গৌর নিতাই

দুলেন্দ্র ভৌমিক

॥ ১ ॥

বেলতলা আর বকুলতলা—পাশাপাশি এই দুটো গ্রামের মধ্যে ব্যবধান শুধু একটা খাল। গঙ্গা থেকে এই খালের আরম্ভ, তারপর নানা গাঁ-গঞ্জের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে গিয়ে ইছামতীতে শেষ। আবার ইছামতীর দিককার লোকেরা বলে, “না গো কত্তা, না, এই যে দ্যাখছেন খালখান, ইডার আসল নাম বেহুলার খাল। সোঁদরবন থেকে বেরিয়ে ইছামতীতে আশ্রয় নিয়েছে, তারপর বিলেতের সাহেবরা গঙ্গা থেকে খাল কেটে সোনাই নদীতক খাল এনেছিল চাষের জন্যি। তা সে সোনাই তো হেজে-মজে এখন উধাও। মা গঙ্গার কিরপায় খালখান রয়ে গেছে। গিয়েছে ওই ইছামতী তক।”

খালের এই উৎপত্তি নিয়ে নানা জটিল তর্ক আছে। তবে এদিককার লোকের এখন আর তর্কে আগ্রহ নেই। তাঁরা বলেন বেলতলার খাল। ওই খালের একদিকে বেলতলা আর অন্যদিকে বকুলতলা। খালখানা গিয়েছে পশ্চিম থেকে পুবে, আর খালের উত্তরে বেলতলা এবং দক্ষিণে বকুলতলা। এই দুটো জায়গার নাম নিয়েও বিস্তর মতভেদ ৷ দেদার বেলগাছ ছিল বলেই যে জায়গাটার নাম বেলতলা তার কোনও মানে নেই। আবার ওদিকেও যে প্রচুর বকুলগাছ ছিল বা আছে তেমনও নয়। তবু ওই রকম নামই বহাল আছে বহুকাল ধরে। লোকে বলে ন্যাড়া নাকি বেলতলায় যায় না। কিন্তু কথাটা যে ঠিক নয় সে তো বেলতলা গ্রামে ঢুকলেই টের পাওয়া যায়। সেখানে অনেক ন্যাড়ামাথার লোক বাস করে। গৌর-নিতাইয়ের বাবা, আন্নাকালীর জ্যাঠা, সতুদের ঠাকুর্দা, এমন কি পেঁচোদার পিসি সমেত তাঁ প্রায় শ-জিনেক ন্যাড়ামাথার মানুষ বেলতলাতে বাস করে এবং খুশিমতো যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায়। কোনও দিন কারও কোনও বিপদ বা কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে কেউ শোনেনি। এই দুটো গ্রামের মধ্যে খুব যে বিবাদ-বিসংবাদ আছে তা নয়, আবার যে গলায়-গলায় মাখামাখি ধরনের আদিখ্যেতা, তেমনও নয়। তবে এটা ঠিক, দুটো গ্রামের মধ্যে একটা চাপা রেষারেষি আছে। এই রেষারেষিটা সব ব্যাপারেই। এরা যদি বারো হাত কালীমূর্তি বানিয়ে পুজো করে, ওরা তবে চোদ্দ হাত তৈরি করবে। এই রেষারেষির ফলেই বেলতলায় এবার কালীমূর্তি হল সাতাশ হাত আর বকুলতলায় ঊনত্রিশ হাত। দু' পাড়ার মধ্যে অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় মা-কালী যত লম্বা হন দু' পাড়ার প্যান্ডেল তৈরি করতে গিয়ে ডেকরেটর ফণী আর মণি দু'জনেই তত বেশি খুশি হয়ে ওঠে। কেননা, দু' হাত বাড়লেই ফণী-মণিদের রেটও বেড়ে যায় দু'শো টাকা করে। ফণী-মণিদের ব্যাপারটা একটু খুলে বলা দরকার। ফণী সরকার হল বেলতলার বাসিন্দা। একসময় বকুলতলার লোকদের ডেকরেটরের খোঁজে বেলতলাতেই আসতে হত। ব্যাপারটা বকুলতলার ছেলে-ছোকরাদের খুব ভাল লাগত না। ওদের মনের ভাব অনুমান করেই ফণী তার ছোট ভাই মণিকে বকুলতলায় দোকান করে দিল। মানে, অন্য লোক দোকান করার আগেই মণি ডেকরেটর্স চালু হয়ে গেল বকুলতলা বাজারে। শুধু মূর্তি তৈরির ব্যাপারেই রেষারেষি সীমায়িত নয়। সব ব্যাপারেই ওটা আছে। রেষারেষির ব্যাপারটা অতিমাত্রায় স্পষ্ট এবং প্রত্যক্ষ হয় ফুটবল আর ক্রিকেট খেলার সময়। ঠিক যেন কলকাতার মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু একটা ব্যাপারে বেলতলাকে কিছুতেই হারাতে পারে না বকুলতলা। বকুলতলার ছেলেরা তাই আক্ষেপ করে বলে, কেমন করে পারা যাবে? আমাদের কি গৌর-নিতাই আছে! ওরা তো ওদের দিয়েই আমাদের কাত করে ফেলছে।

কথাটা মিথ্যে নয়। যে-কোনও ব্যাপারেই বেলতলার বড় ভরসা হচ্ছে, গৌর-নিতাই। তবে কোনও জিনিসের গোটাটাই আর ভাল হয় না। ফুলে যেমন কাঁটা থাকে, আমের মধ্যে পোকা, দুধে জল, তেলে ভেজাল, তেমনই গৌর-নিতাইকে নিয়ে সমস্যাও কম হয় না। তবে ভাল-মন্দ মিলিয়ে বিচার করতে গেলে ভাল'র মাত্রাই কিন্তু বেশি। পেঁচোদার পিসি, তাঁর যে কত বয়স, তা আমরা কেউ বলতে পারব না। ছেলেবেলা থেকেই আমরা দেখছি ন্যাড়ামাথা, পায়ে খড়ম আর হাতে একটা লাঠি নিয়ে তিনি সারা পাড়া ঘুরে বেড়াচ্ছেন' আর সবার খোঁজখবর নিচ্ছেন। বকুলতলার এটাও আক্ষেপের আরও একটা কারণ যে, তাদের গ্রামে অমন একজন ঋজু চেহারার ন্যাড়ামাথা পিসি নেই। পুরীর পাণ্ডারা এই পিসিকে বুঝতে না পেরে 'দাদা' বলে ডেকে ফেলেছিল। কিন্তু যখন তাঁদের বোঝানো হল যে, তিনি 'দাদা' নন, বেলতলার পিসি, তখন তাঁরা ব্যাপারটা হয়তো মেনে নিতে বাধ্য হলেন, কিন্তু তাঁদের সংশয় যে ঘুচল না সেটা তাঁদের বিস্ফারিত চোখের অবাক দৃষ্টি দেখেই দিব্যি বোঝা গেল। তা সেই পিসিও বলেন, “গৌর-নিতাই তো মানুষ নয়, ওরা হল নররূপে নারায়ণ। তবে কিনা অবতারের লীলা বোঝা ভার। ওদের দৌরাত্ম্যের মধ্যেও বুঝি তাঁর লীলা।" এই পিসি ছাড়া আর অবশ্য কেউ ওদের অবতার বলে মনে করে না। ছেলেবেলায় গৌর-নিতাই যখন আমাদের সহপাঠী ছিল, তখন থেকেই আমরা তাদের ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সে সময় বকুলতলা ছিল নিতান্তই একখানা আটপৌরে গ্রাম। আজকের মতো শহুরে কায়দা-কেতা তার গায়ে লাগেনি। গৌর-নিতাই ক্লাস সিক্সে এসে আমাদের স্কুলে ভর্তি হল। প্রথম দিনেই বিভ্রাট। আমাদের প্রথম ক্লাস ছিল বাংলার। ক্লাস নিতে এসে অনাদিবাবুর চোখ গোল-গোল হয়ে গেল। হওয়ারই কথা! ওদের দু'জনকে প্রথম দেখে আমাদেরও তাই হয়েছিল। অনাদিবাবু বেঞ্চে বসা দু'জনের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “তোমরা উঠে এসো।"

সুবোধ বালকের মতো গৌর-নিতাই উঠে গেল। স্যার বললেন, “তোমরা দু'জন দু'পাশে দাঁড়াও।”

ওরা তাই দাঁড়াল। স্যারের টেবিলের দু'পাশে দু'জন। স্যার একবার ডাইনে আর একবার বাঁয়ে। আমরা ব্যাপারটা জেনে গেছি বলে মুখে হাত চাপা দিয়ে খুকখুক করে হাসি। গৌর-নিতাইও হাসে। কিন্তু অনাদিবাবুর মুখে হাসি নেই। তিনি ক্রমাগত দু'জনকে দেখতে-দেখতে নিজের চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ে বলেন, “এমনও হয় নাকি! এ তো শুধু বায়োস্কোপে দেখা যায়।"

ওরা বলে ওঠে, “আমরা স্যার বায়োস্কোপ নই। একেবারে জ্যান্ত, সত্যিকারের ব্যাপার।”

অনাদিবাবু ঢোঁক গিলে বলেন, “তাই তো দেখছি। এটা কেমন করে হল?”

গৌর-নিতাই ফিক করে হেসে ফেলেই নিজেদের সামলে নেয়। তারপর একজন বলে, “স্যার কেমন করে হল, সেটা আমার বাবাও বলতে পারবেন না। তবে হ্যাঁ, হয়ে গেছে। আমরা দু'জন একই দিনে জন্মেছি। মাত্র ন' মিনিট আগে আমি মানে আমি জন্মাবার ন’ মিনিট পরে নিতাই জন্মেছে। আমরা বোধ হয় সেইজন্যেই একই রকম দেখতে হয়েছি। যমজ ভাইদের ক্ষেত্রে নাকি এমনটাই হয়। চেহারায় বিশেষ কোনও তফাত নেই ৷ ”

অনাদিবাবু পরাজিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “বিনয় করে বিশেষ কোনও তফাত নেই বলছ কেন? তোমরা তো একই রকম দেখতে। হুবহু একরকম। কণামাত্র তফাত নেই।"

নিতাই বলল, “না স্যার, মিছে কথা বলব না। আমাদের মধ্যে এক ইঞ্চির তফাত আছে।"

স্যার বললেন, “খালি চোখে তো দু'জনকে সমানই মনে হয়। কে যে এক ইঞ্চি লম্বা, সেটা বোঝা দুষ্কর।"

এবার গৌর বলল, “উচ্চতায় আমরা সমান-সমান। তবে নিতাই ঠিকই বলেছে, এক বিন্দুর মতো একটা ফারাক আছে।"

এবার দু'জনের মুখের দিকে ভাল করে বার দুই দেখে নিয়ে অনাদিবাবু বললেন, “কিসের এক বিন্দুর তফাত? কোথায় তফাত?”

গৌর বলল, “স্যার আমার পেটে একটা ছোট্ট তিল আছে। ওই এক বিন্দুই হবে। নিতাইয়ের নেই।. ওটা ছাড়া আর কোনও তফাত নেই।”

অনাদিবাবু গলায় রাগ ফুটিয়ে বললেন, “ওটা কোনও তফাত হল? আমরা মানুষকে চিনি, মনে রাখি তার মুখ দেখে। কেউ কি পেটের তিল খোঁজে?”

গৌর খুব চিন্তিত মুখ করে বলল, “সেটা একটা কথা বটে! তা ছাড়া তিলটা যদি গালে-কপালে থাকত তা হলে নাহয় একটা কথা ছিল। ওটা একেবারে পেটে।”

সেদিন ক্লাসে আর ভাল করে পড়াতেই পারলেন না অনাদিবাবু। তিনি বললেন, “দেশি-বিদেশি সাহিত্যে অবশ্য এরকম ব্যাপার আছে। শেক্সপিয়রের কমেডিতে এরকম পাই। কিন্তু বাস্তবে কেউ কখনও...”

গৌর বলল, “স্যার, মনে হচ্ছে শেক্‌সপিয়র আমাদের দু'জনকে দেখে থাকবেন। ছেলেবেলায় আমরা অনেকদিন ছোটমামার বাড়িতে ছিলাম। ওই বাড়ির আশেপাশে অনেক সাহেব-মেম থাকতেন। মনে হয় শেক্‌সপিয়রবাবুও ওখানে থাকতেন।”

অনাদিবাবু রাগের চোখে গৌর-নিতাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শাট আপ! এমন কথা আর বাইরে বোলো না।"

গৌর-নিতাই চুপ হয়ে গেল।

মাস তিনেকের মধ্যে আমাদের মতো মাস্টারমশাইরা ও গৌর-নিতাইয়ের ব্যাপারে মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গেলেন। তবে কে যে গৌর আর কে যে নিতাই, সেটা কিন্তু তিন মাসেও বোঝা গেল না। শুধু পণ্ডিতমশাই ক্লাসে এসে ডাকতেন, “গৌর-নিতাই!”

ওরা উঠে দাঁড়াত। পণ্ডিতমশাই বলতেন, “গৌর এদিকে আয়।

গৌর এগিয়ে যাওয়ার পর পণ্ডিতমশাই চকের গুঁড়ো দিয়ে গৌরের কপালে লম্বা দাগ টেনে দিয়ে বলতেন, “তুই হলি গৌর। তোকে চিহ্ন দিয়ে রাখলাম। এবার বুঝতে সুবিধে হবে। খবরদার, দাগ মুছিস না।”।

গৌর-নিতাই লেখাপড়ায় দারুণ কিছু না হলেও ফেল-টেল করত না। তবে গৌর ছিল ইংরেজি আর সংস্কৃতে খুব ভাল।

ওদিকে নিতাই ইংরেজি আর সংস্কৃত একেবারেই পারত না। পাস-মার্ক তোলাও কঠিন হয়ে যেত। ও ভাল ছিল অঙ্কে আর ভূগোলে। অন্যান্য বিষয়ে দু'জনে প্রায় একই রকম। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে যে, আমাদের সব পরীক্ষাতে গৌর-নিতাই অঙ্কে বরাবর একই নম্বর পেয়ে এসেছে, এমন কি হায়ার সেকেন্ডারির টেস্টে এবং ফাইনাল পরীক্ষাতেও। ইংরেজি, সংস্কৃত আর ভূগোলেও প্রায় কাছাকাছি নম্বর। মাত্র এক বা দুইয়ের তফাত। কখনও বা তাও নয়। মাস্টারমশাইরা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেন, “দেখতে নাহয় একরকম। তাই বলে তোদের মেধাও কি একই হবে? অনেক বিষয়েই তোরা একই নম্বর পাস কেমন করে?”

ওরা দু'জনেই হাত কচলে উত্তর দেয়, “সব তো স্যার বুঝিয়ে বলতে পারব না। একসঙ্গে জন্ম হলে মেধাও নিশ্চয়ই একই রকম হয়। আমার জ্বর হলে নিতাইয়ের গা-গরম হয়। আবার নিতাইয়ের পেট খারাপ হলে আমারও হয়।”

মানুষের জন্ম এবং তার রহস্য নিয়ে গবেষণা করার মতো সময় এবং আগ্রহ তো সবার থাকে না। মাস্টারমশাইদেরও বা অত সময় কোথায়। স্কুলের পড়ানো শেষ করে ছুটতে হয় কোচিং ক্লাসে। দফায় দফায় কোচিং সেরে বাড়ি ফিরতে রাত দশটা বাজে। এর মধ্যে যমজ সন্তানের মেধার স্বরূপ এবং প্রকৃতি নিয়ে গবেষণার সময় কোথায়? অতএব, গৌর-নিতাইয়ের ব্যাখ্যাই তাঁরা মেনে নেন। আমাদের বেলতলা গ্রামের পক্ষে গৌর-নিতাই ক্রমেই দ্রষ্টব্য হয়ে উঠতে লাগল। লোকে যেমন কলকাতায় বেড়াতে গেলে হাওড়া ব্রিজ, ভিক্টোরিয়া, চিড়িয়াখানা, মনুমেন্ট, জাদুঘর, গড়ের মাঠ, পাতাল রেল এবং ইদানীং বিদ্যাসাগর সেতু দেখতে ভোলে না, তেমনই বেলতলায় নতুন কোনও অতিথি এলে গৌর-নিতাইকে একবার দেখবেই। এমনকী, বকুলতলার কোনও মেয়ে বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পর সে আর কিছু বলুক না বলুক, বেলতলার গৌর-নিতাইয়ের কথা বলতে ভুলবে না। ফলে নতুন জামাই যখন দ্বিরাগমনে শ্বশুরবাড়িতে আসে, সে জামাই বেলতলা বা বকুলতলা যে তলারই হোক, সে একবার গৌর-নিতাইকে চাক্ষুষ করতে চায়। বকুলতলার ছেলেরা জানে, এই একটা জায়গায় তারা বড্ড মার খেয়েছে। তাদের গ্রামে যদি গৌর-নিতাইয়ের মতো অমন একজোড়া মানিকজোড় থাকত, তা হলে বেলতলার আগন্তুক আর অতিথিদের তারাও তাদের গ্রামে টেনে আনতে পারত। বকুলতলার ভগ্নপ্রায় টেরাকোটার মন্দির, প্রতাপাদিত্যের আরাধ্যা ভুবনেশ্বরীর মন্দির কিংবা নীলকর সাহেবদের পোড়ো কুঠি—এগুলি দেখতে কেউ আর আগ্রহী নয়। গ্রামের ভিখিরি, বাউণ্ডুলে লোকজন ছাড়া ওসব চত্বরে কাউকে বিশেষ দেখা যায় না। ভোটের প্রচার করতে এসে কলকাতা-দিল্লির মানুষও গৌর-নিতাইয়ের কথা জেনে যান এবং নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে একটিবার দেখেও যান। একবার বিদেশ থেকে একদঙ্গল সাহেব-মেম গলায় ক্যামেরা আর জলের বোতল ঝুলিয়ে বেলতলায় এলেন। তাঁরা গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিসে বসে রুরাল ডিভেলাপমেন্ট, ইরিগেশন, মানে গ্রামের উন্নয়নে কী-কী কাজ হচ্ছে বা হবে, এসব বিষয়ে আলোচনা সেরে গ্রাম দেখতে বেরোলেন। বেলতলা দেখে বকুলতলা যাওয়ার কথা। গ্রামের রথতলার মোড়ে গৌর-নিতাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আখ খাচ্ছিল। সাহেব-মেমদের চোখ আটকে গেল। ওঁরা গৌর-নিতাইকে দেখতে-দেখতে নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে-করতে এগিয়ে গেলেন গৌর-নিতাইয়ের দিকে। জেলা থেকে ওঁদের সঙ্গে যেসব সরকারি বাবুরা এসেছিলেন, তাঁরাও অবাক! গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধান পরেশ মণ্ডল যখন বুঝলেন সাগরপারের সাহেব-মেমরা অবাক হয়ে গেছেন, জেলার পদস্থ সরকারি বাবুরাও অবাক চোখে একই চেহারার দু'জন ছেলেকে দেখছেন, তখন আর পরেশ মণ্ডল নিজের আবেগকে সামলাতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন, গ্রামের সর্বপ্রকার উন্নতিতে বিদেশি সংস্থার যে সাহায্য পাওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে তা বুঝি গৌর-নিতাইয়ের জন্যই হবে। সাহেব-মেমরা কিন্তু ততক্ষণে ক্যামেরা বের করে গৌর-নিতাইয়ের ছবি নিতে আরম্ভ করেছেন। ক্লিক, ক্লিক করে ছবি উঠছে। তাঁদের ফরমাশমতো গৌর-নিতাইও নানা ভঙ্গিতে দাঁড়াচ্ছে, বসছে, পরস্পরকে জড়িয়ে জড়িয়ে ধরছে। এইসব কাণ্ডকারখানার মধ্যেই পঞ্চায়েত প্রধান তাঁর দু' আঙুলের টিপে নস্যিটা আর নাকে না দিয়ে ওই অবস্থাতেই সাহেব-মেমদের বলতে লাগলেন, “দিস ইজ ভেরি ইন্টারেস্টিং ম্যাটার ইন আওয়ার নেটিভ ভিলেজ। আই ডু হলফ অ্যান্ড আই মাস্ট সে দিস টাইপ অব সাদৃশ্য ইউ নেভার সি এগেন। দিস ইজ এইট্‌থ আশ্চর্যম ইন দা ওয়ার্ল্ড। ইউ সেভ আওয়ার ভিলেজ অ্যান্ড এইট্‌থ আশ্চর্যম লাইক গৌর অ্যান্ড নিতাই। বোথ আর ভেরি ভেরি মূল্যবান থিংকস।”

পরেশ মণ্ডল মশাই আবেগতাড়িত হয়ে বোধ হয় ইংরেজিতে আরও কিছু বলতেন, কিন্তু সহসা তাঁর পেছন থেকে কে যেন একটা গুঁতো দিয়ে চাপা গলায় বললেন, “থামুন। কথা বললে গলা টিপে ধরব।” পরেশ মণ্ডল বুঝতে পারলেন না, ঠিক কে তাঁকে পেছন থেকে মোক্ষম গুঁতোটা মেরেছেন। তিনি অবাক গলায় বললেন, “হোয়াই? হোয়াই স্টপ?”

আবার একটা গুঁতো পড়তেই তিনি কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে সাহেব-মেমদের এক্কেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে নিজের দেহের ভারটা সামলাবার জন্য সজনে গাছটা দু' হাতে ধরতে যাওয়ার আগেই হাতের টিপ থেকে নস্যি উড়ে গিয়ে কার কার নাকে যে ঢুকল তা বোঝা গেল না বটে, কিন্তু মহকুমা শাসক থেকে সাহেব এবং মেমরা ঘন-ঘন হাঁচতে লাগলেন। পরেশ মণ্ডল ঘাবড়ে গিয়ে মহকুমা শাসকের সামনে এসে বললেন, “ভেরি ভেরি সরি স্যার। বাট আই অ্যাম নট রিয়েল অপরাধী। বাতাস, আই মিন এয়ার ইজ অপরাধী।”

মহকুমা শাসক নাকে রুমাল দিয়ে আরও একবার হেঁচে নিয়ে বললেন, “আপনি আমাদের থেকে অন্তত বিশ হাত দূরে-দূরে থাকুন।”

গৌর-নিতাইয়ের ছবি তুলে যাওয়ার সময় সাহেব-মেমরা যখন একশো টাকার একটা নোট বের করে ওদের দিতে গেলেন, তখন গৌর বলল, “নো, থ্যাঙ্কস!”

সাহেব-মেমরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে গৌর-নিতাইকে দেখতে-দেখতে চলে গেলেন। তাঁরা ওদের দু'জনকে দেখে এতই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন যে, গোটা গ্রামখানা ঘুরে দেখার কর্মসূচি বাতিল করে উঠে বসলেন গাড়িতে। বেলতলার পর বকুলতলায় আর গেলেনই না। অথচ বকুলতলায় তাঁদের অভ্যর্থনার কত আয়োজন করা হয়েছিল। তাঁরা যে বেলতলায় স্রেফ গৌর-নিতাইকে দেখে আর ওদের দু'জনের বিস্তর ফোটো তুলেই কলকাতা চলে গেছেন, সে খবরটা রাষ্ট্র হতে বেশি সময় লাগল না। আক্ষেপে নিজের কপাল চাপড়ে বকুলতলার পঞ্চায়েত-প্রধান দীনবন্ধু পাঁজা বললেন, “সবই কপাল! গৌর-নিতাই এখন টুরিস্ট অ্যাট্রাকশন। অন্য গাঁ থেকেও ওদের দেখতে আসে।"

বকুলতলার গগন গড়াই বলে, “হ্যাঁ গো দিদা, জোড়া ছেলে কি কারও হয় না নাকি! আমার বেয়াই মশাইয়ের জোড়া ছেলে।”

দীনবন্ধু বলেন, “জোড়া হলে হবে না। ওরা কি একই রকম দেখতে? হুবহু একরকম?”

গগন গড়াই বলে, “না, সেরকম নয়। একটি পেয়েছে বাপের মুখ, আরেকটি পেয়েছে মায়ের।”

দীনবন্ধু আপসোস আর রাগ মিশিয়ে বলেন, “অমন ছেলে লাখে-লাখে আছে। ওতে কিছু হয় না। যদি একরকম হত তা হলে তোমার বেয়াইকে ফ্রি জমি দিয়ে বলতুম, এখানে জোড়া ছেলে নিয়ে বাস করো। বেলতলার মতো আমাদের গাঁয়েও তখন সাহেব-মেমরা রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে তোমার বেয়াইয়ের জোড়া ছেলের ছবি তুলত। লোক দেখতে আসত। ওই টেরাকোটার ভাঙা মন্দির আর প্রতাপাদিত্যের গপ্পো বলে কি টুরিস্ট আনা যায়। কলকাতার বড় একটা যাত্রা কোম্পানি গৌর-নিতাইয়ের বাবাকে বলেছিল, ‘দুজনকে ছ’ হাজার টাকা মাইনে দেব, আমার দলে দিন।' ছেলে দুটো রাজি হয়নি বলে বাপ দিতে পারেনি। তা ছাড়া ওদের মা'র খুব আপত্তি ছিল।”

গগন গড়াই বলল, “সে তো হবেই। দুটো ছেলে ছেড়ে মা থাকবে কেমন করে। তবে একটাকে ছেড়ে দিতে পারত। মাসে তিন হাজার টাকা তো ফ্যালনা নয়।"

দীনবন্ধু পাঁজা বললেন, “দুর মশাই, একটাতে কী হবে! ওদের ভ্যালু তো দু'জনকে নিয়ে। একজনের কোনও দাম নেই।"

গৌর-নিতাইকে নিয়ে চারপাশে যত আলোচনা হোক, যতই কৌতূহল থাক, ওরা কিন্তু নির্বিকার। ওরা সবসময় একসঙ্গে থাকে, একই রকম জামা-জুতো পরে। বোধ হয় ওরাও বুঝতে পারে, ওদের নিয়ে অন্যদের বিভ্রম আর বিপত্তি যত বাড়ে, ততই ওরা আলোচ্য হয়ে ওঠে। আমরাও ওদের সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরি। একদিন ওদের জিজ্ঞেস করি, “দ্যাখ, আমরা তো একই মাস্টারমশাইয়ের কাছে সবাই পড়ি। কিন্তু তোদের মতো আমাদের সবার তো একই রকম নম্বর থাকে না। তোদের কেমন করে হয় ৷ ”

গৌর-নিতাই উত্তর দেয় না, মিটিমিটি হাসে। আমি যতই জানবার জন্য পীড়াপীড়ি করি, ওদের হাসি ততই বেড়ে যায়। অবশেষে উঠে আসতে-আসতে বললাম, “কাল থেকে তোদের সঙ্গে কথা বলব না। তোরা বন্ধুকে বিশ্বাস করিস না। তোদের মন এত ছোট!”

আমার কথায় কাজ হয়। ওরা দু'জনে আমাকে হাত ধরে টেনে বসায়। তারপর বলে, “শুধু তোকে বলছি, তোকে কিন্তু দিব্যি কাটতে হবে, কখনও কাউকে বলবি না। দিব্যি কাট।”

আমি চোখ ছুঁয়ে, বই ছুঁয়ে দিব্যি কাটি। গৌর বলে, “তোর মনে আছে একই রকম দেখতে বলে আমাদের দু' ভাইকে নিয়ে ক্লাসে প্রায়ই নানা বিভ্রাট হত। সেজন্য হেডস্যারকে বলে আমিই দু'জনকে দু' সেকশনে দেওয়ার কথা বলেছিলাম?”

আমি বলি, “হ্যাঁ, মনে আছে।"

গৌর বলতে থাকে। অবশ্য গৌর বা নিতাই কে যে বলতে থাকে, সে-ব্যাপারে আমি কিন্তু খুব নিশ্চিত নই। যাই হোক, গৌরই যদি ধরে নিই, তা হলে গৌর বলে, “দু’জন যখন দুই সেকশন, তখন তো স্কুলের পরীক্ষায় একই ঘরে আমাদের সিট পড়বে না। আমাদের দু'জনকে একই ঘরে দেবে না। আমরা আলাদা ঘরে বসতাম। ইংরেজি আর সংস্কৃতে আমার কোনও ভয় নেই। আমি দেড় থেকে পৌনে দু' ঘন্টার মধ্যে সব লিখে বাইরে আসতাম বাথরুম করার জন্য। ঠিক ওই সময় নিতাইও বাইরে আসত একই কারণে। এবার নিতাই গিয়ে বসত আমার ঘরে, আমার সিটে। ওর আর কিছু লেখার দরকার নেই। স্রেফ সময় মতো খাতা জমা দেওয়া। আমি গিয়ে নিতাইয়ের খাতায় লিখতাম। আবার অঙ্ক আর ভূগোলের দিন নিতাই এসে আমার খাতায় লিখে দিত। একই লোক লিখলে নম্বর আর কত তফাত হবে। অঙ্ক তো এক হবেই। কিন্তু কথাটা বলিস না। ভেবে দ্যাখ না, সব বিষয় কি সবার মাথায় ঢোকে। ওই পাললিক শিলা-টিলা আমার মাথায় ঢোকে না। মাটির ওপরে যা আছে তাই বুঝতে পারি না, তার ওপর মাটির নিচে সেঁধিয়ে কতটুকু বোঝা যাবে।”

দিব্যি কাটা ছিল বলে কথাটা কাউকে কোনওদিন বলিনি। কিন্তু আমি প্রতি পরীক্ষাতেই ওদের দু'জনের ব্যাপারটা লক্ষ করতাম। এক ঘণ্টার পর প্রথম বেল পড়ত। তারপর মিনিট চল্লিশ যেতে না যেতেই গৌর উঠে দাঁড়িয়ে বলত, “স্যার বাথরুম যাব।” গৌর বেরিয়ে যেত। মিনিট পাঁচেক পর যে ঢুকত সে যে গৌর নয়, নির্ঘাত নিতাই, এটা আমি ছাড়া আর কেউ টের পেত না। আমি নিতাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসতাম, নিতাইও আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসেই চোখ বড়-বড় করে তাকাত। বোধ হয় আমাকে আমার দিব্যির কথা মনে করিয়ে দিত। রোজই ওদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করতাম, অথচ সবসময় ঠিকঠাক বুঝতে পারতাম না, কোন্‌টা গৌর আর কোন্টাই বা নিতাই। তবে মজা ছিল এই যে, আমরা, শুধু আমরা কেন, পাড়ার বড়রাও ওদের দু'জনকে কখনও আলাদা-আলাদা নামে ডাকতেন না। ‘গৌর' বলে ডাকলে যে আসবে সে যে গৌরই, নিতাই নয়; আবার ‘নিতাই” বলে ডাকলে যে নিতাই-ই আসবে, গৌর আসবে না, এমন গ্যারান্টি তো নেই। অতএব, যাকেই দরকার হোক না কেন, সবাই একসঙ্গে দু'জনকে ডাকতেন। "অ্যাই গৌর-নিতাই।” ক্লাসে মাস্টারমশাইও তাই ডাকতেন। দু'জনে দু' সেকশনে থাকত বটে, তবে কোন সেকশনে গৌর আর কোন সেকশনে নিতাই, সেটা তো রোলকলের খাতা না দেখলে বোঝার উপায় নেই ৷ পাছে কাকে ডাকতে কাকে ডেকে ফেলবেন সেই ভয়ে সবাই দু'জনের নাম জোড়া করে ডাকতেন, “গৌর-নিতাই।”

আমাদের পোস্ট অফিসের মাস্টারমশাই অখিল চৌধুরী নাকি একবার গৌর-নিতাইয়ের বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হ্যা মশাই, আপনার ছেলে দুটো তো একই রকম দেখতে। এটাই তো বড় বিস্ময়কর ব্যাপার। তদুপরি আপনি আবার তাদের নাম রেখেছেন গৌর-নিতাই। নাম রাখার ব্যাপারটা তো আপনার হাতে, এরকম যুগলবন্দি নাম না রেখে অন্যরকম তো রাখতে পারতেন।”

গৌর-নিতাইয়ের বাবার নাম ছিল বিষ্ণুচরণ ভট্টাচার্য। বিষ্ণুকে ভুল উচ্চারণে অপভ্রংশ করে সবাই বলত, বিষ্টুচরণ। পোস্টমাস্টারমশাইয়ের কথা শুনে বিষ্ণুচরণ বলেছিলেন, “দেখুন, আমার নাম বিষ্ণুচরণ, আমার স্বর্গত পিতৃদেবের নাম ছিল হরিচরণ। দুই পুরুষের চরণাশ্রিত বলেই জোড়া ছেলের মুখ দেখতে পেলুম। জানবেন, এটাও তাঁরই কৃপা। তাই ওদের নাম দিলুম গৌর-নিতাই। এই নামের দুই মহাপুরুষ বঙ্গদেশে ভক্তির প্লাবন এনেছিলেন। জাতপাতের বেড়া ভেঙেছিলেন। তাই সর্বক্ষণ তাঁদের নাম যাতে জিভের ডগায় থাকে তাই ছেলে দুটোর ওই নাম। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অন্তত বিশ-পঁচিশবার তো ‘গৌর-নিতাই কোথায় রে, গৌর-নিতাই পড়তে বোস, গৌর-নিতাই মা'কে ডেকে দে, এই করতে-করতে কতবার কর্মসূত্রে তাঁর নাম জপ হয়ে যায় বলুন তো!”

অখিলবাবু মুচকি হেসে বলে ওঠেন, “নামগানের মেড-ইজি।”

বিষ্ণুচরণ হাসেন না। গম্ভীর হয়ে বলেন, “টেক ইট ইজি অখিলবাবু। করণীয় কাজটাকে সহজ অভ্যাসে পরিণত করার নামই হল সাধনা। বনে-বাদাড়ে চোখ বুজে বসে ঈশ্বর আরাধনার দিন তো গেছে। ছোটখাটো পাহাড়ও ফাটিয়ে স্টোন চিপ্‌স তৈরি হচ্ছে। ঘরে বসেই যখন সাধনা করতে হবে, তখন ঘরেই সেই বাতাবরণ তৈরি করা দরকার। ব্যাপারটা কী বুঝলেন?”

অখিলবাবু একটু দমে গিয়ে বললেন, “বুঝলাম। তবে অনেক সময় হয় না, ছেলেরা দুষ্টুমি করলে, কি বেয়াদপি করলে বাবা রেগে গিয়ে বলে ফেলেন, আজ তোকে মেরে ফেলব! পাজি কোথাকার! এই যেমন আমি আমার ছেলের উদ্দেশে বলি, আজ বাড়ি ফিরলে সন্তুকে পিটিয়ে তক্তা করে দেব। আপনি রেগে গেলেও নিশ্চয়ই তাই বলেন।”

বিষ্ণুচরণ অখিলবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসলেন, যেন অখিলবাবু অতি নির্বোধের মতো কিছু একটা বলে ফেলেছেন। বিষ্ণুচরণ বললেন, “আমি কী বলি সেটা বলবার আগে আপনি শুনে রাখুন, আপনি ঠিক করছেন না। নাম হচ্ছে নারায়ণ। ওই ‘সন্তু', ওটা তো চলিত কথ্য ভাষা। ওর মধ্যেই রয়েছে ‘সন্ত' মানে কিনা সন্ন্যাসী। সাধু। আপনি কি ওই নামে গালাগাল করতে পারেন? ক্রোধ হলে আমি কদাচ ওদের নাম উচ্চারণ করি না। আমি বলি, আমার ‘ধাড়ি দুটো কোথায়? এবার ওই ধাড়ি ধরে গালাগাল করে যান। কেউ আপনার ধার ধারবে না।”

এর পর অখিলবাবু আর ঘাঁটাতে সাহস করেননি। ছাতা বগলে তাড়াতাড়ি চলে আসবার জন্য যেই না পা বাড়িয়েছেন অমনিই পেছন থেকে ছাতা টেনে ধরে বিষ্ণুচরণ বললেন, “নাম নিয়ে কথা যখন উঠলই, তখন ব্যাপারটা আরও বিস্তারিত করা যাক। এই যেমন ধরুন, আপনি, আপনার নাম অখিল। আপনি কি চাট্টিখানি লোক! এটা একটা বিশেষণ মাত্র। কিন্তু এটাই যখন বিশেষ্য হয়ে যায়, তখন কী মানে দাঁড়ায় বলুন তো! তখন তো আপনিই গোটা বিশ্ব। আপনার মধ্যেই আমাদের আনাগোনা। সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয়। এই অখিল নিয়ে বিশ্বকবি কত গান বেঁধেছেন, জানেন। যেমন ‘মম জীবন যৌবন মম অখিল ভুবন’ আবার, ‘আকাশ সমুদ্র সাথে প্রচণ্ড মিলনে মাতে অখিলের আঁখিপাতে আররি তিমির'। আবার অন্যদিকে দেখুন...”

অখিলবাবু এবার হাতজোড় করে বলে ওঠেন, “কোনওদিকে না দেখে শুধু আমার দিকে দেখুন। আমার অফিসের বেলা হয়ে যাচ্ছে। দয়া করে আর বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। বিস্তার থামিয়ে এবার বিরতি দিন।”

অখিলবাবুর ছাতার শেষপ্রান্ত বিষ্ণুচরণের হাতে। অখিলবাবু বুঝলেন ছাতা টানাটানিতে গায়ের জোরে বিষ্ণুর চরণাশ্রিত বিষ্ণুবাবুর সঙ্গে তিনি পেরে উঠবেন না। তাই তিনি “আমার ঘাট হয়েছে, এবার ছাতা ছাড়ুন” বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার আগেই বিষ্ণুচরণ বলে উঠলেন, “এই যে বললেন, বিরতি দিন। এই ‘বিরতি' শব্দটা হচ্ছে... "

অখিলবাবু অগত্যা ছাতার মায়া ত্যাগ করে ছাতা ছাড়াই যথাসম্ভব তীব্র গতিতে পোস্ট অফিসের দিকে ধাবিত হলেন। অখিলবাবু অবশ্য তাঁর এই অভিজ্ঞতা গোপন রাখেননি। পোস্ট অফিসে যত লোক গেছেন, সবাইকে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার কাহিনী শুনিয়ে ছেড়েছেন। এর পর গ্রামের কেউ আর এ-বিষয়ে বিষ্ণুচরণকে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পায়নি। এমন কি আমরা যারা লোকমুখে অখিলবাবুর অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি, তাঁরাও কোনওদিন গৌর-নিতাইয়ের বাবা তো দূরের কথা, স্বয়ং গৌর-নিতাইকেও জিজ্ঞেস করতে সাহস পাইনি। পরে অবশ্য জেনেছিলাম, গৌর-নিতাই যদি বেলতলার বিস্ময় হয়, তা হলে ওদের বাবা বিষ্ণুচরণ হচ্ছেন মহা বিস্ময়। যে-কোনও সরল একটা বিষয় থেকেই তিনি মহা তর্ক জুড়ে দিতে পারেন। আমরা একবার বিষ্ণুচরণবাবুর কাছে সরস্বতী পুজোর চাঁদা চাইতে গিয়েছিলাম। বিষ্ণুচরণবাবু তখন উঠোনে বসে খই আর দুধ খাচ্ছিলেন। আমাদের দেখে বললেন, “এসো, এসো। কী ব্যাপার, সবাই দল বেঁধে এয়েছ যে?”

আমি বিনীতভাবে বললুম, “মেসোমশাই, আমরা সবাই মিলে রথতলার মোড়ে সরস্বতী পুজো করছি। তাই আপনার কাছে চাঁদা নিতে এসেছি।”

বিষ্ণুচরণবাবু খাওয়া শেষ করে ছোট্ট একটা ঢেকুর তুলে বললেন, “এসেছ যখন, তখন নিশ্চয়ই কিছু পাবে। কিন্তু ওই যে বললে 'চাঁদা', তা চাঁদা কতরকমের হয় জানো?”

আমাদের চাঁদা আদায়কারী দলের মধ্যে ছিল বিশু। ওর আবার সব ব্যাপারেই আগ বাড়িয়ে কথা বলার স্বভাব। তা সেই বিশু ফস করে বলে উঠল, “চাঁদা অনেক রকম হয়। সরস্বতী পুজোর চাঁদা, দুর্গাপুজোর চাঁদা, কালীপুজোর চাঁদা, পার্টিফান্ডের চাঁদা, গ্রাম উন্নয়নের চাঁদা...”

বিষ্ণুবাবু ছোট্ট একটা ধমক দিয়ে বললেন, “চোপ! তুমি তো বলাইবাবুর ছোট ছেলে। তা ক্রমে ক্রমে তুমি তো ভারি চমৎকার গাধা হয়ে উঠেছ। চারপেয়ে গাধা তোমাকে দেখলে হিংসে করবে। চাঁদা অন্তত চার প্রকার। চাঁদা বলতে আমরা প্রথমে বুঝি চন্দ্র, মানে চাঁদ। যাকে ছন্দ করে ছড়ায় বলা হয় চাঁদামামা। আবার জ্যামিতিতে চাঁদা হল গিয়ে অর্ধচন্দ্রাকার কোণমান যন্ত্ৰ। এই চাঁদা কখনও মৎস্য, যাকে বলে চাঁদামাছ। আবার চাঁদা বলতে লোকজনের কাছ থেকে কোনও কাজ উপলক্ষে অর্থ সংগ্রহ। তা তোমরা কোন চাঁদা চাইছ। সব চাঁদার বানান কিন্তু একই।”

আমি বললাম, “আজ্ঞে, ওই যে অর্থ সংগ্রহের কথা বললেন, আমরা সেই চাঁদা চাইছি।”

বিষ্ণুবাবু মুখে হরীতকীর টুকরো ফেলে চুষতে-চুষতে বললেন, “তা বেশ। ওই যে ‘অর্থ’ কথাটা বললে, ওই অর্থের কতরকম অর্থ হয় জানো? একটা অর্থ অবশ্যই টাকা। আবার অন্য অর্থে সেটাকে উদ্দেশ্য বোঝায়, আবার এটাকে যদি...”

ঠিক এই মুহূর্তে আমাদের অখিলবাবুর কথা মনে হল। যিনি তাঁর পরমপ্রিয় ছাতা ত্যাগ করে বিষ্ণুবাবুর কাছ থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলেন। আমি কালবিলম্ব না করে বললাম, “মেসোমশাই, এত জানলে তো আপনার মতো পণ্ডিত হয়ে যেতাম। আমরা তো এখনও মূর্খ। "

বিষ্ণুবাবু হাসতে-হাসতে বললেন, “শুধু মূর্খ নও, মহামূর্খ। বিদ্যাদেবীর আরাধনায় তোমাদের কোনও অধিকার নেই ৷ আমি প্রতিমা দর্শনকালে প্রণামী হিসেবে যা পারি দিয়ে আসব। মহামূর্খের হাতে বিদ্যাদেবীর আরাধনার নিমিত্তে কোনওপ্রকার অর্থ দেওয়া ঘোর অনর্থ হবে বলে আমার ধারণা।”

এর পর চাঁদা চাইবার সাহস হয়? সুতরাং চাঁদা না নিয়েই আমাদের ফিরে আসতে হয়েছিল। কিন্তু চাঁদার চতুর্গুণ আমাদের পুষিয়ে দিয়েছিল গৌর-নিতাই। কেননা ওরা দু'জনে ছিল আমাদের পুজো কমিটির যুগ্ম ক্যাশিয়ার। কীভাবে পুষিয়ে দিয়েছিল, সেটা বলবার আগে গৌর-নিতাইয়ের আর একটা ঘটনা বলে নেওয়া দরকার।

আমাদের স্কুল থেকে আধ কিলোমিটার দূরে একটা ইটভাটা ছিল। কাঁচা ইট যখন ভাটির মধ্যে থাকে থাকে সাজিয়ে ভাটিতে আগুন দিত, তখন বাইরে থেকে কিছু বোঝা যেত না। শুধু চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বেরুত। ভাটির ওপরটা থাকত মাটি আর বালিতে ঢাকা। খালি পায়ে ওর ওপর দিয়ে হাঁটলে পায়ের তলায় গরম লাগত। কিন্তু ওই ভাটিতে যারা কাজ করত তারা কিন্তু দরকারে-অদরকারে দিব্যি হাঁটত। ভেতরে যখন আগুনের তাপ বেড়ে যেত তখন একটু ধার ঘেঁষে হাঁটাহাটি করত, এই যা তফাত। আমরা ওই ধারে গিয়ে বসতাম আর গরম বালির মধ্যে আলু ঢুকিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতাম। দেড় থেকে দু' মিনিটের মধ্যেই আলুটা পুড়ে সেদ্ধ হয়ে যেত। তখন খোসা ছাড়িয়ে ঝাল নুন দিয়ে ওই পোড়া আলু আমরা খেতাম। শীতকালের বিকেলে এটাই ছিল আমাদের খেলা আর খাওয়া। ইটখোলার মাঠে খেলতাম, ওই পুকুরে ভাল করে হাত-পা ধুয়ে আলু পোড়াতে বসে যেতাম। কিন্তু এর জন্য রোজ-রোজ আলু জোগাড় করতে হত। তখনকার দিনে রোজ-রোজ তিন-চারটে করে নৈনিতাল আলু জোগাড় করা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। বিশুর বাবার ছিল মুদিখানার দোকান। দোকানের নাম ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার'। ' অন্নপূর্ণার ভাণ্ডারই বটে! চাল-ডাল, তেল-মশলার সঙ্গে আলু, পেঁয়াজ, ডিম, ঘুঁটে, কয়লা, বই, খাতা, মাথা ধরার ট্যাবলেট, মাছ ধরার মশলা, এমন কি শাঁখা, শঙ্খ, কোদাল-কুড়লও পাওয়া যেত। বিশু নিজের বাপের দোকান থেকে প্রায়ই অনেক আলু আনত। একদিন বিশু ধরা পড়ে যাওয়ায় আমাদের খুব বিপদ হল। দুই প্যান্টের পকেটে যতটা পেরেছিল আলু পুরেছিল। খানকয়েক নিয়েছিল জামার পকেটেও। এবার গায়ে আলোয়ান জড়িয়ে দোকান থেকে বেরোতে যাওয়ার মুখেই বাবার সঙ্গে দেখা। তিনি বিশুকে দেখে বললেন, “এই যে বিশে, ইনি হচ্ছেন আমার খুড়োশ্বশুর, তোমার মা'র আপন কাকা। গিরিডিতে থাকেন। আজই এসেছেন। এঁকে প্রণাম করো।

নিচু হয়ে প্রণাম করতে গিয়ে পকেটে ঠাসাঠাসি করে রাখা আলু গড়িয়ে পড়ল। খুড়োশ্বশুর পরম আহ্লাদে নাতিকে 'দাদুভাই' বলে জড়িয়ে ধরতেই হড়হড় করে আরও কয়েকটা আলু নিচে পড়ায় খুড়োশ্বশুর বললেন, “বলাই, তোমার ছেলের গা থেকে আলু বেরোয় কেন?”

বিশুর বাবা বলাইবাবু প্রথমে আলু কুড়িয়ে দু' আঙুলে টিপে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলেন। তারপর এক লাফে গিয়ে দাঁড়ালেন নিজের আলুর বস্তার সামনে। বস্তা থেকে একটা আলু তুলে দু' হাতে দুটো আলু নিয়ে মিলিয়ে দেখতে-দেখতে হঠাৎ আর্তস্বরে কেঁদে উঠে বললেন, “হে ভগবান, আমার ছেলে শেষপর্যন্ত আলু চোর হল। তাও কিনা বাপের দোকানের আলু! এত নিকৃষ্ট মানের চোর আমার ঘরে জন্মাল, হে ভগবান!”

বলাইবাবু হাঁক ছেড়ে ভগবানকে ডাকেন আর ডুকরে-ডুকরে কাঁদতে থাকেন। তাই দেখে গিরিডি থেকে সদ্য আসা খুঁড়ো শ্বশুর হতচকিত হয়ে বলেন, “বাবা বলাই, তোমরা কেঁদে যাও। আমি বরং আমার গিরিডির আশ্রমে ফিরে যাই। চোর-ছ্যাঁচোড়ের বাড়ি, তাও আবার আলু-চোর, সেখানে জলগ্রহণ করা আর সম্ভব নয়।"

এই ঘটনার পর আমাদের আলুর জোগান স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গৌর-নিতাই বলল, “একটা কিছু ব্যবস্থা করা দরকার।

আমরা গৌর-নিতাইকে উৎসাহ দিয়ে বললাম, “তোরা দু' ভাই থাকতে আমাদের আলুর সমস্যার সমাধান হবে না, এটা ভাবাই যায় না!”

গৌর-নিতাই দু'জনেই একটু ভেবে বলল, “দেখা যাক, কী করা যায়!”

দিন-দুই পরে খেলার মাঠে এসে বলল, “আজ ইটভাটায় বসব। দু'দিন বসা হয়নি।"

আমি বললাম, “আলু এনেছিস?”

গৌর-নিতাই মুখে কিছু বলল না, শুধু হাসল। ইটভাটায় আসার পর বলল, “বিশুর জন্য এখন বাড়িতে পর্যন্ত আলুর ওপর পাহারা বসে গেছে। শুধুমাত্র একটা আইটেমের ওপর নির্ভর করলে সেই আইটেমটা মনোপলি হয়ে যায়। আমি আলুর বিকল্প খুঁজে এনেছি। একবার টেস্ট করে দেখা যাক।”

আমরা উদ্‌গ্রীব হয়ে বললাম, “আলুর বিকল্প কোনটা?”

গৌর-নিতাই একসঙ্গে বলল, “আমরা গাঠি কচু এনেছি। আলুর কাছাকাছি দেখতে।”

আমি বললাম, “শেষ পর্যন্ত কচুপোড়া?”

গৌর-নিতাই বলল, “লোকে তো গাল দিয়ে বলে কচুপোড়া খা। একবার দেখাই যাক না কচুপোড়া খাওয়া যায় কিনা।”

অগত্যা ওই গাঠি কচু ঢোকানো হল বালির নিচে। দেড়-দু' মিনিটে হল না। মিনিট তিনেক পরে নরম হতেই সেগুলো বের করে যথারীতি ঝাল-নুন দিয়ে খান-দুই খেতেই মনে হল গলা জ্বলে যাচ্ছে। মুখ দিয়ে লালা ঝরতে লাগল। আমরা রেগে গিয়ে গৌর-নিতাইকে গালাগাল করতে লাগলাম। আর গৌর-নিতাই নির্বিকারভাবে বলল, “বিশু; তোর গলা কেমন জ্বলছে?”

বিশু উত্তর দিল, “খুব। মনে হচ্ছে মরে যাব।”

গৌর অথবা নিতাই কেউ একজন বলল, “কচু ঠিকমতো না খেলে কষ্ট হতে পারে, কিন্তু ওতে মানুষ মরে না। শূকর কাঁচা কাঁচা কচু খায়। কিন্তু মরে না। কষ্ট না করলে ফল লাভ হয় না। বিশু আরও দুটো খা।”

বিশু কাঁদো কাদো হয়ে বলল, “খাওয়া তো দূরের কথা, আমি দেখলেই মরে যাব।”

গৌর-নিতাই বলল, “একটু বেশি কষ্ট হবে, কিন্তু মরবি না। তোর কষ্টের মধ্য দিয়েই আমাদের আলু-সমস্যা মিটে যাবে। নে খা, খেয়ে ফেল।

একরকম জোর করেই ওকে খাওয়ানো হল। গলার জ্বলুনি দ্বিগুণ হতেই বিশু মাটিতে শুয়ে গড়াতে আরম্ভ করল। এর পর গৌর-নিতাই যা করল, সেটা একেবারে নাটকীয় এবং অবিশ্বাস্য কাণ্ড। তবু কাণ্ডটা ওরা করল। ইটভাটার কামিনদের কাছ থেকে একটা খাটিয়া এনে বলল, “তুই খাটিয়াতে শুয়ে পড়।”

বিশু খাটিয়াতে শুতেই গৌর-নিতাই বলল, “খাটিয়া কাঁধে তোল। এবার যা-যা করব বিশু কিন্তু তাতেই সায় দিবি।”

আমরা খাটিয়া কাঁধে ভর সন্ধেবেলা গৌর-নিতাইয়ের নির্দেশমতো এসে দাড়ালাম অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের সামনে। বিশুর বাবা বলাইবাবু বললেন, “কী ব্যাপার? কে গেল?”

গৌর-নিতাই বলল, “কাকাবাবু, এখনও যায়নি, তবে যাবে। খাটিয়া করে কে যাচ্ছে জানেন?”

বলাইবাবু হাত তুলে খাটিয়ার দিকে তাকিয়ে প্রণাম করলেন। শবযাত্রীর দিকে যেভাবে সবাই প্রণাম করে আর কি! পরে বললেন, “কে গেলেন?”

গৌর-নিতাই বলল, “বিশু।”

বলাইবাবু বললেন, “বিশু! কোন পাড়ার?”

গৌর-নিতাই জবাব দিল, “আপনার ছেলে বিশু। কচু খেয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল।”

বলাইবাবু প্রচণ্ড একটা চিৎকার করে বলে উঠলেন, “বিশু! আমার বিশু! ওরে পাগলা বিশে রে, কোন দুঃখে কচু খেতে গেলি। আমার সংসারে কি খাবারের অভাব?”

গৌর নিতাই বলল, "আলুর দুঃখে, কাকাবাবু খান কয়েক আলুর জন্যে ওকে দোকানের সামনে যেভাবে কানমলে দিয়েছেন, তাতেই ও আত্মঘাতী হয়েছে। চিঠিতে সব লিখে রেখে গেছে। ওটা থানায় দিতে হবে।”

বলাইবাবু জোর করে খাটিয়া নামালেন। বিশুর মুখ তখন নাল। চোখও লাল। থেকে থেকে লালা ঝরছে। বলাইবাবু ছেলের মুখ মুছিয়ে দিয়ে বলতে লাগলেন, “মানুষ কত শোকে আত্মঘাতী হয়। তুই কিনা আলুর শোকে আত্মঘাতী হলি! এমন কথা তো পাঁচজনকে বলাও যাবে না। হ্যাঁ রে বোকা, খেয়েই যদি মরবি, তবে অন্য কিছু খেলি না কেন? দোকানে তো পোকামাকড় মারার ওষুধও ছিল। ওগুলো না খেয়ে কচু খেতে গেলি?”

আস্তে-আস্তে ভিড় বাড়তে বাড়তে লাগল। ভিড়ের মধ্যে বিষ্ণুচরণবাবুও হাজির হলেন। তিনি ততক্ষণে আত্মহত্যা মহাপাপের ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়েছেন। গ্রামের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটলে সেটা লোকমুখে চাউর হবেই। বেলতলার দেওয়াল-পত্রিকায় পরের মাসেই বিশু খবর হয়ে গেল, “আলুর অভাবে কচু খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা।” বকুলতলার পঞ্চায়েত প্রধান এই খবর পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে গগন গড়াইকে বললেন, “বেলতলার কাছে বকুলতলার আরও একটা ডিফিট হয়ে গেল। কচু খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা সম্ভবত বিশ্বে প্রথম। ভাল প্রচার পেলে গিনিস বুকে বিশুর নাম আর ছবি উঠত। বকুলতলার ছেলেগুলো বড্ড মেনিমুখো। নতুন কিছু করার দিকে একেবারেই ঝোঁক নেই।” বলা বাহুল্য, এর পর থেকে আমাদের আর আলুর অভাব হয়নি। কিন্তু আলু খেতে গেলেও কয়েকদিন বিশু চমকে চমকে উঠত।

এহেন গৌর-নিতাই যখন শুনল তার বাবা চাঁদা দেননি, তখন গম্ভীর হয়ে বলল, “ভাবনা নেই। আমরা পুষিয়ে দেব।”

পুজোর আগের রাত্রে নিজেদের বাতাবি লেবুর গাছ ফাঁকা করে সব বাতাবি লেবু নিয়ে এল আমাদের প্যান্ডেলে। বাড়ির পুজোর জন্য নারকোলের নাড়ু আর খইয়ের মুড়কি করেছিলেন ওদের মা। সেগুলোও এসে গেল প্যান্ডেলে। কিন্তু এ-ব্যাপারে কাকে সন্দেহ করবে? মা জিজ্ঞেস করেন গৌর-নিতাইয়ের বাবাকে, “গাছের ফল নাহয় পেড়ে নিয়েছে। কিন্তু ঘরের তৈরি জিনিস বাইরের চোর নেবে কেমন করে? হ্যাঁগো, ছেলেদুটো তো তোমার ঘরেই শোয়?”

বিষ্ণুবাবু বললেন, “দুটো তো এক ঘরে শোয়। কাল আমার ঘরে একটা শুয়েছিল। তবে সেটা যে কোনটা তা বলতে পারব না।”

মা আকাশপাতাল ভাবতে-ভাবতে বলেন, “ওটাই তো মুশকিল! আমার ঘরে একবার একজন ঢুকেছিল। আমার সঙ্গে কথা বলল। ও কি গৌর, না নিতাই?”

বিষ্ণুবাবু রেগে উঠে বলেন, “মা হয়ে ছেলে চিনতে পারো না! তুমি কেমন মা?”

রেগে গিয়ে মা উত্তর দেন, “বাপ হয়ে তুমিও তো চিনতে পারো না। গৌরের ওষুধ নিতাইকে গিলিয়ে দাও। আবার নিতাইয়ের জায়গায় গৌরকে নিয়ে যাও ইঞ্জেকশন দিতে।”

বিষ্ণুবাবুর বাড়ি থেকে তৈরি করা এককৌটো নারকেল নাড়ু আর খইয়ের মুড়কি চুরি যাওয়ার ঘটনা শুনে বকুলতলার গগন গড়াই ছুটতে ছুটতে পঞ্চায়েত প্রধানের অফিসে এসে বলেন, দিনুদা, আবারও বকুলতলার ডিফিট হল। কস্মিনকালেও শুনিনি চোর এসে নাড়ু আর ঘরে তৈরি মুড়কি চুরি করে। এটাও কিন্তু নতুন জিনিস।”

এখানে একটা কথা বলে রাখা জরুরি। আমি যে লিখতে গিয়ে কেবলই ‘গৌর-নিতাই' বলছি, সেটা কোন কারণে জানেন? ওরা তো সব কথা দু'জনে একসঙ্গে বলে না। আলাদা-আলাদা বলে। কিন্তু কখন কোন্ কথাটা গৌর বলছে আর কখন কোন্ কথাটা নিতাই বলছে, সেটা আমি এখনও ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারি না বলে মিথ্যাভাষণের দায় এড়াতে সর্বদা গৌর-নিতাই বলে একসঙ্গে দু'জনের নাম করি। আমাকে ওদের কাহিনী এইভাবেই চালাতে হবে। আরও একটা কথা, ওই যে ‘পঞ্চায়েত প্রধান, পঞ্চায়েত অফিস' এসব বলছি, আসলে কিন্তু ওটা এখনকার অভ্যাসের ফল। আমার এবং গৌর-নিতাইয়ের কিশোরকালে পঞ্চায়েতরাজ হয়নি। তখন ছিল ইউনিয়ন বোর্ড। প্রধানকে বলা হত ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। এ-রাজ্যে পঞ্চায়েতরাজ চালু হল পাকাপাকিভাবে ১৯৭৮ থেকে।

গৌর-নিতাইয়ের গৌরচন্দ্রিকা আপাতত এখানেই শেষ। এবার ওদের দেখতে পাবেন খেলার মাঠে। বেলতলা একাদশ বনাম বকুলতলা একাদশের ক্রিকেট ম্যাচে।

॥ ২ ॥

বেলতলা বনাম বকুলতলার ক্রিকেট ম্যাচটাকে নিতান্ত দুটো পাড়ার প্রীতি-ম্যাচ ভাবলে মস্ত বড় ভুল হবে। বিশ্বকাপের ফাইনালের চেয়েও বেশি উত্তেজনা আর উৎসাহ এই খেলাকে কেন্দ্র করে। উত্তেজনা মাপার কোনও যন্ত্র থাকলে দেখা যেত, দুটো পাড়ার তামাম মানুষ আগের রাত থেকেই উত্তেজনায় ভাল করে ঘুমোতে পারেন না। গৌর-নিতাইয়ের বাবা বিষ্ণুচরণবাবু খেলার দিন সকালে আধঘণ্টা বেশি বিষ্ণুবন্দনা করেন। পাড়ার অনেকেই নানা ঠাকুরদেবতার কাছে মানত করে রাখেন, যাতে তাঁদের পাড়া জেতে। যেমন উত্তেজনা এপারে, তেমন ওপারেও। মানে বকুলতলাতেও। জগন্নাথ চৌধুরীমশাই তাঁর স্বর্গত পিতৃদেবের নামে গত দু' বছর থেকে বেশ বড় সাইজের একটি কাপ খেলা উপলক্ষে দিয়ে আসছেন। আগে কোনও কাপ-টাপ ছিল না। যে-দল জিতত, তাঁদের প্রত্যেককে একটা করে ফুলের তোড়া আর কিছু একটা উপহার দেওয়া হত। কোনওবার ফ্লাস্ক, কোনওবার চামড়ার ব্যাগ, কখনও বা এক পিস করে শার্টের কাপড়। গত দু' বছর থেকে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠার কারণ ওই বৃহৎ কাপটি। ওটি মাথায় নিয়ে সারা পাড়া ঘোরা হয়, তারপর মাইক লাগিয়ে চলে গান-বাজনা আর ঘন ঘন ঘোষণা, “আনন্দ সংবাদ, আনন্দ সংবাদ। বেলতলা স্পোর্টিং এ-বছর ওয়ান ডে ক্রিকেটে, বকুলতলাকে পরাজিত করে দুর্গাদাস স্মৃতি কাপ অর্জন করেছে। বেলতলা স্পোর্টিংয়ের পক্ষে খেলেছেন সর্বশ্রী...”

পর পর খেলোয়াড়দের নাম ঘোষণার পরেই একটি ঘোষণা অথবা আহ্বান যাই বলা হোক সেটি অনিবার্য। ঘোষণাটি হল, “এখানে আজ সারা রাত্রিব্যাপী এক আনন্দানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। কোনও প্রবেশমূল্য নেই। এখন বেলতলা স্পোর্টিং ক্লাবের পক্ষ থেকে বোঁদে বিতরণ করা হচ্ছে। সবারে করি আহ্বান। বকুলতলার ভাই-বোনদের প্রতিও আমাদের সাদর আমন্ত্রণ রইল। আসুন, বোঁদে খান এবং জলসা শুনুন।"

বকুলতলা থেকে জলসা শুনতে বা বোঁদে খেতে কেউ আসে না। বকুলতলায় তখন শোকের ছায়া। ক্লাবঘর বন্ধ। লোকজনের বাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ। এমন কি, দোকান বন্ধ করে যাঁরা খেলা দেখতে গিয়েছিলেন, হেরে যাওয়ার পর তাঁরা আর দোকানই খোলেন না। প্রথমবার যখন বোঁদে বিতরণের ব্যবস্থা হয়েছিল, সেইবার মাইকে বোঁদে খাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে বকুলতলা থেকে নকুলবাবুর ছেলে হাঁদু, গগন গড়াইয়ের ভাগ্নে গদাই আর রামমকৃষ্ণ সাঁতরার ছেলে বিলে গিয়েছিল বোঁদে খেতে। ওদের তিনজনকে দেখে বেলতলা স্পোর্টিং ক্লাবের ছেলেরা পরম যত্নে যথেষ্ট পরিমাণে বোঁদে খাইয়ে আবার ঠোঙা ভর্তি করে বোঁদে হাতে দিয়ে বলে দিয়েছিল, “যা, এগুলো বাড়ি নিয়ে যা। এগুলো বাড়ির জন্য।"

খালের এপারে বেলতলা থেকে মাইক বাজানো হলে তার শব্দ, এমন কি, প্রত্যেকটি কথা খুব সহজেই যাতে বকুলতলার ঘরে-ঘরে পৌঁছয়, তার জন্য বেলতলার উদ্যমে কোনও ঘাটতি নেই। সাতখানা চোঙার তিনখানাই বকুলতলার দিকে। লম্বা করে তার টেনে যতদূর অবধি টানা যায়, তত দূর টেনে নিয়ে গিয়ে লাইটপোস্টের গায়ে উঁচুতে বেঁধে দেওয়া হয়। প্রথমবার অতবড় ‘দুর্গাদাস স্মৃতি কাপ’ জিতে নেওয়াতে বেলতলার আনন্দ আর উচ্ছ্বাস যতখানি, বকুলতলার দুঃখ আর আক্ষেপ তার চেয়েও বেশি। শিব মন্দিরের চাতালে আর মাঠে বকুলতলার মাতব্বররা তখন বিষণ্ন মুখে বসে। মাইকে ঘন ঘন বোঁদে খাওয়ার আহ্বান ভেসে আসছে। নিজেদের খেলার আত্মসমীক্ষা থামিয়ে বকুলতলা স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি নকুল চৌধুরী বললেন, “খাওয়াচ্ছিস বোঁদে তাও আবার মাইকে গলা ফাটিয়ে প্রচার করছিস। আমার ক্লাব জিতলে ল্যাংচা খাওয়াতাম। তোদের বোঁদে খেতে বকুলতলার একটা কুকুর-বেড়ালও যাবে না। এ পাড়ার ছেলেদের আত্মসম্মান আছে। তোদের বোঁদে তোরাই খা গে যা। "

নকুল চৌধুরী কথা শেষ করে সকলের দিকে তাকালেন। সকলেই নকুল চৌধুরীকে সমর্থন করে সমস্বরে বলে উঠলেন, “কালচারের অভাব।"

রামকৃষ্ণ সাঁতরা বলে উঠলেন, “রসগোল্লা, পান্তুয়া, প্রাণহরা নয়। চাট্টি বোঁদে। তাই নিয়ে মাইকে কেমন বাড়াবাড়িটাই করছে। বকুলতলার ছেলেদের বোঁদের লোভ দেখাচ্ছে ওরা। ওরা কি জানে, আমাদের এখানে, এই তো আমার বাড়িতেই রোজ আধপো-একপো করে রাবড়ি ফেলা যায়। মিষ্টিতে অরুচি ধরে গেছে ছেলেদের।”

রামকৃষ্ণ সাঁতরার কথা শেষ হতেই মাইকের গান থেমে গেল। ঘোষণা শোনা গেল, “বকুলতলার ভাইদের ধন্যবাদ। এইমাত্র বকুলতলার তিন ভাই সর্বশ্রী হাঁদু, গদাই এবং বিলে আমাদের ক্লাবে এসে বোঁদে ভক্ষণ করে গেলেন এবং বাড়ির জন্য কিছু পরিমাণে নিয়েও গেলেন। আমাদের এখানে সারা রাত বোঁদে বিতরণ এবং ভক্ষণের ব্যবস্থা আছে।"

ঘোষণাটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গগন গড়াই চমকে উঠে বললেন, “হাঁদু, গদাই, বিলে, মানে আমার ভাগ্নে আর আপনাদের ছেলে ওদের ক্লাবে বোঁদে খেতে গিয়েছিল?”

রাগে ফেটে পড়লেন দীনবন্ধু পাঁজা। তিনি বললেন, “পুরো অ্যানাউন্সমেন্টটা শুনলে? শুধু খায়নি, বাড়ির জন্য নিয়েও এসেছে। যান, এখন বাড়ি গিয়ে আপনারা ওই বোঁদে খান। ছিঃ ছিঃ ছিঃ।”

বকুলতলার ক্রিকেট কোচ হচ্ছেন সুনীল সিংহরায়। বাবার চাকরি উপলক্ষে ছেলেবেলায় বোম্বাইতে কাটিয়েছেন। তখন নাকি শিবাজী পার্কে আচরেকর ওঁকে হাতে ধরে ক্রিকেট খেলা শিখিয়েছেন। ওয়াদেকর ওর খেলা দেখে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি যখন ভারতীয় দলের ক্যাপ্টেন হলেন তখন নাকি একেবারে ঝোলাঝুলি ওঁকে দলে নেওয়ার জন্য। কিন্তু এঁকে তো তখনই বাবার সঙ্গে কলকাতায় চলে আসতে হল। বোম্বাইয়ের এম, আর, জি ক্রিকেট ক্লাবের ভিত্তিস্থাপন নাকি ক্লাব বিল্ডিং উদ্বোধন, কী একটা অনুষ্ঠানে এসে উমরিগড় সুনীলবাবুকে দেখে বলেছিলেন, “তোমাকে আমার মারতে ইচ্ছে করে। কত রকমের স্ট্রোক ছিল তোমার হাতে। তোমার দেখে দেখে কত ছেলে টেস্টে চান্স পেল আর তুমি কিছুই করতে পারলে না।”

সুনীলবাবু অনেককে গল্প করেছেন : হুক, কভার ড্রাইভের বহু কায়দা এক সময় আমার যে বন্ধুটি দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত আর আমাকেই মনে করে নিজের বাড়িতে শ্যাডো প্র্যাকটিস করত, সেই বন্ধুটিই তো সুনীল গাওস্কর।

এত রকমের গল্প বলে আসর জমাবার পর সেই কোচের টিম যখন বেলতলার কাছে চুয়াল্লিশ রানে হেরে গেল, তখন প্রথম রাগটা তো কোচের ওপর পড়বেই। তাই হেরে যাওয়ার পর কোচকে যথেষ্ট গালমন্দ করে ক্লাব-সভাপতি নকুল চৌধুরী বলেছিলেন, “আপনি মশাই খালি গুল মারেন। আপনাকে দেখে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কে বলেছিল আপনি ‘লায়ন রে'। আমি তো বলব, তিনি ওকথা বলতেই পারেন না। আপনি হচ্ছেন 'র‍্যাট রে'। লায়ন অনেক দূরের ব্যাপার।”

নকুল চৌধুরী বড় ব্যবসায়ী মানুষ। বকুলতলায় মোট পাঁচজনের গাড়ি আছে। রাশভারী চেহারা। কিন্তু নকুল চৌধুরীর আছে দু'খানা গাড়ি। ক্রিকেট কোচ করার জন্য সুনীলবাবুকে মাসে দুশো টাকা নকুলবাবুই নিজের পকেট থেকে দেন। ষাট দশকের গোড়ার দিকে দুশো টাকা খুব কম ব্যাপার নয়। বকুনি খেয়ে সুনীল সিংহরায় ওরফে লায়ন রে মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। কিন্তু এখন যেই না বোঁদে কেলেঙ্কারির কথা শুনলেন, তখন নিজের অপমানের প্রতিশোধস্পৃহা তার মধ্যে প্রবল হয়ে উঠল। তিনি দু' হাত শূন্যে ঝাঁকিয়ে বললেন, “বলেছিলেন না, ওদের বোঁদে খেতে বকুলতলার কুকুর-বেড়ালও যাবে না। ওরা যায়নি, কিন্তু আপনার ছেলে হাঁদু চলে গেছে। আর এই যে রামকেষ্টবাবু, আপনার বাড়িতে রোজই নাকি আধপো-একপো করে রাবড়ি ফেলা যায়! এত খেয়েও তো আপনার ছেলে বিলে ওপাড়ায় গেল বোঁদে খেতে। আপনারাও বড্ড গুল মারেন।”

হঠাৎ নকুল চৌধুরী গর্জন করে উঠে বললেন, “স্টপ! এখনই হাঁদু, গদাই অ্যান্ড বিলে—তিন দেশদ্রোহীকে দেখতে চাই। ওদের এখানে হাজির করুন।

ওই তিনজনকে হাজির করতে আদৌ বেগ পেতে হল না। বেলতলার খালের ওপর সিমেন্টের ব্রিজ। সেই ব্রিজ পেরিয়ে ওরা শিবমন্দিরের দিকেই আসছিল। মাঝপথেই ওঁদের পাকড়াও করা হল। ওরা তিনজনে অনেক কথা শোনার পরও বুঝতে পারল না, ওদের দোষটা কোথায়? যারা ভাল খেলে বেশি রান করেছে, তারা জিতেছে। হেরে যাওয়া দলের সমর্থকদের কি বোঁদে খাওয়া বারণ? ওদের তিনজনকে হাজির করা হল শিবমন্দিরের চাতালের সামনে। তখন ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। গাছের পাতায়-পাতায় কুয়াশা জমে গেছে। উত্তর দিক থেকে মাঝে-মাঝে কনকনে হাওয়া আসছে। বাতাসে ধনেপাতার মিহিগন্ধ ৷ শিবমন্দিরের পিছনেই অশ্বিনী তালুকদারদের কলাবাগান। ওখানে শীতের সময় ধনেপাতার ছোট্ট বাগান করেন অশ্বিনীবাবু। মন্দিরের চাতালের মাথায় টিনের ছাউনি। নিচে মোটা শতরঞ্চি পাতা। নকুল চৌধুরী চুরুটে টান দিতে গিয়ে বুঝলেন, ওটা নিভে গেছে। তিনি আঙুলের ফাঁকে চুরুট নিয়ে হাতমুঠো করে চাতালের ওপর একটা ঘুসি মেরে বললেন, “ইউ, মাই সন হাঁদু, ইউ কাম হিয়ার।”

.

.

হাঁদু কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেল। নকুলবাবু বললেন, 'ট্রেটর' কথাটার মানে বুঝিস? ওর বাংলা মানে হল ‘দেশদ্রোহী'। তুই আজ থেকে দেশদ্রোহী হলি।”

হাঁদু কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেন? আমি কী করলাম?”

নকুলবাবু বললেন, “তুই যা করেছিস তার কোনও ক্ষমা নেই। তুই কি বেলতলা ক্লাবে গিয়ে বোঁদে ভক্ষণ করেছিস এবং ৰোঁদে সঙ্গে এনেছিস?”

হাঁদু সরলভাবে বলল, “হ্যাঁ, এনেছি। শুকনো বোঁদে মুড়ি দিয়ে খেতে ভাল লাগে। ওরা আদর করে দিল, তাই নিলাম। বোঁদে খেলে কেউ কি দেশদ্রোহী হয়! ক্ষুদিরাম, সুভাষ বসু, প্রফুল্ল চাকি, বিবেকানন্দ এঁরা কি কখনও বোঁদে খাননি? রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তো এইরকম বোঁদেই ভালবাসতেন।”

নকুলবাবু গর্জন করে উঠে বললেন, “কে বলেছে? হু সেজ?” হাঁদু উত্তর দিল, “কেন, তোমার সঙ্গে কামারপুকুরে গিয়েই তো শুনলাম। তুমিই তো বললে।”

নকুলবাবু একটা ঢোঁক গিলে বললেন, “কামারপুকুর, দক্ষিণেশ্বর, সিমলা স্ট্রিট কিংবা বাগবাজারের বোঁদের কথা হচ্ছে না। ওঁরা কি বেলতলার বোঁদে কখনও খেয়েছেন! ওরা জয়ের আনন্দে তুচ্ছ বোঁদে বিতরণ করছে, আর তাই খেতে বকুলতলার ছেলেরা ছুটে যাবে ওখানে! এটা দেশদ্রোহিতা নয়?”

হাঁদু একটু ভেবে নিয়ে বলল, “বেলতলা একটা গ্রাম। কয়েকটি গ্রাম মিলে একটি জেলা, কয়েকটি জেলা মিলে একটি প্রদেশ এবং কয়েকটি প্রদেশ মিলে...”

নকুলবাবু গর্জে উঠে বললেন, “আমি কি তোর কাছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিখতে বসেছি! মোদ্দা কথা, তুই বোঁদে খেলি কেন? আর খেলি যদি, তবে বেলতলার বোঁদে কেন খেলি? খেলি, কিন্তু আনলি কেন?”

হাঁদু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না, বোঁদে নিয়েও এত রকমের কাণ্ড হতে পারে। নকুলবাবু নিভন্ত চুরুট ধরিয়ে নিয়ে বললেন, “রামকৃষ্ণবাবু, আপনি কি আপনার ছেলেকে কিছু বলবেন?”

রামকৃষ্ণবাবু কেশে গলা পরিষ্কার করার আগেই বকুলতলার কোচ সুনীল সিংহরায় ওরফে লায়ন রে বলে উঠলেন, “তোমাদের বাড়িতে রোজ আধপো একপো করে রাবড়ি ফেলা যায়, সেই তুমি কিনা সামান্য বোঁদে খেতে ছুটলে। এটা তুমি ভাল করোনি বি ভাই।"

বিলে লায়ন রে'-র কথা শুনে প্রতিবাদের ভঙ্গিতে বলে উঠল, "রাবড়ি রোজ-রোজ ফেলা যায়। দিদিমা তিনদিন এসে আমাদের এখানে ছিলেন। তার মধ্যে একদিন একাদশী। সেইদিন বাড়িতে রাবড়ি এল। দিদিমা এটুখানি খেয়ে বললেন, 'রাম, তুমি এনেছ তাই খেলাম। আমার তো সুগার। মিষ্টি খাওয়া বারণ। এটা তোমরা খেয়ে ফেলো। ওটা রান্না ঘরে ছিল। বেড়াল মুখ দিয়েছিল বলে মা কাউকে না দিয়ে ওটা ফেলে দিয়েছিলেন। আর তো রাবড়ি আসেনি।”

রামকৃষ্ণ সাঁতরা বললেন, “আমাকে আপনারা জানেন না। ওকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আমি আড়ং ধোলাই করব।”

এবার গগন গড়াইয়ের ভাগ্নে গদাইয়ের পালা। গগন গড়াই গদাইকে ডেকে বললেন, “হ্যাঁ রে, গদু, এমনটা কেন করলি? বোঁদে কি কখনও খাসনি?”

গদাই বলল, “আমি কী করব! মামিমাই তো বলল, এত করে মাইকে ডাকছে, যা না চাট্টি বোঁদে নিয়ে আয়। তোর মামা বোঁদে খুব ভাল খায়।”

গগন গড়াই বললেন, “তোর মামিমা তো অতশত জানে না। তুই কেন বললি না, আমাদের হারিয়ে ওরা বোঁদে ভক্ষণের উৎসব করছে। এই উৎসব বর্জন করা দরকার। এই বোঁদেও কালো বোঁদে। এতে আমাদের অসম্মান আছে। আমরা বোঁদে বয়কট করেছি।”

গদাই বলল, “তুমি যা ভাবছ, তা নয় মামা। মামি সব জানে। মামিই তো বললে, খেলতে গিয়ে হেরে মরে। আর হেরে গিয়ে বোঁদের ওপর রাগ ফলায়। হারা জেতায় বোঁদের কি সম্পর্ক? বোঁদে কি আম্পায়ার না ব্যাটম্যান।”

গগন গড়াই কাতর চোখে সবার দিকে তাকিয়ে বলেন, “মা মরা বোনের একটিমাত্র ছেলে। আমি তো নিঃসন্তান। গদাই ওর মামিমার নয়নের মণি। ওকে বেশি কিছু বললে আমারই বাড়ি ঢোকা বন্ধ হয়ে যাবে।”

নকুলবাবু বললেন, “দুর্বল চিত্তের পুরুষরাই সমাজের পক্ষে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। রবীন্দ্রনাথ সেজন্যই বলেছেন, ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা....”

হঠাৎ থেমে গিয়ে বললেন, “ছাত্রজীবনের পড়া তো! সবটা মনে নেই। যাক, ব্যাপারটা এখানেই শেষ করে দেওয়া উচিত হবে কিনা বুঝছি না। এজন্য একটা মিটিং ডাকা দরকার।"

ঠিক এই সময় বকুলতলা হাইস্কুলের হেডমাস্টার শীতাংশু রায় যাচ্ছিলেন শিবতলার পাশ দিয়ে। লায়ন রে তাঁকে ডাকলেন। সব ঘটনা বলার পর বোঁদে এবং দেশদ্রোহিতার প্রসঙ্গও আনলেন। সব শুনে শীতাংশুবাবু বললেন, “বকুলতলা হেরে যাওয়াতে বকুলতলার মানুষ হিসেবে আমারও মন খারাপ হয়েছে। কিন্তু সেটা তাৎক্ষণিক। এটাকে আপনারা ইস্যু করছেন কেন? এই থেকেই তো পাড়াগত বিদ্বেষ জন্মায়। আমি তো ওদের ক্লাবকে চিঠি লিখে অভিনন্দন জানাব।”

নকুলবাবু বিস্ময়ের গলায় বললেন, “অভিনন্দন জানাবেন?”

সীতাংশুবাবু বললেন, “কেন জানাব না! ওরা কি আমাদের পর, না শত্রু? ওরা তো প্রতিবেশী নকুলবাবু, জেদ ভাল, যদি তা মহৎ হয়। হিংসা ভাল না, ওতে মানুষ ছোট হয়ে যায়। বিবেকানন্দের মধ্যে জেদ ছিল, বিদ্যাসাগরের মধ্যে জেদ ছিল, সেটা হচ্ছে মহৎ জেদ। বৃহৎ কর্ম সম্পাদনের জেদ। এইসব তুচ্ছ ব্যাপারে যদি ছেলেদের জড়ান, তা হলে ওদের মন বড় হবে না। খেলাধুলোর কথা বলছেন? ওতে সবচেয়ে বড় কথা হল স্পোর্টসম্যান স্পিরিট। ফ্র্যাঙ্ক ওরেলকে দেখুন। রিচি বেনোকে দেখুন ৷ খেলার মধ্য দিয়েই তো বিশ্বের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তা।”

সীতাংশুবাবু চলে যাওয়ার পর রামকৃষ্ণ সাঁতরা বললেন, “গোটা বিশ্বের সঙ্গে আত্মীয়তা করতে রাজি আছি। কিন্তু বেলতলার সঙ্গে নয়। ওরা আমাদের চিরশত্রু।”

নকুলবাবু বললেন, “নো, নেভার।”

ঠিক এইরকম একটা পরিস্থিতিতে বেলতলা বনাম বকুলতলার ক্রিকেট ম্যাচ হতে চলেছে। পরপর দু' বছর দুর্গাদাস স্মৃতি কাপ জিতে নিয়েছে বেলতলা। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল গত বছর। তবুও পাঁচ রানে বকুলতলা হেরে গেছে। পরপর তিনবার এই কাপ যে জিতবে, জগন্নাথ চৌধুরী তাঁদের দু' হাজার টাকা দেবেন। ষাট দশকের গোড়ায় দু' হাজার টাকা মানে অনেক টাকা। জগন্নাথবাবুরা এক সময়ে এ-অঞ্চলের জমিদার ছিলেন। এখন কলকাতায় খান-সাতেক বাড়ি, উলুবেড়িয়ায় সুতোর কল, বেলেঘাটায় বালবের ফ্যাক্টরি, এন্টালিতে চামড়ার ব্যাগ তৈরির কারবার, যে ব্যাগ যায় জাপানে। অতএব, জগন্নাথ চৌধুরীর কাছে দু-পাঁচ হাজার টাকা কোনও ব্যাপারই নয়। অতএব এইবার, মানে দুর্গাদাস কাপ চালু হওয়ার পর তৃতীয়বার ম্যাচটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বকুলতলা মরণপণ করে লড়ে যাবে, যাতে বেলতলা পর-পর তিনবার কাপ না পায়। আর বেলতলা ভাবছে, পর-পর তিনবার পাওয়ার রেকর্ড একবার করতে পারলে বকুলতলা মনের দিক থেকেই হেরে যাবে। এবারের খেলায় এতই উত্তেজনা তৈরি হল যে, বিশুর বাবা বলাইবাবু বললেন, “এবার জিততে পারলে দশ সের চাল আর দশ সের ডাল আমি ফ্রি দেব। ওতে খিচুড়ি হবে।” বিষ্ণুচরণবাবু বললেন, “জেতা-হারা সবই তাঁর হাতে। তবে তিনি যদি তোমাদের প্রতি প্রসন্ন হন, তা হলে আমি পাঁচ কিলো বোঁদে তোমাদের উপহার দেব।” এসব তো গেল উপহার দেওয়া-দেয়ির ব্যাপার। বেলতলা এবং বকুলতলার কিছু-কিছু লোক এই খেলার ওপর বাজি ধরতে আরম্ভ করল। দুশো চারশো টাকার বাজি। খেলার দিন যতই এগোয়, দু’পাড়ার মধ্যে উত্তেজনা ততই বাড়তে থাকে। পেঁচোদার পিসি, যে ক্রিকেটের ‘ক’ বোঝে না, সেও ষষ্ঠীতলায় গিয়ে মানত করে। তাই শুনে বেলতলা ক্লাবের সেক্রেটারি জীবন মুখুজ্যে বলেন, “ক্রিকেটের সঙ্গে ষষ্ঠীর কী সম্পর্ক?”

পেঁচোদার মাসি রেগে গিয়ে উত্তর দেন, “তুই তো নেকাপড়া শিখে গো-মুখ্যু। ষষ্ঠীর কৃপায় ফললাভ হয়। মা-ষষ্ঠী সন্তান দেন। উনি দয়া করলে তোদের গন্ডা-গন্ডা রান দেবেন।” জীবন মুখুজ্যে চুপ করে যান। বেলতলার বড়লোক বলে যার খ্যাতি, সেই প্রাণবল্লভ সাহা ক্লাবে এসে বলেন, “এবার জিতলে আমি সবাইকে বিরিয়ানি-মাংস খাওয়াব। কলকাতা থেকে বিরিয়ানি রান্নার লোক নিয়ে আসব।"

একখানা গ্রামে তো শুধু একজনই ধনবান থাকেন না। আরও দু-চারজন থাকেন। অন্য ধনীর দেমাক তাঁরা কেন সইবেন! অতএব, গুরুদাস চাটুজ্যে প্রাণবল্লভের কথা শুনে বললেন, “সোনার বন্ধকি কারবার করে টাকা কামিয়েছে। ওর দৃষ্টিভঙ্গি কত বড় হবে? আমাদের ক্লাব জিতলে আমি প্রত্যেক খেলোয়াড়কে একটা করে সোনার চেন দেব।”

এ-কথাটাও রাষ্ট্র হতে সময় লাগল না। বেলতলার সব্যসাচী মুখুজো বললেন, “এক্সপোর্টের ব্যবসা করে গুরু চ্যাটার্জির তো ভারি দেমাক হয়েছে! ঠিক আছে, পাড়ার ব্যাপারে ওর ফিলিংসটা মেনে নিলাম। বেলতলা জিতলে সেদিন রাত্রে জলসা হবে। কলকাতা থেকে আর্টিস্ট আনার খরচ আমার। আমি দশখানা গাড়ি ভাড়া করব। তাসাপার্টি আনব। বকুলতলাকে ফর্দাফাঁই করে দেব। ”

এই ‘ফর্দাফাঁই” কথাটা বিষ্ণুচরণবাবুর কানে যেতেই তিনি বললেন, “ফর্দাফাঁই বলে বাংলায় তো কোনও শব্দ নেই। এই শব্দের প্রকৃত অর্থ কী! সব্যসাচীবাবু যা খুশি তাই বললেই তো সেটা হবে না। ফর্দা এবং ফাঁই মনে হচ্ছে দুটো শব্দের সম্মিলন মানে দাঁড়াচ্ছে ওদের নাকাল করা বা হাটে হাঁড়ি ভাঙা অথবা বেইজ্জত করা। কিন্তু ‘ফর্দা' শব্দের প্রকৃত অর্থ বোধগম্য না হলে ‘ফাঁই” শব্দের প্রয়োগ নিয়ে ভাবতে হয়। শব্দটা আভিধানিক কি না জানি না। মনে হচ্ছে, আরবি অথবা ফার্সি প্রভাব রয়েছে এর মধ্যে। সব্যসাচীবাবুর সঙ্গে এ-ব্যাপারে বসা আবশ্যক।

দু' পাড়ায় এইরকম টানটান উত্তেজনা! যেমন বেলতলায়, তেমনই বকুলতলায়। সেখানেও দেদার প্রতিশ্রুতি এবং ব্যান্ডপার্টি, তাসাপার্টি এবং কলকাতার খাবারওয়ালাদের অগ্রিম টাকাও দেওয়া হয়ে গেছে। দু' পাড়ায় আনুমানিক দু' ডজন মানত করা হয়ে গেছে। কলকাতা থেকে দু'জন আম্পায়ারকে ইতিমধ্যেই বলা হয়েছে। জগন্নাথবাবুর চেষ্টায় এইবারই প্রথম কলকাতার কাগজ থেকে কয়েকজন খেলার রিপোর্টারও আসছেন। অন্যান্য বার শুধু দু লাইনের খবর বেরোত। খেলার আগের দিন বকুলতলার গগন গড়াই বললেন, “আমি কাল ভোরে স্বপ্ন দেখেছি, বেলতলা হেরে গেছে। পেল্লাই কাপটা লরির মাথায় করে বকুলতলায় নিয়ে আসছে ছেলেরা। মেয়ে বউরা দোতলার বারান্দা থেকে গাঁদাফুল আর ফুলের মালা ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে ক্লাবের ছেলেদের আর আমাদের।"

কুয়োতলায় সকালবেলা স্নান করার অভ্যেস রামকৃষ্ণ সাঁতরার। তাঁর স্নানটি বড় বিচিত্র রকমের। শীতকালে পাতকুয়ো থেকে জল তুলে দুটো বালতি ভর্তি করে রোদে দেন। যতক্ষণ রোদের তাপে জল গরম না হচ্ছে, ততক্ষণ ধরে তিনি গায়ে তেল মেখে যাবেন। হাতের তালুতে খানিকটা তেল নিয়ে দু' কানে এবং নাকে দেবেন অন্তত দু'বার। শরীরে এবং নাকে-কানে তৈল প্রদান সম্পর্কে তিনি তাঁর ছেলে এবং ভাইপোদের নানাভাবে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কাজ হয়নি। শীতকালে গায়ে যদিও-বা মাখে, নাকে-কানে একবিন্দুও দেয় না। তিনি ছেলেদের বলতেন, “ওরে মূর্খ, শুনে রাখ, যে জন নাকে-কানে দেয় তেল,/ তার বাড়িতে কদাপি বৈদ্য না গেল।’ ‘না গেল’ মানে ডাক্তার ডাকার দরকার হয় না। এ জিনিস সর্বরোগ হরে।"

তখন ছিল রামকৃষ্ণ সাঁতরার স্নানের সময়। সকাল সাতটার মধ্যে তাঁর স্নানের পর্ব শুরু হয়। শেষটা বলা কঠিন। কেননা ওটা নির্ভর করে রোদের তাপে জল গরম হওয়ার ওপর। তাঁর কাঠের দোকান আর চুন-সুরকির কারবার। পাতকুয়োর পাশে বসে তেল মাখতে মাখতেই তিনি দিব্যি চালিয়ে যেতে থাকেন। এই সময় কাজের জন্য যাঁরা আসেন, তাঁরা রামকৃষ্ণবাবুকে বাড়ির কোনও ঘরে সন্ধান না করে সোজা পাতকুয়োর পাশে চলে যান। সেখানে দুটো কাঠ পেতে বসবার ব্যবস্থাও আছে। অর্থাৎ সকালবেলাটা ওটাই হল রামকৃষ্ণবাবুর বাথরুম কাম অফিস। গগন গড়াই এসে হাজির হলেন ওই পাতকুয়োর সামনে। তাঁর সারা মুখে তখন টসটসে উত্তেজনা। রামকৃষ্ণবাবু কানে তৈলদান পর্ব শেষ করে নাকে দিতে যাচ্ছেন, তখন তিনি গগন গড়াইকে দেখলেন। কোনও কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই গগনবাবু তাঁর স্বপ্নকাহিনী শোনালেন। শেষে বললেন, “ভোরবেলার প কখনও মিছে হতে পারে না। এবার আমরা জিতছিই।"

রামকৃষ্ণবাবু তেলটা নাকে না দিয়ে চুপ করে কিছুক্ষণ গগন গড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন, “গাঁদাফুল ছুঁড়ছে, গোলাপ-টোলাপ নয়?”

গগনবাবু বললেন, “স্বপ্নে তো গাঁদাই মনে হল। শীতকালের স্বপ্ন তো, গাঁদাটাই আসে ভাল।”

রামকৃষ্ণবাবু খুব চিন্তিতমুখে বললেন, “কিন্তু আমাদের দিকে ফুল ছুঁড়ছে কেন? আমরা কি প্লেয়ার নাকি? ”

গগনবাবু বললেন, “আমরাই তো বকুলতলা ক্লাবের ব্যাকবোন।"

রামকৃষ্ণবাবু কী যেন একটা মনে করবার চেষ্টা করতে করতে বললেন, “আপনি গতবারও এইরকম একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন না?”

গগনবাবু উত্তর দিলেন, “ঠিকই ধরেছেন। তবে ওটা ছিল মাঝরাতের স্বপ্ন। খুব ক্লিয়ার ছিল না।”

যেহেতু তৃতীয়বারের ম্যাচটা বেলতলার মাঠে হবে, সেজন্য সাজসজ্জা আর আড়ম্বরটা বেলতলাতে একটু বেশি। প্রথমবার হয়েছিল বেলতলায়, দ্বিতীয়বার বকুলতলায়। তৃতীয়বারে হোম গ্রাউন্ডে খেলার প্রবল ইচ্ছা ছিল বকুলতলার। তাই ওরা ফ্যাকড়া তুলে বলল, “এবারের ম্যাচ কাদের মাঠে হবে সেটা টস করে ঠিক করতে হবে। একবার একবার করে দু'পক্ষের মাঠে হয়ে গেছে। তৃতীয়বারে তাই টস করতে হবে। সেই টসে বেলতলাই জিতে যাওয়াতে খেলাটা বেলতলাতেই হচ্ছে। খালের দু'পারে দুটি তোরণ করা হয়েছে। বেলতলার মাঠে ঢোকবার প্রথম রাস্তার ওপর আরও একটি তোরণ। বেলতলার মণিভাইদের ডাকা হয়েছে ব্যান্ড বাজাবার জন্য। গোড়ার দিকে কথা ছিল, খেলার দিন পুরস্কার বিতরণ করতে আসবেন প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক মনসুর আলি খান পটৌড়ি। যাঁকে অনেকেই 'টাইগার' বলে ডেকে থাকে। কিন্তু টাইগারকে ধরবে কে? কেমন করে তাঁকে এই বেলতলার ফাইনাল খেলায় আনা যাবে? তিনি যে কোথায় থাকেন তার হদিসই তো বেলতলার বহু লোক জানে না। কিন্তু বেলতলা তো ছোট্ট গ্রাম নয়, আর সেখানে অল্প লোকও বাস করে না। হাজার দশেক বাসিন্দার মধ্যে কেউ কি জানে না, তিনি কোথায় থাকেন? কেমন করে তাঁকে আনা যায়?

মনসুর আলি খানের কথাটা যিনি বেলতলা স্পোর্টিং ক্লাবের ছেলেদের মাথায় মাসখানেক আগে প্রথম ঢুকিয়েছিলেন তিনি হলেন টোপাবাবু। টোপাবাবুর ভাল নাম অবশ্যই একটা আছে, তবে সে-নামে বিশেষ কেউ চেনে না। বাইরে থেকে কোনও চিঠি এলে কিংবা বেলতলায় কোনও উপলক্ষে নিমন্ত্রণপত্র দেওয়া হলে তাতে লেখা হয় ব্রজগোপাল মুখোপাধ্যায় এবং ব্র্যাকেটে বড় বড় করে ‘টোপাবাবু’। টোপাবাবু যৌবনে ছিলেন ঘোর স্বদেশী। দেশের মুক্তিসংগ্রামে তিনি বহুবার জেল খেটেছেন এবং বহু গোরা পুলিশকে তিনি একাই মেরে হাত-পা ভেঙে দিয়েছেন। একবার বাঁশবাগানের মধ্যে এক লালমুখো দারোগাকে এমন কান মলে দিয়েছিলেন যে, সেই সাহেব-দারোগা যখন “সেভ মি, হেল্প মি” বলে দৌড় লাগালেন, তখন দেখা গেল ওই দারোগার একটি কান রয়ে গেছে টোপাবাবুর বাঁ হাতে। হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে সেই দারোগা কতবার কাতর আবেদন করেছে টোপাবাবুর কাছে, “প্লিজ রিটার্ন মাই ইয়ার।” টোপাবাবুকে সবাই জিজ্ঞেস করতেন, “তারপর কী করলেন? কান ফেরত দিলেন?”

টোপাবাবু পান চিবুতে চিবুতে উত্তর দিতেন, “ওই ম্লেচ্ছ ব্যাটার একখানা ছেঁড়া কান নিয়ে আমি কী করব! দিনকয়েক আলপিন দিয়ে মাটির দেওয়ালে আটকে রেখেছিলুম। পরে ভেবে দেখলু যার কান তার কাছেই ফেরত দেওয়া ভাল। লোকটা কান্নাকাটি করে খান তিনেক চিঠি লিখে ফেলেছে। তাই একদিন পার্সেল করে ওটা পাঠিয়ে দিলুম ওর ঠিকানায়।”

এই টোপাদাই বললেন, “তোমরা প্রাইজ দেওয়ার জন্য মনসুরকে ডাকছ না কেন? ওর হাত থেকে প্রাইজ পাওয়া তো দারুণ সম্মানের ব্যাপার!”

বেলতলার অনেকেই অবাক চোখে জিজ্ঞেস করল, “মনসুর? সে কে?”

টোপাবাবু দুঃখের হাসি হেসে বললেন, “এইজন্যে, শুধুমাত্র এইজন্যে বেলতলায় বাড়ি করে ভুল করেছি বলে মাঝে-মাঝে আপসোস হয়। তোমরা কি কোনও খবরই রাখো না? পটোডির নাম শোনোনি।"

সবাই একবাক্যে বলে উঠল, “কেন শুনব না? টাইগার পটোডি। ভারতের সেরা ক্রিকেটারদের একজন।

টোপাবাবু বললেন, “টাইগার তো কারও পিতৃদত্ত নাম হতে পারে না। বাঘ মেরেছিল বলে 'টাইগার', ওটা বিশেষণ। পটোডিও নাম নয়, যে জায়গার নবাব ছিল সেটা হচ্ছে ওই পটোডি। আসল নাম মনসুর আলি খান। আমরা তো ওকে মনসুর বলেই ডাকি।”

ছেলেরা আহ্লাদে পুলকিত হয়ে উঠে বলল, “কিন্তু তিনি কি এই গ্রামে আসবেন? আমাদের কথার তো কোনও মূল্যই দেবেন না!”

এবার টোপাদার মুখে সেই রহস্যময় হাসি। তিনি বললেন, “নবাবের রক্ত রয়েছে শরীরে। খানদানি মেজাজ। ডাকলেই কি আসবে? কিন্তু কে ডাকছে সেটা দেখতে হবে। যদি আমি, এই টোপা আঙ্কেল চিঠি দিয়ে ডেকে পাঠাই, তা হলে নেহাত শয্যাশায়ী না হলে এবং বিদেশে না থাকলে এক চিঠিতেই উড়ে চলে আসবে।”

অতএব, সবাই মিলে টোপাদার হাঁটু জাপটে ধরে বলে উঠল, “তা হলে দিন একখানা পত্র লিখে। আপনার সঙ্গে যা সম্পর্ক, তাতে উনি আপনাকে ফেরাতে পারবেন না।"

টোপাদা জর্দা মুখে দিয়ে বললেন, “আফটার অল মনসুরের বাবা তো আমার বাল্যবন্ধু। পিতৃবন্ধুর কথা রাখবে না তো কি তোমাদের বেলতলার ওই জগা চৌধুরীর কথা রাখবে? জগা চৌধুরী নাকি বেলতলার কিছুটা অংশের জমিদার ছিলেন। সবই পাস্ট টেন্স। আর মনসুররা ছিল নবাব। ‘নবাব’ বোঝো! হাতির সঙ্গে মেনি বেড়ালের যা তফাত, নবাবের সঙ্গে গেঁয়ো জমিদারের তাই তফাত। দেখি, কাল একখানা চিঠি লিখে "

টোপাবাবু চিঠি লিখেছিলেন কি না এবং লিখলেও তার কোনও জবাব এসেছিল কি না সে-ব্যাপারে বেলতলার ছেলেরা কিছু জানে না। খেলার দিনসাতেক আগে টোপাবাবু জানালেন, “মনসুর অস্ট্রেলিয়া থেকে গভীর দুঃখপ্রকাশ করে চিঠি দিয়েছে। আপাতত মাসখানেক ওকে ওখানেই থাকতে হচ্ছে। ফলে এবার আর হল না। দেখা যাক আসছে-বার।”

বেলতলার বড়রা অনেক আগেই ব্যাপারটা অনুমান করেছিলেন, কিন্তু ছেলে-ছোকরারা মানতে পারছিল না। তারা ভাবছিল, যদি টোপাদার দৌলতে একবার মনসুর আলি বেলতলার মাঠে এসে যান, তা হলে সেটা একটা স্মরণীয় ঘটনা ঘটবে। এই কৃতিত্বের জন্যই বেলতলা অন্তত দশ-বারো বছর বকুলতলাকে দমিয়ে রাখতে পারবে। কিন্তু পটোডির আসার কোনও চান্স নেই জেনে ছেলেরা হতাশ হয়ে পড়ল। বেলতলার ক্যাপ্টেন অপন গাঙ্গুলি বলল, “ওঁর আসার খবরটা বকুলতলাতেও রটে গেছে। ওদের কাছে বড্ড ছোট হয়ে যাব। ওরা ভাববে আমরা নিধ্যে রটিয়েছি।”

আমি বললাম, “একটা কাজ করলে আমাদের সম্মান কিছুটা বাঁচবে। আমরা যে মিথ্যে বলিনি সেটা প্রমাণ হবে।"

সবাই জানতে চাইল, “সেটা কী কাজ?”

আমি বললাম, “ওঁর চিঠিটা আমরা পুরস্কার বিতরণের আগে পড়ে শোনাব।"

সবাই বলে উঠল, “দারুণ আইডিয়া। টোপাদা, চিঠিটা আপনিই পড়বেন।"

টোপাদা আমাদের সবাইকে, বিশেষ করে আমাকে প্রচণ্ড একটা দাবড়ানি দিয়ে বললেন, “এটা কি বকুলতলা আর বেলতলার জলসা ভেবেছিস! অমুককুমার আসতে পারলেন না বলে ক্ষমা চেয়ে চিঠি দিয়েছে। আর ওই চিঠিতে তোদের বেলতলার নামগন্ধও নেই। ও দুঃখ করেছে, যদি আসতে পারত তা হলে অনেকদিন পরে টোপা আঙ্কেলের সঙ্গে দেখা হত। এই যে দেখা হতে পারল না, দুঃখটা তো সেইজন্যই। এর মধ্যে বেলতলা-তালতলা আসছে কোত্থেকে! এসব ব্যক্তিগত অনুভূতির জিনিস। এসব কি পাঁচ পাবলিকের সামনে প্রকাশ করা যায়! ওসব বায়না ছাড়!”

আমরা সবাই মুষড়ে পড়লাম। মিনমিন করে বললাম, “অন্য কাউকে চেষ্টা করলে আপনি আনতে পারেন না? কলকাতা থেকে কাউকে?”

টোপাদা আমাদের সবার মুখের দিকে ভাল করে একবার দেখে নিয়ে বললেন, “চেষ্টা কি আর করিনি? 'ডিয়ার গ্যারি বলে ওয়েস্ট ইন্ডিজে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সোবার্স বোধ হয় বাড়ি পালটেছে। এখনও উত্তর পেলাম না।”

আমিই বললাম, “কলকাতার কাউকে বলুন না!”

টোপাদা বললেন, “তোরা আমার রেঞ্জটা ধরতে পারছিস না। মনসুর, গ্যারি, এদের যে চিঠি দিয়ে ডেকে পাঠায়, তার পক্ষে কলকাতার কাকে অনুরোধ করা সম্ভব! এখানে আছেটা কে? ও সব করতে হলে তোরা জগা চৌধুরীর কাছে যা।"

অগত্যা আমাদের উঠে আসতে হল। সেক্রেটারি জীবনদা আমাদের মুখ থেকে সব শুনে বললেন, “আমি গোড়া থেকেই জানতাম, হবে না। টোপাদা গুল-শিরোমণি। এমন এক-একটা গল্প ছাড়ে যে, শুনলে মনে হয় টোপাদাকে মিউজিয়ামে রাখি। আমি ডি. এম. সাহেবকে নিমন্ত্রণ করে রেখেছি। উনি আসবেন। ওঁকে দিয়েই প্রাইজ দেওয়াব।”

আমরা টোপাদার মুণ্ডপাত করতে-করতে ক্লাবঘরে গিয়ে বসলাম। আমাদের ভেতরে উত্তেজনা এতই প্রবল হয়ে উঠেছে যে, কোথাও দু' দণ্ড স্থির হয়ে বসতে পারছি না। জীবনদা আমাদের সামনে এসে বললেন, “তোরা যারা খেলবি, তারা টেনশন-ফ্রি থাক। খেলায় জেতা-হারা আছে। আমরা জিতবই। তোরা নিজেদের শান্ত রাখ। ক্রিকেট খেলায় ধৈর্য দরকার। মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। সকাল-বিকেল প্র্যাকটিস কর। ভাল ফিল্ডিং করতে পারলে আমরা বেরিয়ে যাব। গৌরের ব্যাটিং-ফর্মটা যেন ঠিক থাকে।”

বেলতলার ব্যাটিংয়ে যে-তিনজনের ওপর আমাদের সবচেয়ে বেশি ভরসা, সেই তিনজন হল, স্বপন, সুকুমার আর গৌর। এই তিনজনের মধ্যে দু'জন যদি সেট করে যায়, তা হলে আমরা ভাল রান তুলতে পারব। জীবনদা বললেন, “চল্লিশ ওভারের খেলা। ওভারপিছু পাঁচ রান করে তুললে দু'শো রান হয়। আমাদের টার্গেট থাকবে দু'শো পঁচিশ। ওরা যদি টসে হেরে পরে ব্যাট করতে নামে, তা হলে দু'শো পঁচিশ রানের বোঝাটা ওদের কাছে বেশ বড় বোঝা মনে হবে। কুড়ি ওভার পর্যন্ত দেখেশুনে খেলবে। কুড়ির পর হাত খুলে ব্যাট চালাবে। শেষ দশ ওভারে খেলতে হবে মরিয়া হয়ে, কিন্তু তাই বলে আনাড়ির মতো ব্যাট চালাবে না।"

খেলার আগে এরকম উপদেশ প্রতি বছরই শুনতে হয়। কোনও ব্যাটসম্যানই তো ইচ্ছে করে আউট হতে চায় না, হয়ে যায়। একটা সরল বলও মাটিতে পরে হঠাৎ এমন জটিল হয়ে ওঠে যে, তখন তড়িঘড়ি সেটাকে সামাল দিতে গিয়েই ব্যাটের কোনা ছুঁয়ে, বলটা চলে যায় উইকেটকিপারের হাতের মুঠোয়। ফুটবলে একবার মিস করলে পরক্ষণেই আবার একটা সুযোগ পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু ক্রিকেটে একবার, এক মুহূর্তের ভুলে যদি আউট হয়ে যাও, তা হলে সেই ইনিংসে তোমার আর কিছু করার নেই। মাথা হেঁট করে চোখের জল চাপতে চাপতে ফিরে যেতে হয় ড্রেসিংরুমে। আমাদের মধ্যে যখন এইসব কথাবার্তা চলছে তখন গৌর-নিতাই ক্লাবে ঢুকল। আমরা বললাম, “গৌর, তোর ব্যাট থেকেই কিন্তু ভাল রান আশা করছি। আর নিতাই, বল করার সময় তোকে সংহারমূর্তিতে দেখতে চাই।”

গৌর-নিতাই বলল, “আমরাও তো চাই। কিন্তু খেলার কথা কি বলা যায়! হয়তো দেখবি, প্রথম ওভারেই কাত হয়ে গেলাম।”

জীবনদা বললেন, “ওসব অলুক্ষুণে কথা বলতে নেই। তুই তো কখনও ফেল করিস না। মোটামুটি একটা স্ট্যান্ডার্ড তোর থাকে।

এই সময় বেলতলার ক্রিকেট কোচ সুনুদা এলেন। সুনুদা এসেই বললেন, “টোপাদা যথারীতি ডুবিয়েছেন!”

আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি বকুলতলা থেকে আসছি। বোনের বাড়ি গিয়েছিলাম। ওরা পর্যন্ত টিপ্পনী কাটছে।”

আমরা বললাম, “তোমার বোনও টিপ্পনী কাটছে?”

সুনুদা বললেন, “বোন নয়, বোনের জামাই আর ভাগ্নে দুটো। বোন তো বেলতলার মেয়ে ৷ ওর একটা ফিলিংস রয়েছে বেলতলার দিকে। কিন্তু জামাই আর ভাগ্নে দুটো তো বকুলতলার। ওরা এই সুযোগে টিপ্পনী কাটছে।"

দেখতে-দেখতে দিনগুলো চলে গিয়ে খেলার দিনটা এসে গেল। যে সময়ে বেলতলা গ্রামে একদিনের ক্রিকেট নিয়ে এই উত্তেজনা আর দাপাদাপি চলছে, তখনও কিন্তু সারা পৃথিবীতে একদিনের ক্রিকেট আজকের মতো এত আসর জাঁকিয়ে বসেনি। ১৯৬৩ সালে সবে ইংল্যান্ডে চালু হয়েছে একদিনের টুর্নামেন্ট। ওই টুর্নামেন্টই বিশ্বে প্রথম একদিনের টুর্নামেন্ট। তার নাম ছিল জিলেট কাপ। আর বেলতলায় একদিনের খেলা চালু হয়ে গেছে সেই ষাট সাল থেকে। তবে তার নিয়মকানুন ছিল আলাদা। পঁয়ষট্টি থেকেই দুর্গাদাস কাপ চালু হল আর জগন্নাথ চৌধুরীর উদ্যোগে বাইরে থেকে বই-টই আনিয়ে সুনুদার নেতৃত্বে চালু হয়ে গেল একদিনের নির্দিষ্ট ওভারের ক্রিকেট খেলা। আর এখন এই একদিনের ক্রিকেট ম্যাচের সঙ্গে বেলতলা আর বকুলতলার হৃদস্পন্দনের ওঠানামা নির্ভর করে। এমন কি, দুই পাড়ার মানসম্মানও যেন এই খেলার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

॥ ৩॥

সকাল ন'টা থেকে খেলা আরম্ভ হওয়ার কথা। কিন্তু সকাল সাতটার পর থেকেই মাঠে লোক আসতে আরম্ভ করেছে। বাঁশের বেড়া থেকে কিছুটা দুরে চা, আলুর দম, ডিমসেদ্ধ, ঘুগনি আর পাঁউরুটির খানসাতেক দোকান। বড়-বড় দুটো জলের গাড়ি। বুকে ব্যাজ লাগিয়ে বেলতলার ছেলেরা ভলানটিয়ারি করছে মাঠের চারপাশে। মাইকে সকাল থেকেই বেজে চলেছে সানাই। রঙিন শামিয়ানার নীচে দুর্গাদাস কাপ আর খেলোয়াড়দের প্রাইজ। আটটার একটু আগে তিনখানা অ্যামবাসাডর গাড়িতে ঠাসাঠাসি করে বকুলতলার পনেরোজন খেলোয়াড় আর নকুল চৌধুরী এসে গেলেন। তাঁর পেছন পেছন দু'খানা লরি ভর্তি বকুলতলা ক্লাবের সদস্যরা। বেলতলার কে যেন টিপ্পনী কেটে বলল, “কাপ নিয়ে যাবে বলে দু'খানা লরি এনেছে রে!” এ ছাড়াও বকুলতলা থেকে লোক আসার বিরাম নেই। সাড়ে আটটার মধ্যে মাঠের চারদিক কানায় কানায় ভর্তি হয়ে গেল। মাঠের পাশে যত বাড়ি ছিল, তার ছাদেও গিজগিজ করছে লোক। মহিলারাও আছেন। পেঁচোদার পিসি খড়মপায়ে লাঠি হাতে বেলতলার ড্রেসিংরুমে ঢুকলেন গঙ্গাজলের বোতল নিয়ে। সবার মাথায় গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিয়ে তিনি মাঠের দিকে যাচ্ছিলেন। তাঁকে আটকালেন সুনুদা। বললেন, “মাঠে যাবেন না।”

পিসি বললেন, “কেন রে? মাঠে যাব না কেন? ওটা কি ভাগাড় যে আমাদের যেতে নেই! আমার যাওয়া দরকার। "

অসহিষ্ণু গলায় সুনুদা বললেন, “কেন? কিসের দরকার?” পিসি বললেন, “ওই যেখানটায় খেলা হবে, ওখানে গঙ্গাজল দেব।"

সুনুদা কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন, “লাও ঠ্যালা। পিচে জল ঢালবে। এখানে ওসব করতে নেই।”

সুনুদাকে গালাগালি করতে করতে পিসি গিয়ে উঠলেন সদানন্দবাবুদের ছাতে। হাতে লাঠি, মাথায় ছাতা নিয়ে ছাতে একজনই দর্শক ; তিনি বেলতলার পিসিমা। খেলা শুরু হওয়ার দশ মিনিট আগে মহকুমা শাসককে নিয়ে মাঠে ঢুকলেন সব্যসাচীবাবু। তিনি মাননীয় অতিথিকে নিয়ে মঞ্চে উঠতে যাওয়ার আগে বিষ্ণুবাবু তাঁকে পেছন থেকে টেনে ধরে বললেন, “এই যে মশাই! আপনাকে ক'দিন থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।”

সব্যসাচীবাবু একটু বিরক্ত ভঙ্গিতে বললেন, “কেন?”

বিষ্ণুবাবু বললেন, “ওই যে আপনি ‘ফর্দাফাঁই' কথাটা বলেছেন, সে-বিষয়ে একটু আলোচনা করা দরকার।”

নিজের ডান হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে সব্যসাচীবাবু বললেন, “কিসের ফারদাফাই?” বিষ্ণুবাবু এবার খপ করে সব্যসাচীবাবুর বাঁ হাতটা টেনে ধরে বললেন, “কিসের ফর্দা এবং কিসের ফাঁই, সেটা তো আপনিই বলবেন। শুধু শুধু বললেই তো হবে না। শব্দটার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ জানতে হবে। যদি ওটা আরবি বা ফার্সি হয় তা হলে দেখতে হবে শব্দটা কোন অর্থে প্রয়োগ হত। ফর্দা এবং ‘ফাই’ দুটো কি একই শব্দ, না কি দুটো শব্দের সম্মেলনে একটি নতুন অর্থের জন্ম। তা হলে দেখতে হবে ওই অর্থের কাছাকাছি অর্থ হয়, এমন কী বাংলা শব্দ হতে পারে! আমার মনে হচ্ছে যে- অর্থে এবং যে-পরিস্থিতিতে আপনি ‘ফর্দাফাঁই' শব্দটি প্রয়োগ করেছেন সেই অর্থে বাংলায় ‘নাকে ঝামা ঘষে দেওয়া' অথবা 'মুখে চুন-কালি দেওয়া' কি প্রয়োগ হতে পারে না? যেমন ধরুন...”

সব্যসাচীবাবু এবার প্রবল একটা ঝাঁকুনি দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, “নিজের মুখে ঝামা ঘষুন। যত্তসব অনামুখো।"

বেলতলার ড্রেসিংরুমে তখন অন্য সমস্যা। আমাদের ক্লাবের সব খেলাতেই ওপেন করতে নামে স্বপন আর দীপক। ওয়ান ডাউন সুকুমার, টু ডাউন গৌর। সাত নম্বর ব্যাটম্যান হচ্ছে নিতাই। সাত থেকে দশ পর্যন্ত সত্যি বলতে কি, আমাদের কোনও ব্যাটসম্যান নেই। দৈবাৎ কারও ব্যাট থেকে আট-দশ রান এসে গেলে সেটা আমরা ভাগ্য বলে মানি। কিন্তু সুনুদা বললেন, “আজ স্বপন আর দীপক ওপেন করবে। ওয়ান ডাউন গৌর, টু ডাউন সুকুমার। আর নিতাই নামবে পাঁচ নম্বরে।”

সুকুমার বলল, “আমার আপত্তি নেই। গৌর আমার আগে নামুক। কিন্তু নিতাইকে এত এগিয়ে দেওয়ার মানে কি? ওখানে তো নির্মল নামে।”

সুনুদা বললেন, “আমি গৌর-নিতাইয়ের সঙ্গে আলাদা কথা বলে নিয়েছি। নিতাইকে তো বল করতে হবে, তাই ওকে আগে পাঠিয়ে দিলে ও তো চটপট ফেরত আসবে। তাতে কিছুটা রেস্ট পাবে। শেষের দিকে বেপরোয়া ব্যাটিং করে নির্মল তবুও পনেরো-বিশ আনতে পারবে।”

সুনুদার কথাই মেনে নিতে হল। দু' দলের ক্যাপ্টেন টস করতে মাঠে নেমে গেল। আমরা মাঠের এপার থেকেই বুঝতে পারলাম, বেলতলা টসে হেরে গেছে। আর বকুলতলা জিতে গিয়ে ব্যাট নিয়েছে।

বকুলতলার সমর্থকরা যেদিকে ছিল সেইদিক থেকে টসে জেতার পরই পরপর তিনটে পটকা ফাটল। গগন গড়াই আবেগে পাশে বসা রামকৃষ্ণ সাঁতরাকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলেন, “ভোরবেলার স্বপ্ন মিছে হতে পারে না। সূচনাতেই জয়। সমাপ্তিতেও ওই জয়ই থাকবে। কলকাতার হালুইকর পোলাও রান্না শুরু করে দিয়েছে তো?”

রামকৃষ্ণবাবু বললেন, “জোগাড়যন্ত্র করা আছে। সিগন্যাল পেলেই কড়াই চাপাবে।”

গগন গড়াই বললেন, “সিগন্যাল তো পেয়েই গেলেন। রান্নাটা চাপাতে বলে দিন।"

রামকৃষ্ণবাবু ধমক দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, “অত খাই-খাই করবেন না তো। খাওয়া তো রাত্তিরবেলা। "

ওদিকে মাঠে তখন ডি. এম. সাহেবের সঙ্গে খেলোয়াড়দের পরিচয়পর্ব, করমর্দন, ছবি তোলা এবং ফুলের তোড়া বিনিময়-পর্ব চলছে।

রামকৃষ্ণবাবু ফিসফিস করে বললেন, “কাপটা পেলে ডি. এম-কে গাড়ি করে একটি বার বকুলতলায় নিয়ে যাব। ওঁর কৃপা থাকলে কেষ্টপুরের ব্রিজের কাজটা হাতে এসে যাবে। বারো লাখ টাকার কন্ট্রাক্ট। জয় মা ভবতারিণী!”

বেলতলার ছেলেরা সাদা প্যান্ট আর সাদা জামা পরে মাঠে নামল। ছাতের ওপর থেকে মেয়েরা শাঁকে ফুঁ দিল। পেঁচোদার পিসি হাতের লাঠি ঘুরিয়ে “জয় মা ষষ্ঠী, মা ষষ্ঠী ঠাকুন!” বলে ছাতের ওপর খড়ম পায়ে এমনভাবে ঘুরপাক খেলেন যে, ছাতে কাপড় টাঙানোর দড়ি ছিঁড়ে ভেজা শাড়ি আর লুঙ্গি গিয়ে পড়ল পাশের কুলগাছের মাথায়। পেঁচোদা দাঁড়িয়ে ছিলেন অন্য ছাতে। তাঁর চাদরের তলায় এক জোড়া সাদা পায়রা। উনি মুখে বকম-বকম আওয়াজ তুলে পায়রা দুটো ছাতের ওপর থেকে আকাশের দিকে ছেড়ে দিতেই কী যে হল বোঝা গেল না। পায়রা উড়তে গিয়ে উড়তে পারে না, আর পেঁচোদাও টাল খেয়ে পড়ে যান। পায়রা দুটো টাল খেয়ে কাঁপতে কাঁপতে ছাতের কার্নিশে বসে পড়ল। আর তখনই পেঁচোদার মনে পড়ল দুটো পায়রার দুটি পায়ে সুতো বেঁধে, সেই সুতোটা বেঁধে রেখেছিলেন নিজের কাপড়ের খুঁটের সঙ্গে। উত্তেজনার মধ্যে পায়রা তো উড়িয়ে দিয়েছেন, কিন্তু কাপড়ের খুঁট থেকে বাঁধনটা খুলতে গেছেন ভুলে। যখন খুঁটের খুটো ছিঁড়ে দেওয়া হল তখন সেই দড়িসুদ্ধ পায়রা দুটো উড়ে গিয়ে বসল শামিয়ানার ওপর। তাই দেখে নকুল চৌধুরী বললেন, “দিনুবাবু, জোড়া পায়রা। অত্যন্ত শুভ প্রতীক। ব্যাট শুরু করার মুখেই উড়ে এসে বসল।”

ঠিক ন'টা দশ মিনিটে খেলা শুরু হয়ে গেল। বকুলতলার ওপেনার সুশান্ত ব্যাট নিয়ে তৈরি। ওর নাকের ডগায় দু'জন ফিল্ডার। একজন গৌর, অন্যজন নিতাই। কারও নাকের ডগায় একই চেহারার দু'জন ফিল্ডার যদি থাবা বাগিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মিটিমিটি হাসে, তা হলে বকুলতলার সুশান্ত তো দূরের কথা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সোবার্সও খুব স্বস্তি পাবেন বলে মনে হয় না। বেলতলার পক্ষ থেকে বল শুরু করল পল্টু। দুটো বল সুশান্ত খেলতে পারল না। বেলতলার পরেশ পাল বলে উঠলেন, “ইন সুইং। ব্যাট তুলতেই পারবে না। তুললেই বোল্ড। পল্টু এটা মেডেন ওভার নেবে।”

কথা শেষ হওয়ার আগে পল্টুর তৃতীয় বল এল এবং সেই বলে ড্রাইভ করে সুশান্ত চোখের নিমেষে চার রান করে ফেলল। বকুলতলার সমর্থকদের উল্লাসধ্বনি আর হাততালিতে মাঠ এমন মুখর হয়ে উঠল, যেন কানে তালা লাগার জোগাড়। ওরই মধ্যে নকুল চৌধুরী প্রায় আর্তনাদ করে বলে উঠল, “এই যাঃ, জোড়া পায়রা উড়ে গেল।"

পল্টু তার প্রথম ওভারেই ছ' রান দিল। বকুলতলা ক্লাবের সভাপতি নকুল চৌধুরী বললেন, “ওয়েল ডান, ওয়েল ডান মাই বয়। ওভারে ছ' রান করে নিতে পারলেই যথেষ্ট। সেকেন্ড ইনিংসে বেলতলা ভাঙা পিচে ওভার প্রতি তিন রানও পারে না।”

বকুলতলার কোচ লায়ন রে বললেন, “আমাদের ছেলেদের রান রেট ছয় রাখতে বলেছি। খেলাটা প্রায় আমাদের গ্রিপে এসে গেছে।"

পরের ওভার শুরু করতে গেল জয়দীপ। বকুলতলার শ্যামল এবার ব্যাট করবে। জয়দীপের প্রথম বলেই বেশ জোরে মেরেছিল শ্যামল। বাউন্ডারি লাইনের দু' হাত আগে শুয়ে পড়ে বলটা কুড়িয়ে নিয়ে ফেরত পাঠাবার আগেই দু' রান হয়ে গেল। প্রথম চার ওভারে কোনও উইকেট না খুইয়ে বকুলতলা রান করল ষোলো। বকুলতলার শুরুটা ভাল এবং আমাদের বলের ওপর ওরা যে আস্তে-আস্তে আধিপত্য বিস্তার করছে, সেটা আমরা টের পেলাম। পঞ্চম ওভারের চতুর্থ বলে বকুলতলার প্রথম উইকেট পড়ল। পল্টুর একটা বল এগিয়ে গিয়ে বলটাকে ওভারপিচ করে মারতে গেল সুশান্ত। কিন্তু সময়ের সামান্য হেরফেরে সুশান্ত যখন মারবার জন্য ব্যাট তুলে ফেলেছে, তখনই বলটা ব্যাটের তলা দিয়ে চলে গিয়ে লাগল উইকেটে। নিজের ব্যক্তিগত দশ রান এবং দলের আঠারো রানের মাথায় প্রথম উইকেট পড়ল বকুলতলার। ডি. এম. সাহেবের পেছনে বসে ছিলেন টোপাদা। মাথায় সাদা টুপি, গায়ে ব্লেজার। দেখে মনে হচ্ছে বিদেশের কোনও ডাকসাইটে ক্রিকেটার। টোপাদা বললেন, “ক্যামোফ্লেজিং ইয়র্কার। এই বলেই গ্যারি এক ইনিংসে ইংল্যান্ডের দু'জন সেরা ব্যাটম্যানকে শূন্য রানে প্যাভিলিয়নে পাঠিয়েছিলেন।”

ডি. এম. সাহেব একবার পেছন ফিরে টোপাদাকে দেখলেন। ক্যাপ্টেন স্বপন পাঁচ ওভারের পর নিতাইকে ডাকল বল করতে।

ওকে চার-পাঁচ ওভারের পরই ডাকা হয়। জয়দীপকে দু' ওভারের পর তুলে নিল স্বপন। নিতাই বলটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে নিয়ে বল করল। শ্যামল বলটা না খেলে ছেড়ে দিল। নিতাইয়ের বলের গুণটা ছিল : ওর ছ'টা বল ছ'রকম। কোনটা খুব জোরে আসে, কোনটা আস্তে। ফলে ব্যাটসম্যানরা অনেকটা সময় নেয় ওর বল খেলতে। নিতাই তার প্রথম ওভারটা মেডেন পেল। দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই শ্যামল উইকেট-কিপারের হাতে ক্যাচ তুলে আউট। রান তখন কুড়ি। কুড়ি রানে দুটো উইকেট। ওয়ান ডে খেলার নিয়ম অনুসারে চল্লিশ ওভারের খেলায় কোনও বোলারই আট ওভারের বেশি বল করতে পারবে না। নিতাইয়ের বলে বকুলতলার গোড়া থেকেই খেলতে অসুবিধে হচ্ছে। নিতাই আট ওভার বল করার পর ওর বলের গড় দাঁড়িয়েছে, আট ওভারে তিনটে মেডেন, বাইশ রান দিয়ে তিনটে উইকেট। বকুলতলার তখন পাঁচ উইকেটের বিনিময়ে কুড়ি ওভার খেলে চৌষট্টি। গড়ে ওভার-পিছু তিন রানের চাইতে সামান্য কিছু বেশি। বকুলতলার লোকেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল কখন নিতাইয়ের ওভার শেষ হবে। নিতাইয়ের ওভার শেষ হতেই বকুলতলার লোকেরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। লায়ন রে বলে উঠল, “নিতাইয়ের বলটা ব্যাটসম্যানের পক্ষে হাত খুলে খেলার মতো নয়। বলের প্যাটার্নটা নাদকার্নি আর সোবার্স মেশানো।"

নকুলবাবু হুঙ্কার দিয়ে উঠে বললেন, “একটু চুপ করে বসুন তো। কুড়ি ওভারে চৌষট্টি রান! এটা কি খুব ভাল লক্ষণ?”

লায়ন রে বললেন, “কুড়ির পর থেকেই তো রান রেট বাড়বে। তিরিশের পর দ্বিগুণ হবে। ওদের ক্যাপ্টেন আর কোচ দু'জনেই বোকা। এফেকটিভ বোলার নিতাইকে লোভে পড়ে তখনই শেষ করে ফেলল। আমি হলে লাস্ট টেন ওভারের জন্য নিতাইয়ের তিনটে না হোক দুটো ওভার অন্তত রেখে দিতাম। স্বপন এবার দু' দিক থেকে দু'জন নতুন বোলার দিয়ে বল করাতে আরম্ভ করল। ওদের বলে বকুলতলাকে খুব একটা অসুবিধেয় ফেলা যাচ্ছিল না। ওভার প্রতি তিন রান ওরা ঠিকই পেয়ে যাচ্ছিল। এরই মধ্যে বকুলতলার জগা একটা ওভার বাউন্ডারি মারায় খেলার মধ্যে উত্তেজনা চরমে উঠল। বকুলতলার ছেলেরা পটকা ফাটিয়ে নাচতে আরম্ভ করল। গগন গড়াই পাশে বসা রামকৃষ্ণ সাঁতরাকে জড়িয়ে ধরে নাচতে নাচতে বললেন, “পোলাওটা এবার চাপাতে বলুন।”

আনন্দে আপ্লুত রামকৃষ্ণ বললেন, “দলের রান একশো হলেই পোলাও চাপানো হবে।"

তিরিশ ওভার শেষ হতেই বকুলতলার রান গিয়ে দাঁড়াল একশো পনেরো-তে। রামকৃষ্ণ সাঁতরাকে কনুইয়ের খোঁচা মেরে গগন গড়াই বললেন, “একশো পেরিয়ে গেছে। এখন অন্তত পোলাও চাপানোর অর্ডারটা পাঠান।

রামকৃষ্ণবাবু একটা কাগজে খসখস করে লিখলেন, “পোলাও স্টার্ট করুন।” তারপর কাগজটা একটা ছেলের হাতে দিয়ে বললেন, “এটা কারও হাত দিয়ে ক্লাবে পাঠিয়ে দে।"

তিরিশ ওভারের পর রান তোলার জন্য বকুলতলা ব্যাকুল হবেই। এই সময় স্বপন বল করার জন্য গৌরকে ডাকল। এমন একটা গুরুতর সময়ে গৌর, যে কিনা বোলার নয় তাকে বল করতে দেওয়া মানে ওভার পিছু পাঁচ থেকে আট রান ওদের হাতে তুলে দেওয়া। তার বেশি হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই! বোলার বদলাবার সময় মাইকে সেটা ঘোষণা করে দেওয়ার ব্যবস্থা এই মাঠে বরাবরই আছে। নতুন বোলার এবং নতুন ব্যাটসম্যানের নাম বলে দেওয়া হয়। মাইকে ঘোষণা হল, “এবার বল করতে যাচ্ছেন গৌর ভট্টাচার্য। গৌরকে আমরা বেলতলার একজন দক্ষ ডানহাতি ব্যাটসম্যান হিসেবে বেশি জানি। বলও যে তিনি করতে পারেন, তার পরিচয় আর-একটু পরেই আমরা পাব। তিনি তাঁর প্রথম ওভারের বল শুরু করবেন বকুলতলার ভবেশ দত্ত অর্থাৎ ভবার বিরুদ্ধে। ভবা কুড়ি রান করে অপরাজিত। অন্যদিকে আছেন জগা, তিনিই এখন পর্যন্ত একমাত্র ব্যাটসম্যান, যিনি একটি ওভার বাউন্ডারি মেরেছেন।”

গৌরের প্রথম বলটা উইকেটের বাইরে দিয়ে চলে গেল। দ্বিতীয় বলটা ভবা মারতে গিয়ে জুতসই হল না, গৌরের হাতেই ক্যাচ দিয়ে আউট হল। বেলতলার অনেকই জানত না, গৌর এত ভাল বল করে! প্রথম ওভারেই দুটো উইকেট। সাত উইকেট হারিয়ে বকুলতলা সেই একশো পনেরোতে দাঁড়িয়ে। পঁয়ত্রিশ ওভারেই বকুলতলা শেষ হয়ে গেল। রানসংখ্যা একশো চব্বিশ। মানে একশো পঁচিশ করতে পারলে বেলতলা জিতে যাবে। দশটা উইকেটের মধ্যে তিনটে নিয়েছে নিতাই, চারটে গৌর, আর তিনটের মধ্যে একটা রান আউট, অন্য দুটো উইকেট নিয়েছে পল্টু।

লাঞ্চের সময় সেদ্ধ ডিমের ওপর গোলমরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়ে নকুল চৌধুরী কোচকে জিজ্ঞেস করলেন, “রানটা বড্ড পুয়োর। মাথা ঠাণ্ডা করে খেললে একশো পঁচিশ করা শক্ত ব্যাপার নয়।"

লায়ন রে বললেন, “পিচের অবস্থা দেখেছেন! বল তো মাতলা নদীর মতো সাঁইসাঁই করে ঘুরছে। এই পিচে আমি এক দিকে বল করাব মদনকে দিয়ে, অন্য দিকে গোপালকে। দেখবেন শরতের শিউলি ঝরার মতো পটাপট উইকেট পড়বে। ওদের স্বপন, সনাতন আর গৌর, এর পর তো নো ব্যাটসম্যান। তিনটেকে ফেলতে পারলেই শিওর আমরা জিতে গেছি।"

নকুল চৌধুরী একজোড়া সেদ্ধ মুরগির ডিম লায়ন রে'-র দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “বল ঘুরবে বলছেন?'

লায়ন রে ডিম মুখে পোরবার আগে বললেন, “হানড্রেড পার্সেন্ট বল ঘুরবে। দেখলেন না ওদের ক্যাপ্টেন আর কোচ গৌরকে দিয়ে বল করিয়ে পটাপট আমাদের উইকেটগুলো নিয়ে নিল! গৌর তো বোলারই নয়। তবুও ওর বল ঘুরল, পাক খেল। আঙুল আর কবজির কায়দায় ঘোরাতে হয়নি, আপনি-আপনি ঘুরেছে। বোম্বের ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে এই জিনিস দেখেছিলাম। কানপুরে জেসু প্যাটেল যেমন পিচ পেয়েছিলেন, এটাও সে রকম হয়ে গেছে।"

নকুল চৌধুরী নলেন গুড়ের সন্দেশ এগিয়ে বললেন, “ওই মদন আর গোপাল বল ঘোরাতে পারবে? ওদের বল কেমন ঘোরে?”

নলেন গুড়ের সন্দেশ মুখে দিয়ে লায়ন রে বললেন, “ওদের দু'জনের বোলিং অ্যাটাকটা দেখবেন। ওদের আমি রোজ বিকেলে আলাদা কোচ করেছি। ওদের মধ্যে থেকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ বাছতে হবে।”

লাঞ্চের পর খেলা শুরু হল। দু' ওভারে বেলতলার রান উঠল ছয়। চার ওভার পরে রানসংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল দশে। রান রেট দুইয়ের সামান্য বেশি। দশ রানের মাথাতেই বেলতলার প্রথম উইকেট পড়ল। দীপক স্লিপে সহজ ক্যাচ দিয়ে দু' রানে আউট হল। এবার ব্যাট করতে এল গৌর। মাইকে গৌরের নাম ঘোষণা হতেই মাঠে ঘন-ঘন হাততালি পড়ল। পিসি ছাতের ওপর থেকে চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন, “গৌর, গলায় ষষ্ঠীতলার ফুলটা রেখেছিস তো!” দশ রানে বেলতলার প্রথম উইকেট পড়ে যাওয়াতে বেলতলা ঝিমিয়ে পড়েছে। এখন বড় ভরসা গৌর। গৌর আর স্বপন খেলতে লাগল বটে, কিন্তু রান তেমন উঠছে না। আট ওভারের পর বেলতলার রান দাঁড়াল একুশ। আটচল্লিশ বলে একুশ রান। গৌর সাত রান করে দাঁড়িয়ে।

বেলতলার সমর্থকরা ক্ষুব্ধ গলায় চিৎকার করে বলে উঠল, “গৌর, সেই কোন সকালে সাত করে দাঁড়িয়ে আছিস। তোর ব্যাটে কি বাত নাকি?”

লায়ন রে নকুল চৌধুরীকে বললেন, “স্যার, কী বলেছিলাম! গৌরকে একেবারে অ্যারেস্ট করে রেখেছে। ভয়ে ব্যাটই তুলতে পারছে না। "

নকুল চৌধুরী বললেন, “বল কি ঘুরছে?”

লায়ন রে বললেন, “আলবত ঘুরছে। এর পর তো বকুলতলার মাথা ঘুরতে শুরু হবে।"

সত্যি তাই হল। বারো ওভারে, মানে বাহাত্তর বলে দলের যখন একত্রিশ রান আর গৌরের রান মোটে চোদ্দ, তখনই বাউন্ডারি লাইনের কাছে ক্যাচ আউট হল গৌর। এ একেবারে অবিশ্বাস্য ব্যাপার! চোদ্দ রানের মধ্যে একটাও বাউন্ডারি নেই। খেপে গিয়ে ফরওয়ার্ড খেলেছিল। বলটা ব্যাটে লেগে উঁচু হয়ে উড়ে যাচ্ছিল বাউন্ডারি লাইনের দিকে। বেলতলা ওটাকে ওভার বাউন্ডারি হতে যাচ্ছে ভেবে যখন চিৎকার করতে যাচ্ছে ঠিক তখনই যেন দৈব নির্দেশে বলটা নেমে এল মাঠের মধ্যে সীমানার এ পাশে। খুব কষ্ট না করেই ক্যাচটা ধরে নিল বকুলতলার শ্যামল।

বেলতলার সমর্থকরা হতভম্ব! বকুলতলার সমর্থকরা অর্ধেক যুদ্ধজয়ের আনন্দে পটকা ফাটাচ্ছে, কাঁসর বাজাচ্ছে আর নাচছে। পরস্পর জড়াজড়ি করে চেয়ার থেকে মাটিতে গড়িয়ে পড়েছেন গগন গড়াই আর রামকৃষ্ণ সাঁতরা। গায়ের ধুলো ঝেড়ে উঠতে উঠতে গগন গড়াই বললেন, “পোলাওটা উনুনে বসেছে তো?”

লায়ন রে উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়ে মাথার টুপি নাড়তে নাড়তে কী যেন বলতে লাগলেন চিৎকার করে। নকুল চৌধুরী তাঁকে বসিয়ে দিয়ে বললেন, “আমার পায়ের ওপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। পা’-টা বোধ হয় গেল।”

লায়ন রে লজ্জিত হয়ে বললেন, “স্যরি স্যার, স্যরি।"

পায়ের ব্যথাটা আপাতত ভুলে নকুল চৌধুরী বললেন, “মনে হচ্ছে স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। ম্যাচটা বোধ হয় আমরাই জিতছি!”

লায়ন রে বললেন, “স্যার, এখনও সংশয়! এখনও দ্বিধা! বারো ওভারে দুটো উইকেট। এর পর ওই সনাতন ছাড়া ওদের আর কোনও ব্যাট্সম্যান নেই যে, উইকেটে টিকে থেকে রান তুলতে পারে। স্বপন একা কতক্ষণ পারবে! বল তো এর পর চরকির মতো ঘুরবে। এখনই কেমন ঘুরছে, বাঁক নিচ্ছে, লক্ষ করেছেন।"

নকুল চৌধুরী বললেন, “এখান থেকে আপনার মতো অত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না। বল ঘুরুক বা না ঘুরুক, আমি উইকেট পড়লেই খুশি।”

সনাতন আর স্বপন এবার ধরে ধরে খেলছিল। আসবার সময় সনাতনকে সানুদা বলে দিয়েছেন, “উইকেটে টিকে থাক। পঁচিশ ওভার পর্যন্ত যদি টিকে থাকতে পারিস, তা হলে রান আসবেই। এখন আর ঝুঁকি নয়। "

সনাতন পিচে এসেই স্বপনকে কথাটা জানিয়ে দিয়েছে। ষোলো ওভারের শেষ বলে স্বপন এল. বি. ডাবলিউ হয়ে গেল। বেলতলার দর্শক তখন বিমূঢ়! দলের রান তখন মোটে একচল্লিশ। স্বপন থমথমে মুখ নিয়ে প্যাভিলিয়নের দিকে ফিরে গেল। লায়ন রে তখন একসঙ্গে দুটো চিকলেট মুখে দিয়ে বললেন, “বেলতলা ফিনিশ। এখন শুধু লাস্ট উইকেটের পতনটা দেখা বাকি। একটা কথা স্যার।”

নকুল চৌধুরী কাজু বাদামের ঠোঙা থেকে এক মুঠো কাজু আর কিশমিশ লায়ন-রে কে দিয়ে বললেন, “কী কথা?”

লায়ন রে বললেন, “লরির মাথায় কাপটা নিয়ে গোটা বেলতলাটাও ঘুরব। ওরাও দেখুক, কেমন খেলে কাপ জিততে হয় ৷ "

নকুল চৌধুরী বললেন, “অবশ্যই ঘুরতে হবে ৷ মনে নেই, গেলবার ওরা আমাদের ক্লাবের সামনে তাসা পার্টির সঙ্গে কেমন নেচেছিল। বড্ড কুৎসিত নাচ।”

লায়ন রে বললেন, “আমরাও নাচব। নেচে নেচে ফাটিয়ে দেব।"

ঠিক এই সময় পাঁচ-সাতটা চেয়ার টপকে নানা কসরত করে গগন গড়াই হুমড়ি খেয়ে এসে পড়লেন নকুল চৌধুরীর ঘাড়ের ওপর। কানের কাছে মুখটা এনে বললেন, “পোলাও তো রান্না হয়ে এল বলে মনে হচ্ছে। আপনি বলেছিলেন ভরত ময়রার সেই বিখ্যাত লাল দই...”

নকুল চৌধুরী লায়ন রে'র দিকে তাকিয়ে বললেন, “আর দ্বিধা করার দরকার আছে কি? আমি ভরতকে ফাইনাল অর্ডারটা এখনও প্লেস করিনি। শুধু বলে রেখেছি, টিম জিতলে দশ কিলো লাল দই চাই। ফাইনাল অর্ডার দেওয়ার সময় কি এসে গেছে?”

লায়ন রে দু' চোখে বিস্ময় ঝরিয়ে অবাক গলায় বললেন, “এখনও দ্বিধা স্যার। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া হলে তো এতক্ষণে ক্লাবে পতাকা তুলে দিত। জয়লক্ষ্মী বেলতলা ছেড়ে গেছে। তিন উইকেটে একচল্লিশ—এমন জঘন্য খেলা বেলতলাকে কখনও খেলতে দেখেছেন? ”

নকুল চৌধুরী বললেন, “তা অবশ্য দেখিনি। তবে কিনা ক্রিকেট বলে কথা! বিখ্যাত বিখ্যাত লোকরাই তো বলেন, ক্রিকেটে শেষ কথা বলা যায় তখনই, যখন দিনের লাস্ট বলটা হয়ে যায়। "

লায়ন রে বললেন, “আন্তর্জাতিক মানের অনেক ক্রিকেটারের সঙ্গেই তো এক সময় ওঠা-বসা ছিল। উমরি-দা বলতেন, টিমের পারফরমেন্স দেখে আগাম বলে দেওয়া যায়। আমি তো বলছি, যদি গৌর এখনও পিচে টিকে থাকত, তা হলে আমিও কিন্তু খেলা নিয়ে টেনশনে থাকতাম। বেলতলার তিনজন ভাল ব্যাটসম্যানের মধ্যে খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা শুধু গৌরেরই আছে। এখন তো স্রেফ সনাতন। কিন্তু ওকে সাপোর্ট দেওয়ার মতো ব্যাটসম্যান কোথায়। বড়জোর সিক্সটি থেকে সিক্সটি ফাইভ, তার মধ্যেই বেলতলার ইনিংস শেষ হয়ে যাবে।”

গগন গড়াই কণ্ঠে আহ্লাদ ফুটিয়ে বলে উঠলেন, “তা হলে ভরত ময়রার কাছে এইবেলা ফাইনাল অর্ডারটা পাঠিয়ে দিন। কোচ যখন বলছেন, তখন তো আর দ্বিধা করার মানে হয় না।”

নকুল চৌধুরী পকেট থেকে কাগজ বের করে লিখলেন, “ডিয়ার ভরত। দশ কিলো...” এই পর্যন্ত লিখেই থেমে গিয়ে বললেন, “দশে কুলিয়ে যাবে তো?”

গগন গড়াই এবং লায়ন রে উত্তর দেওয়ার আগেই মাইকে ঘোষণা হল, “এবার বেলতলার পক্ষ থেকে ব্যাট করতে যাচ্ছেন নিতাই ভট্টাচার্য। বেলতলার ব্যাটিং বিপর্যয় চলছে। ক্লাবের নামকরা তিনজন ব্যাটসম্যান যেমন স্বপন গাঙ্গুলি, দীপক দত্ত এবং গৌর ভট্টাচার্য আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে গেছেন। ষোলো ওভারে মাত্র একচল্লিশ রান সংগ্রহ করেছে বেলতলা। এ কি সেই বেলতলা, যে গত দু' বছর দুর্গাদাস স্মৃতি কাপ জয় করে ঘরে নিয়ে গেছে! প্রতিপক্ষ বকুলতলা চল্লিশ ওভারের আগে অর্থাৎ পঁয়ত্রিশ ওভারেই সবাই আউট হয়ে গেছেন। তাদের একশো চব্বিশ রানের জবাবে বেলতলা এখন পর্যন্ত ষোলো ওভার খেলে সংগ্রহ করেছে একচল্লিশ রান। অর্থাৎ ছিয়ানব্বই বলে একচল্লিশ রান। দলের এই পরিস্থিতিতে ব্যাট করতে এগিয়ে যাচ্ছেন নিতাই ভট্টাচার্য। যদিও তিনি বোলার হিসেবেই বেশি পরিচিত।

আজকের খেলাতেও তাঁর বোলিং নৈপুণ্যের পরিচয় আপনারা পেয়েছেন। এখন বেলতলা ক্লাবের মস্তবড় দায়িত্ব তাঁর ওপর। দেখা যাক, তিনি কেমন ব্যাট করেন। অন্যদিকে রয়েছেন বেলতলার অপরাজিত ব্যাটসম্যান সনাতন দাস।"

লায়ন রে হঠাৎ খাবলা দিয়ে নকুল চৌধুরীর হাঁটু চেপে ধরে বললেন, “ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন? ওদের সাত নম্বর ব্যাটসম্যান নিতাইকে নিয়ে এল চার নম্বরে। তার মানেটা বুঝতে পারছেন?”

নকুল চৌধুরী বললেন, “কোনও নতুন ট্যাকটিক্স না স্ট্র্যাটেজি?”

লায়ন রে বললেন, “ভাঁড়ে মা ভবানী। ব্যাট করবার লোক নেই। মদন আর গোপালকে কেউ ফেস করতে চাইছে না ৷ আপনি ওটা দশ কেটে পনেরো করুন। আজ দধিমঙ্গল করার দিন।”

নকুল চৌধুরী বললেন, “ওদের ওভার কি শেষ?”

লায়ন রে বললেন, “মদনকে পাঁচ ওভার করিয়ে বসিয়ে দিয়েছি। ওর জায়গায় শ্যামল করছে। গোপালের বাকি আছে দু' ওভার। ওদের আরও পরে আবার আনব। ও নিতাই-ফিতাইয়ের জন্য শ্যামল-রতনরাই যথেষ্ট। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মদন আর গোপালকে বোধ হয় ডাকতেই হবে না। ওরা পঁয়ত্রিশ ওভারে আমাদের ফেলেছে, আমরা বাইশ থেকে পঁচিশ ওভারে ফেলব। "

নকুল চৌধুরী বললেন, “তা হলে দশ কেটে পনেরো কিলোই অর্ডার দিই, কী বলেন!”

গগন গড়াই বললেন, “এতে আর বলাবলির কী আছে। সবই তো তাঁর ইচ্ছাতেই হচ্ছে। আমার ভোরবেলার স্বপ্ন কি মিছে হতে পারে!”

লাল দইয়ের অর্ডার স্লিপ নিয়ে গগনবাবু কিছুটা ক্যাঙারুর ভঙ্গিতে চেয়ার টপকে টপকে নিজের জায়গায় ফিরে যেতে যেতে কাউকে খুঁজছিলেন, যার হাত দিয়ে স্লিপটা বকুলতলার ভরত ময়রার দোকানে পাঠানো যায়। এই মাঠ থেকে সাইকেল করে গেলে মোটে পাঁচ-ছ' মিনিট লাগবে ভরতের দোকানে পৌঁছতে।

এদিকে বেলতলার ড্রেসিংরুমে বেলতলার কোচ সুনুদা বোঝাচ্ছেন, “কারণ আছে। নির্মলের আগে নিতাইকে নামিয়ে দিলাম অন্য কারণে। দলের যা অবস্থা, তাতে থ্রি ডাউনে নিতাইকে পাঠাতে বাধ্য হলাম।” ওদিকে নিতাই উইকেটে গিয়ে গার্ড নেওয়ার পর যখন চারদিকের ফিল্ডিং সাজানো দেখছিল, তখন বকুলতলার বোলার শ্যামলকে হাতের ইঙ্গিতে থামিয়ে দিয়ে আম্পায়ার, লেগ অম্পায়ারকে ডাকলেন। দু'জনে কথা বলতে বলতে এগিয়ে এলেন নিতাইয়ের কাছে। মনে হচ্ছে, কোনও একটা জটিল ব্যাপারে কথা চলছে। খেলা আপাতত বন্ধ ৷ দর্শকরা কেউ কিছু বুঝতে পারছে না।

মাইকে তখন ঘোষণা হল, “ঠিক কী কারণে খেলা বন্ধ হয়ে আছে, তা আমরা জানি না। জানতে পারলেই আপনাদের জানিয়ে দেব। আম্পায়ার এইমাত্র বকুলতলার ক্যাপ্টনকে ডাকলেন, বেলতলার ক্যাপ্টেন এবং কোচকেও ডাকা হয়েছে। এই ফাঁকে বেলতলার স্কোর কার্ডটা আপনাদের শুনিয়ে দিই, দীপক দত্ত— দুই, গৌর ভট্টাচার্য— চোদ্দ, স্বপন গাঙ্গুলি — ষোলো, সনাতন দাস অপরাজিত— ছয় এবং অতিরিক্ত তিন রান। এইমাত্র ব্যাট করতে এসেছেন ডান-হাতি বোলার হিসেবে খ্যাত নিতাই ভট্টাচার্য। তিনি এখনও খেলা শুরু করেননি। আমরা মাঠের মধ্যে বেলতলার কোচের আহ্বানে গৌর ভট্টাচার্যকে ছুটে ছুটে যেতে দেখছি।”

লায়ন রে বললেন, “এই তো স্কোর বোর্ডের অবস্থা। বলতেও তো লজ্জা করে।”

নকুল চৌধুরী বললেন, “কিন্তু খেলা বন্ধ কেন?”

লায়ন রে উঠে দাঁড়াতে-দাঁড়াতে বললেন, “মনে হয় পিচে আমার উপস্থিতিটা এখন দরকার। ওরা খেলাটাকে ভণ্ডুল করার প্ল্যান-ট্যান করতে পারে। আমি পিচে যাচ্ছি।”

কিন্তু লায়ন রে-কে যেতে হল না। খেলা শুরু করার নির্দেশ দিলেন আম্পায়ার। যাঁরা মাঠের ভেতর ছিলেন, অর্থাৎ যাঁদের ডাকা হয়েছিল তাঁরা মাঠ থেকে বেরিয়ে আসছেন। একটু পরেই মাইকের ঘোষণা থেকে যা জানা গেল তা হচ্ছে, কলকাতার আম্পায়ার নিতাইকে ব্যাট করতে দেখে হঠাৎ এগিয়ে এসে বললেন, “তুমি? তুমি তো আউট হয়ে গেছ? আবার কেন ব্যাট করতে এসেছ?”

নিতাই বলল, “নো স্যার। আমার ভাই গৌর আউট হয়েছে। আমি নিতাই।”

এর পরই দু' পক্ষের ক্যাপ্টেনকে ডেকে জিজ্ঞাসা। বকুলতলার ক্যাপ্টেনও যখন বলল, “ওরা একরকম দেখতে,” তখন আম্পায়ার বেলতলার কোচকে ডেকে হুকুম দিলেন, “গৌর অ্যান্ড নিতাই দু'জনকে আমার সামনে একসঙ্গে প্রোডিউস করুন। দু'জনকে পাশাপাশি দেখে তারপর আম্পায়ার খেলা শুরু করার হুকুম দিলেন। গৌর শুধু আম্পায়ারকে বলল, “স্যার, আমি বল করতে যাওয়ার সময়ও আপনি বলেছিলেন আমার ওভার শেষ। তখন তো আমার ভাই নিতাই মাঠেই ছিল, তাই দেখাতে পেরেছিলাম। আমাদের দু'জনের অতবড় ইভেন্টটা আপনি এত চট করে ভুলে গেলেন! ”

মাইকের ঘোষণা শোনার পর ডি. এম. সাহেবের পেছনে বসা টোপাদা বললেন, “নাইন্টিন ফিফটি ফাইভে ঠিক এইরকম ঘটনা ঘটেছিল ম্যাঞ্চেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে। দ্যাট টাইমে আই ওয়াজ প্রেজেন্ট দেয়ার। অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপ্টেন আপত্তি তুলেছিলেন একজন ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যান সম্পর্কে। আসলে ওঁদেরও কয়েকজনকে তো একটু ডিসট্যান্স থেকে গৌর-নিতাইয়ের মতোই মনে হয়।"

ডি. এম. সাহেব আবার পেছন ফিরে টোপাবাবুকে দেখে নিয়ে নিচু গলায় সব্যসাচী মুখার্জিকে জিজ্ঞেস করলেন, “ইনি কে?”

সব্যসাচীবাবু বললেন, “টোপাবাবু। স্বাধীনতা সংগ্রামী।”

খেলা যখন শুরু হতে যাচ্ছে, তখন ড্রেসিংরুমের সামনে—যেখানে বেলতলা ক্লাবের প্লেয়ার, কোচ আর ক্লাবকর্তারা বসে, সেখানে বিষ্ণুবাবু এসে ক্রোধে ফেটে পড়লেন। সুনুদাকে উদ্দেশ করে বললেন, “এই যে সুনু, এটা কেমন হল?”

সুনুদা তখন টেনশানে জেরবার। তিনি মুখ না তুলেই বললেন, “কী আবার হল? কোথায় হল?”

বিষ্ণুবাবু বললেন, “ওই যে কলকাতার আম্পায়ার তোমায় ডেকে নিয়ে গিয়ে গৌর-নিতাইকে প্রোডিউস করতে বলল, আর তুমিও তাই করলে, এটা কি ঠিক হল? আমি যদি কর্মোপলক্ষে বকুলতলার বাইরে থাকতাম কিংবা স্বর্গত হতাম, তা হলে নাহয় ক্লাব-কোচের কিছুটা অধিকার ছিল। যাদের বাপ সকাল থেকে মাঠে উপস্থিত, তাঁর ছেলেকে পরিচয়, ইনট্রোডিউস অথবা প্রোডিউস কোনওটাই শাস্ত্রমতে তুমি করতে পারো না। তুমি কি ওদের জন্মলগ্ন, সেই সময়ে নভোমণ্ডলে রাশিচক্রের অবস্থান, কতক্ষণের ব্যবধানে ওরা জন্মাল এসব জানো? নিশ্চয়ই জানো না। কিন্তু আমি জানি। আর এও জানি, কলকাতার আম্পায়ারের সামনে ঘোঁট পাকাবার জন্য বকুলতলা এরকম ফ্যাকড়া করতে পারে সেজন্য আমি ওদের ঠিকুজি, হাসপাতালের বার্থ সার্টিফিকেট এবং অন্নপ্রাশন ও উপনয়নের ছবি এই ফাইলটাতে। নিয়ে মাঠে ঢুকেছি। আমায় যদি ডেকে নিতে, তা হলে আম্পায়ারকে বুঝিয়ে দিতুম।”

সুনুদার সঙ্গে আমরাও ফিসফিস করে বললাম, “তা হলে আর খেলাটাই হত না।"

হঠাৎ মাঠ জুড়ে চিৎকার উঠতেই বিষ্ণুবাবু আমাদের ছেড়ে মাঠের দিকে তাকাতে তাকাতে বললেন, “আবার কী হল? কে আউট হল?”

বকুলতলার শ্যামলের বলে নিতাই একটা চার মারাতেই ঝিমিয়ে পড়া বেলতলার ছেলেরা চিৎকার করে উঠেছে। একটু শর্টপিচ বল। প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যানরা এসব বল খেলতে ভোলেন না। কিন্তু নিতাই তো তা নয়। ও কিন্তু খুব সহজ ভঙ্গিতে শরীরটা একটু ঝুঁকিয়ে বলের লাইনে শরীরটা নিয়ে সোজা হিট করল। বলটা মাটি কামড়ে বোলার শ্যামলের হাত-তিনেক পাশ দিয়ে সোজা বাউন্ডারি লাইন পেরিয়ে গেল। তাই দেখে নকুল চৌধুরী বললেন, “দারুণ হিট করেছে। বলটা তো বিদ্যুৎ গতিতে মাঠ পেরিয়ে গেল। নিতাইয়ের মার আছে। আপনি যে বলেছিলেন নিতাই বোলার। ব্যাট করতে এলে চার বলের খদ্দের।"

লায়ন রে হাসতে-হাসতে বললেন, “শেষটা দেখে বুঝলেন না, এটা আনাড়ি মার। ওদের প্রথম প্রথম একটু লোভ দেখাতে হয়। ওই আনাড়িপনা করতে গিয়েই হঠাৎ..."

কথা শেষ হল না। শ্যামলের বলটা পিচে পড়ে উঁচু হয়ে আসছিল। নিতাই ডান পায়ে ভর রেখে বলটাকে ব্যাটের মাঝখানে নিয়ে লেগের দিকে ঘুরিয়ে আরও একটা চার নিল বলটা একটু উঁচু হয়ে এমন জায়গায় পড়ল, যার ধারেকাছে কোনও ফিল্ডার নেই। বেলতলার ছেলেদের চিৎকার বেড়ে গেল। নকুল চৌধুরী বললেন, “এটাও আনাড়ি মার বলবেন? ”

লায়ন রে চিকলেট চিবুনো বন্ধ করে বললেন, “কোনও মন্তব্য করব না। নিতাইকে আরও একটা ওভার খেলতে দিন। অবশ্য যদি সেই পুরো ওভারটা টিকে থাকতে পারে তবেই।”

শ্যামলের শেষ দু' বলে দুটো চার নিল নিতাই। এবার সনাতনকে বল করবে বকুলতলার রতন। পিচের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে বেলতলার দুই ব্যাটসম্যান একটু কথা বলে নিল। রতনের প্রথম বলে এক রান নিয়ে সনাতন ওপাশের উইকেটে যেতেই রতন বল করল নিতাইকে। একেবারে লোপ্পা বল। নিতাই যেন মারবার জন্য তৈরি হয়েই ছিল। ব্যাটে-বলে খট করে একটা আওয়াজ, তারপর প্রবল চিৎকারের মধ্যে দিয়ে সবাই দেখল, বলটা অনেকটা উঁচু দিয়ে উড়ে গিয়ে মাঠের ওপাশে পড়ল। একটি দেখবার মতো ছয়। ছাতের ওপর থেকে চোঙা মুখে কে যেন চিৎকার করে বলে উঠল, “নিতাই, বেলতলার মান রাখ। গৌর তো চোদ্দতেই ফতে, তুই বেঁচে থাক।”

চারপাশের উত্তেজনা আর হাততালির মধ্যে রামকৃষ্ণ সাঁতরাও হাততালি দিয়ে উঠলেন। গগনবাবু তাঁর হাত দুটো নিজের দু' হাতে ধরে নিয়ে বললেন, “ওভার বাউন্ডারি করল বেলতলা ; তাতে আপনি হাততালি দিচ্ছেন কেন? ”

রামকৃষ্ণ সাঁতরা একটু লজ্জিত হয়ে বললেন, “না, মানে ডি. এম. সাহেব তালি দিচ্ছেন দেখে আমিও দিলুম। কেষ্টপুরের ব্রিজের কাজটা...”

নকুল চৌধুরী এবার কনুইয়ের গুঁতো মেরে লায়ন রে-কে বললেন, “কী হল? এই যদি আনাড়িপনা হয়, তবে তো এটাই ভাল। তিন বল খেলে যে চোদ্দ রান করে, তাকে আপনি বলছেন আনাড়ি ব্যাটসম্যান। '

লায়ন রে বললেন, “ঘাবড়াবেন না। রমাকান্ত দেশাই তো বোলার, সেও একবার আশি না পঁচাশি রান করেছিল। নিতাই তো রমাকান্ত নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের টেস্টে লাস্ট ব্যাটসম্যান ওইরকম সত্তর-আশি রান করে খেলাটা ড্র করে দিয়েছিল। এখানে তেমন কিছু হচ্ছে না। দু-চারটে রান নেবে। আমি একটু পরেই মদন আর গোপালকে দিয়ে দু' দিক থেকে অ্যাটাক করাব।”

রতন তার তৃতীয় বল করার জন্য দৌড় শুরু করল। বলটা উইকেটের সামনে পড়ে লেগের দিকে চলে গেল। নিতাই বলের ওপর নজর রেখে বলটা ছেড়ে দিল। চতুর্থ বলেও রান নিতে পারল না নিতাই। আর তাই দেখে লায়ন রে বললেন, “নকুলবাবু, বোম্বের শিবাজী পার্ক আর ব্রেবোর্নে এত বছর তো শুধু ঘাস কাটিনি। কলকাতার পঙ্কজ রায়কে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন। নিতাই আর ব্যাট তুলতে পারবে না। রতন ওকে অ্যারেস্ট করে ফেলেছে। আমি বলছি লিখে রাখুন, নিতাই বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ দিয়ে আউট হবে, নয়তো সরাসরি বোল্ড।”

লায়ন রে'র কথা শেষ হওয়ার আগেই রতনের পঞ্চম বলটা এল এবং খুব সহজেই তার থেকে আরও একটা বাউন্ডারি পেয়ে গেল নিতাই। শেষ বলেও নিল দু' রান। তার মানে বকুলতলার বোলার রতন এই ওভারে রান দিল তেরো। যার মধ্যে বারোটা রানই নিয়েছে নিতাই। এইটুকু সময়ের মধ্যে নিতাই সাত বল খেলে রান করেছে কুড়ি। এর ফলে বেলতলার রান একলাফে গিয়ে এখন দাঁড়াল বাষট্টিতে।

নকুলবাবু এবার তপ্ত গলায় বললেন, "আর রিস্ক নেবেন না। আপনি মদন-গোপালকে ফিরিয়ে আনার জন্য ক্যাপ্টেনকে স্লিপ পাঠান। আমাদের দ্বাদশ খেলোয়াড় কে? তাকে দিয়ে খবর পাঠান।”

লায়ন রে উঠে গেলেন। মুখে না বললেও নিতাইয়ের খেলা তাঁকে ভাবিয়ে তুলছে। অবশ্য নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বোঝাচ্ছেন, “এরকম একটু-আধটু হয়। বড়জোর তিরিশ-বত্রিশ পর্যন্ত যাবে। এখনও বকুলতলার রান ছুঁতে অনেক বাকি।”

লায়ন রে যখন স্লিপ পাঠাবার জন্য দ্বাদশ খেলোয়াড়কে ডাকছেন, তখন মাঠের মধ্যে একটা দুষ্ট প্রকৃতির গরু ঢুকে পড়ায় আম্পায়ার মাঠ ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। ফলে আবার খেলা বন্ধ হয়ে গেল।

॥ ৪॥

খেলার মাঠে গরু ঢুকে পড়লে সেই গরু তাড়ানো খুব সহজ ব্যাপার নয়। কলকাতার মাঠে কুকুর, বেজি-টেজি ঢোকার সংবাদ পাওয়া যায়, কিন্তু ক্রিকেট-মাঠে গরু ঢোকার সংবাদ বিশেষ শোনা যায় না। বিদেশের কোনও মাঠে নাকি একবার একঝাঁক দুরন্ত পাখি নেমে পড়ে অনেকক্ষণ খেলা বন্ধ করে দিয়েছিল। মাঠের চারপাশে লোক। সব লোকই হেই হেই করে চিৎকার করায়, ঘাবড়ে গিয়ে গরুটা আর কোনও দিকে যেতে না পেরে মাঠের মধ্যেই ঘোরাফেরা করতে থাকে। সুনুদা ততক্ষণে লোকজন নিয়ে নেমে গেছেন পিচ রক্ষা করতে। যাতে গরুর দাপাদাপিতে পিচের কোনও ক্ষতি না হয়। শেষ পর্যন্ত ছাত থেকে নেমে এলেন পেঁচোদা। আমরাই পেঁচোদাকে ডেকে আনলাম। বেলতলার গরু, কুকুর, ছাগল, অর্থাৎ মন্যুষ্যেতর সমস্ত জীবই যে পেঁচোদাকে চেনে বা তাঁর কথা শোনে, সেটা আমরা জানতাম। কিন্তু কেন যে পেঁচোদাকে ওরা মানে, তা আমরা বলতে পারব না। পেঁচোদা গরু-ছাগল, কুকুরদের টোটকা ওষুধ দিতেন এটুকু জানি। এই ওষুধ নিয়ে বেলতলায় একবার ধুন্ধুমার কাণ্ড হয়েছিল। সে কথা অবশ্য পরে বলা যাবে। মাঠের একটা দিক কোনওমতে ফাঁকা করে তারপর অদ্ভুত কায়দায় গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে, গরুর পিঠেই চড়ে বসলেন পেঁচোদা। গরুর পিঠে চেপে হ্যাট-হ্যাট শব্দ করেন আর গরু মাঠের ওই ফাঁকা দিকটার দিকে এগোয়। পরে লেজ মুচড়ে এমন হ্যাট-হ্যাট শব্দ করে আওয়াজ ছাড়তে লাগলেন যে গরু পেঁচোদাকে নিয়েই ফাঁকা জায়গা দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে বনের দিকে দৌড়তে লাগল। খেলা শেষ হওয়ার আগে গরু তো দূরের কথা, পেঁচোদাও ফিরে আসতে পেরেছেন কিনা জানি না।

কয়েক মিনিট পরে আবার খেলা শুরু হল। সনাতন আর নিতাই দু'জনেই হাত খুলে খেলতে আরম্ভ করেছে। সনাতনের চেয়ে নিতাই পেটাচ্ছে বেশি। ওভার-পিছু রানরেট তখন যথেষ্ট বেড়ে গেছে। যেখানো ষোলো ওভারে বকুলতলার একচল্লিশ ছিল, সেই বকুলতলার এখন পঁচিশ ওভারে রান গিয়ে দাঁড়াল একশো দুই। এখনও পনেরো ওভার বাকি এবং জিততে হলে সেই পনেরো ওভারে বেলতলাকে সংগ্রহ করতে হবে মোটে তেইশ রান। হাতে এখনও সাতটা উইকেট ৷ নিতাই মাঠে নামবার আগে বকুলতলার সমর্থকদের মুখগুলো জয় হাতের মুঠোয় ভেবে খুশিতে চকচক করছিল, অথচ এখন তাঁদের মুখই থমথমে। লায়ন রে নিজের জায়গা বদলে নকুলবাবুর থেকে কয়েকটা চেয়ার দূরে বসেছেন। তিনি ভাবছেন, অল্পক্ষণ আগেও যে জয়টা ছিল হাতের মুঠোয়, তাকে তালুবন্দি করার আগেই জয় উড়ে গিয়ে এখন বেলতলার কোচ সুনুর তালুতে বসেছে। পনেরো ওভারে সাতটা উইকেট হাতে নিয়ে তেইশটা রান তোলা কোনও কঠিন ব্যাপারই নয়। নিজে মনে-মনে একরকম বুঝলেও লায়ন রে রামকৃষ্ণ সাঁতরাকে বোঝালেন, “ক্রিকেট হচ্ছে খুব আনপ্রেডিকটেবল। দেখলেন তো অল্প সময়েই খেলাটা কেমন ঘুরে গেল। আবার এটাও ঘুরে যেতে পারে। "

গগন গড়াই বললেন, “আপনার কী মনে হয়? আবার ঘুরবে?”

লায়ন রে বললেন, “আমার ধারণা, ঘুরবে। রোদ পড়ে আসছে। উত্তুরে হাওয়া মারছে। এইবারই তো বলের আসল ঘোরা শুরু হবে ৷ "

রামকৃষ্ণ সাঁতরা কোনও কথা না বলে গম্ভীর হয়ে রইলেন। মাঠে তখন জল গেছে। লায়ন রে বললেন, “রামকৃষ্ণবাবু, আপনার জলের পাত্রটা দিন তো।”

রামকৃষ্ণবাবু নিজের ওয়াটার বটলটা অন্যদিকে সরিয়ে রেখে বললেন, “আগে আসল ঘোরা শুরু হোক, তারপর জল খাবেন। কাল সন্ধে থেকে কেবলই গুল মেরে যাচ্ছেন।”

লায়ন রে ক্ষুব্ধ গলায় বললেন, “তৃষ্ণার্তকে জল না দিলে পরের জন্মে চাতক হবেন। বড্ড ছোট মন আপনার।"

রামকৃষ্ণবাবু জলের পাত্রটা এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, “নিন, জল গিলুন। আপনি একটা জলহস্তী। '

জল খাওয়ার পর কে একজন লায়ন রে-কে বললেন, “আপনাকে নকুলবাবু ডাকছেন।”

লায়ন রে “যাচ্ছি” বলে উঠতে যাচ্ছিলেন। তখনই সনাতনের ব্যাট থেকে একটা বল ক্যাচ হয়ে ওপরে উঠল। লায়ন রে চিৎকার করে উঠলেন। কিন্তু ক্যাচটা গোপাল ধরতে পারল না। উলটে বলটা মাটিতে পড়ে বিনা বাধায় বাউন্ডারির সীমানা পেরিয়ে চার হয়ে গেল। লায়ন রে আর নকুলবাবুর দিকে এগোলেন না। সারিবদ্ধ চেয়ারের পাশ দিয়ে বিলি কেটে কেটে মাঠের বাইরে এলেন। মাঠের বাইরে এসে একটা সিগারেট ধরাবার জন্য মুখে সিগারেট দিলেন। দেশলাই জ্বালবার আগেই মাঠ জুড়ে বিশাল চিৎকার। মাইকে শুনলেন, মদনের শেষ ওভারের প্রথম বলেই নিতাই আবার একটা ওভার বাউন্ডারি মেরেছে। আর মাত্র তেরো রান করলেই বেলতলা এবারও জিতে যাবে। অতএব, লায়ন রে মাঠের আশপাশে থাকা নিরাপদ মনে করলেন না। মুখের সিগারেট হাতে নিয়ে চোঁ-চাঁ দৌড় লাগালেন বকুলতলার দিকে।

বড় রাস্তায় এসে কোনও রিকশা পেলেন না। পাবেন কোত্থেকে? ওরাও তো সবাই খেলা দেখছে। বছরের এমন একটা দিনে ওরাও সব কাজ ফেলে সকাল থেকে মাঠে বসে আছে। অতএব যতটা সামর্থ্যে কুলোল ততটাই জোরে হাঁটতে আরম্ভ করে দিলেন লায়ন রে। তাঁর যেন কেবলই মনে হচ্ছে, নকুল চৌধুরীর গাড়ি তাঁকে তাড়া করছে। জোরে জোরেই হাঁটছিলেন, ওরই মধ্যে শুনলেন, গনা ঘোষের দোকান থেকে কে যেন খুনখুনে গলায় বলে উঠল, “বকুলতলার কোচ পালাচ্ছে রে।”

এ সময়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কথাটার উত্তর দেওয়া লায়ন রে'-র কাছে ননস্পোর্টিং মনে হল। তা ছাড়া এখানে দাঁড়ানোও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সুতরাং তিনি আরও জোরে হাঁটবার জন্য এমনভাবে এগোতে লাগলেন, ওটাকে হাঁটা না বলে দৌড় বললেও ব্যাকরণে ভুল হবে না। কিন্তু ব্রিজ পেরিয়ে আসবার আগেই বেলতলার মাঠের দিক থেকে প্রবল চিৎকার, কাঁসর, ঘণ্টা আর দমাদ্দম পটকা ফাটার আওয়াজ পাওয়া গেল। তার মধ্যে মাইকে যে চিৎকার করে কী বলে যাচ্ছে, সেটা স্পষ্ট করে শোনা গেল না। শোনার আগ্রহও ছিল না। তিনি ভেবে দেখলেন আর লোকলজ্জার ভয় করে দরকার নেই। অতএব, তিনি দৌড় মারলেন।

খেলায় জয়টা কেমন করে এল এবং জয়ের পর মাঠের অবস্থা কী দাঁড়াল, সেটা দেখতে হলে আপাতত বকুলতলার কোচ সমীর সিংহরায় ওরফে লায়ন রে-কে ছেড়ে আমাদের বেলতলার মাঠে ফিরে যাওয়া দরকার। তেরো রান বাকি, হাতে যথেষ্ট উইকেট এবং ওভার, এমতাবস্থায় লায়ন রে মাঠ ত্যাগ করেছিলেন। বকুলতলা পরের ওভারে সমরকে নিয়ে এল বল করাতে। সমর এক ওভারে দুই-দুই করে চারটে রান দিল সনাতনকে। পরের ওভারে গোপাল এল নিতাইকে বল করতে। এটাই গোপালের শেষ ওভার। জেতবার জন্য রান দরকার মাত্র ন'টি। গোপালের প্রথম বলেই নিতাই চার নিল। জয়ের জন্য বেলতলা তখন আঙুলের কড় গুনছে। চিৎকার করে বলছে, “আর বাকি পাঁচ ৷ নিতাই ছয় মার।"

দ্বিতীয় বলে ব্যাট চালালেও রান এল না। জয়দেব শুয়ে পড়ে আটকেছে। কিন্তু তৃতীয় বলটা নিতাই পাঠাল দু'টো স্লিপের মধ্যে দিয়ে। বলের পিছু ধাওয়া করল দু'জন। কিন্তু নিতাই দু' রান নিয়ে নিয়েছে। এখন তিনটে রানের জন্য অপেক্ষা। এই অপেক্ষার মধ্যে আনন্দ এবং কষ্ট দুটোই থাকে। এখনও যে পরিমাণ উইকেট আর ওভার বাকি তাতে তিনটে রান করা কোনও সমস্যাই নয়। কিন্তু বেলতলার সবাই চাইছে উইনিং শটটা নিতাইয়ের হাত থেকেই আসুক। চতুর্থ বলটা থেকে রান নেওয়া গেল না। পঞ্চম বলটা ব্যাটে লাগিয়েই নিতাই দেখল, সনাতন রান নেওয়ার জন্য মাঝ পিচে এসে গেছে। সুতরাং সেও দৌড় লাগাল। একটুর জন্য রান আউট থেকে বেঁচে গেল নিতাই। সুনুদা চিৎকার করে বলে উঠলেন, “ডোন্ট হারি।”

সনাতন এগিয়ে এসে নিতাইকে বলল, “উইনিং স্কোরটা তোর ব্যাট থেকে আমিও চাইছি। তাই একটা সিঙ্গল নিলাম। বলটা ঘাসে গিয়ে এত স্লো হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি। যাক, তুই নিউ লাইফ পেয়েছিস।” গোপালের শেষ বলটা বেশ সোজা বল। সনাতন সহজেই ওই বল থেকে রান নিতে পারত। কিন্তু সনাতন বলটা শুধু ব্যাট দিয়ে আটকাল। গোপালের ওভার শেষ হয়ে গেল। এবার সমর বল করবে নিতাইকে। বেলতলার জয়ের জন্য দরকার মাত্র দুটো রান। কিন্তু আশ্চর্য, সমরের পর পর দুটো মারবার মতো বল নিতাই শুধু ব্যাট পেতে খেলল। বকুলতলার লোকেরাও বুঝতে পারছে না, নিতাই এমন ঠাণ্ডা হয়ে গেল কেন। তৃতীয় বলটা খেলল বটে, কিন্তু রান নিল না। সমর অনেকটা ছুটে এসে চতুর্থ বলটা ফেলল নিতাইয়ের ডান দিকে। বলটা ব্যাটের থেকে এক হাত আগে মাটিতে পড়বার আগেই ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে গিয়ে ফরওয়ার্ড খেলল নিতাই। দেখে মনে হল, নিতাইয়ের ব্যাটের মার খাওয়ার জন্যই বুঝি বলটা নিজেকে সঁপে দিল। একেবারে নিজের উইকেটের ডান দিক থেকে ব্যাটের মার খেয়ে বলটা উঠে জেট বিমানের গতিতে আকাশ দিয়ে কিছুটা কোনাকুনি ভঙ্গিতে উড়ে গেল অন্য প্রান্তের উইকেটের বাঁ দিক দিয়ে। উড়ে গিয়ে পড়ল সীমানার বাইরে নয়, একেবারে মাঠের বাইরে। এই ছয়রান মানে বেলতলা চার রান এবং সাত উইকেটে জিতে গেল। মাত্র আটাশ ওভারে বেলতলা রান পেল একশো আটাশ। তিন উইকেট হারিয়ে একশো আটাশকে এখন কারও খারাপ লাগছে না। মাইকে তখন স্কোর কার্ড পড়া হচ্ছে, “দীপক দত্ত–দুই, গৌর ভট্টাচার্য – চোদ্দ, স্বপন গাঙ্গুলি – ষোলো, সনাতন দাস অপরাজিত—ঊনত্রিশ এবং নিতাই ভট্টাচার্য অপরাজিত—একষট্টি এবং অতিরিক্ত— ছয়। বোলিংয়ের গড় হিসেব হচ্ছে ...”

বোলিংয়ের গড় হিসেবটা আর শোনা গেল না। কেননা তখন মাঠের মধ্যে মণিভাইদের দল ব্যান্ড বাজাতে-বাজাতে মাঠ পরিক্রমা করছে। এর পর নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না যে, এই খেলায় স্বয়ং ডি. এম. সাহেব কাকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত করেছেন? সবাই জানত, সবাই তেমনটাই অনুমান করেছিল তবুও যখন ডি. এম. সাহেব নিজ মুখে নিতাই ভট্টাচার্যের নামটা ঘোষণা করলেন, তখন সবাই খুশিতে হাততালি দিয়ে চিৎকার করে উঠল। ডি. এম. সাহেব বললেন, “আমার ধারণায় আজকের এই খেলায় একজনই রিয়েল হিরো। একজনই ম্যাচ উইনার, সে নিতাই ভট্টাচার্য। নিতাই উইকেট পেয়েছে তিনটে এবং রান করেছে একষট্টি। দু'দিকেই সে সফল। দলের চূড়ান্ত বিপর্যয়ে একজন বোলার ব্যাট করতে এসে যে সাহস, শৌর্য আর দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছে, তার তুলনা নেই। আমি নিজে ছাত্রজীবনে ক্রিকেট খেলেছি। ইউনিভার্সিটিতে থাকতে কলকাতার হয়ে অন্য রাজ্যে খেলতেও গেছি। তাই নিতাইকে আমি অনুরোধ করব, তোমার বল যেমন সুন্দর, তোমার ব্যাটিংও তেমনই সুন্দর। তুমি খেলার মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করলে তুমি একদিন ভারতের সেরা অলরাউন্ডার হতে পারবে। তবে তার জন্য অনেক ত্যাগ এবং তিতিক্ষার প্রয়োজন। ক্রিকেট হল সহিষ্ণুতার খেলা। শৃঙ্খলার খেলা। শুধু ক্রিকেট কেন, জীবনের সব কাজ, সব খেলাতেই শৃঙ্খলা আর নিয়মানুবর্তিতা হল অত্যন্ত মূল্যবান জিনিস। তোমরা বয়সে নবীন। তোমরাই আগামী দিনের ভারতবর্ষ। তাই তোমাদের বলছি, খেলাতে একপক্ষকে জিততে হয় এবং একপক্ষকে হারতে হয়। যারা জেতে, তারা কৃতী সন্দেহ নেই। কিন্তু যারা হারে, তারাও উপেক্ষিত নয়। কেননা তারা হারল বলেই তো তোমরা জিতলে। তারা যদি জিতত তা হলে তোমরা হারতে। আসল কথা হচ্ছে খেলায় অংশ নেওয়া। নিজেদের মধ্যে লড়াই করার একটা মানসিকতা এবং জেদ তৈরি করা। বিশ্বসেরা দলেরা তো কতবার কতভাবে হেরে যায়। তাতে কী এসে গেল ৷ আমি এখনও আছি, জেতবার জন্য আমি এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি, এটাই তো মস্ত বড় কথা। আর একটা কথা, আমার উদ্দেশ্য কিন্তু তোমাদের জ্ঞান বিতরণ করা নয়। সেসব তো আমাদের শ্রদ্ধেয় মাস্টার মশাইদের কাজ। এই যে খেলা—ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, ভলিবল—এদের নিজস্ব কোনও ভাষা নেই। এরা সারা বিশ্বের সঙ্গে একটা ভাষাতেই সখ্য, শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার বন্ধন তৈরি করে। সেই ভাষাটাই হচ্ছে খেলা, অর্থাৎ স্পোর্টস। আমরা পেলেকে ভালবাসি, ফ্রাঙ্ক ওরেলকে ভালবাসি, রিচি বেনোকে ভালবাসি, ধ্যানচাঁদকে ভালবাসি, লালা অমরনাথকে ভালবাসি। কেন? আমরা কি কখনও তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি? তোমরা কি পেলে, ওরেল বা ইউসোবিওর ভাষা বুঝবে? এখানে ওদের ভাষা হল ওদের খেলা। রবিশঙ্কর, আলি আকবর আর আল্লারাখার ভাষা যেমন তাঁদের সুরে আর ছন্দে, ওঁদের ভাষাও তেমনই ওঁদের খেলায়। সেইজন্য খেলাই পারে খুব সহজে গোটা পৃথিবীর মানুষকে প্রাণের আঙিনায় আনতে। যেমন পারে সুর, ছন্দ আর চিত্রকলা। এই যে ক্রিকেট, এটা তো বাংলা শব্দ নয়। ক্রিকেট শব্দের দুটো অর্থ আছে। একটা অর্থ হচ্ছে ঝিঁঝি পোকা। অন্যটা অবশ্যই এই খেলা। প্রাচীন ফ্রান্স ভাষায় ঝিঁঝিপোকাকে উচ্চারণ করা হত এইরকমই একটা শব্দে। সেটাকে ... ”

ডি. এম. সাহেব কথা শেষ করবার আগেই মাঠের মধ্যে ঢুকে পড়ল সেই গরুটি। আমরা সহজেই গরুটিকে চিনতে পারলাম, কারণ গরুটি প্রস্থানের সময় তার পিঠে পেঁচোদা বসে ছিলেন এখন যখন এই মাঠে ওই গরুটির পুনরাগমন হল তখনও দেখলাম তার পিঠে পেঁচোদা বসে বসে বিড়ি খাচ্ছেন। ডি. এম. সাহেব তাঁর সদাব্যস্ত কর্মজীবনে এমন কোনও দৃশ্য নির্ঘাত ইতিপূর্বে দেখেননি। আমরা অবশ্য· দুরন্ত গ্রীষ্মে মোষের পিঠে চেপে পেঁচোদাকে আইসক্রিম খেতে দেখেছি। সার্কাসের হাতি যখন দলের লোকেরা আমাদের পাড়ার মধ্যে নিয়ে আসত কলাগাছ, কুমড়ো এইসব সংগ্রহের জন্য, কখনও কখনও বা দোকান-বাজার থেকে হাতি দেখিয়ে পয়সা নিত, তখন একবার পেঁচোদা পয়সা দিয়ে ওই হাতির পিঠে চেপে আড়াই মাইল দূরে শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিলেন। সেই হাতিযাত্রা অবশ্য খুব সুখের হয়নি। তবে সেসব কথা পরে বলা যাবে। এখন খেলার মাঠেই ফেরা যাক।

ডি. এম. সাহেব বক্তৃতা শেষ করে বসবার পর বিষ্ণুচরণবাবু বললেন, “আমায় একবার মহকুমা শাসকের সঙ্গে কথা বলতে হবে।”

সব্যসাচীবাবু বললেন, “কেন? কিসের দরকার?”

বিষ্ণুবাবু বললেন, “উনি বললেন 'ত্যাগ', 'তিতিক্ষা' আর 'সমর্পণ'। কিন্তু কথা হচ্ছে সমর্পণ কার কাছে এবং কোথায়? ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ, সেটা নাহয় বোঝা গেল। কিন্তু খেলার কাছে সমর্পণ মানে? খেলার তো কোনও আকৃতি নেই। তিনি মূর্তিহীন নিরাকার। যদি ক্রিকেটই বলি, তা হলে কার কাছে? বলের কাছে, নাকি ব্যাটের কাছে? নাকি পিচের কাছে। কার কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে?”

সব্যসাচীবাবু থাকতে না পেরে বললেন, “দয়া করে একটু থামবেন! আমাদের বকুলতলা জিতেছে, অতএব আনন্দ করুন।"

বিষ্ণুবাবু বললেন, “আমি তো আমার প্রতিশ্রুতি মতো পাঁচ কিলো বোঁদে তৈরি রেখেছি। আপনি সপরিবার সেই বোঁদে ভক্ষণ করতে পারেন। কিন্তু ওই যে বললেন, ‘আনন্দ’–ওই শব্দটার মধ্যে অনেক অর্থ বিদ্যমান। আনন্দ হচ্ছে বিশেষ্য। এর অর্থ হচ্ছে হর্ষ, পুলক আহ্লাদ, সুখ ইত্যাদি। আমার কি এই বয়সে আহ্লাদ করা সাজে! আপনারও সাজে না। আবার ‘আহ্লাদ' শব্দের যদি উৎস খুঁজি, তা হলে কী পাই? সেখানে বিবিধ অর্থের মধ্যে একটি হল আশকারা। মানে আশকারা দিলে সন্তানরা গোল্লায় যায়। এক্ষেত্রে আমি কোন অর্থটা ধরব?”

অন্য সময় হলে সব্যসাচীবাবু কী করতেন জানি না। কিন্তু আজ বেলতলা জিতেছে, শুধু জেতা নয়, পর-পর তিনবার জিতে হ্যাটট্রিক করেছে, সেই আনন্দে তিনি আর বেশি রাগতে পারলেন না। পরম সহিষ্ণুতা দেখিয়ে বললেন, “আপনি যাকে খুশি ধরুন, দোহাই, শুধু আমাকে আজকের জন্য ছাড়ন।”

কথা শেষ করেই সব্যসাচীবাবু ডি. এম. সাহেবের কাছে চলে গেলেন। বেলতলা ক্লাবের ছেলেরা ততক্ষণে অন্যান্যবারের মতো রাস্তায় মাইকের চোঙা টাঙাতে আরম্ভ করেছে। এবার আর তিনটে নয়, পাঁচটা চোঙা বকুলতলার দিকে। কাপ নিয়ে বেলতলা আর বকুলতলা পরিক্রমার জন্য লরিও এসে গেছে। ডি. এম. সাহেব সবাইকে পুরস্কার দিলেন। পুরস্কার বিতরণের পর সব্যসাচী মুখার্জি ঘোষণা করলেন, “বকুলতলার খেলোয়াড়-ভাই এবং ক্লাবের যাঁরা কর্মকর্তা, সেই বন্ধুদের কাছে অনুরোধ, আপনারা যাবেন না। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হব, যদি আপনারা আমাদের সঙ্গে চা-পানে মিলিত হন। খেলা যেমন প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলে, তারই স্মারকচিহ্ন হিসেবে এই চা-পানের ব্যবস্থা। মাননীয় মহকুমা শাসক তাঁর অতি ব্যস্ততার মধ্যেও রাজি হয়েছেন আমাদের চা-পানের আসরে যোগ দিতে। তিনিও আপনাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।”

কথা শেষ করেই সব্যসাচী মুখার্জি মাইকটা এগিয়ে দিলেন ডি. এম. সাহেবের দিকে। কী আর করা যাবে! বাধ্য হয়ে তিনিও বললেন, “বকুলতলার খেলোয়াড়-ভাই এবং বন্ধুরা সবাই আসুন এই চায়ের আসরে। এটাও একটা প্রীতি সম্মেলন।”

গগন গড়াই বললেন, “কী করবেন? যাবেন চা খেতে? অন্যবার তো এসব ফ্যাকড়া ছিল না।"

রামকৃষ্ণ সাঁতরা বললেন, “আমাকে যেতেই হবে। ডি. এম নিজে বলেছেন। সব্যসাচী মুখুজ্যের কথায় যেতাম না। ডি. এম. একজন সম্মানিত মানুষ। তা ছাড়া ওই কেষ্টপুরের ব্রিজটা....”

ওদিকে নকুল চৌধুরী পড়েছেন মহা বিপদে। এ-সময় চা তাঁর গলা দিয়ে নামবে না। কিন্তু না যাওয়াটাও হবে অন্যায় ৷ অতএব, তিনি বকুলতলার পঞ্চায়েত-প্রধান দীনবন্ধু পাঁজাকে বললেন, “কী করা যায় বলুন তো?”

দীনবন্ধুবাবু বললেন, “একটিবার যাওয়া উচিত। তা না হলে ব্যাপারটা বড্ড অশোভন দেখাবে। খেলায় হারতে পারি, তাই বলে ভব্যতায় হারব কেন?”

নকুলবাবু বললেন, “এক কাজ করুন। ভদ্রতা যখন করতেই হবে, তখন ভালভাবেই করা যাক। আপনি আমার গাড়ি নিয়ে ক্লাবে চলে যান। গিয়ে দেখবেন, ক্লাবে বড় সাইজের একটা ফুলের বোকে রাখা আছে। ভেবেছিলাম, জিততে পারলে আমি ক্লাবের পক্ষ থেকে ওটা কোচকে দেব। সেই গুলবাজটাকে তো দেখতে পাচ্ছি না। আপনি গিয়ে ওটা আনুন। ক্লাবের পক্ষ থেকে ডি. এম. সাহেবকে ওটা টি-পার্টিতে উপহার দেব। *

নকুলবাবু যা ভেবেছিলেন, তাই হল। টি-পার্টি শুরু হওয়ার মুখে-মুখেই নকুল চৌধুরী ফুলের বোকেটা ডি. এম. সাহেবের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “এটা বকুলতলা ক্লাবের পক্ষ থেকে আমাদের ভালবাসা ও শ্রদ্ধার অর্ঘ্য। আসলে বকুলতলা আর বেলতলা পাশাপাশি দুটো জায়গা। এরা দুই ভাইয়ের মতো। ক্রিকেট খেলায় বেলতলার শ্রেষ্ঠত্বকে আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে নিয়ে বলছি, এই দুই গ্রামের মধ্যে থেকে বাছাই করে যদি একটা দল করা যায়, তা হলে এই দল আমার মতে ডিস্ট্রিক্টের সেরা দল হবে। এই দল নিয়ে আমরা কলকাতা এবং রাজ্যের বিভিন্ন ওয়ান-ডে টুর্নামেন্টে নাম দিলে অবশ্যই সফল হব। যদি বেলতলা রাজি থাকে, তা হলে আমরা সেই কাজে এগোতে পারি।”

প্রবল করতালি হল নকুলবাবুর বক্তৃতার পর। সব্যসাচী মুখার্জি বললেন, “শ্রদ্ধেয় নকুলদার এই প্রস্তাবকে বেলতলা ক্লাবের পক্ষ থেকে আমরা স্বাগত জানচ্ছি। বেলতলা আর বকুলতলার মধ্যে তফাত তো শুধু একখানা খালের। আমার মেয়ের বিয়ে হয়েছে বকুলতলার বাঁড়ুজ্জ্যে বাড়িতে। আমরা তো পরস্পরের পরম আত্মীয়।”

এর পর বেলতলা ক্লাবের সম্পাদক জীবন মুখার্জি বললেন, "পাইকপাড়ায় যে ক্রিকেট প্রতিযোগিতা হয়, তাতে কলকাতার নামকরা দলগুলোও অন্য নামে খেলতে আসে। বছর দুই আগে বেলতলা আর বকুলতলা মিলে একটা টিম করে আমরা সেখানে নাম দিতে চেয়েছিলাম। শেষপর্যন্ত সেটা হয়ে ওঠেনি। নকুলবাবু যা বললেন, তেমনটা হলে আমরা আগামী বছরই ওখানে নাম দিতে পারি এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমরা ওখান থেকে জিতেও ফিরতে পারব।”

আবার করতালিধ্বনি হল। এর পর এল. ভেজিটেবল চপ, স্যান্ডুইচ, কাজু বাদাম আর চা। বেলতলা ক্লাবের পক্ষ থেকে আলাদা করে প্রত্যেক খেলোয়াড়কে একটা করে তোয়ালে উপহার দেওয়া হল।

নিজেদের ক্লাবের দিকে গাড়ি করে ফিরতে-ফিরতে চৌধুরী বললেন, “বুঝলেন দীনবন্ধুবাবু, ওদের খেলায় যত না মুগ্ধ হয়েছি, তার চেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছি ওদের ব্যবহারে। আগে তো খেলা শেষ হতেই আমরা চলে আসতাম। কিন্তু এবার ওরা যেরকম সৌজন্যবোধ আর ভদ্রতা দেখাল, তাতে আমি কিন্তু সত্যিই মুগ্ধ।”

খালের ব্রিজ পেরিয়ে ওরা পৌঁছে গেলেন বকুলতলা ক্লাবের সামনে। যে-লরিগুলো সমর্থক বোঝাই করে গিয়েছিল, এবং ভেবেছিল কাপ নিয়ে ফিরবে, সেগুলো প্রায় ফাঁকাই এসে পৌঁছেছে ক্লাবের সামনে।

বেলতলায় তখন উৎসবের আমেজ আর উল্লাস। সবাই গৌর-নিতাই আর কোচ সুনুদাকে জড়িয়ে ধরে আদর করছে। ক্লাবের সব ছেলেই যখন ক্লাবের দেড়শো গজ দূরে মল্লিকদের ফাঁকা জমিতে বসে নানা গল্পে মশুগুল, তখন ক্লাবের সেক্রেটারি জীবনদা আর সব্যসাচী মুখার্জি ক্লাবে এসে বললেন, “মল্লিকদাদের জমিতে প্যান্ডেলটা একটু বড় করলে হত। এত লোক বসবার জায়গা হলেও সবার মাথায় কোনও শামিয়ানা নেই।"

সুনুদা বললেন, “সারারাত তো হুল্লোড় চলবে, তাই ফণীদাকে বলেছি। আধঘন্টার মধ্যে ত্রিপল টাঙিয়ে দিচ্ছে।"

সব্যসাচী মুখার্জি বললেন, “সত্যি বলতে কী, নিতাই ব্যাট করতে নামার আগে পর্যন্ত আমি শিয়োর ছিলাম বেলতলা এবার হারছে। চোদ্দ রানে গৌর আউট হতেই বেলতলা খোঁড়া হল।

তারপর স্বপনও চলে গেল। রান তোলবার কোনও লোকই নেই। নিতাই যে আজ এমন ব্যাট করবে সেটা তো অকল্পনীয়। ওকে তো কখনও পাঁচ-সাতের বেশি রান করতে দেখিনি।”

সুনুদা বললেন, “আপনি কি গৌরকেও কখনও বল করতে দেখেছেন? কিংবা এরকম উইকেট নিতে?”

সব্যসাচীবাবু বললেন, “না। তাও দেখিনি। ওরা কামাল করেছে।"

সুন্দা চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন ক্লাবঘরে আর লোক নেই। সবাই মল্লিকবাবুর জমিতে বসে মজা করছে আর পটকা ফাটাচ্ছে। ঘরের মধ্যে শুধু সব্যসাচীবাবু আর জীবনদা। সুনুদা বললেন, “গৌর-নিতাই আমাদের অ্যাসেট। কিন্তু এই খেলায় নিতাই-ই সাতটা উইকেট নিয়েছে। কেমন করে জানেন?”

সব্যসাচীবাবু বিস্ফারিত চোখে বললেন, “সাতটা উইকেট? কেমন করে?”

সুনুদা বললেন, “আমি দেখলাম, নিতাইয়ের বলটাই দারুণ কাজ দিচ্ছে। তিনটে উইকেট পেল। কিন্তু আট ওভারের বেশি তো বল করাতে পারব না। তাই কিছুক্ষণ পর নিতাইয়ের ওভার শেষ হতে আবার নিতাইকেই ডাকলাম, কিন্তু প্রকাশ্যে বলা হল গৌর বল করছে। একই রকম দেখতে তো! ফলে গৌরের নাম নিয়ে নিতাই-ই আবার বল করতে লাগল। ব্যাটেও তাই। গৌর চোদ্দতে আউট। খানিক পরে চার নম্বরে নিতাই নামে যে ব্যাট করতে এল, সে-ও আসলে গৌরই। রিয়েল নিতাই তো ব্যাটই করেনি। মানে হল নিতাই আর গৌর দুই নামে দু'জন নয়, একজন। দু-দফাতেই নিতাই বল করে গেছে আর গৌর-নিতাই নামে দু' দফায় স্রেফ গৌরই ব্যাট করেছে। এটা বকুলতলা বুঝবে কেমন করে!”

সব্যসাচীবাবু দু' হাতে সুনুদাকে জড়িয়ে পরে বললেন, "তুমি বিশ্বের সেরা কোচ। তোমাকে আমি সোনার আংটি উপহার দেব।”

সুনুদা বললেন, “বিশ্বের কোনও দলে যদি গৌর-নিতাই থাকত সেই দলকে হারানো শক্ত হত। ভাবুন না, ভারতে একই চেহারার দু'জন গাওস্কর, কিংবা ওয়েস্ট ইণ্ডিজে একই চেহারার দুজন সোবার্স।"

সব্যসাচী মুখার্জি বললেন, “জোড়া ছেলে অনেকের হয়, তবে গৌর-নিতাইয়ের মতো হয় না। আর হলেও বিপদকালে এদের কেমনভাবে কাজে লাগাতে হয়, সেটা তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না ৷ "

সুনুদা বললেন, “কিন্তু দাদা, কথাটা একদম কাউকে বলবেন না। "

সব্যসাচীবাবু বললেন, “তুমি কি আমাকে পাগল ঠাউরেছ নাকি? এই সিক্রেট কখনও ফাঁস করা যায়!”

এর পর পরম আহ্লাদে সব্যসাচীবাবু নিজেই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে দোদমা ফাটাতে লাগলেন।

॥ ৫॥

বেলতলায় যখন উৎসব, বকুলতলায় তখন নিরানন্দের অন্ধকার। ক্লাবঘরের একপাশে শিবতলা। তার চাতালে ক্লাবের লোকেরা গোমড়ামুখে বসে। কে যেন একজন এসে বলল, “নকুলদা, ভরত ময়রা পনেরো কিলো লাল দই পাঠিয়েছে।

ওগুলো ক্লাবে রাখা আছে। কী করব?”

নকুলবাবু ক্ষিপ্তভঙ্গিতে বললেন, “ওই পনেরো কিলো দইয়ের ঘোল করে আমাদের গুলবাজ কোচ সমীরের মাথায় ঢেলে গোটা বকুলতলা ঘোরান। তা যদি না পারেন, তা হলে নিজেদের মাথায় ঢালুন। আমায় কিচ্ছু জিজ্ঞেস করবেন না ৷ ”

যে জিজ্ঞেস করতে এসেছিল, সে তড়িঘড়ি প্রস্থান করল। একটু পরে এলেন কলকাতার ঠাকুর। তিনি বললেন, “চৌধুরীবাবু, পোলাও আর মাংস নেমে গেছে। এবার আমার পাওনাগণ্ডা বুঝিয়ে দিয়ে আমাকে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন।”

নকুলবাবু খেপে গিয়ে বললেন, “পাওনাগণ্ডা নাহয় দিলাম। কিন্তু পাঠাবার ব্যবস্থা মানে? আমি কি আপনাকে কোলে করে এনেছি যে, কোলে করে পৌঁছে দেব! টিকিট কেটে ট্রেনে চলে যান।”

ঠাকুর পোলাও রাঁধার যন্ত্রপাতি, মানে হাতা-খুন্তি বগলদাবা করে বলল, “যাচ্ছলে! আনবার সময় তো বলেছিলেন, গাড়ি করে শোভাবাজার পৌঁছে দেবেন। এখন ট্রেন দেখাচ্ছেন? ঠিক আছে, ট্রেনেই যাব। ট্রেনের ভাড়া আর শ্যালদা থেকে শোভাবাজার অবধি ট্যাক্সি ভাড়া দিয়ে দিন।”

নকুলবাবু পকেট থেকে টাকা বের করে দীনবন্ধুবাবুর হাতে দিয়ে বললেন, “ওর পাওনাগণ্ডা বুঝিয়ে ওকে সত্বর বিদেয় করুন।”

ঠাকুর চলে যেতেই গগন গড়াই এলেন। তিনি যেন বিষম সমস্যায় পড়েছেন এমন ভাব করে নকুলবাবু আর দীনবন্ধুবাবুকে বললেন, “একটা সমস্যা হয়েছে। ক্লাবের প্লেয়াররা তো হেরে গিয়ে যে যার বাড়িতে চলে গেছে। বোধ হয় এতক্ষণে লেপমুড়ি দিয়ে শুয়েও পড়েছে। ওদিকে রামকৃষ্ণবাবু মনের দুঃখে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এখন একশো লোকের পোলাও রান্না হয়ে গেছে। সঙ্গে এক ডেকচি মাংস, তদুপরি চাটনি, দই, নলেন গুড়ের সন্দেশ। এগুলোর কী হবে? পোলাও তো এর পর...”

গগন গড়াই কথা শেষ করবার আগেই নকুলবাবু বললেন, “পোলাও রান্নার খরচ রামকৃষ্ণবাবুর। তাঁকেই ঘুম থেকে তুলে জেনে নিন পোলাওয়ের কী গতি হবে! আর মাংস তো...”

দীনবন্ধুবাবু বললেন, “আজ্ঞে হ্যাঁ, ওটা আমি এনেছিলাম। তখন তো বুঝিনি বকুলতলা এবারও এমন গোহারান হারবে। তাই আমি বলছি, আমার মাংস ওই বেলতলার খালে ফেলুন।”

গগন গড়াই আঁতকে উঠে বললেন, “ রেওয়াজি মাংস বেলতলার খালে! বলছেন কী! অত মাংস খালে ফেলা যায় নাকি!”

দীনবন্ধু বললেন, “তা হলে যা খুশি তাই করুন। আমায় আর জ্বালাবেন না।”

নকুলবাবু একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে বললেন, “একটা কাজ করলে কেমন হয়?”

দীনবন্ধুবাবু বললেন, “কী কাজ?”

নকুলবাবু বললেন, “আমাদের তো খাবার লোক নেই। আর খাবেই বা কোন মুখে। তার চেয়ে বেলতলা ক্লাবে আমাদের পক্ষ থেকে এগুলো প্রীতি উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দিই।”

দীনবন্ধুবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “আইডিয়াটা মন্দ নয়। তবে কী জানেন, প্রীতি উপহার হিসেবে ওই সন্দেশ, দই এগুলো পাঠানো যেতে পারে। কেননা, এগুলো দোকান থেকে রেডিমেড কিনতে পারেন। পোলাও পাঠালে ভাববে, আমরা হেরে গিয়ে আর পোলাও গলায় তুলতে পারিনি, তাই ওদের ভেট দিয়েছি। কারণ, পোলাও তো বকুলতলায় রেডিমেড কিনতে পাওয়া যায় না। তা ছাড়া বেলতলাও নির্ঘাত জানে, আমরা কলকাতা থেকে ঠাকুর এনে পোলাও রাঁধাচ্ছি।”

নকুলবাবু একটু সংশয় নিয়ে বললেন, “ওরা জানে কি?”

দীনবন্ধুবাবু বললেন, “আলবত জানে। দু'জনেই তো শোভাবাজার থেকে এক বাসে এসেছে। একজন গেছে বেলতলায় বিরিয়ানি রাঁধতে, অন্যজন এসেছে বকুলতলায় পোলাও পাকাতে। দু'জনে ফিরবেও একসঙ্গে।”

গগন গড়াই এবার আবেদন করার ভঙ্গিতে বললেন, “জানুক চাই না জানুক, দয়া করে পোলাও আর মাংসটা পাঠাবেন না। আমি তো বুঝিনি হেরে যাবে। মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয়েই পোলাও চাপাবার অর্ডার পাঠিয়েছি। বাড়িতে ‘নো মিল’ করা আছে। এখন গিয়ে রাঁধতে বললে বউ বিগড়ে যেতে পারে। যেতে পারে কেন, যাবেই।”

নকুলবাবু বললেন, “তা হলে দই-সন্দেশ পাঠিয়ে দিয়ে নিজে গিয়ে বসে-বসে পোলাও-মাংস খান।”

শিবতলার পাশের চাতালে যখন ক্লাবের কর্তাব্যক্তিরা এইসব আলোচনায় মগ্ন, তখন ঠিক শিবতলার পেছন থেকে কে যেন একটা বোমা ফাটাল। শব্দটা এমন আচমকা হল যে, সবাই চমকে উঠে বলে উঠলেন, “কে? কে আজকের দিনে বোমা ফাটায়?”

কেউ অবশ্য উত্তর দিল না, কিন্তু একটু দূরে আবার একটা বোমা ফাটতেই দীনবন্ধু পাঁজা চিৎকার করে বলে উঠলেন, “নিশ্চয়ই বেলতলার দৃষ্ট প্রকৃতির কয়েকটি ছেলের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বকুলতলায়। নইলে এমন শোকের মুহূর্তে কার সাধ হবে পটকা ফাটাতে! এখনই ডোর-টু-ডোর চিরুনি তল্লাশি করলে দুষ্টগুলো ধরা পড়বে।”

চাতালের এককোণে ঝিম ধরে বসে ছিলেন কেষ্ট মিত্তির। তিনি বললেন, “দেড়শো টাকার দুই ঝুড়ি পটকা কেনা হয়েছে। ছোঁড়াগুলি বুঝি তারই সদগতি করছে। আমরাও তো ভেবেছিলাম ক্লাবে এসে আধঘণ্টা পটকা ফাটিয়ে মজা করব।”

নকুলবাবু বললেন, “এক কাজ করতে পারেন। গুটিদশেক বাক্সবোমা আমাদের কোচের বাড়িতে গিয়ে ফাটাতে পারবেন? ব্যাটা সকাল থেকে বলে যাচ্ছে : বল ঘুরছে, বল ঘুরছে। আমিও ওর কথা বিশ্বাস করে ভাবছি, এই বুঝি বেলতলার উইকেট পড়ল!”

" গগন গড়াই বললেন, “নকুলবাবু, আমার কিন্তু একটা কথা মনে পড়ছে। ব্যাপারটা উপেক্ষার নয়। সব ব্যাপারেই শুভ-অশুভ বলে একটা ব্যাপার আছে তো! এসব জিনিস সাহেবরাও মানে ৷ নকুলবাবু বললেন, “যা বলতে চাইছেন, সেটা পরিষ্কার করে বলুন।"

গগন গড়াই গলাটা কেশে একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, “মনে করে দেখুন। যেইমাত্র জোড়া পায়রা এসে প্যান্ডেলের ওপর বসল অমনই আমাদের জয় শুরু হল। পায়রা উড়ে যাওয়ার পর থেকে আমাদের পতন আরম্ভ।"

দীনবন্ধুবাবু বললেন, “কপালে গঁদের আঠা দিয়ে জোড়া পায়রা সেঁটে রাখলেই যদি জয় হত, তা হলে ভারত কোনও খেলাতেই হারত না। ওসব সংস্কার ছাড়ুন।”

গগন গড়াই বললেন, “আজ্ঞে, আমার কথাটা ভালভাবে শুনুন। জোড়া পায়রা যতটুকু শুভ করে দিয়ে গিয়েছিল, তাতেই আমাদের জয় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু ওই যে একটা গরু ঢুকল, ওই গরুই তো পায়রার মঙ্গলচিহ্নটা একেবারে কেটেকুটে দিয়ে আমাদের জয়টা ভেস্তে দিল। আপনারা মনে করে দেখুন, গরুটা কখন ঢুকেছিল? বেলতলার রান তখন বাষট্টি। আর গরু চলে যাওয়ার পর থেকে ব্যাট হাতে নিতাই তো প্রলয় নাচন নাচতে লাগল। আমার মনে হয় গরুটাকে ওয়াচ করা দরকার।"

নকুলবাবু তপ্ত গলায় বলে উঠলেন, “হেরে গিয়ে এখন গরু-ছাগলের ওপর ওয়াচ রাখতে হবে? আমাদের গরুগুলো খেলতে পারল না, হেরে মরল, এখন দোষ হল ওই চারপেয়ে গরুটার! আপনি কথা না বাড়িয়ে বরং পোলাও খেতে বসুন।”

বেলতলা থেকে ততক্ষণে মাইকের আওয়াজ আসতে আরম্ভ করেছে। একেবারে গমগম করে সেই আওয়াজ এসে আছড়ে পড়ছে বকুলতলার শিবমন্দিরের চাতালে। মাইকে ঘোষণা হচ্ছে, “এখনই দুর্গাদাস স্মৃতি কাপ নিয়ে বেলতলার বিজয় মিছিল বের হবে। এই মিছিল ক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে পুবপাড়া, চৌধুরী মোড় ঘুরে যাবে বকুলতলার গেঞ্জিকলের মাঠে। তারপর স্টেশন রোড হয়ে এই মহামিছিল ফিরে আসবে বেলতলা ক্লাবে। এই বর্ণাঢ্য মিছিলের পুরোভাগে থাকবে মণিভাইদের ব্যান্ড, তারপর পঞ্চাশটি রিকশা। তাতে মাল্যভূষিত খেলোয়াড়বৃন্দ, কোচ এবং ক্লাবের কর্মকর্তা। তারপর থাকবে কলকাতার বিখ্যাত মেহবুব ব্যান্ড পার্টির বাদকবৃন্দ, তারপর সুসজ্জিত লরির মধ্যে মাল্যশোভিত দুর্গাদাস কাপ, যা পর পর তিনবার জিতে নিয়ে বিরল কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছে বেলতলা স্পোর্টিং ক্লাব, লরির পেছনে সমর্থকদের নিয়ে আরও দুটি লরি এবং পেছনে কামারপাড়ার বিখ্যাত তাসাপার্টি। এই বর্ণাঢ্য মহামিছিলে সবাই যোগদান করতে পারেন। এই মুহূর্তে ক্লাব প্রাঙ্গণে বোঁদে বিতরণ এবং ভক্ষণ চলছে। আর একটু পরেই মিছিল তার সুনির্দিষ্ট পথে যাত্রা শুরু করবে।”

দীনবন্ধুবাবু বললেন, “বেলতলার এই বোঁদে কালচারটা আর গেল না। এবারও বোঁদে? সঙ্গে আবার ওই কামারপাড়ার তাসাপার্টি?”

নকুলবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মেহবুব ব্যান্ড বাজবার কথা কোথায়, আর আজ বাজবে কোথায়! সবই কপাল! তবে ওরা খুব ভাল অর্গানাইজার। কলকাতার ব্যান্ড তো এরই মধ্যে ঠিক করে এনে ফেলেছে। "

একটু থেমে তিনি বললেন, “আমাদের ব্যান্ড তো ফেরত চলে গেছে, তাই না?”

দীনবন্ধুবাবু বললেন, “কই আর গেল। না বাজালেও তো পুরো টাকা দিতে হত, তাই আমি বেলতলার পরেশ পালকে বললাম, আমরা ব্যান্ড ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছি। তোমাদের দরকার থাকলে নিতে পারো। ওই আমাদেরটাই নিয়েছে। অ্যাডভান্সের টাকাও ওরা ফেরত দিয়েছে।"

নকুলবাবু নিজের বাঁ হাতে কপাল টিপে বসে রইলেন। একটু পরেই আরও হৃদয়বিদারক খবর এল। কেষ্ট মিত্তিরের ছেলে নস্তু এসে খবর দিল, “বাবা, জানো, মা আর দিদি বেলতলায় গেছে। ছোটমামা এসে নিয়ে গেল!”

কেষ্ট মিত্তির জিজ্ঞেস করলেন, “কেন? তোর দিদিমার শরীর খারাপ?”

নন্তু বলল, “না। ছোটমামা বলল, বেলতলায় মেয়ে-বউরা আনন্দে আবির খেলছে। ছোটমামিমারা লরি করে মিছিলে ঘুরবে, তাই তুইও আয়। তুই তো ওই পাড়ারই মেয়ে।"

নকুলবাবু বললেন, “কেষ্টবাবু, এসব কী শুনছি?”

কেষ্ট মিত্তির বললেন, “আজ্ঞে আপনি যা শুনলেন, আমিও তাই শুনলাম। বেলতলার মেয়ে বিয়ে করার আগে তো এসব ভেবে দেখিনি।”

নকুলবাবু বললেন, “যদি এখনও চলে গিয়ে না থাকে, তা হলে আটকান। পথরোধ করে দাঁড়ান।”

নন্তু বলল, “মা আর দিদি এতক্ষণে পৌঁছে গেছে। জেঠু তুমি গেলে হয়তো জ্যাঠাইমাকে এখনও আটকাতে পারবে। শুনলাম জ্যাঠাইমাও যাচ্ছেন।”

নকুলবাবু লাফ দিয়ে চাতাল থেকে নামলেন। দীনবন্ধুবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার ভায়রার বাড়ি বেলতলায়। আমার স্ত্রী যেতে পারে। যাওয়ার খুব চান্স।”

দীনবন্ধুবাবু বললেন, “তা আপনি কোথায় চললেন?”

নকুলবাবু ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, “বুঝতে পারছেন না কোথায় যাচ্ছি! সদর দরজায় তালা লাগিয়ে বসে থাকব।"

নকুলবাবুকে রোখা গেল না। তিনি হনহন করে বাড়ির দিকে পা চালালেন।

বেলতলায় তখন মহোৎসব শুরু হয়ে গেছে। মেয়েদের আবির খেলা, ছেলেদের বাজি পোড়ানো, নাচ আর পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আদর করার ঘটা শেষ হতেই চায় না। এর মধ্যে সব্যসাচী মুখার্জি আর গুরুদাস চ্যাটার্জি দু'জনে দু'জনকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আমাদের দু'জনের ব্যাপারটা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া যাক।"

সুনুদা বললেন, “সবাই জেনে গেছে। আজ রাতের জলসাটা সামনের শনিবার রাতে হবে। ওই অনুষ্ঠানেই খেলোয়াড়দের সোনার চেনও উপহার দেওয়া হবে।”

প্রাণবল্লভ সাহা তোয়ালেতে হাত মুছতে-মুছতে বললেন, “বিরিয়ানিটা যা হয়েছে না! মনে হচ্ছে লখনউ থেকে লোক এসে বানিয়েছে। এট্টু টেস্ট করবেন নাকি!”

ওঁরা দু'জন উত্তর দেওয়ার আগে টোপাদা গলার টাই ঠিক করতে-করতে বললেন, “লখনউ নয়, বিরিয়ানি খাবেন হায়দরাবাদ আর মাইসোরের। হায়দরাবাদ নিজাম প্যালেসের একটা ডিনারে আমি ইনভাইটেড ছিলাম। ইউ কান্ট বিলিভ, এক মাইল দূর থেকে বিরিয়ানির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। সেই গন্ধে প্রায় পাঁচ-সাতশো কুকুর, আই মিন রোডেশিয়ান ডগ প্যালেসের সীমানার বাইরে ভিড় করে ঘুরছে।”

সব্যসাচীবাবু আবার বাড়িতে কুকুর পোষেন। তিনি বললেন, “রোডেশিয়ান ডগ আবার ডগ আবার কোন জাতের কুকুর? কেমন দেখতে?”

টোপাদা বললেন, “রোডেশিয়ান ডগ মানে যারা রোডে থাকে। স্ট্রিট ডগ।”

অন্য সময় হলে সব্যসাচী মুখার্জি কিংবা গুরু চ্যাটার্জি আর কথাই বলতেন না টোপাদার সঙ্গে। কিন্তু আজ সবার মনেই এত খুশি-খুশি ভাব যে, টোপাদার কথাতে সবাই আনন্দ পেল। সব্যসাচী মুখার্জি বললেন, “যাওয়ার সময় ডি. এম. সাহেব আপনার কথা খুব বলছিলেন। আপনার ওই ছেচল্লিশে জেল পালানোর ব্যাপারটা উনি খুব এনজয় করেছেন।”

টোপাদা বললেন, “যাওয়ার সময় একখানা কার্ড দিয়ে দিলুম। আই. এ. এস. তো, লোক চিনতে পারে। বুঝতে পেরেছে কার সঙ্গে কথা কয়ে গেল।"

, গুরু চ্যাটার্জি বললেন, “আচ্ছা টোপাদা, আপনার কার্ডে নামের তলায় এক্স ফ্রিডম ফাইটার কথাটা লেখেন কেন? হোয়াই এক্স?”

টোপাদা পাইপ ধরালেন। দুটো টান দিয়ে বললেন, “বিকজ এখন আর ফ্রিডমের দরকার নেই, ফাইটও নিষ্প্রয়োজন। স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ দুটোই এখন ‘এক্স’। সে জন্যই ‘এক্স ফ্রিডম ফাইটার' কথাটা লিখি।”

সব্যসাচীবাবু বললেন, “গৌর-নিতাইয়ের সাদৃশ্য দেখে উনি তো চমকে গেছেন। দু'জনকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, আম্পায়ারের দোষ কোথায়! পাশাপাশি দেখেও তো আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।”

টোপাদা বললেন, “আমি অবশ্য মাঠে বসেই নাইনটিন ফিফটি ফাইভে ম্যাঞ্চেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে ওল্ড ট্রাফোর্ডে দু'জন ক্যারাবিয়ান ব্যাটসম্যান সম্পর্কে অস্ট্রেলিয়ার ক্যাপ্টেনের যে বিভ্রম ঘটেছিল সেটা ওঁকে শুনিয়ে দিয়েছি।”

গুরুদাসবাবু বললেন, “আরে মশাই, ওটা তো ঘটেছিল, মানে যদি ঘটে থাকে আর কি, সেটা বিদেশে, ওই ম্যাঞ্চেস্টারে। ভারতে এমন ঘটনা ঘটেছে?”

টোপাদা বললেন, “আলবত ঘটেছে। অন্য কোথাও নয়, এই কলকাতাতেই।”

টোপাদা পাইপে টান দিয়ে গলগল করে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “দিস ইজ মাই ওনলি মিসফরচুন, আমি যাদের সঙ্গে মিশি অথবা এই বেলতলায় যারা আমার সঙ্গে মেশে, সবাই এত কম জানে যে, আমার খুব কষ্ট হয়। আমি ভেবে পাই না, বেলতলার ফিউচারটা কী?”

সব্যসাচীবাবু অন্য সময় হলে টোপাদার এসব কথা একদম হজম করতেন না। কিন্তু আজ তিনি দারুণ মুডে আছেন। সেজন্যই তিনি বললেন, “আপনি তো আমাদের পাড়ার, আই মিন বেলতলার অ্যাসেট। তা কলকাতায় গৌর-নিতাইয়ের মতো ঘটনা কোথায় ঘটেছিল?”

টোপাদা পাইপে টান দিয়ে বললেন, “ডু ইউ নো, নাইটিন হানড্রেড ইলেভেন, অর্থাৎ উনিশশো এগারো সাল—হোয়াই উনিশশো এগারো সাল আমাদের কাছে রিমার্কেবল?”

গুরুদাসবাবু বললেন, “উনিশশো এগারো? সো ফার আই রিমেমবার ওই বছরে বিশ্বে দুটো বড় ঘটনা ঘটেছিল। রোয়াল্ড আমান্ডসেন দক্ষিণ মেরু আবিষ্কার করেন। অর্থাৎ সাউথ পোল। আর-একটা ঘটনা হচ্ছে চিনে সান ইয়াত সেন ওই বছরই রাষ্ট্রপতি হন। তখনই চিনে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়।”

টোপাবাবু বললেন, “এইজন্যেই, ঠিক এইজন্যেই আমি বেলতলা ছাড়তে চাই। আমি বলছি কলকাতার কথা আর আপনি নিয়ে এলেন সাউথ পোল আর চিন। কলকাতায় কী ঘটেছিল জানেন? কলকাতার মোহনবাগান সেবার ইস্টইয়র্ক দলকে হারিয়ে আই. এফ. এ. শিল্ড পেয়েছিল। মনে হচ্ছে, আপনি পদ্মার ওপার থেকে তাড়া খেয়ে চলে আসা মানুষ। মোহনবাগান কেন জিতেছিল জানেন?

গুরুদাসবাবু বললেন, “ভাল খেলেছিল, তাই!”

টোপাদা বললেন, “আজ্ঞে মশাই ওটা আসল ফ্যাক্টর নয়। ওখানেও গৌর-নিতাই ছিল। শিবদাস ভাদুড়ী আর বিজয়দাস ভাদুড়ী। টু ভাদুড়ী ব্রাদার্স একই রকম দেখতে। শিবকে গার্ড নিতে গিয়ে বিজয়কে গার্ড নেয়, আবার বিজয়কে আগলাতে গিয়ে শিবকে আগলায়। এই বিভ্রমের মধ্যে পড়ে গিয়েই তো মোহনবাগান জিতে গেল।”

গুরুদাসবাবু বললেন, “সেই খেলা আপনি দেখেছেন?”

টোপাদা মুখ থেকে পাইপ নামিয়ে বললেন, “দ্যাট টাইম আই ওয়াজ এ স্টুডেন্ট। কিন্তু আমি মাঠে ছিলাম। খেলাটা দেখেছি। এই খেলাটা সেদিন ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের একটা অঙ্গ। তখন তো ঘটি-বাঙাল কনসেপ্টটা আসেনি। কলকাতায় মোহনবাগান জিতল—ঢাকা, ময়মনসিং, পাবনা, খুলনা আর চট্টগ্রামে বাজি ফুটতে লাগল। ময়মনসিং শহরে মিছিল বের হল।”

সব্যসাচী মুখার্জি বললেন, “সত্যি, আপনি কত জানেন। উনিশশো এগারোতে আপনি স্টুডেন্ট। তখন তো আমরা- জন্মাইনি। তা হলে এখন আপনার বয়স কত দাঁড়াচ্ছে?”

টোপাদা নিবে যাওয়া পাইপে আবার আগুন ধরিয়ে বললেন, “সরল হিসেবে বয়স অনেক। কিন্তু আমার বয়সের কন্টিনিউটি মানে ধারাবাহিকতা ঠিক থাকেনি। ফরটি সিক্সের পর থেকে ফরটি সেভেনের পনেরোই অগস্ট পর্যন্ত আমার দিনগুলো তলিয়ে গেছে আন্ডার দ্য ওয়াটার। ”

টোপাদার 'আন্ডার দ্য ওয়াটারের' গল্পটা বেলতলা এবং বকুলতলার প্রত্যেকেই বোধহয় জানে। কেউ-কেউ শুনেছে খোদ টোপাদার মুখে, আবার কেউ-কেউ লোকমুখে। আজই তিনি এই গল্পটা ডি. এম. সাহেবকে শুনিয়ে দিয়েছেন। ওই গল্পের জন্যই কি না জানি না, ডি. এম. সাহেব নলেন গুড়ের সন্দেশ মুখে তোলবার আগেই বিষম খেলেন। সবাই জলের গ্লাস নিয়ে এগিয়ে এলেন। জলটল খেয়ে উনি শান্ত হওয়ার পর টোপাদাকে বললেন, “মিঃ মুখার্জি, ক্যারি অন।” এই গল্পটা অন্যের মুখ থেকে শোনার চাইতে টোপাদার মুখ থেকে শোনা অনেক সৌভাগ্যের ব্যাপার। গৌর-নিতাইকে সঙ্গে করে আমরা একবার টোপাদার বাড়িতে গিয়েছিলাম ক্লাবের একটা অনুষ্ঠানে টোপাদাকে নিমন্ত্রণ করতে। অনুষ্ঠানটা ছিল পনেরোই অগাস্টের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রভাতফেরি। স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে টোপাদাকেই আমাদের মনে হয়েছিল যোগ্য লোক, যিনি পতাকা উত্তোলন করে ভাষণ দিতে পারবেন। সেটা বছর চারেক আগের ঘটনা। তখনই টোপাদা বলেছিলেন, “স্বাধীনতা কেমন করে এল জানো?”

আমরা বললাম, “আপনাদের মতো লোকেরা লড়াই করেছিলেন, তাই।”

টোপাদা হাসতে হাসতে বললেন, “এ তো খুব সামান্য কথা। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে এমন কারও নাম জানো, যাকে মারবার জন্য ইংল্যান্ডের রানির বেডরুমে বসে কনফারেন্স হয়েছিল? নিশ্চয়ই জানো না। সেই লোকটা এই আমি, তোমাদের বেলতলার সিম্পল টোপাদা।”

আমরা বললাম, “আপনার আন্ডার দ্য ওয়াটারের ব্যাপারটা একটু বলবেন। আমরা শুনতে চাই।"

টোপাদা মুচকি হেসে বললেন, “এটা এখনও গিনেস বুকে বোধ হয় আছে। ফরটি টু'য়ে কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্ট শুরু হওয়ার আগে মাই ফ্রেন্ড জবাহর বলল, ডিয়ার টোপা তুমি ঢাকায় চলে যাও। ঢাকা থেকে এলাম ময়মনসিং। শুরু হল আন্দোলন। মাঝ রাতে আমাকে অ্যারেস্ট করা হল। সাতশো সেপাইয়ের ফোর্স এসেছিল এই একা টোপা মুখুজ্যেকে অ্যারেস্ট করতে। কয়েক মাস রেখে আমাকে চালান করল চট্টগ্রামে।” ফরটি সিক্সে আমাকে নিয়ে এল ময়মনসিং। ইতিমধ্যে, মানে ফরটি ফাইভের সিক্সথ অগস্ট এ বোম ড্রল্ড অন হিরোশিমা ইন জাপান। ভয়ঙ্কর অবস্থা! জেলের মধ্যে থেকেই গর্জে উঠে জবাহরকে চিঠি লিখলুম। ফরটি সিক্সের গোড়ায় অনেককে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হল শুধু আমাকে বাদ দিয়ে। আমি খবর পাচ্ছিলাম, সবাইকে ছাড়বে কিন্তু ব্রিটিশ টোপা ৰুবুজ্যেকে ছাড়বে না। ইংল্যান্ডের রাজদরবারে আমাকে নিয়ে মিড নাইট মিটিং চলছে। ভারতের ব্রিটিশ প্রশাসন আর পুলিশদের মুখে একটাই বুলি, “টোপা মুখার্জি ইজ ডেঞ্জারাস।” আমাকে জেলের মধ্যেই মেরে ফেলার চক্রান্ত হল। খবর পেয়ে গেলাম। ফরটি সিক্সের সেকেন্ড অগস্ট ময়মনসিংয়ের জেল থেকে পালালাম। মিথ্যে বলব না, জেলের কিছু কয়েদি এবং দু-চারজন বাঙালি পুলিশ আমাকে হেল্প করেছিল। কিন্তু পালিয়ে তো এলাম। রাস্তায় পা দিয়েই শুনলাম, কয়েদি পালানোর জন্য পাগলা ঘণ্টি বাজছে। এবার শুরু হল আত্মগোপনের পালা। একেবারে আক্ষরিক অর্থে চোর-পুলিশ খেলা। চায়ের দোকানে চা বাচ্ছি; দূরে পুলিশের জিপ গাড়ির আওয়াজ। সঙ্গে-সঙ্গে দোকানের পেছন দিয়ে পালিয়ে যাওয়া। শয়ে শয়ে পুলিশ আর সি. আই. ডি. লেগে গেল আমার পেছনে। ফরটি সিঙ্গের ফোরটিন অগস্ট ময়মনসিংয়ের ব্রহ্মপুত্রের ধারে বসে গরম গরম পেঁয়াজি ৰাচ্ছিলাম। একেবারে আচমকা পুলিশ ঘিরে ফেলল। আমি ছিলাম কেওটখালির ব্রিজের আছে। এক দৌড়ে ব্রিজে উঠতেই দেখি দু'দিকে পুলিশ বন্দুক উঁচিয়ে। আর ভেবে লাভ নেই। ‘ভারতমাতা কী জয়' বলে ব্রিজ থেকে দু'-কূল ছাপানো বর্ষার ব্রহ্মপুত্রে ঝাঁপ দিলাম। আমাকে পিছু তাড়া করবার জন্য ব্রহ্মপুত্রে লঞ্চ নামানো হল। কিন্তু আমাকে পাবে কোথায়! লঞ্চ যাচ্ছে জলের ওপর দিয়ে, আমি যাচ্ছি ডুব সাঁতারে জলের অনেক নিচ দিয়ে। মাঝেমধ্যে মাথা তুলে দেখি ফটফটিয়ে পুলিশ লঞ্চ আসছে। একখানা ছোট প্লেনও আকাশপথে ঘুরে বেড়াচ্ছিল আমাকে ধরবার জন্য। একবার মাথা তুলে দেখি, একখানা মাটির সরা ভেসে যাচ্ছে। ব্যস, ওইটা মাথায় দিয়ে বেঁধে নিলাম গলার পৈতেটা পেঁচিয়ে। এখন আর সবসময় ডুবতে হয় না ৷ ঘণ্টা কয়েক ডুবে থাকি, আবার কিছুক্ষণ মাথা তুলি। ,। এই করতে-করতে স্রোতের টানে কোনদিকে এবং কত দূরে যে চলে এসেছি, তার কোনও খেয়াল নেই। প্রথম কয়েক দিনের হিসেব ছিল। তারপর গেল সব গুলিয়ে। কত তারিখ, কী বার, কিছুই আর বুঝতে পারছি না। শরীরও বইছে না। ইতিমধ্যে খবর পেয়ে আরও দুটো পুলিশ লঞ্চ আমাকে ফলো করতে আরম্ভ করেছে। এবার জয় ভারতমাতা বলে বিশাল একটা ডুব দিলাম। অনেকটা গভীরে গিয়ে পায়ে কী যেন ঠেকল। বুঝতে পারলাম ছোটখাটো একটা জাহাজ কাত হয়ে পড়ে আছে জলের নিচে। গিয়ে ঢুকলাম তার ভেতরে। কী বলব তোমাদের! জাহাজটা বোধ হয় সদ্য-সদ্য ডুবেছে। জাহাজের মধ্যে পেলাম পনির, কেক, ডিম আর সেদ্ধকরা মাংস। পাউরুটিও ছিল, তবে সেগুলো জলে ভিজে ন্যাতা হয়ে গেছে। আগে খেয়ে নিলাম। জলের তো অভাব নেই। খাচ্ছি আর ডিপ ব্রহ্মপুত্রের ফ্রেশ ওয়াটার গিলছি। এমন সময় বিব-বিব আওয়াজ শুনে ঘাবড়ে গেলাম। দেখি, ডুবো জাহাজের সন্ধানে তিন পেশাদার ডুবুরি এগিয়ে আসছে। ওদের কাজে একটু সাহায্য করলাম। ওরাই জাহাজের খোলের ভেতর থেকে আমাকে একখানা জলচশমা আর একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার এনে দিল। আমি পিঠে বেঁধে নিলাম। একটা চামড়ার ব্যাগে নিলাম জাহাজ থেকে কিছু আপেল আর বেদানা, কলা। ব্যস, আর কী চাই! ওই পেশাদার ডুবুরিরা আমায় অবাক গলায় বলল, এতদিন অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়া কেমন করে ছিলেন?”

আমরাও টোপাদাকে একই প্রশ্ন করলাম। টোপাদা বললেন, “দশ বছর বয়স থেকে যে যোগ প্র্যাকটিস করে যাচ্ছি, সেটা কি ফেলনা? আমি তো মাটির তলায় মুখ ঢুকিয়ে আটচল্লিশ ঘণ্টা থাকতে পারি। কতবার তো ওই কাণ্ড করে ঢাকাতে পুলিশকে বোকা বানিয়েছি। এখানে তো তবু দু-আড়াই ঘণ্টা পর-পর মাথা তুলেছি।”

আমরা রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের গল্প শোনার মতো ভঙ্গি করে জিজ্ঞেস করি, “তারপর?” টোপাদা পাইপে টান দিয়ে বলেন, “তারপর আর কী! আর তো জল থেকে মাথা তোলবার দরকারই নেই। খালি ভেসে যাচ্ছি। যাচ্ছি তো যাচ্ছিই। দিন-রাত আর বুঝতে পারি না। অবশেষে একদিন মাথা তুলে উঠলাম। সেটা ঠিক কতদিন পর, তা বলতে পারব না। মাঝ নদী থেকে ভাসতে ভাসতে পাড়ে এসে দেখি নদীর ঘাটে তেরঙা পতাকা উড়ছে। ব্যান্ড বাজছে আর ছেলেমেয়েরা গাইছে 'জনগণ মন...'। মানেটা বুঝলে?”

" আমরা বোকার মতন মাথা নেড়ে বললাম, “আজ্ঞে না। টোপাদা বললেন, “জানতাম, বুঝবে না। দেশ তখন স্বাধীন হয়ে গেছে। ময়মনসিংহ থেকে ডুব সাঁতারে অসমে এসে গেছি। এসে পৌঁছেছি ঠিক পনেরোই অগাস্ট। "

আমরা এই গল্প শুনে বলেছিলাম, "টোপাদা, আপনি তো দিল্লিতে মন্ত্রী হতে পারতেন।" টোপাদা উত্তর দিতেন, আজও দেন, “হয়তো পারতাম। কিন্তু হতে তো চাইনি। তা ছাড়া আমার লাইফের ভাইটাল স্ট্রাগলটারই কোনও রেকর্ড নেই। ওটা তো আনসিন। একেবারে আণ্ডার দ্য ওয়াটার। ওই ডুবুরিরা একটা ভিজিটিং কার্ড আমাকে দিয়েছিল। ডাঙায় গিয়ে যোগাযোগ করতে বলেছিল। কিন্তু জলের মধ্যে কার্ডটা তো ভিজে এমন হয়ে গেল যে, একটা বর্ণও আর বুঝতে পারলাম না।"

॥ ৬ ॥

বেলতলার বিজয় মিছিলের প্রস্তুতিপর্ব শেষ হওয়ার আগে বেলতলার পেঁচোদার বিষয়ে কিছু বলে নেওয়া দরকার। কেননা, পেঁচোদার দুটি ঘটনা বেলতলায় বিখ্যাত, আর ওই দুটি ঘটনা ‘পরে বলা যাবে' বলে আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পারা যাচ্ছে যে, আমাদের বেলতলা দৃশ্যত একটা সাধারণ গ্রাম হলেও তার মধ্যে বিস্তর অসাধারণত্ব আছে। আমাদের বেলতলার একজন অলিখিত অভিভাবক একদা ছিলেন। অত্যন্ত রাশভারী এবং মেজাজি লোক। ভাল নাম ছিল রজনীকান্ত চ্যাটার্জি। তাঁরও একটা ডাকনাম ছিল। সে-নামটা হচ্ছে খাঁদুবাবু। আমরা যখন ক্লাস থ্রি-ফোরে পড়ি তখন ওই খাঁদুদাদুকে দেখলেই পালাতাম। তিনি সবসময় তাঁর ব্যাগের মধ্যে একখানা শব্দকোষ নিয়ে ঘুরতেন। আমাদের মতো ছেলেদের দেখলেই জিজ্ঞেস করতেন, “অ্যাই ছোঁড়া, বল তো 'গয়ংগচ্ছ' শব্দের মানে কী?"

ঠিকমতো বলতে না পারলেই তাঁর হাতের লাঠিটা এসে পড়ত আমাদের পিঠে। একবার খেলার পর তাঁরই পুকুরঘাটে গা ধুচ্ছি তিনি হঠাৎ এসে উপস্থিত হলেন। দৌড়ে পালাবার পথ নেই আমরা জলে, তিনি সিঁড়ির ওপরে। আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, “এই বল দিকিনি, ‘বীতিহোত্র’ কথাটার মানে কী?”

আমরা মানে বলব কী! শব্দটাই তো প্রথম শুনলাম। গৌর বলল, “ওরকম শব্দ আমাদের বইতে নেই।”

" খাঁদুদাদু জলের ওপর লাঠি বাগিয়ে ধরে বললেন, “একেবারে মূর্খ। সারাদিন যাকে মাথার ওপর জ্বলতে দেখছিস তাকে চিনিস না! বীতিহোত্র হচ্ছে অগ্নি অথবা সূর্য। দুটোকেই বোঝায় খাঁদুদাদুর এই শব্দকোষ আমাদের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছিল। তিনি একবার গৌর-নিতাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “রজনী অবসানে দিনমণি উঠিল গগনে” এই কথাটার মানে কী? আগে বল ‘রজনী' মানে কী?”

গৌর একবার নিতাইয়ের দিকে তাকাল। নিতাই আমাদের দিকে। তারপর গৌরই বলল, “এ তো খুব সোজা। রজনী মানে হচ্ছে খাঁদুদাদু, অবসানে মানে আপনি দেহ রাখলে, দিনমণি অর্থাৎ দিনুদা আর মণিদা, উঠিল গগনে মানে আপনার বাড়ির ছাতে উঠে আপনার শ্রাদ্ধের প্যাণ্ডেল করবে।”

এর পর কিছুদিন খাঁদুদাদু গৌর-নিতাইকে আর কোনও শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করেননি। দাদুর নামটি কে ‘খাঁদু’ রেখেছিল, তা আমরা জানি না। অমন সুপুরুষ এবং গৌরবর্ণ চেহারার একজন লোকের নাম খাঁদু, ভাবাই যায় না! সম্ভবত সেই রাগেই কি না জানি না, উনি বেলতলায় কারও সন্তান হলে নিজে যেচে গিয়ে তার ডাকনাম রেখে আসতেন। অপছন্দ হলেও সে-নাম কেউ বদলাতে পারতেন না। এক সময় সেটাই রেওয়াজ হয়ে উঠেছিল বেলতলায়। উনি মারা যাওয়ার পর সেই রেওয়াজ বন্ধ হয়েছে। সেজন্য বেলতলার বহু ছেলের ডাকনাম বড় বিচিত্র ধরনের। কয়েকটা নমুনা দেওয়া যাক। ওঁর দেওয়া নামের মধ্যে আছে, ‘ডুগলে’, ভণ্ডুল’, ‘গেঁড়ি’, ‘নাটু’, ‘পান্তা’, 'খাস্তা', 'হাঁদা', 'শিঙে', ‘ঝিঙে’, ‘ভোলা’, ‘হিংলে’, ‘দেঁতো’। তালিকা দিতে গেলে দীর্ঘ হবে। শুধু একটা বলি, ওই সব্যসাচী মুখার্জি, তাঁর জন্মকালে সামনের কপালটা একটু উঁচু ছিল। নামকরণের সময় কপালের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, জন্মাতে একটু বিলম্ব হলে কপালে শিঙ বেরুত। অতএব, তার নাম শিঙে। পরেশ পালের নাম দেঁতো। তিনি মেয়েদেরও নাম রাখতেন। ওঁরই নাতনি, দেখতে একেবারে পরীদের মতো সুন্দরী। সবাই মুখ দেখে বলেছিল, এ মেয়ে বড় হয়ে পরী হবে। ঠাকুরদা তার নাম রাখলেন, ‘বড়ি’। সব্যসাচীবাবুর মেয়ের নাম রেখেছেন 'ফুলঝুরি'। বিয়ের পর সব্যসাচীবাবুর জামাইয়ের সঙ্গে কথা বলে তিনি বলেছিলেন, 'তোমার নাম সৌমব্রত ঠিক মানাচ্ছে না। তোমার ডাকনাম হওয়া উচিত ‘দোদমা’। আশ্চর্য, আমরা এখনও ফুলঝুরিদির বরকে 'দোদমা-দা' বলেই ডাকি। এই যে 'পেঁচো-দা', এই নামটাও তাঁরই দেওয়া। এক সময় যখন বেলতলায় জনবসতি বাড়ল, তখন দেখা গেল বেলতলায় জনা পাঁচেক 'পেঁচো' নামের লোক আছে। খাঁদুদাদু নিজেই উদ্যোগী হয়ে, পাঁচ পেঁচোকে একদিন একসঙ্গে ডাকলেন। তিনি বললেন, “এক নামে একখানা গাঁয়ে এত লোক থাকলে খুব সমস্যা। তোমাদের নাম বদলাবার আর সময় নেই, নামের আগে একটা করে বিশেষণ দিয়ে দিচ্ছি যাতে চট করে সবাই চিনতে পারে। যার গায়ের রং বেজায় কালো, তার নাম দিলেন 'ব্ল্যাক পেঁচো', যিনি সর্বদাই পান খান, তাঁর নাম হল 'পান পেঁচো', একজন ছিলেন যিনি সবার বাড়ির নারকোল গাছে উঠে নারকোল পেড়ে দিতেন এবং গাছও পরিষ্কার করতেন, তাই তাঁকে দেওয়া হল ‘গেছো পেঁচো' নাম, ‘মাছের দোকান' ছিল বলে আর-এক পেঁচোর নাম হল ‘মেছো পেঁচো'। আর আমাদের আলোচ্য যে পেঁচোদা, তাঁর নাম দিলেন 'শেয়ালখেকো পেঁচো'। কেননা, এই পেঁচোদাকে নাকি আঁতুড় ঘরে শেয়াল পায়ে কামড়ে দিয়েছিল। বিস্তর চিকিৎসা করে পেঁচোদা প্রাণে বেঁচেছেন। এই খাঁদুদাদুই তখন কলকাতা থেকে মোটরগাড়িতে করে লালমুখো এক সাহেব ডাক্তার এনেছিলেন পেঁচোদাকে সারিয়ে তুলতে। এর পর থেকেই কেমন করে জানি না, কৈশোরকাল থেকেই কুকুর, বেড়াল, গরু, মোষ, ছাগল সবার সঙ্গেই পেঁচোদার দারুণ সখ্য। আমরা ছেলেবেলা থেকে পেঁচোদাকে পায়ে হেঁটে বিশেষ যাতায়াত করতে দেখিনি। কখনও মোষের পিঠে চড়ে আইসক্রিম খাচ্ছেন, কখনও গরুর পিঠে বসে এ পাড়া থেকে ও-পাড়ায় যাচ্ছেন। পেঁচোদার একবার চাকরি জুটল গঙ্গাপুরের সুতোকলে। সেটাই পেঁচোদা, মানে শেয়ালখেকো পেঁচোদার প্রথম এবং শেষ চাকরি। বেলতলা থেকে সোজা পথে গেলে দু-আড়াই মাইল। ট্রেনে গেলে মোটে একটা স্টেশন। পেঁচোদা যেতেন বকুলতলার গেঞ্জিকলের মাঠ পেরিয়ে কুসুমপুরের ভেতর দিয়ে। তাতে রাস্তা কিছুটা কমত। প্রথম দিন গেলেন ষাঁড়ের পিঠে চেপে। ওখানে হপ্তায় হপ্তায় মাইনে হত। মাইনে আনতে যাওয়ার দিন যেতেন মোষের পিঠে চড়ে। সেই মোষ একদিন লাল জামা পরা যে-লোকটাকে তাড়া করে নর্দমার মধ্যে ফেলে দিল, সে ছিল সুতোকলের মালিক কেশরীরাম। পেঁচোদা তো মালিককে চিনতেন না। কিন্তু মালিক তো আধঘণ্টার মধ্যেই পেঁচোদাকে চিনে গেলেন। তারপরেই পেঁচোদার চাকরি গেল।

এই পেঁচোদা কালক্রমে ওইসব চারপেয়ে প্রাণীর ডাক্তার হয়ে গেলেন। অনেকেই পেঁচোদার কাছে আসতেন। একবার খাটালের মোষেদের চর্মরোগ দেখা দিল। অর্থাৎ বিশ্রীরকমের দাদ। যাকে বলে মোষেদাদ। ওটা এমনই ছোঁয়াচে যে, মানুষেরও হতে পারে, আর একবার হলে সহজে সারে না। খাটালের যিনি সর্দার, সেই বানার্ড এলেন পেঁচোদার কাছে। সর্দার মানে কিন্তু মালিক নয়। অন্য কর্মচারী ও গরু-মোষদের দেখভাল করার, দুধের হিসেব রাখবার প্রধান ব্যক্তি। ওই খাটালের ম্যানেজার গোছের। তাঁর আসল নাম বাণেশ্বর। খাঁদুদাদু তাঁর নাম দিয়েছিলেন বানার্ড। পেঁচোদা গেলেন মোষের দাদ পরীক্ষা করতে। অর্থাৎ রোগী দেখতে। দেখেটেখে বললেন, “কাল ঊষাকালে, অর্থাৎ সূর্য ওঠবার আগে আধপোয়া মোষের কাঁচা দুধ নিয়ে আমার বাড়িতে এসো।”

পেঁচোদা গাছ গাছড়ার শিকড় আর পাতা বেটে ওষুধ তৈরি করলেন। পেঁচোদা এবং তাঁর পিসি দু'জনেই নানা জলপড়া আর টোটকা দিতেন। পেঁচোদা তো রাত্রে ওষুধ তৈরি করে কুসুমপুরে গেছেন, ‘রাজা হরিশচন্দ্র যাত্রা দেখতে। সকালে বার্নার্ড এলে ওষুধটা পিসিরই দিয়ে দেওয়ার কথা। তখনকার যাত্রা এখনকার মতো আড়াই-তিন ঘণ্টার ছিল না। রাত ন'টায় শুরু হলে শেষ হত পরের দিন সকাল আটটায়। এক-একটা যাত্রাপালায় গানই থাকত বিশ থেকে তিরিশটা। সেজন্যই তখনকার দিনে সবাই বলত ‘যাত্রাগান’। এখনও যাত্রাদলের পুরনো লোকরা আমাদের মতো ‘যাত্রা' বলে না। বলেন 'গান কবে গো? এই তো গেল হপ্তায় কালনায় গান করে এলাম।” পেঁচোদা তো যাত্রা দেখছেন। বানার্ড যখন আধপোয়া মোষের কাঁচা দুধ নিয়ে পেঁচোদাকে ডাকছেন, পেঁচোদা তখন কুসুমপুরে বসে অঝোরে কেঁদে যাচ্ছেন। কেননা, হরিশচন্দ্রের কচি ছেলেকে সাথে কেটেছে। মরা ছেলে নিয়ে শৈব্যা এসেছেন শ্মশানে। শ্মশানের তদারকি করছেন তখন হরিশচন্দ্র স্বয়ং। অদৃষ্টের এমনই দেব, অন্ধকার রাত্রে কেউ কাউকে চিনতে পারছেন না। এমন দৃশ্য দেখে চোখে জল আসাই তো স্বাভাবিক! চৌধুরীপাড়ার বিশে মণ্ডল, বলা বাহুল্য এই বিল্টে নামটাও খাঁদুদাদুর দেওয়া। তা সেই বিল্টেদা খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ। বেশি আবেগ হলে মূর্ছা যান। শৈব্যার দুঃখ দেখে কাঁদতে-কাঁদতে বিল্টেদা মূর্ছা গেছেন। এলিয়ে পড়েছেন পেঁচোদার কোলে। পেঁচোদা জানেন, ঘণ্টাখানেক পরেই বিল্টে আবার উঠে বসবে। অতএব, তিনি থেকে থেকে বিল্টেদার কপালে হাত বোলাচ্ছেন আর বিল্টেদার পকেটে হাত ঢুকিয়ে বিড়ি বের করে বিড়ি খেতে খেতে কেঁদে যাচ্ছেন। ঠিক ওইরকম সময়েই বানার্ড এলেন দাদের ওষুধ নিতে। সঙ্গে আধপোয়া মোষের কাঁচা দুধ। পেঁচোদার পিসি দুধটুকু নিয়ে ওষুধ দিয়ে দিলেন। আধ ঘন্টা পরে এলেন পুবপাড়ার নিতাই সাহা তাঁর আবার অর্শের ব্যামো। তাঁর ওষুধও তৈরি ছিল। এতএব, পেঁচোদার পিসি সেটাও দিয়ে দিলেন। পেঁচোদা স্বপ্নপ্রদও এই ওষুধের জন্য কোনও দাম নিতেন না। পরিবর্তে যা নিতেন, সেটা খুব সামান্য। যেমন মোষের জন্য আধপোয়া দুধ, আর অশের জন্য মাত্র দুটি পাকা কলা। যেহেতু নিতাই সাহার কলাবাগান আছে। বেগুনের ক্ষেত থাকলে হয়তো দুটো বেগুন ওষুধের মূল্য হিসেবে চাইতেন। দুজনেই ওষুধ নিয়ে চলে গেলেন। পেচোদা যাত্রা দেখে বাড়িতে ফিরে পান্তাভাত খেয়ে ঘুমোতে গেলেন। সন্ধ্যার আগেই মস্ত গণ্ডগোল লেগে গেল। খাটালের মোষ দড়ি ছিঁড়ে পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে আর নিতাই সাহা যন্ত্রণা সইতে না পেরে একবার পুকুরে নামছেন একবার মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছেন। গোটা পাড়া ভেঙে পড়েছে ওদের দেখতে একদিকে মোষ, অন্যদিকে নিতাই সাহা। পেঁচোদা বুঝলেন, ওষুধ পালটাপালটি হয়ে গেছে। এরপর থেকে ওষুধ বিতরণের কাজে পিসিকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। রেগে গিয়ে পিসি নিজেই নানা রোগের নিদান দেওয়ার জন্য পাড়ায়-পাড়ায় ঘুরে বেড়াতেন।

পেঁচোদার দ্বিতীয় কীর্তি হাতি চড়ে শ্বশুরবাড়ি যাত্রা। সময়টা ছিল মাঘের মাঝামাঝি। কথায় বলে মাঘের শীত বাঘের গায়। তা তখন তেমনই জব্বর শীত পড়েছিল বেলতলায়। দিন দুই আগে হঠাৎ সারাদিন ধরে বৃষ্টি হল। সঙ্গে উড়ো হাওয়া। একেবারে কনকনে ঠাণ্ডা। ভরদুপুরে চাদর গায়ে বেরুতে হয়। পিসি বললেন, ‘ধন্যরাজার পুণ্য দেশ, যদি বর্ষে মাঘের শেষ।” মানে মাঘ মাসের শেষ দিকে বৃষ্টি হলে সেটা খুব শুভ। তা এই রকম শীতের মধ্যে পেঁচোদার শ্যালিকার বিয়ে ঠিক হল। বউদি, মানে পেঁচোদার বউ তো তিনদিন আগেই চলে গেছেন। বিয়ের দিন সকালে বড় জামাই, মানে পেঁচোদার যাওয়ার কথা। পেঁচোদা সিল্কের পাঞ্জাবি, চওড়া-পাড় ধুতি পরে পান খেতে-খেতে রাস্তায় এলেন। ঠিক সেই সময় অলিম্পিক সার্কাসের একটা হাতি নিয়ে সার্কাসের লোকেরা পাড়ায় এল। প্রতিবারই আসে, এবারও আগে একবার এসেছে। ওরা হাতি দেখিয়ে পয়সা নেয়, বাজার থেকে কুমড়ো, লাউ এসব সংগ্রহ করে, তারপর গ্রামের ভেতরে ঢুকে কলাগাছ সংগ্রহ করে হাতির খাওয়ার জন্য। পেঁচোদার কী মনে হল, কে জানে। তিনি গিয়ে সার্কাসের ছেলে দুটোর সঙ্গে কথা বললেন এবং পাঁচ টাকার বিনিময়ে রাজিও করিয়ে ফেললেন। আমরা দেখলাম পেঁচোদা হাতির পিঠে উঠলেন। সার্কাসের ছেলে দুটোও সঙ্গে-সঙ্গে গেল, তবে হেঁটে। আর পেঁচোদা গেলেন হাতির পিঠে চেপে। হাতির পিঠে চেপে শ্বশুরবাড়িতে রাজা-বাদশারা হয়তো গিয়ে থাকবেন। অন্য কেউ এই সময় গেছেন কি না জানি না। আমরা অনেক দূর পর্যন্ত হাতির পেছন-পেছন গিয়ে ফিরে এলাম। পরের ঘটনা আমরা জানলাম তার পরের দিন। জানা গেল পিসির কাছ থেকেই। '

পেঁচোদা তো হাতির পিঠে চেপে শ্বশুরবাড়ির গেটে পৌঁছলেন। বিয়েবাড়ির দরজার গোড়ায় হাতি দেখে সবার চক্ষু ছানাবড়া। ছেলে, মেয়ে এবং বউরা ছুটে এসে দেখলেন, হাতির পিঠে বসে আছেন তাঁদের বড় জামাই। তিনি মিটিমিটি হাসছেন আর বিড়ি খাচ্ছেন। আর হাতি খিদের তাড়নায় এগিয়ে গিয়ে সদর দরজার সামনে মঙ্গলঘটের সঙ্গে যে কলাগাছ ছিল প্রথমে সেটা খেল। তারপর বাড়ির মধ্যে ঢুকে শুঁড় দিয়ে প্রথমেই টানল কাপড়-জড়ানো একটা বাঁশকে। ওই বাঁশের গায়ে রজনীগন্ধার ফুল টাঙানো ছিল। মড়মড় করে প্যান্ডেল ভাঙল আর সানাই বাজার জন্য প্রধান ফটকের ওপর যে রোশনচৌকি তৈরি হয়েছিল, সেটাও হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। সেইসঙ্গে পড়ল ডুগি, সানাই আর দু'জন বৃদ্ধ বাজনদার। বিয়ের কনেসমেত পেঁচোদার শ্বশুর-শাশুড়ি সবাই বাড়ি ছেড়ে রাস্তা দিয়ে দৌড়চ্ছেন। যিনি পেঁচোদার খুড়শ্বশুরকে বিয়ের আভ্যুদয়িক করাচ্ছিলেন, সেই পুরোহিতমশাই “আমাকে বাঁচান, আমাকে রক্ষা করুন” বলতে বলতে উপায়ান্তর না দেখে পুকুরে গিয়ে ঝাঁপ দিলেন। লোকজনের চিৎকার, ইট-পাটকেলের আঘাত, লাঠির খোঁচা এসব খেয়ে হাতিটা গেছে ক্ষেপে। যত ইঁট হাতির উদ্দেশে মারা হয়েছে তার বেশির ভাগটাই লেগেছে পেঁচোদার গায়ে। শেষে হাতি নিজেই এক ঝটকা মেরে পেঁচোদাকে ফেলে দিল ড্রেনের মধ্যে। আলকাতরার মতো কালো জলে সিল্কের পাঞ্জাবি আর চওড়াপাড়ের ধুতি পরা পেঁচোদা প্রায় ডুবে গেলেন। শরীরের নানা জায়গা ইটের ঘায়ে ফেটে গেছে। অতএব, হাতির তাণ্ডব থামলে পেঁচোদাকে হাসপাতাল ছাড়া আর কোথায়ই বা পাঠানো যায়! পাড়ার অনেকেই পেঁচোদাকে দেখতে সদরের হাসপাতালে গেলেন। এর পর পেঁচোদা আর কখনও হাতির পিঠে সওয়ার হয়েছিলেন কি না সেটা আমরা জানি না।

পেঁচোদা প্রসঙ্গে ইতি টেনে এবার আবার ফিরে আসি বেলতলার ক্লাব প্রাঙ্গণে। বেলতলার বিজয় মিছিল তখন ব্রিজ পেরিয়ে বকুলতলায় ঢুকে পড়েছে। পটকা, রং-মশাল, ব্যান্ড, তাসাপার্টি, শঙ্খধ্বনি আর শ্লোগানের দাপটে বকুলতলার সবাই ঘর ছেড়ে বাইরে এসে গেছেন। মনের দুঃখে ঘুমের ওষুধ খেয়ে যিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, সেই রামকৃষ্ণ সাঁতরাও ঘুম ভেঙে যাওয়ায় এসে দাঁড়ালেন নিজের বারান্দায়। বকুলতলা ক্লাবের কর্মকর্তারা এমন দৃশ্য দেখতে চাননি ঠিকই, তবে দৃশ্যটা যখন তাঁদের নাকের ডগায় এসে গেল, তখন না দেখেও তো উপায় নেই। দৃশ্যটা সবার কাছেই বড্ড করুণ। বিশেষ করে কেষ্ট মিত্তির আর নকুল চৌধুরীর কাছে। মেয়েদের লরিতে উঠে কেষ্ট মিত্তিরের বউ আবির মেখে উলু দিচ্ছে। নকুল চৌধুরীর বউ শাঁখ বাজাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে নকুল চৌধুরী বললেন, “কী বলব! গেল মাসেই ই- সি. জি. করিয়েছি। হার্ট উইক। তবুও শাঁক ফুঁয়ে যাচ্ছে। লরির মধ্যে হার্ট অ্যাটাক হলে বেলতলা দেখবে? আমি কালই আমার ভায়রাকে অ্যাটেম্পট্ টু মার্ডার চার্জে ফেলতে পারি।”

গগন গড়াই পোলাও আর মাংস খেতে-খেতেই উঠে এসে বললেন, “খেলায় ওরা জিততে পারে। কিন্তু পোলাওতে আমরা জিতে গেছি। দারুণ রেঁধেছে পোলাওটা।”

হঠাৎ দেখা গেল, রাস্তার ভিড়ের একপাশে চাদর মুড়ি দিয়ে লায়ন রে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ব্যান্ড বাদ্যের সঙ্গে ঘাড় দুলিয়ে তাল ঠুকছেন। নকুল চৌধুরীর নজর পড়তেই তিনি বললেন, “ওই যে আমাদের কোচ। ব্যাটা তাল ঠুকছে। ওটাকে ধরে ওর সর্বাঙ্গে তারাবাতি লটকে জ্বালিয়ে দিন। ওটাকে ধরুন তো!”

গগন গড়াই বললেন, “আমি কী করে ধরব। আমার হাত এঁটো।”

বাধ্য হয়ে নকুল চৌধুরী নিজেই এগিয়ে গিয়ে ডাক ছাড়লেন, “এই যে লায়ন রে, এদিকে আসুন।” নকুলবাবুকে দেখামাত্র লায়ন রে মাথায় চাদর মুড়ি দিয়ে মেহবুব ব্যান্ড পার্টির মধ্যে ভিড়ে গেলেন।

নকুলবাবু রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “লোকটা একটা শুকনো ছুঁচো।”

এই সময়ে মেয়েদের লরিটা এসে পড়ল নকুলবাবুর সামনে।

বেলতলার একটা ছেলে এসে বলল, “জেঠু, আপনাকে ডাকছে।” নকুলবাবু তাকিয়ে দেখলেন, তাঁর স্ত্রী হাতের ইশারায় তাঁকে ডাকছেন। তিনি লরির সামনে যেতেই নকুলবাবুর ছোট শ্যালিকা লরির ওপর থেকে ঝুঁকে পড়ে তাঁকে আবির মাখিয়ে দিলেন আর নকুলবাবুর স্ত্রী বললেন, “ঠাণ্ডায় দাঁড়িয়ে আছ, মাথায় একটা চাদর দিতে পারো তো! দেখছ না হিম পড়ছে।”

নকুলবাবু মুখে কিছু বললেন না। মনে-মনে বললেন, 'একবার বাড়িতে এসো। রিয়েল দক্ষযজ্ঞ করে ছাড়ব।”

নকুলবাবুর আবির মাখা মুখ দেখে দীনবন্ধু পাঁজা বললেন, “আপনিও আবির মাখলেন! কাকে আর বলব, কার ওপরেই বা ভরসা করব! বকুলতলার লাভার বলতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই।”

গগন গড়াই বলে উঠলেন, "আমি স্যার আবির মাখিনি। আমিও বকুলতলার লাভার।”

নকুলবাবু খেপে গিয়ে বলে ফেললেন, “আপনি পোলাও লাভার। হ্যাংলা কোথাকার! ক্লাবের দুর্দিনে পোলাও গিলছেন। আপনার পেট খারাপ হবে!

নকুলবাবু হনহন করে কোথায় যে চলে গেলেন, সেটা বোঝা গেল না।

বকুলতলা এই অপমান সহজে হজম করতে পারল না। দফায়-দফায় ক্লাবে মিটিং হল। দীনবন্ধুবাবু বললেন, “ওই খেলাধুলো দিয়ে ওদের টাইট করা যাবে না। এমন কিছু একটা ভাবুন যাতে ক্লাবের ছোঁড়াগুলো আর ওই হুমদো কোচটার ওপর ভরসা করতে না হয় ৷ "

শুরু হল ভাবাভাবি। এক-একজন এক-একরকম ভেবে এসে বলেন। কিন্তু কোনওটাই সবার মনে ধরে না। অবশেষে দীনবন্ধু বললেন, “একটা জিনিস হতে পারে।"

সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে জানতে চাইলেন, “কী জিনিস?”

দীনবন্ধুবাবু বললেন, “ক্রিকেট খেলার মতো দু' পাড়ার মধ্যে তীব্র রেষারেষি আছে কালীপুজো নিয়ে। ওরা তুবড়ি প্রতিযোগিতা করে, তাতে ওদের নাম আছে। আর আমাদের নাম আছে ভাসানের শোভাযাত্রায়। এবার ওই শোভাযাত্রাটা এমন করতে হবে, যাতে বেলতলার মানুষ চমকে যায়। এমনই ব্যাপার হওয়া দরকার, যাতে এই শোভাযাত্রার চমকটা সব কিছু ঢেকে দিতে পারে।'

রাকমৃষ্ণবাবু বললেন, “যত গুড় তত মিঠে। টাকা খরচ করলে শুধু চমক কেন, বেলতলাকে ঘাবড়ে দেওয়া যেতে পারে।

নকুলবাবু এই প্রস্তাবে সায় দিয়ে বললেন, “শুধু টাকা নয়, সঙ্গে একটা মাস্টার প্ল্যানও চাই। বিশ্বকর্মাপুজোর পর থেকেই কালীপুজোর প্ল্যানটা নিয়ে নেমে পড়তে হবে। দরকার হলে দুর্গাপুজোর বাজেট কিঞ্চিৎ কমিয়ে দেব।”

গগন গড়াই বললেন, “সে তো এখনও অনেকদিন বাকি! তার আগে কিছু একটা করা যায় না।”

অনেক ভেবে-টেবেও তার আগে জুতসই কোনও উপলক্ষ পাওয়া গেল না ৷ গগন গড়াই তবুও বায়না করছেন দেখে দীনবন্ধুবাবু রেগে গিয়ে বললেন, “আপনার যদি তর না সয় তা হলে এখনই পেছনে লেজ লাগিয়ে হনুমান সেজে বেতলার গাছে-গাছে নেচে বেড়ানগে।”,

অগত্যা গগন গড়াইকে থামতে হল। বছর শেষ হওয়ার পর থেকেই বকুলতলা-ভেতরে-ভেতরে তোড়জোড় করে শুরু করে দিল। প্রস্তুতিপর্ব এমনভাবে চালাতে লাগল, যাতে বেলতলা কিছু টের না পায়। অতএব, বেলতলার কেউ জানতেই পারল না যে, বকুলতলা কতরকম ফন্দি আঁটছে ভেতরে-ভেতরে। ইমিতধ্যে দু' পাড়াতেই অনেকরকম ঘটনা ঘটে গেল। বেলতলার অ্যানুয়াল স্পোর্টসে গৌর-নিতাই একটা নতুন সমস্যা সৃষ্টি করল।"গো অ্যাজ ইউ লাইক'-এ নাম দিয়ে দু' জনেই গৌর-নিতাই সাজল। ব্যাপারটা হল কী, গৌর এসে বলল, আমি নিতাই সেজেছি আর নিতাই বলল, আমি গৌর সেজেছি। বিচারকরা পড়লেন মহা সমস্যায়। পুরস্কার দেওয়ার জন্য কলকতা থেকে এসেছিলেন একজন প্রাক্তন ফুটবলার। তিনি তো গৌর-নিতাই রহস্যের কিছুই জানেন না। তিনি কিছু বুঝতে না পেরে বোকার মতো সবার দিকে তাকাতে লাগলেন। গুরুদাস চাটুজ্যে বললেন, “তোদের আবার সাজাসাজি কী রে! তোরা তো এমনিতেই একরকম।”

কিন্তু গৌর-নিতাই মানতে রাজি নয়। অবশেষে প্রধান অতিথির অনুরোধে ওদের দু'জনকে সান্ত্বনা পুরস্কার দেওয়ার কথা ঘোষণা হতেই ওরা দু'জন থামল। এই ঘটনার কয়েক দিন পর কলকাতা থেকে একজন ম্যাজিশিয়ানকে এনে বেলতলায় ম্যাজিক-শো হল। প্রোফেসর ছোট্টেলাল হচ্ছেন সেই ম্যাজিশিয়ান, যিনি মঞ্চের ওপর হাতি-ঘোড়া উধাও করতে পারেন, কালো রুমাল থেকে সাদা পায়রা বের করতে পারেন এবং মঞ্চের ওপর পেট কেটে দেখাতে পারেন। তাঁর এতই নামডাক যে, তিনি বছরে একবার করে বিদেশে যান খেলা দেখাতে। তা সেই ছোট্টেলাল এলেন বেলতলায় জাদু দেখাতে। আমরা গিয়ে বসলাম একেবারে প্রথম সারিতে। আমাদের পেছনেই ক্লাবের কর্মকর্তারা বসে। ছোট্টেলাল এক-একটা করে খেলা দেখান, আর আমরা চমকে-চমকে উঠে হাততালি দিই। কেউ-কেউ বলেন, পি সি সরকারের পর এত ভাল খেলা আর কেউ দেখাতে পারেন না৷ "

টোপাদা বলেন, “আমি টোকিয়োতে একজনের খেলা দেখেছিলুম, তিনি দর্শকদের পর্যন্ত ভ্যানিশ করে করে দিতে পারতেন। "

টোপাদার কথায় কেউ কর্ণপাত করলেন না। তিনি তাঁর মতো বলে যেতে লাগলেন। পর-পর কয়েকটা খেলা দেখিয়ে ছোট্টেলালজি বললেন, “এবার আমি শুরু করব, আমার মোস্ট ফেভারিট আইটেম, মোস্ট একসাইটিং শো, আমি কলকাতা, বোম্বাই, দিল্লি এবং বিদেশের মঞ্চে এই খেলাটা দেখিয়ে থাকি হাতি অথবা ঘোড়া দিয়ে। এখানে হাতি-ঘোড়া আনাটা খুবই ব্যয়সাপেক্ষ বলে ওগুলো আনা যায়নি। তাই বলে খেলাটা থেকে আপনাদের বঞ্চিত করব না। এটাকে বলা হয় 'ভ্যানিশিং পাওয়ার'। যে-কোনও জিনিস আপনাদের চোখের সামনে ভ্যানিশ, মানে উধাও করে দেব। হাতি-ঘোড়ার বদলে মঞ্চে মানুষ ১২৪

ভ্যানিশ করব। এখানে তেমন সাহসী কেউ আছেন যিনি মঞ্চে উঠে আসতে পারেন? যিনি আসবেন তাঁকেই ভ্যানিশ করে দেব। এনিবডি অ্যাকসেপ্ট মাই প্রপোজাল? প্লিজ কাম, কাম অন দ্য স্টেজ। ”

সবসাচী মুখার্জি টোপাদাকে বললেন, “টোপাদা, আপনি যান৷ ”

টোপাদা বললেন, “নো, থ্যাঙ্কস! জীবনের অনেক কটা দিন আন্ডার দ্য ব্রহ্মপুত্র রিভারে ভ্যানিশ হয়েই ছিলাম। ”

ছোট্টেলালজি ডাকতে থাকেন কিন্তু কেউ উঠে যায় না। ছোট্টেলালজি কয়েকবার ডাকাডাকি করে বললেন, “বেলতলায় দেখতে পাচ্ছি সাহসী যুবকের অভাব। বাধ্য হয়ে আমাকে আমার দলের লোক নিয়েই খেলাটা দেখাতে হবে। নাউ মাই ফাইনাল কল, এনি বডি কাম অন দ্য স্টেজ। ”

ছোট্টেলালজির ফাইনাল কল শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই গৌর উঠে গিয়ে স্টেজে দাঁড়াল। দর্শকরা হাততালি দিলেন। ছোট্টেলালজিও জোরে-জোরে তালি বাজিয়ে বললেন, “মনে হচ্ছে তুমি খুব সাহসী। এই খেলাটা একটু সাহসের খেলা। তুমি যদি ভয় পাও অথবা ঘাবড়ে যাও তা হলে তোমার জীবন নিয়ে টানাটানি হতে পারে। এখনও ভেবে দ্যাখো। ' "

গৌর বলল, “ভেবে-টেবেই তো এলাম। আপনিও সাহস সঞ্চয় করুন। " "

গৌরের কথায় সবাই হেসে উঠল। ছোট্টেলালজি কিঞ্চিৎ বিব্রত বোধ করলেন। এবার শুরু হল ছোট্টেলালজির লেকচার। তারপর এল একটা কাঠের বাক্স। সেই বাক্সটা খুলে সবাইকে দেখিয়ে দিয়ে তার মধ্যে চোখ বেঁধে গৌরকে ঢুকিয়ে বাক্সটা বন্ধ করে দিলেন। ওই কালো রঙের বাক্সটা ঢেকে দিলেন কালো রঙের একটা চাদরে। এবার আলোটা কমে গিয়ে ছোট্টেলালজির মুখের ওপর ফোকাস করল। ছোট্টেলালজি হাত-পা নেড়ে, জাদুদণ্ড নাচিয়ে বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। এবার বাজনা বেজে উঠল। কয়েকজন ছেলে-মেয়ে ঝলমলে পোশাকে নাচতে-নাচতে মঞ্চে এল। দীর্ঘ একখানা কালো চাদর ধরে মঞ্চের ওপর টানাটানি করল। তারপর তারা চলে গেল।

" এবার ছোট্টেলালজি বললেন, “আপনাদের সবার সামনে এই বাক্সের মধ্যে চোখ বেঁধে একটি ছেলেকে রাখা আছে। আমি জানি না, এখন তার অবস্থা কেমন। ঈশ্বর তাকে ভাল রাখুন। এইরকম আর কিছুক্ষণ ভয় ধরানো কথাবার্তা বলার পর বাক্স খুলে দেখা গেল, ওর মধ্যে গৌর নেই। সবাই তো হতচকিত! ছোট্টেলালজি বললেন, “ছেলেটি কোথায় গেছে আমি জানি না। উধাও করে দিয়েছি এটা তো দেখলেন। ছেলেটি, আহা, সেই সাহসী বেচার এখন এখান থেকে সাতশো মাইল দূরে এক গভীর অরণ্যে চোখ বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব, কিন্তু সেই চেষ্টা কার্যকর হবে কি না জানি না।”

ছোট্টেলালজির কণ্ঠস্বরে বেদনা উপচে পড়তে লাগল। তিনি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বলা হল না। তার আগেই দর্শকদের মধ্যে থেকে নিতাই উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আপনাকে সার কষ্ট করতে হবে না। আমি এসে গেছি।”

নিতাই এগিয়ে এসে মঞ্চে দাঁড়াল। এবার ছোট্টেলালজি নিজেই ঘাবড়ে গিয়ে নিতাইকে আপাদমস্তক দেখতে-দেখতে বললেন, “তুমি! বেরোলে কেমন করে? বাক্স তো তালা দেওয়া। কে তুমি?”

নিতাই এবার বকাসুরবধ পালার বকাসুরের মতো জোরে জোরে হেসে উঠে বলল, "যে বাক্সের মধ্যে আছে আমি তার আত্মা।"

ছোট্টেলালজির অবস্থা তখন শোচনীয়। তাঁর তিরিশ বছরের ম্যাজিক লাইফে এমন ম্যাজিক তিনি কখনও দেখেননি। স্বভাবতই তিনি ঘামতে লাগলেন। তিনি কলকাতার ম্যাজিশিয়ান। বোম্বে-দিল্লি গেছেন, রোম-টোকিয়ো ঘুরেছেন, কিন্তু বেলতলায় তো আগে কখনও আসেননি। আর আসেননি বলেই গৌর-নিতাইয়ের খোঁজও তিনি জানেন না। তিনি গৌরকে বাক্সবন্দি করেছেন। নিতাই তো তখনও দর্শকদের মধ্যে বসে। আবার একই পোশাকে সজ্জিত নিতাই গিয়ে মঞ্চে দাঁড়াতেই ছোট্টেলালজি ঘামতে লাগলেন। এরকম একটা কাণ্ড যে গৌর-নিতাই করবে বা করতে পারে, তার একটা মিনি মহড়া আমাদের সঙ্গে দেওয়া ছিল বলে আমরা একবিন্দুও অবাক হইনি। ওই মহড়ার শিক্ষা অনুসারে আমরা চিৎকার করে বলতে লাগলাম, “ভ্যানিশ করলেন আপনি আর গৌর ফিরে এল নিজে-নিজেই। এটা কেমন হল?”

ছোট্টেলালজির অবস্থা তখন খুবই খারাপ। তিনি মঞ্চের ভেতরে গেলেন। নিতাইকে তখন আর কে আটকাবে? সেও পেছন-পেছন গেল। গিয়ে দেখে যে-বাক্সে ঢোকানো হয়েছিল সেই বাক্সে গৌর তেমনই রয়েছে। ম্যাজিকের কারসাজিতে বাক্সোটা শুধু বদল করা হয়েছে। মঞ্চের পেছন থেকে আমরা নিতাইয়ের গলার আওয়াজ পাচ্ছিলাম। নিতাই চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে বলছে, “ভ্যানিশ কোথায় হল। এ তো বাক্স বদল।”

ছোট্টেলালজি আর মঞ্চেই এলেন না। তাঁর সহকারী মাস্টার পাপ্পু জানালেন, “সার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অতএব, আজকের শো এখানেই শেষ করে দিতে হচ্ছে বলে আমরা গভীর দুঃখিত।”

বেলতলার দর্শকরা কিন্তু মোটেও দুঃখিত বোধ করল না। তারা তো ম্যাজিকের ডবল মজা উপভোগ করে বেজায় খুশি। গুরুদাস চাটুজ্যে বললেন, “বেচারা ছোট্টেলালজি, পুরো টাকাটা না নিয়েই কলকাতা চলে গলেন।” এর পর থেকে অনেকদিন পর্যন্ত ছোট্টেলাল তো দূরের কথা, কোনও লালই আর ম্যাজিক দেখাতে বেলতলায় আসেননি।

এইরকম ছোট-ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে দিন গড়িয়ে যেতে-যেতে বছর ঘুরে আবার কালীপুজো এসে গেল। এবারের কালীপুজোতে দু' পাড়াতেই সাজ-সাজ রব। বকুলতলা তো বেলতলাকে টেক্কা দেওয়ার জন্য বিশ্বকর্মাপুজোর পর থেকেই কাজে নেমে পড়েছে। এবার সত্যি-সত্যি এসে গেল টেক্কা দেওয়ার দিন। খেলার মাঠে পর-পর তিনবার হেরে যাওয়ার দুঃখটা এবার সুদে-আসলে তুলতে চায় বকুলতলা।

॥ ৭ ॥

কালীপুজো উপলক্ষে বেলতলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল বিরাট তুবড়ি প্রতিযোগিতা। বহু বছর থেকে এটা হয়ে আসছে। কালীপুজোর পরের দিন মণ্ডপের সামনে খাঁদুবাবুর মাঠে এই প্রতিযোগিতা হয়। আমরা জন্মাবার পর থেকেই দেখে আসছি। অনেক দূর-দূর থেকে তুবড়ি নিয়ে প্রতিযোগীরা আসেন। দুটো বাঁশ জোড়া দিয়ে লম্বা করে পোঁতা হয়। তার গায়ে মোটা কাগজ, অর্থাৎ পিচবোর্ডে নম্বর লিখে বাঁশের গায়ে পেরেক দিয়ে লটকে দেওয়ার ব্যবস্থা। খাঁদুবাবুর ছাতের ওপর বসেন বিচারকরা। আমাদের এই বছর কাজ ছিল তুবড়ির ফুল ওপরে ওঠার পর টর্চ মেরে দেখা কোনটা কত নম্বর পর্যন্ত উঠল। এই হাইট দেখেই ফার্স্ট, সেকেন্ড প্রাইজ দেওয়ার নিয়ম। আমাদের বারোয়ারিতে তুবড়ি জ্বালার কাজটা তিনপুরুষ ধরে করে আসছে ভণ্ডুলরা। একটা তুবড়ি নিবে আসার পর, ওর থেকেই নতুন তুবড়ি জ্বালিয়ে নেওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা আছে ভণ্ডুলের। এখানে প্রতিযোগীদের নাম মাইকে ডাকা হয়, তারপর তার তিনটে তুবড়ি জ্বালিয়ে সবচেয়ে বেশি যেটা উঠেছে সেই নম্বরটা খাতায় লেখা হয়। একই লোক নানা নামে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন বলে নানারকম নাম ব্যবহার করেন। মাইকে যখন সেইসব নাম ঘোষণা হয়, তখন শুনলেই বোঝা যায় শুধু বেলতলার খাঁদুদাদুই নন, নানা পাড়াতেও বুঝি একজন করে খাঁদুদাদু আছেন। নামগুলো সাধারণত ঘোষণা করতেন গুরুদাসবাবু। গত বছর থেকে সেই দায়িত্বটা যেচেই নিজের কাঁধে নিয়েছে গৌর আর নিতাই। গৌর-নিতাই বেলতলা, বকুলতলা অথবা কুসুমপুরের কোনও চেনা লোকের নাম পেলে তার সঙ্গে একটা বিশেষ পরিচয় যোগ করে দেয়। যার নামের সঙ্গে সেটা যোগ করত, তার কেমন লাগত জানি না। কিন্তু অন্যরা খুব মজা পেতো। আর নামও জোটে বড় বিচিত্র ধরনের। গত বছর গৌর-নিতাই কেমন করে নাম ডাকছিল, তার একটু নমুনা পেশ করা যাক। মাইকে ওরা বলতে আরম্ভ করে, “ঘৃতগন্ধী চন্দ, চন্দননগর। আদিত্য পারুই, ওরফে পচা পটল, বেলতলা বাজার, কার্তিক ঘোষ ওরফে কোকাই কার্তিক, বকুলতলা। বদ্যিনাথ দাস, ওরফে চারাপোনা, বেলতলা মেছোপট্টি। পেঁচো মণ্ডল, ব্ল্যাক, বেলতলা। ফাটা কালী ঘোষ, বকুলতলা। অনিমেষ চক্রবর্তী ওরফে বককণ্ঠ, চৌধুরীপাড়া। ব্রজদুলাল ওরফে বদনা, কুসুমপুর।"

এই ‘ওরফে’ দিয়ে যে নামগুলো বলা হয়, তারও ছোট-ছোট ইতিহাস আছে। ‘পচা পটল' মানে ওর পটলের দোকান, ‘কোকাই কার্তিক' মানে সবসময় সেজেগুজে ফিটফাট থাকে বলে, ‘চারাপোনা’ অর্থাৎ বেলতলা বাজারে ও রোজ চারাপোনা বিক্রি করে। গলাটা বকের মতো বেশি লম্বা বলে ‘বককণ্ঠ’। বদনার দোকান বলে ‘বদনা'। ব্ল্যাক পেঁচোদার কথা তো আগেই বলা হয়েছে। ‘ফাটা’ তো খুবই সোজা। তিনবার মাথা ফেটেছিল আর সেই দাগ মেলায়নি বলে কালী ঘোষের নাম ‘ফাটা'। এই নাম-মাহাত্ম্যে গৌর-নিতাইয়ের বড় অবদান মধু পালের ছেলে সুশান্ত আর সুনুদার ভাইপো বিশ্বজিতের নব নামকরণ। সুশান্ত পরীক্ষার সব বিষয়ে পাশ করে বটে, কিন্তু এগ্রিগেডে ফেল করে আটকে যায়। তাই দেখে মধু পাল এগ্রিগেড পড়ানোর জন্য একজন শিক্ষকের খোঁজে স্কুলে গিয়েছিলেন। সেটা গৌর-নিতাই জানত বলে সুশান্তর নামের সঙ্গে ওরা ঘোষণা করেছিল, ‘সুশান্ত পাল, ওরফে এগ্রিগেড পাল'। আর সুনুদার ভাইপো বিশ্বজিৎ একবার ঠাকুমার চ্যবনপ্রাশ খেতে গিয়ে ঠাকুর্দার আফিং খেয়ে হাসপাতালে গিয়েছিল। সেইজন্য ওকে বলা হত ‘আফিংখোর'। যেমন সবসময় হাসতেন বলে অশোক চৌধুরীকে খাঁদুদাদু নাম দিয়েছিলেন দত্তকৌমুদী। অতএব, গৌর-নিতাইও মাইকে ডাকত, “অশোক চৌধুরী ওরফে দত্তকৌমুদী, আপনার তুবড়ি অবিলম্বে জমা দিন।”

বলা বাহুল্য, বেলতলায় এই তুবড়ি প্রতিযোগিতাটা ছিল বেশ জনপ্রিয় একটা ব্যাপার। অনেক লোক সন্ধ্যা থেকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে রাত্রি দশটা পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতা দেখত। বকুলতলার কেষ্ট মিত্তির বললেন, “এবার ওই তুবড়ি প্রতিযোগিতায় একটা কাণ্ড বাধাবো। এঁড়েদা থেকে এক বন্ধুকে আনছি নাম দেওয়ার জন্য। দেখবেন কী হয়!”

কী যে হবে, সেটা বকুলতলার কেউ জানতেন না। প্রতিযোগিতা যখন চলছে তখন গৌর-নিতাই ঘোষণা করল, “এখন এঁড়েদার ঘনশ্যাম ভাণ্ডারীর তুবড়ি জ্বালানো হচ্ছে। ইনি এই প্রথমবার বেলতলার তুবড়ি প্রতিযোগিতায় নাম দিলেন বলে তাঁকে অভিনন্দন। আমাদের পক্ষ থেকে তুবড়ি জ্বালাচ্ছেন ভণ্ডুল দাস।”

কেষ্ট মিত্তির ফিসফিস করে গগন গড়াইকে বললেন, “এই ঘনশ্যাম হচ্ছে আমার লোক। দেখবেন এইবার কী হয়!”

ঘনশ্যামের তুবড়ি জ্বেলে দেওয়ার পর যেই না তুবড়ি সোজা করে বসিয়েছে, অমনই বিকট আওয়াজ করে তুবড়িটা ফেটে গিয়ে তুবড়ির খোলের টুকরো তীরবেগে ছুটে গেল চারদিকে। মাঝে-মধ্যে তুবড়ি ফাটে, তবে সেটা অন্য জিনিস, আর এটা হল গিয়ে একেবারে বিস্ফোরণ। ভাগ্য ভাল যে, এতে কেউ আহত হয়নি। কিন্তু হতে পারত। তুবড়ির খোল ফেটে যে টুকরোটা রাখাল বিশ্বাসের চশমায় লেগেছে, সেটা চশমা না থাকলে নির্ঘাত চোখে ঢুকে যেত। চারদিকে হইচই পড়ে গেল। কেউ কেউ দৌড়োদৌড়ি করতে গিয়ে অবস্থাটা আরও জটিল করে ফেললেন। আমরা তো ছাতের ওপর। ওখান থেকে গুরুদাস চাটুজ্যে ক্রমাগত মাইকে বলে যাচ্ছেন, “আপনারা ভয় পাবেন না। ছোটাছুটি করে অবস্থাটাকে আয়ত্তের বাইরে যেতে দেবেন না। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা অবস্থার মোকাবিলা করছে।" স্বেচ্ছাসেবকরা আর কী করবে! তারাও তো ছোটাছুটিতে ব্যস্ত। কাজের কাজ যতটুকু করার, সেটা করেছে ওই ভণ্ডুল। তিন পুরুষ থেকে ওরা তুবড়ি জ্বালিয়ে আসছে। বসন তুবড়ি, উড়ন তুবড়ি, সুতো প্যাঁচানো বোমা, সুতোর মাঞ্জা, ঘুড়ি তৈরি, মাছের চার তৈরি করা এসব কাজে এ-তল্লাটে ওদের জুড়ি নেই। তুবড়িটা বোমার মতো ফাটতেই ভণ্ডুল ফাউল, ফাউল বলে চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ঘনশ্যামের ওপর। ধরেও ফেলেছিল, কিন্তু গায়ের জোরে এঁটে উঠতে না পারায় ঘনশ্যাম পালিয়েছে বটে, কিন্তু ভণ্ডুলের হাতে থেকে গেছে ঘনশ্যামের শালের চাদরটা।

আধ ঘণ্টার মধ্যে অবস্থা শান্ত হতেই আবার তুবড়ি জ্বালানো শুরু হল। গগন গড়াই ফিসফিস করে বললেন, “ছিঃ এটা ঠিক হয়নি। এ তো শুধু ফাউল নয়, এটা ফাউল, হ্যান্ডবল, অফসাইড সব একসঙ্গে। নকুলবাবু জানতে পারলে আপনাকে যাচ্ছেতাই করে বলবেন।”

কেষ্ট মিত্তির অপরাধীর ভঙ্গিতে বললেন, “ওই ঘনা যে বোনা ফাটাবে, তা তো বলেনি। ও বলেছিল, আগুন দেওয়ার পর তুবড়িটা জ্বলতে-জ্বলতে হুশ করে ওপরে উঠে গিয়ে ফাটবে আর তাতে দেখা যাবে একটি ফুলের মালা আর ওই মালার মধ্যে বকুলতলা স্পোর্টিং ক্লাবের নাম লেখা। ওটা ভাসতে ভাসতে এক সময় মিলিয়ে যাবে। এমন হবে জানলে ওকে থোড়াই এখানে আনি! আফটার অল, এটা তো আমার শ্বশুরবাড়ির পাড়া।”

এবার মাইকে গৌর-নিতাইয়ের গলা শোনা গেল, “ঘনশ্যাম ভাণ্ডারীর ভাণ্ড ফেটে যাওয়ার পর আবার তুবড়ি জ্বালানো হচ্ছে। ঘনশ্যামের বাকি দুটি তুবড়ি ভণ্ডুল দাস বাজেয়াপ্ত করেছেন। তিনি আপাতত পলাতক। তবে তাঁর একটি শালের চাদর পলায়নকালে ভণ্ডুল কেড়ে নিয়েছেন। ভাণ্ডারীবাবু অথবা তাঁর কোনও লোক যদি ভিড়ের মধ্যে আত্মগোপন করে থাকেন, তা হলে উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে চাদরটি নিয়ে যান। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, তাঁর মস্তকে পাঁচটি গাঁট্টার বেশি, আর কোনও শাস্তি দেওয়া হবে না। আমাদের পক্ষ থেকে গাঁট্টা দেবেন বেলতলার গাঁট্টা-সম্রাট, আমাদের শ্রদ্ধেয় গাঁট্টা কিং শ্রীযুক্ত গাঁট্টাদা।”

আমাদের পাড়ার নরেশ মণ্ডলকে আমরা 'গাঁট্টাদা' বলে ডাকতাম। তিনি ঘুষি মেরে নারকোল ফাটাতেন এবং এক গাঁট্টায় কাঁচা বেলও ফাটিয়ে দিতে পারতেন। মোক্ষম গাঁট্টা মারতে পারতেন বলে ওই খাঁদুদাদুই নরেশদার একটু বেশি বয়সে নাম দিয়েছিলেন ‘গাঁট্টা’। গৌর-নিতাইয়ের ঘোষণা শুনে গগন গড়াই বললেন, “যান কেষ্টবাবু, ভাণ্ডারীর প্রতিনিধি হয়ে শাল নিয়ে আসুন আর নরেশের গাঁট্টা খেয়ে আসুন।

এর দু' দিন পরে বেলতলার কালীঠাকুর ভাসানে গেল। একই দিনে বেলতলা আর বকুলতলার ঠাকুর ভাসানে যায় না।

বেলতলার একদিন পর বেরুল বকুলতলার বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। সত্যিই দেখবার মতো ব্যাপার! প্রথমেই সুসজ্জিত একটি হাতি। তার ওপর মখমলের চাদর। হাতির পেছন পেছন পায়ে হেঁটে আসছেন বকুলতলার মানুষ। তারপর রাজাবাজার থেকে ভাড়া করে আনা সাদা ঘোড়ায় টানা একখানা গাড়ি, যা দেখতে ঠিক রথের মতো। সেই রথ আবার ফুলে সাজানো। দু' পাশে বাতি স্তম্ভ। ওরকম রথাকৃতির গাড়ি এখন তো অবাঙালিদের বিয়েতে যথেষ্ট দেখা যায় কলকাতায়। কিন্তু বকুলতলার মানুষের কাছে সেটাই ছিল প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা। ওই রথাকৃতির গাড়ির মধ্যে একটি নটরাজের মূর্তি। তারপর আলোকসজ্জা, তারপর লরিতে কালী-মা, লরির পেছনে ধুনুচি নিয়ে আরতি, বাংলা বাদ্য, তারপর আবার লরিবোঝাই লোক, ব্যান্ডপার্টি, শঙ্খধ্বনি, আলোর মালা, এসব করে মিছিলটা এতই লম্বা যে, হাতি যখন বেলতলার ব্রিজের ওপর, শোভাযাত্রার শেষ মাথা তখনও রওনাই দেয়নি ৷ শোভাযাত্রার শেষ মাথা যখন ব্রিজের ওপর, হাতি তখন গজেন্দ্ৰ গমনে গিয়েও পৌঁছে গেছে বেলতলার বারোয়ারি মণ্ডপের সামনে। অঙ্কের হিসেবে ধরলে শোভাযাত্রাটা প্রায় সওয়া মাইল লম্বা। এত দীর্ঘ এবং এত জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা বেলতলা তো বটেই, এই জেলার কেউ কখনও দেখেনি। রাস্তা থেকে, ছাতের ওপর থেকে যারাই দেখে, তারাই বকুলতলার নামে ধন্য ধন্য করতে থাকে। যাদের বয়স অল্প, তারা তো দোকানের ছাতে কি গাছের ডালে উঠে বসে আছে বকুলতলার শোভাযাত্রা দেখবে বলে। মিছিলের পুরোভাগে আছেন গগন গড়াই, কেষ্ট মিত্তির, লায়ন রে, রামকৃষ্ণ সাঁতরা সহ আরও কয়েকজন। মিছিলের একেবারে শেষে আছেন নকুল চৌধুরী, দীনবন্ধুবাবু, উমাপদ মুখার্জি আর দেবু হালদাররা। এরই মধ্যে গগনবাবু এসে জানিয়ে গেছেন, বেলতলার চোখ ছানাবড়া। নিজের হাত থেকে ব্রিজের ওপর হাতি দেখেই সব্যসাচী মুখুজ্যে আর গুরু চ্যাটার্জির মাথায় হাত। গোটা মিছিলটা দেখলে ওরা বোধ হয় ডুকরে কেঁদে উঠবে।

নকুলবাবু বললেন, “আমরা দেখাতে চাই, কাউকে কাঁদাতে চাই না।”

গগনবাবু এর সঙ্গে যোগ করলেন, “যদি কেউ কেঁদেও ফেলে, তাতে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা তো কারও চোখের জল মোছাবার বায়না নিইনি।”

মিছিল যথাসময়ে এগিয়ে যেতে লাগল। লায়ন রে সেই ক্রিকেট কোচের পোশাকটাই পরেছেন। গলায় আবার একটা বাঁশি ঝুলছে। হাতি এসে দাঁড়াল বারোয়ারি মণ্ডপের সামনে। লায়ন রে বাঁশি বাজিয়ে ইঙ্গিত করলেন আস্তে-আস্তে ওদের আসতে দিন। হাতির পেছনে লম্বা গ্যাপ থেকে যাচ্ছে।

কেষ্ট মিত্তির বললেন, “ওটা হাতিওয়ালাই বলেছে। হাতির গায়ে গায়ে যেন লোক না থাকে। একটু গ্যাপ দরকার।"

বারোয়ারিতলায় ইচ্ছে করেই ওঁরা একটু দেরি করলেন। লায়ন রে বললেন, “বেলতলার হাতিদর্শন হোক। আরও একটু ভাল করে দেখুক। হাতি তো খুব শান্ত প্রাণী।"

বারোয়ারি মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল গৌর-নিতাই। একেবারে গোবেচারা ভঙ্গি। লায়ন রে ঘুরে-ঘুরে বাঁশি বাজিয়ে মিছিলের তদারকি করছিলেন। হঠাৎ একটা বাক্স বোমা গড়িয়ে এসে পড়ল হাতির শুঁড়ের কাছে, আর একটা পেটের কাছাকাছি। পড়ল এবং কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে ফাটল। যেই না শব্দ করে বাক্স বোমা দুটো ফাটল, অমনই, হাতি মুখ ঘুরিয়ে উলটো দিকে দৌড়তে আরম্ভ করল। মিছিল আসছে বকুলতলা থেকে বেলতলার দিকে, আর হাতি দৌড়চ্ছে বেলতলা থেকে বকুলতলার দিকে। পদযাত্রীরা যে যার-যার মতো পারলেন দৌড় লাগালেন। মিছিলের শেষভাগে যাঁরা, তাঁরা তখনও হাতিকাণ্ডের খবর পাননি। হঠাৎ নকুল চৌধুরী দেখলেন উলটো দিক থেকে পরিত্রাহি চিৎকার করতে-করতে লোক ছুটে আসছেন, বকুলতলার দিকে। যাঁরা ছুটে আসছেন তাঁদের মধ্যে লায়ন রে-ও একজন।

এদিকে হাতি তো ভয় পেয়ে গিয়ে দৌড় শুরু করেছে। হাতি গিয়ে সুসজ্জিত রথাকৃতির গাড়ির গায়ে এক গুঁতো মারতেই লাগাম ছিঁড়ে ঘোড়াটাও ছুটতে আরম্ভ করেছে বকুলতলার দিকে। ঘনশ্যাম ভাণ্ডারীর বাজেয়াপ্ত করা তুবড়ি দুটো ছিল ভণ্ডুলের কাছে। ভণ্ডুল দেখল হাতি আসছে তাদের দোকানের দিকে। বাধ্য হয়ে ওই বাজেয়াপ্ত করা তুবড়ি দুটোতে আগুন লাগিয়ে একটা ছুড়ল হাতির দিকে, অন্যটা ঘোড়ার দিকে। দুই বোমা-তুবড়িতেই হাতি-ঘোড়া সুসজ্জিত বর্ণাঢ্য মিছিলের বর্ণ নিংড়ে নিয়ে এমন এলোপাথাড়ি ছোটাছুটি আরম্ভ করল যে, মুহূর্তের মধ্যে দক্ষযজ্ঞ লেগে গেল। কেউ চ্যাঁচাচ্ছে “বাবা গো,” কেউ বলছে “হাতিতে খেয়ে ফেলল রে,” কেউ-বা ভয় পেয়ে কেঁদে উঠছে “হরি হে, তুমি কোথায়?”

ব্যান্ডপার্টি আর বাংলা বাদ্যের লোকদের কষ্টটা বেশি হল। ওরা তো বাজনার ঘোরে আর শব্দে চিৎকার-চেঁচামেচি তেমন শুনতে পায়নি। যখন খেয়াল হল, তখন একেবারে হাতির শুঁড়ের নাগালের মধ্যে। মিছিলের শেষভাগটা তখনও ভাল করে বেলতলার ব্রিজ পেরিয়ে বকুলতলার সীমানায় পা রাখতে পারেনি, অথচ অবস্থা বেগতিক দেখে তাঁরাও উলটো মুখো দৌড়ে বকুলতলায় চলে এলেন। মিনিট দশ বারোর মধ্যে রাস্তা ফাঁকা। ফাঁকা রাস্তায় লরির ওপর মা কালী একা দাঁড়িয়ে। তাঁর ভক্তবৃন্দ হাতি আর ঘোড়ার ওই দৌড় দেখে লরি থেকে লাফিয়ে নেমে পালিয়ে গেছেন।

আরও খানিক পরে গৌর-নিতাই আর বেলতলার আরও কয়েকজন গিয়ে নকুল চৌধুরীকে বলল, “নকুকাকা, মা-কালী ফেলে তো সবাই পালিয়ে গেছে। লরির ড্রাইভারও নেই। ‘মা’কে তবে আমরাই কাঁধে করে গঙ্গায় দিয়ে আসি।”

নকুলবাবুর কথা বলার ক্ষমতা নেই। থানার ফোন পেয়ে তিনি বুঝেছেন, ব্যাপারটা ভাল হয়নি। জনবহুল রাস্তায় হাতি-ঘোড়া নিয়ে মিছিল করার আগে থানার লিখিত অনুমতি দরকার ছিল। তিনি থানার দারোগাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন, “আজ্ঞে, কোনও বাজে লোক পটকা ফাটানোর ফলে এরকম হয়েছে। মাইকে আবেদন করা সত্ত্বেও যদি কেউ এই কাণ্ড করে, তবে তাকে কী বলা যায় বলুন তো?”

দারোগা বলেছেন, “আপনাকেই বা কী বলব! কালীপুজোর ভাসানে পটকা-বোমা এসব ফাটবে না তো কি ঘুড়ি উড়বে? এরকম রিস্ক নেওয়াই উচিত হয়নি। এদিকে ঘোড়ার লোক থানায় বসে আছে, তার ঘোড়া নাকি পাওয়া যাচ্ছে না।”

নকুলবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মা না হয় লরির ওপর আরও খানিকক্ষণ বিনা প্রতিবাদে অপেক্ষা করতে পারবেন। কিন্তু ঘোড়াওয়ালা, তো থানায় গেছে নালিশ করতে। হাতিও নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। গৌর-নিতাই আর এই সুনু, তোমরা গিয়ে হাতি আর ঘোড়াটার সন্ধান করো। মরা হাতি লাখ টাকা, জ্যান্ত হাতির জন্য না জানি কত চার্জ করবে!”

হাতি-ঘোড়া খুঁজে পেতে অবশ্য বেশি বেগ পেতে হল না। তাদের উদ্ধার করা হল যথাক্রমে হালদারদের বাগান আর গোশালার মাঠ থেকে। কিন্তু তারপরও উদ্ধারকার্য চলল। গগন গড়াইকে উদ্ধার করা হল ভণ্ডুলদের ডোবা থেকে, লায়ন রে-কে নামানো হল ইলেকট্রিক অফিসের ম‍ই থেকে। ইলেকট্রিক অফিসের মই খুব লম্বা-লম্বা হয়। মিছিল রওনা দেওয়ার আগে লাইটপোস্টের গায়ে ওটা দাঁড় করানো ছিল। প্রথমে হাতি, পরে ঘোড়ার দৌড় দেখে ঘাবড়ে গিয়ে লায়ন রে দৌড়ে মই বেয়ে ওপরে উঠেছিলেন। বেশ কিছুটা তড়বড়িয়ে ওঠবার পর বুঝলেন ম‍ই হড়কে যাচ্ছে। যে-কোনও মুহূর্তে উঁচু থেকে তিনি রাস্তায় অথবা নর্দমায় পড়ে যেতে পারেন। অগত্যা পোস্টটাকেই আঁকড়ে ধরে ঝুলে রইলেন ৷ কেউই তাঁকে লক্ষ করেনি। তিনি ওপর থেকে চিৎকার করে ডাকার ফলে বোঝা গেল তিনি ওখানে আছেন। এইসব উদ্ধারকার্য শেষ করে একেবারে মধ্যরাতে মা'কে গঙ্গায় দিয়ে এল বেলতলার ছেলেরা। বকুলতলার জনা-তিনেকের বেশি ছেলেকে সেই রাত্রে আর পাওয়া যায়নি।

এই ঘটনার কিছুদিন পরেই আমি কলকাতায় চলে আসি। বেলতলার সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। কিন্তু বেলতলার ঘটনা যাদেরই বলতাম, তারা কেউই পুরোটা বিশ্বাস করত না। তারপর অনেকদিন কেটে গেছে। আমি বিয়ে-থা করে সংসার করছি। লোকমুখে গৌর-নিতাইয়ের খবর পেতাম। বড় শখ হত, একদিন গিয়ে গৌর-নিতাইকে দেখে আসি। যাব যাব করে আর যাওয়া হয়ে উঠত না। একদিন সত্যি-সত্যিই শিয়ালদা থেকে ট্রেনে চেপে বসলাম। অনেক দিন পর আবার বেলতলায় যাচ্ছি।

॥ ৮ ॥

বেলতলা এখন অনেক বদলে গেছে। বিস্তর লোক বেড়েছে, সুন্দর সুন্দর বাড়ি উঠেছে, গাড়ির সংখ্যাও বেড়ে গেছে বহুগুণ। বেলতলার খেলার মাঠ বলতে আর কিছু নেই। সেখানে এখন বড় বড় বাড়ি। ক্লাবটা এখনও আছে। বকুলতলার মাঠও গেছে। একচিলতে ফাঁকা জমি নেই কোথাও। বেলতলা আর বকুলতলার নতুন মানুষরাও বিলকুল বদলে গেছে। আমাদের সময় দুই পাড়ার মধ্যে নানা ব্যাপারে রেষারেষি ছিল, জেদ ছিল, তবুও কখনও সখ্যের অভাব ঘটেনি। অন্যায় দেখলে বকুলতলার বয়স্ক লোকরা, তা সে যিনিই হন, বেলতলার যে-কোনও ছেলেকে ধমক দিয়ে কান মলে দিতে পারতেন। বেলতলার বয়স্করাও পারতেন। এ নিয়ে কোনও অভিযোগ করার উপায় ছিল না। অভিযোগ যে করা যায়, সেটাই আমাদের ধারণায় আসত না। বেলতলার সুকুমার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় যেবার সপ্তম হল, সেবার বেলতলা হাই স্কুলের সঙ্গে সঙ্গে বকুলতলা হাইস্কুলও টিফিনের পর ছুটি দিয়ে দেওয়া হল। বকুলতলার লোকেরা খেপে খেপে এসে সুকুমারকে আশীর্বাদ করে মিষ্টি দিয়ে গেল। আবার বকুলতলার সমীর ব্যানার্জি যখন ডাক্তারি পাশ করল, তখন ভর সন্ধেবেলা খাঁদুদাদু রিকশা করে সমীরদার বাড়ি গিয়ে হাঁক দিলেন, "অ্যাই ভুঁদে, কেমন ডাক্তার হলি দেখতে এলাম। এই যে তোর জন্যে রসগোল্লা এনেছি। গপাপগ খা দিকিনি। রসগোল্লা খেয়ে নাড়ি দেখে বল, ক' দিন বাঁচব। দু গ্রাম মিলে তুই হ পয়লা ডাক্তার। গাঁয়ের ছেলে। গাঁয়েই চেম্বার করে বসবি!"

সমীরদা বললেন, “সেইরকমই তো ইচ্ছে। বকুলতলায় দিনুকাকা বলেছেন একটা ঘর জোগাড় করে দেবেন।”

খাঁদুদাদু বললেন, “খালি বকুলতলাতে বসলেই হবে? বেলতলায় রোগ নেই। তোকে বেলতলাতেও বসতে হবে। ঘর আমি দেব। তুই আমার বাইরের ঘরে বসবি। আমি লাঠিপেটা করে রোগী নিয়ে আসব।”

খাঁদুদাদু তাই করতেন। কারও অসুখ হলেই তাকে নিজে ধরে নিয়ে আসতেন সমীরদার কাছে। লাঠি উঁচিয়ে বলতেন, “গ্রামের ছেলে ডাক্তার, তার কাছে না গিয়ে ওই স্টেশন টপকে ভিন গাঁয়ের ডাক্তারের কাছে কেউ গেলে আমি লাঠি মেরে তার ঠ্যাং ভেঙে দেব।” সেই সমীরদা এখন বকুলতলার মস্ত ডাক্তার। সুকুমার মস্ত বড় ইঞ্জিনিয়ার হয়ে টাটায় চাকরি করে। সুকুমার প্রথম প্রথম ছুটিছাটায় আসত, এখন তাও পারে না। সল্ট লেকে জমি কিনে বাড়ি বানাচ্ছে। যে কালীপুজো নিয়ে এত মাতামাতি, এত কাণ্ড, সেই বারোয়ারিতলার কালীপুজো হচ্ছে বেলতলার সবচেয়ে ছোট্ট পুজো। বকুলতলাতেও তাই। দু' গাঁয়ে এখন কম করে বিশটা কালীপুজো হয়। জলসায় কলকাতা থেকে নকল গলায় গান গাইবার লোক আসে। খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি, তেমনই গানের চেয়ে গানের সঙ্গে বাজনদার বেশি। বড়দের আর প্রতাপ নেই। ছেলে-ছোকরারা মান্য করে না। মনটা খারাপ হয়ে যেতে লাগল। মনে-মনে ভাবলাম, আমিও তো তাই। এই গ্রামের জল, হাওয়া আর ধুলোর মধ্যেই আমার যৌবন এল। আমিও তো গ্রাম ছেড়ে এখন অনেক দূরে। ধাত্রীমায়ের মতো যে গ্রাম আমাকে চোখে চোখে আগলে রাখত সেই গ্রাম এখন আমার কাছে শুধুই অতীত স্মৃতি। কত মানুষ এখন আর গ্রামে নেই। খাঁদুদাদু তো আমরা থাকতেই গেছেন। গৌর-নিতাইয়ের বাবা বিষ্ণুচরণবাবু দেহ রেখেছেন দশ বছর আগে। প্রাণবল্লভ বাবুর গলায় ক্যানসার। তিনি কথা বলতে পারেন না, বিছানায় শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর দিন গোনেন। সব্যসাচী মুখার্জি এখন এতই বৃদ্ধ যে, ভাল করে চোখেও দেখেন না। আমাকে তো চিনতেই অনেক সময় লাগল। চেনবার পর বললেন, ভাল থেকো। সবাই ভাল থেকো। এখানে এখন আর মাঠ নেই। খেলাধুলোর পাট চুকে গেছে। কেন যে এখনও বেঁচে আছি, কে জানে! বকুলতলার নকুল চৌধুরী মারা গেছেন গত বছর। হাসপাতালের বিছানায় তিনদিন শুয়ে গগন গড়াইও নেই। থেকে চিরতরে চলে গেলেন। লায়ন রে যে এখন কোথায়, সে-কথা কেউ জানে না। সুনুদা চৌধুরীপাড়ার মোড়ে দোকান দিয়েছেন। খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটেন। রক্তে ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে গিয়ে পায়ের গাঁটে গাঁটে যন্ত্রণা হয়। প্রায়ই শয্যাশায়ী থাকেন। পেঁচোদা ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যেতেই পেঁচোদের পিসি কোথায় যেন চলে গেছেন। আর ফিরে আসেননি। পেঁচোদার বউ দুই ছেলে নিয়ে ওই ভিটেতেই থাকেন। চারদিকে কেবলই মন খারাপ করা ছবি। সময়ের প্রবল স্রোতে কেউ-কেউ ভেসে গেছে, কেউ-কেউ গেছে হারিয়ে।

কিন্তু মোটামুটি একই রকম আছে গৌর-নিতাই। লম্বায় একটু বেড়েছে, গায়ে কিছুটা বাড়তি মেদ আর দু'জনেরই থুতনির কাছে সামান্য একটু পাতলা দাড়ি। ওই গৌর-নিতাই ছাড়া বেলতলা আর বকুলতলার বর্ণাঢ্য মানুষগুলো একেবারেই হারিয়ে গেছে। আমি রিকশা থেকে নেমে গৌর-নিতাইকেই খুঁজলাম। ওদের পেতে দেরি হল না। প্রথমে যার দেখা পেলাম তাকে বললাম, “তুই কে? গৌর, না নিতাই?”

গৌরই প্রথম এসেছিল। হাসতে হাসতে বলল, “আমি গৌর। নিতাই আসছে। তোর চিঠি পেয়ে অপেক্ষা করছিলাম। বেলতলা, বকুলতলা, মায় গোটা দেশটা বদলে গেল, কিন্তু আমরা ঠিকই আছি। এখনও, এতদিনেও কেউ চিনতে পারে না।”

গৌর-নিতাই এখন বড় ব্যবসাদার। ওদের কোম্পানির নাম ‘গৌর-নিতাই অ্যাণ্ড কোং। যাকে বলে ‘আলপিন টু এলিফ্যান্ট’, ঠিক সেইরকমই বহুমুখী ব্যবসা গৌর-নিতাইয়ের। মুদি দোকান, বস্ত্র বিপণি, দশকর্মা ভাণ্ডার, বিউটি পার্লার, সঙ্গীত শিক্ষাকেন্দ্র কোচিং সেন্টার, ক্যাটারিং, বিবাহ-অফিস, ফার্নিচারের দোকান, কাজের লোকের সাপ্লায়ার, লেবার কনট্রাকটর এরকম বহু জিনিসের ব্যবসা করে গৌর-নিতাই। বিয়ে-থা করেনি। কেন করেনি?

ওরা বলে, “সারাজীবন আমাদের নিয়ে গাঁয়ের লোকেরা বিভ্রমে কাটালো। শ্বশুরবাড়ি আর বউরাও যদি সেই ফাঁদে পড়ে, তবে তা হবে আমাদের পক্ষে মস্ত সমস্যা। তাই ভেবেচিন্তে বিয়েটা ড্রপ করলাম।"

আমি বললাম, “এত কাজ তোরা দু'জনে পেরে উঠিস?”

ওরা বলল, “তিন-চারটে কাজের লোক আছে। বাকি কাজ আমরা ভাগাভাগি করে করি। গৌর গান শেখানো আরম্ভ করে কোচিং ক্লাস নিতে গেল। আমি কোচিং ক্লাস কিছুটা করে গানের ক্লাসে গেলাম। আমি গান জানি না। স্টুডেন্টরাও জানে না, আমি গৌর না নিতাই। অন্নপ্রাশন থেকে বিয়েবাড়ির টোট্যাল কনট্রাক্ট আমরা ধরি। গৌর বরাবরই সংস্কৃতে ভাল, তাই গৌর পুরোহিতের কাজটা নিয়ে নেয়। নিতাই ক্যাটারিং-এর ব্যাপারটা দেখে। লোকেরও সুবিধে। এক জায়গাতে এসেই সব পেয়ে যায়।”

আমি জানতে চাই, “কিন্তু এ নিয়ে কোনও গণ্ডগোল বা বিভ্রম, হয় না?”

গৌর উত্তর দিল, “কেন হবে না? সে তো লেগেই আছে। টুনু মল্লিকের মেয়ের বিয়েতে গিয়ে আমি বিয়ে করাচ্ছি। এক ব্যাচ বরযাত্রী খেতে বসেছে। নিতাই ছিল ওখানে খাওয়ার দিকটা সামলাতে। বরের পিসেমশাই নিতাইকে দেখে বললেন, “সে কী, বিয়ে শেষ হয়ে গেছে?”

নিতাই বলল, “শেষ হবে কেন, চলছে। এখনও তো হোম-যজ্ঞ এসব বাকি ৷ ”

বরের পিসে বললেন, “তা হলে আপনি এখানে কেন?”

নিতাই উত্তর দেয়, “এখানে থাকব না তো কোথায় থাকব? আপনাদের খাওয়ার ব্যবস্থাটা দেখতে হবে না!”

বরের পিসে বিষম খেয়ে বলে, “কিন্তু হোম-যজ্ঞ। সেটা কে দেখছে?”

নিতাই বলে, “সেটা পুরোহিতের কাজ, উনি দেখছেন।"

বরের পিসের ধন্দ আর ঘোচে না। তিনি খাওয়া ফেলে ছোটেন বিয়ের আসরে। সেখানে গৌর যথারীতি পুরোহিতের কাজ করে যাচ্ছে। অবশেষে মেয়ের বাপকে অনুরোধ করে দু'জনকে একসঙ্গে দেখার পর তিনি শান্ত হন। আর এই খবর রাষ্ট্র হতেই বরযাত্রীরা ভিড় করে দেখতে আসে গৌর-নিতাইকে।

গৌর-নিতাইয়ের ফার্নিচারের দোকানের পাশে আরও একটা দোকান। ওটাও ওদের। দোকানের মাথায় সাইনবোর্ডে লেখা ‘নিউ বলহরি ফার্নিচার্স', তার তলায় ছোট করে লেখা, 'ঘাটে যাইবার খাট পাওয়া যায়। দিবা-রাত্র খোলা থাকে। হাঁক দিলেই হাজির।"

আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে ওরা বলে, “দশকর্মার জিনিস কিনবে এখানে, আর খাট কিনতে যাবে দু' মাইল দূরে! তাই জনগণের সুবিধের কথা ভেবে ওটাও করে ফেললাম।”

আমি বললাম, “নিউ কেন? ওই নামে আরও দোকান আছে নাকি?”

ওরা বলল, “এদিকে নেই, তবে সিথির মোড়ে ওই নামে একটা দোকান আছে। বাসে যেতে-যেতে দেখতে পেয়েই আইডিয়াটা মাথায় এল। পাছে কপিরাইট অ্যাক্টে ফেঁসে যাই, সে জন্যই মাথায় একটা ‘নিউ’ লাগিয়ে দিয়েছি। আইনের দিকটা ক্লিয়ার রাখতে হবে তো!”

আমি ঘুরে-ঘুরে ওদের ব্যবসাপত্তর দেখতে-দেখতে বললাম, “তোর সব দোকানেই তো বেশ ভাল বিক্রি দেখতে পাচ্ছি। বিউটি পার্লারে বিক্রি বোধ হয় একটু কম, তাই না?”

ওরা বলল, “কম ছিল না রে, বেশ ভিড় ছিল। কয়েকদিন আগে একটা ‘ব্যাড উইল' হয়ে গেল। যে দু'জন মহিলা রেখেছিলুম, তারা একই দিনে কামাই করল। ওইদিন পার্লারে চুলের খোপা করতে এল অশ্বিনীদার ছোট মেয়ে। সেদিন নাকি বারাসত থেকে তাকে দেখতে আসবে। কী আর করব, ঝিনিক তো আর ফেরাতে পারি না। আমিই খোঁপা বেঁধে দিলুম। দেখে-দেখে কিছুটা শেখা ছিল। দেখতে বেশ ভালই লাগছিল ঝিনিকে। রিকশা করে বাড়ি গেল। কিন্তু খোঁপায় পেল্লাই একটা মালা চাপিয়ে যেই না ভাবী শ্বশুর-শাশুড়ির সামনে এসে প্রণাম করল আর ওঁরাও মাথায় হাত রেখে আশীবাদ করছেন, অমনিই খোঁপাটা খুলে গিয়ে পড়ল শ্বশুরমশাইয়ের কোলে। ওই একটা নেগলিজিবল পয়েন্টে বিয়েটা ভেস্তে গেল। মিনি কেঁদে এসে ধরল আমাদের। কিন্তু আমাদের মধ্যে কে যে খোঁপাটা বেঁধে দিয়েছিল সেই ব্যাপারে মিনি তো শিয়োর নয়। কিন্তু কী করব!

মিনির মুখেভাতে বিশটা বিশটা পানতুয়া খেয়েছিলুম। সেই কৃতজ্ঞতাবশে বলে দিলুম, তোর ভাবনা নেই। বারাসতের চাইতেও ভাল বর আমরা জোগাড় করে দেব। তাই দিলুম। আমাদের প্রজাপতি-অফিসের ফাইল খুলে দেখলুম একেবারে পালটি ঘর পাওয়া গেল। বারাসতের ছেলে ছিল স্কুলের মাস্টার, পেয়ে গেলাম বিরাটির ছেলে কলেজ মাস্টার। বিয়ে পাকা হয়ে গেছে। আসছে হপ্তার শুক্রবার বিয়ে। তুইও চলে আয়। অশ্বিনীদাকে তো চিনিস। খাঁদুদাদু নাম দিয়েছিল ‘ঘোঁতনা’।”

আমি লক্ষ করলাম, গৌর-নিতাইয়ের টেবিলে বিস্তর ইলেকট্রিক বিল। আমি বললাম, “এত বিল তোদের আসে?”

ওরা বলল, “আমাদের নয়। সব পাড়ার বিল। এখন তো স্বামী-স্ত্রীতে মিলে চাকরি করে! এসব করার লোক কোথায়। এগুলোও আমরা জমা করে দিই। বেশি না, পার বিলে দু' টাকা চার্জ। গ্যাস এনে দিলে তিন টাকা। টি ভি সারাবার লোক আনলে পাঁচ টাকা। মরা পোড়াবার জন্য শবযাত্রীও দিয়ে থাকি। যদি পুরোহিত আর প্যাণ্ডেলসহ খাওয়ার দায়িত্ব আমাদের দেয়, তা হলে ওটা ফ্রি সার্ভিস। শীতকালের রাত্তির হলে আট টাকা। বর্ষার রাত হলে দশ টাকা।”

আমি বলি, “চাকরি না করে এটা করাই ভাল। বেশ আছিস।”

ওরা বলল, “চাকরি তো করতে চেয়েছিলাম। পেলাম না। একটা চাকরি পেলেও দু'জনে ভাগাভাগি করে দিব্যি চালিয়ে নিতাম। কিন্তু জুটল না।”

সারাটা দিন কাটিয়ে সন্ধেবেলা চলে এলাম। ওরা কিছুতেই ছাড়তে চাইছিল না। আসবার সময় রিকশায় তুলে দিয়ে বলল, “সময় পেলে আবার চলে আসিস। কে কবে চলে যাব, তার তো ঠিক নেই!” একটু থেমে পরে বলল, “একটা কথা কী জানিস, একসঙ্গে জন্মেছি, তাই বলে একসঙ্গে তো আমরা মরব না! যে আগে যাবে, যাওয়ার সময় তার কেমন লাগবে জানি না। কিন্তু যে থাকবে, সে বড্ড খারাপ থাকবে। তাই না? তোর কী মনে হয়?”

আমি উত্তর দিতে পারলাম না। সন্ধ্যার আবছা আলোয় ওদের দুই ভাইয়ের প্রৌঢ় চোখজোড়া জলে ভরে উঠছিল। এই কান্না কার জন্য? আমার জন্য? না কি ওদের নিজেদের জন্য? আমার রিকশা চলতে আরম্ভ করল। ওরা দু'জন হাত নাড়ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা গেল, আমি তাকিয়ে রইলাম।

কথা ছিল আবার একদিন যাব, যেতেও চাইছিলাম। ইচ্ছে ছিল সপরিবারে যাওয়ার। কিন্তু যেতে পারলাম না। খবর পেয়েছি, গৌর আছে কিন্তু নিতাই আর নেই। গৌরও এখন বদলে গেছে। বিলকুল বদলে গেছে। যেন বোবা মানুষ। সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ঘরেই থাকে। পাড়ার কেউ এখন তার খবরাখবর রাখে না।

আমি চোখ বুজে বসে থাকি। ওদের ছবিটা কখনও আলাদা করে স্মৃতিতে ধরা নেই। একসঙ্গে দু'জনকে দেখতে দেখতে আমার মন পিছু হটতে হটতে সেই বেলতলায় যায়, যে বেলতলাও এখন আগের চেয়ে অনেক, অনেক পালটে গেছে।

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%