড়া নেই৷ ঘড়িতে দেখা যাচ্ছে মোটে চল্লিশ মিনিট কিন্তু আসলে মনে হচ্ছিল যেন কয়েক যুগ পেরিয়ে গেছে৷ এরকম ঘটনাই যে ঘটবে তা রিসার্চ সেন্টারের মনস্তত্ত্ববিদরা ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছিল তাকে৷ প্রফেসর হিকোহিতাও তার 'মহাকাশ ও সময়' সংক্রান্ত বক্তৃতায় অনেকবার অন্যান্য বিজ্ঞানীর ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সময় বলে আলাদা কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, ঘটনা আছে বলেই সময় আছে৷ ঘটনা না থাকলে সময়ও নেই৷ বুদ্ধি দিয়ে তা বোঝারও চেষ্টা করেছেন গীর্বাণ সেন৷ কিন্তু বুদ্ধি দিয়ে বোঝা এক জিনিস আর নিজে তা উপলব্ধি করা আর এক জিনিস৷ এরকম অদ্ভুত উপলব্ধি সত্যি তার কখনো হয়নি৷ হওয়া সম্ভবও নয়৷
ঘণ্টায় আঠাশ হাজার কিলোমিটার বেগে ঘুরছে তাদের মহাকাশযানটা অথচ তাঁর মনে হচ্ছে তিনি একেবারে স্থির হয়ে আছেন৷ একচুলও নড়ছে না কোনোদিকে৷ এরকমই একটা অভিজ্ঞতা অবশ্য তার হয়েছিল অনেকদিন আগে যখন সে খুব ছোটো৷ নৌকো করে বাবার সঙ্গে একবার বেড়াতে গিয়েছিল সুন্দরবনে৷ প্রায় সমুদ্রের মতো বিশাল সপ্তমুখী নদী দিয়ে যাচ্ছিল ওদের পাঁচশো-মনী নৌকো পাল তুলে৷ নদী এত বিশাল যে এপার ওপার সরু চুলের মতো দেখা যায়৷ চারপাশে শুধু যা দেখা যায় তা হল জল৷ কিন্তু নৌকো এগোচ্ছে না কেন একদম? একদম স্থির৷ কখন তা হলে সুন্দরবনে গিয়ে পৌঁছোবে ওরা? মাঝিকে আশ্চর্য হয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করাতে মেদিনীপুরের মাঝি খুব গম্ভীরভাবে বলল—নাও পবনের বেগে যায়িঠি খোকাবাবু৷ অর্থাৎ নৌকো হাওয়ার বেগে যাচ্ছে৷
মাঝি কি তাকে ছোটো মানুষ পেয়ে মজা করছে? খুব রাগ হয়েছিল তার৷ হঠাৎ সামনে তাকিয়েই দেখে দুটো কালো বিরাট কী বস্তু জলের উপর দিয়ে বিদ্যুৎ বেগে সোজা এগিয়ে আসছে তাদের নৌকোর দিকে৷ সামনে আসতে দেখে দুটো বিরাট কালো টিনের ড্রাম যাতে আলকাতরা থাকে৷ ওই জিনিস নৌকোয় লাগলে নৌকোর তলা একেবারে ফুটো হয়ে যাবে৷ ভীষণ ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিল সে—সামাল! সামাল মাঝি! নৌকো ডুবল—
হালে বসা মাঝি খুব নিশ্চিন্তে হালটা একটু ঘুরিয়ে দিতেই সেই কালো যমদূতের মতো দুটো জিনিস সাঁ সাঁ করে একচুল পাশ কাটিয়ে নিমেষে মিলিয়ে গিয়েছিল দূরে৷
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেছিল সে মাঝিকে—অত জোরে ছুটে যাচ্ছে—ও দুটো ড্রাম কীসের মাঝি৷
মাঝি হেসে বলেছিল—ও দুটো ছুটে যাচ্ছেনি খোকাবাবু৷ ওগুলো তো জালের 'ভাসা'—মাটিতে নোঙর করা৷ আসলে আমাদের এই নাওটাই ছুটতিছে কিনা অত জোরে—তাই ওরকম দেখাইঠে৷
ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিল গীর্বাণ সেন৷ চারপাশে তাকিয়ে দেখে নৌকো আবার সেরকমই স্থির৷ কোথাও কিছু না থাকলে তাহলে গতিরও কোনো অস্তিত্ব নেই৷
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল কিছুক্ষণের মধ্যে এই অনন্ত মহাশূন্যেও যে ওরকমই আর একটা ঘটনা ঘটবে, তা গীর্বাণ সেনের ধারণায় আসবে কী করে? ঘটনাটি ঘটল খানিকটা পরে৷
এক ভয়ংকর বিপদ ঘটতে ঘটতেও সেই বিপদের হাত থেকে আশ্চর্যভাবে বেঁচে গেল তারা৷
অদ্ভুত বিপদ!
মডিউলের দেওয়ালটা দুটো পরত দিয়ে তৈরি৷ বাইরে দেওয়াল শক্ত স্টেনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি মৌচাকের খাপের মতো দেওয়াল৷ তার বাইরে আবার একটা পদার্থের আস্তরণ যা পৃথিবীতে ঢোকার মুখে বাতাসের ঘর্ষণজনিত তাপে জ্বলে গিয়ে স্টিলের দেওয়ালকে গলে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করবে৷ ভিতরের দেওয়ালটা পাতলা অ্যালুমিনিয়ামের পাত দিয়ে তৈরি৷ ঘরের দেওয়াল হাজার রকমের যন্ত্রপাতি দিয়ে ঠাসা—কতরকমের ডায়াল, সুইচ, বোতাম, গিয়ার, হ্যান্ডেল যার সাহায্যে মহাকাশযানটাকে প্রয়োজনে হেলিকপ্টারের মতো চালানো যাবে-এছাড়াও আছে পৃথিবী থেকে রেডিয়ো টেলিভিশন সংকেত গ্রহণ করা ও পাঠানোর ব্যবস্থা৷ স্প্রিং দেওয়া বসার চেয়ার দুটো ইচ্ছেমতো হেলানো যায়৷ চেয়ারে বসেই যন্ত্রপাতিগুলো সব হাতের নাগালে পাওয়া যায় সুতরাং চেয়ার দুটো তাদের বিশ্রাম এবং কাজ দুয়েরই জন্য৷ তাতে শোয়াও যায়৷ অবশ্য আরাম করে শোয়ার জন্য একটা বেডরুমও আছে৷ তাতে দুটো খাটে ধবধবে চাদর পাতা বিছানা৷ এত সব সরঞ্জামের পরও বেশ খানিকটা জায়গা রয়ে গেছে মডিউলে উঠে দাঁড়িয়ে হাত-পা নাড়িয়ে একটু ব্যায়াম করার জন্য৷ এই সংকীর্ণ জায়গায় এই একঘেয়ে পরিবেশে বৈচিত্র্য আনার জন্য মনস্তাত্ত্বিক কারণেই এই ব্যায়ামের খুব দরকার৷ ছোটো একটা ভাঁড়ার ঘরও আছে৷ তাতে দেওয়ালের তাকে তাকে সাজানো মহাকাশে মাসখানেক থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জল ও খাদ্য৷ খাদ্য সবই শুকনো৷ জল মিশিয়ে লেই করে খেতে হবে৷ ভুট্টার ছাতু আর দুধ দিয়ে তৈরি একরকমের পুডিং, পাঁউরুটির একরকম মন্ড, টিনবন্দি মাছ, বিচিছাড়া শুকনো খেজুর৷
এ তো গেল খাদ্য৷ জলের ব্যবস্থাটাও অদ্ভুত৷ বেডরুমের পাশেই খুব ছোটো একটা ল্যাবরেটরি রুম৷ এই ঘরটা মূলত তৈরি হয়েছে গীর্বাণের জন্যই৷ যদি চাঁদের মাটিতে সত্যি কোনো ব্যাকটিরিয়া পাওয়া যায় তাহলে পৃথিবীতে নিয়ে আসার আগে ওই মহাশূন্যে বসেই যাতে তাদের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো যায় তার জন্যই এই ল্যাবরেটরি৷ ল্যাবরেটরির এক কোণে হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন সিলিন্ডার৷ এই দুই গ্যাসের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় জল আর বিদ্যুৎশক্তি তৈরি হয়ে চলেছে৷ পাইপের মধ্য দিয়ে জল চলে যাচ্ছে ভাঁড়ার ঘরের ট্যাংকে আর বিদ্যুৎ দিয়ে মডিউলের ভিতরের আলো পাখা ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি চালু রাখা হয়েছে৷
কাউচে (বসার চেয়ার) আধশোয়া ভঙ্গিতে বসে এসব দেখতে দেখতেই হঠাৎ কেমন একটা তন্দ্রার ঘোর এসে গিয়েছিল চোখে৷ ক-সেকেন্ড সে ঘুমিয়েছিল জানে না৷ জেগে উঠেই মনে হল তার সময়ের বোধ যেন একেবারে লুপ্ত হয়ে গেছে৷ এখন দুপুর সন্ধ্যা রাত্রি না সকাল৷ সকাল হবে নিশ্চয়৷ পাশের কাউচে চিৎ হয়ে শুয়ে ড. রমন একটা নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রেডিয়ো সিগন্যাল রিসিভ করছিল পৃথিবী থেকে৷ বয়স আর চাকরিতে অভিজ্ঞতা যেহেতু বেশি, টিম লিডার করা হয়েছে ড. রমনকেই৷
ড. রমনের দিকে তাকিয়ে গীর্বাণ বলেন—গুড মর্নিং ড. রমন৷
ড. রমন নব ঘোরাতে ঘোরাতে খুব গম্ভীরভাবে বলে—গুড ইভনিং ড. সেন৷
অপ্রস্তুত হয়ে যান ড. সেন৷ ওর হতভম্ব ভাব দেখে রমন এবার হেসে বলে—ডোন্ট ওরি ড. সেন৷ সকাল সন্ধ্যা দুপুর সবই এক এখানে৷ পৃথিবী নিজের চারদিকে ঘোরে বলেই তো সেখানে সকাল সন্ধ্যা রাত্রি আছে৷ আমরা ঘুরেই চলেছি পৃথিবীর চারপাশে৷ সুতরাং যদি বলতেই চাও তো বলতে পার তোমার কাউচে যখন সকাল আমার কাউচে তখন রাত্রি৷
লজ্জা পেয়ে যান গীর্বাণ সেন৷ ছি ছি! এ তো অত্যন্ত সাধারণ তত্ত্ব!
ড. রমন আরও কয়েকটা সুইচ আর নব পরীক্ষা করে নিয়ে বলে-আবহাওয়া খুব ভালো ড. সেন৷ পৃথিবী থেকে আমরা চমৎকার সিগন্যাল পাচ্ছি৷ ড. রমন কথা শেষ করতে না করতেই টেপ রেকর্ডারে একটা খস খস শব্দ তারপর কোন মহাশূন্য থেকে যেন হিকোহিতার ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট ধাতব গলার আওয়াজ ভেসে এল—থ্যাংকস ফর হ্যাপি জার্নি, বি রেডি ফর নেক্সট লঞ্চিং—নে ক স ট লঞ্চিং৷
কট করে কেটে গেল কথাটা৷ কোথাও পৃথিবীর আয়নস্ফিয়ারে কোনো চৌম্বক ঝড় শুরু হয়েছে বোধ হয়৷ কিন্তু হিকোহিতার কাছ থেকে মেসেজটা পাওয়া মাত্রই যেন শিরদাঁড়া টানটান হয়ে গেল ড. রমনের৷ প্যানেল বোর্ডের দিকে তাকিয়ে বলে—আড়াই ঘণ্টা হতে চলল৷ পৃথিবীকে প্রায় দু-বার পাক খেয়েছি আমরা৷ এবার আমাদের পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে চাঁদের কক্ষপথের দিকে যাত্রা শুরু করার পালা৷ বি রেডি ড. সেন৷ নো ডিলে৷ ড. রমনের কন্ঠস্বরে একটা ত্রস্ত ব্যস্ততার সুর৷
হঠাৎ ঘোরটা কেটে যায় গীর্বাণ-এর৷ এতক্ষণ তাদের ভূমিকা ছিল নিতান্তই যাত্রীর৷ যেন টিকিট কেটে রকেটে উঠে তারা চাঁদে বেড়াতে যাচ্ছে আর পৃথিবীর উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকেই সুইচ টিপে তাদের রকেট চালানো হচ্ছে৷ কিন্তু এবার তাদেরই ভূমিকা নিতে হবে চালকের৷ এবার সুইচ টিপে আর একটা রকেট চালু করতে হবে যার ধাক্কায় পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে চাঁদের কক্ষপথের দিকে রওনা দেবে তাদের মহাকাশ যান৷
ট্রেনিংয়ের সময় হিকোহিতা ও অন্যান্য অ্যাসট্রোফিজিসিস্টরা 'টপোলজি'র অঙ্ক কষে ডায়াগ্রাম এঁকে বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের যে, এ কাজটা করতে হবে প্রায় যন্ত্রের মতো নির্ভুল সতর্কতায়৷ চাঁদও ঘুরছে এবং তাদের মহাকাশযানও ঘুরছে সুতরাং অত্যন্ত সতর্কতায় চাঁদের দিকে মহাকাশযানকে তাগ করতে হবে তাদের৷
এখানে হিকোহিতা আবার সেই doughnut-এর প্রসঙ্গ তুলেছিলেন৷ Doughnut-এর মতো বাঁকা মহাশূন্যের (মহাশূন্য আবার কী করে বাঁকা হয়?) মাঝখানে একটা কাল্পনিক ফুটো আছে (মহাশূন্যে ফুটো?) ব্যাপারটা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না গীর্বাণ সেনের৷ নাঃ এবার চাঁদ থেকে ফিরে এসে অঙ্ক আর জ্যামিতিটা নতুন করে শিখতে হবে তাকে৷ কেননা হিকোহিতা তাকে বলেছিলেন, এই বিশাল ফাঁকা মহাশূন্যে ইউক্লিডের জ্যামিতির সূত্র খাটবে না আর৷ শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন গীর্বাণ সেন৷ সেই ফুটোটাকে বলা যেতে পারে মহাশূন্যের জানলা৷ প্রতি বারো ঘণ্টায় চার ঘণ্টা মাত্র সেই জানলা খোলা থাকে৷ চাঁদে যেতে হলে এই জানলার মধ্য দিয়েই তাদের গলে যেতে হবে৷ সুতরাং এক্ষেত্রে একেবারে জ্যামিতিক নির্ভুল চুলচেরা হিসেব দরকার৷ রকেট চালু করতে এক সেকেন্ডের এক-শো ভাগের এক ভাগ সময়ের হেরফের হলেও তাদের মহাকাশ যান চাঁদের কক্ষপথের দিকে রওনা না দিয়ে পাড়ি দেবে অন্য কোনো অজানা নক্ষত্রের দিকে যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো উপায় নেই৷ তাদের গোটা অভিযানে এই মুহূর্তটিই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ৷ মহাকাশযানের অবস্থান সম্বন্ধে তারা ক্রমশ মেসেজ পাঠাবে পৃথিবীতে৷ পৃথিবী থেকে নির্দেশ আসবে ঠিক কোন মুহূর্তে রকেট চালু করতে হবে তাদের৷ এ কাজটার মূল দায়িত্ব অবশ্য পড়েছে রমনের উপর-গীর্বাণ সেনকে শুধু সাহায্য করতে হবে৷ দেওয়াল ভরতি প্যানেলে কম্পিউটারের লাল নীল সবুজ নানা সংকেত জ্বলছে নিভছে...টেলিমিটারের বোতাম টিপে পৃথিবীতে ক্রমাগত সংকেত পাঠাচ্ছে রমন৷ কখন সেই মহাশুন্যের জানলা খোলা পাওয়া যাবে৷ কখন আসবে সেই মহামুহূর্ত৷
রমন হাতের ইশারায় প্যানেল বোর্ডের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করল ওর৷ পৃথিবী থেকে নির্দেশ এসে গেছে—বি রেডি৷ রকেট চালু করতে হবে৷ এবার কাউন্ট ডাউন হচ্ছে—টেন...নাইন...এইট...
বিপদটা ঘটল সেই মুহূর্তেই৷
হঠাৎ জানলার বাইরে চোখ যেতেই গীর্বাণ দেখলেন বন্দুকের গুলির মতো বেগে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে একটা আগুনের গোলার মতো উজ্জ্বল কী বস্তু সোজা ছুটে আসছে ওদের দিকে৷ উল্কা কি? যদিও রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানীরা ওদের সাবধান করে দিয়েছিল উল্কার বিপদ সম্বন্ধে, তবুও এযাবৎ কোনো উল্কা ওদের চোখে পড়েনি৷ বালির কণার মতো ক্ষুদ্র উল্কাও অবশ্য ভেসে বেড়াচ্ছে মহাশূন্যে কিন্তু সেগুলো তেমন বিপদের কারণ না৷ গীর্বাণের অবশ্য এক লহমা দেখেই মনে হল ওটা আর যাই হোক উল্কা নয়৷ কালো চৌকো মতো কী একটা বস্তু৷ সবচেয়ে আশ্চর্য—দড়ির মতো একটা জিনিস আনুভূমিকভাবে বেরিয়ে এসেছে তার গা থেকে৷ প্রাকৃতিক কোনো বস্তু এটা নয়৷ প্রাকৃতিক কোনো বস্তু এরকম মাপসই হতেই পারে না৷ মানুষের হতে তৈরি কোনো জিনিস তাহলে৷ কিন্তু এই মহাশূন্যে তা আসবে কোত্থেকে?
এদিকে ভয়ংকর বেগে ছুটে আসছে বস্তুটা মহাকাশযানের দিকে৷ আকারে সেটা মহাকাশযানের কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ হলেও প্রচণ্ড গতির দরুণ যা ভরবেগ হবে তার ধাক্কায় মহাকাশযানের গতিপথ যদি কয়েক সেন্টিমিটারও সরে যায় তাহলেই তার ফল হবে বিপজ্জনক৷ বিস্ময়ে ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন গীর্বাণ—দেখো ড. রমন—কী একটা জিনিস ভীষণ বেগে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে!
ড. রমনের চোখে পড়েছে জিনিসটা৷ মুখ শুকিয়ে গেছে তার ভয়ে৷ ফিসফিস করে বলে—উল্কা! উল্কা! ড. সেন৷ ওটা এগিয়ে আসছে না৷ আমরাই এগিয়ে যাচ্ছি ঘণ্টায় আঠাশ হাজার মাইল বেগে৷ ওটার দিকে৷ কিন্তু কিছু উপায় নেই৷ আমাদের মহাকাশযানটাকে এখন তিলমাত্র সরানো চলবে না কক্ষপথ থেকে৷ তাহলে আর সেই মহাশূন্যের জানলাটা আমরা পাব না৷
কী ভয়ানক বিপদ যে এগিয়ে আসছে তা বুঝতে গীর্বাণের বিন্দুমাত্র বিলম্ব হল না৷ কিন্তু সেই ভয়ানক বিপদের মধ্যেও অদ্ভুতভাবে ছোটোবেলায় সেই সুন্দরবনের অভিজ্ঞতাটা মনে পড়ে গেল তার—ভেবে আর একবার আশ্চর্য হল গতি আর সময়ের বোধ কী অদ্ভুতভাবেই না আপেক্ষিক মানুষের মনে৷
সেই বস্তুটা এসে ওদের মহাকাশযানের গায়ে বোমার শেলের টুকরোর মতো আঘাত করবার মুহূর্তেই প্যানেলে কাউন্ট ডাউনের নম্বর ফুটে উঠল টু... ওয়ান...জিরো...৷ সুইচ টিপে দেওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই ভীষণ বেগে পিছনে কমলা বেগুনি শিখায় জ্বালানি জ্বলে উঠে গতিবেগ বাড়িয়ে দিল রকেটের৷ আর সেই বস্তুটা একেবারে ওদের লেজের কাছে একটু ধাক্কা খেয়ে ছুটে, জানলার কাছে মুহূর্তখানেক ওদের মহাকাশযানের সমান্তরালে ছুটে তারপর ছিটকে বেরিয়ে গেল৷ কিন্তু ওই অল্প সময়ের মধ্যেও গীর্বাণের স্পষ্ট মনে হল ওটা একটা ক্যামেরা৷ হ্যাঁ! যত আশ্চর্যই লাগুক ভাবতে ওটা একটা ক্যামেরাই-অত্যন্ত দামি 'হ্যাসেলব্লাড' ক্যামেরা৷ যেরকম ক্যামেরা রিসার্চ সেন্টারে তিনি দেখেছেন৷ এমনকী ক্যামেরাটার গায়ে লেখা দুটো অক্ষরও যেন দেখতে পেয়েছিলেন গীর্বাণ—খুব সম্ভব R.B. কিন্তু একথা কি বিশ্বাস করবে কেউ?
চাঁদ! চাঁদ!
ঘড়ির সময় অনুযায়ী ইতিমধ্যে পঁচাত্তর ঘণ্টা অর্থাৎ পৃথিবীর সময় অনুযায়ী প্রায় তিন দিন পার হয়ে গেল৷ ওদের মহাকাশযান ঘণ্টায় ন-হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটতে ছুটতে চাঁদের উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঢুকে পড়েছে৷ মহাকাশযানের মুখটা অবশ্য ইতিমধ্যে উলটো দিকে ঘুরে গেছে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী৷ এবার চাঁদের মাধ্যাকর্ষের টানে প্রচণ্ড বেগে ওটা চাঁদের দিকে নেমে আসবে কিন্তু সেই বেগকে প্রতিহত করার জন্য আর একবার রেট্রো রকেটে জ্বালানির বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে যাতে রকেটের ঊর্ধ্বমুখী বেগ আর চাঁদের আকর্ষণের নিম্নমুখী বেগ কাটাকুটি হয়ে প্রায় হালকা শিমূল তুলোর বীজের মতো ধীরে ধীরে তারা চাঁদের মাটিতে নামতে পারে৷
সেই ক্যামেরাটার কথা কিন্তু গীর্বাণ কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না৷ এটা কি স্বপ্ন, না তার চোখের ভুল?
চন্দ্রপৃষ্ঠের ১১২ কিলোমিটার উপর দিয়ে ওরা এখন পাক খাচ্ছে৷ বার কয়েক পাক খাওয়ার পরই ওরা মহাকাশযানের একেবারে 'নীচে' বসানো 'লুনার মডিউল' বা 'চাঁদের ট্যাক্সি'তে উঠে বসবে৷ সুইচ টিপে চারটে পা বের করতে হবে সেই ট্যাক্সির৷ তারপর সেই ট্যাক্সিতে চড়েই ওরা নেমে পড়বে চাঁদে৷ ওই ট্যাক্সিতেও ওদের থাকা খাওয়া শোয়ার তোফা ব্যবস্থা আছে৷ আর আছে আস্ত দুটো ল্যাবরেটরি৷ যতদিন থাকবে ওরা ততদিন ওই ট্যাক্সিই হবে ওদের চাঁদে থাকার তাঁবু৷
সেই 'উল্কা'টা ধাক্কা মারার পর থেকেই জানলাটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন গীর্বাণ৷ তা ছাড়া দেখারও তো কিছু নেই৷ সেই একঘেয়ে গতিহীন আকারহীন অন্ধকার৷ কিন্তু আবার কী মনে করে জানলাটা খুলতেই অবাক হয়ে গেলেন গীর্বাণ৷ বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলেন—কাম কাম, ড. রমন! সি!
ড. রমন ছুটে এলেন জানলার কাছে, তারপর তারা দেখতে থাকল সেই অভাবনীয় অকল্পনীয় দৃশ্য! যে চাঁদকে তারা এতদিন চার লক্ষ মাইল দূর থেকে দেখে এসেছে, সে চাঁদ এখন মোটে এক-শো মাইল নীচে৷ ওই তো সেই চরকা বুড়ি—হ্যাঁ, কালো এবড়োখেবড়ো গর্তই তো ওগুলো৷ ওর ঠাকুমা কৃষ্ণচূড়ার ফাঁকে পূর্ণিমার চাঁদ দেখিয়ে চরকা কাটা বুড়ির গল্প বলতেন৷ খুব ছোটোবলোয় ওর এক পিঠোপিঠি বোন ছিল৷ খুব ভালোবাসত ও বোনকে৷ সেই বোন যখন মারা গেল তখন বড়োরা বলত ও চাঁদে বেড়াতে গেছে৷ কথাটা অনেক বয়স অবধিও বিশ্বাস করত সে৷ সেই চাঁদ! কত কথাই যে মনে পড়ে যায়৷
চাঁদের মাটিতে
'লুনার মডিউলে'র ঘড়িতে এখন আটানব্বই ঘণ্টা আঠারো মিনিট৷ অর্থাৎ পৃথিবীর ঘড়ি অনুযায়ী চার দিন হল ওরা পৃথিবী ছেড়ে এসেছে কিন্তু মনে হচ্ছে যেন কয়েক যুগ পেরিয়ে গেছে৷ চাঁদের ট্যাক্সিতে করে ওরা এবার চাঁদের দিকে নামছে৷ বিরাট একটা চাকতিওয়ালা তেকোনা বাক্সের মতো বিদঘুটে দেখতে ট্যাক্সিটা৷ তার নীচ দিয়ে আবার মাকড়সার মতো চারটে ঠ্যাং বেরিয়েছে৷ চারপাশে তার শুঁড়ের মতো সব অ্যানটেনা৷ ঠ্যাঙের নীচে গোল চাকতির প্যাড বসানো, যাতে চাঁদে অবতরণের সময় চাঁদের নরম বালিতে ঠ্যাংগুলো ঢুকে না যায়৷ চাঁদের মাটি আর মোটে কয়েক-শো গজ নীচে৷ গীর্বাণ তাকিয়ে দেখলেন ক্ষতবিক্ষত চাঁদের শরীর৷ এবড়োখেবড়ো বালি... মাটি...বিরাট কালো গর্ত৷ হিকোহিতার কাছে শুনেছিলেন-অনবরত উল্কাপাতের ফলেই নাকি এই গর্তগুলির সৃষ্টি হয়েছে৷ গর্তগুলি এত গভীর, এ কারণেই যে চাঁদের মাটির ঘনত্ব পৃথিবীর তুলনায় অনেক কম৷ সুতরাং পৃথিবীর মাটির তুলনায় তার বাধাদানের ক্ষমতাও অনেক কম৷ সে নাহয় হল কিন্তু এরকম কোনো উল্কা যদি তাদের মাথার উপর এসে পড়ে?
পাশে তাকিয়ে দেখল রমনের চোখেমুখে ভীষণ উত্তেজনা৷ আসলে ওর বিশ্বাস চাঁদের মাটিতে ও নিশ্চয়ই কোনো দুর্লভ খনিজ ধাতুর সন্ধান পেয়ে যাবে৷ এই চারদিনের মধ্যে কথাটা ও কয়েকবারই বলেছে গীর্বাণকে৷
-জানো ড. সেন, আমার মন বলছে আমরা কিছু পাব৷ চাঁদকে আমরা যতটা রিক্ত ভাবছি-চাঁদ তা নয়৷ আর্মস্ট্রং, অ্যালড্রিন, কিছু সংগ্রহ করতে পারেনি চাঁদ থেকে কারণ ওরা মোটে কয়েক ঘণ্টা ছিল কিন্তু আমরা তো থাকতে এসেছি পুরো একটা মাস তাই না?
এই উত্তেজনার বশবর্তী হয়েই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ও চাঁদে নেমে পড়তে চাইছিল কিন্তু নামাটা অত সহজ নয়৷ বেকায়দায় নামলে কোনো গর্তে ঠ্যাং ঢুকে গিয়ে ট্যাক্সি উলটে গেলেই ভীষণ বিপদ ঘটবে৷ নামার ব্যাপারে সেন্টারের বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করে দিয়েছিল তাদের৷
প্রায় মিনিট পনেরো হেলিকপ্টারের মতো এদিক ওদিক চালিয়ে চাঁদের মাটিতে শেষে নামাতে পারল ওরা ট্যাক্সিটাকে৷ চাঁদের মাটিতে একটা মৃদু ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল ট্যাক্সিটা৷
সমস্ত শরীরটা কেমন যেন শিউরে উঠল গীর্বাণের সে বোঝাতে পারবে না কাউকে৷ অবশেষে চাঁদের মাটিতে পা দিতে যাচ্ছে তারা! সেই সুদূর রহস্যময় চাঁদ৷ তার পঁয়ত্রিশ বছরের স্বপ্নের চাঁদ! সারা পৃথিবীতে তার মতো ভাগ্যবান মানুষ ক-জন আছে?
ট্যাক্সির দরজাটা প্রায় একতলা উঁচুতে৷ আর একটা সুইচ টিপতেই লোহার সিঁড়ি বেরিয়ে এসে চাঁদের মাটিতে ঠেকল৷ এবার দরজা খুলে ওদের নামার পালা৷
ঝটপট 'স্পেট স্যুট' পরে নিল দু-জনে৷ প্রায় তেরো কিলোগ্রাম ওজনের এই 'স্পেস স্যুট' দেখতে যতোই জবড়জং হোক না কেন মডিউলের বাইরে এই স্পেস স্যুটই তাদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়—প্রায় পুরো একটা ঘরবাড়ি৷ পরতে পরতে তৈরি তাদের এই পোশাক৷ কোনো পরতের মধ্যে গ্যাস ভরা আছে, কোনো পরত উত্তাপ কিংবা ভীষণ শৈত্যের হাত থেকে রক্ষা করবে তাদের৷ কোনো পরত রক্ষা করবে সূক্ষ্ম উল্কাকণা কিংবা অজ্ঞাত কোনো ক্ষতিকর মহাজাগতিক রশ্মির হাত থেকে৷ পোশাক ছাড়াও দু-জনেই পিঠে নিয়ে নিল দুটো বিরাট রুকস্যাকের মতো বাক্স৷ ওই বাক্স দুটোই হল তাদের প্রাণ-ভোমরার মতো৷ এর মধ্যেই আছে তাদের নিশ্বাস নেওয়ার অক্সিজেন, বিদ্যুৎ তৈরির যন্ত্রপাতি, আছে জলের ব্যবস্থা তাদের শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য৷ এছাড়াও আছে তাদের ল্যাবরেটরির কিছু সরঞ্জাম৷ ড. রমনের বাক্সে একটা 'গাইগার কাউন্টার'—যদি তেজস্ক্রিয় বস্তুর সন্ধান পাওয়া যায় কিছু-পাথর মাটির নমুনা সংগ্রহের জন্য একটা ছোটো ড্রিল, 'রক বক্স' আর আছে একটা জোরালো দূরবিন৷ ওর নিজের বাক্সে আছে একটা অত্যন্ত শক্তিশালী কনট্রাস্ট মাইক্রোসকোপ, এক ডজন স্লাইড৷ বীজাণু (যদি সত্যিই থেকে থাকে) রং করার জন্য এবং যদি বিন্দুমাত্র বাতাসের কোনো সন্ধান পাওয়া যায় তবে তা মাপার জন্য কয়েকটা দরকারি রাসায়নিক পদার্থ... একটা অক্সিজেন ডিটেকটর, একটা ক্যামেরা৷ এই পোশাক আর বাক্স নিয়ে এক-শো কিলোগ্রাম ওজন৷ এই বোঝা গায়ে নিয়ে তাকে চাঁদের মাটিতে হাঁটতে হবে ভেবে রীতিমতো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন গীর্বাণ কিন্তু হিকোহিতাই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যেহেতু পৃথিবীর ছ-ভাগের মোটে এক ভাগ অতএব এ বোঝা তেমন গায়ে লাগবে না তাদের৷

টিম লিডার হলেও ড. রমন গীর্বাণকেই প্রথম সুযোগ দিলেন চাঁদের মাটি স্পর্শ করার৷ সত্যি তো ওজন সত্ত্বেও কী হালকা লাগছে শরীরটা৷ যেন একলাফে এক-শো মিটার পেরিয়ে যেতে পারে৷ দু-তিন সিঁড়ি আগেই লাফ দিয়ে নামলেন গীর্বাণ সেন৷ গ্লাভস পরা হাতেই চাঁদের মাটি স্পর্শ করলেন একবার৷ তারপর শিশুর মতো বিস্ময়ে তাকালেন চারিদিকে৷ চাঁদ! একেবারে সত্যিকারের চাঁদ, যে চাঁদকে ধরা যায় হাত দিয়ে৷ চাঁদের এদিকে এখন দিন৷ ঝকঝক করছে সূর্যের আলোয়৷ কিন্তু আকাশ অমাবস্যার নিকষ রাত্রির চেয়েও বেশি কালো৷ আর সেই আকাশের গায়ে আগুনের ফুলকির মতো এক একটা গ্রহ-নক্ষত্র৷ এত স্পষ্ট যে, পৃথিবীতে বসে তা ধারণা করাও সম্ভবপর নয়৷ একটা ভীষণ উজ্জ্বল তারা একেবারে যেন মাথার উপর জ্বলজ্বল করছে৷
ড. রমন সেদিকে দেখিয়ে বলেন (কথাবার্তা চালাচ্ছিল রাবানল উদ্ভাবিত সেই টেলিসংযোগ যন্ত্রের সাহায্যেই)—বলো তো ড. সেন, কী তারা ওরা?
কিছুক্ষণ চেনার চেষ্টা করে গীর্বাণ বলেন—বলতে পারলাম না, পৃথিবীতে তো এ তারা দেখিনি৷
হো-হো করে হেসে ড. রমন বললেন—ওটা তারা নয় ওটা হল উপগ্রহের উপগ্রহ অর্থাৎ আমাদের সেই মহাকাশযান যেটা আমরা এইমাত্র ছেড়ে এলাম৷ চাঁদের চারপাশে ঘুরছে৷ একমাস পরে ওখানেই আবার ফিরে যেতে হবে আমাদের তারপর ওই মহাকাশযান ধরেই আমাদের পৃথিবীতে৷
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন গীর্বাণ৷ সত্যি চারপাশেই এই বিস্ময়কর জগৎ এত অভিভূত করে ফেলেছে তাকে যে, মস্তিষ্ক যেন ঠিকমতো কাজ করতে চাইছে না৷ সব যেন কেমন ঘুলিয়ে যাচ্ছে৷
প্রথম দিন ওরা ঠিক করেছিল খুব বেশি দূর যাবে না৷ একটা প্রাথমিক সার্ভে করে নেবে-ঘণ্টা দুয়েক থাকবে চাঁদের মাটিতে তারপর ফিরে আসবে তাদের চাঁদের ট্যাক্সিতে৷
কার পা?
চাঁদ সম্বন্ধে আরও নুতন তথ্য সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যেই স্বাভাবিকভাবেই আর্মস্ট্রং ও অ্যালড্রিন চাঁদের যে অঞ্চলটায় নেমেছিল ওরা এসে নেমেছে তার চেয়ে প্রায় পাঁচ-শো কিলোমিটার দূরে৷ সুতরাং চাঁদের এ অঞ্চলে নিশ্চিতভাবে ওরাই প্রথম মানুষ৷ তা ছাড়াও পৃথিবীতে কম্পিউটারে ওরা জীবাণুর যে সংকেত পেয়েছিল তাও এ অঞ্চলের কাছাকাছি কোনো জায়গা থেকেই৷ গাছপালা এবং আবহাওয়া না থাকায় চাঁদের দিগন্তরেখা অত্যন্ত বেশি ধারালো ও স্পষ্ট৷ ঠিক যেন চারপাশে একটা গোল বৃত্ত৷ কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে ওরা৷ গীর্বাণ যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে চাঁদের মাটিতেই দাঁড়িয়ে আছেন তিনি৷ আনন্দে প্রায় শিশুর মতোই হাততালি দিয়ে লাফ দিতেই একটা তাজ্জব কাণ্ড ঘটে যায়৷ এক লাফে সে প্রায় রমনের মাথার উপর দিয়ে পাখির মতো উড়ে গিয়ে অন্যদিকে পড়ে৷ চাঁদে এসে শরীরটা যে ওর এত হালকা হয়ে গেছে বুঝতে পারেননি৷ তিড়িং তিড়িং করে আরও কয়েকটা লাফ দিয়ে যেন খুব ভালো করে বুঝে নিতে চান গীর্বাণ যে সত্যি তিনি চাঁদে এসে পৌঁছেছেন৷
পৃথিবীর মানুষদের পক্ষে আর একটা অভিজ্ঞতাও খুব মজার৷ চাঁদ আকারে অনেক ছোটো ফলে তার বক্রতা অনেক বেশি৷ ফলে দিগন্তরেখা মনে হচ্ছে যেন একবারে হাতের কাছে৷ যেন এক দৌড়ে তারা পৌঁছে যেতে পারবে দিগন্তরেখায়৷ দিগন্তরেখার প্রায় কাছাকাছি অবিকল উটের কুঁজের মতো ছোটো একটা পাহাড় দেখা যাচ্ছে৷ ওরা ঠিক করল ট্যাক্সি আর ওই পাহাড়ের সংযোগকারী কাল্পনিক রেখা ধরেই কিছু দূর এগোবে৷ হাঁটা শুরু করার আগে রমন ওর পকেট থেকে একটা পতাকা বের করে মাটিতে পুঁতে দিল৷ পতাকাটার ডিজাইন হিকোহিতার৷ এটা কোনো দেশের পতাকা নয়৷ সাদা কাপড়ের ওপর একটা নীল রঙের পৃথিবী এঁকে তার নীচে লেখা হয়েছে—পৃথিবীমাতার কাছ থেকে, শান্তির জন্য৷
এবার ওরা এগোতে শুরু করল৷ রমনের হাতে সেই 'গাইগার কাউন্টার'৷ চোখ যন্ত্রটার কাঁটায়৷ যদি মৃদু স্পন্দনও ধরা পড়ে সেখানে৷ গীর্বাণের হাতেও একটা ছোটো কম্পিউটার৷ সেন্টারের সেই মাইক্রোব ডিটেকটরেরই অত্যন্ত ছোটো সংস্করণ৷ ব্যাকটিরিয়ার মতো নিতান্ত ক্ষুদ্র প্রাণও যদি দশ কিলোমিটারের মধ্যে থাকে তাহলে এই যন্ত্রে ক্ষীণ সংকেত ধরা পড়বে৷ পৃথিবীর কম্পিউটার থেকে যে এলাকাটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে তার ব্যাসার্ধ প্রায় এক-শো কিলোমিটার৷ এই এলাকার মোটামুটি কেন্দ্রবিন্দুতে নেমেছে তারা৷ এবার এই ছোটো কম্পিউটারের সাহায্যেই বিশদ অনুসন্ধান চালানো ছাড়া গতি নেই৷
ওরা কয়েক গজ মাত্র এগিয়ে একটা বালির ঢিবি পেরিয়েছে হঠাৎ গীর্বাণ বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল—সি, ড. রমন, সি৷
ওরা দেখল চাঁদের বালির উপর স্পষ্ট জুতোর ছাপ৷ চন্দ্রাভিযানের জুতোর সোল অত্যন্ত বেশি খাঁজকাটা থাকে৷ ফলে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ছাপটা৷ চাঁদে কোনো বাতাস নেই বালির ঝড় নেই ফলে, ছাপটা পুরোপুরি অক্ষত রয়েছে৷
গীর্বাণ চেঁচিয়ে উঠল—নিশ্চয়ই কোনো মানুষ এসেছিল এখানে, দেখো স্পষ্ট পায়ের ছাপ!
রমন অবাক হয়ে দেখছিল পায়ের ছাপটা৷ গীর্বাণ বললেন—আর একটা জিনিস লক্ষ করেছ ড. রমন? মানুষটা প্রচণ্ড ছোটাছুটি করেছিলেন এখানে৷ যেন পাগলের মতো পালাতে চাইছিল কোনো কিছুর হাত থেকে৷
—কী করে বুঝলে?
—দেখো না, পায়ের ছাপগুলি কত দূরে দূরে আর কত গভীর৷
ওরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ৷ এখানে মানুষ আসবে কোত্থেকে? আসা সম্ভব কখনো? এর মধ্যে কোন মানুষ এল এখানে? কীসের হাত থেকে ওরকম পাগলের মতো পালাতে চাইছিল সে? বিস্ময়ে বিমূঢ় হাঁটছিল দু-জন৷ যদি এসেই থাকে তাহলে এই অসীম বিজন মরুভূমির মধ্যে কোথায় গিয়ে লুকোল সে? এ সবটাই তাদের মনের বিভ্রান্তি নয় তো?
ট্যাক্সিটা অদ্ভুত একটা মহাকাশযানের মতোই দাঁড়িয়ে আছে দূরে৷ হাঁটতে হাঁটতে টিম-লিডার হিসেবেই যেন ড. রমন গীর্বাণের বিমূঢ়তা দূর করার জন্যই বলেন-ওসব পায়ের ছাপের চিন্তা ছাড়ো ড. সেন৷ তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? মানুষ আসবে এখানে কোত্থেকে? এটা কি কোনো সায়েন্স ফিকশন নাকি? আসলে কোটি বছর ধরে চাঁদের মাটির স্তরে পৃথিবীর মতো হয়তো কত বিবর্তন হয়েছে ও তারই কিছুর দাগ হবে৷ জুতোর ছাপের মতো লাগছে দেখতে৷ ট্যাক্সিতে ফিরে ঘণ্টা তিনেক একটা ঘুম দাও৷ দেখবে শরীর মন সব ঝরঝরে হয়ে গেছে৷ ঘুমিয়ে পড়ার পর আবার লেগে পড়তে হবে কাজে৷ হাতে সময় বড়ো কম৷
ওদের ডানদিকে কয়েক-শো গজ দূরে কয়েকটা বালি পাথরের ঢিবি পাঁচ-ছ মিটার উঁচু৷ ভূতাত্ত্বিক রমন সেদিকে তাকিয়েই বলে—চলো ওদিকটা বরং একটু দেখে আসি৷ ভালো 'রক' পাওয়া যেতে পারে৷
একটা ঢালু ঢিবি বেয়ে তার মাথায় উঠতেই এমন একটা দৃশ্য দেখল গীর্বাণ, অন্তত সারাজীবনে তা ভুলতে পারবে না৷ দিকচক্রবালের দিকে কালো আকাশ ঈষৎ নীলাভ হয়ে আছে আর ঠিক দিগন্তরেখা ছুঁয়ে ঝুলছে বিরাট নীল একটা বল যা চাঁদের চারগুণ বড়ো কিন্তু পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে অন্তত আশিগুণ বেশি উজ্জ্বল৷ দু-বার বিস্ময়ে বিড়বিড় করে উঠলেন—আর্থ, ড. রমন, মাদার আর্থ!
কিন্তু আরও বড়ো বিস্ময় বাকি ছিল৷ সেই নীলাভ উজ্জ্বল জোতিষ্কের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছিলেন গীর্বাণ—ওই তাদের পৃথিবী! তাদের সুখ দুঃখ ব্যথা বেদনার পৃথিবী! ওরই এক জায়গায় আছে বারাসাত? তার শৈশবের সেই কৃষ্ণচূড়া গাছ? এত উজ্জ্বল পৃথিবীটা! ভাবতে ভাবতেই স্পষ্ট দেখতে পেলেন তিনি আস্তে আস্তে ঘুরে যাচ্ছে সেই বলটা৷ চিৎকার করে উঠলেন তিনি দেখো, ড. রমন, পৃথিবী ঘুরছে! আমরা পৃথিবীর আহ্নিক গতি দেখতে পাচ্ছি! এও কি সম্ভব?
বাইনোকুলারটা নিয়ে তিনি ভালো করে দেখলেন৷ আবছা নীল সবুজ আঁজি কাটা সেই বলের গায়ে দু-প্রান্তে সাদা মতো কী যেন দেখা যাচ্ছে৷ মেরুপ্রদেশের বরফ নাকি? Cross Hair-এর নীচে আস্তে আস্তে কীরকম সবটা ঘুরে যাচ্ছে৷ এর চেয়ে বিস্ময়কর জিনিস কি আর কখনো দেখবেন তিনি যতদিন বাঁচবেন?
উল্কা নয়!
ট্যাক্সিতে ফিরে খেতে খেতেই আবার মহাশূন্যে ভাসমান সেই ক্যামেরাটার কথা মনে পড়ল৷ সত্যি কি ভুল দেখেছিলেন তিনি?
মহাশূন্যে ক্যামেরা আসবে কোত্থেকে? তার গায়ে যে R.B. লেখা ছিল, সেটাও চোখের ভুল? R.B. বলে কি কোনো কোম্পানির ক্যামেরা আছে? হ্যাসেলব্লাড ক্যামেরার ট্রেড মার্ক তো হওয়া উচিত H.B. সমস্ত ব্যাপারটাই কেমন প্রহেলিকার মতো মনে হচ্ছে৷
রমনের ওসব ভাবনাচিন্তা নেই৷ ওর ধারণা ওটা একটা উল্কাই৷ চাঁদের একটা কাল্পনিক ম্যাপ হাতে ও পৃথিবীর রিসার্চ সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে৷
হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো একটা কথা মাথায় এসে গেল গীর্বাণের৷ R.B.....Robert Boyed? সেই রবার্ট বয়েড-যার কথা বলেছিলেন হিকোহিতা? সেই আত্মকেন্দ্রিক কিন্তু অত্যন্ত প্রতিভাসম্পন্ন বিজ্ঞানী আমেরিকার সরকার বিরোধী খবরের কাগজের রিপোর্ট অনুযায়ী যাকে দেড় বছর আগে চাঁদে পাঠানো হয়েছিল? সে নাকি আর ফিরে আসেনি—অথচ মাধ্যাকর্ষণহীন মহাশূন্যে তারই নাম লেখা ক্যামেরাটা ভাসছে?
কিন্তু ক্যামেরার মালিক তাহলে কোথায় গেল? এইসব ভাবতে ভাবতেই কখন এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি৷ .....হঠাৎ ড. রমনের ঠেলায় ধড়মড় করে ঘুম ভেঙে গেল৷ একটা নেভিগেশন চার্টের দিকে চোখ রেখে রমন বললেন—আর কত ঘুমোবে? ছ-ঘণ্টা ঘুমিয়েছ৷ এক্ষুনি আবার কাজ শুরু করতে হবে আমাদের৷
ছ-ঘণ্টা? হ্যাঁ, পৃথিবীর ঘড়ি অনুযায়ী তাই-ই বটে৷ কিন্তু এখানে তা বোঝার উপায় নেই৷ সূর্য ঠিক তেমনি এখনও মাথার উপরে৷ ঝকঝক করছে রোদ৷ কিন্তু কালো আকাশ ভরতি তারা৷ পৃথিবীতে থাকলে সূর্য এতক্ষণে হেলে পড়ত দিগন্তে৷ এখানকার একদিন যে পৃথিবীর চোদ্দো দিনের সমান তা এবার বেশ ভালোভাবেই টের পেলেন গীর্বাণ৷
ড. রমন বললেন—যে দিকে হাঁটা শুরু করেছিলাম সে দিকেই আবার হাঁটব আমরা৷ এখানে দিক ঠিক রাখার একটা মস্ত সুবিধা ড. সেন, আকাশে সব সময়েই তারা আছে৷ যে কোনো একটা তারা দেখেই দিক ঠিক করা চলবে৷
ঘণ্টাখানেক বাদে ওরা কাঁধে সেই বাক্স নিয়ে স্পেস স্যুট পরে নেমে এল চাঁদের মাটিতে৷ হাঁটা শুরু হল সেই উট-কুঁজ পাহাড়টার দিকে লক্ষ রেখে আর মাঝে মাঝে আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে৷ আজ অনেক দূর হাঁটবে৷ কালকের সেই পায়ের ছাপটা পেরিয়ে যাওয়ার সময় গীর্বাণ একবার আড়চোখে দেখে নিলেন ছাপটা ঠিক সেরকমই আছে, একটুও এদিক-ওদিক হয়নি৷ অথচ দশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে ইতিমধ্যে৷ কী ভয়ংকর জড় পরিবর্তনহীন প্রাণহীনতার জগতে এসে পড়েছে তারা তারই যেন ইঙ্গিত ওটা৷
ওদের যাত্রার কাল্পনিক রেখার উপরই একটা জ্বলজ্বলে লাল তারা৷ অনুমান করল ওটা মঙ্গলগ্রহই হবে৷ চারপাশে কোনো শব্দ নেই, কম্পন নেই—তার মধ্য দিয়ে ওরা এগিয়ে চলেছে৷ লাল তারাটার দিকে আর একবার তাকাতে ওরা হঠাৎ দেখতে পেল একটা উল্কা বাঁ-দিকের আকাশের দূর কোণ থেকে একটা দীর্ঘ আগুনের প্যারাবোলা আকৃতির রেখা এঁকে ওদের এক-শো মিটার দূরে এসে পড়ল৷ যদিও ওদের গায়ে মাথায় উল্কা-নিরোধক পোশাক রয়েছে তবু এত বড়ো আকারের একটা উল্কা সরাসরি আঘাত করলে বিপদ ঘটতে পারত বই কী৷ রমনের কিন্তু সেসব চিন্তা নেই৷ সে উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল—ড. সেন দারুণ একটা জিনিস পেয়ে গেছি আমরা৷ এ যেন প্রায় ভগবান পাঠিয়ে দিলেন আমাদের৷ পৃথিবীর জন্মরহস্য জানার পক্ষে এমন উপযোগী জিনিস আর নেই৷ উল্কা তো পৃথিবীর মাটিতে বেশি পাওয়া যায় না৷ পুড়ে ছাই হয়ে যায়৷

উল্কাটা যেখানে পড়ে বালি ছিটকে উঠেছে সেদিকে ছুটতে শুরু করলেন রমন৷
কাছে এসে দেখলেন চাঁদের মাটিতে প্রায় ফিট পাঁচেক গর্ত সৃষ্টি করে ঢুকে গেছে বস্তুটা৷ ব্যাগ থেকে ব্যাটারিচালিত ড্রিল মেশিনটা বের করে বললেন ড. রমন—যাক, এতক্ষণে কাজে লাগল এটা৷
পাঁচ ফিট ড্রিল করতে দু-সেকেন্ডের বেশি সময় লাগল না৷ গর্তের ভিতর হাত ঢুকিয়ে জিনিসটা বের করে আনতেই রমন একদম স্তম্ভিত হয়ে তাকাল গীর্বাণের মুখের দিকে৷
রমনের হাতে একটা ক্যামেরা৷ প্রচণ্ড কিছুর আঘাতে একেবারে বেঁকে চুরে গেছে কিন্তু চামড়ার খাপটা অটুট আছে৷ তার উপরে লাল অক্ষরে গোটা গোটা করে লেখা R.B.
গীর্বাণ অবাক হয়ে বললেন—কী করে হল এটা?
রমন গম্ভীরভাবে বললেন—তুমি তাহলে ঠিকই দেখেছিলে ড. সেন৷ ক্যামেরাটা মাধ্যাকর্ষণহীন মহাশূন্যে ভাসছিল৷ আমাদের রকেটের প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে ওটা রকেটের বেগেই ছুটে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের ভিতর ঢুকে পড়ে৷ কিন্তু যেহেতু ওটার আনুভূমিক বেগ প্রচন্ড ছিল৷ সরাসরি মাটিতে না পড়ে চাঁদের চারপাশে দীর্ঘ প্যারাবোলা এঁকে, এখানে এসে পড়েছে এত সময় পর৷
রমন ক্যামেরাটা নেড়েচেড়ে দেখে বললেন—আরে, এ তো দেখছি ফিল্ম ভরতি৷ সবচেয়ে আশার কথা লেন্সটাও অটুট আছে৷ কেসটা তুবড়ে গেছে বটে কিন্তু ভিতরে আলো ঢুকেছে বলে মনে হয় না৷ আজ সব কাজ থাক৷ চলো গিয়ে ডেভেলপ করি ফিল্মটা৷ এসবের মাথামুণ্ডু কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না৷
গীর্বাণ বললেন-আমি এটা বুঝতে পারছি যে, এটা প্রফেসর বয়েডেরই ক্যামেরা৷ তার অদ্ভুত একটা মুদ্রাদোষ ছিল R-এর পেট কাটা৷ তাহলে বয়েড সত্যই এসেছিল এখানে? কিন্তু তাহলে সে এখন কোথায়? বিড়বিড় করে গীর্বাণ৷
রমন বললেন—ঠিক আছে—চলো দেখি কী আছে ওই ফিল্মে৷
কীসের ছবি?
ট্যাক্সির ল্যাবরেটরিতে গিয়ে ফিল্মটা ডেভেলপ করতেই আশ্চর্য রঙিন নানা রকমের ছবি ফুটে উঠল৷ ঝুঁকে পড়ে দেখলেন দু-জনে৷ কতগুলো ছবি অনেক উপর থেকে তোলা যেন কোনো ভূ-দৃশ্য৷ বরফ ঢাকা পাহাড়...একটু যেন জলের আভাস...নীলাভ সবুজ 'অ্যালগি'র (শ্যাওলা) আস্তরণ যেন মাটিতে৷ দৃশ্যগুলি দেখলে মনে হয় লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর আদিম যে রূপের কল্পনা বিজ্ঞানীরা করে এসেছেন এ যেন সেই কল্পনারই ছবি৷ কিন্তু এ তো জ্বলজ্যান্ত ফটো৷ লক্ষ বছর আগে পৃথিবী যেরকম ছিল তার ফোটো আসবে কোত্থেকে!
রমন বিড়বিড় করে বললেন—স্ট্রেঞ্জ৷ ভেরি স্ট্রেঞ্জ৷ লক্ষ বছর আগে তোলা পৃথিবীর ফোটো? তুমি কিছু বুঝতে পারছ ড. সেন৷
গীর্বাণ সে-কথার কোনো উত্তর দিলেন না৷ তার চোখ আটকে গেছে আর কতগুলি ফোটোতে৷ ইংরেজি V-এর দুই মাথা থেকে ঝালুমঝুলুম ঝুলছে লম্বা লম্বা সুতোর মতো কী বস্তু! সুতোর চারপাশটা কেমন সাদা৷ যেন ক্যামেরার কোনো ফুটো দিয়ে আলো ঢুকে নষ্ট হয়ে গেছে ফিল্মের ওই জায়গাগুলো৷
রমন জিজ্ঞেস করেন—কী ওটা?
—দেখে মনে হচ্ছে মাইক্রোস্কোপের ফোটো লেন্সে তোলা কোনো জীবাণুর ছবি৷
—কী জীবাণু?
—আমি যত রকমের জীবাণুর কথা জানি বা পড়েছি তার একটারও নয়৷ পৃথিবীতে এরকম কোনো জীবাণু আছে বলে জানি না৷
রমন বললেন—তাহলে এই কি সেই জীবাণু যার খোঁজে চাঁদে এসেছি আমরা?
গীর্বাণ বললেন—কী করে হবে? ড. রমন, সেন্টারের কম্পিউটার অনুযায়ী এক-শো কিলোমিটারের মধ্যে কোথাও আছে সেই জীবাণু কিন্তু আমার অক্সিজেন ডিটেকটারে অক্সিজেনের সামান্য আভাসও কোথাও পাচ্ছি না৷ ক্ষীণমাত্রও অক্সিজেন বা বাতাস নেই অথচ প্রাণ আছে—এটা কী করে সম্ভবপর? কল্পবিজ্ঞানের গল্পেও তো এরকম হয় না৷
রমন বললেন—তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে?
—তাই তো বুঝতে পারছি না৷ জুতোর ছাপটা তুমি চোখের ভুল বললে আমি মেনে নিচ্ছি৷ কিন্তু এই ক্যামেরার ছবিগুলো?
—কিন্তু এই ক্যামেরাটা তো মহাশূন্যে ভাসছিল৷ তাতে কি প্রমাণ হয় এখানে কেউ এসেছিল?
—হুঁ, তাই তো ভাবছি৷
—এরকম ভাবনার কোনো কূলকিনারা নেই৷ আমরা প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা হতে চলল চাঁদে নেমেছি কিন্তু প্রোগ্রামমাফিক যা কাজ ছিল তার প্রায় কিছুই হয়নি৷ ছাড়ো এসব ভাবনা৷ নাও, প্যাক আপ৷ আজ ওই উটের কুঁজের মতো পাহাড়টার কাছাকাছি যেতে হবে৷ এখানে হাঁটার তো আর খুব একটা পরিশ্রম নেই৷ আশা করি কুড়ি কিলোমিটার অবধি আজ হাঁটতে পারব৷
চাঁদের এক দিন যে পৃথিবীর চোদ্দো দিনের সমান তাদের পক্ষে এই একটা মস্ত বড়ো সুবিধে৷ অনেকক্ষণ ধরে হাঁটা যায়—রাত্রি নেমে আসার কোনো চিন্তা নেই৷ দিন-অফুরন্ত দিন৷ একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটো৷ গরম খুব চাঁদে৷ যা টেম্পারেচার তাতে মানুষের পক্ষে তা সহ্য করা সম্ভব নয়৷ কিন্তু ওদের 'স্পেস স্যুট' টাই তো একটা এয়ার কন্ডিশানড ঘরের মতো৷ পোশাকের ভিতর দিয়ে ঠান্ডা জল যাওয়ার সরু সরু পাইপ আছে যাতে শরীরটা ঠান্ডা থাকে৷
প্রাণের সন্ধান
ছ-দিনে তারা প্রায় এক-শো বর্গ কিলোমিটার জায়গা চষে ফেলল৷ উটের কুঁজের মতো টিলাটা দশ মিটারের মতো উঁচু হবে৷ পাহাড়ের গা-টা খুব খাড়া৷ কিন্তু ওরা অনায়াসেই উঠে যেতে পারল সেই খাড়াই বেয়ে৷ আসলে শরীরটা এত হালকা লাগছে যে, কোনো পরিশ্রমই খুব বেশি কষ্টকর মনে হচ্ছে না৷ মাঝে মাঝে পাঁচ-ছ ফুট উঁচু ঢিবি কিংবা ফিট দশেক চওড়া গর্ত সামনে পড়লে ওরা আর তা ঘুরে না গিয়ে লাফিয়েই পার হয়ে যাচ্ছে৷ পৃথিবীর মাটিতে যা কল্পনাও করা যেত না৷ এটা যেন ওদের কাছে একটা খেলার মতোই হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ঢিবিটার উপর উঠতেই চারপাশে চাঁদের জমি অনেকটা এবার একসঙ্গে দেখতে পাওয়া গেল৷ ধু-ধু করছে খয়েরি রুক্ষ মাটি কিন্তু কালো কালো অজস্র গর্ত বা জ্বালামুখ ছড়ানো এবং অধিকাংশ গর্তই খুব গভীর৷
চাঁদের একটা ম্যাপ বের করে রমন বললেন—ওদিকে গেলেই চাঁদের সবচেয়ে বড়ো জ্বালামুখ 'ক্লেভিয়াস' পাওয়া যাবে—১৪৫ মাইল ব্যাস সেই ক্রেটারের৷ ওদের পিছনে এবং বাঁয়ে একইরকম সমান সমতল জমি৷ কেবল ওদের বাঁ-দিকে যে ঢিবিটার পিছনে পৃথিবীর সেই অদ্ভুত দৃশ্যটা দেখেছিল ওরা সেদিকটায় ছোটো-বড়ো অজস্র হলুদ-লাল পাথরের টিলা ছড়ানো৷ রমন ওই টিলাটার নামকরণ করেছে আর্থ ভিউ—যেহেতু ওই টিলার মাথায় ওরা পৃথিবীটাকে প্রথম দেখেছিল৷
রমন বললেন—আমার মন বলছে ড. সেন ওই সমতলের দিকে কিছু পাওয়া যাবে না৷ ওই 'আর্থ ভিউ'-এর দিকেই মাটি বেশি বন্ধুর৷ বালির থেকে শক্ত পাথর ওদিকে বেশি৷ আর কিছু না পাওয়া যাক ভালো কিছু রক অন্তত সংগ্রহ করা যাবে৷ কাল ওদিকটাই সার্ভে করে দেখব৷
গীর্বাণও তাতে রাজি৷ এই ছ-দিন একঘেয়ে লাল সমতল কাঁকুড়ে মাটি... মাঝে মাঝে গর্ত দেখে একেবারে একঘেয়ে লাগছে৷
তখন যদি একবার জানত কী ভয়ানক বিপদের দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছে তারা৷
কুঁজ পাহাড় থেকে নেমে 'সেক্সট্যান্ট' দিয়ে সূর্যের উন্নতি কোণ মেপে চিন্তিতমুখে বলল রমন-সেক্সট্যান্ট ৭৭° ডিগ্রি দেখাচ্ছে৷ অর্থাৎ আর মোটে দিন ছয়েক হাতে পাব আমরা তারপর শুরু হবে রাত্রি৷ চোদ্দো দিন একটানা রাত্রি৷ এবং চাঁদের রাত্রি যে কী ভয়ংকর হবে তা বুঝতে পারছ? এখন কোথাও কোনো শব্দ না থাক অন্তত চোখে দেখার কিছু আছে৷ তখন সেই মহাপ্রলয়ের মতো কালরাত্রিতে কোথাও কোনো শব্দ নেই—দেখারও কিছু নেই৷ শুধু আকাশে কিছু তারা ছাড়া৷ ধারণা করতে পারছ সেটা?
খুব ধারণা করতে পারছেন গীর্বাণ৷ কলকাতায় একঘণ্টা লোডশেডিং হলে কী ভয়ানক অবস্থা হয় তা কি তার জানা নেই? সেখানে শব্দ আছে, হাওয়ার স্পর্শ আছে, ধুলো পাতার গন্ধ আছে ৷ আর এখানে মৃত্যুর মতো চোদ্দো দিন লোডশেডিং৷ নানা বিরুদ্ধ পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মতো ট্রেনিং নিতে হয়েছে তাদের, তবু সেই আসন্ন ভয়াবহ রাত্রির কথা ভেবে সত্যি ভয় পেয়ে গেলেন গীর্বাণ৷
রমন বললেন—ওই চোদ্দো 'রাত' অবশ্য আমাদের ট্যাক্সিতেই কাটাতে হবে৷ যা যা পাথরের নমুনা সংগ্রহ করা হল ল্যাবরেটরিতে তা পরীক্ষা করে নিতে হবে৷ তুমি তো কিছুই পেলে না, তাই না ড. সেন?
—নাঃ৷ কিছু পাব না আমি তো সেটা আগেই বলেছিলাম প্রফেসার হিকোহিতাকে৷ হতাশ গলায় বলেন গীর্বাণ৷
—কিন্তু এখনও তো পৃথিবী থেকে ক্রমাগত সংকেত আসছে৷
—ভুল৷ ভুল৷ রাবানলের তৈরি কম্পিউটারের মস্তিষ্ক বিভ্রম ঘটেছে৷ যাক পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে কী নির্দেশ আসছে সেখান থেকে?
রমন হেসে বলেন—হতাশ হয়ে গেলে ড. সেন? অভিযাত্রীদের জীবনে এক-একটা আবিষ্কার ঘটে বড়ো অদ্ভুতভাবে৷ এক মুহূর্ত আগেও হয়তো জানে না তারা কী আবিষ্কার করতে যাচ্ছে৷
—তুমি বেশি আশাবাদী ড. রমন, আমি অতটা নই৷ নির্দেশ কী আসছে বললে না?
—ঠিক সাত দিনের মাথায় যদি রওনা দিই এখান থেকে তাহলে মহাকাশের সেই জানলাটা খোলা পাওয়া যাবে কয়েক ঘণ্টার জন্য৷ —আর না হলে চোদ্দো দিনের এই 'মহানিশা' পার করে দিয়ে ষোলো দিনের দিন আবার খুলবে জানলাটা৷ খাওয়াদাওয়া, ওষুধপত্র, যন্ত্রপাতি, আমাদের শরীরের টেম্পারেচার, রক্তচাপ সব চমৎকার ঠিকঠাক আছে৷ আশা করি আর ষোলো দিন থাকতে কোনো অসুবিধে হবে না৷ চাঁদের দিন তো দেখলাম৷ রাতটাও একটু দেখে যাওয়া যাক৷ পৃথিবীর মানুষদের কাছে গিয়ে অন্তত গল্প করা যাবে৷
সেদিনই ওরা ফিরছে কুঁজ-পাহাড় থেকে—ডান-দিকে 'আর্থ-ভিউ'-এর পিছনে পৃথিবী অনেকটা উপরে উঠে এসেছে আকাশের৷ তাকিয়ে দেখতে যাচ্ছিলেন গীর্বাণ৷ সেই চাঁদের লাল বাঁকা পিঠ, সবুজ পৃথিবীটা, ঘুরঘুট্টি কালো আকাশ সব নিয়ে মনে হচ্ছিল যেন সালভাদর ডালির আঁকা কোনো অবিশ্বাস্য সুররিয়ালিস্টিক ছবি বাস্তবে যা সম্ভব নয়৷ হঠাৎ একটা ছোটো পাথরে হোঁচট খেয়ে মাটিতে তাকাতেই বিস্ময়ে তার আর কথা সরল না৷ আবার সেই একই জুতোর পায়ের ছাপ, সে একই জায়গায় বারবার পাক খেয়ে যেন কিছু একটা খুঁজেছে৷ পায়ের ছাপটা সেখান থেকে চলে গেছে 'আর্থ ভিউ'-এর দিকে যেদিকে ছোটোখাটো টিলার জটলা৷ ভয়ে বিস্ময়ে রমনের মুখেও এবার আর কোনো কথা নেই৷ এটা নিশ্চিত যে ঘণ্টা পাঁচেক আগেও যখন ওরা গিয়েছিল এ-রাস্তা দিয়েই তখনও পায়ের ছাপটা এখানে ছিল না৷
গীর্বাণ ফিসফিস করে বলেন—আমরা ছাড়া আরও একজন মানুষ তাহলে আছে এখানে? টিলা, কাঁকড় বা মাটির ঢিবি না, মানুষ—একজন জ্যান্ত মানুষ৷ আর নিশ্চয়ই এ সেই রবার্ট বয়েড৷ চলো ড. রমন, দেখি ওর পায়ের ছাপ অনুসরণ করে কোথায় গেছে সে৷
রমন বলল—মনে হচ্ছে তাতে খুব লাভ হবে না ড. সেন৷ 'আর্থ ভিউ'-এর ওদিকে দেখছ তো সবই পাথুরে কাঁকুড়ে মাটি৷ জুতোর ছাপ তো আর পড়বে না ওখানে৷ আমার মনে হচ্ছে তুমি যাকে রবার্ট বয়েড বলছ সে-ও বোধ হয় আমাদের পায়ের ছাপ দেখে খানিকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেছিল এখানে৷ তারপর সেও বোধ হয় হাল ছেড়ে দিয়েছে, কেননা দেখো আমাদের পায়ের ছাপও হারিয়ে গিয়েছে কাঁকুড়ে মাটিতে৷
গীর্বাণ বললেন—এ তো মজা মন্দ হল না৷ এই প্রাণহীন বন্ধ্যা মরুভূমিতে আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি ওকে আর ও খুঁজছে আমাদের৷ রমন গম্ভীরভাবে বলে-হুঁ৷ এই স্পন্দনহীন সাড়াহীন জগতে আমরা পরস্পরকে কখনোই খুঁজে পাব কি না তারও ঠিক নেই৷
সেদিন ট্যাক্সিতে ফিরে গীর্বাণ ঘুমের মধ্যে অনেকদিন পর ভারি আশ্চর্য একটা স্বপ্ন দেখলেন৷ দূরে দিগন্তরেখায় স্পেস স্যুট পরা একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে৷ ড. বয়েড বলে চিৎকার করে ওরা এগিয়ে যেতেই, হঠাৎই চাঁদের ভীষণ কালরাত্রি নেমে এল দিগন্ত জুড়ে৷ নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে যেন মিলিয়ে গেল সেই মূর্তি৷ ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসল গীর্বাণ৷
গভীর রহস্য
পাঁচ দিন ওরা তন্নতন্ন করে খোঁজ করল 'আর্থ ভিউ' টিলার এপাশে-ওপাশে কিন্তু ড. রমনের হাতের 'গাইগার কাউন্টারে'র কাঁটা নিশ্চল৷ কোনো বিক্ষেপ নেই তাতে৷ হতাশ হয়ে বললেন ড. রমন৷ —এদিকের মাটির কন্টুরের যা ধরন তাতে মন হয়েছিল এদিকে কিছু থাকলেও থাকতে পারে৷ আমাদের বিহারের যাদুগোড়ায় যেরকম আছে৷ কিন্তু না৷ ইউরেনিয়াম-জাতীয় কোনো তেজস্ক্রিয় ভারী ধাতুর অস্তিত্ব নেই এখানে৷ আমার অনুমানই ভুল ছিল৷ 'রক' যা সংগ্রহ করেছি তা মোটামুটি সবই 'ব্যসল্ট' জাতীয় আগ্নেয়শিলা৷ অবশ্য জল বা আবহাওয়া যেখানে নেই সেখানে পাললিক বা রূপান্তরিত শিলা থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না৷ তোমার কম্পিউটার কী বলছে?
গীর্বাণ বিষণ্ণ হেসে বলেন—ডেড৷
এদিকে চাঁদের মহানিশা যে আসন্ন প্রায় তা বোঝা যাচ্ছে৷ সালভাডর ডালির সেই ছবিটা হয়ে উঠেছে আরও অবিশ্বাস্য আরও ভৌতিক৷ সূর্য ঘুরে গেছে কুঁজ পাহাড়ের পিছনে৷ তির্যকরশ্মির ফলে শীতের বিকেলের মতো রোদের রং কিছুটা লাল হয়ে এসেছে৷ প্রাচীন কালের গ্রিক যোদ্ধাদের হাতে বর্শার মতো কুঁজ পাহাড়ের চুড়োর লম্বা ছায়া পড়েছে চাঁদের এ দিগন্ত থেকে ও দিগন্ত অবধি৷ সূর্যটাকে ভালো করে দেখার জন্যই যেন কুঁজ পাহাড় আর 'আর্থ-ভিউ'র মাঝামাঝি তাকিয়ে আছেন ড. রমন৷ হঠাৎ গাইগার কাউন্টারের কাঁটা নড়ে উঠল মৃদু৷
ভীষণ বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল ড. রমন-ইউরেকা! ইউরেকা! দেখো দেখো ড. সেন৷ পেয়ে গেছি আমরা, পেয়ে গেছি৷
কাউন্টারের কাঁটার বিক্ষেপটা দেখতে যেই একটু এগিয়েছেন গীর্বাণ অমনি তার হাতের 'মাইক্রোব ডিটেকটার'-এও সবুজ বিন্দু বিন্দু দাগ ফুটে উঠল কিছু৷ মৃত সেই যন্ত্রে জীবন সঞ্চার হয়েছে৷
চেঁচিয়ে উঠল ড. রমন—দেখো দেখো ড. সেন৷ তোমাকেও হয়তো খালি হাতে ফিরতে হবে না; ইট ইজ এ মিরাকেল৷ আমরা দু-জনেই সমান ভাগ্যবান৷
একমূহূর্ত আগেও কি তারা ভেবেছিল দু-জনে একই সঙ্গে এভাবে এতদিনের আকাঙ্খিত সংকেত পেয়ে যাবে? মিরাকেল ছাড়া একে আর কী বলা যেতে পারে?
ওদের ট্যাক্সি এখনও প্রায় দশ কিলোমিটার দুর এখান থেকে৷ ড. রমন বলল—এখন আর আমরা যাব না ওদিকে৷ অনেক হাঁটা হয়ে গেছে৷ এখনও তো দু-দিন অর্থাৎ আটচল্লিশ ঘণ্টা টানা সময় আছে হাতে৷ ট্যাক্সিতে ফিরে ঘণ্টা পাঁচ-ছয়েক ঘুমিয়ে একেবারে তরতাজা হয়ে তবে রওনা দেব৷ এবার কতটা হাঁটতে হবে ঠিক নেই৷ তার আগে ওই বড়ো মসৃণ কোয়ার্জ পাথরটার গায়ে R লিখে রেখে যাই যাতে জায়গাটা পরে চিনতে অসুবিধে না হয়৷
একটা শক্ত পাথর তুলে নিয়ে কোয়ার্জের গায়ে দাগ কাটতে গিয়েই চেঁচিয়ে ওঠে রমন-দেখো দেখো ড. সেন৷
প্রচণ্ড বিস্ময়ে গীর্বাণ তাকিয়ে দেখেন পাথরের গায়ে বড়ো বড়ো করে লেখা R৷ তার পেটটা কাটা!

কার কঙ্কাল!
ট্যাক্সিতে ফিরে এসে গীর্বাণ বললেন—ব্যাপারটা কী কিছুই বুঝতে পারছি না৷ রহস্যজনক লাগছে৷ রবার্ট বয়েড আমাদের চারপাশেই খালি ঘুরে বেড়াচ্ছে!
—হুঁ৷ তোমার আমার যন্ত্র একই সঙ্গে 'ক্লিক' করল এটাও খুব রহস্যের৷ যাকগে আর ভাবতে পারছি না৷ এবার কিছু খেয়ে শুয়ে পড়ো৷ মনে রেখো আর আটচল্লিশ ঘণ্টা সময় আছে হাতে এর মধ্যেই যা করার করে নিতে হবে৷ একবার রাত্রি নামলে আর করার কিছু থাকবে না৷
ওরা ঘণ্টা চারেক পর ঘুম থেকে উঠল৷ R নাম লেখা সেই পাথরের কাছে পৌঁছে গেল ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই৷ সূর্য আরও হেলে পড়েছে আকাশে৷ পৃথিবী উঠে আসছে যেন সবুজ জ্যোৎস্নার আভা ছড়িয়ে৷ অপূর্ব দৃশ্য৷
উঁচু-নীচু টিলা, মাঝে মধ্যে ছোটো-বড়ো জ্বালামুখ বা ক্রেটার৷ এগোচ্ছে ওরা৷ থরথর করে কাঁপছে গাইগার কাউন্টারে'র কাঁটা৷ এতক্ষণ প্রাণহীন ছিল যে কম্পিউটারের স্ক্রিন তাতেও মাঝে মাঝে ফুটে উঠছে ভাঙা ভাঙা বাঁকাচোরা কিছু রেখা৷
ঈষৎ ভায়োলেট রঙের একটা পাথরের চাঁই পেরিয়ে সামনে এগোচ্ছেন রমন, হঠাৎ একেবারে স্ট্যাচুর মতো থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন, ভীষণ ভীত ফিসফিস গলায় বললেন, —দেখো সেন৷ দেখো—
পাথরটার গোড়ায় একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলেন গীর্বাণ৷ স্পেস স্যুট পরা কেউ একজন শুয়ে আছে—মাথার হেলমেটটা নেই৷ পড়ে আছে দূরে৷ 'স্পেস স্যুট'টা প্রায় অটুট আছে কিন্তু স্পেস স্যুটের মধ্যে পড়ে আছে একটা কংকাল!
অর্ধস্ফুট গলায় বলেন গীর্বাণ—রবার্ট বয়েড! —মাই গাড!
কঙ্কালটার সামনে চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে দু-জনেই৷ দেড় বছর আগে যে মানুষকে চাঁদে পাঠানো হয়েছে সে যখন পৃথিবীতে ফিরে আসেনি, তখন চাঁদের বায়ুহীন আকাশেই যে তার শেষ নিশ্বাস বেরিয়ে গেছে, এরকম একটা ধারণা দু-জনেই করেছিলেন৷ তবুও ঘণ্টাখানেক আগেই সেই রহস্যময় টাটকা পায়ের ছাপটা চোখে পড়াতে, একটা সম্ভাবনাই মনে জেগেছিল৷ কোনো আশ্চর্য উপায়েই হোক রবার্ট বয়েড আজও বেঁচে আছে চাঁদের মাটিতে৷ কিন্তু তাহলে এই কঙ্কালটা কার? যদি রবার্ট বয়েডের হয় তাহলে ওই স্পষ্ট পায়ের ছাপগুলো কি ওদের চোখের ভুল?
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রমনই এবার বলেন—ব্যাপারটা যে ভীষণ রহস্যময় হয়ে উঠেছে ড. সেন৷ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না৷
হ্যাঁ ড. রমন—গীর্বাণ বলেন৷ বয়েড বেঁচে আছে কি নেই সে রহস্যের চেয়েও জটিল আর একটা রহস্য আমাদের সামনে৷
রমন বলে—আরও একটা রহস্য, ড. সেন? সেটা কী?
—সেটা ওই কঙ্কালটা৷
—মানে?
—মানে স্পষ্ট ড. রমন, চাঁদে বাতাস নেই, জলকণা নেই, যে কোনো জীবনের বেঁচে থাকার জন্য যা প্রয়োজন, অথচ এখানে যে ব্যাকটিরিয়ার অস্তিত্ব সত্যই রয়ে গেছে তার প্রমাণ ওই কঙ্কাল—এবং বড়ো ভয়ংকর সে ব্যাকটিরিয়া৷
—আমি কিছু বুঝতে পারছি না-বিড়বিড় করেন জিওলজিস্ট ড. রমন৷
—ব্যাপারটা খুব স্পষ্ট৷ যে মারা গেছে তার কঙ্কালটা শুধু পড়ে আছে৷ তার শরীরের চামড়া মাংস তাহলে কোথায় গেল?
গীর্বাণের কথায় অবাক হয়ে বলেন রমন-কবে কার কঙ্কাল কেউ জানে? নিশ্চয়ই মাংস পচে চাঁদের মাটির সঙ্গে মিশে গেছে৷
—পচন ধরবে কী করে যদি ব্যাকটিরিয়া না থাকে? যে কোনো প্রাণীর দেহের পচনের মূলে হল আর এক ধরনের প্রাণ-একধরনের ব্যাকটিরিয়া৷ সুতরাং নিশ্চয়ই কোথাও আছে এখানে ব্যাকটিরিয়া—কিন্তু কী করে তার অস্তিত্ব সম্ভব চাঁদের এই পরিবেশে তাই বোঝা যাচ্ছে না৷
কিন্তু ড. সেন, যতই রহস্যজনক হোক ব্যাপারটা, আমাদের তো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে এরকম ভাবলে চলবে না৷
গীর্বাণ ঘোর ভেঙে বলেন—হ্যাঁ ঠিক, আর তা ছাড়া যে মারা গেছে সে রবার্ট বয়েড কি না জানি না৷ তবে সে যেই হোক না কেন, নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেল রহস্যজনক ব্যাকটিরিয়া আছে এই চাঁদের মাটিতে যার অক্সিজেন লাগে না, জল লাগে না৷ খুঁজে আমাদের বের করতেই হবে সে আজব ব্যাকটিরিয়া৷ চলো ড. রমন—
—হ্যাঁ চলো৷ কিন্তু কোনদিকে যাবে?
—কেন? তোমার গাইগার মুলার কাউন্টার যেদিকে দেখাচ্ছে৷ ভারি তাজ্জব ব্যাপার ড. রমন, কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যেদিকে তোমার তেজস্ক্রিয় ধাতু আছে আমার ব্যাকটিরিয়াও সেদিকে, যতই এগোচ্ছি কম্পিউটারে একটা গ্রাফের আভাস ফুটে উঠছে৷
—বেশ তাহলে চলো ওদিকেই৷
তখনও যদি ওরা জানত কোন অমোঘ নিয়তির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওই গাইগার কাউন্টারে'র কাঁটা!
মরণের ফাঁদে
গাইগার কাউন্টারের কাঁটাটা যেন একটা জীবন্ত প্রাণী৷ প্রচণ্ড উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে৷ নিশ্বাস বন্ধ করে এগোচ্ছেন রমন৷ পিছন পিছন গীর্বাণ৷ যতই এগোচ্ছেন কম্পিউটারের স্ক্রিনেও ক্রমশ স্পষ্ট ফুটতে শুরু করেছে সাইক্লয়েডের মতো সেই রেখা৷
একটা প্রায় এক-শো মিটার উঁচু পাহাড়ের কাছে আসতেই গাইগার কাউন্টারের কাঁটা হঠাৎ পাক খেয়েই এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে, যেন কোন দিক নির্দেশ করবে বুঝতে পারছে না৷ রমন চেঁচিয়ে ওঠেন—পেয়েছি পেয়েছি, ড. সেন—নির্ঘাত তাহলে ওই পাহাড়ের একেবারে পিছনেই! পাহাড়টার আড়াল করার জন্যই ওদিকে কোনো রিডিং পাওয়া যাচ্ছে না৷
উত্তেজনায় ওই ভারী বোঝা নিয়েই প্রায় ঝড়ের বেগে ছুটতে থাকে জিওলজিস্ট ড. রমন৷ হঠাৎ একটা কাণ্ড ঘটে যায়৷ হোঁচট লেগে তিনি সজোরে হুমড়ি খেয়ে পড়েন সামনে৷ ডান হাতের গ্লাভসটা খুলে পড়ে যায় মাটিতে৷ চিৎকার করে ওঠেন গীর্বাণ—সাবধান! সাবধান ড. রমন!
মুহূর্তের মধ্যেই গ্লাভসটা হাতে পরে নিয়ে আবার ছুটতে শুরু করেন ড. রমন৷ কিন্তু গীর্বাণের মনে হয় গ্লাভসটা হয়তো হাতে ঠিকমতো লাগেনি৷ কোথাও সামান্য ফাঁক থাকলেও সেখান দিয়ে শরীরে আঘাত করতে পারে ধুলোর মতো সূক্ষ্ম উল্কাকণা৷ কিন্তু কোনো কথা না শুনে পাগলের মতো ছুটছেই ড. রমন৷
পাহাড়টার পাদদেশ জুড়ে প্রায় এক-শো কুড়ি ডিগ্রির মতো যেতেই রমনকে থমকে দাঁড়াতে হয়৷ সঙ্গে সঙ্গে গীর্বাণকেও৷ যা দেখল দু-জনে তা অভাবনীয়৷ অথচ এতক্ষণ যা ঘটে এসেছে তাতে এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল৷ পাহাড়ের পিছনে অনেকটা ফাঁকা সমতল জায়গা যেন একেবারে নিকোনো৷ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আর একটা চন্দ্রযান৷ ওরা যে চান্দ্র ট্যাক্সি করে চাঁদে নেমেছে সেরকম নয়৷ তার চেয়ে আকারে অনেক ছোটো কিন্তু হাজারটা শুঁড় বেরিয়েছে তা থেকে৷ শ-তিনেক ফুট দূরে কতগুলি এলোমেলো পাথরের টুকরো ছড়ানো-ছিটানো যেগুলো থেকে হালকা নীল আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে৷
একমূহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে তারপর বিস্ফারিত চোখে বলেন—আমি যা খুঁজছি ড. সেন, ওই দেখো, নিশ্চয়ই কোনো রেডিয়ো অ্যাকটিভ মিনারেল৷ আমি জানতাম আমার অনুমান ভুল হবে না৷
তারপর চন্দ্রযানটার দিকে দেখিয়ে বলেন—ওই, ওতে করেই বোধ হয় এসেছিল রবার্ট বয়েড৷ সন্ধান পেয়েছিল ওই মিনারেলের কিন্তু আর নিয়ে যেতে পারেনি৷
গীর্বাণ সবিস্ময়ে দেখলেন তার হাতে রাবানলের তৈরি কম্পিউটারে এবার স্পষ্ট একটা সাইক্লয়েড রেখা ফুটে উঠেছে আর নীল অক্ষরে জ্বলছে নিভছে—Mysterious. Not Known.
বিচ্ছুরিত সেই নীল আলোর দিকে এবার ছুটে গেলেন রমন৷ তার পিছন পিছন গীর্বাণ৷ কাছে গিয়ে দেখলেন পাথরের গায়ে কেমন অদ্ভুত মাপ মতো অনেকগুলি গর্ত৷ প্রতিটি গর্তের ভেতর ঘন সবুজ মতো কী তরল পদার্থ—তার থেকেই বেরিয়ে আসছে সেই রশ্মি৷
পিঠের ব্যাগ থেকে একটা স্যামপলার বের করে রমন সেই পাথরের গর্তের কাছে ধরতেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল৷ সেই নীল রশ্মি যেন ধূমকেতুর লেজের মতো গর্তের গা থেকে বেরিয়ে এসে সোজা তার হাতের গ্লাভসের ভিতর দিয়ে ঢুকে গেল৷ দেখতে দেখতে ড. রমনের সমস্ত শরীরটা কেমন যেন কুঁকড়ে গেল৷ একটা চিৎকার করে মাটিতে গড়িয়ে পড়লেন ড. রমন৷ —সেভ মি... ড. সেন! সেভ মি! ওর সমস্ত শরীর থেকে একটা নীল আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে৷ কী ব্যাপারটা হচ্ছে বুঝতে না পেরে হতভম্বের মতো ছুটে কাছে যেতেই গীর্বাণ দেখতে পেলেন ড. রমনের প্রাণহীন দেহটা 'স্পেস স্যুটে'র ভিতর পড়ে আছে৷ দেহ বললে ভুল বলা হবে, কঙ্কালটাই শুধু পড়ে আছে তার৷ শরীরের সমস্ত রক্ত মাংস যেন একেবারে কর্পূরের মতো উপে গেছে স্পেস স্যুটের ভিতর থেকে৷ মৃদু একটা নীল শিখা তখনও ধিকিধিকি জ্বলছে স্পেস স্যুটের ভিতর৷
যতদিন বাঁচবেন এই মুহূর্তের কথা কখনো ভুলবেন না গীর্বাণ৷ রোদ নিভে যাচ্ছে৷ এগিয়ে আসছে চাঁদের সেই মহাতমিস্রার রাত৷ যার রূপও কল্পনা করা কঠিন৷ কুঁজ পাহাড়ের ছায়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে৷ কোথাও সাড়া নেই, শব্দ নেই, গতি নেই৷ মহামৃত্যুর জগৎ৷ সামনে বন্ধুর দেহ৷ এ যে ভয়ংকর রহস্যময় মৃত্যু!
দু-হাজার মাইল ব্যাসার্ধের এই প্রাণহীন পাথর বালি পাহাড়ের স্তূপের মধ্যে একমাত্র জীবিত প্রাণী তাহলে সে?
এরকম দাঁড়িয়ে থাকলে ভীষণ ভয়ে হয় সে মারা যাবে, নয় তো পাগল হয়ে যাবে৷ বিজ্ঞানীর তীব্র কৌতূহলই এখন একমাত্র বাঁচাতে পারে তাকে এই মৃত্যু থেকে৷ কীসের সেই ভয়ংকর প্রাণঘাতী রশ্মি যা মুহূর্তে শুষে নিল রমনের শরীরের রক্তমাংস? মনে হচ্ছিল যেন রশ্মিটা জ্যান্ত৷ রবার্ট বয়েডেরও কি মৃত্যু হয়েছে এই রশ্মির হাতেই? কিন্তু এখন কী করবেন তিনি? একা ভীষণ একা৷ না, এই মুহূর্তে ফিরে যেতে হবে ট্যাক্সিতে৷ সেখানে তাও আলো আছে, আকার আছে, মানুষের হাতের তৈরি যন্ত্র আছে৷
খুব ভক্ত খ্রিস্টান ছিলেন ড. রমন৷ যাওয়ার আগে ওর শিয়রের কাছে একটা ক্রুশ তৈরি করার জন্য পাথর খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ দেখেন একটা সাদা মতো কী জিনিস পাথরের নীচে চাপা দেওয়া৷ কৌতূহলী হয়ে পাথরটা সরাতেই দেখেন একটা ডায়েরি৷ কার ডায়েরি?
চামড়া বাঁধানো কালো ডায়েরিটা নিয়ে ট্যাক্সির দিকে রওনা দেন তিনি৷
বয়েডের ডায়েরি
ট্যাক্সিতে ফিরে এসে কাউচে বসে ডায়েরির পাতা খুললেন তিনি৷ অনেক পাতাই ছেঁড়াখোঁড়া ডায়েরিটার কিন্তু কালিতে লেখা অক্ষরগুলি স্পষ্ট৷ প্রথম পাতায় লেখা— Robert Boyed. Microbiologist, Wisconsin University. তারপর অনেকগুলি পাতা আবার ছেঁড়া৷ পড়তে লাগলেন গীর্বাণ৷
১৯৮৮ সালের ১ মে পৃথিবী থেকে যাত্রা শুরু করে ২৫ জুন ১৯৮৯... এইমাত্র মঙ্গলগ্রহে এসে পা দিলাম৷ অর্থাৎ প্রায় ৪০০ দিন লাগল৷ পৃথিবী থেকে রওনা দেওয়ার আগে 'নাসা'-র বায়োলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার গবেষণা বিভাগের চিফ ড. গুডবডি বললেন আমাকে—তোমাকে মঙ্গলগ্রহে পাঠানো হচ্ছে ড. বয়েড, এমন কোনো জীবাণু আবিষ্কার করার জন্য যা কলেরা বসন্ত যক্ষার জীবাণুর চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর, যা দিয়ে একটা জাতিকে মুহূর্তের মধ্যে শেষ করে দেওয়া যায়৷ ভিয়েতনামের যুদ্ধে আমরা হেরে গেছি কারণ ভালো করে জীবাণুযুদ্ধ চালাতে পারিনি বলে, কিন্তু এবার এমন কিছু আবিষ্কার করতে হবে যাতে কোনো দেশ সাহস পাবে না আমাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে৷ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো যেন মঙ্গলগ্রহে সেরকম জীবাণু পাওয়া যায়৷ পৃথিবীর আর কোনো দেশ জানে না যে তুমি মঙ্গলগ্রহে যাচ্ছ—আমরা সর্বত্র প্রচার করেছি তুমি চাঁদে যাচ্ছ৷
২৮জুন—বিজ্ঞানীরা ঠিকই অনুমান করেছেন৷ প্রথম নজরে অনেকটা আমাদের পৃথিবীর মতোই দেখতে এই গ্রহ৷ তবে একেবারে আদিম পৃথিবী৷ আমার ব্ল্যাক সঙ্গী রিচার্ড, বোটানির লেকচারার ও আমি যেখানে নেমে দু-দিন ধরে হাঁটছি সেখানকার মাটি কেমন লাল ভেজা ভেজা৷ মনে হচ্ছে জলের অস্তিত্ব আছে৷ যেখানে মাটি বেশি ভেজা সেখানে মাটির রং হালকা, হালকা নীলাভ সবুজ অর্থাৎ কোনো আদিম শ্যাওলার আস্তরনে ঢাকা৷
৩০জুন- রিচার্ডের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হল৷ ও বলল ওই নীলাভ সবুজ রং কোনো শ্যাওলার নয়৷ নিশ্চয়ই কোনো 'ক্লে'-জাতীয় মাটির রং৷ ক্লে অনেক সময় নাকি এরকম রঙের হয়৷
১ জুলাই—একা একাই আজ চলে গেলাম সেই সবুজ মাটির দিকে৷ রিচার্ড ঘুমোচ্ছিল স্পেসক্র্যাফটে৷ অক্সিজেন ডিটেকটরে দেখলাম বাতাসে সেখানে অক্সিজেনের পরিমাণ বেশ কিছুটা বেশি৷ অর্থাৎ যা ভেবেছিলাম তাই৷ ফোটোসিন্থেসিসের মাধ্যমে সেই শ্যাওলা অক্সিজেন ছাড়ছে পৃথিবীর গাছপালার মতোই৷ ক্যামেরায় ফোটো তুলে নিলাম৷ তাপমাত্রা ও অক্সিজেনের পরিমাণও নোট করে নিলাম ডায়েরিতে৷ এটা আমার একান্ত গোপন ডায়েরি৷ আবিষ্কারের কথা বলা চলবে না রিচার্ডকে৷ এ আমার একান্ত নিজস্ব আবিষ্কার৷ এর কৃতিত্বের ভাগ আমি আর কাউকে দিতে রাজি নই৷
২ জুলাই—মাটি যখন এত আর্দ্র তখন নিশ্চয়ই এদিকে জলের ধারা আছে কোনো৷ ...অনেকটা হাঁটতে হাঁটতে জলের একটা সরু নালার মতো চোখে পড়ল৷ আরও কয়েকটা নালা এদিকে-ওদিকে৷ কোথাও থেকে যেন তিরতির করে জল আসছে৷ নালার ছবিটা তুললাম৷ মঙ্গলগ্রহে নালার প্রথম আবিষ্কারক আমিই৷ রিচার্ড এসব জানেও না৷ দরকার নেই কিছু জানানোর৷
৪ জুলাই—আজ বৃষ্টি হল মঙ্গলগ্রহে৷ ঠিক পৃথিবীর মতো নয়, কেমন যেন কুয়াশার মতো ধোঁয়া ধোঁয়া৷ আমার পায়ের কাছে সবুজ শ্যাওলা বৃষ্টির জলে ভিজে গেছে—হঠাৎ দেখি তা থেকে কেমন নীল আলো বেরোচ্ছে৷ আশ্চর্য! কোথা থেকে এল এই আভা? কিছু শ্যাওলা ছুরি দিয়ে কেটে স্যাম্পলারে ভরে নিলাম৷ পরীক্ষা করে দেখতে হবে ল্যাবরেটরিতে৷
৫ জুলাই—পৃথিবীর ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা-রিচার্ড ভোঁস ভোঁস করে ঘুমুচ্ছে৷ এই সুযোগ৷ আমি ল্যাবরেটরিতে ঢুকে সেই নীলচে সবুজ শ্যাওলার ডিসটিলড ওয়াটারে একটা সলিউশন বানিয়ে মাইক্রোস্কোপের নীচে ধরতেই দেখি V আকারের একধরনের ব্যাকটিরিয়ায় সমস্ত স্লাইডটা ভরতি৷ এই তো প্রাণ৷ মঙ্গলগ্রহে প্রথম প্রাণের আবিষ্কর্তাও আমি! V-এর দুই মাথা থেকে ঝালুম ঝুলুম সুতোর মতো অনেকগুলি শুঁড় বেরিয়েছে৷ কোনো কোনো ব্যাকটিরিয়ার সেই শুঁড় থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে হালকা নীল আলো৷ মাইক্রোস্কোপের নীচে একটা জ্বলন্ত ব্যাকটিরিয়া ধরতে দেখলাম সেটার অত্যন্ত দ্রুত কোষ বিভাজন হচ্ছে৷ একসময়ে কোষ বিভাজনটা যেই বন্ধ হয়ে গেল আলোও নিভে গেল৷ কীসের আলো ওটা? পৃথিবীর কিছু কিছু জীবাণু কোষ বিভাজনের সময় যেমন তাপ বিকিরণ করে—এরা তেমনি আলো বিকিরণ করছে? এই আলোর চরিত্রটা কী?

৫ জুলাই রাত—সেই রহস্যজনক ব্যাকটিরিয়াগুলো আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে৷ আলোর তীব্রতা মাপার জন্য টেবিলের উপর রাখা একটা ফোটোমিটারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি সলিউশনটা৷ হঠাৎ দেখলাম ঘরের এক কোণে রাখা গাইগার-কাউন্টারের কাঁটাটা নড়ে উঠল৷ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না৷ ব্যাকটিরিয়াগুলো তেজস্ক্রিয় নাকি? গাইগার কাউন্টারে মেপে দেখলাম এই তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ প্রায় আট মিলিকুরি৷ ওই নীল আলো তাহলে তেজস্ক্রিয় রশ্মি! কোষ বিভাজনের সময় এরা, রেডিয়ো অ্যাকটিভ রশ্মি উৎপন্ন করে চলেছে৷ এ কী ভয়ংকর এক জীবাণুর আবিষ্কর্তা আমি! উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছা করছিল আমার৷ ব্যাকটিরিয়াগুলো যে বৃষ্টির জলের সঙ্গেই কোথা থেকে চলে এসেছে তাতে আর সন্দেহ নেই৷ কেননা বৃষ্টির আগে শ্যাওলাগুলি জ্বলজ্বল করছিল না৷ এই রেডিয়ো অ্যাকটিভ ব্যাকটিরিয়া তাহলে মেঘের সঙ্গে আকাশে উঠে যেতে পারে৷ চমৎকার৷ এরকম একটা কিছুই তো খুঁজছিলাম৷ হিরোশিমায় বোমা ফেলার ক-দিন পর নাকি মুষলধারে কালো বৃষ্টি হয়েছিল৷ এ-বৃষ্টি হবে তার চেয়েও ভয়ংকর৷ এ বৃষ্টি হবে তেজস্ক্রিয় বীজাণুর বৃষ্টি৷ হাঃ হাঃ, গোটা মানবজাতিকেই মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার কলকাঠি এখন প্রায় আমার হাতের মুঠোয়৷ শুধু আমাকে এখন জানতে হবে এই ব্যাকটিরিয়াগুলির খাদ্য কী যাতে ওরা মারা না গিয়ে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে৷
৭ জুলাই—রিচার্ড বোধ হয় কিছু সন্দেহ করছে ল্যাবরেটরিতে আমাকে দরজা বন্ধ করে কাজ করতে দেখে৷ আমার আলমারির সামনে ঘুরঘুর করছিল৷ ওর মতলবটা মনে হচ্ছে ভালো নয়৷ আমি ক্যামেরাটা তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছি৷ ও একবার জিজ্ঞেস করল ক্যামেরায় আমি কী তুলেছি৷ আমি বললাম—কিছু না৷
৯ জুলাই—পৃথিবী থেকে গুডবডি জিজ্ঞেস করল কোনো জীবাণুর সন্ধান পেয়েছি কি না৷ বললাম—সেরকম কিছু না৷ কেননা পুরো নিশ্চিত না হওয়া অবধি আমি কাউকে কিছু জানাতে চাই না৷
গুডবডি হতাশ হয়ে বলল—তাহলে তোমরা এবার ফিরে এসো চাঁদে, কারণ এরপর মঙ্গলগ্রহ থেকে বেরোবার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে৷
পূর্ব পরিকল্পনার মধ্যে চাঁদেই ফিরে আসার কথা ছিল আমাদের৷ পৃথিবীতে কোনো ভয়ংকর জীবাণু নিয়ে আসার আগে যাতে চাঁদের মাটিতেই তার উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারি৷ আমাদের চাঁদে যাওয়ার 'মডিউল' অপেক্ষা করছে চাঁদ আর মঙ্গলের মাঝখানে৷ মঙ্গলের মহাকাশযান তার সঙ্গে গিয়ে খাপে খাপে লাগবে৷ তারপর আমরা দড়ি ধরে মহাশূন্যে ভাসমান অবস্থায় ঢুকব গিয়ে সেই লুনার মডিউলে৷ লুনার মডিউলে চড়ে যাত্রা করব চাঁদে৷
১৪ জুলাই—এইমাত্র আমরা মহাশূন্যে সাঁতার দিয়ে মঙ্গলগ্রহের মডিউল থেকে বেরিয়ে চাঁদের মডিউলে ঢুকলাম৷ কিন্তু একটা কাণ্ড ঘটে গেল৷ 'হ্যাসেল ব্লাড' ক্যামেরাটা ছিল আমার হাতে, যার মধ্যে মঙ্গলগ্রহের সব ছবি৷ আমি দড়ি ধরে প্রথম বেরিয়ে এলাম, আমার পিছু পিছু রিচার্ড৷ হঠাৎ রিচার্ড সেই শূন্যে ভাসমান অবস্থাতেই ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে ক্যামেরাটা কেড়ে নিতে গেল৷ আমি একদম প্রস্তুত ছিলাম না৷ ফলে আমার হাত থেকে ক্যামেরাটা ছিটকে বেরিয়ে গেল সেই মহাশূন্যে৷ ভাসতে ভাসতে সামনে এগিয়ে চলল৷ কোথায় গিয়ে থামবে কে জানে৷ ও কি টের পেয়ে গেছে আমি এরকম ভয়ানক এক মৃত্যুবাণ আবিষ্কার করেছি যা দিয়ে সমস্ত মানবজাতিকে ধ্বংস করে দেওয়া যায়? না টের পায়নি এখনও৷ কিন্তু পাবে৷ দাঁতে দাঁত চাপলাম আমি৷
২০ ডিসেম্বর—চাঁদের মাটিতে এসে আজ পৌঁছোলাম৷ চাঁদে এখন রাত্রি৷ কী ভয়ংকর রাত্রি৷ পাঁচ দিনের মাথায় আবার দিন শুরু হবে আর ঠিক তখন আমাদের রকেট চালু করে দিতে হবে পৃথিবীতে রওনা দেওয়ার জন্য৷ এই পাঁচ দিনের মধ্যেই আমার ব্যাকটিরিয়া নিয়ে পরীক্ষা শেষ করতে হবে৷ হাতে সময় বেশি নেই৷ রিচার্ড এই ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে বাইরে বেরোল না৷ আমি টর্চ নিয়ে বাইরে গিয়ে দেখলাম কাছেই কিছু পাথরের স্তূপ৷ ড্রিল দিয়ে তাতে কয়েকটা গর্ত করে সেই শ্যাওলার সলিউশনটা গ্লুকোজের জলে মিশিয়ে ঢেলে দিলাম৷ অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকে অক্সিজেন দিয়ে দিলাম তাতে৷ তারপর মুখগুলো মোম দিয়ে সিল করে দিলাম৷ গর্তগুলিই হল আমার টেস্ট টিউব৷ এখন শুধু খুঁজে বের করা কী এই ব্যাকটিরিয়ার কালচার মিডিয়াম৷ কীসে বংশবৃদ্ধি হবে এদের৷
২১ ডিসেম্বর—নাঃ, পাচ্ছি না৷ কিছুই পাচ্ছি না৷ দুটো টেস্ট টিউবের সব ব্যাকটিরিয়াই খাদ্যের অভাবে মারা গেল৷ গ্লুকোজ তাহলে এদের খাদ্য নয় বোঝা যাচ্ছে৷ এবার আর দুটো গর্তে কিছু গুঁড়ো ইস্ট (yeast) ছড়িয়ে দিলাম৷
২২ ডিসেম্বর—নাঃ, আর দুটো টেস্ট টিউবের ব্যাকটিরিয়াও খতম৷ ইস্ট অর্থাৎ শ্বেতসার তাহলে খায় না এরা? হাতে সময়ও তো বেশি নেই৷ শেষে কি কূলে এসে তরি ডুববে৷ এখানেই কি এই ব্যাকটিরিয়াগুলিরও মৃত্যু ঘটবে৷
২৩ ডিসেম্বর—সকাল—এইমাত্র সেই অদ্ভুত ব্যাপারটা ঘটল৷ নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছি না৷ একটা হার্ড বয়েল ডিম খাচ্ছিলাম ছুরি কাঁটা দিয়ে, হঠাৎ গোটা ডিমটা ছুরির চাপে পিছলে গিয়ে পড়ল পাশে রাখা একটা 'পেট্রি' ডিশকে যেটার গায়ে কিছু সলিউশন লেগে ছিল৷ মুহূর্তে একটা কাণ্ড ঘটল৷ একটা সরু নীল শিখা সাপের জিভের মতো সেই সলিউশন থেকে বেরিয়ে এসে ডিমটাকে একটু চেটে দিল৷ অমনি গোটা ডিমটাই যেন আগুনের মতো বিচ্ছুরিত করতে লাগল নীল শিখা৷ আমি ছুটে মাইক্রোস্কোপটা এনে তার নীচে ধরতেই দেখলাম অবিশ্বাস্য দ্রুত বংশবৃদ্ধি হচ্ছে কোষগুলোর এবং সেই সঙ্গে বেরিয়ে আসছে তেজস্ক্রিয় শিখা৷ গাইগার কাউন্টারের কাঁটা একেবারে থরথর করে কাঁপছে৷ আমার গায়ে স্পেস স্যুট না থাকলে কী হত কে জানে৷ ঠিক পনেরো সেকেন্ডের মধ্যেই গোটা ডিমটা যেন নীল শিখায় রূপান্তরিত হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ মাই গড! তাহলে প্রোটিন? প্রোটিনই কি এই ভয়াবহ জীবাণুর সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য? যদি তাই হয়, কিন্তু না... আরও নিশ্চিত হতে হবে আমাকে...
২৪ ডিসেম্বর (সকাল)—আজকের দিনটাই তো খালি হাতে আছে আমার৷ কাল বড়োদিনেই তো চাঁদ ছেড়ে রওনা দিতে হবে৷ তার মধ্যেই আমাকে জানতে হবে মানুষের শরীরে এর প্রতিক্রিয়া কী৷ কিন্তু তার জন্য, গিনিপিগ কে হবে? হ্যাঁ রিচার্ড, ওই রিচার্ডই হবে আমার গিনিপিগ৷ এই দুর্মূল্য সত্য জানার জন্য এ আর এমন বেশি কথা কী? নাপাম বোমায় ওরকম কত তুচ্ছ প্রাণ গেছে ভিয়েতনামে৷ তবে ওকে একটু লোভ দেখাতে হবে৷ না হলে ফাঁদে পা দেবে না৷
২৪ ডিসেম্বর (সন্ধ্যা)—রিচার্ডকে প্রস্তাবটা দিতে ও খুব আশ্চর্য হয়ে গেল৷ বোধ হয় ভাবতেই পারেনি আমার এই গোপন আবিষ্কারের ভাগ ও এরকম না চাইতেই পেয়ে যাবে৷ আমি বললাম—চলো দেখবে কী অদ্ভুত জিনিস আমি আবিষ্কার করেছি৷ তুমি তো আমার সহকর্মী সুতরাং এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব তোমারও৷ আমরা দু-জনে স্পেসক্র্যাফট থেকে নেমে সেই 'টেস্টটিউব' গুলোর দিকে এগোলাম৷ ঘুটঘুট্টি অন্ধকার শুধু দিগন্তের এককোণে নীল পৃথিবী উঠে আসছে৷ রিচার্ড সেদিকে তাকিয়ে অর্ধস্ফুট গলায় বলল—আঃ! ওইখানে নিশ্চয় আমার আমেরিকা৷ কবে ফিরব—আমেরিকায়?
মনে মনে বললাম—যদি আমার অনুমান ভুল না হয় তাহলে তোমাকে আর কোথাও ফিরতে হবে না৷ টেস্ট টিউবের সিল ভেঙে রিচার্ডকে বললাম হাতের গ্লাভসটা খুলে ওই টেস্ট টিউবগুলোর কাছে আঙুল আনতে৷ একটা মজা হবে৷ রিচার্ড অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আমার কথামতো গ্লাভস খুলে আঙুল সেই টেস্ট টিউবের কাছাকাছি আনতেই আমার অনুমানমাফিক সেই ঘটনাটাই ঘটল৷ টেস্টটিউব থেকে মুহূর্তে একটা নীল শিখা লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসে রিচার্ডের আঙুলের ভিতর দিয়ে ঢুকে গেল, তারপর মুহূর্তের মধ্যে মনে হল রিচার্ডের সমস্ত শরীরটা যেন নীল হয়ে গেছে৷ যন্ত্রণায় ভয়ে চিৎকার করে রিচার্ড ছুটতে শুরু করল পাগলের মতো—আগুন গায়ে লাগলে যেরকম ছোটে মানুষ৷ তারপর পড়ে গেল মাটির উপর৷ সেই সেদ্ধ ডিমের মতো দেখতে দেখতে রিচার্ডের শরীরটাও নীল শিখায় অদৃশ্য হয়ে গেল৷ শুধু পড়ে রইল ক্যালশিয়ামে তৈরি তার কঙ্কালটা যার গায়ে প্রোটিনের ছিটেফোঁটাটুকুও আর নেই৷ সব প্রোটিন ভয়ংকর ব্যাকটিরিয়াগুলো চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছে৷
আনন্দে আমার মাটিতে গড়াগড়ি দিতে ইচ্ছে করছিল৷ আমি পেয়ে গেছি সেই ভয়ংকর ক্ষুধার্ত ব্যাকটিরিয়া যার প্রথম ও একমাত্র খাদ্য হল প্রাণের প্রধান উৎপাদন প্রোটিন৷
হাঃ-হাঃ, আমি সর্বশক্তিমান ঈশ্বর৷ আমি এক নিমেষে ধ্বংস করে দিতে পারি পৃথিবীর কয়েক-শো কোটি প্রাণ৷ এই ভয়ংকর ব্যাকটিরিয়া আমি নিয়ে যাব এখান থেকে৷ তার পর সমস্ত পৃথিবী আমার হাতের মুঠোয়৷ ওই V হল Victory৷ আমার মতো আর সমস্ত সভ্য আমেরিকান জাতির Victory৷
২৫ ডিসেম্বর—নাসা থেকে কাল নির্দেশ এসেছিল ঠিক বেলা বারোটার সময় রকেটের জ্বালানির বিস্ফোরণ ঘটাতে৷ ঠিক বেলা বারোটা বাজতেই আমি রকেটের সুইচ টিপে দিলাম৷ কিন্তু এ কী! এক বার... দু-বার... তিনবার...৷ সুইচটা ট্রিপ করে যাচ্ছে কেন? আমি সভয়ে ইনডিকেটর প্যানেলের কম্পিউটারের দিকে দেখলাম৷ এ কী! কম্পিউটার ডেড৷ তাতে কোনো সাড়া নেই৷ আমি পাগলের মতো হয়ে গেছি৷ হাতে সময় বেশি নেই৷ আধঘণ্টার মধ্যে যে করেই হোক চাঁদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হবে৷ তারপরই বন্ধ হয়ে যাবে মহাকাশের জানলা৷
কোথায় গণ্ডগোল, পাগলের মতো আমি খোঁজাখুঁজি করতে করতেই দেখলাম—সর্বনাশ৷ কম্পিউটারের ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক টেপগুলি সব ফেটে গেছে৷ নিশ্চয়ই ওই তেজস্ক্রিয় শিখার জন্য৷ এখন কী হবে? আমি পৃথিবী থেকে নির্দেশ চাইতে গেলাম৷ না ট্রান্সমিটারের পলিমার দিয়ে তৈরি যন্ত্রাংশগুলি সব তেজস্ক্রিয় শিখার ছোঁয়ায় নষ্ট হয়ে গেছে৷ কোনো নির্দেশ নেই৷ জ্বালানি ট্যাঙ্কের দিকে তাকিয়ে দেখি সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে নীল আভা৷ অর্থাৎ ব্যাকটিরিয়া ভিতরে ঢুকে 'কেরোসিন তেল' খেয়ে নিচ্ছে৷ শুধু রিচার্ডের প্রোটিনে খিদে মেটেনি তাদের, এখন তারা চর্বিও খাচ্ছে৷ আমাকেও নিশ্চয়ই আক্রমণ করত ওরা৷ কিন্তু আমার গায়ের স্পেস সুটের বর্মটাই বাঁচিয়ে দিচ্ছে আমাকে৷ কিন্তু সময় তো নেই আর৷ আমি কি ভয়ে পাগল হয়ে গেলাম নাকি? যে সুইচ হাতের কাছে পাচ্ছি তাই টিপে যাচ্ছি কেন?
২৭ ডিসেম্বর—বন্দি! বন্দি! এই ভয়ংকর প্রাণহীন শব্দহীন স্পন্দনহীন জগৎটার ভিতর আমি বন্দি৷ আমি একা৷ হায় ঈশ্বর৷ এই মাইল মাইলব্যাপী পাথর বালি মাটির স্তূপ৷ এর মধ্যে কোথাও কি প্রাণের অস্তিত্ব নেই শুধু ওই ক্ষুধার্ত জ্বলন্ত ব্যাকটিরিয়াগুলি ছাড়া৷ এ কী! বিড়বিড় করছি কেন? এই এক দিনেই পাগল হয়ে গেলাম নাকি? না না মাথাটা ঠিক রাখতে হবে আমাকে৷ স্পেসক্রাফটে এখনও প্রায় মাস খানেকের খাদ্য মজুত আছে৷ সোলার ব্যাটারি ফুল চার্জ করা আছে৷ বিদ্যুতের অভাব হবে না, খাদ্যেরও না৷ হয়তো মাস খানেকের পর পৃথিবী থেকে সাহায্য আসবে কিন্তু আমাকে এখন শুধু মাথাটা ঠিক রাখতে হবে৷
কত তারিখ আজ? এখন পৃথিবীতে সকাল বিকেল না রাত্রি? সব গুলিয়ে যাচ্ছে আমার৷ হ্যাঁ, সকাল বোধ হয়৷ ওই তো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি আমি, আমার দেশের বাড়ি লুইসায়ানার ওক গাছটায় রবিন আর ম্যাগপাই পাখি শিস দিচ্ছে... এখন হেমন্ত৷ Fall-এর সময়৷ ওই তো ঝরঝর শব্দ করে চেস্ট নাটের বড়ো বড়ো লাল পাতা ঝরে পড়ছে৷ আমি শুনতে পাচ্ছি, স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি৷ রিচার্ড তুমি শুয়ে আছ কেন! ওঠো শুনতে পাচ্ছ না তুমি৷ চলো আমরা বেরিয়ে পড়ি এই মৃত্যুপুরী থেকে৷ আমি বকবক করছি নিজের সঙ্গে? সত্যি কি পাগল হয়ে গেলাম আমি?
...শোনো এখানে কি কেউ নেই? নিশ্চয়ই কেউ আছে৷ কেউ নেই তা হয় না৷ শোনো চুপ করে থেকো না৷ আমি কিছু চাই না—আমি খ্যাতি চাই না, অর্থ চাই না, প্রতিপত্তি চাই না৷ আমি সর্বশক্তিমান ঈশ্বর হতে চাই না, আমি শুধু কথা বলতে চাই একজন মানুষের সঙ্গে৷ কত লক্ষ বছর আমি কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলিনি৷ আমি শুধু একজন মানুষ চাই... একজন মানুষ...৷
গীর্বাণ দেখলেন ডায়েরির একেবারে শেষ পাতায় শুধু গোটা গোটা করে তিনটে অক্ষর লেখা আছে... মা-নু-ষ৷
সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে?
ডায়েরিটা হাতে নিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকেন গীর্বাণ৷ সমস্ত রহস্য তার কাছে এবার পরিষ্কার হয়ে আসছে৷ যে কঙ্কালটা ওরা দেখতে পেয়েছিল সেটা তাহলে রবার্ট বয়েডের নয়, রিচার্ডের৷ রবার্ট বয়েড যাকে তার বৈজ্ঞানিক উচ্চাকাঙ্খার জন্য প্রায় জেনেশুনেই খুন করেছে৷ কিন্তু রবার্ট বয়েড তাহলে বেঁচে আছে এখনও? নিঃসঙ্গ প্রাণহীন উপগ্রহের মৃত্যুপুরীতে বসে সে পাগলের মতো প্রাণের খোঁজ করে চলেছে—যে প্রাণকে নিঃশেষে ধ্বংস করার মারণাস্ত্র সে আবিষ্কার করেছিল? কিন্তু কোথায় গেল তাহলে রবার্ট বয়েড?
মহাকাশচারীদের স্পেস স্যুটের সঙ্গে যে রেডিয়ো সিগন্যালের ব্যবস্থা থাকে তা থেকেও তো কোনো সংকেত পাচ্ছেন না তিনি৷ অবশ্য গীর্বাণ জানেন চন্দ্রপৃষ্ঠের বক্রতা এত বেশি যে দু-ফুট লম্বা একজন মানুষ রেডিয়ো সিগন্যাল পাঠালে তা মোটে দু-মাইল অবধিই পৌঁছতে পারে৷ রবার্ট বয়েড বেঁচে থাকলেও কি তাহলে দু-মাইল ব্যাসার্ধের বৃত্তের বাইরে কোথাও আছে? তার কি কোনোরকম বোধ আছে আর৷ নাকি সে ইতিমধ্যেই উন্মাদ হয়ে গেছে৷
তাদের চাঁদে যাওয়ার ট্রেনিং দেওয়ার সময় এই কথাই বারবার বলেছিল মনস্তত্ত্ববিদরা৷ সেখানকার নির্জনতা কোনো মানুষের পক্ষে একা বেশিক্ষণ সহ্য করা সম্ভব নয়৷ যেকোনো জীবন্ত প্রাণী বা যেকোনো পরিচিত বস্তু থেকে লক্ষ মাইল দূরে আছে সে—এই ভয়াবহ উপলব্ধি একজন মানুষের মনে কি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে তা ধারণারও বাইরে৷ পৃথিবীর মানুষের সব ইন্দ্রিয়গুলি নিরন্তর নানা পরিবর্তনে অভ্যস্ত—চাঁদের সেই ভয়াবহ পরিবর্তনহীন পরিবেশে সে নানারকম অবাস্তব মায়া মরীচিকা দেখতে শুরু করে দিতে পারে আর তাই শেষ অবধি বানিয়ে দিতে পারে তাকে বদ্ধ উন্মাদ৷
ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়ালেন গীর্বাণ, তারপর সেই স্পেসক্রাফটের মধ্যে সংকীর্ণ জায়গায় পায়চারি শুরু করে দিলেন৷ পায়চারি করতে করতে হঠাৎ সেই গানটার কথা মনে পড়ে গেল গীর্বাণের৷ যে গানের ক্যাসেটটা তিনি নিয়ে এসেছিলেন পৃথিবী থেকে৷ এতদিন নানা ব্যস্ততায় সুযোগ পাননি৷ এখন সেই গানটা তিনি চালিয়ে দিলেন৷ স্পেসক্রাফটের কৃত্রিম বাতাসের তরঙ্গ তুলে গানটা বেজে উঠল—'চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো'৷ গানটা বাজতেই একটা মারাত্মক অনুভূতি হল গীর্বাণের৷ পৃথিবীতে এই চল্লিশ বছর অবধি বসবাস করেও কখনো বুঝতে পারেননি যে পৃথিবীকে কতটা ভালোবেসেছিলেন তিনি৷ পৃথিবীর জল মাটি মানুষ হাওয়া গাছপালা তার শৈশব তার যৌবন৷ এই গানটা যেন এক নিমেষে সেই সমস্ত জীবনের স্মৃতিটা একসঙ্গে তার সামনে হাজির করল৷ চারটে চাঁদের মতো বড়ো সবুজ পৃথিবী উঠেছে দিগন্তে মোটে যেন দু-হাত দূরে৷ গীর্বাণের ভয়ানক একটা ইচ্ছা হল যেন স্পেসক্রাফট থেকে লাফিয়ে পড়ে এক দৌড়ে ছুটে চলে যান ওই পৃথিবীর দিকে৷ অনুভূতিটা এমন অসহনীয় যে মনে হল সত্যি তিনি লাফিয়ে পড়ছেন৷ বিষম ভয় পেয়েই গীর্বাণ আবার ক্যাসেটটা বন্ধ করে দিলেন৷ ক্যাসেটটা বন্ধ করে দিতেই আবার সেই ভয়ানক নৈঃশব্দ্য৷
আর হিরোশিমা নয়
সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছিলেন কি না গীর্বাণ সেন বুঝতে পারছিলেন না৷ হঠাৎ টেলিমিটারে চার লক্ষ কিলোমিটার দূরে পৃথিবী থেকে ভেসে আসে মানুষের গলার শব্দ-হ্যালো, এশিয়ান স্পেস রিসার্চ সেন্টার থেকে হিকোহিতা বলছি-হ্যালো৷
ট্রান্সমিটারের কাছে পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েন গীর্বাণ সেন—হ্যালো, আমি গীর্বাণ সেন বলছি—হ্যালো, —রিসার্চ সেন্টার থেকে এতক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ পাইনি কেন?
সূর্যে ভয়ানক চৌম্বক ঝড় চলছে-যোগাযোগ রাখা যাচ্ছে না—হ্যালো—
—হ্যালো—
—হ্যাঁ, আমি হিকোহিতা বলছি—কোনো জীবনের চিহ্ন পাওয়া গেল? কোনো জীবন? উৎকন্ঠিত গলা আসে হিকোহিতার—
—হ্যাঁ পেয়েছি৷ ভয়ংকর সে জীবন৷ ফিশন ব্যাকটিরিয়া৷ মারাত্মক দ্রুত হারে কোষ বিভাজনের সময় তেজস্ক্রিয় রশ্মি বিকীর্ণ করে৷ তেজস্ক্রিয় ধাতুর পরমাণুর মতোই৷ প্রোটিনের অণু সে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়৷ প্রোটিন হল তার খাদ্য৷ এরকম কয়েক-শো ব্যাকটিরিয়ার মুহূর্তে একটা হিরোশিমা তৈরি করে ফেলার ক্ষমতা আছে৷ আর এ জীবাণু চাঁদের নয়, মঙ্গল গ্রহের৷ কেননা, সেখানে বাতাস আছে৷
আবার হিরোসিমা? আবার? লক্ষ লক্ষ মাইল ইথার তরঙ্গ পেরিয়ে হিকোহিতার ক্ষীণ কন্ঠস্বর ভেসে আসে৷ —না , না, ড. সেন৷ এই পৃথিবীতে আর কোনো হিরোশিমার দরকার নেই৷ ফিরে এসো তোমরা৷
—'তোমরা' নয় প্রফেসর হিকোহিতা৷ ড. রমন নেই৷ —হি ইজ ডেড৷ কয়েকটা মাত্র ব্যাকটিরিয়া কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে৷ আমি একা প্রফেসর, আমি একা৷ —প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন গীর্বাণ৷
—মাই গড৷ কিন্তু তোমাকে আরও তো অন্তত আটচল্লিশ ঘণ্টা থাকতে হবে ওখানে৷ এর মধ্যে তো মহাকাশের জানলা আর খোলা পাওয়া যাবে না৷
—আর এক ঘণ্টা এখানে থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব—আমাকে বাঁচান প্রফেসর৷ আমাকে উদ্ধার করুন এখান থেকে৷
—ধৈয ধরো ড. সেন৷ হ্যাভ করেজ৷ মানুষকে কখনো কখনো একদম একা একা বাঁচা শিখতে হয়৷ যে পারে সেই বীর৷ নিজের উপর ভরসা হারিয়ো না মাই বয়—হ্যালো—হ্যালো—হ্যালো—
লাইনটা কেটে গেল আবার৷ পৃথিবী থেকে আসা শেষ ভরসার কন্ঠস্বরটুকুও হারিয়ে গেল সেই শ্মশান-নৈঃশব্দ্যে৷
চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে...
ক-ঘণ্টা কাটল? চার ঘণ্টা? না, এক যুগ? না, না, এখানে তো সেকেন্ড মিনিট ঘণ্টা দিন কিছু নেই—আছে শুধু একটা সময়হীন অন্ধকার৷ সেই অন্ধকার নিঃশব্দে গ্রাস করছে গীর্বাণকে৷
হঠাৎ চমকে ওঠেন গীর্বাণ৷ না, না, শুধু শ্মশানের নিস্তব্ধতা থাকবে কেন? ওই তো বৃষ্টির শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে— হ্যাঁ বৃষ্টি পড়ছে কোথাও৷ পৃথিবীর এক কোণে তার বারাসতের বাড়ির পিছনে একটা জামরুল গাছে বড়ো বড়ো সবুজ পাতায় যেরকম টপটপ করে শ্রাবণের রাতে বৃষ্টি পড়ত—সেরকম শব্দ৷ ওই তো কে যেন মিষ্টি গলায় গান গাইছে না—মেঘ ছায়ে সজল বায়ে—
না, এবার সত্যিই তিনি পাগল হয়ে যাচ্ছেন৷ প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি খাটিয়ে ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন কাউচ ছেড়ে৷ জানলা দিয়ে দেখলেন সূর্য একদম চলে গেছে কুঁজ পাহাড়ের নীচে৷ বাঁ-দিকে যে সমতল ভূমি যার ওপাশে সেই মাইলের পর মাইল সমতল মাটি-যাকে বলা হয় Sea of rains. (হায়, যেখানে একবিন্দুও বৃষ্টি নেই সেখানে ভীষণ নির্মম রসিকতা করে এ নাম কে রেখেছিল কে জানে)৷ তার ওপর দিয়ে শব্দহীন কালো ছায়া গড়িয়ে চলেছে৷ আসছে—কালরাত্রি আসছে৷ কিন্তু এই ছায়ার মধ্য দিয়ে আর একটা ছায়ার মতো কে এগিয়ে আসছে? কে? ভুল দেখছে না তো সে!
না৷ ওই তো মাথার হেলমেটে সূর্যের শেষ আলো পড়ে ঝকঝক করছে৷ স্পেস স্যুট পরা৷ বয়েড, রবার্ট বয়েড! বেঁচে আছে তাহলে এখনও সে৷ কিন্তু রবার্ট বয়েড কি ওদের স্পেসক্রাফটটাকে দেখতে পায়নি৷ কেমন বাচ্চা ছেলের মতো থপথপ পায়ে এগোচ্ছে৷ আবার নিজের চারিদিকে কেমন একবার পাক খেয়ে নিচ্ছে৷ পাগল৷ সত্যি কি তাহলে পাগল হয়ে গেছে রবার্ট বয়েড? যাকে হত্যা করেছে সে তাকে খুঁজতে গিয়েই পাগল হয়ে গেল?
গীর্বাণ হঠাৎ আপ্রাণ চেঁচিয়ে উঠলেন৷ চেঁচিয়ে উঠেই বুঝলেন হ্যাঁ, পাগল হয়ে যাচ্ছেন তিনি, না হলে খামখা চেঁচিয়ে উঠছেন কেন? যেখানে বাতাস নেই সেখানে চেঁচালে কার কানে যাবে সে শব্দ? নিশ্চয়ই রেডিয়ো সিগন্যাল শোনার ব্যবস্থা আছে বয়েডের স্পেস স্যুটেও৷ না হলে রিচার্ড আর বয়েড তাদের স্পেসক্রাফটের বাইরে গিয়ে কী করে কথা বলেছিল পরস্পরের সঙ্গে? কিন্তু তাই বলে রেডিয়ো সিগন্যালের মাধ্যমে পাঠানো ওর শব্দ গেলে দু-জনের রেডিয়ো যন্ত্র তো একই দৈর্ঘ্যের রেডিয়ো তরঙ্গে 'টিউন' থাকা দরকার৷ কিন্তু শব্দের গতির জন্য মাধ্যমের প্রয়োজন, আলোর জন্য তো নয়৷ সোলার ব্যাটারিতে জ্বলা এক-শো পাওয়ারের টর্চ লাইটটা নিয়ে স্পেসক্রাফট থেকে নেমে পড়লেন গীর্বাণ৷ তারপর B অক্ষর তৈরি করে ক্রমাগত নাড়তে লাগলেন সেই আলোটা রেলের সিগন্যালম্যানরা যেভাবে আলো দেখায়৷ ওই তো দেখতে পেয়েছে বয়েড আলোটা৷ হ্যাঁ দেখছে৷ না হলে ওরকম থমকে দাঁড়িয়ে পড়ত না৷ তারপরই গীর্বাণ দেখলেন বয়েড পাগলের মতো ছুটে আসছে ওর দিকে দু-হাত তুলে৷ স্বচ্ছ মুখ ঢাকা তার হেলমেটের নীচে মনে হল আপ্রাণ শক্তিতে চেঁচিয়ে কী বলতে চাইছে সে৷ কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই গীর্বাণ তার কথা কিছু শুনতে পাচ্ছেন না শুধু মুখ নাড়াটাই দেখতে পাচ্ছেন৷ কত দিন এই ভয়ংকর নির্জনতায় বন্দি থাকার পর একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার প্রচণ্ড আবেগকে কিছুতেই ধরে রাখতে পারছে না সে৷ গীর্বাণ হাত বাড়িয়ে তাকে এরকম অনর্থক শক্তি ক্ষয় করতে নিষেধ করবে ভাবছেন৷ হঠাৎ দেখলেন কথা বলার প্রচণ্ড তাড়নায় বয়েড তার মুখের উপর থেকে হেলমেটের ঢাকনাটা খুলে ফেলার চেষ্টা করছেন—যেন হেলমেটটাই তাকে কথা বলতে বাধা দিচ্ছে৷ ভয়ে হিম হয়ে গেল গীর্বাণের বুক—এই হেলমেট খোলার পরিণতি কী, তা কি জানে না রবার্ট বয়েডের মতো একজন বিজ্ঞানী৷ সত্যি কি তাহলে সে পাগল হয়ে গেছে? নিজের অজান্তেই বয়েডকে সাবধান করতে ছুটে যান গীর্বাণ—আপ্রাণ চেঁচাতে থাকেন—না, না বয়েড, হেলমেট খুলো না৷ কিন্তু ততক্ষণে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার দুরন্ত আকাঙ্খায় হেলমেট খুলে ফেলেছে বয়েড৷
ঠিক কয়েক সেকেন্ড, খাড়া দাঁড়িয়ে রইল বয়েড, তারপর কাটা গাছের মতো আছাড় খেয়ে পড়ল মাটিতে৷ নিস্পন্দ প্রাণহীন দেহ৷ গীর্বাণ তাকিয়ে দেখলেন বয়েডের চামড়া ফেটে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে রক্ত৷ চাঁদের শুকনো উত্তপ্ত মাটি শুষে নিচ্ছে সেই রক্ত৷ এরকম হবে তা তো জানা কথাই৷ যত পাগলই হয়ে যাক বয়েডও নিশ্চয়ই তা জানত কিন্তু বহুদিন পর মানুষের সঙ্গে কথা বলার ভীষণ আবেগে ভুলে গিয়েছিল যে চাঁদে বাতাস নেই৷ মুহূর্তে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে গেছে তার৷ তা ছাড়া বাতাস না থাকার দরুণ কোনো 'চাপ'ও নেই৷ বয়েডের শরীরের ভিতরের ভীষণ চাপে তাই মুখের চামড়া ফেটে রক্ত বেরিয়ে এসেছে৷ ইংরেজিতে যাকে বলে রক্ত boil করা৷

হায় উচ্চাকাঙ্খী বিজ্ঞানী সমস্ত মানবজাতিকে ধ্বংস করার ভয়াবহ মারণাস্ত্র আবিষ্কার করার পরই তুমি জানতে পারলে মানুষ একা বাঁচতে পারে না, অন্য মানুষকে তার বড়ো দরকার৷ এই উপলব্ধির মূল্য দিতে হল তোমাকে তোমার জীবন দিয়ে৷
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে নিজের ট্যাক্সির দিকে এগোবেন, হঠাৎ দেখলেন একটা অদ্ভুত দৃশ্য—সাপের মতো সরু একটা নীল শিখা কোনো অদৃশ্য গর্তের ভিতর থেকে বেরিয়ে ছুটে যাচ্ছে বয়েডের প্রাণহীন দেহটার দিকে৷ মুহূর্তে বয়েডের শরীরটা ঢেকে গেল সেই জীবন্ত নীল শিখায়৷
সেই ভয়ংকর ব্যাকটিরিয়া যা শুধু সন্ধান করে বেড়ায় প্রোটিনের—তেজস্ক্রিয় শিখায় মুহূর্তে তাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে বলে৷
ওরা যেন এবার তাকেও ধরতে আসছে৷ ওরা আবার গন্ধ পেয়েছে প্রাণের৷
পাগলের মতো নিজের স্পেসক্রাফটের দিকে ছুটতে থাকেন গীর্বাণ৷
স্পেসক্রাফটের আশ্রয়ে তারপর যেন যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করতে থাকেন গীর্বাণ৷ এদিকে Sea of rains-এর সমভূমির উপর দিয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে সূর্যের শেষ আলো—ওদিক থেকে এগিয়ে আসতে থাকে পৃথিবীর হালকা নীল জ্যোৎস্না৷ মহারাত্রি নামে চাঁদে৷ কোথাও কোনও গতি নেই, স্পন্দন নেই, সময় নেই৷ শুধু দিগন্তের কাছে বলের মতো পৃথিবীটা যে আস্তে আস্তে ঘুরে যাচ্ছে সেদিকেই তাকিয়ে থাকেন গীর্বাণ—'এটুকু বুঝতে যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড একেবারে থেমে নেই৷ ওই গতির অনুভবটাই যদি তাকে এখন পাগল হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে৷
কালো আকাশে ঝকঝক করছে তারা৷ তার মধ্যে ওই লাল তারাটাই হল মঙ্গলগ্রহ৷ আগেকার মানুষেরা বলত 'লোমশ নক্ষত্র'৷ অমঙ্গলের প্রতীক ছিল ওই তারা৷
এক যুগই বোধ হয় পেরিয়ে গিয়েছিল৷ তারপরই সেই চৌম্বক ঝড় পেরিয়ে পৃথিবী থেকে নির্দেশ আসে Lift off অর্থাৎ যাত্রা শুরু করো৷ তখনও কিছু বোধশক্তি বোধ হয় অবশিষ্ট ছিল তার, না হলে সুইচ টিপে কী করে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন রকেটের জ্বালানিতে৷
হু-হু করে প্রচন্ড বিস্ফোরণে চাঁদের মাটি ছাড়িয়ে পৃথিবীর দিকে উঠে যাচ্ছে রকেট৷ চুপ করে ভাবছিলেন গীর্বাণ৷ হিকোহিতা বলেছিলেন তার জীবন পালটে যাবে৷ হ্যাঁ সত্যি৷ পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে এবার তিনি সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষের মতো বাঁচবেন৷ চল্লিশ বছর বয়েস হল তার কিন্তু কখনো কি এর আগে জানতে পেরেছিলেন যে, পৃথিবী এত সুন্দর, প্রাণ এত মূল্যবান, বেঁচে থাকা এত রোমাঞ্চকর৷ এরপর যতদিন বাঁচবেন তিনি এই উপলব্ধি নিয়েই বাঁচবেন৷ ক্যাসেটে সেই গানটা বেজে চলেছে—'চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো'—কতদিনের প্রিয় গান তার, যিনি লিখেছিলেন তিনি জানতেন চাঁদে প্রাণ নেই, সেখানে কেউ হাসে না, তবুও তিনি সব কিছুকেই প্রাণের রঙে রাঙিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন৷
পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে কৃষ্ণচূড়া পাতার ফাঁকে আবার যখন দেখবেন এই চাঁদ তখন এই সত্য যেন তিনি আর না ভোলেন৷ অপস্রিয়মান চাঁদের মাটির দিকে চোখ রেখে মনে মনে বলেন গীর্বাণ—তোমার মাটিতে কিছু মৃত্যু রেখে গেলাম চাঁদ, কিন্তু তুমি তা ভুলে যেয়ো৷ যুগ যুগ ধরে যেমন পৃথিবীর শিশুদের কাছে হেসে এসেছ তুমি, তেমনি হেসে যেয়ো৷ বাঁধ ভেঙে তোমার হাসি ছড়িয়ে পড়ুক তাদের স্বপ্নে—হে মৃত চাঁদ, হে মৃত্যুহীন বিদায়—৷
____
* doughnut রবার টিউবের মতো আকার বিশিষ্ট ময়দার তৈরি একপ্রকার খাদ্য।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন