শৈলেন ঘোষ

একটু এসো না আমার সঙ্গে। খুব দূরে যেতে হবে না। ওই যে দেখতে পাচ্ছ, একটু দূরে একটা ঝাঁকড়া গাছ, যাব ওইটুকুই। দেখতে পাচ্ছ, গাছটা কেমন রোদ-ঝলমল আকাশটাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে? আর একটু এসো, আরও দু’পা। কী দেখছ? গাছের নীচে কে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে যেন! না, ও অন্য কেউ নয়। ওরই নাম রূপচাঁদ। মানুষটা লাঙল চালিয়ে জমির শক্ত মাটি নরম করে। বীজ বুনে ফসল ফলায় জমিতে। যখনই জমি সবুজ রঙে ঝলমল করে ওঠে, তখন খুশিতে উছলে পড়ে তার মন। প্রাণভরে সে গান গায়। খুশি, খুশি, চারদিকে খুশি। আনন্দে সে খুশির আলোয় ছোটে। না হয় হাসে। নয়তো নিজের ছেলেটাকে বুকে নিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে আনন্দে চিৎকার করে। কেননা, সে জানে, ওই আকাশই তার সব। ওই আকাশেই মেঘ, ওই আকাশেই রোদ। ওই আকাশের মেঘেই জল। রোদেই তাপ। ওরা আছে বলেই না, শুকনো খেত সবুজ হয়। সবুজ খেতে সোনা ঝরে।
ওই দ্যাখো, কেমন ছোট্ট ঘরখানা রূপচাঁদের। মাটির। ওই ঘরে থাকে ছেলে, বউ আর সে নিজে। এখান থেকে সমুদ্দুর কতই বা দূর। সমুদ্দুরের যত হাওয়া ওই সবুজ খেত ছুঁয়ে-ছুঁয়ে ভেসে আসে এদিকে। তার ঘরের ভেতর। আকাশভর্তি সব আলো ছড়িয়ে পড়ে ঘরের আনাচে-কানাচে। সে আলোয় ফুটে ওঠে ছায়াবোনা কত ছবি। তার ছেলেটা হাওয়ার সঙ্গে হাত-পা ছুড়ে আলোর ওপর গড়িয়ে পড়ে। ছবি-ছবি আলোর আঁকিবুকি ওর চোখে-মুখে খেলা করে। কী সুন্দর দেখতে লাগে ছেলেটাকে! ছেলের কাণ্ড দেখে রূপচাঁদ হাসে। হাসে তার বউও। হাসতে-হাসতে একদিন তার বউ ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করে বলে উঠল, “আমার ছেলে রাজা হবে।” তখন ছেলের কী হাসি! কে জানে কী বুঝল পুঁচকেটা।
বউয়ের মুখের কথা কানে ঢুকতেই রূপচাঁদের মুখখানাও ঝকঝক করে উঠল। সে হাসতে-হাসতে উত্তর দিল, “না বউ, না, ছেলে আমার রাজার চেয়েও বড় হবে। অনেক বড়।”
হঠাৎ যেন হাসতে-হাসতে বউয়ের মুখের হাসি আবছা হয়ে যায়। বউ কাতর স্বরে বলে, “আমরা চাষি। এই ছোট্ট মাটির ঘরে বসে রাজা-উজিরের স্বপ্ন দেখছি। লোকে শুনলে হাসবে। কী দরকার বাবা ওসব ভেবে। যা আছি, তা-ই ভাল।”
রূপচাঁদ বউয়ের কথা শুনে কষ্ট পেল। বলল, “হতাশ হচ্ছ কেন বউ? তুমি দেখে নিয়ে আমার ছেলে আমার মতো হবে না। ছেলেকে আমি ইস্কুলে দেব। অনেক লেখাপড়া শেখাব। ছেলে আমার পাঁচজনের একজন হবে।”
বউ উত্তর দিল, “আমরা তো দু’বেলা পেটভরে খেতেই পাইনা। লাঙল টেনে কি ছেলেকে লেখাপড়া শেখানো যায়?”
“ঠিক বলেছ বউ, এবার আর খেতখামারে কাজ নয়, এবার আমি শহরে যাব। শহরে সব মস্ত-মস্ত কাজের কারবার আছে। আমি সেখানেই কাজ খুঁজব।”
“যদি কাজ না পাও?” বউ দোমনা গলায় জিজ্ঞেস করল।
“ভাবছ কেন ও কথা? আমার গায়ে তাকত আছে। কিছু না পেলে মজুর খাটব। তাতেও অনেক পয়সা।” বলতে-বলতে রূপচাঁদ তার হাতের মুঠি শক্ত করল। দেখাল বউকে।
রূপচাঁদের সেই দামাল মূর্তি দেখে ভাবনায় শুকিয়ে গেল বউ-এর মুখ। ভয়ে-ভয়ে বলল, “তুমি চলে গেলে আমি ছেলেকে নিয়ে একলা থাকব কেমন করে!”
“একলা কেন থাকবে,” উত্তর দিল রূপচাঁদ, “এ-গাঁয়ের সব মানুষের সঙ্গেই আমাদের ভাব-ভালবাসা আছে। সবাই আমাদের বন্ধু। আমি যখন থাকব না, আমাদের বন্ধুরা থাকবে। তোমার ভয় কিসের। তা ছাড়া আমি তো আর চিরদিনের মতো চলে যাব না। আমি গেলেও আমার মন তো এখানেই পড়ে থাকবে। আমার ছেলেকে নিয়ে তুমি একলা থাকবে, আমি কি সে কথা ভুলে থাকতে পারি! সুযোগ পেলেই চলে আসব।”
আর কিছু বলার ছিল না বউয়ের। কে জানে, হয়তো আড়ালে আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছেছিল ছেলের মুখটি নিজের মুখের কাছে টেনে নিয়ে!
সে-বছর জমিতে ফসল হল অঢেল। মুখে হাসি ধরে না। রূপচাঁদের। তা, বলতে কী, এই অঢেল ফসল ফেলে-ছড়িয়ে খেলেও, দুটো বছর হেসেখেলে কেটে যাবে। ছেলেটাও এখন একটু বড় হয়েছে। হাঁটতে শিখেছে পা-পা। বলতে শিখেছে, বাব্বা, মাম্মা। কাজেই রূপচাঁদ ভাবল, এবার সময় হয়েছে। মাঠের ফসল ঘরে তুলে সে এবার শহরে যেতেই পারে। এখন থেকে চেষ্টা করলে, তবেই না দু’বছর পরে ছেলেটাকে ইস্কুলে দিতে পারবে।
তো, এইকথা ভেবে একদিন পিঠে কাপড়ের পুঁটলি ঝুলিয়ে রূপচাঁদ শহরে চলল। যাওয়ার আগে ছেলেটাকে কত আদর করল। কত কী বুঝিয়ে গেল বউকে। বউ-এর চোখের জল উপচে পড়ল। সে-জল দেখলে কে এমন নির্দয় আছে যে তার চোখও ছলছল করবে না! হ্যাঁ, অশ্রুফোঁটায় উছলে উঠেছিল রূপচাঁদেরও চোখ দুটি। তবু নিজেকে সামলে নিতে তার দেরি হয়নি মুহূর্তও। সে পথ চলল মাঠ পেরিয়ে।
এখন যে-পথে হাঁটছে রূপচাঁদ, এটাই শহরে যাওয়ার পথ। এই পথটা নদীর জাহাজঘাট অবধি চলে গেছে। জাহাজে চেপে ভাসতে-ভাসতে সারাটা দিন কেটে গেলে শহরে পৌঁছবে রূপচাঁদ। অবিশ্যি আরও দু-চারবার শহরে গেছে রূপচাঁদ। তবে সে ছোটবেলায়। একা নয়, বাবার সঙ্গে। বাবার স্বাস্থ্যও কম ছিল না। যেমন গড়নপেটন চেহারা, তেমনই গুরুগম্ভীর গলার আওয়াজ। বাবার আদল অনেকটাই পেয়েছে রূপচাঁদ। যেমন বুকের ছাতি, তেমনই হাতের পেশি। বুক ফুলিয়ে হাঁটে যখন, মনে হয় যেন এ আর-এক শক্তিমান হাঁটছে। রূপচাঁদের বাবা বলতেন, “মাটির সঙ্গে মাখামাখি করে মানুষ হয়েছি আমি। আমার ছেলেও হবে তা-ই। শ্বাসগ্রহণের সঙ্গে সবুজ ঘাসের গন্ধ পেয়েছি আমি, পেয়েছি পাকাধানের খোশবাই। আমার ছেলেও সেই গন্ধ নাকে নিয়ে লাঙল দিয়ে জমি চষবে। ফসল ফলাবে। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকবে।”
তাই লাঙল চালাতেই শিখল রূপচাঁদ। বাবার কাছে। লেখাপড়া হল না তেমন। যেটুকু না হলে নয়, সেটুকুই শিখল রূপচাঁদ। মাত্তর দু-চার পাতা। বই পড়ে রইল তাকে। রাতের অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকিয়ে বাবা তাকে শেখাতেন তারা গুনতে। বলতেন, তারাগুলো এক-একটা পৃথিবীর চেয়েও বড়। বলতেন, চাঁদটা একটা পাথরের ঢেলা। বাবার মুখে এমন কথা শুনতে-শুনতে অবাক হয়ে যেত রূপচাঁদ। মনে-মনে ভাবত নিরেট পাথর থেকে এমন ফিনকি দিয়ে জ্যোছনার আলো ছড়িয়ে পড়ে কেমন করে! পরে অবিশ্যি রূপচাঁদ জেনেছিল, চাঁদের ওই আলো সূর্যের কাছে ধার করা। আর তখন থেকেই রূপচাঁদের মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে জানার কত কী আছে। অথচ তার কিছুই জানা হয়নি। হয়তো আর জানা হবেও না কোনওদিন। তাই সে যেদিন প্রথম ছেলের মুখ দেখলে, সেইদিন থেকেই সে স্বপ্ন দেখতে লাগল। স্বপ্ন দেখল, ছেলেটাকে লেখাপড়া শেখাবে। ছেলে আকাশ চিনবে। ছেলে তাকে আকাশের গল্প বলবে।
অনেকটা পথ চলে এসেছে রূপচাঁদ হাঁটতে-হাঁটতে। মস্ত-মস্ত মাঠ পেরিয়েছে সে। পেরিয়েছে অনেক গাঁ-গঞ্জ। পৌঁছে গেল সে জাহাজঘাটে। যখন পৌঁছল তখন ঠিক মাথার ওপর সূর্য। ঠাঠা রোদ্দুর। উথাল-পাথাল নদীর ঢেউ তখন রোদের ছটায় ঝলমল করছে। শহরে লোকের যাওয়ার তো আর ঘাটতি নেই। তাই জাহাজঘাটা ভিড়ে ভিড়াক্কার। কত লোক, কতরকমের কাজকারবার তাদের। সবাই হুড়মুড় করে উঠছে জাহাজে। সবাই চলেছে শহরে। রূপচাঁদ তাদের সঙ্গী হয়ে শহরে চলল। ভোঁ বাজিয়ে জাহাজ ছেড়ে দিল। কানায়-কানায় জল নদীর। তার ওপর স্রোতের টান কী! বেসামাল হলেই টুপ। মানে নদীর জলে হাবুডুবু। না বাবা, যাত্রাকালে এসব অলক্ষুনে কথা মুখে না আনাই ভাল!
দ্যাখো, কত লোক জাহাজে! সবাই একই পথের যাত্রী। তা, কতক্ষণ আর থাকতে পারে মানুষ মুখ বুজে! নিজেদের মধ্যে এটা-ওটা দু-চারটে কথা হতেই পারে। ওরই মধ্যে যারা একটু বেশি আলাপী, তাদের মুখে তো খই ফোটে। অবশ্য রূপচাঁদের মুখে খই না-ফুটলেও, কেউ তাকে বলতে পারবে না লাজুক। কথা পেলে সে এমন আলাপ শুরু করবে, তুমি না-শুনে থাকতেই পারবে না। তবে অবশ্য এতক্ষণ কথা বলার মতো তার মন ছিল না। ছেলেটার জন্য মন তার ভারী আনচান করছিল। থেকে-থেকেই সে আনমনা হয়ে নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে ছিল। কথা বলতে তার ইচ্ছেও করছিল না।
কিন্তু কতক্ষণই বা অমন একটা চনমনে মানুষ চুপচাপ বসে থাকতে পারে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে চুপচাপ বসে থাকাও যায় না। উত্তর দিতেই হয়। আর হলও তা-ই। জাহাজের ডেকের ওপর ঠিক ওর পাশে যে-লোকটি বসে ছিল, সে হঠাৎ রূপচাঁদকে বলে বসল, “ভায়ার যেন মনটা খুবই খারাপ হয়ে আছে!”
আচমকা এমন একটা কথা শুনলে কে না থতমত খেয়ে যায়! রূপচাঁদ চমকে তার মুখের দিকে তাকিয়ে ফ্যালফ্যাল করে দেখতে। লাগল। লোকটি রূপচাঁদের থমকে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে উঠল। হাসতেই রূপচাঁদ তাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি আমায় কিছু বললেন?”
কোনও সন্দেহ নেই লোকটি রূপচাঁদের চেয়ে বয়সে বড়। রূপচাঁদ তখন যুবক। তার ঠিক-ঠিক বয়স বলা না-গেলেও সাতাশ-আটাশের কম হবে না। আর যে-লোকটি রূপচাঁদের সঙ্গে কথা বলল, তার বয়স কোন না চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ হয়। কাজেই লোকটি রূপচাঁদকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে বলল, “এখানে তুমি ছাড়া আর তো কেউ শুকনো মুখে বসে নেই দেখছি।” বলেই জিজ্ঞেস করল, “‘তুমি’ বললুম বলে রাগ করলে না তো?”
রূপচাঁদ হেসে ফেলল। বলল, আমাকে আপনি ‘তুমি’ই তো বলবেন। আমার চেয়ে আপনি তো বয়সে বড়।”
“না, মানে এখন সময় তো আর আগের মতো নেই। কে কখন কোন কথায় রাগ করে বসবে, কেউ জানে না। কাজেই সমঝে চলতে হয়। তোমায় দেখে আমার মনে হল, হয়তো ‘তুমি’ বললে, রাগ করবে না। তাই বলে ফেললুম।” বলে লোকটি আবার হাসল।
রূপচাঁদ জিজ্ঞস করল, “কেমন করে বুঝলেন আমি রাগ করব না?”
লোকটি উত্তর দিল, “তা বলতে পারব না। অনেক সময় অনেকের মুখ দেখে মনে হয় ভালমানুষ। তোমাকেও আমার তা-ই মনে হল। বলেই একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করলেন, “শহরে যাওয়া হচ্ছে, না, অন্য কোথাও?”
রূপচাঁদ উত্তর দিল, “হ্যাঁ, শহরেই যাচ্ছি।”
“কাজের খোঁজে?”
রূপচাঁদ ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। মুখে তার তখনই কথা সরল না। তার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
“কী, ঠিক বললুম না?”
রূপচাঁদ নিমেষে নিজেকে সামলে নিয়ে হাসল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “আপনি কী করে জানলেন?”
লোকটি মজার ছলে উত্তর দিল, “আমি ম্যাজিক জানি। মানুষের মনের কথা তার মুখ দেখলেই আমি বলে দিতে পারি।”
রূপচাঁদ এ কথার আর কোনও উত্তর না-দিয়ে যেমন হাসছিল, তেমনই হাসতে থাকল। হাসতে-হাসতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“কী, তোমার যে দেখি হাসি থামে না। আমার কথা বিশ্বাস হল বুঝি?” লোকটি হাসতে-হাসতেই জিজ্ঞেস করল। তারপর বলল, “শহরে কোথায় থাকা হবে?”
“দেখি, কোথায় থাকা যায়।” আলতোভাবে জবাব দিল রূপচাঁদ।
“সে কী! থাকার জায়গা ঠিক করে যাচ্ছ না?” লোকটি অবাক হল!
রূপচাঁদ ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল, “দেখেশুনে খুঁজে নেব।”
“সে কী হে, খুঁজে নেব কী বলছ! তোমার তো দেখছি শহর সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই। শহরে যখন-তখন তুমি বদ লোকের পাল্লায় পড়তে পারো। সেটা কি তোমার জানা আছে? তার ওপর তোমার বয়সও কম। তোমার মতো কমবয়সী ছেলের ওপর পাজি লোকের চোখ পড়লে আর রক্ষে নেই! তা ছাড়া চাইলেই কি তুমি শহরে জায়গা পেয়ে যাবে? আর জায়গা খুঁজবেই বা কোথা? না, না, থাকবার জায়গা ঠিক না-করে শহরে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে না।” বলতে-বলতে লোকটির চোখে-মুখে যেন ভীষণ ভাবনার ছায়া দেখা দিল।
লোকটির কথা শুনে রূপচাঁদ একেবারে দমে গেল। কাঁচুমাচু হয়ে বললে, “আমি এতসব ভাবিনি তো! ছেলেবেলায় শহরে গেছি বটে, তবে সে তো বাবার সঙ্গে। এখন কী করি!”
লোকটি উত্তর দিল, “তোমাদের নিয়ে এই হয়েছে মুশকিল। যা ভাবা উচিত, ভাবো না। যা করা উচিত, করো না। শহরে যাচ্ছ, আটঘাট বেঁধে যাবে তো! সাঁতার জানি না, জলে ঝাঁপিয়ে পড়ব? আশ্চর্য!”
“আচ্ছা, আমার তা হলে এখন কী করা উচিত বলুন তো?” ভারী অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করল রূপচাঁদ।
“সেই তো!” লোকটি যেন সত্যিই চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “বাড়িতে তোমার আর কে আছে?”
“ছেলে আর বউ।”
“ছি-ছি, কী অন্যায় বলোদিকি! তাদের ফেলে তুমি শহরে কাজ খুঁজতে বেরিয়েছ একা-একা? কাজ খুঁজতে যদি শহরে যেতে হয়, তবে ঘর-সংসার পেতেছ কিসের জোরে? তাদের খেতে-পরতে দাও কেমন করে?” লোকটি যেন একটু গলা চড়িয়ে রূপচাঁদকে শাসন করল।
রূপচাঁদ আমতা-আমতা করে উত্তর দিল, “আজ্ঞে, আমার খানিকটা জমিজমা আছে। চাষবাস করি।”
লোকটি জিজ্ঞেস করল, “তা হলে আবার কাজের খোঁজে শহরে কেন?”
“আজ্ঞে, জমিতে যা ফসল হয়, তাতে আমাদের খেতে-পরতেই চলে যায়। ছেলেটা বড় হচ্ছে, ভারী ইচ্ছে তাকে লেখাপড়া শেখাব। মানুষ করব। আজ্ঞে, তাই একটা কাজের খোঁজে শহরে যাচ্ছি।”
লোকটি রূপচাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবল খানিক। তারপর বলল, “ঠিক আছে, আমি একখানা চিঠি লিখে দিচ্ছি! আমার বন্ধু থাকে শহরে। তুমি চিঠি নিয়ে তার সঙ্গে দেখা কোরো। তুমি যাতে অন্তত দুটো দিন তার কাছে থাকতে পারো, সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে।” বলে লোকটি তার ব্যাগ থেকে কাগজ কলম বার করে, দু-চার লাইনের একখানা চিঠি লিখে ফেলল। অবিশ্যি নদীর জলে জাহাজের টলমলানিতে হাতের আখর একটু এঁকেবেঁকে গেল৷ তা যাক। চিঠির ওপরে ঠিকানা লিখে রূপচাঁদের হাতে দিয়ে বলল, “দেখো, যেন হারিয়ে ফেলো না!”
রূপচাঁদ বলল, “আজ্ঞে, ঠিকানা তো লিখলেন, কিন্তু যাব কেমন করে?”
লোকটি উত্তর দিল, “ঘাবড়াবার কিছু নেই। যাকে দেখাবে, সে-ই দেখিয়ে দেবে। জায়গাটা সকলেরই চেনাজানা। অবিশ্যি আমিও যেতে পারতুম। কিন্তু একটা জরুরি কাজের জন্যে আজ আমায় বাড়িতে যেতেই হবে। আর, আমার বাড়িটা আবার আমার বন্ধুর বাড়ির ঠিক উলটো রাস্তায়। অনেকটা দূরে।”
রূপচাঁদ লোকটির কাছ থেকে চিঠিটা নিয়ে নিজের জামার পকেটে যত্ন করে রেখে দিল। দিয়ে বলল, “দেখুন দিকি, আপনি না-থাকলে আমি কী করতুম! কী বিপদেই না পড়তুম!”
লোকটি বলল, “বিপদের কথা বলছ? আরে বাবা মানুষ বিপদে না-পড়লে বিপদের মানে ঠিক-ঠিক বুঝবে কেমন করে? বিপদের সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা পাবে কোত্থেকে? তবে বলি শোনো, আমার একটা বিপদে পড়ার ভয়ঙ্কর গল্প।”
গল্পের নাম শুনলে কে না নড়েচড়ে বসে! এতক্ষণ লোকটির কথা শুনে আতঙ্কের ভাবনায় রূপচাঁদ ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছিল। তার ওপর জাহাজের ভেতর একটানা চলতে-চলতে আর যেন ভাল লাগছিল না। রূপচাঁদ ভাবছিল, তাড়াতাড়ি শহর এলে যেন বাঁচে সে। কিন্তু শহর এখনও অনেক দূর। কাজেই, গল্প-শোনার জন্যে উৎসুক হয়ে সে লোকটির মুখের দিকে তাকাল। লোকটি বলতে শুরু করল:
“আমার তখন বয়স কম। খুব বেশি হলে তখন আমি তোমারই মতো যুবক। শহরেই থাকতুম আমরা। আমার বাবা পুলিশে কাজ করতেন। বাবা ছিলেন দারোগা। যেমন সাহসী, তেমনই স্পষ্টবাদী। ওসব ছল-চাতুরির ধার-ধারতেন না বাবা একদম। তাই ওপর-মহলে বাবার ছিল খুব সুনাম। কাজেই বাবাকে সবাই খুব ভয় পেত। জানোই তো, পুলিশের কাজ করা মানে, থেকে-থেকেই এক থানা থেকে আর-এক থানায় বদলি হওয়া। আর এই বদলি হওয়ার ব্যাপারটা বাবার বেলায় ঘটত ঘন ঘন। হবেই তো, পুলিশের কাজে যার সাহস আর সুনাম আছে, তার এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকাই মুশকিল। তাকে নিত্য নতুন বদ লোককে শায়েস্তা করার জন্যে আজ এখানে, কাল ওখানে ছুটতে হয়। কিন্তু মুশকিল এই, নিজের গোটা সংসার নিয়ে বারবার তো আর এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় ছুটোছুটি করা যায় না। কাজেই, আমরা শহরের বাড়িতেই থাকতুম। আমরা বলতে, মা আর আমরা দু’ভাইবোন। যেখানেই থাকুন বাবা, সপ্তাহে-সপ্তাহে একবার করে বাড়িতে তিনি আসতেনই।
“সেবার হল কী, এক সপ্তাহে তিনি এলেন না। এলেন না তো এলেন না। আমরা ভাবলুম, নিশ্চয়ই বাবা কোনও জরুরি কাজে আটকে গেছেন। না তো, তিনি পরের সপ্তাহেও তো এলেন না! এমনকী কোনও খবরও পাঠালেন না। এমন একটা অবস্থায় আমরা যে অত্যন্ত ভাবনায় পড়ব, এ তো খুবই স্বাভাবিক। মায়ের মুখ দেখে আমি তো বুঝতেই পারছিলুম, কী ভীষণ ভাবনায় অস্থির হয়ে উঠেছে মায়ের মন। আমার বোন তখন ইস্কুলে পড়ছে। আমার চেয়ে সে বছর এগারোর ছোট। তার সঙ্গে আমার খুব মনের মিল ছিল। এটা-ওটা নানা ব্যাপার নিয়ে আমরা প্রত্যেকদিন নিজেদের মধ্যে কত আলোচনা করতুম। বোন ছোট বলে তাকে আমি একেবারেই হেলাফেলা করতুম না। সে-ও আমাকে খুব ভালবাসত। তা, বাবার এমন হঠাৎ না-আসা নিয়ে আমাদের ভীষণ চিন্তা শুরু হয়ে গেল। মন এত খারাপ হয়ে গেল যে, কাউকে বোঝাতে পারব না। এ সময়ে কী করা উচিত, এ নিয়েও আমরা কিছু ঠাওর করে উঠতে পারছিলুম না। ঠিক সেই সময়ে একদিন পুলিশের কাছ থেকে খবর এল, ক’জন ডাকাতকে ধরার জন্যে বাবার ওপর ভার দেওয়া হয়েছিল। তাদের ধরতে গিয়ে বাবা আর ফিরে আসেননি। তাঁর এই খবরে আমাদের মনের অবস্থার কথা একবার ভাববার চেষ্টা করো। আমাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ডাকাত ধরতে গিয়ে না-ফেরার মানেটা যে কী, সে আর কে না জানে! খবর পেয়ে মা এমন হতভম্ব হয়ে গেলেন যে, মুখে তাঁর আর কথাই ফোটে না। আমিও চোখের জল সামলাতে পারি না। ভেঙে পড়ি। আচমকা এমন একটা খবর পেলে মন কি শান্ত থাকতে পারে? না। কিন্তু আশ্চর্য কী, আমার ছোট বোনটা কিন্তু একটুও অস্থির হল না। সে মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, তুমি কেন এত ভেঙে পড়ছ মা! মনকে শক্ত করো। আমি বলছি বাবার কিছু হয়নি। দেখো, বাবা ঠিক ফিরে আসবে।’
“বোনের সেই কথা শুনেও আমার মায়ের মুখে কথা ফুটল না। থমথম করতে লাগল মায়ের অমন সুন্দর মুখখানা। আড়ষ্ট হয়ে বসে রইলেন মা পাথরের মতো।
“মায়ের সেই অবস্থা দেখে আমিও কেমন যেন হতবাক হয়ে গেলুম। ভাবনায় আনচান করে অসহায়ের মতো হাহুতাশ করতে লাগলুম। কী যে করি, আকাশ-পাতাল কিছুই ভেবে পেলুম না। বোনকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল, সে কেমন করে জানল, বাবার কিচ্ছু হবে না, কেমন করে জানল বাবা ফিরে আসবে আবার। কিন্তু আশ্চর্য, একথা তাকে জিজ্ঞেস করার আগেই সে-ই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘দাদা শান্ত হ! অত ভেঙে পড়লে চলে! তুই-ই যদি ভেঙে পড়িস মাকে দেখবে কে? মা সাহস পাবে কোথ থেকে?’
“আমি কী উত্তর দেব বুঝতে পারছিলাম না। গলা শুকিয়ে আসছিল। সত্যি আমি ভয় পেয়েছি। বাবা ডাকাতের ডেরায় হানা দিয়ে যদি সত্যিই তাদের হাতে ধরা পড়ে থাকেন! বারবার এই একটা কথাই আমার যতই মনে হচ্ছিল, ততই বুক কেঁপে উঠছিল। ডাকাতের হাতে ধরা পড়লে যে বাবার নিস্তার নেই, এই সোজা কথাটা কে না জানে! তবুও আমি আমার বোনের কথাটা ফেলতে পারলুম না। সত্যিই তো, আমিও যদি ভেঙে পড়ি, তবে মা শক্ত হবে কেমন করে! তাই বোনের কথা শুনে তার মুখের দিকে চমকে তাকালুম। তার কথার কী উত্তর দেব ভেবে না-পেয়ে, তাকেই জিজ্ঞেস করলুম, ‘কী করি বল তো?’
“বোন আমায় ভরসা দিয়ে বলল, ‘বাড়িতে বসে থাকলে মনে-মনে সবাই ভীষণ কষ্ট পাব। তুই আজই পুলিশের অফিসে চলে যা। সেখানে না-গেলে আসল ঘটনা কিছুই জানা যাবে না। বাবা আমাদের। পুলিশ যতই চেষ্টা করুক, আমরা তো চুপচাপ বসে থাকতে পারি না। আমাদেরও কিছু করার আছে। অবশ্য আমিও তোর সঙ্গে যেতে পারতুম। কিন্তু আমি গেলে মা কার কাছে থাকবে! আমার মনে হয়, তোর আর দেরি করা ঠিক হবে না। এখনই তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়। যেতেও তো হবে অনেকটা।’
“আমি বোনের কথাই রাখলুম। দেরি না করে যেমন-তেমন তৈরি হয়ে নিলুম। যা রান্না হয়েছিল তাই দুটো মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়লুম। যেতে হবে ট্রেনে। সময়ও লাগবে অনেকটা। আমার জানা ছিল ঘণ্টায়-ঘণ্টায় ট্রেন আছে। সুতরাং ট্রেন নিয়ে আমার তেমন ভাবনা ছিল না। আর তখন বাবা যে-থানায় বহাল ছিলেন, তার ঠিকানাটা আমার মুখস্থই ছিল। ট্রেন ছাড়া সেখানে যাওয়ার আর কোনও যানবাহনও ছিল না। সুতরাং স্টেশনে এসে পৌঁছলুম ঠিক সময়ে। পাঁচ মিনিটও দাঁড়াতে হয়নি। সঙ্গে-সঙ্গে গাড়ি। কিন্তু ভিড় হয়েছিল অসম্ভব। তা এমন ভিড় এ লাইনে নিত্যদিনই হয়ে থাকে। কাজেই ভিড়ের কথা ভেবে আমার দোনোমনা করার উপায় ছিল না। তখন আমার একটাই ভাবনা, যেমন-তেমন করে তোক আমাকে চটজলদি থানায় পৌঁছতে হবে। সুতরাং ভিড় ঠেলে আমি ট্রেনে উঠে পড়লুম। তখন ভয়ংকর অস্থির হয়ে উঠছিল আমার মন। মনে হচ্ছিল, চোখের পলকে যদি থানায় পৌঁছে যেতে পারি! তা তো আর হয় না। জাদুমন্ত্র ব্যাপারটা যদি সত্যি হত, তা হলে অন্য কথা। তা মন্ত্র-টন্ত্র, জাদু-টাদু গল্পেই পড়া যায়। কাজে আর কে দেখেছে!
“তা, এইসব নানা কথা ভাবতে-ভাবতে এমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলুম যে, রেলগাড়িটা যে ছুটছে, সেটাই খেয়াল ছিল না। কত গাঁ-গঞ্জ যে পেরিয়ে গেল, তাও টের পেলুম না। মাথার ভেতরে যখন বিপদের আতঙ্ক খোঁচা দেয়, তখন চোখ খোলা থাকলেও, চোখজুড়ানো কোনও ছবিই নজরে পড়ে না। বিপদের ছবিটাই বারবার চোখের ওপর ঝলসে ওঠে। আর তাই, আমার চোখে তখন বীভৎস দেখতে অনেক ডাকাতের মুখ থেকে-থেকে ভেসে উঠছিল। আমি যেন দেখতে পাচ্ছিলুম, তারা বাবাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে বেদম মারছে কিল, চড়, ঘুসি! বাবা না পারছেন চেঁচাতে, না পারছেন ঠেকাতে। সেই কথা ভাবতে-ভাবতে আতঙ্কে শিউরে উঠছিলুম আমি। মনে পড়ে যাচ্ছিল মায়ের সেই বোবা মুখের ছবিটা।
“বাবার বিপদের কথা যেই শোনা, অমনই মা যেন একটা পাথরের মূর্তির মতো নিথর হয়ে গেলেন। যাক, তবু ভাল, আমি যখন বাড়ি থেকে বেরোই তখন মায়ের পায়ে হাত দিতেই, মা কেঁদে ফেলেছিলেন। আকুল হয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন আমাকে। সেই সময় মায়ের কান্না দেখে আমার অমন শক্ত-মনা বোনও চোখের জল সামলাতে পারেনি।
“এতসব কথা ভাবতে-ভাবতে আমার হঠাৎ চমক ভাঙল। তাই তো, হয়ে তো গেল অনেকক্ষণ, কতদূরে এসেছি আমি! এখন কোন গ্রামের গা ঘেঁষে ট্রেন চলেছে, ঠাওর করার চেষ্টা করতে লাগলুম। অবশ্য এ-চেষ্টার কোনও মানে হয় না। কারণ এদিকে আমি আসিইনি কোনওদিন, চিনিও না কোনও কিছুই। কাজেই পাশের লোকটিকে জিজ্ঞেস করলুম, ‘দাদা, কতদূরে এসেছি? কোন স্টেশন গেল?’
“লোকটি যে-স্টেশনের নাম করলেন, আমি তার নামগন্ধও শুনিনি কখনও। ফলে, তার মুখের দিকে তাকানো ছাড়া আর কীই বা করতে পারি। তা, আমাকে অমন হতভম্বের মতো তাকাতে দেখেই বোধ হয় লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় যাবে তুমি?’
“যে-স্টেশনে আমি নামব, তার নাম করলুম। তিনি শুনে বললেন, ‘আর আধঘণ্টা মতো লাগবে।’
“তাঁর কথা শেষ হয়নি, হঠাৎ কী যে হল, একটা ভয়ঙ্কর শব্দ শোনা গেল। শব্দে আমার কান ফেটে যায় যেন! কিছু বোঝবার আগেই ট্রেনটা যেন কিসের ওপর ধাক্কা মারল। মারতেই আমরা যে কে-কোথায় ছিটকে পড়লুম, কিছুই বুঝতে পারলুম না। নিমেষের মধ্যে সব যেন তছনছ হয়ে গেল। আমি এর ঘাড়ে, তার মাথায় ঠোক্কর মারতে-মারতে অনেক মানুষের গাদার মধ্যে পড়ে হাঁপাতে লাগলুম। তারপর কী যে একটা আমার মাথার ওপর পড়ল, জানি না! সঙ্গে সঙ্গে চতুর্দিক অন্ধকার হয়ে গেল। আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। আমি অজ্ঞান হয়ে গেলুম। বুঝতেই পারছ, ট্রেনটা দুর্ঘটনায় পড়েছে। ট্রেনের আরও অনেক যাত্রীর মতো আমিও দুর্ঘটনার শিকার। আমি অচেতন হয়ে পড়ে আছি তাদেরই সঙ্গে গাড়ির চুরমার হয়ে যাওয়া কামরার মধ্যে। সুতরাং তারপর কী হল, আমি জানি না।
“কতটা সময় কেটে গেছে বলতে পারব না। হঠাৎ আমার মনে হল, আমার চোখের পাতার ওপর যেন আলোর আবছা আভা ছড়িয়ে পড়েছে। আমার মনে হল, আমি থরথর করে কাঁপছি। আমি তারপরেই বুঝতে পারলুম আমার বাঁ পায়ে ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে। ধীরে ধীরে আমার পুরো জ্ঞান ফিরে এল। আমি ধড়ফড় করে উঠতে গেলুম। উঃ! কোমরে কী ব্যথা! পারলুম না। আবার শুয়ে পড়লুম। যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগলুম। তারপরেই আঁতকে উঠেছি। দেখি, আমার চারপাশে অগুন্তি মানুষ পড়ে আছে। কেউ আহত। কেউ মৃত। চারদিকে রক্ত। ছড়িয়ে আছে, নয়তো গড়িয়ে পড়ছে। রেলগাড়ির ধ্বংসস্তুপের মধ্যে চাপা পড়ে আহত মানুষগুলো যন্ত্রণায় কোঁকাচ্ছে।
“আবার আমি উঠে বসবার চেষ্টা করলুম। রক্ষে এই যে, আমি ধ্বংস স্তুপের মধ্যে আটকা পড়িনি। বসতে পারলুম কোনওরকমে। বুঝতে পারছি, বসে-বসে আমার মাথা টলমল করছে। সাহস হল না দাঁড়াতে। কিন্তু বীভৎস সেই দৃশ্য দেখে আমার মনে হল, আমিও হয়তো মরে যাব এখনই। তার চেয়েও আশ্চর্য কথা, আমার থেকে থেকেই মনে হচ্ছিল, আমি বেঁচে আছি তো! আমার হাত-পাগুলো এখনও আমার শরীর থেকে ছিঁড়ে ছিটকে যায়নি তো! হ্যাঁ, এমন ভয় আমার হতেই পারে। কেননা, যেদিকেই আমি চোখ ফেরাই, দেখি, চারদিকে ছড়িয়ে আছে কারও কাটা হাত, না-হয় কাটা পা। নয়তো ধড় থেকে খসে-পড়া মুণ্ড। আমি আর বসতে পারলুম না। অনেক চেষ্টা করে উঠে দাঁড়ালুম। টাল খেলুম। আমার মাথাটা একটা লোহার গায়ে ঠুকে গেল। আমি সামলাতে পারলুম না। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলুম একটা রক্তাক্ত মানুষের ঘাড়ে। সে নড়ল না। কষ্টের কোনও শব্দও করল না। বুঝতে পারলুম, সে আর বেঁচে নেই। আমি আঁতকে উঠেছি। নিজেকে সামলে আমি আবার উঠে দাঁড়িয়েছি। ছত্রাকার কামরার ছিন্নভিন্ন জঞ্জাল টপকে আমি বেরিয়ে আসার পথ। খুঁজতে লাগলুম। আমার কানে আসছে অসংখ্য মানুষের আর্তনাদ। কিন্তু আমার অসহ্য কষ্ট হলেও আমি মুখ ফুটে কোনও শব্দ করতে পারছি না। আমি যেন বীভৎস সেই দৃশ্য দেখে আতঙ্কে বোবা হয়ে গেছি। মনে হচ্ছিল, এখনই এখান থেকে বেরিয়ে না-গেলে আমিও মরে যাব!
“কিন্তু কী ভয়ানক কাণ্ড, রেল-কামরার ভাঙা পেল্লাই টুকরোগুলো এমনভাবে পথ আটকে পড়ে আছে, মনে হচ্ছে, আমি যেন তার ভেতরে বন্দি! যেদিকেই যাই বেরিয়ে যাওয়ার পথ নেই। ভয়ে আমার বুক শুকিয়ে যায় যেন! যতই বাধার জঞ্জাল পেরিয়ে বেরিয়ে আসার জন্যে কপাক করি, ততই হাঁপ ধরে যায়। মনে হল, খুব চিৎকার করে হাঁক দিই, আমাকে বাঁচাও। তা-ও পারলুম না। গলায় স্বর আটকে যায়! আমার দম নেই। আমি আর পারি না।
“হঠাৎ আমি থমকে গেলুম। আমার অস্থির চোখ চমকে উঠল। আমি দেখতে পেলুম, ভাঙা কামরার পেটের মধ্যে একটা ফোকর। আমার মনে হল, ওই ফোকর গলে হয়তো বাইরে যাওয়া যাবে। তখনই আবার নিশ্বাস পড়তে লাগল ঘন-ঘন। আমি ক’পা এগিয়ে গেলুম। উঃ! কী কষ্ট! সেই ফোকরের ভেতরেও মানুষের মৃতদেহ। আহত মানুষের আর্তনাদ। আশ্চর্য, এখনও পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসেনি আমাদের সাহায্য করতে। এত চটজলদি আসা সম্ভবও নয় এখানে। কেননা, দুর্ঘটনাটা যেখানে ঘটেছে, সেটা একটা ঘন জঙ্গল। এই জনমনুষ্যহীন জঙ্গলে এমন একটা সর্বনাশা বিপদের কথা জানছেই বা কে! সুতরাং যে-মানুষগুলো আহত হয়ে বেঁচে আছে, তাদের আর্তনাদ কারও কানে পৌঁছচ্ছে না। কে আসবে তাদের উদ্ধার করতে! কাজেই নিজেদের বাঁচার রাস্তা নিজেদেরই খুঁজে বার করতে হবে। যেমন আমি খুঁজছি। কিন্তু আহত যেসব মানুষের তেমন ক্ষমতা নেই তাদের আর্তনাদ করা ছাড়া আর কী উপায়!
“হ্যাঁ, অনেক কষ্টে আমি ফোকরটার কাছাকাছি আসতে পেরেছি। এইটুকু আসতেই জেরবার হয়ে গেলুম আমি। খানিক দম নিলুম। তারপর মাথা গলাতে গিয়ে থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লুম। দেখি কী, ভাঙা কামরার কাঠকুটোর সঙ্গে মরা মানুষের দেহগুলো এমনভাবে জড়িয়ে আছে, আমার বেরোবার পথই নেই। দেহ সরিয়ে যে বেরোব আমি, তখন তেমন ক্ষমতাই নেই আমার। ভয়ে আমার হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল। অসহায়ের মতো ভাবতে লাগলুম, এই ভগ্নস্তূপের মধ্যেই হয়তো আমায় মরতে হবে পড়েপড়ে। শেষমেশ এই মৃত মানুষগুলোর ক্ষত-বিক্ষত মুখ দেখতে লাগলুম। আর মনে-মনে ভাবতে লাগলুম, যে মানুষগুলো একটু আগে হাসি-হল্লায় মশগুল ছিল, চোখের পলকে তাদের কী অবস্থা হয়ে গেল। ধক করে উঠল বুকের ভেতরটা। মনে হল, আমারও হয়তো এমনই দুর্দশা হবে একটু পরে। আমি মরে দলা পাকিয়ে পড়ে থাকব এখানেই, ওই মৃত মানুষগুলোর ভিড়ে।
“হঠাৎ আমি আকাশ দেখতে পেলুম। যতক্ষণ গাড়ি ছুটেছে ততক্ষণ কামরার ভেতরে ছিলুম। কামরার ছাদের নীচে। সুতরাং তখন আকাশ চোখে পড়েছে জানলায় দৃষ্টি রেখে। এখন কামরার ছাদটাই ভেঙে চৌচির। সুতরাং মাথার ওপর ঝকঝক করছে আকাশ। হঠাৎ নজরে পড়ে গেল একটা মস্ত গাছ। আমাদের কামরাটা দুর্ঘটনায় ছিটকে পড়েছে জঙ্গলের ওই গাছটার ওপরেই। আধখানা ভেঙে সেটা হেলে আছে। একটা ডাল একেবারে মাথার ওপর ঝুলে পড়েছে। অন্য সময় হলে একটু লেংচে হাত বাড়ালেই পেয়ে যেতুম। কিন্তু এখন হাত বাড়ানো দূরে থাক, ল্যাংচাতেই পারব না। তবে মনে হচ্ছে, ভেঙেপড়া কামরার ওই কাঠটার ওপর উঠতে পারলে, গাছের ডালে হাত পেয়ে যাই। আমি শেষমেশ প্রাণের দায়ে তা-ই করলুম। বলব কী, প্রচণ্ড কষ্ট হল ওই কাজটি করতে। আমি ডালটা ধরেও ফেললুম। কিন্তু হায়! হায়! সময়টা যে আমার এখন একেবারেই ভাল যাওয়ার কথা নয়! তাই, ওই ডাল ধরে চাপ দিতেই সেটা প্রমাণ হয়ে গেল। ডালসুদ্ধু হুড়মুড় করে আমি ঠিকরে চিতপটাং। একেই তো পায়ের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে যাচ্ছিলুম, তার ওপর আবার এই কাণ্ড! আঘাতের ওপর আবার আঘাত। সুতরাং সেই যে পড়লুম আর কে নড়ায়! আমি পড়েই রইলুম দলা পাকিয়ে।
“এমন সময়ে হঠাৎ মনে হল একদল লোক এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। ভাঙা কামরার জঞ্জাল ডিঙোচ্ছে। আঃ! বাঁচার আশায় উত্তেজনায় বুকের ভেতরটা তোলপাড় করতে লাগল। না, আর বোধ হয় ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এবার ওরা আমাদের উদ্ধার করবে! নিয়ে যাবে হাসপাতালে। প্রার্থনা করি, কোনও মানুষ যেন আমার মতো এমন বিপদে আর না-পড়ে। আমি যদি প্রাণে বেঁচে না থাকতুম, তা হলে যে কী হত সেকথা মুখে না বললেও, কে না আন্দাজ করতে পারে! বাবার কী হল, সে-খবর নেওয়ার কথা ছেড়েই দাও, আমার মা আর বোনটার কথা একবার ভেবে দ্যাখো তো! আমি না-থাকলে তারাই বা কার ভরসায় বেঁচে থাকবে?
“হ্যাঁ, সত্যিই এল বটে অনেক লোক আমাদের দিকেই। তারা অদ্ভুত কায়দায় জঞ্জাল টপকে এদিক-ওদিক করছে। কিন্তু, আশ্চর্য, আমাদের উদ্ধার করছে না তো! উলটে আবর্জনার ভেতর থেকে এটা-ওটা টেনে-টেনে বার করছে। খুঁজছে। লুঠ করছে। দেখি কী, বিপদগ্রস্ত মানুষগুলোর সোনাদানা, পয়সাকড়ি যা পাচ্ছে, তা-ই হাতাচ্ছে। লোকগুলো কি তবে ডাকাত! এরাই কি তবে যাত্রীদের যথাসর্বস্ব লুঠ করার জন্যে এই দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে! এই জঙ্গলের নির্জনে! আমি বোবা হয়ে গেলুম তাদের এই সর্বনাশা কাণ্ড দেখে। কী করব, কিছুই মাথায় এল না। আমি এই খোঁড়া পায়ে এখন কীইবা করতে পারি! ওরা অতজন। আমি একা। আমি চিৎকার করে উঠলেই বা কে আসবে আমাদের সাহায্য করতে। চেঁচালেই আমাকে শেষ করে ফেলবে। সুতরাং চেঁচামেচি না করে ঘাপটি মেরে পড়ে রইলুম। আর চোখ পিটপিট করে দেখতে লাগলুম, ওরা কোনদিক দিয়ে এই ভাঙা কামরা থেকে বেরিয়ে যায়। সেদিক দিয়ে আমিও তো বেরিয়ে যেতে পারি।

“কী বলব, নিমেষের মধ্যে যার যেখানে যা ছিল সব লুঠপাট করে তারা সরে পড়ল। আমার কপাল ভাল বলতে হয়, তারা আমায় দেখতে পায়নি। কিন্তু তারা ভাঙা কামরার যে ফাঁকটা দিয়ে বেরিয়ে গেল, সেটা আমি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি। কাজেই ওরা বেরিয়ে যেতেই আমিও ওই ফাঁকটার কাছে এগিয়ে গেলুম। কে আর তখন পায়ের যন্ত্রণার কথা ভাবে। ওই ফাঁকটা দিয়ে বাইরে উঁকি মারলুম। দেখে গা শিউরে ওঠে। দেখি কী, দশ-বারোজন লোক। মুখে কালো কাপড় জড়িয়ে, একটা ঘোড়ায় টানা গাড়িতে রাশি-রাশি লুঠ করা জিনিস বোঝাই করছে। আমার আর সন্দেহের কিছু নেই। এরা ডাকাতই৷ অথচ আমার করারও কিছু নেই। আর করবই বা কী। একা-একা! ওরা অত লোক। বুঝতে পারলে আমায় কি ছেড়ে দেবে? মোটেই না। এখন আমার যা অবস্থা এক ঘা দিলেই শেষ। কিন্তু চোখের সামনে লুঠপাটের এমন জঘন্য কাণ্ড দেখে, আমার রাগে গা রি-রি করে উঠল। আমার বাবা একজন সৎ পুলিশ-কর্মী। তাঁর ছেলে হয়ে আমি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে এই অন্যায় কাজ কেমন করে সহ্য করি! আমার মন তোলপাড় করতে লাগল। কী করলে যে, লোকগুলোকে শায়েস্তা করা যায়, বুঝে উঠতে পারলুম না। আমি জানি, এতক্ষণে রেলের এই দুর্ঘটনার খবরটা নিশ্চয়ই ছড়িয়ে পড়েছে। অন্তত রেল-কর্তাদের কানে যে পৌঁছে গেছে সে সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই। আর হয়তো বেশি দেরি নেই। হয়তো শিগগিরিই তারা পৌঁছে যাবে এখানে। কিন্তু তারা পৌছবার আগেই যে এই দুর্বৃত্তরা এখান থেকে কাটতে চাইছে, সে তাদের তড়বড়ানি দেখেই আমি বুঝতে পারছি। যত দামি-দামি জিনিস তারা লুঠ করেছে, তার সবই তারা গাড়িতে তুলে ফেলেছে। সুতরাং এবার তাদের পালাবার পালা। কিন্তু অত লোককে, এই একটা গাড়িতে ধরবে না তো! তার ওপর গাড়িতে এত মাল। তবে এরা যাবে কিসে! তবে কি এরা এখানেই ভালমানুষ সেজে বসে থাকবে!
“না, তারা বসে থাকল না। সমস্ত লুঠের জিনিস গাড়িতে তুলে দিয়ে, ঘোড়া ছুটিয়ে হাওয়া হয়ে গেল দু একজন ডাকাত। আমিও সঙ্গে-সঙ্গে সেই ফাঁকটায় মাথা গলিয়ে বেরিয়ে পড়লুম। খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে বেশ খানিকটা চলেও এলুম। এসে দেখি, সেই দলের অন্য একদল ডাকাত এক-একটা ঘোড়ার পিঠে বসে ফিসফিস করে কথা বলছে। তাদের সেই কথার আবছা শব্দই আমি শুধু শুনতে পেলাম। কী বলছে, কানে এল না। কিন্তু কথা বলতে বলতেই তারা ঘোড়া ছোটাল। আমি বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে সেইদিকে তাকিয়ে রইলুম।
“অবশ্য নিজেকে বোকা ভাবাটা খুবই অল্পক্ষণের জন্যে। আমি ঝটপট নিজেকে সামলে নিলুম। বোকার মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে আমার মন সায় দিল না আর। আমার বারবার মনে হচ্ছিল, হাতের কাছে পেয়েও এই পজঝড় লোকগুলোকে আমি ধরতে পারলুম না। কী যে আফসোস হচ্ছিল। পজঝড়ই তো! রেলের ভয়ঙ্কর এই দুর্ঘটনাটা যে ঘটিয়েছে এরাই, সে নিয়ে আমার মনে আর কোনও সন্দেহই নেই। মানুষ মরল কি বাঁচল, এদের বয়েই গেছে। সে-কথা ভাবার। যেমন করে হোক লুঠ করতে হবে। নিজেদের কাজ হাসিল করতে মানুষের প্রাণ নিতেও এরা পিছপা হয় না। এমনই নৃশংস এইসব মানুষ। কী হিংস্র মন এদের।
“কী আর করা যাবে! আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলুম, ঘোড়ার পিঠে ছুটতে ছুটতে তারা হারিয়ে গেল জঙ্গলের গভীরে। আর আমার মিথ্যে এখানে দাঁড়িয়ে থাকা।
“না, মিথ্যে নয়। আমার হঠাৎ নজরে পড়ল জঙ্গলের মাটির ওপর চাকার দাগ। মনে হল, ঘোড়ায় টানা যে-গাড়িটা করে ওরা লুঠের জিনিস নিয়ে ভেঙ্গে পড়ল, এ-দাগ সেই গাড়ির চাকার। এই দাগের ওপর লক্ষ রেখে যদি যাওয়া যায়, তা হলে তো লোকগুলোর ডেরা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে!
“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু যাবে কে? আমার তো এই অবস্থা! অনেক দূরে যদি তারা গিয়ে থাকে, আমি খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে যাব কেমন করে সেখানে? সেই অজানা জায়গায় না-জানা দূরে? কেমন অসহায় মনে হল নিজেকে। ভেতরে-ভেতরে ভীষণ ছটফটানি শুরু হয়ে গেল। উত্তেজনায় আমার পায়ের যন্ত্রণার কথা ভুলে গেলুম। মনকে শক্ত করলুম। স্থির করলুম, ওই গাড়ির চাকার চিহ্ন ধরে আমি হাঁটব। যেমন করে হোক ওই লোকগুলোর সন্ধান আমায় পেতেই হবে। ওদের একদিন, কি আমার একদিন। ওদের আমি দেখে নেব। সুতরাং হাঁটো। খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়েই হাঁটো। চোখ রাখো ওই চাকার চিহ্নের ওপর।
“গভীর জঙ্গলে একলা হাঁটছি। আমি এখন আহত। দুর্ঘটনায় আহত এক জোয়ান ছেলে। জঙ্গলের গভীরে যতই ঢুকছি, ছমছম করছে আমার মন। নিস্তব্ধ চারদিক। থমথম করছে যেন সারা জঙ্গল। ডাকাতের ভয় তো আছেই! সেইসঙ্গে সাপ-খোপের ভয়টাকেও হেলাফেলা করা যায় না। এমনকী, এমন জঙ্গলে হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের ভয়টাকেও মন থেকে ঝেড়ে ফেলা খুব শক্ত। তা, যতই এসবের ভয় থাক, এদিক-ওদিক তাকাবার জো নেই। গাড়ির চাকার দাগের ওপর থেকে চোখ সরালেই, গুলিয়ে যেতে পারে পথ। হারিয়ে যেতে পারে চাকার দাগ। কাজেই গাড়ির চাকার দাগ থেকে চোখ সরানো একেবারেই চলবে না। হিংস্র জন্তু আমার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়লেও না। সুতরাং জঙ্গলের জঞ্জালে দৃষ্টি স্থির রেখে হেঁটে চলো। চলো, পায়ের যন্ত্রণা ভুলে একা-একা।
“হ্যাঁ, এই খোঁড়া পায়ে একা অনেকটাই চলে এসেছি। মনকে যতই শক্ত করি, পা যেন আর চলে না। উফ! কী কষ্ট করেই না এতটা পথ এসেছি। কেমন করে এতটা এলুম! নিজেকে নিজেরই যেন বিশ্বাস হয় না। এবার একটু দাঁড়ানো যাক। দাঁড়িয়ে একটু দম না-নিলে পা বুঝি আর শোনে না!
“তারপরেই মন যে উলটো কথা বলে! মন বলে, না, দরকার নেই। বরং একটু আস্তে হাঁটি। তা বলে মনে করার কোনও কারণ নেই, এতক্ষণ আমি বুঝি হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হেঁটেছি। মোটেই না। হেঁটেছি আস্তেই। তবে এখন হাঁটতে হবে আরও একটু আস্তে। চলার গতি কমিয়ে। সেই ভাল, ঠুকঠুক করেই হাঁটা যাক। এতে তেমন দম ফুরোবার ভয় থাকে না।
“কিন্তু হল না। দাঁড়াতে আমায় হলই। তবে দম নেওয়ার জন্যে নয়। আচমকা একটা ঘোড়ার ডাক শুনে। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি। মনে-মনে ভাবছি, তবে কি, এ সেই ডাকাতদের ঘোড়া ডাক দিল! আমি কি তবে তাদের ডেরার কাছে পৌঁছে গেছি! কই না, তেমন তো কোনও ডেরা-টেরা দেখা যাচ্ছে না। যাঃ! আমি খুব সন্তর্পণে একটা ঝোপের মধ্যে বসে গা ঢাকা দিলুম। যত বিপদ আমার খোঁড়া পা-টা নিয়েই। এখন কেউ যদি আমায় দেখতে পেয়ে যায়, তেড়ে আসে, আমার সাধ্যি নেই পালাই! যত নষ্টের গোড়া আমার এই পা! তবে, মিছিমিছি দুষছি পা-কে। পায়ের কী দোষ! পা তো আর ইচ্ছে করে খোঁড়া হয়নি। দুর্ঘটনা ঘটলে কার যে কী হবে, কেউ বলতে পারে! আমার যে প্রাণ যায়নি, এই যথেষ্ট!
“অনেকক্ষণ বসে রইলুম সেই ঝোপের মধ্যে। মনে হচ্ছে, কেউ টের পায়নি। তবে, এখানে, কাছাকাছি যে মানুষ আছে, সেটার কিন্তু আভাস পাচ্ছি যথেষ্ট। ঘোড়ার ডাক যদিও আর শোনা গেল না, কিন্তু তাদের নাকের ফরফরানির শব্দটা থেকে-থেকেই শোনা যাচ্ছে। সঙ্গে, মানুষের অস্পষ্ট গলার শব্দ কানে আসছে। সন্দেহ হল, তা হলে বোধ হয় ডেরাটা এখানেই। যদিও এই আড়াল থেকে ডেরার কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তার ওপর এখানে জঙ্গল বেশ ঘন। গাছের গায়ে গাছ একেবারে জড়ামড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। তুমি দেখবে কেমন করে! একচুলও ফাঁক নেই। এমনকী মাথার ওপরেও যেন ঝাঁকড়া গাছের ছাদ। ডালপালা আর পাতার ঝাঁক এমন আড়াল করে আছে যে, এখান থেকে একফালি আকাশও দেখা যাচ্ছে না। কাজেই কতটা বেলা গড়িয়েছে, তাও আন্দাজ করতে পারছি না। তবে এটা বুঝতে পারছি, সন্ধে হতে আর দেরি নেই। ভয় হল, সত্যি-সত্যি যখন রাতে অন্ধকার নেমে আসবে, তখন কী করব! তখন তো আর এভাবে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা যাবে না। কে আর জীবনের মায়া ছেড়ে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতে চায়! একটা বিপদ থেকে আর-এক বিপদে বোকা-গাধা ছাড়া কে লাফ দেয়! কী দরকার ছিল আমার এমন বিপদের ঝুঁকি নেওয়ার! নিজেকে কে দেখে তার নেই ঠিক, অন্যের জন্যে দরদ দেখানো! কোনও মানে হয়! জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আবার রেল-দুর্ঘটনার জায়গায় ভালয়-ভালয় ফিরে যাওয়াই উচিত। আর দেরি না-করাই ভাল। এর পর রাতের অন্ধকারে চরকিবাজি শুরু হয়ে যাবে!
“কিন্তু হায় রে, মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। আমার মনের বাসনা পূর্ণ হল না। আমি যে-চিহ্ন দেখে ফিরে যাব, সেই চাকার দাগও যে আর চোখে পড়ছে না। তার ওপর আমার আঘাত লাগা পা-টাও বেঁকে বসেছে। সে-ও নড়তে চাইছে না। তা হলে? কী হবে? এবার ভয় পেয়েছি। বুক কাঁপছে। আমার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল। মা আর বোনের কাতর মুখদুটি চোখের ওপর ভেসে উঠল। মনে হল, কেমন যেন হালকা হয়ে আসছে সারা শরীর। এই বুঝি শুয়ে পড়তে হয় আমায়! আমি নিজেই নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলুম। আমি কি তবে হেরে যাব! আমার মাথা টলে পড়ল একটা মস্ত গাছের গুঁড়ির ওপর। আমি হাঁপাতে লাগলুম।
“অনেকক্ষণ এমনই করে বসে থাকার পর আমার হাঁপটা যেন একটু সামলাতে পারলুম। তখন আমার মনে হল, এখন সামলালেও শেষমেশ হয়তো আমায় মরতেই হবে। ভাগ্যের জোরে এখনও বেঁচে আছি বটে, কিন্তু সে-বাঁচা মিথ্যে। এবার জঙ্গলের বিপদ থেকে আমার নিস্তার নেই। মনে হচ্ছে, আকাশে আর দিনের আলো নেই। সন্ধে হয়ে গেছে! কেন না, এতক্ষণ এদিকে-ওদিকে ভাসা-ভাসা যতটুকু আলো দেখা যাচ্ছিল, এখন তার ছিটেফোঁটাও নজরে পড়ছে না। মনে হল, মরতে যখন হবেই, তখন বাঁচার শেষ চেষ্টা করতে দোষ কী! এভাবে এখানে লুকিয়ে না থেকে বরং যেখান থেকে ঘোড়ার ফরফরানির শব্দ আসছে, সেখানেই যাই। সেখান থেকে মানুষেরও গলার ক্ষীণ শব্দ কানে আসছে। ওদের কাছে গিয়ে আশ্রয় চাওয়া ছাড়া আর গত্যন্তর নেই। তবে, ওরা যদি আমার দেখা সেই ডাকাতই হয়, তবে সন্দেহ আমায় করতেই পারে। সন্দেহে আমায় যদি আটক করে, তখন আর কী করা! ওদের নজরবন্দি হয়ে থাকতে হবে। আর যদি মারে, মারুক। আমি তো মরতেই বসেছি। এখন বাঁচার শেষ চেষ্টা করা ছাড়া, আমার তো আর-কিছু করারও নেই। বাঁচি ভাল। মরলে আমার কপাল। সুতরাং খোঁড়া পায়ে যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়ে আমি এগিয়ে গেলুম। ঘোড়ার নাকের ফরফরানি শব্দ শুনি, আর এগোই।
“যা ভেবেছি ঠিক তা-ই। বনের এই গভীরে মাথা গুঁজে থাকার মতো অনেক ঘর হঠাৎ আমার চোখে পড়ল। একটা লম্বা-চওড়া আস্তাবল। শুনতে পেলুম ঘোড়ার পা ঠোকার খুরের শব্দ। শব্দটা আসছে আস্তাবলের ভেতর থেকে। কী জানি কেন, হঠাৎ আমার মনে হল, হুট করে কারও সামনে যাওয়াটা বোধ হয় ঠিক হবে না। মনে হল, আরও খানিক লক্ষ রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে অন্ধকার যেভাবে নেমে এসেছে তাতে লক্ষ রাখাই মুশকিল। হ্যাঁ, এখন মানুষের গলার স্বর বেশ স্পষ্টই শোনা যাচ্ছে। তাদের কথাবার্তা শুনে বুঝতেই পারছি, আজকে এই রেলগাড়ির ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটিয়ে তারা বেশ ভালমতো ধনরত্ন লুঠ করতে পেরেছে। সেই নিয়েই তারা খোশমেজাজে গল্পগুজবে মত্ত। হ্যাঁ, বুদ্ধি বটে এই শয়তানগুলোর! কেমন ডেরা গাড়ার জায়গাটা খুঁজে বার করেছে! কার সাধ্যি টের পায়! টের পেলেও এদের পাকড়াও করবে কে! এখানে এমনই জঙ্গল ঘন, কেউ ধরবার জন্যে এখানে এলেই, জঙ্গল-যুদ্ধ শুরু করে দেবে। এমনভাবে লুকিয়ে-ছাপিয়ে লড়াই চালাবে, কারও মুরোদ নেই তখন এদের সঙ্গে পারে! ওই দেখতে পাচ্ছি অস্পষ্ট চোখে ঘোড়ায়-টানা গাড়িটা। ব্যস, ঝপ করে যেন অন্ধকার আরও গাঢ় হল। চোখ এবার সত্যি-সত্যি অন্ধকারে ডুবে গেল। এখন কী করি! ওদের কাছে আশ্রয় চাইতে এসে এখন ভাবছি, ওরা আশ্রয় দিয়ে আমাকে যদি আর না ছাড়ে! যদি ভাবে, আমাকে ছেড়ে দিলে, আমি ওদের এই গোপন আস্তানার কথাটা ফাঁস করে দিতে পারি! এ ভয়টা ওদের থাকতেই পারে। কাজেই, আশ্রয় দিলেও আমাকে ওরা ছাড়বে না। হয় আমায় মেরে ফেলবে, না হয় জোরজবরদস্তি আমাকে ওদের সঙ্গে ডাকাতি করতে বাধ্য করবে। সুতরাং এই জঙ্গলে, এই ঝোপঝাড়ের আড়ালেই আমায় থাকতে হবে। ইস, কী সঙ্গিন অবস্থা এখন আমার! অন্ধকারের বন যে কী ভয়ঙ্কর, সে তখন আমি হাড়ে-হাড়ে বুঝেছি। ঝিঁঝিঁ ডাকুক, তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু হিংস্র কোনও প্রাণী যদি আমায় দেখতে পায়, তবে নির্ঘাত মরণ। কী করি তবে!
“আসলে আমি নিজেই ভীষণ বোকামি করে বসেছি। এই অন্ধকার নিয়ে আমার এত কথা বলার দরকারও পড়ত না। কী দরকার ছিল এই খোঁড়া পা নিয়ে ওদের পেছনে ধাওয়া করা! আমার তো তখনই বোঝা উচিত ছিল, একা-একা এ-ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়। এখন জঙ্গলের এই মারাত্মক গহীনে ঢুকে বিপদকে তো আমি নিজেই ডেকে এনেছি। রাত যতই এগিয়ে চলেছে, ভয়ে আমার গায়ের রক্ত ততই হিম হয়ে আসছে। মন এমন ছটফট করছে! মনে হচ্ছে, এখনই এখান থেকে পালাই। অন্ধকার জঙ্গল যেন ধীরে-ধীরে এগিয়ে আসছে হাত পাকিয়ে আমার গলাটাকে টিপে ধরার জন্যে। এবার আমি সত্যি ভয় পেয়ে গেলুম। আমি পালাবার পথ খুঁজতে লাগলুম। হায় রে, পথ খোঁজাই সার। আমি কেন, যেসব ডাকাত দিন-রাত্তির এই জঙ্গলে লুকিয়ে আছে, তারাই কি পারবে বিপদে পড়লে অন্ধকারে পথ খুঁজে পালাতে! অসম্ভব। আমার কাছে এখন যা সম্ভব, তা হল ডাকাতের কাছে গিয়ে আশ্রয় চাওয়া। তাতে আমায় যদি ওরা মেরে ফেলতে চায়, ফেলুক। আমার কিছু করার নেই। চেষ্টা তো করতে হবে।
“হ্যাঁ, একটু আগেও ওদের আবছা-আবছা দেখতে পাচ্ছিলুম আমি। এখন দেখা দূরে থাক, সব কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মনে হয়, যে-যার নিজের মাথা গোঁজার চালায় ঢুকে পড়েছে। কাজেই, এখনই আমায় এই ঝোপ ডিঙিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়। আর দেরি করা ঠিক নয়। তবুও দোনোমনা করি। দোনামনা করতে করতেই আমি এগিয়ে গেলুম নিঃসাড়ে। দেখতে পেলুম, ছোট্ট ছোট্ট অনেক চালাঘর। জঙ্গলের কাঠকুটো দিয়ে তৈরি। পাতা দিয়ে ছাওয়া পর্ণকুটিরের মতো। তারা নিজেরাই যে এ ঘরগুলো তৈরি করে নিয়েছে, তা দেখলেই বোঝা যায়! পাকাপোক্ত বাড়ি এরা করবেই বা কেন! দরকার পড়লে এসব ঘর ভেঙে দিয়ে আবার অন্য জায়গায় সরে পড়বে। সেখানে আবার নতুন ডেরা বাঁধবে।
“আমি নিঃশব্দে এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলুম। একটা ঘরের পেছনের দিকে পৌঁছেও গেলুম। জানলা না থাকলেও ক্ষতি নেই। কোথাও-কোথাও একটু-আধটু পাতার দেওয়ালে ফোকর দেখা যাচ্ছে। ঘরের ভেতরে লণ্ঠন জ্বলছে। সেই ফোকরের ভেতর দিয়ে ঝিলমিল করে আলো ছড়িয়ে পড়ছে বাইরে। আমি খুব রয়ে-সয়ে সেই পাতার ফোকরে চোখ রেখে ঘরের ভেতরটা দেখবার চেষ্টা করলুম। ফোকরে যেই চোখ রেখেছি, অমনই আমার সারা শরীরে যেন হঠাৎ চমকে-ওঠা বিদ্যুতের ঝলকা আঘাত করল। উত্তেজনায় আমার দম আটকে আসে! এ কী! ঘরের ভেতরে এ আমি কাকে দেখছি! এ যে আমার বাবা! হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বাবা ঘরের মাটির ওপর পড়ে আছেন। সারা শরীর আমার ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। নিজের চোখকে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। যে বাবার খোঁজ নিতে আমি পথে বেরিয়েছি, সেই বাবাকে আমি যে এখানে, এই অবস্থায় আচমকা দেখতে পাব, ভাবতেই পারি না। যেন অসম্ভব এক কাণ্ড। তবে কি বাবা এই ডাকাতদের ধরতে এসে নিজেই এদের হাতে ধরা পড়েছেন। হ্যাঁ, তাই হবে। এখন বাবার কাছে যাওয়ার জন্য উৎকণ্ঠায় আমার ছটফটানি ধরে গেল। কিন্তু কেমন করে যাব! ওই ঘরে আমি আর-একজনকে দেখতে পাচ্ছি। কে ও? ও কি তবে পাহারা দিচ্ছে বাবাকে? বাবাকে নজরে রেখেছে! হবে হয়তো। অন্ধকার আর আমায় ভয় দেখাতে পারছে না। অন্য আর কোনওদিকে আমার চোখ নেই। অন্য আর কারও কাছে গিয়ে আশ্রয় চাইবার কথা একেবারেই মনে আসছে না। শুধু বাবার কাছে যাওয়ার জন্যেই আমার মন অস্থির হয়ে উঠল। কিন্তু কেমন করে যাব! কেমন করে বাবাকে উদ্ধার করব! কিছুই ভেবে পাই না। মনে-মনে ভাবতে লাগলুম, আহা রে, ওই পাহারাদার লোকটা যদি একবারের জন্যেও ঘর থেকে বেরিয়ে যায়! বেরিয়ে গেলেই বা কী করব। একবার বেরিয়ে যাওয়া মানে তো একেবারে বেরিয়ে যাওয়া নয়! একেবারে বেরিয়ে গেলে তবু কথা ছিল। একটা ব্যবস্থা করা গেলেও করা যেত! তবে, সে যে বেরিয়ে যাবে না, তার হাবভাব দেখে বোঝাই যাচ্ছে। তবে কি ডাকাতদের কাছে গিয়ে মিথ্যে কথা বলব। মিথ্যে-মিথ্যে বলব, আমি পথ হারিয়ে বনে ঢুকে পড়েছি। কিন্তু ওরা যদি বিশ্বাস না করে! ওরা যদি আমাকেও বাবার মতো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে বন্দি করে রাখে! বন্দি করে যদি বাবার ঘরেই আমাকে নিয়ে যায়, তা হলে অবশ্য দু’জনে দু’জনকে দেখতে পাব। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হবে না। তখন দু’জনকেই বন্দি হয়ে থাকতে হবে। সে যে আরও ভয়ানক। আমার মা আর বোনের কী হবে তখন! তাদের কথা ভাবো তো একবার। না, ধরা আমি কিছুতেই দেব না। তার চেয়ে বরং এই অন্ধকারে আমি লুকিয়ে বসে থাকি। বাবাকে যেমন করে হোক উদ্ধার আমায় করতেই হবে। এই অন্ধকারে বসে-বসেই সেই সুযোগের জন্যে আমায় অপেক্ষা করতে হবে, এটা কে না জানে!
“আমি অন্ধকার ছমছম জঙ্গলে, একা বসে আছি। রাতও ধীরে-ধীরে গভীর হচ্ছে। অন্ধকারে একা বসে থাকা যে খুব সহজ কাজ নয়, সে সবাই জানে। চোখে ঘুম জড়িয়ে এলেই মুশকিল। তবে বাঁচোয়া এই, তখনও পর্যন্ত, ঘুমের কথা ছেড়ে দাও, একটা হাই পর্যন্ত ওঠেনি। যার বাবা চোখের সামনে বন্দি হয়ে পড়ে আছেন, তার ঘুম পায়! না, সে ঘুমের কথা ভাবতে পারে! তার ওপর জঙ্গলের ঝোপের মধ্যে মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমোবে কী করে! ঘুম-টুম মাথায় উঠল আমার। মাঝে-মাঝেই পাতায়-ছাওয়া ঘরের দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে বাবাকে দেখছিলুম। বাবা চুপচাপ পড়ে আছেন। ঘুমোচ্ছেন, না জেগে-জেগে নিঃসাড়ে পড়ে আছেন, আমি বুঝতে পারছিলুম না।
“এমনই করে মাঝে-মাঝে উঁকি মারতে গিয়ে হঠাৎ একবার দেখি, সেই পাহারাদার লোকটা বেমালুম ঢুলে-ঢুলে ঘুমোচ্ছ। উত্তেজনায় আমি টান হয়ে বসলুম। চোখের দৃষ্টি লোকটার ওপর রেখে ভীষণ উসখুস করতে লাগলুম। মনে-মনে ভাবলুম, লোকটা একবার ঘুমে কাত হয়ে মাটিতে যদি গড়িয়ে পড়ে! আহা রে তা হলে যা হয় না! বলব কী, যেমন ভাবা তেমনই কাজ। লোকটা সত্যিসত্যিই মাটিতে শুয়ে পড়ল। পড়েই শুরু হয়ে গেল তার নাকের গর্জন। আমিও একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললুম খুব জোরে। ইস, এমন বেআক্কেলের মতো কেউ কাজ করে! নিশ্বাসটা এমন জোরে ফেলে কেউ! শব্দটা যে লোকটার কান পর্যন্ত পৌঁছবে, সে আমার একদম খেয়াল হয়নি। লোকটার চোখ খুলে গেল ঝপ করে। আমি হকচকিয়ে গেছি। আর একটু হলে ‘ইস’ শব্দটা ফস করে মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়েছিল। ঝটপট মুখে হাত চেপে সে-যাত্রা বেঁচে যাই। ভাগ্য বটে! সে-যাত্রা আমার বাঁচার সঙ্গে-সঙ্গে লোকটারও খোলা চোখ আবার বুজে গেল। হবেই তো, ঘুম একবার চেপে ধরলে এমন কে বলবান আছে তাকে ছাড়ায়!
“সুতরাং লোকটাকে ওইভাবে ঘুমে অচেতন দেখে আমার আর তর সইল না। আমি ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে পড়লুম। একটু আগে, এখান থেকেই আমি ঘরের সামনের দিকটা দেখে নিয়েছি পাতার ফোকর দিয়ে। অবশ্য সামনের দিকে দরজামতো একটা ঠেকা আছে। সেটা যে ঠেলা মারলেই খুলে যাবে, তা বোঝাই যায়! আমি এই আড়াল থেকে বেরিয়ে ওদিকেই গেলুম। খুবই সতর্ক আমার চোখের দৃষ্টি।
“তেমনই সতর্ক হাতে আমি দরজায় ঠেলা দিলুম। দরজা একটু নড়েই খুলে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের জ্বলন্ত লণ্ঠনের আলো বাইরে ছড়িয়ে পড়ল। না, হুট করে ঘরে ঢুকে পড়াটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সেই ভেবে খানিক এদিক-ওদিক দেখার চেষ্টা করলুম। মিথ্যে চেষ্টা করা। সেই অন্ধকারে লণ্ঠনের যেটুকু আলো ছড়িয়ে আছে, সেই আলোয় আর কতটুকুই বা দেখা যায়! তবে আশার কথা এই যে, যাকে পাহারা দেওয়ার জন্যে মোতায়েন করা হয়েছিল, তিনি তেড়ে ঘুমোচ্ছেন! তবে তিনি ঘরে ঢোকার পথটি এমনভাবে আগলে ঘুমে গড়াচ্ছেন যে, ঘরে ঢুকতে তাঁকে ডিঙোতেই হবে! একটু বেসামাল হলেই গেছ! যাই হোক, তাকে টপকাতে আমায় তেমন আয়াস করতে হল না। অন্ধকার থেকে আলোয় হঠাৎ আমায় দেখে বাবা যেন ভূত দেখার মতো আঁতকে উঠলেন। আমি সঙ্গেসঙ্গে ইশারা করে তাঁকে কথা বলতে বারণ করলুম। তিনি স্তম্ভিত হয়ে আমায় দেখতে লাগলেন। বাবার সারা শরীর বাঁধা মোটা দড়ি দিয়ে। আমি মুহূর্ত দেরি না করে খুলতে লাগলুম। বাঁধন খুলতে কতক্ষণই বা লাগে! খুলে যেতেই নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলুম। বাবাকে নিয়ে। আবার সেই অন্ধকার। অন্ধকারে ঘোড়ার খুটখাট পা ঠোকার শব্দ শুনে আমি তাদের পাত্তা খোঁজার জন্যে বাবাকে নিয়ে চোরের মতো এদিক-ওদিক করতে লাগলুম। বাবা ব্যস্ত গলায় ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী খুঁজছিস?’
“আমিও বাবার মতো চুপিসারে বললুম, ‘ঘোড়া।’
‘কেন?’
“আমার জানা ছিল, পুলিশে চাকরি পেয়ে বাবাকে ঘোড়ায় চড়া শিখতে হয়েছিল। তাই উত্তর দিলুম, এরা টের পাওয়ার আগেই বন ছেড়ে আমাদের পালাতে হবে। আর তা করতে গেলে ঘোড়া ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না এই জঙ্গলের রাজ্যে। তা ছাড়া রেল দুর্ঘটনায় আমার পা-ও জখম। এই পায়ে ছুটতে পারব না আমি। ছোটার কথা ছেড়ে দাও, হাঁটতে পারব না হনহন করে। সুতরাং ধরা পড়ে যাব।’
“‘রেল-দুর্ঘটনা!’ বাবা অদ্ভুত একটা চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।
“আমি উত্তর দিলুম, ‘সেসব কথা পরে হবে। এখান থেকে আগে পালাই চলো।’
“বাবা মনে-মনে হয়তো আমার বুদ্ধির তারিফ করলেন। তাই বললেন, ‘ঠিক বলেছিস।’
“অবশ্য ঘোড়ার খোঁজ পেতে আমাদের খুব বেশি মেহনত করতে হল না। একটা ঘোড়ার নাকের ফরফরানি একেবারে কানের কাছে বেজে উঠল। ঠিক তখনই সেই ঘোড়াটার গায়ে আমার হাতও পড়ে গেল। চটজলদি তার বাঁধনটা খুলে বাবা এবার নিজেই তার পিঠে লাফিয়ে বসে পড়লেন। আমিও লাফিয়ে বাবার পেছনে বসে পড়লুম। তারপর খানিকটা ধীর পায়ে ঘোড়াটাকে এগিয়ে নিয়ে এলেন। যখন তিনি ঝোপঝাড়ের ফাঁকে-ফাঁকে একটা অস্পষ্ট পথ দেখতে পেলেন, ছোটালেন ঘোড়া সেই পথ দিয়ে। ঘোড়া ছুটতেছুটতে অন্ধকার জঙ্গলের কোন পথ দিয়ে কোথায় চলল, তখন আমাদের অত দেখার ধৈর্য নেই। এখন যেখানে যোক পালাতে হবে। ডাকাতদের কবল থেকে বাঁচবার সেইটাই বোধ হয় সঠিক কৌশল।

“কিন্তু থতমত খেয়ে গেলুম আচমকা। হঠাৎ জঙ্গলের অন্ধকারে কোলাহল শোনা গেল অনেক মানুষের গলায়। আমরা বুঝতে পারলুম, ডাকাতের দল আমাদের পেছনে তাড়া করেছে। আমরাও তীরবেগে ঘোড়া ছোটালুম। তারপরেই শব্দ উঠল গুড়ুম-ম-ম! গুড়ুম-ম-! বাবার ঘোড়া দাঁড়াল না। সে ছুটতে-ছুটতে আমাদের নিয়ে বন পেরিয়ে এল। তারপর—”

তারপর ঘটে গেল অন্য আর এক কাণ্ড।
লোকটির গল্পের শেষটুকু আর শোনা হল না রূপচাঁদের। কেননা, যে-জাহাজে চড়ে সে গল্প শুনতে-শুনতে যাচ্ছিল, সেই জাহাজটাই যেন হঠাৎ কিসে একটা ধাক্কা খেল! এখানে নদী অনেক চওড়া। স্রোতও প্রচণ্ড। গল্প বলতে বলতে লোকটি থমকে থেমে পড়ল। জাহাজ হেলে পড়েছে। স্রোতের টানে সে আর নিজেকে সামাল দিতে পারছে না। জাহাজের ভেতরে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল, “বাঁচাও! বাঁচাও! জাহাজে জল ঢুকছে।”
দেখতে-দেখতে নিমেষের মধ্যে জাহাজটা জলের স্রোতে কুটোর মতো ভাসতে লাগল। হুসহুস করে জল ঢুকতে লাগল জাহাজের পেটে। জল উপচে পড়ার আগেই নদীর জলে তলিয়ে গেল তার সামনের দিকটা। রূপচাঁদও আচমকা ডুবে গেল। জাহাজের সঙ্গে-সঙ্গে। শুধু রূপচাঁদ নয়, তার সঙ্গে আরও অনেকে। এমনকী গল্প-বলা সেই লোকটিও। আশ্চর্য, রেল-দুর্ঘটনার গল্প শুনতে-শুনতে এখন রূপচাঁদ নিজেই এক জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ল। সে-ও কি তবে ওই জাহাজের সঙ্গে তলিয়ে গেল জলের তলায়!
হ্যাঁ, গল্প শুনতে-শুনতে অনেকটা নদীপথ পেরিয়ে এসেছিল রূপচাঁদ, জাহাজে ভেসে। এখান থেকে আরও কতটা গেলে শহর, সেটাও তার জানা হয়নি। হঠাৎই ঘটে গেল এই কাণ্ড! রেল-দুর্ঘটনাটা যদি ডাকাতের দল ঘটিয়ে থাকে, তবে জাহাজের এই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা কে ঘটাল! এ বিপদ যে আরও ভয়াবহ।
না, জাহাজের সঙ্গে জলের তলায় ডুবে যায়নি রূপচাঁদ! ওই দ্যাখো স্রোতের তোড়ে কোথায় চলে এসেছে সে। রূপচাঁদ সাঁতার জানে। তা হলেও এই স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দেবে সে কতক্ষণ! ওই দ্যাখো, দুরন্ত স্রোত তাকে কেমন নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে। কখনও সে ডুবছে, কখনও সে ভাসছে। আর যেন পারছে না সে। দম ফুরিয়ে যায় বুঝি তার। এখন যে এ নদীর একূল, ওকূল কিছুই দেখা যায় না। এখানে বিশাল তার বহর! কে জানে কেমন করে পৌছবে রূপচাঁদ এপারে কিংবা ওপারে। নাকি, স্রোতের সঙ্গে লড়াই করতে-করতেই তার প্রাণ যাবে! এ-কথা আর বলতে পারে কে!
হ্যাঁ, সে লড়াই-ই করেছিল স্রোতের সঙ্গে অনেকক্ষণ। বোধ হয় সে লড়াই করতে করতেই অনেকক্ষণ পর নদীর কিনারে পৌঁছতে পেরেছিল। পৌঁছে তীরের মাটি যখনই সে ছুঁতে পেরেছিল, তখনই বোধ হয় তার দম ফুরিয়ে গেছল। সে অজ্ঞান হয়ে গেল সেই তীরের মাটি আর পাথরের ওপর। সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল অনেকক্ষণ। কেউ তাকে দেখেনি। কেউ জানেও না তার কথা! অদ্ভুত কাণ্ড বটে, একজনের দুর্ঘটনার গল্প শুনতে-শুনতে আর একজনের যে এমন একটা ঘটনা ঘটতে পারে, এ-কথা কি ভাবা যায়!
এমনই করে অনেকক্ষণ অচেতন হয়ে পড়ে ছিল রূপচাঁদ সেইখানে। অনেকক্ষণ পর তার চোখের পাতা ধীরে-ধীরে কেঁপে উঠেছিল। হঠাৎ সে চোখ মেলে চমকে উঠেছিল। ধড়ফড় করে উঠে বসতে গেল সে। কষ্ট হল। সে বসে-বসে দেখতে লাগল নিজেকে। দেখতে লাগল চারপাশটা। এ কোথায় এসেছে সে! এ কী দশা হয়েছে তার! কী নির্জন চারদিক। আকাশের দিকে চোখ পড়তেই তার মনে হল, সন্ধে হতে আর দেরি নেই। সামনে সেই নদী। এতক্ষণ জাহাজের ভেতর যে-মানুষটার গল্প সে তন্ময় হয়ে শুনছিল, সেই মানুষটিই বা গেল কোথায়! কোথায় সেই জাহাজ! জাহাজে কত মানুষ ছিল। অত মানুষের একটা মানুষকেও সে আর দেখতে পাচ্ছে না। কারও চিহ্ন নেই। সে এখন একা। পড়ে আছে জল-কাদার ওপর। ইস! কাদায় কী অবস্থা হয়েছে তার। কাদায় মাখামাখি হয়ে বিশ্রী কাণ্ড! কী দশা কাপড়-জামার! মনে পড়ে গেল আচমকা ঘরের কথা। বউ-ছেলের কথা। ছেলের মুখখানি স্পষ্ট ভেসে উঠল চোখের ওপর। কী করবে এখন সে! কেমন করে শহরে যাবে! এখান থেকে শহর কোনদিকে? কতদূর? সে অবাক চোখে চারদিক দেখতে-দেখতে উঠে দাঁড়াল। একটি-দুটি গাছ নজরে পড়ে। এখানে-ওখানে। বাকি সব কঠিন পাথর। ছড়ানো। কোথাও-কোথাও পেল্লাই-পেল্লাই সেইসব পাথর। বিশাল চেহারা। সেই পাথরের ফাঁকে-ফাঁকে খানাখন্দ। টিপি। রূপচাঁদের চোখ এখন সেই পাথরই দেখছে। জনমানবহীন এ কোন পাথরের দেশে সে ভেসে এল! কী ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধ চারদিক। গা ছমছম করে ওঠে! বটেই তো! বিপদে পড়লে মানুষ তো মানুষকেই খোঁজে। কিন্তু পাথর ছাড়া এখানে আর তো কিছু নেই! মানুষ কই! কে তাকে সাহায্য করবে! কোনদিকে গেলে সে মানুষের দেখা পাবে! কাজ খুঁজতে বেরিয়ে এ আবার কোন গেরোয় পড়ল সে!
কাদায় মাখামাখি রূপচাঁদ। সেই অবস্থাতেই গুটি-গুটি পা ফেলে এগিয়ে চলল। খালি পা। পায়ের জুতো জলে গেছে। সেইসঙ্গে এনেছিল সঙ্গে করে কাপড়ের যে ব্যাগটা, সেটাও গেছে। তাতে ছিল কাপড়-জামা। রুটি-তরকারি। আয়না-চিরুনিএটা-ওটা, আরও সাত-সতেরো। কাজেই খালি হাতে আর খালি পায়ে চলছে বটে, কিন্তু চোখ তার সতর্ক। নজর সজাগ। খুঁজছে মানুষ। মানুষ কেন, কোনও প্রাণীই তার নজরে পড়ল না। আশ্চর্য! এলোমেলো হাওয়ার শাঁ শাঁ শব্দ ছাড়া আর-কোনও শব্দও তার কানে আসছে না। তবু রূপচাঁদ আঁতিপাতি করে খুঁজতে লাগল এদিক-ওদিক।
খোঁজাই সার। কোনও মানুষও নেই, কোনও ঘর-বাড়িও নেই। শুধুই আণ্ডিল-আণ্ডিল পাথর। চারদিকে ছড়ানো এবড়ো-খেবড়ো। সন্ধে যতই ঘনিয়ে আসছে, রূপচাঁদ ততই আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে! সত্যিই তো, রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এলে সে একা থাকবে কোথায় এখানে! এই খাঁ-খাঁ নির্জনে! হঠাৎ এমন সময়ে তার মনের ভেতরটা যেন ভীষণ ছটফট করে উঠল। সে থাকতে পারল না। সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, “বাঁচা-ও-ও-ও!”
কারও সাড়া পেল না রূপচাঁদ। শুধু তার গলার প্রতিধ্বনি শোনা গেল সারা চত্বর জুড়ে। বুক শুকিয়ে গেল ভয়ে। সে যেন শ্বাসও নিতে পারছে না। সন্ধের আবছায়া সরে যাচ্ছে ধীরে-ধীরে। রাতের আঁধার নামছে আকাশ থেকে। তবু ভাল, আঁধার তত ঘন নয়। চাঁদ আছে আকাশে। জ্যোৎস্নায় উপচে পড়া আলো পাথরে-পাথরে ছড়িয়ে পড়েছে। কী অদ্ভুত সেই দৃশ্য। আলোর সেই আশ্চর্য রোশন পাথরের আদলই যেন পালটে দিয়েছে। জ্যোৎস্নার আলোর মায়ায় একটা পাথর যদি মনে হয় হাতির মতো, তবে যেন অন্য একটা মনে হয় হরিণ। আর একটা যদি মনে হয় হাঁ-করা বাঘ, তবে অন্যটা মনে হয় একটা গণ্ডার। কোনওটা যেন বিরাট দত্যি। কোনওটা আস্ত বনমানুষ।
অবাক চোখে দেখতে-দেখতে রূপচাঁদ পাথর টপকাতে লাগল সাবধানে। চাঁদের আলোয় চোখ রেখে। পথ খুঁজে-খুঁজে। আসলে পথ তো মানুষের পায়ে-পায়েই তৈরি হয়। কিন্তু যেখানে মানুষই নেই, সেখানে পায়ে-পায়ে পথ তৈরি হবে কী করে? কাজেই জ্যোৎস্না রাতের আবছা আলোয় নিজের পথ নিজে খুঁজে নেওয়া ছাড়া এখন তো আর কিছুই করার নেই। যতই তার বুক দুরদুর করুক, মন তাকে শক্ত করতেই হবে। এই শক্ত মনেই পথ খুঁজে-খুঁজে সে কোনদিকে, কোন অজানা পথে যে হারিয়ে গেল, নিজেও জানে না। বিপদে পড়লে মানুষ সব ভুলে শুধু বাঁচতেই চায়। রূপচাঁদের বেলায়ও তাই। সে বাঁচতে চায়। বাঁচতে চায় তার ছেলের জন্যে। তার বউয়ের জন্যে। বলতে গেলে সে তো ছেলের জন্যেই আরও বেশি রোজগার করবে বলে ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়েছে। কিন্তু কপাল-দোষে সে যে এমন একটা দুর্ঘটনায় পড়বে, সে আর কে জানত! এখন বলো, এই নির্জন তল্লাট সে কেমন করে পার হবে! কেমন করে যাবে শহরে! কে-ই বা তাকে সাহায্য করবে এখানে? কে-ই বা বলে দেবে শহর কোনদিকে? এমনই করে পাথরবন্দি হয়ে সে যদি দিশেহারার মতো নাজেহাল হয়, আর ঠিক তখনই যদি তার ছেলের মুখখানি তার মনে পড়ে যায়! তবে তার চোখ ছলছল করতেই পারে। তখন তাকে দুর্বল-মনা বলতে পারো না। যার এমন হয়, সেই-ই জানে কষ্ট কাকে বলে।
এমন করে চাঁদের আলোয় আর কত এধার-ওধার করবে রূপচাঁদ। যতই সে ঘুরপাক খায়, ততই রাত ঘনিয়ে আসে। পথের হদিস মেলে না তার। বরং শক্ত হয়ে ওঠে খালি পায়ে পাথরের ওপরে চলাফেরা করা। এখন থামতে হবে তাকে। কোথায়ই বা থামবে। রূপচাঁদ বুঝেছে, এই রাতটা তাকে যাহোক-তাহোক করে কাটাতে হবে। কিন্তু একা, নিস্তব্ধ এই পাথর ছড়ানো রাজ্যে কেমন করে থাকবে রূপচাঁদ! সে যে ভীষণ ভয়ের কথা! কিন্তু উপায় নেই। তা না-হলে কোথায় যাবে সে! কোথায় গেলে মানুষের আশ্রয় পাবে! কে বলতে পারে!
খিদে পাচ্ছে কি রূপচাঁদের? কী করে পাবে? বিপদে পড়লে কারও খিদে পায়? সুতরাং এখন খাবারের কথা না তোলাই ভাল। এখন বরং ভোরের আলোর আশায় এখানে বসে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই কথা ভাবতে-ভাবতে সে বসেই পড়ল। বসল, যেখানে সে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই। কোনও বাছবিচার করার সুযোগই ছিল না।
চারদিক নিথর, নিস্তব্ধ। কার এমন বুকের পাটা আছে যে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারে এখানে! ভয়ের ভাবনাগুলো বারবার ঠোক্কর মারে রূপচাঁদের বুকের ভেতরে। সত্যি বটে, এমন তো কথা ছিল না তার, এখানে ভয়কে জড়িয়ে এইভাবে বসে থাকার। কখন সে শহরে পৌঁছে যেত। কখন সেই লোকটির দেওয়া চিঠিখানি তার বন্ধুর হাতে পৌঁছে দিয়ে তার আশ্রয়ে থাকতে পারত।
হঠাৎ রূপচাঁদের মনে হল, তাই তো, সেই চিঠিখানা তার পকেটে আছে তো! সে ধড়ফড় করে পকেটে হাত দিল। যাঃ! নেই তো! একবার ডান পকেট, একবার বাঁ পকেট, একবার বুক পকেট! কোথাও নেই। পকেটেই তো সে রেখেছিল! হায় রে, নদীর স্রোতে সেটাও গেছে! এখন?
এখন ওটা কী তার সামনে! থতমত খেয়ে গেল রূপচাঁদ? কী দেখল সে?
একটু দূরে কী ও দুটো? জ্বলজ্বল করছে? ধড়ফড় করে উঠল তার বুকের ধুকধুকি। সে তড়বড় করে দাঁড়িয়ে পড়ল। জুলজুল করে দেখতে লাগল একদৃষ্টে। যদিও চাঁদের আলোয় অন্ধকার আবছা হয়ে আছে, তবুও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না ওদুটো কী।
এমনই করে দেখতে-দেখতে হঠাৎ যেন মনে হল, ওদুটো বুঝি কারও চোখ, জ্বলছে! কার চোখ? মানুষের? উঁহু! মানুষের তো নয়। তবে কি রূপচাঁদ ওইদিকে ক’পা এগিয়ে যাবে? না কি সে পালাবে? হায় রে, পালালেও কি নিস্তার আছে! তাছাড়া পালিয়ে যাবেই বা কোথায়? এখানকার নাড়ি-নক্ষত্র তার কিছুই জানা নেই। তার চেয়ে বরং ক’পা এগিয়ে দেখা যাক ও-দুটো সত্যিই চোখ কিনা? যদি চোখ হয়, তবে কার চোখ? না, এখান থেকে শতচেষ্টা করলেও কিছুই আন্দাজ পাওয়া যাবে না। অবশ্য বোঝা যাচ্ছে, ওখানে একটা ইয়া ঢাপ্পুস পাথরের চাঁই পড়ে আছে। চাঁদের আলো আর পাথরের ছায়ার আড়ালে চোখের মতোই জলন্ত দুটো গোল্লা দেখা যাচ্ছে। চোখ হলেও ওদুটো যে বাঘের নয়, দেখলে একটা পুঁচকে ছেলেও বলে দেবে। বাঘের চোখ ওটুকু হয় কখনও!
যাই হোক, রূপচাঁদ নিজের দৃষ্টি সজাগ রেখে এগিয়ে গেল কয়েক পা। সঙ্গে-সঙ্গে সেই জলন্ত গোল্লা দুটোও এগিয়ে এল ঠিক তত পা। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল রূপচাঁদ। তার পা আর সরে না। আরে, কালো কুচকুচে এ যে একটা বেড়াল। জলন্ত গোল্লা দুটো যে বেড়ালেরই চোখ! হতবাক হয়ে গেছে রূপচাঁদ বেড়াল দেখে। তাই তো! এখানে বেড়াল এল কোত্থেকে? তবে কি এখানে মানুষও আছে? যেই না এ-কথা মনে আসা, অমনই সে বেড়ালটাকে আদর করার জন্যে মুখে চ্চু-চ্চু করে হাত বাড়াল। সঙ্গে সঙ্গে বেড়াল দিল ছুট। কোনদিকে কে জানে! রূপচাঁদও ছাড়ল না। সে-ও ছুটল বেড়ালের পেছনে। কিন্তু হলে কী হবে! অন্ধকারে কুচকুচে কালো বেড়ালকে ছুটে ধরা কি সহজ কথা! বিশেষ করে এই এবড়ো-খেবড়ো পাথরের কঠিন রাজ্যে!
আশ্চর্য, কোথায় পালাল বেড়ালটা চোখের পলকে! পালাল, না লুকিয়ে পড়ল পাথরের আনাচে কানাচে? এখন কার সাধ্যি তাকে খুঁজে বার করে!
না, খুঁজতে হল না রূপচাঁদকে। ওইদিকে একটু এগিয়ে যেতেই ওই দ্যাখো, বেড়ালটা সত্যিই একটা পাথরের খাঁজ থেকে উঁকি মারছে। যেই না রূপচাঁদকে দেখতে পেয়েছে, মেরেছে এক লাফ, তিড়িং! মেরেই আবার ছুট। কোথায় গেল! এ তো ভারী মুশকিল। এই রাতের আবছায়াতে কোথায় গেল রূপচাঁদ ঠাওরই করতে পারল না। কোথায় খুঁজবে তাকে!
তবু হাল ছাড়লে চলবে না। রূপচাঁদের কেমন যেন মনে হল, ওই কালো বেড়ালই তাকে আলোর সন্ধান দিতে পারবে। তাই সে নাছোড়বান্দা হয়ে পাথরের আনাচে-কানাচে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল। এখানেই যে কোথাও সেই ম্যাও বাছাধন লুকিয়ে আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে কি বেড়ালটা তার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে! ভারী শয়তান তো!
আরে! আরে! দ্যাখো, দ্যাখো! রূপচাঁদ যেই ওই পাথরটার ফাঁকে মাথা গলিয়েছে, অমনই বেড়ালটা মেরেছে একখানা ডিগবাজি। একেবারে সাঁই করে শূন্যে। মেরেই পাঁই-পাঁই ছুট।
রূপচাঁদও ছাড়ল না। করল ধাওয়া।
তারপর?
কালো-কুচকুচ বেড়াল ছোটে,
ছড়িয়ে আলো জ্যোৎস্না ফোটে।
রূপচাঁদ তার আলগা পা,
ধরতে বেড়াল ডিগবাজি খা।
বেড়াল যদি এদিক যায়,
রূপচাঁদও ঠিক সেদিক ধায়।
ছুটতে-ছুটতে ধপাস ধুপ,
পড়ল কোথায়? অন্ধকূপ!

হ্যাঁ, তাই তো! ধুপ-ধাপ, ধাঁই-ধপাস করে ঠোক্কর খেতে-খেতে রূপচাঁদ যে সত্যি-সত্যি একটা গর্তের মধ্যে গিয়ে পড়ল! রূপচাঁদের পা ফসকে আবার এক কাণ্ড ঘটল! উঃ কী লাগান লাগল তার! যাক, অল্পের ওপর দিয়ে গেছে! ভাগ্যিস হাত-পা ভাঙেনি! মাথা ফেটে যে রক্তারক্তি হয়নি, এই যথেষ্ট।
এসব কিছু হল না বটে, কিন্তু অন্য একটা কাণ্ড হল!
কী হল?
সেই অন্ধকূপের ভেতরে কে যেন হাঁক পাড়ল, “কে? কে? কে পড়ল?”
রূপচাঁদ হাঁক শুনেই ঘাবড়ে গেছে! পড়ে গিয়েই উঠে পড়েছে। উঠলেই বা কী! এই অন্ধকূপের ভেতরে তো আর জ্যোৎস্নার আলো নেই! ভীষণ অন্ধকার। রূপচাঁদ না-পারে এগোতে, না-পারে পেছোতে। দাঁড়িয়ে থাকো পাথরের মতো। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হাঁসফাঁস করো!
সেই অন্ধকূপের ভেতরে সে আবার হাঁক দিল, “কে? কে? কার নিশ্বাসের শব্দ পাচ্ছি? কে হাঁপায়?”
রূপচাঁদ ভয়ে জড়সড় হয়ে নিশ্বাস চাপবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু এই সুনসান অন্ধকূপে যতই চেষ্টা করো নিশ্বাসের ফুসফাস শব্দ চাপা খুবই শক্ত। শোনা যাবেই।
লোকটা এবার চিৎকার করে উঠল, “এই, আলো নিয়ে আয়!”
মুহূর্তের মধ্যে সেই অন্ধকূপে আলো দেখা গেল। রূপচাঁদের চোখের ওপর ভেসে উঠল, পাথর-ঘেরা অন্ধকূপের বীভৎস দৃশ্য। এখানে গর্ত, ওখানে গাজ্ঞা। ওদিকে ফাঁক তো, এদিকে ফোকর। সামনে ফাটা, তো পেছনে ফুটো। রূপচাঁদ ধরা পড়ার আগেই ঝট করে একটা ফোকরে লুকিয়ে পড়ল। খুব বাঁচোয়া, কেউ তাকে দেখতে পায়নি। সে ওই পাথরের ফোকরে লুকিয়ে রইল ভয়ে কাঠ হয়ে। এখন এই অন্ধকূপের অন্ধকার অনেকটাই আলোয় ধুয়ে গেছে। এমনকী, যে ফোকরটায় সে লুকিয়ে আছে, সেখানেও আলোর আভা দেখা যাচ্ছে। অবশ্য তেমন উছলে-পড়া নয়। উছলে-পড়া না হলেও, আবছা আলোও তো যথেষ্ট। লুকিয়ে থাকলেও চোখে পড়তে কতক্ষণ! কাজেই সেই ফোকরে গা-ঢাকা দিয়েও নিস্তার নেই তার! মন বলে, এই বুঝি সে ধরা পড়ে!
না, তক্ষুনি-তক্ষুনি সে ধরা পড়ল না। অনেক মানুষের পায়ের শব্দ তার কানে এল। অনেক মানুষের গলার স্বর সেই অন্ধকূপে প্রতিধ্বনি তুলল। রূপচাঁদ ভাবল, এরা কি তবে এই অন্ধকারে লুকিয়ে আছে কারও ভয়ে! এরা কারা? কাদের গলার স্বর শোনা যাচ্ছে! ইচ্ছে হল তার, উঁকি মেরে তাদের দেখে সে। দোনোমনো করতে করতে সে সত্যি-সত্যিই উঁকি দিল। সে আঁতকে উঠল তাদের দেখে। অন্তত কম করে সে দশজনকে দেখতে পেল। যেমনই তারা লম্বা, তেমনই দশাসই তাদের চেহারা। অ্যায়সা চওড়া কপাল, মাথাভর্তি চুল। বড়-বড় চোখ। তাদের সবার একহাতে লণ্ঠন, আর-একহাতে লাঠি। তবে কি এরা দস্যু! আর ওই যে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল তারা, ওই লোকটাই কি তবে দস্যুসর্দার! না, এদের কারও বয়স তেমন বেশি নয়। সবাই তরতাজা জোয়ান মানুষ। যাকে সর্দার মনে হচ্ছে, তার সামনে গিয়ে সবাই দাঁড়াতেই, সে একটা ভয়ঙ্কর গলায় হুঙ্কার ছাড়ল, “এখানে শব্দ হল কিসের? মনে হল কে যেন পড়ে গেল! কার যেন ঘন-ঘন নিশ্বাস পড়ছিল। মনে হল কে যেন হাঁপাচ্ছে!”
তাদের মধ্যে একজন তার হাতের লণ্ঠনটা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে বলল, “সর্দার, এখানে কে আসবে! আমাদের এই গোপন আস্তানার খবর কারও জানা নেই। তা ছাড়া এই গহ্বরের সামনের ওই গর্তটা এমনই ঘুপচি অন্ধকার আর বিপজ্জনক যে, কেউ আসতে সাহসই করবে না। তবে ক’দিন ধরে একটা কালো বেড়াল বড্ড উৎপাত করছে। হলে সে-ই বোধ হয় লাফ মেরে গহ্বরে ঢুকেছে। ব্যাটা ভীষণ বিচ্ছু। তাড়ালেও যায় না।”
সর্দার ক্ষিপ্ত গলায় উত্তর দিল, “ছা-ছ্যা, শেষকালে একটা বেড়াল আমাদের ভয় দেখায়! সেটা এখানে এল কোত্থেকে? হতভাগাটাকে এক্ষুনি তাড়াও এখান থেকে! দ্যাখো, কোথায় ঢুকল সে!” |
সর্দারের হুকুম মুখ থেকে যেই পড়া, অমনই তারা লণ্ঠন হাতে, লাঠি উঁচিয়ে বেড়াল খুঁজতে শুরু করে দিল। তাদের বেড়াল ধরার সেই মূর্তি দেখে, রূপচাঁদ ভয়ে থরহরি কম্পমান। সে বুঝতে পারে, তার আর রেহাই নেই। এবার সে ধরা পড়বেই। কেননা, যেখানে সে লুকিয়ে আছে, সেখান থেকে পালানো যায় না। পথ নেই। কাজেই তাদের ভুল ভাঙতে আর বেশি দেরি নেই। বেড়াল নয়, এই বুঝি ধরা পড়ল রূপচাঁদ নামে এক অসহায় মানুষ। সত্যি বটে এ এক আজব ঘটনা! জাহাজে চেপে নদীর পথ ধরে শহরে যাচ্ছিল সে। শুনছিল এক অচেনা জাহাজ-যাত্রীর মুখে তাঁর রেল-দুর্ঘটনার কাহিনী। তারপর রূপচাঁদ নিজেই পড়ল জাহাজডুবির সর্বনাশা বিপদে। নদীর স্রোতে ভাসতে-ভাসতে সে কেমন করে যে বাঁচল, নিজেও জানে না। বাঁচল বটে, কিন্তু এ কোথায় এসে পড়ল সে! পাথর-ঘেরা এ কোন দস্যুদলের অন্ধকূপ গহ্বরে! সেই যে কবে বাবার সঙ্গে বেরিয়ে শহরে গেছল রূপচাঁদ, তার বিন্দুবিসর্গও মনে করতে পারে না সে। তখন কত ছোট। তারপর থেকে সে এক পা-ও নড়েনি কোথাও। সেই ছোট্ট গ্রাম। সেই সবুজ গাছগাছালি। সেই খেত-ভর্তি সোনার ফসল। সেই তার হাসি-খুশিতে ঝলমল ছোট্ট ঘরখানা। আর তার আদরের ছোট্ট ছেলেটি। সব মনে পড়ে যায়। কত সুখেই না ছিল সে। হায় রে, ছেলেটাকে অনেক লেখাপড়া শেখাবে বলে কাজ খুঁজতে শহরে বেরিয়ে, এবার বুঝি সে সব হারায়! আগে কি ঘুণাক্ষরেও সে বুঝতে পেরেছিল, শহরে যেতে গিয়ে সে এমন বিপাকে পড়বে! কপালে তার পাথর চেপে বসবে!
দস্যুদের এই অন্ধকূপের গহ্বরটা যে একটুখানি নয়, সেটা রূপচাঁদ একটু-একটু করে বুঝতে পারছে। কেননা, সে দেখতে পেল, এদিকে-ওদিকে অনেক সুড়ঙ্গ। সেই আলো-হাতে লোকগুলো, বেড়াল খুঁজতে খুঁজতে গহ্বরের সুড়ঙ্গের ভেতরই আঁতিপাতি করে ঢুকে পড়ল। এখন কী যে করা উচিত রূপচাঁদের, ভেবে কূলকিনারা করতে পারে না সে। সুড়ঙ্গের ভেতরটা যে কেমন, সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার কোনও রাস্তা আছে কি না, কিছুই জানা নেই তার। জানার কথাও নয়। সে যে এখান থেকে চুপিসারে বেরিয়ে রাস্তার সন্ধান করবে, তারও উপায় নেই। কারণ সর্দারলোকটাও লণ্ঠন হাতে নিয়ে সটান সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তারও হাতে লাঠি। এখন সে একেবারেই একা। তার সাঙ্গোপাঙ্গরা এখন সুড়ঙ্গের ভেতরে বেড়াল খুঁজতে ব্যস্ত! সর্দার হয়তো ভাবছে, বেড়ালটা এদিক দিয়ে পালাতে গেলেই এমন একখানি দেবে, বাছাধনকে আর ঘাড় তুলতে হবে না। এক ঘায়েই শেষ!
হঠাৎ রূপচাঁদের মনে হল, আচ্ছা, সে কেন চোরের মতো এখানে লুকিয়ে আছে! সত্যিই তো, রূপচাঁদ লুকিয়ে আছে কেন? সে তো কোনও অন্যায় করেনি। বেড়ালটাকে ধরতে গিয়ে সে পা পিছলে এই গহ্বরে পড়ে যায়। লুকিয়ে না-থেকে, সে তো এই সত্যি কথাটা কবুল করলেই পারে! সত্যি কথাটা চেপে ঝুটমুট লুকোচুরি খেলার কোনও মানে হয়!
না, হয় না। হয় না বলেই রূপচাঁদ আড়াল থেকে উঁকি মারল। সোজাসুজি সর্দারের মুখের ওপর রূপচাঁদের চোখ আটকে গেল। কী সুঠাম তার চেহারা। সে বইয়ের পাতায় রাজার যেমন ছবি দেখেছে, লোকটাকে যেন ঠিক তেমনই দেখতে। যোমন সুন্দর, তেমনই সুপুরুষ। এমন মানুষ দস্যু হয় কেমন করে! না, তাকে দেখে একেবারেই ইতস্তত করল না রূপচাঁদ। সরাসরি বেরিয়ে এল। গিয়ে দাঁড়াল তার মুখোমুখি। সর্দারের হাতের আলোয় উছলে উঠল রূপচাঁদের সারা শরীর। চমকে উঠল সর্দার। একটা অদ্ভুত ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কে?” যেমন ধরা, তেমনই অস্পষ্ট সেই স্বর।
রূপচাঁদ কী উত্তর দেবে? তেমন জুতসই কোনও কথা খুঁজে না পেয়ে সে বলে ফেলল, “আজ্ঞে, বেড়াল নয়, আমিই এখানে লুকিয়ে আছি।”
সর্দার যেন আঁতকে উঠল আচমকা। চিৎকার করে উঠল বুককাঁপানো গলায়। ধরে ফেলল রূপচাঁদের হাতটা মোচড় দিয়ে।
রূপচাঁদ আর্তনাদ করে উঠল আতঙ্কে। বলল, “আমাকে মারবেন না হুজুর। বিশ্বাস করুন, যে-বেড়ালটা আপনাদের হেনস্থা করছে, সেই বেড়ালটাকে ধরতে গিয়ে, আমি এখানে পা পিছলে পড়ে যাই। আমার অন্য কোনও মতলব ছিল না।”
সর্দার যখন ডাকাত, তখন কি সে রূপচাঁদের এই সত্যি কথাকে সত্যি বলে মানে! সে ক্ষিপ্তস্বরে গর্জে উঠল, “এ-জায়গার হদিস তুই কোথায় পেলি?”
“আজ্ঞে, আমি সব বলব। এখন আপনি আমাকে দয়া করে রক্ষা করুন।” রূপচাঁদ আকুল হয়ে বলে উঠল।
এদিকে, সর্দারের সেই বাজখাঁই গলার চিৎকারটা সুড়ঙ্গের ভেতর প্রতিধ্বনি তুলে তার সাঙ্গোপাঙ্গদের কানে পৌঁছে গেছে। ছুটে এল তারা যে যেখানে ছিল। তাদের হাতের আলোয় রূপচাঁদের কাহিল চেহারাটা এবার স্পষ্ট দেখা গেল। কী অবস্থা হয়েছে তার! কী অবস্থা মুখ-চোখের! মানুষটাকে চেনাই যায় না। কাপড়জামা কাদাজলে মাখামাখি হয়ে ন্যাতা হয়ে গেছে। তার মুখখানা দেখে সর্দারের সঙ্গীরা তাকে এই মারে তো সেই মারে! রূপচাঁদ ভয়ে সিঁটিয়ে দেখতে লাগল তাদের হিংস্র মুখগুলো। রূপচাঁদের মুখে কথা সরে না। সে তাদের দেখে ভয়ে বোবা হয়ে গেল যেন!
সর্দার নিজেই কথা বলল। রূপচাঁদের হাতে একটা মোচড় দিয়ে গর্জে উঠল, “এখানে কোনও বেড়াল ঢুকলে বোঝা যায়, একটা ছোট্ট জানোয়ার চোখকে ফাঁকি দিয়ে ঢুকেছে। কিন্তু এই একটা ধুমসো মানুষ কেমন করে ঢোকে এখানে? তোমরা কি চোখে ঠুলি বেঁধে বসে ছিলে। কী করে এই লোকটা আমাদের ডেরার হদিস পেল? তোমাদের আলসেমিতেই এই কাণ্ড ঘটেছে! এই লোকটা তো মরবেই৷ তার সঙ্গে যার গাফিলতিতে এই লোকটা এখানে ঢুকেছে, তারও প্রাণ যাবে।”
সর্দারের এই কথা শোনার সঙ্গে-সঙ্গে তার সাঙ্গোপাঙ্গদের মুখ ভয়ে কালো হয়ে গেল। আর কেমন যেন আচমকা রূপচাঁদেরও মাথাটা ঢলে পড়ল। সে পড়েই যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি তাকে ধরে ফেলল সর্দার। হ্যাঁ, জ্ঞান হারিয়েছে রূপচাঁদ। অত আলোর ঝলক মুহূর্তের মধ্যে তার চোখ থেকে হারিয়ে অন্ধকার হয়ে গেল। সর্দারের শক্ত হাতের ওপর ভার রেখে সে লুটিয়ে রয়েছে। মনে হল, কী যেন একটা শব্দ মুখে উচ্চারণ করার চেষ্টা করেছিল রূপচাঁদ। সেই অস্পষ্ট শব্দের মানে সর্দারের সঙ্গীদের কেউ বুঝতে পারেনি। সর্দার বুঝেছিল কি না কে জানে!
একটানা অনেকক্ষণ রূপচাঁদ অজ্ঞান হয়ে ছিল। টানা অনেকক্ষণ সে সর্দারের নজরবন্দি হয়েই পড়ে ছিল। তারপর যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন সকাল হয়ে গেছে। সেই গহ্বরের গর্ত দিয়ে আকাশের আলো উঁকি দিচ্ছে। রূপচাঁদ ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে তাই দেখে! তার মনে হল, সে একটা নরম তুলতুলে গদির বিছানায় শুয়ে আছে। সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। বড্ড ঝিমঝিম করে উঠল মাথাটা। শরীরে যেন জোর নেই। কাঁপছে সে। চোখের সামনে কাউকে দেখতে পেল না। চারদিক থমথম করছে। সে উঠে দাঁড়াল। টলে গেল পা। আবার তার শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করল। না, শোবে না সে। এখান থেকে যেমন করে হোক বেরিয়ে তাকে পালাতে হবে। এখনই। নইলে এরা তাকে মেরে ফেলবে। হঠাৎ-হঠাৎ তার ছেলের মুখখানা ভেসে-ভেসে উঠছিল তার চোখে। সে মরে গেলে তার ছেলের কী হবে? তার বউ কোথায় যাবে ছেলেকে নিয়ে? সে একা পারবে কেন ছেলেকে মানুষ করতে! না, না, রূপচাঁদের দরকার নেই অনেক পয়সা রোজগার করার। মাটিতে ফসল ফলিয়েই সে যতটুকু পয়সা উপায় করবে, ততটুকু পয়সা দিয়েই সে ছেলেকে মানুষ করবে। না, সে মরতে চায় না। সে একটিবার ছেলের মুখখানি দেখতে চায়। তাকে পালাতেই হবে। তাই সে আলতো পায়ে এগিয়ে গেল সামনে।
“কোথা যাচ্ছ?”
পেছনে কে ডাকল? কার গলা?
সেই গলা আবার বলল, “তোমার পা কাঁপছে। এক্ষুনি আবার পড়বে তুমি। শুয়ে থাকো আরও কিছুক্ষণ।” এ কী! সর্দারের গলায় যেন নরম সুর!
সেই গলার স্বর শুনে রূপচাঁদ পেছনে মুখ ফেরাল। দেখল, তার পেছনে সর্দার। এতক্ষণ তো তাকে দেখা যায়নি! কোথায় ছিল লোকটা!
সর্দার এগিয়ে এল। রূপচাঁদকে ধরে ফেলল।
রূপচাঁদ তার ক্লান্ত চোখ দুটো সর্দারের দিকে মেলে অবাক হয়ে গেল। কাল লোকটা রূপচাঁদকে ‘তুই তুই’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছিল। আজ তার অন্য মূর্তি! লোকটা এক রাতে পালটে গেল নাকি! এমনকী সর্দারের হাতের স্পর্শও কালকের মতো কঠিন নয়। কেমন যেন শান্ত হয়ে গেছে মানুষটা! রূপচাঁদ দাঁড়িয়ে পড়ল।
“শুয়ে পড়ো!” সর্দার তার সেই শান্ত গলার মতো নিজের চোখের দৃষ্টিকেও নরম করে তার মুখের দিকে তাকাল।
রূপচাঁদ শুয়ে পড়ল।
সর্দার হাঁক দিল, “এই, কে আছিস!”
সর্দারের একজন সহচর দেখা দিল।
সর্দার রূপচাঁদের কপালে হাত রেখে সহচরকে হুকুম করল, “এক গেলাস দুধ নিয়ে আয়!”
রূপচাঁদ ভাবল, তাই তো, হঠাৎ এমন খাতির কেন! কী মতলব লোকটার!
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দুধ এসে গেল।
সর্দার নিজেই হাত বাড়াল দুধের গেলাস হাতে নেওয়ার জন্যে। হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “গরম আছে তো?”
সহচর উত্তর দিল, “হ্যাঁ, হুজুর!”
সর্দার দুধের গেলাস হাতে নিয়ে পরখ করে বলল, “হ্যাঁ, ঠিক আছে।”তারপর দুধের গেলাস নিজে রূপচাঁদের মুখের কাছে ধরল। বলল, “খেয়ে নাও!”
সর্দারের মুখের দিকে আরও একবার অবাক হয়ে তাকাল রূপচাঁদ। তারপর দুধে চুমুক দিল। দুধটা শেষ করতে বেশি সময় লাগল না রূপচাঁদের। শেষ করেই একটা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলল সে। তৃপ্তি হবেই তো! সেই যে কাল দুটো ভাত মুখে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, সেই যা খাওয়া। তারপর থেকে একটা দানাও পেটে পড়েনি। একটা সমর্থ লোক খালি পেটে এতক্ষণ থাকতে পারে! তার ওপর শরীরের ওপর এমন একটা ধকল গেল। বরাতে যে আর কী দুর্ভোগ আছে কে জানে!
সর্দার দুধের খালি গেলাসটা তার সহচরের হাতে দিয়ে বললে, “যাও, যত তাড়াতাড়ি পারো খানকতক রুটি আর তরকারি করে আনো! হ্যাঁ, সঙ্গে মিঠাই আনতে ভুলো না যেন!”
“যো হুকুম,” বলে লোকটা চলে গেল।
রূপচাঁদের সেই অবাক দৃষ্টি আরও অবাক হয়ে সর্দারের মুখের দিকে চেয়ে রইল। চেয়ে-চেয়ে রূপচাঁদ ভাবতে লাগল, তবে কি তাকে হত্যা করার আগে যত্ন করার এ মিথ্যে ছল!
ঠিক এই সময়ে দেখা গেল সর্দারের ঠোঁটের ফাঁকে হাসির ঝিলিক।
হাসি দেখে রূপচাঁদ হকচকিয়ে গেছে। সে সঙ্গে-সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল। তাই তো! যে তাকে মারতে চায়, তার ঠোঁটে এমন আলতো হাসি কেন! কেমন যেন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে রূপচাঁদের।
হঠাৎ আশ্চর্য একটা কথা বলে বসল সর্দার। বলল, “না, তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি তোমাকে মারব না।”
রূপচাঁদের ভয়ে ভাঙা বুকখানা হঠাৎ থরথর করে কেঁপে উঠল। এ আবার কী—। এমন কথা কেন বলে লোকটা! এক লহমায় রূপচাঁদের দৃষ্টি সর্দারের মুখখানা ছুঁয়ে থমকে গেল। আর ঠিক তখনই একেবারে আচম্বিতে সর্দার জিজ্ঞেস করে বসল, “চঞ্চল বুঝি তোমার ছেলের নাম?”
তড়বড় করে উঠে বসেছে রূপচাঁদ। উত্তেজনায় দম ফেলতে তার কষ্ট হচ্ছে। এই দস্যুসর্দার কেমন করে জানল তার ছেলের নাম! তবে কি তারা রূপচাঁদকে চেনে! একটি শব্দও রূপচাঁদের মুখ ফুটে বেরোল না। সে শুধু উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সর্দারের মুখের দিকে।
“তোমার কি জমিজমা আছে? তুমি বুঝি চাষবাস করো?”
রূপচাঁদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের চিহ্ন ফুটে উঠল। তার হাতের শক্ত আঙুলগুলো থির থির করে কাঁপছে। মনে-মনে সে ভাবতে লাগল, তার ঘরের খবর এই পাথরের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে থাকা দস্যুসর্দার জানল কেমন করে!
সর্দার আরও অবাক করে বলে উঠল, “ছেলেকে অনেক লেখাপড়া শেখাবে ভেবে কেউ নিজের চাষবাস ছেড়ে শহরের কাজ খুঁজতে বেরোয়?”
রূপচাঁদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে বুঝি আর থাকতে পারে না। এই বুঝি সে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে, আপনি জানলেন কেমন করে?
না, চিৎকার তাকে করতে হল না। চিৎকার করার আগে সর্দারই আবার কথা বলল, “তোমার কি একটিই ছেলে?”
রূপচাঁদের অবাক-মাখা মুখখানা পলকে নুয়ে পড়ল। সে মাথা নাড়ল। জানাল, হ্যাঁ।
“আমারও একটি ছেলে।”
সর্দারের কথা শুনে ধন্দ লেগে যায় রূপচাঁদের মনে। সে আবার চমকে তাকায়।
সর্দার বলল, “আমার সব কথা জানার সুযোগ তোমার হয়নি। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ, তোমার এত কথা আমি জানলুম কেমন করে! জানলুম, তোমারই মুখ থেকে। তুমি কাল সারারাত অচেতন অবস্থায় এইসব কথা বলছিলে। আমি তোমার কথা শুনে বুঝেছি, আগে তুমি যা বলেছ সব সত্যি। তুমি আমার কোনও ক্ষতি করার জন্যে এখানে আসোনি। অজান্তে তুমি এসে পড়েছ। তুমি নির্দোষ। তবে আমার ভাবতে আশ্চর্য লাগছে, তুমি এই পাথরের রাজ্যে এলে কেমন করে!”
এতক্ষণে রূপচাঁদ কথা কইল। মৃদু স্বরে বলল, তার জাহাজডুবির কথা। বলল, কেমন করে সে একটা বেড়ালকে তাড়া করতে গিয়ে এখানে এসে পড়েছে।
“আশ্চর্য।” অবাক-গলায় বলল সর্দার।
“আশ্চর্য কেন বলছেন?” জানার আগ্রহে সর্দারের মুখের দিকে তাকাল রূপচাঁদ।
সর্দার যেন ভয়ানক দুঃখে বলে উঠলেন, “আমাদের দু’জনেরই একই ভাবনা দুই স্বপ্নের ছেলে নিয়ে। তুমি চাও, তোমার ছেলেকে অনেক বড় করার আশায় অনেক পয়সা। আর আমি চাই আমার যত ধন-সম্পত্তি আছে সব বিলিয়ে দিয়ে আমার ছেলেকে ফিরে পেতে। হ্যাঁ, যতদিন সে ছোট্ট ছিল, ততদিন সে জানত না, আমি দস্যু। যখন সে বড় হল, যখন সে জানল আমি দস্যুগিরি করি, তখনই সে আমায় ঘৃণা করতে শিখল। সে মনে-মনে রাগ করত। কথা বলত না আমার সঙ্গে। তার যত কথা সব সে বলত তার মাকে। আমার নামে তার যত নালিশ সব মায়ের কাছে। আমি আদর করলে, সে নারাজ হয়। আমি ভালবেসে তাকে কিছু দিতে গেলে, সে ছুড়ে ফেলে দেয়। আমি ভেবেছিলুম, আমার ছেলেকেও আমি আমার মতো দস্যু করব, সেও আমার সঙ্গী হবে। কিন্তু মিথ্যে হয়ে গেল আমার সেই খোয়াব দেখা।” বলতে-বলতে যেন আটকে গেল তার গলার স্বর। দুঃখে যেন ভার হয়ে গেল তার সেই কঠিন মুখখানা। অমন একটা দুর্ধর্ষ দেখতে মানুষ নিমেষের মধ্যে কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে গেল।
তাকে হঠাৎ এমন মুষড়ে পড়তে দেখে কেমন যেন করে উঠল রূপচাঁদের মন। সে স্থির থাকতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, “তারপরে কী হল সর্দার?”

“ছেলেটার মা মারা গেল।”
বলার সঙ্গে-সঙ্গে দস্যু নামের সেই ভয়ঙ্কর মানুষটার চোখ যেন ছলছল করতে লাগল। তাই দেখে কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেল রূপচাঁদ। একটা শক্তিমান মানুষ যে এমন করে ভেঙে পড়তে পারে, এ যেন বিশ্বাসই করতে পারে না রূপচাঁদ। তাই দেখে রূপাচাঁদের মুখে কথা আটকে গেল।
কান্না গিলে দস্যুসর্দার ক্ষণেক থামল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মা মরে যেতে একদিন ছেলেটাও আমাকে ফাঁকি দিয়ে কোথায় যে চলে গেল! আমি আর খুঁজে পেলুম না।”
রূপচাঁদের চোখে বিস্ময়ভরা চাউনি। সর্দারের জন্য তার মনটা কেমন যেন কষ্ট পেল। সে থাকতে পারল না। বলেই ফেলল, “ছেলের কথা ভেবে দস্যুগিরি ছেড়ে দিলেন না কেন?”
“হ্যাঁ, কথাটা তুমি ঠিকই বলেছ,” উত্তর দিল সর্দার, “কিন্তু তখন আর ছাড়ার উপায় ছিল না। একটা দস্যুদলের সর্দার হওয়া মানে, অনেক মানুষের আশা-ভরসা হয়ে থাকা। হুট বললেই ছেড়ে চলে আসা যায় না। তাদের খাওয়া-পরার দায় আমাকেই বইতে হয়। তারা যে আমারই মুখ চেয়ে থাকে। আমি ছেড়ে চলে গেলে তারা আমায় ছাড়বে কেন? তাদেরও তো ঘর-সংসার আছে। আমায় বিশ্বাস করে বলেই না, আমি তাদের সর্দার হতে পেরেছি। আমি তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কি করতে পারি! করলে যে তার ফল মৃত্যু, এ আর কে না জানে! আমাকে তো মারবেই। সেইসঙ্গে আমার ছেলেটাও মরবে।”
দেখতে-দেখতে রূপচাঁদের জন্যে রুটি, তরকারি আর মিঠাই এসে গেল। মুখ-চোখ ধুয়ে সাফসুতরো হয়ে রূপচাঁদ খেতে বসল। সে যখন ঘর থেকে বেরিয়েছিল তখন কি সে জানত, তাকে এইভাবে দস্যুর আশ্রয়ে রুটি-মিঠাই খেতে হবে!
“তোমার নামটা আমি জানি না।” সর্দার হঠাৎ বলল।
“রূপচাঁদ।”
“বাঃ!”
“আপনি?”
“আমার নাম নেই। আমি দস্যুসর্দার। তবে আমার ছেলের একটা নাম আছে, সজল।”
“বেশ নাম”, উত্তর দিল রূপচাঁদ।
“তুমি তো শহরে কাজ খুঁজতে বেরিয়েছে?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“আমার কাছে কাজ করবে তুমি?”
সর্দারের আচমকা এই প্রশ্ন শুনে ভয়ে থতমত খেয়ে গেল রূপচাঁদ। কিছু উত্তর দিতে পারল না।
সর্দার তার মুখ দেখে মৃদু হাসল। বলল, “ভয় পেয়ো না। তোমাকে দস্যু হতে হবে না। অন্য একটা কাজ। আমি তোমার ছেলের লেখাপড়া শেখার জন্যে অনেক টাকা দেব। আজই নিতে পারো তুমি। তোমাকে, এমনকী, আমার কাছে থাকতেও হবে না। আমি তোমায় যে কাজটা দেব সেটা একেবারেই অন্য ধরনের। দারোগা-পুলিশের হাতেও পড়তে হবে না। নিজের খুশিমতো সেই কাজ তুমি করবে।”
রূপচাঁদ কুঁথে-কুঁথে জিজ্ঞেস করল, “কী কাজ?”
“আমার ছেলের সন্ধান করার কাজ।”
রূপচাঁদ উত্তর দিল, “আজ্ঞে আমি তো তাকে দেখিনি কোনওদিন। কেমন করে সন্ধান করব?”
“তার একখানি ছবি আছে আমার কাছে। সেটি তোমায় দেব। চিনতে অসুবিধে হবে না।”
রূপচাঁদ উৎসাহের সঙ্গে জবাব দিল, “তা হলে চেষ্টা করতে পারি।”
“শাবাশ!” সর্দার রূপচাঁদের কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে তারিফ করল। তারপর আবার বলল, “এই নাও, এখনই তোমার পথের খরচের জন্যে কিছু টাকা দিচ্ছি। আবার যখনই দরকার পড়বে চলে আসবে। আবার দেব। তোমার বাড়ির ঠিকানাটাও আমায় দাও। আমি তোমার ছেলের জন্যে বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে দেব। কিচ্ছু ভেবো না। তোমার ছেলের পড়াশোনার সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এমনকী, যখন ইচ্ছে হবে, তুমি বাড়িতে গিয়ে দু’দিন থেকেও আসতে পারবে। তবে, আপাতত যে কাজটা তোমায় দিলুম, তুমি যদি সে কাজটা চটপট করে ফেলতে পারো, তবে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি৷ ছেলেকে ছেড়ে কোন বাপ নিশ্চিন্তে থাকতে পারে বলো!”
সর্দারের মুখে এই কথা শুনে, নিজের ছেলের জন্যেও তার যেন মন কেমন করে উঠল। সত্যিই তো, নিজের ছেলেকে ছেড়ে কোন মানুষ অনেকদিন নিশ্চিন্তে থাকতে পারে! আশ্চর্য, শহরের কাজ খুঁজতে বেরিয়ে এ তো দেখি এক অদ্ভুত কাজে জড়িয়ে পড়ল সে! ভারী অবাক লাগছে তার। একেই কি বলে বরাত!
হবে হয়তো, বরাতই বলে।

এখনকার মতো রূপচাঁদের শহরের ভাবনা শিকেয় উঠল। আর, সত্যি বলতে কী, এখন শহরের কথা ভেবেই বা কী হবে! কাজের কথা ছিল, সেই কাজ তো তার একটা জুটে গেল! তা ছাড়া শহরে গেলে কোথায় সে কাজ খুঁজত? কার কাছে গেলে কী কাজ জুটত, সে ধারণাও তো তার ছিল না। কাজেই যা জুটল তা-ই নিয়ে খুশি থাকাই ভাল। তার ওপর পয়সা তো কম দিচ্ছে না সর্দার। যে-ছেলের জন্যে শহরে কাজ খুঁজতে বেরনো, সেই ছেলের পড়াশোনার খরচের কথাও আর ভাবতে হবে না তাকে! সর্দার যখন বলছে, দরকার পড়লে, আরও পয়সা দেবে, তখন শহরে কাজের খোঁজে যাওয়ার দরকারই বা কী! অবশ্য সর্দারের ছেলের খোঁজে যদি যেতে হয়, তখন অন্য কথা। তবে এখন যে কথাটা ভাববার, তা হল, সে ছেলেটাকে খুঁজবে কোথায়! দুনিয়াটা তো আর একটুখানি নয়! সে কোথায় আছে, কেমন করে জানবে? খুঁজে পাওয়াও দস্তুরমতো কঠিন। তা হোক, কাজটা যত কঠিনই হোক, তাকে পিছিয়ে পড়লে চলবে না। আগেই যখন হাতে টাকা এসেছে, তখন সে লড়েই যাবে। আর, তাই সে খুশিমনে রাজি হয়ে গেল।
এমন সময় হঠাৎ সর্দার জিজ্ঞেস করল, “রূপচাঁদ, তুমি ঘোড়ায় চড়তে পারো?”
রূপচাঁদ সর্দারের হঠাৎ এমন প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে গেছে। অবশ্য সঙ্গে-সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন বলুন তো?”
“না, অন্য কিছু নয়। তোমার যদি অভ্যেস থাকে তা হলে পথে চলাফেরা করার জন্যে তোমাকে একটা ঘোড়া দিতে পারি।” উত্তর দিল সর্দার।
রূপচাঁদ একটু ইতস্তত করে বলল, “পারি, তবে অনেকদিন অভ্যেস নেই।”
সর্দার কিছুক্ষণ একটা কিছু ভাবল। তারপর বলল, “ঠিক আছে, তা হলে তুমি দু’দিন এখানে থেকে যাও! আমি তোমায় ঘোড়ায় চড়াটা একটু অভ্যেস করিয়ে দেব। পথে-ঘাটে কোথায় কী গাড়ি-ঘোড়া পাবে, তার কিছু নিশ্চিতি নেই। একটা ঘোড়া সঙ্গে থাকলে অন্তত সেই ভাবনাটা থাকে না।”
রূপচাঁদ ভাবল, ঠিক বটে। সর্দারের কথাটা ফেলার নয়। সুতরাং সে এখানে দু’দিন থেকে যেতেই পারে। কাজেই সে অমত করল না।
সেই গহ্বরের সুড়ঙ্গে রূপচাঁদের কালকের রাতটা কেটেছে সর্দার যেখানে ঘুমোয় সেই গহ্বরে। পরের দু’দিন তার থাকবার ব্যবস্থা হল সুড়ঙ্গের আর এক কোনায়। সত্যি, সুড়ঙ্গটা এত বড়, বিশ্বাস করা যায় না। স্বচ্ছন্দে যেখানে খুশি মাথা গুঁজে থাকা যায়। মাথা তুলে চলাফেরা করা যায়। ভাবলে অবাক লাগে, পাথরের নীচে এমন একটা গহ্বর এরা খুঁজে বার করল কীভাবে! কেমন আবার থরে-থরে পাথর সাজিয়ে ঘরের মতো আলাদা-আলাদা আড়াল বানিয়ে নিয়েছে। বাহাদুরি আছে বলতে হয়। যারা অন্য কাজে এমন পোক্ত, তারা ডাকাতি না-করে অন্য কিছু তো করতে পারত! তখন এমন লুকিয়ে-ছাপিয়ে এদের থাকতে হত না। নিজেদের ঘর ছেড়ে ভয়ে-ভাবনায় দিন কাটাতে হত না। সর্দারের মতো অমন একটা শক্ত-সমর্থ মানুষ ছেলের জন্যে এত যে হাহুতাশ করছে, তখন কি তা করতে হত! না, করতে হত না।
গহ্বরের সুড়ঙ্গে এইসব কথা যতই ভাবছে রূপচাঁদ, ততই তার খুশিতে মন ভরে যাচ্ছে। হ্যাঁ, ছেলেটাকে মানুষ করার জন্যে সে টাকার সন্ধান পেয়ে গেছে। ছেলের লেখাপড়া নিয়ে আর তাকে ভাবতে হবে না। রূপচাঁদ ছেলেকে অনেক লেখাপড়া শেখাবে। মানুষ করবে। অনেক বড় ঘরে তার বিয়ে দেবে। তারপর কত আনন্দে দিন কাটবে তার। তখন, আর জমিতে চাষ করা মানাবে না রূপচাঁদের। ছেলেই বা মানবে কেন! লোকে যে তা হলে ছেলেকে চাষির ছেলে বলবে। না, লাঙলে আর হাত দেওয়া চলবে না। তখন সে মাথা উঁচু করে বলবে, তোমরা দ্যাখো, মুখ্যু বাপের ছেলে কেমন বিদ্বান হয়েছে। সুতরাং, দু’দিন দস্যুদের সঙ্গে থেকে যেতে আপত্তি করে কেউ!
গহ্বরের ভেতরে যে এত বড় একটা আস্তাবল থাকতে পারে, ওপর থেকে একদম বোঝা যায় না। একটা, দুটো, তিনটে করে গুনতে-গুনতে পনেরোটা ঘোড়া গুনে ফেলল রূপচাঁদ। আর সবচেয়ে আশ্চর্য, সব কটা-ঘোড়াই কালো কুচকুচ করছে। তেমনই তেজি। সর্দার নিজেই একটা ঘোড়া বেছে দিল রূপচাঁদের জন্যে। নিজেই বার করে আনল আস্তাবল থেকে সুড়ঙ্গের এই চওড়া জায়গাটায়। রূপচাঁদকে বলল, দ্যাখো, পারো কি না!
রূপচাঁদ ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠল। সামনের দিকে খানিক যেতেই দেখা গেল, এই গহ্বরে ঢোকা আর বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা। রাস্তাটা পাথর দিয়ে এমনভাবে আড়াল করা আছে, ঘুণাক্ষরে কেউ টের পাবে না, এখানে কোনও রাস্তা আছে। সেই রাস্তা পেরিয়ে গহ্বর থেকে ওপরে উঠেই রূপচাঁদ আকাশ দেখতে পেল। তারপর পাথর টপকে ঘোড়া ছোটাতে লাগল। পেছনে-পেছনে সর্দারও বেরিয়ে এসেছে। ঘোড়া ছুটছে। পাথরের ওপর শব্দ উঠছে। সর্দার দেখছে। রূপচাঁদ ঘোড়ার পিঠে বসে ছুটতে-ছুটতে ভাবছে, বাব্বা, জায়গাটা তো বেশ অনেক বড়। আর সাঙ্ঘাতিক বিঘ্নে ভরা। সত্যিই এটা মানুষের বাস করার মতো জায়গাই নয়। এ যেন পাথরের মরুভূমি। যেদিকেই চোখ ফেরায় রূপচাঁদ, গা ছমছম করে। সুতরাং অনেকখানি ছুটে এসে কেমন যেন শিরশির করতে লাগল সারা শরীর। এখানে পাথরের গায়ে ধাক্কা মেরে যেটুকু হাওয়ায় শব্দ উঠছে, সেটুকুই শুধু কানে আসে। তার বাইরে আর কিছু নেই। তবে হ্যাঁ, ঘোড়া ছুটলে অন্য কথা। তবে বাপু, সে তো মাঝেমধ্যে। সবসময় শুধু হাওয়া হুহু করছে! থমথম করছে চারদিক। দস্যুদের গা-ঢাকা দিয়ে থাকবার মতোই জায়গা বটে! এমন মনপসন্দ জায়গা দস্যুরা আর কোথায় পাবে!
না, আর সে এগোল না। দরকারই বা কী! সুতরাং ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে সে ফিরে এল।
“বাহ্, তুমি তো ভালই ঘোড়া ছোটাতে পারো।” রূপচাঁদ ফিরে এসে সর্দারের সামনে দাঁড়াতেই সর্দার তার বাহবা দিল।
ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে নামতে রূপচাঁদ মুচকি হাসল। কোনও উত্তর দিল না।
“তোমাকে আর নতুন করে শেখাব কী! তুমি তো বেশ ভালই ঘোড়া ছোটাও। যথেষ্ট পটু। কোনও দরকার নেই তোমার এই অন্ধকার গহ্বরে দু’দিন থাকার। বরং আজ বিশ্রাম নিয়ে কালই রওনা দিতে পারো। এমন ঘোড়া ছোটাতে তুমি শিখলে কেমন করে?” ঘোড়ার গায়ে হাত বোলাতে-বোলাতে জিজ্ঞেস করল সর্দার।
রূপচাঁদ উত্তর দিল, “এক ভিনদেশি সাহেবের কাছে।”
“কীরকম?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল সর্দার।
রূপচাঁদ ঘোড়ার লাগাম ধরে হাঁটতে-হাঁটতে গহ্বরে ঢুকে এল। তারপর আস্তাবলে ঘোড়া রাখতে-রাখতে সেই ভিনদেশির কথা বলতে শুরু করল:
“আমি তখন ছেলেমানুষ। বয়স কম। ঠিক সেই সময়ে, একদিন আমাদের গ্রামে এক সাহেব এলেন ঘোড়ায় চড়ে। তা, গাঁয়ে-গঞ্জে কোনও সাহেবসুবো এলে যা হয়! সবাই সাহেবের পেছনে হামলে পড়ল। মানুষটাকে দেখতেও ছিল যেমন লম্বা-চওড়া, তেমনই গায়ের রং। লাল টকটক করছে। টিকোল নাক। বড়-বড় চোখ। হাতের পাঞ্জা অ্যাইসা মোটা। তাঁকে দেখে আর চোখ ফেরানো যায় না। কী অদ্ভুত তাঁর পোশাক। বিশেষ করে পায়ের জুতোটা, বাবা কী ঢাপ্পুস। দু’খানা পা বটে! আমার সেই কম বয়সের দুটো পা, একসঙ্গে তাঁর একপাটি জুতোর মধ্যে অক্লেশে ঢুকে যেত। তিনি যে কী ভাষায় কথা বলছিলেন তার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলুম না। কিন্তু কী দরাজ গলা। গমগম করছে। শুনতে এত ভাল লাগছিল! লোকটি এসেছিলেন আরও পাঁচ-ছ’ জনের সঙ্গে। তাঁরাও যে-ভাষায় কথা বলছিলেন, তারও একবর্ণ আমরা বুঝছিলুম না। অবশ্য, তাঁর সঙ্গে আরও যে পাঁচ-ছ’জন ছিল, তারা কেউ ভিনদেশি নয়, এদেশি। তাদের মুখে শুনলুম, ভিনদেশি লোকটি আমাদের গ্রামে থাকবেন কিছুদিন। কিছুদিন মানে সেই মরসুমের গোটা শীতকালটা তিনি ছিলেন আমাদের গ্রামে। আমাদের গ্রামে একটা মস্তবড় ঝিল আছে। শীতের সময় সেখানে দূর-দূর দেশ থেকে কত পাখি আসে। বক, সারস, বনমোরগ, সরাল, রাজহাঁস আরও কত পাখি। দল বেঁধে আসত। ঝিলের ধারে গাছে-গাছে থাকত। ঝিলের মাছ ধরে খেত। ডিম পাড়ত। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোত। তারপর শীত ফুরোলে বাচ্চা নিয়ে আবার যে যার দেশে ফিরে যেত।
“তা, সেই ভিনদেশি সাহেব সেবার এসেছিলেন এইসব পাখি দেখতেই৷ তিনি সঙ্গে করে একটা অদ্ভুত নীলচে রঙের ঘোড়া এনেছিলেন। সেই মস্ত ঝিলের ধারে-ধারে তিনি এক-একদিন পায়ে হেঁটে পাখির চালচলন দেখতেন। আবার এক-একদিন ঘোড়ায় চড়ে ঝিলটাকে পাক দিয়ে অনেক দূরে চলে যেতেন। তাঁকে আর দেখাই যেত না।
“তো, এদিকে, আমরা সব ছেলের দল সাহেব দেখে খুব মজা পেয়ে গেলুম। তিনি ছিলেন আমাদের গ্রামেরই এক সরকারি কুঠিতে। প্রথম-প্রথম আমরা তাঁকে দেখার জন্যে উঁকিঝুঁকি মারতুম কুঠির জানলা দিয়ে। যখন তাঁর চোখে চোখ পড়ে যেত, আমরা পাঁই-পাঁই করে দৌড় মারতুম। সাহেব হেসে উঠতেন। আমরা তাঁর হাসি শুনতে-শুনতেই পগারপার।
“তো এমনই করতে-করতে আমরা যখন দেখলুম, সাহেব আমাদের ছুটতে দেখে শুধুই হাসেন, কিছু বলেন না, তখন আমাদের একটু-একটু সাহস বাড়ল। আমরা তখন আর উঁকিঝুঁকি মারতুম না। তাঁকে সামনাসামনি দূর থেকে দেখতুম। মুচকি-মুচকি হাসতুম। সাহেবও হাসতেন। অবশ্য কাছে যেতে তখনও সাহস হত না। কিন্তু মনে-মনে যাওয়ার ইচ্ছে হত পুরোদস্তুর। সাহেব হাতছানি দিয়ে আমাদের ডাকতেনও। কিন্তু তবুও আমরা নড়তুম না। কিন্তু হাতছানি দিয়ে ডাকতে-ডাকতে আমাদের দিকে তিনি এগিয়ে এলেই, আমরা দে পিটটান!
“এমন সময় একদিন হল কী, অনেক রাত্তির তখন। সবে শুয়েছি। তখনও ঘুম আসেনি চোখে। হঠাৎ আমার কানে এল একটা মিষ্টি শব্দ। মনে হল, কে যেন বাজনা বাজাচ্ছে। টুংটাং। তারের টানে সুর উঠছে। তারপরেই সেই সুরের সঙ্গে গলা মিলিয়ে কে যেন গান গেয়ে উঠল। হ্যাঁ, ঠিক যা ভেবেছি, এই সেই সাহেবের গলা। সাহেবই গান গাইছেন। কী গান গাইছেন জানি না। তাঁর গানের কথার মানে কিছু বুঝি না। কিন্তু কী মিষ্টি দরাজ গলা। দূর থেকে ভেসে আসছে হাওয়ায় দোল খেতে-খেতে। আমি এমন অন্যমনা হয়ে পড়লুম সেই গানের সুর শুনে! কেন যে তখন আমার অমন হল, বলতে পারব না। আমার তখন মনে হল, কোথায়, কতদূরে সাহেবের দেশ আমি জানি না। শুনেছি, অনেক নদী, অনেক সমুদ্র, অনেক পাহাড় ডিঙিয়ে তিনি এসেছেন এদেশে। এসেছেন পাখির টানে। পাখিকে ভালবাসার জন্যে। সঙ্গে-সঙ্গে অন্যমনা সেই আমার চোখে তখন ছায়ার মতো ভেসে উঠল অনেক পাখির উড়ন্ত ডানা। কত সবুজ বন। কত পাহাড়। কত ঢেউ-টলমল নদী। আমি ঘরের জানলাটা খুলে ফেললুম। বাইরে উপচে পড়েছে জ্যোৎস্না। এই রাতে চাঁদের জ্যোৎস্না যেন শীতে জবুথবু। জ্যোৎস্নার সেই আবছা আলোয় চোখ মেলে দাঁড়িয়ে রইলুম। স্পষ্ট কিছুই দেখতে পাই না। কানে বাজে গানের শব্দ। যার মানে কিছুই বুঝি না।
“হঠাৎ কানে এল, গাছের পাখিরা ডেকে উঠেছে।
“তবে কি তারাও সাহেবের গানের সঙ্গে গলা মেলাতে চায়!
“হঠাৎ যেন মনে হল, জ্যোৎস্না-ছায়ায় ডানা মেলে তারা লুকোচুরি খেলছে।
“তবে কি তারা বাজনার ওই টুংটাং শব্দের সঙ্গে হাওয়ায় দোল খাচ্ছে!
“আনমনে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে এইসব ভাবি! কখন যে বাজনা থেমেছে, থেমেছে পাখিদের ডাকাডাকি, কিছুই খেয়াল ছিল না। হয়তো আমি আরও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিলুম এমন করেই। বাবা এসে গায়ে হাত দিতেই আমার চমক ভাঙল। আমি চকিতে ফিরে তাকাতেই বাবা বললেন, ‘এই শীতে জানলা খুলে কী করছিস?’
“আমি থতমত খেয়ে বললুম, ‘না, দেখছি।’
“বাবা জানলাটা বন্ধ করে দিলেন। বললেন, ‘ঠাণ্ডা লেগে যাবে। শুয়ে পড়!’
“আমি চুপচাপ শুয়ে পড়লুম লেপের মধ্যে মুখ লুকিয়ে। তারপর যে কখন ঘুমিয়ে পড়লুম! কিছুই খেয়াল নেই।
“পরের দিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেও আমি কেমন আচ্ছন্ন হয়ে রইলুম। সাহেবের জন্যে আমার মনে আর একটুও ভয় ছিল না। এতদিন যে খুঁতখুঁতোনি ছিল তাও আর নেই। আমার মন বলছিল, সাহেব আর একবার হাতছানি দিয়ে ডাকলেই আমি এগিয়ে যাব সাহেবের কাছে। তাই একটু বেলা বাড়তেই আমি একাই ছুটলুম সাহেবের কুঠিতে।
“না, হুট করে আমি সাহেবের কুঠিতে ঢুকলুম না। অন্যদিনের মতো আমি একটু দূরেই দাঁড়িয়ে রইলুম। দেখবার চেষ্টা করলুম গান-গাওয়া সেই সাহেবকে। গানের অদ্ভুত সুরের সেই রেশটা এখনও আমার কানে লেগে আছে। যতই সুরটা মনে-মনে ভাবছি, ততই কেমন অবাক লাগছে। মানুষটা যে অমন গান গাইতে পারেন, তাঁর মুখ দেখে কে বলবে!
“কিছুক্ষণ আমি দাঁড়িয়ে রইলুম সেই দূরে। তাকে-তাকে থাকলুম। কিন্তু আশ্চর্য, আমি সাহেবকে দেখতে পেলুম না। দেখতে পেলুম, সেই ঘোড়াটাকে। ঘাস খাচ্ছে আর পা ঠুকছে। মনে হল, তা হলে সাহেব বোধ হয় ঝিলের ধারে গেছেন পাখি দেখতে। তা-ই হবে। এই কথা ভেবে, আমি নিঃসাড়ে এগিয়ে গেলুম। সাহেবের সেই কুঠির বেড়া-দেওয়া গেটটা খোলার আগে চারপাশটা সতর্ক চোখে দেখে নিলুম।
“না, কেউ নেই আশেপাশে। সুতরাং বেড়ার গেট ঠেলে আমি ভেতরে ঢুকে গেলুম। সামনেই সাহেবের ঘরের জানলা। খোলাই আছে। উঁকি মারলুম। না, ঘরেও সাহেব নেই। আমি একছুটে ঘোড়াটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। একগোছা ঘাস মাটি থেকে তুলে নিয়ে তার মুখে ধরলুম। ঘোড়া চিবোতে লাগল। বারবার এমনই করে ঘাস ঘোড়ার মুখে তুলে দিই, ঘোড়া খায়, পা ঠোকে। নাকে ফরফর করে। কিন্তু একবার ঘোড়ার মুখে ঘাস তুলে দেওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই থমকে গেছি। মুখ ফেরাতেই দেখি, সাহেব। মুচকি-মুচকি হাসছেন। আমিও মুখে হাসি আনতে গেলুম, পারলুম না। কাঁচুমাচু হয়ে সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। সাহেব বোধ হয় আমার মুখের চেহারা দেখে থাকতে পারলেন না। হো-হো করে হেসে উঠলেন। আমি বোবা হয়ে গেলুম। আরও অবাক হয়ে গেলুম সাহেব যখন মুখে অদ্ভুত শব্দ করে বাংলায় কথা বলে উঠলেন, ‘আজ হামি তুমিকে পাকড় ফেলছি। রোজ ভাগিস আমিকে দেখে। আজ একদম কট।’ বলেই মুচকি হাসা সেই সাহেব হঠাৎ খুবই গম্ভীর হয়ে গেলেন। গম্ভীর মুখে আমার দিকে তাকালেন।
“কথাগুলো উলটোপালটা বললে কী হয়েছে! আমি তো বুঝতেই পারলুম, সাহেব কী বলতে চান। তখন তাঁর সেই গম্ভীর মুখ দেখে আমার বুক শুকিয়ে এইটুকু! পালাব যে, তারও উপায় নেই। হঠাৎ তিনি আমার হাতটাও ঝপ করে চেপে ধরেছেন। সেই হাত ছাড়িয়ে আমি যে পালাব, সে সাধ্যিও আমার নেই। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম। আমার চোখ ছলছল করে উঠল। আমি সেই অবস্থাতেই হাত ছাড়াবার জন্যে টানামানি লাগিয়ে দিলুম। আমি যতই টানছি, সাহেবও ততই চেপে ধরছেন। আমার তখন মনে হচ্ছিল, আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠি। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে এও মনে হচ্ছিল, একজন ভিনদেশি সাহেবের সামনে ককিয়ে কেঁদে ওঠাটা খুবই লজ্জার। তাই, যতক্ষণ পারলুম, চোখের জল মাটিতে পড়তে দিলুম না। তারপর যখন আর পারলুম না, ভ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ করে কেঁদে ফেললুম।
“এবার সাহেব গলা চড়িয়ে হেসে উঠলেন। আমাকে নিজের কোলের কাছে টেনে আদর করে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘আরে না বাবা, হামি তুমিকে মিথ্যে কথা বলেছে। ভয় দেখাচ্ছে। না, না, কাঁদছে না, কাঁদছে না। হামি তুমিকে বাজনা শোনাবে।’
“বাজনার কথা শুনে তখন আর আমি একচোখ জল নিয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকাতে লজ্জা পেলুম না।
“সাহেব আমায় আদর করতে-করতেই বললেন, ‘ছি-ছি! তুমিকো এতো বোড় হল, তবু কাঁদল?’
“আমি ততক্ষণে চোখের জল মুছে ফেলেছি। বুঝতে পারলুম, ভ্যাঁ করে কেঁদে ওঠাটা একেবারেই ঠিক হয়নি। দেশে ফিরে এই ভিনদেশি সাহেব যদি আমার কান্নার কথাটা পাঁচজনের কানে তোলেন! তখন নিশ্চয়ই সবাই হাসাহাসি করবে। তখন সে তো আরও লজ্জা! সুতরাং যাক গে, যা হয়ে গেছে সেই নিয়ে ভাবা মিথ্যে। তখন আমার বাজনাটা শোনার জন্যে মন ভীষণ উসখুস করে উঠল। উদ্গ্রীব হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম আমি। আমার চোখে তখন একফোঁটাও জল নেই। তাই দেখে সাহেবের মুখও খুশিতে ঝলমল করে উঠল। বললেন, ‘তুমিকে হামি খুব ভালবাসবে। তুমির খুব ভাল ছেলে হল। তুমিকে আমি বাজনা শোনাবে। গান গাইবে। ঘোড়ায় ছোটাবে। পাখি দেখাবে। গল্প বলবে। তুমির গল্প জানে?’
“এবার সাহেবের কথা শুনে আমার একটু-একটু হাসি পেল। হয়তো তখন আমার মুখে একটু-একটু হাসির আভা ফুটেও উঠেছিল। সেইটুকু দেখেই সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাসল কেনো?’
“আমি তখন একমুখ হাসি নিয়ে সাহেবের মুখের দিকে তাকালুম। সাহেবও হাসলেন। হাসতে-হাসতে বললেন, ‘হামি বুঝতে পেরেছে তুমির কেনো হাসল! হামার কুথা শুনে তুমির হাসি পাচ্ছে। তাই তো?’
“আমি তখন মুচকি-মুচকি নয়, হো-হো করে হেসে উঠলুম।
“সাহেবও হাসলেন। তবে মুখ তাঁর কাঁচুমাচু। তারপর আমায় টানতে-টানতে তাঁর ঘরের ভেতরে নিয়ে গেলেন। আমিও আর দোনোমনা না-করে সাহেবের ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লুম। ঘরে তেমন কিছুই নেই! একটা তক্তপোশ। তার ওপর বিছানা পাতা। ঘরের দেওয়ালে একটা তাক। তাকে অনেক বইপত্তর। এককোণে চেয়ার টেবিল। লেখার কাগজ। কলম। কিন্তু যেটা দেখতে চাই, সেটা তো দেখতে পাই না! কোথায় সেই বাজনাটা?
“সাহেব চেয়ার টেনে আমায় বসতে বললেন।
“আমিও বসে পড়লুম।
“সাহেব হঠাৎ হেঁট হয়ে তক্তপোশের নীচে মাথা গলালেন। একটা বাক্স টেনে বার করলেন। বাক্সর ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত দেখতে বাজনা বার করলেন। তাতে তার বাঁধা। আমি এরকম বাজনা আগে আর কখনও দেখিনি। তিনি বললেন, ‘এ বাজনাটা হামি বাজাবে। তুমির এ বাজনাটার নাম জানলে?’
“আমি বাজনাটা দেখতে-দেখতে মাথা নেড়ে জানালুম, না।
“‘গিটার।’ বলে সাহেব গিটার নিয়ে বিছানার ওপর বসলেন। টুংটাং করে তারগুলো টেনে-টেনে ঠিক করলেন। সেই টুংটাং শব্দ শুনে তখনই আমার শরীরে কেমন শিহরন লাগছিল। ঠিক এই সময়ে বলে উঠলেন, ‘তুমির মুখে একটা কুথাও তো হামি শুনলে না। কী নাম আছে তুমির?’
“সত্যি বলছি, তখন ওই বাজনাটা দেখে আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেছি। ভয় নামের যে জুজুটা এতক্ষণ আমায় তাড়া দিচ্ছিল, সেটা বেবাক হাওয়া হয়ে গেছে। তখন আমার মনে হল, আর কথা না-বলে চুপ করে থাকার কোনও মানে হয় না। আমি তাই খুশিমনে তাঁকে উত্তর দিলুম, ‘আমার নাম রূপচাঁদ।’
“‘রূপচাঁদ!’ সাহেবের চোখ ঝলমল করে উঠল। তিনি বললেন, ‘চাঁদ? রূপচাঁদ? তুমির নামটো বহুত মিঠাই শুনল।’
“আমার হাসি পেয়ে গেল বেদম।
“সাহেব আমায় হাসতে দেখে কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাসল কেনো?’
“আমি হাসতে হাসতেই উত্তর দিলুম, ‘মিঠাই বলছ কেন? মিঠাই তো একটা মিষ্টি খাবারের নাম। বলো, তোমার নামটা খুব মিষ্টি শুনতে লাগল।’
“সাহেব এবার নিজেই আমার সঙ্গে হা-হা করে হেসে উঠলেন। হাসতে-হাসতে বললেন, ‘হামি সোব কুথা ঠিক কোরে বলতে পারল না বলে তুমির হাসল! আচ্ছা, এখোন হামি একটো গান গাইবে। দেখো, একটো ভুলও বলবে না। তুমির দেশের একটো বুড়া মানুষের কাছে এ গান আমি শিখল। গানটো আমার এতো ভাল লাগল হামি থাকতে পারল না। হামি তাকে বলল, হামাকে আপন গানটা শিখিয়ে দেবেন? আপন শিখিয়ে দিলন। তুমিকো এখোন হামি সেই গান শুনাবে। শুনো!’
“সেই গানটার সব কথা এখন আমি ঠিক-ঠিক বলতে পারব না। সব মনে নেই। যেটুকু মনে আছে, সেটুকু তা-ও গানের মতো ছন্দে মনে নেই। কথায় মনে আছে। গানের কথাগুলি কত সুন্দর। ওই যে আকাশটা আমরা দেখছি, এ আকাশ আমাদের সকলের। ওই যে আকাশভরা আলো, ওই চাঁদ, ওই সূর্য, ওরা আমাদের সকলের বন্ধু। ওই নদী, সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত, সব আমাদের। বাতাস আমাদের জন্য ছড়িয়ে দিয়েছে মুঠো-মুঠো জীবন। সেই জীবন আছে আকাশের মেঘে। সূর্যের তাপে। সবুজ মাঠে। বনের গাছে-গাছে। যে বাতাসে তুমি শ্বাস নাও, আমিও বেঁচে থাকি, সেই বাতাসে শ্বাস নিয়ে। পৃথিবী আমাদের সকলেরই মা। অথচ কী আশ্চর্য, আমরাই আমাদের আপনজনকে মারি। লুঠ করি তার সর্বস্ব। রক্ত ঝরাই। আর সে রক্ত ঝরে পড়ে মায়েরই বুকে। কী নিষ্ঠুর আমরা। কী হিংস্র!
“আমি তো আগেই বলেছি, আমি তখন ছেলেমানুষ। কতই বা বয়স হবে, দশও পেরোয়নি তখন। কাজেই সেই বয়সে চুপচাপ বসে-বসে গান শোনার কথা নয়। অস্থির হয়ে এটা টেনে সেটা উলটে দেখার বয়স তখন। ওখানে ছোটা, এখানে হাঁটার জন্যে পা তখন ছটফট করে। কী বলব, সাহেবের তখন গান শুনে মনটা আমার সব ভুলে কেমন শান্ত হয়ে গেল। আমি নিশ্চল হয়ে বসে গান শুনি, আর অবাক হয়ে তাঁকে দেখতে থাকি। শুনলে হয়তো ভাল লাগবে, সেই গানটা সাহেব আমায় গাইতে শিখিয়েও দিয়েছিলেন। আমি কত লোককে শুনিয়েছি সেই গান। কত তারিফ কুড়িয়েছিলুম। এখন গাইতেই পারি না।
“যাই হোক, তারপর সাহেবের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল আমার। এমন বন্ধুত্ব হয়ে গেল, সাহেব কথা বলতে-বলতে ভুল বললে হাসতুম, রাগাতুম। সাহেব একটুও রাগতেন না। উলটে ভুল শুধরে দিলে, খুশি হয়ে আমায় আদর করতেন। তো একদিন একফাঁকে আমি তাঁকে বললুম, ‘সাহেব, আমাকে ঘোড়ায় চড়াবে?’
“সাহেব বললেন, ‘কেনো চড়াবে না! চোলো হামার সঙ্গে।’ বলে, সেদিন সাহেব আমায় ঘোড়ার পিঠে বসালেন। আমাকে সামনে নিয়ে নিজে পেছনে বসলেন। তারপর লাগাম ধরে ঘোড়া ছোটালেন। ঘোড়া ছুটতে-ছুটতে চলে এল ঝিলের ধারে। সেই পাখির রাজ্যে। কত পাখি। সাহেবও দেখছেন, আমিও দেখছি। ঝিরঝিরে বাতাস বইছে। তার হালকা ছোঁয়ায় ছোট্ট-ছোট্ট ঢেউ খেলছে ঝিলের জলে। কত পাখি গাছে। কত পাখি আকাশে। কত পাখি উড়তে-উড়তে ঝিলের জলে ছোঁ মারছে। মাছ ধরছে। অগুনতি বক চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে এক ঠ্যাঙে জলের ওপর। মাছ দেখলেই ঠোঁট বাড়িয়ে খপাত!
“সেই ঝিলের ধারে অনেকক্ষণ ছিলুম আমরা। এবার ফেরার পালা। আবার ঘোড়ার পিঠে। ফিরতে-ফিরতে কী মনে হল, আমি সাহেবকে জিজ্ঞেস করলুম, ‘তোমার ঘোড়ার নাম নেই?’
“সাহেব উত্তর দিলেন, ‘কেনো থাকব না, বাদাম।’
“আমি হেসে ফেললুম।
“সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাসল কেনো?’
“আমি উত্তর দিলুম, ‘নাম শুনে হাসি পেয়ে গেল।’
“সাহেব বললেন, ‘হামি জানি তুমির লোক বাদাম খেতে খুব ভালবাস।’
“আমি বললুম, ‘তা ঠিক।’
“উত্তর দিয়ে আরও খানিক এদিক-ওদিক দেখতে লাগলুম। দেখতে-দেখতে হঠাৎ বলে বসলুম, ‘তোমার ঘোড়া বড্ড আস্তে হাঁটছে।’
“সাহেব বললেন, “আস্তে কেনো হাঁটব। দেখো, ঘোড়া কেমোন ছুটছে!’ বলেই সাহেব মুখে একটা আওয়াজ করলেন। তারপরেই ধুন্ধুমার কাণ্ড। এমন দৌড় মারল ঘোড়া, আমি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলুম। এই বুঝি পড়ে যাই ঘোড়ার পিঠ থেকে।
“না, পড়িনি অবশ্য। যখন ঘোড়া থামল, আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম।
“সাহেব তখন হাসতে হাসতে বললেন, ‘দেখলো, হামার ঘোড়ার ছুট! তুমির ভয় পেলো খুব না?’
“আমি উত্তর দিলুম, ‘আমি তো ঘোড়ার পিঠে ছুটিনি কখনও। এই প্রথম।’
“‘হামি ঘোড়ার পিঠে তুমিকো ছোটাছুটি শিখালে আর ভয় করব না।’
“সাহেবের কথা শুনে আমি কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলুম। খানিক থমকে তারপর জিজ্ঞেস করলুম, ‘তুমি আমায় ঘোড়ায় চড়ে ছুটতে শিখিয়ে দেবে?’
“‘সেই কুথাই তো বলছি হামি।’
“‘সত্যি?’
“‘হাঁ বাবা হাঁ, সত্যি।’
“‘তখন আমি একা-একা ঘোড়া ছোটাতে পারব?’
“‘আলবত। সক্কলে পারব তো তুমি কেনো পারব না?’
“হ্যাঁ, সেই তখন আমি ঘোড়ায় চড়তে শিখেছি। সেই ছেলে বয়সে। আমাকে গান শেখালেন সাহেব। আমাকে ভালবেসে ঘোড়ার পিঠে নিয়ে কতদিন ঝিলের ধারে ধারে ঘুরলেন সাহেব। তারপর একদিন ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে আমায় একা-একা ছেড়ে দিলেন। প্রথম দিন একটু ভয়-ভয় করছিল। তারপর সাহস বাড়ল। তারপর একদিন আমায় পিঠে নিয়ে কদম-পায়ে ঘোড়া ছুটল। আমার একদম ভয় ভেঙে গেল। তখন আমি একজন পাকা ঘোড়সওয়ার হয়ে গেলুম।”
দস্যুসর্দারকে গল্প বলতে বলতে রূপচাঁদ থামল।
“তারপর?” রূপচাঁদ থামতেই দস্যুসর্দার জিজ্ঞেস করল, “তারপর কি সাহেব থেকে গেলেন তোমাদের গ্রামে?”
“না।” উত্তর দিল রূপচাঁদ, “তারপর একটু-একটু শীত ফুরিয়ে যেতে লাগল। নানান দেশ থেকে উড়ে আসা শীতের পাখিরা একেএকে ফিরে যেতে লাগল নিজের দেশে। তারপর একদিন সাহেবও ফিরে গেলেন সেই ভিনদেশে। আর দেখা পাইনি তাঁর কোনওদিন। বেশ মনে আছে, তিনি চলে যেতে, সেই ছোট্টবেলায় সেদিন আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলুম।”
সেই রাতটা রূপচাঁদের সেই দস্যু-ঘাঁটির গহ্বরেই কেটে গেল নির্বিঘ্নেই। পরের দিন খুব সকাল-সকালই উঠেছিল সে। কোন পথ দিয়ে কোথায় গেলে সে দস্যুসর্দারের ছেলের খোঁজ পাবে, তা জানা নেই রূপচাঁদের। তবু সে ঠিক করল সামনের রাস্তা ধরেই যাওয়া ভাল। যাওয়ার আগে নিজের বাড়ির ঠিকানাটা দস্যুসর্দারকে দিতে ভুলল না রূপচাঁদ। ভুলল না সর্দারের ছেলের ছবিটা নিতেও। ঠিক এই সময়ে কেউ যদি রূপচাঁদকে দেখত, অবাক হয়ে যেত। কী চমৎকার দেখতে লাগছে তাকে। জলে-কাদায় মাখামাখি জামাকাপড় আর তার গায়ে নেই। সর্দার তাকে দিয়েছে নতুন পোশাক। এখন আর ধুতি-পাঞ্জাবি নয়। দস্তুরমতো ঘোড়ায় চড়ার পোশাক। চুস্ত-পাজামা আর চাপকান। পায়ের চপ্পল তো জলের তলায় হাবুডুবু খাচ্ছে। তাই, এখন তার পায়ে নাগরা। দেখলে মনে হবে, একেবারে অন্য মানুষ। মানুষটা যে চাষবাস করে, এখন তাকে দেখলে কার সাধ্যি বোঝে! সর্দারের দেওয়া টাকার বান্ডিলটা আর তার ছেলের ছবিটা, জামার বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখল সে। না, এখানে রাখলে হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। কেউ জানতেও পারছে না।
রূপচাঁদ দস্যু-দলের কাছে বিদায় নিয়ে ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে বসল। শেষবার সর্দারের মুখের দিকে চোখ ফিরিয়ে শেষ বিদায় জানাল। সর্দার বলল, “কিচ্ছু ভেবো না রূপচাঁদ। তোমার ছেলের জন্যে আমার টাকা ঠিক সময়েই পৌঁছে যাবে। আমার ছেলের সন্ধান পেলেই তুমি আমাকে তক্ষুনি-তক্ষুনি খবর পাঠাবে। দেরি কোরো না যেন!”
রূপচাঁদ উত্তর দিল, “আপনিও কিচ্ছু ভাববেন না সর্দার। আমিও আপনার ছেলেকে খুঁজে বার করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব। কাজের খোঁজে বেরিয়ে আপনার দয়ায় কাজ পেয়েছি। সে-কাজে আমি কখনও অবহেলা করতে পারি! বিদায় সর্দার।” বলে কালো ঘোড়ার পিঠে বসে রূপচাঁদ অজানা পথে ছুটে চলল।

বলতে কী, ঘোড়া ছোটানো এখানে এক দুঃসাধ্য কাজ। তার ওপর পাথরের গোলকধাঁধায় পথ খুঁজে বার করাও ভারী মুশকিল। তবু রূপচাঁদকে থামলে চলবে না। সন্ধের আগে কিছু না-হলেও একটা লোকালয়ে পৌঁছতেই হবে। তা না-হলে আবার বিপদের ভয় থেকে নিস্তার পাবে না। অন্তত রাতটা তো নির্বিঘ্নে কাটানোর জন্যে একটা নিরাপদ আশ্রয় চাই। আগে সে একা ছিল। এখন সঙ্গে একটা ঘোড়া। তাকেও তো দেখতে হবে। রাত্তির হলে, তারও চাই একটা থাকার মতো উপযুক্ত জায়গা। তাই, ঘোড়ার পিঠে বসে পাথর টপকাতে-টপকাতে এগিয়ে চলল দুর্গম পথ অগ্রাহ্য করে।
সেই যে দস্যু-ঘাঁটি থেকে বেরোল রূপচাঁদ, তারপর থেকে একটি মানুষেরও টিকি তার নজরে পড়ল না। কাউকে যে জিজ্ঞেস করবে সে ঠিক পথে যাচ্ছে কি না, তারও কোনও উপায় নেই। কাজেই, যেদিকে পাথরের বাধা কম, সেইদিকেই সে ঘোড়ার মুখ ঘোরায়। মাঝে মাঝে আশঙ্কা হয়, তবে কি সে এগোয়নি এক পাও। একই পথে ঘুরপাক খাচ্ছে! সে যে তবে এক ভয়ানক কাণ্ড! সর্দারের ছেলের খোঁজ করা দূরে থাক, তখন যে সে নিজেই পাথরের জটপাকানো ধাঁধায় জড়িয়ে হাঁকপাক করবে। সর্দারের ছেলেকে খুঁজে বার করার কাজটা তো সহজ নয়! পৃথিবীটা কত বড়। সে কোথায় আছে, তার হদিস পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা। কিন্তু রূপচাঁদ যে কথা দিয়ে ফেলেছে। যদি না-পায় তার খোঁজ! সে যে আরও ভয়ঙ্কর। রূপচাঁদের ছেলের যে লেখাপড়া শেখা হবে না। ছেলেকে খুঁজে না-দিলে, সর্দার তো আর রূপচাঁদের মুখ দেখে টাকা দেবে না। নিশ্চয়ই রূপচাঁদের ছেলের জন্যে সর্দার তার বাড়িতে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেবে! তখন!
এইসব নানা কথা যতই তার মনের ভেতর তোলপাড় করছে, ততই সে কেমন যেন ভয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই সময়ে হঠাৎ যেন তার মনে হল, পাথরের বড়-বড় চাঁইগুলো, যেন এক-একটা বিকট চেহারার দত্যি। তার পথ আটকে চেয়ে আছে ড্যাব ড্যাব করে। কাছে গেলেই, তার গলাটা টিপে ধরে মটকে দেবে!
না, রূপচাঁদ মনে সাহস আনল। ভয় পেলে তার চলবে না। ভয় তো পায় কাপুরুষে। মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করল, পথ সে বার করবেই।
কী ভয়ানক মুশকিল!
কেন?
ওই যে, সন্ধে হয়ে আসছে!
তাই তো! এবার যে পথ চেনা দুষ্কর হয়ে দাঁড়াবে!
তা হলে!
ঠিক এই সময়ে হঠাৎই একঝাঁক পাখির কলকলানি শুনতে পেল রূপচাঁদ। চমকে চাইল সে আকাশের দিকে। হ্যাঁ, সে দেখতে পেল ঝাঁক ঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে ডানা ঝাপটে। এতক্ষণে রূপচাঁদের মনটা ভরসায় দুলে উঠল। সে গ্রামের মানুষ। কাজেই, সে জানে, কাছেই কোনও গাছগাছালিতে ওদের বাসা। তবে বোধ হয় এবার পাথরের বাধা কাটবে। তাই আকাশের যে পথ দিয়ে পাখি উড়ে যায়, সেই পথের দিকেই ঠায় চেয়ে রইল রূপচাঁদ। তার চোখে পলক পড়ে না। ঘোড়া ছোটাল রূপচাঁদ আকাশ দেখতে-দেখতে পাখির পেছনে।
হ্যাঁ, ঠিকই ভেবেছে সে। আরও খানিক আসতেই তার চোখে পড়ল, সারি-সারি গাছ। সন্ধের ছায়া নেমেছে পাতায়-পাতায়। আঃ! স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল সে। অন্তত পাথরের বাধা তো টপকাতে পেরেছে!
বটেই তো, পাথর তার পথ রুখতে পারেনি। পাথরের বাধা তুচ্ছ করে রূপচাঁদ এগিয়ে চলেছে।
কিন্তু—
আবার কিন্তু কেন?
এ যে আর-এক বিপদের মধ্যে পড়ল রূপচাঁদ। এ যে এক গভীর বনে এসে পড়েছে সে! এ বন পাথরের গা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে ডালপালা মেলে।
কী করবে এখন রূপচাঁদ?
সন্ধের ছায়া এবার রাতের অন্ধকার ছড়িয়ে দিচ্ছে ধীরে-ধীরে। এই অন্ধকারে সে কি বনের ভেতরে ঢুকবে? না কি, পাথরের ঘুপচির মধ্যে রাত কাটাবে? এইখানে একটু থামল রূপচাঁদ। ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল। গাছের কিছু পাতা ছিঁড়ে ঘোড়ার মুখে দিল। অনেকক্ষণ তার পেটে এক ফোঁটা জল পর্যন্ত পড়েনি। পাথরের স্তূপে জলের ছিটেফোঁটাও খুঁজে পায়নি রূপচাঁদ। এখানে হয়তো পাওয়া যেতে পারে। এমনকী, এখানে মানুষের আস্তানা খুঁজে পাওয়াও অসম্ভব নয়। যদিও অন্ধকারে বনের গভীরে ভয়ের ভাবনাও থাকে যথেষ্ট। অবশ্য বনটা যদি খুব গভীর না-হয়, তবে, রাতের অন্ধকার ঘন হওয়ার আগেই, সে কোনও লোকালয়ে পৌঁছে যেতে পারে। এই কথা ভেবে সে আবার ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে বসল। ঘোড়া ছোটাল। না, এবার আর এবড়ো-খেবড়ো পাথুরে-পথ নয় এটা। বনের এ-পথ দিয়ে খুব সহজেই ছোটানো যায় ঘোড়া। সুতরাং টগবগ-টগবগ ঘোড়া ছোটে।
বলতে-না বলতেই ওই দ্যাখো! ঘোড়া একটা জলা দেখতে পেল। এগিয়ে গেল ঘোড়া। একপেট জল খেল। ফরফর করে নাকে শব্দ করল। ভারী তৃপ্তির সেই শব্দ। এবারে সে জোরকদমে ছুটল। আসলে রূপচাঁদ তাকে ছোটাল। মানে, রাত গভীর হওয়ার আগেই তাকে পার হয়ে যেতে হবে এই বন।
মানুষ ভাবলেই যে তার সব কাজ মনের মতো হবে, এমন কোনও কথা নেই। ঠিক তেমনই হল রূপচাঁদের বেলাতেও। যে আশা নিয়ে সে বনে ঢুকেছিল, তা নিষ্ফল হয়ে গেল। পাথরের ওই বিপদসঙ্কুল পথের চেয়ে, বনের এই গা-ছমছম নিস্তব্ধতা কম রহস্যময় নয়! পাথরের বাধা পেরিয়েছে সে দিনে-দিনে। কিন্তু বনের এই রহস্যঘেরা ছমছমানি সে রাতের অন্ধকারে কেমন করে পেরোবে। পাথরের রাজ্য ছিল নির্জন। বনের রাজ্য ভয়ঙ্কর নিঝুম। কার সাধ্যি এই ভয়ঙ্কর নিঝুমকে অবহেলা করে ঘোড়া ছোটায়। শেষমেশ, অন্ধকারে তার পথই হারিয়ে গেল বনের গভীরে। আর কিছু করার নেই তার। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো অন্ধকারে। না, রূপচাঁদ আর এগোতে পারবে না। কেননা, কিছুই দেখা যায় না। তা হলে তার ঘোড়া কি আর এক পাও এগোবে না? তা হলে সে কি বোবা অসহায়ের মতো বসে থাকবে ঘোড়ার পিঠে? আচ্ছা, সে যদি ঘোড়াটাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে, নিজে গাছে উঠে বসে থাকে?
না, তাও করা যাবে না। সাঁঝ যত কমছে, বনের এ-কোণ সেকোণ থেকে কতরকমের শব্দ ভেসে আসছে খুসখাস। রূপচাঁদ জানে, দিনের আলোয় বনের ঝোপঝাড়ে ঘুমিয়ে থাকে যেসব হিংস্র প্রাণী, রাতের অন্ধকারে তারা জেগে ওঠে। সে বাঘও হতে পারে, সাপও হতে পারে। কিংবা অন্য আরও কোনও জীব। কাজেই সে গাছে থাকলেও সাপের ভয়, মাটিতে থাকলেও বাঘের ভয়। এমনকী, ঘোড়াও রেহাই পাবে না। তার চেয়ে বরং যতটা সে এগিয়ে এসেছে, ততটা পিছিয়ে যাওয়াই ভাল। আজ রাতটা সে পাথরের রাজ্যে আশ্রয় নিয়ে, কাল দিনে-দিনে বনের রাস্তা ধরবে। দিনে-দিনে বনে হাঁটলেও যে সাপখোপের ভয় থাকবে না, তেমন নয়। থাকলেও অন্তত বেঘোরে প্রাণ যাবে না। এখন যেমন বনের মধ্যে কিছুই ঠাওর করা যাচ্ছে না, তখন তো যাবে। অবশ্য বন যদি খুব ঘন হয়, যদি গাছের গায়ে গাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে অন্য কথা। দিনের বেলাতেও তখন সেখানে আঁধার। সে-আঁধারও বুকচমকানো। সুতরাং না, আর দরকার নেই এগিয়ে। ফিরে যাওয়াই ভাল।
এই কথা ভেবেই রূপচাদ ঘোড়ার মুখ ফেরাল। অবশ্য একটু আগে যত দ্রুত ঘোড়া পা ফেলে ছুটছিল, এবার তা পারল না। কারণ এখন ঘুরঘুট্টি অন্ধকার সারা বন ঢেকে ফেলেছে। ঠিক আছে, এখানে এমন বিপদ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে হেঁটে-হেঁটে এখান থেকে সরে পড়া ভাল। সুতরাং, রূপচাঁদের ঘোড়া ঠুকুস-ঠুকুস করেই হাঁটা দিল।

রূপচাঁদের উদ্দেশ্য কাজে এল না। বন থেকে বেরিয়ে কোথাও একটা জায়গা খুঁজে যে আশ্রয় নেবে, হল না তা-ও। সত্যি বলতে কী, এখন রূপচাঁদের খিদেও পেয়েছে খুব। সেই কখন বেরিয়েছে। তারপর থেকে এতক্ষণ এক ফোঁটা জল পর্যন্ত পেটে পড়েনি। তবু। যা হোক, ঘোড়াটার পেটে গাছের পাতা পড়েছে। জলায় মুখ ঠেকিয়ে জলও খেয়েছে অনেকটা। কিন্তু রূপচাঁদ? তার টানা উপোস। সঙ্গে তার সর্দারের দেওয়া অনেক টাকা। কিন্তু থাকলে কী হবে! খরচ করবে কোথায়? বনের ভেতরে কি মিষ্টি-মিঠাই-এর দোকান আছে! না কি দোকান আছে ভাত-ডালের! যখন কোনও খাবারই মিলবে না, তখন ওই টাকা থাকাও যা, না থাকাও তা। মানুষ তো আর টাকাগুলো কড়মড় করে কামড়ে খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে না।

অন্ধকারে খুব হুঁশিয়ারির সঙ্গে খানিকটা এগোল ঘোড়া। কোথাও তার পা পড়ে ঠুকঠুক, কোথাও বা খুটখাট। কিন্তু কোনদিকে যাচ্ছে ঘোড়া। কে জানে! গাছগাছালি আর ঝোপঝাড়ের জঙ্গলে চোখের দৃষ্টি থমকে-থমকে পথ খোঁজে। এ আর-এক বিপত্তি। কেন যে সাঁঝের বেলা বনে ঢোকার দুর্মতি হল রূপচাঁদের! তার একটি ছেলে আছে ঠিকই, কিন্তু তাই বলে রূপচাঁদ নিজে তো বুড়ো হয়ে যায়নি। এখন ঝলমল করছে তার যৌবন। কাজেই দুঃসাহস তাকে পেয়ে বসতেই পারে। ঠিক আছে, দুঃসাহস পেয়ে বসুক, তাতে ক্ষতি নেই! কিন্তু এ যে ভয়ঙ্কর দুঃসাহস! এ তো বোকার মতো বিপদকে ডেকে আনা। বনজঙ্গলের পথ যদি চেনা থাকে, সে এক কথা। কিন্তু চেনানা-থাকলে? এমন করে বনের মধ্যে অন্ধকারে কেউ পথ খোঁজে! ঘোড়া তো আর পথের হদিস দেওয়ার জন্যে তোমায় পিঠে নেয়নি! তুমিই তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। যে-পথে তুমি নিয়ে যাবে, সেই পথেই সে হাঁটবে। লাগাম তো তোমার হাতে।
ঘোড়া যতই এদিক-ওদিক করছে, রাত ততই বাড়ছে। রাত যতই বাড়ছে, বন ততই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। একটু যদি টুক করে শব্দ ওঠে ওদিকে, ছ্যাঁত করে ওঠে বুকের ভেতরটা। একটু যদি খুট করে ওঠে এদিকে, ভয়ে কাঁপ ধরে যায় সারা দেহে৷ এমন সময় ঝরঝর করে কেঁপে উঠল ঠিক সামনের ওই গাছের ডালপালা। কী যেন লাফিয়ে পড়ল, এ-ডাল থেকে ও-ডালে। চমকে তাকায় রূপচাঁদ। সঙ্গে-সঙ্গে ঘোড়ার পায়ের ফাঁক দিয়ে কী একটা চলে গেল। শুকনো পাতা খসখস করে উঠল। হবে হয়তী কেউটে, না হয় চন্দ্রবোড়া সাপ। কিছুই নজরে পড়ে না। অন্ধকার প্রকৃতির এক আশ্চর্য সৃষ্টি। তোমার চোখের দৃষ্টি যতই সজাগ রাখো, আঁধারে তা ঢাকা পড়বেই। অন্ধকারের এ নিয়ম কে অমান্য করবে শুনি?
দূর থেকে একটা শব্দ ভেসে আসছে, শুনতে পাচ্ছ কি? ওটা কি পেঁচার ডাক? হুতুম পেঁচা? না, লক্ষ্মী পেঁচা? এই রাতদুপুরে বোধ হয় ইঁদুর খুঁজে বেড়াচ্ছে? হবে হয়তো। ইঁদুর খুঁজুক আর যাই খুঁজুক, এই রাতের অন্ধকার ভেঙে-ভেঙে তার গলার শব্দটা যতই কানে আসছে, রূপচাঁদ ততই ঘোড়ার পেটে গোড়ালি ঠুকছে। ঠুকলে হবে কী! ঘোড়া যাবে কোথায়? তবু তো এখনও ফেউ কিংবা খ্যাঁকশেয়ালের গলার আওয়াজ কানে আসেনি। শেয়াল তবু ভাল, কিন্তু নেকড়ে! নিঃসাড়ে ডিঙি মেরে যদি গাঁক করে ঘোড়ার ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে! যদি রূপচাঁদের টুটিটা কামড়ে ধবে! না, এবার সত্যিই গায়ে কাঁটা দেয় রূপচাঁদের। বনের অন্ধকারে সে যে পথ গুলিয়ে ফেলেছে, এ আর এখন জানতে বাকি নেই তার। তা হলে এখন?
এখন এই অন্ধকারে বনের গভীরে আকুলি-বিকুলি করে পথ খোঁজা যে কী ভয়ানক কাজ, সেটা যে জানে সে-ই বলতে পারে। অন্ধকারে বনের ভেতর বিপদে পড়ে তাই বলে তো হাল ছেড়ে দেওয়া যায় না। তাকে যেমন করে হোক বাঁচতে হবে। অবশ্য এই বনের অন্ধকারে যদি তার মরার কথা আগেই ঠিক হয়ে থাকে, তবে কে তাকে রক্ষা করবে! ভুল করছ! আহা, আগেই মরার কথা তুলছ কেন? প্রাণ আছে যতক্ষণ, ততক্ষণ তো লড়াই চালাতেই হবে।
বলতে-বলতে এখটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে গেল। সেই অন্ধকারে ঘোড়ার পিঠে বসা রূপচাঁদের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে কার দুটো চোখ! ধক করে উঠল তার বুকের ভেতরটা। থিরথির করে কেঁপে উঠল সারা শরীর। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল তার ঘোড়া। চেয়ে রইল রূপচাঁদ সেইদিকে একদৃষ্টে।
আচ্ছা, সত্যিই কি ও দুটো চোখ? চোখদুটো কি কোনও হিংস্ৰজন্তুর? এবার সত্যিই কি রূপচাঁদের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে জ্বলজ্বলে-চোখ জন্তুটা তার মুণ্ডপাত করবে? হায়! এখন এমনই অবস্থা রূপচাঁদের, পকেটে একটা মরচে-পড়া ছুরিও নেই যে, বাঁচার জন্যে শেষ চেষ্টা করবে।
আচমকা ডেকে উঠল সেটা, ম্যাও।
এ কী! তবে কি এটা সেই কালো বেড়ালটা! এই বেড়ালটার জন্যেই কি সেই দস্যুসর্দারের গহ্বরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছল রূপচাঁদ! এর জন্যেই কি দেখা পেয়েছিল দস্যুসর্দারের! এবার বুঝি সে অন্য কারও সন্ধান দেবে!
বলতে-না-বলতেই লাফ মারল বেড়ালটা। ডাক ছাড়ল। তার পরই লাফিয়ে-লাফিয়ে ছুটল। রূপচাঁদও ঘোড়া ছোটাল তার পেছনে। অন্ধকারে দেখা যায় না ভাল। কিন্তু আশ্চর্য, বেড়াল থেকে-থেকেই দাঁড়ায়, মুখ ফিরিয়ে তার চোখের আলো দেখায়। রূপচাঁদ সেই চোখের আলো দেখে তাকে অনুসরণ করে। রূপচাঁদের আশা হল, এবার নিশ্চয়ই সে বন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পাবে। সুতরাং এখন ভয়ে ভার মনটা অনেক যেন হালকা হয়ে গেল। বেড়ালের ছোটার পথ দেখে, নিজের ঘোড়ার পথ খুঁজে পেল। ভারী আহ্লাদ হল তার মনে। কিন্তু তারপরেই ফক্কা!
কী হল?
এইখানে, এই বনের অন্ধকারে এসেই তার সব গোলমাল হয়ে গেল।
কেন?
বেড়ালটা গেল কোথায়? কোথায় লুকিয়ে পড়ল? আর তো দেখা যায় না তার জ্বলজ্বলে সেই দুটো চোখ। শোনা যায় না শুকনো ঝরাপাতার ওপর তার লাফিয়ে ছোটার শব্দ!
রূপচাঁদের ধন্ধ লেগে গেল। সে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক ফ্যালফ্যাল করে দেখতে লাগল।
দেখতে-দেখতে থতমত খেয়ে যায় রূপচাঁদ। হঠাৎ যেন তার চোখে ঠেকল, বনের আড়াল থেকে অস্পষ্ট একটা আলোর টুকরো উঁকি মারছে। উত্তেজনায় অস্থির হয়ে সে ওই আলোর দিকেই ছুটে গেল। খানিক গিয়ে আলোর সামনেই সে থমকে দাঁড়াল। অবাক চোখে দেখতে পায়, এককোণে একটা ভাঙা বাড়ি। কত বড় বাড়িটা, অন্ধকারে হদিস করা যায় না। তার একটা জানলার ফাঁক দিয়ে আলোর ঝলক ঠিকরে বেরোচ্ছে। ঘোড়ার লাগাম ধরে আস্তে-আস্তে ওই আলোর দিকেই এগিয়ে গেল রূপচাঁদ। চারদিক নিস্তব্ধ, নিঝুম। উত্তেজনায় তার শ্বাস পড়ছে ঘন-ঘন। সে শ্বাসের শব্দ অনেক কষ্টে চেপে উঁকি মারতে লাগল, এদিক-ওদিক, চারপাশ। কারও কোনও সাড়া তার কানে এল না। তবে কি বাড়ির ভেতরে কেউ নেই! কেউ যদি না থাকে, আলো জ্বলে কেন? কে জ্বালায়? আশ্চর্য! বনের এই ভয়ঙ্কর অন্ধকার নির্জনে ভাঙা বাড়িতে কে থাকে তবে? আরও অবাক কথা, কোথা থেকে হঠাৎ করে ছুটে আসে ওই কালো বেড়াল! কেন আসে? কেনই বা আবার চোখের পলকে হারিয়ে যায়? কোথা থেকে আসে সে? কোথায় যায়ই বা! সেই যখন রূপচাঁদ পাথরের গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে আঁকপাক করছিল, বেড়ালটা তখন যেন আচম্বিতে শূন্য আকাশ থেকে চোখের সামনে উদয় হল। এবারও সেই একই কথা। এ তো ভারী আজব কাণ্ড!
রূপচাঁদ ভাবছে, অনেকক্ষণ ধরেই ভাবছে। ভাবছে কী করা উচিত। তবে কি সে ভাঙা বাড়ির অন্দরে ঢুকবে! ঢোকার পথই বা কোনদিকে?
ওই তো, সামনেই একটা হেলে-পড়া ফটক দেখা যাচ্ছে। ফটকের হেলে-পড়া ফাঁক দিয়ে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, খানিকটা ফাঁকা জমি ভেতরে পড়ে আছে। হয়তো এই জমিতে এককালে ফুলের বাগান ছিল। কিন্তু এখন যতটুকু দেখা যায়, মনে হচ্ছে, সবটাই ঝোপঝাড়ের জঙ্গল। তাও খুব আবছা দেখা যাচ্ছে।
হ্যাঁ, হেলে-পড়া ফটকে ঠেলা মারতেই বিচ্ছিরি একটা শব্দ উঠল, ক্যাঁচ-চ-চ! সঙ্গে-সঙ্গে খুলে গেল। খুলেই হেলে দাঁড়িয়ে পড়ল। রূপচাঁদ ঢুকব কি ঢুকব না করতে-করতে ঢুকেই পড়ল। ফটকের ভেতর দিয়ে ঘোড়াটাও ঢুকে গেল অক্লেশে। বা রে! ফটকের ভেতরে এই জায়গাটাতেই তো ঘোড়াটা থাকতে পারে। কোনও অসুবিধে হবে বলে তো মনে হয় না। দড়িদড়া থাকলে ঘোড়াটাকে বেঁধে রাখা যেত। তার দরকার নেই। এমনিই থাকতে পারবে। ঘোড়ারও তো ভয় আছে। অন্ধকারে যাবেই বা কোথা? আসলে প্রাণ আছে যার, প্রাণের ভয়ও আছে তার। কাজেই জায়গাটা গা-ছমছমে হলেও, বনের অন্ধকারের মতো ভয়জাগানো নয়।
এ-ধার ও-ধার করতে করতে রূপচাঁদ ভাঙা বাড়ির ভেতরে ঢোকার সদর দরজাটা খুঁজে পেল। হাত দিয়ে ঠেলতেই দরজাটা খুলেও গেল। অবশ্য জানান না দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই সে খানিক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল নিঃশব্দে। মনে-মনে ভাবল, আগে ডাক দিয়েই দেখা যাক। তাই প্রথমটা খুবই হালকা গলায় ডাক দিল, “বাড়িতে কে আছেন?”
কোনও সাড়া মিলল না।
আবার ডাকল। এবার একটু জোরে, “বাড়িতে কে আছেন?”
তবুও কোনও সাড়া নেই।
শেষমেশ সে হাঁক পাড়ল, “বাড়িতে কেউ আছেন কি?”
এবার প্রতিধ্বনি তুলে তার সেই হাঁক বাড়ির আনাচে-কানাচে ঘুরপাক খেতে লাগল। কিন্তু কোনও সাড়া মিলল না।
তবে কি ভাঙা বাড়িতে কেউ নেই? বাড়ি শূন্য? তা হলে কে জ্বালল আলো?
এবার আর সে ডাকাডাকি করল না। আদতে তার গলা আর ডাকতে চাইছে না। বলতে কী, সারাদিন উপোসী থাকলে যা হয়। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে রূপচাঁদের। ঠিক আছে, একটি দিন উপোস করে না-হয় থাকা গেল, কিন্তু বিশ্রাম না-করলে যে শরীর আর বইবে না। শুতে না পাক, নিশ্চিন্তে বসারও যদি একটু সুযোগ পাওয়া যায়! সারাটা দিন ঘোড়ার পিঠে বসে-বসে আর পারা যায় না! শরীরে ব্যথা ধরে গেছে। যারা হরবকত ঘোড়ায় চড়ে, তাদের কথা আলাদা। যখন ইচ্ছে চড়ো, যখন ইচ্ছে নামো। অভ্যস্ত তারা।
ঠিক আছে, ঘোড়ার পিঠে বসে বিশ্রাম নেওয়ার কথা না-হয় ছেড়ে দিলুম। তুমি যে অন্ধকার ঘুরঘুট্টি রাতে গাছের তলায় শুয়েবসে জিরিয়ে নেবে, তাতেও বিপদ হাজারটা। কাজেই এই বাড়িটা ভাঙা হলেও নিশ্চিন্তে খানিকটা দম তো নেওয়া যাবে। অন্তত কাল সকাল পর্যন্ত থাকতে পারলেই হল। সকাল হোক, তারপর বনের রাস্তা খোঁজ করলেই হবে।
এই কথা ভাবতে-ভাবতে বাড়ির ওই হেলে-পড়া গেটটা সে আবার টেনে ভেজিয়ে দিল। আবার বিচ্ছিরি শব্দটা কানে বাজল। থাক এমনই, ভেজানো থাক। অন্তত ঘোড়াটা তো এখন নিরাপদে থাকতে পারবে। আর ঘোড়াটাকে কেউ খাওয়ার জন্যে তাক করতে পারবে না। ঘোড়াটারও বেরিয়ে যাওয়ার ভয় থাকল না।
না, আর ডাকাডাকি না-করে সদর দরজা ডিঙিয়ে রূপচাঁদ বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। সুড়সুড় করে। আসলে বাড়ির ভেতরটাও অন্ধকারে ডুবে আছে। যে-ঘরটায় আলো জ্বলছে, সে-ঘরটাই বা কোনদিকে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। রূপচাঁদ অবশ্য অন্ধকার হাঁটকাতে-হাঁটকাতে সেই ঘরটারই সন্ধান করতে লাগল। ফের কাকে বলে! কাজ যা-ও বা একটা জুটল, তা সে-কাজ শুরু করার আগেই অবস্থা যদি এই দাঁড়ায়, তবে শেষ হবে কী করে? অন্ধকারে ঢুঁড়তে-ঢুঁড়তে বাড়ির ভেতরে রূপচাঁদ দু-একবার হোঁচট খেল। তা খাক। খেতে-খেতে কাজের কাজ করে ফেলেছে রূপচাঁদ! আলোর নিশানটা সে খুঁজে পেয়েছে। যে-ঘরটায় আলো জ্বলছে, সেই ঘরটার সামনেই এসে দাঁড়াল সে। উঁকি মারল খুব ভয়ে-ভয়ে। যাচ্চলে। ঘরের ভেতরে তো কেউ নেই! এ আবার কী আজগুবি কাণ্ড! দ্যাখো, ঘরের ভেতরে একটা বিছানাও পাতা আছে। তা হলে সে এবার কী করবে? যে-ঘরে কেউ নেই সে-ঘরে ঢোকাটা কি ঠিক হবে? ভাবতে-ভাবতে ঘরের ভেতর ঢুকেই পড়ল রূপচাঁদ। আর সে দাঁড়াতে পারছে না। অমন একটা পরিপাটি করে পাতা বিছানা দেখলে কে-ই বা দাঁড়াতে পারে! আর কোনও কিছু না-ভেবে, বসেই পড়ল সে বিছানার ওপর। আঃ! ভারী আরাম! ইচ্ছে করলে সে এখনই শুয়ে পড়তে পারে! না, সে বসেই রইল। দরজাটার দিকে নজর রেখে সে সময় গুনতে লাগল।
কিন্তু কতক্ষণই বা একটা ক্লান্ত মানুষ এইভাবে বসে থাকতে পারে! চুপচাপ! পারল না। নিজের অজান্তেই শুয়ে পড়ল, ওই পরিষ্কার ঝকঝকে বিছানার ওপর। শুয়েই বা থাকবে কতক্ষণ! চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল তার। ঘুমে অচেতন হয়ে সে পড়ে রইল, সেই রহস্য-ঘেরা ভাঙা বাড়ির একটা ভাঙা ঘরে। অকাতরে ঘুমোল সে, যতক্ষণ না-সকাল হয় সেই ততক্ষণ।

হঠাৎই তার ঘুম ভেঙে গেছল। চোখ চেয়েই সে ধড়ফড় করে উঠে পড়ল। হ্যাঁ, সত্যি সকাল হয়ে গেছে। সে উঠে তড়বড় করে দাঁড়াতে গেল, পারল না। মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। বসে পড়ল। বসতে না বসতেই ঘরের অন্যদিকে চোখ পড়ে গেল তার। সামনে দাঁড়িয়ে তিনটি মেয়ে। ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল রূপচাঁদ। অবাক হয়ে চেয়ে রইল তাদের দিকে।
তাদের একজন জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে?”
রূপচাঁদ আমতা-আমতা করে তার নাম বলল।
“আমাদের এই গোপন আস্তানার তুমি খোঁজ পেলে কেমন করে?”
“রাতের অন্ধকারে আমি বনের পথ হারিয়ে ফেলেছিলুম।” উত্তর দিল রূপচাঁদ।
“তুমি মিথ্যে কথা বলছ!” অন্য আর একটি মেয়ে নরম গলায় বলল।
আর-একজন বলল, “তোমাকে যেতে হবে আমাদের সঙ্গে!”
“কোথায়?” ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করল রূপচাঁদ।
“যেখানে তোমার জন্যে মৃত্যু অপেক্ষা করছে।” উত্তর এল তিনটি মেয়ের মুখ থেকে একসঙ্গে।
“আমি তো কোনও অন্যায় করিনি!” রূপচাঁদের গলা কেঁপে উঠল।
“এর চেয়ে বড় অন্যায় আর কী করতে পারো তুমি? চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।” তাদেরই মধ্যে আর-একজন বলল।
ভীষণ ভয় পেয়ে গেল রূপচাঁদ। এবার কাকুতি-মিনতি করে সে বলল, “বিশ্বাস করো, আমি অন্ধকার বনে পথ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলুম। হঠাৎ আলোর আভা দেখে আমি এখানে এসেছি। আমার কোনও দোষ নেই। আমি বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে অনেক ডাকাডাকি করেও কারও সাড়া পাইনি। সাড়া না পেয়েই আমি বাড়ির ভেতরে এসেছি।”
“তুমি নিজেকে চালাক ভাবছ খুব। কিন্তু তোমার ওই কালো ঘোড়াই তোমার পরিচয়। তুমি দস্যু। তুমি ভাবছ, কালো ঘোড়ার সওয়ার হয়ে কারা দস্যুগিরি করে তা আমরা জানি না?”
“না-আ-আ।” ক্লান্ত স্বরে প্রায় চিৎকার করেই উঠেছিল রূপচাঁদ।
“না, কি হ্যাঁ, সেটা তুমি মরলেই প্রমাণ হয়ে যাবে। বেশি কথা বলার দরকার নেই। যা বলছি, তাই করো। চলো আমাদের সঙ্গে।” বলে শাসিয়ে উঠল একটি মেয়ে।
অগত্যা রূপচাঁদকে যেতেই হল।
আবার সে দাঁড়াতেই তার মাথা টলমল করতে লাগল। কিন্তু কী আর করা যাবে! যারা তার কালো ঘোড়া দেখে তাকেও দস্যু ভেবেছে, তাদের সে কেমন করে বোঝাবে, ঘোড়াটা দস্যুর হতে পারে, কিন্তু সে নিজে দস্যু নয়। বললেও বিশ্বাস করবে কেন! অবশ্য বলা যেতে পারে, ঘোড়াটা কালো হলেও দস্যুর ঘোড়া নয়। বাজারে তো হাজার-হাজার কালো ঘোড়া বিকোয়। তা হলে, কালো ঘোড়া মানেই কি দস্যুর ঘোড়া? এ তো আচ্ছা বাহানা!
রূপচাঁদের পা চলতে চাইছে না। তবু তাকে চলতে হল। এই ঘর পেরিয়ে সে অনেক সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠল। তবে কি এই ভাঙা বাড়িটা অনেক বড়? সেই সিঁড়ির মুখ ছুঁয়ে একটা মস্ত দরদালান। এতবড় দালান দেখার ভাগ্য রূপচাঁদের এর আগে আর কখনও হয়নি। সেই দালানের একপাশ দিয়ে বাঁক খেতেই দেখা গেল আর-একটা দালান। সেই দালানেই ঢুকে পড়ল সেই তিন মেয়ে। তাদের সঙ্গে রূপচাঁদও ঢুকল। ঢুকতেই রূপচাঁদের চোখে সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। আরও অনেকটা গেল তারা। আবার একটা বাঁক। সেই বাঁকটা ধরতেই সামনে একটা মস্ত ঘর। সেই ঘরে ঢুকল মেয়ে তিনটি। তাদের পেছনে-পেছনে ঢুকল রূপচাঁদও। এই গোলমেলে ঘরে পৌঁছতে তাকে অনেকটা সিঁড়ি ভাঙতে হয়েছে। অনেকটা হাঁটতে হয়েছে। হাঁপিয়ে গেছে বেচারা। পারল না রূপচাঁদ আর দাঁড়াতে। সে বসে পড়ল মেঝের ওপরই দলা পাকিয়ে। মুখ তুলল সে সামনে। সামনে চোখ পড়তেই সে হকচকিয়ে গেল। কে তার সামনে বসে? কে তিনি?—এক রূপসী নারী! কোথা থেকে এলেন তিনি এখানে?
আশ্চর্য এক সুরেলা গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমায় দেখে মনে হচ্ছে, অনেকক্ষণ তোমার কিছু খাওয়া হয়নি।”
তাঁর কথার কোনও উত্তর দিতে পারল না রূপচাঁদ। অবাক চোখে তাঁর দিকে চেয়েই রইল।
“তোমার ঘোড়াটাকে অবশ্য খাওয়ানো হয়েছে। তাকে নিয়ে তোমার ভাবনার কিছু নেই। তোমাকে নিয়েই আমাদের ভাবনা। তোমার মৃত্যুর আর দেরি নেই। ইচ্ছে করলে তুমি কিছু খেয়েও মরতে পারো, না খেয়েও মরতে পারো। তুমি কোনটা চাও?” তেমনই সোনা-ঝরা কণ্ঠে সেই রূপসী জিজ্ঞেস করলেন।
অনেকটা সামলালেও কষ্টটা রূপচাঁদের এখনও সহজ হয়নি। তার ওপর ওই রূপসী নারীর মুখে তার মৃত্যুর ওই ভয়ঙ্কর কথা শুনে সে ভয়ে কুঁকড়ে গেল। তার মুখ দিয়ে কথা যেন বেরোতে চায় না। ভয়ে খুবই কাতর হয়ে কাঁপা-কাঁপা গলায় রূপচাঁদ বলল, “আজ্ঞে, আমি তো কোনও দোষ করিনি। আমাকে মারবেন কেন?”
রূপসী খুবই ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দিলেন, “তোমার ঘোড়া দেখে আমি তোমাকে চিনেছি। আমি বুঝতে পেরেছি, তোমরা এখনও আমার পিছু ছাড়োনি। তোমাদের যে সর্দার তাকে আমি চিনি। সে-ও আমাকে চেনে। তোমরা আমার সর্বস্ব লুঠ করেছ। এমনকী, আমার ছেলেকে পর্যন্ত। সেইসঙ্গে তার বাবাকে হত্যা করেছ। বুঝতে পারছি তাতেও তোমাদের সাধ মেটেনি। এখন তোমরা নিশ্চয়ই আমাদের সবাইকে হত্যা করতে চাও। কিংবা আমাদের যা শেষ সম্বল আছে, তা-ও কেড়ে নিতে চাও। সে সুযোগ তোমাদের আর আমি দেব না। সুতরাং আশা কোরো না, তোমাকে আমি ছেড়ে দেব। জেনে রাখো, এখানে আমি ভয়ে লুকিয়ে নেই। আছি প্রতিশোধ নেব বলে। প্রতিশোধ নিয়ে আমার ছেলেকে তার হাত থেকে উদ্ধার করার জন্যে আমি তৈরি হচ্ছি। আমি জানি, তোমরা কোথায় তোমাদের সর্দারের গোপন আস্তানা গেড়েছ! সুতরাং তুমি যে তার হয়ে গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছ, এ আমার জানা। কিন্তু এ-কটা কথা আমার মাথায় ঢুকছে না। আমি যে এখানে আছি, একথাটা তোমরা জানলে কেমন করে! আমি অবশ্য নৃশংসভাবে রক্ত ঝরিয়ে তোমাকে মারব না। মনে রেখো, এই ভাঙা বাড়ি তুমি এখন যতটা বড় ভাবছ, এ-বাড়ি তার চেয়ে অনেক বড়। তোমাকে এর গোলকধাঁধায় ছেড়ে দেব আমি। তুমি সেই গোলকধাঁধায় মাথা কুটে মরে গেলেও পথ খুঁজে পাবে না। ঘুরপাকই খাবে শুধু। খেতে-খেতে তুমি পৃথিবীর মায়া কাটাবে। আর এই যে সুন্দরী মেয়ে তিনটিকে দেখছ, এরা আমারই সন্তান। আমি আমার মেয়েদেরও মনে প্রতিহিংসার বীজ পুঁতে দিয়েছি। ওদের বলেছি, যে ওদের বাবাকে মেরেছে, ভাইকে হরণ করেছে, তাকে খতম করতে হবে। ওরাও সেইভাবে দস্যুর মোকাবিলায় নিজেদের তৈরি করেছে। মনে কোরো না, তুমি কাল রাত্রে যে হাঁকডাক করছিলে আমরা শুনতে পাইনি। তোমার ঘোড়ার পায়ের শব্দ অনেকক্ষণ ধরেই আমাদের কানে আসছিল। আমরা তোমার গতিবিধি লুকিয়ে-লুকিয়ে লক্ষ রাখছিলুম। আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলুম, তুমি একটা কালো ঘোড়ার সওয়ারি। কেননা, অন্ধকারে যত কাছ থেকে আমরা ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলুম, তত কাছ থেকে ঘোড়াটাকে নজর করতে পারছিলুম না। কারণ, তার গায়ের কালো রং অন্ধকারে মিশে আছে। অবশ্য ঘোড়ার পিঠে-বসা তোমাকে আমরা দেখতে পাচ্ছিলুম। দেখতে পাচ্ছিলুম তোমার ওই গায়ের সাদা ডোরাকাটা জামার জন্যে। তখন আমরা ভেবেছিলুম, তোমরা হয়তো দলে অনেকজন আছ। ভেবেছিলুম, তোমরা হয়তো আমার এখানে থাকার খবর পেয়ে আক্রমণ করতে আসছ! কিন্তু অনেকক্ষণ লক্ষ করেও আমরা আর কাউকে দেখতে পেলুম না। তখনই আমরা তোমার চোখে ফেলার জন্যে ঘরে আলো জ্বেলে রাখি। আমাদের উদ্দেশ্য সফল হল। তুমি এই আলোর দিকেই এলে। তুমি ঘরেও ঢুকলে। ঘুমিয়েও পড়লে। ইচ্ছে করলে কালই তোমাকে আমি নাজেহাল করতে পারতুম। তবে, সেটা করলে, আমার কাজটা ভুল হয়ে যেত। কেননা, তখনই তোমাকে মেরে ফেললে, তোমার কাছে আমার ছেলের খবর জানা হত না। জানা হত না, সে কেমন আছে। জানতে পারতুম না, বন্দিঘরে বন্ধ হয়ে সে কেঁদেকেটে দিন কাটাচ্ছে কি না। এই খবরগুলোই আমি আগে তোমার কাছে পেতে চাই। অবশ্য, খালি পেটে এত কথার উত্তর দিতে তোমার যে খুবই কষ্ট হবে, সে আমি জানি। কাজেই কিছু খেয়ে নিতে তুমি আপত্তি করবে না নিশ্চয়ই। অবশ্য একটা কথা শুনে রাখো, তুমি সব কথার ঠিক-ঠিক উত্তর দিলে, আমি তোমাকে ক্ষমাও করতে পারি। তবে, সেটা তুমিই স্থির করবে, বাঁচবে, না মরবে!”
নিথর হয়ে গেল রূপচাঁদ, সেই সুন্দরী তিন কন্যার মায়ের মুখের কথা শুনে। কেমন যেন তার সব গোলমাল হয়ে গেল। হ্যাঁ, এ-কথাটা তো ঠিকই, যে-দস্যুদলের আস্তানায় সে কালো বেড়ালটাকে ধাওয়া করতে গিয়ে আচমকা গিয়ে পড়ে। সেই দস্যুদলের সব ঘোড়াই কালো। তবে সত্যিই কি ওই দস্যুদল এই রূপসী মায়ের ছেলেকে হরণ করেছে! তার সর্বস্ব লুঠ করে তার স্বামীকে হত্যা করেছে! তবে কি যে-ছেলের ছবি তার বুকের ভেতর লুকনো আছে, সে-ছেলে দস্যুসর্দারের নয়! সেই ছেলে এই রূপসী মায়ের! দস্যুসর্দার কি তবে মিথ্যে-মিথ্যে বলেছে, সে দস্যুগিরি করে বলে ছেলে ঘৃণায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে! নিথর হয়ে ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ তার মনে হল, তার বুকের ভেতর লুকনো সেই ছেলের ছবিটা বার করে দেখাবে নাকি এই রূপসী মাকে! জিজ্ঞেস করবে নাকি এই ছেলে তার কি না!
“কী ভাবছ?” আচমকা জিজ্ঞেস করলেন সেই রূপসী মা।
রূপচাঁদ থতমত খেয়ে গেছে। আমতা-আমতা করে বলল, “না, অন্য কিছু নয়। আপনার ছেলের কথা শুনতে-শুনতে, আমার ছেলের কথা মনে পড়ে গেল।”
“কীরকম?”
“না, ভাবছি, এমন অঘটন আমার ছেলের বেলাতেও যদি ঘটে যায়!” উত্তর দিল রূপচাঁদ।
রূপসী বললেন, “দস্যুর ছেলের গায়ে কে হাত দিতে সাহস পায়?”
এবার রূপচাঁদের মন আকুল হয়ে ভেঙে পড়ল। সে উদ্বেগভরা গলায় বলে উঠল, “বিশ্বাস করুন, আমি দস্যু নই। এ-কথা সত্যি, আমি যে-ঘোড়ায় চড়ে এখানে এসে পড়েছি, সে-ঘোড়া এক দস্যুদলের। আপনি বিশ্বাস করুন, আমার ছেলেকে অনেক লেখাপড়া শেখাব বলে আমি কাজের খোঁজে বেরিয়েছিলুম। বিশ্বাস করুন, আমি শহরে যাব বলে নদীর পথে জাহাজে পাড়ি দিই। কিন্তু জাহাজ ডুবে যায়। নদীর স্রোতের সঙ্গে লড়াই করতে-করতে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। ভেসে-ভেসে পৌঁছে যাই কোন এক অজানা জায়গায়। কোনওরকমে বেঁচে উঠি আমি। তারপর আমি দস্যুর পাল্লায় পড়ি।” বলতে-বলতে মুহূর্ত থামল রূপচাঁদ। তার জামার ভেতর হাত গলিয়ে বুকের নীচ থেকে ছবিটা বার করতে করতে জিজ্ঞেস করল, “আপনার ছেলের নাম কি সজল?”
চমকে উঠলেন সেই রূপসী মা। উত্তেজনায় মুখ ফুটে বেরিয়ে এল, “হ্যাঁ!”
“দেখুন তো এ ছবিটা তার কি না!”
তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই তো আমার সজল!” বলতে-বলতে সেই রূপসী মা রূপচাঁদের হাত থেকে ছবিটা ছিনিয়ে নিয়ে হাউ-হাউ করে কেঁদে ফেললেন। তাঁর মেয়েরাও হুমড়ি খেয়ে দেখতে লাগল মায়ের হাতের সেই ছবি। তাদের চোখেও জল টসটস করে উঠল। মায়ের হাত থেকে ছবি নিয়ে, নিজেরাও দেখতে লাগল কাড়াকড়ি করে।
রূপচাঁদ সেই দৃশ্য দেখে থ। মনে-মনে ভাবতে লাগল, এ তো ভারী আশ্চর্য কাণ্ড!
সেই রূপসী মা উৎকণ্ঠায় অস্থির হয়ে রূপচাঁদকে জিজ্ঞেস করলেন, “এ-ছবি তুমি পেলে কোথায়?”
“দস্যুসর্দারের কাছ থেকে।” উত্তর দিল রূপচাঁদ।
“তুমি তা হলে নিশ্চয়ই জানো, আমার ছেলে এখন কোথায় আছে?”
“না, বিশ্বাস করুন, আমি জানি না। এই ছবিটি হাতে দিয়ে দস্যুসর্দার বলেছে, এ-ছবি তার ছেলের। তার এই ছেলেকে খুঁজে বার করার কাজ দিয়েছে সে আমায়। আমার ছেলের লেখাপড়ার খরচের জন্যে সে মাসে-মাসে টাকা পাঠাবে। তার ছেলেকে আমি যদি খুঁজে দিতে পারি, তবে সে আরও টাকা দেবে। আমি জানি না, এতবড় দেশে আমি তাকে কোথায় খুঁজে পাব। সে শহরে আছে, না শহরতলিতে, তা-ও আমার জানা নেই। তার খোঁজে অজানা পথে ঘুরতে হবে বলেই সে আমায় ঘোড়াটা দিয়েছে। আপনি যদি বিশ্বাস করেন, তবে, আমি বলি, আমি একবিন্দুও মিথ্যে বলছি না। এখন আপনার কথা শুনে আমার কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, দরকার নেই আমার ছেলের অনেক লেখাপড়া শিখে। চাষির ছেলে, চাষি হয়েই থাকা ভাল। দরকার নেই আমার অনেক টাকার।”
সেই রূপসী মা হঠাৎ কেমন যেন থমকে থিতিয়ে গেলেন। রূপচাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেন খানিক ভাবলেন তিনি। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কথা বিশ্বাস করে তোমার প্রাণ যদি আমি না নিই, তবে প্রাণের বদলে তুমি আমাকে কী দেবে?”

“আজ্ঞে, আমি আর আপনাকে কী দিতে পারি! আমি তো গরিব চাষি৷”
“না,” তিনি বললেন, “তুমি আর গরিব থাকবে না। তোমার টাকার ব্যবস্থা, আমি করে দেব। তুমি অনেক টাকার মালিক হবে। তোমার ছেলেকে তুমি অনেক লেখাপড়া শেখাতে পারবে। সে অনেক বড় হবে। কিন্তু তার বদলে আমাকে একটি কাজ করে দিতে হবে।”
“আজ্ঞে, কী কাজ?”
“তুমি যাকে খুঁজতে বেরিয়েছ, আমার সেই ছেলে সজলকে তুমি যদি খুঁজে পাও, তবে তাকে আমার কাছে নিয়ে আসতে হবে। আমি তার মা। দস্যুসর্দার তার কেউ নয়। সে তোমাকে মিথ্যে বলেছে। তাকে তুমি কিছুতেই দস্যুসর্দারের কাছে নিয়ে যেতে পারবে না। এই আমার শর্ত।”
“কিন্তু আমি যদি তাকে খুঁজে না-পাই?” সভয়ে জিজ্ঞেস করল রূপচাঁদ।
তিনি বললেন, “যদি না পাও, তবে সে-খবরটাও আমায় জানিয়ে যাবে তুমি।”
“আমি যদি না আসি?”
তিনি উত্তর দিলেন, “আমি জানি, গরিব মানুষ যদি কথা দেয়, তবে কথা রাখতে সে কখনও ভুল করে না। তুমি যদি না আসো তবে আমি মনে করব, তুমি এক পুত্রহারা মাকে কথা দিয়ে ঠকিয়েছ।”
কী করবে, কিছুই বুঝতে পারে না রূপচাঁদ। কেমন যেন দোটানায় পড়ে যায় সে। আসলে, সে তো দস্যুসর্দারকেও কথা দিয়েছে। সেই দস্যুসর্দার মাসে-মাসে তার ছেলের জন্যে টাকা পাঠাবে। তার কাছে রূপচাঁদের বাড়ির ঠিকানাও আছে। রূপচাঁদ যদি তাকে ফাঁকি দেয়, তবে দস্যুসর্দারের হাতে নির্ঘাত ধরা পড়ে যাবে। আবার এই রূপসী মাকেও যদি সে তার প্রাণের বদলে কথা দেয়, আর, কথা দিয়ে যদি কথা না রাখে, তবে সে বিশ্বাসঘাতক হয়ে যায়! কাজেই কী করবে রূপচাঁদ!
অনেক ভেবে সে ঠিক করল, সে এই রূপসী মাকে কথা দেবে। এই রূপসী মাকে কথা না-দিলে এখনই তার মৃত্যু নিশ্চিত। না, না, সে মরতে চায় না। তার ছেলে আছে, বউ আছে। রূপচাঁদের প্রাণ গেলে, তারা যে অথই জলে ভেসে যাবে! তাকে বেঁচে থাকতে হবে এখনও অনেকদিন। বেঁচে থাকতে হবে ছেলের জন্যে। বউয়ের জন্যে। সুতরাং সেই সজল যারই ছেলে হোক, তাকে খুঁজে বার করতে পারলে, রূপচাঁদ তো তার কাছেই জানতে পারবে, সে কার ছেলে! সে যদি বলে দস্যুরই সে ছেলে, তবে, তাকে পৌঁছে দেবে দস্যুর কাছে। কিংবা সে যদি বলে, এই রূপসী নারীই তার মা, তবে তাকে পৌঁছে দেবে তার এই মায়ের কাছে। সুতরাং সে কথা দিয়ে ফেলল এই রূপসী নারীকেই। সে সজলকে খোঁজার জন্যে পথ হাঁটবে।
সেই রূপসী-মা আর তার তিন মেয়ে রূপচাঁদের আশ্বাস পেয়ে আনন্দে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। তারপর মায়ের কথামতো তার তিন মেয়ে রূপচাঁদকে কত যত্ন-আত্তি করল। কত মুখরোচক খাবার রান্না করে তাকে খাওয়াল। দস্যুর দেওয়া পোশাক ফেলে দিয়ে তাদের দেওয়া পোশাক পরতে বলল। এ পোশাক পরেই তো মানুষ ঘোড়ায় চড়ে পথে-পথে হাঁটে।
কেন তার এ-পোশাক?
রূপসী সেই মা রূপচাঁদকে বললেন, “বাঃ! ভারী সুন্দর মানিয়েছে তোমাকে এই পোশাক পরে। শোনো রূপচাঁদ, কালো ঘোড়ার সওয়ার হয়ে তুমি যে-পোশাক পরে এখানে এসেছিলে, সে-পোশাক পরে লুকিয়ে দস্যুগিরি করা যায়। মানুষের সামনে ঘোরাফেরা করা যায় না। তোমার ওপর সন্দেহে মানুষের চোখ তখন উঁকি মারবে। চাই কী, তোমাকে আঘাত করতেও তখন তারা পিছপা হবে না। কাজেই, আমি যে পোশাক দিলুম, এই পোশাক পরেই তুমি পায়ে-পায়ে পথ হেঁটো। কেউ তোমাকে সন্দেহ করবে না। তোমার কালো ঘোড়া আমার কাছেই থাকবে। ঘোড়ার দেখাশোনার কোনও অসুবিধে হবে না। ফিরে এলে তোমার ঘোড়া তুমিই ফিরে পাবে। আর শোনো, আমার মেয়েরা তোমার সঙ্গে খানিক গিয়ে তোমাকে বন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেবে। খানিক গিয়ে এরা তোমাকে দেখিয়ে দেবে একটি নদী। সেই নদী যেদিকে বয়ে যাচ্ছে, সেইদিকে হাঁটতে-হাঁটতে তুমি এগিয়ে যেয়ো। বেশ খানিকটা গেলে তুমি শহরতলি পাবে। শহরতলি পেরোলেই শহরে পড়বে তুমি। সেখান থেকেই শুরু করতে হবে তোমায়। সুতরাং এগিয়ে যাও!”
রূপচাঁদের সঙ্গে এক পোঁটলা খাবার দিতে ভুল করল না রূপসীর তিন মেয়ে। খাবারের পোঁটলা পিঠে ঝুলিয়ে, তিন মেয়ের সঙ্গে নদীর ধারে চলল রূপচাঁদ। কালো ঘোড়া রয়ে গেল ভাঙা বাড়ির মস্ত উঠোনে।
খানিকটা যেতেই রূপচাঁদের কানে এল জলের ছলাতকারের শব্দ। আরও খানিকটা হাঁটতেই নদীর জল চোখে পড়ল। মনে হল, যেন কোনও পাহাড়ের ওপর থেকে লাফিয়ে, নদী এই বনের পথ ধরেই ছুটে চলেছে। সে-পাহাড় এখান থেকে কতদূরে, কোথায়, জানে না রূপচাঁদ। এই নদী দেখে একটু থমকে দাঁড়াল রূপচাঁদ। মনে পড়ে গেল, জাহাজডুবির সেই ভয়াবহ দৃশ্যটা। এই নদীই কি সেই নদী! এই নদীতেই কি সেই জাহাজ ডুবে গেছে! গায়ে কাঁটা দেয় রূপচাঁদের।

রূপসী মায়ের তিন মেয়ে রূপচাঁদকে নদীর তটে পৌঁছে দিয়ে ঘরে ফিরে গেল। রূপচাঁদ নদীর স্রোতে পাল্লা দিয়ে একা-একা বনের পথে হাঁটতে লাগল। রূপচাঁদ চাষির ছেলে বলেই সে হাঁটাহাঁটি করতে পারে অক্লেশে। হেঁটে-হেঁটে সে পোক্ত। রক্ষে এই, এখন ঝকঝকে দিন। যদিও বনের গাছপালা ডিঙিয়ে আকাশের সব আলো বনের মধ্যে উছলে পড়ছে না, তবু রাতের বনের মতো সাঙ্ঘাতিক বলা যায় না এখন, এই বনকে। ভালয়-ভালয় এই দিন থাকতেই যেন সে শহরে পৌঁছে যেতে পারে! এই কথাটাই সে বারবার আওড়াতে লাগল মনে-মনে।
হাঁটতে হাঁটতে লাঠির মতো শক্ত একটা গাছের ডাল কুড়িয়ে পেল রূপচাঁদ। ভালই হল। এই লাঠি ঠুকতে-ঠুকতেই সে এগোবে। চারদিকে এত খানা-খন্দ! কোথায়, কোন ফাঁকে সাপখোপ ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে, কে বলতে পারে! বনে যেমন সাপখোপের ভয়, তেমনই ভয় বিষাক্ত পোকা-মাকড়েরও। কে যে কখন নষ্টামি করে বসবে কেউ জানে না।
খানিকটা হাঁটতেই এ কী কাণ্ড! রূপচাঁদের পথের বাধা হয়ে একটা দেবদারু গাছ কেমন দাঁড়িয়ে আছে! কী পেল্লাই গাছটা! এমন ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কার সাধ্যি পথ খুঁজে বার করে! অবশ্য, রূপচাঁদ এতে ঘাবড়ায় না। গাছের ডাল ধরে ঝুলতে-ঝুলতে কেমন করে পথের বাধা টপকাতে হয়, সে তার জানা আছে। তবে, পিঠে বাঁধা খাবারের পোঁটলাটা একটু সামলে রাখতে হবে। হাতের লাঠিটাও কম কাজের নয়। সেটাও হাতছাড়া করা চলবে না। তবে পিঠে বাঁধা পোঁটলা নিয়ে গাছে ওঠা যত-সোজা, লাঠি-হাতে তা তো হওয়ার নয়। তাই সে লাঠিটা ছুড়ে ওই গাছের ফাঁক দিয়ে ওইপাশে ফেলে দিল। সামনেই পড়ল সেটা। সুতরাং গাছ পেরিয়ে ওপাশে পৌঁছে লাঠি খুঁজতে হবে না তাকে। হলও তা-ই। লাঠি ওপাশে ফেলেই রূপচাঁদও ঝপাঝপ এ-ডাল ও-ডাল করতে-করতে পৌঁছে গেল ওপাশে। তারপর লাঠিটা তুলে নিয়ে আবার হাঁটা দিল। কোথাও খানা, কোথাও খন্দ। কোথাও ঢিপি উঁচু-নিচু। কোথাও বা জটপাকানো ঝোপঝাড়। রূপচাঁদ যে হনহনিয়ে হেঁটে যাবে, তারও কোনও উপায় নেই। আর যতই সে বাধা পাচ্ছে, ততই তার হাঁটাও মন্থর হয়ে যাচ্ছে।
এমনই করে অনেকটা হাঁটার পর তার খিদে পেয়ে গেল। কাজেই সে ওরই মধ্যে দেখেশুনে, নদীর ধারে, একটা গাছের ছায়ায় বসল। একটু জিরিয়ে নদীর তীরে এগিয়ে গেল। নদীর জল মুখে-চোখে দিতেই অনেকটা ক্লান্তি তার দূর হয়ে গেল। আবার সে ছায়ায় বসল। পিঠে বাঁধা খাবারের পোঁটলা পিঠ থেকে নামিয়ে খুলে ফেলল। পোঁটলার ভেতরে বেশ বড়সড় একটা খাবারের কৌটো। তার ভেতরে এত লুচি, তরকারি, মিষ্টি। মানে, আজকের সারাদিনের খাবার। এখন পেটভরে খেলে, তবুও অনেক খাবার থাকবে। থাক, শহরে পৌঁছে তারপর দেখা যাবে। তা ছাড়া সঙ্গে তো অনেক টাকাও আছে। দস্যুসর্দার দিয়েছে না!
হ্যাঁ, সে তো সবাই জানে দস্যুসর্দার রূপচাঁদকে অনেক টাকা দিয়েছে। আচ্ছা, সত্যি, ছেলেটা যদি দস্যুসর্দারেরই না হবে, তবে দস্যুসর্দারের এত কিসের দায়, অত টাকা খরচ করার! আবার দ্যাখো, ছেলে যদি রূপসী মায়ের না-ই হবে, তবে তিনিই বা ছেলের জন্যে এত আকুল কেন! আচ্ছা, ছেলেটা কি দস্যুসর্দারের কোনও গোপন খবর জানতে পেরেছে! তাই কি ভয় পেয়ে তাকে পাকড়াও করতে চায়? পাকড়াও করে তবে কি তাকে মেরে ফেলবে?
ইস! দ্যাখো, দ্যাখো, রূপচাঁদের অবস্থা। লুচি-তরকারি খাবে কি, ঝাঁক ঝাঁক মাছি যে তাকে ছেঁকে ধরেছে! আরে বাবা! বনের মধ্যে এত মাছি ছিল কোথায়! কী মারাত্মক ভনভনানি শব্দ তাদের! যতই তুমি হাত চালাও, বয়েই গেছে! এই উড়ে গেল তো, আবার এসে বসল। একটা, দুটো করতে-করতে একেবারে অগুনতি মাছির মচ্ছব শুরু হয়ে গেছে।
বাবা রে বাবা! খাওয়া মাথায় উঠল রূপচাঁদের। এখন, এখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচে সে! বনের মাছি যে এমন ভয়ঙ্কর হয়, এ তো রূপচাঁদের ধারণার বাইরে!
একী! এ যে আর-এক কাণ্ড! এত পিঁপড়ে এল কোত্থেকে?
পালা! পালা! রূপচাঁদ কোনওরকমে বাটি-ঘটি পোঁটলাবন্দি করে দিল ছুট। ছুটলেও কি ছাড়ে মাছি! যতক্ষণ পারল, তারা তাড়া করল রূপচাঁদের পেছনে। ছাড়েনি পিঁপড়েগুলোও। এমন কামড়ে দিয়েছে, জ্বালায় ছটফট করতে করতে রূপচাঁদ যায় আর কি!
না, জ্বালা সামলাতে পারল না রূপচাঁদ। নদীর জলে পা ডুবিয়ে খানিক দাঁড়িয়ে রইল সে। পিঁপড়ের কামড়ে যে এত বিষ, এটা তার জানা ছিল না। এ কী রে, একটা ধুমসো কোলা ব্যাঙ কোথায় লুকিয়ে ছিল! সটান রূপচাঁদের গায়ের ওপর লাফিয়ে পড়ল ব্যাঙটা। ডেকে উঠল, ঘ্যাঙ-ঘ্যাঙ! ভয়ে চমকে উঠেছে রূপচাঁদ। তড়বড় করে উঠে পড়েছে জল থেকে। জলের ভেতর আবার ডুব দিয়ে ব্যাঙটা তলিয়ে গেল। সেদিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রূপচাঁদ ভাবল, কী কাণ্ড!
এখানে আর দাঁড়াল না সে। হাঁটতে-হাঁটতে তার মনে হল, বন যেন হালকা হচ্ছে একটু-একটু। বনের আড়াল থেকে আকাশও যেন তার নীল বাহার মেলে ধরছে চোখের ওপর ঝলমলিয়ে। খানিক পরেই সূর্য ডুব দেবে মনে হচ্ছে। কাজেই সে এবার একটু পা চালিয়েই হাঁটা দিল। যেমন করে হোক, সন্ধের আগেই তাকে শহরতলিতে পৌঁছতে হবে।
ঠিক বটে! আর-একটু বন পেরিয়ে এগিয়ে আসতেই একটি-দু’টি মানুষ দেখতে পেল সে। নদীর রূপও পালটেছে। এখন নদী এখানে অনেক চওড়া। সুতরাং শহর বুঝি তার নাগালের মধ্যে এসে পড়েছে।
কিন্তু তারপর? ভাবল রূপচাঁদ।
কেন, আর ভাবনার কী আছে?
ভাববে না? শহরে গিয়ে কোথায় থাকবে সে? কোথায় গিয়ে সে খুঁজবে, তার বুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ছবির সজলকে?
ছবির কথা মনে পড়তেই সে চমকে উঠল। ছবিটা আছে তো! তাড়াতাড়ি সে জামার নীচে হাত গলিয়ে দিল। হ্যাঁ, এই তো আছে! আঃ! স্বস্তির হাঁফ ছাড়ল সে। হ্যাঁ, দস্যুসর্দারের দেওয়া টাকাটাও আছে বুকের ভেতর। গেলেই, হয়েছিল আর কি! যাক, টাকাটা এখন কাজে লাগবে।
শহরতলি পেরিয়ে যত সে হাঁটছে, ধীরে-ধীরে শহরও এগিয়ে আসছে। কেমন জমজমাট হয়ে উঠছে চারপাশ। রূপচাঁদ যখন দস্যুর ডেরায় ছিল, তখন সে ছিল পাথরের রাজ্য। পাথরের মতো নিশ্চুপ ছিল সেই রাজ্য। রূপচাঁদ রাতের বেলা বনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল যখন, তখন বন ছিল বুক-কাঁপানো থমথমে। তারপর সে যখন ভাঙা বাড়ির অন্দরে ঢুকে আলো-উজ্জ্বল শূন্য ঘরে বিছানা পাতা দেখল, তখন তার চোখে ভেসে উঠল এক আশ্চর্য মায়াময় দৃশ্য। শেষমেশ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে সে যখন সেই রূপসী-মায়ের সামনে হাজির হল, তখন সে ছিল এক দুর্ভাবনায় অস্থির উত্তেজনা। আর এখন? বন পেরিয়ে শহরে ঢুকতেই মনে হয়, রূপচাঁদ যেন এক স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে জমজমাট এক হট্টগোলের হট্টমেলায় ঢুকে পড়েছে।
উফ! হেঁটেছে বটে রূপচাঁদ! সেই ভাঙা বাড়ির ফটক পেরিয়ে, বন ডিঙিয়ে, এই অ্যাত্তখানি পথ! বাহাদুর মানুষ বটে রূপচাঁদ! বাহাদুরই তো! গ্রামের ছেলে পথকে ভয় করে থোড়াই। তবে, হাঁটতে-হাঁটতে এখন খিদেটা বড়ই চাগাড় দিয়ে উঠেছে রূপচাঁদের। কিছু না খেলেই নয়। সঙ্গে তো তার লুচি-তরকারি আছেই। না, না, ওসব মুখে দেবে কি! তখন বনের ভেতর ঝাঁক-ঝাঁক মাছির বিষাক্ত ছোঁয়া লেগেছে ওই খাবারে। মুখে তুললেই গেছ। ছিঃ! কী ঘেন্না! তার চেয়ে ফেলে দাও জঞ্জাল ফেলার আঁস্তাকুড়ে। বনে যেমন মাছি, তেমনই শহরের রাস্তায় কেমন কুকুরের উৎপাত দ্যাখো! এত কুকুর কোথায় ছিল? তীরবেগে ছুটে এসে টপাটপ হামলে পড়ল আবর্জনার আঁস্তাকুড়ে। গপাগপ লাগিয়ে দিলে মহাভোজ! রূপচাঁদ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল।
দাঁড়িয়ে আর দেখবে কতক্ষণ! এদিকে, খিদেয় নিজের পেট যে চুঁই-চুঁই করছে। এখন একটা খাবারের দোকান-টোকান তো খুঁজে বার করতেই হয়। তবে, আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এখন তো পকেটভর্তি পয়সা আছে তার। এখন যা ইচ্ছে সে কিনে খেতে পারে। শহরের দোকানে কী না পাওয়া যায়!
তা বটে, পাওয়া তো যায় হরেক খাবার, কিন্তু কোন খাবারটার কত দাম, সেটা তো তার জানা নেই। নাই থাক, ঢুকে তো পড়া যাক।
হ্যাঁ, খুঁজেপেতে একটা খাবারের দোকান বার করল রূপচাঁদ। বসে খাওয়ার বন্দোবস্ত আছে দোকানটায়। দোকানে ঢুকে সে ভাল করে হাত-মুখ ধুলো। গায়ের পোশাক ঝেড়েঝুড়ে মাথায় একটু জলের ছিটে দিল। মাথার চুলগুলো হাত দিয়েই পরিপাটি করে আঁচড়ে নিল। চিরুনি না থাকলে, হাতই সই। তারপর একটা খাবারের টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারে বসে পড়ল। বসে পড়তেই একটা লোকের দিকে তার নজর পড়ে গেল। চোখে চোখ পড়তেই লোকটা নজর সরিয়ে নিল। মনে হল, কেমন যেন সন্দেহের চোখে তাকে দেখছিল লোকটা। কে তো কে! ক’খানা রুটি, আর একবাটি আলুর দম কিনল সে। খুব তৃপ্তি করে খেল। তারপর এক পেট জল খেয়ে একটা ঢাউস ঢেকুর তুলে দোকান থেকে বেরিয়ে এল রূপচাঁদ। সে কিন্তু বুঝতে পারছিল, ওই লোকটা থেকে-থেকেই তাকে দেখছে। দেখছে তো বয়েই গেল! যত পারে দেখুক!
রাতের খাওয়াটা রূপচাঁদের বেশ জম্পেশই হয়েছে। একটু তাড়াতাড়িই সেরে ফেলেছে। যদিও রাত এখনও তেমন নামেনি। না নামলে কী করা! পেটে খিদে নিয়ে তো আর বসে থাকা যায় না। কিন্তু এবার? পেট তো ভরল, রাতটা সে কাটাবে কোথায়? এইবারই মুশকিল। আজকের রাতটা কোনওরকমে কাটাতে পারলেই কাল থেকে লেগে পড়বে সজলের খোঁজে। তাকে খুঁজে বার করতেই হবে। কিন্তু কোথায় তাকে খুঁজবে? কেমন করে তার খোঁজ পাবে, কিছুই জানে না সে। অবশ্য সেসব নিয়ে এখনই মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। আজকের কাজ, রাতটা নিশ্চিন্তে ঘুমনো। কালকের কাজ, সজলকে খোঁজা। তাই, আলো-ঝলমল রাতের শহর দেখে যতই তার মন উছলে উঠুক, আর হাঁটতে তার মোটেই ভাল লাগছে না। কষ্ট হচ্ছে। বসতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কই? তেমন একটা জুতসই জায়গা তো তার নজরে পড়ছে না, যেখানে সে বসতে পারে। তাই, ইচ্ছে না করলেও রূপচাঁদকে বসার জায়গা খোঁজার জন্যে দু-চার পা হাঁটতেই হয়।
এত লোক, এত বড় রাস্তা, এখন তো খোশমেজাজেই রূপচাঁদ এদিক-ওদিক হাঁটতে পারে। তার আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
কিন্তু না, সে ভয় পেল। এত লোকের সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতেও তার গা-টা কেমন যেন শিরশির করে উঠল। তার মনে হল, খাবারের দোকানে যে-লোকটা তাকে থেকে-থেকে উঁকি মেরে দেখছিল, সেই লোকটা যেন তাকে পাশ কাটিয়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল রূপচাঁদ। মনে হল, এ আবার কী সৃষ্টিছাড়া কাণ্ড! লোকটা কোথায় ছিল! কোত্থেকে এল!
দরকার নেই। রূপচাঁদ তাই, লোকটা যেদিকে গেল, সেদিকে এগোল না। উলটোদিকে আর একটা পথে হাঁটতে শুরু করল। ও বাবা! এদিকে একটু আসতেই এ কী দেখে রূপচাঁদ। এ যে হইহই কাণ্ড! এ যে আলো-ঝলমল সার্কাসের তাঁবু। রূপচাঁদ সেই কোন ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে সার্কাস দেখেছে। সেই একবারই। এই বয়সে আর-একবার সে দেখতেই পারে। যদিও তার সার্কাস দেখার চেয়ে এখন ঘুমোতে ইচ্ছে করছিল বেশি। তবুও সে লোকটার চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে সার্কাসের একখানা টিকিট কেটে ফেলল। ঢুকে পড়ল সার্কাসে। সার্কাস অবশ্য তখন শুরু হয়ে গেছে। তখন চলছে ভালুকের সাইকেল চালানোর খেলা। তার সঙ্গে বাজনা বাজছে ঝমক-ঝমক। মজা দেখে মন ভরে যায়! খেলাটা কী শক্ত বলো!
ভালুকের অমন মজার খেলা দেখেও কিন্তু রূপচাঁদের মন স্থির হল না। হ্যাঁ, থেকে-থেকেই সেই লোকটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। কেন দেখছিল সে রূপচাঁদকে অমন করে! বারবার!
অবশ্য সে যা ভাবছে, তা না-ও তো হতে পারে। লোকটা তার দিকে চেয়েছে বলেই তাকে সন্দেহ করার কোনও মানে হয় না। হ্যাঁ, এও ঠিক কথা, লোকটা রাস্তা দিয়ে চলবার সময়েও রূপচাঁদের গা-ঘেঁষে হনহন করে চলে গেছে। যেতেই পারে। শহরের পথ দিয়ে চলতে-চলতে অমন কত লোকই গা-ঘেঁষে হনহন করে চলে যায়। তাতে ঘাবড়াবার কী আছে? তার মানে এই নয় যে, হনহন করে চলে গেল বলেই লোকটা মতলববাজ।
সার্কাসে এবার ট্রাপিজের খেলা শুরু হল। বাজনার সুরটাও কেমন পালটে গেল! কেমন দুলকি চালে বেজে উঠল। যেমন রূপকথা-গল্পের অপ্সরা দেখতে সুন্দরী, রূপবতী, তেমনই দেখতে পাঁচ-পাঁচজন মেয়ে। ট্রাপিজের ওপর কত রকমের কসরত দেখাতে লাগল। সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল, একটি ছোট্ট ছেলের কেরামতি। সে কখনও ডিগবাজি খাচ্ছে। কখনও লাফ মারছে। কখনও ওই সুন্দরী মেয়েরা যেমন ছাতা-হাতে ট্রাপিজের ওপর খেলা দেখাচ্ছিল দুলে-দুলে, সেও তেমনই খেলা দেখাতে-দেখাতে দুলছিল। অন্যমনস্ক রূপচাঁদের হঠাৎ সেইদিকে নজর পড়ে গেল। দেখতে-দেখতে একেবারে মশগুল হয়ে গেল সে। আরে বাবা, কী বাহাদুর ছেলে রে! শরীরের সঙ্গে টান-টান জড়ানো সাদা ঝকমকে পোশাকটা গায়ে দিয়ে তাকে কী সুন্দর মানিয়েছে। দ্যাখো, পেছনে হাতের সঙ্গে বাঁধা দুটো ডানা। যেন সে পাখির মতো উড়ছে। বুঝি-বা সত্যি একটা পাখি। আহা। রূপচাঁদের ছেলেটাকেও সে যদি অমনই সাজাতে পারত! অমনই পাখির মতো! যদি অমন করে ট্রাপিজের ওপর পা ফেলে দোল খেত সে! তবে, তাকেও কী সুন্দরই না মানাত! দারুণ! ছেলেটার খেলার মাঝেই চটাপট জোর হাততালি পড়ল। রূপচাঁদও খুব জোরে মারতে গেল তালি। কিন্তু পারল না। তালি দিতে গিয়ে রূপচাঁদ যেন থমকে গেল। ছ্যাঁত করে চমকে ওঠে তার বুকের ভেতরটা। হাত-পা যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেল! একটু দূরে কে বসে-বসে সার্কাসের খেলা দেখছে। সেই লোকটা না? কখন ঢুকল সে সার্কাসে? একেবারে খেয়ালই করতে পারেনি রূপচাঁদ। তবে কি সত্যি-সত্যি লোকটা রূপচাঁদের পিছু নিয়েছে? কেন? কী মতলব লোকটার? উসখুস করতে লাগল রূপচাঁদ। চুকে গেল তার সার্কাস দেখা। এখন সে পালাতে পারলেই বাঁচে!
না তক্ষুনি-তক্ষুনি সে পালাল না। সামনে, চোখের ওপর খেলা চলছে সার্কাসের। এখন সেদিকে তার মন নেই। সে হতভম্বের মতো বসে রইল ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে। বুঝি আবার কোনও বিপদ দেখা দেয়।
সার্কাস ঠিক সময়েই ভাঙল। ভাঙার সঙ্গে-সঙ্গে রূপচাঁদ ভিড়ের মধ্যে গা-ঢাকা দিলে। বাইরে বেরিয়ে সে আর এদিক-ওদিক করল না। ভিড় ঠেলে সিধে হাঁটল জোরসে পা চালিয়ে। কোথায় চলল সে, জানবার দরকার নেই। এখন, ওই লোকটাকে ফাঁকি দিতে পারলেই যেন বাঁচে সে!
হ্যাঁ, তখন হয়ত রূপচাঁদ লোকটার চোখকে ফাঁকি দিতে পেরেছিল। কেননা, তখন আর লোকটাকে দেখা গেল না। তবু বিশ্বাস করতে পারে না রূপচাঁদ। সে থমকে-থমকে থামে। চমকে-চমকে ভাবে, এই বুঝি লোকটা আবার দেখা দেয়!

হাঁটতে-হাঁটতে অনেকটা চলে এসেছে রূপচাঁদ। হঠাৎ ওটা কী দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল রূপচাঁদ?
একটা মন্দির। কিছু না ভেবেই সে ঢুকে পড়ল মন্দিরের ভেতরে। সামনে মস্ত চাতাল। অনেক মানুষ চাতালে বসে আছে। সেও অনেক মানুষের জটলার মধ্যে বসে পড়ল। না, ঠাকুর সে দেখল না। ঠাকুর দেখার কথা তার মনেই এল না, একবারের জন্যেও। কোন ঠাকুরের মন্দির এটা, তা-ও কাউকে জিজ্ঞেস করে না সে। চুপচাপ বসে থাকে। বসে-বসে ভাবে, লোকটা কি সত্যিই তার পিছু নিয়েছে! তা যদি হয়, তবে কেমন করে লোকটার হাত থেকে রেহাই পাবে সে!
আচ্ছা, রেহাই পাওয়ার কথা উঠছে কেন? লোকটা এখনও পর্যন্ত তাকে তো কোনও ভয়ও দেখায়নি, উলটোপালটা ভয়ের কথাও বলেনি। এমনও তো হতে পারে, লোকটা ভাল। অবশ্য, চোখের চাউনিটা একটু কেমন যেন! কেমন যেন গোলমেলে। হতেই পারে। সবার চোখের চাউনি যে ঢুলুঢুলু হবে, তার কী মানে! না, না, একটা নির্দোষ লোককে মিথ্যে-মিথ্যে ভয় পাওয়ার কোনও মানে হয় না। ও যা করছে, করতে দাও। তোমার ক্ষতি না করলেই হল!
তবে, রূপচাঁদকেও দোষ দেওয়া যায় না। ও কী করবে বলো! একটার পর একটা বিপদে পড়লে, মানুষ মাথার ঠিক রাখতে পারে! যে পারে, তার কথা আলাদা। তার ওপর সে শুনেছে শহরে মন্দ লোকের অভাব নেই। সুতরাং সেই ভয়ে মন্দিরে ঢুকে সে যদি একটু স্বস্তি পায়, তবে তাকে মন্দিরেই থাকতে দাও না! তা ছাড়া আর কোথায় বা থাকবে সে? আজ রাত্তিরটা সে যদি মন্দিরের চাতালে শুয়ে কাটিয়ে দিতে পারে, তবে অন্য কোথাও থাকার কথা ভাবতে হয় না। অন্য কোথায় থাকবেই বা সে! তার তো শহরের ঠিক-ঠিকানা কিছুই জানা নেই। মন্দিরই ভাল।
মন্দিরের একটা কোণেই সে চুপটি করে বসে ছিল। আরও কত লোক বসে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। তারা হয়তো মনে মনে ঠাকুরের নাম জপ করছিল। নাম জপটপের কথা তখন রূপচাঁদের মনেই আসছিল না। লোকটার ভয়েই সে থরহরি। বসে-বসে তার হঠাৎ-হঠাৎ কেমন যেন মনের মধ্যে ধাঁধাঁ লেগে যাচ্ছিল। আচ্ছা, যে লোকটা তাকে অমন করে দেখছে, রূপচাঁদ কি সেই লোকটাকে কোনওদিন দেখেছে কোথাও! কিছুতেই সে মনে করতে পারছিল না। না কি লোকটা তাকে চেনে! নানান চিন্তায় মন তার তোলপাড় করতে লাগল। এইসব চিন্তা করতে-করতেই কখন যে দেওয়ালে তার মাথাটা ঢলে পড়েছে ঘুমে, সে তার একেবারেই খেয়াল ছিল না। হবেই তো! সারাটা দিন সে নদীর স্রোত দেখে বনের পথ হেঁটেছে। এখন তার কাহিল অবস্থা। সুতরাং ঘুমিয়ে পড়লে সে তো আর দোষের নয়!
সে ঠিক আছে, ঘুম পেলে তুমি ঘুমোবে বইকী। কিন্তু তাই বলে মন্দিরের চত্বরে! রাত্তিরবেলা পুজো যখন শেষ হয়ে গেল, তখন মন্দির ছেড়ে ভক্তের দলও একে-একে ঘরে ফিরল। কিন্তু একজন ফিরল না। সে ঘুমোচ্ছে। পুরোহিতের চোখে সেই দৃশ্য না পড়ে যায়! তিনি তো ঘুমন্ত লোকটাকে দেখে রেগে কাই। এমন গাঁক-গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠলেন যে, রূপচাঁদের ঘুম তো কোন ছার, স্বয়ং কুম্ভকর্ণের পিলে চমকে উঠত। রূপচাঁদ সেই চিৎকারে ধড়ফড় করে উঠে পড়েছে। ভয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে পুরোহিতের মূর্তি দেখে! পুরোহিতমশাই খেঁকিয়ে উঠলেন, “তুমি কে হ্যা লাটসাহেব, এখানে ঘুমোচ্ছ? মন্দিরটা কি তোমার ঘুমোবার জন্যে তৈরি হয়েছে? শিগ্গির ভাগো এখান থেকে। নইলে লোক ডাকব!”
না, লোক ডাকতে হল না। মানে-মানে বেরিয়ে পড়ল রূপচাঁদ মন্দিরের দরজা পেরিয়ে।
পুরোহিত মন্দিরের দরজায় আগল দিতে-দিতে গজগজ করে উঠলেন, “যত্তসব!”
সে তো হল, রূপচাঁদ তো ঘুমচোখে বেরিয়ে পড়ল মন্দিরের ভেতর থেকে, কিন্তু এখন? রাতটা সে থাকবে কোথায়? অবশ্য কোথাও না জায়গা পেলে, মন্দিরের বাঁধানো এই রকে সে আজকের রাতটা আরামসে কাটিয়ে দিতে পারবে। বাইরে তো আর পুরোহিত তাড়া দেবে না! তবে, বাইরে পুরোহিতের ভয় না থাকলেও, লোকটার ভয় থেকেই যায়! ধুস! তার এই রাতদুপুরে অত গরজ পড়েনি! সে ঘুমোবে, না রাস্তায়-রাস্তায় রূপচাঁদকে খুঁজে বেড়াবে! ছেড়ে দাও তো!
না, ছেড়ে দেওয়া গেল না। রূপচাঁদ মন্দিরের বাইরে, এই রকে তখন ঘুমে অচেতন। তখন গভীর রাত। কোথা থেকে যেন একটা কী রূপচাঁদের গায়ে পড়ল। তার ঘুম ভেঙে গেল আচমকা। সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। চোখ কচলে দেখতে লাগল এদিক-ওদিক। না তো, কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না। এই এক মুশকিল! মনে যদি একবার ভয় ঢুকে যায়, তখন টিকটিকিও টকটক করে উঠলে বুকও ধকধক করে উঠবে। সুতরাং আর কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে, সে আবার শুয়ে পড়ল।
কিন্তু এবার চোখ বোজার আগেই আবার ঠকাস! একটা খোলামকুচি সটান রূপচাঁদের গায়ে এসে পড়ল।
এখন আর রূপচাঁদ সন্দেহ না করে থাকতে পারে না। তা হলে কি এর আগেও তার গায়ে খোলামকুচি ছুড়ে ঘুম ভাঙিয়েছে কেউ! দরকার নেই বাবা এখানে ঘুমিয়ে। বরং একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজে দেখা যাক। জুটলে ভাল। নইলে রূপচাঁদ রাস্তার এককোণে জেগে বসে থাকবে। কাজেই সে পাততাড়ি গুটিয়ে আবার জায়গার তল্লাশে পাড়ি দিল।
“যাচ্ছ কোথায়? একটু দাঁড়াও!” রূপচাঁদ দু’ পা-ও যায়নি, এমন সময়ে কে যেন খুব চাপা গলায় ডাকল তাকে অন্ধকারের আড়াল থেকে।
চকিতে মুখ ফেরাতেই রূপচাঁদ দেখে মূর্তিমান সেই লোকটি তার পেছনে দাঁড়িয়ে!
রূপচাঁদের চোখে চোখ পড়তেই সে একটা অদ্ভুত রহস্য-জড়ানো গলায় বলল, “তোমাকে আমার দরকার আছে।”
তেমনই চাপা স্বরে রূপচাঁদ উত্তর দিল, “কে আপনি?”
লোকটা মনে হল, নিস্তব্ধ অন্ধকার রাতে গলা চেপে হেসে ফেলল। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “তোমাকে আমার অনেক কথা বলার আছে।”
রূপচাঁদ মনে-মনে ভয় পেল বটে, কিন্তু বাইরে রাগের ভান করে বলল, “কী এমন কথা বলার আছে যে, তখন থেকে আপনি আমার পেছনে ঘুরঘুর করছেন! আমাকে ঘুমোতে পর্যন্ত দিচ্ছেন না!”
“বলছি। চলো, আমরা একটু আড়ালে যাই।” সে গলার স্বর আরও নিচু করে বলল।
রূপচাঁদ জিজ্ঞেস করল, “আড়ালে কেন? আপনার বাড়িতে যেতে পারি তো?”
সে বলল, “আমারও তোমার মতো অবস্থা। আমারও কোনও বাড়ি-ঘর নেই।”
“কেন?” আশ্চর্য হল রূপচাঁদ।
সে উত্তর দিল, “তুমি যদি ভয় না-পাও, তো বলি।”
“ভয় পাব কেন?” বুকের ভেতর ভয় চেপেই রূপচাঁদ জিজ্ঞেস করল।
“আমি এক দলছুট দস্যু। একটা দারুণ খবর দেব বলে, তোমাকে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি পালিয়ে-পালিয়ে।”
চমকে উঠল রূপচাঁদ, “কী খবর?”
সে উত্তর দিল, “সে-খবর এখানে দাঁড়িয়ে দেওয়া যাবে না। চলো, আড়ালে যাই।”
রূপচাঁদ ইতস্তত করল।
“আরে এসো, এসো,” বলে লোকটা রূপচাঁদের হাত ধরে টানল। টানতে টানতে আবার বলল, “সে-খবর এমন, শুনলে তুমি চমকে উঠবে!”
“এমন কী খবর যে শুনলেই চমকে উঠব?” জিজ্ঞেস করল রূপচাঁদ।
“এই মাঝরাতে, এখানে, এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেই কথা নিয়ে আলোচনা করলে কেউ দেখে আমাদের সন্দেহ করতে পারে। এসো!” সে রূপচাঁদের হাত ধরে টানতে-টানতে আড়ালে চলল।
খানিকটা গিয়ে একটা ঘুপচিমতো জায়গা তারা খুঁজে পেল।
লোকটা বলল, “এসো, এখানে বসি।”
তার কথামতোই রূপচাঁদ ওই ঘুপচি জায়গাতেই বসে পড়ল। বসে রূপচাঁদ চারদিকে চোখ বুলিয়ে উত্তর দিল, “মনে হচ্ছে, জায়গাটা খুব সুবিধের নয়। আপনার যা বলার, তাড়াতাড়ি বলুন।”
লোকটি বলল, “হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। তোমাকে তাড়াতাড়িই বলছি।” বলেই সে রূপচাঁদকে আচমকা জিজ্ঞেস করল, “সার্কাসের ওই ছেলেটির খেলা তোমার কেমন লাগল?”
রূপচাঁদ থতমত খেয়ে গেল তার প্রশ্ন শুনে। ঝট করে তার অন্ধকারে ঢাকা মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করল, “কেন বলুন তো? খুব ভাল।”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মনে মনে হয়তো ভাবল কিছু। তারপর আচম্বিতে বলে উঠল, “তুমি যাকে খুঁজছ, সে ওই ছেলে।”
আচমকা তার মুখে এই কথা শুনে রূপচাঁদের ভয়ে রক্ত যেন হিম হয়ে যায়। সে উদ্বেগভরা গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি কেমন করে জানলেন?”
“জেনেছি, তুমি যখন আমাদের ডেরায় ছিলে, তখন।”
রূপচাঁদ থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি ওই ডেরায় ছিলেন? আপনি কি ওদেরই দলের লোক?”
“হ্যাঁ, তুমি হয়তো আমাকে ঠিক চিনতে পারছ না। পারা সম্ভবও নয়। কারণ, ডেরায় দেখে থাকলে, তুমি আমায় একবারই দেখেছ। কিন্তু ওই ছেলেটিকে খুঁজে দেওয়ার জন্যে সর্দার যে তোমাকে ভার দিয়েছিলেন, এটা আমি জানি। তিনি যে তোমার ছেলের লেখাপড়া শেখার জন্যে যত খরচ হয়, সব দেবেন বলেছিলেন, এও আমার জানা। কষ্ট করে পায়ে হেঁটে-হেঁটে ছেলেটিকে যাতে খুঁজতে না-হয়, তাই সর্দার তোমাকে একটি কালো ঘোড়াও দিয়েছিলেন। সে-ঘোড়াটির তদারকি আমিই করতুম। কিন্তু তোমাকে ঘোড়ায় চড়া শেখাবার জন্যে সর্দার যখন নিজেই ভার নিলেন, আর তোমার দু’দিন থাকবার ব্যবস্থা হল আমাদের ডেরায়, তখন সেই ফাঁকে আমি পালিয়ে আসি দস্যুডেরা থেকে। তোমার সঙ্গে পথে দেখা করার জন্যে আমি ওত পেতে লুকিয়ে ছিলুম বনে। কিন্তু কেন যে দেখা হল না, আমি বুঝতে পারিনি। দেখা হল না বলেই আমি আগেভাগে শহরে চলে আসি। তারপর হঠাৎ এই দেখা দু’দিন পরে। এই দু’দিন মনে হয়, তুমি বনের মধ্যেই পথ হারিয়ে ঘুরপাক খেয়েছ। সঙ্গে তোমার সেই ঘোড়া না-দেখে ভাবছি, বনের মধ্যে সেই ঘোড়াও হয়তো তোমায় ফেলে উধাও হয়ে গেছে।”
“কেন আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চান?” কথা বলতে রূপচাঁদের গলা যেন জড়িয়ে আসে।
“সব বলছি।” সে উত্তর দিল, “ওই ছেলেটির খোঁজ আমি পেয়েছি হঠাৎ, কাল এই শহরে! শুনে রাখো, ছেলেটি দস্যুসর্দারের ছেলে নয়। এক মস্ত ধনী বণিকের ছেলে ও। একবার ওই ধনীর বাড়িতে লুঠ করার মতলব আঁটি আমরা। হ্যাঁ, লুঠ করে সত্যি-সত্যিই আমরা তার সর্বস্ব হরণ করি। সেই ধনী বণিক আমাদের বাধা দিতে এলে, আমাদের হাতে তার প্রাণ যায়। তার ছেলেকেও আমরা হরণ করি। হরণ করে আমাদের ডেরায় নিয়ে আসি। বন্দি করে রাখি। ছেলেটিকে দেখতে-শুনতে ভারী ফুটফুটে। ওর মা আর তিন দিদি তেমনই সুন্দরী। আমরা লুঠ করেছিলুম তাদের লক্ষ-লক্ষ টাকার হিরে-জহরতের গয়না। এমনকী কয়েক লাখ নগদ টাকাও। ছেলেটিকে হরণ করার একটাই কারণ ছিল সর্দারের। সর্দার তাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে দস্যু বানাতে চেয়েছিল। প্রথম-প্রথম ছেলেটি আমাদের ডেরায় খুবই কান্নাকাটি করত। তারপর সে যখন ফিরে যাওয়ার আর উপায় দেখল না, তখন কান্না ভুলল। ধীরে-ধীরে সর্দারের বশে এল। তখন সর্দার যা বলে, সে শোনে। সর্দারের সঙ্গে গল্পগুজব করে। আমাদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করে। আমরা যখন রাতদুপুরে দস্যুগিরি করতে বেরোই, সে একা-একা আমাদের ডেরা আগলায়। তখন অবশ্য আমাদের ডেরা ওই পাথরের গহ্বরে ছিল না। আমরা পাথরের গহ্বরে গেছি, ওই ছেলেটি আমাদের ওখান থেকে নিরুদ্দেশ হওয়ার পরেই।”
“কেন ওই পাথরের গহ্বরে গেলেন?” উত্তেজনায় রূপচাঁদের গলা যেন রুদ্ধ হয়ে আসে।
সে উত্তর দিল, “সর্দার ভয় পেল। ভাবল, ছেলেটা যদি তাদের পাত্তা সবাইকে জানিয়ে দেয়, তবে বিপদ হতে পারে। ধরা পড়ে যেতে পারি আমরা। তাই, তড়িঘড়ি সেখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে ওই গহ্বরে পালিয়ে যাই।”
“ছেলেটা পালাল কেমন করে?” জিজ্ঞেস করে রূপচাঁদ।
লোকটি উত্তরে বলল, “অন্যদিনের মতো সেদিনও আমরা তাকে একা রেখে লুঠ করতে বেরোই। আগে কোনওদিন সে যা করেনি, সেদিন সে তা-ই করল। আমাদের ফাঁকি দিয়ে সে পালাল। পালাবার সময় সে সর্দারের বাক্স ভেঙে একটা অনেক অ-নে-ক দামি হিরের হার হাতিয়ে নিয়ে গেল। ওই হারটা আমরা ওদের বাড়ি থেকেই লুঠ করি। খুব সম্ভব হারটা ওর মায়ের। মায়ের জিনিস, মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যেই বোধ হয় সে তক্কে-তক্কে ছিল হারটা হাত করার জন্যে।”
“কিন্তু, এখন আপনি আমার পিছু নিয়েছেন কেন?” জিজ্ঞেস করল রূপচাঁদ।
সে উত্তর দিল, “ছেলেটিকে যে আমি খুঁজে পেয়েছি, এই খবরটি দেওয়ার জন্যে। আসলে যেদিন সে পালাল, সেইদিন থেকেই আমি তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছি। অবশ্যই সর্দারকে না-জানিয়ে। সর্দারকে না-জানানোরও একটা অন্য কারণ ছিল আমার।”
হঠাৎ রূপচাঁদ জিজ্ঞেস করে বসল, “কী কারণ?”
“ধীরে-ধীরে আমি তোমাকে সব কথা বলছি। একটু সবুর করো।” বলে, লোকটা আবার শুরু করল, “আমি যখন সারা রাজ্য তোলপাড় করে ছেলেটিকে খুঁজে পেলুন না, তখন আমার সন্দেহ হল, ছেলেটি হয়তো মা’র কাছেই ফিরে গেছে। তাদের বাড়ি শহরে। সুতরাং এর পর আমার লক্ষ্য হল শহর। শহরে ওই ধনী বণিকের বাড়ি সবাই চেনে। আমরাও চিনি। সুতরাং ডেরার থেকে লুকিয়ে পালিয়ে এসে আমি বনে অপেক্ষা করতে লাগলুম। আমি জানতুম, ঘোড়ায় চড়ে তোমাকে বনের পথ দিয়েই যেতে হবে। কিন্তু আশ্চর্য, তুমি এলে না। বনে তোমার জন্যে আমার লুকিয়ে অপেক্ষা করার কারণ ছিল একটাই, আমি তোমাকে নিজে সঙ্গে করে শহরে নিয়ে আসব। তোমাকে আমিই এদের বাড়িটা চিনিয়ে দিতে চেয়েছিলুম। কারণটা অন্য কিছু নয়, আমাকে দেখে কেউ যাতে চিনে না ফেলে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তোমার সঙ্গে আমার দেখাই হল না।
“অগত্যা, আমি একাই শহরের উদ্দেশে রওনা দিলুম। শহরে পৌঁছে, গা-ঢাকা দিয়ে, আমি ওদের বাড়িটার হদিস করতে লাগলুম। খুঁজে পেলুমও। কিন্তু অবাক কাণ্ড, দেখলুম বাড়ি খাঁ-খাঁ করছে। কেউ কোত্থাও নেই। তখন হতাশ হয়ে কী করা যায় ভাবছি। পথে ঘুরঘুর করছি। এমন সময় হঠাৎ আমি ছেলেটার সন্ধান পেয়ে গেলুম। রাতের আলোয় শহরের বাহার তো দেখতেই পেলে! তা, আমিও এই বাহার দেখতে-দেখতে হঠাৎ চমকে উঠি! দেখি কী, একটা বাড়ির দেওয়ালে সার্কাসের এক মস্ত ছবি সাঁটা। তাতে বাঘ-ভালুকের যেমন ছবি আছে, তেমনই দেখি একটি ছেলের হাসিখুশি মুখের ছবি। আমার কেমন সন্দেহ হল। ছবিটা হাতে আঁকা বলেই এই সন্দেহ। কিন্তু তার মুখের আদলটা চেনা-চেনা লাগল। মনে হল বটে, এই ছবিই সেই ছেলের। তবুও, সামনাসামনি না-দেখলে বিশ্বাস করতে ভরসা পাচ্ছিলুম না। সুতরাং ঠিক করলুম, পরের দিনই সার্কাসে ঢুঁ মারব।
“আমি শেষ কবে সার্কাস দেখেছি, মনে নেই আমার। তবে, দেখেছি খুবই ছেলেবেলায়। সেই সময় চোখের সামনে জ্যান্ত বাঘ-ভালুকের খেলা দেখে আমি হাঁ হয়ে গেছলুম। তা সেই ছেলেবেলার সেই সার্কাস এখন এতদিন পরে কেমন হয়েছে, সেটা দেখার ইচ্ছে আমার একেবারেই ছিল না। আমার ইচ্ছে ছিল, ওই ছেলেটিকে দেখার। কে সে!
“তাই, টিকিট কেটে আমি ঢুকে পড়লুম সার্কাসে। আর বলব কী, আমি যা সন্দেহ করেছি, বিলকুল তা-ই। আমি যাকে এতদিন ধরে খুঁজছি, সেই ছেলে ট্রাপিজের খেলা দেখাচ্ছে। উত্তেজনায় আমার গায়ে কাঁটা দিল। আমি ওর নাম ধরে আর-একটু হলেই ডেকে ফেলেছিলুম। না, খুব সামলে গেলুম।”
“তারপর কী হল?” রূপচাঁদের গলায় উৎকণ্ঠা।
“তারপর, ছেলেটির সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্যে আমি ছটফট করতে লাগলুম। কিন্তু ভয় হল, আমাকে দেখে সে যদি দস্যু বলে চিৎকার করে ওঠে তখন যে আমারই বিপদ। কাজেই আমি কী করব, এই চিন্তায় যখন ব্যস্ত হয়ে পথে-পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তখনই তোমায় আমি দেখতে পেলুম। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম।”
রূপচাঁদ হতবাক হয়ে গেল তার কথা শুনে। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।
রূপচাঁদকে অমন নির্বাক দেখে লোকটাই কথা বলল, “কী হল? তুমি অমন চুপ করে রইলে কেন?”
“না, আমি একটা অন্য কথা ভাবছি।” উত্তর দিল রূপচাঁদ।
সে উদ্গ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী কথা?”
রূপচাঁদ বলল, “আপনি শুধুমুধু ছেলেটিকে খুঁজছেন কেন? আপনি বুঝি নিজেই ছেলেটিকে সর্দারের কাছে ধরে নিয়ে যেতে চান বাহবা নেওয়ার জন্যে?”
“না, না।” লোকটি উত্তর দিল।
“তবে?” প্রশ্ন করল রূপচাঁদ।
“অন্য একটা কারণ আছে।”
“কী বলুন তো?”
রূপচাঁদের প্রশ্ন শুনে লোকটি বলল, “আছে, আছে।”
রূপচাঁদ বলল, “আমাকে বলতে আপনার আপত্তি থাকলে, আমিও শুনতে চাই না।”
“না, কথাটা আপত্তির নয়।” সে উত্তর দিল।
“তবে?”
“কথাটা খুবই গোপনীয়।”
রূপচাঁদ উত্তর দিল, “ঠিকই তো, গোপনীয় কথা গোপনে রাখাই ভাল। নইলে, আমি আবার মুখ ফসকে কখন কাকে বলে ফেলব।”
“সেটা অবশ্য ঠিক,” বলে লোকটি রূপচাঁদের মুখখানা দেখবার চেষ্টা করল। অন্ধকারে রূপচাঁদের মুখ সে কতটা দেখতে পেল বোঝা গেল না। কিন্তু সে আবার বলল, “আমি জানি, তুমি সেই গোপন কথা শুনলে তোমার মুখ কখনওই ফসকাবে না। কারণ, তাতে তোমারও কিছু লাভের কড়ি থাকতে পারে।”
“তবে বলে ফেলুন,” রূপচাঁদের গলায় যেন হালকা হাসির সুর ঝঙ্কার তুলল, “আরে মশাই, আমার লাভের কথা যেখানে, সেখানে আপনার গোপন কথা আমি না-শুনে পারি! বলুন! বলুন!”
তখন লোকটি উত্তর দিল, “ব্যাপারটা কী জানো, গোপন কথা বলা যতটা সহজ, গোপনে কাজ করা কিন্তু ততটাই শক্ত। কাজটা কিন্তু আমাদের দু’জনকেই মাথা খাটিয়ে সাবধানে করতে হবে। সে কাজ যদি একবার হাসিল করতে পারি, তবে তোমার-আমার লাভের বখরা আধা-আধি!”
রূপচাঁদ অন্ধকারে আবার হাসল। বলল, “ভাল রে ভাল, আপনি তো দেখি আগেই ভাগাভাগি করে বসলেন। কিন্তু ভাগটা কিসের সেটা তো এখনও ভাঙলেন না।”
এবার লোকটা রূপচাঁদের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “সর্দারের বাক্স ভেঙে ছেলেটা যে হিরে-গাঁথা হারটা নিয়ে পালিয়েছে, বখরা তার। ওই হারটা ছেলেটার কাছ থেকে বাগাতে পারলেই, কেল্লা ফতে!”
রূপচাঁদ ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “বাগাবেন কেমন করে?”
সে বলল, “ভুলিয়ে-ভালিয়ে। না হলে ভয় দেখিয়ে।”
রূপচাঁদ বলল, “সে তো বুঝলুম। কিন্তু ভোলাবে কে?”
“কেন, তুমি!”
“আমি?”
“হ্যাঁ, কাজটা তোমাকেই কামাল করতে হবে।” উত্তর দিল সেই লোকটা। “কারণ, আমায় ছেলেটা চেনে। আমি যে দস্যু, সে জানে। আমায় দেখে সে যদি এই কথাটা একবার কারও কানে তুলে দেয়, তবে মাঠে মারা যাবে আমাদের সব ফন্দি। আমার পালাবার পথ থাকবে না। মারের চোটে বৃন্দাবন দেখিয়ে ছাড়বে।”
রূপচাঁদ তো এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। সে তার কথা লুফে নিয়ে ভণিতা করে বলল, “ফন্দি যদি খেটে যায়, অর্ধেক বখরাটা ঠিক পাব তো?”
দস্যুলোকটা মুখ থেকে পিচ ফেলার মতো একটা শব্দ করে বলল, “আরে ভাই, তুমি আমাকে মিথ্যে-মিথ্যে সন্দেহ করছ। কাউকে কথা দিয়ে আমি বেইমানি করব! তেমন মানুষ আমি নই। তুমি করবে কাজ, আর আমি দেব ফাঁকি? ছিঃ!”
“ঠিক আছে। আমাকে তা হলে একটু ভেবে দেখতে দিন।” ভড়ং করে উত্তর দিল রূপচাঁদ।
সে বলল, “আবার কী ভাববে। এই তো পাকা কথা হয়ে গেল, বখরা আধা-আধি।”
“সে তো জানি,” উত্তর দিল রূপচাঁদ, “আপনি বললেন আর আমি করে ফেললুম, ব্যাপারটা কিন্তু অত সোজা নয়। দস্তুরমতো ঠাণ্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে এগোতে হবে। কী করলে কী হতে পারে, তার একটা হিসেব ঠিক-ঠিকমতো আগে করে না রাখলে, পরে পস্তাতে হবে। এসব কাজ খুব বুদ্ধি খাটিয়ে করতে হয়, বুঝলেন!” বলে রূপচাঁদ ঝট করে তার মুখের চেহারাটা একবার আড়চোখে দেখে নিল।
না, মুখ দেখে মনে হল না, রূপচাঁদের কথা শুনে সে অবিশ্বাস করছে একটুও। তাই, রূপচাঁদ তাকে আরও একটু আশ্বস্ত করার জন্যে বলল, “শুনে রাখুন, হিরের হার যদি হাতে পাই, আমার হাত থেকে সে হার আপনার হাতে যেতে বেশি সময় লাগবে না।”
রূপচাঁদের এই কথা শুনে হাসল সে। তার ছ্যাতলা-পড়া বত্রিশ পাটি দাঁত, এই অন্ধকারেও ঝিলমিলিয়ে উঠল। সে একবর্ণও বুঝতে পারল না, রূপচাঁদ তার মনের ভেতর কী ছল-চালাকি ভাঁজছে। তাই সেই লোকটা সহজ মনেই জিজ্ঞেস করল, “এবার তা হলে কী করা যায় বলো তো?”
রূপচাঁদ উত্তর দিল, “আজ এই রাতে তো আর কিছু করা যাবে না। কাল সকাল থেকেই কাজ শুরু করা যাবে। আজ বরং রাতটা কোথাও নিশ্চিন্তে কাটাবার মতো একটা জায়গার খোঁজ করা যাক।”
দস্যুলোকটা বলল, “খোঁজ করতে হবে না। চলো, আমার একটা সরাইখানা জানা আছে। সেখানেই থাকা যাবে।”
“বেশ, তাই চলুন। বলে রূপচাঁদ সেই লোকটার সঙ্গে অন্ধকার থেকে আলোয় বেরিয়ে এল। সরাইখানার দিকে চলল। রাতের বেলা অনেক মানুষের মাথা গোঁজার আশ্রয় এটা। বলা যায়, আশ্ৰয়টা মন্দের ভাল।
সে-রাতে তেমন আর ঘুম হয়নি রূপচাঁদের। চোখে ঘুম আসে না। যতবার সে ঘুমোবার জন্যে চোখ বুজেছে, ততবারই চমকে-চমকে ঘুম ভেঙে গেছে। উত্তেজনা যেন বাগ মানে না তার। কাজেই, ঘুমও আসে না। অথচ দস্যুলোকটা চুটিয়ে ঘুমিয়েছে, তার পাশে পড়ে-পড়ে। আশ্চর্য, একটুও ভয় নেই মনে!
খুব ভোরে রূপচাঁদ উঠে পড়েছিল। চোখে ঘুম না-এলে যা হয়! কী হবে ঝুটমুট পড়ে থেকে! দস্যুটা তখনও নাক ডাকাচ্ছে। পারে বটে! রূপচাঁদ ঠেলা দিতে তবে সে উঠল। উঠল মানে, একেবারে ধড়ফড়িয়ে! রূপচাঁদ তার কানের কাছে মুখ এনে খানিকটা ইশারায় আর খানিকটা চাপা স্বরে বলল, “আপনার দেখছি কোনও ভয়ডর নেই। এমন বেহুঁশের মতো নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন কী করে? দস্যু বলে আপনাকে কেউ চিনে ফেললে, পিঠের ছালচামড়া তুলে নেবে। আপনার সঙ্গে আমাকেও ধোলাই দিতে ছাড়বে না। আমি তো মশাই ভয়ে সারারাত ঘুমোতেও পারিনি। সময় গুনেছি মটকা মেরে শুয়ে-শুয়ে। যাই হোক, এখন আমি তৈরি হয়ে নিই তাড়াতাড়ি। ছেলেটার হালচালের একটু খোঁজখবর নিতে হবে তো! আপনি কী করবেন?”
“তাই তো ভাবছি। তোমার সঙ্গে আমার যাওয়াটা মোটেই ঠিক হবে না। কী বলো?” দস্যুলোকটা চোখ কচলে রূপচাঁদের মুখের দিকে তাকাল।
“খেপেছেন!” উত্তর দিল রূপচাঁদ।
“তা হলে কী করা যায় বলো তো?” সে জিজ্ঞেস করল।
রূপচাঁদ বলল, “আপনি এই সরাইখানাতেই অপেক্ষা করুন। আমি দেখি কতদূর কী করতে পারি।”
“সেই ভাল,” ডাকাত লোকটা সায় দিল। তারপর বলল, “দেখো শিকার যেন ফসকে না যায়!”
রূপচাঁদ ভেতরে-ভেতরে কী ভাবল কে জানে! তেরছা চোখে দস্যুলোকটার দিকে তাকাল একবার। তারপর বলল, “আপনি পাগল হয়েছেন! আর ফসকাতে দিচ্ছে কে! একবার যখন নজরে পড়েছে, তখন দেখুন, কেমন খেলিয়ে তুলি।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই রূপচাঁদ তৈরি হয়ে সার্কাসের তাঁবুর দিকে হাঁটা দিল। আর সেই দস্যুলোকটা উত্তেজনায় প্রায় দমবন্ধ করে সেই সরাইখানায় অপেক্ষা করতে লাগল।

তাঁবুর দিকে যেতে-যেতে একটা সোনা-চাঁদির দোকান খুঁজে বার করল রূপচাঁদ। দস্যুসর্দারের সেই টাকা দিয়ে দোকান থেকে একটা সোনার মেডেল কিনল। মেডেল নিয়ে সিধে চলে গেল সার্কাসের চত্বরে। চত্বরে ঢুকেই সামনে দেখতে পেল সার্কাসের অফিস। অফিসের ভেতরে এক কর্তাব্যক্তি লোকের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিল। কাল সার্কাস দেখে তার কী ভালই না লেগেছে, সেই কথা বলতে-বলতে যেন আহ্লাদে মাতন শুরু করে দিল। রূপচাঁদ যতই তাদের প্রশংসা করছে, কর্তাব্যক্তি লোকটা ততই মুচকি-মুচকি হাসছে। মাথা দোলাচ্ছে। ধন্যবাদ দিচ্ছে। শেষমেশ কর্তাব্যক্তিটি যখন শুনল, রূপচাঁদ ট্র্যাপিজের ওপর খেলা দেখানো সেই ছেলেটিকে একটি সোনার মেডেল দিতে চায়, সেও তখন আহ্লাদে আট দুকুনে ষোলোখানা হয়ে হাঁক পাড়ল, “সজল!”
নামটা শুনে ধক করে চমকে উঠল রূপৰ্চাদের বুকের ভেতরটা। তবে তো ঠিকই বলেছে ওই দস্যুলোকটা।
সজল ডাক শুনে হাসতে-হাসতে ছুটে এল। চমৎকার ফুটফুটে একটি ছেলে। রূপচাঁদ যেমন শুনেছে, ঠিক তেমনই দেখতে তাকে।
কর্তাব্যক্তিটি খুশিতে ডগমগ করতে-করতেই বলল, “দ্যাখো, ইনি তোমার জন্যে কী এনেছেন!”
এতক্ষণ থ হয়ে দেখছিল রূপচাঁদ ছেলেটিকে। হঠাৎ কর্তাব্যক্তির কথা শেষ হতে রূপচাঁদ খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠল। ছেলেটির গলায় সোনার মেডেল ঝুলিয়ে বলল, “তোমার খেলা দেখে আমার কাল যে কী আনন্দ হয়েছে কী বলব! তাই তোমাকে আমি এই মেডেলটি উপহার দিলুম।”
সজল, নামের ওই ছেলেটি তখন আনন্দে উচ্ছল। সে কর্তাব্যক্তিটিকে দেখিয়ে বলল, “উনিই আমাকে ট্রাপিজের খেলা শিখিয়েছেন।”
রূপচাঁদ তখন কর্তাব্যক্তিটির তারিফ করে উঠল একগাল হেসে। বলল, “বাহ্, আপনার তো বাহাদুরি আছে মশাই।”
কর্তাব্যক্তিটি উত্তর দিল, “আপনি আমার বাহাদুরিই দেখলেন। কিন্তু ওর বাহাদুরিটা দেখলেন না। গুণ না থাকলে এমন একটা শক্ত খেলা ও রপ্ত করতে পারত! তা ছাড়া শিখেছেও কত কম সময়ে।”
রূপচাঁদ বাহবা দিয়ে ছেলেটির দুটি কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিল।
সজলের সে কী হাসি!
শুধু সজল কেন, সেই সার্কাসের সব মানুষ আনন্দে ছুটে এসে হল্লা জুড়ে দিল। সজলের গলায় সেই সোনার মেডেল দেখে তাদের সে কী উল্লাস!
তারপর?
সেই প্রথম দিনেই রূপচাঁদের সঙ্গে সজলের বন্ধুত্ব হয়ে গেল। কত কথা হল, এটা-ওটা। কত গল্প হল, নানা জানা-অজানার। যেন শেষ নেই তার।
না, আর বেশিক্ষণ থাকা নয়। রূপচাঁদ বলল, “এবার যাব আমি।”
ব্যস, রূপচাঁদের মুখে যেই না যাওয়ার কথা শোনা, অমনই সজলের মুখভার।
কর্তাব্যক্তিটি রূপচাঁদের হাতে হাত মিলিয়ে উত্তর দিল, “যাচ্ছেন, যান! কিন্তু দেখতে পাচ্ছেন কি সজলের মুখ কেমন ভার হয়ে গেল?”
রূপচাঁদ সঙ্গে-সঙ্গে সজলের চিবুকটি ছুঁয়ে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে বলল, “মনখারাপ হয়ে গেল বুঝি?”
বলতে-না-বলতেই সজলের চোখ টসটস করে উঠল।
এবার সজলকে জড়িয়ে ধরে রূপচাঁদ হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “এই দ্যাখো! ছিঃ! বাহাদুর ছেলের চোখে জল দেখলে লোকে কী বলবে!”
এবার সত্যিই সজলের চোখ উপচে জল গড়াল।
রূপচাঁদ তার চোখের জল মুছিয়ে দিতে-দিতে বলল, “আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে আমি আবার আসব।”
কর্তাব্যক্তিটি বলল, “হ্যাঁ মশাই, মনে করে সত্যিই আসবেন। আপনাকে ওর ভাল লেগে গেছে। আসলে ছেলেমানুষ তো। আপনজনকে অনেকদিন না-দেখতে পেলে, যা হয়। একটু ভালবাসা পেলেই, পরকে আপন করে ফেলে।”
রূপচাঁদ চকিতে একবার কর্তাব্যক্তিটির মুখের দিকে তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। তারপর সজলের মুখের দিকে চেয়ে অন্য কোনও কথা না জিজ্ঞেস করে বলল, “হ্যাঁ, সে তো বটেই৷”
সজল এবার রূপচাঁদের দুটি হাতে নিজের হাত রেখে খুব নরম গলায় বলল, “আসবে তো?”
রূপচাঁদ আবার ওর চিবুকে হাত দিয়ে আদর করে বলল, “নিশ্চয়ই আসব।”
সরাইখানায় অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে-করতে দস্যুলোকটা আর যেন পারছিল না। তার ভীষণ ছটফটানি ধরে গেছল। তাই, যখনই সে রূপচাঁদকে সরাইখানায় ঢুকতে দেখল, তখনই সে প্রায় পড়িমরি করে ছুটে গেল তার কাছে। রূপচাঁদ চোখ মটকে তাকে সাবধান করে দিল। নিচু স্বরে বলল, “অত অস্থির হলে, লোকে সন্দেহ করবে। সবুর করুন। সব বলছি আপনাকে। কাজটা অনেকখানি এগিয়েছে।”
সে উদ্গ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কতটা এগিয়েছে?”
রূপচাঁদ উত্তর দিল, “ছেলেটির কাছে রোজ যাওয়ার আমি একটা পাকা ব্যবস্থা করে ফেলেছি।”
“শাবাশ!” দস্যুলোকটা যেন খুশি চাপতে পারছে না।
হ্যাঁ, পরদিন থেকে রূপচাঁদ রোজই যাওয়া শুরু করল সজলের। কাছে। প্রথম-প্রথম কর্তাব্যক্তিটি খুবই নজর রাখত তার ওপর। তারপর যখন দেখল রূপচাঁদের সত্যি-সত্যি অন্য কোনও মতলব নেই, তখন সজল রূপচাঁদের সঙ্গে তার চোখের আড়ালে চলে গেলেও সে সন্দেহ করত না। আর এমনই করে একদিন আড়ালে গিয়ে রূপচাঁদ তাকে জিজ্ঞেস করে বসল, “তুমি সার্কাসে এলে কী করে?”
সজল তখন রূপচাঁদকে বলে ফেলল সব কথা। বলল, কেমন করে দস্যুরা তাদের বাড়িতে হানা দিয়েছিল। কেমন করে তারা তার বাবাকে আঘাত করেছিল। কেমন করে তাদের সব জিনিস লুঠপাট করে সজলকে ধরে নিয়ে গিয়ে ডেরায় বন্দি করে রেখেছিল। সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে সেখান থেকে কেমন করে পালিয়েছিল, বলল সে-কথাও। তারপর সে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে এদিক-ওদিক কতদিন। তন্নতন্ন করে খুঁজেছে মাকে আর দিদিদের। এত খুঁজেও তাদের যে সন্ধান সে করতে পারেনি, এ-কথা বলতে-বলতে সে ডুকরে কেঁদে ফেলল।
রূপচাঁদ তার সব কথা নিঃশব্দে শুনল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তুমি যখন মাকে খুঁজে পেলে না, তখন কী করলে?”
সজল কান্না গিলে উত্তর দিল, “তখন আমি হারিয়ে গেছি। কোনখানে জানি না। ক’দিন কিচ্ছু খাইনি। খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার। একটু হাঁটলেই দম ফুরিয়ে যাচ্ছিল। পা যখন আর চলছিল না, একটা গাছের নীচে বসে পড়লুম। বসেও থাকতে পারলুম না। আমাকে শুতেই হল। তারপর আমার আর কিছুই মনে নেই। আমার যখন ঘুম ভাঙল, তখন আমি চমকে উঠেছিলুম বাঘের ডাক শুনে। আসলে সে বাঘটা কোনও বনের নয়, এই সার্কাসেরই বাঘ। আমি যে কেমন করে এই সার্কাসে এলুম, কিছুই আন্দাজ করতে পারছিলুম না। কিন্তু পরে আমি জানতে পারলুম, একটা লোক এখানে আমাকে নিয়ে এসেছিল। তাকে অনেক টাকা দিয়ে এরা আমাকে এখানে রেখে দেয়। আমি অনেক কান্নাকাটি করলুম। মায়ের কাছে যাওয়ার জন্যে বায়না ধরলুম। কিছুতেই কিছু হল না। এরা আমায় ভয় দেখাল। বলল, কান্নাকাটি করলে মেরে ফেলবে। আমি তখন আর ভয়ে কাঁদতে পারি না। এদের চোখে-চোখে আমি বন্দি হয়ে রইলুম। তারপর যখন অনেকটা সয়ে গেল, তখন এরা আমায় এটা-ওটা কাজ করাতে লাগল। মাকে আর দিদিদের আর কোনওদিন খুঁজে পাব না ভেবে, এইখানেই রয়ে গেলুম। কিছু না হোক, এরা তো খেতে দেবে। শেষমেশ ধীরে-ধীরে খেলা শিখলুম। ট্রাপিজের খেলা। আমার খেলা দেখে লোকের মুখে-মুখে ছড়িয়ে গেল প্রশংসা। আমার নাম হয়ে গেল ‘সার্কাসের ছেলে’।” বলতে-বলতে আবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।
এবার রূপচাঁদ আর দোনোমনা করল না। মনে-মনে ভাবল, আর দেরি করা ঠিক হবে না। তাই সে এদিক-ওদিক দেখে বলেই ফেলল, “সজল, আমি তোমার মায়ের কাছ থেকেই আসছি।”
চমকে উঠল সজল। চোখের জল তার থমকে গেল। জ্বলজ্বল করে উঠল তার চোখের দৃষ্টি। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সে রূপচাঁদের দিকে।
রূপচাঁদ তার জামার নীচে, বুকে লুকনো সজলের ছবিটা বার করল। বলল, “এই দ্যাখো, তোমার ছবি। তোমাকে খুঁজে বার করার জন্যে তোমার মা আমাকে দিয়েছেন।”
সজল রূপচাঁদের হাতে নিজের ছবিটা দেখল। তারপর ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমার মা কোথায়?”
রূপচাঁদ উত্তর দিল, “তোমার দিদিদের নিয়ে, তিনি এক গভীর বনের ভাঙা বাড়িতে লুকিয়ে আছেন।”
“আমায় এক্ষুনি সেখানে নিয়ে চলো!” আকুল হয়ে সে রূপচাঁদের হাতদুটি জড়িয়ে ধরল।
রূপচাঁদ দৃঢ় গলায় আশ্বস্ত করল সজলকে। বলল, “হ্যাঁ, আমি তোমাকে, তোমার মায়ের কাছেই নিয়ে যেতে এসেছি। কিন্তু এরা তোমায় কিছুতেই ছাড়বে না। তোমায় আমার সঙ্গে লুকিয়ে পালাতে হবে। তা-ও এখন এই দিনের আলোয় সে কাজ করা যাবে না। অন্ধকার রাতে আমাদের পালাতে হবে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে। পারবে?”
“হ্যাঁ, পারব।” বীরের মতো বুক ফুলিয়ে সে কঠিন গলায় উত্তর দিল।
“কেমন করে পারবে? রাত্তিরে তো সার্কাসে পাহারা থাকে!”
সজল উত্তর দিল, “নামেই পাহারা। সবাই বসে-বসে ঘুমোয়। আমি ঠিক পারব।”
রূপচাঁদ বলল, “পাহারাদাররা ঘুমোলে কী হবে, গেটে তো তালা-চাবি দেওয়া থাকে। সার্কাসের গোটা চত্বরটাই তো টিন দিয়ে ঘেরা।”
সজল, রূপচাঁদকে সাহস দিল। বলল, “কিচ্ছু ভেবো না তুমি, কোথাও-কোথাও টিনে ফাঁক আছে। আমি সেই ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাব। এসো, আমি তোমায় দেখিয়ে দিচ্ছি।” বলে, সজল সত্যি-সত্যি একটা টিনের ফাঁকের কাছে নিয়ে গেল রূপচাঁদকে।
ফাটা টিনের সেই ফাঁক দেখে উত্তেজনায় মন তোলপাড় করে উঠল রূপচাঁদের। তবু মনকে শক্ত করে সে বলল, “ঠিক আছে! শোনো, রাত্তিরে যখন সার্কাস চলবে, আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব ঠিক এই ফাঁকটার সামনে। তোমার খেলা শেষ হয়ে গেলে, সবাই যখন অন্য খেলায় ব্যস্ত থাকবে, সেই তক্কে তুমি টিনের এই ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসো। খুব সাবধান! কেউ না টের পায়! তা হলে সব ভেস্তে যাবে। বিপদে পড়ব দু’জনেই।”
সজল রূপচাঁদকে আশ্বাস দিয়ে বলল, “না, না, কেউ জানতে পারবে না।”
রোজ যেমন হয়, আজও তেমনই হল। সরাইখানায় পৌঁছনোর সঙ্গে-সঙ্গে রূপচাঁদকে উদ্গ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল সেই দস্যুলোকটা, “কতদূর এগোল?”
রূপচাঁদ উত্তর দিল, “অনেকটা। আর দু-একটা দিন ধৈর্য ধরতে হবে।”
দস্যুলোকটা ব্যস্ত হল। জিজ্ঞেস করল, “তা হলে, আজকালের মধ্যে কিছু হচ্ছে না?”
“এটা এমন একটা কাজ যার পদে-পদে বিপদ। এমন কাজ হাসিল করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, বুঝলেন!” উত্তর দিল রূপচাঁদ। তারপর বলল, “দেখি, আজ রাত্তিরে একবার যাব। আমি সার্কাসের কর্তাব্যক্তিটিকে বলেছি, তাঁদের ওই সার্কাসের দলে আমাকে একটা কাজ দিতে। লোকটি আমাকে খুব বিশ্বাস করে ফেলেছেন। কাজটা যদি পাকা হয়ে যায়, তবে আর ভাবনার কিছু থাকে না। ছেলেটাকে গোপনে ঠিক বার করে আনব।”
দস্যুলোকটি মনে হল, রূপচাঁদের কথা শুনে খুবই খুশি। তাই উত্তরটাও সে খুশি-খুশি গলায় দিল, “বাহ্, তোমার বুদ্ধির তারিফ না-করে থাকা যায় না।” তারপর একটু থেমে রূপচাঁদের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি হিরের হারটার কোনও খোঁজ পেলে?”
“না, এখনও পাইনি।”
“সেইটা দেখো, যেন হাতছাড়া না-হয়ে যায়!”
রূপচাঁদ উত্তর দিল, “ছেলেটাকে হাতে পেলে, হারটাও আপনা থেকেই হাতে আসবে। ঘাবড়াবার কিছু নেই।” বলে হাসল রূপচাঁদ।

সূর্য ডুবেছে অনেকক্ষণ। রাত্তির তখনও খুব একটা হয়নি। এই সময়ে পুরোদমে সার্কাসের খেলা চলছে। তাঁবুর চারদিকে আলোয় আলো। আলোর সাজ দেখলেই চক্ষুস্থির। রূপচাঁদ সেই আলো দেখতে-দেখতেই কথামতো ভাঙা টিনের ফাঁকটার কাছে এসে হাজির। এই দিকটাই একটু যা আঁধার-আঁধার। লোকজনও তেমন নেই। এটাই সার্কাস-তাঁবুর পেছন দিক। যত ভিড় সামনে। ফটকের কাছে।
বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হয়নি রূপচাঁদকে। হঠাৎই সে শুনতে পেয়েছিল টিনের ঠিন-ঠিন শব্দ। চমকে তাকাল রূপচাঁদ সেদিকে। দেখল, সজল বেরিয়ে আসছে। তার গায়ে এখন আর সেই সাদা ধবধবে খেলা দেখানোর পোশাক নেই। সাধারণ প্যান্ট, শার্ট। সঙ্গে-সঙ্গে তাকে আড়াল করে দাঁড়াল রূপচাঁদ। তারপর চারদিকটা ভালভাবে পরখ করে হাঁটতে লাগল। কারও মুখে কোনও কথা নেই। ভেতরে-ভেতরে ভীষণ উৎকণ্ঠা। কেউ না দেখে ফেলে চিনে ফেললেই বিপদ। সুতরাং যতটা পারো মুখ লুকিয়ে হাঁটো। আজ রাতটা কোথাও গোপনে থাকতে হবে। কাল ভোর হলেই সেই বনের নদীর তীর ধরে হাঁটতে হবে। পথটা রূপচাঁদের স্পষ্ট মনে আছে। সুতরাং বনে হারিয়ে যাওয়ার কোনও ভয় নেই আর। তাই, রূপচাঁদ ঠিক করল, শহর থেকে বেরিয়ে সে অন্য কোথাও নয়, নদীর ধারেই যাবে। সেখানেই সে আজ রাতটা নিরাপদে কাটাবার জন্যে একটা জায়গা খুঁজে নেবে। এই ভেবেই সে শহর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথটাই ধরল। এতক্ষণ মুখে একটি কথাও ছিল না। হঠাৎ সজলই চুপিসারে প্রথম কথা কইল, “এদিকে কোথায় যাচ্ছ?”
“তোমার মায়ের কাছে।”
“এদিকেই মা থাকে?”
“হ্যাঁ, তবে এখান থেকে আরও অনেক দূর। নদীর তীর ধরে যেতে হবে। আজ রাতটা আমরা নদীর কাছাকাছি কোথাও লুকিয়ে থাকব। কাল সকাল থেকেই হাঁটা দেব।”
“নদীর কাছে লুকিয়ে থাকার জায়গা আছে?”
“চলো, দেখি।”
“কোথায় যাচ্ছ?” হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন হাঁক পাড়ল। মনে হল সে যেন হাঁপাচ্ছে।
চমকে উঠল রূপচাঁদ। পিছু ফিরে দেখে সেই দস্যুলোকটা।
ভয়ে কুঁকড়ে গেল সজল। সে স্পষ্ট চিনতে পারে দস্যুলোকটাকে।
দস্যুলোকটা হাঁপাতে-হাঁপাতেই বলল, “তুমি ভেবেছিলে আমাকে ভড়কি দিয়ে পালাবে! এঁ!” বলতে-বলতে সে হেসে উঠল হা-হা করে। তারপর আবার বলল, “আমি দস্যু। দস্যুর চোখে ধুলো দেওয়া অত সহজ নয়! আমি এতদিন ধরে তোমার সব চালচলন আগাগোড়া লক্ষ করে এসেছি। আজও তোমার পিছু নিয়েছিলুম আমি৷ দেখছিলুম, তুমি কী করো। তুমি কী করে বুঝলে, আমি দস্যু হয়ে তোমাকে এতটা বিশ্বাস করব? কী করে ভাবলে, আমি এত বোকা! যদি ভাল চাও তো ছেলেটাকে আমার হাতে তুলে দাও! আর তা যদি না দাও, তো ওর কাছে যে হিরের হারটা আছে সেটা আমাকে দিতে বলো! নইলে, আমি তুলকালাম বাধিয়ে ছাড়ব!”
চোখের পলকে রূপচাঁদ দস্যুলোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
আতঙ্কে থরথর করে কেঁপে উঠল সজল।
চিৎকার করে উঠল দস্যুলোকটা।
তার মুখের চিৎকার চেপে ধরল রূপচাঁদ হাত দিয়ে।
লেগে গেল মারামারি।
পড়ে গেল দু’জনেই মাটির ওপর।
শুরু হয়ে গেল তুমুল লড়াই।
লোকটা রূপচাঁদের গলা খামচে ধরে।
রূপচাঁদ আঁকপাক করতে-করতে তার পেটে মারে ঘুসি।
লোকটা ককিয়ে ওঠে।
রূপচাঁদ লোকটার চুলের মুঠি ধরে একটার পর একটা ঘুসি চালায়।
হেরে গেল লোকটা।
হ্যাঁ, রূপচাঁদ ঘায়েল করতে পেরেছে দস্যুলোকটাকে। যতই হোক সে চাষি। লাঙল ধরে-ধরে লোহার মতো শক্ত হয়ে গেছে তার হাতের পাঞ্জা। লাঙলের ফলার মতো তীক্ষ্ণ তার হাতের আঙুল। একটা দস্যু কেন, একসঙ্গে চারটে দস্যুকে ঘায়েল করার ক্ষমতা ধরে সে।
মনে হল, দস্যুটার মাথা ফেটেছে।
রূপচাঁদেরও নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে।
রূপচাঁদ চোখের পলকে সজলের হাতটা চেপে ধরল। ছুট দিল। ছুটতে-ছুটতে বলল, “চলো, পালাতে হবে।”
ছুটল তারা।
হঠাৎ দস্যুটা চেঁচিয়ে উঠল, “ছেলে চোর! ছেলে চোর! পালাচ্ছে! পালাচ্ছে!”
দেখতে-দেখতে লোক জমে গেল।
দেখতে-দেখতে সার্কাসের তাঁবুতে খবর পৌঁছে গেল।
দেখতে-দেখতে কয়েকশো মানুষ সেই রাতের ছায়ায় রূপচাঁদ আর সজলের পিছু নিল।
ছুটতে-ছুটতে দম যেন আর মানে না সজলের।
ছুটতে-ছুটতে হাঁপিয়ে পড়ে রূপচাঁদ।
কয়েকশো লোক চিৎকার করে, “চোর! চোর!”
ছুটতে-ছুটতে বনের অন্ধকারে ঢুকে পড়ল সজল আর রূপচাঁদ।
কয়েকশো লোকের দু-একশো তবুও তাড়া করতে ছাড়ে না।
তাড়া খেয়ে রূপচাঁদ আর সজলও বনের ঝোপেঝাড়ে হোঁচট খায়। পড়তে-পড়তে আবার ওঠে, আবার ছোটে।
অন্ধকার! আরও অন্ধকার!
আরও, আরও অন্ধকার!
অন্ধকারে ওটা আবার কী দেখা যায়!
অন্ধকারে মনে হয় যেন সেই কালো বেড়ালটার চোখ জ্বলছে!
দেখতে পায় সজল। সে চেঁচিয়ে ওঠে, “আমার কালো বেড়াল!”
ছুটতে-ছুটতে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়ায় রূপচাঁদ। জিজ্ঞেস করে, “ওই কালো বেড়াল তোমার?”
“হ্যাঁ।”
বলতে-না-বলতেই বেড়াল ছুটে এসে লাফিয়ে ওঠে সজলের কোলে।
সজল তাকে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে।
বেড়াল আবার লাফিয়ে নামে মাটিতে। ছুট দেয় সামনে।
সজলও ছোটে তার পেছনে।
রূপচাঁদ চেঁচায়, “সজল, ও তোমায় মায়ের কাছে নিয়ে যাবে।”
সজল উত্তর দিল, “হ্যাঁ জানি। তুমিও সঙ্গে এসো!”
রূপচাঁদ উত্তর দিল, “সজল তুমি এগিয়ে যাও। আমি যাচ্ছি।”
“ঠিক আছে।” বলতে-বলতে সজল এগিয়ে গেল।
হঠাৎ একটা পাথর এসে পড়ল। একেবারে রূপচাঁদের পায়ের ওপর। আঃ! যেন ভেঙে গেল তার পায়ের হাড়!
একশো লোক তেড়ে আসছে তীরবেগে।
ভাঙা পায়ে রূপচাঁদ যেন আর ছুটতে পারে না।
একশো লোক তাকে ঘিরে ফেলল।
ততক্ষণে সজল তাদের নাগালের অনেক বাইরে চলে গেছে।
একশো লোক তখন একটা লোককেই ধরে নিয়ে গেল পুলিশের কাছে।

হাজতে বন্দি হয়ে রইল রূপচাঁদ। বিচারে ছেলেচোরের সাজা হল তিন বছর কয়েদ খাটার। কয়েদে সে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ঘানি টানতে লাগল।
তারপর?

দেখতে-দেখতে তিনটে বছর কেটে গেল। এই তিন বছরে সে খবর জানে না তার ছেলের, বউয়ের। তিন বছরে ছেলে তার কতটা ডাগর হয়েছে কে জানে! বয়স তার কোন না পাঁচ-ছয় হয়েছে। ছিঃ! একদিন আরও বড় হলে সে যখন জানবে তার বাবা চুরির দায়ে কয়েদ খেটেছে, তখন কী লজ্জা! সে যে চুরি করেনি, এ-কথা বললেও কি বিশ্বাস করবে? পাড়ার লোকেরাও যে সবাই তাকে ধিক, ধিক করবে! রূপচাঁদ কী করে তাদের সামনে দাঁড়াবে! তা হলে সে এখন যাবে কোথায়? যাবে নাকি সে বনের ভেতর সেই ভাঙা বাড়িতে! দেখতে যাবে নাকি, মায়ের কাছে সজল এখন কেমন আছে! হ্যাঁ, সেই ভাল।
না, সেই দস্যুসর্দারের দেওয়া একটা টাকাও এখন তার কাছে নেই। সব লুঠ হয়ে গেছে। যাকগে, ভালই হয়েছে। অবশ্য, এখন দুটো-চারটে টাকা পকেটে থাকলে কয়েদ খাটতে-খাটতে গালভর্তি যে দাড়ি গজিয়েছে, সেগুলো কেটে ফেলতে পারত। কয়েদখানায় তাকে একদিনও উপোসী থাকতে হয়নি। এখন তাকে উপোস করে থাকতে হবে। কী আর করা! তিন-চারদিন পেটে কিছু না-পড়লে, সে মরে যাবে না! একবার সজলদের সেই ভাঙা বাড়িতে পৌঁছতে পারলে খিদের জ্বালা নিয়ে আর হা-হুতাশ করতে হবে না তাকে। এইসব কথা ভাবতে-ভাবতে সে বনেই ঢুকল।
দেখেছ, এই দিনদুপুরে একফোঁটাও রোদ নেই আকাশে! কাল থেকেই আকাশ যেন মুখভার করে আছে। আকাশের কী মরজি কে জানে!
রূপচাঁদ জানে, আকাশের কী মরজি। এই আকাশ যে প্রলয় ঘটাতে পারে, সেই ভয়টা আকাশ দেখেই বুঝতে পারল রূপচাঁদ। এখন ভালয়-ভালয় ভাঙা বাড়িতে পৌঁছতে পারলে হয়!
হ্যাঁ, রূপচাঁদ ভালয়-ভালয়ই পৌঁছল। কিন্তু ভাঙা বাড়ির অন্দরে একটি প্রাণীরও সে দেখা পেল না। সেখানে সজলও সেই, নেই তার মা আর দিদিরাও। সারা বাড়ি খাঁ-খাঁ করছে। নেই সেই কালো ঘোড়াটা পর্যন্ত।
আচ্ছা, মনে হচ্ছে কি, ঝড় উঠবে! হাওয়াটা কেমন যেন গোলমেলে ঠেকছে! দরকার নেই বাবা আর বনে থেকে! রূপচাঁদ তাই আর দাঁড়াল না। কিন্তু সে যাবে কোথায়? সে কি তবে নিজের বাড়িতেই ফিরে যাবে!
দ্যাখো, বাতাস যেন একটু-একটু তার তেজ দেখাচ্ছে! না, নির্ঘাত ঝড় উঠবে। রূপচাঁদ হনহনিয়ে হাঁটা দিল।
কিন্তু হাঁটলে কী হবে, রূপচাঁদ পারল না বন থেকে বেরিয়ে যেতে। হঠাৎ যেন সমস্ত বন কাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঝড়।
ছুট দিল রূপচাঁদ।
বনের ঝুঁটি নাড়া দিতে-দিতে ঝড় ছুটে চলে।
অন্ধ হয়ে যায় রূপচাঁদের চোখ ধুলোর ঝাপটায়।
ভেঙে পড়ে গাছের ডাল।
ভাগ্যিস, ঘাড়ে পড়েনি রূপচাঁদের!
সারা আকাশ ঝলসে বিদ্যুৎ চমকায়!
চমকে ওঠে রূপচাঁদের বুক।
বাজ পড়ে প্রচণ্ড শব্দে দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে, কড়-কড়-কড়াত!
দাঁতে দাঁত লেগে যায় যেন রূপচাঁদের, ভয়ে, শব্দ শুনে।
দুরন্ত হয়ে ওঠে ঝড়ের গতি।
সামলাতে পারে না রূপচাঁদ ঝড়ের ধাক্কা।
মড়মড় করে উপড়ে পড়ে গাছের গুঁড়ি।
রূপচাঁদ ঠিকরে পড়ে বেসামাল হয়ে।
বৃষ্টি নামল আকাশ ভেঙে ঝমঝমিয়ে।
ভিজে ঢোল হয়ে গেল রূপচাঁদ। কাদাজলে নাস্তানুবাদ হয়ে খুঁজে বেড়ায় আশ্রয়। পায় না। ঝড়ে-জলে বিধ্বস্ত হয়ে সে লুটোপুটি খায় মাটিতে। কখনও সে সাপটে ধরে গাছের গুঁড়ি। কখনও সে লুকিয়ে পড়ে ঝোপের আড়ালে। ছড়ে যায় গা, হাত, পা। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে সে চিৎকার করে, “বাঁচাও-ও-ও!”
হাজার-হাজার কামানের গোলার মতো শব্দ তুলে যে-বাজ আকাশ কাঁপায়, সেই শব্দের কাছে রূপচাঁদের গলা যেন মিনমিন করে উঠল।
বৃষ্টির জল জমে-জমে বন ছাপিয়ে ওঠে। আর বুঝি লড়াই করতে পারে না রূপচাঁদ। সে বোধ হয় হেরে গেল। পিছলে পড়ে তার পা কাদায়। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় সে। আবার ওঠে টলতে-টলতে। পা চলে না আর। কেমন যেন অসাড় হয়ে যায় সারা শরীর।
এ কী! কী দেখে রূপচাঁদ সামনে, হঠাৎ! এই দুর্যোগে কোথা থেকে এল সেই কালো ঘোড়াটা! কোথায় ছিল সে? ঝড়ের ঝাপটায় সে-ও বুঝি ধ্বস্ত হয়ে গেছে! সেই তেজীয়ান ঘোড়ার এ কী চেহারা হয়েছে! ডিগডিগে রোগা! যেন কতদিন খেতে পায়নি!
রূপচাঁদ তাকে দেখে উঠে দাঁড়াল।
ঘোড়া রূপচাঁদকে দেখে হাঁটা থামাল।
উফ! এতক্ষণ, একলা, কী ভয়ঙ্কর আতঙ্কে আনচান করছিল রূপচাঁদের সারা মন। এখন সে একটা প্রাণীর দেখা পেল! হলেই বা জন্তু, তবু মনে হল, সে যেন কতদিনের বন্ধু। বুঝি তার প্রাণ বাঁচাতে এসেছে সে ধ্বংসকারী এই ঝড়ের তাণ্ডবকে তুচ্ছ করে। আঃ! ঘোড়ার গলায় হাত বুলিয়ে রূপচাঁদ আদর করল ঘোড়াকে। তারপর তার পিঠে উঠে পড়ল। ঝড়কে পায়ে ঠেলে ঘোড়া ছুটল বনের বাইরে।
রূপচাঁদ চিৎকার করে উঠল, “ঘোড়া, আমি বাড়ি যাব, আমার ছেলের কাছে। ছেলের মার কাছে। সেখানে আমায় নিয়ে যাবি?”
বন পেরোল ঘোড়া।
তবু ঝড় থামল না।
শহর পেরোল ঘোড়া।
তবু বৃষ্টি কমল না।
রূপচাঁদের গ্রামে পৌঁছল ঘোড়া।
রূপচাঁদ তার ঘর চিনতে পারল না!
চেনা যায় না। যেদিকে তাকায় রূপচাঁদ, দেখে ঘর-বাড়ি সব ভেঙে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ঝড়ে, বৃষ্টিতে, বজ্রপাতে! ভেসে গেছে জমিজমা। হাহাকার পড়ে গেছে চারদিকে।
বুক শুকিয়ে যায় রূপচাঁদের। আর্তনাদ করে ওঠে, বাড়ি ভাঙে, ভাঙুক। ঘর যায়, যাক! কিন্তু তার ছেলে কোথা গেল? আর তার মা?
কেউ জানে না, কোনখানে গেছে তারা! যে বেঁচে আছে সে শুধু নিজের প্রাণ বুকের মধ্যে আগলে নিয়ে, নিজের ঘর খোঁজে। সে জানে, যে নেই, সে হারিয়ে গেছে। না-হয় চাপা পড়েছে ভাঙা ঘরের ছড়িয়ে পড়া স্তূপের নীচে।
“না-আ-আ-আ!” গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল রূপচাঁদ। না, না, সে তাদের হারিয়ে যেতে দেবে না। কিছুতেই না।
ঘোড়া ছোটায় রূপচাঁদ। ঢুঁড়ে ফেলে সে দিশেহারা হয়ে চৌদিক। সে চিল-চেঁচিয়ে হাঁক পাড়ে তার ছেলের নাম ধরে, “চঞ্চল-ল-ল-ল!”
ঝড় তার গলার শব্দ গিলে ফেলে। তবু সে চিৎকার করে। তবু সে ঘোড়া ছোটায় ঝড় আর জলকে অগ্রাহ্য করে!
এমন সময় হঠাৎ—হ্যাঁ, হঠাৎই রূপচাঁদ থমকে থামে। হঠাৎই সে চমকে তাকায়। হঠাৎই যেন তার চোখে পড়ল, জল-উপচানো মাঠে কে যেন ডুবে আছে! মুখ তুলে! কে যেন কাঁদে! ছুটে যায় ঘোড়া সেইদিকে। নেমে পড়ে রূপচাঁদ ঘোড়ার পিঠ থেকে। তুলে নেয় তাকে বুকে। এ কী! এ যে তারই ছেলে!
ছেলেকে কোলে নিয়ে আবার সে ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়ে হন্তদন্ত হয়ে। আবার সে ঢুঁড়ে ফেলে চারদিক। ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করতে-করতে খুঁজে বেড়ায় ছেলের মাকে।
হ্যাঁ, খুঁজে পেয়েছে সে। ওখানে ও কে পড়ে আছে! ওই তো, ওই তো তার ছেলের মা। পড়ে আছে যুদ্ধে বিধ্বস্ত যেন এক সৈনিক। রূপচাঁদ তাকেও তুলে নিল ঘোড়ার পিঠে। তারপরেই কার যেন আর্তনাদ শুনতে পেল রূপচাঁদ, “বাঁধ ভেঙে গেছে! পালাও! পালাও! জলোচ্ছ্বাস ধেয়ে আসছে!”
রূপচাঁদ চোখের পলকে লাফিয়ে উঠল ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়া ছোটাল তীরবেগে। পারল না জলোচ্ছ্বাস ঘোড়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে। জলোচ্ছ্বাস মাঠ-ঘাট ভাসিয়ে যতই দ্রুত ধেয়ে আসে, ঘোড়াও যেন ততই দ্রুত ছুট দেয়।
তারপর?
জলোচ্ছাসের বেগ নিস্তেজ হল ধীরে-ধীরে। মেঘ কাটছে। আকাশে আলো উঁকি দিচ্ছে একটু-একটু। প্রকৃতি শান্ত হচ্ছে।
কিন্তু শান্ত হল না রূপচাঁদের ঘোড়া। সে ছুটে যায়। ছুটতে-ছুটতে কোথায় যে কতদূরে চলে গেল, আর দেখা গেল না। কোথায় যে কত দূরে আবার রূপচাঁদ ঘর বাঁধল, তা-ও কেউ জানতে পারল না। সে বোধ হয় এখন সেই না-জানা দেশের সবুজ জমির মাটি চেনাচ্ছে তার ছেলেকে। ছেলে বোধ হয় বড় হয়ে সেই মাটিতে লাঙল চালাবে। ফসল ফলাবে। রূপচাঁদ এখন নিজের হাতে ফসল ফলানোর বিদ্যেটাই শেখাবে ছেলেকে। কেননা, সে এখন জেনে ফেলেছে, অনেক বিদ্যে শেখার অনেক বই আছে। সেই অনেক বইয়ের এ যে অন্য আর-এক পিঠ। বইয়ের সেই অন্য আর-এক পিঠের পাতায়-পাতায় অনেক ফুটন্ত ফুল আছে। পাখি আছে। মৌমাছি আছে। আর আছে পাকা ধানের বাতাস-ছোঁয়া দোলনা। আঃ ! সে-দোলনায় কার না মন দোলে!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন