দীপান্বিতা রায়

অফিসে নিজের ঘরে ঢুকে চেয়ারে রিল্যাক্স করে বসল শ্রীময়ী। হ্যান্ডব্যাগটা টেবিলের ডানদিকের চওড়া ড্রয়ারের ভিতর রাখা। টানাটা পুরো বন্ধ না করে, হ্যান্ডেলদুটো বাইরে বার করে রেখেছে রঘু। ওরকম ভাবেই রাখে। আসলে হ্যান্ডব্যাগে ছোটখাটো বহু দরকারি জিনিস বিশেষ করে দু-তিন রকম মিন্ট রাখা শ্রীময়ীর অভ্যাস। কিন্তু বারবার ড্রয়ার থেকে ব্যাগ বার করা, খোলা আবার ঢোকানো পোষায় না। চেন খোলা অবস্থায় ব্যাগটা তাই আধখানা টানা ড্রয়ারে রাখা থাকে। প্রয়োজনমতো হাত ঢুকিয়ে কাজের জিনিসটি টুক করে বার করে নেওয়া যায়।
দরকারি ফাইলগুলোও গাড়ি থেকে নামিয়ে টেবিলের বাঁদিকে গুছিয়ে রেখেছে রঘু। এসব কাজে ওর ভুল হয় না কখনও। ভুল হলে অবশ্য লেদার গুডসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর শ্রীময়ী সেনের খাস বেয়ারা হিসেবে দশ বছর চাকরি করতে পারত না।
আনপ্রফেশনাল, এলোমেলো কাজ শ্রীময়ীর অত্যন্ত অপছন্দের। এই যেমন তার ঘরটা এখন বেশ হিমহিম ঠান্ডা। তাপমাত্রা মোটামুটি ১৬ ডিগ্রির কাছাকাছি। রঘু জানে তার ম্যাডাম একটু বেশি ঠান্ডা ঘরে থাকা পছন্দ করেন। কিন্তু শ্রীময়ী অফিসে পৌঁছানোর পর যদি এসি মেশিনটা চালু করে, তাহলে ঠান্ডা হতে সময় লাগবে। তাই ম্যাডামের বাড়ির দারোয়ানের সঙ্গে সে একটা গোপন বোঝাপড়া করে নিয়েছে। শ্রীময়ীর গাড়ি তাদের নিউ-আলিপুরের বাড়ি থেকে বেরোলেই, তেজবাহাদুর ফোন করে দেয় রঘুকে। নিউ আলিপুর থেকে আনন্দ পালিত রোডের অফিস। মোটামুটি আধঘণ্টা তো বাঁধা। ততক্ষণে ঘরের আবহাওয়া হিমশীতল হয়ে শ্রীময়ীর পছন্দমতো হয়ে যায়। এই খবরটা পাওয়ার পর সেবছর রঘুর ইনক্রিমেন্ট বেশি দিয়েছিল শ্রীময়ী।
ধোঁয়া ওঠা কফির কাপটা শ্রীময়ীর টেবিলে রেখে একটু দাঁড়াল রঘু। যদি ম্যাডাম আর কিছু হুকুম করেন। কিন্তু শ্রীময়ী চোখের ইশারায় রঘুকে চলে যেতে বলে কাপে চুমুক দিল। ভিয়েতনামি কফির সুগন্ধ ধীরে ধীরে মস্তিস্কের মধ্যে প্রবেশ করে স্নায়ুগুলোকে সতেজ করে দিচ্ছে। কফিতে চিনি খায় না সে। জিভে কফি বিনসের হালকা তিতকুটে স্বাদ উপভোগ করতে করতে নিজের চিন্তাগুলোকে গুছিয়ে নিচ্ছিল শ্রীময়ী।
এটা তার স্বাভাবিক অভ্যাস নয়। সাধারণত অফিসে ঢুকেই কাজের মধ্যে ডুবে যায় সে। চারপাশ থেকে ব্যস্ততা ঝাঁপিয়ে আসে। কিন্তু আজকের দিনটা অন্যরকম। গত পনেরো দিন একটা সাংঘাতিক ডামাডোল গেছে। অফিসের কথা ভাবারই সময় পায়নি শ্রীময়ী। তাই আজ নিজস্ব রুটিনে ফিরতে একটু সময় লাগছে।
মাসের দ্বিতীয় বুধবার ছিল। কারখানার ডিপার্টমেন্টাল হেডদের সঙ্গে মার্কেটিং-এর মিটিং-এর দিন। কোন প্রডাক্ট কী অবস্থায় রয়েছে, কোনটা কখন বাজারে যাবে, এক্সপোর্টে যাওয়ার মাল রেডি হয়েছে কিনা...এইসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা। প্রত্যেকের রিপোর্ট খুঁটিয়ে দেখে শ্রীময়ী। অনেকসময় দু-পক্ষের মধ্যে উত্তেজিত তর্কাতর্কিও হয়। সেসবও ঠান্ডা মাথায় সামলাতে হয়।
সেদিন মিটিংটা একটু লম্বাই হয়েছিল। বিদেশ থেকে একটা অর্ডার এসেছে। লেদার গুডসের ব্যাগের দেশে-বিদেশে খুব সুনাম। প্রায় দু'হাজার ব্যাগ সাপ্লাই যাবে ডেনমার্কে। কিন্তু পার্টি যে তারিখের মধ্যে মাল চাইছে, কারখানার অফিসারদের মতে ওই সময়ে ব্যাগ সাপ্লাই দেওয়া যাবে না। কারণ তাহলে চামড়া ঠিকঠাক প্রসেসিং হবে না। জিনিস খারাপ হলে কোম্পানির নাম খারাপ হবে। এদিকে মার্কেটিং-এর বক্তব্য হল, এতবড় অর্ডার ছেড়ে দেওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। দু-পক্ষেরই যুক্তি আছে।
শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ আলোচনার পর শ্রীময়ী নিজে কথা বলল, ডেনমার্কের কোম্পানির তরফে যিনি যোগাযোগ করেছেন তাঁর সঙ্গে। সমস্যাটা তাঁকে বুঝিয়ে আরও দিন পনেরো সময় চেয়ে নেওয়ায় দু-পক্ষকেই সন্তুষ্ট করা গেল। মিটিং যখন শেষ হল ঘড়িতে রাত প্রায় সাড়ে ন'টা। বাড়ি ফিরে অভ্যাসমতো মায়ের ঘরেই প্রথমে গেছিল শ্রীময়ী। অফিস থেকে ফিরে দেখা না করে নিজের ঘরে চলে গেলে বিরক্ত হন মা।
অপরাজিতা তখন খেতে বসেছেন। আজকাল আর রাতে ডাইনিংরুমে খেতে যান না। খাবার বলতে নামমাত্র। স্যুপ আর তার সঙ্গে খুব পাতলা চিজ বিস্কিট কিংবা একবাটি গাজর-আলু-বিনসব্রকোলির সঙ্গে অল্প চিকেন দেওয়া পাতলা ঝোল। তবে মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাসটা ছাড়তে পারেননি। একটা কম মিষ্টির সন্দেশ থাকেই। খাটের পাশেই ফোল্ডিং টেবিলটা এনে খাবার সাজিয়ে দিয়েছে অনিতা।
শ্রীময়ী ঘরে ঢুকতেই অপরাজিতা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার রাই তোমার এত দেরি হল যে?
মাথাটা মুহূর্তে গরম হয়ে গেছিল শ্রীময়ীর। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, আজ বুধবার, মান্থলি মিটিং ছিল। একটা প্রবলেম হয়েছে, সেটা সলভ করতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল।
তাহলে মিটিংটা আরও আগে ডাকবে। রাত দশটার সময় বাড়ি ফেরাটা কোনও কাজের কথা নয়। তাছাড়া আমি তোমাকে বলেছিলাম যে তোমার সঙ্গে কিছু জিনিস ডিসকাস করতে হবে।
ঠিক আছে করো। আমি বসছি। তুমি খাওয়া শেষ করে নাও। তারপর তোমার সঙ্গে কথা বলে ঘরে যাব।
কণ্ঠস্বরে বিরক্তি গোপন ছিল না শ্রীময়ীর। কারণ সে ভালো করেই জানে, মায়ের দরকারি কথা যে সবসময়ই দরকারি হবে তার কোনও মানে নেই।
কিন্তু অপরাজিতা নিজের জায়গা থেকে নড়ার পাত্রী নন। তাই ঘনঘন মাথা নেড়ে বললেন, না না, ওভাবে তাড়াহুড়ো করে কোনও জরুরি কথা বলা যায় না। আমি বকে যাব আর তুমি উল্টোদিকে বসে ভাববে কতক্ষণে ঘরে গিয়ে জামা পাল্টে স্নানে ঢুকবে তা হয় না। আমার কথা শুনতে হলে ওরকম পিছটান থাকলে চলবে না। তাছাড়া আমার ঘুমের সময়ও হয়ে এসেছে। তুমি এখন যাও। সকালে যদি সময় পাও তো আসবে, তখন বলব।
মেয়ের যুক্তি বিস্তারের চেষ্টাকে প্রায় নস্যাৎ করে দিয়ে স্যুপের বাটিতে মন দিলেন অপরাজিতা। এরপর কথা বাড়ানো বৃথা। তাই নিজের ঘরে চলে আসে শ্রীময়ী। সমরেশ ফিরেছে খানিকক্ষণ আগেই। বেডরুমে বসেই ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছে। তিথি লিভিং রুমের সোফায় আধশোয়া হয়ে ফোনে মগ্ন।
জামা-কাপড় বদলে সবে স্নানে ঢুকেছে শ্রীময়ী এমন সময় চেঁচামেচি শোনা গেল। বাথরুমের দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে অনিতা,
দিদি শীগগির এসো, দ্যাখো দিদা কেমন করছে!...
কোনওরকমে ভিজে গায়েই বাথরোবটা জড়িয়ে বেরিয়ে এসেছিল শ্রীময়ী। ততক্ষণে সমরেশ, তিথি দু'জনেই চলে গেছে মায়ের ঘরে।
খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর বাথরুমে হাত ধুতে যাচ্ছিলেন অপরাজিতা। বয়স সত্তর ছাড়ালেও হাঁটা-চলা করতে কোনওই অসুবিধা নেই। এখনও সকালে নিয়মিত মর্নিং ওয়াকে যান। অনিতা যদিও সঙ্গে যায়, কিন্তু সেটা অপরাজিতা খুব একটা যে পছন্দ করেন তা নয়। কিন্তু সেদিন খাট থেকে নেমে পা-টা নাকি একটু টলে গেছিল। পালঙ্কের ছত্রিটা ধরে সামলে নেন নিজেকে। অনিতা ব্যাপারটা খেয়াল করলেও এগিয়ে গিয়ে ধরেনি, কারণ তাহলে ধমক খেতে হবে। ও থালা-বাসনগুলো তোলার জন্য টেবিলের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল।
পুরোনো আমলের মস্ত ঘর। খাট থেকে নেমে বাথরুমের দরজা পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি অপরাজিতা। তার আগেই কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে বসে পড়েন। তারপর শুয়ে পড়েন। তাই দেখে হাঁউমাউ করে চেঁচিয়ে ওঠে অনিতা।
সবাই মিলে ধরাধরি করে অতিকষ্টে খাটে তোলা হল অপরাজিতাকে। জ্ঞান নেই তখন। অ্যাম্বুলেন্সে খবর দেওয়া হল। আধঘণ্টার মধ্যে দামি হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে নিয়ে গিয়ে শিরায় ছুঁচ বিঁধিয়ে শুরু হল চিকিৎসা। কিন্তু জ্ঞান আর ফিরল না। তিনদিন ওই অবস্থায় থেকে চলে গেলেন অপরাজিতা।
মা সেদিন কী জরুরি কথা বলতে চেয়েছিলেন সেটা আর জানা হল না শ্রীময়ীর।
তবে মহিলা শিল্পপতি অপরাজিতা দাশগুপ্তের মৃত্যু তো আর নিঃশব্দে হতে পারে না। তাই খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্রই বাড়িতে সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে বহু বিশিষ্টজনের আনাগোনা শুরু হয়ে গেল। শ্রীময়ীকেই সামলাতে হচ্ছিল সেসব। সমরেশ ব্যস্ত ছিল শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করতে। তারপর তো শ্রাদ্ধের বিশাল আয়োজন, খাবার, ফুল, ডেকরেশন, নিমন্ত্রণ সব মিলিয়ে ব্যস্ততার যেন কোনও শেষ নেই। কাজ করার লোক অনেক কিন্তু আয়োজনও তো বিশাল। আর অত লোককে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করাটাও তো একটা সাংঘাতিক ব্যাপার।
তবে সবকিছুই মিটেছে ঠিকঠাক। শ্রীময়ীর ব্যবস্থাপনার প্রশংসাই করেছেন সকলে। আসলে এতদিন তো বাড়িতে যাই-ই হোক না কেন সর্বময় কর্তৃত্ব সবসময়ই মায়ের হাতেই থাকত। শ্রীময়ী কিংবা সমরেশ ছিল বলা যেতে পারে একটু উঁচুদরের হুকুম বরদার। এই প্রথম নিজে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা।
সত্যি কথা বলতে কি মাঝে-মাঝে একটু বাধো বাধো ঠেকছিলও শ্রীময়ীর। মায়ের হুকুমে কাজ করাটাই তো অভ্যাস। অথচ অফিস কিন্তু শ্রীময়ী নিজের মতেই চালায়। সিদ্ধান্তও নেয় নিজের বিবেচনায়। অপরাজিতা যে খোঁজখবর রাখতেন না তা নয়। তবে মেয়ের সঙ্গে মতে না মিললে বাধা দিতেন না।
কিন্তু সংসারের ক্ষেত্রে তাঁর মতই ছিল চূড়ান্ত। সেটা যে শুধু এখন তা নয়। যখন শ্রীময়ীর বাবা বেঁচে ছিলেন, তখনও কর্তৃত্ব ছিল অপরাজিতার হাতেই। নানা বিষয়ে স্বামীর সঙ্গে অশান্তিও কিছু কম হত না। কিন্তু নিজের জায়গায় থেকে সাধারণত সরানো যেত না অপরাজিতাকে। বিশেষ করে শ্রীময়ীর ক্ষেত্রে অন্য কারুর কোনও মতই তিনি শুনতেন না। শ্রীময়ী যে শুধু তার মায়ের নয়, বাবারও সন্তান এটা যেন অপরাজিতা মানতেনই না।
পরিতোষ দাশগুপ্ত যথেষ্ট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। কিন্তু মেয়েকে নিয়ে স্ত্রী প্রায় হিস্টেরিক হয়ে যাচ্ছে দেখে শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে শ্রীময়ীর ব্যাপারে কোনও মতামত দেওয়া বন্ধ করে দেন। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটা শীতল দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। শ্রীময়ীর ধারণা সেটা ভাঙতে দু'জনের কেউই খুব একটা আগ্রহীও ছিলেন না। বাইরে থেকে অবশ্য বিশেষ কিছু বোঝা যেত না। স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনের ছবিটা যে আসলে ধোঁকার টাটি সেটা জানত শুধু একমাত্র সন্তানরাই।
বাবার ক্যানসার হয়েছিল। চিকিৎসা, সেবা-যত্ন কোনও কিছুর এতটুকু ত্রুটি হয়নি। কিন্তু কিছু করার ছিল না। পরিতোষ যখন মারা গেলেন, শ্রীময়ী তখন সতেরো। মায়ের ভয়ঙ্কর শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনও উপায় ছিল না। কিন্তু অভিমান করে কাঁদার একটা জায়গা তো ছিল। বাবা মারা যাওয়ায় তাই বড্ড একা হয়ে গেছিল সে। অনেকদিন পর্যন্ত রাতে বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদত বাবার জন্য। কিন্তু মায়ের মৃত্যু কি সেভাবে নাড়া দিল তাকে? নাকি মনের গোপনে কোথাও একটা মুক্তির অনুভূতি কাজ করছে?
কফিতে চুমুক দিতে দিতেই ল্যাপটপটা খুলেছিল শ্রীময়ী। কোন কাজটা কী অবস্থায় রয়েছে একবার ঝালিয়ে নেওয়া দরকার। তিনদিন আগে মায়ের কাজ মিটেছে। বাড়িটা মোটামুটি গুছিয়ে নিয়ে আজ অফিস এসেছে। তবে এখনও বড্ড ক্লান্ত। একটু তাড়াতাড়ি চলে যেতে পারলে ভালো হয়। কার কার সঙ্গে আজকেই মিটিং করাটা জরুরি সেটাও একটু দেখে নিতে হবে।
ল্যাপটপে নিজের প্ল্যানারটার ওপরে চোখ বোলাতে বোলাতে টেবিলের পাশের বোতামটা টিপল শ্রীময়ী। আধ মিনিটের মধ্যেই দরজা খুলে মুখ বাড়ালো তার সেক্রেটারি সুপ্রিয়। বেশ কাজের ছেলে।
অফিস মেইলটা চেক করে যেগুলো দরকার আমাকে পাঠিয়ে দাও। আর চিঠিপত্র যদি কিছু এসে থাকে তো সেগুলোও দাও।
অফিসের মেইল বক্সে প্রতিদিনই গাদাখানেক মেইল জমা হয়। সুপ্রিয়র কাজ হল প্রাথমিকভাবে তার একটা ঝাড়াই-বাছাই করে শ্রীময়ীকে পাঠিয়ে দেওয়া। এছাড়া চিঠিও আসে নানারকম। সেগুলোও খুলে প্রথমে পড়ে সুপ্রিয়। তারপর শ্রীময়ীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়াই নিয়ম।
মেইলগুলো আমি একটু আগেই ফরোয়ার্ড করে দিয়েছি ম্যাডাম। আপনি একবার চেক করে নিন। চিঠিগুলো নিয়ে আসছি।
ল্যাপটপ খুলে মেইল চেক করতে করতেই সুপ্রিয় ফের এল চিঠির দুটো বান্ডিল নিয়ে। একটা বান্ডিল শ্রীময়ীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞাসা করল, ম্যাডাম, অপরাজিতা দাশগুপ্তের চিঠিগুলোও আপনাকে দিয়ে যাব তো?
প্রশ্নটা শুনে সামান্য একটু চমকাল শ্রীময়ী। প্রায় সাত-আট বছর হয়ে গেল মেয়েকে বসিয়ে লেদার গুডসের ডিরেক্টরের পদ থেকে সরে গেছিলেন অপরাজিতা। বোর্ড অফ ডিরেক্টরসে অবশ্য ছিলেন। তবে সেটা শুধু নামেই। খুব জরুরি মিটিং না হলে সাধারণত আসতেন না। কিন্তু এখনও অপরাজিতা দাশগুপ্তের নামে লেদার গুডসের ঠিকানায় নানারকম চিঠিপত্র আসে।
এতদিন নিয়ম ছিল চিঠি এলে সেগুলো বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। মা নিজে খুলে দেখবেন। যেটা প্রয়োজন মনে করবেন সেটা শ্রীময়ীকে দিয়ে দেবেন। কিন্তু মায়ের চিঠি অন্য কেউ খুলবে না। আসলে অপরাজিতা সবসময় নিজের ব্যক্তিগত পরিসরের চারপাশে একটা গণ্ডি টেনে রাখতে পছন্দ করতেন। তার ভিতরে কারুর প্রবেশাধিকার নেই। হুটহাট করে তাঁর বেডরুমে ঢোকার কারুর অনুমতি ছিল না। মায়ের আলমারি খুলে নিজের পছন্দমতো শাড়ি বের করে নেওয়ার কথা শ্রীময়ী কখনও ভাবতেই পারেনি।
মায়ের শাড়ির সংগ্রহ ছিল দেখবার মতো। কলেজের শুরুর দিকে দু-একবার মায়ের কাছে শাড়ি চেয়েওছে শ্রীময়ী। কিন্তু মা যেটি পছন্দ করে বার করে দেবে সেটিই পরতে হবে। নিজের খুশিমতো বেছে নেওয়া যাবে না। এরকম তিক্ত অভিজ্ঞতার পর আর এগোয়নি ও। কিন্তু এখন তো অপরাজিতা এসবের ঊর্ধ্বে। সুপ্রিয়কে চিঠিগুলো রেখে যেতে বলে শ্রীময়ী।
এই লেদার গুডস কোম্পানিটা ছিল করুণাময় সেনগুপ্তের। ব্যবসার শুরু হয় করুণাময়ের বাবা সুধাবিন্দুর হাত ধরে। তবে তিনি মূলত বিভিন্ন জায়গা থেকে চামড়ার জিনিস কিনে সেগুলো বিক্রি করতেন। তাঁরই ইচ্ছেতে করুণাময় লেদার টেকনোলজি নিয়ে পড়াশোনা করেন।
সুধাবিন্দু অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন ঠিকই কিন্তু দ্রুত উন্নতি করেন। করুণাময় যখন কলেজে পড়ছেন তখনই টাকা জমিয়ে একটা পুরোনো চামড়ার কারখানা কিনে ফেলেন সুধাবিন্দু। করুণাময় পাশ করে বেরোনোর পর বাপ-ছেলেতে মিলে কোমর বেঁধে ব্যবসায় নেমে পড়েন। পার্ক সার্কাসের কাছে পুরোনো কারখানাটিতে নতুন মেশিনপত্র বসিয়ে ঢেলে সাজানো হয়। নাম দেওয়া হয় লেদার গুডস প্রাইভেট লিমিটেড। করুণাময় একবছরের জন্য বিদেশে গিয়ে কিছু ট্রেনিংও নিয়ে আসেন। অল্পদিনের মধ্যেই লেদার গুডসে উন্নত মানের আধুনিক জিনিসপত্র তৈরি হতে থাকে।
করুণাময় বিদেশে গিয়ে শুধু ট্রেনিং কিংবা পড়াশোনা নয়, ব্যবসায়িক কিছু যোগাযোগও তৈরি করে এসেছিলেন। সেগুলিকে কাজে লাগিয়ে শুরু হয় বিদেশে এক্সপোর্টের কাজ। চামড়া তৈরির ক্ষেত্রে কোনওরকম জল মেশানোর ঘোরতর বিরোধী ছিলেন সুধাবিন্দু। আর বিদেশি ক্যাটালগ দেখে নিত্য-নতুন ডিজাইন বেছে নেওয়া, প্রডাক্টের ফিনিশিং যাতে আন্তর্জাতিক মানের হয় সেদিকে নজর রাখা ছিল করুণাময়ের দায়িত্ব।
ব্যবসা দিনে দিনে ফুলে-ফেঁপে উঠছিল। লেদার গুডসের সুনামও ছড়িয়ে পড়ছিল খুব দ্রুত। দেশের বহু বড় সংস্থা তাদের জিনিস কিনত। বিদেশেও রপ্তানি হত ভালোরকম। সুধাবিন্দু বেঁচে থাকতেই মল্লিক বাজারে আলাদা অফিসঘর নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং কর্মচারীর সংখ্যা বাড়ায় বছর পনেরো আগে আনন্দ পালিতে বড় জায়গা নিয়ে অফিস চালু হয়। পরে সরকারি নিয়ম মেনে কারখানাও পার্ক সার্কাস থেকে বানতলায় গেল। সেখানে সবমিলিয়ে প্রায় চারশো লোক কাজ করে। আনন্দ পালিতে দুটো ফ্লোর নিয়ে অফিস। সেখানেও প্রায় একশো কর্মচারী আছে।
করুণাময়ের বরাবর নজর ছিল বিদেশের বাজারের দিকে। তিনি জানতেন ইউরোপের বাজারে চামড়ার জিনিসের কদর ঠিক কতটা। কিন্তু লেবার কস্ট বেশি হওয়ায় ওদের দেশে চামড়ার যে প্রডাক্ট তৈরি হয় তার দামও সাংঘাতিক। কলকাতায় শ্রম সস্তা। তাই জিনিসও তৈরি হবে অনেক কম দামে। সেক্ষেত্রে মান ঠিক থাকলে বিদেশের বাজার তাঁর তৈরি জিনিস লুফে নেবে।
তবে দূরদর্শী করুণাময় কখনও লাভের সবটুকু গুড় একলা খাওয়ার চেষ্টা করেননি। হাতে-কলমে যারা কাজ করছে, তারা খুশি না থাকলে যে প্রডাক্টের মান ঠিক রাখা সম্ভব নয় সেকথাও তিনি বিলক্ষণ বুঝতেন। তাই বাইরের নানা রকম চেষ্টা সত্ত্বেও লেদার গুডসে কখনও শ্রমিক অসন্তোষের সমস্যা দেখা যায়নি।
অপরাজিতা করুণাময়ের একমাত্র সন্তান। প্রেসিডেন্সির ইকনমিকসের ছাত্রী। পরে ম্যানেজমেন্টও করেন। বাবার কাছেই কাজ শিখেছিলেন অপরাজিতা। করুণাময়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দায়িত্বও বেড়েছিল। তারপর একসময় তিনিই লেদার গুডসের সর্বময় কর্ত্রী হলেন।
ব্যবসায়ী পরিবারে সঙ্গে সাধারণত ব্যবসায়ী পরিবারেরই পারিবারিক বন্ধন তৈরি হয়। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। পরিতোষদেরও পারিবারিক ব্যবসা। দুই ছেলেকে দুটি ব্যবসার দায়িত্ব দিয়েছিলেন শ্রীময়ীর দাদু। ফিনান্স কোম্পানিটি পড়েছিল পরিতোষের ভাগে। বড় ব্যবসা। সামলাতেনও যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে।
কিন্তু পরিতোষ হঠাৎ মারা গেলেন। সবাই ভেবেছিল কোম্পানি এবার লাটে উঠবে। কিন্তু অপরাজিতা সেটা হতে দিতে রাজি ছিলেন না মোটেই। পরিতোষের আমলের দক্ষ এবং বিশ্বস্ত কর্মী সুবোধ মজুমদারকে দায়িত্ব দিলেন। তবে নিজে নজর রাখতেন সবসময়। প্রায় দশ বছর ফিনেস ইন্টারন্যাশনাল চলেছে এভাবেই। শ্রীময়ীর বিয়ের পর অপরাজিতার নির্দেশেই সমরেশ একটু একটু করে ফিনেসের কাজ বুঝে নিয়েছে। সুবোধবাবু তখনও ক্ষমতায়। তিনিই কাজ শিখিয়েছেন সমরেশকে। সুবোধবাবু অবসর নেওয়ার পর দায়িত্ব এসেছে সমরেশের কাঁধে। তবে এখনও কোম্পানিতে তেমন কোনও সংকট হলে সুবোধ মজুমদারের শরণাপন্ন হয় সমরেশ। ফিনেসের বোর্ড অফ ডিরেক্টরসে অপরাজিতা যেমন ছিলেন তেমনি সুবোধ মজুমদারও আছেন।
ফিনেসের বোর্ডে অবশ্য শ্রীময়ীও আছে। কোম্পানির মালিকানা তাদের দু'জনের নামে। স্বামীর কোম্পানির মালিকানা মেয়ে-জামাইকে ভাগ করে দিয়েছেন অপরাজিতা। যদিও কাজকর্ম সবটাই সমরেশ দেখে। লেদার গুডসের মালিক কিন্তু শুধুই শ্রীময়ী। সেখানে সমরেশের কোনও অংশীদারি নেই।
সুপ্রিয় চিঠিগুলো রেখে গেছে টেবিলে। নিজেরগুলো দেখে নিয়ে মায়ের চিঠিগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিল শ্রীময়ী। বেশিরভাগই বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপনের কাগজ। আজকাল এগুলো মেইলেই আসে। অপরাজিতা মেইল ব্যবহার করতেন না বলে কোম্পানির তরফ থেকে তাঁকে চিঠি পাঠানো হয়।
হঠাৎ একটা খামে চোখ আটকে গেল শ্রীময়ীর। এএনসি ব্যাঙ্কের খাম। এই ব্যাঙ্কের সঙ্গে লেদার গুডস কিংবা ফিনেস, কারুরই কোনও লেনা-দেনা নেই। শ্রীময়ীদের কারুর এই ব্যাঙ্কে কোনও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টও নেই। তাই খানিকটা কৌতূহলবশতই চিঠিটা খোলে শ্রীময়ী এবং খুলে রীতিমতো চমকে ওঠে।
ব্যাঙ্কের চিঠির বয়ান থেকে যেটা বোঝা যাচ্ছে, প্রায় তিরিশ বছর আগে অপরাজিতা দাশগুপ্ত নিজের নামে ওই ব্যাঙ্কে দশ লক্ষ টাকার একটি ফিক্সডডিপোজিট করেন। সেই ফিক্সডডিপোজিটের নমিনি কোনও এক গুড়িয়া। ফিক্সড ডিপোজিট যখন করা হয়, তখন মেয়েটি মাইনর ছিল, অপরাজিতা ছিলেন তার গার্জিয়ান। কিন্তু ব্যাঙ্ক জানাচ্ছে যে জন্মতারিখের হিসেব অনুযায়ী গুড়িয়া প্রায় বারো বছর হয়ে গেল মেজর হয়ে গেছেন। তাই অপরাজিতা নমিনি ট্রান্সফার করবেন কিনা সেটা ব্যাঙ্কের জানা দরকার। ব্যাঙ্কের তরফ থেকে এর আগেও যে বেশ কয়েকবার রিমাইন্ডার দেওয়া হয়েছে, সেকথাও স্পষ্ট লেখা রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, চিঠির তারিখটা প্রায় বছর দুয়েক আগের।
শ্রীময়ী খাম উল্টে ঠিকানা দেখে বুঝতে পারল, চিঠিটা এসেছিল তাদের মল্লিকবাজারের পুরোনো অফিসের ঠিকানায়। তারপর রিডাইরেক্ট হয়ে আরও নানা হাত ঘুরে শেষপর্যন্ত এখানে এসে পৌঁছেছে।
মল্লিকবাজারে সুধাবিন্দুর অফিস ছিল ভাড়া বাড়িতে। বাড়ি ছাড়ার সময় বাড়িওলার সঙ্গে বিভিন্ন কারণে গন্ডগোল চলছিল। তাই অফিস যখন শিফট করা হল তখন পুরোনো ঠিকানায় কোনও চিঠিপত্র এলে বাড়িওলা সেগুলি গাপ করে দিয়ে লেদার গুডসকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করতেন। সেই কারণেই তখন কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে এবং আরও নানাভাবে লেদার গুডসের নতুন ঠিকানা যাতে সবাই জানতে পারে সেই চেষ্টা করা হয়েছিল।
বোঝাই যাচ্ছে, এএনসি ব্যাঙ্কের কর্মকর্তাদের সেইসব বিজ্ঞাপন মোটেই চোখে পড়েনি। ফলে তাঁরা পুরোনো ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই চিঠি অপরাজিতা দাশগুপ্তের হাতে পৌঁছায়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িওলা ভদ্রলোকের প্রতিহিংসা স্পৃহা হয়তো কমে এসেছে। সম্ভবত সেই কারণেই এবার এই চিঠিটি আনন্দ পালিত পর্যন্ত আসতে পেরেছে।
কিন্তু অপরাজিতা নিজে কেন এবিষয়ে ব্যাঙ্কে খোঁজ নেননি? যে কোনও সফল ব্যবসায়ীর মতোই টাকা-পয়সার ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট সতর্ক থাকতেন। ব্যাঙ্কের নিয়ম-কানুনও খুব ভালোমতো জানা ছিল। অপরাজিতা কী কথাটা ভুলে গেছিলেন? সেটা হয়তো খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ এই গুড়িয়ার জন্মতারিখ থেকে বোঝা যাচ্ছে, তার যখন মাত্র একমাস বয়স, তখনই মা টাকাটা ফিক্সড করেছেন। তারপর তো তার মেজর হতে দীর্ঘ আঠারো বছর সময় লেগেছে। এই হিসেবটা সম্ভবত মা মনে রাখতে পারেননি। ব্যাঙ্কের তরফ থেকে সময়মতো রিমাইন্ডার পেলে হয়তো মনে পড়ত, কিন্তু তাও তো হয়নি।
চিঠিটা আরও কয়েকবার ভালো করে পড়ে শ্রীময়ী। তিরিশ বছর আগে দশ লক্ষ টাকা ফিক্সড করেছেন মা। সে সময় কলকাতা শহরে দশলক্ষ টাকায় একটা ভালো মাপের ফ্ল্যাট পাওয়া যেত। এতগুলো টাকার নমিনি যাকে করা হয়েছে সেই গুড়িয়াটি কে? এরকম নামে তাদের কোনও আত্মীয়-স্বজন কিংবা চেনা-পরিচিত কাউকে তো মনে করতে পারছে না। তার পদবিই বা উল্লেখ করা হয়নি কেন?
দশলক্ষ টাকা তো এতদিনে সুদে-আসলে বেড়ে অনেকটাই হওয়া উচিত। নমিনি যদি অন্য কেউ থাকে, আর মা যদি এব্যাপারে কিছু ইনস্ট্রাকশন না দিয়ে থাকে, তাহলে তো পুরোটাই হাতছাড়া হবে। লিগাল এয়ার হিসাবে অপরাজিতা দাশগুপ্তের যাবতীয় সম্পত্তিরই হকদার শ্রীময়ী। কিন্তু এক্ষেত্রে টাকাটা সে পাবে না। শ্রীময়ী ঠিক করে অ্যাকাউন্টটার বিষয়ে ব্যাঙ্কে গিয়ে কথা বলবে। তবে তার আগে মায়ের আলমারিটা খুঁজে দেখতে হবে। এই গুড়িয়ার কোনওরকম ডকুমেন্টসের হদিস পাওয়া যায় কিনা।

অক্টোবর শুরু হতে না হতেই এই জায়গাগুলোয় ঠান্ডা পড়তে শুরু করে। তারপর দিন যত ছোট হয় আকাশ ততই ঝকঝকে পরিষ্কার। অনেক দূরের নীল-সবুজ ঢেউ খেলানো পাহাড়ের ওপাশে মাঝে মাঝে মুক্তোর সারি ঝিকমিক করে ওঠে। ঝকঝকে সবুজ পাইন গাছের বনের ভিতর দিয়ে সরসর করে হাওয়া খেলে যায়। ক্রমশ বাড়তে থাকে হাওয়ার ধার।
তবে তার এখনও দেরি আছে। এবার অক্টোবরের গোড়াতেই পুজো ছিল। কালীপুজো, দেওয়ালি পেরিয়ে এখন সব শান্ত। শীত এখনও পড়েনি। তবে সকালের মিঠে রোদ্দুরের আমেজটি দিব্যি এসে গেছে। বড়াপানি লেকের দিকে মুখ করা লনে তাই আজ সকালের চা-টা দিতে বলে দিয়েছিল প্রতিমা।
ছোট ছোট সাদা টেবিল আর গার্ডেন চেয়ার দিয়ে সাজানো হয়েছে লনটা। সবাই যে আসতে পারবে বা চাইবে তা অবশ্য নয়। তবে যেকজন আসবেন তাঁরা চাইলে যাতে ওখানে বসেই ব্রেকফাস্ট সেরে নিতে পারেন তার ব্যবস্থাও করা আছে। লনে এসে একবার গুনে দেখল প্রতিমা। মোট কুড়িটা টেবিল দেওয়া হয়েছে। প্রায় জনাচল্লিশেকের বসার ব্যবস্থা। অবশ্য তার বেশি দরকার হবে না। একুশ নম্বর ঘরের কাঞ্চন মিত্র অসুস্থ। তাঁকে রেখে মিস্টার মিত্র আসবেন না নিশ্চিত। তিরিশ আর একত্রিশের বোর্ডাররা তো বিছানা থেকে প্রায় উঠতেই পারেন না। পঁচিশের মিস্টার মজুমদারের শরীর ভালো নেই। মহিলাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আবার ভয়ঙ্কর শীতকাতুরে। সারাক্ষণই ঠান্ডা লেগে যাওয়ার ভয়ে কাতর।
প্রতিমা হিসেব করে দেখল গোল্ডেন অর্চার্ড-এর পঞ্চাশজন বোর্ডারের মধ্যে পঁচিশজনের বেশি এই রোদে বসে চা খাওযার আনন্দ উপভোগ করতে রাজি হবে না। তবে যদি...হ্যাঁ, এর মধ্যে একটা যদির ব্যাপারও আছে। অমিয় নন্দী যদি এসে বসেন, তাহলে কী হবে ঠিক বলা যায় না।
অমিয় নন্দীর কথা ভেবে নিজের মনেই একটু হেসে ফেলে প্রতিমা। কারণ তাঁর মতো বহুবর্ণের চরিত্র গোল্ডেন অর্চার্ডে আর একটিও নেই।
গোল্ডেন অর্চার্ড তারা শুরু করেছিল বছর দশেক আগে। সে নিজে গৌহাটির মেয়ে। তবে কলকাতায় মামাবাড়ি আর পড়াশোনার সুবাদে বাংলাটাই মাতৃভাষা। প্রতীক অবশ্য কলকাতারই ছেলে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ই আলাপ। বিয়ের পর দু'জনেই চাকরির সুবাদে মুম্বই পাড়ি দেয়।
বছর দশেক চাকরি করার পর ওদের মনে হয় জীবনটা যেন বড্ড বেশি গতে বাঁধা হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে গৌহাটির শান্ত, নির্জন ব্রহ্মপুত্রের ধারে বড় হওয়া প্রতিমার তো মুম্বইয়ের ওই সারাক্ষণ দৌড়ে চলা পছন্দ হত না মোটেই। তাই নিজেদের মতো কিছু একটা করার পরিকল্পনা মাথার মধ্যে যখন ঘুরপাক খাচ্ছে, তখনই শিলং-এর এই প্রপার্টিটা হাতে এল। বলা যেতে পারে অনেকটা ঈশ্বরের দানের মতোই।
প্রতিমার বড়মামা ছিলেন এই প্রপার্টিটার মালিক। মামা নিঃসন্তান। মামি মারা যাওয়ার পর প্রতিমাদের বাড়িতেই থাকতেন। প্রতিমা আর প্রতীক নিজেদের মতো কিছু করতে চাইছে শুনে, আদরের ভাগ্নিকে বড়াপানির ধারে এই দু'বিঘে জমি উপহার দিলেন তিনি। ব্যাস শুরু হয়ে গেল গোল্ডেন অর্চার্ডের পরিকল্পনা।
প্রায় দশ কাঠা জমিতে মূল বাড়ি। একতলা-দোতলা মিলিয়ে পঞ্চাশজন বোর্ডারের থাকার ব্যবস্থা। সিঙ্গল আর ডাবল দুরকম রুমেরই ব্যবস্থা রেখেছে তারা। কারণ অনেকেই স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে থাকেন। পরে অবশ্য একজন কেউ মারা গেলে অন্যজনকে সিঙ্গল রুমে শিফট করে দেওয়া হয়। এছাড়া আছে ডাইনিং হল, মেডিটেশন রুম, লাইব্রেরি, প্লে-রুম আর বিশাল খোলা-মেলা ছড়ানো লাউঞ্জ। মাঝে মাঝে সিনেমা কিংবা নাটক দেখানোর জন্য একটা ছোট অডিটোরিয়ামেরও ব্যবস্থা রেখেছে প্রতিমা। ছোটখাটো অসুস্থতা সামাল দেওয়ার জন্য একটা হেলথকেয়ার ইউনিটও আছে। সেখানে এমারজেন্সির সব রকম ব্যবস্থা মজুত। একজন নার্স চব্বিশঘণ্টা থাকেন। ডাক্তার অবশ্য দিনে দু'বার আসেন।
নামে বৃদ্ধাশ্রম হলেও থাকার ব্যবস্থা প্রায় পাঁচতারা হোটেলের মতোই। মূল বাড়িটার সামনে-পিছনে লন। চারপাশে ফুলের কেয়ারি করা। বাকি জমিতে আপেল, নাশপাতি আর চেরির বাগান। এছাড়া সারাবছর নানা ধরনের ফুল আর সবজির চাষ হয়। ছোট একটা পোলট্রিও আছে। সেখান থেকে ডিম-মাংস দুই-ই আসে।
এসব থেকেও ভালো রোজগার হয় তাদের। এরকম একটা ব্যবস্থাপনায় থাকার মূল্য নিশ্চিতভাবেই অনেক বেশি। প্রথমে যখন প্রতীক প্ল্যানটা করে তখন তাই বেশ খানিকটা সংশয়ে ছিল প্রতিমা। বৃদ্ধ বয়সে আরামে থাকার জন্য এত টাকা খরচা করতে কি কেউ রাজি হবে? কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল ঠিক উল্টো। প্রথম একটা বছর নাম ছড়াতে সময় লেগেছিল। তারপর থেকেই সিট পুরো ভর্তি। বহু অ্যাপ্লিকেশন পেন্ডিং থাকে। জায়গা দেওয়া যায় না। ওদের দু'জনেরই যোগাযোগটা যেহেতু মূলত কলকাতায়, তাই গোল্ডেন অর্চার্ডে বাঙালি বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সংখ্যাই বেশি। অন্য শহর থেকেও এসেছেন বেশ কয়েকজন।
লনে বসে থাকতে থাকতেই প্রতিমা দেখল করিডর পেরিয়ে অমিয় নন্দী লনের দিকে আসছেন। কালো রঙের একটু মোটা কর্ডুরয়ের ট্রাউজারসের সঙ্গে রেড অ্যান্ড ব্ল্যাক কটসুলের চেক শার্ট। গলায় একটা অফ হোয়াইট স্কটিশ চেক মাফলার। মাথায় টুপি, হাতে ছড়ি। আজ পর্যন্ত প্রতিমা ভদ্রলোককে কখনও বেমানান কিছু পরতে দেখেনি। গরমের দুপুরে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে ক্রিসমাস ইভের পার্টিতে থ্রি-পিস স্যুট, সবসময় নিখুঁত টিপটপ। বয়স পঁচাত্তর পেরিয়েছে। তবে এখনও বেশ সোজা আর শক্তই আছেন। গায়ের রঙ ময়লা। ভুরুদুটো হালকাভাবে জোড়া। আর ছেলেদের তুলনায় একটু বেশি টানা চোখ, কোণের দিকে সামান্য তোলা। এরজন্যই সম্ভবত চেহারার একটা বাড়তি আকর্ষণ আছে। তবে আকর্ষণটা কতটা চেহারার আর কতটা ব্যক্তিত্বের সেটা বলা কঠিন।
গুড মর্নিং মিস্টার নন্দী।
গুড মর্নি মাদমোজেল! আজ সকালে প্রথমেই তোমার মুখ দেখলাম। আজকের দিনটা নিশ্চিত ভালো যাবে।
মোটেই আপনি প্রথমে আমার মুখ দেখেননি। ঘুম থেকে উঠে আগে আয়নায় নিজের মুখ দেখেছেন।
আরে ও তো আমি আয়না সামনে না ধরেও দেখতে পাই। সত্যি কথা বলতে কি আয়নার থেকে ভালো দেখতে পাই। কারণ কী বলো তো, আয়না সামনে না ধরলে তো আর বয়স বেড়েছে বোঝার কোনও উপায় নেই। তাই আমার দিব্যি নিজেকে মধ্য তিরিশের অমিয় বলে ভেবে নিতে অসুবিধা হয় না। সেজন্য আমি সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়নার দিকে তাকাই না বুঝলে তো। অপেক্ষা করে থাকি কখন তোমার মতো সুন্দরী কেউ সামনে আসবে, তখন চোখ ভরে দেখে নেব বলে।
ফ্লার্টিংটা এত সহজভাবে আসে অমিয় নন্দীর যে প্রতিমার মতো স্মার্ট মেয়েও সামান্য অপ্রতিভ বোধ করে কথা ঘোরাতে বলে, আজকে এই লনে বসে মর্নিং-টি আর ব্রেকফাস্টের প্ল্যানটা কিন্তু আমার। কেমন হয়েছে বলুন তো?
আ ভেরি গ্যালান্ট আইডিয়া ইনডিড! আমরা গ্রীষ্মের সকালে এখানে বসে চা খেয়েছি। কিন্তু এই সময়ে, এই যে ডিমের কুসুমের মতো কমলা রঙের একটা রোদ উঠেছে সেটা গায়ে মাখতে ভারি আরাম। আর অবশ্যই তার সঙ্গে তোমার বানানো গোল্ডেন ব্রাউন দার্জিলিং টি। আজ ব্রেকফাস্টে তুমি আমাদের কী খাওয়াবে ডিয়ার?
গার্লিক ব্রেড উইথ চিজ ওমলেট। ম্যাসডপোটাটো বানানো হয়েছে। ফল তো আছেই। কাল রাতে অরেঞ্জ পুডিং বানিয়েছিলাম, সেটাও আজ ব্রেকফাস্টের সঙ্গে সার্ভ করা হবে।
ও মার্ভেলাস! শোনো ডিয়ার, আমি যখন মন্ট্রিয়েলে ছিলাম, তখন আমার বাড়িওলি গিন্নি আমাকে মাঝে মাঝে পুডিং বানিয়ে খাওয়াত। ওরা ক্যারামেল পুডিং-ই বেশি পছন্দ করে। তবে অরেঞ্জ কিংবা লেমন পুডিংও বানাত। আর সার্ভ করার সময় পুডিং-এর ওপর মার্মালেড ছড়িয়ে দিত। মানে অরেঞ্জ পুডিং হলে অরেঞ্জ মার্মালেড আর লেমন পুডিং হলে লেমন। তুমি কিন্তু ব্যাপারটা ট্রাই করে দেখতে পারো। নট আ ব্যাড আইডিয়া। দেখতে ভালো, খেতেও ভালো।
ব্রেকফাস্টের পর আজ আমাদের কোনও প্ল্যান আছে নাকি প্রতিমা?
লনের চেয়ারগুলো ইতিমধ্যেই একটু একটু করে ভরে উঠেছে। প্রতিমার ডান দিকের টেবিল থেকে প্রশ্নটা করলেন কণিকা তপাদার।
হ্যাঁ মাসিমা। আজ যদি আপনারা রাজি থাকেন, তাহলে আমরা সবজি খেতে যেতে পারি। পিছনের কর্নার প্লট দুটোতে এবার বিনস আর টোম্যাটো লাগানো হয়েছে। দুটোতেই ভালো ফলন হয়েছে। আপনারা গিয়ে যদি বিনস আর টোম্যাটো তোলেন তাহলে তাই দিয়েই আজ দুপুরে তরকারি আর স্যালাড দুটোই হতে পারে।
বাঃ, দারুণ ব্যাপার তো! নিশ্চয় যাব। মিঃ নন্দী, আপনি আমাদের সঙ্গে বিনস তুলতে যাবেন নাকি?
যেতে পারি, তবে একটু পরে। আজ আমার একটা জরুরি ফোন আসার কথা আছে। সেজন্য ওয়েট করতে হবে। এই রেড শালটাতে কিন্তু আপনাকে গর্জাস দেখাচ্ছে মিসেস তপাদার। আসলে কী বলুন তো আমি যখন ফ্রান্সে ছিলাম, তখন এই অটামের সময় অ্যাপেল অর্চার্ডে...
ব্রেকফাস্ট সার্ভ করতে বলার জন্য কিচেনের দিকে যেতে যেতে হেসে ফেলে প্রতিমা। কোনও মহিলার প্রশংসা করার ক্ষেত্রে সামান্যতম সুযোগও কখনও হাতছাড়া করেন না অমিয় নন্দী। আর তাঁর কথা বলার ধরনে যে সত্তোরোর্ধ করুণা তপাদারের মুখেও হালকা লালচে আভা ফুটে উঠেছে সেটাও বিলক্ষণ জানে প্রতিমা। তাছাড়া ওনার যে এই অনবরত মন্ট্রিয়েল, প্যারিস কিংবা ভিয়েনার গল্প, সেটাও যে কতটা সত্যি কে জানে!
অমিয় নন্দী পেশায় লেখক। ইংরাজিতে লেখেন। দেশে এবং বিদেশে তাঁর লেখা বইয়ের বেশ ভালো চাহিদা আছে। বই লিখে অমিয় নন্দী ভালো রোজগার করেন। তবে ওনার আসল রোজগার হল মুম্বইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে। মুম্বইয়ের বহু নামকরা পরিচালকের ছবির স্ক্রিপ্ট লেখেন তিনি। কিন্তু এই কাজটা পুরোটাই করেন ছদ্মনামে। অমিয় নন্দী নিজেই একদিন প্রতিমাকে বলেছিলেন যে তিনি চান, তাঁকে সবাই সাহিত্যিক হিসাবেই চিনুক। তাই তিনি স্ক্রিপ্ট লেখার সময় নিজের নাম ব্যবহার করেন না।
তবে এর সুবাদে মুম্বইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বহু বিখ্যাত লোকের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা ছিল। এখনও নিয়মিত যোগাযোগ আছে। অনেক নায়ক-নায়িকার হাঁড়ির খবরও তাঁর জানা। সেইসব মুখরোচক এবং আদি রসাত্মক গল্প দিয়ে তিনি দিব্যি গোল্ডেন অর্চার্ডের আড্ডা জমিয়ে তোলেন। তবে কখনও শ্লীলতার গণ্ডি পেরোন না। তাই তাঁকে নিয়ে কোনও অভিযোগ অন্য বোর্ডারদের নেই। একমাত্র রাখি ছাড়া আর কেউই তাঁর সম্বন্ধে কোনওদিন কোনও বিরূপ মন্তব্য করেনি। রাখির কথাটা মনে পড়তেই ভুরুটা কুঁচকে যায় প্রতিমার।

স্কুল ফেরতা বাজারে যাবে ঠিক করেছিল সুমিতা। মশলাপাতি ফুরিয়ে গেছে। তাছাড়া ফল কেনা দরকার। টিফিনের জন্যও টুকিটাকি কিছু কিনতে হবে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আজ আবার হাতভর্তি খাতা রয়েছে। এসপ্তাহে পরপর ইউনিট টেস্ট হয়েছে তিনটে ক্লাসের। সেই খাতা যদি তিনদিনের মধ্যে দেখে ফেরত দিতে হয়, তাহলে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু অতগুলো খাতা নিয়ে বাজারে ঘোরা তো অসম্ভব। কী করবে ভেবে না পেয়ে খানিকটা বেজার মুখেই টিচার্স রুমে বসেছিল। ক্লাস শেষ করে ফিরে জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল অঞ্জলি।
চা খাবি নাকি?
নাঃ, ইচ্ছে করছে না।
কী ব্যাপার, মেজাজ খারাপ? মুখ গোমড়া করে বসে আছিস?
না রে। মেজাজ খারাপ নয়। আসলে কী করা যায় তাই ভাবছি। আজ একবার বাজার যাওয়া দরকার। এদিকে এতগুলো খাতা ব্যাগে ভরে বাজারে যাবই বা কী করে?
আরে অত চিন্তার কী আছে? আমি তো আজ হাসিদির মেয়েকে পড়াতে যাব। গাড়ি থাকবে তো। পড়ানো সেরে, মাংসের ঘুগনি কিংবা লুচি আলুর দমের খ্যাটন দিয়ে সোজা বাড়ি! হাসিদির ড্রাইভারই তো আমায় পৌঁছে দেবে। তোর খাতাও আমার সঙ্গে গাড়ি চেপে বাড়ি চলে যাবে। তুই বাজার-হাট সেরে বাড়ি এসে খাতা নিয়ে নিবি। তবে তোর যদি মনে হয় আমাকে দিয়ে খাতা বওয়ানোটা অনুচিত কাজ তাহলে নিজেই বরং খাতাগুলো নিয়ে হাসিদির গাড়িতে তুলে দিস। নামানোর সময় আমি ড্রাইভারকে বলব নামিয়ে দিতে।
সব সময় হাসি-মজা করে কথা বলাটাই অঞ্জলির অভ্যাস। জীবনের সব সমস্যাই সে যেন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবে। শুধু নিজের নয়, অন্যদেরও সমস্যার সমাধানের চাবিকাঠি তার হাতে থাকে। সুমিতার ঠিক উল্টো। সেজন্যই বোধহয় দু'জনের মধ্যে ভাবটা একটু বেশি। রিভারসাইড রোডে তাদের দু'জনের কোয়ার্টারও পাশপাশি। তাই বাড়ি ফিরে খাতা নিয়ে আসাটা কোনও সমস্যা নয়।
ইউনিট টেস্টের খাতাগুলো গুছিয়ে, দড়ি দিয়ে বেঁধে অঞ্জলির টেবিলে রেখে বেরিয়ে পড়ে সুমিতা। প্রথমটায় ভেবেছিল কাছের মার্কেটটাতেই যাবে। কিন্তু তারপর মনে হল, সময় যখন পাওয়া গেছে তখন শপিং মলে যাওয়াই ভালো। একছাদের তলায় সব জিনিস পাওয়া যাবে। দু-চারটে শখের জিনিসও কেনা হবে। স্কুল থেকে বেরিয়ে কিছুটা এগোলেই বাসস্ট্যান্ড।
বাসে উঠে জানলার ধারের একটা সিটে বসে সুমিতা ভাবছিল দেখতে দেখতে এই স্টিল টাউনশিপের স্কুলের চাকরিতে তার পাঁচ বছর হয়ে গেল। এমএ পাস করে বিএড। পড়তে পড়তেই চাকরির চেষ্টা করছিল। পেয়েও গেছিল তাড়াতাড়ি। আসলে মফস্বলের স্কুলে তো সহজে কেউ যেতে চায় না। কিন্তু সুমিতার যেহেতু তেমন পিছটান নেই, তাই সে আর অন্য কিছু চিন্তা-ভবনা করেইনি।
চাকরির অভিজ্ঞতা এখনও পর্যন্ত তেমন খারাপ কিছু নয়। মাইনেটাও সময়মতো হাতে পেয়ে যায়। স্কুলের ডিসিপ্লিনও ভালোই। মেয়েদের স্কুল। কারখানার কর্মীদের মেয়েরাই পড়ে। ভালো-মন্দয় মিশিয়ে ছাত্রী। রেজাল্ট আহামরি কিছু না হলেও নেহাত খারাপও নয়।
পাঁচ বছর এখানে থেকে শহরটাকেও মোটামুটি চিনে ফেলেছে সুমিতা। খুব যে ঘুরে বেড়ায় তা অবশ্য নয়। সময় কোথায়? ইচ্ছেও বিশেষ নেই। তবে কাজে-কর্মে, কখনও একা, কখনও অন্য টিচারদের সঙ্গে এদিক-ওদিক যাওয়া তো হয়ই। বিশেষ করে অঞ্জলির আবার সিনেমা দেখার খুব নেশা। আর একলা সিনেমা দেখতে যাবে না কিছুতেই। সুমিতাকে নিয়ে টানাটানি। সব সময় এড়ানো যায় না। সিনেমা দেখে, রেস্তোরাঁয় খেয়ে বাড়ি ফেরে দু'জনে।
জায়গাটার নাম পোলো গ্রাউন্ড। একসময় নাকি বিশাল মাঠ ছিল। মাঠের তিনদিকে চওড়া রাস্তা। বড় বড় শিরীষ আর কৃষ্ণচূড়ার ছায়া। রাস্তার ধারে ধারে মস্ত সব বাংলো। বেশিরভাগই সরকারি আমলা আর অফিসারদের। নিজস্ব বাড়িও দু-চারটে আছে। একপাশে একটা বড় মেয়েদের কলেজ। মাঠে নাকি কোনও এককালে ঘোড়দৌড় হত। সেজন্যই পোলো গ্রাউন্ড নাম। ইন্দিরা গান্ধী কিংবা জ্যোতি বসুও নাকি বক্তৃতা দিতে এসেছেন এখানে। মাঠ জুড়ে মানুষের ঢেউ, সন্ধে নামলে জ্বলে উঠেছে অজস্র মশালের আলো, এসবের সাক্ষী এখনও অনেকে আছেন। ইদানীং যদিও মাঠের পরিসর নানাভাবে ছোট হয়ে এসেছে। এই পোলো গ্রাউন্ডেই রাস্তার ধার ঘেঁষে গজিয়ে উঠেছে ঝাঁ-চকচকে শপিং মল।
বাস থেকে নেমে রাস্তা পেরিয়ে ঢুকে পড়ল সুমিতা।
শীততাপনিয়ন্ত্রিত এই বাজারগুলো বেশ ভালো লাগে তার। একটা ট্রলি নিয়ে ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে যাও। চারপাশে অনেক লোক। কিন্তু সবাই নিজের মতো ব্যস্ত। কেউ তোমাকে খেয়াল করবে না। বড়জোর তোমার ট্রলির চাকা পায়ে ঠেকে গেলে একবার ভুরু কুঁচকে তাকাবে। বাজারের ঠেলাঠেলি, গুঁতোগুঁতি, চেঁচামেচি কিচ্ছুটি নেই। পাঁচটাকার জন্য খদ্দেরের সঙ্গে দোকানদারের দড়ি টানাটানিও নেই। সুমিতার কেমন যেন মনে হয়, সকলের মধ্যে থেকে একলা হওয়ার জন্য এর থেকে ভালো জায়গা বোধহয় আর হয় না।
শপিং মলে এলে সে মাঝে মাঝে একটা বেশ মজার খেলাও খেলে। চারিদিকে থরে থরে রকমারি জিনিস। যেটা খুশি তুমি তুলে নেড়েচেড়ে দেখে ট্রলিতে রাখতে পারো। যতক্ষণ না দাম দেবার লাইনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছ, ততক্ষণ তোমাকে কেউ কোনও প্রশ্ন করবে না। একেকদিন তাই সে ট্রলিতে নিজের পছন্দমতো নানারকম জিনিস ভর্তি করে। অনেক অনেক জিনিস। সবই তার ভীষণ পছন্দের।
কাঠ কিংবা পাথরের টুকিটাকি। যেগুলো দিয়ে সুন্দর করে সাজানো যায় ছোট্ট ড্রইংরুমটা। কাচের ফুল তোলা বাসন, অতিথি এলে সুন্দর করে খাবার পরিবেশনের জন্য। কিংবা মুঠিতে ভরে ফেলার মতো নরম, গোলাপি রাতপোশাক। পরে শুলে নতুন নতুন স্বপ্নরা এসে বসবে চোখের পাতায়। সব ভরে ফেলে সুমিতা ট্রলির মধ্যে। দামের ট্যাগের দিকে তাকায় না। শুধু জিনিসগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে, হাত বুলিয়ে সেগুলোকে উপভোগ করার চেষ্টা করে। একসময় ট্রলি যখন উপছে পড়ার অবস্থা হয়, তখন সেটাকে ঠেলতে ঠেলতে একটা মোটামুটি নির্জন কোণে এনে দাঁড় করায়। তারপর আরও নতুন কিছু নিয়ে আসার অছিলায় সেখান থেকে সরে গিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে দোকান থেকে।
শপিং মল থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তার দিকে একটু এগোলেই পরপর দুটো আধা পুরোনো মুদির দোকান। সেখান থেকে আড়াইশো মুসুরির ডাল, মাখন, পাঁউরুটি, জ্যাম কিনে তাড়াহুড়ো করে অটো ধরতে যায়। প্রতিদিনই তার আশঙ্কা হয়, এই বুঝি মল থেকে কেউ বেরিয়ে এসে বলল, দিদি আপনার ট্রলিটা পড়ে রইল যে...।
কিন্তু কেউ-ই কিছু বলে না। অটোতে উঠে বসে নিশ্চিন্ত হয় সুমিতা।
আজ অবশ্য এরকম খেলার সুযোগ নেই। সত্যিই কয়েকটা জিনিস কিনতে হবে তাকে। সেগুলো সাধারণ পাড়ার মুদির দোকানে পাওয়া মুশকিল। কেনা-কাটা সেরে ফিরতেও হবে তাড়াতাড়ি। ঠান্ডা যদিও এখনও পড়েনি কিন্তু বেলা ছোট হয়ে আসছে ক্রমশ। আর এইসব মফস্বল শহরে অন্ধকার হয়ে গেলে দ্রুত বাস চলাচল কমে আসে। তবে মলে ঢুকে খানিকটা আশ্বস্ত হল সুমিতা। দাম দেওয়ার জায়গায় লাইন নেই তেমন। আসলে মাসের শেষ। লোকের হাতে রেস্ত ফুরিয়ে এসেছে।
দরকারি জিনিসপত্র কিনে নিজের আর অঞ্জলির জন্য দুটো বড় চকোলেট বার নিল। তারপর দাম মিটিয়ে বেরিয়ে এল। প্যাকেটটা বেশ ভারী হয়েছে। তাড়াতাড়ি একটা অটো পেলে ভালো হয়।
স্কুলে সাধারণত শাড়ি পরেই যায় সে। কিন্তু আজ একটা সালোয়ার-কামিজ পরেছে। ওড়নাটা কাঁধের ওপর দিয়ে আড়াআড়ি নিয়ে এসে কোমরে একটা নট বেঁধে নেয়। চুলটা একটা টাইট খোঁপায় শক্ত করে বাঁধা আছে। নাহলে অটোতে যাওয়ার সময় উড়লে বড্ড বিরক্ত লাগে। যদিও স্ট্যান্ডে এসে দেখা গেল অটো নেই একটিও। অতএব বাস। কতক্ষণে আসবে সেটা অবশ্য অনিশ্চিত।
বাধ্য হয়েই হাতের প্যাকেটটা মাটিতেই নামিয়ে রাখবে কিনা ভাবছে সুমিতা, এমন সময় খুব কাছেই একটা গাড়ির হর্ন শোনা গেল। স্বাভাবিক রিফ্লেক্সেই প্রথমটায় পিছিয়ে গেছিল সুমিতা, কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হল হর্নটা যেন তার উদ্দেশেই বাজছে। গাড়িটাও এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশেই।
একটু অবাক হয়ে তাকাতেই একহাতে সামনের দরজাটা ঠেলে খুলে ডাঃ অর্ণব মিত্র বলেন, উঠে আসুন তাড়াতাড়ি। পিছনে গাড়ি হর্ন দিচ্ছে...।
অন্যসময় হলে কী করত সুমিতা জানে না। কিন্তু বাস্তবিকই পিছনের গাড়ি হাঁকডাক লাগিয়েছে। বাসস্ট্যান্ডের লোকেরাও ড্যাবড্যাব করে সুমিতাকে দেখেছে। তাই বাধ্য হয়েই এগোয় সুমিতা। অর্ণবের নির্দেশে হাতের প্যাকেটটা পিছনের সিটে রেখে দ্রুত ড্রাইভারের পাশের আসনে বসে পড়ে।
আমি তো বাসেই চলে যেতে পারতাম। আপনি আবার...।
হাতে ওরকম মস্ত ঝোলা-ঝম্পটি যখন, তখন বাড়ি যাচ্ছেন নিশ্চয়। আমিও ওদিকেই যাব। অসুবিধার কোনও প্রশ্নই নেই। তবে আপনার যদি ওই ঝোলা নিয়ে বাসে উঠে লোকের মুখ ঝামটা খেতে বিশেষ ভালো লাগে তাহলে সেকেন্ড থট দিতে হবে।
কথার পিঠে কথা বলাটা সুমিতার ঠিক আসে না। তাই উত্তরে সুমিতা একটু হাসে। সামনেই ঢিমে তেতালায় একটা মিনিবাস যাচ্ছে। সেটাকে নিপুণভাবে কাটিয়ে দিলেন ডাঃ মিত্র। বোঝাই যাচ্ছে, গাড়ি চালানোর হাত বেশ ভালো।
শরীর কেমন? জ্বর আসেনি তো?
ঠিকই আছে। না, জ্বর আসেনি। দুর্বলতাটাও অনেকটাই কেটে গেছে।
আপনার একটা চেক-আপ করার কথা ছিল, সেটা করতে এলেন না তো?
গেছিলাম তো! সেদিন আপনি ছিলেন না। অন্য একজন ডাক্তার ছিলেন...ডাঃ শান্তনু চক্রবর্তী।
আরে কী আশ্চর্য! আপনাকে বলে দিলাম না, যে আমি বৃহস্পতিবার আউটডোরে বসি না। ওইদিনটা বাদ দিয়ে আসবেন। আপনি ঠিক সেই বেছে বেছে বৃহস্পতিবারেই...।
ভুরুটা কুঁচকে গেছে অর্ণব মিত্রের। চোখ রাস্তার দিকে। অপ্রস্তুত হয় সুমিতা।
আসলে সেদিন পরপর বেশ কয়েকটা ক্লাস হল না। মেয়েদের একটা প্রোগ্রামের জন্য রিহার্সাল চলছিল। তাই আমি ভাবলাম সেই সময় ঘুরে আসি।
আমি তো আপনাকে বলেছিলাম, আপনি যদি ওপিডি-র সময়ে নাও আসতে পারেন, স্কুল ছুটির পর আসবেন। আমি দেখে দেব। অবশ্য আপনার যদি আমার ওপর আস্থা না থাকে, তাহলে আর...
কী আশ্চর্য! তা আবার হয় নাকি। আপনি আমাকে সুস্থ করলেন আর আমার আপনার ওপর...প্রশ্নই ওঠে না। আমি আসলে...
কথাটা শেষ না করেই চুপ করে যায় সুমিতা। কীভাবে মাপ চাইবে ভেবেই পায় না। অত গুছিয়ে কথা বলা তার একেবারেই আসে না। আর এক্ষেত্রে তো ডাঃ মিত্রের অভিযোগটা একেবারেই অমূলক নয়। অর্ণব মিত্র না থাকলে তার সেরে ওঠা কঠিন ছিল। এমনকী মৃত্যুর আশঙ্কাও যে একেবারে ছিল না তাও বোধহয় বলা যায় না।
জ্বরটা হচ্ছিল কিছুদিন ধরেই। প্রথম দু-তিন দিন ভাইরাল ফিভার ভেবে নিজেই প্যারাসিটেমল খেয়ে স্কুলে গেছিল। কিন্তু তাতে কমল না। স্কুল যাওয়া বন্ধ করে বিছানা নিতে হবে বুঝে লোকাল ডাক্তারের কাছে গেছিল সুমিতা। তিনি বুক-পিঠ পরীক্ষা করে অ্যান্টিবায়োটিক দিলেন। সাতদিনের কোর্স। যেদিন ওষুধ শেষ হল সেদিন রাত থেকে আবার ধুম জ্বর এল।
অঞ্জলি সেই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে আর এক প্রস্থ ওষুধ নিয়ে এল। কিন্তু তাতেও কাজ না হওয়াতে হাসিদির পরামর্শেই যাওয়া হল হাসপাতালে।
স্টিল টাউনশিপের হাসপাতালের আউটডোরে সেদিন ছিলেন ডাঃ অর্ণব মিত্র। সুমিতাকে দেখামাত্রই এমারজেন্সিতে ভর্তি করে নেন। অ্যাকিউট নিউমোনিয়া। তারপর প্রায় দিন সাত-আট যমে-মানুষে টানাটানির চলে। সুমিতার খুব যে ভালো জ্ঞান ছিল তা নয়। তবে তার কেমন যেন মনে হয়, জ্বরের ঘোরে যতবারই সে চোখ খুলেছে, ততবারই দেখেছে অর্ণব মিত্র তার বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।
সিস্টারদের কাছে পরে সুমিতা শুনেছে রাতে ডিউটিতে থাকলে তো বার দু-তিন রাউন্ডে আসতেনই। এমনকী নাইট শিফট না থাকলেও সুমিতার অবস্থা যখন বেশ ক্রিটিক্যাল, তখন নিজের কোয়ার্টার থেকে এসে পেশেন্টকে দেখে যেতেন। ওষুধ-ইঞ্জেকশন-যত্ন কোনওকিছুরই ত্রুটি হতে দেননি ডাঃ মিত্র। সাতদিনের মাথায় জ্বর ছেড়েছিল সুমিতার। তারপরেও আরও দিন পাঁচেক হাসপাতালে অবজারভেশনে থাকার পর ছুটি পেয়েছিল।
ডাঃ মিত্রের মুখটা বেশ গম্ভীর। চোখ শুধুই রাস্তার দিকে। আর কিছু ভেবে না পেয়ে বাধ্য হয়েই সুমিতা খুব নীচু গলায় বলে, স্যরি। ভুল হয়ে গেছে। এরপর থেকে বৃহস্পতিবারটা ঠিক মনে রাখব।
গম্ভীর মুখটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে ডাঃ মিত্রের। তবে চোখের ভিতরে যে একটা চোরা হাসি খেলা করছে বুঝতে অসুবিধা হয় না।
স্যরি বলার কিছু নেই। আপনি যে অত ভেবে-চিন্তে কিছু করতে পারেন না সেটা এতদিনে আমি বুঝে গেছি। আর ভয়ানক অপ্রস্তুত হলে যে কথা খুঁজে পান না, তুতলে যান সেটাও আজ বুঝলাম। আশা করি, আপনার ছাত্রীরা এটা জানে না। জানলে কিন্তু বিপদ আছে। আর শুনুন, শুধু স্যরি বললে হবে না। প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
সে আবার কী কথা!
ঘাবড়ে গিয়েও হেসে ফেলে সুমিতা।
অর্ণবও হাসতে হাসতে বলেন, সামনেই একটা নতুন কফি কর্নার খুলেছে। আপনার নিশ্চয় অনেকক্ষণ বাজার করে গলা শুকিয়ে গেছে। আর আমার তো কফি দেখলে স্লাইটলি কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায়। তাই ওখানে একবার নামব। কফি খেয়ে বাড়ি যাব। আর হ্যাঁ, আমিই কিন্তু খাওয়াব। কারণ আপনি আমার পেশেন্ট।
পেশেন্টকে ডাক্তার ওষুধ খাওয়ায় বলে জানতাম। কফি খাওয়ানোর রাইটও আছে বলে তো কখনও শুনিনি! আপনাদের মেডিকেল জার্নালে লেখা আছে বুঝি?
এই তো দিব্যি কথা ফুটেছে দেখছি। ঠিক আছে, পরের দিন আপনি খাওয়াবেন। সেই অজুহাতে আর একদিন তো অন্তত কফি খেতে আসা যাবে।
গাড়িটা পার্ক করে কফির অর্ডার দিতে চলে যান অর্ণব। কাচের দরজার বাইরেও কতগুলো চেয়ার-টেবিল পাতা আছে। সেখানেই বসে সুমিতা। এখান থেকে কাউন্টারে দাঁড়ানো ডাঃ মিত্রকে বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সাদার ওপর নীল পিনস্ট্রাইপ দেওয়া একটা শার্ট পরেছেন। সঙ্গে নেভি-ব্লু ট্রাউজারস বেশ লম্বা, ছিপছিপে চেহারা। গায়ের রঙ বেশ কালো। কাটা কাটা নাক-মুখ-চোখ আর মাথার কোঁকড়ানো চুলে দিব্যি দেখায়। সব থেকে সুন্দর অবশ্য ওনার হাসি। ঝকঝকে, বুদ্ধিদীপ্ত কিন্তু মায়া মাখানো। ডাক্তারের এমন হাসি দেখলেই রোগীর অর্ধেক কষ্ট দূর হয়ে যায়।
সামান্য অস্বস্তি হচ্ছে সুমিতার। ডাঃ মিত্র তাকে কেন হঠাৎ এভাবে কফি খাওয়ার জন্য ধরে নিয়ে এলেন বোঝা যাচ্ছে না। হাসপাতালে থাকাকালীন চিকিৎসার বাইরে ওনার সঙ্গে আর বিশেষ কিছু কথা হয়নি। ছাড়বার আগের দিন শুধু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনি তো শুনলাম কোয়ার্টার্সে একাই থাকেন। শরীর কিন্তু এখনও বেশ দুর্বল। আত্মীয়-স্বজন কেউ সঙ্গে থাকলে ভালো হত বোধহয়।
অঞ্জলি নিতে এসেছিল তাকে। বেডের পাশে দাঁড়িয়ে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিল। উত্তরটা সেই দিয়েছিল।
চিন্তা করবেন না ডাঃ মিত্র। আমাদের দু'জনের পাশাপাশি কোয়ার্টার্স। ও পুরো সেরে না ওঠা পর্যন্ত আমি ওর সঙ্গেই থাকব।
একটা ট্রে-তে দু-কাপ ক্যাপুচিনো কফি নিয়ে ফিরে এলেন অর্ণব মিত্র।
আপনাকে জিজ্ঞাসা না করেই ক্যাপুচিনো নিলাম। আশা করি খুব অপছন্দ হবে না। আর দুটো ব্রাউনি উইথ হট চকোলেট সস অর্ডার দিয়েছি। ব্রাউনিটা এরা ভালো বানায়।
রাতে তো আর কিছু খেতে হবে না মনে হচ্ছে!
তাই বুঝি। এরকম পাখির আহারে থাকলে কিন্তু শরীর সারবে না বলে দিচ্ছি। লক্ষ্মী মেয়ের মতো ডাক্তারের কথা শুনে ব্রাউনিটা খেয়ে ফেলুন। ডিনারের এখনও ঢের দেরি আছে।
কফির কাপে চিনি মিশিয়ে, ভালো করে নেড়ে একটা আরামের লম্বা চুমুক দিলেন অর্ণব মিত্র। তারপর লম্বা পা দুটো একটু ছড়িয়ে দিয়ে গুছিয়ে বসলেন।
নিজেদের মধ্যে আলাপ-পরিচয়টা আর একটু বিস্তারিতভাবে সেরে নেওয়া বোধহয় ভালো। তাহলে আড্ডা জমাতে সুবিধা হয় বুঝলেন তো। আমি হলাম গিয়ে শ্রীযুক্ত অর্ণব মিত্র। পিতার নাম সুধীর মিত্র। মাতা অণিমা মিত্র। আদি বাসস্থান পূর্ববঙ্গে, মানে সোজা কথায় বাঙাল। বাপের হোটেল কলকাতার ঢাকুরিয়ায়। সাউথ পয়েন্টে পড়তাম। বিচ্ছুমির জন্য বার দুয়েক রাস্টিকেট হতে হতে বেঁচে গেছি। তারপর আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ। বছর সাতেক হল এই হাসপাতালের গোয়ালে ঢুকেছি। কলেজে পড়ার সময়ই এক শ্রীমতীর ফাঁদে পড়েছিলাম। তা তিনি বছর পাঁচেক নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে এনআরআই-এর ল্যাজ ধরে বিদেশ গমন করলেন। লেঙ্গির আঘাতে বেশ কিছুদিন ধরাশায়ী ছিলাম। এখন অবশ্য সামলে উঠেছি।
অর্ণব মিত্রের এহেন বাক্যবিন্যাস শুনতে শুনতে মুখ হাঁ হয়ে গেছিল সুমিতার। হঠাৎ কথা শেষ হয়ে যাওয়ায় একটু খাবি খেল সে। কারণ অর্ণব ব্রাউনির একটা টুকরো কাঁটায় গেঁথে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার মানে এবার সুমিতার আত্মপরিচয় দেওয়ার পালা। কাজটা তার কাছে বেশ কঠিন। তাই নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে কফির কাপে চুমুক দেয় সুমিতা।
আমার আসলে এত কিছু বলার নেই। একটু বেশিই সিম্পল জীবন বলতে পারেন। আমার মা-বাবা নেই। জ্ঞান হওয়া ইস্তকই নেই। আমাকে মানুষ করেছে মাসি। মাসি বিয়ে করেনি। তাই তাঁর সবটুকু স্নেহ আর যত্নই আমি পেয়েছি। টাকা-পয়সার খুব একটা অভাব হয়নি। কারণ বাবা টাকা রেখে গেছিলেন। মাসিরও নিজস্ব কিছু সম্পত্তি ছিল। বেথুন কলেজে পড়তাম। তারপর ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি। বিএড করে বছর পাঁচেক হল এখানে চাকরিতে ঢুকেছি। মাসি কলকাতাতেই থাকে। বাগুইআটিতে একটা ছোট ফ্ল্যাট আছে আমাদের। বয়স হয়ে গেছে বলে নড়াচড়া করতে চায় না মোটেই।
চুপ করে সুমিতার কথা শুনছিলেন অর্ণব। এবার একটু নীচু স্বরে বললেন, স্যরি আমি তো জানতাম না। ভুল করে আপনার গোপন ব্যথায় হাত দিয়ে ফেলেছি। কিছু মনে করবেন না প্লিজ।
মনে করব কেন? সত্যিই তো আপনি জানতেন না। আর তাছাড়া ব্যথাবোধ যে আমার খুব আছে তা হয়তো নয়। আমি তো মা-বাবাকে দেখিনি কখনও। তাদের ভালোবাসা, কাছে থাকার অনুভূতি কেমন হয় জানি না। ছোটবেলায় অন্য বন্ধুদের মা-বাবাকে দেখলে মন খারাপ হত নিশ্চয়। মাসি আমাকে বলেছিল আমার মা-বাবা নাকি খুব জরুরি কাজে অনেক দূরের দেশে গেছে। আমি বড় না হলে ফিরতে পারবে না। তাই আমি মনে মনে ঠাকুরকে ডাকতাম যাতে আমি তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাই, যাতে আমার মা-বাবা ফিরে আসতে পারে। পরে যখন সত্যিই বড় হলাম, তখন তো সবই বুঝতে পারলাম। তখন অপেক্ষাও শেষ হল।
মেয়েটা একটু বেশি চুপচাপ। কিংবা চুপচাপ বলাটা হয়তো ঠিক নয়, একটু গুটিয়ে থাকা। শিক্ষিত, চাকরি করা মেয়েরা যেমনটা হয়, তেমনটা নয়। অথচ আনস্মার্ট বলা যাবে না। কথা বলার ভঙ্গিতেও জড়তা নেই মোটেই। কিন্তু চোখ যা বলে, তার অনেকটাই মনের ভিতরে থেকে যায়। কৌতূহল হত অর্ণবের। আজ বোঝা গেল কারণটা।
মা-বাবা নেই, অনাথ শিশু। মাসির কাছে মানুষ হয়েছে। ছোটবেলা থেকে চরম নিরাপত্তাহীনতা ভিতরে ভিতরে গুটিয়ে দিয়েছে সুমিতাকে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েও সেটা থেকে বেরোতে পারেনি। খুব কোমল একটা মায়াময় অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে যায় অর্ণবের মন। মনে হয় তার উল্টোদিকে বসে কফির কাপে চামচে নাড়ছে যে মেয়েটি সে যেন অবিকল শীতের সন্ধ্যায় ফুটে ওঠা একটি শিরীষ ফুল। একটু জোরে বাতাস দিলেই ঝরে পড়বে মাটিতে। কিন্তু যতক্ষণ গাছে রয়েছে, ভারি মিষ্টি একটা সুবাসে ঢেকে রেখেছে নিজের সর্বাঙ্গ।
সুন্দরী হয়তো নয় সুমিতা। কিন্তু ওই শিরীষ ফুলের মতোই স্নিগ্ধ। গমের মতো রঙ, হালকা করে জোড়া টানা ভুরু, গালের ওপর ছায়া ফেলা চোখের পাতা আর চিবুকের বাঁদিকে কুচকুচে কালো একটা তিল। সবমিলিয়ে চোরা আকষর্ণ আছে এই মুখের। যখন খুব অসুস্থ ছিল, জ্বরের ঘোরে পাণ্ডুর হয়ে থাকত মুখ, ফ্যাকাসে হয়ে গেছিল ঠোঁট, তখনও কিন্তু এই তিলটা ঠিক একইভাবে জ্বলজ্বল করত। সুমিতা জানে না, সেই সময় কতদিন রাত্রিবেলা, তার বেডের পাশে বসে চুপ করে মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন অর্ণব। সিস্টারদের মধ্যে ডাঃ মিত্রকে নিয়ে ফিসফাসও বোধহয় শুরু হয়েছিল একটু-আধটু। অর্ণব পাত্তা দেননি।
সুমিতার আঙুলগুলো ভারি সুন্দর। সরু, লম্বাটে। হালকা গোলাপি রঙের নেলপলিশ। বাঁ-হাতের কবজিতে কালো চামড়ার ব্যান্ড দেওয়া ছোট্ট একটা রিস্টওয়াচ। ডানহাত সম্পূর্ণ নিরাভরণ। অর্ণবের ইচ্ছে করছিল হাতের পাতাটা নিজের হাতের মধ্যে তুলে নেয়। তাই মন ঘোরাতে কফিতে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে প্রসঙ্গ বদলান। স্কুলের গল্প, কলেজের গল্প। ছোটবেলায় কোন্ননগরে মামাবাড়ি যাওয়া। একটু একটু করে মুখ খুলছে সুমিতাও। কেমন ইচ্ছে করত ছ'কোনা হলুদ পেন্সিলের একটা গোটা বাক্স পেতে। কিন্তু কোনওদিন সাহস করে মাসিকে বলতে পারেনি। নতুন সেন্টেড ইরেজার হারিয়ে ফেলে কী ভীষণ ভয় পেয়েছিল।
কফি-ব্রাউনি শেষ করে ওঠে দু'জনে। রিভারসাইড রোডে যাওয়ার রাস্তাটা ফাঁকা। দু-পাশে একটু দূরে দূরে বাংলো প্যাটার্নের কোয়ার্টার্স। অনেকখানি হাতার ভিতরে ঘরের আলো দেখা যায়। মাঝে মাঝে ঝোপ-ঝাপ। পূর্ণিমা কাছাকাছি হবে বোধহয়। চাঁদ উঠে গেছে। ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় ভিজে যাচ্ছে চারপাশ। নিঃশব্দে গাড়ি চালাচ্ছিল অর্ণব। সামনের দিকে তাকিয়ে চুপ করে আছে সুমিতাও। কোয়ার্টার্সের কাছে এসে গাড়ি থামিয়ে অর্ণব বলল, প্যাকেটটা তো খুব ভারী। আমি পৌঁছে দিয়ে আসি?
না না, আমি পারব, থ্যাঙ্কিউ। আমার জন্য এতটা এলেন, আবার ফিরতে হবে তো।
ফিরতে তো হবেই। আপনি তো আর থাকতে দেবেন না। চা খাওয়ানোর ভয়ে, প্যাকেটটা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে দিচ্ছেন না।
না না, তা নয়।
কী বিপদ। আমি তো জানি, তা নয়। কিন্তু আপনি তো কফি খাওয়ানোর নেমন্তন্নটাও করছেন না!
কফি খাওয়ানোর নেমন্তন্ন!
বাঃ, এর মধ্যেই ভুলে গেলেন! আপনি তো দেখছি ভারি বিপজ্জনক মহিলা। কথা হল না, আজ কফিটা আমি খাওয়াব, এর পরের দিন আপনার টার্ন?
হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়। কবে যাবেন বলুন?
ডেট এবং টাইম ঠিক করা আপনার দায়িত্ব। আমার আপাতত যা ডিউটি শিডিউল, তাতে বিকেলটা ফ্রি থাকছি। মোবাইল নম্বর তো আছে আপনার কাছে। জানিয়ে দেবেন।
গাড়িটা ঘুরিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন ডাঃ অর্ণব মিত্র। অঞ্জলির ঘরে আলো জ্বলছে। তারমানে বাড়ি ফিরেছে। কিন্তু গেল না সুমিতা। প্যাকেটটা তুলে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
না, ফ্রেশ হতে ইচ্ছে করছে না। বসার ঘরের ডিভনটায় ধপ করে বসে পড়ল সুমিতা। সমস্ত শরীর অবশ লাগছে। আবার ঘনিয়ে আসছে মেঘ। অর্ণব মিত্রের চোখের ভাষায় ইঙ্গিত স্পষ্ট। বহু যুগ ধরে মানব-মানবীর শিরায় শিরায় বয়ে যাওয়া অনুভূতি অনায়াসে চিনিয়ে দেয় সেই ভাষার অর্থ।
এর আগে শৌনক তারপর সুমিত্র। দু'জনকেই ফিরিয়ে দিয়েছে সুমিতা। ফিরিয়ে দিয়ে নিজে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। পালিয়ে এসেছে কলকাতা শহর ছেড়ে। নির্জনতার ঘেরাটোপের মধ্যে বন্দি করে রেখেছে নিজেকে। সীমিত করেছে মেলামেশার গণ্ডি। কিন্তু তবু পারল কই?
কেমন যেন দুর্বল লাগছে নিজেকে সুমিতার। বয়স প্রায় তিরিশ হল। যৌবনের প্রান্তভাগে পৌঁছতে আর খুব বেশি দেরি তো নেই। কেন সব সাধ সে অপূর্ণ রাখবে? কেন বঞ্চিত করবে নিজেকে বারবার? অন্ধকার ঘরে চুপ করে বসে আবার একটা নির্ঘুম রাতের জন্য প্রস্তুতি নেয় সুমিতা।

আমার মা অপরাজিতা দাশগুপ্ত আপনাদের ব্যাঙ্কে একটা ফিক্সডডিপোজিট করেছিলেন। এই ব্রাঞ্চেই। আমি সেই অ্যাকাউন্টটার ব্যাপারে একটু খোঁজখবর নিতে এসেছিলাম। মা মারা গেছেন। তিনি তাঁর সব সম্পত্তিরই নমিনি আমাকে করে গেছেন।
কত টাকার ফিক্সডডিপোজিট ম্যাডাম?
ইনিসিয়ালি তো দশ লক্ষ টাকার করেছিলেন। এখন টাকাটা কত দাঁড়িয়েছে সেটাও আমার জানা দরকার।
আপনি কাগজপত্রগুলো দিন, আমি দেখছি।
ব্যাগ থেকে কাগজটা বার করে দেয় শ্রীময়ী। দু'দিন আগেই মায়ের আলমারি ঘেঁটে ফিক্সড ডিপোজিটের রসিদটা খুঁজে বার করেছে সে। সাধারণত মায়ের ব্যাঙ্কের সব দরকারি কাগজ যে তিনটে ফোল্ডারে থাকে সেখানে এটা ছিল না। বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর একটা পাতলা ব্রাউন পেপারের খামের ভিতর থেকে রসিদটা বেরোল।
রসিদটা পাওয়ার পরই ব্রাঞ্চ ম্যানেজারকে ফোন করেছিল শ্রীময়ী। লেদার গুডসের ডিরেক্টর ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইছেন জেনে নতুন অ্যাকাউন্ট পাওয়ার আশায় ম্যানেজার খুবই খুশি হয়েছিলেন নিশ্চিত। কিন্তু এখন শ্রীময়ী তার মায়ের পুরোনো ফিক্সডডিপোজিটের খোঁজে এসেছে শুনে যে বেশ হতাশ হয়েছেন সেটা স্পষ্টই বোঝা গেল।
ম্যাডাম, আপনার মায়ের অ্যাকাউন্টটা পাওয়া গেছে। কিন্তু আমার মনে হয় আপনি এই অ্যাকাউন্টটা অ্যাকসেস করতে পারবেন না। কারণ এটার নমিনি আপনি নন। উনি গুড়িয়া নামের একজনকে নমিনি করে গেছেন। অ্যাকাউন্ট যখন খোলা হয়, তখন গুড়িয়া মাইনর ছিল। তাই আপনার মা ন্যাচারল গার্জেন হিসাবে অ্যাকাউন্ট হ্যান্ডেল করতেন। এতদিনে গুড়িয়া তো মেজর হয়ে গেছেন। কিন্তু অ্যাকাউন্টটা ওনার নামে ট্রান্সফার করা হয়নি। অন্য কারুর নামেও করা হয়নি। তারমানে আপনার মা যেহেতু মারা গেছেন, তাই নমিনি হিসাবে গুড়িয়াই টাকাটা পাবেন।
কিন্তু এই গুড়িয়া যে কে, সেটাই তো আমরা বুঝতে পারছি না। ওনার কোনও ঠিকানা, ফোন নম্বর বা রেফারেন্স কিছু দেওয়া আছে?
না ম্যাডাম, কিছু দেওয়া নেই। থাকা সম্ভবও নয়। কারণ গুড়িয়া তো তখন মাইনর। তাই গার্জেনের ঠিকানাটাই জরুরি ছিল। পরে যদি ওনার নামে অ্যাকাউন্টটা ট্রান্সফার হত, তাহলে নিশ্চয় নাম-ঠিকানা সবই থাকত। কিন্তু সেটা তো আপনার মা করেননি।
এটা তো হতেই পারে যে মা কোনও বিশেষ কারণে টাকাটা একজনের নামে রেখেছিলেন। পরে নমিনি বদলে দেবেন ভেবেছিলেন।
হতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে আমরা কিছু করতে পারব না। কারণ আপনার মা নমিনি চেঞ্জ করার ব্যাপারে ব্যাঙ্ককে কিছু না জানালে নমিনি গুড়িয়াই থাকবেন।
আচ্ছা, এই অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আর কারুর কোনও লেনদেন হয়?
দেখুন, আপনার মা আমাদের কাস্টমার ছিলেন। তাঁর অ্যাকাউন্টের বিষয়ে অন্য কাউকে কিছু জানানো ব্যাঙ্কের এথিক্সের বিরোধী। কিন্তু আপনি যেহেতু ওনার মেয়ে, তাই এটুকু বলতে পারি, ফিক্সড ডিপোজিটের ইন্টারেস্টের টাকা, আপনার মায়ের নির্দেশ মেনেই প্রতি মাসে অন্য একটি অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়।
এবার রীতিমতো চমকে ওঠে শ্রীময়ী।
ট্রান্সফার করা হয় মানে! এখনও করা হয়?
হ্যাঁ ম্যাডাম। প্রতিমাসে। এটা অপরাজিতা দাশগুপ্তের একদম লিখিত নির্দেশ।
কার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়?
সেটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় ম্যাডাম। ব্যাঙ্কের কিছু নিয়ম আছে। কাস্টমারের ব্যাঙ্ক ডিটেলস আমরা অন্যকে জানাই না।
এএনসি ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বেশ নীতিবাগীশ লোক। শ্রীময়ীর অনেক অনুরোধেও অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের ডিটেইলস দিতে রাজি হলেন না। লেদার গুডসের একটা তিন কোটির অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার করার লোভ দেখিয়েও লাভ হল না।
হতাশ হয়ে ফিরে এল শ্রীময়ী। কিন্তু এই ব্যাপারটা তার মাথার মধ্যে সারাক্ষণ ঘুণ পোকার মতো ঘুরঘুর করতে লাগল। কে এই গুড়িয়া? কেন মা তার নামে এতগুলো টাকা রাখল? ইন্টারেস্টের টাকা কে তোলে? তার সঙ্গে কি এই গুড়িয়ার কোনও সম্পর্ক আছে?
স্বাভাবিক বুদ্ধিতে কতগুলো সরল সমীকরণ টানাই যায়। গুড়িয়া যেই-ই হোক মা টাকাটা তাকে দিয়েছেন, মানে তিনি চেয়েছেন তার জন্যই টাকাটা খরচা হোক। মেয়েটি তখন যেহেতু একেবারেই শিশু তাই তার ভরণপোষণের জন্যই টাকাটা কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন মা। মাসে মাসে টাকা দেওয়ার ঝামেলা না রাখতেই ফিক্সড ডিপোজিটের ব্যবস্থা। তার মানে ইন্টারেস্টের টাকা যে তুলছে, তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বাচ্চাটাকে মানুষ করার। সে যাতে কাজটা ঠিকঠাক করতে পারে সেজন্য মা টাকার রাশ নিজের হাতে রেখেছিলেন।
তাহলে কি ইন্টারেস্ট যিনি তুলছেন গুড়িয়া তারই মেয়ে? কিন্তু সেক্ষেত্রে মা তো সরাসরি তাকেই টাকাটা দিতে পারতেন। এরা কি মায়ের কোনও দুঃস্থ আত্মীয় কিংবা বন্ধু-বান্ধব? কিন্তু তাহলে ব্যাপারটা নিয়ে এত গোপনীয়তা কেন?
মা নিজে ব্যবসা চালাতেন। তিনি নিজে থেকে না বললে শ্রীময়ীর বাবা কখনও তাঁর কাজে মাথা গলাতেন না। সেক্ষেত্রে তো মা অনায়াসেই তাদের নিত্যদিন যে ব্যাঙ্কের সঙ্গে কারবার সেখানেই ফিক্সড ডিপোজিট করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে একটা প্রায় অখ্যাত ব্যাঙ্কে, এই অ্যাকাউন্টটা খুলেছেন। তাহলে কি এর মধ্যে অন্য কোনও গল্প আছে! এই গুড়িয়া এবং আরও একজন অজানা মানুষ কি এমন কেউ, যাদের সম্বন্ধে মা কাউকে কিছু জানাতে চাননি?
অদ্ভুত একটা সন্দেহের কাঁটা খচখচ করছে শ্রীময়ীর মনের মধ্যে। সমরেশকে সে এখনও পর্যন্ত এবিষয়ে একটাও কথা বলেনি। দু-একবার বলতে গিয়েও মনে হয়েছে, বলাটা উচিত হবে না। কারণ কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কী সাপ যে বেরোবে তা তো সে নিজেই জানে না।
সাধারণত মেয়েদের সঙ্গে মায়ের যে একটা স্বাভাবিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকে, শ্রীময়ীর সঙ্গে অপরাজিতার কখনোই সেটা তৈরি হয়নি। মা চিরকালই তার কাছে একজন লৌহশীতল, দূরের মানুষ। অথচ তার ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব শুধুমাত্র মায়ের। সেখানে কারুর এতটুকু নাক গলানোর কিংবা মতামত দেওয়ার কোনও অধিকার নেই। তবে কর্তৃত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি শ্রীময়ীর প্রতিটি প্রয়োজনের দিকেও তীক্ষ্ন নজর ছিল অপরাজিতার। জামা-কাপড়, বই-খাতা থেকে শুরু করে স্কুলের হ্যান্ডিক্রাফটের প্রতিটি খুঁটিনাটি জিনিস পর্যন্ত ঠিক সময়ে তার ঘরে মজুত থাকত। এমনকী কোন বয়সে শ্রীময়ীর ঠিক কীরকম অন্তর্বাস দরকার সেটাও অপরাজিতা ঠিকঠাক বুঝতেন এবং ঠিক জিনিসটি কিনে নিয়ে আসতেন। কিন্তু মেয়েকে কোনও বিষয়ে এতটুকু স্বাধীনতা দিতে রাজি ছিলেন না তিনি।
শ্রীময়ী গার্লস স্কুলে পড়েছে। তারপর গার্লস কলেজ। এমনকী ইউনিভার্সিটিতেও তার সঙ্গে একজন লোক যেত, যে ক্লাসের বাইরে বসে পাহারা দিত শ্রীময়ীকে। কথাটা শুনলে অবাস্তব মনে হতে পারে, কিন্তু অপরাজিতা এই শর্তেই শ্রীময়ীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেতে দিতে রাজি হয়েছিলেন। তিনি যেন চাইতেন সম্পূর্ণ পুরুষবর্জিত পরিবেশে শ্রীময়ী মানুষ হোক।
বাড়ির গাড়িতে সর্বত্র যাতায়াত। ড্রাইভার ছাড়াও মায়ের খাস লোক মলিনাদি থাকত সঙ্গে। কোনও মেয়ে বন্ধুর বাড়িতেও রাত কাটানোর কিংবা জন্মদিনের পার্টি বা গেট টুগেদারে যাওয়ার হুকুম ছিল না। অদ্ভুত এক দুঃসহ বন্দি জীবন! মাঝে মাঝে পাগল পাগল লাগত শ্রীময়ীর। বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে হত। মনে হত বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেদিকে দু'চোখ যায় চলে যেতে। কিন্তু মায়ের ওইরকম শাসনের মধ্যে থেকে এমন একটা অভ্যাস হয়ে গেছিল যে নিজের মতো করে কিছু করার কথা ভাবতে ভয় লাগত।
অথচ সে যখন খুব ছোট, তখন কিন্তু মা মোটেই এরকম ছিলেন না। শ্রীময়ীর আবছা মনে পড়ে তার যখন বছর সাতেক বয়স, মা-বাবার সঙ্গে সে দার্জিলিং বেড়াতে গেছে। পাহাড়ি রাস্তায় দু'জনের হাত ধরে বেড়াচ্ছে। তার ছেলেমানুষি কাণ্ড-কারখানা দেখে মা হেসে বাবার গায়ে গড়িয়ে পড়ছেন। খাওয়া নিয়ে বায়না করলে মা কোলে বসিয়ে খাইয়ে দিচ্ছেন। কোথাও কোনও ভয় কিংবা আশঙ্কার চিহ্নমাত্র সেই স্মৃতিতে নেই।
অন্য মেয়েদের থেকে বেশ খানিকটা আগে পিরিয়ডস শুরু হয়েছিল শ্রীময়ীর। রক্ত দেখে ভয় পেয়ে ছুটে এসেছিল মায়ের কাছে। মা কিন্তু তাকে পরিষ্কার করে দিয়ে, সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এরকম হলে কী করতে হবে। এটা যে মেয়েদের একটা খুব স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থা সেটাও বলেছিলেন। ছোট্ট শ্রীময়ী তার অনেক বন্ধুর কাছেই শুনেছে যে পিরিয়ডস হওয়ার পর তাদের মা বলেছেন যে এটা মেয়েদের জন্য ভীষণ লজ্জার। কারুর সামনে এসব কথা বলবে না। বাবা কিংবা ভাইদেরও না। এই সময় ঠাকুরঘরে যাওয়া নিষেধ। এমনকি গতজন্মের পাপের জন্যই নাকি মেয়ে হয়ে জন্মে এই শাস্তি ভোগ করতে হয় এমন কথাও তার বন্ধু মণিকা, ঠাকুমার কাছে শুনেছিল।
অপরাজিতা কিন্তু এসব কিছুই বলেননি। তাদের বাড়িতেও পুজো-আচ্চা হয় না, এমন নয়। কিন্তু তাহলেও পিরিয়ডস চলাকালীন মা কোনওদিনই শ্রীময়ীর ঠাকুরঘরে যাওয়া নিয়ে মাথা ঘামাননি। অথচ সে ঋতুমতী হওয়ার পর থেকেই কিন্তু এই বদলটা হয়েছিল। শ্রীময়ীর হেসে-খেলে বেড়ানো স্বাভাবিক জীবনটা হঠাৎ যেন চারটে দেওয়ালের মধ্যে আটকে দিয়ে দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছিলেন অপরাজিতা। অনেক ভেবেও মায়ের এই বদলের রহস্য এখনও পর্যন্ত শ্রীময়ী খুঁজে পায়নি।
শুধু রহস্য বলাটা বোধহয় ঠিক নয়। মায়ের এই ধরনের আচরণের পিছনে কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণও খুঁজে পায়নি শ্রীময়ী। কারণ তাকে নিয়ে মায়ের যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
শ্রীময়ী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, তখন থেকেই অপরাজিতা তাকে মাঝে মাঝে অফিসে নিয়ে যেতেন। তাঁর ঘরেই পাশে একটা আলাদা টেবিলে শ্রীময়ী বসত। লেদার গুডসের কাজকর্ম কীভাবে চলে সেটা যাতে শ্রীময়ী হাতে-কলমে শিখতে পারে সেজন্যই এই ব্যবস্থা করেছিলেন অপরাজিতা। কোম্পানির জরুরি মিটিং-এও তাকে যোগ দিতে হত। মিটিং-এর আগে মেয়ে ঠিকঠাক প্রস্তুতি নিচ্ছে কিনা সেদিকেও নজর রাখতেন অপরাজিতা।
তখন অনেক সময় বাড়ি ফিরে মায়ের সঙ্গে তার অফিস সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনাও হত। অপরাজিতা খুব যত্ন করে মেয়েকে অফিসের বিভিন্ন পলিসি, কীভাবে কাজ হয়, কী করলে কোম্পানির লাভ হতে পারে, সব বুঝিয়ে দিতেন। তখন যেন তিনি একজন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ।
কারখানার কাজ ঠিকঠাক চলছে কিনা সেটা জানার জন্য সেখানেও যেতে হত শ্রীময়ীকে। তবে কখনোই একা নয়। অফিসের কাজ, বিশেষ করে মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দিলেও মেয়েকে এক মুহূর্তের জন্য চোখছাড়া করতেন না অপরাজিতা।
সমরেশের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থাও অপরাজিতা নিজেই করেছিলেন। এব্যাপারে মেয়ের কোনও মতামতও নেননি। সমরেশের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ কীভাবে হয়েছিল শ্রীময়ী জানে না। তবে কথাবার্তা এটাই ছিল যে বিয়ের পর শ্রীময়ী আর সমরেশ জয়েন্ট ডিরেক্টর হিসাবে তার বাবার কোম্পানির দায়িত্ব নেবে এবং তারা স্বামী-স্ত্রী এই বাড়িতেই থাকবে।
শ্রীময়ীর শ্বশুরবাড়ি কোচবিহারে। খুবই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। সমরেশের আরও দুই ভাই আর এক বোনও আছে। যে কোনও কারণেই হোক, শ্রীময়ীর শ্বশুর-শাশুড়ি অপরাজিতার শর্ত মেনে নিয়েছেন। তবে তাঁদের সঙ্গে কোনও অসদ্ভাব একেবারেই নেই।
শ্রীময়ী হয়তো খুব বেশি শ্বশুরবাড়ি যায় না। কিন্তু সমরেশ ছেলে হিসাবে তার সব কর্তব্যই করে, নিয়মিত যোগাযোগও রাখে। এব্যাপারে অপরাজিতার কোনওদিন কোনও আপত্তি তো ছিলই না বরং তিনি তাঁদের যে কোনও প্রয়োজনে পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন।
সমরেশের সঙ্গে প্রথম আলাপের দিনটা বেশ স্পষ্ট মনে আছে শ্রীময়ীর। সেদিন অফিসে একটা জরুরি মিটিং ছিল। মায়ের সঙ্গে শ্রীময়ীও গেছিল অফিসে। অপরাজিতা বারবার তাড়া দিচ্ছিলেন যাতে মিটিং তাড়াতাড়ি শেষ হয়।
সব হয়ে যাওয়ার পর তারা যখন গাড়িতে ফিরছে, তখন হঠাৎ মা বললেন, রাই, তুমি বাড়ি গিয়ে একটু জামা-কাপড় বদলে ফ্রেশ হয়ে নিও। একটি ছেলে তোমার সঙ্গে আজ দেখা করতে আসবে। আমি ওর সঙ্গে তোমার বিয়ে ঠিক করেছি।
রীতিমতো চমকে উঠে শ্রীময়ী বলেছিল, বিয়ে ঠিক করেছ মানে? আমার মতামত না নিয়েই বিয়ে ঠিক করে ফেলেছ?
তুমি এখনও ছেলেমানুষ। তোমার কীসে ভালো হবে, সেটা আমি তোমার থেকে ভালো বুঝব। সেইজন্যই ঠিক করেছি। তাছাড়া তুমি যাতে আলাপ করতে পারো, সেজন্যই ছেলেটিকে আজ আসতে বলেছি। কথা বলে দ্যাখো। যদি কোনও কারণে তোমার সত্যিই অপছন্দ হয়, তাহলে আমাকে জানিও। শুধুমাত্র আমি পছন্দ করেছি বলে তাকে নাকচ করার মতো বোকামি করতে যেও না। ছেলেটির নাম সমরেশ। শিক্ষিত, বুদ্ধিমান। সবদিক বিবেচনা করেই আমার ওকে তোমার উপযুক্ত বলে মনে হয়েছে।
তার মানে তো তুমি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছ। ওর তো আর নড়চড় হবে না। শুধু শুধু আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার নাটকটা কেন করছ? একেবারে বিয়ের পিঁড়িতে বসেই নাহয় দেখতাম।
মেয়ের গলার তীব্র অভিমান বুঝতে অসুবিধা হয়নি অপরাজিতার। তবে তিনি সেটাকে গুরুত্ব দেননি মোটেই। বরং স্বাভাবিক গলাতেই বলেছিলেন, সেটা করাটা ঠিক হবে না। তোমার একবার দেখা দরকার। হতে পারে বিশেষ কিছু আমার চোখ এড়িয়ে গেছে সেটা তুমি বুঝতে পারবে। তাছাড়া ছেলেটিও তোমাকে একেবারেই না দেখে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যাবে এমনটাও তো আশা করা ঠিক নয়!
গাড়িতে আসতে আসতে অনেক কিছু ভেবেছিল শ্রীময়ী। নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে। অপরিচিত ছেলেটিকে এমন খারাপ খারাপ কথা বলবে যাতে সে পালিয়ে যায়। পাগলের মতো উদ্ভট সেজে গিয়ে বসবে।
কিন্তু কার্যক্ষেত্রে কিছুই করে উঠতে পারেনি। মলিনাদির নির্দেশমতো একটা গোলাপি আর সবুজের কাজ করা সিল্কের শাড়ির সঙ্গে হালকা প্রসাধন আর অল্প কিছু গয়না পরে লিভিংরুমে গিয়ে বসতে হয়েছিল।
সমরেশ একটা লেমন ইয়ালো আর সাদা চেক শার্টের সঙ্গে কালো ট্রাউজারস পরেছিল। তাদের দু'জনের আলাপ করিয়ে দিয়ে উঠে গেছিলেন অপরাজিতা। তারপর বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তাও হয়েছিল।
সত্যি কথা বলতে কি, যতখানি বিরূপ মন নিয়ে কথা বলতে বসেছিল শ্রীময়ী, সমরেশের সঙ্গে আলাপের পর সেটা কিন্তু অনেকটাই কেটে গেছিল। কারণ সমরেশ হচ্ছে ইংরাজিতে যাকে বলে প্লিজিং পার্সোনালিটি, সেই ধরনের মানুষ। তার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে। শান্ত, ধীরস্থির কিন্তু রসবোধও আছে। অন্যের কথা মন দিয়ে শোনে। নিজের মত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে না। শ্রীময়ীর মনে হয়েছিল, অপরাজিতার শাসনের বাঁধন থেকে বেরনোর জন্য যদি এই মানুষটির হাত ধরতে হয়, তাহলে সেটা খুব খারাপ কিছু হবে না।
রাতে খাবার টেবিলে নিজের মত মাকে জানিয়ে দিয়েছিল শ্রীময়ী। অপরাজিতা সম্ভবত খুশিই হয়েছিলেন। যদিও মুখের ভাবে বিশেষ কিছু প্রকাশ পায়নি।
তার মাস দেড়েকের মধ্যেই অপরাজিতা দাশগুপ্তের মেয়ের উপযুক্ত ধুমধামের সঙ্গেই বিয়ে হয়ে গেছিল। বছর তিনেকের মাথায় তিথি। স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন। সমরেশের সঙ্গে ঝগড়া-ঝাঁটি হয় না শ্রীময়ীর। মতের অমিলও খুব বেশি নেই। আসলে দু'জনেই দু'জনকে মানিয়ে চলে। অশান্তি এড়িয়ে যায়। নির্ভরও করে পরস্পরের ওপর। তবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সাধারণত যে সুন্দর বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকে সেটা তাদের মধ্যে নেই। সম্ভবত পরস্পরকে ভালো করে না চিনেই বিয়েটা করে ফেলতে হয়েছে বলে সেটা গড়ে ওঠেনি।
আশ্চর্যের ব্যাপার, বিয়ের পর থেকেই মেয়ের ওপর অপরাজিতার নজরদারি কমে গেছিল। তিথি হওয়ার পর সেটা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে কাজের জগৎ থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিলেন তিনি। লেদার গুডসের পুরো দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন শ্রীময়ীকে।
মায়ের কাজের পরম্পরা বিচার করলে কিছুতেই যেন মেলাতে পারে না শ্রীময়ী। যে মানুষটার সামাজিক অনেক বিষয়েই তেমন কোনও সংস্কার নেই, যিনি মেয়েকে কোম্পানির দায়িত্ব নেওয়ার উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছেন, তাঁকে তো কোনওভাবেই রক্ষণশীল বলা যেতে পারে না। কিন্তু তাহলে শ্রীময়ীর প্রতি তাঁর আচরণকে কোন যুক্তি দিয়ে ব্যাখা করবে সে?
নিজের জীবনেও শ্রীময়ীর মা মোটেই পুরোনো চিন্তা-ভাবনাকে আঁকড়ে থাকতেন না। রীতিমতো অ্যাক্টিভ সোশ্যাল লাইফ ছিল তাঁর। পুরুষ বন্ধুও ছিল বেশ কয়েকজন। বাবা বেঁচে থাকতে নিয়মিত পার্টিতে যাওয়া, ডিনার, নাচ সবই চলত। অল্পবিস্তর মদ্যপানেও আপত্তি ছিল না কোনও। মা দামি শিফনের শাড়ি পরে, সেজেগুজে বাবার সঙ্গে সন্ধের পর বেরিয়ে যাচ্ছেন, ফিরছেন যখন তখন রাই ঘুমিয়ে পড়েছে, এমনটা প্রায়ই ঘটত।
বাবা মারা যাওয়ার পরও তার খুব যে বদল হয়েছিল তাও নয়। কলকাতার এলিট মহলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অপরাজিতা দাশগুপ্তের উপস্থিতি ছিল বাঁধা। কিন্তু সেইসব জায়গায় শ্রীময়ীর কোনও প্রবেশাধিকার ছিল না। অপরাজিতা কখনও তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন না। অথচ বিয়ের পর সমরেশ আর অপরাজিতাকে একসঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়ে সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে তার মা-ই।
অল্পবয়সে অপরাজিতা রীতিমতো সুন্দরী ছিলেন। গায়ের রঙ খুব ফর্সা ছিল না ঠিকই, কিন্তু লম্বা, ছিপছিপে চেহারায় আকর্ষণ ছিল যথেষ্ট। ভালো ব্যাডমিন্টন খেলতে পারতেন, চমৎকার ইংরাজি বলতেন এবং ইংরাজি গানের সঙ্গে পা মেলাতেও দক্ষ ছিলেন। রুচিবোধও ছিল যথেষ্ট উন্নতমানের। কখনও শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু পরতেন না। কখনও অতিরিক্ত প্রসাধন করতে কিংবা এক গা গয়নাও পরতেন না। কিন্তু যতটুকু পরতেন তাতেই তাঁকে দিব্যি ঝলমলে দেখাত। এহেন মহিলার কোনও পুরুষ অনুরাগী থাকবে না, এ তো আর হতে পারে না। নিশ্চয় ছিল।
শ্রীময়ীর মাঝে মাঝে মনে হয়, শেষের দিকে বাবার সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক যে ক্রমশ শীতল হয়ে গেছিল তার কারণ হয়তো কোনও তৃতীয় ব্যক্তি। দু'জনেই তখন নিজেদের কাজ আর সোশ্যাল লাইফ নিয়ে ব্যস্ত। পরস্পরকে দেওয়ার মতো সময় নেই বললেই চলে। তবে এই তৃতীয় ব্যক্তিটি যে কে হতে পারে সে সম্বন্ধে কোনও ধারণা নেই শ্রীময়ীর।
শ্রীময়ীর বাবা তার মায়ের সম্পর্কে মনে মনে কী ভাবতেন জানা নেই। কোনোদিন বাবাকে মায়ের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করতেও শোনেনি সে। মাও কখনও বাড়িতে নিজের বন্ধু-বান্ধবদের সম্বন্ধে কোনও কথা বলতেন না। নিজের ব্যক্তিজীবন এবং বাইরের জগতের থেকে সংসারকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর।
গুড়িয়ার সঙ্গে মায়ের এই বাইরের বন্ধুর জগতের কোনও যোগ নেই তো? বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বসলেই এই ভীষণ অনুচিত চিন্তাটা মাথার মধ্যে এসে যাচ্ছে শ্রীময়ীর। কারণ, সে হিসেব করে দেখেছে, যে সময় মা ওই বাচ্চাটির নামে টাকাটা ফিক্সড ডিপোজিট করলেন, সেই সময় পরিতোষ দেশে ছিলেন না। তিনি একটা বিশেষ কোর্স করতে দু'বছরের জন্য জার্মানি গেছিলেন।

বাংলায় একটা কথা আছে না, যার সঙ্গে যার মজে মন, কিবা হাঁড়ি কিবা ডোম। কে বলেছিলেন ঠিক মনে নেই। রামী-চণ্ডীদাসের প্রেম নিয়েই সাধারণত বলা হয়। তবে এ একেবারে দার্শনিক কথা বুঝলেন মশাই? এত বড় সত্যি জগতে আছে কিনা সন্দেহ। তাও পুরুষমানুষের ক্ষেত্রে কিছু কিছু বোধহয় মাপকাঠি থাকে, কিন্তু মহিলারা একেবারেই দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যা।
নিজের পাইপটাতে খোঁচাখুঁচি করতে করতে কথাগুলো বললেন অমিয় নন্দী।
ক'দিন ধরেই বেশ ভালোরকম ঠান্ডা পড়েছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। পারদ এখন ক্রমশ নামবে। দিনের বেলায় ঝকঝকে রোদ থাকে বলে অসুবিধা নেই। কিন্তু সন্ধের পর আর ঘর থেকে বেরোনোর প্রশ্ন নেই।
বিকেলের আলো কমে এলেই হলঘরের হিটারগুলো জ্বালিয়ে দেয় প্রতিমা। হলঘরটা বেশ বড়। ভারী সোফা দিয়ে সাজানো। পুজোর পরে জানলার হালকা পর্দাগুলো বদলে ঘন রঙের ভারী পর্দা লাগায়। এখন যেমন অফহোয়াইট আর সোনালি কাজ করা সোফার কভারের সঙ্গে কন্ট্রাস্টে ঘন মেরুন পর্দা ঝুলছে জানলায়। মাঝখানে একটা বড় সেন্টার টেবিল আর এপাশে-ওপাশে ছড়ানো ছোট ছোট টেবিল। মেঝেতে পিচরঙের উলের নরম কার্পেট। দু'কোণে দুটো টুপি পরানো স্ট্যান্ড ল্যাম্প। সবমিলিয়ে একটা ভারী উষ্ণ আরামদায়ক পরিবেশ।
শীতের সময় বাইরে বেরোনো যায় না। বিকেল না হতেই ঝুপঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। তাই লম্বা সন্ধে কাটানোর জন্য এরকম একটা ঘরে আড্ডা দিব্যি জমে ওঠে।
সন্ধে একটু গড়ালে প্রতিমা এক পাত্তর করে ওয়াইন সার্ভ করে। ডিনারের আগে অ্যাপেটাইজার। যে-কোনও কারণেই হোক এই সান্ধ্য আড্ডাটা পুরুষদের বেশি পছন্দের। মহিলারা যে আসেন না তা নয়, তবে নিয়মিত নয়। আজই যেমন বেশ একটা হার্ট টু হার্ট মেল টকের জমাটি আসর বসেছে। আর খুব স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যমণি অমিয় নন্দী। গল্পের মুখপাত দেখেই বোঝা যাচ্ছে তার মধ্যে দিব্যি রসাল সব উপাদান আছেই।
ওয়াইন দেওয়ার সময় এখনও হয়নি। তাই শালুকে কফির ট্রে দিয়ে পাঠিয়ে নিজে রান্নাঘরে ডিনারের তদারকিতে নেমে পড়ল প্রতিমা।
পাইপ আপনার অনেকক্ষণ সাফ হয়ে গেছে। এবার ওটা ধরিয়ে একটু ঝেড়ে কাশুন দেখি নন্দীসাহেব! কফির সঙ্গে গল্পটা জমবে ভালো।
গরমকাপড়ের পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর শালটা ভালো করে জড়িয়ে গুছিয়ে বসে কথাটা বললেন প্রণব তালুকদার। রেলের বড় অফিসার ছিলেন উনি। পৈতৃক সম্পত্তিও ছিল অনেক। দুই ছেলেই বিদেশে। তাই স্বামী-স্ত্রী এখানে চলে এসেছেন। স্ত্রী আবার একটু ভক্তিমতি মানুষ। সকাল-বিকেল পুজো-আহ্নিকেই অনেকটা সময় কেটে যায়। তালুকদার নিজে ওসবের ধারপাশ মাড়ান না। রসে-বশে থাকতেই ভালোবাসেন। তাই অমিয় নন্দীর সঙ্গে জমে ভালো।
তবে নন্দীর গল্প শোনার আগ্রহ সবারই আছে। তাই মুখে কিছু না বললেও দোতলার স্বপন মজুমদার, বাণীব্রত মল্লিক কিংবা হেমবীর সিং সকলেই যে বেশ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
অমিয় নন্দী নিজেও সেটা বেশ জানেন এবং উপভোগও করেন। তাই ধীরে-সুস্থে পাইপ খোঁচানো শেষ করে, লাইটার জ্বেলে সেটি ধরিয়ে বেশ আয়েশ করে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, আসল গল্পে আসছি। কিন্তু তার আগে একটা কথা বলি। আমার পাইপ নিয়ে খোঁটা দিলেন তো তালুকদার সাহেব, কিন্তু আপনি কি জানেন যে বাংলা কিংবা হিন্দি ছবিতে এই যে অসংখ্য হিরো কিংবা হিরোর বাবাদের পাইপ টানতে দেখা যায়, তারা কেউ পাইপ ধরতেই জানে না?
মানে, আপনাদের এই কমল মিত্র, বিকাশ রায় থেকে শুরু করে অশোককুমার পর্যন্ত কেউ না! ঠিকঠাক পাইপ ধরতে জানতেন আমাদের আগের প্রজন্মে দু'জন। একজন অবশ্যই মানিকদা মানে আপনাদের সত্যজিৎ রায়। আরেকজন হচ্ছেন তাঁরই হাতে গড়া অভিনেতা হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়। দু'জনেই গত হয়েছেন। তাই এখন যদি কাউকে পাইপ ধরা শিখতে হয়, তাহলে আসতে হবে এই শর্মার কাছেই।
বলিউডের ডিরেক্টররা মাঝে-মাঝেই এসব ছোটখাটো জিনিস আমার কাছে শিখতে আসত। সবাই নয় অবশ্য, যারা ছবি তৈরির সময় ডিটেলের দিকে একটু বেশি নজর দেয় তারাই। যাদের ছবিতে নায়িকা গাড়ি চেপে যাচ্ছে, তখন লম্বা বিনুনি আর বাড়িতে গিয়ে নামার সময় ববকাট, তাদের কথা আলাদা। যে দর্শক নায়িকার এরকম ঘন ঘন রূপবদল দেখতে পছন্দ করে তাদের পাইপ কীরকমভাবে ধরা হল, তা নিয়ে কিছু আসে যায় না।
মিঃ নন্দী আপনি কিন্তু ট্র্যাক থেকে সরে যাচ্ছেন। কথা হচ্ছিল চণ্ডীদাস আর রামী রজকীনির প্রেম নিয়ে। তার থেকে পাইপ হয়ে একেবারে নায়িকাদের হেয়ার কাটে চলে গেলেন যে!
চিন্তা করবেন না মিঃ পাত্র, অমিয় নন্দী কখনও ট্র্যাক থেকে বেরোয় না। এগুলো হল গিয়ে ভণিতা বুঝলেন না! একটা গল্প তো আর এমনি এমনি বললে হয় না, তার একটা পরিবেশ তৈরি করতে হয়। সেই চেষ্টাই করছিলাম এতক্ষণ। যাই হোক, আপনারা যখন অধৈর্য হয়ে পড়েছেন তখন আর দেরি করে লাভ নেই।
সময়টা হচ্ছে আশির দশকের মাঝামাঝি বুঝলেন। তখন বলিউড কাঁপাচ্ছে লীনা সম্পত পরপর হিট। লীনা প্রথম দুটো-তিনটে ছবি অন্য নায়কদের সঙ্গে করেছিল। তারপর প্রীতম কপূরের সঙ্গে একটা ছবি ক্লিক করে গেল। প্রীতম আর লীনার জুটিটা পছন্দ হয়ে গেল পাব্লিকের। ব্যাস একের পর এক ছবি একেবারে বক্স অফিসে তোলপাড় ফেলে দিতে লাগল।
এই জুটি হিট করার ব্যাপারটাও কিন্তু ভারি মজার জানেন তো। এর কোনও নির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই। পরিচালক হয়তো খুব ভেবে চিন্তে একটা ছেলের সঙ্গে একটা মেয়েকে জুতে দিল। দু'জনেই খুব মানানসই। কাছাকাছি বয়স। নায়কের থেকে নায়িকার হাইট ছয় ইঞ্চি কম। হিরো মাজা রঙের হলে হিরোইন ফুটফুটে গোলাপি। কিন্তু অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রি হল না। হলে ছবি দেখতে এসে পায়রা উড়ল না। একটা বড় জোর দুটো ছবির পরেই জুটি ফুটুস!
আবার কিছুই হয়তো মিল নেই। মানানসই নয়। তবু দর্শকদের সাংঘাতিক পছন্দ হয়ে গেল। তারপর একটার পর একটা চিত্রনাট্য তাদের দু'জনকে ভেবেই লেখা হতে লাগল এরকমটাও হয়। এই যেমন বাংলায় দেখুন না উত্তমকুমারের সঙ্গে কতজন তো অভিনয় করেছেন, সুচিত্রা, সুপ্রিয়া, সাবিত্রী, মাধবী..। হিটও সবারই আছে। কিন্তু তবু জুটি বলতে উত্তম-সুচিত্রাই বোঝায়। তা লীনা আর প্রীতমের জুটিটা ছিল ওই সেকেন্ড ক্যাটাগরির। মানে হিরো-হিরোইনে কোনোই মিল নেই। অথচ অডিয়েন্সের পছন্দ হয়েছে।
লীনার ব্যাকগ্রাউন্ডটা খুব নর্মাল। মুম্বইয়ের মেয়ে। পড়াশোনা বিশেষ কিছু করেনি। তবে ভালো নাচত আর নাটকও করত। মুম্বইয়ের একটা মোটামুটি নামকরা গ্রুপের সঙ্গে নিয়মিত নাটক করত লীনা। সেই নাটক দেখতে গেছিলেন পরিচালক আশিস মেহরা। সস্ত্রীক গেছিলেন। কারণ নাটকের ডিরেক্টর ছিলেন আশিসের স্ত্রীর বন্ধু। সেই নাটক দেখেই লীনাকে পয়েন্ট করে মেহরা।
মেহরার কিন্তু চোখ সাংঘাতিক। যতগুলো ইয়াং আর্টিস্টকে ও এনেছে সবক'টা হিট করেছে।
তো লীনাকে বলিউডে এন্ট্রি দিল মেহরা। ওর ছবিতে কাজ করল লীনা। প্রথম ছবিতে অবশ্য হিরোইন হয়নি। কিন্তু বেশ ভালো রোল ছিল। কিন্তু সেকেন্ড ছবি থেকে আশিস মেহরার ছবিতে লীনা সম্পত হিরোইন। শুধু বাইরে নয় ঘরেও। মানে বুঝলেন তো? লীনাকে সরাসরি নিজের ঘরে ঢুকিয়ে নিল আশিস।
বান্দ্রাতে ওর একটা বড় বাংলো ছিল। সেখানে লীনা থাকত। আশিসও বেশিরভাগ সময় ওখানেই থাকত। ওর বউ-ছেলে-মেয়ে থাকত জুহুর বাড়িতে। আশিস আর লীনার প্রেম তখন বলিউডের সেরা গসিপ! আমি সেসময় পরপর আশিস মেহরার অনেকগুলো ছবির চিত্রনাট্য লিখছি। তাই প্রায়ই ওদের বান্দ্রার বাড়িতে যেতে হত। থাকতামও খুব কাছেই একটা ফ্ল্যাটে।
আমার একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ফিয়াট গাড়ি ছিল। সেটা প্রায়ই খারাপ হত। আশিস আর লীনার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা এতটাই বেশি ছিল যে অনেকসময় গাড়ি না থাকলে এবং বিশেষ দরকার থাকলে আমি লীনার গাড়িটা নিয়ে বেরোতাম। লীনা সাধারণত আশিসের গাড়িতেই স্টুডিও যেত বলে ওর গাড়িটা বাড়িতেই থাকত।
এদিকে যেটা হল প্রীতমের সঙ্গে ছবিতে রোম্যান্টিক দৃশ্যে অভিনয় করতে করতে একটা সময় লীনা তো প্রীতমের প্রেমে পড়ে গেল। যাওয়াটাই স্বাভাবিক। অত সুন্দর হিরো! তাছাড়া প্রীতমের কথাবার্তাও খুব চোস্ত। খানদানি বাড়ির ছেলে। কথায় কথায় শায়ের আওড়ায়। লীনার তো একেবারে হাবুডুবু অবস্থা। প্রীতমের অবস্থাও যে খুব সুবিধার তেমনও বলা যাবে না।
এদিকে লীনার পক্ষে আশিসকে ছেড়ে চলে যাওয়া সম্ভব নয়। একে তো আশিস ওর কেরিয়ার তৈরি করে দিয়েছে। তাছাড়া আশিসের তখন মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যা প্রভাব-প্রতিপত্তি তাতে ও যদি ব্যাগড়া দেয়, লীনা কোথাও কাজ পাবে না। যে ক'টা ছবি করেছে তার ভিডিও দেখতে হবে সারাজীবন ধরে। ফল যা হওয়ার তাই হল। লীনা আর প্রীতম লুকিয়ে প্রেম করতে লাগল।
আশিস সেই সময় ডিরেকশনের পাশাপাশি নিজের কোম্পানি খুলে ফিল্ম প্রডিউসও করছিল। ফলে ব্যস্ততা খুব বেশি। প্রায়ই তাকে মুম্বইয়ের বাইরে সিঙ্গাপুর, দুবাই, হংকং যেতে হয়। সেই সুযোগে প্রীতম আর লীনা এদিক-ওদিক চলে যায়। দু-পাঁচদিন কাটিয়ে আসে।
একবার ওইরকম আশিস সিঙ্গাপুর গেছে। সাধারণত আশিস না থাকলে আমি ওদের বাংলোতে যেতাম না। দুপুরে নিজের ঘরে বসে কাজ করছি, হঠাৎ ফোন। দেখি লীনা ফোন করছে। তখন তো আর মোবাইলের যুগ নয়। ল্যান্ডলাইন। তাতেই ফোন করেছে। গলার স্বর শুনে মনে হচ্ছে প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়েই ফোনটা করেছে।
খাজিলা বলে একটা জায়গায় লীনার শ্যুটিং ছিল। সেখানে কাজ মিটে গেছে দু'দিন আগেই। লীনা কিন্তু ইউনিটের সঙ্গে ফেরেনি। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। গ্রুপের লোক প্যাক আপ করে চলে আসার পর প্রীতম নিজের গাড়ি নিয়ে সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছে। তারপর দু'জনে মিলে দিব্যি মস্তি করছিল।
এদিকে আশিসের যেদিন ফেরার কথা তার দু'দিন আগে কাজ শেষ হয়ে গেছে। সেই খবরটা লীনাকে ফোন করে দিতে গিয়ে হোঁচট খায়। লীনা তো বাড়ি নেই! তারপর ইউনিট ম্যানেজারের কাছে শোনে লীনা ম্যাডাম খাজিলাতেই দু'দিন স্টে ব্যাক করেছেন।
সেই রিসর্টের নম্বরে আশিসের ফোন গেল। প্রচণ্ড ঘাবড়ে গেলেও লীনা কোনওরকমে আশিসকে বোঝায়, জায়গাটা তার খুব পছন্দ হয়েছে, তাছাড়া আশিসও যেহেতু মুম্বইয়ে নেই, তাই দু'দিন থেকে যাবে ভেবেছিল। আশিস কী বুঝেছিল জানি না, লীনার সঙ্গে প্রীতমের সম্পর্ক নিয়ে কোনও কথা তার কানে এসেছিল কিনা তাও আমার জানা নেই। তবে আশিস লীনাকে বলে, সে তাকে এয়ারপোর্টে এসে রিসিভ করলে তার ভালো লাগবে।
এবার তো লীনা পড়ে গেল সাংঘাতিক মুশকিলে! খাজিলায় সে ইচ্ছে করেই গেছে শ্যুটিং ইউনিটের গাড়িতে। প্যাক আপ হওয়ার পর গাড়িটাও ছেড়ে দিয়েছে। কারণ ফেরাটা তো প্রীতমের সঙ্গে ঠিক হয়ে আছে। এদিকে এয়ারপোর্টে যেতে হবে নিজের গাড়িতে। নাহলে আশিসের সন্দেহ হবেই। আর আশিস যতক্ষণে পৌঁছবে, ততক্ষণে তার পক্ষে মুম্বইয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে, গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টে যাওয়াটা সম্ভব নয়।
এবার লীনার আমার কাছে রিকোয়েস্ট হল, আমি যেন ওর গাড়িটা নিয়ে খাজিলা চলে যাই। খাজিলা থেকে ও গাড়িটা নিয়ে আশিসকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্ট চলে যাবে। আর আমি প্রীতমের সঙ্গে ফিরে আসব। একমাত্র আমি গেলেই কেয়ারটেকার গাড়ির চাবি দেবে। অন্য কারুর পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়।
প্রতিমা কফির সঙ্গে প্লেটে কুকিজও পাঠিয়েছে। কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে কাজু কুকিজের টুকরো ভেঙে মুখে পুরলেন অমিয় নন্দী। গোল্ডেন অর্চার্ডের চা-কফি দুটোই অতি উৎকৃষ্ট মানের। খেয়ে মন ভরে যায়। কিন্তু তিনি যতক্ষণে আরাম করে ফিল্টার কফির স্বাদ নিচ্ছেন, ততক্ষণে শ্রোতারা রীতিমতো অধৈর্য হয়ে উঠেছে।
মিঃ বড়ুয়া তো আর ধৈর্য ধরতে না পেরে বলেই ফেললেন, কফিটা তাড়াতাড়ি শেষ করুন মিঃ নন্দী! গল্পের শেষটা তো আমাদের জানা দরকার। লীনার প্রস্তাবে কি আপনি রাজি হলেন?
দেখুন, আমার কাছে ব্যাপারটা একটা সাংঘাতিক দোটানার। মেহরা আমার বন্ধু। শুধু বন্ধু নয়, বলতে পারেন সেই সময় আমার কেরিয়ারের দিক থেকেও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওর ছবিগুলোতে পরপর চিত্রনাট্য লেখার কাজ আমি করছিলাম। এদিকে লীনার সঙ্গেও আমার সম্পর্ক খুব ভালো। মেয়েটা বিপদে পড়েছে। ওকে হেল্প করাটা উচিত। তাছাড়া ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলে লীনা আর আশিসের মধ্যে নিশ্চিত একটা সাংঘাতিক গন্ডগোল হবে। সেই ডামাডোলে কাজকর্ম সব মাথায় উঠবে। এইসব সাত-পাঁচ ভেবে-চিন্তে আমি রাজি হয়ে গেলাম লীনার প্রস্তাবে।
গাড়ি পেতে কোনও অসুবিধা হয়নি। আশিসের বাড়ির কেয়ারটেকার জানে যে আমি মাঝে-মধ্যে লীনার গাড়িটা নিয়ে বেরোই। কিন্তু আমি গাড়ি নিয়ে বেরোলাম অথচ লীনা সেটা নিয়ে ফিরল, এনিয়ে প্রশ্ন উঠলে কী হবে বুঝতে পারছিলাম না। তা লীনা বলল, এটা কোনও সমস্যা নয়। আশিস কখনোই কেয়ার-টেকারের সঙ্গে কোনও কথাবার্তা বলে না। আর কেয়ার-টেকারও জিজ্ঞাসা না করলে নিজে থেকে কিছু বলতেও যাবে না।
কথাটা মিথ্যা নয়। কারণ এই ধরনের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির লোকেদের এতরকম সম্পর্ক থাকে যে তাদের বাড়ির কাজের লোকরা সবসময়ই খুব সাবধানে থাকে। শুধু তো আর প্রেম-পীরিতি নয়। গুণ্ডা-মাফিয়া সবারই সঙ্গেই তো ওঠাবসা! তাই খুব ঠেকায় না পড়লে সহজে কেউ মুখ খোলে না।
গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম খাজিলায়। হোটেলের রিসেপশনে জিজ্ঞাসা করে ঘরে গিয়ে নক করেছি। বেশ কিছুক্ষণ পরে কোনওরকমে বিছানার চাদরটা কোমরে জড়িয়ে প্রীতম দরজা খুলল। ভিতরের খাটে লীনা শুয়ে আছে। যতটুকু দেখা যাচ্ছে তাতেই বুঝলাম শরীরে সুতোটি নেই। নতুন নতুন প্রেম। এরকম তো হবেই। কিন্তু অবস্থাটা সামাল দেওয়াও দরকার। তাই প্রীতমকেই বললাম, লীনাকে বলো তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে। আধঘণ্টার মধ্যে বেরোতে না পারলে কিন্তু সময়মতো এয়ারপোর্ট পৌঁছতে পারবে না।
সে ছেলে মাথা নেড়ে দরজা বন্ধ করে দিল। আমি একটা বিয়ার নিয়ে হোটেলের লাউঞ্জে বসলাম। আধঘণ্টা না হলেও মোটামুটি পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মাথায় লীনা এল। মুখচোখ থমথমে। কাঁচা প্রেমের ঘোর ভেঙে বেরোতে হয়েছে। মেজাজ খারাপ। দেখে মনে হল কান্নাকাটিও হয়েছে।
আমি কোনও কথাবার্তার মধ্যে না গিয়ে চাবিটা ওকে দিলাম। লীনা বেরিয়ে গেল। একটু পরে প্রীতমও এল। হোটেলের ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে বেরোলাম দু'জনে। প্রীতম তখন রীতিমতো চুর। তার হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং দেওয়া আর নিজের প্রাণটি যমরাজের হাতে তুলে দেওয়া একই ব্যাপার। তাই গাড়ি আমিই চালালাম। ও পাশে বসে ঘুমোলো।
প্রীতমের অ্যাপার্টমেন্টটা চেনা ছিল। কাছাকাছি পৌঁছে, ওর হাতে গাড়ির চাবি দিয়ে নেমে চলে এলাম। একটু চিন্তা হচ্ছিল। ফ্ল্যাটে প্রীতম একাই থাকে। কিন্তু এসব ব্যাপারে বেশি মাখামাখি না করাই ভালো। তাই ওকে ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার ভাবনাটা মাথায় এলেও সেটাকে প্রশ্রয় দিইনি।
বাড়ি চলে আসার ঘণ্টাখানেক পরে লীনার ফোন এল। অদ্ভুত ব্যাপার। এয়ারপোর্টে আশিস আসেনি। ও বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বাড়ি ফিরে শুনেছে, আশিস নাকি বাড়িতে ফোন করে জানিয়েছে যে সে ফ্লাইট মিস করেছে। তাই পরের ফ্লাইটে আসছে। লীনা আমাকে বলল, অমিয়ভাইয়া প্রীতম কি বাড়িতে পৌঁছে গেছে জানেন?
তখন যা সময় হয়েছে, তাতে না পৌঁছানোর কোনও কারণ নেই। কিন্তু লীনা বলে সে নাকি অনেকবার প্রীতমের ফ্ল্যাটে ফোন করেছে কিন্তু কেউ ফোন ধরছে না।
আমি বললাম, তাহলে মনে হয় প্রীতম ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়েছে। এমনিতেই বেশ খানিকটা টিপসি ছিল।
লীনা আর কিছু বলল না। সেদিন রাতে লীনার সঙ্গে আর কোনও কথা হয়নি। আমার একটা স্ক্রিপ্টের কাজ চলছিল। ডিরেক্টরের তাড়া ছিল। তাই পরের দিন বেরোইনি। তার পরের দিন খবর পেলাম গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে প্রীতম মারা গেছে। সব থেকে আশ্চর্য ব্যাপার হল অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে, খাজিলা থেকে বান্দ্রা আসার রাস্তার মাঝামাঝি একটা মোটামুটি নির্জন জায়গায়।
পাইপটা নিভে গেছিল। আবার খোঁচাখুঁচি করে সেটাকে জ্বালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন অমিয় নন্দী। গল্পের এরকম আকস্মিক পরিসমাপ্তিতে সবাই একটু হতভম্ব। সাময়িক নৈঃশব্দ্য কাটিয়ে তালুকদার বললেন, খুনটা করল কে?
খুন কোথায়? অ্যাক্সিডেন্ট তো! তবে এটা ঠিক যেখানটায় গাড়িটা পাওয়া গেছিল, সেখান থেকে অনেকটা পথ চলে এসেছিলাম আমরা। আমি যেখানে গাড়ি থেকে নেমেছিলাম, সেটা প্রীতমের ফ্ল্যাট থেকে এক কিলোমিটারও দূর নয়। আর প্রীতম অতটা মাতাল ছিল না যে আবার গাড়ি ঘুরিয়ে খাজিলা যাওয়ার চেষ্টা করবে। তাহলেও সেক্ষেত্রে গাড়িটা যেদিকে পাওয়ার কথা সেদিকে ছিল না। ছিল ফেরার পথেই। আর খুনের কথা যদি বলেন তাহলে তো বলতেই হবে, খুন কে করেছে আমি কী করে জানব?
আর লীনা সম্পত? সে কী করল?
কিছুই করল না। আশিসের সঙ্গে থেকে গেল। মেহরার বউ ওকে ডিভোর্স দেয়নি। তাই বছর পাঁচ-ছয় লিভ-ইন করার পর একদিন মন্দিরে গিয়ে দু'জনে বিয়ে করে চলে এল। তার রিসেপশন হল। বলিউডের বাঘা বাঘা লোকেরা এসে নেমন্তন্ন খেয়ে গেল। আমারও নেমন্তন্ন ছিল। বিয়ের পর অবশ্য আর বিশেষ সিনেমা করেনি লীনা। ছেলে হল একটা। ইদানীং আবার দেখছি ক্যারেক্টার রোলে নামছে। তবে ওই ঘটনার পর আমি আর কোনওদিন ওর গাড়িতে হাত দিইনি।
লীনা সম্পতকে তো চিনি। মোটামুটি ফেমাস আর্টিস্ট। কিন্তু প্রীতমকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না?
অজয় সিনহার কথা শুনে মুচকি হাসলেন অমিয় নন্দী, না চেনারই কথা। অনেকদিন হয়ে গেল। ক'টাই বা সিনেমা করার সুযোগ পেয়েছিল ছেলেটা। তাছাড়া নামটা একটু বদলেও দিয়েছি। বড়লোকের কেচ্ছা তো। কোথায় কে জেনে গেল তারপর আমাকে নিয়ে টানাটানি...।
রেড ওয়াইনের পর ডিনারে স্যুপ আর বয়েলডচিকেন উইথ ভেজিটেবলস দিয়েছিল প্রতিমা। সঙ্গে ব্রেড রোল। ডেজার্টে অ্যাপেল পাই। খাওয়া সেরে সোজা নিজের ঘরে চলে এসেছিলেন অমিয় নন্দী। জামাকাপড় বদলে স্লিপিং স্যুটের ওপর গরম কাপড়ের ড্রেসিং গাউন চাপিয়ে নিলেন। একটু থ্রিলার ঘেঁষা একটা গল্পের অর্ডার এসেছে। শুধু থ্রিলার হলে চলবে না। তার সঙ্গে রোমান্স, অবৈধ প্রেম এসবও থাকতে হবে।
ঘরে একটা ছোট ইলেকট্রিক কেটলি থাকে তাঁর। জল গরম করে কফি বানালেন এক কাপ। তারপর বসলেন টেবিলে। গল্পটা মাথার মধ্যে ক'দিন ধরেই ঘুরঘুর করছিল। আজ সন্ধেবেলায় বলার সময় ফাঁকফোকর সব মেরামত হয়ে গেছে। এখন আর লিখতে বেশি সময় লাগবে না। লীনা সম্পতের সঙ্গে কাল্পনিক প্রীতম কপূরের প্রেমের গল্প, গোল্ডেন অর্চার্ডের বুড়োরা যেরকম গপগপ করে খেল তাতে দর্শকদেরও অপছন্দ হবে বলে মনে হয় না।
মানুষের বিশ্বাস করার ক্ষমতা এমন মারাত্মক বেশি যে সেটা দেখে মাঝে মাঝে নিজেরই অবাক লাগে তাঁর। বলার ভঙ্গিটা শুধু একটু কনভিনসিং করতে হয়। তবে সেটা তাঁর আসে। খুব ছোটবেলা থেকেই এব্যাপারে তাঁর একধরনের এক্সপার্টাইজ আছে। অনেকবার, বহু বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে তিনি এর জোরে উতরে গেছেন। একবার, জীবনে মাত্র একবারই এই গুণ তাঁর কাজে লাগেনি। সত্যি কথা বলতে কি, কাজে লাগানোর কোনও সুযোগই পাননি। তবে সুযোগ পেলেও হয়তো পরিণতি একই হত। কারণ অমিয় নন্দী জানেন ওই মানুষটিকে কনভিন্স করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। তার জন্য কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। তাতে অবশ্য ক্ষতি কিছু হয়নি। আখেরে লাভই হয়েছিল। কিন্তু তবু ঘটনাটা মনে পড়লে এখনও চোয়াল শক্ত হয়ে যায় অমিয়র।

সকাল থেকেই মাঠটা একেবারে জমজমাট। আগের দিনই চারপাশে লম্বা লম্বা স্টিলের ডান্ডায় সাদা ফ্ল্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সকালে একপাশে স্কুলের ব্যানারটাও লাগিয়ে ফেলা হয়েছে। কাল বিকেলে গেম টিচার প্রবাল হোড় চুন দিয়ে দৌড়োনোর ট্র্যাকগুলো ঠিকমতো রেডি করা হয়েছে কিনা তদারকি করে গেছেন।
সুমিতাদের স্কুলের মাঠটা ছোট। তাই প্রতিবছর স্পোর্টসের জন্য এই মাঠটাই ভাড়া করা হয়। তবে স্কুলের ছোট মাঠে সারাবছরই প্র্যাকটিস চলে। জেলার মধ্যে তাদের স্কুলের স্পোর্টসে নাম-ডাক আছে। প্রতিবছরই বেশ কিছু প্রাইজ-মেডেল আসে। দু-এক বছর অন্তর গ্রুপ চ্যাম্পিয়নও হয়।
সুমিতা নিজে স্কুলে পড়ার সময় কখনও স্পোর্টসে নাম দেয়নি। খেলাধুলোয় কোনও আগ্রহই ছিল না তার। অন্য মেয়েরা যেমন টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখে, ভারত জিতলে নাচানাচি করে, সেসবও কোনওদিন করেনি সে। তার পড়ার বইয়ের ভিতরে সচিন, সৌরভ কিংবা স্টেফি গ্রাফের ছবিও থাকত না। শাহরুখ, আমির কিংবা সলমন খানের ছবিও অবশ্য ছিল না। যদিও সিনেমা মাঝেসাঝে দেখা হত।
আসলে এই হিরো ওয়ারশিপ ব্যাপারটা সুমিতার কোনওকালেই আসে না। তার স্বভাবটা কিছুটা শামুক ধরনের। নিজের মধ্যেই গুটিয়ে থাকার অভ্যাস। স্কুল-বাড়ি-পড়াশোনা এই ছিল তার জীবন। যদিও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, নিজস্ব জীবন যাপনের একটা আকাঙ্ক্ষা কিন্তু খুব ছোট থেকেই তৈরি হয়েছিল।
স্কুলে জয়েন করার পর প্রথমবছর স্পোর্টসে, সুমিতা খুব স্বাভাবিকভাবেই কোনও আগ্রহ বোধ করেনি। কিন্তু সাধারণত এই ধরনের ক্ষেত্রে নতুন, ছেলেমানুষ টিচারদের ঘাড়ে কিছু কাজের দায়িত্ব চাপে। তাই সুমিতা আর অঞ্জলির ওপর ভার ছিল বাচ্চাদের টিফিন দেওয়া আর ফার্স্ট এইডস সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখার। অঞ্জলি তার একবছর আগে জয়েন করেছে। তাই খানিকটা অভিজ্ঞতা আছে।
দু'জনে মিলে স্পোর্টস শুরু হওয়ার আগেই একটা বড় টেবিলে খাবারের প্যাকেটগুলো গুছিয়ে রেখেছিল। লম্বা একটা খাতায় যারা স্পোর্টসে নাম দিয়েছে সেইসব ছাত্রীদের নাম-ক্লাস-সেকশন লেখা। মিলিয়ে মিলিয়ে প্যাকেট দিতে হবে। কঠিন কিছু কাজ নয়। গোছানো হয়ে গেলে অঞ্জলি চলে গেল অন্য টিচারদের সঙ্গে গল্প করতে। সুমিতা একাই চেয়ার নিয়ে বসে আছে। একেকটা ইভেন্ট শেষ হচ্ছে। ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ডের নাম ঘোষণা হচ্ছে। কোনওটাই সে খুব মন দিয়ে শুনছে না। শুধু যে খাবার প্যাকেট নিতে আসছে, তার নামটা লিস্টে আছে কিনা ভালো করে দেখে নিচ্ছে।
মাস ছয়েক হয়েছে স্কুলে। সব মেয়েকে এখনও ভালো করে চেনে না সুমিতা। তবে ক্লাস সেভেন এ-র সে ক্লাস টিচার। সেই ক্লাসের সবার নাম-ধাম জেনে গেছে ভালো করেই।
দুপুর নাগাদ একটা মেয়ে দৌড়তে দৌড়তে এল। ঝলমলে মুখ, ঘেমেচুমে লাল হয়ে আছে। এখনও স্পষ্ট মনে আছে সুমিতার, নাম বলেছিল মৌমিতা দাস। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে লিস্টে টিক দিতে গিয়ে চমকে উঠেছিল সুমিতা। নামের পাশে সেভেন এ লেখা। কিন্তু এই মেয়েটাকে তো সে চেনে না!
অ্যাই, তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?
ক্লাস সেভেন এ মিস।
না, তুমি তো সেভেন এ-তে পড়ো না! তোমাকে তো কোনওদিন ক্লাসে দেখিনি?
আমি তো আপনার ক্লাসেই পড়ি মিস। থার্ড বেঞ্চে বসি, অনসূয়াদের সঙ্গে।
মেয়েটা বিস্ময়ে প্রায় হতবাক। সুমিতা এবার ভালো করে মেয়েটাকে দেখে। থার্ড বেঞ্চের এক কোণে বসে মৌমিতা। পড়াশোনায় তেমন ভালো নয়। তাই প্রায় গুটিয়ে-সংকুচিত হয়ে থাকে বেশিরভাগ সময়। বন্ধুদের সঙ্গে কথাবার্তাও বিশেষ বলে না। সামনের এই ঝলমলে মেয়েটাই রোগা, সামান্য দাঁত উঁচু মৌমিতা! সন্দেহ নেই কোনও মৌমিতাই...কিন্তু কিন্তু...
আমি ফার্স্ট হয়েছি মিস, হান্ড্রেড মিটার, টু হান্ড্রেড মিটার দুটোতেই ফার্স্ট হয়েছি। জুনিয়র রিলেতেও নামব।
মুহূর্তে ম্যাজিকের মতো সবটা স্পষ্ট হয়ে যায় সুমিতার কাছে। জয়, আত্মবিশ্বাস। পড়া বলতে না পারা কুণ্ঠিত মেয়েটাকে যেন জাদুদণ্ডে বদলে দিয়েছে।
দারুণ দারুণ খুব খুশি হয়েছি রে, খুব ভালো! রিলেতেও ফার্স্ট হতে হবে কিন্তু।
গোমড়ামুখো মিসের মুখে এমন প্রশংসা শুনে খুশিতে আটখানা হয়ে লাফাতে লাফাতে চলে গেছিল মৌমিতা। আর সুমিতা তারপর যারা প্যাকেট নিতে আসছিল তাদের সবার মুখগুলো দেখছিল খুঁটিয়ে। খেলাধুলোর সঙ্গে পড়াশোনার নিশ্চিত কোনও বিরোধ নেই। কিন্তু আশ্চর্যভাবে স্পোর্টসে যারা খুব ভালো তারা পরীক্ষায় তেমন ভালো রেজাল্ট করে না। সারা বছর টিচারদের কাছে বকুনি খাওয়া, বন্ধুদের চোখে ছোট হয়ে যাওয়া মেয়েগুলোর কাছে এই একটা দিনই হিরো হওয়ার সুযোগ। অন্যসময় ক্লাসের পিছনের বেঞ্চে মুখ লুকিয়ে বসে থাকা মেয়েগুলো যেন একদম পাল্টে যায় এই দিনটাতে।
তারপর থেকে ওদের মতো সুমিতাও অপেক্ষা করে স্পোর্টসের জন্য। তৃষিতের মতো দেখে ভিকট্রি স্ট্যান্ডে উঠে দাঁড়ানো আলো জ্বলা মুখগুলো। ওদের চোখ, হাসি, খুশির উচ্ছ্বাস যেন তার নিজের বুকের মধ্যেও অনেকখানি বাড়তি অক্সিজেন পুরে দেয়।
এবারও সেরকমই হয়েছে। তবে এবার অঞ্জলি নেই। মায়ের শরীর খারাপ বলে ছুটি নিয়ে রাঁচি গেছে। ওখানেই ওর দাদার কাছে থাকেন অঞ্জলির মা। তাতে অবশ্য অসুবিধা কিছু হয়নি। সুমিতা একাই দিব্যি খাবারের দায়িত্ব সামলাচ্ছিল। ফার্স্ট এইড বক্সটাও তারই হেফাজতে ছিল।
ইভেন্টগুলো যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন ক্লাস নাইনের মায়া দাস তার কাছে এসে বলে যে তার শরীরটা একটু খারাপ লাগছে। সকাল থেকেই চড়া রোদ। তার ওপর সারাদিন দৌড়াদৌড়ি। বেশি ঘাম হয়ে ক্লান্ত হয়ে গেছে ভেবে সুমিতা তার হাতে এক গ্লাস গ্লুকোজের জল ধরিয়ে দিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে বলে।
মাঠের একপাশে টিচারদের বসার জন্য একটা ছোট ঘর আছে। টিচাররা অবশ্য সেখানে কেউ বসেননি। কিন্তু স্পোর্টসের জিনিসপত্র, বাড়তি ব্যানার, ফ্ল্যাগ এসব রাখা ছিল। মায়া যে গ্লাসটা নিয়ে সেই ঘরে ঢুকেছে সেটা সুমিতা খেয়াল করেছিল কিন্তু তারপর সে আর ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পরে, স্কুলের বেয়ারা হরি জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে দেখে মায়া সেই ঘরের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে।
ততক্ষণে স্পোর্টস শেষ হয়ে গেছে। ছাত্রীরা অধিকাংশই চলে গেছে। টিচারদেরও কেউ কেউ চলে গেছেন। সুমিতা অবশ্য ছিল। হেডমিস্ট্রেসের সঙ্গে জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল। হরি এসে খবর দিতেই একেবারে হইচই পড়ে গেল। সবাই মিলে দৌড়ে গিয়ে মায়ার মুখে-চোখে জল ছিটিয়েও কোনও লাভ হল না দেখে, তাড়াতাড়ি নিয়ে আসা হল হাসপাতালে। ছাত্রীদের একজনের কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে মায়ার বাড়িতেও খবর দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের এমারজেন্সিতে ভর্তি করা হল মায়াকে। আরও দু-তিনজন টিচারের সঙ্গে সুমিতাও ছিল। একটু পরেই খবর পাওয়া গেল মায়ার জ্ঞান ফিরে এসেছে। সে দু-একটা কথাও বলছে। মায়ার মা ভিতরে ছিলেন। তিনিই বেরিয়ে এসে বললেন।
সুমিতারা সবে হাঁফ ছেড়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে বাড়ি ফিরবে কিনা ভাবছে, এমন সময় জানা গেল বাইরে ভয়ানক গন্ডগোল হচ্ছে। মায়ার অসুস্থতার খবর রটে গেছে শহরে। বহু গার্জেন চলে এসেছেন হাসপাতালের সামনে। তাদের অভিযোগ একজন ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে জেনেও স্কুলের টিচাররা যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। আরও কিছুক্ষণ ওইভাবে পড়ে থাকলে মেয়েটি মরেও যেতে পারত। মায়া নাকি জ্ঞান ফেরার পর বলেছে সে মিসকে বলেছিল যে তার শরীর খারাপ লাগছে, কিন্তু মিস পাত্তাই দেয়নি। অভিভাবকদের দাবি, সুমিতা মিস-কে এসে ক্ষমা চাইতে হবে। এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন টিচারকে স্কুলে রাখাটাও উচিত নয়।
সুমিতাদের হেডমিসট্রেস মিসেস মৈত্র এমনিতেই একটু ভীতু মানুষ। গন্ডগোলে পড়ে তাঁর তো প্রায় নার্ভাস ব্রেক ডাউন হওয়ার মতো অবস্থা। অন্য টিচাররাও ভয়ানক ভয় পেয়ে গেছেন। আর সুমিতার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। পা দুটো যেন পাঁচমন ভারী। সে যেন সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই থাকতে পারছে না। এমন সময় এমারজেন্সি থেকে বেরিয়ে এলেন ডাঃ অর্ণব মৈত্র। সোজা এসে সুমিতার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনি আসুন তো আমার সঙ্গে!
খানিকটা কলের পুতুলের মতন অর্ণবকে অনুসরণ করে সুমিতা। বাইরে বেরিয়ে হাসপাতালের সামনে পোর্টিকোতে এসে দাঁড়ান ডাঃ মৈত্র। সামনে তখন অভিভাবকদের ভিড়। জমায়েত থেকে মাঝে মাঝেই চিতার করে সুমিতার মুন্ডুপাত করা হচ্ছে।
ডাক্তারের সঙ্গে সুমিতাকে দেখে চিতারটা জোরদার হয়ে ওঠার আগেই অর্ণব মৈত্র বলে ওঠেন, আমি ডাক্তার অর্ণব মৈত্র। আমি নিজে এতক্ষণ এমারজেন্সিতে মেয়েটিকে দেখছিলাম। মায়া ভালো আছে। কথা বলছে। আমি ওকে পরীক্ষা করে বুঝেছি যে দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকায় ওর গ্যাস হয়ে গেছিল। তারজন্যই মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে যায়। মায়া আমাকে এটাও বলেছে যে বাড়িতে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে সে না-খেয়ে স্কুলে গেছিল। তারপর স্পোর্টস বলে মাঠে দৌড়াদৌড়ি করার পর শরীর খারাপ লাগতে থাকে। তখন সে সুমিতা মিসকে কথাটা বলে।
সুমিতা মিস তো ডাক্তার নন। তিনি স্বাভাবিকভাবেই বুঝতে পারেননি মায়ার কী হয়েছে। রোদে গরমে ক্লান্ত হয়ে গেছে ভেবে গ্লুকোজের জল দেন। এরমধ্যে তো ভুল কিংবা অন্যায় কিছু নেই। আপনারা অকারণে ওনাকে দোষ দিচ্ছেন। তাছাড়া ঘটনাটা খুবই সামান্য। এটা মেয়েটির বাড়িতেও ঘটতে পারত। ও ভালো আছে। আরও ঘণ্টাখানেক রেখে আমরা ওকে ছেড়ে দেব। আপনারা হাসপাতালে গন্ডগোল করবেন না। এখানে অন্য রোগীরা আছে তাদের অসুবিধা হচ্ছে।
ডাক্তারের কথায় আশ্বস্ত হয়েই সম্ভবত, অভিভাবকরা আর বেশি ঝামেলা না করে ফিরে গেলেন। ডাঃ মৈত্র যতক্ষণ কথা বলছিলেন, সুমিতা পাশে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সে স্পষ্ট বুঝতে পারছিল, তার পা দুটো থরথর করে কাঁপছে।
জায়গাটা মোটামুটি ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পর অর্ণব বললেন, আপনার অন্য কলিগরা যদি বাড়ি চলে যেতে চান, যেতে পারেন। মেয়েটি এখন পুরোপুরি আউট অফ রিস্ক। তবে আপনি যাবেন না। ওকে ডিসচার্জ করার পর আপনি হাসপাতাল থেকে বেরোবেন। পাবলিককে বিশ্বাস নেই। কখন কী গুজব রটে, আর তা থেকে সিচ্যুয়েশন ফ্লেয়ার আপ করে, বলা যায় না। আপনি বরং আপাতত ডক্টরসরুমে বসে থাকুন, আমি সিস্টারকে বলে দিচ্ছি।
রাত আটটা নাগাদ মায়া দাসের ছুটি হয়ে গেল। কিন্তু তখনই বেরোনো হল না সুমিতার। রাত হয়ে গেছে। রিভারসাইড রোডের বাস পাওয়া এখন মুশকিল। তাই অর্ণব পৌঁছে দেবেন বলেছেন। অসম্ভব ক্লান্ত লাগছিল সুমিতার। বুঝতেই পারছিল বাড়ি ফিরে ভাতে-ভাত ফুটিয়ে খাওয়ার ক্ষমতা বা ইচ্ছে কোনওটাই থাকবে না। একেবারে শুয়ে পড়তে হবে।
হাতের আরও দু-একটা কাজ সেরে অর্ণবের বেরোতে প্রায় সাড়ে আটটা বাজল। হাসপাতালের ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে একটা চৌমাথা। রিভারসাইড রোডের দিকে যেতে হলে বাঁদিকের রাস্তা ধরতে হবে। কিন্তু গাড়ি ডানদিকে ঘুরছে দেখে অবাক হয়ে সুমিতা কিছু বলার আগেই অর্ণব বললেন, একটা ছোট্ট কাজ সেরে নেবে। দেরি হবে না।
মিনিট সাত-আট ড্রাইভের পর একটা ছোট চাইনিজ রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়ান অর্ণব। গাড়িটা পার্ক করে বলেন, নেমে আসুন।
এখানে কেন?
আরে, আসুন না। বাকি কথা ভিতরে গিয়ে হবে।
এই রেস্তোরাঁটায় আগে আসেনি সুমিতা। তবে যাতায়াতের পথে দু-একবার দেখেছে। চাইনিজ ধরনে ছিমছাম সাজানো ভিতরটা। হালকা আলো জ্বলছে। খুব মৃদু কোনও মিউজিকও চলছে। কোণের দিকে একটা টেবিলে সুমিতাকে নিয়ে বসেন অর্ণব।
প্রথমে একটা স্যুপ অর্ডার দিই। সেটা খান। তারপর হালকা কোনও মেন ডিশ বলব।
আসলে আমার বড্ড ক্লান্ত লাগছে। খাওয়ার কোনও ইচ্ছেই নেই। বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়তে পারলে ভালো লাগত।
কথাটা বেশ রূঢ় শোনাল বুঝেও বলে ফেলে সুমিতা।
অর্ণব কিন্তু একটুও অসন্তুষ্ট হলেন না। বরং ভারি কোমল গলায় বলেন, জানি তো। সেজন্যই নিয়ে এলাম। বলতে পারেন একজন ডাক্তার হিসাবেই নিয়ে এলাম। আপনার এখন যা অবস্থা তাতে আপনি যে বাড়িতে গিয়ে কিছু খাবেন না শুয়ে পড়বেন সেটা নিশ্চিত। মা-ঠাকুমা গোছের কেউ থাকলে হয়তো জোরজার করত। কিন্তু সেরকম তো অবস্থাটা নয়। অথচ আজ যদি এভাবে শুয়ে পড়েন তাহলে কাল সকালে আর উঠতে পারবেন না। মাথা ঘুরবে, বমি হবে। একদম সোজা দিন দু-তিন বিছানায়। সেজন্য যেটা বলছি শুনুন, স্যুপটা খান। গরম স্যুপ খেলে দেখবেন ক্লান্তি অনেকটা কাটবে। আমার কথাটা শুনুন প্লিজ।
অর্ণবের কথা বলার ধরনে এমন একটা কিছু ছিল যাতে আর আপত্তি করতে পারেনি সুমিতা। চুপচাপ স্যুপ খেয়েছে। তারপর সামান্য গ্রেভি চাউমিন। শেষে একটু আইসক্রিম। অর্ণবও খেয়েছে তার সঙ্গে। কিন্তু সুমিতার কেমন যেন মনে হচ্ছিল অর্ণব আসলে নিজে খাচ্ছে না। সামনে বসে তাকে খাওয়াচ্ছে। মা কেমনভাবে সন্তানকে সামনে বসে খাওয়ায় তার কোনও অভিজ্ঞতা সুমিতার নেই। মাসি তাকে কোনওদিন অযত্ন করেনি। কিন্তু অর্ণব যেভাবে সস নুন, গোলমরিচের কৌটো এগিয়ে দিচ্ছিল, যেভাবে নিবিষ্ট চোখে প্রতিবার সুমিতার চামচ মুখে তোলা দেখছিল তাতে একটা অনাস্বাদিতপূর্ব সুখে ভরে যাচ্ছিল তার সমস্ত শরীর।
রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে চুপচাপ গাড়ি চালিয়ে রিভারসাইড রোডে এল অর্ণব। দু'জনের কেউই বিশেষ কথাবার্তা বলেনি। নামার আগে সুমিতা বলল, থ্যাঙ্কিউ। আপনি ঠিক বলেছেন। এখন শরীরটা অনেক ভালো লাগছে। অমন জোর করে নিয়ে না গেলে আমি সত্যিই আজ রাতে কিছু খেতাম না।
জানি তো। তবে আজ আর একটা কথা বলব আপনাকে। জ্ঞান দেওয়া নয় কিন্তু। এতদিনে হয়তো কিছুটা বন্ধু হতে পেরেছি সেই জোরে। নিজে যদি অন্যায় না করেন তাহলে ভয় পাবেন না। সত্যি কথা সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে বলবেন। সাধারণ মানুষ হুজুগে মাতে ঠিকই, কিন্তু সত্যি-মিথ্যের ফারাক বোঝে। আপনি সত্যি কথা বললে কয়েকজন হয়তো চেঁচাবে, কিন্তু বেশিরভাগই মেনে নেবে। যাক গে, স্যরি একটু বেশি গুরুগম্ভীর কথা বলে ফেললাম বোধহয়!
বন্ধুরা তো স্যরি বলে না...।
তাহলে আপনি মেনে নিচ্ছেন যে আমি আপনার বন্ধু?
গাড়ির হেডলাইটটা নিভিয়ে দিয়েছে অর্ণব। দূরে একটা স্ট্রিট লাইট জ্বলছে। সামান্য কুয়াশায় চারিদিকটা একটু অস্পষ্ট। তবু অর্ণবের মনে হয় একটা চাপা হাসির বিদ্যুৎ খেলে গেল সুমিতার মুখে। কোয়ার্টার্সের গেটের দিকে দু-পা এগিয়ে সামান্য ঘাড়টা ঘুরিয়ে বলল, এরপরেও বন্ধু না বললে পাপ হবে যে!

এএনসি ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার রাজি হননি। কিন্তু টাকা দিয়ে একটা সামান্য নাম-ঠিকানা বার করা যাবে না, এতটা খারাপ অবস্থা এখনও কলকাতা শহরের হয়নি। বিশেষ করে, এখন যেহেতু পুরো সিস্টেমটাই কম্পিউটারাইজড হয়ে গেছে। তবে শ্রীময়ী নিজে আড়ালে থেকেই খবরটা বার করতে চাইছিল। কারণ ব্যাপারটা যে-কোনও সময়েই কলকাতার হাই সোসাইটিতে একটা মুখরোচক গসিপ হয়ে উঠতে পারে। তাই শ্রীময়ী চাইছিল অন্য কারুর মাধ্যমে কাজটা করতে। এমন কেউ যে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য।
টাকার অঙ্কটা নেহাত কম নয়। দশ লক্ষ! কিন্তু আবার লেদার গুডসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর শ্রীময়ী সেনের কাছে সাংঘাতিক বেশিও নয়। বিশেষ করে, যখন এটা হিসাব বহির্ভূত টাকা। ওরকম লাখ দশেক টাকা সে চাইলে কোনও রিলিফ ফান্ডে দানও করতে পারে। কিন্তু আসলে ব্যাপারটা নিয়ে তার খানিকটা জেদ চেপে গেছে। ওই টাকার মালিক কে এবং অপরাজিতা দাশগুপ্তের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক সেটা না জানতে পারা পর্যন্ত তার স্বস্তি হচ্ছে না।
অনেক ভেবেচিন্তে শেষপর্যন্ত কাজটা সুপ্রিয়কেই করতে বলল শ্রীময়ী। সুপ্রিয় প্রায় দশ বছর হতে চলল তার কাছে কাজ করছে। পার্সোনাল সেক্রেটারি হওয়ায়, কোম্পানির অনেক কথাই সে তার কাজের সূত্রেই জানতে পেরে যায়। কিন্তু আজ পর্যন্ত কখনও সে বিষয়ে অন্তত অফিসে কারুর সঙ্গে আলোচনা করেনি সেটা নিশ্চিত। শ্রীময়ী বিভিন্ন সময় ক্রশ চেক করে দেখে বুঝেছে সুপ্রিয় তার কাজের প্রতি একশো শতাংশ বিশ্বস্ত।
কর্মচারীদের মধ্যে নিজের লোক কিংবা সোজা কথায় চর রেখে কীভাবে এই ক্রশ চেকের ব্যাপারটা করতে হয়, সেটা অপরাজিতা নিজে শ্রীময়ীকে শিখিয়েছিলেন। এসব ক্ষেত্রে মায়ের তীক্ষ্ন বুদ্ধির প্রশংসা না করে উপায় নেই। কারণ এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে অফিসের স্টাফদের ভিতরের খবরাখবর যেমন সে পেয়ে যায় তেমনি আবার কোনও কারণে ক্ষোভ কিংবা অসন্তোষ দেখা দিলেও সেটা তেমনভাবে মাথাচাড়া দেওয়ার আগেই সামলে নেওয়া যায়।
সুপ্রিয়র ক্ষেত্রে আরও একটা সুবিধা হল, সে একেবারেই মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে। পড়াশোনায় খারাপ নয়। বুদ্ধিও আছে। কিন্তু সমাজে যে ধরনের কানেকশন থাকলে চাকরি-বাকরি পাওয়া সহজ হয় সেসব তার নেই। তাই লেদার গুডসের চাকরিটা তার এবং তার পরিবারের জন্যও খুব জরুরি। শ্রীময়ীর বিশ্বাসভঙ্গ করে নিজের চাকরি খোয়াতে সুপ্রিয় কিছুতেই চাইবে না।
সুপ্রিয়কে ডেকে মায়ের এএনসি ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট নম্বরটা দিয়ে শ্রীময়ী বলল, তোমাকে একটা কাজ করতে হবে সুপ্রিয়। এএনসি ব্যাঙ্কে অপরাজিতা দাশগুপ্তের এই অ্যাকাউন্টের ডিটেলটা জোগাড় করতে হবে। অ্যাকাউন্টের একজন নমিনি আছে। তার যদি কোনও ঠিকানা দেওয়া থাকে তাহলে সেই ঠিকানাটা লাগবে। আর এই ফিক্সড ডিপোজিটের ইন্টারেস্ট প্রতিমাসে অন্য একটা অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়। সেই অ্যাকাউন্টের ডিটেলটাও লাগবে। অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের নাম, ঠিকানা যদি সম্ভব হয় তাহলে ফোন নম্বরও। বুঝতেই পারছ ব্যাপারটা গোপনীয়।
আমি জানি এই ধরনের কাজ মুখের কথায় হয় না। এব্যাপারে তোমার যদি টাকার দরকার হয়, নিশ্চিন্তে আমাকে বলবে। সে ব্যবস্থা আমি করব। একেবারে অ্যাবনর্মাল কিছু না হলে টাকার অঙ্ক নিয়ে ভাববে না। আমার ইনফরমেশনগুলো জানা দরকার।
সুপ্রিয় মোটামুটি দিন পনেরো সময় নিয়েছিল। হাজার দশেক টাকা খরচও হয়েছিল শ্রীময়ীর। এএনসি ব্যাঙ্কের ওই ব্রাঞ্চের এক ক্লার্কের কাছ থেকেই খবর পাওয়া গেল। অপারজিতা দাশগুপ্তের ফিক্সড ডিপোজিটের সুদ পাঠানো হয় ডরোথি মণ্ডল নামে এক মহিলার অ্যাকাউন্টে। ব্যাঙ্কের খাতায় তার ঠিকানা দেওয়া আছে, ভিলেজ শীতলাতলা, পোস্ট বাসন্তী, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। কোনও ফোন নম্বর নেই।
নামটা দেখে বেশ অবাক হল শ্রীময়ী। খ্রিস্টান নাম। পদবি মণ্ডল। তারমানে নিম্নবর্ণের মানুষ ধর্ম বদলে খ্রিস্টান হয়েছে। কিন্তু এই নামের কাউকে সে কোনওদিন চিনত বলে মনে করতে পারল না।
ভোর ভোর গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিল শ্রীময়ী। প্রথমে একবার ভেবেছিল সুপ্রিয়কে সঙ্গে নেবে কিনা। তারপর নিজেরই মনে হল সেটা ঠিক হবে না। ছেলেটা যেটুকু জেনেছে তাই যথেষ্ট। এর থেকে বেশি জানতে দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু বাসন্তীতে গিয়ে কীভাবে খোঁজ করবে সেটাও মাথায় ঢুকছিল না। বাসন্তী একটা বেশ বড় গঞ্জ এলাকা। সেখানে শুধু নাম বলে কাউকে খুঁজে বার করা কঠিন।
সুপ্রিয় নাম-ঠিকানা এনে দেওয়ার পর, সেদিন বাড়ি ফেরার সময় নিজের মনেই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ফোনে মেইল চেক করছিল শ্রীময়ী। হঠাৎ একটা মেইলে চোখ আটকে গেল। 'বাদাবন বাঁচাও' বলে একটা সংস্থা ধন্যবাদ জানিয়েছে তাকে।
টলি ক্লাবের বন্ধু সঞ্জয় পাকড়াশীর রিকোয়েস্ট এই এনজিওকে কিছু অর্থসাহায্য করেছিল শ্রীময়ী। পাকড়াশী নিজে এর সঙ্গে যুক্ত। ওরা নাকি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সুন্দরবন অঞ্চলে খুব ভালো কাজ করছে। লম্বা একটা বক্তৃতা দিয়েছিল পাকড়াশী। শ্রীময়ী একটা স্কচ অন রকস নিয়ে খানিকটা অন্যমনস্কভাবেই শুনছিল। পাকড়াশী দেখতে ভালো। কথাও চমৎকার বলেন। তাই একটু বোর হলেও বাধা দেয়নি। শেষকালে অবশ্য টাকা-পয়সার ব্যাপার এল।
আসবে যে সেটা ও জানতও। তবে এরকম ক্ষেত্রে তো আর আপত্তি করা যায় না। তাই রাজি হতে হয়েছিল। কয়েকদিন বাদে এক ভদ্রলোক অফিসে এসে একটা পাঁচহাজার টাকার চেক নিয়ে গেছিলেন। শ্রীময়ীকে বারবার বলেওছিলেন একবার গিয়ে ওনাদের কাজকর্ম দেখে আসতে। যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। তবু স্বাভাবিক ভদ্রতায় মাথা নেড়েছিল শ্রীময়ী।
ভদ্রলোক নিজের একটা কার্ডও দিয়ে গেছিলেন। সেটা পড়েও দেখেনি শ্রীময়ী। কিন্তু আজ প্রাপ্তি স্বীকারের মেইলটাতে ও খেয়াল করল 'বাদাবন বাঁচাও'য়ের অফিস হচ্ছে বাসন্তীতে! তারমানে, ওই সুবিমল না পরিমল নামে যে ভদ্রলোক এসেছিলেন তিনি ওখানেই থাকেন। টাকা দিয়েছে, ভদ্রলোক নেমন্তন্নও করেছেন, তাই শ্রীময়ী একবার যেতেই পারে।
মেইলে ফোন নম্বর দেওয়া ছিল। ফোন করে সুবিমল গড়ুইয়ের সঙ্গে কথা বলে যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলল শ্রীময়ী। ভদ্রলোক খুবই অবাক হয়েছিলেন নিশ্চিত। তবে গলার স্বরে মনে হল খুশিও হয়েছেন। না হওয়ার কোনও কারণ নেই। সব দেখেশুনে শ্রীময়ীর যদি ভালো লাগে তাহলে তো আরও কিছু অর্থ প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকবেই।
বাসন্তী যাওয়ার কথাটা সমরেশকে বলেছে শ্রীময়ী। এমনিতে একসঙ্গে যাওয়ার ব্যাপার না থাকলে সাধারণত রোজকার রুটিনে সে কোথায়, কখন যাবে সে বিষয়ে কোনও কথাবার্তা সমরেশের সঙ্গে হয় না। সকালের চা আর ব্রেকফাস্টটা একসঙ্গে করাই অভ্যাস। তিথির চিরকালই জিমের বাতিক। সে ওই সময়টায় জিমে বেরিয়ে যায়। সমরেশও একটু হেলথফ্রিক আছে। খুব ভোরবেলায় উঠে গাড়ি নিয়ে ভিক্টোরিয়ায় যায়। বেশ খানিকটা জগিং আর ফ্রি-হ্যান্ড করে ঘাম ঝরিয়ে, বাড়ি ফিরে স্নান। তারপর চা। শ্রীময়ী আবার শরীরকে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপারে মোটে নেই। চিরকালই সে ঘুম বিলাসী। তাই সমরেশ স্নানে ঢুকেছে বুঝলে ধীরে-সুস্থে উঠে চা-এর টেবিলে বসার প্রস্তুতি নেয়।
কোনও এক অলিখিত চুক্তিতে সকালে চা কিংবা জলখাবার খেতে বসে শ্রীময়ী কিংবা সমরেশ কেউই কখনও অফিসের কথা আলোচনা করে না। নিজেদের ব্যক্তিগত কথা, মেয়ে কিংবা সংসারের কথা অবশ্যই হয়। শ্রীময়ী খানিকটা সচেতনভাবেই কথাবার্তার মধ্যে সমরেশের কোচবিহারের বাড়ি এবং আত্মীয়স্বজনের কথা টেনে আনে। সত্যি কথা বলতে কি, সারাদিনের মধ্যে এইটুকু সময়ই তাদের দু'জনের একান্ত নিজস্ব। রাতে খাওয়ার সময় মেয়ে থাকে।
বছরখানেক আগেও অপরাজিতা নিজে এসে ডিনার টেবিলে বসতেন। মায়ের সাহচর্যে শ্রীময়ী কখনোই তেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত না। তবে মজার ব্যাপার হল মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে কাঠিন্য থাকলেও জামাইয়ের সঙ্গে কিন্তু অপরাজিতা খুবই সহজ ছিলেন। এক্ষেত্রে অবশ্য শ্রীময়ী মনে করে কৃতিত্ব অনেকটাই সমরেশের। সে বুদ্ধিমান ছেলে। সেন্স অফ হিউমারও খুব ভালো। খুব সাধারণ কথাও এমন একটা নিরাসক্ত কিন্তু মজাদার ভঙ্গিতে বলতে পারে যে অতিবড় হাঁড়িমুখোও না হেসে পারবে না।
অপরাজিতা জামাইয়ের এই গুণটি বিশেষভাবে পছন্দ করতেন। তাই রাতে খাবার টেবিলে অনেকসময়ই আড্ডা বেশ জমে উঠত। শ্রীময়ী তাতে যে খুব যোগ দিত তা হয়তো নয়। কিন্তু ব্যাপারটা উপভোগ করত। সকালে চা খেতে বসেও তারা যখন গল্প করে তখনও বিভিন্ন বিষয়ে সমরেশের সরস মন্তব্যে মাতিয়ে রাখে।
শ্রীময়ী লক্ষ্য করেছে, সকালের এই সামান্য কথাবার্তার পরেই তার মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে ওঠে। সমরেশ অফিসের কাজে বাইরে গেলে তাই এই ব্রেকফাস্ট সেশনটা সে একটু মিস করে।
তবে আজ শ্রীময়ী বাসন্তী যাবে শুনে সমরেশ একটু আশ্চর্য হয়েছিল। কারণ তার স্ত্রী যে হুট করে কোথাও বেড়াতে চলে যাওয়ার মতো মহিলা নয়, সেটা সে খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। সে নিজে থেকে না বললে যে জিজ্ঞাসা করবে না, সেটা শ্রীময়ী জানত।
সকালে বেরিয়ে সন্ধের মধ্যেই ফিরে আসবে। তাই সমরেশকে না জানালেও কিছু আসত-যেত না। কিন্তু অপরাজিতা দাশগুপ্তের কাছ থেকে এই আর একটা জরুরি শিক্ষা সে পেয়েছে। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক যেমনই থাক, অপরাজিতা শহরের বাইরে গেলে সবসময় পরিতোষকে জানিয়ে যেতেন। বাবা বাইরে গেলেও সেটা মায়ের জানা থাকত। এখন অপরাজিতা বুঝতে পারে একজন শিল্পপতির স্বাভাবিক সাবধানতার জন্যই এটা করা জরুরি। অনেক মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়, অনেক কঠিন পরিস্থিতিতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাই শত্রুসংখ্যাও নেহাত কম থাকে না।
ডায়মন্ডহারবার রোড দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। শীতের সকাল। অনেকদিন পর এভাবে গাড়ি নিয়ে শহর ছাড়িয়ে বেরোল শ্রীময়ী। এমনিতেই বেড়াতে যাওয়ার অবকাশ তাদের বিশেষ থাকে না। কিন্তু কাজের সূত্রেই হোক কিংবা বেড়ানো, বাইরে যাওয়া-আসা সবই তো আজকাল ফ্লাইটে। ছোট্ট একটা শক্ত কাচের জানলার ভিতর দিয়ে প্রথমে রানওয়ের কুচকুচে কালো সাপের মতো পিছল রাস্তা। তারপরেই একেবারে হুস করে মেঘের সীমানা পেরিয়ে আকাশে ঢুকে পড়া। সমুদ্রের মতো আকাশ তো জ্যান্ত নয়, তাই একটু পরেই ভীষণ বোরিং। বিশেষ করে নিয়মিত যাদের যাতায়াত করতে হয় তাদের পক্ষে তো বটেই। তখন কোলে ল্যাপটপ, হাতে বই কিংবা কানে হেডফোন গুঁজে সিনেমা।
তাই অনেকদিন বাদে শীতের ঝলমলে রোদ ঢালা সকালটা ভারি টানছিল শ্রীময়ীকে। শহরতলি এলাকাটা পেরিয়ে যাওয়ার পরই দু'ধারে মাঠ। কোথাও ফসল উঠে গেছে। শুকনো ধানগাছের গোড়াগুলো বেয়াড়া ছেলের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও আবার সবজির চাষ শুরু হয়ে গেছে। দেখতে ভালো লাগছিল। কিন্তু উপভোগ করতে পারছিল না। মনের ভিতরে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা!
শ্রীময়ীর মনে হচ্ছিল, সে যেন একটা লম্বা অন্ধকার টানেলের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। টানলেটা কোথায় শেষ হবে তার জানা নেই। সেখানে পৌঁছে কী দেখবে তাও জানা নেই। হয়তো এমন কিছু যাতে তার এতদিনের একরকম ভাবে গড়ে ওঠা সম্পর্ক কিংবা ধারণাগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। শ্রীময়ী চাইলেই এখান থেকে এখন গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ি চলে যেতে পারে। ডরোথি মণ্ডল কে সেটা না জানলেও তার বাকি জীবনটা এভাবেই কেটে যাবে। কিন্তু সেটা সে পারবে না। অপরাজিতা দাশগুপ্তের জীবনের গোপন কথা খুঁজে তাকে বার করতেই হবে।
আসলে শ্রীময়ী নিজেও তার মায়ের মতোই ভীষণ জেদি আর একগুঁয়ে। যে জায়গাটায় সে পৌঁছতে চায়, সেখানে না পৌঁছানো পর্যন্ত স্বস্তি পায় না। মায়ের কাছে তার সারেন্ডারটা ছিল ছোটবেলার অভ্যাস। অপরাজিতার প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বের চাপে সে তার থেকে বেরোতে পারেনি। সেজন্য ভিতরে ভিতরে চিরকাল একটা প্রতিশোধস্পৃহা তার মধ্যে কাজ করেছে। এটা ঠিক নয়, শ্রীময়ী জানে। এটা কখনও কোনও মা আর সন্তানের মধ্যেকার স্বাভাবিক সম্পর্ক নয়। কিন্তু নিজের কাছে শ্রীময়ী অস্বীকার করতে পারে না যে মায়ের কোনও দুর্বলতার জন্য সে মনে মনে অপেক্ষা করে থাকত। এতদিন সুযোগ হয়নি। কিন্তু আজ যদি তেমন কিছু হাতের মুঠোয় আসে, তাহলে মা বেঁচে না থাকলেও তার শেষ তাকে দেখতেই হবে।
নদী পেরিয়ে বাসন্তী পৌঁছতে প্রায় দশটা বাজল। রাস্তায় বারদুয়েক সুবিমল গড়ুইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। কীভাবে আসতে হবে ঠিকঠাক বুঝিয়েও দিয়েছেন।
'বাদাবন বাঁচাও'য়ের অফিসটা গঞ্জের ভিতর দিয়ে যে মূল সড়ক চলে গেছে, তার পাশেই। ছোট একটা গোলাপি রঙের দোতলা বাড়ি। গোটা দুয়েক অফিসঘর ছাড়া বাকিটা নানারকম ট্রেনিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। পিছনদিকে অ্যাসবেসটাস দিয়ে ঘেরা একটা জায়গাও আছে। সুবিমলবাবু বললেন ওটা নাকি মাশরুম চাষের জন্য। শ্রীময়ীকে সবকিছু ঘুরিয়ে দেখালেন। ট্রেনিং নিতে ছেলে-মেয়েরা এসেছে। মেয়েদের সংখ্যা তুলনায় বেশি। বেশ কিছু বিবাহিত মহিলাও আছে। সুবিমল গড়ুই খুব উতাহের সঙ্গে সবকিছু দেখাচ্ছিলেন।
ইতিমধ্যে শ্রীময়ীর জন্য চাও এসেছে। একটু দূরে তাদের আর একটা ট্রেনিং সেন্টার আছে। সেখানে যাওয়ার কথাও হচ্ছে।
কিন্তু শ্রীময়ীর ভিতরে অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে। তাই আর বেশি দেরি না করে সে সুবিমলবাবুকে বলল, হ্যাঁ, ওখানেও যাব নিশ্চয়। কিন্তু তার আগে আমার একটা ছোট্ট কাজ আছে। আমি একজনের সঙ্গে একটু দেখা করতে চাইছিলাম। এখানে মানে বাসন্তীতেই থাকে। এক্স্যাক্ট ঠিকানাটা অবশ্য জানি না। আপনি যদি হেল্প করেন...।
হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়! আমি তো গত সাত-আট বছর এখানে কাজ করছি। কাজের জন্যই আমাকে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে হয়। এখন নাহয় নামটা লোকে চিনেছে। আগে তো বাড়ি গিয়ে বোঝাতে হত। সেজন্য বাসন্তীর অনেক লোককেই আমি চিনি। নামটা বলুন না দিদি।
ডরোথি মণ্ডল। এর বেশি আর কিছু কিন্তু জানি না। কিন্তু ভদ্রমহিলাকে আমার বিশেষ দরকার। একটু দেখুন তো যদি খোঁজ পাওয়া যায়।
সুবিমল গড়ুই কিন্তু নাম শুনে চিনতে পারলেন না। প্রথমে খানিক ফোন করে খোঁজখবর নেওয়া হল। এখানে নাকি একটা মণ্ডল পাড়া আছে। সেখানকার বাসিন্দারাও খ্রিস্টান। এই অঞ্চলগুলোয় বহুদিন ধরে খ্রিস্টান মিশনারীদের যাতায়াত। এলাকায় গোটা দুয়েক চার্চ আছে। ছেলে-মেয়েদের স্কুল, ট্রেনিং সেন্টার এসবও আছে। সেগুলো মিশনারীরাই চালায়। ডরোথি মণ্ডলের খোঁজ করার ফাঁকে এই এলাকা সম্বন্ধে নানারকম গল্প করছিলেন সুবিমল গড়ুই।
বুঝলেন তো দিদি, এইসব জায়গায় থাকলে বোঝা যায়, ধর্ম ব্যাপারটা আসলে কীরকম যেন গোলমেলে। এই যে এখানকার লোকজন, এরা তো সব খ্রিস্টান। আমার এখানে একটা মেয়ে আছে। ট্রেনিং নেয়। ওই মণ্ডল পাড়ারই মেয়ে। একদিন আসেনি। তো পরের দিন জিজ্ঞাসা করলাম, কাল আসিসনি কেন রে?
সে বলে কিনা কাল শিবরাত্তিরের উপোস ছিল! আমি তো অবাক। বললাম, তোরা তো খ্রিস্টান। তোদের আবার শিবরাত্তির কীসের? কী বলব আপনাকে, সে মেয়ে আমাকে রীতিমতো মুখঝামটা দিল। বলে, কেন, খ্রিস্টান বলে কি শিবরাত্তির নেই নাকি? শিবের মাথায় জল ঢেলে, চার্চে গিয়েও গোটা ফল দিয়ে এসেছি।
ভাবুন দিদি একবার, একইসঙ্গে মহাদেব আর যিশুর পুজো হয়ে গেল। সব একেবারে ঘেঁটেঘুঁটে একাক্কার। মরে গেলে কবর দেবে। আবার বাড়িতে কীর্তনও বসাবে। ওই সেই গান ছিল না, কৃষ্টে আর খ্রীষ্টে তফাত কিছু নাই রে...এ একেবারে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। এখানে না থাকলে এমনভাবে বুঝতে পারতাম কিনা জানি না।
সুবিমল গড়ুই কথা বলেন বেশ ভালো। শ্রীময়ী বুঝতে পারছিল ভদ্রলোককে দেখতে গ্রাম্য হলেও পড়াশোনা জানেন আর চিন্তা-ভাবনাও একটু অন্যরকম। তবে কথাগুলো শুনতে ভালো লাগলেও সে খুব বেশি মনোযোগ দিতে পারছিল না। ডরোথি মণ্ডলকে পাওয়া যাবে কিনা এই চিন্তাটা তার মনকে বারবার বিক্ষিপ্ত করে দিচ্ছিল। ফোন করে কোনও হদিশ মিলল না। দু'জনকে মণ্ডলপাড়ায় খোঁজ করতে পাঠানো হয়েছিল। তারাও ফিরে এসে কোনও খবর দিতে পারল না। ওই নামের কাউকেই নাকি ওই পাড়ার লোক চেনে না।
শ্রীময়ী বুঝতে পারছিল, তার মনের ভিতর একটা অদ্ভুত দোলাচল চলছে। ওই মহিলাকে খুঁজতে সে গাড়ি নিয়ে এতদূর এসেছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত যদি তার সন্ধান না পাওয়া যায়, তাহলে কি সত্যিই হতাশ হবে? হয়তো না। কারণ একদিকে সে চাইছে ডরোথি মণ্ডলকে খুঁজে বার করতে। অন্যদিকে তার নিজের মনের মধ্যেই একটা প্রচণ্ড বাধা আসছে, ইচ্ছে করছে ফিরে গিয়ে পুরো ব্যাপারটা ভুলে যেতে।
দিদি এভাবে মনে হচ্ছে হবে না। ভদ্রমহিলা হয়তো বাসন্তীতে থাকেন না। কাছাকাছি কোনও গ্রামে থাকেন। কিংবা হয়তো আগে ছিলেন। আমার মনে হয়, আপনার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে একটু অন্যভাবে খোঁজখবর করি?
সামান্য একটু অন্যমনস্ক ছিল শ্রীময়ী। সুবিমলের কথায় দ্রুত সচেতন হয়ে বলল, না না, পুলিশের কাছে আমি যাব না। এটা আমার একদমই ব্যক্তিগত ব্যাপার।
না দিদি, পুলিশের কাছে আমি যেতে বলছি না। তাছাড়া হাতে কিছু গুঁজে না দিলে পুলিশ গা-নাড়াই দেবে না। আমি বলছিলাম কি, ফাদার উইলিয়ামের কাছে যাই চলুন।
তিনি আবার কে?
এখানে যে ক্যাথলিক চার্চ আছে, তার ফাদার। বুড়ো মানুষ। অনেক বছর বাসন্তীতে আছেন। মাঝখানে বদলি হয়ে অন্য জায়গায় চলে গেছিলেন আবার এসেছেন। চার্চে যারা যায়, তাদের সবাইকে উনি চেনেন। তাছাড়া ওদের একটা রেজিস্টার খাতা থাকে। খ্রিস্টান পরিবারগুলোর নাম-ধাম সেখানে লেখা থাকে। ফাদার উইলিয়াম ভালো লোক। আমাকে স্নেহ করেন। আমার মনে হয় উনি হয়তো আপনাকে ডরোথি মণ্ডলের সন্ধান দিতে পারবেন।
কলকাতার সেন্ট পলসক্যাথিড্রাল দেখে অভ্যস্ত শ্রীময়ী। চার্চ বলতে ওরকম একটা ছবিই তার মাথার মধ্যে ছিল। সুবিমলবাবু যদিও বলেছিলেন এখানকার লোকেরা নাকি চার্চ বলে না। বলে গির্জেঘর। তাও সাদা রঙের একতলা বাড়িটা দেখে প্রথমটায় বেশ অবাকই হয়েছিল সে। মাথায় অবশ্য একটা ক্রশ লাগানো আছে। সামনে অনেকখানি বাগান। তাতে সুন্দর ফুলের কেয়ারি করা। একপাশে শিশু যিশুকে কোলে নিয়ে মা মেরির মূর্তি।
শীতের দুপুরে ফাদার উইলিয়াম বাগানেই একটা ইজিচেয়ার পেতে বই পড়ছিলেন। সুবিমলকে দেখে খুশি হলেন। শ্রীময়ী কেন এসেছেন সেকথা জানাতে ফাদার বললেন, ডরোথি নামটা কিন্তু চেনা চেনা লাগছে। তোমরা আমার সঙ্গে এস, আমি দেখছি।
পরিষ্কার বাংলা বলেন ফাদার উইলিয়াম। তবে এমনিতে মনে হয় দক্ষিণভারতের লোক। অন্তত চেহারা আর গায়ের রঙ দেখে সেরকমই মনে হয়।
চার্চের মূল হলঘরে অপেক্ষা করছিল সুবিমল আর শ্রীময়ী। একটু পরে ফাদার একটা বড় খাতা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এসে বললেন, পাওয়া গেছে। তবে ডরোথি মণ্ডল নয়। ডরোথি দাস। আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, এরই খোঁজ করছ তোমরা। দাস ওর বিয়ের আগের পদবি। বিয়ে করে মণ্ডল হয়েছিল মনে হয়।
আপনি কি নিশ্চিত ফাদার?
শ্রীময়ীর প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়লেন ফাদার উইলিয়াম, মোটামুটি নিশ্চিতই বলতে পারেন। কারণ বাসন্তী এলাকায় আর কোনও ডরোথি আমি পাচ্ছি না।
ভদ্রমহিলা কি এখানেই থাকেন?
মনে হয় না। তাহলে আমি জানতে পারতাম। ডরোথির বাবা ছিল জোনাথন দাস আর মা এই যে লিলি দাস। দু'জনেই মারা গেছেন। দু'জনকেই এখানে কবর দেওয়া হয়েছে। একটাই মেয়ে। তবে ডরোথি কিন্তু এখানে থাকত না। ও কলকাতায় চলে গেছিল। ওখানেই বিয়ে করেছিল। যতদূর মনে পড়ছে ছেলেটা হিন্দু ছিল। সেজন্য বিয়ে নিয়ে বাড়িতে ঝামেলা হয়েছিল। তাই ও বেশি আসত না। তারপর ওর বরও মারা যায়। শি ইজ আ উইডো। বাবা আগেই মারা গেছিলেন। মা মারা যাওয়ার সময় যখন এল, তখন কাজকর্ম মিটে যাওয়ার পর একদিন চার্চে এসেছিল। আমার সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছিল সেই সময়।
আপনার কাছে কি ওনার ঠিকানা আছে?
মাথা নাড়লেন ফাদার উইলিয়াম, না, ঠিকানা নেই। যতদূর জানি মা-বাবা মারা যাওয়ার পর ডরোথি এখানকার জমি জায়গা সব ওর খুড়তুতো ভাইকে বিক্রি করে দিয়ে চলে গেছে। আমাকে ও সেরকমই বলেছিল। তবে ওর ভাইয়ের কাছে অবশ্য আপনারা ঠিকানা পেতে পারেন...আরে ওই দ্যাখো বলতে বলতেই প্রবীর এসে গেছে। ওই হচ্ছে প্রবীর দাস। ডরোথির ভাই।
শ্রীময়ী দেখল একজন মাঝবয়েসি ভদ্রলোক একটা সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে চার্চের গেট খুলে ভিতরে ঢুকছেন।

লাউঞ্জে ঢুকতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন অমিয় নন্দী। ভারী পর্দাটা টানা আছে। তবে ভিতরে রীতিমতো হাসি-গল্পের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। নিশ্চয় ওই তপাদারের ফ্যামিলি। একটু আগে বারান্দা থেকে দেখেছেন পরপর দুটো গাড়ি ঢুকল। দুটোই বোঝাই। ছেলে-মেয়ে, বাচ্চা-কাচ্চা। গাড়িদুটো থামতেই বাচ্চাগুলো ছুটে নামল আর মুহূর্তে চেঁচামেচি করে চারিদিকে ছুটে বেড়াতে লাগল।
শীতের দিনে গোল্ডেন অর্চার্ডের সকালটা যেন এক ফোঁটা টলটলে মধুর মতো ঝলমল করে। চারিদিক চুপচাপ। পাতা ঝরে যাওয়া গাছগুলো থেকে মাঝে-মধ্যে এক-আধটা ট্রি-পাইয়ের ডাক। রোদে গা পেতে দিয়ে আরামে ঝিমোয় বড়াপানি লেক। তার বুকের ওপর স্থির হয়ে থাকে সবুজ পাইনের ছায়া।
এই নৈঃশব্দ্য ভীষণ উপভোগ করেন অমিয় নন্দী। মাঝে মাঝে শুধু মৌমাছির হালকা গুঞ্জনের মতো কিচেনের দিক থেকে প্রতিমা আর তার মেইডের নীচু স্বরের কথাবার্তা শোনা যায়। পরিবেশটা এরকম থাকলে লেখার মেজাজও আসে তাঁর। বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে নিজের মনে কাজকর্ম করেন।
কিন্তু আজ আর সেসব কিছু হবে বলে মনে হয় না। সকালে ওই এক গাড়ি লোক দেখেই তিনি বুঝেছিলেন। ক্রিসমাস যত এগিয়ে আসবে, তত এরকম ভিড় বাড়বে। শিলং-এ ফুর্তি করতে আসবে ছেলে-মেয়েরা। আর যাওয়ার আগে একবেলার জন্য গোল্ডেন অর্চার্ডে নেমে মা-বাবাকে কেক-গিফট দিয়ে যাবে। এতই যদি আদিখ্যেতা তাহলে বুড়ো-বুড়িকে বাড়িতে না রেখে হোমে কেন পাঠিয়েছে বোঝেন না অমিয়। আর বুড়োরাও তেমনি। ছেলে-মেয়ে আসলে যেন গলে যায়। তিনদিন ধরে ঘুরে ঘুরে সবাইকে দেখাবে কে কী গিফট পেল, কার ছেলে কত আদর করে কথা বলল। অথচ মা-বাবার শরীর খারাপ হলে কিন্তু পোলাপানদের টিকিটিরও দেখা মেলে না! তখন সব দায়িত্ব প্রতিমা আর প্রতীকের।
লেখাটা এগোল না। ভাবছিলেন লাউঞ্জে বসে টেলিভিশনে একটু বিদেশের খবর দেখবেন। সে গুড়েও বালি। নিজেদের ঘরে এতজনের একসঙ্গে বসার জায়গা হবে না বলে তপাদার আর ওনার স্ত্রী, ছেলে-বউ, মেয়ে-জামাই সবাইকে নিয়ে গুছিয়ে বসেছে সেখানে। এখন এই আড্ডা অন্তত ঘণ্টাখানেক চলবে। তার মধ্যে আর টেলিভিশন দেখতে পাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। অবশ্য অমিয় নন্দী যদি ভিতরে গিয়ে টিভিটা খুলে বসেন, তাহলে কি আর কেউ বাধা দেবে?
কিন্তু তাঁর মতো শোভন-মার্জিত রুচির ভদ্রলোকের পক্ষে এই ধরনের কাজ করাটা একেবারেই বেমানান। তাছাড়া ওরকম গোলমালের মধ্যে বসে নিজের পছন্দমতো প্রোগ্রাম দেখাও অসম্ভব! বাচ্চাগুলো আছে। হুটোপাটি করবে। অনেক বাচ্চার আবার গায়ে ওঠা অভ্যাস থাকে। বিরক্ত লাগে অমিয় নন্দীর। বাচ্চা ব্যাপারটাই তাঁর পছন্দ নয়। কিন্তু নারী শরীর তাঁকে ভীষণরকম টানে। সেই শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা সুখ তিনি দারুণ উপভোগ করেন। কিন্তু ওই উপভোগটুকুই তাঁর পছন্দ। তারপরে পর্বটা নিয়ে কোনওদিনই ভাবতে চাননি তিনি। ভাবতে ভালো লাগে না তাঁর।
লাউঞ্জে না ঢুকে বাগানের দিকে এগোলেন অমিয় নন্দী। প্রতিমার ব্যবস্থাপনায় কোনও ত্রুটি নেই। এইসময় বাগানে বেশ কয়েকটি ইজি চেয়ার পাতা থাকে। তার একটাতে শুয়ে খানিকক্ষণ সময় কাটানো যাবে। ঘর ডাস্টিংয়ের ছেলেটাকে এক কাপ কফি দিয়ে যেতে বলে ইজিচেয়ারে গা এলালেন।
শীতের রোদ সোনালি ওড়নার মতো গায়ে বিছিয়ে আছে। সামান্য ঘুমের আমেজে চোখ বন্ধ করে নন্দী ভাবছিলেন এই তপাদার, পাকড়াশি, বড়ুয়া এদের সঙ্গেই তিনি আছেন এখন। উঠছেন, বসছেন, কথা বলছেন। অথচ এদের সবার থেকে তাঁর জীবনটা কত আলাদা। এই যে বাঁধাধরা জীবন, পড়াশোনা তারপর চাকরি, বিয়ে, সন্তান এসবে তিনি কোনওদিনই বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর জীবনে বহু নারী এসেছে। অমিয় নন্দী জানেন, তিনি অসম্ভব সুপুরষ না হলেও তাঁর একটা অদম্য আকর্ষণ আছে। অনেকটা সাপুড়ের বাঁশির মতো তিনি মেয়েদের আকৃষ্ট করতে পারেন। জীবনে প্রথমবার তাঁকে এই কথাটা বুঝিয়ে ছিল দোলা।
তাঁদের বাগবাজারের বাড়িটা ছিল বড় রাস্তার ওপরে। তার পাশ দিয়ে যে গলিটা ঢুকেছে সেই গলিরই একদম শেষমাথার বাড়িতে থাকত দোলা। মধ্যবিত্ত পরিবার। দোলার একটা ছোট বোনও ছিল। নামটা জানতেন। এখন আর মনে নেই।
ডাকসাইটে সুন্দরী বলে শুধু তাদের পাড়ায় নয়, আশপাশের পাড়াতেও নাম ছড়িয়েছিল দোলার। গোলাপি ঘেঁষা গায়ের রঙ। টানা টানা মায়াবী চোখ, পাতলা ঠোঁট। ঠোঁটের বো-টা এমন চমৎকার ছিল যে, এতদিন পরেও সেটা স্পষ্ট মনে আছে। ঠোঁটের নিচে বাঁদিকে একটা কালো কুচকুচে তিলও ছিল। তবে ঠোঁট কিংবা তিলের থেকেও তাকে অনেক বেশি টানত কিশোরী দোলার ইউনিফর্মে ঢেকে রাখা উদ্ভিন্ন দুই স্তন।
তাদের বাড়ির সামনেই স্কুলবাসের জন্য অপেক্ষা করত দোলা। ফিরতও একই পথে। অমিয়র তখন পনেরো। ওই হালকা ঢেউ জাগানো বুকদুটি দেখার জন্যই তিনি রোজ ঠিকসময়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেন। দোলা জানত, তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। সে কখনও তাকাতো না। স্কুল থেকে ফেরার সময় পিছন থেকে ওর মসৃণ, রোমহীন সুগঠিত পাও অমিয়কে ভীষণ টানত।
দোলা কিন্তু খুব ভালো মেয়ে ছিল। একেবারে আক্ষরিক অর্থে ভালো মেয়ে। পড়াশোনায় ভালো। সিস্টার নিবেদিতা স্কুলে ক্লাসে স্ট্যান্ড করাটা তখন সহজ ছিল না মোটেই। দোলা প্রথম তিনজনের মধ্যেই থাকত। তাছাড়া স্বভাবটিও ছিল ভালো। আশপাশের সব উঠতি বয়সের ছেলেরাই যে তার জন্য পাগল সেটা সেও জানত। তার মধ্যে প্রায় সবার সঙ্গেই সে সহজভাবে কথা বলত। কিন্তু কাউকে বাড়তি গুরুত্ব দিত না।
অমিয়র সঙ্গে দোলার সেভাবে আলাপ ছিল না। অমিয় জানতেন, তিনি চাইলেও দোলা হয়তো তার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হবে না। নামজাদা স্কুলে পড়লেও পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা। তাছাড়া ওই বয়সেই মেয়েবাজ এবং এঁচড়ে পাকা বলে পাড়ায় তাঁর অল্পবিস্তর বদনাম ছড়িয়ে ছিল। বড়লোকের ছেলে। তাই সামনে বিশেষ কিছু বলত না কেউ।
অমিয় ধরেই নিয়েছিলেন তিনি চাইলেও দোলা তাঁর প্রতি কোনও আগ্রহ দেখাবে না। কিন্তু যৌবনের ধর্মই হল, যা অসম্ভব সেদিকে এগিয়ে যাওয়া। তাই একদিন দোলা যখন স্কুল থেকে ফিরছে তখন তার দিকে একটা চিঠি গোল্লা পাকিয়ে ছুড়ে দিলেন অমিয়। দূর থেকে দেখলেন, কাগজটা তুলে নিল দোলা। ঠিক দু'দিন দুরুদুরু বুকে অপেক্ষার পর চিঠির উত্তর এল। প্রেমপত্র তার আগেও অমিয় পেয়েছিলেন কিন্তু প্রেমপর্ব শুরু হল সেই প্রথম।
টিউশনে যাওয়ার নাম করে, স্কুল থেকে ফেরার সময় একটা নির্দিষ্ট জায়গায় স্কুলবাস থেকে নেমে যেত দোলা। অমিয় সেখানে অপেক্ষা করতেন। তারপর দু'জনে মিলে এদিক-ওদিক ঘুরে, নির্জন গঙ্গার ঘাটে কিছুক্ষণ বসে বাড়ি ফিরতেন। ওই গঙ্গার ঘাটেই দিন-তিনেক যাওয়ার পর একদিন দোলাকে চুমু খেয়েছিলেন অমিয়। দোলা বাধা দেয়নি। তবে তার ঠোঁটদুটো থিরথির করে কাঁপছিল। তারপরের দিন ওখানে বসেই যখন স্তনে আলতো করে হাত রাখলেন, তখনও দোলা একেবারে টুকটুকে লাল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও একটুও বাধা দিতে পারেনি। কেমন যেন অবশভাবে বসে সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে ছিল তাঁর দিকে।
তার ওই অবস্থা দেখেই বদমাইসি বুদ্ধিটা মাথায় খেলেছিল অমিয়র। দুপুরবেলায় বাড়ির একতলাটা ফাঁকা থাকত। মা ঘুমোতেন দোতলায়। আর কাজের লোকরা ওই সময় পাশের পাড়ায় তাসের আড্ডায় যেত। ক্ষেমিপিসিও মায়ের ঘরেই মাটিতে শুয়ে ঘুম দিত।
সেই সুযোগে একদিন স্কুলফেরতা দোলাকে অমিয় নিয়ে এলেন একতলায় নিজের পড়ার ঘরে। চুপিচুপি ভিতরে ঢুকে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিতে চমকে উঠেছিল দোলা। মুখখানা ভয়ে সাদা।
কিন্তু অমিয় ততক্ষণে শরীরের নেশায় পাগল হয়ে গেছেন। দোলাকে টেনে এনে শুইয়ে দিয়েছিলেন পাশে রাখা ছোট খাটটাতে। আনাড়ি হাতেও দ্রুত খুলেছিলেন ব্লাউজের বোতাম। স্কার্টটা টেনে নামিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন মাটিতে। তারপর নিজের পাজামাটা নামাতেই তাঁর উথিত পুরুষাঙ্গ দেখে শিউরে উঠেছিল দোলা। কিন্তু তখন আর কিছু করার নেই। অমিয় ঝাঁপিয়ে পড়ে চুমুতে তার মুখ বন্ধ করে দিয়ে পাগলের মতো পিষে দিয়েছিলেন স্তন। তারপর একসময় দুই উরুর মাঝখানে একেবারে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিলেন নিজের পুরুষাঙ্গ।
তাঁর নিজেরও সেটাই প্রথম সঙ্গমের অভিজ্ঞতা। তবু কী করে প্রথমবারেই প্রবিষ্ট হতে পেরেছিলেন জানেন না। দোলা যন্ত্রণায় অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠেছিল। কিন্তু সেদিকে কান দেওয়ার সময় তাঁর ছিল না। বারে বারে বিদ্ধ করছিলেন তাকে। বুঝতে পারছিলেন ক্রমশ প্রতিরোধ আলগা হয়ে গিয়ে দোলাও অংশ নিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই খুব দ্রুত নিঃশেষ হয়ে গেছিলেন অমিয়। ছাড়া পেয়ে দোলা কয়েক মুহূর্ত হতভম্ব হয়ে বসেছিল। তারপর দ্রুত জামা-কাপড় পরে নিয়ে ছুটে পালিয়ে গেছিল ঘর থেকে। তাকে আটকানোর কোনও চেষ্টা করেননি অমিয়।
তবে এরপরেও দোলার সঙ্গে বার তিনেক অন্তত তিনি একইভাবে মিলিত হয়েছিলেন। প্রথমবারের পর দোলার আগ্রহই বেশি ছিল। সদ্য পাওয়া শরীরী সুখ, নিষিদ্ধ আনন্দ তাকে একেবারে অভিভূত করে রাখত। অমিয় বুঝতে পারতেন, তাঁরা দু'জনে গঙ্গার ধারে গিয়ে বসলেও দোলা ইচ্ছে করেই অনেক বেশি তার গা ঘেঁষে বসছে। চাইছে অমিয়র হাত তার শরীরে খেলা করুক।
তাঁরও যে ভালো লাগত না তা নয়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, একবার শরীরের পুরো স্বাদ পেয়ে যাওয়ার পরেই দোলার ওপর আকর্ষণটা কেমন যেন কমে গেছিল তার। পরের মিলনগুলোয় উত্তেজনা থাকলেও সেই অসম্ভব তাড়না ছিল না। যদিও দোলা যে তার প্রতি প্রায় মোহগ্রস্ত হয়ে গেছে সেটা তিনি দিব্যি বুঝতে পারতেন।
বছরখানেকের মধ্যেই দোলার সম্পর্কে সব আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায় অমিয়র। মেয়েটাকে তিনি তখন ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারলে বাঁচেন। কিন্তু দোলা তো একেবারেই ব্যাপারটা সেভাবে নেয়নি। তাই দু'জনের দেখা হলেই কান্নাকাটি করে এক বিরক্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করত। দোলার স্কুলের রেজাল্ট খারাপ হতে শুরু করেছিল। তাই নিয়ে বাড়িতে অশান্তি ছিল। দোলার মা সম্ভবত কিছু সন্দেহ করেছিলেন। সেজন্য তার বাড়ি থেকে বেরোনোও কমে গেছিল। তাতে অবশ্য অমিয়র সুবিধাই হয়েছিল। নানারকম ভুজুং-ভাজুং দিয়ে তিনি দেখা করার ব্যাপারটা পিছিয়ে দিতেন।
ঠিক সেইসময়ই বাড়িতে পরপর অনেকগুলো দুর্ঘটনা ঘটে গেল আর অমিয়ও শেষপর্যন্ত তাদের বাগবাজারের বাড়ি ছেড়ে ল্যান্সডাউন রোডে দিদির বাড়িতে চলে এলেন।
আসার আগে দোলার সঙ্গে দেখা হয়নি। দেখা করার কথা তাঁর মনেও হয়নি। তারপরেও আর কোনওদিন দোলার সঙ্গে দেখা হয়নি তাঁর। তবে অনেকবছর পরে মুম্বাইয়ে ওই পাড়ারই একজনের সঙ্গে দেখা হওয়ায় তাঁর মুখে শুনেছিলেন দোলা নাকি ডক্টরেট করে এখন প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ায়। তবে তারা আর ও পাড়ায় থাকে না। অনেকদিন আগেই সল্টলেকে চলে গেছে।
দোলার কথা মনে পড়লেই পরে অমিয়র মনে হত যে তাঁর খুব ভাগ্য ভালো যে কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যায়নি। তখন তাঁদের যা বয়স তাতে মিলিত হওয়ার সময় প্রোটেকশন নেওয়ার কথা মাথাতেই আসেনি। অমিয় ভাবেননি। দোলার পক্ষেও ভাবা সম্ভব ছিল না। কিন্তু কিছু ঘটে গেলে দোলা নির্ঘাৎ তাদের সম্পর্কের কথা বাড়িতে বলে দিত। উত্তর কলকাতার পাড়ায় এরকম কিছু হলে অমিয় মোটেই সহজে রেহাই পেতেন না। হয়তো দোলাকে বিয়েই করতে হত তাঁকে।
কথাটা ভাবলেই মনে মনে শিউরে ওঠেন অমিয়। দোলার মতো একটা মেয়েকে বিয়ে, তারপর ছেলে-মেয়ে, সংসার একটা পুরোপুরি ভ্যাদভেদে জীবন। তাঁর ভাগ্য ভালো যে তিনি এর থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন।
সূর্যটা সামান্য একটু সরেছে। পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে আলোর একটা রেখা সরাসরি তাঁর মুখে এসে পড়ছে। মাথার টুপিটা মুখের ওপর সামান্য টেনে দিয়ে আবার চোখ বুজলেন অমিয়।
দিদির বাড়িতে থাকতে শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই দিদির দূর সম্পর্কের ননদ শেফালির সঙ্গে তাঁর একটা সম্পর্ক হয়েছিল।
তাঁর থেকে অন্তত বছর ছয়েকের বড় শেফালির তখন বিয়ে হয়ে গেছে। থাকত হরিশ মুখার্জি রোডে। কানপুরে ওদের বাড়ি ছিল বোধহয়। বিয়ে হয়ে কলকাতায় এসেছিল শেফালি। কাছাকাছির মধ্যে বাপের বাড়ির একজন আত্মীয় থাকায় শেফালি মাঝেমাঝেই দিদির বাড়িতে চলে আসত। লম্বা ছিপছিপে চেহারা। অসম্ভব সরু কোমর আর ভারী বুক। মুখখানা তেমন সুন্দর না হলেও খুবই অ্যাপিলিং।
শেফালি চোরা চোখে দেখত অমিয়কে। অমিয় বুঝতে পারতেন তাঁর পুরুষাঙ্গ শিরশির করছে। শেফালি একটু একটু করে তার দিকে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু একদিন হরিশ মুখার্জি রোডে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়ায় ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে গেল। শেফালি তাকে ধরে নিয়ে গেল নিজের বাসায়। একতলা সাজানো-গোছানো বাড়ি। অমিয়র মনে আছে বসার ঘরের দেওয়ালে একটা রবিবর্মার ছবি টাঙানো ছিল।
খানিকক্ষণ কথাবার্তা, চা খাওয়ার পর, বাড়ি দেখানোর নাম করে শেফালি নিজেই তাকে বেডরুমে নিয়ে গেল। তবে প্রথমদিন, প্রায় বছর তিনেক বিবাহিত জীবনে অভিজ্ঞ শেফালির কাছে নিজেকে খানিকটা আনাড়িই লেগেছিল অমিয়র। শেফালির বর যে প্রায়ই ট্যুরে বাইরে যায়, এই তথ্যটিও সেদিন জানা গেছিল।
তারপর থেকে প্রায়ই বর না থাকলে শেফালির বাড়িতে মিলিত হতেন তাঁরা। বিছানায় খুবই উপভোগ্য ছিল শেফালি। সত্যিকথা বলতে কি, শরীরী সুখের নানা অন্ধিসন্ধির সন্ধান শেফালিই প্রথম তাঁকে দেয়। পরে অবশ্য নিজগুণে অমিয় নন্দী সেব্যাপারে আরও অনেক বেশি এক্সপার্টাইজ অর্জন করেছিলেন। কিন্তু তখন তো তিনি নভিস।
মজার ব্যাপার হল, এতসব সত্ত্বেও বছর দেড়েকের মধ্যেই শেফালির প্রতি আকর্ষণ কমে আসছিল তাঁর। ততদিনে কলেজে ভর্তি হয়েছেন। মঞ্জিরার সঙ্গে ঘোরাঘুরি বাড়ছে। একইসঙ্গে শেফালি আর মঞ্জিরা দু'জনকে সামলাতে একটু বিরক্তিই লাগছিল।
পাল্লাটা মঞ্জিরার দিকেই ভারী ছিল। কারণ নতুন শরীর সবসময় তাঁকে বেশি টানত। শুধু নতুন নয় কচিও। অমিয় জানেন তাঁর থেকে বয়সে অনেকটা ছোট নারী শরীর তিনি চিরকালই খুব উপভোগ করেন। হতে পারে এটা একটা টিপিক্যালি মেল শোভিনিস্টিক মনোভাব। কিন্তু তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না।
সেসময় শেফালি কিছু বুঝেছিল কিনা অমিয়র জানা নেই। তবে হঠাৎ একদিন দিদির কাছে শুনলেন শেফালি নাকি বাপের বাড়ি চলে গেছে। তার বাচ্চা হবে। ডাক্তার বলেছেন বিশ্রামে থাকতে। বাচ্চাটা কার, তাঁর নাকি শেফালির বরের অমিয় জানেন না। জানার কোনও ইচ্ছাও তার হয়নি। বরং ঝামেলা চুকেছে বুঝে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন।
যদিও পরে অমিয়র মনে হয়েছে তাঁর হয়তো সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা নেই। জীবনে তো বহু নারীসঙ্গ করেছেন। কখনও কেউ গর্ভবতী হয়ে পড়েনি। অবশ্য যেসব মেয়েরা শরীরের আকর্ষণে তাঁর কাছে আসত, তারা সকলেই যথেষ্ট অভিজ্ঞ। তাই নিজেরাই প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করত কিনা অমিয় জানেন না। জানার চেষ্টাও করেননি কোনওদিন। নিজের সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা আছে কি নেই, তা নিয়েও কোনওদিন মাথা ঘামাননি। বরং ভিতরে ভিতরে এরকম নির্ঝঞ্ঝাট শরীরী সুখ উপভোগ করতে পারেন বলে খুশিই হতেন।
মঞ্জিরার পর সুতপা। তারপর অঙ্কিতা। মাঝখানে কি আর কেউ এসেছিল? আধো ঘুমের মধ্যে ভাবার চেষ্টা করেন অমিয়। মনে পড়ে না ঠিক। না পড়ারই কথা। যাদের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা অন্তত গড়িয়েছিল, তাদেরই কথা তাও একটু-আধটু মনে আছে। এছাড়াও বহু মেয়ের সঙ্গে বিছানায় গেছেন তিনি। যাদের শরীর উপভোগ করেছেন, তাদের অনেকেরই নাম-মুখ কিছুই ভালো করে মনে পড়ে না।
অমিয়র মনে মনে একটু গর্বই আছে যে নিত্য-নতুন শরীরের চাহিদা মেটাতে তাঁকে কখনও বেশ্যাপাড়ায় যেতে হয়নি। তিনি যে বহু নারীসঙ্গ করেন এটা জানা সত্ত্বেও কী এক অমোঘ আকর্ষণে চেনা-পরিচিত মেয়েরাই পতঙ্গের মতো ছুটে এসেছে তাঁর দিকে। তিনি নিজে কখনও জোর করেননি কাউকে। কথাটা মাথায় আসতেই, কুটকরে একটা পোকা যেন কামড়াল তাঁকে। চিন্তাটা সরানোর জন্য অমিয় ভাবলেন, আচ্ছা তাঁর যে এই বহুগামিতা, এটা কি আসলে জিনের কারসাজি? ব্যাপারটা কি তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন?
বাগবাজারের নন্দীদের একসময় বোলবোলাও ছিল খুব। বিশাল বাড়ি, নানারকম ব্যবসা, দাসী, চাকর, ঝাড়লণ্ঠন। অমিয়র ঠাকুরদা মদন নন্দীর সময় থেকেই অবস্থা পড়তে থাকে। বাবা প্রমথেশ নন্দী ছিলেন একেবারেই বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলে। কাজেকর্মে নেই অথচ বাবুয়ানি আছে ষোলআনার ওপর আঠারোআনা। বাবা যে নিয়মিত বেশ্যাবাড়ি যেতেন অমিয় খুব ভালো করে জানে। তাঁর বাঁধা দু-একজন মেয়েমানুষও ছিল। মায়ের সঙ্গে এসব নিয়ে অশান্তিও কিছু কম হত না। আবার তাদের এক দূর-সম্পর্কের কাকা যে বাবা বাড়িতে না থাকলে মায়ের সঙ্গে ঘরে ঢুকে দরজা দিত, তাও অমিয়র নিজের চোখে দেখা।
দিদি অমিয়র থেকে সতেরো বছরের বড়। দিদির বড়ছেলে পরিতোষ মাত্র তিন বছরের ছোট ছিল অমিয়র থেকে। পড়াশোনায় ভালো ছিল দিদি। দেখতেও খুব সুন্দর। দক্ষিণ কলকাতার বিখ্যাত ব্যবসায়ী পরিবারে বিয়ে হয়েছিল। ছোট ভাইকে প্রায় নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসত দিদি। জামাইবাবুও ছোট শালাটিকে খুবই স্নেহ করতেন।
দোলার সঙ্গে যখন অমিয়র প্রেমপর্ব চলছে, সেই বছরই জুন মাসে দার্জিলিং থেকে ফেরার সময় রাস্তায় গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মা-বাবা দু'জনেই মারা যান। প্রমথেশ নন্দী ছিলেন একমাত্র সন্তান। দিদি কিছু চায়নি। তাই পিতৃসম্পত্তি সবই অমিয় পেয়েছিলেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল বিশেষ কিছুই অবশিষ্ট নেই। বরং বাজারে বহু টাকার দেনা।
জামাইবাবু বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি শালাকে নিজের কাছে নিয়ে এসে বাগবাজারের বিশাল বাড়ি বিক্রি করে দেনার টাকা শোধ করে দিলেন। বাকি টাকা অমিয়র নামে ব্যাঙ্কে জমা রইল। তখন থেকে দিদির বাড়িই তাঁর স্থায়ী ঠিকানা। তবে দিদি কিংবা জামাইবাবুর অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও অমিয় কোনওদিনই চাকরি কিংবা ব্যবসার রাস্তায় যাননি। এমএ ক্লাস পর্যন্ত পড়াশোনা অবশ্য করেছিলেন।
তখন থেকেই অতিরিক্ত গল্পের বই পড়া, ছোটখাটো নাটক, চিত্রনাট্য লেখা, ছবি আঁকার নেশা তাঁকে পেয়ে বসেছিল। মা-বাপ মরা ছেলে। তাই দিদির বাড়িতে একটু বাড়তি আদর ছিল। তবে তার থেকেও যেটা বেশি ছিল সেটা হল পরিতোষের সঙ্গে বন্ধুত্ব।
মামা-ভাগনে প্রায় সমবয়েসি। তাই ছোটবেলা থেকেই পরিতোষ তাঁর খেলার সাথী। আর ল্যান্সডাউন রোডের বাড়িতে থাকতে শুরু করার পর তো তাঁরা প্রায় হরিহর আত্মা। অথচ স্বভাবের দিক থেকে দু'জন কিন্তু একেবারে উল্টো। পরিতোষ ধীর-স্থির-মেধাবী ছেলে। সেই কারণেই সম্ভবত বোহেমিয়ান মামাটিকে সে এত বেশি ভালোবাসত। অমিয় অবশ্য আর সব কথা বললেও নিজের নারীঘটিত খবরগুলি কখনোই পরিতোষকে বলতেন না। কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানতেন সেটা হজম করা পরিতোষের পক্ষে কঠিন হবে।
মামা ভালো গল্প লেখে, ভালো ছবি আঁকে, ভালো গান করে, চমৎকার ফটোগ্রাফির হাত। এমন মামাকে নিয়ে খুব গর্ব ছিল পরিতোষের। সেটা ভাঙতে চাননি অমিয়। পরিতোষ তাঁকে এতটাই ভালোবাসত যে, জামাইবাবু যখন ব্যবসা ভাগ করে দিলেন আর পরিতোষ নিজের বাড়ি করে নিউ আলিপুরে উঠে গেল, তখন মামাকেও সে জোর করে সঙ্গে নিয়ে গেছিল। তাঁর জন্য একটা ঘর আলাদা করে সাজিয়েও দিয়েছিল পরিতোষ। অপরাজিতাও আপত্তি করেনি।
অপরাজিতার কথা মনে পড়তেই চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেল অমিয় নন্দীর।
তিনি যখন কলকাতা ছেড়ে চলে আসেন তখন পরিতোষ বিদেশে। তারপরে সে অনেকবার মুম্বইয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছে। ঠিকানা জোগাড় করে চিঠি দিয়েছে। ফোন করেছে। কিন্তু অমিয় একদম নিশ্চুপ ছিলেন। পরিতোষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সব রাস্তা তিনি শক্ত হাতে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এমনকী পরিতোষের মৃত্যুসংবাদ পেয়েও তিনি একটা ফোন পর্যন্ত করেননি।
মুম্বাই যখন এসেছিলেন, তখন ব্যাঙ্কে ওই বাড়ি বিক্রির কয়েকটা টাকা ছাড়া আর কিছু ছিল না। অচেনা শহর। অচেনা মানুষ। সেখান থেকে আজ তিনি যে জায়গায় এসে পৌঁছেছেন এর সবটাই তাঁর নিজের হাতে তৈরি। বোহেমিয়ান, উচ্ছৃঙ্খল, লম্পট অমিয় নন্দীর নিজের অর্জিত। তাই নিজের ব্যাপারে কারুর কোনও মতামত, সমালোচনা কোনও কিছুকেই তিনি তোয়াক্কা করেন না। জীবনটা তাঁর। নিজের খুশিমতোই বাঁচবেন তিনি।

ফোনটা এসেছিল একটু রাতের দিকে। খাওয়া সেরে ক্লাস নাইনের টিউটোরিয়ালের খাতা নিয়ে বসেছিল সুমিতা।
ক'দিন ধরেই হুট করে বেশ গরম পড়ে গেছে। এইসব জায়গায় এরকমটাই হয়। গত কয়েকবছরের অভ্যাসে বুঝেছে সুমিতা।
শীতের আমেজ থাকে প্রায় মার্চের শেষ পর্যন্ত। দিনের বেলায় রোদ থাকলেও সূর্য ডুবলেই শিরশিরে ঠান্ডা। ভোরের দিকে গায়ে চাদর দিয়ে শুতে হয়। এপ্রিলের শেষ থেকে রোদের তেজ দ্রুত বাড়ে। দুপুরে শুকনো গরম হাওয়া হুহু করে বইতে থাকে। নাকে-মুখে চাপা না দিয়ে ঘর থেকে বেরোয় না কেউ। দই, ঘোল, ছাতুর সরবত এসবের চাহিদা বাড়ে। গরম খুব বেশি পড়লে মর্নিং স্কুল হয় সুমিতাদের। তবে তার এখনও সময় হয়নি। নতুন সেশন শুরু হওয়ার পর ক্লাস চলছে পুরোদমে। খাতা দেখার চাপও তাই ভালোই।
ফোনটা বাজছে। স্ক্রিনে অর্ণব মিত্রের নাম দেখে সামান্য একটু ইতস্তত করে ধরে সুমিতা।
ঘুমিয়ে পড়েননি তো? সবে দশটা। কলকাতায় এখন সবাই বাড়ির সামনে চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে।
কলকাতায় থাকার সময়ও আমি কখনও রাত দশটায় চা-এর দোকানে আড্ডা দিইনি।
নাইট শো-এ সিনেমাও দেখেননি নিশ্চয়? আচ্ছা, আপনি এত ভালোমানুষ কী করে হলেন বলুন দেখি! এত সুশীলা কিন্তু আমার ঠিক পছন্দ নয়।
বুঝেছি। কিন্তু ফোনটা তো আপনিই করলেন।
সে তো করলামই। না করে উপায় কী বলুন! এই পোড়া শহরে একমাত্র আপনিই স্বীকার করে নিয়েছেন যে আমি আপনার বন্ধু। তাই বাধ্য হয়েই নেমন্তন্ন করতে হচ্ছে। অনুগ্রহ করে কাল সন্ধ্যা সাত ঘটিকায় প্রস্তুত থাকিবেন। আমি আপনাকে আপনার বাসভবন হইতে আপন শকটে তুলিয়া নৈশভোজে যাইব। ফোনের দ্বারা নিমন্ত্রণের ত্রুটি মার্জনা করিবেন।
মার্জনা করিলাম। কিন্তু উপলক্ষ?
উপলক্ষ অতি সাধারণ। আগামীকল্যই সেই বিশেষ দিবস যেদিন আমা হেন মহান ব্যক্তি এই ধরাধামে অবতীর্ণ হইয়া পৃথিবীকে পবিত্র করিয়াছিল। অতএব...
যাক, পঁচিশে বৈশাখের কাছাকাছি নয় ভাগ্যিস!
অমন সুন্দর করে সাধু ভাষায় নেমন্তন্ন করলাম তাও পছন্দ হল না! যাক গে, যার যেমন ভাগ্য। রেডি হয়ে থাকবেন কিন্তু। আমি ঠিক সাতটায় পৌঁছে যাব। আর শুনুন, খালি হাতে চলে আসবেন না যেন। গিফট নিয়ে আসবেন। জন্মদিনে গিফটনা পেলে আমার ভালো লাগে না।
ফোনটা ছেড়ে দিয়ে আর খাতা দেখায় মন দিতে পারল না সুমিতা। নাইট ল্যাম্পটা জ্বেলে শুয়ে পড়ল।
শুক্লপক্ষ সবে শুরু হয়েছে। আকাশের এক কোণে একফালি চাঁদ চকচক করছে। তার কোয়ার্টার্সের গেটে একটা মাধবীলতা আছে। লাল-সাদা ফুলে ভরে গেছে গাছটা। মৃদু সুগন্ধ আসছে।
ঘুম আসছিল না। বিছানায় শুয়ে ঘুরতে থাকা পাখার ব্লেডের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল সুমিতা। কফি একবার খাওয়াতেই হয়েছিল। নাহলে একটু অভদ্রতা হত। কিন্তু সেদিন ইচ্ছে করেই অঞ্জলিকে সঙ্গে নিয়ে গেছিল।
আগের কথা কিছু বলেনি। তাই অঞ্জলি প্রথমটায় বেশ অবাক হয়েছিল। পরে কিছু আন্দাজ করেছে কিনা সুমিতা জানে না। তবে মুখে কিছু বলেনি। বলবে না সুমিতা জানে। সে নিজে থেকে কিছু না বললে জিজ্ঞাসাও করবে না। অঞ্জলির এই স্বভাবটাকে মনে মনে শ্রদ্ধা করে সুমিতা।
ডাঃ মিত্রও নিশ্চিত অবাক হয়েছিলেন অঞ্জলিকে দেখে। সুমিতা আশা করেছিল বন্ধু বলে মেনে নিলেও সম্পর্কটাকে যে সে শুধুমাত্র বন্ধুত্বের সীমাতেই বেঁধে রাখতে চাইছে, অঞ্জলির উপস্থিতি ওনাকে সেটা বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু তা হল না। ডাঃ মিত্র ব্যাপারটাকে পাত্তা দিলেন না মোটেই। তারপর আরও দু'বার তাদের দেখা হওয়ার সম্ভাবনাকে নানা অজুহাতে কাটিয়ে দিয়েছে সুমিতা। তাই এবার সরাসরি জন্মদিনের নেমন্তন্ন। নেমন্তন্ন যে শুধু তারই সে বিষয়েও কোনও সন্দেহ নেই।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে সুমিতা ঠিক করল কালই সে সব কথা বলে দেবে অর্ণবকে।
সকালে ঘুম যখন ভাঙল, তখনও রাতের কথাগুলোই মাথার মধ্যে গুনগুন করছে। অথচ মন চলছে তার নিজের খুশিতে। সুমিতার মনে হচ্ছিল তার মাথার সঙ্গে মনের যেন কোনও যোগ নেই। মানবদেহের সব বৈজ্ঞানিক তথ্যকে তুচ্ছ করে তার শরীর মাথার কথা মোটেই শুনছে না। শুনছে শুধুই মনের কথা।
সেজন্য স্কুলে যাওয়ার আগে নিয়ম ভেঙে শ্যাম্পু করে চুলে ভালো করে কন্ডিশনার লাগানো হল। সারাদিন পড়ানোর ফাঁকে বারবারই অন্যমনস্ক হয়ে ভাবল কোন শাড়িটা পরবে।
বিকেল না হতেই বাড়ি এসে অডিকোলন দিয়ে গা ধুয়ে আলমারি থেকে অনেক বেছে বার করল গোলাপি আর সাদাতে কাজ করা মলমল। হালকা গোলাপি ব্লাউজ। আলগা খোঁপা। ম্যাসকারা আর কাজলে ঘন চোখ। গোলাপি লিপস্টিক। কিন্তু তাও কেমন যেন অসম্পূর্ণ মনে হচ্ছিল সাজ।
ঘড়িতে সাতটা বাজতে যখন মাত্র পাঁচমিনিট বাকি, তখন দ্রুত বাগান থেকে একগোছা লাল-সাদা-গোলাপি মাধবীলতা ভেঙে এনে চুলের পাশে গুঁজে নিল সুমিতা। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই হাসিমুখে আয়না জানতে চাইল, বলো দেখি সুমিতা, এজগতের সেরা সুন্দরী কে?
উত্তর পাওয়া গেল অর্ণবের মুগ্ধ চাউনিতে। মনের কথা গোপন করার চেষ্টা করলেন না অর্ণব। গভীর গলায় বললেন, ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে আপনাকে। এর আগে তো কোনওদিন সেজেগুজে দেখিনি। একেবারে অন্যরকম! প্রসাধনে মেয়েদের এই বদলটা আমার খুব ইন্টারেস্টিং লাগে।
এরকম দেখেছেন বুঝি আগেও?
হ্যাঁ দেখেছি। আমাদের ক্লাসের রোমিতা। রোজই একটা টেনে ঝুঁটি বেঁধে, শার্ট আর আধময়লা জিনস পরে ক্লাসে আসত। আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে, সিগারেট খাচ্ছে। হঠাৎ ফেস্টের দিন সেজেগুজে শাড়ি পরে এসেছে। আমি তো প্রথমটায় চিনতেই পারিনি। ক্যাবলা হয়ে গেছিলাম একদম।
তবে এটা সবথেকে বেশি দেখেছি আমার মায়ের মধ্যে। মা চাকরি করেন না। তবে নানা ধরনের সোশ্যাল ওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। তাই রোজ না হলেও মাঝ-মধ্যেই বেরোতে হয়। বাড়িতে মা যেমন-তেমন। কিন্তু বেরোনোর আগে যেই তৈরি হল, মনে হত মানুষটাই যেন বদলে গেল। অথচ মা কিন্তু কোনওদিনই তেমন সাজে না। চোখে একটু কাজল, কপালে টিপ, পাটপাট করে পরা শাড়ি। ব্যস ওইটুকুই। অত কম প্রসাধনে ওরকম বদল আমি আর দেখিনি।
আজ আবার আপনাকে দেখলাম। মায়ের সঙ্গে আপনার আর একটা মিল আছে জানেন! মাও চুলে ফুল গুঁজতে ভালোবাসে। বড় একটা খোঁপা করে পাশে পাতাসুদ্ধ গন্ধরাজ...আমার ছোটবেলা থেকে দেখা।
রেস্তোরাঁটা একেবারে নদীর ধারে। এখানে একটা পার্ক অনেকদিন ধরেই আছে। এক বিদেশি সাহেব এই এলাকার টোপোগ্রাফিটা ব্যবহার করে পার্কটা তৈরি করেছিলেন। ছোট ছোট ঝরনা-পুকুর, উঁচু-নীচু নুড়ি ফেলা রাস্তা দিয়ে সাজানো। সবুজ ঘাসের লন, তার চারপাশে নানারকম ফুলের কেয়ারি এসব যেমন আছে তেমনি আবার বড় গাছও অনেক।
পার্কটা যে অর্ণবের খুব পছন্দ সেটা সুমিতা জানে। আগেও দু-একবার বলেছেন। সুমিতা যদিও প্রথম থেকেই এই রিভারসাইড রোডের কোয়ার্টার্সে আছে কিন্তু তার কখনও পার্কটা দেখা হয়নি। আসলে স্কুলের পর সুমিতার বেরোনটা ভীষণরকম অঞ্জলি নির্ভর।
অঞ্জলিই ধরে-বেঁধে নিয়ে যায়। সেটা সাধারণত সিনেমা দেখতে অথবা স্কুলেরই কোনও টিচারের বাড়ি আড্ডা মারতে। অঞ্জলির আবার গাছপালা-পার্ক এসবে কোনও আগ্রহ নেই।
সুমিতারও যে খুব আছে তেমনটা বলা যায় না। তবে অর্ণবের কাছে শুনে খানিকটা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। পার্কের শেষপ্রান্তে দামোদর নদী। তার ধারেই রেস্তোরাঁটা। তাই নাম শুনে সুমিতা বলল, তাহলে তো পার্কটাও দেখা হয়ে যাবে?
পার্ক দেখা যাবে না। আপনি তো আর কিছুতেই দিনের আলো থাকতে থাকতে আমার সঙ্গে বেরোবেন না। দু'দিন বললাম। দু'দিনই তা-না-না করে কাটিয়ে দিলেন। ভাবলেন আমি কিছু বুঝিনি। কিন্তু আমি যে ভারি বেহায়া সেটা তো আর আপনি জানেন না। তাই ঠিক সুযোগ বুঝে জন্মদিনের নেমন্তন্নটা করে ফেললাম। জানি এটা আর আপনি কাটাতে পারবে না।
সুমিতা সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামিয়ে নেয়।
অর্ণব কিন্তু হেসে ওঠেন হা-হা করে। তারপর সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলেন, সন্ধে হয়ে গেলে আর পার্কে ঘুরতে দেয় না। তবে রেস্তোরাঁয় যাওয়ার রাস্তাটা পার্কের ভিতর দিয়েই। ভিতরে আলোও আছে। তাই কিছুটা আপনি দেখতে পাবেন। আর রিভার ভিউয়ের একটা দিকের দেওয়াল পুরো কাচের। সে দিকটায় বসতে পেলে রাতের দামোদর দেখতে পাবেন। এখন কেমন দেখাবে জানি না। কিন্তু আমি একবার বর্ষায় এসেছিলাম। সেদিন বিকেলেই ডিভিসি জল ছেড়েছিল। নদী তখন ফুঁসছে। একূল-ওকূল দেখা যায় না। সে এক দৃশ্য বটে!
স্টার্টারে দুরকম কাবাব বললেন অর্ণব। তার সঙ্গে মকটেল।
সুমিতা চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে বসেছিল। নদী খাত এখন শুকনো। তারার আলোয় মাঝে মাঝে ক্ষীণ জলের ধারা চকচক করছে। মাঝখানে কিছুটা জায়গায় জল আছে। সেখানে এখনও দু-একজন সাইকেল একহাতে ধরে পারাপার করছে। এরা নদীর ওপারের গ্রামের লোক। কাজ-কর্ম করতে সকালে শহরে আসে। আবার সন্ধের পর ফিরে যায়। ঠিক যেন পাখির জীবন। সন্ধে নামতেই ডানামুড়ে বাসায় গিয়ে ঢোকা। নিশাচর প্রাণী ছাড়া আর সবার ক্ষেত্রেই তো একই নিয়ম। শুধু মানুষই অন্ধকারে আলো জ্বালার উপায় আবিষ্কার করে মধ্যরাত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ায়।
সুমিতার কেন জানি মনে হয়, মানুষের যেমন প্রকৃতিকে জয় করার একটা অদম্য ইচ্ছা আছে, তেমনি প্রকৃতিও চায় মানুষকে হারাতে। নিঃশব্দে প্রতিযোগিতাটা চলে। অধিকাংশ সময়ই মানুষ জিতে যায়। কিন্তু কোনদিন যে প্রকৃতি তাকে হ্যান্ডসডাউনে হারিয়ে দেবে কেউ জানে না।
এত মনোযোগ দিয়ে কী ভাবছেন বলুন তো?
কিছু ভাবছিলাম না। নদী দেখছিলাম। এতক্ষণ একসঙ্গে আছি অথচ আপনাকে শুভেচ্ছা জানানোই হয়নি। শুভ জন্মদিন...
বলতে বলতে নিজের ব্যাগ থেকে উপহারের প্যাকেটটা বার করে অর্ণবের দিকে বাড়িয়ে দেয় সুমিতা।
ছেলেমানুষের মতো খুশি হয়ে প্যাকেটটা নিয়ে তক্ষুনি সেটা খুলে ফেলে অর্ণব। একটা পুরুষালি পারফিউম, এক বাক্স চকোলেট আর একটা খাম।
খামটা খুলতে যাচ্ছিল অর্ণব। তার আগেই সুমিতা বলে, ওটাতে বুক কুপন আছে। আপনি তো বলেছিলেন বই পড়তে ভালোবাসেন। কিন্তু কী বই পড়েন, কোন বই আছে না আছে তা তো জানি না। তাই বুক কুপন দিয়েছি। নিজে পছন্দ করে কিনে নেবেন।
মোটেই নিজে পছন্দ করে কিনব না। আপনাকে সঙ্গে গিয়ে পছন্দ করে দিতে হবে। আর জানেন নাই বা কেন? জেনে নিলেই তো পারেন। একদিন আমার সঙ্গে গিয়ে দেখে আসতে পারেন আমার ঘর, বই, এলোমেলো সংসার। মানুষকে চিনতে তার ঘর দেখাটা কিন্তু খুব জরুরি।
সুমিতা চুপ করে থাকে। অর্ণব একটু থেমে বলে, অবশ্য আপনি যদি চিনতে না চান তাহলে আলাদা কথা।
অর্ণবের গলায় অভিমানের আভাস বুঝতে অসুবিধা হয় না সুমিতার। বুঝতে পারে সে নিজেও প্রায় খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। আর অপেক্ষা করলে পা ফসকে যাবে। তাই প্রায় শোনা যায় না এমন নীচু গলায় বলে, চিনে তো কোনও লাভ নেই।
একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকায় অর্ণব। বেয়ারা এসেছে কাবাব নিয়ে। পরিবেশন করে কাঁটা-চামচ ন্যাপকিন গুছিয়ে দিয়ে চলে যায়। খাবারে হাত দেয় না দু'জনের কেউই।
অর্ণব নীচু স্বরে জানতে চায়, লাভ নেই কেন? আপনি কি অন্য কাউকে চিনে নিতে বেশি আগ্রহী?
একদমই না। আসলে এই চেনাচিনির তো সবসময় একটা পরিণতি থাকে...
নিশ্চয়! আমরা তো কেউ টিন-এজ ছেলে-মেয়ে নই যে ভবিষ্যতের কোনও ভাবনাই দানা বাঁধেনি।
আমার কাছে সেই পরিণতিটা এত অবাস্তব যে আমি তার আগের পর্যায়গুলোর ভিতর দিয়ে যেতে পারিনি।
অবাক হন অর্ণব, কেন? অবাস্তব কেন?
খানিকটা মরিয়ার মতোই সুমিতা বলে, আমি তো আপনাকে সব কথাই বলেছি। আমি অনাথ। মা-বাবা নেই। মাসির কাছে মানুষ। আপনি যে ধরনের পরিবারের ছেলে তাতে...
তাতে একেবারেই কিছু আসে যায় না সুমিতা। আমার বাড়ির কারুর কিচ্ছু আসে যায় না। ইনফ্যাক্ট আমি ঠিকই করে ফেলেছি, আজ আপনার সঙ্গে কথা বলে যদি পজিটিভ সাড়া পাই, তাহলে মাকে পুরো ব্যাপারটা জানাবো। আপনার সবরকম পরিচয় দিয়েই জানাব।
না প্লিজ, আপনি কিছু জানাবেন না। এটা সম্ভব নয়! আমি আপনাকে দুঃখ দিতে চাইছিলাম না বলেই বারবার দেখা করাটা এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আপনি তো শুনলেন না। বুঝতেও চাইলেন না। আমারও দোষ আছে নিশ্চয়। হয়তো আরও কড়া হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমি পারিনি। আপনার সঙ্গে দেখা করতে, কথা বলতে এত বেশি ইচ্ছে করে আমার...
গলাটা ধরে এল সুমিতার। দু-হাতের মুঠো শক্ত করে প্রাণপণে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল সে। সেই শক্ত মুঠির ওপরে আলতো করে হাত রাখেন অর্ণব, তাহলে তো আমি ঠিকই বুঝেছি। তোমার মন যদি আমাকে চায়, তাহলে বাধা কোথায়?
আমি আপনাকে সবটা বলিনি অর্ণব! গাল থেকে গড়িয়ে আসা জলের ফোঁটা মুছে নিয়ে শান্ত গলায় বলে সুমিতা।
আমি আপনাকে বলেছিলাম আমি অনাথ সন্তান। আমার মা-বাবা দু'জনেই মারা গেছেন। আমি আপনাকে বলিনি আমি আসলে অবৈধ সন্তান। আমার পিতৃপরিচয় জানা নেই। বলতে পারেন বেওয়ারিশ বাচ্চা!
কয়েক সেকেন্ডের একটা নৈঃশব্দ্য। তারপর সুমিতার হাতটা দৃঢ়ভাবে নিজের মুঠির মধ্যে ধরে অর্ণব বলেন, তাতেও আমার সিদ্ধান্তের কোনও বদল হবে না সুমিতা। এর কোনও কিছুর জন্যই তুমি দায়ী নও। তাই তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক।
আপনার হয়তো এখন এরকম মনে হচ্ছে। পরে অন্যরকমও তো মনে হতে পারে। তাছাড়া আপনার বাড়ি, আত্মীয়স্বজন...
আমি ঘনঘন মত বদলানোর মতো মানুষ একেবারেই নই সুমিতা। আমার মনে হয় না আমার মা-বাবার চিন্তাভাবনাও অন্যরকম কিছু হবে। বাবা আর আমি দু'জনেই সেলফমেড মানুষ। তাই আত্মীয়স্বজনরা কী ভাবল তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। কিন্তু তুমি যদি আমাকে বিশ্বাস করে সবটা খুলে বলো তাহলে আমার ভালো লাগবে। হয়তো তোমারও একটু হালকা লাগবে। তবে ইচ্ছা না হলে নাই বলতে পারো। আমি জোর করব না। কোনওদিন জানতেও চাইব না। আর প্লিজ, খেতে শুরু করো। কাবাব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
কাঁটায় কাবাবের একটা ছোট্ট টুকরো গেঁথে মুখে পোরে সুমিতা। জল খায় অল্প। তারপর নদীর দিকে একটুসময় তাকিয়ে থেকে বলে, সবটা আমিও জানি না। মাঝে মাঝে ফাঁক আছে কিছু। মাসি মনে হয় সবটা আমাকে বলে না। যেটুকু জানি সেটুকুই আপনাকে বলছি—
আমার জন্ম হয়েছিল নীলরতন সরকার হাসপাতালে। মাঝরাতে একটা লোক, হয়তো সেই আমার বাবা, আমার মাকে হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে নিয়ে আসে। মা নাকি তখন ব্যথায় ছটফট করছে। ভোরের দিকে আমার জন্ম হয়। তার ঘণ্টাখানেক পরে আমার মা মারা যান। কিন্তু ওই ভর্তি হওয়ার সময় যে লোকটি সঙ্গে এসেছিল তার আর কোনও খোঁজ মেলেনি। আমাকে নিতে বা মায়ের মৃতদেহ সৎকার করতে কেউ আসেনি। ভর্তির সময় ঠিকানা একটা দেওয়া ছিল কিন্তু তারও নাকি কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে আমি বেশ কয়েকদিন ওই ওয়ার্ডেই ছিলাম।
মাসি তখন ওখানে আয়ার চাকরি করত। মাসির বর তার আগেই অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। ছেলেপুলে নেই। তাই মাসি হাসপাতালের সুপারকে বলে আমাকে মানুষ করবে বলে নিজের কাছে নিয়ে আসে।
আশ্চর্যের ব্যাপার হল যেদিন মাসি আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসে, তার তিন-চারদিন পরে মাসির নামে একটা চিঠি আসে। সেই চিঠির সঙ্গে ছিল একটা দশ লক্ষ টাকার চেক। চিঠিতে লেখা ছিল এই টাকাটা যেন আমার নামে ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে সেই সুদে আমার খরচ চালানো হয়।
সেই চিঠি তুমি দেখেছ?
না। চিঠিটা নাকি হারিয়ে গেছে। তবে টাকাটা মাসি ব্যাঙ্কে জমা দিয়েছিল। সেই টাকাতেই আমার পড়াশোনা, আমাদের দু'জনের সংসার সবই চলেছে। হাসপাতালের আয়ার কাজটা মাসি বোধহয় কয়েকবছর পরেই ছেড়ে দিয়েছিল।
মাসির হাসপাতালে কাজ করতে যাওয়ার আমার নিজের কোনও স্মৃতি নেই। তবে বাগুইআটির যে ছোট ফ্ল্যাটটায় আমরা থাকি, সেটা কেনা হয় আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। সেটা মাসি কীভাবে কিনেছিল আমি কিন্তু জানি না। যদিও ওই সময়, ওই এলাকাগুলোয় ফ্ল্যাটের দাম খুবই কম ছিল। কিন্তু তবু সেই টাকাটা এল কোথেকে? মাসি কি সুদের টাকা জমিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছিল? আমার কাছে বিষয়টা মোটেই পরিষ্কার নয়।
মাসিকে কখনও জিজ্ঞাসা করোনি?
মাসি বলেছে মেসোর নাকি কিছু জমানো টাকা ছিল আর মাসি নিজে যেহেতু একমাত্র সন্তান, তাই মা-বাবা মারা যাওয়ার পর যা কিছু সম্পত্তি পেয়েছিল তাই বিক্রি করে ফ্ল্যাটটা কিনেছে। কিন্তু সেটা কতটা ঠিক আমি জানি না। সত্যি কথা বলতে কি আমি এসব নিয়ে মাসিকে কখনও খুব বেশি জেরাও করিনি।
এই কথাগুলো তুমি কবে জানলে?
বেশ ছোটবেলাতেই। মানে, যখন থেকে খানিকটা জ্ঞানবুদ্ধি হয়েছে তখন থেকেই। আসলে মাসি তো ঠিক পড়াশোনা জানা শিক্ষিত মহিলা নয়। ভান-ভণিতা করতে পারে না। আমি যে মাসির কেউ নই, আমার যে মা-বাবা নেই সেটা ছোটবেলাতেই বলে দিয়েছিল।
একটু বড় হওয়ার পরে, মানে যখন আমার বারো বছর বয়স, আমি একদিন মাসিকে সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করলাম যে আমার মা-বাবা কে? সেদিনই সবটা শুনেছিলাম। তারপর বেশ কিছুদিন একটা অদ্ভুত ফিলিং হত। রাস্তায় কোনও অচেনা লোক আমার দিকে তাকালেই মনে হত, হয়তো এই আমার বাবা। দু-একবার বদমাইস লোকের পাল্লায় পড়তে পড়তেও বেঁচে গেছি। তারপর একসময় নিজেই একটু একটু করে শক্ত হলাম। মন দিয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করলাম যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি। কিন্তু সেই বাবাকে খোঁজার ইচ্ছেটা এখনও পুরোপুরি মরে যায়নি।
কথাটা বলতে গিয়ে সুমিতার গলা কেঁপে গেল বুঝতে পারলেন অর্ণব। নরম গলায় বললেন, আর কিছু জানো, বাবার নাম, মায়ের নাম?
বাবার নাম জানি না। হাতের লেখা নাকি পড়া যায়নি। মায়ের নাম হাসপাতালের খাতায় লেখা ছিল লক্ষ্মী গুপ্ত। সেটা আসল নাম কিনা কেউ জানে না। আমার শুধু মনে হয় জানেন...অবৈধ সন্তান, ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলেছে। মা মরে গেছে যখন, তখন তো আরোই সুবিধা। কিন্তু পরে টাকাটা কেন পাঠাল? তার মানে আমার খোঁজ রাখত। কে আমাকে মানুষ করছে জানত। অত টাকা দিতে পেরেছে যখন তখন নিশ্চয় পয়সাকড়িও ছিল। তার একবার মনে হল না মেয়েটাকে দেখে যাই! একবার জানতে ইচ্ছে করল না বড় হয়ে মেয়েটা কেমন আছে? এরকমও মানুষ হয়! ঘৃণা করি লোকটাকে আমি! ভীষণ ভীষণ ঘৃণা করি। তবু বড্ড দেখতে ইচ্ছে করে একবার। নিজের পরিচয় দেব না...শুধু একবার দেখব।
সুমিতার দু'চোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। অর্ণব দুহাতের মুঠোয় সুমিতার হাত চেপে ধরে বললেন, আজ থেকে আমিও তোমার সঙ্গে তোমার বাবাকে খুঁজব সুমিতা। দু'জনে মিলে খুঁজলে ঠিক পারব দেখো। এখন তো পৃথিবী অনেক ছোট হয়ে গেছে। আমার যেখানে যেটুকু চেনাশোনা আছে সবটুকু কাজে লাগিয়ে আমি চেষ্টা করব। তুমি শুধু কথা দাও আমার সঙ্গে থাকবে।
চোখের জল মোছেনি সুমিতা। সামান্য ধেবড়ে গেছে কাজল। গালের ওপর কালচে জলের রেখা। দোয়েল পাখির মতো মায়াজড়ানো কালো চোখে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত প্রত্যয়ী গলায় বলল, থাকতে বড্ড ইচ্ছে করছে বলেই বোধহয় এত কথা বলে ফেললাম। কখনও তো কাউকে বলিনি!

ডরোথি আমার বোন ছিল ম্যাডাম, আপন নয়, তুতো বোন। ওর বাপ আমার কাকা লাগত। পাশাপাশি বাড়ি। তবে ওদের সঙ্গে আমাদের তেমন পটত না কখনোই। বোনই হতো, বলা উচিত নয় তবে বড্ড নাকউঁচু মেয়েছেলে! যেমন ও তেমনি ওর মা। কেন যে অত মটমটানি জানি না। জমি তো ছিল মাত্তর দু'বিঘে আর ওই বাড়িখানা। তাও যখন কাকার টিবি ধরা পড়ল আর খেতে কাজ করা বন্ধ হল তখন দু'বেলা ভাতও জুটত না। আমাদের বাড়িতে চাল চাইতে আসতে হত।
শক্ত চোয়াল, চৌকো মতো মুখ প্রবীর দাসের। চোয়াড়ে ধরনের চেহারা। পছন্দ হচ্ছিল না শ্রীময়ীর। সে যে ডরোথির খোঁজে এসেছে একথাটা প্রবীরকে ফাদার উইলিয়াম জানানোর পর থেকে বকেই চলেছে। শ্রীময়ী প্রথমটায় চেষ্টা করছিল কথাগুলোর ভিতর থেকে যদি কিছু সূত্র উদ্ধার করা যায়। কিন্তু সেরকম কোনও সম্ভাবনা নেই দেখে সরাসরি প্রসঙ্গে চলে গেল,
আপনার কাছে ডরোথির কোনও ঠিকানা কিংবা ফোন নম্বর আছে?
না ম্যাডাম, সেসব নেই। ও কারুর সঙ্গে যোগাযোগই রাখত না তো ঠিকানা! বড়লোকের বাড়িতে থাকত কিনা, তাই নিজেকেও ওরকম মনে করত।
বড়লোকের বাড়িতে থাকত?
হ্যাঁ, ওই ওর বাবার যখন টিবি ধরা পড়ল, তখনই তো ওর মা-ই ওকে কলকাতায় বাড়িতে কাজ করতে পাঠাল।
কাদের বাড়িতে কাজ করত জানেন কিছু?
না না, সেসব বলতে পারব না। তবে একবার জানি শুনেছিলাম ভবানীপুরে নাকি থাকে। খুব বড়লোক...তা ও বড়লোক তো আমাদের কী বলুন? ওখানে থাকতে থাকতেই তো হিন্দু ছেলেকে বিয়ে করে বসল। তারপর থেকে মা-বাবা মুখ দেখেনি অনেকদিন। তারপর একবার বড়দিনে বরকে নিয়ে এল। বর মরে যাওয়ার পরও এসেছে দু-একবার।
ডরোথির মেয়েও ওর সঙ্গে আসত?
কথাটা বলতে গিয়ে শ্রীময়ী বুঝতে পারল যে তার গলা সামান্য কেঁপে গেল।
প্রবীর দাস কিন্তু কিছু বুঝেছে বলে মনে হল না। বরং একটু অবাক হয়েই বলল, মেয়ে! ডরোথির মেয়ে ছিল নাকি? ছেলেপিলে হয় নাই বলেই তো শুনেছিলাম। ওর মা মাঝেসাঝে দুঃখ করত। তারপর তো বরও মরে গেল...
বর কবে মারা গেল?
তা বলতে পারব না। তবে ওর বাবা মরার আগে। বাবা বলেছিল মেয়েকে এখানে এসে থাকতে। ডরোথি রাজি হয়নি।
বর মারা গেছে। বাবার কাছেও এসে থাকতে চায়নি। তাহলে ওর চলত কী করে?
চাকরি করত শুনেছিলাম। অনেক অপিসে বর মরলে বউকে চাকরি দেয় তো। সেরকম পেয়েছিল বোধহয়।
কোথায় চাকরি করত বলতে পারবেন?
তা বলতে পারব না ম্যাডাম। শুনে থাকলেও মনে নাই। অনেককালের ব্যাপার। ডরোথির বাপ মরেছে না হোক তিরিশ বছর। মাও কবরে গেছে পঁচিশ বছর হয়ে গেল।
কিন্তু ডরোথি তো ওর বাড়ি-জমি আপনাকে বিক্রি করেছিল বলছেন। তাহলে বিক্রির সময় দলিলে তো ঠিকানা দেবে নিশ্চয়...।
এবার একটু চিন্তিত দেখায় প্রবীর দাসকে।
ফাদার উইলিয়ামও শ্রীময়ীকে সমর্থন করেন, ম্যাডাম কিন্তু ঠিকই বলেছে প্রবীর। দলিলে নিশ্চয় ওর ঠিকানা দেওয়া ছিল।
আমি মুখ্যু মানুষ। অত তো বলতে পারবনি। দলিল উকিল দেখে দিয়েছিল। তারপর বাড়ি-জমি রেজিস্ট্রি হল। ডরোথি কোর্টে এসে সই করে টাকা নিয়ে গেছিল।
ফাদার উইলিয়ামের কথায় মাথা নাড়ে প্রবীর, সে জমি তো আমি চুন্নু শেখকে বিক্রি করে দিয়েছি ফাদার। দলিল ওর কাছে হবে।
চুন্নু শেখকে সুবিমল গড়ুই চেনেন। ফোন করে জানা গেল, সে বাড়িতে নেই। ডায়মন্ডহারবার গেছে।
আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম, চুন্নুর কাছ থেকে দলিল বার করে ওতে যদি ডরোথি মণ্ডলের ঠিকানা থাকে আমি আপনাকে জানিয়ে দেব।
ভদ্রলোক এমনিতেই বেশ সিনসিয়ার টাইপ। তাছাড়া বাদাবন বাঁচাও-এর জন্য আরও কিছু টাকা দেবে বলে কথা দিয়েছে শ্রীময়ী। শুধু যে সুবিমল গড়ুই তাকে সাহায্য করেছেন সেজন্য নয়। ভদ্রলোক যে কাজটা করছেন সেটা দেখেশুনে তার পছন্দ হয়েছে।
শ্রীময়ী আদ্যন্ত ব্যবসায়ী মানুষ। তাই টাকাটা দান হিসাবে দেওয়ার কথা সে বলেনি। ইদানীং বিদেশে চামড়ার ওপর পেইন্টিং করা ব্যাগের খুব চল হয়েছে। অনেকটা শ্রীনিকেতনে যে ধরনের ব্যাগ তৈরি হয় সেরকম। কিন্তু শ্রীনিকেতনের ব্যাগগুলোর ডিজাইন বড্ড একরকম, ভীষণ ক্লিশে। ওই ধরনটা বিদেশের বাজারে চলবে না। শ্রীময়ী অনেকদিন ধরেই ভাবছিল ব্যাগের ওপরে একেবারে আধুনিক ডিজাইনের পেইন্টিং করে একটা এক্সপেরিমেন্ট করবে। সেই পেইন্টিং-এর কাজটা সুবিমল গড়ুইয়ের সংস্থার মেয়েদের দিয়ে করানো যায়।
ডিজাইন, রং সব শ্রীময়ী দেবে। ওর লোক এসে কাজটা কীভাবে করতে হবে সেটা শিখিয়েও দেবে। মেয়েরা শুধু পেইন্টিং করবে। তার বিনিময়ে টাকা পাবে। শ্রীময়ীরও সুবিধা হবে। কলকাতার তুলনায় এখানে লেবার কস্ট অনেক কম। সবটা খুলে না বললেও সুবিমল গড়ুইকে কাজের খানিকটা আভাস দিয়েছে শ্রীময়ী। ভদ্রলোক তাতে খুবই খুশি হয়েছেন।
গাড়িতে কলকাতায় ফিরতে ফিরতে শ্রীময়ী ভাবছিল, বাসন্তী আসাটা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। ডরোথি মণ্ডল সম্বন্ধে দুটো খুব জরুরি ইনফরমেশন জানা গেল। প্রথমত তার নিজের কোনও বাচ্চা নেই। তার মানে, এই গুড়িয়া ডরোথির নিজের মেয়ে নয়। আর দ্বিতীয় ডরোথি ভবানীপুরে কোনও এক বড়লোকের বাড়িতে কাজ করত। ভবানীপুরে শ্রীময়ীর মামাবাড়ি।
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সুধাবিন্দু ভবানীপুরে একটা একতলা বাড়ি কিনেছিলেন। সামনে-পিছনে অনেকটা জায়গা ছিল। পরে করুণাময় সেই বাড়িটাকে দোতলা করেন। ভিতরেও অনেক রদবদল করা হয়। তবে বাগান তারপরেও বেশ খানিকটা ছিল। শ্রীময়ীদের আলিপুরের বাড়িতে যেটুকু বাগান আছে, তাও একেবারে ছেঁটেকেটে, ফুলের কেয়ারি করে সাজানো।
মামাবাড়ির বাগানটা ঠিক সেরকম নয়। পিছনদিকে এলোমেলো গাছপালা। সামনে অনেকটা চওড়া বারান্দা। তার ধার দিয়ে নানারকম টবে দাদুর শখের গাছ থাকত। একপাশে একটুখানি জায়গা বেদীর মতো উঁচু করা ছিল। সেখানে কাচের বোয়ামে আচার রোদ্দুরে দেওয়া হত।
এসবের জন্যই ছোটবেলায় মামাবাড়ি যেতে ভারি ভালো লাগত শ্রীময়ীর। একদম ছোটবেলায়, মানে শ্রীময়ী যখন স্কুলের একেবারে গোড়ার দিকে। তখন অনেকসময় এরকমও হয়েছে, স্কুল ফেরতা গাড়ি গিয়ে তাকে মামাবাড়িতে নামিয়ে দিয়ে এসেছে। দিদিমার কাছে চান করে ভাত খেয়ে নিয়েছে। তারপর বিকেলে মা অফিস থেকে দাদুর সঙ্গে ফেরার পর দু'জনে বাড়ি এসেছে।
একমাত্র নাতনি। দাদু-দিদিমা দু'জনেই রাই বলতে অজ্ঞান ছিলেন। কিন্তু মা যখন থেকে তার ওপর নজরদারি শুরু করল, তারপর মামাবাড়িও একলা যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছিল। মায়ের সঙ্গে যাওয়া, মায়ের সঙ্গে ফেরা। এমনকী বাড়ির ভিতরেও একটু বেশিক্ষণ চোখের আড়ালে থাকলে বিরক্ত হতেন অপরাজিতা। তাকে এভাবে অতিরিক্ত চোখে চোখে রাখার ব্যাপারটা দাদু-দিদিমারও ভালো লাগত না। দু-একবার তাঁদের বলতেও শুনেছে শ্রীময়ী। কিন্তু তাতে কোনও লাভ হয়নি।
ব্যবসা কিংবা পারিবারিক ব্যাপারে দাদুর ওপর যে মায়ের আস্থা ছিল সেটা বোঝা যায়। দাদু নিজে হাতে ব্যবসাটাকে বড় করেছিলেন। তাই তাঁর মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন মা। কিন্তু শ্রীময়ীর ক্ষেত্রে তাঁদের কোনও কথাই যেন তাঁর কানে ঢুকত না।
রাই যখন ক্লাস এইটে পড়ে তখন দাদু মারা গেলেন। তার বছর দুয়েক পরে দিদিমাও চলে গেলেন। অপরাজিতা একমাত্র সন্তান। তাই দাদু-দিদা মারা যাওয়ার পর ওবাড়িতে সেই অর্থে থাকার মতো আর কেউ ছিল না। অনেকেই ভেবেছিল অপরাজিতা হয়তো বাড়ি বিক্রি করে দেবেন কিংবা প্রোমোটিং করে ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রি করে দেবেন। কিন্তু তিনি সেসব কিছুই করেননি। বরং বাড়ির পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন।
ভবানীপুরের বাড়ি এখনও যেমন ছিল ঠিক তেমনটি আছে। দাদুর আশ্রিতা ছিলেন তাঁদের এক দূর সম্পর্কের বিধবা বোন। বয়সে দাদুর থেকে অনেকটাই ছোট। তিনিই এখন বাড়ির কর্তী। অপরাজিতা তাঁকে রাঙাপিসি বলতেন। শ্রীময়ী রাঙাদিদা বলে। চাকর-বাকর, কাজের লোক সবাই যে যেরকম ছিল তেমনটাই আছে। দু-চার বছর অন্তর বাড়ি মেরামতি, রঙ করানোও হয়।
ওবাড়িতে অপরাজিতার নিজের ঘর আর তাঁর মা-বাবার ঘর ঠিক যেমনটি ছিল তেমনভাবে পরিপাটি গোছানো থাকে। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত অপরাজিতা নিয়ম করে বছরে চারদিন, মা-বাবার জন্মদিন এবং মৃত্যুদিনে ওবাড়িতে গিয়ে থাকতেন।
শ্রীময়ী আর সমরেশও মেয়েকে নিয়ে প্রতিবছর বিজয়া আর পয়লা বৈশাখে ওবাড়ি গিয়ে রাঙাদিদাকে প্রণাম করে আসে। অপরাজিতা মারা যাওয়ার পর সমরেশের সঙ্গে অন্যান্য অনেক কিছুর মতোই ভবানীপুরের বাড়ি নিয়েও শ্রীময়ীর কথা হয়েছে। দু'জনেই একমত যে রাঙাদিদা যতদিন বেঁচে আছেন, ততদিন বাড়ি যেমনভাবে চলছিল তেমনই চলুক। পরের কথা পরে ভাবা যাবে।
মায়ের কাছে শ্রীময়ী শুনেছে, রাঙাদিদা তাঁর মাত্র কুড়ি বছর বয়স থেকেই দাদুর বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। দিদিমার চেষ্টাতেই কলেজ পাস করে, টিচার-ট্রেনিং নিয়েছিলেন। তারপর দাদুর যোগাযোগে একটা স্কুলে চাকরি পান। অনেকবছর হল রিটায়ারও করেছেন। মা নাকি ছোটবেলায় এই অল্পবয়েসি পিসিটির খুব ন্যাওটা ছিলেন।
শ্রীময়ী ঠিক করল মা মারা যাওয়ার পর কাজের চাপে রাঙাদিদার সঙ্গে আর যোগাযোগই করা হয়নি। কালই সে যাবে ভবানীপুরের বাড়িতে।
চা-এর সঙ্গে একটু মিষ্টি নিমকি খাবি নাকি রে রাই? কালকেই বানিয়েছি।
দাও তাহলে। অল্প করে দিও।
রাঙাদিদার নির্দেশ মতো ট্রে-তে করে চায়ের কাপ, ছোট প্লেটে নিমকি সাজিয়ে নিয়ে এল প্রণতি। সঙ্গে একগ্লাস জলও। অনেক বছর ধরে এবাড়িতে আছে। শ্রীময়ীদের সবার অভ্যাস তার জানা।
ভালো দার্জিলিং চা দিদি। খেয়ে দ্যাখো। ভুরভুরিয়ে গন্ধ বেরোচ্ছে!
প্রণতির কথা শুনে একটু হেসে চায়ের কাপটা তুলে নিল শ্রীময়ী। একতলার ড্রইংরুমেই তারা বসেছে। পুরোনো দিনের ভারী সোফা-কৌচ দিয়ে ঘরটা সাজানো। দেওয়ালের একদিকে যামিনী রায়ের পেইন্টিং। অন্যদিকে ওড়িশার একটা বড় পিপলি ঝোলানো।
শ্রীময়ীর উল্টোদিকে একটা গদিআঁটা কাঠের হাতলওলা চেয়ারে বসেছেন রাঙাদিদা। বয়স আশি পেরিয়েছে অনেকদিন। কিন্তু এখনও খুব শক্তপোক্ত। অল্পবয়সে যে সুন্দরী ছিলেন দেখলে বোঝা যায়। ফুটফুটে ফর্সা রঙ। মাথার সব চুল সাদা। পাতলা নাকে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা। রাঙাদিদার চোখদুটো সবসময় হাসি-খুশিতে ঝলমলে দেখেছে শ্রীময়ী। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর সেদুটোয় একটা বিষণ্ণতার ছাপ পড়েছে।
মিষ্টি নিমকির একটা টুকরো তুলে নিয়ে শ্রীময়ী বলল, আচ্ছা রাঙাদিদা, তোমাদের বাড়িতে, মানে আমি বলছি দাদুর বাড়িতে ডরোথি বলে কোনও কাজের লোক ছিল?
ভুরুদুটো একটু কুঁচকে গেল রাঙাদিদার। চোখ সরু করে সামান্য ভেবে বললেন, না, ওই নামে তো কেউ ছিল বলে মনে পড়ছে না। তাছাড়া, নামটা বেশ অন্যরকম, শুনলে নিশ্চয় মনে থাকত।
নাম শুনে তো বোঝা যায় খ্রিস্টান। দিদিমা কি খ্রিস্টান মেয়ে রাখা অ্যালাউ করতেন বলে তোমার মনে হয়?
না না, ওসবের কোনও ব্যাপার নেই। তোর দিদিমা জাত-পাত কিছু মানত না। ছোঁয়াছুঁয়ি, বাছ-বিচারও ছিল না। তোর দাদুও মানত না। বলত, আমার কারখানায় সাতজাতের লোক কাজ করতে আসে। সবাই মিলে কাজ করে বলেই কারখানা চলে। আমার ওসব মানলে চলে নাকি! দাদার তো মুখে-মনে আলাদা ছিল না। বিজয়া, ঈদ, বড়দিন সবেতে কারখানায় মিষ্টি যেত। বিশ্বকর্মা পুজোয় সবাই পাত পেড়ে খেত। সে ধারা অবশ্য তোর মা-ও বজায় রেখেছিল।
শ্রীময়ী একটু মুচকি হেসে বলল, চিন্তা কোরো না রাঙাদিদা সে ধারা এখনও আছে। দাদুর পাট এখন আমি রাখছি। কিন্তু আমি তোমার কাছে যেটা জানতে চাইছি সেটা বলো। ডরোথি নামের কেউ এবাড়িতে কাজ করত না বলছ?
উঁহু। ও নামের কেউ এবাড়িতে আসেনি।
বেশ কনফিডেন্টলি কথাটা বলল রাঙাদিদা।
আচ্ছা, এমন কোনও কাজের লোক এখানে ছিল যাকে মা খুব পছন্দ করত?
সে তো ডলিই ছিল। এখানে যখন কাজে ঢুকল, তখন রোগা-প্যাংলা চেহারা। কোথায় যেন একটা থাকত, এখন ভুলে গেছি। টাকা মানিঅর্ডার করে পাঠিয়ে দিত দাদা। সেই ডলি একটু কাজকম্ম শেখার পর তোর মায়ের খুব ন্যাওটা হল। সারাক্ষণ অপাদিদির পায়ে পায়ে ঘুরছে। তোর মা যখন কলেজে যায়, তখন শাড়ি ইস্ত্রি থেকে ঘর গুছিয়ে দেওয়া সব ওই ডলিই করত। আমরা তো বলতাম অপা যখন শ্বশুরবাড়ি যাবে, তখন ডলিকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।
সত্যিই শ্বশুরবাড়ি গেছিল নাকি?
না না, তার আগে তো ও নিজেই শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। এপাড়ারই একটা ছেলের সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা করে পালালো একদিন। সে এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড। ছেলেটার নাম ছিল সুবল। আমাদের বাড়িতে আসত ইলেকট্রিকের কাজ করতে। তারমধ্যে কখন চার চোখের মিলন হয়েছে কে বুঝবে বল? ডলিকে নিয়ে পালাতে তো সে সুবলের মা এসে বউদির কাছে কান্নাকাটি।
সুবলের দুটো ষণ্ডাগুন্ডা দাদা ছিল। তাদের তখনও বিয়ে হয়নি। তার আগেই ছোটভাই বিয়ে করে পালিয়েছে। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। দাদারা নাকি সুবলকে মারবে ঠিক করেছিল। কিন্তু সুবল আর বাড়ি ফেরেনি। ডলিও তারপরে আর কোনওদিন এবাড়ি আসেনি।
ভবানীপুর থেকে বাড়িতে ফেরার সময় গাড়িতে বসে শ্রীময়ী ভাবছিল, যেটুকু সামান্য সুতো পাওয়া গেছিল, তাও ছিঁড়ে গেল। ভবানীপুরে যে বাড়িতে ডরোথি কাজ করত, সেটা তার মানে তার মামার বাড়ি নয়। তাহলে এবার কোন জায়গা থেকে শুরু করবে সে?
টিং করে মোবাইলে মেসেজ ঢুকল একটা। সুবিমল গড়ুই।
চুন্নু শেখের দলিল দেখা হয়েছে দিদি। তাতে ডরোথি মণ্ডলের ঠিকানাও পাওয়া গেছে। ১৩ নম্বর, তালতলা লেন। কলকাতা -১৩। ডরোথি মণ্ডল বিধবা। তার স্বামীর নাম ছিল সুবল মণ্ডল।

জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি মাসটা মোটেই ভালো কাটেনি। জানুয়ারির শুরুতেই দোতলার কোণের ঘরের সুমিত্রা বাগচি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। গোল্ডেন অর্চার্ডের একেবারে শুরু থেকেই আছেন সুমিত্রা। একলা মানুষ। বিয়ে-থা করেননি। ইউনিভার্সিটির প্রফেসার ছিলেন। ভাইপো-ভাইঝিদের মানুষ করে সাংসারিক কর্তব্য করেছেন। রিটায়ার করার পর যখন মনে হচ্ছিল এবার পরনির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে তখনই চলে এসেছিলেন এখানে। খুব হাসি-খুশি হয়তো নয়। কিন্তু বেশ প্রসন্ন স্বভাবের মহিলা। সহজে বিরক্ত হন না।
প্রতিমা খুবই পছন্দ করে সুমিত্রাকে। আশির কাছাকাছি হলেও এমনিতে কিন্তু বেশ শক্তপোক্তই আছেন। হঠাৎ তিনদিনের একটা ফ্লু-তে প্রথমে কাহিল হয়ে গেলেন। তারপর বুকে সর্দি বসে অবস্থা বেশ ঘোরালো হয়ে গেল।
সুমিত্রাদি সামলে ওঠার আগেই একতলার সুলেমান সাহেবের শরীর খারাপ হল। তাঁকে নিয়েও টানাটানি অবস্থা। জানুয়ারির গোটাটা কাটল এভাবেই। ফেব্রুয়ারিতে পড়লেন মিসেস পাকড়াশী আর ডিসুজা আঙ্কল। ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল আর বাড়ি ছোটাছুটি করে প্রতিম-প্রতীক দু'জনেই একেবারে হয়রান হয়ে গেছিল।
আসলে প্রায় প্রতিবারই এরকমটা হয়। ডিসেম্বরের পর জানুয়ারির প্রচণ্ড ঠান্ডাটা বয়স্ক মানুষরা আর নিতে পারেন না। প্রতিমা সব ঘর, ডাইনিং, লাউঞ্জ সর্বত্র হিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট রাখে। ট্যাপে সারাক্ষণ গরমজল। দামি ব্ল্যাঙ্কেট। কিন্তু তবু অসুস্থ হয়ে পড়া আটকানো যায় না। তবে এবার তাও তাদের ভাগ্য ভালো যে সবাই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। নাহলে গোল্ডেন অর্চার্ডের প্রায় সব মৃত্যুর ঘটনাই শীতের সময়েই ঘটেছে।
সবথেকে বেশিদিন অসুস্থ ছিলেন ডিসুজা আঙ্কল। বয়সও অনেকটাই। তবে তিনিও দিন পাঁচেক হল সুস্থ হয়ে ফিরেছেন।
গত সপ্তাহ থেকে ঠান্ডাও অনেকটা কমেছে। দু-একদিন একটু মেঘলা ছিল। কিন্তু আজ একেবারে ঝকঝকে রোদ্দুর। শিলং-এর ওয়েদারে অভ্যস্ত প্রতিমা জানে, এই যে রোদ উঠল, এখন বেশ কিছুদিন আকাশ পরিষ্কারই থাকবে। তাপমাত্রাও একটু একটু করে বাড়বে। এবারের মতো শীতের ফাঁড়াটা কাটল ভেবে মনটা খুশি খুশি লাগছিল তার।
বাগানে রঙ-বেরঙের জারবেরা ফুটেছে অনেক। সকালে একটা বাস্কেট আর কাঁচি নিয়ে বেরিয়েছিল। বেছে বেছে ফুল আর ফার্ন তুলে নিয়ে এসেছে। ডাইনিংরুমের লম্বা টেবিলটাতে ফুলদানিগুলো রেখে গেছে মংগু। প্রতিমার নির্দেশমতো সবগুলোই অর্ধেকের বেশি জলে ভর্তি। ডাইনিং, লাউঞ্জ, লাইব্রেরি এসবের জন্য বড় ফুলদানি। আর প্রতি ঘরের জন্য স্বচ্ছ কাচের ছোট ফুলদানি।
বড় ভাসগুলোতে সুন্দর করে রঙ মিলিয়ে ফুল সাজালো প্রতিমা। ছোটগুলোতে একটা করে জারবেরার সঙ্গে একটা ফার্নের ডাঁটি। ফুল সাজাতে ভালোবাসে সে। শখ করে কিছুদিন ইকেবানা শিখেওছিল। যদিও তার নিজের মনে হয় এটাতে শেখার কিছু নেই। ফুল ব্যাপারটাই এত সুন্দর যে সেটার চারপাশে খানিকটা খোলা জায়গা দিয়ে সাজিয়ে রাখলেই চমৎকার দেখায়। বাঁধাবাঁধিতে ফুলের সৌন্দর্য খোলে না। প্রতিমা তাই ফুল সাজায় অনেকটা ছড়িয়ে। বড় ভাস। অল্প ফুল। সঙ্গতের জন্য অল্প পাতা।
রোজ অবশ্য নিজের হাতে সাজানোর সময় হয় না। মংগুকে হাতে ধরে শিখিয়েছে। সে মোটামুটি কাজ চালিয়ে দেয়। সাজানো হয়ে গেলে একটা ট্রে-তে ছোট ফুলদানিগুলো নিয়ে ঘরে ঘরে দিতে চলে গেল মংগু। ফিরেও এল একটু পরে। প্রতিমা তখন কিচেনে। লাঞ্চের জোগাড়ে লাগতে হবে এবার।
নন্দী স্যার কফি চাইছেন।
হাতজোড়া প্রতিমার। রাখি সবজি কাটছিল। তাকেই বলল, অমিয় নন্দীকে এক কাপ কফি দিয়ে আয়।
আমি কফি বানিয়ে দিচ্ছি। আপনি মংগুকে দিয়ে পাঠান। আমি যাব না।
প্রতিমা আর কিছু বলল না। রাখি অমিয় নন্দীকে এড়িয়ে চলে। ঠিক কী হয়েছে রাখি বলেনি। হয়তো তেমন কিছু হয়ওনি। কিন্তু রাখি পছন্দ করে না ভদ্রলোককে। তার মতে ওর দৃষ্টি খারাপ। মেয়েদের দিকে ভালো চোখে তাকায় না।
অমিয় নন্দী যেরকম সফিস্টিকেটেড মানুষ, যেমন আদব-কায়দা, চাল-চলন তাতে রাখির মতো একটা খাসি মেয়ের প্রতি আকর্ষণ জাগার কোনও কারণ নেই। রাখিকে দেখতে যে খুব সুন্দর তেমনটাও বলা যায় না। বয়স কম। আলগা চটক আছে। ভরাট, শক্ত শরীর। তবে অমিয় নন্দীর যেসব মহিলার সঙ্গে ওঠা-বসা তার তো ধারে-কাছেও নয়। যদিও মানুষের আদিম প্রবৃত্তি যখন মাথা চাড়া দেয়, তখন এইসব আভিজাত্য, আড়ম্বর কিছুই যে গুরুত্ব পায় না সেটা প্রতিমা জানে।
ব্যাপারটা ততদূর যায়নি নিশ্চয়। এসব ব্যাপারে পাহাড়ি মেয়েরা ভয়ানক কড়া। বেচাল বুঝলে ঝামেলা হত। তবু সতর্ক থাকে প্রতিমা। রাখিকে কিছু না বলে নিজেই কফির ট্রে নিয়ে দোতলায় উঠে যায়।
দোতলার বাঁদিকের উইং-এ থাকেন অমিয় নন্দী। গোল্ডেন অর্চার্ডের এই ঘরগুলোই সবথেকে ভালো। সবথেকে বেশি দামিও। একটা ছোট্ট লিভিং রুম, একটা বেডরুম, অ্যাটাচডবাথ। বাগানের দিকে একটুকরো বারান্দাও আছে। এই প্যাটার্নের ঘরগুলো সাধারণত কাপলরা নেন। স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে থাকতে সুবিধা হয়। অমিয় নন্দী অবশ্য একাই থাকেন। এখন এরকম ঘর সিঙ্গল পার্সনের জন্য অ্যালট করা হয় না। কিন্তু উনি একদম প্রথম দিকের বোর্ডার বলে পেতে অসুবিধা হয়নি।
দরজা ভেজানো ছিল। প্রতিমা নক করতেই ভিতর থেকে সাড়া এল, কাম ইন।
কফির ট্রে হাতে প্রতিমাকে ঢুকতে দেখে একটু অবাক হলে অমিয় নন্দী। খুশিও হলেন। নিজের টেবিলে বসে একটা বড় অ্যালবাম খুলে কী যেন দেখছিলেন। সেটা বন্ধ করে প্রতিমার দিকে ফিরে বললেন, কী ব্যাপার? আজ যে একেবারে মেঘ না চাইতে জল। আমি ভাবছি মংগু আসবে কফি নিয়ে। তার বদলে একেবারে মাই সুইটহার্ট হাজির!
দিনের মধ্যে কতজনকে, কতবার সুইটহার্ট বললেন, কখনও গুনে দেখেছেন?
উঁহু। দেখিনি। দেখার চেষ্টাও করিনি। কেন করব বলো তো? লোকে ঠাকুর-দেবতার নামে ছেলে-পুলের নাম কেন রাখে জানো? যাতে তাকে ডাকতে গিয়ে বারবার ঠাকুরের নাম করে তরে যাওয়া যায়। আমার কেসটাও অনেকটা ওরকম। সুইটহার্ট বলে ডাকতে ডাকতে শেষ পর্যন্ত যদি বিশ্বপ্রেমিক হয়ে উঠতে পারি। অনেককাল ধরে চেষ্টা করছি তো। খুব বেশি দেরিও আর আছে বলে মনে হয় না।
বলতে বলতে নিজের রসিকতায় হো-হো করে হেসে ওঠেন মিঃ নন্দী। হাসি চাপতে পারে না প্রতিমাও। হাসতে হাসতেই উঠে দেওয়ালের গ্লাস কেস থেকে একটা কফি মাগ বার করেন অমিয়। ফ্লাস্কের কফি থেকে খানিকটা ঢেলে প্রতিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, এলেই যখন তখন একটু কফি খেয়ে যাও। গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোর মতো হল যদিও ব্যাপারটা। তোমার কফি তোমাকেই অফার করছি।
রাখি সবজি কাটছে। তারপর মশলা রেডি করলে রান্না শুরু হবে। হাতে একটু সময় আছে প্রতিমার। তাই একটু হেসে কফিতে একটা চুমুক দিয়ে বলে, আপনি কি আজ নস্টালজিক মুডে আছেন মিঃ নন্দী?
কেন বলো তো?
না, ওই অ্যালবামটা দেখে মনে হল। ওরকম অ্যালবাম আমার মায়ের কাছেও কয়েকটা আছে। একেকেটা পাতায় তিন-চারটে করে ছবি। কর্ণার দিয়ে আটকানো। দিদিমার আমলেরগুলো সবই সাদাকালো। তারপরে রঙিন। ছোটবেলায় আমার খুব পছন্দ ছিল খাটের ওপর বসে মন দিয়ে ছবিগুলো দেখা। দিদিমা পাশে বসে থাকতেন। আর আঙুল দিয়ে দিয়ে কে কোনটা চিনিয়ে দিতেন।
এই অ্যালবাম কনসেপ্টটাই এখন উঠে গেছে।
হ্যাঁ। এখন তো সবাই ফোনেই ছবি তোলে আর ফেসবুকে পাঠিয়ে দেয়। যাদের নেহাত ছবি তোলার শখ তারাও ডিজিট্যাল ক্যামেরায় ছবি তোলে, তারপর ল্যাপটপে ডাউনলোড করে রাখে। ছবি প্রিন্ট করার ব্যাপারটা এখন আর নেই। পাসপোর্ট সাইজ ছবি ছাড়া আর কিছু প্রিন্ট হয় বলে তো আমার মনে হয় না।
সেটা আমার ভালোই লাগে জানো প্রতিমা। আমি সবসময় সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ভালোবাসি। পুরোনো কিছুকে আঁকড়ে থাকা আমার স্বভাব নয়।
তাহলে হঠাৎ আজ পুরোনো অ্যালবাম খুলে বসেছেন যে?
আরে, সেটা একেবারে একটা কেজো ব্যাপার। সাধারণত আমি এগুলো নিয়ে কারুর সঙ্গে আলোচনা করি না। কিন্তু তুমি যখন জানতে চাইছ...আর আফটার অল ইউ আর মাই সুইটহার্ট!
আসলে, আমার বেশ ছোটবেলা থেকেই ছবি তোলা অভ্যাস বুঝলে। অল্পবয়সে মা-বাবা মারা গেছিলেন। তারপর দিদির বাড়িতে চলে আসি। সেবছর, মানে যেবছর মা-বাবা মারা যাওয়ার পর আমি দিদির বাড়িতে থাকতে এলাম, আমার জন্মদিনে জামাইবাবু আমাকে একটা ক্যামেরা কিনে দিয়েছিলেন। দিদি আমার থেকে অনেক বড়। জামাইবাবুর কাছে আমি ছেলের মতোই ছিলাম। তাই মন ভালো করতেই কিনে দিয়েছিলেন জিনিসটা। কিন্তু ওটা থেকেই আমার ছবি তোলার নেশা চাপল। বাড়িতে একটা ছোট ডার্করুম করে ছবি ডেভেলপও করতাম।
আমার অভ্যাসটা বেশ অদ্ভুত ছিল জানো তো। প্রকৃতির ছবি তুলতাম না। আমার সাবজেক্ট ছিল মানুষ। বিশেষ করে নারী। ছবি তুলতাম। ছবি প্রিন্ট করে অ্যালবামে আটকানোর সময় তার পাশে তার সম্বন্ধে কয়েক লাইন লিখে রাখতাম। কোনও বিশেষ সিচুয়েশনে ছবিটা তোলা হলে বা সাবজেক্ট সম্পর্কে কোনও ঘটনা জানতে পারলে সেটাও লিখে রাখতাম। প্রথমদিকে নতুন কিছু করার ইচ্ছেয় শুরু করেছিলাম। পরে এটা অভ্যাস হয়ে গেল। আর এখন এটা বলতে পারো আমার রুটি-রুজির উপায়।
একটু অবাক হল প্রতিমা। কফিতে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ঠিক বুঝলাম না কিন্তু।
না বোঝাই স্বাভাবিক। তুমি তো জানো, আমি দুধরনের কাজ করি। একটা হল আমার নিজের লেখা মানে সাহিত্যসৃষ্টি। যেখানে আমি সাহিত্যিক অমিয় নন্দী। ইংরাজিতে লিখি বলে আমার বই বিদেশেও যথেষ্ট বিক্রি হয়। তার থেকে নিশ্চিত আমি একটা মোটা টাকা রয়্যালটিও পাই। তবে এই লেখাটা হল আমার প্যাশন।
আমি কখনও দু'বছর কখনও তিন বছর ধরে একটা উপন্যাস লিখি। তারজন্য জানতে হয়, পড়াশোনা করতে হয়, রিসার্চ করতে হয়। আমার একটা লেখার জন্য আমি একবার প্রায় ছ'মাস কচ্ছের রণে গিয়ে ছিলাম। এরমধ্যে কোনও তাড়াহুড়ো থাকে না। কিন্তু আমার অন্য কাজটা হল পুরোদস্তুর ফরমায়েসি। বলিউডের ছবির জন্য স্ক্রিপ্ট আর গল্প লেখা। মোটা টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু ধরাবাঁধা সময়ে, ধরাবাঁধা ফর্মুলায় কাজ। অমুক পরিচালকের, অমুক সময়ের মধ্যে গল্প চাই। গল্পটা মোটামুটি অমুক প্যাটার্নের হবে। মানে ধর, লাভ স্টোরি বা থ্রিলার কিংবা রিলেশনশিপ, ফ্যামিলি ড্রামা এরকম আর কী।
এরমধ্যে আমার এক্সপার্টাইজ হল লাভ স্টোরি, রিলেশনশিপ আর ফ্যামিলি ড্রামা। মানে এই ধরনের থিম নিয়ে ছবি করার কথা ভাবলে পরিচালকরা আমার শরণাপন্ন হন। আমিও খুব দ্রুত তাদের গল্প সাপ্লাই দিই। কী করে পারি জানো? এই অ্যালবামগুলো থেকে। ওই যে তোমাকে বললাম ছোট ছোট করে ঘটনা, পরিচয়, পরিস্থিতি লিখে রাখতাম, ওগুলো থেকেই আমার গল্পের বীজ বেরিয়ে আসে। তারপর সেটাকে রঙ চড়িয়ে, মশলা মাখিয়ে, ভেজে-কষে প্লেটে সাজিয়ে দেওয়া তো কোনও ব্যাপারই নয়।
তারমানে আপনি বলতে চাইছেন ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যন ফিকশন কথাটা সত্যি?
অ্যাবসোলিউটলি ডিয়ার! এইতো আমি তোমাকে দেখাচ্ছি। এই যে অ্যালবামটা এটা হচ্ছে আমার একদম প্রথম অ্যালবাম। আমার কলেজ জীবনের প্রেমিকাদের ছবি আছে এখানে।
তাই নাকি! কলেজে তার মানে একাধিক প্রেম করেছেন? তার আগেও করেছেন নাকি?
প্রতিমার চোখে একইসঙ্গে চিকচিক করছে হাসি আর কৌতূহল। অমিয় নন্দী কিন্তু নির্বিকার।
একটাই ওরকম গোলমেলে ব্যাপার হয়েছিল বুঝলে। সেটাই প্রথম। তবে তার কোনও ছবি নেই। তখনও হাতে ক্যামেরা আসেনি। তবে আঁকা ছবি আছে। এখানে যাদের ফটোগ্রাফ দেখছ, তাদের অনেকেরই ছবি আমি রঙ-তুলিতেও ধরেছি। তবে সবার নয়। আসলে পেইন্টিং করতে গেলে মুখে কিংবা চেহারায় বিশেষ কোনও ক্যারেক্টার থাকতে হয়। সেটা সবার থাকে না। দেখতে সুন্দর হলেও থাকে না। যাদের মধ্যে সেটা দেখেছিলাম তাদের ছবি এঁকেছি। পোট্রেট নয় কিন্তু পেইন্টিং মাই ডিয়ার। সেখানে শিল্পীর কল্পনা মিশে থাকে। সেগুলো তোমাকে পরে আর একদিন দেখাব।
অ্যালবামটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টে দেখছিল প্রতিমা। প্রায় সবই মহিলার ছবি। উল্টোদিকে বসে অমিয় নন্দী বলে যাচ্ছিলেন, এটা মঞ্জিরা আমার ক্লাসমেট ছিল। সোনালি, এও আমাদের কলেজে পড়ত। শেফালি, আমার দিদির দূরসম্পর্কের ননদ। এ হচ্ছে পূবালি। ইউনিভার্সিটিতে আমাদের সঙ্গে পড়তে এসেছিল। একে নিয়েই এবারের গল্পটা লিখব ঠিক করেছি বুঝলে। ভীষণ অদ্ভুত একটা জীবন। চমৎকার একটা ফ্যামিলি ড্রামার ছাঁচে ফেলে দেওয়া যাবে। প্রেম, দাম্পত্য, অশান্তি, ত্যাগ সব মিলিয়ে একদম জমজমাট ককটেল...
অমিয় নন্দী বলে যাচ্ছেন। একটু অন্যমনস্কভাবে শুনতে শুনতে পাতা উল্টে যাচ্ছিল প্রতিমা। পাশের লেখাগুলোর ওপরেও চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল। একদম শেষ পাতায় একটা ছবি। তবে এখানে মহিলা একলা নয়। সঙ্গে একজন পুরুষও আছেন। মহিলাকে যে অপূর্ব সুন্দরী বলা যাবে তা নয়। কিন্তু চেহারায়, দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে এমন একটা ব্যক্তিত্বের ছাপ আছে যে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। প্রতিমা ভালো করে ছবিটা দেখতে দেখতে বলল, ইনি কে? কীরকম যেন অন্যরকম সুন্দর!
কথা থামিয়ে অ্যালবামের ওপর ঝুঁকে পড়লেন অমিয় নন্দী। ছবির দিকে চোখ পড়তেই মুহূর্তে কঠিন হয়ে গেল মুখ। প্রতিমার হাত থেকে অ্যালবামটা নিয়ে পাতা উল্টে দিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, আমার ভাগ্নে পরিতোষ আর ওর স্ত্রী অপরাজিতা।

বাসটা যখন ডানকুনি পেরোচ্ছে, তখনই ফোনটা করেছিল অর্ণব। তিনটে রিং হতে বাপ্পাদা ধরল।
হ্যাঁ, বল কী খবর? অনেকদিন কোনও সাড়াশব্দ নেই?
সাড়াশব্দ তো আর একপক্ষে হয় না। তুমি আজকাল এমন ব্যস্ত সার্জেন যে অধম ভাইদের খোঁজ নেওয়ারও সময় পাও না।
খাবি এক ঝাপড় শালা! লাস্ট ফোনটা আমিই করেছিলাম।
সে তো মাল খেয়ে, মিষ্টির সঙ্গে ঝগড়া করে গ্যালগ্যালিয়ে মনের কথা বলতে। আমি কিছু বুঝি না ভাবছ। যাকগে শোনো, আমি আজকে বাড়ি ফিরছি। মানে এখন বাসেই আছি। তুমি চেম্বার থেকে ফিরবে কখন?
তুই আসবি নাকি? তাহলে চেষ্টা করছি ন'টার মধ্যেই ফিরতে। এখানেই ডিনার করে নিবি তো?
একদম না। তিনমাস বাদে বাড়ি যাচ্ছি। গিয়েই যদি বলি রাতে খাব না, মা কুরুক্ষেত্র করবে। আজ ডিনার কিছুতেই নয়। তুমি বরং মিষ্টিকে বলো চিজ পকোড়া বানিয়ে রাখতে। তোমাদের শিবাণীদি ওটা হেব্বি বানায়। সেলারে কী আছে?
সব আছে। কী খাবি বল না?
তাহলে স্কচ অন রকস তবে দুটোর বেশি না। মা যদি খাবার নিয়ে বসে থাকে তাহলে বেশি রাত করা যাবে না।
এইজন্যই তো বলছি, মাসিমাকে বল রাতে আমার এখানে খাবি। একেবারে কাল সকালে লুচি-আলুরদম দিয়ে ছেলে আদরের পর্ব শুরু করবে।
চেষ্টা করে দেখছি, তবে ম্যানেজ করা যাবে বলে মনে হয় না।
ফোনটা ছেড়ে দিয়ে স্ক্রিন সেভারটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে অর্ণব। জন্মদিনের দিন ওই রেস্তোরাঁতে বসেই তুলেছিল। বেরোনোর একটু আগে। গোলাপি লিপস্টিক। চোখের কাজল বেশ খানিকটা ধেবড়ে গেছে। গালে শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ তখনও স্পষ্ট। কানের পাশে লাল-সাদা মেশানো মাধবীলতার গোছা যেন ঝুঁকে পড়ে সেই গোপন অশ্রু দেখার চেষ্টা করছে। অসম্ভব বিষণ্ণ, মায়াবী মুখ। দেখলে বুকের ভিতর পর্যন্ত মুচড়ে ওঠে। স্ক্রিনটা অন্ধকার হয়ে যেতে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে দিল অর্ণব।
সেদিন সুমিতার সঙ্গে কথা বলে ফেরার পর থেকেই সে ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে যাচ্ছে। সুমিতাকে সে বলেছে, তার বাবাকে খোঁজার ব্যাপারে সাহায্য করবে। কিন্তু কীভাবে? কোনও তথ্য, কোনও সূত্র তো হাতে নেই। তাহলে শুরু করবে কোথা থেকে? বিষয়টা নিয়ে অনেক ভাবনা-চিন্তা করে অর্ণবের মনে হয়েছে, অন্ধকারে হাতড়ানোর কোনও মানে হয় না। শুরু করতে হলে যেটুকু ইনফরমেশন সে পেয়েছে সেখান থেকেই শুরু করা দরকার। সেক্ষেত্রে যে তাকে সাহায্য করতে পারে সে হল বাপ্পাদা মানে ডাঃ কুণাল দে।
বাপ্পাদা অর্ণবের থেকে বছর চারেকের সিনিয়র। সাউথ পয়েন্টেরই ছাত্র। ঢাকুরিয়ায় অর্ণবদের বাড়িতে যেতে হলে রেললাইন পেরিয়ে আরও খানিকটা ভিতরদিকে যেতে হয়। বাপ্পাদাদের বাড়িটা রেললাইনের একটু আগে। একই বাসে তারা স্কুল যেত। তবে শুধু স্কুল নয়, পারিবারিক সূত্রেও বাপ্পাদাকে সে ছোট থেকে চেনে। বাপ্পাদার মা ছিল তার বড়মাসির ক্লাসমেট। ফলে মায়ের সঙ্গে বাপ্পাদার মায়েরও যথেষ্ট আলাপ এবং যাওয়া-আসা ছিল। ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র, ভালো ফুটবল খেলে, দারুণ আড্ডাবাজ বাপ্পাদাকে ছোটবেলায় প্রায় গুরু মানত অর্ণব। বড় হওয়ার পর সেটা অবশ্য ক্রমশ দাদা-ভাইয়ের বন্ধুত্বে বদলে গেল। অর্ণবের ক্লাসমেট মিষ্টির সঙ্গে বাপ্পাদার বিয়ে হওয়ায় সম্পর্কটা আরও জোরদার হয়েছে।
অর্ণব মেডিক্যাল পড়েছে আর জি করে। বাপ্পাদা ছিল নীলরতনের নামকরা ছাত্র। পাশ করে এখন সেখানেই চাকরি করছে। ভালো সার্জন হিসাবে একটু একটু করে নাম-ডাকও বাড়ছে।
বাড়ি এসে স্নান সেরে, জামা-কাপড় বদলে বাপ্পাদার বাড়ির দিকে রওনা দিল অর্ণব। তার আগে অবশ্য মা আর বাবার সঙ্গে জমিয়ে বসে চা আর ঘরে বানানো কেকও খেল। মাকে ম্যানেজ করা গেছে। বাপ্পাদার বাড়িতে ডিনার করবে শুনে বেশি ঝামেলা করেনি।
মুরারি মোহন লেনে ওদের পৈতৃক দোতলা বাড়িটায় যখন ঢুকল অর্ণব, তখন ঘড়িতে ঠিক ন'টা। বাপ্পাদা তখনও ফেরেনি। তবে ওর ল্যান্সডাউনের চেম্বার থেকে যে বেরিয়ে পড়েছে সেটা মিষ্টিকে জানিয়েছে।
রাস্তায় বড্ড জ্যাম থাকে রে এই সময়টায়। আধঘণ্টা তো লাগবেই। তুই একটা পেগ বানিয়ে নিয়ে বোস। আমাকে একটা ভোডকা দিস। অল্প করে লাইম দিয়ে। রাতে খেয়ে যাবি তো?
ঘাড় নেড়ে সোফায় জুতকরে বসে অর্ণব। মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে, ডিনার তো খাব। কিন্তু ড্রিঙ্কসের সঙ্গে চিজ পকোড়া লাগবে। বাপ্পাদাকে বলে রেখেছিলাম। হ্যাঁরে মিষ্টি ফের ওয়েট পুট অন করেছিস তুই!
একদম বাজে কথা বলবি না অনি। রেগুলার জিমে যাচ্ছি। বিকেলে সাঁতার কাটছি। তিনমাসে আড়াই কেজি ওজন কমেছে। তোদের শকুনের চোখ। সেই কোন কালে স্কুলে পড়ার সময় মোটা ছিলাম, সে আর ভুলতে পারিস না, তাই না?
হাসতে হাসতে পকোড়া আনতে চলে যায় মিষ্টি। দেওয়ালের একদিকে বাপ্পাদার সেলার। সেখানে গিয়ে দু'জনের জন্য ড্রিঙ্কস বানাতে বানাতে ঘরটা ভালো করে দেখে অর্ণব।
বাপ্পাদাদের এই ড্রইংরুমটা খুব এয়ারি। চারদিকের খোলা জানলা দিয়ে হু-হু করে হাওয়া আসে। ঘরটা সাজানোও খুব সুন্দর করে। বেইজ আর কফি রঙের কম্বিনেশনের ভারী সোফা। একটু নীচু সেন্টার টেবিল। ঘরের কোণে একটা লম্বা স্ট্যান্ড ল্যাম্প জ্বলছে। তার নরম হলুদ আলো ছড়িয়ে আছে ঘরময়। টেবিলে একটা মোরাদাবাদি থালায় স্তূপ করে জুঁই ফুল রাখা। হালকা গন্ধটা বাতাসে ভেসে রয়েছে।
চেম্বার থেকে ফিরে স্নান সেরে বাপ্পাদার বসতে প্রায় দশটা বাজল। মিষ্টি গেল ডিনারে ফাইনাল টাচ দিতে। বাপ্পাদা হুইস্কির গ্লাসটা নিয়ে বসলে অর্ণব বলল, বাপ্পাদা, তোমার সঙ্গে আমার একটা জরুরি কথা আছে। মিষ্টি আসার আগেই সেটা বলে নিতে চাইছি। মানে মিষ্টি আমার খুবই বন্ধু। কিন্তু এই কথাটা আসলে আমার জন্য এতটাই প্রাইভেট যে আমি চাইছি, যত কম মানুষকে জানানো যায়।
তাহলে আমাকে বলছিস কেন?
একদম সত্যি কথাই বলি। তোমাকে বলছি কারণ তোমার সাহায্য আমার দরকার। একটা ইনফরমেশন জানার জন্য তোমার হেলপ লাগবে। ইনফ্যাক্ট ইনফরমেশটা জানা আমার নিজের জন্য যে খুব জরুরি তা নয়। কিন্তু যার জন্য জানতে হবে সে আমার জীবনে এই মুহূর্তে খুব জরুরি মানুষ।
মেয়েটা কে? কার প্রেমে পড়লি বল তো? তুই তো আবার ক্যাবলাকান্ত হরিচরণ। একটা মেয়ের কাছে লেঙ্গি খেয়ে মুখ ঝুলিয়ে পাঁচ বছর বসে রইলি।
সব বলব। কিন্তু তার আগে তুমি বলো আমায় সাহায্য করবে তো?
আলবাত করব! তোর জন্য আমি জান লড়িয়ে দিতেও রাজি আছি। জান নিতে বললেও ভেবে দেখব। শুধু মিষ্টিকে দিতে পারব না। বউ ছাড়া আমার চলবে না। এছাড়া তুই আর যা...
উফ বাপ্পাদা! তুমি একটা যা-তা। ইয়ার্কি মেরো না। সিরিয়াসলি শোনো। আমার কয়েকটা ইনফরমেশন দরকার।
সেটা তো বললি এক্ষুনি। কীরকম ইনফরমেশন বল?
১৯৯০ সালের ২৫ জুলাই লক্ষ্মী গুপ্তু নামে এক মহিলা নীলরতন সরকার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। পরদিন সকালে তাঁর একটি মেয়ে হয়। লক্ষ্মী গুপ্ত ঘণ্টাখানেক বাদে মারা যান। ভদ্রমহিলাকে নিয়ে এসেছিল যে লোকটি তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। বাচ্চাটা কয়েকদিন হাসপাতালেই থাকে। তারপর ওখানকার এক আয়া তাকে বাড়ি নিয়ে যায়। আমি এই লক্ষ্মী গুপ্ত সম্পর্কে হাসপাতালে আর কোনও তথ্য আছে কিনা জানতে চাই। বিশেষ করে তাঁকে যিনি নিয়ে এসেছিলেন তাঁর নাম কিংবা ঠিকানা কিছু যদি পাওয়া যায়।
কী ব্যাপার বল তো অনি? আমি তো কেসটা খুব সুবিধার বুঝছি না।
আমি তোমাকে সবই বলব বাপ্পাদা। কিন্তু তুমি বলো, তোমার পক্ষে কি এই ইনফরমেশনগুলো জোগাড় করা সম্ভব?
১৯৯০ সাল তো। তারমানে তিরিশ বছর হয়ে গেছে। কঠিন ব্যাপার! হাসপাতালে সবই রেকর্ড রাখা নিয়ম। থাকেও। যতদূর আমি জানি, ২০০০ সাল পর্যন্ত সবটাই ডিজিটাইজও করা হয়েছে। হয়তো তার আগেও হয়ে থাকতে পারে জানা নেই। তবে ডিজিটাইজ হয়ে না থাকলেও রেকর্ড রুমে তো থাকবে নিশ্চয়। আফটার অল সরকারি হাসপাতাল। বার্থ আর ডেথ সার্টিফিকিটের জন্য জরুরি রেকর্ড তো রাখতেই হয়। কিন্তু আমি ভাবছি কীভাবে সেটার খোঁজ নেব...।
রেকর্ড রুমের সঙ্গে তো আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। তাছাড়া হঠাৎ খোঁজ নিতে গেলে অবাক তো হবেই, কো-অপারেট করবে কিনা তাই বা কে জানে? আচ্ছা দাঁড়া, একটা উপায় হতে পারে। আমাদের রেকর্ডরুমে তমাল বলে একটা ছেলে কাজ করে। ওর মায়ের কিছুদিন আগে অপারেশন হয়েছে। আমিই করেছি। মেজর অপারেশন। বাঁচার আশা ছিল না। কিন্তু ভদ্রমহিলা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। ন্যাচারলি তমাল আমার প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ। ওকে বললে কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু তোর কবের মধ্যে লাগবে?
তুমি খোঁজ নাও না বাপ্পাদা। আমার ওরকম কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। আমি চারদিন আছি। বুধবার সকালের বাসে ফিরব। তারমধ্যে যদি জানা যায় তো ভালো। নাহলে তুমি আমাকে ফোনে জানিয়ে দিও।
মিষ্টি চলে আসাতে আলোচনাটা আর এগোল না। ডিনার খেয়ে, আড্ডা মেরে বাড়ি ফিরতে প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা। চাবি ছিল। মা-বাবা শুয়ে পড়েছে। দরজা খুলে ঢুকে জামাকাপড় বদলানোর আগে একটা হোয়াটসঅ্যাপ করল অর্ণব। সুমিতা বেশি রাত জাগতে পারে না। তাছাড়া সকালে উঠতেও হয় তাড়াতাড়ি। জবাব এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।
বন্ধুর বাড়ি আড্ডা শেষ হল?
মাস তিনেক পরে নিয়মমাফিক বাড়ি এসেছে অর্ণব। সুমিতার কাছ থেকে একদিন শুধু জরুরি তথ্যগুলো জেনে নিয়েছিল। তারপর আর কোনও কথা হয়নি। ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গটা তোলেনি অর্ণব। তাই বাপ্পাদার বাড়ি সে কেন গেছে সে বিষয়ে কোনও ধারণাই নেই সুমিতার। অর্ণবও এখনই কথাটা ভাঙতে চাইছে না। তাই একদম ক্যাজুয়ালি লিখল, দারুণ আড্ডা হল। কিন্তু তুমি এখনও জেগে কেন? শুয়ে পড়ো এবার।
তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। এবার শুয়ে পড়ছি। গুডনাইট।
রোজ দেখা হয় না। কিন্তু তবু মনে হয় কাছাকাছিই আছি। আজ প্রথমবার এতটা দূরে এসে মনকেমন করছে। সাবধানে থেকো।
কথাগুলো লিখে, একটা লাভ সাইন দিয়ে মেসেজটা পাঠিয়ে দিল অর্ণব। তারপর জামাকাপড়ে বদলে, ফ্রেশ হয়ে, টেবলল্যাম্পটা জ্বেলে একটা বই নিয়ে বসল। শোয়ার আগে বই পড়া তার অনেকদিনের অভ্যাস। নেশাও বলা যায়। ইন্টারেস্টিং বই হলে রাত কাবার হয়ে গেছে এমনও হয়েছে। রিনি তাকে মজা করে পেঁচা বলত। রিনির কথা মনে পড়তে একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায় অর্ণব।
রিনির সঙ্গে ওর আলাপ হয়েছিল কলেজ ফেস্টে। রিনি যাদবপুরে পড়ত। ইংলিশ অনার্স। ইন্টার কলেজ কালচারাল মিটে অর্ণবের একবছরের সিনিয়র গৌতমদা গেছিল ডিবেটে অংশ নিতে। সঙ্গে ল্যাংবোট অর্ণব। গৌতমদাই উৎসাহ করে নিয়ে গেছিল।
সেকেন্ড ইয়ার হয়ে গেল, এখনও তোর কেউ জুটল না। এরপরে তো লোকে দুয়ো দেবে রে। চল আমার সঙ্গে যাদবপুরে। সে একেবারে ফুলের বাগান। তবে তুলতে জানতে হবে।
এমন ভাব দিয়ে কথাটা বলেছিল গৌতমদা যে ভীষণ হাসি পেয়ে গেছিল অর্ণবের। তার আগে স্কুলে ওদের ক্লাসমেট পারমিতার প্রতি ওর একটু দুর্বলতা ছিল। কিন্তু টুয়েলভ পাশ করে পারমিতা ভর্তি হল আশুতোষ কলেজে। ওরা থাকত আলিপুরের ওদিকে। তাই দেখাশোনা কমে গেল।
অর্ণব যতদিনে সাহস সঞ্চয় করে ওর বাড়িতে একবার ঢুঁ মারবে কিনা ভাবছে, তখন জানা গেল পারমিতা শৈবালের সঙ্গে লটকে গেছে। শৈবাল ওদের ফার্স বয়। আইআইটি-তে ভর্তি হয়েছিল। তাই আর কোনও চান্স নেই বুঝে কেটে পড়েছিল অর্ণব।
পারমিতার জন্য মনটা একটু নরম ছিল বলেই হয়তো চটকরে কাউকে মনে ধরেনি। তবে যাদবপুরে গিয়ে গৌতমদার ভবিষ্যৎবাণী যে ওরকম অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাবে সেটা সে মোটেই ভাবেনি।
রিনিরা একঝাঁক বসেছিল হলে। অন্য কলেজের যারা ডিবেট করতে উঠছিল, নানা টিকা-টিপ্পনি সহযোগে তাদের আওয়াজ দিচ্ছিল। যাদবপুরের ছেলে হলে হাততালি দিচ্ছিল। অর্ণব যে একটা জলজ্যান্ত অপরিচিত লোক পাশে বসে আছে তাতে পাত্তাও দিচ্ছিল না।
গৌতমদা চমতার বলেছিল। বলার পরে অর্ণব হাততালি দিতেই ওরা সবাই মিলে অর্ণবের পিছনে লেগে পড়ল। মেডিকেল কলেজের ছেলেরা কীরকম অপদার্থ, তাদের কীরকম ঢ্যাঁড়শ মার্কা চেহারা, আসলে তারা কীরকম নাড়ি টেপা ডাক্তার হয় এরকম সব নানা আক্রমণাত্মক কথা। অর্ণব বেচারি সপ্তরথী পরিবৃত হয়ে লড়তে লড়তে একসময় ধূলিসাৎ হয়ে গেল। রিনিরা দলবল মিলে বীরদর্পে বেরিয়ে গেল হল থেকে। আরও বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর যখন গৌতমদার পাত্তা পাওয়া গেল না, তখন অর্ণব ঠিক করে ফেলল সে বাড়ি চলে যাবে।
অডিটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে খানিকটা গেছে এমন সময় দেখা গেল উল্টো দিক থেকে দলের মধ্যে সবথেকে তুখোড়, মুখরা মেয়েটি আসছে। অর্ণব সবে ভাবছে একটা লম্বা দৌড় দেবে কিনা, তার আগেই মেয়েটি বলল, কী হল, আমাকে দেখে পালাবার মতলব করছেন নাকি? ওসব চলবে না। চলুন কফি খেতে হবে। আফটার অল আমাদের কলেজে আপনি অতিথি। আপ্যায়নের একটা ব্যাপার আছে তো!
রীতিমতো ভয়ে ভয়েই সেদিন শ্রীমতী ভয়ঙ্করীর সঙ্গে কফি খেতে গেছিল অর্ণব। তখনই জেনে ছিল তার নাম রিনি রায়। যোধপুর পার্কে বাড়ি। যাদবপুর থেকে সেদিন ঢাকুরিয়ে হেঁটেই ফিরেছিল অর্ণব, রিনিকে ওদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে। গল্প হয়েছিল অনেক। বাড়ি ফিরেও সেদিন বহুরাত পর্যন্ত শুধু রিনির কথাই ভেবেছিল। না ভেবে উপায় ছিল না। কারণ রিনি খুবই সুন্দরী। চমতার ফিগার। ভীষণ ভালো কথা বলে। খুবই বুদ্ধিমান, তুখোড় এবং অত্যন্ত স্মার্ট। এতগুণ একসঙ্গে কারুর মধ্যে থাকলে তো তার প্রেমে না পড়ে কোনও উপায় থাকে না।
এতগুণ থাকলে যে আবার প্রেম টিকিয়ে রাখাও বেশ কঠিন সেটা বুঝতে অবশ্য বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল। তবে প্রথম কয়েকবছর রীতিমতো জমজমাট প্রেমই করেছে তারা। রিনির আগে ছুটি হলে অনেকসময় ওদের কলেজে চলে যেত। অর্ণব সময় পেলে চলে আসত যাদবপুরে। ছুটির দিনগুলোয় অনেকটা সময় একসঙ্গেই কাটত। মা সবই জানতেন। রিনি মাঝেমধ্যেই আসত অর্ণবদের বাড়িতে। অর্ণবের ঘরে বসেই গল্প করত। তবে দরজা খোলা থাকত সমবসময়। তার বেশি মা যে অ্যালাও করবেন না অর্ণব জানত।
রিনিদের বাড়ি কিন্তু তুলনায় অনেকটাই লিবারাল ছিল। ওর দেড়তলার ঘরে দরজা বন্ধ করে গল্প করত দু'জনে। প্রথমবার ওখানেই মিলিত হয় তারা। তারপর নিয়মিতই। শরীর নিয়ে রিনির কোনও ইনহিবিশন ছিল না। সত্যি কথা বলতে কি, সঙ্গমের সময় রিনি এত অ্যাক্টিভ থাকত যে সেটা রীতিমতো উপভোগ করত অর্ণব।
সম্পর্কের ভিতটা আলগা হতে শুরু করল অর্ণবের ফাইনাল এমবিবিএস-এর বছর থেকেই। রিনি তখন মাস্টার্স করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু অর্ণব বাইরে যাবে না। মা-বাবাকে রেখে দেশের বাইরে যাওয়ার ইচ্ছে তার নেই।
রিনির যথেষ্ট ডমিনেটিং পার্সোনালিটি। তাই প্রথমটায় ভেবেছিল অর্ণবকে রাজি করিয়ে ফেলবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা হবে না বুঝে নিজেই সরে যাবে ঠিক করল। রিনির কাছে কোনওদিনই নিজের কেরিয়ারের থেকে প্রেম বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। সিদ্ধান্ত সে-ই নিয়েছিল। যদিও অর্ণবও ক্রমশ বুঝতে পারছিল রিনির উচ্চাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সরে আসাই ভালো। দুঃখ পেয়েছে। সেসময় রিনিকে দোষও দিয়েছে সে। কিন্তু এখন এক এক সময় অর্ণবের মনে হয়, রিনি ঠিকই করেছিল। যদি তাদের সম্পর্কটা আরও কিছুটা এগিয়ে যেত তাহলে তিক্ততা আরও বাড়ত।
তারপর অনেকদিন মেয়েদের সম্পর্কে নিস্পৃহ ছিল সে। জন্মদিনের সন্ধ্যায় সুমিতাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ফেরার সময় প্রথমবার অর্ণবের মনে হয়েছিল এতদিন বোধহয় এরকম একজন মানুষের জন্যই মনের গভীরে অপেক্ষায় ছিল সে।

তালতলা এলাকাটায় পাঁচমিশালি লোকের বাস। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সব গায়ে গায়ে বাড়িতে থাকে। ধর্মতলার কাছাকাছি ওরকম একটা জায়গা। অথচ অনেকটাই বস্তি এলাকা। সরু সরু গলির ভিতর ইদানীং মাথা তুলেছে ফ্ল্যাট। তার গায়েই খাপরা কিংবা অ্যাসবেসটাসের চালা দেওয়া ঘর।
শ্রীময়ী গাড়িটা বড় রাস্তায় রেখে ওর ড্রাইভার চঞ্চলকে পাঠিয়েছিল খোঁজ নিতে। চঞ্চলকে বলেও দিয়েছিল ডরোথি মণ্ডল বলে যদি কেউ থাকে তাহলে তাকে ডেকে আনতে। আর যদি না থাকে তাহলে ওই ১৩ নম্বর তালতলা লেনের বাসিন্দাকেই ডাকতে। ঠিকানা প্রায় তিরিশ বছর আগের। এতদিন এই বাড়িতেই যে ডরোথি থাকবে তার তো কোনও নিশ্চয়তা নেই। তবে তার চেনা পরিচিত যদি কেউ থাকে তাহলে তার কাছ থেকে হয়তো সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
চঞ্চলের সঙ্গে এলেন এক আধবুড়ো মুসলমান ভদ্রলোক। নাম বললেন ইয়াকুব হোসেন। ১৩ নম্বর তালতলা লেনের তিনি বাসিন্দা। চঞ্চল তাঁকে ধরে আনায় তিনি অবাক, সামান্য বিরক্তও। যদিও ওরকম একখানা বড় গাড়ি আর শ্রীময়ীর পোশাক-পরিচ্ছদ দেখেই সম্ভবত বিরক্তিটা প্রকাশ করলেন না।
শ্রীময়ী খুব ভদ্রভাবেই বলল, আমি ডরোথি মণ্ডল নামে এক মহিলার খোঁজ করছি। একসময় তিনি ১৩ নম্বর তালতলা লেনে থাকতেন, এটুকু জানতে পেরেছি। আপনি কি এরকম কাউকে চেনেন? মানে, আমি বলতে চাইছি, আপনার আশপাশে এই নামে কেউ থাকে?
না ম্যাডাম। আমি তো এবাড়িতে কুড়ি বছর আছি। আমার রিজিয়া বেটির জনম এখানে হয়েছে। তারও তো সতরো সাল হয়ে গেল। এই নামে তো কাউকে থাকতে দেখিনি।
এটা কি আপনার নিজের বাড়ি?
না ম্যাডাম। ভাড়া। আমরা সবাই এখানে ভাড়া থাকি।
আপনার আগে এই বাড়িতে কে ছিলেন বলতে পারবেন?
তা তো বলতে পারব না ম্যাডাম। আমি তো হানিফাবিবির কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিয়েছি। এই বাড়িগুলো সবই হানিফাবিবির। ও হয়তো আপনাকে বলতে পারবে।
ইয়াকুবের কাছে হানিফাবিবির ঠিকানা পাওয়া গেল। একটু দূরে চার্চের গলিতে বাড়ি। ইয়াকুব ফোন করে বলেও দিল ম্যাডাম যাচ্ছেন।
জন্ম থেকে কলকাতায় থাকলেও এরকম কোনও বাড়িতে কোনওদিন যায়নি শ্রীময়ী। পুরোনো দিনের মুসলিম পরিবারের বাড়ি। দোতলায় জাফরিকাটা বারান্দা। খড়খড়ি দেওয়া সবুজ জানলা। সামনে একটা লাল মেঝের থাম দেওয়া খোলা জায়গা। হানিফাবিবি সেখানেই একটা গদি দেওয়া ভারী চেয়ারে বসেছিলেন। বয়স আশির ওপরে তো হবেই। তবে বেশ শক্ত চেহারা।
খানদানি মুসলিম বাড়ি যে নয়, সেটা পরিবারের লোকজনদের চেহারাতেই স্পষ্ট। তবে পয়সা আছে এবং নিশ্চিত ক্ষমতাও। ক্ষমতা না থাকলে যে এই এলাকায় এতগুলো বাড়ি ভাড়া দেওয়া এবং ভাড়া আদায় করা সম্ভব নয় সেটা শ্রীময়ী খুব ভালো করেই জানে। অন্ধকার জগতের সঙ্গে যোগ থাকার সম্ভাবনাও প্রবল। তবে সেসব নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই তার।
ইয়াকুব ফোনে ম্যাডাম সম্বন্ধে কী বলেছিল পুরোটা বোঝা যায়নি, তবে হানিফাবিবি শ্রীময়ীকে রীতিমতো ভালোভাবেই আপ্যায়ন করলেন। তাঁর নির্দেশে বাড়ির একটি মেয়ে এসে কাচের গ্লাসে সবুজ রঙের সরবতও দিয়ে গেল।
এতটা বয়স হলেও হানিফাবিবির কিন্তু স্মৃতিশক্তি যথেষ্ট প্রখর। শ্রীময়ীর কাছে নামটা শুনেই বললেন, হ্যাঁ, ডরোথি মণ্ডল তো থাকত। ওই ১৩ নম্বর বাড়িতেই থাকত। ওর হাজব্যান্ডও থাকত...নামটা আমার ঠিক মনে পড়ছে না। দাঁড়ান খাতা দেখে বলছি। কতসাল আগে বললেন, তিশ-বত্তিশ সাল তো? মাসুদ, ৮৬-৮৭ সালকো তালতল্লা বালা কপি লে আ...।
একটি অল্পবয়েসি ছেলে এসে একটা জাবদা খাতা দিয়ে গেল। হানিফাবিবি পাতা উল্টিয়ে দেখতে দেখতে একটা জায়গায় থেমে আঙুল দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, এই তো মনে পড়েছে। সুবল মণ্ডল। ডরোথির পতি। বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল। সুবল মণ্ডল কিন্তু মরে গেছিল জানেন তো। অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। পার্ক সার্কাস ক্রসিংয়ে রাস্তা পেরোনোর সময় গাড়ি ধাক্কা দেয়। মদ খেত তো। অনেক রাতে মদ খেয়ে আসছিল। ডরোথি কিন্তু তারপরেও থাকত ওই বাড়িতে...
বাচ্চা ছিল ওদের?
না, ছেলেপুলে হয়নি। বরটাও মরে গেল...তবে পরে হয়েছিল।
হানিফাবিবির কথায় ভিতরে ভিতরে চমকে ওঠে শ্রীময়ী। যদিও মুখে প্রকাশ করে না। খুব স্বাভাবিক স্বরে বলে,
পরে বাচ্চা হয়েছিল মানে?
হানিফাবিবি একটু চুপ করে থেকে কী যেন ভাবে। তারপর বলে, ডরোথি খুব অদ্ভুত একটা কাজ করেছিল। ও বাড়ি ছেড়ে হঠাৎ একদিন চলে গেল। কিন্তু ঘরটা ছাড়েনি। দরজায় তালা লাগিয়ে গেছিল। মাসে মাসে মানিঅর্ডারে ভাড়া পাঠিয়ে দিত। ছয়-সাত মাস পরে এসে ঘর সাফ-সুতরো করে আবার চলে যেত। কোথায় যেত, কোথায় থাকত, কেউ জানে না। এরকম চলল প্রায় পাঁচবছর। তারপর একদিন সকালে এসে বলে গেল বাড়ি ছেড়ে দেবে। কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। তবে আমার মনে লাগে ও আবার বিয়ে করেছিল...।
এখান থেকে চলে যাওয়ার দু-তিন সাল পর একবার নিউমার্কেটে দেখা হয়েছিল। বড়দিনের সময়। পরিষ্কার, সাফ-সুতরো জামা পরা, সঙ্গে একটা বাচ্চা মেয়ে। বলল, আমার মেয়ে। কিন্তু আর কিছু বলল না। তাড়াহুড়ো করে চলে গেল। কথা বলতে চাইছিল না আমার সঙ্গে। তাতেই আমার মনে হল আবার বিয়ে করেছে হয়তো।
ডরোথির বয়স কীরকম ছিল?
আমার এখান থেকে যখন গেল, তখন কারিফ পঁয়তিশ সাল হবে।
ডরোথির চলত কী করে? কাজ করত কিছু?
হ্যাঁ, ওর বরের চাকরিটা তো ও পেয়েছিল। মালকিন ওকে খুব ভালোবাসত।
বর কোথায় চাকরি করত?
সে আমি বলতে পারব না। তবে চামড়ার কারখানা, ব্যাগ-উগ তৈয়ারি হত। কারখানা থেকে লেবারদের বউদের জন্য ব্যাগ দিয়েছিল। ডরোথিও পেয়েছিল ব্যাগ।
লেদার গুডসের পার্সোনাল ডিপার্টমেন্টের ইনচার্জ কৃষ্ণপদ লাহা। অফিস যখন মল্লিকবাজারে ছিল তখন থেকেই আছেন তিনি। বাবার আমলের লোক বলে অপরাজিতা বিশ্বাস করতেন তাঁকে। পার্সোনাল ডিপার্টমেন্ট সংক্রান্ত যে কোনও কাজে শ্রীময়ীও কৃষ্ণজ্যাঠার ওপরেই নির্ভর করে। আজও অফিসে এসে খবর দিতেই এলেন কৃষ্ণপদ।
বেঁটে-খাটো ফর্সা মানুষ। মাথায় গোল চকচকে টাক। দেখতে শান্ত প্রকৃতির হলেও শক্ত ধাতের। শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধার দিকে কড়া নজর। কোম্পানির বহুদিনের লোক। শ্রীময়ীকে জন্ম ইস্তক দেখছেন। তাই মালকিন হলেও তুমি বলেও সম্বোধন করেন।
শ্রীময়ী চা দিতে বলছিল, কৃষ্ণপদ বললেন, এখন আর চা খাব না মা। সকালে এসেই দু-কাপ খাওয়া হয়ে গেছে। আজকাল বড্ড অম্বল হয়। ডাক্তার বলেছে চা খাওয়াটা কমাতে। তুমি যে বিজ্ঞাপনটা দিয়েছিলে তার কতগুলো জবাব এসেছে সেগুলো কি তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব?
আমার দেখার দরকার নেই। আপনি দেখে বুঝে নিন, তাহলেই হবে। কিন্তু আমি আপনাকে অন্য কাজে ডেকেছিলাম কৃষ্ণজ্যাঠা। আচ্ছা, আমাদের অফিসে ডরোথি মণ্ডল বলে কেউ কখনও কাজ করত?
কয়েক সেকেন্ড একটু ভাবলেন কৃষ্ণপদ। তারপর বললেন, হ্যাঁ, করত তো। প্রথমে কাজ করত ওর বর সুবল মণ্ডল। সুবল অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। তখন ওর কাজটা ডরোথিকে দেওয়া হল। কিন্তু ডরোথি কিছুদিন বাদে চাকরিটা ছেড়ে দেয়। কেন ছেড়ে দিল কে জানে। সেও অনেক বছর হয়ে গেল।
সুবল মণ্ডল কীভাবে চাকরি পেয়েছিল, কোথা থেকে এসেছিল কিছু জানেন?
কোথা থেকে এসেছিল বলতে পারব না। তবে চাকরি তোমার দাদুই দিয়েছিলেন। আমার ধারণা এর পিছনে তোমার মায়ের হাত ছিল। কারণ ডরোথি যখন কাজ করতে এল, তখন অফিসে তোমার মায়ের দেখাশোনা, ফাইফরমাশ খাটা ওই করত। ম্যাডাম ওকে বেশ পছন্দ করতেন বলেই মনে হত। সুবল তো কারখানায় কাজ করত। কিন্তু ডরোথিকে তোমার মা অফিসের কাজে বহাল করেন।
ম্যাডাম ওকে ডলি বলে ডাকতেন। আমাদেরও ওটাই শুনে অভ্যাস হয়ে গেছিল। তাই তুমি যখন বললে প্রথমটায় ধরতে একটু অসুবিধা হয়েছিল। অফিসের খাতায় ওর নাম ছিল ডরোথি।
সুতোগুলো জুড়ে জুড়ে যাচ্ছে ক্রমশ। সুবল মণ্ডলকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিল ডরোথি। ডরোথি বরের চাকরির জন্য ধরেছিল তার অপাদিদিকেই। মা রেগে যাবেন বলে বাড়িতে কিছু জানায়নি অপরাজিতা। বাবার সঙ্গে পরামর্শ করে চাকরির ব্যবস্থা হয়। সুবল মারা যাওয়ার পরে চাকরি দেওয়া হল ডরোথিকে।
স্বামী নেই। একলা অসহায় মেয়ে। নিজের জীবনধারণের জন্য অপরাজিতার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত। খুব স্বাভাবিকভাবেই গোপন কাজের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য ডরোথি মণ্ডলকেই বেছে ছিলেন অপরাজিতা। গুড়িয়া নামের বাচ্চাটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ডরোথিকে। ব্যাপারটা যাতে সম্পূর্ণ গোপন থেকে সেজন্য লেদার গুডসের চাকরি ছাড়তে হয়েছিল ডরোথিকে। বদলে গেছিল ঠিকানাও। পরিস্থিতি যদি হঠাৎ পাল্টে যায়, এই আশঙ্কাতেই সম্ভবত তালতলার বাড়িটা ডরোথি কয়েক বছর রেখেছিল। পরে ছেড়ে দেয়।
কিন্তু কার জন্য এত ব্যবস্থা? গুড়িয়া কি ডরোথির সন্তান? হানিফাবিবির তাই ধারণা। কিন্তু শ্রীময়ীর অঙ্ক বলছে, তা নয়। গুড়িয়ার সঙ্গে অপরাজিতার সম্পর্ক অনেক নিকট। কার সন্তান গুড়িয়া?
অপরাজিতার অভ্যাস ছিল ব্যক্তিগত চিঠিপত্র গুছিয়ে রাখা। মায়ের মৃত্যুর পর শ্রীময়ী অবাক হয়ে দেখেছে, একটা সুন্দর লম্বাটে চন্দনকাঠের বাক্সে বাবার লেখা সব চিঠি গুছিয়ে রেখেছে মা। আর একটা বড় কাশ্মীরি কাঠের বাক্সে আছে অন্যান্য চিঠিপত্র।
অন্যমনস্কভাবে সেটাই ঘাঁটতে ঘাঁটতে শ্রীময়ী দেখল যে বছরের অগাস্ট মাসে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্টটা খুলেছিলেন অপরাজিতা, সেই বছরের জুনমাসে একটা চিঠি রয়েছে মায়ের কলেজের বন্ধু রীনামাসির।
চিঠিটা পড়ে একটু অবাক হল শ্রীময়ী। কারণ চিঠিতে রাইয়ের শরীর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রীনামাসি। জানতে চেয়েছে তারা কবে বাড়ি ফিরবে?
তাহলে কি সেই সময় মায়ের সঙ্গে সে কোথাও গেছিল? চিঠির তারিখের হিসেবে সে তখন ক্লাস ফাইভ। ওই সময়টায় সে বেশ কিছুদিন অসুস্থ ছিল। একটা অপারেশনও হয়েছিল। একটু ভাবতে শ্রীময়ীর মনে পড়ল, তখন কিছুদিন তারা একটা অন্য বাড়িতে থাকত। কোথায় সেই বাড়িটা একদম মনে পড়ছে না! বেশ বাগানঘেরা বাড়ি।
মা বলেছিল, মায়েরও নাকি শরীর খারাপ, তাই ডাক্তার খোলামেলা জায়গায় থাকতে বলেছে। রীনামাসি তখন দিল্লিতে। মেসো রিটায়ার করার পর কলকাতায় চলে এল। চিঠিটা দিল্লি থেকে লেখা। কিন্তু খামটা নেই। তাই চিঠিটা কোন ঠিকানায় এসেছে বোঝার কোনও উপায় নেই।
রীনামাসি মায়ের সবথেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। চিরকাল সব মনের কথা চালাচালি হত। মা অফিসের কাজে দিল্লি গেলে সবসময় রীনামাসির বাড়িতে উঠত। রীনামাসিও কলকাতায় এলে বেশ তিন-চারটে আড্ডার সেশন ছিল বাঁধা। পরে যখন ওরা কলকাতায় চলে এলেন তখনও মাঝে মধ্যেই রীনামাসি চলে আসত এবাড়িতে। এছাড়া ফোনে কথাবার্তা তো হতই।
রীনামাসিকে জিজ্ঞাসা করলে হয়তো জানা যাবে যে সেসময় কেন তারা বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় গিয়ে ছিল।
শ্রীময়ী ঠিক করল সামনের সপ্তাহেই সে রীনামাসির বাড়ি যাবে।

একদম ভদ্র, শিক্ষিত মানুষ বলতে যা বোঝায়, পরিতোষ চিরকালই সেরকম। জামাইবাবুর চেহারা ভালো ছিল। পুরুষালি লম্বা গড়ন। কিন্তু মুখশ্রী তেমন সুন্দর নয়। কিন্তু দিদি রীতিমতো সুন্দরী। পরিতোষ আর অনুতোষ দুই ভাই মিলিয়ে মিশিয়ে মা-বাবার চেহারা পেয়েছিল।
পরিতোষ ছিল বাবার ধাঁচের। প্রায় ছ'ফুটের কাছাকাছি লম্বা। চওড়া কাঁধ। তবে মুখের রেখায় লাবণ্য কম। খেলাধুলো করত বলে চেহারায় একধরনের ক্ষিপ্রতা ছিল। অমিয়র যেটা সবথেকে ভালো লাগত সেটা হল তার ভারী উজ্জ্বল দুটি চোখ। পরিতোষ যে বুদ্ধিমান ছেলে সেটা তার চোখ দেখেই বোঝা যেত।
তবে চেহারাটা লম্বা-চওড়া হলেও পরিতোষ মানে অমিয়র আদরের ভাগ্নে মিঠু মানুষটা ছিল খুবই নরম মনের। ভদ্র, সভ্য। উঁচু গলায় কথা বলা, গালগাল করা এসব পরিতোষের আসত না। বেশ একটু লাজুকও। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তাই মেয়েদের থেকে প্রথমটায় একটু দূরে দূরেই থাকত। বাড়ি ফিরে অমিয়র কাছে গল্প করত, কোন মেয়ে কী বলেছে। কে কফি হাউস নিয়ে যেতে চাইছিল। অপরাজিতার প্রেমে পড়ার কথাও প্রথম তার মামুকেই বলেছিল মিঠু।
প্যালেটে কালো আর খয়েরি রঙের সঙ্গে টিউব টিপে অল্প ইয়োলো অকার বার করে তুলি দিয়ে ভালো করে মেশালেন অমিয়। অনেকদিন বাদে আজ আবার ছবি আঁকতে বসেছেন। তাঁর বারান্দা থেকে দূরের যে জঙ্গলটা দেখা যায়, কিছুদিন আগে সেখানে আগুন লেগেছিল। দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বেশ খানিকটা জায়গা। কালচে-বাদামি রঙের একটা বিস্তীর্ণ ছোপ। তার ঠিক মাঝখানে কীভাবে জানি বেঁচে দাঁড়িয়ে আছে একটা শিমূল গাছ।
শীতের দিনে নিষ্পত্র গাছটাকে ওই মরা জঙ্গলে তেমন বেমানান লাগছিল না। কিন্তু বসন্ত পড়তেই সে ফুলে সেজে উঠেছে। আগুনে নিঃশেষ হওয়া ধ্বংসলীলার মাঝখানে রক্তবিন্দু। বয়ে চলা প্রাণের দর্পিত স্পন্দন।
দৃশ্যটা ভীষণ টানছিল তাঁকে। তাই ইজেলে ক্যানভাস টাঙিয়ে বসেছেন। কিন্তু জঙ্গলের ওই কালচে-বাদামি রঙটা যেন কিছুতেই ঠিক আসছে না। পাশে রাখা বিয়ারের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে এলোমেলো একবার রঙটা ঘাঁটলেন অমিয়।
একেবারে মারকাটারি না হলেও অপরাজিতা নিশ্চিত সুন্দরী ছিল। সাধারণ বাঙালি মেয়েদের থেকে একটু বেশি লম্বা। মাজা রঙ। লম্বা বেণী কিংবা চুল ঘুরিয়ে নিয়ে একটা শক্ত খোঁপা। ঈষৎ ফোলা অতীব আকর্ষণীয় ঠোঁট, ঝকঝকে দাঁত। সাজগোজ, প্রসাধন কিচ্ছুটি নেই। কিন্তু হাসলে যেন চারিদিকে আলোর ফুলঝুরি জ্বলে ওঠে। মায়াবী দীঘল চোখ। মুখের রেখায় কোমলভাব থাকলেও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি দিব্যি জানান দিত।
পরিতোষের থেকে দুবছরের জুনিয়র ছিল অপরাজিতা। প্রথমটায় মিঠুর ধারণা ছিল মেয়েটা ভীষণ নাক উঁচু। বড়লোকের মেয়ে। অন্যদের মানুষ বলে মনে করে না। তাই দেখে ভালো লাগলেও সেটা বুঝতে দেয়নি।
বিয়ের পরে একবার গল্প করার সময় হাসতে হাসতে অপরাজিতা বলেছিল, ওর যে আমাকে ভালো লেগেছে, সে তো আমি ক'দিন যেতে না যেতেই বুঝে গেছিলাম। কিন্তু কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের মেয়ে তো আর থার্ড ইয়ারের সিনিয়রকে নিজে থেকে গিয়ে প্রেম নিবেদন করতে পারে না। একেবার ঢিঢি পড়ে যাবে তাহলে। তাই ওয়েট করছিলাম কবে তোমার ভাগ্নেটি মুখ খোলে। কিন্তু ও বাবা! তার তো দেখি আর সাহসই হয় না।
এদিকে ডিবেটে ফার্স্ট হলে প্রথমে আমাকে এসে খবর দিচ্ছে। এমনকী পিসির মেয়ের বিয়েতে যাবে বলে চারদিন কলেজে আসবে না, তাও বলে যাচ্ছে। অথচ আসল কথার নাম নেই। এদিকে ফার্স্ট ইয়ার শেষ হতে চলল। লীনা আর মণিকা ছিপ পেতে বসে আছে আমি জানি। শেষ পর্যন্ত কি হাতছাড়া হয়ে যাবে নাকি! ভেবে-চিন্তে দেখলাম আর সময় দেওয়া উচিত হবে না। এবার একটা এসপার-ওসপার করে নেওয়াই ভালো।
সে কী, প্রোপোজটা তাহলে তুমিই করেছিলে! মিঠু বলেনি তো কোনওদিন!
বলবে কী করে। এমন বোকা হয়েছিল...।
ঘরোয়া গল্পের আসর। মিঠু পাশে বসে মুচকি মুচকি হাসছিল। অমিয় প্রবল উৎসাহে বলেছিলেন, বলো বলো শুনি ঘটনাটা।
শ্রীমান লাইব্রেরিতে বসে পড়াশোনা করছিলেন। আমি সোজা গিয়ে দু-হাত মুঠি করে এগিয়ে দিয়ে বললাম, যে কোনও একটা ধরো তো পরিতোষদা। অবাক হয়ে বলল, কেন বলো তো? আমি ভীষণ সিরিয়াস মুখ করে বললাম, শোনো দু'জন আমাকে প্রোপোজ করেছে। দু'জনকেই আমার বেশ পছন্দ। তাই ডিসিশান নিতে পারছি না। সেজন্য দুটো চিরকুটে নাম লিখে মুঠোয় রেখেছি। তুমি যে হাতটা ধরবে তাকেই হ্যাঁ বলে দেব। তোমার ওপর আমার আস্থা আছে।
তারপর?
ব্যস, আমার কথা শুনে তার মুখ তো ততক্ষণে সাদা হয়ে গেছে! বলে কিনা আমার মনে হয় দু'জনের কেউই তোমার জন্য ঠিক স্যুটেবল নয়।
শুনে তো আমার বেজায় হাসি পেয়েছে। অনেক কষ্টে হাসি চেপে বললাম, তুমি কী করে জানলে? তুমি তো জানোই না ওরা কারা? দু'জনেই ভালো ছেলে, ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট! তোমার ক্লাসেই পড়ে। তখন বাবাজি বলে কিনা, কী নাম শুনি। আমি বললাম ঠিক আছে চিরকুট দুটো দিচ্ছি তুমিই বেছে দাও। বলে মুঠি খুলে ওর হাতে দিয়ে দিলাম।
অপরাজিতা হেসে গড়িয়ে পড়ছে দেখে অমিয় এবার মিঠুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তারপর কী হল?
লাজুক হেসে মিঠু বলল, কী আবার হবে? ও কি কম পাজি নাকি! দুটো চিরকুটেই তো আমার নাম লেখা ছিল।
প্যালেটে অল্প একটু সাদা মেশালেন অমিয় নন্দী। এইবার মনে হচ্ছে রঙটা ঠিকমতো হয়েছে।
এই ছবি আঁকাটাও তাঁকে একসময় নেশার মতো পেয়ে বসেছিল। তবে প্রকৃতি তিনি খুব একটা আঁকতেন না। তাঁর আঁকার বিষয় ছিল নারী। প্রতিমাকে সেদিন কথাটা একটু অন্যভাবে বলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু আসলে মেয়েদের শরীরের গোপন সৌন্দর্য খুঁজে বার করাটাই ছিল তাঁর নেশা।
অনেক সময় এমন হয়েছে নগ্ন অবস্থায় যে নারীর স্তন তাঁকে সবথেকে বেশি আকর্ষণ করেছে, ছবিতে তাকে যখন ধরতে গেছেন তখন মনে হয়েছে মেয়েটির মসৃণ-পেশল কাঁধ যেন তার স্তনের থেকে ঢের বেশি সুন্দর। চোখের আর মনের মাপ মেলেনি। আর রঙ-তুলি নিয়ে বসলে সবসময় নিজের মনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন অমিয়।
মিঠু যখন অপরাজিতার সঙ্গে তাঁর আলাপ করিয়ে দিল, তখন কিন্তু নিজের মনে মনে একটু আশঙ্কাতেই ছিলেন অমিয়। আসলে যে কোনও মেয়েই যে তার সঙ্গে আলাপ হলে নিজেকে ধরে রাখতে পারে না, এবিষয়ে তিনি তখন বেশ আত্মবিশ্বাসী। আর কেউ ধরা দিতে চাইলে তাকে তিনি কখনোই ফেরাতেন না।
কিন্তু মিঠুর প্রেমিকার ক্ষেত্রে তো সেটা হওয়া সম্ভব নয়। সেখানে নিজেকে সংযত হতেই হবে। তাই একটু সতর্কই ছিলেন। তাঁরা তিনজনে একসঙ্গে হলে খুব সন্তর্পণে অপরাজিতার চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করতেন। বুঝতে চাইতেন সেখানে কোনও গোপন ইঙ্গিত আছে কিনা।
একদিন তো রীতিমতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেদিন অপরাজিতার সঙ্গে মিঠু সিনেমা দেখতে যাবে। কথা ছিল মিঠু নিজের গাড়ি নিয়ে কলেজে গিয়ে অপরাজিতাকে তুলে নেবে। তারপর দু'জনে মিলে যাবে নিউমার্কেট চত্বরে। মিঠু সম্ভবত কোনও কারণে নিজে সেদিন কলেজ যায়নি। কিন্তু দুপুরের পর থেকে সারা শহর জুড়ে শুরু হল ধুন্ধুমার ঝড় সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি।
অমিয় যথারীতি কফিহাউসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। সাতটা নাগাদ মিঠুর ফোন এল, অপরাজিতা কলেজে আটকে পড়েছে। এদিকে চারিদিকে জল জমে এমন অবস্থা যে মিঠুর পক্ষে কলেজ স্ট্রিট যাওয়া তো সম্ভব নয়। অপরাজিতার বাড়ির গাড়িও যেতে পারছে না। অমিয় যেন একটা ট্যাক্সি নিয়ে অপরাজিতাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়।
কফি হাউস থেকে বেরিয়ে অমিয় দেখেন চারদিক জলমগ্ন। শীতের দিন। তার ওপর ওরকম বৃষ্টি। রাস্তাঘাট ইতিমধ্যেই প্রায় শুনশান হয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্সির গেটের সামনে একলা অপরাজিতা দাঁড়িয়ে আছে।
বহুকষ্টে ট্যাক্সি একটা পাওয়া গেল। জলমগ্ন রাস্তা। বাইরে প্রবল বৃষ্টি পড়ছে। ঝড়-বাদলার কারণে অধিকাংশ জায়গাতেই কারেন্ট নেই। ট্যাক্সির ভিতরে অন্ধকারে অমিয় আর অপরাজিতা পাশাপাশি বসে আছেন। মাঝে মাঝে ট্যাক্সি গর্তে পড়লে ঝাঁকুনির চোটে মাঝের দূরত্ব কমে যাচ্ছে। অপরাজিতার মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু অমিয় স্পষ্ট বুঝতে পারছেন আজ আর কিছু করা যাবে না। দুর্ঘটনা একটা ঘটবেই!
এমন সুযোগ অপরাজিতার মতো বুদ্ধিমান মেয়ে হাতছাড়া করবে বলে মনে হয় না। এমন সময় একটা ঘটনা ঘটল। ঝড়াং করে ট্যাক্সিটা গর্তে পড়তেই অমিয় যেদিকে বসেছিলেন সেদিকের জানলার কাচটা ঝপাস করে নেমে গেল। মুষলধারে বৃষ্টি স্রোতের মতো ঢুকে এল ভিতরে।
অমিয় কিছু ভেবে ওঠার আগেই অপরাজিতা তার হাত ধরে হেঁচকা টান দিয়ে নিজের দিকে টেনে এনে বলল, আরে আরে, সরে এসো। ভিজে যাচ্ছ তো!
টানের চোটে ভাগ্নের প্রেমিকার প্রায় গায়ের ওপর এসে পড়েছেন অমিয়। এদিকে সেই মেয়ে ততক্ষণে প্রায় তাঁর কোলের ওপর উপুড় হয়ে প্রাণপণে নিজের আঁচল হ্যান্ডেলে পেঁচিয়ে কাচটা তোলার চেষ্টা করছে। সঙ্গে চলছে ট্যাক্সি ড্রাইভারকে তুমুল বকাবকি।
মিনিট কয়েকের মামলা। ড্রাইভারের নির্দেশ মেনে কাচ ঠেলে তোলা গেল। সিটের খানিকটা অংশ ভিজে গেলেও দু'জনেই আবার মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থানে বসলেন।
কিন্তু ততক্ষণে অমিয় বুঝে গেছেন এতক্ষণ যা ভাবছিলেন, তা একেবারে ভুল। তাঁর পরিচিত অন্য মেয়েদের সঙ্গে অপরাজিতার কোনও মিল নেই। অমিয় যত আকর্ষণীয়ই হোন না কেন এই মাজা রঙের ছিপছিপে মেয়েটির তাঁর প্রতি সামান্যতম কোনও দুর্বলতাও নেই।
ব্যাপারটা কি তাঁর অহং-এ কোনওভাবে আঘাত করেছিল? মনের গোপনে অমিয় জানেন যে করেছিল। তবে কোনওদিনই তার কোনও বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। তিনি নিজেও ভীষণরকম সতর্ক ছিলেন। সেজন্যই সম্ভবত অপরাজিতার মতো বুদ্ধিমতী মেয়েও ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি।
শুধু এটা নয়, অমিয়র যে অপরিসীম নারী শরীরের প্রতি দুর্বলতা সেটাও অপরাজিতা বুঝতে পারেনি। পারলে হয়তো পরিতোষ যখন অমিয়কে তাদের নিউ আলিপুরের বাড়িতে থাকার প্রস্তাব দিল, তখন বাধা দিত। কিন্তু আপত্তি করেনি অপরাজিতা। বরং খুশিই হয়েছিল।
একটা স্ট্রোক হওয়ার পরেই জামাইবাবু তাঁর ব্যবসা দুই ছেলের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন। বিয়ের কয়েক বছর পর, রাই যখন বছর দুয়েকের তখন নিউ আলিপুরের বাড়িটা কিনে চলে এল পরিতোষ। সঙ্গে নিয়ে এল অমিয়কেও। দোতলার একটা দিক শুধু অমিয়র জন্য। তার স্টুডিও, স্টাডি সব রকম ব্যবস্থা মজুত।
এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসাটা দেখছিল অনুতোষ। মনোহরপুকুরের বাড়িতেই থাকত বউ নিয়ে। সেকেন্ড অ্যাটাকে জামাইবাবু মারা গেলেন। তার তিনমাসের মধ্যে দিদিও চলে গেল। বছর দুয়েকের মধ্যেই অনুতোষ ব্যবসা গুটিয়ে দিল্লিতে শিফট করল। অমিয় কলকাতা ছাড়ার আগেই মনোহরপুকুরের বাড়িও বিক্রি হয়ে গেছিল।
নিউ আলিপুরের বাড়িটা বিশাল। অপরাজিতা খুব সুন্দর করে সাজিয়েছিল। তখন ওরা দু'জনেই সাংঘাতিক ব্যস্ত। অপরাজিতা ওর বাবার লেদার ফ্যাক্টরির দায়িত্ব নিয়েছে। পরিতোষ নিজের ফিনান্স কোম্পানি চালাচ্ছে। দু'জনেই সকালে বেরিয়ে যায়। ফিরতে সন্ধে পার।
অমিয়ও তখন নানারকম কাজ করছেন। একদিকে চলছে চিত্রনাট্য লেখা। অন্যদিকে ছবি আঁকা। গোটা দুয়েক এক্সিজিবিশনও হয়ে গেছে। কিন্তু ব্যস্ততা সত্ত্বেও রাতে খাবার টেবিলে রোজই প্রায় গল্প হত।
তবে বাড়ির তৃতীয় মানুষটি যে সবার অগোচরে একটু একটু করে বড় হচ্ছিল সেটা তাঁরা কেউই খেয়াল করেননি। রাই স্কুলে যেত-আসত। মাঝে মাঝে মামাবাড়ি যেত। তার দেখাশোনার জন্য একজন সর্বক্ষণের আয়া ছিল।
অমিয় কোনওদিনই বাচ্চাদের নিয়ে আদিখ্যেতা পছন্দ করেন না। রাইয়ের সঙ্গে তাঁর তেমন ভাব হয়নি কখনও।
পরিতোষ তখন বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একটা বছর দুয়েকের কোর্স। কোম্পানির কাজ ম্যানেজারই দেখবে। ওভারঅল একটা সুপারভিশন অপরাজিতার থাকবে। সেজন্য অপরাজিতার ব্যস্ততা তখন খুব বেশি। নিজের কাজ তো আছেই। প্রায় রোজই পরিতোষের অফিসে গিয়ে সেখানকার ব্যাপারস্যাপারও অনেকটাই বুঝে নিতে হচ্ছিল। রাই অনেকসময়ই মামারবাড়িতে থাকত। কিন্তু সেদিন কেন স্কুলফেরতা ভবানীপুর যায়নি অমিয় জানেন না।
তবে দুপুরবেলা যখন রাই এসে হঠাৎ বলল যে, সে তার ঘরে খানিকক্ষণ থাকবে, তখন অবাক হয়েছিলেন। সামান্য বিরক্তও। রাই অবশ্য তাকে বলেছিল তার আয়া মলিনাদি একটু বাইরে গেছে। একা ঘরে ভয় লাগছে। বাড়িতে তো আর কেউ নেই। তাই এঘরে চলে এসেছে।
অমিয় ছবি আঁকছিলেন। কথাগুলো শুনে হাসি পেলেও আপত্তি করেননি। এমনিতে ছবি আঁকার সময় কেউ ঘরে থাকা অমিয়র পছন্দ ছিল না। কিন্তু রাই তাঁকে বিরক্ত করেনি মোটেই। পাশের ডিভানে শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিল।
ছবি আঁকতে আঁকতে হঠাৎ অমিয়র চোখ পড়েছিল সেদিকে। ছোট একটা স্কার্ট পরে আছে রাই। সেটা সরে গিয়ে ভিতরের ফুলছাপ প্যান্টি দেখা যাচ্ছে। হালকা গোলাপি রঙের নির্লোম দুটো পা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। ওপরের হাতকাটা আলগা টপও সরে গেছে বেশ খানিকটা। তাকিয়ে থাকতে থাকতে অমিয় বুঝতে পারছিলেন রাই আর শিশু নেই। সে যৌবনে পা দিয়েছে। শরীর জুড়ে ঘুমিয়ে থাকা কুঁড়িগুলোর সবে ঘুম ভাঙছে। অমিয় বুঝতে পারছিলেন ভয়ঙ্কর লোভ হচ্ছে তাঁর। ঠিক এইরকম বয়সের কোনও নারী শরীর তিনি কখনও দেখেননি। রঙ-তুলিতে এরকম একটা ছবিকে ধরে রাখার প্রবল ইচ্ছে তাকে গ্রাস করে ফেলছে।
তারপর থেকেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। সুযোগ এল পরিতোষ বিদেশে চলে যাওয়ার কয়েকদিন পরেই। হঠাৎ মায়ের শরীর খারাপের খবর আসায় রাইয়ের আয়া ঘণ্টা দুয়েকের জন্য বাইরে যাবে বলে তাঁকে বলতে এসেছিল। অমিয় বলেছিলেন, রাই একা ঘরে ভয় পায়। ওকে আমার ঘরে পাঠিয়ে দিও।
সব পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন আগেই। কিছুদিন ধরে ঘুমের সমস্যা হচ্ছিল বলে ডাক্তার হালকা ডোজের ঘুমের ওষুধ দিয়েছিল।
এই ওষুধটা খেলে খুব সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখা যায়। এটা একা ম্যাজিক মেডিসিন...।
নয় বছরের মেয়ে স্বপ্ন দেখার লোভে দিব্যি খেয়ে নিল ওষুধটা।
গভীরভাবে ঘুমন্ত সদ্য কিশোরীকে ডিভানে শুইয়ে একটু একটু করে তাকে নগ্ন করছিলেন অমিয়। তারপর মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখেছিলেন। অপূর্ব সৌন্দর্য। দুই স্তন যেন দুটি আধফোঁটা পদ্ম। হালকা গোলাপি পাপড়ির ভিতর থেকে উঁকি মারছে গাঢ় গোলাপি রঙের বৃন্ত। পেটের নীচে প্রথমে একটা আলতো বাদামি রঙের রোমের রেখা। তারপর ছোট্ট ত্রিভুজ ঢেকে আছে নরম সোনালি রোমে। নাভি থেকে ঠিক একইরকম একটা সোনালি রোমের রেখা এসে মিশেছে যোনিতে।
ক্যানভ্যাস থেকে তুলি সরিয়ে নিলেন অমিয়। পাশে রাখা বিয়ারের গ্লাসে পরপর দুটো লম্বা চুমুক দিলেন। দৃশ্যটা মনে পড়লে অনেকদিন পর্যন্ত তাঁর পুরুষাঙ্গ শক্ত হয়ে যেত।
রাইয়ের ছবি তিনি সেদিন আঁকেননি। তবে কতগুলো ফোটো তুলে রেখেছিলেন। ছবি এঁকেছেন অনেক পরে। যখন মুম্বইয়ে সেটলড তিনটে ছবির একটা সেট। তিনরকম ভঙ্গিতে কুঁড়ি ফোটা কিশোরী।
ঘুমন্ত রাইকে খুব সাবধানে তিন-চাররকম ভঙ্গিতে শুইয়ে তুলেছিলেন ছবিগুলো। তার ওপর বেস করেই আঁকা। যদিও রাইকে ছবিতে চেনার কোনও উপায় নেই। তখন আর অমিয় বিশেষ ছবি আঁকেন না। তাহলেও প্রশংসিত হয়েছিল সিরিজটা। ছবিগুলো বিক্রিও হয় মোটামুটি ভালো দামেই। ফটোগ্রাফগুলো অমিয় প্রিন্ট করে নিজের আলমারিতে রেখেছিলেন। অনেকদিন পর্যন্ত সেগুলো তাঁর কাছেই ছিল। কীভাবে হারিয়ে গেল এখন আর খেয়াল নেই।
পরিতোষ বিদেশ যাওয়ার প্রায় মাস পাঁচ-ছয় পরে ঘটনাটা ঘটল।
জলের বাটিতে মোটা ব্রাশটা ধুয়ে ফেললেন অমিয়। এবারে সরু তুলি দিয়ে কয়েক জায়গায় আঁচড় কাটতে হবে। সূক্ষ্ম কাজ। কিন্তু এখন আর করা যাবে না। সেদিনের অপমানটা মনে পড়লেই মাথাটা বড্ড বেশি গরম হয়ে যায়!
কয়েকদিন ধরেই খুব দুশ্চিন্তিত দেখাচ্ছিল অপরাজিতাকে। রাতে খাওয়ার টেবিলে নিয়মিত আসছিল না। অন্য সময় দেখা হলেও দু-চারটে কেজো কথা হয়তো হল। কেমন যেন একটা তাড়াহুড়ো ভাব। অমিয়র মনে হচ্ছিল বড্ড বেশি স্ট্রেইন যাচ্ছে মেয়েটার। দুটো কোম্পানির দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো তো আর সোজা কথা নয়। শরীরটাও বোধহয় ভালো যাচ্ছিল না।
একদিন ডিনারের সময় হঠাৎ বমি করে ফেলল। তারপর একটু অপ্রস্তুত হয়েই বলল, পরিতোষ বলেছে, আমাদের ছয়মাস পরপর একটা করে ফুল হেলথচেক-আপ করাতে। ব্লাডের একটা লিপিড প্রোফাইল অন্তত করিয়ে নেওয়া উচিত। আমি বলে দিয়েছি। কাল সকালে ক্লিনিক থেকে লোক আসবে, ব্লাড নিতে।
পরিতোষ চিরকালই একটু হেলথফ্যাড। তাছাড়া ভীষণ কেয়ারিং। বিদেশে আছে বলে চিন্তাটাও বেড়েছে। বুঝতেই পেরেছিলেন অমিয়। আপত্তিও করেননি। পরদিন লোক এসেছিল রক্ত নিতে।
অপরাজিতার একজন ডাক্তার বন্ধু ছিল। কলেজের সময়কার বন্ধু। কিন্তু নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, দেখাশোনা, আড্ডা হত। তারই ক্লিনিকের লোক।
দু'দিনের জন্য একটা শ্যুটিং টিমের সঙ্গে বাইরে গেছিলেন অমিয়। যেদিন ফেরার কথা তার আগের দিন সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে দেখেছিলেন ড্রইংরুমে একই সোফায় সেই ডাক্তারের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে বসে কথা বলছে অপরাজিতা। যদিও দু'জনেরই বেশ গম্ভীর মুখ।
রাই আর তার আয়া ওপরের ঘরে। বাড়িতে আর কেউ নেই। পরিতোষ বিদেশে। এই অবস্থায় ফাঁকা বাড়িতে একজন বাইরের পুরুষের সঙ্গে এভাবে বসে থাকাটা এমনিতে হয়তো একটু দৃষ্টিকটু। অমিয়র সামান্য খটকাও লেগেছিল। কিন্তু পাত্তা দেননি। কারণ অপরাজিতার সঙ্গে এসব ব্যাপারগুলো একদমই মেলে না। পরে অবশ্য মনে হয়েছিল, ওই সময় বাড়িতে এসে পড়াটাই তাঁর ভুল হয়েছিল! কারণ সেদিন রাতেই তাঁর ঘরে এসেছিল অপরাজিতা।
তখন বেশ রাত। দরজায় টোকা শুনে খুলে ওকে দেখে অবাক হয়েছিলেন অমিয়। চোয়াল শক্ত অপরাজিতার। চোখদুটো যেন জ্বলছে। হিংস্র-কঠিন গলায় বলেছিল, আজকের রাত আর কালকের সারাদিনটা সময় দিলাম। তারমধ্যে নিজের সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে এবাড়ি থেকে চলে যাবে!
তার মানে?
মানে খুব স্পষ্ট। আর কোনওদিন যেন আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় তোমায় না দেখি। আমি ক্ষমতা দেখাতে চাই না। কিন্তু তুমি জানো যে ক্ষমতা আমার আছে।
কী বলছ তুমি, অপরাজিতা! এটা তো পরিতোষের বাড়ি। পরিতোষ নিজে আমাকে থাকতে বলেছে...তুমিও তো...
পরিতোষের সঙ্গে আমি বুঝে নেব। আর এটা শুধু পরিতোষের বাড়ি নয়, আমারও বাড়ি। কথা বাড়াতে চাই না। যদি আত্মসম্মান থাকে কাল সকালের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।
আর একটাও কথা না বলে মুখের ওপর দরজাটা ধড়াম করে বন্ধ করে চলে গেছিল অপরাজিতা।
সাধারণ আশ্রিত তো তিনি নন। প্রতিষ্ঠা আছে, উপার্জন আছে। এমনকী পৈতৃক সম্পত্তিও আছে। নিজে আসেননি। আদর করে ডেকে এনেছিল পরিতোষ। রাগে-অপমানে মাথা ঝনঝন করছিল অমিয়র। রাতেই সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছিলেন। ভোরবেলা কেউ ঘুম থেকে ওঠার আগেই বেরিয়ে আসেন বাড়ি থেকে। তখনই ঠিক করে নিয়েছিলেন এই শহরেই আর নয়। ট্যাক্সি নিয়ে সোজা এয়ারপোর্টে এসে মুম্বইয়ের প্লেন। কলকাতা মুছে গেল তাঁর জীবন থেকে।

খবরটা নিয়ে ক'দিন ধরেই কাগজপত্রে তোলপাড় হচ্ছে। টেলিভিশন খুললেও একই আলোচনা। বালিগঞ্জের এক বহুতল আবাসনে এক কিশোরের মৃত্যু। আবাসনের পার্কিং প্লেসে, তিন-চারজন বন্ধুর সঙ্গে মদ্যপান করছিল ছেলেটি। নিজেদের গাড়িতে গান চালিয়ে নাচও হচ্ছিল। তারপর কী কারণে নিজেদের মধ্যে ঝামেলা বাধে।
অতিরিক্ত মদ্যপানে তখন কারুরই আর শরীর-মন কিছুই বশে নেই। ঝামেলা থেকে হাতাহাতি, ধাক্কাধাক্কি। শেষ পর্যন্ত বেকায়দায় পড়ে গিয়ে মাথায় লাগে একটি ছেলের।
যার বাড়ির নীচে এইসব কাণ্ডকারখানা চলছিল, তার বাবাকে খবর দেওয়ায় তিনি এসে গাড়িতে করে ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেই ছেলেটি মারা যায়। মৃত কিশোরের মা-বাবার দাবি, তাঁদের ছেলেকে খুন করা হয়েছে। সত্যিই কি খুন হয়েছে ছেলেটি? নাকি নিছকই একটা দুর্ঘটনা? কীভাবে ঘটল ঘটানাটা?
খবরের কাগজে গ্রাফিক্স ডিজাইন করে ছবি আঁকা। টেলিভিশন চ্যানেলে পুনর্নির্মাণ। ওই বয়সের চার-পাঁচটা ছেলে বাড়ির নীচে মদ খাচ্ছিল। মা-বাবা জানতে পারেনি? ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারাই বা কী করছিলেন? গম্ভীর মুখে মনোবিদদের মতামত। প্যানেল ডিসকাশন। গত সাতদিন ধরে খবরের কাগজের প্রথম পাতাজোড়া খবর।
আজও কাগজটা খুলে এটাই দেখছিলেন সুধাময়বাবু। সাধারণত জলখাবার খেয়েই বাজার যান। কিন্তু আজ একটু সকাল সকাল গেছিলেন। অর্ণব ট্যাংরা মাছ ভালোবাসে। গত দু'দিন পাননি। ঢাকুরিয়ার এই বাজারটায় ভালো মাছ তেমন ওঠে না। যেটুকু পাওয়া যায়, তারজন্য তাড়াতাড়ি যেতে হয়। আজ তাই চা খেয়েই বাজারের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন সুধাময়।
গিয়ে অবশ্য লাভ হয়েছে। ডিমভরা দেশি ট্যাংরা পেয়েছেন। ভালো বেগুন, টোম্যাটো, সবই খুঁজে-পেতে কিনে এনেছেন। বাজারের থলিটা উপুড় করে হেসে ফেলেছিলেন সুরমা।
আসলে বাজার করতে সুধাময় বিশেষ পছন্দ করেন না। কলেজে পড়াতেন। ছাত্র পড়ানো, বই পড়া আর মাঝে-মধ্যে ভালো নাটক হলে দেখতে যাওয়া। এর মধ্যেই তাঁর ঘোরাফেরা। বাজারও বেশিরভাগ সময় সুরমাই করেন। কারণ সুধাময় বাজার করলে তাঁর পছন্দ হয় না। সুধাময় তো কোনও রান্নার কথা মাথায় রেখে বাজার করতে পারেন না। যা সামনে দেখলেন চারটি চারটি কিনে নিয়ে ব্যাগে ভরে বাড়ি চলে এলেন।
কিন্তু আজ উপায় ছিল না। অর্ণব কাল এসেছে। আজ সকালে জলখাবারে লুচি ভাজবেন সুরমা। তাঁর বাজার যাওয়ার প্রশ্নই নেই। তাই বিনা আপত্তিতে শুধু বাজার করে আনেননি সুধাময়, ছেলের পছন্দের কথা মাথায় রেখে গুছিয়ে কিনেছেন। সুরমার হাসি যে সে কারণেই সেটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি।
আসলে অর্ণব একমাত্র সন্তান হলেও মুখোমুখি কোনও আদিখ্যেতা দেখানোর অভ্যাস তাঁদের স্বামী-স্ত্রী দু'জনেরই কোনওদিন নেই। কিন্তু ছেলে তো তাঁদের প্রাণের থেকেও প্রিয়। তাই তার সামান্য ভালোলাগা, সুধাময়বাবুর মতো আত্মভোলা মানুষেরও মনে থাকে।
সুরমা তিনজনের লুচি-আলুরদম খাওয়ার টেবিলে দিয়ে গেছেন। নিজেদের একপ্রস্থ চা আগেই খাওয়া হয়ে গেছে। ছেলের সঙ্গে আর একবার খাওয়া হবে বলে কাপ-ডিশ সাজাচ্ছেন। অর্ণবও এসে বসেছে।
সুধাময়বাবু কাগজটা মুড়ে রেখে বললেন, কী অদ্ভুত ব্যাপার। এখন আবার জানা যাচ্ছে, ছেলেটির নাকি আগের দিন ঠাকুমা মারা গেছিল...ঠাকুমা মারা গেছে আার নাতি বাড়ির নীচে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মদ খেয়ে নাচানাচি করছে! কী রকম পরিবেশে মানুষ হয় এরা যে এরকম মানসিকতা?
চা নিয়ে এসে বসেছেন সুরমা। কাপে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, পরিবেশ তো খারাপ কিছু নয়। মা-বাবা দু'জনেই তো দেখলাম উচ্চশিক্ষিত। বাবার ব্যবসা আছে। মা চাকরি করে।
শিক্ষা মানে শুধু কলেজ-ইউনিভার্সিটির সার্টিফিকেট নয় সুরমা। সেটা হয় তো এঁদের আছে। কিন্তু আসল শিক্ষা বলতে যা বোঝায় তা নেই। থাকলে ছেলে কখনও এরকম হতে পারে না।
তা কেন বলছ? হয়তো মা-বাবা চেষ্টা করেছে। বেয়াড়া ছেলেপুলেও তো কত আছে...
আমার মনে হয় না। মানুষ কীরকম হবে, সেটা অনেকটাই তার বাড়ি, তার পরিবেশ এসবের ওপর নির্ভর করে। সুস্থ পরিবেশ, সুস্থ মূল্যবোধ, সুস্থ জীবন তৈরি করে বুঝলে?
কিন্তু, তাহলে যারা অনাথ, যাদের সে রকম কোনও পরিবেশে বড় হয়ে ওঠার সুযোগ হয়নি, তাদের মধ্যে সুস্থ মূল্যবোধ থাকে না?
অর্ণবের আচমকা প্রশ্নটায় একটু অবাক হলেন সুধাময় এবং সুরমা দু'জনেই। শুধু আচমকা নয় ছেলের কথাগুলোর মধ্যে যেন একটা তীব্রতা আছে। একটা চাপা চ্যালেঞ্জ।
একটা লুচির টুকরো আলুরদম দিয়ে মুখে পুরে দু-এক মুহূর্ত ভাবলেন সুধাময়। তারপর শান্তভাবেই বললেন, না তা নয়। যে অনাথ তার ক্ষেত্রে এই একই মানদণ্ডে বিচার করলে চলবে না। কারণ সে তো স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগটাই পাচ্ছে না। তার ক্ষেত্রে দেখতে হবে সে কী বেছে নিচ্ছে। মানে, যদি ভালো এবং মন্দ দুরকম অপশন থাকে তাহলে সে কোনটা বেছে নিচ্ছে।
যদি মনে করো কেউ আত্মনির্ভরশীল, সুস্থ জীবনই বেছে নেয়?
অর্ণবের প্রশ্ন শুনে ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়লেন সুধাময়, খুবই কঠিন। সৎভাবে বাঁচার পথ সমবসময়ই কঠিন হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও যদি কেউ সেপথেই হাঁটে তাহলে বুঝতে হবে খাঁটি সোনা।
বাপ-ছেলের এই কথোপকথনের মাঝে সুরমা এতক্ষণ খুব মন দিয়ে ছেলের মুখের ভাব লক্ষ্য করছিলেন। এবার একটু হেসে বললেন, মেয়েটা কে? সে কি অনাথ? তোর পছন্দ হলে আমার কিন্তু কোনও আপত্তি নেই।
মেয়ে? মেয়ে আবার কোথা থেকে এল?
সুধাময়বাবু রীতিমতো অবাক। সুরমা এবার তাঁকে এক দাবড়ানি দিলেন, তুমি থামো তো। হ্যাঁ রে বাবাই, বল না কী ব্যাপার? পাশ করেছিস। ভালো চাকরি করছিস। এবার তো একটা কিছু ভাবতে হয়। তোর মত নেই বলে সম্বন্ধ করিনি। তা তোকে নিজেকেও তো কিছু করতে হবে।
স্ত্রীর দাবড়ানিতে থিতিয়ে গিয়ে এতক্ষণ হাঁ করে শুনছিলেন সুধাময়বাবু। এবার হঠাৎ অতি উতাহী হয়ে ওঠেন, হ্যাঁ, সে তো করতেই হবে। করতে হবে বৈকি। সব কিছুরই তো একটা বয়স আছে। সে বয়স তো প্রায় পেরোতে চলল...।
আর শোন, অনাথ হলেও তো এবাড়িতে এলেই মা-বাবা সব পেয়ে যাবে। তাই ও নিয়ে ভাবিস না। এখন বল দেখি মেয়েটা কে? তোদের হাসপাতালের মানে ওখানকার কেউ?
সুমিতার কথাটা বলার জন্য এর থেকে সুবর্ণ সুযোগ আর হয় না। তাই অর্ণব বলতেই যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ফোনটা বাজল। বাপ্পাদা ফোন করছে।
বাবাই একবার আসতে পারবি?
কোথায়?
হাসপাতালে আয়। সোজা আমার রুমে চলে আসবি। তমালও আসছে। ওকে বলে রেখেছি। বেশি দেরি করিস না। চেষ্টা কর এগারোটার মধ্যে পৌঁছে যেতে।
রাতে খাবার সময় কথা হবে।
কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে, মা-বাবাকে খানিকটা হতভম্ব করেই উঠে পড়ল অর্ণব।
অফিস টাইমে ঢাকুরিয়া থেকে শিয়ালদহ যাওয়া বেশ ঝামেলার। তবে একটা উবের পেয়ে যাওয়ায় মোটামুটি সময়মতোই পৌঁছে গেল অর্ণব। বাপ্পাদার ঘরটা ফিমেল ওয়ার্ডের পিছন দিকে। ঘর অবশ্য বলাটা একটু বাড়াবাড়ি। প্লাইউডের হাফ পার্টিশন দেওয়া একটা জায়গা।
অর্ণব ঢুকতেই বলল, বোস, চা দিতে বলছি। তমালও এসে গেছে। এখনই ফোন করেছিল। সইটা করে আসছে।
চা এল। বাপ্পাদের ড্রয়ারে জিঞ্জার বিস্কিট ছিল। সেটাও বার করা হল। ততক্ষণে তমাল এসে গেছে।
মাঝারি হাইটের ফর্সা মতো ছেলে। মুখে একটা ভালোমানুষির ছাপ আছে। তেল দেওয়া চুল পেতে আঁচড়ানো। বয়স পঁচিশের নীচেই হবে মনে হয়।
স্যার, আপনারা চা খেয়ে নিয়ে আমার সঙ্গে চলুন। বেশি দেরি না করাই ভালো। আমি যদিও সেকশন ইনচার্জকে বলে রেখেছি, ডাঃ দে-র কিছু ইনফরমেশন দরকার। তবে লোকজনের কৌতূহল তো অতিরিক্ত বেশি, তাই...।
রেকর্ডরুমটা দোতলায়। লম্বাটে একটা বিশাল ঘর। তার দেওয়ালে সার সার ছাদ ছোঁয়া তাকে অজস্র ফাইল রাখা। গোটা ঘরে ধুলোর একটা চাপা-ভ্যাপসা গন্ধ। রেকর্ড রুমের গা লাগোয়াই পার্সোনাল সেকশন। তমাল আগেই ওদের জানিয়েছিল যে, ১৯৯০ সালের রেকর্ড এখনও ডিজিটাইজড হয়নি। তাই ফাইল ঘেঁটেই বের করতে হবে। যদিও বছরের হিসেবেই ফাইল সাজানো রয়েছে, কিন্তু তার থেকে কিছু খুঁজে বার করা অতীব কঠিন।
ভাগ্য ভালো, তমালের সঙ্গে বাপ্পাদাকে দেখে সেকশন ইনচার্জ অনিল বেরা দয়াপরবশ হয়ে এগিয়ে এসে বললেন, কী খুঁজছেন বলুন তো ডাক্তারবাবু! আমিও একবার চেষ্টা করে দেখি।
আসলে দরকারটা ওর। ও হচ্ছে ডাঃ অর্ণব সেন। আমার ছোট ভাইয়ের মতো।
বাপ্পা এবার অর্ণবের দিকে তাকাতে অর্ণব বলল, ১৯৯০ সালের ২৫ জুলাই লক্ষ্মী গুপ্ত নামে এক মহিলার এই নীলরতন সরকার হাসপাতালে বাচ্চা হয়েছিল। বাচ্চা হওয়ার পর মহিলা মারা যান। আমি ওই মহিলা সম্বন্ধে কিছু ইনফরমেশন জানতে চাইছি। মানে মহিলাকে কে ভর্তি করালেন, তাঁদের কোনও ঠিকানা বা কিছু যদি থাকে। সম্ভবত মহিলার দেহ নিতে কেউ আসেনি। বাচ্চাটাও তাই হাসপাতালেই ছিল। শেষ পর্যন্ত একজন আয়া তাকে বাড়ি নিয়ে যায়।
অর্ণবের কথা শুনতে শুনতে ভুরু কুঁচকে যাচ্ছিল অনিল বেরার। কথা শেষ হতে জিজ্ঞাসা করলেন, বাচ্চাটি কি ছেলে না মেয়ে?
মেয়ে।
ছাদ ছোঁয়া ওই ফাইলের স্তূপ থেকে আদৌ কিছু বের করা যাবে বলে আশা করেনি অর্ণব। কিন্তু অনিল বেরা সত্যিই কাজের লোক। আধঘণ্টার চেষ্টাতেই ১৯৯০ সালের জুলাই মাসের ফাইল বেরিয়ে এল।
ফাইলটা নিয়ে নিজের টেবিলে এলেন অনিলবাবু। উল্টোদিকের চেয়ারে অর্ণব আর কুণাল বসে আছে। ফাইল খুলে ২৫ জুলাইয়ের পাতা বার করলেন।
গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে একসময় একটু বিস্মিত গলায় বললেন, না মশাই, ২৫ জুলাই তো লক্ষ্মী গুপ্ত নামে কোনও ডেলিভারি কেস দেখছি না। সেদিন বাচ্চা হয়েছে চারটে। তিনটে ছেলে, একটা মেয়ে। এই দেখুন পার্বতী সাহা, হাজবেন্ড রামতারণ সাহা, বেবি ফিমেল। মলিনা মণ্ডল আর অর্জুন মণ্ডলের ছেলে হয়েছে। রৌশেনারা বেগম, হাজবেন্ড নৌশাদ আলমেরও মেল বেবি। চায়না হাজরা, হাজবেন্ড সুনীল হাজরা এদেরও ছেলে হয়েছে। এই চারটে ডেলিভারি কেস। লক্ষ্মী গুপ্ত বলে তো কোনও নাম নেই। কোনও ডেথ কেসও নেই। মানে ডেলিভারি হতে গিয়ে কেউ মারাও যায়নি। আপনি ডেটটা ঠিক বলছেন তো?
অর্ণব একটু থতমত খেয়ে গেল প্রথমটায়। আসলে সে ব্যাপারটা এত নিশ্চিত ধরে নিয়েছিল যে খুবই অবাক হয়েছে। তারপরেই সামলে নিয়ে বলল, ডেট একটু এদিক-ওদিক হতেই পারে। অনেকদিনের ব্যাপার তো। তাছাড়া খুব লেখাপড়া জানা লোকজনও নয় বুঝতেই পারছেন। আগে-পরে দু-একদিন একটু দেখুন তো।
অনিল বেরা চশমার ওপর দিয়ে কড়া চোখে একবার অর্ণবের দিকে তাকালেন।
বাপ্পা ততক্ষণে আরও এক কাপ করে চা আর ক্যান্টিনের ফিশ-ফ্রাইয়ের অর্ডার দিয়ে দিয়েছে।
সামান্য নরম হয়ে আবার ফাইলটা খুলে বসলেন অনিলবাবু। কিন্তু আগে-পরে দু-একদিন তো নয়ই, গোটা জুলাই মাসেই লক্ষ্মী গুপ্ত নামে কোনও মহিলার ডেলিভারি কেস কিংবা কোনও অ্যাবানডান বেবি পাওয়া গেল না।
অর্ণব রীতিমতো অপ্রস্তুত। মনের মধ্যে সন্দেহের একটা লুকোনো কাঁটাও খোঁচা দিচ্ছে ক্রমশ। সুমিতা কি তাহলে পুরোটা সত্যি কথা বলেনি? কিন্তু তাই বা হবে কেন? তাতে তো লাভ কিছু নেই। অর্ণব তো স্পষ্টই বলে দিয়েছে যে সে অতীত নিয়ে মাথা ঘামায় না। তাছাড়া সন্তান কীভাবে জন্মগ্রহণ করবে তাতে তো আর সন্তানের কোনও ভূমিকা থাকে না। কোথাও নিশ্চিত কিছু একটা গন্ডগোল হচ্ছে...।
সুমিতার মাসি কি সুমিতাকে সত্যি কথা বলেননি? সেটা হতেই পারে। হয়তো সুমিতা তাঁরই কোনও নিষিদ্ধ সম্পর্কের ফল। অল্পবয়সে বিধবা হয়েছিলেন। এরকমটা হতেই পারে। যাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তিনি নিশ্চিত বড়লোক। পিতৃত্ব স্বীকার না করলেও বাচ্চাকে মানুষ করার খরচ দিয়েছেন। মহিলা লজ্জায় তাকে বাবার পরিচয় দিতে পারেননি। নাকি সুমিতা সবটাই জানে? ভিতরে কি আরও বড় কোনও কলঙ্কের ইতিহাস আছে? জেনেবুঝেই তাই সত্যিটা গোপন করছে?
কী রে কী ভাবছিস চুপ করে?
বাপ্পাদার ডাকে সম্বিত ফিরতে অর্ণব আচমকা যে কথাটা বলল, এক মুহূর্ত আগেও কিন্তু সে নিজেও সেটা আদপে ভাবেনি।
আচ্ছা, ওই বাচ্চাটিকে মানে পরিত্যক্ত বাচ্চাটাকে এখানকার এক আয়াই নাকি নিয়ে গেছিলেন মানুষ করার জন্য। সেজন্য হাসপাতালের অনুমতিও নিয়েছিলেন নিশ্চিত...
তিনি কি এখানে চাকরি করতেন?
অনিল বেরার প্রশ্নের উত্তরে একটু ইতস্তত করে অর্ণব বলল, সেরকমই তো জানি। তবে উনি কিছুদিন পরে চাকরি ছেড়ে দেন।
পুরো ব্যাপারটা নিয়ে অনিল বেরা সম্ভবত বেশ খানিকটা কৌতূহলী হয়ে পড়েছিলেন। তাছাড়া গরম ফিশ ফ্রাইও এসে গেছে। তাই নিজে থেকেই বললেন, আমাদের এই পাশের ঘরটাই হচ্ছে পার্সোনাল সেকশন। ওদের কাছে হাসপাতালের স্টাফদের ডিটেলস থাকে। দাঁড়ান একবার খোঁজ নিয়ে দেখছি। নাইন্টিজ-এ চাকরি করতেন তো। নামটা বলুন।
পার্সোনাল সেকশনের খাতা হাঁটকিয়েও কিন্তু ডরোথি মণ্ডল নামে কোনও আয়ার সন্ধান পাওয়া গেল না।
সেকশনের এখন যিনি বড়বাবু, তিনি চাকরিতে ঢুকেছিলেন পঁচাশি সালে। সামনের বছর রিটায়ার করবেন। বেশ জোর দিয়েই বললেন ডরোথি মণ্ডল নামে কোনও আয়া এখানে কাজ করেনি। করলে নাম শুনলেই বুঝতে পারতেন।
হাসপাতাল থেকে বেরোনোর সময় এতটাই ডিপ্রেসড দেখাচ্ছিল অর্ণবকে যে বাপ্পাদা আর কিছু জিজ্ঞাসা করেনি।
ছেলের মন ভালো নেই বুঝে মা-বাবাও খাওয়ার টেবিলে আর কিছু জানতে চাইল না। দু'দিন ভালো করে কথা হয়নি। রাতে শোয়ার আগে সুমিতার সঙ্গে গল্প করবে ঠিক করেছিল অর্ণব। কিন্তু ইচ্ছে করল না মোটেই। মাথা ধরেছে বলে এড়িয়ে গেল। সুমিতা শুধু অবাক নয় একটু আহত হয়েছে বুঝেও কথা না বাড়িয়ে ফোন অফকরে শুয়ে পড়ল। যদিও ঘুম এল না একটুও। মনের ভিতরটা ভীষণ অস্থির লাগছে। সুমিতাকে মিথ্যেবাদী ভাবতে ইচ্ছে করছে না একটুও। অথচ যুক্তি তাকে বারবার সেদিকেই ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।
ভোরবেলায় বাস। রাতে ঘুম হয়নি। অ্যালার্মের শব্দে উঠে চোখে জল দিতেই জ্বালা করে উঠল। রান্নাঘরে মায়ের শব্দ পেয়েছিল আগেই। চা তৈরি। বাসে খাওয়ার জন্য টিফিনও বানানো হয়ে গেছে। বাবা উঠে পড়েছে। তিনজনেই চা খেল একসঙ্গে। টুকটাক কথা। ব্যাগ নিয়ে বেরোচ্ছে। সুধাময়ও চটিটা পায়ে দিয়ে নেমে এলেন রাস্তায়।
কী হল, কোথায় যাবে?
চল, তোকে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে আসি।
অবাক হল অর্ণব। এরকমটা কখনও হয় না। মা তাও গেট পর্যন্ত আসে। দাঁড়িয়ে থাকে সে মোড়ের মাথায় বাঁক নেওয়া পর্যন্ত। বাবা বারান্দা থেকেই হাত নেড়ে ঘরে ঢুকে যায়। চুপচাপ হাঁটছিল দু'জনে। বড়রাস্তায় পড়ে একটু এগোতেই একটা স্ট্যান্ড। ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে গোটা তিনেক।
এগোতে যাচ্ছিল অর্ণব। সুধাময় ডাকলেন, বাবাই, তোর মন খারাপ আমরা বুঝতে পেরেছি। কেন মন খারাপ জানি না। তুই বলিসনি। নিশ্চয় বলতে পারিসনি। বড় হলে সবকথা মা-বাবাকে বলা যায় না, আমি জানি। তবে দুটো কথা মনে হল বলা জরুরি। যদি কোথাও মন টানে, তাহলে সেখানে মনের কথাই শুনবি। যুক্তি অনেক সময় মনকে ভুল বুঝিয়ে দেয়। সেজন্য পরে কষ্ট পেতে হয়। তোকে আমরা ঠিকঠাক মানুষ করেছি। তুই যদি কোনও সিদ্ধান্ত নিস, সেটা আমাদের খারাপ লাগতে পারে না।
ধর্মতলা থেকে বাসে উঠে নিজের সিটে গুছিয়ে বসল অর্ণব। তারপর ফোন করল সুমিতাকে। ঘুম জড়ানো গলায় হ্যালো শুনেই বলল, শোনো, বাসে উঠে পড়েছি। নেমে সোজা হসপিটালে যাব। বিকেলে কিন্তু বেরোতে হবে। জরুরি কথা আছে অনেক। ডিনার করে ফিরব। এখন ঘুমিয়ে নাও আর একটু।

বড় রাস্তাতেই গাড়িটা রেখেছিল শ্রীময়ী। পানের দোকানের লোকটা যে রাস্তাটা দেখালো সেটা বেশ সরু। গাড়ি ঢোকালে ঘোরানো মুশকিল হবে। লোকটা বলেছে এই রাস্তাটা দিয়ে গিয়ে বাঁদিকে ঘুরলেই এলআইজি বেঙ্গল আবাসন।
বাগুইআটির এই দিকটায় কখনও আসেনি শ্রীময়ী। তার শ্বশুরবাড়ির তরফে এক আত্মীয় থাকেন বাগুইআটিতে। তার মেয়ের বিয়েতে একবার এসেছিল। কিন্তু সেটা এদিকে নয়। বাসস্ট্যান্ডের কাছে।
সে অবশ্য অনেকদিন আগের কথা। এখন এই জায়গাগুলো অনেক বদলে গেছে। তাও এই পাড়াটায় যে একেবারেই মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্তের বাস সেটা বোঝা যায় বেশ। আশপাশে এখনও অনেক পুরোনো বাড়ি। মাঝে মাঝে ইতিউতি মাথা তুলেছে ফ্ল্যাট। ছোট দোকান, মজা পুকুর। নাইটির ওপর গামছা জড়িয়ে রাস্তার কলে জল ভরছে মেয়েরা।
তাদের পাশ কাটিয়ে এগোতে এগোতে শ্রীময়ী ভাবছিল ঠিকানা তো একটা পাওয়া গেছে। কিন্তু মানুষটাকে কি পাওয়া যাবে?
কৃষ্ণজ্যাঠার কাছে ডরোথি মণ্ডলের ঠিকানা চেয়েছিল শ্রীময়ী। কিন্তু অফিসের খাতায় দেখা গেল পার্ক সার্কাসের সেই ঠিকানাই লেখা আছে। সেটাই খুব স্বাভাবিক। কারণ সুবল মণ্ডল মারা যাওয়ার পর সে যখন চাকরি করতে এল তখন তো সে পার্ক সার্কাসেই থাকে। কিন্তু চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর তার ঠিকানা তো আর অফিসের পার্সোনাল সেকশনে থাকবে না।
যে ব্যাঙ্কে ডরোথির অ্যাকাউন্ট সেখান থেকে ঠিকানা পাওয়ার চেষ্টা করবে নাকি ভবানীপুরে সুবল মণ্ডলের বাড়ির খোঁজ করবে ভাবছিল শ্রীময়ী। ভবানীপুরটা খুব ফিজিবল বলে মনে হচ্ছিল না। ছেলে মরে গেছে প্রায় তিরিশ বছর। বউয়ের খোঁজ কি আর বাড়ির লোকেরা রাখবে? বিশেষ করে, সে যদি আবার বিয়ে করে থাকে। হানিফাবিবির তো ধারণা ডরোথি আবার বিয়ে করছিল। শ্রীময়ীর যদিও সন্দেহ আছে। কিন্তু এতসবের মধ্যে ঠিকানা সমস্যার সমাধান হচ্ছিল না।
এরমধ্যে হঠাৎ একদিন কৃষ্ণজ্যাঠা এসে বললেন, শ্রীময়ী তুমি ডরোথি মণ্ডলের ঠিকানা খোঁজ করছিলে না, একটা ঠিকানা পাওয়া গেছে। আমার মনে হয় এটাই রিসেন্ট অ্যাড্রেস।
নিজের আগ্রহটা যথাসম্ভব বুঝতে না দিয়ে নির্লিপ্তভাবে কাগজের টুকরোটা নিয়ে শ্রীময়ী দেখেছিল, তাতে লেখা আছে, এলআইজি বেঙ্গল আবাসন। সি ব্লক। ফ্ল্যাট নম্বর ফাইভ এ। বাগুইআটি।
এটা কোথায় পেলেন কৃষ্ণজ্যাঠা?
আরে, বোলো না। দিওয়ালির মিষ্টি যাবে তো। সেই লিস্টে চোখ বোলাতে গিয়ে দেখি নামটা রয়েছে। তখনই তাড়াতাড়ি টুকে নিলাম। আসলে ওই লিস্ট তো আমি দেখি না। অনুপমই দেখেশুনে ছেড়ে দেয়। নতুন কোনও নাম যোগ হলে কিংবা কেউ বাদ হলে ওকেই বলে দিই। এবার তো মা মারা গেছে বলে অনুপম ছুটিতে। তাই আমার ঘাড়েই পড়েছে কাজটা। ভালোই হয়েছে। সেজন্যই তো চোখে পড়ল।
কিন্তু ডরোথি মণ্ডল তো আমাদের স্টাফ নয়। তাহলে দেওয়ালির সময় ওর বাড়িতে মিষ্টি যায় কেন?
শ্রীময়ীর কথা শুনে হেসে ফেললেন কৃষ্ণপদ।
তোমার দাদুর আমল থেকেই এই মিষ্টি পাঠানোর চল। দীপাবলি উপলক্ষে সব স্টাফের বাড়িতে মিষ্টি যাবে। কিন্তু শুধু কি স্টাফ! আরও কতজনের বাড়িতে যায় তো। খাতিরে যায়, পছন্দে যায়, ভালোবাসলেও যায়। বছরে একদিন মিষ্টি দিতে আর কত খরচ! কিন্তু তাতে মানুষ খুশি হয় খুব। তোমার দাদু এটা বুঝতেন। মাও বুঝতেন। তাঁদের নির্দেশেই মিষ্টি যেত। নিশ্চয় কোনওসময় লিস্টে ডরোথি মণ্ডলের ঠিকানাটাও ঢুকে পড়েছিল। তারপর থেকে মিষ্টি যায় প্রতিবছর। দ্যাখো, ভাগ্যিস যায়। সেজন্যই তুমি আজ দরকারের সময় ঠিকানাটা পেলে।
চঞ্চল গাড়িতেই আছে। তাকে একবার সঙ্গে নিয়ে আসার কথা ভেবেছিল শ্রীময়ী। কিন্তু তারপর ভেবে দেখল সেটা ঠিক হবে না। কারণ আজকে কী পরিস্থিতি হবে সে নিজেও জানে না। ডরোথি মণ্ডলের বাড়িতে আর কে আছে জানা নেই। যে ধরনের কথাবার্তা শ্রীময়ী জানতে চাইবে, তাতে তাকে ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়। চঞ্চলের সামনে এসব ঘটলে আর দেখতে হবে না। অফিসের দেওয়ালের ধেড়ে টিকটিকি থেকে স্টোরের আরশোলা পর্যন্ত সবাই সব কিছু জেনে যাবে। তাই সে একলাই যাবে ঠিক করেছে।
রাস্তাটা আরও একটু এগিয়ে যেতেই বাঁদিকে এলআইজি আবাসন দেখা গেল। কালো রঙের মস্ত গেটটা খোলা আছে ঠিকই, কিন্তু গেটের পাশে একজন দারোয়ান বসে ঢুলছে। শ্রীময়ীর পায়ের শব্দে সে একটু বিরক্তভাবে চোখ মেলে তাকাল।
সি ব্লকে যাব। ফ্ল্যাট নম্বর ফাইভ। ডরোথি মণ্ডলের কাছে।
লোকটা সম্ভবত একটু অবাকই হল। হয়তো শ্রীময়ীর পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে। কিংবা এইরকম ভর দুপুরে সচরাচর কেউ আসে না বলে। তবে কোনও প্রশ্ন করল না। ডানদিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওপাশে লিফট আছে চলে যান। লিফট থেকে বেরিয়ে ডান দিকের দরজা।
ফ্ল্যাটের দরজার গায়ে কলিং বেল। সেটা টিপতে একটু পরে ভিতরে পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। ম্যাজিক আই দিয়ে দেখল কেউ একজন। প্রথমে একটা তালা লাগানো গ্রিলের গেট। তারপর দরজা। দরজাটা খুললেন এক মহিলা। বয়স ষাট পেরিয়ে গেছে। মোটাসোটা, আলগা চেহারা। কাঁচাপাকা চুল খোলা আছে। একটা লাল ব্লাউজের সঙ্গে ছাপা শাড়ি মোটামুটি গুছিয়ে পরা। গায়ের রঙ বেশ কালো। দুপুরের খাবারের পর সম্ভবত পান খেয়েছেন। তাই ঠোঁটে লাল ছোপ। শ্রীময়ীকে দেখে যে খুবই আশ্চর্য হয়েছেন স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে।
কাকে চান?
আমি ডরোথি মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলাম।
আমিই ডরোথি মণ্ডল। বলুন?
এভাবে তো হবে না। একটু বসে কথা বলতে হবে।
মহিলার মুখে এবার সন্দেহের ছাপ পড়ল, আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না...
আমি শ্রীময়ী দাশগুপ্ত। অপরাজিতা দাশগুপ্তের মেয়ে।
কথাটা শোনামাত্র ডরোথি মণ্ডলের মুখটা এক নিমেষে উজ্জ্বল হয়ে উঠেই, পরমুহূর্তেই ছাই হয়ে গেল। অস্ফুট গলায় বললেন, তুমি...তুমি রাই!
মাথা নাড়ল শ্রীময়ী। ডরোথি তাড়াতাড়ি চাবি এনে গেট খুলে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসালেন শ্রীময়ীকে।
ছোট্ট দু-কামরার ফ্ল্যাট। এলআইজি আবাসন যেমন হয়। ঢুকেই অল্প এক টুকরো বসার জায়গা। বেতের সস্তা সোফাসেট পাতা আছে। তার পাশে খাবার টেবিল। দুদিকে দুটো শোবার ঘর। একপাশে রান্নাঘর।
একটা ছোট ট্রেতে কাচের গ্লাস বসিয়ে জল নিয়ে এলেন ডরোথি। অনেক দিন আগের শিক্ষা। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে ভোলেননি এখনও। ভবানীপুরে দিদিমার বাড়ির নিয়ম, কেউ এলে তাকে আগে এক গ্লাস জল দিতে হবে। আর জলের গ্লাস কখনও হাতে করে নিয়ে যাওয়া চলবে না। স্টিলের গ্লাসে জল দেওয়া যাবে না। কাচের গ্লাস ট্রেতে বসিয়ে নিয়ে যেতে হবে অতিথির কাছে। দেখা যাচ্ছে ডরোথি নিজের বাড়িতেও এই নিয়মটা চালু রেখেছেন।
জলটা দরকার ছিল। একচুমুকে খানিকটা খেয়ে গ্লাসটা নামিয়ে রাখল শ্রীময়ী। তারপর সোফায় আর একটু রিল্যাক্স করে বসল। ডরোথি বসলেন উল্টোদিকের সোফায়। মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। সেটা বাড়ানোর জন্য ইচ্ছে করেই একটু সময় নিয়ে শ্রীময়ী বলল, আমার মাকে তো আপনি চিনতেন?
ঘাড় নাড়লেন ডরোথি।
কতদিন চিনতেন?
অনেকদিন। আমি যখন অপাদিদিদের বাড়িতে কাজে লাগলাম তখন তো আমার বারো-তেরো বছর বয়স। অপাদিদি তখন সতেরো। সেই বছরই কলেজে গেল তো। কী সুন্দর দেখতে ছিল!
আপনি ওবাড়ি থেকে চলে আসার পরও আপনার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল?
হ্যাঁ, সে তো ছিলই। মামি আমার ওপর খুব রেগে ছিল। কিন্তু মামাকে বলে অপাদিদিই আমার বরের চাকরি জোগাড় করে দিল। তারপর সে যখন মরে গেল তখনও তো অপাদিদিই আমাকে দেখেছে। না থাকলে কোথায় ভেসে যেতাম...
মা তো আপনাকে লেদার গুডসের চাকরিতে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। আপনি হঠাৎ সেই চাকরিটা ছেড়ে দিলেন কেন?
শ্রীময়ীর প্রশ্নটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না ডরোথি। থতমত খেয়ে গিয়ে বললেন, না মানে, আসলে অপাদিদি বলল...আমার শরীরটা আসলে তখন ভালো যাচ্ছিল না তো, তাই ভাবলাম আর কাজ করব না।
চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরেও তো আপনার সঙ্গে মায়ের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তাই না?
ডরোথিকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে তিনি বেশ খানিকটা নার্ভাস হয়ে গেছেন, তবে সেটাকে সামলে নেওয়ারও চেষ্টা করছেন।
যোগাযোগ ছিল। অপাদিদি ফোন করত মাঝে মাঝে। খোঁজখবর নিত।
আপনার খোঁজখবর নিত?
কথাটা বলে সামনের তাকটার দিকে তাকাল শ্রীময়ী। বসার ঘরের তাকে টুকিটাকি জিনিস সাজানো আছে। সবই মামুলি জিনিস। দুটো মাটির পুতুল। একটা কাঠের ফুলদানিতে প্লাস্টিকের ফুল। ঝিনুকের কলমদান। তারই পাশে দুটো ছবি। খোলা বইয়ের মতো যে ফ্রেম হয়, সেরকমই একটা ফ্রেমে বাঁধানো। একটাতে ডরোথি মণ্ডলের সঙ্গে একটি মেয়ে।
অন্যটিতে সেই মেয়েটির ক্লোজ আপ। জোড়া ভুরু। একটু টানা চোখ। চোখের কোণটা সামান্য ওঠা। তারজন্য মুখটায় একটা অন্যরকম আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। কচি পেয়ারার মতো নিটোল চিবুক। ঠিক এরকমই চিবুক ছিল অপরাজিতার। মায়ের বিয়ের ছবিতে চন্দনআঁকা চিবুকটি দেখে ছোটবেলায় মুগ্ধ হয়ে যেত শ্রীময়ী। সে নিজে পিতৃমুখী কন্যা। বাবার সঙ্গেই মিল বেশি। শুধু তারও চিবুকটি পুরোপুরি মায়ের মতো।
শ্রীময়ীর দৃষ্টি অনুসরণ করে ডরোথি নিজেও একবার ছবিটির দিকে তাকালেন। তারপর একটু ইতস্তত করে বললেন, আমারই খোঁজখবর নিত। আর কার নেবে?
মা মারা গেছে, আপনি খবর পেয়েছিলেন?
হ্যাঁ, কাগজে দেখলাম...
গলা কেঁপে গেল ডরোথির।
খবর পেয়েও যাননি তো! মায়ের কাজের দিন আপনাকে দেখেছি বলে তো মনে হচ্ছে না।
মাথা নাড়লেন ডরোথি। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এসেছে। সামলাতে একটু সময় দিল শ্রীময়ী। তারপর অমোঘ বাণের মতো প্রশ্নটি করল, গুড়িয়া আপনার কে হয়?
ভীষণরকম চমকে উঠলেন ডরোথি। কোনওরকমে সামলে নিয়ে বললেন, আমার বোনঝি। আমার কাছেই মানুষ।
আপনার কোনও ভাই-বোন নেই। আমি জানি। আপনি একমাত্র সন্তান। আপনার মা-বাবা দু'জনেই মারা গেছে। বাসন্তীর বাড়ি আপনি আপনার খুড়তুতো ভাইকে বিক্রি করে দিয়ে চলে এসেছেন।
ডরোথি মণ্ডলের মুখ ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেছে। গলা দিয়ে প্রায় আওয়াজ বেরোচ্ছে না। কোনওরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, তুমি আমাকে এভাবে জেরা করছ কেন রাই? তুমি অপাদিদির মেয়ে। আমার কত আদরের! তুমি আজ আমার বাড়িতে এসেছ বলে আমার যে কত আনন্দ হচ্ছে...।
আমি জানি আপনার আনন্দ হচ্ছে। আমি জানি আপনি মাকে ভালোবাসতেন। মাও আপনাকে ভালোবাসত, বিশ্বাস করত। সেজন্যই হয়তো আপনাকেই বেছে নিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাস করুন, গুড়িয়া কে জানা আমার খুব দরকার! আমার জানা দরকার মা কেন তার জন্য অতগুলো টাকা ফিক্সড করে রেখেছেন? টাকার ওপর আমার কোনও লোভ নেই। মা আমাকে যা দিয়ে গেছেন, তারপরে আমার আর কিচ্ছু চাই না। কিন্তু আমি সত্যিটা জানতে চাই। আমার নিজের জন্য জানতে চাই। আমি কথা দিচ্ছি কখনও কাউকে বলব না। গুড়িয়াও কোনওদিন জানতে পারবে না। শুধু আমি আর আপনি জানব। প্লিজ আপনি বলুন আমাকে!
আমি তো নিজেও জানি না রাই। সবটা জানি না...
যতটা জানেন বলুন আমাকে!
ডরোথি আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে নিলেন। তারপর উঠে গিয়ে একটা প্লেটে দুটো মিষ্টি এনে রাখলেন শ্রীময়ীর সামনে।
প্রথমদিন মাসির ঘরে এসেছ। একটু মিষ্টি অন্তত মুখে দাও।
শ্রীময়ী চামচ দিয়ে মিষ্টির একটা টুকরো কেটে মুখে পুরল।
ডরোথি চেয়ারে বসে, প্রথমে একটু সময় চুপ করে নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর বললেন, আমি তখন তোমাদের লেদার গুডসে চাকরি করি। আমার বর মারা যাওয়ার পর অপাদিদি আমাকে কাজে ঢুকিয়ে নিয়েছিল। তবে বর চাকরি করত কারখানায়। আর আমি অপিসে। অপাদিদির দেখাশোনা করাই ছিল কাজ। যখন যা লাগবে হাতে হাতে গুছিয়ে দেওয়া। ঘর-দোর, টেবিল সব মুছে পরিষ্কার রাখা। চা-কফি দেওয়া। এইসব। অন্যকাজও কিছু কিছু করতে হত। টেবিলে ফাইল দিয়ে আসা, নিয়ে আসা এইসব। খারাপ লাগত না আমার। মাইনে যা পেতাম চলে যেত।
তোমার বাবা তখন বিদেশে। অপাদিদি একাই দুটো অফিস সামলাচ্ছে। হঠাৎ শুনলাম অপাদিদি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কী একটা রোগ হয়েছে, যাতে আলাদা থাকতে হবে। দিদি অফিসে আসছিল না। বাড়িতেও ছিল না। অন্য কোথায় বাগানবাড়িতে তোমাকে নিয়ে আছে। অফিসের কাগজপত্র সব সেখানে নিয়ে গিয়ে সই করিয়ে আনা হচ্ছে। আমি তো চিন্তায় অস্থির। এরমধ্যে একদিন অফিসে কাজ করছি অপাদিদির ফোন এল। কেষ্টবাবু এসে বললেন, ডলি, ম্যাডাম ফোনে আছেন। তোমার সঙ্গে কথা বলবেন।
আমি গিয়ে ফোন ধরলাম।
দিদি আমাকে বলল, ডলি, তোকে আমি একটা খুব বড় দায়িত্ব দেব। একমাত্র তোকেই বিশ্বাস করে এই দায়িত্ব দিতে পারি।
আমি তো অবাক। দিদির গলাটা কেমন যেন শোনাচ্ছে। ভীষণ গম্ভীর কিন্তু কান্না কান্না মতো। ভয় পেয়ে গেলাম খুব। বললাম, দিদি তোমার কী হয়েছে? তুমি সেরে ওঠো, আমাকে যা করতে বলবে তাই করব। তুমি তো জানো আমার আর কেউ নেই। তুমিই আমার সব।
দিদি আমাকে বলল, ভয় পাস না। আমি ঠিক আছি। ঠিক সময়মতো তোকে খবর দেব।
কথা থামিয়ে ডরোথি উঠে গিয়ে একটু জল খেলেন। নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ করে অপেক্ষা করছে শ্রীময়ী।
ফিরে এসে নিজের চেয়ারে বসে আবার বলতে শুরু করলেন ডরোথি।
শ্রাবণ মাস ছিল। সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছিল খুব। অফিস থেকে বাড়ি চলে এসেছিলাম। ঘরে এসে চা-খাবার খেয়ে একটু শুয়েছি, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। খুলে দেখি দিদি। কেমন একটা ফ্যাকাসে, ক্লান্ত চেহারা। আমাকে বলল, তৈরি হয়ে নে। এক্ষুনি আমার সঙ্গে বেরোতে হবে। তাড়াতাড়ি কাপড় পরে তৈরি হয়ে, বাইরে এসে দেখি ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে।
ট্যাক্সি করে গেলাম সল্টলেক। তখন অবশ্য জানতাম না জায়গাটাকে সল্টলেক বলে। পরে জেনেছি। একটা ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল দিদি। এরকমই ছোট ফ্ল্যাট। সাজানো-গোছানো। একজন নার্সের মতো জামা-কাপড় পরা মহিলা দরজা খুলল। বয়স্ক।
দিদি আমাকে বলল, ডলি এখন থেকে তুই এখানেই থাকবি।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন?
দিদি বলল, আয় ভিতরে আয়।
আমি ভিতরের ঘরে ঢুকে দেখি খাটের ওপর একটা একদম কচি বাচ্চা শুয়ে আছে। ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে অপাদিদি বলল, ডলি এই বাচ্চাটাকে তোকে মানুষ করতে হবে। আজ থেকে এর দায়িত্ব তোর। টাকা-পয়সার জন্য ভাবিস না। সেজন্য আমি আছি। কিন্তু বাকি সব তোকে দেখতে হবে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, বাচ্চাটা কার দিদি?
দিদি আমার দিকে কেমন যেন অদ্ভুতভাবে তাকাল। তারপর বলল, কোনওদিন জানতে চাস না কার বাচ্চা। আমি যে নিয়ে এসেছি সেকথাও কাউকে বলবি না।
কিন্তু দিদি আমি তো বিধবা। আমার নিজের বাচ্চা বলব কী করে?
আমি জানি ডলি। নিজের বাচ্চা বলার দরকার নেই। বলবি তুই মানুষ করেছিস। আজ থেকে তোকে আর লেদার গুডসে কাজ করতে হবে না। সবাইকে বলবি তুই হাসপাতালে আয়ার কাজ করতিস। সেখানে বাচ্চা হতে গিয়ে মা মরে গেছে। বাবা ফেলে পালিয়েছে। তাই তুই নিয়ে এসে মানুষ করছিস।
কিন্তু পুরোনো মানুষজন, তারা যদি...
পুরোনো মানুষজনের সঙ্গে আর দেখা হবে না তোর। আজ থেকে এই গুড়িয়াকে নিয়ে তুই নতুন জীবন শুরু কর। আর কোনওদিন আমার অফিসে যাবি না, বাড়িতে যাবি না। আমার সঙ্গে দেখা করবি না। আমি নিজে যোগাযোগ রাখব। এই বাড়িটা আমি ভাড়া নিয়েছি। একলা বাচ্চা নিয়ে তোর অসুবিধা হবে বলে ওই নার্স তোর সঙ্গে এখন থাকবে। কিন্তু ওর সঙ্গেও কিচ্ছু আলোচনা করবি না। একলা মানুষ তুই। একটা কচি বাচ্চাকে মানুষ করতে পারবি না?
অপাদিদির মুখ শক্ত। কিন্তু চোখ ছলছল করছে। আমি দিদির হাত ধরে বললাম, নিশ্চয় পারব দিদি। তুমি দেখো আমি ঠিক পারব।
সেদিন সন্ধেবেলা দিদি চলে গেল। তারপর আর কোনওদিন আসেনি। ব্যাঙ্কে গুড়িয়ার নামে টাকা জমা করে দিয়েছিল। মাসে মাসে সুদ আসে। কোনও অসুবিধা নেই। মেয়ে বড় হল। ইস্কুলে ভর্তি হল। সব খবর রাখত অপাদিদি।
তারপর গুড়িয়ার যখন ছয় বছর বয়স, তখন ভাড়াবাড়ি ছেড়ে আমরা এই ফ্ল্যাটে উঠে এলাম। দিদিই ফ্ল্যাট কিনে দিল আমার নামে। তারপর তো কতদিন হয়ে গেল। মেয়ে স্কুল থেকে কলেজে গেল। তারপর আরও পড়ালেখা করল। লক্ষ্মী মেয়ে। কোনওদিন একটু ঝামেলা পোহাতে হয়নি ওকে নিয়ে। ছোটবেলাতেই জেনে গেছিল ওর মা-বাবা নেই। আমি ওকে মানুষ করেছি।
গুড়িয়া এখন কোথায়?
চাকরি পেয়েছে তো। মেয়েদের ইস্কুলে দিদিমণির চাকরি। কোয়ার্টারও পেয়েছে। সেখানেই থাকে। আমাকেও যেতে বলেছিল। কিন্তু বড্ড ফাঁকা জায়গা। আমার মন বসে না। যাই আবার চলে আসি।
বিশ্বাস করো রাই, এর থেকে বেশি আমি আর কিছু জানি না। কোনওদিন তোমার মায়ের অবাধ্য হইনি। দিদি বারণ করেছিল বলে, মারা যাওয়ার খবর পেয়েও যাইনি। বুক ফেটে গেছিল। তবু যাইনি। দিদি যা বলেছিল ঠিক তাই করেছি। আজ তোমাকে বললাম, তুমি দিদির মেয়ে বলে। তাও হয়তো বলতাম না। কিন্তু তুমি টাকার কথাটা বললে তো। তোমার হয়তো মনে হচ্ছে যে তোমার মা-কে ঠকিয়ে আমি টাকাটা নিয়েছি। কিন্তু তা তো নয়। তাই মনে হল, তোমার জানা দরকার।
ডরোথি যে আর কিছু সত্যিই জানেন না, সেটা তার মুখ দেখেই বুঝতে পারছিল শ্রীময়ী। তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল একটু আগে শোনা কথাগুলো। তারমানে বাচ্চাটা হওয়ার আগের চার-পাঁচ মাস ডরোথি মাকে দেখেনি। শুধু ডরোথি নয়, অন্যরাও কেউ দেখেনি। কারণ কোনও একটা অচেনা ছোঁয়াচে রোগের জন্য মা একটা আলাদা বাড়িতে ছিল। শুধু সে-ই সঙ্গে ছিল। স্বাভাবিক, একলা বাড়িতে তাকে রেখে যাওয়া সম্ভব নয়। ভবানীপুরের বাড়িতে রেখে যায়নি কেন সেটা যদিও বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু ছোঁয়াচে অসুখ হলে তারও তো বিপদের সম্ভাবনা ছিল!...
আচ্ছা, এই যে গুড়িয়াকে মা আপনার কাছে রেখে গেল, সেটা আর কেউ জানত বলে আপনার মনে হয়?
শ্রীময়ীর কথা শুনে চুপ করে একটুখানি কী যেন ভাবল ডরোথি। তারপর বলল, ওই যে নার্স থাকত আমার সঙ্গে, চারবছর ছিল। গুড়িয়া বড় স্কুলে যেতে শুরু করল যখন, আমিই দিদিকে বলেছিলাম আর দরকার নেই। তো একদিন গুড়িয়া যখন খুব ছোট হঠাৎ খুব শরীর খারাপ হয়ে পড়ল। তখন ওই নার্সই একজন ডাক্তারকে ফোন করে। আমার কথা শুনে কেমন যেন মনে হয়েছিল ডাক্তারবাবু বোধহয় অপাদিদির চেনা। পরে ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ও বলেছিল ওই ডাক্তারবাবুই ওকে আমাদের বাড়িতে কাজের জন্য পাঠিয়েছে।
সেই ডাক্তারের নাম মনে আছে আপনার?
তা মনে আছে। আসলে খ্রিস্টান নাম তো। তাই বোধহয় মনে রয়েছে। মাইকেল মিত্র। যদিও নার্স আমাকে বলেছিল, ডাক্তারবাবু নাকি হিন্দু ঘরেরই ছেলে। খ্রিস্টান নয় মোটেই। বাপ শখ করে ওরকম নাম রেখেছে।
বাগুইআটি থেকে ফেরার পথে ফোনে রীনামাসিকে ধরল শ্রীময়ী। দু-চারটে খেজুরে কথাবার্তার পর জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা মাসি, মায়ের কোনও ডাক্তার বন্ধুকে তুমি চেনো? মানে আমি পরের দিকের বিজনেস ওয়ার্ল্ডের বন্ধু বা চেনা-পরিচিতের কথা বলছি না। তাদের তো আমি জানি। অল্পবয়সের। কলেজের সময়কার।
হ্যাঁ, ছিল তো। মাইকেলই তো ওর খুব বন্ধু ছিল। মাইকেল মিত্র। মেডিক্যাল কলেজে পড়ত। তোর মায়ের প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খেত। কিন্তু তোর মা তো পরিতোষদার প্রেমে পড়ে গেল। মাইকেল রীতিমতো হতাশ। আমরা খুব পিছনে লাগতাম! তবে তোর মা পছন্দ করত মাইকেলকে। দু'জনে বন্ধু ছিল খুব।

বাগানের শেষদিকে বেড়ার ধার ঘেঁষে সার দিয়ে অনেকগুলো জ্যাকারান্ডা গাছ। জুন মাসের গোড়ায় সেগুলো নীলচে-বেগুনি ফুলে একেবার ভরে গেছে। এই গাছগুলো খুব প্রিয় অমিয় নন্দীর। এটা বৃষ্টির সময়। যখন তখন ঝুপঝপিয়ে নেমে পড়ে। তাই এইসময় বাগানে কোনও বসার অ্যারেঞ্জমেন্ট রাখে না প্রতিমা। কিন্তু লনের দিকের বারান্দায় বসলে গাছগুলো দেখা যায়। বৃষ্টিতে ভিজলে আরও যেন ঝলমল করে।
আসলে নীল রঙটা অমিয়র খুব পছন্দ। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক এদেশে এক অপরাজিতা ছাড়া নীল রঙের ফুল তেমন চোখে পড়ে না। রামায়ণে অবশ্য নীলপদ্মের একটা গল্প আছে। কিন্তু বাস্তবে সে ফুলের কোনও অস্তিত্ব আছে কিনা অমিয়র জানা নেই। ফুল নিয়ে খুব বেশি মাথাও যে তিনি ঘামান তাও নয়। তবে বিদেশে বিশেষ করে ইউরোপে গিয়ে লক্ষ করেছেন সেখানে নীল কিংবা বেগুনি ফুলের ছড়াছড়ি। ওদের সামারে মাঠ-ঘাট সব ব্লু বেল-এ ঢেকে যায়। আসমানি নীল রঙের একখানা কার্পেট যেন। ভারি সুন্দর সেই দৃশ্য!
চায়ের কাপটা নিয়ে বারান্দায় বসে এসবই ভাবছিলেন অমিয়। কিন্তু তারপরেই হঠাৎ কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল। খবরের কাগজ তিনি পড়েন না। বাংলা কাগজ তো নয়ই। টেলিভিশনে খবর শোনাও তাঁর তেমন অভ্যাস নেই। যদি বসেন, তাহলে সাধারণত বিদেশি চ্যানেলই দ্যাখেন। সেজন্য লাউঞ্জে সান্ধ্যকালীন নিউজ শোনার আসরে তাঁর উপস্থিতি অনিয়মিত। ওই সময়টায় তিনি লাইব্রেরিতে বসে একটু বইপত্র ঘেঁটে দেখেন। এইসব কারণেই হয়তো খবরটা তাঁর চোখে পড়েনি।
আজ বারান্দায় বসে আছেন, টেবিলে একটা বাংলা পত্রিকা পড়ে ছিল। পুরোনো পত্রিকা। বোর্ডারদেরই কেউ নিশ্চয় ফেলে গেছে। অন্যমনস্কভাবেই পত্রিকার পাতাটা ওল্টাচ্ছিলেন অমিয়। হঠাৎ চোখ গেল একটা খবরের দিকে। শিল্পপতি অপরাজিতা দাশগুপ্তের প্রয়াণ। তারিখটা মাস ছয়েক আগের।
একনিঃশ্বাসে খবরটা পড়লেন অমিয়। স্বাভাবিক মৃত্যু। বাড়িতেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর মারা যায়। একমাত্র কন্যা শ্রীময়ী, জামাতা সমরেশ আর নাতনিকে রেখে গেছেন। অপরাজিতা সম্পর্কে আরও অনেক ভালো ভালো কথা লেখা আছে। কিন্তু অমিয় সেসব কিছুই পড়ছিলেন না। তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি হঠাৎ কীরকম যেন দিশেহারা হয়ে পড়লেন, জীবনের অভিমুখটা যেন আচমকা লক্ষ্যহীন হয়ে গেল।
অথচ এরকমটা তো আদৌ হওয়ার কথা নয়। মুম্বই আসার পর বেশ কিছুদিন একটা খুব কঠিন সময় গেছিল। চিরকালই শেল্টারডলাইফ। মা-বাবা ওরকমভাবে হঠাৎ মারা গেলেও দিদি-জামাইবাবু কোনওদিন সেই অভাবটা বুঝতে দেয়নি। তারপর পরিতোষের ছায়ায় কেটেছিল বেশ কিছু দিন। এরকম একটা পরিস্থিতি থেকে হঠাৎ একেবারে জলে পড়ে যাওয়া...।
তবে অমিয়র বাস্তববুদ্ধি যথেষ্ঠ প্রখর চিরকালই। তাই রীতিমতো হিসেব করে এগিয়েছিলেন। প্রথম কয়েকদিন হোটেলে থেকে প্রথমে একটা খুবই সাধারণ মানের বাসা ভাড়া নেন। মুম্বইয়ে বাড়ি ভাড়া ভয়ঙ্কর। তাই থাকতেন শহরতলির দিকে। ভিড় ট্রেনে চেপে রোজ যাতায়াত। রান্নাবান্না কিছুটা নিজে, কিছুটা হোটেল বা ছোটখাটো দোকানে। তারমধ্যে স্টুডিওপাড়ায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কলকাতায় যেসব কাজ করেছেন সেই রেফারেন্সগুলো তখন খুব কাজে লেগেছিল। তাও প্রথম বছর দেড়েক নিজের পুঁজি ভেঙেই চালাতে হয়েছে।
এরমধ্যেই রীতিমতো ক্লাস করে হিন্দিটা শিখে নিয়েছিলেন। দেড় বছরের মাথায় তাঁর গল্প থেকে তৈরি ছবি, দুলারি বিবি হিট করল। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজের ফ্ল্যাট, গাড়ি, নামডাক সবই হয়েছে। মুম্বই আসার পর খানিকটা নিজেকে গোপন রাখার তাগিদেই লেখালিখি শুরু করেছিলেন ঠাকুমার দেওয়া বিষু� নামে। ক্রমশ বিষু� নন্দী নামটাই সবার চেনা হয়ে গেল। তাই আর বদলালনি। কিন্তু পরে যখন নিজস্ব লেখালিখি শুরু করলেন তখন আসল নাম ব্যবহার করেছেন। মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ছাড়া দেশে-বিদেশে তিনি সাহিত্যিক অমিয় নন্দী।
অনেকবার সুযোগ হয়েছে, প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু এত বছরে কখনও কলকাতা যাননি অমিয়। অথচ তাঁর কীরকম মনে হত অপরাজিতা তাঁর সব কাজকর্মের ওপর নজর রাখে। প্রতিটা পুরস্কার, সম্মান, আপ্যায়ন উপভোগ করতে করতে ভাবতেন তিনি শোধ নিচ্ছেন। সেদিনের অপমানের প্রতিশোধ!
তাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় বাড়ি থেকে বার করে দিয়ে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল অপরাজিতা। কেন চেয়েছিল তিনি জানেন না। হয়তো সেই সন্ধেয় ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বসে থাকার দৃশ্যে এমন কিছু ছিল যা সে গোপন রাখতে চেয়েছিল। কিংবা হতে পারে একইসঙ্গে দুটো কোম্পানির মালিক হয়ে বসার ক্ষমতা তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। জানতে চেষ্টা করেননি অমিয়।
কিন্তু প্রতিশোধ নিতে চেয়েছেন। নিজের প্রতিটি সাফল্য দিয়ে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছেন। প্রতিটা প্রাপ্তির পর অপরাজিতার সঙ্গে মানসিক কথোপকথনে এক অদ্ভুত আনন্দ পেতেন তিনি। এই মৃত্যুসংবাদে সেই জায়গাটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। মৃত মানুষের সঙ্গে তো আর তর্ক চলে না। তাকে কিছু দেখানোর কিংবা শোধ নেওয়ারও কোনও সুযোগ নেই। তিরিশ বছরেরও বেশি সে মানুষের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। তার জন্য মনের মধ্যে ঘৃণা ছাড়া অন্য কোনও অনুভূতিও নেই। অথচ আজ অপরাজিতার মৃত্যুসংবাদে অমিয়র মনে হল তাঁর জীবনটা যেন হঠাৎ কেমন বর্ণহীন হয়ে গেল।

অক্টোবর মাস। ইউরোপে ফল শুরু হয়ে গেছে। শূন্য হয়ে যাওয়ার আগে প্রকৃতি যেন শেষবারের মতো নিজেকে রাঙিয়ে নিচ্ছে। উজ্জ্বল লাল, সোনালি, বাদামি, হলুদ পাতায় সাজানো গাছগুলো হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন নানা রঙের ফুলে সেজে উঠেছে।
ট্রেনের কাচের জানলা দিয়ে বাইরের এইসব দৃশ্যই দেখছিল শ্রীময়ী। আসলে দেখছিল বললে ভুল হবে। তার চোখের ওপর দিয়ে দৃশ্যগুলো বয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তার দৃষ্টিতে কিছুই ধরা পড়ছিল না।
ইউরোপের ট্রেনগুলো চমৎকার! আরামদায়ক সিটে হেলান দিয়ে বসে শ্রীময়ী বুঝতে পারছিল তার মাথার মধ্যে সারাক্ষণ একটা জিগস অফ পাজলের খেলা চলছে। অনেকগুলো ছোট ছোট ঘটনার টুকরো। সব মিলিয়ে যে ছবিটা তৈরি হবে তারও একটা অস্পষ্ট ধারণা। কিন্তু সবগুলো টুকরো এখনও জায়গা মতো বসেনি। মাঝে মাঝে ফাঁক। সে প্রাণপণে চেষ্টা করছে সবগুলো ঠিকঠাক বসিয়ে ছবিটাকে শেষ করতে। অথচ যে ছবিটা তৈরি হবে সেটা সে একটুও দেখতে চাইছে না।
রীনামাসির কাছে শোনার পরই মায়ের সঙ্গে বাগানবাড়িতে গিয়ে থাকার সময়টা তার মনে পড়েছিল। বাড়িটা বেশ বড়। দোতলা। তবে সবগুলো ঘর তারা ব্যবহার করত না। দোতলার একটা ঘরে মায়ের সঙ্গে সে থাকত। আর একটা ঘরে খাওয়া-বসার ব্যবস্থা ছিল। সেই ঘরটাতেই ডাইনিং টেবিল পাতা ছিল। রান্নাবান্না মনে হচ্ছে নীচেই হত। সেটা খুব ভালো করে তার মনে নেই। কারণ মা তাকে একদম নীচে নামতে দিত না। নিজেও নামত না বিশেষ। ওই সময়টায় স্কুলে যাওয়াও বন্ধ ছিল শ্রীময়ীর। তবে বইখাতা ছিল। নিয়মিত পড়তে বসতে হত। মা অফিস যেত না। তাই মা-ই তখন পড়াত তাকে। সে বছর হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। একেবারে অ্যানুয়াল দিয়েছিল।
একজন বয়স্ক মহিলা ছিল। নামটা এখন আর মনে নেই। সেই তাদের কাজকর্ম করত, খাবার নীচ থেকে নিয়ে আসত। বাড়িটার পিছন দিকে অনেক বড় একটা বাগান ছিল। নানারকম গাছপালায় ভর্তি। ওদের ঘরটাও ছিল পিছনদিকে। বাগানের দিকে ঘরের লাগোয়া একটা বারান্দা ছিল। সেখানেই অনেকসময় বসে থাকত শ্রীময়ী।
রীনামাসির চিঠিতে মা লিখেছে বাগানবাড়িটা আসলে ওই ডাঃ মাইকেল মিত্রের। মা কয়েকমাসের জন্য ভাড়া নিয়েছিল।
শ্রীময়ীর অস্পষ্ট মনে পড়ে তার শরীর খারাপের কথাও। বাড়ি যাওয়ার জন্য সে কান্নাকাটি করলেই মা বলত, সেরে উঠলেই দিদার বাড়ি নিয়ে যাব। সেই সময় তার পেটে টিউমার হয়েছিল। খুব কষ্ট হত। কিছু খেলেই বমি হয়ে যেত। প্রথমে ডাক্তার বলেছিল ওষুধ খেলে কমে যাবে। কিন্তু কমছিল না। অত অসুস্থ ছিল বলেই সম্ভবত মা ওকে কারুর কাছে রেখে যায়নি। তারপর টিউমার অপারেশন হল। তবে সেটা তখনই, নাকি ওরা বাড়ি ফিরে আসার পর সেটা এখন আর ঠিকমতো মনে নেই।
রাইয়ের নিজের ধারণা মায়ের ছোঁয়াচে রোগের গল্পটার মধ্যে কোনও সত্যতা নেই। গর্ভাবস্থায় শরীরের যে পরিবর্তন সেটা লুকোতেই ওভাবে অজ্ঞাতবাসে গেছিল মা। যদিও তার নিজের মায়ের শারীরিক বদলের কোনও স্পষ্ট স্মৃতি নেই। ওই বয়সের বাচ্চার পক্ষে সেটা বোঝাও কঠিন।
ডরোথির কাছে রাই শুনেছে, সেসময় অফিসের লোকজনের সঙ্গে মায়ের কথাবার্তা বেশিরভাগ ফোনেই হত। ফাইলপত্র সই করাতে অবশ্য লোক যেত। কিন্তু সেটা কীভাবে সই করানো হত সেবিষয়ে ডরোথি কিছু জানেন বলে মনে হয়নি। এটা অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করাও সম্ভব নয়। এমনটা হতেই পারে যে ফাইল রেখে আসা হত। মা সময়মতো সই করে ফেরত দিতেন।
তার ধারণা ওই পুরো সময়টাই মা প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। গুড়িয়া জন্মানোর পর তাকে ডরোথির জিম্মা করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।
কিন্তু ওই বাড়িটা যদি ডাঃ মাইকেল মিত্রর হয়, তাহলে তিনি নিশ্চয় সব জানতেন। তিনিই কি তাহলে গুড়িয়ার বাবা? দুর্বল মুহূর্তে কারুর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক হয়ে যেতেই পারে। সেটা শ্রীময়ীও মানে। কিন্তু যেটা সে কিছুতেই মেলাতে পারে না সেটা হল, অ্যাবর্শন তখন অলরেডি লিগালাইজড। অপরাজিতা দাশগুপ্তের মতো একজন শিক্ষিত, স্মার্ট মহিলা এভাবে অবাঞ্ছিত সন্তানের জন্ম দিলেন কেন!
রীনামাসির মুখেও মাইকেল মিত্র নামটা শোনার পর থেকেই তাঁকে খুঁজতে শুরু করেছিল শ্রীময়ী। মাসি বলেছিল যে ভদ্রলোক বিদেশ চলে গেছিলেন। তারপরেই মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি কি বিদেশেই সেটল করেছিলেন নাকি ফিরে এসেছিলেন সে বিষয়ে রীনামাসি আর কিছু জানে না।
শ্রীময়ীর মতে, ভদ্রলোক যদি ফিরেও আসেন, তাহলেও সে যা ভাবছে তা সত্যি হলে তিনি আর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে আগ্রহী হবেন না। কারণ গুড়িয়ার প্রতি তিনি যে কোনও কর্তব্যই পালন করেননি সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। তাই প্রথমটায় সে তার ডাক্তার বন্ধুবান্ধব মহলে খোঁজখবর শুরু করেছিল। কিন্তু ওই নামের কারুর সন্ধান পাওয়া গেল না।
ভদ্রলোক দেশে ফিরলেও যদি কলকাতায় না থাকেন তাহলে এভাবে সন্ধান পাওয়া মুশকিল। ফেসবুকেও ডক্টর মাইকেল মিত্র নামে কাউকে পাওয়া গেল না। মায়ের ক্লাসমেট। তারমানে বয়স সত্তর ছাড়িয়েছে। মারা গেলেও অস্বাভাবিক কিছু নয়।
শ্রীময়ী যখন প্রায় হতাশ হয়ে পড়েছে, তখনই একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। স্মার্ট ফোনটা হাতে নিয়ে নাড়াচড়া করছিল সে। অভ্যাসে ফেসবুক খুলে মাইকেল নামটা টাইপ করতে যেসব অপশন এল তাতে একজন হলেন মাইকেল মিটার। তবে তার নামের শুরুতে ডক্টর নেই।
শ্রীময়ী বিশেষ কিছু না ভেবেই প্রোফাইলটা খুলেছিল এবং একটু চোখ বুলিয়েই তার স্নায়ু টানটান হয়ে গেল। ভদ্রলোক পেশায় ডাক্তার। গায়নোকলোজিস্ট। কলকাতার ছেলে, মেডিক্যাল কলেজে পড়েছেন। বয়স যা দেখাচ্ছে, তাতে অপরাজিতারই সমবয়েসি। তার মানে ইনিই সম্ভবত ডাঃ মাইকেল মিত্র। এর আগে শ্রীময়ী প্রতিবারই ডক্টর দিয়ে সার্চ করায় সম্ভবত এনাকে খুঁজে পায়নি।
প্রোফাইল থেকে জানা গেল ভদ্রলোক প্রায় কুড়ি বছর অস্ট্রিয়াতে আছেন। তার আগে বছর পাঁচেক জার্মানিতেও ছিলেন। এখন থাকেন সলসবুর্গ শহরে। প্রোফাইলের সঙ্গে বেশ কয়েকটা ছবিও রয়েছে। দেখে বোঝা যায় অল্পবয়সে দেখতে ভালো ছিলেন। সত্তর পেরোলেও বেশ শক্ত চেহারা। স্ত্রী বিদেশিনি। দুই মেয়ে। ভদ্রলোক সম্ভবত বিয়েটা বেশ দেরিতেই করেছেন।
শ্রীময়ী হিসেব করে দেখল, এক্ষেত্রেও রীনামাসির কথা মিলে যাচ্ছে। গুড়িয়ার জন্মের কয়েক বছর পরেই দেশ ছেড়েছেন ডাঃ মিটার।
মিউনিখের একটা কোম্পানির সঙ্গে লেদার গুডসের ব্যবসার ব্যাপারে কথাবার্তা চলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। ফাইনাল ডিলের জন্য ওদের কোম্পানির এক্সপোর্ট ডিভিশনের ম্যানেজার সৌমিত্র রায় মিউনিখ যাবেন, সেরকম কথাবার্তাও হয়ে গেছিল। কিন্তু হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদলে শ্রীময়ী নিজেই ডিলটা ফাইনাল করতে যাবে ঠিক করেছে শুনে সমরেশ একটু অবাকই হয়েছিল। সৌমিত্র অনেকদিনের পাকা লোক। তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা যায়। কিন্তু রাই যখন বলল যে, সে নিজে একটু কথাবার্তা বলে দেখবে নতুন কোনও ওপেনিং পাওয়া যায় কিনা, তখন আর কিছু বলেনি।
হিসেব করে হাতে দু'দিন বাড়তি সময় নিয়ে এসেছিল শ্রীময়ী। মিউনিখের কাজটা গতকালই মিটে গেছে। আর তারপর আজ সকালে সে সলসবুর্গের ট্রেন ধরেছে।
ফেসবুকে মাইকেল মিত্রের খোঁজ পাওয়ার পর শ্রীময়ী প্রথমটায় ভেবেছিল ওনাকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবে। কিন্তু তারপরেই তার মনে হল, প্রোফাইল দেখে উনি যদি বুঝতে পারেন যে, সে অপরাজিতার মেয়ে তাহলে নিশ্চিত সতর্ক হয়ে যাবেন। রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করবেন না। ব্লকও করে দিতে পারেন। তাহলে সামান্য যোগসূত্রটুকুও ছিঁড়ে যাবে। তার থেকে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা ভালো।
সুযোগটা যে কীরকম হতে পারে সে সম্পর্কে তাঁর কোনও ধারণা ছিল না। কিন্তু তবু প্রায় রোজই সে ভদ্রলোকের টাইমলাইনটা খুলে একবার করে কথাবার্তা, কমেন্টগুলো দেখত।
এরমধ্যে অবশ্য রীনামাসিকে ভদ্রলোকের ছবিটা দেখিয়ে ঠিক লোক কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে নিয়েছিল। তার আগ্রহ দেখে রীনামাসি হেসে ফেলে বলেছিল, তুই কি তোর মায়ের অ্যাডমায়ারারদের নিয়ে রিসার্চ করছিস নাকি রে রাই? হঠাৎ মাইকেলকে নিয়ে এত আগ্রহ কেন?
কথাটা হেসে এড়িয়ে গেছিল শ্রীময়ী। কিন্তু দিন-পনেরো আগে একদিন ভদ্রলোকের টাইমলাইন খুলে চমকে ওঠে সে। মাইকেল মিত্রর কোনও এক কলেজের বন্ধু অস্ট্রিয়া বেড়াতে যাচ্ছেন। মাইকেলের সঙ্গেও দেখা করতে আসবেন। তার অনুরোধে ফেসবুকেই মাইকেল নিজের বাড়ির ঠিকানা আর ফোন নম্বর দিয়েছেন।
ভদ্রলোক বোঝাই যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ার ধরন-ধারণে খুব একটা অভ্যস্ত নন। সাধারণত এভাবে কেউ নাম-ঠিকানা দেয় না। ইনবক্সে যোগাযোগ করতে বলে। কিন্তু মাইকেল মিত্র নিশ্চিত এত কথা ভাবেননি। তিনি বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে বেশি আগ্রহী।
ঠিকানাটা হাতে পাওয়ামাত্রই শ্রীময়ী ঠিক করে ফেলেছিল সে সলসবুর্গ যাবে। মিউনিখের প্রোগ্রামটা হাতের কাছে ছিল বলে একটু সুবিধা হল ঠিকই। কিন্তু তা না হলেও মাইকেল মিত্রর সঙ্গে দেখা করার জন্য তাকে সলসবুর্গ আসতেই হত।
এদেশে কেউ ফোন না করে কারুর বাড়ি যায় না। মিউনিখ থেকে তাই সে ফোন করেছিল ডাঃ মিত্রকে। নিজের পরিচয় দেয়নি। কিছু গায়নোকলজিক্যাল সমস্যার জন্য কনসাল্ট করতে চায় বলেছে।
ডাঃ মিত্র প্রথমটায় বলেছিলেন যে, তিনি এখন আর প্র্যাকটিস করেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর অনুরোধে রাজি হয়েছেন। আজ বিকেল চারটেয় ডাঃ মাইকেল মিত্রের বাড়িতে তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট।
সলসবুর্গে একটা হোটেলে ঘর বুক করেছে শ্রীময়ী। সেখানেই রাতটা থেকে পরদিন সকালের ট্রেনে মিউনিখ ফিরবে। কলকাতায় ফেরার ফ্লাইট মিউনিখ থেকেই।
ইউরোপের যে কোনও ছোট শহরের মতোই সলসবুর্গও খুব সুন্দর। পৃথিবীবিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী মোতার্ট ছিলেন এই শহরের মানুষ। তাঁর বাড়ি আছে এখানে। সেটা অবশ্য এখন একটা সুন্দর সংগ্রহশালা। কিন্তু এসব কিছুই দেখার মতো মনের অবস্থা ছিল না শ্রীময়ীর।
হোটেলে মাইকেল মিত্রর বাড়ির ঠিকানাটা দেখাতে তারা জায়গাটা বলে দিল। ঠিক শহরের মাঝমধ্যিখানে বাড়ি নয়। একটু বাইরের দিকে। ভালো করে বুঝে নিয়ে একটা ট্যাক্সি ডেকে বেরিয়ে পড়ল শ্রীময়ী। ব্যবসার কাজে এবং বেড়াতে সে আগেও কয়েকবার ইউরোপ এসেছে। তাই ব্যাপার-স্যাপারগুলো মোটামুটি সড়গড় আছে। ট্যাক্সি তাকে নামিয়ে দিল গোলাপের বাগানে ঘেরা একটা চমৎকার বাংলো প্যাটার্নের দোতলা বাড়ির সামনে।
বেল বাজাতে যে বয়স্ক মহিলা দরজা খুললেন, তিনি যে মিসেস মিটার বুঝতে অসুবিধা হল না। ফেসবুকের প্রোফাইলে দু'জনের একসঙ্গে ছবি আছে। নাম বলতে ছোট্ট একটা করিডর পেরিয়ে লিভিং রুমে নিয়ে গিয়ে বসালেন।
চারিদিকে কাচ দিয়ে ঘেরা মস্ত ঘর। একপাশে ভারী সোফা পাতা আছে। অন্যদিকে একটা রিডিং জোন। দেওয়ালে পরপর বই ভর্তি র্যাক। সামনে অর্ধবৃত্তাকার টেবিল। কয়েকটা গদিআঁটা চেয়ার। ডাক্তার মিত্র ওখানে বসেই বই পড়ছিলেন। শ্রীময়ীকে দেখে উঠে এসে সোফায় বসলেন।
বাইরে বিকেলের আলো ঝলমল করছে। ডাঃ মিত্রের চশমার সোনালি ফ্রেম চিকচিক করছে সেই আলোয়। কয়েকমুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে থেকে নিজেকে ধাতস্থ করে নিল শ্রীময়ী। তারপর সরাসরি জিজ্ঞাসা করল, আপনিই ডক্টর মাইকেল মিত্র তো?
বাংলা শুনে একটু চমকে উঠলেন ডাঃ মিত্র। দৃশ্যতই খুশিও হলেন। সামান্য হেসে বললেন, আপনি বাঙালি নাকি? ফোনে কথা শুনে, ইনফ্যাক্ট নামটা শুনেও ইন্ডিয়ান আন্দাজ করেছিলাম। তবে বাঙালি বুঝিনি। আপনিও তো কিছু বলেননি! এত বছর হল দেশ ছেড়ে চলে এসেছি, তবু বাংলা কথা শুনলে মনটা বেশ চনমনে হয়ে ওঠে। দাঁড়ান, আগে আপনার কী প্রবলেম শুনে নিই। তারপর গল্প করব। কলকাতার নাকি?
ঘাড় নাড়ে শ্রীময়ী। তারপর সরাসরি ডাঃ মিত্রের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, আমার আসলে কোনও প্রবলেম নেই। আপনার সঙ্গে দেখা করব বলে মিথ্যে কথা বলেছিলাম।
কেন, মিথ্যে কথা কেন?
ডাঃ মিত্র বেশ অবাক হয়েছেন।
কারণ, সত্যিটা বললে যদি আপনি দেখা না করেন। আমার নাম শ্রীময়ী দাশগুপ্ত ডাঃ মিত্র। আমি অপরাজিতা দাশগুপ্তের মেয়ে।
তুমি...তুমি অপরাজিতার মেয়ে! তোমার যেন কী একটা ডাক নাম ছিল? অপরাজিতা ডাকত...
রাই। মা আমাকে রাই বলে ডাকত।
হ্যাঁ রাই, রাই। ঠিক বলেছ। মনে পড়েছে। কিন্তু তুমি এভাবে, পরিচয় গোপন করে আমার কাছে!...
কথাটা বলতে বলতেই হঠাৎ থেমে যান ডাঃ মিত্র। তাঁর ফর্সা মুখটা উত্তেজনায় লাল হয়ে গেছিল। সেটা ক্রমশ ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
শ্রীময়ী খুব শান্তভাবে বলে, আমি আসলে আপনার কাছে একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে এসেছি। আমার ধারণা এই প্রশ্নের উত্তর মাত্র দু'জনের জানা আছে। আমার মা আর আপনি। মা মারা গেছেন। তাই এখন একমাত্র আপনিই আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন।
অপরাজিতা চলে গেছে আমি জানি। খবর পেয়েছিলাম...।
কথাটা বলে একটুসময় চুপ করে থাকেন ডাঃ মিত্র। তারপর দৃঢ় কিন্তু মৃদু স্বরে বলেন, কী প্রশ্ন তোমার রাই?
আজ থেকে তিরিশ বছর আগে আমার মা একটি সদ্যোজাত শিশুকে মায়ের এক বিশ্বস্ত পরিচারিকা ডরোথির কাছে দিয়ে এসেছিলেন মানুষ করার জন্য। আমি সেই মেয়েটির পরিচয় জানতে চাই। তার মা-বাবা কে জানতে চাই।
তোমার কেন মনে হল এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে আছে?
আমি জানি। মায়ের মৃত্যুর পর, গত এক বছর ধরে আমি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছি। যা যা জানতে পেরেছি তার থেকে এটা স্পষ্ট যে, এই ঘটনাটা যখন ঘটে তখন মায়ের সঙ্গে একমাত্র আপনি ছিলেন। ও জন্মানোর আগের কয়েক মাস, আপনার ব্যারাকপুরের বাংলোয় মা আমাকে নিয়ে থাকত। ডরোথির সঙ্গে বাচ্চা রাখার কাজে সাহায্য করত যে নার্স, তাকেও আপনিই পাঠিয়েছিলেন। আপনি সবই জানেন ডাঃ মিত্র! প্লিজ বলুন।
কেন শুনতে চাইছ রাই? কী লাভ? ওকথা জানার তো কোনও প্রয়োজন নেই...।
প্রয়োজন আছে ডাঃ মিত্র। আমার নিজের জন্য প্রয়োজন আছে। সেই প্রয়োজনটা আমি আপনাকে বোঝাতে পারব না...
সহ্য করতে পারবে না রাই। কষ্ট পাবে খুব...।
আমি সহ্য করতে পারব। সারা জীবন আমি অনেক কিছু সহ্য করে এসেছি। কিন্তু আমার জানা খুব দরকার!
খুব শান্তভাবে কিছুক্ষণ শ্রীময়ীর দিকে তাকিয়ে থাকেন ডাঃ মিত্র। তারপর পরিষ্কার উচ্চারণে কেটে কেটে বলেন, ওই বাচ্চাটা তোমার রাই।
আমার!!
শ্রীময়ীর মনে হয় কাচের জানলার বাইরে বিকেলের ঝলমলে আলোটা যেন হঠাৎ নিভে গেল। চারিদিকটা ঘোর অন্ধকার। আর তারমধ্যে দিয়ে ভেসে আসছে মাইকেল মিত্রের অমোঘ উচ্চারণ
হ্যাঁ রাই। তোমার বাবার মামা অমিয় নন্দীর ঔরসে, তোমার গর্ভে ওর জন্ম।
কিন্তু, কিন্তু...এটা কীভাবে সম্ভব! আমি নিজে তো কখনও...
খুব আর্লি মেনস্ট্রুরাল সার্কেল তোমার রাই। সাড়ে আট বছর বয়সে পিরিয়ডস হয়েছিল। এটা বেশ রেয়ার। তবে গায়নোকলজিক্যালি খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। বয়সের তুলনায় একটু সরলও ছিলে। মানুষের জন্মরহস্যের কিছুই জানতে না। না জানাটাই স্বাভাবিক। কারণ ঘটনাটা যখন ঘটে, তখন তোমার নয় পূরণ হয়নি।
অমিয় নন্দী তোমার ইগনোরেন্সের সুযোগ নিয়ে তোমার সঙ্গে ইন্টারকোর্স করেছিলেন। সম্ভবত কোনও ড্রাগসও খাইয়েছিলেন। তাই তুমি বিশেষ কিছুই বোঝোনি। পরে তোমার সঙ্গে কথা বলে অপরাজিতা এগুলো আন্দাজ করে।
প্রেগনেন্সি যে হয়েছে সেটা বোঝাও তোমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ, যে কোনও ঘটনা মানুষ সাধারণত দু-ভাবে বোঝে, প্রথমত অভিজ্ঞতা। সেটা তো তোমার নেই। আর নয়তো পারিপার্শিক। তারমধ্যে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কথাবার্তা হতে পারে আবার বইপত্র পড়াও হয়। বুঝতেই পারছ রাই এরকম কোনওভাবেও তখন তোমার পক্ষে মানুষের জন্মরহস্য বোঝা সম্ভব ছিল না।
অপরাজিতাও বোঝেনি। তোমার শরীর খারাপ হয়েছে। মাঝে-মধ্যে বমি করছ। এসব তো স্বাভাবিক ব্যাপার। তখন ও খুব ব্যস্ত। মেয়ের নিয়মিত পিরিয়ডস হচ্ছে কিনা খোঁজ রাখেনি। আসলে ভাবেইনি ব্যাপারটা নিয়ে। প্রতি মাসে পিরিয়ড না হলে যে কী হতে পারে সে ধারণা তো তোমার নেই। তাই তুমিও কিছু বলোনি।
তারপর একদিন হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেছ শুনে আমার কাছে নিয়ে এল। তখন দ্য ফিটাস ওয়াজ নিয়ারলি ফাইভ মান্থস, অ্যাবর্শন করার সময় অনেকদিন পেরিয়ে গেছে। অপেক্ষা করতে হল। তোমাকে দেখে যাতে কেউ কিছু সন্দেহ না করে তাই মেয়ে নিয়ে অপারজিতা ব্যারাকপুরে আমার বাংলোতে চলে গেল। নর্মাল ডেলিভারির প্রশ্ন ছিল না। সিজারিয়ান করলাম। তোমার ব্রেস্টে যাতে মিল্ক না আসে সেজন্যও ব্যবস্থা করলাম। তারপর বাচ্চাটাকে ডরোথির কাছে রেখে অপরাজিতা তোমাকে নিয়ে আলিপুরে ফিরে গেল।
আমাকে মা বলেছিল আমার টিউমার হয়েছিল...
হ্যাঁ, আমিই অপাকে বলেছিলাম ওটা বলতে। যাতে বড় হয়ে ঘটনাটা নিয়ে তোমার মনে কোনও প্রশ্ন না জাগে। পেটে টিউমার হওয়ার সিম্পটমগুলো ভীষণরকম প্রেগনেন্সির সঙ্গে মেলে। বিশেষ করে পিরিয়ডস বন্ধ হয়ে যাওয়াটা। বড় টিউমার হলে সেটা ওপর থেকে বোঝা যায়, ফিল করা যায়।
আসলে তোমার যাতে কোনওভাবে ট্রমা না হয়ে যায় সেজন্য সবরকম সতর্কতা আমাদের নিতে হয়েছিল। কিন্তু সত্যকে বোধহয় কখনোই পুরোপুরি লুকোনো যায় না রাই...
ডাঃ মিত্রের স্ত্রী কফি আর কুকিজ রেখে গেছেন টেবিলে। কিন্তু শ্রীময়ীর মনে হচ্ছে কফির কাপটা তোলার মতো শক্তিও তার শরীরে আর অবশিষ্ট নেই। তার মাথাটা যেন ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। তবু তারমধ্যেও কোনওরকমে শক্তি সংগ্রহ করে জানতে চায়, অমিয় নন্দী কে?
অমিয় নন্দী সম্পর্কে তোমার বাবার মামা। যদিও পরিতোষদার প্রায় সমবয়েসিই ছিলেন। তোমাদের বাড়িতেই থাকতেন। আমার যতদূর মনে পড়ছে তোমার বাবা ওনাকে বাচ্চুমামা বলে ডাকতেন। এই ঘটনার পর অপরাজিতা ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। তোমাদের বাড়িতে ওর নাম উচ্চারণ করা বারণ ছিল। তারপর উনি সম্ভবত মুম্বই চলে গেছিলেন। এখন অবশ্য উনি বেশ সেলিব্রিটি মানুষ...।
ডাঃ মিত্রর কথায় চমকে ওঠে শ্রীময়ী।
বাচ্চুমামাকে আমার একটু একটু মনে আছে। কিন্তু তিনিই অমিয় নন্দী মানে রাইটার অমিয় নন্দী?
ইয়েস। ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়েন ডাঃ মিত্র।
নাম করেছে, পয়সাও করেছে। গুণ ছিল অনেক...
ডাঃ মিত্র কথা বলে যাচ্ছেন। কিন্তু শ্রীময়ীর কানে কিছুই ঢুকছে না। কেমন একটা অস্পষ্ট কুয়াশার মধ্যে দিয়ে তার মনের মধ্যে কিছু কিছু ঘটনা ভেসে উঠছে। একটা দুপুরবেলা। লম্বামতো একটা লোক ছবি আঁকছে। লোকটা একটা ট্যাবলেট খাইয়ে দিল। বলল মজার মজার স্বপ্ন দেখা যাবে। সোফায় শুয়ে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
হঠাৎ কেমন একটা কষ্টে ঘুমটা ভেঙে গেল। পুরোটা নয়। চোখদুটোতে তখনও যেন আঠা মাখানো। তারমধ্যেই বুকের ওপর সেই লোকটার মুখ আর দু'পায়ের ফাঁকে একটা জোরালো ব্যথার অনুভূতি। ঘুমের ঘোরেই ওকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করছিল সে।
বেশিক্ষণ নয়। ভারটা সরে গেল। কিন্তু উরুর ভিতর দিকটায় একটা চটচটে ভাব। ততক্ষণে ঘুমটাও ভেঙে গেছে। লোকটা পাশে একটা চেয়ারে বসে আছে। তাকে কোলে নিয়ে আদর করে চকোলেট দিল। খুব অস্বস্তি লাগছিল রাইয়ের। আসলে সে তখন বুঝতে পেরেছে, ঘুমের মধ্যে তার প্যান্টিটা কী করে যেন খুলে গেছে। লোকটাকে লুকিয়ে প্যান্টিটা তুলে নিয়ে নিজের ঘরে চলে এল রাই।
ডাঃ মিত্র নিজের চেয়ার থেকে উঠে গেলেন। সামনের বুক শেলফের কাছে গিয়ে নীচের দিকের ড্রয়ার খুলে হাতড়াচ্ছেন। একটা ব্রাউন খাম, অনেক পুরোনো। হাতে নিয়ে এগিয়ে এলেন রাইয়ের দিকে।
এটা রাখো তোমার কাছে।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় শ্রীময়ী।
এটাতে বাচ্চার বার্থ সার্টিফিকেট আছে। আর ডিএনএ রিপোর্ট। ওই বাচ্চাটা যে অমিয় নন্দীর তার প্রমাণ। অপরাজিতা কোনও বিষয়েই চট করে সিদ্ধান্ত নিত না। তুমি যে প্রেগনেন্ট সেটা বোঝার পর প্রথমটায় প্রায় পাগলের মতো হয়ে গেছিল। তারপর নিজেকে সামলে ও বোঝার চেষ্টা করে কালপ্রিট কে। তোমাকে বুঝতে না দিয়ে ও নানাভাবে জিজ্ঞাসা করেছিল।
হ্যাঁ, আমার মনে পড়েছে।
ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে শ্রীময়ী, মা আমাকে কোলে বসিয়ে জিজ্ঞাসা করছিল কেউ কোনওদিন আমার গায়ে হাত দিয়েছিল কিনা। আমার জেনিটাল টাচ করেছিল কিনা। আমি বললাম, না, কেউ করেনি। তাও মা বারবার জিজ্ঞাসা করছিল। কোনওদিন ওখানে ব্যথা পেয়েছি কিনা? কেউ গায়ে উঠেছে কিনা। হঠাৎ মামাদাদুর কথাটা মনে পড়ল। মাকে বললাম। মা জিজ্ঞাসা করল ঘরে আসার পর আর কী হয়েছিল। আমি বললাম, ব্লিডিং হচ্ছিল, ব্যথাও লাগছিল। কিন্তু তুমি তো বলেছিলে মেয়েদের বড় হলে মাঝে মাঝে ওরকম ব্লিডিং হয়। তাই কাউকে কিছু বলিনি। আসলে পিরিয়ডস যখন শুরু হল তখন মা ওই কথাগুলো বলেছিল আমায়...
তোমার কথাতেই অপরাজিতা বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু তবু আমাকে বলল ডিএনএ টেস্ট করতে। কনফার্ম হতে হবে যে বাচ্চাটার বাবা অমিয় নন্দীই। মিথ্যে কথা বলে ওর ব্লাড কালেক্ট করেছিল। এটা সেই ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট। অপা নিয়ে যায়নি। আমার কাছেই ছিল। এটা দেখার পরই ও ঠিক করে ফেলে অমিয় নন্দীকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে। ওর সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক তোমাদের পরিবারের কারুর থাকবে না।
অপাকে আমি অনেকদিন চিনি। কিন্তু সেদিন ওকে দেখে ভয় লাগছিল আমার। শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম যাতে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটিয়ে না ফেলে। আমার মনে আছে সারারাত ঠায় বসেছিলাম। দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি। সকালে ওর ফোন এল, মাইকেল, জানোয়ারটা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।
গলাটা শুকিয়ে গেছে একদম। কফির কাপটা তুলে নিয়ে একটা চুমুক দেয় শ্রীময়ী।
অপাকে আমি বলেছিলাম, বাচ্চাটাকে কোনও অনাথ আশ্রমে দিয়ে আসতে। কিন্তু ও রাজি হল না। বলল, ওর তো কোনও দোষ নেই মাইকেল! তাছাড়া ও আমার রাইয়ের সন্তান। আমার পরিবারের রক্ত আছে ওর শরীরে। তাকে আমি কোন প্রাণে অনাথ আশ্রমে, সারাজীবন অবহেলার মধ্যে মানুষ হতে দিই বলো? ওকে পরিচয় দিতে পারব না। সে আমার সাধ্যের অতীত। কারণ তাহলে রাইয়ের জীবনটা ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু একটা সুস্থ জীবন দেওয়ার চেষ্টা তো অন্তত করি...।
কথা বলল ডরোথির সঙ্গে। বাড়ি ভাড়া নিল। তখনকার দিনে দশ লক্ষ টাকা ফিক্সড করে দিল বাচ্চাটার নামে। অপা তোমার মা, অপা আমার বন্ধু। কিন্তু আমি সত্যি বলছি রাই এত বছরের জীবনে অপরাজিতার মতো মানুষ আমি খুব কম দেখেছি।
চোখ থেকে জল উপচে আসছে, ধরা গলায় শ্রীময়ী বলল, আমার বাবা ঘটনাটা জানতেন?
না। এই একটামাত্র জায়গায় আমার মনে হয়েছিল অপা বোধহয় কিছু ভুল করল। অমিয় নন্দী যে তোমার সঙ্গে এরকম একটা জঘন্য কাজ করেছে সেটা ও কিছুতেই পরিতোষদাকে বলতে পারেনি। ওর কীরকম মনে হয়েছিল পরিতোষদা কথাটা বিশ্বাস করবে না।
আসলে বাচ্চুমামা চিরকালই পরিতোষদার খুব কাছের মানুষ, আপনার জন। বাবা-মা হঠাৎ মারা যাওয়ায় অমিয়দাকে পরিতোষদার মা নিজের কাছে নিয়ে আসেন। তারপর ওদের যখন সম্পত্তি ভাগ হয়ে গেল তখন পরিতোষদার অনুরোধেই অমিয় নন্দী ওদের বাড়িতে থাকত। অপরাজিতা তোমার বাবাকে বলেছিল যে বাচ্চুমামা এমন একটা অন্যায় কাজ করেছে যে, তাকে বাড়ি থেকে বার করে দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না ওর। আর ওর নামও ওই বাড়িতে আর উচ্চারণ করা হবে না সেটাও বলে দিয়েছিল। কিন্তু কাজটা যে কী সেটা বলেনি।
এরপরই সম্ভবত পরিতোষদার সঙ্গে ওর একটা দূরত্ব তৈরি হয়। আমি কিন্তু ওকে বলেছিলাম, সত্যি কথাটা বলে দিতে। কিন্তু ও পারল না। ওর নিজের ভিতরে বোধহয় একটা অপরাধবোধ তৈরি হয়েছিল। মনে হয়েছিল, পরিতোষদার অনুপস্থিতিতে ও তোমাকে ঠিকঠাক প্রোটেকশন দিতে পারেনি। এত অর্থ, এত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পারেনি। সেজন্য ক্রমশ তোমার প্রতি অবসেসড হয়ে যাচ্ছিল। তোমাকে চোখের আড়াল করতে চাইত না। সব পুরুষ মানুষের সামনে থেকে তোমাকে আড়ালে রাখতে চাইত। ওই ঘটনার পরেও বছর তিনেক আমি দেশে ছিলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম ব্যাপারটা। ওকে সাবধানও করেছিলাম। তারপর তো চলে এলাম। আস্তে আস্তে যোগাযোগ কমে এল। আসলে এটা হয় জানো...
ডাঃ মিত্রের দিকে চুপ করে তাকিয়ে আছে শ্রীময়ী। কাচের দেওয়ালের বাইরে হলুদ আলোটা আবার একটু একটু করে ফিরে আসছে। একটা মস্ত মেপল গাছ। বাদামি, সোনালি, কমলা পাতাগুলো একটা একটা হাওয়ায় ঘুরে ঘুরে খসে পড়ছে। ঠিক যেন রাইয়ের বুকের মধ্যে জমে থাকা অসংখ্য নালিশের টুকরো। মায়ের বিরুদ্ধে জমে থাকা যে কালো কালো নালিশগুলো প্রতি নিয়ত ক্ষত-বিক্ষত করত তাকে। হঠাৎ একটা আলোর ঝলক যেন সেগুলোকে নানা রঙে রাঙিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে হাওয়ায়। দুচোখের পাতায় জমে ওঠা কুয়াশার পর্দার ভিতর দিয়ে শ্রীময়ী দেখছে সেই রঙিন স্রোতের ভেসে যাওয়া।

লম্বা লবিটার একেবারে শেষপ্রান্তে একটা ছোট কফি কর্নার। চারজন, বড়জোর ছয়জনের বসার ব্যবস্থা। পাঁচতারা হোটেলে এরকম কিছু এক্সক্লুসিভ টেবিল থাকে। একেবারে নিভৃত আলোচনার জন্য।
রয়্যাল ইন্ডিয়ার এই কফি কর্নারটা শ্রীময়ীর খুব পছন্দ। বিশেষ বিশেষ দিনে সে, সমরেশ আর তিথি এখানে বসে ব্রেকফাস্ট খেয়েছে অনেকবার।
কাল ডরোথির ফোনটা আসার পর প্রথমেই এই জায়গাটার কথাই মনে হয়েছিল। রয়্যালের ম্যানেজারকে ফোন করে বলেও রেখেছিল তখনই। যদিও এখন কফি টেবিলের সামনে হালকা বাদামি রঙের সোফায় বসে শ্রীময়ী বুঝতে পারছে তার সমস্ত শরীর-মন এক অজানা আশঙ্কায় পাথর হয়ে আছে।
পেশাদারি জীবনে তাকে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একটা গোটা কোম্পানি চালানো সহজ কথা নয়। দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর সে না চাইলে অপরাজিতা মাথা ঘামাতেন না। শ্রীময়ী নিজেও মায়ের ওপর নির্ভরশীলতা রাখতে চায়নি। তাই অনেক কঠিন সিদ্ধান্তও একাই নিয়েছে। তারজন্য অনেক নির্ঘুম রাতও কাটাতে হয়েছে। কিন্তু শ্রীময়ী নিজে জানে এমন দুরূহ প্রশ্নের মুখোমুখি সে কখনও হয়নি। প্রশ্নপত্র তার জানা। উত্তরও সবই জানা। কিন্তু সঠিক উত্তর কি সে দিতে পারবে?
গতকাল বিকেলের দিকে ডরোথি ফোন করে বললেন, আচমকাই তার আগের দিন রাতে সুমিতা এসেছে। আসার কোনও খবর ছিল না। তবে মেয়ে আসাতে খুশিই হয়েছিলেন ডরোথি।
রাতে কথাবার্তা কিছু হয়নি। তবে ডরোথির মনে হয়েছিল, সুমিতা যেন একটু বেশি গম্ভীর। সকালে চা খাওয়ার সময় সুমিতা জানায়, তার একটি ছেলেকে পছন্দ হয়েছে। ছেলেটির নাম অর্ণব। তাদের ওই শহরের হাসপাতালের ডাক্তার। অর্ণব আর সে বিয়ে করবে ঠিক করেছে। তাই অর্ণব আজ আসবে ডরোথির সঙ্গে দেখা করতে।
মেয়ের কথা শুনে আমার এত আনন্দ হয়েছিল রাই, তোমাকে কী বলব! আমি তো ভেবেছিলাম ও কোনওদিন বিয়ে-থা করবে না। কাউকে ভালো লাগলেই সুমি তার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিত। তারপর লুকিয়ে কাঁদত...আমাকে কখনও কিছু বলত না। কিন্তু ও কেন কলকাতা থেকে চলে গেল তাও তো আমি বুঝতে পেরেছিলাম।
চুপ করে শুনছিল শ্রীময়ী। ছেলেটি এসেছিল একটু বেলায়। ভারি চমৎকার ছেলে। দেখে মন ভরে গেছিল ডরোথির। কিন্তু সুমিতার মুখখানা এমন কাঠ-কাঠ হয়ে আছে কেন তখনও বোঝেনি। চা-খাবার দেওয়ার পর সুমিতা সরাসরি বলল,
মাসি, সত্যি করে বলো তো, আমার মা-বাবা কে? তুমি এতদিন আমাকে যা বলে এসেছ সেটা যে সত্যি নয়, আমি জেনে গেছি। ১৯৯০ সালের ২৫ জুলাই লক্ষ্মী গুপ্ত নামে কোনও মহিলার নীলরতন সরকার হাসপাতালে বাচ্চা হয়নি। ওই নামের কোনও মহিলা সেদিন মারা যাননি। কেউ ওই নামের ভর্তিই হয়নি। গোটা মাসেই কোনও বাচ্চাকে ফেলে কেউ চলে যায়নি। আর ডরোথি মণ্ডল নামে কেউ নীলরতন সরকার হাসপাতালে আয়ার কাজও করত না। অর্ণব হাসপাতালের রেকর্ড থেকে দেখে এসেছে। তাহলে আমার মা-বাবা কে? তুমি আমাকে কোথায় পেয়েছ?
শ্রীময়ী বুঝতে পারছিল ডরোথির কথা শুনতে শুনতে তার বুকের ভিতরটা এমনভাবে তোলপাড় করছে যেন চাইলে বাইরে থেকেও দেখা যাবে সেই অসম্ভব হৃদস্পন্দন। সে কোনওরকমে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বলেছিল, আপনি কী বললেন?
আমি আর কিছু লুকোইনি রাই। যতটুকু জানি ততটুকু বলেছি। অপাদিদি যে ওকে আমার হাতে দিয়ে গেছিল সেটাই বলেছি। ছেলেটাকে আমি হাতজোড় করে বলেছি, সুমির কোনও দোষ নেই। আমিই ওকে মিথ্যে কথা বলেছিলাম।
অপাদিদি যা বলতে বলেছিল তাই বলেছিলাম। অপাদিদির কথা অমান্য করার সাধ্য ছিল না আমার। ছেলেটা বড় ভালো রাই। ও আমার হাত ধরে বলল, আমি তো কোনও দোষ খুঁজিনি। সুমিতা নিজের মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইছিল, তাই আমি খোঁজ নিয়েছিলাম। আমি ওকে ভালোবাসি। ও যারই সন্তান হোক, তাতে আমার কিছু যায়-আসে না।
আপনি কি ওদের আমার কথা বলেছেন?
শ্রীময়ী বুঝতে পারে, তার মনের মধ্যে একটা অসম্ভব টানাপোড়েন চলছে। সে যে সত্যি কী চায় নিজেই হয়তো জানে না। ডরোথি অপরাধীর সুরে বললেন, হ্যাঁ রাই। আমি বলে ফেলেছি যে তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলে...রাই ওরা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে।
নিঃশ্বাসটা বুকের মধ্যে ধরে রেখেছিল শ্রীময়ী। চেষ্টা করছিল না বলার। কিন্তু তার শ্বাসবায়ুর সঙ্গে সঙ্গে যেন কথাগুলো আপনা থেকেই বেরিয়ে এল, বেশ তো। আসতে বলুন ওদের।
রিসেপশনে বলা ছিল। মোবাইলটা বাজতে ধরল শ্রীময়ী। ওরা এসে গেছে। লবির এই কোণটা থেকে নীচের লিলিপুলের পাশটা দেখা যায়। সেখান দিয়েই আসার রাস্তা। দেখতে পেল শ্রীময়ী। ছবি দেখেছিল আগেই। তাই চিনতে অসুবিধা হয়নি।
একটা ধানি রঙের সবুজ শাড়ি পরেছে সুমিতা। লাল ব্লাউজ। ছিপছিপে চেহারা। পেস্তা রঙের শার্ট পরা অর্ণব। কেমন যেন একটা বুভুক্ষুর মতো দেখছিল শ্রীময়ী। তার সন্তান! তার থেকে মাত্রই নয় বছরের ছোট। মা না হয়ে দিদিই তো হতে পারত সে। এই ব্যবসা, সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি সবেতেই তিথির মতোই সমান অংশীদার তো সুমিতাও। অথচ সে কোথাও নেই। তার অস্তিত্ব স্বীকার করে না এই সমাজ। একজন মানুষের লালসা নষ্ট করে দিয়েছে তিনটে জীবন!
অপরাধবোধ কুরে কুরে খেয়েছে অপরাজিতাকে। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। মেয়েকে আগলাতে গিয়ে তাঁর জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছেন। মা-মেয়ের স্বাভাবিক সম্পর্ক কখনও হয়নি তাদের। শ্রীময়ী মাকে ঘৃণা করেছে, সন্দেহ করেছে। আর সুমিতা তো সারাজীবনের জন্য মা-বাবা পরিত্যক্ত অনাথের তকমা পেয়েই গেছে। কিন্তু যে মানুষটি এসবের জন্য দায়ী, তাকে ধরার কোনও উপায় নেই! তার গায়ে হাত ছোঁয়াতে গেলেই সমাজের মেকি খোলস হুড়মুড় করে চারপাশ থেকে ধসে পড়ে শ্রীময়ীর টুঁটি চেপে ধরবে।
সুমিতা আর অর্ণব এসে বসেছে সামনে। গলার কাছটা ব্যথা করছে শ্রীময়ীর। কফির কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে সেটাকে নীচের দিকে নামানোর চেষ্টা করতে করতে ওদের দু'জনের জন্যও দু-কাপ কফি অর্ডার দিল।
একটা স্যান্ডুইচ বলি? এরা স্মোকড চিকেন উইথ মাস্টার্ডটা ভালো বানায়।
বলতে পারেন। তবে অল্প। আমরা খেয়ে এসেছি। ইনফ্যাক্ট কফিটাই ঠিক আছে।
অর্ণবের কথায় সামান্য হাসে রাই। একটু চেষ্টাকৃত সহজ গলাতেই বলে, তা কী হয়। প্রথমদিন দেখা হচ্ছে। ডরোথিমাসি আমাকে সবই বলেছে। মেয়ে-জামাইকে প্রথমদিনে তো আর শুধুমুখে আপ্যায়ন করা যায় না!
সুমিতা এতক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল শ্রীময়ীর দিকে। এবার তার কথার মাঝখানেই বাধা দিয়ে বলে ওঠে, আমি কার মেয়ে মিসেস সেন? আমার মা-বাবা কে? মাসির কাছে আমি সবই শুনেছি। অপরাজিতা দাশগুপ্তই কি আমার মা? আমার বাবা কে?
মানসিক উত্তেজনায় সামান্য এই ক'টা কথা বলেই হাঁফিয়ে গেল সুমিতা। কফি এসে গেছে। কাপটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে একটু সামলাতে সময় দেয় শ্রীময়ী। নিজেও একটু সময় নিয়ে বলে, না সুমিতা। যদিও ঘটনা পরম্পরা দেখলে মনে হয় অপরাজিতা দাশগুপ্তই তোমার মা। আমার নিজেরও সেরকমই ধারণা হয়েছিল। কিন্তু আমি এখন নিশ্চিত যে উনি তোমার মা নন। তার প্রমাণও আমার হাতে আছে।
তাহলে আমার মা কে?
তুমি কি সত্যিই জানতে চাও সুমিতা? সত্যিটা কিন্তু বড় কঠিন। তুমি যা জেনে এসেছ এতদিন, তার থেকেও কঠিন।
আমি সহ্য করে নেব। আপনি বলুন।
একটু চুপ করে থেকে শ্রীময়ী বলে, তোমার মা যিনি, ঘটনার সময় তিনি নাবালিকা ছিলেন। তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধেই ব্যাপারটা ঘটে। কনসিভ যে করেছে সেটা সে নিজেও বোঝেনি। বাড়ির লোকেরাও বুঝতে পারেনি। তাই দেরি হয়ে যায় এবং তোমার জন্ম হয়।
তার মানে সময়মতো ব্যাপারটা বোঝা গেলে অ্যাবর্শন করা হত?
সুমিতার মুখ রক্তশূন্য। অর্ণব তার হাত শক্ত করে ধরে আছে। খুব ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে শ্রীময়ী।
তার মানে, আসলে সেই বাচ্চা মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। আমি তার মানে ধর্ষণের ফল, ভালোবাসার নই!...
চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ছে সুমিতার। অর্ণব প্রায় দু-হাতে আঁকড়ে ধরেছে তাকে। শ্রীময়ী বুঝতে পারছে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই তারও দু'চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে।
তোমাকে পরিচয় দেওয়ার ক্ষমতা অপরাজিতা দাশগুপ্তের ছিল না সুমিতা। তাই তুমি যাতে অন্তত সুস্থভাবে বাঁচতে পারো, সেটা তিনি করেছিলেন।
অর্ণব সুমিতার পিঠে হাত রেখে নীচু গলায় বলে, আমরা তাহলে এবার উঠি সুমি?
না দাঁড়াও। মায়ের নাম আপনি বলবেন না। আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু বাবার নামটা কী জানা যাবে, নাকি সেখানেও আপনাদের কোনও অসুবিধা আছে?
শ্রীময়ী নিজের ব্যাগ খুলে একটা ব্রাউন রঙের খাম বার করে এগিয়ে দেয়, এটার ভিতরে তোমার বাবার নাম-ঠিকানা আছে। আরও একটা জিনিস আছে, সেটা হল তুমি যে ওনারই সন্তান তার প্রমাণপত্র। ডিএনএ রিপোর্ট।
সুমিতা হাত বাড়িয়ে খামটা নিয়ে খুলতে যাচ্ছিল। অর্ণব বাধা দেয়। তারপর বলে, আর একটা কথা আমরা আপনাকে বলব বলে ঠিক করে এসেছিলাম। সুমিতা তো এখন নিজেও চাকরি করছে। আমরা একসঙ্গে নতুন জীবন শুরু করব ঠিক করেছি। তাই অপরাজিতা দাশগুপ্ত যে টাকাটা সুমির জন্য রেখেছিলেন, সেটায় আমাদের আর প্রয়োজন নেই। ডরোথি মাসির দায়িত্বও আমরা নিতে পারব। ওই টাকাটা আমরা আপনাকে ফেরত দিতে চাই।
সেটা তো আমি পারব না অর্ণব। মা ওটা সুমিতাকে যৌতুক দিয়ে গেছেন। মায়ের ইচ্ছাপত্রে লেখা আছে সুমিতার বিয়ের সময় পুরো টাকাটাই সুদে-আসলে সুমিতার নামে ট্রান্সফার করে দেওয়া হবে। আরও একটা জিনিসও দিয়ে গেছেন...
অর্ণবের তীক্ষ্ন-অন্তর্ভেদী দৃষ্টি থেকে জোর করে নিজের চোখ সরিয়ে নিয়ে, সুমিতা ব্যাগ থেকে মাঝারি আকারের একটা মখমলের বাক্স বার করে। তিথি হওয়ার পর মেয়ে আর নাতনি দু'জনকেই ঠিক একরকম দেখতে একটা করে হার উপহার দিয়েছিলেন অপরাজিতা। নিজের হারটা আজ নিয়ে এসেছে শ্রীময়ী। একটা জিনিস অন্তত দুই মেয়ের একরকম থাক।

শিলং পাহাড়ে আগুন লেগেছে। গোল্ডেন অর্চার্ডের বারান্দা থেকে সেই আগুনের শিখা দেখতে পাচ্ছেন অমিয়। দাবানল। দু-এক বছর অন্তরই লাগে। তেলে টুপটুপে সরলগাছের জঙ্গল। শীতে শুকনো কাঠে ঘষাঘষি লেগে আপনা থেকেই জ্বলে ওঠে। কিন্তু এবার যেন মনে হচ্ছে আগুনটা বড্ড কাছে। অন্ধকার মাড়িয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে কমলা আলো। লকলকে জিভগুলো যে কোনও মুহূর্তে মুখের ভিতর পুরে নেবে নিশ্চিন্ত ঘুমে ডুবে থাকা বাড়িটাকে। ভয় ভয় করছে অমিয়র। ঘটনাটার পর থেকেই একটা ভয়ের পোকা বুকের মধ্যে ক্রমাগত গুরগুর করছে।
অথচ সকালটা কিন্তু দিব্যি ছিল। পেছনের বারান্দায় চেয়ারে গা এলিয়ে দ্বিতীয়বারের কফিটা যখন খাচ্ছেন, তখনই রাখি এসে খবর দিল, তাঁর দু'জন গেস্ট এসেছে। খুবই আশ্চর্য হয়েছিলেন অমিয়।
তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসার লোক নেই বললেই চলে। কেউ আসলে আগে থেকে জানা থেকে। হলের পর্দা সরিয়ে ভিতরে ঢুকে বিস্ময় আরও একটু বাড়ল। সোফায় একটি ছেলে ও মেয়ে বসে আছে। তিরিশ-বত্রিশের মধ্যে বয়স। ছেলেটি সম্পূর্ণ অচেনা। কিন্তু মেয়েটিকে কেন জানি খুবই চেনা লাগছে। যদিও কোথায় দেখেছেন মনে করতে পারলেন না।
সোফায় বসে নমস্কার করতে মেয়েটি খুব পরিষ্কার গলায় বলল, আমি সুমিতা। কলকাতা থেকে আসছি। ও অর্ণব, ডাঃ অর্ণব মিত্র। আমরা বিয়ে করব ঠিক করেছি। তাই ভাবলাম তার আগে আপনার সঙ্গে দেখা করে কথাটা আপনাকে একবার জানিয়ে যাই।
আমাকে! কেন?
নিজের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় জন্মদাতাকে সেটা জানানোর ইচ্ছা সবারই হয়...
জন্মদাতা মানে...কী বলছেন আপনি!
আমি আপনার সন্তান। সেই অধিকারেই বলছি।
মুহূর্তের মধ্যে স্নায়ু শক্ত হয়ে গেছিল অমিয়র। এধরনের ঠকবাজের গল্প তিনি বহু লিখেছেন। বাস্তবে যদিও দেখেননি। কিন্তু এদের কীভাবে মোকাবিলা করবেন ভেবে নিতে এক মুহূর্ত লাগেনি। তাই এবার রিল্যাক্স করে বসে ব্যঙ্গের হাসি দিয়ে বললেন, তাই নাকি! কিন্তু আমি তো ভাই ব্যাচেলর মানুষ। বিয়ে-থা করিনি। তাই বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বীচির মতো এই সন্তানটি কোথা থেকে এল বুঝতে পারছি না। আপনি এহেন একটা মহান আবিষ্কার কীভাবে করলেন জানতে পারি কি?
আমাকে জানিয়েছেন শ্রীময়ী দাশগুপ্ত। লেদার গুডসের মালিক। অপরাজিতা দাশগুপ্তের মেয়ে...আপনি বোধহয় তাঁকে চিনতেন?...
কথাটা শোনামাত্র বিদ্যুতের ছোবল খাওয়ার মতো চমকে সোজা হয়ে বসেছিলেন অমিয়। মেয়েটি কিন্তু তখনও থামেনি। তাঁর দিকে তাকিয়ে একইরকম কাটা কাটা ভাবে বলেছিল, আপনি কোনও একজন নাবালিকাকে ধর্ষণ করেছিলেন। আমি সেই ধর্ষণের ফসল...
পরিচয় দিতে না পারলেও আমাকে যাতে অনাথ আশ্রমে বড় হতে না হয় সেই ব্যবস্থা অপরাজিতা দাশগুপ্তই করেছিলেন। মায়ের নাম জানতে পারিনি। তবে শ্রীময়ীর কাছ থেকে আপনার নাম আর আপনার সঙ্গে আপনার সম্পর্কের প্রমাণপত্র আমি পেয়েছি। যদিও প্রমাণপত্রের বোধহয় কোনও প্রয়োজন নেই। কারণ আপনাকে আর আমাকে একসঙ্গে দেখলে কারুরই কিছু বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
ততক্ষণে অমিয় বুঝে গেছেন মেয়েটিকে কেন চেনা চেনা লাগছিল তাঁর। একইরকম হালকা জোড়া ভুরু। টানা চোখের কোণটা সামান্য ওপরে ওঠা। প্রতিদিন সকালে আয়নায় দেখা পরিচিত মুখ।
মেয়েটি ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করে টেবিলের ওপর রাখে। অমিয় বুঝতে পারছিলেন তাঁর হাত-পা অসাড় হয়ে গেছে। কিছু বলার মতো ক্ষমতাও নেই।
এটা আপনার পিতৃত্বের প্রমাণ। ডিএনএ রিপোর্ট। কিন্তু ডিএনএ রিপোর্ট দিয়ে পিতৃত্ব প্রমাণ করা যায়, বাবা পাওয়া যায় না, আমি জানি। তাই এটাতে আমার আর কোনও প্রয়োজন নেই। জন্ম থেকেই জেনে এসেছি আমি অনাথ। মা মারা গেছে। বাবার সন্ধান কেউ জানে না। তাই শ্রীময়ীর কাছে যখন জানতে পারলাম আমার বাবা আছেন এবং বেঁচে আছেন, তখন একবার দেখার খুব ইচ্ছে হয়েছিল। সে ইচ্ছে মিটে গেছে।
আর দ্বিতীয় কোনও কথা না বলে উঠে দাঁড়িয়েছিল মেয়েটি। তারপর দু'জনে বেরিয়ে গেছিল ঘর থেকে। ব্রাউন খামটা তুলে নিয়ে নিজের ঘরে এসে বারান্দায় বসেছিলেন অমিয়। তারপর কখন দুপুর গড়িয়ে সন্ধে হয়েছে টের পাননি। তাঁর চোখের সামনে দিয়ে ছায়াছবির মতো ভেসে গেছে মেঘলা আলোয় সদ্য কুঁড়ি ফোটা এক শরীর। বিস্মিত, যন্ত্রণাদীর্ণ দৃষ্টি। অপরাজিতার আগুনের মতো গনগনে মুখ। তারপর যত রাত গড়িয়েছে, তত যেন কাছে এসেছে আগুনের বেড়াজাল।
অস্থির লাগছে অমিয়র। কী করবেন বুঝতে পারছেন না। অপরাজিতা সেদিন যখন তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, তাঁর ক্রোধ, জেদ, ইচ্ছে সব তাঁর পক্ষে ছিল। কিন্তু আজ আবার অপরাজিতা যখন তাঁকে সমূলে উৎখাত করে দিল, তখন তো তাঁর সঙ্গে কিচ্ছু নেই। আজ যে নিজের কাছ থেকে পালাতে হবে তাঁকে। কীভাবে? অসহায় অমিয় তাকিয়ে থাকেন দাবানলের দিকে। বুঝতে পারেন ক্রমশ ধেয়ে আসা অগ্নিবলয় একটু একটু করে গ্রাস করে ফেলছে তাঁকে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন