ডার্বি

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

অ্যান-আর্বার, মিশিগান

“চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা, সবাই আমাকে মান্য করে চলে। আমি যখন চাই তখন পৃথিবী ফুলে-ফলে ভরে ওঠে। যখন চাই না তখন রুক্ষ মরুভূমি হয়ে যায় চারপাশ। আমার ইচ্ছেয় ধান ভরে ওঠে দুধে। অনিচ্ছেয় রস শুকিয়ে যায় সমস্ত ফসল থেকে। আমি যখন মনে করি তখন, ধনীরা দরিদ্রের থালায় ঢেলে দেয় অন্ন, পাথর ফাটিয়ে বইতে থাকে ঝরনা, উপচে ওঠে নদী আর শান্ত হয়ে যায় সমুদ্র। এই পৃথিবীর জল, স্থল, মানুষ, পশু, পাখি, আমারই কথা শুনে চলে। আমার সৌন্দর্যে হেসে ওঠে চাঁদ। তোমরা তাকে ডাকো পূর্ণিমা বলে।”

সংলাপটা বলার পর জয়ী তাকাল। হাততালি পড়ল, যেরকম পড়ে। কিন্তু মন থেকে খুশি হতে পারল না ও। রত্নেশ্বর পালিত নানা রকম দেশি-বিদেশি কথা-উপকথা মিশিয়ে নিজের মতো করে তৈরি করেন নাটক। আর ওরা তার রিহার্সাল দেয় ভদ্রলোকের বাড়ির একতলার বিরাট হলঘরে। ওরা বলতে এই অ্যান-আর্বার শহরের দশ-বারোজন বাঙালি। পূর্ব উপকূল আর মিড ওয়েস্টের মধ্যে স্থিত, অ্যান-আর্বার আধুনিক শিক্ষার এক বিরাট কেন্দ্র। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও আরও কয়েকটা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র, গবেষক ও অধ্যাপকের বাস এই শহরে। নতুন ভাবনা আর নতুন-নতুন আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত এই শহর, প্রতিবাদের কারণেও শিরোনামে উঠে এসেছে বারবার। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যেমন এই অ্যান-আর্বার থেকেও ছাত্র আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি হয়েছিল।

রত্নেশ্বরদার এই হলঘর অবশ্য কোনও প্রতিবাদ-প্রতিরোধ নয়, বরং ভালবাসা ছড়িয়ে পড়ার জায়গা, পরস্পরের হাত ধরার মেহফিল। অ্যান-আর্বার শহরে দুর্গাপুজো হয়, শহর আর শহরতলির বাঙালিরাই আয়োজন করে তার। কিন্তু রত্নেশ্বরদার বাড়িতে পুজো মানে সংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের গান, কখনও-সখনও আধুনিক বা গজ়ল, কোনও-কোনওদিন সেতার বা তবলা, কখনও কারও কবিতা, এইরকমই চলতে থাকে সপ্তাহের পর-সপ্তাহ। পুজোর আগে রত্নেশ্বরদা নিজে বিজ্ঞানী হয়েও নাটক লিখে থাকেন ওদের জন্য। সে নাটক যে রোমাঞ্চ বা বৈদগ্ধ্যে সবার সেরা তা নয়। তবুও, এখানকার বাঙালিদের অনেকে ভালবেসেই তা মঞ্চস্থ করে। আসলে রত্নেশ্বরদাকে দুঃখ দিতে মন চায় না কারও। পুরো শহরটার সংস্কৃতিমনস্কদের রসের ভিয়েন জোগান দেওয়ার মুখ্য কারিগর যে এই লোকটাই।

“ভাল হয়েছে জয়ী।” রত্নেশ্বরদা বলে উঠলেন।

“যেরকম চাইছিলাম সেরকমটা হল না। এত ভাল সংলাপের প্রতি সুবিচার করতে পারলাম না ঠিক।”

“আরে সংলাপ তো আমি এদিক-ওদিক থেকে জোগাড় করি।” শিশুর সারল্যে হেসে উঠলেন রত্নেশ্বরদা।

“সবটাই গ্যাঁড়াফাই?” ঘন হয়ে বসে থাকা দর্শকদের মধ্যে থেকে দু’জন একসঙ্গে জানতে চাইল।

রত্নেশ্বরদা কিছু বলার আগেই অরণ্য বলে উঠল, “ইংরেজিতে বলে, তিন বছর মানে বুম, তিরিশ বছর মানে ফেম, তিনশো বছর হল গিয়ে গ্লোরি, আর তিন হাজার বছর হচ্ছে হোমার। এবার আমরা যারা তিন বছরের খ্যাতি পেলেই ধন্য হয়ে যাব, তারা যদি ওই তিন হাজার বছর টিকে থাকা লোকগুলোর থেকে একটু-আধটু নিই-টিই, সেটাকে গ্যাঁড়াফাই বলে না, সেটা হল গিয়ে আমাদের ঐতিহ্য।”

“খালি পেটে তিন হাজার বছরের ঐতিহ্যের কথাই চলবে, না কি এবার আমরা একটু খাওয়াদাওয়ার কথাও ভাবব?” মালবিকাদি বলে উঠলেন।

“এখনও রিহার্সাল শেষ হল না, এখন কিসের ডিনার?” অরণ্য বলল।

রত্নেশ্বরদার স্ত্রী সুচন্দ্রা দোতলা থেকে নেমে এসে জানতে চাইলেন, “তোমাদের সবার কি খিদে পেয়ে গেছে, না কি আর-এক রাউন্ড চলবে?”

“অবশ্যই আর-এক রাউন্ড। আর আমাদের মতো কয়েকজনের জন্য দুই বা তিন!” অরণ্য একদম চালিয়ে খেলছিল।

“তুমি আজ একটু বেশিই মুডে আছ মনে হচ্ছে?” রত্নেশ্বরদা জিজ্ঞেস করলেন।

“মুডে থাকব না? আজ ইস্টবেঙ্গল জিতেছে জানেন! উফ, আফটার সাচ আ লং টাইম। এক গোলে নয়, দু’গোলে হারিয়েছি মোহনবাগানকে।”

“মিশিগানে এসেও ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান?” পিছন থেকে কেউ বলল।

“আরে বাবা, বাঙালি স্বর্গে গেলেও ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান করবে। ডার্বি বলে কথা!” প্রশ্নটা কে করেছে খেয়াল না-করেই গ্লাসে একটা বড় চুমুক দিয়ে কথাগুলো বলল অরণ্য।

অরণ্য কাকে তাতানোর জন্য কথাগুলো বলছিল, জয়ী বুঝতে পারছিল। পাত্তা দেবে না বলে জেদ ধরেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই রাগের বিস্ফোরণটা ঘটেই গেল ভিতরে। আর রাগটাকে শব্দে প্রকাশ করবে না বলে জয়ী মুখটা ঘুরিয়ে নিল। যেদিন অরণ্য ওর ঘরে এসে হাঁটু মুড়ে বসে প্রপোজ় করছিল, জয়ী ওকে মেঝের কার্পেটে বসতে বারণ করেছিল। পাথর ফাটিয়ে ঝরনা না বেরোক, অর্কিড বেরোবেই ইত্যাদি বলতে বলতে অরণ্য যখন আবেগের আতিশয্যে উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরেছিল ওকে, জয়ী বাধা দেয়নি। সেদিন ওর মুখ থেকে অরণ্য, ‘হ্যাঁ’ শুনতে না-পেলেও মনে মনে একটা ‘হ্যাঁ’-কেই চারাগাছ হিসেবে ওর হাতে তুলে দিয়েছিল জয়ী, যাকে লালন করলে মহীরুহের জন্ম অসম্ভব নয়।

কিন্তু সেই রাতের সাতদিন পেরনোর আগেই জয়ী ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে অ্যান-আর্বারের একটা ছোট্ট বইয়ের দোকানের বাইরে একটি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মেয়েকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল অরণ্যকে। এ দেশে ওরকম ‘হাগ’ করা তেমন কিছুই নয়, জয়ী তাই অবাক হলেও ততটা পাত্তা দেয়নি ঘটনাটাকে। কিন্তু দৃশ্যটা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়েও আর-একবার পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখেছিল, মেয়েটি অরণ্যর চোখের জল মুছিয়ে দিচ্ছে। বাব্বা! এত কান্না অরণ্যর চোখে যে একজন হলুদ চুলের সুন্দরীকে মুছিয়ে দিতে হচ্ছে। তা হলে ওর হৃদয়ে না জানি কত কষ্ট জমে আছে। ভাগ্যিস জয়ী তার নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করেনি। যে চোখের জল এত সস্তা যে রাস্তাঘাটে মুছিয়ে দেওয়ার লোক দরকার পড়ে, জয়ীর জীবনে তার কোনও দরকার নেই।

মধ্যে এক-দু’বার অরণ্য ফোন করেছিল, জয়ী ধরেনি। একদিন ইউনিভার্সিটিতেই প্রায় জয়ীর পথ আটকে অরণ্য খুব ব্যগ্র হয়ে জানতে চেয়েছিল, ব্যাপারটা কী। জয়ী অনেক কথা বলতে চেয়েও, ‘বাড়িতে খুব অসুবিধে চলছে’ বলে কাটিয়ে দিয়েছিল অরণ্যকে। অরণ্য সরে যাওয়ার সময় খেয়াল করেনি যে জয়ী ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়েছিল। আসলে জয়ী তো অরণ্যের ভালবাসায় সাড়া দিতে চাইছিল, কিন্তু সেই ভালবাসা যদি কুয়াশা হয় কেবল, ভোরবেলা যার ভিতরে পড়লে আর কিচ্ছু দেখা যায় না কিন্তু বেলা হলেই রোদের দাপটে যা মিলিয়ে যায় বেমালুম, তা হলে কীসের ভরসায় এগোয় জয়ী? বিশেষ করে ও যখন ভুক্তভোগী, সেই কৈশোর থেকে ও যখন জানে যে দু’জনের সংসারে তিনজন এলে ঠিক কী হয়, কতটা মূল্য দিতে হয় সংশ্লিষ্ট সবাইকে! বাবা আর মায়ের ভিতরে মিতালি বসুর আগমনের সেই মুহূর্তগুলো ও যেন চোখ বন্ধ না-করেও স্পষ্ট দেখতে পায় আজও। ফুল বিছানো রাস্তাগুলো কীরকম পলকে ভাঙা কাচে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল, সেই খতিয়ান ওর কৈশোরের ক্যালেন্ডারের প্রতিটি পাতায় লেখা আছে।

সেই পৃষ্ঠাগুলো থেকে, সেইসব স্মৃতি থেকে মনটাকে ফিরিয়ে নিতে রত্নেশ্বরদার ঘরের দেওয়ালের মস্ত ছবিটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল জয়ী। দুর্লভ একটি ছবির বেশ দামি একটা প্রিন্ট বহুদিন আগে সংগ্রহ করেছিলেন রত্নেশ্বর পালিত। প্রথমদিন এই ঘরে এসে ছবিটায় চোখ আটকে গিয়েছিল জয়ীর। আজও ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল ও। পাওলো ভেরোনিস-এর আঁকা, দ্য ওয়েডিং ফিস্ট অ্যাট কানা ছবিটার নায়ক যিশুখ্রিস্ট। রত্নেশ্বরদার মুখেই ছবিটার ইতিহাস শুনেছিল জয়ী এবং অন্যরা। ভেনিসের ‘অর্ডার অফ সেন্ট বেনেডিক্ট’-এর পাদ্রিদের নির্দেশে ছবিটা এঁকেছিলেন ভেরোনিস। তেলরঙে আঁকা পনেরোশো তেষট্টি খ্রিস্টাব্দের এই ছবিতে যিশুর প্রথম অলৌকিক শক্তির প্রকাশকে ধরা হয়েছে। গ্যালিলির একটি বিয়ের ভোজসভায় যিশু, মা মেরি এবং যিশুর শিষ্যরা আমন্ত্রিত ছিলেন। সেই ভোজসভা চলাকালীন মদ ফুরিয়ে গিয়েছিল। কথাটা জানতে পেরে যিশু পরিবেশকদের আদেশ দেন মদের পাত্রগুলি জল দিয়ে ভরে দিতে। ভিস্তিরা সেই পাত্রগুলি জল দিয়ে ভরে দেওয়া মাত্র জলটা মদে পরিবর্তিত হয়ে যায়। ছবিটায় দেখা যাচ্ছে যিশু একটা বারান্দায় বসে আছেন, তাঁর সামনে একটি বড় টেবিল। সেই টেবিলের অন্যধারে একটু নীচে বসে বাদ্যকাররা নানা রকম বাজনা বাজাচ্ছে। কেউ কর্নেটো, কেউ বা ভায়োলিন। তার মধ্যে সাদা পোশাকে ভায়োলিন বাজাচ্ছে যে লোকটা, তাকে নাকি ভেরোনিস নিজের আদলে এঁকেছিলেন। অসংখ্য মানুষ ছবিটায় কিন্তু ছবিটা কালজয়ী, কারণ এখানেই যিশুর জলকে মদে রূপান্তরিত করার আলেখ্য চিত্রিত হয়েছে। ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই নিজের কাঁধে অরণ্যর হাতের স্পর্শ পেল জয়ী। অরণ্য জানতে চাইছিল, এক পেগ মদ খেয়ে জয়ী নিজেও আজ রাতে যিশুর অলৌকিক কৃপা অনুভব করবে কি না।

জয়ী ফিরে তাকাল কিন্তু কোনও উত্তর দিল না। ছবিটা তখনও ওর মাথার মধ্যে ঘুরছে। তা ছাড়া ওর মনে হচ্ছিল যে অরণ্য আসলে কোনও উত্তর চাইছে না, কেবল ছুঁয়ে দেখতে চাইছে ওকে। আর সেই মনে হওয়াটা বিশ্বাসে বদলে যেতেই অনেক আগেকার একটা স্মৃতি জয়ীর দু’চোখের মাঝখানে ঝলসে উঠল। জয়ীর বাবা কমলেশের সঙ্গে তখন মিতালি বসুর অ্যাফেয়ার শুরু হয়ে গেছে। আর সেই ‘অ্যাফেয়ার’ যেন এক চোরাবালি, যেখানে বাবা নিজের পরিবার, ব্যাবসা, বংশগরিমা সব নিয়ে ডুবছে। সংসারে অশান্তি যত বাড়ছে, জয়ী তত আঁকড়ে ধরতে চাইছে ওদের একশো বছরের পুরনো বাড়িটাকে, যার সিঁড়ি আর কড়িকাঠে ইতিহাস কথা বলে। কিন্তু সেই ইতিহাসের সঙ্গে জয়ীর বর্তমানের যে যোগসূত্র সেই প্রীতিকণা চৌধুরী, ওর ঠাকুরমা, যাকে ছোটবেলা থেকে ‘দিদুন’ বলে ডেকে এসেছে জয়ী, তখন কলকাতায় নেই। সংসারে ভাঙন ধরার আঁচ পেয়েই কি তিনি কাশীতে জয়ীদের যে বাড়ি ছিল, সেখানে গিয়ে উঠেছিলেন?

জয়ী জানত না। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় ও প্রথম জেনেছিল মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল দুটো আলাদা দ্বীপ আর সেই দুই ভূখণ্ডের মাঝখানে এত এত নোনা জল, এত অবিশ্বাস, এমনই ভুল বোঝাবুঝি যে তা দূর হওয়ার নয়। এমনিতে তো জয়ীর খুব প্রিয় আউটিং ছিল, মোহনবাগান মাঠ কিংবা সল্টলেক স্টেডিয়াম, কিন্তু সেদিন বাবা ওকে নিয়ে যায়নি ডার্বি দেখাতে। মোহনবাগান এক গোলে হেরে যাওয়ার পর বাবাকে অনুযোগের সুরে সেই কথা বলতে গিয়েছিল জয়ী। ওর কেবলই মনে হচ্ছিল যে টিভিতে না দেখে, মাঠে গিয়ে খেলা দেখলে হয়তো হারত না মোহনবাগান।

দোতলায় বাবার নিজস্ব ঘরটায় আধশোওয়া হয়ে একটা বোতল থেকে গ্লাসে মদ ঢালছিল বাবা। তখনও জয়ী রং দেখে চিনতে পারে না মদটার কী নাম। কিন্তু বাবা ঢালছিল, চুমুক দিচ্ছিল গ্লাসে আর মাঝেমধ্যে কতগুলো কাগজপত্র ওলটাচ্ছিল খুব দ্রুততার সঙ্গে। জয়ী বাবার সামনে দাঁড়িয়ে ওর মনের কথা বলতেই, জোর ধমক খেল।

“তুই এমন কী পয়া যে মোহনবাগানকে জিতিয়ে ফিরতিস? হারার কপাল ছিল কিংবা ভাল খেলতে পারেনি, তাই হেরেছে। তুই যা পড়তে বোস গে যা!” বলে উঠল বাবা।

পড়া নিয়ে জয়ীকে কখনও কিছু বলতে হয়নি। তাই কমলেশ চৌধুরীর মুখে ওই কথাগুলো শুনে খানিকটা অবাকই হয়ে গেল ও। ততদিনে অবশ্য রাত্রিবেলা মায়ের চাপা কান্না আর মাঝেমধ্যে বাবা আর মায়ের তুমুল কথা কাটাকাটি দেখতে দেখতে অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে জয়ী। তবু সেদিন সন্ধ্যায় বাবার ওই আচরণ ওকে বিহ্বল করে দিয়েছিল। বিহ্বলতার অনেকটা অবশ্য বাকি ছিল। আর-একটু রাতের দিকে অসিতমামা যখন বাবার ঘরে গিয়ে ঢুকল, তখনই যেন নাটক তার ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছল।

বাবার বিজ়নেস পার্টনার অসিত মজুমদার ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক ছিলেন, ওরা সবাই জানত। মায়ের কীরকম দূরসম্পর্কের দাদা ছিলেন বলে জয়ী ওঁকে ছোট থেকেই মামা বলে ডেকে এসেছে। কিন্তু ‘মামা’ বলে ডাকলেও বাবার সঙ্গেই অসিতমামার দহরম-মহরম দেখেছে ছোট থেকে। বরং অসিতমামা এলেই যে বাবা বোতল আর গেলাস সমেত আড্ডার জন্য তৈরি হয়ে যেত, সেটা নিয়ে মায়েরই অনেক আপত্তি ছিল। সেদিন সন্ধ্যায় মামা যখন ইস্টবেঙ্গলের জয় সেলিব্রেট করতে চেয়ে দু’পাত্র খাওয়ার কথা বলেছিলেন তখন বাবার হাসিমুখেই সেই কথা মেনে নেওয়ার কথা। আগের বছরই তো মোহনবাগানের ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে লিগ জেতা উপলক্ষে ওদের বাড়িতে মস্ত সাইজ়ের বাগদা নিয়ে এসেছিলেন অসিতমামা। সেই ডাব-চিংড়ির স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে জয়ীর। আজ তবে কী হল যে অসিতমামা ঘরে ঢুকে সামান্য ইয়ার্কি করতেই বাবা মদের গ্লাসটা টেবিল থেকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল?

হয়তো বোতলটাও মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি যেত কমলেশ চৌধুরীর হাতের ঠেলা খেয়ে, যদি না অসিতমামা ওই মেঝেয় ছড়িয়ে থাকা কাচের টুকরো খালি পায়ে টপকে গিয়ে হাত দিয়ে চেপে ধরত বোতলটা।

জয়ী তখনও বাবার ঘর থেকে বেরোয়নি বলে ওর চোখের সামনেই ঘটে যাচ্ছিল ঘটনাগুলো। টেবিলের এপাশে বসে পড়ে অসিতমামা খানিকটা আহত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী হলটা কী?”

জয়ী নিচু হয়ে মেঝে থেকে কাচের টুকরো কুড়িয়ে নিল স্বতঃপ্রণোদিতভাবে। কুড়োনো হয়ে গেলে মস্ত ঘরটার একটা কাবার্ডের আড়ালে প্রায় লুকিয়ে থেকে বুঝে নিতে চাইছিল ঠিক কতটা পরিবর্তন ঘটে গেছে, চৌধুরীবাড়িতে, কমলেশ চৌধুরীর মনের ভিতর। আর কী সেই পরিবর্তনের কারণ?

অসিতমামার প্রশ্নের উত্তরে অল্প একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবা বলে উঠল, “আমি ইস্টবেঙ্গলের লোকের সঙ্গে বসে ড্রিঙ্ক করি না।”

“তা এতদিন তো করতে। হঠাৎ করে মত ও পথ পরিবর্তনের কারণ কী, তা জানতে পারি?”

“কোনও কারণ নেই, ধরে নাও এমনিই।”

অসিতমামা হাসলেন, “পৃথিবীতে এমনি-এমনি কি আর কিছু হয়? আমার কী মনে হয় জানো? মিতালি বোস তোমায় বারণ করে দিয়েছে আমার সঙ্গে মেলামেশা করতে।”

“ইউ শাট আপ! একদম ওই নাম মুখে আনবে না। ওটা আমার ব্যক্তিগত জায়গা, ওখানে কোনও রিফিউজি ঢুকুক, সেটা আমি চাই না।” কমলেশ চৌধুরী চিৎকার করে উঠল।

অসিতমামা একদম ঠান্ডা গলায় জবাব দিলেন, “তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে এই রিফিউজি ঢুকতেও চায় না। তুমি চাইলে না হয় এই বাড়িতেও না ঢুকলাম। কিন্তু ভায়া, তুমি নিজেই যে রিফিউজি বনতে যাচ্ছ। নিজের ঘর-পরিবার সব ছেড়ে কিসের মোহে একটা মরীচিকার পিছনে দৌড়চ্ছ, একটু বলবে? এমন বনেদি পরিবারের ছেলে, তোমার বাবা যেদিন পৃথিবীতে আসেন সেদিন নাকি মোহনবাগান মাঠে খেলা দেখতে আসা সবাইকে রসগোল্লা খাওয়ানো হয়েছিল, তুমি কোন মধুর সন্ধানে নিজের মিষ্টি মেয়েটার পরোয়া না করে, অফিসের সেক্রেটারির সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে পড়ছ যে আর ফেরার রাস্তা থাকছে না?”

জয়ী ঘরের একটা ধারে আসবাবের মতো নড়াচড়া না করে দাঁড়িয়ে ছিল, যাতে ওদের দু’জনের কেউই ওর উপস্থিতি খেয়াল না করে। অসিতমামার কথা বলতে পারবে না, কিন্তু বাবা যে খেয়াল করেনি সেটা নিশ্চিত। খেয়াল করলে জয়ীর তিন বছর বয়সে মারা যাওয়া ওর সাত বছরের দাদার কথা তুলে পুত্রশোকের দুঃখে কেঁদে উঠত না।

“দীপজয়ের জন্য যন্ত্রণা আমাদের মনে কিছু কম নেই। তুমি বাবা, মনে তো থাকবেই। প্রমিতার মনেও কি যন্ত্রণা কম? একবার ভেবে দেখো তো!”

“ভেবে লাভ আছে কিছু? জীবনটা কি ভেবে নষ্ট করার জায়গা? কত ভাববে একটা মানুষ, কত? তার চেয়ে কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিতে হয়।”

“তা সেই কাজের মধ্যে ডুবে যেতে কে বারণ করেছে তোমাকে কমলেশ? পারিবারিক মিষ্টির দোকানগুলো তুলে দিলে, জুতোর ব্যাবসায় অর্ধেক এগিয়ে এখন স্ট্যাচু হয়ে আছ। আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।”

“কার জন্য কাজ করবে মানুষ, কার জন্য? কে আমার উত্তরাধিকারী? মুখে রক্ত তুলে খেটে কার হাতে দিয়ে যাব যাব অর্জিত সবকিছু?”

“কেন, জয়ী? তুমি কি তোমার মেয়েকে নিজের...”

“জয়ীকে বড় করা, সুপাত্রে বিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। কিন্তু জয়ী কি এই চৌধুরী পরিবারের মুখ হতে পারে? পারে না, অসিতদা। তার জন্য আমার দীপজয়কে ফেরত চাই।”

“কী পাগলের মতো বকছ?”

“একদম ঠিক কথাই বলছি, অসিতদা। এক পাত্র খাও, তা হলেই বুঝতে পারবে। দীপজয় চলে গেছে কিন্তু মিতালি আমাকে নতুন দীপজয় দেবে। আমার পিণ্ডলোপ হবে না। মরার পর আমি ছেলের হাতের আগুন তো পাব মুখে।”

“হে ঈশ্বর! আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এগুলো কী বলছ তুমি? প্রমিতার কাছে ব্যাপারটা কত শকিং হবে, জয়ী কতটা কষ্ট পাবে, একবার ভাববে না? রাস্তাঘাটে লোকজন জয়ীকে টিটকিরি দেবে...”

অসিতমামাকে থামিয়ে দিয়ে বাবা বলে উঠল, “কার ক্ষমতা আছে জয়ীকে টিটকিরি দেওয়ার? ও কি বাস্তুহারা পরিবারের মেয়ে নাকি যে রাস্তায় চটি ফটফটিয়ে লোকজনের আওয়াজ খেয়ে টিউশনি করতে যাবে? ও এখনও কলকাতার পাঁচটা বনেদি পরিবারের একটার মেয়ে। যখন গাড়ি থেকে নামবে, গাড়িতে উঠবে, পাঁচজন স্যালুট করবে ওকে।”

“কিন্তু তোমায়? এই বয়সে বউ-বাচ্চা ছেড়ে আবার নতুন ফাঁদে পড়া...”

“ফাঁদ বলছ কেন? আমার একটা ছেলে হবে, আমি আবার বাবা হব, এটা কি একটা ফাঁদ? এটা তো খুশির খবর! নাও, গ্লাসটা দাও।”

“সরি কমলেশ, আমার কাছে এটা একটা ফাঁদ। আমার মনে হয়, মাসিমা এখানে থাকলে তোমার এই কাজ সমর্থন করতেন না।”

“মা সারাজীবন কিছুর বিরোধিতাও করেনি, সমর্থনও নয়। নিজে স্বাধীনচেতা বলে সবাইকেই স্বাধীনভাবে চলতে দিয়েছে।”

“স্বাধীনভাবে চলতে গিয়ে দুর্ঘটনা হয়। কিন্তু তুমি যেটা করতে যাচ্ছ সেটা সুইসাইড! আমি এখনও বলছি, মিতালি বোসের সঙ্গে সব সংস্রব ত্যাগ করে তুমি নিজের সংসারে ফিরে এসো। আলেয়াকে আলো ভেবে মরতে যেয়ো না। তুমি চাইলে আমি মিতালির সঙ্গে কথা বলতে পারি, যাতে ও তোমাকে ছেড়ে...”

“কোনও লাভ নেই অসিতদা, মিতালি কনসিভ করেছে। শি ইজ় থ্রি মান্থস প্রেগন্যান্ট উইথ মাই বেবি। আর আমি নিশ্চিত, ছেলেই হবে মিতালির।”

অসিতমামা কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ালেন কথাটা শুনে, “আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, তুমি এরকম একটা কাজ করতে পারো! এই মিতালির রিক্রুটমেন্টের সময় আমিও ছিলাম ভেবে আমার অসম্ভব গ্লানি হচ্ছে। উফ, এটা কী করে পারলে কমলেশ?”

“এখনও তো এক পেগও গলায় ঢাললে না। ঢালো, তা হলেই সবটা ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আর তারপর আমায় একটা বুদ্ধি দাও, ব্যাপারটা কীভাবে প্রমিতাকে বলা যায়?”

“তোমার পাপ, কীভাবে হ্যান্ডল করবে তুমি বুঝবে। আমি এসবের মধ্যে নেই।” অসিতমামা দরজার দিকে এগোলেন।

“আরে, একটা খেয়ে তো যাও অন্তত। আজ ইস্টবেঙ্গল জিতেছে!”

“কে জিতেছে সেটা খুব তুচ্ছ একটা ব্যাপার। আজ আমি হেরে গেছি। তোমার প্রতি আমার ভালবাসা হেরে গেছে। আমায় মাফ কোরো কমলেশ, আমি অমানুষের সঙ্গে বসে ড্রিঙ্ক করতে পারব না।”

অসিতমামা বেরিয়ে যাওয়ার সময় খেয়াল করলেন না, ঘরের ভিতরেই একটা প্রায়-কিশোরী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা ঘরের ভিতরে বসেও টের পেল না জয়ীর অস্তিত্ব। জয়ীর মনে হচ্ছিল, ও সত্যি সত্যি ‘রিফিউজি’ হয়ে গেছে। ভাল বাংলায় যাকে ‘বাস্তুহারা’ বলে।

কতগুলো ক্ষত মনের ভিতর থাকতে থাকতে নিজেরই হয়ে যায়। মনে হয় যেন তার সঙ্গে আজন্ম সহবাস। এই ক্ষতটাও বোধ হয় তেমনই কিছু ছিল, যতক্ষণ না অরণ্য ওর দিকে একটা গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল, “থ্রি-চিয়ার্স ফর ইস্টবেঙ্গল!”

জয়ী অরণ্যর হাত থেকে শান্তভাবে গ্লাসটা নিয়ে ঘরের একদম কোণের ওয়াশ-বেসিনে গ্লাসের ভিতরকার সোনালি তরলটা সম্পূর্ণ উপুড় করে দিয়ে বলল, “সরি, আমি ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকদের সঙ্গে ড্রিঙ্ক করি না।”

জয়ীর এরকম আচরণ কেউ কখনও দেখেনি। ঘরের ভিতরে উপস্থিত সবাই তাই খানিকটা অবাক হয়েই তাকাল ওর দিকে। সেই বিস্ময়ের মধ্যে ঘটি-বাঙাল একাকার হয়ে গেল।

“কী হয়েছে জয়ী?” রত্নেশ্বরদা আলতো করে জিজ্ঞেস করলেন।

জয়ী উদ্যত কান্নাটাকে গিলে নিয়ে বলল, “কী হয়েছে, কেন হয়েছে, সব সময় বলা যায় না রত্নেশ্বরদা। কিন্তু অনেক সময় কয়েকটা কথা বলে দিতে হয়। নইলে যারা সব জায়গায় কাঁদছে তাদের কান্নাটা আসল না নকল লোকে বুঝতে পারে না। আই অ্যাম সরি, এবারের নাটকটায় আমি অভিনয় করতে পারব না। আমাকে মার্জনা করবেন।”

জয়ী প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। রত্নেশ্বরদা এবং আরও দু’-একজন এক-দু’বার ডেকে চুপ করে গেলেন। কিন্তু রত্নেশ্বরদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাইরের ঘাসজমিতে দাঁড়ানো নিজের গাড়িটায় ওঠার মুহূর্তে ও নিজের পিছনে অরণ্যর উপস্থিতি টের পেল। পাত্তা না দিয়ে গাড়ির ভিতরে বসে স্টার্ট দিল জয়ী।

“কেন আমার সঙ্গে এরকম করলি? অপমানের কারণটা শুধু জানতে চাই আমি।” অরণ্য গাড়ির কাচে ধাক্কা দেওয়ায় কাচটা নামাল জয়ী।

“অপমানিত যে হয়, অপমানের কারণ বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব তার। অপমান যে করে তার নয়।” বলেই কাচটা তুলে দিল জয়ী। আর গাড়িটা যখন ঘাসজমি পেরিয়ে রাস্তায় পড়ছে তখন সামনের দিকে তাকিয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা অরণ্যর থমথমে মুখটা দেখতে পেল। না, ওর চোখে কোনও জল নেই। থাকলে এই অন্ধকারেও জয়ী দেখতে পেত। অরণ্যর কান্না তার মানে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার ব্লন্ড মেয়েরাই শুধু দেখতে পায়। জয়ী তো স্ক্যান্ডিনেভিয়ার নয়, ব্লন্ডও নয়। কিন্তু জয়ী ওর মা প্রমিতা চৌধুরী হতে চায় না। যে অবহেলায় ফেলে দিয়ে চলে গেছে, বাতিল কাগজের মতো ছুড়ে দিয়েছে ডাস্টবিনে, তার পথ চেয়ে, তার একটু কৃপাদৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করতে করতে মা মারা গেল একদিন। হয়তো মৃত্যুতেই মুক্তির পথ জেনে, মৃত্যুর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল, বেঁচে থাকতে থাকতেই।

জয়ী বাঁচতে চায়। আর সেই বেঁচে থাকার রাস্তায় দ্বিতীয় কেউ এলেই যদি যন্ত্রণা বাড়ে তা হলে একা থাকাই শ্রেয়। এই রাস্তাগুলো যেমন একা।

কিন্তু রাস্তার উপরও বরফ এসে পড়ে। রাস্তা ঢেকে যায়। প্রশাসনের তরফ থেকে সকাল হতে না-হতে ইলেকট্রিক বেলচা হাতে লোকজন সেই বরফ সরিয়ে দেয়। তবে গাড়ি চলে। লোকজন কাজে বেরোয়। জয়ীর মনটাও কেমন যেন বরফে বরফে ছেয়ে গেছে। মনের বরফ কাটার বরাত কাউকে দেওয়া যায় না? কার আছে সেই বেলচা, যা মনের বরফ সরাতে পারে?

সূর্য সেন পল্লী, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা

বাইরের বারান্দায় চিঠিটা হাতে করে একটা আরামকেদারায় বসেছিলেন আনন্দকুমার। রোদ আসছে, হালকা রোদ গায়ে এসে পড়ছে। শীতের সময় মন্দ লাগে না এই রোদের আমেজ। অবশ্য এতদিন যে বেঁচে আছে, তার কাছে সবই ভাল লাগার কথা। এখন চলে যেতে পারলেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন আনন্দকুমার। কাজ যা করবেন ভেবেছিলেন জীবনে, তার চেয়ে খানিকটা বেশিই হয়তো করেছেন। আর থাকা কেন? তবু যাওয়ার দিন না-এলে তো মানুষ যেতে পারে না। আর যার যখন যাওয়ার সে তখনই যাবে। ওঁর একমাত্র ছেলে সরিৎ যেমন চলে গেল অল্প বয়সে। হার্টের অসুখ ছিল ছোটবেলা থেকে, আনন্দকুমার তাঁর সীমিত সাধ্যে চেষ্টার কসুর করেননি তবু। সরিতের চলে যাওয়ার দুঃখ খুব বেশিদিন বহন করতে হয়নি সুষমাকেও। ছেলের মৃত্যুর কয়েক বছর পর সে-ও পা বাড়িয়েছে না-ফিরে আসার দেশে। আনন্দকুমারের একমাত্র জীবিত ভাই যৌবনে নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল, এখন দিল্লিতে থাকে। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দিল্লিও যাননি আনন্দকুমার। কলকাতার উপকণ্ঠের এই ঠিকানাতেই জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়ে, এখান থেকেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যেতে চান। পরজন্মে বিশ্বাস নেই আর পরজন্ম যদি থাকেও, কোথায় ফিরবেন? যে উত্তাল নদী আর প্রবল বৃষ্টির দেশে জন্মেছিলেন, সেখানে? না কি জীবনের প্রায় উপান্তে এসে যেখানে দু’কাঠা জমির উপর তিনটে ঘর দাঁড় করাতে পেরেছেন, সেখানে? দোতলার ভিত করিয়ে রেখেছিলেন বাড়ি বানানোর সময়, ভাবলে হাসি পায় এখন। একতলাতেই থাকার লোক নেই, কে থাকবে দোতলায়? হয়তো যে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে দানপত্র করে দিয়ে যাবেন ভেবেছেন বাড়িটা, তারা নিজেদের প্রয়োজনমতো দোতলা তিনতলা তুলবে। কিংবা তুলবে না। কী এসে যায়? উদয়াস্ত পরিশ্রমের ফসল এই বাড়ি, তবু বহুদিন যাবৎ আনন্দকুমার নিস্পৃহ এর বিষয়ে। ইট-কাঠ-সিমেন্ট দিয়ে নয়, কলম আর কাগজে যা নির্মাণ করে গেছেন, বাঙালির স্মৃতির কোনও এক কোণে তা যদি থাকে, তা হলেই ওঁর জীবন সার্থক।

এখন প্রায় সবসময়ই মনে পড়ে সেই জীবনের কথা, যা শুরু হয়েছিল কোনও এক স্বপ্নের দেশে, রূপকথার মতো। যেখানে জল আর মাটি এমন মিশে থাকত পরস্পরের সঙ্গে যে পায়ের নীচে ঘাসের মতোই মাছ এসে পড়ত সময়-সময়। ওঁর গ্রামের কাছেই দুটো স্টিমারঘাট ছিল, একটা তারপাশায়, আর একটা লৌহজঙে। লৌহজঙের স্টিমারঘাট পদ্মায় তলিয়ে যাওয়ার পর তারপাশা হয়ে দাঁড়াল স্টিমারে চাপার একমাত্র পথ। কিন্তু যে স্টিমারঘাটে বাবাকে তুলে দিতে যেতেন, ছোটবেলায় মায়ের কোলে চেপেও গেছেন একবার, সেই স্টিমারঘাটটা হঠাৎ করে একেবারে তলিয়ে গেল? যেরকমভাবে বাস্তু তার সমস্ত স্মৃতি নিয়ে তলিয়ে যায়?

আনন্দকুমার চমকে উঠলেন। আধো-ঘুমটা ভেঙে গেল। তারপরও সেই অতীতেই রইলেন আনন্দকুমার। তারপাশা থেকে স্টিমারে চড়ে গোয়ালন্দ, গোয়ালন্দ থেকে কলকাতা, সেই প্রথম পুজো দেখতে আসার স্মৃতি মাথার মধ্যে চরকি কাটতে লাগল। পুজো দেখতে সেবার ওঁদের গোটা পরিবার এসেছিল কলকাতায়। আনন্দকুমার তখন ন’-দশ বছরের হয়তো। তবু দেওয়ালে গাঁথা ক্যালেন্ডারের মতো সমস্তটাই যেন গেঁথে আছে মনের সঙ্গে। হোগলার বেড়া আর টিনের ছাদওয়ালা ঘর, মাটির মেঝেয় আসনপিঁড়ি হয়ে বসে ভাত আর মাছের ঝোল খাওয়ার ব্যবস্থা। শুধু ঝোলের মাছই থাকত না, অনেক সময় রুই মাছ ভাজা, ইলিশ মাছ ভাজারও অঢেল আয়োজন থাকত। যত মানুষ ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি মাছ ছিল যে দেশটায়। বিক্রমপুর ছেড়ে আসার পর নতুন জীবনে যেদিন সামান্য থিতু হতে পেরেছেন আনন্দকুমার, সেদিনও বাজারে গিয়ে মাছের আগুন দাম শুনে হাত ছোঁয়াতে না-পারলেও, মাছের কাঁটা বা মুড়ো থলেয় লুকিয়ে বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। মাছের ওই ঝরতি-পড়তির সংস্পর্শেও রান্না পালটায় আর রান্নাই পালটে দেয় জীবন। লাউ যেমন বড়ি দিয়ে রাঁধলে একরকম আর সেই লাউয়ে মাছের কাঁটা দিলে লাউটাই হয়ে ওঠে অমৃত। ইভ আসার আগে আদমের কাছে স্বর্গটাও একটা মরুভূমি ছিল। তেমনই বোধ হয় মাছের কাঁটা আসার আগে অনেক অনেক সবজি রংহীন, স্বাদহীন হয়ে পড়ে ছিল। আনন্দকুমারের মনে হত।

কলকাতা আসার পথে গোয়ালন্দে মাছ-ভাত খাওয়া হয়েছিল। এত সস্তা মাছ, তবু হোটেল মালিকরা কেন যে ঠকাতে চাইত। যারা খাওয়ার পরে পয়সা দেবে, তাদের কাছে খাবার আসত জমিয়ে, অনেক ভাত, পর্যাপ্ত মাছ। আর যারা আগে থেকে খাবারের টিকিট কেটে বসে যেত, তাদের মাথায় কেমন করে টুপি পরাবে, তার সমস্ত ছক কষা থাকত। সেই প্রথমবার যে-হোটেলে ওরা খেতে বসেছিল, বেয়ারা এসে ক্রমাগত বলে যাচ্ছিল, “এই গরম ভাত নামল বলে...”

শেষমেশ গরম ভাত নামল, ডাল এল, একটা তরকারিও, কিন্তু মাছ আসার আগেই হঠাৎ করে ম্যানেজার এসে বলল, “খুব আফসোস হইতাসে, আপনাগো খাওয়াইতে পারলাম না, ট্রেনের হুইসল পইড়া গেসে গিয়া।”

সেই শুনেই পয়সা দেওয়া কিছু যাত্রী খাওয়া ফেলে দৌড়ল ট্রেন ধরতে।

কিন্তু আনন্দকুমারের মামা, জগন্নাথ মুখোপাধ্যায় রুখে দাঁড়ালেন, “ট্রেনের অহনও আধাঘণ্টা দেরি আসে। আগের বাইরও তোমরা এইসব কইয়াই ঠকাইসিলা।”

“ট্রেন সত্যই আইসা গেছে।” হোটেল ম্যানেজার জবাব দিল।

জগন্নাথমামা ধমক দিয়ে বললেন, “ট্রেন যদি ফেল করি, তাইলে পরে কাইল যামু কইলকাতা। আজ ভাল কইরা খাইয়া নিই।”

এই প্যাসেঞ্জারদের ঠকানো অসম্ভব বুঝতে পেরেই হয়তো ভাত আর দু’রকম মাছ এসেছিল তারপর। ইলিশ মাছ ভাজা ছিল, আর সেই ভাজা মাছগুলোর প্রায় প্রত্যেকটার মধ্যে বেশ বড় সাইজ়ের ডিম ছিল। ডিম হলে নাকি মাছের স্বাদ কমে যায়, মা বলত। কিন্তু ডিমের যা স্বাদ তা তো মাছের স্বাদের চতুর্গুণ। সেই মাছের ডিমভাজার স্বাদ যেন পদ্মা পেরিয়ে গঙ্গায় এসে পৌঁছল। আনন্দকুমার একটা ঢোঁক গিললেন। যখন কলকাতা শহরে এসে রবারের মতো লাফিয়ে ওঠা ভাত দিয়ে খিদে মেটানোর চেষ্টা করতেন, তখনও সেই ইলিশ মাছ ভাজা আর ডিমের স্বাদের স্মৃতি কোথাও একটা জোর দিত ওঁকে। বলা যায়, স্মৃতি দিয়ে মেখে ভাত খেতেন আনন্দকুমার।

এখানে এসে প্রথম যেদিন একটা ঘরে ঠাঁই পেয়েছিলেন, সেদিন ভুলে থাকতে চেয়েছিলেন যে সেটা আসলে চট, শুকনো পাতা, কাঠের বাকল আর পোড়া-ঝোরা বাঁশের খুঁটি একত্র করে তোলা একটা আস্তানা মাত্র। আনন্দকুমার সেই ঘরে যখন ঘুমোনোর চেষ্টা করছিলেন, পুরো দেশটা তার সমস্ত সম্পদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওঁর ওপরে। কিন্তু গভীর ক্লান্তিতে আর বেশি কিছু ভাবার অবকাশ পাননি। প্রবল পরিশ্রম, আর প্রবলতর ক্লান্তি জীবনটাকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর পাক খাওয়াতে খাওয়াতে নিয়ে এসেছে। ঠিক যেমন বেডিং পাক খেয়ে গুটিয়ে যাওয়ার পর কোনখানে বালিশ, কোথায় চাদর বোঝা যায় না, সেভাবেই পূর্ব সব অভিজ্ঞতাও গুলিয়ে গেছে। স্মৃতির গায়ে জ্বলন্ত কয়লা দিয়ে যে দৃশ্যগুলো আঁকা, তার কয়েকটাই মাত্র নিজের বইতে রাখতে পেরেছেন আনন্দকুমার। না-রাখতে পারা কত ঘটনা যে মাথার ভিতরে স্লাইডের মতো ঘুরে বেড়ায়। নিমতলা ঘাটে অমরেশকে খিচুড়ি খেতে দেখা সেইরকমই একটা অভিজ্ঞতা।

গ্রামে আনন্দকুমারদের পাশের বাড়িটাই ছিল অমরেশদের। ছোট থেকেই, একটা পেয়ারা গাছ থেকে পাড়লেও আনন্দকুমারকে না দিয়ে খাওয়ার কথা ভাবতেই পারত না অমরেশ। কিন্তু সেই ছেলেটাই যখন দেশভাগের পর রাতারাতি বাড়ি-উঠোন-তুলসীতলা সমস্ত ছেড়ে শিয়ালদা স্টেশনে এসে উঠল, রুক্ষ হাওয়ার থাপ্পড় তার কানে অন্য মন্ত্র দিল কি? নইলে নিমতলা ঘাটের কাছে বসে থাকা ভিখিরিদের মধ্যে ভিড়ে গিয়ে সে দাতব্যে পাওয়া খিচুড়ি হুপহাপ গিলবে কেন?

“তুই আমারে বাদ দিয়া খাইতে শুরু করলি ক্যামনে?” অমরেশের সন্ধান পেয়েই জিজ্ঞেস করেছিলেন আনন্দকুমার।

“ভয় পাইসিলাম। তরে ডাকতে গেলে পরে যদি খিচুড়ি ফুরাইয়া যায়।” জবাব দিয়েছিল অমরেশ।

অমরেশের এই পালটে যাওয়ার কারণ তবে সাতপুরুষের ভিটে-মাটি ছেড়ে আসা? উদ্বাস্তু কি তা হলে সে-ই, যার কোনও ধর্ম নেই, জাত নেই, সংস্কার নেই, সংসার নেই, সম্পদ নেই, সংস্রব নেই, এমনকী সন্তাপও নেই? যার বাড়ি হারায় না কেবল, বাড়ির সঙ্গে হারিয়ে যায় সমস্ত অনুভূতি, যার চোখের জল কেবল কয়লাপোড়া ছাই হয়ে বেঁচে থাকে? সেই ছাইটাই যে কোনওদিন হিরে হতে পারত, সেই কথাই নিজের বইয়ে লেখার চেষ্টা করেছেন আনন্দকুমার।

যেদিন শিয়ালদা স্টেশনে রাতে শুতে হবে জেনে মা বলেছিল, “আমি এখানে থাকতে পারুম না, আমারে তুই চিতায় তুইলা দে, নইলে অন্য কোথাও নিয়া চল।” সেদিন আনন্দকুমার বইটা লিখতে চাননি, কারণ তখন তো বাঁচার ধান্দায় পাগলের মতো ঘুরছেন।

বইটা লেখার কথা সেই ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ দেখতে গিয়েও মাথায় আসেনি, যেদিন ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে জায়গা না পেয়ে মোহনবাগান গ্যালারিতেই বসে গিয়েছিলেন। ওঁর ঠিক পাশেই বসেছিল শতচ্ছিন্ন জামাকাপড় পরা একটা লোক। মোহনবাগান এক গোলে এগিয়ে ছিল, ইস্টবেঙ্গল গোল শোধ করতেই লোকটার চোখদুটো চকচক করে ওঠে। কিন্তু কোনও আওয়াজ করে না সে। আনন্দকুমারের কেমন জানি সন্দেহ হয়। ম্যাচটা অমীমাংসিত ভাবে শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দকুমার লোকটার পিছু নেন। একসময় নাগালে পেয়ে জিজ্ঞেস করেন, “দেশ কোথায়?”

লোকটা চমকে ওঠে। তারপর ফিসফিসিয়ে বলে, “দ্যাশটারে তো গলার ভিতর লুকাইয়া রাখসি। চিৎকার করলে কেউ যদি বুইঝা ফালায়!”

চিৎকার না করলেও, সর্বস্ব হারিয়ে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে এসে পড়া মানুষের আর্তনাদে মানুষ একটু কেঁপে উঠুক কোথাও, সেই ইচ্ছেই নদীর গতিবেগ সংগ্রহ করছিল আনন্দকুমারের অন্তরে। দিনের পর-দিন তা মোহানায় আছড়ে পড়ার মতো বড় হতে হতে আনন্দকুমারকে জিজ্ঞেস করত, ‘মনে রাখছ?’ আনন্দকুমার তখনও একটা শব্দও লেখেননি, কিন্তু অন্তরের অন্দরে একটা জাতির নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্তে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর আলেখ্য হাত-পা মেলছে। তবে সেই হাত-পা মেলা অদৃশ্যই থাকত যদি না স্বাধীনা এই বইটার স্বপ্নকে নিজের ইচ্ছে থেকে আনন্দকুমারের দু’চোখে স্থাপন করত।

অবরুদ্ধ কান্নাগুলো নিয়ে আনন্দকুমার যখন লৌহজঙের স্টিমারঘাটের মতো তলিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন স্বাধীনাই ওঁকে হাত ধরে টেনে তুলেছিল। স্বাধীনার তাগাদা ব্যতিরেকে এই বইয়ের একটি পাতাও লিখে উঠতে পারতেন না আনন্দকুমার। এই বই তাই স্বাধীনারও, যতটা আনন্দকুমারের। কিন্তু এই বইয়ের পিছনে স্বাধীনার সেই অবদান, স্বাধীনার কথাতেই, গোপন রাখতে হয়েছে ওঁকে। আজ যখন আনন্দকুমারের বইটি আমেরিকা থেকে প্রকাশ করতে চেয়ে জগদ্বিখ্যাত প্রকাশক চিঠি দিয়েছেন তখন সারাক্ষণ স্বাধীনার কথা মনে পড়ছিল ওঁর। যদি এই বই ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে বেরোয় তা হলে তা হবে আনন্দকুমার আর স্বাধীনার যৌথ প্রচেষ্টায় স্থাপিত উপনিবেশ। মানুষ তো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে আবার নতুন করে নিজের আবাদ গড়ে তোলে। আমেরিকা থেকে আনন্দকুমারের এই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হলে হয়তো সারা বিশ্ব জানবে একটা ভূখণ্ডের মানুষের আবার উঠে দাঁড়ানোর কথা, ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়ে নয়াবাদ বানানোর কথা। সেই নয়াবাদের পাতায় পাতায় যে চটের, হোগলার, পোড়া বাঁশের বাড়িগুলোর বিবরণ থাকবে সেই বাড়িগুলোর কোনও একটা ঘরে স্বাধীনা আর আনন্দকুমারের স্বপ্নজীবনও হয়তো বাতাসে আর্দ্রতার মতো মিশে থাকবে, ওই আর্দ্রতার থেকেই তো এই বইয়ের জন্ম। বাস্তুহারার ঘর নির্মাণের আখ্যান যেখানে লিপিবদ্ধ, স্বপ্নহারার ভাঙা স্বপ্নের টুকরো সেখানে থাকবে না, তাই হয়?

অ্যান-আর্বার, মিশিগান

আমেরিকার বাঙালি সমাজে কে কার বাড়িতে নেমন্তন্ন পাবে কিংবা পাবে না সেটা বেশ জটিল একটা ব্যাপার। এই নেমন্তন্নের রাজনীতি জয়ী প্রথম-প্রথম মোটেই বুঝতে পারেনি। একদিন ঈপ্সিতা দত্তর বাড়িতে শহরের অনেকের নেমন্তন্ন, জয়ীকে সকাল সকাল ডেকেছিল ঈপ্সিতাদি কাজেকম্মে সাহায্যের জন্য, তা সেইসব কাজকম্মো শেষে দুপুরের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল জয়ী। আধো ঘুমেই শুনল ইপ্সিতাদি ফোনে কার সঙ্গে যেন আলোচনা করছে, নিমন্ত্রিতর তালিকা থেকে চন্দনা দাশগুপ্তকে বাদ দেওয়ার কারণ বিষয়ে।

“আসলে চন্দনার ডিভোর্সটা হয়ে গেছে তো, ও একদম ফাঁকা এখন। তাই অনেকেই আমাকে বলছে যে ওকে ডাকার দরকার নেই। বিশেষ করে তনুকার বাড়ি ওর আর আবেশদার ডুয়েট গান, আবেশদার ওয়াইফই যখন ভালভাবে নেয়নি, তখন ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কী বলো?”

কথাগুলো শুনে ঘুমের চোদ্দোটা বেজে গিয়েছিল জয়ীর। কী পৃথিবী রে বাবা, যেখানে ডিভোর্স হয়ে গেলে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে ডুয়েট গান অবধি গাইবার অধিকার নেই! প্রতিটা মুহূর্তে সমাজ যদি এত জোড়ায়-জোড়ায় চলে তা হলে তো একা বেঁচে থাকা মানুষজনের ভয়ানক দুর্গতি। ভাবতে ভাবতে অরণ্যর প্রস্তাবের ব্যাপারে খানিকটা আগ্রহ জন্মেছিল জয়ীর। নইলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাউকে ভালবাসার মন ওর মরে গিয়েছিল সেই কোন ছোটবেলায়। অভিরাজের সৌজন্যে।

অভিরাজকে ও ভালবেসেছিল ক্লাস ইলেভেনে পড়তে। গার্লস স্কুলের ছাত্রী হিসেবে কিছুটা দ্বিধা ভিতরে ছিলই, কিন্তু কোচিং ক্লাসে আলাপ হওয়া অভিরাজ যে সহজতায় ওর হাত ধরত, কানে কানে কথা বলার অছিলায় গরম নিশ্বাসের লাভায় ধুইয়ে দিত জয়ীর মুখ, এমনকী, একবার খুব খারাপ পরীক্ষা দেওয়ার কারণে মুহ্যমান জয়ীর ঠোঁটে গাঁজা মেশানো সিগারেট গুঁজে দিয়ে প্রথমে কাশি আর তারপর একটা মাথা-বনবন করা নেশার জগৎ উপহার দিয়েছিল, তাতে জয়ীর ওর প্রেমে পড়াই স্বাভাবিক ছিল। অভিরাজ নিজের কথাকে অন্যের মুখ দিয়ে বলিয়ে নিতে পারত, নিজের ইচ্ছেকে অন্যের ইচ্ছে বলে চালাতেও পারত। কিন্তু সেই সব কেরামতির খবর তো জয়ী জানত না তখন। জয়ী তখন সদ্য ষোলো পেরোনো একটা মেয়ে, যার বাবা তার মাকে ছেড়ে অন্য একটা সংসার বেঁধেছে, যার ফলে পুরো দুনিয়াটাকেই সার্কাস বলে মনে হচ্ছে ওর। আর সার্কাসে তো কেবলমাত্র হিংস্র পশু কিংবা ট্র্যাপিজ় থাকে না, ক্লাউনও থাকে। অভিরাজ নানা রকম মজা করে জয়ীকে এইটা বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল যে ওর কাছাকাছি থাকলে জয়ী যতটা মজায় থাকবে, সেরকম মজা ওকে আর কেউই দিতে পারবে না। জয়ী বিশ্বাস করেছিল কারণ জয়ী বিশ্বাস করতে চাইছিল। বিশ্বাস করতে চাইছিল বলেই কোচিং থেকে ফেরার পথে একটা আধো-অন্ধকার পার্কে নিয়ে গিয়ে অভিরাজ যখন একটা টর্পেডোর মতো নিজেকে আছড়ে ফেলছিল ওর উপর, চুমুর পর চুমু খেয়ে জয়ীর ঠোঁটদুটো অসাড় করে দিচ্ছিল প্রায়, জয়ীর মনে হচ্ছিল, এটাই সেই স্বর্গসুখ যার পরিণামে ঠোঁট যত ভারী হয়ে যায় তত হালকা ফুরফুরে হয়ে ওঠে মন। জয়ী যেন অনুভব করছিল, একটা মস্ত পরীক্ষায় ও পাশ করে যাচ্ছে। কিশোরী থেকে মেয়ে হওয়ার সেই পরীক্ষায় পাশ মার্কস কোনও নম্বরের উপর নির্ভর করে না। প্র্যাক্টিক্যালের ল্যাবরেটরি কিংবা কোনও এক্সপেরিমেন্ট দরকার নেই তার জন্য। দরকার শুধু বয়ঃসন্ধি পার করার পর অন্য একটা সিগন্যালে নিজের অনুভূতিকে থমকে রাখা। ঘোর কুয়াশার মধ্যে গাড়ি যখন হেডলাইট জ্বালিয়েও সামনেটা দেখতে পায় না তখন যেমন আন্দাজেই পথ চলতে হয়, মানুষের ভবিষ্যৎযাত্রাও সেরকমই। সেই যাত্রাপথে কোনও টর্চ বা মশাল নয়, অন্য একটা কিছু সঙ্গে থাকে মানুষের। জয়ীর ঠাকুরমা প্রীতিকণা চৌধুরী যাকে বলতেন ‘আশার নেশা’।

ওদের পারিবারিক থিয়েটার ছিল উত্তর কলকাতায়, জয়ী শুনেছে। কিন্তু সেই থিয়েটার ওর জন্মের আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেখানে শিশির ভাদুড়ি থেকে অহীন্দ্র চৌধুরী কবে কোন নাটকে অভিনয় করেছেন, সেই গল্প জয়ী অনেক শুনেছে, কিন্তু থিয়েটার বন্ধ কেন হয়ে গেল? এই প্রশ্ন উঠলেই একটাই উত্তর দশদিক থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, ‘শরিকি ঝামেলা’। এই শরিকি ঝামেলা যেন রাজা-রাজড়াদের ইতিহাসের মতো, কেবল দাদাকে মেরে ভাইয়ের কিংবা বাপকে মেরে ছেলের সিংহাসনে বসার বদলে, এর ওকে, ওর তাকে মামলায় সর্বস্বান্ত করে নিজেদের ভাগের সম্পত্তি বাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা।

“তবে অধিকাংশ মামলা লড়তেই এত খরচ হয়ে যেত যে শেষমেশ লাভের গুড় উকিলবাবুরা খেয়ে যেত আর নাভিশ্বাস উঠে যাওয়া দুই পক্ষ তাঁদেরই ধরত কোর্টের বাইরে একটা বোঝাবুঝির জন্য। সেই বোঝাবুঝি করতে গিয়ে আবার বিড়াল যেমন করে দুই বানরের মধ্যে থাকা পিঠে ভাগ করে দিয়েছিল, তেমন করে উকিলবাবুরা নিজেদের কোলেই ঝোল টেনে নিতেন যতটা সম্ভব।” জয়ীর মা ওকে বলত।

“আমাদের বাড়ির লোকেরা অত মামলা করত কেন?” মায়ের কথার উত্তরে প্রশ্ন করত জয়ী। আর মায়ের কাছে ঠিকঠাক উত্তর না পেয়ে জিজ্ঞেস করত দিদুনকে।

“কী বলি বলো তো তোমায়? এককথায় বলতে গেলে আশার নেশায়।”

“সেটা আবার কী?” জয়ী জানতে চাইত।

“ওই যে গিরিশবাবু বলেছিলেন, ‘পুরস্কার তিরস্কার/কলঙ্ক কণ্ঠের হার/তবু এই পথে পদ করেছি অর্পণ/ রঙ্গমঞ্চ ভালবাসি/হৃদে সাধ রাশি-রাশি/আশার নেশায় করি জীবনযাপন।’ আমাদের বাড়ির পুরুষরাও সব ওই আশার নেশায় মত্ত হয়ে সমুদ্রকে খাল-বিলের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর ছিল। আমি উড়ে এসে জুড়ে না বসলে সেইটুকুও থাকত কি না সন্দেহ।”

“তুমি কোত্থেকে উড়ে উড়ে এসে জুড়ে বসেছিলে?” জয়ী হেসে উঠেছিল খিলখিল করে।

প্রীতিকণা হঠাৎ করে গম্ভীর হয়ে যেতেন, “সে ছিল একটা জায়গা, এই পৃথিবীর বাইরে কোথাও। সেখানে হ্যালোজেন লাইট ছিল না, জুড়িগাড়ি ছিল না, নাটক দেখতে যাওয়া মেয়েদের থিয়েটারের দাসীদের দিয়ে ডেকে পাঠানো ছিল না...”

“কী ছিল তা হলে?”

“কেন, ওই আশার নেশা।”

“তোমারও ছিল?”

“থাকবে না কেন? এখনও আছে। এই যে তুমি আমার কোলে এসে বসবে, সেটা হল আশা আর বসলে আমি যে তোমার দু’গালে চুমু দেব দুটো, সেটা হল গিয়ে নেশা।” প্রীতিকণা হেসে উঠতেন।

কিন্তু সেই প্রীতিকণারই অন্য রূপ দেখেছিল জয়ী, ক’দিন পরেই।

সেদিন জয়ীকে কোচিং ক্লাসে ডুব দিয়ে নিজের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যেতে বাধ্য করেছিল অভিরাজ আর প্রায় ফাঁকা হলের ভিতরে জয়ীর যৌবন ছুঁতে যাওয়া শরীরটাকে নিংড়োচ্ছিল। জয়ীর বুক টনটন করছিল ব্যথায়, ওর ঠোঁটদুটোয় কেটে বসছিল অভিরাজের আদর যাকে আক্রোশের থেকে আলাদা করা দুঃসাধ্য। জয়ীর স্কুল-ইউনিফর্মের প্রথম বোতামটা ছিঁড়ে পড়ে গিয়েছিল হলের ভিতরেই কোথায় আর তাই নিয়ে এমনই শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল জয়ী যে খেয়াল করেনি ওই কামড়াকামড়ি, চটকাচটকির মোচ্ছবে ওর কল্পনা থেকে চিরতরে খসে পড়ে গেছে সেই আকাঙ্ক্ষা, পুরুষের সঙ্গে প্রথম ঘনিষ্ঠতাকে যে কবিতার মতো কিছুতে বাঁধতে চেয়েছিল।

বাবা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে মা আধখানা, কিংবা বলা যায় সিকি-মানুষ হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর সব ঘটনা-দুর্ঘটনাই মায়ের চোখের সামনে ঘটলেও কোনও প্রতিক্রিয়া জাগাতে পারত না, আঙুল গলে গড়িয়ে যাওয়া জল যেরকম আঙুলের কোনও হেলদোল ঘটাতে পারে না।

ঠোঁট কীভাবে কালো হয়ে গেছে তার উত্তরে, ‘জানি না কিছু একটা কামড়েছে হয়তো’ বলে মায়ের সামনে থেকে তাই সরে আসতে পেরেছিল জয়ী। কিন্তু দিদুনের কেটে-কেটে বলা কথাগুলোর সামনে ওর কোনও প্রতিরোধ দানা বাঁধতেই পারল না।

প্রীতিকণা খুব স্পষ্ট করে বললেন, “তোমার ঠোঁটের এই অবস্থা কীভাবে হয়েছে, কেমন করে হতে পারে সবটাই আমি বুঝতে পারছি, কারণ আমি তোমার বয়সটা পেরিয়ে এসেছি। তাই আমার সামনে দয়া করে মিথ্যে বলার চেষ্টা কোরো না।”

“আমি মিথ্যে বলছি না। ছেলেটা আমায় ভালবাসে।”

“ভালবাসার প্রসঙ্গে আমি পরে আসব। কিন্তু তার আগে বলি, ছুড়তে জানার আগে বোমা হাতে নিতে নেই। টাকা যেমন ব্যাঙ্কে রাখতে হয়, শরীরটাকেও তেমনি পরিণত হতে দিতে হয়। শরীরটা অপব্যবহারের জন্য নয়। তুমি কী খুঁজতে কোথায়, কার কাছে গেছ, সে তোমাকে চাইছে, না কি তোমার শরীরটাকে, এটা তোমায় বুঝতে হবে জয়ী।”

“কিন্তু আমি ভালবাসি!” বাইরে বেরিয়ে আসতে চাওয়া কান্নাটাকে ভিতরে চেপে বলে উঠল জয়ী।

“বেশ, মেনে নিলাম তোমার কথাই। কিন্তু তুমি ভাল যাকে বাসো, সে তোমার এরকম অবস্থা করেছে কেন? মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকো না, এই শনিবারই ছেলেটাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। কী নাম ওর?”

“অভিরাজ।”

“ওই অভিরাজকে গিয়ে বলো যে আমি ওর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছি।”

“ও আমার ব্যাচমেট। যদিও অন্য স্কুলে পড়ে।”

“সেই স্কুলে ডিসিপ্লিন শেখায় না ওকে? একটা মেয়ের সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেই শিক্ষাটুকু দেয় না?”

“তুমি ওকে বকবে, ও তোমার সামনে এলে?”

“সাবধান করব। তা নইলে তো পরে আবার তোমার এমনই হাল করবে যাতে তুমি স্কুল যেতে না পারো দু’দিন।”

“স্কুল?”

“হ্যাঁ। কাল কামাই করতে হবে তোমাকে। নইলে ওই কালশিটে পড়ে যাওয়া ঠোঁট নিয়ে স্কুলে গেলে দশজন দশ রকম প্রশ্ন করবে আর উত্তর দিতে গিয়ে দশটা গল্প ফাঁদতে হবে তোমাকে। আমি সেটা চাই না জয়ী।”

জয়ী কেঁদে ফেলল কথাগুলো শুনতে শুনতে। আর গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে দিদুনের বিছানার একটা ধারে বসে অপেক্ষা করতে লাগল, কখন দিদুন ওকে কাছে ডেকে জড়িয়ে নেয়, তার জন্য। প্রীতিকণা মুখে একটা পান দিয়ে বললেন, “ভালবাসা মানে যাকে ভালবাসি তাকে আদরে রাখা, আর আদরে রাখতে গেলে তো যাকে আদর করছি ভাবছি, তাতে আদতে তার কষ্ট হচ্ছে কি না, সেটা বুঝতে হবে।”

“তুমি যা দেখছ তার বেশি আর কিচ্ছু হয়নি দিদুন। আই প্রমিস।”

“আমার সে বিশ্বাস আছে তোমার উপর। সবকিছুর একটা সময় আছে জয়ী। তুমি যখন সেই সময়ে পৌঁছবে, তোমার সত্তাই তোমাকে বলে দেবে। তার আগে পাহাড়ে ওঠার সময় দেখে নিতে হবে কতটা অক্সিজেন আছে পিঠের সিলিন্ডারে।”

জয়ী জড়িয়ে ধরল ওর দিদুনকে। প্রীতিকণা আলতো করে একটা চুমু দিলেন ওর কপালে। ওইরকম একটা আলতো চুমু জয়ী অভিরাজের কাছ থেকেও প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু জয়ীর ঠাকুরমা ওকে ওদের বাড়িতে ডেকেছে শোনার পর থেকেই জয়ীকে কীরকম এড়িয়ে চলতে শুরু করল অভিরাজ। জয়ী কারণটা কিছু বুঝতে পারছিল না, হয়তো পারতও না, যদি না একদিন একটু আগেই পৌঁছে যেত কোচিংয়ে আর অভিরাজ, প্লাবন, সৈকতকে গোল হয়ে আড্ডা দিতে দেখত। জয়ী দরজার বাইরে ছিল বলে ওরা কেউ জয়ীকে দেখতে পায়নি, কিন্তু জয়ীর কানে আসছিল ওদের প্রত্যেকটা কথা।

“জয়ীর সঙ্গে তলে তলে ভালই তো চালাচ্ছিস, এদিকে আমাদের সামনে এমন ভাব করিস যেন তোদের মধ্যে কিচ্ছু নেই। শোন ভাই, শৌনক তোদের দু’জনকে একসঙ্গে সিনেমা হলে ঢুকতে দেখেছে। ঝুট বোলকে ফায়দা হবে না।” প্লাবন বলল।

“আরে না রে ভাই, মিথ্যে বলব কেন ফালতু-ফালতু। সিনেমায় গিয়েছিলাম সে কথা সত্যি, কিন্তু সে অনেকদিন আগের ব্যাপার। এখন আমার কোনও হ্যাল নেই জয়ীর উপর। তোরা যে খুশি ওকে নিয়ে মজা করতে পারিস।”

কথাটা একটা বাজের মতো জয়ীর কান দিয়ে ঢুকে সারা শরীরে ফেটে পড়ল যেন। অভিরাজ এইসব কী বলছে? ও জয়ীকে ছেড়ে দিয়েছে? সেদিন সিনেমা হলে যা ঘটল তার পরেও ছেড়ে দেওয়া এত সহজ? চাইলেই ছাড়া যায়? জয়ীর গলার ভিতরে প্রশ্নগুলো দলা পাকিয়ে গেল।

‘‘কিন্তু ছেড়ে দিলি কেন?’’ সৈকত জিজ্ঞেস করল।

“বনেদি বাড়ির মেয়ে, প্লাস মনটাও ভাল। অনেক মেয়ে আছে নোটস-ফোটস দিতে চায় না, বাট জয়ী ইজ় ভেরি হেল্পফুল।” প্লাবন বলল।

“কিন্তু সে সমস্ত হয়ে আর হবেটা কী? অভিরাজের নজর এখন ইলিনার দিকে পড়েছে। এখন বাবুর ইলিনাই ধ্যান-জ্ঞান।” সৈকত বলল।

“সেটা হওয়া কি খুব অস্বাভাবিক ভাই?” অভিরাজ প্লাবনের কাছ থেকে নিয়ে সিগারেটের কাউন্টারে টান দিল।

“ভাল একটা মেয়েকে ছেড়ে দিয়ে আবার অন্য একটা মেয়ে?” প্লাবন প্রশ্ন করেই যাচ্ছিল।

বিরক্তি ঝরে পড়ল অভিরাজের গলা দিয়ে, “ভাল-ভাল-ভাল শুনে আমি কী করব রে শালা? আমি কি ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দেওয়ার অফিস খুলেছি নাকি? জয়ী খুব সোবার, খুব ভদ্র, ভেরি হেল্পফুল, কিন্তু মোদ্দা কথা হল, জয়ী রেজ়ালার মাংস। আর আমার রেজ়ালার মাংস ভাল লাগছে না। আমার এখন চাঁপ চাই। ওই রোগাপ্যাটকা জয়ীর চেয়ে ডবকা ইলিনা অনেক বেশি অ্যাট্রাক্টিভ, অস্বীকার করতে পারবি? ইলিনা ইজ় ভোলাপচুয়াস অ্যান্ড বাউন্টিফুল। আর সেই কারণেই ও অনেক বেশি ডিজ়ায়ারেবল আমার কাছে। খেল খতম, পয়সা হজম!”

“তা হলে? জয়ী গন, ইলিনা অন?” সৈকত বলল।

কেউ তার কোনও উত্তর দেওয়ার আগেই মহুয়া কোচিং-এ ঢুকতে গিয়ে জয়ীকে দেখে বলে উঠল, “বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন জয়ী?”

মহুয়ার কথা শুনে ঘরের ভিতরে থাকা তিনজনই পিছন ফিরল চকিতে। কিন্তু ততক্ষণে জয়ী ছুটতে শুরু করে দিয়েছে। ও ছুটতে শুরু করেছে, ডবকা, ভোলাপচুয়াস কিংবা বাউন্টিফুল একটা পৃথিবীর থেকে। ছুটছে সেই নরকটাকে পেরিয়ে যেতে, যেখানে পরিচয়ের ফর্মে রেজ়ালা কিংবা চাঁপ লিখতে হয় না। প্লাবন ওর পিছু পিছু আসছে, ও টের পেয়েছিল। কিন্তু কাছাকাছি এসে পৌঁছনোর আগেই জয়ী একটা বাসে উঠে পড়ল। বাসটা কোথায়, কতদূর যাবে কিচ্ছু জানা নেই। কেবল ওকে সেই দুনিয়ায় পৌঁছে দিক যেখানে কোনও পুরুষের সঙ্গে ওকে কথা বলতে না হয়।

বাড়ি ফিরে কেন বাড়ির গাড়ি না চেপে বাসে করে ফিরেছে তার কোনও জবাব দিতে পারেনি জয়ী। কেবল বমি করেছিল দু’বার। পরদিন যখন ডিনারে মাংস হয়েছিল আর মা যত্ন করে বেড়ে দিয়েছিল জয়ীকে, তখনও প্রথম টুকরোটা মুখে দিয়েই বাথরুমের দিকে ছুটে গিয়েছিল জয়ী। ওর ভিতর থেকে অভিরাজের সবটুকু স্পর্শ বমি হয়ে বেরিয়ে যেতে চাইছিল।

“ওটা স্পর্শ নয়, ওটা আসলে হাঙরের দাঁত। তোমাকে কামড়ে ধরেছিল কিন্তু ছিন্নভিন্ন করতে পারেনি।” জয়ীর মাথায় জলপট্টি দিতে দিতে প্রীতিকণা বললেন।

“হাঙরটা কোনও পানিশমেন্ট পাবে না? এত কষ্ট দিল আমাকে?”

“ওকে শাস্তি ওর জীবন দেবে, ওর ভবিষ্যৎ দেবে। কিন্তু তুমি ওকে শাস্তি দেওয়ার রোখটা মনের মধ্যে চেপে রাখলে সেই রোখ তোমাকেই কষ্ট দেবে প্রতিনিয়ত।”

“বাট, আই কান্ট ফরগেট, দিদুন।”

“আমি বুঝতে পারছি সোনা। আমি শুধু বলব যে তুমি জোর করে মনে করতেও যেয়ো না, ভুলতেও না।”

“তুমি আমাকে অন্য কোনও গল্প বলতে পারো দিদুন? এইসব রেজ়ালা-ফেজ়ালা থেকে যা অনেক দূরে কোথাও নিয়ে যাবে আমাকে?”

“শুনবে গল্প? অন্য একটা দেশের,অন্য একটা যুগের, বলা যায় অন্য একটা গ্রহের গল্প?”

সেই সময় দিনের পর-দিন দিদুন জয়ীকে নিজের কাছে ডেকে এনে শোওয়াত। আর অনেক রাত পর্যন্ত গল্প বলত। একটা নদীর গল্প। নদীর নামটা জয়ী ভুলে গেছে, কিংবা কে জানে দিদুন হয়তো বলেইনি। সেই নদীটায় একটা রাখাল ছেলে কিংবা এমনি ছেলে নৌকো বাইত। আর সেই নৌকোর সওয়ারি ছিল দিদুন একা। নদীটার এক প্রান্তে ছিল একটা গঞ্জ শহর আর অন্য প্রান্তে একটা মস্ত পাহাড়। সেই পাহাড়ের গায়ে-গায়ে উপজাতিরা আগুন জ্বালাত। সেই আগুনের ছাই উর্বর করত মাটিকে আর তারপর ফসল উগরে দিত মাটি। ওই পাহাড়ের গায়েই একটা গ্রাম ছিল আর সেই গ্রামে বসবাস করা মানুষদের কোনও নাম ছিল না, তারা প্রত্যেকে প্রত্যেককে একটা কোনও সুরে ডাকত। একটা সুর মানে একটা মানুষ। প্রতিটা মানুষের জন্য একটা করে সুর নির্ধারিত। ওই সুরটা শুনলেই সেই মানুষটা সাড়া দেবে। সেই ছেলেটা দিদুনকে কোন সুরে ডাকত আর দিদুনই বা কোন সুরে উত্তর দিত, তা অবশ্য জানা হয়নি জয়ীর। তবে ওই গল্প ওকে সুস্থতায় পৌঁছে দিয়েছিল, ব্যবহার হয়ে যাওয়ার ভয়ঙ্কর গ্লানি থেকে নদীর বাতাসের শুদ্ধতায় পৌঁছে দিয়েছিল। গল্প ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও অনেকদিন, ক্ষত মিলিয়ে যাওয়ার পরেও অনেক রাতে জয়ী সেই ছেলেটার কথা ভাবত যে কখনও দিদুনকে আঁচড়ে-কামড়ে ছিন্নভিন্ন করতে চায়নি।

সময় যখন ওর শরীরে নিজের ছাপ রাখতে শুরু করেছে, জয়ী হয়ে উঠেছে সেই ঝরনা যা পৃথিবীর সব স্ট্যাটিস্টিক্সকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে একইসঙ্গে সংযত ও অফুরন্ত, ধারালো ও ভারী। তখনও পুরুষের প্রতি একটা বীতরাগ, একটা দ্বিধা ওর ভিতরে কাজ করত। তার তীব্রতা অনেক কমে এসেছিল কালের নিয়মেই কিন্তু বেড়াজাল ছিলই, যেখানে থাকার।

অরণ্যকে সেই কৃতিত্ব দিতেই হবে যে বহু বছর পর সেই জালটা ও এতটা নড়বড়ে করে দিতে পেরেছিল যেখানে দাঁড়িয়ে অন্য কিছুও ভাবা যায়। তা নইলে তো জয়ী দিদুনের গল্পের সেই রাখাল ছেলেকেই ভালবেসে ফেলেছিল মনে মনে। দিদুনকে জ্বালিয়ে মারত ও রোজ, সেই ছেলেটা কীরকম দেখতে ছিল জানতে চেয়ে। তখন ওই দেখতে চাওয়ার কারণটা বোঝেনি কিন্তু এখন বোঝে যে ভিলেনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর মানুষের মন একটা কোনও হিরোকে দেখতে চায়। ‘হিরো ওয়ারশিপ’ করতে চায় একটু। দিদুনও ব্যাপারটা বুঝেছিল কি না কে জানে। তাই ছবি দিয়েছিল জয়ীকে একটা। কিন্তু বেশ কিছুদিন পরে জয়ী আবিষ্কার করে যে সেই ছবিটা আসলে শিবদাস ভাদুড়ির, যাঁর গোলে উনিশশো এগারো সালের শিল্ড জিতেছিল মোহনবাগান।

“আমাকে তো কোনও রাখাল ছেলের ছবি তুমি দাওনি দিদুন!” জয়ী নকল রাগ দেখিয়েছিল।

“কে বলল, রাখাল ছেলের ছবি নয়? সেদিন এই ছেলেটার পায়ের জাদুতেই তো স্বাধীনতার বাঁশি বেজে উঠেছিল কোটি বাঙালির মনে। খালি পায়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে গোল করেছিল ছেলেটা।” প্রীতিকণা তাকিয়েছিলেন জয়ীর দিকে।

জয়ীর মনে হয়েছিল দিদুন যেখানে থেমে গেল সেখানে ওর জন্য একটা প্রশ্ন অপেক্ষা করছে। কেন একটা খারাপ স্মৃতিকে গোল দিয়ে হারিয়ে দিতে পারছে না জয়ী? মাঠের বাইরে বের করে দিতে পারছে না একদম?

মিশিগানের মস্ত মস্ত পাঁচটা লেকের একটা দেখতে নিয়ে গিয়ে অরণ্য যখন চুমু খেল না, জাপটে ধরল না, শুধু গল্প করে গেল, ওর স্ট্রাগলের, বিদ্যাসাগর উপনিবেশের একটা দু’কামরা বাড়ির ভিতর আলাদা কোনও পড়ার ঘর ছাড়াই ওর অ্যান-আর্বার পর্যন্ত আসার কাহিনি, তখন জয়ীর চোখে ওই কলোনিটাই সুন্দর হয়ে উঠছিল, অরণ্যর লড়াইটাই একটা সুর হয়ে উঠছিল। কিন্তু ওই ব্লন্ড মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে কান্না, জয়ীর ভুলে যাওয়া প্রতিশোধস্পৃহাকে জাগিয়ে তুলল যেন? অভিরাজ যেমন ওকে ছেড়ে ইলিনার দিকে গিয়েছিল কেবলমাত্র শরীরের লোভে, অরণ্যও কি...

অরণ্য অভিরাজ নয়, জয়ী বোঝে। কিন্তু পুরুষ তো! ঘুরে যেতে কতক্ষণ?

রত্নেশ্বরদার বাড়িতে ওভাবে অপমান করার পর জয়ী আর আশা করেনি যে অরণ্য ফিরে যোগাযোগ করবে। তবু একটা ক্ষীণ আশায় মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকত জয়ী, অকারণে উঁকি মারত ইনবক্সে। দিন সাতেক পরের একটা শনিবার বেলা এগারোটার সময় অরণ্য যখন বেল বাজাল জয়ীর ফ্ল্যাটে, জয়ী ঘুম থেকে উঠেছে তার একটু আগেই। সদ্য ঘুম-ভাঙা জয়ীকে দেখে অরণ্য বলে উঠল, “খাসা লাগছে তো দেখতে।”

কথাটা শুনেই মাথা গরম হয়ে গেল জয়ীর। ও জানে যে ওকে দেখে অনেকেই মুগ্ধ হয়। কিন্তু অরণ্যও কি তাদের দলে? কোনও মনের টানে নয়, বিচ্ছেদের বেদনায় নয়, কেবলমাত্র দেখতে ভাল লাগে বলে সাতদিন পরে ও আবার ছুটে এসেছে জয়ীর কাছে? তা হলে যেদিন দেখতে ভাল লাগবে না সেদিন এরকমভাবেই ছুটে চলে যাবে অন্য কারও কাছে। জয়ীর বাবাই যেমন চলে গিয়েছিল মিতালি বসুর কাছে।

“একটু কফি খাওয়াবি নাকি?” জয়ীর ভিতরের রাগটা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল অরণ্য।

জয়ী কোনও উত্তর না দিয়ে কিচেনে ঢুকে গিয়ে ভাবল ভীষণ তেতো আর কড়া একটা কফি খাওয়াবে অরণ্যকে। জীবন যেরকম ঝাঁঝালো ঠিক সেরকম। কফিটা বানানোর মুহূর্তে জয়ীর মনে হচ্ছিল, অরণ্যকে জিজ্ঞেস করে, কী ভাবে অরণ্য জয়ীর সম্পর্কে? জাস্ট আ পাউন্ড অফ ফ্লেশ?

তখনই ঘর থেকে অরণ্যর গলা এল, “তোর জন্য পাঁঠার মাংস রান্না করে এনেছি জয়ী। গোট মিট। খেয়ে বলবি কেমন হয়েছে।”

বহু বছর মাংস খাবে ভাবলেই বমি পেত জয়ীর। কিন্তু অরণ্যর কথাটা বলার মধ্যে কী একটা ছিল, ওর মনে হল আজ ও বেশ তৃপ্তি করে মাংস দিয়ে ভাত খেতে পারবে।

সূর্য সেন পল্লী, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা

শীতের রোদও বেলা বাড়লে মাঝে মাঝে বেশ তাত এনে দেয়। আনন্দকুমারের মনে হল এবার একটু ঘরে যাওয়া প্রয়োজন।

ওঁর দেখভাল যে করে সেই চিন্ময়ী ভিতর থেকে বলে উঠল, “আজ বেগুনপোড়া করেছি গো দাদু। তুমি ভালবাসো খেতে।”

আনন্দকুমার কথাটার উত্তরে কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেলেন। জীবনে আরও কত কিছু ভালবেসেছিলেন। তার মধ্যে কোনটাকেই বা ধরে রাখতে পেরেছেন? আনন্দকুমারের বাবা, কালীকুমার চক্রবর্তী দেশ ছেড়ে চলে আসার সময় সব ওষুধপত্রের শিশি বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন।

“আপনি কলকাতায় গিয়া চিকিৎসা করবেন না?” আনন্দকুমার জিজ্ঞেস করেছিলেন।

“জীবনের সব সুখ পুড়াইয়া দিয়া বেঘর পরদেশি হইতাসে যে মানুষটা সে কার অসুখের চিকিৎসা করতে পারব?” বাবার হুতাশের সামনে চুপ করে গিয়েছিলেন আনন্দকুমার। পোড়া একটা মন নিয়ে স্বাভাবিক একটা জীবন অতিবাহিত করার মস্ত চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে এপার ওপার একাকার হয়ে গিয়েছিল ওঁর। শৈশব আর কৈশোর নাছোড়বান্দা জোঁকের মতো এঁটে ছিল অস্তিত্বের সঙ্গে।

এল এম এফ ডাক্তার কালীকুমার চক্রবর্তীর আশপাশের গ্রামে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি ছিল মেয়েদের সঠিক চিকিৎসার জন্য। এবার চাষিবউরা অনেক সময় পথেঘাটেও নিজেদের অসুখের কথা ডাক্তার চক্রবর্তীকে গলা তুলে বলত একটু দূর থেকে, কিন্তু গাঁয়ে-গঞ্জে সমাজের অভিজাত কিন্তু প্রচণ্ড রক্ষণশীল অংশের মেয়েরা ছিল আরও অসহায়। মরণাপন্ন হলেও তাদের যে ডাক্তারের সামনে বেরোনোর হুকুম নেই। অধিকাংশ সময়েই বাড়ির লোকের কথা শুনে ওষুধ দিতে হত। আর যদি বা রোগিণীর মরোমরো অবস্থায় ডাক্তারবাবুকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হত, সামনে বসিয়ে ডায়াগনোসিসের কোনও সুযোগ ছিল না। পেশেন্ট যে খাটে শুয়ে আছে, তার উপর মশারি টাঙানো থাকত। কোনও-কোনও বাড়িতে আবার মশারির উপর একটা চাদর ঢাকা দিয়ে দেওয়া হত। ডাক্তার বসত মশারির পাশে একটা চেয়ারে। রোগিণী হাতও বাড়াতে পারত না মশারির ভিতর থেকে। মশারির মধ্যে হাত ঢুকিয়েই হাত টিপে নাড়ি দেখার ব্যবস্থা। যদি বুকে স্টেথোস্কোপ দেওয়া অতীব প্রয়োজনীয় হত, তা হলে বাড়িরই কোনও বাচ্চা ছেলে মশারির মধ্যে ঢুকে স্টেথোস্কোপটা মেয়ে কিংবা মহিলা পেশেন্টের বুকে দিত আর ডাক্তারের কানে থাকত স্টেথোস্কোপের উলটোদিকের অংশটা, যা দিয়ে শব্দ আসত। শব্দ বুঝে ওষুধ দিতে হত। সেই ওষুধে রোগিণী বাঁচলে বাঁচত, মরলে মরত। সম্প্রদায় এবং সমাজের মাথারা মেয়েদের সম্মান বজায় রাখতে এত ব্যস্ত ছিল যে এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা কেউ ভাবতেনও না।

ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেলে অবশ্য স্বাধীনা সেনগুপ্তর সঙ্গে আলাপই হত না আনন্দকুমার চক্রবর্তীর। যদিও একই গ্রামের বাসিন্দা, তবু সেই যুগে গ্রামের এপাড়া আর ওপাড়ার মধ্যে অনেক তফাত, বিশেষ করে যদি দুটো পাড়া দুই জাতির হয়। কিন্তু স্বাধীনার সঙ্গে নেত্রকোনা যাওয়ার সময় আনন্দকুমারের একবারও মনে হয়নি উনি ব্রাহ্মণ, স্বাধীনা বদ্যি, বরং নৌকোর ভিতরে খেতে বসা আনন্দকুমারকে একদিন যখন ছুঁয়ে ফেলেছিল স্বাধীনা, নদীর অতল থেকে লাফ দিয়ে ওঠা শুশুক দেখাবে বলে, রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছিলেন আনন্দকুমার। ভয়ঙ্কর বাতিকগ্রস্ত স্বাধীনার মা হয়তো দৃশ্যটা দেখলে হার্টফেল করতেন। তিনি যে দেওয়াল বেয়ে ভাত মুখে পিঁপড়ে উঠলে দেওয়াল ধোয়াতেন! কিন্তু পনেরো ছুঁইছুঁই আনন্দকুমারের পিঠে নয় পেরোনো স্বাধীনার আঙুল রিডের উপরে বাতাসের মতো খেলে গিয়েছিল। আনন্দকুমারের মনে হয়েছিল, রুক্ষ মাঠে বৃষ্টি নেমেছে আচমকা আর তা থেমে যাওয়ার আগেই মাটিগুলো কাদা হয়ে যাবে। তবু স্বাধীনার মা দেখতে পেলে কী হবে, সেই দুশ্চিন্তায় খেতে খেতে হেঁচকি উঠছিল আনন্দকুমারের। কিন্তু স্বাধীনা একদম নির্বিকার ছিল।

“আমরাই তো তোমায় নিয়ে যাচ্ছি, তা হলে তোমার ভয়টা কীসের?” স্বাধীনা খর চোখে তাকিয়েছিল আনন্দকুমারের দিকে।

আনন্দকুমার চুপ করে ছিলেন। স্বাধীনার বাবা দুর্গাদাস সেনগুপ্ত যে জমিদারি সেরেস্তায় বড়বাবু ছিলেন সেই জমিদারের প্রাণপ্রিয় ভাইঝির চিকিৎসার জন্যই কালীকুমারকে নেত্রকোনা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। উদ্যোগটি দুর্গাদাসবাবুরই ছিল মূলত। রোগিণীর চিকিৎসার জন্য বেশ কিছুদিন বাবাকে থাকতে হবে জানার পর, বাবার শীতের জামাকাপড় এবং আরও কিছু জরুরি জিনিসপত্র দিয়ে স্বাধীনাদের সঙ্গে আনন্দকুমারকে নেত্রকোনা পাঠিয়েছিলেন আনন্দকুমারের মা।

সেই যাওয়ার পথেই, বাড়ির বোনেদের বাইরের কোনও মেয়ের সঙ্গে কথা বললেন আনন্দকুমার। স্বাধীনার মা বেশির ভাগ সময়েই পৃথিবীর কোন ভূখণ্ডের কতটুকু এঁটো হয়ে গেল সেই দুশ্চিন্তায় মগ্ন থাকতেন বলে, নিজের মেয়ের সঙ্গে আনন্দকুমারের কথাবার্তায় তেমন কিছু বাধা দিতেন না। কিন্তু তাই বলে স্বাধীনার বাড়াবাড়ি মেনে নেওয়ার মতো কোনও সঙ্কেতও দেননি।

স্বাধীনার অবশ্য নিজের কোনও কাজকেই বাড়াবাড়ি বলে মনে হত না। সুযোগ পেলেই সে ‘পোড়া রাজা’র গল্প শুনিয়ে আনন্দকুমারকে বলত যে রাজার গায়ের সঙ্গে বাজপাখি যেরকম লেপটে ছিল, সেভাবেই স্বাধীনাকে অনুসরণ করতে। ‘পোড়া রাজা’র গল্প সারা বিক্রমপুর জুড়েই ছড়িয়েছিল। এক-এক গোষ্ঠীর মানুষের কাছে রাজার পরিচয় এক-এক রকম। কারও কাছে প্রজাবৎসল তো কারও কাছে অত্যাচারী। কিন্তু সেই কিশোর বয়সে রাজার স্বভাব-চরিত্র নয়, আকর্ষণ করত রাজার অদ্ভুত গল্প। যুদ্ধে বেরোনোর সময়, রাজা নিজের প্রাসাদের লোককে নাকি বলে গিয়েছিল যে রাজা ফেরার আগেই যদি বাজপাখি ফিরে আসে, তা হলে ধরে নিতে হবে যে যুদ্ধে রাজার প্রাণহানি ঘটেছে।

এবার প্রতিপক্ষের সঙ্গে ভয়াল ভয়ঙ্কর যুদ্ধে জিতে রাজা নিজের গায়ের রক্ত ধোয়ার জন্য যখন স্নান করতে পুকুরে নেমেছে, বাজপাখিটা তাঁর হাত ফসকে পালিয়ে যায়। উড়ে উড়ে ফিরে যায় রাজারই প্রাসাদে আর রানি এবং তাঁর সহযোগী, সহচরীরা ভেবে নেয় রাজা বোধ হয় যুদ্ধে মারা গেছে। আর সেই ধারণা এমনই এক অজানা আতঙ্ক তৈরি করে যে প্রাসাদের সবাই আগুনে ঝাঁপ দেয়। রাজা প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়েছিল, কিন্তু ফিরে আসে এক জতুগৃহে। যুদ্ধে জিতেও জীবনে হেরে গেল রাজা ওই বাজপাখি পালিয়ে যাওয়ার জন্য। বাজপাখিটা কি তা হলে মানুষের স্বপ্নের প্রতিরূপ, যা পালিয়ে গিয়ে হারিয়ে দেয় মানুষকে?

“পোড়া রাজার পোড়া কপাল!” বলতে বলতে বেগুনপোড়া খেত স্বাধীনা। জীবনসায়াহ্নে সেই কথা মনে পড়ছিল আনন্দকুমারের, ভাত ভাঙতে ভাঙতে। না, রাজা পোড়া হোক আর কোরা হোক, তাই নিয়ে কোনও আগ্রহ কখনও ছিল না আনন্দকুমারের। তিনি লিখতে চেয়েছিলেন লাখ লাখ সাধারণ মানুষের কথা, যাঁদের প্রত্যেকের কপাল এমনই পোড়া যে, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে, বহু শতকের ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল আর সেই উৎখাত হওয়ার পরও নতুন করে শিকড় ছড়িয়ে দেওয়ার আলেখ্যই আনন্দকুমার ধরে রাখতে চেয়েছিলেন নিজের বইয়ে। কিন্তু সেটুকু চাওয়ার জন্য কি কম প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে আনন্দকুমারকে? কত জায়গা থেকে কত রকম চেষ্টা যে হয়েছে কলম থামিয়ে দেওয়ার। ওঁদের বিক্রমপুরেরই একজন মানুষ যেমন মন্ত্রীর চেয়ারে বসে আনন্দকুমারকে বলেছিলেন, “এই বই লেখার কোনও প্রয়োজন নেই।”

সরকারি আর্কাইভে বন্দি তথ্যের সন্ধানে অনেক কষ্টে ভদ্রলোকের একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট জোগাড় করেছিলেন আনন্দকুমার। ওঁর কথা শুনে খানিকটা হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন,“নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে শিয়ালদা স্টেশনে আশ্রয় নিল একটা জাতির এত লক্ষ মানুষ আর তাদের ইতিহাস লেখার প্রয়োজন নেই?”

মন্ত্রী জবাব দিয়েছিলেন, “না, প্রয়োজন নেই। পুরনো সব জিনিস ভুলে যাওয়াই ভাল। সেগুলো আবার মনে পড়িয়ে দিলেই অশান্তি সৃষ্টি হয়।”

“না, অশান্তি হয় না। বরং ইতিহাসকে ভুলে গেলেই ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হয়। আর ইতিহাসের উপাদান কখনও একপাক্ষিক হতে পারে না। আমার বাড়িতে চারজন আগুন লাগিয়েছিল, কিন্তু তখন একশোজন কেঁদেও ছিল। এবার আগুন লাগানোর ইতিহাসটা যদি আমি চেপে যাই তা হলে ওই চারজন আর একশোজন, বাহ্যিক পরিচয়ে এক হলেও আসলে যে আলাদা, তা প্রমাণ করা যায় না। অপরাধী ব্যক্তিকে চিহ্নিত না-করলে, যাদের সঙ্গে অপরাধ ঘটেছে সেই মানুষগুলোর কাছে গোটা গোষ্ঠীটা অপরাধী হয়ে যায়। ঘৃণা আর অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। সেগুলো প্রতিহত করার জন্যই ফেলে আসা ভূখণ্ডের সুঘ্রাণ বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।”

“আপনার ওইসব লেকচার শোনার সময় আমার নেই। আমি যখন বলেছি, এইসব কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের করার দরকার নেই, তখন দরকার নেই।”

“আপনার কাছে দরকার না-থাকলেও, আমার কাছে দরকার আছে।”

“তা হলে নিজের দরকার নিজে মেটানোর ব্যবস্থা করুন। আমার কাছ থেকে কোনও সাহায্য তো পাবেনই না, আমি এমন ব্যবস্থা করে দেব যে কাগজপত্রের জন্য যেখানে যাবেন, সেখান থেকেই গলাধাক্কা খাবেন।”

“গলাধাক্কা খাওয়ার অভ্যেস তো সেই গ্রাম ছেড়ে চলে আসার সময় থেকেই হয়ে গেছে। এখন গলাধাক্কা না খেলেই বরং অম্বল হয়।” আনন্দকুমার হাসতে হাসতে বলেছিলেন মন্ত্রীর ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময়। বিবাদী বাগের রাস্তায় বেরিয়ে এসে ওঁর মনে হয়েছিল, এইসব শান্তি-অশান্তির অজুহাতগুলো ডাহা মিথ্যে। উদ্বাস্তুদের মধ্যে যে অল্প কয়েক হাজার লোক এপারে এসে গুছিয়ে নিতে পেরেছে পুরোপুরি, রাজনীতি কিংবা যোগাযোগের দৌলতে নতুন গড়ে ওঠা উপনিবেশগুলোয় পাঁচকাঠা-ছ’কাঠা সাউথ ফেসিং প্লট বাগিয়ে নিতে পেরেছে, তারাই সর্বতোভাবে চায় দুর্ভাগা বাস্তুহারাদের ইতিহাস একেবারে মুছে দিতে। কারণ ওই ইতিহাসটা সামনে এলেই এই প্রশ্নটাও আসবে যে, লক্ষ লক্ষ সর্বহারা যখন পচে মরছে প্ল্যাটফর্মে, প্রায় হাত-পা-বাঁধা অবস্থায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে দণ্ডকারণ্য কিংবা আন্দামানে, তখন এই লোকগুলো দিল্লি কিংবা কলকাতার সুবিধেজনক জায়গায় জমিজিরেতের মালিক হয়ে বসল কীভাবে? নিজেদের প্রাপ্তির কলঙ্ক চাপা দিতেই এরা কোটি মানুষের সর্বনাশকে ‘হয়নি’ বলে দাগিয়ে দিতে চায়। শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে স্নান করার সময় ভুলতে ও ভুলিয়ে দিতে চায় সেই অসংখ্য মেয়ের কথা যারা বালতি হাতে রাস্তার কলের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কোনও মায়া, কোনও সৌহার্দ ছড়ানোর জন্য নয়, সমগোত্রীয়রা যখন প্রাণে মরছে তখন আমরা আখের গুছিয়ে নিয়েছি, এই নির্মম সত্যকে দিনের আলোর মুখ দেখতে না-দেওয়ার জন্যই এই নির্মম ভণ্ডগুলোর যাবতীয় প্যাঁচ-পয়জার। এরা নিজেদের বাড়ির লোককে ‘দ্যাশের ইলিশের মতো স্বাদ কি না কও’ বলে গড়িয়াহাট বাজারের সেরা মাছটা খাওয়াতে খাওয়াতে ক্যাম্প কিংবা স্টেশনে থাকা ‘দেশের মানুষ’কেই জুতো দিয়ে পিষে গেছে অবলীলায়। আর সেই পিষে মারাকে থিয়োরি দিয়ে ঢাকা দেবে বলেই ভুলিয়ে দিতে চাইছে যে বিরাট সংখ্যক বাঙালির উদ্বাস্তু হওয়ার পিছনে ধর্মীয় কারণ যদি থাকেও, তাদের জীবনসংগ্রাম আদ্যন্ত অসাম্প্রদায়িক। রাইজদিয়া গ্রামের নিলুদা, বজ্রযোগিনীর সুলাল, মালখানগরের সুনির্মল, প্রত্যেকে রীতিমতো অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে। সর্বস্ব হারিয়ে কলকাতায় এসে, নিলুদা ফুটপাথে বসে শায়া-ব্লাউজ় বিক্রি করত, সুলাল বাস কন্ডাক্টর হয়েছিল, সুনির্মল ধূপকাঠি ফিরি করত ট্রেনে। ওরা কেউ কি ওদের ক্রেতা কিংবা সওয়ারিকে জাতধর্ম জিজ্ঞেস করত?

আনন্দকুমার অনুভব করতেন সব। আর অনুভব করতেন বলেই বুঝতেন এই ইতিহাস ধামাচাপা দেওয়ার চক্র কতটা ব্যাপ্ত, কী অসম্ভব ক্ষমতাশীল। আড়াল থেকে স্বাধীনার ফোনগুলো না থাকলে ওই মন্ত্রীর মতো লোকগুলো খুন করিয়ে দিত ওঁকে। একবার তো একটা লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আসার সময় কয়েকটা লোক ঘিরে ধরেছিল আনন্দকুমারকে। আনন্দকুমারের ঝোলায় থাকা কাগজপত্র ছিনিয়ে নিতে চাইছিল তারা। কিন্তু তখনই সিনেমার নায়কের মতো সেখানে আবির্ভূত হয়ে আনন্দকুমারকে বাঁচিয়ে দেন এক দীর্ঘদেহী, শ্যামবর্ণ মানুষ। আনন্দকুমার পরে জেনেছিলেন তিনি কলকাতা পুলিশের বড় অফিসার হিমাদ্রি তালুকদার আর আরও পরে জেনেছিলেন যে সেই মানুষটি স্বাধীনার কাছে ভাইফোঁটা নিতেন প্রতি বছর, স্বাধীনার নির্দেশেই আনন্দকুমারের উপর নজর রেখেছিলেন তিনি।

একটা সামান্য বই লেখা হবে, তা নিয়ে এত ভয়? হাসি পেত আনন্দকুমারের। তারপর চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলে সাম্প্রতিক অতীতের ঘটনাগুলো স্লাইডের মতো ভেসে উঠত চোখের সামনে। সুচিত্রা সেন এবং উত্তমকুমার অভিনীত সবার উপরে ছবিতে পূর্ব-পাকিস্তানের ‘নির্যাতিতা নারী’ হিসেবে সুচিত্রা নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন কিন্তু তারপর থেকেই ‘কোথা হইতে কী হইয়া গেল’, বাঙালদের প্রতিনিধি হিসেবে সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে আবির্ভূত হলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ‘মাসিমা মালপো খামু’র রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হল একটা গোটা সমাজকে। বাস্তু হারানোর ট্র্যাজেডিকে প্রতিস্থাপিত করা হল মালপো খাওয়ার ভাঁড়ামোয়। এরপর ওরা থাকে ওধারে-র ভানু থেকে বসন্ত বিলাপ-এর রবি ঘোষ, পূর্ববঙ্গীয় চরিত্র মানেই সে আধা ক্লাউন, আধা কাঙাল। জগদীশচন্দ্র বসু থেকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় কিংবা সত্যেন্দ্রনাথ বসু, যাঁরা প্রত্যেকে নোবেল প্রাইজ় পেতে পারতেন, ঘর-হারানো মানুষের মুখ হয়ে উঠতে দেওয়া হল না তাঁদের, গণেশ ঘোষ থেকে অম্বিকা চক্রবর্তী, ‘ভারত স্বাধীন-করা বিপ্লবী’ থেকে রূপান্তরিত হলেন ‘রিফিউজি নেতা’য়।

অন্তরে অন্দরে পুড়ে যাওয়ার সেই আখ্যান ফার্সে রূপান্তরিত হলেও পোড়া মাটির ভিতরে থেকে যায় অনেক আঙুলের দাগ। সেই দাগগুলো যখন শব্দের রূপ ধরে, তখন স্মৃতিও জেগে ওঠে। কসবা গ্রামের সেই মসজিদ যাঁর একটা গম্বুজকে জড়িয়ে ধরলে শীত লাগে আর অন্য গম্বুজটাকে জড়িয়ে ধরলে উত্তাপ বোধ হয়, আনন্দকুমারের স্মৃতিতে ফিরে ফিরে আসত। ওই উত্তাপ আর শীতলতার সম্মিলনই ছিল ওঁর দেশ, ওঁর দেশ ছিল পদ্মার ঢেউয়ে মেঘনার স্রোতের মিশে যাওয়া। উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতা শহরে প্রথম পা রেখে মনে হয়েছিল, ভিটের পরিবর্তে পৃথিবীকে পেয়েছেন আর ওই বই লেখার কাজে হাত দিয়ে মনে হয়েছিল, নিজের জন্মভূমিকে আবার ফিরে পেয়েছেন সাদা পৃষ্ঠায়। রক্ত-ঘামের বিনিময়ে অর্জন করা পা রাখার মাটির ইতিহাস লিখে রাখতেও কাগজ লাগে, রক্তের সঙ্গে সবচেয়ে অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক কাগজেরই। বাংলায় লেখা বইটার প্রথম সংস্করণের হলুদ হয়ে আসা কাগজে মুখ ডোবালেন আনন্দকুমার, খেয়ে উঠে। চেনা আর পুরনো একটা গন্ধ উঠে এল। মা উঠোন নিকোনোর পরে এই গন্ধটা ওঁদের গ্রামের বাড়িতে পেয়েছেন আনন্দকুমার। পেয়েছেন সীমান্ত পেরোনোর সময় নেমে আসা বৃষ্টির ছাঁটে। আর একটা কোথায় যেন পেয়েছেন, মনে পড়ছে না এখন। একটু হাঁটাচলা, এমনকী, বেশ খানিকক্ষণ বসে খাওয়ার ধকলেও ক্লান্ত হয়ে পড়েন আনন্দকুমার। চিন্ময়ী পাশের ঘরে শুয়েছে। ওর হালকা নাক ডাকার আওয়াজ পাচ্ছিলেন আনন্দকুমার। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যারা খুব পরিশ্রম করে, ঘুমের সময় নাক ডাকে তাদের, আনন্দকুমার খেয়াল করেছেন। আনন্দকুমার কি পরিশ্রম করেননি জীবনভর? তা হলে ওঁর নাক ডাকত না কেন ঘুমের মধ্যে? না কি ডাকত? সুষমা, বরকে একটু খুশি করবে বলে মিথ্যে করে বলত যে, ডাকে না। কতদিন এমন হয়েছে যে হৃৎপিণ্ডে গোলযোগ থাকা সরিতের নাক ডাকছে ঘুমের মধ্যে জোরে জোরে আর ওরা স্বামী-স্ত্রী জেগে রয়েছেন, জেগে থেকে সেই শব্দ শুনছেন। শব্দ মানেই প্রশ্বাস আর প্রশ্বাস মানেই সচলতা। নিজের লেখা বইয়ের পৃষ্ঠায় হাত বোলাতে বোলাতে আনন্দকুমারের চোখ লেগে গেল, সচলতার রাজ্যে স্মৃতি জেগে উঠল।

নেত্রকোনার উপর দিয়ে বয়ে গেছে মগরা নদী। নদীর বাঁকটা চোখের কোণের মতো বলে নদী ঘিরে রেখেছে যে জায়গাটুকু, তার নাম নেত্রকোনা। নেত্রকোনা আগে ময়মনসিংহেরই অংশ ছিল। বিংশ শতকের শেষদিকে আলাদা জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। উত্তরে গারো পাহাড়, দক্ষিণে কিশোরগঞ্জ, পশ্চিমে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনার ভিতরেই রয়েছে চোখজুড়োনো সৌন্দর্যের সুসং-দুর্গাপুর। ছোট ছোট টিলা, পাহাড়, ঝরনা, রাজবাড়ি সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক রূপের ডালা খুলে বসে থাকা এই অঞ্চলকে সুসং রাজার দেশ বলেও ডাকত অনেকে। রাজার দেশের রাজকুমারী ছিল যেন সোমেশ্বরী নদী। আঁকাবাঁকা,খরস্রোতা এই নদী পূর্বদিকে বয়ে যেত। আর নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে স্বাধীনার মনে ভয় জন্মাত, সূর্যটা কি একেবারেই ডুবে গেল, না কি কাল আবার উঠবে?

জমিদারবাবুর ভাইয়ের মেয়ের একটা ভয়ঙ্কর কাশি হয়েছিল। মাঝে মাঝে রক্তও পড়ত সেই কাশি দিয়ে। অনেক বড় বড় ডাক্তার সেই কাশির শব্দ শুনে তাকে টিবি রোগ বলে দেগে দিয়ে চলে গেছেন। কিন্তু এল এম এফ ডাক্তার কালীকুমার মেয়েটিকে না-দেখে কেবল কাশির শব্দ শুনেই বলে দিয়েছিলেন যে, টিবি হয়নি মেয়েটির। কালীকুমারের দেওয়া ওষুধে উন্নতি হচ্ছিল মেয়েটির আর আনন্দকুমার এবং স্বাধীনারও নেত্রকোনায় থাকার মেয়াদ বাড়ছিল। এবার মানুষ তো স্ট্যাচু নয় আর বিশেষ করে যাঁর থেকে কাজ পাওয়া যায় তাঁর আত্মীয়-পরিজনের কদরও বেড়ে যায়। স্বাধীনা আর আনন্দকুমার তাই প্রায়ই জমিদারের গাড়ি চড়ে এদিক-ওদিক ঘুরে আসত। স্বাধীনার মা ঘরের ভিতরে এঁটোকাঁটা ইত্যাদি নিয়ে যতটা পিতপিতে ছিলেন, ওদের দু’জনের বাইরে বেরোনো নিয়ে ততটা নয়। পনেরো আর দশ ছুঁইছুঁই ছেলেটি আর মেয়েটি তাই ঘোড়ার মতো ছুটে বেড়াত, উড়ে বেড়াত পাখির মতো।

পূর্ববঙ্গে গোরুর গাড়ির চল তত বেশি ছিল না যতটা ছিল বাংলার পশ্চিমদিকে। তার কারণ আর কিছুই নয়, বীরভূম, বাঁকুড়া কিংবা মুর্শিদাবাদ, নদিয়াতেও গ্রামের পথ অপেক্ষাকৃত রুক্ষ, গোরুর চলার সুবিধে। কিন্তু বাংলার পূর্বদিকে এত বৃষ্টি, এত জল আর এতই কাদা যে থেকে-থেকে গোরুর পা বসে যায়, তখন লেজে মোচড় দিয়ে বা পাঁচনবাড়ি দিয়ে তাড়া দিলেও গোরুও নড়ে না, চাকাও গড়ায় না। তাও পূর্ববঙ্গের উত্তরাংশে গোরুর গাড়ির খানিকটা চল আছে, কিন্তু বরিশাল-খুলনার দিকে বৃষ্টির এত তেজ, আজ সকালে যে জমি বিকেলেই সে জলা বলে, গোরুর গাড়ি প্রায় চলেই না বলতে গেলে। হয়তো বাহন হিসেবে কাজে লাগে না বলেই জেলায় জেলায় ষাঁড়ের লড়াইয়ের বাড়বাড়ন্ত। আর সেই ষাঁড়ের লড়াই আয়োজন করার দৌড়ে নেত্রকোনার নাম উপরের দিকেই থাকবে।

সেই ষাঁড়ের লড়াই দেখতে কত কত লোক যে দূরদূরান্ত থেকে আসত, তার তুলনা নেই। সমতলের লোক তো বটেই, পাহাড় থেকেও উপজাতিরা নেমে আসত সময় সময়। বড় বড় কুঁদো ষাঁড় এনে জড়ো করা হত বেশ কিছুদিন ধরে। তাদের সামনে গিয়ে পড়লে ভয় লাগবে এক রকম। কিন্তু এক-একটা লোক থাকত, যারা ওই ষাঁড়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করত অবলীলায়। নিলু হাতি ছিল তাদেরই একজন। মস্ত চেহারা, মাথায় বাবরি চুল, কষ্টিপাথরের মতো গায়ের রং, যে ষাঁড়ের গুঁতোয় পঙ্গু হয়ে গেছে লোক, মারাও গেছে কেউ কেউ, সেই ষাঁড়কে নির্ভয়ে নিয়ন্ত্রণ করত নিলু। কী তার আসল নাম, কী-ই বা পদবি, কেউ জানত না। দেশ-দুনিয়ার কাছে নিলু হাতি নামেই তার পরিচয়। যখন আগুন জ্বলছে মাঝখানে আর ওদিক থেকে ছুটে আসছে দামাল একটা ষাঁড়, তখন হাসতে হাসতে তার শিংদুটো ধরে তাকে শান্ত করে ফেলছে নিলু, ষাঁড়ের প্রবল রব মৃদু হয়ে আসছে, এই দৃশ্য দেখতে দেখতে উচ্ছ্বাসে পাগল হয়ে উঠত জনতা। হাততালিতে ফেটে পড়ত। সেই হাততালির শব্দ সোমেশ্বরী নদী পেরিয়ে, সুসং-দুর্গাপুর পেরিয়ে যেন গারো পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছে যেত, পাহাড়ের দুর্ভেদ্য পাথরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসত আবার সমতলের জমিতে।

মেয়েরা প্রায় থাকতই না সেই ষাঁড়ের লড়াইয়ের আঙিনায়। কিন্তু স্বাধীনা তো আর একশোটা মেয়ের থেকে আলাদা। কৌশলে জমিদারবাবুর থেকে অনুমতি আদায় করে নিয়ে ও নিজের বাবাকে বাধ্য করত ওকে ষাঁড়ের লড়াই দেখতে ছেড়ে দিতে। আর ওই দৌড়ে আসা ষাঁড় দেখে যখন আনন্দকুমারও ভয় পেয়ে যেতেন এক-এক মুহূর্তে তখন খিলখিলিয়ে হেসে উঠত স্বাধীনা। হাসতে হাসতেই হাতটা চেপে ধরত আনন্দকুমারের।

আনন্দকুমারের বুকের ভিতর, শিরায় শিরায় হঠাৎ করে একটা খ্যাপা ষাঁড় দৌড়তে শুরু করত তখন। হয়তো সেই ষাঁড়টার সঙ্গে প্রত্যেক কিশোরেরই পরিচয় হয় কৈশোরে, তবু হাজার হাজার বছর ধরে কোটি মানুষের সঙ্গে ঘটলেও, ব্যক্তিমানুষের কাছে নিজের যে কোনও অভিজ্ঞতাই যেহেতু অভিনব এবং অনন্য, আনন্দকুমার নিজের ভিতরে সেই ষাঁড়ের দৌড় অনুভব করার মুহূর্তেই নিজের মধ্যেই একটা নিলু হাতিকে খুঁজে বেড়াতেন যে ষাঁড়টাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, শান্ত করে দিতে পারবে। নিলুকে অন্তরে খুঁজে না পেয়ে অসহায় লাগত আনন্দকুমারের। স্বাধীনার দিকে তাঁর যে বারবার তাকাতে ইচ্ছে করছে, কী করবেন তবে সেই ইচ্ছের? কেমনভাবে স্বাধীনার দিকে ঘুরে যাওয়া চোখটাকে বাঁকিয়ে নেবেন মগরা নদীর বাঁকের মতোই?

কিন্তু নিয়ন্ত্রণের বাইরে কি আনন্দকুমার একাই চলে যাচ্ছিলেন? না কি দশ না-পেরোনো স্বাধীনাও অন্য রকম একটা পৃথিবীর হ্যাঁচকা টান অনুভব করছিল? তা নইলে ক’দিন পরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির একটা দুপুরে কেনই বা সে প্রায় জোর করে উঠে আসবে সেই নৌকোয়, আনন্দকুমার একাই যেখানে মাঝি এবং সওয়ারি, দুই-ই? ‘আমিও যামু’ বলতে বলতে নৌকোয় উঠে পড়ে সামান্য গুটিয়েই ছিল স্বাধীনা। কিন্তু নৌকো খানিকটা এগোতেই যখন প্রথমে হালকা আর পরে তোড়ে বৃষ্টি নামল, তখনই শীতে কিংবা উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে একদম কাছে ঘেঁষে এসে স্বাধীনা নিজের মাথাটা রাখল আনন্দকুমারের বুকে।

এক পলকের জন্য আনন্দকুমারের মনে হয়েছিল, নিশ্বাস-প্রশ্বাস বুঝি থেমে যাবে ওঁর। কিন্তু প্রবল শিরশিরানি অনুভূতির মধ্যেও লগি ঠেলে নৌকোটাকে তীরে এনে ভিড়িয়েছিলেন আনন্দকুমার। আকাশ তখন কালো হয়ে গেছে সম্পূর্ণ। তিরের ফলার মতো বৃষ্টি নেমে আসছে দশদিক দিয়ে। আর ওই কালোর ভিতরে আলোর মতো আনন্দকুমার স্বাধীনার ঠোঁট, গাল, চোখের স্পর্শ পাচ্ছিলেন নিজের হৃদয়ে।

আনন্দকুমারের মনে হচ্ছিল, জমিদারবাবুর ভাইঝি, বাবার পেশেন্ট সেই মেয়েটা যে মশারির ভিতরে থাকে, তার উপর থেকে কালো চাদরটা সরে গেল। আর তারপর মশারিটাও উড়ে গেল এক ঝটকায়। ওঁরই মতো সম্পূর্ণ ভিজে যাওয়া স্বাধীনার মুখটা নিজের বুকের মধ্যে থেকে তুলে ধরে স্বাধীনার দুই চোখে দুটো চুমু খেলেন আনন্দকুমার। পাগলামি আর নিয়ন্ত্রণ যেন মিশে গেল একটিই পাত্রে। নেত্রকোনার বাঁকটা স্বাধীনার দৃষ্টির মতোই স্বচ্ছ সোজা আর স্পষ্ট হয়ে উঠল।

দেশ ছেড়ে এসে উদ্বাস্তু হওয়া যদি আদ্যন্ত পুড়ে যাওয়ার গল্প হয় তা হলে সেই গল্পের ভিতরের ওই চুম্বন বৃষ্টির মতোই জেগে আছে। সত্তর বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসে সেই দুপুরটাকে নিজের ত্বকের নীচে জ্বলতে দেখলেন আনন্দকুমার।

আচ্ছা, সেদিনের সেই চুমুর কথাটা স্বাধীনা কখনও কাউকে গল্প করেছে কি?

অ্যান-আর্বার, মিশিগান

ওয়াশিংটন ডি সি এখান থেকে খুব দূরে নয়। আর সেই শহরে অজস্র মানুষ প্রতিনিয়ত কোনও না কোনও কাজে যায়, ফিরে আসে, থেকে যায়। যে-কোনও সন্ধ্যায়, রেস্তরাঁ বা পানশালায় গান-বাজনার ভিতরেই প্রতিরোধ আর প্রতিবাদ ধ্বনিত হতে হতে একটা সময় ন্যায় আর অন্যায়ের বোধ গুলিয়ে দেয়। নিউ ইয়র্কে মানুষ যেন নিজেকে স্বাধীন বলে অনুভব করে প্রতিটা মুহূর্তে আর ওয়াশিংটন ডি সি, আমেরিকার রাজধানী বলেই হয়তো, সেখানে মানুষ নিজের উলটোদিকে এক অদৃশ্য প্রতিপক্ষকে দেখতে পায় সবসময়। আর সেই প্রতিপক্ষের ছায়া একদম ব্যক্তিগত পৃথিবীতেও এসে পড়ে। জয়ী যেরকম অরণ্যর চোখ মুছিয়ে দেওয়া মেয়েটাকে নিজের প্রতিপক্ষ ভেবে নিয়েছিল, অবচেতনে।

বরেণ্য বাঙালি দার্শনিক ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের উপর নিজের পোস্ট-ডক্টরাল কাজ করছে জয়ী। এ এমন এক পৃথিবী যেখানে দেশচেতনা হাত ধরে বিশ্ব-মানবতার, অবচেতন আর মননের ভিতরে রাস্তা তৈরি হয় অহরহ। জয়ী ডক্টরেট করেছিল বাংলার হারিয়ে যেতে বসা পুজো ও লোকাচার নিয়ে। কীভাবে ইতুপুজো আর নীলষষ্ঠী হারিয়ে গেল এমনকী গঞ্জেও, ওদিকে পূর্ববাংলার কোজাগরী প্রতিষ্ঠা পেল রাঢ়বাংলার ঘরে-ঘরে, ওর গবেষণায় তা নিয়ে কাজ করেছিল জয়ী। থিসিসটা লেখার সময় যখন দিদুনের সঙ্গে কথা বলত জয়ী, প্রীতিকণা বলতেন যে রান্না আর খাওয়ার ব্যাপারটায় যেন বিশেষ করে জোর দেয় জয়ী।

“সবাই রান্নার কথা উঠলেই বাঙালদের প্রসঙ্গ টেনে আনে কেন বলো তো? তোমার মতো রান্না ক’জন বাঙাল করতে পারবে?”

“সে তুই আমাকে ভালবাসিস বলে বলছিস।”

“না, মোটেই তা নয়। তোমায় না-চিনলেও যে তোমার রান্না একবার খেয়েছে তাকে বলতেই হবে, ইউ আর দ্য বেস্ট কুক ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।”

“আমার চেয়েও বেটার অনেক কুকের রান্না আমি খেয়েছি, তাই তোর কথাটা মানতে পারলাম না পুরোপুরি।” প্রীতিকণা হেসে ফেললেন।

“তোমার চেয়েও বেটার? ইউ মিন বেটার দ্যান দ্য বেস্ট?” জয়ী জিজ্ঞেস করত। আর জিজ্ঞেস করার সময় ওর ঘাড়টা বেঁকে যেত অবিশ্বাসে।

‘দিদুন’ এই পৃথিবীটার মধ্যেই একপৃথিবী বিশ্বাস লুকিয়ে ছিল আসলে। সমস্ত সংশয়ের যেখানে অবসান, সব যন্ত্রণার যেখানে উপশম। কৈশোরের সেই টালমাটাল অবস্থায় দিদুনের দেওয়া শিবদাস ভাদুড়ির ছবিটাই তো হয়ে উঠেছিল সেই নোঙর, যেখানে জয়ী নিশ্চিন্তে নিজেকে সঁপে দিতে পারত। ‘মোহনবাগান’ নামটাই ওকে হাজারও ঝঞ্ঝার মধ্যে সেই আশ্রয়ের খোঁজ দিয়েছিল যেখানে একবার প্রবেশ করতে পারলে আর হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই।

মায়ের মৃত্যুর পর আরও একা হয়ে গিয়েও জয়ী টের পেয়েছিল, শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকলে মানুষ একটা স্রোতের অংশ, সে একদম একা নয়। আমেরিকা আসার ইচ্ছে যে জয়ীর খুব ছিল তা নয়, কিন্তু আমেরিকায় ও এসেছিল একটা অভিমানে। বাবা আর মিতালি বসুর ছেলে রণজয় যেদিন নিজের মাকে নিয়ে ওদের বাড়ির তিনটে ঘর দখল করে মাঝে-মাঝেই আসতে-যেতে শুরু করল, সেদিন থেকে জয়ীর কাছে অসহ্য ঠেকছিল নিজের বাড়িটাও।

“ওরা তো ওদের ভাগ বুঝে নিয়েছে, একই কম্পাউন্ডে থাকা দুটো বাড়ির একটা প্রমোটারের কাছে বিক্রি করে দিতে হয়েছে বাবার ফুর্তির দাবি মেটাতে, আমার তিনতলার ঘর থেকে সূর্য দেখা বন্ধ হয়ে গেছে সামনেই একটা পাঁচতলা ওঠার কারণে, তারপর আবার এখানে কী উদ্দেশ্যে, কেন আগমন ওদের?”

“এলে তো আমি তাড়িয়ে দিতে পারি না। তোর বাবা সারাজীবন ধরে একের পর-এক বিনিয়োগে সব খুইয়েছে আর তার মূল্য দিতে হয়েছে গোটা পরিবারকে।”

“বাবার লসের মূল্য যদি দিইও, বাবার বেল্লেলাপনার মূল্য দেব কেন?”

“কারণ সে তোর বাবা, আমার ছেলে।”

“তোমার এই কথাটা মানতে পারলাম না দিদুন। যে নিজে এই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল কারও কোনও বারণ না শুনে...”

“কমলেশ তো ফিরে আসছে না। কিন্তু তার স্ত্রী-পুত্র যদি এই বাড়িতে থাকতে চায় তা হলে...”

“স্ত্রী? তুমি ওই মিতালিকে তোমার পুত্রবধূ বলে স্বীকার করো? তা হলে এই বাড়িতে আমার মায়ের জায়গা কোথায় রইল দিদুন? মরে গেছে বলে সেই মানুষটা নেই হয়ে গেল একদম?”

“তুই ভুল বুঝছিস আমাকে, কিংবা হয়তো আমিই তোকে বোঝাতে পারছি না...” প্রীতিকণা তখনকার মতো জবাবটা এড়িয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু দশ-বারোদিন পরের এক সন্ধ্যায় দিদুনের ঘরে ঢুকতে গিয়ে দিদুনের বিছানায় রণজয়কে বসে থাকতে দেখে থমকে যায় জয়ী। দরজার বাইরে থেকেই দেখে, প্রীতিকণা সুপুরি থেতো করার ফাঁকে ফাঁকে সেই কিশোরের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন যার মুখের আদলে ওর বাবার মুখের ছাপ স্পষ্ট একেবারে। তা হলে কি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নাতি এসে মাথাটা ঘুরিয়ে দিল দিদুনের? জয়ী আর প্রীতিকণার ভিতরকার জলতরঙ্গ, এবারে অন্য সুরে, অন্যের সুরে বাজবে?

জয়ী সেদিন রাতেই আমেরিকা যাওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করে নিয়েছিল। প্রায় পুরো স্কলারশিপটাই যখন পাওয়া যাচ্ছে, তখন দ্বিধার মানে হয় না কোনও। আর তা ছাড়া ওর নিজের জমানো টাকা, মায়ের করে যাওয়া জীবনবিমা থেকে প্রাপ্ত টাকা, সব মিলিয়ে চলে যাবে।

“যাওয়া কি খুব জরুরি ছিল? ফিরে এসে যদি আমায় দেখতে না পাস আর?” প্রীতিকণা নিজের স্বভাববিরুদ্ধ ঢঙে জিজ্ঞেস করলেন।

“নিশ্চয়ই পাব। দু’-তিনবছরের তো ব্যাপার।”

“আমার জীবন আমাকে অতটা সময় দেবে, তুই নিশ্চিত?”

“নিশ্চয়ই দেবে। তা ছাড়া এখন তোমার নাতি তোমার কাছে-কাছে থাকবে...”

“তুই কি সেই কারণে চলে যাচ্ছিস বাড়ি ছেড়ে? একটা বাচ্চার উপর তোর কিসের এত রাগ? তা ছাড়া যা-ই ঘটে থাক, সেই ছেলেটা তোর ভাই...”

“প্লিজ় দিদুন। কে আমার কী, আজ এই আঠাশ বছরে পৌঁছে সেটা আমাকেই ঠিক করতে দাও।” প্রীতিকণাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল জয়ী।

প্রীতিকণার মুখের উপর এভাবে কথা জয়ী কেন, অনেকদিনই কেউ বলেনি এই বাড়িতে। উনি জবাবে কিছু একটা বলতে গিয়ে থমকে গেলেন। বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে।

কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার দিন প্রীতিকণার ঘরে ঢুকে ওঁকে প্রণাম করতে গিয়ে কেঁদে ফেলল জয়ী। কিন্তু প্রীতিকণা নিজেকে একটা খোলসের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়েছিলেন। জয়ী ওঁকে জড়িয়ে ধরলেও সেই দেওয়ালটা ভাঙল না, যা অকস্মাৎ তৈরি হয়ে গিয়েছিল দু’জনের মধ্যে।

“আমি চলে যাচ্ছি দিদুন।”

“সাবধানে যেয়ো। পৌঁছে খবর দিয়ো।”

“দিদুন, আমায় ক্ষমা কোরো। তোমাকে আঘাত করব বলে আমি কিছু বলতে চাইনি। শুধু...”

“ওসব কথা থাক, জয়ী। তুমি নিজেকে ভাল রেখো, যত্নে রেখো।”

“আমি একবছরের মধ্যেই একবার আসব দিদুন। আর আড়াই-তিনবছরের মধ্যে তো পাকাপাকি...”

“যে কাজে যাচ্ছ, সম্পূর্ণ করে এসো। ভাগ্যে থাকলে আবার দেখা হবে নিশ্চয়ই।”

প্রীতিকণার পায়ে নিজের মাথাটা রাখল জয়ী। প্রীতিকণা ওর মুখটা তুলে ধরে চিবুকে হাত দিয়ে কপালে চুমু খেলেন। সব আগের মতো, সব। তবু, কোথায় কিসের যে একটা অভাব, যেন মোহনবাগান জিতেছে কিন্তু জার্সির রংটা ঠিক সবুজ-মেরুন নয়। এয়ারপোর্টে সিকিওরিটি চেকের লাইনে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডব্যাগটায় হাত দিয়ে একটু ভয় পেয়ে গেল জয়ী। কোনও কারণে ছবিদুটো আনতে ভুলে গেল নাকি? পিছনের দুটো লোককে এগিয়ে যেতে দিয়ে জয়ী একপাশে সরে এসে ব্যাগটা খুলে হাঁটকাতে শুরু করল। এই তো শিবদাস ভাদুড়ির সেই ছবি, ঐতিহাসিক শিল্ড জয়ের পরপর তোলা। শিবদাস, বিজয়দাস, দ্বিজদাস, রামদাস, মোহনবাগানের একটা টিমে চার ভাই একসঙ্গে খেলতেন।

ওর তো একটাই ভাই। হোক না মা অন্য, বাবা তো এক। লক্ষ্মণ আর ভরত রামকে ভালবাসেনি? তা হলে সেই পনেরো বছরেরও বেশি ছোট ভাইয়ের উপস্থিতি সহ্য করতে না-পেরে কেন বাড়ি ছেড়ে, দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে জয়ী? এই ওর টিম-স্পিরিট? এই ওর মোহনবাগানি স্পিরিট?

জয়ীর মনে হল ওর মাথার মধ্যে প্রীতিকণা চৌধুরীর গলা বাজছে।

ওই গলা, ওই ব্যক্তিত্ব কি সামনের মেটাল ডিটেক্টরে আটকে যাবে, না কি জয়ীর সঙ্গে উড়ে যাবে আকাশে? সিকিওরিটি চেক হয়ে যাওয়ার অনেক পরে সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে জয়ী অস্ফুটে বলে উঠল, “দিদুন!”

জয়ীর মোবাইলের স্ক্রিনসেভারেই প্রীতিকণা চৌধুরীর মুখ।

কিন্তু জয়ী ‘আছি’ শব্দটা শুনতে পেল না।

ব্রজেন্দ্রনাথ শীল একশো বছরেরও বেশি আগে সারা পৃথিবীর মানুষকে চমকে দিয়েছিলেন তাঁর দর্শনের প্রজ্ঞায়, জ্ঞানের গভীরতায়। দ্য কোয়েস্ট ইটারনাল নামে তাঁর কাব্যগ্রন্থটি অনেক সমালোচকের মতে টি এস এলিয়টের ওয়েস্টল্যান্ড-এর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। কিন্তু বাদামি চামড়ার ভারতীয় নোবেল প্রাইজ়ের জন্য বিবেচিত হতে পারেন ক্বচিৎ কখনও! তাই এইসব প্রতিভা অন্তরালেই থেকে যেতে বাধ্য। তবু আড়াল থেকেই শরীরের প্রতিটি তন্ত্রীতে বেজে ওঠে অমোঘ পঙক্তিগুলো, তখন বিচার-অবিচার তুচ্ছ হয়ে যায়। “দাই প্রেজ়েন্স গার্ডস মি রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড/আ স্লিপলেস আই, আ নেমলেস পাওয়ার,” অস্তিত্বের সবটা জুড়ে ঘুরছিল জয়ীর, ইমিগ্রেশনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে।

যে চোখে ঘুম নেই আর যে ক্ষমতার কোনও নাম থাকে না, এই দু’জন কি একই মানুষ? দু’জনই ঈশ্বর? আচ্ছা, সত্যিই কি ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে? না কি সমবেত মানুষের শক্তিই ঈশ্বরের শক্তি হিসাবে মাথা দোলায়? ওয়াশিংটন ডিসির রাস্তায় অসংখ্য মানুষের একটা মিছিলের মধ্যে পড়ে গিয়ে দ্বিতীয়টাই মনে হল জয়ীর। কালো-সাদা-বাদামি অজস্র রঙের মানুষ হাঁটছে মিছিলটায়। তাদের ভিতরে আছে টিনএজার, আছে সাত-আটমাসের গর্ভবতী মহিলা, যার টি-শার্টে লেখা, ‘আই অ্যাম ফিউচার/আই অ্যাম ইউ এস এ’। এই মানুষগুলো হাঁটছে কারণ আমেরিকার সরকার নাকি ঠিক করেছে যে এদের তাড়িয়ে দেওয়া হবে। কোথায় যাবে এরা? নিকারাগুয়া, এল সালভাদোর, কিউবা, চিলি? ফিরে তো যাবে কিন্তু ফিরবে কোথায়?

কলম্বাস কি ফিরবেন বলে এসেছিলেন? তাঁর দেখানো রাস্তা ধরে আমেরিকায় আসা ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, ব্রিটিশ, জার্মান, কাউকে তো ফিরে যেতে হচ্ছে না। তা হলে যে কালো মানুষেরা শতকের-পর-শতক গলায় রক্ত তুলে পরিশ্রম করে আমেরিকার গায়ে কাপড় দিয়েছে, মুখে অন্ন দিয়েছে, তাদের চলে যেতে হবে কেন? তারা আফ্রিকা থেকে এসেছিল বলে? সেই লাতিনোদের চলে যেতে হবে, যারা আমেরিকার প্রায় প্রতিটা শহরের প্রতিটা বাড়ির বাথরুম পরিষ্কার করে? চলে যেতে হবে সেই মেয়েটাকে যার বাচ্চাকে তার থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে বৈধ কাগজপত্র না থাকায়?

ওই জুলিয়ার দুঃখের কথা শুনে অরণ্যর চোখে জল এসে গিয়েছিল বলে অরণ্যকে অপমান করেছিল জয়ী। হয়তো ওর অর্ধেক ভাই রণজয়ের মধ্যেও এমন কোনও দুঃখ ছিল যার সামনে টলে গিয়েছিলেন প্রীতিকণা চৌধুরী। আর তার জন্যেও কি তাকে জয়ীর অপমান সইতে হয়নি?

দেখেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া মস্ত দোষ আর সেই দোষ অপরাধের চেহারা নেয়, যখন সেই সিদ্ধান্তের জেরে অপমান করা হয় কাউকে!

অ্যান-আর্বারে ফিরে জয়ী অরণ্যকে করা সেই অপমান, অরণ্যর আদর শরীরে নেওয়ার মধ্যে দিয়েই ফিরিয়ে নিতে চাইছিল। ওদের সম্পর্কটা যৌনতাচালিত নয়। যৌনতা সেখানে আগ্নেয়গিরির মতো হঠাৎ জেগে উঠে লাভা উগরে দিয়েছে তবে টিউকলের জল আনার মতো নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়ায়নি কখনও। কিন্তু মিশিগানে ফিরে এসে অরণ্যকে ওই মিছিলটার কথা বলতে বলতে জয়ীর মনে হচ্ছিল, রোজ হলেই বা ক্ষতি কী? ওই যে অরণ্যের নেশা তা কি ঠোঁটে ঠোঁট ডুবে গেলে বা ফুসফুসে কার্বন ডাইঅক্সাইড ঢুকলে জয়ীরও হয়ে যায় না?

তীব্র আলিঙ্গনে পিষে যেতে যেতে জয়ীর মনে হচ্ছিল সব সংশয় আর প্রতিবন্ধকতা আজই ভেঙে যাক বাস্তিল দুর্গের মতো। কিন্তু অরণ্যই জয়ীকে আলগা দিয়ে জিজ্ঞেস করে, “অনেক লোক ছিল মিছিলটায়?”

প্রথম আলাপের পরপরই জয়ীকে নিজের কবিতার ডায়েরি পড়তে দিয়েছিল অরণ্য। কবিতায় তত কিছু আগ্রহ কোনওদিনই ছিল না জয়ীর, তবু দু’-একবার পাতা উলটে দেখেছিল। তেমন কিছু টানেনি বলে আবার ডায়েরি বন্ধ করে যথাস্থানে রেখে দিয়েছিল। ভিতরের পৃষ্ঠাগুলোর কবিতার একটা লাইনও মনে রাখতে পারেনি কেবল মনে রয়ে গেছে, পিছনের পাতার একটা পেনসিল স্কেচ। তিন-চারটে ছেলে একটা জার্সি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সাদা-কালোয় আঁকা ছবিটার নীচে লেখা, ‘আমরা সবাই ইস্টবেঙ্গল’।

“কবিতার খাতাতেও ইস্টবেঙ্গল কেন?” জয়ী জিজ্ঞেস করেছিল অরণ্যকে। অনেকদিন আগে।

অরণ্য বহুদিন পরে প্রশ্নটার উত্তর দিল, “ইস্টবেঙ্গল আছে সেইটা খেয়াল করলি আর লাল-হলুদ রংটা নেই, সেটা খেয়াল করলি না?”

“নেই কেন?”

“হয়তো রং-পেনসিল কেনার সামর্থ্য ছিল না সেই সময়টায়। রিফিউজিরা ডিমের সঙ্গে ময়দা মিশিয়ে চারটে ডিম থেকে চোদ্দোটা মামলেট বানাত, শুনেছি। তাই লাল-হলুদ না থাকলেও আছে আমার কাছে। আর তা ছাড়া লাল-হলুদ তো আছে।”

“কোথায়?”

“গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকা। তাকালেই দেখতে পাবি।”

জয়ী বাইরে তাকাল। তাকাতেই একটা উত্তাল ইস্টবেঙ্গল গ্যালারি যেন ওর দৃষ্টিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

“আমেরিকার ফল, যা দেখার জন্য সারা বিশ্বের কত টুরিস্ট আসে, সেটা যে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব কিনে নিয়েছে, তুই কল্পনা করতে পেরেছিলি? তুই ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে বসে ড্রিঙ্ক না-করলে কী হবে, সব গাছের পাতাগুলো কীরকম লাল আর হলুদে মস্ত মাতাল হয়ে উঠেছে দ্যাখ!”

জয়ীর কথাতেই একটা গ্যাস স্টেশনে গাড়িটা পার্ক করে ওরা হাঁটতে শুরু করেছিল ওই খুনখারাপি রঙের মধ্যে। যে গাছটার সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছিল সেই গাছটাতেই লাল-হলুদ-কমলার বিপ্লব। গাছের পাতাগুলো ঝরে পড়ার আগে হলুদ থেকে বাদামি হয়ে গিয়ে একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ করছে হয়তো। জয়ীর ভিতরেও একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হচ্ছিল। পুরুষকে অপরাধী ভাবা, ভেবে চলা থেকে কোথাও কোনও পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অপরাধী হিসেবে মনে করা।

“আই অ্যাম সরি অরণ্য। তোকে সেদিন ওভাবে বলা অন্যায় হয়েছে।”

“তোর কথায় আমি অপমানিত হইনি। আর হলেও কিছু আসত যেত না। কিন্তু যে মানুষগুলো আগের রাতে হয়তো মাছ-ভাত খেয়েছে, সঙ্গম করেছে, সন্ধ্যার শঙ্খধ্বনি আর ভোরের আজানে নিজের অস্তিত্ব, নিজের ভিটেকে চিনেছে, বাচ্চা যেভাবে নিজের মাকে চেনে অহরহ, তাদের যখন সর্বস্ব ছেড়ে একরাতের মধ্যে অচেনার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়তে হয় তখন সেই এক্সোডাসটা নিয়ে আমরা ইয়ার্কি করতে পারি না বোধ হয়!”

জয়ীর চোখটা কীরকম জ্বালা-জ্বালা করছিল। ও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছু না বলে।

“তোকে কতবার সাঁতরাগাছির ঝিলের গল্প বলেছি না? সেই ঝিলে যে পাখিগুলো ইউক্রেন কিংবা সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসে তারাও নিজেদের চেনা জায়গাতেই ফিরে আসে বছরের পর-বছর। নতুন যে পাখিটা আসে সে-ও এমন পাখিদের সঙ্গে আসে যাদের জায়গাটা চেনা। কিন্তু দেশভাগের পর বহু বছর ধরে যে ভিড়টা আছড়ে পড়েছিল শিয়ালদা স্টেশনে তাদের আট থেকে আশির কাছে কলকাতা শহর একই রকম অচেনা ছিল। তাই কোনও দালাল যখন কোনও মেয়েকে পাচার করার ধান্দায় সেই মেয়েটাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতে চেয়েছে, মেয়েটা আপত্তি করার কথা ভাবেনি কারণ সে কিংবা তার পরিবার তো ‘পাচার’ শব্দটার সঙ্গেই পরিচিত নয়। যখন কেউ দু’কাঠা জমি কিনিয়ে দেবে বলে কোমরে গুঁজে নিয়ে আসা শেষ সম্বল দু’ভরি সোনাও লুঠ করে নিয়েছে তখনও সেই লুঠেরাকে আগেভাগে চেনা যায়নি, কারণ দেশে তো দশ-বিশকাঠা জমি এমনি দেওয়া-থোওয়া হয়ে যেত।”

অরণ্যর কথা শুনতে শুনতে কষ্টের পাশাপাশি, নিজের অনিচ্ছাতেও ভাল লাগছিল জয়ীর। গল্পগুলো সেই ‘পুকুইরে পাইসিলাম দশ কিলো ইলশা’র দিকে যাচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল ওর। ভাতের পাতে দশ রকম মাছ, দুধের সমুদ্র, গল্প করার সময় কি নিজেদের ফেলে আসা ভূখণ্ডের কথা বলে, না কি এলডোরাডোর কথা? কিংবা কে জানে, হয়তো মানুষ যা হারিয়ে ফেলে তাই তার কাছে সোনা হয়ে যায়, এলডোরাডো হয়ে যায়।

পৃথিবীর সবচেয়ে খাঁটি সোনার নাম ভালবাসা। পুরুষ কেবলমাত্র শরীর খোঁজে এই সন্দেহে সেই ভালবাসার উচ্চারণে ভয় করত জয়ীর। অরণ্যর অতীতের কথায় কেবল এক অজানা ভূখণ্ডই নয়, জয়ীর শিরায় শিরায় ফিরে আসছিল ওর চেনা অতীত, যখন জয়ী ভালবাসতে ভয় পেত না। বিছানায় একসঙ্গে শোওয়ার মধ্যে যত শিহরন থাক, প্রকৃতির মধ্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকায় একটা আহরণ আছে। নিশ্বাস নেওয়াটাও তখন কেমন একটা অ্যাডভেঞ্চার হয়ে দাঁড়ায়। জয়ী সেই অ্যাডভেঞ্চারের শরিক হয়ে ওর হ্যান্ডব্যাগে যে ফল কাটার ছুরিটা আছে তাই দিয়ে একটা গাছের গায়ে নিজের আর অরণ্যর নাম লিখতে গেল। কিন্তু কিছুতেই ছুরি দিয়ে বাংলা অক্ষর লেখা গেল না গাছটার গায়ে।

“বাংলা ভাষাটাই এমন যে ছুরি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা যায় না। আমাদের নামদুটো ইংরেজিতেই লিখতে হবে গাছের গায়ে। অবশ্য গাছটাকে কষ্ট দিয়েই বা কী লাভ? আমাদের নামগুলো কি একে অন্যের মনে খোদাই হয়ে যায়নি?” বলতে বলতে অরণ্য পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল জয়ীকে। ওর চুমু পাহাড়ি পথ বেয়ে নেমে আসা স্রোতোধারার মতো নামতে থাকল জয়ীর ঘাড় থেকে গলায়, গলা থেকে পিঠে। জয়ী নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে না-চেয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টায় বলে উঠল, “কী হচ্ছেটা কী? আমি না তোকে প্রত্যাখ্যান করেছি?”

অরণ্য কথাটা শুনতে পায়নি এমনভাবে আবারও চুমু খেতে লাগল। খেতে খেতে জয়ীকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “আমার কবিতাগুলো নিয়ে একটা বই করব ভেবেছি। তুই ডায়েরি থেকে তো পড়লি না, কিন্তু ছেপে বেরোলে পড়তেই হবে, কারণ তোকেই উৎসর্গ করব বইটা।”

জয়ীর সারা শরীরে যেন আনন্দের হলকা খেলে গেল একটা। নাই বা বুঝল ও কবিতা তেমন করে, নাই বা ওকে টানল কথার কারুকার্য, কিন্তু কেউ একজন ওকে একটা পুরো বই উৎসর্গ করবে এটা ভাবলেই...

“তিনটে ভাগে ভাগ করব বইটা। প্রথম ভাগে থাকবে ঘর হারানোর গল্প, দ্বিতীয় অংশে রাস্তার রুটম্যাপ আর শেষাংশে, ফিনিক্স পাখির উঠে দাঁড়ানোর আখ্যান।”

কবিতার বই, তার আবার পর্বভাগ, জয়ীর মাথার উপর দিয়ে সবটা বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ওই মুহূর্তে ওর অরণ্যকে ওখান থেকে বের করে আনতেও ইচ্ছে করছিল না। বরং না-চাইতেও কমলেশ চৌধুরীর কথা মনে পড়ে গেল সেই মুহূর্তে। বাবা প্রত্যেকটা ব্যাবসায় পারিবারিক সঞ্চয় জলাঞ্জলি দেওয়ার পর নতুন ব্যাবসায় নামার আগে নানা রকম স্বপ্নের জাল বুনে দেখানোর চেষ্টা করত জয়ী আর ওর মাকে। ওরা পরের দিকে বুঝত যে এই ব্যাবসার গণেশও অচিরেই উলটোবে, তবু বাবার ওই কথার মারপ্যাঁচে স্বপ্ন তৈরি করা শুনতে মন্দ লাগত না। মাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে বাবা নাকি বলেছিল, “মিতালি সম্ভবত আমার কাজকর্মের ক্ষেত্রে লাকি, নইলে ভাল তোমায় আজও কিছু কম বাসি না।”

কাজকর্মের ক্ষেত্রে মিতালি কোনও সৌভাগ্যই বয়ে আনেনি বাবার জীবনে, কেবল বাবার ভেঞ্চারগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল। ব্যাবসায় লস খেয়ে নতুন ব্যাবসার কথা ভাবা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, পড়ে ছিল শুধু ঘরে বসে স্মৃতিচারণের স্বাধীনতা।

স্মৃতিই মানুষের মনে ভবিষ্যতের জন্য ভয়ের সঞ্চার করে। ‘ঘরপোড়া গোরু’ না থাকলে ‘রক্তসন্ধ্যা’কে ভয় পাওয়ার কী ছিল? অরণ্যও এইসব স্বপ্নকে হাতিয়ার করে বাস্তবে ছুরি মারবে না তো জয়ীর পিঠে? মনে হতেই ও আবারও অস্ফুটে বলে উঠল, “কিন্তু আমি তো তোকে প্রত্যাখ্যান করেছি।”

কথাটা শুনে একটা আলো খেলে গেল অরণ্যের মুখে। সেই আলোটাই হয়তো চ্যালেঞ্জ গুঁড়িয়ে দিয়ে প্রাপ্তির পূর্ণতা। নিজের মুখটা জয়ীর মুখের উপর নামিয়ে এনে অরণ্য বলল, “কবিতার বইটার কী নাম হবে জানিস?”

জয়ী নিজের বন্ধ হয়ে যাওয়া চোখদুটো খুলে তাকাল কেবল। জয়ীর ঠোঁটে নিজের জিভ ছুঁইয়ে অরণ্য বলল, “‘প্রত্যাখ্যান করেছি প্রত্যাখ্যানকে’।”

সূর্য সেন পল্লী, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা

সোনারং গ্রামে মূলত বৈদ্যদের বাস হলেও অন্যান্য জাতির লোকও ছিল বেশ কয়েক ঘর। আর ব্রাহ্মণ হয়েও কালীকুমার চক্রবর্তী যেহেতু পেশায় বৈদ্য, তাই সারা গ্রামেই তাঁর একটা আলাদা খ্যাতি ছিল। বছরের মধ্যে বেশির ভাগ সময়ই তিনি গ্রামের বাইরে চিকিৎসায় ব্যস্ত থাকতেন বলে ছোট থেকেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছিলেন আনন্দকুমাররা।

“বাবা খালি বাড়ি ছেড়ে চলে যায় কেন?” আনন্দকুমারের ছোট ভাই সুধাংশু জিজ্ঞেস করত মাকে।

“কাজে যায় বাবা, কাজে যেতে হয়।” মা জবাব দিতেন।

মা যা বলতে পারতেন না তা হল, বাবা গ্রামে বসে থাকলে মাসের মধ্যে কুড়িদিনই পেটে গামছা বেঁধে বসে থাকতে হবে পরিবারের সবাইকে। গ্রামের মধ্যে রুগি, তাও আবার পয়সা দিয়ে দেখাবে এমন রুগি, কতজন পাওয়া যাবে? তাই আজ গোপালগঞ্জ, কাল বারদি তো পরের মাসে উয়াড়িতে রুগি দেখতে ছুটে যেতে হত কালীকুমারকে। নেত্রকোনায় বাবার রুগি দেখতে যাওয়ার সূত্রেই তো স্বাধীনার সঙ্গে পরিচয় আনন্দকুমারের। তবে সেরকম সুযোগ জীবনে ক্বচিৎ-কদাচিৎ আসত। অধিকাংশ সময় বাবাকে যারা ডেকে নিয়ে যেত, তারা অতি কষ্টে বাবার থাকার ব্যবস্থাটুকুই করে উঠতে পারত। কেউ কেউ তাও নয়।

সেবার কালীপুজোর সময়ও বাবা বাড়ি নেই আর ওদিকে গ্রামের অবনী গুহদের বাড়িতে মারমার-কাটকাট যাত্রাপালা। প্রতিবারই পারিবারিক কালীপুজোয় গুহবাবুরা ঢাকা থেকে যাত্রার দল নিয়ে আসতেন আর সেই সময় ধর্মীয় পালার বদলে স্বদেশি মার্কা যাত্রাপালা খুব চলছে। এবার স্বদেশি পালাও পুলিশের নজর এড়াতে একটা কোনও ধর্মীয় ছদ্মবেশ ধারণ করত, কিন্তু সেবারের পালাটি অনেকটা সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে বেশ খোলাখুলিই ব্রিটিশ-বিরোধিতাকে বুনে দিয়েছে নাটকের ভিতর। আর তার সঙ্গে অভিনয়ও মারকাটারি। চন্দ্র দাস বলে এক তরুণ অভিনেতা টেগার্টকে গুলি মারতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া বিপ্লবী গোপীনাথ সাহার ভূমিকায় কাঁপিয়ে দিয়েছে এক রকম।

ব্রিটিশ শাসক ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দিলেও গোপীনাথ পূর্ববঙ্গের ঘরে ঘরে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত একটি নাম ছিল। বাংলার মানুষ ক্ষুদিরামের নাম যতটা জানে, গোপীনাথের নাম ততটা জানে না, এই নিয়ে বেশ খানিকটা ক্ষোভও ছিল এদিককার মানুষের। তাই যাত্রাপালায় গোপীনাথের উল্লেখ মানুষকে একদম নাড়িয়ে দিয়েছিল। সমবেত অনুরোধে ওই পালা পরদিন রাতেও অভিনীত হবে, সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

ওই দ্বিতীয়দিন যাত্রা দেখতে যাওয়ার জন্য একটা শর্টকাট রাস্তা ধরতে গিয়ে সাপের কামড় খান আনন্দকুমার। পায়ের উপর দিয়ে সরসর করে কী একটা চলে যাচ্ছে টের পেয়ে নিচু হয়ে সাপটা ধরতে যেতেই ডান হাতটা ঝনঝন করে ওঠে। যাত্রা দেখা শিকেয় তুলে একরকম ছুটে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন আনন্দকুমার, কিন্তু বাবা তো তখন গোপালগঞ্জে। তাই বলে ডাক্তারের ছেলে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে? বাড়িতে একটা হুলস্থুল পড়ে গেল। কে যেন পাশের গ্রাম থেকে একজন ওঝাকে ডেকে আনল। সেই ওঝা আগুন জ্বালিয়ে, নানা রকম মন্ত্র পড়ে, আনন্দকুমারের গায়ে-মাথায় চামর বুলিয়ে ওঁর ডান হাতটায় পাক দিয়ে একটা কাপড় শক্ত করে বেঁধে দিল কবজির কাছে। তারপর তর্জনী আর মধ্যমায় দুটো ছুঁচ ফুটিয়ে দিল আর রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরোতে থাকল বাইরে।

স্বাধীনা যখন ওঁকে শিশিটা এনে দেখাল তখন আনন্দকুমারের মনে হল যে ওখানেই আর-একবার মরে যাবেন। ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে জানতে চাইলেন, “কিন্তু এই রক্তটা তো বিষাক্ত।”

“শাক্ত না কি শৈব আমি অতশত জানি না। তোমার রক্ত মাটিতে গড়াইয়া পড়তাসিল, আমি ধইরা রাখসি।”

“শিশি পাইলা কই?”

“তোমার বাবার একটা ওষুধের শিশি ধারেকাছে আছিল। ওই ডামাডোলের সময় আমি সেইটা নিয়া কী করতাসি, কেউ খেয়াল করে নাই।”

“কিন্তু তুমি জানলা ক্যামনে আমারে সাপে কামড়াইসে? কইল কে?”

“যাত্রা দেখতে বইসা শুনলাম। ডাক্তারের বড় পোলারে সাপে কামড়াইসে। তারপর আর আমার জ্ঞান আছিল না। একদৌড়ে ছুইট্যা আসছি। আর তুমি তখন প্রায় অচৈতন্য, আমার বুকটা ফাইটা যাইতাছিল। পরদিন আমি চাচার ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া কইরা মধুডিঙ্গার কালীমন্দিরে পুজা দিতে গেছিলাম। মানত কইরা আইসি, তুমি সুস্থ হইয়া গেলে পূজা দিয়া আসুম ফের। যাওয়া হয় নাই এখনও। যাইবানি আমার লগে পূজা দিতে?”

আনন্দকুমারের চোখ জলে ভিজে গেল। মনে হল উনি তো দাঁড়িয়ে আছেন এক জীবন্ত প্রতিমার সামনে। আবার পুজো দিতে যাবেন কার?

সেই রাত্রিটা ছিল নষ্টচন্দ্রার। ভাদ্রমাসের পূর্ণিমায় নষ্টচন্দ্রা তিথি পালিত হত গ্রামে গ্রামে তখন। চন্দ্র তার গুরুপত্নী তারাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, নষ্টচন্দ্রার রাতে যে চাঁদের দিকে তাকাবে, তার নামেই কিছু না-কিছু বদনাম রটবে! কিন্তু পৃথিবীতে কোন বদনামের এমন জোর আছে যে মনের সঙ্গে মনের মিল হতে দেবে না?

স্বাধীনাদের বাড়ির স্থলপদ্মের গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে আনন্দকুমার ভাবছিলেন, চারদিকে একটা অগ্নিপ্রবাহ, দেশের স্বাধীনতা উচ্ছেদের নোটিশ নিয়ে আসবে কি না তাই নিয়ে মানুষ চিন্তিত, তার ভিতরে বিক্রমপুরের ছোট একটা গ্রামে দুই ভিনজাতের কিশোর-কিশোরীর মধ্যে যদি প্রেমও হয়, তাতে কি রসাতলে যাবে পৃথিবী? মানুষের মন কি এতই ক্ষুদ্র থাকবে, না কি পালটাবে সব ভালর দিকে?

ওঁর ভাবনার ভিতরেই স্বাধীনা দু’পা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল ওঁকে। একটি বছর বারোর কিশোরী, যে গত বছর কালীপূজার সময় থেকে এই বছর ভাদ্র মাস পর্যন্ত আনন্দকুমারের হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া বিষাক্ত রক্ত পর্যন্ত জমিয়ে রেখেছে, কেমন করে তাকে সরিয়ে দেবেন আনন্দকুমার? কেমন করে অস্বীকার করবেন এই সম্পর্ক যখন আকাশের চাঁদ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখছে ঘুমন্ত গ্রামের মধ্যে আলিঙ্গনাবদ্ধ এক প্রায় যুবক ও কিশোরীকে?

না, গোটা গ্রাম আজ ঘুমোচ্ছে না। অনেকে আজ চুরি করতে বেরিয়েছে কারণ নষ্টচন্দ্রার রাতে চুরি বৈধ। না, সোনাদানা নয়, এর বাড়ির আতা, ওর বাগানের কলা, এইসব চুরি আজকের রাতের রেওয়াজ। আর চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়া তো মহাপুণ্য বলে স্বীকৃত। কিন্তু চক্রবর্তীদের ছেলে জড়িয়ে ধরেছে সেনগুপ্তদের মেয়েকে, এ তো চুরি নয়, ডাকাতি। সেই ডাকাতি কে মেনে নেবে? তোলপাড় পড়ে যাবে সারা গ্রামে। বুড়িগঙ্গায় ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করতে হবে দু’জনকেই। আর দুটো পরিবার ছারখার হয়ে যাবে চিরতরে, চিরদিনের জন্য। না, নিজের ভাললাগা চরিতার্থ করতে কাছের মানুষদের এত বড় ক্ষতি করতে পারবেন না আনন্দকুমার।

“তুমি শান্ত হও। আমাদের মধ্যে সেইসব হতে পারে না, যা তুমি চাইছ।”

“ক্যান পারে না? আমরা বইদ্য আর তুমি বাওন বইল্যা?”

“ওসব তুমি বড় হইয়া বুঝবা।”

“আমারে স্তোক দিয়ো না। ভালবাসলে পরে কোন বাধাটা বাধা? সমাজ যদি আমাগো ত্যাজ্য করে, আমরা চণ্ডাল-চণ্ডালনি হইয়া ঘুরুম-ফিরুম। শ্মশানে-মশানে থাকুম। তাতে কী আইব-যাইব?”

“আর তোমার বাবা-মা? আমার পরিবার?”

“তাগো তুমি চিনো না? আমি চিনি না? তারা আমাগো বুঝব না? ঠিক বুঝব। তুমি ভয় পাইতাসো ক্যান? পুরুষমাইনষের ভয় পাইলে চলে?”

“আমি ভয় পাই নাই। ভয় পাইতে যামু ক্যান?” আনন্দকুমার বুঝতে পারছিলেন আবেগের আগ্নেয়গিরিতে ভাসতে থাকা এই কিশোরীর সঙ্গে যুক্তিজাল বিস্তার করে জেতা যাবে না। তার চেয়ে বরং ওর কথা আপাতত মেনে নেওয়াই শ্রেয়, যতক্ষণ আকাশের চাঁদটা এত বড়, যতক্ষণ এই রাতটা ভোর না হচ্ছে।

“ভয় পাও নাই তো ওইরকম করতাসিলা ক্যান? ভাবো না, সেই সোমেশ্বরী নদীতে আমরা ভাইস্যা যাইতাসি, তুমি আর আমি। সেই সেইদিনকার মতো।”

“এইটা আমাগো গ্রাম, নদী না। এইখানে পদ্ম চুরি করলে পরে শাস্তি দিব না কেউ আজকে, কিন্তু বাগানের মালকিনকে চুরি কইরা পালাইতে গেলে, লোকে ধইরা পিটানি দিব না?” আনন্দকুমার নিজেকে ছাড়িয়ে নিলেন, কিছুটা চেষ্টা করেই।

স্বাধীনা হেসে উঠল জোরে, “পাগল রে আমার। নষ্টচন্দ্রায় ফুল চুরি করলে যদি বদনাম না হয়, জ্যোৎস্না চুরি করলে বদনাম হয় নাকি?”

কথাটা মনের মধ্যে এমন গেঁথে গিয়েছিল, সেই আলোতেই পথ চলবেন ভেবে নিয়েছিলেন আনন্দকুমার। কিন্তু কোথায় হারিয়ে গেল জ্যোৎস্না?

দু’রাত্রির মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ভিটেমাটি ছেড়ে নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়াতে হবে। বাবা কবে কোথায় কোন পেশেন্টের প্রাণ বাঁচিয়েছিল, তার নাকি আদত বাড়ি কলকাতার অদূরেই। কাজের সূত্রে পূর্ববঙ্গে এসে মরতে বসেছিল, বাবার চিকিৎসায় প্রাণে বেঁচে যায়। কোথায় কার বাড়িতে দেখা হয়েছিল সেই পেশেন্টের সঙ্গে, কতদিনের পরিচয়, সেই সব জিজ্ঞেস করার কথা মাথায় আসেনি কারও। পাশের জেলায় আক্রমণের ঘটনা জেনে যারা আশঙ্কিত হয়েছে, পাশের গ্রামে আক্রমণের কথা শুনে তারা আতঙ্কিত হয়েছে, আর পাশের পাড়াতেও যখন আগুন লাগতে শুরু করেছে, ধর্ম-পরিচয় নির্বিশেষে বাঙালির সঙ্গে বাঙালির শত শত বছরের পুরনো সম্পর্ক চুরমার করে দেওয়ার জন্য ভিন্ন ভাষায় কথা বলা দাঙ্গাবাজরা, বিহার থেকে, পঞ্জাব থেকে এসে দাপাতে শুরু করেছে পদ্মা-মেঘনার তীরে-তীরে, তখন দু’রাত্রি তো অনেক, দু’ঘণ্টা সময়ই যেন কাটতে চায় না।

কলকাতায় পা দেওয়ার আগে আনন্দকুমার জানতেন না যে স্টেশনে থাকতে হতে পারে মানুষকে। কলকাতায় নেমে জানলেন কারণ বাবার হাতে সেরে ওঠা যে রুগি ওঁদের পরিবারের জন্য ঘর দেখে রেখেছেন জেনে ওরা পা বাড়িয়েছিলেন গ্রাম ছেড়ে, শিয়ালদায় নেমে তার আর কোনও পাত্তা পাওয়া গেল না। বাবা স্টেশনে বসেই প্রায় কুড়িবার সেই লোকটির দেওয়া সর্বশেষ চিঠিটি পড়লেন এবং শোনালেন। প্রতিবারই অসম্ভব আওয়াজে বাবার গলা চাপা পড়ে গেল। ট্রেনের যাওয়া-আসার আওয়াজ, যাত্রীদের ওঠা-নামার চিৎকারের পাশাপাশি বিগত এক-দেড়বছর শিয়ালদা স্টেশনটাকেই যারা ঘর-বাড়ি বানিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে, তাদের কলরোল যেন প্রতিটা শব্দকে গিলে নিচ্ছে, পদ্মা যেভাবে জনপদ গিলে নিত।

নিয়তি যেন পদ্মার চেয়েও ভয়ঙ্কর। সে আরও দ্রুত সবকিছু গিলে নিতে পারে। নইলে পলকে কীভাবে মিলিয়ে গেল সব, দৈনন্দিন জীবনযাপন হয়ে উঠল স্মৃতির অংশ। হারিয়ে গেল বিক্রমপুর, সেই নষ্টচন্দ্রার রাতটা হারিয়ে গিয়ে রইল শুধু নষ্ট হয়ে যাওয়া জীবন। সেই জীবনের এক-একটা মুহূর্ত যেন এক-একটা যুগের চাইতেও দীর্ঘ। স্টেশন থেকে বেরিয়ে বৈঠকখানা বাজারের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আনন্দকুমারের মনে হত, বিভিন্ন দোকানের ওই পসরার মতো একটা সাজানো জীবন চেয়েছিলেন, আর জীবন ওঁকে দিয়েছে একটু দূরের ওই চোলাই মদের ঠেকের মতো পচন। সেই পচন থেকেই তো নেশা জাগে দুনিয়ায়, তা হলে আনন্দকুমার একটু মাতাল হয়ে গিয়ে ভুলে যেতে পারছেন না কেন, স্বাধীনা এখন কোথায়, কীভাবে আছে?

মনে রেখেই বা লাভ কী? কোথায় দাঁড়াবেন যদি স্বাধীনা সামনে এসে দাঁড়ায়, কোন নির্জনতায় দুটো কথা বলবেন তার সঙ্গে? এই স্টেশন, যেখানে উদ্বাস্তুদের পোঁটলা-পুঁটলি, নোংরা বিছানাপত্র প্ল্যাটফর্মের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিদিন কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডায়রিয়ায় কীটপতঙ্গের মতো মরছে মানুষ, সেখানে? শয়ে-শয়ে যুবতী, যারা দু’দিন আগেও বহতা নদীতে স্নান করেছে সাঁতার কেটে, হাজার লোকের সামনে প্ল্যাটফর্মে বসে আদুল গায়ে স্নান করছে? স্বাধীনাকে তাদের মধ্যে দেখার আগে অন্ধ হয়ে যেতে চান আনন্দকুমার। দেশ ছেড়ে আসার আগের রাতে স্বাধীনাদের বাড়িতে গিয়ে আনন্দকুমার দেখেছিলেন বাড়ি খাঁ-খাঁ করছে, কেউ কোত্থাও নেই, কেবল সেই গাছটায় একটা ফুল ফুটে আছে, নষ্টচন্দ্রার রাতে যেটা শূন্য ছিল। ওই ফুলটাই হয়তো স্বাধীনার শেষ উপহার ওঁর জন্য, ওই ফুলটা নিজেই হয়তো স্বাধীনার মন, যা সে গোয়ালন্দ পেরিয়ে কলকাতায় নিয়ে যায়নি, ফেলে গেছে আনন্দকুমারের জন্য। না, স্বাধীনা কোথায় আছে আনন্দকুমার জানতে চান না। ও যেখানেই থাক, যেন মানুষের মতো বেঁচে থাকার সুযোগ পায়। আনন্দকুমারের চারপাশে পশুর জীবনে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে ওঠা মানুষগুলোর একজন ওকে কখনও না হতে হয়। ওই স্টেশনে বসেই কালীকুমার একদিন বলছিলেন, “‘সোনারং’ গ্রামের নাম কীভাবে হইসিল, জানস? বইন্য শূকর শিকার করনের লাইগ্যা উঁচা মাচা বান্ধা হইসিল সোনায়। সোনার টং থিকাই সোনারং।”

আনন্দকুমার শুনতে শুনতে ভাবছিলেন, জীবন থেকে সব রং আর টং মুছে গেছে চিরতরে। বরাবরের মতো একটা ফুটপাথে এনে দাঁড় করিয়েছে জীবন। আর সেই ফুটপাথে কোনও জ্যোৎস্না কিংবা প্রেম নেই। আছে শুধু স্মৃতি। সাপের কামড়ের পর শরীরে যে বিষরক্ত জমে উঠেছিল, সেরকমই বিষাক্ত সব স্মৃতি। ভুলতে চাইলেও ভোলা যায় না যাদের।

স্টেশন থেকে একটা ক্যাম্প, তারপর সেই ক্যাম্প থেকে দুটো বাসের অযোগ্য বাড়ি ঘুরে অবশেষে যখন আধা-মানুষ থাকতে পারে এরকম একটা বাড়িতে জায়গা পেলেন, ততদিনে দাঁড়িয়েও ঘুমিয়ে পড়তে পারেন আনন্দকুমার। কিন্তু সেই দুটো ঘরের একটার মেঝেয় শুয়েই একদিন দুপুরে ঘুমিয়ে গেলেন আর স্বপ্নে দেখলেন যে স্বাধীনা এসে বলছে, “আমি ওই শিশিটা নিয়া আসছি।”

আনন্দকুমার থম মেরে রইলেন ঘুম থেকে উঠে। এত এত রক্তপাতের ভিতরে একটা মেয়ে যদি নিজের ঈপ্সিতর আঙুলের রক্তের শিশি এক ভূখণ্ড থেকে অন্য ভূখণ্ডে নিয়ে আসতে পারে, তা হলে সেই রক্তের মূল্য স্বর্গগঙ্গার জলের চাইতেও বেশি। আচ্ছা, কোথায় আছে স্বাধীনা? কোনও হোগলার চাল, চাটাইয়ের বেড়া পেয়েছে, না কি ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পে যাওয়ার পথে পাচার হয়ে গেছে, দেশভাগের স্রোতে ভেসে আসা অনেক অনেক মেয়ের মতো? স্বপ্নটা দেখার পর থেকেই আনন্দকুমারের মাথার মধ্যে দুশ্চিন্তাটা পাক খেতে লাগল। আর যত পাক খেতে লাগল তত মনে হতে লাগল, একবার যদি দেখা হত স্বাধীনার সঙ্গে, কেবল একবারই?

স্বাধীনার মামাবাড়ি ছিল চট্টগ্রাম। স্বাধীনতার আগেই চট্টগ্রামকে স্বাধীন করে তোলা বিপ্লবীদের অনেকেই এখন রিফিউজি হয়ে কলকাতার রাস্তায়। ভাবলে গলায় একটা কান্না দলা পাকিয়ে উঠত আনন্দকুমারের। কিন্তু সেই কান্নাটাই একটা খুশিতে রূপান্তরিত হল যখন চট্টগ্রাম পরিষদের একটা সভার বাইরে স্বাধীনার ছোটমামাকে দেখতে পেলেন আনন্দকুমার। সভাটা হচ্ছিল উত্তর কলকাতার একটা হলে, ভদ্রলোক বাইরে চা খেতে বেরিয়েছিলেন। নেত্রকোনা থেকে ফেরার পরপর যখন দু’-চারবার স্বাধীনাদের বাড়ি গেছেন, স্বাধীনার এই মামাকে দেখেছেন আনন্দকুমার। এখন চেহারা একটু ভেঙে গেলেও চিনতে কোনও অসুবিধে হল না।

আনন্দকুমার এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলেন স্বাধীনার কথা।

স্বাধীনার ছোটমামা চায়ের ভাঁড়টা রাস্তায় ফেলে, নাকে নস্যি নিয়ে বলে উঠলেন, “স্বাধীনা যেখানে আছে, ভাল আছে। ওর খবরে তোমার কী দরকার?”

“আমি শুধু জানতে চাইছিলাম, ও ভাল আছে কি না।”

“ভাল না কি মন্দ, কেমন আছে তোমার জানার কোনও প্রয়োজন নাই। যাও ভাগো এইখান থিকা। ফালতু পোলা একটা। অন্যের বাড়ির মাইয়াগো খবর নিতে লজ্জা করে না?”

স্বাধীনার ছোটমামার কাছে অকারণে অপমানিত হতে হতে দুটো জিনিস মনে হচ্ছিল আনন্দকুমারের। এক, পূর্ববাংলার কথ্যভাষার বৈচিত্র্য কলকাতায় এসে হারিয়ে গেছে। আগে ওই লোকটা যখন কথা বলত তখন একটা কথা বোঝাও কঠিন ছিল, এমনই ছিল চাটগাঁইয়া ভাষার টান। কিন্তু এখন লোকটা দিব্যি ঢাকা-ফরিদপুরের ভাষা মিশিয়ে কথা বলছে। এইটা ভেবে মন একটু খারাপ হলেও দ্বিতীয় ব্যাপারটা অনুভব করে মনে মনে খুশিই হলেন আনন্দকুমার। ভাল আছে, স্বাধীনা নিশ্চয়ই ভাল আছে। ভাল না-থেকে যদি কষ্টে থাকত তা হলে এত লম্বা-চওড়া কথা বেরোত না লোকটার মুখ দিয়ে। কষ্টে ভেঙে পড়ত, চাই কি কুড়ি টাকা ধার চেয়েও বসতে পারত। মুকুটগঞ্জের বনেদি পরিবারের ছেলে রুদ্রদা যেমন চেয়েছিল ওর কাছে, বাসে দেখা হয়ে যেতে। “কী করো এখন?” জিজ্ঞেস করায় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, “ট্যাক্সি চালাইতাসিলাম কিন্তু গাড়িটা অ্যাক্সিডেন্ট করল। এখন কাঠ বেকার। একটা রিকশা কিননের পয়সা দিতে পারস?”

খারাপ কতদিন থাকতে পারে মানুষ? কতটা খারাপ থাকতে পারে? যে খুব খারাপ আছে, সেও বেঁচে থাকার ভিতর দিয়ে যেতে-যেতেই একটু ভাল থাকায় পৌঁছে যায় একসময়। আনন্দকুমারও নাইট কলেজের লেখাপড়া শেষে, প্রাইভেটে এম এ পাশ করে শহরতলির একটি কলেজের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তার আগে প্রায় তিনটে চাকরি করা হয়ে গেছে, দ্বিতীয়টায় মাইনের পাশাপাশি কিছু উপরির ব্যবস্থাও ছিল, কিন্তু জীবনের এত দুর্বিপাকেও ‘ঘুষ’ শব্দটার উপর অবিমিশ্র ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই জন্মায়নি, তাই যতদিন ছিলেন চাকরিটায় গা-বাঁচিয়ে ছিলেন যথাসম্ভব আর পরিবর্তনের সুযোগ পাওয়া মাত্রই পা বাড়িয়েছেন।

বিগত সাত-আট বছরে জীবনও মোটের উপর পরিবর্তনের স্রোতেই ভেসে আছে। বাবার চলে যাওয়া, একটি ভাই এবং একটি বোনের অকালমৃত্যু, একটা বোনের বিয়ে, দেশের পাট চুকিয়ে কলকাতায় এসে দাঁড়ানো দিদি-জামাইবাবুর বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, জামাইবাবুর মৃত্যুর পর দিদিকে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টায় সাফল্য এবং একদিনের জন্যেও স্বাধীনাকে ভুলতে না-পারার ব্যর্থতা, মেশিনের মধ্যে থেকে বেরোনো মশলাকে শ্রমিকরা যেমন মাথায় করে নিয়ে যায় ঢালাইয়ের জন্য, আনন্দকুমারও তেমন নিজের ভাগ্যকে মাথায় করে চলেছেন, কখনও নীচ থেকে উপরে, কখনও বা উপর থেকে নীচে।

যাতায়াতের পথে রাস্তায় দেখা হয়ে গেছে অনেক দেশের মানুষের সঙ্গে, তারা কেউ কেউ দাঁড়িয়ে দু’দণ্ড কথা বলেছে, কেউ কেউ আবার লজ্জায় দেখা দিতে চায়নি। খাঁচায় বন্দি বাঘও কি জঙ্গলের কেউ সামনে এসে দাঁড়ালে লজ্জা পায়? তা নইলে যাদের সঙ্গে ওঠাবসা ছিল একসময়, তাদের কেউ কেউ আজ দেখলে পালিয়ে যায় কেন?

সবাই অবশ্য পালায়ও না। বারদির চিত্ত সাহা যেরকম। বিরাট ছিট কাপড়ের ব্যাবসা ছিল ওদের। বারদির লোকনাথ মন্দিরে নিত্য ভোগ দেওয়া হত চিত্তদার পরিবারের নামে আর সেই ভোগ কাঙালিদের মধ্যে বিলি করা হত। কত মানুষ যে খেত সেই ভোগ। চিত্তদার মায়ের চিকিৎসা কালীকুমার চক্রবর্তীই করতেন, সেই সূত্রে কতবার লোকনাথবাবার স্পেশাল ভোগ যে আনন্দকুমারদের বাড়িতে এসেছে। কিন্তু আচমকা চিত্তদার সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়ে যাওয়ায় ‘স্পেশাল’ থেকে একদম ‘জেনারেল’ পৃথিবীতে ভূপতিত হলেন আনন্দকুমার। চিত্তদাদের কাপড়ের গুদামে নাকি আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

“আগুন না-লাগাইয়া লুইট্যা নিলে কাপড়গুলি নষ্ট হইত না।” চিত্তদা দুঃখ করছিল।

যা ফেলে চলে আসে তার প্রতিও কতটা মায়া রয়ে যায় মানুষের। চিত্তদা ওদের দোকানের কর্মচারী কালু শেখ-এর কথা বলছিল। ওরা সবাই যখন এপারে চলে আসছে তখন কালুও জেদ করে ওদের সঙ্গে চলে এসেছিল। বলেছিল যে জীবনের এতগুলো দিন যাদের সঙ্গে কাটিয়েছে, তারা যেখানে থাকবে, সেটাই ওর দেশ।

“এখনও এখানেই আছে কালু?”

“না গেসে গিয়া। তয় অহনও বছরে দুইবার-তিনবার কইরা চইলা আসে, আমাগো দেখতে।”

“তুমি অহন কী কাম করো?”

“একটা কাপড়ের দোকানে খাতা লিখতাম। মালিক বেবাক বুরবাক, ব্যাবসাটারে ডুবাইতাসে। আমি বুঝাইতে গেলাম, মুখে-মুখে তর্ক করনের ইলজাম দিয়া ভাগাইয়া দিল আমারে।”

“তোমার কিছু কওনের দরকার আসিল?”

“না, ছিল না। কিন্তু কইয়া ফালাইলাম। আসলে আমি আর মালিক না, এইটা খেয়াল থাকে না সব সময়।” চিত্তদা হাসল।

যাদের কাছে পঞ্চাশজনের উপরে লোক কাজ করত সেই চিত্তদার অবস্থা দেখে একটা ঠান্ডা স্রোত শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে গেল আনন্দকুমারের। চিত্তদাকে কিছু খাবার কথা বলতে গেলেন। আর তখনই ঘটনাটা ঘটল।

একবার একটা ইংরেজি বইয়ে আনন্দকুমার পড়েছিলেন যে এক ফাঁসির আসামিকে ফাঁসির দিন সকালে নতুন পোশাক পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার নিজের সেল থেকে ফাঁসির মঞ্চের দিকে যাওয়ার সময় একটা কাদাজলে ভর্তি গর্ত দেখে সেই আসামি গর্তটাকে টপকে গিয়েছিল কারণ সে চাইছিল পরিষ্কার ধবধবে পোশাকে ঝুলে পড়তে। এমনকী, ফাঁসির আগেও, সাদা পোশাকটায় কাদা লাগুক সে চায়নি। আনন্দকুমার সেই লোকটাকে নিজের ভিতরে আবিষ্কার করলেন যখন পথ চলতে চলতে একটা মন্দিরের সামনে ‘দরিদ্রনারায়ণ’ সেবা হচ্ছে দেখে চিত্তদাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন আর হাতের শালপাতায় এসে পড়া লুচি, হালুয়া, আলুর দমকে পদ্মার বুকে সূর্যোদয়ের চাইতেও সুন্দর বোধ হতে লাগল। তখনই গাড়ি থেকে দু’-তিনজন নেমে দাঁড়ালেন আর আওয়াজ উঠল, “চৌধুরীবাবু কি জয়!”

চিত্তদা বলছিল, “এই শালপাতা কিন্তু আমাগো দ্যাশে ছিল না, কইলকাতায় আইসাই এইটার লগে পরিচয়...”

আনন্দকুমার তখন দেখছিলেন, চৌধুরীবাবুর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে। মাথায় ঘোমটা, সারা গায়ে গয়না, কিন্তু অত লম্বা মেয়ে আর ক’টা দেখেছেন আনন্দকুমার জীবনে?

সারা গায়ে গয়না পরা স্বাধীনা কোথায় থাকে এখন? কোন ক্যাম্পে? যে বাড়িতে স্বাধীনাকে মাথায় ঘোমটা দিতে হয়, সেটা তো ক্যাম্পই। যে স্বাধীনা ওর সমস্ত স্মৃতির ভাণ্ডারি, যার সঙ্গে আমরণ জ্যোৎস্না দেখার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বাধীনা গাড়িতে উঠছে দেখেও জয়ধ্বনি দিতে পারলেন না আনন্দকুমার। ধ্বনিটা ওঁর গলায় আটকে গেল। আটকে গেল লুচি, হালুয়া, আলুর দম। আটকে গেল পদ্মার স্রোত, বুড়িগঙ্গার ঢেউ, গুহবাড়িতে হওয়া যাত্রার সংলাপ, কালীমন্দিরের কাঁসরঘণ্টা, শিয়ালদা স্টেশনের ট্রেন। স্বাধীনার নামটাও আটকে গেল আনন্দকুমারের গলায়। অনেক চেষ্টা করেও ডেকে উঠতে পারলেন না একবার। নামটাকে ভিতরে গিলে ফেলার চেষ্টায় লুচি, হালুয়া ভিতরে গিলে ফেললেন দিব্যি। পৃথিবীতে ‘বমি’ শুধু বড়লোকরা করে। গরিবদের সমস্ত লাঞ্ছনা আর অপমান গিলে ফেলতে হয়, কারণ গরিবদের পেটে একটা আগ্নেয়গিরি থাকে। সেটা লাভা উগরে দেয় না, গিলে নেয়।

পাতের দুটো মিষ্টি চিত্তদার পাতায় তুলে দিয়ে আনন্দকুমারের মনে হল, খিদে না থাকলেই বা কী হত? স্বাধীনার নাম ধরে ডাকলেই কেউ সাড়া দিত নাকি? কলকাতায় নষ্টচন্দ্রার নিয়ম খাটে না। এখানে কারও জিনিস কিংবা মানুষের উপর অন্য কেউ এক মুহূর্তের জন্য অধিকার পায় না।

অ্যান-আর্বার, মিশিগান

উইকএন্ডে কাছাকাছি একটা জঙ্গলে বেড়াতে গিয়েছিল জয়ী আর অরণ্য। জঙ্গলটায় ঢোকার মুহূর্তে নেট কানেকশন চলে গেল, আর-একটু গভীরে যেতেই ফোনে কোনও কলই আসছিল না। গরমের দিনে পাশাপাশি দুটো পাথরে শুয়ে ছোট একটা নদীর তিরতির করে বয়ে যাওয়ার শব্দ শুনছিল জয়ী আর অরণ্য। কিছুক্ষণ পর দু’জনে একটাই পাথরে উঠে এল আর নদীর বয়ে যাওয়ার শব্দের বিপ্রতীপে তৈরি হল ওদের নৈকট্যের শব্দ। পরস্পরের মধ্যে অবলুপ্ত হচ্ছিল ওদের শরীর আর দু’জনই যেন অনুভব করছিল যে, শহর সেটাই যেখানে আলো আর রাস্তার সঙ্গম চলে অহরহ, অন্যদিকে জঙ্গলে নির্দিষ্ট কিছুক্ষণ পরপরই অন্ধকার আর মাটির রতিক্রিয়া শুরু হয়। আর তার ভিতরেই ডেকে ওঠে পাখি, মেঘ করে আসে সহসা, বৃষ্টি নামে হঠাৎ করে। আদর-ক্লান্ত জয়ী আর অরণ্য আকাশের দিকে বৃষ্টির জন্যই তাকিয়েছিল হয়তো, কিন্তু বৃষ্টির বদলে কোনও এক পশুর ডাক দূর থেকে ভেসে এল। কী জন্তু ওটা? বাঘ? ভাল্লুক? জয়ী আরও ঘন হয়ে এল অরণ্যর।

জঙ্গল থেকে ফেরার পথে ওরা বলাবলি করছিল যে মিশিগান রাজ্যটা একদিকে যেমন বামপন্থী রাজনীতির আঁতুড়ঘর, অন্যদিকে এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছে চরম দক্ষিণপন্থী সমস্ত সংগঠন। অ্যান-আর্বারে, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা যখন চাঁদা তুলেছে, গান বেঁধেছে চে কিংবা কাস্ত্রোর জন্য, ডেট্রয়েট কিংবা রাজ্যের আরও উত্তরদিকে জন্ম নিয়েছে নিও-নাৎসি ভাবধারায় জারিত কু-ক্লাক্স-ক্ল্যানের মতো দলও। বাম আর ডান, দুইয়েরই চরম রূপ দেখেছে মিশিগান।

“লেফটিস্ট কিংবা রাইটিস্ট, দুই দলের মধ্যবিত্তদেরই গাড়ি দরকার। আর মিশিগান হচ্ছে আধুনিক গাড়ি-শিল্পের জননী। ফোর্ড, ক্রাইসলার, জেনারেল মোটর্স, সবার জন্ম কিন্তু এই মিশিগানেই। তাই যে অবস্থানেই থাকো না কেন, মিশিগানকে অগ্রাহ্য করা চলবে না।” অরণ্য হাসতে হাসতে বলল।

“আমরা যারা গণতন্ত্রের হয়ে কথা বলি তারাই আবার অগণতান্ত্রিক শক্তির হাতও সুবিধে মতো ধরে নিই, তাই না?” জয়ী অন্যমনস্কভাবে বলল।

“কী বলতে চাইছিস? সরকারি সুবিধে নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মৃদু প্রতিবাদ করার ভণ্ডামির কথা? হয়তো সেই সামান্য প্রতিবাদের মধ্যে দিয়েই লোকটা নিজের বিপ্লবী সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখে।”

“বিপ্লবী সত্তার আয়ু কতবছর, অরণ্য? বামপন্থীদের নিয়োগকর্তা যদি ক্যাপিটালিস্টরাই হয় আবহমানকাল, তা হলে বামপন্থা কতদিন টিকে থাকে মানুষের জীবনে?”

তর্ক হয়তো আরও চলতে থাকত কিন্তু সেদিন শহরে ফিরে অরণ্য আবারও জয়ীর অ্যাপার্টমেন্টেই থেকে যেতে চাইল।

“তোর ঘরে আমাকে নিয়ে যেতে তোর গুচ্ছের আপত্তি কিন্তু আমার ঘরে এসে থাকতে তোর কোনও অসুবিধে নেই। এই দ্বিচারিতা কতদিন চলবে?” জয়ী কপট রাগ দেখাল।

“আমার এক বন্ধুর বাড়ি ছিল হুগলির গ্রামে, সেখানে গিয়ে বর্ষার সময়ে ছিলাম একবার। ধান রোয়া হয়ে গেছে, খেত বৃষ্টির জলে থইথই, এমন সময়ে আশপাশের ডোবা, পুকুর, খাল-বিল থেকে খেতের মধ্যে উঠে আসে মাছ। এবার আল জলে ডুবে থাকে বলে কার মাছ কার জমিতে যাচ্ছে কোনও হদিশ পাওয়া যায় না। মাছ ধরার যে যন্ত্রগুলো বানানো হয়, সেই মুগরি কিংবা পাং এইক্ষেত্রে বিচারক। যার মুগরিতে মাছটা পাওয়া যাবে, মাছ তারই।”

“এই ভাট গল্পের সঙ্গে আমার প্রশ্নের কী সম্পর্ক?”

“সম্পর্ক হল, এই যে আমি তোর মুগরিতে ধরা পড়েছি, তুই আমার মুগরিতে ধরা পড়িসনি। তাই আমিই থাকতে আসি, তুই যাস না।”

“তুই যেতে দিস না। কে জানে ওখানে আবার হলুদ চুলের কাউকে লুকিয়ে রেখেছিস কি না।”

অরণ্য হেসে উঠল। সেই হাসিতে তর্ক হয়তো থামত না যদি না ওদের ইউনিভার্সিটির একটি ছেলের তৈরি একটা শর্ট ফিল্ম জয়ীর ল্যাপটপে শুরু হয়ে যেত। ছবিটায়, একটা ছোট্ট ছেলে তাদের বাড়ির পিছনে খরগোশের থাকার গর্তে সপ্তাহে ছ’দিন খরগোশদের খাওয়াতে আর একদিন খরগোশদের মারতে যায়। সেই দিনটা তার মন ভীষণ খারাপ থাকে কারণ খরগোশগুলোর উপর মায়া পড়ে যাওয়ায় সে ওগুলোর একটাকেও মারতে পারত না সহজে। ঘটনাটা ঘটছিল হিটলারের জার্মানিতে। সেখানে একদিন ওই খরগোশদের গর্তের মধ্যেই একটা নকল দরজা বসিয়ে একটি লোকের দাঁড়িয়ে কিংবা কোনওভাবে বসে থাকার একটা ব্যবস্থা হল। আধো-অন্ধকারে নিশ্বাস নেওয়া ওই লোকটার কাছে একটা খাবারের থালা গলিয়ে দিতে এবং লোকটার বর্জ্যসমেত বালতিটা সংগ্রহ করতে দিনে একবার যেত এই বালক। লোকটা শিল্পী না কি সংগীতজ্ঞ না কি স্রেফ হিটলারের বিরোধী, তা ছেলেটা জানত না। আর জানত না বলেই ওর মনে প্রশ্ন জাগত, লোকটাকে এভাবে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে কেন। তারপর একদিন লোকটা ধরা পড়ে গেল। আর ওকে আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে ছেলেটার ঠাকুরদা, বাবা, মা সবাইকে তুলে নিয়ে গেল পুলিশ। তারপর থেকে আর কোনওদিন ছেলেটা তাদের দেখতে পায়নি। আমেরিকায় পালিয়ে আসে ছেলেটা একটা সময় আর আসার সময় ওর মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে কত কত লোক ওই খরগোশের মতোই একটা গর্ত থেকে অন্য গর্তের দিকে ছুটছে একটু বেঁচে থাকার আশায়।

সিনেমাটা চলাকালীনই খানিকটা আনমনা হয়ে গিয়েছিল, শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল অরণ্য, “আমাদের হস্টেলের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল দেখতে দেখতে। দারুণ দেখতে একটা ছেলে ছিল, আমাদের থেকে এক বছর জুনিয়র, অভ্রদীপ নাম। এত ভাল খেলাধুলো করত, লং জাম্প আর হাই জাম্পে ওর ধারেকাছে দাঁড়াতে পারে এমন কেউ কলেজে ছিল না। আমাদের হস্টেলে আবাসিকদের অনেক নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হত, তবু তারই মধ্যে কেউ কেউ লুকিয়ে সিনেমা-টিনেমা যেত। অভ্রদীপ ওসবের মধ্যেই থাকত না। আমরা রীতিমতো সমীহ এবং ঈর্ষা করতাম ওকে। কিন্তু হঠাৎ করেই একটা কানাঘুষো শুরু হল, ও নাকি সৈন্যবাহিনী থেকে পালিয়ে এসেছে।”

“পালিয়ে এসেছে মানে?”

“মানে, প্রথম পোস্টিং কাশ্মীরের পহেলগাঁও না কোথায় একটা হয়েছিল, ভোরবেলা মুখ ধুতে গিয়ে পাশে গ্রেনেড ফাটতে দেখে নাকি নার্ভ ফেল করে যায়। কাউকে কিছু না-জানিয়ে সটান এসে ভর্তি হয় আমাদের কলেজে। কিন্তু সেই আত্মগোপন কপালে সইলে তো।”

“ওকে কি জেরা করা শুরু হয়েছিল?”

“না, ঠিক তা নয়। তবে ঘুরিয়ে দু’-একটা প্রশ্ন করত কেউ কেউ, দু’-একজন টোন-টিটকিরিও শুরু করেছিল। আর অভ্রদীপ বাইরে থেকে ওরকম সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী হলে কী হবে, ভিতরে ভিতরে মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল একদম। কেউ সামান্য প্ররোচিত করলেই ধৈর্য ধরে রাখতে পারত না আর। একবার কেউ একটা ওর পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলে উঠল, ‘সারেন্ডার, সারেন্ডার’। অভ্রদীপ সঙ্গে সঙ্গে একছুটে হস্টেলের রান্নাঘরে গিয়ে একটা আঁশবঁটি নিয়ে ফিরে এল।”

“আঁশবঁটি দিয়ে গলা কাটতে গেল লোকের?” জয়ী চেপে ধরল অরণ্যকে।

“না। কিন্তু মাথার উপর তুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, ‘আমাকে কিছু করতে এলে আমি নিজেকে তো মারবই কিন্তু তোদেরও মেরে মরব। আমি কিছুতেই ধরা দেব না আর যতদিন আমি এখানে থাকতে চাইব, থাকতে দিতে হবে আমাকে।’”

“তুই তখন কী করছিলি?”

“আর সবাই তো অভ্রর আঁশবঁটি নাচানো দেখে গর্তে ঢুকেছিল, আমি একাই ওর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। ওকে একটু ভরসা দেওয়ার চেষ্টায় বলেছিলাম যে আমার প্রাণ থাকতে অভ্রর কোনও ক্ষতি কেউ করতে পারবে না। হয়তো বা আমার কথায় একটু ভরসা পেয়েছিল ছেলেটা। নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমোতে পেরেছিল। কিন্তু সেদিন ওই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলা যে ওর সর্বনাশ ডেকে আনছে এটা আঁচ করতে পেরেছিলাম বলেই আমি ঘুমোতে পারিনি সেই রাতটা। আর জেগে থেকে টের পেয়েছিলাম অভ্রর অতীত লোকের সামনে ফাঁস করে দিয়েছে কে।”

“কে করে দিয়েছিল ফাঁস?”

“ওর পাশের পাড়ার, ঋচীক বলে একটা ছেলে। অভ্রদের পাড়ায় তার মামাবাড়ি। সেখানে একটা মেয়েকে পটাতে গিয়ে ছেলেটা নাকি ব্যর্থ হয়েছিল কারণ মেয়েটা অভ্রর রূপ দেখে ফিদা ছিল।”

“তাই প্রতিশোধ নিতে হবে?”

“মানুষ এর চাইতে অনেক তুচ্ছ কারণে খুন করে দেয়, এ তো রীতিমতো যৌন-ঈর্ষা। আর সেই ঈর্ষাই সেদিন সারারাত হস্টেলের বাতাসে ঘুরেছিল, ফিরেছিল। না, কেবল ঈর্ষা নয়, একটা ছেলে পাঁকে পড়েছে, এবার কীভাবে তাকে একদম ডুবিয়ে মারা যায়, সেই চেষ্টা!”

“কী জঘন্য মানসিকতা, সত্যি!”

“অথচ মুখে সবাই দেশের জন্য কী প্রবল চিন্তিত! ট্যাক্স ফাঁকি পড়ছে তার জন্য চিন্তিত নয়, ঘুষ ছাড়া একটা কাজ হচ্ছে না, তার জন্যেও নয়, খালি একটা ছেলে যে ওই বোমা-গুলি-মর্টারের মধ্যে টিকতে পারেনি, পালিয়ে এসেছে, হয়তো অন্যায়ভাবেই পালিয়ে এসেছে...”

“পালিয়ে আসা অন্যায় হয় কী করে, তুই একটু বোঝাবি আমাকে? মানুষ যখন পারে না, তখনই তো সে পালিয়ে যায়। পারলে তো যেত না।”

“সেনাবাহিনীর কিছু নিয়ম আছে, দেশের নিরাপত্তার জন্য সেই নিয়মগুলো থাকা উচিতও হয়তো, কিন্তু সব নিয়মের যেমন ব্যতিক্রম থাকে, যুদ্ধে যোগ দিয়েও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা লোকটার জন্যেও তো একটা রক্ষাকবচ থাকবে। আফটার অল, সে তো আর পরমবীর চক্র চাইছিল না, জাস্ট একটু বেঁচে থাকতে চাইছিল।”

“পেরেছিল বেঁচে থাকতে ছেলেটা?”

“তা জানি না। কিন্তু ওকে ওর পছন্দের রাস্তায় একটু এগিয়ে দিতে পেরেছিলাম, সেটুকু জানি। যদিও জানি না যে ওইভাবে পালিয়ে বাঁচার ব্যবস্থা করে দিয়ে ওর উপকার করছিলাম না অপকার।”

“খুলে বল।”

“যখন আমার কাছে ক্লিয়ার হয়ে যায় যে ভোর হতে না-হতে ঋচীক আর ওর কাছের দু’-একজন হস্টেল ওয়ার্ডেনকে জানিয়েই পুলিশে খবর দিতে গেছে যাতে ঘুম থেকে উঠতে না-উঠতেই পুলিশ এসে গ্রেফতার করে নেয় অভ্রদীপকে, আমি তখন নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না।”

“কী করলি?”

“অভ্রর ঘরে ঢুকে ওকে ধাক্কা মেরে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে বললাম, ‘তোকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ওরা পুলিশ ডাকতে গেছে, তুই পালা শিগগির।’”

“অভ্র কী করল?”

“হতভম্ব হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর কীরকম একটা গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘আমি ওদের কোনও ক্ষতি করেছি?’”

“যেন এই পৃথিবীতে কারও ক্ষতি করার জন্য তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়!” জয়ী একটা তেতো হাসি হাসল।

“কিন্তু এই পৃথিবীতে ভালবাসা পাওয়ার জন্য ভালবাসতেও হয় না সবসময়। অভ্রদীপ কি আমাকে মারাত্মক কিছু ভালবাসত?”

“ভরসা করত নিশ্চয়ই। সময়-সময় ভরসার মূল্য ভালবাসার চেয়েও বেশি।”

“সেই ভরসার যতটা মূল্য দেওয়া সম্ভব, আমি তার চেয়ে কিছু বেশিই দিয়ে থাকব জয়ী। মাপতে চাই না, মাপলে পৃথিবীও ছোট হয়ে যায়, কিন্তু সেদিন সকালে অভ্রকে আমি ব্রাশ পর্যন্ত করিয়ে দিয়েছিলাম। ও যেন কীরকম অসংলগ্ন হয়ে গিয়েছিল, ওর হাত-পা নিজের বশে ছিল না। বলতে গেলে, আমিই ওকে শার্ট-প্যান্ট এগিয়ে দিয়ে তৈরি করলাম, তারপর ওর বুকপকেটে তিনশো টাকা গুঁজে দিয়ে হস্টেলের পিছনের পাঁচিল টপকালেই যে মাঠটা, তার মুখে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালাম।”

“ছেলেটা তখনও টলমল করছে?”

“করছিল। কিন্তু যে-মুহূর্তে ওকে প্রায় নির্দেশ দেওয়ার ঢঙে বলে উঠলাম যে এক্ষুনি পাঁচিল টপকাতে হবে, লাগামছাড়া ঘোড়ার মতো ছিটকে উঠল প্রায়। আসলে মাথা কাজ করছিল না ওর, কিন্তু শরীরটা তো চাবুক। সেই শরীর কথা বলতে শুরু করতেই কুয়াশাটা অনেকটা কেটে গেল। আমি হ্যাঁচড়প্যাঁচড় করে পাঁচিল টপকে দেখলাম, অভ্র একদম নিরুদ্দেশে চলে যাওয়ার জন্য রেডি।”

“গেল চলে?”

“যাবে না তো কী করবে? হরিণ যেভাবে পিছনে চিতাবাঘকে নিয়ে দৌড়য়, সেভাবেই একটা রাষ্ট্রের নিয়মকে পিঠে নিয়ে দৌড়ে গেল অভ্র। আমি প্রায় মিনিটখানেক ধরে ওর সেই দৌড়নো দেখলাম।”

“তারপর?”

“পুলিশ এসেছিল হস্টেলে। কেউ কেউ আমার নামে চুকলি কেটেছিল নিশ্চয়ই। তবে পুলিশের সামনে আমি বেশ বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করতে পেরেছিলাম।” হেসে উঠল অরণ্য।

হাসতে হাসতে খেয়াল করল যে জয়ী কাঁদছে।

“কাঁদছি কারণ, খুব অপরাধবোধ হচ্ছে। তুই একটা ছেলেকে নিজের মতো করে বাঁচার রাস্তা দেখাতে পারলি আর আমি একটা লোককে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিলাম। ইচ্ছে করে নয়, কিন্তু আমারই নির্বুদ্ধিতার দাম দিতে হয়েছিল লোকটাকে। কী করব, খুব পছন্দের স্কার্ফ ছিল যে ওটা।”

“মৃত্যু, অপরাধবোধ, স্কার্ফ... আমার তো পুরো ঘেঁটে ঘ’ হয়ে যাচ্ছে। কী ব্যাপার একটু বুঝিয়ে বলবি জয়ী?”

“আমেরিকায় সদ্য এসেছি তখন। বাবার কোনও চেনা-পরিচিতর কাছে যাওয়ার ব্যাপারে আমার প্রবল একটা বাধা ছিল, কিন্তু প্রলয়কাকু সেসব শোনার বান্দা ছিল না। যৌবনের আগুনখেকো লোকটার চুলে পাক ধরলেও, তেজ একটুও কমেনি তখনও।

আগুনখেকো? মানে, সেই আল্ট্রা লেফট টার্ন্ড বুর্জোয়া?’’

‘‘ছাড়, তোকে এখন থিসিস নামাতে হবে না কারণ আমি যা বলতে চাইছি তার সঙ্গে প্রলয়কাকু সামান্যই যুক্ত। ঘটনাটা মৃন্ময় সেনকে নিয়ে। একেবারে একজন নিপাট ভদ্রলোক উনি। শিকাগোর উপকণ্ঠে ওকল্যান্ডে থাকতেন।”

“ওকল্যান্ড? আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বাড়ি?”

“আজ্ঞে। সেই বাড়ির ভিতরে ঢুকেছি, ছবি তুলেছি...”

“‘আ ম্যান ক্যান বি ডেসট্রয়েড বাট নট ডিফিটেড,’ এই মন্ত্রটা উচ্চারণ করিসনি?”

“আমার এখন কী মনে হয় জানিস, একটা মানুষ হেরে যাওয়ার পরই তার ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।”

“তোর কথা মানতে পারলাম না। কিন্তু এখন ঝগড়া করব না তাই নিয়ে। তুই গল্পটা বল।”

“গল্প নয়, একদম একশো শতাংশ সত্যি। আমি অ্যান-আর্বারে এসেছি জেনে, প্রলয়কাকু চলে এসেছিল একদিন আর আমাকে প্রায় হাইজ্যাক করে নিয়ে গিয়েছিল শিকাগো। ওঁর ইচ্ছে ছিল আমি ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোয় কিংবা আর্বানা-শ্যাম্পেনে কাজ করি।”

“কেন, কোন মধু আছে ওখানে?”

“উফফ, তুই চুপ কর না।’’

“ওকে ম্যাম, প্লিজ় প্রসিড!”

“তো, শিকাগোয় প্রথম এসেছি, এটা-ওটা তো দেখবই। কিন্তু শহরটা জুড়ে চরকি কাটতে গিয়ে আমার খানিকটা ঠান্ডা লেগে গেল। তার ভিতরেই, হেমিংওয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রলয়কাকুর জোরাজুরিতে ওই মৃন্ময় সেনের বাড়িতে যেতেই হল। না গেলে নাকি ভদ্রলোক খুব দুঃখ পাবেন। অধীরাকাকিমা প্রথমটা আমার তালে তাল মেলাচ্ছিল, তারপর ঘুরে আসার পক্ষেই মত দিতে শুরু করল।”

“কী হল সেই বাড়িতে গিয়ে?”

“দারুণ খাওয়াদাওয়া হল। আর তার মধ্যেই মৃন্ময় সেন প্রলয়কাকুর যুক্তি নস্যাৎ করে দিয়ে বললেন যে লেখাপড়ার জন্য শিকাগোর চেয়ে অ্যান-আর্বারটাই ভাল হবে আমার পক্ষে। শিকাগোর নাকি একটা অন্ধকার তলদেশ আছে।”

“খাঁটি কথা। একটা দুর্দান্ত বই আছে, দ্য ডার্ক আন্ডারবেলি অফ শিকাগো বলে। পড়াব তোকে। আল কাপোন থেকে শুরু করে মস্ত মাফিয়াদের বেড়ে ওঠার তৃণভূমি ছিল শিকাগো। সানফ্রান্সিসকো থেকে লঞ্চে চেপে সমুদ্রের মাঝখানে যে জেলে যেতে হয়, কুখ্যাত সেই আলকাতরাজ় জেলে, বন্দি বেশির ভাগ কয়েদির আদি ঠিকানা ছিল শিকাগো। শিকাগো শহরে একটা বিখ্যাত বাস টুর আছে, যেটা সব মাফিয়াদের বাড়ি ঘুরিয়ে দেখায়, দেখেছিস?”

“না। স্বামী বিবেকানন্দ যেখানে ভাষণ দিয়েছিলেন তার মধ্যে একটা তো ভেঙে নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে, কিন্তু আর একটা একদম আগের অবস্থায় আছে। সেই রকফেলার ইনস্টিটিউট দেখতে গিয়েছিলাম।”

“এত অল্প বয়সেই তোর এত ধর্মে মন হল কেন রে?”

“এটা ধর্ম-কর্মের ব্যাপার নয় রে পাঁঠা। বাঙালির বিশ্বজয় নিউ ইয়র্ক কিংবা লস এঞ্জেলস থেকে শুরু হয়নি। ইস্ট-কোস্ট কিংবা ওয়েস্ট-কোস্ট নয়, নরেন্দ্রনাথ দত্তর হাত ধরে মিড-ওয়েস্ট থেকেই বাঙালির বিশ্বজয়। আর শিকাগো সেই মিড-ওয়েস্টের প্রাণকেন্দ্র।”

“বাপ রে! তা তোর বিশ্বজয় হল না কেন ওখানে গিয়ে?”

“টন্ট করিস না। আমি বিশ্বজয় করতে যাইনি। কিন্তু মৃন্ময় সেনের বাড়ির আন্তরিকতা খুব ভাল লেগেছিল। আরও বেশ কয়েকজনকে ডেকেছিলেন ভদ্রলোক, আমরা যাচ্ছি বলে। তাদের মধ্যে অনন্যা নামের একজন ভদ্রমহিলা আমাদের খাওয়াদাওয়া সব দেখভাল করলেন। মৃন্ময় সেন বিপত্নীক হলেও বন্ধুহীন নন, এটা উনি নিজেও দু’-চারবার বললেন। বেরিয়ে আসার পরও ভাল-লাগার একটা রেশ লেগে ছিল মনে। চোখ জড়িয়ে এসেছিল সামান্য, হঠাৎ খেয়াল পড়ল আমার নতুন কেনা স্কার্ফটা আমি ফেলে এসেছি ওই বাড়িতে।

“আরও ওরকম অনেক স্কার্ফ আছে, একটা দিয়ে দেব তোকে।’’ অধীরাকাকিমা বলল।

“না, আমার ওই স্কার্ফটাই দরকার। ওটা আমার ভীষণ পছন্দের, পয়া স্কার্ফ, আমি ওটা ছাড়া থাকতে পারব না!’’ আমি কান্নাকাটি জুড়ে দিলাম।

“এমনই নাছোড়বান্দার মতো করতে লাগলাম যে প্রলয়কাকু প্রায় বাধ্য হয়ে গাড়ি ঘোরালেন। ততক্ষণে দশ মাইলের বেশি চলে এসেছি আমরা, আমেরিকায় তো পঞ্চাশ মাইলের দূরত্বেও প্রতিবেশী হয়। কিন্তু আমাদের গাড়িটা যখন আবার মৃন্ময় সেনের বাড়ির সামনে দাঁড়াল, তখন ওখানে আর একটাও গাড়ি দেখতে পেলাম না।’’

“সবাই চলে গেছে, ভদ্রলোক হয়তো শুয়েও পড়েছেন।’’ অধীরাকাকিমা একটু বিরক্তির গলায় বললেন।

“কিন্তু আমার তখন ওসব শোনার সময় নেই। আমি প্রায় দৌড়ে গিয়ে বেল বাজালাম আর মুহূর্তের মধ্যে ওই অনন্যা নামের ভদ্রমহিলা এসে দরজা খুলে আমায় দেখে শিউরে উঠলেন। মুখটা যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল একেবারে। ততক্ষণে কাকিমাও আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। আর আমরা দু’জনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি ওর দিকে।”

“কেন? উনি মৃন্ময় সেনের বাড়িতে আছেন তাতে বিস্ময়ের কী আছে?”

“উনি আগেই বেরিয়ে গিয়েছিলেন। আবার ফিরে এসেছেন, কথা সেটা নয়। কথা হল, উনি রাতপোশাকে ছিলেন। অসতর্কভাবে, কে আসতে পারে না-ভেবেই দরজা খুলে দিয়েছিলেন। কেন খুলেছিলেন, বলতে পারব না। হতে পারে রাতেই ট্র্যাশ কালেক্ট করে নিয়ে যাওয়ার জন্য ফোন করেছিলেন, আর সংগ্রহ করার লোক এসেছে ভেবে আই-হোলে চোখ রাখেননি আর। কারণ যাই হোক, ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পরই পিন-পতনের নিস্তব্ধতা নেমে এল। দশ সেকেন্ডের মধ্যে মৃন্ময় সেনও দরজার সামনে এলেন আর আমাদের দু’জনকে দরজার বাইরে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন।

“ততক্ষণে গাড়ির ভিতর থেকে নেমে প্রলয়কাকুও চলে এসেছেন দরজার কাছে আর আমি বলে ফেলতে পেরেছি যে ফেলে আসা স্কার্ফটা ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই আমাদের ফিরে আসা। স্কার্ফটা হাতে নিয়ে আমরা যখন ফিরে আসছি, প্রলয়কাকুকে একটা ডাক দিলেন মৃন্ময় সেন। শিকাগোর ঠান্ডা তখন পড়ব-পড়ব করছে, তবু কলকাতা থেকে সদ্য যাওয়া আমার কাছে সেই তাপমাত্রাই রীতিমতো হাড়কাঁপানো। তার ভিতরে রাতপোশাক পরা মৃন্ময় সেন, কাকুকে ডাক দিলেন পিছন থেকে। ওই ঘাসের লনে দাঁড়িয়েই কথা বললেন, মিনিটখানেক।

“গাড়ি আবার চলতে শুরু করতেই, প্রলয়কাকুর পাশে বসা অধীরাকাকিমা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী বলছিল ডেকে?’

“কী আবার বলবে, ওই ওঁর ঘরে অনন্যার থাকার ব্যাপারটা কোনও বাঙালির সঙ্গে ডিসকাস করতে বারণ করল।’’

“কেন, লোকে শুনলে ছি ছি করবে, তাই?’’

“বলছিলেন যে অনন্যা ওঁর বন্ধু...’’

“বন্ধু না হাতি। তুমি চুপ করো তো। ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে আবার ঘরে ফিরে আসে, শয্যাসঙ্গিনী বলতে কী অসুবিধে হয়?’’ অধীরাকাকিমা ঝাঁঝিয়ে উঠে চুপ করিয়ে দিলেন কাকুকে।

“আমার বোধ হয় স্কার্ফটার কথা বলা ঠিক হয়নি।’’

“কে বলেছে ঠিক হয়নি? ভাগ্যিস তুই বললি জয়ী। নইলে আমাদের শহরেই এরকম নির্লজ্জ ব্যাপার চলছে জানতেই পারতাম না। কাউকে কিছু জানতে না-দিয়ে এরকম ডুবে ডুবে জল খাওয়া...’’

“অধীরাকাকিমাকে থামিয়ে দিলেন প্রলয়কাকু, ‘কে কীরকম ভাবে জল খাবে সেটা একেবারেই তার নিজস্ব ব্যাপার। তা ছাড়া একজন বিপত্নীক মানুষের সঙ্গে যদি একজন ভদ্রমহিলার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাতে দোষের কী আছে? সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তুমি এগুলো নিয়ে এত বদার্ড হচ্ছ কেন? তোমার কী আসছে-যাচ্ছে এতে?’’

“সমাজের মধ্যে থাকলে, অসামাজিক কাজের নিন্দে করতেই হয়। চোখের সামনে আমি দেখছি, একটা বাচ্চা মেয়ে দেখছে, ছলচাতুরি করে ফুর্তি করছে একটা লোক, সেটা নিয়ে দুটো কথা বললেই অন্যায়? নির্লজ্জ লোক সত্যি!’’ অধীরাকাকিমা থামার পাত্রী ছিলেন না।

“ওরা যখন তর্ক করছে তখন আমার ভিতরে জ্বালাপোড়াটা শুরু হয়ে গেছে। কী হত আমার স্কার্ফটা ওখানেই পড়ে থাকলে? কত লক্ষ ডলার লাগত একটা নতুন স্কার্ফ কিনতে? যে লোকটা বলতে গেলে আমার অনারেই পার্টি দিল, যার বাড়িতে অত ভাল খানিকটা সময় কাটিয়ে এলাম, তাকে ওইভাবে অপমানিত হতে শুনে আমার মাথার ভিতর যেন লাভাস্রোত বইছিল। কিন্তু কিছু বলতেও পারছিলাম না, কারণ জোর করে গাড়ি ঘুরিয়ে আবার ওকল্যান্ড যাওয়ার জন্য জেদাজেদি তো আমিই শুরু করেছিলাম।”

“আরে বাবা, তুই তো আর ইচ্ছে করে করিসনি। তুই কী করে জানবি যে ওখানে তখন একজনের বদলে দু’জন থাকবে? কিন্তু একটা ব্যাপার ভেবে আমি খুব মজা পাচ্ছি, কলকাতার এত বড় বনেদি ফ্যামিলির একটি মেয়ে, শেষে কিনা একটা স্কার্ফের জন্য...” অরণ্য হেসে উঠল।

“স্কার্ফটা শুধু একটা জিনিস ছিল না, আমি ভালবেসে ফেলেছিলাম ওটাকে। তোর কিংবা অন্য কারও জায়গা থেকে ব্যাপারটা বোঝা সম্ভবও নয়। কিন্তু আমার জীবন এমনই যে কয়েকটা প্রাণহীন জিনিসও আমার কাছে চূড়ান্ত জ্যান্ত হয়ে উঠেছে। হাজার চেষ্টা করেও আমি তাদের আর কেবল জিনিস বলে ভাবতে পারব না। আমার মায়ের বেনারসিটা যেমন...”

“তোর মায়ের বেনারসির আবার কী গল্প?”

“সে অনেক কথা। বাদ দে।”

“বলছিস যখন বলই না বাবা!”

“বাবা! হ্যাঁ, বাবাই। যখন দীর্ঘ তিনবছর পরে একদিন রাতে আবার আমাদের সঙ্গে থাকতে এল লোকটা, আমি ভীষণ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু মাকে স্নান করে চুল বাঁধতে দেখে, মুখে ক্রিম মাখতে দেখে আর সর্বোপরি ওই নীলরঙা বেনারসিটা পরতে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম ভীষণ। একদম উলোঝুলো হয়ে থাকত যে মানুষটা সে আজ আবার কোন স্বপ্নের টানে এরকম সাজুগুজু করছে? মা কি সত্যিই ভাবছিল যে বাবা মিতালি বোসকে ছেড়ে এসেছে, ওদের সংসার আবার শুরু হবে নতুন করে?”

“মিতালি বোস, মিতালি চৌধুরী হয়নি ততদিনে?”

“আমি কোনওদিন ওই ভদ্রমহিলার পাশে আমাদের পদবিটা বসাতে পারব না।”

“কিন্তু ভদ্রমহিলা, আর কিছু না-হোক, তোর বাবার সন্তানের মা আর সেই ছেলেটা বাই ডিফল্ট তোর ভাই...”

জয়ী ঠাস করে একটা চড় মেরে দিল অরণ্যর গালে। আর তারপর কাঁদতে শুরু করল চিৎকার করে।

“আই অ্যাম সরি জয়ী, আমার ওই প্রসঙ্গটা তোলা উচিত হয়নি।”

“প্লিজ়, সরি বলিস না। তুই তুললি বলেই আমি আবার কথাটা বলছি আর বলতে বলতে জমে থাকা বিষগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে আমার, একটা ক্যাথারসিস হচ্ছে। মায়েরও বোধ হয় সেই ক্যাথারসিস হচ্ছিল যখন বাবার মুখে, ‘বাহ্, তোমাকে তো বেশ ভাল লাগছে,’ শুনেই হাতের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা বাক্সটায় দেশলাই ঘষে দিল।”

“কিন্তু সারা জীবনের জন্য গ্রহণ করার পরও যে ছেড়ে চলে গেছে, একরাত্রির জন্য আবার তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেনই বা কেন উনি? নিজেকে খেলো করা হল না তাতে?”

“মা অত চুলচেরা বিচারের জায়গায় ছিল বলে মনে হয় না আমার। মা কেবল একটা শিক্ষা কিংবা শাস্তি দিতে চাইছিল যাতে কমলেশ চৌধুরীর ভবিষ্যতের আনন্দময় মুহূর্তগুলোর গায়ে একটা দহন জেগে থাকে।”

“তোর বাবাই বা এসেছিলেন কেন? ছেড়ে যাওয়া বউয়ের কাছে?”

“ধান্দায় এসেছিল। অনেকগুলো শেয়ার সার্টিফিকেট কিংবা সম্পত্তির দলিল দু’জনের নামে ছিল তো। মাকে দিয়ে সইগুলো না করানো গেলে ভোগ করবে কী করে?”

“পেরেছিল সই করাতে?”

“সেই সুযোগ পায়নি। আমি অবচেতনে কিছু একটা আঁচ করেছিলাম বলেই মায়ের কাছাকাছি ছিলাম সম্ভবত। মা যে-মুহূর্তে জ্বলন্ত দেশলাই আর বেনারসিটার সংযোগ ঘটিয়ে দিয়েছে, আমি তখনই মায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়েছি বেনারসিটা ধরে। আশ্চর্য যে মা পোড়েনি, কিন্তু পুড়ে গিয়েছিল আমার বাঁ হাতের তালুর কাছটা। দাগ ছিল অনেকদিন। আর পুড়ে গিয়েছিল বেনারসিটা। অনেকক্ষণ পর্যন্ত ওই শাড়ি বাঁচানোর কথা খেয়াল হয়নি। তারপর একসময় দেখলাম, বাবা শাড়িটার গায়ে জল ঢেলে পায়ের চটি দিয়ে আগুন চাপছে। ততক্ষণে অবশ্য সনাতনকাকা, মায়াদিরা ঘরে ঢুকে এসেছে। আমি এগিয়ে গিয়ে বাবাকে পা সরিয়ে নিতে বলেছিলাম ওই পোড়া বেনারসির থেকে। আমার কেমন যেন মনে হচ্ছিল যে লোকটা ওই শাড়িটা পা দিয়ে ঠেসে আমার মাকে অপমান করছে।”

“কী হল সেই শাড়িটার?”

“যতটা অংশ পোড়েনি শাড়িটার, ততটুকু আমাদের বাড়ির পিছনের বস্তির বাচ্চাদের মধ্যে কেটে কেটে বিলি করে দিয়েছিলাম। ওরা ওদের পুতুলের বিয়ে দেওয়ার জন্য অত ভাল শাড়ি জীবনে পায়নি। মানুষের নিজের জীবন ধ্বংস হলে, তবেই সে অন্য অনেকের জীবন সুন্দর করে দিতে পারে, তাই না? মা যখন আত্মহত্যার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে জীবনটাকে আবারও বহন করার ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিল, তখন একদিন সন্ধ্যায় মাকে একরকম জোর করে নিয়ে গিয়েছিলাম পিছনের বস্তিটায়, একটা পুতুলের বিয়ে দেখাতে। মা জানত না যে সেই বিয়ে উপলক্ষে খাওয়াদাওয়া ইত্যাদি আমিই স্পনসর করেছিলাম, মা কেবল নিজের জীবনে যা ড্রাকুলার রূপ ধরে এসেছে, অন্যের জীবনে তা যে পরির রূপ ধরেও আসতে পারে, তা দেখেই মোহিত হয়ে গিয়েছিল। ওই খেলান্তির বিয়ে আসল বিয়ের সব কদর্যতাকে মুছে দিয়ে একটা স্বর্গীয় আবহ তৈরি করেছিল, যেখানে একটা পুতুল আর-একটা পুতুলকে কোনওদিন কষ্ট দেয় না। আর দেয় না বলেই পুতুলদের কখনও গায়ের বেনারসিতে আগুন দিতে হয় না।”

জয়ীর কথাটা শেষ হতেই অরণ্য ওকে জড়িয়ে ধরল, “আমি সেদিন বুঝতে পারিনি তুই কেন বেনারসি পরে বিয়ে না করার কথা বলছিলি।”

“তোর বুঝতে পারার কথাও নয়।”

“কিন্তু একটা কথা আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি আজ এই মুহূর্তে। জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে তুই জিতবি, তুই-ই। ইউ আর অ্যান্ড ইউ উইল রিমেন আ উইনার।”

“না, না, না! আমি হেরে গেছি। অধীরাকাকিমা কিছুতেই চুপ থাকতে পারেননি। আর সেদিন রাতের ওই ঘটনাটার একমাসের মাথায় মৃন্ময় সেন অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ একসঙ্গে খেয়ে মারা যান।”

“স্যাড টু হিয়ার দ্যাট। কিন্তু তার জন্য নিশ্চয়ই তুই রেসপনসিবল নোস।”

“আমি ছাড়া আর কে দায়ী? যদি ফিরে না যেতাম লোকটার কিছুই হত না... আচ্ছা, আমি যে তোর জীবনেও ফিরে এলাম, এতে তোর ক্ষতি হবে না কোনও?”

“আমার জীবন থেকে তুই চলে গিয়েছিলি কবে?” অরণ্য হেসে উঠল।

অরণ্যর আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে জয়ী বলল, “তোকে একটা কথা বলা হয়নি। যে রাতে তোকে অপমান করেছিলাম তার পরদিন আমি শিকাগো চলে গিয়েছিলাম। একা একা গোটা শহরটা চষে বেড়িয়েছিলাম। ওই যে সব মাফিয়াদের বাড়ি-ঘরদোরের ট্রিপটার কথা বললি তুই, আমার সেদিন ওই ট্রিপটা নিতে খুব ইচ্ছে হয়েছিল। নিজেকে নিজের ক্রিমিনাল মনে হচ্ছিল তো। তবে আমি ট্রিপটা নিতে পারিনি।”

“কিন্তু কেন?”

“শিকাগোর ওই মাফিয়া কানেকশনের কথা আমি যে প্রথম মৃন্ময় সেনের মুখ থেকে শুনেছিলাম। আমার, কে জানে কেন, মনে হচ্ছিল যে ওই বাড়িগুলোর আলো-আঁধারিতে হয়তো মৃন্ময় অপেক্ষা করছেন আমার জন্য। আমাকে দেখতে পেলেই জানতে চাইবেন সেই স্কার্ফটার কথা, যেটা ততদিনে আমি একেবারেই হারিয়ে ফেলেছি। আমার খুব ভয় করছিল জানিস, হয়তো কোনও ভিত্তি নেই ভয়টার, তবু ভয়টা সত্যি।”

“ভয় কখনও সত্যি হয় না জয়ী, ভয় সবসময় মিথ্যে। তোর মনে আছে, প্রথম-প্রথম আমাকে ‘তুমি’ বলতে তোর কীরকম ভয় করছিল, অথচ ‘তুই’ বলতেও স্বচ্ছন্দ বোধ করছিলি না।”

“কেন ভয় করবে না? ‘তুমি’ শব্দটার সঙ্গে অভিরাজ জড়িয়ে ছিল যে।”

“এখন থেকে তোর আর আমার প্রত্যেকটা শব্দের সঙ্গে যদি শুধু তুই আর আমিই জড়িয়ে থাকি?”

“শুধু আমরা দু’জন? আর কেউ নয়? কিচ্ছু নয়?” প্রশ্ন করতে করতেই জয়ী জড়িয়ে ধরল অরণ্যকে। সব প্রশ্নের উত্তর হিসেবে।

সূর্য সেন পল্লী, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা

ভূমিকম্প একসময় থেমে যায়। কিন্তু থামে না সময়। স্মৃতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উলটোদিকে ছুটতে থাকে সে। স্মৃতি ক্ষয়ে যেতে থাকে। নতুন অভিজ্ঞতা এসে তার জায়গা নেয়। যা ছিল কষ্টের, বহুদিন পার করে এসে তাকেও আনন্দের মনে হতে থাকে, কারণ সময় সময় সবকিছু পালটাতে পালটাতে যায়। সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যারাথন রানার, যে একশো মিটার দৌড়নো লোকটার পাশের ট্র্যাকে ছুটছে।

যেদিন ঘরদোর ছেড়ে একটা বিরাট মিছিলের সঙ্গে শিয়ালদা স্টেশনে নেমেছিলেন আনন্দকুমার, সেদিন তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, একটা জাতির প্রতিনিধি ছিলেন। যে জাতি দিনে-রাতে চারবার করে ভাত খাওয়া অনেক মানুষের সমষ্টি আর যারা ভিন্ন একটা ভূখণ্ডের প্রতিকূল পরিবেশে মাইলো খুঁজতে শিখে যায়। যারা দিনে দু’বার খাল-বিল এপার-ওপার করত আর আচমকা আবিষ্কার করেছিল যে একটা টিউকল টিপে একবালতি জল জোগাড় করাও এই নতুন দেশে কষ্টসাধ্য। ইতিহাসের সেই মস্ত বড় ট্র্যাজেডির সামনে দাঁড়িয়ে আনন্দকুমার চেষ্টা করছিলেন আবারও একজন ব্যক্তি হিসেবে মাটির উপর পা রাখার, কিন্তু সে কি খুব সহজ কাজ?

ভিটে ছেড়ে আসার বছরপাঁচেক পরে শিয়ালদা স্টেশনেই আনন্দকুমারের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় হারাধন কৈবর্তর। অবসরে কীর্তন-গান করা হারাধন ঝড়-জলের রাতে বেরিয়ে মাছ ধরায় বিশেষ পারদর্শী ছিল, তা ছাড়া কী সব কায়দা জানত, ইলিশকে পর্যন্ত বেশ খানিকক্ষণ বাঁচিয়ে রাখতে পারত ধরে ফেলার পর। আনন্দকুমারের মনে আছে, একবার জ্যান্ত ইলিশ সমেত বাড়িতে এসে হারাধন ওঁর নাম ধরে ডাকাডাকি করে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিল। বিক্রমপুরের একটা ঐতিহ্য ছিল, বাচ্চারা কাউকে ‘কাকু’ বলে ডাকলে, সেই লোকটিও ‘কাকু’ বলে উত্তর দিত। হারাধন যেমন আনন্দকুমারকে ‘ধলাকাকু’ বলে ডাকত। কোনওদিনই তেমন কিছু গৌরবর্ণ ছিলেন না আনন্দকুমার, কিন্তু হারাধন কৈবর্তর সম্বোধন বদলায়নি তার জন্য।

এত বছর পর স্টেশনের হইহট্টগোলে হারাধন কিন্তু চিনতে পারেনি আনন্দকুমারকে। চেহারা ভেঙে গেলেও ওর ওই কাঁধ-ছাপানো চুল তখনও বিদ্যমান, যে চুল ঝাঁকিয়ে গ্রাম্য আসরে ঢোল বাজিয়ে কীর্তন গাইত নাচতে নাচতে। মানুষটাকে চিনতে পারার মুহূর্তে আনন্দকুমারের মনে হল, পৃথিবী যখন প্রলয়নৃত্য শুরু করে, মানুষের নাচ থেমে যায়। হারাধনের ছেলে হরিরামকে কঠিন অসুখ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন আনন্দকুমারের বাবা। সেই কৃতজ্ঞতায় সবচেয়ে ভাল মাছটাই দিয়ে যাওয়া নয়, ওঁদের বাড়ির কাউকে দেখলেই খলবলিয়ে কথা বলে উঠত লোকটা, মনে হত ওর জিভের ভিতর যেন খলসে, ট্যাংরা, ন্যাদোশ লাফাচ্ছে-ঝাঁপাচ্ছে। কিন্তু সেদিন আনন্দকুমারকে চিনে উঠতেই যেন অনেকটা সময় লাগল হারাধনের। আর তারপরও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল যেন জাহাজ এসে চড়ায় ঠেকে গেছে, এগোতে পারছে না আর।

তারপর যে কথাগুলো বলে গেল হারাধন, তাও অনেকটাই অসংলগ্ন। সেই সব অসংলগ্ন শব্দের ভিতর দিয়ে দুটো মানুষের মাঝখানে,একটা সুজলা-সুফলা গ্রামদেশ দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া স্মৃতিতে পরিণত হতে থাকল। আনন্দকুমার জানলেন, নদী-নালার পৃথিবী থেকে উৎখাত হয়ে আসা হারাধন এবং আরও অসংখ্য জেলেকে ভারত সরকার দণ্ডকারণ্যের মালকানগিরি অঞ্চলে পুনর্বাসন দিয়েছিল। হারাধন ‘পুনর্বাসন’ শব্দটার মানে জানত না, ও এবং ওরা কেবল নিজেদের সর্বস্ব হারানোর বিনিময়ে জানতে পেরেছিল, ওড়িশার ওই রুক্ষ, খরাপ্রবণ অঞ্চলকেই এখন থেকে ‘দেশ’ বলে ভাবতে হবে, এক কলসি জলের জন্য হেঁটে যেতে হবে মাইলের পর-মাইল।

যে জায়গায় বছরে সাতদিন বৃষ্টি হয় কি না সন্দেহ, সেখানে গিয়ে জেলেরা থাকবে কী করে? কেন ওদের জন্য মহাবলীপুরম, বিশাখাপত্তনম, কোঙ্কণের কোনও উপকূলের কথা ভাবা হল না? উত্তর আনন্দকুমারের কাছে ছিল না, কিন্তু যন্ত্রণাটা ওঁকেও ছিন্নভিন্ন করতে লাগল। জীবনানন্দের সেই কবিতা যার শেষে এসে বেহুলা ছিন্ন খঞ্জনার মতো নাচ দেখায় ইন্দ্রের সভায়, গোটা উদ্বাস্তু সমাজের বর্ণনা হয়ে ওঠে আনন্দকুমারের কাছে। আড়াআড়ি বিভক্ত অসংখ্য মানুষ স্মৃতির দ্বারা চালিত হয়ে বর্তমানের হাতল ধরতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, তলিয়ে যাচ্ছে কোন অচেনা কৃষ্ণগহ্বরে, কেউ তার খেয়াল রাখবে না, কেউ না? জলকে যেভাবে শুষে নেয় ব্লটিং পেপার, বাস্তুহারাদের সেইভাবে শুষে নেবে এই খণ্ডিত স্বাধীনতা? হারাধনের ছেলে যেরকম স্টেশন থেকে এক ক্যাম্প হয়ে আর-এক ক্যাম্পে যাওয়ার পথে হারিয়ে গেছে চিরতরে, তেমনভাবেই হারিয়ে যাবে সব সম্পর্ক আর সংকল্প? আর জলের মানুষ হারাধনের দুটো চোখ হয়ে উঠবে ওই মালকানগিরির মতোই শুকনো খটখটে, যেখানে পদ্মা-মেঘনার কোনও চিহ্ন পর্যন্ত পাওয়া যায় না।

হারাধনের কাহিনি শুনে কতক্ষণ ভারাক্রান্ত হয়ে থাকবে মন? প্রতি মুহূর্তে হাজারও হারাধনের গল্প আছড়ে পড়ছে দশদিক থেকে! বরিশালের উজিরপুরের সুরেশ যেমন। একেবারে কেষ্ট ঠাকুরের মতো চেহারা, শুধু হাতে একটা বাঁশি ধরিয়ে দিলেই হল। সেই সুরেশ, যে যাত্রাদলের কুশীলব হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে বাসা বেঁধেছিল বিক্রমপুরেরই মাইজদা গ্রামে,স্থানীয় মেয়ে পার্বতীকে বিয়ে করে। ভারী সুন্দর গানের গলা ছিল পার্বতীরও। দুর্ভিক্ষের বছরে, যখন চাল নেই মানুষের ঘরে, তখনও সুরেশ আর পার্বতী নিজেদের গান নিয়ে দরজায় এসে দাঁড়ালে পারতপক্ষে ফেরাত না মানুষ, যা পারত, যতটা পারত হাতে তুলে দিত। সেই সুরেশ পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে কলকাতায় আসার পথে হারিয়ে ফেলল পার্বতী আর নিজের একমাত্র সন্তানকে। তারা কি ভিড়ের মধ্যে ট্রেনে উঠতে গিয়ে পড়ে গেল, না কি কেউ লুঠ করে নিয়ে গেল পার্বতীকে, কে দেবে তার হদিশ?

শিয়ালদা স্টেশনে এসে দাঁড়ানো, একা, উদ্‌ভ্রান্ত সুরেশকে কে যেন দু’-কিলো চাল দেবে বলে হাঁটিয়ে অনেকটা পথ নিয়ে গিয়েছিল। পথে যেতে যেতে সুরেশের গুনগুন শুনে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গানও গাইয়েছিল ওকে দিয়ে। আর তারপর গলা তুলে বলেছিল, “কিছু মনে কোরো না ভাই, আমার বউ আসলে কখনও বাঙাল দেখেনি তো। তাই তোমাকে দেখাব বলে নিয়ে এসেছি,” তখনই সুরেশ খেয়াল করেছিল ঘোমটার আড়াল দেওয়া এক মহিলা ঘরের চৌকাঠ থেকে অন্তরালে ফিরে যাচ্ছেন আবার। না, সুরেশকে খালি হাতে ফিরতে হয়নি সেই বাড়ি থেকে। চালের সঙ্গে অল্প কিছু সবজিও পেয়েছিল। কিন্তু ওর চারটে পা আছে না কি লেজ, যে ওকে দেখাতে আনতে হবে, এই প্রশ্নটার থেকে রেহাই পায়নি। হয়তো সেই প্রশ্নটাই ওই রূপবান মানুষটাকে দ্রুত ধাবমান ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্ররোচিত করেছিল। চিড়িয়াখানার জন্তু হয়ে বেঁচে থাকতে চায়নি বলেই হয়তো ওইভাবে জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সুরেশ। যখন ওর দ্বিখণ্ডিত শরীরটা উদ্ধার হয়, তখন দেখা যায় যে হাতের মুঠোয় বন্দি একটা গোটা টাকা, যা দেশের মতো ভাগ হয়ে যায়নি। অখণ্ডই আছে।

তাই বলে শুধুই কি অপমানের আর অবমাননার গল্প? তেমন হলে তো সুরেশের মতো আনন্দকুমারও নিজের জীবন শেষ করে দিতে বাধ্য হতেন। কিংবা হতে পারে নদীর গায়ে ফুটে ওঠা ফুল যদি সমুদ্রের ধারে নিজেকে বালির ফুলে রূপান্তরিত করতে পারে তা হলে পরিবেশ যেমনই হোক, বেঁচে যাবে সে। ‘অভিযোজন’ শব্দটা তো কেবল পশুপাখির জন্য সৃষ্টি হয়নি। আর তা ছাড়া অবজ্ঞা কিংবা অবহেলা যেমন ছিল, সহানুভূতি আর ভালবাসাও কি ছিল না? ওগুলোর প্রকাশ হয়তো দীর্ঘমেয়াদি ছাপ রাখতে পারত না কারণ একটা মানুষ সর্বহারায় পর্যবসিত হলে তাকে আবার মধ্যবিত্ত জীবনে তুলে আনা আর-একজন মধ্যবিত্তের পক্ষে কঠিন, ভীষণ কঠিন। তাই বলে ট্রেনের জানলা দিয়ে ডেকে পরম মমতায় যে মাতৃসমা মহিলা নিজের ছেলেকে দেওয়ার পাশাপাশি আনন্দকুমারের দিকেও এগিয়ে দিয়েছিলেন একটি কমলালেবু, তাঁকে কীভাবে ভুলবেন আনন্দকুমার? কীভাবে ভুলবেন বাগবাজারের ঘটি অনাদিদাকে, যিনি নিজের উদ্যোগে ডকে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন আনন্দকুমারকে?

শিয়ালদার যে প্রেসে ফুরনে কাজ করতেন আনন্দকুমার তারই ম্যানেজার ছিলেন অনাদিদা। আনন্দকুমার খুব একটা বেশি কথা বলতেন না, তবু ওঁর মুখে ফেলে আসা মাটি-নদীর কথা শুনতে-শুনতে অনাদিদার কেমন জানি ভাবান্তর হত। একদিন শিয়ালদা থেকে ফেরার পথে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে যদুনাথ সরকারের ভাষণ শুনতে ঢুকে পড়েছিলেন ওঁরা দু’জন। স্যার যদুনাথ খুব আবেগদীপ্ত কণ্ঠস্বরে বলছিলেন, বাস্তুহারা মানুষকে সমাজের একধারে ফেলে না-রাখতে। সমাজের মূল শাখার সঙ্গে তাদের মিশিয়ে নিতে, যারা একেবারে শূন্য হাতে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু করেছে আবার। তাঁর কথায় উঠে আসছিল ঐতিহাসিক গিবনের বলা সেই প্রাচীন যাযাবর উপজাতিদের কথা, যারা আশ্রয়ের সন্ধানে দেশ থেকে দেশান্তরে আসত। যদুনাথ নিজের বক্তব্য শেষ করলেন উদ্বাস্তুদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সাহায্য করার কথা বলে। ওই একই সভায় ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কেও প্রথম দেখেন আনন্দকুমার, বাস্তুহারাদের নিয়ে তাঁর দুর্ভাবনা আর স্বপ্নের শরিক হন।

অস্তিত্ব কেবলমাত্র যন্ত্রণা-নির্ভর হতে পারে না। তুমুল ঝঞ্ঝার ভিতরেও আনন্দের ঢেউ তাকে দোলা দিয়ে যায়। আনন্দকুমারের সামনেও তেমনই কলকাতা নিজের রূপ-রস-গন্ধ উন্মোচিত করছিল। গ্রামীণ সেই কিশোর, যৌবনে পা দিয়ে হয়ে উঠছিল সেই প্রজাপতি, যার ডানাদুটো পরিস্থিতির কাছে বন্ধক দেওয়া থাকলেও, একদিন না-একদিন ছাড়িয়ে আনা যাবেই।

স্যার যদুনাথ এবং সুনীতিকুমারের ভাষণ যে অনাদিদাকে অতটা উদ্বুদ্ধ করেছে, আনন্দকুমার ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি। বুঝলেন যখন পরদিন প্রেস থেকে বেরোনোর সময় ওঁর হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিলেন অনাদিদা। বললেন যে, করতে হবে শুনে ঘরে বসে থাকলে চলবে না, প্রত্যেককে নিজের সাধ্যমতো কিছু করে দেখাতে হবে।

অনাদিদার সেই চিঠি নিয়ে খিদিরপুর ডকের দিকে রওনা দিয়েছিলেন আনন্দকুমার। চাকরিটা পেয়ে গিয়ে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন কারণ ওই ফুরনের কাজের চেয়ে অনেকটাই বেশি মাইনে এখানে, তার পাশাপাশি সময়টাও বেশি দিতে হচ্ছিল না বলে নাইট কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ এসে গেল সামনে। ওখানে কাজ ছিল দুপুরবেলা রোদে দাঁড়িয়ে শ্রমিকরা সবাই খাটছে কি না সেটা খেয়াল রাখা। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করেই একটু ফাঁকি দিতেন আনন্দকুমার, যাতে ওই খর রোদে ঘাম-ঝরানো লোকগুলো একটু বিশ্রাম নিতে পারে। বিহার-ওডিশা-উত্তরপ্রদেশ-অসম, কত জায়গার লোক শ্রমিকদের মধ্যে। তবু খিদে আর বিশ্রামের জায়গায়, সবাই এক।

যখন কোনও জাহাজ ভেসে যেত, দাঁড়িয়ে দেখতেন আনন্দকুমার। মনে হত, জাহাজেরও একটা নির্দিষ্ট গতিপথ থাকে। জলের মধ্যে নটিক্যাল মাইল হিসেব করে সে নিজের গন্তব্যের দিকে ভেসে যায়। আচ্ছা, এই যে এত মানুষ আচমকা ভিটেমাটি ছেড়ে চলে এল, এখনও আসছে, তাদের যাত্রাপথ কী? কোন বন্দর অপেক্ষা করছে তাদের জন্য? কে দিকনির্দেশ দেবে তাদের ওইদিকে যেতে? না কি মার্বেলের মতো লাট খেতে খেতে শেষমেশ ভাগ্য যেখানে গিয়ে থামাবে, সেখানেই থামবে?

ডক-ইয়ার্ডে কাজ করতে-করতেই নাইটে গ্র্যাজুয়েশন, তারপর এম এ পাশ করে ফেললেন আনন্দকুমার, প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে। এম এ-তে প্রায় ফার্স্ট ক্লাসের কাছাকাছি নম্বর আসায় নিজেই অবাক হয়ে গেলেন। প্রাইভেটে তো সচরাচর এত নম্বর ওঠে না। বিষয়টা নিয়ে ভাবতে-ভাবতেই ওঁর মনে হল, পূর্ব থেকে পশ্চিমে আসার পর থেকে উদ্বাস্তুদের গোটা জীবনটাই তো ‘প্রাইভেট’ উদ্যোগেই চলছে, এখানে সরকারি অবদান আর কতখানি? উলটে প্রশাসন আর পুলিশের প্রবল বাধার মধ্যে দাঁড়িয়ে একটু নিজেদের দাঁড়ানোর জায়গা সুরক্ষিত রাখার লড়াই। সেই লড়াইয়ের অংশ হিসেবে ‘বাস্তুহারা পরিষদ’-এর হয়ে বহুবার মিছিলে হেঁটেছেন আনন্দকুমার। মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে বহু বন্ধুত্বও হয়েছে। কিন্তু সেই ‘বন্ধু’দের মধ্যে থেকে কেউ কেউ নিজেরটা বুঝে নিয়ে সরে পড়েছে আবার। কল্যাণ বলে একটি ঠোঁটকাটা ছেলের সঙ্গে মিছিলের শেষে প্রায়ই শহিদ মিনারের নীচে চা খেতেন আনন্দকুমার। সেই কল্যাণই বলত, “রিফিউজিগো মইধ্যে আবার দোস্তানি কিসের?”

“এইটা তুমি কী কথা বলছ?” আনন্দকুমার ততদিনে কলকাতার ভাষা ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছেন।

“ঠিকই কইতাসি। রমেনকাকা আর আমার বাপের পঞ্চাশ বছরের খাতির। রমেনকাকা বিদ্যাসাগর কলোনির জমি বাগাইয়া নিবার সময়, একখান খবর পর্যন্ত দিল না।”

কথাগুলো শুনতে শুনতে আনন্দকুমারের অমরেশের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। এই দেশে এসে বাঁচল না বেশিদিন অমরেশ। দু’দিনের একটা জ্বরে চলে গেল আচমকা। তবু যাওয়ার আগে একদিন যে পেট ভরে খিচুড়ি খেয়ে গেছে, নাই বা ভাগ দিয়ে খাক, আনন্দকুমারের তাতেই শান্তি।

“শ্রীশ সেনগুপ্তর নাম শুনছ?” কল্যাণ চা-টা শেষ করে একটা বিড়ি ধরিয়ে বলে উঠল।

“না। কে তিনি?”

“উদ্বাস্তুগো যে ল্যান্ড অ্যালটমেন্ট হইতাসে তার আধিকারিকের কাম করেন ভদ্রলোক। ওনার অফিসের বাইরে যে বেবাক রিফিউজি বইসা থাকে, তাগো ভিতর দিয়া চলাফেরা করার সময়, তাগো গায়ে যাতে না লাগে তার লাইগ্যা ভদ্রলোক জুতা পরাই ছাইড়া দিসেন। খালি পায়ে মাইনষের প্রবলেম সলভ কইরা যান, যতখানি পারেন। যাইবা নাকি ভদ্রলোকরে দেখতে একদিন?”

“এমন মহৎ একজন মানুষকে সামনাসামনি দেখতে পেলে তো ভালই। কিন্তু ভীষণ ভিড় যদি এমনিই হয়, তার মধ্যে আবার ওনারে ডিস্টার্ব করা ঠিক হবে?”

“হাজারবার হইব। আমরা তো আর তীর্থদর্শনে যাইতাসি না। আমরা যাইতাসি তিন-চারকাঠা জমি যদি আদায় করতে পারি, সেই লক্ষ্যে। না কানলে পরে মায়েও দুধ খাওয়ায় না, আমাগো তো কইতে হইব কোথাও না-কোথাও।”

“কী কমু?” আনন্দকুমার দেশের ভাষায় ফিরে গেলেন।

“কমু যে আমাগো জমি দাও, আমাগো জমি চাই।”

চুপ করে গিয়েছিলেন আনন্দকুমার। বাড়ি ফেরার পথে ভাবছিলেন, এই যে লাখ-লাখ লোক একটা নতুন জায়গায় এসে পড়েছে, তাদের সবাই জমি পাবে, সবাইকে জমি দেওয়া সম্ভব? এখনও কত লোক আসছে, প্রতিদিন! কী করে এই খণ্ডিত বাংলায় সবাইকে জমি দেওয়া সম্ভব? আর যারা পাবে না জমি, তারা কোথায় যাবে? দণ্ডকারণ্য, অসম, নৈনিতাল? কাগজে রোজ জায়গার নামগুলো পড়েন আর চমকে চমকে ওঠেন আনন্দকুমার। পাঁচ বছর আগেও যারা ভেবেছিল, পাঁচরকম মাছ খেয়ে দিন যাবে আনন্দে, তাদের এখন খাঁচায় বন্দি ইঁদুরের মতো ছুড়ে ফেলা হচ্ছে পরিত্যক্ত জমিতে, সমুদ্রে।

লোকটাকে ক্রমাগত ধাক্কা দিয়ে জাহাজের ভিতরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে আর লোকটা ক্রমাগত ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে দেখে, এগিয়ে গেলেন আনন্দকুমার। আন্দামানগামী এই জাহাজে অসংখ্য বাঙালি গাদাগাদি করে বসে বা দাঁড়িয়ে আছে। ছ’মাস-একবছর আগেও তাদের ঠিকানা ছিল, ধানজমি ছিল, পুকুর ছিল, যার কিছুই ছিল না তারও কুড়ি-তিরিশটা কাঁসা-পেতলের বাসন ছিল। এখনও শীতের পাতার মতো ময়মনসিংহ, যশোর, রাজশাহি, নারায়ণগঞ্জ নামগুলো লেগে আছে তাদের সঙ্গে, ঝরে যাবে বলে। নতুন যে সবুজ পাতা জন্মাবে তার গায়ে তাদের ‘রিফিউজি’ পরিচয় লেখা থাকবে, যারা স্টেশনেই জীবন-মরণ দেখতে অভ্যস্ত, কিন্তু প্ল্যাটফর্ম তো আর আটকা থাকতে পারে না অনন্তকাল, কতগুলো হাঘরে বাস্তুহারার জন্য, তাই লোকগুলোকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে কালাপানি পার করিয়ে সেই সুদূর আন্দামানে, যেখানে ঘন জঙ্গলের মধ্যে রোদ ঢোকে না বছরের পর-বছর, যেখানে জারোয়ারা নাকি অচেনা লোকের পায়ের আওয়াজ শুনলেই, বিষ-মাখানো তির ছুড়ে মারে।

আনন্দকুমারের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ভয় নামল আবার উঠল, যখন উনি দেখলেন, যে লোকটা জাহাজে করে আন্দামান যেতে চাইছে না, সে আর কেউ নয়, শহিদ মিনারের তলায় ওঁর চায়ের সঙ্গী কল্যাণ। কল্যাণের সঙ্গে কলোনির জমির জন্য তদ্বির করতে যাওয়া হয়নি, কিন্তু তাই বলে কল্যাণকে যে একেবারে আন্দামান চলে যেতে হবে, এমনটা ভাবেননি আনন্দকুমার। সব লোকের জায়গা হবে না না হয়, কিন্তু পশ্চিমবাংলা কি এতই ছোট যে কল্যাণকেও রাখতে পারছে না? আচ্ছা, কল্যাণের জায়গায় যদি আনন্দকুমার নিজেই থাকতেন ওই জাহাজে? আনন্দকুমার আর ভাবতে পারলেন না।

ততক্ষণে কল্যাণের হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে ওকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে জাহাজে। ‘সি-কিং’ জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার পর আস্তে-আস্তে নিজের অফিসঘরে এসে বসেছেন, হঠাৎ একটা চিৎকার শুনলেন আনন্দকুমার। চিৎকারটা শুনে বাইরে বেরিয়ে আবারও এগিয়ে গেলেন কিছুটা আর জানতে পারলেন, কীভাবে যেন হাত-পায়ের দড়ি খুলে ফেলে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে কল্যাণ। যে দেশের সে মানুষ, তাতে সাঁতার না-জানাই বিস্ময়কর কিন্তু কল্যাণ কি সেই সংযম অভ্যাস করে নিয়েছে যাতে মৃত্যুর মুহূর্তেও হাত-পা না-নেড়ে থাকতে পারে মানুষ?

কল্যাণের মৃতদেহ যখন জল থেকে তুলে আনা হল, তখন তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারলেন না আনন্দকুমার। শুধু মনে-মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন যে এই ডক-ইয়ার্ডের চাকরিতে আর নয়। যে নদী কোনও তীরে পৌঁছে দিতে পারে না, তার পারে দাঁড়িয়ে থেকে কী লাভ?

ডকের চাকরি ছাড়লেও পৌরসভার চাকরি বেশিদিন করতে পারলেন না আনন্দকুমার। জন্ম-মৃত্যু-জীবন, প্রতিটা ক্ষেত্রে এত এত ঘুষের লেনদেন সেখানে, ঘুষ না-নেওয়াটাই যেন একটা অপরাধ। আট-আনা পয়সা বাঁচানোর জন্য প্রত্যহের সংগ্রাম তবু হাতে গোঁজা একশো টাকার কড়কড়ে নোট, হাতে বেশিক্ষণ ধরে রাখলেই গা-গোলাত, মাথা ঝিমঝিম করত আনন্দকুমারের। বাবার কথা মনে পড়ত। বাবা একবার এক রুগির কাছে পৌঁছনোর আগেই সে এক্সপায়ার করে। রুগির বাড়ির লোক, সেই সময়ের চারটাকা দিতে গিয়েছিলেন বাবার হাতে। বাবা বিনম্রভাবে সেই টাকা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, “যাকে চিকিৎসা করারই সুযোগ পেলাম না, তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত থাকার জন্য টাকা নিতে পারব না।” ওই চাকরি করতে করতে আনন্দকুমারের মনে হত, সম্পূর্ণ সমাজটাই যেন মূল্যবোধের মৃত্যুর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই অবস্থায় অনেকেই এসে দাঁড়ানোর ফি হিসেবে টাকার জন্য হাত বাড়াচ্ছে। কিন্তু কালীকুমার চক্রবর্তীর সন্তান আনন্দকুমারকে ওই অধঃপতন থেকে দূরে থাকতে হবে, যে-কোনও মূল্যে।

নিয়তি শুধু মেরেই ফেলে না, বাঁচায়ও। ওই দমবন্ধ করা টানাপোড়েনের মধ্যেই আনন্দকুমার শহরতলির নতুন গড়ে ওঠা কলেজটায় অধ্যাপনার জন্য নির্বাচিত হলেন। ফাইনাল ইন্টারভিউয়ের সময় আনন্দকুমারের দেশ কোথায়, জিজ্ঞেস করলেন একজন।

“বিক্রমপুরের সোনারং গ্রাম, বর্তমানে...”

ভদ্রলোক কথা শেষ করতে না-দিয়ে বললেন, “শেষ তিনটে ইন্টারভিউতে, ফাইনালি যে সিলেক্টেড হল সে বাঙাল। তোমরাই সব নিয়ে নিলে, আমাদের ছেলেরা কী কাজকর্ম করবে বলতে পারো?”

আনন্দকুমারের চোখ ফেটে জল আসার উপক্রম হল। ওই পদ্মা, ওই বুড়িগঙ্গা, ওই বাখরখানি, ওই তেলকই, ওই মস্ত উনুনের উপর কড়ায় বসানো দুধ থেকে উঠে আসা সর, উনি তো সব পিছনে ফেলেই এসেছেন, চিরকালের মতো। আজ তবু শুনতে হল, ‘তোমরাই সব নিয়ে নিলে...’ আনন্দকুমার কি সত্যিই অনেক বেশি নিয়ে নিয়েছেন? পৃথিবীর উপর চাপ বাড়ছে কি ওঁর জন্য, ওঁদের জন্য?

জীবন যখন গরম তাওয়ায় ফেলে ভাজে তখন দার্শনিক প্রশ্নগুলো খুব তাড়াতাড়ি একটা ব্যবহারিক চেহারা নিয়ে নেয়। আনন্দকুমার যেমন কলেজে ঢোকার পর থেকেই, ‘কোথায় বাড়ি’ এই প্রশ্নের উত্তর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এড়িয়ে যেতে শুরু করলেন। নিজের মনকে বোঝাতেন, যেখানে বসবাস করছি সেটাই আমার বাড়ি, কবে কী ছিল না ছিল সেই পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ কী? ততদিনে যাদবপুরের কাছাকাছি সেই ভাড়াবাড়িতে উঠে এসেছেন, যেখানে অন্তত মানুষের মতো বাঁচা যায়। বাড়ি ফেরার পথে প্রায়দিনই বিজয়গড়ের ভিতর দিয়ে হেঁটে আসতেন আর হাঁটতে হাঁটতে বিস্মিত হয়ে ভাবতেন কীভাবে সন্তোষ দত্তর নেতৃত্বে একদল সর্বার্থে নিঃস্ব মানুষ পত্তন করেছেন এই উপনিবেশের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত এয়ারোড্রোমে স্থাপিত এই জনপদ, কেবল উদ্বাস্তু মানুষের বসতিই নয়, আনন্দকুমারের চোখে ‘বিজয়গড়’ ছিল এক নতুন সভ্যতা। হরপ্পা বা মহেঞ্জোদাড়োর ভিতর দিয়ে চলাফেরার সময় রাখালদাস যেরকম চমৎকৃত হয়েছিলেন, আনন্দকুমারও সেরকম চমৎকৃত হতেন ওই হোগলা আর চাটাইয়ের বাড়িগুলোর ভিতর থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি ভেসে আসতে শুনে। ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মুখেও যে জাতি নিজের সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে রাখতে জানে, তার বিনাশ হতে পারে না। আনন্দকুমারের মন বলত।

সেই সংস্কৃতিচর্চার সূত্রেই আনন্দকুমারের সঙ্গে সুষমার পরিচয়। বাস্তুহারারা যেখানে বসতি স্থাপন করতে পারছিল, সেখানেই ছেলেদের স্কুলের পাশাপাশি গড়ে উঠছিল মেয়েদের স্কুল। চারটে ‘বয়েজ় স্কুল’-এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চারটে ‘বালিকা বিদ্যালয়’, এরকমটা এই বাংলায় হয়নি এর আগে। সেরকমই একটি স্কুলে রাজ্যপাল আসবেন বলে একটু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। আনন্দকুমারের কলেজের অধ্যাপক মনোতোষদা, ওঁকে অনুরোধ করেন স্কুলের দিদিমণিদের সঙ্গে মিলে বাচ্চাগুলোকে একটু তৈরি করে দিতে।

“কিন্তু আমি তো কালচারাল ফিল্ডের লোক নই মনোতোষদা।” আনন্দকুমার মৃদু আপত্তি জানিয়েছিলেন।

“আমরা, রিফিউজিরা সবাই এখন ‘ফিল্ড’-এর লোক, কে কোন ফিল্ডের সেটা বড় কথা নয়, মাঠে টিকে থাকাটাই বড় কথা।” মনোতোষদা হেসে উঠলেন।

টালির চালের স্কুলটায় গিয়ে অবশ্য কান্না পেয়ে গেল আনন্দকুমারের। দুটো ঘুপচি ঘর, সামনে একটুকরো দাওয়া, একটা শতচ্ছিন্ন শতরঞ্চির উপরে বসে আছে মেয়েরা, এই স্কুলে রাজ্যপাল আসবেন?

“নমস্কার। আমি সুষমা রায়। এই স্কুলে পড়াই।”

“আপনি একাই? আর কোনও শিক্ষিকা নেই?” আনন্দকুমার ওঁর সামনে দাঁড়ানো শ্যামলা মেয়েটিকে প্রতিনমস্কার করে বলে উঠলেন।

“আপাতত আমি একাই। আসলে...”

“চুপ করে গেলেন কেন? বলুন।”

“মায়না দেওয়ার ক্ষমতা নাই কর্তৃপক্ষের। তাই...”

“আপনি বিনে মাইনেয় পড়ান?”

“কোনও মাসে দশ টাকা, কোনও মাসে পনেরো, এই রকম পাই। পূজার মাসে অবশ্য কুড়ি টাকা পাইসিলাম। কিন্তু বাবার একটা ধুতি আর সনু-ভনুর শার্ট-প্যান্ট খরিদ করতেই সব ফিনিশ। নিজের জন্য একটা নতুন শাড়িও কিনা হয় নাই। এখন এই স্কুলেই রাজ্যপাল আসছেন, আমি কীভাবে ওনার সামনে গিয়া দাঁড়াই বলেন তো?”

শ্যামলা রং, কিন্তু লাবণ্যে ঢলঢল মুখশ্রী সুষমার। আনন্দকুমারের বুকের মধ্যে একটা যন্ত্রণা টাটিয়ে উঠছিল। ইচ্ছে করছিল, একটা শাড়ি কিনে দেন মেয়েটিকে। কিন্তু এত এত রিফিউজির এত কষ্ট যে, দরদ দেখাতে গেলে ভেসে যেতে হবে। তা ছাড়া অবিবাহিত আনন্দকুমার অবিবাহিতা সুষমাকে শাড়ি কিনে দিয়েছেন জানলে বেশ কিছু লোক কেচ্ছা করার একটা বিরাট মওকা পেয়ে যাবে। বাঙালি নিজের সব ফেলে আসতে পারলেও গসিপ করার স্বভাবটি তো ফেলতে পারে না।

হয়তো ব্যক্তিগত কিছু কথা বলে ফেলার লজ্জায় সুষমার মুখেও শব্দ আসছিল না আর। আনন্দকুমার গলাখাঁকারি দিয়ে বললেন, “রাজ্যপাল এখানে আপনার শাড়ি দেখতে আসছেন না। তিনি আসছেন ছোট ছোট মেয়েদের মুখ থেকে আবৃত্তি-গান শুনবেন বলে। কিন্তু তারা কি তৈরি? আমি তো স্কুলে ঢোকার সময় দুটো বাচ্চাকে কবিতা আবৃত্তি করতে বললাম একটা করে। দু’জনের কেউই কিন্তু ঠিকঠাক চার লাইনও বলতে পারল না।”

“যাদের ঘরবাড়ি কিছুই নাই...”

“ঘরবাড়ি আমরা কেউই পিঠে করে নিয়ে আসিনি দিদিমণি। কিন্তু সেই ঘরবাড়ি না-থাকার শোকে বাকি জীবনটা কেঁদে কাটানোটাও কোনও কাজের কথা নয়। আপনি আসুন আমার সঙ্গে, বাচ্চাদের ডাকুন, ওদের আমাদের তৈরি করতে হবে। রাজ্যপাল যেন এখান থেকে এই বিশ্বাস নিয়ে ফিরে যান যে আমাদের নতুন শাড়ি না থাক, স্বর আছে, হাঁড়িতে ভাত না থাক, রবীন্দ্রনাথ আছেন।”

হাতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া যায়?

পরে অনেকদিন কথাটা ভেবে হেসেছেন আনন্দকুমার। কিন্তু সেদিন অনেক রাতে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুষমাকে চোখ মুছতে দেখে রীতিমতো আশঙ্কিত হয়েছিলেন।

“কী হল আপনার? বাড়ির কারও কিছু...”

“বাড়ির, পাড়ার সবার বিপদ। নইলে রাতের বেলা আপনার কাছে আসি?”

“কী হয়েছে বলবেন তো!” সুষমাকে কাঁদতে দেখে বিব্রত আনন্দকুমার জিজ্ঞেস করলেন।

“হইসে আমাগো সর্বনাশ। আজ রাতে কলোনিতে হাতি আইব।”

“হাতি? কেন? সার্কাস হবে নাকি?”

“সার্কাসই বটে। আর আমরা সবাই সেই সার্কাসেরই জন্তু। কেন, আপনি জানেন না, পুলিশ আর জমির মালিকরা একযোগে জবরদখল কলোনিগুলায় হাতি পাঠায়?”

“হাতির কী কাম কলোনিতে তাই তো মাথায় আসে না।”

“অনেক কাম আছে। হাতিরে আদেশ দেওয়া মাত্রই হাতি লাথাইয়া ভাঙব আমাগো সবার আস্তানা। ইট-সিমেন্টের বাহারি ইমারত তো আর না, হাতির লাথি কতক্ষণ সইতে পারব ওই বেড়া-টালির ঘরগুলান? সে ভাঙুক, আবার নয় রাস্তায় গিয়া পড়ুম। কিন্তু যদি বাচ্চাগুলানরে জাগাইয়া রাখতে না-পারি আর কলোনির ভিতর দিয়া যাওনের সময় হাতি অগো পিষা মাইরা দেয়? আমার যা হওনের হইব কিন্তু আমার দুইটা ভাইরে যদি আজকের রাতটা আপনার ঘরে আশ্রয় দেন...” গলা বুজে এল সুষমার।

বাবা ঘরের ভিতরে ছবি হয়ে আছেন। ছোটভাই কলেজের হস্টেলে। বাড়িতে লোক বলতে শুধু মা আর বড় ছেলে। আনন্দকুমার বুঝতে পারছিলেন না কী উত্তর দেবেন সুষমাকে।

“আপনি না কইরা দিলে আমায় অগো রাস্তায় বসাইয়া রাইখ্যা কলোনিতে ফিরা যাইতে হইব। একটা প্রতিরোধ খাড়া করন চাই।”

“হাতির সামনে প্রতিরোধ?”

“আর কোন রাস্তা আছে? বলেন আমারে?”

“যদি আমি আপনার সঙ্গে গিয়ে দাঁড়াই?”

“আপনি আসবেন? আমাগো অরবিন্দ কলোনিতে? হাতি মানব আপনারে?”

“নাই বা মানল। হাতির পায়ের তলায় আপনি একা চাপা পড়বেন কেন? আমিও পড়ি।”

“কিন্তু আমার ভাই দুইটা?”

“ওরা কোথায়?”

“ওই যে দূরের টিউকলটার সামনে খাড়াইয়া আছে। ডাকুম ওদের?”

“ডাকুন। আমি ভিতরে গিয়ে মাকে ওদের শোওয়ার ব্যবস্থা করতে বলি।”

মাকে বোঝাতে দু’মিনিটও লাগল না। সনু আর ভনুকে মায়ের দায়িত্বে রেখে অরবিন্দ কলোনির দিকে হাঁটা লাগালেন আনন্দকুমার। সুষমাকে পাশে নিয়ে। সেদিন সারারাত গোটা কলোনির লোক জেগে ছিল। ততদিনে একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস রচিত হয়ে গেছে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের আত্মবলিদান এপার বাংলার উদ্বাস্তু জনতাকেও প্রাণিত করছে। ভাষার বন্ধন একদিন আগুন লাগা ঘরেও প্রদীপ জ্বালাবার নিরাপত্তা এনে দেবে, তাদের এই আশা ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠছে আবার। বাংলার মাটি থেকে বাঙালি বিতাড়নের নরমেধ যজ্ঞ শেষ হবেই, আজ নয় কাল। কিন্তু কালকের গল্প কালকে। আজ কী হবে? নাওয়া-খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে পথে এসে দাঁড়ানো নিঃসম্বল উদ্বাস্তুদের কি আবারও বেঘর হতে হবে? ভদ্রাসন তো গেছেই, কলোনির এই মাটিটুকুও যাবে?

“মেঘনাদ সাহাও চইলা গেলেন। দিল্লিতে আমাগো কথা আর কইব কেডা?” অরবিন্দ কলোনির জমায়েতের ভিতর থেকে কেউ বলে উঠল।

কথাটা শুনে ভিতরে যেন একটা ইলেকট্রিক শক খেলেন আনন্দকুমার। শ্রদ্ধানন্দ পার্কে ড. সাহার ভাষণ শুনে চোখ ফেটে জল এসেছিল ওঁর। মনে হয়েছিল, সব হারায়নি কারণ এই বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী দিল্লির সংসদে উদ্বাস্তু বাঙালির অবর্ণনীয় জীবন যন্ত্রণার নিরাময় চেয়ে লড়াই চালাচ্ছেন। বারংবার কেন্দ্র সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছেন ত্রাণ আর পুনর্বাসনের। অখণ্ড ভারতের পশ্চিম থেকে আসা উদ্বাস্তুরা যে সহায়তা পেয়েছেন, পূর্ব থেকে আসা উদ্বাস্তুরা সেই সহায়তা পাবেন না কেন, জানতে চাইছেন।

সেই ড. সাহার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে সারাদিন কিছু খেতে পারেননি আনন্দকুমার। ওঁর মনে হচ্ছিল, হতভাগ্য বাঙালদের কথা আর কে বলবে? সেদিন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আনন্দকুমার টের পাচ্ছিলেন, কলকাতা আর আশপাশের জেলায় এক নতুন রামায়ণ সৃষ্টি হচ্ছে, রিফিউজি রামায়ণ। সেই রামায়ণে প্রত্যেক উদ্বাস্তুকেই মেঘের আড়ালে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তাদের সংসার তো দূর, অস্তিত্বই থাকবে না। তারা মেঘের আড়াল থেকে মাঝে-মাঝে ট্রেনে এসে হকারি করে যাবে, শিয়ালদা স্টেশনে ভিক্ষাবৃত্তি করবে, মেয়ে হলে পাচার হয়ে যাবে, কিন্তু কেউ তাদের দেখতে পাবে না। নতুন নতুন সিনেমা মুক্তি পাবে, ‘সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা’ গানে ভরে যাবে প্যান্ডেল। কেবল মানুষগুলো বাষ্প হয়ে মিশে যাবে হাওয়ায়। সবার অলক্ষে। কিংবা সবার চোখের সামনেই।

সারা রাত্রি প্রায় সবাই জেগে বসে আছে, শেষ রাতের দিকে একটা আওয়াজ এল। হইহই করে উঠল সবাই। আওয়াজটা পেয়েই। না, হাতি আসেনি, অসমের হাতিকে বোধ হয় অন্য কোনও কলোনিতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু পুলিশ এসে দাঁড়াল। সেই পুলিশকে প্রতিরোধ করতে এগিয়ে গিয়ে হাতে-কোমরে লাঠির বাড়ি খেলেন আনন্দকুমার আর ওঁকে আড়াল করতে গিয়ে মার খেল সুষমাও। ওই লাঠিই যেন বিক্রমপুরের সঙ্গে গোপালগঞ্জের, সোনারং গ্রামের সঙ্গে বালুচর গ্রামের সব দূরত্ব ঘুচিয়ে দিল।

পুলিশ ফিরে যেতেই উল্লাস শুরু হল গোটা কলোনি জুড়ে। আগেকার দিন হলে, দেশের বাড়ি হলে, কিছু না-খাইয়ে আনন্দকুমারকে কেউ ছাড়ত না, সুষমার এইসব কথায় তখন রাগ বাড়ছে আনন্দকুমারের। কলোনির একফালি ঘরের একটা চৌকিতে শুয়ে আছেন সুষমার অসুস্থ বাবা, তিনি পুলিশ আসার খবর শুনেও ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ওঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতেই আনন্দকুমার বলে উঠলেন, “মেনে নাও, আমরা নতুন প্রাণী। মানুষ যেমন বানর থিক্যা মানুষ হইসিল, আমরা মানুষ থিক্যা রিফিউজি হইসি।”

“আবার রিফিউজি থিক্যা মানুষ হইতে পারুম না?”

সুষমার কথার উত্তর দিতে গিয়ে আনন্দকুমার দেখলেন যে মেয়েটার চোখে জল। কথাগুলো বলা হল না আর।

“সনু আর ভনুরে নিয়া আইতে হইব।”

“হ্যাঁ, চলো।” আনন্দকুমার আর ‘আপনি’-তে ফিরতে পারলেন না।

পথে বেরিয়ে হঠাৎ বৃষ্টিতে দু’জনেই ভিজে গেলেন খানিকটা।

শাড়ি ভিজে যাওয়া সুষমাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা দৃষ্টিকটু বলে ওর আপত্তি সত্ত্বেও ওকে ঘরে নিয়ে এলেন আনন্দকুমার। আর সনু-ভনুকে ডেকে দিতে যাওয়ার আগে আনন্দকুমারের মা সরলা চক্রবর্তী একটা নতুন তাঁতের শাড়ি হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেলেন সুষমার।

“এইটা যদি কাল ফিরত দিয়া যাই? কাইচা, ইস্তিরি কইরাই দিমু।”

“ফেরত পামু বইল্যা দিই নাই। এইটা আমাগো পরিবারের তরফ থিক্যা তোমারে দেওয়া প্রথম শাড়ি। পরের শাড়িগুলান আমার বড় পোলা দিব। আপাতত এইটা পরো।” সরলা ব্রহ্মাস্ত্রের মতো কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে সরে গেলেন সামনে থেকে। আনন্দকুমার কীরকম বিহ্বল হয়ে গেলেন কথাগুলো শুনে। আড়চোখে দেখলেন, সুষমাও হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শাড়িটা দুই হাতে ধরে। মিনিটখানেকের মধ্যে ফিরে এসে সরলা বললেন, “সনু-ভনু খাইতাসে। খাওন শেষ কইরা ফিরব তোমার লগে।”

সুষমা পুতুলের মতো মাথা নাড়ল।

সরলা রাগ দেখিয়ে বললেন, “তুমি শাড়িটা অহনও পরো নাই ক্যান? তোমারে শাড়িটা পরতে কইয়া গেলাম তো, হাতে লইয়া সঙের লাহান খাড়াইয়া থাকতে কই নাই।”

“ক্যামনে পরুম? আপনার পোলা তাকাইয়া আসে আমার দিকে, একই ঘরের মইধ্যে!”

সুষমার এই পলকে খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতায় হতচকিত আনন্দকুমার ওঁর দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর মাকে বললেন, “আমারে যাইতে কইলে আমি ঘরে থাকতাম না এতক্ষণ। কিন্তু তুমি ঘর ছাইড়্যা যাওনের আগে কী কথা কইয়া গেলা?”

“যা শুনছস, তাই কইসি। এত বড় পণ্ডিত হইছস, কলেজে লেকচার ঝাড়স, সহজ কথার মানে বুঝস না?”

“মা, তুমি ভুইল্যা যাইতাসো, আমরা রিফিউজি।”

“রিফিউজিরা নিশ্বাস নেয় না? ক’ আমারে, নেয় না?”

“দুইটা এক হইল?”

“একই। তোর বাবায় শিয়ালদার প্ল্যাটফর্মে ঘুম ভাইঙ্গা গেলে আমারে কইত, রাতে সে কী স্বপ্ন দেখসে। প্ল্যাটফর্মে ঘুমাইলেও স্বপ্ন মাইনষের পিছু ছাড়ে না রে মনা, ঘর ছাইড়া আইসি, স্বপ্ন ছাইড়া যাম কই?”

“তয় কী করুম আমি এখন?”

“কী করতে হইব তুই বুঝস না? লক্ষ্মী পায়ে হাইট্যা ঘরে আইসে, লক্ষ্মীর কদর কর।”

মায়ের কথা শুনতে শুনতে চোখ বন্ধ করে ফেললেন আনন্দকুমার। স্বাধীনার মুখটা ভেসে উঠল। কিন্তু সেই গ্রাম্য স্বাধীনা নয়, গয়নায় মোড়া স্বাধীনা। মুখটা কেমন যেন ঝাপসা। চোখ খুলতেই দেখলেন, ভাড়াবাড়ির একটা ঘরে নতুন শাড়ি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা লক্ষ্মীকে। তার ভিজে শাড়ি থেকে জল ঝরে পড়ছে এখনও ফোঁটা ফোঁটা। ওই জলে মরুভূমি থেকে প্ল্যাটফর্ম সব সিক্ত হবে। নতুন ধানের চারা ডানা মেলবে দিগন্তে। অতীত মিলিয়ে যাবে অতীতেরই গর্ভে। ধ্বংসের ভিতর থেকে মাথা তুলবে ভবিষ্যৎ। পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যার পুনর্নির্মাণ হতে পারে না। হিরোশিমাতেও যদি ঘাস জন্মে থাকতে পারে আবার, কলোনি সংলগ্ন এই ভাড়াবাড়ির জানলা দিয়েও পদ্মার ঢেউয়ের শব্দ শোনা যাবে।

আনন্দকুমার ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। সরলা পিছন থেকে বললেন, “যাস কই আবার?”

“বাজার যাইতে হইব না? কথা খাইয়া পেট ভরব?”

“কাল সারা রাত জাগছস, আজ নয় না গেলি কলেজে?”

“বাড়ি বইস্যা করুম কী?”

“আমার একখান কথা রাখবি? একখান ইলিশ পাইলে আনবি বাজার থিক্যা? ছেমড়িটারে তাইলে রাইন্ধ্যা খাওয়াইতাম।”

“আনতে মন লাগে না। তুমি তো খাইবা না।”

“দ্যাশে থাকতে অনেক খাইসি।”

“আর এই বিদেশে?” কষ্টের মধ্যেও হেসে ফেললেন আনন্দকুমার।

“আজ সকাল থিক্যা আর পরদেশ মনে হইতাসে না। কেমন য্যান মনে হইতাসে সংসার।”

মায়ের কথাটা মাথায় নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আনন্দকুমারের মনে হল, সংসারই তো। যে সংসার মাটি নয়, মানুষ দিয়ে তৈরি। মনে হল, তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে বাজার থেকে। সুষমাকে নতুন শাড়িতে কেমন লাগছে, দেখতে হবে না?

ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভেনিয়া

মানুষের সঙ্গে মানুষের যুদ্ধ কী কুৎসিত! কিন্তু দুটো ফুলের মধ্যে যদি যুদ্ধ লাগে আর রংগুলো মিশে যায় একে অপরের মধ্যে, তা হলে অপূর্ব লাগে। সেই অপূর্বর সামনে বারবার করে গিয়ে দাঁড়াত জয়ী আর অরণ্য, যেখানে যখন যতটুকু সুযোগ পেত। আর ওই সময় ওরা নিজেরাও হয়ে উঠত দুটো ফুল, যাদের রং পরস্পরের মধ্যে না মিশলে সম্পূর্ণতা পায় না।

“এমন নয় যে আমি খুব ইনসিকিয়োর ফিল করছি, কিন্তু আমার মনে মাঝে-মাঝে একটা প্রশ্ন জাগে।”

ডেলাওয়্যার নদীর ওয়াটার ফ্রন্টে যে আউটডোর স্কেটিং রিং আছে, ওরা তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। এই জায়গাটায় প্রায় সারাক্ষণ একটা কার্নিভ্যাল চলে, কত রকম লোক এসে কত খেলা যে দেখায়। শীতকালে পুরো জায়গাটা আইস-স্কেটারে ভর্তি থাকে, এখন খানিকটা ফাঁকা ফাঁকা।

“ফিলাডেলফিয়া সম্বন্ধে একটা কথা আছে, এখানে সব প্রশ্ন গান হয়ে যায়। আর তোর এখানে এসে মনে প্রশ্ন জেগে উঠছে। আশ্চর্য তো!”

জয়ী হাসল কথাটা শুনে। কিন্তু সেই হাসি ততটা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না।

দুপুরে যে হোটেলে ওরা খেতে গেল, সেখানকার ল্যাম্বের প্রিপারেশনের খুব সুখ্যাতি আছে। টরটিয়া দিয়ে ল্যাম্ব খেতে খেতে জয়ী অরণ্যকে বলল, “এই দেশটায় আমরা যে আগন্তুক, তা কিন্তু মনে হয় না, তাই না?”

“আমেরিকা দেশটাই অনেক অনেক আগন্তুকের সমন্বয়ে তৈরি। অবশ্য এখন একদল সাদা চামড়ার আগন্তুক কালো বা বাদামি চামড়ার আগন্তুকদের তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। যেমন তুই মাঝে-মাঝে আমাকে তাড়িয়ে দিতে চাস।”

“মিথ্যে কথা। তোকে কবে বাজে কথা বলেছি, তাই দিয়ে তো বিচার হবে না। সেটা একজন মোহনবাগানি নয়, একটা মেয়ে হিসেবে বলেছি। আর, হোল্ড অন, আমার সঙ্গে যাই সম্পর্ক থাক, আমার বাবার বলা একটা কথা আমি ভুলতে পারি না। সেই পঁচাত্তর সালের শিল্ডে মোহনবাগানকে পাঁচ গোল দেওয়ার পর, ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা রাস্তাঘাটে সবুজ-মেরুন দেখলেই হাত তুলে ‘পাঁচ’ দেখাত। এটা অপমান নয়?”

“আমার বাবা ওই খেলাটা দেখতে গিয়েছিল, জানিস তো। সুভাষ ভৌমিক নাকি মোহনবাগানের গোলপোস্টের সামনে প্লেয়ার ডেকে এনে গোল করিয়েছিল।”

“হাউ মিন! অ্যান্ড হোল্ড অন, ক’বছর আগে মোহনবাগানও পাঁচ গোল দিয়েছে তোদের।”

“ফুঁ! পাঁচ-শূন্য আর পাঁচ-তিন একই রেজ়াল্ট হল নাকি?”

“ওইসব এগেনস্টে কে কত, তা দিয়ে কিছু হয় না। তোরা ‘পাঁচ’ দিয়েছিস, আমরাও ‘পাঁচ’ দিয়ে দিয়েছি। বাট দ্য ফানিয়েস্ট পার্ট অফ দি ইন্সিডেন্ট ইজ়, বাবা সেই পঁচাত্তর সালের পর কচুবাটা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল আর চৌত্রিশ বছর পর দিদুনকে ফোন করেছিল জাস্ট এটা বলতে যে দিদুনের হাতের কচুবাটা খুব মিস করছে।”

“তোর দিদুনকে কচুবাটা বানাতে শেখাল কে?”

“কেন, ওটায় কি তোদের পেটেন্ট করা আছে নাকি?”

“অ্যাবসোলিউটলি। ইলিশ মাছ আর...”

“স্টপ, স্টপ। আমার দিদুনের হাতের ইলিশ-কুমড়ো কিংবা ইলিশ ভাপা খেলে না, জাস্ট স্বর্গে উঠে যাবি, আবার ফিরে আসবি।”

“তোর দিদুন খুব ইন্টারেস্টিং চরিত্র মানতেই হচ্ছে, কিন্তু তাই বলে আমি আমাদের পেটেন্ট ছাড়তে রাজি নই।”

“আর আমিও সেই পেটেন্ট মানতে রাজি নই।”

“আচ্ছা, আমার পেটেন্ট কার কাছে বলে তোর মনে হয়?” রাস্তায় বেরিয়ে জয়ীর গালে হালকা একটা চুমু দিয়ে জিজ্ঞেস করল অরণ্য।

জয়ী ওর খোলা চুলে আটকানো সানগ্লাসটা নিজের দু’চোখে নামিয়ে আনল, ঠোঁট দিয়ে একটা শব্দ করল শুধু।

অরণ্য অনেকটা মুগ্ধতা নিয়ে তাকাল জয়ীর দিকে।

ছুরির মতো ধারালো একটা হাওয়া ওদের দু’জনের মুখে ধাক্কা মেরে গেল। সেই হাওয়ার কোনও পেটেন্ট নেই।

সেদিন সন্ধেয় সম্পূর্ণ সুতোহীন জয়ীর শরীরে আলতো কামড় দিয়ে ‘ন্যাচরাল’ ট্যাটু তৈরি করছিল অরণ্য। ট্যাটু না কি মুরাল? না কি কোনও স্থাপত্যের নকশা? জয়ী জানে না। ওর ভিতর থেকে কেবল একটা গান উঠে আসতে চাইছিল, যেভাবে সমুদ্রসৈকতের বালির ভিতর থেকে উঠে আসে কাঁকড়া। কিন্তু মুহুর্মুহু ঢেউ এসে বালি ভিজিয়ে দেয় বলেই কাঁকড়াগুলো আবার চলে যায় বালির তলায়। অরণ্যও ক্রমাগত ভিজিয়ে দিচ্ছিল জয়ীকে। বাহিরে, অন্তরে। আর ভিজিয়ে দিচ্ছিল বলেই জয়ীর গলা থেকে ছড়িয়ে পড়তে চাওয়া গান, ভালবাসাবাসির স্রোতের মধ্যে কাঁকড়ার দাঁড়ার চিহ্নের মতো এক-আধ সেকেন্ড জেগে থাকছিল শুধু, তারপর মিলিয়ে যাচ্ছিল আবার, আমেরিকার ভিতর যেভাবে মিলিয়ে যায় স্প্যানিশ-ফ্রেঞ্চ-ব্রিটিশ-জার্মান-ইতালিয়ান-রাশিয়ান সমস্ত পরিচয়।

“আমার ভিতরে তোর নাম লেখা হচ্ছে।” অরণ্যকে ভিতরে নিয়ে বলে উঠল জয়ী।

“মানে?” ‘ক্রিয়া’র ভিতরে থাকা অরণ্য ধরতে পারল না জয়ীর কথা।

“আমি বলছি যে আমি যেন গাছ আর তুই সেই গাছে চলতে থাকা ছুরি। গাছের গায়ে বাংলায় তুই আমার নাম লিখতে পারিসনি কিন্তু আমাতে পারছিস, বিশ্বাস কর পারছিস। আর তার কারণ তুই গাছের উপরে নাম লেখার চেষ্টা করছিলি, আর আমার গভীরে লিখছিস।”

“তুই কোনও প্রোটেকশন নিয়েছিস?”

“তুই না কবিতা লিখিস? এরকম অকবির মতো কথা বলছিস কেন? ‘নিরাপত্তা’ শব্দটা তো আসলে একটা খাঁচা, যা মাটির অতল থেকে উঠে আসা রস আর সূর্য থেকে নেমে আসা রোদকে একাকার হয়ে যেতে দেয় না। তাই তুইও প্রোটেকশন নিসনি, আমিও না। সেই গানটা ছিল না, ‘না না না, আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাব না...’ আর তার ওই লাইনটা, ‘তুমিও যাবে না, আমিও যাব না...’ সেরকম ওই প্রোটেকশন আজ তুমিও নেবে না, আমিও নেব না...”

“ক’পেগ খেয়েছিস বল তো?” অরণ্য ফুরিয়ে যেতে যেতে বলল।

“তোকে অনুভব করার জন্য আমার মদ লাগে না। আমার প্রত্যেকটা শিরা ছুঁয়ে দেখ, প্রতিটি স্পন্দনে নিজের নাম শুনবি। প্রতিটায়।” বলতে বলতে জয়ী অরণ্যর মাথাটা নামিয়ে আনল নিজের বুকে। চেপে ধরল।

অরণ্য মাথাটা তুলে কিংবা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল না।

“তুই সকালবেলা বলছিলি না আমার মনে কেন প্রশ্ন আসছে যখন গান আসা উচিত, তোর এই কথাটা মনে হয়নি যে গান আসলে এক রকম প্রশ্নই। পৃথিবীর সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্নের মতো জেগে ওঠে গানই।”

“ঘুমিয়ে পড় এবার। প্রচুর বাজে বকছিস।”

“আমি আসল কথাগুলো যখনই বলতে যাই, তুই ‘বাজে বকছিস’ বলে থামিয়ে দিতে চাস।”

“আচ্ছা, থামাব না। বল তোর কী প্রশ্ন?”

“তুই কেন আমাকে বিয়ে করার কথা বলিস না একবারও?”

“ওহ, এই কথা। যদি বলতাম তা হলে হয়তো ভাবতিস যে, তোর প্রচুর সম্পত্তির অংশীদার হতে চাই বলে বলছি।”

“ভাবতাম না। ভাবার স্কোপ নেই। কারণ তালপুকুর ওই নামেই, ঘটি ডোবার মতো জল আছে কি না সন্দেহ।”

“ঘটিটা তো আছে। তাই যথেষ্ট।”

“ব্যঙ্গ করলি? ঘটি আমার দরকার নেই। তুই নিয়ে নে আমাকে। আমার সব অতীত, সমস্ত ঐতিহ্য, গ্যালারিতে যে মশাল জ্বালাস, তাই দিয়ে পুড়িয়ে দে। আমি আগুনের ভিতর থেকে জন্মাব আবার।”

“তুই তো আগুনই। অগ্নিরূপা, অগ্নিস্নাতা, অগ্নিবর্ণা...” অরণ্য চুমু খেতে লাগল জয়ীর ঠোঁটে, গালে, গলায়, বৃন্তে।

জয়ী দু’হাত দিয়ে অরণ্যর গলা জড়িয়ে বলল, “স্পন্দন, আমার স্পন্দন।”

অরণ্য প্রায় একটা হ্যাঁচকা টানে নিজেকে জয়ীর থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “ওই নামটা করিস না বারবার। আমার অসুবিধে হয়।”

“অহনাদের বাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির উলটোদিকে।” রাতে ডিনার করে এসে জয়ীকে বলল অরণ্য।

“আমি স্পন্দনের কথা জানতে চাইছিলাম।” জয়ী নরম করে বলল।

“সেটা জানি। কিন্তু অহনার কথা না-বললে স্পন্দনের কথা বোঝানো যাবে না।”

জয়ী হেসে উঠল, “তুই একদম প্রাচীন গ্রিসের মতো হয়ে যাচ্ছিস।”

“গ্রিস আবার কোত্থেকে এল?”

“গ্রিসের কোনও শহরে রাস্তা হাঁটতে গেলে নাকি পায়ের একটা ঠোক্করে মাটি উঠে গেলে যে বস্তুটা পাওয়া যায়, তার বয়স তিনহাজার বছরের বেশি। মাটির নীচে এমনভাবে একটার পর-একটা ইতিহাস জড়িয়ে আছে যে, একটা ধরে টান মারলেই দশটা উঠে আসে। যাক গে, তুই তোর অহনার গল্প বল।”

“গল্প নয়, ঘটনা। আর ঘটনাটা হল অহনাকে আমার ভাল লেগেছিল।”

“সম্পর্ক হয়নি?”

“সুপারফাস্ট ট্রেন চালিয়ে দিলে কিছুই বলতে পারব না। ঘটনাটা হল, ভাল লাগার উপর ভিত্তি করে যারা সম্পর্ক করে, অহনা সে দলে ছিল না।”

“বুঝলাম না।”

“মানে ভাল লাগলেই প্রেম করতে হবে, এই যুক্তিতে ও বিশ্বাস করত না। ভাল থাকবে সেই বিষয়ে সিওর হলে প্রেমের দিকে পা বাড়াত।”

“দেখতে কেমন ছিল? ছবি আছে?”

“তোর মোবাইল থেকে ফেসবুকে গিয়ে দেখে নে।”

“আমার দেখার দরকার নেই। তোর চোখে কেমন ছিল, জানতে চাইছি।”

“ডানাকাটা পরি তো ছিল না, তবে আমার ভাল লাগত, ভাল লেগেছিল। একটা শার্প ব্যাপার ছিল।”

“কীরকম ধারালো? ছুরি না তলোয়ার?”

“ব্লেড। এবার হয়েছে?”

“ক্যারি অন।”

“দেন প্লিজ় ডোন্ট ইন্টারাপ্ট।”

“সরি। ক্যারি অন।”

“আমি একটা দোলের দিন অহনাকে প্রপোজ় করেছিলাম, কিন্তু অহনা আমায় পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল যে আমার যা ক্যালিবার তাতে আমি ভবিষ্যতে ক্লার্ক কিংবা স্কুল মাস্টার অথবা সেলস রিপ্রেজ়েন্টিটিভ হতে পারি। আর এরকম কোনও ছেলের সঙ্গে ঘর বাঁধার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ওর নেই, কারণ ও নিজেকে সুখী দেখতে চায়।”

“অহনার কাছে সুখ মানে স্বাচ্ছন্দ্য ছিল তবে?”

“লাগজ়ারি। হ্যাপিনেস ওয়াজ লাগজ়ারি টু হার।”

“আর তুই?”

“সেই লাগজ়ারি প্রোভাইড করতে পারলে ওর জীবনে আমার জায়গা আছে, নইলে নেই, এটা প্রথমেই ক্লিয়ার করে দিয়েছিল অহনা।”

“তারপরও তুই...”

“হ্যাঁ, তারপরও। কারণ ভাল লেগে গেলে ব্যালেন্স থাকে না। এবার আমার হয়তো অনেকবার মনে হত যে অহনার সঙ্গে চলতে গেলে মানসম্মান বিসর্জন দিতে হবে, কিন্তু হস্টেল থেকে বাড়িতে ফিরে যখনই ওকে দেখতাম সব সিদ্ধান্ত গুবলেট হয়ে যেত।”

“কী দেখতিস? অহনা ড্রেস চেঞ্জ করছে? শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে?”

“প্লিজ় জয়ী, গিভ মি আ ব্রেক। আমার একটা প্রেম জন্মেছিল অহনার প্রতি, আর প্রেম নিশ্চয়ই চরিত্র বিশ্লেষণ করে জন্মায় না।”

“স্পন্দন কোত্থেকে এল এসবের মধ্যে, আই মিন, তোর আর অহনার প্রেমকাহিনিতে?”

“স্পন্দন বেশ অনেকদিন আমার রুমমেট ছিল হস্টেলে। বর্ধমানের প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি ছিল ওর। মেমারি থেকে প্রায় বিশ মাইল। একইসঙ্গে এতটা ব্রিলিয়ান্ট আর সরল ছেলে আমি দেখিনি জীবনে। এবার মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার পর আমি হস্টেল ছেড়ে চলে এলেও স্পন্দন স্পেশাল পারমিশন করিয়ে হস্টেলেই ছিল, কারণ ও নয়তো থাকবে কোথায় কলকাতায়? কিন্তু হস্টেলে থাকলেও ও দু’-তিনবার এসেছে আমার বাড়ি, আর ওই আসা-যাওয়ার ফাঁকেই আমার ঘর-লাগোয়া বারান্দা থেকে অহনাকে দেখে স্পন্দন।”

“তারপর?”

“আমি জানি না অহনা তখন কী করছিল, বোধ হয় চুল আঁচড়াচ্ছিল, সেই দৃশ্য দেখে আমার গোপবালক ফিদা হয়ে গেল একদম।”

“তোকে বলল?”

“কিচ্ছু বলেনি। কিন্তু পরীক্ষার আগে, আমার যাচ্ছেতাই অবস্থা, স্পন্দনের কাছে গিয়েছি একদিন একটু সাহায্যের আশায়, দেখি ও বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে, জ্বরে। ওই অবস্থায় তো ফেলে আসা যায় না, থেকে গেলাম সেই রাতটা ওর ঘরে। আর রাতের দিকে ওর ঘরের টেবিলে নোটস দেখতে গিয়ে দেখলাম, তিন-চারটে সাদা কাগজে আঁকা একটাই মুখ, অহনার।”

“মানে?”

“গুণী ছিল ছেলেটা। আঁকার হাতও দুর্ধর্ষ। নইলে কতক্ষণই বা ও দেখার সুযোগ পেয়েছে অহনাকে? কিন্তু সেই সামান্য দেখাই অসামান্য কয়েকটা পেন্সিলের আঁচড় হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পাতার পর পাতায়। এ কি নন্দলাল না অবন ঠাকুর? আমি চমকে গেলাম দেখে!”

“রাগ হল না তোর? জ্বরে কাতরানো ছেলেটাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়ার ইচ্ছে হল না মাটিতে?”

“একটুও না। একবারও না। কারণ অহনা থোড়াই আমার বাগদত্তা ছিল। অহনা ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা কিংবা এভারেস্ট। পতাকা ওড়ানোর জন্য অনেক উঁচুতে উঠতে হবে। আমার বরং স্পন্দনের ড্রয়িংগুলো দেখে মাথার মধ্যে একটা অন্য ছবি ঝিলিক দিয়ে গেল। ভবিষ্যতের ছবি।”

“ভবিষ্যৎ?”

“ইয়েস, ভবিষ্যৎ। যে ভবিষ্যৎ তৈরি করার জায়গায় আমি ছিলাম না আর যে ভবিষ্যৎ স্পন্দনের ঘাড়ে ভর করে তৈরি করে ফেলাটা তত কিছু অসম্ভবও লাগছিল না। গ্র্যাজুয়েশনে ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট হওয়া স্পন্দন এম এ-তেও ফার্স্ট হবে, এমন একটা ধারণা মোটামুটি প্রচলিত ছিল। আমি ভাবছিলাম যদি আমিও প্রথম দশজনের মধ্যে চলে আসতে পারি স্পন্দনের দৌলতে? সেই জায়গা থেকেই স্পন্দনের ওই ঘুপচি ঘরে আরও দু’দিন থেকে গেলাম আমি। ওকে খাওয়ালাম, স্পঞ্জ করিয়ে দিলাম আর তৃতীয় দিন ফিসফিসিয়ে জানতে চাইলাম, ওর টেবিলে যে মেয়েটার মুখ এঁকে রেখেছে, সেই মেয়েটাকে ও চায় কি না!”

“কী বলল ছেলেটা?”

“লজ্জা পেয়ে গেল। আমি সেই লজ্জাটার উপর খেলতে লাগলাম। বলতে লাগলাম যে আমার ধারণা, অহনাও ওকে চায়। শুনে হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে রইল স্পন্দন। আমি ওর মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম যে ওর মাথায় তখন অনেক পাখি উড়ছে, অনেক হরিণ দৌড়চ্ছে। আমি সেই দৌড়টার সঙ্গে নিজের দৌড়টা জুড়ে দিলাম শুধু। স্পন্দনকে বললাম যে অহনাও ওকে খেয়াল করেছে, আমার কাছে একদিন জানতে চাইছিল ওর সম্বন্ধে, স্পন্দন ইউনিভার্সিটি টপার শুনে অহনার মুখেও আলো জ্বলে উঠেছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি।”

“ছেলেটা সব বিশ্বাস করল? একবারও ওর সন্দেহ হল না যে তুই ঢপ দিচ্ছিস? একজন ইউনিভার্সিটি টপারকে এতটা বোকা ভাবতে আমার কেমন যেন লাগছে!”

“মেয়েদের ব্যাপারে ছেলেরা বোকাই হয়ে যায়। ঐতিহাসিকভাবেই এটা সত্যি। মার্ক অ্যান্টনির কথা ভাব। বক্তৃতা দিয়ে লোকের মন এমন ঘুরিয়ে দিল যে ব্রুটাস অবধি কাত হয়ে গেল কিন্তু সেই অ্যান্টনিই ক্লিওপেট্রার সামনে এমন চকোলেটের মতো গলতে শুরু করল যে রাজ্য, সাম্রাজ্য সব গেল, কবিকে পর্যন্ত লিখতে হল, ‘‘লেট দ্য রোম ইন টাইবার মেল্ট...’’

“অহনার সঙ্গে ক্লিওপেট্রার তুলনাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না?”

“ছাগলের কাছে কাঁঠালপাতাই অমৃত। নাথিং ডুয়িং।”

“তা, স্পন্দনকে ছাগল বানানোর পর কী করলি?”

“আমি অন্য একটা প্রেক্ষিত থেকে তুলনাটা করেছিলাম। কিন্তু স্পন্দনকে ছাগল বানানোর কোনও উদ্দেশ্য আমার ছিল না। আমি শুধু চেয়েছিলাম ওর উপর ভর করে দারুণ একটা রেজ়াল্ট করতে আর সেটাকে তেমন কিছু অন্যায় বলেও আমার মনে হয়নি।”

“অন্যায় হলেই বা কী? এভরিথিং ইজ় ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার।”

“সেভাবে দেখলে তাই। আর তাই বলেই হয়তো, স্পন্দনকে আমি আমার বাড়িতে এসে থাকতে বললাম, পরীক্ষার আগের ক’মাস।”

“ও রাজি হয়ে গেল?”

“অবভিয়াসলি। রোজ অহনাকে দেখতে পাওয়ার জন্য ও তখন রৌরব নরকে গিয়ে থাকতেও রাজি হয়ে যেত। আর আমার বাড়িতে আমি নিজে মেঝেয় শুয়ে ওকে বিছানা ছেড়ে দিয়েছিলাম। টাইম-টু-টাইম চা-কফি, ও যা-যা খেতে ভালবাসত, সেগুলো বাজার থেকে নিয়ে এসে মাকে দিয়ে রাঁধানো, জামাই-আদরে রেখেছিলাম ছেলেটাকে।”

“মাস্টারস্ট্রোক, আই মাস্ট সে।”

“হ্যাঁ, মাস্টারস্ট্রোকই। কারণ স্পন্দনের তৈরি করা সমস্ত নোটস আমি নিজের কাজে লাগাতে পারছিলাম, নিজেকে দুর্দান্তভাবে তৈরি করতে পারছিলাম পরীক্ষার জন্য আর আবার বলছি এই নিয়ে কোনও অপরাধবোধ আমার মধ্যে ছিল না, কারণ আমি তো স্পন্দনের ক্ষতি করছিলাম না।”

“তোর বাবা-মা জানত ব্যাপারটার কথা?”

“কী উদ্দেশ্যে এনেছি সেটা জানত না, তবে আমার এক বন্ধু আমার ঘরে থেকেই পরীক্ষা দেবে, সেটা জানত। এবার যেহেতু আমাদের বাড়িতে সেই ঠাকুরদার আমল থেকেই অনেক লোক আসত, বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে থাকত পনেরোদিন, তারপর চলে যেত আবার, তাই ওদের তেমন কিছু মনে হয়নি।”

“অনেক লোক মানে? তারা কারা?”

“হয়তো দূরসম্পর্কের আত্মীয়, হয়তো বাবার গ্রাম-সহোদর, মানে একই গ্রামে জন্মানো পাবলিক, এইরকম সব। উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতায় এসে তারা দেশের এমন কাউকে খুঁজত যার থাকতে দেওয়ার মতো একটা মেঝে আছে এবং সর্বোপরি যে তাড়িয়ে দেবে না।”

“ওরকম হাজার হাজার লোক আমাদের বাড়িতে আশ্রিত হিসেবে ছিল একসময়, দিদুনের কাছে শুনেছি সব।”

“তোরা আশ্রয় দিতিস। তোদের অনেক বাড়ি, শয়ে-শয়ে ঘর, আশ্রয় দেওয়া তোদের সাজে। কিন্তু আমরা আতিথ্য দিতাম। দুটো ঘরে বাইরের পাঁচজনকে নিয়ে এসে আশ্রয় দেওয়া যায় না তো। তাদের মিশিয়ে নিতে হয়, পরিবারের মধ্যে।”

“থাক, আর লেকচার দিতে হবে না। গল্পটা শেষ কর।”

“লেকচার দিচ্ছি না। স্পন্দন আমাদের বাড়িতে থাকতে আসার ফলে বাবাকে বসার ঘরের সোফায় শুতে হত, কারণ মা আর বোন আর-একটা ঘরে থাকত।”

“ও আসার আগে তোর বাবা কোন ঘরে শুতেন?”

“আমার ঘরে। উই শেয়ার্ড দ্য বেড। কিন্তু স্পন্দনের খাতাপত্র-বইয়ের জায়গা করে দেওয়ার জন্যই মেঝেয় জায়গা নিয়েছিলাম আমি।”

“গ্রেট। অহনাকে বলেছিলি ব্যাপারটা?”

“পাগল? কিন্তু অহনা আমায় একদিন রাস্তার মধ্যে ধরে, স্পন্দন সম্পর্কে কমপ্লেন করে। ছেলেটা নাকি একবার ওকে ছাদে উঠতে দেখলে বারান্দা থেকে নড়ে না আর। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। আমি অহনাকে, ‘তোমায় সামনে পেলে কে দেখবে না’ বলে খুব তেল দিলাম। পাড়ার মোড় থেকে মুড়ি-বেগুনি কিনে ঠোঙাটা ওর হাতে ধরিয়ে একটা গলি ধরে হেঁটে এলাম পাশাপাশি...”

“চুমু খেলি না?”

“না, সেদিন খাইনি। কারণ তখন পরীক্ষার সাতদিন বাকি আর মাথার মধ্যে নানারকম প্রশ্নপত্রের ছবি উঠছে, ভাসছে, মিলিয়ে যাচ্ছে।”

“তোদের বাড়িতে থেকেই পরীক্ষা দিল স্পন্দন?”

“হ্যাঁ। অহনার মুখ থেকে ওর ওই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার কথা শুনে আমার মনে একটা কু-ডাক ডেকেছিল। আমি হালকা করে ওকে হস্টেলে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছিলাম, আমার ঘরে থেকে ওর লেখাপড়ার ক্ষতি হচ্ছে এইসব ত্যানা পেঁচিয়ে, কিন্তু তখন ওর চোখে ঘোর লেগে গেছে পুরো। হাতের ভঙ্গিমায় আমার প্রস্তাব উড়িয়ে দিল স্পন্দন।”

“এর জন্য কি তুই-ই দায়ী নোস?”

“জানি না। কিন্তু পরীক্ষা ফাইনালি শেষ হওয়ার পরদিনই ওর সঙ্গে যা হল তার জন্য আমি দায়ী নই কোনওমতেই।”

“কী হয়েছিল?”

“আরে, আমি দত্তপুকুরে গিয়েছিলাম আমাদের এক দূরের রিলেটিভের বিয়েতে। বাড়ি থেকে একাই। এবার মা স্পন্দনকে দোকানে পাঠিয়েছিল একটু গরম মশলা আনতে। সেই হতভাগা, দোকানের সামনে অহনাকে দেখে এগিয়ে গিয়ে প্রথমে ওর হাতটা চেপে ধরে। অহনা স্তম্ভিত হয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে জড়িয়ে ধরে জোরসে।”

“মাই গুডনেস! তারপর?”

“পাড়ার ভিতর ভর সন্ধ্যাবেলা এরকম একটা কাণ্ড যে ঘটাতে পারে স্পন্দন, আমি কল্পনা করিনি, বিশ্বাস কর। ট্রেনের মধ্যেই মোবাইলে খবরটা পেয়ে ইস্তক ওর নিরাপত্তার কথা ভাবছিলাম সারাক্ষণ। ট্রেন থেকে নেমে প্রায় দৌড়ে ফেরার পথে দেখি, বাড়ির সামনে বেশ বড় একটা জটলা। আমাকে দেখেই ভিড়টা চিৎকার করে উঠল প্রায়। অহনার বাবা সেই ভিড়ের ভিতর থেকে এগিয়ে এসে বললেন, “এইসব লুম্পেনকে বাড়িতে রাখা চলবে না। কালকের মধ্যে ও পাড়া ছেড়ে চলে না-গেলে আমরা ওকে পুলিশে দেব, বলে গেলাম।”

“সেদিনই দেয়নি কেন?”

“এগজ্যাক্টলি দ্য রাইট কোয়েশ্চেন। কেন দেয়নি জানিস? দিতে গেলে নিজেরাই ফেঁসে যেত যে। বারোটা সেলাই পড়েছিল স্পন্দনের মাথায়।”

“উফফ! এতটা মেরেছিল?”

“অহনার প্রত্যক্ষ মদত ছিল, আমি পরে জেনেছি। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।”

“মানে?”

“পরে বলছি, আগে স্পন্দনের কথাটা বলে নিই।”

“কী হল ছেলেটার?”

“যা হওয়ার। যখন পাড়ার লোকের হাতে-পায়ে ধরে সাতটা দিন ওকে বাড়িতে রেখে সুস্থ করে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছি, তখনও মাঝে-মাঝে বারান্দায় বেরিয়ে গিয়ে অহনাকে দেখার চেষ্টা করত। একটা তালা লাগিয়ে রেখেছিলাম আমি শেষে, বারান্দায় বেরোনোর দরজাটায়। কিন্তু ওর দুর্ভাগ্যের দরজায় কোন তালা লাগাব? যখন বর্ধমানের বাসে ওর সঙ্গে উঠে বসেছি তখন পাশের সিটটা হাত দিয়ে চেপে রেখেছে, আমাকে বসতে না-দিয়ে। ভাবছে, অহনা আসবে।”

“অসহনীয়, একদম অসহনীয়!”

“আমি জানি, এর জন্য তুই আমাকে রেসপন্সিবল ভাবিস, আমি নিজেও ভাবি, বিশ্বাস কর। কিন্তু এরকমটা হোক আমি চাইনি। মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস থার্ড হওয়ার পর, আমেরিকার দরজা খোলার পর, আমার যার কথা সবার আগে মনে পড়েছে সে আর কেউ নয়, স্পন্দন। কিন্তু ও তো ততদিনে মেন্টাল রিহ্যাবে।”

“পাগলাগারদে বল।”

“না। পাগলাগারদে যাতে ওকে থাকতে না হয়, তার দায়িত্ব আমি নিয়েছিলাম। এখানে আসার পর ক’টা টাকা পেতাম? কিন্তু বাড়িতে না-পাঠিয়ে স্পন্দনের জন্য টাকা পাঠিয়েছি, যাতে...”

“রেজ়াল্ট কীরকম করেছিল ছেলেটা?”

“ভাল নয়। ফার্স্ট ক্লাসটাও রাখতে পারেনি।”

“সেটাই স্বাভাবিক। এখনও রিহ্যাবে আছে?”

“না। বাড়িতে। তবে মা মারা যাওয়ার পর ওকে দেখার লোক নেই...”

“ফরগেট দ্য পাস্ট। আমরা স্পন্দনকে আমাদের সংসারে এনে রাখতে পারি না? আমি ওর কাছে গিয়ে বলতে পারি না যে, আমি অরণ্যর স্ত্রী, আমরা তোমাকে ভালবাসি। তুমি চলো, আমাদের সঙ্গে গিয়ে থাকবে।”

“পারিস একশোবার। কিন্তু ও তোকে অহনা বলেই ভাববে হয়তো। ওর পুরো অস্তিত্বটাই একটা টাইম-ওয়ার্পে ঢুকে গেছে তো!”

“আমাকে যা খুশি ভাবুক ও, ড্রাকুলা, পূতনা, এনিথিং। তোর এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমাকেই করতে হবে। নইলে শান্তি পাব না।”

“সময় নিশ্চয়ই তোকে সে সুযোগ দেবে।”

“আমি একমাস পরেই কলকাতা যাব। তখনই স্পন্দনের কাছে গিয়ে বলব, আমারও পূর্বপুরুষ কোনও এক যুগে বর্ধমান থেকে কলকাতায় এসে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। তোমারও হেরে গেলে চলবে না। তোমার সঙ্গে আমি আছি, আমার বর অরণ্য আছে, আমরা একসঙ্গে মিলে তোমাকে ফিরিয়ে আনবই জীবনে। বাক আপ।”

“তুই খুব ইমোশনাল জয়ী!” অরণ্য জয়ীকে জড়িয়ে ধরে বেশ কয়েকটা চুমু খেল ওর গালে, ঠোঁটে।

জয়ী বাধা না-দিলেও সাড়াও দিল না। ইমোশনাল ছাড়া আর কী হতে পারে মানুষ?

“তুই যা চাইছিস, তাই হবে। আমরা একসঙ্গেই স্পন্দনের কাছে যেতে পারব, আই বিলিভ। সময়কে একটু সময় দে, আমি মুক্ত হই।”

“তুই কোন জেলে আছিস?”

“আমার আর অহনার ডিভোর্সটা কমপ্লিট হয়নি জয়ী। আই হোপ, এবার দেশে গিয়ে আমি মিটিয়ে ফেলতে পারব এই পাপটা...”

“হোয়াট? এতকিছুর পর তুই আবার বিয়ে করেছিলি অহনাকে?”

“আই হ্যাড টু। আমি আমেরিকায় আসার পর প্রথম যেবার দেশে গেলাম, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে আমার পালানোর পথ ছিল না।”

“কেন? প্রেগন্যান্ট করে দিয়েছিলি ওকে?”

“না। নেভার। বাট, যে প্যাঁচে পড়েছিলাম, কেটে বেরোতে পারিনি।”

“মিথ্যে বলছিস তুই, মিথ্যে। ইউ লায়ার। যারা যারা তোকে ভরসা করে, তুই তাদেরই ঠকাস। স্পন্দনকে, আমাকে। কে জানে হয়তো অহনাকেও ঠকিয়েছিস। আমি কলকাতা ফিরে ওর সঙ্গে দেখা করলে হয়তো দেখব যে মেয়েটা ভাল, আসল কালপ্রিট তুই।”

“অহনা আমার কী কী ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল, আমার পোস্ট-ডক্টরাল কাজকম্মো বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, আমি বলব তোকে সব...”

“ও যা ক্ষতি করেছে, তার দশগুণ ক্ষতি আমি করব, ইউ জাস্ট ওয়েট। তুই আমার সঙ্গে নন-কনসেনসুয়াল সেক্স করেছিস, এটা লিখে তোর ইউনিভার্সিটির ডিনকে চিঠি দেব। তোর একের পর-এক জীবন নষ্ট করা বার করছি আমি, দাঁড়া। আমার মনে জায়গা পেয়ে মনটাকেও প্ল্যাটফর্ম ভেবে ফেলেছিস, তাই না? যেখানে কিছুদিন থেকে নোংরা করে আবার অন্যত্র চলে যাওয়া যায়?”

“আমাকে যা ভাবছিস, যেরকম ভাবছিস, আমি তেমন নই। তুই প্লিজ় একটু শান্ত হ।”

জয়ী অরণ্যর গালে ঠাস করে একটা চড় কষিয়ে বলল, “আমি শান্তই আছি।” তারপর পলকের মধ্যে ড্রেস করে ওভারকোটটা বগলদাবা করে বেরিয়ে গেল হোটেলের দরজা খুলে।

অরণ্য নিজের হাতটা বাড়িয়ে একটা শেষ চেষ্টা করল ওকে আটকাতে, পারল না।

ফিলাডেলফিয়ার রাস্তায় বেরিয়ে স্পন্দনের জন্য মনকেমন করে উঠল জয়ীর। মনে হল, কোথায় কোন একলা খুপরিতে বসে আছে এখন ছেলেটা, জয়ী যদি গিয়ে জড়িয়ে ধরতে পারত ওকে, যদি বলতে পারত যে জয়ী নিজেও একই লোকের কাছে ঠকে গেছে ওর দেশোয়ালি স্পন্দনের মতো? নিজের ভিতরে সেই পঁচাত্তর সালের শিল্ড ফাইনালের রাতকে ফিরে আসতে দেখছিল জয়ী। যেদিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল সব মোহনবাগানি। কিন্তু সেই রাতে গ্লানি আর অপমান ছিল, জয়ীর শরীরে যে সেই সবের সঙ্গে আদরও লেগে আছে। না, আদর নয়, স্পর্শ। ওই নোংরা লোকটার স্পর্শ। জয়ীর ইচ্ছে করছিল নিজেকে পেট্রোলে চুবিয়ে শুদ্ধ করে, তারপর একটা অনন্ত স্নানের মধ্যে চলে যায়।

অরণ্যর সঙ্গে শরীরী কার্নিভ্যালের সময় জয়ী একটুও নেশা করেনি। কিন্তু এখন ওর অনেকটা জ্বালাময়ী তরল দরকার। ভাবতে ভাবতে একটা আলো-আঁধারি বারে ঢুকল জয়ী। প্রথম পেগটা খেতে-খেতেই কেটে দিল আসতে থাকা ফোনটা। শয়তানটার নম্বর তো ব্লক করেই দিয়েছে, তা হলে ফোন আসছে কোত্থেকে? অসীম বিরক্তিতে ফোনটা চোখের সামনে নিয়ে এসে জয়ী দেখল, ‘হোম কলিং’ আর ফোনটা ধরতেই সনাতনকাকার থেকে শুনল সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়েছে দিদুনের, হাসপাতালে ভর্তি। বাহাত্তর ঘণ্টা কাটার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না।

এতগুলো বজ্রপাত একইদিনে? একটু গ্যাপ দিয়ে হলে পারত তো! ফোনটা বন্ধ করে টেবিলের উপরে রেখে জয়ীর মনে হল। এই বারে আবার একটা নাচার মঞ্চ আছে। সেখানে শ্বেতাঙ্গী আর কৃষ্ণাঙ্গী মেয়েরা একসঙ্গে নাচছে। নর্তকীর আবার বর্ণ কী? তার নাচই তার পরিচয়। কিন্তু ওদের কারও পায়ে ঘুঙুর নেই কেন? জয়ীর একটা ঘুঙুর ছিল। ওর দিদুন ওকে কিনে দিয়েছিল। আচ্ছা, দিদুন কোন এমন ঘুমে গেছে যে ঘুঙুরের শব্দেও ভাঙবে না?

আর একটা পেগ খেতে খেতে জয়ীর মনে হচ্ছিল ওই যে নৃত্যরতাদের গায়ে হাত দিচ্ছে নাচ দেখতে আসা লোকেরা, জয়ীর গায়েও ওরকম হাত দিয়ে গেছে দুটো লোক। একজন আগে, একজন ইদানীং। হাত দিয়ে গেছে শুধু, ভালবাসা দেয়নি। দ্বিতীয় পেগটা শেষ করার সময় জয়ী শুনল ওর পাশের টেবিলের লোকটা একজন ওয়েটারকে বলছে যে আগে যে-সমস্ত বারে মেয়েরা নাচ দেখাত, সেখানে মেয়েরা মদ খেতে ঢোকার অনুমতি পেত না। ওয়েটার লোকটি বোঝানোর চেষ্টা করছিল যে, এখন সবাই সর্বত্র যেতে পারে। কোনও বাধা নেই। লোকটা তবু জানতে চাইছিল, একটা মেয়ে কেন ওর পাশের সিটে?

জয়ীর ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে বলে যে ও কোনও সিটে বসতে চায় না, কোনও বিছানায় শুতে চায় না, ওর দিদুন যদি না ফেরে তা হলে তার সঙ্গেই চলে যেতে চায় অন্য একটা পৃথিবীতে, যেখানে শঠতা নেই, তঞ্চকতা নেই, পাগলাগারদ নেই। সবচেয়ে ভাল হয় যদি সেই মাঠটায় চলে যেতে পারে যেখানে বুট-পরাদের বিরুদ্ধে নেমেছিল খালি পায়ের কতগুলো লোক।

জয়ীর জীবনটাও তো বুট-পরা কতগুলো স্মৃতির বিরুদ্ধে খালি-পায়ে দাঁড়ানো বর্তমানের লড়াই। সেই লড়াইয়ে কি একবার অন্তত জিততে পারবে জয়ী? চোখ মেলবে দিদুন, সব অভিমান সরিয়ে কাছে টেনে নেবে জয়ীকে? চৌধুরীবাড়ির তিনতলার জানলা দিয়ে ওরা দু’জন বাইরে তাকালেই সরে যাবে সময়? রাজেন আর অভিলাষের সামনে নাস্তানাবুদ হয়ে খাবি খাবে গোরারা? ছিঁড়ে যাওয়া নাগরদোলা পড়ে যেতে যেতে উপরে উঠবে? মৃত্যু আর জীবনের মাঝখানের কয়েক মিনিটে আর একটা গোল করতে পারবেন শিবদাস?

প্রীতিকণা চৌধুরীর মুখে আবার নিজের নামটা শুনতে পাবে জয়ী? মোহনবাগান জিতবে?

সূর্য সেন পল্লী, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা

সময় নাকি নদীর স্রোতের প্রায় বয়ে যায়, কিন্তু সুষমা আর আনন্দকুমারের জীবন থেকে তো নদীই মুছে গিয়েছিল। থাকার মধ্যে ছিল একটা স্মৃতির ধারা, যা কখনও-সখনও রক্তে রাঙা হয়ে, নতুন গতি পেত। সুষমার খুড়তুতো ভাই নবীন পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়ার পর যেমন পুরনো সমস্ত কান্নার গায়ে নতুন পালিশ লাগল। লাঠি-ফাটি চলত, সে একরকম অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু যখন গুলি চালিয়ে দিত পুলিশ আর সেই গুলিতে প্রাণ চলে যেত কোনও তরতাজা যুবক কিংবা কিশোরের, তখন ভিটে-মাটি থেকে উৎখাত হওয়ার বেদনা দ্বিগুণ হয়ে বাজত।

“আমার যে দাদা বিপ্লবী দলের সদস্য ছিল, স্বাধীনতা ঘোষিত হওয়ার পরদিন থিক্যা সে আমাগো পাড়ায় আইসা কইত, এই নতুন ব্যবস্থায় আমরা টিকতে পারুম না, যত শিগগির সম্ভব পোটলা বাইন্ধ্যা রওনা হইয়া পড়ি য্যান। আমি তারে একদিন জিজ্ঞাসা করসিলাম যে যারে স্বাধীন করতে রক্ত ঝরাইলা, সেই মাটি ছাইড়া চইলা যাইতে কও ক্যান? অদ্ভুত উত্তর দিসিল দাদা। কইসিল যে বৃন্দাবন যমুনায় তলাইয়া গেলে কৃষ্ণের বাঁশি শোনার কোনও লোক থাকে না।”

“বৃন্দাবন কাকে বলে বলো তো? নিরাপত্তাকে? মানুষ উদয়াস্ত খেটে ঘরের লোকের মুখে দুটো ভাত তুলে দিতে চায়। কিন্তু খাটতে যাওয়ার সময় সে এইটুকু নিশ্চয়তা চায় যে ফিরে এসে ঘর আর ঘরের মানুষগুলোকে অক্ষত দেখবে। সেই নিরাপত্তা যখন থাকে না...”

“কলকাতায় আইসা কোন নিরাপত্তা পাইলাম আমরা? বাসুদেব মিছিল করতে গিয়া শহিদ হইয়া গেল, ভিটায় থাকলে পরে এর চেয়ে বেশি কী হইত?”

আনন্দকুমার জবাব দিতে গিয়ে চুপ করে যেতেন। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে জীবন বেশি না কি কম সেই হিসেব করতে পারে না মানুষ। জীবন আছে, সেই আশ্বাসটুকুই যথেষ্ট। আর সেই জীবনকে টিকিয়ে রাখার জন্য অনন্ত সংগ্রামের নামই বোধ হয় ইতিহাস। সেই ইতিহাসের ধাক্কায় সম্পূর্ণ ভিন্ন মতের দু’জন মানুষও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারে। জাতীয়তাবাদী মহাদেবদা যেমন বামপন্থী বিজয়দার সঙ্গে মিলে পোদ্দারনগর, দাসপাড়া, যতীন দাস পল্লী গড়ে তুলছিলেন। দেশে থাকতে দু’জনের কেউ কাউকে চিনতেন না, তখন তো জেলা আর নদী আর গ্রামের স্বাতন্ত্র্যে স্বস্তি পাওয়ার জমানা ছিল, এখানে যখন সব তকমা মুছে গিয়ে উদ্বাস্তুর স্ট্যাম্প পড়ল গায়ে, তখন দম নেওয়ার প্রয়োজনেই একজনের হাত ধরতে হল আর-একজনকে।

“আচ্ছা, আপনাদের দু’জনের যে মতের অমিল, বিশ্বাসের অমিল, তা একসঙ্গে কাজ করতে অসুবিধে হয় না?” একদিন একটা জমায়েতের শেষে রাস্তায় চা খেতে খেতে আনন্দকুমার জিজ্ঞেস করলেন ওঁদের দু’জনকেই।

মহাদেবদা হো হো করে হেসে উঠলেন, “অনেক মত কোথায় থাকতে পারে বলো তো? যেখানে অনেক পথও আছে। আমরা তো সবাই মিলে একটা অন্ধগলির সামনে এসে দাঁড়িয়েছি, এখন এই গলি থেকে বেরোনোর একটাই পথ।”

“গলি থেকে বের হইতে পারলে পরে তখন আবার অনেকগুলো রাস্তা পাওয়া যাবে। ভিন্ন ভিন্ন মতের চর্চা সেই সময়ের জন্য তুলে রেখেছি আমরা।” বিজয়দা শেষ চুমুক দিলেন চায়ে।

আনন্দকুমার ওদের দু’জনের দিকে তাকালেন ভাল করে। শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে আসতে চাইল। কারা নেতাজিকে ঈশ্বর মানত, কারা বাজে কথা বলেছিল, কারা গাঁধীবাদী ছিল, কারা ছিল না, কারা মহাসভার, কারা রেভলিউশনারিদের, এইসব পরিচয় শিয়ালদা স্টেশনে কোনও কাজে আসেনি। সেখানে প্রতিটা পরিবার এক বালতি জল, কয়েকটা লজ্জাবস্ত্র আর আব্রু রক্ষার জন্য একটা চটের খোঁজ করছিল।

“তুমি স্টেশন-স্টেশন করো, কিন্তু আমার মনে হয়, স্টেশনের চেয়ে ক্যাম্প আরও সাংঘাতিক। ক্যাম্পে লোকে যে কোন পশুর অধম জীবন যাপন করত যারা দেখেনি সামনে থেকে, তারা ভাবতেও পারবে না। অত বড় বিপ্লবী অম্বিকা, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সময় ডান হাতে, বাঁ হাতে পিস্তল চালিয়েছে, সে কুপার্সে গিয়ে এক দৌড়ে বমি করতে করতে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। টিকতে পারেনি ভিতরে।” মহাদেবদা বললেন।

“ক্যাম্পের ভিতরকার অবস্থা সম্বন্ধে আমিও ওয়াকিবহাল। সত্তর হাজার লোকের জন্য যেখানে আশিটা পায়খানা, স্নান মানে টিউকল টিপে, সেখানে কুকুর বেড়াল টিকতে পারবে না, অথচ আমার তোমার জেলার লোক কেমন করে টিকে আছে, ভাবতে পারি না।” বিজয়দা অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন।

“ডিটেনশন ক্যাম্পের কথা ইতিহাসে আছে শুনেছি, কিন্তু মানুষকে ডিটেন করতে গেলেও তো মানুষের মতো থাকতে দিতে হবে।”

“কে দেবে? ভিখিরির কাছে রাজার কোনও দায়বদ্ধতা থাকে না। দেশভাগের আগে যে মহামহিমরা আমাদের সব রকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এখন তাঁরাই বলছেন যে আর একজন উদ্বাস্তুকেও এই ভূখণ্ডে গ্রহণ করা হবে না। যারা এসেছে, তাদেরও ফিরে যেতে হবে।”

“ফিরতে কে চায় না বলো তো? তুমি চাও না, আমি চাই না? কিন্তু ফিরতে পারি না কেন?”

“মানসম্মান নিয়ে থাকা যাবে না, আতঙ্কের মধ্যে নিশ্বাস নেওয়া যাবে না, এই ভয়ে চলে আসছে তো আসছেই। আচ্ছা এখানে রেল-স্টেশনে কি মানসম্মান নিয়ে থাকা যাচ্ছে? ক্যাম্পের ভিতর দম আটকে মরে যাওয়ার আতঙ্ক নেই? জবরদখল কলোনিগুলিতে যারা থাকে তাদের প্রতি মুহূর্তে ভয় করে না, কখন লেঠেল এল, কখন পুলিশ এল, পুলিশ আর লেঠেল একসঙ্গে এল কখন?”

“তবু কিসের আশায় এত লোক আসছে, আমরাই বা কেন এসেছি বুঝি না। এর চাইতে থাকতাম যেখানে ছিলাম, পারাপারহীন নদীতে ডুবতাম, ভোলার চরে ভেসে উঠতাম, রক্তমাখা লাশ অগ্রাহ্য করে ঘাড়ে জোয়াল নিয়ে খেতের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেত গোরু, সোনালি ফসলে ভরে উঠত চারপাশ...”

“আর রূপকথা শুনাইও না মহাদেব। শুনলে পরেও চোখে দেখতে পাই না কিছু, কালো একটা রাত্রি ছাড়া। পঙ্গু বাচ্চা জন্মালে অনেক সময় নিজের মায়েও মুখে নুন দিয়া মাইরা দেয় শুনছি, আমাদের জন্মদাত্রী ভূমি আমাদের সেইরকম মুখে নুন দিয়া মাইরা দিসে, ধইরা নাও।”

“ঠিকই কইস। কিন্তু আমরা এখানে কেন আসছি, তার একটা উত্তর আমার মাথার মধ্যে ঘোরে-ফিরে। সেইটা সঠিক কি না জানি না, কিন্তু মনে লাগে যে কথাটার ভিতরে সারবত্তা আছে।”

“বলো শুনি।” বিজয়দা পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখে আর-এক রাউন্ড চায়ের অর্ডার করলেন।

“জিন্দা লাশ হয়ে বাঁচার জন্য ওপার থেকে এইপারে আসিনি আমরা। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম যে স্বাধীনতার আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি সব সত্য, আমাদের যে নেতারা আশ্রয় দেবেন বলে কথা দিয়েছেন তারাই যে হঠাৎ পালটি খেয়ে যাবেন আর ওপার বাংলা তাঁদের চোখে, ‘কাদায় ভর্তি নোংরা জলা জমি’ বলে প্রতিভাত হবে, এমনটা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারিনি কেউ।” মহাদেবদা নস্যি নেওয়ার জন্য থামলেন।

ওঁদের প্রতি অনন্ত শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও ওঁদের কথা শুনতে বিরক্তি বোধ হচ্ছিল আনন্দকুমারের। বারবার করে ‘আশ্রয়’ শব্দটা উচ্চারণ করছেন কেন ওরা? কিসের আশ্রয়? কেন আশ্রয়? আনন্দকুমারের মন বলে, র‌্যাডক্লিফের ছুরিকে মেনে নিয়ে নদীনালা নির্ভর অসংখ্য বাঙালির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন তাবড় নেতারা। আজ তাদের সম্পর্কে বারবার যে বলা হয় তারা আশ্রয়প্রার্থী উদ্বাস্তু, আশ্রয় কি তারা মনের খুশিতে চেয়েছিল? একটা বাড়ির বেশ খানিকটা অংশকে যদি সেই বাড়ির দলিল থেকে ছেঁটে ফেলা হয় তা হলে সেই অংশের বাসিন্দারা করে কী? বাড়ির যে অংশ দলিলের অন্তর্ভুক্ত সেখানেই এসে মাথা গোঁজার চেষ্টা করতে বাধ্য তারা। সবাই মাটিতে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, একদল হঠাৎ আবিষ্কার করল যে তাদের পায়ের তলায় মাটি নেই, চোরাবালি। কী করবে তারা তখন? যেখানে মাটি আছে সেখানে যাবে না? সেই যাত্রাটা যদি লাখ লাখ লোকের হয়, তা হলে তাকে গণ-উদ্বাসন বলা যেতেই পারে কিন্তু সেই লোকগুলোকে ‘শরণার্থী’ বলা হবে কেন? তাদের বাড়ি-উঠোন-গোয়াল-তুলসীমঞ্চ-ধানের গোলা সব খোওয়া যাবে গদি ভাগাভাগিতে আর রিফিউজি হবে তারা? এই লোকগুলোরই পূর্বপুরুষ চিত্তরঞ্জন দাশ, বিনয়-বাদল-দীনেশ এই লোকগুলোর মধ্যে থেকে উঠে এসেই নাড়িয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের ভিত, তা হলে আজ এত অবমাননা কেন তাদের? কেন নিজের বউভাতের দিন সকালে আনন্দকুমার মায়ের শেষ সম্বল একরত্তি সোনার হারটা হাতে নিয়ে পথে বেরিয়েছিলেন? কেন শুধু হারে কুলোল না, কেন উপহার পাওয়া বিদেশি হাতঘড়িটা পর্যন্ত বেচতে হল, রাতের নিমন্ত্রিতদের মানরক্ষা করতে?

সোনার হারটার সময় তত নয়, কিন্তু ঘড়িটা বিক্রি করার সময় আনন্দকুমারের দু’চোখ জলে ভরে যাচ্ছিল বারবার। ম্যাট্রিকুলেশনে ওঁর স্কুল থেকে একমাত্র আনন্দকুমারই পাশ করেছিলেন ফার্স্ট ডিভিশনে। সেই খবরে খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঁকে নিজের বাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছিলেন স্কুলের হেডমাস্টারসাহেব। আনন্দকুমার যখন ওঁর বাড়িতে ঢুকছেন, তখন তিনি সান্ধ্য প্রার্থনায়। দিনে পাঁচবার প্রার্থনা করা মানুষটার কপালে ছিল একটা চওড়া দাগ।

আনন্দকুমারকে নিজের ঘরের চেয়ারে বসিয়ে হেডস্যার বললেন, “আকাশে যে মালিক থাকেন তিনি চান যে ধরতির মাটির সঙ্গে আমাদের যোগ থাকুক সবসময়। তাই তো বারবার মাটিতে মাথা ছুঁইয়ে প্রণামটা পাঠিয়ে দিই আকাশে।”

আনন্দকুমার ভাবছিলেন, স্যারের মুখে মাঝে-মাঝেই শোনা, ‘ইবাদত’ শব্দের মানে কি তবে এই-ই?

হেডস্যার বললেন, “তোমাকে আমার ঘরে আসতে কেন বললাম, জানো? আজ তুমি তোমার স্কুলকে গৌরবান্বিত করেছ। সবাই বলছে সোনারং হাইস্কুলের ইতিহাসে নতুন যুগ শুরু হল আজ। আর যুগ কী দিয়ে শুরু হয় বলো তো?”

আনন্দকুমার উত্তর খুঁজে না পেয়ে চুপ করে রইলেন।

“যুগ, ওয়াক্ত দিয়ে শুরু হয় বেটা। আর সেই নতুন সময়ের শুরু যখন তুমি করেছ, তখন তোমাকে তেমনই কিছু দিতে হয়। এই নাও, হাত বাড়াও।” হেডস্যার নিজের মুঠোটা বন্ধ রেখেই হাতটা বাড়ালেন।

“আমি মা-বাবার অনুমতি নিয়া আসিনি স্যার।”

“তোমার বাবা-মা আমার থেকে উপহার নিয়েছ শুনলে রাগ করবেন না। আর তা ছাড়া এই স্নেহাশীর্বাদ কেবল একজন শিক্ষক দিচ্ছেন না, একজন পিতা তাঁর সন্তানপ্রতিম ছাত্রকে দিচ্ছেন। আমার বড় ছেলের জন্য তোলা ছিল এই বস্তুটি। কিন্তু সে আর এই দুনিয়ায় নেই, মালিক তাকে টেনে নিয়েছেন। তাকে যা দিতে পারিনি আজ তোমাকে তাই দিতে চাই আনন্দ। তোমার জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত যেন সুন্দর হয়ে ওঠে এই যন্ত্রের স্পর্শে।” আনন্দকুমারের হাতে ঘড়িটা বেঁধে দিয়েছিলেন হেডস্যার।

বাড়ি ফিরে আসার আগে খানিকটা বিহ্বল, খানিকটা আপ্লুত আনন্দকুমার নিজের স্কুলের প্রধানশিক্ষককে প্রণাম করতে গেলে, হেডস্যার আনন্দকুমারকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, সব প্রণাম ওই ওখানে পৌঁছে দিতে হবে।

নদিয়া থেকে বিক্রমপুরে চাকরি করতে গিয়েছিলেন বলে, হেডস্যার প্রায় শান্তিপুরী বাংলাতেই কথা বলতেন। কলকাতায় এসে আনন্দকুমার যে অল্প ক’দিনে নিজের বাচনভঙ্গি প্রায় এদেশীয় করে নিয়েছিলেন তার পিছনে ওঁর কৈশোরের সেই অভিজ্ঞতাও কাজ করেছিল। কিন্তু সেদিন ঘড়িটা বিক্রি করার সময় ওঁর মনে হচ্ছিল নিজের সবকিছু হারিয়ে ফেলছেন আর সবচেয়ে বেশি করে হারিয়ে ফেলছেন সেই সময়, যা আর ফেরত পাওয়া যায় না।

“দুঃখ করিস না। তর বউভাতে খাইতে বইসা লোকে হিসাব করতাসিল, কে কত বছর পর মাংস খাইতাসে। কেউ কয় দ্যাড়, কেউ আড়াই, রক্ষিতের কাকা তো ছয় বছর দাবি কইরা রেকর্ড করসে। অগো সুসময় আজ রাতেই আইসে আর সেই সুসময় আননের জন্য যদি কিছু গিয়াও থাকে, গ্যাসে। আবার হইব। আর না হইলেও ওই হাসির শব্দই তর সংসারে সুখবৃষ্টি হইয়া নামব, মিলাইয়া নিস।”

মায়ের কথাগুলো একটা কান দিয়ে ঢুকে আর-একটা কান দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। আনন্দকুমারের মনে পড়ছিল সেই যে পৈতের পর দণ্ডি ভাসাতে গিয়ে শুনেছিলেন যে ওঁর দ্বিজত্ব প্রাপ্তি হয়েছে, আজ তারও বিসর্জন হয়ে গেল। শয়ে শয়ে জন্ম হয়ে গেল আনন্দকুমারের আজ, একদিনে। আর প্রতিটা জন্মের সঙ্গে একটা করে মৃত্যুও লেগে রইল, নদীর ধারের ঘাসের মৃত্যু, দূর গ্রামের বটগাছের মৃত্যু, আর সেই মেয়েটার সঙ্গে দেখতে যাওয়া দৃশ্যটারও মৃত্যু যেখানে সন্ধ্যার আগে আগে একটু হেলে থাকা একটা মঠ, আকাশের শ্যামের সঙ্গে জীবনের সিদ্ধিকে মিলিয়ে দিয়েছে।

রাতে ফুলশয্যায় ফুলের অভাব যখন চোখকে কষ্ট দিচ্ছে তখন একটা রুপোর আংটি আনন্দকুমারের হাতে পরিয়ে দিতে দিতে সুষমা বলল, “মনুকাকার ব্যাপারটা দেখলা?”

ঘাড় নাড়লেন আনন্দকুমার। যদিও পুরো ব্যাপারটা সম্বন্ধেই ওয়াকিবহাল ছিলেন।

সুষমা বলতে থাকল, “ঘরের একদিকে হ্যাজাকের আলোটা কম হইয়া গেসে, সেই সময় একটা ব্যাং, সোনা না কোলা কে জানে, কাকার পাতে লাফ দিয়া উঠসে। কাকা মাংসের টুকরা ভাইব্যা চাইপ্যা ধরসে, তখন ব্যাংটা একটা আওয়াজ করসে। ব্যস সবাই ছুইট্যা আইসা কাকারে ফেলতে কইসে। কিন্তু কাকার চোখে ছানি আসে মনে লয়, ব্যাং ধইরাই বইসা আছে, ভাবতাসে ওইটা মাংসের টুকরা।”

“তারপর ওর থালাটা বদলে দেওয়া হয়েছিল?”

“উনিই বদলাতে দেয় নাই। পাতে নাকি তিন টুকরা মাংস আসিল। কাকা কইতাসিল কী জানো, ‘‘পাতের উপর দিয়া গোখরো সাপ চইলা গেলেও ওই মাংস আমি ফেলতে দিমু না।”

“কখন মানুষ এরকম কথা বলে জানো? যখন সে নিজেই দ্বিখণ্ডিত-ত্রিখণ্ডিত হতে হতে একটা মাংসের টুকরো হয়ে যায়।”

“বুঝলাম না।”

“এই এলাকায় যারাই থাকে, কিংবা ধরো তোমাদের অরবিন্দ কলোনিতে, প্রত্যেকটা ফ্যামিলিই দ্বিখণ্ডিত-ত্রিখণ্ডিত হয়ে গেছে। খবর নিলে দেখবে, পরিবারের একটা অংশ অসমে, অন্য অংশটা দণ্ডকারণ্যে, তৃতীয়টা হয়তো শিলিগুড়ি, চতুর্থটা বিজয়গড়। একটা শরীর যেমন টুকরো টুকরো হয়ে যায় আমরা তেমন টুকরো টুকরো হয়েছি সুষমা, আর সেই সম্মিলিত গান-হাসি-মশকরা কিছুই হবে না। এখন আমরা পাতের উপর দিয়ে ব্যাং চলে গেলেও ভাতের থালা ছাড়তে পারব না, হাতি লেলিয়ে দিলেও কলোনি ছাড়তে পারব না।”

কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিল সুষমা। শুনতে শুনতে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কলোনিতে জমি পাওনের চেষ্টা করো নাই?”

খানিকটা দার্শনিক হয়ে ওঠা আনন্দকুমার সুষমার কথায় একটু থমকে গিয়ে বললেন, “আমার এক বন্ধু আছে চৈতন্য। অবস্থাপন্ন পরিবারের ছেলে। দেশেই শুধু না, সাভারেও বাড়ি ছিল ওদের। সেই বাড়িতে অনেক পেন্টিং ছিল। গিয়ে দেখেছি। তা কলকাতায় এসে রেলে চাকরি পেয়েছিল চৈতন্য ওই আর্টিস্ট হওয়ার দৌলতেই। এখন সারাদিন দরজার উপর ঘোমটা মাথায় মেয়ের ছবি এঁকে উপরে লেখে, ‘জেনানা’ আর ধুতি-পরা পুরুষের ছবি এঁকে উপরে লেখে, ‘মর্দানা’। সব আর্ট ওখানেই চলে গেছে। আমিও জানি যে আমার সব বিদ্যা-শিক্ষা রিফিউজি হওয়ার দিনই জলাঞ্জলি গেসে, তাও আমার ভাবতে ইচ্ছা করে যে তুমি বুঝবা, পৃথিবীতে সবাই শুধু নিজের কথা ভাইব্যাই ছুটবে বইল্যা জন্ম নেয় নাই, অনেকে অন্যদের কথাও ভাবে। না ভাইব্যা পারে না। তাদের মনের গঠনই ওইরকম।”

“আমি ভাবতে বারণ করি নাই। আমার কথাও তো ভাবসিলা একদিন।”

আনন্দকুমার যেন শুনতেই পাননি এমনভাবে বললেন, “আমার বাবাও ভাবতেন, অহরহ ভাবতেন। তাই আগের প্রতিজ্ঞা ভুলে স্টেশনেও স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে একে ওকে দেখে বেড়াতেন। ওষুধ কে কিনবে তখন? আর ওষুধ কেনা তো দূর, ওষুধের নাম লেখার মতো কাগজই নেই, নেই একটা কলম পর্যন্ত। তবু, সেইদিনও, বর্ডার পেরিয়ে আসা ওই স্টেথোস্কোপ গলা থেকে নামাননি বাবা। যার নিজের ঘর নাই, বসার একটা চেয়ার নাই, উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় অসুখ যাকে মানুষের থেকে নাম কেটে বাস্তুহারার দলে ভিড়িয়ে দিয়েছে, সেই লোকটা কী শুনত, স্টেশনে থাকা অন্যান্য বাস্তুহারার বুকে? আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম বাবাকে।”

“কী কইসিলেন উনি?” সুষমা নিজের অজান্তেই জড়িয়ে গেল গল্পটার সঙ্গে।

“বাবা বলেছিলেন, ‘শুনি, খুব মন দিয়া শুনি। তারপরও গোয়ালন্দের হার্টবিটের লগে শিয়ালদার হার্টবিটের তফাত পাই না।’ আমি প্রথমে ভেবেছিলাম বাবা বোধ হয় সীমান্তের দু’পারেই হৃদ্স্পন্দন একই রকম, সেরকম কিছু বলতে চাইছেন। কিন্তু পরে বুঝলাম বাবা বলতে চাইছেন যে রিফিউজি হওয়ার আগে একটা মানুষের হার্ট যেরকম চলত, রিফিউজি হবার পরও তেমনই চলছে। আর হৃৎপিণ্ড যখন একইভাবে চলছে, জীবনকেও তো চলতে হবে, তাই না?”

“চলতেই হইব।”

“তাই তোমার সঙ্গে পরিচয় হল, সত্যি করে সর্বহারা দু’জন মানুষের চারটে হাত এক হল, এখন এরপরে কী হবে...”

সুষমা আনন্দকুমারকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “তোমারে যে জীবনে পাইসে সে আর যাই হউক গিয়া, সর্বহারা হইতে পারে না। আমি, ইউনাইটেড সেন্ট্রাল কাউন্সিল ফর রিফিউজিস, মানে ইউসিআরসি-র অনেক মিছিলে গেসি, ‘আমরা কারা সর্বহারা/ আমরা কারা বাস্তুহারা’ স্লোগান দিসি অনেক, কিন্তু তুমি বিশ্বাস করো, আজ আমি ফিল করতাসি আমি সর্বহারা না। তোমার স্ত্রী সর্বহারা হইতেই পারে না। বাবা ঠিক কইতেন, গোয়ালন্দের লগে শিয়ালদার ফারাক নাই, ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়া আমাগোই আমাদের ভবিষ্যৎ গইড়া তুলতে হইব।”

“কী কইলা? ভবিষ্যৎ? উদ্বাস্তুগো ভবিষ্যৎ থাকে? আমি তো জানতাম, আমাগো শুধু চির-বর্তমান, প্রতিটা মিনিটের লড়াই। সকালে ভাত খাইসি রাতে প্যাটে গামছা না কি মাইলো, এই চিন্তায় দিনাতিপাত করনই আমাগো এগজ়িস্ট্যান্স।”

“ওই লড়াইটা আমাগো রেজ়িস্ট্যান্স। আর রেজ়িস্ট যে করতে পারে, এগজ়িস্ট সে করবই।” বলতে বলতে আবেগের জোয়ারে আনন্দকুমারকে জড়িয়ে ধরলেন সুষমা।

বাইরেটা তখন প্রায় ফরসা হয়ে এসেছে। কোকিল নাই বা ডাকল, কাকের ডাকেও টের পাওয়া যায়, ভবিষ্যৎ আকাশে উঠব উঠব করছে।

সুষমা মাঝে-মাঝেই বলত যে দেশে থাকতে কলকাতা শহরকে একটা রূপকথার রাজ্য বলে মনে হত ওর আর উদ্বাস্তু হয়ে এপারে এসে কলকাতাকে পায়ে হেঁটে এমন চেনাই চিনলেন যে নিজের বেড়ে ওঠার জেলাটাকে তার অর্ধেকও চেনেন কি না সন্দেহ।

কথাটা শুনতে শুনতে মনখারাপ হয়ে যেত আনন্দকুমারের। ওদের গ্রামের মেয়েরা কলকাতায় আসতে চাইত শহরের নানা বিস্ময় দেখবে বলে, কিন্তু কলকাতায় আসার পর তাদের প্রতিটা নিশ্বাসের জন্য যুদ্ধ করতে হচ্ছে। সেই যুদ্ধের অঙ্গ ছিল শহরের বড় বড় তেমাথা-চৌমাথা-পাঁচমাথায় মিছিলের আয়োজন করা। বাস্তুহারা কর্মপরিষদের পাঁউরুটি-আলুর দম তো দূর, চা খাওয়ানোর পয়সাও থাকত না সবসময় আর তার চাইতেও বড় ব্যাপার হল, বাস-ট্রাম ভাড়া দেওয়ারও ক্ষমতা থাকত না। তবু প্রতিটা মিছিলে হাজার-হাজার মানুষ কোত্থেকে যে এসে জড়ো হত! কলকাতায় উদ্বাস্তুদের মিছিল আগেকার সব মিছিলের চেয়ে আলাদা হয়ে গিয়েছিল একটাই কারণে, মিছিলে অজস্র মেয়ের যোগদান। অচেনা অজানা সব জায়গা থেকে অতি মলিন শাড়ি আর সস্তার চটি পায়ে কত মেয়ে যে হাজির হত মিছিল শুরুর সময়টায়, যোগ দিত মিছিলের মাঝপথে, আর হাঁটত শেষ পর্যন্ত। মেয়েদের স্লোগান আর ছেলেদের স্লোগান মিলেমিশে একটা অদ্ভুত সুর তৈরি হত, সেই সুর কারও কারও কানে ক্যাকোফনির মতো লাগতেই পারে, কিন্তু আনন্দকুমারের কানে সে-ই ছিল, পৃথিবীর সবচাইতে বড় মেলোডি।

সেই মেলোডির মধ্যে হয়তো আনন্দকুমার আর সুষমার সুর মিশে গেছে, ওদের দু’জনের দেখা হওয়ার আগেই। হয়তো দু’জন অচেনা নারী-পুরুষ যখন একইসঙ্গে মুষ্টিবদ্ধ হাত শূন্যে তুলে বলে উঠেছে, “আমরা কেউ জন্তু না/তাড়িয়ে দেওয়া চলবে না!” তখন বহু লক্ষ মাইল দূর থেকে নিয়তি পরিকল্পনা করছেন সেই দু’জনকে মিলিয়ে দেওয়ার।

“নিয়তি? আমাগো নিয়া ভাবার সময় নিয়তির আছে বইল্যা মনে হয় তোমার?” আনন্দকুমারের কথা শুনতে শুনতে হেসে উঠত সুষমা।

“কেন? আমরা কি নিয়তির বাইরে?”

“হ। আমরা দেশের ইতিহাসের বাইরে, ভূগোলের বাইরে, পরিকল্পনার বাইরে, উন্নতির বাইরে, নিয়তি আমাগো সেই যে ভিটা থিক্যা উচ্ছেদ কইরা ফুটপাথে বসাইয়া দিয়া গেসে, তারপর থিক্যা আমরা সবকিছুর বাইরে। কেবল মাঝে-মাঝে এক-একটা দুর্ঘটনা আমাগো নিজের ভিতরে টাইন্যা নিতে চায়। তোমার কাছে আসার আগে সেই দিন যেমন টানতে চাইসিল।” সুষমার গলাটা কেমন যেন অন্য রকম শোনাল শেষদিকটায়।

“কী বলছ, বুঝতে পারছি না।”

“তোমার না বুঝলেও চলত হয়তো, তবে জীবনে মিথ্যা কথা কই নাই তো, এখন ভিতরে কিছু গোপন করলেও, মনে লয় যেন মিথ্যা কইত্যাসি।”

“হেঁয়ালি না কইরা, বলো যা বলার।” আনন্দকুমারের কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল।

“যা কইলা সেইটা করতে দেখস কখনও আমারে?”

“দেখি নাই বইলাই...” আনন্দকুমার চুপ করে গেলেন।

“আচ্ছা, ওই কলোনিতে হাতি আসব গুজব রটছিল যেদিন সেইদিন আমি হঠাৎ তোমার কাছে দৌড়াইয়া গেলাম দেইখ্যা তোমার সন্দেহ হয় নাই? মনে হয় নাই, ক’দিনের পরিচয় যে ছেমরিটা আমার কাছেই আইল?”

“না, হয়নি। এর থেকে অনেক স্বল্প পরিচয়ে মানুষকে মানুষের কাছে ভেঙে পড়তে দেখেছি আমি। আমরা রিফিউজিরা তো একটা স্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে ছিলাম না, অকল্পনীয় একটা পরিস্থিতির মধ্যে পড়লে স্বাভাবিক-অস্বাভাবিকের সীমারেখা কাজ করে না।”

“সেইদিন সন্ধ্যায় আমিও অকল্পনীয় পরিস্থিতির মইধ্যেই পড়সিলাম।”

“সে আর বলা লাগবে কেন? কলোনি ভাঙতে হাতি আসছিল...”

“আমারে ভাঙতে হয়তো আরও বড় সর্বনাশ আইতাসিল...”

“মানে?”

“কইতে হলে পুরাটাই কওন লাগব। আমি তো ইস্কুলে মায়না পাইতাম না, সংসার চালানের লাইগ্যা টিউশানি পড়াইতাম। এইবার আমাগো রিফিউজিগো মইধ্যে পড়াইয়া টাকা দিব কে? আর কলকাত্তাইয়া বাড়িতে এন্ট্রি পাওয়াও বেবাক কঠিন আছিল। সেই সময় গোপালদার রেফারেন্সে আমি অ্যালেক্স টমসন সাহেবের বাড়িতে যাওয়ার চান্স পাই।”

“কও কী? সাহেব থাকত কই?”

“গলফ ক্লাবের কাছেই। বাড়িটার ভিতর এত সুন্দর একটা ফুলের বাগান ছিল, দেখলে পরে মন করত অনেকক্ষণ খাড়াইয়া থাকি। একটা সরাইল্যা কুত্তাও আছিল অবশ্য সাহেবের, তয় সে জানি না ক্যান আমারে খানিকটা পছন্দই করত। পা চাটত, গায়ের গন্ধ নিত, সেইটা খুব অস্বস্তির ব্যাপার আছিল যদিও। কিন্তু মাস গেলে তিরিশ টাকা যখন পাইতাম...”

“তবে যে কইসিলা, শাড়ি কিনতে পারো নাই স্কুলে সামান্য বোনাস দিসিল বইল্যা, সেইসব কি ঝুটমুঠ সিমপ্যাথি আদায় করনের লাইগ্যা?”

“আমি সিমপ্যাথি পাওনের লাইগ্যা জীবনে কখনও কিছু করি নাই। ভগবান যাগো সিমপ্যাথি দেখায় নাই, মাইনষের সিমপ্যাথিতে তাদের প্যাট ভরে না। হ, তুমি বিয়া করসো আমারে, মায়ের কথায় করসো, কিন্তু সেইটা যদি সিমপ্যাথির কারণে হয় তয় আমারে কইয়া দাও...”

“খামখা জটিল করতাসো... আমি একটা প্রশ্ন করসি কেবল...”

“না, তোমার প্রশ্নটায় আমি অপমানিত বোধ করসি। আর তাই ওই কথাগুলান আইল। যখন তোমারে শাড়ির কথা কইসিলাম, তখন আমি টিউশনিটা পাই নাই। গোপালদার লগে মোলাকাতও হয় নাই তখন।”

“এই গোপালদা লোকটা কে?”

“আমাগো মামার বাড়ির দিকের আত্মীয়। কুত্তার বিজ়নেস করত, ভাল ভাল কুত্তার বাচ্চা কম পয়সায় জোগাড় কইরা বেশি দামে বেচত। কলকাতায় আসার পর থিক্যা অর লগে কোনও যোগাযোগই ছিল না, আমরাও আগ বাড়াইয়া দেখা করতে যাই নাই, তা ছাড়া ঠিকানাও জানতাম না, কারও থিক্যা বাবার শরীর খারাপ শুইন্যা গোপালদাই একদিন কলোনিতে আইসিল দেখা করতে। পাতা-ঠিকানা হয়তো সেই দিয়া থাকব। এবার বাড়িতে কেউ আইস্যা না খাইয়া চইল্যা গেলে, বাবা খুব রাগ করত, গোপালদার ক্ষেত্রেও করতাসিল। ওদিকে সেদিন ঘরে একদানা চাল নাই।”

“তোমরা না খাইয়া ছিলা?”

“কয়জন রিফিউজি এপারে আইস্যা ভরপেট খাইত? তয় আমি ক্ষুধার বিরুদ্ধে একটা প্রতিষেধক আবিষ্কার করসিলাম।”

“ক্ষুধার প্রতিষেধক? তোমারে তো নোবেল দেওন লাগে?”

“হাইস্যো না। বিহারি ছাতুওয়ালাদের কাছ হইতে আমি শিখসিলাম একগ্লাস ছাতুর শরবত ক্যামনে প্রাণ বাচাইতে পারে মানুষের। পুষ্টিকর না ভুষ্টিকর জানি না, তয় খিদার মুখে ছাতু গুইল্যা একঘটি জল খাইলে, মানুষ অন্তত মরে না। তো গোপালদারেও সেইদিন ওই ছাতু গুইলাই দিসিলাম। ঘরে গ্লাস নাই, লজ্জার মাথা খাইয়া একটা সানকির বাটিতে, কিন্তু...”

“কিন্তু কী?”

“গোপালদা খাইতে গিয়া কাইন্দ্যা ফেলল। কইতে লাগল যে আমাগো বাড়িতে খাওন-দাওন শুরু হইত মৌরলা দিয়া, তারপর একদিন আইত চিতল, একদিন কই আর শেষ সবসময়ই হইত দুই-তিনরকম ইলিশ দিয়া, সইর্ষা দিয়া ভাপে কিংবা কলাপাতার পাতুরি কিংবা কচি কুমড়া আর কালাজিরা দিয়া ঝোল আর সেই একই বাড়িতে কিনা ছাতুর শরবত দিয়া...”

“বাড়ি তো এক ছিল না...”

“কিন্তু মানুষগুলি তো আর বেবাক বদলাইয়া যায় নাই...”

“পৃথিবীই বদলে গেছে। নিমপাতা ভাজার সঙ্গে গিমার বড়া ভাজা কী ভালবাসতাম! নিমপাতা বাজারে যাও বা মেলে, গিমা আর নাই।”

“তিতা যা, সবই আসে, স্বাদের জিনিস অমিল।” সুষমা হাসল একটু।

“সাহেবের বাড়িতে খাইতে দিত কিছু?”

“হ্যাঁ। মাখন টোস্ট। ডিমের পোচ। সেইটারে আবার কইত, ‘সানি সাইড আপ’। প্রথমটা লুকাইয়া নিয়া আসতাম সনু-ভনুর লাইগা, কিন্তু পরেরটা তো আর আনন যায় না। আরও নানাবিধ জিনিস দিত খাইতে। ওয়ালনাট কেক খাইসিলাম একদিন, জিভে লাইগ্যা আসে এখনও। গোপালদার সুপারিশে কিছু সাহেবি খানা পেটে পড়সিল, এইটা স্বীকার করতেই হইব।”

“গোপালদাকে সাহেব চিনল কীভাবে? আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, তুমি সাহেবের বাড়ি গিয়ে পড়াতে কাকে?”

“ওই কুত্তা কিনতে গিয়াই পরিচয়। সেই কুত্তা অবশ্য বাঁচে নাই, সাহেবের থিক্যা শুনসিলাম। সে যাউক। আর আমি পড়াইতাম সাহেবের মা-মরা ছোট মাইয়াটারে।”

“কী পড়াতে?”

“ক্যান, বাংলা। অবাক হইয়ো না, সাহেব কলকাতারে এমনই ভালবাসছিল যে লন্ডনে ফিরা যাইবার কথা ভাবতেও পারত না আর। বরং শয়নে-স্বপনে কলকাতার কথাই কইত। কতটা ভাল কান আসিল যে, আমার উচ্চারণ যে কলকাত্তাইয়া নয়, সেইটা ধইরা ফালাইসিল প্রথম দিনেই।”

“তা তুমি নিজের উচ্চারণ ঠিক করে নাও না কেন? কলকাতায় থাকলে...”

“তুমিও তো কও মাঝে মাঝে!” সুষমা ফুট কাটল।

“রেয়ারলি কই। ইমোশনাল হইয়া গেলে পরে কই। তোমার মতো হরবখত নয়।” আনন্দকুমার জবাব দিলেন।

“আসলে কিছুই তো আর নিয়া আসতে পারি নাই এই শব্দগুলি ছাড়া। সেই যন্ত্রণা কিন্তু সাহেবও বুঝত। মাঝে মাঝে আমার ছোটবেলার গল্প শুনতে চাইত। আর লন্ডনের প্রসঙ্গ উঠলেই কইত, ‘ওন্ট গো ব্যাক। দ্য বিটার কোল্ড অফ ইংল্যান্ড উইল কিল মি...’”

“শীতে ভয়? সাহেব কি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ছিলেন?”

“না। সমারসেট কাউন্টির লোক। মেমসাহেব মারা যাওনের পর বড় মেয়েরে পাঠাইয়া দিসিলেন ওইখানে। কিন্তু নিজে কলকাতা ছাড়নের কথা ভাবতে পারতেন না। কলকাতায় থাকবেন বইলাই মাইয়ারে বাংলা শিখাইতে চান, গোপালদা কইসিল।

“এতদিন রাজত্ব করেছেন তো...”

“তা নয়। কীরকম য্যান জড়াইয়া গেসিল বাংলার মাটির সঙ্গে। সেইসব দেইখ্যাই আমি সেই সন্ধ্যায় সনু আর ভনুরে নিয়া সাহেবের দরজায় গেসিলাম প্রথমে। অগো কীভাবে বাচামু মাথায় আইতাসিল না।”

“টমসন কী কইল?”

“খুশিই হইল। অন্তত রাগ তো করে নাই। খইয়ের মতো একটা জিনিস, নাম কইতে পারুম না, উপরে দুধ ঢাইল্যা খাইতে হয়, আগাইয়া দিল দুইজনের দিকেই।”

“তারপর?”

“আমারে জিজ্ঞাসা করল, আমি কী খাইতে চাই। আমি চুপ কইরা ছিলাম, সাহেব আমার পিছনে আইসা কইল যে যতদিন এই টমসন ভিলা আছে, আমাগো থাকনের জায়গার অভাব হইব না। কিন্তু কথাটা কওনের সময় সাহেবের নিশ্বাস আমার পিঠে লাগতাসিল...”

“চুপ করলা ক্যান? কও?”

“আমার বাপেরে আমি বহুবার কইতাম যে যদি ইংরাজরা চইল্যা যাইতেই আমাগো ভাগ্যে এত বড় সর্বনাশ নাইম্যা আইল, ইংরাজগো তাড়ানোর দরকার কী আসিল? বাবা কইত যে ইংরাজের শাসনে না থাকলে পরে নাকি কথাটা বুঝন যায় না। সেই সন্ধ্যায় কথাটা কইতে কইতে টমসন সাহেব যখন আমার পিঠে হাত রাখল, আমার মনে লাগল যে আমি ইংরাজের ডাইরেক্ট শাসনে চইলা আইলাম। আর মনে হওয়ামাত্র আমি ডুকরাইয়া কাইন্দ্যা উঠলাম। কিন্তু সাহেব ভাল মানুষ আসিল। আমারে কানতে দেইখ্যা সঙ্গে সঙ্গে মার্জনা চাইল।”

“সে তো সব আসামিই চায়। পরিস্থিতি ঘোরালো হইয়া উঠলে।”

“সাহেব আসামি ছিল না। গোপালদা, ওরে দাদা কইতে ঘৃণা লাগে, মিষ্টির মোড়কে বিষ একটা, সাহেবের থিক্যা আমার নাম কইর‌্যা তিনহাজার টাকা নিয়া গেসিল।”

“তোমারে বেইচ্যা?”

“টমসন কিনতে চায় নাই। সে একটা বাঙালি মেয়ের লগে সংসার করতে চাইসিল। তাতে অন্যায় কী আসে? অন্যায় তো করসিল গোপাল, মিথ্যামিথ্যি ‘আমি রাজি আছি’ এই খবর সাহেবরে শুনাইয়া।”

“ধরো নাই শালারে?”

“কই পামু? ওর ঠিকানা জানতাম না আগেই কইসি...”

“কিন্তু সেই রাতে তোমার একটা ঠিকানা তো...”

“আমি ওইরকম ঠিকানা চাই নাই। সেদিন রাতে মরণও সামনে খাড়াইয়া থাকতে পারে এমন অবস্থাতেও আমি চোখ বন্ধ কইরা কী দ্যাখলাম জানো? আমাগো গ্রামের বাড়িতে কালীপূজা উপলক্ষে জোর খাওয়াদাওয়া, আট-দশটা বলি হইসে, প্রসাদী মাংস রান্না হইতাসে পিয়াজ রসুন ছাড়া আর তার মধ্যেই দুইটা পোলাপান লইয়া এক বৈষ্ণব দম্পতি রাতের আশ্রয়ের জন্য উঠানে আইসা দাড়াইসে। অগো সবাই প্রসাদ পাইতে অনুরোধ করল, বাবা তো পারলে হাতে-পায়ে ধরে কিন্তু অরা উত্তরে শুধু কইল, ‘আমাদের একটু আগুনের ব্যবস্থা করে দিন।’”

“আগুন দিয়া কী করব?”

“সারাদিন ভিক্ষা কইরা যে চাল-আলু পাইসে, সেইটাই ফুটাইয়া খাইব, নিজেদের লগে থাকা মাটির পাতিলে। আর তার জন্য প্রয়োজনের আগুনটুকু নিব শুধু। তার বেশি কিচ্ছু না। আমি জীবিকা অর্জন করতে সাহেবের বাড়ি গেসি, আমি সাহেবরে স্বামিত্বে বরণ করতে যাই নাই।”

“থাকার কষ্ট, খাওয়ার কষ্ট সব এক লহমায় দূর হয়ে যেত...”

“তার চাইতেও বড় কষ্ট ছিল। স্নানের কষ্ট। রাস্তার ধারের টিউকলে বইস্যা চোখ ফাইট্যা জল আইত গ্রামের কথা ভাইব্যা। সাহেবের বাড়ির বাথরুমে ঢুইক্যা, ওই তোমার শাওয়ার না কী কয়, ভুল কইরা ঘুরাইয়া ফেলসিলাম একদিন। ঝরঝর কইরা জল নাইমা আইসে, ওপারে ঢেউ আইত যেমন কইরা...”

“তা হলে রাজি হলে না কেন?”

“ওই যে কইলাম, ওই দম্পতি কেবল আগুন চাইসিল। এবার অগো সঙ্গে থাকা বাচ্চা দুইটার কি ইচ্ছা হয় নাই, খাইতে? আমার ভিতরের বাচ্চাটারও হইসিল। কিন্তু আমি তারে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারসিলাম, আমি তারে বুঝাইতে পারসিলাম, লোভের কাছে নতিস্বীকার আমার সংস্কার নয়।”

“সেদিন যদি দেখা না হত আমার সঙ্গে? যদি সনু-ভনুকে রাস্তায় বসিয়েই আবার দৌড়ে যেতে হত কলোনিতে?”

“হয় তো নাই।”

“কিন্তু যা হল তাতেই বা লাভ কী হল? শেষ অবধি তোমার সংস্কার তোমারে কী দিল সুষমা?”

“আগুন দিসে। আগুনের মতো শুদ্ধ একটা মানুষ দিসে। শাওয়ারের কল আর জলের চাইতে অনেক দামি।” বলতে বলতে আনন্দকুমারকে জড়িয়ে ধরল সুষমা।

জলের ভিতর আগুনের স্রোত দাম্পত্যের মাচায় লকলকিয়ে উঠল।

টালির নালা দিয়ে আরও অনেক জল, কচুরিপানা ঠেলে আরও অনেকদূর এগিয়ে যাওয়ার পর একদিন ঘরে এসে বার্স্ট করল সুষমা। ততদিনে ওর মাইনে ষাট টাকা হয়েছে, আনন্দকুমারের উপার্জনও বেড়েছে খানিকটা। সনু-ভনু গায়ে-গতরে বেশ অনেকটা বড় হয়ে উঠেছে, সুষমার বাবা পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পর আনন্দকুমার চাইলেও সুষমা চায়নি যে ওরা এই বাড়িতে চলে আসুক, যেহেতু ওরা চলে এলে অরবিন্দ কলোনির বাড়িটা হাতছাড়া হয়ে যাবে। আপাতত সুষমার এক পিসি ওদের ওই বাড়িতে থেকেই দেখভাল করছেন। আনন্দকুমারের মা-ও আচমকা একদিন দুপুরে জীবন থেকে কাচের ফ্রেমে চলে গেছেন, সুধাংশু কলেজের হস্টেলে, ভাড়াবাড়ির ওই একতলাটা মালিক মারা যাওয়ার পর তার ছেলের থেকে কিনে নেওয়ার কথা ভাবছেন আনন্দকুমার।

“কিন্তু কেন? কী লাভ আমাদের বাড়ি কিনে? কে থাকবে সেই বাড়িতে? সকাল থেকে রাত্রি আমরা দু’জন তো বাইরে।” সুষমা প্রায় চিৎকার করে উঠল।

“আমরা রাতে তো ফিরব?”

“কেন ফিরব? কার কাছে ফিরব? তোমার মুখে ‘সতর্ক থাকতে হবে, অ্যাক্সিডেন্টালি কিছু হয়ে গেলে অ্যাফর্ড করা মুশকিল’ শোনার জন্য ফেরার দরকারটা কী?”

“তুমি কিন্তু এখন একদম ক্যালকেশিয়ান ঢঙে কথা বলতে শিখে গেছ সুষমা।”

“রাখো তোমার রসিকতা। আমার কথার জবাব দাও। আমরা বিয়ে করেছিলাম কী জন্যে?”

“বাঁচার জন্য।”

“আমাদের মৃত্যুর পর কে বাঁচাবে আমাদের?”

“বেঁচে থাকতেই কেউ বাঁচাচ্ছে না...”

“এটা কোনও কথা নয়। আজ আমাদের স্কুলে খুব ঝামেলা হয়েছে।”

“কী নিয়ে?”

“কয়েকজন গার্জিয়ান, যাদের মধ্যে কেউ কেউ এই দশ বছরে পয়সা করেছে, চাইছে যে ‘নতুননগর সম্মিলিত উদ্বাস্তু বালিকা বিদ্যালয়’-এর নাম থেকে ‘উদ্বাস্তু’ শব্দটা কেটে বাদ দিতে।”

“কিন্তু কেন?”

“কারণ ‘উদ্বাস্তু’ শব্দটা স্কুলের সঙ্গে লেগে থাকলে তাদের প্রেস্টিজে লাগে সেই স্কুলে নিজেদের মেয়েদের পাঠাতে। পাশের বয়েজ় স্কুলের ক্ষেত্রেও নাকি এই দাবি ফিসফাসের মতো উঠতে শুরু করেছে। ওই স্কুলের পিওন রামরনের মুখে শুনলাম।”

“কী বলছ সুষমা? হিমালয়ের, বরফে লজ্জা?”

“অত উপমা জানি না। কিন্তু এটুকু বুঝছি যে আমাদের ভিতরকার অনেকেরই এখন ‘উদ্বাস্তু’ কিংবা ওইরকম শব্দে আপত্তি জন্মাতে শুরু করেছে। সেদিনই কোথায় নাকি ‘বাস্তুহারা ব্যবসায়ী সমিতি’-র নাম পালটে ‘অগ্রণী ব্যবসায়ী সমিতি’ রাখা হয়েছে।”

“যা ছিল আইডেন্টিটি, তাই আজ লাগেজ? আমরা নিজেরাই নিজেদের ইতিহাস মুছে দেব?”

“তোমার মতো লোকও তো তাই করছে।”

“আমি? আমাকে কেন দায়ী করছ?”

“আমাদের দু’জনের সন্তান আসুক, সেটা চায়নি কে?”

“যে যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে গেছি, আমি একা নই, তুমিও, তাতে নতুন কাউকে আনার ব্যাপারে কেন দ্বিধা কাজ করে, তুমি বোঝো না?”

“বুঝতে চাই না। পৃথিবীতে কোনকালে দুধ আর মধুর বন্যা বইবে, ততদিন অপেক্ষা করতে হলে আমাকে আরও দু’বার মরে জন্মাতে হবে। যন্ত্রণার ভিতরেই আসুক না সন্তান। যন্ত্রণাকে চিনতে চিনতে নিজের শিকড় চিনবে, বাবা-মাকে চিনবে, ইতিহাসকে চিনবে।”

আনন্দকুমার চুপ করে গেলেন। ওঁর মনে হল, সুষমা ঠিকই বলছে। ‘প্রমিসড ল্যান্ড’-এ যদি প্রতিশ্রুতির মানুষই না আসে তা হলে আর সেই জমির কী মূল্য? আজাদগড় থেকে বিজয়গড়, ওদিকে মাইকেল কলোনি থেকে অশ্বিনী দত্ত উপনিবেশ, কত কত নয়াবাদ গড়ে উঠল আর নয়া প্রজন্ম আসবে না? তা হলে কার জন্য এত লড়াই, ধারাই যদি না রইল তো স্মৃতিধারা বাঁচিয়ে রাখবে কে?

মাসতিনেক পরের এক রাতে ঘুমটা ভেঙে যেতেই, অভ্যাসে হাতটা বাড়িয়ে আনন্দকুমার দেখলেন যে সুষমা পাশে নেই। ইলেকট্রিক কানেকশন নিলেও কলকাতা সংলগ্ন এই অঞ্চলে বেশির ভাগ সময়েই লোডশেডিং। কেরোসিনও দুর্মূল্য। ঘরে তাই মোমবাতি ব্যবহার করা হয়, আলো না-থাকলে। সেই মোমবাতিটা নিভে গেছে, ওদিকে সুষমাও নেই। আনন্দকুমার অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে বাইরে বেরোলেন। চোখ সয়ে যেতে দেখলেন, ওঁদের ঘর-লাগোয়া ছোট বারান্দাটায় সুষমা উবু হয়ে বসে আছে আর মাঝে মাঝে ‘ওয়াক’ শব্দ তুলছে।

পাশে রাখা বালতি থেকে মগে করে জল তুলে নিয়ে মুখে-চোখে ছিটোচ্ছে সুষমা, আনন্দকুমার এগিয়ে গিয়ে নিজের স্ত্রীর পিঠে হাত রাখলেন। কোনও কথা বললেন না।

সুষমা একটুও না চমকে একদম স্বাভাবিক গলায় বলল, “ইতিহাসটা মনে হচ্ছে আবার নতুন করে তৈরি হবে, জানো!”

ভবানীপুর, কলকাতা

নিয়তি পরের মুহূর্তে কোন তাসটা খেলে দেবে কেউ জানে না, তবু নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করেই বাঁচতে চায় মানুষ। একেবারে ষোলো ঘণ্টার জন্য একটা ফ্লাইটে উঠে সিটবেল্ট বেঁধে নিল জয়ী, যন্ত্রচালিত রোবটের মতো। আর প্লেনটা টেক অফ করতেই ওর মনে হল, প্লেনটা যদি হারিয়ে যায় কোনও বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে, যদি কিউমুলাস আর কিউমুলোনিম্বাস মেঘের সংঘাতে চুরমার হয়ে যায় এই অ্যালুমিনিয়ামের শরীর, যদি কোনও মিসাইল এসে চূর্ণ করে দেয় আকাশে ভেসে থাকা এই ঘর কিংবা হোটেলটাকে যার ভিতরে এখন দুশোর বেশি লোক সিনেমা দেখছে নয়তো জল চাইছে আর নইলে কম্বলের গায়ে একটা দাগ আছে বলে সেটাকে পালটে দিতে বলছে এয়ার-হস্টেসকে? সত্যিই, কত তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে প্রতিক্ষণ মগ্ন থাকে মানুষ, কত মিথ্যেকে সত্যি বলে আঁকড়ে থাকে আর তাই হয়তো বেঁচে থাকে, জয়ীর মতো সত্যের ভিতরের সত্য, শিকড়ের ভিতরের শিকড় খুঁজতে গিয়ে একদম একা আর নিঃসম্বল হয়ে যাওয়া তো কোনও মানুষের প্রার্থিত হতে পারে না।

প্রথমে ইংরেজি, তারপর বাংলা এবং ফ্রেঞ্চ হয়ে মালয়ালম, শেষে হিন্দি, কোনও ভাষার ছবিতেই মন বসাতে না পেরে সামনের স্ক্রিনটা অন্ধকার করে দিয়ে একটু ঘুমোনোর চেষ্টা শুরু করল জয়ী। ট্রেন বা বাস কিংবা গাড়িতে বাইরের দৃশ্যের দিকে কাটিয়ে সময় পার করে দেওয়া যায়, কিন্তু বিমানের ভিতর থেকে বাইরে তাকালেও এত একঘেয়ে দৃশ্য যে ঘুমোনো ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প থাকে না হাতে। কিন্তু সেই ঘুমই কি সহজে আসে? বিশেষ করে যখন তাকে ডাকা হয়?

হাজারও কাঁটা জয়ীকে বিঁধছিল সেফটিপিনের মতো। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কাঁটাটা হল, অরণ্য এত জড়িয়ে, এত ভরিয়ে আদর করত ওকে যে শরীরের সঙ্গে শরীরের সঙ্গতে অসংখ্য সুর জন্ম নিয়েছে জয়ীর মধ্যে। আচ্ছা সেই সুরের সবক’টাই কি কর্কশ চিৎকার হয়ে জয়ীকে আক্রমণ করবে আরও যতদিন জয়ী বাঁচবে?

টয়লেটে গিয়ে মুখে চোখে জলের ঝাপটা দিল জয়ী। আর যাওয়ার পথে টলমল করে হাঁটতে থাকা ছোট বাচ্চাটাকে আদর করার সূত্রে ওর লজ্জা করতে শুরু হল একটু আগের ভাবনাগুলোর জন্য। কীভাবে অতটা স্বার্থপর হল ও? এই প্লেনটার ধ্বংস চাইবার মতো স্বার্থপর? এই বিমানের মধ্যে যে এত এত শিশু-কিশোর-যুবক-যুবতী-বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, তাদের প্রত্যেকের জীবন তো জড়িয়ে আছে নাম না-জানা আরও অসংখ্য মানুষের সঙ্গে, একটা পরিচয় কিংবা আত্মীয়তার বুদ্বুদ যেখানে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য সম্পর্কের মায়াজাল। সেই সমস্ত সম্পর্কের ভিতর না জানি কত স্বপ্ন আর কত ভালবাসা আছে, জয়ী কীভাবে নিজেকে শেষ করার ইচ্ছেয় তাদের সবক’টাকে শেষ করে দিতে চাইল?

না, শেষ হবে না। শুরু হবে। জয়ীর নিজের জীবনও নতুন করে শুরু হবে একদম যেখানে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের মূল্য ভেঙে যাওয়া কাচের গ্লাসের চাইতে এক পয়সা বেশি হবে না। কে অরণ্য, যার বিহনে জয়ীর জীবন একেবারে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে? বরং অনেক বেশি জরুরি ওই স্পন্দন নামের ছেলেটাকে খুঁজে বের করা, যে ভালবাসায় বিশ্বাস করে আজ কোনও মানসিক হাসপাতালের কুঠুরির মধ্যে বসে আছে হয়তো। জয়ী পারবে না ওকে খুঁজে বের করে, ওর মাথাটা নিজের দু’হাতের মধ্যে নিয়ে অনেকগুলো চুমু খেতে, যাতে সব অসুখ ওকে ছেড়ে পালিয়ে যায়, চিরতরে? কিন্তু জয়ীর চুমুর ভিতরে তো কোনও ওষুধ নেই, থাকলে এত বিশ্বাসঘাতকতার অসুখ অভিরাজ আর তারপর অরণ্যর মধ্যেও দেখা দিত না! আচ্ছা অভিরাজ যেটা করেছিল তা কি বিশ্বাসঘাতকতার পর্যায়ে পড়ে? ওই ছেলেটা তো নিজেই প্রবৃত্তিতাড়িত একটা পশু, আর পশু কি বিশ্বাসঘাতকতার মানে বোঝে? যদি ওকে কেউ আক্ষরিক অর্থেই ঠকিয়ে থাকে তা হলে সে অরণ্য! অরণ্য সত্য গোপন করে, একটা সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে না এসে ওকে নিজের জীবনে টেনেছিল, আর যদি জয়ী ওকে বিয়ের কথা বলে চাপ না দিত, তা হলে ওই কেচ্ছা প্রকাশও করত না কোনওদিন! এমন নয় তো যে অরণ্য ওকে নিজের জীবন থেকে সরাবে বলেই অহনার কল্প-কাহিনি সামনে নিয়ে এল? হতেই পারে যে অহনা বলে কেউ নেই, অরণ্য আবার কোনও হলুদ কিংবা লাল চুলের মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আর এবারে ওই আগের বস্তাপচা মানবিকতার গল্প চলবে না বলে আগেভাগেই জয়ীকে সরিয়ে দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার রাখতে চেয়েছে?

কিন্তু অহনা যদি না থাকে, তা হলে তো স্পন্দনও নেই। অরণ্য কি স্পন্দনের গল্প পর্যন্ত বানাল? না, অতখানি শরৎচন্দ্র হওয়ার ক্ষমতা নেই অরণ্যর। ভাবতে গিয়ে হেসে ফেলল জয়ী। কিন্তু সেই হাসিটাই জয়ীর আইল সিটের পাশ দিয়ে টয়লেটের দিকে ধীর লয়ে এগিয়ে যাওয়া এক মহিলাকে দেখে আতঙ্কে পর্যবসিত হল। ভদ্রমহিলার সামনের দিকে এগিয়ে থাকা পেটের ভিতরে যে প্রাণ পৃথিবীতে আসার জন্য উন্মুখ, তা জয়ীকে ফিলাডেলফিয়া এবং কয়েকদিন আগের মিশিগানে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। ওর তো কোনও নিরাপত্তা ছিল না, ও অরণ্যকেই নিজের নিরাপত্তা ভেবে সমর্পণ করেছিল নিজের সবটুকু। সেই সমর্পণের পরিণাম কী হবে? জয়ীর গর্ভেও কি অঙ্কুরিত হবে অবাঞ্ছিত প্রাণ কোনও? মরুঝড় কি ক্যাকটাস চারিয়ে দেবে, যার হাত থেকে নিস্তার নেই কোনও? না কি কোথাও একটা মরূদ্যান অপেক্ষা করছে, পরদার আড়ালে ঠিক সময়ে আবির্ভূত হবে বলে?

জয়ী আর ভাবতে পারছিল না। আইল সিটে বসেই জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল, আকাশটা ডিমের কুসুমের রং ধরছে, ভোর হয়ে আসছে তাই। বিমান থেকে দেখা আকাশ এই একটা সময়ে অন্তত অপূর্ব, একটুও আলুনি নয় তার বর্ণ আর আবহ। জয়ীদের স্কুলের এক শিক্ষিকা সুলতাদি বলতেন যে মির‌্যাকল নাকি রোজ ঘটে। জয়ীরা অনেকেই হাসত কথাটা শুনে। কিন্তু এখন এই উড়োজাহাজে বসে মনে হচ্ছিল যে কথাটা একশো শতাংশ সত্যি। এই সূর্যোদয়ই তো সেই মির‌্যাকল যা ভোরের জন্ম দিতে ক্লান্ত হয় না লক্ষ-লক্ষ বছর। আর কচুরির ভিতরে কড়াইশুঁটির মতো প্রতিটা ভোরের মধ্যে মিশিয়ে দেয় নতুন স্বপ্ন আর প্রত্যাশা।

প্রাথমিক কিছু দ্বিধা-অবরোধ, যা সমস্ত সম্পর্কের শুরুর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে, কাটিয়ে অরণ্যকে এমনভাবে গ্রহণ করেছিল জয়ী যেন অরণ্য সেই দূরদেশি রাখাল ছেলে যার জন্য রাজকন্যার মালা প্রতীক্ষায় আছে। সেই মালা যদি আজ ধুলোয় গড়ায়, তা হলে দোষ মালা যে গেঁথেছে তার নয়, মালা যে পরতে পারেনি তার। ভাবতে ভাবতে চোখটা লেগে গিয়েছিল জয়ীর। আর সেই বন্ধ চোখের মাঝখানে হঠাৎ ফিরে এল একটা পুরনো স্মৃতি, স্বপ্নের চেহারা নিয়ে।

কমলেশ চৌধুরী যখন মিতালি বোসের সৌজন্যে ছেলের বাবা হয়ে ওর মাকে ফোন করে জানিয়েছিল যে সবার ভাগ্যে ছেলের মা হওয়া থাকে না, তারপরও জয়ীর মা লোকটাকে যৎপরোনাস্তি অপমান করতে পারেনি। অনেক আগাপাশতলা খারাপ লোককে দেখলে যেমন গা-পিত্তি জ্বলে যায়, অনেক আদ্যোপান্ত ভাল লোককে দেখলেও ঠিক সেটাই হয়। ওর মা ছিল তেমনই একজন মানুষ। মানুষ যে ঠিক কতটা সহ্য করতে পারে, সেই বোধ হারিয়ে যেত ওই ভদ্রমহিলাকে দেখলে। মাঝে-মাঝে ওর কথা শুনে জয়ীর ইচ্ছে হত যে চিৎকার করে কাঁদে কিংবা ঝাঁপিয়ে গিয়ে খিমচে-কামড়ে দেয়, তবু শেষ পর্যন্ত বিশেষ কিছুই করতে না েপরে মায়ের কথাই মেনে নিত, কারণ যে জীবনের থেকে অত জ্বালা সয়েছে তাকে নতুন করে জ্বালা দিতে ইচ্ছে করত না।

সয়ে নিতে গিয়ে অনেক ভুল করেছে জয়ী। যেমন বাবার ওই দ্বিতীয় পক্ষের ছেলের জন্মদিনে কিছুতেই যাওয়া উচিত ছিল না ওর। কিন্তু মায়ের ঘ্যানঘ্যান এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছিল যে বারংবার না বলেও অবশেষে সামান্য প্রসাধন করে বাড়ির গাড়িতে গিয়ে চেপে বসেছিল ও। যেত না, মা যে লোকটার জন্য গায়ে আগুন লাগাতে গিয়েছিল, তার কোনও অনুষ্ঠানে হারগিস যেত না কিন্তু ততদিনে মারণরোগ মায়ের শরীরে ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। জয়ীর কেবলই মনে হত যে মায়ের কথা, তা সে যত অন্যায়ই হোক, নির্বিচারে মেনে নিলে, সেই খুশিটা হয়তো মানুষটাকে বাঁচিয়ে রাখবে আর কয়েকটা দিন।

সেই ধারণা থেকেই কমলেশ চৌধুরীর ছেলের পাঁচবছরের জন্মদিনে জয়ী গিয়েছিল, ওদেরই আর একটা বাড়িতে, যেটা ওই লোকটা তখনও বেচে খেয়ে নিতে পারেনি।

“কীরকম লাগল রে সবকিছু?” ফিরে আসার পর মা জিজ্ঞেস করেছিল।

জয়ী বলে উঠেছিল, “যুধিষ্ঠিরের নরকদর্শনের মতো মা, একদম যুধিষ্ঠিরের নরকদর্শনের মতো।” বলেই বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়েছিল শাওয়ারের নীচে, যদি গরম জল চরম সমস্ত অপমানকে ধুইয়ে দিতে পারে।

কিন্তু অপমান যে মেশিনের কালির চাইতেও ঘন! গন্ডারের চামড়ার চাইতেও পুরু!

কমলেশ চৌধুরী লেকচার দিচ্ছিল ছেলের জন্মদিনের দিন, “ছোটবেলায় আমি যখন বাবা-মা’র সঙ্গে ইউরোপ গিয়েছি, তখন কলকাতা থেকেই সব ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটগুলো ছাড়ত। তখন বাঙালির অন্য রেলা ছিল। তারপর এল সব ঘেরাও আর ধর্মঘটের দিন, বিরাট বড় বড় শিল্পপতিকে রাস্তায় হেকল করা শুরু হল, দু’-একজনকে তো আন্ডারওয়্যার পরিয়েও হাঁটিয়েছে, তারা আর কোন দুঃখে কলকাতায় থাকবে বলো? পাততাড়ি গোটাল, তার সঙ্গে পুঁজিও পালাল। আর এইসব ফ্লাইট ওঠা-নামার ম্যাপে, কলকাতা হয়ে দাঁড়াল একটা গ্লোরিফায়িড গঞ্জ, যেখানে চিনের চেলারা দিন-রাত চেঁচাতে থাকল, ‘ব্যাবসা খারাপ, শিল্প খারাপ’। ওরে হতভাগা, চায়না গিয়ে দেখে আয়, ইন্ডাস্ট্রিতে কী করেছে দেশটা...”

সুধন্য সরকার বলে ওর এক পুরনো বন্ধু এই সময় বলে উঠল, “চিন কিংবা আমেরিকার কথা বাদ দাও। তুমি নিজেদের ফ্যামিলির ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে একের পর এক ডোবালে কেন, সেই কথা বলো।”

হয়তো পেটে দু’পাত্র পড়েছিল বলে খানিকটা বেসামাল হয়েছিল লোকটা, কিন্তু কমলেশ তাতে ওরকম অভদ্রতা করবে কেউ আন্দাজ করেনি।

“পঞ্চাশ পেরিয়ে ছেলের বাপ হয়েছি। তোমার মতো মেয়েদের বিয়ে দিয়ে জামাইয়ের হাততোলা হয়ে থাকতে হবে না।”

“ছেলের বাপ হলে কি দুটোর বদলে চারটে হাত হয়?” সুধন্য সরকার জবাব দিল।

কমলেশের মেজাজ তখন সপ্তমে, “পিণ্ডলোপ হয় না, বুঝলে? ছেলে আছে বলেই আমার মৃত্যুর পর আমি পিণ্ড পাব আর নেই বলে তুমি পাবে না।”

সুধন্যও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়, “অবৈধ পুত্রও কি পিণ্ডদানের অধিকারী?”

“মানে?”

“মানে, তুমি তো এক বউ রেখে আবার বিয়ে করেছ, তাই বলছিলাম যে ভারতীয় আইন অনুযায়ী তোমার এই অবৈধ পুত্র তোমার ঠিকঠাক উত্তরাধিকারী তো?”

কমলেশ একটা বন্য জন্তুর মতো তেড়ে গেল সুধন্যর দিকে, কিন্তু দু’জনের হাতাহাতি শুরু হওয়ার আগেই কারা যেন দু’জনকে আলাদা করে দিল। সুধন্য সরকার গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে, কিন্তু যে পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়ে গেল, তাতে জয়ীর দম নিতে অসুবিধে হচ্ছিল। বারবার, ‘ওয়ারিশন’, ‘পুত্রসন্তান’, ‘বংশগৌরব’ কথাগুলো ফিরে ফিরে আসছিল নানা জনের মুখে আর জয়ীর মনে হচ্ছিল যে জন্মদিনের অনুষ্ঠানের বদলে এটা আসলে সেই শ্মশানকালীর পুজো যার গল্প ও দিদুনের মুখে শুনেছে অনেকবার। সেই পূজার রাতে যেমন পাঁঠা কিংবা মোষ অথবা মানুষেরও কাটামুন্ডু গড়ায় মাটিতে আর শেয়াল এসে চেটে খায় তার ভিতরের রক্ত, তেমনই ওই বাচ্চার জন্মদিনে নিরন্তর লেখা হচ্ছে জয়ী আর ওর মায়ের ডেথ-সার্টিফিকেট আর ওই ফিশফ্রাই আর কেকের ভিতর থেকেও গড়িয়ে পড়ছে কাঁচা রক্তের চাইতেও লাল অসম্মানের ফোয়ারা, যা জয়ীর নতুন স্কার্ট আর টপকে ভিজিয়ে দিচ্ছে গ্লানিতে।

ছেলে, ছেলে, ছেলে। ছেলে বংশরক্ষা করবে, ছেলে পিণ্ড দেবে গয়ায় গিয়ে। একই রক্ত, এক ঐতিহ্য শিরা-ধমনীতে বইলেও মেয়ের সেই অধিকার নেই। ছেলে যেন আকাশ-প্রদীপ আর মেয়ে যেন মাটির পিদিম। জয়ীর ভিতরটা এমন তোলপাড় করছিল যে মনে হচ্ছিল ওর সামনে কোনও মানুষ নেই, কেবল পুত্র-প্রত্যাশী কিছু পুতুল ঘুরে বেড়াচ্ছে যারা নিজেদের মৃত্যুর পরের পিণ্ডের বিমা সুনিশ্চিত করার জন্য, সন্তানের জীবন পর্যন্ত ছারখার করে দিতে পারে।

নীরবে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল জয়ী আর তখনই পিছন থেকে ওর বাবা ডাকল।

বাবা তো ডাকার মতো অবস্থায় ছিল না। তবে কি বাবার ওই ‘দ্বিতীয় পক্ষ’ বাবাকে খোঁচা দিয়ে দেখাল যে বাবার ‘প্রথম পক্ষ’-এর মেয়ে কিছু না খেয়ে চুপচাপ চলে যাচ্ছে? একবুক হিংসে থেকে অকল্যাণ কামনা করে চলে যাচ্ছে?

যাচ্ছে তো যাচ্ছে। যেখানে মাথায় আবর্জনা ঢেলে দেওয়া হচ্ছে, বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে ছেলের বাবা হওয়ার পরই পূর্ণ হয়েছেন চৌধুরীবাবু, সেখানে কিছু দাঁতে কাটতে পারবে না জয়ী।

প্রায় দৌড়ে বাড়ির গাড়িটার কাছে এসে জয়ী চেঁচিয়ে উঠল, “এক্ষুনি বাড়ি ফিরতে হবে, এক্ষুনি। আমার ভীষণ বাথরুম পেয়েছে।”

পুরনো ড্রাইভার সুবলদার চোখে খেলা করে গিয়েছিল বিস্ময় হয়তো। হয়তো ভেবেছিল, কেন জয়ী বাথরুম সেরে এল না? কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই না বলে জয়ীকে রেহাই দিয়েছিল লোকটা।

তবু রেহাই যে সহজ নয়, তা তো নিজেদের বাড়িতে ঢোকার পরও অনুভব করছিল জয়ী। দীর্ঘ স্নানের শেষে ও তাই মাকে এড়িয়ে ছুটে গিয়েছিল দিদুনের কাছে, আছড়ে পড়েছিল কান্নায়। গোঙানির ভিতর দিয়ে বলেছিল সেই সমস্ত কথা যা হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাগ্মী এসেও শব্দে বুঝিয়ে বলতে পারতেন না।

শুনতে শুনতে দিদুন ওকে নিয়ে গিয়েছিল তিনতলার সেই ঘরে, যেখানে জয়ীর কোমরে কিংবা পায়ে যাতে ব্যথা না হয় তার জন্য, নীচে ফোম আর উপরে প্লাইউড দিয়ে ঘরের মেঝেয় বিরাট এক আয়তক্ষেত্র বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল দিদুনেরই নির্দেশে, জয়ী নাচবে বলে।

সেই নৃত্যের প্রথম এবং প্রধান দর্শক ছিলেন নটরাজ, যাঁকে জয়ী কখনওই এক কালো পাথরের মূর্তি বলে ভাবতে পারেনি। জয়ীর কাছে সে-ই ছিল পৃথিবীর সর্বোত্তম প্রেমিক, যে গঙ্গাকে জটায় ধারণ করেছিল বলেই পার্বতীকে ধারণ করেছিল শরীরে। যাতে পার্বতীর ঈর্ষা না হয়, সে অনিশ্চয়তায় না ভোগে। সতীকে মাথায় চাপিয়ে তার ওই নাচ মৃত্যুকে মাথায় ধারণ করে জীবনের নাচ বলেই পরে অনেকবার মনে হয়েছে জয়ীর। কিন্তু সেদিন অত কিছু উপলব্ধি করার মতো বয়স কিংবা মনের অবস্থা ছিল না।

জয়ী কেবল শুনতে পেয়েছিল দিদুনের গলায়, “পৃথিবীতে ওই উনিই প্রকৃত পুরুষ, যিনি স্বেচ্ছায় অর্ধনারীশ্বর হয়েছেন। মনে রাখবে, নারীকে যে নিজের ধ্যানে ধরতে পারে না, সে পুরুষই নয়।”

সেই আদিপুরুষ, আদিপ্রেমিকের সামনে ওই রাতে ছোটবেলা থেকে শিখে আসা ভরতনাট্যমের পরতের পর-পরত মেলে ধরেছিল জয়ী। নাচতে নাচতে নিশ্বাস-প্রশ্বাসে টের পেয়েছিল, সংকটকালে শিল্পী আর ঈশ্বরের মাঝখানে অন্য কেউ থাকে না। থাকে না বলেই রাহুর গ্রাস থেকে বেরিয়ে চাঁদ তার জোছনা ছড়িয়ে দেয় চরাচরে, পাখি তার শিসে ভরিয়ে দেয় সকালবেলা, ফুল তার সুগন্ধকে মিশিয়ে দেয় বাতাসে।

যখন দিদুনের সঙ্গে ভয়ঙ্কর অভিমানের পালা চলছে, তখন একদিন প্রীতিকণা চৌধুরীর একটা চিঠি পেয়েছিল জয়ী। কিন্তু এমনই একটা শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধ চলছে তখন ভিতরে যে, চিঠিটা খুলে পর্যন্ত দেখেনি। মনে হয়েছিল, কী এমন কথা যা দিদুন একটা ডাক দিলে ও গিয়ে শুনতে পারবে না?

চিঠিটা একটা বইয়ের ভিতরে করে আমেরিকা নিয়ে এসেছিল জয়ী। আর মিনিয়াপোলিসের প্রবল ঠান্ডায় একটা সেমিনারে অংশ নিতে গিয়ে সেই বইটা যখন উঠে এসেছিল হাতে তখন খামটা ছিঁড়ে জয়ী দেখতে পেয়েছিল নিটোল হস্তাক্ষরে লেখা, “তোমার কষ্ট, তোমার যন্ত্রণা, তোমার অপমান আমি যে কেবল বুঝি তাই নয়, মর্মে মর্মে অনুভব করি। কিন্তু সেইসব কষ্ট, যন্ত্রণা, অপমানের জন্য এই বালক কোনওভাবেই দায়ী নয়। যারা দায়ী ও তাদের সন্তান হতে পারে কিন্তু সেই কারণে আমি ওকে ত্যাগ করতে পারি না, কারণ ও তো নিজের বাবা-মাকে বেছে নেয়নি। আর যদি ত্যাগ করি তবে তা তোমার প্রতিও অন্যায় হবে, কেবল ওর প্রতি নয়। আমার বিশ্বাস তুমি কখনওই চাইবে না যে তোমার ‘দিদুন’ এমন কোনও কাজের সঙ্গে যুক্ত থাক, যার জন্য পরে তোমারও খারাপ লাগতে পারে।”

দূরত্বের যে শোধনাত্মক প্রক্রিয়া তার জেরে এবং ভালবাসার অভিঘাতে তো বটেই, জয়ীর চোখ দিয়ে কেবলই জল গড়াচ্ছিল চিঠিটা পড়ে। ওর মনে হচ্ছিল, দিদুনকে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে, অন্তত একটা ফোন করে। ফোন ও করেছিল, আমেরিকায় এসে পৌঁছসংবাদ দেওয়ার পরে সেই ওর প্রথম ফোন ভবানীপুরের বাড়ির ল্যান্ডলাইনে, কিন্তু সেই সনাতনকাকাই ফোন ধরে জানিয়েছিল যে দিদুন ঘুমিয়ে পড়েছে। জয়ীর পরে মনে হয়েছিল যে ভালই হয়েছে, যে-কথা জড়িয়ে ধরে, অনেক কান্নাকাটি করে তবে বলার, সেই কথা ফোনের ওপাশ থেকে বলা যায় না।

প্লেনটা একটা টার্বুলেন্সের মধ্যে পড়ায় পাইলটের বাণী এবং এয়ার-হস্টেসদের সতর্কবাণীতে তন্দ্রাটা ভেঙে যাওয়ার আগের মুহূর্তে জয়ী দেখল যে কলকাতায় পৌঁছেই ও ঘুমন্ত দিদুনের ঘুম ভাঙানোর প্রার্থনা নিয়ে সেই ঘরটায় গেছে, যেখানে নটরাজ ওর নাচ দেখার প্রতীক্ষায় আছেন।

স্বপ্ন কি ভবিষ্যতের সঙ্গে অতীতকে বুনে দিতে পারে? তা নইলে কলকাতায় পা দেওয়ার পরদিন রাতেই পায়ে ঘুঙুর বেঁধে কেন ওই তিনতলার ঘরে নটরাজের সামনে গিয়ে আবার দাঁড়াবে জয়ী? যাঁরা ভরতনাট্যমকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তাঁরা মঞ্চপ্রবেশের আগের দিন নটরাজের সামনে বসে একটা পুজো করেন। সেই পুজোকে বলা হয় ‘চালাঙ্ঘাই’। সে পুজোর মধ্যে দিয়ে নটরাজকেই জীবনের ধ্রুবতারা মেনে নিয়ে শিল্পী পা রাখেন মঞ্চে। না, জয়ীর পেশাগত মঞ্চপ্রবেশ হয়নি। ওঁদের পারিবারিক ঐতিহ্য ইত্যাদি কারণেই শুধু নয়, দিদুনের ইচ্ছে ছিল না যে, নাচ জয়ীর জীবিকার অংশ হয়ে উঠুক।

“যা আনন্দের মাধ্যম, উত্তরণের মাধ্যম, তাকে সেভাবে রাখতে পারাই ভাল। হিমালয়ের শুটিং করলেও হিমালয়কে খানিকটা চেনা যায় না তা নয়, কিন্তু সেই চেনার সঙ্গে একজন পর্বতারোহীর কিংবা সাধকের চেনার ফারাক রয়েছে।” প্রীতিকণার গলায় বলা কথাগুলো এখনও বাজে জয়ীর কানে।

কিন্তু জয়ীর সর্বাঙ্গে এখন তবলার মতো, ড্রামসের মতো, ব্যাঞ্জোর মতো বেজে চলেছে একটাই প্রশ্ন, কেন দিদুন, কেন?

হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই বাবাকে দেখে খানিকটা না-চেনার ভান করেই এগিয়ে যাচ্ছিল জয়ী। বাবা পিছু ডাকায় থামতে হল, দু’-চারটে আধো-অর্থহীন কথাও বলতে হল। কিন্তু তাতে জয়ীর আসে যায়নি কিছুই। উলটে বাবা যখন বলছিল যে দিদুন হাসপাতালে ভর্তি থাকায় নিজের ছেলেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে কি না, জয়ীর ইচ্ছে হচ্ছিল বলে যে ও থাকতে ওই কিশোরের কোনও অসুবিধে হবে না।

অসুবিধেটা হল বাড়িতে ফিরে আসার পরপরই।

দিদুনের সব অফিশিয়াল কাজ সামলায় যে প্রীতীশ, সে জয়ীর সামনে এসে দাঁড়াল। জয়ী আমেরিকায় যাওয়ার আগেই প্রীতীশ কাজে ঢুকেছিল। এই ক’বছরে বেশ চৌকস হয়ে উঠলেও জয়ীর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ খুব একটা হয়নি বলেই হয়তো একটা আড়ষ্টতা ছিল।

সেটা কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় জয়ী বলে উঠল, “আমাদের সমস্যা হলে তুমি উদ্ধার করবে, তোমার কী সমস্যা হল?”

প্রীতীশ একটা চেক খামের ভিতর থেকে বের করে আবার খামের ভিতর ঢুকিয়ে রেখে খামটা জয়ীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “জানি না এই চেকটা লেখার সময় ম্যাডামের অ্যাটাকটা হয়ে গিয়েছিল কি না, কিন্তু চেকের সইটা মেলেনি। বড় অ্যামাউন্টের বলে ব্যাঙ্ক থেকে চেকটা ফেরত পাঠিয়েছে। ম্যাডামের অবস্থার কথা শুনে ম্যানেজারবাবু বলেছেন যে চৌধুরীবাড়ির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা মাথায় রেখে ওঁরা চেকটা রিলিজ় করে দেবেন, যদি বাড়ির লোক বলে, তা হলে। এবার আপনিই সিদ্ধান্ত নিন, কী করণীয়।”

“দিদুন আগে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরুক, তারপর দিদুনের লেখা চেক নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। এই চেকের জন্য কারও বাড়িতে নিশ্চয়ই হাঁড়ি না-চড়ার অবস্থা হয়নি যে এখনই তোমায় নিয়ে ব্যাঙ্কে ছুটতে হবে আমায়।” জয়ী জবাবটা দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল।

কলকাতায় থাকতে কোনওদিন খায়নি আর আমেরিকায় থাকতেও খুব অকেশনালি একটা-দুটো। এবারই ফেরার পথে দুবাইয়ে নেমে মনে হল, জীবনটা ধোঁয়ার মতো উড়ে যাচ্ছে অথচ ছাই আর আগুনের সঙ্গে পরিচয়ই হচ্ছে না। এয়ারপোর্টের ডিউটি-ফ্রি থেকেই বেশ মাইল্ড দু’প্যাকেট কিনেছিল জয়ী আর ফিরে এসে দিদুনকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার আগে একটা, দেখে ফিরে এসে গোটাচারেক খেয়ে নিয়েছে। অন্য উপায়ই বা কী? যে মানুষটাকে জীবনে কখনও অকারণে বসতে পর্যন্ত দেখেনি, আশি পেরিয়েও যাঁর চটির শব্দ একতলা থেকে তিনতলা পর্যন্ত শোনা যেত, তিনি মুখে মাস্ক, হাতে অজস্র নল নিয়ে শুয়ে আছেন একটা লোহার বিছানায়, এই দৃশ্য সহ্য করার জন্য একটু তাপ দরকার। আর এই সিগারেট ছাড়া সেই তাপ দেওয়ার ক্ষমতা এই মুহূর্তে কারও নেই।

রাতে খাওয়ার পর আর একটা ধরিয়ে, কী জানি কী মনে হল, নিজের ঘরের টেবিলের উপর রাখা খামটা হাতে তুলে নিয়ে মুখটা ছিঁড়ে দিল জয়ী। ভিতরের চেকটা দেখবে বলে। আর চেকটা চোখে পড়ামাত্র ওর মনে হতে লাগল, ওর শৈশব-কৈশোর-যৌবন সবটাই ছিঁড়ে ফর্দাফাই হয়ে গেছে। ছিঁড়ে গেছে ওর অস্তিত্বটাই। ও কে, কী ওর পরিচয়, যদি দিদুন, ইস্টবেঙ্গলের শতবর্ষ উপলক্ষে, দশলক্ষ এক টাকার একটা চেক দিতে পারে লাল-হলুদ ক্লাবকে?

ইস্টবেঙ্গল বলেই কি হাত কেঁপে গিয়েছিল দিদুনের? মশাল বলেই সইটা মেলেনি প্রীতিকণা চৌধুরীর? ইলিশ বলেই কাঁটাটা গলায় গিয়ে লেগেছিল আর সেখান থেকে যন্ত্রণা শুরু হয় মাথায়?

‘কেন, দিদুন কেন? ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সঙ্গে তোমার কিসের লেনাদেনা যে ওদের দশলাখ টাকা দিতে হবে? প্রতিবেশী ক্লাব, প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব বলে সৌজন্য? কিন্তু সৌজন্যের মূল্য তো এত বেশি হওয়ার কথা নয়!’ জয়ী স্বগতোক্তি করল।

সেই স্বগতোক্তিই যেন ঘুঙুরের শব্দ ছাপিয়ে ঘরের মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত উঠল আর নামল, যতক্ষণ জয়ী নেচে গেল। আর এবার নাচের সময় যে-ক’বার চোখ বন্ধ হয়ে গেল, একবারও নটরাজকে দেখতে পেল না, ওর চেতনায় জ্বলে উঠল না কালো পাথরের, আলো করা চোখ। উলটে সেই আমেরিকান ফলের দুটো রং, একটা পতাকায় মিশে গিয়ে আছড়ে পড়তে লাগল ওর সত্তায়, একটা চেকের নীচে একটু কেঁপে যাওয়া একটা সই, ভূমিকম্পের মতো কাঁপিয়ে দিল ওর সমূহ অস্তিত্ব।

মোহনবাগান ওর আত্মায়, ওর শরীরে, ওর জাতীয়তায়, ওর জাগরণে। ঘাসের সবুজ আর স্কুল ইউনিফর্মের মেরুন ওর ভিতরে সেই কোন শৈশবে মিশে গিয়েছে। একটার পর-একটা মুদ্রায় জয়ী সেই সমস্ত ফেলে আসা দিনগুলোকে ছুঁতে চাইছিল আর ওর মনে হচ্ছিল, সতীর খণ্ডিত দেহ তো শুধু সনাতন ভারতের বিভিন্ন অংশে ছিটকে পড়েছিল, ওকে টুকরো টুকরো করলে মিসিসিপি থেকে মধ্যমগ্রাম ছড়িয়ে যাবে খণ্ড খণ্ড মোহনবাগান। বাবার ছেড়ে যাওয়া, মায়ের মৃত্যু, দিদুনের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি, অরণ্যর সঙ্গে বিচ্ছেদ, সব ডুবে যাওয়ার মধ্যে ওই পালতোলা নৌকোই যে জয়ীর বেঁচে থাকার একমাত্র প্রমাণ।

চেকের নীচের ওই সইটা ব্যাঙ্কে মেলেনি। কীভাবে মিলবে? ওই সই আর চেকের মাঝখানে যে এগারোর শিল্ডজয়ী দলটা দাঁড়িয়ে আছে, মোহনবাগান লেনের ক্ষয়ে যাওয়া, রোদে পোড়া, বৃষ্টি ভেজা সবকটা ইট দাঁড়িয়ে আছে, জয়ীর রক্তের ভিতর বয়ে চলা পালতোলা নৌকোটা ভেসে আছে।

নৌকোটার সামনে ওই তো দিদুন আর দিদুনের চেয়ে বড় একটা ঢেউ, আরও বড় হচ্ছে। শূন্যে ভাসিয়ে দেওয়া হাতটা নিজের কাছে ফিরিয়ে আনার আগেই জয়ীর সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।

দূরের গঙ্গায় ঝিকমিক করে উঠল একটা-দুটো তারা।

সূর্য সেন পল্লী, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা

সন্তানের জন্ম যতখানি আনন্দের, অসুস্থ সন্তান পৃথিবীতে নিয়ে আসার বেদনাও ততখানি। ছোট্ট ছেলেটা যখন দৌড়তে গিয়ে পড়ে যেতে, হাঁপাতে শুরু করত আচমকা, তখনও তত কিছু খেয়াল করেননি সুষমা আর আনন্দকুমার। কিন্তু অসুস্থতা এমন একটি বিষয় যা নিজেকে উন্মোচিত করবেই, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরিতের বাবা-মাও জানতে বাধ্য হলেন যে তাঁদের ছেলের হার্টের ভালভে কিছু গোলযোগ আছে, একদম সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের হকদার ও কখনই হতে পারবে না।

“এত এত খারাপ ঘটনা আমাদের সঙ্গেই ঘটে কেন?” সুষমা ভাতের থালার সামনে বসে জিজ্ঞেস করল একদিন।

“এর চাইতে আরও অনেক বেশি খারাপ আরও অনেকের সঙ্গে ঘটেছে সুষমা।” আনন্দকুমার শান্ত গলায় জবাব দেন।

“কে জানে! আমি তো আমার যন্ত্রণার তল খুঁজে পাই না।”

আনন্দকুমার উত্তরে বলতে চাইছিলেন, মানুষ নিজেরটাই বড় করে দেখে, তাই... কিন্তু কিছু বললেন না। সন্তানের কষ্টে পীড়িত মাকে খোঁচানোর কোনও মানে হয় না।

পীড়িত আনন্দকুমারও ছিলেন না কি? ভীষণই ছিলেন। কিন্তু সরিতের অসুস্থতা এমন অনেক অতিরিক্ত কাজের দায়িত্ব চাপিয়েছিল ঘাড়ের উপরে যে, দু’দণ্ড বসে কষ্ট করার সুযোগ পেতেন না।

“বর্ডার পার হওয়ার সময় আমাদের এক আত্মীয় বলেছিল, ‘ছুইট্যা পার হইয়া যাবি, থামলেই চাইপ্যা ধইরা সব কাইড়া নিব।’ কথাটা খুব মনে পড়ে।”

“তারপরও, কপাল তো কেড়েই নিল সব।” আনন্দকুমারের কথার উত্তরে সুষমা বললেন।

কী কেড়ে নিয়েছে আর কী আছে সেই বিচারে কী লাভ? যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। কিন্তু আশা যেখানে নেই, সেখানেও কর্তব্য আছে, আলো যেখানে নিভে গেছে, সেখানেও চোখের তারার কাজ ফুরোয় না। ছেলেকে সঙ্গে করে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় সুষমা, ছেলেকে কোলে করে যখন-তখন ডাক্তারের কাছে ছোটা আনন্দকুমার কি সেই কর্তব্যই করতেন, না কি অপত্যর ডাকে সাড়া দিতেন, সেই ভালবাসার কাছে জীবনের বাকি সবকিছু বন্ধক রাখতেন, যে ভালবাসার ধর্মই কষ্ট স্বীকার করা?

গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো সেই সময়ই একদিন সুধাংশু দিনতিনেকের জন্য বাড়ি এল আর আনন্দকুমার হতচকিত হয়ে শুনলেন যে ও এবছর পরীক্ষা ড্রপ করেছে।

“আমি আর তোর বউদি রক্তজল কইরা খাটতাসি আর তুই পরীক্ষা না দিয়া মজা মারতাসস?” তীব্র ক্রোধে মাতৃভাষায় ফেটে পড়লেন আনন্দকুমার।

“সে তোমরা নিজেরা ভাল থাকবে বলে খাটছ। তোমাদের বাচ্চার চিকিৎসার খরচ জোগাবে বলে খাটছ। আমি দুনিয়ার ভাল-মন্দ নিয়ে ভাবি।” সুধাংশু অম্লানবদনে জবাব দিল।

“কীভাবে ভাবিস? পরীক্ষা ড্রপ দিয়ে?”

“যে সিস্টেমে পরীক্ষা হয়, রেজ়াল্ট বেরোয়, কেউ ফার্স্ট হয় আর কেউ ফেল করে, সেই সিস্টেমটাই মানি না।’’

“তা হলে কী মানিস?”

“মানি এটাই যে সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়ার সময় এসেছে। ধ্বংস হলে তবেই নতুন সৃষ্টি সম্ভব।”

“আমাদের দেশের বাড়িতে তোর একটা খেলনা গাড়ি ছিল। একদিন কার একটা পায়ের চাপে সেটা দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল। তুই একটা রাত্রি উপোস করে ছিলি।”

“সে কোন যুগের ঘটনা আমার মনে নাই। এখন আমি তাদের হিসাব নিই, যারা মানুষকে উপোস করিয়ে রাখে।”

“কিন্তু তুই নিজেই তো উপোস করে মরবি রে হতভাগা, পেটে বিদ্যে না থাকলে। কোন কাজকাম জুটবে তোর, কে খাওয়াবে?”

“আমার বিপ্লব খাওয়াবে। শুধু আমাকে না, দুনিয়ার কোটি কোটি লোককে খাওয়াবে। আর যারা সেই কাজে বাধা দিতে আসবে, তারা ফিনিশ হয়ে যাবে একদম। ওই তোমার ছেলের ডাক্তার যেমন গেছে।”

“মানে?”

“ডাক্তার ধরের চেম্বার পুড়িয়ে দিয়েছে, খবর পাও নাই?”

“হ্যাঁ, কিন্তু সে তো কতগুলো লুম্পেন...”

“কে লুম্পেন? আমি লুম্পেন?”

“তুই পোড়াইছস?”

“নকশা আমার। কাম তামাম করেছে অন্য ছেলেরা।”

“যে লোকটার কাছে বিপদে-আপদে তোর ভাইপোকে নিয়ে যাই, তার চেম্বার...”

“পঁচিশ টাকা ভিজ়িট দিয়ে তুমি যেতে পারো, কিন্তু একটা রিকশাওয়ালা তো পারে না। আর রিকশাওয়ালা যাকে দেখাতে পারে না, সেই ডাক্তারকে আমরা পৃথিবীতে টিকতে দেব কেন?”

“তাই বলে তার চেম্বারে আগুন? আর সেই আগুনের নকশা কার, না যার নিজের বাপেই ডাক্তার?”

“কেন, আগুন আমাদের গ্রামে লাগে নাই? বাবার ডিসপেনসারির ওষুধপত্র পোড়ে নাই?”

সুধাংশুর কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন আনন্দকুমার। আর কোনও কথা বলতে না পেরে উঠে এলেন সামনে থেকে। কিন্তু সেদিন রাতে, পরদিন দুপুরে, এক সপ্তাহ পরের বিকেলেও কথাগুলো ওঁকে তাড়িয়ে ফিরতে লাগল।

পরিবর্তন একটা হাওয়ায় উড়ছিল, তার আঁচ কম-বেশি সবাই পাচ্ছিল। স্কুল-কলেজে, পরীক্ষার হলে টেবিলে ছুরি গেঁথে গণটোকাটুকি কিংবা মনীষীদের মূর্তি ভাঙা যদি তার একটা দিক হয়, খালের জলে তাজা তরুণদের লাশ ভেসে ওঠা তার অন্য দিক। কোন রাস্তা ঠিক আর কোনটা ভুল, সেই বিচারের জায়গায় না-থেকেও আনন্দকুমারের বারবার মনে হত, এক জীবনে আর কত রক্তপাত দেখতে হবে ওঁকে? কিন্তু সেদিন সুধাংশুর শেষ কথাটা ওকে অন্যভাবে নাড়িয়ে দিয়ে গেল। শৈশবের ঘর ছেড়ে আসার স্মৃতি, গ্রাম ছেড়ে আসার যন্ত্রণা সুধাংশুকে যে-কোনও অন্যায় কিংবা নৃশংসতাকে সমর্থন করার অজুহাত দিচ্ছে না তো?

“রিফিউজিদের উসকে পশ্চিমবঙ্গীয় লোকেদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে যারা, তারা বিপ্লব করছে না, সমাজটাকে টুকরো করার চেষ্টা করছে।” প্রীতিকণা লালবাজারের একটা ঘরে বসে বললেন।

আনন্দকুমার তার কিছুক্ষণ আগেই জেনেছেন যে স্বাধীনাকে এখন ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করতে হবে, ‘আপনি’ বলতে হবে, কারণ সে এখন কলকাতার বিখ্যাত চৌধুরীবাড়ির বউ প্রীতিকণা। আনন্দকুমার ভাবছিলেন, সুষমাকে বিয়ের মুহূর্তে বা তার পরেও স্বাধীনা সেনগুপ্তর কথা ওঁর প্রায় মনেই পড়েনি। তা হলে কোন এক্তিয়ারে উনি স্বাধীনাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, সে কেন অপেক্ষা করেনি আনন্দকুমারের জন্য।

আনন্দকুমারের মুখ দেখে প্রীতিকণা কী বুঝতে পারলেন কে জানে, জিজ্ঞেস করলেন, “আমার কথা মনে পড়ত মাঝেসাঝে?”

“তেমন একটা নয়। হয়তো পড়ত। কিন্তু...”

“কিন্তু?”

আনন্দকুমার সংক্ষেপে সেই মন্দিরের সামনে কাঙালিদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে এক গা গয়না পরা স্বাধীনাকে দেখার দৃশ্য ফিরে বলতে গিয়ে রক্তাক্ত হলেন আবার।

“ভাগ্যিস ডাক দাওনি তখন।” প্রীতিকণা একটা তেতো হাসি হাসলেন।

“পুলিশের লোক যখন আমায় ডাকতে আমার কলেজে গিয়েছিল, তখনও বুঝিনি যে সেই ডাকের পিছনে আপনি আছেন। এখানে এসে আপনাকে দেখে...”

“ঘরে তো আর কেউ নেই। ‘তুমি’ করেও বলতে পারো এখন।”

“থাক। যা হারিয়েছি তা আর ফিরে পেতে ইচ্ছেও করে না সব সময়। আমার মন শুধু জানতে চায়, সুধাংশুকে সেই কোন ছোটবেলায় দেখেছেন, এতদিন পর ওকে দেখে চিনতে পারলেন কী করে?”

“কারণ ওর মুখটার আদল একেবারে তোমার মুখের মতোই। আমার দেখে মনে হচ্ছিল সেই বিক্রমপুরের তুমি দাঁড়িয়ে আছ আমার সামনে। তাই তোমাকে এত্তেলা দিতে বললাম। নইলে পুলিশ ওকে ভ্যান থেকে নেমে দৌড়তে বলে পিঠে গুলি মারত। ওর স্যাঙাতদের তাই করেছে হয়তো এতক্ষণে।”

“ভয়াবহ, অমানবিক।”

“আর ওরা যেটা করছে সেটা খুব প্রেমময় কিছু, তাই না? বড় বড় শিল্পপতির গেটের তালা পর্যন্ত খোলার ক্ষমতা নেই, গ্রামে তিনবিঘে-পাঁচবিঘের মালিকদের মুন্ডু কেটে বীরত্ব ফলানোটা বিপ্লব? পাঁচবিঘে জমি থেকে যে একটা পরিবারের সারা বছরের ভাতের চালের পর্যন্ত জোগান হয় না, সেই বোধটুকুও এদের নেই?”

“কিন্তু তুমি এসবের মধ্যে জড়ালে কী করে?” আনন্দকুমার উত্তেজনায় ‘আপনি’র জায়গায় তুমি’ই বললেন।

“আমাদের এক আত্মীয়র মেয়ের বিয়ে ছিল বর্ধমান আর বাঁকুড়ার সীমান্তবর্তী গ্রামে। একেবারেই নিম্নবিত্ত তারা। আমি একরকম দাঁড়িয়ে থেকে মেয়েটির বিয়ে দিতে গিয়েছিলাম বলতে পারো আর সেই বিয়ের আগের দিন রাতেই তোমার ভাইয়ের দল ওই বিয়েবাড়িকে আক্রমণ করে ‘জোতদার’ তকমা লাগিয়ে। রান্না করতে আসা একটা লোক ওদের ওয়ান-শাটার পিস্তলের গুলি খেয়ে মরোমরো। আর-একজনেরও গুলি লেগেছে গায়ে। তারপরই গ্রামবাসীরা সবাই মিলে ধরে ফেলে ওদের। আমি অকুস্থলে ছিলাম বলে খুনে বদমাশগুলোকে তাড়াতাড়ি পুলিশে চালান করা সম্ভব হয়েছে।”

“আচ্ছা, বুঝলাম।”

“কী বুঝলে?”

“তুমি ছিলে বলেই পুলিশ ওদের তাড়াতাড়ি ধরেছে। মানে, নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারের রাস্তা তুমিই দেখিয়ে দিয়েছ! আমি এত বোকা যে ভুলে যাই, তুমি এখন মোহনবাগান গ্যালারির লোক।”

“কথাটা বলতে লজ্জা করল না, আনন্দদা?”

“লজ্জা কেন করবে? কথাটা তো সত্যি। তবে কষ্ট হল বলতে।”

“হ্যাঁ, দুনিয়ার সব কষ্ট তো ইস্টবেঙ্গলের লোক ট্যাঁকে গুঁজে নিয়ে এসেছে আর চোখের মণির মতো ধারণ করে আছে। ঘর-বাড়ি হারিয়ে যারা এসেছে দুঃখ শুধু তাদের আর যাদের জমি জবরদখল হয়ে গেল, যারা নিজেদের বেহাত হওয়া জমিতে অন্যের ঘর উঠতে দেখল, তাদের কোনও দুঃখ থাকতে পারে না?”

“আরে বাবা, জবরদখল যারা করেছে সেই লোকগুলো তো বাস্তুহারা...”

“আর যাদের জমি দখল হয়ে গেছে, তারা জমিহারা হল না? তা ছাড়া উদ্বাস্তু কি শুধু বাঙালরাই হয়েছে? ছেচল্লিশের গন্ডগোলের সময় অনেক ঘটি কলকাতার ভদ্রাসন ছেড়ে, বালি, উত্তরপাড়া, জিরাট, গুসকরায় গিয়ে সেই যে মাথা গুঁজেছে আর ফিরতে পারেনি কলকাতায়। স্বাধীনতার পর সেইসব বাড়ি দখলমুক্ত হলে সেখানে ওপার থেকে আসা মানুষরাই ঘরভাড়া পেয়েছে অল্প পয়সায়, নইলে দণ্ডকারণ্য আর আন্দামানে যাওয়ার ভিড় আরও বাড়ত।”

“দণ্ডকারণ্য আর আন্দামানের কথা আপনি না হয় আর না-ই বললেন, প্রীতিকণাদেবী। আন্দামানে কীভাবে লোকে গেছে আর আন্দামানে না যেতে চেয়ে কীভাবে লোকে মরেছে, আমি তার জলজ্যান্ত সাক্ষী।”

“তা হলে সেই অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে একটা বই লেখো। এমন একটা বই যেখানে লক্ষ লক্ষ নরনারীর উদ্বাস্তু হওয়ার, উদ্বাস্তু হয়েও মানুষ থাকার মরিয়া চেষ্টার কথা লিপিবদ্ধ থাকবে।”

“কী লাভ হবে লিখে? ফিরে আসবে সেই কৈশোর, সেই গ্রাম, সেই নদী, সেই প্রেম?”

“না ফিরে আসুক, এই হিংসা তো অন্তত দূরে যাবে। বিদেশের চেয়ারম্যানকে নিজের ভেবে, নিজের লোকগুলোকে খুন করা তো বন্ধ হবে।”

“সত্যিই নিজের লোক? ‘বাঙাল মনুষ্য নয়’ বলে আওয়াজ কারা দিত? ঘাগুলো যে এখনও বড় দগদগে...”

“দগদগে তার কারণ, আমরা একদিক দিয়েই দেখেছি কেবল। আর একদিক দিয়ে দেখলে নিজের প্রতিও অবিচার করা হয়। সরকার অনেক অত্যাচার করেছে এটা কত লোক বলে কিন্তু সরকারের মাথায় থাকা ডাক্তার ভদ্রলোক যে দিন-রাত এক করে উদ্বাস্তুদের জীবন একটু সহনীয় করে তুলতে চাইতেন, সেই ইতিহাসও তো লিখে রাখা দরকার। যখন ভিটেমাটি হারিয়ে শূন্য হাতে পালিয়ে আসা মানুষেরও প্রাণ বিপন্ন হচ্ছে তখন ডাক্তার রায় কী অসম্ভব আবেগতাড়িত হয়ে ফুঁসে উঠেছিলেন, সেই সত্য আমাদের জানার দরকার নেই?”

“আচ্ছা একটা অন্য কথা জিজ্ঞেস করছি, এই যে নতুন বিপ্লবীরা ডাক্তারদের ফোনে হুমকি দিয়ে ফিজ় কমাতে বলে, এটা ভাল না খারাপ? খারাপ বলার আগে একটু ভেবো যে এর ফলে কুড়ি টাকা ভিজ়িট নেওয়া ডাক্তার আট টাকা নিয়ে রুগি দেখছে। তাতে তোমার কিছু এসে না গেলেও সবজিবিক্রেতা কিংবা রিকশাওয়ালার বিরাট উপকার হচ্ছে।”

“উপকার হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু আমার মতে আসল উপকার হচ্ছে না। যে ডাক্তারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে সে কিন্তু আজ নয় কাল পাড়ায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস ছেড়ে আলিপুর বা ক্যামাক স্ট্রিটের প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে নাম লেখাবে। আর সেখানে তার ভিজ়িট হবে, চল্লিশ টাকা। অতএব কুড়ি টাকাটা আট করতে গিয়ে চল্লিশের পথে ঠেলে দিচ্ছি না তো?”

“উত্তরটা আমিও জানি না। আমি শুধু জানি যে আমি বিভ্রান্ত আর একইসঙ্গে কৃতজ্ঞও।”

“কার কাছে কৃতজ্ঞ?”

“তোমার কাছে। কারণ তুমি মধ্যিখানে না থাকলে পুলিশ হয়তো এনকাউন্টার করে দিতে পারত সুধাংশুর। তুমিই আটকেছ। হয়তো যে পুরনো স্মৃতি তুমি ভুলতে পারোনি, তাই তোমাকে দিয়ে আটকেছে।”

“আমি কিছু ভুলতে চাইওনি। আর চাইনি বলেই আমি তোমাকে বারবার করে বলছি তুমি একটা বই লেখায় হাত দাও, যে বইয়ে ধরা থাকবে কোটি কোটি মানুষের জীবন কীভাবে র‌্যাডক্লিফের ছুরিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েও আবার এক অদৃশ্য সুতোয় জোড়া লাগল।”

“জোড়া কি আদৌ লেগেছে?”

“অন্তত বাইরে থেকে মনে তো হচ্ছে। স্টেশনে এখন তো আর হাজারও মানুষ শুয়ে থাকে না।”

“ক্যাম্পে, কলোনিতে, জঙ্গলে থাকে।”

“কীভাবে থাকে? কেমন করে মানিয়ে নেয়? কী জাদু আছে জীবনের, যে শূন্য থেকে সে আবার শুরুই করে, শেষ হয়ে যায় না?”

“আমি লেখক নই। তবু তোমার কথা শুনতে শুনতে মনে হয়, তোমার জীবন নিয়েই একটা বই লিখি। সেটা উপন্যাস হবে না জীবনী আমি জানি না...”

“আমার জীবনের ইতিহাস অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর। সেটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। আমি চাইছি একটা জাতির ইতিহাস, একটা কাটা গাছ কীভাবে আবার ভিন্ন ভূখণ্ডে নিজের শিকড় চারিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারে তার খতিয়ান।”

“কিছু যদি মনে না করো, তোমার স্বামীর...”

“উনি পৃথিবীতে থাকলেও, সংসারে আর নেই। আমি ওঁর বিষয়ে কোনও কথা বলতে চাই না তাই।”

“ওহ! আমি জানতাম না। ক্ষমা কোরো।”

“ক্ষমার কথা আবার আসছে কোত্থেকে? আমি স্বচ্ছন্দ নই ওই বিষয়ে কথা বলতে। তাই বলব না। কিন্তু যা বলব তা হল, তুমি সেই বইটা লেখায় হাত দাও, নইলে আগামী প্রজন্ম একদিন বিশ্বাস করে বসবে যে সবরকম সুযোগ সুবিধে পাওয়া পঞ্জাবের উদ্বাস্তু আসলে কর্মঠ, উদ্যমী, সাহসী আর জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম সাহায্য না পাওয়া বাঙালি হল গিয়ে অলস, অকর্মণ্য, অপদার্থ। এই মিথ্যেটাকে ভাঙার জন্যই তোমায় সত্যিটা লিখতে হবে।”

“মিথ্যেটা যে মিথ হয়ে গেছে।” আনন্দকুমার হাসলেন অনেকক্ষণ পরে।

“সেই মিথ ভেঙে নতুন মিথ প্রতিষ্ঠা করো তবে। মনে করে নাও, সুধাংশুর প্রাণ বাঁচানোর বিনিময়ে এটাই আমার চাওয়া। আর হ্যাঁ, সুধাংশুর জন্য আমি দিল্লির কাছে একটা ফ্যাক্টরিতে কাজের কথা ভেবে রেখেছি। ওকে আপাতত এখান থেকে সরিয়ে দাও। নইলে এই ঘূর্ণি ওকে গিলে ফেলবে।”

আনন্দকুমারের চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। উনি উঠে দাঁড়ালেন। স্বাধীনার হাতটা একবার স্পর্শ করবেন ভাবলেন, তারপর সংযত করলেন নিজেকে। সামান্য থেমে থেমে বললেন, “আমার জন্য তুমি যতটা করলে সেই ঋণ...”

“বইটা লিখে শোধ করবে।” প্রীতিকণার গলায় একটুও আবেগ খেলা করল না।

“আমার উপর যতটা ভরসা করছ, আমি কি ততটা ভরসার যোগ্য? আমি কিন্তু খুবই সাধারণ...”

আনন্দকুমারকে থামিয়ে দিলেন প্রীতিকণা, ‘‘সেই কারণেই তো ভরসা করছি। সমুদ্রের ধারে লোকে ঘর বাঁধতে যায় না, নদীর ধারে যায়। তুমি সাধারণ হলেই বরং তোমার বইটার ভিতর দিয়ে লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল মানুষের দুঃখ-কান্না-বেদনা-যন্ত্রণা আর তার সঙ্গে সর্বনাশ থেকে উত্তরণের কাহিনি পুরোপুরি ধরা দেবে। ব্যক্তির রঙে সমষ্টির কথা রাঙিয়ে যাবে না। তুমি লেখো আনন্দদা, তোমাকে লিখতে হবে।”

“কিন্তু কীভাবে শুরু করব, তথ্য কিংবা নথি কী উপায়ে পাব, আমার তো জানা নেই কিছুই।” সুধাংশু আর কোনওরকম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকবে না, পুলিশের কথায় সেই বন্ডে সই করে দিতে দিতে আনন্দকুমার বললেন।

লালবাজারের এক কর্তা ওঁকে আশ্বস্ত করলেন যে পুলিশ নিজের দায়িত্বে সুধাংশুকে দিল্লি পাঠিয়ে দেবে। আনন্দকুমার খবর পাবেন, চিন্তার কিছু নেই।

“পুলিশের যা করার কথা নয়, কেবল তোমার জন্য পুলিশ তা করছে, নইলে আমি কে?” বাইরের রাস্তায় বেরিয়ে আনন্দকুমার গলা একটু নামিয়ে বললেন।

প্রীতিকণা কোনও উত্তর দেওয়ার আগেই লালবাজারের একদম সামনেই একটি ছেলে এগিয়ে এসে প্রণাম করল আনন্দকুমারকে। খুব কৃতজ্ঞ কণ্ঠে জানাল যে ওঁর জন্যই সে আজ একটি কলেজের অধ্যাপক হতে পেরেছে।

“কিন্তু আমি কী করেছি তোমার জন্য?” আনন্দকুমার ছেলেটিকে চিনতে না পেরে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

“আপনার মনে পড়ছে না স্যার? আপনার জন্যই আমি বি এ পরীক্ষা দিতে পেরেছিলাম। আমার পার্সেন্টেজ ছিল না, আমি নন-কলেজিয়েট হয়ে গেলে পরীক্ষা দিতে পারতাম না, কিন্তু আপনি সব ক্লাস রেজিস্টার টেনে বের করে যেখানে-যেখানে আমি ‘অ্যাবসেন্ট’, সেখানে, ‘প্রেজ়েন্ট’ বসিয়ে দিয়েছিলেন।”

“তুমি ক্লাসে আসতে না কেন?” আনন্দকুমার জানতে চাইলেন।

“কী করে আসব স্যার? আমি তো শিয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে কলেজে আসতাম। প্ল্যাটফর্মে ছোট ভাই-বোনদের সামলাতাম, জলের জন্য, ডোলের জন্য লাইন দিতাম। সমস্ত সামলে সময় করতে পারলে কলেজে আসতাম।”

“এখন কোথায় থাকো?”

“বারাসতের কাছেই, মতিলাল কলোনিতে। একদিন আপনাকে নিয়ে যাব স্যার। বাবা আর নেই, মা খুব খুশি হবেন।”

ছেলেটির মাথায় হাত রেখে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলেন আনন্দকুমার। ছেলেটি চলে যাওয়ার পরও সেই ঘোর রইল।

“এই তো তোমার তথ্য, তোমার নথি, তোমার উপাদান। তুমি এই বইয়ের ধারণার কাছে নিজেকে সমর্পণ করো আনন্দদা। তারপর ইতিহাস নিজেই তোমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেবে, তার যা লেখানোর। আর সেতুবন্ধনের সময় যেমন কাঠবিড়ালি ছিল, সেরকম আমি তো রইলামই।”

আনন্দকুমার পারিবারিক সমস্যা, ছেলের হার্টের অসুখ ইত্যাদি কিছু বলতে পারলেন না। ওঁর মনে হল সুধাংশুর অতিবিপ্লবী হওয়ার হঠকারিতা ওঁর জীবনের একটা সিংহদরজা খুলে দিয়েছে, যার ভিতর দিয়ে এক-দু’পা এগোলেই এই ইট-কাঠ-কংক্রিটের শহর পেরিয়ে পদ্মার চরের নরম মাটি পায়ে ঠেকছে। হাওয়ার ভিতরে লুকিয়ে থাকা জলকণা এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে মুখ, না কি এ আসলে কান্না, যা এতদিন ভিতরে জমতে জমতে পাথরে রূপান্তরিত হয়েছিল।

আজ পাথর চূর্ণ-বিচূর্ণ করে জন্মস্থানের প্রতি সেই ভালবাসা জেগে উঠছে, জন্ম-জড়ুলের মতো যা মানুষের সঙ্গেই থাকে সব সময়। আর সেই মানুষ যখন হয়ে ওঠে বহু মানুষের প্রতিনিধি, তখন তার নাম নেই, ধাম নেই, সে কেবল পদ্মার সন্তান। যে পদ্মা রাত্রির ভাঙনে ঘরদোর ধসিয়ে দেয়, ভিটে গ্রাস করে, সেই পদ্মাই আবার শিখিয়ে দেয় কীভাবে নতুন ঘর বাঁধতে হবে চরে। ওই অনন্ত, অকল্পনীয় পদ্মা যেমন কখনও ভাঙছে, কখনও ছুটছে, কখনও বা উন্মত্ত অধীর হয়ে উঠছে, পদ্মার সন্তানদের মধ্যেও সেই স্বভাবই যেন সংক্রামিত হয়েছে। গঙ্গার জল লোকে মাথায় ঠেকায় কিন্তু গঙ্গা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বয়ে চলে। হিমালয় থেকে জন্ম নিয়ে কয়েক হাজার মাইল তার যে যাত্রা তার দুই তীরে কত শহর, কত মন্দির, কত স্নানের ঘাট। মানুষের ইচ্ছেই যেন গঙ্গার ইচ্ছে হিসেবে রূপ ধরেছে, সভ্যতার প্রয়োজন মেটাতে উৎসর্গ করেছে নিজেকে। সেখানেই তার সার্থকতা। কিন্তু পদ্মা কারও অনুগত নয়। সে প্রেমিকা, পাগলী, প্রলয়ংকরী। একইসঙ্গে আশ্রয় আর চোরাবালি সে। বাঁধনে যাকে বাঁধা যায় না, তেমনই স্বাধীন আর দুরন্ত সে। একইসঙ্গে নির্মম আর মুক্ত। তার তীরে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছে, তাকেই সে তলিয়ে দিয়েছে জলের তলায়। তার পরিচয় গুঁড়িয়ে দেওয়ায়, ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ায়। আর সে সেই পরিচয়ের প্রতি বিশ্বস্ত।

পদ্মার সন্তানরাও শিরায় শিরায়, হাতের রেখায় পদ্মাকেই বহন করছে যেন। জীবনের ভিত্তি না থাকা যে লাখ-লাখ লোক আছড়ে পড়েছিল প্ল্যাটফর্মে, আজ তারাই কোথাও-না-কোথাও দরমার বেড়া, টালির চালের আশ্রয় জুটিয়েছে। সরকারি অনুগ্রহে নিজেদেরটা বুঝে নিয়ে যারা উদ্বাস্তু পরিচয়টাই ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছে, তাদের সংখ্যা আর কত? প্রতিকূলতার পর প্রতিকূলতার জগদ্দল পাথর ঠেলে দোতলা বাড়ি করেছে, এমন লোকও দেখেছেন আনন্দকুমার। তারা অন্তরে বিশ্বাস করেছে যে পদ্মা যখন একদিকের জনপদ ধ্বস্ত করে দিয়েছে তখন সেই মাটি দিয়েই গড়ে উঠেছে নতুন চর। সেখানে যে লড়তে পারবে সে-ই টিকবে, যে রক্ত ঝরাতে পারবে, তারই ঘর উঠবে।

“কলকাতা শহর সংলগ্ন সব পতিত জমিতে যেভাবে রাতারাতি অজস্র উপনিবেশ গড়ে উঠল তা যে কোনও রূপকথাকে হার মানায়।” একটি সভায় একবার এক সাংবাদিক মন্তব্য করেছিলেন।

পরিত্যক্ত এয়ারোড্রোমে বিজয়গড় কলোনির নির্মাণ যাঁর হাত ধরে, সেই সন্তোষ দত্ত সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সাংবাদিকের কথার উত্তরে বলেছিলেন, “না, রূপকথা নয়, এ আমাদের রক্ত-কথা। আমরা সবাই মিলে মাটি কেটেছি, বেড়া বেঁধেছি, ড্রেন, টিউবওয়েল তৈরি করেছি। আর এত সব করার পাশাপাশি পুলিশ আর গুন্ডাদের হাত থেকে বাঁচতে রাত জেগে পাহারা দিয়েছি।”

সেই রূপকথা, থুড়ি রক্ত-কথা লেখার ব্রতে ব্রতী হয়ে দিন নেই, রাত নেই, আনন্দকুমার ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন, লেখ্যাগার থেকে গ্রন্থাগার, সরকারি অফিস থেকে মহাফেজখানা। কত বাধা, কত অপমান, কত প্রত্যাখ্যান, তবু অন্তরে জ্বলে ওঠা সেই আলো আর যে সেই আলো জ্বালিয়েছিল, সময়ে-অসময়ে তার অপ্রত্যক্ষ হাতের আড়াল, শিখা নিভতে দিত না। সেই শিখার সাহচর্যে পথ হাঁটতেন বলেই বোধ হয় অন্ধকার তত অন্ধকার লাগত না। ঘরে অসুস্থ ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়ত, সুষমা ভাত নিয়ে জেগে থাকত, মাঝে-মাঝে রাগ করত কিন্তু বিরক্ত হত না।

“তুমি না চাইলে আমি এখানেই ইতি টেনে দেব, এই কাজের। পৃথিবীর বৃহত্তম গণ-উদ্বাসন, যাতে প্রায় এককোটি লোক সর্বস্ব হারিয়ে অজানার উদ্দেশে পা বাড়িয়েছে, তাই নিয়ে আর কারও যদি ইতিহাস লেখার ইচ্ছে বা সময় না থাকে, কোনও অক্সফোর্ড-কেম্ব্রিজ-হার্ভার্ডে যদি একটিও শব্দ আলোচনা না হয় তাই নিয়ে, তবে আমি এক নগণ্য কলেজমাস্টার কোন হরিদাস পাল যে আমাকেই এই সিন্দবাদের বোঝা বইতে হবে?”

আনন্দকুমারের ক্রোধ আর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের সামনে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে সুষমা বলত, “বইতে তোমাকেই হবে।”

রাতে ঘুমনোর আগে সরিতের হাপরের মতো ওঠা-নামা করতে থাকা বুকটায় হাত বোলাতে বোলাতে আনন্দকুমার বলে উঠতেন, “কেন আমাকেই সবাই পেয়ে বসে বলো তো?”

সুষমা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, “যে তোমাকে স্কুলের বাচ্চাদের রিহার্সাল দেখতে পাঠিয়েছিল, সে-ও পেয়ে বসেছিল। আর সে পেয়ে বসেছিল বলেই আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তোমার।”

“তুমি কী পেয়েছ আমার থেকে?”

“পাওনের চাইতেও বেশি, দেখসি। তোমার দুই চোখে পদ্মার ঢেউ দেখসি।” বহুদিন পর বাঙাল ভাষায় কথা বলল সুষমা।

সম্পদ গেছে, সংসার গেছে, স্বস্তি গেছে, তবু সেই ঢেউটা যায়নি। ঢেউটা বোধ হয় যায় না। ওই ঢেউটাই সুবলের ভিতরে দেখেছিলেন আনন্দকুমার। যে সুবল প্ল্যাটফর্মে থেকেও খেপ খেলত। একদিন তিন-চারটে গোল দেওয়ার পর বিজয়ী দলের কর্তারা ওকে বড় হোটেলে খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু হাতজোড় করে বেরিয়ে আসার সময় সুবল বলেছিল যে ও পারবে না। ওর আত্মীয়-পরিজনরা যখন না খেয়ে আছে, তখন পেটপুরে চর্ব্যচোষ্য খেতে পারবে না। ওই একই ঢেউ বাতাসির মধ্যেও ছিল। বাতাসিদের বাড়ি ছিল বৈষ্ণব, কত সাধু প্রতিবার দোলযাত্রার আগে থাকতেন এসে ওঁদের বাড়িতে, কত নামগান হত তিন-চারদিন ধরে, ওই ভোগের খিচুড়ি খেতে গেলে স্নান করে যাওয়া আবশ্যিক ছিল। সেই বাতাসিই কলকাতায় এসে দশটা পয়সার জন্য ভিক্ষে করত স্টেশনের বাইরে।

ভিক্ষে করলেই কি সংস্কার বিসর্জন দেয় মানুষ? দিতে পারে? বাতাসি তো পারেনি। কোনও এক বড়লোকের বাড়িতে খাওয়া-পরার কাজ পেয়ে চলে গিয়েছিল বাতাসি। খবরটা পেয়ে খুশিই হয়েছিলেন আনন্দকুমার। যাক, দু’বেলা খেতে-পরতে পাবে মেয়েটা। কিন্তু একদিন বাস না পেয়ে ধর্মতলা থেকে পার্কস্ট্রিট পর্যন্ত চলে এসেছেন, হঠাৎ একটা গাড়ির ভিতর থেকে নিজের নাম শুনে চমকে উঠলেন আনন্দকুমার।

“উইঠ্যা আসো, উইঠ্যা আসো, সাউথের দিকে যাইবা তো?”

গাড়ির ভিতর থেকে যে কথাগুলো বলছিল, আনন্দকুমার তাকে চিনতে পারছিলেন না।

“আরে বাতাসি কইতাসি। তুমি খাড়াইয়া না-থাইক্যা ওঠো গাড়িতে।”

খানিকটা অনিশ্চয়তায় আর কিছুটা ভাষার টানে গাড়ির মধ্যে উঠে পড়লেন আনন্দকুমার। উঠেই নিজের পাশে বসা মেয়েটিকে নিরীক্ষণ করলেন বেশ অনেকক্ষণ ধরে। রক্তের মতো লাল রং তার ঠোঁটে, গালে ঘন গোলাপি আভা, শরীরে আঁটসাঁট স্লিভলেস জামা, পরনে মিনি স্কার্ট, আনন্দকুমার ভেবলে গেলেন কিছুটা।

“কী ভাবতাসো, আমি সত্যিই বাতাসি কি না?”

“বিশ্বাস হয় না।”

“হইবার কথাও না। যেই বাড়ির কৃষ্ণনামে গ্রামের একটা পাড়ার ঘুম ভাঙত, যে বাড়িতে রাধাকৃষ্ণেরে রোজ ফুলের আবির মাখানোর চল আছিল, সেই বাড়ির মাইয়ার গালে-ঠোঁটে এইসব ফরেন কালার দেখলে পরে...”

“তুই যে সেই কাদের বাড়ি কাম করতে গেলি?”

“তারা লোক ভাল না, আনন্দদা। না, আমারে শারীরিক টর্চার কিছু করে নাই কিন্তু পাত থিক্যা আইঠা তুইল্যা খাইতে দিত।”

“মানে?”

“বাড়ির সকলে খাইতে বইল, এবার যার পাতে যা উচ্ছিষ্ট থাকত, পোলাটা হয়তো একটা মাছের পেটি, মাইয়াটা দুই টুকরা মাংস ফালাইয়া গেসে, সেইগুলিই জড়ো কইরা আমার পাতে দিত। আমি কইতাম যে আলুসিদ্ধ ভাত দ্যান খাইয়া নিমু, আইঠ্যা দিয়েন না, কিন্তু আমার বারণ শুনত না। দামি খাবার নষ্ট করব ক্যান, এই ছিল বাবুগো কথা। তগো খাবার দামি, আমার ঠাকুর দামি না?”

“কী কইলি?”

“সেই ন্যাংটা বয়স থিক্যা আমার বাবা লালকমল দাস আমারে শিখাইসে, অন্তরে ‘গোপাল’ আসে, তারে নিবেদন কইরা তয় ভাত মুখে দিতে হয়। আমি ওই আইঠ্যা মাছ, আইঠ্যা মাংস আমার প্রাণ থাকতে গোপালরে দিই ক্যামনে? লাত্থি মাইর‌্যা চইল্যা গেসি। তারপর সাতঘাটের জল খাইতে খাইতে আজ মিস রোজ়ি হইসি।”

“মিস রোজ়ি? তুই?”

“হ। তুমি কাগজে বিজ্ঞাপন দ্যাখো না? আমি পার্ক স্ট্রিটের সবচাইতে বড় হোটেলটায় নাচি আনন্দদা।”

“কী নাচস? তর বাপে সেই যে হরির নামে নাচতে নাচতে বিভোর হইয়া যাইত...”

“সেই নাচই আনন্দদা। সংকীর্তনের লগে আমার বাপে নাচত, ব্যাঞ্জো, ড্রামস, অ্যাকর্ডিওনের লগে নাচি আমি। একদিন আসবা নাকি আমার নাচ দেখতে? মস্ত বড় ফিল্মস্টাররাও আসে।”

আনন্দকুমার মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন।

“ঘেন্না পাইলা? ক্যান, আমি কি অন্যায় করতাসি? ভাই-বোন, মায়েরে একটা একতলা বাড়ি খরিদ কইরা দিসি, দমদম ক্যান্টনমেন্টের কাছে। নিজে একটা ফ্ল্যাট কিনসি বালিগঞ্জে, সেইখানে রাধাকৃষ্ণরে প্রতিষ্ঠা করসি, দোলে, ঝুলনে, পুরুত ডাকাইয়া পূজা করাই, ভোগ দিই, আর দিতে দিতে কী কই জানো আনন্দদা?”

আনন্দকুমার মুখ ফেরালেন।

“কই, ঠাকুর, আমি বাতাসি, সোনারং গ্রামের বাতাসি, লালকমলের বেটি বাতাসি, তোমারে ভোগ দিসি, তুমি খাও। লোকে আমারে বেশ্যা কয়, নষ্টা কয়, ভ্রষ্টা কয় কিন্তু আমি তো জানি এই নাচের মইধ্যে আমার বাপের, আমার ঠাকুরদার, আমাগো চোদ্দো পুরুষের ভাবোল্লাস মিশ্যা গেসে গিয়া, মাথুর মিশ্যা আছে।”

“ঠাকুর কিছু জবাব দেয়?”

“কথা কইতে পারলে নিশ্চয়ই দিত। তয় ওই গোয়ালার ব্যাটা নির্ঘাত বোঝে যে বাতাসি দাস নিজেরে আইঠ্যা হইতে দিলেও নিজের অন্তরের ঠাকুরেরে আইঠ্যা খাইতে দেয় নাই। আর দিব না বইলাই, হাওয়াইয়ান শিখসে, সাম্বা শিখসে...”

“এইসব কিসের নাম কস?”

“নাচের নাম, দুনিয়ার পপুলার সব নাচ এইগুলা। লোকে দিওয়ানা হইয়া যায় আমার এইসব নাচে। এখন যে এই গাড়ি কইরা যাইত্যাসি, আলিপুরের এক রইসের বাড়ি, প্রাইভেট ডান্স শো করতে। কত দিব, কও তো? দশ হাজার, কড়কইরা দশ হাজার। মিউজ়িক, অ্যারেঞ্জমেন্ট সব বাদ দিয়া আমার নিজের ছয় থিক্যা সাত থাকব অন্তত। আমি তোমারে দুই দিয়া দিমু তার থিক্যা, তুমি যাইবা আমার লগে আজ?”

“থামা। তুই গাড়ি থামাইতে ক। আমারে নামতে হইব।”

“খারাপ নিয়ো না আনন্দদা। আমি খারাপ সেন্সে বলি নাই। আসলে, তুমি আমারে আমাগো বাড়ির ভোগারতির সময় নাচতে দেখসো তো, আজও যদি দেখতা তাইলে হয়তো...”

“হয়তো কী?”

“তোমারে বুঝাইতে পারতাম, বাতাসি দাস ভগবানরে যে অনেস্টি নিয়া নাচ দেখাইসে, মাইনষেরেও সেই একই অনেস্টি নিয়া নাচ দেখায়। এইবার কে আমার গোপালের মতো বোবা হইয়া থাকব আর কে শয়তানের মতো ঝাঁপাইয়া পড়ব, সেটাও কি আমার হাতে, কও?”

আনন্দকুমারের গলা ধরে গিয়েছিল। গাড়ি থেকে নামার সময়ও কিচ্ছু বলতে পারেননি, তাই।

নিজের বইয়ের পৃষ্ঠায় নিখাদ তথ্যগুলো লেখার সময় আনন্দকুমারের কলম বুজে আসতে চাইত, গলার মতোই। পুরনো সংবাদপত্র থেকে পুলিশের রেকর্ড থেকে যে সত্য উদ্ঘাটিত হচ্ছিল ওঁর চোখের সামনে, তাতে সারা ভারতের গণিকালয়ে সবচেয়ে বেশি মেয়ে গেছে এই খণ্ডিত বাংলা থেকেই। পাচার হয়ে যাওয়া সেই মেয়েদের সিংহভাগ যে উদ্বাস্তু, সেই বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই। রাগে, ক্রোধে অন্ধ হয়ে যেতে যেতে আনন্দকুমারের মনে হত, পদ্মার সাহস আর সৌন্দর্য রক্তে ধারণ করা মেয়েরা গণিকালয়গুলোকে ধ্বংস করে দিতে পারছে না? না কি গণিকালয় এমন জায়গা, যেখানে দুরন্ত নদীকেও শিকলে বেঁধে রাখা যায়?

ছেলেরাও কি ঠকেনি? কলোনির দেওয়ালে দেওয়ালে, ‘চিন’, ‘রাশিয়া’, ‘কিউবা’ আর ‘বন্দুকের নল’-এর ক্রমাগত উল্লেখের তাৎপর্য ক্রমশ পরিষ্কার হতে থাকল আনন্দকুমারের সামনে। যাঁরা নিজেদের বিপ্লবী সন্তানরা বিপদে পড়লেই তাদের আমেরিকা কিংবা বিলেতে পাঠিয়ে দিত, তারাই চিন এবং রাশিয়ার গাজর ঝুলিয়ে বিভ্রান্ত করত সাধারণ যুবকদের, সিআরপি-র বুলেট যাদের মৃত্যু ছাড়া কোনও দেশে পৌঁছে দিত না।

উদ্বাস্তু মেয়েদের ‘স্টার’ হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বিক্রি করত যে দালালরা তাদের তবু চেনার উপায় ছিল, কিন্তু যারা দিনবদলের স্বপ্ন ফিরি করে এমনকী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করত দাঁতে-নখে, বরিশাল থেকে আসা নিরন্ন ছেলেটাকে বর্ধমানের গৃহস্থের বাড়িতে ঢুকিয়ে দিত পিস্তল হাতে, তাদের চেনা কঠিন ছিল অনেক।

আনন্দকুমার সেই কাজটা শুরু করেছিলেন বলেই আক্রমণ আসছিল চারদিক থেকে। তার অনেকগুলোই আনন্দকুমার পর্যন্ত পৌঁছত না স্বাধীনার জন্যই। কিন্তু প্রীতিকণা তো নিয়তির চেয়ে বেশি শক্তিশালী নয়। স্কুলের স্পোর্টসে নাম না-থাকা সত্ত্বেও জোর করে দৌড়তে যাবে সরিৎ, দৌড়তে গিয়ে পড়ে যাবে মুখ থুবড়ে, সে জানবে কী করে? আনন্দকুমার বা সুষমাই কি জানতেন?

“স্কুলের দিদিমণিরা তো জানত ওর অসুখের কথা। কেউ বাধা দিল না?” সরিতের মৃত্যুর দিনদশেক পর নিজের মনে বলে উঠেছিলেন আনন্দকুমার।

“ওরা ভেবেছিল দৌড়লে সব ভাল হয়ে যাবে। আমি জিজ্ঞেস করায়, একজন বললেন।” উদাসীন গলায় জবাব দিল সুষমা।

শোওয়ার ঘরের দেওয়ালে নতুন সংযোজন সরিতের ছবিটা তখন চকচক করছে। দৌড়নোর সময় ঘাম বেরোলে মানুষের মুখ যেরকম চকচক করে।

বইয়ের অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি স্বাধীনার বাড়ি গিয়ে ওর হাতে তুলে দিয়ে এসেছিলেন আনন্দকুমার। না, এই কাজ করে চলা আর ওঁর পক্ষে সম্ভব নয়। এটুকুই জানিয়েছিলেন আর মনে মনে বিড়বিড় করেছিলেন, দুনিয়া থেকে সবাইকেই উদ্বাস্তু হয়ে চলে যেতে হয়, আজ নয়তো কাল। কেন যায়, কোথায় যায়, সবটাই অজানা।

“সময় তো খেতে আসবে তোমায়। সময়টা নিয়ে কী করবে ভেবে দেখেছ?”

“রেসের মাঠে গিয়ে বসে থাকব ভেবেছি। দৌড়লে নাকি সব অসুখ ভাল হয়ে যায়।”

“তুমি যদি নিজের পাশাপাশি আমার জীবনের দৌড়ের কথাও একটু শুনতে...”

স্বাধীনার শেষ কথাগুলো শুনতে পাননি আনন্দকুমার। তিনি ততক্ষণে বেরিয়ে পড়বেন বলে উঠে পড়েছেন।

যেহেতু মানুষ তার জীবনের পরের ঘণ্টায় কী ঘটবে সেটাও জানে না, তাই আনন্দকুমারও জানতেন না যে ওই পাণ্ডুলিপি ফেরত নিতে আবার উনি গিয়ে দাঁড়াবেন চৌধুরীবাড়ির দরজায়। জানতেন না কারণ আনন্দকুমার দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেননি যে ঢাকা আর বারদির বিলেতফেরত রিফিউজিরা প্রগতিশীলতার নামে গদিতে বসে, দণ্ডকারণ্য থেকে মরিচঝাঁপিতে ফিরে আসা কৃষিজীবী রিফিউজিদের উপরে গুলি চালানোর অর্ডার দেবে। সেই গুলিতে অসংখ্য উদ্বাস্তু মারা পড়বে, আরও বেশি উদ্বাস্তুকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলে,পানীয় জল পেতে না দিয়ে, ঘাস খেতে বাধ্য করে মেরে ফেলা হবে।

বহুদিন আগে একবার বিজয়দার কথা শুনে কুপার্সে গিয়ে আনন্দকুমার দেখেছিলেন, কী অবর্ণনীয় অবস্থার মধ্যে বেঁচে আছে মানুষ। পচা চাল আর পচা আটাকে ‘ডোল’ হিসেবে গ্রহণ করে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে তো সেই শিয়ালদা স্টেশনেই শিখে গিয়েছিল, এখন সেনাবাহিনীর প্রয়োজনে তৈরি ‘নিসেন হাটে’ রাত কাটাতেও শিখে গিয়েছে। সেই গুদামের মতো নিসেন হাটে কোনও জানলা ছিল না, ছিল শুধু দুটো দরজা যা দু’দিক থেকে ঠেলে দিলে খাপে খাপে লেগে যেত। হায়না আর শেয়ালরা বাচ্চা চুরি করে নিয়ে যেত বলে ওই বন্ধ গুদামের মধ্যেই রাতে শুয়ে থাকত রিফিউজিরা। আর দিনের আলোয় একটা পায়খানায় যাওয়ার জন্য কমপক্ষে পঞ্চাশজনের হুড়োযুদ্ধি চলত সব সময়। এতেই শেষ নয়, পচা ডোল আর পচা জল খেয়ে প্রতিনিয়ত বাচ্চারা মরত আর সপ্তাহে একবার মানুষ থেকে বাতিলের দলে ঠাঁই পাওয়া মায়েদের অবিশ্রান্ত কান্নার ভিতর মৃত বাচ্চাদের লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারি ট্রাক আসত।

তবু, সেদিনের সরকার গুলি চালিয়ে দেয়নি উদ্বাস্তু ক্যাম্পে। কিন্তু এখন চোখের সামনে বর্ধমানের কাশীপুরে গুলি চালিয়ে মেরে দেওয়া হচ্ছে হাঘরে রিফিউজিদের, হাসনাবাদ পর্যন্ত পৌঁছতে না দিয়ে বিনা চিকিৎসায়, বিনা খাদ্যে মানুষগুলোকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে।

আনন্দকুমারের পাগল পাগল লাগছিল। চেনাজানা কাউকে কাউকে জিজ্ঞেস করছিলেন, কিন্তু ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া মানুষগুলো কী আশ্চর্য রকম বদলে গিয়েছিল।

“শূন্য হাতে, পরিবারের এক-তৃতীয়াংশ খুইয়ে কলকাতা শহরে পা রেখে, এখন আমি নামে-বেনামে দশকাঠা জমির মালিক।” আনন্দকুমারের চেনা এক নেতা ওঁকে বললেন।

“আর যারা গুছিয়ে নিতে পারেনি আপনার মতো?”

“তারা অযোগ্য, অক্ষম। তাদের দায়িত্ব পৃথিবী নেবে না কারণ পৃথিবীতে ‘উদ্বাস্তু কোটা’ বলে কিছু নেই।”

উত্তরটা মাথায় নিয়ে পথ হাঁটতে হাঁটতে আনন্দকুমারের মনে হল, ভাগ্যিস উনি নেতা-মন্ত্রী কিছু হননি। ভাগ্যিস কেবলমাত্র ‘বাস্তুহারা’ হয়েই কেটে গেল জীবনটা। হঠাৎ রাস্তায় একটা সবুজ-মেরুন পতাকা ওড়াতে থাকা লরি থেকে কতগুলো ছেলের উল্লাস ভেসে এল।

মোহনবাগান জিতেছে? বেশ হয়েছে। ইস্টবেঙ্গল হারুক। হেরে ভূত হোক। যে ভূখণ্ডের মানুষ এমন মানুষকে নেতা বেছে নেয় যারা এক প্ল্যাটফর্ম শেয়ার করা মানুষের উপর হত্যালীলা নামিয়ে আনে, তারা জিতবে কেন?

হঠাৎ গাড়িটা থেকে কে যেন স্লোগান দিয়ে উঠল, “পালানোই কর্ম, পালানোই ধর্ম, পালানোয় নেই কোনও পাপ/ঠাকুরদা পালিয়েছে, পালাচ্ছি আমি নিজে, পালিয়েছিল আমার বাপ...”

আর সেই স্লোগান শেষ হতেই সবাই মিলে বলে উঠল, “ও লোটা, তাঁবু গোটা...”

আবার তাঁবু গোটানোর আগে তাঁবুর ভিতরের ইতিহাসটা লিখে রাখা জরুরি মনে করে উলটোদিকের বাসে উঠে পড়লেন আনন্দকুমার। আর বসার সিট পাওয়া মাত্র ওঁর মনে হল, অবস্থা পালটালেও স্বাধীনা তো পালটায়নি। সবাই পালটায় না তার মানে?

ভবানীপুর, কলকাতা

জ্ঞান ফিরতে জয়ী নিজেকে ওদের বাড়ির একটা ঘরের বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখল সামনের আয়নায়, আর যে দৃশ্যটা দেখে ওর আবার অজ্ঞান হয়ে যেতে ইচ্ছে করল, সেটা হল অরণ্য ওর হাতটা ধরে বসে আছে।

“কীভাবে হল এইসব? খাওয়াদাওয়া করিসনি?” অরণ্য খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল।

জয়ী টের পেল যে ওর যতটা রেগে যাওয়া উচিত, ও ঠিক ততটা রাগছে না। সে কি শরীরে শক্তি নেই বলে, না কি যাকে দেখলে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠার কথা তাকে দেখে ওর অবচেতনে খুশি ছড়িয়ে পড়েছে? বিচিত্র এই পৃথিবী আর আরও বিচিত্র মানুষের মন।

সনাতনকাকা ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎ বলল, “তুমি যে কোথায় আমি তো তাই জানতুম না। এই ভদ্রলোক তোমার খোঁজে বাড়ির এমুড়ো-ওমুড়ো ঘুরতে ঘুরতে তোমাকে ওই নাচের ঘরে খুঁজে পায়।”

অরণ্য হাসিমুখে বলল, “আমি তো ভাবলাম, তোরও বুঝি তোর দিদুনের মতো...”

“দিদুনের কিছু হয়েছে কে জানাল?” এতক্ষণে কথা বলল জয়ী।

“তোদের বাড়িতে ঢোকার মুখে যে পান-সিগারেটের দোকান সেখানেই শুনলাম।”

“আমাদের বাড়িটাও কি পান-বিড়ির দোকান হয়ে গেল সনাতনকাকা, যার খুশি সেই ভিতরে ঢুকে দোতলা-তিনতলা করে বেড়াতে পারে?”

অরণ্যর হাসিটা মুছে গেল।

সনাতনকাকা আমতা আমতা করে বলল, “তোমার বিদেশের বন্ধু শুনলাম।”

“কে বলেছে বন্ধু? আমি বলেছি? ছবি দেখিয়ে চিনিয়ে দিয়েছি?”

সনাতনকাকা আর কিছু বলার আগেই ডাক্তার সান্যাল ঘরে ঢুকলেন। এই ভদ্রলোকের বাবাও জয়ীদের ফ্যামিলি ফিজ়িশিয়ান ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর ওঁর কাধে দায়িত্ব বর্তেছে। ওঁরা আছেন বলেই ‘বাড়ির ডাক্তার’-এর মতো প্রায় অবলুপ্ত হতে বসা শব্দটা টিকে আছে এখনও।

“হঠাৎ করে কনকাশন মতো হয়েছিল তোমার। এখন দু’-তিনদিন একদম রেস্ট, কেমন?” ডাক্তার সান্যাল বললেন।

আর উনি ঘর থেকে চলে যাওয়ার পরই অরণ্য উঠে দাঁড়াল, “সনাতনকাকার কোনও দোষ নেই। উনি আমাকে একটা ঘরেই বসিয়েছিলেন। আমিই কাউকে কিছু না বলে এই ঘরে ওই ঘরে তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। তোদের বাড়ির গন্ডগোলের পরিস্থিতিতে সেটা আটকানো ওঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।”

“আটকানো জরুরি ছিল। হু আর ইউ? কোন অধিকারে আমাদের বাড়ির আনাচকানাচ ঘুরছিলি?”

“কোন অধিকারে তা জানি না, তবে তুই কলকাতার প্লেন ধরেছিস খবরটা পাওয়া মাত্র আমেরিকার মাটিতে আর-এক মুহূর্ত টিকতে পারিনি।”

“কে দিল খবর?”

“অ্যান-আর্বার ছোট জায়গা জয়ী।”

“ছোটলোকদের জন্য পৃথিবীর সব জায়গাই ছোট।”

“এটা সত্যি যে আমার গায়ে নীল রক্ত নেই, কিন্তু আমি ছোটলোক কি না তা নিয়ে পরে তোর সঙ্গে তর্ক করব।”

“আমি তোর মুখ দেখতে চাই না আর। প্লিজ়!” জয়ী চোখদুটো বন্ধ করল। কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে নামল ওর গাল বেয়ে।

“কিন্তু কেন বল তো? কী এমন অপরাধ করেছি আমি, যার ক্ষমা হয় না? আমি কি তোর সঙ্গে সম্পর্ক থাকাকালীন আর কারও সঙ্গে জড়িয়েছি? হ্যাঁ, আমার একটা অতীত ছিল, যেমন অনেকেরই থাকে, আর আমি সেটার কথা তোর কাছে স্বীকার করেছি। এখন যদি বলিস যে প্রপোজ় করার আগে তোকে সবকিছু বলে নিইনি কেন, তা হলে বলতে হয় আমি তো ‘মাই পাস্ট ফাইলস’ বলে কিছু হাতে নিয়ে ঘুরি না...”

“আমি এসব কথা শুনতে চাইছি না, আমার ভাল লাগছে না, প্লিজ়...”

“কিন্তু আমাকে বলে যেতেই হবে কয়েকটা কথা, কারণ ফিলাডেলফিয়ার সেই রাত্রিটা কাঁটা হয়ে আটকে আছে আমার গলায়। আমি তোর হেরিটেজ কিংবা সম্পত্তির প্রেমে পড়িনি, তোর প্রেমে পড়েছি। আর মানুষ যার প্রেমে পড়ে তাকে নিজের আকর্ষক রূপটাই দেখাতে চায়। একটা পতঙ্গও রং বদলে বদলে নিজের সঙ্গিনীকে অ্যাট্রাক্ট করার চেষ্টা করে।”

“তোর থেকে কোচিং নেয় নাকি পতঙ্গরা?”

“তোর সঙ্গে ওদের আলাপ থাকলে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারিস। কিন্তু আমি যেটা জানি তা হল পতঙ্গ আর মানুষ দুই-ই মুঠোর মধ্যে বন্দি থাকলে ছটফট করে, উড়তে চায়।”

“তোর ওড়া আটকাচ্ছে কিসে?”

“উড়তে নয়, আমি থিতু হতে চাইছি। আর সেটা আটকাচ্ছে, কারণ আমি ডিভোর্সটা এখনও পাইনি। যেদিন আদালত রায় দেবে আর সেই রায়ের সার্টিফায়েড কপিটা আমি হাতে পাব, সেদিন আর আটকাবে না। তবে আশার কথা হল, অহনা ইজ় স্টেয়িং উইথ সামওয়ান এলস। আই থিঙ্ক শি ইজ় হ্যাপি নাও। আর মানুষ যখন নিজে সুখে থাকে তখন সে অন্যকে অসুখী করার চেষ্টায় ঢিল দেয়। তাই আমার মুক্তির সময়ও হয়তো আসন্ন।”

“আর স্পন্দনের? দু’জনের সাপ-লুডোয় ঢুকে যার যাবজ্জীবন হয়ে গেল?”

“স্পন্দনের কথা আমার মাথার মধ্যে নেই ভাবছিস কেন?”

“মাথায় থাকতে পারে, মনে নেই।”

“না থাকলে ওই সময় তোকে ওর নামটা বলতাম না জয়ী।”

“সেটা তোর অস্বস্তি তোকে দিয়ে বলিয়েছিল।”

“অস্বস্তি তার জন্যই হয়, যার প্রতি ভালবাসা আছে। হ্যাঁ, আমি ওর কাঁধে ভর করে বৈতরণী পেরোতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ও ডুবে যাক চাইনি একবারও।”

“এখন যখন ও ডুবে গেছে?”

“তখন ওকে টেনে তুলতে হবে। তার জন্য যা যা করা যায়, করতে হবে। আমি একা হয়তো পারব না, কিন্তু তুই পাশে থাকলে পরে নিশ্চয়ই পারব।”

“এবার কি তা হলে স্পন্দনের জন্য তোকে...”

“কার জন্য আমি জানি না। কিন্তু আমার মন বলে, তোকে আমাকে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে। আমি ছোটলোক হলেও বলতে হবে। কারণ ভদ্রলোকরা উদ্ধার না-করলে ছোটলোকরা যাবে কোথায়?”

জয়ী হেসে ফেলল। আর তখনই একটা ফোন এল অরণ্যর মোবাইলে।

“ধরতে পারিনি কারণ আমি ব্যস্ত ছিলাম। এখনও ব্যস্ত আছি। কী হয়েছে বলবে তো?”

জয়ী পাশ ফিরে শুতে শুতে ভাবল, কে ফোন করেছে যাকে এভাবে ঝাঁঝাচ্ছে অরণ্য?

“মা, আমি তোমায় বললাম তো চাপে আছি আমি। তার মধ্যে তোমার মামাকে দেখতে যাওয়া সম্ভব নয় এখন। আমি পরে কোনওদিন যাব। এখন প্লিজ় ফোনটা রাখো।”

মা ফোন করেছে? অবশ্য মা না হলে আর কাকেই বা এমন মুখের উপর রিফিউজ় করা যায়? জয়ীর মা-ও যদি বেঁচে থাকত, জয়ী কি এরকম ভাবে কথা বলত? কিন্তু জয়ীর তো মা নেই। যে ছিল বলে বাবার মৃত্যু, মায়ের চলে যাওয়া ইত্যাদি সমস্ত আঘাত খানিকটা তীব্রতা হারিয়ে আঘাত করেছে জয়ীকে, আজ সে-ও কোমায়। আর কোমায় যাওয়ার আগে...

“দেওয়ালে এই ছবিটা কার? তোর দিদুনের অল্প বয়সের নিশ্চয়ই? তোর সঙ্গে বেশ খানিকটা মিল আছে কিন্তু!” ফোনটা কেটে দিয়ে অরণ্য বলল।

জয়ী তাকাল প্রীতিকণা চৌধুরীর অল্প বয়সের ছবিটার দিকে। এই ছবির সঙ্গে সুচিত্রা সেনের খানিকটা মিল আছে হয়তো, জয়ীর নিজের ভিতরে ওই তেজ, ওই আত্মাভিমানের সামান্যই খুঁজে পায়। রূপ কি শুধু চোখ আর নাকের দৈর্ঘ্য দিয়ে মাপা সম্ভব? রূপ লুকিয়ে থাকে সেই শিশিরকণায়, যাকে স্পর্শ করার জন্য রোদকেও নিচু হতে হয়।

“তোর কবিতার বইটা কবে বেরোবে?”

“বেরোবে না, আমি ম্যানুস্ক্রিপ্টটা ট্র্যাশে ফেলে দিয়েছি।”

“মানে? কেন?”

“এমনিই। কিছু হয়নি কবিতাগুলো। আমি কি আর কবি নাকি?”

“না, তুই এরকম করতে পারিস না।” জয়ী উঠে বসল বিছানায়।

সনাতনকাকা ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, জয়ীর গলার আওয়াজে ঘরে ঢুকে এসে ওকে বসে থাকতে দেখে অবাক চোখে তাকাল।

“আমি ঠিক আছি, ওর সঙ্গে একটু কথা বলছি।” জয়ী বলল।

সনাতনকাকা কোনও জবাব না দিয়ে ঘরের একটা জানলা খুলে দিয়ে বাইরে চলে গেল আবার।

প্রীতিকণার সাদা-কালো ছবিতে তখন জানলা দিয়ে ভিতরে আসা আলোর খেলা শুরু হয়েছে।

অরণ্য সেদিকে একবার তাকিয়ে বলল, “আসলে খুব আত্মদংশন হচ্ছিল। ফিলাডেলফিয়াতে তোর ট্রেস না পেয়ে অ্যান-আর্বারে ফিরেই যখন শুনলাম তুই দেশে চলে গিয়েছিস, আমার অন্যায়গুলো আমাকে কামড়ে খেতে শুরু করল। মনে হল আমি তোকে চিট করেছি, স্পন্দনকে চিট করেছি, আমি একটা ঠগ। আর একজন ঠগের কোনও অধিকার নেই কবি হওয়ার। তাই পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠাগুলো কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলেছি। ছিঁড়ে ফেলে শান্তি পেয়েছি, বিশ্বাস কর।”

“কিন্তু আমার সর্বাঙ্গে আবার অশান্তির আগুন লাগিয়ে দিলি। বইটা বেরোলে আমার থেকে নামটা মলাটে নিয়েই বেরোত, তুই ম্যানুস্ক্রিপ্টটা ছিঁড়ে ফেলে আমাকেই প্রত্যাখ্যান করলি।”

“না জয়ী, না। ওই কবিতাগুলো তোর যোগ্য ছিল না। যেমন আমি তোর যোগ্য নই এখনও। কিন্তু তুই যদি আমাকে আর একটা চান্স দিস, তা হলে আমি তোর যোগ্য হওয়ার চেষ্টা করব, তুই নাম দিয়ে আনন্দ পাবি, সেরকম কবিতা লেখার চেষ্টা করব...”

“আমার দিদুনকে নিয়ে একটা কবিতা লিখতে পারবি?”

“মানে?” অরণ্য অবাক হয়ে গেল।

“মানে, একটা মানুষ, তাকে আমরা যেরকম দেখছি, সে ঠিক সেরকম নয়, অনেক অজানা সুতোয় বোনা তার জীবন...”

“জয়ী, তোর এখন বেশ খানিকটা বিশ্রাম দরকার। কবিতার কথা পরে বললেও চলবে।”

“না। এখনই একটা কথা দিয়ে যা। তুই দিদুনকে নিয়ে একটা কবিতা লিখবি। যে কবিতায় একজন কিশোরী আস্তে আস্তে একটা বাড়ির সর্বময় কর্ত্রী হয়ে উঠছে। তার আধা উদাসীন স্বামী হরিদ্বারে গিয়ে এক সাধুর আখড়ায় এমন জড়িয়ে যাচ্ছে যে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হিমালয়ের চড়াই-উতরাইকেই জীবনের মোক্ষ ঠাউরে নিচ্ছে, তার ছেলে সংসারের সমস্ত সম্পদ নিজের পরিশ্রমহীন সাফল্য পাওয়ার নেশায় বাজি ধরে গোটা পরিবারটাকে সংকটের মুখে নিয়ে যাচ্ছে, তার মেয়ে মায়ের অমতে বিয়ে করে এমন এক পরিবারে চলে যাচ্ছে যারা বাড়ির বউকে সন্তানসম্ভবা অবস্থাতেও খেতে না দিয়ে মারধোর করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে আর তারপরও যে নিজের প্রাণপ্রিয় নাতনিকে প্রেমের থেকে দূরে থাকার সাবধানবাণী শোনাচ্ছে না, বরং একটা নদী আর রাখালের গল্পের মধ্যে দিয়ে চিনিয়ে দিচ্ছে সত্যিকারের ভালবাসা...”

“আমি এতটা পারব না রে জয়ী। তোর দিদুনের কথা লিখতে গেলে একটা হেরিটেজের অংশ হওয়া দরকার। আমি রিফিউজি বাড়ির ছেলে...”

“ধুত্তোর হেরিটেজ। নিকুচি করেছে রিফিউজির। তুই ইস্টবেঙ্গলের কথা নিয়ে আয় না দিদুনকে নিয়ে লেখা কবিতায়। জীবনের স্ট্রাকচার তো এবড়োখেবড়ো, কবিতার স্থাপত্যকে অত নিটোল হতে হবে কেন? নকশাগুলো মেলার দরকার নেই, এ ওর দিকে তর্জনী তুলে দাঁড়িয়ে থাক বরং। একটা দরজা খুলতে গেলে অন্য দরজা বন্ধ করে দিতে হবে, কে বলেছে? ভেজানো থাকতে পারে না?”

“জয়ী সোনা, তুই প্লিজ় আর-একটু ঘুমো। এখন এত কথা বলা ঠিক হচ্ছে না তোর। আমিই ভুল করলাম তোকে এত বকিয়ে। উফফ, মা আবার ফোন করছে।”

“ধর মায়ের ফোনটা। আমি চাইলেও মায়ের ফোন ধরতে পারি না আর।” জয়ী আবার শুয়ে পড়ার আগে বলল।

অরণ্য খানিকটা ভয়ে আর খানিকটা বিস্ময়ে জয়ীর দিকে তাকিয়ে ফোনটা রিসিভ করেই আঁতকে উঠল, “কোথায় যেতে হবে? মোহনবাগানে? এই ঘরে শুনছি ইস্টবেঙ্গল আর তুমি বলছ মোহনবাগান। উফফ, এবার সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাব আমি।”

মোহনবাগান কলোনি, নদিয়া

বহুদিন পর বাড়ির বাইরে বেরোলেন আনন্দকুমার। যে বয়সে তিনি পৌঁছেছেন, রাস্তায় হাঁটাচলা করার কথা নয়, তবু আজ বেরিয়েছেন, বাপ্পা বলে এক যুবকের সাহায্যে একটি গাড়ি ভাড়া করে এতদূর এসেছেন, তার কারণ ওঁর বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ বের হওয়ার প্রস্তাব এবং এই খবরটা প্রায় একই সময়ে এসে পৌঁছেছে। আর খবরটা পেয়েই আনন্দকুমারের মনে হয়েছে, এই ঘটনাটা একবার যাচাই করা দরকার। যদি সত্য হয় তা হলে ঘটনাটার কথা, কারণসহ ওঁর বইয়ের পরবর্তী সংস্করণে থাকা অবশ্যপ্রয়োজনীয় এবং একই রকম প্রয়োজন বইটার ইংরেজি অনুবাদেও বিষয়টার বিস্তারিত উল্লেখ।

“আপনি সত্যিই জানেন না যে, উত্তর চব্বিশ পরগনা আর নদিয়ার সীমান্তে এই নামের একটা কলোনি আছে?” উদ্বাস্তুদের ইতিহাস নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে কাজ করা আশিস হাজরা, আনন্দকুমারের ঘরের একটা মোড়ায় বসে ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কয়েকদিন আগে।

“নাহ। আজ প্রথম নাম শুনলাম। আমার বইয়ে আমি প্রায় একহাজার কলোনির নাম দিয়েছি, দুই চব্বিশ পরগনা, কলকাতা, হাওড়া, হুগলি শুধু নয়, বর্ধমান কিংবা মেদিনীপুরে স্থাপিত কলোনিরও নাম আছে, বিবরণ আছে। এটা কীভাবে হতে পারে যে এরকম একটা কলোনি আছে কিন্তু তার কথা আমার গোচরে আসেনি? ব্যাপারটা ঘটে থাকলে, আমার তরফে গাফিলতি হয়েছে ধরে নিতে হবে।” আনন্দকুমার নিজের শ্রবণযন্ত্রটা কানের সঙ্গে সেঁটে নিলেন।

“গাফিলতি আপনার নয়, আসলে জায়গাটা এত ছোট যে ঠিক কলোনি পদবাচ্য নয়। ধরুন মেরেকেটে দশ-বারো বিঘে আর ফ্যামিলিও পঁচিশ-তিরিশটার বেশি নয়। তা ছাড়া এমনই একটা ভৌগোলিক অবস্থান যে, কোনও হাইওয়ে কিংবা স্টেশনও ধারেকাছে নেই। আগে দুর্গম ছিল, এখনও রিমোট বলাই যায়।”

“আপনি জানলেন কী করে তবে?”

“সেও এক ইন্টারেস্টিং গল্প। দয়াময় পাল বলে এক উদ্বাস্তু কুম্ভকারের জীবন নিয়ে একটা ডকু-ফিচার করছি আমি, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজের তৈরি লক্ষ্মী আর কালীর কাঠামোর পিছনে এমনভাবে লুকিয়ে পড়েছিলেন যে কুমোরপাড়ায় ঢুকে পড়া ঘাতকবাহিনীর গুলি তাঁর তৈরি মূর্তিগুলিকে ঝাঁঝরা করে দিলেও ছুঁতে পারেনি শিল্পীকে। সেই ঘটনার পর কলকাতায় চলে আসা দয়াময়বাবু, উদ্বাস্তু আন্দোলনের এক সময়ের নেতা কৃষ্ণকিরণ রাহার সৌজন্যে ওই কলোনিতে জায়গা পান। এখন দয়াময়বাবু যাদবপুরের কাছে থাকেন, নিজস্ব একটা স্টুডিয়ো হয়েছে ওঁর, কিন্তু সেই দিনগুলোর কথা মনে করে আজও চোখ ভিজিয়ে ফেলেন।”

“কৃষ্ণকিরণকে তো আমি চিনি। আমার বই লেখার সময় ওর কাছ থেকে অনেক সাহায্যও পেয়েছি। কিন্তু বহু বছর কোনও যোগাযোগ নেই। ও বেঁচে আছে তো?”

“আছে। ওই কলোনিতেই আছে এখন। আমি দয়াময় পালের থেকেই শুনলাম। তবে ভীষণই অসুস্থ।”

“ওর ফোন নম্বরটা একটু জোগাড় করা যায়?”

“উনি মোবাইল ব্যবহার করেন না। আর ওই কলোনির যে-ঘরটায় থাকেন সেটা টালির চালের, ভিতরে ল্যান্ডফোন তো দূর, ইলেকট্রিক কানেকশনও নেই। ব্যাচেলর মানুষ, আশি পেরিয়েছেন, কিন্তু এত জেদি যে...”

“জেদ বলবেন না, ওটাই আদর্শ। আমরা ওর জোরেই পথ চলতাম। আমার স্ত্রীর যেদিন হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, ওকে নিয়ে সরকারি হাসপাতালে গিয়েছি, স্ট্রেচারে করে পেশেন্টকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুটো লোক পঞ্চাশ টাকা চাইল। দিলে হয়তো ভদ্রমহিলা বেঁচে যেত, কিন্তু এত ঘৃণা জাগ্রত হল যে তাড়িয়ে দিলাম লোকদুটোকে। নিজের চেষ্টায় যখন ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যেতে পারলাম ততক্ষণে আধঘণ্টা কেটে গিয়েছে, সুষমা ডাক্তারির আওতার মধ্যে নেই আর। ঘটনাটা যে শুনেছে সেই ‘হায় হায়’ করেছে সামনে আর আড়ালে, ‘চশমখোর বুড়ো পঞ্চাশ টাকা খরচ না করে বউটাকে মেরে ফেলল’ বলেছে। দু’-চারবার আমার নিজেরও যে নিজেকে চাবকাতে ইচ্ছে হয়নি তা নয়, কিন্তু সেদিন ওই মুহূর্তে আমি পেরে উঠিনি ঘুষ দিয়ে পরিষেবা পেতে। কৃষ্ণকিরণও হয়তো সেরকম কোনও কারণেই লাইট-ফ্যান ছাড়া থাকে। ওকে অনেকদিন চিনি তো, কম্প্রোমাইজ় করলে মন্ত্রী-টন্ত্রী হয়ে যেতে পারত।”

“কম্প্রোমাইজ়ের কথায় মনে পড়ল, দয়াময়বাবুকে উনি বলেছিলেন যে ওই কলোনিতে থাকতে গেলে মোহনবাগানকে সাপোর্ট করতে হবে। এই ব্যাপারে কোনও আপস করা যাবে না। সেই স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে দয়াময়বাবু হাসছিলেন আর বলছিলেন যে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান খেলার দিন কলোনির অনেকেই রেডিয়ো বন্ধ করে বসে থাকত, ইস্টবেঙ্গল গোল দিলে পাছে উল্লাস করে বসে।”

“এরকম শর্ত কেন?”

“ওটাই নাকি ওই উপনিবেশের স্থায়ী নিয়ম ছিল। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান খেলার দিন মোহনবাগান জিতুক কিংবা হারুক, সবুজ-মেরুন পতাকা উড়বে।”

“বিস্ময়কর! আমাকে ব্যাপারটা কৃষ্ণকিরণের থেকে জানতে হবে আশিস। যেভাবেই হোক, একবার দেখা করতে হবে ওর সঙ্গে।”

“কিন্তু উনি তো শয্যাশায়ী। হাঁটাচলা করতে পারেন না একদমই।”

“আমি তো পারি। এখনও। আমিই যাব।”

“তারিখটা কত বললে? উনপঞ্চাশ সালের তেইশে জুলাই? অঝোর বৃষ্টি হচ্ছে?” কৃষ্ণকিরণের চৌকিটার পাশে একটা বেতের চেয়ারে বসে জানতে চাইলেন আনন্দকুমার।

উত্তরে কৃষ্ণকিরণ খানিকটা জড়ানো গলায় ইতিহাসের একটা অলিখিত দিনের পরদা ধরে টান দিল আর সরে যেতে থাকল মাথার উপরের চাঁদোয়া, পায়ের তলার আস্তরণ, পাতাল থেকে আকাশ পর্যন্ত সংযুক্ত হয়ে যেতে থাকল সেই বৃষ্টিতে যা দু’দিক ভেজালেও একদিক ঝাপসা করে রাখে।

“সাকুল্যে পনেরো-ষোলোটা ঘর হবে, দরমা-টালির, জমিদারের লেঠেলরা এসে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল সবক’টা।”

“কেউ প্রতিরোধ তৈরি করতে পারেনি?”

“প্রতিরোধ করার মতো জোর ছিল না কারও। দু’দফা পালিয়ে আসা লোক সব। প্রথমে ভিটে-মাটি ছেড়ে, তারপর কলকাতার কোন এক জবরদখল কলোনির ধ্বংসস্তূপ থেকে। শহরের এত দূরে, প্রায় জঙ্গুলে একটা জায়গায় যে আবার আক্রমণের শিকার হবে, ভাবতে পারেনি লোকগুলো। ওই জায়গাটায় জমিদারের বাগানবাড়ি না কী একটা তৈরির প্ল্যান ছিল, ওদের জন্য পণ্ড হবে নাকি সেই পরিকল্পনা? অবাক করা বিষয় যে, হাঁড়ি-বাসন আর পেতে শোওয়ার চটটুকু হাতে নিয়ে নিজেদের ঘর থেকে শেষবার বেরিয়ে যাওয়ার সময় লোকগুলো হাতজোড় করে প্রণাম জানাচ্ছিল জমিদারকে। আর তখনই হাতে একটা দা নিয়ে বেরিয়ে এল মেয়েটা।”

“তার খোলা চুল যেন একটা জলপ্রপাত, তার দুই চোখে যজ্ঞ থেকে উঠে আসা দ্রৌপদীর তেজ। ছিন্নমস্তা যেমন নিজের রক্ত নিজেই পান করতেন, সে ছিন্ন-লজ্জা হয়ে নিজের লজ্জা নিজেই বিসর্জন দিয়ে দাঁড়িয়েছে পরাক্রমী বিরুদ্ধশক্তির মুখোমুখি, জান আর জমির অধিকার বুঝে নেবে বলে।”

“তুমি এতসব জানলা ক্যামনে আনন্দদা? তুমি তো ছিলা না সেদিন এইখানে, ছিলাম আমি।” আবেগের বিস্ফোরণে দ্যাশের ভাষায় ফিরে গেলেন কৃষ্ণকিরণ।

“আমি ছিলাম, তুমি ছিলা, আমরা সব উদ্বাস্তুরা ওই তেইশে জুলাই এইখানেই ছিলাম কৃষ্ণকিরণ। তুমি বলো, তারপর কী ঘটল।”

“তুমি ঠিকই কইসো, এই কলোনির মাটি সেদিন রাত্রে নোয়ার নৌকো হইয়া উঠসিল য্যান, প্রলয়ের মধ্যে রিফিউজিগো যার ভিতরে আশ্রয় পাইতেই হইব। আর আমাগো আশ্রয়দাত্রী জগদ্ধাত্রী, সেই দা হাতে কইরা জমিদারের সম্মুখে আইস্যা খাড়া হওয়া মাইয়াটা, সবার সমস্ত ভয়রে যে অধিকারে বদলাইয়া দিসিল নিমেষে!” কৃষ্ণকিরণ দম নেওয়ার জন্য থামলেন।

“কিন্তু সেই অধিকারের মইধ্যে কম্প্রোমাইজ় আইল ক্যামনে? কলোনির লগে ‘মোহনবাগান’ জুড়ল কী কইরা?” আনন্দকুমারের গলাটা উত্তেজনায় ভাঙা ভাঙা শোনাল।

উত্তর দেওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়লেন কৃষ্ণকিরণ। কথা বলার শ্রান্তিতে, ইতিহাসকে ফিরে দেখার ক্লান্তিতে। কিন্তু ততক্ষণে ওই ঘরের মধ্যে উপস্থিত এক অপরিচিত যুবক, ঘরের ট্রাঙ্ক হাতড়ে বের করে এনেছে কলোনির প্রাচীন আমলের একটি ছবি, যার মাঝামাঝি দাঁড়ানো মেয়েটির উপরে চোখে আটকে গেছে আনন্দকুমারের। দু’দিকের দুই বেণী যেন তিস্তা আর মেঘনার মতো নেমে এসেছে আর মুখটায় কোনও এক আগ্নেয়গিরি নিজের সবটুকু আগুন দিয়ে একটা রূপকথা তৈরি করেছে।

বেশ খানিকক্ষণ পর চোখ খুলে ছবিটা দেখেই কৃষ্ণকিরণ বললেন, “এই ছবি কলোনি বাঁচানোর পরদিন তোলা হয়েছিল। সেদিন আমার আট কিংবা নয় বছরের জন্মদিন ছিল,মনে আছে।”

মেয়েটির জন্মদিন কবে? না কি প্রতিটা উদ্বাস্তুর জীবনযুদ্ধে জিতে যাওয়ার দিনটাই তার জন্মদিন? আনন্দকুমার ভাবলেন।

অপরিচিত যুবকটিও তখন ছবিটির মধ্যের মেয়েটিকে দেখতে দেখতে ফিরে গেছে সেদিন সকালেই দেওয়ালে দেখা একটি মুখের কাছে। দুটো মুখের মধ্যে এত মিল কেন?

দুই বেণী, দুই বাংলা, দু’রকম সময়, দুই দৃষ্টিভঙ্গি।

শুয়ে থাকা কৃষ্ণকিরণের ঘরে বসে থাকা দুই অসমবয়সি মানুষের মধ্যে, একটা মুখ আর একটা ঘটনা বর্তমান থেকে ইতিহাসে, ইতিহাস থেকে বর্তমানে বনবন করে ঘুরতে লাগল।

পটকা ফাটতে লাগল বাইরে।

স্বাধীনতার দিন যেমন ফেটেছিল।

আইসিইউ, জুপিটার হাসপাতাল

চোখ খুললে তো যে কোনও একটা কিছুতেই আটকে থাকে দৃষ্টি, কিন্তু বন্ধ চোখের পরদায় অগুনতি দৃশ্য খেলা করে যায়। প্রীতিকণা কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবেন? ওই যে আনন্দদার সঙ্গে একই নৌকোয় ভেসে যাচ্ছেন, ওই আবার লোকনাথবাবার মন্দিরে মিছরি প্রসাদ নিচ্ছেন সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে একই পঙ্‌ক্তিতে দাঁড়িয়ে, ওই যে আইফেল টাওয়ারের মতো খানিকটা হেলে দাঁড়ানো শ্যামসিদ্ধির মঠ চোখের সামনেই যেন উঁচু হয়ে উঠছে আরও খানিকটা আর ছায়া থেকে রোদ কিংবা রোদ থেকে ছায়ায় দৌড়তে দৌড়তে আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে কাঠবেড়ালীটা, প্রীতিকণা কাকে স্থির হতে বলবেন চেতনায়? অবশ্য স্থির হতে বলবেনই বা কী করে? চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত যে ভরতমামা ওঁদের বিক্রমপুরের বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন, তিনিই তো বারবার করে ওঁকে বলতেন, “স্বাধীনা, এত অস্থির হইও না। স্থির হও।”

আনন্দদা বলত যে পদ্মার সন্তানেরা কখনও স্থির হতে পারে না, হয়তো ঠিকই বলত। তারা ওই অস্থির কাঠবেড়ালীর মতো রোদ থেকে ছায়ায় দৌড়ে বেড়ায়, কিন্তু প্রীতিকণা কি একছুটে নিজের শৈশবের নামটার কাছে ফিরে যেতে পারবেন, চাইলেই?

চাকরিসূত্রে চট্টগ্রামে থাকতেন স্বাধীনার মায়ের বাবা। প্রথমে একা, পরে গোটা পরিবারকেই নিয়ে গিয়েছিলেন সেখানে। স্বাধীনাকে গর্ভে নিয়ে ওর মা যখন দাদুর বাড়িতে গিয়ে উঠল, তখন শীত শেষ হয়ে আসছে। মেয়ের প্রথম সন্তান দাদুর বাড়িতেই হবে এমন রেওয়াজ ছিল তখন। আর তার পাশাপাশি সেই সন্তান ছেলে হবে এমন একটা আশাও ঘুরে বেড়াত হাওয়ায়। কিন্তু ‘স্বাধীনা’-র জন্মের সঙ্গে দেশের মুক্তি এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল যে সন্তান ছেলে না মেয়ে সেই বিচার তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল।

মায়ের ব্যথা ওঠার সময়েই আসলে শুরু হয়েছিল বিপ্লব আর স্বাধীনা যখন পৃথিবীর আলো দেখল, উনিশশো তিরিশের সেই আঠেরোই এপ্রিল, চট্টগ্রাম ব্রিটিশ ভারত থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া একটা মুক্তাঞ্চল।

“পরাধীন ভারতে আমার মেয়ের জন্ম নয়। ব্রিটিশ ভারতের থেকে ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটি স্বাধীন ভূখণ্ডে ওর জন্ম। তাই কোনও দেব-দেবীর নামে নয়, ওর নাম আমি রাখব ‘স্বাধীনতা’র নামে। যে স্বাধীনতা মানুষের প্রাণের চেয়েও মূল্যবান।”

বাবার ডায়েরিতে লেখা এই কথাগুলো বাবার মৃত্যুর অল্প কয়েকদিন আগে পড়তে পেয়েছিল স্বাধীনা। আসলে নিয়মিত ডায়েরি লিখত না বলে একটা ডায়েরিতেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছিল বাবা। ঘরদোর ছেড়ে অচেনা জায়গায় চলে আসার আগে লিখেছিল, “যে স্বাধীনতার স্পর্শ আমার কন্যার জন্মের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতার অনেক আগেই পেয়েছি, সেই স্বাধীনতার মূল্য দিতেই আজ চিরকালের চেনা জল-হাওয়া-মাটিকে ছেড়ে অন্যত্র চললাম। স্বর্গাদপি গরীয়সী জন্মভূমির মায়া এই জীবনের মতো কাটল। বাকি জীবনটা পথেই কাটুক বা প্রাসাদে, দুই-ই আমার কাছে নরক ভিন্ন অন্য কিছু নয়...”

নরকেও, স্বর্গের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে মানুষ। তাতে স্বর্গসুখ কতটা পাওয়া যায় কে জানে, নরকের কষ্ট কমে না। দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের উদাসীনতা, নতুন পরিচিতদের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা, পথে পথে মানুষের মুখোশে কত যে রক্তচোষা, তার ইয়ত্তা মেলা ভার। তবু মার্বেলের গুলির মতো ক্যাম্প থেকে কলোনিতে গড়িয়ে যেতে যেতে স্বাধীনা ওর মায়ের মুখে বারবার শুনতে পেত সেই গল্প, যা ওর জন্মের সঙ্গে একটি দেশের মুক্তিকে একসুতোয় বেঁধে দিয়েছিল সেই আঠেরোই এপ্রিল রাতে, তিরিশ সালের চট্টগ্রামে।

মায়ের প্রসবযন্ত্রণা যখন শুরু হয়েছে, চট্টগ্রামে তখন কেবল তার ছিঁড়ে পড়ছে, রেললাইন উপড়ে ফেলা হচ্ছে। স্বাধীনতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত সেই রাতে ব্রিটিশ শক্তিকে হারিয়ে দিয়েছিল বাঙালির শৌর্য। আর সেই ইতিহাসে কেবল অম্বিকা চক্রবর্তী, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, অনন্ত সিংহ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত প্রমুখ বিপ্লবী আর তাঁদের মাথার উপরে গনগনে সূর্যের মতো মাস্টারদা সূর্য সেনই ছিলেন না, ছিল একটি জন্ম, একটি কান্না, একটি আগমন।

প্রসবের জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চল তখনও ছিল না আর সেদিন চট্টগ্রামে সব রাস্তাই শুধু মুক্তির পথে হাঁটছে। তার ভিতরেই পৃথিবীতে এসেছিল মেয়েটি আর সেই বিশেষ দিনে পৃথিবীর আলো দেখার জন্য ওকে ঘিরে একটা হুজুগ তৈরি হতে যাচ্ছিল। হয়নি কারণ, পরিবারের মধ্যেই একজন পুলিশের দারোগা ছিলেন, ব্রিটিশ সরকার চট্টগ্রাম পুনর্দখলের পরে যিনি দুর্গাদাস সেনগুপ্তকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, মেয়ের জন্মতারিখ বা জন্মের সময়কার পরিস্থিতির কথা যেন কঠোরভাবে গোপন রাখা হয় নইলে অকারণে গোটা পরিবারকে পুলিশি হুজ্জুতির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। ছোটবেলায় স্বাধীনা নিজেও তাই সঠিক জানত না ওর জন্মের রাত্রির আবহ। একমাত্র ভরতমামা ইশারায় কিছু কিছু বলতেন কিন্তু তার মর্মোদ্ধার করা সেই বাচ্চা মেয়েটার পক্ষে সম্ভব হয়নি তখন।

আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, যা গোপনীয় ছিল, জন্মভূমি থেকে চলে আসতে বাধ্য হওয়ার পর পর তাই হয়ে উঠল গৌরবের এবং চর্চার। তা হলে কি বাড়ি থেকে বহিষ্কারই খুলে দেয় বাড়ির গোপন সব চিলেকোঠা? পরে অনেকবার মনে হয়েছে স্বাধীনার। নিজের নামটার মানে খুঁজতে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করত সেই সময়বিন্দুর কাছে, যখন পরাধীনতা থেকে মুক্তি মানেই শিকড় থেকে বিচ্ছেদ!

শিকড়হীন লতা যেভাবে জলকে আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকতে চায়, এক ভাগাড় থেকে অন্য ভাগাড়ে ছিটকে পড়া মানুষগুলো সেভাবেই টিকে থাকতে চাইছিল। কিন্তু তাড়াতে তাড়াতে শেষ কিনারে নিয়ে এসেও যখন তাড়ানো থামত না, তখন? কলকাতা থেকে অনেক দূরের একটা পৃথিবীতে, হোগলা আর বাঁশের ঘর ছেড়েও যখন আবার নিরুদ্দেশে বেরিয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছিল মানুষগুলো?

“জমিদারবাবু ওঁর সাধের বাগানবাড়ি বানাইব এইখানে, তাই লাঠিয়াল দিয়া পিটাইয়া তুইলা দিব আমাগো।” স্বাধীনার মা ওপার থেকে নিয়ে আসা একটা কলসির ভিতর শেষ সম্বল দুটো সোনার বালা আর একটা হার শাড়িতে মুড়ে গুঁজে রাখতে রাখতে বললেন।

মায়ের বলা কথাগুলোর প্রতিটা শব্দ যেন জালালাবাদ পাহাড় থেকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দিকে ছোড়া বুলেটের মতো স্বাধীনার শরীরে এসে বিঁধতে লাগল। ক্ষত সৃষ্টি করতে লাগল ওর আত্মায়। ব্যাপারটা চলতে চলতে এক সময় একটা সহস্র-চক্ষু যন্ত্রণা একটা অন্ধ ক্রোধের জন্ম দিল অন্তরে আর হাতের সামনে পড়ে থাকা হাত-দা’টা নিয়ে স্বাধীনা দাওয়াটা টপকে নেমে দাঁড়াল জল-থইথই উঠোনে, এগিয়ে গেল জমিদারের দিকে।

“অত দূরের একটা জমি উদ্ধার করার জন্য আপনি নিজে গিয়েছিলেন কেন?” প্রীতিকণা পরে জিজ্ঞেস করেছিলেন তাঁর শ্বশুর অশেষনারায়ণ চৌধুরীকে।

“ওটা যে আমার দাদুর দেওয়া জমি আমার মাকে। আমার দাদু একটি সওদাগরি আপিসে খুব সাধারণ চাকরি করতেন, কিন্তু তিনি মোহনবাগান ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। ওই জমি লাগোয়া যে বড় পুকুরটা আছে সেখানে রাজেন সেনগুপ্ত, অভিলাষ ঘোষ, গোষ্ঠ পালরা এসে মাছ ধরেছেন, ছিপ ফেলে...”

“পারিবারিক ঐতিহ্যের সেই জায়গা আপনি আমাদের দিয়ে দিলেন?”

“তোমার ভিতর আমার মাকে দেখতে পেলাম যে!” অশেষনারায়ণ চোখে চোখ রাখলেন প্রীতিকণার।

“দা হাতে রাস্তায় নামা একটা মেয়ের মধ্যে মাতৃদর্শন হল?”

“হয়েছিল। কারণ মা মানে শুধু গর্ভধারিণী নয়, দেশমাতৃকাও। তোমার ওই আগুনে দৃষ্টি থেকে যখন কান্না গড়াচ্ছে তখন আমার চোখের সামনে যে মাকে র‌্যাডক্লিফের ছুরি দু’ভাগে ভাগ করে দিয়েছে সেই মা নয়, যে মায়ের দুই চোখের নাম কর্ণফুলি আর কংসাবতী, সেই অখণ্ড মায়ের দুয়ারই যেন খুলে গিয়েছিল। তাকে দেখে চোখ আর ফেরাতে পারছিলাম না।”

“তাই তার জাত-গোত্র-বংশ কিচ্ছু না দেখে...”

“মায়ের আবার ওইসব হয় নাকি? কিন্তু নামটা পালটে দিয়ে নতুন একটা পরিচয়ে পরিচিত করতে তোমাকে কাশী নিয়ে যেতে হয়েছিল, কারণ আমাকেও সমাজেই থাকতে হয়।”

“সে নয় বুঝলাম, কিন্তু ওই মোহনবাগানের সমর্থক হওয়ার শর্ত আপনি দিয়েছিলেন কেন? মোহনবাগানের কি সমর্থকের অভাব?”

“বাহ্ রে, আমার দাদুর জমিটা নিঃশর্তে ছেড়ে দেব আর দাদুর স্মৃতির প্রতি একটা নজরানা নেব না?”

“তাই বলে ইস্টবেঙ্গলের লোককে দিয়ে...”

“রাজেন সেনগুপ্ত, অভিলাষ ঘোষ, গোষ্ঠ পাল কোথাকার লোক? ইস্টবেঙ্গলের লোক ছাড়া যে মোহনবাগানের উৎসব সম্পূর্ণ হয় না।”

“একদিন মোহনবাগানের লোক ছাড়াও ইস্টবেঙ্গলের উৎসব সম্পন্ন হবে না, আপনি দেখবেন।”

“তাই বুঝি?”

“আজ্ঞে। আর আমিই সেটা করে দেখাব, কথা দিলাম আপনাকে।”

“আমি পৃথিবীতে থাকি না-থাকি তুমি কথা রাখতে পারো সেই আশীর্বাদই করি। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর আমি আজও পাইনি।”

“বলুন।”

“তুমি আমাকে বলেছিলে যে তোমার বাবার দেখানো পথে চলবে বলেই তুমি রাজি হচ্ছ আমার প্রস্তাবে। তোমার বাবা কোন পথে চলেছিলেন?”

“আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ইলিশে পোড়া লাগলে আপনার ছেলে রেগে যাবে।”

“আমি রাগ করতে পারব না তোমার উপর। কিন্তু আমার প্রশ্নটার উত্তর পেলে ভাল লাগত...”

“ভালবাসার ভিতর সব উত্তর আছে। আমার মুখের দিকে আর-একবার তাকিয়ে দেখুন, ঠিক টের পাবেন...”

প্রীতিকণা টের পেলেন যে জয়ী ওঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। পাশে সৌম্যদর্শন একটি ছেলে। অনেক কথা বলছে জয়ী, কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে থাকার কারণ জানতে চাইছে প্রীতিকণার কাছে, প্রশ্ন করছে...

প্রীতিকণার পক্ষে সম্ভব হলে উনি জয়ীকে উত্তরগুলো দিয়ে যেতেন। কিন্তু জালালাবাদ পাহাড়ের ওপারে যে মুক্তি সেই মুক্তি যে ওঁকে ডাকছে। সেখানে চা খাচ্ছেন গণেশ ঘোষ, হাতের পিস্তলটা ঘোরাতে ঘোরাতে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের দিকে ছুড়ে দিলেন অনন্ত সিংহ, ওই যে একটু দূর থেকে মাস্টারদা আপনমনে বলে উঠলেন, ‘জীবন নিজেই একটা অস্ত্রাগার আর প্রত্যেকটা স্মৃতিই একটা অস্ত্র।’

মাস্টারদার কথাটা নিজেদের মতো করে আবৃত্তি করতে শুরু করল সকলে... এখনই ওখানে গিয়ে না দাঁড়ালে স্বাধীনতা আসতে আরও দেরি করে ফেলবে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকতে ঢেউ আসতে দেরি করে ফেলবে, আর আনন্দদা তো দেরি করছেই...

আচ্ছা, আনন্দদার থেকেই প্রীতিকণা জেনেছিলেন না যে কক্সবাজারের আদি নাম হল গিয়ে পালংকি কিংবা প্যানোয়া আর তার মানে হলুদ ফুলের দেশ? সেই হলুদ ফুল আনন্দদা কোনওদিন এনে দেয়নি নিজের স্বাধীনাকে, কেবল একটা অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি দিয়ে গিয়েছিল আর ফেরত নিয়ে যাওয়ার সময় বুঝতেও পারেনি কেন খানিকটা হলুদ হয়ে গেছে পৃষ্ঠাগুলো। আরে বাবা, প্রীতিকণার ভালবাসায় পাতাগুলো হলুদ ফুল হয়ে গেছে যে সব! জীবনসায়াহ্নে দাঁড়িয়েও ওই ভালবাসাটা তাণ্ডবের চেহারা নিতে চাইছিল বলেই তো নিজের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে আনন্দদার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন বইটা প্রকাশ পাওয়া মাত্রই। কিন্তু আজ যখন নিশ্বাস-প্রশ্বাসের বন্ধনই ছিন্ন হতে চলেছে তখন আবার তাকে পাওয়ার জন্য হাত বাড়ানোই যায়।

বিয়ের সন্ধ্যায় যাঁর মুখ দেখে মনে হয়েছিল ‘বেশ সুন্দর তো’, সেই হৃদয়েশ নারায়ণ চৌধুরীকে মনেই পড়ল না প্রীতিকণার, খালি মনে হতে লাগল এই দমের কষ্টটুকু পেরিয়ে ওই জালালাবাদ পাহাড়ে উঠে যেতে পারলেই আনন্দদা ফুলের মালা পরিয়ে দেবে খোঁপায় আর পৃথিবীর সব রাত্রি নষ্টচন্দ্রার রাতে বদলে যাবে।

জয়ীর কানে কানে ওর পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা কী যেন বলল। আচ্ছা, জয়ী যে এখনও এত প্রশ্ন করছে, ওই ছেলেটা কি ওকে জানাতে পারেনি ভালবাসার ভিতরেই সব উত্তর আছে?

বিটি রোড, উত্তর চব্বিশ পরগনা

নব্বই পেরোনো একটা মানুষের শরীর যে আছে তাই তো অনেক, সেই শরীরকে ধকল দেওয়া একেবারেই গর্হিত একটা কাজ। কিন্তু ফেরার পথে পিঠ আর কোমর টাটিয়ে উঠলেও আনন্দকুমারের মনে হচ্ছিল, বাড়ি ফিরেই সাদা পৃষ্ঠায় কলম ছোঁয়াতে হবে ওঁকে, আরও একটা অধ্যায় লিখতেই হবে, নইলে ‘বঙ্গীয় উদ্বাস্তুর জীবনকথা’ পূর্ণতা পাবে না। আর ইংরেজি অনুবাদ বের করতে চাইছেন যাঁরা তাঁদেরও সামান্য অপেক্ষা করতে বলতেই হবে, জীবন যখন ফুরিয়ে যায়নি, ইতিহাস অপূর্ণ থাকে কেন? সেই ইতিহাসের হাতের ভাঁজে নানা রঙের তাস, প্রতিটাই মুহূর্তের রঙে রঙিন, দূর থেকে দেখলে কোনওটা আত্মত্যাগ আর কোনওটা বা আপোশের মতো লাগে।

“তুমিও তোমার বাবার মতো আপোশ করবে, আমি ভাবি নাই স্বাধীনা। কিন্তু সন্তান তো বাবার পদাঙ্কই অনুসরণ করে...”

“আমি কোনও আপোশ করিনি আনন্দদা। আমি কী কারণে, কোন পরিস্থিতিতে এখানে বিয়ে করেছি, সেই কৈফিয়ৎ আমি দিতে চাই না তোমাকে। দিয়ে লাভ নেই। কিন্তু আমার বাড়িতে বসে তুমি আমার বাবা নিয়ে কথা বলবে, সেটাও তো মেনে নেব না আমি।”

“তুমি মেনে না নিলেই তো ইতিহাস পালটাবে না। যে চার্লস টেগার্ট বিক্রমপুর, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহির মানুষের চোখে একটা রাক্ষস, একটা শয়তান, সেই টেগার্টের কাছে দুর্গাদাস সেনগুপ্ত খেলার মাঠের অংশ চেয়ে দরবার করতে গিয়েছিলেন, তুমি অস্বীকার করতে পারো?”

“মিথ্যে কথা বলছ তুমি, আমার বাবা এরকম কিছু করেনি।”

“আমি তোমার মদতেই এই বইটা লেখার কাজ করতে পারছি স্বাধীনা। তুমি চাইলে কালই কাজ বন্ধ করে দিতে পারি। কিন্তু ইতিহাস লেখার সময় তো কৃতজ্ঞতার হিসেব করলে চলে না। কেবল তথ্যের উপর নির্ভর করতে হয় আর সেই তথ্যই যে বলছে টেগার্টকে লেখা চিঠিটার ড্রাফট তোমার বাবা করেছিলেন। ঘটনাটার দু’-তিনজন সাক্ষী এখনও বেঁচে আছেন।”

“সেই সাক্ষীদের গিয়ে জিজ্ঞেস করো তো, বাবা কি মেয়ের বিয়ের অর্থসাহায্য চেয়ে চিঠি লিখেছিল, না কি বাড়ি ঢালাই করার অনুমতি ভিক্ষে করে?”

“তা নয়, কিন্তু চিঠিটা তোমার বাবার...”

“হ্যাঁ, আমার বাবার, কারণ গোটা বিক্রমপুরে আমার বাবার মতো চিঠি ড্রাফট করতে আর কেউ পারত কি না সন্দেহ। দ্বিতীয়ত বাবা চিঠিটা লিখছিল ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের হয়ে। যে ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান থেকে আলাদা হয়ে গিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে কিন্তু ময়দানে একটু প্র্যাক্টিস করার জায়গা পাচ্ছে না। আর তৃতীয়ত চিঠিটা টেগার্টকে লেখা কারণ ওই লোকটাই তখন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। ওর বদলে যদি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ক্ষমতায় থাকতেন তখন, তা হলে তাঁকেই চিঠিটা লিখত বাবা।”

“তাই বলে চার্লস টেগার্টের বদান্যতায় প্র্যাক্টিস করার মাঠ জোগাড় করতে হবে? সেই সুযোগটা নিয়ে টেগার্ট মোহনবাগান মাঠের প্রায় অর্ধেকটা কেটে ইস্টবেঙ্গলকে দিয়ে দিলেন আর পাশাপাশি তাঁবু হওয়ার কারণে অনন্ত ঝগড়া জিইয়ে থাকল দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে!”

“কেন অনন্ত ভালবাসা বয়ে গেল না পাশাপাশি থাকা দু’টি ক্লাবের মধ্যে? কে বারণ করেছিল? কেন প্রাচীন ক্লাবটি নবীন ক্লাবকে আপনিই খানিকটা জায়গা ছেড়ে দিল না? দিলে তো অনুশীলন করার মাঠের জন্য টেগার্টের শরণাপন্ন হতে হত না ইস্টবেঙ্গলের লোকদের? কেন যে-দলের প্রথম শিল্ডজয়ের পিছনে অনেক বাঙালের কেরামতি, সেই দল নিজের ভিতর থেকে ‘ইস্টবেঙ্গল’ নামক একটা স্বতন্ত্র আইডেন্টিটিকে জন্ম নিতে দিল?”

“এত প্রশ্নের উত্তর তো আমার কাছে নেই...”

“কেবল আমার বাবার দিকে তোলা তর্জনীটা আছে। কেন? কী দোষ সেই লোকটার? একদিন রাতের চৌরঙ্গীতে টেগার্টের পুলিশের হাতে মার খেয়েছিল যে লোকটা, কীরকম ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছিল সে টেগার্টের সামনে দাঁড়িয়ে ময়দানের অধিকার চাইতে, সেটা ভাবলে না?”

“তা হলে করেছিলেন কেন কাজটা?”

“কারণ আমার বাবা নিজের যন্ত্রণার চাইতে সমষ্টির প্রাপ্তিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে চিরকাল। ‘ইস্টবেঙ্গল’ বলে যে আবেগটা সব-হারানোর দিনে আমাদের মনে মনে বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেই কুড়ির দশকে বাবা টেগার্টকে চিঠি-চাপাটি না করলে হয়তো তার কোনও টেন্ট থাকত না কলকাতা ময়দানে। তখন প্লেয়াররা শিয়ালদা স্টেশন থেকে খেলতে আসত কি, বলো?”

“আমায় ক্ষমা কোরো, স্বাধীনা। আমি ব্যাপারটা এভাবে ভেবে দেখিনি।”

“তোমার দোষ নেই আনন্দদা। এভাবে কম লোকই ভাবে। আমার বাবা ভাবত। আর তুমি ঠিকই বলেছ, আমিও তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই...”

“আমি বুঝতে পারছি। তুমি নিজেরটা নিয়ে পড়ে থাকলে দিল্লিতে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়ে সুধাংশুকে বাঁচাতে না, আমাকে দিয়ে লেখাবে বলে এতটা ঝঞ্ঝাট পোয়াতে না...”

“নিজেদের কথা লেখাতে চাইলে কাজও তো নিজেকেই করতে হবে।”

“কিন্তু আমি যে তোমার কথাও জানতে চেয়েছি। জানতে চাই। তোমার কথা না-থাকলে ইতিহাসের খড়ের কাঠামোয় মাটি লাগবে কী করে?”

“এটা সিমেন্ট-কংক্রিটের শহর। এখানে পা রেখেই বুঝেছিলাম ভিতরের মাটিটা পুড়িয়ে কঠিন করে ফেলতে হবে। কিন্তু সে কি সহজ কাজ? কঠিন হতে পারলে কেন কান্না পাচ্ছিল যখন নিজের কথা একটুও না-ভেবে এগিয়ে যাচ্ছিলাম...”

“কোথায় এগিয়ে যাচ্ছিলে স্বাধীনা, কোথায়?”

“মোহনবাগানের দিকে।” হো হো করে হেসে উঠল স্বাধীনা। আর হঠাৎ হাসিটা থামিয়ে বলল, “তোমাকে বলেছি না এই বাড়ির ভিতর আমাকে ওই নামে না ডাকতে!”

কত বছরের ব্যবধানে, দুইয়ের সঙ্গে দুই, নাটকের একটা অংশের সঙ্গে সমান্তরাল অংশটা মিলল। স্বাধীনার মোহনবাগানের দিকে যাওয়া এবং যাওয়ার কারণ পরিষ্কার হয়ে গেল আনন্দকুমারের চোখের সামনে। বইটা বের হওয়ার পরপরই স্বাধীনা সব যোগাযোগ ছিন্ন না-করে দিলে আজ ওকে একটা ফোন করতেন আনন্দকুমার। ফোনে সব জানাতেন।

গাড়িটা আটকে আছে তো আছেই। একটা মিছিল কলকাতার দিকে যাচ্ছে।

“কোনও রাজনৈতিক দলের মিছিল নয়, ইস্টবেঙ্গলের একশো বছর উপলক্ষে সেলিব্রেশন, তাতে যোগ দিতে ওরা কলকাতায় যাচ্ছে।” আনন্দকুমারের সফরসঙ্গী বাপ্পা জানাল।

আনন্দকুমারের সারা শরীর টাটাচ্ছিল তাও জানলা দিয়ে চোখ বাড়িয়ে ওঁর মনে হল ওই লাল-হলুদ জার্সি পরে উনি আর স্বাধীনাও হাঁটছেন, হেঁটে চলেছেন, হাঁটবেন। এক ভূখণ্ড থেকে অন্য ভূখণ্ডে, এক পৃথিবী থেকে অন্য পৃথিবীতে। আরও অজস্র, অসংখ্য মানুষের সঙ্গে।

যন্ত্রণা হোক শরীর জুড়ে।

যন্ত্রণার ভিতরেই ইতিহাসের মিসিং লিঙ্কগুলোকে জুড়তে হবে।

সমষ্টির সাফল্যের সামনে ব্যক্তির আবার ব্যর্থতা কী?

‘বারে বারে তোরে ফিরে পেতে হবে বিশ্বের অধিকার।’

আনন্দকুমার গুনগুন করে উঠলেন।

রাস্তা থেকে রাস্তা, কলকাতা

“আবারও অনেকগুলো লোক যাতে বেঘর না হয় তার জন্য স্বাধীনা সেনগুপ্ত নিজেকে প্রীতিকণা চৌধুরীতে রূপান্তরিত করেছিলেন!” অরণ্যর গলায় উত্তেজনা ফেটে পড়ছিল।

জয়ী কথাটা শুনে তাকাল অরণ্যর দিকে। কিছু বলল না।

“ভাগ্যিস মা আমায় নিজের গ্রাম-সম্পর্কের মামাকে দেখতে ওই গঞ্জে পাঠিয়েছিল। আমি যেন সৃষ্টির আগের মুহূর্ত পর্যন্ত দেখতে পেয়ে গেলাম জয়ী। এমনকী তোর দিদুন পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গল?”

“পৃথিবীতে কেউ কেউ দলের ঊর্ধ্বে উঠে যায়। দিদুন বোধ হয় তাদের দলেই।” জয়ী নিচু গলায় বলল। ওর মাথায় তখন আনন্দকুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে হওয়া সকালের কথোপকথনটা ঘুরছে।

আশিস হাজরা বলে এক ভদ্রলোক, দিদুনকে লেখা ওঁর একটি চিঠি নিয়ে দেখা করতে এসেছিলেন আর প্রীতিকণা চৌধুরী হাসপাতালে জেনে আশিসবাবুই নিজের ফোনে কথা বলিয়ে দেন আনন্দকুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে।

কথা শোনার অসুবিধে অতিক্রম করেও প্রায় পনেরো মিনিট আনন্দকুমার কথা বললেন জয়ীর সঙ্গে আর আশিসবাবু চলে যাওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে যখন দিদুনের ময়দান ছেড়ে ভিক্টোরিয়ার পরি হয়ে যাওয়ার খবরটা এল, জয়ীর মনে হল আনন্দকুমারের লেখা চিঠিটা ওঁকে পড়ে ফেলতে হবে। প্রীতিকণা চৌধুরী যে এখন ওরই রক্তস্রোতে বহমান।

ওই চিঠিটা বারতিনেক পড়ে ফেলার জন্যই হয়তো, রাস্তায় ইস্টবেঙ্গলের মিছিলের মধ্যে আটকে গিয়েও খারাপ লাগছিল না জয়ীর। এই মিছিলটার কেউ, “আমরা কারা, মোহনবাগান” কিংবা “সংস্কৃতিতে মোহনবাগান” বলছিল না। বলছিল না, “আস্তে বলো মোহনবাগান” বা “গর্জে ওঠো মোহনবাগান।” কিন্তু যা বলছিল, সেই, “বুকের ভিতর এই মশাল/ইস্টবেঙ্গল চিরকাল” শুনেও জ্বালাপোড়া করছিল না। বরং অচেনা মুখে দিদুনের আদল দেখতে পাচ্ছিল জয়ী আর মুখগুলোর সংখ্যা বাড়ছিল। কিংবা হয়তো একটাই মুখ, কাঁটাতার অগ্রাহ্য করে, অনেক মুখের রাগ, বেদনা আর লাবণ্যকে ধারণ করছিল।

“তুই কি ওঁকে মোহনবাগান কলোনিতে নিয়ে যাবি ভাবছিস?” প্রীতিকণার মরদেহর সামনে দাঁড়িয়ে জয়ীকে জিজ্ঞেস করল অরণ্য।

“নিয়ে যেতে হলে বিক্রমপুর কিংবা চট্টগ্রামেও নিয়ে যেতে হয়। আর তা ছাড়া প্রায় সত্তর বছর কেটে গেছে, ওই তোর মামাদাদুর মতো বয়স্ক দু’-একজন ছাড়া কেউ দিদুনের আগের কিংবা পরের কোনও নাম পর্যন্ত জানে না। সেখানে ওঁর মরদেহ নিয়ে গিয়ে বিড়ম্বনা বাড়ানোর কোনও মানে হয় না।”

“তা হলে?”

“বাড়ি নিয়ে যাব।”

“বাবাকে বলবি না মুখাগ্নির জন্য?”

“না। মুখাগ্নি আমিই করব। যদিও দিদুনের ছেলে এবং নাতি দুই-ই আছে, তবু আমি মনে করি যে মুখাগ্নির অধিকার সম্পর্ক থেকে জন্মায়, পুংলিঙ্গ থেকে নয়। তাই...”

“কেউ কিছু বলবে না?”

“বললে বলবে। সে তো দিদুনের গায়ের উপর যখন সবুজ-মেরুনের পাশাপাশি আর-একটা পতাকাও থাকবে, তখনও চিৎকার-চেঁচামেচি করবে অনেকে। তাই বলে বুকের উপর লাল-হলুদ পতাকা বাদ দিয়ে দিদুনকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া উচিত বলে তোর মনে হয়?”

অরণ্যর গলা বুজে এল, ও কিছু বলতে পারল না উত্তরে। বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল জয়ীর মুখের দিকে।

ওই একই রকম বিস্ময়ের সঙ্গে ব্যাঙ্ক ম্যানেজারও তাকিয়েছিল, যখন জয়ী প্রীতিকণা চৌধুরীর কেঁপে যাওয়া সইটাকে ‘অথেনটিক’ বলে দাবি করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের অ্যাকাউন্টে টাকাটা ট্রান্সফার করে দিতে বলেছিল।

আরও অনেকের অনেক রকম বিস্ময়ের ভিতরেই জয়ী আনন্দকুমার চক্রবর্তীর চিঠিটার অংশবিশেষ জোরে জোরে পড়ল প্রীতিকণা চৌধুরীর চন্দনমাখা মুখটার সামনে দাঁড়িয়ে। ভবানীপুরের বাড়ির দরদালানে। চিঠিটার যে-জায়গায় লেখা আছে যে স্বাধীনা আর প্রীতিকণা আসলে একই মানুষ আর ওঁর নাম হওয়া উচিত ছিল, ‘জগদ্ধাত্রী, জীবনদাত্রী’, সেখানটা দু’-তিনবার পড়ল জয়ী আর তারপর মন্দিরের দরজা সবার সামনে খুলে দেওয়ার মতো সবুজ-মেরুন আর লাল-হলুদ একই সঙ্গে বিছিয়ে দিল ওর দিদুনের উপর।

খোলা গাড়িতে শায়িত প্রীতিকণার বুকে জেগে থাকা দু’রকম পতাকার উপর হঠাৎ করে বৃষ্টি নেমে এল শ্মশানে পৌঁছনোর আগেই। সেই বৃষ্টিতে প্রীতিকণার পাশাপাশি পতাকা দুটোও ভিজে গেল খানিকটা। আর শ্মশানচত্বরে প্রীতিকণাকে নামাতেই দেখা গেল সেই মির‌্যাকল।

বৃষ্টিভেজা সবুজ-মেরুনে যেমন লাল-হলুদ ছাপ, ভিজে যাওয়া লাল-হলুদেও দেখা গেল সবুজ-মেরুন স্পর্শ।

বাবা কেমন গুম হয়ে ছিল। অনেক কথা বলছিল অনেকে।

সবকিছু থেকে খানিকটা সরে গিয়ে জয়ী দেখল, বৃষ্টির জল দুটো পতাকার রংকে এমনভাবে গুলে দিয়েছে যে স্বাধীনার থেকে প্রীতিকণাকে, ইস্টবেঙ্গলের থেকে মোহনবাগানকে, সবুজ-মেরুনের থেকে লাল-হলুদকে আলাদা করা যাচ্ছে না কিছুতেই।

যাবেও না হয়তো আর কোনওদিন।

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%