সূর্যমন্দিরের শেষ প্রহরী

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

উকেয়ালি রিসর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল সুজয়। আশেপাশের কাঠের বাড়ি-ঘরের মাথার ওপর দিয়ে দূরে নীল আকাশের বুকে জেগে আছে তুষার ধবল পর্বতমালা। দক্ষিণ থেকে উত্তরে বিস্তৃত। সকালের সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল পর্বতশৃঙ্গ, উদ্ভাসিত এই উপত্যকা। ওই পর্বতমালার নাম আন্দিজ! উপত্যকার নাম কুজকো, আর এ ভূমির নাম ‘ইনকা ভূমি!’ এখন অবশ্য এ দেশের পোশাকি নাম ‘রিপাবলিকা ডেল পেরু’ বা ‘পেরু সাধারণতন্ত্র’। দূরের পর্বতশ্রেণির দিকে তাকিয়ে বুকের ভিতর কেমন যেন রোমাঞ্চ অনুভব করছিল সুজয়। বইতে সে কত পড়েছে এই পাহাড়ের কথা। একসময় এই পাহাড়, এই উপত্যকাতেই জন্ম নিয়েছিল সুমহান এক সভ্যতা, ‘ইনকা সভ্যতা।’ যে সভ্যতার কাহিনি আজও হাতছানি দেয় আধুনিক পৃথিবীর মানুষকে। ‘ইনকা’ মানেই ছেলেবেলায় গল্পের বইতে পড়া, সোনার শহর ‘এল ডোরাডো’-র গল্প, ‘ইনকা’ মানেই ছবির বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা, গায়ে-মুখে বিচিত্র উলকি আর বিচিত্র পোশাকের বর্শাধারী মানুষ, যারা বসবাস করে আন্দিজ পর্বতে, তার পাদদেশে আমাজনের গহীন জঙ্গলে!

ছেলেবেলার গল্প কাহিনিতে পড়া সোনা-ঝরা ইনকার দেশে সে-যে কোনোদিন উপস্থিত হবে তা স্বপ্নেও ভাবেনি সুজয়। না-ভাবাটাই স্বাভাবিক। কারণ কোথায় ইন্ডিয়া, আর কোথায় পেরু! অর্ধেক পৃথিবী সত্যি পার হতে হয় এখানে আসতে হলে। বাঙালি ভ্রমণপিপাসু হলেও ছাপোষা বাঙালির পক্ষে শুধুমাত্র ভ্রমণের জন্য পেরুতে আসাটা একটু কষ্টসাধ্য কল্পনাই বলা চলে। সুজয়েরও এখানে আসা কোনোদিন সম্ভব হত না, যদি না সে যে কোম্পানিতে চাকরি করে সেই মাইনিং কোম্পানি একটা কাজে তাকে লিমাতে পাঠাত। লিমাতে দিন তিনেক ছিল সুজয়। সেখানে কাজ মিটে যাবার পর ইনকা সভ্যতার পীঠস্থান, কুজকো আর ‘মাচুপিচু’ দেখার লোভ সামলাতে পারেনি সে। এ সুযোগ আর তার জীবনে আসবে না। তার ভিসার মেয়াদ ‘ফুরাতে সপ্তাহ দুই বাকি আছে, সুযোগ আর সময়ের সদব্যবহার করতে রাজধানী লিমা থেকে গতকাল রাতে এসে পৌঁছেছে কুজকোতে।

‘আপনি কি ইন্ডিয়া থেকে এসেছেন?’

‘আপনি কি ইন্ডিয়া থেকে এসেছেন?’ প্রশ্নটা কানে যেতেই সুজয় ফিরে তাকিয়ে দেখল, একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক এসে দাঁড়িয়েছেন তার পিছনে। তার সঙ্গে বছর দশেকের একটা বাচ্চা ছেলেও আছে। ভদ্রলোকের পরনে ধবধবে সাদা জামা-প্যান্ট, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, মাথায় পানামা হ্যাট। তার সাদা চাপদাড়ির সঙ্গে সাদা পোশাক খুব সুন্দর মানিয়েছে।

সুজয় তার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘হ্যাঁ। আপনি কীভাবে জানলেন?’ বৃদ্ধ স্মিত হেসে বললেন, ‘রিসেপশনিস্ট বলছিল, একজন ইন্ডিয়ান যুবক এসেছেন এখানে, আপনাকে দেখে মনে হল আপনি তিনি হবেন।’ এই বলে দু-পা এগিয়ে এসে করমর্দনের জন্য ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি, হোসে মার্কেজ। চিলি থেকে আসছি।’

সুজয় তার সঙ্গে করমর্দন করে বলল, ‘সুজয় রয়, ফ্রম কলকাতা। এখানে বেড়াতে এসেছি। আপনিও কি টুরিস্ট?’

ভদ্রলোক হেসে জবাব দিলেন, ‘তা বলতে পারেন, আবার নাও বলতে পারেন। চিলির ‘ভ্যালপ্যারাইজো ইউনিভার্সিটি’-র ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপনা করতাম আমি। সেখান থেকে অবসর নেবার পর একটা বই লেখার কাজে আমি হাত দিয়েছি। সে প্রয়োজনেই আমার পেরুতে আসা। এর আগেও আমি দু-বার এসেছি এখানে।’

প্রফেসর মার্কেজের পাশে দাঁড়ানো বাচ্চাছেলেটা এবার সুজয়কে লক্ষ করে তার ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি সুসান। তুমি আমার সাথে পরিচয় করবে না?’ তার কথা শুনে সুজয় হেসে ফেলে তার সাথে করমর্দন করে বলল, ‘ও আই অ্যাম সরি। অবশ্যই তোমার সাথে পরিচয় করব।’ প্রফেসর মার্কেজ সুসানের মাথায় স্নেহের হাত রেখে সুজয়ের উদ্দেশ্যে বলল, ‘এ হল আমার গ্র্যাণ্ডচাইল্ড। ওর বাবা-মা সান্ডিয়াগোতে থাকে। ও থাকে ভ্যালপ্যারাইজোতে আমার কাছে। বাচ্চাটাকে দেখতে বেশ সুন্দর। ফরসা রং, কালো চুল, টানা টানা, ভ্রু-চোখ। সুসানের কপালের ঠিক মাঝখানে হালকা লাল রঙের একটা জড়ুল আছে। প্রথম দর্শনে সেটা দেখলে মনে হতে পারে, কেউ যেন একটা তিলক এঁকে দিয়েছে ছেলেটার কপালে। সুসানের বাঁ-হাতে ধরা আছে একটা বই, ‘টিনটিন ইন আমেরিকা’।

প্রফেসর এরপর সুজয়কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা আজ কি দেখতে যাবেন ভেবেছেন?’ সুজয় তার প্রশ্ন শুনে একটু ইতস্তত করে বলল, ‘আসলে কি দেখতে যাব এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। গাইড বইতে কুজকোর বেশ কয়েকটা দর্শনীয় স্থানের নাম দেখলাম ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে কোন জায়গাগুলো বেশি ইম্পর্টান্ট তা আমার জানা নেই। আপনি তো এর আগে এখানে এসেছেন এখানে কোথায় কোথায় যাওয়া যায় বলবেন?’

প্রফেসর বললেন, ‘কুজকো আর তার আশেপাশে ইনকা সাম্রাজ্যের বহুনিদর্শন ছড়িয়ে আছে। ঐতিহাসিকদের কাছে সবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার মধ্যে সাকসাহুয়ামান দুর্গ, করিকানচা সূর্যমন্দির, কুজকোর চন্দ্রমন্দির,—এগুলো অবশ্যই দেখে নেবেন আপনি। ইনকাদের আশ্চর্য স্থাপত্য-কৌশল, তাদের ধর্মীয় চেতনা, বৈভব ইত্যাদি সম্পর্কে তাহলে আপনি ধারণা করতে পারবেন।’-এ জায়গাগুলোর কথা জানাবার পর কয়েক মুহূর্ত কি যেন ভাবলেন প্রফেসর মার্কেজ, তারপর বললেন, ‘আমি যে জায়গাগুলোর কথা বললাম তার মধ্যে সাকসাহুয়ামান আর করিকানচাতে যাচ্ছি আমি। আর একটু পরেই বেরব। আরও একজন যাবে আমার সঙ্গে। তবে চারজনের জায়গা হয়ে যাবে গাড়িতে, আপনি ইচ্ছা করলে আমাদের সাথে যেতে পারেন।’

প্রস্তাবটা পাবার সঙ্গে সঙ্গেই লুফে নিলে সুজয়। সে বলল, ‘এ তো সৌভাগ্যের বিষয়। আমি যাব আপনাদের সঙ্গে। আপনার মতো মানুষের সঙ্গী হতে পারলে এখানকার ইতিহাস ভালোভাবে জানা যাবে আর দ্রষ্টব্যগুলোও ভালো করে বুঝতে পারব। তবে একটা কন্ডিশন, শেয়ারে যাব কিন্তু।’

প্রফেসর হেসে বললেন, ‘সে দেখা যাবে।’

সুজয় এবার জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার সঙ্গে আর-একজন যিনি যাবেন তিনি কে?’

প্রফেসর জবাব দিলেন, ‘একজন আমেরিকান ‘ফটোগ্রাফার। নাম, ‘বিল’। ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি করার জন্য পেরু এসেছে। কাল এই রিসর্টে আলাপ। আমার বইয়ের জন্য কিছু ছবির দরকার। ওকে কাজটা করার প্রস্তাব দিতেই ও রাজি হয়ে গেল। ওই যাবে আমার সঙ্গে।’

প্রফেসরের কথা শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শোনা গেল, ‘হাই প্রফেসর, গুড মর্নিং’। সুজয় দেখল বারান্দার অপর প্রান্ত থেকে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে একজন। প্রফেসরও তার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘গুড মর্নিং বিল।’ সুজয়ের মনে হল বিলের বয়স তারই মতো অর্থাৎ পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। বেশ লম্বা, ফরসা, একমাথা সোনালি চুল, পরনে জিন্স-টিশার্ট। সে এসে সামনে দাঁড়াতেই সুজয়কে দেখিয়ে প্রফেসর তাকে বললেন, ‘ইনি ইন্ডিয়া থেকে এসেছেন। আমাদের সঙ্গে যাবেন।’ তাঁর কথা শুনে বিল সুজয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘বিল সয়ার। ‘ফ্রম, ‘কানেক্টিকাট,’ ‘ইউএসএ।’

প্রাথমিক পরিচয় পর্বে বিল সম্বন্ধে সুজয় যা জানতে পারল, তা হল, সে একটা ওয়াইল্ড লাইফ ম্যাগাজিনে চাকরি করে। তারই কাজে সে মাস দেড়েক হল ঘর ছেড়েছে। পেরুতে আসার আগে বেশ কিছুদিন ব্রাজিলে কাটিয়েছে সেখানকার বিখ্যাত ‘ব্ল্যাকপ্যান্থার’ অর্থাৎ কালো বাঘের ছবি তোলার জন্য। পেরুতে এসেছে আন্দিজের কেশরহীন সিংহ ‘পুমা’-র ছবি তুলতে।

সুজয়ের সঙ্গে পরিচয় পর্ব মেটাবার পর, প্রফেসর একবার নিজের রিস্টওয়াচের দিকে দেখে বিলের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তুমি কি রেডি?’ সে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ। শুধু ক্যামেরার ব্যাগটা নিতে হবে, আর গায়ে জ্যাকেটটা চাপাতে হবে।’

তিনি শুনে বললেন, ‘তাহলে তুমি নীচে নেমে কাজ দুটো সেরে ফেলো। আমি মিনিট দশেকের মধ্যেই নীচে নামছি। আর রিসেপশনে কাইণ্ডলি একটু বলে দিও যে, আমাদের এই নতুন বন্ধুর লাঞ্চের জন্য আর একটা প্যাকেটও যেন আমার গাড়িতে তুলে দেয়।’

বিল বলল, ‘আচ্ছা।’

বিল চলে যাবার পর প্রফেসর সুজয়কে বললেন, ‘আপনার যদি তৈরি হবার থাকে তবে তৈরি হয়ে নিন। ঠিক আটটায় বাইরে যাব আমরা।’ এই বলে তিনি বিদায় নিলেন।

সুজয়ের তৈরি হবার তেমন ব্যাপার ছিল না। শুধু ঘরে ঢুকে স্নিকারটা পরে নিল। তারপর তার ছোট্ট ক্যামেরাটা নিয়ে ঘর বন্ধ করে কমপ্লিট রেডি হয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। মিনিট সাতেকের মধ্যেই সুজয়ের ঘরের দুটো ঘর পরে একটা ঘর থেকে প্রফেসর সুসানকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তারপর একসঙ্গে তিনজন নীচে নামার সিঁড়ির দিকে এগোল।

রিসর্টের লবির ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল জিপ জাতীয় একটা গাড়ি। তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল বিল। গায়ে কালো রঙের অনেকগুলো পকেটঅলা হাত-কাটা জ্যাকেট, কাঁধে ক্যামেরা ব্যাগ। সুজয়রা রিসেপশনের কাচের দরজা ঠেলে বাইরে পা রাখতেই সে প্রফেসরের উদ্দেশ্যে বলল, ‘আপনার গাড়ি এসে গেছে। খাবারও গাড়িতে উঠে গেছে।’ সুজয়রা এসে উঠে বসল গাড়িতে। বিল বসল ড্রাইভারের পাশে। প্রফেসর, সুসান, সুজয় বসল পিছনের আসনে। গাড়ি যখন স্টার্ট নিল, সুজয়ের ঘড়িতে তখন কাঁটায় কাঁটায় আটটা বাজে।

রিসর্ট কম্পাউণ্ডের বাইরে এসে রাস্তায় নামার পর ড্রাইভার দুর্বোধ্য ভাষায় কী যেন জানতে চাইল প্রফেসরের কাছে। প্রফেসরও ওই ভাষাতেই তার কথার জবাব দিলেন। তাঁর কথা শুনে ড্রাইভার ঘাড় নেড়ে অ্যাক্সিলেটরে চাপ দিল। সুজয় কৌতূহল বশত প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি ভাষায় কথা বললেন, স্প্যানিশ?’ প্রফেসর মৃদু হেসে বললেন, ‘না এটা স্প্যানিশ নয় ‘কোয়েচুয়া’ বা ‘কেচুয়া’। পেরুর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কোয়েচুয়াতে কথা বলে। কোয়েচুয়া, আইমারা ও স্প্যানিশ-এ তিনটি হল এখানকার সরকারি ভাষা। স্প্যানিশ আমার মাতৃভাষা, কোয়েচুয়াটা শিখতে হয়েছে আমার কাজের জন্য। চিলির পেরু কনসুলেটের এক ভদ্রলোক শিখিয়েছেন, আর আইমারা ভাষা এর আগে এখানে কাজ করতে আসার সুবাদে কিছুটা বুঝতে পারি, তবে বলতে পারি না।’ এই বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তিনি বললেন, ‘লিমা, আরেকুইপা, ফ্যালাও, ইত্যাদি বড়ো বড়ো শহরে স্প্যানিশটাই বেশি চলে, তবে এন্টিরিয়ার অঞ্চলে কাজ করতে হলে, স্থানীয় ভাষা জানা থাকলে বাড়তি অ্যাডভানটেজ পাওয়া যায়।’

সুজয়দের গাড়ি মিনিট দশেকের মধ্যেই শহর ছাড়িয়ে উপত্যকার ফাঁকা পথ ধরল। কালো পিচের রাস্তা চড়াই-উতরাই ভেঙে, নানা বাঁক অতিক্রম করে এগিয়ে গেছে। পথের পাশে মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো গ্রাম চোখে পড়ছে। বাড়িঘরগুলো সব কাঠের তৈরি। গ্রাম সংলগ্ন পাহাড়ের ঢালে কফি, আলু, ভুট্টা নানারকম খেত। এ রকমই একটা ছোটো গ্রামের গায়ে পথের পাশে একটা ছোটো খেত দেখিয়ে প্রফেসর সুজয়কে বলল, ‘এটা কীসের খেত জানেন?’ সুজয় খেতের দিকে তাকিয়ে চিনতে না-পেরে বলল, ‘না, এ গাছ আমি চিনি না।’ প্রফেসর বললেন, ‘এগুলো হল, ‘কোকাগাছ।’ যার থেকে নেশার ওষুধ কোকেন তৈরি। পৃথিবীতে কোকাগাছের সর্বাধিক চাষ হয় এই পেরুতে। আর-একটা জিনিস জানবেন, কন্দ বা আলু কিন্তু এখান থেকেই স্পেনীয়দের হাত ধরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। আলু আন্দীয় জনগোষ্ঠীর বা ইনকাদের দান। পার্বত্য অঞ্চলে ৯০০০ ফুট উচ্চতায় প্রথম আলুর চাষ শুরু করে তারা।’

আলু বাঙালিদেরও প্রিয় জিনিস। তার উৎস যে এ জায়গা তা জানা ছিল না সুজয়ের। তথ্যটা চমকপ্রদ লাগল সুজয়ের কাছে। সুজয় এর পর প্রফেসরের উদ্দেশ্যে বলল, ‘গাইড বুকে তো লেখা আছে এই কুজকো একসময় ইনকা সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল, এখানকার ইতিহাস আমাকে একটু বলবেন? তাহলে আমার বেড়াতে সুবিধা হবে।’ বিলও বলল, ‘হ্যাঁ, এ জায়গার ইতিহাস আমিও জেনে নিতে চাই।’ তাদের কথা শুনে প্রফেসর বললেন, ‘কুজকোর ইতিহাস যেমন দীর্ঘ তেমনই চমকপ্রদ। সংক্ষেপে বলা সম্ভব নয়। তবুও আমি এ জায়গা সম্বন্ধে একটা প্রাথমিক ধারণা দেবার চেষ্টা করছি।’ এই বলে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর জানলার বাইরে তাকিয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন—‘আসলে ইনকারা ছিল এক আদীম জনজাতি। আপনারা নিশ্চই পেরুর বিখ্যাত টিটিকাকা হ্রদের নাম শুনেছেন। আন্দিজ পর্বতমালার ৩৮১০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত টিটিকাকা বা তিতিকাকা। ইনকারা ওই অঞ্চলেই প্রথমে বসবাস করত। আনুমানিক ১১০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনো একসময় তারা তিতিকাকা অঞ্চল ছেড়ে নেমে এসে কুজকোতে বসতি স্থাপন করে। তবে তার আগে এখানে ছিল তিয়াহুয়ানকো, হুয়ারি প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর বাস। পৃথিবীর প্রত্যেক জনজাতির উৎপত্তির পিছনে একটা করে দৈবকাহিনি আছে। যাকে বলে ‘মায়া কাহিনি’। ইনকাদেরও ‘মায়া কাহিনি’ আছে। সেই কাহিনি অনুসারে তিতিকাকা অঞ্চলে হাজার বছর আগে মানকো কাপাক ও মামা ওকল্লো নামে দুই ভাই-বোন বাস করতেন। একদিন তারা সূর্যদেব ‘ইনতি’-র দৈববাণী শুনলেন, ‘তোমরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ো। আশেপাশের সবাইকে শিক্ষিত করে তোলো। আমার সোনার ছড়ি তোমাদের পথ দেখিয়ে যেখানে তোমাদের নিয়ে যাবে, সেখানে বসতি স্থাপন করবে তোমরা। সে জায়গা কেন্দ্র করেই জ্ঞানের আলো তোমরা ছড়িয়ে দেবে চারপাশে।’ ইনতির এ ঘোষণার পরই তাদের চোখের সামনে আবির্ভূত হল এক সোনার ছড়ি। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল ভাই-বোন। ছড়ি তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। বেশ কিছুদিন চলার পর একদিন এক উপত্যকায় এসে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই ছড়ি। সূর্যদেবের নির্দেশ মতো সেই উপত্যকাতেই বসতি স্থাপন করল দুই ভাই-বোন। সেই উপত্যকাই হল এই কুজকো উপত্যকা। মানকো কাপাক আর ওকল্লো এ অঞ্চলে গড়ে তুললেন নতুন সভ্যতা। মানকো কাপাককেই কুজকো নগরীর প্রতিষ্ঠাতা ও ইনকা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলে মনে করা হয়। মানকো কাপাকই ছিলেন প্রথম ইনকা সম্রাট। বিখ্যাত ইতিহাস গবেষক ‘জোশেফ বুমব্লিশ’ তাঁর কাস্কারা নামক গ্রন্থেও এই একই মতামত ব্যক্ত করেছেন।’

একটু থামলেন প্রফেসর। পাহাড়ি পথের বাঁক ভেঙে এগিয়ে চলেছে সুজয়দের গাড়ি। পথের পাশে পাহাড়ের ঢালে এবার শুরু হয়েছে জঙ্গল। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, ‘সম্রাট মানকো কাপাক ১১৯০ থেকে ১২৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কুজকো নগরী গড়ে তোলেন। ‘কুজকো’ শব্দের অর্থ হল, ‘নাভি’। মানকো কাপাক ভেবেছিলেন কুজকোই হল পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু। তিনি সূর্য দেবতা ‘ইনতি’ ও স্রষ্টা দেবতা ‘বীরকোচা’-র উদ্দেশ্যে এই নগরীকে উৎসর্গ করেন। তিনি এখানে ইনতিকানচা-সূর্যমন্দির স্থাপন করেন। মানকো কাপারের পরবর্তী সম্রাটদের প্রত্যেকের আমলেই এই নগরীর উন্নতিসাধন হয়। তবে এ ব্যাপারে চার জন ইনকা সম্রাটের অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁরা হলেন, তৃতীয় ইনকা সম্রাট, ‘লোক ইপানকুই’, পঞ্চম সম্রাট’, ‘কাপাক ইপানকুই’, নবম সম্রাট পাচাকুটি ইনকা ইপানকুই ও দশম ইনকা সম্রাট, ‘টুপাক ইনকা ইপানকুই।’ সম্রাট লোক ইপানকুই ১২৬০ থেকে ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তিনি এখানে এক বিরাট বাজার তৈরি করেছিলেন। যার ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়। ওই স্থায়ী বাজারে আন্দিজ পর্বতমালার নানা প্রান্তের মানুষ ব্যবসা করতে আসতেন। এ ছাড়া তিনি কুজকো নগরীতে ‘আকলাহুয়াসি’ নির্মাণ করান। এই আকলাহুয়াসিতে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সুন্দরি মেয়েদের এনে রাখা হত। তাদের উৎসর্গ করা হত সূর্যদেবের উদ্দেশ্যে। তাদের বলা হত ‘সূর্য্য-কন্যা’। অনেকটা আপনাদের দেশের হিন্দু মন্দিরের দেবদাসীর মতো। তবে, সূর্য-কন্যাদের অনেক সময় বলিও দেওয়া হত। কাপাক ইপানকুইয়ের আমলে কুজকো নগরীর সর্বাধিক উন্নতি হয়। ঐতিহাসিক গার্সিলাসো দালা ভেগার রচনা থেকে জানা যায় যে, কুজকো নগরীর আশ্চর্য্য স্থাপত্য তার আমলেই বিকশিত হয়। বহু-রাস্তাঘাট-সেতুও তিনি নির্মাণ করান। সেচ ও নগরীর জল নিকাশিব্যবস্থাও তিনি গড়ে তোলেন। নবম সম্রাট পাচাকুটি ইনকা ছিলেন ইনকা সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্রাট। তিনি ১৪৩৮ থেকে ১৪৬৩ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তাঁর আমলে কুজকোসহ সাম্রাজ্যের সর্বাধিক উন্নতি হয়। আক্ষরিক অর্থে শুধু নয়, পাচাকুটির আমলে সত্যি সত্যিই নগরীর প্রধান সৌধগুলো ছিল সোনায় মোড়া। আর দশম ইনকা সম্রাট কুজকো নগরীকে প্রসারিত করেন। আমরা যে সাকসাহুয়ামান দুর্গ দেখতে যাচ্ছি, তার নির্মাণও সম্পূর্ণ করেন দশম ইনকা টুপাক ইনকা ইপানকুই। এই ভাবে মানকো কাপাকের রাজত্বকাল থেকে টুপাক বা টোপা ইনকার রাজত্বকাল পর্যন্ত অর্থাৎ ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় তিনশো বছর ধরে গড়ে ওঠে কুজকো। টোপা ইনকার পরবর্তী আমলে, হুয়ানাকাপাক, হুয়াসকার বা সম্রাট আতাহুয়ালপা-র আমলেও কুজকোর বেশ কিছু পরিবর্তন হয়। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই কুজকোকে কেন্দ্র করে যে সাম্রাজ্য ছিল তার বিস্তার ছিল লম্বায় ২৫০০ মাইল, ইকুয়েডর থেকে চিলি পর্যন্ত বিস্তৃত। ইনকা সাম্রাজ্যের এককোটি কুড়ি লক্ষ মানুষের রাজধানী ছিল এই কুজকো। নগরীর কেন্দ্রস্থলে ছিল ‘ইনকা প্রাসাদ’ বা ‘হাউজ অভ সান’। সূর্য পুত্র ইনকা সম্রাটরা বসবাস করতেন সেখানে...।

প্রফেসর মার্কেজ বলে যেতে লাগলেন কুজকোর ইতিহাস। সুজয় শুনে যেতে লাগল তার কথা। ইনকাদের নামগুলো একটু খটমট শোনালেও কুজকোর কাহিনি শুনতে ভালোই লাগছিল তার। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তারা এসে উপস্থিত হল উন্মুক্ত এক পাহাড়ি প্রান্তরে। সেখানে তাদের চোখে পড়ল দূরে, অনেক উঁচুতে পাশাপাশি দুটো পাহাড়ের গায়ে বেশ অনেকটা অঞ্চল নিয়ে ছড়িয়ে আছে বিশাল এক স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ। তাই দেখে এতক্ষণ পর সুসান হঠাৎ তার দাদুর উদ্দেশ্যে বলে উঠল, ‘ওইটা কি?’ প্রফেসর মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘ওই হল সাকসাহুয়ামান দুর্গ। ওখানেই এখন যাব আমরা।’ এরপর তিনি সুজয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘কুজকো নগরীর উত্তর দিকে এখন উপস্থিত হয়েছি আমরা। বলতে পারেন ওই দুর্গই হল কুজকোর সীমারেখা। স্পেনীয়দের আক্রমণের সময় ইনকারা নগরী ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিল ওই দুর্গে। মানকো কাপাক স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী লড়াই চালান সাকসাহুয়ামান থেকে। ‘সাকসাহুয়ামান’ শব্দটা আমরা এক সঙ্গে উচ্চারণ করলেও আসলে কিন্তু তা দুটো শব্দ,—সাকসা, হুয়ামান। অর্থাৎ ‘তৃপ্ত-বাজপাখি’। কিছুক্ষণের মধ্যেই সুজয়দের গাড়ি পৌঁছে গেল সাকসাহুয়ামানের কাছে।

বিশাল এক পাথুরে চত্বরে এসে গাড়ি থেকে নামল সুজয়রা। চত্বর থেকে পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ির মতো থাক থাক ধাপ ওপর দিয়ে উঠে গেছে বিরাট প্রাচীর ঘেরা সাকসাহুয়ামানে প্রবেশ করার জন্য। যেখানে সুজয়রা গাড়ি থেকে নামল সেখানে আরও বেশ কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কিছু টুরিস্ট আর গাইড গোছের স্থানীয় কিছু লোকও ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। সুজয়দের দেখে বুকে আই কার্ড ঝোলানো একজন লোক এগিয়ে এসে বলল, ‘গাইড স্যার? ওনলি, ‘হান্ড্রেড নুয়েভো সোল।’ ‘নুয়েভো সোল’ হল পেরুর মুদ্রা। মার্কেজ তাকে বললেন, ‘না আমাদের গাইডের দরকার নেই, আমিই গাইড।’ লোকটা তাঁর কথায় কী বুঝল কে জানে, দুর্বোধ্য ভাষায় প্রফেসরের উদ্দেশ্যে কী একটা বলে অন্য দিকে হাঁটা শুরু করল। হোঃ হোঃ করে হেসে উঠে প্রফেসর সুজয়কে বললেন, ‘ও আমাকে ‘বুড়ো গুয়ানাকো’ বলল। ‘গুয়ানাকো’ এখানকার এক ধরনের প্রাণী। আমরা ওর সঙ্গে যাব না শুনে চটে গেল লোকটা।’

চত্বরের একপাশে টিকিট কাউন্টার। প্রফেসর মার্কেজ সবাইকে নিয়ে এগোলেন সেদিকে। সেখানে পৌঁছে তারা দেখতে পেল কাউন্টারের এক পাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু সাদা চামড়ার টুরিস্ট। আর সেই বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত সুরে বাঁশি বাজাচ্ছে একজন স্থানীয় মানুষ বা যাদেরকে বলা হয় নেটিভ আমেরিকান। তার পরনে প্রাচীন ইনকাদের মতো পোশাক, মাথায় ছুঁচলো ধরনের কান ঢাকা ঝলমলে টুপি, পায়ে কাঠের পাদুকা। গালে আঁকা বিচিত্র উলকি। ঠিক যেন ছবির বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা কোনো প্রাচীন মানুষ। লোকটার সঙ্গে একটা প্রাণীও আছে। তার দেহও ঝলমলে কাপড় দিয়ে সাজানো। প্রাণীটাকে সুজয় এই প্রথম চাক্ষুষ করলেও তার ছবি এর আগে সে দেখেছে,—লামা! প্রফেসর সুজয়কে বললেন, ‘ইনকা সাম্রাজ্যের সবচেয়ে পবিত্র প্রাণী ছিল এই ‘লামা।’ এখনও নেটিভ আমেরিকানরা এখানে একে দেবতা জ্ঞানে পুজো করে। ঠিক আপনাদের দেশে যেমন, ‘হোলি কাউ।’ এরপর তিনি বললেন, ‘আপনারা এখানে দাঁড়ান, ‘আমি টিকিটটা নিয়ে নিই।’ সুজয় তাঁর কথা শুনে পয়সা দেবার জন্য পার্স বার করতে যাচ্ছিল। তা বুঝতে পেরে প্রফেসর বললেন, ‘এখন থাক। পরে নেব।’ টিকিট কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালেন প্রফেসর আর সুজয়রা দাঁড়িয়ে সেই নেটিভ আমেরিকানের বাঁশি বাজানো দেখতে লাগল। ব্যাগ থেকে তার ক্যামেরা বার করে লোকটার গোটা দুই ছবিও তুলল বিল। বেশ মন দোলানো সুরে বাঁশি বাজাচ্ছে লোকটা। বাঁশিটাও বড়ো অদ্ভুত ধরনের। ফাঁপা কঞ্চি জাতীয় জিনিস পরপর পাশাপাশি বসিয়ে বানানো বাঁশিটা। সুজয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সুসান। সে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কি বাঁশি? সুজয় বলল, ‘আমি নাম জানি না। তোমার দাদু হয়তো বলতে পারবেন।’ টিকিট কাটা হয়ে গেছিল প্রফেসরের, সুজয়দের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে সম্ভবত তিনি শুনতে পেয়েছিলেন সুসানের প্রশ্নটা। তাই কাছে এসে তিনি বললেন, ‘এ বাঁশির নাম হল, ‘রনডাডর’। বাঁশ বা নলখাগড়া দিয়ে তৈরি হয়। নেটিভ আমেরিকানদের খুব প্রিয় জিনিস।’ সুজয়রা এরপর হাঁটতে শুরু করল দুর্গে ওঠার পথের দিকে।

পাহাড়ের গায়ে নিখুঁতভাবে থাক থাক করে পাথর কেটে তৈরি ওপরে ওঠার সিঁড়ি। ওপরে উঠতে শুরু করার আগে সেই সোপানশ্রেণির সামনে দাঁড়িয়ে প্রফেসর বিলের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমার কাজ এখান থেকেই শুরু করো। এই সিঁড়ির ধাপের একটা ছবি তোলো।’ এরপর তিনি সুজয়কে বললেন, ‘ধাপগুলোর দিকে ভালো করে লক্ষ করুন। প্রতিটা পাথর কেমন নিখুঁতভাবে কাটা! আর ওই যে দুর্গ-প্রাকার দেখছেন, ওর কাছে গেলে বুঝতে পারবেন, যে পাথরগুলো এই নীচ থেকে ইটের মতো দেখাচ্ছে সেগুলো আসলে কি বিশাল! ওর এক-একটার ওজন হল একশো আঠাশ টন! আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, এর মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যাপার কি আছে? অস্বাভাবিক ব্যাপার হল, ইউরোপীয়নরা লোহার ব্যবহার জানলেও ইনকারা কিন্তু তা জানত না। তাহলে তারা কীভাবে এত নিখুঁত-মসৃণ ভাবে এই সোপানশ্রেণি বা ওই পাথরের ব্লকগুলোকে কাটল? ইনকা সভ্যতায় বেশ কিছু মিস্ট্রিয়াস ব্যাপার আছে, যার সমাধান এখনও বিশেষজ্ঞরা করে উঠতে পারেননি। তার মধ্যে এটা হল একটা মিস্ট্রি।

পাথরের সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে শুরু করল সবাই। সুসান বেশ মজা পেয়েছে। সে সবার আগে উঠছে। আর সবার পিছনে প্রফেসর মার্কেজ। সুজয় সিঁড়ির একটা ধাপে দাঁড়িয়ে প্রফেসরকে বলল, ‘আপনার কি উঠতে কষ্ট হচ্ছে? তাহলে আমার হাতটা ধরতে পারেন।’ প্রফেসর বললেন, ‘আসলে বয়স হচ্ছে তো, কামিং ফেব্রুয়ারি সুইট এইট্টি হবে। তাই একটু হাঁপ ধরছে। তবে হাত ধরতে হবে না’। সুজয় একটু অবাক হল তাঁর কথা শুনে। প্রফেসরের যে এতটা বয়স তা বুঝতে পারেনি সে। প্রথমে সুসান, তারপর বিল আর সবশেষে প্রফেসর আর সুজয়, এইভাবে সিড়ি ভেঙে তারা একসময় সাকসাহুয়ামানের প্রবেশ পথে উঠে এল। ভিতরে ঢোকার মুখে একবার প্রফেসর বিলকে দাঁড় করালেন প্রবেশ পথের একটা ছবি তোলাবার জন্য। প্রবেশ পথের এক পাশে প্রাচীরের ওপর বিরাট একটা পাখির মূর্তি বসানো। ছবি তোলা হয়ে গেলে বিল প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করল, ‘ওটা কী?’ প্রফেসর বললেন, ‘ওটা হল কনডোর বা বাজপাখি। এরকম আটটা কনডোর মূর্তি বসানো আছে দুর্গ-প্রাকারে। যুদ্ধে যাদের মৃত্যু হত তারা বিশালাকার কনডোর পাখিদের খিদে মেটাত। নর মাংসের লোভে দুর্গ-প্রাকারে সার বেঁধে বসে থাকত তারা। অনেকে বলেন, এ কারণেই এ দুর্গের নাম ‘তৃপ্ত বাজ’। কনডোরের স্বভাব বাজের মতো আক্রমণাত্বক। আর চেহারা শকুনের মতো।’

ত্রিস্তর জিগজ্যাগ দেওয়াল ঘেরা দক্ষিণমুখী সংকীর্ণ প্রবেশপথ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল সুজয়রা। চারপাশে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ। একটু এগোবার পর দক্ষিণ দিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে দু-ভাগে বিভক্ত পাথুরে আবাস স্থল। প্রফেসর জানালেন তাদের একটার নাম, ‘মাল্লাকামারকা’ অপরটার নাম ‘পাতকামারকা’। ধীরে ধীরে প্রফেসরের পিছন পিছন সবাই ঘুরতে শুরু করল দুর্গের ভিতর এ জায়গা থেকে সে-জায়গা। প্রফেসরের নির্দেশ মতো বিল ছবি তুলতে লাগল। আর প্রফেসর জায়গাগুলো সম্বন্ধে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন সুজয়কে। এত সুন্দরভাবে প্রফেসর বলছিলেন যে, সুজয়ের মনে হচ্ছিল যে প্রফেসর মার্কেজ যেন নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন এই দুর্গের ইতিহাস। দুর্গের ভিতর সম্রাটের স্নানাগার, ইনকা অর্থাৎ সম্রাট যেখানে বসে প্রজাদের দর্শন দিতেন, সূর্যদেব ইনতির মন্দির সব জায়গাগুলো ঘুরে-ফিরে দেখল সুজয়রা। অবশ্য দেখল মানে, তার কোনো কিছুই আজ আর আস্ত নেই। কোথাও হয়তো দাঁড়িয়ে আছে ছাদহীন কক্ষ, কোথাও দাঁড়িয়ে আছে সার সার পাথরের স্তম্ভ, কোথাও আবার স্তূপাকৃত পাথরের রাশি। যে দুর্গ নগরীর ধুলোতেও নাকি একদিন সোনার গুঁড়ো মিশে থাকত বলে প্রবাদ আছে, ইনকাদের সেই বৈভব নগরী আজ শুধুই স্মৃতির শ্মশান। সারা নগরীতে ছড়িয়ে আছে ‘চেকান’ বা জলাধারের চিহ্ন। পাথরের ধাপে ধাপে পাথরের নল দিয়ে চেকানের জলে অসংখ্য ফোয়ারা দিয়ে নাকি সাজানো ছিল এই দুর্গ। সূর্য উপাসক ইনকারা খুব সৌখিন ছিলেন। বাগান-ফোয়ারা দিয়ে সাজিয়ে ছিলেন তাদের আবাস স্থল। তার কিছু কিছু চিহ্ন সময় আজও ধরে রেখেছে।

ঘণ্টা তিনেক নানা জায়গা দেখার পর সুজয়রা এসে উপস্থিত হল বিশাল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। বেশ কয়েকটা ধাপে বিভক্ত হয়ে সেটা নীচের দিকে নেমে গেছে। একদম ওপরের ধাপে গ্যালারির মতো সার সার বসার আসন। পাথরে তৈরি আসনগুলোর পিঠের দিকটা লম্বা। বেশ কিছু টুরিস্ট বসে আছে সেখানে। প্রফেসর সুজয়দের নিয়ে বসলেন সেখানে। পুরো প্রাঙ্গণটা নীচু দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। প্রফেসর বললেন, ‘এটা ছিল অ্যামফিথিয়েটর’, সুজয় বলল, ‘কী হত এখানে, এখানেও কি রোমের মতো গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই হত নাকি?’ মার্কেজ বললেন, ‘না না, এখানে সে-সময় ধর্মীয় কারণে বলি প্রথা থাকলেও ইনকারা অত হিংস্র ছিলেন না। সূর্যদেব ইনতির পার্বণে এখানে সমবেত হত নগরবাসীরা। আমরা যেখানে বসে আছি সেখানে স্বর্ণভূষণে সজ্জিত হয়ে সম্রাট তাদের পার্ষদবর্গদের নিয়ে বসতেন। তাঁর সঙ্গে থাকত ইনতির সোনার প্রতিকৃতি। তিনি জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতেন। আর আমাদের সামনে ঢালু জমিতে নানা রঙের উজ্জ্বল পোশাকে সজ্জিত সমবেত নগরবাসী সম্রাটের উদ্দেশ্যে জয়ধ্বনি করত, ইনতির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানাত, যেন তাদের সাম্রাজ্যের শান্তি, বৈভব, সম্মান অটুট থাকে, সূর্যদেব যেন তাঁর পুত্রদের সব বিপদ থেকে মুক্ত রাখেন।’

এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘কিন্তু স্বর্ণলোভী স্পেনীয় সানফ্রান্সিসকো পিজরো ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে যেদিন পেরুর তুমবেজ উপকূলে নৌকা ভেড়ালেন সে দিন থেকেই ইনকাদের ভাগ্যাকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে এল। পিজরো ও তাঁর সঙ্গীদের ফর্সা, দীর্ঘ চেহারা, হাতে আগুন ছোড়া লাঠি মানে বন্দুক দেখে, স্থানীয় ইনকা জনজাতি তুমপিরা ভাবল আগন্তুকরা সাক্ষাত সূর্যের সন্ততি। সরল-মনা তুমপিরা তাদের বরণ করল সোনার তৈরি নানা পাত্র, হাঁসের ডিমের আকারের পান্না দিয়ে। পান্না জিনিসটা চেনা ছিল না পিঞ্জরোদের। শোনা যায় তাঁর সঙ্গীরা নাকি খেলার জিনিস ভেবে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিল পান্নাগুলোকে। তবে সোনা তারা বিলক্ষণ চিনত। পিজরো ঘুরে-ফিরে দেখলেন ইনকাদের বৈভব, তাদের সোনায় মোড়া মন্দির, প্রাসাদ, ইনকাদের পোশাক। এরপর পিজরো ফিরে গেলেন ঠিকই কিন্তু তারপর আবার যখন তিনি এ মাটিতে পা রাখলেন, তাঁর হাতে তখন ইনকা সাম্রাজ্যের মৃত্যুর পরোয়ানা। স্বর্ণ লুন্ঠনের অতৃপ্ত-উদগ্র বাসনা পেয়ে বসেছে তাঁকে। ছলেবলেকৌশলে কীভাবে তিনি ইনকা সাম্রাজ্যের দখল নিয়েছিলেন তা এক দীর্ঘ ইতিহাস। তা যেমন চমকপ্রদ তেমনই ভয়াবহ। ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট ইনকা সম্রাট আতাহুয়ালাপার গলায় ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দিয়ে পেরু বিজয়ের চূড়ান্ত কাজ সম্পন্ন করেন পিজরো। ছাব্বিশ টন সোনা পেয়েও পিজরোর খিদে সেদিন মেটেনি। মন্দির-প্রাসাদের গায়ে আরো যত সোনা রুপো ছিল সব তারা খুবলে তুলে নিল। সোনার তৈরি ইনকাদের অসাধারণ সব শিল্প সামগ্রীকে গলিয়ে সোনার বাটে পরিণত করল। কারণ, স্বর্ণলোভী পিজরো বাহিনীর কাছে শিল্পের কোনো মূল্য ছিল না। এমনকি সোনার বাকল খুলে নেবার পর পাথরের কাঠামোগুলোকেও তারা রেহাই দেয়নি। ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্পেনীয়রা এই সাকসাহুয়ামান থেকে পাথর কেটে নিয়ে গিয়ে অন্যত্র তাই দিয়ে নিজেদের গির্জা ইত্যাদি তৈরি করে। পেদ্রো সানচের ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দের লিখিত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, সে-সময় এই সাকসাহুয়ামান দুর্গের মতো সুন্দর ও বিশাল দুর্গ ইউরোপের কোথাও ছিল না। পিজরো আর তাঁর বাহিনীর বর্বরতা একটা জাতির ইতিহাসকে নির্মমভাবে ধ্বংস করে দিল।

প্রফেসর মার্কেজ এরপর আরও কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু হঠাৎ কাছ থেকে ভেসে এল একটা অপরিচিত কন্ঠস্বর,—‘পিজরো কি শুধু নিছকই একজন স্বর্ণলোলুপ হানাদার ছিলেন? তাঁর মত সাহসী, বুদ্ধিমান, পরিশ্রমী ব্যক্তি সেই সময় সারা ইউরোপে আর কেউ ছিল কি? নাবিকদের মুখে শোনা গল্পকে পাথেয় করে, সামান্য অবলম্বন নিয়ে, মৃত্যুর হাতছানি উপেক্ষা করে তিনি যে এদেশ আবিষ্কার করলেন ইতিহাসে তার কি দামই নেই! পিজরোর মতো সাহসী মানুষরাইতো অজানা পৃথিবীকে চিনিয়েছেন সভ্য জগতের কাছে। এ কথা কি অস্বীকার করা যায়?’

সুজয়রা তাকিয়ে দেখতে পেল তাদের কয়েক হাত দূরে পেছনের সারির আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে একজন লোক। বয়স তার সম্ভবত বছর পঁয়তাল্লিশ হবে। বেশ সুঠাম চেহারা। ছুঁচলো দাড়ি, ডান চোখে একটা পারকোল, তার থেকে সোনার চেন ঝুলছে। পরনে ধূসর রঙের সুট। ভদ্রলোক এরপর এসে দাঁড়ালেন প্রফেসরের সামনে। প্রফেসর উঠে দাঁড়ালেন তার আসন ছেড়ে, তার সঙ্গে সঙ্গে বিল আর সুজয়ও। সেই ভদ্রলোক প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন, ‘মাফ করবেন আমাকে, আপনাদের কথার মাঝে ঢুকে পড়লাম বলে। কিন্তু আমি কথাগুলো কি খুব ভুল বললাম?’ প্রফেসর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে জবাব দিলেন, ‘না, আপনার কথা আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না, তবে আমার কথাগুলোও কিন্তু একবর্ণ মিথ্যা নয়।’ ভদ্রলোক আর একবার হেসে বললেন, ‘সে-কথা কিন্তু আমিও বলিনি। আমি শুধু আমার কথা বললাম। তা আপনারা উকেয়ালি রিসর্টে আছেন তো?’ তাঁর কথা শুনে প্রফেসর মার্কেজ একটু অবাক হয়ে বললেন, ‘আপনি কি করে জানলেন?’ ভদ্রলোক সুসানকে দেখিয়ে বললেন, ‘কাল বিকালে এই বাচ্চাটাকে আমি রিসর্টের লনে খেলতে দেখেছি।’ এরপর তিনি প্রফেসরের দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি সিয়েরো পিনচিও, ফ্রম, স্পেন। আপনারা?’ প্রফেসর তাঁর সঙ্গে করমর্দন করে নিজের পরিচয় দিলেন। অন্যদের সাথেও তাঁর পরিচয় করিয়ে দিলেন। পিনচিও, বিল আর সুজয়ের সাথেও করমর্দন করলেন।

প্রফেসর এরপর তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তা আপনিও কি টুরিস্ট?’

পিনচিও বললেন, ‘হ্যাঁও বলতে পারেন, আবার নাও বলতে পারেন। এ দেশটা দেখার সাথে সাথে একটা কাজও করতে এসেছি আমি। একটা ‘এনজিও’ চালাই আমি। ছোটো শিশুদের জিনিসপত্র দিয়ে সাহায্য করি। এ দেশটাতো খুব গরিব। দেখি এখানকার কিছু শিশুকে কোনো সাহায্য করা যায় কিনা। এ কাজের জন্য বহুজায়গাতে যাই। তার সাথে সাথে সে জায়গাটাও দেখে নেই।’

ছুঁচলো দাড়ি, ডান চোখে একটা পারকোল, তার থেকে সোনার চেন ঝুলছে।

প্রফেসর মার্কেজ শুনে বললেন, ‘বাঃ, বেশ মহৎ উদ্দেশ্য আপনার। তা এ জাতীয় কাজ তো বেশ ব্যয় সাপেক্ষ?’

পিনচিও একটু হেসে জবাব দিলেন। ‘হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। আসলে উত্তরাধিকার সূত্রে এক-সময় বেশ কিছু অর্থ পেয়েছিলাম আমি। তা ছাড়া ‘মাদ্রিদ’ আর ‘ভ্যালেন্সিয়াতে’ দুটো কিউরিও শপ আছে আমার। এসব থেকে আমার যা আয় হয় তারই একটা অর্থ ‘এনজিও’-র মাধ্যমে দুঃস্থ শিশুদের জন্য খরচ করি।

ভদ্রলোক যে বেশ ধনী, তার তার কথা শুনে বুঝতে অসুবিধা হল না সুজয়ের।

পিনচিও এরপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা মাচুপিচু দেখা হয়ে গেছে নাকি?’

মার্কেজ বললেন, ‘না, কালই এখানে এসেছি আমি। আজ কুজকো দেখে কাল মাচুপিচুর দিকে রওনা হবার ইচ্ছা আছে।’ পিনচিও বললেন, আমারও কাল ওদিকে যাওয়ার কথা। শুনেছি জায়গাটা খুব ইন্টারেস্টিং। অনেক কিছু দেখার আছে।’

প্রফেসর মার্কেজ তার কথা শুনে কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই হঠাৎ তাঁর আর সুজয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সুসান প্রফেসর মার্কেজের জামা খামচে ধরল। থেমে গেলেন প্রফেসর। সুজয় দেখল, সুসানের মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। প্রফেসর সুসানকে ‘কি হল?’ বলতেই সে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল গ্যালারির এক পাশে। সে দিকে তাকিয়ে একটা লোককে দেখে সুজয়ও যেন মুহূর্তের জন্য চমকে উঠল প্রথমে। এমন বীভৎস মুখাবয়ব সে আগে দেখেনি। লোকটার মুখের ডান পাশটা যেন পুড়ে একদম ঝামা হয়ে গেছে। সে পাশের কান কুঁকড়ে ছোটো হয়ে মাথার সঙ্গে মিশে আছে, অক্ষি কোটর শূন্য। এক চোখে সে তাকিয়ে আছে সুজয়দের দিকে। পোশাক দেখে সুজয়ের মনে হল লোকটা স্থানীয় ইন্ডিয়ান উপজাতীয় কেউ হবে। একটা ঘাসের তৈরি টুপি ধরা আছে তার হাতে। কয়েক মুহূর্ত সুজয়রা সবাই তাকিয়ে রইল তার দিকে। পিনচিও এরপর মৃদু হেসে সুজয়দের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, ‘ওর চেহারা দেখে ঘাবড়াবেন না। ওর নাম ‘হুইকা’, আমার গাইড। এখানকার সব কিছু ও হাতের তালুর মতো চেনে।’

হুইকা বলে লোকটা এবার সুজয়দের কাছে এগিয়ে এল। তারপর তার পোশাকের ভিতর থেকে একটা পাথরের চোখ বার করে তার শূন্য কোটরের মধ্যে তা ভরে ফেলে সুসানের উদ্দেশ্যে হেসে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ‘এবার নিশ্চয় আমাকে দেখে তোমার ভয় লাগবে না?’ সুসান তার কথার কোনো জবাব দিল না।

লোকটা তারপর পিনচিওর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বার্লো’। এ শব্দের অর্থ অবশ্য বুঝতে পারল না সুজয়। পিনচিও মৃদু হাসলেন লোকটার কথা শুনে। এরপর তিনি রিস্টওয়াচের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে সুজয়দের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভারি ভালো লাগল। এক হোটেলে যখন আছি, তখন নিশ্চই আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে। আপনাদের সময় এখন আর নষ্ট করব না। ভালো করে বেড়ান। ‘গুড বাই।’—এই বলে একটু মাথা ঝুঁকিয়ে বিদায় সম্ভাষণ জানালেন তিনি।

প্রফেসর মার্কেজও তাঁকে ‘গুড বাই’ জানালেন। পিনচিও এরপর তার এক চক্ষু গাইডকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন অন্য দিকে। আর প্রফেসরও সুজয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘চলুন এবার ফেরা যাক। নীচে নেমে লাঞ্চ সেরে কারিকানচার দিকে রওনা হতে হবে।’ সুজয়রা ফেরার পথ ধরল। চলতে চলতে মার্কেজ মন্তব্য করলেন, পিনচিওর পূর্বপুরুষরা যে পাপ করেছিলেন হয়তো তার কিছুটা স্খলন হবে পিনচিওর কাজের দ্বারা। লোকটাকে খারাপ বলে মনে হল না। ধনী লোকরা সাধারণত নিজেদের নিয়ে ভোগবিলাসে ব্যস্ত থাকে। এ লোকটা তবু কিছু করছে।’ বিল বলল, ‘তবে ওর সঙ্গীটা কেমন যেন! ওর তাকানোটা ভারী অদ্ভুত!’

প্রফেসর বললেন, ‘মুখ দেখে কারো সম্বন্ধে কোনো ধারণা করা ঠিক নয়, অনেক সময় কুৎসিত মানুষের মধ্যেই সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে।’ সুজয় সিঁড়ির ধাপ বেয়ে নীচে নামতে নামতে প্রফেসরকে প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, গাইডটা যে মি. পিনচিওকে ‘বার্লো’ না কি একটা বলল, তার মানে কী?’

মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘যতটুকু জানি, তা হল, ইনকা সম্রাটরা কপালে যে রাজটিকা বা তিলক আঁকতেন তাকে বলা হত ‘বার্লো’। তবে শব্দটার অন্য কোনো অর্থও থাকতে পারে যা হয়তো আমার জানা নেই।’

কথা বলতে বলতে সুজয়রা কিছুক্ষণের মধ্যে সাকসাহুয়ামান থেকে বাইরে বেরিয়ে নীচের সেই চত্বরটিতে নেমে এল। জায়গাটাতে বেশ ভীড় হয়ে গেছে। অনেক ক-টা টুরিস্ট গাড়ি এসে উপস্থিত হয়েছে সেখানে। সেই বাঁশিঅলা বাঁশি বাজিয়ে চলেছে। তাকে ঘিরে টুরিস্টের ভীড়। আরও বেশ কয়েকটা বড়ো লামাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে আনা হয়েছে। তাদের গলার ঘণ্টা বাজছে টুং টাং শব্দে। বেশ জমে উঠেছে চারপাশ।

নিজেদের গাড়ির কাছে পৌঁছে লাঞ্চ প্যাক বার করে খাওয়া সেরে নিল তারা। মিনিট কুড়ি মতো সময় লাগল। তারপর তারা রওনা হল করিকানচার উদ্দেশ্যে। গাড়িতে ওঠার একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ে ছিল সুজয়। ঘণ্টাখানেক বাদে যখন তার ঘুম ভাঙল তখন তারা নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গেছে।

গাড়ি থেকে নামার পর সুজয়ের চোখে পড়ল চার দিকে বিস্তীর্ণ জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে আছে বিরাট বিরাট প্রাচীন স্থাপত্যের ধংসস্তূপ, ছাদহীন পাথুরে কাঠামো, স্তম্ভ, প্রাচীরের মাঝখান দিয়ে শান বাঁধানো রাস্তা এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। তারপর তা হারিয়ে গেছে করিকানচার গোলকধাঁধার মাঝে। গাড়ি থেকে নেমে প্রফেসরের পিছন পিছন হাঁটতে শুরু করল সবাই। বেশ চড়া রোদ। রাস্তার পাশে তাঁবুর নীচে তরমুজ বিক্রি করছে মেয়েরা। পরনে ঝলমলে পোশাক। মাথায় টুপি। মেয়েরা এখানে যে টুপি পরে তা দেখতে ভারি অদ্ভুত। একটা বড়ো থালা যেন তাদের মাথার ওপর বসানো আছে! দুপুরবেলা বলেই সম্ভবত জায়গাটা বেশ ফাঁক ফাঁকা লাগছে। দু-চার জনের বেশি টুরিস্ট চোখে পড়ল না সুজয়ের। দু-পাশের মাঝখান দিয়ে সোজা সামনের দিকে এগোতে এগোতে মার্কেজ বললেন, এই জায়গা এক সময় ছিল ইনকা সাম্রাজ্যের পবিত্রতম স্থান। আমরা যে পথ ধরে এগোচ্ছি এর নাম ‘ইনতি কিজল্লো’ বা রাজপথ। এ পথ ধরেই একদিন সোনার শিবিকায় চেপে সূর্যদেব ইনতি-র মন্দিরে পূজো দিতে যেতেন ইনকা সম্রাটরা। আশেপাশে আমরা যেসব পাথুরে ধ্বংসস্তূপ দেখতে পাচ্ছি তা এক সময় সবই ছিল সোনা দিয়ে মোড়া। ইনকা সাম্রাজ্যের যে স্বর্ণনগরীর গল্প শোনা যায় তা সম্ভবত এই করিকানচাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। মন্দিরে পুজো সেরে বাগানে সোনার গাছ রোপণ করতেন সম্রাট। সে বাগানের গাছফুল-পাখি সব কিছুই ছিল, সোনা আর পান্না দিয়ে তৈরি। বর্বর স্পেনীয়রা এসব কিছুই লুটপাট করে নিয়ে যায়।

বেশ কিছুটা এগোবার পর একটা প্রশস্ত চত্বরে উপস্থিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন মার্কেজ। পথের ডানপাশে ছাদহীন সার সার ঘরের ধ্বংসাবশেষ দেখিয়ে তিনি বললেন, এর নাম ‘আকল্লাকুনা’ অর্থাৎ ‘সূর্য্যকন্যাদের আবাস’। ইনকাদের আমলে সুন্দরী কন্যাদের সূর্যদেবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার প্রথা ছিল। ওই সব মেয়েদেরই বলা হত সূর্যকন্যা। প্রায় পাঁচশো সূর্য্যকন্যা থাকতেন এখানে। ইনকা সম্রাট যেহেতু সূর্যদেবের পুত্র বা অংশরূপে বিবেচিত হতেন, তাই কেবল মাত্র তিনিই শুধু আকল্লা কুনাতে প্রবেশ করতে পারতেন। অন্য কোনো পুরুষের এখানে প্রবেশাধিকার ছিল না। কয়েকশো মহিলা রক্ষী পাহারা দিত আকল্লাকুনা। বাইরের কেউ এখানে প্রবেশ করলেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফাঁসিতে লটকে দেওয়া হত বা জ্যান্ত কবর দেওয়া হত।’

সুজয় জিজ্ঞেস করল। ‘সূর্য কন্যারা কী করতেন?’

প্রফেসর বললেন, ‘সূর্যকন্যাদের আকল্লাকুনার বাইরে যাবার অনুমতি ছিল না, যদি না তাদের কাউকে সম্রাট তাঁর রানি করে নিজের প্রাসাদে নিয়ে যেতেন। সূর্যকন্যারা ইনতি অর্থাৎ সূর্যদেবের দৈনন্দিন পূজার উপকরণ প্রস্তুত করতেন, আর বুনতেন পশমের তৈরি পোশাক। ইনকা সম্রাট যে পোশাক পরতেন, তা তৈরি করতেন তাঁরা।’ এরপর একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘আর হতভাগ্য কিছু সূর্যকন্যাকে নির্দিষ্ট দিনে ইনতির উদ্দেশ্যে বলিও দেওয়া হত।’

‘বলি?’ অবাক হয়ে বলল সুজয়।

‘হ্যাঁ, বলি। ‘কাপাক সিতুওয়া’ অর্থাৎ আগস্ট মাসে ‘প্রধান শুদ্ধিকরণ’ অনুষ্ঠান হত। পবিত্র চিহ্ন যুক্ত কোনো সূর্যকন্যাকে বলি দিয়ে তার রক্তে ইনতির মন্দির শুদ্ধ করা হত। তারপর তাকে মমি করে রাখত ইনকারা। এখানের মিউজিয়ামে একটা মেয়ের মমি আছে। সম্ভবত তাকে ইনতির সামনে বলি দেওয়া হয়েছিল।’

সুজয়রা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল ‘আকল্লাকুনা’। প্রফেসর বলে যেতে লাগলেন সূর্যকন্যাদের গল্প। আর তার নির্দেশে মাঝে মাঝে ছবি তুলতে লাগল বিল। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে কাটাবার পর একসময় তারা এসে উপস্থিত হল করিকানচার সামনে।

করিকানচা! ইনকাদের সর্বশ্রেষ্ঠ মন্দির-স্থাপত্য। মহাকাল আজ এর অনেক কিছু গ্রাস করে নিয়েছে। কোথাও ছাদ ধসে পড়েছে, প্রাচীর হেলে পড়েছে, বিরাট বিরাট স্তম্ভগুলো আশ্রয় নিয়েছে মাটিতে। তবু যতটুকু আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সুজয়। কী বিরাট তার পরিধি! কী সুবিশাল চত্বর! সর্বোপরি কী অদ্ভুত তার গঠনশৈলী! ভগ্ন মন্দিরের দেওয়াল-স্তম্ভের অপূর্ব সুন্দর কারুকাজগুলো আজও সাক্ষ্য বহন করে চলেছে সমৃদ্ধশালী এক অতীতের। গঠনভঙ্গিতে পার্থক্য থাকলেও মন্দিরটার দিকে তাকিয়ে সুজয়ের কেন জানি মনে পড়ে গেল তার দেখা নিজের দেশের কোণার্কের সূর্যমন্দিরের কথা। এ মন্দিরও কালো পাথরের তৈরি।

মন্দির চত্বরে প্রবেশ করতে করতে মার্কেজ বললেন, ‘এই মন্দিরের বাইরে ভিতরে সব কিছুই একদিন সোনার পাতে মোড়া ছিল। পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতাগুলো যেমন মিশরীয়, সুমেরীয়, ভারতীয় সভ্যতায় বেশ কিছু মন্দিরের সন্ধান আমরা পাই যার বৈভব-সম্পদ কিছু কম ছিল না, কিন্তু এই মন্দিরের কাছে যেসব কিছুই তুচ্ছ ছিল বলা যেতে পারে। এই মন্দিরের ধূলিকণাতেও সত্যি সত্যি সোনার গুঁড়ো ছড়ানো থাকত। পিজরোর দলবল সব সোনা নিয়ে যাবার পর তাদের ভৃত্য স্থানীয় অনুচরের মন্দির চত্বর ঝাঁট দিয়ে যে সোনার গুঁড়ো পেয়েছিল। তাতে তাদের পাঁচ পুরুষের আরামে বসে খাবার সংস্থান হয়ে গেছিল।

মন্দির গাত্রের কালো পাথরগুলো দেখিয়ে বিল জানতে জাইতে চাইল, ‘এ পাথরগুলো কি’ গ্র্যানাইট?’

প্রফেসর জবাব দিলেন, ‘এ পাথর হল ‘ব্ল্যাক আন্দেসাইট।’ এখান থেকে পনেরো মাইল দূরে হুয়াকোটো নামক পাহাড়ি অঞ্চল থেকে আনা হয়েছিল এই পাথর। শুধুমাত্র সূর্যদেব ইনতি আর তার পুত্র ইনকা সম্রাটদের প্রাসাদ এই পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হত।’

সুজয়রা সবাই মিলে ঘুরে বেড়াতে শুরু করল সূর্যমন্দিরের ভিতর। বিশাল বিশাল আলো-আঁধারি কক্ষ। বিরাট বিরাট স্তম্ভ ছড়িয়ে আছে মন্দিরের ভিতর। তার গায়ে নানা ধরনের ছবি, বাজপাখি, পুমা, কুমির, সাপ, বিভিন্ন বিচিত্র ধরনের কল্কা, অদ্ভুত ধরনের শিরস্ত্রান পরা মানুষের মুখ, আরও কত কী। মার্কেজ জানলেন এ ছবিগুলো হল ইনকাদের হুয়াকা বা পবিত্র চিহ্ন। বিল নির্দেশ মতো হুয়াকার ছবি তুলতে লাগল। আরও বেশ কিছু টুরিস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে সুজয়দের পাশে পাশে। সবাই নীচু গলায় কথা বলছে। দৈবাৎ কেউ উচ্চগ্রামে কথা বললেই তা অনুরণিত হচ্ছে পাথরের দেওয়ালে। মার্কেজ বললেন, ‘পিজরো বাহিনী করিকানচার দখল নেবার পর একে গির্জায় পরিণত করে ছিল। মন্দিরের এক অংশে তার অস্তিত্ব আজও বর্তমান।

একটার পর একটা ঘর ঘুরে বেড়াতে লাগল সুজয়রা। প্রত্যেক ঘরগুলোর পাথুরে দেওয়ালে নানা বিচিত্র জিনিস খোদিত করা আছে। মার্কেজ প্রয়োজন মতো সব কিছু বুঝিয়ে দিতে লাগলেন বিল আর সুজয়কে। প্রায় এক ঘণ্টা তন্ময় হয়ে দেখতে দেখতে এ কক্ষ থেকে ও কক্ষে ঘোরার পর প্রফেসর মার্কেজ তাদের নিয়ে প্রবেশ করলেন একটা ঘরে। ঘরটা আলোআঁধারিতে ঢাকা, বেশ লম্বা ঘর, ছাদও অনেক উঁচুতে। সমস্ত ঘরটাই কালো পাথরে মোড়া। ঘরের মেঝে থেকে শুরু করে সর্বত্রই খোদাই করা আছে বিভিন্ন ধরনের হুয়াকা, অস্ত্র হাতে ভীষণ দর্শন মানুষের ছবি। কেমন যেন গা-ছমছমে পরিবেশ বিরাজ করছে ঘরের মধ্যে। ভিতরে ঢোকার পর সুসান চাপা স্বরে তার দাদুকে জিজ্ঞেস করল, ‘মমিটা এখানেই রাখা আছে নাকি!?’ মার্কেজ শুধু উত্তর দিলেন, ‘না’। তারপর তিনি সুজয়দের নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন ঘরের শেষপ্রান্তে একটা বেদীর সামনে। সেই বেদীর ওপর অধিষ্ঠান করছে অপূর্ব সুন্দর বিরাটকার এক পাথরের মূর্তি। তাঁর সামনে জ্বলছে একটা প্রদীপ। পূজার কিছু উপকরণও ছড়িয়ে আছে মূর্তিটার পায়ের কাছে। দুজন বিচিত্র পোশাক পরা বর্শাধারী স্থানীয় ইন্ডিয়ান কঠিন মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মূর্তির দু-পাশে। তারাও যেন পাথরের তৈরি। বিগ্রহর পিছনের ছটা দেখে সেটা যে সূর্যমূর্তি তা বুঝতে অসুবিধা হয় না সুজয়ের। মার্কেজ চাপা স্বরে বললেন, ‘এই হল মন্দিরের গর্ভগৃহ। আমরা দাঁড়িয়ে আছি দেবতা ইনতির সামনে। এই দেবমূর্তি আজও পূজা পেয়ে আসছেন। বিল স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ক্যামেরাটা চোখের সামনে ওঠাতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাই দেখে মূর্তির পাশে দাঁড়ানো এক বর্শাধারী দুর্বোধ্য ধমকের স্বরে কি যেন বলে উঠল। প্রফেসর মার্কেজ তাড়াতাড়ি বিলকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই পবিত্র মূর্তির ছবি তোলা নিষেধ। নির্দেশ অমান্য করলে এখনই এই গার্ডরা তোমার পেটে বর্শা বিঁধিয়ে দিতে দ্বিধা করবে না। এতটাই প্রবল এদের ধর্মীয় বিশ্বাস। ছবি তোলা-তো দূরের কথা। কিছুকাল আগে পর্যন্ত সাদা চামড়ার মানুষদের প্রবেশ অধিকার ছিল না এখানে। এখনও এরা ঘৃণা করে সাদা চামড়ার লোকদের। কারণ, সাদা চামড়ার পিজরো অপবিত্র করেছিলেন এই মন্দির।’

সুজয় বলল, ‘এই ঘরও নিশ্চই সোনায় ভর্তি ছিল!’

দেয়ালের হুয়াকাগুলোর দিকে তাকিয়ে একটু চাপা স্বরে মার্কেজ বললেন, হ্যাঁ, তা তো ছিলই, তবে সবচেয়ে মূল্যবান যে দুটো জিনিস এ ঘরে রাখা ছিল, তা হল সূর্যদেবের সোনার চাকতি আর সম্রাট পাচাকুটির উৎসর্গ করা হাঁসের ডিমের আকারের একটা পান্না। অন্য সব সম্পদের সঙ্গে পিজরো এ দুটো পবিত্র জিনিসও লুঠ করেন। ইনকাদের অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি এ ব্যাপারে কর্ণপাত করেননি।’ বিল তার কথা শুনে বলল, ‘ও জিনিসগুলো নিশ্চয়ই এখন ইউরোপের কোনো মিউজিয়ামে শোভাবর্ধন করছে?’

মার্কেজ আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘না, তাহলেও তো অন্তত চর্মচক্ষু সার্থক করা যেত। এ ব্যাপারে যতটুকু জানা যায় পিজরো এ জিনিসগুলো দান করেছিলেন, তার বিশস্ত সঙ্গী ‘মানচিও সিয়েরো দ্য লেন-গুইসামো’-কে। লেনগুইসামো ছিলেন জুয়াড়ি। যেদিন তিনি ওগুলো হাতে পেলেন সেদিন সন্ধ্যাবেলাতেই সব কিছু তিনি খুইয়ে বসেন। তারপর ওসবের আর কোনো সন্ধান মেলেনি।’

গর্ভগৃহ ভালো করে দেখে নেওয়া হলে, সুজয়রা বাইরে বেরিয়ে এল। মার্কেজ বললেন, ‘চলুন, আমরা এবার এখানকার মিউজিয়াম দেখতে যাব। ওখানে ইনকা মমি রাখা আছে। দেখবেন কী অদ্ভুত!’ এই বলে তিনি সবাইকে নিয়ে এগোতে যেতেই সুসান হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে আঙুল তুলে এক দিকে দেখিয়ে বলল ‘ওই যে সেই লোকটা!’ সুজয়েরা তাকিয়ে দেখল, একটু দূর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে পিনচিও আর তার সেই সঙ্গী। তাদের সঙ্গে রয়েছে আর একজন দীর্ঘদেহী লোক। তার পরনে আলখাল্লার মতো দেখতে ঝলমলে পোশাক। মাথায়, পাখির পালক লাগানো তাজ। মুখে উলকি আঁকা। বেশ দৃপ্ত ভঙ্গীতে পা ফেলছে সেই লোকটা। পিনচিওরা সুজয়দের লক্ষ করেনি। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে, কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তারা অদৃশ্য হয়ে গেল একটা ভগ্নস্তূপের আড়ালে। প্রফেসর মার্কেজ সেদিকে তাকিয়ে মন্তব্য করলেন, ‘ওদের সঙ্গের লোকটা সম্ভবত একজন ইনকা পুরোহিত।’ তারপর সুজয়ের দিয়ে তাকিয়ে বললেন, ‘এখনও এসব অঞ্চলে ইনকা পুরোহিতদের অত্যন্ত প্রভাব আছে। স্থানীয় লোকেরা বেশ সমীহ করে চলে এদের।’ এই বলে তিনি সুজয়দের নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন মিউজিয়ামের উদ্দেশ্যে।

উকেয়ালি রিসর্টের ব্যালকোনিতে পাশাপাশি চেয়ার সাজিয়ে বসেছিল সুজয়রা। রিসর্টে ফিরতে সাড়ে চারটে বেজে গেছিল। তারপর নিজেদের ঘরে ঘণ্টা দেড়েক বিশ্রাম নিয়ে বারান্দায় এসে বসেছে সকলে। একটু আগেই বারান্দায় বসে সান্ধ্য জলযোগ সেরেছে। রিসর্টের লোক কফি আর খাবার দিয়ে গেছিল। খাবারটার নাম ‘পিকানটে-ডি-কুই’। স্থানীয় খাবার। শুকরের হার্ট, বিন আর নুডুলস দিয়ে বানানো। খেতে খুব একটা মন্দ লাগল না সুজয়ের।

সুজয়ের রিস্টওয়াচে সাতটা বাজে। বারান্দার আলো নিভিয়ে দিয়েছে সুজয়রা। চাঁদ ধীরে ধীরে মাঝ আকাশে উঠছে। তার মৃদু আলো এসে পড়েছে বারান্দায়। আশেপাশের হোটেলগুলোর ঢালু কাঠের ছাদের মাথার ওপর দিয়ে চাঁদের আলোতে উঁকি দিচ্ছে আন্দিজের শিখর। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডাও পড়তে শুরু করেছে। পাহাড়ি উপত্যকায় যেমন হয়। কোথা থেকে যেন মৃদু বাজনার শব্দ ভেসে আসছে। কাছের কোনো হোটেলের বলরুম থেকে হয়তো। এ ছাড়া অন্য কোনো সাড়া শব্দ নেই। সুজয়ের বেশ ভালো লাগছে পরিবেশটা। ইতিমধ্যে প্রফেসরের সঙ্গে তার কথা হয়ে গেছে যে তার সাথেই সুজয় মাচুপিচু রওনা হবে পরদিন ভোরে। সেখানে একদিন কাটাবে তারা। তারপর প্রফেসর আর সুজয় নিজ নিজ চিন্তাভাবনা অনুযায়ী নিজেদের কর্মপন্থা ঠিক করে নেবে।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর সুজয় প্রফেসরকে বলল, ‘এখনতো আমাদের বসে থাকা ছাড়া অন্য কোনো কাজ নেই। আপনি বরং ইনকাদের গল্প বলুন। তাতে সময়টাও কাটবে আর গল্পের ছলে এখানকার ইতিহাস সম্বন্ধেও আমার আরও কিছু জানা হয়ে যাবে।’ সুজয়ের কথা শুনে বিলও বলল, ‘হ্যাঁ, ডিনারের জন্য ডাক আসবে সেই রাত ন-টায়। আপনি গল্প বলুন, শুনি।’

মার্কেজ হেসে বললেন, ‘ইনকাদের ইতিহাস বেশ বিস্তৃত। তার কোন কাহিনি আপনাদের বলি বলুনতে? তার চেয়ে আমি আপনাদের ইনকা সভ্যতায় মানুষরা কেমন জীবন কাটাত সে সম্বন্ধে বলি। তাতে তাদের সম্বন্ধে আপনাদের একটা ধারণা হবে।’

এই বলে একটু চুপ করে থেকে প্রফেসর মার্কেজ বলতে শুরু করলেন, ‘‘ওই যে চাঁদের আলোতে জেগে আছে আন্দিজ পর্বতমালা, ওই পর্বতমালাকে কেন্দ্র করে উত্তর থেকে দক্ষিণে ইকুয়েডর থেকে চিলি পর্যন্ত দীর্ঘ এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধশালী সাম্রাজ্য, ইনকা সাম্রাজ্য। দক্ষিণের প্রশান্ত মহাসাগর, তারপর শুষ্ক মরুভূমি, তার গা দিয়ে উঠে যাওয়া আন্দিজ পর্বতমালা। আন্দিজের তুষারধবল শৃঙ্গ, তার পূর্ব দিকে পাহাড়ের ঢালে, আমাজান অববাহিকার গহীন জঙ্গল, এ সবই ছিল ইনকা সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। প্রকৃতি দিয়েছিল অফুরন্ত সম্পদ। আর তাকে ব্যবহার করে সৎ পরিশ্রমী ইনকা গোষ্ঠী সাজিয়ে তুলেছিল তাঁদের সভ্যতাকে। ইনকা সভতা সত্যিই ছিল সোনার সভ্যতা। সমকালীন ইউরোপীয় সভ্যতার চেয়ে প্রকৃত অর্থেই অনেক এগিয়ে ছিল এ সভ্যতা। তাদের সমাজজীবনও ছিল নৈতিকতার দিক থেকে ইউরোপীয়দের থেকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। চুরি কাকে বলে তা বলতে গেলে জানা ছিল না ইনকাবাসীদের। কাজের জন্য কোথাও কেউ বাড়ি ছেড়ে গেলে সে তার ঘরের দরজা খোলা রেখে যেত। শুধু ঘরের মালিকের লাঠিটা শোয়ানো থাকত দরজার সামনে। যাতে অন্য কেউ এলে তা দেখে সে বুঝতে পারে যে ঘরের মালিক অন্যত্র গেছে। পিজরোর অনুচররা যখন ইনকা গ্রামে পা রাখে তখন এ ব্যাপারটা দেখে তারা ভীষণ আশ্চর্য হয়। ঘরে ভর্তি সোনার জিনিস, অথচ ঘরের দরজা হাট করে খোলা! ঘরের মালিক তখন হয়তো গেছে একশো মাইল দূরে আন্দিজের জঙ্গলে শিকার করতে! দৈবাৎ কেউ চুরি করলে তাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হত। তবে তার বিচারের সময় বিচারক দেখতেন তার চুরির কারণ। স্বভাবজাত না-অভাবজাত? প্রথমটা হলে কঠিন শাস্তি। কিন্তু দ্বিতীয়টা হলে চোরের পরিবর্তে শাস্তি দেওয়া হত গ্রাম প্রধানকে। কারণ, তাঁর শাসনকার্যের গাফিলতিতেই অভাবগ্রস্ত হয়ে লোকটা চুরি করতে বাধ্য হয়েছে। কৃষিভিত্তিক ইনকা সমাজে খাদ্যের কোনো অভাব ছিল না। প্রতিবন্ধী এবং বৃদ্ধদেরও তাদের ক্ষমতা অনুযায়ী শ্রমের বিনিময়ে খাদ্য দান সুনিশ্চিত ছিল। অনাহারে কারও মৃত্যু হত না ইনকা রাজ্যে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আজও পৌঁছোতে পারেনি এ উচ্চতাতে, যা করে দেখিয়েছিল ইনকারা। ভাবতে পারেন?’ কথাগুলো বলে মার্কেজ তাকালেন সুজয়ের দিকে।

সুজয় বলল, ‘বাঃ সত্যিই বিস্ময়কর!’

মার্কেজ আবার বলতে লাগলেন, ‘এই সমৃদ্ধশালী সভ্যতার শাসন কাঠামোও ছিল। বেশ কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল সাম্রাজ্য, তার কেন্দ্র ছিল কুজকো। প্রতিটি প্রদেশে ছিল গ্রাম দিয়ে ঘেরা নগর। সম্রাট বছরে অন্তত একবার বড়ো বড়ো নগর পরিদর্শনে যেতেন। সেসব নগরেও সম্রাটের প্রাসাদ থাকত। নগরীগুলো ছিল প্রাচুর্য আর বৈভবে পরিপূর্ণ। প্রত্যেক নগরীতে থাকত একটা করে সূর্যমন্দির আর মন্দির সংলগ্ন সূর্যকন্যাদের আবাস। আর যা থাকত তা হল সরকারি কোষাগার। সেখানে সঞ্চিত থাকত সোনা আর রুপো। তবে একটা ব্যাপার জেনে রাখা প্রয়োজন যে সোনা-রুপো কিন্তু কখনই ইনকাদের কাছে সে অর্থে লেনদেনের মাধ্যমে ছিল না। শ্রমদান ও তার বিনিময়ে খাদ্য এই ছিল সে-সময়ের ব্যবস্থা। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ক্ষেত্রেও এই প্রথাই চালু ছিল। আসলে তাঁরা মনে করতেন যে সোনা হল সূর্যদেবের ঘর্ম আর রুপো হল চন্দ্রদেবের অশ্রু। তাদের বিশ্বাস ছিল যে এই দুটি ধাতু যার কাছে থাকবে, সূর্যদেব ও চন্দ্রদেবের আশীর্বাদ তত তার ওপর বর্ষিত হবে। অর্থনৈতিক কারণে নয়, এই ধর্মীয় বিশ্বাস থেকেই সম্রাট থেকে সাধারণ প্রজা সবাই সোনার প্রতি আকৃষ্ট হতেন। শহরের উন্নতি কামনায় সোনা দিয়ে সাজানো হত শহর।’

মার্কেজ এই পর্যন্ত বলার পর বিল তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘ইনকাদের যে স্বর্ণনগরী ‘এল ডোরাডো’-র গল্প শোনা যায় সে নগরী কি সত্যিই ছিল?’

প্রফেসর তার কথা থামিয়ে বিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘না। ইনকা সাম্রাজ্যে সোনার তৈরি মন্দির-প্রাসাদ থাকলেও ওরকম সোনার তৈরি কোনো নগরী ছিল না। বিখ্যাত অভিযাত্রী আলেকজাণ্ডার ফন হুমবোল্ট মন্তব্য করেছিলেন, ‘ইনকাদের ‘এল ডোরাডো’ একটা মরীচিকা। যার পিছনে ছুটে বেড়িয়েছে স্বর্ণ সন্ধানী ইউরোপীয়রা।’

সুজয়ও বিভিন্ন বইতে ‘এল ডোরাডো’-র কথা পড়েছে। তার মনের মধ্যেও একটা ধারণা ছিল, ইনকাদের এ নগরী হয়তো সত্যিই ছিল। মার্কেজের কথা শুনে সে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে যুগ যুগ ধরে এ কাহিনি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল? বহুবিখ্যাত বই সিনেমাওতো তৈরি হয়েছে ওই নগরীকে নিয়ে। এমনকি বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক তাঁর জগদবিখ্যাত উপন্যাস কাঁদিদ-এর পাত্র-পাত্রীকেও তো ‘এল ডোরাডো’তে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন!’

প্রফেসর মার্কেজ তার প্রশ্ন শুনে বললেন, ‘আপনার কথার উত্তর দিতে হলে আমাকে একটু প্রসঙ্গান্তরে যেতে হবে। তবু ব্যাপারটা আপনাকে বুঝিয়ে বলি—’

‘স্পেনীয়রা যখন ইনকা সাম্রাজ্যে লুন্ঠন শুরু করে তখন নগরীগুলোর সোনার প্রাচুর্যের কথা লোক মুখে মুখে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। যা পল্লবিত হয়ে জন্ম দেয় এক কল্পিত স্বর্ণনগরীর—যার পথের ধুলাও সোনা! এল ডোরেডো শব্দের উৎপত্তি হয় ষোড়শ শতাব্দীতে। আসল শব্দ হল, ‘EL INDIO DOREDO’। যার অর্থ ‘সোনার তৈরি ইন্ডিও’ বা ‘সোনার তৈরি মানুষ’। শহর নয়। সেই সময় ইনকা সাম্রাজ্যের অন্তর্গত কলম্বিয়ার বোগেটা অঞ্চলে চিবচা জনগোষ্ঠী এক ধর্মীয় উৎসব করত। প্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে একজন ইন্ডিয় যুবককে বলি দিয়ে তার দেহ সোনায় মুড়ে গিয়েনা অঞ্চলের এক হ্রদ বা নদীতে ফেলে দিত। ওই চিবচা জনগোষ্ঠী যে নগরীতে বাস করত তা সোনায় মোড়া বলে জনশ্রুতি ছিল। তারা নাকি সোনার তৈরি পোশাক পরতেন! কিন্তু ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দে সানফ্রান্সিসকো পিজরোর ভাই গনজালো পিজরো ও ১৫৯০ খ্রিস্টাব্দে অভিযাত্রী আন্তেনিও বহু-সন্ধান চালিয়েও, সেই হ্রদ, সেই নগরী বা এমন কোনো ইন্ডিওদের সন্ধান পাননি যারা সোনার পোশাক পরেন।

এবার বলি, এল. ডোরাডোর কথা ইউরোপ ছাড়িয়ে কীভাবে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। বিখ্যাত ব্রিটিশ পুরুষ, স্যার ওয়াল্টার র‍্যালের নাম নিশ্চই আপনার জানা আছে। এল. ডোরাডোর অলীক কাহিনি বিশ্বব্যাপী প্রচারের কৃতিত্ব তাকেই দেওয়া যেতে পারে। গনজালো পিজরোর অন্বেষণ ব্যর্থ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে একটা মতামত দিয়ে যান। তিনি বলেন যে, তাঁর অনুমান গিয়েনা অঞ্চলে আমাজন নদী ও ওরিনাকো অঞ্চলের মাঝামাঝি কোনো স্থানে গভীর অরণ্যের মধ্যে সেই হ্রদ আর স্বর্ণনগরী লুকানো আছে। সেই স্থানের একটা কল্পিত ম্যাপও তিনি আঁকেন। কী’ভাবে যেন সেই ম্যাপ গিয়ে পড়ে স্যার র‍্যালের হাতে। ১৫৯৬ সালে স্যার র‍্যালে ওই ম্যাপের ওপর ভিত্তি করে এল. ডোরাডোর সম্বন্ধে একটি বই লেখেন। এমন বিশ্বাস যোগ্যতার সঙ্গে তিনি স্বর্ণনগরীর বাস্তবতা ওই বইতে উপস্থাপিত করেন যে সে বই পড়ে সারা পৃথিবী ব্যাপী সাড়া পড়ে যায়। সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করে এল ডোরাডোর গল্প। এই সময় কি একটা ভিন্ন রাজনৈতিক কারনে ব্রিটেনে গ্রেপ্তার হল র‍্যালে। ব্রিটিশ সরকার এই শর্তে তাঁকে মুক্তি দেন যে তিনি ওই স্বর্ণনগরী অভিযানে যাবেন এবং সেখানে যা সোনা পাবেন তা তুলে দেবেন ব্রিটিশ সরকারকে। এ ঘটনায় নিশ্চই বুঝতে পারছেন যে র‍্যালের লেখা বই কী পরিমাণ বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেছিল ব্রিটিশ সরকারের মনেও! যাই হোক ১৬১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত
র‍্যালে গনজালোর ম্যাপে বর্ণিত স্থানে স্বর্ণনগরী আর সেই হ্রদ খুঁজতে যান। কিন্তু সেই নগরী বা হ্রদ কোনোটাই তিনি খুঁজে পাননি। ১৬১৮ সালে ব্যর্থ অভিযান শেষে র‍্যালে ব্রিটেনে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। কিন্তু তার বই যুগযুগ ধরে এল ডোরাডো সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে রাখে মানুষের মনে।’

এক টানা কথাগুলো বলে একটু থামলেন প্রফেসর। তারপর বললেন, ‘তবে, বেশ কিছু ইনকা নগরীতে প্রচুর পরিমাণ সোনা সঞ্চিত ছিল সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। কেউ কেউ বলেন যে, যে পরিমাণ সোনা পিজরো হস্তগত করেছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ সোনা নাকি ছিল ইনকাদের।’

‘তাহলে সে-সব সোনা কোথায় গেল?’ প্রশ্ন করল বিল।

তিনি বললেন, ‘পিজরোর লুন্ঠনের সময় ভীত ইনকারা নাকি সেসব সোনা পাহাড়-অরণ্যের মাঝে অবস্থিত বিভিন্ন ছোটো ছোটো নগরীতে লুকিয়ে ফেলে। দুর্গম স্থানে অবস্থিত সেসব নগরী খুঁজে বার করতে পারেনি পিজরো বাহিনী। কালের নিয়মে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে-সব সোনা আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়। যদিও পিজরোর পরবর্তীকালে গত চারশো বছর বেশ কিছু অভিযান হয়েছে সেসব স্বর্ণসন্ধানে, কিন্তু উল্লেখযোগ্য সাফল্য তেমন কেউ পাননি। কেউ হয়তো পেয়েছেন, একটা আধ ভাঙা রূপার পাত্র, কেউ পেয়েছেন কর্ণকুন্ডলের সামান্য অংশবিশেষ। ব্যাস এ পর্যন্তই।’

সুজয় এবার জানতে চাইল, ‘সোনার সন্ধান না-পাওয়া যাক, ওই সব হারিয়ে যাওয়া নগরের সন্ধান পাওয়া গেছে কি?’

মার্কেজ উত্তর দিলেন, ‘মাচুপিচুই তো ওই রকম একটা স্থান। দুর্গম পর্বতমালা আর অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত ছিল বলে স্পেনীয়রা তার সন্ধান পায়নি। ফলে ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায় জায়গাটা। ১৯১১ সালে মার্কিন প্রত্নতত্ত্ববিদ ‘হিরাম বিংগহ্যাম’ খুঁজে বার করেন ইনকাদের এই পবিত্র নগরীর ধ্বংসাবশেষ। মাচুপিচুর মতন বিরাট না-হলেও আরও কিছু ছোটো খাটো জনপদের ধ্বংসাবশেষও আবিষ্কৃত হয়েছে কিছু জায়গাতে, ঐতিহাসিক গবেষকদের কাছে সে-সব জায়গার কাঞ্চনমূল্য যথেষ্ট।’

‘আপনি সে-সব নগরীতে গেছেন কখনও?’ আবার প্রশ্ন করল সুজয়।

মার্কেজ বললেন, ‘না। বিখ্যাত জায়গাগুলো দেখেছি ঠিকই। কিন্তু ওসব জায়গাতে যাওয়া হয়নি। আসলে ওসব জায়গায় যাওয়া একটু কষ্ট সাধ্য। পায়ে হেঁটে পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ট্রেক করে যেতে হয়। স্থানীয় কিছু মানুষ ওসব পথের সন্ধান জানে। মাচুপিচু যাবার পর এবার ওরকমই কোনো জায়গার সন্ধানে যাবার ইচ্ছা আমার। এ ব্যাপারে আমাকে খোঁজ খবর নিতে হবে।’

‘ওরকম একটা জায়গার সন্ধান কিন্তু আমার কাছে আছে।’

মার্কেজের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে খুব কাছ থেকে ভেসে এল কথাগুলো। সুজয়রা তন্ময় হয়ে শুনছিল মার্কেজের গল্প। কথাগুলো কানে যেতেই সুজয় একপাশে তাকিয়ে দেখতে পেল একটু দূরে বারান্দায় আধো আলো-ছায়াতে একটা থামের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন। লোকটার মুখ অন্ধকারে থাকলেও চাঁদের আলোতে তার পোশাক দেখে তাকে চিনতে পারল সুজয়। পর-মুহূর্তে থামের কাছ ছেড়ে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন সিয়েরো পিনচিও! মাকসাহুয়ামানে আজ যাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে সুজয়দের।

তিনি সামনে এসে দাঁড়াতে প্রফেসর মার্কেজ সৌজন্যবশত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আসুন, আসুন মিস্টার...মিস্টার...’ মার্কেজ মনে হয় তাঁর নামটা মনে করতে পারছিলেন না। ‘সিয়েরো পিনচিও’, মার্কেজের অসম্পূর্ণ বাক্যটা সম্পূর্ণ করলেন পিনচিও নিজেই। তারপর একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসতে বসতে বললেন, ‘আপনাদের সঙ্গে একটু সময় কাটালে নিশ্চই আপনাদের আপত্তি হবে না। আসলে ঘণ্টাখানেক আগে রিসর্টে ফিরেছি। রুমে একলা সময় কাটছিল না। মনে হল, যখন আপনাদের সঙ্গে পরিচয় হলই, তখন আপনাদের সঙ্গে একটু দেখা করি। তাই চলে এলাম।’

মার্কেজ চেয়ারে বসে বললেন, ‘ভালোই করেছেন। আমরাও সময় কাটাবার জন্য বসে বসে গল্প করছি।’

সিয়েরো পিনচিও পকেট থেকে একটা চুরুট বার করে লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে নিয়ে মার্কেজের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনি কিন্তু বেশ গল্প বলেন। আমি দাঁড়িয়ে শুনছিলাম।’

মার্কেজ জবাবে বললেন, ‘এখানকার ইতিহাস নিয়ে আমার কিছুটা পড়াশোনা আছে। আগে বার দুই এসেছি এখানে। আমার সঙ্গীরা শুনতে চাইল, তাই বলছিলাম।’ এরপর তিনি পিনচিওকে প্রশ্ন করলেন, ‘তা আপনি ইনকাদের প্রাচীন সন্ধান সম্বন্ধে কী জানা আছে বলছিলেন?’

পিনচিও বললেন, ‘হ্যাঁ। মাচুপিচু থেকে নাকি দিন তিনেকের পথ সে-জায়গা। ইনকাদের ভাঙা ঘর বাড়ি, সূর্য মন্দির-টন্দির সেখানে আছে। সেখানে যারা বাস করেন তারা নাকি আজও ইনকা যুগে পড়ে আছে। মানে তারা নাকি সত্যিকারের ইনকা! ভিকুয়ার পশমের রঙচঙে পোশাক পরে, পায়ে কাঠের চটি, মাথায় পাখির পালক গোঁজে, বর্শা দিয়ে শিকার করে। তবে তাদের সোনা-দানা আছে কিনা জানি না।’

মার্কেজ উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘সে-জায়গার নাম কী? আপনি রুট ম্যাপ জানেন?’

চেয়ারে হেলান দিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে পিনচিও বললেন, ‘না সে জায়গার নাম বা রুট ম্যাপ আমার জানা নেই। আসলে, আজ করিকানচাতে আমার গাইড’ হুইকা, সূর্যমন্দিরের এক পুরোহিতের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। কথা প্রসঙ্গে তার কাছ থেকেই শুনলাম জায়গাটার কথা। বাইরের লোকজনের যাওয়া-আসা সেখানে নেই। দিন চারেক পর সেখানে কি একটা উৎসব হবে। করিকানচার পুরোহিত যাবেন সেখানে। পাহাড়-নদী-জঙ্গল পার হয়ে অনেক কষ্টে ওই স্থানে যেতে হয়।’

এরপর একটু থেমে পিনচিও বললেন, ‘ওই পুরোহিত লোকটার নাম, ইল্লাপা। বংশপরম্পরায় সে সূর্যমন্দিরের পুরোহিত। হুইকা বলছিল, লোকটা নাকি এ অঞ্চলের অনেক কিছুর খোঁজ খবর জানে। তা ছাড়া সে নাকি জাদুবিদ্যারও চর্চা করে!’

মার্কেজ শুনে বললেন, ‘ইনকা পুরোহিতদের অনেকেই এ বিদ্যার চর্চা করে থাকেন। স্থানীয় মানুষেরা এ কারণে তাদের বেশ ভয়ভক্তি করে থাকে। লোকটার সঙ্গে পরিচয় হলে কিছু খোঁজ খবর হয়তো পেতে পারতাম।’

পিনচিও বললেন, ‘আমি কাল মাচুপিচু দেখতে যাচ্ছি। ওই পুরোহিত আমাকে অনুরোধ জানিয়েছে, আমার গাড়িতে সে পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে যেতে। আমার সঙ্গে কাল সে যাবে। আপনারা যদি...’

তাঁর কথা শেষ হবার আগেই মার্কেজ বললেন, ‘আমরাও তো কাল ওখানেই যাচ্ছি। পুরোহিত লোকটার সঙ্গে তাহলে নিশ্চই আপনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে পারবেন।’

পিনচিও মৃদু হেসে জবাব দিলেন, ‘ও কাজটা মনে হয় করতে পারব।’

এরপর পিনচিও অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়ে সুজয়দের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তা আজ যা যা দেখলেন, তার মধ্যে কোন জায়গাটা ভালো লাগল আপনাদের?’

সুসান এতক্ষণ চুপচাপ বসে কথোপকথন শুনছিল। সম্ভবত সে তার প্রতি পিনচিওর দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই হঠাৎ শিশু সুলভ ভঙ্গীতে বলে উঠল, ‘করিকানচার সূর্যমন্দির।’

পিনচিও তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাঃ, তাই নাকি! তা ওখানে তোমার কী কী ভালো লেগেছে?’

সুসান জবাব দিল, ‘মিউজিয়ামে মমি আর সূর্যদেবের ঘরটা। অনেকদিন আগে যেখানে একটা সোনার চাকতি আর পান্না রাখা ছিল। পিজরো বলে একটা লোক সেগুলো নিয়ে নিয়েছে।’

পিনচিও আবার বললেন, ‘বাঃ, তুমিতো বেড়াতে এসে অনেক কিছু জেনে ফেলেছ দেখছি! গুড বয়!’

প্রশংসা শুনে সুসান সলজ্জ ভঙ্গীতে বলল, ‘দাদু বলেছে’।

এরপর পিনচিও মার্কেজের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বললেন, ‘আচ্ছা, ওই সোনার চাকতি আর পান্নার ব্যাপারে আপনার ইতিহাস কী বলে?’ মার্কেজ বললেন, পিজরো ও-জিনিসগুলো তাঁর এক জুয়ারি সঙ্গীকে দান করেছিলেন। সে জুয়ার আসরে ওগুলো খুইয়ে বসে।’

‘ও ব্যাপারটা সবার জানা, কিন্তু তারপর?’ আবার প্রশ্ন করলেন পিনচিও।

‘এর চেয়ে বেশি কিছু ইতিহাসে লেখা নেই’। ‘এটা একটা মিস্ট্রি বলতে পারেন,’—জবাব দিলেন প্রফেসর।

পিনচিও কয়েক মুহূর্ত যেন কী চিন্তা করলেন। তারপর মৃদু হেসে চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন, ‘আমি এখন যাই। কাল দেখা হবে। গুড নাইট এভরিবডি।’ সুজয়রাও উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে বিদায় সম্ভাষণ জানাবার পর, যেমন হঠাৎ তিনি এসেছিলেন, তেমনই হঠাৎ চলে গেলেন পিনচিও।

তিনি চলে যাবার পর মার্কেজ বললেন, ‘পিনচিও ভদ্রলোক কিন্তু বেশ মিশুকে। দু-দু-বার নিজেই পরিচয় করতে আর কথা বলতে এলেন।’

বিল মন্তব্য করল, হ্যাঁ, তবে লোকটার একটু আড়িপাতার স্বভাব আছে। আপনারা যখন ওকে দেখলেন তার মিনিটপাঁচেক আগেই উনি এসে দাঁড়িয়েছিলেন থামের কাছে। আমি লক্ষ করেছি।’

প্রফেসর পালটা কোনো মন্তব্য করলেন না তার কথা শুনে। এরপর তিনি আবার ফিরে গেলেন ইনকার গল্পে। চাঁদের আলোতে বসে সুজয়রা শুনতে লাগল সেই ফেলে আসা যুগের নানা কথা। টুকরো টুকরো ভাবে সেই সময় যেন মার্কেজের কথার মাধ্যমে ধরা দিতে লাগল সুজনের সামনে।

ঠিক রাত ন-টায় নীচে ডাইনিংরুমে ডাক পড়ল তাদের। বিরাট ডাইনিং-এ ধবধবে সাদা চাদর বিছানো টেবিল। বেশ কিছু টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে খেতে বসেছে টুরিস্টরা। হালকা আলো জ্বলছে ঘরে। সুজয়রা একটা টেবিলে বসল। পেরুভিয়ান খাবারই সার্ভ করা হল তাদের। তার একটা পদের নাম, ‘আন্দিয়ান পাঁচামানকা’। মাংস, বিন আর ওল জাতীয় কন্দ দিয়ে রান্না। অন্যটার নাম ‘লোমো সলতাদো’। মাংস, টম্যাটো ও পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি। ভাত দিয়ে মেখে খেতে হয়। পেরুতেও যে ভাত খাওয়া হয় তা দেখে অবাক হল সুজয়। তার ধারণা ছিল ভাত জিনিসটা শুধু এশীয়দেরই খাবার। বেশ তৃপ্তি করে খেল সকলে।

খাওয়া শেষ হবার পর যখন সুজয়রা তাদের ঘরের কাছে ফিরে এল তখন রাত দশটা বাজে। বিল আর সুজয় নিজেদের ঘরে ঢোকার আগে মার্কেজ জানিয়ে দিলেন, পরদিন সকাল সাতটার মধ্যে তৈরি হয়ে নিতে হবে মাচুপিচুতে যাবার জন্য। আর গাড়িতে ওঠার সময় হাত ব্যাগে গরম জামাকাপড় নিতে হবে, কারণ ও জায়গাটা একদম পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত। এ হোটেল থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে মাচুপিচুতে গিয়ে থাকবে তারা।

অন্যদের থেকে বিদায় নিয়ে ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে সারাদিনের কথা ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল সুজয়।

চড়াই বেয়ে উঠছে সুজয়দের গাড়ি। মসৃণ পাথর বিছানো রাস্তা। দু-পাশে ঘন জঙ্গল। মাঝে মাঝে নীচের দিকের তাকালে চোখে পড়ছে গভীর বনানীর মাঝে রূপালি রেখা। চুলের কাঁটার মতো নাম না-জানা পাহাড়ি নদীর বাঁক। দূরের তুষারধবল পর্বতমালাগুলো ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে।

বেশ ঝলমলে সকাল। কুজকো থেকে যাত্রা শুরু করার পর ঘণ্টা খানেক সময় কেটে গেছে। দু-পাশের প্রকৃতির শোভা দেখতে দেখতে চলেছে সবাই। মার্কেজ বললেন, ‘আমরা যে রাস্তা ধরে চলেছি, এর নাম ‘ইনকা রোড’। এ রাস্তা কিন্তু ইনকা সম্রাটদের আমলে তৈরি করা। ভালো করে লক্ষ করুন রাস্তার পাথরের ব্লকগুলো কী নিখুঁতভাবে কেটে পাশাপাশি বসানো আছে। অথচ ভাবতে অবাক লাগে যে ইনকারা লোহার ব্যবহার জানত না! তবে আমরা যে-পথ আজ গাড়িতে চলেছি, এপথ কিন্তু তৈরি হয়েছিল পায়ে চলার জন্যই। আমরা ওপর দিকে উঠলেও রাস্তার ঢাল খুব সামান্য। মানুষ এবং পণ্য বহনকারী লামাদের চলাচলের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল এ পথ।’

সুজয় প্রশ্ন করল, ‘এ রাস্তা কার আমলে তৈরি হয়?’

মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘এ রাস্তা ঠিক কার আমলে হয়েছিল তা সঠিক বলতে পারব না। তবে মজার ব্যাপার হল, ইনকারা লোহার মতো ‘চাকা’-র ব্যবহার না-জানলেও তাদের সড়ক ব্যবস্থা কিন্তু খুব উন্নত ছিল। সাম্রাজ্যের পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরের তটরেখা বরাবর দক্ষিণ থেকে উত্তরে নির্মাণ করা হয়েছিল প্রধান সড়ক। এসড়ক পথ তার শাখাপ্রশাখা মিলিয়ে কুড়ি হাজার কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত ছিল। সমুদ্র উপকূল থেকে বাইশহাজার ফুট উচ্চতাতেও উঠেছে এসব পথ। ভাবতে পারেন!?’

এরপর একটু আবেগ মথিত কন্ঠে তিনি বললেন, ‘আমরা যে পথ ধরে ওপরে উঠছি সে-পথ ধরেই একদিন স্বর্ণনির্মিত চতুর্দোলায় চেপে, বর্শাধারী পদাতিক সৈন্য পরিবেষ্টিত হয়ে পবিত্র মাচুপিচুতে যেতেন ইনকা সম্রাটরা। সৈন্যদের কাঠের জুতো পরা পায়ের সংঘবদ্ধ পদচারণার শব্দ প্রতিধ্বনিত হত পাথুরে দেওয়ালে। এদের রঙচঙে পোশাক, সোনার সাজ সূর্যের আলোতে এমন ঝলমল করত যে চোখ ধাঁধিয়ে যেত অনেক দুর থেকে চেয়ে থাকা পথিকদের। রাস্তার পাশে ছড়িয়ে থাকা প্রজারা পরমসম্ভ্রমে মাথা নোয়াতো সম্রাটের উদ্দেশ্যে। কারণ, তিনি স্বয়ং সূর্যপুত্র! তুষার-ধবল পর্বতমালা, বিস্তীর্ণ সমুদ্রপকূল, নদী-বনজঙ্গল এসব কিছুরই মালিক হলেন তিনি—ইনকা। কিন্তু কালের অমোঘ নিয়মে সেদিনের সোনাঝরা ইনকা সাম্রাজ্য হারিয়ে গেছে। পড়ে আছে এ পথটাই। যে পথ আমাদের পৌঁছে দেবে ইনকাদের স্মৃতিমন্দির মাচুপিচুতে।’

বেশ কিছু টুরিস্ট গাড়ি চলছে সুজয়দের গাড়ির আগে-পিছে। রাস্তার স্পিড লিমিট বাঁধা আছে পঁচিশ কিলোমিটার। নিয়ম মেনেই চলছে সবাই। রাস্তা সংরক্ষণের জন্য বড়ো-ভারি গাড়ি চলা নিষিদ্ধ এ রাস্তায়। অধিকাংশই জিপ বা ল্যাণ্ডরোভার জাতীয় গাড়ি চোখে পড়ছে। আর চলছে ভারবাহী লামাদের কাফেলা। উট জাতীয় প্রাণীগুলো নানা ধরনের পুঁতির মালা দিয়ে সাজানো। টুং-টাং মিষ্টি শব্দ হচ্ছে তাদের গলার ঘণ্টা থেকে। পিঠের দু-পাশে ঝুলছে পণ্যের বস্তা। মার্কেজ জানালেন ওই সব বস্তায় কুজকো থেকে মাচুপিচুতে টুরিস্টদের জন্য রসদ যাচ্ছে। যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলে এ ভাবেই পণ্য পরিবহণ হয়। তবে বিজ্ঞানের আর গতির যুগে এ ব্যবস্থা আর কিছুদিনের মধ্যে শেষ হয়ে আসছে। ইউনেস্কো মাচুপিচুকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’-এর তালিকার অন্তর্ভুক্ত করায় এমনিতেই ভিড় বাড়ছিল। তার ওপর সম্প্রতি মাচুপিচু পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের তালিকাভুক্ত হওয়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে পর্যটক এখানে ছুটে আসছে। এই অবস্থা সামাল দিতে ভিলকন্টানদীর ওপর আধুনিক ব্রিজ তৈরি করছে গভর্নমেন্ট। অতিদ্রুত পণ্যবাহী যানবাহন আর টুরিস্ট যে পথে পৌঁছে যেতে পারবে মাচুপিচুতে।

দু-পাশের প্রকৃতির শোভা দেখতে দেখতে চলল সুজয়রা। সুসানকেও আজ বেশ চনমনে দেখাচ্ছে। পথের পাশে নানা দৃশ্য দেখে মাঝে মাঝে এটা কী? এটা কী বলে প্রশ্ন করতে লাগল তার দাদুকে। মার্কেজ তার প্রশ্নের জবাব দিতে লাগলেন, আর তার পাশাপাশি সুজয় আর বিলের উদ্দেশ্যে বলে চললেন ইনকা সভ্যতার খন্ড খন্ড কথা। প্রয়োজন মতো সুজয়ও তাঁকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে লাগল।

আরও এক ঘণ্টা পথ চলার পর পথের বাঁকে নীচের দিকে চোখে পড়ল এক নদী। নদীটা যে বেশ বড়ো তা ওপর থেকেই বোঝা যাচ্ছে। বাঁক নিয়ে সে হারিয়ে গেছে পাহাড়ের ঢালে গভীর অরণ্যের মধ্যে। এত দূর থেকেও তার কলোচ্ছ্বাস যেন কানে আসছে। মার্কেজ বললেন, ‘ওই দেখুন বিখ্যাত উরুবাম্বা নদী। এ নদী আমাজনের উৎস। আমরা আমাদের গন্তব্যের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’ গাড়ি থামিয়ে ওপর থেকে উরুবাম্বার ছবি তুলল বিল আর সুজয়। বাইরের বাতাস বেশ ঠাণ্ডা লাগছে। ছবি তোলার পর গাড়িতে উঠে হালকা গরম পোশাক গায়ে চাপিয়ে নিল সকলে। আর আধঘন্টার মধ্যেই তাদের গাড়ি পৌঁছে গেল পাহাড় ঘেরা উপত্যকার পাদদেশে।

সুজয়দের গাড়ি যেখানে এসে থামল সে জায়গাতে লোকজন গাড়িঘোড়ার ভিড়। তার একটা বড়ো অংশই বিদেশি টুরিস্ট। রাস্তার পাশে সার সার দোকান। কাঠের তৈরি দোতলা-তিনতলা বেশ বড়ো বড়ো আধুনিক কয়েকটা হোটেলও আছে সেখানে। সুজয়ের মনে ধারণা ছিল এ জায়গাটা হয়তো ফাঁকা ফাঁকা হবে। গাড়ি থেকে নামার পর সে প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করল, ‘এ জায়গাই কি মাচুপিচু?’ মার্কেজ হেসে বললেন, ‘আমরা দাঁড়িয়ে আছি মাচুপিচুর পাদদেশে। ওই দেখুন!’ এই বলে তিনি আঙুল তুলে দেখালেন সুজয়ের পিছন দিকে পাহাড়ের দিকে। সে দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল সুজয়। পাশাপাশি দুটো পাহাড় সে দিকে উঠে গেছে আকাশের দিকে। আর সেই দুই পাহাড়ের খাঁজে থাক থাক পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ। কালচে-হলদেটে গ্র্যানাইট পাথরের তৈরি সার সার বাড়ি-ঘর-স্তম্ভ। প্রাচীনত্বের গাম্ভীর্য নিয়ে বিরাজমান পাহাড়ের বুকে। আকাশ আর পাহাড়ের রং দুটোই ঘন নীল। একেবারে ওপরের দিকের বাড়ি-ঘরগুলো ঢেকে আছে ঘন কুয়াশার মধ্যে। সময় যেন সত্যিই থমকে আছে ওখানে। মার্কেজ বললেন, ‘ওই হল মাচুপিচু, ‘দ্য সেক্রেড প্লেস অব ইনকা।’

এখানে হোটেল বুকিং কুজকো থেকেই করা ছিল মার্কেজের। গাড়ি ছেড়ে কিছুটা হেঁটে ছিমছাম দেখতে দোতলা একটা হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে মার্কেজ বললেন, ‘এই আমাদের হোটেল।’ হোটেলের গায়ে সোনালি হরফে বড়ো বড়ো করে লেখা ‘গোল্ডেন ইনকা’। মার্কেজ কাচের দরজা ঠেলে সুজয়দের নিয়ে প্রবেশ করলেন গোল্ডেন ইনকার রিসেপশনে। বেশ সুন্দরভাবে সাজানো রিসেপশন রুম। মাটিতে লাল কার্পেট পাতা। দেওয়াল জুড়ে মাচুপিচুর বাঁধানো ফটোগ্রাফ—দর্শনীয় স্থানের ছবি।

সুজয়রা বসল রিসেপশনের সোফায় আর মার্কেজ এগিয়ে গেলেন ঘরের এক কোণায় কাউন্টারের দিকে। সেখানে বসেছিলেন এক সুবেশী তরুণী। মার্কেজ পকেট থেকে বুকিং স্লিপ বার করে এগিয়ে দিলেন তার দিকে। কী সব কথাবার্তা হল তাদের দুজনের মধ্যে। মার্কেজকে একটা খাতায় সই করালেন রিসেপশনিস্ট, তারপর ডেকে পাঠালেন এক বেয়ারাকে। মার্কেজের ইশারাতে উঠে পড়ল সুজয়রা। লাগেজগুলো তুলে নিল বেয়ারা। সবাইকে নিয়ে তার পিছন পিছন হোটেলের ভিতর প্রবেশ করলেন মার্কেজ।

সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতে উঠতে সুজয়ের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, ‘আপনার হয়তো একটু অসুবিধা হবে। আসলে আমার দুটো রুমের বুকিং ছিল। আর একটা রুম পাওয়া গেল না। আপনাকে আর বিলকে একটা রুমে থাকতে হবে। তবে রিসেপশনিস্ট বলল, একটা ঘরে দুজনের থাকার কোনো অসুবিধা নেই।’

সুজয় বলল, ‘বিলের কোনো অসুবিধা না-হলে আমার অসুবিধা হবে না।’

বিল বলল, ‘আমার আবার কী অসুবিধা হবে! মাস খানেকতো আমাজনের জঙ্গলে তাঁবুর মধ্যেই রাত কাটালাম! একবার তো একটা প্যান্থারের বাচ্চা সারা রাত কাটিয়ে গেল তাঁবুতে আমার ক্যাম্পখাটের নীচে। হোটেলের ঘর তো সে তুলনায় স্বর্গ। রাতবিরেতে জন্তুজানোয়ার ঢুকে পড়ার ভয় নেই।’

বিলের কথা শুনে মার্কেজ বললেন, ‘তাঁবুর কথা শুনে মনে পড়ে গেল, ‘রিসেপশনিস্ট বলল যে পাহাড়ের ওপর মাচুপিচু চত্বরের মধ্যেই নাকি ‘গোল্ডেন ইনকার’ তাঁবুতে থাকার ব্যবস্থা আছে। প্রয়োজন হলে সেখানেও আমরা থাকতে পারি।’

সুজয় বলল, ‘পাহাড়ের ওপর প্রাচীন নগরীতে রাত কাটানো বেশ একটা থ্রিলিং ব্যাপার হবে। আমি কিন্তু ব্যাপারটাতে আগ্রহী।’ মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘ঠিক আছে দেখা যাক কী করা যায়।’

ঘরে ঢোকার পর সুজয়রা বুঝতে পারল ঘরগুলো বেশ বিরাট, অনায়াসে দুজন থাকা যায়। প্রফেসর বললেন, ‘আধ ঘণ্টার মধ্যেই ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ব। অনেকটা ছড়ানো জায়গা মাচুপিচু। দেখতে বেশ সময় লাগবে।’

মার্কেজ সুসানকে নিয়ে নিজের ঘরে চলে যাবার পর সুজয় আর বিল ঢুকে পড়ল তাদের ঘরে। বিল দরজা বন্ধ করার পর ফ্রেশ হবার জন্য শার্ট খুলে ফেলতেই সুজয় একটু চমকে উঠে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিল তার কারণ বুঝতে না-পেরে প্রথমে বলল, ‘কী হল!?’

তার পরক্ষণেই ব্যাপারটা ধরতে পেরে বলল, ‘ও এইটা?’ এরপর সে তার কোমরের বাইরে বেরিয়ে থাকা রিভলবারের বাঁটটা ধরে সেটা টেনে বার করে আনল। সুজয় তাকিয়ে রইল সেটার দিকে।

বিল একটু হেসে বলল, ‘ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি করিতো, তাই সঙ্গে রাখতে হয়। আমার নামে লাইসেন্সড করা। এটা নিয়ে ঘোরার অনুমতিপত্রও আছে।

বিল রিভলবারটা সুজয়ের হাতে তুলে দিয়ে প্রশ্ন করল, ‘তুমি রাইফেল-রিভলবার চালিয়েছ?’

জিনিসটা বেশ ভারি। হাতে নিয়ে সেটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে সুজয় বলল, ‘না, সত্যিকারের রিভলবার এই প্রথম হাতে নিলাম।’

বিল উত্তর শুনে একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘কেন তুমি সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং নাওনি?’

জিনিসটা বিলের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে সুজয় জবাব দিল, ‘না।’

বিল রিভলবারটা খাটের ওপর নামিয়ে রেখে কোমরের বেল্ট খুলতে খুলতে বলল, ‘আমাদের দেশে ওই ট্রেনিং বাধ্যতামূলক। ওই ট্রেনিং-এর সময় মেশিনগান পর্যন্ত চালিয়েছি আমি। তুমি যদি আমার সঙ্গে জঙ্গলে বেড়াতে তাহলে রিভলবার চালানোটা অন্তত শিখিয়ে দিতে পারতাম।’

সুজয় হেসে বলল, ‘আমি সাধারণ ইঞ্জিনিয়ার। রিভলবার চালানো শিখে আমি কী করব?’

বিল বলল, ‘সব কিছুই একটু-আধটু শিখে রাখা ভালো। জীবনে চলার পথে কখন কোন শিক্ষাটা কাজে লেগে যায় তা আগাম বলা যায় না।’

হোটেলে ঢোকার ঠিক আধ ঘণ্টার মধ্যেই ফ্রেশ হয়ে হালকা খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ল সুজয়রা। মার্কেজ বললেন, ‘পায়ে হেঁটেই ওপরে উঠব আমরা।’ সুজয়রা হাঁটতে শুরু করল। হোটেল, বাজার চত্বর ছাড়িয়ে একটু এগোবার পরই পাথরের ব্লক বিছানো রাস্তা ওপরে উঠে গেছে। ওপরে ওঠার পথের মুখে টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে পাহাড়ে ওঠার পথ ধরল তারা। অধিকাংশ টুরিস্টই হেঁটে ওপরে উঠছে। নানা দেশের নানা বর্ণের পোশাক তাদের পরনে। তার মধ্যে যেমন আছে শ্বেতবর্ণের দীর্ঘদেহী আমেরিকান বা ইউরোপীয়ান, তেমনই আছে পীত বর্ণের ছোটোখাটো চেহারার এশীয়রা। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে বলতে বা গাইডের কথা শুনতে শুনতে ওপরে উঠছে তারা। কেউ কেউ আবার ঘোড়ায় চেপেও চলেছে। মার্কেজ বললেন, ‘ঘোড়া নামের প্রাণী কিন্তু এদেশে আমদানি করে স্পেনীয়রা। তারা এ দেশে আসার আগে ঘোড়া চোখে দেখেনি ইনকারা। পিজরোর দূত যখন ঘোড়ায় চেপে সম্রাট আতাহুয়ালাপার সাথে সাক্ষাত করলেন, তখন সেই প্রথম ঘোড়া দেখে বেশ ভয় পেয়ে গেছিলেন ইনকা সম্রাট ও তার সঙ্গীরা। তারা ভেবেছিলেন এই অদ্ভুত প্রাণীরা কোনো দৈত্য বা অপদেবতা গোছের কিছু হবে!’

তার দাদুর কথা শুনে সুসান হেসে ফেলে বলল, ‘কই, আমিতো ঘোড়া দেখে ভয় পাইনি! আমিতো ঘোড়ার পিঠে চেপেওছি। আর, অতবড়ো রাজা ঘোড়া দেখে ভয় পেয়ে গেল!?’

বিল সুসানের পিঠ চাপড়ে বলল, ‘তুমিতো সাহসী ছেলে, তাই ভয় পাওনি।’

চলতে চলতে সুজয় অবশেষে একসময় উঠে এল নগরীর প্রবেশ তোরণের সামনে। গ্র্যানাইট পাথরের তৈরি বিশাল তোরণ মহাকালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ভিনদেশি অভ্যাগতদের স্বাগত জানাচ্ছে। তোরণের সামনে দাঁড়িয়ে মার্কেজ সুজয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোরণের গঠনটা লক্ষ করুন, ট্র্যাপিজিয়ম আকৃতির। এই ইনকা নগরীর বৈশিষ্ট হল, এখানের সব স্থাপত্যই জ্যামিতিক আকৃতির। গঠন বৈচিত্র্যে এ জায়গা পৃথিবীর অন্য সব প্রাচীন শহরের থেকে আলাদা।’ তোরণের মাথায় ছটাসহ সূর্যদেব ইনতির মুখ বসানো আছে। মসৃণ দেওয়ালের গায়ে খোদিত আছে ফুল-পাখি-জীবজন্তুদের বিভিন্ন পবিত্র চিহ্ন বা হুয়াকা, সময় যাদের এখনও সম্পূর্ণ গ্রাস করে নিতে পারেনি। সুজয় বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তোরণের কারুকাজের দিকে। বিল ছবি তুলল প্রবেশ তোরণের। তারপর সকলে মিলে প্রবেশ করল তোরণের ভিতর।

সামনেই একটা পাথুরে চত্বর। মার্কেজ বললেন বেশ কিছুটা চড়াই ভাঙলাম তো, চলুন ওখানে বসে একটু জিরিয়ে নেই। এ নগর ঘুরে দেখতে হলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অনেকবার ওঠানামা করতে হবে। কোনো কোনো জায়গায় আবার রাস্তা ধসে গেছে, সেখানে পাথরের খাঁজে ভর দিয়ে ওপরে উঠতে হয়।’ চত্বরের ঠিক মাথার ওপর ঢাল বেয়ে সার সার দাঁড়িয়ে পাথরের তৈরি ছাদহীন ঘর, প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ। তার ছায়া এসে পড়েছে চত্বরের এক পাশে। সেই ছায়ায় ছড়িয়ে থাকা পাথরের স্তূপের ওপর সকলে গিয়ে বসল।

মিনিট পাঁচেক চুপচাপ বসে থাকার পর প্রফেসর মার্কেজ সুজয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এ জায়গার সম্বন্ধে আপনি নিশ্চই গাইড বইতে পড়েছেন, তবু দেখা শুরু করার আগে মাচুপিচু সম্পর্কে কয়েকটা কথা আপনাকে বলি। তাতে এ জায়গা সম্বন্ধে আপনার একটা ধারণা হবে।’ সুজয় বলল, ‘হ্যাঁ বলুন। আমি এখনই আপনাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম।’

প্রফেসর বক্তৃতার ঢঙে বলতে শুরু করলেন—‘‘মাচুপিচু। কোয়েচুয়া ভাষায় এ শব্দের অর্থ হল ‘বৃদ্ধপর্বত শৃঙ্গ’। এ নগরীর আসল নাম কী ছিল তা আজ সঠিক জানা যায় না। কেউ কেউ বলেন, এ নগরীর নাম নাকি ছিল সূর্যনগরী’—ইনতির উপাসনার পবিত্র ভূমি। যাই হোক এ নগরী আজ মাচু-পিচু নামেই পরিচিত। সম্ভবত ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট পাচাকুটির আমলে, আমাজান উপত্যকার ট্রপিকাল রেনফরেস্টের উরুবাম্বা নদীর দু-হাজার ফিট ওপরে, প্রায় আট হাজার ফিট উচ্চতায়, চারপাশে কুয়াশা ঘেরা পর্বতমালা দিয়ে ঘেরা এ জায়গাতে এ নগরী নির্মিত হয়। এ নগরীর স্থায়িত্ব কাল ছিল মাত্র একশো বছর। তারপরই পরিত্যক্ত হয়ে যায়। একদিন যে জঙ্গল কেটে পাহাড়ের মাথায় ইনকারা এই আশ্চর্য নগর নির্মাণ করে ছিলেন তা আবার ঢেকে যায় গভীর জঙ্গলের আড়ালে। স্পেনীয়রা তাই একে খুঁজে পায়নি। এ শহরের কথা মুছে যায় সাধারণ মানুষের মন থেকে। শুধু কিছু ইনকা পুরোহিত নাকি বংশপরম্পরায় জানতেন এই লুপ্ত শহরের কথা। সযত্নে তারা এ কথা গোপন রেখেছিলেন সভ্য পৃথিবীর কাছে। তারা মনে করতেন, এ লুপ্ত নগরী হল প্রেতাত্মাদের আশ্রয় স্থল। প্রাজ্ঞ আত্মারা এখানে উপাসনা করেন। তারা চাননি যে বাইরের পৃথিবীর লোক তাঁদের শান্তি ভঙ্গ করুক। আজও কিন্তু স্থানীয় মানুষ এ ধারণা পোষণ করেন। ১৯১১-তে হিরাম বিংগহ্যাম এ শহর খুঁজে বার করার পরও বহুবছর স্থানীয় মানুষরা এ অঞ্চলে বাইরের পৃথিবীর মানুষকে প্রবেশ করতে দিত না। বিশেষত, সাদা চামড়ার ইউরোপীয়দের প্রতি ছিল তাদের প্রবল ঘৃণা।

পাহাড়ের ঢালে প্রায় পাঁচ বর্গকিলোমিটার জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে আছে এ নগরী। এ নগরীর দু-ভাগে বিভক্ত। পাহাড়ের ওপর দিকে ওই যে কুয়াশা ঘেরা জায়গা, ওকে বলে হানান। সূর্যমন্দির, ইনকাদের বিখ্যাত ‘তিন-জানলা ঘর’ ইত্যাদি রয়েছে ওখানে। আর নীচের অংশ অর্থাৎ আমরা যেখানে রয়েছি, অর্থাৎ পাহাড়ের নীচের এই অংশের নাম ‘হুরিন।’ বেশ অনেকটা চত্বর অতিক্রম করে হুরিন থেকে হানানে যেতে হয়। হানান ও হুরিনে প্রায় আড়াইশোটি স্থাপত্য আছে। তবে হানান অংশের স্থাপত্য বেশি আকর্ষণীয়।

এখানে ঘরের সংখ্যা দেখে অনুমান করা হয়, খুব বেশি হলে এক হাজার মতো লোকের বাসস্থান ছিল এখানে। কৃষিই ছিল মানুষের প্রধান জীবিকা। সূর্যদেবের উৎসবের সময় বহুমানুষ সমবেত হতেন এখানে। ইনকারা চাকা-লোহা বা লিপির ব্যবহার না-জানলেও জ্যোতির্বিজ্ঞানে যে তারা অনেক এগিয়ে ছিল তার বহুপ্রমাণ পাওয়া যায়। এই নগরীর বেশ কিছু জ্যামিতিক স্থাপত্য সে-প্রমাণ দেয়। এ নগরীর প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা নাকি নির্ভুলভাবে সূর্যের পরিক্রমণের গননা করতেন এবং তার ওপর ভিত্তি করে আবহাওয়ার ভবিষ্যদবাণীর খবর ছড়িয়ে দিতেন সাম্রাজ্যে। সূর্যনগরীর ভবিষ্যদবাণীর ওপর নির্ভর করেই পরিলক্ষিত হত বিশাল সাম্রাজ্যের কৃষি কাজ। একদিকে মাচুপিচু ছিল সূর্যদেব ইনতির পবিত্র উপাসনা স্থল, অন্যদিকে এ স্থান ছিল কৃষিভিত্তিক ইনকাদের সামাজিক-দৈনন্দিন কাজের নিয়ন্ত্রক।’

কথাগুলো বলার পর উঠে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর বললেন, ‘চলুন, এবার তাহলে ঘোরা শুরু করা যাক।’

সুজয়রা ধীরে ধীরে দেখে বেড়াতে লাগল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাহাড়ের গায়ে ঝড়-ঝঞ্ঝা, মানুষের লোভকে উপেক্ষা করে আজও দাঁড়িয়ে আছে ইনকাদের স্থাপত্যকীর্তিগুলো। সার সার পাথরের তৈরি বাড়ি-ঘর-স্তম্ভ-প্রাচীর। ইনকারা লিপির ব্যবহার জানতেন না। প্রাচীন স্থাপত্যগুলো দেখে বেড়াতে বেড়াতে সুজয়ের মনে হল, ‘এই স্থাপত্যগুলোই যেন ইনকাদের লিপি। এ লিপি যারা পাঠ করতে জানে, তারা জানে, কত অজানা কাহিনি লুকিয়ে আছে গ্র্যানাইট পাথরের তৈরি প্রাচীন স্মারকগুলোর গায়ে! সোনাঝরা ইনকাদের কত স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে মূক-বধির স্থাপত্যগুলো!’ পাথরে লেখা ইনকা কাহিনি সুজয় পাঠ করতে না পারলেও তার অভাব পূরণ করে দিতে লাগলেন মার্কেজ। দেখতে দেখতে-ঘুরতে ঘুরতে সে-কাহিনি তন্ময় হয়ে শুনতে লাগল সুজয়। তাঁর কথা শুনতে শুনতে একসময় যেন তার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠতে লাগল এই সূর্যনগরী। সত্যিই অপূর্ব বলেন মার্কেজ! সম্ভবত সুসানেরও যাতে বুঝতে অসুবিধা না-হয় তার জন্য যথাসম্ভব সহজভাবেই সব কিছু বুঝিয়ে যেতে লাগলেন তিনি। আর বিল পেশাদারি ঢঙে মার্কেজের নির্দেশে ছবি তুলতে লাগল।

মার্কেজ জানালেন, হুরিন অংশ মূলত ছিল আবাসিক স্থল। আর হানান অংশ ছিল ইনতির উপাসনা স্থল ও জ্যোতির্গননা কেন্দ্র। সম্ভবত হুরিনের সবার অনুমতি ছিল না হানান অংশে ওঠার। হানান অংশে শুধু যেতেন প্রাজ্ঞ জ্যোতির্গণনাকারী ও জাদুকর পুরোহিতরা। হানানের কাজকর্মের গোপনীয়তা সযত্নে রক্ষা করা হত। পুরোহিতরা সেখানের কাজকর্ম সম্বন্ধে যতটুকু জানাতেন ঠিক ততটুকুই জানতেন সাধারণ প্রজারা। ইনকা সম্রাটরা মাঝে মাঝে আসতেন হানান পরিদর্শনে। তখন তাঁর রক্ষী বাহিনীরও সকলকে হানানে উঠতে দিতেন না সম্রাট।

হুরিন অংশ দেখতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগল সুজয়দের। তারপর ধীরে ধীরে তারা পাহাড়ের ঢালে বেশ কয়েকটা চত্বর অতিক্রম করে, সিঁড়ি ভেঙে উঠে এল হানানে। এ জায়গাটা পাহাড়ের মাথায়। অনেক দূর পর্যন্ত চোখে পড়ে এ জায়গা থেকে। তিনদিকে পাহাড়ের সারি। আকাশ আর পাহাড়ের রং নীলে নীল। খাদের নীচ থেকে ভেসে উঠছে ঘন কুয়াশা। নীচের দিকে তাকাল চোখে পড়ছে উরুবাম্বা নদীর বাঁক, আর পূর্বের পাহাড়ের ঢালে অন্তহীন গভীর জঙ্গল। সে জঙ্গলের শেষ কোথায় এত ওপর থেকেও তা বোঝা যাচ্ছে না। কুয়াশার একটা আস্তরণ দিগন্ত বিস্তীর্ণ হয়ে ছড়িয়ে আছে জঙ্গলের মাথায়। আর এসব কিছুর মাথার ওপর আপন গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইনকাদের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য চিহ্ন হানানের পাথর নির্মিত স্মারকগুলো। আকাশ নির্মেঘ। সূর্যের আলো এসে পড়েছে সৌধগুলোর গায়ে। কয়েকটা বিবর্ণ হয়ে যাওয়া রঙিন পতাকা ঠাণ্ডা বাতাসে উড়ছে। হানানেরও বেশ কয়েকটা ধাপ আছে। দুটো ধাপের মধ্যের ফাঁকা অংশগুলো সবুজ ঘাসের গালিচা মোড়া। লামার দল চলছে সেখানে। স্মারকগুলোর আশেপাশে ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে টুরিস্টরা। কেউ কেউ আবার বসে জিরিয়ে নিচ্ছে পাথর বা সবুজ ঘাসের ওপর। সুজয়রাও হানানে উঠে বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল। সঙ্গে আনা কিছু শুকনো খাবারও সেখানে বসেই খেয়ে নিল তারা। তারপর উঠে দাঁড়াল সৌধগুলো ঘুরে দেখার জন্য। একটু উঁচুতে আঙুল তুলে দেখিয়ে মার্কেজ বললেন, ‘আমরা প্রথমে সিঁড়ি বেয়ে ওখানে যাব, তিন-জানলা ঘর’ দেখতে। তারপর দেখব সূর্যমন্দির আর ‘ইনতিহুয়ানাতা।’

শেষ শব্দটার মানে কি?’ প্রশ্ন করল সুজয়।

সূর্যকে বেঁধে রাখার স্তম্ভ, সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন প্রফেসর।

পাথরের ধাপ বেয়ে সুজয়রা পৌঁছে গেল তিন-জানলা চত্বরে। খাদের ধারে সার সার দাঁড়িয়ে আছে ঘর। পাথরের তৈরি ঘরগুলোর তিনটে করে দেওয়াল। তিনটে জানলা। ঘরে ঢোকার মুখটা ট্রাপিজিয়াম আকৃতির। তবে ঘরগুলো ছাদহীন। মসৃণ দেওয়ালগুলোতে বিভিন্ন হুয়াকা আঁকা আছে, কোথাও ছটাসহ সুর্যের ছবি, কোথাও পুমা, কোথাও লামা, সাপ বা কনডোর পাখির ছবি। পাথরের তৈরি বাটালি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা ছবিগুলো আজও সাক্ষ্য বহন করছে ইনকা শিল্পরীতির। ঘরগুলো ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে মার্কেজ বললেন, ‘একটা জিনিস খেয়াল করেছেন নিশ্চই যে, ঘরগুলো ছাদহীন। আসলে ইনকারা পাকা ছাদ দিত না। হালকা কাঠ, মাদুর অথবা শন জাতীয় জিনিস দিয়ে ছাদ ছাওয়া থাকত। এইসব ছাদহীন ঘর, জামিতিক আকৃতির স্থাপত্য কিন্তু ইনকা স্থপতিরা নিছক মনের খেয়ালে তৈরি করেননি। আসলে আন্দিজ পর্বতমালার বেশির ভাগ অঞ্চলই ভূমিকম্প-প্রবণ। ভূমিকম্পর হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্যই স্থাপত্যগুলো এভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। এখনও এ সব অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়। নির্মাণ শৈলীর বিশিষ্টতার জন্যই এখানকার এই ঘরবাড়িগুলো আজও টিকে আছে।’

অত বছর আগেও যে ইনকাদের স্থাপত্য ভাবনা এত উন্নত ছিল তা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল সুজয়।

সুসান হঠাৎ তার দাদুকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা, এই ঘরগুলোতেই কি প্রেতাত্মারা থাকে?’

মার্কেজ তার কথা শুনে হেসে বললেন, ‘এখানকার মানুষেরাতো তাই বলে।’

‘তাদের দেখতে কেমন?’ সুসান আবার প্রশ্ন করল।

মার্কেজ বললেন, ‘যদিও, আমি তাদের দেখিনি, তবু অনুমানে বলতে পারি। তাদের দীর্ঘ চেহারা, গায়ের রং লালচে তামাটে, চওড়া কপাল, মাথার চুল বিনুনি বাঁধা। পরনে রঙচঙে পোশাক। পায়ে কাঠের জুতো, হাতে বর্শা।’

‘তাদের না-দেখলে, তারা কেমন দেখতে জানলে কীভাবে?’ দাদুর কথা শুনে জানতে চাইল সুসান।

প্রফেসর হেসে জবাব দিলেন। ‘আমি তাদের ছবি বইতে দেখেছি।’

পরপর ঘরগুলোতে ঘুরে বেড়াতে লাগল সবাই। একটার পর একটা ঘরে কত রকমের যে হুয়াকা রয়েছে তা দেখলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। মার্কেজ বললেন, ‘হুয়াকা আঁকা তিন-জানলা ঘরগুলোকে বলে ‘মিসমা।’ এই মিসমা স্থাপত্য ইনকা সভ্যতা ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না।’ বিভিন্ন রকম হুয়াকার বেশ কিছু ছবি তুলল বিল। সার বন্দি শেষ ঘরটা দেখার পর তার বাইরে বেরিয়ে বিল বলল’, ফিলম শেষ হয়ে গেল, একটু দাঁড়ান আমাকে একটা নতুন রোল ক্যামেরায় লোড করতে হবে।’ এই বলে একটা পাথরের ওপর ক্যামেরাটা কোলে নিয়ে সে বসল।

সুজয়রা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার থেকে একটু দূরে একদম খাদের কিনারে একলা দাঁড়িয়ে আছে বেশ বড় একটা ট্রাপিজিয়ম আকৃতির ঘর। এমনভাবে ঘরটা দাঁড়িয়ে আছে যে দেখে মনে হচ্ছে, বাতাসের ধাক্কায় এখনই মনে হয় সে নীচে পড়ে যাবে। ঘরের দরজা দেখা যাচ্ছে না। সম্ভবত তার মুখ খাদের দিকে। মার্কেজ বিলের কথা শুনে বললেন, ‘ঠিক আছে তুমি কাজ সারো, আমরা খাদের ধারে ওই ঘরটা দেখে আসি।’ এই বলে সুজয় আর সুসানকে নিয়ে ঘরটার দিকে এগোতে যাচ্ছিলেন তিনি। সুসান বলল, ‘তোমরা যাও, বিল আঙ্কল কীভাবে ফিলম লোড করে দেখব।’ বিল ক্যামেরাটা ততক্ষণে খুলতে শুরু করেছে। সে বলল, ‘ঠিক আছে, ও আমার কাছে থাক। আমার এখনই হয়ে যাবে।’ সুসান বসে পড়ল বিলের পাশে। মার্কেজ আর সুজয় ঘাসের গালিচা বিছানো ঢাল বেয়ে এগিয়ে গেল সেই ঘরটার দিকে।

ঘরটার কাছাকাছি পৌঁছে মার্কেজ বললেন, ‘এ ঘরটার মাথায় দেখছি ছাদ দেওয়া। চট করে এ ঘর এখানে চোখে পড়ে না। কাছে গিয়ে তারা বুঝতে পারল, আর তিন দিকের দেওয়াল থেকে ছাদে ওঠার জন্য সিঁড়ি উঠে গেছে। মার্কেজ বললেন, ‘ও বুঝেছি, জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রয়োজনে এ ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। সম্ভবত এটা একটা ক্ষুদ্র মানমন্দির’। ঘরের বাইরের দিকের হুয়াকাগুলো লক্ষ করুন,—ফুল-পাখি-জীবজন্তুর পরিবর্তে সব জ্যামিতিক নকশা আঁকা আছে!’ এরপর মার্কেজ প্রায় নিজের মনেই বললেন, ‘ভাগ্যিস ঘরটা দেখতে এলাম। আগের বার এ ঘরটা চোখে পড়েনি।’

ঘরে ঢোকার দরজাটা খাদের দিকেই। একটা সুঁড়ি পথ দিয়ে দেওয়ালকে বেড় দিয়ে মার্কেজ আর সুজয় উপস্থিত হল সে জায়গায়। দরজার সামনে কয়েক হাত জায়গা মাত্র। তারপরই অতলান্ত খাদ। তার নীচে রুপোলি ফিতার মতো বয়ে চলা উরুবাম্বা। ওপর থেকে কোনোভাবে নীচে পড়লে মৃত্যু একদম নিশ্চিত। ট্রাপিজিয়ম আকৃতির দরজার ভিতরটা প্রায় অন্ধকার। ঘরে কোনো জানলা নেই। আর দরজাটা উত্তরমুখী বলে সূর্যের আলো ভিতরে প্রবেশ করতে পারছে না। দরজার ঠিক মাথার ওপর চিত্রিত আছে সূর্যমূর্তি। আর দু-পাশে আঁকা আছে নানা ধরনের জ্যামিতিক নকশা। সুজয় লক্ষ করল, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা সহ্য করতে হয় বলেই মনে হয় ঘরটার সামনের দিকের পাথুরে দেওয়াল কেমন ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে। অলংকরণগুলোও স্থানে স্থানে নষ্ট হয়ে গেছে। মানমন্দির বা ঘর, যাই হোক-না-কেন, এ স্থাপত্য যে অনেক প্রাচীন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

কয়েক মুহূর্ত ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার পর মার্কেজ বললেন, ‘চলুন এবার ঘরের ভিতরটা একবার দেখা যাক। তার কথা শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের ভিতর থেকে একটা অস্পষ্ট শব্দ ভেসে এল। ভিতরে ঢুকতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সুজয়রা। আর তার পরক্ষণেই সেই ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল দুজন লোক। তাদের দেখে অবাক হয়ে গেল প্রফেসর মার্কেজ আর সুজয়। লোক দুজনের একজন মি. পিনচিও, আর একজন যেন ছবির বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা কোন ইনকা পুরুষ। সে দীর্ঘদেহী। উচ্চতায় সুজয় বা বিলের থেকেও লম্বা, অন্তত সাড়ে ছ-ফুট হবে। তার পরনে রঙিন ‘টিউনিক’ বা ‘উনকু’ আর কম্বলের মতো আচ্ছাদন ‘ইয়াকোলা’। কোমরে চওড়া কোমর বন্ধ। একরাশ কালো চুল ঘাড় ছাপিয়ে নীচের দিকে নেমেছে, মাথার ফেট্টিতে বেশ বড়ো দুটো কালো পালক গোজা। মনে হয় বাজ বা ওই জাতীয় কোনো প্রাণীর হবে। লোকটার গলায় বেশ কয়েকটা রঙিন পাথরের মালা। সারা মুখে আর পেশিবহুল বাহুতে আঁকা আছে উলকি।

সুজয়রা যেমন তাদের দেখে একটু অবাক হল, পিনচিও যেন বাইরে বেরিয়ে তাদের দেখে মুহূর্তের জন্য একটু থতোমতো খেয়ে গেলেন, তারপর মার্কেজের উদ্দেশ্যে হেসে বললেন, ‘হাই প্রফেসর। এখানে কখন এসে পৌঁছোলেন?’

মার্কেজ বললেন, ‘এই তো ঘণ্টা তিনেক আগে। হোটেলে মালপত্র রেখে দেখতে বেরিয়ে পড়েছি।’

পিনচিও বললেন, ‘ও। আমি এখানে পৌঁছেছি বেলা ‘ন-টা নাগাদ। তারপর দেখতে বেরিয়েছি। তবে হোটেল নিইনি। এখানে থাকার জন্য তাঁবু পাওয়া যায়। ওতেই থাকব রাতে। চাঁদের আলোতে পাহাড়ের মাথায় এই প্রাচীন নগরীতে রাত কাটানো নাকি বেশ একটা থ্রিলিং ব্যাপার। সুযোগটা হাত ছাড়া করতে চাই না। তা ছাড়া ইনিও এখানে থাকবেন...’ এই বলে পিনচিও তাকালেন তাঁর দীর্ঘকায় সঙ্গীর দিকে।

মার্কেজ পিনচিওর সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘উনি...?’

পিনচিও বললেন, ‘ওহো! পরিচয়টা করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। উনি হলেন করিকানচা মন্দিরের পুরোহিত। যাঁর কথা আপনাকে কাল বললাম।’ সুজয় বুঝতে পারল একেই তাহলে কাল তারা দেখেছিল পিনচিওর সঙ্গে।

ইনকা পুরোহিত নিশ্চয়ই ইংরেজি বোঝেন, কারণ এরপর তাঁর দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতেই মার্কেজ আর সুজয়ের পরিচয় দিলেন পিনচিও। মার্কেজ করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালেন ইনকা পুরোহিতের দিকে। তিনি কিন্তু মার্কেজের দিকে হাত বাড়ালেন না। ডান হাতটা বুকের কাছে আড়াআড়ি ভাবে এনে, সামান্য মাথা ঝোঁকালেন মাত্র। সুজয়ের তাই দেখে মনে হল, সম্ভবত এটা ইনকাদের সম্ভাষণের রীতি হতে পারে। প্রফেসর হাতটা গুটিয়ে নিয়ে তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনার কথা মি. পিনচিও আমাদের বলেছেন। আপনার কাছে আমি কিছু জানতে চাই—।’

উনি হলেন করিকানচা মন্দিরের পুরোহিত।

‘কী জানতে চান?’—একটু যেন সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে মার্কেজকে জরিপ করে, ভাঙা ইংরেজিতে গম্ভীর স্বরে বললেন ইনকা পুরোহিত ইল্লাপা। মার্কেজ বললেন, ‘শুনেছি, এখানে আরও বেশ কিছু প্রাচীন নগরী আছে, যার খবর কেবল মাত্র স্থানীয় মানুষরা কেউ কেউ জানেন, বাইরের পৃথিবীর কাছে তা অজানা। ও সব জায়গার খোঁজ নিশ্চই আপনার জানা আছে। মি. পিনচিও বলছিলেন, সে-রকম কোনো একটা জায়গাতে কী একটা উৎসবে আপনি যাচ্ছেন। দয়া করে যদি ওরকম কোনো একটা জায়গার সন্ধান আমাকে দেন তাহলে আমার উপকার হয়।’

মার্কেজের কথা শুনে ইল্লাপা প্রথমে একবার তাকালেন পিনচিত্তর দিকে। যেন তাঁর প্রাচীন নগরীতে উৎসবে যাবার কথাটা সুজয়দের কাছে ব্যক্ত করায় পিনচিত্তর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন তিনি। তাঁর তাকানোর ভঙ্গী দেখে সুজয়ের তাই মনে হল।

এরপর ইল্লাপা একটু কঠিন স্বরে মার্কেজের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘ও সব শহরের খোঁজ জেনে আপনি কী করবেন? সোনা খুঁজতে যাবেন?’ মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘না, না, সোনা খোঁজার ইচ্ছা আমার নেই। আসলে আমি একটা বই লিখছি। তার প্রয়োজনেই ও রকম কোনো জায়গায় যেতে চাই আমি।’

ইল্লাপার এবার তার কন্ঠের কঠিনতা ও গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললেন, ‘ওসব গোপন নগরীর হদিশ আমরা বাইরের লোককে দিই না। ওসব জায়গা লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে রেখেছি আমরা। ওখানে বাইরের পৃথিবীর মানুষের পা পড়ুক তা চাই না আমরা।’

‘কেন?’ প্রফেসর, ইনকা পুরোহিতের কথা শুনে কিছু বলার আগেই হঠাৎই নিজের অজান্তে প্রশ্নটা বেরিয়ে এল সুজয়ের মুখ থেকে। ইল্লাপা এবার স্থিরদৃষ্টিতে একবার তাকালেন সুজয়ের দিকে। তারপর বললেন, ‘ওসব নগরী সূর্যদেব ইনতির পবিত্র বাসভূমি। সূর্যপুত্ররা ইনতির সাধনা করেন সেখানে। তোমরা বিদেশিরা একবার তার সন্ধান পেলে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ ছুটতে শুরু করবে ওসব জায়গাতে। হারিয়ে যাবে আমাদের উপাসনাস্থল। ঠিক যেমন হল এই মাচুপিচুতে। পৃথিবীর মন থেকে এ পবিত্র স্থান মুছে গেলেও এ নগরীর সন্ধান আমরা ইনকা পুরোহিতরা বংশপরম্পরায় জানতাম। এখানে ইনতির উপাসনা আর জাদুবিদ্যাচর্চা করতে আসতেন ইনকা পুরোহিতের দল। তারপর একদিন এক সাদা চামড়া খুঁজে বার করল এ শহর। লোকজন এক এক করে আসতে শুরু করল এখানে। সব কিছু নষ্ট হয়ে গেল।’ এরপর ইনতি পুজারি দুর্বোধ্য ভাষায় কী সব যেন বললেন স্বগতোক্তির সুরে। যার বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারল না সুজয়। মার্কেজের ওসব কথা বোধগম্য হল কিনা তাও সে ধারণা করতে পারল না।

ইনকা পুরোহিতের কথা শেষ হলে, একটু চুপ করে থেকে মার্কেজ তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আচ্ছা, ধন্যবাদ। আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল। আপনাকে প্রশ্ন করে বিরক্ত করলাম বলে দুঃখিত।’

ইল্লাপা কোনো জবাব দিলেন না তার কথায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখতে লাগলেন। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে আকাশের দিকে তাকাতেই সুজয় আর মার্কেজের চোখে পড়ল তাদের মাথার ওপরেই আকাশের বুকে ডানা মেলে ভাসছে বেশ বড়ো আকারের কী একটা পাখি! একমাত্র চিল বা বাজ জাতীয় পাখিরাই ওভাবে স্থির হয়ে বাতাসে ভাসতে পারে। ইনকা পুরোহিত এরপর হঠাৎ তার দীর্ঘ ডান বাহু প্রসারিত করে তুলে ধরলেন আকাশের দিকে। আর তারপর মুহূর্তেই পাখিটা তির বেগে নীচে নেমে এসে ডানা ঝটপট করে বসল ইল্লাপার বাহুতে। ইল্লাপা পাখিটার মাথায় একবার হাত বোলাবার পর সে হাত বেয়ে তার কাঁধে গিয়ে বসল। সুজয় ভালো করে দেখতে লাগল পাখিটাকে। সত্যিই বেশ বড়ো পাখি। ছাই রঙা পাখিটার পিঠ ইল্লাপার মাথার সমান প্রায় উঁচু। তার সবল পায়ে ধারালো নখ, বাঁকানো সবল ঠোঁট। সে যে শিকারি গোত্রের তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ইল্লাপার ডান কাঁধের ওপর পাখি বসার জন্যই সম্ভবত পোশাকের গায়ে একটা চামড়ার পটি লাগানো আছে। কাঁধে বসার পর পাখিটা বার দুই সেই চামড়ার পটিতে ঠোঁট ঘসে মাথা তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল সুজয়ের দিকে। তার লাল চোখ দুটো হিংস্রতা মাখা। সেদিকে তাকিয়ে সুজয়ের গা-টা কেমন যেন শিরশির করে উঠল। পাখিটার ধারালো নখ আর ঠোঁট যেকোনো প্রাণীকে মুহূর্তে চিরে ফালা ফালা করে দিতে পারে! সে ইল্লাপার কাঁধে বসার পর মি. পিনচিও মনে হয় তার ভয়ে তাঁর পাশ থেকে সরে দাঁড়ালেন।

মার্কেজ পাখিটাকে ভালো করে দেখার পর অবাক হয়ে ইল্লাপাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কি পাখি?’

ইল্লাপা জবাব দিলেন, ‘কনডোরের বাচ্চা’।

ইনকা পুরোহিতের থেকে প্রাচীন নগরীর সন্ধান পাওয়া যাবে না বুঝতে পেরে প্রসঙ্গ পালটে মার্কেজ পিনচিওকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা এখানে এসে এখন পর্যন্ত কী কী দেখা হল আপনার? সূর্য মন্দির, ইনতিহুয়ানাতা এসব দেখা হয়ে গেছে আপনার?’

পিনচিও বললেন, ‘না ওসব কিছু এখনও আমার দেখা হয়নি। এখানে এসে সরাসরি এ জায়গাতে চলে এসেছি। ইনকা পুরোহিত এ ঘরেই রাত কাটাবেন। আমার গাইড ওঁরই একটা কাজে গেছে। সে ফিরলে তাকে নিয়ে দেখতে বেরোব।’

এরপর পিনচিও সুজয়দের আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই পিছনে একটা খসখস শব্দ শুনে ফিরে তাকিয়ে মার্কেজ আর সুজয় দেখতে পেল তাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে পিনচিওর সেই একচক্ষু গাইড। তার সঙ্গে রয়েছে একটা ধবধবে সাদা লামার বাচ্চা। তার লাগামটা ধরা আছে লোকটার হাতে। সে লামাটা আনার পর ইল্লাপা যেন মনোযোগ দিয়ে নিরীক্ষণ করলেন প্রাণীটাকে। তারপর দুর্বোধ্য ভাষায় গাইডটাকে কী বললেন, তার কথা শুনে লোকটা সুজয়দের পাশ কাটিয়ে প্রাণীটাকে নিয়ে পাথুরে ঘরটার ভিতরে গিয়ে ঢুকল।

মার্কেজ পিনচিওর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, ‘এ প্রাণীটা দিয়ে কি হবে?’

পিনচিও বললেন, ‘ইনকা পুরোহিত যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে সঙ্গে নিয়ে যাবেন লামাটাকে। ওকে সেখানে বলি দেওয়া হবে।’

মার্কেজ তাঁর কথা শোনার পর সুজয়ের দিকে তাকিয়ে তাকে জানানোর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘প্রাচীন কালেও কিন্তু ইনকারা ধর্মীয় উৎসবে লামা বলি দিতেন। যুগ যুগ ধরে সে প্রথা আজও চালু আছে। তবে সে-সময় নরবলি দানও করা হত। বিশেষত যুদ্ধ যাত্রার প্রাক্কালে জয়লাভের আশায় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে নর রক্ত তারা ইনতিকে উৎসর্গ করত। সুলক্ষণা সূর্যকন্যা বা বালকদেরই নির্বাচন করা হত বলির জন্য। একবার একসঙ্গে দুশোজনকে বলি দিয়ে ছিল তারা...।’

প্রফেসর কথাগুলো সুজয়কে বললেও পিনচিও তা শুনে বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘এক সাথে দুশোজনকে! এটাতো জানা ছিল না! কেন?’

মার্কেজ তাঁর কথার উত্তর দেবার আগেই শোনা গেল সুসানের গলা, ‘ওঃ কী বাতাসের ঝাপটা এখানে!’।

আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল...

সুসান বিলের সঙ্গে এসে উপস্থিত হল সুজয়দের পিছনে। তারপর সুজয়দের সঙ্গে পিনচিও আর পাখি কাঁধে অদ্ভুত পোশাক পরা একজন লোককে দেখতে পেয়ে একটু থতোমতো খেয়ে মার্কেজের কোল ঘেষে দাঁড়াল। বিলও ইনকা পূজারিকে অবাক হয়ে দেখতে লাগল। ইল্লাপা এবার শুধু নবাগতদের তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে দৃষ্টিপাত করে আকাশের দিকে তাকালেন।

পিনচিও ইল্লাপার উদ্দেশ্যে এবার সুসান আর বিলের পরিচয় দিলেন। আকাশের দিকে চোখ রেখেই ইনকা পুরোহিত নিতান্ত অনিচ্ছাকৃতভাবেই যেন তাঁর ডান হাত নিজের বুকের কাছে এনে সম্ভাষণ জানালেন বিলকে।

ঠিক এই সময় লামাটাকে ঘরের ভিতর রেখে বাইরে বেরিয়ে ইল্লাপার পাশে এসে দাঁড়াল পিনচিওর গাইড হুইকো। একচোখে সে একবার নিরীক্ষণ করল সকলকে। সুজয়ের মনে হল, সকলকে দেখার পর তার দৃষ্টি যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল সুসানের দিকে। আর তার -পরই সে ইল্লাপার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে কি বলল! তার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ইনকা পুরোহিত আকাশের থেকে মুখ ফিরিয়ে সোজা তাকালেন সুসানের দিকে। কয়েক মুহূর্ত ভালো করে তাকে দেখার পর ইনকা পুরোহিত দুর্বোধ্য ভাষায় কী একটা বললেন তার পাশে দাঁড়ানো হুইকোর উদ্দেশ্যে।

সুসান মনে হয় পিনচিওর গাইডকে দেখে আবার ভয় পেয়ে গেল, সে তার দাদুর কোটের হাতা ধরে টান দিয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘এবার চলো, আমার এখানে থাকতে ভালো লাগছে না।’

ঘরের ভিতরটা দেখার ইচ্ছা থাকলেও সেখানে ঢোকা আর সমীচীন মনে হল না মার্কেজের। ইনকা পুরোহিতের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র হয়তো রাখা আছে ঘরের মধ্যে। ভিতরে ঢুকলে তাঁর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ হতে পারে। তা ছাড়া ইল্লাপা লোকটা যেন একটু রুক্ষ ধরনের। কাজেই সে ইচ্ছা পরিত্যাগ করে তিনি পিনচিওর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমরা তাহলে এবার যাচ্ছি। আরও দেখা বাকি আছে আমাদের। এত বড়ো জায়গা দেখতে বেশ সময় লাগে। আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল।

পিনচিও প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমারও ভালো লাগল। আপনারা বেড়ান। আমিও হুইকোর সাথে একটু পরে দেখতে বেরব। আবার নিশ্চই আপনাদের সাথে আমার দেখা হবে।’

মার্কেজ বললেন, ‘একই জায়গায় যখন বেড়াচ্ছি তখন নিশ্চয়ই দেখা হবে। ভালো করে বেড়ান, অনেক কিছু দেখার আছে এখানে।’ একথা বলে তিনি তাকে বিদায় জানিয়ে সুজয়দের সঙ্গে নিয়ে সে জায়গা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তারপর হাঁটতে শুরু করলেন অন্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে বিল মন্তব্য করল, ‘মাথায় পালক লাগানো লোকটার হাবভাব দেখে মনে হল, ও যেন আমাদের ঠিক পছন্দ করল না।’ মার্কেজ বললেন, ‘ওই লোকটা করিকানচার পুরোহিত। খাঁটি ইনকা রক্ত গায়ে আছে ওর। এখানকার স্থানীয় মানুষরা কেউই এসব জায়গা অর্থাৎ তাদের প্রাচীন ধর্মস্থানে বাইরের লোকের আনাগোনা পছন্দ করে না। নেহাত দেশটা গরিব। টুরিস্টদের আসা-যাওয়ার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে এখানকার বর্তমান অর্থনীতি। তাই ওরা মুখে কিছু বলে না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে অপছন্দ করে আমাদের। তাই ইনকা পুরোহিতের এ ব্যবহার আশ্চর্যের কিছু নয়।’

সুজয় বলল, ‘তাহলে তো তাঁর পিনচিওকেও অপছন্দ করা উচিত?’

প্রফেসর বললেন, ‘তাইতো করা উচিত।’

বিল প্রশ্ন করল, ‘আমরা এবার কোন দিকে যাচ্ছি?’

তিনি জবাব দিলেন, ‘সূর্যমন্দিরের দিকে।’

আশেপাশের স্থাপত্যগুলো দেখতে দেখতে, পাহাড়ের ধাপ ভেঙে উঠে নেমে সুজয়রা এক সময় পৌঁছে গেল মাচুপিচুর করিকানচা বা সূর্যমন্দির চত্বরে। মন্দিরটা বর্তমানে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও এক সময় যে কলেবরে যে বেশ বড়ো ছিল তা বোঝা যায়। তার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে আকাল্লাকুনা বা সূর্যকন্যাদের আবাস। পর্যটকদের বেশ ভিড় আছে এ জায়গাতে। বেশ কয়েকজন স্থানীয় মানুষ নানা রকম জিনিসও ফেরি করছে সেখানে। তাদেরই একজনের হাতে ধরা লাঠি থেকে ঝুলছিল ফুট তিনকে করে লম্বা নানা রঙের রেশমের দড়ি। সুজয়রা চত্বরে গিয়ে উপস্থিত হতেই লোকটা তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে দড়িগুলো দেখিয়ে বলল, ‘খিপু স্যার?’ ‘খিপু? ভেরি চিপ...’ দড়িগুলো কী কাজে লাগে তা বুঝতে না-পেরে সুজয় তাকাল মার্কেজের দিকে। তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর সুজয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এই দড়িগুলোর নাম খিপু’। ইংরেজি বানান, ‘QUIPU’। ইনকারা সংখ্যাতত্ত্বের ব্যাপারে অবগত থাকলেও সংখ্যা লিখন তাঁদের জানা ছিল না। খিপু নামের এই দড়িগুলোর সাহায্যেই তারা হিসাব রাখত। একটা দড়ি হাতে নিয়ে তিনি বললেন, ‘ভালো করে দেখুন, দড়িটার স্থানে স্থানে গিঁট দেওয়া আছে। গিঁটের সংখ্যা, ধরন, তাদের মধ্যে দূরত্ব, দড়ির বুনোন, উপকরণ আর রং দিয়ে সংখ্যা ও কীসের গণনা করা হচ্ছে তা চিহ্নিত করা হত। যেমন আমার হাতের দড়ির রংটা সাদা। পাঁচটা গিঁট আছে এতে। প্রত্যেকটা গিঁট সমদূরত্বে। সাদা রং নির্দেশ করত লামার সংখ্যা। পাঁচটা গিঁটের অর্থ ‘পাঁচ’। আর সমদূরত্ত্বের অর্থ, প্রত্যেকের পিছনে একটা ‘শূন্য’ বর্তমান। অর্থাৎ এ দড়ির সাহায্যে পঞ্চাশটা লামা বোঝান হচ্ছে। ঠিক এমনভাবে গৃহপালিত পশু বোঝানোর জন্য সবুজ রঙের দড়ি, সৈন্য সংখ্যা বোঝানোর জন্য লাল রঙের দড়ি ইত্যাদি নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত ছিল। এখনও পর্যন্ত প্রায় দুশো রকমের খিপু আবিষ্কার হয়েছে। শস্যের হিসাব থেকে শুরু করে জনগণনা, সবকিছুরই হিসাব তারা খিপুর মাধ্যমেই রাখত। সেদিনের স্মৃতি ধরে রাখতে এগুলো বিক্রি করা হয়। টুরিস্টরা সুভিনির হিসেবে কেনে।’

মার্কেজের কথা শোনার পর সুজয় গোটা দু-এক খিপু কিনল দেশে ফিরে বন্ধুবান্ধবদের দেবে বলে। মার্কেজ বললেন, তার প্রত্যেক ক-টার অর্থ পরে তিনি সুজয়কে বুঝিয়ে দেবেন।

এরপর তারা সকলে প্রবেশ করলেন মন্দিরে। কুজকোর মন্দিরের সঙ্গে এ মন্দিরের পার্থক্য হল, এখানকার দেওয়ালের গায়ে খোদিত হুয়াকাগুলো অন্য ধরনের। ফুল-পশুপাখির নকশার পরিবর্তে এখানে দেওয়ালের গায়ে আঁকা আছে বিভিন্ন ধরনের জ্যামিতিক নকশা, মার্কেজ জানালেন, এই আঁকজোকগুলো সম্ভবত বিভিন্ন ঋতুতে সূর্যের গতিপথের অঙ্কন। এ ছাড়া বিভিন্ন আকারের স্তম্ভ ও অদ্ভুত জ্যামিতিক স্থাপত্যও রয়েছে এখানে। মন্দিরের ভিতরে কোনো বিগ্রহ নেই। কোনো কোনো পন্ডিতের নাকি অভিমত, এ জায়গা আসলে ছিল মানমন্দির। ইনকা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যের গতিপথ ও রাতের আকাশে নক্ষত্রমন্ডলের অবস্থান নির্ণয় করতেন এখান থেকে। তাঁরা আবহাওয়ার ভবিষ্যদবাণী করতেন। যার ওপর নির্ভর করে ইনকারা তাদের কৃষিকাজ সম্পূর্ণ করতেন।

বেশ অনেকটা সময় নিয়ে এই মানমন্দির ঘুরে ঘুরে দেখল সুজয়রা। প্রফেসর মার্কেজ বুঝিয়ে দিলেন প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো। তারপর একসময় সে জায়গা ছেড়ে তারা রওনা হল অন্যদিকে। এ রকমই একটা চত্বরে বেশ কয়েকটা তাঁবু চোখে পড়ল সুজয়দের। তাঁবুগুলোর সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রিল্যাক্সড মেজাজে বসে রয়েছে সাদা চামড়ার বেশ কয়েকজন টুরিস্ট। নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছে তারা। মার্কেজ তা দেখে বললেন, ‘সম্ভবত এই তাঁবুগুলোতেই রাত কাটাবে এরা। দেখি, হোটেলে ফিরে কথা বলি। আমারও আজ রাতটা এই প্রাচীন নগরীতেই থাকতে ইচ্ছা করছে।’ তাঁর কথা শুনে সুজয় মনে মনে বলল, ‘তাহলে তো বেশ ভালোই হয়। একটা দুর্লভ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হওয়া যাবে।’

গোটা দশেক চত্বর অতিক্রম করার পর অবশেষে সুজয়রা উঠে এল পাহাড়ের মাথার ওপর। সেখানে বৃত্তাকারে ছড়িয়ে রয়েছে অতিপ্রাচীন বেশ কিছু ছাদহীন পাথরের ঘর। আর তার একপাশে বেশ উঁচু একটা বেদীর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের তৈরি স্তম্ভ। তার চারদিক থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে স্তম্ভর পাদদেশে পৌঁছোবার জন্য। সুজয়রা গিয়ে দাঁড়াল স্তম্ভ বেদীর নীচে। মার্কেজ সুজয়দের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এই হল মাচুপিচুর বিখ্যাত ‘ইনতিহুয়ানাতা’ বা সূর্যকে বেঁধে রাখার স্তম্ভ। এর ছায়া দেখেই সূর্যর ক্রান্তি পথ ও সময় গণনা করা হত। তা ছাড়া উৎসবের দিনে এই স্তম্ভর ওপর আগুন জ্বালানো হোত।’

‘কীভাবে?’ জানতে চাইল সুজয়।

তিনি বললেন, ‘আগুন জ্বালাবার জন্য ইনকারা বিশেষ পদ্ধতি গ্রহণ করত। তাঁরা কাচের ব্যবহার জানতেন না। বিরাট বিরাট অবতল আকৃতির সোনার চাকতি দিয়ে সূর্যরশ্মিকে কেন্দ্রীভূত করে তারা দাহ্যবস্তুর ওপর ফেলে প্রচন্ড উত্তাপ সৃষ্টি করে আগুন জ্বালত তারা। ওই অবতল চাকতিগুলো যেখানে আগুন জ্বালানো হত তার চারপাশে অনুচ্চ স্তম্ভের গায়ে এমনভাবে লাগানো থাকত যে উলম্বভাবে নাড়াচাড়া করা যায়।’ এরপর একটু থেমে তিনি বললেন, ‘এই পদ্ধতিতে স্তম্ভর গায়ে বেঁধে অপরাধী বা সাদা চামড়ার বিদেশিদের সূর্যরশ্মি দিয়ে পুড়িয়ে মারা হত।’

বিল তার কথা শুনে বলল, ‘হ্যাঁ, এরকম ব্যাপার কোনো একটা বইতে পড়েছিলাম!’

সুসান বলল, ‘হ্যাঁ, আমিও পড়েছি, টিনটিনের গল্পে!’

বিল ক্যামেরা বার করে বেশ কয়েকটা ছবি তুলল ইনতিহুয়ানাতার। সুজয়ও তুলল। তারপর বিল সিঁড়ি বেয়ে বেদীর ওপর উঠে চারপাশে তাকিয়ে নীচে দাঁড়ানো সুজয়ের উদ্দেশ্যে বলল, ‘এখানে উঠে এসে তোমার ক্যামেরায় ছবি নাও। মাচুপিচুর পুরো ভিউ পাওয়া যাচ্ছে এখান থেকে! মার্ভেলাস!’ তার কথা শুনে সুজয়ও সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল। মার্কেজ আর সুসান দাঁড়িয়ে রইল নীচে। সত্যিই বেদীর ওপর দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকালে, প্রাচীন নগরীর প্রায় সম্পূর্ণটাই চোখে পড়ছে। পাহাড়ের ধাপে ধাপে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পবিত্র ইনকা নগরীর চিহ্ন। সূর্য পশ্চিমে হাঁটতে শুরু করেছে। নগরীর এক অংশে পড়েছে পাহাড়ের ছায়া। তবে পূর্বদিকের জঙ্গলের মাথায় কুয়াশার আস্তরণ এখন আর নেই। সেদিকে অনেক অনেক দূরে নীল আকাশের বুকে চোখে পড়ছে নাম না-জানা পর্বতশৃঙ্গ। সুজয় ওপর থেকে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা নগরীর বেশ কয়েকটা ছবি তুলল। বিল প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার, সে ক্যামেরা এক হাতে চোখের সামনে তুলে ধরে অন্য হাতে ক্যামেরার জুমটা ঘুরিয়ে কীভাবে তুললে ছবিটা ভালো হবে তা বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছিল। ক্যামেরা ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ থমকে গিয়ে লেন্সে চোখ রেখে সে বলল, ‘আরে ওই লোকটা ওখানে কী করছে!’ পাশে দাঁড়ান সুজয় বিলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কে?’ বিল কোনো কথা না-বলে বেশ অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একসারি পাথুরে ঘরের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে তার ক্যামেরাটা সুজয়ের হাতে তুলে দিল। ক্যামেরায় চোখ রাখল সুজয়। জুম লেন্সটা দূরের ঘরগুলোকে কাছে নিয়ে এসেছে। সুজয় দেখল পাথরের ঘরগুলোর একটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মি. পিনচিওর গাইড হুইকো! সুজয়ের মনে হল সে যেন দূর থেকে তাকিয়ে আছে তাদের দিকেই। কিন্তু ঘরগুলোর আশেপাশে পিনচিওকে কোথাও দেখতে পেল না সে। কয়েক মুহূর্ত পর ধীরে ধীরে লোকটা একটা ছাদহীন ঘরের দেওয়ালের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। ক্যামেরাটা বিলের হাতে তুলে দিয়ে সুজয় বলল, ‘মনে হল লোকটা যেন আমাদেরই দেখছিল।’ বিল জবাব দিল আমারও তাই মনে হল, তাই তোমাকে দেখালাম।’ এরপর সেখানে দাঁড়িয়ে বিল কয়েকটা ছবি তোলার পর তারা দুজন নীচে নেমে এল।

বিল মার্কেজের উদ্দেশ্যে বলল, ‘এবার কোন দিকে যাওয়া হবে?’

মার্কেজ তার রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তিনটে বেজে গেছে। নীচে নেমে আমরা এখন সোজা হোটেলে ফিরব। যদি হোটেলে গিয়ে রাতে এখানে থাকার বন্দোবস্ত হয়ে যায় তাহলে তো আবার আমাদের সন্ধ্যার আগেই এ জায়গাতে ফিরতে হবে। কাজেই বলা যেতে পারে এখনকার মতো আমাদের কাজ শেষ।’

তাঁর কথা শুনে ঘাড় নেড়ে বিল তার ক্যামেরা চামড়ার কেসের মধ্যে পুরে ফেলল। তারপর সকলে ইনতিহুয়াতানা চত্বর ছেড়ে নীচে নামতে শুরু করল। নামতে নামতে মার্কেজ বললেন, ‘আবার ফিরতে হলে এবার ঘোড়াতেই ফিরব। দু-বার পাহাড় ভাঙার ধকল এ বয়সে সহ্য হবে না।’

দেখতে দেখতে ওপরে উঠতে যত সময় লেগেছিল, নীচে নামতে তত সময় লাগল না তাদের। ঘোড়া চলাচলের একটা পথ ধরে মিনিট চল্লিশের মধ্যেই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে আসা গেল। তারপর তারা পা বাড়াল হোটেলের দিকে।

তিন-জানলা চত্বরের কাছেই তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়েছিল সুজয়রা। গোল্ডেন ইনকা হোটেল কর্তৃপক্ষ এ জায়গাতেই দুটো তাঁবুতে তাদের রাত কাটাবার ব্যবস্থা করেছেন। তাঁবুর ভিতরে ঢুকে বিছানাতে শোয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়েছে সুসান। ঘোড়ায় চেপে আধ ঘণ্টা হল তারা এখানে এসে পৌঁছেছে। সূর্য অস্ত যেতে বসেছে। তার লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ের ঢালে তার খাঁজে খাঁজে দাঁড়িয়ে থাকা পাথুরে ঘরবাড়ি-স্তম্ভের মাথায়। এ রকম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কত সূর্যাস্ত-সূর্যদেবের সাক্ষী হয়ে আছে মূক-বধির এই স্থাপত্যগুলো! আঁধার ঘনিয়ে আসছে প্রাচীন নগরীর বুকে। ইতিমধ্যে পাহাড়ের দীর্ঘ ছায়া গ্রাস করে নিয়েছে নগরীর একাংশ। সুজয়রা যখন ঘোড়ার পিঠে চড়ে আসছিল, তখন এক বৃদ্ধ সহিস তাদের গল্প করছিল যে, রাত নামার সঙ্গে সঙ্গেই নাকি জেগে ওঠে এ নগরী, জেগে ওঠে প্রেতাত্মারা! এখানে রাত কাটাতে এসে অনেকেই নাকি দেখেছে দীর্ঘদেহী, মাথায় পালকের টুপি গোঁজা, বর্শাধারী সেইসব প্রাচীন ইনকা পুরুষদের! এমনিতে তাঁরা কাউকে কিছু বলেন না, কিন্তু কখনও তাঁদের পিছু ধাওয়া করতে নেই। একবার নাকি একদল সাহেব-মেমের চোখে পড়েছিল এরকমই এক প্রাচীন ইনকা। ওই দলের এক দুঃসাহসী সাহেব চাঁদের আলোতে পিছু নিয়েছিল তার। পর দিন সেই সাহেবের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় ইনতিহুয়ানাতার সামনে। তার ঘাড়টা ছিল ভাঙা। আর তার পাশে পড়েছিল কনডোর পাখির বিরাট বড়ো একটা কালো পালক। যা একসময় নিজেদের মাথায় দিতেন প্রাচীন ইনকা যোদ্ধারা!

—এ রকম আরও বেশ কয়েকটা ঘটনার কথা বলছিল সে। স্থানীয় লোকটার সন্ধ্যার পর এ জায়গার ছাওয়া মাড়ায় না। সন্ধ্যার আগেই তাঁরা নীচে চলে যায়। এখানে যে প্রেতাত্মারা বাস করে এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস তাদের। আর বিশ্বাস হবে নাই বা কেন? বংশপরম্পরায় তারা এই একই কথা শুনে আসছে যে! ঘোড়ার সঙ্গে যারা এখানে এসেছিল, তাঁবুর দায়িত্বে থাকা হোটেলের লোকটাকে নীচে ফেরার জন্য তাড়া দিচ্ছিল তারা। সুজয়দের এখানে নামাবার পর টাকা বুঝে নিয়ে, যত দ্রুত সম্ভব ফেরার পথ ধরল লোকগুলো।

ঘোড়াঅলাদের বা স্থানীয় লোকদের বক্তব্যের সারবত্তা কতটা আছে তা সুজয়ের জানা নেই। সে নিজেও ভূত-অপদেবতা বিশ্বাস করে না। কিন্তু তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে সে ভাবছিল ‘সত্যি সত্যিই যদি আজ রাতে কোনো ইনকা প্রেতাত্মার সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে মন্দ হয় না! ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা মানুষকে তাহলে চর্মচক্ষে প্রত্যক্ষ করা যাবে।’

একথা ভাবতে ভাবতে সুজয় বিলকে প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা বিল, তুমি কি ভূত-প্রেত-এসব ব্যাপার বিশ্বাস করো?’ বিল জবাব দিল, ‘না। অনেক বনবাদাড়ে তো ঘুরে বেড়িয়েছি, তারা যদি থাকত, তবে নিশ্চই তাদের সাক্ষাত পেতাম আমি।’

মার্কেজ সুজয়ের প্রশ্ন শুনে বললেন, ‘ও আপনি বুঝি ঘোড়াঅলাদের গল্পগুলোর কথা ভাবছেন? আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন?’ সুজয় হেসে ফেলে বলল, ‘না। তবে ভূতের গল্প পড়তে আমার ভালো লাগে।’

মার্কেজ হেসে বললেন, ‘আমারও ভালো লাগে। উইলিয়ম জেকবস এর লেখা, দ্য মাঙ্কি’জ প গল্পটা আমার অন্যতম প্রিয় গল্প। আপনি পড়েছেন গল্পটা? সেই যে এক ভারতীয় ফকিরের দেওয়া অলৌকিক বাঁদরের পাঞ্জার গল্প...’

তিনি আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বিল হঠাৎ বলে উঠল, ‘ওই যে আমাদের দিকে যারা এগিয়ে আসছে, আশা করি তারা কোনো প্রেতাত্মা নন।’

বিলের কথা শুনে তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সুজয়রা দেখল, তিন-জানলার ওদিক থেকে তাদের দিকে হেঁটে আসছে দুজন লোক। সুজয় দূর থেকেই চিনতে পারল তাদেরকে। মি. পিনচিও আর তার গাইড হুইকো। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের তাবুর সামনে এসে দাঁড়াল তারা দুজন। কাছে এসে পিনচিও মার্কেজের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘কি আপনাদের বেড়ানো কেমন হল? আপনারা যে এখানে থাকবেন তা বলেননি তো! আপনাদের হোটেলের লোকের মুখে জানতে পারলাম যে আপনারাও এখানে রাত কাটাবেন।’

মার্কেজ বললেন, ‘বেড়ানো বেশ ভালোই হল। তা আমাদের হোটেলের লোকের সঙ্গে কোথায় দেখা হল আপনার? আপনি কীভাবে জানলেন আমরা কোন হোটেলে উঠেছি?’

পিনচিও জবাবে বললেন, ‘বিকাল থেকেই আপনাদের খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি। নীচের হোটেলগুলোতে আপনাদের খোঁজে গিয়েছিলাম। গোল্ডেন ইনকাতে আপনাদের খবর পেলাম।’

মার্কেজ তাঁর কথা শুনে একটু অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘আমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন কেন? কোনো বিশেষ দরকারে কি?’ পিনচিও মৃদু হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ। বিশেষ একটা খবর জানাবার জন্যই আপনাদের খুঁজে বেড়াচ্ছি। চলুন কোথাও একটু বসে কথা বলি।’

মার্কেজ বললেন, ‘ও তাঁবুতে ঢুকেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সারাদিন অনেক ধকল গেছে ওর ওপর। চলুন কোথাও একটু বসে কথা বলি।’

বসার পর পিনচিও মার্কেজের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনার জন্য একটা খবর আছে। আপনিতো অজানা প্রাচীন শহরের খোঁজ করছেন। পুরোহিত ইল্লাপা আপনাদের তার খবর না-জানানোতে বেশ খারাপ লাগছিল আমার। আপনারা চলে আসার পর আমি তাকে বোঝালাম আপনাদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে। কত দূর থেকে আপনারা এখানে এসেছেন এই সুমহান সভ্যতাকে প্রত্যক্ষ করার জন্য, ইল্লাপাদের পূর্বপুরুষদের গৌরবগাথা আজকের পৃথিবীর কাছে তুলে ধরার জন্য। আপনারা এসেছেন এক মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে। এদেশের সভ্যতা-সংস্কৃতিকে কলুষিত করতে আপনারা আসেননি, এসেছেন ইনকাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানাতে। তা ছাড়া আমারও এ রকম কোনো প্রাচীন নগরী দেখার খুব ইচ্ছা। একা তো ওসব জায়গাতে যাওয়া যায় না, ইল্লাপার কাছ থেকে সন্ধান পেয়ে আপনারা যদি ওরকম কোনো নগরীতে যান, তাহলে আমিও আপনাদের সঙ্গী হতে পারি। অনেক বোঝাবার পর শেষপর্যন্ত ইনকা পুরোহিত রাজি হলেন এক প্রাচীন নগরীর সন্ধান দিতে। আর এ খবরটা জানাবার জন্যই আপনাদের খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি।’—একটানা কথাগুলো বলে থামলেন মি. পিনচিও।

তাঁর কথা শুনে উৎফুল্ল হয়ে মার্কেজ বললেন, ‘তাই নাকি! ইনকা পুরোহিত সেই নগরীর ব্যাপারে আরও কিছু বলেছেন নাকি আপনাকে? কোথায় সে নগরী? কীভাবে যেতে হয়?

পিনচিও তাঁর চোখ থেকে পারকল খুলে নিয়ে বললেন, ‘ইল্লাপা যেখানে যাচ্ছেন সেখানে ইনকা পুরোহিত ছাড়া সাধারণ ইনকাদেরও প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু তাঁর যাত্রাপথে আরও-এক প্রাচীন নগরী আছে, যার সন্ধান বাইরের পৃথিবী জানে না। গভীর জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে আছে সে নগর। পাহাড়-নদী-জঙ্গল পার হয়ে তিনদিন সময় লাগে সেখানে যেতে। ওখানে যারা বাস করে খাঁটি ইনকা রক্ত নাকি বহমান তাদের শরীরে। গত তিন-চারশ বছরের মধ্য ইনকা পুরোহিতরা ছাড়া কোনো সভ্য পৃথিবীর মানুষ সেখানে পদার্পণ করেনি। ইল্লাপা কাল তার গন্তব্যের অভিমুখে রওনা হচ্ছেন। যদিও তার যাত্রা পথের সেই প্রাচীন নগরীতেও বিদেশিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ, কিন্তু তিনি কথা দিয়েছেন তাঁর গন্তব্যে যাবার পথে সে নগরীতে তিনি আমাদের নিয়ে যাবেন। তার কথা শুনে মার্কেজ একটু বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘ইল্লাপাতো আমাকে প্রাচীন নগরীর কোনো সন্ধানই দিতে রাজি ছিলেন না! তিনি আপনার কথায় আমাদের তাঁর সঙ্গে করে নিয়ে যেতে রাজি হলেন? শেষপর্যন্ত তিনি আমাদের সেখানে নিয়ে যাবেন তো?’

পিনচিও হেসে বললেন, ‘আমার মনে হয় আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। তিনি আমাদের নিয়ে যাবেন। আসলে আমার প্রতি তাঁর একটা দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। যে কারণে আমার অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেননি।’

প্রফেসর তাঁর এই কথা শুনে বললেন, ‘আপনাকে একটা প্রশ্ন করছি, কিছু মনে করবেন না! এমনিতে ইনকা পুরোহিতরা বিদেশিদের ঠিক পছন্দ করেন না, তার ওপর আপনি আবার স্পেনীয়, পিজরোর দেশের লোক! এরা তো ঘৃণা করে স্পেনীয়দের। এর পরিবর্তে আপনার প্রতি তাঁর দুর্বলতা জন্মাল কীভাবে?’

মার্কেজের প্রশ্নের জবাবে পিনচিও বললেন, ‘এর পিছনে বিশেষ একটা কারণ আছে। আপনাকে তো বলেছি আমার কিউরিওর ব্যাবসা। যে দেশেই যাই আমি সেখানেই কিউরিওশপে একবার ঢুঁ মারি আমি। লিমার এক কিউরিও শপ থেকে একটা ‘টুমি’ কিনেছিলাম আমি। কিনেছিলাম বাণিজ্যিক প্রয়োজনেই। আজ সকালে গাড়িতে মাচুপিচু আসার পথে গাড়িতে সেটা ইল্লাপাকে দেখাতেই তিনি চেয়ে বসলেন আমার কাছে। তাঁর নাকি একটা ও জিনিসের ভীষন প্রয়োজন। অর্থাভাবে কিনতে পারছেন না। তার কথা শুনে শেষপর্যন্ত টুমিটা আমি তাকে উপহার দিয়েছি। এ কারণে তাঁর আমার প্রতি দুর্বলতা জন্মে গেছে।’

মার্কেজ শুনে অবাক হয়ে বললেন, ‘টুমিটা’ কি ইনকা আমলের? এমন একটা দুর্মূল্য জিনিস আপনি হাত ছাড়া করলেন!

তিনি বললেন, ‘না ওটা ইনকা আমলের নয়, রেপ্লিকা। তবে, গোল্ড প্লেটেড। হাজার ডলার দাম নিয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষরা তো অনেক কিছু এ দেশ থেকে নিয়ে গেছিল, ইল্লাপা যখন জিনিসটা চাইলেন তখন ভাবলাম ওটা ওকে দিয়েই দি। লিমার সেই দোকানে আরও বেশ কয়েকটা ও জিনিস আছে, ফেরার পথে একটু কিনে নেওয়া যাবে।’

মার্কেজ মৃদু হেসে বললেন, ‘ওটা দিয়ে কি পূর্বপুরুষদের পাপস্খলন করলেন?’

পিনচিও একটু আনমনা ভাবে বললেন, ‘না, না, ব্যাপারটা ঠিক সেরকম নয়।’ তারপরই তিনি মূল প্রসঙ্গে চলে গিয়ে বললেন, ‘তাহলে কী করবেন বলুন। ইনকা পুরোহিত কিন্তু কাল সকালেই রওনা হবেন।’

মার্কেজ বললেন, ‘আপনার প্রস্তাব যে লোভনীয় তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু, তিন দিনের জন্য যেতে হলে তো কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজন। তা ছাড়া খরচপত্র...’ তাঁকে কথা শেষ করতে না-দিয়ে স্পেনীয় ব্যবসায়ী বললেন, ‘ওসব ব্যাপার নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। ওখানে যেতে হলে, হোটেল-ট্যাক্সি বা এয়ার টিকিটের তো বুকিং লাগবে না। পদব্রজেই আমাদের যেতে হবে। আমার গাইড হুইকো খুব কাজের লোক। আপনি রাজি থাকলে রসদপত্র যা লাগবে, আজ রাতের মধ্যেই ও জোগাড় করে নেবে। শুধু আপনার মতামতের অপেক্ষা।’

মার্কেজ এবার তাকালেন সুজয় আর বিলের দিকে। সুজয়ের দেশে ফেরার জন্য হাতে বেশ সময় আছে। সম্ভবত দিন আষ্টেক সময় লাগবে ও জায়গা দেখে আসতে। এসব দেখার সুযোগ চট করে সাধারণ টুরিস্টদের হয় না। আবার তার সঙ্গে রয়েছে প্রফেসর মার্কেজের মতো পন্ডিত মানুষের দুর্লভ সাহচর্য! এ সুযোগ হাত ছাড়া করতে রাজি হল না সে। মার্কেজের উদ্দেশ্যে সে বলল, ‘আপনার যদি আপত্তি না-থাকে তাহলে আমি আপনার সঙ্গে যেতে আগ্রহী।’

মার্কেজ সুজয়ের উদ্দেশ্যে সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে চাইলেন বিলের দিকে। বিল একটু ইতস্তত করে বলল ‘মি. পিনচিওর মুখ থেকে সে জায়গার সম্বন্ধে যা শুনলাম তাতে ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। ওখানে যেতে পারলে ভালোই হয়। কিন্তু আমি যে কাজটার জন্য এখানে এসেছি সে কাজটা তাহলে পিছিয়ে যাবে। এ ব্যাপারে একটু ভাবার সময় পেলে ভালো হয়।’ এই বলে চিন্তা করতে লাগল বিল।

পিনচিও বিলের কথা শুনে মার্কেজকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘উনি কি বিশেষ কোনো কাজ নিয়ে এখানে এসেছেন? বলতে বাধা না-থাকলে জানাবেন সেটা কী কাজ?’

মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘না, বলতে বাঁধা নেই। কোনো গোপন ব্যাপার নয়। ও ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি করে তো, ও পেরুতে এসেছে কেশরহীন আন্দীয় সিংহ, অর্থাৎ পুমার ছবি তোলার জন্য। ও সে-কাজের কথাই বলছে।’

পিনচিও বললেন, ‘আমরাও তো জঙ্গলের মধ্যে দিয়েই যাবো। ওই যে পূব দিকের ঘন জঙ্গল, ইল্লাপা বলেছেন, ওই জঙ্গল-পাহাড় ভেঙে যেতে হবে আমাদের। ওখানেও ওয়াইল্ড লাইফ আছে নিশ্চই।’

তাঁর কথা শুনে বিল প্রশ্ন করলেন, ‘ওখানে কি ওয়াইল্ড লাইফ আছে জানেন আপনি?’

তিনি জবাব দিলেন তা জানি না। গাইড বইতে লেখা আছে দেখলাম ওই অরণ্য আমাজন অববাহিকা পর্যন্ত বিস্তৃত। উকেয়ালির বেশ কয়েকটা শাখা ওই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তবে কী কী প্রাণী আছে তা বলতে পারব না। হুইকো হয়তো বলতে পারবে। ও এর আগে একবার গেছিল ওই জঙ্গলে।’ এই বলে তিনি তাকালেন হুইকোর দিকে।

হুইকো এতক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে তাদের কথোপকথন শুনছিল। এবার সে ফিরে তাকাল সুজয়দের দিকে। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ, আমি একবার এ সাহেবের সঙ্গে গেছিলাম ওখানে। ও জঙ্গলে, জাগুয়ার আছে, শ্লথ আছে, টেপির আছে। বন্য ভিসুনিয়া আছে, লামা আর আলপাকাতো আছেই।’

‘তাহলে পুমা নেই!’ তার কথা শুনে একটু হতাশভাবে বলল বিল।

হুইকো বলল, ‘পুমা থাকে নেড়াপাহাড়ের ঘাস-জঙ্গলে। কখনো কখনো অবশ্য খাবারের অভাব পড়লে তারা নীচের জঙ্গলে নামে। গভীর জঙ্গলে তারা থাকে না।’

বিল একটু ম্রিয়মাণ হয়ে বলল, ‘জাগুয়ার বা ভিসুনিয়ার ব্যাপারে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই, আমি এসেছি পুমার ছবি তুলতে।’ কয়েক মুহূর্তে কী যেন চিন্তা করে নিয়ে হুইকো এবার বলল, ‘পুমার দেখা হয়তো মিলবে না। কিন্তু ও জঙ্গলে এমন এক পাখি আছে, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। আমি যে সাহেবের সঙ্গে ওই বনে গেছিলাম, তিনি ওখানে গেছিলেন ওই পাখির ছবি তুলতে।’

সম্ভবত আর একজন ফটোগ্রাফারের কথা শুনে বিল একটু উৎসাহিত হয়ে জানতে চাইল, ‘কী নাম সেই ফটোগ্রাফারের? কী পাখির ছবি তিনি তুলতে গেছিলেন?’

বিলের কথার জবাব দেবার আগে যেন একটু ইতস্তত করল হুইকো। তারপর পাথরের চোখটা কোটরে বসিয়ে নিয়ে, বিলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সেই সাহেবের নাম ছিল, ‘নিক কার্টার’। তিনি ‘কোরাকেঙ্কু’-র ছবি তুলতে গেছিলেন।’

হুইকোর কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল বিল। সুজয়ের মনে হল প্রফেসর মার্কেজও যেন এটু চমকে উঠলেন হুইকোর কথা শুনে।

উঠে দাঁড়াবার পর বিল মার্কেজের উদ্দেশ্যে বলল, ‘বিখ্যাত মার্কিন ফটোগ্রাফার নিকের তোলা ‘কোরাকেঙ্কুর’ ছবি আমি নেচার পত্রিকা-য় দেখেছি। একটাই মাত্র ছবি। ছবির সঙ্গে প্রবন্ধটাও পড়েছি। ছবিটা নিয়ে বেশ বিতর্ক হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়তির অভিযোগ এনেছিলেন কিছু পক্ষীবিদ। ছবি আর প্রবন্ধ ছাপা হবার কিছু দিনের মধ্যে নিক মারা যায়, ফলে ব্যাপারটাও ধামা চাপা পড়ে যায়। লোকে ধারণা করে নেয়, বৃদ্ধ বয়সে নিক আরও খ্যাতি পাওয়ার লোভে এ কান্ড করেছিলেন। ও পাখির কোনো অস্তিত্ব নেই। তাহলে ও পাখি কি সত্যিই আছে! তুমি দেখেছ সে পাখি?’ মার্কেজের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে হুইকোর চোখের দিকে তাকাল বিল।

হুইকো বিলের চোখের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, দেখেছি’। মাচাকুয়ে নদীর জঙ্গলে গাছের ডালে বসে ছিল পাখিটা। সোনালি রং। লম্বা ল্যাজে লাল-সাদা-কালো ডোরা। অপূর্ব পাখি। নিক সাহেব একটাই ছবি তুলতে পেরেছিলেন পাখিটার। তারপর সে উড়ে গেল। আর খুঁজে পেলাম না।’

‘তুমি সত্যিই দেখেছ!’ বিস্ময় নিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল বিল।

‘হ্যাঁ দেখেছি। ইনতির শপথ!’ শান্তভাবে বলল হুইকো।

তাদের কথাবার্তা শুনে সুজয় পাশে বসে থাকা মার্কেজকে বলল, ‘এরা যে পাখির কথা বলছে তার কথা আপনি জানেন?’

মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘বইতে পড়েছি। তবে নেচার পত্রিকা-য় নয়, ইনকা সভ্যতা নিয়ে লেখা একটা ইতিহাস বইতে।’

‘ইতিহাস বইতে?’

মার্কেজ বললেন, ‘হ্যাঁ। সেখানে কোরাকেঙ্কুর কথা ছিল। ইনকা সম্রাটরা যে তাজ মাথায় দিতেন তার নাম ‘ল্লান্টু’। ওই তাজের ওপর বসানো থাকত কোরাকেঙ্কুর লেজের দুটো পালক, রাজশক্তির প্রতীক। সেই সময়ের সাধারণ মানুষ কোনোসময় চোখে দেখতে পেত না সেই পাখিকে। দুর্গম স্থানে, সতর্ক পাহারার মধ্যে পালন করা হত সেই দুষ্প্রাপ্য পাখি। তার লেজের দুটো পালক নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য প্রাপ্তির পর সে পালক দুটো খুলে নিয়ে পাখিটা মেরে তার দেহ আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হত। আর কোনো চিহ্নই থাকত না সে-পাখির। কেবলমাত্র সেই পালক দুটো ছাড়া, তারা বৈভব আর শৌর্যের প্রতীকরূপে শোভা পেত সূর্যপুত্র ইনকা নরেশের ল্লান্টুতে।’ এই বলে চুপ করে গেলেন তিনি।

বিল মাথা নীচু করে কী যেন ভাবছে, অন্য কারো মুখে কোনো কথা নেই। হুইকোর দুটো চোখই স্থির। দ্রুত অন্ধকার নেমে আসছে প্রাচীন নগরীর বুকে। মি. পিনচিও এরপর উঠে দাঁড়িয়ে মৌনতা ভঙ্গ করে বললেন, ‘তাহলে কী ঠিক করলেন আপনারা?’

মার্কেজ তাকালেন বিলের দিকে।

বিল, তার উদ্দেশ্যে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি রাজি, হয়তো, যে কাজের জন্য আমার এখানে আসা সে কাজটা আমার পিছিয়ে যাবে। আমি যাব আপনার সঙ্গে। একটা চান্স নিই। যদি ওই দুর্লভ পাখি কোনো ভাবে চোখে পড়ে...।’

মার্কেজ এবার, মি. পিনচিওর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে আমরা যাব।’

পিনচিও হেসে বললেন, ‘ভালোই হল, আমরা তাহলে সবাই যাচ্ছি। তবে প্রফেসরকে একটা কাজ করতে হবে। একটা সরকারি কাগজে সইসবুদ করতে হবে। সাধারণ টুরিস্টদের বনের ভিতর ঢুকতে দেয় না এখানকার সরকার। তবে ইতিহাস গবেষকদের ক্ষেত্রে নিয়মটা শিথিল। কারণ, তাঁরা কিছু খুঁজে পেলে লাভ সরকারেরই। তেমন হলে ভবিষ্যতে সেখানে তারা পর্যটক টানতে পারবে। এই বনের ভিতর এখনও কী কী লুকিয়ে আছে তা বলা কঠিন। কাগজ-কলমে প্রফেসর হবেন আমাদের দলপতি, আপনারা, আমি আর হুইকো হলাম ওনার কম্পেনিয়ন।’ কথাগুলো বলে তিনি তাকালেন সুজয়ের দিকে। সুজয়ের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘আর পুরোহিত ইল্লাপা?’

পিনচিও হেসে বললেন, ‘ইনকা পুরোহিতরা জাদুবিদ্যাচর্চা করে বলে এখানকার সাধারণ মানুষ তাঁদের বেশ ভক্তি-শ্রদ্ধা করে, ভয়ও করে। সরকারি কর্মচারীদের ব্যাপারটাও একই। তার ওপর আবার ইল্লাপা কুজকোর করিকাঞ্চার পুরোহিত। তাঁর প্রতাপ আরও বেশি। সর্বত্র অবাধ তাঁর গতিবিধি। তার জন্য তার সরকারি কাগজের দরকার হয় না।’

মার্কেজ তাঁর কথা শুনে বললেন, ‘ বুঝলাম। কিন্তু আমাদের জন্য যেসব কাগজপত্র লাগবে তা পাব কোথায়?’ তার জন্যও তো সময়ের প্রয়োজন।’ পিনচিও তাঁর বুকের ভিতর থেকে রোল করা একটা কাগজ বের করতে করতে বললেন, ‘আপনাদের হোটেল থেকে ফেরার পথে ‘ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অফিস থেকে ফর্ম তুলে এনেছি। কাল ভিতরে ঢোকার সময় জমা দিতে হবে। এই যে...।’

বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে। কাগজটা হাতে নেবার পর প্রফেসর মার্কেজ সকলকে নিয়ে ঢুকলেন তাঁর তাঁবুতে। শুধু হুইকো বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। প্রত্যেক তাঁবুতে একটা করে ছোটো পেট্রোম্যাক্স বাতি রাখা আছে। সেটা জ্বালিয়ে নিলেন মার্কেজ। ক্যাম্প খাটে কম্বল মুড়ি দিয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে সুসান। তার ছোট্ট মুখটা শুধু কম্বলের বাইরে। পেট্রোম্যাক্সের আলোতে ফর্মটা দেখতে লাগলেন মার্কেজ, আর পিনচিও তাকিয়ে রইলেন সুসানের ঘুমন্ত মুখের দিকে।

ফর্মটা হাতে নিয়ে পড়ল সুজয়ও। ফর্মের মূল বক্তব্য মোটামুটি স্বাভাবিকই, ‘ব্রাজিলের আন্তর্জাতিক সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত এই বনাঞ্চলের যাবতীয় প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদই ‘রিপাবলিকা-ডেল-পেরু’-র সম্পত্তি। অনুপ্রবেশকারীরা যেন এ ব্যাপারে সচেতন থাকে। এ বনাঞ্চল থেকে সংগৃহীত যেকোনো বস্তু বা তথ্য তুলে দিতে হবে পেরু সরকারের হাতে।’ এ ছাড়া তাতে লেখা আছে যে, ‘এ অরণ্যে বিভিন্ন ধরনের হিংস্র জন্তু ও অর্ধসভ্য বেশ কিছু উপজাতি গোষ্ঠীর বাস। অরণ্যে প্রবেশকারীদের এই মর্মে অবগত করা হচ্ছে যে জন্তু বা উপজাতীদের দ্বারা তাদের প্রাণহানি বা অন্য কোনো ধরনের ক্ষতিসাধনের দায়িত্ব পেরু সরকারের ওপর বর্তাবে না।’ আছে আবেদনকারীর উদ্দেশ্য ও ব্যক্তিগত বিষয় সম্বন্ধে কিছু প্রশ্নও। যেগুলো পূরণ করতে হবে।

মার্কেজের ফর্মটা পূরণ করতে মিনিট দশেকের মতো সময় লাগল। তারপর তিনি সেটা পিনচিওর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘আর কিছু?’ পিনচিও একবার কাগজটার ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, ‘না, আর কিছুর দরকার নেই। থ্যাঙ্ক য়ু প্রফেসার।’

মার্কেজ বললেন, ‘তাহলে আগামীকাল কখন, কীভাবে যাত্রা শুরু করব আমরা?’

তিনি উত্তর দিলেন, ‘এখানে ইনতিহুয়ানাতা বলে একটা স্তম্ভ আছে জানেন নিশ্চয়ই। কাল সকাল সাতটায় ওর নীচেই মিলিত হব আমরা। ইল্লাপা বলেছেন ওর পূর্ব দিকের ঢাল বেয়েই জঙ্গলে যাবার রাস্তা। তবে সময়টা খেয়াল রাখবেন। ইল্লাপা আবার কী সব গ্রহনক্ষত্র হিসাব করে ওই সময়টাই যাত্রারম্ভের শুভ সময় নির্বাচন করেছেন। এসব ব্যাপারে ওঁর আবার প্রবল বিশ্বাস।’

মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘ওই সময়ের আগে আমরা ইনতিহুয়াতানার নীচে পৌঁছে যাব।’

পিনচিও চলে যাবার পর মার্কেজ ক্যাম্প খাটের ওপর বসে পড়ে সুজয়দের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমি কিন্তু মনে মনে চাইছিলাম যে আমরা সবাই সেখানে যাই। আমার বয়স হয়েছে, সঙ্গে ছোটো একটা বাচ্চা ছেলে রয়েছে। আপনারা দুজন থাকলে বনজঙ্গলে ভরসা পাব।’

বিলের মাথায় সম্ভবত সেই কোরাকেঙ্কুর কথা এখনও ঘুরছিল। সে মার্কেজকে বলল, ‘আচ্ছা, আপনার কি মনে হচ্ছে, ‘হুইকো যা বলে গেল তা সত্যি?’ মার্কেজ বললেন, ‘ও তো দৃঢ়তার সঙ্গে কথাগুলো বলল, এসব ব্যাপার সত্যি কী মিথ্যা তা চট করে বলা যায় না। তবে অনেক সময় গাইডদের কোনো কথা, বা একটুকরো বিবর্ণ হয়ে যাওয়া কাগজে আঁকা ম্যাপ, এসব জায়গাতে অনেক সময় অনেক বড়ো কিছুর খোঁজ দিয়েছে। ব্রিংহ্যামও তো সামান্য লোককথার সূত্র ধরে আবিষ্কার করেছিলেন মাচুপিচু।’

বিল এরপর বলল, ‘আপনাকে আরও একটা কথা বলি, ‘মি. পিনচিও প্রাচীন নগরীতে যাবার ব্যাপারে হঠাৎই যেন বড়ো বেশি উৎসাহী হয়ে পড়েছেন বলে মনে হচ্ছে না? ইনকা পুরোহিতকে রাজি করানো! আমাদের খুঁজতে আসা! কাল যখন এ প্রসঙ্গে ওর সঙ্গে আপনার কথা হল তখনতো এ উৎসাহ দেখিনি?’

এ ব্যাপারটা কিন্তু সুজয়েরও মনে হচ্ছিল।

মার্কেজ বিলের কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘এ কথাটা অবশ্য তুমি ঠিকই বলেছ। এর কারণ আমি বলতে পারব না।’ তারপরই তিনি একটু লঘুভাবে বলল, ‘ওর দেহে স্পেনীয় রক্ত আছে তো! একসময় পূর্বপুরুষরা পালতোলা নৌকায় মহাসমুদ্র পাড়ি দিত নতুন দেশের খোঁজে, সোনার সন্ধানে। হয়তো ও ভেবেছে কোনো হারানো নগরীর সন্ধান পেলে সেখানে সোনার খোঁজও পাওয়া যেতে পারে। আর তা না-পাওয়া গেলেও পিজরোর মতো আবিষ্কারক হিসেবে অন্তত ইতিহাস বইতে তার স্থান হতে পারে।’

বিলও এবার লঘুভাবে বলে উঠল, ‘ইতিহাস বই মানে কি আপনার লেখা বই?’ তাহলে দেখবেন, আবিষ্কারক হিসেবে আমার নামটা যেন সেখানে বাদ না-হয়ে যায়! তবে আপনার বই লেখার আগে প্রাচীন নগরী খুঁজতে গিয়ে আমরাই আবার ইতিহাস হয়ে যাব-না তো?’ বিলের রসিকতায় হেসে উঠলেন মার্কেজ। হেসে উঠল সুজয় আর বিল নিজেও।

হাসি থামার পর সুজয় মার্কেজের কাছে জানতে চাইল, ‘মি. পিনচিও ইনকা পুরোহিতকে ‘টুমি’ বলে যে জিনিসটা দিয়েছে সেটা আসলে কী? কোনো অলংকার বা জাদুদন্ডের মতো দেখতে কিছু?’

প্রফেসর জবাব দিলেন, ‘টুমি’, হল পুত ছুরিকা। ছোটো আকৃতির দেখতে হয়। সোনার তৈরি এই ছুরি দিয়ে প্রাচীনকালে লামা বলি দেওয়া হত ইনতির উদ্দেশ্যে। ধর্মীয় উৎসবে এখনও টুমির সাহায্যেই লামাবলি দেওয়া হয়। এরপর একটু থেমে তিনি বললেন, ‘জাদুকর ইনকা পুরোহিতরা টুমির সাহায্যেই লামার বুক চিরে হৃৎপিন্ড বাইরে বার করে আনতেন। তারপর তখনও স্পন্দিত সেই হৃৎপিন্ড হাতের মুঠোতে ধরে ভবিষ্যদবাণী করতেন। ইনকা পুরোহিতদের কাছে টুমি জিনিসটা তাই মূল্যবান।’

এরপর শুরু হল ইনকা পুরোহিতদের জাদুবিদ্যাচর্চা নিয়ে গল্প। কীভাবে ইনকা পুরোহিতরা লামার হৃৎপিন্ড, মাকড়সা, টিকটিকি, ব্যাঙ ইত্যাদির সাহায্যে ঝড়, বৃষ্টি, খরা ইত্যাদি সম্বন্ধে ভবিষ্যদবাণী করতেন, কীভাবে তারা সম্রাটের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন এসব গল্প। বক্তা অবশ্যই মার্কেজ। শ্রোতা বিল আর সুজয়।

প্রায় এক ঘণ্টা গল্প করার পর তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়াল সকলে। ততক্ষণে চাঁদ উঠেছে। পূর্ণিমার আকাশ না-হলেও বেশ উজ্জ্বল আলো। সেই আলোতে বিধৌত পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন ইনকা নগরীর ধ্বংসাবশেষ। পাথুরে স্তম্ভ, প্রাচীর, ছাদহীন ঘরগুলো যেন আরও বেশি রহস্যময় হয়ে উঠেছে চাঁদের আলোতে! কোথাও কোনো শব্দ নেই। পর্যটকদের কোলাহল সূর্য ডোবার অনেক আগেই থেমে গেছে। শুধু এক বুক কথা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মূক-ম্রিয়মাণ প্রাচীন সৌধগুলো। সুজয় প্রফেসরের কাছে শুনেছে যে, ইনকারা বিশ্বাস করতেন, ‘সোনা হল সূর্যদেবের ঘর্ম, আর রুপা হল চন্দ্রদেবের অশ্রু। তার মনে হল চাঁদের করুণা যেন সত্যিই রুপোলি অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ছে মাচুপিচুর বুকে! কারো মুখে কোনো কথা নেই, বিল শুধু একবার অস্ফুট স্বরে বলল, ‘বিউটি ফুল!’

তাঁবুর কিছুটা দূরেই একটা খাদ। চাঁদের আলোতে নীচের হুরিন চত্বরকে ভালোভাবে দেখার জন্য তাঁবু দুটোকে পিছনে ফেলে পায়ে পায়ে সুজয়রা গিয়ে দাঁড়াল খাদের ধারে। খাদের নীচে ঘুমিয়ে আছে হুরিনের পাথুরে সৌধগুলো। মৃত নগরীতে কোথাও কোনো জনপ্রাণী নেই। শুধু একটা ঘাসে ঢাকা চত্বরে নড়াচড়া করছে বেশ কয়েকটা সাদা বিন্দু, লামার দল। কাল ভোরের প্রতীক্ষায় সম্ভবত ওদের মালিক ছেড়ে রেখে গেছে প্রাণীগুলোকে। কিছুক্ষণ নীচের দিকে তকিয়ে থাকার পর সুজয় মাথা তুলে তাকাল ওপর দিকে। তাদের সামনেই কিছু দূরে আকাশের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে একটা পাহাড়,—ওর নাম ‘হুয়ানাপিচু’। তার মাথার ওপর নির্মেঘ আকাশে ফুটে উঠেছে অসংখ্য নক্ষত্ররাজি। ঠিক কেউ যেন মুঠোমুঠো আলোকবিন্দু ছিটিয়ে রেখেছে আকাশের বুকে! নীচের চন্দ্রস্নাত মাচুপিচুর মতো মাথার ওপরে সেই দৃশ্যও কম সুন্দর নয়! কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর মার্কেজ আকাশের একজায়গায় আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন, ‘ওই যে উত্তর দিকে নক্ষত্রমন্ডলী দেখছেন, ওর নাম ‘ভালপেকূলা’ নক্ষত্রমন্ডল। এ নাম ইনকাদেরই দেওয়া। এ নামের অর্থ হল ‘শৃগাল নক্ষত্রমন্ডল।’ ইনকা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমনই নির্মেঘ আকাশের রাতে এই মাচু-পিচুর মানমন্দির থেকে নক্ষত্রমন্ডলীর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতেন। খালি চোখে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের সূচনা করে ইনকারা। তবে তারা নির্দিষ্ট কোনো নক্ষত্রর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতেন না, নক্ষত্র-মন্ডলীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন। তাঁদের চোখে দৃশ্যমান নক্ষত্রপুঞ্জকে বিভিন্ন প্রাণীর আকারে কল্পনা করতেন তারা, এবং সেই মর্মে তাদের নামকরণও করেছিলেন। ভালপেকূলা বা শৃগাল, মাচাকুয়ে বা সর্প, উনালামাচা বা ছোটোলামা, কনডোর, পিউমা,—এ জাতীয় সব নাম। বিভিন্ন ঋতুতে এখান থেকে খালি চোখে যত নক্ষত্রমন্ডলী দৃশ্যমান, তাদের সব ক-টিকেই চিনতেন প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। কোন নক্ষত্রমন্ডলীর, কোথায় অবস্থান কীসের আগমনবার্তা সূচিত করছে, তা তারা জানিয়ে দিতেন কুজকো নগরীতে সম্রাটের কাছে।’ এই কথা বলার পর মার্কেজ বেশ কিছুক্ষণ ধরে সুজয়দের একে একে চিনিয়ে দিতে লাগলেন কোনটা কোন নক্ষত্রমন্ডলী। তাঁর কথা শুনে সুজয় বুঝতে পারল, প্রফেসরের বুৎপত্তি শুধু ইনকাদের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়, জ্যোতির্বিজ্ঞানেও বেশ কিছুটা জ্ঞান আছে ভদ্রলোকের। চন্দ্রালোকে পাহাড়ের গায়ে রহস্যময় প্রাচীন নগরীতে দাঁড়িয়ে, আরও রহস্যময় আকাশের দিকে তাকিয়ে মার্কেজের কথা শুনতে শুনতে সুজয় তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, নক্ষত্রমন্ডলীর অবস্থান, গণনা, এইসব জটিল হিসাবনিকাশ সে আমলে কীভাবে রাখতেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা?’

মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘এসব হিসাবও রাখা হত ওই খিপু পদ্ধতির মাধ্যমেই।’

এরপর তিনি সম্ভবত ওই হিসাব পদ্ধতি সম্বন্ধে আরও কিছু কথা বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই একটা চিৎকারের শব্দ ভেসে এল পিছনে তাদের তাঁবুর দিক থেকে!

মার্কেজ বললেন, ‘সুসানের গলা না?’ আর তারপরই তারা ছুটতে শুরু করল তাঁবুর দিকে।

খাদের কাছ থেকে তাঁবুতে এসে ঢুকতে বড়ো জোর এক মিনিট সময় লাগল সুজয়দের। ভিতরে ঢুকে তারা দেখল, সুসান কম্বল মুড়ি দিকে ক্যাম্পখাটে বসে আছে। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। মৃদু-মৃদু কাঁপছে সে। সুজয় তার উদ্দেশ্যে বলল, ‘তোমার কি হল সুসান? তুমি কি ভয় পেয়েছ?’ তার কথার কোনো জবাব দিল না সুসান, সে শুধু ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইল। বিল তাড়াতাড়ি ফ্লাস্ক থেকে জল এনে ধরল সুসানের সামনে। ইতিমধ্যে মার্কেজও প্রবেশ করলেন তাঁবুতে। তিনি সুসানকে বললেন, ‘কি হয়েছে তোমার স্বপ্ন দেখেছ?’ তাঁকে দেখে এবার মনে হল আশ্বস্ত হল সুসান। বিলের হাতে ধরা গ্লাসের জলটা পান করে সে ভয়ার্ত স্বরে বলল, ‘ভূত এসেছিল। ইনকার ভূত!’

প্রফেসর বললেন, ‘কোথায় ভূত? এখানে তো কেউ নেই! তুমি মনে হয় স্বপ্ন দেখেছ!’

সুসান ধীরে ধীরে বলল, ‘না, স্বপ্ন নয়, সত্যি ভূত এসেছিল। আমি ঘুমাচ্ছিলাম, ঘুম ভেঙে গেল। আমি দেখলাম তাঁবুর বাইরে একটু দূরে কম্বল মুড়ি দিয়ে একজন লম্বা লোক পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ভাবলাম সে বিল আঙ্কেল, শুয়ে শুয়ে আমি তাকে বললাম, ‘বিল আঙ্কল, দাদু কোথায়?’ সে আমার কথার কোনো জবাব দিল না। তারপর আবার তাকে ডাকলাম। সে তখন ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকাল আমার দিকে। আমি দেখলাম সে বিল আঙ্কল নয়, একটা ইনকা ভূত! তার মুখে উলকি আঁকা, চোখ দুটো যেন জ্বলছে। তাঁর হাতে রয়েছে একটা লাঠি। আমি ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলাম। সঙ্গে সঙ্গে সে ভ্যানিশ হয়ে গেল! আর তারপরই তোমরা চলে এলে।’

বিল এবার তাকে জিজ্ঞেস করল ঠিক কোথায় দেখেছিল তুমি তাকে? আমরাতো তাঁবুর কাছাকাছিই ছিলাম!’

পাথরের ঘরগুলোর একটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মি. পিনচিত্তর গাইড হুইকো!

সুসান আবার বলল, ‘ওইতো ওইতো ওখানে তাঁবুর দরজার একটু বাইরে।’

মার্কেজ বসলেন সুসানের পাশে। সুজয় আর বিল তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এসে তাকাল চারদিকে। না, কোথাও কেউ নেই। ঘুমিয়ে থাকা প্রাচীন নগরী শুধু প্লাবিত হয়ে আছে চাঁদের আলোতে। ভালো করে চারপাশ একবার দেখে নেবার পর বিল বলল, ‘এখানে আসার পথে ঘোড়াঅলারা ইনকা ভূতের গল্প বলেছিল তো। এমনিতেই বাচ্চাদের মন কল্পনাপ্রবণ হয়। ও সব শুনে সুসানের হ্যালুমনেশন হয়েছে।’

সুজয় বলল, ‘হ্যাঁ, তা হতে পারে।’

বিল এরপর আমাজনের অরণ্যে তাঁবুতে রাত কাটানো নিয়ে সুজয়কে গল্প বলতে শুরু করল।

বেশ কিছুক্ষণ গল্প করার পর মার্কেজের তাঁবুর ভিতর থেকে তাঁর ডাক শোনা গেল, ‘চলে আসুন, রাতের খাওয়াটা সেরে নেওয়া যাক।’ বিল তার কথা শুনে সুজয়কে বলল, ‘চলো তাহলে। আজ তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে শুয়ে পড়া ভালো। কাল থেকে তো আমাদের পায় হাঁটা শুরু হবে। এরকম ভ্রমণের আগে একটা রাত টানা ঘুম খুব জরুরি। হয়তো দেখবে জঙ্গলের ভিতর তাঁবুতে রাত জাগা পশুপাখির ডাকে কাল রাতে ঘুমই হবে না তোমাদের।’ সে একথা বলার পর তারা দুজন তাঁবুতে ঢোকার জন্য পা বাড়াল। এক পা সেদিকে এগোবার পরই হঠাৎ সুজয়ের চোখে পড়ল তাঁবুর কয়েক হাত দূরে ঘাসের ওপর কী যেন একটা জিনিস চাঁদের আলোতে চকচক করছে। সুজয় আঙুল তুলে বিলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ‘কী ওটা?’ বিল কাছে গিয়ে জিনিসটা কুড়িয়ে নিল। সুজয় দেখল সেটা, একটা পালক! সাদা-কালো ডোরা আঁকা একটা পালক। বেশ বড়ো আকারের। পালকটা একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বিল বলল, ‘এ পালকটা এখানে আগে পড়ে থাকতে দেখিনিতো!’ তারপরই সে বলল, ঠিক এরকমই পালক আমি ইনকা পুরোহিতের মাথায় দেখেছি।’ তাঁবুতে ঢোকার আগে বিল পালকটা গুঁজে দিল তাঁবুর মাথায়।

হোটেল থেকেই খাবার এনে ছিল তারা। মার্কেজের তাঁবুতে একসঙ্গে বসে খাওয়া সারার পর সকলে এক সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল। কিন্তু বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না তারা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস ভেসে আসছে পাহাড় ঘেরা জায়গাটাতে। ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে তাদের। তাই কিছুক্ষণ কথা বলার পরই মার্কেজ বিল আর সুজয়কে শুভরাত্রি জানিয়ে সুসানকে নিয়ে শুতে চলে গেলেন তাঁর তাঁবুতে। সুজয় আর বিলও গিয়ে ঢুকল তাদের নিজেদের তাঁবুতে। কম্বল মুড়ি দিয়ে ক্যাম্পখাটে শোয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সারাদিনের ক্লান্তিতে সুজয়ের চোখে ঘুম নেমে এল।

ভোরবেলা যখন ঘুম ভেঙে সুজয় তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়াল তখন পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যকিরণ ছড়িয়ে পড়েছে মাচুপিচুর বুকে। ঝলমল করছে নীল আকাশের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা তুষারধবল শৃঙ্গরাজি। তবে পুবদিকের সেই অরণ্যের মাথা এখনও কুয়াশার ঘন চাদরে ঢাকা। ওই অরণ্যতেই আজ প্রবেশ করতে হবে সুজয়দের। ওই কুয়াশার চাদরের নীচে তাদের জন্য কত রহস্য লুকিয়ে আছে কে জানে!’ সেদিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল সুজয়।

সুজয়ের আগেই ঘুম ভেঙে উঠে পড়েছেন প্রফেসর মার্কেজ, বিল, এমনকি সুসানও। তাঁবুর কিছু দূরে দাঁড়িয়ে তারা কথা বলছিল। সবার শেষে ঘুম ভাঙায় মনে মনে একটু লজ্জা পেল সে। প্রফেসর তার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘গুড মর্নিং। আশা করি ভালো ঘুম হয়েছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। ইনতিহুয়ানাতা পর্যন্ত আমাদের মালপত্র নিজেদেরই টেনে নিয়ে যেতে হবে, তাই একটু আগেই বেরোব আমরা।’ সুজয়ের রিস্টওয়াচে ঠিক ছ-টা বাজে। সময়টা দেখে নিয়ে সুজয় বলল, ‘আমার তৈরি হতে ঠিক দশ মিনিট সময় লাগবে’।

মার্কেজ হেসে বললেন, ‘অত তাড়াতাড়ির দরকার নেই, সাড়ে ছ-টার মধ্যে তৈরি হয়ে নিলেই হবে।’ সুজয় বলল, ‘আচ্ছা’।

ঠিক সাড়ে ছ-টার সময় তাঁবু ছেড়ে মালপত্র নিয়ে ইনতিহুয়ানাতা চত্বরের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করল সকলে। জিনিসপত্র নিয়ে পাহাড়ের খাঁজ বেঁয়ে, সঙ্কীর্ণ পাথুরে ধাপে পা ফেলে ওপরে উঠতে বেশ কষ্টই হল সুজয়দের। তারা যখন ইনতিহুয়ানাতা চত্বরে পৌঁছোল তখন তাদের চোখে পড়ল ইনতিহুয়ানাতার ঠিক নীচে পিনচিও আর হুইকো দাঁড়িয়ে আছে ইনকা পুরোহিত ইল্লাপার সঙ্গে। তাদর একপাশে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকজন লোক আর একদল লামা।

সুজয়রা তাঁদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই পিনচিও বললেন, ‘গুড মর্নিং প্রফেসর। আমরা আগেই চলে এসেছি। আপনাদের মালপত্রগুলো এবার চটপট তুলে ফেলতে হবে প্রাণীগুলোর পিঠে। আমাদেরগুলো বাঁধা হয়ে গেছে।’ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইল্লাপা একটা কথাও বললেন না। তিনি নির্লিপ্তভাবে একবার সুজয়দের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে তাকালেন সামনের পাথুরে মাটির দিকে। ইনতিহুয়ানাতার একটা আবছা ছায়া এসে পড়েছে সে জায়গাতে। পাথুরে মাটিতে সে জায়গাতে পর পর কতগুলো সরলরেখা আঁকা, আর একটা লাঠি শোয়ানো আছে সেখানে। সুজয়ের মনে হল সূর্যঘড়িতে সময় দেখছেন ইল্লাপা।

মোট পাঁচটা ভারবাহী লামা, আর চারজন স্থানীয় পোশাক পরা লোক। আর সেই সাদা লামার বাচ্চাটাও আছে। লোকগুলোর মধ্যে একজন বেশ শক্তপোক্ত, আর একজন বেশ বৃদ্ধ। তিনটে লামার পিঠে ইতিমধ্যেই মালপত্র বাঁধা। পিনচিওর নির্দেশে কিছুক্ষণের মধ্যেই হুইকো, আর একজন লোক সুজয়দের মালপত্র দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল অন্য দুটো লামার পিঠে।

বাঁধাছাঁদা শেষ হবার পর মার্কেজ, পিনচিওকে বললেন, ‘সাতটাতো প্রায় বাজে, আমরা কি তাহলে এখনই রওনা হচ্ছি?’

পিনচিও ইল্লাপার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, সূর্যঘড়িতে সাতটা বাজলেই রওনা হব আমরা।’

ইল্লাপা তখনও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ইনতিহুয়ানাতার ছায়ার দিকে। সে তাকানোর অর্থ এবার বুঝতে পারল সুজয়।

বেশ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর ইনকা পুরোহিত হঠাৎ সূর্যের দিকে মুখ তুলে বিড় বিড় করে কী যেন বলতে শুরু করলেন। সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল। মার্কেজ চাপা স্বরে সুজয়ের কানের কাছে বললেন, ‘যাত্রা শুরুর আগে সূর্যস্তুতি করছে ইনকা পুরোহিত। মিনিট পাঁচেক মন্ত্রোচ্চারণের পর মাটি থেকে লাঠিটা তুলে কাঁধে রাখলেন ইল্লাপা। সুজয়রা কেউই খেয়াল করেনি, ইল্লাপার পোষা সেই কনডোরের বাচ্চাটা এতক্ষণ বসেছিল ইনতিহুয়ানাতার মাথায়। তিনি লাঠিটা কাঁধে ফেলে মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ করতেই পাখিটা ওপর থেকে উড়ে নীচে নেমে এসে বসল লাঠিটার মাথার কাছে এক জায়গাতে। আর তারপরই ইঙ্গিতে সবাইকে তাঁকে অনুসরণ করতে বলে লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে শুরু করলেন ইনকা পুরোহিত। সুজয়ের ঘড়িতে তখন সাতটা বেজে চার। সবাই এবার ইল্লাপার পিছন পিছন হাঁটতে শুরু করল। প্রথমে ইনকা পুরোহিত, তারপর পিনচিওসহ সুজয়রা, আর সব শেষে লামার বাচ্চা আর ভারবাহী লামাগুলোকে নিয়ে অন্য লোকগুলো। যেতে যেতে সুজয় মার্কেজকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমার ঘড়ির সাথে সূর্যঘড়ির মিনিট চারেক সময়ের পার্থক্য হল কেন?’

মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘ইনতিহুয়ানাতা তৈরি হয়েছিল সাড়ে পাঁচশো বছর আগে। এই সাড়ে পাঁচশো বছরে সূর্য ও পৃথিবীর গতিপথের যে পরিবর্তন হয়েছে তার জন্য সময়ের ওই পার্থক্য।’

ইনতিহুয়ানাতা চত্বর ছেড়ে পূব দিকের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল সুজয়রা। সুসান চলেছে সুজয়ের হাত ধরে। সে জানতে চাইল আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?

সুজয় তাকে কুয়াশার চাদরে ঢাকা জঙ্গলের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘আমরা যাব ওই জঙ্গলে।’ সুসান আবার প্রশ্ন করল, ‘কী আছে ওই জঙ্গলে?’

সে জবাব দিল, ‘এ রকম একটা পুরোনো শহর আছে ওই জঙ্গলের মধ্যে। আমরা সেটা দেখতে যাচ্ছি। তা ছাড়া জঙ্গলের মধ্যে নানা রকম পশুপাখি আছে। তাদেরও নিশ্চই দেখতে পাব আমরা।’

পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একসময় সুজয়রা নীচে নেমে এল। তারপর উপত্যকা রেখে হাঁটতে শুরু করল পূবের জঙ্গলের দিকে। ক্রমশই কাছে এগিয়ে আসতে লাগল পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা সেই জঙ্গলের প্রবেশমুখ। তারা যখন সে জায়গাতে পৌঁছোল তখন প্রায় এক ঘণ্টা সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। আসলে মাচুপিচুর ওপর থেকে জঙ্গলটা যত কাছে মনে হচ্ছিল আসলে তা ততটা কাছে নয়। জঙ্গলের প্রবেশমুখে একটা ছোট্ট চেকপোস্ট। ফরেস্ট গার্ডরা তাদের পথ আটকাতেই পিনচিও পকেট থেকে আগের দিনের সেই কাগজটা বের করে তুলে দিলেন অফিসার গোছের লোকের হাতে। সেই অফিসার একবার কাগজটাতে চোখ বুলিয়ে নিয়ে ভ্রুকুঁচকে সুজয়দের দিকে তকিয়ে বললেন, ‘প্রফেসর মার্কেজ কোন জন?’ মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘এই যে আমি।’

অফিসার একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। তারপর প্রশ্ন করল, ‘এসব লোকজন সবাই আপনার সঙ্গেই যাচ্ছে! গাইড কে?’

মার্কেজ জবাব দেবার আগেই হুইকো বলে উঠল, ‘আমরা সবাই ওনার লোকজন, আর আমি হলাম গাইড।’ এই বলে সে পকেট থেকে তার পরিচয়পত্র গোছের কিছু একটা বার করে এগিয়ে গেল অফিসারের দিকে। অফিসার এরপর হুইকোকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে কী সব জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগলেন। মিনিট তিনেক তারা কথাবার্তা বলার পর হুইকো ফিরে এসে বলল, ‘কাগজ ঠিকই আছে। কিন্তু আমাদের মালপত্র খুলে পরীক্ষা করতে চাইছে ও। বিশেষত ওই লম্বা কাঠের বাক্সগুলো। ওর ধারণা ওর মধ্যে আপত্তিকর কিছু থাকতে পারে।’

হুইকোর কথা শুনে কেমন যেন চুপসে গেলেন পিনচিও। একটা লামার পিঠে বেশ লম্বা ধরনের দুটো পালিশ করা কাঠের বাক্স ঝোলানো আছে। একজন বেশ শক্তপোক্ত পেরুভিয়ান সেই লামাটার লাগাম ধরে পথ চলছে। সুজয় লক্ষ করল, সে তার পাশের সঙ্গীকে চাপাস্বরে কী যেন বলল।

ইল্লাপা দাঁড়িয়ে ছিলেন একটু দূরে একটা গাছের ছাওয়াতে। এবার তিনি এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন সুজয়দের কাছে। এতক্ষণ তাঁকে মনে হয় খেয়াল করেননি সেই ফরেস্ট অফিসার। ইল্লাপাকে দেখে তিনি যেন কেমন চমকে উঠলেন! ইল্লাপা, কী হয়েছে তা জেনে নিলেন হুইকোর কাছে, তারপর সেই অফিসারের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে দুর্বোধ্য ভাষায় কী বলল! তাঁর কথা শোনার সাথে সঙ্গেই কেমন যেন গুটিয়ে গেলেন সেই পেরুভিয়ান অফিসার। সুজয়ের মনে হল, জাঁদরেল চেহারার অফিসারটি যেন ভয় পেয়ে গেলেন। এরপর তিনি তার সঙ্গী ফরেস্ট গার্ডদের সুজয়দের পথ ছেড়ে দেবার নির্দেশ দিলেন, মালপত্র পরীক্ষা করার কোনো কথা আর মুখে আনলেন না তিনি। তাদের পাশ কাটিয়ে ইল্লাপা সকলকে নিয়ে প্রবেশ করলেন জঙ্গলের পথে, এগোতে এগোতে সুজয় মার্কেজকে জিজ্ঞেস করল, ‘ইনকা পুরোহিত এমনকি বলল, যে ফরেস্ট গার্ডরা ভয় পেয়ে গেল?’ মার্কেজ বললেন, ‘ইল্লাপা বললেন, ও সব তাঁর জিনিস। তাঁর সময় নষ্ট করলে করিকানচার পুরোহিত তাঁকে অভিশাপ দেবেন। অফিসার হলেও লোকটাতো পেরুভিয়ান, অভিশাপ-টভিশাপে ওরা বিশ্বাস রাখে, তাই ভয় পেয়ে পথ ছেড়ে দিল।’

জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল তারা। প্রথমে ঝোপঝাড়, একটু দূরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বড়ো বড়ো গাছ, জমি কখনও উঁচু, কখনও নীচু। তারপর এক সময় চারপাশের বনজঙ্গল যেন ঘন হয়ে চেপে ধরতে শুরু করল তাঁদেরকে। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে ধীর পায়ে চলতে লাগল তারা। গাছের মাথার ওপর থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছে, কিন্তু তাদের চোখে দেখা যাচ্ছে না। ইল্লাপা সবার আগে হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখছেন।

ঘণ্টাখানেক চলার পর একসময় সুজয়রা সত্যিই প্রবেশ করল গভীর জঙ্গলের মধ্যে। সেখানে যে দিকেই তাকানো যায় সেদিকেই বিরাট বিরাট গাছ। অনেক ওপরে তাদের ডালপালাগুলো চাঁদোয়ার মতো আকাশকে ঢাকার চেষ্টা করছে। বিলের বনজঙ্গল সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা আছে। তাই মার্কেজ তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আমাজনের জঙ্গল কি এর চেয়ে বেশি ঘন?’

বিল বলল, ‘এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি ঘন। এখানেতো তাও পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো কিছু হলেও আসছে। সেখানে একদম নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।’ তবে এ জঙ্গলের ভিতরটা কেমন, এখনই তা বলা সম্ভব নয়। আমার মনে হয় এখনও বাফার এলাকাতেই আছি কোর এলাকাতে ঢুকিনি।’

মার্কেজও বিলের কথাবার্তা শুনে পিনচিও বললেন, ‘কোর এলাকা মানে?’

বিল বলল, ‘সে-সব জায়গাতে রাস্তা এত ঘন থাকে যে অনেক সময় জঙ্গল কেটে রাস্তা বানিয়ে এগোতে হয়। ঠাস বুনোট গাছের ফাঁক দিয়ে মাছিও গলতে পারে না আর কোর এলাকার বাইরের অঞ্চল হল বাফার।’

সুজয় বলল, ‘এই বাফার এলাকাতে জন্তুজানোয়ার থাকে না?’

সে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, নিশ্চই আছে। আমাদের চোখে পড়ছে না। জন্তুজানোয়ারেরা তাদের স্বভাব অনুযায়ী জঙ্গলের বিভিন্ন জায়গাতে বাস করে।’ এসব নানা কথা আলোচনা করতে করতে এগোতে লাগলেন তারা। শুধু ইল্লাপাই নিশ্চুপভাবে সুজয়দের কয়েক হাত তফাতে নিজের মনে হেঁটে চললেন। মাঝে মাঝে মিনিট দশেকের বিশ্রাম, তারপর আবার হাঁটা। একসময় সুসান আর হাঁটতে পারছিল না। থামতে হল সুজয়দের। সমস্যার সমাধান করে দিল লামা নিয়ে যারা চলছিল তাদের মধ্যে বৃদ্ধ লোকটা। এমনিতে লামার পিঠে ঘোড়ার মতো বসা যায় না। সে লামার পিঠে ঝুলন্ত মালপত্রের খাঁজে বসিয়ে দিল সুসানকে। তারপর শুরু হল পথ চলা। দু-পাশের জঙ্গল ক্রমশই আরও ঘন হয়ে উঠছে। সুজয়ের মনে হল তারা যেন প্রবেশ করছে এক আদিম পৃথিবীতে। কী বিশাল মোটাসোটা গাছের গুঁড়ি, সেইসব আদিম মহাদ্রুম যেন ঊর্ধ্বে উঠে আকাশকে ছুঁতে চাইছে। আর গাছের গুঁড়িগুলোকে ঘিরে রয়েছে মানুষ সমান উঁচু ঝোপঝাড়। তার মধ্য দিয়েই চলছে সকলে।

জঙ্গলে প্রবেশের পর যে প্রাণীটা প্রথম চোখে পড়ল সেটা একটা ‘শ্লথ’। সুজয়দের যাত্রাপথের পাশে একটা মোটা গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে ঝুলছিল প্রাণীটা। তার ঝুলন্ত রোমশ লেজটা প্রথম চোখে পড়ল বিলেরই। প্রাণীটাকে ভালো করে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ল সুজয়রা। খয়েরি-সাদা ফুট তিনেকের প্রাণীটাও ঘাড় ফিরিয়ে তার গোলগোল সবুজ চোখ দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা দু-পেয়ে জীবগুলোর দিকে। তারপর শ্লথ গতিতে পাতার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। ততক্ষণে অবশ্য পেশাদারি দক্ষতায় তার বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিয়েছে বিল। এরপর আবার হাঁটা।

বেলা বারোটা নাগাদ দুপুরের খাবার জন্য থামল সুজয়রা। শুকনো খাবার আর জল দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজন সারা হল। সুজয়দের সঙ্গে সঙ্গে লামা নিয়ে চলা লোকগুলো খাওয়া সারলেও ইনকা পুরোহিত কিন্তু কিছুই ছুঁলেন না। একটা শোয়ানো গাছের গুঁড়ির ওপর বসে, তিনি লক্ষ করতে লাগলেন সুজয়দের। হুইকো হিসাব করে বলল, সকাল থেকে এখন পর্যন্ত খুব বেশি হলে মাইল পনেরো এগিয়েছে তারা। মার্কেজ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আজ আরও কতটা পথ হাঁটব আমরা?’

হুইকো জবাব দিল, ‘এখান থেকে দশ মাইল দূরে একটা নদী আছে, তার নাম ‘কোচা’ নদী। পুরোহিত বলেছেন ওই নদী পর্যন্ত আজ যাব আমরা।

বিল প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা সেই মাচাকুয়ে নদীটা কোথায়?’

হুইকো বলল, ‘সে এখনও অনেক দূরের পথ। কোচা নদীর ওপারে বিরাট বন। তারপর পড়বে একটা জলা। তারপর আবার জঙ্গল। সেই জঙ্গলের মধ্যে মাচাকুয়ে নদী। পরশু দুপুরের আগে সেখানে আমরা পৌঁছোতে পারব না। ইল্লাপা যাবেন মাচাকুয়ে নদী পার হয়ে ওপারের জঙ্গলে।’

তার কথা শুনে মার্কেজ বললেন, ‘কুয়েচুয়া ভাষায় ‘মাচাকুয়ে’ শব্দের অর্থতো ‘সাপ’ তাই না? সে নদীতে কি অনেক সাপ আছে?’

‘বিষধর সাপ?’ মার্কেজের প্রশ্নের সাথে সাথেই হুইকোকে প্রশ্ন করলেন পিনচিও।

হুইকো উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ সাপ আছে, তবে তারা বিষধর নয়।’

তার উত্তর শুনে পিনচিও হেসে বললেন, ‘বিষধর যখন নয়, তখন আর তেমন ভাবনার কিছু নেই আমাদের। কি বলুন?’—এই বলে তিনি তাকালেন বিলের দিকে।

বিল কিন্তু হুইকোর কথা শুনে ভ্রূ কুঁচকে তাকে প্রশ্ন করল, ‘বিষধর’ নয়তো তারা কী সাপ?’

তার প্রশ্ন শুনে হুইকোর এক চোখের দৃষ্টি যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। একটু ইতস্তত করে এরপর সে জবাব দিল,—‘অ্যানাকোণ্ডা।’ ‘অ্যানাকোণ্ডা!’—মানে পৃথিবীর বৃহত্তম সাপ! যে শিকারকে পিষে মারে?’—হুইকোর কথা শুনে বিস্ময়ে বলে উঠল সুজয়।

হুইকো মুখে কোনো কথা না-বলে শুধু সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে উঠে দাঁড়াল। কারণ, ইনকা পুরোহিত ইতিমধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সুজয়রা আবার দ্বিতীয় দফার যাত্রা শুরু করল।

অরণ্যের মধ্যে দিয়ে শুধু চলা আর চলা। চারপাশে খালি গাছের গুঁড়ির প্রাচীর। একধরনের গাছ প্রায়ই জঙ্গলের মধ্যে চোখে পড়ছে। ঋজু গাছগুলোর গুঁড়ি শাখাহীন ভাবে ওপরে উঠে যাবার পর ডালপালার চাঁদোয়া বিস্তার করেছে। সুজয় হুইকোকে জিজ্ঞেস করল, ‘এগুলো কি গাছ?’ সে উত্তর দিল, ‘এ গাছের নাম ‘বালসা।’ এ গাছের গুঁড়ি খুব মজবুত আর হালকা হয়। জলে শোলার মতো ভাসে। নৌকা তৈরি হয় এ গাছের কাঠ দিয়ে।’ তার কথা শুনে মার্কেজ বললেন, ‘এ তো বিখ্যাত গাছ! বইতে এ গাছের কথা পড়েছিলাম, আজ তাহলে চোখে দেখলাম! ষোলোশো বছর আগে ইনকাদের পূর্বপুরুষরা কনটিকির নেতৃত্বে এই বালসা কাঠের সামান্য ভেলায় চেপে প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল জলরাশি অতিক্রম করে পেরু থেকে সাড়ে চার হাজার মাইল দূরে পলিনেশিয়ায় পাড়ি জমিয়ে ছিলেন।’

বিল জানতে চাইল, ‘কনটিকি কে?’

মার্কেজ উত্তর দিলেন, ‘‘ইনকা কাহিনি অনুযায়ী ‘কনটিকি ছিলেন সূর্যদেব ইনতির পুত্র। তবে তিনি মানুষরূপে পেরুদেশে জন্মেছিলেন।’

সুজয় জিজ্ঞেস করল, ‘এ ঘটনা কি সত্যি? সামান্য কাঠের ভেলায় চেপে সাড়ে চার হাজার মাইল সমুদ্র পেরিয়ে ছিল তারা?’

চলতে চলতে মার্কেজ বললেন, ‘‘কনটিকি বলে সত্যি কেউ ছিলেন কিনা ইতিহাসে কোনো প্রমাণ না-মিললেও পেরুবাসীদের পূর্বপুরুষরা যে সমুদ্র অতিক্রম করে সুদূর পলিনেশিয়ায় পৌঁছে ছিলেন তার সমর্থনে ঐতিহাসিক যুক্তি আছে। পেরুতে কোনো কোনো জায়গাতে পাথরের তৈরি তিন-চার তলা উঁচু মানুষের মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। হুবহু একই রকমের মূর্তি দেখতে পাওয়া যায় পলিনেশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপেও।’

এরপর তিনি সুজয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এ ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বিখ্যাত লেখক ‘থর হেইয়েরডাল’-এর কালজয়ী একটা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি আছে, ‘কনটিকি এক্সপিডিশান’, সম্ভব হলে দেশে ফিরে পড়ে নেবেন।’

লামার সঙ্গের লোকগুলো কেমন যেন নির্বাক প্রকৃতির। ইনকা পুরোহিতের মতো তাদের মুখেও কোনো কথা নেই। সুসান যে লামার পিঠে বসে আছে, সেই লামার লাগাম ধরে সেই বৃদ্ধ লোকটা চলছে সুজয়দের পাশেপাশেই। আর তার অন্য সঙ্গীরা চলছে সুজয়দের পিছনে। সুসানও লামার পিঠে বসে চারপাশের এই অজানা পৃথিবীকে দেখতে দেখতে চলেছে। সুজয় একসময় তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার লামার পিঠে চড়তে কেমন লাগছে সুসান?’

সে জবাব দিল, ‘ভালো।’ এরপর সে বলল, ‘সেই যে কখন একটা শ্লথ দেখলাম, তার পরতো কিছুই আর দেখতে পেলাম না!’

সুসানের কথাটা মনে হয় কানে গেছিল বনদেবতার। কারণ, সুসানের একথা বলার কিছুক্ষণের মধ্যে সুজয়রা দেখতে পেল একটা ‘টেপির!’ বেশ বড়ো আকারের প্রাণীটা এটা ঝোপ থেকে বেরিয়ে সুজয়দের পথ আগলে দাঁড়াল কয়েক মুহূর্তের জন্য। সে যেন তাদের দেখে বিস্মিত ভাবে একবার বলল, ‘তোমরা বাপু কোথা থেকে উদয় হলে এ জঙ্গলে?’ আর তার পর মুহূর্তেই বিলকে তার ছবি তোলার সুযোগ না-দিয়ে উলটো দিকের ঝোপঝাড়ের মধ্যে উধাও হয়ে গেল।

হুইকো বিলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঘাবড়াবেন না, এ বনে টেপির অনেক আছে। আবার তাদের দেখা মিলবে।’

সুজয়দের এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মাথার ওপর ডালপালার ফাঁক দিয়ে সূর্যদেবও পশ্চিমে হাঁটতে লাগলেন। অবশেষে বিকাল পাঁচটা নাগাদ জঙ্গলের মধ্যে একটু ফাঁকা মতো জায়গায় পৌঁছে ইনকা পুরোহিত ইঙ্গিত দিলেন যাত্রা এ দিনের মতো সাঙ্গ করার। সুজয়ের পা যেন আর চলছিল না। যাত্রা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই সে মাটিতে বসে পড়ল। সুসান লামার পিঠ থেকে নামার পর তাকে নিয়ে বসে পড়লেন মার্কেজ, পিনচিও আর বিলও। হুইকো বসল না। সে লেগে গেল লামাগুলোর পিঠ থেকে মালপত্র নামানোর তদারকির কাজে। আর ইল্লাপা তাঁর লাঠির মাথা থেকে কনডোরের বাচ্চাটাকে নামিয়ে তাকে একটা গাছের ডালে বসিয়ে দিয়ে নিজে বসলেন একটা শুয়ে থাকা গাছের ওপর।

কিছুক্ষণের মধ্যে মালপত্র সব নামানো হয়ে গেল। তারপর খাটানো হল তিনটে তাঁবু। একটা বড়ো, অন্য দুটো ছোটো। পিনচিও জানালেন বড়ো তাঁবুটা বরাদ্দ সুজয়দের জন্য। আর অন্য দুটোর একটায় থাকবেন তিনি আর হুইকো, অপরটাতে থাকবেন ইনকা পুরোহিত। লামাঅলাদের জন্য কোনো তাঁবুর ব্যবস্থা নেই। তারা রাত কাটাবে খোলা আকাশের নীচে।

মালপত্র প্রাণীগুলোর পিঠ থেকে নীচে নামাবার পর প্রাণীগুলোকে ছেড়ে দিয়ে তাদের মালিকরা শুকনো ডালপাতা সংগ্রহ করতে লেগে গেল রাতের আগুন জ্বালাবার জন্য। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর বিল সুজয়দের উদ্দেশ্যে বলল, ‘এবার উঠে পড়ো। অনেক পথ হেঁটেছি তো, বেশিক্ষণ এখন বসে থাকলে পায়ের মাংসপেশিতে খিঁচ ধরে যাবে, কাল সকালে আর হাঁটতে পারবে না। বিলের কথা শোনার পর উঠে দাঁড়াল সবাই, তারপর গাছের গুঁড়ির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা জায়গাটাতে ধীরে ধীরে ঘুরে বেড়াতে শুরু করল, দিন শেষ হতে চলেছে। দিনান্তের রং ধরেছে গাছের পাতায়। বনের ভিতর থেকে ভেসে আসছে পাখির ডাক, যদিও তাদের চোখে দেখা যাচ্ছে না। ঝিঁঝির ডাকও মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে আশেপাশের ঝোপঝাড় থেকে। অন্ধকারের আবাহনী গীতের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। সুসানও ঘুরে বেড়াচ্ছিল নিজের মতো করে। সুজয়দের কাছ থেকে কিছুটা দূরে চলে গেছিল সে, হঠাৎ সুজয়ের চোখে পড়ল, একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে ইশারায় সে তাদের ডাকছে, আর মাঝে মাঝে গাছের ওপর দিকে তাকাচ্ছে। নিশ্চই কিছু দেখতে পেয়েছে সে! সুজয়, বিল আর মার্কেজ তার কাছে এগিয়ে যেতেই সুসান গাছের মাথার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘দ্যাখো কী বিরাট পাখি!’ তার কথা শুনে ওপর দিকে তাকাতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সুজয়রা। দিনের সেরা চমক যেন তাদের জন্য যেন এখানেই অপেক্ষা করেছিল। এত বড়ো পাখি সুজয় জীবনে এই প্রথম দেখল। গাছের ডালে বসে থাকা বর্ণময় পাখিটার দৈর্ঘ্য অন্তত পাঁচফুট হবে। তার মাথা, পিঠ, আর দীর্ঘ লেজ উজ্জ্বল লাল বর্ণের। ডানার হলুদ বর্ণের পালকের শেষে সমুদ্রের ঘন নীল, চোখের চারপাশে সাদা রিং। বিরাট ঠোঁটের গঠন টিয়া পখির মতো! শক্তপোক্ত পা দিয়ে গাছের ডালে বসে ঘাড় বেঁকিয়ে সুজয়দের দেখছে সে। কৌতূহলী দৃষ্টি, তার চোখে ভয়ের কোনো লক্ষণ নেই। শেষ বিকালের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে তার শরীরে এসে পড়ে তাকে যেন আরও বর্ণময় করে তুলেছে। সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল পাখিটার দিকে। তারপর বিল চাপা স্বরে বলল, ‘স্কার্লেট ম্যাকাও! প্যারাকিড বা তোতা পরিবারের সবচেয়ে বর্ণময় আর বিরাটাকৃতির পাখি। দক্ষিণ আমেরিকার গভীর জঙ্গল এদের বাসস্থান। আমাজনের জঙ্গলে এ পাখির ঝাঁক আমি দেখেছি। তবে এত কাছ থেকে নয়!’ সুজয় এবার বিলকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি যে পাখি খুঁজতে যাচ্ছ সেই ‘কোরাকেঙ্কু’ কি এর থেকেও সুন্দর হবে?’

ক্যামেরার লেন্সের ক্যাপ খুলতে খুলতে বিল পাখিটার দিকে চোখ রেখে বলল, ‘আমি ঠিক জানি না।’

বিল বেশ কয়েকটা ছবি তুলল পাখিটার, সুজয়ও তুলল তার ছোটো ক্যামেরা দিয়ে। পাখিটার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে একইভাবে দেখছে সুজয়দের, আর মাঝে মাঝে ঠোঁট ঘষছে গাছের ডালে।

প্রফেসর বললেন, ‘দেখেছেন, ও কিন্তু আমাদের ভয় পাচ্ছে না!’

বিল বলল, ‘সম্ভবত এ জায়গাতে মানুষের আসা-যাওয়া নেই। ও প্রথম মানুষ দেখছে, তাই ভয় পাচ্ছে না।’ এরপর একটু থেমে বিল বলল, ‘আমার মন বলছে, আমরা যে উদ্দেশ্যে এগোচ্ছি তা সফল হবে।’

‘কেন?’ জানতে চাইলেন মার্কেজ।

বিল জবাব দিল, ‘আপনারা হয়তো মানতে চাইবেন না, কিন্তু আমরা যারা জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই, শিকারি বা ফটোগ্রাফার যাই হই না কেন, কিছু সংস্কার মেনে চলি। এই স্কার্লেট ম্যাকাও-এর দর্শন সৌভাগ্য বয়ে আনে। মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে। যে কারণে একসময় পালতোলা জাহাজের জলদস্যুরা এই তোতা তাদের সঙ্গে রাখত।’

সুজয়দের গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কৌতূহলবশত এরপর পিনচিও, হুইকো, এমনকি ইল্লাপাও এসে দাঁড়ালেন সেখানে। সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল পাখিটাকে। তারপর একসময় সন্ধ্যা নেমে আসছে বলেই বোধ হয় পাখিটা একটা ডাক ছেড়ে ডানা ঝাপটিয়ে সুজয়দের চোখের আড়ালে চলে গেল।

গাছের নীচে জটলাটা সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে গেল। সুজয়রা হাঁটতে লাগল তাঁবুর দিকে। সেদিকে ফেরার সময় ইল্লাপা হঠাৎ তার মৌনব্রত ভঙ্গ করে মার্কেজকে দুর্বোধ্য ভাষায় কী যেন বললেন, তার মধ্যে একটা শব্দ শুধু বুঝতে পারল সুজয়,—‘কোরাকেঙ্কু’। কথাগুলো বলার পর ইল্লাপা এগোলেন যেখানে তিনি বসেছিলেন সেদিকে। তিনি সেদিকে এগোবার পর সুজয় মার্কেজকে জিজ্ঞেস করল, ‘ইনকা পুরোহিত আপনাকে কী বললেন?’

মার্কেজ বললেন, ‘ইল্লাপা কুয়েচুয়াতে বললেন, ‘এ পাখিটা সুন্দর, কিন্তু স্বর্গীয় পাখি কোরাকেঙ্কুর মতো সুন্দর নয়।’

মার্কেজের কথা শুনে, বিল উৎসাহ প্রকাশ করে বলল, ‘তার মানে, কোরাকেঙ্কুর গল্প মিথ্যা নয়! ইনকা পুরোহিতও দেখেছেন সেই পাখি!’ ‘তাঁর কথা শুনে তাইতো মনে হচ্ছে’,—মন্তব্য করলেন মার্কেজ।

সুজয়রা তাঁবুর কাছে ফিরে আসার কিছু সময়ের মধ্যেই ঝুপ করে সন্ধ্যা নামল অরণ্যের বুকে। সারাদিনের পরিশ্রমের পর একটু বিশ্রাম নেবার জন্য সুজয়রা গিয়ে ঢুকল তাদের জন্য নির্ধারিত তাঁবুতে। তাঁবুতে ঢুকেই পোশাক পালটে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল সবাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই সুজয়ের চোখে ঘুম নেমে এল।

বিলের ডাকে সুজয়ের যখন ঘুম ভাঙল তখন রাত সাড়ে আটটা বাজে। সুজয় উঠে দেখল অন্যরা সবাই বসে আছে। তাদের চোখ-মুখ দেখে বোঝা গেল তারাও সদ্য ঘুম থেকে উঠে বসেছে। তাঁবুর ভিতর একটা মোম জ্বলছে। খাবার দিয়ে গেছে পিনচিওর লোকেরা। মার্কেজ একটা হাই তুলে সুজয়ের দিকে তাকালেন। তাঁবুর মধ্যে গোল হয়ে খেতে বসল সবাই। রুটি আর ওল জাতীয় জিনিসের তরকারি দিয়ে রাতের খাবার সারা হল সুজয়দের। তারপর সকলে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এল।

তাঁবুর একটু দূরেই জ্বলছে বেশ বড়ো একটা অগ্নিকুন্ড। তার কাছে বসে আছেন ইনকা পুরোহিত, পিনচিও আর হুইকো। তারা নিজেদের মধ্যে মনে হয় কথাবার্তা বলছিল। সুজয়রা বাইরে আসতেই তারা কথা থামিয়ে তাকাল তাদের দিকে। চারপাশে অন্ধকার। একটা বিরাট গাছের ঘন ডালপালা আড়াল করে রেখেছে চাঁদটাকে। সেই অন্ধকারের মধ্যে পিনচিওর লোকজন আর লামাগুলো কোথায় রয়েছে তা ঠিক ঠাহর করতে পারল না সুজয়। তাঁবু থেকে বেরোবার পর সুজয়রাও গিয়ে বসল সেই অগ্নিকুন্ডের ধারে, পিনচিওদের মুখোমুখি। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল সকলে। তারপর মার্কেজ পিনচিওর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘কাল সকালে কখন যাত্রা শুরু করব আমরা?’

পিনচিও একবার তার পাশে বসে থাকা ইল্লাপার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘উনি বলছেন, ‘কাল সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই রওনা হতে হবে আমাদের।’ তাঁর জবাবের পর ইল্লাপা গম্ভীর স্বরে মার্কেজের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘কাল যে পথে আমরা এগোব সে পথ দুর্গম। যেকোনো সময় বিপদের সম্ভাবনা আছে। সবাইকে এক সঙ্গে সাবধানে পথ চলতে হবে। আমার নির্দেশ অমান্য করলে বিপদ হতে পারে। বাচ্চা ছেলেটা যেন কোনো সময় চোখের আড়াল না-হয়।’ একথা বলার পর হুইকোকে তিনি বললেন, ‘লামার বাচ্চাটাও সাবধানে রাখতে হবে। ওকে শেষপর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।’ তাঁর কথা শুনে মার্কেজ বললেন, ‘কালকের যাত্রাপথ কি তাহলে খুবই বিপজ্জনক?’

অগ্নিকুন্ডের ওপাশে উঠে দাঁড়ালেন ইল্লাপা। কয়েক মুহূর্ত তিনি চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘হ্যাঁ, খুবই বিপজ্জনক। জলে-জঙ্গলে হিংস্রপ্রাণীতো আছেই আর আছে তার চেয়েও হিংস্র কিছু উপজাতী গোষ্ঠী। তাদের কেউ কেউ ইনতিকেও মানে না।’ গম্ভীর স্বরে একথা বলার পর ইনকা পুরোহিত এগোলেন তার তাঁবুর দিকে।

সুজয়রা এরপর কিছুক্ষণ অগ্নিকুন্ডের পাশে বসে সারা দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলল। তারপর পিনচিওকে শুভরাত্রি জানিয়ে তাঁবুতে ফিরে কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়ল।

পরদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই যাত্রা শুরু করল সুজয়রা। কিছুটা এগোবার পরই হালকা হয়ে এল বন। সুজয়রা উপস্থিত হল কোচা নদীর ধারে। নদী চওড়াতে বেশি বড়ো নয়। তার ওপাশে বিরাট বিরাট গাছের ঘনজঙ্গল। সকালের সূর্যের আলোও সেখানে প্রবেশ করছে না। কেমন যেন থমথমে ভাব বিরাজ করছে সেখানে। নদীর পাড়ে একটা কাঠের ভেলা চোখে পড়ল সুজয়দের। ভেলা মানে, গোটা দশেক বালসাগাছের গুঁড়ি পাশাপাশি সাজিয়ে দড়ি দিয়ে বাঁধা। ইল্লাপা আর পিনচিও বেশ কিছুক্ষণ ভেলাটা পরীক্ষা করার পর, ইল্লাপা লামাঅলাদের উদ্দেশ্যে কী যেন বললেন, তার কথা শুনে তাদের মধ্যে দুজনে ভেলাটা ঠেলে জলে নামাতে লাগল, আর অন্য দুজন লামাগুলোর পিঠ থেকে মালপত্রগুলো খুলতে শুরু করল।

মার্কেজ হুইকোকে বললেন, ‘এই ভেলাতেই আমরা নদী পেরব নাকি! এটা কাদের ভেলা?’

হুইকো সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে বলল, ‘মাঝে মাঝে কিছু উপজাতি লোকজন নদী পারাপার করে। এ ভেলা তাদেরই তৈরি।’

লোকগুলো কিছু সময়ের মধ্যেই প্রথমে লামার পিঠের মালপত্রগুলো ভেলাতে তুলে ফেলল। লামা, মালপত্র, আর এতজন লোকের সংকুলান একবারে ভেলাতে হবে না। প্রথমে তাই মালপত্রর সঙ্গে নেওয়া হল চারটে ভারবাহী লামা। হুইকো আর তিনজন লোক চড়ে বসল তাতে। তারপর লগি দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে ভেলাটাকে তারা এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল ওপারের দিকে। ওপারে পৌঁছোতে তাদের মিনিট পাঁচেক সময় লাগল। সেদিকে মালপত্র, লামা, আর অন্যদের নামিয়ে দিয়ে কিছু সময়ের মধ্যেই একজন আবার ভেলা নিয়ে ফিরে এল এপাড়ে।

অন্যরা সবাই এরপর লামার বাচ্চাটা আর অবশিষ্ট ভারবাহী লামাটাকে নিয়ে উঠে বসল ভেলাতে। ভেলাতে ওঠার পর ইল্লাপা সুজয়দের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘সবাই বসে পড়ুন। জলে পড়ে গেলে বিপদ হবে।’ এই বলে তিনি লামার বাচ্চাটার দড়ি ধরে নিজে বসে পড়লেন। তার কথা শুনে সকলে বসে পড়ল। লগির ঠেলায় ভেলা এগোতে লাগল মাঝ নদীর দিকে। বিল ইল্লাপার উদ্দেশ্যে বলল, ‘জলতো বেশি গভীর নয়, নদীতে ‘কেম্যান’ আছে নাকি?’ ইনকা পুরোহিত জবাব দিলেন, ‘না, তবে নদীতে পড়ে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত।’

বিল আবার জানতে চাইল, ‘জলও গভীর নয় কেম্যানও নেই তাহলে মৃত্যু নিশ্চিত কেন? তাহলে কি অ্যানাকোণ্ডা আছে?’

ওপারের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে ইনকা পুরোহিত শুধু ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন, না। তার আসল প্রশ্নের জবাব পেল না বিল।

সুসান ‘কেম্যান’ শব্দটা শুনে চাপা স্বরে বলল, ‘বিল আঙ্কেল’ কেম্যান কী?’

বিল উত্তর দিল, ‘এক ধরনের আমেরিকান কুমির।’

বিলের কথা শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এমন একটা বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল যে বিল যে কথাটা জানতে চেয়েছিল ইল্লাপার কাছে তার উত্তর মিলে গেল। সকালবেলা সুজয়দের যাত্রা শুরুর সময় থেকেই কনডোরের বাচ্চাটা চুপচাপ বসে ছিল ইল্লাপার কাঁধে ফেলা লাঠির মাথায়। ইল্লাপার কাছেই ভারবাহী লামাটার দড়ি ধরে বসেছিল তার বুড়ো মালিক। হঠাৎ কী খেয়াল হওয়াতে কনডোরটা লাঠির আগা ছেড়ে ডানা ঝটপট করে বসল গিয়ে লামাটার ঘাড়ে। তাতে ভয় পেয়ে লামাটা ঘাবড়ে গিয়ে লাফ দিল জলে। তাই দেখে চিৎকার করে উঠল সবাই। লামার দড়িটা তখনও বুড়োটার হাতে ধরা। সে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল তাকে ভেলায় টেনে তোলার। লামাটাও উঠে আসতে চেষ্টা করতে লাগল ভেলায়। ভেলাটা দুলতে লাগল। সুসান ভয় পেয়ে জড়িয়ে ধরল সুজয়কে। যে লগি ঠেলছিল সে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল ভেলাটা স্থির রাখার। কিন্তু এরপরই হঠাৎ বীভৎস একটা চিৎকার করে উঠে জলের মধ্যে দাপাদাপি শুরু করল প্রাণীটা। সুজয়রা দেখল লামার চারপাশের জলটা কেমন লাল হয়ে উঠেছে! দাঁড়িয়ে পড়ল ভেলা। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নিস্তেজ হয়ে লামাটা হারিয়ে গেল জলের নীচে। সেখানকার জল তখনও ঘোর রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। লামার গলার দড়িটা তখনও ধরা আছে বুড়ো লোকটার হাতে। ফ্যালফ্যাল করে সে চেয়ে আছে লাল জলের দিকে। কোনো একটা ভয়ংকর কিছু যে ঘটে গেল তা বুঝতে পারল সবাই। তখন একটু আতঙ্কের ভাবও ফুটে উঠেছে সকলের চোখে-মুখে। কিন্তু ইনকা পুরোহিত নির্বিকার। লামাটা জলে পড়ে গেলে সে যে আর উঠবে না তা যেন তিনি জানতেন। আকাশে কনডোরটা একটা চক্কর মেরে ফিরে এসে তাঁর কাঁধে আবার বসল। ইল্লাপা এরপর ধমকের সুরে প্রথমে সম্ভবত তাঁর পাখিটার উদ্দেশ্যে কিছু বললেন, তারপর যে লগি ঠেলছিল তাকে ইঙ্গিত করলেন ভেলা এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য।

মিনিট তিনেক পর ওপারে গিয়ে নামল সুজয়রা। বুড়ো লোকটা সব শেষে ডাঙায় নেমে তার হাতের দড়িটা ধরে টান দিল। দড়ির শেষ মাথায় উঠে এল লামার একটা কঙ্কাল! একটুও মাংস লেগে নেই হাড়ের গায়ে। দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন সুনিপুণ ভাবে ছুরি দিয়ে হাড়ের গা থেকে মাংস চেঁছে ফেলেছে! খুব বেশি হলে মিনিটচারেক জলের নীচে ছিল প্রাণীটার দেহ। মাত্র এইটুকু সময়ের মধ্যে এত বড়ো প্রাণীর দেহ থেকে সব মাংস সরিয়ে ফেলল কে? বিল প্রথমে, তারপর সুজয় হঠাৎ খেয়াল করল, কঙ্কালটার পাঁজরে আটকে আছে ছোটো আকৃতির চাঁদা মাছের মতো একটা মাছ। সূর্যের আলোতে সেটা চিকচিক করছে। কঙ্কালটার বুকের খাঁচায় আটকে মাছটা উঠে এসেছে। তার ছোট্ট লেজটা তখনও মৃদু মৃদু কাঁপছে। ইল্লাপাও ব্যাপারটা খেয়াল করলেন। তারপর তিনি কঙ্কালটার কাছে ঝুঁকে পড়ে মাছটাকে বার করে আনলেন সুজয়দের ভালোভাবে মাছটাকে দেখানোর জন্য। ইল্লাপার কঠিন আঙুলের চাপে মাছটার অবশিষ্ট প্রাণ বায়ু বার হবার পর তিনি সাবধানে মাছটার মুখ ফাঁক করলেন। সুজয়রা দেখল মাছটার চোয়ালে সাজানো আছে খুদে খুদে তীক্ষ্ণ দাঁতের সারি। দাঁতগুলো ব্লেডের মতো ধারালো! দাঁতগুলো দেখাবার পর ইল্লাপা মাছটাকে ছুড়ে ফেলে কঙ্কালটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘পিরানহা!’ রাক্ষুসে মাছের ঝাঁক! এরপর তিনি বিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি জলে পড়লে, সময় লাগত মাত্র, ‘দেড় মিনিট।’ মাছটা দেখে আর ইল্লাপার কথা শুনে এই নদী-জঙ্গলে মৃত্যু কতটা ভয়ংকর হতে পারে এই প্রথম তা প্রত্যক্ষ করতে পারল সুজয়রা। লামাটা যখন জলে পড়ে দাপাদাপি করছিল তখন যদি ভেলা থেকে কেউ নদীতে পড়ে যেত, তাহলে তারও অবস্থা হত ওই কঙ্কালটার মতো!

মিনিট তিনেক পর ওপারে গিয়ে নামল সুজয়রা।

এপাড়ে আগে চলে আসা লোক ইতিমধ্যেই লামার পিঠে মালপত্র বাঁধাছাঁদা শুরু করেছে। যে লগি ঠেলছিল সেও গিয়ে হাত লাগাল তাদের সঙ্গে। শুধু সেই বুড়ো লোকটা একটু দূরে তাকিয়ে রইল নদীর পাড়ে পড়ে থাকা তার লামার কঙ্কালের দিকে। সুজয়ের পাশে দাঁড়িয়ে সুসান একবার শুধু বলল, ‘ওই লামাটারই পিঠে চড়ে ছিলাম আমি।’ সুজয় সস্নেহে তার কাঁধে হাত রাখল।

কিছুক্ষণের মধ্যই মালপত্র তোলা হয়ে গেল লামাগুলোর পিঠের দু-ধারে। শুধু সেই লম্বা কাঠের বাক্স দুটো পড়ে রইল মাটিতে। হুইকো বাক্সদুটোর ডালা খুলে তার মধ্য থেকে যা বার করল তা দেখে চমকে উঠল মার্কেজ, সুজয় আর বিল। রাইফেল! দুটো, দুটো করে মোট চারটে। আর তার সাথে কার্তুজের বেল্ট! সেগুলো দেখে মার্কেজ পিনচিওকে বললেন, ‘রাইফেল সঙ্গে এনেছেন কেন? এগুলো কি ইনকা পুরোহিতের সম্পত্তি? এ সবের অনুমতিপত্র আছে তো?’

পিনচিও বললেন, ‘না, রাইফেলগুলো ইল্লাপার সম্পত্তি নয়। তবে তারই পরামর্শে হুইকো জিনিসগুলো সংগ্রহ করেছে। ইনকা পুরোহিত বলেছেন, বন্যজন্তু বা অসভ্য উপজাতিরা যদি আমাদের আক্রমণ করে তাহলে তখন রাইফেলগুলো আমাদের কাজে আসবে।’

এরপর একটু থেমে তিনি বললেন, ‘আর অনুমতিপত্র বলতে আপনি যা বোঝাতে চাচ্ছেন তা আমাদের কাছে নেই। হুইকো হাত ভাড়ায় জিনিসগুলো এনেছে। এ সবের লাইসেন্স হয় না। তবে আপনার ঘাবড়াবার কিছু নেই। এখানে নাকি এটাই দস্তুর। নদীর এপাড়ে কোনো বনরক্ষী রাইফেলের লাইসেন্স দেখতে আসবে না। ফেরার সময় হুইকো নিজ দায়িত্বে জিনিসগুলো জঙ্গলের বাইরে নিয়ে জায়গা মতন ফেরত দিয়ে আসবে। আমাদের কোনো ঝামেলায় পড়তে হবে না।’

প্রফেসর তাঁর কথা শুনে গম্ভীর ভাবে বললেন, ‘তার মানে অস্ত্রগুলো বেআইনি। আপনি যাই বলুন, এ কাজটা কিন্তু ঠিক হয়নি। কোনো অজুহাতেই আইন ভাঙা ঠিক নয়। আমি কিন্তু এসবের কোনো দায়িত্ব নিতে রাজি নই।’

পিনচিও কোনো উত্তর দিলেন না তার কথায়।

কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ থাকার পর বিল হঠাৎ বলল, ‘কিন্তু রাইফেল চালাবে কারা?’

পিনচিও এবার বললেন, ‘আমাদের সঙ্গে আসা লোকগুলো। ওরা শুধু লামাঅলাই নয়, ওরা রাইফেল চালাতেও জানে। বলতে পারেন ওরা আসলে আমাদের রক্ষী।’

পিনচিওর কথা শুনে মার্কেজ গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘ও ব্যাপারটা বুঝলাম।’

রাইফেল আর কার্তুজগুলো বের করার পর হুইকো তিনজন লামাঅলার হাতে তিনটে রাইফেল কার্তুজ তুলে দিল। তারপর নিজেও একটা রাইফেল আর কার্তুজের বেল্ট গলায় ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়াল। এরপর যাত্রা শুরুর আগে ইল্লাপার নির্দেশ মতো সুসানকে তুলে দেওয়া হল একটা লামার পিঠে ঝুলতে থাকা মালপত্রর খাঁজে। প্রথমে ইল্লাপা, আর তার সঙ্গে লামার বাচ্চাটা, তারপর একজন লামাঅলা বা রক্ষী সুসানের লামাটা নিয়ে, মাঝে সুজয়রা তিনজন আর তারপর অন্য ভারবাহী পশুগুলো নিয়ে অন্য তিনজন। এ ভাবেই তারা প্রবেশ করল সেই জঙ্গলের মধ্যে। কি গহীন অরণ্য। বিরাট বিরাট গাছ অনেক উঁচুতে উঠে গিয়ে যেন আকাশকে ছুঁতে চাইছে। পাশাপাশি কয়েকটা গাছ আবার অনেক জায়গাতে মাথার ওপর মিলেমিশে গিয়ে চাঁদোয়ার সৃষ্টি করেছে। সেসব জায়গাতে মাটিতে সূর্যালোক এসে পৌঁছোয় না। সেখানে গাছের মোটাসোটা গাছের গুঁড়িতে শতাব্দী প্রাচীন শ্যাওলার পুরু আস্তরণ, গাছের নীচে স্তূপীকৃত হয়ে আছে পচা পাতার রাশি। এ ছাড়া ছোটো-ছোটো ঝোপজঙ্গলতো আছেই। সেগুলো ভেঙেই চলতে থাকল সুজয়রা।

ধীরে ধীরে যত তারা বনের ভিতর প্রবেশ করতে লাগল ততই ঘন হতে লাগল অরণ্য, এ যেন এক অন্য পৃথিবী! কত প্রাচীন গাছ! তাদের থেকে ঝুলছে কত বিচিত্র ধরনের লতা! কোনো কোনো লতা নৌকার কাছির মতো মোটা! বিচিত্র তাদের বর্ণ, সবুজ, হলুদ, কালো, লাল! সেসব দেখতে দেখতে এগোল সকলে। মাঝে মাঝে জঙ্গলের ভিতর থেকে ভেসে আসছে নানা ধরনের শব্দ। সেই শব্দ সন্দেহজনক মনে হলেই দাঁড়িয়ে পড়ছেন ইল্লাপা। তাঁর পিছন থেমে যাচ্ছে অন্যরাও। ইনকা পুরোহিত শব্দের প্রকৃ«তি সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হলেই তবে আবার চলা শুরু হচ্ছে। আস্তে আস্তে নানা ধরনের জীবজন্তুও চোখে পড়তে লাগল সুজয়দের। গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে ঝুলতে থাকা শ্লথ, ঝোপজঙ্গল ভেঙে ইঞ্জিনের মতো ছুটে যাওয়া টেপির, লামা পরিবারেরই অন্যতম সদস্য বন্য ভিসুনিয়া, এ ছাড়া নানা ধরনের অচেনা ছোটো ছোটো প্রাণী। একবার, হরিণ আর ক্যাঙারুর সঙ্গে মিল আছে, এ জাতীয় একটা ছোটো প্রাণী দেখতে পেয়ে বিল সুজয়কে বলল, ‘এই প্রাণীটার নাম হল ‘অপোসাম,’ বইতে ওর ছবি আমি দেখেছি। অপোসাম দ্বিগর্ভ প্রাণী। দ্বিগর্ভ অর্থাৎ এই ক্যাঙারু গোত্রের প্রাণী অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ ছাড়া অন্য কোথাও দেখা যায় না। লক্ষ লক্ষ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকা যে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল, এখানে অপোসামের উপস্থিতি তারই প্রমাণ দেয়।’

তার কথা শুনে সুজয় বলল, ‘জীবজন্তু আর জঙ্গলের কথা শুনলেই মানুষের প্রথমে মনে হয় আফ্রিকার কথা, এখানেও তো দেখছি তার চেয়ে কম কিছু নেই!’

বিল বলল, ‘হ্যাঁ, ঠিক কথা। এসব অঞ্চলের জঙ্গল সম্বন্ধে আমার কিছু পড়াশোনা আছে। দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে এমন অনেক প্রাণী আছে যা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। লামা, টেপির, ভিসুনিয়াতো আছেই, আছে আন্দিজের পুমা, ব্রাজিলের কালো বাঘ, পিরানহার মতো রাক্ষুসে মাছ, অ্যানাকোণ্ডার মতো বৃহত্তম সর্প এমনকি রক্তচোষা বাদুড় অর্থাৎ ভ্যাম্পায়ারও আছে এখানে!’

ভ্যাম্পায়ারের কথা শুনে সুজয় একটু অবিশ্বাসের সুরে বলল, ‘সে কী! ব্রাম স্ট্রোকারের ‘ড্রাকুলা’ গল্পেতো পড়েছি সে তো ট্রান্সেলভেনিয়ার বাসিন্দা?’ বিল হেসে বলল, ‘না, তোমার গল্পে পড়া বিষয়টা ঠিক নয়। ব্রামস্ট্রোকার তার কাহিনির প্রয়োজনে ভ্যাম্পায়ারকে রোমানিয়া-ট্রান্সেলভেনিয়ার পটভূমিতে নিয়ে গেছিলেন। আদতে দক্ষিণ আমেরিকার ক্রান্তীয় অঞ্চলে এদের বাস। ইকুয়েডর, পেরু ও ব্রাজিলের কিছু কিছু বনে এদের দেখা মেলে।’

সুজয় শুনে বলল, ‘ধন্যবাদ বিল। আমার মনে অনেকদিন ধরে রাখা একটা ভ্রান্ত ধারণা তুমি ভেঙে দিলে।’

চলতে থাকল সুজয়রা। জঙ্গল যেন ক্রমশই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে তাদেরকে। কখনও মাথা সমান উঁচু ঝোপজঙ্গল সাফ করে। কখনও বা কোনো রকমে মোটা গাছের গুঁড়ির ফোকর গলে এগোতে থাকল তারা। সবচেয়ে অসুবিধা হচ্ছিল ভারবাহী প্রাণীগুলোকে নিয়ে। মাঝে মাঝেই গাছের ওপর থেকে নেমে আসা লতাগুল্মে আটকে যাচ্ছিল তারা। একজন বন্দুকধারী ছুরি দিয়ে লতা কেটে মুক্ত করছিল তাদের। সময়ও এগোতে থাকল।

বেলা বারোটা নাগাদ খাবার আর বিশ্রামের জন্য থামতে হল সবাইকে। খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নেবার পর যাত্রা শুরুর আগে ইল্লাপা জানালেন, এবার একটু দ্রুত চলতে হবে। এ জঙ্গলের শেষে একটা বিরাট জলা আছে। সন্ধ্যার আগে সেই জলা পার হয়ে ওপাশের জঙ্গলে পৌঁছোতে হবে। আবার শুরু হল চলা। সেই একই বিরাট গাছের জঙ্গল, মানুষ সমান উঁচু ঝোপঝাড়, আধো অন্ধকার পথ! অবশ্য পথ বলতে যা বোঝায় তা কিন্তু নেই। ইনকা পুরোহিত সবার আগে আগে যে ভাবে হাঁটতে থাকলেন অন্যদের কাছে সেটাই হল পথ! অতিকষ্টে আদিম মহিরুহদের নাগপাশ ভেদ করে এগোতে এগোতে একসময় সুজয়ের মনে হতে লাগল এই মহারণ্য মনে হয় কোনোদিন শেষ হবে না! কিন্তু এ অরণ্যও একসময় শেষ হল। ঘণ্টা তিনেক পর ফিকে হয়ে এল জঙ্গল। ডালপালার চাঁদোয়া ছেড়ে বেরিয়ে তারা উপস্থিত হল এক উন্মুক্ত স্থানে।

সামনে একটা বিরাট জলা জমি। স্থানে স্থানে ডোবা। পচা জলে পুরু শ্যাওলার আস্তরণ, মাঝে মাঝে কিছু দূরে দূরে দাঁড়িয়ে কয়েকটা মাঝারি আকৃতির নেড়া গাছ। ঠিক যেন মূর্তিমান প্রেতের মতো জলা পাহারা দিচ্ছে তারা। জলার ওপাশে আকাশ যেখানে মাটির সঙ্গে মিশেছে সেখানে একটা কালো রঙের মোটা রেখা উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত জঙ্গল! জলা পার হয়ে ওই জঙ্গলেই প্রবেশ করতে হবে সুজয়দের।

সুজয়রা যে জঙ্গল থেকে বাইরে এল, সে জঙ্গল আর জলার মধ্যের ছোট্ট জমিটা পুরোটাই কাদা মাখা। নানা ধরনের জন্তুর পায়ের ছাপ আঁকা হয়ে আছে কাদামাটিতে। এখানে জল খেতে আসে ওরা।

জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে জলার সামনে এসে দাঁড়ালেন ইনকা পুরোহিত। তারপর সুজয়দের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একজনের পর একজন, এ ভাবে সার বেঁধে এগোব আমরা। যাদের হাতে বন্দুক আছে তারা থাকবে দু-পাশে।’

পিনচিও হুইকোকে জিজ্ঞেস করলেন। ‘ডোবাগুলো কত গভীর?’

সে জবাব দিল, ‘কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও আবার কোমর পর্যন্ত।’

তার উত্তর শুনে পিনচিও বললেন, ‘তাহলে তো বিশেষ চিন্তার কিছু নেই। কি বলো?’

হুইকো তার কথার কোনো উত্তর দিল না, কিন্তু ইনকা পুরোহিত কেমন যেন একটা অদ্ভুত হাসলেন পিনচিওর কথা কানে যেতে। এরপর তিনি মার্কেজের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘বাচ্চাটাকে লামার পিঠে রাখা যাবে না। জলায় পড়ে গেলে বিপদ হবে। ওকে কাঁধে নিতে হবে!’

ইল্লাপার কথা শুনে বিল প্রফেসরকে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি সুসানকে কাঁধে নিয়ে নিচ্ছি।’ এই বলে সে সুসানের দিকে এগোতে যেতেই একটা অদ্ভুত কান্ড করলেন ইল্লাপা। তিনি নিজেই এগিয়ে এসে সুসানকে লামার পিঠ থেকে ছোঁ মেরে তুলে নিলেন নিজের কাঁধে!

ইনকা পুরোহিত এরপর সুসানকে শক্ত হাতে কাঁধে ধরে পা বাড়ালেন জলার দিকে। সুসানের দিকে তাকিয়ে সুজয় বুঝতে পারল সে বেশ ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। ইল্লাপার কথা মতো তাঁর পিছন পিছন সার বেঁধে সুজয়রা নেমে পড়ল জলাতে। তাদের দু-পাশে রইল লামা-সহ বন্দুকধারীরা।

হুইকো ঠিকই বলেছে। জল কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও কোমর অব্দি। জলের নীচে পাঁক ভর্তি। পা বসে যাচ্ছে সুজয়দের। মাঝে মাঝে কোনো কোনো জায়গাতে ঢিপির মতো একটু উঁচু জমি। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ পাতাহীন গাছ! এরকমই একটা গাছের পাশ দিয়ে যাবার সময় সুজয় দেখতে পেল পাতাহীন গাছের ডালে হলুদ রঙের ফিতের মতো বেশ কয়েকটা সাপ জড়িয়ে আছে। তা দেখে সে বিলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ‘ওই দেখো!’ বিল কয়েক মুহূর্ত সে দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘বোড়া’’ প্রজাতির সাপ। ভয়ংকর বিষধর! কামড়ালেই সাক্ষাৎ মৃত্যু। গাছের মধ্যে যখন আছে, তখন এই ডোবাগুলোর মধ্যেও নিশ্চই আছে! আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’ তার কথা শুনে শিউরে উঠল সুজয়। জলায় হাঁটতে হাঁটতে খালি তার মনে হতে লাগল, জলের নীচে তার ডুবে থাকা পায়ে কী যেন জড়িয়ে যাচ্ছে! ভয়ে ভয়ে এগোতে লাগল সুজয়।

তাদের কাউকে সাপে না-কামড়ালেও একটা দমবন্ধকর ঘটনা কিন্তু সেখানেই ঘটল। এক ঘণ্টা পর জলাটা তখন প্রায় পার হয়ে এসেছে। চোখে পড়ছে ওপাশের গহীন অরণ্য। সুজয়ও মনে মনে ভাবছে, ‘যাক, সাপের ফাঁড়াটা কেটে গেল!’ ঠিক এমন সময় লাঠির আগায় বসা কনডোরটা হঠাৎ কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল জলার এক দিকে তাকিয়ে। সুজয়রা তখন কোমর সমান পাঁক জলে। পাখির চিৎকার শুনে হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়লেন ইনকা পুরোহিত। তার পিছনে দাঁড়িয়ে পড়ল অন্যরাও। চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে ইল্লাপার দৃষ্টি এসে থেমে গেল এক জায়গাতে। পাখিটাও তাকিয়ে আছে ও দিকেই। ইল্লাপার দৃষ্টি অনুসরণ করে সুজয়রাও তাকাল সে দিকে। সুজয় দেখতে পেল তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার থেকে হাত পঞ্চাশেক দূরে একটু কোনাকুনি ডোবার জলে ভাসছে একটা শ্যাওলা মাখা গাছের গুঁড়ি। একটু ভালো করে লক্ষ করার পর সুজয়ের মনে হল গুড়িটা যেন ভাসতে ভাসতে তাদের দিকেই আসছে। হঠাৎ ইল্লাপা সেটা দেখিয়ে চাপা স্বরে কি যেন বললেন। সুজয়দের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন রাইফেলধারীকে। সে লোকটাও তাকিয়ে ছিল সে দিকেই। ইনকা পুরোহিতের কথা কানে যাওয়া মাত্রই লোকটা দ্রুত তার রাইফেলটা খুলে নিল তার কাঁধ থেকে, তারপর সেই গাছের গুঁড়িটাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দিল! গুলির শব্দে কেঁপে উঠল চারদিক! কনডোরটা ভয় পেয়ে কর্কশ একটা ডাক ছেড়ে উড়ে গেল। গুলিটা সম্ভবত গাছের গুড়ির গায়ে লাগল না। তার পাশের একটু জল ছিটকে উঠল। কিন্তু তার পরমুহূর্তেই সেই গাছের গুঁড়িটা একটু নড়ে উঠে মাথা তুলল। সুজয়রা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার তুলনায় প্রাণীটা যেখানে রয়েছে সেখানকার জল মনে হয় কম। কারণ, তার সামনের দুটো পায়ে ভর দিয়েই সম্ভবত মাথা তুলে সুজয়দের দেখছে সে। একটা চ্যাপটা ধরনের মুখঅলা কুমির! বিল সুজয়দের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘কেম্যান!’

মুহূর্ত মাত্র সময়ের ব্যবধান। এর পরের গুলিটা চালাল হুইকো। অব্যর্থ লক্ষ্য, গুলিটা গিয়ে বিঁধল প্রাণীটার টাগরাতে! তার পরমুহূর্তেই সেখানকার জলে তোলপাড় শুরু হল। লাল হয়ে উঠল সেখানকার জল। সুজয়রা দেখতে পেল আরও বেশ কয়েকটা সবুজ গুঁড়ি প্রথমে ভেসে উঠল যে জায়গাতে জল ছিটকাচ্ছে তার আশেপাশে। তারপর তারা দ্রুত এগিয়ে গেল সেই হতভাগ্য কেম্যানটার দিকে! প্রচন্ড একটা হুড়োহুড়ি শুরু হল জলের মধ্যে। আকাশের দিকে ছিটকে উঠতে লাগল জল। ইল্লাপা আর সময় নষ্ট করলেন না। সুসানকে কাঁধে নিয়ে তিনি দ্রুত এগোতে লাগলেন ডাঙার দিকে। সতীর্থর মাংস দিয়ে ভোজ সারতে লাগল ক্যেমানগুলো। এর কিছু কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাঙায় উঠে এল সবাই।

সুজয়দের সারাদেহ জল-কাদায় মাখামাখি। জঙ্গলের চেয়ে জলা পার হতে যেন অনেক বেশি পরিশ্রম হল তাদের। ওপরে উঠেই ভেজা অবস্থায় মাটিতে বসে পড়লেন পিনচিও আর মার্কেজ। কনডোরটা আকাশে চক্কর কাটছিল। সে আবার এসে বসল লাঠির মাথায়। সুজয় ক্যেমানের ঘটনাটা ঘটার পর পাখিটার ব্যাপারে একটা জিনিস বুঝতে পেরেছে, কনডোরটা নিছকই ইল্লাপার শখের পোষ্য নয়, লাঠির মাথায় বসে পাখিটা নজরদারেরও কাজ করে। শকুনজাতীয় পাখিদের দৃষ্টিশক্তি প্রখর হয়, বহুদূরের জিনিস দেখতে পায় তারা।

সুজয়ও ক্লান্তিতে মাটিতে বসে পড়তে যাচ্ছিল, কিন্তু ইনকা পুরোহিত আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সূর্য ডুবতে দেরি আছে এখনও। থামলে চলবে না।’ অগত্যা বসা হল না সুজয়দের। ইল্লাপা সুসানকে নামিয়ে দিলেন লামার পিঠে। তারপর ঘাস-জমি ভেঙে এগোলেন জঙ্গলের দিকে। আর তার পিছনে অন্যরা।

এ বনও আগের মতোই গহীন। চারপাশে মহাবৃক্ষরাজি, গাছের মাথার ওপর থেকে নেমে আসা বড়ো বড়ো লতা, ঝোপঝাড়। তবে একটা পার্থক্য আছে। নদী পার হবার আগে বনের ভিতর অবিশ্রান্তভাবে নানা পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছিল তারা, কিন্তু এ অরণ্য যেন একদম নিঃঝুম, নিঃশব্দ। ঘণ্টাখানেক চলার পরও কোনো পশুপাখি চোখে পড়ল না। অবশেষে এক সময় সূর্য ঢলে পড়ল। জঙ্গলের মধ্যে একটা ফাঁকা মতন জায়গাতে তাঁবু ফেলার নির্দেশ দিলেন ইল্লাপা। তাঁবু খাটানোর সঙ্গে সঙ্গেই পরিশ্রান্ত দেহে সুজয়রা গিয়ে ঢুকল তাঁবুর মধ্যে। তারপরই তারা শুয়ে পড়ল।

রাতে খাওয়া সেরে তাঁবুর বাইরে এল বিল আর সুজয়। একটু দূরে বিরাট অগ্নিকুন্ডের কাছে বসে কথা বলছেন পিনচিও আর হুইকো।

সুজয়রা সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই পিনচিও জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রফেসর কই? শুয়ে পড়লেন?’

অগ্নিকুন্ডের পাশে বসার পর সুজয় বলল, ‘হ্যাঁ, বৃদ্ধ মানুষ, ওঁরই বেশি পরিশ্রম হচ্ছে!’

বিল সুজয়ের পাশে বসে হুইকোকে বলল, ‘এই জঙ্গলের শেষেইতো মাচাকুয়ে নদী, তাই না?’

হুইকো বলল, ‘হ্যাঁ। তবে যাবার পথে আমরা কিন্তু থামব না, সোজা নদী পেরব। আমি যেখানে কোরাকেঙ্কু দেখেছিলাম, সে জায়গা নদীর পাড় ধরে বেশ কিছুটা উত্তরে। ইনকা নগরী দেখে ফেরার পথে আমি সেখানে নিয়ে যাব।’

বিল বলল, ‘জায়গাটা তুমি চিনতে পারবে তো?’

‘হ্যাঁ, পারব।’ জবাব দিল হুইকো।

চারপাশে তাকাল সুজয়। ইল্লাপা মনে হয় তাঁবুর ভিতরে। তাকে দেখা গেল না। কিছুদূরে অগ্নিকুন্ডের পাশে জটলা করছে তিনজন বন্দুকধারী। আর যার লামা পিরানহার পেটে গেছে সেই লোকটা একপাশে হাঁটুতে মুখগুঁজে বসে আছে। বুড়ো লামাঅলা মনে হয় তার লামার শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি! সারাটা পথ সে চুপচাপ সবার পিছনে হেঁটেছে।

কিছুক্ষণ অগ্নিকুন্ডের ধারে বসে থাকার পর বিল সুজয়কে বলল, ‘শুনতে পাচ্ছ, মেঘ ডাকছে। রাতে মনে হয় বৃষ্টি নামবে।’ সুজয়ও এবার শুনতে পেল গুরু গুরু মেঘ গর্জনের শব্দ। অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। সে বলল, ‘হ্যাঁ, পাচ্ছি!’

তাদের কথা শুনে হুইকো বলল, ‘আপনারা যাকে মেঘ গর্জনের শব্দ ভাবছেন, তা আসলে অসভ্য উপজাতিদের ঢাকের শব্দ। জঙ্গলে যে বাইরের মানুষ প্রবেশ করেছে তা টের পেয়েছে ওরা। তাই ঢাক বাজিয়ে তাদের অন্য সঙ্গীদের বার্তা পাঠাচ্ছে। এ ভাবেই জঙ্গলে খবর আদান-প্রদান চলে!’

বিল প্রশ্ন করল, ‘ওরা কি আমাদের আক্রমণ করতে পারে?’

হুইকো তার পাশে মাটিতে নামিয়ে রাখা রাইফেলটা তুলে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, পারে। যদি ওদের মনে হয় আমরা ওদের ক্ষতি করতে এসেছি, অথবা যদি ওদের আমাদের চামড়ার দরকার হয়।’ শেষের কথাটা বলে দাঁত বের করে হাসল সে।

‘আমাদের চামড়ার দরকার হয়’ ‘মানে?’ বিল জানতে চাইল।

হুইকো জবাব দিল, ‘ওরা মানুষের চামড়া দিয়ে এক ধরনের ঢাক বানায়, তার নাম ‘রুনটিনি।’ ওরা এত সুন্দর মানুষের গায়ের চামড়া ছাড়ায় যে তা শুকিয়ে বোতাম লাগিয়ে জামার মতো গায়ে দিতে পারবেন।’

বিল আর সুজয় চমকে উঠল তার কথা শুনে।

মার্কেজ এবার তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তবে আমাদের ভয়ের কিছু নেই। ইল্লাপা বলে দিয়েছেন আমাদের লোকেরা বন্দুক নিয়ে রাত জেগে তাঁবুর বাইরে পাহারা দেবে।’

মার্কেজের থেকে বিদায় নিয়ে এরপর তাঁবুতে ফিরে গেল সুজয়রা। প্রফেসর আর সুসান আগেই শুয়ে পড়েছে। তারাও ফিরে শুয়ে পড়ল। বিল ঘুমিয়ে পড়ল কিন্তু সুজয়ের ঘুম এল না। তার মনে হতে লাগল বাইরের সেই ঢাকের শব্দ যেন ক্রমশই বেড়ে চলেছে! পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, সব দিক থেকেই যেন গুরু গুরু-দ্রিমিদ্রিমি শব্দ ভেসে আসছে! তারা অনেকে যদি একসঙ্গে আক্রমণ করে তাহলে চারটে রাইফেল কি তাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে?—এসব কথা ভাবতে ভাবতে সুজয়ও একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।

মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল সুজয়ের। মনে হল, কে যেন মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে তাকে। তাহলে কি সেই অসভ্য জাতিরা তাঁবু আক্রমণ করতে এসেছে? কম্বল মুড়ি দিয়ে উঠে বসল সুজয়। তার সামনে দাঁড়িয়ে একটা মূর্তি। তাকে চিনতে পরল সুজয়, তাদের সঙ্গে আসা বুড়ো লামাঅলাটা! সুজয় তার দিকে তাকাতেই লোকটা তাঁবুর বাইরে একবার তাকিয়ে নিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলল তাকে। সুজয় শুয়েছিল তাঁবুর দরজার কাছাকাছি। তারপর অন্যরা সার বেঁধে শুয়ে আছে। বুড়ো লোকটা হাঁটু মুড়ে সুজয়ের পাশে বসল। তারপর সুজয়ের কানের কাছে মুখ এনে চাপা স্বরে কী যেন বলতে শুরু করল। সে ভাষার বিন্দুবিসর্গ বোধগম্য হল না তার। সুজয় প্রফেসরকে ডাকতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় তাঁবুর বাইরে কার যেন গলার শব্দ শোনা গেল। সেই শব্দ কানে যেতেই বুড়োটা কথা বন্ধ করে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তারপর তাঁবুর বাইরেটা উঁকি মেরে একবার দেখে, সন্তর্পণে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে গেল। ঘুম চোখে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আবার শুয়ে পড়ল সে।

রাতটা নিরুপদ্রবেই কাটল। কিন্তু ভোরবেলা তাঁবু গুটিয়ে যাত্রা শুরুর মুহূর্তে একটা গোলযোগ বাঁধল। দাঁড়িয়ে পড়ল সেই বৃদ্ধ লামাঅলা। সে এগোতে রাজি নয়, ফিরে যেতে চায়! ইল্লাপা, পিনচিও, হুইকোসহ অন্য লোকগুলো বুড়োটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। সুজয়, মার্কেজ আর বিল সুসানকে নিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইল। সুজয়ের মনে পড়ে গেল গত রাতের ঘটনাটা। ব্যাপারটা শুনে মার্কেজ বেশ আশ্চর্য হলেন। বিল চাপাস্বরে বলল, ‘লোকটা কি তাহলে আমাদের কোনো গোপন ব্যাপার বলতে এসেছিল? নইলে, ও চুপি চুপি আমাদের তাঁবুতে আসবে কেন?’

প্রফেসর তার কথার জবাবে কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় একটা ঘটনা ঘটল। সেই বুড়ো সম্ভবত কিছুতেই আর এগোতে রাজি হচ্ছিল না। সমানে তর্ক করছিল অন্যদের সঙ্গে। সময় নষ্ট হচ্ছে দেখে ইল্লাপার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। একটা দুর্বোধ্য চিৎকার করে তিনি এক ধাক্কায় লোকটাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে, পাশের একজনের রাইফেল টেনে নিয়ে সেটা তাক করলেন লোকটার বুকের দিকে! একটা ভয়ংকর কিছু ঘটতে চলেছে বুঝতে পেরে বিল তিরের মতো সেখানে ছুটে গিয়ে ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে আড়াল করে দাঁড়াল বুড়োটাকে। সুজয়ও দৌড়ে গেল সেখানে। বিল ওভাবে দাঁড়িয়ে পড়াতে তার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন ইনকা পুরোহিত। সুজয়ের ভয় হল রাগের মাথায় বিলকেই না গুলি চালিয়ে দেন তিনি। ইতিমধ্যে প্রফেসরও সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। পিনচিও, হুইকো সবাই যেন হতভম্ব ঘটনাটা দেখে। বিলেরও একটা হাত কোমরের কাছে জামার নীচে। হাতটা ওখানে কেন তা অনুমান করতে পারল সুজয়। বিল আর ইল্লাপা তাকিয়ে আছে পরস্পরের দিকে। এভাবে কয়েকটা মুহূর্ত কেটে যাবার পর একসময় ইনকা পুরোহিত ধীরে ধীরে রাইফেলটা নামিয়ে নিয়ে বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে এলেন। মাটিতে পড়ে থাকা বুড়ো লোকটা তখনও ভয়ে কাঁপছে। বিল হাত ধরে টেনে দাঁড় করাল তাকে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই যাত্রা শুরু হল। বুড়োটাও চলতে শুরু করল তাদের সঙ্গে।

সেই ঝোপঝাড় ভেঙে, গাছের গুঁড়ির ফাঁক গলে একই রকম পথ চলা। সুজয় খেয়াল করল, একজন রাইফেলধারী সবসময় সেই বুড়োটার পাশাপাশি হাঁটছে। সম্ভবত সে আগলে রাখছে তাকে। সুজয় পিনচিওর কাছে জানতে চাইল, ‘বুড়ো লোকটা আমাদের সঙ্গে আর আসতে চাইছিল না কেন?’

উত্তরটা এল হুইকোর কাছ থেকে। সে বলল, ‘লামাটা নদীতে পড়ে যাবার পর ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে! ওর ধারণা, ঘটনাটা অশুভ। আমরা আর এগোলে ভয়ংকর কোনো বিপদ হতে পারে।’

এরপর কিছুটা স্বগতোক্তির সুরে সে বলল, ‘আসলে চিমু উপজাতির লোকগুলোই এরকম! ওকে সঙ্গে আনাই উচিত হয়নি।’

সুজয় বলল, ‘এই লোকগুলো একই গোষ্ঠীর নয়?’

হুইকো জবাব দিল, ‘না, অন্যরা সব কুয়েচুয়া গোষ্ঠীর।’

বিল, প্রফেসর মার্কেজকে জিজ্ঞেস করল, ‘চিমুরা কি ইনকাদেরই আর-একটা গোষ্ঠী?’

তিনি বললেন, ‘না।’ চিমু জাতি ছিল পৃথক আন্দীয় জনগোষ্ঠী। ‘চিমু’ এবং ‘মোচে’ নামের আর-এক জনগোষ্ঠীর ইতিহাস কিন্তু ইনকাদের চেয়েও প্রাচীন। এরা ছিল ইনকাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। চিমুদের সঙ্গে বহুযুদ্ধ হয় ইনকাদের। শেষপর্যন্ত অবশ্য তারা ইনকাদের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১০০০ থেকে ১৪৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই সভ্যতা চরম উৎকর্ষ লাভ করে। চিমুদের রাজধানী ‘চানচান’ ছিল সে-সময় দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম নগর। আপাদমস্তক পাখির পালকের সাজে সজ্জিত চিমুরা, স্বর্ণ ও পটারি শিল্পে উৎকর্ষ লাভ করেছিল, কুজকো মিউজিয়ামে এর বেশ কিছু নির্দশন সংরক্ষিত আছে।’ এরপর মার্কেজ চলতে চলতে সুজয়দের উদ্দেশ্যে বলে যেতে লাগলেন চিমুদের ইতিহাস। তাই শুনতে শুনতে এগোতে লাগল সুজয়রা।

ঘণ্টা পাঁচেক একনাগাড়ে চলার পর হুইকো একসময় বলল, ‘আমরা মাচাকুয়ে নদীর প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি এখন।’ তাই শুনে বিল উৎসাহিত হয়ে বলে উঠল, ‘তাই নাকি! ভাগ্য যদি সুপ্রসন্ন হয়, তাহলে হয়তো তার দেখা এখন যাত্রাপথেই মিলে যেতে পারে!’ এই বলে সে তার কিট ব্যাগের ভিতর থেকে একটা ছোটো বাইনোকুলার বার করল।

মার্কেজ বিলের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমার উদ্দেশ্য যেন সফল হয় তাই কামনা করি। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার এ জঙ্গলে একটা পাখিও চোখে পড়েনি আমার! তাহলে কি কোরাকেঙ্কু যেখানে থাকে, সেখানে অন্য কোনো পাখি থাকে না?’ কথাটা বলে তিনি তাকালেন হুইকোর দিকে। হুইকো যেন মার্কেজের কথাটা শোনেনি এমন ভাব করে আগের মতোই হাঁটতে লাগল।

বিল মাঝে মাঝে তার বাইনোকুলারটা চোখে লাগিয়ে চারপাশ দেখার চেষ্টা করছে। হঠাৎ সে জিনিসটা চোখে লাগিয়ে বলল, ‘গাছের ডালে সাদা কাপড়ের ফালি ঝুলছে কেন? এখানে কি মানুষ থাকে?’ তার কথাটা কানে যেতেই হুইকো দাঁড়িয়ে পড়ে বাইনোকুলারটা হাতে নিয়ে একঝলক সে-দিকে তাকিয়ে কী যেন একটা বলল ইল্লাপার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। সুজয়ও কাচের মধ্যে চোখ রেখে দেখল দূরে গাছের ডালের দিকে। হ্যাঁ, একটা সাদা রঙের লম্বা কাপড়ের ফালি যেন ঝুলছে গাছের ডাল থেকে!

হুইকো ইনকা পুরোহিতের সামনে এগিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে কী যেন আলোচনা করল। তারপর সম্ভবত সন্দেহ নিরসনের জন্যই একজন রাইফেলধারীকে সঙ্গে নিয়ে কিছু দূরে সেই গাছের দিকে এগোল। অন্যরা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলেও কৌতূহলবশত তাদের পিছু নিল বিল আর সুজয়। ঝোপঝাড় ভেঙে সেই গাছটার কাছাকাছি পৌঁছে থমকে দাঁড়িয়ে গাছের ডালে ঝুলতে থাকা জিনিসটার দিকে তাকালেন তিনি। দাঁড়িয়ে পড়ে সেদিকে তাকাল সুজয়রাও। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তারা বুঝতে পারল, তারা যেটাকে কাপড়ের ফালি বলে মনে করেছিল, সেটা আসলে বিরাট লম্বা একটা সাপের খোলস! অন্তত পনেরো ফুট লম্বা হবে! বিল অস্ফুট স্বরে সুজয়ের কানের কাছে বলল, ‘অ্যানাকোণ্ডা!’ ইনকা পুরোহিত ঝুঁকে পড়ে একমুঠো মাটি তুলে নাকের কাছে নিয়ে শুঁকে বললেন, ‘এক্ষুনি এখান থেকে আমাদের যেতে হবে, সাপটা ধারেকাছেই আছে।’ কথাটা বলার পর আর-এক মুহূর্ত সেখানে না-দাঁড়িয়ে দ্রুত পা চালালেন ফেরার জন্য।

তারা আগের জায়গায় ফিরে আসার পর ইনকা পুরোহিত দ্রুত পা চালাবার জন্য সকলকে নির্দেশ দিলেন। তার নির্দেশ মেনে তাকে অনুসরণ করল সবাই. চলতে চলতে ইল্লাপা সকলকে সাবধান করে দিয়ে বললেন, ‘গাছের নীচ দিয়ে যাবার সময় সাবধান, ‘বড়ো মাচাকুয়ে’ গাছের ওপর থেকে শিকারের ওপর লাফিয়ে পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। তারপর তার পেশির প্রচন্ড চাপে হাড়গোড় চূর্ণ করে মানুষকে মাথার দিক থেকে গিলতে শুরু করে!’ তাঁর কথা শোনার পর গাছের মাথার দিকে তাকিয়ে চলতে লাগল সবাই।

সুজয়ের কানে এল পিনচিও চাপাস্বরে ইল্লাপাকে বললেন, ‘আপনি এ পথটা বাছলেন কেন? এ ছাড়া কি অন্য কোনো পথ ছিল না?’

ইনকা পুরোহিত জবাব দিলেন, ‘বড়ো মাচাকুয়ে’ এ জায়গা ছেড়ে চলেগেছিল। আবার যে তাদের এখানে খাবারের ব্যবস্থা করে ডেকে আনা হয়েছে এ খবর আমি পাইনি।’

পিনচিও তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডেকে আনা হয়েছে মানে?’

তার একথার কোনো উত্তর দিলেন না ইনকা পুরোহিত। সতর্ক দৃষ্টিতে গাছের মাথার দিকে তাকিয়ে দ্রুত পা চালালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা উপস্থিত হল মাচাকুয়ে বা সর্পনদীর ধারে। দু-পাশে গহীন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সাপের মতো এঁকে বেঁকে প্রবাহিত হয়েছে সর্পনদী। তবে এ নদী চওড়ায় খুব বেশি নয়। একটা গা-ছমছমে পরিবেশ বিরাজ করছে চারপাশে, কোথাও কোনো শব্দ নেই, যেন কোনো অজানা আতঙ্কে গাছের পাতাও এখানে নড়ছে না! নদীর পাড়ে এক জায়গাতে গাছের গুঁড়ির তৈরি একটা নৌকা রাখা আছে। ইল্লাপা, সুজয়দের সঙ্গে আসা লোকগুলোর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘নৌকো নামাও। তাড়াতাড়ি এ জায়গা ছেড়ে যেতে হবে!’ দুজন লোক ঠেলে নৌকা জলে নামাতে লাগল।

বিল হুইকোকে জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে কোথায় কোরাকেঙ্কু পাখি দেখেছিলে তুমি?’ বিলের কন্ঠস্বর শুনে সে যে ভিতরে ভিতরে খুব উত্তেজিত তা বুঝতে পারল সুজয়।

প্রশ্ন শুনে হুইকো দূরে নদীর বাঁকের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওদিকে বেশ কিছুটা এগিয়ে।’

বাইনোকুলার দিয়ে সেদিকটা দেখতে দেখতে বিল বলল, ‘এখন ওদিকে একটু যাওয়া যায় না?’

হুইকো জবাব দিল, ‘এখন নয়। ফেরার পথে।’

বিল আরও কী একটা কথা বলতে যাচ্ছিল হুইকোকে। কিন্তু ততক্ষণে নৌকা নামানো হয়ে গেছে। ইল্লাপা সুজয়দের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, এখানে দাঁড়ানো যাবে না।’ এই বলে তিনি এগোলেন নৌকার দিকে। তার কথা শুনে আর কিছু নাবলে একটু অসন্তুষ্টভাবেই সুজয়দের সঙ্গে বিলও পা বাড়াল সেদিকে। কোনো ধরনের নৌকা, একটা লম্বা গাছের গুঁড়ির মধ্যে খোঁদল করা। ইনকা পুরোহিতের সঙ্গে সুসানকে সঙ্গে নিয়ে সুজয়রা, পিনচিও আর হুইকো উঠে বসল সেই খোঁদলের মধ্যে। সব শেষে নৌকায় তোলা হল লামার বাচ্চাটাকে। আর জায়গা নেই। হুইকো নৌকা নিয়ে আবার এপারে ফিরে এলে দ্বিতীয় দফায় ও পাড়ে পৌঁছোবে লামাগুলোকে নিয়ে বাকি চারজন। নৌকতে তখন উঠে বসেছে সবাই। হুইকো লগি তুলে নিয়েছে হাতে। ঠিক সেই সময় সুসান পাড়ের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওটা কি?’ তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সবাই দেখল, একটু আগে তারা যেখানে দাঁড়িয়েছিল তার হাত পনেরো দূরে জঙ্গলের গা ঘেঁসে নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের তৈরি প্রাচীন এক মানুষের মূর্তি! এতক্ষণ সুজয়রা সেটা খেয়াল করেনি। স্তম্ভাকৃতি মূর্তিটা অন্তত কুড়ি ফুট হবে। বিকট দর্শন তার মুখ। পরনে প্রাচীন ইনকাদের পোশাক। আর সেই মূর্তিকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে পাথরের তৈরি এক মহাসর্প! তার ভয়াল মুখগহ্বরে যেন গিলতে চলেছে মূর্তির মাথাটাকে! বেশ কিছু দড়িদড়া আর কিছু ছেড়া কাপড়ের টুকরোও ঝুলছে মূর্তির গা থেকে। সেসব অবশ্য পাথরের নয়, আসল! মূর্তিটা যে বেশ প্রাচীন তাতে সন্দেহ নেই।

মার্কেজ ইল্লপার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এখানে এটা কীসের মূর্তি আপনি জানেন? এই মূর্তিতো আগে দেখিনি!’

ইনকা পুরোহিত জবাব দিলেন, ‘ইনতিকে যারা মানে না, সেসব লোকদের দু-ভাবে শাস্তি দেয় প্রাচীন নগরীর ইনকারা। হয়, সূর্যস্তম্ভে বেঁধে তাদের আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়, অথবা নদী পার করে এখানে আনা হয়।’

‘এখানে আনা হয় মানে?’ পাশ থেকে প্রশ্ন করল বিল।

পুরোহিত জবাব দিলেন, ‘এখানে এনে অপরাধীকে বাঁধা হয় ওই স্তম্ভ-মূর্তির সঙ্গে, তারপর তার পায়ে ঢেলে দেওয়া হয় বাঁদর বা লামার কাঁচা রক্ত। রক্তের গন্ধ বাতাসে ভেসে ছড়িয়ে পড়ে জঙ্গলে। আর সেই গন্ধ পেয়ে এখানে ছুটে আসে বড়ো মাচাকুয়ে। আর তারপর ...? একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘বহুপ্রাচীন কাল থেকে এ ব্যবস্থা চলে আসছে। মাঝে কিছুদিন অবশ্য বন্ধ ছিল, এখন আবার শুরু হয়েছে দেখছি।’ ইনকা পুরোহিতের কথা শুনে শিউরে উঠল সবাই। বিল বলল, ‘তার মানে এ জায়গাটা মশান! এখন বুঝলাম কেন এ জঙ্গলে কোনো পশুপখি চোখে পড়ল না!’ ইনকা পুরোহিতের ইশারাতে লগি ঠেলতে শুরু করল হুইকো। পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো তাকিয়ে রইল সেই ভয়াল মূর্তির দিকে। নৌকা থেকে সুজয় বুঝতে পারল তাদের চোখে-মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে আতঙ্কের চিহ্ন!

মিনিট পাঁচেক সময় লাগল নদী পার হতে। সুজয়দেরকে পাড়ে নামিয়ে হুইকো কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপারে পড়ে থাকা লোকগুলো আর ভারবাহী পশুদের নিয়ে ফিরে এল। নৌকা থেকে এ পারে পৌঁছে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল লোকগুলো। নতুন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আবার শুরু হল পথ চলা। আবার এ জঙ্গলের মধ্যে শোনা যেতে লাগল পাখির ডাক। এক-এক করে ছোটোখাটো পশুপাখিও চোখে পড়তে লাগল। তবে এ জঙ্গলও কম গভীর নয়, মাঝে মাঝেই ঝোপঝাড় কেটে এগোতে হচ্ছিল। মাঝে একবার খাবার খেয়ে নেওয়ার জন্য থামতে হল, তারপর আবার চলা। বেলা তিনটে নাগাদ জঙ্গলের মধ্যে বিশালাকৃতির এক প্রাচীন তোরণের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেল সবাই। তার ওপরের খিলান ধসে পড়েছে। মোটা মোটা বুনো লতার নিবিড় বেষ্টনীতে স্তম্ভ দুটো শুধু মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। গাছের ডালপালার চাঁদোয়ার ফাঁক দিয়ে শেষ দুপুরের আলো এসে পড়েছে সেখানে। স্তম্ভ দুটোর গায়ে খোদিত আছে ইনকা যোদ্ধার মূর্তি, পরনে পাথর খোদিত অদ্ভুত সাজ-পোশাক। হাতে ধরা তরবারি জাতীয় অস্ত্র। একটা কনডোর ডানা মেলে বসে আছে মূর্তির মাথার ওপর। পাথরে ‘ফুটে ওঠা, তীক্ষ্ণ নখ আর ধারাল ঠোঁটের পাখিটা যেন ডানা মেলে আগলে রেখেছে তাকে। সুজয়রা বিস্মিত হয়ে এসে দাঁড়াল সেই স্তম্ভ দুটোর সামনে। মার্কেজের অনুরোধে একজন লোক স্তম্ভর গা থেকে লতাপাতা একটু সরিয়ে দিতেই স্তম্ভ বেদীতে চোখে পড়ল আশ্চর্য সব হুয়াকা। পুমা, লামা, কুমির ইত্যাদি নানা পশুপাখির ছবি খোদিত আছে সেখানে। মুগ্ধ চোখে সবাই দেখতে লাগল সেই কারুকাজ। নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে ইনকা পুরোহিত ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে পিনচিওকে বললেন, ‘আমরা প্রাচীন নগরীর কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। একসময় এ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সেই নগরী।’

প্রফেসর উৎসাহিত হয়ে ইল্লাপাকে বললেন, ‘তার মানে এটা নগরীর প্রবেশ তোরণ ছিল! আর কত সময় লাগবে সেখানে পৌঁছোতে?’

ইনকা পুরোহিত একবার মাথার ওপর তাকিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আলো থাকতেই পৌঁছোব।’

সুসান হঠাৎ তার দাদুকে প্রশ্ন করল, ‘আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে কি ইনকারা এখনও আছে?’

মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘তারাতো এখন আর নেই, তাদের ঘরবাড়িগুলো আমরা দেখতে যাচ্ছি।’

মার্কেজের জবাব শুনে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইল্লাপা এবার বললেন, ‘না কিছু মানুষ এখনও আছে সেখানে। ইনতির উপাসক তারা। আজও খাঁটি ইনকা রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে তাদের শরীরে। ওই নগরী, এ জঙ্গলের বাইরে তারা পা রাখে না কখনও। বাইরের পৃথিবীও তাদের কোনো খবর রাখে না।’

মার্কেজ ইনকা পুরোহিতের কথায়, উৎফুল্ল হয়ে বললেন, ‘তাই নাকি! এতো অবিশ্বাস্য ব্যাপার! এতটা আমি আশা করিনি।’ এ কথা বলার পর তিনি ইল্লাপাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, ওই লোকগুলো কি এখনও সে যুগেই পড়ে আছে?’

ইনকা পুরোহিত বললেন, ‘এখন তারা চাকা আর লোহার ব্যবহার জানে। কিন্তু অন্য সব কিছুই আগের মতোই আছে। একটা ব্যাপার সকলকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। সেখানে তাদের রীতিনীতি মেনেই সবাইকে চলতে হবে। বিদেশিদের এমনিতে তারা নগরীতে প্রবেশ করতে দেয় না, আমি সঙ্গে আছি তাই। কিন্তু, আমার কথা শুনে না চললে বিপদ হতে পারে।’

সকলে চুপচাপ শুনলেন ইনকা পুরোহিতের কথা। বিল বেশ কয়েকটা ছবি তুলল তোরণের। তারপর ইনকা পুরোহিতের সঙ্গে সবাই এগোল প্রাচীন নগরীর উদ্দেশ্যে। কিছুটা সময় এগোবার পর হঠাৎ দূর থেকে যেন ভেসে আসতে লাগল ঢাকের শব্দ। প্রথমে ধীর লয়ে তারপর দ্রুতছন্দে বেজে চলেছে ঢাক। মার্কেজ ইল্লাপাকে একটু শঙ্কিত ভাবে বললেন, ‘ঢাক বাজাচ্ছে কারা? অসভ্য জংলিরা নাকি!’

ইনকা পুরোহিত বললেন, ‘না, এটা পুমাটিনির শব্দ। পুমার চামড়া থেকে তৈরি ঢাক। আমাদের আগমনবার্তা পেয়ে গেছে নগরবাসীরা। নগরের বাইরে যারা গেছে, এই ঢাক বাজিয়ে তাদের নগরে ফিরে আসতে বলা হচ্ছে।’

‘কীভাবে তারা এ খবর পেল?’ জানতে চাইল বিল।

‘জঙ্গলে তাদের লোক ঘুরে বেড়ায়। তারাই কেউ দেখেছে আমাদের।’ জবাব দিলেন ইল্লাপা।

ইনকা পুরোহিত তার চলার গতি বাড়িয়ে দিলেন। প্রাচীন নগরীর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে জানতে পেরে উৎসাহিত হয়ে সবাই তাঁর সঙ্গে পা মেলালেন। বিল শুধু হুইকোকে একবার বলল, ‘ফেরার পথে মাচাকুয়ে নদীর তীরে সেই জায়গাতে আমাকে কিন্তু অবশ্যই নিয়ে যেতে হবে। ওই জন্যই কিন্তু আমার এখানে আসা।’

বিলের কথা শুনে সম্মতিসূচক মাথা নাড়াল হুইকো।

আরও এক ঘণ্টা চলার পর ক্রমশ ফিকে হয়ে আসতে লাগল জঙ্গল। তারপর তিন দিনের যাত্রা শেষে তাদের চোখের সামনে ফুটে উঠল জঙ্গল ঘেরা প্রাচীন এক নগরীর ছবি।

সুজয়রা এসে দাঁড়াল প্রাচীন নগরীর প্রধান প্রবেশ তোরণের সামনে। বিশাল তোরণ। বয়সের ভারে সে কিছুটা জীর্ণ হলেও মহাকাল এখনও তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিতে পারেনি। তোরণের মাথাতে ছটাঅলা সূর্যমূর্তি আজও বর্তমান। তারা সেখানে উপস্থিত হতেই দুজন দীর্ঘকায় বর্শাধারী তোরণের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। তাদের পরনে রঙিন ডোরাকাটা
র‍্যাপারের মতো দেখতে রেশমের পোশাক। পায়ে কাঠের তৈরি জুতো। মুখমন্ডলে কালো রঙের বিচিত্র উলকি। ঠিক যেন তারা ছবির মানুষ। ইনকা পুরোহিত তাঁদের উদ্দেশ্যে কী একটা বলতেই তারা প্রথমে সম্ভ্রমে মাথা নোয়াল তার প্রতি। তাদের একজন এগিয়ে এসে হাতে নিল সাদা লামার বাচ্চার দড়িটা। এরপর রক্ষী দুজনের পিছন পিছন সকলে প্রবেশ করল নগরীতে।

একটা পাথর বিছানো সোজা রাস্তা চলে গেছে সামনের দিকে। চারপাশে ছোটো ছোটো টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে পাথরের তৈরি বাড়িঘর। বয়সের ভারে জীর্ণ তারা। ছাদহীন, দেওয়াল ধসে পড়ছে। বহু শত বছর ধরে তারা পরিত্যক্ত বলেই মনে হয়। বেশ কিছু ছোটো-বড়ো পাথরের তৈরি স্তম্ভও চোখে পড়ছে পথের ধারে। কিন্তু কোথাও কোনো লোকজন নেই। অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে একটা বিরাট স্তম্ভের শীর্ষদেশ। ইনকা রক্ষীরা তাদের নিয়ে চলল সেই স্তম্ভের দিকে। মার্কেজ সে দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে ইল্লাপার কাছে জানতে চাইল, ‘ওদিকে কী আছে?’ ইনকা পুরোহিত জবাব দিলেন, ‘ওটা হল এই নগরীর প্রধান ইনতিহুয়ানাতা। নগরবাসীরা সব ওখানেই বাস করে। ‘আউকুইকননা’র প্রাসাদও ওদিকে।

সুজয় মার্কেজকে জিজ্ঞাসা করে ‘আউকুইকননা’ মানে কী?’

প্রফেসর বললেন, ‘এ শব্দের একাধিক অর্থ,—পুরোহিত, জাদুকর, ওঝা, কোনো কোনো সময় শাসনকর্তা অর্থেও শব্দটা ব্যবহৃত হয়।’

কথাটা বলার পর তিনি এবার ইনকা পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা এ নগরী কার সময় তৈরি হয়েছিল?’

‘টুপাক ইনকা ইপানকুই।’ সংক্ষিত জবাব দিলেন ইনকা পুরোহিত।

মার্কেজ সুজয়ের দিকে তাকিয়ে উৎসাহিত ভাবে বললেন, ‘অর্থাৎ এ নগরী প্রায় ছশো বছরের প্রাচীন! কাল ভোরবেলা উঠেই কিন্তু বেরিয়ে পড়তে হবে জায়গাটা দেখার জন্য।’

কিছুটা পথ ইনতিহুয়ানাতার দিকে এগোবার পর আস্তে আস্তে দু-একটা লোক চোখে পড়তে লাগল। তাদের পরনে প্রাচীন আমলের পোশাক, মাথায় রঙবেরঙের পালকের সাজ, পাথরের তৈরি অলংকার। সুজয়রাও যেমন তাদের দেখতে লাগল, সেই লোকগুলোও তেমনই অবাক চোখে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে।

ইনতিহুয়ানাতা চত্বরের কাছাকাছি পৌঁছোতেই শেষ বিকালের সোনালি আলোতে সূর্যস্তম্ভের বেদীর ঠিক নীচে বেশ জমায়েত দেখতে পেল সুজয়রা। সেই জমায়েতের সামনে উপস্থিত হবার পর আরও একটা জিনিস চোখে পড়ল তাদের। ইনতিহুয়ানাতা বেদীতে একজন জমকালো পোশাক পরা বিশাল বপু মাঝবয়সি লোক বসে আছে। মাথায় তার ছবির বইয়ে দেখা রেড ইন্ডিয়ানদের মতো পখির পালকের বিরাট তাজ। গলায় ঝুলছে সবুজ পাথরের তৈরি অনেকগুলো মালা। ইল্লাপাকে দেখে জমায়েত দু-ভাগে ভাগ হয়ে তাদের মাঝখান দিয়ে বেদীর দিকে যাবার জন্য রাস্তা করে দিল। বেদীর ওপর বসে থাকা লোকটাও উঠে দাঁড়াল তাঁকে দেখে। সুজয়রা বুঝতে পারল, সম্ভবত এ লোকটাই এখানকার আউকুইকননা। বেদীর ঠিক নীচে উপস্থিত হবার পর ইল্লাপা অন্য সবাইকে নীচে দাঁড়াতে বলে হুইকোর হাতে কনডোর সমেত লাঠিটা ধরিয়ে দিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গীতে বেদীতে উঠে পড়লেন। জমকালো পোশাক পরা লোকটা বেশ খাতির করে তাঁকে নিজের পাশে বসাল। ইনকা পুরোহিত আস্তে আস্তে কি যেন বলতে লাগলেন সেই লোকটাকে। সে ইনকা পুরোহিতের কথা শুনতে শুনতে নীচে দাঁড়িয়ে থাকা সুজয়দের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে লাগল।

বেদীতে একজন জমকালো পোশাক পরা বিশাল বপু মাঝবয়সি লোক বসে আছে।

মার্কেজ হুইকোকে জিজ্ঞেস করল, ‘এ লোকটা কে?’

সে জবাব দিল, ‘ওঁর নাম কুইলো। প্রাচীন নগরীর প্রধান পুরোহিত ও শাসনকর্তা।’

বিল চাপা স্বরে মার্কেজকে বলল, ‘শাসনকর্তার দরবারে বেশ খাতির দেখছি ইনকা পুরোহিতের!’

মার্কেজ বললেন, ‘কুজকো মন্দিরের পুরোহিতরা হলেন, ‘পুরোহিত শ্রেষ্ঠ’। ইনকা আমলেও তারা সম্রাট থেকে শুরু করে সর্বত্রই খাতির পেতেন।

বেদীর ঠিক নীচেই সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে চারজন অতিদীর্ঘকায় লোক। এ লোকগুলো যেন অন্যদের থেকে আলাদা। তাদের পোশাকের কোনো বাহুল্য নেই। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। নিম্নদেশে সামান্য পশুচর্মের আচ্ছাদন, কাঁধে তিরধনুক, ভাবলেশহীন কঠিন মুখ নিয়ে পাথরের মূর্তির মতো তারা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চেহারা কেমন যেন জান্তব! তাদের ইশারায় দেখিয়ে মার্কেজ চাপাস্বরে বললেন, ‘এ লোকগুলো সম্ভবত,’ আমাজন ইন্ডিয়ান! ভয়ংকর যোদ্ধা জাতি! এরা ইনকা সম্রাটদের দেহরক্ষী হিসেবে থাকত। এদের বলা হত, ‘কাকা কুজকো।’ সম্ভবত এরাও শাসনকর্তা কুইলোর দেহরক্ষী।’

চারপাশের কৌতূহলী জনতা চুপচাপ তাকিয়ে দেখছে সুজয়দের। তারাও দেখছে তাদের। ইল্লাপা আরও কিছুক্ষণ কুইলোর সঙ্গে কথাবার্তা বলার পর ইশারায় হুইকোকে কাছে ডাকলেন। সে বেদীর ওপর উঠে ইনকা পুরোহিতের কথা শুনে তার পরমুহূর্তেই নীচে ফিরে এসে মার্কেজকে বলল, ‘আপনার সঙ্গের বাচ্চাটাকে ডাকছেন ইল্লাপা।’

‘কেন?’ একটু বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন প্রফেসর।

হুইকো বললেন, ‘এরা বিদেশিদের পছন্দ না-করলেও আমরা সবাই ইনকা পুরোহিতের সঙ্গী বলে আউকুইকননা আমাদের অতিথি বলে গ্রহণ করছেন। এখানকার নিয়ম অনুসারে ওর হাতে উপহার তুলে দিয়ে অতিথি বরণ করতে চাচ্ছেন তিনি।’

তার কথা শুনে মার্কেজ তাকালেন সুসানের দিকে।

সুসান বেশ উৎসাহিত হয়ে তার দাদুকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি যাব ওখানে?’

মার্কেজ বললেন, ‘ডাকছে যখন যাও।’

সুসান এরপর কোনো ভয় না-করে বেশ স্মার্টলি বেদীর ওপর উঠে ইল্লাপা আর কুইলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কুইলো বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকে নিরীক্ষণ করার পর নীচে দাঁড়িয়ে থাকা সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে কী যেন বললেন। একটা মৃদু গুঞ্জন উঠল জনতার মধ্যে। কথা শেষ করে দু-বার হাততালি দিলেন কুইলো। ভীড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল চারজন বাচ্চা মেয়ে। তাদের বেশ সুন্দর দেখতে। কাজল কালো চোখ, পাতা করে আঁচড়ানো ঘন কালো চুলের শেষে দীর্ঘ বিনুনি, পরনে ঝলমলে পোশাক। বয়স মনে হয় দশ-বারো বছর হবে। তাদের মধ্যে মাথায় যে সবচেয়ে বড়ো তার হাতে রেশমবস্ত্রে আবৃত একটা থালা। তারা বেদীর ওপর উঠে কুইলোর সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়াল।

বিল বলল, ‘এরা কি সূর্যকন্যা নাকি!?’

মার্কেজ জবাব দিলেন ‘হতে পারে!’

কুইলো আর ইল্লাপা উঠে দাঁড়ালেন এরপর। থালার আচ্ছাদন সরিয়ে কুইলো একটা সবুজ পাথরের মালা আর একগোছা সাদা সুতলি নিয়ে সেগুলো তুলে দিলেন সুসানের হাতে। তারপর ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে সুসানের কপালটা একটু ঘসে দিলেন। হয়তো এটা তাদের অতিথি বরণের কোনো প্রথা। সুসান জিনিসগুলো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কুইলো জিনিস দুটো তার হাতে দেবার পর বেদীর নীচে সমবেত ইনকা জনতার উদ্দেশ্যে দুর্বোধ্য ভাষায় কী যেন বলতে শুরু করলেন!

দীর্ঘ বক্তৃতা। তার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না সুজয়। সে প্রফেসরকে প্রশ্ন করল, ‘লোকটা কী বলছে?’

মার্কেজ বললেন, ‘এ ভাষাটা বর্তমানে প্রচলিত কুয়েচুয়া ভাষা নয়। তার পূর্বসূরি স্থানীয় কোনো কথ্য ভাষা। দু-একটা শব্দ ছাড়া আমিও তাঁর কথা বুঝতে পারছি না।’

মিনিট দশেক পর কুইলো বক্তৃতা শেষ করলেন। বেদীর নীচে জমায়েতটা ভেঙে গেল এরপর। সে জায়গাটা মোটামুটি ফাঁকা হয়ে যাবার পর মাথায় কনডোরের পালক গোঁজা একজন লোক ফুট তিনেক লম্বা রঙবেরঙের পাথর বসানো ধাতব দন্ড নিয়ে বেদীর ওপর উঠে সেটা তুলে দিল কুইলোর হাতে। সুজয়ের মনে হল সেটা শাসনকর্তার দন্ডগোছের কিছু হবে। কুইলো দন্ডটা হাতে তুলে নিয়ে কী যেন নির্দেশ দিলেন সেই লোকটাকে। লোকটা মাথা নেড়ে সুসানকে নিয়ে নীচে নেমে এল। এরপর ওপরে ডাক পড়ল হুইকোর। সে ওপরে উঠে ইল্লাপার সঙ্গে কথা বলে ফিরে এসে নীচে দাঁড়িয়ে থাকা কনডোরের পালক গোঁজা লোকটাকে দেখিয়ে মার্কেজকে বলল, ‘ও আপনাদের থাকার জায়গাতে নিয়ে যাবে এখন।’ তারপর সে পিনচিওর উদ্দেশ্যে বলল, ‘আপনাকে এখানেই দাঁড়াতে বলেছেন ইনকা পুরোহিত।’

পিনচিও তার কথা শুনে সুজয়দের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তাহলে আপনারা যান। আমিও যেতে পারলে ভালো হত। সারদিন যা ধকল গেছে, বিশ্রামের দরকার। কিন্তু ইল্লাপার কথা না-শুনলে তিনি আবার রাগ করবেন।’

মার্কেজ বললেন, ‘ঠিক আছে আমরা তাহলে এগোচ্ছি।’

হুইকো এরপর যে দুটো লামার পিঠে সুজয়দের মালপত্র আছে সে দুটো লামাকে টেনে এনে তাদের দড়ি ধরিয়ে দিল কনডোরের পালক গোঁজা লোকটার হাতে। সে দড়িটা হাতে নিয়ে ইশারায় সুজয়দের তাকে অনুসরণ করতে বলল। ইনতিহুয়ানাতাকে বেড় দিয়ে একটা রাস্তা ধরল সে। পথের দু-পাশে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন নগরীর নানা চিহ্ন। কোথাও ছাদহীন জ্যামিতিক আকৃতির ঘর, কোথাও কারুকাজ করা তোরণ বা প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ, কোথাও বা পথের পাশে একলা দাঁড়িয়ে থাকা স্তম্ভ। দ্রুত সন্ধ্যা নেমে আসতে শুরু করেছে প্রাচীন নগরীর বুকে। দু-পাশের প্রাচীন সৌধগুলো ভৌতিক আকার নিচ্ছে। খন্ডহর নগরীর আনাচেকানাচে অন্ধকার জেগে উঠছে। মার্কেজ লামা নিয়ে চলা লোকটাকে কুয়েচুয়াতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখানে এখনও কত লোক থাকে?’ লোকটা মনে হয় তাঁর কথা বুঝতে পারল না, সে চুপচাপ চলতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর লোকটা সুজয়দের নিয়ে উপস্থিত হল এটা পাথুরে চত্বরে। সে চত্বরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটা স্তম্ভ। আর তাকে বেষ্টন করে দাঁড়িয়ে আছে কাঠের ছাদঅলা সারসার পাথুরে ঘর। হাতে বর্শা নিয়ে বেশ কয়েকজন ইনকা পুরুষ উপস্থিত আছে সেখানে। দুটো লোক জ্বলন্ত মশাল গুঁজছে দেওয়ালের খাঁজে। কনডোরের পালক গোঁজা লোকটা সুজয়দের নিয়ে ঢুকল একটা ঘরে। ভিতরে মশাল জ্বলছে। লোকটা ইশারাতে বুঝিয়ে দিল এ ঘরটাই সুজয়দের থাকার জায়গা। এরপর লামা দুটোর পিঠ থেকে মালপত্র খুলে সেগুলো ঘরে ঢুকিয়ে বিদায় নিল সে।

বেশ বড়ো ঘর। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কাঠের সিলিং, মেঝেতে মাদুর পাতা। একটা গরাদহীন জানলা আছে ঘরে। চারপাশে তাকিয়ে বিল বলল, ‘এদের অতিথিশালাটা দেখছি মন্দ নয়! রাতে ভালো করে ঘুমানো যাবে।’

ঘুমের কথা শোনার পরই সুসান তার হাতে ধরা মালা আর সুতলির গোছটা তার দাদুর হাতে দিয়ে বলল, ‘এগুলো রাখো, আমি এখন ঘুমোব।’ এরপর সে গিয়ে শুয়ে পড়ল মাদুরে।

সুজয়রা এরপর ব্যাগ থেকে জামাকাপড় বার করে পোশাক পরিবর্তন করে নিল। জামাকাপড় পালটিয়ে মার্কেজ সুসানের দেওয়া জিনিস দুটো নিয়ে মশালের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। সবুজ মালাটা মশালের আলোতে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘মালার পাথরগুলো সম্ভবত ‘আনকাট এমারেল্ড!’ সুজয় শুনে আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘তাহলে তো মালাটার অনেক দাম হবে।’

মার্কেজ তাঁর সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, তা হয়তো হবে। আর এর যদি কোনো অ্যান্টিক ভ্যালু থাকে তবে আরও বেশি দাম হবে।’

বিল হঠাৎ তাকে প্রশ্ন করল, ‘পিজরো তার সঙ্গীকে যে হাঁসের ডিমের মতো পান্না দিয়েছিলেন, তা যদি খুঁজে পাওয়া যায় তবে তার দাম কত হবে?’ প্রফেসর হেসে বললেন, ‘যদিও আমি রত্ন বিশেষজ্ঞ নই, তবে একটা বইতে পড়েছিলাম ওরকম আকারের পান্নার বিনিময়ে অনায়াসে একটা এরোপ্লেন বা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ছোটোখাটো একটা দ্বীপ পাওয়া যেতে পারে। ওর রত্ন মূল্য আর অ্যান্টিক মূল্য দুটোই অসাধারণ।’

বিল শুয়ে পড়ে বলল, ‘ওরকম একটা রত্ন যদি পেতাম, তাহলে বনেবাদাড়ে ক্যামেরা কাঁধে আমাকে আর ঘুরে বেড়াতে হত না।’ তার কথা বলার ভঙ্গি দেখে সুজয় আর মার্কেজ হেসে ফেলল।

মালাটা দেখার পর মার্কেজ সুতলির গোছাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। তাঁর মুখ দেখে সুজয়ের মনে হল তিনি যেন পান্নার মালাটার চেয়ে সুতলির গোছাটার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়েছেন। বেশ কিছুক্ষণ ধরে সেটা দেখার পর মার্কেজ বললেন, ‘আশ্চর্য! সাদা রঙের সুতোর আড়ালে একটা সোনালি আর তিনটে বেগুনি সুতো কেন?’

সুজয় মার্কেজের কাছে গিয়ে বলল, ‘তার মানে?’

তিনি সুতোগুলো দেখিয়ে বললেন, ‘এটা হল একটা খিপু। সাদা সুতোর অর্থ হল শান্তি বা আতিথেয়তা। এটা বুঝতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু যতটুকু জানি, সোনালি সুতো দিয়ে ‘রাজা বা রাজবংশধর’ আর বেগুনি সুতো দিয়ে ‘রাজবন্দি’ বোঝানো হোত।’ এই দু-রঙের সুতো খিপুতে কেন। ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না।’ এরপর তিনি সুতোর গোছা আর মালাটা পকেটে রেখে বললেন, ‘হয়তো ওই দুটো রঙের অন্য কোনো অর্থও থাকতে পারে। আমার তো সামান্য পুঁথিগত বিদ্যা। বইতে ভুলও জানা হতে পারে। তবে খিপু সম্বন্ধে যদি এদের কাছে ভালো করে জেনে নেওয়া যায়, তাহলে সেটাও বিরাট কাজ হবে ঐতিহাসিক মহলে। কারণ, এখনও সব খিপুর পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি।’

মার্কেজ এরপর আর কোনো কথা না-বলে মাদুরের ওপর শুয়ে পড়লেন। সুসান ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। সুজয়ও শুয়ে পড়ল তার পাশে।

প্রায় এক ঘণ্টা পর সুজয়দের ঘরে ঢুকলেন পিনচিও। তাকে দেখে উঠে বসল সকলে। সুজয় তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘এতক্ষণ কি ইনতিহুয়ানাতার ওখানেই ছিলেন?’

পিনচিও পকেট থেকে রুমাল বার করে ঘাম মুছে বললেন, ‘ওখান থেকে ইনকা পুরোহিতের সঙ্গে আমি কুইলোর প্রাসাদের দিকে গেছিলাম। ওর কাছাকাছি একটা জায়গাতে আমার আর হুইকোর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আর ইনকা পুরোহিত থাকবেন কুইলোর প্রাসাদে।’

মার্কেজ প্রশ্ন করলেন, ‘ইনকা পুরোহিতের যেখানে যাবার কথা, তার উদ্দেশ্যে কি তিনি কালই রওনা হবেন?’

পিনচিও বললেন, ‘হ্যাঁ, তাই তো শুনলাম। তবে আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে না। সব ব্যবস্থা তিনি করে যাচ্ছেন।’ এই বলে হাসলেন তিনি। মার্কেজ এরপর জানতে চাইলেন, ‘আপনি তো অনেকক্ষণ সময় বাইরে ছিলেন, তা কী কী দেখলেন?’ কুইলো লোকটা কেমন?

পিনচিও বললেন, ‘অন্ধকারে তেমন কিছু ভালোভাবে বুঝতে পারলাম না। ভাঙাচোরা ঘর-বাড়ি মন্দির সব ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তবে শুনলাম অনেক কিছুই, অবশ্য তা সবই প্রায় হুইকো আর ইনকা পুরোহিতের মাধ্যমে। এখানে নাকি সূর্যকন্যাদের আবাস, অপরাধীকে পুড়িয়ে মারার স্তম্ভ, এসব কিছুই সত্যি সত্যি আছে। দেবতা ইনতি আর বিচামার উদ্দেশ্যে নরবলিও নাকি হয় এখানে। নগরীতে প্রায় পাঁচশো জন লোক বাস করে। ইনকাদের প্রাচীন নিয়ম মেনেই তাদের জীবনযাত্রা পরিচালিত হয়। আর কুইলো লোকটাকে ভদ্র-সভ্য বলেই মনে হল। তবে তাঁর ‘ন’-জন স্ত্রী, সাতাশ জন সন্তান! স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তিনি সূর্যমন্দিরের পাশে তাঁর প্রাসাদে থাকেন।’

মার্কেজ শুনে বললেন, ‘বাঃ, এর মধ্যেই তো আপনি অনেক খবর সংগ্রহ করে ফেলেছেন!’

পিনচিও হাসলেন। তারপর বললেন, ‘এবার আসল খবরটা বলি, কুইলো আজ রাতে তার প্রাসাদে আমাদের সকলকে খাবার নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বিল তার কথা শুনে উৎফুল্ল হয়ে বলল, ‘এতো দারুণ ব্যাপার! তাঁর ‘ন’ জন স্ত্রী যখন তাহলে নিশ্চই ন-টা পদ রান্না হবে! আমার তো এখনই খিদে পাচ্ছে। তা কখন যেতে হবে সেখানে?’

তিনি জবাব দিলেন, ‘একটু পরেই। আমার সঙ্গে একজন রক্ষী এসেছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সে নিয়ে যাবে।’

এরপর আরও কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন তিনি, কিন্তু ঘরের মধ্যে হঠাৎ এসে প্রবেশ করল হুইকো। সবার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে সে মার্কেজের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল, ‘আমাদের সঙ্গে যে বুড়ো লামাঅলাটা ছিল, সে কি এখানে এসেছিল?’

মার্কেজ বললেন, ‘না তো।’

পিনচিও জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন?’

হুইকো একটু ইতস্তত করে বলল, ‘ইনতিহুয়ানাতা চত্বর থেকে কোন ফাঁকে যেন উধাও হয়ে গেছে বুড়োটা। তাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। তাই দেখতে এলাম যদি এখানে এসে থাকে।’

পিনচিও বললেন, ‘লোকটা পালিয়ে গেল না তো! ভারি পাজিতো লোকটা!’

হুইকো তাঁর কথার জবাবে শুধু বলল, ‘আপনারা কুইলোর প্রাসাদে আসুন, আমি আসছি।’ এই বলে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। পিনচিও স্বগতোক্তির স্বরে বললেন, ‘বুড়োটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। পালাতে গেলে জঙ্গলে বেঘোরে মারা পড়বে।’

সুসান ঘুমিয়ে পড়েছে। তার দিকে তাকিয়ে মার্কেজ পিনচিওকে বললেন, ‘ও তো ঘুমোচ্ছে। সারা দিন অনেক ধকল গেছে, একটা কাজ করলে হয় না, বিল আর সুজয় আপনার সঙ্গে ভোজ খেতে যাক, আমি না-হয় এখানে সুসানকে নিয়ে এখানে থাকি!’

তাঁর কথা শুনেই পিনচিও বলে উঠলেন, ‘না না, আপনাকে সেখানে যেতেই হবে। কুইলো না-হলে কুপিত হতে পারেন। তা ছাড়া ইনকা পুরোহিত আপনার সঙ্গে কী একটা জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চান।’

মার্কেজ বললেন, ‘ঠিক আছে, তাহলে তো যেতেই হবে।’ এরপর তিনি সুসানকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সুজয়রা ঘর ছেড়ে বাইরে বার হল। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল বর্শা হাতে একজন ইনকা রক্ষী। সুজয়দের নিয়ে চলতে শুরু করল সে। মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে। তার আলো ছড়িয়ে পড়েছে ভগ্নপ্রায় সৌধগুলোর মাথায়। তাদের জঠরে বিরাজ করছে জমাটবাঁধা অন্ধকার। মাঝে মাঝে ছোটোছোটো চত্বরে মশাল হাতে পাহারা দিচ্ছে ইনকা রক্ষীরা। বেশ কিছুটা এগোবার পর পথের পাশে বিরাট একটা মন্দির জাতীয় স্থাপত্য। তার চুড়ো ধসে পড়েছে, সামনে চত্বরে বেশ কয়েকটা স্তম্ভ চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে। পাশ দিয়ে যাবার সময় মিস্টার পিনচিও বললেন, ‘এটা হল প্রাচীন নগরীর সূর্যমন্দির। এই চত্বরেই নকি ওই স্তম্ভগুলোর সঙ্গে বেঁধে শত্রুদের পুড়িয়ে মারা হয়।’

মার্কেজ বললেন, ‘কাল তাহলে এখান থেকেই দেখা শুরু করব আমরা। নিশ্চই এখানে অনেক প্রাচীন হুয়াকা আছে!’

মন্দির থেকে একটু এগোতেই একটা আলোকিত চত্বরে এসে উপস্থিত হল সবাই। বর্শাধারী বেশ কয়েকজন রক্ষী সেখানে পদচারণা করছে। তার একপাশে বেশ বড়ো একটা পাথুরে বাড়ি। কাঠের ছাদ। বাইরের দেওয়ালে মশাল গোঁজা। কুইলোর প্রাসাদ।

প্রাসাদের দরজার দু-পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুজন ভীষণ দর্শন আমাজনীয় রক্ষী। নিশ্চল পাথরের মূর্তি। তাদের পাশ কাটিয়ে প্রাসাদের মধ্যে প্রবেশ করল সুজয়রা। তাদের সঙ্গের লোকটা কয়েকটা নীচু ছাদঅলা ঘর পার হয়ে তাদের নিয়ে উপস্থিত হল লম্বাটে ধরনের একটা হল ঘরের মধ্যে। ঘরটা মশালের আলোতে আলোকিত। মেঝেতে মাদুর পাতা। মাথার ওপরের সিলিংয়েও মাদুরের আচ্ছাদন। ঘরের শেষ মাথায় একটা নীচু বেদীর ওপর বসে আছেন ইল্লাপা আর কুইলো। সঙ্গের লোকটা সুজয়দের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে চলে গেল। তারা সেই বেদীর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ইল্লাপা ইশারায় তাদের সেখানে বসতে বললেন। তাদের থেকে একটু দূরত্ব রেখে সুজয়রা বসল বেদীতে। কুইলো একবার সকলকে ভালোভাবে দেখলেন। তারপর ইল্লাপার কানে কানে কী একটা কথা বলে সুজয়দের উদ্দেশ্যে দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলতে শুরু করলেন। মিনিট তিনেক বলার পর থামলেন তিনি। তারপর মাথা দোলাতে লাগলেন।

মার্কেজ ইনকা পুরোহিতকে বললেন, ‘উনি আমাদের উদ্দেশ্যে কী বললেন? ভাষাটা আমাদের বোধগম্য হল না।’

ইল্লাপা, শাসনকর্তা কুইলোর বক্তব্যের যা তর্জ্জমা করে দিল তা মোটামুটি হল এই,—‘প্রাচীন ইনকা নগরীর শাসনকর্তা ও প্রধান পুরোহিত কুইলো এ নগরীতে বিদেশিদের স্বাগত জানাচ্ছে। বিদেশিরা নোংরা ও ঘৃণ্য জীব। ইনতি পুত্রদের ধর্ম নষ্ট করো তোমরা। ইনতির পবিত্র গ্রামের ওপর তোমাদের দারুণ লোভ। সেই লোভে তোমরা সূর্যপুত্র আতাহুয়ালাপাকে ফাঁসি দিয়েছিলে, টুপাক আমরুর মুন্ড কেটে নিয়েছিলে। তাঁদের আত্মারা যেন তোমাদের পুড়িয়ে মারেন। আমরা বিদেশিদের এ নগরীতে প্রবেশ করতে দিই না। দৈবাৎ কেউ এখানে পা রাখলে তাকে ইনতিহুয়ানাতে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হয়। কিন্তু তোমরা কুজকো করিকাঞ্চার মহান পুরোহিতের সঙ্গী। তাই তোমরা আমার অতিথি। আমি তোমাদের রাজকীয় ভোজে আপ্যায়িত সম্মানিত করছি।’

কুইলোর বক্তব্য শুনে বিল মার্কেজকে চাপা স্বরে বলল, ‘নিমন্ত্রণ কর্তা স্বাগত ভাষণটাতো চমৎকার! কিছুই বলতে আর বাকি রাখলেন না!’ মার্কেজ গম্ভীরভাবে বললেন, ‘ওঁর কথা শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি কথাই বলেছে ও। এই সুমহান প্রাচীন সভ্যতাকে বিদেশিরাই নির্মমভাবে ধ্বংস করেছিল স্বর্ণ আহরণ আর ধর্মপ্রচারের অভিলাষে।’

মিনিটখানেক সবাই এরপর চুপচাপ বসে রইল, তারপর বিরাট একটা বারকোষ হাতে ঘরে ঢুকল একজন লোক। তার মধ্যে দুটো পাত্রে খাদ্যদ্রব্য রাখা। বারাকোষটা নিয়ে লোকটা কুইলোর সামনে এসে দাঁড়াল। কুইলো পাত্র দুটোতে ডান হাতের কড়ে আঙুল ছুইয়ে তা জিভে ঠেকাবার পর লোকটা বারকোষটা সরিয়ে নিয়ে গিয়ে ঘরের এককোণাতে মশালের কাছে মাটিতে নামিয়ে রাখল। ইনকা পুরোহিতকে এবার কী যেন বললেন কুইলো। তিনি কথাটা সুজয়দের অনুবাদ করে দিলেন,—‘শাসনকর্তা খাবারের আস্বাদ গ্রহণ করলেন, অতিথিরা যেন এবার খাওয়া শুরু করে।’

সুজয়রা বেদী ছেড়ে গিয়ে বসল ঘরের কোনায় বায়কোষের কাছ। বিল যা ভেবেছিল, সেই কুইলোর নয় রানির রান্না করা নয়টি পদ সেখানে নেই। রাজকীয় ভোজ বলতে একটা পাত্রে রাখা আছে সেদ্ধ আলু জাতীয় কন্দ, আর একটাতে কীসের যেনও ঝলসানো মাংস! বেশ খিদে পেয়েছিল সকলের। তারা খেতে শুরু করল। খাবার মুখে তোলার পর সুসান হঠাৎ বলে উঠল, ‘আচ্ছা এই বাটিগুলোও কি সোনার?’ তার কথা শুনে পাত্র দুটোর দিকে ভালো করে তাকাতেই চমকে উঠল সবাই। এতক্ষণ কেউ খেয়াল করেনি, পাত্রদুটো সম্ভবত সত্যিই সোনা দিয়ে তৈরি! বিল একটা পাত্র মশালের দিকে উঁচু করে ধরতেই তার কানটা ঝিলিক দিয়ে উঠল! এরপর মুহূর্তেই কিছুদূরে বসে থাকা কুইলোর সাথে চোখাচোখি হল বিলের। প্রাচীন সভ্যতার রক্ষক কুইলোর চোখে যেন ফুটে উঠেছে একটা হাসি। সে হাসি যেন বিদ্রূপ করছে আধুনিক সভ্যতার প্রতিনিধিদের! পাত্রটা বিল নামিয়ে রাখল।

মার্কেজ বললেন, ‘এ জাতীয় স্বর্ণপাত্র কোনো মিউজিয়ামে নেই! পিজরো বাহিনী শুধু স্বর্ণ লুন্ঠন আর ইনকা সম্রাটদের হত্যাই করেনি। লুন্ঠিত সব স্বর্ণ সামগ্রী গলিয়ে তারা সোনার বাটে পরিণত করেছিল। এটাও তাদের কম বড়ো অপরাধ নয়!

তার কথা শোনার পর সুজয় প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা কুইলো তার বক্তব্যে যে টুপাক আমরুর কথা বললেন, তিনি কে ছিলেন?’

প্রফেসর খেতে খেতে বললেন, ‘তিনি ছিলেন ইনকা সম্রাট, যিনি মাতৃভূমিতে ইনকাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার করার জন্য স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। আত্মসমর্পণ করলে তার মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে এই আশ্বাসে পরাজিত সম্রাট ধরা দেন স্পেনীয়দের হাতে। কিন্তু প্রবঞ্চক স্পেনীয়রা কথা রাখেনি। টুপাক আমরুকে সোনার শিকলে বেঁধে কুজকোতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর বিচারের নামে এক প্রহসন হয়। ‘দিয়েগো ওর্তি’ নামের এক ধর্মযাজক হত্যার মিথ্যা অপবাদে ১৫৭২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর শিরচ্ছেদ করা হয়।’

এরপর একটু থেমে তিনি সুজয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তাঁকে যখন বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তখন হাজার জনতা পরিবৃত বধ্যভূমির জল্লাদের উদ্যত খড়্গর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি শেষ, যে কথা বলেছিলেন তা হল, ‘ককোল্লান পাচাকামাক রিকুই আউক্কাকুনাক ইয়াহুয়ারনি হি চাস কান কুতা!’ অর্থাৎ, ‘হে আমার মাতৃভূমি, তুমি দেখো শত্রুরা তোমার সন্তানের কীভাবে রক্ত ঝরাচ্ছে!’

মার্কেজ হয়তো এরপর আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ঘরের ভিতর প্রবেশ করল হুইকো, সকলের দৃষ্টি চলে গেল তার দিকে। সে এসে মুহূর্তের জন্য দাঁড়াল সুজয়দের কাছে। পিনচিও তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি লোকটাকে খুঁজে পেলে?’

সে শুধু জবাব দিল, ‘না,’ তারপর সে সোজা ইল্লাপার দিকে এগিয়ে গিয়ে চাপাস্বরে কী বলতে শুরু করল!’

খাওয়া শেষ হবার পর আবার বেদীর কাছে ফিরে এল তারা। ইল্লাপা বসতে বললেন সকলকে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে হুইকো। বিশাল বপু কুইলো তাকিয়ে আছেন তাদের দিকে। বিশেষত সুসানকে যেন লক্ষ করছেন তিনি। এক জন ভৃত্য গোছের লোক সুজয়দের সামনে পানীয় ভর্তি বেশ কয়েকটা পাথরের গেলাস এনে রাখল।

মার্কেজ গেলাসগুলো দেখে ইল্লাপার দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, ‘চিচা’, পান করুন।’

‘চিচা কী?’ জানতে চাইল বিল।

মার্কেজ বললেন, ‘ইনকাদের প্রিয় পানীয়। বিভিন্ন ফলের বীজ থেকে তৈরি হয়। সাধারণত মাদকহীন। প্রাচীনকালে সূর্যদেবের উৎসবের সময় ইনকা সম্রাট প্রজাদের সাথে একসাথে বসে চিচা পান করতেন।’ কথাগুলো বলে কৌতূহল ভরে একটা গেলাস তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দিলেন তিনি। সুজয়ও একটা গেলাসে চুমুক দিল। পানীয়টা অনেকটা ঘোলের মতো। বেশ মিষ্টি মিষ্টি স্বাদ! বিলও পান করে বলল, স্বাদটা মন্দ নয়। শুধু পিনচিও গেলাসটাতে একটা চুমুক দিয়ে সেটা নামিয়ে রেখে বললেন, ‘আপনারা যাই বলুন, আমার কিন্তু স্বাদটা ভালো লাগল না। এক চুমুকেই গা গোলাচ্ছে। সম্রাটরা যে কীভাবে চিচা পান করতেন কে জানে!’

চিচা পান শেষ হবার পর মার্কেজ ইল্লাপার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনিতো কালই চলে যাবেন তাই না?’

ইনকা পুরোহিত জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ। কাল ভোরেই ইনতিহুয়ানাতা চত্বরে লামাবলি দিয়ে যাত্রা শুরু করব।’

মার্কেজ এরপর তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি যেখানে যাবেন সে জায়গাটা কত দূর?’

ইল্লাপা জবাব দিলেন, ‘আরও দু-দিনের পথ।’ এরপর একটু চুপ করে থেকে ইনকা পুরেহিত মার্কেজের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, ‘এ ব্যাপারে আপনার সঙ্গে আমি একটা আলোচনা করতে চাই।’

কী আলোচনা? ‘সেখানে আপনি আমাদের নিয়ে যাবেন?’ সাগ্রহে প্রশ্ন করলেন মার্কেজ।

ইনকা পুরোহিত বললেন, ‘না, সেখানে আপনাদের নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে এক বিশেষ প্রয়োজনে আমি আপনার সঙ্গের বাচ্চা ছেলেটাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই। আপনারা এই প্রাচীন নগরী ভালো করে দেখে বেড়ান, কুইলোর সব রকম সাহায্য পাবেন। চার দিন পর বাচ্চাটাকে নিরাপদে এখানে ফিরিয়ে আনব আমি। তারপর সকলে একসঙ্গে কুজকোতে ফিরব।’

ইনকা পুরেহিতের প্রস্তাব শুনে মার্কেজসহ সুজয়রা হতভম্ব হয়ে গেল।

ইল্লাপা আবার বললেন, ‘আপনার আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। কুজকো করিকাঞ্চার পুরোহিত যার সঙ্গে থাকে মৃত্যুদেব বিচামাও তাকে স্পর্শ করে না। মহান ইনতি সর্বদা তাকে রক্ষা করেন।’

প্রফেসর মার্কেজ এবার বিস্ময়ের ঘোর কটিয়ে উঠে বললেন, ‘আমি দুঃখিত ইনকা পুরোহিত। একটা অসম্ভব প্রস্তাব করে বসলেন আপনি। এইটুকু ছেলেকে আমি এখানে কোনোভাবেই কাছছাড়া করতে পারব না। এমনিতেই আমার পথে বার বার মনে হচ্ছিল, ওর মতো বাচ্চাকে এ পথে আনা উচিত হয়নি।’ এই বলে ব্যাপারটাকে একটু হালকা করার জন্য ঠোঁটের কোণায় হাসি ফুটিয়ে তুললেন প্রফেসর।

ইনকা পুরোহিত কিন্তু হাসলেন না। গম্ভীরভাবে তিনি বললেন, ‘আপনারা যেখানে এসেছেন এ জায়গাতে আমি না-নিয়ে এলে আপনাদের আসা সম্ভব হত না। গত কয়েক শতাব্দীর মধ্যে কোনো বিদেশি এ মাটিতে পা রাখেনি। দু-এক জন যারা এ নগরীর কাছাকাছি পৌঁছেছিল তারা আর ফিরে যায়নি, আপনারা সৌভাগ্যবান, এ নগরী দেখে নিরাপদে আবার ফিরবেন আপনারা। কিন্তু তার পরিবর্তে আমাকে আপনারা সাহায্য করবেন না?’

মার্কেজ বললেন, ‘আপনি না-নিয়ে এলে এখানে আমার আসা হত না, এ ব্যাপারের জন্য সত্যি সত্যি আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আপনাকে আমার সাধ্যমতো অন্য যেকোনো ধরনের সাহায্য করতে আমি রাজি আছি। কিন্তু আপনার এ প্রস্তাব মানা, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি আমাকে আর এ ব্যাপারে অনুরোধ করবেন না।’ শেষ কথাগুলো বেশ একটু দৃঢ় ভাবেই বললেন মার্কেজ।

সুজয়ের মনে হল মার্কেজের কথা শুনে মুহূর্তের জন্য যেন দপ করে জ্বলে উঠল ইনকা পুরোহিতের চোখ। ক্রুদ্ধভাবে কী যেন বলতে গিয়েও শেষমুহূর্তে নিজেকে যেন সংযত করে নিলেন তিনি। বেশ কিছুক্ষণ সময় কারো মুখে কোনো কথা নেই। কুইলো চোখ বন্ধ করে দুলে চলেছেন। ইল্লাপা স্থির-দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মার্কেজের দিকে। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে হুইকো চোখের কোটোর থেকে পাথরের চোখটা বার করে গম্ভীর ভাবে সেটা হাতের তেলোতে ঘোরাচ্ছে। সুসান একটু ভয় পেয়ে তাকাল সুজয়ের দিকে। সুজয় তার পিঠে হাত রাখল।

শেষপর্যন্ত নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে ইল্লাপা বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনারা এখন বিশ্রাম গৃহে ফিরে যান। তবে আমার কথা শুনলে ভালো করতেন।’ একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল ইনকা পুরোহিতের ঠোঁটের কোণে।

মার্কেজ আর কথা বাড়ালেন না। সুসান বিল আর সুজয়কে নিয়ে বেদী ছেড়ে উঠে তিনি ঘরের বাইরে এগোলেন। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল সেই লোক, যে তাদের পিনচিওর সঙ্গে এখানে এনেছিল। তার সঙ্গে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে সুজয়রা তার পিছন পিছন হাঁটতে শুরু করল।

তাদের পথপ্রদর্শক আগে। একটু তফাতে সুজয়রা। চত্বরের মশালের আলোগুলো নিভে গেছে। চাঁদের আলোয় নীচে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন নগরীর ভগ্নপ্রায় সৌধগুলো। মাঝে মাঝে পথের পাশে দু-একটা গাছ। তারা যেন এ নগরীর রক্ষক প্রাচীন প্রেতাত্মা! তার নীচে জমাট বাঁধা অন্ধকার। সবাই চুপচাপ চলছে। একসময় বিল মৌনতা ভঙ্গ করে বলল, ‘ইল্লাপার প্রস্তাবটা বড়ো অদ্ভুত ছিল তাই না! আচ্ছা সুসানকে ইনকা পুরোহিত তার সঙ্গে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন কেন?’

এ প্রশ্নটা সুজয়ের মাথাতেও ঘুরপাক খাচ্ছে। মার্কেজ জবাব দিলেন, ‘জানি না।’

তারপর একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘ইল্লাপা কিন্তু অসন্তুষ্ট হলেন আমাদের প্রতি। কিন্তু তাঁর বোঝা উচিত তাঁর ওই প্রস্তাবে সায় দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’

বিল এবার বলল, ‘একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করলেন!, মিস্টার পিনচিও কিন্তু কোনো কথা না -বলে চুপচাপ বসে রইলেন! পিনচিও আর হুইকোর আচরণও একটু অদ্ভুত। আমাদের আড়ালে বেশ কয়েকবার ইল্লাপার সঙ্গে তাদের পরামর্শ করতে দেখেছি। তারা যেন কোনো কিছু গোপন করছেন আমাদের থেকে।’

সুজয় বলল, ‘আমিও ব্যাপারটা লক্ষ করেছি!

সুসান এবার হঠাৎ বলে উঠল, ‘আমি যখন মাথায় পালক গোঁজা পুরোহিতের কাঁধে চেপে যাচ্ছিলাম তখন পিনচিও আঙ্কল আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, বাবা-মা কে ছেড়ে আমার এখানে থাকতে মনে কষ্ট হচ্ছে কিনা?’

আমি বললাম, কষ্ট হবে কেন? আমিতো বড়ো হয়ে গেছি! বেড়াতে আমার ভালো লাগছে। তা ছাড়া দাদুওতো সঙ্গে আছে।

এরপর তিনি আমাকে বললেন, ‘ধরো, যদি কেউ তোমাকে এমন কোনো জায়গাতে বেড়াতে নিয়ে যায়, যেখানে দাদুও তোমার সঙ্গে নেই তাহলে থাকতে পারবে তুমি?’—এই কথা বলে সুসান চুপ করে গেল।

তার কথা শুনে একটু অবাক হয়ে মার্কেজ বললেন, ‘কই, কথাটা তুমি আমাকে বলোনি তো! তা তুমি কী উত্তর দিলে? আর কী জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি?’

সুসান জবাব দিল। ‘আমি বললাম, ‘আমিতো বড়ো হয়ে গেছি থাকতে পারব। তবে দাদুর জন্য একটু মন খারাপ হবে।’ এরপর আমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি পিনচিও আঙ্কল।’

তার কথা শুনে বলল, ‘ওর কথা শুনে আমার মনে হচ্ছে মিস্টার পিনচিও, ইনকা পুরোহিতের প্রস্তাবের ব্যাপারটা জানতেন! ব্যাপারটার মধ্যে কোথায় যেন একটা গোলমাল আছে!’

প্রফেসর একটু চিন্তান্বিত ভাবে বললেন, ‘যাই হোক আমরা যতদিন না-ফিরে যাচ্ছি ততদিন আচার ব্যবহারে ওঁদেরকে খুশি রাখতে হবে। ওরা পথ না-দেখালে আমরা এখান থেকে ফিরতে পারব না।’

এরপর কেউ আর কোনো কথা বলল না। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণের মধ্যে তারা পৌঁছে গেল তাদের থাকার জায়গাতে।

১১

বিলের ধাক্কায় ঘুম ভাঙল সুজয়ের। ভোরের নরম আলো খোলা দরজা দিয়ে প্রবেশ করেছে ঘরের ভিতর। চোখ কচলে উঠে বসতেই সুজয় দেখল তার সামনে পাংশু মুখে দাঁড়িয়ে আছেন মার্কেজ। তিনি যেন কী বলতে গেলেন সুজয়কে। কিন্তু গলা বুজে এল। থরথর করে কাঁপতে লাগলেন তিনি। সুজয় কিছু বুঝতে না-পেরে ফিরে তাকাল বিলের দিকে। তার মুখ গম্ভীর। সুজয় তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’

সে জবাব দিল, ‘সুসানকে খুঁজে পাচ্ছি না!’

সুজয় অবাক হয়ে বলল, ‘তার মানে?’

সে বলল, ‘মিনিট চল্লিশেক আগে ঘুম ভাঙে প্রফেসরের। তখনও ভোরের আলো ভালো করে ফোটেনি। তিনি উঠে দেখেন সুসান পাশে নেই। প্রথমে ওঁর মনে হয় সুসান হয়তো বাথরুম করতে গেছে। কিন্তু মিনিট পাঁচেক পরও সুসান ঘরে না-আসায় উনি ঘরের বাইরে যান ওকে খুঁজতে। বাইরে তাকে খুঁজে না-পাওয়ায় উনি ফিরে এসে আমাকে ডেকে তোলেন। তারপর আধ ঘণ্টা ধরে আমরা বাড়িটার চারপাশে যতটা সম্ভব পারা যায় খুঁজেছি ওকে, কিন্তু কোথাও সে নেই!’

সুজয় কিছুক্ষণ ঘটনার আকস্মিকতায় নির্বাক হয়ে বসে রইল। কম্পিত হাতে মাথা চেপে দাঁড়িয়ে আছেন মার্কেজ। বিলের মুখেও আর কোনো কথা নেই।

একটু ধাতস্ত হয়ে সুজয় বলল, ‘এমনও তো হতে পারে যে সুসান ভোরবেলায় হাঁটতে হাঁটতে এই প্রাচীন নগরীর গোলক ধাঁধায় হারিয়ে গেছে। তারপর আর পথ চিনে ফিরতে পারছে না। আপনারা তো শুধু এই বাড়িটার আশেপাশে খুঁজেছেন, ও রাস্তা ধরে অন্য কোথাও চলে গিয়ে থাকলে? অনেক সময় বাচ্চাদের মনে নানারকম খেয়াল চাপে!’

মার্কেজ এবার কাঁপা কাঁপা স্বরে বললেন, ‘কিন্তু ওর জুতো জোড়া তো ঘরের মধ্যেই আছে! খালি পায়ে ও কতদূর যাবে?’

সুজয় দেখল দরজার পাশে সুসানের জুতোটা রয়েছে। একটু ভেবে নিয়ে সে বলল, ও তো আর উবে যাবে না! নিশ্চই এ নগরীর মধ্যেই পথ হারিয়ে কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে! ওর ভাষা এখানকার কেউ বুঝতে না-পারার কারণে ও ফিরতে পারছে না। আমাদের উচিত ব্যাপারটা এখনই গিয়ে মিস্টার পিনচিও আর হুইকোকে জানানো। তারপর সবাই মিলে তাকে খুঁজে বার করা।

বিল বলল, ‘আমিও এ কথাটাই ভাবছিলাম, মিস্টার পিনচিওর ওখানে এখনই আমাদের যাওয়া দরকার। তিনি তো কুইলোর প্রাসাদের কাছাকাছি আছেন। আর যাবার পথে যদি সুসানকে দেখতে পাই, তাহলে তো সব সমস্যা মিটে গেল।’

সুজয় উঠে দাঁড়িয়ে মার্কেজের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চলুন তাহলে, দেরি করা ঠিক হবে না।’

ঘর ছেড়ে তিন জন বেরিয়ে পড়ল। সূর্যদেব আলো ছড়াতে শুরু করেছেন প্রাচীন নগরীর বুকে। রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে চারপাশে জেগে উঠেছে প্রাচীন ঘরবাড়ি, জীর্ণ স্তম্ভ, সৌধের ধ্বংসস্তূপ। তবে কুয়াশার একটা পাতলা আস্তরণ এখনো যেন রয়েছে তাদের গায়ে। হাঁটতে হাঁটতে সুজয় একবার রিস্টওয়াচের দিকে তাকালো। সাড়ে পাঁচটা বাজে। চারদিকে দেখতে দেখতে আন্দাজ মতো কুইলোর প্রাসাদের দিকে এগোল তারা, এবং একসময় প্রাসাদের কাছে পৌঁছেও গেল।

সেখানে আশেপাশে কুইলোর প্রাসাদ ছাড়া বেশ কয়েকটা বাড়ি রয়েছে। কয়েক জন লোক আর রক্ষী রয়েছে চত্বরে। চারদিকে তাকিয়ে বিল বলল, ‘কিন্তু মিস্টার পিনচিও কোন বাড়িটায় আছেন বুঝব কী করে?’

পরমুহূর্তেই তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। চত্বরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে জোর গলায় হাঁক দিল, ‘মিস্টার পিনচিও আপনি কোথায়?’ তার চিৎকার শুনে চত্বরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন রক্ষীরা তাকাল বিলের দিকে। বিল আবার ডাকল, ‘পিনচিও আপনি কোথায়...?’ দ্বিতীয় বারের চিৎকারে বাড়িগুলোর ভিতর থেকে দু-একজন লোক বাইরে বেরিয়ে এল বটে, কিন্তু পিনচিওর সাড়া মিলল না। কয়েকজন রক্ষী এবার ধীরে ধীরে সুজয়দের কাছে এসে দাঁড়াল। তাদের চোখমুখ দেখে মনে হল, তারাও কিছুটা আশ্চর্য হয়েছে, এই সাতসকালে বিদেশিদের চত্বরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে দেখে! বিল আরও কয়েকবার নিষ্ফলভাবে হাঁকডাক করার পর মার্কেজ একজন রক্ষীর কাছে এগিয়ে গিয়ে কুয়েচুয়া ভাষায় বলল, ‘আমাদের সঙ্গে যে আর একজন বিদেশি এসেছে, সে কোথায় আছে বলতে পারো?’

লোকটা কোনো জবাব দিল না।

মার্কেজ এরপর তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা এখানে কোনো বাচ্চা ছেলেকে দেখেছ?’

সেই রক্ষী এবারও কোনো কথার জবাব না-দিয়ে তাকাল তার পাশের রক্ষীর দিকে।

সুজয়ের মনে হল সম্ভবত তারা বুঝতে পারছে না মার্কেজের কথা। বিল আর মার্কেজ এরপর হাত নেড়ে, কুয়েচুয়াতে তাদের বেশ কিছুক্ষণ ধরে নিজেদের বক্তব্য বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারল না তারা। মার্কেজের উদ্দেশ্যে উদ্ভট ভাষায় একজন রক্ষী কী যেন বলল, তারপর রক্ষীরা ফিরে গিয়ে দাঁড়াল নিজেদের জায়গাতে।

বিল বলল, ‘এভাবে কিছু হবে না। চলুন আমরা কুইলোর প্রাসাদে যাই। হয়তো ওই লোকটা আমাদের কথা অনুমান করতে পারবে!’

সুজয়রা গিয়ে দাঁড়াল শাসনকর্তার প্রাসাদের সামনে। দরজার দু-পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুজন আমাজনীয় রক্ষী। তাদের ভাবলেশহীন মুখ, হাতে ধরা আছে সুতীক্ষ্ণ বর্শা, কাঁধে তির-ধনুক। মার্কেজ তাদের একজনকে বলল, ‘আমরা শাসনকর্তার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’

মার্কেজের কথা শুনে সে একবার শুধু ভুরু কুঁচকালো। তারপর নিস্পন্দ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।

বিল বলল, ‘সম্ভবত এরাও আমাদের কথা বুঝবে না। চলুন আমরা ভিতরে যাই।’ এই বলে সে দরজার দিকে পা বাড়াতে যেতেই আমাজনীয় দ্বাররক্ষী দুজন বর্শার লাঠি দুটো দিয়ে বিলের পথ আটকে দিল।

মার্কেজ কুয়েচুয়াতে তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমাদের ভিতরে ঢুকতে দাও। আমরা শাসনকর্তার অতিথি।’ কিন্তু লোক দুটো পথ ছাড়ল না। বিল ছিল প্রথমে। সে এবার লাঠি দুটো সরিয়ে এগোতে যেতেই বিজাতীয় ভাষায় হিংস্রভাবে চিৎকার করে উঠল তারা। তারপর একজন আমাজনীয় প্রচন্ড জোরে ধাক্কা মারল বিলকে। তার পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিল সুজয় আর মার্কেজ। তিনজনেই ছিটকে পড়ল পাথুরে মাটিতে!

আমাজনীয়দের চিৎকার কানে যেতেই চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা ইনকা রক্ষীরাও ছুটে এল সেখানে। সুজয়রা উঠে দাঁড়াবার আগেই ইনকা রক্ষী আর আমাজনীয় দুজনের তীক্ষ্ণ বর্শা ফলকের ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে গেল তারা। বিল মনে হয় কোমরে হাত দিতে যাচ্ছিল রিভলবারটা বার করার জন্য। কিন্তু তাই দেখে একজন ইনকা রক্ষী এমনভাবে তাঁর বর্শা উঁচিয়ে ধরল যে, সে আর হাত নাড়তে সাহস পেল না।

মাটিতে পড়ে আছে সুজয়রা। তাদের কী করা উচিত তারা বুঝতে পারছে না। ইনকাদের বর্শার ফলাগুলো চারপাশ থেকে উঁচিয়ে ধরা তিনজনের দিকে। সূর্যের আলোতে ঝলমল করছে সেগুলো। এক-একটা মুহূর্ত যেন এক-একটা ঘণ্টা! হিংস্র চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে লোকগুলো। সুজয়ের প্রতি মুহূর্তেই মনে হতে লাগল, এই বুঝি বর্শার ফলাগুলো ছুটে আসবে তাদের দিকে। ঠিক এমন সময় সম্ভবত চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ শুনেই প্রাসাদের ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন কুইলো। তাঁর পিছনে মুখে উলকি আঁকা অস্ত্রধারী আরও দুজন আমাজনীয় দেহরক্ষী।

কুইলো বাইরে আসতেই সুজয়দের ঘিরে ধরা রক্ষীরা তাকাল তাঁর দিকে। শুধু যেন কুইলোর সামান্য ইশারার অপেক্ষা, আর তা পেলেই তারা মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন করে দেবে এই বিদেশিদের।

কুইলো প্রথমে সব কিছু ভালো করে দেখে দুর্বোধ্য ভাষায় রক্ষীদের সরে যাবার নির্দেশ দিলেন। কয়েক পা পিছু হটে সার বেঁধে দাড়াল তারা। সুজয়রা এরপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কুইলো কুতকুতে চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সুজয়দের দিকে। তাঁকে দেখে সুজয়ের মনে হল সম্ভবত সদ্য ঘুম ভেঙেছে তাঁর। মাথায় পালকের সেই বিশাল সাজ এখন তাঁর নেই। কুইলোর উন্মুক্ত ঊর্ধ্বাঙ্গে মাথা শুদ্ধ একটা পুমার চামড়া শালের মতো জড়ানো। প্রাণীটার মাথাটা এমন ভাবে কুইলোর ডান কাঁধে রাখা যে দেখলে মনে হবে একটা মানুষের দুটো মাথা!

সুজয়রা তিনজন উঠে ধুলো ঝেড়ে কুইলোর সামনে দাঁড়াবার পর মার্কেজ তাঁকে কুয়েচুয়াতে বললেন, ‘মিস্টার পিনচিও, তাঁর সঙ্গী হুইকো কোথায় আছে বলতে পারেন? আমাদের দারুণ বিপদ হয়েছে! আমার সঙ্গের বাচ্চা ছেলেটাকে খুঁজে পাচ্ছি না! দয়া করে যদি তাকে খোঁজার ব্যবস্থা করে দেন তাহলে উপকার হয় আমাদের।’

কুইলো মার্কেজের কথা শুনে নিরুত্তর ভাবে তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে!

মার্কেজ আবার একই কথা বললেন তাঁর উদ্দেশ্যে। কুইলোর হাবভাবের কোনো পরিবর্তন হল না। সুজয়রা বুঝতে পারল শাসনকর্তা কুইলোও অন্য ইনকা রক্ষীদের মতোই নিজেদের কথ্য ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বোঝেন না!

অন্যদের মতো এরপর তাঁকেও আকার-ইঙ্গিতে নানাভাবে নিজেদের কথা বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগল সুজয়রা। কিন্তু তাদের কথা মিনিট পাঁচেক ধরে শোনার পরও তা বোধগম্য না-হওয়াতে সম্ভবত ধৈর্যচ্যুতি ঘটল কুইলোর। স্বজাতীয় ভাষায় তিনি রক্ষীদের কী একটা নির্দেশ দিয়ে সুজয়দের দিকে পিছন ফিরে পা বাড়ালেন আবার বাড়ির ভিতরে যাবার জন্য।

প্রফেসর মার্কেজ এবার একটা শেষ চেষ্টা করে তার উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, ‘করিকাঞ্চার পুরোহিত ইল্লাপা কি এখনও আপনার প্রাসাদে আছেন?’

ইল্লাপা নামটা কানে যেতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে মার্কেজের দিকে ফিরে তাকালেন কুইলো। কয়েক মুহূর্ত তিনি তার দিকে তাকিয়ে থেকে দূরে আঙুল তুলে দেখিয়ে শুধু বললেন, ‘ইনতিহুয়ানাতা।’ এরপর আর তিনি দাঁড়ালেন না। ঢুকে পড়লেন প্রাসাদের ভিতর। আমাজনীয় রক্ষী দুজন এসে দরজা আগলে দাঁড়াল। অর্থাৎ, ভিতরে প্রবেশ নিষেধ!

কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন মার্কেজ। সুজয় বলল, ‘কুইলোর কথা শুনে মনে হচ্ছে ইনকা পুরোহিত ইনতিহুয়ানাতার দিকে গিয়েছেন। তার তো ওখান থেকেই যাত্রা শুরু করার কথা। তাড়াতাড়ি ওখানে চলুন। ওকে ধরতে পারলেও কাজ হবে!’

বিলও প্রফেসরকে বলল, ‘ও ঠিকই বলেছে। এখনই ইল্লাপার খোঁজে ওখানে যাওয়া প্রয়োজন। হয়তো মিস্টার পিনচিও আর হুইকোও ওখানেই আছে! তা ছাড়া অন্য একটা ব্যাপারও হতে পারে! সেটা হল...’—বিল তার কথা শেষ না-করেই কার্যত ছুটতে শুরু করল ইনতিহুয়ানাতার দিকে। তার পিছনে সুজয় আর প্রফেসর মার্কেজও এগোল। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল সূর্যস্তম্ভের শীর্ষদেশ। কাজেই সেটা লক্ষ করে এগোতে তাদের অসুবিধা হল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা এসে উপস্থিত হল ইনতিহুয়ানাতা চত্বরে।

চত্বরটা একটা টিলার ওপর অবস্থিত। চারপাশে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ। আর তারপর দিগন্ত ব্যাপী মহারণ্য। ভোরের সূর্যালোক এসে ছড়িয়ে পড়েছে সূর্যস্তম্ভের মাথায়, তার চারপাশে ঘিরে থাকা পাথুরে চত্বরে। কিন্তু সেখানে কেউ নেই, চড়াই জাতীয় ছোটো কয়েকটা পাখি শুধু খেলে বেড়াচ্ছে সেখানে। ধাপ বেয়ে সুজয়রা এসে দাঁড়াল ইনতিহুয়ানাতার বেদিমূলে। চারপাশে অনেকটা জায়গা দেখা যাচ্ছে সেখান থেকে। না, কোথাও চোখে পড়ছে না ইনকা পুরোহিত বা অন্য কাউকে। বিল বলল, ‘ইনকা পুরোহিত সম্ভবত চলে গেছেন। চলুন এবার আমরা সুসানকে নগরের ভিতর খুঁজতে শুরু করি। মিস্টার পিনচিও তো নিশ্চই এই নগরের ভিতরেই কোথাও আছেন।’ প্রফেসর আশাহত হয়ে বললেন, ‘তাই চলো।’

কথাটা বলার পরই মার্কেজ হঠাৎ দু-পা এগিয়ে মাটি থেকে কী একটা ছোট্ট জিনিস কুড়িয়ে নিলেন। মুহূর্তখানেক সেটা ভালো করে দেখে ফ্যাকাশে মুখে হাতের তেলোটা বাড়িয়ে দিলেন সুজয়দের দিকে। একটা ছোট্ট সোনালি রঙের বোতাম!

মার্কেজ অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘সুসানের জামার বোতাম! কাল রাতে ও এ জামাটাই পরেছিল’!

মার্কেজ সম্ভবত এরপর কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বিল হঠাৎ একটু দূরে মাটির দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে উঠল, ‘ওটা কী!?’ তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেখানে তাকাতেই চমকে উঠল সুজয়। একটা লাল রঙের ধারা বেদির ওপাশ থেকে বেদিমূলের ধাপ বেয়ে এদিকে এগিয়ে এসেছে। রক্ত! জমাট বাঁধা রক্তধারা! নির্বাক হয়ে সকলে তাকিয়ে রইল সেদিকে। একটা অশুভ চিন্তা মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করল সুজয়কে! বিলই প্রথম সাহসে ভর করে রক্তধারা অনুসরণ করে বেদির ওপাশে এগিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। ওপাশে বিলের কোনো সাড়াশব্দ নেই! সুজয়ের বুকের ভিতর কেউ যেন হাতুড়ি পিটছে। মার্কেজের মুখ রক্ত শূন্য!

একসময় ওপাশ থেকে বিলের গলার স্বর শোনা গেল, ‘প্রফেসর ভয় পাবেন না, এদিকে আসুন!’

সুজয় আর মার্কেজ তার গলার স্বর শুনে একটু আশ্বস্ত হয়ে বেদির ওপাশে এগিয়ে গেল। তারপর তাদের চোখে পড়ল ব্যাপারটা! ইনকা পুরোহিতের সঙ্গে আনা সেই সাদা রঙের বাচ্চা লামাটা পড়ে আছে মাটিতে। তার কন্ঠনালি ছিন্নভিন্ন! তার দেহ আর চারপাশ লাল হয়ে আছে রক্তে। তার কাছেই এক জায়গাতে ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে আছে কিছু ফুল-পাতা।

কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর মার্কেজ বললেন, ‘সম্ভবত ইনতির উদ্দেশ্যে লামাটাকে উৎসর্গ করা হয়েছে। এই ভাবে টুমি দিয়ে কন্ঠনালি ছিন্ন করে লামা বলি দেয় ইনকারা! তার মানে ইল্লাপা চলে গেছেন, আর তিনিই সম্ভবত সঙ্গে নিয়ে গেছেন সুসানকে! নইলে তার জামার বোতাম এখানে পড়ে থাকবে কেন?’ মার্কেজের কন্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এল, বৃদ্ধ কপাল চেপে ধরে পাথরের ধাপে বসে পড়লেন। সুজয় আর বিল নির্বাক হয়ে রইল।

ভেঙে পড়েছেন প্রফেসর। কিছুক্ষণ পর বিল সুজয়কে বলল, ‘এখন কী করা উচিত বলোতো? ইল্লাপা কোন দিকে গেছেন কিছুই আমাদের জানা নেই। মিস্টার পিনচিও আর হুইকোও তাদের সঙ্গে গেছেন কিনা তাও বুঝতে পারছি না! সুসান যদি সত্যিই ইল্লাপার সঙ্গে গিয়ে থাকে তবে তাকে আমরা কীভাবে খুঁজব?’

সুজয় একটু চিন্তা করে বলল, ‘ইনকা পুরোহিত গতকাল রাতে বলেছিলেন, চারদিন বাদে তিনি আবার সুসানকে নিয়ে এখানে ফিরে আসবেন। এই চারদিন অপেক্ষা করা ছাড়াতো এই মুহূর্তে অন্য কোনো রাস্তা দেখছি না।’

বিল মার্কেজের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে চাপাস্বরে বলল, ‘কিন্তু তারা যদি আর না-ফেরে?’

এ প্রশ্নের জবাব সুজয়ের কাছে নেই। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘এখানে দাঁড়িয়ে থেকে তো কোনো লাভ নেই। তবুও চলো আমরা একবার নগরীর ভিতর সুসানকে খুঁজে দেখি।’

বিল বলল, ‘হ্যাঁ, সেই ভালো।’

সে মার্কেজের কাছে গিয়ে তাঁর কাঁধে হাত রেখে আশ্বাসের সুরে বলল, ‘চলুন প্রফেসর। আমরা দুজনতো আপনার সঙ্গে আছিই। দেখা যাক কী করা যায়। আপনি ভেঙে পড়লে চলবে না। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে।’

তার কথা শোনার পর মার্কেজ পকেট থেকে রুমাল বার করে চশমার কাচ মুছলেন, তারপর বিলের কাঁধে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

বিল সুজয়কে বলল, ‘আমরা প্রথমে এখান থেকে আমাদের থাকার জায়গাতে একবার গিয়ে দেখব, তারপর নগরীর ভিতর খুঁজতে বেরব।’—এই বলে সে প্রফেসরকে নিয়ে পা বাড়াতে যেতেই হঠাৎ তাদের কানে একটু দূর থেকে একটা কন্ঠস্বর ভেসে এল, সেনর! সেনর!—’

তারা শব্দ লক্ষ করে তাকিয়ে দেখতে পেল কিছু দূরে একটা ভগ্ন প্রাচীরের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা লোক। তারা তার দিকে তাকাতেই সে হাতছানি নিয়ে ডাকল তাদের। কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থাকার পর সুজয়রা চিনতে পারল লোকটাকে, সুজয়দের সঙ্গে আসা সেই বুড়ো লামাঅলা! যাকে কাল খুঁজে পাচ্ছিল না হুইকো!

সুজয়রা তার দিকে এগিয়ে যেতেই লোকটা ইশারায় তাদের প্রাচীরের আড়ালে আসতে বলল। সুজয়রা প্রাচীরের ওপাশে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াতেই সে সম্ভবত কুয়েচুয়া ভাষায় মার্কেজকে কী একটা বলল!

তার কথা শুনে মার্কেজ সুজয়দের বললেন, ‘ও বলছে, ও নাকি সুসানকে দেখেছে!’

এরপর মার্কেজ লোকটাকে প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু লোকটা হঠাৎ দূরে আঙুল তুলে দেখাল। দূর থেকে দুজন ইনকা রক্ষী ইনতিহুয়ানাতা চত্বরের দিকে আসছে। সম্ভবত সকালবেলা রোদে বেরিয়েছে তারা, কিংবা হয়তো সুজয়দের ওপর নজরদারি করার জন্যই তারা এদিকে আসছে! তাদেরকে দেখাবার পর লামাঅলা আর সেখানে দাঁড়াল না। সুজয়দের তার সঙ্গে আসতে বলে সে প্রাচীরের আড়াল ঘেঁসে এগোল কিছু দূরের একটা দেউলের ধ্বংসস্তূপের দিকে। তাকে অনুসরণ করে সুজয়রা ঢুকে পড়ল তার ভিতর। তারপর তাদের নিয়ে ছাদহীন, চারপাশে দেওয়াল ঘেরা একটা ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়াল লোকটা। বাইরে থেকে সে জায়গাটা দেখার কোনো সম্ভাবনা নেই।

সুজয়রা লোকটাকে ঘিরে দাড়াবার পর প্রফেসর মার্কেজ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সুসানকে তুমি কোথায় দেখেছ?’ সে জবাব দিল, ‘ইনতিহুয়ানাতাতেই। করিকাঞ্চার পুরোহিতের সাথে। একটা লামার পিঠে বাঁধা ছিল সে। তখনও সূর্য ভালো করে ওঠেনি। তারা চলে গেল!’

‘তারা কোথায় গেছে তুমি জানো! আর কে ছিল তাদের সঙ্গে?’ উত্তেজিত ভাবে জানতে চাইলেন মার্কেজ।

লোকটা বলল, ‘তারা গেছে নিষিদ্ধ নগরীতে। সেনর পিনচিও, হুইকো আর সঙ্গে আছে।’

মার্কেজ বললেন, ‘ওরা যে দিকে গেছে তুমি সে দিকে আমাদের এখন নিয়ে যেতে পারবে? সে পথ তুমি চেনো?’

সে বলল, ‘নগর ছেড়ে তারা এতক্ষণে অনেক দূর চলে গেছে। নিষিদ্ধ নগরীতে যাবার রাস্তা আমার জানা নেই। তা ছাড়া আমাকে দেখতে পেলেই রক্ষীরা ধরে নিয়ে গিয়ে ইনতিহুয়ানাতায় বেঁধে পুড়িয়ে মারবে। করিকাঞ্চা পুরোহিত কুইলোকে এ কাজ করতে বলেছেন। কাল রাতে দুজন রক্ষী এই আলোচনা করছিল ইনতিহুয়ানাতার বেদিতে বসে। আমি আড়াল থেকে শুনেছি!’

প্রফেসর এবার লোকটা কুয়েচুয়াতে কী বলছে তা জানালেন সুজয় আর বিলকে। সুজয় শুনে মার্কেজের মাধ্যমে তাকে প্রশ্ন করল, ‘এ ঘটনা যে ঘটবে তা কি তুমি জানতে? তুমিতো ওদেরই সঙ্গে এসেছিলে, তুমি ওখানে গেলে না কেন? ব্যাপারটা একটু খুলে বলতো?

লোকটা দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর আগে দিল। সে বলল, ‘নিষিদ্ধ শহরে গেলে কেউ আর প্রাণ নিয়ে ফিরে আসে না। সে হল মৃত্যু নগরী। তা ছাড়া, ওদের কথাবার্তা যা শুনেছি, তাতে আর ওরা এপথে ফিরবে না। আমাজনের দিকে চলে যাবে।’

তার কথা শুনে মার্কেজ মৃদু আর্তনাদ করে বললেন, ‘তার মানে সুসানকে নিয়ে তারা আর এখানে ফিরবে না!?’

লোকটা জবাব দিল, ‘ওরা তাই বলেছিল।’

এরপর লোকটা সুজয়ের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল, ‘আমি প্রথমে এসব ব্যাপার জানতাম না। হুইকো আমাকে বলেছিল, একদল সাহেবকে সে জঙ্গল দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে গেলে দিন পিছু একশো ডলার পাওয়া যাবে। কোচা নদী পর্যন্ত যাবে তারা। এত টাকা কেউ দেয় না। আমি রাজি হয়ে গেলাম। তখনও আমি জানতাম না যে করিকাঞ্চার পুরোহিত আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন। পরদিন যাত্রা শুরুর সময় তাকে দেখে অবাক হয়ে গেছিলাম আমি। তবে তখনও ব্যাপারটা সেভাবে আন্দাজ করতে পারিনি। সেটা বুঝতে পারলাম সে দিন রাতে জঙ্গলের মধ্যে আপনারা সবাই তাঁবুতে শুতে চলে যাবার পর। অগ্নিকুন্ডের ধারে আমাদের সবাইকে ডাকলেন করিকাঞ্চা পুরোহিত। তখনই আমি জানতে পারলাম আমরা আসলে তাঁর সঙ্গে যাচ্ছি নিষিদ্ধ নগরীতে। তবে সবাই নয়, বিদেশিদের মধ্যে শুধু সেনর পিনচিও আর আপনাদের বাচ্চা ছেলেটা সেখানে যাবে। আমাদের এও নির্দেশ দেওয়া হল যে, আপনাদের ওপর যেন সবসময় নজর রাখা হয়, আর কোনো কারণে আপনারা করিকাঞ্চা পুরোহিত আর সেনর পিনচিওর সঙ্গে না-এগোতে চাইলে তাঁদের নির্দেশ মতো আমরা যেন আপনাদের খতম করে দেই। আর এও শুনলাম এই সূর্যনগরী পর্যন্ত আপনাদের নিয়ে আসা হবে, তারপর আপনাদের এখানে ছেড়ে দিয়ে বাচ্চাটাকে নিয়ে যাওয়া হবে নিষিদ্ধ নগরীতে!’

কথাগুলো বলে একটু থামল লোকটা, তারপর আবার বলতে শুরু করল, ‘নিষিদ্ধ নগরীতে যাবার কথা আর খুনোখুনির ব্যাপার শুনে আমি হুইকোকে বললাম, ‘আমি ফিরে যাব।’ সেনর পিনচিও আমাকে অনেক টাকার লোভ দেখালেন। আমি তবুও সঙ্গে আসতে রাজি ছিলাম না। করিকাঞ্চা পুরোহিত তখন আমাকে ভয় দেখিয়ে বললেন যে ফেরার চেষ্টা করলে আমাকেও গুলি করে মারা হবে! আমি তখনই মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম, আমাকে ফিরতে না-দিলে সুযোগ মতো পালাতে হবে, আর আপনাদেরও সাবধান করে দিতে হবে। কিন্তু তা আর হল না। রাতে আমি তাঁবুতে ঢুকলাম, সেনর আমার কথা বুঝতে পারলেন না। সারাটা পথ ওরা আমাকে চোখে চোখে রাখল, পালাতে পারলাম না। কাল সন্ধ্যায় ইনতিহুয়ানাতা লোকজনের ভিড়ে সুযোগ এসে গেল, আমি গা ঢাকা দিলাম...।’ কথা শেষ করল লোকটা।

সুজয়রা পুরো ব্যাপারটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। বিল বলল, ‘তার মানে, মিস্টার পিনচিও প্রথম থেকেই এই চক্রান্তের শরিক। আমাদের প্রাচীন নগরী দেখাতে আনার মূল উদ্দেশ্য ছিল সুসানকে ঠিকমতো এ পর্যন্ত নিয়ে আসা!’

বিল লোকটাকে মার্কেজের মাধ্যমে প্রশ্ন করল, ‘তুমি জানো, ছেলেটাকে ওরা ওখানে কেন নিয়ে যাচ্ছে?’

সে জবাব দিল, ‘তা ঠিক জানি না। তবে, করিকাঞ্চা পুরোহিতকে একবার সেনর পিনচিওর উদ্দেশ্যে বলতে শুনেছিলাম, ‘বাচ্চাটা না-থাকলে আমিও ওখানে ঢুকতে পারব না।’

প্রফেসর মার্কেজ সুজয়ের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ কন্ঠে বললেন, ‘সবই তো শুনলেন, এখন কী করা যায় বলুন? যে ভাবেই হোক সুসানকে ফিরে পেতেই হবে।’

সুজয় বলল, ‘এই লোকটাই এখন আমাদের ভরসা। ও নিজে নিষিদ্ধ নগরীর রাস্তা না-চিনলেও, ও যদি এমন কোনো সূত্র দিতে পারে যার মাধ্যমে আমরা সেখানে পৌঁছোতে পারি, তাহলে একটা উপায় হয়তো হবে। ওর কর্মপন্থাও আমাদের জানা প্রয়োজন?’

প্রফেসর এরপর লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এখান থেকে কোন দিকে যাবে? তোমার এমন কেউ জানা আছে যে ওই নিষিদ্ধ নগরীর রাস্তার সন্ধান দিতে পারে?’

লোকটা বলল, ‘আমি আগে এ নগরীতে না-এলেও অনেক বছর আগে এক সাহেবের সঙ্গে এ নগরীর কাছাকাছি এসেছিলাম। এই নগরীর পুব দিকে পঁচিশ মাইল দূরে চিমু জাতীর একটা ছোটো গ্রাম আছে। এই নগরীর পাশ দিয়ে রাস্তা ধরে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সেখানে গেছিলাম আমরা। সাহেব গেছিলেন ছবি তুলতে। আজ রাতে আমি ওই গ্রামের দিকে পালাব। ওখানে পৌঁছোতে পারলে তারপর ওদের সাহায্য নিয়ে নদীপথে আমি কোচা নদী পর্যন্ত পৌছোতে পারব। সেখান থেকে আমি একলাই ফিরতে পারব মাচুপিচুতে।

সুজয় তাকে প্রশ্ন করল, ‘তারা তোমাকে সাহায্য করবে কেন?’

সে উত্তর দিল, ‘আমার নাম, টিহুয়াচান।’ চিমু উপজাতির লোক। চিমুরা এমনিতে দুর্ধর্ষ হলেও স্বজাতীয়দের প্রতি তাদের দারুণ টান, তা তারা যেখানেই থাকুক না কেন! প্রয়োজন হলে তারা নিজেদের লোকের জন্য জানও দিতে পারে!

মার্কেজ এবার তাকে বলল, ‘তুমি নিষিদ্ধ নগরীর রাস্তা না চিনলেও সে জায়গা সম্বন্ধে একটা আন্দাজ দিতে পারো?’

টিহুয়া চান জবাব দিল, ‘শুনেছি জায়গাটা রুক্ষা নেড়া পাহাড়ি অঞ্চল। সেখানে নাকি বিচামার মন্দির আছে। কাকা কুজকোদের এলাকা সেটা। ওখানে গেলে কেউ ফেরে না। তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে বিচামার সামনে বলি দেওয়া হয়!’

এরপর একটু যেন ভেবে নিয়ে সে বলল, ‘আমি যেখানে যাচ্ছি সেখানে যে গাঁও বুড়ো আছে তার অনেক বয়স। সে অনেক কিছু জানে। হয়তো সে আপনাদের নিষিদ্ধ নগরীর রাস্তা বাতলাতে পারে। আপনারা চাইলে আমার সাথে সে গ্রামে যেতে পারেন। তারপর নিষিদ্ধ নগরীর সন্ধান না পেলে নয় আমার সাথেই ফেরার পথ ধরবেন।’

টিহুয়াচানের প্রস্তাব শুনে মার্কেজ তাকালেন সুজয়দের দিকে। সুজয় বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে ওর প্রস্তাবটা খারাপ নয়। ওই গাঁও বুড়ো হয়তো আমাদের কোনো আশার আলো দেখাতে পারে। তাছাড়া যত দ্রুত সম্ভব এ নগরী ত্যাগ করা প্রয়োজন। ইল্লাপা আমাদের সম্বন্ধে কুইলোকে কী নির্দেশ দিয়ে গেছেন কে জানে! হয়তো কুইলো যে কোনো মুহূর্তে আমাদের গ্রেপ্তার করবেন! এ সব ঘটার আগেই অন্তত এ জায়গা ছেড়ে যাওয়া ভালো।’

বিল বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়। আর সে ক্ষেত্রে এই লোকটাই আমাদের একমাত্র সাহায্য করতে পারে।’

প্রফেসর মার্কেজ, সুজয় আর বিল এরপর বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করল নিজেদের মধ্যে। তারপর মার্কেজ টিহুয়াচানকে বললেন, ‘আমরা যেতে চাই তোমার সাথে। কিন্তু কীভাবে পালাব আমরা?’

টিহুয়াচান বলল, ‘আজ সূর্য ডোবার পর ইনতিহুয়ানাতার মাথার ওপর যখন চাঁদ উঠবে তখন ইনতিহুয়ানাতার পশ্চিমে যে ‘আকল্লা কুনা’ আছে তার পিছনে আসবেন। আমি অপেক্ষা করব। ও জায়গাটা ফাঁকাই থাকে। দু-একজন মহিলা রক্ষী ছাড়া সেখানে পুরুষ রক্ষীরা যায় না। ওদের চোখ এড়ানো সহজ হবে। যাবার সময় জায়গাটা দেখে যান। আকল্লা কুনার দেওয়ালে নাক ভাঙা একটা বড় সূর্যমূর্তি খোদাই করা আছে। তার পায়ের নীচে একজন নারী। দেখলে চিনতে পারবেন।’

টিহুয়াচান এরপর দেওয়ালের বাইরে একবার উঁকি মেরে বলল, ‘আপনারা এখন যান, আমিও যাই। রক্ষীরা খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে আসতে পারে। অনেকক্ষণ আমরা এখানে আছি। আপনারা চিন্তা করবেন না। আমি আকল্লাকুনাতে থাকব।’

সবাই এরপর সেই চার দেওয়ালের বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরে আসার পর মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেল টিহুয়াচান। তাকে আর দেখতে পেল না কেউ। সুজয়রা এগোলো আকল্লাকুনা খুঁজে বার করার জন্য। মাথার ওপর রোদ অনেকটা উঠে গেছে। প্রফেসরের বয়স যেন ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আরও দশ বছর বেড়ে গেছে। চারদিকে ছড়িয়ে আছে কত প্রাচীন স্থাপত্য। যা দেখতে এসেছিল সুজয়রা। সে সব দিকে এখন আর তাদের নজর নেই। গভীর চিন্তায় ডুবে হাঁটতে লাগল তারা। কীভাবে পৌঁছানো যাবে সুসানের কাছে?

১২

মহিলারক্ষী পরিবৃত আকল্লাকুনা জায়গাটা চিনে নিজেদের থাকার জায়গাতে ফিরে এল সুজয়রা। তারপর সারা দিন তারা কাটিয়ে দিল ঘরের মধ্যেই। মার্কেজ যেন পাথর বনে গেছেন। ঘরে ফিরে আসার পর সারাটা দিন তিনি আর একটাও কথা বললেন না। কুইলোর কোনো লোকজন তাদের খোঁজ নিতে এল না। একজন রক্ষী শুধু ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় সম্ভবত কৌতূহলবশতই ভিতরে একবার উঁকি দিয়েছিল। এক সময় দিন ফুরিয়ে এল। সূর্যদেব দিন শেষের রক্তিম আভা ইনতিহুয়ানাতার মাথায় ছড়িয়ে দিয়ে ডুব দিলেন দূরের অরণ্যের আড়ালে। দ্রুত অন্ধকার গ্রাস করে নিতে লাগল প্রাচীন নগরীকে। সুজয় ঘরের বাইরে তাকিয়ে দেখল দূরে কুইলো প্রাসাদের দিকে ফুটে উঠছে জোনাক বিন্দু। প্রাসাদ চত্বরে মশাল জ্বালাচ্ছে রক্ষীরা। সে এরপর তাকাল আকাশের দিকে। ক্ষীণ চাঁদ উঠতে শুরু করেছে। সুজয়রা প্রস্তুত হতে লাগল নতুন পথে যাত্রা শুরুর জন্য। এ যাত্রাপথে বোঝা নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, শুধু অতি দরকারি কিছু জিনিসপত্র আর সামান্য কিছু খাবার নিজেদের পিঠের কিট ব্যাগে ভরে নিল তারা।

ঠিক যখন ইনতিহুয়ানাতার মাথার ওপর সোনার থালার মতো গোল চাঁদ উঠল, তখন তিনজন ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। দিনের সূর্য নগরী রাতের জ্যোৎস্নালোকে প্লাবিত। জ্যোৎস্নাস্নাত প্রাচীন সৌধ, মিনার। এত উত্তেজনার মধ্যেও বিল চারপাশে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘অপূর্ব!’ সামনের চত্বরটা পার হয়ে নির্দিষ্ট দিকে এগোল তারা। কোনো লোক তাদের চোখে পড়ল না। কিছু সময়ের মধ্যেই তারা উপস্থিত হল আকল্লাকুনার কাছে। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা আকল্লাকুনা। পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ এখানে। প্রবেশ তোরণের পাশে দেওয়ালের গায়ে একটা মশাল জ্বলছে, আর তার কাছেই একটা পাথরের বেদিতে বসে আছে একজন অস্ত্রধারী মহিলা দ্বাররক্ষী। এ জায়গাটা দিনের বেলা ভালো করে দেখে নিয়েছে সুজয়রা। সন্তর্পনে তারা রক্ষীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে প্রাচীরের অন্ধকার ঘেঁষে দাঁড়াল। তারপর সতর্ক চোখে বেড় দিয়ে আকল্লাকুনার পিছনে এসে উপস্থিত হল। জায়গাটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। আকল্লাকুনার পাথুরে দেওয়াল চাঁদকে আড়াল করে রেখেছে সেখানে। চারপাশ ঝোপঝাড় পরিপূর্ণ। ভলো করে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সুজয়রা সেখানে গিয়ে দাঁড়াবার পর কাছেই একটা ঝোপ হঠাৎ নড়ে উঠল। তার ভিতর থেকে উঠে দাঁড়াল একটা আবছা ছায়ামূর্তি! তারপরই পরিচিত চাপা কন্ঠস্বর শোনা গেল, ‘সেনররা আমার সঙ্গে আসুন।’ টিহুয়াচান। তাকে অনুসরণ করল তারা।

কিছুটা ঝোপজঙ্গল ভাঙার পর আবার চাঁদের আলোর নীচে তারা এসে দাঁড়াল। পথের দুপাশে নানা ধরনের অজস্র ধ্বংসস্তূপ। ছাদহীন পাথুরে ঘর, ধসে পড়া প্রাচীর, হেলে পড়া স্তম্ভ। তার মধ্যে দিয়ে সতর্কভাবে টিহুয়ার পিছনে সুজয়রা এগোতে থাকল। আধঘণ্টাটাক চলার পর চারপাশের ঘর বাড়ি ফাঁকা হয়ে এল। সামনে চোখে পড়ল একটা প্রাচীর, তার ওপাশে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে ঘন জঙ্গল। টিহুয়া, মার্কেজকে বলল, ‘আমরা নগরীর শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি। প্রাচীর পার হয়ে ওই জঙ্গলে ঢুকে পড়তে পারলেই আপাতত নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে।’ প্রাচীরের গায়ে বাইরে যাবার জন্য একটা ভগ্ন তোরণও চোখে পড়ল। তারা এগোল সেদিকে।

সুজয়রা যখন তোরণের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে তখন হঠাৎই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল! কোথা থেকে যেন মশাল হাতে একজন বর্শাধারী ইনকা রক্ষী উদয় হল সেখানে। এক হাতে মশাল আর অন্য হাতে বর্শা নিয়ে সুজয়দের দিকে পিছন ফিরে সে তোরণ আগলে দাঁড়াল। এখানে কোনো রক্ষী থাকবে ধারণা করতে পারেনি কেউ। পাথরের মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে পড়ল সকলে। মাত্র হাত কুড়ির ব্যবধান। কোথাও আড়াল নেই সেখানে। কোনো কারণে সে পিছনে তাকালেই দেখতে পাবে সবাইকে! রক্ষী তাকিয়ে আছে অন্ধকার জঙ্গলের দিকে। সুজয়রাও দাঁড়িয়ে আছে পাথরের মূর্তির মতো। কী করবে তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। বিল হঠাৎ তার ক্যামেরার ব্যাগটা সুজয়ের হাতে ধরিয়ে শ্বাপদের মতো নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে লাগল রক্ষীর দিকে। উত্তেজনায় সুজয়দের হৃৎপিন্ড স্তব্ধ হয়ে যাবার যোগাড়! বিল লোকটার পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে একটা অদ্ভুত কান্ড করল। সে মৃদু টোকা দিল রক্ষীর কাঁধে। রক্ষী ঘুরে দাঁড়াল। আর তার পর মুহূর্তেই বিল তার ডান হাতের পোঁচরা দিয়ে সজোরে আঘাত করল রক্ষীর কন্ঠনালিতে! একটাও শব্দ না করে বিরাট দেহ নিয়ে কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে পড়ে গেল সে। সুজয়রা এবার দৌড়ে গেল সেখানে। রক্ষীর দেহ একদম স্থির। বিল বলল, ‘ভোরের আগে ওর আর জ্ঞান ফিরবে না।’ সুজয় বিলকে বলল, ‘এ বিদ্যে তুমি শিখলে কোথায়?’ বিল জবাব দিল, ‘তোমাকে বলেছিলাম না যে আর্মি ট্রেনিং নেওয়া আছে আমার। এটাও ওই সময় শেখা।’

মশালটা নিভিয়ে ফেলে সেটা সঙ্গে নিল টিহুয়া, বর্শাটাও সে সঙ্গে নিল। তারপর সকলে তোরণ অতিক্রম করে সামনের একটা ফাঁকা মাঠ পার হয়ে প্রবেশ করল জঙ্গলের মধ্যে। আন্দাজ মতো পূর্ব দিক বরাবর তারা হাঁটতে শুরু করল।

বিচিত্র এই পথচলা। ডালপালার ফাঁক দিয়ে আবছা চাঁদের আলো ভেসে আসছে। যত তারা বনের গভীরে প্রবেশ করতে লাগল ততই কাছে দূরে শোনা যেতে লাগল নানা ধরনের শব্দ। নৈশ বিহারে বেরিয়েছে অরন্যের শিশুরা! তাদেরই শব্দ ও সব! এক সময় ডালপালার চাঁদোয়ার আড়ালে ঢেকে গেল চাঁদ। ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুধু ঝোপঝাড়ে জোনাকির আলো জ্বলছে নিভছে। অরণ্যের প্রেতাত্মারা যেন ঝোপঝাড়-গাছের গুড়ির আড়াল থেকে লক্ষ নিযুত চোখ মেলে দেখছে অরণ্যচারী এই অদ্ভুত অভিযাত্রীদের। সুজয়দের খুব কাছ দিয়েই ঝোপজঙ্গল ভেঙে কী যেন একটা ভারী প্রাণী দৌড়ে গেল। অনেকদূর পর্যন্ত তার পায়ের শব্দ শোনা গেল। টিহুয়া এরপর দাঁড়িয়ে পড়ে মার্কেজকে বলল, ‘মশালটা এবার জ্বালিয়ে নেওয়া দরকার। এ বনে অনেক জন্তু আছে দেখছি! সঙ্গে আগুন থাকলে তারা কাছে ঘেঁষবে না।’

মার্কেজ বললেন, ‘কিন্তু আগুন জ্বাললে যদি ওরা আমাদের সন্ধান পেয়ে যায়?’

সে জবাব দিল, ‘ইনকাই হোক বা চিমু, ভূতের ভয়ে তারা কেউ রাতে জঙ্গলে ঢোকে না। এ সবে তারা খুব বিশ্বাস করে। সূর্য নগরীর ইনকারা দিনের বেলা আমাদের খুঁজতে যদি জঙ্গলে ঢোকে, ততক্ষণে আমরা অনেক দূর চলে যাব। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মশাল জ্বালিয়ে আমাদের পথ চলতে হবে।’ বিল লাইটার দিয়ে মশালটা জ্বালিয়ে দিল। আবার শুরু হল পথ চলা। প্রফেসর, টিহুয়াকে প্রশ্ন করল, ‘কাল আমরা চিমু গ্রামে কখন পৌঁছব?’

টিহুয়া জবাব দিল, ‘তাড়াতাড়ি চললে কাল সূর্য মাঝ আকাশে ওঠার আগেই সেখানে পৌঁছে যাব আমরা।’

সময় এখন খুব মূল্যবান। তাই তার কথা শূনে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল সকলে। সুজয় চলতে চলতে শুধু লক্ষ করতে লাগল মার্কেজকে। এই বয়সেও তাঁর পরিশ্রম করার কত ক্ষমতা। মশালের আলোতে তার মুখ দেখে মনে হল সুসানের প্রতি তার অসীম স্নেহ আর একটা দুর্দমনীয় ইচ্ছাশক্তি যেন তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে তাঁকে। যে ভাবেই হোক তাঁকে পৌঁছতে হবে সুসানের কাছে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেতে লাগল। তারপর এক সময় যেন গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে শুকতারা চোখে পড়ল সুজয়ের। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই যেন পুব আকাশে লাল রং ধরতে শুরু করল। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার কেটে গিয়ে বনের মধ্যে ফুটে উঠতে লাগল আবছা আলো। আস্তে আস্তে শোনা যেতে লাগল দু-একটা পাখির ডাক। রাত্রি শেষ হল।

সুজয়রা এসে উপস্থিত হল জঙ্গলের মধ্যে ছোটো নদীর ধারে। সাদা নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে শীর্ণ জলধারা তিরতির করে প্রবাহিত হচ্ছে সেখানে। গোড়ালির একটু ওপর সমান জল হবে সেখানে। চওড়াও বেশি নয়। অনায়াসে হেঁটে পার হওয়া যায় এ নদী। নদীর দু-পাশে হাত দশেক ফাঁকা জমি তারপর ছোটো ছোটো ঝোপ ঝাড়। এ পাশের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে সুজয়রা নদী পার হবার আগে একটু জিরিয়ে নেবার জন্য বসল। চারপাশে অপূর্ব পরিবেশ। সূর্যদেব দিনের প্রথম আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন, গাছের মাথায়, নদীর জলে। বনের ভিতর থেকে ভেসে আসছে পাখির কলকাকলি। একটা বেশ বড়ো প্রজাপতি সুজয়ের নাকের সামনে দিয়ে ডানা মেলে উড়ে গেল। তার ডানায় রামধনুর সাত রং। যেন সূর্যদেবের জিয়ন কাঠির স্পর্শে নতুন করে জেগে উঠেছে এই অরণ্যময় পৃথিবী!

সুজয় বিলকে প্রশ্ন করল, ‘তুমিতো অনেক অরণ্যে গেছো! সেখানেও কি ভোর এই রকমই সুন্দর?’

বিল জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, ভোর সর্বত্রই একই রকম সুন্দর। শুধু তাকে চেনার চোখ থাকা চাই।’

সুজয় বলল, ‘হ্যাঁ, ভোর মানেই তো জীবন!’

প্রফেসর কিন্তু নিশ্চুপ। জীবনের সৌন্দর্য আহরণ করার মতো মানসিক অবস্থা তাঁর এখন নেই। সুজয়দেরও নেই। কিন্তু মুহূর্তের জন্য এই সুন্দর সকাল যেন তাদের সব কিছু ভুলিয়ে দিয়েছিল।

বিলের পাশেই বসে ছিল টিহুয়া। সে হঠাৎ উঠে নদীর ধারে এগিয়ে গেল জল খাবার জন্য। স্বচ্ছ জল আঁজলা ভরে পান করার পর সে যখন সুজয়দের দিকে ফিরতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই সুজয়দের একটু দূরে একটা ঝোপ হঠাৎ দুলে উঠল। আর তারপরই সুজয়দেরই চমকে দিয়ে নদীর পাড়ে বেরিয়ে এল একটা বাঘ জাতীয় প্রাণী। কুচকুচে কালো তার গায়ের রং। সুবজ রঙের চোখ দিয়ে সে তাকিয়ে আছে টিহুয়ার দিকে। ঠিক যেন একটা কষ্টি পাথরের মূর্তি! শুধু তার লেজের ডগাটা মৃদুমৃদু নড়ছে। টিহুয়া তাকে খেয়াল করেনি। সে নদী থেকে উঠে মুখ মুছছে। হিংস্র প্রাণীটা আর তার মধ্যে হাত পনেরোর মাত্র ব্যবধান। মার্কেজ তাকে সাবধান করতে গেলেন কিন্তু গলা দিয়ে তার শব্দ বেরল না। সুজয় নিজেও যেন পাথর বনে গেছে। চোখের পাতা বোজার ক্ষমতাও যেন তার নেই! প্রাণীটা তার দেহের সামনের অংশটা মাটির দিকে একটু ঝোঁকালো। এবার সে লাফ দেবে! ঠিক সেই সময় প্রচন্ড জোরে একটা কান ফাটা শব্দ হল সুজয়ের পাশে! প্রাণীটাও লাফিয়ে উঠল শূন্যে। পর মুহূর্তে আরও একটা প্রচন্ড শব্দ। শূন্যেই একটা প্রচন্ড আর্তনাদ করে প্রাণীটা আছড়ে পড়ল টিহুয়ার ওপর। তারপর দুজনেই মাটিতে পড়ে একদম স্থির হয়ে গেল! পুরো ব্যাপারটা ঘটতে সম্ভবত তিন সেকেণ্ড সময় লাগল। বিলের রিভলবার থেকে তখনও ধোঁয়া বার হচ্ছে। সুজয়রা উঠে দৌড়ে গেল জায়গাটাতে। রক্তমাখা দুটো দেহ মাটিতে পড়ে আছে। প্রাণীটা মরে গেছে। তার নীচে টিহুয়া। বিল টেনে প্রাণীটাকে সরিয়ে দিতেই উঠে বসল টিহুয়া। বিস্ময়ে সে তাকিয়ে রইল মৃত প্রাণীটার দিকে। বিলের একটা গুলি বিঁধেছে তার শিরদাঁড়াতে। আর অন্যটা চূর্ণ করে দিয়েছে তার মাথার খুলি। বিল প্রাণীটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কালো বাঘ বা ব্ল্যাকপ্যান্থার। একমাত্র আমাজন অববাহিকার অরণ্যে এদের দেখা মেলে।’

টিহুয়ার আঘাত তেমন গুরুতর নয়। শুধু বাঘটা পড়ার সময় দুটো নখ বিঁধে গেছিল তার হাতে। সামান্য একটু রক্তপাত হচ্ছে। সুজয় ব্যাগ থেকে কাপড়ের টুকরো বার করে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিল তার হাতে। উঠে দাঁড়াল টিহুয়া। বিস্ময়ের ঘোর তার তখন সম্পূর্ণ কাটেনি। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মাটিতে পড়ে থাকা নিস্পন্দ মৃত্যুদূতের দিকে। তারপর বিলের ডান হাতটা টেনে নিয়ে তাতে একটা চুমু খেয়ে আবেগ মথিত স্বরে বলল, ‘সেনর, তুমি দুবার আমার প্রাণ রক্ষা করলে। আমি কথা দিলাম, গাঁও বুড়ো যদি নিষিদ্ধ নগরীর যাবার রাস্তা বাতলাতে পারে, তাহলে আমি তোমাদের সঙ্গে সেখানে যাব।’ তার কথাটা অনুবাদ করার পর মার্কেজও বিলকে জড়িয়ে ধরলেন। টিহুয়া এরপর বলল, ‘চলুন এবার নদী পার হওয়া যাক।’

বিল নদী পার হবার জন্য তার কিট ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে সুজয়ের উদ্দেশ্যে বলল, ‘একটু আগেই তুমি বলছিলে না যে, ভোর মানেইতো জীবন! দেখলে, মৃত্যু আমাদের জন্য কেমন ওৎ পেতে বসেছিল নদীর ধারে? আসলে, ভোর হোক বা রাত, জীবন-মৃত্যু এখানে সব সময়ে পায়ে পায়ে ঘোরে! জীবন এখানে যতটা সুন্দর, ঠিক ততটাই নিষ্ঠুর! খাদ্য-খাদকের নিরন্তর সংগ্রাম চলে এখানে। আমার গুলি দুটো ফস্কালেই বাঘটার বদলে টিহুয়া এখানে পড়ে থাকত।’

নদীটা পার হল সুজয়রা। তারপর ওপারের জঙ্গলে প্রবেশ করে হাঁটতে শুরু করল। টিহুয়া বলল, ‘এ জঙ্গলের শেষেই চিমুদের গ্রাম। যে গতিতে আমরা চলেছি তাতে ঘণ্টা ছয়-সাতের মধ্যেই গ্রামের কাছে পৌঁছে যাব।’

সুজয় হিসাব করে দেখল, তাহলে বেলা দশটা-এগারোটা নাগাদই সেখানে পৌঁছে যাবার কথা। পুব বরাবর এগোতে থাকল তারা।

এই নতুন জঙ্গলে ঝোপ-ঝাড়ের তুলনায় বড়ো বড়ো গাছের সংখ্যাই বেশি। আদিম মহাবৃক্ষগুলো যেন ডালপালা বাড়িয়ে ছুতে চাইছে আকাশকে। মোটা মোটা লতাগুল্ম ঝুলছে তাদের ডাল থেকে। বিচিত্র ধরনের অর্কিডের সমারোহ চারপাশে। আর রয়েছে, বিভিন্ন পাখি। তাদের অধিকাংশই টিয়া বা প্যারাকিড প্রজাতির। লাল, নীল, হলুদ, কত রঙের টিয়া!

চলতে চলতে বনের মধ্যে এক জায়গাতে গাছের মাথার ওপর থেকে হাসির শব্দ কানে এল! মার্কেজ আর সুজয় চমকে উঠে ওপর দিকে তাকাতেই দেখতে পেল একদল ছোটো আকৃতির লাল রঙের বাঁদর বসে আছে গাছের ডালে। নীচে সুজয়দের দিকে তাকিয়ে হাসছে তারা। অবিকল মানুষের মতো হাসির শব্দ! সুজয়রা আশ্চর্য হয়ে গেল!

বিল বলল, ‘এদের আমি দেখেছি। আমাজন অববাহিকার জঙ্গলে এদের দেখা মেলে। এদিককার গাছগুলোও চেনা লাগছে আমার। সম্ভবত আমাজন অববাহিকার দিকেই এগোচ্ছি আমরা, অর্থাৎ ব্রাজিল সীমান্তের দিকে। কালো বাঘ আর এই বাঁদরগুলো তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।’

বাঁদরের দল মাথার ওপর বুনো লতায় ঝুলতে ঝুলতে বেশ কিছুটা পথ চলল তাদের সাথে। বাঁদরগুলোর বাঁদরামি দেখে এত কষ্টের মধ্যেও এক সময় হেসে উঠলেন মার্কেজ।

ঘণ্টা পাঁচেকের যাত্রাপথে জঙ্গলের মধ্যে বেশ কয়েকটা শীর্ণ নদী পার হতে হল সুজয়দের। সম্ভবত এরা সব উকেয়ালির শাখা নদীর কোনো উপশাখা। এ সব অজস্র নদীর মিলিত জলধারায় পুষ্ট হয় আমাজন। অবশেষে জঙ্গল এক সময় ফাঁকা হয়ে আসতে লাগল। টিহুয়া মার্কেজকে বলল, ‘এ জঙ্গল শেষ হলেই চিমুদের গ্রাম দেখা যাবে।’

আরও কিছু পথ এগোবার পর হঠাৎ জঙ্গলের ভিতর একটা পাখি ডেকে উঠল। আর তার পরই জঙ্গলের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসতে লাগল একই ধরনের পাখির শব্দ। জঙ্গলে পাখিতো ডাকতেই পারে। তাই ব্যাপারটা তেমন ভাবে গুরুত্ব দেয়নি সুজয়রা। কিন্তু টিহুয়া দাঁড়িয়ে পড়ল। ডেকেই চলেছে পাখিগুলো। কখনো একটানা, কখনো বা থেমে থেমে। কান খাড়া করে বেশ কিছুক্ষণ ধরে শব্দ শুনে টিহুয়া, মার্কেজকে বলল, ‘আমরা গ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছি। জঙ্গলের নজরদাররা আমাদের দেখতে পেয়েছে। সে খবরই পাখির ডাকের সংকেতের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বনের ভেতর।’

মার্কেজ শুনে চারপাশে তাকিয়ে বললেন, ‘তার মানে তো তারা আমাদের কাছাকাছি আছে। কিন্তু কোথায় তারা?’

টিহুয়া জবাব দিল, ‘জঙ্গলের আড়াল থেকে তারা আমাদের লক্ষ করছে। আপনি তাদের দেখতে পাবেন না। ঠিক সময় তারা দেখা দেবে।’

এরপর সে বিলের উদ্দেশ্যে বলল, ‘আপনি তাদের দেখে অস্ত্র বার করবেন না কিন্তু! তাহলে গোলমাল হবে। তারা যেন কখনো আমাদের শত্রু না ভেবে বসে!’

টিহুয়ার কথা যে সত্যি তা কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রমাণিত হল। জঙ্গল যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু হয়েছে ঘাস জমি। তারা সে জায়গাতে উপস্থিত হতেই হঠাৎ যেন মাটি ফুঁড়ে উঠে এল জনা দশেক লোক। ঘিরে ধরল সুজয়দের। লোকগুলোর মাথায় পালকের সাজ, দেহের পোশাকও পালকের তৈরি, তবে এদের মুখে উল্কি আঁকা নেই। সুজয়দের দিকে তাক করে ধনুকের ছিলা টেনে দাঁড়াল তারা। পর্যবেক্ষণ করতে লাগল সুজয়দের।

টিহুয়া এরপর তার পকেট থেকে বার করল কয়েনের মতো দেখতে একটা কালো রঙের চাকতি। সেটা সে দু-আঙুলের ফাঁকে ধরে লোকগুলোকে দেখিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে দুর্বোধ্য ভাষায় কী যেন বলল!

লোকগুলোর মধ্যে একজন এবার টিহুয়ার দিকে এগিয়ে এসে তার হাত থেকে চাকতিটা নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল।

তারপর সেই লোকটা আর টিহুয়ার মধ্যে চলল দুর্বোধ্য ভাষায় কথোপকথন। তার মর্মার্থ প্রফেসরও উদ্ধার করতে পারলেন না। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই চিমুরা সুজয়দের নিয়ে চলল তাদের গ্রামের দিকে।

যেতে যেতে মার্কেজ টিহুয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি চাকতিটা দেখিয়ে কী বললে?’

টিহুয়া বলল, ‘আমি যে ওদের স্বজাতি তার পরিচয় চিহ্ন এই চাকতি। বংশ পরম্পরায় এটা আমার কাছে আছে। এই বলে সে সেটা প্রফেসরের হাতে দিল। তিনি সেটা দেখার পর সুজয়ও হাতে নিয়ে দেখল জিনিসটা। সেটা ধাতব নয়, পোড়া মাটির তৈরি। দু-পাশে খোদিত আছে অদ্ভুত দর্শন মানুষের ছবি। চিমুদের কোনো দেবদেবী হবে হয়তো!

ঘাস জমি পার হয়ে চিমুদের গ্রামে এসে উপস্থিত হল সুজয়রা। মাটির নীচু দেওয়াল দিয়ে গ্রামটা ঘেরা। একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেল তারা। দেওয়ালের গায়ে কিছু দূর দূর একটা করে লম্বা লাঠি পোঁতা। তার মাথায় বসানো আছে নরমুন্ড!

টিহুয়া বলল, শত্রু নিধনের পর নাকি তাদের মুন্ডু কেটে চিমুরা এই ভাবে সাজিয়ে রাখে। ওই সব মুন্ডুগুলো অধিকাংশই হল ইনকাদের। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চিমুদের সাথে ইনকাদের শত্রুতা চলে আসছে।

গ্রামের ভিতর বাড়িগুলো ইটের তৈরি। মাথায় খড়ের ছাউনি। দেওয়ালের গায়ে অপূর্ব সুন্দর জ্যামিতিক নকশা ও রঙের মোজেকের কাজ। কোথাও আবার দেওয়ালের গায়ে মাটির প্রলেপের ওপর ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানা পশুপাখি ও অদ্ভুত দর্শন দেবদেবীর মূর্তি। গ্রামের ভেতর রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে মার্কেজ বললেন, ‘মোজেক শিল্পের জনক কিন্তু চিমুরাই। পরে তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে বলেন, চিমুদের শিল্পকলা নাকি ইনকাদের থেকে বেশি উন্নত ছিল।’

গ্রামের ভিতর বেশ অনেক লোকজন। তার মধ্যে অস্ত্রধারী চিমু যোদ্ধাদেরও যেমন সুজয়রা দেখতে পেল, তেমনই দেখা মিলল কাঁখে শিশু নিয়ে দাড়িয়ে থাকা চিমু রমণীদেরও। তাদের দীর্ঘ বেণী। পাথর আর সোনার অলঙ্কারে সজ্জিত তারা। নারী-পুরুষ প্রত্যেকের কানেই রয়েছে কর্ণকুণ্ডল। তবে তা ইনকাদের মতো মাকড়ি ধরনের নয়, দেখতে কানপাশার মতো। আর স্ত্রী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে প্রত্যেকের পরনেই পালকের পোশাক! নানা রঙের নানা ধরনের পালক দিয়ে তা তৈরি।

চিমুদের পোশাক দেখে বিল বলল, ‘এত পালক এরা পায় কোথা থেকে? নিশ্চই অনেক পাখির প্রাণ যায় এর জন্য!’

টিহুয়া তার কথা শুনে বলল, ‘খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া চিমুরা পাখি শিকার করে না। বরং পাখিদের এরা ভালোই বাসে। নির্দিষ্ট এক একটা ঋতুতে এক এক ধরনের পাখির পালক ঝরে যায়। বন থেকে সেই পালক কুড়িয়ে এনে তাই দিয়ে পোশাক বানানো হয়।’

মার্কেজ টিহুয়ার কাছে জানতে চাইলেন, ‘তোমার সেই গাঁওবুড়ো এখনও বেঁচে আছে তো?’

সে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ’, তার কাছেই আমাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সুজয়রা গ্রামের মাঝখানে একটা খোলা জায়গাতে এসে উপস্থিত হল। সেখানে বিরাট একটা গাছের তলায় বেদিতে বসে আছেন এক অতিবৃদ্ধ। তার দেহের চামড়া সব ঝুলে পড়েছে। মুখে অসংখ্য বলিরেখা। পরনে পালকের পোশাক, মাথায় বিরাট পালকের সাজ। বৃদ্ধ গাছের নীচে বসে ঝিমোচ্ছিলেন। এক পাল বাচ্চাকাচ্ছা খেলা করছিল তার চারপাশে। সুজয়দের সঙ্গের রক্ষীরা বাচ্চাগুলোকে হটিয়ে দিয়ে তাদের গাঁওবুড়োর সামনে এনে দাঁড় করাল। তারপর একজন রক্ষী তাঁর উদ্দেশ্যে কী যেন বলল। ধীরে ধীরে চোখ খুললেন গাঁও বুড়ো। তারপর সামনে প্রথমেই বিলকে দেখতে পেয়ে তার লোকজনের উদ্দেশ্যে স্বজাতীয় ভাষায় বললেন, ‘ও, সাদা চামড়া! তা আমার কাছে আনলে কেন? শুধু মুন্ডুগুলো আনলেই তো হত!’

রক্ষীদের মধ্যে একজন বলল, ‘ওদের মধ্যে একজন চিমুও আছে। সে আগেও এসেছে আমাদের এখানে। ওই এনেছে বিদেশিদের!’

লোকটার কথা শুনে এবার একটু নড়েচড়ে বসে ভালো করে তাকালেন সুজয়দের দিকে। টিহুয়া তার একদম সামনে দাঁড়িয়ে একবার ডানপাশে আর একবার বাঁপাশে থুতু ছিটিয়ে টুপি খুলে মাথা ঝোঁকাল গাঁওবুড়োর উদ্দেশ্যে। সম্ভবত এটাই সম্ভাষণের রীতি! এরপর সে নিজের পরিচয় ব্যক্ত করল। কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকার পর মাথা ঝাঁকিয়ে গাঁওবুড়ো বলল, ‘ও এবার মনে পড়েছে! সেবার ছিল আমার বড়ো নাতির পঞ্চাশতম জন্ম বছর। এক সাদা চামড়াকে নিয়ে এসেছিলে তুমি। এক চাঁদ এ গ্রামে ছিলে।’

টিহুয়া বলল, ‘হ্যাঁ একদম ঠিক বলেছেন আপনি।’

মার্কেজ বা সুজয়রা অবশ্য এই সব কথোপকথন বুঝছিল না। তারা চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল।

গাঁওবুড়োর দৃষ্টি পড়ল সুজয়ের ওপর। তিনি বললেন, ‘সাদা চামড়ার সাথে এ লোকটা কে। এতো চিমু, ইনকা, বা মোচে নয়! এ কোন জাতির লোক?’

টিহুয়া সুজয়কে তাঁর কথা অনুবাদ করে দেওয়াতে সুজয় বলল, ‘আমি ভারতবর্ষ থেকে এসেছি।’

গাঁওবুড়ো তার কথা শুনে আবার জানতে চাইলেন, ‘সে দেশটা কোথায়? কুজকোর ওদিকে কি? তোমাদের আরাধ্য দেবতা কি ইনতি? নাকি এই বন, পাহাড় নদীর সৃষ্টিকর্তা ‘মহান ওলাওলা’?’

টিহুয়া তাকে খুশি করতে এবার বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, দেশটা কুজকোর ওদিকেই। আর মহান ওলাওলাই হল আরাধ্য দেবতা।’

সুজয়ের আরাধ্য দেবতা ওলাওলা শুনে গাঁওবুড়ো প্রসন্ন দৃষ্টিতে সুজয়ের দিকে তাকিয়ে সোনা বাঁধানো দাঁতে হাসলেন। সুজয় অবশ্য ব্যাপারটার বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারল না।

গাঁওবুড়ো এরপর প্রফেসর মার্কেজ আর বিলের পরিচয় জানতে চাইলেন। টিহুয়া কিছু সত্যি কিছুটা মিথ্যা মিলিয়ে মিশিয়ে তাদের পরিচয় ব্যক্ত করল তার কাছে।

সুজয়দের পরিচয় জানার পর তারা গ্রামে থাকতে এসেছে ভেবে গাঁওবুড়ো টিহুয়াকে বললেন, ‘তুমি চিমু। সারা পৃথিবীর চিমুরা হল সহোদর ভাই। তা তারা আমাজন বা কুজকো যেখানেই থাকুক না কেন! আর তোমার সঙ্গীরা যখন প্রত্যেকেই এই পৃথিবীর স্রষ্টা ওলাওলাকে মানে, তখন তোমাদেরকে এ গ্রামে থাকতে দিতে আমার আপত্তি নেই। তোমরা ‘দু-চাঁদ’ থাকতে পার এখানে।

টিহুয়া তাঁকে বলল, ‘আমরা এখানে এসেছি আপনার সাহায্য পাবার আশায়। কুজকো কারিকাঞ্চার পুরোহিত আমাদের সঙ্গের একটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। তার সাথে বেশ কয়েকজন লোকও আছে। বাচ্চাটাকে খোঁজার ব্যাপারে আপনার সাহায্য চাই।’

গাঁওবুড়ো টিহুয়ার কথা শুনে বললেন, ‘কুজকো করিকাঞ্চার পুরোহিত! ওরাতো ওই রকমই হয়। অনেক অনেক চাঁদ আগে ইনকা সম্রাট আর করিকাঞ্চার পুরোহিতরা মিলেই মহান সৃষ্টিকর্তা ওলাওলার সন্তান চিমুদের রাজধানী ‘চানচান’ ধ্বংস করেছিল! অস্ত্রের জোরে আমাদের ইনকা সম্রাটদের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করিয়েছিল! চানচান ছেড়ে এই বনে জঙ্গলে পালিয়ে এসেছিলাম আমরা। তারাও অবশ্য রেহাই পায়নি। ওলাওলার অভিশাপে তাদের সোনার নগরীও ধ্বংস হয়েছিল একদিন। লাঠির থেকে আগুন ঝরানো একদল বিদেশি ইনকা সম্রাটকে ফাঁসিতে লটকে সব সোনা লুঠ করে নিয়েছিল। করিকাঞ্চার পুরোহিতরাও রেহাই পায়নি সেদিন। বিদেশিরা তাদের ধরে তামার ষাঁড়ে জ্যান্ত সিদ্ধ করেছিল। উচিত শিক্ষা হয়েছিল তাদের।’

এ সব প্রাচীন ইতিহাস গাঁওবুড়ো বিজ্ঞের মতো টিহুয়াকে জানাবার পর তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তা করিকাঞ্চার পুরোহিত বাচ্চাটাকে নিয়ে কোথায় পালিয়েছে? কুজকো ছেড়ে তারা আবার কোথাও নতুন শহর স্থাপন করল নাকি?’

টিহুয়া জবাব দিল, ‘পুরোহিত তাকে নিয়ে গেছে নিষিদ্ধ নগরীতে। আপনি যদি সে নগরীর পথ বলে দেন, তাহলে ছেলেটাকে উদ্ধার করতে পারি আমরা।’

টিহুয়ার কথা শুনে এবার চমকে উঠলেন গাঁওবুড়ো। তিনি বললেন, ‘নিষিদ্ধ নগরী! সে নগরীতে গেলে বেঁচে ফেরা সম্ভব নয়! বাচ্চাটা যদি সেখানে পৌঁছে যায় তাহলে সে আর ফিরবে না। তোমরা সেখানে পৌঁছবার আগেই সে বলি হয়ে যাবে। পরে তোমাদেরও ওই দশা হবে।’ ভাগ্যিস টিহুয়া আর গাঁওবুড়োর কথাবার্তা বুঝতে পারছিলেন না মার্কেজ। নইলে গাঁওবুড়োর শেষ কথাগুলো তাঁর পক্ষে শোনা কষ্টকর হত।

গাঁওবুড়ো এরপর বললেন, ‘সেখানে হেঁটে যেতে হলে দুই চাঁদ লাগে। নৌকায় উজান বেয়ে গেলে অবশ্য তাড়াতাড়ি পৌছানো যায়। কিন্তু সে এক ভয়ঙ্কর দেশ। সেখানে গাছপালা নেই, খালি ছোটো ছোটো রুক্ষ পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় আছে ইনকাদের মন্দির। কাকা আমাজনীয়রা যুগযুগ ধরে পাহারা দিয়ে আসছে সে মন্দির। আকাশে সেখানে উড়ে বেড়ায় হিংস্র কনডোর পাখির ঝাঁক! মানুষ দেখলে তারা ছিঁড়ে খায়! যুবক বয়সে অনেক লোকজন মিলে একবার আমরা একবার সেই নগরীর দখল নিতে গেছিলাম। কিন্তু পারিনি। অনেক কষ্টে মাত্র কয়েকজন প্রাণ নিয়ে সেখান থেকে ফিরতে পেরেছিলাম! এই দ্যাখো তার চিহ্ন—’

এই বলে গাঁওবুড়ো তাঁর পালকের জামা বুকের ওপর টেনে তুলতেই বেরিয়ে পড়ল, তার বুক থেকে পেট পর্যন্ত এক বিঘত লম্বা একটা প্রাচীন ক্ষতচিহ্ন! তিনি বললেন, ‘কনডোরের ঠোঁটের দাগ এটা!’

টিহুয়া বলল, ‘যাই হোক আমাদের সেখানে যেতে হবে। ছেলেটাকে না নিয়ে আমরা ফিরতে পারব না। আপনি আমাদের যাবার রাস্তা বলে দিন।’ গাঁওবুড়ো প্রথমে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না টিহুয়ার কথায়। তিনি খালি বলে যাচ্ছিলেন, ‘ওলাওলার উপাসকদের কিছুতেই আমি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না! তোমরা কেউই আর ফিরবে না সেখান থেকে। তোমাদের মৃত্যুর জন্য ওলাওলা আমাকে অভিশাপ দেবেন।’

ইতিমধ্যে সুজয়দের চারপাশে আরও বেশ কিছু লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। সুজয়রা গাঁওবুড়ো আর টিহুয়ার কথা শুনে কিছু বুঝতে না পারলেও সে সব কথা শুনে তারা নিজেদের মধ্যে চাপা স্বরে আলোচনা শুরু করেছে, আর বিস্মিত ভাবে তাকাচ্ছে সুজয়দের দিকে।

গাঁওবুড়ো এরপর টিহুয়ার সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পর নাছোড়বান্দা টিহুয়ার কাছে হার মানতে বাধ্য হলেন। তিনি সম্মত হলেন নিষিদ্ধ নগরীর রাস্তা বাতলাতে। ভিড়ের মধ্যে থেকে তিনি কয়েকজন প্রবীণ চিমুকে ডেকে নিয়ে শলাপরামর্শ করতে বসলেন। দীর্ঘক্ষণ চলল সেই আলোচনা। অবশেষে গাঁওবুড়ো টিহুয়াকে বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমরা সেখানে যেতে চাচ্ছ যখন যাও। এখান থেকে দূরে উজানের পথে ‘পুমার মুখ’ নামে এক গুহা আছে। সেই পুমার মুখ দিয়ে পৌছে যাওয়া যায় সেই নগরীতে। আজ বিকালে নৌকায় যাত্রা শুরু করলে কাল ভোরে পুমার মুখে পৌঁছে যাবে তোমরা। আমাদের লোকরা সে জায়গা পর্যন্ত তোমাদের পৌঁছে দেবে। ওলাওলা যেন তোমাদের রক্ষা করেন।’

গাঁওবুড়ো এরপর তাঁর স্মৃতি হাতড়ে পুমার মুখ দিয়ে কীভাবে সেই মৃত্যু নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করা যাবে তাও মোটামুটিভাবে বলল টিহুয়াকে। মার্কেজ ও সুজয়রা দীর্ঘ সময় ধরে কার্যত দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। টিহুয়া এবার তাদের সমস্ত কথাবার্তা ব্যক্ত করল মার্কেজ আর সুজয়দের কাছে। শুধু সুসান আর তাদের পরিণতি সম্পর্কে গাঁওবুড়োর বক্তব্য বাদ দিল সে। সব কথা শুনে প্রফেসর তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘সত্যি যদি আমি সুসানকে ফিরে পাই তাহলে বৃদ্ধ বয়সে তোমাকে আর লামা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে ভাতের জোগাড় করতে হবে না। তোমার ভরপোষণের ব্যবস্থা আমিই করব।’

বিল হঠাৎ প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা নিষিদ্ধ নগরীর বিচামার মন্দিরে এমনকী আছে, যা পাহারা দেয় আমাজনীয়রা?’

গাঁওবুড়ো তাঁর সভা ভেঙে উঠতে যাচ্ছিলেন, টিহুয়া তাকে প্রশ্নটা করতে তিনি বললেন, ‘ঠিক জানি না। আগে মাঝে মাঝে কাকা কুজকোরা সেখান থেকে স্থলপথে এখানে আসত বলি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। জঙ্গলের মধ্যে চিমু বা অন্য জাতীয় কোনো লোককে একলা পেলে ধরে নিয়ে যেত। অনেক বছর আগে একটা উলটো ব্যাপার ঘটেছিল। বলি সংগ্রহ করতে আসা একজন দলছুট কাকা কুজকোকে ধরে ফেলেছিলাম আমরা। তার মুখ থেকে যা শুনেছিলাম তা হল, বিচামার বিগ্রহ নাকি পাহাড়া দেয় সে মন্দির। মন্দিরের দরজা নাকি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বন্ধই আছে। ভিতরে ঠিক কী আছে তা নাকি তাদেরও জানা নাই। তারা শুধু ওই মন্দির রক্ষা করে মাত্র। যে ওই দরজা খুলবে তাকে নাকি পুড়ে মরতে হবে! এর চেয়ে আর বেশি সে বলেনি আমাদের। আমরাও তাকে ওলাওলার থানে বলি দিই।’ এরপর বেদি ছেড়ে উঠে তার লোকজনকে যাত্রার বন্দোবস্ত করতে বলে গাঁওবুড়ো রওনা হলেন তাঁর কুঁড়ের দিকে।

সেখানেই বসল সুজয়রা। কিছুক্ষণ পর তাদের খাবার দিয়ে গেল চিমুরা। মৃৎপাত্রগুলোতে অসাধারণ সুন্দর কারুকাজ। খাবার পর দুটো ছোটোপাত্র তাদের ব্যাগের মধ্যে নিয়ে নিল বিল আর সুজয়। যদি কোনো দিন সভ্য জগতে ফেরা যায় তখন চিমুদের পটারি শিল্পের আশ্চর্য নমুনা তারা দেখাতে পারবে অন্যদেরকে। খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে সময় কাটাবার জন্য গ্রাম দেখতে বেরল তারা। চিমুদের পটারি শিল্পের বহু নিদর্শন দেখল তারা। দেখল কিভাবে তৈরি হয় পালকের পোশাক। তাছাড়া চিমুদের বিখ্যাত মোজেক শিল্পগুলোও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। নিষিদ্ধ নগরীর সন্ধান জানার পর মার্কেজ তার বিহ্বলতা অনেকখানি কটিয়ে উঠেছেন। মোজেকের স্থাপত্যগুলো দেখতে দেখতে সুজয়কে তিনি বললেন, ‘আপনাদের মনে হয় বলেছিলাম যে, চিমুদের রাজধানী চানচান এক সময় দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম জনপদ। সেখানে ছিল বিশাল বিশাল চত্বর, পিরামিড, জলাধার, বাগান, সমাধিক্ষেত্র। তার সব জায়গাতেই ছিল অপূর্ব সুন্দর মোজেকের কাজ। নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে চিমুরা ইনকাদের থেকেও উন্নত ছিল। ইনকারা তাদের পরাজিত করার পর চিমুদের শিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করে। ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে এ জায়গা দখল করতে থাকে ইনকা শিল্পরীতি। সভ্য জগৎ থেকে অনেক দূরে বলে বংশপরম্পরায় এ সব শিল্পকলা আজও এরা টিকিয়ে রাখতে পেরেছে।’

গ্রাম দেখতে দেখতে এক সময় বেলা পড়ে এলে সুজয়রা ফিরে এল সেই গাছের নীচে। গাঁওবুড়ো আবার তখন ফিরে এসেছেন। যারা সুজয়দের নিয়ে যাবে তারাও একে একে উপস্থিত হল সেখানে। সুজয়দের প্রত্যেককে একটা করে বর্শা, মশাল, আর কিছু খাবার দেওয়া হল। বিকাল নাগাদ সুজয়রা গাঁওবুড়োর থেকে বিদায় নিয়ে চিমুরক্ষীদের সাথে গ্রাম ত্যাগ করল। গ্রামের পূর্ব দিকে একটা ছোটো জঙ্গল অতিক্রম করে তারা এসে উপস্থিত হল নদীর ধারে। এ নদীর নাম ‘নিয়া’। ম্যারিনিয়নের শাখা নদী। নদীর পাড়ে পৌঁছে সুজয়রা দেখল সেখানে একটা গাছের নীচে বেশ কয়েকটা নৌকা রাখা আছে। নৌকা মানে পনেরো কুড়ি হাত লম্বা মোটা গাছের গুঁড়ি। তার ভিতর বসবাস করার জন্য খোঁদল করা আছে। চিমুরা লেগে গেল দুটো গাছের গুঁড়িকে ঠেলে জলে নামানোর কাজে। নদীর পাড়ে মাঝেমাঝে নীচু জমিতে জল জমে ছোটোছোটো ডোবা সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে বেশ বড়ো আকারের অজস্র ব্যাং। তাদের গায়ের রং উজ্জ্বল হলুদ। পিঠের ওপর তিনটে লম্বা কালো দাগ যেন তিন আঙুলের ছাপ। জলে নামার আগে টিহুয়া হঠাৎ একটা ডোবার সামনে দাড়িয়ে পড়ে তার জামার নীচ থেকে টেনে বার করল একটা ফুট দুয়েক লম্বা কাঠের সরু পাইপ আর একটা ছোটো থলি। সেই থলির মধ্যে থেকে বার হল ছোটো ছোটো বেশ কয়েকটা কাঁটা। মার্কেজ তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী এটা?’ টিহুয়া জবাব দিল, ‘ব্লো পাইপ। গ্রামের একজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছি।’

সুজয় ‘ব্লো পাইপের’ কথা বইতে পড়েছিল। জিনিসটা এই প্রথম চাক্ষুস করল। মার্কেজ বললেন, তুমি ব্লো পাইপ ছুড়তে পারো? টিহুয়া জবাব দিল, ‘হ্যাঁ পারি’। এরপর সে একটা অদ্ভুত কান্ড করল! ডোবার ধারে বসে পড়ে খপ করে একটা ব্যাঙ ধরে ফেলল! তারপর ব্লো পাইপের কাঁটাগুলো ব্যাঙটার মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে আবার তা বার করে আনতে লাগল। কাঁটাগুলো ভিজে যেতে লাগল ব্যাঙের মাথা নিঃসৃত হলুদ রসে!

বিল সুজয়কে বলল, ‘ও কী করছে জানো? ব্লো পাইপের তিরে বিষ মাখাচ্ছে। এই ব্যাং একমাত্র দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া যায়। নাম, ‘থ্রি-স্ট্রাইপড পয়জন ফ্রগ।’ এদের আরও একটা প্রজাতি আছে তারা কালোর ওপর হলুদ বর্ণের। তার নাম ‘অ্যারো পয়েজন ফ্রগ’। আমাজনে দেখেছি আমি। এই ব্যাংগুলোর দেহরস সাপের বিষের চেয়েও তীব্র! আমাজনীয় উপজাতিরা তাদের তিরের ফলায় এই বিষ মাখিয়ে নেয়। ওই তিরের একটা খোঁচা খেলে মুহূর্তের মধ্যে মানুষ অচৈতন্য হয়ে যায়, তারপর ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে!’

তার কাজ শেষ হয়ে গেলে ব্যাংটাকে ডোবার জলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল টিহুয়া। মার্কেজ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত সব তুমি শিখলে কোথায়?’ টিহুয়া হেসে জবাব দিল, ‘সেনর, আমার বয়সও তো কম হল না! ছোটোবেলা থেকেই লামা নিয়ে সাহেবদের সাথে বনে জঙ্গলে অনেক ঘুরে বেড়িয়েছি। অনেক উপজাতিদের সাথেও মিশেছি আমি। নানা জায়গাতে নানা জনের থেকে অনেক কিছু জেনেছি আমি। জীবনের শিক্ষাইতো হল ‘জানা’ তাই না?’ কথার শেষে টিহুয়া যেন দার্শনিকের মতো একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল প্রফেসরের দিকে!

মার্কেজ বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। আর তার জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। পুঁথি পড়ে সব জানা যায় না। জীবনের থেকেই শিক্ষা নেয় মানুষ। আমিও এই যাত্রাপথে অনেক কিছু শিখলাম, জানলাম, যা ঘরে বসে জানা সম্ভব ছিল না!’

জলে নৌকা নামিয়ে ফেলল চিমুরা। সুজয়রা চারজন গিয়ে বসল তার একটাতে। সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। নদীর ওপর দিয়ে পাখিরা তাদের বাসায় ফিরতে শুরু করেছে। দাঁড় বাইতে শুরু করল চিমুরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা নেমে এল পৃথিবীর বুকে। আকাশ, জঙ্গল, নদী, সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল গাঢ় অন্ধকারে। তারপর এক সময় ধীরে ধীরে চাঁদ উঠল। নদীর জলে ধরা পড়ল তার প্রতিবিম্ব। দু-পাশে গভীর জঙ্গল, তার মধ্যে দিয়ে চন্দ্রালোকে চিমুদের নৌকা ছপছপ শব্দে উজান বেয়ে সুজয়দের নিয়ে চলল এক অজানা দেশের দিকে। যে দেশের নাম, ‘নিষিদ্ধ নগরী’! ইনকা পুরোহিত সুসানকে নিয়ে গেছেন সে মুলুকে।

১৩

ঘুম ভেঙে পাশ ফিরে, তার দাদু, সুজয় বা বিল কাউকে দেখতে পেল না সুসান। কিন্তু সবাইতো তার পাশেই শুয়েছিল! উঠে বসতে গেল সে। কিন্তু পারল না। মাথাটা বড্ড ভার লাগছে! সে অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে। সুসান মনে মনে ভাবল, ‘তাহলে কি ভোর হয়ে গেল! সবাই কি তাকে ঘরে রেখে বাইরে বেড়াতে চলে গেল! কিন্তু তাতো হবার কথা নয়, নিশ্চই তারা ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সুসান কান খাড়া করল। হ্যাঁ, ওইতো! অস্পষ্ট কথার শব্দ যেন বাইরে শোনা যাচ্ছে! নিশ্চই তাহলে তারা!

দ্বিতীয় বারের চেষ্টায় সুসান উঠে বসল। কিন্তু এটাতো সেই ঘর নয়, এটা তো একটা তাঁবু! এখানেই কি তাহলে রাতে শুয়ে ছিল? সুসানের মাথাটা গুলিয়ে গেল। বাইরে থেকে একটা আলো এসে ঢুকছে তাঁবুতে। কিন্তু তা যেন কেমন ম্যাড়মেড়ে, বিষণ্ণ। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর সুসান ধীরে ধীরে উঠে তাঁবুর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তাকাতেই সুসান অবাক হয়ে গেল, আরে, বাইরেতো বিকেল! একটা জঙ্গলের মধ্যে তারা রয়েছে! বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে ওঠার পর সুসান দেখল, কিছু দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন মিস্টার পিনচিও আর ইনকা পুরোহিত। সুসান ভালো করে বাইরে চারপাশে তাকিয়েও সুজয়দের কাউকে না দেখতে পেয়ে পিনচিওর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল, ‘আঙ্কেল, আমার দাদুরা কই?’

তার গলা শুনে তাঁরা দুজন কথা বন্ধ করে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন সুসানের সামনে। পিনচিও হাসি মুখে জানতে চাইলেন, ‘কি ব্রেভ বয়, তোমার ঘুম কেমন হল?

সুসান বলল, ‘ভালো। আমার দাদু, সুজয় আঙ্কল, এরা কোথায়?’

ইনকা পুরোহিতের সাথে একবার দৃষ্টি বিনিময় করে নিয়ে পিনচিও সুসানকে বললেন, ‘তাঁরা সব চলে গেছেন।’

‘কোথায়?’ বিস্মিত হয়ে জানতে চাইল সুসান।

পিনচিও বললেন, ‘তোমার দাদুর যে শহর দেখতে যাবার কথা সেখানে। তিনি আগে গেছেন, আমরা কাল সকালে যাব।’

সুসান অবাক হয়ে বলল, ‘কিন্তু আমরাতো একটা শহরে গেছিলাম! রাতে সেখানে একটা ঘরে শুয়েছিলাম, সে শহরটা কোথায় গেল?’

পিনচিও অবাক হবার ভান করে প্রথমে বললেন, ‘কই না তো! আমরাতো কোনো শহরে যাইনি! এরপর তিনি হেসে ফেলে বললেন, ‘ও বুঝেছি, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে তো, ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখেছ!’

সুসান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে ভাবল, ‘সেই যে একটা পুরনো শহরে তারা গেল, সেখানে কুইলো বলে একটা লোক তার প্রাসাদে সবাইকে নিমন্ত্রণ করল! ইনকা পুরোহিত তাকে কোথায় নিয়ে যাবার কথা বললেন! তারপর সেখান থেকে ফিরে গিয়ে পাথরের ঘরটাতে সবাই মিলে এক সাথে শুয়ে পড়ল,—এ সবই কি তাহলে স্বপ্ন!’

কিন্তু তার দাদু তাকে এখানে রেখে গেল কেন? সুজয় আঙ্কল, বিল আঙ্কল, তারাও তো নেই! ব্যাপারটা চিন্তা করে দাদুর ওপর অভিমানে কান্না পেয়ে গেল তার। সে অস্ফুট স্বরে বলল, ‘আমাকে ওরা সঙ্গে নিল না কেন?’

ইতিমধ্যে হুইকোও এসে দাঁড়াল সেখানে। তার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে পিনচিও বললেন, ‘চলতে চলতে এক জায়গাতে থেমেছিলাম আমরা। সেখানে তুমি ঘুমিয়ে পড়লে। কিছুতেই তোমার ঘুম ভাঙানো গেল না। এদিকে তোমার দাদুকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। তখন আমি তাকে বললাম, ‘ও তো বড় হয়ে গেছে। আর ও তো খুব সাহসী। ঠিক টিনটিনের মতো! আপনারা এগোন, ওর ঘুম ভাঙলে ওকে নিয়ে আমি পরে যাচ্ছি।’

এরপর একটু থেমে তিনি বললেন, ‘তুমিতো আমাকে বলেছিলে যে দাদুকে ছাড়া তুমি থাকতে পারবে, কি মনে আছে? এ কথাটাও আমি বলেছি প্রফেসর মার্কেজকে। তিনি এটাও দেখতে চেয়েছেন যে তুমি সত্যি সাহসী ছেলে কিনা? দাদুকে ছেড়ে আমাদের সাথে থাকতে পার কিনা?’

সুসান কাঁদতে গিয়েও চুপ করে গেল, পাছে এই লোকগুলো তাকে ভীতু ভাবে এই ভেবে।

পিনচিও এর পর সুসানের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘তুমি ম্যাজিক দেখবে ম্যাজিক?’ ইনি খুব ভালো ম্যজিক জানেন! ‘এই বলে তিনি ইল্লাপাকে দেখালেন।

ইনকা পুরেহিতরা যে জাদুকর হয় তা তার দাদুকে বলতে শুনেছিল সুসান। কান্নাটা চাপার চেষ্টা করে, ঘাড় নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, দেখব।’

পিনচিও তাকালেন ইনকা পুরোহিতের দিকে। ইনকা পুরোহিত, তার পাশে হুইকোকে কী যেন বলতেই, সে তার পাথরের চোখটা খুলে তাঁর হাতে দিল। তিনি চোখটা হাতের তালুতে নিয়ে প্রথমে মেলে ধরলেন সুসানের সামনে। তারপর মুঠিটা বন্ধ করলেন। কয়েক মুহূর্ত সে ভাবে হাতটাকে তিনি ধরে রেখে মুঠিটা ধীরে ধীরে খুলতেই সুসান দেখল তার হাতে রাখা চোখটা একদম ভ্যানিশ! এর পরই তিনি আবার সেই চোখটা সুসানের জামার পকেট থেকে বার করলেন!

অবাক হয়ে গেল সুসান। পিনচিও বললেন, ‘উনি আরও অনেক ম্যাজিক জানেন। তুমি যদি ভালো ছেলের মতো ওনার কথা শোন, তাহলে উনি আরও দেখাবেন, তোমাকে শিখিয়েও দেবেন। কিন্তু যারা ওঁর কথা শোনে না তাদের উনি কী করেন জানো? মন্ত্র পড়ে তাদের তিনি লামা বানিয়ে দেন! ‘সুসান চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, ‘সত্যি?’

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, একদম সত্যি। যে লামাগুলো মোট বইছে, তারাওতো মানুষ ছিল, ইনকা পুরোহিতের কথা না শোনাতে তিনি তাদের লামা বানিয়ে দিয়েছেন। এখন মোট বয়ে মরছে ব্যাচারারা।’

কথাটা শোনার পর সুসান তাকিয়ে রইল ইনকা পুরোহিতের দিকে।

পিনচিও এরপর বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি এখন তাঁবুর ভিতরে থাকো। কোনো ভয় নেই, রাতে আমি তোমার সাথে শোব।’

সুসান আবার গিয়ে শুয়ে পড়ল তাঁবুর ভিতর। তারপর তার দাদুর কথা, বিল আঙ্কল, সুজয় আঙ্কলের কথা ভাবতে লাগল। ঘুম ভাঙার পরইতো সকলে এক সাথে যেতে পারত। দাদুদের কি তর সইল না! আবার কান্না পেয়ে গেল তার। কিন্তু, তার কান্না শুনে ইনকা পুরোহিত যদি রেগে গিয়ে তাকে লামা বানিয়ে দেন!? সুসান এই ভেবে কান্না চেপে কম্বলে মুখ গুঁজে শুয়ে রইল।

বাইরে অন্ধকার নামল এক সময়। কে যেন একটা মশাল পুঁতে দিয়ে গেল তাঁবুর বাইরে। সুসান চুপচাপ শুয়ে রইল। অন্ধকার নামার পর থেকেই একটা শব্দ অনেক দূর থেকে যেন ভেসে আসতে শুরু করল। ঢাকের বাজনা। দ্রিমি-দ্রিমি শব্দে বেজে চলেছে, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে। রাত যত বাড়তে লাগল, সেই বাজনা তত যেন কাছে এগিয়ে আসতে লাগল। এক সময় উঠে গিয়ে বাইরে উঁকি দিল সুসান। তাঁবুর কাছেই একটা বড় অগ্নিকুন্ড জ্বালানো হয়েছে। তার পাশে গম্ভীর মুখে কী যেন আলোচনা করছেন পিনচিও, ইনকা পুরোহিত আর হুইকো। তাদের আরও একটু দূরে রান্নাবান্না করছে লামা নিয়ে আসা লোকগুলো। ঢাকের শব্দ এখন আরও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। একটানা শব্দ।

এর কিছুক্ষণ পর তাঁবুতে দুজনের খাবার নিয়ে এলেন পিনচিও। তার মুখ গম্ভীর, খেতে খেতে তিনি শুধু বললেন, ‘কাল কিন্তু খুব ভোরে উঠব আমরা। অনেকটা পথ যেতে হবে আমাদের।’

সুসান বলল, ‘কালই কি আমরা দাদুদের কাছে পৌঁছে যাব?’

তিনি শুধু বললেন, ‘হুঁ।’

সুসান এরপর তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ওই যে শব্দ হচ্ছে, ঢাক বাজাচ্ছে কারা?’

পিনচিও এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘এখন আমরা শুয়ে পড়ব। আর রাতে তাঁবুর বাইরে যাবার দরকার হলে আমাকে ডাকবে। জঙ্গলে অনেকরকম হিংস্র জন্তু জানোয়ার আছে, একলা বেরোলে বিপদ হতে পারে।’

সুসান ঘাড় নেড়ে বলল, ‘আচ্ছা’।

কিছুক্ষণের মধ্যেই খাওয়া শেষ হল। সুসান শুয়ে পড়ল কম্বল মুড়ি দিয়ে। কিছু তফাতে শুলেন পিনচিও। এর পর ঢাকের শব্দ শুনতে শুনতে আর দাদু, সুজয় আঙ্কেলের কথা চিন্তা করতে করতে আবার সুসানের চোখে ঘুম নেমে এল।

মাঝ রাতে প্রচন্ড চিৎকার চ্যাঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙে উঠে বসল সুসান। তাঁবুর বাইরে একটু দূরেই যেন খুব জোরে অনেকগুলো ঢাক বাজছে! আর তার সাথে মানুষের কোলাহল। বেশ কয়েক বার রাইফেলের শব্দও শোনা গেল, দুড়ুম দুম! দুড়ুম দুম! সুসান দেখল পিনচিও আঙ্কেলও উঠে বসে তাকিয়ে আছেন তাঁবুর বাইরের দিকে। তারও হাতে ধরা রাইফেল। বাইরে কী হচ্ছে সুসান বুঝতে পারল না। এর পর মুহূর্তেই দৌড়ে এসে তাঁবুতে ঢুকল, হুইকো আর ইনকা পুরোহিত। হুইকোর হাতেও ধরা আছে রাইফেল। ইনকা পুরোহিতের কাঁধে বসা পাখিটা কর্কশ স্বরে চিৎকার করছে। তাঁবুতে ঢুকেই হুইকো পিনচিওকে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি তাঁবুর বাইরে চলুন, এখুনি আমাদের পালাতে হবে! অসভ্য মোচে গোষ্ঠীর জংলিরা তাঁবু আক্রমণ করেছে! আমাদের রক্ষীরা গুলি চালাচ্ছে। কিন্তু ওরা সংখ্যায় অনেক। তিন চারটে রাইফেল দিয়ে ওদের বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। তাড়াতাড়ি! তাড়াতাড়ি!’

তার কথা শোনার সাথে সাথেই পিনচিও সুসানকে নিয়ে তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়ালেন। জঙ্গলের মধ্যে একটু ফাঁকা জায়গাতে তাঁবু ফেলা হয়েছিল। সুসান দেখল, দক্ষিণের জঙ্গলটা মশালের আলোয় আলোকিত। অনেক অনেক মশাল। সেই আলোতে জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মানুষ! মুখে উল্কি আঁকা, অর্ধউলঙ্গ ভূতের মতো সব মানুষ! মশালের আলোতে তাদের উদ্যত বর্শাফলক ঝলকাচ্ছে! মুখে বিভৎস চিৎকার! মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে দুজন রক্ষী রাইফেল চালাচ্ছে তাদের লক্ষ্য করে। সুসানরা বাইরে এসে দাঁড়াতেই তৃতীয় একজন লামাঅলা রক্ষী পিনচিওর হাত থেকে রাইফেলটা নিয়ে তাক করল জঙ্গলের দিকে। এবার জঙ্গলের ওদিক থেকেও ছুটে আসতে লাগল ঝাঁকে ঝাঁকে বর্শা। যে রক্ষী পিনচিওর হাত থেকে রাইফেল নিল, সে দুটোমাত্র গুলি ছুঁড়তে পারল। তার পরই একটা বর্শা এসে তার পাঁজর এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল! একটা বিকট আর্তচিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেল লোকটা! ইনকা পুরোহিত, আর অপেক্ষা করলেন না। এক ঝটকায় তিনি সুসানকে নিজের কাঁধে উঠিয়ে নিয়ে ছুটতে শুরু করলেন পুব দিকের জঙ্গলের দিকে। তার পিছন পিছন ছুটলেন পিনচিও আর হুইকো। তাদের তাঁবু, লামা, সব সেখানে পড়ে রইল। অন্য রক্ষী দুজনও গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পিছু হঠার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসা বর্শার আঘাতে তারাও মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। জঙ্গলের অনেক দূর পর্যন্ত সুসানরা শুনতে পেল রক্ষীদের কাটা মুন্ডু নিয়ে অসভ্য জংলিদের নারকীয় উল্লাসের শব্দ!

সুসানকে কাঁধে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছুটে চললেন ইনকা পুরোহিত। ক্রমে ক্রমে এক সময় পিছনে মিলিয়ে গেল জংলিদের কোলাহল, ঢাকের শব্দ। তবু থামলেন না ইনকা পুরোহিত। অস্পষ্ট চাঁদের আলোতে এগোতে থাকলেন তারা। তাদের এ চলার যেন বিরাম নেই। সুসানের মনে হল স্বপ্নের ঘোরে ইনকা পুরোহিতের কাঁধে চেপে যেন চলছে সে। তার পর এক সময় ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। হাঁটার গতি এবার একটু শ্লথ করলেন ইল্লাপা। ভোরবেলা তারা পৌছল একটা নদীর ধারে। সেখানে পৌঁছে সুসানকে কাঁধ থেকে নামালেন ইনকা পুরোহিত। সকলে জিরিয়ে নেবার জন্য একটু বসল নদীর ধারে।

মাটিতে বসে পড়ে পিনচিও বললেন, ‘জংলিগুলো আবার আমাদের পিছু ধাওয়া করবে নাতো?’

ইনকা পুরেহিত একটু যেন চিন্তান্বিত হয়ে বললেন, ‘ঠিক বুঝতে পারছি না। এমনিতে ওরা ওদের গ্রামের আশেপাশেই ঘোরাঘুরি করে। হঠাৎ ওরা ওদের গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে আমাদের আক্রমণ করল কেন তাও বুঝতে পারছি না!’

এরপর একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘যে ভাবে ওরা ঢাক আর লোকজন নিয়ে বেরিয়েছে তাতে মনে হচ্ছে ওরা দীর্ঘ সফরের জন্য তৈরি। হয়তো ওদের যাত্রাপথের মধ্যে পড়ে গেছিলাম আমরা। তাই ওরা আমাদের আক্রমণ করল। নইলে ওদের গ্রাম থেকে অন্তত দশ মাইল পশ্চিমে ছিল আমাদের তাঁবু।

পিনচিও আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কী মনে হয়, ওরা কোথায় যাচ্ছে?’

ইল্লাপা বললেন, ‘ঠিক বলতে পারব না। এ সব অঞ্চলে পনেরো বিশ মাইল দূরে দূরে অসভ্য উপজাতিদের ছোটো ছোটো গ্রাম আছে। তাদের নিজেদের মধ্যে মাঝে মাঝেই ঝগড়া ঝামেলা হয়। এ ওর গ্রামে হানা দিয়ে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, শত্রুর মাথা কাটে। হয়তো সে রকমই কোনো অভিযানে বেরিয়েছে ওরা!’ হুইকো এবার তাঁর কাছ জানতে চাইল, ‘নিষিদ্ধ নগরীতে পৌঁছোতে আর কত সময় লাগবে আমাদের?’

ইনকা পুরোহিত বললেন, ‘বিকাল নাগাদই আমরা সেখানে পৌঁছে যাব। কিন্তু যতক্ষণ না কনডোর গুলোর চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে ততক্ষণ সেখানে প্রবেশ করা যাবে না। অন্ধকার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

কিছুক্ষণ সেখানে বিশ্রাম নিল সুসানরা। কাদের যেন একটা ভেলা রাখা ছিল নদীর ধারে। সেটাতে চেপে নদী পার হয়ে ওপাশের জঙ্গলে পৌঁছে আবার তারা চলতে থাকল। কখনো ইনকা পুরোহিত, কখনো হুইকো সুসানকে কাঁধে নিয়ে চলল। সূর্য ক্রমশ মাথার ওপর উঠতে শুরু করল। আরও একটা বেশ বড়ো নদী পার হল তারা দুপুরের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে গাছপালা যেন কমে আসতে লাগল। পায়ের নীচে ঘাস মুছে গিয়ে পাথুরে জমি বেরিয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে তাদের চোখে ভেসে উঠল ছোটো ছোটো নেড়া পাহাড়ের সারি। ইনকা পুরোহিতের ঠোঁটের কোনায় এবার হাসি ফুটে উঠল। দূরের পাহাড়গুলোর দিকে আঙুল তুলে তিনি পিনচিওকে বললেন, ‘ওই পাহাড়গুলোর মধ্যেই সেই নগরী। যার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলাম আমরা।’ তাঁর কথা শুনে পিনচিওর চোখ দুটোও যেন চিকচিক করে উঠল। তিনি ইল্লাপাকে কী একটা বলতে গিয়েও সুসানের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেলেন। ক্রমশই কাছে এগিয়ে আসতে লাগল সেই পাহাড় শ্রেণি। দু-পাশের প্রকৃতিও তত রুক্ষ হয়ে উঠতে লাগল। মাঝে মাঝে শুধু ঘাস ঝোপ। সূর্যের তাপে পিঙ্গল বর্ণ ধারণ করেছে। এছাড়া অন্য কোনো গাছপালা নেই। পাহাড়ের পাদদেশে এসে উপস্থিত হল সুসানরা। পাশাপাশি বেশ কয়েকটা পাহাড়। সুসানরা যে পাহাড়ের সামনে এসে উপস্থিত হল তার একটা পাহাড় পরেই আর একটা পাহাড়ের মাথাতে যেন অস্পষ্ট ভাবে চোখে পড়ছে প্রাকার স্তম্ভ ইত্যাদি। তার মাথার ওপর পাক খাচ্ছে কালো কালো পাখি। অনেক উঁচুতে বলে তাদের ঠিক চেনা যাচ্ছে না! ইনকা পুরোহিত সেই দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কনডোরের ঝাঁক আকাশ থেকে নগরী পাহারা দিচ্ছে। ওখানেই যাব আমরা।’

ইনকা পুরোহিত পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে চড়াই-উতরাই ভেঙে এগোলেন সেই পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। রাস্তার পাশে পাহাড়ের গায়ে ছোটো বড়ো গুহা মুখ। পিনচিও ইল্লাপাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ সব গুহাগুলো কীসের?’

পুরোহিত বললেন, ‘এর ভিতর অনেক জায়গাতে ইনকাদের সমাধি আছে। ইনকা পাচাকুটির আমলে এ জায়গা ছিল সমাধি স্থল। কিছু কিছু গুহার মধ্যে দিয়ে ওই নগরীতেও পৌঁছান যায়। পাহাড়ের ওপাশে একটা নদী আছে। কিছু কিছু রাস্তা সে পর্যন্তও গেছে।’

জায়গাটা গাছপালাহীন বলে রোদের তাপ প্রচন্ড। সম্ভবত তাই পিনচিও বললেন, ‘এ রকম একটা সুড়ঙ্গ পথে আমরা নগরীতে পৌঁছতে পারি না?’

ইল্লাপা বললেন, ‘হ্যাঁ, পারি। তবে প্রাচীন সুড়ঙ্গ, নানান রকম বিপদ থাকতে পারে ভিতরে। ওপাশের নদীর থেকে অনেক সময় বড়ো মাচাকুয়ে বাসা বাঁধে সুড়ঙ্গের ভিতর। তাই ও পথ নিরাপদ নয়। চোরের মতো নগরীতে ঢুকতে হলে আমাদের গুহাপথই ধরতে হত। কিন্তু করিকাঞ্চার পুরোহিত নগরীতে প্রবেশ করবে নগরীর প্রধান তোরণ দিয়ে। আজ সাক্ষাৎ ইনকা আছেন আমার সাথে।’ এই বলে হাসলেন তিনি।

সুসান যাচ্ছিল হুইকোর কাঁধে চেপে। এতক্ষণ পর সে হঠাৎ পিনচিওকে প্রশ্ন করল, ‘আমার দাদু, সুজয় আঙ্কল, এরা তো সবাই ওখানে আগেই পৌছে গেছে তাই না?’

তার কথা শুনে সবাই হাসতে শুরু করল। সুসান অবাক হয়ে পিনচিওকে প্রশ্ন করল, ‘তোমরা হাসছ কেন?’

হাসি থামিয়ে পিনচিও বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, এতক্ষণে তারা নিশ্চয় পৌঁছে গেছেন!’

ইনকা পুরোহিত যে পথ ধরে চললেন, মাঝে মাঝেই সে পথের ধারে পড়ে আছে লামার কঙ্কাল, হাড়গোড়। পিনচিও তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত প্রাণীর কঙ্কাল কীভাবে এখানে এল?’

ইল্লাপা বললেন, ‘বিচামার মূর্তির সামনে লামা বলি দেবার পর তাদের দেহগুলো এখানে ফেলে যাওয়া হয়। মৃত্যু দেবতা বিচামার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত প্রাণীর মাংস আমাজনীয় রক্ষীরা খায় না। আর কোনো অজানা কারণে কনডোররাও ছোঁয় না এ মাংস।’

বেশ কিছুটা এগোবার পর পথের পাশে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল সকলে। সুসান অবশ্য তা দেখে একটু ভয়ও পেয়ে গেল! একটা গুহা মুখের ঠিক সামনে পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে একটা নর কঙ্কাল। তার দেহে কোনো পোশাক আশাকের আজ কোনো চিহ্ন না থাকলেও লোহার নাল লাগানো চামড়ার জুতো জোড়া এখনও তার পায়ের সাথে আটকে আছে। একটা মরচে ধরা বন্দুক তার কোলে রাখা। ভঙ্গিটা এমন যে বন্ধুকটা হাতে ধরে যেন এখনই উঠে দাঁড়াবে লোকটা! ইনকা পুরোহিত কঙ্কালটার দিকে তাকিয়ে পিনচিওর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমার মতোই এ লোকটা কোনো ভাগ্যান্বেষী ইউরোপীয় ছিল। সোনা খুঁজতে হয়তো এসেছিল এখানে। ফিরে যেতে পারেনি। যুগ যুগ ধরে হাত পা ছড়িয়ে এখানেই বসে আছে!’ পিনচিওর লোভী চোখ হঠাৎ খেয়াল করল, কঙ্কালটার দাঁতগুলো যেন চকচক করছে। সে বলল, ‘ওর দাঁতগুলো দেখছি সোনার! ওঁরতো আর এখন খাবার চিবুতে হয় না। দাঁতগুলো তাহলে খুলে নেই।’ এই বলে তিনি পা বাড়াতে যাচ্ছিলেন সে দিকে, কিন্তু ইনকা পুরোহিত দুর্বোধ্য ভাষায় তাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘মৃত মানুষের জিনিস চুরি করলে প্রেতাত্মারা অভিশাপ দেন। আমাদের উদ্দেশ্য তাহলে পন্ড হবে।’ এই বলে এরপর আবার চলতে শুরু করলেন ইনকা পুরোহিত।

তৃতীয় পাহাড়টা যত কাছে মনে হচ্ছিল আসলে সেটা তত কাছে নয়। ঘণ্টা দু-এক পাথুরে পাকদন্ডী বেয়ে চলার পর অবশেষে সেই পাহাড়ের পাদদেশে উপস্থিত হলেন ইনকা পুরোহিত। একটা গুহার মতো জায়গাতে আশ্রয় নিল তারা। এখনও বেশ বেলা আছে। সন্ধ্যা নামতে অন্তত ঘণ্টা তিনেক দেরি। পাহাড়ের মাথায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, নগর প্রাকার, ঘর, বাড়ি, ইনতিহুয়াতানা, পাখিগুলোও ওড়াউড়ি করছে আকাশে। তবে প্রাকারে কোনো মানুষ চোখে পড়ছে না। ইনকা পুরোহিত, পিনচিওকে বললেন, ‘নগরীতে পাহাড়ের দেওয়াল ঘেঁষে পাথুরে ছাদঅলা বৃত্তাকার টানা বারান্দা আছে। কনডোরগুলোর জন্য রক্ষীরাও দিনের বেলা কেউ খোলা আকাশের নীচে আসে না। ওই বারান্দা দিয়েই নগরীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া আসা করে। কনডোররা ওদেরও রেয়াত করে না। যতক্ষণ না কনডোরদের ওড়াউড়ি বন্ধ হয় ততক্ষণ ওপরে ওঠা যাবে না। এ নগরী সম্রাট পাচাকুটি বানিয়ে ছিলেন তার বিপদকালীন আশ্রয়স্থল হিসাবে। ইনকা সম্রাট, তাঁর প্রধান সেনাপতি, কুজকো সূর্যমন্দিরের পুরোহিতরা ও খিপুকামেওক অর্থাৎ সম্রাটের প্রধান হিসাবরক্ষক ছাড়া কেউ নগরীতে প্রবেশ করতে পারতেন না। ইনকা আতাহুয়ালপা যদি এখানে পালিয়ে আসতে পারতেন তাহলে বিদেশিরা তার কোনো ক্ষতি করতে পারত না।’

পিনচিও জিজ্ঞেস করলেন, ‘বিচামার মন্দির নগরী কোথায়?’

ইল্লাপা বললেন, ‘আমরা যে রাস্তায় নগরীতে প্রবেশ করব তার বিপরীত প্রান্তে নগরীর শেষ মাথায় পাহাড় কুঁদে তৈরি সেই মন্দির। গত পাঁচশ বছর ধরে সে মন্দিরের দরজা বন্ধ। বিচামা তার ঘর ছেড়ে মন্দিরের বাইরে অবস্থান করছেন। আর ঘরের ভিতর আছেন সূর্যদেব। তাই ও মন্দিরকে সূর্যমন্দিরও বলা যায় এখন। সূর্যদেব বলতে আমি কী বলতে চাচ্ছি তা নিশ্চই বুঝতে পারছো? রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল ইল্লাফার ঠোঁটে।

পিনচিও মৃদু হেসে বললেন, ‘কালইতো বিচামার ঘর খালি হয়ে যাওয়ার কথা তাই না?’

ইনকা পুরোহিত গম্ভীরভাবে বললেন, ‘সব ঠিক থাকলে তাই হবে। কাল সন্ধ্যার পর নগরীতে ‘কাপাক সিতুওয়া’ অর্থাৎ ‘বলিদান’ অনুষ্ঠান হবে। বলির রক্তে নগরী শুদ্ধিকরণ হবে। সারা রাত ধরে সেই অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকবে সবাই।’

সুসান যাতে শুনতে না পায়, এমন ভাবে চাপাস্বরে পিনচিও জানতে চাইলেন, ‘বলি মানে, লামা না নরবলি?’

ইল্লাপা মৃদু স্বরে জবাব দিলেন, ‘নরবলি।’

‘কাদের বলি দেওয়া হবে?’ আবার জানতে চাইলেন পিনচিও।

ইনকা পুরোহিত তাঁর এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তাকিয়ে রইলেন পাহাড়ের মাথায় নগরীর দিকে।

গুহার ভিতরে বসে সন্ধ্যা নামার প্রতীক্ষা করতে লাগলেন ইনকা পুরোহিত। সুসান এক কোণে ঘুমিয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে এক সময় সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ল। আর তার সাথে সাথেই পাখির ঝাঁক হারিয়ে যেতে লাগল নগরীর আকাশ থেকে। ইনকা পুরোহিতের ইশারাতে সুসানের ঘুম ভাঙিয়ে দিল হুইকো। সে উঠে বসার পর ইনকা পুরোহিত তাঁর পোশাকের নীচ থেকে একটা থলে বার করে সেটা হুইকোকে দিয়ে বললেন, ‘এগুলো বাচ্চাটাকে পরাতে হবে। তারপর নগরীর দিকে উঠব আমরা।’ থলে থেকে বার হল, লাল রঙের রেশমের তৈরি একটা ঝলমলে পোশাক, সোনালি সুতোর কাজ করা একটা চওড়া ফিতে। আর একটা ছোট্ট কাঠের পাদুকা। সেই পাদুকার ওপরও সোনালি পাত বসানো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই পোশাকে সুসানকে সাজিয়ে তুলল হুইকো। ফিতেটা বেঁধে দেওয়া হল তার কপালে। সব শেষে ইল্লাপা সোনার তৈরি ব্রোচ আটকে দিলেন সুসানের কপালের ফেট্টিতে। ছটা সহ সূর্যদেবের মুখমন্ডল খোদিত আছে তাতে।

পিনচিও ইল্লাপাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওটা লাগালেন কেন?’

ইনকা পুরোহিত জবাব দিলেন, ‘এটা একটা প্রাচীন জিনিস। ইনকা রাজবংশের পরিচয় জ্ঞাপক চিহ্ন। এতদিন কুজকো মন্দিরে রক্ষিত ছিল।’

সুসানকে পুরদস্তুর ইনকা পোশাকে সাজিয়ে ইনকা পুরোহিত গুহার বাইরে এসে দাড়ালেন। বাইরের আলো তখন নিভে যেতে বসেছে।

ধাপ বেয়ে পাহাড়ের ওপর নগরীর দিকে উঠতে শুরু করল সুসানরা। অন্ধকার গাঢ় হতেই বিন্দু বিন্দু মশালের আলো একটা দুটো করে জ্বলে উঠতে শুরু করল পাহাড়ের মাথায়। মৃদু কোলাহলও যেন ভেসে আসতে শুরু করল সেখান থেকে। সূর্য ডোবার পর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে মৃত্যু নগরী। এ নগরী সম্রাট পাচাকুটি উৎসর্গ করেছিলেন মৃত্যু দেবতা বিচামার উদ্দেশ্যে। ধাপ বেয়ে কিছুটা ওপরে ওঠার পর পাথর বিছানো রাস্তা এগিয়েছে নগরীর দিকে। সে রাস্তা ধরে অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে চলল সকলে। সবার আগে সুসানের হাত ধরে ইনকা পুরোহিত, তারপর পিনচিও আর হুইকো। অন্ধকারের মধ্যেও ইনকা পুরোহিত যেভাবে পা ফেলে এগোচ্ছিলেন তাতে বোঝা যাচ্ছিল, এ পথ তার চেনা। অর্ধেক রাস্তা ওঠার পর হঠাৎ তাদের চোখে পড়ল এক ঝাঁক আলোক বিন্দু দ্রুত গতিতে পাক দন্ডী বেয়ে নীচের দিকে নামতে শুরু করেছে। ইল্লাপা বললেন, ‘রক্ষীরা আমাদের উপস্থিতি টের পেয়েছে। তাই দেখতে আসছে আমরা কারা!’ সুসানরা ওপরে উঠতে লাগল, আর আলোগুলো নামতে লাগল নীচের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই মশালের আলোগুলো এসে পড়ল তাদের কাছে। দাঁড়িয়ে পড়লেন ইনকা পুরোহিত। তাদের কিছুটা তফাতে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল মৃত্যুনগরীর রক্ষীরাও। গোটা কুড়ি মশালের আলোয় আলোকিত হয়ে গেল জায়গাটা। মুখে বীভৎস উল্কি, লম্বা বেণী, কর্ণকুন্ডল পরা দীর্ঘদেহী আমাজনীয় যোদ্ধা সব! কাঁধে তির ধনুক। প্রায় উলঙ্গ তাদের দেহ। শুধু নামমাত্র বস্ত্র খন্ড তাদের কোমরে জড়ানো। ঠিক যেন মৃত্যু দূত তারা। পাথরের মূর্তির মতো তাকিয়ে দেখতে লাগল মৃত্যু নগরীর অতিথিদের। বেশ কয়েক মুহূর্ত উভয় পক্ষের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময়ের পর ইনকা পুরোহিত দুর্বোধ্য ভাষায় তাদের উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটা কথা বললেন। এক জন যোদ্ধা এগিয়ে এসে মশালটা ভালো করে তুলে ধরে দেখল সুসানকে। মশালের আলোতে ঝলমল করে উঠল তার কপালের ফেট্টিতে আটকানো সোনার চাকতিটা। সেটা দেখার পর সেই যোদ্ধা যেন কী যেন বলল তার সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে। ওমনি তারা মাথা ঝুঁকিয়ে সম্ভাষণ জানাল সুসানকে। এরপর দুজন রক্ষী দ্রুত ছুটল নগরীর দিকে সুসানদের আগমন বার্তা পৌঁছে দেবার জন্য। আর অন্যরা ইনকা পুরোহিত আর সুসানদের দুপাশে সারবদ্ধ হয়ে প্রথমে দাঁড়াবার পর তাদের নিয়ে চলল নগরীর দিকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ইনকা পুরোহিতের হাত ধরে সুসান পা রাখল মৃত্যু নগরীতে। পাহাড়ের মাথায় কালো পাথর কুঁদে তৈরি করা এ নগরী। বাড়িঘরগুলোর গঠন-শৈলীগুলোও যেন কেমন রুক্ষ, কারুকাজহীন, নিষ্প্রাণ। যেন কোথাও প্রাণের স্পর্শ নেই। পাথরের দেওয়ালের গা ঘেঁষে ছাদঅলা লম্বা লম্বা বারান্দা চলে গেছে নানা দিকে। মশাল জ্বলছে চারপাশে, সেই আলোতে পাথরের মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে হিংস্র চেহারার কাকা কুজকোরা। দিনের আলোতে যারা এ নগরী পাহারা দেয় সেই কনডোর পাখির ঝাঁক আবছা মূর্তির মতো সার বেঁধে বসে আছে বারান্দাগুলোর ছাদের কার্নিশে। রক্ষী পরিবৃত সুসানরা নগরীর প্রধান রাস্তা ধরে সোজা এগিয়ে চলল। এ নগরী বেশি বড়ো নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল নগরীর শেষ প্রান্তে মশাল আলোকিত এক চত্বরে। সেখানে এক পাশে পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে কালো পাথরের তৈরি এক মন্দির। সারা নগরীর মধ্যে এই মন্দিরের গায়েই একমাত্র কারুকাজ করা। বিরাট বড়ো তার দরজা। সিঁড়ি ভেঙে সেই দরজার কাছে পৌঁছতে হয়। সিড়ির ধাপের দু-ধারে দাঁড়িয়ে আছে দুজন প্রহরী। তাদের হাতে চামড়ার ফিতেতে বাঁধা আছ দুটো প্রাণী। কালো মিশমিশে তাদের দেহ। সবুজ চোখ দুটো মশালের আলোতে জ্বলছে। মাঝে মাঝে লাল জিভ বার করে ঠোঁট চাটছে প্রাণী দুটো। আমাজনের বিখ্যাত কালো বাঘ!

চত্বরের ঠিক মাঝখানে বেশ কয়েকটা স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই স্তম্ভ আর মন্দিরের মাঝখানে একটা বেদির ওপর বসানো আছে অস্ত্রধারী বিকট দর্শন এক মূর্তি! ইনিই হলেন ইনকাদের মৃত্যু দেবতা বিচামা। তার মুখ ফেরানো মন্দিরের দিকে। সেই সংহার মূর্তি যেন পাহারা দিচ্ছেন সূর্যদেবের মন্দির। আর চত্বরের দক্ষিণ দিকে পাহাড়েরই একটা অংশ উঠে গেছে অন্ধকার আকাশের দিকে। সেখানে সার সার গুহামুখ। তার সামনেও সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে মশালধারী একদল রক্ষী।

১৪

অনেক রক্ষী রয়েছে জায়গাটাতে। তাঁদের দাঁড়িয়ে রয়েছে বিচামার মূর্তি ঘিরে। আর কিছু লোক জল দিয়ে ধোয়ামোছা করছে, চত্বর আর স্তম্ভগুলো। সম্ভবত পরদিনের ‘কাপাক সিতুওয়া’ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ইনকা পুরোহিত সুসানকে নিয়ে উপস্থিত হলেন বিচামার মূর্তির কাছে। রক্ষীদের ভিড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে সুসানদের সামনে এসে দাঁড়াল একজন। সে ঠিক অন্য রক্ষীদের মতো দেখতে নয়, আকারে একটু ছোটোখাটো। পরনে রক্তবর্ণের পোশাক। মাথায় সাদা রঙের পালকের সাজ, কানে স্বর্ণকুন্ডল, গলায় নানা রঙের পাথরের মালা। তার কোমরে একটা টুমি গোঁজা আছে। ইনকা পুরোহিত আর সুসান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা ইল্লাপার দিকে তাকিয়ে কী যেন বলল, তার উদ্দেশ্যে ঘাড়টা একটু ঝোঁকালেন ইল্লাপা। সেই লোকটা এরপর নতজানু হয়ে বসল সুসানের কাছে। একজন রক্ষী এরপর রেশমবস্ত্রে ঢাকা একটা থালা নিয়ে এসে দাঁড়াল সেই লোকটার সামনে। তাতে রাখা আছে একটা পাখির পালক। আর ছোট্ট টুমি। লোকটা সেই পালকটা গুজে দিল সুসানের কপালের সোনার চাকতিতে, আর টুমিটা ধরিয়ে দিল তার হাতে। পিনচিও চাপা স্বরে ইনকা পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করল, ‘এ লোকটা কে?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘বিচামার পুরোহিত। এই কাল নরবলি দেবে।’

টুমিটা সুসানের হাতে দিয়ে বিড়বিড় করে তাকে কী একটা বলার পর উঠে দাঁড়াল বিচামা পুরোহিত। সুসান চারপাশে একবার ভালো করে তাকিয়ে পিনচিওকে বলল, ‘কই, দাদু, সুজয় আঙ্কল ওরা সব কই? ওদের তো দেখতে পাচ্ছি না!’

পিনচিও বললেন, ‘ওরা কাছেই কোথাও হয়তো আছে। তুমি ঠিক দেখতে পাবে।’

ইল্লাপা এরপর দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলতে শুরু করলেন বিচামা পুরোহিতের সাথে। সে ভাষার মর্ম বুঝতে পারলেন না পিনচিও বা হুইকো। দীর্ঘ সময় ধরে দুই পুরোহিতের মধ্যে কথা চলতে লাগল। লাল পোশাকের পুরোহিত কথা বলতে বলতে মাঝেমাঝেই তাকাতে লাগল, সুসান, পিনচিও আর হুইকোর দিকে। সুসানের চোখ খুঁজতে লাগল মার্কেজদের।

কিছুক্ষণ পর সুসান দেখল, কয়েকজন লোককে একদল রক্ষী একটা গুহা থেকে বার করে ধাক্কা দিতে দিতে তাদের দিকে নিয়ে আসতে লাগল। রক্ষীরা তাদের এনে দাঁড় করাল দুই পুরোহিতের সামনে। দঁড়ি বাধা লোকগুলোও অসভ্য জাতির। তিনজন লোক। পরনে নামমাত্র পোশাক। উলঙ্গই বলা চলে! সর্বাঙ্গে উল্কি আঁকা। পুরোহিতদের সামনে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল অসভ্য তিনজন। যেন প্রবল মৃত্যুভয় গ্রাস করেছে তাদেরকে। দুই পুরোহিত সেই লোক তিনজনকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল, আর সম্ভবত তাদের সম্বন্ধে আলোচনা করতে লাগল। ইল্লাপার লোকগুলোকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর তাদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। সম্ভবত পুরোহিতদের দেখানোর জন্যই তাদের নিয়ে এসেছিল রক্ষীরা।

বন্দিরের নিয়ে তারা চলে যাবার পর লাল পোশাকের পুরোহিত আর ইল্লাপা সুসানদের নিয়ে এগোলেন চত্বরের অন্য প্রান্তে। সার সার পাথুরে ঘর দাঁড়িয়ে আছে সে দিকে। তাদের সাথে চলল একদল আমাজনীয় রক্ষী। সুসানের মনে হল, তারা যেন সকলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ঘরগুলোর দিকে এগোতে এগোতে পিনচিও, ইল্লাপাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যে তিনজনকে রক্ষীরা বেঁধে আনল তারা কারা?’

ইনকা পুরোহিত জবাব দিলেন, ‘ওরা মোচে উপজাতি গোষ্ঠীর অসভ্য। যারা আমাদের তাঁবু আক্রমণ করেছিল, সেই গোষ্ঠীর লোক। জঙ্গল থেকে কয়েক দিন আগে ওদের ধরে আনা হয়েছে কাপাক সিতুওয়া অনুষ্ঠানের জন্য।’

পিনচিও শুনে বললেন, ‘তার মানে ওই তিনজনকেই...!!!’

গম্ভীর ভাবে ইনকা পুরোহিত বললেন, ‘হ্যাঁ, ওদের তিনজনকেই উৎসর্গ করা হবে দেবতার উদ্দেশ্যে।’’

বিচামা পুরোহিত সবাইকে এনে তুললেন চত্বরের একপাশে একটা ঘরের মধ্যে। মশাল জ্বলছে ঘরে। মাটিতে ঘাসে বোনা মাদুর পাতা। তাদের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে ইনকা পুরোহিতের সাথে কয়েকটা কথা বলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন লাল পোশাকের পুরোহিত। সকলে বসল মাদুরে। ইল্লাপা তার কাঁধের থেকে কনডোরের বাচ্চাটাকে মাটিতে নামিয়ে পিনচিওর মুখোমুখি বসলেন।

পিনচিও ইনকা পুরোহিতকে বললেন, ‘ওই পুরোহিতের সাথে কথা বলে কী বুঝলেন? পরিকল্পনা মতো কাজ হবে তো?’

ইনকা পুরোহিত বললেন, ‘দেখা যাক কী হয়। মন্দিরের ভিতরে কিন্তু আমি আর এই বাচ্চাটা ছাড়া কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেবে না এরা। এমনকী বিচামা পুরোহিতকেও আমাজনীয় রক্ষীরা কোনোদিন প্রবেশ করতে দেয়নি মন্দিরের ভিতর। কারণ ও মন্দির এখন বিচামা নয়, সূর্যদেবের আবাসস্থল।

ইল্লাপার কথা শুনে পিনচিও বললেন, ‘তাহলে আমরা কোথায় থাকব? আপনিতো আর ওই দরজা দিয়ে বাইরে আসবেন না!’

ইনকা পুরোহিত বললেন, ‘একটু পরে রক্ষীরা এসে আমাদের এক জায়গাতে নিয়ে যাবে। সেখানে গিয়ে এ সব কথাবার্তা হবে। বাচ্চাটাকে কিন্তু কাল সন্ধ্যা নামার আগে পর্যন্ত একলা এ ঘরেই থাকতে হবে। দিনের বেলা আমরা কেউ বাইরে বের হতে পারব না। সন্ধ্যাবেলায় আমি ওকে নিতে আসব মন্দিরে নিয়ে যাবার জন্য। ও যেন আমার নির্দেশ মেনে চলে সে ব্যাপারটা ওকে বুঝিয়ে দিতে হবে। সম্ভবত মন্দিরের ভিতর ঢোকার আগে তোমাদের সাথে ওর আর দেখা হবে না।’ ইনকা পুরোহিত আরও কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, সুসান বুঝতে পারছিল না তাদের কথাবার্তা, তাদের কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎ সে বলে উঠল, ‘আমার দাদু কোথায়? তার কাছে আমাকে কখন নিয়ে যাবে?’

সুসানের কথা শুনে থেমে গেলেন ইনকা পুরোহিত। পিনচিও একবার তাকালেন পুরোহিতের দিকে, তারপর সুসানের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এই কথাইতো আমরা আলোচনা করছিলাম। এখানে এসে শুনলাম তোমার দাদু এখান থেকে একটা অন্য জায়গাতে গেছেন। আমাদের এখানে একটা কাজ আছে। সে কাজ না করে আমরা তোমাকে তোমার দাদুর কাছে নিয়ে যেতে পারব না। যদি তুমি সে কাজে আমাদের সাহায্য করো তাহলে আমরা তোমাকে তোমার দাদুর কাছে পৌঁছে দেব।’

সুসান জিজ্ঞেস করল, ‘কী কাজ?’

পিনচিও বললেন, ‘কাজটা খুব সামান্য। এখানে একটা মন্দির আছে, সেটা নিশ্চই তুমি দেখেছো? কাল রাতে ইনকা পুরোহিত তোমাকে সেই মন্দিরের ভিতর নিয়ে যাবেন। তারপর তিনি তোমাকে যা যা করতে বলবেন, সে কাজগুলো তুমি করে দিলেই আমাদের কাজ মিটে যাবে। আর তারপরই তোমার দাদুর কাছে পৌঁছে যাবে তুমি।’ এই বলে হাসলেন পিনচিও।

হুইকোও হেসে সুসানকে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক তাই! তারপরই তুমি পৌঁছে যেতে পারবে সেখানে!’

সুসান বলল, ‘এখন সেই মন্দিরে যাওয়া যায় না? তাহলে তো আজই আমি দাদুর কাছে যেতে পারি!’

পিনচিও বললেন, ‘তাহলে তো আমাদেরও ভালো হত। কিন্তু এখানকার লোকগুলো আজ সেখানে তোমাদের ঢুকতে দেবে না। কাল সারাদিন তুমি এই ঘরের মধ্যে থাকবে। তারপর অন্ধকার হলে ইনকা পুরোহিত এসে তোমাকে মন্দিরে নিয়ে যাবেন।’

সুসান কিছু বলল না, সে উঠে গিয়ে ঘরের জানলার সামনে দাঁড়াল। ঘরটা একদম খাদের কিনারে। বাইরে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ের গায়ে। অনেক নীচ পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেই আলোতে। সে দিকে তাকিয়ে সুসান তার দাদুর কথা ভাবতে লাগল। ইনকা পুরোহিত, পিনচিও আর হুইকো নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পর একদল রক্ষী এসে হাজির হল ঘরের বাইরে। তাদের মধ্যে একজন ঘরের ভিতর ঢুকে মাদুরের ওপর দুটো পাত্র নামিয়ে রাখল। মশালের আলোতে পাত্র দুটো ঝলমল করে উঠল। সম্ভবত সেগুলো সোনার তৈরি। সুসানের জন্য খাবার আর জল আছে তাতে। সেগুলো নামিয়ে রেখে সেই লোকটা ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। ইনকা পুরোহিত, পিনচিওকে বললেন, ‘এবার রক্ষীদের সাথে আমাদের যেতে হবে। ওরা সে জন্যই দাঁড়িয়ে আছে।’

কথাটা বলে কনডোরের বাচ্চাটাকে আবার কাঁধে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। পিনচিও আর হুইকোও উঠে পড়ল।

ইনকা পুরোহিত এরপর হুইকোকে বললেন, ‘তোমার কাঁধের বন্দুকটা আমাকে দিয়ে দাও। আসলে, এই আমাজনীয় রক্ষীরা বন্দুকধারীদের সহ্য করতে পারে না। ওরা ভাবে বন্দুকধারী মানেই স্বর্ণ লুন্ঠনকারী স্পেনীয়। পিজরোর অভিযানের সময় থেকেই এ ধারণা তাদের মনে গেঁথে গেছে। ওটা তোমার সঙ্গে থাকলে বিপত্তি ঘটতে পারে।’

ইনকা পুরোহিতের কথা শুনে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও হুইকো রাইফেলটা তুলে দিল তাঁর হাতে।

পিনচিও এরপর সুসানকে একবার স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, কাল দিনের বেলায় সে যেন ঘর ছেড়ে বাইরে না যায়। কারণ, এখানকার পাখিরা মানুষের মাংস খায়!

তিনি কথাগুলো বলার পর সুসানকে ঘরে একলা রেখে ইনকা পুরোহিতের সাথে হুইকোকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। তারা চলে যাবার পর সুসান এগিয়ে গেল মাটিতে নামিয়ে রাখা পাত্রগুলোর কাছে। একটা পাত্রে রাখা আছে অনেকটা আধপোড়া মাংস। বেশ খিদে পেয়েছিল তার। কয়েকটা বড়ো মাংসের টুকরো আর জল খেয়ে মাদুরের ওপর শুয়ে পড়ল সে। শুয়ে শুয়ে খোলা জানলা দিয়ে চাঁদটাকে স্পষ্ট দেখতে পেল সে। কী বিরাট বড়ো রুপোর থালার মতো চাঁদ। সেই চাঁদ যেন কাঁদছে নিঃসঙ্গ সুসানের দিকে তাকিয়ে। প্রাচীন ইনকাদের বিশ্বাস ছিল চাঁদের অশ্রু পৃথিবীতে ঝরে পড়ে জমাট বেঁধে তৈরি হয় রুপো। চাঁদের দিকে তাকিয়ে দাদুর কাছে শোনা গল্পটা সুসানের মনে পড়ে গেল। ‘সত্যিই ব্যাপারটা কি তাই?’ চাঁদের দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর দরজার বাইরে পায়ের শব্দ পেয়ে আবার উঠে বসল সুসান। দরজার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে দুজন রক্ষী। তাদের একজনের হাতে শিকলে বাঁধা বিরাট বড়ো একটা কালো বাঘ। বেশ ভয় পেয়ে গেল সুসান। ওরা সঙ্গে এই প্রাণীটাকে এনেছে কেন?

সুসান তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। লোক দুজন দরজার বাইরে হাঁটু গেড়ে বসে সুসানের উদ্দেশ্যে মাথা ঝুঁকিয়ে কী যেন বলতে লাগল! সুসান তাদের কথার মধ্যে একটা শব্দই শুধু বুঝতে পারল,—‘ইনকা’।

বেশ কিছুক্ষণ একটানা কথা বলার পর লোকদুটো প্রথমে উঠে দাঁড়াল, তারপর দরজার বাইরে একটা পাথরের থামে বাঘের শিকলটা বেঁধে দিয়ে চলে গেল।

তারা চলে যাবার পর বাঘটা এগিয়ে এল ঘরের দরজার দিকে। ভয় পেয়ে গেল সুসান। ও যে ঘরে ঢুকতে চাচ্ছে! টুমিটা শক্ত করে হাতে চেপে ধরল সুসান। বাঘটা ঘরের চৌকাঠে পা রাখতেই তার গলার শিকলে টান পড়ল। ঘরের ভিতর মাথা ঢুকিয়ে সুসানের দিকে তাকিয়ে গলা দিয়ে একটা ঘড়ঘড় শব্দ করল সে, তারপর ঠিক দরজার বাইরে থাবার ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল।

ঘরের ভিতর মশালের আলো নিভে গেল একটু পরেই। জানলা দিয়ে আবছা চাঁদের আলো ভেসে আসছে ঘরে। বাঘটাকে আর ভালো করে চোখে পড়ছে না সুসানের। অন্ধকারের মধ্যে যেন সে মিশে গেছে। দরজার ঠিক সোজাসুজি বসে আছে সুসান। দূরে চত্বরটার একটা অংশ সুসান দেখতে পাচ্ছে ঘরের ভিতর থেকে। মশাল হাতে রক্ষীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে। নানা রকম অস্পষ্ট শব্দও ভেসে আসছে। সারা রাত ধরেই মনে হয় এ নগরীর লোকেরা কাজ করে। বসে থাকতে থাকতে এক সময় নিজের অজান্তেই সুসান মাদুরের ওপর ঘুমে ঢলে পড়ল।

রাত তখনও শেষ হয়নি। আবার সুসানের ঘুম ভেঙে গেল। সুসান দেখল তার মুখের ওপর মশাল হাতে ঝুঁকে পড়েছেন ইনকা পুরোহিত। তার পাশে লাল পোশাক পরা বিচামা পুরোহিতও আছে। সুসান উঠে বসতেই ইনকা পুরোহিত তাকে ইশারায় বললেন তাকে তাদের সাথে বাইরে যেতে হবে। তাহলে কি তিনি এখনই সেই মন্দিরে যাবেন? ধীরে ধীরে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর ইনকা পুরোহিতের পিছন পিছন পা বাড়ল দরজার দিকে। কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে শিকল বাঁধা বিরাট বাঘটা হঠাৎই ইনকা পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে গজরাতে শুরু করল। ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে ইনকা পুরোহিত বিচামা পুরোহিতের দিকে তাকালেন। বিচামা পুরোহিত একটু তাচ্ছিল্যের ঢঙে হেসে ওই ভয়ঙ্কর প্রাণীটাকে পা দিয়ে ধাক্কা মেরে দরজার সামনে থেকে সরিয়ে দিল। অতবড়ো হিংস্র প্রাণীটা ঠিক যেন পোষা কুকুর! এর পর সে তার ভাষায় ইল্লাপাকে বলল, ‘আপনার কাঁধের পাখিটাকে দেখে ও এমন করছে। কনডোর আর এই বড়ো বিড়ালগুলো চিরশত্রু। এখানে মাঝেমাঝেই প্রচন্ড লড়াই হয় এদের মধ্যে।’ সুসান বিচামা পুরোহিতের কথা বুঝতে পারল না। শুধু ইনকা পুরোহিতের পিছন পিছন ঘরের বাইরে পা রাখার সময় ভয়ে ভয়ে বাঘটার দিকে তাকিয়ে দেখল, কালো প্রাণীটা যেন ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইল্লাপার কাঁধে বসা পাখিটার দিকে। আর পাখিটাও ঘাড় ফিরিয়ে দেখছে তাকে।

ইনকা পুরোহিত কিন্তু সুসানকে মন্দিরে নিয়ে গেলেন না। তাকে নিয়ে যাওয়া হল চত্বরের মাঝখানে এক জায়গাতে। সেখানে মশালের আলোতে দাঁড়িয়েছিল বেশ কয়েকজন লোক। তারা ঠিক সৈনিক নয়। রেশম বস্ত্রে আচ্ছাদিত কয়েকটা থালা ধরা আছে তাদের হাতে। বেশ কয়েকটা কাঠের বালতিতে জলও রাখা আছে সেখানে। ইনকা পুরোহিত সেখানে সুসানকে নিয়ে গিয়ে তার শিরোবস্ত্র, চাকতি সহ সেই কাপড়ের ফেট্টিটা মাথা থেকে খুলে নিলেন, তারপর তাঁকে স্নান করতে বললেন, ইচ্ছা না থাকলেও ভয়ে ভয়ে স্নান সেরে নিল সুসান। লোকগুলোর হাতে থালাতে রাখা ছিল তার পোশাক। একজন লোক তাকে সেই পোশাক পরিয়ে দিল। সে পোশাকের রংও লাল, তবে আরও উজ্জ্বল। সবশেষে তার মাথায় বেঁধে দেওয়া হল সোনার সুতোয় বোনা একটা জমকালো শিরোবস্ত্র বা লান্টু। ইনকা পুরোহিত সেই সোনার চাকতিটা আগের লান্টু থেকে খুলে নিয়ে সেটা লাগিয়ে দিলেন নতুনটাতে। এরপর তিনি সুসানকে ফিরিয়ে নিয়ে চললেন ঘরের দিকে। বিচামা পুরোহিত, আর দুজন রক্ষীও চলল তাদের সাথে। সে দুজনই বাঘটাকে বেঁধে গিয়েছিল সুসানের ঘরের সামনে। সম্ভবত তারা চলল বাঘটাকে ফিরিয়ে আনার জন্য। সুসান দেখল পুব আকাশে শুকতারা ফুটে উঠতে শুরু করেছে।

সুসানরা ঘরের কাছে পৌঁছতেই বাঘটা তাদের দেখে উঠে দাঁড়াল। তার নাকের ডগা দিয়েই ইনকা পুরোহিতের সাথে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। বিচামা পুরোহিত আর রক্ষীরা রইল ঘরের বাইরে। তাদের মধ্যে একজন রক্ষী এগিয়ে গেল পাথরের থেকে বাঘের শিকলটা খোলার জন্য। ইনকা পুরোহিত যখন সুসানকে ঘরে ঢুকিয়ে আবার ঘরের বাইরে পা রাখলেন ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত কান্ড হল! কালো প্রাণীটা দাঁড়িয়ে ছিল দরজার পাশেই। ইনকা পুরোহিত তার দিকে পিছন ফিরে এক পা এগোতেই প্রাণীটা হঠাৎ দু-পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কামড়ে ধরল পুরোহিতের পিঠের কাছে ঝুলতে থাকা কনডোরের লেজটা। কর্কশ চিৎকার করে পাখিটা লাফিয়ে উঠল, কিন্তু তার লেজটা রয়ে গেল বাঘটার মুখে। এক রাশ পালক উড়ল বাতাসে। লেজহীন পাখিটা চিৎকার করতে করতে পাক খেতে লাগল ইল্লাপার মাথার ওপর। তার চিৎকার শুনে জেগে উঠল নগরীর ঘরবাড়ি মন্দিরের ছাদে, পাহাড়ের কোটরে থাকা তার জাত ভাইরা। কর্কশ চিৎকারে শেষ রাতের আকাশ তারা বিদীর্ণ করে ফেলল। তাঁর আদরের পাখিটার দুর্দশা দেখে খেপে উঠলেন ইল্লাপা। যে লোকটা শিকল খুলছিল সে ব্যাপারটা দেখে শিকল না খুলেই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। তার কোমরে ঝুলছিল একটা চামড়ার চাবুক। ডগায় ধাতুর টুকরো বাঁধা। সম্ভবত ওই দিয়েই এই কালো প্রাণীগুলোকে বশে রাখা হয়। ইনকা পুরোহিত রক্ষীর কাছে ছুটে গিয়ে তার কোমর থেকে চাবুকটা খুলে নিলেন, তারপর বাঘটার কাছে ফিরে প্রচন্ড জোরে চাবুক চালাতে লাগলেন প্রাণীটাকে লক্ষ্য করে। চাবুকের প্রথম আঘাতে আর্তনাদ করে কুঁকড়ে গেল অত বড়ো প্রাণীটা। কিন্তু থামলেন না ইনকা পুরোহিত। তিনি যেন পাগল হয়ে গেছেন। বাতাস কেটে চাবুকটা এসে পড়তে লাগল প্রাণীটার গায়ে। বিস্ফারিত সুসান দেখল প্রাণীটার কালো অঙ্গ লাল হয়ে যেতে শুরু করেছে। বাঘের আর্তনাদে আর কনডোর পাখিদের কর্কশ চিৎকারে নগরীর নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে যেতে লাগল! বিচামা পুরোহিত আর রক্ষী দুজন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ইনকা পুরোহিত যে ভাবে চাবুক চালাচ্ছেন তাতে তাঁর দিকে এগোতে সাহস পাচ্ছে না কেউ। এরপর বাঘটা শুয়ে পড়ে গোঙাতে শুরু করল। তারপর ধীরে ধীরে এক সময় সেই শব্দটুকুও বন্ধ হয়ে গেল। অবশেষে প্রাণীটার আর সাড়া শব্দ নেই দেখে ক্ষান্ত হলেন ইল্লাপা। চাবুকটা তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বিচামা পুরোহিতকে বললেন, ‘বড় বেয়াদপতো বাঘটা! ওকে ভালো করে শিক্ষা দিতে পারেনি?’

বিচামা পুরোহিত ইল্লাপার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, ‘ও বাঘ নয় বাঘিনী। মন্দিরের সবচেয়ে শিক্ষিত পাহারাদার। আসলে, একটা কারণে, ও কনডোর পাখিদের ব্যাপারে ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। তাই এই ঘটনাটা ঘটিয়ে ফেলল!’

ইল্লাপা বললেন, ‘সেটা কী ব্যাপার?’

বিচামা পুরোহিত বলল, ‘সপ্তাহ দুই আগে ওর দুটো বাচ্চা হয়েছিল। বাচ্চা দেবার সময় হলে আমরা ওদের ছেড়ে দেই। ওরা এখানে যে গুহাগুলো আছে তার মধ্যে ঢুকে বাচ্চা দেয়। তারপর বাচ্চাগুলোর চোখ ফুটলে তাদের সেখান থেকে তুলে এনে আমরা তাদের মানুষ করি। চারদিন আগে, ওর পিছন পিছন একটা বাচ্চা কীভাবে যেন বিকালের দিকে গুহার বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। কনডোরের ঝাঁক তখনও আকাশে। একটা পাখি ছোঁ মেরে ওর বাচ্চাটাকে তুলে নিয়ে গেল। আমরা ঘরের ভিতর থেকে ব্যাপারটা দেখলাম কিন্তু কিছু করতে পারলাম না। বাইরে গেলে আমাদেরও ছিঁড়ে খেত পাখিরা। ওই ঘটনার পর সেই যে গুহায় ঢুকল বাঘিনী, দু-দিন আর বাইরে এলো না। গতকাল ওর অন্য বাচ্চার খোঁজ নিতে গুহায় ঢুকেছিল রক্ষীরা। ওর দেখা পেলেও তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বাচ্চাটার দুটোর সন্ধান মেলেনি। সম্ভবত সে বাচ্চাটাও দিনের বেলায় গুহার বাইরে বেরিয়ে ছিল, এবং তাদেরও একই পরিণতি ঘটেছে। এ ব্যাপারটা হয়তো কারও চোখে পড়েনি। সারা রাত জাগতে হয় বলে, সাধারণত আমাজনীয়রা সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটায়। যাই হোক বাচ্চা না পাওয়াতে রক্ষীরা গতকাল ওকে গুহার বাইরে বার করে এনেছে। এ কারণে কনডোরের ওপর ওর এত রাগ!’

কথাগুলো বলার পর একটু চুপ করে থেকে আকাশের দিকে তাকালেন মৃত্যু নগরীর পুরোহিত। চাঁদ ফ্যাকাশে হতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা দেবে ভোরের প্রথম আলো। কিন্তু এ নগরীতে দিন হল রাতের সমার্থক। বরং রাতেই সামান্য হলেও কিছুটা প্রাণ স্পন্দন ফিরে পায় এই মৃত নগরী।

কনডোরের বাচ্চাটা আবার এসে বসল ইনকা পুরোহিতের কাঁধে। বিচামা মন্দিরের পুরোহিত তারপর করিকাঞ্চার পুরোহিতকে বলল, ‘চলুন এবার ফেরা যাক। ভোর হয়ে আসছে, কনডোরের ঝাঁক উড়তে শুরু করবে। তাছাড়া নতুন বন্দিদের একবার দেখে যাই। আমার কাজ বেড়ে গেল। সারা দিন ঘরে বসে টুমি ঘসতে হবে পাথরে।’

তার কথা শুনে, একটা ক্রুর হাসি ফুটে উঠল ইনকা পুরোহিতের ঠোঁটের কোণে। ঘরের ভিতর সুসানের দিকে একবার তাকিয়ে তিনি জায়গাটা ছেড়ে বিচামা পুরোহিতের সাথে পা বাড়ালেন। বাঘিনীটা আর রক্ষীদের সাথে নিয়ে যাবার মতো ছিল না। প্রাণীটাকে ফেলে রেখেই রক্ষী দুজনও পুরোহিতদের পিছু নিল।

চলে গেল তারা। বাঘিনী নিঃস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে ঘরের দরজার সামনে। সুসান ব্যাপারটা দেখে বেশ ভয়ে পেয়ে গেছে। বাঘটাকে যখন ইনকা পুরোহিত মারছিলেন, তখন তাঁকে বাঘের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর বলে মনে হচ্ছিল সুসানের। ইনকা পুরোহিত যেন একটা দানব! অত বড়ো বাঘটাকে তিনি একদম চুপ করিয়ে দিলেন!

বাইরের অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে। ইনকা পুরোহিতরা চলে যাবার পর ঘরের কোণায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল সুসান। তারপর আবার সে ঘুমিয়ে পড়ল।

১৫

সুসানের যখন ঘুম ভাঙল। তখন রোদ ঘরের কোনো স্পর্শ করেছে। উঠে বসল সুসান। বাঘটা কি মরে গেছে? সুসান উঁকি দিল দরজার দিকে। কালো প্রাণীটা একইভাবে পড়ে আছে। দূরে দেখা যাচ্ছে সূর্যের আলোতে আলোকিত পাথুরে চত্বর। কিন্তু কোনো লোকজন নেই সেখানে। কোথাও কোনো শব্দও নেই। সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়েছে এ নগরী। সুসান উঠে গিয়ে দাঁড়াল জানলার সামনে। চারপাশে রুক্ষ পাহাড়। কোনো নয়নাভিরাম দৃশ্য নেই। নীচে অতলান্ত খাদ, নিষিদ্ধ নগরীতে ওঠার পাকদন্ডী। ওই বেয়েই এ নগরীতে প্রবেশ করেছে সুসানরা। বাইরে চড়া রোদ। সূর্য মাঝ আকাশের দিকে এগোচ্ছে। সুসান অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে। সুসান তাকালো আকাশের দিকে। মেঘহীন আকাশ। ঝাঁক বেঁধে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে কনডোর পাখিরা। মাঝে মাঝে তাদের কর্কশ ডাক প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পাহাড়ে। ‘তার দাদু এখন কোথায়?’ জানলার সামনে দাঁড়িয়ে সুসান ভাবতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর একটা শব্দে দরজার দিকে ফিরে তাকাল সুসান। কালো প্রাণীটা টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়েছে দরজার সামনে। সুসানের দিকে সে তাকিয়ে আছে। প্রাণীটার চোখে হিংস্রতার লেশ মাত্র নেই, বরং কেমন যেন একটা করুণ ভাব ফুটে উঠেছে তার চোখে। সুসানকে কিছুক্ষণ দেখার পর প্রাণীটা একটা ঘড়ঘড় শব্দ করতে শুরু করল। জন্তুটাকে দেখে সুসানের হঠাৎ অন্য একটা প্রাণীর কথা মনে পড়ে গেল। তাদের ভ্যালপারাইজোর বাড়িতে একটা কুকুর আছে। গ্রেট ডেন, বিরাট কুকুর, তার পিঠের উচ্চতা এই কালো বাঘের চেয়েও বেশি। সুসানকে সে খুব ভালোবাসে। সেও এমন ঘড়ঘড় শব্দ করে। সুসানের হঠাৎ মনে হল, ‘এ প্রাণীটা সত্যিই কি বাঘ? অন্য কোনো প্রজাতির কুকুর নয়তো? নইলে এ লোকগুলো বাঘকে কুকুরের মতো পোষ মানিয়েছে কীভাবে? বাঘ কি কখনো পোষ মানে? এ দেশেতো অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত দেখতে প্রাণী আছে! লামা, টেপির, ভিসুনিয়া আরও কত কি! দাদুতো সুসানকে বলেছিল, লামা আসলে হল উটজাতীয় প্রাণী! অথচ তাদের চেহারার কত তফাত! এই বাঘের মতো দেখতে প্রাণীটা আসলে এদেশীয় কুকুর নয়তো?’

ঘড়ঘড় শব্দ করতে করতে প্রাণীটা ঘরের ভিতর আনাচেকানাচে তাকাতে লাগল। যেন কী খুঁজছে ও। তারপর এক সময় ও জলের পাত্রটার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল। একটা সোনার প্যানের মতো পাত্রে জল রাখা আছে। প্রাণীটা সেটা দেখতে পেয়েছে। কয়েক মুহূর্ত পাত্রটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর সে ঘরে ঢুকতে গেল পাত্রটার কাছে যাবার জন্য। গলার শিকলে টান পড়ল প্রাণীটার। চৌকাঠে আটকে গেল সে। প্রাণীটা এরপর করুণ দৃষ্টিতে একবার তাকাতে লাগল জলের পাত্রর দিকে, আর একবার সুসানের দিকে। সুসান বুঝতে পারল কালো জন্তুটার জল তেষ্টা পেয়েছে, কিন্তু পাত্রটা এগিয়ে দিতে প্রথমে তার সাহস কুলালো না। সেও দেখতে লাগল প্রাণীটাকে। সতৃষ্ণ নয়নে সে বারবার তাকাচ্ছে পাত্রর দিকে। কিছুক্ষণ পর সুসান সাহস সঞ্চয় করল। জলের পাত্রটা দরজার কাছে নিয়ে এসে, সে সেটা ঠেলে দিল বাঘটার দিকে। বাঘটার গলা তবুও পাত্রর কাছে পৌঁছল না। সুসান এবার বাঘটার আরও কাছে গিয়ে পাত্রটা আর একটু ঠেলে দিল। মনে হয় খুব তেষ্টা পেয়েছিল তার, সঙ্গে সঙ্গে সে অতবড়ো পাত্রের প্রায় অর্ধেক জল খেয়ে নিল, তারপর লম্বা জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটতে চাটতে তাকিয়ে রইল সুসানের দিকে। সুসান খেয়াল করেনি যে সে বাঘটার এত কাছে চলে এসেছে যে ঘরের মধ্যে ঢুকতে না পারলেও থাবা বাড়ালেই সে সুসানকে পেয়ে যাবে। সূর্যমন্দিরের প্রহরী কিন্তু তার দিকে থাবা বাড়াল না, একটা শুধু মোলায়েম শব্দ করল। যেন সুসানকে জল দেবার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাল। সুসানের এরপর মনে হল, হয়তো প্রাণীটার খিদেও পেয়েছে। থালায় তখনও অনেকটা ঝলসানো মাংস পড়ে রয়েছে। সুসান খেয়ে দেখেছে তার স্বাদটা কেমন যেন কাঁচা কাঁচা, আঁশটে গন্ধও আছে তাতে। খুব খিদে পেয়েছিল বলে তাই সে খেয়েছিল মাংসটা। হয়তো ওই মাংস বাঘটার খেতে ভালো লাগবে! এই ভেবে এরপর সুসান ঘরের মাঝখান থেকে মাংসের পাত্রটা এনে বাঘটার একদম মুখের কাছে নামিয়ে রাখল। সে সেটা একবার শোঁকার পর খেতে শুরু করল। সুসান একদম চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। তাঁর ঠিক সামনের বিরাট বড়ো কালো মাথাটা নীচু করে খাচ্ছে প্রাণীটা। তার তেল চুকচুকে কালো শরীরের অনেক জায়গাতে কেটে বসে গেছে চাবুকের দাগ। দেহের জায়গায় জায়গায় রক্ত আর লোম জমাট বেঁধে দলা পাকিয়ে আছে। তাকে দেখে বেশ কষ্ট হল সুসানের। তার ইচ্ছা হল প্রাণীটার মাথায় একবার হাত দেয়। এরপর এক সময় হয়তো নিজের অবচেতনেই বাঘটার মাথায় হাত দিয়ে বসল। বাঘটা কিছু বলল না। সে চুপচাপ খেতে লাগল। সুসানের ছোটো ছোটো আঙুল চলে ফিরে বেড়াতে লাগল প্রাণীটার মাথায়, ঘাড়ে।

এক সময় সম্বিৎ ফিরে এল সুসানের। সে কার গায়ে হাত দিচ্ছে! চমকে উঠে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল সুসান। কালো প্রাণীটা ততক্ষণে খাওয়া শেষ করে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুসানের দিকে। একবার হাই তুলল প্রাণীটা। কি ভয়ঙ্কর তার দাঁতগুলো! ইচ্ছা হলে সে এখন মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন করে দিতে তার ছোট্ট শরীরটাকে! কিন্তু বাঘটা এরপর সুসানের পায়ে মাথা ঘসতে ঘসতে একটা অন্যরকম ঘড় ঘড় শব্দ করতে লাগল। এ শব্দের ধরন সুসানের চেনা। তাদের গ্রেটডেনটা যখন আদর খেতে চায় তখন সে পায়ে মাথা ঘসে এমনই শব্দ করে!

আবার সাহস ফিরে পেল সুসান। সে বাঘটার গায়ে হাত দিয়ে ধীরে ধীরে তাকে আদর শুরু করল। প্রাণীটাও মাথা নীচু করে শব্দ করে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ পর সুসানের মনে হঠাৎ একটা প্রশ্ন জাগল,—ইনকা পুরোহিত কি ফিরে এসে আবার চাবুক মারবেন ওকে?’ চাবুক হাতে ইনকা পুরোহিতের পৈশাচিক চেহারার কথা ভেবে কেঁপে উঠল সুসান। কিন্তু ওকে যদি এখন শিকল থেকে মুক্ত করে দেওয়া যায় তাহলে তো আর তিনি তাকে চাবুক মারতে পারবেন না! কথাটা মাথায় আসতেই সুসান এরপর তার গলার শিকলটা খোলার চেষ্টা করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝনঝন শব্দে খসে পড়ল ভারী শিকলটা। শব্দটা শুনে চমকে উঠল সুসান। কালো বাঘটাও এবার ঘাড়টা তুলল। সে যে এখন মুক্ত তা সম্ভবত প্রাণীটা বুঝতে পারল। সে একবার তাকাল সুসানের দিকে, আর একবার তাকাল চত্বরের দিকে। মুহূর্তখানেক সে দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। তারপর বিরাট একটা লাফ দিয়ে তিরের বেগে কোনাকুনি ছুটল চত্বরের দিকে। মাত্র কিছুটা সময়, লম্বা লম্বা লাফে বিদ্যুৎ গতিতে সে পার হয়ে গেল জায়গাটা। গিয়ে দাঁড়াল চত্বর প্রান্তের পাহাড়ি দেওয়ালের সামনে। সে দেওয়ালে মাটি থেকে বেশ কিছুটা উঁচুতে একটা গুহামুখ। প্রাণীটা মুহূর্তের জন্য একবার থমকে দাঁড়াল সেই দেওয়ালটার সামনে। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে কী যেন একবার দেখল। তারপর খাড়া দেওয়াল বেয়ে সেই গুহাটার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল!

সুসান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল চত্বরের ওপাশে সেই গুহাটার দিকে। তার পর দরজার বাইরে বেরিয়ে কয়েক পা এগিয়ে ভালো করে তাকাল চত্বরের চারপাশে। চত্বরের এক দিকে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের গায়ে খোদিত বিশালাকৃতির মন্দির। মাঝখানে অনেকটা ফাঁকা জায়গার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ইনতিহুয়ানাতাগুলো। ওখানেই আছে বিচামার মূর্তি। মন্দিরের এক পাশ থেকে টানা বারান্দাঅলা কালো পাথরের তৈরি ঘর অর্ধবৃত্তাকারে এগিয়ে এসেছে সুসান যে ঘরে আছে সে দিকে। আর অন্য পাশে পাহাড়ের দেওয়ালের গায়ে সার সার গুহামুখ। সব কিছু ভালো করে তাকিয়ে দেখতে লাগল সুসান। চড়া রোদে খাঁ খাঁ করছে চত্বরটা। কেউ কোথাও নেই। যেন এই নিষিদ্ধ মৃত্যু নগরীতে সুসানই একমাত্র জীবিত প্রাণী! কাল রাতের অত রক্ষী, লোকজন, সব দিনের আলোতে কোথায় যেন ভ্যানিশ হয়ে গেছে। দিনের আলোতেও মৃত্যু নগরীতে থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সুসান যখন আবার ঘরে ফিরতে যাচ্ছে তখন একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল সুসানের। মন্দিরের কিছু দূরে বারান্দাঅলা কালো পাথরের বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একজন লোক। বারান্দার বাইরে বেরিয়ে সে সম্ভবত চারপাশে তাকাতে লাগল। বেশ অনেকটা দূরে হলেও তার পোশাক দেখে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তাকে চিনতে পারল সুসান। লোকটা, পিনচিও আঙ্কল! তিনি চারপাশ দেখে নিয়ে এর পরই হঠাৎ ছুটতে শুরু করলেন চত্বরের মধ্য দিয়ে। তিনি ছুটছেন কেন বুঝতে পারল না সুসান। তিনি ছুটছেন পাহাড়ের গায়ে গুহাগুলোর দিকে। চত্বরের মাঝখানে ইনতিহুয়ানাতা দৌড়ে পার হতেই আকাশ থেকে নেমে এল একঝাঁক কনডোর! তাঁরা আক্রমণ করল পিনচিওকে। কোনো রকমে তাদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে করতে দৌড়াতে লাগলেন পিনচিও। শকুনের মতো বিরাট পাখিগুলোর ধারালো ঠোঁট আর নখের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগল তাঁর পোশাক। আতঙ্কিত চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল সুসান। গুহার কাছাকাছি পৌঁছে পাখিগুলোর বিশাল ডানার ঝাপটায় মটিতে পড়ে গেলেন পিনচিও। হিংস্র পাখিগুলো যেন জয়ের উল্লাসে বিভৎস চিৎকার করে উঠল। আতঙ্কে সুসানের গলা থেকেও একটা চিৎকার বেরিয়ে এল। এর পরমুহূর্তেই ঝাঁকে ঝাঁকে তির ছুটে গেল, মাটিতে পড়ে থাকা পিনচিও আর কনডোর পাখিদের দঙ্গলের দিকে। বারান্দার আড়াল থেকে তাদের লক্ষ্য করে তির ছুড়ছে রক্ষীরা! দুটো পাখি তির খেয়ে পড়ে গেল, কিন্তু আরও পাখি ওপর থেকে নেমে আসছে নর মাংসের লোভে। বাঁচার একটা শেষ, চেষ্টা করলেন পিনচিও, আর কয়েক হাত দূরে একটা গুহামুখ। কনডোরের দঙ্গল থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালেন তিনি। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা তির এসে বিঁধল তার কোমরের নীচে। আবার পড়ে গেলেন তিনি। তারপর সেই অবস্থাতেই হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে গেলেন গুহার ভিতর। তির চালানো এবার বন্ধ করল রক্ষীরা। কনডোর পাখিগুলো এরপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মটিতে পড়ে থাকা তির বেঁধা তাদের সঙ্গীদের ওপর, তাদের নিজেদেরই মাংস ছিঁড়েখুঁড়ে খাবার জন্য! সুসান পাথরের মূর্তির মতো আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে ছিল সেদিকে। হঠাৎই তার কিছুদূরে পাথর বসানো সূর্যালোকিত মাটিতে সে দেখতে পেল একটা ছায়া। চমকে সে মাথা তুলে তাকাতেই দেখল, তার প্রায় কাছেই অনেক নীচে নেমে এসেছে একটা কনডোর! বিরাট কালো ডানা মেলে স্থির হয়ে বাতাসে ভেসে সে হিংস্র চোখে সুসানকে দেখছে। তার বিরাট বাঁকানো ঠোঁট আর তীক্ষ্ণ নখ এখনই নেমে আসবে সুসানের ওপর! তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সুসান ঘরে ছুটল ভিতরে ঢোকার জন্য, আর পাখিটাও তির বেগে নেমে এল সুসানের মাথা লক্ষ্য করে। সুসান ঘরের মধ্যে পা রাখার মুহূর্তেই শুনতে পেল লক্ষ্যভ্রষ্ট হিংস্র পাখিটার ঠোঁট ঠক করে শব্দ তুলে সজোরে ধাক্কা খেল পাথরের দেওয়ালে।

ঘরের ভেতর ঢুকে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগল সুসান। ঘরের দরজারতো কপাট নেই, যদি ওই রাক্ষুসে পাখিটা ঘরে ঢুকে পড়ে! পাখিটা ঘরে ঢুকল না। সে এর পর উড়ে গেল। তার সতীর্থদের মাংস দিয়ে চত্বরে যেখানে ভোজের অনুষ্ঠান চলছে তাতে যোগ দেবার জন্য। তখনও সে দিক থেকে ঘরের মধ্যে ভেসে আসছে হিংস্র পাখিগুলোর উল্লাস।

আতঙ্কিত সুসান বসে রইল ঘরের মধ্যে। সময় এগিয়ে চলল। এক সময় বাইরে পাখিগুলোর চিৎকার চ্যাঁচামেচি মিলিয়ে গেল। ভোজ সভা শেষ করে নতুন শিকারের সন্ধানে আকাশে আবার টহল দিতে শুরু করল পাখিগুলো। এতক্ষণ যেন কোথাও কিছু হয়নি! আবার নিস্তব্ধতা গ্রাস করল মৃত্যু নগরীকে।

রোদ তখন মাথার ওপর। একটু ধাতস্থ হয়ে ঘরের এক কোণায় শুয়ে পড়ল সুসান, তারপর ঘুমিয়ে পড়ল। মাঝে একবার ঘুম ভেঙেছিল সুসানের। ঘুমের ঘোরে বেশ কয়েকবার তার মনে হয়েছিল ঘরের মেঝেটা যেন দুলছে! একবার ওরকমই একটা দুলুনি মনে হওয়াতে উঠে বসেছিল সে। কিন্তু উঠে বসার পর আর কিছু বুঝতে না পেরে সুসান আবার শুয়ে পড়ল, সুর্যদেব এগিয়ে চললেন পশ্চিমের দিকে।

সুসান এরপর যখন ঘুমে ভেঙে উঠে বসল তখন বাইরে সূর্য ডুবে গেছে। আধো অন্ধকার ঘরে বসে রইল সুসান। অন্ধকার হলে ইনকা পুরোহিতের তাকে নিতে আসার কথা। তিনি তাকে নিয়ে যাবেন সূর্য মন্দিরে। সেখানে সুসানকে কী একটা যেন কাজ করতে হবে। তারপর তিনি তাকে পৌঁছে দেবেন তার দাদুর কাছে। তিনটি দিন যেন একটা দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করে চলেছে সে। আর তার দাদুকে ছেড়ে থাকতে ভালো লাগছে না। দাদু কেন এখানে এসে তার জন্য অপেক্ষা না করে অন্য জায়গাতে চলে গেল! সুজয় আঙ্কল বা বিল আঙ্কল তারাওতো একজন এখানে থাকতে পারত! তাহলেও তো সুসানকে এই ভয়ঙ্কর জায়গাতে একলা থাকতে হত না। দাদু কি দেখেনি, এখানে লোকজন, পশু-পাখি, এ সবই কেমন ভয়ঙ্কর ধরনের! তা সত্ত্বেও তারা তাকে এখানে রেখে গেল কেন? একটা প্রচন্ড অভিমান দলা পাকিয়ে উঠতে লাগল সুসানের গলা দিয়ে। কান্না চেপে রেখে ঘরে বসে ইনকা পুরোহিতের আগমনের প্রতীক্ষা করতে লাগল সে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরের আবছা আলোও মুছে গেল। গাঢ় অন্ধকার গ্রাস করে নিল ঘরটা। এরপর ধীরে ধীরে দু-একটা করে মশালের আলো জ্বলে উঠতে শুরু করছে চত্বরে, শোনা যেতে লাগল, রক্ষীদের হাঁকডাক, নানারকম শব্দ। অন্ধকার নামার সাথে সাথেই আবার জেগে উঠছে মৃত নগরী। অন্ধকার ঘরে বসে খোলা দরজা দিয়ে সুসান দেখতে লাগল, মশালের আলোতে ক্রমশই আলোকিত হয়ে উঠছে চত্বর। রক্ষীর দল ভিড় করতে শুরু করেছে সেখানে। চত্বরে রক্ষীদের উপস্থিতি, ব্যস্ততা ক্রমশ বেড়েই চলল। তার পর মন্দিরের দিক থেকে গম্ভীর স্বরে ঢাক বাজতে লাগল। বিরামহীন সেই শব্দ। অন্ধকার ঘরে বসে সুসান শুনতে লাগল সেই আওয়াজ। সময় ক্রমশ এগিয়ে চলল। কিন্তু ইনকা পুরোহিতের দেখা নেই।

ঘণ্টাখানেক পরে অধৈর্য হয়ে উঠে দাঁড়াল সুসান। সে একবার ভাবল, ঘর ছেড়ে সে চত্বরে নামে। তার পরক্ষণেই সুসানের মনে হল, একলা বাইরে বেরলে যদি তার কোনও বিপদ হয়! এই ভেবে সে বাইরে না গিয়ে জানলার কাছে এসে দাঁড়াল। বিরাট বড়ো রূপালি চাঁদ উঠেছে আকাশে। তার আলোতে বিধৌত নেড়া পাহাড়ের শৃঙ্গগুলো। অনেক দূর পর্যন্ত চাঁদের আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সুসান মাথা ঝুঁকিয়ে তাকাল নীচের দিকে। একটা অদ্ভুত জিনিস এবার তার চোখে পড়ল। অনেক অনেক নীচে পাহাড়ের পাদদেশে জোনাকির মতো অসংখ্য বিন্দু বিন্দু আলো জ্বলছে। সুসান বেশ কয়েকমূহূর্ত সে দিকে তাকিয়ে থাকার পর বুঝতে পারল, ওগুলো আসলে মশালের আলো, এত ওপর থেকে দেখছে বলে তাদের জোনাকি মতো মনে হচ্ছে! আরও ভালো করে দেখার পর সুসানের মনে হল, যেন সেই জোনাকির আলো পাকদন্ডী বেয়ে ধীরে ধীরে নগরীর দিকে এগোচ্ছে! ওরা কারা তা বুঝতে পারল না সুসান। হয়তো তারা নগরীরই রক্ষী হবে। মনে মনে ভাবল সুসান। সে দেখতে লাগল সেই জোনাকির ঝাঁক।

হঠাৎ দরজার বাইরে কাদের পায়ের শব্দ শুনে সুসান ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল, ইনকা পুরোহিত, আর সেই দুজন লোক এসে উপস্থিত হয়েছে, যারা বাঘটাকে বেঁধে রেখে গেছিল। বাঘটা না দেখতে পেয়ে তারা একটু আশ্চর্য হয়ে ইনকা পুরোহিতকে কী যেন বলল! তিনি একবার ঘাড় নাড়লেন, তারপর ইশারায় সুসানকে বাইরে আসতে বললেন। সুসান ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসার পর তিনি সুসানকে নিয়ে চত্ত্বরের মাঝখান দিয়ে এগোলেন মন্দিরের দিকে।

পুরো চত্বরটাই আজ মশালের আলোয় আলোকিত। অনেক অনেক মশাল আর রক্ষী রয়েছে চত্বর জুড়ে। রক্ষীরা আজ পুরোদস্তুর যুদ্ধ সাজে সেজেছে। কাঁধে ধনুক, চামড়ার ফিতে বাঁধা তূণীর, হাতে বর্শা। কোমর থেকে ঝুলছে লম্বা দা-এর মতো অস্ত্র। তাদের দীর্ঘ কালো বেণী বুকের দুপাশ বেয়ে কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে। প্রত্যেকের কপালে বাঁধা লাল রঙের ফেট্টি। ভাবলেশহীন ইস্পাত কঠিন মুখ। কারও কারও হাতে শিকলে বাঁধা কালো বাঘ। প্রাণীগুলো মাঝে মাঝে লাল জিভ বার করে ঠোঁট চাটছে। যেন তার প্রভুর নির্দেশ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে কারও ঘাড়ে! পাহাড়ের খাঁজে খাঁজেও আজ দাঁড়িয়ে আছে মশাল হাতে তিরন্দাজরা। ওপর থেকে সতর্ক চোখে তারা নজর রাখছে চত্বরের ওপর। রক্ষীদের নজর এড়িয়ে স্বয়ং মৃত্যুদেবতা বিচামাও এই মৃত্যু নগরীতে প্রবেশ করতে পারবেন না।

ইনকা পুরোহিত ইল্লাপাও আজ নতুন পোশাকে সেজেছেন। তার পরনে ধবধবে সাদা রঙের পশমের পোশাক। তার গলায়, হাতে রঙিন সুতোর কাজ। চওড়া সোনার কোমরবন্ধ থেকে ঝুলছে সোনালি খাপে ঢাকা দীর্ঘ টুমি। মাথায় বিশাল ঝালরের মতো লাল পালকের বিরাট সাজ। কানে স্বর্ণকুন্ডল। ইনকা পুরোহিত আগে আগে, তার পিছনে কয়েক হাত তফাতে চলল সুসান। আর তার পিছনে সেই দুজন রক্ষী। সুসানরা তখন চত্বরের মাঝখানে ইনতিহুয়ানাতাগুলোর কাছে পৌঁছে গেছে। অনেক রক্ষী দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। চলতে চলতে হঠাৎ একটা সাদা ছোট্ট গোলাকার বস্তু তার সামনেই মাটিতে পড়ে আছে দেখল সুসান। জিনিসটা কুড়িয়ে দেখার পরই সুসান ভয় পেয়ে সেটা সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিল। মাটিতে কিছুটা গড়িয়ে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল হুইকোর পাথরের চোখটা। আর এর পরই সে তাকাল ইনতিহুয়ানাতাগুলোর দিকে। পরপর চারটে স্তম্ভে বাঁধা আছে চারজন লোক। তাদের মাথাগুলো বুকের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সারা বুক লাল। নিঃস্পন্দভাবে ইনতিহুয়ানাতা স্তম্ভের সাথে শিকল বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে তারা। তাদের মধ্যে তিন জন অর্ধউলঙ্গ, চতুর্থ জনের পরনে পোশাক আর মাথায় একটা টুপিও আছে। রক্ষীদের ভিড়ের ফাঁক দিয়ে মুহূর্তের জন্য সেই টুপিটা যেন চেনা মনে হল সুসানের। ও টুপিটা হুইকো বলে লোকটার!

ইনতিহুয়ানাতাগুলো পার হয়ে ইনকা পুরোহিত সুসানকে নিয়ে উপস্থিত হলেন বিচামা মুর্তির সামনে। তার চারপাশে অনেক লোকজন। এক কোণে ঢাক বাজছে। বিচামা পুরোহিতও দাঁড়িয়ে সেখানে। মশালের আলোতে ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে কালো পাথরের তৈরি মূর্তিটাকে। অস্ত্রধারী, অদ্ভুত মুখমন্ডলের মূর্তির জেড পাথরের চোখ দুটো যেন জ্বলছে! সত্যিই এ মূর্তি যেন মৃত্যুর প্রতিরূপ! তাঁকে দেখে ভয় লাগল সুসানের। মূর্তির পাথরের বেদিমূলে কৃষ্ণবর্ণের কিছু বুনো ফুল ছড়ানো। আর রয়েছে একটা পাথরের থালা ও তারপাশে শোয়ানো একটা বেশ লম্বা খাপ খোলা টুমি। থালাটা লাল রঙের তরলে পরিপূর্ণ, টুমিতেও লেগে আছে সেই রং। একটা আঁশটে গন্ধ বাতাসে ভাসছে।

সুসান সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই বিচামা মূর্তি আর তাকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সবাই। জোরে জোরে বাজতে শুরু করল ঢাক। বিচামা পুরোহিত সুসান আর মুর্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে সুসানের দিকে তাকিয়ে কী যেন বলতে শুরু করলেন। প্রথমে ধীর গতিতে, তারপর ক্রমশ বাড়তে লাগল তার গলার শব্দ। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলল কান ফাটানো ঢাকের বাজনা। দাঁড়িয়ে থাকা রক্ষীদল পাথরের মূর্তির মতো তাকিয়ে আছে সুসানের দিকে। বিচামা পুরোহিতের কন্ঠস্বর আর ঢাকের শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎই এক সাথে থেমে গেল বিচামা পুরোহিতের গলা আর ঢাকের বাদ্যি। বিচামা পুরোহিত নতজানু হয়ে কয়েক মুহূর্ত মাথা ঝুকিয়ে বসলেন সুসানের সামনে, তারপর উঠে গিয়ে লাল রঙের তরলপূর্ণ পাথরের থালাটা নিয়ে এসে দাঁড়ালেন তার কাছে। থালাটা কাছে আনতেই লাল তরলের তীব্র আঁশটে গন্ধে গাটা গুলিয়ে উঠল সুসানের। ইনকা পুরোহিত এবার ওই তরলে আঙুল চুবিয়ে সুসানের ললাটে পরিয়ে দিলেন রক্ত টিকা। বিচামা পুরোহিত থালাটা নামিয়ে মূর্তির কাছে গিয়ে তার মুখগহ্বরের ভিতর হাত ঢুকিয়ে বার করে আনলেন দুটো পাখির পালক। লাল, কালো, সাদা ডোরা আঁকা তাতে। পালক দুটো এনে তিনি গুঁজে দিলেন সুসানের মাথার লান্টুতে। সঙ্গে সঙ্গে সমবেত জনতা চিৎকার করে উঠল, ‘পাঁচাকুটি ইনকা ইপানকুই! পাঁচাকুটি ইনকা ইপানকুই!! পাঁচাকুটি ইনকা ইপানকুই!!!’ আবার জোরে জোরে বেজে উঠল ঢাক। মুহূর্তের জন্য সুসানের মনে হল তার পায়ের নীচের মাটিটা যেন হঠাৎ কেঁপে উঠল!

রক্ষীদল এরপর বিচামা মুর্তির কাছ থেকে মন্দিরের সিঁড়ি পর্যন্ত মশাল হাতে দু-পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের মাঝখান দিয়ে ইল্লাপা সুসানকে নিয়ে এগিয়ে চললেন মন্দিরের সিঁড়ির দিকে। বিচামা পুরোহিত আর তিনজন রক্ষীও তাদের পিছনে চলল। দুজন ভয়ঙ্কর দর্শন রক্ষী চামড়ার ফিতেয় বাঁধা বাঘ হাতে দাঁড়িয়েছিল সিঁড়ির মুখটাতে। তাদের ভ্রূক্ষেপ না করে ইনকা পুরোহিত দৃপ্ত ভঙ্গিতে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে গিয়ে দাঁড়ালেন মন্দিরের বন্ধ দরজার সামনে। বিচামা পুরোহিত আর রক্ষী তিনজনও উঠল সেখানে। নীচে থেকে নিষ্পলক চোখে সুসানদের দিকে তাকিয়ে আছে সমবেত জনতা। বাঘ দুটোও ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখছে বেদির ওপর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুসানদের। সম্ভবত তারাও বিস্মিত। কোনো জ্যান্ত মানুষকে ওই দরজার সামনে পৌছঁতে দেখেনি তারা!

বিশাল দরজাতে কোনো খিল নেই। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বন্ধ দরজার কপাট। ইনকা পুরোহিতের নির্দেশে রক্ষী তিনজন ধাক্কা দিয়ে কপাট খোলার চেষ্টা করতে শুরু করল। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর দুই পুরোহিতকেও তাদের কাজে সঙ্গী হতে হল। সমবেত চেষ্টাতে এক সময় দরজার কপাট কিছুটা ফাঁক হল। সুসান দেখল দরজার ওপাশে বিরাজ করছে জমাট বাঁধা অন্ধকার! ইনকা পুরোহিত একটা মশাল হাতে সুসানকে নিয়ে দরজার ফাঁক গলে প্রবেশ করলেন মৃত্যু মন্দিরের গহ্বরে। বিচামা পুরোহিত আর অন্যরা বাইরে থেকে টেনে বন্ধ করলেন দরজার ফাঁকটুকু।

মন্দিরের ভিতরটা আসলে একটা গুহা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ গুহামুখ বন্ধ। পুরু ধুলোর আস্তরণ জমেছে মাটিতে। বাতাস ভারী। ভিতরে ঢুকে সুসানের যেন দমবন্ধ হয়ে আসতে লাগল। মশালের আলোতে সুসান দেখল একটা রাস্তা চলে গেছে সামনের দিকে। মাকড়সা জাল বুনেছে সেই প্রবেশ মুখে। ইল্লাপা পুরু ধুলোর আস্তরণ মাড়িয়ে সুসানকে নিয়ে প্রবেশ করলেন সেই রাস্তাতে। রাস্তা মানে সুড়ঙ্গ। দু-পাশে পাথরের দেওয়াল। নীচু ছাদ। এঁকে বেঁকে পথ এগিয়েছে সামনের দিকে। নির্বাক ইল্লাপার সাথে সুসান চলল সুড়ঙ্গ ধরে। মাঝ মাঝে ছোটোছোটো ঘরের মতো জায়গা, সেখান থেকে নানা গুহামুখ বেরিয়েছে। সে সব ঘর অতিক্রম করে এগিয়ে চলল তারা। মশালের আলোতে মাঝে মাঝে সুসানের চোখে পড়ছে পাথর খোদিত বিভৎস সব মূর্তি, নানা রকম সব হুয়াকা! চলতে চলতে একসময় একটা সুড়ঙ্গে কীসে যেন ঠোক্কর খেলেন ইল্লাপা। মৃদু ধাতব শব্দ হল। মশালটা নীচু করে তিনি দেখলেন নানা রকম ছোটো বড়ো ধুলোমাখা পাত্র মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। একটা ছোটো পাত্র তিনি হাতে তুলে মশালের কাছে ধরলেন। মন্দিরের পূজা সামগ্রী হবে হয়তো। মশালের আলোতে ঝিলিক দিয়ে উঠল পাত্রর কানাটা। সোনার তৈরি!! পাত্রটাকে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আবার এগোলেন তিনি। এরপর আরও কয়েকটা জায়গাতে এ রকম পাত্র মেঝের ধুলোতে পড়ে থাকতে দেখল সুসান। ইনকা পুরোহিত এ সবে আর ভ্রূক্ষেপ না করে সুসানকে নিয়ে এগিয়ে চললেন।

এ সুড়ঙ্গ ও সুড়ঙ্গ বেয়ে বেশ অনেকটা পথ চলার পর সুসানরা অবশেষে এসে উপস্থিত হল বিরাট হলঘরের মতো গুহাতে। জায়গাটার চারপাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে অনেকটা অন্ধকার গুহামুখ। মাথার ওপর ছাদ অনেক উঁচুতে। দেওয়ালের চতুর্দিকে দেওয়ালের গায়ে ছোটো ছোটো সিঁড়ির মতো থাক বৃত্তাকারে দেওয়ালকে বেষ্টন করে উঠে গেছে ছাদের দিকে অনেক উঁচুতে। ঘরে ঢুকে মশালটা চারপাশে একবার ঘুরালেন ইনকা পুরোহিত। সুসান দেখতে পেল ঘরের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটা নীচু বেদি। তার চারকোণে বসে আছে চারজন বর্শাধারী ইনকা সৈনিক আর বেদির ঠিক মাঝখানে একটা পাথরের স্তম্ভের ওপর বসানো আছে বেশ বড়ো গোলাকার একটা চাকতি আকৃতির জিনিস। এ সব কিছুই ধুলোর আবরণে ঢাকা।

সুসানরা গিয়ে দাঁড়াল বেদির সামনে। ইনকা রক্ষীরা কিন্তু তাদের দেখে উঠে দাঁড়াল না। মুর্তিগুলো পাথরের নয় ঠিকই। কিন্তু মাকড়শা জাল বুনেছে তাদের গায়ে, স্তম্ভ-চাকতিতে। যুগযুগ ধরে এই চারজন প্রহরী পাহারা দিচ্ছে বেদিটাকে। সূর্য মন্দিরের যক্ষ এঁরা! সুসান দেখল একটা টিকটিকি জাতীয় প্রাণী ধুলোমাখা একজন ইনকা রক্ষীর চোখের একটা কোটর থেকে বেরিয়ে তার মুখের ওপর ঘোরাঘুরি করে চোখের অন্য কোটরে ঢুকে পড়ল। মুর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে ভয় করতে লাগল সুসানের। মাকড়শার জাল মেখে ইনকা পুরোহিত সুসানকে নিয়ে বেদিতে উঠলেন। তারপর স্তম্ভের সামনে গিয়ে তার খাঁজে বসানো চাকতিটার সামনে মশাল তুলে ধরলেন। বেশ কয়েক মুহূর্ত তিনি ধুলোর আস্তরণ ঢাকা চাকতিটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর আঙুল দিয়ে একটা ঢেরা কাটলেন চাকতির গায়ে। ধুলো সরে গিয়ে একটা লম্বা রেখা ঝিলিক দিয়ে উঠল চাকতিতে। হাসি ফুটে উঠল ইনকা পুরোহিতের কঠিন মুখে। যত তিনি আঁক কাটতে লাগলেন ততই যেন আলোক ছটা ফুটে বার হতে লাগল সেখান থেকে।

এরপর সুসানের দিকে ফিরে দাঁড়ালেন ইনকা পুরোহিত। মশালটা ছাদের দিকে তুলে ধরে দুর্বোধ্য ভাষাতে দেওয়ালের মাথার দিকে একটা কোণা দেখিয়ে কী যেন বললেন তিনি। সুসান প্রথমে তার কথা বুঝতে পারল না। তারপর এক সময় তার মনে হল ইনকা পুরোহিত যেন তাকে দেওয়ালের থাক বেয়ে ওই জায়গাতে উঠতে বলছেন! সে দিকে তাকিয়ে ভয় লাগলেও ইনকা পুরোহিতের চোখের দিকে তাকিয়ে আরও ভয় লাগল তার। বেদি থেকে নেমে সে গিয়ে দাঁড়াল দেওয়ালের সামনে। এই থাকগুলো বেয়ে শুধু বাচ্চা ছেলেদেরই ওপরে ওঠা সম্ভব। বড়ো মানুষ ওপরে উঠতে পারবে না। ভয় লাগলেও ধীরে ধীরে থাক বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল সে। ইনকা পুরোহিত নীচে দাঁড়িয়ে তার দিকে মশাল তুলে ধরে তাকিয়ে রইলেন। এক সময় অনেক ওপরে উঠে ইনকা পুরোহিতের দেখিয়ে দেওয়া জায়গাতে পৌঁছে গেল সুসান। সে জায়গাটা একটা বারান্দা মতো। মশালের আলো সেখানে পৌঁছচ্ছে না। গুহার দেওয়ালগুলো নীচ থেকে উঠে এসে সুসানের মাথার ওপর কিছু দূরে মিশেছে। অন্য দেওয়ালের থাকগুলোও এখানে কাছাকাছি। সুসান জায়গাটাতে উঠে নীচের দিকে তাকাতেই ইনকা পুরোহিত ইশারাতে কি যেন খুঁজতে বললেন তাকে। ইনকা পুরোহিতের ইঙ্গিত অনুমান করে অন্ধকারের মধ্যেই ধুলো হাতড়ে সুসান পেয়ে গেল জিনিসটা। একটা ছোটো বাক্স! সুসান ওপর থেকে বাক্সটা তুলে দেখাতেই ইনকা পুরোহিত সেটা নিয়ে তাকে নীচে নেমে আসতে বললেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই সুসানের নজর পড়ল, তার কাছেই উলটো দিকের দেওয়ালের একটা থাকে। সে দেখতে পেল থাকের অন্ধকারের ভিতর থেকে দুটো জ্বলন্ত চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে!! এ নিশ্চয় বিচামা মন্দিরের ভূত!! আতঙ্কে হিম হয়ে গেল সুসানের শরীর। আর একটু হলে নীচে পড়ে যাচ্ছিল সে। সুসান বাক্সটা কোনো মতে আঁকড়ে ধরে নীচের দিকে নামতে লাগল। ইনকা পুরোহিত তার দিকে লক্ষ রেখে চাকতি থেকে ধুলো সরাতে লাগলেন। সুসান যত নীচে নামতে লাগল ততই মশালের আলো চাকতিতে প্রতিফলিত হয়ে আলোকিত হয়ে উঠল গুহা।

১৬

নেড়া পাহাড় বেষ্টিত এক রুক্ষ প্রান্তরে ভোরের আলো ফুটতেই নৌকা থেকে নেমে পড়ল সুজয়রা। চিমুরা কিন্তু সে মাটিতে পা রাখল না। যদিও এই বিদেশি লোকগুলোর ফিরে আসার সম্ভাবনা কম, তবুও যদি কেউ ফেরে, এই ভেবে সুজয়দের জন্য একটা নৌকা ছেড়ে রেখে তারা চলে গেল। কী অদ্ভুত ভোর এখানে! কোনো পাখির ডাক নেই, সবুজের কোনো চিহ্ন নেই। বাতাস যেন থেমে আছে এখানে। ভোর যে এত নিষ্প্রাণ হতে পারে তা জানা ছিল না সুজয়দের। এ যেন সত্যিই মৃত্যুভূমি!

সুজয়রা যেখানে নামল তার কিছু দূরেই পাহাড়ের গায়ে বেশ কয়েকটা গুহামুখ। তার একটা যেন ঠিক পুমার মুখের মতো! কাঁকর বিছানো রুক্ষ মাটিতে হেঁটে তারা গিয়ে দাঁড়াল গুহা মুখের সামনে। তার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে অস্ত্রধারী পাথরের এক ভয়ঙ্কর মুর্তি। সময় তার দেহে থাবা বসিয়েছে। কিছু অঙ্গ খসে পড়ে গেছে। তাতে যেন আরও বিভৎস লাগছে তাকে। মার্কেজ গুহায় ঢোকার আগে একবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ‘প্রাচীন ইনকারা গুপ্ত নগরীর প্রবেশ মুখে এ জাতীয় মূর্তি বসিয়ে নরবলি দিয়ে মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করত। তারা ভাবত তাদের অনুপস্থিতিতে এই মুর্তিগুলো জেগে উঠে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের প্রবেশ রোধ করবে।’

গাঁওবুড়োর নির্দেশমতো টিহুয়া সুজয়দের নিয়ে প্রবেশ করল গুহার ভিতর। লম্বা সুড়ঙ্গ এঁকে বেঁকে চলে গেছে সামনের দিকে। আধো অন্ধকার পথ। মাঝে মাঝে পাথরের ফাটল চুঁইয়ে আলো আসছে ভিতরে। চলতে থাকল সুজয়রা। পথ কখনো ওপরে উঠছে, কখনো নীচে নামছে। বিল জানতে চাইল, ‘কতক্ষণে আমরা সেই নগরীর কাছাকাছি পৌঁছব?’ টিহুয়া জবাব দিল, ‘গাঁওবুড়ো যা বলেছে, তাতে ঘণ্টা পাঁচেক সময় লাগার কথা। তিন চারটে পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে, তারপর নাকি নগরীতে পৌঁছেছে এই সুড়ঙ্গ। আমরা আসলে এগোচ্ছি নগরীর পিছন দিক থেকে। আর ইনকা পুরোহিতরা জঙ্গল ভেঙে পাহাড় অতিক্রম করে নগরীর সম্মুখ ভাগ দিয়ে সম্ভবত নগরীতে প্রবেশ করেছেন।’ এরপর কেউ আর কোনো কথা বলল না। নির্বাক ভাবে টিহুয়াকে অনুসরণ করে চলল সবাই। মাঝে মাঝে নিঃশ্চিদ্র অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে তারা। তখন মশাল জ্বেলে নিতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে দু-এক সময় মাটিতে হাড়গোড় পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। একবার একটা বর্শা বেঁধা নরকঙ্কালও চোখে পড়ল সুজয়ের। তবে তা অনেক দিনের পুরনো। বিল তাকে স্পর্শ করতেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল কঙ্কালটা। বহু বছর আগে, গাঁওবুড়োদের সেই নগরীতে প্রবেশ প্রস্থানের পর হয়তো আর কেউ ঢোকেইনি এই গুহাতে।

গুহা পথে এগোতে লাগল সুজয়রা। আর বাইরে সূর্য ক্রমশ মাথার ওপর উঠতে শুরু করল। সুজয়রা যে নিষিদ্ধ নগরীর দিকে এগোচ্ছে, তার আকাশে পাক খেতে শুরু করল কনডোর পাখির ঝাঁক। ঘণ্টা তিনেক চলার পর সুড়ঙ্গর দেওয়ালের গায়ে মানুষ খোদিত নানা ধরনের হুয়াকা দেখতে পেল সুজয়রা। মার্কেজ মশালের আলোতে হুয়াকাগুলো ভালো করে দেখে বললেন, ‘সম্ভবত আমরা নগরীর কাছাকাছি কোথাও পৌঁছে গেছি।’ বিল ঘড়ি দেখে বলল, ‘হ্যাঁ, তিন ঘণ্টা হাঁটছি আমরা। হুয়াকা খোদিত দেওয়াল ক্রমশ এগিয়েছে সামনের দিকে। সে পথ ধরে আরও বেশ কিছুটা এগিয়ে তারা উপস্থিত হল ভূগর্ভস্থ এক পাথুরে চত্বরে। জমাট অন্ধকার সেখানে। কিছুই সামনে দেখা যাচ্ছে না। মশালটা নিভিয়ে ফেলা হয়েছিল। সেখানে পৌছে মশালটা আবার জ্বালিয়ে সামনে তাকাতেই একটা ঠাণ্ডা স্রোত যেন সুজয়ের মেরুদন্ড বেয়ে নীচে নেমে গেল। পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পড়ল সবাই। টিহুয়ার হাতে ধরা মশালের আলো সামনে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই আলোতে সুজয়রা দেখল চত্বরে সার বেঁধে বসে আছে অসংখ্য ইনকা মূর্তি! অনেক অনেক মানুষ সেখানে! শুধু অম্রধারী পালক গোঁজা মাথার সারি! সামনে থেকে দেওয়ালের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তারা বসে আছে। যেন তারা সুজয়দের জন্যই এখানে অপেক্ষা করছে! এখনই উঠে আক্রমণ করবে সুজয়দের! বেশ কিছুক্ষণ সুজয়রা তাকিয়ে রইল লোকগুলোর দিকে। তারা কিন্তু উঠে এল না। কিছুক্ষণ পর টিহুয়া বলে উঠল, ‘ও মনে পড়েছে, গাঁওবুড়ো আমাকে বলেছিলেন সুড়ঙ্গতে একটা প্রাচীন কবরখানা আছে।’

সবাই এবার বুঝতে পারল ব্যাপারটা। মার্কেজ বললেন, ‘তার মানে এসব মমি! ইনকারা বসার ভঙ্গিতে মানুষের মমি তৈরি করতেন। এটাই ছিল তাদের মমি তৈরির রীতি। এরপর মমির সারির মধ্যে দিয়ে এগোতে থাকল তারা। বেশ বড়ো কবরখানা। অসংখ্য মমি, পুরুষের-নারীর। বিচিত্র তাদের পোশাক, মাথার সাজ। মমিগুলোর বুকের দুপাশ থেকে ধাতুর শিকল বেঁধে পাথরের ছোটো ছোটো স্তম্ভের সাথে তাদের বেঁধে রাখা হয়েছে। নারী মূর্তিগুলো ভালো করে দেখে প্রফেসর বললেন, ‘‘এদের প্রত্যেকের কন্ঠনালিতে কাটা চিহ্ন আছে। টুমি দিয়ে কন্ঠনালি ছিন্ন করে বলি দিত ইনকারা। এদের দেহে সোনার অলঙ্কারও আছে। সম্ভবত এই নারীরা প্রত্যেকেই এক সময় সূর্য কন্যা ছিলেন। ইনতি বা বিচামার উদ্দেশ্যে এঁদের উৎসর্গ করার পর মমি বানানো হয়।’

কবরখানাটা পার হতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। তারপর সুড়ঙ্গ বেয়ে ক্রমশ ওপর দিকে উঠতে শুরু করল তারা। টিহুয়া বলল, ‘মনে হচ্ছে আমরা এবার মৃত্যু নগরীর দিকে উঠছি।’ তার কথা শেষ হবার প্রায় সাথে সাথেই সুড়ঙ্গটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। দাঁড়িয়ে পড়ল সকলে। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকার পর মার্কেজ বললেন, ‘সম্ভবত ভূমিকম্প হল। পেরুর সব অঞ্চলই ভূমিকম্পপ্রবণ। যে কারণে ভূকম্পনরোধী জ্যামিতিক আকৃতির স্থাপত্য নির্মাণ করত প্রাচীন ইনকারা। সে রকম ভূমিকম্প হলে হয়তো এই সুড়ঙ্গতেই পাথর চাপা পড়ে মরতে হবে সকলকে!’ তার কথা শুনে কেউ কোনো মন্তব্য করল না।

অতি কষ্টে প্রায় এক ঘণ্টা ওপরে ওঠার পর সুড়ঙ্গর ভিতর একটা বেশ প্রশস্ত জায়গাতে উঠে এল তারা। আরও বেশ কয়েকটা সুড়ঙ্গ সেখান থেকে নানা দিকে চলে গেছে। পাথরের দেওয়ালের দু-পাশে দুটো ফোঁকর গলে বেশ কিছুটা আলোও ঢুকছে সেখানে। মার্কেজ আর সুজয় বিশ্রাম নেবার জন্য সেখানে বসে পড়ল, আর বিল গিয়ে উঁকি মারল একটা ফোঁকরে। আর তার পরই সে বলে উঠল, ‘আরে আমরাতো পৌঁছে গেছি!’ তার কথা শোনার সাথে সাথেই সুজয়রা তিনজন ফাটলটার কাছে গিয়ে বাইরে উঁকি দিল। তারা দেখতে পেল তাদের হাত তিরিশেক নীচেই একটা প্রশস্ত চত্বর। টানা বারান্দা অলা শ্রীহীন পাথুরে বাড়িঘর রয়েছে চত্বরের দুপাশে। একপাশে পাথরে খোদাই করা বিরাট এক মন্দির। কালো রং তার। বেশ কয়েকটা ইনতিহুয়ানাতা দাঁড়িয়ে রয়েছে সেখানে। আর পুরো চত্বরটাকে ঘিরে রেখেছে পাহাড়ের প্রাচীর। তবে চত্বরের কোথাও কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই, মৃত্যুর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে চত্বরে। আকাশে পাক খাচ্ছে কালো কালো হিংস্র পাখির ঝাঁক। তারা মাঝে মাঝে কর্কশ চিৎকারে নিঃস্তব্ধতা ভঙ্গ করছে। মার্কেজ ঘরগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সুসান যদি সত্যি এ পর্যন্ত এসে পৌঁছে থাকে তাহলে ওই ঘরগুলোর মধ্যেই কোথাও সে বন্দি আছে।’

টিহুয়া বলল, ‘আপনি ভাববেন না। সে এখানে থাকলে আমরা তাকে খুঁজে বার করবই।’

এরপর মার্কেজ মন্দিরটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সম্ভবত ওটাই সেই মন্দির।’ বিল ততক্ষণে ক্যামেরার টেলিফটো লেন্সটা বার করে সেটা ক্যামেরাতে লাগিয়ে দূরবিনের মতো ব্যবহার করতে শুরু করেছে। তার মাধ্যমে বিচামার মূর্তিটাও দেখতে পেল সুজয়রা। তবে লেন্সের মাধ্যমে চত্বর আর ঘর বাড়িগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেও একটা মানুষও কোথাও চোখে পড়ল না। টিহুয়া বলল, ‘এখনতো বাইরে যাওয়া যাবে না, আমরা বরং সুড়ঙ্গর ভিতর দিয়ে চত্বরটাকে বেড় দিয়ে মন্দিরের দিকে এগোই। তারপর রাত নামলে দেখা যাবে।’ তার কথায় সবাই সম্মত হয়ে মন্দিরের দিকে যাবার সুড়ঙ্গটা অনুমান করে এগোল সে দিকে।

সর্পিল সুড়ঙ্গ। ধুলোতে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে দেহ। কিছুটা সে দিকে এগোবার পর হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল সকলে। কিছুক্ষণ পর তারা বুঝতে পারল কাছেই একটা সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে শব্দটা হচ্ছে। মানুষের গোঙানির শব্দ!! বর্শা তুলে ধরে টিহুয়া এগোল সে দিকে। তার পিছনে এগোল অন্যরা। ক্রমশ শব্দটা স্পষ্ট হতে লাগল। তারপর তারা দেখতে পেল সুড়ঙ্গর আলোআঁধারির মধ্যে মাটিতে পড়ে থাকা একটা মানুষকে। টিহুয়া বর্শা দিয়ে তাকে শেষ করে দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাদের দেখতে পেয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল মানুষটা। আর সঙ্গে সঙ্গেই তার গলার শব্দে সবাই মুহূর্তের মধ্যে চিনে ফেলত তাকে, মিস্টার পিনচিও!!!

টিহুয়া বর্শা ছাড়ল না। সবাই ছুটে গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা পিনচিওকে ঘিরে দাঁড়াল। রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে তার দেহ, ছিন্নভিন্ন তার পোশাক! একটা তির বিঁধে আছে তার কোমরের কাছে, মুখের চামড়া ফালা ফালা! মার্কেজ তার ওপর ঝুঁকে পড়ে উত্তেজিত ভাবে বললেন, ‘সুসান? সুসান কোথায়?’ পিনচিও মনে হয় চিনতে পারলেন মার্কেজকে। তিনি জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বললেন, ‘সুসান এখানেই আছে। শয়তান ইল্লাপা তাকে আজ নিয়ে যাবে মন্দিরে। সে আর ফিরবে না। আমাকে ক্ষমা করুন প্রফেসর। আমার পাপের শাস্তি আমি পাচ্ছি! ও কি কষ্ট! জল, একটু জল।’ সুজয় এরপর তাড়াতাড়ি জল বার করে ঢেলে দিল পিনচিওর মুখে। সুজয়দের সব কিছু জানার জন্য তার আরও কিছু সময় বেঁচে থাকা প্রয়োজন।

জল পান করানোর পর পিনচিওকে ধরাধরি করে দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিল বিল। মৃত্যু পথযাত্রী যেন কিছুক্ষণের জন্য স্বস্তি পেল তাতে। প্রফেসর উৎকন্ঠার সাথে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সুসান ভালো আছে তো? আপনারা কেন তাকে চুরি করে আনলেন? আপনার এ অবস্থাই বা করল কে?’

মিস্টার পিনচিও বললেন, ‘হ্যাঁ, সে ভালো আছে এখনও পর্যন্ত। ওর ললাটে বার্লো আঁকা আছে। ইনকা সম্রাটের উত্তরাধিকারীর চিহ্ন। ওই টিকা না থাকলে সূর্য মন্দিরে কারও প্রবেশের ক্ষমতা নেই। তাই আমরা ওই ছেলেটার জন্যই আপনাদের ভুলিয়ে এনেছিলাম। তারপর ছেলেটাকে চুরি করে পালালাম। পথে আমাদের সঙ্গীরা অসভ্যদের হাতে মারা গেল। আমি, হুইকো আর ইল্লাপা শুধু পৌঁছলাম এখানে। ছেলেটাকে একটা ঘরে রাখল ইল্লাপা। তারপর ইল্লাপার রূপ বদলে গেল। আমাদের থাকার জায়গায় নিয়ে যাবার নাম করে বিচামা পুরোহিতকে দিয়ে আমাদের কয়েদ করাল আজ রাতের উৎসবে বলি দেবার জন্য। দিনের আলোতে চত্বর রক্ষীহীন দেখে আমি পালাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আকাশ থেকে নেমে আসা ভয়ঙ্কর পাখিগুলো ঠুকরে আমাকে শেষ করে দিল। তাও কোনোরকমে আমি গুহায় ঢুকতে যাচ্ছিলাম। রক্ষীরা আড়ালে দাঁড়িয়ে তির চালাল। এ তিরে বিষ আছে! আমি আর বাঁচব না!’ একটানা কথাগুলো বলে হাঁফাতে লাগলেন পিনচিও।

মার্কেজ এরপর প্রশ্ন করলেন, ‘মন্দিরের ভিতর কী আছে? যেখানে ঢুকবে বলে ছেলেটাকে চুরি করলে!’

পিনচিওর বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করতে শুরু করেছে। যেন তার বুকের বাইরে আসার জন্য ছটফট করছে। অতিকষ্টে তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ‘পিজরো ইনকা সাম্রাজ্যের দখল নেবার পর লুঠ করা সামগ্রীর মধ্যে দুটো মহার্ঘ্য বস্তু তার সঙ্গী সিয়েরো দ্য লেনগুইসমোকে দান করেছিলেন নিশ্চই জানেন?’

মার্কেজ বললেন, ‘হ্যাঁ কুজকোর সূর্যমূর্তির পিছনে বসানো একটা সোনার চাকতি, আর পাঁচাকুটি ইনকার পান্না।’

পিনচিও শ্বাস ছেড়ে বললেন ‘ঠিক। আর এও নিশ্চই জানেন নেশার ঘোরে ও দুটোই তিনি জুয়ায় খুইয়ে বসেন। পরবর্তীকালে ইতিহাসে তার সন্ধান মেলেনি। আসলে যিনি জিনিসগুলোর দখল পেয়েছিলেন তাকে হত্যা করে কুজকো মন্দিরের এক পুরোহিত সেগুলো নিয়ে পিজরোর সেনাদের নজর এড়িয়ে এখানে পালিয়ে আসেন। জিনিসদুটোকে সুরক্ষিত রাখার জন্য তিনি ওগুলোকে রাখেন বিচামা মন্দিরে। সূর্যদেবের প্রতীক সেই চাকতি গর্ভ গৃহে স্থান পায়। বিচামার স্থান হয় মন্দিরের বাইরে। ইনকা সাম্রাজ্যের প্রধান মন্দিরের পুরোহিত হিসেবে তিনি ঘোষণা করেন, ‘একদিন পাঁচাকুটি ইনকার পুনর্জন্ম হবে। তার কপালে আঁকা থাকবে বার্লো। দশম বর্ষ যখন সম্রাটের অতিক্রম হবে তখন কুজকো মন্দিরের পুরোহিত তাঁকে এখানে আনবে। তাঁরা দুজনেই কেবল মন্দিরে প্রবেশ করে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে ও দুটো জিনিস।’ এ কথা বলার পর বিড়বিড় করে বললেন, ‘ঠিক ছিল আমি পান্নাটা নেব, আর ইল্লাপা নেবে চাকতিটা। কিন্তু, কিন্তু...।’ গলা বুজে এল পিনচিওর, চোখও বুজে এল।

মার্কেজ তাকে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, ‘এ কথা আপনারা জানলেন কীভাবে?’

চোখ বন্ধ অবস্থাতে তিনি জবাব দিলেন, ‘বংশপরম্পরায় করিকাঞ্চা মন্দিরের কয়েকজন পুরোহিত এ কাহিনি জানে। ইল্লাপা তাঁদের একজন। আর আমি জেনেছিলাম পরবর্তীকালে, ‘সিয়েরো দা লেনগুইসমো’ ব্যাপারটা জেনেছিলেন বলে। তিনি তার ডায়েরিতে ব্যাপারটা লিপিবদ্ধ করে যান।’ সুজয়ের মনে হল পিনচিওর কন্ঠস্বর যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে!

মার্কেজ তাঁর কথা শুনে অবাক হয়ে বললেন, ‘আপনি সে ডায়েরি পেলেন কোথায়?’

জড়ানো গলায় পিনচিও জবাব দিলেন, ‘আমার বাড়িতে, পারিবারিক সিন্দুক ঘাঁটতে গিয়ে।’

‘মানে!!?’ বিস্মিত কন্ঠস্বর বেরিয়ে এল প্রফেসরের গলা দিয়ে।

ধীরে ধীরে চোখ খুললেন পিনচিও। এত যন্ত্রণার মধ্যেও তাঁর ঠোঁটের কোণায় মুহূর্তের জন্য একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘পেরু বিজয়ের নেতা সানফ্রান্সিসকো পিজরোর ঘনিষ্ঠ অনুচর ‘সিয়েরো দা লেনগুইসমো ছিলেন আমার ঊর্ধ্বতন চতুর্দশ পুরুষ।’ এরপরই পিনচিওর চোখের তারা স্থির হয়ে গেল!

মার্কেজ বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‘মিস্টার পিনচিও! মিস্টার পিনচিও!!!’

পিনচিও কোনো সাড়া দিলেন না। কয়েক মুহূর্ত পর বিল তাঁর চোখের পাতা বুজিয়ে দিয়ে বলল, ‘পাপের বেতন মৃত্যু। ঈশ্বর ওর আত্মাকে শান্তি দিক।’

বিল আর টিহুয়া মিলে পিনচিওর দেহ থেকে তিরটা খুলে নিল, তারপর যথাসম্ভব সুন্দরভাবে তাঁর মরদেহ একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে শায়িত করে সুড়ঙ্গর মুখে পাথর চাপা দিয়ে দিল।

মার্কেজ শুধু অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘আসলে ওঁর রক্তেই বংশানুক্রমে অ্যাডভেঞ্চার আর লোভ প্রবাহিত হচ্ছিল। তারাই ওঁকে এখানে ছুটিয়ে এনে মারল। যুগ যুগ ধরে ওই গুহার মধ্যে শায়িত থাকতে হবে ওঁকে।’

সুজয়রা আবার সুড়ঙ্গ ধরে মন্দিরের দিকে এগিয়ে চলল। মার্কেজ বললেন, ‘আশা করি পিনচিও আমাদের সত্যি কথা বলেছেন। মন্দিরের ভিতরে আমাদের প্রবেশ করতেই হবে। তাহলেই আমরা সুসানকে পেতে পারি।’

সুড়ঙ্গ কিন্তু সোজা মন্দিরের কাছে যায়নি। তার পাশ ছুঁয়ে চলে গেছে অন্যত্র। তারপর আবার ফিরে এসেছে মন্দিরের কাছে। বেশ কিছুটা চলেও তারা মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করতে পারল না। এক সময় তারা উঠে এল সুড়ঙ্গর ভিতরেই একটা চওড়া জায়গাতে। সেখানে দেওয়ালের গায়ে একটা ছিদ্র দিয়ে বাইরের আলো আসছে। তারা কোথায় আছে? সেই অবস্থান বোঝার জন্য বিল সেই ছিদ্র দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বুঝতে পারল তারা ঠিক মন্দিরের উলটো দিকে নগরীর প্রধান প্রবেশ পথের দিকে চলে এসেছে। নীচে তাকালেই চোখে পড়ছে ওপরে ওঠার পাকদন্ডী। বিল ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখল জায়গাটা দেখার জন্য। তার একটু পরই সে বলল, ‘আরে মানুষ দেখা যাচ্ছে! এরাই কি এখানে থাকে?’

পাহাড়ের নীচে একটু দূরে এদিকটাতে ছোটো গাছের জঙ্গল আছে। বিলের নির্দেশমতো সুজয় টেলিফটো লেন্সে চোখ রেখে দেখল, সেই জঙ্গলের আড়ালে আত্মগোপন করে আছে অসংখ্য মানুষ। তারা সব উলঙ্গ! এত দূর থেকে তাদের পুতুলের মতো লাগছে। টিহুয়া ক্যামেরার সাহায্যে তাদের অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে দেখার পর বলল, ‘এরা কাকাকুজকো নয়। জঙ্গলের অসভ্য জাতি। ভয়ঙ্কর হিংস্র হয়। সম্ভবত মোচে জনজাতির। আমার মনে হচ্ছে সম্ভবত এরা এ নগরী আক্রমণ করতে এসেছে!’

সুজয় বলল, ‘কেন?’

টিহুয়া বলল, ‘নইলে ওরা এদিকে আসবে কেন? জঙ্গলে সকলের এলাকা ভাগ করা আছে। ওরা থাকে গভীর জঙ্গলে, আর এটা হল কাকা কুজকোদের এলাকা। সম্ভবত কাকা কুজকোরা ওদের কাউকে ধরে এনেছে, অথবা এ জাতীয় কোনো ব্যাপার ঘটেছে। রাতের অন্ধকারে ওপরে উঠবে ওরা।’

বিল বলল, ‘তাহলে তো ভয়ঙ্কর লড়াই হবে দু-দলের মধ্যে?’

টিহুয়া জবাব দিল, ‘তাই মনে হচ্ছে!’

সুসানরা এরপর যে পথ ধরে এগিয়েছিল, সেই পথ ধরেই ফিরতে শুরু করল। কিছু সময় পর তারা আবার ফিরে এল মন্দিরের কাছাকাছি এক জায়গাতে। বাইরে ইনতি ততক্ষণে পশ্চিম দিকে পরিক্রমণ শুরু করেছেন। সেখানে বসে পড়ল সকলে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর টিহুয়া বলল, ‘এভাবে মন্দিরে পৌঁছান যাবে না। এ জায়গাটা একটা গোলকধাঁধা! বেশ কয়েকটা সুড়ঙ্গ পথ নানা দিকে চলে গেছে জায়গাটা থেকে। মার্কেজ আর টিহুয়া উঠে গিয়ে সুড়ঙ্গ মুখগুলো পরীক্ষা করতে লাগলেন। হঠাৎ একটা সুড়ঙ্গর দেওয়ালে অস্পষ্ট কিছু হুয়াকা চোখে পড়ল প্রফেসরের। ধুলো ঝাড়তেই দেওয়ালের গায়ে ফুটে উঠল কনডোর পাখির একটা মুর্তি। সুড়ঙ্গটা দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে সেটা এগিয়েছে মন্দিরের বিপরীত দিকে। প্রফেসর বললেন, ‘আগের সুড়ঙ্গটা মন্দিরমুখী হয়েও সেখানে যায়নি। আমার মনে হচ্ছে এটা বিপরীত মুখী হয়েও মন্দিরের দিকে যেতে পারে। হয়তো ধোঁকা দেবার জন্যই এই ব্যবস্থা করে রাখা আছে।’

তাঁর কথা শোনার পর সুজয়রা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে, সে পথেই যাবে ঠিক করল। তারা প্রবেশ করল সেই পথে। কিছুটা এগোবার পরই অন্ধকারে ডুবে গেল তারা। বাধ্য হয়ে মশাল জ্বালিয়ে নিতে হল। পথ এগিয়েছে এঁকেবেঁকে, নীচু ছাদ, ঘেঁসাঘেসি পাথরের দেওয়াল যেন পিষে ধরতে চাচ্ছে সুজয়দের। কোনো কোনো সময় হামাগুড়ি দিয়ে চলতে লাগল সবাই। সময়ের সাথে সাথে ওদিকে বাইরে আলোও কমে আসতে লাগল। এক সময় দেওয়ালের গায়ে মশালের আলোতে চোখে পড়তে লাগল সার সার হুয়াকা, পুমা, কনডোর, মাচাকুয়ে ইত্যাদি বিভিন্ন পশুপাখির সাপের মূর্তি। নানা রকমের অদ্ভুত আকৃতির মানুষের মুখ। এ রকম হুয়াকা এখানে কোন সুড়ঙ্গে চোখে পড়েনি কারও। বেশ কিছুটা পথ হুয়াকা আঁকা সুড়ঙ্গ দিয়ে চলার পর হঠাৎ দূর থেকে একজন মশালধারী রক্ষী চোখে পড়ল। একটা ছোটো ঘরের মতো জায়গাতে সুড়ঙ্গর মুখ আগলে সুজয়দের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘদেহী আমাজনীয় রক্ষী। তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে মশাল নিভিয়ে দিয়ে টিহুয়া সন্তর্পণে এগোতে লাগল রক্ষীর দিকে। তার পিছনে দেওয়াল ঘেঁসে এগোল অন্যরা। কিছুটা এগিয়ে কোমর থেকে ব্লো পাইপ বার করে মুখের কাছে ধরল টিহুয়া। রক্ষী তখন সুজয়দের হাত কুড়ি দূরে দাঁড়িয়ে। একটা মৃদু শিসের মতো শব্দ হল ব্লো পাইপ থেকে। কাঁটাটা গিয়ে বিঁধল রক্ষীর ঘাড়ে। একবার যেন শুধু ঘাড়ে হাত বুলাল রক্ষী। তারপর মুহূর্তেই দড়াম করে আছড়ে পড়ল মেঝেতে। সুজয়রা তার কাছে গিয়ে পড়ে থাকা মশালটা তুলে নিয়ে দেখল লোকটার মুখটা নীল হয়ে গেছে। মুহূর্তের মধ্যেই মরে কাঠ হয়ে গেছে অতবড়ো মানুষটা! মার্কেজ অবাক হয়ে টিহুয়াকে বললেন, ‘তুমি লোকটাকে মেরে ফেললে!?’ টিহুয়া জবাব দিল, ‘ওর কপালে আজ মৃত্যু লেখা ছিল। আমি না মারলেও মোচেদের সাথে লড়াইয়ে বা অন্য কোনো ভাবে মৃত্যু হত ওর।’ এই বলে সে আবার এগোতে লাগল। আরও কিছু সময়ের পর আরও একজন রক্ষী দেখতে পেল তারা। তাকে একই ভাবে সাবাড় করার পর টিহুয়া বলল, ‘আমরা মনে হয় ঠিক পথেই এগোচ্ছি, নইলে এদিকে সুড়ঙ্গে রক্ষী থাকবে কেন?’

সময় এগিয়ে চলল, এক সময় বাইরে থেকে শোনা যেতে লাগল ঢাকের শব্দ। সুড়ঙ্গও বেশ কয়েকবার কেঁপে উঠল। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কেউ আর কোনো কথা বলল না। তারপর সুড়ঙ্গর গায়ে একটা ফাটল চোখে পড়ল। সেই ফাটল দিয়ে বাইরে তাকাতেই সুজয়দের চোখের সামনে ভেসে উঠল মশাল আলোকিত, রক্ষী পরিবৃত চত্বর। একটু খেয়াল করার পর ইনতিহুয়ানাতা বাঁধা চারজন লোক চোখে পড়ল তাদের। একজনকে চিনতে পারল সুজয়। পিনচিও-র সহচর হতভাগ্য হুইকো! লোকগুলো নড়ছে না। সম্ভবত তাদের বলি দেওয়া হয়ে গেছে! টিহুয়া বাকি তিনজনকে দেখে বলল, ‘এবার বুঝলাম অসভ্যরা কেন এদিকে আসছে? ওদের লোককে এরা ধরে এনেছিল!’

হঠাৎ প্রফেসর বলে উঠলেন, ‘ওই যে! ওই যে! বিচামা মূর্তির কাছে। সুজয়রা দেখল বিচামা মূর্তির সামনে রক্ষী পরিবৃত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাদা পোশাক পরা ইনকা পুরোহিত আর তার পাশে ঝলমলে পোশাক পরা সুসান। সুসানের সামনে নতজানু হয়ে বসে আছে লাল পোশাক পরা একজন লোক! সম্ভবত সে বিচামা পুরোহিত হবে! মন্ত্রমুগ্ধের মতো সুজয়রা তাকিয়ে রইল সে দিকে। এক সময় ইল্লাপা সুসানকে নিয়ে এগিয়ে চলল মন্দিরের দিকে। টিহুয়া এবার সুজয়দের হুঁস ফিরিয়ে বলল, ‘আর আমাদের দেখার কিছু নেই। ওরা মন্দিরে ঢুকতে যাচ্ছে! আমাদেরও এগোতে হবে।’

সুজয়রা আর দাঁড়াল না। দ্রুত চলতে লাগল সুড়ঙ্গ ধরে। পথ যেন আর ফুরায় না। প্রতিটি মিনিট যেন এক একটা ঘণ্টা! মার্কেজ এক সময় বললেন, ‘এ পথ আমাদের ঠিক মন্দিরে নিয়ে যাচ্ছে তো?’ অবশেষে এক সময় সুড়ঙ্গর শেষ প্রান্তে একটা আলোকরেখা দেখতে পাওয়া গেল। মশাল নিভিয়ে সে দিকে এগিয়ে সুড়ঙ্গর শেষ প্রান্তে পৌঁছে আলোক উৎসের দিকে উঁকি দিল তারা।

সুজয়রা দেখতে পেল বিশাল একটা গুহার মাঝখানে একটা নীচু বেদির ওপর মশাল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ইনকা পুরোহিত ইল্লাপা। বেদির চার কোণে বসে আছে চারটে মমি। আর বেদির মাঝখানে ছোটো একটা স্তম্ভের গায়ে বসানো আছে বিরাট বড়ো গোল চাকতি। মশালের আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে চাকতিটা! মার্কেজ একবার চাপা স্বরে সুজয়ের কানের কাছে বললেন, ‘সূর্যদেবের সোনার চাকতি!’

সুড়ঙ্গের ভিতর সুজয়রা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে ঘরের একটা অংশই চোখে পড়ছে। ছাদ আর দু-পাশের দেওয়াল দেখা যাচ্ছে না। সুসানকে তারা প্রথমে দেখতে পেল না। সুজয়ের মনে হল, মশাল ধরে ইল্লাপা যেন ছাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। ভিতরে ঢুকে পড়বে নাকি চিন্তা করতে লাগল সুজয়রা। কয়েক মুহূর্ত পরই তারা দেখতে পেল সুসানকে! একটা ছোটো বাক্স হাতে সে এগিয়ে আসছে বেদির দিকে। তার দিকে তাকিয়ে বেদি থেকে নেমে দাঁড়ালেন ইনকা পুরোহিত। সুসান তার হাতে বাক্সটা তুলে দিতেই মশালটা একটা মমির হাতে গুজে দিয়ে বাক্সটা খুলে ফেললেন। তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল হাঁসের ডিমের মতো বড়ো প্রায় গোলাকৃতি সবুজ রঙের একটা পাথর! মশালের আলোতে ঝলমলে সবুজ দ্যুতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে ইনকা পুরোহিতের হাতে ধরা পাথর থেকে। সুজয় বুঝতে পারল, ওই হল সেই, ‘পাঁচাকুটি ইনকার পান্না!’ যার জন্য এ মৃত্যু নগরীতে ছুটে আসতে হয়েছে সকলকে! এরই লোভে প্রাণ দিলেন পিনচিও, মরতে হল হুইকোকে!

বেশ কয়েক মুহূর্ত পাথরটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার পর ইল্লাপা পাথরটা তার কোমর বন্ধনিতে গুঁজে নিলেন, তারপর তিনি সেই বাক্সটা ছুড়ে ফেললেন সুড়ঙ্গের দিকে। সুজয়ের প্রায় গায়ে এসে সুড়ঙ্গর ভিতর পড়ল সেটা। বাক্সটা ফেলে দিয়ে ইনকা পুরোহিত আবার বেদিতে উঠে স্তম্ভের খাঁজে বসানো বিরাট থালার মতো চাকতিটা দু-হাত দিয়ে খুলে ফেললেন। ঝিলিক দিয়ে উঠল সূর্যদেবের সোনার চাকতি! তিনি চাকতিটা নিয়ে বেদি থেকে নীচে নামতেই সুসান বলে উঠল, ‘এবার তাহলে আমাকে দাদুর কাছে পৌঁছে দাও!’ সুড়ঙ্গর ভিতর দাঁড়িয়ে সে কথা শুনতে পেল সকলে।

ইনকা পুরোহিত সুসানের কথা বুঝতে পারলেন কিনা কে জানে! তিনি শুধু ঘাড় নেড়ে, চাকতিটা সাবধানে মাটিতে নামিয়ে রেখে কোমরে হাত দিয়ে সুসানের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। মশালের আলো এসে পড়েছে ইল্লাপার মুখে। সুজয় দেখল ধীরে ধীরে ইনকা পুরোহিতের মুখে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠছে! হঠাৎই তার চোখ দুটো কেমন হিংস্র হয়ে উঠল। তিনি এগোতে লাগলেন সুসানের দিকে। ভয় পেয়ে সুসানও পিছু হটতে শুরু করল। মশালের আলোতে কী যেন চকচক করে উঠল ইনকা পুরোহিতের হাতে! কোমর থেকে দীর্ঘ টুমিটা খুলে নিয়ে সুসানের দিকে এগোচ্ছেন তিনি! বিলও রিভলবারটা উঁচিয়ে ধরেছে সুড়ঙ্গর মুখে দাঁড়িয়ে, টিহুয়ার মুখের কাছে ধরা ব্লো পাইপ। কিন্তু তারা কেউই ব্যবহার করতে পারছে না সেগুলো। ইল্লাপা আর সুসান এত ঘনিষ্ঠ যে সুসানের গায়ে লেগে যেতে পারে তা। ইনকা পুরোহিত এক পা এগোচ্ছেন আর সুসান পিছোচ্ছে। সুসানের পিঠ সুজয়দের দিকে। ইল্লাপা আর সুসানের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ কমে আসছে! ইনকা পুরোহিত মাথার ওপর টুমিটা তুলে ধরলেন। মশালের আলোতে ঝলসে উঠল তার ফলাটা! হঠাৎই যেন আবার মৃদু মৃদু কাঁপতে শুরু করল সুজয়দের পায়ের তলার মাটি। বিল আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। ইল্লাপা আর সুসানের মধ্যে হাত দুয়েকের পার্থক্য। টুমিটা সুসানের ওপর নেমে আসার আগেই সুড়ঙ্গর মুখে দাঁড়িয়ে সুসানের মাথার ওপর দিয়ে ইল্লাপাকে লক্ষ্য করে বিল গুলি চালিয়ে দিল। প্রচন্ড শব্দ আর বারুদের ধোঁয়ায় ভরে গেল চারপাশ। বিলের গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। সেটা বিদ্ধ করল ইল্লাপার কাঁধের কনডোরটাকে। এক গোছা পালক উড়িয়ে কর্কশ আর্তনাদ করে পাখিটা ছিটকে পড়ল ঘরের কোণে। সুড়ঙ্গর মুখ থেকে সুজয়কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বিল ঢুকে পড়ল ঘরের মতো গুহাটার ভিতর। ব্যাপারটা ঘটতে কয়েক মুহূর্ত মাত্র সময় লাগল। ইল্লাপা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে প্রথমে ছুটে গিয়ে মাটি থেকে চাকতিটা তুলে নিলেন। তারপর সেটা ঢালের মতো উঁচিয়ে ধরে ফিরে দাড়ালেন বিলের দিকে। বিল ততক্ষণে রিভলবার উঁচিয়ে ধরে প্রায় তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

সুজয়রাও ততক্ষণে গুহার ভিতর ঢুকে পড়েছে। তাদের দেখতে পেয়েই দৌড়ে এসে মার্কেজকে জড়িয়ে ধরল সুসান। বিল ইল্লাপার কাছে পৌছেই আর একটা গুলি চালাল। চাকতিতে লেগে ছিটকে পড়ল গুলিটা। আর একটাই মাত্র গুলি আছে বিলের রিভলবারে। ইনকা পুরেহিত এবার উলটো দিকের দেওয়ালের দিকে পিছোতে শুরু করলেন চাকতিটাকে ঢালের মতো আঁকড়ে ধরে। আর বিলও এগোতে লাগল তার দিকে। টিহুয়ার ব্লোপাইপটা বিল সুড়ঙ্গ থেকে বেরবার সময় হাত থেকে কোথায় খসে পড়েছে। সুসানকে নিয়ে সুজয়, মার্কেজ আর টিহুয়া তাকিয়ে দেখতে লাগল বিলদের। ইনকা পুরেহিত ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছেন গুহার অন্ধকার কোণের দিকে। গুহার চার দেওয়াল থেকে বারান্দার মতো অসংখ্য থাক ক্রমশ ওপর দিকে উঠে ছাদের কাছে পৌঁছে মিলেমিশে গেছে। ইনকা পুরোহিত পিছু হটতে হটতে এক সময় দেওয়ালের এক কোণায় পৌঁছে গেলেন, ঠিক সেই সময় মশালের আলোটাও হঠাৎই কমে গেল। প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল সেই কোণটা। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগালেন ইনকা পুরোহিত। প্রচন্ড জোরে চাকতিটা তিনি ছুড়ে মারলেন বিলের দিকে! বিল আঘাতটা এড়াল ঠিকই, কিন্তু টাল সামলাতে না পেরে সে পড়ে গেল মাটিতে। রিভলবারটাও ছিটকে মাটিতে পড়ল! সোনার চাকতিটা দেওয়ালে আছড়ে পড়ার আর রিভলবারের অবশিষ্ট গুলিটা বেরিয়ে যাবার মিলিত বিভৎস শব্দে কানে তালা লেগে গেল সুজয়দের। পরক্ষণেই রক্ত জল করা একটা হাসির গররা বেরিয়ে এল ইনকা পুরোহিতের গলা থেকে। মানুষের হাসি যে এত ভয়ঙ্কর হতে পারে সুজয়ের তা জানা ছিল না! এরপর ইনকা পুরোহিত দুর্বধ্য ভাষায় একটা চিৎকার করে টুমিটা উঁচিয়ে ধরে এগোলেন মাটিতে পড়ে থাকা বিলের দিকে। কিছুটা দূরে হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে সুজয়রা। হঠাৎ সুজয়ের মনে হল ইনকা পুরোহিতের ঠিক পিছনে মাথার ওপর দেওয়ালের একটা থাকের অন্ধকারটা যেন একটু দুলে উঠল, মুহূর্তের জন্য যেন সুজয় দেখতে পেল একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখ! এরপর মুহূর্তেই সেই অন্ধকারটা পিছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল ইনকা পুরোহিতের ঘাড়ে! মন্দিরের শেষ প্রহরী আমাজনের কালো বাঘ টুঁটি কামড়ে ইল্লাপাকে পেড়ে ফেলল মাটিতে। টুমি খসে গেল ইল্লাপার হাত থেকে। প্রাণীটার হাত থেকে বাঁচবার জন্য ঝটাপটি শুরু করলেন ইনকা পুরোহিত। ক্রুদ্ধ কালো প্রাণীটা গজরাতে গজরাতে থাবা চালাতে লাগল তাঁর শরীরে। তীক্ষ্ণ নখের আঘাতে ফালা ফালা হয়ে যেতে লাগল ইল্লাপার শরীর। তার সাদা পোশাক মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে গেল। এ লড়াই বেশিক্ষণ চালানো সম্ভব হল না ইনকা পুরোহিতের পক্ষে। তার শরীর ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে এল, নিথর হয়ে গেল কুজকো করিকাঞ্চার ইনকা পুরোহিত ইল্লাপার দেহ। বাঘটা এর পরও বেশ কিছুক্ষণ কামড়ে ধরে রইল ইনকা পুরোহিতের গলা। তারপর তাকে ছেড়ে ফিরে তাকাল মাটিতে পড়ে থাকা বিলের দিকে। সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে প্রাণীটার উজ্জ্বল চোখ দুটো পর্যবেক্ষণ করতে লাগল বিলকে। ভয়ঙ্কর দাঁতগুলো বার করে একবার ঠোঁট চাটল প্রাণীটা! তার চিবুকে লেগে আছে ইনকা পুরোহিতের টাটকা রক্ত।

সুজয়রা কখন যে পায়ে পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে গেছে তা তারা বুঝতে পারেনি। হঠাৎ টিহুয়ার খেয়াল হল তার হাতে ধরা বর্শার কথা। প্রাণ ভয়ে কোনো রকমে উঠে দাঁড়াল বিল। তার দিকে তাকিয়ে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে মিশমিশে কালো প্রাণীটা। তার লেজের ডগাটা শুধু মৃদু মৃদু নড়ছে। ঝাঁপ দেবার আগের মুহূর্ত! সে বিলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই টিহুয়া তার বর্শাটা তাগ করল প্রাণীটাকে লক্ষ্য করে। ঠিক তখনই সুসান এক কান্ড করল, হঠাৎ সে তির বেগে ছুটে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল বিল আর প্রাণীটার মাঝে! বর্শা ছোড়া হল না টিহুয়ার, প্রাণীটাও লাফ দিতে গিয়ে শেষ মুহূর্ত কেমন যেন থমকে গেল! সুজয়ের পায়ের নীচে মাটি কাঁপছে। সুসান আর বাঘটার দিকে তাকিয়ে তার হৃৎপিন্ডও কাঁপছে। একই অবস্থা প্রফেসর মার্কেজেরও। টিহুয়া বর্শা ছুড়তে পারছে না, বাঘের দেহর একটা অংশ আড়াল করে সুসান দাড়িয়ে আছে। সুসান আর বাঘটা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে। এক একটা মুহূর্ত যেন এক একটা ঘণ্টা! আর এর পরই একটা বিস্ময়কর ঘটনার সাক্ষী হল সবাই। সুসান কয়েকপা এগিয়ে গিয়ে হাত রাখল প্রাণীটার মাথায়! আর বাঘটাও পোষা কুকুরের মতো ঘড়ঘড় শব্দ করতে করতে মাথা ঘসতে লাগল সুসানের গায়ে! কয়েক মুহূর্ত পর আরও একটা অদ্ভুত জিনিস দেখল সুজয়। দেওয়ালের গায়ের খাঁজ বেয়ে একটা কালো রোমশ বল গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে এসে দাঁড়াল, বাঘটার পাশে। খুদে খুদে চোখ দিয়ে সে তাকাচ্ছে চারপাশে! বাঘটা লম্বা জিভ দিয়ে তার গা চাটতে লাগল। সুসান এরপর সুজয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সুজয় আঙ্কল এদিকে এগিয়ে এসো। বাঘটা কিছু বলবে না।’ মাটি কাঁপছে। সুজয় এগিয়ে গেল সুসান আর বাঘটার দিকে। তার পিছনে প্রফেসর মার্কেজ আর টিহুয়া। সুজয় সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই সুসান বলল, ‘ওর গায়ে হাত দাও।’ কাঁপা কাঁপা হাতে সুজয় প্রাণীটার গায়ে হাত দিল। বাঘটা একবার শুধু তার দিকে তাকিয়ে আবার তার বাচ্চাটার গা চাটতে লাগল। সবাই তাকিয়ে দেখতে লাগল তাদের। একটু দূরেই পড়ে আছে ইনকা পুরোহিতের রক্তাক্ত মৃতদেহ। তাঁর খোলা চোখ দুটো তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে। তাঁর সেই চোখ দুটোকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণীটার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর মনে হল সুজয়ের।

মুহূর্তেই সেই অন্ধকারটা পিছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল ইনকা পুরোহিতের ঘাড়ে!

হঠাৎ টিহুয়া বলে উঠল, ‘শুনতে পাচ্ছেন? বাইরে থেকে গোলমালের শব্দ আসছে! সম্ভবত অসভ্য মোচেরা নগরী আক্রমণ করেছে!’

সুজয়রা তার কথা শুনে এতক্ষণ পরে খেয়াল করল, সুড়ঙ্গর মোটা পাথুরে দেওয়াল ছাপিয়ে ভেসে আসছে কোলাহল, চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ!

আর এর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই হঠাৎ প্রচন্ড জোরে দুলতে শুরু করল সুজয়ের পায়ের তলার মাটি, কোনো প্রকান্ড দৈত্য যেন ধরে ঝাঁকুনি দিচ্ছে গুহাটাকে।

মার্কেজ চিৎকার করে উঠলেন, ‘এখনই আমাদের পালাতে হবে এখান থেকে। ভূমিকম্প শুরু হয়েছে।’

বাঘটাও মুহূর্তের মধ্যে তার বাচ্চাটাকে মুখে তুলে নিয়েছে! ছাদ থেকে খসে পড়ছে পাথর! মাথা বাঁচিয়ে টলোমলো পায়ে সুজয়রা এগোল, যে সুড়ঙ্গ দিয়ে তারা গুহার ভিতরে ঢুকেছে সে দিকে। কিন্তু তারা সে পর্যন্ত পৌঁছবার আগেই ওপর থেকে প্রচন্ড বড়ো একটা পাথরের চাঁই ধসে পড়ে সেই সুড়ঙ্গ মুখ বন্ধ করে দিল! পাথর সরাবার আর সময় নেই, পাথর বৃষ্টি শুরু হয়েছে ওপর থেকে। কিংকতর্ব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সকলে। টিহুয়া দেখতে পেল বাঘটা তার বাচ্চাটাকে মুখে তুলে দ্রুত এগোচ্ছে গুহার অন্য পাশে একটা সুড়ঙ্গর দিকে। তাই দেখে টিহুয়া বলে উঠল, ‘ওই দেখুন! বাঘটা মনে হয় বাইরে যাবার রাস্তা জানে! ওকে শীগগির অনুসরণ করতে হবে। তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি!’ এই বলে সে ছুটে গিয়ে মমির হাতে ধরা মশালটা তুলে নিল। সুসানকে নিয়ে সকলে ছুটল বাঘটার পিছু পিছু। বিচামা মন্দিরের গর্ভ গুহায় পড়ে রইল ইনকা পুরোহিতের দেহ, পাঁচাকুটি ইনকার মহার্ঘ পান্না আর সূর্যদেবের সোনার চাকতি। বাঘটার পিছু পিছু গুহা ছেড়ে একটা সুড়ঙ্গ ধরে কিছুটা এগোতেই সুজয়রা পিছনে প্রচন্ড একটা শব্দ শুনতে পেল। ধসে পড়ল তাদের ফেলে আসা গুহাটা! বাঘটার পিছু পিছু একটার পর একটা সুড়ঙ্গ অতিক্রম করতে লাগল তারা। অবশেষে এক সময় তারা পৌঁছে গেল সেই চেনা সুড়ঙ্গ পথে। যে পথে সুজয়রা প্রবেশ করেছিল নগরীতে। বাঘটা সেই সুড়ঙ্গর মুখে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে পিছন ফিরে তাকাল সুসানের দিকে। নির্বাক দৃষ্টিতে সুসানের দিকে তাকিয়ে সে যেন বলল, ‘বিদায়, হে অচেনা বন্ধু!’ আর তার পরই বাচ্চাটাকে মুখে নিয়ে লাফ দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বাইরে শোনা যাচ্ছে অসভ্য মোচেদের বর্বর উল্লাস, আমাজনীয় নগর রক্ষীদের আর্তনাদ আর পাথর খসে পড়ার বিভৎস শব্দ! ভূমিকম্পে ধসে পড়ছে ইনকাদের শতাব্দী প্রাচীন এই মৃত্যু নগরী! সুড়ঙ্গ পথ ধরে বাইরে যাবার জন্য ছুটতে শুরু করল সুজয়রা। তারা চলল তো চললই। সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে তারা যখন নদীর পাড়ে পৌঁছে নৌকায় উঠে বসল তখন পাহাড়ের মাথায় সূর্যোদয় হচ্ছে। মৃত্যু নগরীর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রয়ে গেলেন, পিনচিও, হুইকো, ইনকা পুরোহিত। সুজয়দের নৌকো জল কেটে রওনা হল চিমু গ্রামের দিকে।

পুনশ্চ : তিন দিন পর চিমু গ্রামের এক পাতায় ছাওয়া কুঁড়েতে বসে নিজেদের মালপত্র গোছগাছ করছিল সুজয়রা। পরদিন তারা ফেরার জন্য যাত্রা শুরু করবে। সবার মনই বেশ উৎফুল্ল, কেবল বিলের মন একটু খারাপ। গাঁওবুড়ো বেশ কিছু মৃৎপাত্র উপহার দিয়েছেন প্রফেসর মার্কেজকে। সেগুলো প্যাক করতে করতে মার্কেজ বললেন, ‘এ সব জিনিস হল খাঁটি চিমু শিল্পের নিদর্শন। কুজকো মিউজিয়ামেও এ জিনিস নেই! এগুলো যে কোনোদিন আমার হাতে আসবে তা স্বপ্নেও ভাবিনি! আমার এখানে আসা সার্থক।’

তার কথা শুনে বিল বলল, ‘আমার আশা পূর্ণ হল না। কোরাকেঙ্কুর দর্শন মিলল না। তবে একটা ব্যাপারে কিন্তু আমি নিশ্চিত। ও পাখি ঠিক আছে। কোনো দিন যদি সুযোগ পাই তবে কোরাকেঙ্কুর সন্ধানে আবার পেরুতে অভিযানে আসব আমি।’

সুজয় তার কথা শুনে একটু আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘তুমি এতটা নিশ্চিত কীভাবে হলে? আমার তো মনে হয় পুরো ব্যাপারটাই নিছক গল্প কথা!’

বিল কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় বলল, ‘না সে পাখি আছে। নইলে এদুটো কোথা থেকে এল?’ এই বলে সে তার জামার তলা থেকে সাবধানে বেশ বড়ো দুটো পালক বের করে আনল। লাল, সাদা, কালো ডোরা আঁকা তাতে! এরপর বিল বলল, ‘নিকের লেখাতে বা হুইকোর বর্ণনাতেও কিন্তু এরকম পালকের কথাই ছিল!’

অবাক হয়ে পালকের দিকে তাকিয়ে সুজয় বলল, ‘এ পালক তুমি কোথায় পেলে?’

সে জবাব দেবার আগেই সুসান হঠাৎ বলে উঠল, ‘মন্দিরে ঢোকার আগে এ পালক দুটোইতো আমার মাথায় গুঁজে দিয়েছিল বিচামা পুরোহিত!’

বিল তার কথার সাথে সংযুক্ত করল, ‘হ্যাঁ, এ দুটো সুসানের ল্লান্টুতে ছিল। আপনারা খেয়াল করেননি। সুড়ঙ্গতে পালাবার সময় খসে পড়েছিল। আমি কুড়িয়ে নিয়েছি। এই পালক মাথায় গুঁজে দিয়ে ইনকা হিসাবে সুসানের অভিষেক করা হয়েছিল।’

ঠিক সেই সময় টিহুয়া ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি বাইরে আসুন একটা জিনিস দেখে যান!’

সুজয়রা ঘরের বাইরে পা রাখতেই টিহুয়া আঙুল তুলে দেখাল একটা বিরাট গাছের দিকে। শেষ বিকালের পড়ন্ত সূর্যের আলো এসে পড়েছে গাছটার মাথায়। একটা বিরাট বড়ো পাখি বসে আছে উঁচু একটা ডালে। সোনালি দেহ, লাল-সাদা-কালো-ডোরা আঁকা দীর্ঘ লেজ। কোরাকেঙ্ক!! সত্যি অপূর্ব সুন্দর পাখি! বিল ক্যামেরা আনতে যাচ্ছিল, কিন্তু পাখিটা তার আগেই ডানা মেলে দিল আকাশে। তারপর ছোটো হতে হতে এক সময় হারিয়ে গেল দূরদিগন্তে।

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%