শৈলেন ঘোষ
এক ছিল পুতুলওয়ালা। সে পুতুল নাচ দেখাতো। নাচ দেখাতো আর গান গাইতো|
তার মাথা ভর্তি চুল, ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া। ডাগর ডাগর চোখ, টানা টানা। ইয়া পেল্লাই গোঁফ, কাঁচা-পাকা|
রেশমি পোশাক ঝলমলানো, গায়ে দিত। লাল পাগড়ি চুমকি আঁটা, মাথায় দিত। নাগরা জুতো শুঁড় তোলা, পায়ে দিত।
সব্বাই বলে লোকটা ভেল্কি জানে।
জানে হয়তো। নইলে হাত তো দুটো। দুহাত দিয়ে নাচায় কেমন করে পুতুলদের অমনি? নাচ দেখলে কে বলবে পুতুল? পুতুল না তো, যেন সব সত্যি-সত্যি! জ্যান্ত-জ্যান্ত!
বাজনা বাজলে টুংটাং, পুতুলওয়ালার হাতের আঙুল নড়বে টুকটুক। অমনি পুতুলরা ঝুনঝুন নাচবে। গটমট হাঁটবে। টগবগ ছুটবে। অবাক কাণ্ড! অবাক বলে অবাক!
পুতুলওয়ালার অনেক পুতুল। কোনটা টাট্টুঘোড়া টগবগ। তার পিঠে ঘোড়-সওয়ার। কোনটা হাঁসের ছানা প্যাঁক প্যাঁক। সাদা ধবধব। এক রাজা। তার মাথায় সোনার মুকুট। ময়ুরপংখী নাও। তাতে আবার পাল তোলা। পুতুল-হাতি, মাহুত-ছেলে, সিপাই-সেনা, বাঘ-সিংগী। উরি বাবা কত! বলে আর শেষ করা যায় না।
আর ছিল কে?
ছিল মিতুল।
নামটি মিতুল। ছোট্ট পুতুল। দুষ্টু-দুষ্টু চোখ। মিটিমিটি চাইবে। টুকটুকে ঠোঁট। মুচকি মুচকি হাসবে। ভারি দস্যি ছেলে! দেখলে আর চিনতে বাকি থাকে না!
নাচ যখন শুরু হয়, প্রথমে বাজনা বাজবে। তারপর আলো জ্বলবে। নাচতে নাচতে আসবে একটি মেয়ে-পতুল। নাচন-নাচন মেয়ে। নীল-নীল আলো তার সারা অঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে। কমলা রঙের শাড়ি তার ঝলমল করবে। মেয়ে নাচবে। খুশিতে দুলবে। ওমা! ঠিক তক্ষুনি মিতুল লাফিয়ে পড়বে নাচন-নাচন মেয়ের সামনে। কোথা ছিল? ভেংচি কাটবে। মারবে ডিগবাজি, একটা-দুটো-তিনটে। তারপরে দেবে এক টান মাথার বিনুনি ধরে। কি দুষ্টু!
মেয়ে নাচতে নাচতে চিৎপটাং! একী কাণ্ড! অমনি হাততালি। চেঁচামেচি। হাসিতে আকাশ ভরে যায়।
মিতুল না থাকলে কি নাচ জমে! মিতুল নেই তো নাচ কিসের! মিতুলের জন্যেই তো সবাই ছোটে নাচ দেখতে। মিতুল নেই যেখানে, মজা নেই সেখানে। মজা নেই তো হাসিও নেই। হাসি না থাকলে কি নাচ হয়!
ভারি মজাদার পুতুল এই মিতুল। হাড়গোড় যেন কিচ্ছু নেই। ডিগবাজি মারছে। গাছে উঠছে। লাফাচ্ছে। ছুটছে। বসছে। উঠছে। ঘুরছে। নাচছে। গড়াচ্ছে। যা খুশী তাই!
মিতুলের একটা খেলা ভারি মজার। ঘোড়া ছুটছে টগবগ টগবগ। মিতুল ছুটছে ঘোড়ার পিছু, পাঁই পাঁই, পাঁই পাঁই। তিড়িং করে মারবে লাফ। ঘোড়ার ল্যাজটা ধরে ফেলবে। ল্যাজে ঝুলে সটান ঘোড়ার পিঠে। ওমা! দেখো, দেখো, ঘোড়ার পিঠে যে রাজকন্যা! লাল টুকটুক রাজকন্যা! রাজকন্যার গলায় হীরা মোতির মালা। আলোয় আলোয় ঝিকমিক। ঘোড়া ছুটছে। দোলা লাগছে। হীরা মোতির মালা টুংটাং টুংটাং বাজছে। এমন সময় মিতুল ঘোড়ার পিঠে চাপবে। চুপি চুপি আসবে পিছন দিকে। রাজকন্যার কানের কাছে মুখটি আনবে। তারপর এমন জোরে “কু” দেবে যে কী বলব! আচমকা চমকে উঠে থমকে যাবে রাজকন্যা। টাল সামলাতে পারবে না। মারবে ঘোড়ার পিঠ থেকে ডিগবাজি মাটিতে। আহা-রে লেগেছে! বড্ড লেগেছে! লেগেছে তো বয়েই গেছে। মিতুল সটান দাঁড়িয়ে পড়বে ঘোড়ার পিঠের ওপর! নাচবে আর হাততালি দেবে। তার সেই নাচ যারা দেখবে, তারাও না নেচে থাকতে পারে।
দুচক্ষে দেখতে পারে না রাজকন্যা মিতুলকে। একদম না। মিতুল দুষ্টমি করবে আর সবাই তাই দেখে হাসবে! মজা করবে! কেউ কিচ্ছু বলবে না! বা রে! রাজকন্যা ভাবে আর রাগে।
রাজকন্যা তো রাজকন্যা। তার দেমাক কত! মাটিতে পা পড়ে না। পড়বে কেন? যেমন তার দেহের গড়ন, তেমনি তার দুধের বরণ। প্রজাপতির পাখার মত ফিনফিনে পোশাক তার গায়ে। রঙ-ছড়ানো! চোখ জুড়ানো! মুক্তা মানিক, পান্না চুনি ঝিলিক ঝিলিক। পায়েতে সোনার নূপুর রুনঝুন। আহা-রে! হাঁটতে যেন পারেন না। কইতে যেন জানেন না। যেন ফুলের ঘা-এ মূর্ছা যাবেন। পুতুল না তো, আহ্লাদী!
আর মিতুল? তার কী আছে? এই এক ইয়া লম্বা ইজের। ঢলঢলে। জামা ঢলঢলে। মাথায় একটা তালপাতার টুপি। ব্যস! চলবে গটমট। ছুটবে ছটফট। আর সব উল্টাপাল্টা! গান গাইতে বললে কাঁদবে। কাঁদতে বললে হাসবে। হাসতে বললে ডিগবাজি খাবে। বেড়ে মজা তো! তাকে কিনা সবাই ভালোবাসে! তাকে দেখতেই সবাই আসে! হিংসেয় ফেটে পড়ে রাজকন্যা। তাই কথা বলে না মিতুলের সঙ্গে। চায় না তার দিকে। আড়ি।
মিতুল কিন্তু আড়ি-টারি ওসব জানে না। রাজকন্যা মুখটি ভার করলে মিতুল দেবে ভেংচি কেটে। আরও রেগে যাবে রাজকন্যা। আরও রাগবে মিতুল। রাজকন্যার গোমরা মুখের চাউনি বেশ দেখতে লাগে মিতুলের। রাজকন্যা যদি পায় তো খুব মারে মিতুলকে! কিন্তু মারবে কী! মারতে এলে এমন মিষ্টি মিষ্টি হাসে মিতুল মুখের দিকে চেয়ে!
পুতুলওয়ালারও কী কম ভাবনা মিতুলের জন্যে! ভাবনাও যেমন, যত্নও তেমন। যত্ন না করলে মিতুলই বা পারবে কেন অত সইতে? পারবে কেন অত ছুটোছুটি লাফালাফি করতে? ওর বুঝি কষ্ট হয় না? হাজার হোক পুতুল তো!
কী সুন্দর তুলতুলে বিছানা মিতুলের। পাখির পালকের গদি। পালকের বালিশ। একটা মাথার বালিশ। দুপাশে দুটো। পায়ে একটা। আঃ! আরাম করে ঘুময় মিতুল রাত্তিরবেলা। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে মিতুল। হয়তো ভাবে রাত যেন ফুরিয়ে না যায়। এমনি ঘুম-ঘুম রাত, নিঃঝুম।
না, রাত চলে যায়। সকালে সোনার আলো ছড়িয়ে পড়ে টুপটুপ করে মিতুলের দুটি চোখে। ঘুম ভেঙে যায় মিতুলের। আলোর দিকে চেয়ে থাকে মিতুল। সকালের আলো। আহা কী মিষ্টি সকাল! আজকের সকাল কী কালকের চেয়েও মিষ্টি! ভাবে মিতুল।
এমনি করে কত সকাল চলে গেল। ভাবতে ভাবতে। চলে গেল রোদ ঝিলমিল দিন। দিনের পর মাস। তারপর বছর।
এক দেশ থেকে আর এক দেশে যায় মিতুল। নাচ দেখাতে। শহর থেকে গ্রামে যায়। গ্রাম থেকে গঞ্জে। গঞ্জ থেকে হাটে যায়। হাটের শেষে মেলা। কত টাকা! ঝন ঝন ঝন!
পুতুলওয়ালার ছোট্ট বাড়ি বড় হল।
আরও বড়।
অনেক বড়।
একশো টাকা দুশো হল।
হাজার হল।
লক্ষ লক্ষ।
এখন পুতুলওয়ালা মস্ত লোক। মস্ত লোক তাই ব্যস্ত লোক। কথা বলে না যখন-তখন। বললেও তা দেখে চিনে। কাজ করে না আগের মতন। করলেও তা একটি দুটি। করবে কেন? লোক গমগম বাড়িতে। বাড়ি ভর্তি গাড়িতে। কাজ করে না। হুকুম করে। হুকুম করে, আঙুল নাড়ে।
হুকুম করে, একশো পুতুল দুশো কর।
দুশো হল। চারশো হল। পাঁচশো হল।
আর কী সেদিন আছে? সেই পুরনো নড়বড়ে দিন! চলে গেল সেই দিনগুলি! একটি একটি। সেই খুশিমাখা মিতুলের দিনগুলি!
নতুন নতুন পুতুল এখন। তাদের চোখ জুড়ানো রঙ। নতুন নতুন নাচবে পুতুল। তাদের নতুন নতুন ঢঙ।
মিতুল এখন ফেলনা পতুল। মিতুল আর নাচ দেখায় না।
কেন?
মিতুলের জামা কেটেছে পোকায়। ময়লা ধরেছে। টুপি ভেঙেছে। রঙ চটেছে। পালকের গদি গেছে। রেশমি চাদর গেছে। তার সঙ্গে আদর গেছে।
আদর গেছে মিতুলের। আদর গেছে রাজকন্যার।
রাজকন্যার ফিনফিনে পোশাক। তার রঙ ঝরেছে। রাজকন্যার গলার হার নতুন পুতুল গলায় দিয়েছে। তার পায়ের নূপুর, নতুন কন্যার পায়ে বেজেছে। ঘরের এক কোণে পড়ে থাকে মিতুল আর রাজকন্যা। ধুলোয়। কেউ দেখে না। কথাও বলে না। নতুন যারা এলো তারাও না। পুতুলওয়ালাও না। পুতুল ওয়ালা আসেই না এদিকে! তার অত সময় কোথায়? সময় কোথা মিতুলের কথা ভাববার? রাজকন্যের কথা মনে রাখবার? ভাঙা পুতুলের কথা ভাবতে কার অত মাথাব্যথা পড়েছে? তাই পড়ে থাকে। পড়ে থাকে আর জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে মিতুল আর রাজকন্যা।
ছোট্ট দুটি চোখ রাজকন্যার। ভারি মিষ্টি। একদিন চোখ দুটি জলে ভরে গেছলো রাজকন্যার। কেঁদেছিল লুকিয়ে লুকিয়ে। আর ভেবেছিল তাদের আদোর গেলো কেন? কেমন করে?
না, দেখতে পায়নি মিতুল। দেখতে পায়নি রাজকন্যার জলভরা দুটি চোখ। ইস। দেখলে কী লজ্জা! এখনও তো কথাই নেই রাজকন্যার মিতুলের সঙ্গে। দেখতে পেলে ভাবতো কিছ,। হাসতো হয়তো। আহা-রে! এখন যদি মিতুলের সঙ্গে রাজকন্যার ভাব থাকতো!
মিতুল কিন্তু একদিন কথা বলেছিল। ডেকেছিল নামটি ধরে, “রাজকন্যা।”
রাজকন্যা উত্তর দেয়নি। পারেনি উত্তর দিতে। লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। খুব খারাপ লেগেছিল সেদিন মিতুলের।
সত্যি কেউ নেই আর। সেই পুরনো দিনের বন্ধুরা কেউ নেই। আছে রাজকন্যা। সে-ও কথা বলে না। তাই একদিন মিতুল ভাব করতে গেলো নতুন পুতুল টাট্টু ঘোড়ার সঙ্গে।
মিতুল বলেছিল, “টাট্টু ঘোড়া, টাট্টু, ঘোড়া, আমার সঙ্গে ভাব করবে?” টাট্টু ঘোড়া কথা বলেনি। ডেকেছিল, “চিঁহিঁহিঁ!”
মিতুল আবার বলেছিল, “টাট্টু ঘোড়া, টাট্টু, ঘোড়া, আমার সঙ্গে খেলা করবে?”
টাট্টু আবার ডেকেছিল, “চিঁহিঁহিঁ!”
মিতুল শেষবার বলেছিল, “টাট্টু ঘোড়া, টাট্টু, ঘোড়া, আমি তোমার পিঠে চাপবো? তুমি ছুটবে?”
টাট্টু ঘোড়া আর একবার ডেকেছিল, “চিঁহিঁহিঁ!”
তারপর মিতুল টাট্টুর গায়ে হাত দিয়েছে। উঠতে গেছে। ব্যাস! টাট্টু মিতুলের পেটে মেরেছে এক লাথি। ধাঁই। মিতুল ছিটকে পড়েছে। সাত হাত দূরে। আচমকা। উঃ! কী জোর লেগেছে! আর একটিও কথা বলেনি মিতুল। ভাব করতেও যায়নি আর কারো সঙ্গে। আর যায়!
একদিন রাজকন্যা মনে মনে ভেবেছিল, “আহা-রে! আমি যদি পাই তো রাজার কাছে যাই।”
তাই সে একদিন নতুন পুতুল রাজার কাছে গেলো। বললে, “রাজামশাই, রাজামশাই, আমি রাজকন্যা।”
রাজা একবার বাঁ-চোখ ফিরিয়ে দেখলে রাজকন্যাকে।
রাজকন্যা আবার বললে, “রাজামশাই, রাজামশাই, আমি নাচতে পারি ঝুনঝুন, গাইতে পারি গুনগুন।”
রাজামশাই ডান চোখ ঘুরিয়ে দেখলো রাজকন্যাকে।
রাজকন্যা শেষবার বললে, “রাজামশাই, রাজামশাই, তোমার মুখে হাসি, দেখতে ভালবাসি।”
“চোপরাও!” ওমা, ধমকে উঠল রাজা। হাসির বদলে খিঁকিয়ে উঠলো রাজা! কোত্থেকে দুজন পল্টন পুতুল এসে রাজকন্যার কান ধরলে। হিড়হিড় করে টানতে টানতে রাজার চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল। যাঃ! ফেলে দিলে রাজকন্যাকে ঘাড় ধরে। মাটিতে।
সেইদিন থেকে রাজকন্যাও আর কারো সঙ্গে ভাব করতে যায়নি। চেয়ে চেয়ে দেখতো দুজনে—মিতুল আর রাজকন্যা। দেখতো নতুন-নতুন পুতুলদের। আর ভাবতো তাদের দিন গেল কেন? আর কি আসবে না ফিরে সেই আলো ঝলমল দিনগুলি? আর কি আসবে না পুতুলওয়ালা তাদের আদর করতে?
এসেছিল পুতুলওয়ালা একদিন সেই ঘরে। একদিন সকালবেলা চোখ খুলে দেখেছিল মিতুল আর রাজকন্যা। ছোট্ট দুটি বুক খুশিতে উছলে গেছলো। সাজানো-সাজানো পুতুল। নতুন-নতুন পুতুল দেখছে পুতুলওয়ালা। আরও কত লোক সঙ্গে। একটি একটি কথা বলছে। এক পা এক পা হাঁটছে। এটা ওটা করতে বলছে। আর ক’ পা এলেই পুতুলওয়ালা দেখতে পাবে মিতুল আর রাজকন্যাকে। কতদিন পরে দেখবে পুতুলওয়ালা মিতুল আর রাজকন্যাকে। কত, কত দিন পর। দেখবে তার আদরেরমিতুল আর রাজকন্যা ঘরের কোণে পড়ে আছে। কেউ দেখে না তাদের দিকে চেয়ে। কেউ বলে না একটি কথা। সবচেয়ে পাজি ঐ দুটো লোক। ঐ যে আসছে পুতুলওয়ালার পিছু পিছু! যেন কিচ্ছু জানেন না। ওরাই তো কেড়ে নিয়েছে সব মিতুল আর রাজকন্যার! দেখলে যা বকবে লোক দুটোকে। আঃ! তুলে নেবে বকে পুতুলওয়ালা মিতুলকে আর রাজকন্যাকে। গালে একটা টুসকি মারবে মিতুলের। আর একটা রাজ কন্যার। কত আদর করবে। ওঃ কী মজা! খুশিতে চেঁচাতে ইচ্ছে করছে মিতুলের। নাচতে ইচ্ছে করছে রাজকন্যার।
“এ দুটো এখানে কেন?” হঠাৎ ধমকে উঠলো পুতুলওয়ালা।
চমকে উঠলো মিতুল আর রাজকন্যা। তাকালো পুতুলওয়ালার দিকে। কটমট করে চেয়ে আছে তাদের দিকে পুতুলওয়ালা। পা দিয়ে ঠেলে দিল মিতুলকে। বললে, “এ দুটোকে এখানে রেখেছ কেন? জঞ্জাল। ফেলে দিতে পার না?
বুক কেঁপে উঠলো। মিতুলের মনে হলো পুতুলওয়ালার পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলে, “না, না, আমাদের ফেলো না। আমাদের থাকতে দাও।” বলবে কী! ততক্ষণে ঘরের জানলা দিয়ে রাস্তায় জঞ্জালের গাদায়। মুখ-থুবড়ে পড়ে রইল মিতুল আর রাজকন্যা। চোখ ফেটে জল এল।
অনেকক্ষণ পড়ে রইলো। কেউ দেখলো না তাদের দিকে। কেউ জিগ্যেসও করল না তাদের কথা। কার আর বয়ে গেছে ওদের কথা জিগ্যেস করতে! অমন রাস্তাঘাটে কত কী পড়ে থাকে। কে দেখে চোখ ফিরিয়ে?
“মিতুল।” কে ডাকল যেন। চমকে চাইলো। চাইলো রাজকন্যার দিকে, অবাক হয়ে। কে ডাকছে তাকে? রাজকন্যা?
রাজকন্যাই ডাকলো আবার, “মিতুল।”
খুশিতে উছলে গেল মিতুলের বুকখানা। এত দুঃখেও মিতুলের চোখ দুটি যেন নেচে উঠলো। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল মিতুল রাজকন্যার কাছে। গলাটি জড়িয়ে ধরলো। চোখে জল রাজকন্যার। মিতুল বললে, “তুমি কাঁদছ রাজকন্যা?”

রাজকন্যা বললে, “আমায় কী আর ও নামে মানায় এখন? আমি তো আর রাজকন্যা নই। আজ থেকে আমি তোমার বন্ধু। আমায় অন্য নামে ডেকো।” গড়িয়ে গেল চোখের জল গাল দুটি বেয়ে রাজকন্যার।
ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে মুছে দিল মিতুল রাজকন্যার চোখের জল। না, থাকতে পারলো না মিতুল। তারও চোখ ছলছল করছে। জিগ্যেস করলো, “তবে কী নামে ডাকবো তোমায়?”
রাজকন্যা বললে, “যা খুশি।”
“তবে বোনটি বলে ডাকি?”
দুটি হাত দিয়ে গলাটি জড়িয়ে ধরলো মিতুলের রাজকন্যা। বললে, “ভাইটি আমার, তাই ডেকো।”
সকালের সূর্যি সোনার সব আলো যেন খুশির মত ছড়িয়ে গেলো। হাসিভরা মুখখানি মিতুলের উছলে গেছে। ভারি মিষ্টি লাগছে, সকালের রোদে। রাজকন্যা তাকে ভাই বলেছে! মনে হলো খুব জোরে গান গেয়ে ওঠে মিতুল। মনে হলো নাচে আজ সে সারাক্ষণ। খুশির নাচন। কিন্তু নাচবে কেমন করে? এই রাস্তায়? জঞ্জালে? রাস্তায় কি নাচা যায় এই সকালের রোদের আলোয়?
সেই আলো কই? সেই রঙ রঙ আলো? আলো আলো মিষ্টি! মানিকের বিষ্টি!
“মিতুল!” আবার ডাকলো রাজকন্যা।
“কি বলছ বোনটি?” সাড়া দিল মিতুল।
“আমাদের কী হবে? এইখানে পড়ে থাকব? জঞ্জালে?”
মিতুল বললে, “রাত না এলে যাব কোথায়? রাত এলে আমরা চলে যাব অনেক দূরে। যেখানে পুতুলওয়ালা নেই। পুতুলওয়ালার মত মানুষ নেই। নিষ্ঠুর মানুষ।”
“রাত কী আসবে?”
“রাত আসবে। তারা উঠবে। তারা দেখে দেখে আমরা পথ চলব।”
“না মিতুল। রাত নয়। এখনই এখান থেকে চল যাই।”
“কেউ দেখতে পেলে?”
“কে দেখতে পাবে? কাউকে দেখতে পেলে লুকিয়ে পড়ব। এই বিচ্ছিরি জঞ্জালে বসে থাকতে গা ঘিনঘিন করছে।”
মিতুল চুপিসাড়ে উঠে দাঁড়ালো। কেউ না দেখতে পায়! সত্যি তারও ঘেন্না ঘেন্না লাগছিল। এখানে না থাকাই ভালো। আড় চোখে দেখলো মিতুল এদিক ওদিক। না কেউ নেই। কাছেও নেই, দূরেও নেই। তাই হাত ধরল মিতুল রাজ কন্যার। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললে, “চলো বোনটি, পালাই।”
ছুটতেই যাচ্ছিল রাজকন্যা মিতুলের হাত ধরে।
“ঘেউ-ঘেউ-উ-উ!” আরি বাবা! একটা কুকুর ডেকে উঠেছে। থতমত খেয়ে গেল মিতুল আর রাজকন্যা। ছুটতে গিয়ে পা থামলো। বুক ধুক ধুক কাঁপতে লাগল। লুকিয়ে পড়ল। সেই জঞ্জালের গাদায়। কুকুরটা ডাকছেই—ঘেউ-ঘেউ ঘেউ।
ঘড়-ঘড়-ঘড়। কিসের শব্দ আসছে না কানে?
হ্যাঁ তো রে! উঁকি মারলো মিতুল। উঁকি মারলো রাজকন্যা। একটা গাড়ি আসছে! গাড়ি টানছে জমাদার। রাস্তা সাফ করছে। রাস্তার ময়লা গাড়িতে তুলে নিচ্ছে। কী রে বাবা! ঐ গাড়িতে তাদেরও যেতে হবে নাকি!
আর বলতে! সত্যি সত্যি গাড়িটা তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। কী রকম দেখতে গাড়িটা! একটা চাকা। তার হাতল দুটো। ক্যাঁচ করে সামনে দাঁড়াতেই ছ্যাঁৎ করে উঠল রাজকন্যার বুকটা। জড়িয়ে ধরল মিতুলকে।
মিতুলের তো চক্ষুস্থির! কত বড় বড় চোখ রে বাবা জমাদারের! ড্যাব ড্যাবে! মাথাটা এতখানি। হাঁড়ির মতন। ওদের সামনে গাড়ি থামিয়ে ফিক করে হেসে ফেললো। বাবা! দাঁত না-তো, যেন এক একটা কুড়ুল! হাসছে কেন?
“বা-রে! বেশ তো পুতুল দুটো!” গলার কী আওয়াজ! যেন কোলা ব্যাঙের ঘ্যাঙ-ঘ্যাঙানী। ঘ্যাঙ-ঘ্যাঙ করেই চেঁচিয়ে উঠল লোকটা। খুশিতে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।
তুলে নিল মিতুলকে আর রাজকন্যাকে। নেড়ে নেড়ে দেখতে লাগলো। নাচাতে লাগলো। দোলাতে লাগলো আদর করে। ধুলো ঝেড়ে দিল। জামার ধুলো। মিতুল আর রাজকন্যার জামা। ছিঁড়ে গেছে। চেঁচিয়ে উঠলো, “কে এমন বেআক্কেলে রে? তোদের রাস্তায় ফেলে দিয়েছে? এমন সুন্দর পুতুল! দয়া মায়া নেই। ছ্যা ছ্যা! চ আমার সঙ্গে। আমার বাড়িতে চ। আমার সঙ্গে খেলবি। আমার বউ-এর কাছে থাকবি।”
জমাদার গাড়ির দু হাতলে দুজনকে বসালো। যেন ঘোড়ার পিঠে চেপেছে। খুশিতে দুলে গাড়ি ঠেলল জমাদার। গাড়ি চলল ঘড়ঘড়, ঘড়ঘড়। দুলতে লাগল রাজকন্যা আর মিতুল। এমন করে কোনদিন তো গাড়ি চড়েনি তারা। এমনি হাতলে বসে! ভালো লাগছে। ভয়ও করছে। তারা যাচ্ছে কোথা? কোথা নিয়ে যাচ্ছে তাদের জমাদার? মিতুলও ভাবছে। ভাবছে রাজকন্যা। ভাবছে আর মাঝে মাঝে চাইছে এ ওর দিকে চুপি চুপি। আড় চোখে।
হঠাৎ জমাদার গান ধরলে। হেঁড়ে গলায়। বাবা কী চীৎকার! একে কী গান বলে! গান না ছাই! পিলে চমকে যায়।
কেমন যেন ভালো লাগলো লোকটাকে। ভালো লাগলো মিতুল আর রাজকন্যার। বিচ্ছিরি দেখতে লোকটা। মনটা কী সুন্দর!
গাড়ির হাতলে চেপে ঘুরে বেড়ালো মিতুল আর রাজকন্যা। অনেকক্ষণ। অনেকক্ষণ পর জমাদার ঘরে ফিরলো। ঘরের দরজা ঠেলে ডাক দিল জমাদার, “ও বউ, ও বউ, কোথা গেলি? এই দেখ, তোর জন্যে কি এনেছি!”
বলতে বলতেই বউ বেরিয়ে এল। দেখেই তো পিলে শুকিয়ে গেল মিতুল আর রাজকন্যার। যত বড় নাক, তার চেয়েও অনেক বড় একটা নথ নাকে। কানে দুটো এইসা বড় বড় মাকড়ি। হাতে মোটা মোটা বালা। পায়ে মল। পা ঠুকতে ঠুকতে বেরিয়ে এল। জিগ্যেস করলে, “কি এনেছিস?” বাবা! কী তিরিক্ষি মেজাজ।
জমাদার বউকে দেখতে পেয়ে এক গাল হেসে বললে, “এই দেখ।” বলে মিতুল আর রাজকন্যাকে এগিয়ে দিলো বউ-এর দিকে।
“পুতুল! কি হবে?” বউ ধমক দিলো।
“আহা! অমন ধমক দিচ্ছিস কেন? শোন না। আমাদের তো ছেলেমেয়ে নেই। তাই তোর জন্যে নিয়ে এলুম। রাস্তায় পড়ে ছিল। দেখ, দেখ, কী সুন্দর! আমার ছেলে, আমার মেয়ে।” বলে জমাদার মিতুল আর রাজকন্যার গাল টিপলে। আদর করলে।
আর দেখতে হয়! জমাদারের বউ রেগে আগুন, তেলেবেগুনে। একেবারে চিলের মত চেঁচিয়ে উঠলো, “চালাকির জায়গা পাওনি! রাস্তা থেকে দুটো পুতুল এনে বলে ছেলেমেয়ে! আমাকে কী ঠাউরেছিস? কচি খুকি, না রাস্তার ভিখিরি? যা ফেলে দিয়ে আয়। খবরদার ঘরে ঢোকাবি না। তা হলে তোর একদিন কি আমার একদিন!”
ধমক খেয়ে ভয় পেয়ে গেল জমাদার। আমতা আমতা করে বললে, “আহা রাগ করছিস কেন বউ? একবার চেয়েই দেখ না! কী সুন্দর পুতুল! চোখগুলো দেখ। যেন আমাদের ডাকছে।”
কোথায় ছিল বউ। দৌড়ে এসে ছিনিয়ে নিলো মিতুল আর রাজকন্যাকে জমাদারের হাত থেকে। ছুড়ে ফেলে দিলো উঠনে। রাগে গজরাতে গজরাতে বললে, “ভীমরতি ধরেছে! যা চান করে খেয়ে নে। পুতুল নিয়ে খেলা। বড়ো বয়সে মরণদশা!”
এবার আর থাকতে পারলো না জমাদার। কী ভীষণ রেগে গেল! বউ-এর মুখের ওপর যে টু’ শব্দ করে না, সে রেগে কাঁই! কী! তার পুতুলকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে! চেঁচিয়ে উঠলো জমাদার, “বেশ করেছি পুতুল এনেছি! তা বলে তুই ফেলবি কেন? তোর না ভালো লাগে, আমার কাছে থাকবে। খবরদার! যদি পুতুলের গায়ে হাত দিবি তো ঘাড় ধরে বার করে দেব!” বলে জমাদার মিতুল আর রাজকন্যাকে তুলে নিলো আবার বুকে। আদর করলো, “কোথা লেগেছে রে? খুব লেগেছে?”
লেগেছিল। যা জোর ছুড়েছে জমাদারের বউ। লাগবে না? ব্যথা ভুলে গেলো মিতুল আর রাজকন্যা। আদরে। জমাদারের আদরে। নিজের বিছানায় বসিয়ে দিলো জমাদার মিতুল আর রাজকন্যাকে। বাটি বাটি খাবার নিয়ে এলো। ঘটি ঘটি দুধ নিয়ে এলো। মিতুল আর রাজকন্যার জন্যে। খাবে কী! ওরা তো পুতুল। নোলায় জল আসছে খালি!
মিতুল আর রাজকন্যাকে নিয়ে জমাদারের সে কী খুশির দিন! কখনও গাইছে। কখনও হাসছে। নিজের মনে কথা বলছে। চেয়ে চেয়ে দেখছে মিতুল আর রাজকন্যা। ভাবছে, আহা-রে! লোকটা সত্যিই ভালো!
জমাদারের বউ সেই যে ধমক খেলো, ব্যস! আর মুখে রা নেই। চুপচাপ। রাগছে। ভেতরে ভেতরে ফুলছে। মুখ দেখলেই বোঝা যায়। এমন করে মিতুল আর রাজকন্যার মুখের দিকে চাইছে মাঝে মাঝে! বুক শুকিয়ে যায়।
রাত্তির এলো। আদরে আদরে ঘুমিয়ে পড়লো মিতুল আর রাজকন্যা। ঘুমুবে না? সারাদিন যা ধকল গেছে!
কোলের কাছে ঘুম পাড়িয়ে মিতুল আর রাজকন্যাকে জমাদারও ঘুমিয়ে পড়লো। জেগে রইল জমাদারের বউ। কী যেন বুদ্ধি তার পেটে পেটে! কী সে ভাবছে, সে-ই জানে!
ঠিক তাই। শীত পড়েছে খুব। কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমুচ্ছে জমাদার অঘোরে। নাক ডাকাচ্ছে। বউ চুপি চুপি উঠলো। উঁকি মারলো জমাদারের মুখের দিকে। না, এখন আর ঘুম ভাঙবে না। চেপে ধরলো মিতুল আর রাজ কন্যার ঘাড় দুটো। ঘরের দরজা ঠেলে বাইরে এলো। ছুড়ে দিলো। দুজনে ধুপ ধুপ করে পড়লো রাস্তায়। ঘুম ভেঙে গেলো আচমকা মিতুল আর রাজ কন্যার। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো দুজনে দুজনের মুখের দিকে। মিতুল হাত দিলো রাজকন্যার মাথায়। জিগ্যেস করলো, “লেগেছে?”
অন্ধকারে ভালো করে দেখতে পেলো না মিতুল। দেখতে পেলো না রাজ-কন্যার চোখ দুটো। জল টলমল। মিতুলের আদরমাখা হাতখানি এত মিষ্টি!
আগে তো জানতো না রাজকন্যা। এত ভালো, এত লক্ষ্মী মিতুল! ছিঃ ছিঃ, তার সঙ্গে শুধুমুধু, ঝগড়া করেছে এতদিন। মিথ্যে মিথ্যে হিংসে করেছে। মিতুলের হাতটা টেনে নিলো রাজকন্যা। বললো, “তোমার লেগেছে?” চোখ দিয়ে ক’ ফোঁটা জল গড়িয়ে এলো। টুপ টুপ। মিতুলের হাতে। মিতুল বললে, “চলো, এখান থেকে চলে যাই।”
“কোথা যাবে?” জিগ্যেস করলো রাজকন্যা। উঠে দাঁড়ালো মিতুলের হাত ধরে। এগিয়ে চললো সামনে।
আলো নেই তো দেখবে কেমন করে? ছোট্ট ছোট্ট তারাগুলো কত ওপরে! ওখান থেকে কী আলো আসে? আহা-রে! একটি তারা যদি নেমে আসে মাটিতে! মিতুল আর রাজকন্যার হাত ধরে বলে, “চলো, তোমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাই।” তাহলে কেমন মজা হয়! আচ্ছা, আকাশে তো অত তারা। লক্ষ লক্ষ। একটিও তো আসতে পারে। আসে না কেন? ওরা কি দেখতে পায় না কত কষ্ট হচ্ছে মিতুল আর রাজকন্যার! না কি ওদের একটুও দয়া নেই শরীরে!
রাজকন্যা চলতে চলতে হঠাৎ থামলো। চাপা গলায় ডাকলো, “মিতুল?”
“কি”
“কিসে পা ঠেকলো।”
“কই?”
“এই তো!” নিচু হয়ে বসলো রাজকন্যা। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দেখতে লাগলো।
“মিতুল!” আবার ডাকলো রাজকন্যা। “দেখ, দেখ কী রকম নরম।”
“কই দেখি।” হাত বুলিয়ে দেখতে দেখতে মিতুল বললে, “নরম আবার গরম। গদির মতন। শুয়ে পড়লে কেমন হয়?”
রাজকন্যা বললে, “বেশ হয়। যা ঘুম পাচ্ছে।” বলে রাজকন্যা আগেভাগে উঠতে গেছে সেটার ওপর। উঠেছেও। ওমা! তবু বুঝতেই পারেনি একটা ছাগলের ঘাড়ে চাপছে। ঘুমুচ্ছে ছাগলটা, সেও টের পায়নি। বসে পড়ল ছাগলের পিঠে রাজকন্যা। ডাকলো, “মিতুল এদিকে এস।”
মিতুল করেছে কী, একেবারে আঁকপাঁকিয়ে উঠতে গেছে। দেখতে পায়নি ছাগলের নাকটা। ব্যস! নাকের ভেতর আঙুল ঢুকে গেছে। মিতুলের ছোট্ট হাতের আঙুল। “ফ্যাঁচ্চ্চ্!” আরে বাবা! এক বোম্বাই হাঁচি হেঁচে দিয়েছে ছাগলটা। নাকে যে সুড়সুড়ি লেগে গেছে! হে’চেই মেরেছে লাফ, তিড়িং। “ম্যাঁএ্যাঁএ্যাঁ” করে ডাকতে ডাকতে মার ছুট। মিতুল তো সাত হাত দূরে ছিটকে পড়লো। আর রাজকন্যা? কাছেই ছিল নিম গাছ। একেবারে তার ওপরে। নিম গাছের মগডালে।
মগডালে পেঁচার বাসা। খাসা মৌতাতে বসেছিল ঠাকুরদাপেঁচা বাসায়। পড়বি তো পড় রাজকন্যা একেবারে তার ঘাড়ে। পড়েই জাপ্টে ধরেছে ঠাকুরদা পেঁচাকে। ভয়েময়ে। প্রথমটা ঠাকুরদাপেঁচা বুঝতেই পারেনি। থতমত খেয়ে গেছলো। তারপর হেসে উঠেছে, “ক্যাঁএ্যাঁএ্যাঁ।” কী হাসি! হাসতে হাসতে প্রাণ বেরিয়ে যাবার গোত্তর। হাসবে না? এমন ধরেছে রাজকন্যা ঠাকুরদাদাকে! কাতুকুতু লেগে গেছে যে। ঠাকুরদাদা হাসছে।
রাজকন্যাও ভয়েময়ে ততই জড়িয়ে জড়িয়ে ধরছে।
হাসতে হাসতে ঠাকুরদাদা গাছের ডালে ঝটাপটি লাগিয়ে দিলে। “ছাড়, ছাড়”, চেঁচিয়ে উঠলো ঠাকুরদাদা। কে কার কথা শোনে! আর থাকতে পারলো না। রাজকন্যাকে পিঠে নিয়েই আকাশে উড়তে আরম্ভ করে দিল।
মিতুলের তো চক্ষু চড়কগাছ! পেঁচার বিটকেল হাসি শুনে আকাশে তাকালো। তাকিয়ে অবাক! বোনটি তার পেঁচার পিঠে গেল কী করে? মিতুল আকাশের দিকে চেয়ে ডাকলো, “বোনটি।”
কে শুনবে? রাজকন্যাকে পিঠে নিয়েই অন্ধকার রাত্তিরে আকাশে ছুটতে লাগলো ঠাকুরদাপেঁচা। উড়ে উড়ে। আর হাসতে লাগলো বিটকেল সুরে।
রাজকন্যা উড়ছে পেঁচার পিঠে আকাশে। তাই দেখে দেখে মিতুল ছুটছে মাটিতে, ছুটছে আর ডাকছে, “বোনটি।” উড়তে উড়তে পেঁচাও উড়ে গেল। আর ডাকতে ডাকতে মিতুলেরও ডাক ফুরিয়ে গেল। হারিয়ে গেল বোনটি। হারিয়ে গেল ভাইটি। যাঃ!
তবুও ছুটছিল মিতুল। একটা বনে এসে পড়েছে। রাত্তিরবেলা বুঝতেও পারেনি, চিনতেও পারেনি। চিনবে কি করে? মিতুল তো আগে বনবাদাড় দেখেনি। তাই ভাবলো কী তো কী? বনের মধ্যে ঢুকে খুঁজতে লাগলো রাজকন্যাকে। গভীর বন। ছুটতে লাগলো। ডাকতে লাগলো, খুঁজতে লাগলো। এতক্ষণ ধরে তবুও আলো দেখা যাচ্ছিল, একটু একটু। এখন একদম ঘুরঘুট্টি। আকাশও নেই। ছাই আলোও নেই। যেটুকু মিতুল দেখতে পাচ্ছে তা-ও আবছা আবছা। ছুটছে। হোঁচট খাচ্ছে। আবার উঠছে।
ওমা! থমকে দাঁড়ালো কেন মিতুল? ছুটতে ছুটতে?
“হুক্কা হুয়া!” কে ডাকলো?

হুক্কাহুয়া এগিয়ে এলো। মিতুলের পথ আগলে দাঁড়ালো। মিতুল প্রথমটা গতমত খেয়ে গেছলো। ডাক শুনে। ভয় পেলো না।
হুক্কাহুয়া সামনে দাঁড়ালো মিতুলের। চোখগুলো বড় বড় করে বললে, “কেরে তুই? ছোট-খাটো, বেঁটে-খাটো, গেঁড়ি-মেড়ি-তেড়ি!”
হেসেই ফেলল মিতুল। গেড়ি-মেরি-তেড়ি! সে কী রে বাবা! অত দুঃখেও মজা লাগলো, শিয়ালের কথা শুনে। বললে, “আমি মিতুল, ছোট্ট পুতুল।”
“আয় তোকে খাই।” শেয়াল ধমকালো।
মিতুল বললো, “ওমা! কেউ আবার পুতুল খায় নাকি! কী রাক্ষস!”
“কী আমায় রাক্ষস বললি। আমি রাক্ষস হতে যাব কী দঃখে! আমি শেয়াল, হুক্কা হুয়া!”
“ও তুমিই বুঝি শেয়ালভায়া?”
অমন রাগে টকটক চোখ দুটো শেয়ালের, কেমন যেন ফস করে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ছেলেটা তাকে ভাই বললে! আহা-রে তাহলে তো ছেলেটা ভালো। তবুও মিথ্যে মিথ্যে রাগ দেখালো। গলাটা ভারি করে বললে, “একা একা কোথা
বাঘে খাবে যে!”
মিতুল ডাকলো, “শেয়ালভায়া, শেয়ালভায়া।”
আদরে গলে গেল শেয়াল ডাক শুনে। বললে, “উঁ, উঁ°!”
‘আমার বোনকে দেখেছো?”
শেয়াল বললে, “কেমন দেখতে, বোনকে তোর?”
“আমার মত ছোট্ট, আবার আমার মত বড়। আমার মত পুতুল, আবার আমার মত মানুষ।”
“দেখেছি।”
“কোথা দেখেছ?” হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেলো মিতুল।
“ঠাকুরদাপেঁচার পিঠে। উড়ে যাচ্ছে।”
“কোন্ দিকে?”
“উই দিকে”, বলে শেয়াল সামনে দেখালো।
“আমি তাহলে ঐ দিকে যাব।”
“কোথা যাবি অন্ধকারে, বনবাদাড়ে?” বলে শেয়াল মিতুলের ছোট্ট হাতটা চেপে ধরলো।
মিতুল বললে, “অন্ধকারই হোক, আর বনবাদাড়ই হোক, বাঘই আসুক, সিংগীতে খাক, আমাকে যেতেই হবে। ও যে আমার বোন। হারিয়ে গেছে। খুঁজে বার করতে হবে না?”
শেয়ালটার মনটা যেন কেমন কেমন করে উঠলো। বললে, “কিন্তু খুঁজবি কোথায় বল তো? তা ঠাকুরদাপেঁচার পিঠে চাপলো কেমন করে?”
মিতুলের কান্না পেয়ে গেল। বললে, “জানি না।”
মিতুলের কান্না-কান্না চোখ দুটি শেয়াল স্পষ্ট দেখতে পেলে। শেয়ালের মনটাও কেঁদে উঠলো। বললে, “রাতভিতে কোথায় খুঁজবি বল তো! কোন্দিকে যাবে, কেউ বলতে পারে?” বলে একটু ভাবলো শেয়াল। তারপর বললে, “আচ্ছা, এক কাজ কর। এই রাস্তা ধরে সিধে চলে যা। খানিকটা গেলে একটা ভালুকের বাসা দেখতে পাবি। তাকে ভালো করে জিগ্যেস করবি। সে বলে দেবে।”
মিতুল বললে, “শেয়ালভায়া তুমি সত্যি ভালো।” বলে মিতুল পা-টি পা-টি হাঁটলো। এক পা গেছে কী দুপা গেছে, শেয়াল ছুট্টে তার সামনে এসে হাজির। কী ভাবলো?
বললে, “মিতুল-মিতুল ছোট্ট পুতুল, আমার পিঠে চাপ। আমি তোকে পৌঁছে দিই ভালুকের কাছে।”
মিতুলের মুখখানা উছলে গেলো খুশিতে। বললে, “সত্যি বলছ শেয়াল ভায়া?”
শেয়াল বললে, “একা একা কতক্ষণে যাবি? এইটুকু-টুকু পা ফেলে? তার চেয়ে চ আমার সঙ্গে।”
শেয়াল উপুড় হয়ে বসলো। মিতুল পিঠে উঠলো। শেয়াল ছুট দিলে।
বাব্বারে বাবা! কী সব রাস্তাঘাট। এইখানটা উঁচু। ঐদিকটা নিচু। এই দিকটা বেঁকে গেছে। ঐ পাশটা সিধে গেছে। ভয় করে।
ছুটতে ছুটতে শেয়াল বললে, “কি রে মিতুল, ভয় করছে?”
মিতুল বললে, “তুমি তো আছ?” জিগ্যেস করলে, “আরও অনেক দূর যেতে হবে বুঝি?”
শেয়াল বললে, “আর পোটাক।”
“সেখানে গেলেই ভালুক বলে দেবে?” মিতুল জিগ্যেস করলে।
“বলে দেবে। চাইকি তোর বোনের কাছে পৌঁছে দেবে।”
“তাই বুঝি? ভালুক বুঝি মন্তর জানে?”
“জানে বোধ হয়।”
“তুমি জান না কেন?”
“শিখিনি বলে।”
“তোমার বুঝি শিখতে ইচ্ছে করে না?”
শেয়াল এবার থমকে দাঁড়ালো। বললে, “মিতুল, এবার নামতে হবে।”
মিতুল নামলো। শেয়াল বললে, “আমি আর যাব না। ঐদিকে গেলেই ভালুককে দেখতে পাবি। আমায় দেখলে তেড়ে আসবে।”
“কেন?”
“ওদের স্বভাবই অমনি।”
“তুমি আদর করে ডাকলেও তেড়ে আসবে? তাহলে আমাকেও যদি তেড়ে আসে?”
“না, তোকে কিচ্ছু বলবে না। তুই যে পুতুল!”
“তাহলে আমি যাই শেয়ালভায়া।”
শেয়াল বললে, “লক্ষ্মী মিতুল!” গালে একটা চুমু খেলো মিতুলের। শেয়ালের চোখ দুটি ছলছল করে উঠলো।
দাঁড়ালো না মিতুল। হাঁটি হাঁটি পা পা করে একটু গেছে। দেখে কী, অন্ধকার কালো ঘুরঘুট্টি বন। বনের মধ্যে আরও কালো একটা কি দাঁড়িয়ে আছে! তার দিকে চেয়ে আছে। চমকে থামলো মিতুল। ভাবলো, এই বোধ হয় ভালুক।
মিতুলকে দেখে ভালুক রাগি রাগি গলায় হাঁকলো, “কে যায় রে কে যায়?”
মিতুল বললে, “আমি যাই।”
ভালুক সাংঘাতিক ধমক দিয়ে বললে “আমিটা কে?”
“আমি মিতুল।”
“মিতুল! সেডা আবার কেডা?”
“আজ্ঞে আমি। আমায় তো আপনি চিনবেন না। আমি তো কোনদিন আসিনি আপনার কাছে।”
“আজ এসেছিস কেন? আমার খিদে মেটাতে! আয়, তোকে গিলি!”
মিতুল বললে, “ওমা! আমায় গিলবেন কেমন করে! আমি যে পুতুল। গলায় আটকে যাবো।”
“আয় তবে, তোকে ছে’চি?”
“ছেঁচতে চান ছেঁচুন। কিন্তু আপনি কে জানতে পারলুম না তো?”
“আমি ভালুক।”
“ও আপনিই ভালুকদাদা?”
দাদা বলতে ভালুকের কোথায় রাগ থামবে, তা না, আরও রেগে গেল! বললে, “এই আমায় দাদা বললি কেন রে!”
মিতুল উত্তর দিলে, “বারে! দাদা বলব না? আপনি আমার চেয়ে কত বড়! দেখুন না আমি কতটুকুনি। আপনি ফুস করলে, আমি হুস করে উড়ে যাবো!”
“তবে দিই তোকে হুস করে উড়িয়ে!” তেড়ে এল ভালুকটা।
মিতুল বললে, “দাঁড়ান, দাঁড়ান। তার আগে একটা কথা জিগ্যেস করবো আপনাকে।”
“কি কথা? তাড়াতাড়ি জিগ্যেস কর।”
“আমার বোনকে না ঠাকুরদাপেঁচা পিঠে নিয়ে উড়ে গেছে। কোথায় গেছে। জানেন তো বলেন না?”
“ও! সেটা তোর বোন বুঝি?” ভালুকটা কেমন গম্ভীর গলায় তাচ্ছিল্য করে হাসলো।
মিতুল বললে, “হ্যাঁ।”
“তবে আমি জানি না!” বলে ভালুকটা মুখ ঘুরিয়ে নিলে।
“ভালুকদাদা, ভালুকদাদা, এই দেখুন না সারারাত ধরে তাকে খুঁজছি। আমায় দেখে আপনার দয়া হচ্ছে না! দিন না বলে!”
ভালুকটা চেঁচিয়ে উঠলো, “জানলেও বলবো না!” বলেই মিতুলকে ফুস করে উড়িয়ে দিতে গেলো।
ফুস করবে কী! কেমন যেন কাঁপতে লাগলো ভালুকটা। কাঁপতে কাঁপতে পড়েই গেলো। পড়ে গোঁ গোঁ করতে শুরু করে দিলে।
মিতুল ভাবলো, বাবা এ আবার কী! অসুখ-বিসুখ করলো নাকি! সঙ্গে সঙ্গে গায়ে হাত বুলুতে বুলুতে জিগ্যেস করলে, “কি হয়েছে? কি হয়েছে ভালুকদাদা?”
কি আবার হবে? ভালুকদাদাকে জ্বরে ধরেছে। মিতুল আর অতশত জানবে কি করে? জানবে কি করে যে থেকে থেকে ভালুকের জ্বর হয়। তাই খুব আদর করে ভালুকের মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
একটু পরেই জ্বর ছাড়লো। উঠে বসলো ভালুক।
মিতুল ব্যস্ত হয়ে বললে, “উঠবেন না। উঠবেন না। শুয়ে থাকুন। আমি গায়ে হাত বুলিয়ে দিই।”
ভালুকের কোথায় রাগ আর কোথায় কী! গলে জল। এতক্ষণ তিরিক্ষি গলায় বকাঝকা করছিল। এখন একেবারে ঠাণ্ডা! বেশ নরম গলায় বললে, “বাঃ বেশ লক্ষ্মী ছেলে তো! চ তোর বোনকে খুঁজে দিই।” উঠে দাঁড়ালো ভালুকটা।
মিতুল বললে, “এ আবার কেমনতর অসুখ! এই হলো, এই ভালো হয়ে গেলো!”
ভালুক বললে, “আমাদের জ্বর হলে অমনিই হয়। এই ধরলো। এই ছাড়লো।”
মিতুল বললে, “ভাগ্যিস জ্বর হওয়ার আগে আমায় গিলে খাননি! তা হলে হয়তো, জ্বর আর ছাড়তোই না। যা রাগ আপনার!”
“হেঁ হেঁ হেঁ, যা বলেছিস!” বলেই ভালুকটা কেমন হাসতে লাগলো। হাসতে হাসতে নিচু হয়ে বসলো। বললে, “নে, আমার পিঠে চাপ।”
মিতুল পিঠে চাপতে চাপতে বললে, “আপনি বুঝি জানেন, আমার বোনটি কোথায় আছে?”
“আমি জানি না, নেকড়ে জানে।”
“সে আবার কে?”
“তার কাছেই তোকে নিয়ে যাচ্ছি।”
ভালুক হাঁটা দিলে। মিতুল দুলতে লাগলো ভালুকের পিঠে বসে।
বেশ কিছুটা যাবার পর ভালুক থামলো।
মিতুল জিগ্যেস করলে, “দাঁড়ালেন যে। আমার বেশ লাগছে। আপনার পিঠটা বেশ নরম!”
ভালুক বললে, “নেকড়ের বাসা এসে গেছে। নেমে পড়।”
“এসে গেছে?” ভালুকের পিঠ থেকে নামতে নামতে জিগ্যেস করলে মিতুল। “কোন্দিকে?”
“উই দিকে।”
“আপনি যাবেন না?”
“আমি গেলে তোর কাজ হবে না!”
“তবে গিয়ে কাজ নেই। আমি একাই যাচ্ছি।” মিতুল একা একা চলে গেলো।
ভালুকটা মিতুলের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মায়া লাগছে ছেলেটার জন্যে। আহা-রে বেচারা রাতভিতে বোনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে! বনে বনে।
দেখতে দেখতে মিতুল চলে গেলো। ভালুকের চোখের আড়ালে। খানিকটা গিয়েই দেখে, কী ওটা? নেকড়েটা? তার চোখ দুটো জ্বল-জ্বল। ঠোঁট দুটো খাই-খাই। কান দুটো খাড়া-খাড়া। দাঁতগুলো বার করা। মিতুলের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রথম যেন ভয় ভয় করলো মিতুলের। তবু সাহস এনে দাঁড়ালো তার সামনে। বললে, “নেকড়েমামা, নেকড়ে মা—”
কথা শেষ করতে হল না।
“গাঁক!” কী বিকট হাঁক দিলে নেকড়েটা। হাঁক দিয়েই লাফ দিলে। একেবারে মিতুলের ঘাড়ে। মিতুল তো ছোট্ট। টুপ করে বসে পড়ল। আর নেকড়েটা শুকনো মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে ধাঁই করে, মিতুল সঙ্গে সঙ্গে ভোঁ কাট্টা!
ভোঁ কাট্টা কী! বাঘ তো বাঘ, নেকড়ে বাঘ! ছাড়বার পাত্তর নাকি! উঠে পড়েই আবার লাফ। মিতুলের দিকে। মিতুলও গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। নেকড়েটার মাথা ঠুকে গেছে। ঠুকবি তো ঠোক গাছের গুঁড়িতে। উঃ হু হু হু! কী জোর লেগেছে। লাগলে কী, উঠেই চরকি বাজি। গাছের চারদিকে ছুটোছটি লাগিয়ে দিলে। মিতুলও ছুটছে, লুকোচ্ছে। নেকড়েও ছুটছে, খুঁজছে। একেবারে লুকোচুরি খেলা। বনের ভেতর লুকোচুরি খেলতে ভারি মজা। মজা না ছাই! মিতুলের প্রাণ যায় যায়! নেকড়ের সঙ্গে পারা কি চারটিখানি কথা! এক গাছ থেকে আর এক গাছ। এক পাশ থেকে আর এক পাশ। সামনে থেকে পেছনে। ছুটছে। দাঁড়াচ্ছে। বসছে। হাঁপাচ্ছে। কতক্ষণ পারবে নেকড়ের সঙ্গে? ব্যস! নেকড়েটা ধরে ফেলেছে মিতুলকে। চেপে ধরেছে থাবা দিয়ে। মিতুলের দম বেরিয়ে যাবার গোত্তর!
ওমা! একী! একী! মিতুলের ভালুকদাদা এসে পড়লো কোত্থেকে? কোথা ছিল?
লুকিয়ে ছিল। ঝাঁপিয়ে পড়লো একেবারে নেকড়ের ঘাড়ে। জাপ্টে ধরলো। নেকড়ে ধাক্কা খেয়ে টাল রাখতে পারল না। টুক করে বেরিয়ে এলো মিতুল। নেকড়ের থাবার ভেতর থেকে। তারপর যা লেগে যা ঝটাপটি। নেকড়েতে আর ভালুকে।
ঝটাপটি কামড়া-কামড়ি। খিমচো-খিমচি। রক্তা-রক্তি। এ কামড়ায়, তো ও খামচায়। এ মারে, তো ও পড়ে। কী ভয়ঙ্কর চিৎকার।
মিতুল বেরিয়ে পড়েছে। পড়েই ছুট-ছুট-ছুট। নেকড়ের চোখ তো! ঠিক দেখতে পেয়েছে! ভালুককে ছেড়ে মিতুলের দিকে ছুটলো! ভালুক ঝট করে নেকড়ের ল্যাজটা টেনে ধরলে। আবার লেগে গেল ধাঁই ধপাধপ। মারলে ঝটকা। ছুটলো নেকড়ে। ছুটলো ভালুক।
মিতুলও অনেকটা ছুটে গেছে। গেলে কী হবে? নেকড়ের দৌড়ের সঙ্গে পারবে কেন? মিতুল ছুটছে আগে আগে। নেকড়ে ছুটছে পাছে পাছে। সব পেছনে ভালুকদাদা।
সামনে একটা বাঘ! এই খেয়েছে! গায়ে তার ডোরা ডোরা দাগ! বাঘবাবাজি আলিস্যি ভাঙছিল আনমনে। চেঁচামেচি শুনে পিছন ফিরে চমকে চাইলো। চেয়েই দেখে তার পেছনে একটা ছোট্ট মত মানুষ! দেখেই বাঘের চক্ষু ছানাবড়া। “বাপরে” বলে ল্যাজ গুটিয়ে মার ছুট। ল্যাজ আর গুটুতে হলো না! তার আগেই মিতুল বাঘের ল্যাজ ধরে ফেলেছে। ল্যাজে সুড়সুড়ি! মারলে লাফ গাঁক করে! বন কেঁপে উঠল। মিতুলের বুকটা দুরদুর করে উঠলো। তবু ল্যাজ ছাড়লো না। বাঘও ছুটছে। ল্যাজ ধরে, ল্যাজের ওপর বসে মিতুলও ছুটছে।
বাঘ ছুটেছে আগু, আগু,
বাঘের ল্যাজে মিতুল বাবু।
নেকড়ে পিছে মারছে ছুট;
ছুটছে ভালুক থুপুস থুপু।
ছুট। ছুট। ছুট।
বাঘের সঙ্গে পারবে কেন? ছুটতে ছুটতে কে কোথায় পিছিয়ে গেল। ভালুকও রইলো না নেকড়েও রইলো না। শুধু বাঘের ল্যাজের ওপর বসে রইলো মিতুল। চুপটি করে। বাঘ কিন্তু ছুটছেই।
যাঃ চলে থামে না তো! কতক্ষণ হয়ে গেলো! কী বিচ্ছিরি গন্ধ। বাঘের গায়ে গন্ধ! মিতুল আর অতশত জানবে কেমন করে? জানবে কেমন করে যে এটা বাঘ! অন্ধকারে সামনে যা পেয়েছে তাই ধরে ফেলেছে। বাঘের গন্ধ এমন বিচ্ছিরি!
খুব বেঁচে গেছে কিন্তু মিতুল! নেকড়েটা আর একটু হলেই গিলে ফেলতো! তখন কি হতো? কোথায় থাকতো মিতুল আর কোথায় তার বোনটি!
আশ্চর্য এই বনের জন্তুরা! কেউ মিতুলকে ভালবাসলো। আদর করলো। তার বোনটিকে খুঁজে দেবার জন্য কত চেষ্টা করলো। কেউ মারতে এলো। কেন এমন হয়?
এ এক আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়েছে মিতুল। কিছুতেই থামছে না কেন, এই ছুটন্ত জন্তুটা! সত্যি গায়ের গন্ধটা যাচ্ছেতাই। পেটের নাড়ি-ভুঁড়ি বেরিয়ে আসে! নিজের নাকটাও যে চেপে ধরবে মিতুল তারও উপায় নেই। তাহলেই হাত ফসকে আলুরদম! লাফিয়ে পড়বে মিতুল? না, সাহস হচ্ছে না। কিন্তু কতক্ষণ এমনি করে থাকা যায়! এমনি করে বাঘের ল্যাজের ওপর বসে!
মিতুল আর থাকতে পারলো না। ল্যাজ টেনে ডাক দিল, “ওগো মশাই, থামুন।”
মিতুলের কথা শুনতেই পেলো না বাঘটা।
মিতুল আবার ডাকলো, “মশাই, মশাই, থামুন। আমায় ছেড়ে দিন। আমি নেমে পড়ি। আপনার গায়ে বিচ্ছিরি গন্ধ!”
তবু শুনলো না বাঘটা।
মিতুল ভাবলো, আচ্ছা জ্বালাতনে পড়া গেল তো! এবার আর ডাকলো না। এক রামচিমটি কেটে দিল বাঘের ল্যাজে। বাঘটা “গাঁক-ক-ক” করে চেঁচিয়ে উঠলো। ল্যাজটা পাক দিয়ে মারলে এক ঝাপটা। মিতুল হুস! ল্যাজ ফসকে তীরের মত আকাশে উড়ে গেলো! বাব্বা ঝাপটার কী জোর!
মিতুল গাছের মাথা, গাছের ফল, গাছের পাতা, গাছের ফুলে ধাক্কা খেতে খেতে কোথায় যে গিয়ে পড়ল কেউ জানতেও পারলো না।
রক্ষে! মিতুলের খুব একটা লাগলো না। লাগবে না তো জানাই। অমন কত লাফ দিয়েছে মিতুল, যখন নাচ দেখাতো! ফুঃ! এ তো কিছুই নয়! কিন্তু যারা কখনও মিতুলের নাচ দেখেনি, তারা ভাববে নিশ্চয়ই ওর দফা শেষ!
যতই হোক ভয় পেয়েছিল মিতুল। আচমকা ল্যাজের ঝাপটা খেয়ে ওর নিজেরই মনে হয়েছিল এই বুঝি শেষ।
না। যেখানে পড়লো মিতুল বনের শেষ শেষ সেদিকটা। উঠে দাঁড়ালো। কেউ কোত্থাও নেই। চারিদিকে নিঃঝুম। নিঃসাড়! কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে মিতুলের। কিচ্ছু ভাবতে পারছে না। এতদিন ঘরের মধ্যে ছিল। কিচ্ছু জানতো না। বাইরে এত গোলমাল! এত ঝামেলা! বিচ্ছিরি তো!
একটি পাখি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ডেকে উঠলো। গাছের ডালে। চমকে চাইলো মিতুল। হয়তো স্বপ্ন দেখছে পাখিটা। কী আরাম এই সময়ে যারা ঘুমিয়ে থাকে! মায়ের কোলের পাশে যদি ঘুমুতে পায় মিতুল চুপটি করে! দূর! মিতুল তো পুতুল। ওর আবার মা কোথায়?
সামনে ওটা কী? থতমত খেয়ে গেল মিতুল। একটা যেন বাড়ি-বাড়ি! তাই তো! বনের মধ্যে বাড়ি! কে করেছে রে বাবা!
এগিয়ে গেলো মিতুল। বাড়িটার দিকে। ঝোপের মধ্যে যেন জুজুবুড়ি। মাথা মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা জানলাগুলো বন্ধ। কী আছে ভেতরে? ঠেলা দিলো মিতুল দরজাটা আস্তে আস্তে। হঠাৎ মনে হলো তার বোনটিকে কেউ বন্দী করে রাখেনি তো এখানে? মিতুল আবার ঠেলা দিলো। ঠেলা দেওয়ার যা বহর! একে তো ঐটুকুনি দেখতে। অত বড় দরজা নড়েও না, চড়েও না।
না, দরজা ঠেলে ঢোকা যাবে না ঘুরতে লাগলো বাড়ির চারপাশে। দেখতে লাগলো বাইরে থেকে। কই, ঢোকার রাস্তা?
আচ্ছা, ঐ নর্দমাটার ভেতর দিয়ে ঢোকা যায় তো! গুঁড়ি মেরে! হেঁট হয়ে দেখতে লাগলো মিতুল! মাথাটা সেঁধিয়ে দিলো নর্দমার ভেতরে। হামাগুড়ি দিলে। বাঃ। একেবারে সরসর করে ঢুকে গেল মিতুল ভেতরে।
একটা অন্ধকার ঘর। ঘুরঘুট্টি। আলতো পায়ে ডিঙি মেরে দেখতে লাগলো মিতুল। এদিকটা উঁকি মারলে। ওদিকটা ঝুঁকি দিলে। কেউ কোত্থাও নেই। খাঁ খাঁ করছে।
হঠাৎ কিসে পা পড়লো? হোঁচট খেলো মিতুল। আর একটু হলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছলো। বসে পড়লো মেঝেতে। মেঝেতে একটা মস্ত বড় পোঁটলা। কী বাঁধা আছে ভেতরে। টানাটানি লাগিয়ে দিলে।
ফস করে খুলে গেল পোঁটলাটা। যাঃ। টুংটাং, টিংটিং, ঝুনঝুন, টুনটুন কত রকমের বাজনা বেজে উঠল। তারপর চোখের সামনে আলো-আলো-আলো। ঝিকমিক করে উঠলো অন্ধকার ঘরটা। ঘর ভর্তি ছড়িয়ে গেল, মণি-মুক্তা-চুনি পান্না। এই সব্বনাশ করেছে!
অবাক! মিতুলের চোখ দুটি ঝলসে যাচ্ছে। অবাক চোখে চাইছে। আর ভয়ে বুকটা কাঁপছে। কী হবে এবার?
কী আর হবে? ঘরে কেউ থাকলে, তবে তো!
ঘরে কেউ নেই। তবে এ কী গুপ্তধন! বনের মধ্যে কোনো আছে! হাতে নিয়ে দেখতে লাগলো মিতুল। একটি একটি। ভাবতে লাগলো, আহা-রে! তার বোনটি যদি থাকতো! মানিক দিয়ে সাজিয়ে দিতো!
ঘরটা মস্ত বড়। মিতুল স্পষ্ট দেখতে পেলে। ঘরে পেল্লাই দেরাজ। তালা আঁটা। মোটা মোটা শেকল দিয়ে বাঁধা দেরাজগুলো। এক কোণে একটা নড়বড়ে খাট। বিছানা পাতা তিনটে বালিশ। খালি পড়ে আছে। আলনায় জামা ঝোলানো। কিসের যেন বাসা কড়ি-কাঠে! নোংরা। চামচিকে হবে হয়তো! আর ওটা? ওটা কী? ওরে বাবা! চকচক করছে একটা তরোয়াল। এই সেরেছে! এ কোথায় ঢুকেছে মিতুল!
দেওয়ালের গায়ে একটা টিকটিকি। টিকটিক ডেকে উঠলো। ভাঙা দেয়ালের গায়ে কালো কালো ঝুল। বড় বড় মাকড়সা। মিতুলের মনে হলো তবে কী এটা কোন রাজার বাড়ী! অনেক অনেক কালের! ভাঙা পড়ে আছে! রাজার মুক্তা মানিক পান্না চুনির ধনদৌলত লুকনো এখানে! হবে হয়তো! কিন্তু মিতুলেরই বা কি হবে এত সব দামী দামী জিনিস নিয়ে? ও তো পুতুল! পুতুলের তো আর এসবের দরকার নেই! পুতুলের টাকাও চাই না, দামী দামী জিনিসও চাই না, খাওয়াও চাই না। কিচ্ছু না। শুধু আদর পেলেই হলো। একটু একটু মিষ্টি মিষ্টি আদর, এখন তাকে কেউ আর আদর করবার নেই। কেউ না।
সত্যি সত্যি, তার বোনটি কোথা গেল? রাজকন্যা পুতুলটি? আর কি কোনদিন দেখা পাবে না তার মিতুল?
কিসের যেন একটা শব্দ এলো! খস খস! কারা যেন আসছে! ফিসফিস! কারা যেন কথা বলছে! কান পেতে রইলো মিতুল! হ্যাঁ তো রে! ঝন ঝন ঝন! বাইরের দরজাটা নড়ে উঠলো। কী হবে এখন! কী করবে মিতুল? পালাবে?
ঘরের দরজা খুলে গেল। হুট করে। মিতুল চট করে লুকুতেও পারলো না। পালাতেও পারলো না। চুপটি করে বসে রইল মেঝের ওপর। এক কোণে। চারিদিকে ছড়ানো শুধু মানিক আর মানিক। মুক্তো আর সোনা।
তিনটে লোক ঢুকলো! থমকে দাঁড়ালো লোক তিনটে। হকচকিয়ে। তাড়াতাড়ি ঘরের আলো জ্বেলে দিলে। মিতুলের চোখ ঝলসে গেলো। কতক্ষণ আলো দেখেনি মিতুল! ভালো করে চেয়ে দেখতেই মিতুল আর মিতুল নেই। পিলে শুকিয়ে গেছে। আরে বাবা! কী ভয়ানক দেখতে তিনজনকে! মাথায় কালো-কালো ফেট্টি। চোখে কালো কাপড়। এমন করে বাঁধা, চোখ দুটি ছাড়া কিচ্ছু দেখা যায় না। গায়ে কালো কুচকুচে জামা। একেবারে হাঁটু পর্যন্ত। কোমরে একটা করে ছোরা! পিঠে মস্ত মস্ত বোঝা।
ব্যস্ত হয়ে উঠলো লোক তিনজন। এসব ছড়ালো কে ঘরে? মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। ঘরের এদিকে চোখ ঘুরছে। ওদিকে চাইছে। কী ব্যাপার!
“ঐ জানলাটা ঠেলে দেখ!” একজন আর একজনকে ফিসফিস করে বললে।
“জানলা বন্ধ।” উত্তর এলো।
“দেরাজের পেছনটা টান।”
“পেছন খালি।”
“খাটের নিচটা?”
“উঁহুঁ, কেউ নেই!”
কেউ নেই তো পোঁটলা খুললো কেমন করে? এ কী ভেল্কিবাজি! ভালো করে দেখা দরকার। এটা ঠেলে, ওটা টেনে একেরারে তছনছ করে ফেললো তিন-জনে সারা ঘরটা। কিন্তু মিতুলকে কেউ দেখতেই পেলো না।
একজন বললে, “দেরাজ খুলে দেখ, সব ঠিক আছে কিনা!”
দেরাজ খুলে গেলো।
আরে বাবা! দেরাজে ঠাসা ঠাসা কী ওসব? কত গয়না! হীরে জহরৎ! কি করে লোকগুলো এসব নিয়ে? কোথা পেলো এত সব!
না, ঠিক আছে। দেরাজ ভর্তিই আছে।
দেরাজ বন্ধ হয়ে গেলো।
ভাবতে বসলো তিনজনে। আচ্ছা মজা তো! ঘরের দরজা বন্ধ, দেরাজে চাবি বন্ধ অথচ ঘরে এসব ছড়ালে কি করে?
“নিশ্চয়ই কেউ ঢুকেছিল।” একজন বললে।
“ঢুকেছিল তো কেউ কিচ্ছু নিল না! ধুৎ! ইঁদুর-টিদুরের কাণ্ড!”
পিঠের বোঝা খুলে ফেললো তিনজনে। একটি একটি করে তুলে ফেললো সেই মানিক-চুনি, হীরা-পান্না ঘরে ছড়ানো।
ঠিক তখুনি মিতুলের যেন মনে হলো পাখি ডাকছে বাইরে। ভোর হয়ে আসছে হয়তো! ঘরের ভেতর থেকে তো আর বোঝা যায় না বাইরে আলো, না অন্ধকার!
এখন কি করবে মিতুল? কোথা যাবে? যেমন করে এসেছিল ঐ নর্দমার ফাঁক দিয়ে, তেমনি করে বেরিয়ে যাবে নাকি? না, দেখতে ইচ্ছে করছে মিতুলের। দেখতে ইচ্ছে করছে লোকগুলোর ব্যাপার-স্যাপার! দেখাই যাক না!
আলো নিভিয়ে দিলে। কালো কাপড় সরিয়ে নিল চোখ থেকে। কালো ফেট্টি খুলে ফেললো মাথা থেকে। জামা খুলে শুয়ে পড়লো লোক তিনজন। তর সইলো না। সঙ্গে সঙ্গে নাক ডাকতে সুরু করে দিলে। কী রাক্ষুসে ঘুম রে বাবা!
মিতুলেরও যেন ঘুম-ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু ভয়-ভয়ও করছে ঘুমুতে। যদি ঘুমিয়ে পড়ে অঘোরে? ঘুম না ভাঙে ঠিক সময়ে! তবে? না বাবা, দরকার নেই। তার চেয়ে জেগে বসে থাকাই ভালো ঘরের কোণে।
অবিশ্যি এখন আর তেমন অন্ধকার নেই। জানলার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে একটু একটু। সকালের মিষ্টি আলো।
ইচ্ছে হলো একবার বাইরে ছুটে যায় মিতুল। সকালের আলোয় একবার ছুটে আসে। হয়তো শিশিরে টলমল করছে গাছের পাতা। ঝলমল নাচছে। টুপটাপ পড়ছে মাটিতে। ভেজা মাটির গন্ধ মিষ্টি লাগে? ভাবে মিতুল।
না বাবা, গিয়ে কাজ নেই। আবার যদি দেখতে পায় নেকড়েটা! তেড়ে আসে!
তাই গুঁড়ি-সুঁড়ি মেরে আবার নর্দমায় ঢুকে পড়লো মিতুল। ঐ নর্দমাটার ভিতর দিয়েই তো মিতুল এই ঘরে ঢুকেছে। লুকিয়ে, শুয়ে শুয়ে দেখতে লাগলো বাইরেটা।
এখান থেকে বেশ দেখা যায়। আঃ, সকালের সূর্যি কোথায় উঠে গেছে! গাছের পাতায়-পাতায় একটি-একটি মানিক যেন দোল খাচ্ছে। কত বড় একটা প্রজাপতি! রঙ-মিষ্টি পাখা দুটো দেখলেই পিঠে বসতে ইচ্ছে করে। মনে পড়ে মিতুলের সেই গল্পটা। প্রজাপতির সেই গল্প। কতদিন পুতুল নাচে এই গল্পটা দেখিয়েছে তারা। মনে পড়ে মিতুলের:
হাজার হাজার দস্যু এসেছে রাজবাড়ি লুঠ করতে। তারা রাজকন্যাকে চুরি করে নিয়ে যাবে। রাজকন্যা পাতালপুরীর স্বপ্নপুরীতে লুকিয়েছিল। লুকিয়ে থাকলে কি হয়? দস্যুদের যে সর্দার সে পাতালপুরীর সিংদরজা ভেঙে ফেললে। আটশো সিপাই তাকে রুখতে পারলো না। মারতে পারলো না। মারবে কেমন করে? তার সারা গায়ে লোহার বর্ম। হাতে তরোয়াল। মন্ত্র পড়া। যার গায়ে লাগবে নির্ঘাত মরণ।
দস্যুসর্দার পাতালে ঢুকে পড়লো। স্বপ্নপুরীর গোপন ঘরে ধাওয়া করলে। আর তখন রাজকন্যা? দস্যুকে দেখতে পেয়ে “মাগো” বলে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়লো। ঠিক তখুনি কোথায় ছিল রাজকন্যার ঘোড়া! রাজকন্যাকে পিঠে নিয়ে ছুট দিলো। দস্যুসর্দার সে-ও ছুটলো। হলে কী হবে? ঘোড়া ছোটে তীরের মতন। তাকে ধরতে পারবে কেন দস্যুসর্দার? ঘোড়ার সঙ্গে কে ছুটবে? দস্যুসর্দার তখন করলো কি নিজের মন্ত্ৰপড়া সেই তরোয়ালটা মাটিতে খুব জোরে ঠুকে দিলে। মাটি চৌচির। সঙ্গে সঙ্গে পাঁচটা ঘোড়া মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো। একটার জিন টেনে ধরলো দস্যুসর্দার। পিছু নিলো রাজকন্যার। ছুটতে ছুটতে ছুটতে কত বন পেরিয়ে গেলো। কত পাহাড়। কত নদী। কত নগর। কত শহর। রাজকন্যাকে ধরতেই পারে না দস্যুসর্দার। থামলো হঠাৎ দস্যুসর্দার। নামলো ঘোড়ার পিঠ থেকে। মন্ত্ৰপড়া তরোয়াল দিয়ে নিজের ঘোড়ার গলাটা খান খান করে কেটে ফেললে। আর বলবো কী, ঘোড়ার গলা দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরয় আর শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে সেনা বেরিয়ে আসে রক্তের সঙ্গে সঙ্গে। দস্যুসর্দার হুকুম দিল সেনাদের, “ঘিরে ফেলো রাজকন্যাকে।” অমনি হাজারে হাজারে সেনা ছুট দিল রাজকন্যাকে ধরবার জন্যে।
কত নগর ভেঙে চুর-চুর হয়ে গেলো। কত বন মাটির সঙ্গে মিশে ধুলো ধুলো হয়ে গেলো। কত মানুষ মরলো হাজারে হাজারে, লাখে লাখে। পূব কাঁপলো। পশ্চিম কাঁপলো। দক্ষিণ গমগম। উত্তর টলমল।
ঘিরে ফেললো তারা রাজকন্যাকে। আর নিস্তার নেই। কোথা লুকাবে? কোথা পালাবে?
ছুটতে ছুটতে রাজকন্যার ঘোড়া পথ হারালো। একেবারে দস্যুসেনার মুখোমুখি! হা-রে-রে-রে করে ছুটে আসছে তারা! এবার কী হবে?
ঠিক তখুনি আকাশ ভরে গেলো রঙে রঙে। কত রঙ। এত প্রজাপতি এলো কোথা থেকে? সুর্যের আলোয়, আকাশের নীলে আর প্রজাপতির রঙে ঢেউ জাগালো। অবাক হলো দস্যুর সেনারা! ছুটতে ছুটতে থমকে দাঁড়ালো তারা। চমকে চাইলো আকাশে। দেখলো সব বড় যে প্রজাপতি, তার পাখায় চেপে রাজ কন্যা উড়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার প্রজাপতি তাদের রঙিন পাখার ছায়া মেলে রাজকন্যাকে আগলে আছে।
দস্যুসর্দার চেঁচিয়ে উঠলো পাগলের মতো, “পাকড়াও!”
তখন প্রজাপতিরা গান ধরলো। আকাশের আলোয়। সামনে পাহাড়। ছুটলো দস্যুসর্দার রাজকন্যাকে ধরতে। পাহাড়ের পাথর কেঁপে উঠলো। প্রজাপতিরা নেচে উঠলো। দুহাত ছুঁড়ে পাহাড়ের চূড়ার ওপর্ লাফিয়ে উঠলো দস্যুসর্দার। গর্জন করে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে পা ফসকে গেল। গড়াতে গড়াতে একেবারে মস্ত খাদে। সেখানে গর্জন নেই। সেখানে চিৎকার নেই। সব নিশ্চুপ।
আকাশে খালি গান। প্রজাপতির গান। প্রজাপতির গান শুনতে শুনতে রাজকন্যা ভেসে চললো হাওয়ায়-হাওয়ায়। যেতে যেতে হারিয়ে গেলো রঙ। প্রজাপতির গান। হারিয়ে গেলো রাজকন্যা। কোথায়? কেউ জানে না।
কেন জানি গল্পটা বেশ লাগে মিতুলের। ভালো লাগে একা-একা বসে বসে ভাবতে। মনটা নেচে ওঠে। কত ছবি! কত আলো! কত রঙ! সত্যি দস্যুকে জব্দ করতে ভারি মজা। একটা তরোয়াল নিয়ে বীরের মত বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়। তারপর লাগাও লড়াই। ভাবতেই মনটা শিউরে ওঠে।
শিউরে ওঠে মিতুল। হঠাৎ মনে হয় লোকগুলো দস্যু নয় তো! ঐ তিনটে লোক। এতক্ষণ ভুলেই গেছলো মিতুল লোক তিনটের কথা। এক্কেবারে ভুলে গেছলো গল্পটা ভাবতে ভাবতে!
হ্যাঁ, হতে পারে দস্যু। তা না হলে এখানে লুকিয়ে থাকার কী মানে? এই নির্জন বনে, এই ভাঙা বাড়িতে? হয়তো সারারাত লুঠতরাজ করবে আর দিনের বেলা ঘুমুবে! দস্যু যদি না হবে তো, এত সোনা-রুপো এলো কোথা থেকে এদের কাছে?
ঠিক কথা। ঠিক ভেবেছে মিতুল। ঘুম-চুপ-চুপ রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, ওরা তখন জাগে। অন্ধকার রাতে ওরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে। অন্যের জিনিস কেড়ে নেয়। কেউ যদি রুখতে আসে, কোমরের ছোরা দিয়ে তার বুকের রক্ত বার করে নেয়। ওদের দয়াও নেই, মায়াও নেই।
লোকগুলো এখনও ঘুমুচ্ছে। এখনও নাক ডাকাচ্ছে। নর্দমার ভেতর লুকিয়ে লুকিয়ে মিতুল স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। একটা বুদ্ধি এলো মিতুলের মাথায়।
নর্দমার থেকে বেরিয়ে এলো মিতুল আবার ঘরে। একটা পোঁটলার মধ্যে হাত গলিয়ে দিল। এক মুঠো সোনায় বসানো পাথর নিজের পকেটে পুরে নিলে। জানালার পাশেই একটা দেরাজ। দেরাজের পাশেই খাট। জানালার ওপরে উঠতে মিতুলের কষ্ট হলো না। জানালায় উঠে দেরাজটা ধরে ফেললো। দেরাজের পেছন দিকটা মিতুলের পা রাখার মত বেশ খাঁজ কাটা-কাটা। খাঁজে খাঁজে পা রেখে মাথায় উঠে পড়লো মিতুল। দেরাজের মাথায় বসে উঁকি মারতে লাগলো ঐতিনটে লোকের দিকে।
তারপর?
“টকাস!” পকেট থেকে একটা পাথর বার করে একজনের মাথায় ছুড়ে দিয়েছে মিতুল।
“উঁঃ!” মুখে আওয়াজ করে লোকটা এপাশ থেকে ওপাশে ঘুরে শুলো।
আবার একটু পরে “টকাস!” আবার মেরেছে মিতুল।
“উঃ উঃ উঃ!” না, ঘুম ভাঙলো না। আবার নাক ডাকাতে শুরু করে দিলে।
“টকাস!” এবার একটা বড় পাথর ছুড়েছে মিতুল। পড়েছে মাথায়। ঝনঝন করে উঠলো লোকটার মাথা। এক ঠেলা মারলে পাশের লোকটাকে, “এই।”
পাশের লোকটা তড়বড়িয়ে উঠলো, “কি রে?”
“মারছিস কেন?”
“কে মারছে?”
“তুই তো!”
“আমি? কেন মারবো?”
“মারলি না?”
“স্বপ্ন দেখছিস্। আমি ঘুমুচ্ছি দেখতে পেলি না?”
“স্বপ্ন দেখছিলুম! টকাস টকাস করে মারলি তুই। স্বপ্ন দেখলে কারো লাগে নাকি?”
“আচ্ছা নে বাবা! আর চেঁচাস না। ঘুমো।”
আবার দুজনে ঘুমিয়ে পড়লো।
হাসি পেয়ে গেল মিতুলের। একটু হলেই খিলখিল করে হেসে উঠতো। খুব রক্ষে! সামলে নিলো। হাসির আর দোষ কী! যা করে ঘুমুচ্ছে লোক তিনটে। একজন চিত হয়ে পড়ে আছে। মুখখানা হাঁ করে। একজন আবার চোখ চেয়ে চেয়ে নাক ডাকাচ্ছে। আর একজনের পেট নাচছে।
আবার ছুড়লো মিতুল। এবার একটা পাথর। বেশ বড়। এই রে যা! হাঁ করা লোকটার মুখের ভেতর ঢুকে গেছে।
“খক খক খক!” ঘুম ভেঙে গেছে। কাশতে কাশতে দম আটকাবার যোগাড়!
আর দুজনেরও ঘুম মাথায় উঠে গেলো। চমকে ধড়ফড়িয়ে উঠতে যাবে, আর “ধাঁই।” কাশতে কাশতে লোকটা মেরেছে এক বিরাশি সিক্কার ঘুসি একজনের পিঠে।
“এই মারলি কেন?” যাকে মারলে সে তেড়ে উঠেছে।
“আমার গালে তুই পাথর পুরে দিবি কেন?” রেগে লোকটার চোখ মুখ লাল।
“না জেনেশুনে যার তার নামে দোষ!” বলে সে-ও এক থাপ্পর কসিয়ে দিলে লোকটাকে। তারপর লেগে গেল ঝটাপটি। জাপ্টাজাপ্টি। কোস্তাকুস্তি। ঘরের ভেতর হুলস্থূল কাণ্ড!
দুজন লড়ছে, একজন থামাচ্ছে। ছাড়িয়ে দিচ্ছে। কে কার কথা শোনে! ঘরের মধ্যে তুলক্রাম! দুজনের গায়ে কী জোর! ও ফেলছে একবার। এ উঠছে একবার। ও মারছে ঢুঁ। এ মারছে গোঁত্তা!
দেখেশুনে মিতুলের চক্ষু চড়কগাছ। কী হবে? লড়াই থামবে না তো!
এইরে বোধহয় দুটো লোকই মরবে! মুখ ফসকে গেলো মিতুলের। ঐ দেরাজের মাথার ওপরে বসে চেঁচিয়ে ফেলল, “ও মশাই। থামুন, থামুন!”
কথা বলেই জিভ কেটেছে মিতুল। সব্বনাশ! কী হবে এখন?
আর হবে! কোথায় লড়াই, আর কোথায় কী! চমকে গেলো তিনজনে। মুখ শুকিয়ে আমসি! ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো এ ওর মুখের দিকে।
“কে কথা বলে?” একজন চাপা গলায় জিগ্যেস করলে।
চটপট ছোরা তিনটে হাতে নিল তিনজনে। একজন দেরাজের পেছনটা উঁকি মারলে।
“পেছনে নয়। ওপরে।” আর একজন বললে।
বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো মিতুলের। এইরে! মিতুল তো ওপরেই বসে আছে। যদি দেখে লোকগুলো।
দেখলো ওপরে। কিন্তু মিতুলকে দেখতেই পেলো না। দেরাজটা নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া লাগিয়ে দিলে। মিতুল আর একটু হলেই পড়ে গেছলো বেটক্কা। মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেলো মিতুলের। চেঁচিয়ে উঠলো, “দেরাজ টানলে কী হবে? আমি বাইরে।”
মিতুলের তো সরু গলা। কথা শুনলে কে বলবে বাইরে না ভেতরে? লোক তিনটে থতমত খেয়ে থমকে দাঁড়াল। একজন তাড়াতাড়ি দরজাটা খুলতে গেলো। আর একজন ধাঁ করে চেপে ধরলো তাকে। ইশারা করলো, “খুলিস না।”
“কেন?”
“ভালো করে দেখ আগে।”
“আমার হাতে ছোরা আছে তো!”
“কজন আছে আগে না দেখলে বিপদ হবে!”
“তাই দেখ তবে।”
কথাগুলো মিতুলের কানে ফিস ফিস করে পৌঁছে গেলো। একটা লোক দরজা খুললো। আস্তে আস্তে। খুব আস্তে। যেন শব্দ না হয় একটুও। একটু ফাঁক করলো দরজাটা। আর একটু। উঁকি মারলো। দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে। ঠিক তখনি মিতুল সাড়া দিল, “টুকি!”
“দড়াম।” কী জোর দরজাটা বন্ধ করলে লোকটা ভয়েময়ে। ধড়াস ধড়াস করে বুক উঠছে নামছে। ঠকঠক করে কাঁপছে। খিল এঁটে দিল।
“কজনকে দেখলি?” আর একজন জিগ্যেস করলে।
“একজনকেও না।”
“তবে দরজাটা না খুলে জানলাটা ফাঁক করে দেখ।”
জানলাটা খুললে। একটুখানি। আরও একটু। সবটা। যাঃ চলে! কেউ কোত্থাও নেই।
“কইরে! কেউ তো নেই!”
“তবে চ দেখি বাইরেটা! দরজা খোল।”
“খুলবি?”
দরজা খুলে গেলো।
একটুখানি উঁকি। তারপর এক পা। তারপর পা পা। তারপর একেবারে বাইরে।
এই তাল। সঙ্গে সঙ্গে মিতুল লাফিয়ে পড়লো দেরাজের মাথা থেকে। একেবারে বিছানায়। সামনেই কালো কালো জামাগুলো ঝুলছে। লম্বা। হাত দিয়ে ধরে ফেললো মিতুল একটা জামা। তারপর জামা ধরে ঝুলে পড়লো। তালগাছে ওঠার মত ওপরে উঠতে উঠতে একটা জামার পকেটে ঢুকে পড়লো। উরিব্বাস! কত বড় পকেট। গা-হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়া যায়। নাচানাচিও করা বায়। না বাবা, নাচানাচি করে কাজ নেই! চুপটি করে বসে রইল মিতুল। বসে থাকতে থাকতে ঘুম ঘুম আসছে মিতুলের। হাই উঠছে। ঘুমিয়ে পড়লো মিতুল পকেটের মধ্যে। তারপর আর কিচ্ছু জানে না।
অনেকক্ষণ মিতুল ঘুমিয়ে ছিল। কতক্ষণ আর জানবে কেমন করে? জানবে কেমন করে দিনের আলো চুপি চুপি কখন ঘরে চলে গেছে।
ঘুম ভাঙতেই আবার উঁকি মারলো মিতুল পকেটের ফাঁক দিয়ে। আলো জ্বলছে ঘরে। মোমের আলো। আলো ছড়িয়ে পড়েছে সারা ঘরে। কিন্তু ঘরে তো কেউ নেই। কাউকে দেখতে পাচ্ছে না মিতুল। কোথা গেলো লোক তিনটে। পকেটের ভেতর থেকেই মুখ উঁচিয়ে দেখলো মিতুল। বেরুতে সাহস হচ্ছে না। যদি কেউ থাকে! দেখতে পায়!
কেউ আছে নিশ্চয়ই। নইলে আলো জ্বলছে কেন? ঘরের বিছানাগুলো এলোমেলো ছড়ানো। দরজাটাও ভিতর থেকে খিল আঁটা। দেরাজগুলোও তেমনি তালা বন্ধ। একটা দেরাজের ঠিক পাশে কুলুঙ্গি। কি সব সাত সতেরো জিনিস ভর্তি রয়েছে কুলুঙ্গিতে ঠাসা ঠাসা। কুলুঙ্গির ঠিক ধার ঘেঁষে একটা সিন্দুক।
আরে! চমকে উঠলো মিতুল। সিন্দুকের মাথার ওপর ওটা কী? তাইতো!
ওমা! একটা লোক! লোকটা সিন্দুকের মাথার ওপর বসে দিব্যি ঘুম দিচ্ছে! কী ব্যাপার! বিছানা থাকতে সিন্দুকের মাথায় কেন? পাগল নাকি?
পাগল নয়। মিতুল তো জানে না। আজ ও ঘরের পাহারাদার, দুজন গেছে বাইরে। লুঠপাট করতে। বসিয়ে রেখে গেছে ঐ লোকটাকে। সকালে যা কাণ্ড হয়ে গেলো! তারপর কেউ ঘর খালি রেখে যায়!
কিন্তু খুব পাহারাদার! বেমক্কা ঘুমুচ্ছে! একেবারে সিন্দুকের মাথায়! ঘুমুবার আর জায়গা নেই?
এবার আস্তে আস্তে বেরিয়ে পড়লো মিতুল পকেট থেকে। টুক করে নিচে লাফিয়ে পড়লো। মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে মিতুলের। একটা ছোট্ট কাঠি খুঁজে নিল মিতুল। সিন্দুকটা তো অনেক নিচু, উঠতে একদম কষ্ট হলো না। চুপি চুপি লোকটার পাশে গিয়ে বসলো। খুব সাবধানে কাঠিটা নিয়ে একেবারে লোকটার নাকের ভেতর গুঁজে দিলো।
“হ্যাঁচ্চো-ও-ও-ও!” আরে বাবা! কী বাজখাঁই হাঁচি! পিলে ফেটে যাবার গোত্তর! হাঁচির ধাক্কায় সিন্দুকের ওপর থেকে মারলে ডিগবাজি মিতুল! লোকটা কেমন চাইলো বোকাবোকা! একবার এদিকে দেখলো। একবার উদিক। মিতুলকে এবারও দেখতে পেলে না। ঘুম-চোখ যে! আবার ঘুমুবার জন্যে চোখ বুজলে।
মিতুল সামলে নিল নিজেকে। উঠে দাঁড়ালো। একটা বেশ লম্বা সুতো বার করলো খুঁজে খুঁজে। এবার আর সিন্দুকের মাথায় উঠলো না। সুতোটা নিয়ে লোকটার কাপড়ের খুঁটের সঙ্গে বাঁধলো। নিচে সিন্দুকের পেছনে লুকিয়ে পড়লো। লুকিয়ে লুকিয়ে সুতোয় টান দিল টুক টুক। ছেলের সাহস দেখো।
লোকটা প্রথমে বুঝতে পারেনি। ঘুমুচ্ছে তো! একটু পরে সুড়সুড়ি লেগেছে। ঝট করে ঘুম ভেঙে গেলো। ভাবলো আরসোলা নাকি! ঘুম-চোখে হাত বাড়ালো। ধরবে আরসোলা। আর ধরবে! দেখে তো চক্ষু ছানাবড়া! আরে ব্যস! কাপড়টা যে তালে তালে নাচছে! কোথায় ঘুম আর কোথায় কী! “ওরে বাপরে” বলে সিন্দুকের ওপর থেকে মারলে এক লাফ! হুড়মুড়, দুড়মুড়, দুদ্দাড় করে ছুট। বেসামাল! মোমবাতিটায় পা লেগে গেলো। ব্যস! দপ! নিভে গেল মোমবাতিটা। লোকটা অমনি “ওরে বাবারে, মরে গেলুমরে” বলে মরণ কান্না শুরু করে দিলে। কী চিৎকার! কান ফেটে যাবার গোত্তর! কাছেপিঠে তো জন-মনিষ্যি নেই, কে শুনবে? বাবা! এত বড় একটা ধুমসো লোকের কী ভয়! ভেবেই অবাক মিতুল। মিতুলের তো ভয় করছে না।
লোকটা ঘরের দরজা খুলতে গেলো চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে। মিতুল সিন্দুকের আড়াল থেকে দেখে ফেলেছে! মিতুল লুকিয়ে লুকিয়ে, সিন্দুকের আড়াল থেকেই অমনি ধমকে উঠলো, “এই, ঘরের দরজা খুলছিস কেন?”
মিতুলের গলা শুনে লোকটার বুকের ধুকধুকি থেমে যায়-যায়! ভয়ে!
মিতুল আবার বললে, “দরজা খুলবি না। আমি তোকে খেতে এসেছি।”
গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করে দিলে লোকটা।
মিতুল এবার আরও জোরে ধমকে উঠলো, “চেঁচাবি তো গলায় বাঁশ পুরে দেবো! থাম!”
লোকটার চেঁচানি থামলো। কাঁদুনি থামলো না। ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
“তোর নাম কি?” গম্ভীর হয়ে জিগ্যেস করলে মিতুল।
“হরিহর।”
“তোর বাবার নাম কি?”
“বাসুদেব।”
“আর দুটো লোক তোর কে হয়?”
“কেউ না।”
“কেউ না? মিথ্যে বলছিস! এত সোনা-রুপো, চুনি-পান্না কোত্থেকে এলো? কার এসব?”
“আমার।”
“ঠিক করে বল!”
“আজ্ঞে সক্কলের।”
“সক্কলের! আমার সঙ্গে ঠাট্টা হচ্ছে! ঠিক করে বল, নইলে গলা কেটে দেবো।”
গলা কাটার নাম শুনে লোকটা চিতপটাং। মাটিতে শুয়ে পড়লো। কাঁদতে কাঁদতে বললে, “আজ্ঞে, গলাটা কাটবেন না। আমি সব বলছি। এসব জিনিস আমরা চুরি করে এনেছি।”
“চুরি করেছিস! কার জিনিস?”
“আজ্ঞে অনেকের।”
“সিন্দুকের চাবি কোথা?”
চুপ করে রইলো লোকটা।
মিতুল আবার জিগ্যেস করলে, “চুপ করে কেন? সিন্দুকের চাবি কই?”
“আজ্ঞে আমার কাছে তা নেই।”
“ফের মিথ্যে বলছিস? বল কোথা? নইলে হাতুড়ি মেরে মাথা ছেঁচে দেবো?”
লোকটা আবার চেঁচিয়ে উঠলো। “না না, হাতুড়ি মারবেন না। চাবি আমার কাছে।”
“সিন্দুকের মাথায় চাবিটা রাখ।” হুকুম করলো মিতুল।
লোকটা ঝোলানো কালো জামাটার পকেট থেকে এত্তোবড় একটা চাবি বার করলে। সিন্দুকের মাথায় রাখলে।
মিতুল এবার জিগ্যেস করলে, “মরবি? না বাঁচবি?”
লোকটা দু’হাত জোর করে বললে, “আজ্ঞে মরবো না, মরবো না। আমি বাঁচবো। আমাকে বাঁচান।”
“ঠিক আছে। তবে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়া।”

লোকটা দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ালো।
“আমি যতক্ষণ না বলবো, ততক্ষণ নড়বি না।”
চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইলো লোকটা।
মিতুল ঝট করে বেরিয়ে এলো সিন্দুকের পেছন থেকে। চট করে চাবিটা নিয়ে নিজের কোমরে গুঁজে ফেললে। তারপর ঐ কালো জামাটার পকেটে ঢুকে পড়লো। ঠিক আগের মতন। তারপর জামার পকেট থেকে গলা বাড়িয়ে বললে, “যা এবার।”
পড়ি-মরি করে লোকটা পালাতে গেছে। মিতুল আবার চেঁচিয়ে ডাকলো, “এই জামাটা পরলি না যে! পর জামা।”
কাঁপতে কাঁপতে জামা পরলো লোকটা। ঘরের দরজা খুললো। তারপর মার ছুট। জানতেও পারলো না, তার পকেটে, মিতুল নামে একটা ছোট্ট পুতুলও সঙ্গে সঙ্গে ছুটছে। এত বুদ্ধি মিতুলের! মিতুলের পেটে পেটে এত ছিল!
ছুটছে লোকটা বনে বনে। থামে না। দুলছে মিতুল তার পকেটে। যেন এক্কাগাড়ি চেপেছে মিতুল। যা হাসি পাচ্ছে! কী ঠকান ঠকিয়েছে লোকটাকে! কী বোকা! রাম ভীতু! ভয়ে একেবারে ভিরমি খাবার যোগাড়!
মিতুলের একটুও ভয় নেই। ভয় কিসের? ও কী কোন অন্যায় করেছে যে ভয় পাবে? যে অন্যায় করে তারই ভয়! কোমরের চাবিটা এবার বেশ আঁট-সাঁট করে জড়িয়ে রাখলো মিতুল। পকেটের মধ্যে আবার নড়াচড়া করা বিপদ। যদি টের পেয়ে যায়, না, পাবে না। জামাটা বেশ লম্বা। পকেটটাও বেশ ঢাপ্পুস। তার ওপর লোকটা ছুটছে। টের পাবে কেমন করে? তাই উঁকি মারলো মিতুল পকেটের ভেতর থেকে।
ওমা! আর তো বন নেই। বন পেরিয়ে গেছে। আকাশটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মিতুল। রাতের আকাশ। চাঁদ নেই বলে মিতুল বুঝতে পারলো না, ও গ্রামের মাঠে পড়েছে।
দুটো লোক আসছে ছুটতে ছুটতে। সামনে।
দেখতে পেয়েই মিতুল টুপ করে ঢুকে গেলো পকেটের মধ্যে। ওমা! এ যে সেই দুজন লোক। মিতুল যার পকেটে বসে আছে তারই বন্ধু দুজন।
ছুটতে ছুটতে জড়িয়ে ধরলো।
“কি রে? কি হয়েছে?”
“ঘরে কে ঢুকেছে! সব জানতে পেরে গেছে! আমি প্রাণে বেঁচে গেছি। পালিয়ে এসেছি।” হাঁপাতে হাঁপাতে বলে গেলো লোকটা। এক নিশ্বাসে।
“কে ঢুকেছে?” আর দুজন জিগ্যেস করলে।
“কি জানি! বাঁচতে যদি চাও তো পালাই চলো।” বলে লোকটা আবার ছুট দিলে। বন্ধু দুজন তাই না দেখে দে-ছুট। তার পেছনে। ভয়ে-ভয়ে!
এবার মিতুল সত্যি সত্যি হেসে ফেললো। লোকগুলো বোকার ধাড়ি। আচ্ছা ঠকান ঠকিয়েছে মিতুল। চাবিটাও পেয়ে গেছে। কিন্তু পেলেই বা কি হবে? যাদের জিনিস তাদের তো পৌঁছে দিতে পারবে না মিতুল! কেমন করে দেবে? কে জানে কোথায় তাদের ঘর! আর জানলেই বা কী! ওর কথা বিশ্বাস করবে কেউ? ও যে পুতুল। আহা-রে! যদি শাস্তি পায় ঐ লোক তিনটে! তাহলে খুব খুশি হয় মিতুল।
তিনটে লোকই ছুটতে ছুটতে থামলো। পা চালিয়ে হাঁটলো। মিতুল পকেটের মধ্যে বসে বসেই বুঝতে পারলে। “দেখি তো”, বলে আর একবার উঁকি দিলে পকেট থেকে। বাইরে। ওমা রাতের অন্ধকার ত আর নেই। ভোরের আলো ফুটছে। গাছের সবুজ পাতা ধুয়ে গেছে শিশিরের জলে। যেন কার কান্নার জল। গড়িয়ে পড়ছে। আকাশ কি কেঁদেছে সারারাত! সেদিন মিতুলের গলাটি জড়িয়ে এমনি করেই কেঁদেছিল তার বোনটি!
এতক্ষণ ভুলেই ছিল মিতুল। ভুলে ছিল তার বোনটির কথা। রাজকন্যার কথা! ভুলবে না? যা এতক্ষণ হলো!
কিন্তু তার বোনটিকে এখন সে কোথায় খুঁজে পাবে? পথ ঘাট কিচ্ছু জানে না। জানলেই বা কী! এত বড় পৃথিবী? সে তো ছোট্ট পুতুল! কেমন করে খুঁজে পাবে আর একজন ছোট্ট পুতুলকে। তা ছাড়া দু’পা অন্তর বিপদ! পৃথিবীতে কেউ যেন শান্তিতে থাকতে চায় না! সবাই সবাইকে ঠকাচ্ছে! বিচ্ছিরি!
রোদ উঠেছে। এতক্ষণ সামনোটা কয়াশায় ঢাকা ছিল। রোদের ছোঁয়া লেগেছে কুয়াশার গায়ে! এখন ঘরে যাবার পালা। কুয়াশার ছুটি আজকের মত।
সামনে কী? উরি বাবা! কত বড় একটা পাহাড়! এক্কেবারে আকাশ ফুঁড়ে যেন চলে গেছে। কত উঁচু! একটা নদী নেমেছে পাহাড় থেকে নিচে। পাহাড় তলির গ্রাম দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। লোকগুলো তো পাহাড়ের দিকেই যাচ্ছে। মিতুল তো কোনদিন পাহাড়ে চড়েনি! তাই ভারি মজা লাগছিল তার। পাহাড়ে চড়বে মিতুল। ভাবতেই মজা।
আর যেন হাঁটতে পারছে না দস্যুগুলো। কতক্ষণ ধরে হাঁটছে। বাব্বা হাঁটুক না। যত পারে হাঁটুক। মিতুলের তো কোন কষ্ট হচ্ছে না। মজাই। কেমন পকেটের মধ্যে বসে আছে।
“একটু বসলে হয় না?” হঠাৎ একজন দস্যু বললে। চমকে উঠলো মিতুল। কথা শুনে।
“হ্যাঁ, তাই বস। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা করছে।” আর একজন উত্তর দিলে।
শেষ জন বললে, “খিদে পাচ্ছে। চ না কিছু খেয়ে জিরনো যাবে। সামনেই তো বাজার।”
“তাই ভালো।” বলে হাঁটলো বাজারের দিকে তিনজনে।
এতক্ষণ পরে একটি-একটি মানুষ নজরে পড়লো মিতুলের। গ্রামের মানুষ এরা! কোনদিন মিতুল এমনি করে গ্রাম দেখেনি। গ্রামের মানুষও দেখেনি। সকালে দোকান-হাটে যাচ্ছে কেউ কেউ। কাজে যাচ্ছে অনেকে। নদীর জল আনছে মেয়েরা। কলসি মাথায়। পায়ে মল ঝুম ঝুম। দেখতে বেশ লাগছে। পাহাড়। তার নিচে ছায়া। তার পাশে নদী। নদীর কোলে গ্রাম। চোখ ভরে যায় মিতুলের। মন বলে, আহা-রে! কত আলো এখানে!
হাটে কত লোক! গিস-গিস করছে। কত দোকান। কোনটা কাপড়ের। কোনটা কাঁচের। কোনটা বাসনের। একটা না দুটো খেলনার দোকান। কত পুতুল। সাজানো-সাজানো। একটা শোলার টিয়া দাঁড়ে বসে আছে। চোখ টিপলে মিতুলের দিকে চেয়ে। ডাকলো বোধ হয়। কেউ দেখতে পেলো না। মিতুল কিন্তু ঠিক দেখেছে। দেখলে কী হবে? যাবার তো উপায় নেই।
একটা জিলিপির দোকানের সামনে দাঁড়ালো দস্যু তিনজন। কড়া ভর্তি জিলিপি! উনুনের ওপর ভাজছে দোকানদার। আওয়াজ বেরুচ্ছে বেশ, “ছিলি কিলি ছিলিকিলি!” পাশে আর একটা রস ভর্তি গামলা। গামলায় দোল খাচ্ছে অগুনতি পানতুয়া। একটা পেলে মন্দ হয় না!
“এই দোকানি, আধ সের জিলিপি দাও তো।” একজন দস্যু চাইলো। টুপ করে পকেটের মধ্যে ঢুকে গেলো মিতুল।
কেন?
লোকটা পকেটের মধ্যে যেন হাত গলাচ্ছে। হ্যাঁ তো রে! এই সেরেছে, মিতুলের বুঝি এই শেষ। না। খুব রক্ষে! মোটা মোটা আঙুল। পকেটে ঢুকেই আবার বেরিয়ে এলো। মিতুল কোনো রকমে ঘাড় গুঁজে বেঁচে গেছে। ধরা পড়ে গেছলো আর একটু হলেই। কাঁপছে মিতুল ভয়ে। লোকটার হাত যে পকেটে ঢুকতে পারে, একথা ভাবেনি মিতুল। তাই তো! কি করবে এখন সে!
না, আর পকেটে থাকা নয়। এবার পালাতেই হবে মিতুলকে পকেট থেকে। কিন্তু কেমন করে পালাবে? কেমন করে পকেট থেকে বেরুবে? এত লোক! এত চোখ! সবাইকে কি ফাঁকি দেওয়া যায়! ভাবতে লাগলো মিতুল। চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো মাথাটা তুলে পকেটের মধ্যে! তৈরী থাকাই ভালো। আবার যদি ঢোকে হাতটা!
না, এখন আর হাত ঢুকবে না। এখন জিলিপি খাচ্ছে লোকগুলো।
কিচ্ছু উপায় নেই। যতই ভাবক মিতুল, বেরুতে আর হচ্ছে না!
এখন তো খাওয়া হয়ে গেছে। জিলিপি খাওয়া। নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ালো তিনজনে। জল খাবে। চুপিসাড়ে আর একবার উঁকি দিল মিতুল। বসলো লোক তিনটে। হাত বাড়িয়ে নদীর জলে আঁজলা করলে। এই সুযোগ! ভাবলো মিতুল! পকেট থেকে বেরিয়ে পড়তে পারলে আর কী! মাথাটা বার করলে। খুব সাবধানে। লাফ দিল বলে!
“এই, তোর পকেটে ওটা কি রে?”
বুকটা থমকে গেলো মিতুলের। ফসকে গেলো হাতটা।
“কই?” লোকটা পকেটে হাত ভরে দিল। মিতুলের পেটটা চিপ্টে ধরলে। টেনে বার করলো মিতুলকে।
“আরে একটা পুতুল!” অবাক হলো তিনজনে।
“কোত্থেকে এলো?”
“কে জানে!
“দিনের দিন তুই কচি খোকা হচ্ছিস নাকি! পুতুল নিয়ে পকেটে পুরেছিস। খেলা ধরেছিস। ফেলে দে।”
ফেলে দিলো মিতুলকে। ছুড়ে দিলো নদীর জলে। মাঝ দরিয়ায়। টুপ! ডুবে গেলো মিতুল!
হয়তো ডুবে যেতো মিতুল একেবারে। হয়তো ডুবতে ডুবতে ও কোথায় তলিয়ে যেতো! আর কোনদিন ওকে কেউ দেখতে পেতো না। কেউ ওর কথা মনে রাখতো না।
না, ভেসে উঠলো মিতুল।
নদী নামছে পাহাড় থেকে। তার কী স্রোত! জলের স্রোতে ভেসে চলেছে মিতুল! কোথা চলেছে? কেউ জানে না। কোন্ দেশে? তাও জানে না। কেমন করে ও নদীর জল থেকে পাড়ে উঠবে? তাই বা কে বলবে! হয়তো এমনি করে নদীর জলে ভাসতে ভাসতে একদিন সব ফুরিয়ে যাবে! মিতুল হারিয়ে যাবে চিরদিনের মত!
ভাবতে পারছিল না মিতুল। সামনে একটা কুটোও নেই যে আঁকড়ে ধরে। চারিদিকে শুধু জল আর জল। ভেসে চলেছে মিতুল। কেউ কি দেখবে না তার দিকে একবার? কেউ কি তাকে বাঁচাবে না?
কে আসবে? কে দেখবে? এমন তো কত কী নদীর জলে ভেসে যায়! কার দেখতে বয়ে গেছে! সে নিয়ে ভাবতে কারই বা মাথাব্যথা পড়েছে। তা ছাড়া ও তো একটা পুতুল। ফেলে দেওয়া পুতুল। ও আর কী কাজে আসবে? যতদিন সুন্দর ছিল, মিষ্টি মুখে হাসি ছিল, তখন ওর আদর ছিল। সবাই ভালো বেসেছে। সবাই তার নাচ দেখে বাহবা দিয়েছে। পুতুলওয়ালা কত বড় লোক এখন! কত পয়সা! কত দেমাক! সে তো মিতুলেরই জন্যে! আর আজ? আজ তারা কোথায়? কেউ নেই!
চেঁচিয়ে ডাকতে ইচ্ছে করলো মিতুলের, “তোমরা আমায় বাঁচাও।” কে শুনবে? কেঁদে ফেললো মিতুল হাউ-হাউ করে! এমন করে সে তো কোনদিন কাঁদেনি! মিতুলের চোখের জল নদীর জলে মিশে গেলো। ভেসে গেলো। ঠিক তক্ষুনি মনে পড়ে গেলো বোনটির কথা। তার সঙ্গে মিতুলের আর কোনদিন দেখা হবে না। কোনদিনই না। “না হোক।” ভাবে মিতুল, “সে যেন ভালো থাকে। ভালো থাকে। যেখানেই যাক সে যেন কাঁদে না কোনোদিন। আমার জন্যে। তার ভাইটির জন্যে।”
ভেসেই চলেছে মিতুল। কতক্ষণ, কতদিন কিচ্ছু জানে না। নদীর দু-পাশে সবুজ সবুজ গাছের সারি। দূরে দূরে। নীল নীল আকাশে ঝলমল আলো আর চারিদিকে জল থৈ থৈ। হঠাৎ আকাশের নীলের সঙ্গে সবুজ ডানার পাখনা মেলে একটি পাখি উড়ে এলো। নদীর বুকে। উড়তে উড়তে মিতুলের মাথার ওপর ঘুরতে লাগলো।
চমকে চাইলো মিতুল আকাশে। পাখি! মনটা দুলে উঠলো মিতুলের। আশায়। চেয়ে রইলো মিতুল একদৃষ্টে। হাতছানি দিল। নাম জানে না মিতুল পাখির। ডাক দিলো, “ও পাখিভাই, ও পাখিভাই, সবুজ সবুজ পাখি, আমায় তুমি বাঁচাবে?”
পাখি বললো, “ওমা! ওমা! কে তুমি?”
মিতুল বললো, “আমি পুতুল, নাম মিতুল।”
পাখি বললো, “পতুল-পুতুল মিতুল তুমি?”
মিতুল উত্তর দিলো, “হ্যাঁ ভাই, সবজ-সবুজ পাখি।”
পাখি বললো, “মিতুল-মিতুল পুতুল, আহা-রে কেমন করে জলে ভাসলে?”
মিতুল উত্তর দিতে পারলো না। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। পাখি মিতুলের চোখের জল স্পষ্ট দেখতে পেলে।
পাখি ডাকলো, “রুপালি-রুপালি মাছ। রুপালি-রুপালি মাছ।” ডাকতে ডাকতে ঘুরপাক খেতে লাগলো আকাশে। জলের ওপর।
অমনি নদীর জলে হাজার হাজার রুপালি মাছ ভেসে উঠেছে। ঝিকিমিকি। ঝিকিমিকি।
সবুজ-সবুজ পাখি বললে, “রুপালি-রুপালি মাছ, মিতুল-পুতুল নদীর জলে ভাসছে। তাকে বাঁচাও।”
সঙ্গে-সঙ্গে নদীর জলে লাফিয়ে উঠলো রূপালি মাছের সর্দার। মিতুলকে পিঠে তুলে নিলো। মিতুল ভাসছিল চিত হয়ে। মাছের পিঠে বসলো এবার। সর্দার মাছ পাখনা দুলিয়ে মিতুলকে পিঠে নিয়ে সাঁতার দিলো জলের ওপর। হাজার হাজার রূপো-ঝিকমিক মাছের দল এগিয়ে চললো। চললো সর্দারের সঙ্গে নেচে নেচে।
আকাশের সবুজ পাখি বললে, “মিতুল-মিতুল ছোট্ট পুতুল, তুমি কোথা যাবে?”
মিতুল বললে, “জানি না তো! আমার তো ঘরও নেই, বাড়িও নেই। আমার এখন কেউ নেই।”
সবুজ পাখি জিগ্যেস করলে, “মিতুল, তুমি আমাদের কাছে থাকবে?”
মিতুল বললে, “তোমরা কত সুন্দর! কত ভালো!”
আকাশ ভরে গেলো। কত পাখি নদীর বুকে। ডানা মেলে উড়ছে। রঙিন ছায়া ঢেউ-এ ঢেউ-এ দুলেছে নদীর জলে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো মিতুল। দেখতে লাগলো জলের নিচে। রুপালি মাছের দিকে। আকাশে সবুজ পাখির দিকে।
সবুজ পাখি উড়তে উড়তে রুপালি মাছকে বললো, “রূপালি মাছের সর্দার, আমি নামছি।”
সবুজ পাখি আকাশ থেকে রুপালি মাছের দিকে নামতে নামতে বললো, “মিতুল-পুতুল হাত বাড়াও। আমার পা ধর।”
মিতুল হাত বাড়ালে সর্দার মাছের পিঠে বসে। সবুজ পাখি একেবারে মিতুলের মাথার ওপর উড়ে এলো। মিতুল হাত দিয়ে সবুজ পাখির পা দুটি জড়িয়ে ধরলো। ঝুলে পড়লো। ঝুলে ঝুলে নদীর জল ছেড়ে, মাছের পিঠ ছেড়ে, আকাশে উড়ে চললো।
মিতুল ঝুলতে ঝুলতে বললে, “সবুজ-সবুজ পাখি, আমার ভয়-ভয় করছে। হাত ফসকে যদি আবার পড়ে যাই জলে!”
পাখি বললে, “মিতুল আমার পিঠের ওপর উঠে এসো।”
মিতুল সবুজ পাখির পা ছেড়ে, আস্তে আস্তে গলা জড়িয়ে একেবারে পিঠের ওপর চড়ে বসলো।
না, আর ভয় করছে না। আঃ নরম তুলোর মত পাখির পিঠ! কী আরাম!
নিচের দিকে তাকালো মিতুল। রুপালি মাছেরা নাচছে জলের নিচে। খুশিতে। মিতুলের দিকে চেয়ে চেয়ে।
আকাশে চাইলো মিতুল। সবুজ-রঙিন পাখিরা গান গাইছে। পাখির ডানায় হাওয়ার ঝুনঝুনি বাজছে।
একটু একটু করে চলে গেলো নদীর জল চোখের আড়ালে। একটি একটি করে হারিয়ে গেলো রুপালি মাছ নদীর জলে। উড়ে চলেছে মিতুল। মনটা যেন কেমন-কেমন করে উঠলো মিতুলের। মাছের জন্যে। ঐ রুপালি মাছ ঝিকমিক! আর কি কোনদিন ওদের সঙ্গে দেখা হবে মিতুলের!
অনেকক্ষণ পর একটি গাছে বসলো সবুজ পাখি। মিতুল সবুজ পাখির পিঠে থেকে নামলো। গাছের ডালে সবুজ পাতার ওপর বসে রইলো।
সবুজ পাখি জিগ্যেস করলে, “মিতুল, গাছের ওপর বসতে তোমার ভয় করছে?”
মিতুল বললে, “ভালো লাগছে।”
অমনি গাছের ডালে দোল দিয়ে দিয়ে হাওয়া বইলো। হাজার হাজার প্রজাপতি উড়ে এলো। মিতুলের চোখে তারা কাজল পরিয়ে দিলো। মিতুলের ছেঁড়া জামায় রঙ ছড়িয়ে দিলো। রঙের রেণু উড়তে উড়তে ছড়িয়ে গেলো সবুজ সবুজ গাছে। রঙিন রঙিন ফুলে। মৌমাছিরা গুন-গুন করে গান ধরলে। মিতুলের কাজল পরা চোখ দুটি নাচতে লাগলো। হাসিতে-খুশিতে। মিতুলের ছোট্ট ঠোঁট দুটি কাঁপতে লাগলো। গানেতে-সুরেতে। যেন সকালবেলার লাল গোলাপের পাপড়ি!
মিতুল বললো, “রঙিন-রঙিন প্রজাপতি, আমিও খেলতে পারি।”
প্রজাপতিরা বললে, “এস না!”
অমনি মিতুল উঠে দাঁড়ালো গাছের ডালে। প্রজাপতি আর মৌমাছিদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা শুর করে দিলো। সবুজ সবুজ পাখি তাই দেখে হেসে কুটোকুটি। লুটোপুটি।
কী সুন্দর দেখতে লাগছে মিতুলকে! খেলছে। কত রঙ, কত আলো মিতুলের সারা গায়ে! কী সুন্দর সাজিয়ে দিয়েছে মৌমাছিরা, প্রজাপতিরা! মিতুল যেন আর সে-মিতুল নেই! এক্কেবারে একটি নতুন পুতুল। আগের চেয়েও ভালো। অনেক ভালো।
খেলতে খেলতে হঠাৎ কী হল? সবুজ পাখিরা ফুড়ুৎ করে উড়ে গেলো কেন সক্কলে? প্রজাপতি পাতায় পাতায় লুকিয়ে গেলো কেন ঝুপঝাপ? মৌমাছিরা ফুলের ডালে ঘাপটি মেরে বসে রইলো কেন চুপচাপ? ব্যাপার কী?
মিতুল ডাকলো, “সবুজ পাখি!”
কেউ সাড়া দিলো না।
আবার ডাকলো, “প্রজাপতি রঙিন-পাখা!”
কেউ দেখা দিলো না।
মিতুল অবাক হলো। এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলো। দেখতে লাগলো।
গাছের তলায় ও কে দাঁড়িয়ে? চোখ পড়তেই চমকে গেলো মিতুল।
একটা ছেলে। গাছের দিকে তাকিয়ে। ছেঁড়া-ময়লা কাপড়। যেন সাত জন্মে কাচা হয়নি। উসকো-খুসকো চুল। যেন কত কাল তেল দেয়নি। রোগা প্যাঁক প্যাঁকে চেহারা। যেন কোন জন্মে খেতে পায়নি। লম্বা একটি লাঠি কাঁধে। ড্যাং-ড্যাং করে চলছিল। চলতে চলতে থামলো। চাইলো গাছের দিকে।
মিতুলের খুব ভয় হয়ে গেছে। কী করবে এবার? গাছ থেকে নামবে, তারও উপায় নেই। এত বড়, এত উঁচু গাছ থেকে কি মিতুল নামতে পারে? তা ছাড়া ছেলেটা যে-রকম চেয়ে আছে প্যাট-প্যাট করে! এক্ষুনি দেখে ফেলবে! তাই সুট করে পাতার আড়ালে লুকিয়ে পড়লো মিতুল। গুঁড়ি-সুঁড়ি মেরে বসে রইলো। লুকিয়ে!
ছেলেটা তো ছেলেটা! ভেল ভেলেটা! চোখ দুটোতে দুষ্টুদুষ্টু চাউনি। দাঁত বের করে মুচকি মুচকি হাসছে। পেটে পেটে বুদ্ধি ছেলের! পিঠে একটা পুঁটলি বেঁধে কেমন তাকাচ্ছে দেখ না! গা জ্বলে যায়! মিতুল ভাবলো, “দেখি না ছেলেটা কি করে?”
আরি ব্যস! গাঁক গাঁক করে চেঁচাতে শুরু করে দিলো ছেলেটা। কেন-রে বাবা! চেঁচানি কেন? গান গাইছে নাকি! গান গাইছে, না গরু তাড়াচ্ছে! থাম না বাপু!
থামলো। পিঠের পুঁটলিটা খুললো। গাছের নিচে রাখলো। হাতের লাঠিটা নিয়ে ছুড়ে দিল পাঁই। গাছের ওপরে। পাখির বাসায়। ঘেঁচু! পাখি থাকলে তবে তো! পাখিও নেই। পাখির ছানাও নেই। আবার ছুড়লো! এই সেরেছে! মিতুলের যদি লেগে যায়! মিতুল পেটের মধ্যে হাত পা সেঁধিয়ে বসে রইলো
আর একবার ছুড়লো! হুস। যা ভাবা ঠিক তাই। লাগলো না মিতুলের গায়ে। একেবারে নাকের পাশ দিয়ে উড়ে গেলো লাঠিটা। যাঃ! হাত ফসকে গেছে মিতুলের। মার ডিগবাজি। একটা, দুটো, তিনটে, চারটে! ব্যস একেবারে ছেলেটার কাঁধে। দুটি পা কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে গলাটি জড়িয়ে ধরলো মিতুল।
ছেলেটা তো অবাক! “যাঃ বাবা! ইনি কিনি?” বলে মিতুলের ঠ্যাং ধরে চোখের সামনে আনলো। দেখতে লাগলো। “আরে! একটা পুতুল!” নিজের মনেই চেঁচিয়ে উঠলো। মাথা চুলকে গাছের দিকে তাকালো। মিতুলের দিকে চাইলো। ভাবলো, “তাইতো! গাছে পতুল এলো কোত্থেকে! কোথায় পাখির ছানা খুঁজছি, না গাছ থেকে পুতুল পড়ছে! দূর ছাই, পুতুল কী হবে!” বলে খুব জোরে আবার ছুড়ে দিলো মিতুলকে গাছের ওপর। না, গাছে আটকালো না মিতুল। ডিগবাজি খেতে খেতে পড়বে তো পড় ছেলেটার মাথায়, টকাস!
ছেলেটা বললো “ভালরে ভালো! জ্বালাতন করলে তো! দূর তোর—” বলে আবার ছুড়তে গেলো। থমকে গেলো হাতটা। মিতুলের চোখ দুটি যেন ওর দিকে তাকিয়ে আছে! ভালো করে দেখলো। কিছু বলবে নাকি পতুলটা! তাই আবার হয়! পুতুল কোন কালে কথা বলে! তবু চোখ দুটি ভালো লাগছে দেখতে! পুতুলের চোখ! ভালো লাগছে মুখখানি। না, আর ছুড়তে ইচ্ছে হলো না। বললে, “না, তোকে ফেলবো না। চ আমার সঙ্গে। শহরে গিয়ে বেচে দেব। যা পাওয়া যায়!” বলে মিতুলকে কাঁধে বসালো। পিঠে পোঁটলা বাঁধলো। চেঁচিয়ে গান ধরলো। হাঁটা দিল। মিতুল গান শুনতে শুনতে কোথায় চললো আবার? কে জানে!
গাইতে গাইতে হাঁটতে লাগলো ছেলেটা। কাঁধের ওপর দুলতে লাগলো মিতুল। দেখতে লাগলো সামনেটা। কেউ নেই। সবুজ পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি! একটি কথা কারো সঙ্গে সে বলতে পারলো না। যারা তার প্রাণ বাঁচালো তাদের জন্যে সে কী করলো! মনটা ভার হয়ে যায় মিতুলের! বেশ তো মজা! নদীর জলে ভাসছিল মিতুল একটু আগে! রুপালি মাছ, সবুজ পাখি তাকে বাঁচালো। রঙ-ঝরানো প্রজাপতি, ফুল-ফোটানো মৌমাছি তাকে সাজালো। তার সঙ্গে খেলা করলো। আর এখন? সে নাম-না-জানা একটা ছেলের কাঁধে চেপে কোথা চলেছে?
চলেছে সামনে পাহাড় তার ওপরে।
ছেলেটার ভয়ডর নেই। কেমন দেখো নাচতে নাচতে চলেছে! গাইতে গাইতে দুলছে! কোথা যাবে পাহাড় পেরিয়ে?
পড়ে গেলো মিতুল ছেলেটার কাঁধ থেকে। হঠাৎ। যা ঝাঁকুনি। কতক্ষণ কাঁধে থাকবে? গড়িয়ে গেল পাথরের ওপর।
“কিরে পড়িস কেন?” ছেলেটা ঘুরে দাঁড়ালো। তুলে নিলো মিতুলকে। জামাটা ঝেড়ে দিলো মিতুলের। আর একবার চোখ দুটির দিকে তাকালো। কাজলপরা দুটি চোখ মিতুলের। দেখতে দেখতে আপন মনেই বললে, “ভারি মিষ্টি তো চোখ দুটি তোর! নে চ। এখন ঘরে চ।” বলে আবার কাঁধে তুলে নিলো মিতুলকে। আবার দলতে লাগলো। আবার গাইতে লাগলো।
এখন তো বিকেল-বিকেল। পাহাড়ের উপর বিকেলের রোদ বেশ লাগে। আর একটু পরে সূর্যিমামা ঘরে চলে যাবে। একটু একটু অন্ধকার নেমে আসবে তারপর। তখন কি হবে? তখনও যদি ছেলেটা ঘরে না পৌছায়! ভয় করবে না? ঘেঁচু, ভয় না আর কিছু। ঘর থাকলে তবে তো! দিন নেই, রাত নেই, ও শুধু হাঁটছে। পথেই বসে পড়লো। পথেই শুয়ে রইলো। যার কেউ নেই, তার আবার ভাবনা কিসের? চলো, শুধু চলো। এক পাহাড় থেকে আর এক পাহাড়। এক দেশ থেকে আর এক দেশ।
হাঁটতে-হাঁটতে এ কোথায় এলো? কী সুন্দর! অবাক হয়ে গেলো মিতুল! কী সুন্দর দেখতে ঐ পাহাড়ের নিচটা! ছোট্ট ছোট্ট পাথর সাজানো ঘর। ঘরের মাথায় পাতার ছাউনি। পাথর ছড়ানো রাস্তা। সবুজ-সবুজ বাগান। একটা ছোট্ট ঝরনা টুংটাং নাচতে নাচতে নেমে আসছে। মিতুল ভাবলো, ছেলেটার বাড়ি হয়তো এখানে। এখানে থাকতে হবে তাকে! তা হলে তো বেশ হয়! দেখতে বেশ লাগছে মিতুলের। ভাবতে আরও ভালো লাগছে।
ঐ দিকেই ছুট দিল ছেলেটা। ঝরনার দিকে।
কারা যেন খেলা করছে! হ্যাঁ তো রে। ঘাগরা পরা ছোট্ট মেয়ে। কত দেখো! পাগড়ি মাথায় ছোট্ট ছেলে। অনেক অনেক। ছেলেটার গান শুনে ওরাও এদিকেই ছুটে আসছে। ছুটছে আর চেঁচাচ্ছে:
কটকটি কটকটি,
ল্যাক প্যাকে সিং।
হাড়গিলে বক যেন,
টিং টিং টিং!
চেঁচাতে চেঁচাতে একেবারে ওর সামনে। অরি কী হুল্লোড় লাগিয়ে দিলে! ওকে বক দেখাতে লাগলো। জিভ ভেঙালে। চেঁচামেচি। হুড়োহুড়ি।
ছেলেটা গান থামালো। আচমকা মুখটা যেন শুকিয়ে গেলো। একজন একটা ঢিল ছুড়ে দিলো। টং! একেবারে ওর মাথায়। ঘুরে দাঁড়ালো। ঘুরলে কী হবে? আর একটা ঢিল। টং! একজন লাঠিটা ছিনিয়ে নিলে। পিঠে এক কিল বসিয়ে দিল। তেড়ে গেল ওর দিকে।
“আবার এসেছিস এখানে?” একজন চেঁচিয়ে উঠলো।
ছেলেটা রেগে আরও জোরে চেঁচিয়ে উত্তর দিলে, “বেশ করছি।”
“বেশ করছিস! আয় তোর ঠ্যাং ভেঙে দিই।” সবাই লাফিয়ে উঠলো।
একজন বললে, “আরে! আরে! একটা পুতুল রে, কাঁধের ওপর!”
অমনি ছেঁকে ধরলো সবাই মিলে। ছেলেটাও পাঁই পাঁই মারলো ছুটে। মিতুলকে কাঁধ থেকে নামিয়ে নিলে। বুকে জড়িয়ে ধরলো। ওরাও ছুটলো পিছু পিছু। ধরে ফেললো ওকে সবাই মিলে।
“দে পুতুলটা!”
“না, দেব না।”
“চুরি করেছিস?”
“বেশ করেছি।”
সবাই মিলে ঠেলে দিল ছেলেটাকে। পড়ে গেলো পাথরের ওপর। মাথাটা কেটে গেলো! রক্ত বেরিয়ে এল। কেউ এলো না কাছে। উঠে দাঁড়ালো ছেলেটা। আবার ছুট দিলো মিতুলকে বুকে নিয়ে। ওরা আর ছুটলো না। পারলো না ধরতে।
ছুটতে ছুটতে অনেক দূরে চলে এসেছে! আর পারছে না ছুটতে। হাঁটছে।
হাঁটতেও পারছে না। একটু বসলো। একটা গাছের নিচে। পাথরের ওপর। সন্ধে হয়ে আসছে। আরও নিচে পাহাড়তলি। ছোট্ট ছোট্ট ঘর দেখা যাচ্ছে। আলো জ্বলছে। শুয়ে পড়লো। পাথরটার ওপর। মিতুলের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। মিতুল স্পষ্ট দেখলো ওর চোখ দুটি ছলছল করছে। মিতুলের কপালে একটা চুমু খেলো। গালটা টিপে দিলো আলতো আলতো। বললে, “কি দেখছিস? আমাকে? কেউ নেই রে আমার।” চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো ছেলেটার। আবার বললো, “তা বলে লাগেনি আমার। একটুও না।”
মিতুলের মনটা কেমন-কেমন করে উঠলো। ছিঃ ছিঃ, তার জন্যেই তো এমন হলো! ইচ্ছে হলো তার চোখের জল মুছিয়ে দেয়। কপালে হাত বুলিয়ে দেয়। এখনও রক্ত লেগে রয়েছে! কিন্তু কেমন করে দেবে?
“আমার কাছে থাকবি তুই? আমার কাছে?” মিতুলের মুখের দিকে চেয়ে জিগ্যেস করলো ছেলেটা। “আমার সঙ্গে থাকবি? আমার সঙ্গে বেড়াবি? আমি গান শোনাবো। কেউ আমার গান শোনে না রে।”
মিতুলের এত দুঃখেও কেমন যেন হাসি পেলো। মনে মনেই ভাবলে, “আহা! তুমি যা গান গাও!”
উঠে বসলো। মিতুলের জামার দিকে তাকিয়ে রইলো অবাক হয়ে। বললে, “বাঃ তোর জামাটা তো বেশ। এতক্ষণ দেখিনি তো! এত রঙ দিয়ে সাজালো কে? কার পুতুল তুই? কোথা ছিলি?”
মিতুল চেয়েই রইলো ফ্যালফ্যাল করে!
“আমার যদি পয়সা থাকতো তোর জন্যে একটা টুপি কিনে দিতুম। একটা তাল পাতার বাঁশি কিনে দিতুম। দূর বাঁশি! খেতেই পাই না!”
মিতুলের বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো। ভাবলে, “খেতে পায় না!”
আবার বললো ছেলেটা, “কে খেতে দেবে? আমায় তো সবাই পাগল বলে। পাগলের আবার খিদে পায় নাকি! পাগলের খিদে পায় না। ঘুম পায় না। কিচ্ছু না। আমারও ঘুম পায় না। সারারাত জেগে থাকি। জেগে জেগে ভাবি। কত কী! ভাবি আমার যদি একটা ফুলপাড় কাপড় থাকতো, ছেঁড়া কাপড়ের বদলে। একটি খুব সুন্দর রেশমি জামা। পায়ে শুঁড় তোলা নাগরা। মাথায় একটা পাগড়ি। আর যদি থাকতো একটা খুব সুন্দর নাম, কাঞ্চন। আমায় সবাই ডাকে কটকটি বলে। তা বলে আমার নাম কটকটি নয়! রাগায়! আমার নাম ডুংরি। ডুংরি নামটাও আমার ভালো লাগে না। কে যে রেখেছিল!”
আর একটু হলেই মিতুল খিলখিল করে হেসে উঠেছিল। কটকটি! কটকটি আবার নাম হয় নাকি! কটকটি তো লোকে খায়। কিনতে পাওয়া যায় ময়রার দোকানে!
পাহাড়তলির পথের ওপর সানাই শোনা গেল। চকিতে উঠে দাঁড়ালো ছেলেটা। ডুংরি। চনমন করে তাকালো পাহাড়তলির রাস্তার দিকে। শুধু কি সানাই? আরে বাবা, কত লোক! আরও কত বাজনা! কত পতাকা! সানাই বাজছে প্যাঁ পোঁ পোঁ। বাদ্যি বাজছে ডিম ডিম। ডুম ডুম। পতাকা উড়ছে পত পত পত। লোক চলেছে ঘোড়ার পিঠে। কেউ যাচ্ছে এক্কা চড়ে। কেউ কেউ যায় পায়ে হেঁটে। মধ্যিখানে একটা কী সুন্দর পালকি। বেহারা ছুটছে পালকি কাঁধে, “হুঁ হুঁ ন্না, হুঁ হুঁ ন্না!”
ডুংরি চেঁচিয়ে উঠলো সেই দিকে চেয়ে “এই, বর-কনে যাচ্ছে।” মিতুলকে নিয়ে ছটলো পাহাড়ের ওপর। ছটতে ছুটতে নিচে। পাহাড়তলির রাস্তায়। পালকির পাশে পাশে হাঁটতে লাগলো। বাজনা শুনতে শুনতে। কেমন গাল ফুলিয়ে ফুলিয়ে ঐ লোকটা সানাই বাজাচ্ছে! হেসে ফেললো ডুংরি। দুহাত দিয়ে আকাশে তুলে নাচালো মিতুলকে। খুশিতে। বললে, “আজ আর খাবার ভাবনা নেই। চ, নেমন্তন্ন খেয়ে আসি।”
কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলো ডুংরি হঠাৎ! হাঁটতে হাঁটতে থামলো। মিতুলের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো। কী হলো? হঠাৎ চমক লাগে কেন?
আবার একবার নাচালো মিতুলকে। হ্যাঁ, এবারেও অবাক হয়ে গেলো ডুংরি। পুতুলটা নাচছে যেন আপনা-আপনি! সে কি ভুল দেখছে? আবার নাচালো।
আবার!
আবার!
আবার!
মনে মনে হাসলো মিতুল। ডুংরি লাফিয়ে উঠলো মিতুলকে বুকে নিয়ে। চেঁচিয়ে উঠলো আকাশের দিকে চেয়ে। কিন্তু কেউ শুনতে পেলো না সে চিৎকার! কে শুনবে? সানাই বাজছে যে! বর যাচ্ছে, কনে যাচ্ছে পালকি চেপে হুঁ হুঁ ন্না! চেঁচিয়েই ছুট দিলো ডুংরি একেবারে অন্য দিকে। নিঃঝুম জায়গাটায়। পাহাড়ের একটু উপরে। যেখানে সেই ছোট্ট ঝরনাটা নাচছে। পাথরের ওপর ঝুন ঝুন ঝুন। না, কেউ নেই এখানে! আর একবার দেখলে হয় না! আর একবার নাচালো ডুংরি মিতুলকে। আহা! সানাই-এর সুরটা কী মিষ্টি লাগছে মিতুলের। সেই সুরে সুরে মিতুলেরও পা দুটি নেচে নেচে উঠলো।
হাত কাঁপছে ডুংরির। থামে না মিতুল। নাচে আর নাচে। অবাক হয়ে দেখে ডুংরি। অনেকটা খুশিতে। খানিকটা ভয়েতে! এমন তো কোনদিন সে দেখেনি!
সেই নিঃঝুম জায়গাটায় জেগে রইলো সে। ঘুম এলো না। তবু শুয়ে পড়লো। পাথরটার ওপর। মিতুলকে বুকে জড়িয়ে। চেয়ে রইলো আকাশের দিকে। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমিয়ে পড়লো মিতুলও। ডুংরির গলা জড়িয়ে।
ভোরের প্রথম পাখিটা ডাকলো, পাহাড়ের সব উঁচু গাছটায়। সে ডাকে মিতুলের ঘুম ভাঙলো। প্রথম আলোর রঙ ছড়িয়ে গেলো ডুংরির চোখ দুটিতে। সে ছোঁয়ায় ডুংরির ঘুম ভাঙলো।
কাল রাতে স্বপ্ন দেখেছে কি ডুংরি? মিতুলের স্বপ্ন। হয়তো দেখেছে। তা না হলে সাত সকালে উঠেই ও ছুটলো কোথা? মিতুলকে নিয়ে? কী ভেবেছে?
ছুটেছে ডুংরি পাহাড়তলির গ্রামে গ্রামে। ডাক দিয়েছে সক্কলকে। নাচ দেখিয়েছে মিতুলের। পুতুল নাচ।
নাচ দেখেছে দলে দলে। ছেলে দেখেছে। মেয়ে দেখেছে। বুড়ো দেখেছে।
বুড়ি দেখেছে। মা দেখেছে। বাবা দেখেছে। মাসী দেখেছে। মেসো দেখেছে। অবাক সবাই! বেবাক সবাই! এমন নাচ তো তারা কোনদিন দেখেনি!
এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রাম। ডুংরি ছোটে। মিতুল নাচে। পয়সা পায়।
এক হাট থেকে আর এক হাট। ডুংরি হাঁটে। মিতুল নাচে। টাকা পায়।
এক দেশ থেকে আর এক দেশ। ডুংরি চলে। মিতুল দোলে। সোনা পায়।
তারপর ডুংরি একদিন পাহাড় ডিঙুলো। নদীতে পাড়ি দিল। নদী পেরিয়ে সুমুদ্দুরের জলে ময়ুরপংখী নায়ে পাল তুলে দিলো।
মিতুলকে নিয়ে চলেছে ডুংরি সুমুদ্দুরের ওপারে আর একদেশে। সে দেশে মেলা বসেছে। মেলাতে নাচ দেখাবে।
এখন সত্যি-সত্যি রেশমি জামা পরে ডুংরি। পায়ে নাগরা পরে। মাথায় পাগড়ি বাঁধে। পরবে না! এখন তার কত পয়সা!
আর মিতুল? তার সাজ হয়েছে একশো রকম। একশো রকম পোশাক তাতে হাজার রকম ফুল। রঙ তুল তুল তুল।
উরি বাস! কত লোক মেলায়! ভিড়ে ভিড়! কত দোকান! কত বাহার! কত হাসি! কত মজা! এত জায়গায় ঘুরেছে মিতুল কিন্তু এমন মেলা কক্ষনো দেখেনি।
তাঁবু পড়লো মেলায়। মস্ত তাঁবু।
ঢ্যাঁড়া পড়লো।
বাজনা বাজলো। নাচ শুরু হয়ে গেলো মিতুলের।
সানাই প্যাঁপোঁ বাজে,
মিতুল সোনা নাচে।
দেখতে দেখতে ভিড়ে ভিড়! কী ভিড়! কী ভিড়! নাচ দেখবে কী তারা! মিতুলের নাচ দেখে নিজেরাই নাচতে শুরু করে দিলে।
পুতুল নাচে, মিতুল নাচে
তাই না দেখে ধাড়ি নাচে, ধেড়ে নাচে
ছোটকা নাচে, ছুটকি নাচে
বাচ্চা নাচে, কাচ্চা নাচে।

হৈ হৈ কাণ্ড!
মিতুলের নাচের কথা এ-কান থেকে ও-কান গেলো। এমুখ থেকে ওমুখ গেলো। এ-গ্রাম থেকে ও-গ্রাম গেলো।
কেউ আসছে পায়ে হেঁটে
কেউ চলেছে হাতির পিঠে
টগ বগ টগ ছুটছে ঘোড়া।
ছুটছে ঘোড়া এক্কাগাড়ি
ক্যাঁচ ক্যাঁচ ক্যাঁচ গরুর গাড়ি!
অবাক! সক্কলে অবাক। এমন নাচ হয় না তো!
একবার দেখলো। মন ভরলো না।
দু’বার দেখলো। চোখ মানলো না।
তিনবারের বার, আশ মিটলো না।
তাই বার বার দেখলো। বার বার ছুটলো। রাত্তিরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পুতুল নাচের স্বপ্ন দেখলো!
কথাটা পৌছে গেলো রাজবাড়িতে। পুতুল নাচের কথা।
প্রথমে পৌঁছলো দ্বারীর কানে।
দ্বারী বললো সিপাইকে।
সিপাই শোনালো মাহুতকে।
মাহুত থেকে বামুনঠাকুর।
বামুন থেকে ঝিয়ের কানে।
ঝি বললে রানীমাকে।
রানী তুললে রাজার কানে।
রাজা বললেন, “তাই নাকি? তবে তো দেখতে হয় পুতুল নাচ।”
অমনি সাজ সাজ রব পড়লো। রাজা মেলায় চললেন। পুতুলের নাচ দেখতে।
নাচ দেখলেন। অবাক চোখে চেয়ে রইলেন। বললেন, “ডাক তো ছেলেটাকে।”
ডুংরির ডাক পড়লো।
“তোমার পুতুল তো বেশ নাচে!” রাজা বললেন।
ডুংরি মাথা হেঁট করলো।
“আমারও একটি পুতুল আছে। সেও নাচতে জানে। তার সঙ্গে তোমার পুতুল নাচতে পারবে? নাচে তাকে হারাতে পারবে!” রাজা জিগ্যেস করলেন।
ডুংরি এবার মাথা তুললো। বুক ফুলিয়ে বললো, “নিশ্চয়ই!”
“যদি তোমার পুতুল আমার পুতুলকে হারায়, তবে তোমায় রাজ্য দেব। যদি তোমার পুতুল হারে, তবে তোমার পুতুল নেব।” রাজা বললেন।
ডুংরি বললে, “আমার পুতুল কোনদিন হারে না। রাজামশাই, মিথ্যে আপনার বাজি। আমি নাচ লড়তে রাজি।”
রাজা বললেন, “বেশ।” বলে গোঁফে হাত বুলালেন।
মিতুল মুচকি হাসলো। রাজার গোঁফ দেখে।
তারপর?
ড্যাম কুড় কুড় বাদ্যি বাজে।
পিউ পিউ পিউ বাঁশি।
তাক দুমা দুম ঢোলক বাজে।
কাঁই না না না কাঁসি।
হৈ হৈ পড়ে গেলো। কাতারে কাতারে লোক জমেছে। ছাতের ওপর। গাছের ডালে। পথের ধারে। রথের চূড়ায়। ঘোড়ার পিঠে। হাতির মাথায়।
মেলার মাঠে দুই ধারে দূই মঞ্চ হলো।
এক মঞ্চে মিতুল দাঁড়াল। আর এক মঞ্চে রাজার পুতুল ছোট্ট মেয়ে!
কী সুন্দর সেজেছে রাজার পুতুল ছোট্ট মেয়ে। রেশমি শাড়ি। রঙ বাহারী। গোলাপ-গোলাপ ঠোঁট। সারা অঙ্গে মুক্তা-হীরা, পান্না-চুনি। ঝিলিক ঝিলিক।
আর তেমনি সেজেছে মিতুল। যেন রাজপুত্তর! মাথায় মুকুট। যেমনি জামা তেমনি কাপড়। আলোয়-আলোয় ঝলমল। সোনায়-সোনায় টলমল।
বাজনা বাজলো। মিতুল নাচ ধরলো।
রাজপুত্তুর শিকারে যাচ্ছে। হাতে তার তীরধনুক। সামনে সোনার হরিণ। হরিণ ছোটে, মিতুল ছোটে। হরিণ নাচে, মিতুল নাচে। নাচতে নাচতে মিতুলের তীর ছুটলো। হরিণ অমনি টুপ করে লুকিয়ে পড়লো। অমনি একটা বাঘ! “গাঁক” করে মিতুলের সামনে লাফিয়ে পড়েছে। পড়েই ঝাঁপিয়ে পড়লো।
বাঘ লাফিয়ে ডাইনে ছোটে। মিতুল ছোটে বাঁয়ে।
বাঘ যদি যায় বাঁদিকে তো মিতুল ছোটে সামনে।
বাঘে মিতুলে লড়াই লেগে গেলো। সে কী কাণ্ড! একবার তীরের ফলা বাঘের চোখে যায়-যায়! আর একবার বাঘবাবাজি মিতুলকে খায়-খায়!
“মিতুল!” কে যেন চেঁচিয়ে ডাকলো আঁতকে উঠে!
কে চেঁচালো তো কে চেঁচালো! কে শুনবে কার কথা! যা লড়াই চলছে। সবাই তটস্থ। ভয়ে আড়ষ্ট।
“মিতুল!” আবার কে ডাকলো।
“মিতুল!” জোরে ডাকলো।
“মিতুল!” আরও জোরে।
“মিতুল!” খুব জোরে।
ওমা! কে ডাকছে? রাজার পুতুল-মেয়ে না?
মেয়ে ডাকছে? মিতুলের নাম জানলো কেমন করে? ভালো করে দেখি তো!
আরে! আরে! এ যে সেই রাজকন্যা! মিতুলের বোনটি! এ কী কাণ্ড! কেমন করে রাজবাড়ি গেল? কেমন করে চিনলো মিতুলকে?
মিতুল তার বোনটিকে দেখেও নি। চিনতেও পারেনি। ডাক শুনতেও পায়নি। শুনবে কী! এখন লড়াই বাঘের সঙ্গে। বাঘের সঙ্গে লড়তে গেলে অন্য কথা কানে নেয়!
দেখতে দেখতে সাঁই-ইই তীর ছুটলো মিতুলের হাত থেকে। লাগলো বাঘের চোখে। আর একটা তীর সাঁই-ই লাগলো গিয়ে বাঘের আর এক চোখে। ঝরঝর করে রক্ত পড়তে লাগলো। বাঘের চোখ অন্ধ। ল্যাজ গোটালো। মারলো ছুট। আর অমনি গাছের ডাল ভেঙে পড়লো। হাতির শুঁড় নেচে উঠলো। লক্ষ লোক “সাবাস সাবাস” করে চেঁচিয়ে উঠলো। মিতুলের নাচ শেষ হলো! লক্ষ লোকের মাঝ থেকে তার বোনটিও খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলো। আবার ডাকলো, “মিতুল। আমি তোমার বোনটি। আমার দিকে চাও।” মিতুল শুনতেই পেলো না। যা হৈ হৈ!
এবার রাজার পুতুল-মেয়ের পালা।
আবার বাজনা বাজলো। সুর উঠলো। গাছে গাছে ফুল। গোলাপ, টগর, যূঁই। ফুলে ফুলে রঙ। হাওয়া দোদুল দোলা।
কিন্তু পুতুল-মেয়ে যেন কেমন কেমন নাচছে! নাচতে নাচতে থামছে। মিতুলের দিকে চাইছে। থামছে। আবার নাচছে। বাঁশিতে সুর কাটছে। নূপুরে তাল পড়ে না। নাচতে যেন মন সরে না। হাজার হাজার লোক ছি ছি করে চেঁচিয়ে ওঠে। হি হি করে হেসে ওঠে। ছ্যা ছ্যা করে পালিয়ে যায়।
মেয়ে আর নাচে না। সবাই চেঁচিয়ে উঠলো, “হেরে গেছে, হেরে গেছে।” লজ্জায় রাজার মুখ লাল হয়ে গেলো।
ডুংরি মিতুলকে বুকে নিয়ে লাফিয়ে উঠলো। জয়ের আনন্দে। হাজার হাজার লোক জয়ের মালা পরিয়ে দিলো ডুংরির গলায়। উৎসব লেগে গেলো ডুংরিকে নিয়ে, মিতুলকে নিয়ে। রাজার পুতুল মেয়ের দিকে কেউ ফিরেও তাকালো না।
মিতুলও এতক্ষণ দেখেনি রাজার মেয়ে-পুতুলকে। এবার ঘুরে দাঁড়ালো মিতুল। বুক ফুলিয়ে চাইলো তার দিকে। থমকে গেলো। চমকে উঠলো। মুখ-খানি তার চেনা-চেনা লাগছে যেন!
আরও ভালো করে দেখলো মিতুল।
চোখ দুটি তার জানা-জানা লাগছে যেন! মেয়েটি কাঁদছে কেন? মিতুল চিনতে পেরেছে।
লাফিয়ে উঠলো মিতুল। চেঁচিয়ে উঠলো, “বোনটি!”
সাড়া দিলো বোনটি, “মিতুল!”
সে-ডাক কেউ শুনতে পেলো না। খালি শুনলো মিতুল আর তার বোনটি। শুনলো, কিন্তু কেউ তো কারো কাছে যেতে পারলো না। পারলো না তো বোনটি মিতুলের গলা জড়িয়ে খুশিতে কেঁদে উঠতে। কেমন করে পারবে? ওরা যে পুতুল! ওদের মনের কথা কে জানে! কেউ না। একজনও না।
অপমানে লজ্জায় উঠে দাঁড়ালো রাজা। বললে, “চলো।”
রাজার পুতুল-মেয়ে রাজার সঙ্গে রথে চেপে চলে গেলো। আর মিতুল ডুংরির কোলে চেপে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগলো। এত আনন্দেও তার মন একটুও মানছে না। এত কাছে পেয়েও সে বোনটিকে খুঁজে পেলো না। মিতুলের মনে হচ্ছে, বার বার মনে হচ্ছে, সে জেতেনি, সে জেতেনি, সে হেরে গেছে। কেঁদে ফেললো মিতুল। কোথায় গেলে পাবে তার বোনটিকে? কোথায়? কোথায়?
কাঁদতে কাঁদতে রাত এসে গেলো। ঘুম-ঘুম রাত।
রাত এলো। মেলার আলো নিভলো। দোকানপাট বন্ধ হলো। সব নিঃঝুম। চুপচাপ। কেমন নিঃসাড়ে আসে রাত? কেমন সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়!
ঘুম এলো না মিতুলের। উঠে দাঁড়ালো মিতুল। দেখলো ডুংরির দুটি চোখের দিকে। কী ঘুম ঘুমুচ্ছে সে! বেরিয়ে পড়লো তাঁবুর পর্দা ঠেলে রাস্তায়! চুপিচুপি। কেউ না দেখতে পায়! সে রাজার বাড়ি যাবে। যাবে সে বোনটির কাছে! কিন্তু যাবে কেমন করে? সে তো রাজার বাড়ির রাস্তা জানে না!
রথের দাগ রয়েছে রাস্তায় এখনও। রাজার রথের দাগ। মিতুল অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেলো। মনে হলো মিতুলের, দাগ দেখে দেখে তো চলা যায়! চললো মিতুল। চললো ঐ রথের চাকার দাগের ওপর পা ফেলে ফেলে। ছোট্ট ছোট্ট পা।
অনেকক্ষণ হেঁটেছে মিতুল। ছোট্ট পা দুটি ব্যথা-ব্যথা করছে হাঁটতে হাঁটতে। তবুও যেতে হবে মিতুলকে। বোনটিকে তার খুঁজে পেতে হবে। যেমন করে হোক।
আলো দেখা গেলো। একটু দূরে। আলোর দিকে চেয়ে চেয়ে এগিয়ে গেলো মিতুল। ক’ পা যেতে একটা আকাশ-ছোঁয়া দরজা। মিতুলের নজরে পড়লো। আরও ক’ পা যেতে মিতুল স্পষ্ট দেখলো রথের চাকার দাগ আকাশ-ছোঁয়া দরজা দিয়ে ভেতর চলে গেছে। তবে কি এটা রাজবাড়ি?
আরও এগিয়ে গেলো মিতুল। উঁকি মারলো দরজার আড়াল থেকে। দরজার দুপাশে দুজন লোক বসে আছে। বসে বসে ঢুলছে। কোমরে তাদের তরোয়াল। হাতে বর্শা। মিতুল চুপিসাড়ে টুক করে ভেতরে ঢুকে গেলো। দেখতেই পেলো না লোক দুটো। ঢুললে কি দেখা যায়! অত বড় বাড়িতে এখন বোধ হয় সব্বাই ঘুমুচ্ছে। জেগে আছে মস্ত মস্ত সেজবাতি। দেওয়ালের গায়ে গায়ে! মাথার ওপর ঝাড় লণ্ঠন। আলো ছড়িয়ে পড়েছে দালানের ওপর। বাবা! দালান তো নয়! এদিক থেকে ওদিক দেখাই যায় না। ঝকঝকে, তকতকে! শ্বেত পাথরের চক মেলানো। হাঁটতে হাঁটতে পা পিছলে যায়! দেওয়ালের কোণ ঘেঁষে ঘেঁষে হাঁটছে মিতুল। খুব সাবধানে। তবু দু’বার পড়ে গেলো।
কিন্তু এই এত বড় রাজবাড়িতে কোথা খুঁজবে সে বোনটিকে? কোন্ দিকে যাবে? কেউ যদি দেখে ফেলে মিতুলকে!
তবু সে হাঁটলো এঘর-ওঘর দেখতে দেখতে। এমহল-ওমহল ঘুরতে ঘুরতে। একটা সিঁড়ির সামনে দাঁড়ালো মিতুল। ওপরে উঠতে পারলে হয়! কিন্তু উঠবে কেমন করে? সিধে ওপরে যাওয়া কি চারটিখানি ব্যাপার! ভাবতে ভাবতে চমকে উঠলো। “খট, খট, খট,!” পায়ে চলার শব্দ যেন! হ্যাঁ, ঠিক তাই। কে যেন হাঁটতে হাঁটতে এদিকেই আসছে! কি করবে মিতুল?
“এই হো হো হো,” লোকটা কী বিকট চেঁচিয়ে উঠলো। দেখতে পেলে নাকি! পিলে চমকে গেলো মিতুলের! আগু পিছু কিচ্ছু না ভেবে, “দে ছুট, দে ছুট।” মিতুল ছুট দিলো সিঁড়ির ওপর। টপাস টপাস করে ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে এক্কে-বারে ওপরে। ছুটতে ছুটতে ডানদিক গেলো। ডানদিক থেকে বাঁদিকে গেলো। সামনে ঘর। পেছনে ঘর। এধার আলো। ওধার কালো। কালো দেখে, কালো কালো অন্ধকারে চুপটি করে লুকিয়ে পড়লো। লুকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইলো।
একটু পরে যখন সব চুপচাপ, কোন হাঁকডাক নেই, নিঃসাড়, তখন মিতুল ওধারের আলোর দিকে ছুটে গেলো। আলোর সামনে ঘর। ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লো মিতুল। ঢুকেই সামনে পালঙ্ক। পালঙ্কের নিচে চুপটি করে বসে রইলো।
একটুক্ষণ বসে রইলো। আর কোন সাড়া নেই। কোন শব্দ নেই। মিতুল উঁকি মারলো পালঙ্কের নিচ থেকে। উঁকি মারলো, তারপর পা বাড়ালো। বাইরে এলো। আহা! ঘরটি কী সুন্দর! দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা রঙ সাজানো ছবি। মাথার ওপর ফুল! একটা ফুল খুব বড়। পাশে ছোট ছোট অনেক আরও! নীল আলো ছড়িয়ে আছে সারা ঘরে! একটা দোলনা। দুলছে দুল দুল। হাওয়াতে। চোখ জুড়িয়ে গেলো মিতুলের। ছোট্ট পালঙ্ক। ঝকঝকে বিছানা পাতা। কিন্তু কেউ তো শুয়ে নেই পালঙ্কে। কাউকে তো দেখতে পাচ্ছে না মিতুল!
হঠাৎ বুকটা ধক করে কেঁপে উঠলো মিতুলের। জানালার ধারে যেন কে বসে আছে! গালে হাত দিয়ে। কে ও?
“বোনটি!” ডেকে উঠলো মিতুল পিছন থেকে আচমকা!
ওমা! সত্যিই তো মিতুলের বোনটি বসে আছে!
চমকে উঠলো মিতুলের বোনটি। লাফিয়ে দাঁড়ালো। ছুট্টে এলো। গলাটি জড়িয়ে ধরলো মিতুলের। চোখে চোখে জল ভরে গেলো। উপছে গেলো।
“কোথা ছিলে এতদিন আমার ভাইটি?”
বোনটি মিতুলকে দেখে অবাক হলো। আবার জিগ্যেস করলে, “কেমন করে এলে রাজবাড়িতে?”
মিতুল বললে, “লুকিয়ে লুকিয়ে!”
বোনটি ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলো, “কেউ দেখতে পায়নি তো?”
মিতুল ঘাড় নাড়লো, “না।” বোনটির চোখের জল মুছিইয়ে দিল মিতুল।
“চোখ কেন কাঁদে মিতুল?” জিগ্যেস করলো বোনটি। যদি না থাকতো?”
মিতুল বললে, “আমি তোমায় কোনদিন দেখতে পেতুম না।”
“আমিও তোমায় কোনদিন দেখতে পেতুম না। বসে বসে তোমার কথা ভেবেছি কত দিন, কত রাত!”
মিতুলও বললে, “আমিও তোমায় খুঁজেছি কতদিন, কত রাত! কেমন করে রাজবাড়িতে এলে?”
“সে তো অনেক গল্প!”
মিতুল বললে, “আজ সারা রাত শুধু গল্প করব। বল তুমি সে গল্প!”
বোনটি বললো, “সেই যে ঠাকুরদাপেঁচা আমায় পিঠে নিয়ে উড়লো, আর থামলো না। উড়তে উড়তে কত নদী পেরিয়েছি, কত বন পেরিয়েছি, কত পাহাড় পেরিয়েছি। ঠাকুরদাপেঁচাকে জিগ্যেস করেছি, “আমার ভাইকে কি খুঁজে পাব না?”

ঠাকুরদা বলল, “এই তো এত খুঁজছি, পাচ্ছি কই?”
“তবে? কি হবে আমার?” জিগ্যেস করেছি আমি ঠাকুরদাপেঁচাকে।
ঠাকুরদা বললে, “তাই তো!” তারপর বললে, “আমার কাছেই বা থাকবি কি করে? আমার বাসা গাছে। তার চেয়ে চ, তোকে রাজবাড়িতে পৌঁছে দিই। সুখে থাকবি।”
“ঠাকুরদাপেঁচা আমায় রাজবাড়ির ছাদের ওপর নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো। রাজা একদিন ছাদে হাওয়া খেতে উঠলেন। আমায় দেখতে পেলেন। আমায় আদর করে ঘরে তুললেন। আমি নাচলুম। তারপর থেকে আমি এখানেই আছি। একদিন রাজা খুব ধুমধাম করে ভোজ দিলেন। দূর দূর দেশ থেকে রাজকন্যা এলো। কত রাজপুত্তুর। কত রাজরানী। কত বড় বড় রাজা। রাজা তাঁদের বললেন, “এইটি আমার পুতুলমেয়ে। আপনাদের নাচ দেখাবে।”
“আমি তাঁদের নাচ দেখালাম। আমার নাচ দেখে সবাই অবাক হয়ে গেলো। ধন্যি ধন্যি পড়ে গেলো। সবাই ভাবলো পুতুল আবার এমনি করে নাচতে পারে! তারপর থেকে আমি রাজাকে রোজ নাচ দেখাই। সেই থেকে আমি রাজার পুতুলমেয়ে।”
মিতুল বললে, “আর আমি—”
ঘণ্টা বাজলো। নিজের গল্প বলতে গিয়ে থমকে গেলো মিতুল। ভোরের ঘণ্টা। এক্ষুনি ঘুম ভেঙে যাবে সক্কলের। কেউ যদি মিতুলকে দেখতে পায়? কি হবে তখন?
বোনটি ব্যস্ত হলো। বললো, “মিতুল তুমি লুকিয়ে পড়।”
মিতুল ভয়ে ভয়ে বললে, “কোথায়?”
“আমার ঐ গয়না রাখার বাক্সটার পাশে।”
“কতক্ষণ লুকিয়ে থাকবো?” জিগ্যেস করলো মিতুল।
“রাত আসুক। রাত্তির এলে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে, আমরা তখন এখান থেকে চলে যাবো। রাজবাড়িতে রাজার পুতুল-মেয়ে সেজে আর থাকতে ইচ্ছে করছে না।”
মিতুল বললে, “সেই ভালো।” বলে গয়না রাখার বাক্সের পাশে লুকিয়ে পড়লো।
সেদিন সারারাত জেগে কেটেছে রাজার। ঘুম এলো না চোখের পাতায়। লজ্জায়। অপমানে। রাগে। কী না একটা বাচ্চা ছেলে তার পুতুলকে হারিয়ে দিলো! ছিঃ ছিঃ ছিঃ! সকালবেলা ডাক পড়লো মন্ত্রীর।
রাজা হুকুম করলেন, “আমার ঐ পুতুলটা চাই। ঐ ছেলেটার পুতুল।”
একশো সিপাই সাজলো। ছুটলো তারা ডুংরির পুতুল কেড়ে আনতে। জানতেও পারলো না সে-পুতুল যে রাজবাড়িতেই লুকিয়ে আছে। রাজার মেয়ে-পুতুলের কাছে!
ডুংরির তাঁবু তছনছ করে ফেললো সিপাইরা।
পুতুল পাওয়া গেল না।
ডুংরিকে তারা মেরে অজ্ঞান করে দিলো।
ডুংরি কিছুতেই বলতে পারলো না। ডুংরি বলবে কেমন করে? সে নিজেও জানে না। সে নিজেও অবাক! কোথা গেল তার পুতুল?
সিপাইরা ডুংরিকে বন্দী করে নিয়ে চললো রাজার কাছে।
মিতুলের বোনটি দাঁড়িয়ে ছিল ঘরের জানালায় একা। মিতুল ঘুমিয়ে পড়েছিল বাক্সের পাশে। লুকিয়ে লুকিয়ে। জানালায় চোখ মেলে দেখছিল বোনটি। বাইরে। এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় রাজবাড়ির সিংদরজাটা। সিংদরজার ওপর দিয়ে, আরও দূরে ছবির মত শহর। রোজ দেখে বোনটি। রাস্তার ওপর দিয়ে উট চলেছে হেঁটে হেঁটে, দুলে দুলে। বেশ লাগে দেখতে।
মিতুলের ঘুম ভেঙে গেল। বাক্সের পাশটা যা ঘুপটি! আরাম করে ঘুমুনো যায়! মিতুল উঁকি মারলো। তার বোনটিকে দেখতে পেলো না। তাই আর এক বার উঁকি মারলো। বারে! বেশ তো আরাম করে বসে আছে জানলার ধারে বোনটি। আলতো আলতো পা ফেলে বেরিয়ে এলো মিতুল। পেছন থেকে ঝুপ করে চোখ দুটি চেপে ধরলে।
“এ কী বেরিয়ে এলে যে!” থতমত খেয়ে জিগ্যেস করলে বোনটি!
উঃ! ঐ অন্ধকারে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকতে ভালো লাগে? তুমি তো বেশ হাওয়ায় বসে আছ!” বললে মিতুল। হঠাৎ নজর গেল বাইরে, “দেখো, দেখো বোনটি, কেমন উট হাঁটছে!”
চোখ মেলে চাইলো বোনটি। বললে, “দেখো, দেখো, কেমন হাতি যাচ্ছে!”
দুজনে চোখ মেলে তাকিয়ে ছিল উট আর হাতির দিকে। হঠাৎ বোনটি সিংদরজার দিকে তাকালো। বললে, “মিতুল, মিতুল, রাজার সিপাইরা কাকে বেঁধে আনছে দেখো!”
মিতুল চেয়ে দেখলো। চমকে উঠলো। বললে, “আরে! আরে এ যে ডুংরি?”
“সে কে?” জিগ্যেস করলো বোনটি।
মিতুল বললে, “ঐ তো আমার বন্ধু। ওর কাছেই তো আমি এতদিন ছিলুম। ওকে ধরলো কেন সিপাই?” ব্যস্ত হয়ে উঠলো মিতুল।
বোনটি বললে, “আমি যে হেরে গেছি তোমার কাছে, তাই। রাগ হবে না রাজার? লক্ষ লক্ষ লোক দেখলো, কী অপমান বল তো!”
“তার জন্যে ডুংরির কী দোষ? ও তো কিছু, অন্যায় করেনি। ওকে কেন বেঁধে আনবে?” জিগ্যেস করলো মিতুল।
“রাজা হয়তো শাস্তি দেবে।”
“না, না”, ব্যাকুল হয়ে তার বোনটির হাত দুটি জড়িয়ে ধরলো মিতুল। বললে, “না, না, তা হতে দেব না। কিছুতেই না। ডুংরির জন্যেই যে তোমাকে আমি খুঁজে পেয়েছি।”
বোনটি এবারে ব্যস্ত হয়ে বললে, “তুমি আবার লুকিয়ে পড়। নইলে তোমাকেও ধরে নিয়ে যাবে। যা হবার সেই রাত্তিরে। সব্বাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে।”
মিতুল আবার লুকিয়ে পড়লো বাক্সটার আড়ালে। লুকিয়ে লুকিয়ে ডাকলো, “বোনটি!”
“কেন?”
“আমায় একটু কাগজ আর দোয়াত কলম দেবে?”
“কি করবে?”
“দাও না। পরে বলব।”
কাগজ আর দোয়াত কলম এগিয়ে দিলো।
মিতুল লিখতে বসলো বাক্সের আড়ালে।
আজ ভারি খুশি। ভারি খুশি রাজকন্যা পুতুলটি। দোলনায় দোল খেতে লাগলো রাজকন্যা। আজ যে সে মিতুলকে ফিরে পেয়েছে। দোল খাচ্ছে আর ভাবছে, “কি লিখছে মিতুল?”
মিতুল চিঠি লিখছে ডুংরিকে।
রাত্তির হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। মস্ত রাজবাড়িটা ঘুমে নিঃঝুম। ঘুমিয়ে পড়েছে সক্কলে। ঘুময়নি মিতুল আর তার বোনটি। দুজনেই তৈরী এখন। সময় গুনছে। আজ চলে যাবে তারা। তার আগে শেষবারের মত দেখে যাবে মিতুল ডুংরিকে। রাজবাড়ির কয়েদখানায় সে যে বন্দী আছে!
ঘণ্টা বাজলো ঢং ঢং। অন্ধকার নিস্তব্ধ রাত্তিরে কত দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে ঘণ্টার সুর। সময় হলো। এগিয়ে এলো বোনটি। বললে, “চলো মিতুল, যাই।”
মিতুল ফিসফিস করে জিগ্যেস করলে, “কোন্ দিকে?”
বোনটি বললে, “আমার হাত ধর।”
মিতুল বোনটির হাত ধরে বেরিয়ে পড়লো।
খুব সাবধানে যেতে হবে। সারারাত জেগে থাকে শান্ত্রীরা। সিঁড়ি দিয়ে নামতে হবে নিচে। একট, ইদিক উদিক হলে আর রক্ষে নেই। নির্ঘাৎ বিপদ।
সিঁড়ি দিয়ে নামা, সেকি সহজ কাজ!
সিড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো দুজনে। মিতুল কানে কানে জিগ্যেস করলো বোনটিকে, “পারবে তো?”
“তুমি?”
মিতুল বললে, “আমি উঠতে পেরেছি। নামতেও পারব।”
বোনটি বললে, “আমি তো কোনদিন নিজে নিজে উঠিনি। যদি পা ফসকে পড়ে যাই!”
মিতুল সঙ্গে সঙ্গে উপড় হয়ে বসে পড়লো। বললে, “আমার পিঠে চাপো।”
“পারবে তো?”
“এখন ভয় পেলে চলে!” উত্তর দিলো মিতুল।
বোনটি মিতুলের পিঠে চাপলো। মিতুল একটি একটি পা ফেললো। একটি একটি সিঁড়ি টপকালো। খুব সাবধানে।
“লাগছে মিতুল?” বোনটি জিগ্যেস করলো।
মিতুল বললে, “এখন কথা বলো না। লক্ষ্য রাখো কেউ আসছে কিনা!”
বাহাদুর ছেলে মিতুল। অত উঁচু সিঁড়ি। ঠিক নেমে এলো বোনটিকে পিঠে নিয়ে। কেউ দেখতেও পেলো না। কেউ জানতেও পারলো না। কিন্তু এতখানি নামতে যা কষ্ট হয়েছে তা মিতুলই জানে। তবু তার মুখে হাসি। বোনটিকে পিঠ থেকে নামিয়ে হাত ধরলো। এগিয়ে চললো সামনে। এখন আর কথা নয়। একদম নয়।
আশ্চর্য! এত বড় রাজবাড়িতে একটিও মানুষের টিকি নেই। রাত্তিরে কেউ পাহারায় নেই! কী রে বাবা! সবাই একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লো নাকি!
তাড়াতাড়ি চললো। এগিয়ে।
তারা তো জানে না কয়েদখানা কোনদিকে। দেখেওনি কোনদিন। তবু সামনের দিকেই চললো। আঁকাবাঁকা পথে না হাঁটাই ভালো।
থমকে দাঁড়ালো বোনটি! কী দেখলো? মিতুলের হাত চেপে ধরলো। একটা ফটক। সামনে দ্বারী। নিঃসাড় চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
মিতুল বোনটির কানের কাছে মুখ এনে জিগ্যেস করলে, “কি করা যায়? সামনে দ্বারী দাঁড়িয়ে!”
বোনটি বললে, “পেছন দিকে চলা যায় না?”
মিতুল বললে, “পিছু ফেরার আগে সামনেটা একবার ভালো করে দেখি দাঁড়াও।”
দেখলো মিতুল এগিয়ে গিয়ে।
লোকটা নড়ে না।
আরও এগিয়ে গেলো। হাঁটি হাঁটি পা পা।
তবু লোকটা সরে না।
কেমন যেন সাহস হয়ে গেলো মিতুলের। হাতছানি দিয়ে ডাকলো। হাত ধরলো বোনটির। লোকটার পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে গেলো। একেবারে সামনে। ওমা! লোকটা ঘুমুচ্ছে বেমালুম! কী ঘুম-রে বাবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে! ছুট দিল মিতুল বোনটির হাত ধরে ফটকের ভেতরে! বুঝতেই পারলো না।
ছুটতে ছুটতে থামে কেন মিতুল? থেমে সামনে দেখে কেন? কী দেখে?
এই-রে! মিতুল আর রাজকন্যা রাজবাড়ির হাতিশালে ঢুকে পড়েছে যে! অজানতে। একেবারে হাতির পায়ের নিচে দাঁড়িয়ে তারা! কত হাতি রে বাবা! শুঁড় তুলছে। দোল খাচ্ছে। ঝিম মারছে। ঘুম দিচ্ছে। দিলো ছুট। অমনি সব চেয়ে ছোট হাতিটা দেখতে পেয়েছে! চেঁচিয়ে উঠলো।
ছোটকে দেখে বড় চেঁচালো। বড় চেঁচালো, ধেড়ে চেঁচালো। ধেড়ে চেঁচালো, ধাড়ি চেঁচালো। বেঁটে চেঁচালো ঢ্যাঙা চেঁচালো।
হাতিদের সে কী চেঁচানি। পাঁই পাঁই ছুট দিলে মিতুল আর রাজকন্যা সেখান থেকে। চোখ কান বুজে ছুটলো। আর দেখতে! বেটক্কা ঢুকে পড়েছে ঘোড়াশালে।
ঘোড়াশালে হাজার হাজার ঘোড়া। লাল ঘোড়া, নীল ঘোড়া। সাদা ঘোড়া। হাঁদা ঘোড়া। কালো ঘোড়া। ভালো ঘোড়া। চিঁ হিঁ হিঁ! চিঁ হিঁ হিঁ! সব এক সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো। চার-পা তুলে নেচে উঠলো। উরি ব্যস! পিলে চমকে যায়। কী করবে এবার তারা? নির্ঘাৎ ধরা পড়লো বলে। সেখান থেকে ভোঁ কাট্টা!
সামনে পাখির ঘর। মারলে ধাক্কা মিতুল পাখির খাঁচায় অন্ধকারে। অমনি ডেকে উঠলো খাঁচার পাখি কিচির-মিচির। চেঁচামেচি। এক ঝাঁক লালমন।
লালমন ডাকলো। কাকাতুয়া হাঁকলো। টিয়াপাখি রাগলো। কিঁচকিঁচ! মিঁচমিঁচ! ক্যাঁক্ক্যাঁ! কোঁককোঁক। কান ঝালাপালা।
পালা, পালা। আর পালা! হাতি হাঁকছে। ঘোড়া নাচছে। পাখি ডাকছে। ভয় লাগছে। সে কী বিকট চিৎকার! গোটা রাজবাড়িটা যেন কেঁপে উঠলো।
মিতুল দেখলো ভারি বিপদ। বোনটির হাত ধরে তড়িঘড়ি ছুট দিলে। দে ছুট, দে ছুট! আগুপিছু, কিচ্ছু দেখলো না। দেখবার উপায় আছে?
হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো মিতুল। কি যেন নজরে পড়লো! কে যেন শুয়ে আছে!
“ডুংরি!” চেঁচিয়ে উঠলো মিতুল। “ডুংরি ঐ তো?”
বোনটি হাত দিয়ে মুখটি চেপে ধরলো মিতুলের। মিতুল জিব কাটলো। বললে, “চেঁচিয়ে ফেলেছি!”
মিতুল জানে না ছুটতে ছুটতে কয়েদখানার দিকেই চলে এসেছে। ঐ তো সামনে কয়েদখানার ভিতরে ঘুমুচ্ছে ডুংরি। মাটিতে পড়ে পড়ে। তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়লো কয়েদখানার ভেতরে। গরাদ ডিঙিয়ে। ওরা তো পুতুল। একটুও কষ্ট হলো না মাথা গলিয়ে ঢুকে পড়তে! ডুংরিকে সামনাসামনি দেখে ছ্যাঁৎ করে উঠলো মিতুলের বুকটা। চটপট জামার পকেট থেকে চিঠিটা বার করলো। আর বার করলো সেই চাবিটা। দস্যুদের কাছ থেকে এই চাবিটাই তো মিতুল চালাকি করে কেড়ে নিয়েছিল। এতদিন কাছে কাছে রেখেছে লুকিয়ে। আজ আর কোন দরকার নেই চাবির। দিয়ে দেবে মিতুল ডুংরিকে। তাই চিঠির সঙ্গে চাবিটা বেশ করে মুড়লো মিতুল। ছুড়ে দিলো ডুংরির দিকে। তাড়াতাড়িতে টাল সামলাতে পারলো না। হাত ফসকে গেলো। চাবিটা ঠক করে গিয়ে পড়লো ডুংরির মাথায়। ইস! ঘুম ভেঙে গেলো ডুংরির। চমকে উঠলো। ঘুমচোখে চেয়ে দেখলো সামনেটা। একী! এ যে তার পুতুল! আঁকপাঁকিয়ে হাত বাড়ালো ডুংরি মিতুলকে ধরবার জন্যে। বোনটির হাত ধরে মিতুল ছুটলো সঙ্গে সঙ্গে। চেঁচিয়ে উঠলো ডুংরি, “আমার পুতুল, আমার পুতুল।” সে চিৎকার পেীঁছে। গেলো সকলের কানে।
ঘুম ভেঙে গেলো সক্কলের। ভাঙবে না? কী চিৎকার! কী হৈ হৈ!
সিপাই এলে৷ ছুটতে ছুটতে। শান্ত্রী এলো পড়তে পড়তে। মন্ত্রী এলেন। পাত্র এলেন। রাজা এলেন। রানী এলেন। ব্যাপার কী! চেঁচায় কেন হাতি-ঘোড়া, উট-ভেড়া! চেঁচায় কেন বন্দী ছেলেটা?
আর চেঁচায় কেন! একেবারে মাথা ঘুরে গেলো সক্কলের! আরে বাবা! ওকী দেখেন? কী দেখেন? দেখেন, রাজার পুতুলমেয়ে, সেই ছেলে-পুতুলটার হাত ধরে ছুটছে! বাপরে বাপ! এ কোন্ দেশের পুতুল! মানুষের মত ছোটে! ধর। ধর। ধর।
ছুট দিলো রাজা পাঁই পাঁই পুতুল দুটোর পেছনে।
রাজাকে ছুটতে দেখে রানীও ছুটলেন।
রানীকে দেখে মন্ত্রী ছোটেন।
মন্ত্রী দেখে শান্ত্ৰী ছোটে।
সিপাই ছোটে, পেয়াদা ছোটে।
মাথায় টিকি, পুরুত ছোটে।
দাসী ছোটে, মাসী ছোটে।
মাসীর পিছে মাহুত ছোটে।
মাহুত দেখে হাতি ছোটে।
হাতি ছোটে, ঘোড়া ছোটে।
ছাগল ছোটে, বাঁদর ছোটে।
সবশেষে একটা কুকুরছানা।
কিন্তু কী জোর ছুটছে মিতুল আর বোনটি! কেউ ধরতেই পারছে না। পুতুল অত জোরে ছোটে কেমন করে? ভেল্কি নাকি!
ছুটতে ছুটতে অন্দর মহল পড়ে থাকলো। ধরা গেলো না।
মাঝের মহল পিছিয়ে রইলো। নাগাল পেলো না।
বার মহলও ছাড়িয়ে গেলো। তবুও না। তবুও না।
ছুটতে ছুটতে রাজবাড়ি শেষ। সিংদরজাও পার। তারপর রাজপথ।
ওমা! রাজপথেও যে রাজা থামেন না! রাজাও থামেন না, রানীও দাঁড়ান না। হাতিও থামে না, ঘোড়াও রোখে না। ছুটছে। ছুটছে। ছুটছে।
মিতুল ছোটে, বোনটি ছোটে।
ছুটতে ছুটতে বাড়ি গেলো।
বাড়ি গেলো, রাস্তা এলো।
রাস্তা পারে দোকান পসার।
দোকান ফেলেই বাজার এলো।
বাজার শেষে ঠাকুরবাড়ি।
আমের বাগান, জামের বাগান।
লিচুর বাগান, পান সুপারি।
বাগান পাশেই দীঘির হাট।
হাটের গায়ে মস্ত দীঘি।
থমকে দাঁড়ালো মিতুল বোনটির হাত ধরে! এই সেরেছে! কেমন করে পেরুবে এই দীঘিটা। এখুনি পেরুতে হবে! ঐ তো রাজা এসে গেলো ছুটতে ছুটতে।
টুপ! টুপ! পদ্মপাতায় লাফিয়ে পড়লো মিতুল আর বোনটি।
লুকিয়ে পড়লো পাতার আড়ালে।
ধাঁধা লেগে গেলো রাজার চোখে! কোথায় গেলো পুতুল দুটো?
এদিক দেখেন, ওদিক দেখেন। সামনে ছোটেন, পিছন ফেরেন। কই পুতুল?
চোখে ঝাপসা লাগলো। মনে হলো রাস্তা ধরে সামনে দিকে’ছুটছে পুতুল!
আবার ছুট। ছুট। ছুট। গোটা রাজবাড়িটা ছুটে চলেছে যেন রাস্তা দিয়ে রাজার সঙ্গে!
কোথা গেলো সত্যিই তো! কোথা লুকালো মিতুল আর রাজকন্যা?
হাঁপাচ্ছে মিতুল লুকিয়ে লুকিয়ে পদ্মপাতায়। কাঁপছে রাজকন্যা পাতার আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। পারবে কেন এত সইতে! এত ছুটতে! ছোট্ট ছোট্ট পা-গুলি আর পারছে না। পারছে না দাঁড়াতে। পারছে না বসে থাকতে। শুয়ে পড়লো মিতুল আর রাজকন্যা পাতার ওপর। আর তো ভয় নেই তাদের কিচ্ছু। খুঁজে পেয়েছে যে ভাইটি তার বোনকে। না, আর তারা কোনদিন যাবে না এখান থেকে বাইরে। না, রাখবে না চোখের আড়ালে বোনটিকে তার ভাইটি। না, না। মিতুল আর সাজবে না। মাথায় টুপি পরবে না। রাজকন্যা নাচবে না। পায়ে নূপুর বাজবে না। কোনদিন না। ঘুমিয়ে পড়লো নিশ্চিন্তে রাজকন্যা আর মিতুল পাতার দোলনায়। ওরা ঘুমোবে এখন। কেউ ডেকো না যেন!
সূর্যি উঠছে। পাপড়ি ফুটছে। পদ্মের পাপড়ি। একটু, একটু, রঙ লাগছে। একটু, একটু, নীল। একটু, একটু, লাল। মৌমাছিরা গুনগুনিয়ে গান গাইছে। হাওয়া-ঝুরঝুর ঢেউ দিচ্ছে দীঘির জলে।
দেখো দেখো ফুল দুটি! চেনা চেনা লাগছে যেন! হ্যাঁ তো! ঐ তো মিতুল, নাচন-পুতুল নীল ফুলটি। ঐ তো পুতুল রাজকন্যা, লাল ফুলটি! নীল পদ্ম দুলে দুলে হাসছে। লাল পদ্ম জলের ঢেউ-এ নাচছে। আহা!
তবু রাজা ছুটছে। এখনও ছুটছে।
আর ডুংরি?
মিতুলের কথা ভাবছে আর মিতুলের চিঠি পড়ছে। মিতুল লিখেছে:
ভাই ডুংরি,
তুমি আমার জন্যে যা করেছ, ভুলবো না কোনদিন। তুমি জানো না, আমার বোনকে খুঁজেছি কত দিন। কত রাত। সে হারিয়ে গেছলো। তাকে খুঁজে পেয়েছি। তাই আজ তোমার কাছে ছুটি আমার। চিঠির সঙ্গে যে চাবিটা দেখছো, আমি দস্যুদের কাছ থেকে কেড়ে এনেছি। তোমায় দিলুম। একটা খুব গভীর বনে তাদের গুপ্তধন লুকানো আছে। সেখানে কত যে মণি-রত্ন, হীরা-পান্না আছে বলে শেষ করা যায় না। আমি ঠিক রাস্তা জানি না। তাই বলতেও পারছি না। পারলে খুঁজে নিও। তোমার জন্যে আমার অনেক ভালো বাসা রইল। তুমি ভুলে যেও আমায়। বিদায়।
মিতুল।
ডুংরি সে চিঠি পড়ছে এখনও। এখনও পুতুলের রাজা পিছু ছুটছে। আর নীল পদ্ম, লাল পদ্ম দীঘির জলে এখনও দোল খাচ্ছে। আর হাসছে।
——
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন