রজনী

সুচরিতা ধর

বেশ কিছুদিন হলো কলকাতার গরমটা এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেছে। মোবাইলে ঝট করে একবার ওয়েদারটা দেখে নিলো প্রত্যয়। নাহ্, আগামী দশ দিনে কোনো বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।

ফোনটা সোফার উপর ফেলে হটাৎ করে বলে ফেললো, “এই ধৃতি, ক'দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গেলে কেমন হয়?”

'গ্রামের বাড়ি' কথাটা শুনেই মুখটা উজ্জ্বল হয়ে গেলো ধৃতির।

—কবে যাবো আমরা গ্রামের বাড়ি? চলো কাল'ই চলো!

—আরে দাঁড়াও দাঁড়াও... তোমার তো দেখছি, উঠলো বাই তো মক্কা যায়!

—কেন? আবার দাঁড়ানোর কী আছে শুনি? এই তো বললে, তুমি যাবে। আর তাছাড়া কাল রাতেই তো বলছিলে, এখন অফিসের কাজও নেই বিশেষ।

কিছুক্ষণ ভাবলো প্রত্যয়, সত্যিই তো, অনেক দিন সে গ্রামের বাড়ি যায়নি! মা-বাবা'কেও দেখেনি কতদিন। বিয়ের পর একবার মাত্র গেছিলো ধৃতিকে নিয়ে; মা-বাবা কে প্রণাম করতে, মা-বাবা এতটাই রেগে ছিলো যে, ওদের সাথে কথা পর্যন্ত বলেনি, শুধু ঠাম্মিকে প্রণাম করে চলে এসেছিলো প্রত্যয় আর ধৃতি...

মা-বাবার একমাত্র সন্তান প্রত্যয়, খুব আদরে মানুষ। সেই ছেলেই কিনা মা-বাবাকে না জানিয়ে বিয়ে করে নিলো!

যদিও বিয়ে করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা ছিলো না প্রত্যয়ের কাছে। পিতা-মাতা'হীন ধৃতি গ্রামে কাকার বাড়িতে মানুষ; প্রত্যয় কৃষি বিজ্ঞানের কাজ নিয়ে বেশ কিছুদিন গ্রামে ধৃতিদের বাড়িতে ছিলো, প্রথম দেখেই ভালো লেগে গেছিলো ধৃতিকে।

আস্তে আস্তে ভালোলাগা পরিবর্তন হয় ভালোবাসায়। মাঝে মাঝেই ফাঁকা বাড়িতে মিলিত হতো তারা, তাদের ভালোবাসায় প্রকৃতির নিয়মে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে ধৃতি। জানায় প্রত্যয়কে...

গ্রামে জানাজানি হলে আত্মহত্যা করতে হতো ধৃতিকে, তাই রাতারাতি ধৃতির কাকাকে সব জানিয়ে ধৃতিকে কলকাতায় নিয়ে এসে বিয়ে করে প্রত্যয়।

তবে বাঁচাতে পারেনি তাদের সন্তানকে, চার মাসে মায়ের পেটে শেষ হয়ে যায় তাদের আনগত সন্তান।

ধৃতি গ্রামের মেয়ে। মাত্র দেড় বছর হলো সে কলকাতাতে এসেছে, তাই গ্রাম শুনেই সে লাফিয়ে উঠেছে। বিয়ের পর একবার মাত্র নিজের গ্রামে গেছিলো; কাকা এগিয়ে এলেও তার কাকী সাফ জানিয়ে দিয়েছিলো, তারা যেন আর কখনো না আসে... এক কথায় ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলেছিলো।

হটাৎ কী হলো ধৃতির, সে প্রত্যয়কে বললো, আচ্ছা, আমরা যে গ্রামের বাড়ি যাবো, মা-বাবা যদি থাকতে না দেয়?

—না, না, সেরকম কিছু আর হবে না। এতদিনে নিশ্চয়ই মা-বাবার রাগ পড়ে গেছে, আসলে তখন সদ্য ধাক্কাটা ওরা সামলাতে পারেনি, আর তাছাড়া আমরাও তো আর ওদের রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করিনি।

দু'দিন পর ওরা বেরোলো প্রত্যয়দের গ্রামের বাড়ি নিশুতপুরের উদ্দেশে। কলকাতা থেকে ট্রেনে প্রায় ছয় ঘণ্টা। আগে গ্রামের অবস্থা খুব খারাপ ছিলো, ট্রেন থেকে নেমে সন্ধের পর  রিকশা পাওয়া যেতো না। এখন অনেকটা উন্নত হয়েছে, অন্ততঃ রাত এগারোটা পর্যন্ত রিকশা পাওয়া যায়...

ওরা যখন ট্রেন থেকে নামলো তখন প্রায় সন্ধে সাতটা, সহজেই রিকশা পেয়ে গেলো। স্টেশন থেকে প্রত্যয়দের বাড়ি প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট...

প্রত্যয়রা গ্রামের বেশ অবস্থাপন্ন পরিবার। প্রত্যয়ের বাবার বড়ো আড়ৎ। ঠাম্মার কাছে শুনেছে সে, তাদের পূর্বপুরুষরা নাকি জমিদারের নায়েব ছিলেন।

রিকশা এসে দাঁড়ালো বাড়ির সামনে। বেশ সংকোচ নিয়েই নিজের বাড়িতে ঢুকলো প্রত্যয়।

—দাদাবাবু... এদ্দিন পর!! ও মা, দেখুন কে এইছে...

ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো প্রত্যয়ের মা।

—কে এসেছে রে ঝুমুর? এত চিৎকার করছিস কেন?

—দাদাবাবু এইছে গো মা, সাতে বৌদিমণিও আছে।

প্রত্যয়ের মা এগিয়ে আসতেই ওরা প্রণাম করলো।

—এতদিন পর মনে পড়লো মাকে! আয় ভিতরে আয়।

—ঠাম্মি কোথায় মা?

—মা মায়ের ঘরে শুয়ে, বেশ কয়েক মাস হলো সেভাবে আর হাঁটাচলে করতে পারে না। ঝুমুর'ই দেখাশোনা করে।

আশালতার ঘরে ঢুকলো প্রত্যয়, ধৃতি ও প্রত্যয়ের মা।

—দেখুন মা কারা এসেছে...

ঘোলাটে চোখে তাকায় আশালতা।

—কে এসেছিস? বাবাই?

প্রত্যয়ের বাড়ির নাম বাবাই।

—হ্যাঁ ঠাম্মি, আমি বাবাই। এই দেখো তোমার নাতবউকেও এনেছি।

আশালতার কাছে গিয়ে বসে ধৃতি।

—নাতবউ এসেছিস? সেই যে তোরা চলে গেলি আর এলি না, তোদের মা-বাবাকে কতবার বললাম, একবার ডাকতে তোদের, যাতে মরার আগে একবার অন্ততঃ দেখতে পাই তোদের...

—এই তো ঠাম্মি আমরা এসে গেছি!

আশালতা মুখটা উঁচু করে ধৃতির, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো ধৃতির দিকে।

—মা ওরা অনেকটা পথ এসেছে, ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

—হ্যাঁ তাই তো, যা নাতবউ, বিশ্রাম কর।

ধৃতি এই প্রথম নিজের শ্বশুরবাড়ির ভিতরে ঢুকলো, আগের বার তো সে সুযোগ তার হয়নি...

—তোরা হাত-মুখ ধুয়ে খেতে আয়, আমি ঝুমুরকে দিয়ে তোর ঘরটা পরিষ্কার করিয়ে দিচ্ছি।

—বাবা কোথায় মা? বাবাকে তো দেখছি না!

—তোর বাবা আড়তের কাছে শহরে বিজনবাবুর বাড়িতে গেছে।

বাড়িটা অনেক পুরোনো, আর ঘরগুলোও বিরাট বড়ো বড়ো। ধৃতি আগে কখনো এরকম বাড়ি দেখেনি, গ্রামে ছোট্ট টালির বাড়িতে বড়ো হয়েছে সে, আর কলকাতায় এসে দু'কামরার ফ্ল্যাট।

প্রত্যয়ের ঘরে ঢুকে প্রথম আকর্ষণ করলো ধৃতিকে দক্ষিণের বড়ো খোলা জানালা। ধৃতি গিয়ে দাঁড়ালো জানালার পাশে।

—কি মিসেস রায় চৌধুরী, ভয় কাটলো?

এখানে আসার আগে ধৃতির মনে বেশ খানিকটা ভয় ছিলো, যদি মা-বাবা এখন ও রেগে থাকেন, ধৃতিকে যদি ওনারা মেনে না নেন! আসলে ছোটোবেলাতেই মা-বাবাকে হারানো ধৃতি যেন ভালোবাসার কাঙাল।

এক টানে ধৃতিকে কাছে টেনে নিলো প্রত্যয় । সরিয়ে দিলো ধৃতির আঁচল, প্রত্যয়ের হাত অবাধ্যর মতো ঘুরতে থাকলো ধৃতির সারা শরীরে।

হঠাৎ দরজায় টোকা পড়লো...

—কে?

—আমি গো দাদাবাবু, ঝুমুর।

বেশ বিরক্ত হয়ে দরজা খুললো প্রত্যয়।

—বৌদিমণিকে একটা কথা বলতে এলুম...

দরজার কাছে এগিয়ে এলো ধৃতি।

চারপাশটা একবার ভালোবাসা করে দেখে ঝুমুর বললো,

—রাতে জানালা-দরজা কিছু খোলা রাখবে না যেন বৌদিমণি। আর রাতে কলঘরে গেলে একা যাবে না, দাদাবাবুকে সাতে নিয়ে যাবে। আমি চলি কেমন? ভোর ভোর আসবো।

ঝুমুর চলে যেতেই প্রত্যয় সজোরে দরজা বন্ধ করে দিলো...

—ওর কথায় তুমি আবার যেন ভয় পেয়ো না। আগা গোড়া খুব বাজে বকে ঝুমুর। মেজাজটাই খারাপ করে দেয়।

তবে প্রত্যয় বুঝলো, ধৃতি ভয় পেয়েছে, তাই নিজের মেজাজ ঠিক করে জড়িয়ে ধরলো ধৃতিকে। শুরু হলো ভালোবাসার খেলা।

ওরা কেউ দেখতে পেলো না, খোলা দক্ষিণের জানালায় চোখ রেখে ওদের রতিকর্ম উপভোগ করলো কেউ।

ভোর থাকতেই উঠে পড়েছে ধৃতি, এটা তার বরাবরই স্বভাব। প্রত্যয় ঘুমোচ্ছে, তাই তাকে না জাগিয়ে একাই ঘরের বাইরে বেরোলো সে। বারান্দা পেরিয়ে উঠে গেলো সিঁড়ি দিয়ে, সামনেই আকাশের মতো বড়ো ছাদ।

আহা... প্রাণ ভরে নিঃশাস নিলো ধৃতি। ছোটোবেলা থেকে গ্রামে বড়ো হওয়া ধৃতির কাছে কলকাতা শহরটা বড্ড আবদ্ধ লাগতো। অনেকদিন পর আবার সেই প্রাণ খোলা পরিবেশ...

আকাশে সবে আলো ফুটেছে, হালকা ঠান্ডা বাতাস, পাখির কিচির-মিচির, অদ্ভুত এক ভালোলাগায় ভেসে গেছিলো ধৃতি... হঠাৎ হাত ধরে টান পড়তেই ঘোরটা কেটে গেলো।

—ও কী করছিলে গো বৌদিমণি?

ভয়ার্ত চোখে ধৃতিকে জিজ্ঞেস করলো ঝুমুর।

ধৃতি কিছু বুঝতে পারছে না দেখে ঝুমুর নিজেই বললো, তুমি এই ছাদের ধারে কী করছিলে? এই দিকের পাঁচিল তো পুরো ভাঙা, আর এক পা বাড়ালেই সোজা নিচে। আমি দূর থেকে দেখলুম তোমাকে, তাই ছুটে এলুম। চলো দেখিনি নিচে চলো...

নিচে নামতেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধৃতির শাশুড়ি।

—কী ব্যাপার বৌমা, তুমি ছাদে কী করছিলে? ঝুমুরের চিৎকারে আমি উঠে এলুম বাইরে।

—আর বলো না মা, এই বৌদিমণি একা একা ভাঙা পাঁচিলের ধারে দাঁড়িয়েছিল, আমি দেখলুম তাই, নইলে এক পা বাড়ালেই...

—আচ্ছা থাম থাম, বৌমা তুমি ঘরে যাও মা। আর একা একা ছাদে যেও না, কেমন?

ধৃতি ঘরে এসে দেখলো, প্রত্যয় তখন ও ঘুমোচ্ছে। ও চুপ চাপ বসে থাকলো তার পাশে...

বেশ একটু বেলাতে উঠলো প্রত্যয়, ধৃতি তখনও ওভাবেই বসে। ভোরবেলায় যেটা হলো, সেটা কাউকেই বলেনি সে।

ধৃতি তো ওই ভাঙা পাঁচিলের দিকে দাঁড়ায়নি, সে তো সম্পূর্ণ উল্টো দিকে দাঁড়িয়েছিল! স্পষ্ট মনে আছে... তাহলে সে ওই ভাঙা পাঁচিলের একেবারে ধারে গেলো কী করে?

—বৌদিমনি মা ডাকছে তোমাদের, বড়োবাবু ফিরে এসেছেন।

ওরা একসাথে গেলো প্রত্যয়ের বাবাকে প্রণাম করতে।

প্রণাম করতেই প্রত্যয়কে বুকে জড়িয়ে ধরলো তার বাবা...

—এত রাগ তোর? যে দেড় বছর বাড়িতেই এলি না?

প্রত্যয় কিছু বলতে পারলো না, আবেগে গা ভাসিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো।

—এলিই যখন, তখন দশ-পনেরো দিনের আগে কিছুতেই তোদের ছাড়বো না।

—কিন্তু মা, আমার তো শুধু তিন দিন মাত্র ছুটি! তিন দিন পর অফিস যেতেই হবে। তবে হ্যাঁ, ধৃতি চাইলে কিছুদিন এখানে থাকতেই পারে।

—কি বৌমা থাকবে তো?

ধৃতি বেশ খুশি হয়েই রাজি হলো।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর প্রত্যয় তার বাবার সাথে  আড়ৎ এ গেলো। ধৃতির শাশুড়ি মা ঘুমোচ্ছে। দুপুরে ঘুমোনোর অভ্যাস কোনোদিন'ই নেই ধৃতির, বরং দুপুরটা সে বই পড়ে কাটাতেই পছন্দ করে। কিছু বই সে সাথে করে এনেছে ঠিকই, তবে পড়তে ইচ্ছে করছে না...

বারান্দা দিয়ে একা একাই হাঁটছিলো, হঠাৎ দেখলো আশালতার ঘরটা খোলা...

—ঠাম্মি আসবো?

—কে নাতবউ? আয় আয়, ভিতরে আয়।

—তুমি কি ঘুমোচ্ছিলে?

—না রে মা, এই বুড়ির চোখে ঘুম আর কই? যেদিন চোখ বুঝবো একেবারে নিশ্চিন্তে ঘুমোবো।

—অমন কথা বলোনা ঠাম্মি।

মৃদু হাসলো আশালতা।

—তুই না এলেও তোকে আমি ডেকে পাঠাতাম রে নাতবউ।

—কেন ঠাম্মি?

—সকালে ঝুমুরের মুখে শুনলুম, তুই নাকি ছাদে গিয়েছিলি?

ছাদের কথাটা শুনে মুখটা একটু ম্লান হয়ে গেলো ধৃতির, যা আশালতার ছানি পড়া চোখ এড়োলো না।

—হ্যাঁ ঠাম্মি, আসলে আমার বরাবরই খুব ভোরে ওঠা অভ্যাস, তাই উঠে আমি...

—তুই যাসনি, সে তোকে টেনে নিয়ে গেছিলো...

বিড়বিড় করে বললো আশালতা।

—কিছু বললে ঠাম্মি?

—শোন নাতবৌ, যদ্দিন এখানে থাকবি সন্ধের পর আর সূয্যি ওঠার আগে স্বামীকে চোখের আড়াল করবি না। কেমন?

—আচ্ছা ঠাম্মি।

—কী রে ঝুমরি, আজ এত দেরি হলো তোর!

—ওই বুড়িকে খাইয়ে আসতে একটু দেরি হয়ে গেলো গো...

ঝুমুরকে ভালোবেসে ওর বর স্বপন ঝুমরি বলে ডাকে, দু-সপ্তাহ আগেই ওদের বিয়ে হয়েছে। স্বপন স্টেশনে রিক্সা চালায়, ওদের ভালোবাসার বিয়ে...

সংসারে অভাব থাকলেও স্বপন ঝুমুরকে ভালোবাসে, সে অনেক বার বলেছে ঝুমুরকে ওই বাড়ির কাজ ছেড়ে দিতে, কিন্তু ঝুমুরের এক কথা,

—সেই ছোটোতে মায়ের সাথে কাজে ঢুকেছিলুম। বাপটা মদ খেয়ে মাকে মারতো, আমাকেও মারতো, তারপর মদ খেতে খেতে নিজেই মরে গেলো, তখন বড়োবাবু-মা না দেখলে আমি জলে ভেসে যেতাম, তাই যদ্দিন ওরা আছে, আমি কাজ করবো।

স্বপন মাঝে মাঝে বাংলা মদ খেয়ে আসে, ঝুমুরকে কাছে টেনে নেয়, আদর-সোহাগে ভরিয়ে দেয়।

সেই রকমই একদিন স্বপন ঝুমুরকে কাছে টেনে নিয়েছে, নিরবস্ত্র দুটো উষ্ণ শরীর, ভালোবাসার চরম সীমায় পৌঁছে গেছে... হঠাৎ... হঠাৎ ঝুমুরকে ছিটকে ফেলে উঠে পড়লো স্বপন। কিছুক্ষণ ঘরের মাটিতে চুপ করে বসে থাকলো।

—কী গো, কী হয়েছে?

—তোর মুখটা...

ঝুমুরের মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকলো সে...

—আমার মুখটা? কী আমার মুখটা?

—তোর মুখটা কেমন অন্যরকম, অন্য কারোর মুখ।

—কী আবোল তাবোল বলছো, আজ মদের নেশাটা বেশি করে ফেলেছো, শুয়ে পড়ো।

আর কোনো কথা না বলে শুয়ে পড়ে স্বপন।

ঝুমুরের বেশ রাগ হয়, স্বপনের সোহাগে সে এক অন্য জগতে পৌঁছাচ্ছিল, তবে সম্পূর্ণ যেতে পারলো না... মনে মনে গালাগাল দিলো সে স্বপনকে...

“মাতাল মিনসে একটা! সহ্য করতে পারিস না যখন গেলার দরকার কী!”

আশালতার বলা কথাগুলো মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে ধৃতির, কেন বললো ঠাম্মি তাকে এসব কথা? কাকে এখন বলবে ধৃতি? প্রত্যয়কে কি জানাবে? কিন্তু প্রত্যয় যা ছেলে, সে তো কিছুই বিশ্বাস করবে না।

—কী ব্যাপার ধৃতি, ঘরের লাইট অন করোনি কেন? অন্ধকারে বসে আছো!

হ্যাঁ তাই তো, ঠাম্মির ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে এসে বসেছিল ধৃতি, কখন যে সন্ধে হয়ে গেছে বুঝতে, পারেনি।

—না, এমনিই।

প্রত্যয়কে দেখে বেশ কিছুটা স্বস্তি পেলো ধৃতি।

রাতে খাওয়া-দাওয়া করে বিছানায় শুয়ে প্রত্যয় বললো ধৃতিকে,

—আমি তো কাল'ই কলকাতা ফিরে যাবো, তোমার এখানে কোনো সমস্যা হবে না দেখবে। তাছাড়া তুমি গ্রাম ভালোবাসো, এখানে তোমার ভালোই লাগবে। হ্যাঁ তবে তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমার একটু কষ্ট হবে।

ঘরের লাইটটা অফ করে ধৃতিকে কাছে টেনে নিলো....

প্রত্যয়ের কোনো কথা'ই যেন কানে ঢুকছে না ধৃতির, তার চোখ যাচ্ছে বারবার দক্ষিণের খোলা জানালাটার দিকে। বারবার মনে হচ্ছে, কেউ সেখানে দাঁড়িয়ে ওদেরকে দেখছে একদৃষ্টিতে।

—কী হলো ধৃতি? তোমার কি শরীর খারাপ?

—কই না তো...

—কেমন যেন লাগছে তোমাকে!

—কিছু না, মাথাটা খুব যন্ত্রণা করছে।

—ওঃ সেটা তো আগে বলবে।! ঠিক আছে ঘুমিয়ে পড়ো।

শুয়ে পড়লো ধৃতি, ঘুম তার আসছে না। কই আর তো মনে হচ্ছে না, কেউ দাঁড়িয়ে আছে! এত বেশি ভাবে সে, তাই এসব ভুলভাল দেখে, নিজের মনেই বললো ধৃতি...

প্রত্যয়ের বিকেলের ট্রেনে কলকাতা ফেরার কথা ছিলো, কিন্তু তাকে সকালেই ফিরতে হচ্ছে, এখানে কোনো নেটওয়ার্ক না থাকায় অফিসের কোনো কাজ সে করতে পারেনি, তাই ফিরে অফিসের কাজ করবে এবং পরের দিন অফিস যাবে।

প্রত্যয় চলে গেছে, মনটা বেশ খারাপ করছে ধৃতির। বিয়ের পর তো কোনোদিনও আলাদা থাকেনি।

—শোনো বৌমা, বাবাই তো চলে গেলো! একদম মন খারাপ করবে না, কেমন? এটা তো তোমারও বাড়ি, যখন যা দরকার আমাকে বলবে, আমি তো তোমারও মা...

চোখ'দুটো জলে ভরে গেলো ধৃতির, সেই কোন ছোটোতে মাকে হারিয়েছে, এইরকম মায়ের ভালোবাসা'ই তো সে চেয়েছিলো।

—কি রে ঝুমরি রাগ করেছিস?

––না, কিন্তু  মদ খেলে তোমার কী হয় বলো তো?

—এই মাইরি বলছি, মদ খেলে আর তোর কাছে যাবো না।

রাতে মদ না খেয়েই ঝুমুরের কাছে এলো স্বপন। অমনই চিৎকার করে উঠলো ঝুমুর, দুটো মণিহীন চোখ বেড়ার ফাঁক দিয়ে জ্বলজ্বল করছে।

ঝুমুর বলতে শুরু করলো,

—বেহায়া মাগি, হারামজাদি নিজের বরটাকে খেয়েছিস, এখন আমার বরের দিকে নজর দিচ্ছিস? মুখে নাড়ো জ্বালিয়ে দেবো।

অমনই চোখ দুটো সরে গেলো।

—কে? কে এসেছিলো রে ঝুমরি?

কাঁপা কাঁপা গলায় বললো ঝুমুর,

—রজনী...

কেমন যেন অস্বস্তি করছে ধৃতির, প্রত্যয়কেও ফোনে পেলো না, নেটওয়ার্ক প্রবলেমের জন্য।

শুয়ে পড়লো ধৃতি, কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই। হঠাৎ ঘুম ভাঙলো ঝুমুরের ডাকে,

“বৌদিমণি, ও বৌদিমণিইইইইইই...”

ঘুমটা ভেঙে গেলো ধৃতির, তবে বুঝতে পারলো না কে ডাকছে, ভাবলো হয়তো মনের ভুল! কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার ডাকটা কানে এলো,

“বৌদিমণি, ও বৌদিমণিইইইইই...”

উঠে দরজাটা খুললো ধৃতি।

—কী ব্যাপার ঝুমুর, তুমি এত রাতে?

—দাদাবাবু কোথায় বৌদিমণি?

ঝুমুর আবার কিছু বলতেই যাচ্ছিলো, কিন্তু হঠাৎ ঝুমুরের মুখের উপর দরজাটা বন্ধ করে দিলো ধৃতি।

ঘরে এসে খাটের উপর বসে ঠক ঠক করে কাঁপছে সে, কাউকে ডাকার মতো শক্তি তার নেই। সারারাত ওভাবেই বসে থাকলো... কিন্তু ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলো।

সকালে প্রত্যয়ের মায়ের ডাকে ঘুমটা ভাঙলো ধৃতির, গা পুড়ে যাচ্ছে ভয়ে। কোনোরকমে উঠে দরজাটা খুললো,

—কী হয়েছে বৌমা? এত বেলা হয়ে গেলো, তুমি তো বলেছিলে, তোমার ভোরে ওঠা অভ্যাস, শরীর খারাপ?

—না মা, একটু দেরি হয়ে গেলো ।

—সে ঠিক আছে, যাও স্নান সেরে জলখাবার খেয়ে নাও।

কিছু ভালো লাগছে না ধৃতির, কাল রাতে যেটা দেখেছে সে, সেটাকে মনের ভুল ভাবে কী করে?

আশালতার ঘরে ঢুকে ঝুমুরকে দেখেই চমকে উঠলো ধৃতি, মাথাটা ঘুরে গেলো। ঝুমুর তাড়াতাড়ি হাতটা ধরে খাটে বসালো।

—এ কী বৌদিমণি, তোমার তো গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গো!

ঝুমুরের কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলো ধৃতি,

—ঝুমুর, তুমি কি কাল রাতে এসেছিলে?

—আমি? আমি তো রাতে আসি না বৌদি! সন্ধেয় যাই, আবার কাকভোরে আসি। কেন জিজ্ঞেস করছো বৌদিমণি?

—নাহ্, কিছু না।

—তুমি কি কাউকে দেখেছো বৌদিমণি?

—বল নাতবউ, চুপ করে থাকিস না।

ধৃতি বলতে শুরু করলো,

কাল রাতে ঝুমুরের ডাকে আমার ঘুম ভাঙলো, দরজা খুললাম, ঝুমুর জিজ্ঞেস করলো, “দাদাবাবু কোথায় বৌদিমণি?”

আমি উত্তর দিতে যাবো অমনই আমার চোখ গেলো ঝুমুরের পায়ের দিকে, পা ছিলো না, শরীরটা যেন শূন্যে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি সপাটে দরজা লাগিয়ে ঘরে বসে ছিলাম...

পুরো ঘর জুড়ে নিস্তব্ধতা, যেন একটা সুঁচ পড়লেও কানে লাগবে। কিছুক্ষণ পর নিস্তব্ধতা ভেঙে ঝুমুর বললো,

—আমি না গো বৌদিমণি, সে এসেছিলো, সে... কাল রাতে আমার ঘরেও চোখ রেখেছিলো, আমি গালাগালি দেওয়াতে চলে গেছে।

—সে মানে? সে কে?

—রজনী...

—রজনী কে ঠাম্মি?

—চুপ কর, চুপ কর নাতবউ, ওই নাম মুখেও আনিস না...

—কেন নাম মুখে আনলে কী হবে?

—অমঙ্গল...

আশালতাকে অনেক জিজ্ঞাসার পরেও সে মুখ খোলেনি। শুধু বলেছিলো, “সব কিছু সব সময় বলতে হয় না রে নাতবউ। ওই নাম করে অমঙ্গল ডেকে আনিসনে।”

পুরো একটা দিন পর প্রত্যয়ের ফোন পেলো। ধৃতি ভেবেছিলো, সে সব কিছু প্রত্যয়কে জানাবে, কিন্তু আবার ভাবলো, যদি প্রত্যয় ভাবে, এখানে থাকবে না বলে ধৃতি এসব বলছে? তাই আর কিছুই জানালো না।

সারাদিন খুব স্বাভাবিক ভাবেই কাটলো, সন্ধেতে ঝুমুর বাড়ি ফেরার আগে চুপি চুপি ধৃতির ঘরে এলো।

—বৌদিমণি আসবো?

—এসো...

—তোমাকে একটা কথা বলতে এলুম বৌদিমণি...

—কী কথা?

—রাতে খুব সাবধানে থেকো, কেউ ডাকলে দোর খুলবে না, এমন কী আমিও না... আর ঘর থেকে বেরোবেও না।

এবার ঝুমুর মুখটা ধৃতির কানের কাছে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললো,

—দু'দিন আগে সে আমার ঘরেও চোখ রেখেছিলো। আমি গালাগাল দিতেই সরে গেছে... একটা কথা মাথায় রেখো বৌদিমণি, তুমি যতক্ষণ না দরজা-জানালা খুলে তাকে ঢুকতে দেবে, সে ততক্ষণ ঢুকতে পারবে না। আর বড়োমা'কে বলোনি যেন, আমি তোমাকে বলেছি।

কথাগুলো বলেই দ্রুত পায়ে চলে গেলো ঝুমুর। ধৃতি দরজাটা বন্ধ করে দিলো।

গভীর রাত। ঘুমিয়ে পড়েছে ধৃতি। হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই তার মনে হলো, কেউ যেন খাটের পাশে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ খোলার সাহস পেলো না ধৃতি, ক্রমশঃ শরীর ভারী হয়ে আসছে তার। জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে। ঘরের তাপমাত্রা কমে ঘর প্রচণ্ড ঠান্ডা হয়ে গেছে...

এবার কেউ যেন হিসহিসিয়ে ধৃতির কানের কাছে বললো,

“স্বামীর সোহাগ একা'ই পাবি?

জ্বলবো আমি পুড়ে?

জ্বালিয়ে কোনো লাভ হবে না...

আসবো আবার ফিরেএএএএএ...”

চোখ খুলে ধড়ফড় করে উঠে বসলো ধৃতি। দক্ষিণের জানালাটা খোলা। মনে পড়ে গেলো ঝুমুরের কথাটা...

“বৌদিমণি, তুমি নিজে তাকে ঢুকতে না দিলে সে ঢুকতে পারবে না...”

উঠে ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে জানালাটা বন্ধ করে দিলো। কানের কাছে যেন হিসহিসিয়ে বলা কথাটা ভাসছে।

এটা কি স্বপ্ন ছিলো? না সত্যি? স্বপ্ন হলেও এত স্পষ্ট কি সত্যিই স্বপ্ন?

ধৃতি ঠিক করলো, সকাল হলেই সে আশালতাকে জিজ্ঞেস করবে, কে রজনী? কেন তার নাম নিলে অমঙ্গল হবে?

সকাল হতেই ধৃতি গেলো আশালতার ঘরে...

—ঠাম্মি তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো...

ধৃতির চুল উসকো-খুসকো, চোখে-মুখে আতঙ্ক।

—কী হয়েছে নাতবউ?

—রজনী কে ঠাম্মি? আজ আমাকে সব বলতেই হবে তোমাকে।

কিছুক্ষণ জানালার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো আশালতা, তারপর বললো, “সে অনেক কাল আগের কথা,আমিও আমার শাউরিমার কাছে শুনেছি..

রজনী এই গ্রামের মেয়ে এই গ্রামের'ই বৌ ছিলো। কথায় বলে নাতবৌ,

'অতি বড়ো সুন্দরী না পায় বর'

'অতি বড়ো ঘরণী না পায় ঘর'...

রজনীরও ঠিক তাই হলো, জেলের ঘরে অভাব নিয়ে  জন্মেছিলো, কিন্তু ঈশ্বর রূপ দিয়েছিলো ঢেলে।

একটু বড়ো হতেই গ্রামের পুরুষ মানুষদের চোখ পড়তে থাকলো রজনীর দিকে। তারপর একদিন গ্রামের মোড়লের পছন্দ হলো রজনীকে। বিয়ের প্রস্তাব দিলো... তেরো বছরের রজনী আর ষাট বছরের মোড়ল। মোড়লের আগের বউ মরে গেছিলো বহুদিন, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছিলো, বাড়িতে দুই ছেলে ও বউমা ছিলো। অনেক টাকার লোভ দেখালো রজনীর মা-বাবাকে। রজনীর গরিব মা-বাবা রাজি হয়ে গেলো। বিয়ে হয়ে গেলো রজনীর।

মোড়ল বৃদ্ধ ছিলো, রজনী যুবতী― স্বামী-সুখ সে পেতো না। বছর ঘুরতেই বুড়ো মোড়ল মরে গেলো হঠাৎ।

রজনী লুকিয়ে মোড়লের ছেলে-বউদের মিলন দেখতো। গ্রামের অনেকেই তাকে দেখেছিলো, লুকিয়ে দেখতে। একদিন হঠাৎ মোড়লের বড়ো ছেলের বউ মুখে রক্ত উঠে মরলো। কিছুদিন বাদে পর পর মরলো বড়ো ছেলে ও ছোটো ছেলের বউ― একইভাবে মুখে রক্ত উঠে...

গ্রামের লোক বললো, রজনী ডাইনি, ওই'ই মেরেছে সবাইকে। মোড়লের ছোটো ছেলে চুলের মুঠি ধরে নিয়ে এলো গ্রামের মাঝখানে, সবাই মিলে আগুন ধরিয়ে দিলো রজনীর গায়ে।

তারপর থেকেই এই গ্রামে কোনো বউকে সে ছাড়ে না। যাদের নতুন বিয়ে হয়, তারা কেউ এই গ্রামে থাকতে পারে না, এক বাচ্চার মা হয়ে ফিরে আসে। আর যারা থাকে, তাদের ছাড়ে না সে। আমি, তোর শাশুড়ি সবাই বিয়ের পর বাপের ঘরে থেকে বাচ্চা সমেত এসেছি...

তোর উপর তার নজর পড়েছে রে নাতবউ...”

কথাগুলো বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আশালতা।

—কোনো চিন্তা করিস না নাতবউ, আমি ঝুমুরকে বলবো, তোকে মাদারী তলার পীর বাবার কাছ থেকে ধাগা বাঁধিয়ে আনতে। এই গ্রামের লোক খুব বিশ্বাস করে পীর বাবাকে, পীর বাবা না থাকলে এই গ্রাম শ্মশান হয়ে যেতো।

যা, এবার দুটো ভাত মুখে দিয়ে একটু বিশ্রাম কর।

ধৃতি ঘরে এসে কাঁদতে থাকে, এ কোন বিপদের মুখে পড়লো সে? কী হবে এবার?

ঝুমুর ঘরে আসতেই আশালতা বললো,

“শোন, আজ সন্ধের পর নাতবউকে নিয়ে মাদারীতলার পীর বাবার কাছে যাবি। কেউ যেন জানতে না পারে ঘুণাক্ষরেও; আর শোন, পুরো রাস্তা প্রদীপ জ্বালিয়ে হাতে রাখবি।

ধৃতির শ্বশুরশাই আড়ৎ থেকে এসে নিজের ঘরে বই পড়েন, আর ওনার স্ত্রী সন্ধ্যা পুজো করেন― যা অনেকটাই সময়সাপেক্ষ...

তাই ঝুমুরের সাথে বেরোতে অসুবিধা হলো না ধৃতির। গ্রাম পেরিয়ে জঙ্গলের রাস্তা। আশালতার কথা মতো ঝুমুর ও ধৃতি হাতে প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিলো। কিছুদূর এগোনোর পরেই,

—একীইই! এত বড়ো গাছটা পড়লো কীভাবে?

—এখানে আর দাঁড়িও না গো বৌদমণি, তাড়াতাড়ি ফিরে চলো...

—কেন কী হয়েছে?

—পরে সব বলবো... এখন তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বাড়ির দিকে চলো, আর সাবধান, প্রদীপ যেন না নেভে...

ওরা পেছন ফিরে রুদ্ধশ্বাসে হাঁটতে লাগলো। আর শুনলো এক অতিপ্রাকৃতিক হাসি... হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে খিলখিলিয়ে হাসছে সে।

কোনো রকমে বাড়িতে পৌঁছলো ধৃতি আর ঝুমুর। সব খুলে বললো আশালতাকে।

“আমি জানতুম ওই ডাইনি মাগি তোদের কিছুতেই পীর বাবার কাছে যেতে দেবে না, জানতুম আমি...”

—তাহলে এখন উপায় কী ঠাম্মি?

আশালতা চুপ করে থাকলো।

আজ আর রিক্সা টানতে ভালো লাগছিলো না স্বপনের, বড্ড গরম লাগছিলো, তাই সন্ধের মধ্যেই বাড়ি ফিরে দরজা-জানালা খুলে শুয়েছিল।

—কী রে ঝুমরি, আজ এত তাড়াতাড়ি চলে এলি?

ঝুমুর কোনো উত্তর দিলো না, ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়লো স্বপনের খোলা বুকের উপর। বেশ অবাক হলো স্বপন, ঝুমুর কাজ থেকে ফিরে প্রত্যেকদিন আগে গা-হাত-পা ধোই, কাপড় ছাড়ে, আজ কী হলো? আরও অবাক হলো, ঝুমুরের গা'টা অস্বাভাবিক ঠান্ডা।

ঝুমুর জিভ দিয়ে লেহন করতে থাকলো স্বপনের খোলা বুক-গলা।

হঠাৎ এক ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো স্বপন ঝুমুরকে, ছুটে বেরিয়ে এসে বাইরে থেকে দরজাটা টেনে দিলো। স্বপনের পুরো বুকে আঠালো লালার মতো কিছু লেগে ছিলো। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকলো স্বপন...

—কী গো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে এমন হাঁপাচ্ছ কেন?

ঝুমুরকে দেখে চমকে উঠলো স্বপন।

—আ মরণ, আমাকে দেখে অমন চমকে ওঠার কী হলো? ভূত দেখলে নাকি?

সবটা খুলে বললো স্বপন, সে বললো,

—তোর ব্যবহার দেখে আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম, তারপর যখন তুই শুলি আমার উপর, তোর গা বরফের মতো ঠান্ডা ছিলো, যেই আমার মুখের কাছে মুখ আনলি, কোনো নিঃশাস পড়ছিলো না। আমি বুঝলাম, এটা তুই না... ধাক্কা মেরে সরিয়ে ছুটে এসে বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছিলাম।

ঝুমুর ঘরের দরজা খুললো। কেউ কোত্থাও নেই, ঘরের জানালাটা হাট করে খোলা।

ঝুমুর স্বপনকে বললো,

—সে এসেছিলো, ওই ডাইনিটা এসেছিলো...

একটা মৃদু হাওয়া ঝুমুরের কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেলো, আর হিসহিসিয়ে বলে গেলো,

'“স্বামীর সোহাগ একাই পাবি?

জ্বলবো আমি পুড়ে?

জ্বালিয়ে কোনো লাভ হবে না...

আসবো আবার ফিরেএএএএএ...”

অনেকটা রাত, অনবরত বৃষ্টি পড়ে চলেছে। গোটা বাড়ি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঘুম নেই শুধু ধৃতির চোখে।গ্রামে বৃষ্টি মানে ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে কখন আসে তার কোনো ঠিক থাকে না...

ঘুমোতে যাওয়ার আগে ধৃতির শাশুড়ি মা একটি হ্যারিকেন ধরিয়ে রেখে গেছিলো। সেটাও এখন প্রায় নিভু নিভু। অনেকবার প্রত্যয়কে ফোন ট্রাই করলো, পেলো না।

বিছানায় শুয়ে ঘুমের চেষ্টা করছে ধৃতি, তবে ঘুমটা এসেও যেন আসছে না কিছুতেই। একে একনাগাড়ে বৃষ্টির শব্দ, তারউপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটা বিড়াল কেঁদেই চলেছে। বিড়ালটা যেন একদম ধৃতির ঘরের দরজার বাইরেটায় বসে আছে।

নাহ্, অনেকক্ষণ সহ্য করলাম, এবার বিড়ালটাকে তাড়াতেই হবে, নইলে সারারাত ঘুম হবে না। অর্ধেক নিভে যাওয়া হ্যারিকেনটা নিয়ে দরজাটা খুললো ধৃতি।

কই! দরজার সামনে তো কোনো বিড়াল বসে নেই! এবার বিড়ালের কান্নার আওয়াজটা আসছে সিঁড়ির দিক থেকে। ধৃতি এগিয়ে গেলো সিঁড়ির দিকে...

হ্যাঁ ওই তো বিড়ালটা― কালো কুচকুচে গা, চোখগুলো অস্বাভাবিক লাল, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ধৃতির দিকে...

হঠাৎ তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো বার করে ঝাঁপিয়ে পড়লো ধৃতির গায়ে, দাঁত বসিয়ে দিলো ধৃতির হাতে। গল গল করে রক্ত পড়ছে... প্রচণ্ড ভয়ে জ্ঞান হারালো ধৃতি। বিড়ালটা শান্ত হয়ে তৃপ্তি করে ধৃতির হাত থেকে রক্ত চেঁটে খেতে থাকলো...

—বৌদিমণি, ও বৌদিমণি...

—বৌমা? কী হয়েছে? বৌমা...

চোখ খুলে তাকালো ধৃতি, ধড়ফড় করে উঠে বসলো, চোখে-মুখে রাতের সেই আতঙ্ক স্পষ্ট।

—কী হয়েছিল বৌমা? তুমি জ্ঞান হারালে কী করে? আর এই কলঘরের পিছনের বাগানেইবা কী করছিলে?

কিছু বুঝতে পারছে না ধৃতি। কলঘরের পিছনের বাগানে তো সে আসেনি!

—বাগানে? আমি, আমি তো বাগানে আসিনি!

—ভালো করে দেখো, এখনো তো আমরা বাগানেই বসে... ভোরে ঝুমুর বাসন মাজতে এদিকে এসে তোমাকে দেখে, তুমি অজ্ঞান হয়ে ছিলে। ঝুমুরই আমাকে খবর দিলো।

—আমি একটু ঠাম্মির ঘরে যাবো।

—বেশ যাবে, তবে তার আগে ঘরে চলো, একটু গরম দুধ দিচ্ছি, খেয়ে নেবে।

—ঝুমুর তুই দেখবি, গরম দুধটা যেন খায়...

ধৃতিকে ধরে ধরে ঘরে নিয়ে এলো ঝুমুর। তারপর গরম দুধটা খাইয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,

—সত্যি করে বলো তো বৌদিমণি, কাল রাতে কী হয়েছিল?

ধৃতি সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বললো ঝুমুরকে।

সব শুনে ঝুমুর বললো, ওই ডাইনি মাগিটা কাল আমার ঘরেও এসেছিলো গো বৌদিমণি, আমার চেহারা নিয়ে আমার মানুষটার ক্ষতি করতে চেয়েছিলো। তুমি-আমি জোর বাঁচা বেঁচে গেছি।

—ঝুমুর, এখন'ই একবার ঠাম্মির কাছে যেতে হবে।

—হ্যাঁ বৌদিমণি, চলো।

—আয় আয় নাতবউ...দেখ না, এই মুখপুড়ি ঝুমুর সকাল থেকে একবারও আসেনি আমার ঘরে, এতক্ষণে এলো...

—ওকে বকাবকি কোরো না ঠাম্মি, ওর কোনো দোষ নেই। আমার জন্যই ও সকাল থেকে আসতে পারেনি।

—কী হয়েছে রে নাতবউ?

আশালতাকে গত রাতের বৃত্তান্ত খুলে বললো ধৃতি।

—বিশ্বাস করো ঠাম্মি, আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি সিঁড়ির কাছ পর্যন্ত গেছিলাম, বিড়ালটা ওখানেই বসে ছিলো। আমি উঠোন পেরিয়ে কলঘরের পিছনের বাগানে যাইনি। কিন্তু আমার যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন আমি বাগানে।

—আমি জানি, তুই যাসনি নাতবউ... সে মায়াজাল বিছিয়ে ছিলো, তোকে সে মায়া করে টেনে নিয়ে গেছে...

—ঝুমুর, তুই দিন থাকতে থাকতে আজ মাদারী তলায় পীর বাবার কুটিরে যাবি। আর একা যাবি কেমন?

—ঠিক আছে বড়ো মা।

ধৃতি ঘরে এসে ফোন করলো প্রত্যয়কে। ফোন জানালো, সে ফিরে যেতে চায়। প্রত্যয় যেন এসে তাকে নিয়ে যায়।

প্রত্যয় জানালো, আগামী পাঁচদিন সে কোনো ভাবেই ছুটি পাবে না, অফিসে কাজের খুব চাপ, পাঁচ দিন পরে সে এসে ধৃতিকে নিয়ে যাবে...

বিকেল থাকত থাকতে আশালতার কথা মতো বেরিয়ে পড়ে ঝুমুর...

পীর বাবার কুটিরের সামনে যখন পৌঁছোয়, তখন প্রায় সন্ধ্যা নামছে। পীর বাবার কুটির খালি, অনেক ডাকাডাকির পর জঙ্গলের শেষ মাথায় যারা ঘর বেঁধে থাকে, তাদের মধ্যেই একজন এসে বললো, বাবা আর এখানে থাকে না।

—থাকে না! কেন গো? আমি তো জানতুম, পীর বাবা এই মাদারী তলার কুটিরে থাকতো!

—হ্যাঁ থাকতো, কিন্তু থাকতে দিলো না ওরা।

—কারা?

—ওই তোমাদেরই গেরামের লোকজন। বাবাকে মারধর করে তাড়িয়ে দিছে। বাবা চার'দিন হলো চলি গিছে...

—কোথায় গেছে?

—তা আমরা জানি না, ও পীর ফকির মানুষ, কোথায় চলে গেছে...

তবে হ্যাঁ, যাওয়ার আগে বাবা বলি গিছে, “আমি এই নিশুতপুরের বাঁধন খুলে নিয়ে গেলাম, সে এখন মুক্ত...”

অনেক জোরে জোরে পা চালাচ্ছে ঝুমুর; একে জঙ্গল, তারপর সন্ধ্যা নেমে গেছে, দু-এক ফোঁটা বৃষ্টির জল ও গায়ে পড়ছে।

চলতে চলতে হটাৎ থেমে গেলো সে। এ কী? এটা কে?এভাবে বসে আছে কেন?

“এই যে, এই যে, এখানে বসে আছো কেন বাপু? এখানে বসে থেকোনি? খুব খারাপ জায়গা, চলো। আমিও গ্রামে ফিরছি, আমার সাথে চলো...”

“কী ব্যাপার বল তো নাতবউ, ঝুমুরটাকে যে সেই কখন পাঠালাম, এখনো তো এলো না!”

বৃষ্টিতে ভিজে স্নান করে ফিরলো ঝুমুর, প্রচণ্ড হাঁপাচ্ছে।

ধৃতি এক গ্লাস জল নিয়ে ঝুমুরকে দিলো। এক ঢোকে জলটা খেয়ে ঝুমুর বললো, সর্বনাশ হয়ে গেছে গো বড়ো মা, সর্বনাশ হয়ে গেছে...

—কী সর্বনাশ হয়েছে?

—পীর বাবা চলে গেছে, এই গ্রামের কিছু লোক তাকে মারধর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। যাওয়ার আগে সে বলে গেছে, সে এই গ্রামের বাঁধন খুলে দিয়ে গেছে।

আর আমি...

—কী তুমি?

জিজ্ঞেস করলো ধৃতি।

—ফেরার সময় ওই ডাইনি মাগি আমার পেছনে পড়েছিল গো বড়ো মা...

আমি জোরে জোরে হাঁটছিলুম, হঠাৎ দেখি, একটা মেয়েমানুষ বসে আছে মুখ নিচু করে। আমি বললুম, এখানে বসে কেন? আমি গ্রামে ফিরছি আমার সাথেই চলো, বসে থেকোনে, জায়গাটা ভালো না...

কথাগুলো বলে কিছুক্ষণ থামলো ঝুমুর।

ধৃতি আবার জিজ্ঞেস করলো, তারপর কী দেখলে?

ঢোক গিলে ঝুমুর বললো, ওই মেয়েমানুষ আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে খিল খিল করে হাসতে থাকলো। কী বীভৎস মুখটা... কালো কুচকুচে পোড়া মুখ। আমি দৌড়োতে শুরু করলাম, সেও আমার পেছনে আসছিলো হাওয়ার গতিতে, আর খিল খিল করে হাসি, সে হাসি কোনো মানুষের মতো নয় গো।

আমি দৌড়ে জঙ্গলের শেষ মাথায় যে মন্দিরটা আছে সেখানে ঢুকে পড়লুম। হাসিটা থেমে গেলো... অনেকক্ষণ বসে থাকার পর এই দৌড়ে বাড়ি ফিরে এলুম।

—সত্যিই অনেক বড়ো সর্বনাশ হয়েছে রে ঝুমুর, পীর বাবা গোটা গ্রামকে বেঁধে রেখেছিলো, অনেকদিন তাই সে কোনো শিকার পায়নি, এখন সে মুক্ত... এখন সে মুক্ত...

রাত হয়ে গেছে, আতঙ্কে জড়োসড়ো হয়ে আছে ধৃতি। মনে মনে সব দেব-দেবীকে স্মরণ করছে।

খাওয়া-দাওয়া করে একটা গল্পের বই নিয়ে পড়ার চেষ্টা করছে ধৃতি, তবে কিছুতেই মন বসাতে পারছে না। কিছুক্ষণ পর মনে হলো, মুখটা যেন কেমন জ্বালা জ্বালা করছে। আস্তে আস্তে মাত্রটা বাড়তে থাকলো, আর থাকতে না পেরে আয়নার সামনে গিয়ে অনেকক্ষণ দেখলো, কই মুখে তো কিচ্ছু হয়নি। একবার ভাবলো, বাথরুমে গিয়ে মুখে জলের ছিটে দিয়ে আসে, তবে গতরাতের কথা ভেবে ঘর থেকে বেরোনোর সাহস সে পেলো না...

ধৃতি যখন নিজের মুখ কিছুক্ষণ দেখে আয়নার দিকে পেছন ফিরে খাটে এলো, তখন আয়নার উপর সম্পূর্ণ ধৃতির প্রতিচ্ছবিটা দাঁত বার করে হাসতে থাকলো, যেটা ধৃতি দেখতে পেলো না।

ঘরের আলোটা নিভিয়ে শুয়ে পড়লো...

কিছুক্ষণ পর থেকে একটা ফিসফিস করে কথা বলার শব্দ কানে এলো ধৃতির। শব্দটা খুব মৃদু, তবে আওয়াজটা বেশ কাছ থেকে আসছে। কেউ যেন ফিসফিস করে কথা বলছে, খিল খিল করে হাসছে... এবার বুঝতে পারলো ধৃতি আওয়াজটা অন্য কোথাও না, ওর খাটের নিচ থেকেই  আসছে... একটা ঠান্ডা স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাচ্ছে, চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে ধৃতি, হাত-পা অবশ হয়ে গেছে তার, আওয়াজটা আস্তে আস্তে স্পষ্ট হচ্ছে। এবার খাটের তলা থেকে না, আওয়াজটা আসছে পায়ে কাছ থেকে, কারোর উপস্থিতি স্পষ্ট বুঝতে পারছে ধৃতি। এবার একটা চারপেয়ে কোনো প্রাণী যেন তার সারা শরীরের উপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। নাহ্, কিছুতেই চোখ খুলবে না ধৃতি, সে জানে, চোখ খুললেই সাক্ষাৎ মৃত্যু। কাঠের মতো শুয়ে আছে ধৃতি, ভয় যেন তার শরীরের প্রতিটা শিরা-উপশিরাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে...

খিলখিল করে হাসির শব্দ চললো অনেকক্ষণ, আর সাথে সেই চার পেয়ে প্রাণীটি চলাফেরা করলো ধৃতির সারা শরীরে... প্রায় কতক্ষণ ধরে চললো এই অশরীরি খেলা, তার সময় ঠিক বোঝা গেলো না। তারপর হঠাৎ সজোরে একটা আওয়াজ হলো, জানালার পাল্লাগুলো খুলে বন্ধ হয়ে গেলো। হাসির শব্দটা থেমে গেলো, আর তার সাথে সেই প্রাণীটির চলাফেরাও...

চোখ খুলে ধীরে ধীরে উঠে বসলো ধৃতি। ভয়ে শরীর যেন এত ভারী হয়ে গেছে যে, সে নিজের শরীরটাকে তুলে বসতে পারছে না।

দক্ষিণের জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলো, ভোরের আলো জানালার একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে খাটে এসে পড়েছে।

ভীষণ ক্লান্ত লাগছে ধৃতির, খুব কষ্ট হচ্ছে। সে কি আর কোনোদিনও প্রত্যয়কে দেখতে পাবে না? কোনোদিনও যেতে পারবে না প্রত্যয়ের কাছে?

টলতে টলতে বারান্দার থামে হেলাম দিয়ে দাঁড়ালো ধৃতি। ধৃতির শাশুড়ি গায়েত্রী সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে ।

—কী হলো বৌমা? এখানে দাঁড়িয়ে কেন?

কোনো উত্তর দিলো না ধৃতি, অঝোরে কেঁদে ফেললো...

—বৌমা? কী হয়েছে? কাঁদছো কেন মা?

—আমি আর পারছি না মা, আর পারছি না। সে আমাকে ছাড়বে না, আমাকে মেরে ফেলবে।

—কী বলছো? কে ছাড়বে না? কে মেরে ফেলবে?

—রজনী...

নামটা শুনেই গায়েত্রী আঁতকে উঠলো। মনে পড়ে গেলো, ত্রিশ বছর আগের সেই রাত....

—তুমি এই নাম জানলে কী করে?

—আমি বলেছি।

লাঠিতে ভর দিয়ে কোনোরকমে ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এসেছে আশালতা।

—আমি বলেছি বৌমা। তুমি জানো না, আমি ইচ্ছে করেই তোমাকে জানাইনি... কারণ আমি জানি, সেই রাতের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা তুমি আজও ভোলেনি।

—কিন্তু মা, পীর বাবা যে সেই রাতে...

গায়েত্রীর কথা থামিয়ে আশালতা বললো, পীর বাবাকে গ্রামের কিছু মানুষ মারধর করে গ্রাম থেকে বার করে দিয়েছে... উনি যাওয়ার আগে বলে গেছেন,

“আমি চলে যাচ্ছি। গ্রামের বাঁধন খুলে দিলাম, সে এখন মুক্ত...”

মাথাটা একটু ঘুরে গেলো গায়েত্রীর...

—মা, আপনি ঠিক আছেন তো?

ধৃতির হাতটা শক্ত করে ধরে গায়েত্রী বললো,

—ভয় পেয়ো না, ঈশ্বর আছেন। তোমার কোনো ক্ষতি হবে না।

ধৃতি একবার ভাবলো, একবার জিজ্ঞেস করবে কী হয়েছিল সেই রাতে? কিন্তু সাহস পেলো না।

পুজোর ঘরে বসে আছে গায়েত্রী, এটাই তার সুখ-দুঃখ-ভয় ভাগ করে নেওয়ার জায়গা।

'রজনী' বহু বছর পর আবার সেই অভিশপ্ত নাম সে শুনলো, তাও নিজের বাড়িতেই...

চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠলো ত্রিশ বছর আগের সেই ভয়ঙ্কর রাত।

প্রত্যয় হয়নি তখনও, গায়েত্রীর স্বামী প্রবালবাবু প্রায়ই আড়ৎ-এর কাজে গ্রামের বাইরে থাকতেন, সেই রকম সেইদিনও তিনি রাতে বাড়িতে ছিলেন না। বাড়িতে গায়েত্রী ও তার শাশুড়ি আশালতা ছিলো।

বেশ রাত, গরম কাল, কলঘর থেকে গা ধুয়ে ফিরছিলো গায়েত্রী, হঠাৎ একটা কালো বিড়াল পথ আটকালো তার... বিড়ালের চোখগুলো রক্তাক্ত, ভয়ে উঠোন পেরিয়ে বারান্দায় উঠতে পারছিলো না গায়েত্রী।

তারপরই এক অদ্ভুত দৃশ্য ঘটে গেলো... একজন আধপোড়া নারী শরীর সম্পূর্ণ উলঙ্গ, চোখগুলো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, শরীর থেকে মাংসপিণ্ড গলে গলে পড়ছে― একটা খিল খিল হাসির শব্দ, তার সাথে চিৎকার সব মিলিয়ে...

উফ্ফ কী বীভৎস সে দৃশ্য।

এবার ওই আধপোড়া শরীরটা ধেয়ে এলো গায়েত্রীর দিকে, ভয়ে চোখ বন্ধ করে নেয় গায়েত্রী, হঠাৎ একটা হুঙ্কার... আধপোড়া শরীরটা ছিটকে পড়লো কিছু দূরে, পড়ার সাথে সাথেই মিলিয়ে গেলো। আর কালো বেড়ালটা কর্কশ একটা শব্দ করে লাফ দিয়ে পালিয়ে গেলো।

চোখ খুললো গায়েত্রী।

সামনে একজন মানুষ― পরনে কালো বস্ত্র, মাথায় কালো ফেটি, চোখে সুর্মা, হাতে ছোটো একটা ঘড়া।

—কে বাবা আপনি?

—আমি কেউ নই রে বেটি, আমি ফকির মানুষ।

তবে সাবধান বেটি, এই আত্মা যে সে আত্মা না...

—তাহলে উপায় কী বাবা?

—আমি মন্ত্র বলে এই নিশুতপুরকে বেঁধে দেবো, সে থাকবে তবে ক্ষতি করতে পারবে না।

নিজের কথা মতো পীর বাবা পুরো গ্রাম মন্ত্র বলে বেঁধে দিয়েছিলো...

এরপর বহুবার রজনীর অস্তিত্ব বুঝতে পেরেছে।

বহুবার স্বামীর সাথে সেই বিশেষ মুহূর্তে গায়েত্রীর কানে কেউ ফিসফিস করে বলেছে,

“স্বামীর সোহাগ একাই পাবি?

জ্বলবো আমি পুড়ে?

জ্বালিয়ে কোনো লাভ হবে না...

আসবো আবার ফিরেএএএএএ...”

“বেটি বাড়ি আছিস নাকি?”

ধৃতি দরজা খুললো।

আওয়াজটা বড্ড চেনা চেনা লাগছে, ঠাকুর ঘর থেকে ছুটে বাইরে এলো গায়েত্রী, হ্যাঁ যা ভেবেছিলো তাই... পীর বাবা...

—বাবা আপনি এসেছেন?

—হ্যাঁ রে বেটি এসেছি। আমি জানি, তোরা খুব বিপদে আছিস।

—আপনি এই গ্রাম থেকে কেন চলে গিয়েছিলেন বাবা?

পীর বাবা হেসে বললেন, আমাকে তাড়াতে না পারলে তার কার্যসিদ্ধি হতো না রে... শোন ভয় পেলে চলবে না। মনে সাহস আর আল্লাহ'র উপরে ভরসা রাখ, উনি আছেন।

আমি এই বাড়িতে থাকবো না, তোর বাড়ির পিছনের বাগানে যে কুটিরটা আছে, আমি সেখানেই থাকবো।

কুটিরের দিকে পা বাড়ালো পীর বাবা।

কিছুদিন আগে রাতে মাদারীতলায় পীর বাবার কুটির থেকে এক নারীর চিৎকার শুনতে পায় গ্রামবাসীরা, কিছুজন সেখানে গিয়ে দেখে, একজন অর্ধনগ্ন যুবতী ও বৃদ্ধ পীর...

কিছু বোঝার আগেই পীরকে মারধর করে তারা। বৃদ্ধ পীর রেগে, অপমানে বাঁধন খুলে দেয় গ্রামের, ও গ্রাম ছেড়ে চলে যান...

দৌড়াচ্ছে ঝুমুর।  দৌড়াতে দৌড়াতে সে কতটা চলে এসেছে, নিজেও জানে না।

গতরাতে ধৃতিদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ি ফেরে ঝুমুর। অনেকটা রাত হয়ে গেছিল। সেই সময় স্বপনের নিজের বাড়িতেই থাকার কথা। কিন্তু স্বপন বাড়িতে ছিল না। ধৃতি ভাবলো, হয়তো স্টেশন থেকে কোনো প্যাসেঞ্জার নিয়ে আসছে।, তাই বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে। কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও স্বপনকে বাড়ি ফিরতে না দেখে ঝুমুর স্টেশনের দিকে যায়।

সেখানে গিয়ে জানতে পারে, স্বপন অনেকক্ষণ আগে স্টেশন থেকে বাড়ির দিকে চলে এসেছে।

পাগলের মতো আশেপাশে খোঁজ নিতে থাকে ঝুমুর। তারপর হঠাৎ সে দেখতে পায়, জঙ্গলের মুখে শিব মন্দিরের সামনে স্বপনের রিক্সাটা রাখা। গ্রামের কেউ বলতে পারেনি স্বপন কোথায়। বাধ্য হয়ে ঝুমুর অত  রাতে জঙ্গলে ঢুকে স্বপনের নাম ধরে চিৎকার করতে থাকে। কিন্তু স্বপ্নের কোনো সাড়া পায় না।

স্বপনকে খুঁজতে খুঁজতে জঙ্গলের মধ্যিখানে এসে দাঁড়ায় ঝুমুর। তারপরই একটা পোড়া গন্ধ তার নাকে যায়, দাঁড়িয়ে পড়ে ঝুমুর। জঙ্গলের ভিতরটা যেন বড়ো বেশিই নিস্তব্ধ লাগছে। মনে মনে প্রমাদ গোনে ঝুমুর, তাড়াহুড়োতে লণ্ঠনটাও আনতে ভুলে গেছে। গলাটা বড্ড বেশি শুকিয়ে গেছে, চিৎকার করতে পারছে না। হঠাৎ যেন শরীরটা ভার  হয়ে গেলো ঝুমুরের, সে যেন  বুঝতে পারছে, খুব কাছ থেকে একদৃষ্টিতে তাকে কেউ দেখছে... এবার আরও কাছে, আরও কাছে... একদম তার ঘাড়ের কাছে...

শরীরের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে ঝুমুরের... পোড়া কটু  গন্ধটা খুব বেশিই...

দৌড়োতে শুরু করলো ঝুমুর, দৌড়োতে দৌড়োতে কতটা চলে এসেছে সে নিজেও জানে না, একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো। আর চলার শক্তি তার নেই।

কিন্তু এ কী! এটা তো সেই গাছ, যেখান থেকে কিছুক্ষণ আগে সে দৌড়োতে শুরু করেছিল! একটা কালো বেড়াল তার দিকে এগিয়ে আসছে, যার চোখ দুটো রক্তাক্ত, সামনের দাঁতগুলো অতিরিক্ত তীক্ষ্ণ।  ঝুমুর বুঝতে পারলো, তার মৃত্যু সাক্ষাৎ... চোখের পলক ফেলতে বিড়ালটা ঝুমুরের গায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো, দাঁত বসালো ঝুমুরের গলায়, তারপর ধারালো নখ ও দাঁত দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিল ঝুমুরের শরীর। মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো সে শুনতে পেল,কেউ তার কানে কানে বলছে...

“স্বামীর সোহাগ একাই পাবি?

জ্বলবো আমি পুড়ে?

জ্বালিয়ে কোনো লাভ হবে না

আবার আসবো ফিরেএএএএএ...”

খিলখিল করে হাসতে থাকলো সেই অশরীরি, মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়লো ঝুমুর।

ভোর হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে জ্ঞান ফিরলো ধৃতির।  রাতের বিভীষিকা যেন তার হাত-পা'গুলোকেও অসাড় করে দিয়েছে, কোনোরকমে উঠে দরজা খুলে বাইরে গেল সে।

বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই শুনলো, কেউ বাইরের দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ছে। দরজা খুললো ধৃতি।

গ্রামের একজন লোক, লোকটি খুব তাড়াহুড়োর মধ্যে বললো,

“বৌদি গিন্নি মা বাড়িতে আছে? একবার ডেকে দিন তো!”

—হ্যাঁ ডাকছি। কী দরকার বলুন…

লোকটি চোখে-মুখে ভয় নিয়ে বললো,

—আপনাদের বাড়িতে কাজ করতো ঝুমুর, আর ওর বর স্বপনকে কারা যেন মেরে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে রেখেছে।

“মাআআআআআআআ...”

চিৎকার করে উঠলো ধৃতি।

ধৃতির চিৎকারে বাইরে বেরিয়ে এল গায়ত্রী।

—কী হয়েছে বৌমা!!

ধৃতি কিছু বলতে পারলো না, শুধু লোকটার দিকে আঙুল তুলে দেখালো...

—এ কী বিশু, তুমি এত ভোরে?

—একটা সর্বনাশ হয়ে গেছে গিন্নিমা... আপনাদের বাড়িতে কাজ করতো ঝুমুর, আর ওর বর স্বপনকে কারা যেন জঙ্গলে মেরে ফেলে রেখেছে।

—কী? কী যা-তা বলছো?

—আপনার বিশ্বাস না হলে দেখবেন চলুন!

—মা আমি যাবো দেখতে…

—না বৌমা তুমি যাবে না দেখতে।

—আমাকে যে যেতেই হবে মা।

আর পেছনে ঘুরে তাকালো না ধৃতি। একাই বেরিয়ে গেল।

গায়ত্রী চিৎকার করতে করতে ধৃতির পেছনে কিছুদূর যাওয়ার পর তার হঠাৎ করে মনে পড়লো, পীর বাবার কথা। ঘুরে এসে বাড়ির পেছনে পীরবাবার কুটিরের দিকে গেলো।

পীর বাবা চোখ বন্ধ করে জপ করছিলেন। গায়ত্রী কুটিরের ভেতরে ঢুকতে তিনি চোখ বন্ধ করেই বললেন...

—খুব ভুল হয়ে গেলো রে বেটি, খুব ভুল হয়ে গেল…

—বাবা ঝুমুর...

কথা শেষ করার আগেই গায়ত্রীকে থামিয়ে দিল পীরবাবা...

চোখ খুলে তিনি বললেন, ওর হাত থেকে একজনকে বাঁচাতে আরেকজনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হলো রে বেটি। ঝুমুর বেটিরও তো নতুন নতুন শাদি হয়েছিলো!

গায়ত্রী নির্বাক, কিছু বলার ভাষা সে খুঁজে পাচ্ছে না। সত্যিই তো, তাই তারা শুধু ধৃতির কথাই ভেবেছে! ঝুমুরের কথা তো সত্যিই তাদের মাথায় আসেনি!

খুব কষ্ট হচ্ছে গায়ত্রীর, সেই ছোটোবেলা থেকে ঝুমুরকে মানুষ করেছে সে, মা বলে তাকে ডাকতো ঝুমুর... আর কিছু ভাবতে পারছে না গায়েত্রী। দু'চোখ জলে ভরে যাচ্ছে তার।

“চলেন বৌদি, আমি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি বডি গুলোর কাছে...”

বিশুর পেছনে পেছনে ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে ধৃতি। গত রাতের ভয়কে ছাপিয়ে ঝুমুরের মুখটা বারবার ভেসে উঠেছে চোখের সামনে।

ঝুমুরের ক্ষতবিক্ষত মৃত শরীরটা পড়ে আছে মাটিতে, গ্রামের লোকজন ভিড় করে দেখছে, আস্তে আস্তে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল ধৃতি। মৃতদেহটার ওপর ঝুঁকে পড়ে দেখলো, ঝুমুরের গলার নলি রাস্তার উপর ধারালো জিনিস দিয়ে কেটে দেওয়া হয়েছে, রক্ত জমাট বেঁধে লেগে আছে পুরো গলায়। একটু দূরেই স্বপনের মৃত দেহ। দেহটা সম্পূর্ণ নির্বস্ত্র ছিল, গ্রামের লোকেরা একটা কাপড়ে ঢেকে দিয়েছে।

গা'টা গুলিয়ে উঠলো ধৃতির। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না, ছুটে চলে এলো বাড়ির দিকে।

আশালতাকে এখনো কিছু জানায়নি গায়ত্রী, এই বয়সে এত কিছু সে সহ্য করতে পারবে না। তবে জানাতে তো হবেই কোনো না কোনো সময়।

কুটির ছেড়ে বাবা এলো বাড়ির ভিতর। জঙ্গল থেকে ফিরে ধৃতি উঠোনে বসে আছে। পীর বাবা এসে ধৃতিকে বললেন,

—ওভাবে বসে থাকিস না বেটি, যা হওয়ার হয়ে গেছে...  তবে আসল সর্বনাশ এখনো বাকি। খুব সতর্ক থাকতে হবে তোদের। এতদিন পর বাঁধন ছেড়ে বেরিয়ে এসে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

আজ রাতে আমি এই বাড়ির একটা ঘরে একা থাকবো। আর তোরা সবাই একটা করে থাকবি।

প্রবালবাবু বাড়িতে নেই দু'দিন হলো, আজও সে ফিরবে না। তাই গায়ত্রী আর ধৃতি ঠিক করলো, তারা আজ রাতে আশালতার ঘরেই থাকবে। আর পীর বাবা থাকবেন ধৃতির ঘরে।

“শোন বেটি, কাল রাতে ওই রজনী ঝুমুরের শরীরে  যে তোর সামনে হাজির হয়েছিল। সে আবারও আসবে, ভয় পাবি না, আমি আছি। আর কোনো ক্ষতি আমি হতে দেবো না।

আর হ্যাঁ, আমি আজ সারাদিন-সারারাত এই ঘরের মধ্যে নিজেকে বন্দি রাখবো। আমার না ডাকা পর্যন্ত এই ঘরের দরজার সামনে কেউ আসবি না।”

ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন পীর বাবা।

—কী হয়েছে বৌমা? কাল থেকে ঝুমুর আসছে না! তোমরাও কিছু বলছো না।

কাঁদতে কাঁদতে বললো গায়ত্রী, ঝুমুর আর নেই মা।

—নেই মানে?

—ওই ডাইনিটা ওকে শেষ করে দিয়েছে মা। ঝুমুরের নতুন বিয়ের সুখ ওই ডাইনি মাগি সহ্য করতে পারেনি।

চুপ করে রইলো আশালতা, আর একটাও কথা সে বললো না....

সারাদিনটা যে কীভাবে কেটে গেল, তারা নিজেরাও বুঝতে পারলো না। বাড়িতে রান্না হয়নি, কারো পেটে দুটো ভাত পড়েনি। তিনটে প্রাণী একটা ঘরে নির্বাক হয়ে বসে আছে।

ঘরের মধ্যে ধুনো দিয়ে মন্ত্র পাঠ করতে থাকলেন পীর বাবা। চোখ বন্ধ, মুখে বিড়বিড় করে মন্ত্র উচ্চারণ করে যাচ্ছেন। সারাদিন একনাগাড়ে মন্ত্র পড়লেন।

গভীররাতে পীর বাবার পাশে রাখা কাপড়ের থলিটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো।

পীর বাবা মৃদু হাসলেন।

একটা কালো বিড়াল গোল গোল তাকে প্রদক্ষিণ করছে। হঠাৎ দ্রুতবেগে আক্রমণ করতে এলে বিড়ালটা পীর বাবাকে, অমনই পীর বাবা একমুঠো সাদামাটি ছুঁড়ে দিল তার দিকে। ঘরের একপাশে ছিটকে গিয়ে পড়ল বিড়ালটা।

এবার গোটা ঘর একটা অপ্রাকৃতিক হাসিতে ভরে গেল। সেই হাসির শব্দ অন্য ঘর থেকে শুনতে পেল গায়ত্রী, আশালতা, ধৃতি। ভয়ে সিঁটিয়ে গেল তারা। শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল তাদের।

পীরবাবার সামনের আয়নায় ভেসে উঠলো, এক উলঙ্গ আধপোড়া নারীশরীর। মন্ত্রোচ্চারণ থামিয়ে পীর বাবা জিজ্ঞেস করলেন, কেন মারলি ঝুমুরকে?

শিরায় কাঁপুনি লাগানো হাসি হেসে সেই আধপোড়া নারী শরীরটা বললো, “কাউকে পেতে দেবো না স্বামীর সোহাগ, সবাইকে শেষ করে দেবো...”

—অনেক মানুষের প্রাণ তুই নিয়েছিস, আর না... বলেই মন্ত্র পড়া জল ছিটিয়ে দেয় আয়নার উপর।

সাথে সাথেই নারী শরীরটা মিলিয়ে যায় আয়নায়।আবার চোখ বন্ধ করে মন্ত্র পড়তে থাকে পীর বাবা।

এবার পাশের ঘর থেকে চিৎকার করে ওঠে ধৃতি। একটা আধপোড়া হাত তাকে টেনে এনে ফেলে উঠোনে। গায়ত্রী আটকাতে যায়, কিন্তু পারে না।

ঘর ছেড়ে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে পীর বাবা।

শুধু হাত নয়, আস্তে আস্তে ফুটে ওঠে সেই আধপোড়া পচা-গলা শরীর...

হ্যাঁ, সেই শরীর― যা ত্রিশ বছর আগে গায়ত্রী দেখেছিলো।

জোরে জোরে মন্ত্র পড়ে পীর বাবা। কালো বিড়ালটা উঠোন দিয়ে পার হচ্ছিলো, পীর বাবার ইশারাতে কালো বিড়ালটাকে একটা ঝুড়ি চাপা দিয়ে দেয় গায়ত্রী।

রজনীর হাত আলগা হয়ে যায়, ছেড়ে দেয় ধৃতিকে... পীর বাবা ঝুড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে ঝুড়ি সমেত কালো বিড়ালটা। আর সাথে সাথে প্রচণ্ড চিৎকার করে বাতাসে মিলিয়ে যায় রজনীর আত্মা।

ভোর হয়ে গেছে। উঠোনে সূর্যের আলো এসে পড়ছে। তিন প্রজন্মের তিনটি নারী এক বিন্দু স্বস্তির নিঃশাস নিয়েছে।

“আমি আসি রে বেটি... আমার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।” বিদায় নেয় পীর বাবা।

দু-দিন পর প্রত্যয় এসে নিয়ে যায় ধৃতিকে। প্রত্যয়কে কেউ কিছু জানায়নি, ঝুমুর মারা গেছে শুনে দুঃখ পায় প্রত্যয়।

বেশ কিছুদিন কেটে গেছে, কলকাতায় ফিরে এসেছে ওরা। ধৃতি কিছু মনে রাখতে চায় না, তাই এসব নিয়ে বিশেষ কিছু ভাবেও না।

রাতে বিছানায় ধৃতিকে কাছে টেনে নিলো প্রত্যয়। গ্রাম থেকে আসার পর ধৃতি প্রায় এক সপ্তাহ জ্বরে ভোগে। তাই সে'ভাবে দু'জন দু'জনকে সময় দিতে পারেনি। কাছে টেনে নিয়ে প্রত্যয় বললো, “কতদিন হয়ে গেলো তোমাকে কাছে পাইনি, আজ আর কোনো খামতি রাখবো না।”

মিলে গেলো দুটো শরীর, দুটো মন...

ধৃতির কানের কাছ দিয়ে মৃদু ঠান্ডা হাওয়া বেরিয়ে গেলো... আর কেউ যেন বলে গেলো,

“স্বামীর সোহাগ একাই পাবি?

জ্বলবো আমি পুড়ে?

জ্বালিয়ে কোনো লাভ হবে না,

আসবো আবার ফিরেএএএএএ...”

সমাপ্ত

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%