উদয়াদিত্য সোম

ওএল ৯৫.২
কারাকক্ষ থেকে জে়নোফনকে বেরিয়ে আসতে দেখে সসম্মানে উঠে দাঁড়াল রক্ষী দু’জন। অভিবাদন জানিয়ে খুলে দিল কারাগারের সদর দরজার পাশের একটি ছোট দরজা, যেটি ব্যবহার করা হয় কেবল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের জন্য। অন্যমনস্ক ভাবে পর্যায়ক্রমে দু’জনের দিকে চেয়ে মাথা নোয়ালেন তিনি, তারপর সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন চিন্তাক্লিষ্ট মুখে। অ্যাক্রোপলিসের ও-পারে সূর্য তখন অস্তমিত। আলো জ্বলে উঠেছে এথেনা পার্থেনসের মন্দিরে।
শহরের এ-পাশটা, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কারাগারের দিকটা সাধারণ মানুষ এড়িয়ে চলে সচরাচর। তার ওপরে সন্ধ্যার মুখে রাস্তা প্রায় জনশূন্য। কিন্তু জে়নোফন জানেন, কারাগৃহের অন্তরালে তাঁর আজকের সাক্ষাৎকারের কথা শত্রুপক্ষের কাছে গোপন থাকার নয়। পথের দু’পাশে তীক্ষ্ম দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন তিনি।
পথের ওপারে তিনটি বাজে-পোড়া নিষ্পত্র পাইন গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে কঙ্কালের মত। গোধূলির প্রায়ান্ধকারে তাদেরই একটির নিচে জে়নোফনের নজর গেল। গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে পড়ে থাকা একটি শীর্ণ শরীর। দূর থেকেও কোহলের ঝাঁঝালো গন্ধ এসে লাগল তাঁর নাকে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি লক্ষ করলেন, নেশাতুর শরীরের পাশে উল্টে পড়ে রয়েছে সুরাপাত্র, সঙ্গে একটি কাপড়ের ঝোলা।
জে়নোফন তাকে পেরিয়ে খানিকটা এগিয়ে যেতেই লঘু পায়ে উঠে দাঁড়াল সে। তার চেষ্টা ছিল যতটা সম্ভব শব্দহীন থাকার, কিন্তু তার অজান্তেই উঠে দাঁড়ানোর সে-খবর জে়নোফনের অভিজ্ঞ কানে পৌঁছে দিল ঘাসের ওপর তার পদসঞ্চারের মৃদু শব্দ। এর চেয়েও নিঃশব্দে যুদ্ধক্ষেত্রে পেছন থেকে বাতাস কেটে উড়ে আসে মৃত্যুবাহী তীর বা বর্শা— তার তুলনায় এই শব্দ যেন আগোরা-র মদিরাশালায় সুরাপায়ীদের কলরোল!
মাত্র দু’বছর আগে পার্সিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় দারিয়ুসের দুই ছেলের সিংহাসন-দখলের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে নিতান্ত অনিচ্ছায় জড়িয়ে পড়েছিল এথেন্সের সৈন্যবাহিনী। ব্যাবিলনের উত্তরে কুনাক্সা-র যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের পরে যখন তারা সমূহ বিনাশের মুখে দাঁড়িয়ে, তাদের প্রবীণ সেনাধ্যক্ষ মৃত, সেই সময়ে তারা নিজেরাই জে়নোফনকে বেছে নেয় তাদের নতুন সেনানায়ক হিসেবে। স্বীয় যুদ্ধকৌশলের বলে জে়নোফন তাদের ফিরিয়ে আনেন নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে। আক্রমণ প্রতি-আক্রমণের মতোই, পশ্চাদপসরণও যে রণকৌশলের এক অন্যতম অঙ্গ, সে-কথা এথেন্সের অভিজ্ঞ সৈন্যবাহিনীকে প্রথমবার শিখতে হয়েছিল আসন্ন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে, এক নবীন সেনানায়কের কাছ থেকে। এই রাষ্ট্র নিতান্ত অকারণেই তাঁকে দশহাজার ‘মার্সিনারি’ সৈন্যের অধিনায়ক নিযুক্ত করেনি, তা-ও মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে।
অভিজ্ঞ সৈনিকের শ্রবণশক্তির সঙ্গে-সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গড়ে ওঠে তার তৃতীয় নয়ন, যেন মাথার পেছনের চোখ। ঘাড় না ঘুরিয়েও চোখের কোনা দিয়ে জে়নোফন দেখতে পেলেন, মদ্যপটি উঠে দাঁড়িয়ে অদৃশ্য হল গাছের আড়ালে। তার অল্পক্ষণ পরে সে যখন আবার বেরিয়ে এল, তার বিস্রস্ত বেশবাস অন্তর্হিত হয়েছে সর্বাঙ্গ-ঢাকা এক যাজকের পোশাকের তলায়। অনেক দিন ধরে তাঁকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে চলেছে অ্যানাইটাসের এই গুপ্তচরটি। কখনও বণিক, কখনও ভবঘুরে, কখনও বা সৈনিকের বেশে। তবে যাজকের ছদ্মবেশ এই প্রথমবার।
এক সফল পশ্চাদপসরণের মাধ্যমে কুনাক্সা-র যুদ্ধে আসন্ন এবং অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর হাত থেকে নিজের বাহিনীকে প্রায় অক্ষত অবস্থায় স্বদেশে ফিরিয়ে এনে এথেন্সের রাষ্ট্রশক্তির কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন জে়নোফন। কিন্তু সেই কৃতজ্ঞতার মূল্যে কি তিনি কিনে নিতে পারবেন তাঁর পূজনীয় গুরুর মুক্তি? ভাবতে-ভাবতে চিন্তাক্লিষ্ট জে়নোফন পা চালালেন আগোরা’র দিকে। যেখানে তাঁর সতীর্থ অপেক্ষা করে আছেন এক পূর্বনির্দিষ্ট মদিরাশালায়।
*
ঢোকার মুখেই জে়নোফনকে মৃদু হেসে স্বাগত জানালেন মদিরাশালার মালিক মেলিকাস, “প্লেটো অপেক্ষা করছেন আপনাদের প্রকোষ্ঠে, সেনানায়ক জে়নোফন।”
“ধন্যবাদ মেলিকাস। একটা কথা বলে রাখি আপনাকে, যাজকের পোশাকে একজন গুপ্তচর এখুনি এসে ঢুকবে পান্থশালায়। আমি চাই না, সে যেন আমাদের আলোচনা শোনার মতো জায়গায় বসতে পারে।”
“যাজকের পোশাক পরে থাকলে তো ঢুকতে বাধা দিতে পারব না সেনানায়ক জে়নোফন, তবে সে যাতে আপনাদের ধারে-কাছে বসার জায়গা না পায় তার ব্যবস্থা করে দিতে পারব অবশ্যই। আমি এখানেই দাঁড়াচ্ছি, আপনি কেবল দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে বসুন, আমাকে ইঙ্গিত করে দেবেন তাকে দেখতে পেলেই। এখন যান, প্লেটো উতলা হয়ে অপেক্ষা করছেন।”
প্লেটো। গ্রিক দর্শনের জগতে আগামীদিনের সম্ভবত উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক। পিতার সূত্রে এথেন্সের পৌরাণিক সম্রাট কড্রাস, এবং মায়ের সূত্রে মহান কবি সোলোনের বংশজ তাঁর এই সতীর্থটিকে একাধারে স্নেহ এবং শ্রদ্ধা করেন জে়নোফন। স্নেহ করেন বয়সে ছোট ভাইয়ের মতো, আর শ্রদ্ধা করেন তাঁর জ্ঞান ও চিন্তার গভীরতার জন্য। জে়নোফনের বিশ্বাস, তাঁদের গুরুর শিক্ষার পূর্ণ বিকাশ একদিন ঘটবে তার এই অনুজপ্রতিম সতীর্থটির হাত ধরেই।
আগোরা-র এই মদিরাশালার একেবারে ভেতরে, দেওয়ালের সঙ্গে লাগোয়া এই প্রকোষ্ঠটির সঙ্গে অজস্র স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে জে়নোফনের। গুরুর নির্লিপ্ত, অথচ প্রখর যুক্তিনির্ভর তত্ত্বাবধানে এখানেই তাঁর বিতর্ক-অনুশীলনের সূত্রপাত, সূত্রপাত স্বচ্ছ ও মুক্ত চিন্তাভাবনার প্রসারের। এখানে বসে সুরাপাত্রে চুমুক দিতে-দিতেই তিনি শিখেছেন প্রশ্ন করতে। গ্রিসের সমকালীন শিল্প, দর্শন, সাহিত্য, রাষ্ট্রনীতি এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারার আঁতুড়ঘর এথেন্সের এই আগোরা, আর সেই আগোরা-র সবচেয়ে কাঙ্খিত আলোচনাসভাগুলি আহূত হত এই প্রকোষ্ঠেই। যার কেন্দ্রে থাকতেন আপাত-উন্মাদ এক প্রৌঢ়, আর তাঁকে ঘিরে প্লেটো বা জে়নোফনের মতো বহু শিষ্য তথা অনুরাগীর দল, যাদের নিজেদের পরিচয়ের সুখ্যাতিও ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রিক নগর-রাষ্ট্রের সীমান্ত ছাড়িয়ে।
অথচ আজ, এথেন্সের রাজনীতির গোপন চক্রান্তে ভেঙে গেছে আগোরা-র মুক্তচিন্তার সেই পরিবেশ। প্রখর সূর্যের মতো তেজোময় মানুষটি আজ আবদ্ধ রাষ্ট্রীয় কারাগারে। জে়নোফনের মতো ছাত্ররা, যাঁরা নিজের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রচালনার গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রয়েছেন, তাদের কেশ স্পর্শ করতে পারছে না চক্রান্তকারীরা। আর তাই, এই কুচক্রীদের সমস্ত অভিযোগের তীর সরাসরি নিক্ষিপ্ত হচ্ছে তাঁদের গুরুর প্রতি। এথেন্স তথা গ্রিসের মুক্তচিন্তার পথিকৃৎ এই মানুষটিকে সরিয়ে না দিতে পারা অবধি বিরাম নেই তাদের।
বিরাম নেই তাঁর ছাত্রদেরও, গুরুর প্রাণরক্ষার চেষ্টার, প্রয়োজনে প্রাণভিক্ষার মূল্যেও। আজ সেই অন্তিম চেষ্টা করতেই কারাগারে গিয়েছিলেন জে়নোফন।
ভিড়ের আড়ালে প্রকোষ্ঠের এক কোণে পিছন ফিরে বসে ছিলেন প্লেটো। সামনে সুরার পাত্র, বোঝাই যাচ্ছে ছুঁয়ে দেখা হয়নি। তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে আড়াআড়ি ভাবে বসলেন জে়নোফন, যাতে তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে পান্থশালার দরজা দিয়ে কেউ ঢুকে আসতে না পারে। ইশারায় পরিচারককে ডেকে, দিতে বললেন সুরাপাত্র। তার পর, প্লেটোর সপ্রশ্ন দৃষ্টির দিকে চেয়ে মাথা নাড়লেন গভীর হতাশায়।
মার্জনা চাইতে রাজি হননি মানুষটি। হবেন না যে, তার ইঙ্গিত অবশ্য পাওয়া গিয়েছিল স্ত্রী-র সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কালে। এই কারাগারে, এমনকি বিচারাধীন রাজনৈতিক বন্দীর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী-র কথাবার্তাও গোপন থাকে না। রক্ষীদের মধ্যে মিশে থাকা গুপ্তচরদের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে সেই কথোপকথনের সারসংক্ষেপ। প্রবল অভিমানে তাঁর একদা-মুখরা স্ত্রী কেঁদে বলেছিলেন, “তুমি তো কোনও দোষ করনি, তবুও কেন তোমাকে শাস্তি পেতে হচ্ছে!”
নির্মোহ উত্তর ছিল তাঁর, “তবে কি আমি দোষ করে শাস্তি পেলে তুমি খুশি হতে?”
“মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও যাঁর এই যুক্তিবোধ, তাঁকে দিয়ে নিজেকে ভুল প্রতিপন্ন করানো বা প্রাণভিক্ষা করাতে পারা অসম্ভব, প্লেটো।” চিন্তাক্লিষ্ট মুখে বললেন জে়নোফন।
“এই যুক্তিবাদকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই তো ওঁর যে-কোনও মূল্যে বেঁচে থাকা প্রয়োজন, জে়নোফন। একটি মাত্র পথ খোলা আছে আমাদের সামনে— শেষবারের মতো প্রাণভিক্ষা করে অন্য কোনও শাস্তি প্রার্থনা করা ওঁর জন্য। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তা হলে ওঁকে এথেন্স থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে রাতের অন্ধকারে। আমি, আপনি, ক্রিটো, অ্যাপোলোডুরাস— আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করলে ওঁকে গোপনে এথেন্সের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব, শুধু ওঁকে রাজি করাতে হবে। যে-কোনও মূল্যে।”
“চেষ্টা করেছি, প্লেটো। ক্ষমা-প্রস্তাবের উত্তরে উনি হেসে জানিয়েছেন, ওঁর যুক্তি অনুযায়ী, ওঁর প্রচারিত মতবাদ এথেন্সকে আরও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে, সুতরাং যদি ওঁকে অন্য কোনও পরিণতি চাইতে বলা হয়, তাহলে উনি চেয়ে নেবেন নিঃশর্ত মুক্তি। এবং শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাবি করবেন এথেন্সের প্রিটেনিয়ামে বাকি জীবনের মতো নিঃশুল্ক খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। অর্থাৎ, সরাসরি ব্যঙ্গ, এথেন্সের বিচারব্যবস্থার প্রতি। এই দাবি, নিজের মৃত্যুদণ্ডের স্বীকৃতিপত্রে স্বাক্ষর ব্যতীত আর কিছুই নয়। আমি নিশ্চিত প্লেটো— অ্যানাইটাস এবং তার সঙ্গীরা বিচারপরিষদের ওপর সর্বতোভাবে প্রভাব খাটাবেন, চেষ্টা করবেন ওঁর প্রাণদণ্ডের আজ্ঞা আগামীকালই কার্যকরী করার জন্য।”
উত্তরে প্লেটো কিছু বলতে যাওয়ার আগেই চোখের ইশারায় তাঁকে নিরস্ত করলেন জে়নোফন। দরজায় মেলিকাস কথা বলছেন এক যাজকের সঙ্গে। দৃশ্যতঃ, তিনি ভেতরে এসে বসতে চাইছেন, উদ্দেশ্য অবশ্যই প্লেটো ও জে়নোফনের কাছাকাছি কোনও আসন নেওয়া। কিন্তু মেলিকাস ধুরন্ধর ব্যবসায়ী, হাসিমুখে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে যাজকটিকে বসালেন মদিরালয়ের বিপরীত কোণের এমন একটি আসনে, যেখান থেকে প্লেটো-জে়নোফনকে দেখতে পেলেও, তাদের কথোপকথন শুনতে পাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব।
“অ্যানাইটাসের গুপ্তচর, যাজকের ছদ্মবেশে। কারাগারের বাইরে থেকেই অনুসরণ করছে আমাকে। মেলিকাসকে বলা ছিল, অনেকটা দূরের একটি আসনে বসিয়েছে ওকে। আশা করা যায়, এত দূর থেকে শুনতে পাবে না আমাদের কথা, তবুও সাবধানের মার নেই, ধীরে কথা বলাই ভালো।” যতটা সম্ভব গলা নামিয়ে বললেন জে়নোফন।
“তাহলে তো একটাই রাস্তা বাকি থাকে! এথেন্স ছাড়তে হবে ওঁকে। পালাতে হবে! ক্রিটো, অ্যাপোলোডুরাস— দু’জনেই তৈরি আছে। রক্ষীদের উৎকোচে বশীভূত করে ফেলে আজ রাতের মধ্যেই ওঁকে কারাগার থেকে বের করে আনতে হবে। তারপর দু’ভাগ হয়ে যাবে দলটি। আপনি আর ক্রিটো যাবেন কোরিন্থের দিকে। আপনি সঙ্গে থাকলে এথেন্সের সৈন্যরা ধরে নেবে গুরুকে আপনিই নিয়ে চলেছেন প্রহরা দিয়ে, ওরা আপনাদের পেছনে ধাওয়া করবে। আর এই অবসরে ওঁকে নিয়ে অ্যাপোলোডুরাস পৌঁছে যাবেন স্পার্টার আশ্রয়ে।”
“রাজি করানো গেল না তাতেও, প্লেটো। উনি জানিয়েছেন, বিচারের ফল মাথা পেতে নিতে এথেন্সের কাছে উনি দায়বদ্ধ। বিচারের পরিণাম এড়িয়ে পালিয়ে গেলে সে দায়িত্ব উল্লঙ্ঘন করা হবে, তাই হেমলক পান করাই মনস্থ করেছেন উনি।”
“জে়নোফন, গুরুর কি তবে মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটল?” অস্ফুটে আর্তনাদ করে উঠলেন প্লেটো।
সহসা উত্তর যোগাল না জে়নোফনের মুখে। ক্লান্ত দৃষ্টিতে তিনি খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন প্লেটোর দিকে। তারপর, প্রায় অশ্রুত কণ্ঠে ভেসে এল ক’টি কথা, “বোধহয়... না, বোধহয় নয়, নিশ্চিত ভাবেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন গুরু। বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসার আগে শুনতে পেলাম, কারাগারের অন্ধকার কোণে, গবাক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে গুরু আবৃত্তি করছেন প্রাচীন অ্যাটিকা-র ভাষায়। কান পেতে শুনলাম। কোনও সুগভীর দর্শনতত্ত্ব নয়, উনি আবৃত্তি করছেন এক অর্থহীন, ছেলে-ভুলোনো ছড়া,
কিউবিট যা, ট্যালেন্ট’ও তাই। পার্থেনসের নামে
আগুন চুরির হিসেব-নিকেশ, হেমলকের দামে।
ছুটে গিয়ে ওঁর দু’কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে সম্বিত ফেরানোর চেষ্টা করলাম। মৃদু হেসে গুরু বললেন, আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা কোরো না, জে়নোফন। প্রমিথিউসের মূল্য, হেমলক। এমনটাই ফিডিয়াসের বিধান। যুগে-যুগে এরই পুনরাবৃত্তি হয়ে আসছে।”
*
রাত্রির মধ্যযামে অ্যানাইটাসের হাতে তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর ট্রায়ন পৌঁছে দিল একটি প্যাপিরাসের কুণ্ডলী। আজ সন্ধ্যায় কারাগার থেকে জে়নোফনের বেরিয়ে আসা থেকে শুরু করে আগোরার মদিরাশালায় প্লেটোর সঙ্গে তাঁর কথোপকথন— সবটুকুর হুবহু অনুলিখন রয়েছে তাতে। সঙ্গে দু’পংক্তির একটি আপাত-অর্থহীন ছড়া এবং আরও অর্থহীন একটি পংক্তি।
“তুমি নিশ্চিত, ট্রায়ন? কোনও ভুল নেই এই লেখায়?”
“না প্রভু।” মাথা নাড়ল ট্রায়ন, “আমার এই মূক-বধির চরটি বিশেষ প্রশিক্ষিত। ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে মুখের কথা বুঝে নিতে পারে। গত এক মাস ধরে একে ছায়ার মতো লাগিয়ে রাখা হয়েছে সেনানায়ক জে়নোফনের সঙ্গে। জনসমক্ষে তাঁর ঠোঁটের ভঙ্গিমা অনুসরণ করে তাঁর সমস্ত কথাবার্তার অনুলিখন সে প্রতিদিন পাঠিয়েছে আমাকে। আর সেই একই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অন্য এক করণিককেও। প্রতি দিনের শেষে এই দু’জনের লেখা মিলিয়ে পড়ে দেখেছি আমি, এবং প্রয়োজনমতো আমার চরের পঠনে কিছু-কিছু শুদ্ধিও করেছি। আমি নিশ্চিত, জে়নোফন প্লেটোকে যা বলেছেন, তার হুবহু বিবরণ রয়েছে এতে।”
“বেশ। তোমার চরের কাজ তাহলে সমাপ্ত! এবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এর পায়ের ছাপ মুছে ফেলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে, ট্রায়ন। না হলে, বলা যায় না, জে়নোফনের মতো কেউ যদি একে অনুসরণ করে তোমার দরজা অবধি পৌঁছে যায়, তাহলে আমাকেও তোমার পায়ের ছাপ মোছার ব্যবস্থা করতে হবে!”
ভেতরে-ভেতরে শিউরে উঠলেও মুখের অভিব্যক্তিতে তার কোনও ছাপ পড়তে দিল না ট্রায়ন। সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে এল প্রভুর কক্ষ থেকে। কাল ভোরের আগেই প্রভুর আদেশ পালন করতে হবে, এবং করতে হবে নিজের হাতেই। এ-কাজের ভার বিশ্বাস করে অন্য কারও হাতে দেওয়া যাবে না।
দরজা বন্ধ করে নিজের কাজের জায়গায় গিয়ে বসলেন অ্যানাইটাস। ট্রায়নের দিয়ে যাওয়া প্যাপিরাসটি খুলে পড়লেন বার-বার, অনেক বার। বিশেষ করে শেষ কয়েকটি পংক্তি।
ফিডিয়াসের বিধান!
এ এক অবিশ্বাস্য প্রাপ্তি! প্রায় ত্রিশ বছরের এক পুরোনো সংকেত, যা হারিয়ে গিয়েছিল এই কারাগারের দেওয়ালেই, এথেন্সের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর করুণা আজ তাকে আবার আলোর দিশা দেখিয়েছে। যে-ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করার অভিযোগে কারাগারে নিক্ষিপ্ত এই বৃদ্ধ উন্মাদ, আজ তাকে দিয়েই ইঙ্গিত পাঠিয়েছেন দেবী এথেনা। জনশ্রুতি ছিল বটে, হেমলক পান করার আগে এই এথেন্সেরই কোনও কোণে এরকমই একটা সংকেত রেখে গেছে ঈশ্বরদ্রোহী ফিডিয়াস। তার অনুসারীরা গোপনে খোঁজ চালিয়েছে বার-বার, কেউ-কেউ ধরাও পড়েছে রাষ্ট্রের হাতে। কিন্তু ফিডিয়াসের শেষ লিপির রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি।
এবং হবেও না আর কোনওদিন। এই রাষ্ট্রদ্রোহীর মৃত্যুর পর তাঁর কারাপ্রকোষ্ঠটি ভেঙে নতুন করে তৈরি করিয়ে দিতে হবে। মুছে দিতে হবে দেওয়ালের সব অতীত লিখন, যাতে করে এই অবিশ্বাসীদের অনুগামীরা সেখানে নতুন করে স্মরণবেদী তৈরির অনুপ্রেরণা খুঁজে না পায়।
কিন্তু তার আগে, এই উন্মাদ রাষ্ট্রদ্রোহী দার্শনিকটির প্রাণদণ্ড কার্যকরী করে ফেলতে হবে আগামীকালই। এর ছাত্রদের ওপর ভরসা নেই। প্যাপিরাসের কুণ্ডলীটি সরিয়ে রেখে অ্যানাইটাস ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তার চূড়ান্ত পরিকল্পনায়।
*
পরের দিন এক বৃদ্ধ রাষ্ট্রদ্রোহী দার্শনিকের মৃত্যুদণ্ডের শোরগোলের ফাঁকে চাপা পড়ে গেল বন্দর-সংলগ্ন এক মদিরালয়ের পেছনের রাস্তায় এক মধ্যবয়স্ক যাজকের মৃতদেহ আবিষ্কারের ঘটনাটি। ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে তাঁকে, তারপর পাথর দিয়ে বারম্বার আঘাত করে বীভৎসভাবে বিকৃত করে দেওয়া হয়েছে তাঁর মুখ। সনাক্ত করার কোনও উপায়ই আর রাখেনি হত্যাকারী। পরনের অবিন্যস্ত পোশাক দিয়েই তাঁকে চিহ্নিত করা গেল, যাজক বলে।
সেই দিনই বিকেলে পিরিয়াস বন্দর থেকে একটি মাঝারি মাপের বাণিজ্য-জাহাজ ছেড়ে গেল, উৎকৃষ্ট গ্রিক অলিভ আর সুরার পসরা নিয়ে। গন্তব্য তার পন্টোস অ্যাক্সেইনোস, অর্থাৎ কৃষ্ণসাগরের পশ্চিম উপকূলে অ্যাপোলোনিয়া বন্দর। সকাল থেকেই ক্রীতদাসের দল জাহাজে বোঝাই করছিল সারি-সারি পোড়ামাটির অ্যাম্ফোরা। নির্বাক দাসদের ওপর চাবুক চালাতে এতটাই ব্যস্ত ছিল তাদের সর্দার, ভিড়ের সুযোগে কখন যে একটি নতুন, মূক-বধির শ্রমিক জায়গা করে নিয়েছে দলের মধ্যে, তার নজরেও আসেনি। পরদিন সূর্যোদয়ের পরে গুনতির সময় যখন একটি অতিরিক্ত মাথা পাওয়া গেল, জাহাজ তখন মাঝ-সমুদ্রে।
সেদিন এথেন্সের সূর্য অস্ত গেল হেমলকের পাত্রে।
হোস্টেলের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে প্যাসেজের আলো জ্বালাল দিতি। রুমমেটরা মনে হয় ফেরেনি এখনও, ইউনিভার্সিটি থেকে। পায়ে-পায়ে লবি পেরিয়ে নিজের রুমে এসে অন্ধকারের মধ্যেই অভ্যস্ত হাতে চার্জারের তার গুঁজে দিল মৃতপ্রায় ফোনটায়। ক্লাস থেকে বেরোনোর সময়েও দশ পার্সেন্ট ছিল। ফ্ল্যাটে ঢুকতে-ঢুকতেই একটা ফোন এল প্রফেসর সুইনবার্নের— কলটা কানেক্টও করা গেল না, এদিকে চার্জ কমতে-কমতে দু’পার্সেন্টে এসে ঠেকেছে।
তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে ঢুকল দিতি। সওয়া পাঁচটা বাজে প্রায়। হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে প্রফেসরকে কল করে নেবে একবার। খানিকক্ষণ নেটফ্লিক্স দেখবে কফি খেতে-খেতে, ভিডিও-কল করবে বাড়িতে, তারপর রাতের খাওয়ার চিন্তা।
ফৌজের চাকরি দিতির বাবার, পাকাপাকি ঠিকানা তাই কোথাওই গড়ে ওঠেনি ওদের। কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে পড়াশুনোর পর, ইংল্যান্ডের ইস্ট মিডল্যান্ডে এই ইউনিভার্সিটিতে যখন গ্র্যাজুয়েশন করার সুযোগ আসে দিতির, কর্নেল চন্দ্রা বা তার স্ত্রী কেউই আপত্তি করেননি। যখন যে ক্যান্টনমেন্টে থেকেছেন, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলো, ঘোড়ায় চড়া, মার্শাল আর্ট শেখা— একমাত্র মেয়েকে সব-রকম স্বাধীনতা দিয়েই বড় করে তুলেছিলেন ওঁরা। আর দিতির তরফেও সে স্বাধীনতার কোনও অপব্যবহার হয়নি আজ অবধি।
দিতিদের এই হোস্টেল ব্লকটা ইউনিভার্সিটির মূল ক্যাম্পাস থেকে খানিকটা দূরে। বাসে মিনিট-দশেকের পথ। প্রায় তিন একর জায়গা নিয়ে অনেকগুলো চারতলা হোস্টেল ব্লক, প্রতি তলায় দুটো করে অ্যাপার্টমেন্ট। দিতির ব্লকটা বড় রাস্তা থেকে একটু ভেতরে, নিরিবিলিতে। দু’বছর ধরে এখানেই রয়েছে সে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে কিচেনে ঢুকে জল গরম করল দিতি। তারপর কফি পাউডারে ঈষৎ গরম জল মিশিয়ে অনেকক্ষণ ধরে চামচে ফেটিয়ে ফেনা তুলল। বাদামি রেণুতে লুকিয়ে থাকা খোশবাই ছড়িয়ে গেল রান্নাঘরে। ইউনিভার্সিটিতে মেশিনে-তৈরি কফি দিয়েই কাজ চালাতে হয় তাকে, কিন্তু সকাল-সন্ধের এই দু’কাপ হাতে-বানানো কফি তার বিলাসিতার জায়গা, পৃথিবী জুড়ে ডালগোনা-পাগলামি শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই।
কফির কাপ হাতে দিতি নিজের রুমে ফিরে আসতে-আসতেই আবার বাজতে শুরু করল ফোনটা। প্রফেসর ক্যাথরিন সুইনবার্নের কল। দরজা বন্ধ করে স্পিকার অন করে দিল দিতি।
“গুড ইভনিং ক্যাথ। সরি, রাস্তায় ছিলাম, আর ফোনের চার্জ ছিল না একেবারে।”
“নট টু ওয়ারি দিতি। একটা ভাল খবর আছে। ইউ হ্যাভ বিন সিলেক্টেড। ডক্টর স্নোপ আমার রেকমেন্ডেশন অ্যাকসেপ্ট করে নোট পাঠিয়ে দিয়েছেন ওঁর সেক্রেটারিকে। সোমবার সকালেই ওঁর সই হয়ে চিঠি চলে আসবে আমার কাছে। সোমবারই আমি তোমাকে মেইল করে জানাব। কাউকে ফর্মালি জানাতে চাইলে তার পরে জানানোই ভালো। আমি শুধু তোমাকে খবরটা জানিয়ে রাখলাম, যাতে উইকেন্ডটা ভালো যায় তোমার।”
“অবিশ্বাস্য! থ্যাংক ইউ ক্যাথ, থ্যাংক ইউ সো মাচ!” উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠতে গিয়ে খানিকটা গরম কফি চলকে পড়ল বিছানায়।
“ইউ’ভ আর্নড ইট, দিতি। সোমবার লাঞ্চের পর দেখা কোরো। উই হ্যাভ এ লট টু ডিসকাস। হ্যাভ এ গ্রেট উইকেন্ড।” ফোন রাখলেন সুইনবার্ন।
ঘরের মধ্যে একা-একাই দু’পাক নেচে নিল দিতি।
তুলনামূলক রাজনীতির ছাত্রী হিসেবে প্রাচীন গ্রিসের রাজনীতি-সংক্রান্ত একটি ঐচ্ছিক পেপার নিয়েছিল দিতি। যতটা ছিল বিষয়ের টান, তার চেয়ে বেশি ছিল প্রফেসর ক্যাথরিন সুইনবার্নের নামের আকর্ষণ। ‘অ্যান্টিকুইটি’ নামের টিভি চ্যানেলটির সুবাদে প্রফেসর সুইনবার্নের খ্যাতি ততদিনে ছড়িয়ে পড়েছে ডিপার্টমেন্ট এবং ইউনিভার্সিটির সীমানা ছাড়িয়ে, বাইরের দুনিয়ায়।
মাত্র দু’বছর আগে জর্ডন-ইজরায়েলের সীমান্তে ডেড সি-র দক্ষিণে ওয়াদি আরাবা-র কাছে এক্সকাভেশন চালিয়ে প্রফেসর সুইনবার্ন যখন খুঁজে বের করেন বাইশশো বছরের পুরোনো এক দুর্গের ভগ্নাবশেষ, তখনও পৃথিবী চিনত না তাঁকে। একজন সহকারী, একজন ইন্টার্ন এবং স্থানীয় শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি এই পুরোদস্তুর অপেশাদার দলটির বাজেট ছিল নামমাত্র। ভবিষ্যতের প্রচারের কথা মাথায় রেখে সুইনবার্ন তাঁর ইন্টার্ন য়ুরিকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের প্রতিদিনের খোঁড়াখুঁড়ি আর আবিষ্কারের মুহূর্তগুলো মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে রাখার, আর তার সারসংক্ষেপ সম্পাদনা করে পাঁচ মিনিটের একটি করে ছোট্ট ক্যাপসুল দিনের শেষে আপলোড করার, তাঁদের অভিযানের ফেসবুক পেজ আর ইউটিউব চ্যানেলে। দিন-সাতেকের মাথায় য়ুরি এসে জানায়, ইউটিউব হিট হান্ড্রেড-ফিফটি থাউসেন্ড, মানে দেড় লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। বারো দিনের দিন সন্ধ্যায় ফোন আসে ‘অ্যান্টিকুইটি’ চ্যানেলের কাছ থেকে।
পর-পর তিন বছরের তিনটি ‘সামার এক্সকাভেশন’, অর্থাৎ গ্রীষ্মকালীন খননের স্পন্সরশিপ— তার বদলে ‘অ্যান্টিকুইটি’ চ্যানেলের সঙ্গে ‘ডিগিং উইথ ক্যাথ’ অনুষ্ঠানের এক্সক্লুসিভ ফুটেজ ভাগ করে নেওয়ার চুক্তির প্রাথমিক খসড়া সারা হয়ে যায় ফোনে-ফোনেই।
শুধু একটি ব্যাপারে অনড় ছিলেন প্রফেসর সুইনবার্ন। চ্যানেলের কোনও টিম থাকতে পারবে না পুরো অভিযানে। ওঁর যুক্তি ছিল, এই অপেশাদার হাতের অপটু, কিন্তু আন্তরিক রেকর্ডিংই তাঁদের অভিযান তথা ইউটিউব চ্যানেলের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ— চ্যানেলের পেশাদার সিনেমাটোগ্রাফার সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরলে এর সঙ্গে আর পাঁচটা এক্সকাভেশনের ফারাক থাকবে না কোনওই। খানিক মতান্তরের পর চ্যানেলওয়ালারা মেনে নেন সুইনবার্নের যুক্তি।
সেই সিরিজের শেষ এক্সকাভেশন এবার। গত বছর অবধি য়ুরি থাকায় আর ইন্টার্নের খোঁজ করতে হয়নি, কিন্তু এ-বছর সে পাশ করে ফিরে গেছে নিজের দেশ রাশিয়ায়, সেন্ট পিটার্সবার্গ ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতে। যদিও সে ইচ্ছুক ছিল ছুটি নিয়ে এসে এক্সকাভেশনে যোগ দিতে, কিন্তু ইউনিভার্সিটির নিয়ম অনুযায়ী নিজেদের একজন ছাত্রকেই দরকার ইন্টার্ন হিসেবে, আর তাকে প্রফেসর সুইনবার্ন বেছে নেবেন তাঁর এই ‘প্রাচীন গ্রিসের ইতিহাস’ মডিউলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকেই। বেছে নেওয়ার মাধ্যম, প্রবন্ধ-প্রতিযোগিতা। বিষয়টাও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন প্রফেসর সুইনবার্ন। ও-ও-পি আর্টিফ্যাক্ট।
“তোমাদের মধ্যে সকলেই যে ইতিহাস বা আর্কিওলজির ছাত্র, এমন নয়। তাহলে কীসের ভিত্তিতে তোমাদের মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নেওয়া হবে, এই অভিযানের ইন্টার্ন হিসেবে? কী খুঁজছি, আমি?
আমি যা খুঁজছি, তার জন্য আর্কিওলজি বা ইতিহাসের ডিগ্রি দরকার নেই। দরকার কেবল ইতিহাসের প্রতি ভালোবাসা, একজোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, একটি অনুসন্ধিৎসু মন, আর প্রশ্ন করার ক্ষমতা। শুধু আমাকে নয়, নিজেকেও।
ইতিহাস সাক্ষী, এই ক’টি উপাদান বাদ দিয়ে কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার সম্ভব হয়নি আজ অবধি, তা সে ক্রিটের নসোস হোক, হোক ইজিপ্টের তুতানখামুনের সমাধি বা চিনের টেরাকোটা সৈন্যদল। আর তোমার মধ্যে এই গুণগুলো রয়েছে কি না, সেটা বোঝা যাবে, তোমার ও-ও-পি আর্টিফ্যাক্ট চিনে নেওয়ার ক্ষমতা থেকে। যে-কোনও ঐতিহাসিক ইমারত, বা আর্কিওলজিক্যাল সাইটে ঘোরার সময় যদি তোমার চোখে এমন কিছু পড়ে, যার ওখানে থাকার কথা নয়, অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে আউট-অফ-প্লেস— তারাই হচ্ছে ও-ও-পি আর্টিফ্যাক্ট। এমন কিছু, যা হয় তাদের সময়ের থেকে আলাদা, বা পারিপার্শ্বিকের থেকে, বা প্রযুক্তির থেকে। যেমন ধরো পেরুর নাজকা লাইন্স। মাইলের-পর-মাইল জুড়ে মাটির ওপরে আঁকা এমন সব ছবি, যাদের আকাশ থেকে ছাড়া দেখাও যায় না। বা গ্রিসের মাইসেনিয়ার সাইক্লপিয়ান দেওয়াল। পনেরো-বিশ টন ওজনের পাথরকে পরের-পর গেঁথে এমন দেওয়াল কারা বানিয়েছিল, আজ থেকে হাজার-হাজার বছর আগে? কোথা থেকে এসেছিল, ইস্টার আইল্যান্ডের বিচিত্র সব মূর্তি? ইয়েস, থার্ড বেঞ্চের তুমি— কিছু বলবে?”
“ত্রয়োদশ শতাব্দীর একটা বিখ্যাত মন্দির আছে পূর্ব ভারতের কোণার্কে। সূর্য মন্দির। সেই মন্দিরের গায়ে আমি একটা জিরাফের রিলিফ দেখেছি, প্রফেসর সুইনবার্ন— কিন্তু ভারতের কোথাও তো জিরাফ পাওয়া যায় না! এটাও কি ও-ও-পি-র নিদর্শন?” তৃতীয় বেঞ্চের কোণ থেকে হাত তুলে প্রশ্ন করল দিতি।
“অবশ্যই! ব্রিলিয়ান্ট পর্যবেক্ষণ!” সপ্রশংস গলায় উত্তর দিলেন ক্যাথরিন, “অবশ্যই ‘আউট-অফ-প্লেস’— পূর্ব-ভারতে জিরাফ এসেছিল আফ্রিকা থেকে, এবং এসেছিল রাজকীয় উপঢৌকন হিসেবে। সুতরাং সেই সময়ে যে দস্তুরমতো ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক ছিল দু’দেশের মধ্যে, এবং তার সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য যে বিদেশি রাজা এবং বণিকদের তরফ থেকে দেশীয় রাজাদের খুশি করার চেষ্টার ত্রুটি থাকত না, এটি তার অত্যন্ত উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
এইরকম সব অসামঞ্জস্য নজর করতে পারে, এবং প্রশ্ন করতে পারে খুঁটিয়ে, এমন একজনকেই খুঁজছি আমি। তার মানে অবশ্যই এমন নয় যে যা ‘আউট-অফ-প্লেস’, তা-ই একটা যুগান্তকারী আবিষ্কারের সূত্র, কিন্তু শুরুটা হয় ওখান থেকেই। সুতরাং, যারা-যারা আগ্রহী, তারা আগামী সাত দিনের মধ্যে একটা ‘স্টেটমেন্ট অফ পারপাস’ লিখে জমা দিয়ে দাও। যাতে লেখা থাকবে তোমার একেবারে নিজস্ব একটি বা একাধিক আউট-অফ-প্লেস আর্টিফ্যাক্ট খুঁজে পাওয়ার অভিজ্ঞতা, এবং সেটা নিয়ে তোমার নিজস্ব বিশ্লেষণ, দু’হাজার শব্দের মধ্যে। তার ভিত্তিতে বেছে নেওয়া হবে ‘ডিগিং উইথ ক্যাথ’-এর এ-বছরের স্টুডেন্ট ইন্টার্নকে।”
লেকচার শেষ হওয়ার পরে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করল দিতি, ভিড় হালকা হওয়ার জন্য। তারপর ল্যাপটপ কাঁধে তুলে বেরোতে যাবে, হাত তুলে ওকে দাঁড়াতে বললেন প্রফেসর সুইনবার্ন।
“তুমি তো আর্কিওলজির স্টুডেন্ট নও, তাই না? কী সাবজেক্ট তোমার, ইতিহাস?”
“না প্রফেসর সুইনবার্ন। কম্প্যারেটিভ পলিটিক্স। ‘প্রাচীন গ্রিসের ইতিহাস’ আমার অপশনাল মডিউল।”
“কল মি ক্যাথ। কী নাম তোমার?”
“দিতি চন্দ্রা, ফ্রম ইন্ডিয়া।”
“ও-ও-পি-র খুব ভালো উদাহরণ দিয়েছ দিতি। আনফরচুনেটলি, এটা তো আর ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু তোমার অবজারভেশন ভালো, চেষ্টা করলে এ-রকম আরও উদাহরণ নিশ্চয় খুঁজে পাবে। আমি আশা করছি তুমি অ্যাপ্লাই করবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ভিসা আছে তোমার?”
দু’বছরের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা করানো ছিল গত বছরই, তাই মূলত প্রফেসর সুইনবার্নের আগ্রহেই কপাল ঠুকে অ্যাপ্লাই করে দেয় দিতি। গত বছর গরমের ছুটিতে রুমমেট টেরেসা-র সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিল গ্রিসের অলিম্পিয়ায়, যেখানে খ্রিষ্টের জন্মের সাতশো ছিয়াত্তর বছর আগে শুরু হয়েছিল প্রথম অলিম্পিক। সেখানেই ওর চোখে পড়ে একটা প্রাচীন চার্চের ধ্বংসাবশেষের রেলিং, আর তার গায়ের অদ্ভুত ডিজাইনটা— একটা নয়, দু’দুটো আলাদা জায়গায়। ট্যুর গাইড তাড়া দিচ্ছিলেন, তাই খুব খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ হয়নি, কিন্তু চলে আসার আগে সেগুলোকে ক্যামেরাবন্দি করে রেখেছিল দিতি। ফিরে এসে পড়াশুনোর চাপে মাথার পেছনে চলে যায় বিষয়টা, কিন্তু খটকাটা রয়েই গিয়েছিল। সামান্য খোঁচাতেই তাই বেরিয়ে এল হুড়মুড়িয়ে।
ডিজাইনটা আর কিছুই নয়, একটা ক্রস! চার্চের গায়ের নকশা হিসেবে হয়তো তেমন অবাক করা কিছু নয়, কিন্তু একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, আর পাঁচটা সাধারণ ক্রসের মতো নয়— নকশাটা টেম্পলার ক্রসের!
টেম্পলার ক্রস! আর তা-ও কি না অলিম্পিয়ার চার্চের গায়ে। এবং শুধু তাই নয়, সময়টাও খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি, কি তারও আগে। অথচ ক্রুসেডের হাত ধরে টেম্পলারদের ইতিহাসে আগমন তারও প্রায় সাড়ে ছ’শো বা সাতশো বছর পরে। আউট-অফ-প্লেস ছাড়া আর কী?
গত পনেরো বছরে ড্যান ব্রাউনের ‘দা ভিঞ্চি কোড’-এর দৌলতে সারা পৃথিবীতে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে টেম্পলার নাইটদের খ্যাতি। প্রথম ক্রুসেডের পরে ১১১৯ খ্রিস্টাব্দে স্থাপনা হয় খ্রিস্টধর্মের অন্যতম শক্তিশালী সৈন্যদল, এই যোদ্ধা-সন্ন্যাসী বাহিনীর। সামরিক শক্তির হাত ধরে ক্রমে-ক্রমে তাদের হাতে এসে জমা হয় বিপুল ধনসম্পদের অধিকার। এক সময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায়, টেম্পলাররা হয়ে ওঠেন পৃথিবীর যে-কোনও কোণ থেকে পবিত্র জেরুজালেমে তীর্থ করতে যাওয়া যে-কোনও খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যাঙ্কিং প্রতিষ্ঠান। তারপর যা হয়, টেম্পলারদের বিরোধ শুরু হয় সম্রাট এবং চার্চের সঙ্গে। ১৩১২ খ্রিস্টাব্দে টেম্পলার নাইটদের দুশো বছরের ইতিহাস পুড়ে ছাই হয়ে যায় ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ ফিলিপ এবং চার্চের প্রতিনিধি পোপ পঞ্চম ক্লেমেন্টের প্রতিশোধের আগুনে, ঠিক যে-ভাবে ক্রুশে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল জোয়ান অফ আর্ক-কে।
এই ক্রুশ বা ক্রসের দু’টি অংশ থাকে, একটি উল্লম্ব বা ভার্টিকাল, অন্যটি অনুভূমিক বা হরাইজ়ন্টাল। সাধারণত চার্চে যেমনটি দেখা যায়, উল্লম্ব অংশটি হয় অনুভূমিক অংশের তুলনায় দীর্ঘতর। কিন্তু টেম্পলার ক্রসের ক্ষেত্রে এই দু’টি অংশই হয় সমান দৈর্ঘ্যের। যেমনটি হুবহু উৎকীর্ণ ছিল পাথরের রেলিংয়ের গায়ে, বৃত্তের মধ্যে। আর অলিম্পিয়ার ঠিক যে জায়গাটিতে সেই চার্চটি তৈরি হয়েছিল...

—অলিম্পিয়ার প্রাচীন চার্চের ধ্বংসাবশেষের রেলিং-এর গায়ে টেম্পলার ক্রস
“এই যে চার্চটি দেখছেন, অলিম্পিয়ার— শুধু অলিম্পিয়া বলি কেন, সমগ্র এলিস অঞ্চলের প্রথম চার্চ। হয়তো গোটা পেলোপনিস ভূখণ্ডের-ও প্রথম। কিন্তু আদতে এটি ছিল একটি কর্মশালা। খ্রিস্ট-জন্মের চারশো পঁয়ত্রিশ বছর আগে এখানে বসেই প্রাচীন পৃথিবীর সাতটি আশ্চর্যের অন্যতম, মহান জিউসের মূর্তিটি বানিয়েছিলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গ্রিক ভাস্কর ফিডিয়াস। সেই ফিডিয়াস, যিনি কিনা ছিলেন এথেন্সের অ্যাক্রোপলিসে এথেনা পার্থেনসের মূর্তিরও স্রষ্টা। তাই অলিম্পিয়ার মানচিত্রে এই জায়গাটির নাম ফিডিয়াসের ওয়ার্কশপ”— বলতে-বলতে এগিয়ে গিয়েছিলেন বৃদ্ধা ট্যুর গাইড।
নিজের তোলা কিছু ছবি, ইন্টারনেট এবং লাইব্রেরি-লব্ধ তথ্য আর সঙ্গে নিজের বিশ্লেষণ দিয়ে সাজিয়ে দু’সপ্তাহ আগে নিজের প্রবন্ধ মেইল করে দেওয়া ইস্তক দিতি ভুলেই গিয়েছিল এই প্রতিযোগিতার কথা। ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্ব মিলিয়ে অন্তত জনা-তিরিশেক ছাত্রছাত্রী অ্যাপ্লাই করেছিল ‘ডিগিং উইথ ক্যাথ’-এর ইন্টার্নশিপের জন্য। অপশনাল মডিউলের কারও কপালে যে এই শিকে ছিঁড়তে পারে, এমন ভাবনা দূরতম কল্পনাতেও ঠাঁই পায়নি দিতির মাথায়। এই সিলেকশনটা তাই বড্ড স্পেশাল!
মেইলের জন্য অবশ্য সোমবার অবধি অপেক্ষা করতে হল না। তার বদলে শনিবার সকালেই এল প্রফেসর সুইনবার্নের ফোন।
“একবার মেইন ক্যাম্পাসের কফিশপে আসতে পারবে দিতি? আধ-ঘণ্টার মধ্যে? খুব আর্জেন্ট!” সুইনবার্নের গলায় গভীর উদ্বেগ!
বুঝে নিতে অসুবিধা হল না দিতির— একটা সমস্যা খাড়া হয়েছে, এবং সমস্যাটা তার নির্বাচন নিয়েই। ‘ডিগিং উইথ ক্যাথ’-এর মতো একটা ইভেন্টে অপশনাল মডিউলের একজন স্টুডেন্টের নির্বাচন আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য কর্তারা নিশ্চয় ভালো ভাবে নেননি, তাই চাপ সৃষ্টি করছেন সুইনবার্নের ওপর! যারা ভাবে, এ-সব দেশে সিলেকশন নিয়ে নোংরা রাজনীতি হয় না, কী ভুলটাই না ভাবে তারা!
টেবলের ওপর একতাড়া ফাইল, তার পাশে কফির কাপ নিয়ে বসেছিলেন প্রফেসর সুইনবার্ন। দিতি হাত নেড়ে অপেক্ষা করতে বলল ওঁকে, তারপর নিজের কফির অর্ডার দিয়ে ডেলিভারি কাউন্টারে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করতে লাগল নিজের ভাবনাগুলোকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার। হাজার হলেও প্রফেসর বলে কথা— নিজের ভেতরের বিরক্তিটা ঠিক কতটা প্রকাশ করা উচিত হবে, সে-ব্যাপারে একটু সাবধান থাকা ভাল।
শনিবারের সকালে তেমন ভিড় নেই, ফলে মিনিট-পাঁচেকের মধ্যেই দিতিকে হাজির হতে হল সুইনবার্নের টেবলে। একটু কাষ্ঠহাসি আর ঠোঁটের ফাঁকে চাপা গুডমর্নিং ছুঁইয়ে দু’হাতে কফির মাগ আগলে ধরে বসল দিতি।
“আয়েম সরি দিতি, পারহ্যাপ্স আই স্পোক টু সুন।” বিষণ্ণ শোনাল সুইনবার্নের গলা।
“আপনার আজ সকালের ফোনটা পেয়ে আমার মনেই হয়েছিল প্রফেসর সুইনবার্ন, সিলেকশনটা বোধ হয় আপনাদের ডিপার্টমেন্টের মনোমতো হয়নি।”
দিতির গলার শীতল বিরক্তি আর পোশাকি সম্ভাষণে ফিরে যাওয়া নিশ্চয় সুইনবার্নের কান এড়ায়নি, কিন্তু তাতে ওঁর মুখের কোনও পরিবর্তন দেখল না দিতি।
“এটা নিছক ডিপার্টমেন্টের ব্যাপার নয়, দিতি। ইন ফ্যাক্ট, এই সিলেকশন নিয়ে আমাকে কেউ চাপ দেবে, এমন কথা ভাবার কোনও কারণ নেই। ব্যাপারটা যে ঠিক কী, সেটা আমার নিজের কাছেও পরিষ্কার নয় এই মুহূর্তে। কিন্তু কাল তোমাকে ফোন করা আমার উচিত হয়নি, কারণ ফোনটা না করলে আজ এই মুহূর্তে তোমার-আমার মধ্যে এই অপ্রিয় পরিস্থিতিটা তৈরি হত না। আসলে আমি একেবারেই ভাবিনি, তোমার পেপারটা এত আগ্রহ নিয়ে পড়ার পরে, আমার সঙ্গে তোমার সিলেকশন নিয়ে এত দীর্ঘ আলোচনা করার পরে এমনকি নিজের মুখে অনুমতি দেওয়ার পরেও ডক্টর স্নোপ এ-ভাবে মত পাল্টে ফেলবেন। এটা জাস্ট... জাস্ট অবিশ্বাস্য!” শেষ দিকে গলা ধরে এল সুইনবার্নের।
“ডক্টর স্নোপ... আমার পেপার পড়েছেন? আলোচনা করেছেন আপনার সঙ্গে?” স্তম্ভিত দিতির মুখ থেকে নিজের অজান্তেই খসে পড়ল শব্দগুলো।
ডক্টর অলিভার স্নোপ। প্রবাদপ্রতিম ব্রিটিশ আর্কিওলজিস্ট, এই ইউনিভার্সিটির আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টের মাথা। ট্রয়ের এক্সকাভেশন নিয়ে প্রামাণ্য কাজ করেছেন এক-সময়। সেই তিনি... দিতির পেপার পড়ে মত দিয়েছেন, আবার ফিরিয়েও নিয়েছেন? মেলাতে পারছিল না দিতি।
“আমার তোমাকে জানানো উচিত, দিতি। দিস ইস দ্য লিস্ট আই ক্যান ডু ফর য়ু। শুধু একটাই অনুরোধ, ব্যাপারটা জানাজানি কোরো না। কাল বিকেলে তোমাকে ফোন করার আগে আধ-ঘণ্টা আমাদের আলোচনা হয় এই ফাইনাল সিলেকশন নিয়ে। তোমার পেপার পড়ে উনি খুব খুশি হলেন, আমাকে বললেন তোমার নাম রেকমেন্ড করে পাঠাতে, উনি অ্যাপ্রুভ করে দেবেন। ওঁকে মেইল পাঠিয়েই আমি তোমাকে ফোন করে জানাই। তারপর, পৌনে ন’টা নাগাদ যখন অফিস থেকে বেরোচ্ছি, তখনও দেখলাম ওঁর রুমের দরজা ভেজানো, ভেতরে আলো জ্বলছে। সাধারণত অত রাত অবধি অফিসে থাকেন না ডক্টর স্নোপ, তাই ভাবলাম একবার দেখা করে যাই। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখি, টেবলে মাথা নামিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে ঝুঁকে বসে আছেন উনি। ছুটে গিয়ে ঘাড়ের ওপর হাত রেখে পালস চেক করি, তারপর এনএইচএস-কে ফোনে জানাই। দশ মিনিটের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স এসে নিয়ে যায় সেন্ট মেরি’জ় হসপিটালে। ডাক্তারের সঙ্গে রাতে কথা হল, বলছেন ম্যাসিভ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। বাহাত্তর ঘণ্টার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না।”
“খুব আনফর্চুনেট, কিন্তু এর সঙ্গে আমার সিলেকশনের ব্যাপারে ওঁর মত পাল্টানোর কী সম্পর্ক, প্রফেসর?”
প্রশ্নটার সরাসরি উত্তর দিলেন না প্রফেসর সুইনবার্ন। খানিকক্ষণ চেয়ে রইলেন নিজের ফোনের দিকে। তারপর নিজের মনেই যেন কোনও একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। ফোনের গ্যালারি থেকে একটা ছবি খুলে ফুলস্ক্রিন করে এগিয়ে দিলেন দিতির দিকে।
এমনভাবে নেওয়া হয়েছে ছবিটা, যাতে স্পষ্ট পড়া যায় কাগজের লেখা। সুইনবার্নের ই-মেইলের প্রিন্টআউট। দিতি চন্দ্রার রেকমেন্ডেশন। ছবিটাকে বাঁ-দিকে সরিয়ে আনতেই অলিভার স্নোপের সইয়ের ওপর নজর গেল দিতির। পরিষ্কার অক্ষরে দু’টি শব্দ লিখে তার নীচে নাম সই করেছেন ডক্টর স্নোপ— ‘Not Approved’
“ডক্টর স্নোপ একটু প্রাচীনপন্থী।” বললেন সুইনবার্ন, “সমস্ত রকম অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সিদ্ধান্ত জানানোর ব্যাপারে এখনও অবধি ই-মেইল নয়, বরং মেমো লেখার পুরোনো রীতিই অনুসরণ করেন। এটা দেখে বুঝতে পারছ তো, কেন এত অবাক হয়েছি আমি? দু’ঘণ্টা আগে নিজের মুখেই অ্যাপ্রুভ করলেন রীতিমতো প্রশংসা করে, দু’ ঘণ্টার মধ্যে দস্তুরমতো লিখে নাকচ করে দিলেন, আমাকে কারণটা অবধি জানালেন না— এত অবিশ্বাস্য লেগেছিল আমার, প্রায় রিফ্লেক্সেই একটা ছবি তুলে নিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল তোমাকে দেখানো দরকার। এবারে ডিলিট করে দেব।” বলতে-বলতে ফোনের দিকে হাত বাড়ালেন সুইনবার্ন।
“এক মিনিট, প্লিজ়।” হাত তুলে ওঁকে নিরস্ত করে ছবিতে আবার মনোনিবেশ করল দিতি। তারপর, প্রায় আধ-মিনিটের নিশ্ছিদ্র নীরবতার পরে চোখ তুলল, “আউট-অফ-প্লেস, ক্যাথ। ভেরি আউট-অফ-প্লেস। আপনার চোখে পড়েনি?”
বিস্মিত চোখে তাকালেন সুইনবার্ন। স্পষ্টতই, বুঝতে পারেননি।
“এখানে ‘নট অ্যাপ্রুভড’ লিখুন তো, ক্যাথ!” একটা টিস্যু পেপার আর পেন এগিয়ে দিল দিতি।
“তুমি কি আমার হাতের লেখা মিলিয়ে দেখতে চাইছ? সন্দেহ করছ আমাকে? কী ভাবছ? আমি নিজে লিখে ডক্টর স্নোপের নাম দিয়ে চালাতে চাইছি? ছিঃ দিতি! ইউ আর ক্রসিং লিমিটস!” রুক্ষভাবে বলে উঠলেন সুইনবার্ন।
“এক্কেবারে নয়, ক্যাথ। একেবারেই সন্দেহ করছি না আপনাকে— ট্রাস্ট মি। আপনি লিখুন, তারপর বুঝিয়ে বলছি আপনাকে।”
এক মুহূর্তের দ্বিধার পরে দু’টি শব্দ লিখে টিস্যু পেপারটি দিতির দিকে ঘুরিয়ে ধরলেন ক্যাথ— ‘Not approved’
“নাও, প্লিজ়় এক্সপ্লেইন!” উষ্মার ভাব তখনও পুরোপুরি কেটে যায়নি সুইনবার্নের গলা থেকে।
“ডক্টর স্নোপের মতো একজন প্রাচীনপন্থী ব্রিটিশ প্রফেসর ইংরেজি ব্যাকরণের সঙ্গে সমঝোতা করবেন না, ক্যাথ। যেমন আপনিও করেননি। আপনার ‘নট’-এর এন, ক্যাপিটাল অক্ষরে লেখা— বাকি সব স্মল লেটার, ছোট-হাতের লেখা, এমনকি ‘অ্যাপ্রুভড’-এর ‘এ’ অবধি। ডক্টর স্নোপ তো আরও পুরোনো দিনের মানুষ, ব্যাকরণের ব্যাপারে নিশ্চয় আরও গোঁড়া? ওঁর ‘অ্যাপ্রুভড’ বানানে তবে ‘এ’ ক্যাপিটাল লেটারে লেখা কেন? আমি বলছি কেন লেখা। উনি ‘অ্যাপ্রুভড’-ই লিখেছিলেন। তারপর তার নিচে সই করেছিলেন। ছবিতে দেখুন, ‘অ্যাপ্রুভড’ আর ওঁর সই—এই দুটোই কেমন এক লাইনে রয়েছে। এই ‘নট’টি যোগ করা হয়েছে পরে। হয়তো ওঁর ইচ্ছেয়, হয়তো অনিচ্ছেয়— কিন্তু পরে যে লেখা, সে-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কোনও হ্যান্ডরাইটিং বিশেষজ্ঞ দেখলে নিশ্চয়ই ধরতে পারবেন।”
“রাইট ইউ আর! এ-ভাবে তো একেবারেই ভাবিনি! কিন্তু কে করতে পারে? তোমার সঙ্গে কার এত শত্রুতা, যে তোমার সিলেকশন ক্যানসেল করার জন্য ডক্টর স্নোপের ঘরে ঢুকে... এক মিনিট... তবে কি ডক্টর স্নোপের হার্ট অ্যাটাকটাও...?” উত্তেজনায় কথা হারিয়ে ফেললেন সুইনবার্ন।
“আমি বোধ হয় এখানে আদৌ গুরুত্বপুর্ণ নই ক্যাথ...” প্রয়োজনের চেয়ে শান্ত শোনাল দিতির গলা, তার নিজের কানেও, “তবে নিঃসন্দেহে, আপনার এই স্টুডেন্ট ইন্টার্ন বেছে নেওয়াতে বিশেষ কারও আপত্তি থাকলেও থাকতে পারে, এবং সেটা আটকাতেই এই চেষ্টা। আর আপনার শেষ প্রশ্নটার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যদিও বাইরে থেকে এ-ভাবে হার্ট অ্যাটাক ঘটানো সম্ভব কি না সেটা সেন্ট মেরি’জে়র ডাক্তাররাই বলতে পারবেন। তবে ব্যাপারটা গোলমেলে। ডক্টর স্নোপ সুস্থ হলে একবার কথা বলে দেখবেন, উনি হয়তো কিছু বলতে পারবেন। অন্তত সেদিন সন্ধ্যায় আপনি চলে আসার পরে ওঁর কাছে কেউ এসেছিল কি না, কী কথাবার্তা হয়েছিল, এ-সব জানতে পারলেও হয়তো একটা ধারণা পাওয়া যাবে।”
“সে না হয় করব। কিন্তু আমি ভাবছি এক্সকাভেশনে তোমার যাওয়ার কথা, দিতি। ডক্টর স্নোপের লিখিত অনুমতি ছাড়া তো চ্যানেল তোমার খরচ দেবে না। আর এই রিজেকশন মেমো যে সত্যি নয়, সে কথা প্রমাণ করতে গেলে ডক্টর স্নোপের সুস্থ হয়ে ওঠাটা জরুরি। অত সময় তো নেই আমার কাছে!”
“আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না ক্যাথ। আমি তো সত্যিই কখনও ভাবিনি, এ-রকম একটা সুযোগ পেতে পারি। ডক্টর স্নোপ আর আপনি, দু’জনে মিলে আমাকে এই এক্সকাভেশনের যোগ্য মনে করেছিলেন, এটাই একটা বিরাট পাওয়া আমার কাছে। আই উইশ ইউ অল সাকসেস!” বলতে-বলতে গলা সামান্য কেঁপে গেল দিতির, মনখারাপটা লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও।
ঝুঁকে পড়ে দিতির হাতে হাত রাখলেন ক্যাথ।
“তোমাকে হয়তো সঙ্গে নিয়ে যেতে পারব না দিতি, কিন্তু তুমি এক্সকাভেশনের সঙ্গেই থাকবে, আমার ভার্চুয়াল অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে। যতক্ষণ আমরা জানতে না পারছি ঠিক কী রহস্য আছে এর পেছনে, ব্যাপারটা গোপন থাকবে। খুব শিগগিরই একটা সিকিওর্ড ই-মেইল আইডি খুলে পাসওয়ার্ড পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমাকে। ওয়েলকাম টু ‘ডিগিং উইথ ক্যাথ’!”
দিতির মনখারাপের মেঘটা উড়ে গেল এক ঝটকায়। সুইনবার্নের হাতে-হাত-মিলিয়ে টেবল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে, একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল সে, “সো হোয়্যার অ্যাম আই নট গোয়িং? কোথায় হচ্ছে এবারের এক্সকাভেশন?”
“তোমার পেপারটা তো সেই জন্যই আমাদের অবাক করেছিল, দিতি! আমাদের এবারের গন্তব্য, গ্রিসের অলিম্পিয়া। আর যে মানুষটির পেছনে ধাওয়া করছি আমরা, তার নাম ফিডিয়াস। প্রাচীন গ্রিসের শ্ৰেষ্ঠতম ভাস্কর।”
যেমন বলেছিলেন সুইনবার্ন, বিকেলের আগেই আলাদা আইডি এবং পাসওয়ার্ড এসে গেল দিতির কাছে। যেহেতু খাতায়-কলমে ওর নাম নেই এক্সকাভেশনের দলে, তাই আইডি খোলা হয়েছে ভিআই@ নামে— অর্থাৎ ভার্চুয়াল ইন্টার্ন। দেখে বোঝার উপায় নেই, নামের পেছনের ইন্টার্নটি আসলে কে।
ক্লাসের পরে, বিকেল পাঁচটা থেকে এক্সকাভেশনের ভার্চুয়াল চ্যাটরুমে হাজিরা দেওয়া নতুন রুটিন হল দিতির। এই ধরনের এক্সকাভেশনগুলোয় পারস্পরিক কাজের সুবিধার জন্য অনেকগুলো ইউনিভার্সিটি তাদের রিসার্চ আর্কাইভ একে-অপরকে ব্যবহার করার সুযোগ দেয়। শ’য়ে-শ’য়ে ফাইল ইনডেক্স করা রয়েছে, তার বেশিরভাগটাই প্রত্নতত্ত্বের টেকনিক্যাল দিক নিয়ে। সে-দিকে ওকে নজর দিতে বারণ করলেন সুইনবার্ন। ওর কাজ হবে মানুষ ফিডিয়াসের সম্বন্ধে যতটা সম্ভব তথ্য পড়ে নোট তৈরি করা। ভাস্কর নয়, মানুষ ফিডিয়াসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই অভিযানের সাফল্যের চাবিকাঠি।
“ঠিক কীসের খোঁজ লুকিয়ে আছে এই এক্সকাভেশনের পেছনে, ক্যাথ?” প্রথম দিনেই প্রশ্ন করেছিল দিতি, “অলিম্পিয়ার তো প্রায় প্রতি ইঞ্চি খুঁড়ে দেখা হয়ে গিয়েছে এতদিনে, তাই না?”
“হ্যাঁ, এবং না। অলিম্পিয়ায় প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয় ১৮২৯-এ, মানে আজ থেকে প্রায় দু’শো বছর আগে। তার পর থেকে দফায়-দফায় বহু এক্সকাভেশন চলেছে, এখনও চলছে। কিন্তু সে-সব প্রথাগত খোঁড়াখুঁড়ি। আমাদের খোঁজ একটু অন্যরকম। অলিম্পিয়ার ইতিহাস নয়, আমাদের খোঁজ ফিডিয়াসকে নিয়ে। এথেনা আর জিউসের আড়ালে পড়ে যাওয়া এই গ্রিক ভাস্করটির নামের ওপর বিস্মৃতি আর অপবাদের প্রচুর ধুলো জমে আছে। আমাদের উদ্দেশ্য, সেই ধুলো সরিয়ে আসল ফিডিয়াসের সন্ধান করা। যে-কারণে এবারের পর্বটির নামই দেওয়া হয়েছে ‘ফিডিয়াসের খোঁজে— ইন সার্চ অফ ফিডিয়াস’।”
আরও অনেক কথা বলে গিয়েছিলেন সুইনবার্ন।
“ফিডিয়াসের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি যদিও অলিম্পিয়ার জিউসের মূর্তি, কিন্তু তারও আগে গোটা গ্রিস জুড়ে ফিডিয়াসের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল এথেন্সের অ্যাক্রোপলিসে স্থাপিত এথেনা-র তিনটি মূর্তির সুবাদে। প্রথম দেবী-মূর্তিটির নাম ছিল ‘এথেনা প্রমাকোস’, ব্রোঞ্জের তৈরি, উচ্চতা প্রায় ত্রিশ ফিট। প্রবাদ ছিল, দ্বিপ্রহরের সূর্যের আলোয় ঝলসে ওঠা এথেনা প্রমাকোসের শিরস্ত্রাণ আর বর্শার ফলক নাকি ইজিয়ান সাগরের ঘরমুখী নাবিকদের চোখে পড়ত এথেন্স থেকে সত্তর কিলোমিটার দূরে, মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণতম বিন্দু কেপ সুনিয়ন থেকেও। এর পরে তিনি সৃষ্টি করেন আরেকটি ব্রোঞ্জ মূর্তি, ‘লেমনিয়ান এথেনা’। ততদিনে ফিডিয়াস প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এথেন্সের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর হিসেবে। এথেন্সের শাসক পেরিক্লিসের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গাঢ় হয়েছে। ৪৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পেরিক্লিস তাকে নিয়োগ করেন এথেন্সের নবনির্মাণ-কাজের প্রধান ভাস্কর হিসেবে। আর সেই দায়িত্ব পূর্ণতা পায় এথেনা পার্থেনসের মূর্তির সৃষ্টির সময়ে। আইভরি, অর্থাৎ হাতির দাঁত, আর মূল্যবান ধাতু দিয়ে ভাস্কর্য তৈরির এক আশ্চর্য কৌশলের জনক ছিলেন ফিডিয়াস, যার নাম ছিল ক্রাইসেলিফ্যান্টাইন টেকনিক।
৪৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এথেনা পার্থেনসের কাজ শেষ হওয়ার অব্যবহিত পরেই ফিডিয়াসের ডাক আসে এথেন্সের প্রতিবেশী রাজ্য এলিস থেকে, অলিম্পিয়ায় দেবরাজ জিউসের মূর্তি স্থাপনের দায়িত্ব নিতে। যে-পদ্ধতিতে এথেনা পার্থেনসের মূর্তি বানানো হয়েছিল, সেই ক্রাইসেলিফ্যান্টাইন টেকনিক ব্যবহার করা হয়েছিল এখানেও। প্রায় পঁয়ত্রিশ ফিট উঁচু ছিল এথেনার দণ্ডায়মানা মূর্তি। আর সিংহাসনে আসীন জিউসের মূর্তিটি ছিল চল্লিশ ফিটের ওপরে। কাঠের ফ্রেমের ওপরে তৈরি সেই মূর্তির শরীরের দৃশ্যমান অংশগুলোর জন্য ফিডিয়াস ব্যবহার করেছিলেন আইভরি। বাকি অংশ তৈরি হয়েছিল সোনায়, তার সঙ্গে অজস্র মণিমুক্তো, রুপো, তামা, এনামেল, রঙিন কাচের কারুকাজ। সিংহাসন-সহ জিউসের মূর্তিটি বসানো ছিল বত্রিশ ফিট বাই কুড়ি ফিটের কালো পালিশ-করা মার্বেলের বেদীর ওপরে। ফিডিয়াস জিউসকে এমন ভাবে সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, যাকে দেখে ভক্তদের মনে একই সঙ্গে অবিমিশ্র ভক্তি আর ভয়ের উদ্রেক হয়।”
“কিন্তু এই মূর্তির আদলের উৎস কী? মানে, কী থেকে এই মূর্তির কল্পনা করেছিলেন ফিডিয়াস? নিশ্চয় স্বপ্নে পাওয়া নয়?” প্রশ্ন করেছিল দিতি।
“না, হোমারের ইলিয়াডে যেমন বর্ণনা আছে জিউসের, ঠিক তেমন করেই নাকি তাঁকে ভেবেছিলেন ফিডিয়াস। পাউসনিয়াসের নাম শুনেছ তো? দ্বিতীয় শতকের ভৌগোলিক, যিনি দশ খণ্ডে লিখে গেছিলেন তাঁর গ্রিসের ভ্রমণকাহিনি?”
“হ্যাঁ, নাম শুনেছি, কিন্তু পড়িনি।”
“পাউসনিয়াসের লেখায় আছে, ফিডিয়াস নাকি নিজের কাজ শেষ করার পরে জিউসের কাছে প্রার্থনা করেন এমন কোনও ইঙ্গিত দিতে, যাতে ফিডিয়াসের মনে হয় জিউস তার কাজে প্রীত হয়েছেন। এবং তার সঙ্গে-সঙ্গেই জিউসের বজ্র এসে আঘাত করে বেদীর সামনের একটি অংশে। মেঝে ফাটিয়ে দেয়। ফিডিয়াস ধরে নেন, দেবরাজ সন্তুষ্ট! পরে সে জায়গাটিকে ঢেকে দেওয়া হয় জেড পাথর কুঁদে তৈরি করা একটি সুদৃশ্য অ্যাম্ফোরা দিয়ে।”
“কিন্তু এত করেও তো শেষ রক্ষা হয়নি, তাই না?” ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না-সরিয়েই বলেছিল দিতি, “না এথেনা, না জিউস— কেউই তো নিজেদের মূর্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেননি সময়ের প্রকোপ থেকে। চুয়াল্লিশ ট্যালেন্ট সোনা ব্যবহার করা হয়েছিল এথেনা পার্থেনসের মূর্তিতে। সে-সোনাও তো শুনেছি মূর্তির গা-থেকে খুলে নিয়ে যাওয়ার চল ছিল, এথেন্সের যে-কোনও জরুরি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে। আবার পরে সে-সোনা ফিরিয়েও দেওয়া হত। জিউসের পরিণতিও কি তাই হয়েছিল?”
“না, দেবরাজ জিউসকে নিজের মূর্তির গায়ের সোনা দিয়ে এলিসের যুদ্ধের খরচ জোগাতে হয়নি বটে, কিন্তু নিজের মূর্তিটিকে তিনি সময়ের হাত থেকে রক্ষাও করতে পারেননি। কথিত আছে, রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা মূর্তিটিকে রোমে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, উদ্দেশ্য ছিল জিউসের মাথাটিকে সরিয়ে সেখানে নিজের মুখ স্থাপন করা। সে লক্ষ্য অবশ্য সফল হয়নি, কিন্তু খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে সম্রাট কনস্টান্টাইন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পরে নির্দেশ দেন, জিউসের মূর্তির গা থেকে যাবতীয় সোনা আর অন্যান্য মূল্যবান ধাতু, মণিমুক্তা সব সরিয়ে নিতে। এর পরের পরিণতি খানিকটা ধোঁয়াটে। আনুমানিক ওই চতুর্থ শতকের শেষ ভাগেই মূর্তিটিকে নিয়ে যাওয়া হয় কনস্টান্টিনোপলে, এবং ৪৭৫ খ্রিস্টাব্দে এক বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় ফিডিয়াসের শেষ কীর্তি।”
“আর এথেনা পার্থেনস? তাঁর পরিণতি কী হয়েছিল, ক্যাথ?” কি-বোর্ডে প্রশ্ন করল দিতি।
উত্তরে সার্ভার থেকে একটা ফাইল টেনে এনে চ্যাট-জানলা দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন সুইনবার্ন— সঙ্গে লিখলেন, “আমার প্রফেসর ইভলিন হ্যারিসনের কাজ। পড়ে দেখো। এথেনার অন্তিম পরিণতি সম্বন্ধে একটা ইন্টারেস্টিং থিওরি আছে ওঁর।”
পড়ে, আরও খানিকটা তাজ্জব হয়ে গেল দিতি।
এথেনা পার্থেনসের মূর্তির বাঁ-হাতে ধরা ছিল একটি ঢাল, এথেনার বিখ্যাত ‘শিল্ড’। আমাজন নারী-যোদ্ধাদের সঙ্গে এথেন্সের লড়াইয়ের নানান দৃশ্য রিলিফের আকারে উৎকীর্ণ ছিল সেই ঢালের ওপর। আর ঢালের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় ফিডিয়াস রেখে গিয়েছিলেন নিজের স্বাক্ষর। মানে ঠিক সইসাবুদ নয়— দেব-দেবীদের মূর্তিতে সে-সব করার অনুমতি ছিল না এথেন্সে, তাই ঢালের ঠিক মাঝখানটিতে নিজের প্রতিকৃতি স্থাপন করে গিয়েছিলেন ফিডিয়াস। আর এমন এক গোপন কলকব্জা দিয়ে তাকে জুড়ে রেখেছিলেন এথেনা পার্থেনসের মূর্তির সঙ্গে, যাতে ঢাল থেকে সে-প্রতিকৃতি সরাতে গেলেই সমগ্র মূর্তিটি টুকরো-টুকরো হয়ে ভেঙে পড়বে— ঠিক যেমন একটা চাবি ঘোরালেই একাধিক লিভার সরে গিয়ে খুলে যায় বিরাট ভল্টের দরজা।
প্রফেসর হ্যারিসন নিজে সন্দিহান ছিলেন এই দাবির সত্যতা নিয়ে। কিন্তু ফিডিয়াসের পরবর্তীকালের বিখ্যাত রোমান বাগ্মী ও রাজনীতিজ্ঞ সিসেরো, এবং গ্রিক ঐতিহাসিক প্লুটার্ক, দু’জনেই ইঙ্গিতে স্বীকার করে গেছেন ফিডিয়াসের এই গোপন কলের রহস্য। একই সঙ্গে, ফিডিয়াসের বিরুদ্ধে এথেন্সের রাজপুরুষদের আনা অভিযোগ, তাঁর বিচার ও শাস্তির কথাও রয়েছে প্লুটার্কের লেখাতে। বড় কঠিন সেই অভিযোগ।

—এথেনা পার্থেনসের ঢাল
অলিম্পিয়ায় জিউসের মূর্তি উৎসর্গের কাজ শেষ হলে আনুমানিক ৪৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এথেন্সে ফিরে এলেন বৃদ্ধ ফিডিয়াস। ততদিনে অভিযোগপত্র প্রস্তুত তাঁর বিরুদ্ধে। এথেনা পার্থেনসের মূর্তি তৈরির জন্য নির্ধারিত সোনার অংশ আত্মসাৎ করার দায়ে অভিযুক্ত হলেন ফিডিয়াস। অভিযুক্ত হলেন, এথেনার শিল্ডের ওপর নিজের প্রতিকৃতি স্থাপন করে দেবীমূর্তির অবমাননার দায়ে।
“কিন্তু এথেন্স থেকে অলিম্পিয়ায় গিয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠতম শিল্পকীর্তিটি সম্পূর্ণ করার পরেও আবার কেন ফিডিয়াসকে এথেন্সেই ফিরে আসতে হয়েছিল, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মুখোমুখি হতে? আর যদি ফিডিয়াসের সততা নিয়েই প্রশ্ন ছিল এথেন্সের, তাহলে তাঁকে দেবরাজ জিউসের মূর্তির মতো মহান সৃষ্টির দায়িত্বই বা দেওয়া হল কেন?” পরদিন চ্যাটরুমে এক ধাক্কায় জোড়া প্রশ্ন ছুড়ে দিল দিতি।
“গুড কোয়েশ্চেনস, দিতি। প্রথমত, অলিম্পিয়া ছিল এলিসের অংশ। যে-সময়ে ফিডিয়াস জিউসের মূর্তির দায়িত্ব নেন, সে-সময়ে এলিস ছিল স্পার্টা-র মিত্রশক্তি। স্পার্টার সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল না এথেন্সের। সুতরাং এলিসের কোনও দায় ছিল না ফিডিয়াসের প্রতি আনা এথেন্সের অভিযোগ নিয়ে মাথা ঘামানোর। আর দ্বিতীয়ত, সেই সময়ে ফিডিয়াসের সমকক্ষ আর কেউ ছিলেন না এই কাজের জন্য। প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রকে টপকে যাওয়ার জন্য তারই শ্রেষ্ঠ শিল্পীকে ব্যবহার করার সুযোগ কে-ই বা ছেড়ে দেয়? ৪৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জিউসের মূর্তির কাজ শেষ হওয়ার পরে ফিডিয়াস ফিরে আসতে চেয়েছিলেন স্বদেশে, এথেন্সে। সম্ভবত ভরসা ছিল শাসকের বন্ধুত্বের প্রতি। তাঁর প্রিয় বন্ধু, এথেন্সের স্বর্ণযুগের পথিকৃৎ পেরিক্লিস তখনও রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা। কিন্তু কিন্তু সেই বন্ধুত্বই ফিডিয়াসের কাল হয়েছিল। পেরিক্লিসের শত্রুরা জোট বাঁধছিল তাঁর বিরুদ্ধে, এবং তাঁকে আঘাত করার জন্য তারা বেছে নেয় ফিডিয়াসকেই। ৪২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ মারা গেলেন পেরিক্লিস। ততদিনে ফিডিয়াসকে আদালতে তোলা হয়েছে, তাঁর অন্যতম সহকারী মেনন তাঁর বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হতে সম্মত হয়েছেন— পেরিক্লিসের অবর্তমানে বৃদ্ধ ফিডিয়াসের পক্ষে সম্ভব ছিল না রাষ্ট্রের আনা অভিযোগের মোকাবিলা করার। এথেন্স তাঁকে কারাগারে পাঠায়, এবং সেখানেই মারা যান বৃদ্ধ ভাস্কর। এথেন্সের সেই কারাগারে, যেখানে তার আনুমানিক তিন দশক পরে বন্দি ছিলেন সক্রেটিস।”
সুইনবার্নের একটা পক্ষপাত কাজ করছে ফিডিয়াসের প্রতি, সেটা বুঝতে পারছিল দিতি। কিন্তু সঙ্গে এটাও মনে হচ্ছিল, হয়তো এটা সুইনবার্নের একটা কৌশল, রিসার্চের ব্যাপারে দিতি কতটা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারে সেটা যাচাই করে নেওয়ার। সেটা আন্দাজ করেই ও পরের পড়াশোনা শুরু করল ফিডিয়াসের প্রতি এথেন্সের অভিযোগের সত্যতা নিয়ে। সত্যিই কি অসৎ ছিলেন ফিডিয়াস? সত্যিই কি এতটাই মোহ ছিল ওঁর, অর্থের?
সে-সময়ের আদালতের নথিপত্রের কপি বিশেষ নেই ইন্টারনেটে। অন্যান্য ইউনিভার্সিটিগুলোর আর্কাইভ ঘেঁটে-ঘেঁটেই তথ্য সংগ্রহ করছিল দিতি। খুঁজতে-খুঁজতে হঠাৎ ওর মনে পড়ল ক’দিন আগে সুইনবার্নের বলা একটা কথা— ফিডিয়াসের প্রায় তিন দশক পরে ওই একই কারাগারে বন্দি ছিলেন বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস। আর্কাইভের সার্চ অপশনে গিয়ে ‘সক্রেটিস’ এবং ‘কারাগার’ লিখে সার্চ করতে প্রায় হাজার চল্লিশেক ফাইল বেরিয়ে এল বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির আর্কাইভ থেকে। এক-একটা ফাইল খুলে এক নজরে দেখতে যদি এক মিনিটও লাগে, সাড়ে ছ’শো ঘণ্টার ওপর সময় লাগবে সব ক’টা ফাইল খুলে দেখতে— মনে-মনে হিসেব করে নিল দিতি। অসম্ভব! এ-ভাবে হবে না!
আগের দুটো শব্দের সঙ্গে ‘ফিডিয়াস’ জুড়ে আবার সার্চ কম্যান্ড দিল দিতি। এবারে মাত্র ন’শো তিপ্পান্নটি ফাইল। ফাইল পিছু এক মিনিট ধরলে ষোলো ঘণ্টা। বাথরুম থেকে চোখেমুখে জল দিয়ে ফিরে এসে লেগে পড়ল দিতি।
এবং ষোলো নয়, আশার আলো দেখতে পেল আড়াই ঘণ্টার মাথায়। সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির আর্কাইভে পাওয়া গেল একটি ফোল্ডার, তাতে দু’টি ফাইল। প্রথম ফাইলটিতে রয়েছে একটি নিউজ ক্লিপিং।
দু’হাজার আঠারোর অক্টোবর মাস নাগাদ একটি ব্রিটিশ-বুলগেরিয়ান যৌথ অভিযান বুলগেরিয়ার বুর্গাস শহরের তটভূমি থেকে আশি কিলোমিটার দূরে, কৃষ্ণসাগরের গভীরে খুঁজে পায় প্যারামিনোস নামের একটি গ্রিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। ধ্বংসাবশেষ বলাটা যদিও সঙ্গত নয়, কারণ দু’হাজার মিটারের গভীরতায় জলে অক্সিজেনের পরিমাণ নেই বললেই চলে, ফলে জাহাজটি প্রায় পুরোটাই রয়েছে অটুট অবস্থায়। একজোড়া রোবট ডাইভার দু’টি-মাত্র পোড়ামাটির পাত্র বা অ্যাম্ফোরা তুলে আনতে সক্ষম হয়, আর তার কার্বন ডেটিং করে জানা গেছে জাহাজটির ডুবে যাওয়ার সময়কাল আজ থেকে আনুমানিক চব্বিশশো বছর আগের। বয়সের বিচারে এখনও অবধি খুঁজে পাওয়া পৃথিবীর প্রাচীনতম জাহাজডুবির নিদর্শন।
চট করে আরেকবার গুগল করে নিশ্চিত হয়ে নিল দিতি। সক্রেটিসের মৃত্যুর আনুমানিক সময় ৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। অর্থাৎ আজ থেকে দুহাজার চারশো সতের বছর আগের কথা।
অর্থাৎ এই ডুবে যাওয়া জাহাজটি, প্রায় সক্রেটিসের সমসাময়িক।
অন্য ফাইলটি তুলনায় ছোট। তুলে আনা একটি অ্যাম্ফোরার সিল ভেঙে উদ্ধার করা দু’টি প্যাপিরাসের স্ক্রোলের ছবি। প্রাচীন গ্রিসের অ্যাটিকা অঞ্চলের ভাষায় লেখা, পাশে তাদের ইংরিজি অনুবাদ। অনুবাদ-দু’টির ওপরেই নজর দিল দিতি।
প্রথম স্ক্রোলটি প্যারামিনোস জাহাজের মালিক তথা ক্যাপ্টেন য়োনাস প্যারামিনোসের লেখা। ডায়েরির আদলে, কিন্তু পুরোপুরি ডায়েরি বলা যায় না— মাত্র একদিনের দিনলিপি আছে তাতে।
*
৯৫.৩ / হেকাটো / ২৪
এই ক’দিন খুব দুর্ভোগ গেছে মারমারা সাগর পেরিয়ে আসতে। এর পর সামনে আসছে বসপোরাস প্রণালী, সেটা সাবধানে পেরিয়ে যেতে পারলেই পন্টোস অ্যাক্সেইনোসে পৌঁছে যাবে আমার ‘প্যারামিনোস’। এর মধ্যে হয়তো আর সময় পাব না, তাই এখনই লিখে রাখছি, যাতে করে ছোটখাটো ব্যাপারগুলো ভুলে না যাই। কপালে থাকলে এ-ঘটনা আমার জীবন বদলে দিতে পারে।
ইজিয়ান সাগরে পড়ার পরদিন আমার নাবিকদের সর্দার থেরাপন একটা লোককে নিয়ে এল আমার কাছে। লোকটা বোবা-কালা। আগের দিন যখন পিরিয়াস বন্দরে জাহাজে মাল তোলা হচ্ছিল, তখন কোনও এক ফাঁকে উঠে পড়েছিল, বোধ হয় খোলের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। পরদিন সকালে খিদের জ্বালায় বেরিয়ে এসেছিল, গুনতির সময় ধরা পড়ে গেছে।
লোকটা যে সত্যিই বোবা-কালা, সে-বিষয়ে নিঃসন্দেহ হওয়ার পর আমি থেরাপনকে জিজ্ঞেস করলাম, একটা অতিরিক্ত লোক এই সমুদ্র সফরে ওর কোনও কাজে আসবে কি না ।
“মাঝারি গড়ন লোকটার, হেরোস য়োনাস। গায়ে-গতরেও খুব শক্তপোক্ত নয়। তেমনটি হলে এতক্ষণে জুতে দিতাম দাঁড় বাওয়ার কাজে। কিন্তু তাতে লাভের চেয়ে লোকসান হবে বেশি। কাজ কম করবে, ফলে বাকি দাঁড়িরাও সুযোগ পাবে কাজে ফাঁকি দেওয়ার। আমার মনে হয়, এই লম্বা সফরে একটা অতিরিক্ত পেট পোষার দায় না নেওয়াই ভালো হেরোস। আজকের দিনটা খোলের ভেতরে বেঁধে ফেলে রাখি, রাতের বেলায় জলে ফেলে দিলেই ল্যাঠা চুকে যাবে। কেউ খবরও নেবে না, কোনও ঝামেলাও হবে না।”
সিদ্ধান্তটা খুব মানবিক নয়, কিন্তু এই দীর্ঘ সমুদ্র সফর মানবিকতা দেখানোর জায়গাও নয়। তার ওপরে মারমারা আর বসপোরাস, দু’জায়গাতেই নাবিকদের শৃঙ্খলার ওপর ভরসা করতে হয় আমাদের। আর জাহাজে এরকম উটকো লোক উঠে পড়লে এ-ধরনের সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েও থাকি। তাই থেরাপনের কথায় সায় দিতে খুব বেশি ভাবতে হল না।
কথাবার্তা যা হওয়ার, লোকটার সামনেই হয়েছিল, কারণ আমরা দু’জনেই নিশ্চিত ছিলাম, লোকটা বোবা এবং কালা। কথা শেষ করে যখন থেরাপন লোকটার দিকে ফিরল, লোকটা চকিতে ওর পাশ কাটিয়ে এসে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার পায়ে। দুটো হাত জড়ো করে বার-বার যেন কিছু বলতে চায় আমাকে। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, ভয় পাওয়া লোকের চোখ। কিন্তু একেবারে নিরক্ষর কুলি বা ক্রীতদাসের চোখ এ নয়— বুদ্ধির ছাপ স্পষ্ট সে-দৃষ্টিতে। আর ছাপ মৃত্যুভয়ের।
আমি, য়োনাস প্যারামিনোস, ‘প্যারামিনোস’ জাহাজের ক্যাপ্টেন, ইজিয়ান থেকে অ্যাক্সেইনোস সাগর পাড়ি দিচ্ছি আজ কুড়ি বছর হল। বহু সমুদ্রঝড় সামাল দিয়েছি, পিরিয়াস থেকে অ্যাপোলোনিয়া অবধি বহু বন্দরে বহু পোড়-খাওয়া মাতাল নাবিকের টক্কর নিয়েছি। আমি মানুষ চিনি। এই লোকটার চোখে আসন্ন মৃত্যুর ছায়া দেখে তাই চমকে উঠলাম। এর তো জানার কথা নয়, কী আলোচনা হয়েছে আমার সঙ্গে থেরাপনের?
ইশারায় থেরাপনকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে লোকটাকে হাত ধরে তুলে দাঁড় করলাম। হাত আর চোখের ইশারায় জানতে চাইলাম, কী চায়!
সন্তর্পণে জামার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটা কুণ্ডলী-পাকানো প্যাপিরাস বের করে আনল লোকটি। তারপর আমার হাতে তুলে দিয়ে দু-পা পিছিয়ে দাঁড়াল জড়োসড়ো ভঙ্গিতে।
পরিষ্কার গোটা-গোটা অক্ষরে লেখা। কোনও ক্রীতদাস বা নাবিকের হাতের লেখা নয় মোটেই। অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে। হাতের ইঙ্গিতে ও আমাকে বোঝালো, ওর যা বলার তা ও আমাকে লিখে জানাতে পারে।
দেরাজের ভেতর থেকে একটা আনকোরা প্যাপিরাস আর লেখার সরঞ্জাম বের করে দিলাম ওকে। অল্পক্ষণের মধ্যেই লেখা শেষ করে আমার দিকে এগিয়ে দিল।
“আমার নাম গর্গিওস। আমি স্পার্টার অধিবাসী। জন্ম থেকেই আমি মূক-বধির, তাই স্পার্টার মূল সমাজে আমার জায়গা হয়নি। চাষের জমিতে কাজ করে খেতে পেতাম। আমার যখন কুড়ি বছর বয়স, ঘটনাচক্রে আমি এক স্পার্টান রাজপুরুষের নজরে পড়ি। তিনি আমাকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দেন স্পার্টার গুপ্তচর তৈরির শিক্ষাস্থল ক্রিপ্টাইয়া-তে। সেখানে আমাকে গুপ্তচরবৃত্তির পাশাপাশি লেখাপড়া আর শরীরচর্চা শেখানো হয়। শিক্ষা দেওয়া হয় মূকভাষায়। আমরা ছিলাম স্পার্টা রাজ্যের প্রথম মূক গুপ্তচর।
মানুষের ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে আমরা বুঝে নিতে পারি তার কথা। বোবা-কালা মানুষকে কেউ সন্দেহ করে না, তাই এই কাজের জন্য আমরা আদর্শ। রাজা দ্বিতীয় আগিসের বিশ্বস্ত ছিলাম আমি, আর তাই তাঁর মৃত্যুর পরে যখন স্পার্টার সিংহাসন নিয়ে লড়াই শুরু হল, প্রাণ বাঁচাতে আমি এথেন্সে পালিয়ে আসি। কাজ পাই অমাত্য অ্যানাইটাসের সহকারী ট্রায়নের দপ্তরে। তাঁর গুরু সক্রেটিসের প্রাণরক্ষার জন্য সারা শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন সেনানায়ক জে়নোফন। আমার দায়িত্ব ছিল তাঁকে অনুসরণ করা, এবং তার সমস্ত কথোপকথনের অনুলিখন পেশ করা ট্রায়নের কাছে। দু’দিন আগে অবধিও সেই কাজটিই করছিলাম। আমার শেষ অনুলিখনটির প্রতিলিপিই আপনাকে দিয়েছি, আমার কথার প্রমাণস্বরূপ।
দু’দিন আগের কথা। কাজ শেষ করে ট্রায়নের কাছে বিশদ বিবরণ পেশ করে বাড়ি ফেরার পথে একটা পানশালায় বসেছিলাম। সেখান থেকে মাঝরাতের পরে বেরিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরছি, সেই সময়ে ছুরি হাতে আমাকে আক্রমণ করে এক গুপ্তঘাতক। ক্রিপ্টাইয়া-তে সবরকমের শিক্ষাই দেওয়া হত আমাদের, ফলে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে পেরেছিলাম। ওরই হাতের ছুরি ছিনিয়ে নিয়ে ওকে আহত করে পালিয়ে আসি।
পালানোর আগে সেই ঘাতকের মুখের কাপড় সরিয়ে দেখে নিয়েছিলাম, সে আর কেউ নয়, ট্রায়ন স্বয়ং। বুঝতে পারি, সে আমাকে হত্যা করতে চাইছিল, কারণ তার প্রভুর আর আমাকে প্রয়োজন নেই। অ্যানাইটাসের শত্রুতা বয়ে নিয়ে আমার মতো গুপ্তচরের পক্ষে এথেন্সে থাকা সম্ভব নয়, তাই পিরিয়াস বন্দরে লুকিয়ে ছিলাম পালানোর সুযোগের অপেক্ষায়। ‘প্যারামিনোস’ জাহাজে অ্যাম্ফোরা বোঝাই করার কাজ শুরু হলে সেই কুলির দলে ভিড়ে যাই, এবং রাতের অন্ধকারে জাহাজের নিচের খোলে লুকিয়ে থাকি।
আমি আপনার কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইছি হেরোস য়োনাস। মহান জিউসের নামে শপথ করে বলছি, সবটুকু ক্ষমতা দিয়ে সারা জীবন আপনার সেবা করে যাবে এই অধম গর্গিওস।”
যেদিন জাহাজে মাল বোঝাই করা হচ্ছিল, সেদিন বন্দরের কাছে দেখেছি বটে, রাস্তার পাশে প্রচুর লোকের ভিড়, এক যাজকের মৃতদেহকে ঘিরে। পাথরের আঘাতে তার মুখ নাকি এমন বিকৃত করে দেওয়া হয়েছিল, যে সনাক্ত অবধি করা যায়নি। এদিকে এ বলছে, নাকি স্রেফ ছুরি মেরে আহত করে পালিয়ে এসেছে। খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যাই হোক, এত কথা জানার পরে একে জলে ভাসিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। একে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যে প্যাপিরাসের কুণ্ডলীটা প্রথমে দিয়েছিল আমাকে, সেটাও আমার কাছেই রাখা আছে, সময় করে পড়ে দেখতে হবে। তারপর অ্যাপোলোনিয়ায় পৌঁছে অবস্থা বুঝে একে তুলে দেওয়া যাবে আইনের হাতে। এথেন্সের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল অ্যাপোলোনিয়ার, একজন যাজকের হত্যাকারীকে ধরে দেওয়ার জন্য নিশ্চয়ই উপযুক্ত পুরস্কার দেবেন রাজা। সুতরাং একে নিজের নজরদারিতে রাখাই ভাল।
থেরাপনকে ডেকে বলে দিয়েছি, আপাতত এই জাহাজেই থাকবে গর্গিওস। এখন আমার খাস ভৃত্যের কাজ সামলাচ্ছে। সত্যিই মুখের কথা ফেলতে হচ্ছে না, ঠোঁট নাড়ানো দেখলেই বুঝে যাচ্ছে আমার কী চাই।
*
য়োনাস প্যারামিনোসের লেখা পড়ে যে খানিকটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল দিতির মনে, সেটা অনেকটাই কেটে গেল পরের প্যাপিরাসটার অনুবাদ পড়ে। এথেন্সের অমাত্য অ্যানাইটাসের গুপ্তচর গর্গিওসের শেষ মিশনের রিপোর্ট। যা বোঝা গেল, নিজের প্রভুকে মোটেই বিশ্বাস করত না গর্গিওস, তাই বিশেষ-বিশেষ দিনের রিপোর্ট দেওয়ার সময় তার একটা নকল বানিয়ে রেখে দিত নিজের কাছে। ধুরন্ধর বটে!
ল্যাপটপ বন্ধ করে কফি বানিয়ে চুমুক দিতে দিতে গর্গিওসের কথাই ভাবছিল দিতি। স্পার্টা বলতেই ওর মনে পড়ে যাচ্ছিল ‘থ্রি হান্ড্রেড’ ছবিটার কথা— তেমনই সব দীর্ঘদেহী যোদ্ধাদের ভিড়ে একটা বোবা-কালা মানুষ কী-ভাবে নিজের জায়গা করে নিয়েছিল শুধুমাত্র নিজের সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে। তারপর স্পার্টা থেকে এথেন্স। সক্রেটিস, জে়নোফন, প্লেটো, অ্যানাইটাস— গ্রিক ইতিহাসের এক একটা চরিত্র যেন গর্গিওসের জীবনের এক-একটা পাতা। সেখান থেকে শেষ পরিণতি পন্টোস অ্যাক্সেইনোস, আজকের কৃষ্ণসাগর বা ব্ল্যাক সি-র গভীরে। প্যারামিনোসের সঙ্গেই কি তবে সলিল সমাধি হয়েছিল গর্গিওসের? না কি শেষ মুহূর্তে ভাগ্য তাকে পৌঁছে দিয়েছিল অ্যাপোলোনিয়ার বন্দরে?
তবে তার অন্তিম পরিণতি যা-ই হোক, সক্রেটিসের সঙ্গে ফিডিয়াসের সূত্রটা যে গর্গিওসই জুড়ে দিয়ে গেছেন, তার লেখার শেষ ক’টি লাইন পড়ে তাতে আর কোনও সন্দেহ রইল না দিতির। পুরো লেখাটাই কথোপকথনের আদলে— ঠিক যেন একটা নাটক চলছে গর্গিওসের সামনে, আর উনি এক একজন কুশীলবের ডায়ালগ লিখে চলেছেন, যে যেমন বলছেন। একেবারে শেষ ক’টি কথা জে়নোফনের।
‘জে়নোফন: আমি বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসার আগে শুনতে পেলাম, কারাগারের অন্ধকার কোণে, গবাক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে গুরু আবৃত্তি করছেন প্রাচীন অ্যাটিকা-র ভাষায়। কান পেতে শুনলাম। কোনও সুগভীর দর্শনতত্ত্ব নয়, উনি আবৃত্তি করছেন এক অর্থহীন, ছেলেভুলোনো ছড়া—
কিউবিট যা, ট্যালেন্ট’ও তাই। পার্থেনসের নামে
আগুন চুরির হিসেবনিকেশ, হেমলকের দামে।
ছুটে গিয়ে ওঁকে দু’হাতে ধরে ঝাঁকিয়ে সম্বিত ফেরানোর চেষ্টা করলাম। মৃদু হেসে গুরু বললেন, আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা কোরো না, জে়নোফন। প্রমিথিউসের মূল্য, হেমলক। এমনটাই ফিডিয়াসের বিধান। যুগে যুগে এরই পুনরাবৃত্তি হয়ে আসছে।’
পড়া শেষ করে ল্যাপটপ বন্ধ করল দিতি। জল খেতে গিয়ে দেখল, বোতলটা খালি হয়ে গেছে। রান্নাঘরে ঢুকে কল থেকে জল ভরতে গিয়ে নজরে পড়ল, ডাইনিং টেবলে স্প্যানিশ রুমমেট টেরেসা বসে পড়ছে। ভারি ভোলাভালা শান্ত স্বভাবের মেয়ে টেরেসা, আর তেমনই বইপোকা। পাছে সে বিরক্ত হয়, তাই পা টিপে-টিপে ফিরে আসছিল নিজের রুমে, পেছন থেকে ডাকল টেরেসা।
“হাই দিতি। খুব ব্যস্ত? সন্ধে থেকে দেখিইনি তোমাকে।”
‘ডিগিং উইথ ক্যাথ’ নিয়ে কিছু বলার উপায় নেই, তাই পড়াশোনার অজুহাত দিয়ে পিছন ফিরতে যাবে, টেরেসা আবার প্রশ্ন করল, “তোমার বাবার লন্ডন অফিসের কলিগ কি ফোন করেছিলেন তোমাকে?”
“আমার বাবার লন্ডন অফিসের কলিগ?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করল দিতি, “আমার বাবা ইন্ডিয়ান আর্মির অফিসার, আর ইন্ডিয়ান আর্মির তো লন্ডনে কোনও অফিস নেই টেরেসা!”
“আমি অফিসে রেন্টাল চেক জমা দিতে গিয়েছিলাম, দেখলাম এক ভদ্রলোক তোমার নাম করে ঠিকানা জানতে চাইছেন। বললেন, তোমার বাবার লন্ডন অফিসের কলিগ, অফিসের কাজে এসেছিলেন তাই দেখা করে যেতে চান। তোমার বাবা নাকি কোনও সারপ্রাইজ পাঠিয়েছেন। মিসেস লওসনকে তো চেন, বুড়ি একেবারে পরিষ্কার ভাগিয়ে দিল, বলল এ-সব দেওয়ার পারমিশন নেই। আমার খুব খারাপ লাগল, তাই বেরোনোর সময় ভদ্রলোককে ডেকে বাইরে নিয়ে এলাম। বললাম, আমি তোমার ফ্ল্যাটমেট। ভারি ভাল মানুষ। আমাকে হট চকোলেট খাওয়ালেন, তারপর আমার সঙ্গেই হেঁটে-হেঁটে আমাদের হোস্টেল অবধি এলেন। তোমার গিফটটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, এটা একটা সারপ্রাইজ, তাই যতক্ষণ উনি তোমাকে ফোন না করছেন, আমি যেন তোমাকে গিফটটা না দিই। সেই জন্যই জিজ্ঞেস করলাম, ফোন করেননি এখনও?”
“তুমি... তুমি একটা অচেনা লোকের হাত থেকে পার্সেল নিয়ে নিলে?” হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করল দিতি, “ইউনিভার্সিটি থেকে এত বার পই-পই করে আমাদের সাবধান করা হয়েছে ড্রাগ থেকে, এক্সপ্লোসিভ থেকে সতর্ক থাকতে, অচেনা-অজানা লোকের কাছ থেকে কোনও কিছু না নিতে, আর তুমি একবারও আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না? সোজা তাকে চিনিয়ে দিলে আমাদের হোস্টেল? ফোন নম্বরও দিয়ে দিয়েছ নিশ্চয়?”
“হ্যাঁ, মানে... উনি তো বললেন, তোমার বাবার কলিগ!”
“উফফ টেরেসা! প্লিজ়, যাও নিয়ে এস প্যাকেটটা।”
স্থানীয় স্টোর সেইন্সবেরি-র মোড়কে সুদৃশ্য গিফট বাক্স, অনেকটা কফি মাগের মাপের। খানিকটা ভয়ে, খানিকটা উৎকণ্ঠায় কাঁপা হাতে ওপরের মোড়ক খুলতে বেরিয়ে এল আরেকটা গিফট প্যাক।
এটা অন্য একটা স্টোরের। মাৰ্ক্স অ্যান্ড স্পেনসার।
দু’রকম স্টোরের মোড়কে উপহারের বাক্স পাঠানোর মানুষ ওর বাবা নন। এর পেছনে অন্য কোনও রহস্য আছে। সিকিউরিটিকে জানানো দরকার। টেরেসাকে ধন্যবাদ দিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এসে ইউনিভার্সিটির সিকিউরিটি অফিসে ফোন করার জন্য মোবাইলের দিকে হাত বাড়াতে-বাড়াতে অনুভব করল দিতি, বিনবিন করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে তার ঘাড় দিয়ে, শিরদাঁড়া বরাবর!
হাতে তুলে নেওয়ার আগেই ঘরের নিস্তব্ধতা খান-খান করে বেজে উঠল সে-ফোন। প্রাইভেট নাম্বার।
ট্রিগার সিগন্যাল? বাক্স-বোমার কথা দিতি পড়েছে বটে ইসরায়েলের সিক্রেট এজেন্সি মোসাদের মিশনের গল্পে, বাস্তবে এ কি তাই? তার নিজের ফোনের সিগন্যালই কি ট্রিগারের কাজ করবে? ফোনটা রিসিভ করলেই কি তার হোস্টেলের ঘর হয়ে উঠবে আর একটা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বা মুম্বইয়ের জাভেরি বাজার?
প্রথমবার বেজে-বেজে কেটে গেল ফোনটা। তারপর যখন আবার বাজতে শুরু করল, টেরেসার দরজা ধাক্কানোর শব্দ পেল দিতি, তখন সম্বিৎ ফিরল তার। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফোনটা তুলে নিয়ে রিসিভ করল সে।
“ওপন দ্য বক্স।” শীতল ব্রিটিশ উচ্চারণে আদেশ ভেসে এল ফোনের ওপার থেকে।
কাঁপা হাতে মাৰ্ক্স অ্যান্ড স্পেনসারের মোড়ক ছিঁড়ে বাক্স খুলল দিতি। ভেতরে একটি ছোট চিরকুট। খবরের কাগজের হরফ কেটে আঠা দিয়ে জোড়া একটি তিন শব্দের চিঠি—
‘stop chasing phidias’
“হেলো দিতি।” ঠান্ডা কণ্ঠস্বর কথা বলছে আবার, “প্লিজ় ফলো দ্য অর্ডার। এলস ইট উইল বি এ রিয়াল বম্ব নেক্সট টাইম।”
হাঁটু ভেঙে মেঝের ওপর বসে পড়ল দিতি। হাত থেকে ফোন গড়িয়ে গেল মেঝেতে।
“৯৫.৩ আর হেকাটো, এ-দুটোর অর্থ বুঝতে পেরেছ, দিতি?”
আটচল্লিশ ঘণ্টা পরে আবার সিকিওর্ড চ্যাটরুমে ঢুকেছে দিতি। আজ ভিডিওচ্যাট চালু করেছেন সুইনবার্ন। সেদিনের পরে আজই প্রথম মুখোমুখি কথা।
দু’দিন আগে দিতির কল্পনার বাইরে ছিল এ-ভাবনা, সে আবার ফিরে আসবে ফিডিয়াসের খোঁজে, অতীতের রাস্তায়। ভয়ার্ত দিতি সেদিন অনেক রাতে মেসেজ করেছিল সুইনবার্নকে, নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নিতে চেয়ে এই এক্সকাভেশনের মিশন থেকে। সুদূর ভারত থেকে সে পড়াশোনা করতে এসেছে এ-দেশে। কোনও রহস্যের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে নিজেকে বিপদে ফেলার কোনও ইচ্ছে নেই তার।
সুইনবার্ন ফোন করেছিলেন সঙ্গে-সঙ্গেই। কোনও কথা জানতে চাননি। শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, দিতি ঠিক আছে কি না, ওঁর আসার প্রয়োজন আছে কি না। আর বলেছিলেন, এখন রেস্ট করো, আমরা কাল কথা বলব।
পরদিন দুপুরে লেকচার থিয়েটারে সুইনবার্ন জানিয়ে দিলেন, ডক্টর স্নোপের অসুস্থতার কারণে এ-বছরের ইন্টার্ন-নির্বাচন বাতিল করা হল।
দিতি যখন বেরোচ্ছে, টেবলের কোনা দিয়ে নিঃশব্দে একখানা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিলেন সুইনবার্ন। তুলে নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে কোনওদিকে না তাকিয়ে এগিয়ে গেল দিতি।
হোস্টেলে ফিরে নিজের ঘরে ঢুকে কার্ডটা বের করল দিতি। সেলোটেপ দিয়ে একটা সিম কার্ড আটকানো আছে উল্টোদিকে। সঙ্গে একটা টেলিফোন নম্বর, আর দু’লাইনের চিঠি।
“এই সিম কার্ডটা ব্যবহার কোরো আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য। আর এটা আমার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর। এই নম্বরে ফোন কোরো ছ’টার পরে।”
দিতি নয়, সুইনবার্নই ফোন করলেন সোয়া ছ’টা নাগাদ।
“ইউনিভার্সিটির তরফ থেকে আমি লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী, দিতি। একজন ছাত্রীকে তার রিসার্চের কাজের জন্য ইউনিভার্সিটি হোস্টেলের ভেতরে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, এটা শুধু আমাদের নয়, সমস্ত ব্রিটিশ শিক্ষা-ব্যবস্থার লজ্জা। আমি জানি না কে আছে এর পেছনে। কী-ভাবে এরা তোমার হদিস পেয়েছে, তা-ও জানি না। কিন্তু বিদেশি ছাত্রী হিসেবে তুমি আমাদের ইউনিভার্সিটির দায়িত্ব, এবং ব্যক্তিগতভাবে আমারও। আমাদের তরফ থেকে যা-যা সাবধানতা নেওয়ার আমরা নিচ্ছি। তুমি চাইলে আমি পুলিশের সঙ্গে কথা বলব, যাতে তারা তদন্ত করেন, প্রয়োজনে তোমার সুরক্ষার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু আমি কখনওই চাইব না, তুমি এই এক্সকাভেশনের টিম থেকে সরে দাঁড়াও। খুব ভাল কাজ করছ তুমি দিতি— ইট ক্যান বি এ গ্রেট ফেদার ইন ইওর ক্যাপ।”
“কিন্তু, ক্যাথ... লোকটা বলেছিল... এর পরের বার ইট উইল বি এ রিয়াল বম্ব...” কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল দিতি।
“ট্রাস্ট আস। ট্রাস্ট দ্য পোলিস। বাক্সটা আছে তোমার কাছে, না ফেলে দিয়েছ?”
চোখ তুলে দেখল দিতি। টেবলের কোনায় এখনও রাখা আছে মোড়ক-খোলা বাক্সটা।
“আছে। কিন্তু... আমি পুলিশের ঝামেলা চাই না ক্যাথ।”
“বেশ। তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না। আমি তোমার এই নম্বরটা ইউনিভার্সিটি পুলিশ বিটের ইনচার্জকে দিয়ে রাখছি। উনি তোমাকে যোগাযোগ করে নেবেন। আর এর পর থেকে এই এক্সকাভেশনের ব্যাপারে একে-অন্যকে যোগাযোগ করতে আমরা এই নম্বরদুটোই ব্যবহার করব। আমার ওপর বিশ্বাস রাখো, তোমার কোনও ক্ষতি হবে না। আজকের দিনটা ব্রেক নাও, কাল বিকেলে দেখা হবে চ্যাটরুমে। বাই।”
ঘণ্টা-দুয়েক পরে ক্যুরিয়ার কোম্পানির জ্যাকেট পরা যে মেয়েটি এসে ক্যুরিয়ার পৌঁছে দেওয়ার নাম করে দিতির ঘরে নকল উপহারের বাক্সটি কালেক্ট করে নিয়ে গেল, সে-ই যে বিট কনস্টেবল অ্যালিসিয়া মর্টন, আইডেন্টিটি কার্ড না দেখলে আন্দাজও করতে পারত না দিতি। দিতিকে নিজের নম্বরও দিয়ে গেল মেয়েটি, যে-কোনও প্রয়োজনে, চব্বিশ ঘণ্টার সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে।
অনেকটা নিশ্চিন্তি নিয়ে সেদিন রাতে শুতে গেল দিতি। পরের দিন বিকেলে যখন চ্যাটরুমে ঢুকল, তার মন থেকে দু’দিন আগের ভয় এবং আশঙ্কার মেঘ কেটে গেছে প্রায় পুরোপুরিই।
৯৫.৩ যে আসলে বছরের মাপ, আর হেকাটো যে আসলে হেকাটোমবায়ন, সেটা গুগল করেই জেনে নিয়েছিল দিতি। এথেন্স, এলিস, স্পার্টা এদের সকলেরই নিজস্ব ক্যালেন্ডার থাকা সত্ত্বেও অলিম্পিয়ান ক্যালেন্ডার ছিল গ্রিসের একটি সর্বজনগ্রাহ্য হিসেব। ৭৭৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম অলিম্পিকের শুরুর বছরটাকে ও.এল ১.১ বলে চিহ্নিত করা হত অলিম্পিয়ান ক্যালেন্ডারের হিসেবে। তারপর ও.এল ১.২, ১.৩ আর ১.৪ পেরিয়ে ৭৭২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হল ও.এল ২.১। এই হিসেবে ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ, পঁচানব্বই-তম অলিম্পিকের বছর, তাই ও.এল ৯৫.১। সক্রেটিসের মৃত্যু ৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, অর্থাৎ ও.এল ৯৫.২।
“কিন্তু ক্যাথ, য়োনাস প্যারামিনোসের প্যাপিরাস তো তার এক বছর পরের সাল দেখাচ্ছে, ও.এল ৯৫.৩।” অভিযানের খরচের বাজেট কম্পিউটারে এন্ট্রি করতে করতে বলেছিল দিতি।
“হ্যাঁ, কারণ অলিম্পিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে আমাদের এখনকার ক্যালেন্ডারের একটু তফাৎ আছে।” উত্তর দিলেন সুইনবার্ন, “আমরা চলি গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারে, যা সূর্যকে অনুসরণ করে। আর অলিম্পিয়ান ক্যালেন্ডারের চলন চান্দ্রমাসের হিসেবে। তাদের বছরের শেষ মাস ছিল স্কিরোফোরিওন, আমাদের জুন-জুলাই। এই মাসেই মারা গিয়েছিলেন সক্রেটিস। আর সেই দিনেই যাত্রা শুরু করে ‘প্যারামিনোস’ জাহাজ। য়োনাস প্যারামিনোসের প্যাপিরাস তার এক মাস পরে লেখা, ততদিনে নতুন বছর শুরু হয়ে গেছে। হেকাটোমবায়ন ছিল ওদের বছরের প্রথম মাস, আমাদের জুলাই-আগস্ট।”
“থ্যাংক ইউ ক্যাথ। এটা তো পরিষ্কার হল। কিন্তু সক্রেটিসের এই ধাঁধাঁটার সমাধান করতে পারছি না কিছুতেই! কিউবিট যা, ট্যালেন্ট-ও তাই— এর মানে কী?”
“হুঁ, আমাকেও ভাবাচ্ছে এটা।” সুইনবার্নের উত্তর ভেসে এল চ্যাটরুমে, “কিউবিট তো প্রাচীন গ্রিসের দৈর্ঘ্যের মাপ। আর ট্যালেন্ট, ওজনের। দুটো এক হয় কেমন করে?”
“কিউবিট, ট্যালেন্ট— দুটোই তো মাপ, মানে ডাইমেনশন-সংক্রান্ত শব্দ, আর সক্রেটিস ছিলেন দার্শনিক। এমন কী... উফফ... কী করে মিস করে গেলাম এটা!” বলতে-বলতে চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠল দিতি, “এক্ষুনি ফোন করছি আপনাকে ক্যাথ, দু’মিনিটে...।”
কিন্তু দিতি ডায়াল করার আগেই ফোন বেজে উঠল। সুইনবার্ন। উত্তেজনা সামলে কোনও মতে নিজের ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে বলার চেষ্টা করল দিতি।
“একবার ভাবুন তো, গর্গিওস ঠিক কী লিখে গেছিলেন, জে়নোফনের জবানিতে! ‘আমি বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসার আগে শুনতে পেলাম, কারাগারের অন্ধকার কোণে, গবাক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে গুরু আবৃত্তি করছেন প্রাচীন অ্যাটিকা-র ভাষায়। কান পেতে শুনলাম। কোনও সুগভীর দর্শনতত্ত্ব নয়, উনি আবৃত্তি করছেন এক অর্থহীন, ছেলে-ভুলোনো ছড়া।’— তাই তো?”
“হ্যাঁ, তাই... কিন্তু?”
“ক্যাথ, আমরা কেন ধরে নিচ্ছি, এই ছড়ার ধাঁধা সক্রেটিসের লেখা? আমরা তো জানি, ফিডিয়াসকেও বন্দি রাখা হয়েছিল এথেন্সের কারাগারেই! জে়নোফনের কথাগুলো ভাবুন— “কারাগারের অন্ধকার কোণে, গবাক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে গুরু আবৃত্তি করছেন’ হতেই পারে, ওই একই কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছিল ফিডিয়াসকেও? সক্রেটিস যে বলছেন ‘এমনটাই ফিডিয়াসের বিধান।’, সে-বিধান হয়তো কারাগারের দেওয়ালে ফিডিয়াসই কোনও ভাবে লিখে গিয়েছিলেন এই হেঁয়ালির আকারে? শিল্পী ছিলেন উনি, পাথরে খোদাই করে লিখে রেখে যাওয়া কি নিতান্তই অসম্ভব ওঁর পক্ষে? সক্রেটিস হয়তো আবিষ্কার করেছিলেন সে-লেখা, তাই সেই হেঁয়ালিই আবৃত্তি করছিলেন জে়নোফনের জন্য? ‘পার্থেনসের নামে’ কথাটা মনে করুন ক্যাথ— পার্থেনসের সঙ্গে কিন্তু অচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে আছে ফিডিয়াসের নাম!”
“রাইট, রাইট— ইশশ, কী করে ভুলে গেলাম এ-কথা?” উত্তেজনা সুইনবার্নের গলাতেও, “পেরিক্লিসের শত্রুরা বিষপ্রয়োগে হত্যা করেছিল ফিডিয়াসকে, এমন সম্ভাবনার কথা তো প্রফেসর হ্যারিসন নিজেও বলে গেছেন ওঁর গবেষণায়! এথেনা পার্থেনসের সোনা চুরির অপরাধের দায় হয়তো হেমলকের দামেই চোকাতে হয়েছিল ফিডিয়াসকে?”
“সোনা নয় ক্যাথ। সোনা নয়। আগুন। ‘আগুন চুরির হিসেবনিকেশ’— আচ্ছা, গ্রিক উপকথায় আগুন চুরি বলতে তো প্রমিথিউসের নামই মনে পড়ে, তাই না?”
“ঠিক তাই। টাইটান প্রমিথিউসের আগুন চুরির গল্পটা জান তো?” পাল্টা প্রশ্ন করলেন সুইনবার্ন।
“খানিকটা জানি।” বলল দিতি, “গ্রিকদের আদি দেবতা ইউরেনাস ও গাইয়ার সন্তানরা পরিচিত ছিলেন টাইটান নামে। তেমনই এক টাইটান য়াপেটাস ও ক্লাইমেনের সন্তান ছিলেন প্রমিথিউস। সেই সূত্রে তিনিও ছিলেন টাইটান। ইউরেনাসকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেন তার কনিষ্ঠ সন্তান ক্রোনাস, নামান্তরে ক্রোনোস। মৃত্যুকালে ক্রোনোসকে অভিশাপ দিয়ে যান ইউরেনাস, তারও মৃত্যু ঘটবে নিজের সন্তানের হাতে। সে অভিশাপ পূর্ণতা পায়, যখন দশ বছরের যুদ্ধ শেষে টাইটান ক্রোনোসকে হত্যা করেন তার পুত্র জিউস। ক্রোনোসের বাকি সন্তানদের সহায়তায় টাইটানদের ক্ষমতাচ্যুত করে মাউন্ট অলিম্পিয়ায় দেবত্বের সিংহাসন দখল করেন, অলিম্পিয়ান নাম নিয়ে। প্রমিথিউস আগুন চুরি করে তুলে দিয়েছিলেন মানুষদের হাতে, সেই দোষে জিউস তাঁকে শাস্তি দেন, এটুকু জানি। কিন্তু চুরির পেছনের কারণটা জানি না।”
“প্রমিথিউস এবং আরও কিছু টাইটান ছিলেন, যারা অলিম্পিয়ান আর টাইটানদের যুদ্ধে সরাসরি ভাগ নেননি। ফলে অলিম্পিয়ানরা তাদের শত্রুর নজরে দেখতেন না। পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টির পরে অলিম্পিয়ান দেবতারা দুই টাইটান ভাই এপিমিথিউস আর প্রমিথিউসকে দায়িত্ব দেন, মানুষ এবং অন্যান্য সমস্ত প্রাণীর কাছে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ কিছু গুণাগুণ পৌঁছে দিতে। এপিমেথিউস শুরু করেন মনুষ্যেতর প্রাণীদের দিয়ে। কাউকে দেন শক্তি, কাউকে গতিবেগ, কাউকে ডানা, কাউকে বা নখ, বা বর্মের সুরক্ষা। সবাইকে সব কিছু দিয়ে দেওয়ার পরে মানুষকে দেওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না তার কাছে। প্রমিথিউস যখন দেখলেন মানুষের জন্য কিছুই আর বেঁচে নেই, এবং এর অবর্তমানে মানুষের পক্ষে পৃথিবীতে টিকে থাকা দুষ্কর হবে, তখন তিনি গোপনে গেলেন দেবতাদের বাসস্থান অলিম্পিয়ায়। শিল্প ও ধাতুবিদ্যার দেবতা হেফাস্টাসের কর্মশালা থেকে চুরি করে আনলেন পবিত্র আগুন, পৌঁছে দিলেন মানুষের কাছে। এই চুরির অপরাধে জিউস তাকে সারা জীবনের মতো শাস্তি দিয়েছিলেন। অসহায় টাইটান বাঁধা পড়ে থাকতেন পাথরের সঙ্গে। জিউসের ঈগল প্রতিদিন ঠুকরে-ঠুকরে খেত জীবন্ত প্রমিথিউসের যকৃৎ, প্রতি রাতে তা আবার পূর্ণ রূপ পেত। এই শাস্তি চলেছিল ততদিন, যতদিন না মহাবীর হেরাক্লিস এসে সেই ঈগলকে বধ করে তাকে মুক্ত করেন।”
“কিন্তু ফিডিয়াসের সম্বন্ধে চুরির যা অপবাদ, তার সবটাই তো এথেনা পার্থেনস সংক্রান্ত। জিউসের মূর্তি তৈরি নিয়ে তো এমন কোনও অপবাদ ছিল না তাঁর নামে? তাহলে প্রমিথিউসের সঙ্গে তুলনা কীসের?” প্রশ্ন ছুড়ে দিল দিতি।
উত্তর দিলেন না সুইনবার্ন। কিন্তু পরের দিন বিকেলে যখন চ্যাটরুমে এসে ভিডিও চালু করলেন, রীতিমতো উৎফুল্ল দেখাচ্ছে তাঁকে।
“বুঝলে দিতি, খুব কাজে এসেছে তোমার শেষ প্রশ্নটা। কাল রাতে পড়াশোনা করতে-করতে অনেকটা এগিয়ে গেছি এই ব্যাপারটা নিয়ে। এটা একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ অ্যাঙ্গল হতে পারে আমাদের খোঁজার ব্যাপারে। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের বিখ্যাত গ্রিক ভৌগোলিক পাউসনিয়াসের সময়ের কিছু নথি সংরক্ষিত আছে এথেন্সের ন্যাশনাল আর্কিওলজিকাল মিউজিয়ামে, সাধারণের নজরের বাইরে। পাউসনিয়াসের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রমিথিউসের অনুগামীরা তাঁর নামে একটি গোপন কাল্টের স্থাপনা করেন, এবং সেই কাল্টের কেন্দ্রবিন্দু ছিল থিবেস। আর রাজনৈতিক ভাবে থিবেস ছিল এথেন্সের শত্রুপক্ষ। সুতরাং ফিডিয়াস যদি গোপনে প্রমিথিউসের অনুগামী হয়ে থাকেন, অর্থাৎ প্রকারান্তরে জিউস বা এথেনার মতো অলিম্পিয়ান দেবতাদের বিরুদ্ধাচারী, তাহলে এথেন্সের যথেষ্ট কারণ থাকে সেই অপরাধের ফলস্বরূপ ফিডিয়াসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার। ‘আগুন চুরির হিসেবনিকেশ, হেমলকের দামে।’— একেবারে মিলে যাচ্ছে হিসেব।”
“না ক্যাথ।” দিতির স্বরে তখনও দ্বিধা, “একেবারে তো মিলছে না। ওই কিউবিট-ট্যালেন্টের হিসেবটা তো বাকি রয়ে গেল!”
“ওটার-ও সমাধান হয়ে গেছে, দিতি। আমার ধারণা, কিউবিট আর ট্যালেন্টকে এখানে ফিডিয়াস একটা প্রতীক হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। একটা বস্তুর দৈর্ঘ্য আর ওজন, দুটোর মধ্যে তো কোনও পারস্পরিক সম্পর্ক নেই। আমার মনে হচ্ছে, এটা ইংরেজি ভাষার ‘কাম হেল অর হাই ওয়াটার’-এর মতো একটা প্রবাদ। উনি বলতে চেয়েছেন, যা-ই ঘটে যাক না কেন, প্রমিথিউসকে আগুন-চুরির দাম হেমলক দিয়েই চোকাতে হবে। আর তার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন এথেনা পার্থেনসের সোনা চুরির অপবাদের প্রসঙ্গ। নাহ্— এই ধাঁধাটা আমরা সমাধান করে ফেলেছি দিতি। ফিডিয়াসের একটা সম্পূর্ণ নতুন দিক তুলে ধরেছে এই ধাঁধাটা। বাকি শুধু থিবেসের সঙ্গে ফিডিয়াসের যোগসূত্রটা খুঁজে বের করা। ইন ফ্যাক্ট, আমি ঠিক করেছি এই এক্সকাভেশনের সময়টা দু’সপ্তাহ এগিয়ে আনব। আগামী সোমবার থেকেই শুরু করব খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। যদি এথেন্স থেকে অনুমতি পাই, তাহলে হয়তো আমাকে দিন-তিনেক আগেই চলে যেতে হবে। সে-ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে টিমের পেপারওয়ার্কগুলোর দায়িত্ব আমি দিয়ে যাব আমাদের অফিস-সেক্রেটারি সুসানকে। সুসান খুবই বিশ্বস্ত, কিন্তু অতটা চটপটে নয়, তাই তোমাকে একটু সাহায্য করে দিতে হবে। পারবে না সামলে দিতে?”
সে অবশ্য সামলে দিল দিতি।
তুমুল ব্যস্ততার মধ্যে কাটল শেষ ক’টা দিন। সুইনবার্ন এথেন্স চলে যাওয়ার পরের দিনই এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল, যার ধাক্কায় শোকের ছায়া নেমে এসেছিল পুরো ডিপার্টমেন্টের ওপরে। ডক্টর স্নোপ আর বেরিয়ে আসতে পারেননি কোমা থেকে। এথেন্সে বসে খবরটা পেয়ে সুইনবার্ন এমনও বলেছিলেন, এবারের অভিযান বন্ধই করে দেবেন। কিন্তু সমস্ত টিকিট, বুকিং, ভিসা ইত্যাদি হয়ে গেছে, এক্সকাভেশনের স্থানীয় দল পৌঁছে গেছে অলিম্পিয়ায়, এখন পিছিয়ে আসা মানে বিপুল আর্থিক ক্ষতি, এবং তার ওপর চ্যানেলের সঙ্গে চুক্তির কথা ভেবে শেষ অবধি সে-ভাবনা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন।
এবং এত মনখারাপের মধ্যে খুশির কথা এই যে, একেবারে ধূমকেতুর মতো শেষ মুহূর্তে এসে হাজির হয়েছে য়ুরি। গত দুটো এক্সকাভেশনে সে-ই ছিল ক্যামেরার দায়িত্বে। এবারেও প্রথম থেকে তার ইচ্ছে ছিল অভিযানের সঙ্গে থাকার, কিন্তু ইউনিভার্সিটির সম্মতি ছিল না। কিন্তু ইন্টার্ন-নির্বাচন বাতিল হয়ে যাওয়ার পরে একেবারে শেষ মুহূর্তে সে আবার ক্যাথকে ফোন করে জানায়, দু’সপ্তাহের ছুটি সে জোগাড় করতে পেরেছে, সুতরাং ক্যাথ যদি তার ফ্লাইট আর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন তাহলে বাকি কাজটা সে বিনা পয়সায় উতরে দিতে রাজি। ইন্টার্ন নেওয়ার খরচ বেঁচে যাওয়াতে ক্যাথ আর আপত্তি করেননি। সরাসরি অলিম্পিয়ায় এসে দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছে য়ুরি।
এথেন্স থেকে পিরগোস হয়ে কেটিইএলের বাস যখন অলিম্পিয়ার বাস স্টেশনে নামিয়ে দিল দিতিকে, ঘড়িতে তখন বিকেল প্রায় চারটে। স্কুল-কলেজের ছুটি শুরু হয়নি এখনও, ফলে বিকেলের শেষ বাসে ট্যুরিস্টদের ভিড় প্রায় ছিল না বললেই চলে। টিকিট অফিসটির কাউন্টারের জানলা বন্ধ, একটি বাদে বাকি দোকানগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। বৃদ্ধ দোকানির কাছ থেকে দিতি কিনে নিল দু’লিটারের দুটো জলের বোতল, স্যান্ডউইচ আর শুকনো গ্রিক মিষ্টি বাকলাভা— অনেকটা দেশের বালুশাই-এর মতো স্বাদ।
হার্মিস হোটেলে রিজার্ভেশন করিয়ে রেখেছিল দিতি, মূলত দু’টি কারণে। প্রথমত, হোটেল থেকে অলিম্পিয়ার সাইট হাঁটা-পথে দশ মিনিটের রাস্তা। আর দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ, কম দাম। এই যাত্রার খরচ এখনও অবধি নিজের পকেট থেকেই যাচ্ছে তার।
কিন্তু এই মুহূর্তে খরচ নিয়ে একেবারে মাথাব্যথা নেই দিতির। তার মাথা জুড়ে রয়েছে সুইনবার্ন।
গত শুক্রবারের কথা। এথেন্স থেকে ফোন করে সুইনবার্ন জানিয়েছিলেন, শেষ মুহূর্তে য়ুরির দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
“আমাদের এক্সকাভেশনের গ্ৰুপ ইন্স্যুরেন্সের লিস্টে ওর নাম ঢোকাতে হবে, আর সে-জন্য ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে জানাতে হবে ওর গত ছ’মাসের সব বিদেশ-ভ্রমণের বৃত্তান্ত। আমি ওকে বলেছি ওর পাসপোর্টের সব-ক’টা পাতা স্ক্যান করে আমাকে পাঠাতে। পেলেই তোমাকে ই-মেইল করে দেব। তুমি ওর ট্রাভেল রেকর্ডটা আপডেট করে সুসানকে পাঠিয়ে দিয়ো।”
রবিবার লাঞ্চের পর মেইলবক্স খুলল দিতি। ফ্লাইটের টিকিটের কপি, আর তার সঙ্গে য়ুরি ড্রাগোনভের পাসপোর্টের কপি মেইলবক্সে এসে পৌঁছেছে আজ সকালে। অভ্যস্ত আঙুলে একটা এক্সেল ওয়ার্কশিট খুলে পাসপোর্টের ভিসার ছাপগুলো থেকে একটা-একটা-করে দেশের নাম, এবং ইমিগ্রেশনের তারিখগুলো এন্ট্রি করতে শুরু করল দিতি।
রাশিয়ান ইমিগ্রেশনের সব-ক’টি ছাপই সেন্ট পিটার্সবার্গের পুলকোভো এয়ারপোর্টের। প্রতিটি বিদেশ-ভ্রমণ পিছু দু’টি করে স্ট্যাম্প— একটি বেরোনোর, অপরটি ফেরার। বিদেশের ইমিগ্রেশন বলতে ইস্তাম্বুলের একজোড়া ছাপ, থাকার মেয়াদ চার দিনের। আর দু’জোড়া ছাপ সোফিয়ার। প্রথম জোড়ার মধ্যে পার্থক্য পাঁচ দিনের। পরের জোড়া দু’সপ্তাহের।
এবং শেষ ছাপটি লন্ডনের হিথরো এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনের। তারিখ গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবারের। আজ থেকে দশ দিন আগের।
পৃথিবীর কিছু-কিছু দেশ, তাদের দেশ থেকে বেরোনোর সময় পাসপোর্টে ইমিগ্রেশনের ছাপ মারার নিয়ম বন্ধ করেছে, সে-কথা মনে ছিল দিতির। ইউকে-র ইমিগ্রেশন তাদের অন্যতম। তাই য়ুরির পাসপোর্টে হীথরোর এক্সিট স্ট্যাম্প না দেখে সে অবাক হল না। অবাক হল এ-কথা ভেবে, যে মাত্র দশ দিন আগে ইংল্যান্ডে এসে ঘুরে যাওয়া সত্ত্বেও য়ুরি তার ডিপার্টমেন্টে এসে তার প্রফেসরের সঙ্গে দেখা করেনি। সেই প্রফেসর, যার সঙ্গে এক্সকাভেশনে যেতে সে এত ব্যাকুল!
না কি, দেখা করেছিল? সুইনবার্ন লুকিয়ে গেছেন সে-কথা?
কিন্তু, লুকিয়েই যদি যাওয়ার ছিল, তাহলে কি সুইনবার্ন এই পাসপোর্টের তাড়া দিতির কাছে পাঠাতেন?
নাহ্, এ-সব ভেবে মাথা খারাপ করবে না দিতি। নিজের কাজটুকু শেষ করে ভালোয়-ভালোয় বেরিয়ে আসবে এই দায়িত্ব থেকে।
ফ্লাইট টিকিটের কপিটা খুলে দেখল দিতি। এরোফ্লোটের ইকনমি ক্লাস টিকিট, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে এথেন্স। শনিবার গভীর রাতের ফ্লাইট, প্রথমে মস্কো। সেখানে সাত ঘণ্টার বিরতির পরে সকাল আটটায় আবার উড়ান। এথেন্স পৌঁছবে দুপুর বারোটায়।
আউট-অফ-প্লেস। খটকার কড়া খটখট করে নড়ে উঠল দিতির মগজের ভেতরে। সুইনবার্নের মেলটা খুলে দেখল আবার। তার নিচে য়ুরির মেল, আর সে-মেল পাঠানোর সময় আজ সকাল সাতটা। হিসেব-মতো সে-সময় য়ুরির বসে থাকার কথা মস্কো এয়ারপোর্টে। এথেন্সগামী ফ্লাইটের অপেক্ষায়।
হয়তো এয়ারপোর্টে বসে, হয়তো বা এয়ারপোর্টের ওয়াইফাই সিগন্যাল ব্যবহার করেই গত ছ’মাসের বিদেশভ্রমণের যাবতীয় বৃত্তান্ত স্ক্যান করে পাঠিয়ে দিয়েছে য়ুরি ড্রাগোনভ। কিন্তু মস্কো এয়ারপোর্টে বসে নয়।
কারণ, হিসেবমত, এথেন্সগামী বিমানে চড়ার আগে য়ুরি ড্রাগোনভের ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স হওয়ার কথা মস্কোতে। সেন্ট পিটার্সবার্গে নয়। আর য়ুরির পাসপোর্টে গতকাল রাত বা আজ ভোররাতের মস্কো এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনের কোনও স্ট্যাম্প নেই। এমন কি পুলকোভো এয়ারপোর্টেরও নয়।
নিজের প্রাইভেট সিম চালু করে সুইনবার্নকে ফোন করল দিতি।
“হ্যালো, ক্যাথ...”
সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে ঠান্ডা মাথায় উত্তর দিলেন সুইনবার্ন, “য়ুরির অলিম্পিয়ায় এসে পৌঁছনোর কথা আজ রাতে। ও যে দশ দিন আগে ইউকে ঘুরে গেছে সে-কথা আমাকে বলেনি। দেখি, এখানে এসে নিজে থেকে কিছু বলে কি না। তুমি ওর রেকর্ডগুলো সুসানকে পাঠিয়ে দাও, যেমন বলেছি। আর শোনো, খুব চমকে দেওয়ার মতো কিছু তথ্য পেয়েছি এথেন্সের মিউজিয়াম থেকে,পাউসনিয়াসের ভ্রমণবৃত্তান্তের মধ্যে। তোমাকে ইমেলে পাঠাচ্ছি। দিতি— উই মাইট বি অন টু সামথিং বিগ। খুব সাবধানে সামলে রেখো এই খবরটা।”
চমক লাগিয়ে দিল সুইনবার্নের আবিষ্কৃত নতুন তথ্য।
“ফিডিয়াসের মৃত্যুর চার বছর পরে আরও একবার পাল্টে যায় গ্রিসের রাজনৈতিক পাশা। স্পার্টার পক্ষ ছেড়ে এলিস যোগ দেয় এথেন্সের সঙ্গে। ৪২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ‘ব্যাটল অফ স্ফ্যাক্টেরিয়া’-য় এথেন্স আর এলিসের মিলিত শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে স্পার্টা। আর সেই জয়কে স্মরণীয় করে রাখতে অলিম্পিয়ায় একটি নতুন মূর্তির স্থাপনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গ্রিক পুরাকথার যুদ্ধজয়ের দেবী নাইকির একটি মার্বলের মূর্তি।
ফিডিয়াসের প্রিয় ছাত্রদের অন্যতম ছিলেন পাইওনিওস। ফিডিয়াসের সঙ্গেই তাঁর ওয়ার্কশপে কাজ করেছিলেন তিনি। গুরুর মৃত্যুর বছর চারেক পরে, ৪২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি দায়িত্ব পান দেবী নাইকির মূর্তি তৈরির। আর ঠিক সেই সময়েই জিউসের মন্দিরের বাইরের ত্রিকোণ চূড়োয়, যাকে গ্রিকরা বলতেন ‘পেডিমেন্ট’, তার ওপরে পাথরের কারুকাজ করার জন্য শিল্পী নিয়োগের প্রতিযোগিতা চলছিল। পাইওনিওস যোগ দেন সেই প্রতিযোগিতাতেও, এবং বিজয়ী হন। ফলে ৪২৫ থেকে ৪২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ, এই টানা পাঁচ বছর, নাইকির মূর্তি তৈরি এবং স্থাপনার কাজ শেষ না হওয়া অবধি জিউসের মন্দির চত্বর এবং মূল মন্দিরের দরজা তাঁর জন্য ছিল অবারিত।
নাইকির মূর্তির পায়ের নিচে উৎকীর্ণ ছিল স্ফ্যাক্টেরিয়ার যুদ্ধজয়ের কথা। আর তার নিচে, খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই লেখা ছিল আরও একটি লাইন, অন্তত যেমনটি পাউসনিয়াস দেখেছিলেন—

—দেবী নাইকি
‘দেবীর সদাজাগ্রত দৃষ্টি বর্ষিত হোক আমার প্রভুর দেওয়া দায়িত্বের প্রতি।’
আকাশপথে নেমে আসা নাইকি-র মূর্তিটি দাঁড়ানো ছিল একটি পিলারের ওপর। পিলার সহ মূর্তিটির আনুমানিক উচ্চতা ছিল প্রায় বারো মিটার। ছ’মিটার উঁচু পিলারের ওপর আরও ছ’মিটারের দীর্ঘাঙ্গী দেবীমূর্তি। যোদ্ধৃসুলভ সুঠাম দৃঢ়তার সঙ্গে লাবণ্যের এক অপূর্ব সহাবস্থান। আকাশপথে উড়ে এসে দেবী লঘু পায়ে নামছেন মাটিতে, পায়ের কাছে তাঁর বাহন ঈগল। সুদূর পারোস দ্বীপ থেকে আনা পারিয়ান মার্বলে এতটাই সূক্ষ্মভাবে সে মূর্তির রূপ ফুটিয়ে তুলেছিলেন পাইওনিওস, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে মনে হত, যেন হাওয়ায় কেঁপে উঠছে দেবীর উর্ধ্ববাস।
এই মূর্তিটির স্থাপনার জন্য পাইওনিওস যে জায়গাটি বেছে নিয়েছিলেন সেটি জিউসের মূল মন্দিরের বাইরে, বাঁ-দিকে, প্রায় দশ মিটার দূরত্বে। নাইকি-র মুখ ফেরানো ছিল মন্দিরের ‘প্রোনাওস’, অর্থাৎ পোর্টিকো-র দিকে।
অলিম্পিয়ায় পাইওনিওস যে-দু’টি কাজের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তার একটি ছিল দেবী নাইকি-র মূর্তি, অপরটি জিউসের মন্দিরের বাইরের সৌন্দর্যসাধন। এমনটি হতেই পারে, তাঁর কাজ শেষ করার পরে তিনি নিজেই প্রার্থনা করেছিলেন, যাতে দেবী নাইকি তাঁর কৃপাদৃষ্টি দিয়ে আগলে রাখেন পাইওনিওসের ওপর তাঁর প্রভুর ন্যস্ত দায়িত্বকে। কিন্তু কার দেওয়া দায়িত্ব? কোন সে প্রভু?
দিতি, আমার বিশ্বাস, এর ভেতরেই লুকোনো আছে ফিডিয়াসের ধাঁধার উত্তর। কাল আমাদের এক্সকাভেশন শুরু হবে। প্রথম সুযোগেই এখানে খোঁড়া শুরু করব। যদি প্রয়োজন হয়, তোমাকে খবর পাঠাব, চলে এস। খরচের ব্যাপারে চিন্তা কোরো না।”
সেদিন ছিল রবিবার। তার পরে তিন দিন কোনও খবর ছিল না সুইনবার্নের, শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় য়ুরি তার ইউটিউব লিংক আপলোড করা শুরু করেছিল। বুধবার রাতে সুইনবার্নের একটা টেক্সট মেসেজ আসে দিতির ফোনে।
“ইটস আ ব্ল্যাঙ্ক। কিছু পাওয়া যায়নি। কাম শার্প।”
সেই মেসেজের পরিণতিতেই দিতি আজ অলিম্পিয়ায়।
মেসেজটা পেয়েই আসার টিকিট কেটে ফেলে দিতি। মাঝের একটা দিন বাদ দিয়ে শুক্রবার ভোরের ফ্লাইট। সেই মতো জানিয়েও দেয় সুইনবার্নকে।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছে খেয়াল নেই, হোটেলের ফোনের কর্কশ রিং-এ ঘুম ভাঙল দিতির। ধড়মড় করে উঠে এসে ঘড়ি দেখল। সাতটা বাজতে দশ। তার মানে ঘুমিয়েছে মাত্র ঘণ্টা-দেড়েক।
সস্তার হোটেল হলে যা হয়, ফোনটা টিভি ক্যাবিনেটের পাশে, দেওয়ালে ঝোলানো। বিছানা ছেড়ে উঠে যেতে-যেতে পর্দা সরিয়ে দেখল দিতি। আকাশে তখনও শেষ বিকেলের আলো।
“হ্যালো?”
“দিতি চান্দ্রা! ওয়েলকাম টু অলিম্পিয়া!”
“কে বলছেন?” মুহূর্তে স্নায়ু টানটান হয়ে গেল দিতির।
“ইউ আর আ স্টাবর্ন লেডি দিতি চান্দ্রা! বাট অলসো স্মার্ট। ভেরি স্মাৰ্ট। সুইনবার্ন পিকড আ গুড ইন্টার্ন।”
“কে আপনি? কী চান?” নিজের গলাকে যতটা সম্ভব বশে রেখে প্রশ্ন করল দিতি।
“তোমার হোটেল থেকে অলিম্পিয়ার আর্কিওলজিক্যাল সাইট দশ মিনিটের হাঁটা পথ। সন্ধে আটটায় বন্ধ হয় সাইট, টিকিট বিক্রি শেষ হয় তার পনেরো মিনিট আগে। সাড়ে সাতটার মধ্যে টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে আসবে। হেরার মন্দির থেকে বাঁ-দিকে বেঁকে মেট্রোয়ামের মন্দির। মন্দির পেরোতেই বাঁ-হাতে পর-পর অনেকগুলো ভাঙা পাথরের বেদী। ছ’নম্বর বেদীর সামনে গিয়ে অপেক্ষা করবে। টিকিট কাউন্টারেই ম্যাপ পেয়ে যাবে, চিনতে অসুবিধা হবে না। খালি হাতে আসবে, জাস্ট ক্যারি ইওর ফোন। অ্যান্ড নো স্মার্ট ট্রিক্স। ইউ আর বিয়িং ওয়াচড। বি দেয়ার বাই সেভেন ফর্টি।”
“আমি যদি না যাই? আপনি বলছেন না কেন, কে আপনি?”
“একবার কথা শোনোনি। সে-বার ছিলে নিজের ইউনিভার্সিটির মধ্যে। আর এবার বিদেশে-বিভুঁইয়ে। দ্বিতীয়বার অবাধ্য হওয়ার ভুল কোরো না। এই নাও— শোনো...”
ফোনের ওপাশে একটা গভীর শ্বাসের শব্দ শোনা গেল। তারপর, খুব ধীরে-ধীরে, যেন বহুদূর থেকে ভেসে এল সুইনবার্নের ক্লান্ত গলা, “আয়েম সরি দিতি... প্লিজ় ফলো হিস অর্ডারস, না হলে...”
একটা চড়ের শব্দ, একটা আর্তনাদ, তার সঙ্গে-সঙ্গেই খুট করে কেটে গেল ফোনটা।
মেট্রোয়ামের মন্দিরের পরেই সার দিয়ে দাঁড়-করানো পাথরের বেদীগুলো এখন দেখলে বোঝা যায় না, এককালে এগুলো ছিল দেবরাজ জিউসের সারি বাঁধা ব্রোঞ্জ মূর্তির ভিত্তি। প্রাচীন অলিম্পিকের ‘আনফেয়ার প্লে ট্রফি’। প্রতিটি অসৎ প্রচেষ্টা পিছু একটি করে মূর্তি। অলিম্পিকের পবিত্র নিয়ম ভাঙত যে-সব প্রতিযোগীরা, তাদের জরিমানার অর্থ দিয়ে তৈরি হত এই-সব মূর্তি। আর মূর্তির পাথরের ভিতের ওপর খোদাই করে দেওয়া হত সেই প্রতিযোগীদের আর তাদের রাজ্যের নাম, যাতে তাদের দেখে পরবর্তীকালের প্রতিযোগীরা সাবধান হতে পারে।
এই দৈব সাবধানবাণী সত্ত্বেও নয়-নয় করে ষোলোটি ব্রোঞ্জের মূর্তি জমা হয়েছিল এই পবিত্র দেবভূমিতে। মূর্তিগুলো এখন তলিয়ে গেছে সময়ের গর্ভে, পড়ে রয়েছে শুধু ষোলোটি পাথরের বেদী। মানুষের অদম্য জিগীষার তাড়নার সাক্ষী হয়ে।
তারই ছ’নম্বরটির সামনে যখন এসে দাঁড়াল দিতি, ঘড়িতে তখন সাতটা পঁয়ত্রিশ।
চারদিক একেবারে শুনশান। যে-ক’জন ট্যুরিস্ট ঘুরতে এসেছে, তারাও দিনের বেড়ানো শেষ করে গুটি-গুটি ফিরে গেছে হোটেলের আশ্রয়ে। এতক্ষণ খেয়াল ছিল না, এইবারে খিদেটা চাগাড় দিচ্ছে আস্তে-আস্তে। ভাগ্যিস বেরোবার আগে ব্যাকপ্যাক থেকে বের করে নিয়েছিল স্যান্ডউইচ-বাকলাভা আর...
“দিতি?”

—অলিম্পিয়ার মানচিত্র
তিন বা চার নম্বর পিলারের পেছন থেকে যে বেরিয়ে এসে দিতির পাশ দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল, সুইনবার্নের পাঠানো পাসপোর্ট-কপির কল্যাণে তার মুখ দিতির চেনা। য়ুরি ড্রাগোনভ।
দিতি নিজে প্রায় সাড়ে পাঁচ ফিটের, কিন্তু য়ুরিকে দেখার জন্য তাকেও ঘাড় বাঁকাতে হল বেশ খানিকটা। অন্তত সাড়ে ছয়। রোগাটে গড়ন, ছোট করে ছাঁটা ব্লন্ড চুল, পরনে ফেডেড ডেনিম আর ধূসর উইন্ডচিটার— তার ওপরে ‘ডিগিং উইথ ক্যাথ’-এর লোগো। মুখে নিপাট ভালোমানুষের ছাপ, যেটা বোধ করি একটা ক্রিমিন্যালের সবচেয়ে বড় মূলধন।
তবে মুখে যতই ভালোমানুষির ছাপ থাকুক, সৌজন্য দেখানোয় সময় নষ্ট করল না য়ুরি। সোজা সামনে এসে দাঁড়িয়ে দুটো হাড়গিলে হাতের শক্ত আঙুলে দিতির দুটো কাঁধ চেপে ধরে এক ঝটকায় তাকে ঘুরিয়ে দিল একশো আশি ডিগ্রি। তারপর অভ্যস্ত হাত বুলিয়ে দিল দিতির জ্যাকেট আর জিনসের ওপর দিয়ে— পুলিশের পরিভাষায় প্যাট-ডাউন সার্চ করে জ্যাকেটের ডান পকেট থেকে বের করে নিল ফোনটা।
“বাঁ-পকেটে কী?”
“খাবার... লাঞ্চ করা হয়নি আসলে...”
“ওকে, মুভ।” বলে প্রায় ঘাড়ে ধরেই ওকে আবার পেছন ফেরাল য়ুরি, তারপর ঠেলে নিয়ে চলল ষষ্ঠ আর সপ্তম ভিত্তিপাথরের মাঝের ফাঁক দিয়ে। সামনে খানিকটা অবিন্যস্ত ঝোপঝাড় পেরিয়ে নিচু পাথরের দেওয়াল, সেটা টপকে যেতেই সামনে চোখে পড়ে পাইনে-ছাওয়া ক্রনোস হিল। অলিম্পিয়ার উত্তর সীমান্তের প্রহরী এই টিলাটির নামকরণ হয়েছিল দেবরাজ জিউসের জন্মদাতা, টাইটান ক্রনোসের নামে। ওখানেই নিয়ে যাচ্ছে কি, দিতিকে?
না, ক্রনোস হিল নয়। তার পায়ের কাছে পাথরের তৈরি টানা এক সারি ঘরের ধ্বংসাবশেষের দিকে দিতিকে ঠেলে নিয়ে চলল য়ুরি। গতবার অলিম্পিয়ার স্টেডিয়াম দেখতে আসার সময় দূর থেকে গাইড দেখিয়েছিলেন বটে। পাথরের তৈরি এই একতলা ঘরগুলোর বেশির ভাগই বয়সে জিউসের মন্দিরের চেয়েও পুরোনো। দূর-দূরান্তের গ্রিক কলোনিগুলো যে অর্ঘ্য পাঠাত দেবভূমি অলিম্পিয়ায়, সেগুলো সঞ্চিত থাকত তাদেরই নিজস্ব মালিকানার অধীনে, এ-রকম এক-একটি ঘরে। আক্ষরিক অর্থেই তাদের নাম ছিল ‘থিসাভ্রোস’— ট্রেজারি বা কোষাগার।
বাঁ-হাতে তাদের রেখে চলতে-চলতে প্রায় শেষ মাথায় পৌঁছে সে-রকমই একটা ট্রেজারির ছাদহীন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিতিকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল য়ুরি।
আন্দাজ পনেরো ফিট বাই দশ ফিটের একটা বারান্দা পেরিয়ে একটা পাথরের দেওয়াল, তাতে দরজার জায়গায় ফিটচারেক চওড়া আর এক-মানুষ উঁচু একটা ফাঁক। ভেতরে আর একটা ঘর, সম্ভবত সেটাই ট্রেজারির মূল ঘর। চওড়ায় সেই পনেরো ফিট, কিন্তু আসন্ন সন্ধের ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে দিতির মনে হল, লম্বায় প্রায় তার দ্বিগুণ। মাথার ওপরের ছাদ ধ্বসে গেছে কালের গর্ভে। বাইরে দূরে-দূরে স্ট্রিটলাইট, তারই একটা থেকে একফালি আলো এসে পড়েছে ট্রেজারির ভেতরঘরে। তাতে আলোর চেয়ে অন্ধকারটাই জোরদার হয়েছে বেশি। আলো-আবছায়ায় দেখা যাচ্ছে, ঘরের কোনায় খুলে বিছিয়ে রাখা একটা ফিল্ড-টেন্ট। ভেতরে মেঝেতে একটা ম্যাট্রেস পাতা, তার ওপরে একটা স্লিপিং ব্যাগ।
রুক্ষ পাথরের মেঝের ওপর দিয়ে লম্বা-লম্বা পা ফেলে দিতিকে নিয়ে ঘরের কোনায় পৌঁছে গেল য়ুরি। ডান হাত দিতির ঘাড়ে রেখেই বাঁ-হাত বাড়িয়ে জ্বালিয়ে দিল একটা পোর্টেবল ল্যাম্প। অর্ধগোলাকৃতি শেডটি এমনভাবে বাঁকিয়ে রাখা, যাতে সবটুকু আলো এসে পড়ল কেবল ম্যাট্রেসের ওপর। ইশারায় দিতিকে ওর ওপরে গিয়ে বসতে বলল য়ুরি।
“আই’ল কিপ দিস শর্ট, ওকে? ফিডিয়াসের সিক্রেট আমার চাই। তোমার ভার্চুয়াল ইন্টার্নশিপ, সক্রেটিস, গর্গিওস, প্যারামিনোস জাহাজের প্যাপিরাস স্ক্রোল, পাউসনিয়াস, নাইকির স্ট্যাচু, পাইওনিওসের গোপন ইঙ্গিত— এ-সব আমার জানা। তোমার প্রফেসর এখন আমার হেফাজতে। সব করেছে, কিন্তু শেষ কোডটা ক্র্যাক করতে পারছে না। নাইকির স্ট্যাচুর মধ্যে নাকি ইঙ্গিত আছে জিউসের মন্দিরের ভেতরে কোনও গোপন জায়গার। কিন্তু সে-সব দেখা হয়ে গেছে, সব ফক্কা। এখন জানি না, তোমার প্রফেসর সত্যিই পারছে না, না কি নাটক করছে। সে-জন্যই তোমাকে নিয়ে আসা হয়েছে। আজকের রাতটা সময় দেওয়া হচ্ছে তোমাদের। যেমন করে পারো সমাধান করো, খুঁজে দাও ফিডিয়াসের সিক্রেট, তারপর আমি হাওয়া হয়ে যাব এখান থেকে। তোমরা এক্সকাভেশন করতে থাকো। কিন্তু যদি বেফাঁস কিছু করার চেষ্টা করো, প্রথমে যাবে তুমি, তার পরে যাবে তোমার প্রফেসর। মাথায় রেখো, অলিম্পিয়ার এই সাইটের ভেতরে রাতে গার্ড প্রায় থাকেই না, যতটুকু যা থাকার তা ওই বাইরের গেটে। ক্রনোস হিলের জঙ্গলের ভেতরে দুটো লাশ পড়ে থাকলে কেউ খুঁজেও পাবে না। নেকড়ে আর শেয়ালের দল ক’দিনের মধ্যেই তাদের কাজ শেষ করে দেবে। ক্লিয়ার?”
য়ুরির কথা বলার ফাঁকে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিল দিতি। সুইনবার্নের সঙ্গে যোগাযোগ করাটা খুব দরকার এই মুহূর্তে। ফোনটা যদি পাওয়া যেত...
“ইয়ে... ক্যাথ কোথায়? আসলে, উনি এথেন্স আসার পর থেকে ওঁর যা-যা রিসার্চ ছিল, তার ডিটেল তো আমার কাছে নেই। আর এখনও অবধি আমি যতটুকু যা করেছি, ওঁর সঙ্গে কথা বলেই করেছি। আমাকে ওঁর কাছে নিয়ে চলুন, আমরা একসঙ্গে কাজ করলে নিশ্চয়ই সমাধান পাওয়া যাবে।”
“এ-ব্যাপারে আমি কোনও ভাবেই নেগোশিয়েট করছি না তোমার সঙ্গে। তোমাদের দু’জনের এক-সঙ্গে এক-জায়গায় থাকাটা আমার পক্ষে ঝুঁকির। তোমার বিছানার পাশে একটা ফোল্ডার রাখা আছে। সুইনবার্ন এথেন্সের মিউজিয়াম থেকে কী-কী সূত্র পেয়েছে, তার সব ডিটেল রয়েছে ওখানে। আর একটা ট্যাবও দেওয়া রইল, উইথ ডেটা কানেকশন। সুইনবার্ন আর আমার নম্বর সেভ করা আছে ওতে। ওকে ফোন করো, প্রয়োজনে নেট সার্ফ করো, কিন্তু কাল সকালের আগে আমার সলিউশন চাই। আর হ্যাঁ, এই ট্যাবে ট্র্যাকার ইনস্টল করা আছে। কোথায় ফোন করছ, কোন সাইট সার্ফ করছ, সব রিপোর্ট আমি পাব আমার ফোনে। কোনওরকম চালাকি করার চেষ্টা করলে, মাথায় রেখো, ইটস জাস্ট এ ম্যাটার অফ টু বুলেটস।”
“আর যদি এর মধ্যে কোনও গার্ড চলে আসে এখানে? কী বলব আমি? আমার তো ট্যুরিস্ট টিকিট, এতক্ষণে বেরিয়ে যাওয়ার কথা।”
পকেট থেকে একটা কর্ড-লাগানো ট্যাগ বের করে ছুড়ে দিল য়ুরি। অলিম্পিয়ার সরকারি পরিচয়পত্র। পাশে দিতির ছবি।
“তোমার টেম্পোরারি পাস। এক্সকাভেশনের স্টাফদের অনুমতি রয়েছে প্রয়োজনে সন্ধ্যা অবধি কাজ করার। আর এটা সুইনবার্নের নিজের টেন্ট। ওঁর তো প্রয়োজনে এখানে রাত্রে থাকারও অনুমতি আছে, তাই আলো জ্বলতে দেখলেও কেউ আসবে না। এমনিতেও গার্ডরা বিশেষ আসে না এদিকে, আর এলেও আমার নজর থাকবে। নাও— গো টু ওয়ার্ক। ন’ঘণ্টা সময় আছে তোমার।” বলতে-বলতে পেছন ফিরল য়ুরি।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্যাট্রেসের ওপর আসনপিঁড়ি হয়ে বসল দিতি। একটু সতর্ক হওয়া উচিত ছিল তার। সুইনবার্ন যখন মেসেজ করে আসতে বললেন অলিম্পিয়ায়, তার উচিত ছিল অন্তত একবার ওঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করা। যাক, এ-সব ভেবে লাভ নেই। বরং এখন একবার কথা বলা যাক সুইনবার্নের সঙ্গে। এটুকু তো অন্তত বোঝা যাচ্ছে, ফিডিয়াসের রহস্যের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাদের কোনও ক্ষতি করবে না য়ুরি।
কিন্তু নাহ্— পর-পর তিন বার ডায়াল করা সত্ত্বেও সুইনবার্নের ফোন বেজে গেল। কোনও উত্তর নেই। বাধ্য হয়ে ফোন রেখে ফোল্ডারটা হাতে তুলে নিল দিতি। একটি মাত্র এ-ফোর কাগজে হাতে লেখা সুইনবার্নের নোট, এথেন্স মিউজিয়ামের লাইব্রেরি থেকে পাউসনিয়াসের ভ্রমণকাহিনি ঘেঁটে উদ্ধার করা সূত্রের ভিত্তিতে তৈরি। সঙ্গে একটি ম্যাপ।
“নাইকির মূর্তির পায়ের নিচে উৎকীর্ণ ছিল স্ফ্যাক্টেরিয়ার যুদ্ধজয়ের কথা। আর তার নিচে, খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই লেখা ছিল আরও একটি লাইন, অন্তত যেমনটি পাউসনিয়াস দেখেছিলেন—‘দেবীর সদাজাগ্রত দৃষ্টি বর্ষিত হোক আমার প্রভুর দেওয়া দায়িত্বের প্রতি।’
পাউসনিয়াস যে প্রাচীন গ্রিক শব্দটি ব্যবহার করেছেন, সেটি হল ‘কিরিওস’, যার অর্থ প্রভু। সাধারণ অর্থে এলিসের রাজা। কিন্তু প্রাচীন গ্রিসে ‘কিরিওস’ শব্দের আরও একটি অর্থ হত। শিক্ষক বা গুরু। পাইওনিওসের গুরু, অর্থাৎ ফিডিয়াস।

—জিউসের মন্দিরের গ্রাউন্ড প্ল্যান
স্কুলে-পড়া ত্রিকোণমিতির শিক্ষা কাজে আসছে এইখানে। নিচের ম্যাপটা হচ্ছে জিউসের মন্দিরের ফ্লোর প্ল্যান।
মন্দিরের এক মাথা থেকে আর এক মাথা লম্বালম্বি প্রায় ষাট মিটার। বাঁ-দিকে মূল মন্দিরে ঢোকার দরজা, যার বাইরে বাঁ-হাতে দশ মিটার দূরে নাইকির মূর্তি। ভেতরে ঢুকে প্রথমে প্রোনাওস অর্থাৎ পোর্টিকো, তারপর নাওস অর্থাৎ গর্ভগৃহ, আর সব শেষে ওপিস্থডোমা, যার আক্ষরিক অর্থ ‘পিছনের ঘর’। এই নাওস, বা গর্ভগৃহেই স্থাপিত ছিল জিউসের মূর্তি।
নাইকির মূর্তির ভগ্নাবশেষ রাখা আছে অলিম্পিয়া মিউজিয়ামে, কিন্তু মূর্তিটির আকার থেকে তার মাথার এবং চোখের অবস্থানের একটা আন্দাজ করতে পেরেছি। দেবীর চোখের দৃষ্টি বরাবর যদি একটা সরলরেখা টানা যায়, সেই রেখা সোজা এসে পড়ে জিউসের মন্দিরের নাওস, অর্থাৎ গর্ভগৃহের সামনের অংশে। ঠিক সেই বিন্দুতে, পাউসনিয়াসের কথা অনুযায়ী যেখানে জিউসের বজ্র এসে আঘাত করেছিল ফিডিয়াসের আহ্বানে, ফাটিয়ে দিয়েছিল মেঝের একটা অংশ। ঠিক যেমনটি স্কেচ করে রাখলাম এখানে।
‘দেবীর সদাজাগ্রত দৃষ্টি বর্ষিত হোক আমার প্রভুর দেওয়া দায়িত্বের প্রতি।’— এ-কথার অর্থ, নাইকি-র মূর্তি এবং স্থাপনার পরিকল্পনা এমন ভাবেই করেছিলেন পাইওনিয়াস, যাতে দেবীর দৃষ্টি সর্বদা ন্যস্ত থাকে এই জায়গাটির ওপরে। আমার বিশ্বাস, এই সেই জায়গা, যেখানে লুকোনো আছে ফিডিয়াসের ধাঁধার উত্তর। কাল আমাদের এক্সকাভেশন শুরু হবে। প্রথম সুযোগেই এখানে খোঁড়া শুরু করব।”
এখানেই শেষ হচ্ছে ক্যাথের নোট। সঙ্গের ম্যাপটি জিউসের বেদীর সেই বিশেষ জায়গাটির বিশদ নকশা, দেওয়াল থেকে দূরত্ব মেপে আঁকা। এই নকশাটিই সুইনবার্ন ব্যবহার করেছিলেন তাঁর খোঁড়াখুঁড়ির জন্য। যা বোঝা যাচ্ছে, কিছুই পাওয়া যায়নি এখানে। কিন্তু কিছু না পাওয়াটাই কি সঙ্গত ছিল না? অলিম্পিয়ার এই অংশটার প্রতি ইঞ্চি ইঞ্চি খুঁড়ে দেখা হয়ে গেছে এতদিনে। যদি এখানে আদৌ কোনও গোপন কীর্তি লুকিয়ে রেখেও থাকেন পাইওনিয়াস, সে কি এতদিনে আবিষ্কার হয়ে পৌঁছে যায়নি কোনও মিউজিয়ামে? বিশেষ করে যখন জানাই যাচ্ছে না, কী ছিল সেই গোপন কীর্তি?
কিউবিট-ট্যালেন্টের সংকেতের আড়ালে কী হতে পারে সেই গোপন কীর্তি?
অন্যমনস্ক দিতি হাতে তুলে নিল য়ুরির রেখে যাওয়া ট্যাবটা। সার্চ উইন্ডোতে গিয়ে টাইপ করল— কিউবিট।
সার্চ রেজাল্টগুলো স্ক্রোল করতে-করতে হঠাৎ দিতির মনে হল, ট্রেজারির দরজা নামের ফাঁকটার সামনে থেকে যেন একটা ছায়া সরে গেল।
য়ুরি-ই হবে বোধহয়। নজর রাখছে, আড়াল থেকে।
রাত সাড়ে আটটা নাগাদ স্যান্ডউইচ আর একটা বাকলাভা খাওয়ার পরে খানিক মিটেছিল খিদেটা। ম্যাট্রেসের পাশে মেঝেতে ক’টা জলের বোতল রেখে গিয়েছিল য়ুরি। তার পর থেকে ঘণ্টা-তিনেক লড়ে গেছে দিতি। এবং অবিশ্বাস্য হলেও, একটা সম্ভাবনা ধীরে-ধীরে দানা বেঁধে উঠেছে তার মনে। আর্কিমিডিসের স্নানের টাবে নাব্যতা আবিষ্কার করার মতো ‘ইউরেকা’ মুহূর্ত নয়, বা নিউটনের গাছ থেকে আপেল পড়তে দেখে মাধ্যাকর্ষণ সূত্র আবিষ্কার করতে পারার মতো হঠাৎ-পাওয়া ভাবনাও নয়। তার ভিত্তি গাঁথা, বরফ-ঠান্ডা লজিক আর অঙ্কের মাটিতে।
‘আমার ধারণা, কিউবিট আর ট্যালেন্টকে এখানে ফিডিয়াস একটা প্রতীক হিসেবে ধরেছেন। একটা বস্তুর দৈর্ঘ্য আর ওজন, দুটোর মধ্যে তো কোনও পারস্পরিক সম্পর্ক নেই। আমার তো মনে হয় এটা ইংরিজির ‘কাম হেল অর হাই ওয়াটার’-এর মতো একটা প্রবাদ।’ এমনটাই বলেছিলেন ক্যাথ। কিন্তু যদি তা না হয়? এই ভাবনাটাকেই প্রশ্ন করতে শুরু করল দিতি।
প্রাচীন গ্রিসে দৈর্ঘ্যের মাপ ছিল কিউবিট। এক কিউবিট, মানে প্রায় আঠারো ইঞ্চি, অর্থাৎ দেড় ফিট। আর ট্যালেন্ট ছিল ওজনের হিসেব। আজকের মাপে প্রায় ছাব্বিশ কিলোগ্রাম।
এমন কোন বস্তুর কথা লিখে যেতে পারেন ফিডিয়াস, যার দৈর্ঘ্য যত কিউবিট, ওজন ঠিক তত ট্যালেন্ট? আর এই সংখ্যাটাই বা কত? এক? দশ? একশো? না এর মাঝামাঝি কিছু?
রাতের অন্ধকারে ফিডিয়াসের ওয়ার্কশপের দিক থেকে বয়ে আসা বাতাস দিতির কানে-কানে ফিসফিসিয়ে শুনিয়ে গেল তার উত্তর; যেখানে বসে আছ তুমি, সেখানে এককালে দূর-দূরান্তের গ্রিক নগর-রাজ্যগুলোর উপঢৌকন জমা রাখা হত। এক-একটি রাজ্যের এক-একটি নির্দিষ্ট কোষাগার। আসত দেবরাজ জিউস আর তাঁর মহিষী হেরার নামে উৎসর্গ হওয়া মূল্যবান দানসামগ্রী, হিরে, জহরত, আর অনন্য সব শিল্পকীর্তি। আর আসত সোনা।
সোনা!
চুয়াল্লিশ ট্যালেন্ট সোনা ব্যবহার করা হয়েছিল এথেনা পার্থেনসের মূর্তিতে। যে-মূর্তি তৈরির পরে ফিডিয়াসকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, নির্ধারিত সোনার অংশ আত্মসাৎ করার অভিযোগে। তবে কি তা থেকে খানিকটা সোনা সত্যিই সরিয়ে ফেলেছিলেন ফিডিয়াস? সরিয়ে ফেললে কতটা?
ফিডিয়াসের বিরুদ্ধে সোনা চুরির অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্র। সে-জন্যই কি নতুন করে তাঁর নামে দেবী এথেনার অবমাননার অভিযোগ আনতে হয়েছিল? অর্থাৎ চুরি হয়ে থাকলেও চোরাই সোনার পরিমাণ এতটাও বেশি ছিল না। যতটা সোনা ধার্য হয়েছিল এথেনার মূর্তির জন্য, তা থেকে দু’ট্যালেন্ট বা তার বেশি পরিমাণের সোনা সরিয়ে ফেললে বোধহয় চুরির অভিযোগ প্রমাণ করা তত কঠিন হত না।
তাই আপাতত এক ট্যালেন্টেই মনোনিবেশ করল দিতি। সঙ্গে এক কিউবিট।
সোনার ঘনত্ব জানা গেল গুগল সার্চ করতেই। এক কিউবিক সেন্টিমিটার, অর্থাৎ এক সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতার সোনার তৈরি একটি লুডোর ছক্কার ওজন ১৯.৩২ গ্রাম। তাহলে এক ট্যালেন্ট, অর্থাৎ ছাব্বিশ কিলোগ্রামের সমান সোনার আয়তন হবে প্রায় বিরাশি ঘন ইঞ্চি। আর তার দৈর্ঘ্য যদি হয় এক কিউবিট, মানে আঠারো ইঞ্চি, তাহলে তার বাকি দুটো দিকের মাপ দাঁড়ায় দু’ইঞ্চির সামান্য বেশি।
অর্থাৎ, দুই বাই দুই বাই আঠারো ইঞ্চির একটা সোনার পাত। কিন্তু, আগুন চুরির হিসেবনিকেশ? তবে কি প্রমিথিউসের কোনও গোপন মন্দির তৈরি করে গিয়েছিলেন ফিডিয়াস, জিউসের এই পুণ্যভূমিতে? কিন্তু তা কোথায় খুঁজবে, দিতি? এই সাড়ে পাঁচশো স্কোয়্যার কিলোমিটারের প্রত্নভূমিতে একটা আঠার ইঞ্চির ধাতব পাত খোঁজা কি খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার মতই অসম্ভব নয়?
আরও একবার সুইনবার্নের নম্বর ডায়াল করল দিতি। হয়তো উনি জানবেন, অলিম্পিয়ায় প্রমিথিউসের কোনও গোপন মন্দিরের খবর। কিন্তু নাহ্, এবারেও বেজে গেল ফোন সমানে।
এবং তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই, রাতের স্তব্ধতা খান-খান করে গোঁ-গোঁ শব্দে গুমরে উঠল ট্যাবটা। ইনকামিং কল। য়ুরির ফোন।
“কী ব্যাপার! কেন এতবার ফোন করছ তোমার প্রফেসরকে? তোমাকে নিজের মাথা খাটাতে নিয়ে আসা হয়েছে।” ধমকে উঠল য়ুরি।
“আমি জানতে চাইছি, অলিম্পিয়ায় প্রমিথিউসের কোনও মন্দির আছে কি না।” দাঁতে-দাঁত-চেপে জবাব দিল দিতি।
ফোনের ভেতর দিয়েই দিতি শুনতে পেল, তার প্রশ্নটা কারোর কাছে পৌঁছে দিল য়ুরি— সম্ভবত বন্দি সুইনবার্নের কাছে। এবং তার অল্পক্ষণের মধ্যে উত্তরও ফিরে এল, “না, নেই। বাই দ্য ওয়ে, আর চার ঘণ্টা সময় আছে তোমার হাতে।” ফোন কেটে দিল য়ুরি।
ট্যাবটা বন্ধ করে একটু অন্য কথা ভাবার চেষ্টা করল দিতি।
যদি সত্যিই ফিডিয়াসের রহস্যের সমাধান সম্ভব না হয়, তাহলে কী পরিণতি হবে তার আর সুইনবার্নের? য়ুরি কি সত্যিই ঝুঁকি নেবে, তাকে আর সুইনবার্নকে সরিয়ে দেওয়ার? আচ্ছা, য়ুরি কি একাই রয়েছে এই চক্রের পেছনে, না কি পেছনে ইশারা রয়েছে অন্য কারোর? গত ছ’মাসে একবার ইংল্যান্ড, আর দু’দুবার সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে সোফিয়া গেছে য়ুরি। বুলগারিয়ার রাজধানী সোফিয়া। আন্দাজ করা কঠিন নয়, সোফিয়া য়ুরির অন্তিম গন্তব্য ছিল না, তার লক্ষ্য ছিল কৃষ্ণসাগরের তীরে সোজোপোল শহর। যার প্রাচীন নাম অ্যাপোলোনিয়া। গর্গিওসের সূত্র ধরে হয়তো বা প্যারামিনোস জাহাজের ধ্বংসাবশেষ অবধি পৌঁছে গিয়েছিল য়ুরি, যতটা এমনকি সুইনবার্নও পৌঁছতে পারেননি। এত খরচের ধাক্কা সামলানো একটা পিএইচডি ছাত্রের কর্ম নয়। কে যোগাচ্ছে এই খরচ?
আর ডক্টর স্নোপ? কে গিয়েছিল তাঁর সঙ্গে দেখা করতে, সেদিন রাতে? কার স্বার্থ ছিল, দিতিকে এই এক্সকাভেশন টিমের বাইরে রাখার পেছনে? সে-ও কি য়ুরি? বার-বার ঘুরে-ফিরে সে যে সুইনবার্নের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল এই অভিযানের অংশ হতে চেয়ে— সে কি এই কারণেই? ডক্টর স্নোপের হার্ট অ্যাটাকটাও কি তাহলে স্বাভাবিক নয়? কে রয়েছে এর পেছনে? কোনও কিউরিও-মাফিয়া?
রাশিয়ান মাফিয়া?
ভাবতেই দিতির শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। এক লহমায় মনে পড়ে গেল বাড়ির কথা। মা-বাবার কথা। না। এখন সে একেবারে ভাববে না ও-সব কথা। ওদের ভাবনা তাকে দুর্বল করে দেবে। এখন তার একমাত্র লক্ষ্য, যতটা সম্ভব প্রলম্বিত করা সময়কে, অন্তত আজকের রাতটুকু। আর আশায় থাকা, ফিডিয়াসের ধাঁধার সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত য়ুরি বা তার প্রভুরা কোনও চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকবে।
কিন্তু তার জন্য, আজ রাত শেষ হওয়ার আগেই দিতিকে ছুড়ে দিতে হবে এমন একটা কোনও ইঙ্গিত, যা থেকে য়ুরির মনে বিশ্বাস জন্মাবে, আর একটা দিন সময় পেলেই দিতি খুলে দিতে পারবে ফিডিয়াসের রহস্যের পর্দা। দিতির বাবা, কর্নেল চন্দ্রা-র ফৌজি পরিভাষায় যাকে বলে ডিকয়।
ইশ্শ্— এই কথাটা এতক্ষণ কেন মনে আসেনি তার?
ডিকয়! ফৌজি অভিধানে যার অর্থ ধোঁকা। অর্থাৎ যা আসল নয়, তা দেখিয়ে যা আসল, তাকে আড়ালে রাখা।
ফিডিয়াস যদি সত্যিই এমন কোনও গোপন দায়িত্ব ন্যস্ত করে যান তাঁর প্রিয় ছাত্র পাইওনিয়াসের হাতে, তাহলে সে গোপনীয়তা রক্ষার জন্য ডিকয় ছাড়া আর কী-ই বা সম্বল থাকতে পারত, এক অসহায় কারারুদ্ধ বৃদ্ধের কাছে? আর সে-বৃদ্ধ যদি হন সে-সময়ের দক্ষ শিল্পী আর প্রযুক্তিবিদদের অন্যতম, তাহলে সে-ডিকয়ের পরিকল্পনা করার জন্য তাঁর চেয়ে যোগ্যতরই বা আর কে হতে পারত?
ফিডিয়াসের ওয়ার্কশপ ঘুরিয়ে দেখানোর সময় বৃদ্ধা ট্যুর গাইড বলেছিলেন কথাটা। জিউসের মূর্তির কাজ শুরু করার আগে, যখন নিজের কাজের পরিকল্পনা করছিলেন ফিডিয়াস, সেই সময়ে তিনি তৈরি করান নিজের এই কর্মশালাটি। এবং তা তৈরি করানো হয় হুবহু জিউসের মূল মন্দিরের অভ্যন্তরের মাপে। একই দৈর্ঘ্য, একই প্রস্থ, একই উচ্চতা।
জিউসের পায়ের কাছে যে বিন্দুতে এসে মিশেছিল নাইকির মূর্তির দৈব দৃষ্টি, ফিডিয়াসের কথা অনুযায়ী ঠিক সেই বিন্দুতেই এসে পড়েছিল জিউসের বজ্রের আঘাত! সেখানে খুঁড়ে দেখেছেন সুইনবার্ন, পাননি কিছুই।

—জিউসের মন্দির (ডান দিকে) ও হুবহু তার মাপ অনুযায়ী তৈরি ফিডিয়াসের কর্মশালার (বাঁ-দিকে) গ্রাউন্ড প্ল্যান
না পাওয়ার কারণ কি এই, যে জিউসের মন্দিরের সেই বিন্দুটি আসলে অসামান্য দক্ষতায় তৈরি একটি ডিকয়? দেবরাজ জিউসের সেই দৈব ইঙ্গিত, সেই বজ্রের আঘাতের যে-কাহিনি ফিডিয়াসের জবানিতে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন পাউসনিয়াস, হয়তো সেই গল্পটিও এই ডিকয়েরই অংশ? হয়তো সত্যিই কিছু পাওয়ার কথা ছিল না ওখানে? আসল বিন্দুটি হয়তো তার হুবহু প্রতিস্থাপন, শুধু স্থানটা বদলে গেছে তার?
জিউসের মন্দিরের বদলে ফিডিয়াসের নিজের কর্মশালা!
নিজের গোপন সৃষ্টিটিকে সুরক্ষিত রাখার জন্য এর চেয়ে যথাযথ জায়গা আর কী-ই বা হতে পারত?
নিজের ভাবনায় নিজেই স্তম্ভিত হয়ে ট্যাবটা আরেকবার টেনে নিল দিতি। জিউসের মন্দিরের ভেতরকার প্ল্যানটা ফিডিয়াসের ওয়ার্কশপের প্ল্যানের ওপর প্রতিস্থাপন করতে হবে— তাহলেই পাওয়া যাবে জায়গাটার আসল অবস্থান। তারপর সেখান থেকে গুগল ম্যাপে নিয়ে গেলেই বেরিয়ে আসবে তার অক্ষ-দ্রাঘিমা।
সত্যি হোক বা না হোক, এই সম্ভাবনাটাকেই ডিকয় হিসেবে ছুড়ে দিতে হবে য়ুরির দিকে, আজ ভোররাতের আগে, কোনও এক সময়ে। যাতে আর একটা দিন সময় পাওয়া যায় হাতে। ভাবতে-ভাবতে ঘড়ি দেখল দিতি, রাত পৌনে বারোটা বাজে প্রায়।
দরজায় কারও ছায়া এসে পড়ল। য়ুরি বোধহয় এসেছে আবার—
“আর ইউ শিওর?”
“এ-ছাড়া আর কোনও সম্ভাবনা হতেই পারে না।” গলায় সবটুকু দৃঢ়তা জড়ো করে বলল দিতি, “সমস্ত যুক্তি, সমস্ত প্রমাণ এই একটা দিকেই ইঙ্গিত করছে। ফিডিয়াসকে যদি কোনও কিছু লুকিয়েই রেখে যেতে হয়, তিনি কি নিজের হাতেই নিশ্চিত করে যাবেন না, তার গোপনীয়তা?”
“আর ট্যালেন্ট, কিউবিট?”
“কী খুঁজছি-র চেয়ে কোথায় খুঁজছি-টা বেশি জরুরি নয় কি?” নিজের উত্তেজনা চেপে রেখে গলায় নির্লিপ্তি আনার চেষ্টা করল দিতি, “আর তার আগে ক্যাথকে নিয়ে এস এখানে! ফিডিয়াসের রহস্যের সমাধান হয়ে গেলে আমাদের ছেড়ে দেবে, এমনটাই কথা ছিল কিন্তু!”
কড়া-পড়া হাতের একটা সশব্দ চড় আছড়ে পড়ল দিতির গালে। ছিটকে পড়ে যেতে-যেতে কোনওমতে নিজেকে সামলে নিল দিতি।
“শর্ত রাখার মতো জায়গায় তুমি নেই, দিতি চন্দ্রা। শো মি দ্য স্পট। হেল্প আস ফাইন্ড দ্য ট্রেজার। ততক্ষণ অবধি তোমার প্রফেসর পণবন্দি থাকছেন আমাদের কাছে। যদি তুমি কোনও চালাকি না করো, তাহলে কাজের শেষে তোমাকে ছেড়ে দেব আমরা। বাকি রাতটা এই টেন্টেই কাটিয়ে কাল সকালে অলিম্পিয়া থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে, সাইটের সদর দরজা খোলার পরে। তোমার প্রফেসরের সঙ্গে আরও কিছু কাজ আছে আমাদের। ফিডিয়াসের রেখে যাওয়া এই গোপন বস্তুটি যাই হোক, সেটা যে আদৌ কোনও ধাপ্পাবাজি নয়, সেটার প্রমাণ পেলেই ওঁকেও ছেড়ে দেব আমরা। তারপর আমাদের আর অলিম্পিয়ায় দেখতেও পাবে না, নিজের মতো এক্সকাভেশন চালিয়ে যেতে পারবে তোমরা। এবার এগোও। তিনটে বাজে, ভোর হওয়ার আগেই কাজ শেষ করতে হবে।”
এক-নাগাড়ে বলে যাচ্ছিল বটে য়ুরি, কিন্তু দিতির মগজে দাগ কাটছিল না কথাগুলো। ডান গালটা জ্বলছিল তার, আর তার চেয়েও অনেক বেশি করে পুড়িয়ে দিচ্ছিল রাগ আর অপমানের জ্বালা। বড় হওয়ার পর থেকে বাবা-মা কখনও হাত তোলেননি তার ওপর, প্রয়োজনও পড়েনি। অলিম্পিয়ায় পৌঁছে য়ুরির ফোন আসা থেকে এই এতক্ষণের হুমকি, সুইনবার্নকে আলাদা ভাবে পণবন্দি করে রেখে তাদের দিয়ে ফিডিয়াসের রহস্যের সমাধান করিয়ে নেওয়ার চাপ, এ-সব কিছুর মধ্যেও দিতির মাথায় একটা ভাবনা কাজ করছিল, তাদের পিছু নিয়েছে একদল পেশাদার চোর, যাদের লক্ষ্য এক প্রাচীন প্রত্নতত্ত্বের নিদর্শন। লক্ষ্যপূরণ হয়ে গেলে তাদের ছেড়ে দেবে এরা। কিন্তু য়ুরির এই বিনা প্ররোচনায় তার ওপর হাত ওঠানো থেকে একটা ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে, কাজ শেষ হয়ে গেলেও য়ুরির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হবে না।
“কী হল, কথা কানে যাচ্ছে না? বলছি যে, মুভ? এগোও আমার আগে আগে।” দিতির চিন্তার জাল ছিঁড়ে হিসিয়ে উঠল য়ুরির গলা।
যে-কোনও কারণেই হোক, মানসিক চাপের মধ্যে আছে য়ুরি। আর মানসিক চাপ মানেই মুহূর্তের ভুলের সম্ভাবনা। য়ুরির ভুল, অর্থাৎ দিতির সুযোগ। কথায়-কথায় ব্যস্ত রাখতে হবে ওকে। এমন বিশ্বাস দিতে হবে, যাতে ওর মনে হয়, ভয়ে গুটিয়ে গেছে দিতি।
“কিন্তু এত রাতে খোঁড়াখুঁড়ি করলে গার্ডরা ছুটে আসবে না?” নিজের রাগ গিলে ফেলে মিনমিনে গলায় প্রশ্ন করল দিতি, এগোতে-এগোতেই।
“কেউ আসবে না। বলছি তো, ব্যবস্থা করা আছে আমাদের। আর যেখানে যাওয়ার কথা বলছ, ফিডিয়াসের ওয়ার্কশপ, ওটা এমনিতেও ক্লাডিওস নদীর শুকনো খাতের দিকে। ওদিকটা একটু বেশিই নির্জন। চলো, চলো...”
রাতের অন্ধকারে ট্রেজারি থেকে ফিডিয়াসের ওয়ার্কশপ অবধি সাড়ে চারশো মিটারের দূরত্ব পেরোতে সময় লাগল প্রায় আধ-ঘণ্টা। দিতি সামনে, তার তিন-পা পেছনে বিশাল এক টুলব্যাগ কাঁধে য়ুরি। মেঘ-ছেঁড়া চাঁদের আলো-আঁধারিতে চোখ সয়ে এল একটু পরেই। ট্যুরিস্টদের জন্য অলিম্পিয়ার ভেতরে তৈরি হয়েছে মোরাম-বিছোনো হাঁটাপথ, তার সমান্তরালে সারি দিয়ে গাছ। মূল রাস্তা ছেড়ে নেমে এসে গাছের সারির পেছনের সুঁড়িপথ ধরল য়ুরি। রাস্তা প্রায় মুখস্থ তার, ফলে টর্চ জ্বালানোরও প্রয়োজন পড়ল না একেবারেই। দিতি আন্দাজ করল, রাস্তার আলোতে মোশন-সেন্সর লাগানো আছে, তাই এই সাবধানতা।
জিউসের মন্দির থেকে শ’খানেক মিটার পশ্চিমে, চুনাপাথরে গাঁথা ফিডিয়াসের কর্মশালার ধ্বংসস্তূপ আজ গড়পড়তা ট্যুরিস্টের কাছে পরিত্যাজ্য। পূর্ব-পশ্চিমে বত্রিশ মিটার ছড়িয়ে রয়েছে তার ভিত্তি, আর উত্তর-দক্ষিণে আঠার মিটার। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, এমনকি উচ্চতায়ও জিউসের মূল মন্দিরটির একেবারে সমান মাপ-বরাবর এর নির্মাণ করিয়েছিলেন প্রবীণ ভাস্কর। মূর্তিটিকে মূল মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করার আগে নিজের ওয়ার্কশপে তার প্রতিটি অংশ তৈরি করে প্রথমে এখানেই স্থাপনা করতেন ফিডিয়াস, আন্দাজ করে নিতেন মূল মন্দিরের পরিসরে কেমন দেখাবে দেবরাজের মূর্তিটিকে। অন্তত ইতিহাসের এমনটাই বিশ্বাস।
একদিন যেখানে গ্রিক পুরাকথার দেবরাজ মূর্ত হয়েছিলেন মানুষের হাতে, প্রায় সাড়ে আটশো কি ন’শো বছর পরে কালের নিয়মে সেই কর্মশালার মাটিতেই গড়ে উঠেছিল এলিসের প্রথম খ্রিস্ট-উপাসনার ব্যাসিলিকা। তার আয়ুও ছিল একশো বছর। এক প্রবল ভূমিকম্প ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল তাকে। তারপরে ক্লাডিওস নদীর উপর্যুপরি প্লাবন তাকে ঢেকে দেয় পলির আস্তরণে, তেরশো বছরের জন্য। যে বিস্মৃতির আড়াল থেকে আবার তার মাথা তুলে দাঁড়ানো শুরু হয় ঊনবিংশ শতকে।
তার চব্বিশশো বছরের প্রাচীন ইতিহাস, তার বুকে চেপে রাখা গোপন রহস্যের সবটুকু এখনও উজাড় করে দেয়নি ফিডিয়াসের ওয়ার্কশপ, কিছু তার বাকি রয়েছে আজ রাতের জন্য— এই বিশ্বাস বুকে নিয়ে পাথরের দেওয়াল টপকে কর্মশালার জমিতে পা রাখল দিতি।
এবং তাকে চমকে দিয়ে জ্বলে উঠল সার্চলাইট। মোশন সেন্সর।
ডান হাতে দিতির জ্যাকেটের কলার ধরে এক হ্যাঁচকা টানে তাকে পেছনে টেনে আনল য়ুরি, একটা ভাঙা দেওয়ালের আড়ালে। তারপর নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল।
অনেকটা দূর থেকে ভেসে এল হুইসলের শব্দ। নিশ্চয় কোনও গার্ডের নজরে পড়েছে এই হঠাৎ আলো জ্বলে-ওঠা।
যেমন হঠাৎ জ্বলে উঠেছিল, মিনিট-পাঁচেক পরে তেমন করেই নিভে গেল আলো। আরও মিনিট দশেক একভাবে পড়ে থাকার পরেও যখন কারও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না, তখন উঠে পড়ল য়ুরি, পেছন-পেছন দিতিও। ভাঙা দেওয়ালের পাশ দিয়ে দু’জনে ঢুকল ওয়ার্কশপের মূল জমিতে। দিতির হাতে একটা কাগজে লেখা নির্দিষ্ট জায়গাটির অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ, য়ুরির হাতে একটা হ্যান্ডহেল্ড লেসার ডিভাইস। ওয়ার্কশপের মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে পরপর চার কোণে লেসার বিম তাক করল য়ুরি। সঙ্গে-সঙ্গে ডিভাইসের পর্দায় ভেসে উঠল ওয়ার্কশপের দ্বিমাত্রিক প্ল্যান। দিতির হাত থেকে কাগজটা নিয়ে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ টাইপ করল য়ুরি। দ্বিমাত্রিক প্ল্যানটির ওপর একটি বিন্দু জ্বলে উঠল।
“আমাদের বাঁ-দিকে এগোতে হবে। ফলো মি।”
য়ুরির পেছন-পেছন চলতে-চলতে দিতি অনুভব করল, এতক্ষণের ভয়, দ্বিধা, আশঙ্কা, ক্লান্তি, সব কিছুকে ছাপিয়ে তার প্রতিটি ইন্দ্রিয় হয়ে উঠেছে টানটান সজাগ, সচেতন। সারা শরীরে দৌড়ে বেড়াচ্ছে এক তীব্র স্নায়বিক উত্তেজনা। একেই বোধহয় বলে অ্যাড্রিনালিন-রাশ।
“এখানে...” স্ক্রিনের দিকে নজর রেখে চলতে-চলতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল য়ুরি। টর্চ জ্বালিয়ে কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখল টুলব্যাগ। তা থেকে বেরোল ভাঁজ করা লম্বাটে একটা যন্ত্র, তার নিচে একটা ছোট চৌকোনা প্যাড লাগানো। হ্যান্ডলের ওপরে ছোট্ট একটা স্ক্রিন। প্রযুক্তির নতুন উপহার প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য। গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং ৱ্যাডার, সংক্ষেপে জিপিআর। ওয়ার্কশপের এই অংশের মেঝে চুনাপাথরের তৈরি। বোধহয় ফিডিয়াসের সময়কার ভিতের পরিবর্তন করার প্রয়োজন বোধ করেননি পরবর্তীকালের চার্চের স্থপতিরা। লেসার ডিভাইসটি যে জায়গাকে নির্দিষ্ট করেছিল, ঠিক সেখানে পাথরের ওপরেই জিপিআরের প্যাডটা রেখে স্যুইচ চালু করল য়ুরি। একটা ধূসর সবজেটে আলোয় ভরে গেল পর্দা। ছবির কন্ট্রাস্ট সামান্য কমবেশি করতে-করতে ধীরে-ধীরে একটা ছায়া যেন দানা বেঁধে উঠল পর্দায়। প্রায়-নিখুঁত একটা বৃত্ত। অর্থাৎ মাটির নিচে একটা কিছু আছে, এবং তা হয় একটা গোল চাকতির মত, অথবা একটা স্তম্ভের আকারের।
ফিডিয়াসের ধাঁধা!
চব্বিশ শতাব্দীর ওপার থেকে এক প্রবীণ ভাস্করের বিদেহী আত্মা বুঝি তৃপ্তির হাসি হাসলেন। সে হাসি শনশন শব্দে ছড়িয়ে গেল রাতের আকাশে, পপলার-সাইপ্রেসের পাতায় পাতায়। উত্তেজনায় গলা ছেড়ে চিৎকার করতে ইচ্ছে করছিল দিতির। য়ুরির পাশ দিয়ে উঁকি মেরে দেখল সে— পর্দায় ছবি এবং আরও অনেক ডিসপ্লে’র সঙ্গে ভেসে উঠেছে একটা সংখ্যা— ‘d=735.7 mm’
অর্থাৎ, জিপিআরের হিসেবে প্রায় পৌনে এক মিটারের গভীরতায় প্রোথিত রয়েছে ওদের কাঙ্খিত বস্তুটি। কিন্তু সেটি রয়েছে পাথরের ভিতের ভেতরে। এত রাতে এই পাথর কাটতে বসলে তার শব্দে অলিম্পিয়ার সমস্ত গার্ড এসে জমা হবে এইখানে। তাহলে কী...?
ভাবতে-ভাবতেই য়ুরির টুল ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এল পাথর কাটার ব্লেড। এলইডি টর্চের আলোয় যন্ত্রটা দিতির হাতে তুলে দিয়ে তাকে ইশারা করল য়ুরি।
“কাজে লেগে পড়ো। এই চাকতিটার পরিসীমা থেকে এক ফুট দূরত্ব ছেড়ে কাটতে শুরু করো। আমি নজর রাখছি।”
“আর শব্দ হলে?” জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল দিতি।
“হবে না। স্পেশাল মেটিরিয়াল।” নির্লিপ্ত জবাব এল চাপা গলায়।
ব্যাটারিচালিত ব্লেডটা চালাতে গিয়ে বুঝল দিতি, প্রত্নতত্ত্বের কাজটাকে কতটা সহজ করে দিয়েছে আজকের বিজ্ঞান। হাইস্পিড ব্লেডের ওপরে কোনও বিশেষ ধরনের কোটিং দেওয়া, ফলে সহস্রাব্দ-প্রাচীন চুনাপাথরের মেঝে কেটে ঢুকে যেতে থাকল সভ্যতার স্পর্ধা, যেন মাখনের মধ্যে গরম ছুরির মত, আর তেমনই নিঃশব্দে।
প্রায় ঘণ্টাখানেকের চেষ্টার পরে চতুর্দিকের পাথর কেটে পৌঁছোনো গেল মিটার দেড়েকের গভীরতায়। য়ুরির টুলব্যাগ থেকে ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছে কার্বন-স্টিলের তৈরি রাবারের লাইনিং দেওয়া শাবল। দিতির সঙ্গে হাত লাগাল য়ুরি নিজেও। পাথর-কাটা ব্লেড আর শাবলের আঘাতে একটু-একটু করে খসে পড়তে লাগল চুনাপাথরের আস্তরণ। তারপর অবশেষে যন্ত্রপাতি সরিয়ে রেখে গহ্বরের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিল দিতি। প্রথমবারের মতো হাত বাড়িয়ে ছুঁল ফিডিয়াসের সহস্রাব্দ-প্রাচীন সৃষ্টিকে।
“আস্তে-আস্তে ওপরে তুলে আনো ওটাকে।”
আধো-অন্ধকারে চোখ সয়ে এসেছে এতক্ষণে। য়ুরির গলাকে অনুসরণ করে তাকাতেই দিতির চোখে পড়ল, শাবল সরে গিয়ে য়ুরির হাতে উঠে এসেছে আগ্নেয়াস্ত্র। ব্যারেলটা অস্বাভাবিক রকমের লম্বা। বোধ করি সাইলেন্সার লাগানো।
এই তবে য়ুরির পরিকল্পনা, চোখ বুজে ভাবার চেষ্টা করল দিতি। কাল সকালে অলিম্পিয়ায় ফিডিয়াসের ওয়ার্কশপের ভেতরে পাওয়া যাবে এক অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর মৃতদেহ। পুরাতাত্ত্বিক সামগ্রী চুরি, আর সেই চোরদের অন্তর্দ্বন্দ্বের জেরের নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে দিতি চন্দ্রা। যদি না...
সমস্ত দুর্ভাবনাকে সরিয়ে রেখে স্তম্ভটিকে দু’হাতে স্পর্শ করল দিতি। ঠান্ডা ধাতুর অনুভব আঙুলে, মাথার কাছেই দু’দিকে একশো আশি ডিগ্রির ব্যবধানে দু’টি খাঁজ করা রয়েছে, যাতে করে তুলে আনা যায় স্তম্ভটিকে। হয়তো এই খাঁজে শেষবারের মতো আঙুল ঢুকিয়ে ফিডিয়াস নিজেই তাঁর সৃষ্টিকে নামিয়ে দিয়েছিলেন নিজের কর্মশালার গর্ভগৃহে। সে-কথা মনে করতেই বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল দিতি; যেন হাজার-হাজার বছরের ইতিহাসের ধারা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল তার কানে। শুধু ফিডিয়াস নন, এথেন্সের কারাগারে মৃত্যুপথযাত্রী সক্রেটিস, আগোরার পানশালায় আলোচনারত সৈন্যাধ্যক্ষ জে়নোফন আর দার্শনিক প্লেটো, প্রাসাদের গুপ্তকক্ষে চক্রান্তে রত ক্রূর অ্যানাইটাস, ডুবন্ত প্যারামিনোস জাহাজের ডেকে দাঁড়ানো মূক স্পার্টান গুপ্তচর গর্গিওস— সকলেই যেন আঁকড়ে ধরতে চাইছেন, হাজার-হাজার বছরের ওপার থেকে বাড়িয়ে দেওয়া এক হাতের আশ্রয়!
দু’পাশের খাঁজে আঙুল ঢুকিয়ে, ধীরে-ধীরে ফিডিয়াসের সঁপে যাওয়া উত্তরাধিকারটিকে মাটির ওপরে তুলে আনল দিতি। পাথরের মেঝেতে দাঁড় করিয়ে দিল স্তম্ভটিকে। সারা রাতের ক্লান্তি, গত এক ঘণ্টার তীব্র শারীরিক শ্রমের অবসাদ, সব একসঙ্গে ভিড় করে আসতে চাইছে দিতির দু চোখে, কিন্তু তা সত্ত্বেও দিতিকে টানটান করে জাগিয়ে রাখল দু ফিট লম্বা স্তম্ভটির ধাতব ঔজ্বল্য। চাঁদের মৃদু আলোয় কালচে সোনালী আভা ঠিকরে বেরোচ্ছে তার গা থেকে।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্তম্ভটির চারধারে হাত বুলিয়ে দেখল দিতি। সোনা নিশ্চয় নয়, কারণ এই পুরো স্তম্ভটি সোনার তৈরি হলে এক ট্যালেন্টের বহু গুণ বেশি হত তার ওজন। ওপরের খাঁজ দু’টি বাদ দিলে সারা গা একেবারে মসৃণ, শুধু মাঝামাঝি জায়গায় এসে আঙুলে ঠেকল একটা কিছু। একটা নকশা বুঝি উৎকীর্ণ করা আছে! গোল, ফুলের মত!
“টর্চ, প্লিজ়।” উবু হয়ে বসা অবস্থাতেই ঘাড় না ঘুরিয়ে নিজের ডান কাঁধের ওপর দিয়ে বাঁ-হাত পেছনে বাড়িয়ে দিল দিতি। একটা সন্দেহ দানা বাঁধছে তার মাথায়। টর্চটা জ্বালিয়ে দেখতে পারলে সন্দেহের নিরসন হয়। আর দুবার টর্চ জ্বালানোর ইশারাই তার বাঁচার একমাত্র পথ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে!
কিন্তু টর্চ নয়, আঙুলে ঠেকল অন্যরকম একটা ধাতব স্পর্শ। য়ুরির রিভলবারের সাইলেন্সার। অর্থাৎ, য়ুরির কাছে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। টর্চ জ্বালানোর সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। যা করার দিতির, নিজেকেই করতে হবে।
“আর টর্চ লাগবে না তোমার। কোনও রকম চালাকি না করে আস্তে-আস্তে উঠে দাঁড়াও তো দেখি, দুটো হাত ওপরে করে...”
সাইলেন্সারের চাপ বাড়ল দিতির কাঁধের ওপর। ওপর থেকে কোনাকুনি চাপ, অর্থাৎ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে য়ুরি। বাঁ-হাতটা আগে থেকেই তোলা ছিল, এবারে দিতির ডান হাতটাও উঠে এল ওপরে। কিন্তু উঠে আসার আগে, নিজের শরীরের আড়ালের সুযোগ নিয়ে নিঃসাড়ে বের করে নিল বাঁ-পায়ের মোজার ভেতরে লুকিয়ে রাখা সরু অস্ত্রটা। হোটেলের রুম ছেড়ে বেরোনোর আগে স্যান্ডউইচ-বাকলাভার সঙ্গে এটিই তুলে নিয়েছিল দিতি, আর ক্যাপটা খুলে রেখেছিল সুইনবার্নের টেন্ট থেকে য়ুরিকে ফোন করার আগেই। দাঁড়িয়ে-থাকা য়ুরির মাথার অবস্থানটাকে মোটামুটি আন্দাজে রেখে, ডান হাতের তর্জনীর সমস্ত জোর দিতি উজাড় করে দিল স্প্রে-ক্যানটার ট্রিগারের ওপরে।
তিন ফিট দূর থেকে বিনা নোটিশে ধেয়ে আসা নাগামিজ ভূত-জোলোকিয়ার স্প্রে সামলানোর মতো কোনও প্রস্তুতিই ছিল না য়ুরি ড্রাগোনভের কাছে। নতুন প্রেশারাইজড ক্যানের প্রথম ঝটকাটা তীব্র বেগে ছুটে এসে আছড়ে পড়ল তার বাঁ চোখের ওপরে। একটা আর্ত চিৎকারের সঙ্গে প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় ডানদিকে ঘাড় ঘোরাল য়ুরি, ফলে দ্বিতীয় ঝটকাটা সরাসরি খুঁজে পেল তার ডান চোখ। সেই একই প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় তার রিভলবার-ধরা হাত উঠে এল মুখকে আড়াল করতে, কিন্তু ততক্ষণে সাময়িক অন্ধত্ব ঘনিয়ে এসেছে য়ুরির দু’চোখে। কাঁধের ওপর থেকে রিভলবারের নল সরে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে পাশ ফিরে মাটিতে গড়িয়ে গিয়েছিল দিতি, এবারে শোয়া অবস্থাতেই সর্বশক্তি দিয়ে সে পা চালাল য়ুরির গোড়ালি লক্ষ্য করে। কাটা কলাগাছের মতো চুনাপাথরের মেঝের ওপরে আছড়ে পড়ল য়ুরির সাড়ে ছ’ফিটের শরীরটা। হাত থেকে খসে পড়ল রিভলবার।
উঠে দাঁড়িয়ে রিভলবারটা কুড়িয়ে নিল দিতি। দু’হাতে পাগলের মতো চোখ কচলে যাচ্ছে য়ুরি, কিন্ত মুখে শব্দ নেই এখন আর। একবার মুহূর্তের জন্য চোখ থেকে হাত সরাতেই দিতি আরেক রাউন্ড স্প্রে ছিটিয়ে দিল য়ুরির চোখে, তারপর কাঁপা গলায় আর একবার বলল, “টর্চ...!”
দু’বার টর্চ জ্বালানো-নেভানোর ইশারা করার আধ-মিনিটের মধ্যে ওয়ার্কশপের পেছনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ছুটে পেরিয়ে এল একটি ছায়ামূর্তি, তার পেছনে ধীর পায়ে আর একজন। প্রথমজন এসেই ক্ষিপ্র হাতে টেপ দিয়ে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেললেন য়ুরির দু-হাত, পা, মুখ। তারপর দিতির দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “এক্সট্রিমলি ওয়েল ডান, ইয়ং লেডি। আমি গ্রাহাম সেইমুর, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। ডক্টর স্নোপ আমার ক্লায়েন্ট। আপাতত আপনারা সুইনবার্নের টেন্টে গিয়ে বিশ্রাম নিন একটু, আমি একে আর আর্টিফ্যাক্টটা নিয়ে পৌঁছাচ্ছি আপনাদের পেছনে-পেছনে।”
ধীর পায়ে ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছেন দ্বিতীয়জন। দিতির ইউনিভার্সিটির আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টের প্রধান, ডক্টর অলিভার স্নোপ। আজ সন্ধ্যা থেকে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার।
গত রাতের কথা। ঘড়িতে তখন প্রায় পৌনে বারোটা। ট্রেজারির দরজায় ছায়া এসে পড়েছিল কারও। য়ুরি এসেছে ভেবেই ঘুরে তাকিয়েছিল দিতি। আর তাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে দেওয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন ডক্টর স্নোপ। অশরীরী নন, জীবন্ত।
খুব অল্প কথায় যতটা সম্ভব ওকে বুঝিয়ে বলেছিলেন ডক্টর স্নোপ। ইউনিভার্সিটির সামার-এক্সকাভেশনকে একটা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পুরাতাত্ত্বিক সামগ্রীর চোরাচালানের একটা অভিযোগ গত বছর থেকেই কানে এসেছিল ডক্টর স্নোপের। মূলত, অভিযোগটা ছিল য়ুরি ড্রাগোনভের নামে, কিন্তু, সে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই ইউনিভার্সিটি ছাড়ে য়ুরি। সে-জন্যই ক্যাথ সুইনবার্ন যখন এই বছরেও তদবির করতে যান তার হয়ে, ডক্টর স্নোপ সরাসরি নাকচ করে দেন সে-প্রস্তাব। সুইনবার্নকে বাধ্য করেন নতুন ছাত্রদের মধ্যে থেকে কাউকে বেছে নিতে। সে-প্রতিযোগিতায় প্রথম হয় দিতি।
সুইনবার্ন-য়ুরির যোগসূত্র কতটা গভীর, এবং তাতে ইউনিভার্সিটির বাইরের কোনও চক্র যুক্ত আছে কি না সে-ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য গ্রাহাম সেইমুরকে নিয়োগ করেন ডক্টর স্নোপ। কিন্তু সেইমুর তদন্তের সম্পূর্ণ রিপোর্ট পেশ করার আগেই আক্রান্ত হন স্নোপ।
“প্যারামিনোস জাহাজের প্যাপিরাসের সন্ধান সুইনবার্ন নিজেই পেয়েছিল আর্কাইভ থেকে।” বললেন স্নোপ, “তখন থেকেই ওর লক্ষ্য ছিল ফিডিয়াসের রহস্য এবং অলিম্পিয়া। ওদিকে য়ুরির যোগাযোগ ছিল একটা রাশিয়ান কিউরিও মাফিয়া চক্রের সঙ্গে। সেদিন সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ য়ুরিই এসেছিল আমার ঘরে। আমার সঙ্গে ওর পোস্ট ডক্টরাল থিসিস নিয়ে কথা বলতে-বলতে আচমকাই সামনে ঝুঁকে এসে একটা কিছু স্প্রে করে আমার নাকের ওপর। আমি জ্ঞান হারাই। প্রথমে হাসপাতালে সবাই ভেবেছিলেন ম্যাসিভ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, কিন্তু সেইমুরের কাছে খবর যেতে উনিই প্রথম সন্দেহ করেন, ব্যাপারটা অন্যরকম কিছুও হতে পারে। সেইমতো ডাক্তাররা আরও কিছু টেস্ট করে বুঝতে পারেন, মিথাইল আয়োডাইডের কোনও একটা ডেরিভেটিভ স্প্রে করা হয়েছিল আমার ওপর। মিথাইল আয়োডাইডের বিষক্রিয়ার পরিণতি খুব মেলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সিম্পটমের সঙ্গে, আর আমার কার্ডিয়াক সমস্যার কথা সুইনবার্নের অজানা ছিল না।”
“কিন্তু তাহলে সুইনবার্ন আপনাকে বাঁচিয়ে তুলতে চাইবেন কেন?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করল দিতি, “কেন উনি এনএইচএসকে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকলেন?”
“সুইনবার্ন? এই সব বলেছে না কি? অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছিল আমাদের অফিস-সেক্রেটারি সুসান। বাড়ি যাওয়ার পথে আমার ঘরে আলো জ্বলতে দেখে সুসানই আবিষ্কার করে আমাকে ওই অবস্থায়, তারপর সুইনবার্নকে ডেকে আমার ঘরে বসিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ডাকে, আর গার্ডদের খবর দেয়।”
“আচ্ছা... আন্দাজ ক’টা নাগাদ ঘটেছিল ঘটনাটা, মনে আছে?” প্রশ্ন করল দিতি।
“সুইনবার্নের সঙ্গে মিটিং ছিল ইন্টার্ন সিলেকশন নিয়ে। তোমার সিলেকশন ফাইনাল হওয়ার পরে আমিই জোর করেছিলাম, যেন তোমাকে ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয়। সেই মতো সুইনবার্ন ফোনও করে তোমাকে। তখন হবে আন্দাজ পৌনে ছ’টা, তার পরেই য়ুরি এল ছ’টা নাগাদ। কতক্ষণ আর কথা বলল, বড়জোর মিনিট কুড়ি-পঁচিশ! সাড়ে-ছ’টার আগেই। আমাকে হসপিটালে অ্যাডমিট করা হয় সাতটা পঁচিশে। সেইমুর পরে রেকর্ড চেক করেছিলেন।”
“তার মানে, সুইনবার্ন যখন প্রথমবার আমাকে ফোন করে জানান আমার সিলেকশনের কথা, সেটা ছিল এক-রকম বাধ্য হয়ে ফোন করা। সুসান যখন ডাক্তার ডাকতে গেছেন, হয়তো সেই সময়েই আপনার অ্যাপ্রুভ করা মেমোটি হস্তগত করে নিয়েছিলেন উনি। তারপর রাতারাতি আপনার হাতের লেখা নকল করে Approved-কে Not Approved করে, পরের দিন সকালে সেই নকল প্রমাণ দেখিয়েই আমাকে পাকাপাকিভাবে টিম থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্ল্যান ছিল ওঁর, কিন্তু আমি ওই ক্যাপিটাল আর স্মল লেটারের কারচুপিটা ধরে ফেলায় উনি বাধ্য হন আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলতে।”
“হ্যাঁ, প্রথমদিকে তোমাকে সঙ্গে রাখাটা ছিল আমার চোখে ধুলো দেওয়ার একটা চেষ্টা মাত্র। যাতে আমি কোনওক্রমে সুস্থ হয়ে উঠলে ও বলতে পারে, তোমাকেই ও ব্যবহার করছে ইন্টার্ন হিসেবে, আমার নির্দেশ অনুযায়ী। এদিকে সেইমুরের পরামর্শ অনুযায়ী হাসপাতাল থেকে আমার স্বাস্থ্যের ক্রমাগত অবনতির কথা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, এবং সুইনবার্ন শহর ছাড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই জানানো হয়, আমি মারা গেছি। এর পরেই আনন্দে, উত্তেজনায় ভুল করে বসে ওরা দু’জন। য়ুরির পাসপোর্টের সব ক’টা পাতার কপি এবং টিকিট তোমাকে না পাঠালেও চলত হয়তো, কিন্তু ফিডিয়াসের রহস্য বিক্রি করার মোটা দাঁও, এবং আমার মৃত্যুর পরে ডিপার্টমেন্টের প্রধানের পদে নিজের নিয়োগ একরকম নিশ্চিত হয়ে যাওয়া, এই দুটো ঘটনা সুইনবার্নকে একটু অতিরিক্ত বেপরোয়া করে তোলে। এবং সেই ভুল থেকে য়ুরির দিকে ঘুরে যায় তোমার সন্দেহের তীর। সে-জন্যই তোমাকে সরানো দরকার ছিল, তাই সুইনবার্ন তোমাকে টোপ দিয়ে টেনে এনেছে এখানে।”
“শুধু তাই নয়, এখনও ওদের শেষ অঙ্কটা মেলানো বাকি, আর সেটা সুইনবার্নের বুদ্ধিতে কুলিয়ে উঠছে না।” জবাব দিল দিতি, “কিন্তু আপনি এখানে কী উদ্দেশ্যে?”
“আমরা ওদের হাতে-নাতে ধরতে চাই, দিতি। তা-ছাড়া তোমার নিরাপত্তার দায়িত্বও রয়েছে। এক্সকাভেশনের চ্যাটরুমে অ্যাডমিন রাইটস রয়েছে সুইনবার্নের, এবং আমার। সুতরাং তোমাকে ভার্চুয়াল ইন্টার্ন হিসেবে নিয়োগ করা, তোমার এক-এক করে রহস্যের পর্দা তোলা, এ-সবই আমি এবং সেইমুর দেখতে পাচ্ছিলাম হাসপাতালে বসেও। তোমার সিকিউরিটির ওপরেও নজর রাখছিলেন সেইমুর। তোমাকে হুমকি-পার্সেল পাঠানোর আর উড়ো ফোন করার পরিকল্পনাটাও ওর।”
“সেইমুর? কেন?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করল দিতি।
“আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সুইনবার্নকে একটু তাড়াহুড়োয় ফেলে দেওয়া। ওকে ভাবতে বাধ্য করা, যে অন্য কেউও ধাওয়া করছে ফিডিয়াসের ধাঁধার পেছনে। যত তাড়াহুড়ো, তত বেশি ভুল হওয়ার সম্ভাবনা। আর সেটাই হয়েছে। যাক— আর বেশি সময় নেব না তোমার, দিতি। আমি আর সেইমুর দু’জনেই আজ রয়েছি অলিম্পিয়ায় গা-ঢাকা দিয়ে। আজ রাতেই ওদের ধরতে চাই, এবং তাতে তোমার সাহায্য দরকার। তবে তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, তোমার সুরক্ষার সমস্ত দায়িত্ব আমার।”
তার পরেই গোপনে সারা হয়ে যায় সব পরিকল্পনা। দিতিও ওর ডিকয়ের প্ল্যান ভাগ করে নেয় ডক্টর স্নোপের সঙ্গে। কথা হয়, ফিডিয়াসের কর্মশালায় পৌঁছে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করার পরে সুযোগ বুঝে দিতি টর্চের সিগন্যাল দেবে, অন-অফ, অন-অফ। সেই মতো সেইমুর এসে মহড়া নেবেন য়ুরির। য়ুরিকে ফোন করার সময়টাও নির্ধারিত হয় ডক্টর স্নোপের পরামর্শে।
“সোয়া পাঁচটায় আলো ফুটবে এখানে। ওকে পৌনে তিনটে নাগাদ ফোন করে বলো, তুমি একটা থিওরিতে পৌঁছাতে পেরেছ, ওর সঙ্গে গিয়ে সরেজমিনে খুঁড়ে দেখতে চাও। খোঁড়াখুঁড়ির জন্য মাত্র ঘণ্টা-দেড়েক সময় পাবে হাতে, ফলে স্বভাবতই একটা চাপ থাকবে ওর ওপর।”
কিন্তু ডক্টর স্নোপকেও বিশ্বাস করে নিজের গোপন অস্ত্রের কথাটা বলে উঠতে পারেনি দিতি।
যখন প্রথমবার দেশ ছাড়ছে দিতি, মা-র অসমীয়া বন্ধু রিঙ্কুকাকিমা এসে দিতির হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন গুয়াহাটিতে ওর ভাইয়ের ফ্যাক্টরিতে পরীক্ষামূলক ভাবে তৈরি হওয়া এই ভূত-জোলোকিয়া স্প্রে-র একটা ক্যান।
“এইটো লগত রাখিবি দিতি, বিদেশত প্রয়োজন হব।”— এটা কাছে রাখিস দিতি, বিদেশে লাগতে পারে...।
যে-পথে গিয়েছিল, সে-পথেই ফিরে এল ওরা, মোশন সেন্সর বাঁচিয়ে। ট্রেজারির খানিকটা দূরে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন ডক্টর স্নোপ।
“একটা কথা মাথায় রাখিনি আমরা। সুইনবার্ন তো জানে তুমি আর ফিরছ না। যদি এর মধ্যে ফিরে এসে থাকে নিজের টেন্টে?”
আশঙ্কাটা যে অমূলক ছিল না, তার প্রমাণ পাওয়া গেল আর একটু এগিয়েই। ট্রেজারির ভেতর থেকে হালকা আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে বাইরে। অথচ ঠিক মনে আছে দিতির, টেন্টের আলো নিভিয়ে বেরিয়েছিল ওরা।
মিনিট কুড়ি পরে হাতমুখ বাঁধা য়ুরিকে ফ্রগমার্চ করিয়ে হাজির হলেন সেইমুর। ডক্টর স্নোপের সঙ্গে নিভৃতে খানিক আলোচনা করলেন, তারপর দিতিকে প্রস্তাব দিলেন, “তুমি একটু গার্ড দাও একে, ইয়ং লেডি। আমি আর ডক্টর স্নোপ ওদিকটা সামলে নিই।”
“না মিস্টার সেইমুর।” উত্তর দিল দিতি, “গত দু’সপ্তাহ ধরে যা ঘটে গেছে, তার পরে আমার খুব দরকার একবার, শেষবারের মতো ক্যাথ সুইনবার্নের মুখোমুখি হওয়ার। আপনাদের অনুরোধ করছি আমার পেছনে থাকতে। দরকারে আওয়াজ দেব।”
এমন একটা প্রত্যয় ছিল দিতির বলার মধ্যে, দু’জনের কেউই দ্বিমত দেখালেন না।
নিঃশব্দে ট্রেজারির দরজার কাছে পৌঁছে ভেতরে উঁকি মারল দিতি। টেন্টের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সুইনবার্ন, কানে ফোন, হয়তো চেষ্টা করছেন য়ুরিকেই ধরার। না পেয়ে বিরক্ত হয়ে ফোনটা ম্যাট্রেসের ওপর ছুড়ে দিয়ে পেছন ফিরলেন, আর ঠিক তখনই চৌকাঠ টপকে ভেতরে ঢুকে এল দিতি।
“গুড মর্নিং ক্যাথ! আপনাকে মুক্ত দেখে কি নিশ্চিন্তই না লাগছে!”
অনেক পরে ঠান্ডা মাথায় ভাবার চেষ্টা করেছিল দিতি, দেখা হওয়ার সেই প্রথম মুহূর্তে ঠিক কী-কী অভিব্যক্তির প্রকাশ খেলে গিয়েছিল সুইনবার্নের মুখে। বোধ হয় বিস্ময়, রাগ, আশাভঙ্গ আর ভয়, এই চারটে অনুভূতিকে আলাদা-আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব হত, যদি আরও খানিকটা সময় পাওয়া যেত। কিন্তু ওই এক মুহূর্তই। তার পরেই নিজেকে সামলে নিয়ে শুধু অবাক অকপট বিস্ময়টুকু চোখেমুখে ঝুলিয়ে এগিয়ে এলেন সুইনবার্ন, দু’হাত বাড়িয়ে।
“হোয়াট আ প্লেসান্ট সারপ্রাইজ, দিতি! তুমি এখানে, এই সময়ে কী-ভাবে? ভেতরে কী করে এলে, এত সকালে? আর... আমাকে মুক্ত দেখে— হোয়াট ডু য়ু মিন?” অনেকগুলো প্রশ্ন একসঙ্গে ছুড়ে দিলেন সুইনবার্ন, হয়তো বা নিজেকে একটু সামলে নেওয়ার চেষ্টাতেই।
“আমি? কেন? এখানে?” আলাদা করে কেটে-কেটে তিনটে শব্দ উচ্চারণ করল দিতি, প্রশ্নের মতো করে, “আপনি জানেন না আমি কেন এখানে? আমাকে এখানে আসতে বলে খবর পাঠাননি আপনি নিজেই, গত বৃহস্পতিবার?”
“আমি? তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে দিতি? কবে মেসেজ পেয়েছ তুমি? কোন নম্বর থেকে?”
“দেয়ার ইউ গো, ক্যাথ।” দিতির নিজের কানেই ইস্পাতের মতো কঠিন শোনাল ওর গলা, “মেসেজ আর ফোন নম্বরের কথাই কেন মনে হল আপনার? আমি তো একবারও বলিনি, এটা কোনও মেসেজ’ই ছিল, আর মেসেজটা কোনও ফোন থেকেই এসেছিল? ই-মেইলও তো হতে পারত? কিন্তু না, ফোন নম্বরের কথা আপনার মনে হল, কারণ আপনি মেসেজটা পাঠিয়েছিলেন আপনার প্রাইভেট নম্বর থেকে, এবং সে-সিমকার্ড এতক্ষণে আপনি নষ্ট করে ফেলেছেন, যাতে করে কোনওভাবেই প্রমাণ করা না যায় যে আপনিই এখানে ডেকে পাঠিয়েছিলেন আমাকে। ব্যস— এইটুকুই জানার ছিল আমার, ক্যাথ সুইনবার্ন। ডক্টর স্নোপ, মিস্টার সেইমুর— আসুন, টেক চার্জ।”
এবারে একটিই অভিব্যক্তি ভেসে উঠল সুইনবার্নের মুখে। বিশুদ্ধ আতঙ্কের।
উপসংহার
পরদিন সকাল দশটা। সুইনবার্ন এবং য়ুরি আপাতত গ্রিক পুলিশের জিম্মায়, সঙ্গে রাতের শিফ্টের দু’জন রক্ষীও। ‘মিউজিয়াম অফ দ্য এক্সকাভেশনস ইন অলিম্পিয়া’-র কিউরেটরের অফিসের বাইরে বসে ছিল দিতি। ডক্টর স্নোপ ভেতরে আলোচনায় ব্যস্ত। আজ সকালেই ফিডিয়াসের উত্তরাধিকার তুলে দেওয়া হয়েছে তাঁর দেশবাসীর হাতে।
কিউরেটরের অফিসের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক মধ্যবয়স্কা ভদ্রমহিলা। পরনে জ্যাকেট আর লং স্কার্ট। কালচে-বাদামি চুল, চশমার পেছনে বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। পেছন-পেছন বেরিয়ে এলেন ডক্টর স্নোপ। আলাপ করিয়ে দিলেন দিতির সঙ্গে, “ডক্টর অ্যালেক্সান্দ্রা পাপাপুলোস, এই মিউজিয়ামের কিউরেটর।”
“কল মি অ্যালেক্স। গ্রেট জব। ডক্টর স্নোপ সব বলেছেন আমাকে। গ্রিস কৃতজ্ঞ থাকবে তোমার কাছে। এখন এসো, আমরা চাই তোমার হাত দিয়েই তোলা হোক এই রহস্যের শেষ পর্দা।”
ডক্টর পাপাপুলোসের ঘরের টেবলে দাঁড় করানো ছিল স্তম্ভটি। দিনের আলোয় আরও উজ্জ্বল। আর তার মাঝামাঝি জায়গায় রিলিফের কাজের মতো খোদাই করে তোলা রয়েছে একটি মানুষের মুখের ছবি, কাল রাতে যাকে মনে হয়েছিল গোল ফুলের নকশা। এ মুখ, গ্রিক প্রত্নতত্ত্বের সমস্ত ছাত্রের পরিচিত, এমন কি দিতিরও।
এথেনা পার্থেনসের শিল্ডের মাঝখানে এই আত্ম-প্রতিকৃতিই উৎকীর্ণ করে গিয়েছিলেন ফিডিয়াস।
কাঁপা হাতে ফিডিয়াসের প্রতিকৃতিটিকে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করল দিতি। অনড় রইলেন ফিডিয়াস।
আরেকবার, এবার সময়ের বিপরীত দিকে। এবারে ঘুরল প্রতিকৃতিটি। প্রথমে ধীরে-ধীরে, চব্বিশশো বছরের জাড্যকে একটু-একটু করে অতিক্রম করে— ক্রমে সহজ হয়ে এল তার গতি। তারপর, যেমন করে মেশিন থেকে খুলে আসে বোল্ট, তেমনি করে স্তম্ভের গা থেকে বিযুক্ত হয়ে এল প্রতিকৃতিটি।
এথেনা পার্থেনসের মূর্তির সম্বন্ধে ঠিক যেমনটি লিখে গেছিলেন সিসেরো বা প্লুটার্ক, যেন ফিডিয়াসের প্রতিকৃতিটি কোনও অদৃশ্য কলকব্জা হয়ে জুড়ে রেখেছিল গোটা স্তম্ভটিকে— সেটি বিযুক্ত হতেই সমগ্র স্তম্ভটি টুকরো-টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল টেবলের ওপর। শুধু তার ধাতব ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে রইল স্তম্ভের গর্ভে লুকিয়ে রাখা আদ্যন্ত সোনায় তৈরি একটি নিখুঁত মূর্তি। তাঁর মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত ধরে রেখেছে আগুনের শিখা।
প্রমিথিউস!
সারাটা জীবন রাষ্ট্রের দাবিতে নিজের শিল্পীসত্তাকে উৎসর্গ করেছিলেন ফিডিয়াস, অলিম্পিয়ান দেব-দেবীদের মূর্তি তৈরি করতে। কিন্তু তাঁর অন্তর জুড়ে ছিলেন টাইটান প্রমিথিউস। তাই, হয়তো চুরির কলঙ্ক নিজের মাথায় নিয়েও নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠতম শিল্পকীর্তিটি সৃষ্টি করে গিয়েছিলেন তিনি।
কে জানে, চুরি নয়, হয়তো এই ঈশ্বরদ্রোহেরই দাম দিয়েছিলেন ফিডিয়াস, এথেন্সের কারাগারে। সক্রেটিসের মতই, হেমলকের পাত্রে।
এ-সব প্রশ্নের উত্তর জানে না দিতি। শুধু জানে, মূর্তিটির দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় ফিট। প্রাচীন গ্রিসের হিসেবে, এক কিউবিট।
দিতি এও জানে, ছাব্বিশ কিলোর কাছাকাছিই ওজন হবে মূর্তিটির। প্রাচীন গ্রিসের হিসেবে, এক ট্যালেন্ট।
উত্তরকথন
‘ফিডিয়াসের ধাঁধা’ একটি ইতিহাসাশ্রিত কল্পনাকথন। গল্পের মূল ঐতিহাসিক চরিত্র, যেমন ফিডিয়াস, সক্রেটিস, জে়নোফন, প্লেটো, অ্যানাইটাস— এদের সময়কাল এবং পারস্পরিক অবস্থান, ইতিহাসে যেমন স্বীকৃত তেমনটিই দেখানোর চেষ্টা করেছি। গল্পের প্রয়োজনে ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসেছেন ভৌগোলিক পাউসনিয়াস, ভাস্কর পাইওনিয়াস, তাঁর তৈরি নাইকি-র স্ট্যাচু, এসেছেন রোমান বাগ্মী সিসেরো, ঐতিহাসিক প্লুটার্ক। বাস্তব চরিত্র ডক্টর ইভলিন হ্যারিসনও। এথেনা পার্থেনসের শিল্ড নিয়ে প্রামাণ্য কাজ রয়েছে ওঁর।
এই প্রসঙ্গে নাম করতে হয় স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ সেন্ট অ্যান্ড্রুস, স্কুল অফ ক্লাসিকসের ডক্টর রেবেকা সুইটম্যানের। তাঁর গবেষণা-প্রবন্ধ ‘দ্য ক্রিশ্চিয়ানাইজেশন অফ পেলোপনিস’ আমাকে বেশ কিছু তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে। ডক্টর সুইটম্যান নিজেও তাঁর বিপুল ব্যস্ততার মধ্যে থেকে সময় বের করে নিয়ে একাধিক ছোট-খাটো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমাকে অশেষ কৃতজ্ঞতাভাজন করেছেন।
ট্রায়ন, মূকভাষী গুপ্তচর গর্গিওস বা জাহাজী য়োনাস প্যারামিনোসের জন্ম আমার কল্পনায়, যদিও প্রাচীন স্পার্টায় ক্রিপ্টাইয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠান সত্যিই ছিল, যেখানে গুপ্তচরবৃত্তির প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। বুলগারিয়ার উপকূলে কৃষ্ণসাগরের নিচে খুঁজে পাওয়া জাহাজটি আদতেই একটি চব্বিশশো বছরের পুরোনো গ্রিক জাহাজ, এবং পৃথিবীর ইতিহাসের প্রাচীনতম জাহাজডুবির নিদর্শন।
শুধু সক্রেটিসের কারাগারে খোদাই করা ফিডিয়াসের ছড়াটি, নাইকি-র মূর্তির নিচে উৎকীর্ণ পাইওনিয়াসের পংক্তিটি, এবং প্রমিথিউসের মূর্তিটি আমার কল্পনাপ্রসূত।
আর হ্যাঁ, ফিডিয়াসের ওয়ার্কশপটি তৈরি হয়েছিল হুবহু জিউসের মূল মন্দিরের মাপেই।
_
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন