নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
আনন্দবাজার পত্রিকা যে বানান-বিধি অনুসরণের পক্ষপাতী, তা নিম্নে প্রদত্ত হল। যে-সব তৎসম শব্দের বানানে প্রায়ই ভুল ঘটে (কিংবা ঘটা কিছু বিচিত্র নয়), এবং অ-তৎসম অন্যান্য শ্রেণীর যে-সব শব্দের বানানে বিধিবহির্ভূত নানা বিচ্যুতি ঘটতে দেখা যায়, তার একটি তালিকাও আমরা প্রস্তুত করেছি। তালিকাবদ্ধ শব্দগুলি বর্ণানুক্রমিকভাবে সাজানো আছে। দেখলেই বোঝা যাবে, কোন শব্দের কোন বানান লেখা বিধিসম্মত হবে, এবং কোন বানান তা হবে না।
প্রায় প্রতিটি বর্ণের শব্দ-তালিকার শেষে দেওয়া হয়েছে সেই বর্ণ দিয়ে যার শুরু এমন একটি ক্রিয়াপদের বিভিন্ন রূপের দৃষ্টান্ত। এই রূপগুলি এমনভাবে নির্বাচন করা হয়েছে, যাতে বোঝা যায় ক্রিয়াপদের শেষে (বা সূচনায়) কোথায় ও-বর্ণ বসবে, আর কোথায় ও-কারযুক্ত বর্ণ।
(১) তৎসম শব্দ
যে-সব সংস্কৃত শব্দ অবিকৃত রূপে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয়, তাদেরই আমরা তৎসম শব্দ বলে থাকি। তিরিশের দশকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ পুস্তিকায় যেমন বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত অন্যান্য শব্দের তেমনই তৎসম শব্দের বানানেও কয়েকটি পরিবর্তন সাধনের সুপারিশ করা হয়। যথা
(ক) ‘রেফের পরে ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হইবে না।’ (দৃষ্টান্ত: ‘অর্জ্জন’ নয়, ‘অর্জন’; ‘কাৰ্য্য’ নয়, ‘কার্য’; ‘পূৰ্ব্ব’ নয়, ‘পূর্ব’; ‘বর্জ্জন’ নয়, ‘বর্জন’।)
(খ) শব্দের অন্তে অবস্থিত বিসর্গ বর্জনীয়।১ (দৃষ্টান্ত: ‘অন্ততঃ’ নয়, ‘অন্তত’; ‘অহরহঃ’ নয়, ‘অহরহ’; ‘ইতস্ততঃ’ নয়, ‘ইতস্তত’; ‘ক্রমশঃ’ নয়, ‘ক্রমশ’; ‘সদ্যঃ’ নয়, ‘সদ্য’।)
তৎসম শব্দের বানানের ব্যাপারে এই সুপারিশ আমরা মান্য করব। তা ছাড়া
(গ) যেমন বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত অন্যান্য শব্দের ক্ষেত্রে, তেমনই তৎসম শব্দের ক্ষেত্রেও বর্জন করব শব্দের অন্তে অবস্থিত হস্চিহ্ন।২ (দৃষ্টান্ত: ‘দিক্’ নয়, ‘দিক’; ‘ধনবান্’ নয়, ‘ধনবান’; ‘বাক্’ নয়, ‘বাক’; ‘বুদ্ধিমান্’ নয়, ‘বুদ্ধিমান’।)
(ঘ) তৎসম শব্দের বানানে যে-সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ ও হ্রস্ব দুই স্বরই শুদ্ধ বলে গণ্য হয়, সে-সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ স্বর বর্জন করে একমাত্র হ্রস্ব স্বরই আমরা গ্রহণ করব। অর্থাৎ সে-সব ক্ষেত্রে ‘ঈ’ স্থলে ‘ই’ এবং ‘ঈ-কার’ স্থলে ‘ই-কার’, সেই সঙ্গে ‘ঊ’ স্থলে ‘উ’ এবং ‘ঊ-কার’ স্থলে ‘উ-কার’ ব্যবহার করব আমরা। (দৃষ্টান্ত: ‘ভঙ্গী’ নয়, ‘ভঙ্গি’; ‘সূচী’ নয়, ‘সূচি’; ‘ঊর্বর’ নয়, ‘উর্বর’; ‘ঊষা’ নয়, ‘উষা’। ফলত ‘প্রত্যূষ’ নয়, ‘প্রত্যুষ’; ‘প্রাগূষা’ নয়, ‘প্রাগুষা’।)
(২) অন্যান্য শব্দ
বাংলা ভাষায় যেমন তৎসম শব্দ আছে, তেমনই আছে আরও পাঁচ শ্রেণীর শব্দ। এগুলি হল তদ্ভব, অর্ধতৎসম, স্থানীয়, দেশের অন্যান্য ভাষা থেকে আহৃত ও বিদেশি শব্দ। শেষোক্ত এই পাঁচ শ্রেণীর শব্দকে আমরা—সাধারণভাবে—অতৎসম শব্দ বলতে পারি। অতৎসম শব্দগুলির ক্ষেত্রে যে-চারটি সাধারণ নিয়ম আমরা পালন করব, তা এই যে, এদের কোনওটির বানানেই আমরা
(ক) দীর্ঘস্বর ‘ঈ/ঊ’ অথবা তাদের প্রতীক-চিহ্ন ‘ঈ-কার/ঊ-কার’ ব্যবহার করব না।৩
(খ) ‘ঋ’ বর্ণ অথবা তার প্রতীক-চিহ্ন ‘ঋ-কার’ ব্যবহার করব না। (দৃষ্টান্ত: ‘কৃমিয়া’ নয়, ‘ক্রিমিয়া’; ‘বৃটেন’ নয়, ‘ব্রিটেন’।)
(গ) ‘মূর্ধন্য ণ’ ব্যবহার করব না। (এমন কী, ‘র’, ‘র-ফলা’, ‘রেফ’ অথবা ‘মূর্ধন্য ষ’-এর পরে এলেও ‘মূর্ধন্য ণ’-এর পরিবর্তে আমরা ‘দন্ত্য ন’ ব্যবহার করব। দৃষ্টান্ত: ‘দরুণ’ নয়, ‘দরুন’; ‘ট্রেণ’ নয়, ‘ট্রেন’; ‘চার্ণক’ নয়, ‘চার্নক’; ‘কিষেণচাঁদ’ নয়, ‘কিষেনচাঁদ’।)
(ঘ) ‘ৎ’ বর্ণটি ব্যবহার করব না।
(৩) পূর্বোক্ত পাঁচ শ্রেণীর অতৎসম শব্দের মধ্যে যেগুলি বিদেশি শব্দ, তাদের বানানে আরও যে-দুটি বর্ণ আমরা বর্জন করব, তা হল ‘অন্তঃস্থ য’৪ ও ‘মূর্ধন্য ষ’।
(৪) অন্য চার শ্রেণীর অতৎসম (অর্থাৎ তদ্ভব, অর্ধতৎসম, স্থানীয়, এবং দেশের অন্যান্য ভাষা থেকে আহৃত) শব্দের বানানে ‘অন্তঃস্থ য’ ও ‘মূর্ধন্য ষ’কে সর্বৈব বর্জন করা এখনই সম্ভব নয়। (দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, আমাদের উচ্চারণ যা-ই হোক, ‘যখন’ ‘কেষ্ট’ ও ‘বিষ্টু’ই আমরা লিখব, ‘জখন’ ‘কেশটো’ ও ‘বিশটু’ লিখব না।)
(৫) কিন্তু এই চার শ্রেণীর কয়েকটি শব্দের বানানে ‘অন্তঃস্থ য’-এর পাশাপাশি ‘বর্গীয় জ’ও যে দিব্য চলছে, সেটাও লক্ষণীয়। (দৃষ্টান্ত: ‘যুঁই’ ও ‘জুঁই’, ‘যোগাড়’ ও ‘জোগাড়’, ‘যাদু’ ও ‘জাদু’, ‘যাঁতা’ ও ‘জাঁতা’।)
এই সব ক্ষেত্রে একমাত্র ‘বর্গীয় জ’ই আমাদের গ্রাহ্য হবে।
(৬) ক্রিয়াপদ ব্যবহারের সময় যে সাধারণ নিয়ম আমরা পালন করব, তা এই যে, বাক্যে যাকে ‘তুমি’ বা যাদের ‘তোমরা’ বলা হচ্ছে, তার বা তাদের বেলায় মাত্র তিনটি ক্ষেত্রে ক্রিয়াপদের শেষে ‘ও’ অথবা ‘ও-কার’ বসবে। ক্ষেত্র তিনটি হল (ক) নিত্য-বর্তমান, (খ) বর্তমানকালে পালনীয় অনুজ্ঞা (বা অনুরোধ) এবং (গ) ভবিষ্যৎকালে পালনীয় অনুজ্ঞা (বা অনুরোধ)। অন্য কোথাও ক্রিয়াপদের শেষে ‘ও’ বর্ণ অথবা ‘ও-কার’ বসবে না।
(৭) নিত্য-বর্তমান
এ ক্ষেত্রে ক্রিয়াপদের শেষে ‘ও-কার’ যোগের দৃষ্টান্ত; ‘তোমরা যা করো, তা ভাল কাজ।’
(৮) বর্তমানকালে পালনীয় অনুজ্ঞার (বা অনুরোধের) ক্ষেত্রে ক্রিয়াপদের শেষে ‘ও’ বর্ণ যোগের দৃষ্টান্ত: ‘খাও’, ‘গাও’, ‘চাও’, ‘দাও’, ‘নাও’। (একটা কথা এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া ভাল। সেটা এই যে, নিত্য-বর্তমানের ক্ষেত্রেও এই সব ক্রিয়াপদ এই একই রূপে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দৃষ্টান্ত: তুমি যে গান গাও, তা আমি জানি।)
(৯) বর্তমানকালে পালনীয় অনুজ্ঞার (বা অনুরোধের) ক্ষেত্রে ক্রিয়াপদের শেষে ‘ও-কার’ যোগের দৃষ্টান্ত: ‘মন দিয়ে কাজ করো।’
(১০) ভবিষ্যৎকালে পালনীয় অনুজ্ঞার (বা অনুরোধের) ক্ষেত্রে ক্রিয়াপদের শেষে যেমন ‘ও-কার’ বসবে, তেমনই বসবে ক্রিয়াপদের প্রথমেও দৃষ্টান্ত: ‘এখন যদি কাজটা করবার সময় না পাও, তবে পরে কখনও কোরো।’
(১১) ভবিষ্যৎকালে পালনীয় অনুজ্ঞার (বা অনুরোধের) ক্ষেত্রে কয়েকটি ক্রিয়াপদের রূপ অবশ্য পূর্বোক্ত পদ্ধতিতে পালটাবে না। যথা:
(ক) ‘ওঠা’, ‘ছোটা’, ‘জোটা’ ইত্যাদি। এদের ক্ষেত্রে শেষ বর্ণটি ‘ও-কার’যুক্ত হবে বটে, কিন্তু প্রথম বর্ণ ‘ও’ অথবা প্রথম বর্ণের ‘ও-কার’ হয়ে যাবে যথাক্রমে ‘উ’ অথবা ‘উ-কার’। দৃষ্টান্ত: ‘উঠো’, ‘ছুটো’, ‘জুটো’।
(খ) ‘খাওয়া’, ‘গাওয়া’, ‘চাওয়া’ ইত্যাদি। এদের ক্ষেত্রে শেষ বর্ণটি ‘ও-কার’যুক্ত হবে বটে, কিন্তু প্রথম বর্ণের ‘আ-কার’ হয়ে যাবে। ‘এ-কার’। সেইসঙ্গে লুপ্ত হবে দ্বিতীয় বর্ণ ‘ও’। দৃষ্টান্ত: ‘খেয়ো’, ‘গেয়ো’, ‘চেয়ো’।৫ (‘খেও’, ‘গেও’ কিংবা ‘চেও’ নয়।)
(গ) ‘দেওয়া’, ‘নেওয়া’। নিত্য-বর্তমানে ও বর্তমানকালে পালনীয় অনুজ্ঞার (বা অনুরোধের) ক্ষেত্রে এদের রূপ: ‘দাও’, ‘নাও’। ভবিষ্যৎকালে পালনীয় অনুজ্ঞার (বা অনুরোধের) বেলায় এদের শেষ বর্ণটি ‘ও-কার’যুক্ত হবে এবং প্রথম বর্ণের ‘এ-কার’ হয়ে যাবে ‘ই-কার’। সেই সঙ্গে লুপ্ত হবে দ্বিতীয় বর্ণ ‘ও’। ফলত এদের চেহারা সে-ক্ষেত্রে হবে: ‘দিয়ো’, ‘নিয়ো’। (‘দিও’ কিংবা ‘নিও’ নয়।)
(ঘ) ‘লেখা’, ‘শেখা’ ইত্যাদি। এদের ক্ষেত্রেও শেষ বর্ণ ‘ও-কার’যুক্ত হবে, এবং প্রথম বর্ণের ‘এ-কার’ হয়ে যাবে ‘ই-কার’। অর্থাৎ এদের চেহারা দাঁড়াবে: ‘লিখো’, ‘শিখো’।
(১২) ক্রিয়াপদের অতীত-রূপে এবং (কোনও অনুজ্ঞা/অনুরোধের ব্যাপার না থাকলে) ভবিষ্যৎ-রূপে আমরা ‘ও-কার’ যোগ করব না। (দৃষ্টান্ত: ‘কোরেছিলো’ কিংবা ‘কোরেছিল’ কিংবা ‘করেছিলো’ নয়, ‘করেছিল’। তেমনই, ‘কোরবো’ কিংবা ‘কোরব’ কিংবা ‘করবো’ নয়, ‘করব’।)
(১৩) ‘কি’ ও ‘কী’র দ্যোতনা পৃথক, প্রয়োগক্ষেত্রও পৃথক। দুই বানানই অতএব আমরা রক্ষা করব। দুই বানানের কোনটি কোথায় করণীয়, সেটা অবশ্য পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া চাই।৬
(১৪) আমরা ‘কোনো’ ‘আরো’ ‘আজো’ না লিখে ‘কোনও’ ‘আরও’ ‘আজও’ লিখব। সেই রকম ‘এখনো’ ‘কখনো’ ‘তখনো’ না লিখে ‘এখনও’ ‘কখনও’ ‘তখনও’ লিখব।
(১৫) ‘এছাড়া’ ‘তাছাড়া’ ‘তাহলে’ ‘যাহলে’ না লিখে আলাদা করে লিখব ‘এ ছাড়া’ ‘তা ছাড়া’ ‘তা হলে’ ‘যা হলে’।৭
(১৬) ‘চলেনা’ ‘বলেনা’ ‘চলিনা’ ‘বলিনা’ না লিখে আলাদা করে লিখব ‘চলে না’ ‘বলে না’ ‘চলি না’ ‘বলি না’।৮,৯ কিন্তু
(১৭) ‘নাই’-এর সংক্ষেপিত রূপ ‘নি’কে আলাদা করে লিখব না। তাকে জুড়ে দেব পূর্ববর্তী শব্দের সঙ্গে। অর্থাৎ ‘চলি নি’ ‘বলি নি’ না লিখে লিখব ‘চলিনি’ ‘বলিনি’।৯
(১৮) আনান/আনানো; করান/করানো; বলান/বলানো
যে তিন জোড়া শব্দ এখানে দেখানো হল, তাদের প্রতিটির ক্ষেত্রেই প্রথম শব্দের শেষ বর্ণে ‘ও-কার’ নেই, দ্বিতীয় শব্দের শেষ বর্ণে আছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বানান যেমন একরকম নয়, অর্থও তেমন আলাদা। ‘ও-কার’বিহীন অবস্থায় এই শব্দগুলি (এবং এই রকম আরও অনেক শব্দ) ক্রিয়াপদ হিসাবে ব্যবহৃত হয়; আর ‘ও-কার’যুক্ত অবস্থায় ব্যবহৃত হয় বিশেষ্য অথবা বিশেষণ হিসাবে।
‘আনান’; ‘করান’; ‘বলান’। ক্রিয়াপদ হিসাবে ব্যবহৃত এই শব্দগুলির অর্থ যথাক্রমে ‘আনিয়ে নেন’, ‘আনিয়েছিলেন’ বা ‘আনিয়ে নিন’; ‘করিয়ে নেন’, ‘করিয়েছিলেন’ বা ‘করিয়ে নিন’; এবং ‘বলিয়ে নেন’, ‘বলিয়েছিলেন’ বা ‘বলিয়ে নিন’।
‘আনানো’; ‘করানো’; ‘বলানো’। বিশেষ্য হিসাবে ব্যবহৃত এই শব্দগুলির অর্থ যথাক্রমে ‘আনিয়ে নেওয়া’; ‘করিয়ে নেওয়া’; ‘বলিয়ে নেওয়া’। নানা সময়ে বিশেষণ হিসাবেও এই শব্দগুলি (এবং এই রকমের আরও অনেক শব্দ) ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তখন, যথাক্রমে, এদের অর্থ দাঁড়ায়: ‘আনিয়ে নেওয়া হয়েছে এমন’ (আনানো জিনিস); ‘করিয়ে নেওয়া হয়েছে এমন’ (করানো কাজ); ‘বলিয়ে নেওয়া হয়েছে এমন’ (বলানো কথা)।
সংক্ষেপে বলি, যখন ক্রিয়াপদ হিসাবে ব্যবহৃত হয়, এই ধরনের শব্দের শেষ বর্ণে তখন ‘ও-কার’ হয় না, কেউ তা দেনও না। কিন্তু বিশেষ্য বা বিশেষণ হিসাবে যখন ব্যবহৃত হয়, ক্রিয়াপদের সঙ্গে পার্থক্য রক্ষা করবার জন্য এই ধরনের শব্দের শেষ বর্ণে তখন আমরা ‘ও-কার’ যোগ করব।
(১৯) দাঁড়িয়েছিল/দাঁড়িয়ে ছিল; বসেছিল/বসে ছিল; শুয়েছিল/শুয়ে ছিল কেন যে কোথাও ‘দাঁড়িয়েছিল’ ‘বসেছিল’ ‘শুয়েছিল’ লেখা হয়, আবার কোথাও বা আলাদা করে লেখা হয় ‘দাঁড়িয়ে ছিল’ ‘বসে ছিল’ ‘শুয়ে ছিল’, তা বোঝা কঠিন নয়।
‘দাঁড়িয়েছিল’ ‘বসেছিল’ বা ‘শুয়েছিল’ লিখলে নিত্য অতীত বা সাধারণ অতীতকালের কথা বোঝানো হয়। (এই শব্দ তিনটি হল ইংরেজির stood, sat ও lay.)
অন্য দিকে, আলাদা করে ‘দাঁড়িয়ে ছিল’ ‘বসে ছিল’ বা ‘শুয়ে ছিল’ লিখলে বোঝানো হয় ঘটমান অতীতকালের কথা। (ইংরেজিতে এরা (i) was standing, had been standing, remained standing, (ii) was sitting, had been sitting, remained sitting, (iii) was lying, had been lying, remained lying.)
(২০) তাই/তা-ই
অর্থ যখন ‘সুতরাং’ বা ‘সেই জন্য’ বা ‘সেই হেতু’ বা ‘সেই কারণে’ বা ‘অতএব’, তখন আমরা ‘তাই’ লিখব। (দৃষ্টান্ত: ‘মেঘ নেই, তাই বৃষ্টির আশাও নেই।’) অন্য দিকে, শব্দটা যখন ‘তাহাই’-এর সংক্ষেপিত রূপ, তখন আমরা ‘তা-ই’ লিখব। (দৃষ্টান্ত: ‘যা পাওয়া শক্ত, তা-ই সে চেয়ে বসে।’)
(২১) কিনা/কি না
(ক) ‘কিনা’ অনেক ক্ষেত্রেই কথার মাত্রা বা লব্জ। (দৃষ্টান্ত: ‘বোঝো ব্যাপার, বামন হয়ে কিনা চাঁদ ধরতে চায়!’)
(খ) ‘যেহেতু’ অর্থেও ‘কিনা’র ব্যবহার আছে। (দৃষ্টান্ত: ‘তিনি কিনা বড্ডই ভালমানুষ, তাই সাতে-পাঁচে থাকেন না।’)
এই দুই প্রকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা ‘কিনা’ লিখব।
(গ) অর্থ যখন ‘কিংবা নয়’, ‘কিংবা না’, ‘কিংবা নাই’, তখন বুঝতে হবে যে, ‘কি’ আসলে ‘কিংবা’র সংক্ষেপিত রূপ। (দৃষ্টান্ত: ‘মানুষটি ভাল কি না, তা বোঝা শক্ত।’ বিশ্লিষ্ট অবস্থায় এই বাক্যের রূপ হবে: ‘মানুষটি ভাল কিংবা ভাল নয়, তা বোঝা শক্ত।’ অর্থাৎ ‘কি না’ এখানে ‘কিংবা নয়’। ঠিক তেমনই ‘তুমি যাবে কি না, তা জানাওনি’—এই বাক্যের বিশ্লিষ্ট রূপ: ‘তুমি যাবে কিংবা যাবে না, তা জানাওনি।’ অর্থাৎ ‘কি না’ এখানে ‘কিংবা না’। তৃতীয় দৃষ্টান্ত: ‘তুমি খেয়েছ কি না, তা বলোনি’। বিশ্লিষ্ট অবস্থায় এই বাক্যের রূপ হবে: ‘তুমি খেয়েছ কিংবা খাওনি (খাও নাই) তা বলোনি।’ অর্থাৎ ‘কি না’ এখানে ‘কিংবা নাই’।)
এই সব ক্ষেত্রে আমরা আলাদা করে লিখব ‘কি না’।১০
(২২) ডাব্ল প্লুরাল
কোনও কোনও ভাষায় সংখ্যা অনুযায়ী বিশেষ্যপদের বচন পালটে যায়। (সেই সঙ্গে পালটায় ক্রিয়াপদও।) দৃষ্টান্ত হিসাবে সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষার নাম করা যেতে পারে। সংখ্যাটা ১ হলে প্রথমায় যা ‘নরঃ’, ২ হলে তা ‘নরৌ’, আবার ২-এর বেশি হলে তা-ই ‘নরাঃ’ হয়ে যায়। ইংরেজিতে দ্বিবচনের ঝামেলা নেই, আছে শুধুই একবচন ও বহুবচন। সিঙ্গুলার ও প্লুরাল। সংখ্যাটা ১ হলে ‘man’, ১-এর বেশি হলেই ‘men’।
বাংলায় কিন্তু সংখ্যা যা-ই হোক, সেই অনুযায়ী বিশেষ্যপদের বচন পালটাবার দরকার হয় না। সেটা রীতিও নয়। তাই ১-এর ক্ষেত্রে যা ‘মানুষ’, সংখ্যাটা ১-এর বেশি হলেও তা ‘মানুষ’ই থেকে যায়, ‘দুটি মানুষেরা’ বা ‘তিনটি মানুষেরা’ লিখবার দরকার হয় না বাংলা ভাষায়। এ-ভাষায় যেমন ‘একটি মানুষ’, তেমনই ‘দুটি মানুষ’ ‘তিনটি মানুষ’ বা ‘অনেক মানুষ’ লেখাই রীতি।
এই রীতি মান্য করা উচিত। কখনও লেখা উচিত নয় ‘সংসদের বহু। (বা অনেক) সদস্যরাই বিলটির বিরোধী’, বা ‘অন্যান্য (বা বিভিন্ন) বিষয়গুলিতে বক্তারা একমত হন’, বা ‘সব (বা সমস্ত) নদীগুলিতেই জলস্ফীতি দেখা দিয়েছে’, বা ‘কতিপয় (বা কিছু/কয়েকজন/কয়েকটি) লোকেরা হাঙ্গামা বাধায়’।
(২৩) এক/বেলা/খেলা/চেলা/গেছে
এই পাঁচটি শব্দের (এবং এই রকম আরও অনেক তৎসম/অতৎসম শব্দের) গোড়ায় রয়েছে ‘অ্যা’ ধ্বনি। বলা বাহুল্য, উচ্চারণ আমরা যে যা-ই করি না কেন, তৎসম শব্দের বানান পালটাবার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। সুতরাং আমরা ‘এক’ ও ‘বেলা’ই লিখব, মুখে যদিও বলব ‘অ্যাক’ ও (দিনের অংশ বোঝাতে হলে) ‘ব্যালা’। ‘খেলা’ ‘চেলা’ ‘গেছে’ ‘হেলা’ ‘ফেলা’ ইত্যাদি বানানও এত বেশি প্রচলিত যে, এদের পরিবর্তন করা উচিত হবে না।
(২৪) স্যাঁতস্যাঁত, ল্যাগব্যাগ, ক্যাঁটক্যাঁট, প্যাচপ্যাচ
এই সব শব্দ (এবং এই ধরনের অন্যান্য শব্দ) থেকে যখন আমরা বিশেষণ বানাই, তখন এদের প্রথম ‘অ্যা’ ধ্বনির কোনও বিকার ঘটে না, কিন্তু দ্বিতীয় ‘অ্যা’ ধ্বনি ‘এ’ হয়ে যায় (সেই সঙ্গে শেষ বর্ণটিও হয়ে যায় ‘এ-কার’ যুক্ত)। অর্থাৎ আমরা লিখি ও বলি ‘স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া’, ‘ল্যাগবেগে শরীর’, ‘ক্যাঁটকেঁটে রং’, ‘প্যাচপেচে কাদা’। বিশেষণের এই যে রূপ, এটাই আমাদের গ্রাহ্য হবে। আমরা স্যাঁতস্যাঁতে ‘ল্যাগব্যাগে’ ‘ক্যাঁটক্যাঁটে’ বা ‘প্যাচপ্যাচে’ লিখব না।
(২৫) জন্য/জন্যে; দেওয়া/দেয়া; নিকাশ/নিকেশ; নেওয়া/নেয়া; মধ্য দিয়ে/মধ্যে দিয়ে; সন্ধ্যা/সন্ধে; হিসাব/হিসেব;
অনেক শব্দেরই দুই রূপের সঙ্গে আমরা পরিচিত। দুই রূপের কোনওটাই ত্যাজ্য নয়, তবে কোথায় কোন রূপ গ্রাহ্য, সে-বিষয়ে একটা সুস্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার। আমরা যে-নিয়ম পালন করব, তা এই:
আমরা লেখ্য ভাষা ও কথ্য ভাষার পার্থক্য মেনে চলব। প্রতিবেদনে, অন্যান্য সংবাদে, সম্পাদকীয় নিবন্ধে, অন্যান্য নিবন্ধে ও আমাদের পত্রিকায় প্রকাশিত চিঠিপত্রে আমরা গ্রহণ করব এই সব শব্দের (ও এই ধরনের অন্যান্য শব্দের) লেখ্য রূপটিকেই (‘জন্য’, ‘দেওয়া’, ‘নিকাশ’, ‘নেওয়া’, ‘মধ্য দিয়ে’, ‘সন্ধ্যা’, ‘হিসাব’)। কথ্য রূপগুলি (‘জন্যে’, ‘দেয়া’, ‘নিকেশ’, ‘নেয়া’, ‘মধ্যে দিয়ে’, ‘সন্ধে’, ‘হিসেব’) একমাত্র সংলাপে কি প্রবাদবাক্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে, অন্যত্র নয়। কারও মন্তব্য সম্পূর্ণভাবে বা অংশত উদ্ধৃত করার প্রয়োজনে যদি এই সব শব্দের (বা এই ধরনের অন্যান্য শব্দের) কথ্য রূপ ব্যবহার করতে হয়, তবে সে ক্ষেত্রে আমরা উদ্ধৃতিচিহ্ন ব্যবহার করব।
(২৬) সংস্কৃত ‘ঈয়’ (স্ত্রীলিঙ্গে ‘ঈয়া’) প্রত্যয়ের বিকল্প নেই। সুতরাং যেমন ‘জাতীয়’ ‘দেশীয়’ বা ‘ভারতীয়’ লিখি, অতৎসম শব্দের ক্ষেত্রেও তেমনই ‘ঈ-কার’ চাই। (দৃষ্টান্ত: ‘এশীয়’ ‘অস্ট্রেলীয়’ ‘ইউরোপীয়’। তবে, ‘ইউরোপ’ থেকে যে-ভাবে ‘ইউরোপীয়’ শব্দটিকে পাওয়া যায়, ‘অস্ট্রেলিয়া’ ‘এশিয়া’ ইত্যাদি শব্দ থেকে সে-ভাবে ‘অস্ট্রেলীয়’ ‘এশীয়’ ইত্যাদি শব্দ পাওয়া যায় না। তা না-ই যাক, এ-সব শব্দের এই রূপই চলিত ও গ্রাহ্য।)
(২৭) বাংলায় অবশ্য ‘ইয়া’ প্রত্যয় রয়েছে। তাই স্বচ্ছন্দে আমরা ‘অসমিয়া’ ‘ওড়িয়া’ ‘পাহাড়িয়া’ ইত্যাদি লিখে থাকি। ভবিষ্যতেও এ সব শব্দ আমরা ‘ই-কার’ যোগেই লিখব, ‘ঈ-কার’ ব্যবহার করব না।
(২৮) প্রতিবর্ণীকরণ বা লিপ্যন্তর
(ক) বাংলা লিপিতে যখন ইংরেজি শব্দ লেখা হবে, তখন প্রতিবর্ণীকরণে আমরা মূলের উচ্চারণ যথাসম্ভব রক্ষা করতে যত্নবান হব।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ পুস্তিকায় (সম্ভবত ইংরেজি শব্দের কথা মনে রেখেই) বলা হয়েছিল, “বিদেশী শব্দে মূল উচ্চারণ অনুসারে s স্থানে স sh স্থানে শ হইবে।” এখানে ‘মূল উচ্চারণ অনুসারে’ বাক্যাংশটি প্রণিধানযোগ্য। কেননা, মূল উচ্চারণ অনুসারে কয়েকটি ক্ষেত্রে s স্থানে স হয় না, শ হয় (দৃষ্টান্ত: sugar, sure)। sh অবশ্য সর্বত্রই শ। আবার ss স্থানে অনেক ক্ষেত্রে স হয় বটে, কিন্তু কয়েকটি ক্ষেত্রে হয় না। (দৃষ্টান্ত: pressure। এখানে ss স্থানে শ হবে।) ch নিয়েও বিভ্রম ঘটে। কেননা, ch কখনও ক (দৃষ্টান্ত: chameleon, chemical), কখনও চ (দৃষ্টান্ত: chance, much), কখনও শ (দৃষ্টান্ত: chivalry, machine)।
ইংরেজি শব্দকে বাংলায় লিপ্যন্তরিত করবার সময়ে আর-একটি কথা আমাদের মনে রাখা দরকার। আমরা ‘এটর্নি’ ‘এডভোকেট’ ‘এফিডেভিট’ ‘এভিনিউ’ ইত্যাদি বানান লিখব না। শুধু তা-ই নয়, আমরা মনে রাখব যে, ‘এ্যাডভোকেট’ ‘এ্যাটর্নি’, ‘এ্যাফিডেভিট’ ‘এ্যাভিনিউ’ ইত্যাদি বানানও লেখা চলে না, কেননা ‘এ’ বর্ণের সঙ্গে ‘য-ফলা আ-কার’ লাগানোটা নিয়মবিরুদ্ধ ব্যাপার। বস্তুত (‘অ্যা’ ধ্বনির প্রতীক হিসাবে পৃথক কোনও স্বরবর্ণ এবং কার-এর ব্যবস্থা যত দিন পর্যন্ত না হচ্ছে। এই সব বিদেশি শব্দের গোড়ার দিকের ‘অ্যা’ ধ্বনিকে ধরবার জন্য যে ‘য-ফলা আ-কার’ লাগানো দরকার, একমাত্র ‘অ’-এর সঙ্গেই তা লাগানো সম্ভব। সুতরাং আমরা ‘অ্যাটর্নি’ ‘অ্যাডভোকেট’ ‘অ্যাফিডেভিট’ ‘অ্যাভিনিউ’ ইত্যাদি বানান লিখব।১১
যে-সব ইংরেজি শব্দ কিছুটা বিকৃত চেহারায় আমাদের শব্দভাণ্ডারের অঙ্গীভূত হয়ে গিয়েছে, সেগুলিকে অবশ্য সেই চেহারাতেই রক্ষা করা ভাল। যথা ‘ইঞ্চি’ ‘গেলাশ’ ‘টেবিল’ ইত্যাদি।
(খ) ইংরেজি ভাষার সঙ্গে আমাদের যতটা যোগ-সম্পর্ক রয়েছে, অ-ভারতীয় অন্যান্য অনেক ভাষার সঙ্গেই তা নেই। (যথা রুশ, জার্মন, ফরাসি, পোর্তুগিজ, স্পেনীয়, ইতালীয়, চিনা, জাপানি ইত্যাদি।) ফলে, বিভিন্ন দেশের স্থান-নাম ও ব্যক্তি-নামের প্রতিবর্ণীকরণ নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের নীতি এই হবে যে, ইংরেজি ভাষায় সে-সব নামের যে-উচ্চারণ আমরা পাই, বাংলায় প্রতিবর্ণীকরণের সময়েও সেই উচ্চারণই আমরা অনুসরণ করব।
(গ) অ-বাংলা উত্তর-ভারতীয় স্থান-নাম ও ব্যক্তি-নামের প্রতিবর্ণীকরণ হওয়া উচিত নাগরি লিপিতে সে-সব নাম যে-ভাবে লিখিত হয়, সেই অনুযায়ী। এই নীতি অনুযায়ী প্রতিবর্ণীকরণের কাজ যে এখনই সর্বত্র সম্ভব হবে, তা নয়। ব্যক্তি-নাম নিয়ে অসুবিধার আশঙ্কা নেই। তবে স্থান-নাম নিয়ে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। অন্তত সে-ক্ষেত্রে তাই ‘ধীরে চলো’ নীতিই বাঞ্ছনীয়; অর্থাৎ একই সঙ্গে না করে এ-কাজ পর্যায়ক্রমে করা ভাল।
(ঘ) দক্ষিণ-ভারতীয় স্থান-নাম ও ব্যক্তি-নামের প্রতিবর্ণীকরণের সময় অল্পবিস্তর অসুবিধা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক; সে-ক্ষেত্রে সমস্যার নিরাকরণের জন্য দক্ষিণ-ভারতীয় সহকর্মীদের সাহায্য গ্রহণ সংগত হবে।
(২৯) বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত নানা আরবি ও ফারসি শব্দের বানানে কোথাও আমরা ‘শ’ ব্যবহার করি, কোথাও ‘স’। এই দুটি উষ্মবর্ণের কোনটি কোথায় ব্যবহার করা উচিত, তা নির্ণয় করবার ব্যাপারে আমরা নির্ভরযোগ্য অভিধানের সাহায্য গ্রহণ করব।
(৩০) ‘ঙ’ ও ‘ং’
অনেকে ‘দার্জিলিঙ লেখেন, ‘কালিম্পঙ’ লেখেন। ‘দার্জিলিং’ ও ‘কালিম্পং’ লেখেন না। যুক্তি এই হতে পারে যে, ‘দার্জিলিংয়ের’ ও ‘কালিম্পংয়ের’ তুলনায় ‘দার্জিলিঙের’ ও ‘কালিম্পঙের’ লিখতে জায়গা লাগে কম। কিন্তু তা হলে তাঁরা ‘ঘিসিং’ ও ‘ক্যানিং’ লেখেন কেন? সম্বন্ধে ষষ্ঠী বিভক্তি-যোগের দরকার তো হয় এদের (এবং এই ধরনের আরও নানা শব্দের) ক্ষেত্রেও। তখন কেন জায়গার প্রশ্ন ওঠে না?
অন্য দিকে বিবেচ্য, ‘দার্জিলিং’ ও ‘কালিম্পং’ লিখলেই যে ষষ্ঠী বিভক্তি-যোগে ‘দার্জিলিঙের’ ও ‘কালিম্পঙের’ লেখা যাবে না, তাও নয়। বস্তুত, আমরা ‘রঙ’ ‘ঢঙ’ বা ‘ব্যাঙ’ না লিখে ‘রং’ ‘ঢং’ বা ‘ব্যাং’ তো লিখতেই পারি, এবং লিখেও থাকি। সে-ক্ষেত্রে ষষ্ঠী বিভক্তি যোগ করলে লিখি ‘রঙের’ ‘ঢঙের’ ‘ব্যাঙের’।
অনুস্বরের অসুবিধা এই যে, তাতে ‘কার’ যোগ করা যায় না। ‘ঙ’ বর্ণে সে-ক্ষেত্রে অনায়াসেই ‘কার’ যোগ করতে পারি। (দৃষ্টান্ত: ‘বাঙাল’, ‘রঙিন’, ‘আঙুল’।)
মনে হয়, অতৎসম বিশেষ্যপদে যথাসম্ভব ঙ স্থলে ং লেখাই বাঞ্ছনীয়। বিভক্তির প্রয়োজনে ‘কার’ যোগ করতে হলে আমরা ং স্থলে ঙ বসাব।

১. বর্জিত হওয়া সত্ত্বেও অন্ত-বিসর্গের কথাটা কিন্তু মনে রাখা দরকার। নইলে সন্ধির সময়ে বিভ্রাট ঘটবার আশঙ্কা। আমরা ‘দিবস’ অর্থে ‘অহঃ’ না লিখে ‘অহ’ লিখি (যথা ‘পুণ্যাহ’)। কিন্তু ‘প্রতিদিবস’ বা ‘প্রতিনিয়ত’ অর্থে ‘অহ+অহ=অহাহ’ লিখতে পারি না, লিখতে হয় ‘অহরহ’। অর্থাৎ দ্বিতীয় ‘অহঃ’ থেকে বিসর্গ বর্জন করলেও প্রথমটির অন্তে অবস্থিত বিসর্গের কথা ভোলা চলে না, তাকে হিসাবের মধ্যে রেখে সন্ধি করতে হয়। ঠিক তেমনই ‘মনঃ’ না লিখে ‘মন’ এবং ‘সদ্যঃ’ না লিখে ‘সদ্য’ লিখি বটে, কিন্তু ‘মনকামনা’ এবং ‘সদ্যজাত’ না লিখে আমাদের লিখতে হয় ‘মনস্কামনা’ এবং ‘সদ্যোজাত’। সেও ওই বিসর্গের কারণেই।
২. বর্জিত হওয়া সত্ত্বেও, অন্তে অবস্থিত বিসর্গের মতোই, অন্তে অবস্থিত হস্চিহ্নের কথাটাও মনে রাখা দরকার। নইলে ‘দিগ্বলয়’ না লিখে ভুল করে লিখব ‘দিকবলয়’; ‘বাগ্দেবী’ বা ‘বাগ্দেবী’ না লিখে ভুল করে লিখব ‘বাকদেবী’; ‘বুদ্ধিমত্তা’ না লিখে ভুল করে লিখব ‘বুদ্ধিমানতা’।
৩. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ পুস্তিকায় অতৎসম শব্দের ক্ষেত্রেও, ব্যতিক্রম হিসাবে, “স্ত্রীলিঙ্গ এবং জাতি, ব্যক্তি, ভাষা ও বিশেষণ বাচক শব্দের অন্তে” ঈ-কার দেবার কথা বলা হয়েছিল। আমরা সে-ক্ষেত্রে কোনও ব্যতিক্রম না রাখার পক্ষপাতী। অর্থাৎ, যেমন আমরা ‘দিদি’ লিখি, তেমনই ‘মাসি’ ‘পিসি’ তো লিখবই, একই সঙ্গে লিখব ‘পঞ্জাবি’, ‘কেরানি’, ‘হিন্দি’, ‘সরকারি’ ইত্যাদি। তা ছাড়া আমরা ‘গ্রিস’ ‘গ্রিন’ ‘চিন’ ইত্যাদি বানানের পক্ষপাতী।
৪. প্রশ্ন হচ্ছে ‘যিশু’ না লিখে ‘জিশু’ লেখা যাবে কি না। ইংরেজিতে লেখে Jesus. তার প্রতিবর্ণীকরণে (‘যেসাস’ না লিখে) স্বচ্ছন্দে আমরা ‘জেসাস’ লিখি। সুতরাং ‘জিশু’ লিখলে কারও আপত্তি হবে বলে মনে হয় না।
৫. শব্দের অন্তে ‘ও’ বর্ণ থাকলে সাধারণত ‘ক্লোজ্ড সিলেব্ল’ সুচিত হয়। (যথা: ‘খাও’, ‘গাও’, ‘চাও’, ‘বানাও’, ‘হটাও’।) যেখানে ‘ওপ্ন সিলেব্ল’-এর ব্যবস্থা রাখাই অভিপ্রেত, এই কারণে সেখানে ‘ও’র বদলে ‘য়ো’ লেখাই সংগত বলে মনে হয়। (যথা: ‘খেয়ো’, ‘গেয়ো’, চেয়ো’, ‘বানিয়ো’, ‘হটিয়ো’।)
৬. খুব সহজেই সেটা বোঝা যায়। ‘কি’ ও ‘কী’, দুটিই প্রশ্নবোধক শব্দ। যা মনে রাখা দরকার, তা এই যে, প্রশ্নের উত্তরে শুধু ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বললেই যেখানে কাজ চলে যায় (অর্থাৎ প্রশ্নকর্তা তাঁর প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যান), সেখানে বানান হবে ‘কি’; আর যেখানে ‘হ্যাঁ’ কি ‘না’ বললে উত্তরদানের কাজ চলে না (অর্থাৎ প্রশ্নকতা পান না তাঁর প্রশ্নের উত্তর), সেখানে ‘কী’ বানান হবে। একটা দৃষ্টান্ত দিলে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে। “Will you eat?” এই যে প্রশ্ন, শুধু ‘হ্যাঁ’ কি ‘না’ বললেই এর উত্তর দেওয়ার কাজটা দিব্য চলে যায়, আর-কিছু বলবার দরকার হয় না। সুতরাং এর বাংলা হবে ‘তুমি কি খাবে?’ কিন্তু যদি কেউ প্রশ্ন করেন, “What will you eat?” তা হলে দেখা যাবে, ‘হ্যাঁ’ কি ‘না’ বললে এই প্রশ্নের কোনও উত্তরই হয় না। সুতরাং এর বাংলা হবে ‘তুমি কী খাবে?’
শব্দটা যখন ক্রিয়ার বিশেষণ বা বিশেষণের বিশেষণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়, তখনও ‘কী’ লেখা সংগত। (দৃষ্টান্ত: ‘কীভাবে তাকাচ্ছে দ্যাখো’; ‘কী নোংরা’, ‘কী পরিচ্ছন্ন’, ‘কী কুচ্ছিত’, ‘কী সুন্দর’।)
৭. ‘এ’ ‘তা’ ‘যা’ ‘না’ ইত্যাদি পৃথক শব্দ। সুতরাং ‘ছাড়া’ কিংবা ‘হলে’র সঙ্গে তাদের জুড়ে দেওয়া অনুচিত। অনেকে ‘তাছাড়া’ লেখেন। এই অভ্যাস অনুমোদন, সমর্থন বা প্রশ্রয় পেলে পরে কখনও তাঁরাই হয়তো ‘মাছাড়া শিশুর চলে না’ লিখতে প্রলুব্ধ হবেন।
৮,৯. ‘না’ একটি পৃথক শব্দ। সুতরাং ‘না’কে আলাদা করে লেখাই সংগত। ‘করেনা’ ‘চলেনা’ ‘বলেনা’ না লিখে লেখা উচিত ‘করে না’ ‘চলে না’ ‘বলে না’। ‘নি’ কিন্তু একটি পৃথক শব্দ নয়, সে একান্তভাবেই পরাশ্রিত। বস্তুত, এই কারণে ‘তুমি খেয়েছ কি না’ এই প্রশ্নের উত্তরে কারও পক্ষে শুধু ‘নি’ বলা চলে না। বলতে হয় ‘খাইনি’। এই পরনির্ভরতার কারণেই ‘নি’কে তার পূর্ববর্তী শব্দের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া উচিত। ‘করি নি’ ‘চলি নি’ ‘বলি নি’ না লিখে লেখা উচিত ‘করিনি’ ‘চলিনি’ ‘বলিনি’।
১০. এই প্রসঙ্গে ‘হয়তো’ এবং ‘হয় তো’র কথাটাও বলা ভাল। ‘সম্ভবত’ অর্থে আমরা ‘হয়তো’ লিখব। (দৃষ্টান্ত: ‘বিকেল নাগাদ বৃষ্টি হয়তো থেমে যাবে।’) ‘হয় তো’র অর্থ সে-ক্ষেত্রে ‘(যদি) হয়, তবে’। (দৃষ্টান্ত: ‘সে [যদি] রাজি হয় তো আমরাও রাজি।’)
১১. প্রতিবর্ণীকরণের প্রসঙ্গে একটা কথা বলা প্রয়োজন। আমরা যাবতীয় ‘land’কে বাংলা লিপিতে ‘ল্যান্ড’ লিখে থাকি। যথা ‘আইসল্যান্ড’, ‘আয়ারল্যান্ড’, ‘গোর্খাল্যান্ড’, ‘গ্রিনল্যান্ড’, ‘নাগাল্যান্ড’, ‘স্কটল্যান্ড’, ‘হল্যান্ড’। ব্যতিক্রম একমাত্র England, যা কিনা বাংলা লিপিতে অনেক সময় ‘ইংলন্ড’ রূপে দেখা দেয়। এ-ক্ষেত্রেও আমরা ‘ইংল্যান্ড’ই লিখব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন