অ্যান্টি হিরো

জয়ন্ত দে

গভীর লোমশ রাত। নাক টানলে হালকা পশু পশু বুনো গন্ধ। রাত এমনই হয়। স্পর্শ করলে টের পাওয়া যায়, গভীর রাতের শরীরে যেন ঘন লোম। তাতে বুনো গন্ধের সঙ্গে কর্কশ অন্ধকার মাখামাখি।

এদিককার আলোগুলো ঘুম চোখে ঢুলছে। কোনও কোনও বাড়ির বারান্দার ছোট ছোট লাল আলো বুড়ো পাহারাদারের মতো জেগে! আর ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর হাড়ে-পাঁজরে যে ঝকঝকে সাদা আলোগুলো সন্ধে থেকে ঝিলিক মারে তারাও সব আধো ঘুমঘোরে। আজ রাতে গাড়ি আসবে। নতুন কনসাইনমেন্ট।

নন্দিতা জেগে আছে নতুন অতিথির জন্যে। কী আসবে, তা আগেভাগে সে জানতে পারে না। কনসাইনমেন্ট বাড়ির কাছাকাছি এলে রজতকান্তির ফোন আসে। খুব ছোট্ট একটা কথা বলে রজতকান্তি—গেট খুলে রাখো।

কক্ষনো, একবারও বলে না, 'ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?' বা, 'শরীর ঠিক আছে?' কখনও এমন কথা ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে না, 'বাবা কেমন আছে? ওষুধ খেয়েছে?'

এমন হতে পারে, এসব রাতে রজতকান্তি নিজে খুব টেনশড থাকে। তখন ওর মন-প্রাণ হয়তো পড়ে থাকে কনসাইনমেন্টটার ওপর। কনসাইনমেন্টটা ঠিক ঠিক রিসিভ করা বেশ একটা ঝামেলার কাজ।

এ-ধরনের কনসাইনমেন্ট রিসিভ করে নন্দিতা।

নন্দিতা চাবি হাতে দোতলার বারান্দার নেভা আলোর পাশে অপেক্ষায় থাকে। ওখানে পাশাপাশি দুটো চেয়ার আছে। একটা রকিং চেয়ার। সেগুন কাঠের পুরনো আমলের জিনিস, এখনও অটুট পালিশ। এই চেয়ারে বসে নন্দিতা যদি এখন অপেক্ষার সঙ্গে দোল খেত, কেউ শব্দ পেত না, চেয়ারটা এতটাই মসৃণ। নন্দিতা এ চেয়ারে বসে না। তার পাশে একটা খুব বেঁটে টুল আছে। নন্দিতা টুলে বসে থাকে। যেখানে সে বসে থাকে ঠিক সেখানে তাকে আড়াল করা হাফ মানুষ সমান দেওয়াল। তারপর লোহার ঘন ডিজাইনের মজবুত গ্রিল। গ্রিলের বাইরে টব রাখার জায়গা। তাতে নানাধরনের গাছ। প্রত্যেক রবিবার দুজন লোক আসে। তাদের একজন বাড়ির বাইরে থেকে সারা বাড়ির যত গ্রিল আছে মোছে। আর একজন মালি। যত টব আছে তার পরিচর্যা করে। এসব কাজে নন্দিতা হাত দেয় না, দেখভালও করে না। সামান্য কোনও ক্রটি থাকলে রজত এসে যার কাজ তাকে ধরে। তার টাকা আটকে দেয়। রজত একটা অদ্ভুত কায়দায় সবার টাকা কীভাবে যেন আটকে দেয়। এই আটকানোর কাজটা সে একটু একটু করে করে, ফলে যারা কাজ করে তারা কিছুতেই ছেড়ে যায় না। তাদের এখান থেকে মুক্তি নেই। তারপরও কিন্তু রজতের নামে টাকাপয়সা নিয়ে কেউ একটাও বাজে কথা বলতে পারে না। কারণ সবকিছুতেই অন্যলোকের থেকে রজত ডবল টাকা দেয়। অসুখ-বিসুখে হাত পাতলে ফেরায় না। পুজো, ইদ, বড়দিনে আলাদা টাকা দেয়, এত সুখের কাজ, কে অবহেলা করে। নন্দিতা বউ। তার কোনও বেতন নেই। তবে বড় কোনও কনসাইনমেন্টের পরই ওর জন্যে গয়না আসে। ওর দুটো ব্যাংকে নিজস্ব লকার আছে। সে গয়না সেখানে ঢুকে যায়। আর কোনওদিন বের হয় না। কারণ ও গয়না পরে না। আগে পরত, বিয়ের প্রথম প্রথম। কিন্তু এই বিশাল ফাঁকা বাড়িতে গয়নার আওয়াজ কেমন যেন বেদনার মতো শোনায়। আর রাতের বেলা যখন একা একা দরজা খোলে তখন হালকা আলোয় ঝিকিয়ে ওঠা সোনার গয়না দেখে কেমন ভয় ভয় করে।

নন্দিতা পশুপাখিকে ভয় পায় না, যতটা মানুষকে পায়। নন্দিতা মানুষকে খুব ভয় পায়। খুব, যতটা ও নিজে বোঝে তার থেকে বেশিই যেন পায়। গায়ে সোনার গয়না না থাকলে মানুষের প্রতি প্রাথমিক ভয়টা কেটে যায়। এরপর বাকি থাকে শরীর!

রজতকান্তিও হয়তো মানুষকে ভয় পায়। তাই এ বাড়ির মেলা কাজের লোক। কিন্তু সবারই স্পষ্ট সীমারেখা আছে, তার বেশি কেউ এগিয়ে যেতে পারে না। সর্বক্ষণ এ-বাড়িতে কেউ থাকেও না।

বড় রাস্তা পেরিয়ে গাড়িটা তাদের বাড়ির ছোট রাস্তায় ঢুকলে সে নীচে নামে। গাড়িটা বাড়ির সামনে এসে নিশ্চুপে দাঁড়ায়। গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হলে কেউ একজন গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। সে এসে বারান্দার দিকে তাকায়। বারান্দার অন্ধকার ঠেলে তখন নন্দিতা ওঠে। দোতলা থেকে একতলায় নেমে আসে। এসব দিনে ভেতরকার খানচারেক কোলাপসিবল গেট, কাঠের দরজা আগেভাগেই খোলা থাকে। ওই যে রজতের ফোন এসেছিল, ওই ফোন এইসব দরজাগুলো খোলার জন্যে। বাকি আছে শুধু মেন গেটটা খোলা। নন্দিতা এসে মেন গেটটা খুলে দেয়। মেন গেট খুলে একটু ভেতরদিকে এসে দাঁড়ায়। অপেক্ষা করে।

নন্দিতা নেমে গেট খুললেই ওরা বুঝে যায় লাইন ক্লিয়ার। কনসাইনমেন্ট ডেলিভারি করতে হবে। এবার ওরা খুব দ্রুত কনসাইনমেন্ট নামাবে। সাধারণত কাঠের বাক্স। নীচে রাবারের নরম চাকা থাকে। ধারে ধরার জায়গা। যাতে কোনওরকম টানা-হেঁচড়া না করতে হয়। মসৃণ গতিতে শব্দহীন গড়িয়ে, নয় ভার বহন করে তুলে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়া।

নন্দিতা এবার বাড়ির ভেতরকার পথ দেখাবে। একতলা থেকে তিন, সাড়ে তিনতলা। চিলেকোঠা। এ-বাড়িতে ছোট-বড় অজস্র ঘর। সেইসঙ্গে গলিপথের মতো করিডর। নন্দিতা জানে কোন ঘরে যেতে হবে। এটা রজত আগের দিন বা সকালেই বলে দেয়। সেদিন সে ঘরটা পরিষ্কার করে রাখতে হয়। সেখানেই আগত অতিথি ঢোকে।

এখন নন্দিতা না বললেও বুঝতে পারে কীরকম মাল আসছে। কত দামি, কত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত রজত যখন শহরে থাকে তখন এসব দামি জিনিস আসে না। রজত যখন বাইরে থাকে তখনই এসব জিনিস আসে। হয়তো রজত এগুলো নানা দেশে ঘুরে ঘুরে কেনে, তারপর সেটা বাড়িতে পাঠায়। এটা একটা স্টেশন। এখানে যেন ক'দিন গাড়ি থামে। রেস্ট নেয়, তারপর আবার চলতে শুরু করে।

আবার কোনও কোনও সময় রজত বাইরে যায়, দশ দিন, বিশ দিন, তিরিশ দিন। অথচ কোনও কনসাইনমেন্ট আসে না। শুধু ফেরার সময় গয়না আসে।

তখন নন্দিতা বোঝে এবার কনসাইনমেন্ট পার্টির কাছে সরাসরি ডেলিভারি করা হয়েছে। আর কোনও সময় একদম খালি হাতে। নন্দিতা বুঝতে পারে 'কাজ' হয়নি। কাজ তো সোজা নয়।

অনেক সময় ভালো কিছুর খবর পেলে রজত হুট বলতেই চলে যায়। রজত গিয়ে জিনিসটা দেখেশুনে কেনে। তারপর কনসাইনমেন্ট পাঠায় বাড়িতে। সে জিনিসের হয়তো অর্ডার নেই। জিনিসটা বাড়ি আসার পর রজতের কাস্টমার খোঁজা শুরু হয়। মাঝে জিনিসটা আধ মাস, এক মাসও থাকতে পারে। আবার কোনও কিছু অর্ডার হয়েছে, কিন্তু কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছে না। সে-ও এক সমস্যা, রজত পাগলের মতো সারা দিন ল্যাপটপে। ফোনে।

যারা অর্ডার দেয়, তাদের কতদিন অপেক্ষা করতে হবে কেউ বলতে পারে না। সময়-সুযোগমতো জিনিসটা আগে রজতের হাতে আসে। রজত সেটা নিয়ে জেনে বুঝে ডেলিভারি দেয়। ভুল জিনিস চলে গেলে ভারী সমস্যা। বিশ্বাস ভঙ্গের ব্যাপার আছে। বিশ্বাসটা এ লাইনের সবচেয়ে বড় কথা। বিশ্বাস ভঙ্গ হলে এ লাইনে শুধু টাকাপয়সা দিয়ে খেসারত নয়, অনেক সময় প্রাণ দিয়েও মেটাতে হয়।

এখন রজত কোন দেশে আছে নন্দিতা জানে না। রজত তাকে বলে যায় না। শুধু বলেছে, 'জরুরি কাজ আছে।' কাজ সেরে সে যখন ফোন করে, তখনই নন্দিতার কাজ শুরু হয়।

কাল রজত ফোন করেছিল। বলেছিল, 'কনসাইনমেন্ট বুক করা হয়েছে। কাল রাতে চলে যাবে। ওটা থাকবে সাড়ে তেরো নম্বর ঘরে।'

'সাড়ে তেরো নম্বর ঘর' বলে রজত একটু থেমেছিল। থামার কারণ কিছু না, এই ঘর এ-বাড়ির সবচেয়ে গোপন ঘর, সেই ঘরে কনসাইনমেন্ট পাঠানো মানে রিসিভার প্রচণ্ড সতর্ক হবে। গোপনীয়তা রক্ষা করার সবরকম ব্যবস্থা করবে।

সাড়ে তেরো নম্বর ঘর শুনে নন্দিতার বুকের ভেতর কেঁপে উঠেছিল। সাড়ে তেরো নম্বর ঘরে সচরাচর কিছু ঢোকে না। যা ঢোকে—সেটা নিশ্চয়ই হয় দুর্মূল্য, চোর বা ওই জাতীয় কারও কাছ থেকে লুকোনোর জন্যে এই ঘর বেছে নেওয়া হয়। নাহলে চরম নিষিদ্ধ, পুলিশ বা যে-কারও চোখ এড়াতে এটি এখানে রাখা হয়। নাহলে হিংস্র! যে-কোনও সময় ওদিক থেকে আক্রমণ আসতে পারে। তাই বিপদ থেকে বাঁচতে তার জন্যে বাড়ির সবচেয়ে গোপন আর সুরক্ষিত ঘর।

এ ঘরে যেতে গেলে প্রথমে প্রায় তিনতলার কাছাকাছি উঠে যেতে হয়। তিনতলায় গিয়ে একটু হেঁটে চারটে সিঁড়ি নীচে নামতে হয়। আরও একটু হেঁটে একটা ঘরের ভেতর ঢুকে অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে দুটো সিঁড়ি উঠে ছ'টা সিঁড়ি নামতে হয়। এবার একটা ঘরের ভেতর গিয়ে ছ'টা সিঁড়ি নেমে লম্বা করিডর দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। তারপর আবার ঘর। আবার দুটো সিঁড়ি নামা।

সাড়ে তেরো নম্বর যেতে হলে এভাবেই যেতে হবে। যে এখানে রাতের অন্ধকারে যাবে সে কিছুতেই হিসেব করতে পারবে না, কোন তলায় আছে, কোন দিকের ঘর। করিডর আর ঘরের মিশেলে এ ঘর বেশ জটিল হয়ে যায় তার কাছে।

অবশ্য এ ঘরের যাওয়ার সোজা একটা পথ আছে, সে ঠিক দোতলার পরেই। পর পর একটা বড় ঘরের ভেতর দিয়ে গিয়ে একটা ছোট ঘর। সেই ঘরের ভেতর দিয়ে গিয়ে লাগায়ো বাথরুম। বাথরুমের দরজা খুললে, দেওয়ালের ওপর লম্বা একটা আয়না। আয়নার নীচে ড্রয়ার। আয়নাটা একটা লোহার দরজার সঙ্গে সেট করা। ড্রয়ারটা ঠেলে দিলে ওই ঘরের ভেতর অনেকটা চলে যায়। আয়নার পাশে ছোট একটা ফুটে আছে। চাবির। আয়নাটা যে একটা দরজা, তা এ-বাড়ির তিনজন মানুষ জানে। রজতকান্তি, বিনয়কান্তি আর নন্দিতা।

রজত যখন থাকে তখন দিনেরবেলায় পাখি আসে। নানা রকম পাখি। বদ্রী, ফ্রিঞ্চ, লাভ বার্ড, ককাটেল, হলুদ-নীল-সাদা-ধূসর-রামধনু রঙের টিয়া, ম্যাকাও, কাকাতুয়া। রজতের কাছে বিদেশি পাখি বিক্রি করার লাইসেন্স আছে। রজত দেশি পাখি বিক্রি করে না। বেআইনি। তবু নন্দিতা জানে, বোঝে সব কিছু আইন মেনে রজত বিক্রি করে না। করলে অনেক কিছুতেই এত লুকোছাপা করত না।

এ-বাড়িতে তাহলে আড়াই নম্বর ঘর, সাড়ে তেরো নম্বর ঘর থাকত না। রাতের বেলা লুকিয়ে গাড়ি আসত না। বাইরে থেকে রজতের পাঠানো কনসাইনমেন্ট নিয়েও নন্দিতা এত উতলা হয়ে থাকত না। এসব দিনে রজতও দূরে বসে মারাত্মক টেনশনে থাকে, নন্দিতা জানে। কেন না এসব সময়ের ফোনে রজতের গলা ভীষণ ভারী ভারী শোনায়। থেমে থেমে, কেটে কেটে কথা বলে। এভাবেই বলে যাতে রজতের বলা কথাগুলো নন্দিতা একবারেই বুঝে নেবে। দ্বিতীয়বার বলার বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না।

নন্দিতাও এ-বাড়ির নিঃস্তব্ধতা, রাতের নীরবতা থেকে ধীর-স্থির হয়ে কথাগুলো শোনে। নন্দিতা ভালোবাসে রজতকে। খুব ভালোবাসে। রজত পশুপাখিদের কী অসম্ভব ভালোবাসে! কত কত খুঁটিনাটি জানে। একজন ভেটেরিনারি ডাক্তারও এত জানে না। ওদের অসুস্থতা সম্পর্কে কী কুইক ডিসিশন নেয়। শুধু বিক্রি নয়, রজত বাড়ি থাকলে প্রতি মুহূর্তে ইন্টারনেটে এইসব জীবজন্তুর লাইফস্টাইল, বিহেভিয়ার, ট্রিটমেন্ট নিয়ে পড়ে থাকে। রাস্তার কুকুরকেও রজত এড়িয়ে যায় না। এ-বাড়ির রান্নার লোককে প্রতিদিন এক কিলো চালের ভাত করতে হয়। তাতে পাঁচশো গ্রাম চিকেনকিমা আর ওষুধ মেশাতে হয়, রাস্তার কুকুরের জন্য। বাড়ির ছাতে কাক-পাখির জন্য জল রাখা থাকে। দানা খাবারও দেয়। সকালবেলা এ-বাড়ির ছাতে পাখিরা আসে নিয়ম করে। এসব ব্যবস্থা রজত করেছে, ত্রুটি নেই তাতে।

একটা ত্রুটি আছে রজতের সেটা নন্দিতা জানে। রজত খবরটা জানতে পেরে লুকোয়নি নন্দিতার কাছে। পরিষ্কার রিপোর্টটা তুলে দিয়েছিল ওর হাতে। নন্দিতা মেনে নিয়েছে ব্যাপারটা। রজত বাবা হতে পারবে না কোনওদিন। ওর শারীরিক যা ত্রুটি আছে তা সারবে না। নন্দিতা তাই চারদিকের কোলাহল থামিয়ে নিজে ভেতর ভেতর শান্ত হয়ে গেছে।

একটা স্করপিও এসে দাঁড়াল। গাড়িটা থামল আর রজতকান্তির ফোন এল—'কী হল এসেছে?'

'হ্যাঁ, আমি সিঁড়ি দিয়ে নামছি।'

'সাড়ে তেরো নম্বর ঘর। ঘরে বেশি করে ফল রেখেছ তো? আপেল, ন্যাসপাতি, কলা। ঘরের চৌবাচ্চা প্রপার ক্লিনিং করেছ? ওখানে মিনারেল ওয়াটার ছাড়া কোনও জল দেবে না। ঘুমের ওষুধ জলে দিয়েছ? সব ওকে—?'

নন্দিতা একবারও হ্যাঁ বলেনি।

রজত জানে নন্দিতা এগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। কোনও ভুল হবে না।

নন্দিতা আরও জানে, ওই ঘরের মেঝে থেকে বয়ে যাওয়া জলের লাইন আছে। সেই কল খুলে দিলে প্রবল জলধারায় রোজ সকালে বিকেলে আগত অথিতির মলমূত্র পরিষ্কার হয়ে যাবে।

রজত বলল, 'ওকে, গুড নাইট। ওরা গেলে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ো। গল্পের বই নিয়ে রাত জেগো না। কোনও প্রয়োজন হলেই ফোন করবে। ফোন খোলা থাকল।'

নন্দিতা মেন গেট খুলল।

একজন চাপা গলায় বলল, 'আপনি আগে চলুন—আমরা পিছনে যাচ্ছি।'

নন্দিতা এক ঝলক দেখল—চওড়ায় দেড়-দু'ফুট, লম্বায় পাঁচ-ছ'ফুট একটা কফিন বাক্স।

ওরা দুজনে বক্সের মাথার দিকের হ্যান্ডেল ধরে গাড়ি থেকে অনায়াসে বের করে ফেলল। 'নিন ম্যাম আপনি আগে চলুন।'

মেন গেট পেরিয়ে আগে নন্দিতা পিছনে কফিন বহন করে ওরা হাঁটে। তিনজনের মুখেই কোনও কথা নেই। এসময় বাড়ির আলো জ্বালানো হয় না। সবকিছুর জন্যে টর্চের আলো ভরসা।

নন্দিতা বলল, 'আস্তে, সিঁড়ি আছে।'

ওরা এতক্ষণে তিনতলায় উঠে এসেছে। এখন শুনল সিঁড়ি আছে। ওদের ভাবার অবকাশ না দিয়ে সে বলল, 'সিঁড়ি—ডাউনে।'

এতখানি উঠে আসার পর ওরা নীচের দিকে চারটে সিঁড়ি নামল। আবার একটুখানি হেঁটে দুটো সিঁড়ি উঠে ছ'টা সিঁড়ি নামল। নন্দিতা এবার একটা ঘরের ভেতর ঢুকল। করিডর থেকে বাক্সটা ঘরে ঢোকাতে বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। নন্দিতা বেশ সামনে এগিয়ে গেল আলো নিয়ে। খুব কায়দা করে ওরা প্রায় দাঁড় করিয়ে বাক্সটা ঘোরালো। বলল, 'আর কত ভেতরে?'

'এই তো এসে গেছে, আর একটু।'

'যা ভারী না মালটা!'

বাক্সটা ঘর থেকে করিডরে বের করতে আবার একটু অসুবিধে হচ্ছিল। নন্দিতা এগিয়ে যাওয়ার আগেই ওরা বের করে ফেলল, সেইসঙ্গে নন্দিতা অনুভব করল, একটা হাত আলতো করে ওর পাছায় ঘষে গেল। সতর্ক নন্দিতা দু'স্টেপ দ্রুত এগিয়ে এল। আরও একটু হেঁটে, আবার দুটো সিঁড়ি ডাউন। তারপর বলল, 'এই ঘর?'

ঘরের ভেতর হালকা আলো। মৃদু এসি চলছে। রজত যেমন বলেছিল।

'আপনি বেরিয়ে আসুন। আর একটা আলো জ্বালানো যাবে?'

'এখানে আলাদা কোনও আলো নেই। জিরো পাওয়ার।'

'ঠিক আছে।' নন্দিতা বেরিয়ে এল। আসার ঠিক আগের মুহূর্তে আবার সেই হাতটা ওর পিঠে আলতো ছুঁয়ে গেল।

নন্দিতা পিঠ বেঁকিয়ে বেরিয়ে এল।

ওরা দ্রুত হাতে বাক্স খুলছে। নন্দিতা বেশ কিছুটা সরে এসে দাঁড়াল। মিনিট পাঁচ-সাতেকের ব্যাপার। একজন এসে সামনে দাঁড়াল, বলল, 'হয়ে গেছে ম্যাম। বাক্সটা বাইরের ঘরে রেখেছি। রিলিজের সময় বাক্সটা লাগবে। মালটা ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছি। সাড় নেই, ঘুমাচ্ছে।'

'দরজা ঠিক করে লক করেছেন?'

'হ্যাঁ। বন্ধ করেছি। আপনি একবার চেক করে নিন।'

নন্দিতা এগিয়ে গেল। দরজাটা দেখল। বাইরে থেকে লক করা। এর পরেও আর একটা দরজা লকিং হবে। সেটা নন্দিতা করবে। আগে ওদের বের করে দিতে হবে। সে বলল, 'চলুন।'

আবার পুরোটা বাড়ি ঘুরিয়ে ওদের গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে সে একটা একটা করে দরজা বন্ধ শুরু করল। শেষ যেখানে এসে সে দাঁড়াল সেই দরজার ওপারে এ-বাড়িতে ঢুকেছে নতুন কনসাইনমেন্ট। নন্দিতা জানে না সেটা কোন প্রাণী। সে কি হিংস্র? এই দরজা খোলা পেলেই দাঁত-নখ নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে? নাকি সে ভীত? প্রচণ্ড ভয়ে, আতঙ্কে সে আধো আলোর ঠান্ডা ঘরের এক কোণে সিঁটিয়ে বসে আছে? সে কি ডিম ফেটে বেরিয়েছে, নাকি মায়ের পেট মাটি ছুঁয়েছে? তার বয়েস কত, কত দিন সে মায়ের দুধ ছেড়েছে? তার দেশ কোথায়?

নন্দিতা শুধু জানে যে এ-বাড়িতে এসেছে সে খুব দামি। সে মাংসাশী নয়। সে ফল খায়। সে এখন কদিন এ-বাড়িতে থাকবে। তাকে রুটিন মেনে ফল দিতে হবে। মিনারেল ওয়াটারে ভরতি করে দিতে হবে তার ঘরের চৌবাচ্চা। সেই জলে লিটার পিছু মাপমতো ঘুমের ওষুধ দিতে হবে। সে ফল খাবে, জল খাবে, আর ঘুমাবে। ডাকবে না, চিৎকার করবে না, ঝটপট করবে না, আঁচড়াবে না, লোহার গরাদ কামড়ে নিজে ক্ষতবিক্ষত হবে না। সে আপাতত শুধু ঘুমাবে এই ঘরের ভেতর।

নন্দিতা জানে।

রজত ফেরার আগেই আবার কোনওদিন সকালবেলা ফোন করবে। জানাবে, আজ রাতে সাড়ে তেরো নম্বর ঘরের কনসাইনমেন্টটা রিলিজ হয়ে যাবে। ওরা আসবে রাত দশটা-এগারোটা নাগাদ।

ওরা আবার আসবে। তখন ওদের হাতে থাকবে ঘুমপাড়ানি রিভলভার। প্রাণীটাকে ঘুম পাড়িয়ে কফিনবন্দি করে নিয়ে চলে যাবে অন্য কোথাও।

নন্দিতা ওই ঘরের ভেতর ঢুকবে। আলো জ্বালাবে। দেখবে ওর খাওয়া, না-খাওয়া ফল পড়ে আছে। ওর হেঁটে চলে বেড়ানোর দাগ আছে। ওর ওষুধ-জর্জরিত ঘুমের চিহ্ন ঘরে ছড়ানো। দেওয়ালে লোম। থোকা থোকা লোম পড়ে।

নন্দিতা ঘরে এল। দোতলার আর-এক কোণে, তার ঘর থেকে গোনা চারটে ঘর পরে বিনয়কান্তির কাশির শব্দ শুনল। বিনয়কান্তি বাথরুমে গেল। ছরছর জলের শব্দ। বিনয়কান্তিও জেগে। নিশ্চয় ওঁর কাছেও ছেলের ফোন এসেছে। তিনিও জানেন আজ এ-বাড়িতে নতুন অতিথি এসেছে। কিন্তু অতিথি কে—বিনয়কান্তি কি জানেন?

নন্দিতা জানে না, জানতে চায় না। সে শুধু জানে আজকের রাতের অতিথির নিশ্চয় ঘুমপাড়ানি ওষুধের ঘোর এখনও কাটেনি। সে ঘুমাচ্ছে। নন্দিতা আজ জাগবে, সারা রাত গান শুনবে। বই পড়বে।

সারারাত বই পড়তে পড়তে শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল নন্দিতা। তবু যখন ঘুম ভাঙল তখন ঠিক সাড়ে চারটে। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা প্রতিদিন তার এই সময় ঘুম ভাঙে। ঘুম ভাঙার জন্যে কোনও অ্যালার্ম দিতে হয় না। ঘুম ভেঙে নন্দিতা দেখল বিছানার পাশে টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। বুকের ওপর বইটা আধ বন্ধ হয়ে পড়ে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল সে? কতক্ষণ?

টেবিল ল্যাম্প নিভিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে থাকল নন্দিতা। যেন নড়াচড়াও করবে না সে। এত ভোরে চারদিক নিঃস্তব্ধ, এসময় কান পাতলেই শিশির পড়ার শব্দ, গাছের পাতা খসার আওয়াজ পাওয়া যায়। এমনকী কখনও কখনও নন্দিতার মনে হয় রাতের আকাশ চিরে আলো নেমে আসারও শিরশির ঝিরঝির শব্দ বাতাসে মিশে থাকে।

খুব ক্লান্ত নন্দিতা। বিছানা ছেড়ে ওঠার কথা ভাবল। ঘুম ভাঙলেই সে দ্রুত উঠে পড়ে। কিন্তু এখন উঠল না, আর একটু শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। খোলা জানলা দিয়ে রাত ধোয়া ফিকে আলো ঢুকছে ঘরে। এখনও তার পাখির ঘরে দিন শুরুর কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে না। গত কালের রাত যেন তার শরীরের সঙ্গে ক্লান্তি হয়ে লেগে। কত রাতে গেল ওরা—তখন কি ঘড়ি দেখেছিল নন্দিতা? না, সে ঘড়ি দেখেনি। কত রাতেই বা এসেছিল ওরা? সে তো এগারোটা নাগাদ রজতের ফোন আসার পর বারান্দায় গিয়ে বসেছিল। কতক্ষণ বসেছিল? কখন এল ওরা?

ওদের কথা মনে হতেই নন্দিতার গা ঘিনঘিন করে উঠল। কাল রাতে ওদের একজন অন্ধকারের সুযোগে ওকে ছুঁয়ে গেল। সে যতটা পেরেছিল সরে এসেছিল কিন্তু তার হাতটা যখন নন্দিতার গায়ে ঠেকল, একবার নয়, দু'দুবার। তখন এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল তার। মনে হয়েছিল মানুষ নয়, লোমশ কোনও পশু নয়, হাতটা যেন কঙ্কালের—তাকে স্পর্শ করে গেল।

ওরা কাল কী আনল কফিনবন্দি করে? যা এনেছে তা পাখি নয় সে জানে, তাহলে কোনও পশু! নিষিদ্ধ কোনও পশু।

যে-ই আসুক সে এ-বাড়িতে অতিথি। নন্দিতার দায়িত্ব তাকে দেখভাল করা, তার পছন্দমতো খাবার দেওয়া। একটা রাত তার এ-বাড়িতে কাটানো হয়ে গেল।

নন্দিতা চোখ বন্ধ করে ভাবে তাকে কি সুপ্রভাত জানানো উচিত!

অচেনা অজানা কোনও জীব যখন ঢোকে এ-বাড়িতে তখন তাকে দেখার, তার সম্পর্কে সব কথা শোনার জন্যে নন্দিতার বুকের ভেতর কুরে কুরে খায়। তাকে নিয়ে এ-ক'টা দিন তার মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন। রজত সব কিছু বলে কিন্তু অতিথি কে সেটুকু কখনও বলে না। নন্দিতা বোঝে, কোনও জীব, কোনও প্রাণী—এর বেশি কিছু না।

তার প্রশ্ন করার অধিকার নেই।

প্রশ্ন কেন, এটাকে যে জানতে চাওয়া বলে রজত বোঝে না। যাকে আড়াল থেকে সে দেখভাল করছে, রুটিন মেনে পরিচর্যা করছে, খাবার জল দিচ্ছে—সে কে, নন্দিতা জানবে না স্পষ্ট করে। তাকে বুঝে নিতে হবে। তাকে দেওয়া খাবার দেখে, কখনও কখনও তার ডাক শুনে। তার কান্না শুনে। তারপরেও যদি সে প্রশ্ন করে রজত পালটা বলবে—কেন? কী দরকার? তোমাকে যেটুকু বলছি সেটুকু করো।

রজতের গলা প্রচণ্ড ভারী। এসময় আরও ভারী হয়। গলায় একটু জোর দিলেই গম গম করে। অনেকবার নন্দিতা দেখেছে রজত গলা তুলে তাকে ডাকলে খাঁচার পাখিরা ঝটপট করে। কখনও যদি রজত পাখির ঘর ঠিকমতো পরিষ্কার হয়নি দেখে কাজের ছেলেগুলোকে বকাবকি করে তখনও নন্দিতা দেখেছে খাঁচার সব পাখি তালগোল পাকিয়ে এক কোণে।

রজতের গলার ভারী আওয়াজ শুনলে নন্দিতারও চারদিক কেমন অস্পষ্ট হয়ে যায়। সে অস্পষ্টতা কিছুতেই সে কাটাতে পারে না। পাখিদের মতো নন্দিতাও রজতের গলার আওয়াজে ভেতর ভেতর তালগোল পাকিয়ে যায়। হৃদয়ের এককোণে গুটিশুটি মেরে পড়ে থাকে।

ইদানীং সে আর ওই ভাব কাটানোর চেষ্টাও করে না। দম দেওয়া পুতুলের মতো রজত যা বলে সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। যাকে বলে হুকুম পালন করা।

চোখ বন্ধ করে নন্দিতা ভাবল, কোনও বুনো আজ এক রাত তার গৃহে অতিথি হয়ে কাটাল। তার ঠিকানা এখন এ-বাড়ির সবচেয়ে গোপন সাড়ে তেরো নম্বর ঘরে। এ-ঘরের কথা কেউ জানে না। এই সাড়ে তেরো নম্বর ঘর, আড়াই নম্বর ঘরগুলো লুকিয়ে রাখার জন্যে এ-বাড়ির এত গোপনীয়তা।

এই গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্যে এ-বাড়িতে সারাদিন অনেক কাজের লোক থাকলেও সর্বক্ষণের কোনও কাজের লোক নেই। আর যারাই এই বাড়িতে ঢোকে তাদের গতিবিধি নির্দিষ্ট।

যেমন রবিবারের গ্রিল মোছার লোক যা কাজ করে তা বাড়ির বাইরে থেকে। শুধু একবার সিঁড়ির রেলিং মুছতে মুছতে ছাদে যায়। আর নেমে আসে। যে মালি আসে রবিবার, সে কোনওদিন ঘরের ভেতর ঢোকেনি। নীচের বাগান, ছাদের বাগান। এরা দুজন ছাড়া আছে আরও তিনজন গৃহস্থালীর কাজের লোক। তাদের মধ্যে একজন শ্যামলী। সে এ-পরিবারের ব্যবসা সম্পর্কে অনেক খোঁজখবর রাখে, হয়তো নন্দিতার থেকেও বেশি জানে। কিন্তু এ-ঘরের কথা সে জানে না। সে রোজ এসে একতলায় বিনয়কান্তিকে দেখাশোনা করে। রাত আটটায় বিনয়কান্তি দোতলায় উঠে যান। সে দোতলায় আসে কিছুক্ষণের জন্যে। বিনয়কান্তিকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে, ঘুম পাড়িয়ে চলে যায়। খুব বেশি হলে আধ ঘণ্টা সে দোতলায় থাকে। তার স্বামী মনোজও জানে না। আর একজন কাজের লোক কৃষ্ণামাসি। দু'বেলা এসে রান্না করে চলে যায়। সে দোতলায় ওঠে না। সকালের দিকে আর একজন আসে। সে ঘর মোছে, বাসন মাজে। তার কাজ একতলা আর দোতলায়।

এ-বাড়ির যে ড্রাইভার, সে রজত না থাকলে বাড়িমুখো হয় না। তবে ফোন করলেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে চলে আসবে। আরও দুজন ছেলে রোজ আসে। লালা ও পিন্টু। তাদের কাজ ভিন্ন। তারা এ-বাড়ির তিনতলা জোড়া যে নানা ধরনের পাখির ঘর আছে, সেগুলো পরিষ্কার করে। খাবার দেয়। জল, ওষুধ দেয়। হাঁড়ি বাঁধে। ডিম দেখে। পাখির বাচ্চা হলে তাদের দেখভাল করে। কুকুর বা খরগোশের বাচ্চা এলেও এরা দেখে। এরা ইঞ্জেকশন দিতে পারে। এরাই প্রয়োজনে ডাক্তার ডেকে আনে। এরা দোতলায় ঢোকে না। বন্ধ কোলাপসিবলের বাইরে থেকে চাবি নিয়ে, সোজা ওপরে চলে যায়। যাওয়ার সময় চাবি জমা দেয়।

এ-বাড়ির এতগুলো লোকের দৃষ্টির আড়ালে সাড়ে তেরো নম্বর ঘর। সে ঘরে আজ অতিথি আছে। আচ্ছা, সে যদি ঘুমের ওষুধের ঘোর কাটিয়ে ডেকে ওঠে? স্বপ্নের ভেতর কথা বলে? তার স্মৃতিতে যদি জেগে ওঠে দেশ গ্রাম, জঙ্গল নদী, আরও আরও দূরবর্তী কোনও ঝরনার ধ্বনি? সে যদি ডাক দেয় স্মৃতিকে! তখন তার ডাক শুনলে নন্দিতা হয়তো অনুমান করতে পারবে কে এসেছে? কিন্তু তার দেশ ছাড়া, স্বজন ছাড়ার কষ্ট, বন্দি জীবনের ছোট খাঁচার ভেতর ছটফটানির আর্তস্বর কি নন্দিতা চিনবে?

নন্দিতা বোঝে কোন সুদূর থেকে পাড়ি দিতে দিতে এরা অনেক সময় শুধু প্রাণ হয়ে বেঁচে থাকে। বন্য জীবনের এক প্রান্ত থেকে খাঁচাবন্দি জীবনের এই যাত্রাপথ বড় কঠিন। বড় কষ্টের। এসময় তাদের গলার আওয়াজ থাকে না। ঘুমের ওষুধের আচ্ছন্নভাব, চারদিক ঢেকে দেওয়া অন্ধকারে তারা নিজেদের মৃত ভাবে। মৃতের মতোই পড়ে থাকে। তাদের যে গলার আওয়াজ আছে তা যেন তারা ভুলে যায়। গলার আওয়াজের জন্যে কথা বলার সঙ্গী চাই। একা একা তো খাঁচার ভেতর চিৎকার করা যায় না। জ্ঞান থাকলে বড়জোর অন্ধকার আর চারদিকের কঠিনকে দাঁত-নখ বসিয়ে দেওয়া যায়।

নন্দিতা একবার এমন এক অতিথির পরিচর্যার পর রজতকে আতঙ্কগ্রস্ত গলায় বলেছিল, 'ও ডাকছে না কেন?'

কে ডাকছে না সেটা সেদিনও নন্দিতা জানত না।

রজতকান্তির ভারী গলায় হালকা চালে বলেছিল, 'ওর এখন পৈতে হচ্ছে। উপনয়ন। সাধারণ জীবন থেকে ব্রাহ্মণ জীবন। দ্বিজ। পৈতের সময় কি কথা বলতে আছে, না কারও মুখ দেখতে আছে? ওর পৈতে সম্পন্ন হোক, তখন খাঁচায় থাকবে, কত লোক দেখবে, ও কত কথা বলবে। তুমি ওকে নিয়ে ভেবো না।'

নন্দিতাও এক-একদিন, সারাদিন কথা না বলে থাকে। তারপর হঠাৎ কোনও সময় কথা বলতে গিয়ে দেখে তার গলার স্বর রুদ্ধ। কতগুলো অস্ফুট আওয়াজ ছাড়া গলা দিয়ে কিছু বেরুচ্ছে না, অথচ কত কথা তার বলার আছে। তখন তার নিজের গলার অস্ফুট আওয়াজকে কোনও নাম না-জানা পশুর ডাকের মতো মনে হয়।

বিছানায় কিছুক্ষণ নিশ্চুপে শুয়ে থেকে নন্দিতা ওঠে। দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। ভোরের কালোতে এখন আলোর ছিটছিট দাগ! এসময় চারদিকটা স্পটহেডেড শালিখ পাখির মতো মনে হয়। আর একটু পরে দিন যখন ধূসর হয়ে ডানা মেলবে তখন নন্দিতার দু'চোখ জুড়িয়ে আসে। চারদিক ভরে যায় পাখির কলকাকলিতে।

নন্দিতা ফুলশয্যার রাতে রজতের কাছে ঝরনার ধারে পাখির আওয়াজ শুনতে চেয়েছিল। রজত হেসেছিল, 'কত পাখি নেবে তুমি? কী পাখি চাও বলো? কাকাতুয়া এ-বাড়িতেই আছে, ম্যাকাও আছে। ময়নাও আছে বেশ কিছু। আর যা যা মনে হবে বলো।'

নন্দিতা বলতে পারেনি—ঝরনা! ঝরনা পাব কোথায়? আমি যে ঝরনার ধারে মুক্ত পাখির ডাক শুনতে চাই। নদীর চরায় পাখির মেলায়...।

রজত বলেছিল, 'তবে একটা কথা মনে রাখবে, বাবার ওই কাকাতুয়াটা ছাড়া সবাই এ-বাড়ির অতিথি। অতিথির জন্যে যেমন মায়া টান থাকা উচিত, তার বেশি টান বাড়াবে না। তাহলে কষ্ট পাবে। ওরা আসবে, যাবে। মাঝে ক'দিন তোমার সঙ্গে থাকবে। মায়া বাড়াবে না।'

নন্দিতা মায়া বাড়ায় না। ওরা আসে যায়, আসে যায়। বর্ষে বর্ষে দলে দলে...।

ভোর পাঁচটার সময় নন্দিতা দোতলা থেকে তিনতলার ঘরে আসবে। তিনতলা জুড়ে এ-বাড়ির পক্ষী আবাস। লম্বা টানা বারান্দার পাশে পর পর কয়েকটা ঘর। কিন্তু মাঝের ঘরগুলো জুড়ে পাখির খাঁচা। ঘরের ভেতর বিশাল খাঁচায় বদ্রী। অস্ট্রেলিয়ার পাখি। প্রচুর জন্মায়। মাঝে মাঝে খাঁচাবন্দি হয়ে বাংলাদেশে চলে যায়। তার পাশের খাঁচায় ফ্রিঞ্চ। অস্ট্রেলিয়ার পাখি কিন্তু নিয়ে এসেছিল ব্রিটিশরা। তার পাশে লাভ বার্ড। তার পাশে ককাটেল। অনেকেই এদের কাকাতুয়া ভাবে। পাশের ঘরের অর্ধেক জুড়ে নানা রঙের টিয়া পাখি। তার পাশের ঘরটা দামি পাখিদের জন্যে, এখানে খাঁচায় আছে ম্যাকাও। তাদের অনেক যত্ন। তাদের জন্যে অনেক আয়োজন। ঠিক তার পাশের ঘরে থাকে কাকাতুয়া। এই সব কিছু মিলিয়েই তিনতলার পক্ষী-আবাস—যা নন্দিতার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।

খুব ভোরে পাখিদের যখন ঘুম ভাঙে, বড় বড় জানলার গরাদ কেটে ভোরের আলো এসে যখন ঘরে ঢোকে, নন্দিতা তখন পক্ষীমাতা সেজে একটা ঘরে, এক-একটা খাঁচার ভেতর এসে ঢুকে পড়ে। তার গায়ে মাথায় বুকে মুখে পাখিরা দল বেঁধে এসে বসে। নন্দিতা ডানা মেলার মতো দু'হাত বাড়িয়ে দেয়, হাতের ডানায় পাখি বসে, নন্দিতা দু'চোখের পাতা উড়িয়ে দেয়, তার ভ্রু পল্লবে পাখিরা বসে। নন্দিতা পক্ষীমাতা সেজে সকালের প্রথম আলোকে আহ্বান জানায়।

এ-বাড়ির দোতলায় দুজন মানুষ থাকে। নন্দিতা আর তার শ্বশুর বিনয়কান্তি মজুমদার। রজতকান্তির বাবা। প্রায় পঁচাশি বছর বয়স। অন্ধ মানুষ। অ্যাক্সিডেন্টে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। উনি সকাল আটটায় নীচে একতলায় নেমে যান। সারাদিন ওইখানেই থাকেন। দেখাশোনা করে শ্যামলী। শ্যামলীর রাত সাড়ে আটটায় ছুটি। অন্য সময় বিনয়কান্তি দোতলায় একা ঘরেই থাকেন। ঘরের লাগোয়া বারান্দায় গিয়ে বসেন। বারান্দার পাশেই বাথরুম। ওর ঘরের ভেতর চলাফেরা করতে কোনও অসুবিধে হয় না। শ্যামলী এ-বাড়ির অনেক কথা জানে। হয়তো নন্দিতার থেকেও বেশি জানে। ওর মা এই বাড়িতে কাজ করতেন। ওর বাবা কাজ করতেন বিনয়কান্তির কাছে। এখন ওর স্বামী এখানে কাজ করে রজতকান্তির সঙ্গে। রজতকান্তিই শ্যামলীর বিয়ে দিয়েছে ওর খাস লোক মনোজের সঙ্গে। মনোজ খুব চালাক-চতুর ছেলে। শ্যামলীও কম যায় না। সে-ই সারাদিন বিনয়কান্তিকে দেখভাল করে। তার কাছে অনেক খবর থাকে। এ-বাড়ি নিয়ে বাইরের লোক, পাড়ার লোকের খুব কৌতূহল। অনেকে তো মনে করে এ-বাড়িতে বাঘ-ভালুকও ঢুকে বসে থাকে। অনেকে নাকি রাতে-বিরেতে বাঘের গর্জনও শুনেছে। কিন্তু কে শুনেছে তার নাম কেউ বলতে পারে না। আর সামনা-সামনি কেউ বলেও না। সব কথাই চাপা, কানাঘুষো। কিন্তু বিনয়কান্তি বা রজতকান্তির ব্যবহারে এ-পাড়ার বেশিরভাগ মানুষ মুগ্ধ। যে-কোনও বিপদে আপদে ওরা পাশে থাকে। সে পাড়ার পুজো থেকে কারও মেয়ের বিয়ে বা অসুস্থতা,—ওদের কাছে গেলে কেউ ফিরে আসে না। তবু কেউ যখন শ্যামলীকে একা পায় তখন ফিসফিস করে জিগ্যেস করে ওরা কি সত্যিই পাখি, খরগোশ, কুকুর বিক্রি করে, না কি ওদের তালিকায় বাঘ, সিংহও আছে?

ওদের কথায় শ্যামলী হাসে। বলে, 'বাঘ সিংহ পুষবে কে, যে ওরা বিক্রি করবে? ওদের কাছে সব পশুপাখির লাইসেন্স আছে। কিন্তু আমার স্বামীর কাছে শুনেছি খদ্দের নেই। আগে নাকি রাজারাজড়ারা এসব পুষত। সার্কাস পার্টি কিনত। এখন কেউ কেনে না। পাখি, কুকুর বিক্রি করেই সংসার চলে।'

তবু যখন মানুষ অন্য কথা বলে তখন শ্যামলী সেসব কথার ধার কাছে দিয়ে হাঁটে না। মানুষের কত কথা। আগে শুনত বাঘের ছাল দামি বস্তু, এখন শোনে হাড়!

শ্যামলী জানে তার মুখের কোনও অন্যরকম কথা মানেই এ-বাড়ির অমঙ্গল। আর এ-বাড়ির অমঙ্গল হলে তারাও ভালো থাকবে না। তার বরও জড়িয়ে যাবে। তাই এ-বাড়ির সবকিছু সে বড় গোপনে রাখে, বড় যত্নে রাখে। একটা কথাও তোলে না বাইরের লোকের কাছে। কী বলতে কী বলবে, কেমন গুজব ছড়াবে তার থেকে বোবা হয়ে থাকা ভালো।

রজতকান্তি এ-বাড়িতে মাসে দিন পনেরো করে থাকে। যখন থাকে তখন সে-ও নিয়মমাফিক দোতলার বাসিন্দা। তখন দোতলায় তিনজন। একতলায় বড় ঘর প্রায় ফাঁকা। সেখানে সোফা পাতা, কার্পেটে মোড়া। রজতকান্তি বাড়িতে থাকলে এখানেই মাঝে মাঝে পান ভোজনের আসর বসে। রজতকান্তি খুব দামি দামি বিদেশি স্কচ নিয়ে আসে। তখন এখানে রাজনৈতিক নেতা থেকে পুলিশ, কর্পোরেশনের বড় বড় অফিসার, ফরেস্টেরও মানুষজন আসে। অনেক রাত পর্যন্ত খাওয়াদাওয়া চলে। খাবার আসে হোটেল থেকে। নন্দিতা বোঝে এরাই রজতকান্তিকে আড়াল করে রাখে।

এদের সঙ্গে কখনও কখনও নিয়মমাফিক নন্দিতার আলাপ হয়েছে। বা এদের কারও বাড়ির অনুষ্ঠানেও রজতকান্তির সঙ্গে নন্দিতা গেছে। এসময় রজতকান্তিকে অন্য মানুষ মনে হয়। পাঁচ বছর আগেকার মানুষটার মতো। হাসিখুশি, কথা বলা। শাশুড়ির মৃত্যু, শ্বশুরের অ্যাক্সিডেন্টের পর এ-বাড়ির আবহাওয়াটাই কেমন যেন পালটে গেছে।

একতলার একদিকে গ্যারেজ। পর পর দুটো বড় গাড়ি। একটা ইনোভা, আর একটা বিএমডব্লু। পুরোনো গাড়ি, সেকেন্ড হ্যান্ড কেনা। বিদেশ থেকে আনানো। শ্যামলী মারফত মনোজের কাছ থেকে নন্দিতা জেনেছে—আসলে নতুনই গাড়ি, ট্যাক্স ফাঁকি দিতে পুরোনো দেখানো। গ্যারেজের সামনে আগে বাগান ছিল। তখন নন্দিতার শাশুড়ি বেঁচে। সে-বাগানে প্রচুর ফুল ফুটত। এখন বাগান আছে। নিয়ম করে মালিও আসে। কিন্তু তেমন যেন ফুলের বাহার খোলে না। পাঁচিলের ধারে ছোট নীচু নীচু চৌবাচ্চা। চৌবাচ্চাগুলো সাদা টাইলসে মোড়া। ওপরে মোটা লোহার রডের জালি ঢাকনা। এখন সেখানে তালা মারা নেই, খোলা। আগে এই চৌবাচ্চায় নানা প্রজাতির কচ্ছপ আসত। সেসব কচ্ছপ মানুষ বাড়িতে পুষত। রঙিন মাছের কারবারিরা এসে সে কচ্ছপ কিনে নিয়ে যেত। নিউ মার্কেটের সামনে হাতে হাতে বিক্রি হত। এখন কচ্ছপ নিয়ে ব্যাপক ধড়পাকড় হয়। কম দামি একটা জিনিসের জন্যে প্রচুর টেনশন। রজতকান্তিরা আর কচ্ছপ আনে না। যদিও আনে তা টাকাপয়সা ছাড়া বড় কোনও সরকারি অফিসারের ছেলেমেয়েদের গিফট দেওয়ার জন্যেই আনে।

এ-পাড়ার অনেকের বাড়িতেই রজতকান্তির দেওয়া বদ্রী পাখি আছে। কেউ কেউ দামি পাখিও সস্তায় কিনেছে। এসব বিক্রি করে মনোজ। মনোজ যখন থাকে তার সঙ্গেই এসব খুচরো পাখি বেচা-কেনা নিয়ে কথা বলতে হয়। রজতকান্তি এসবের মধ্যে ঢোকে না। তবে হ্যাঁ, রজতকান্তির কাছে ভালো জাতের কুকুরের খোঁজ থাকে। কুকুর কিনতে চাইলে রজতকান্তি তার সঙ্গে কথা বলে, তার কী পছন্দ, বাজেট কত ইত্যাদি ইত্যাদি জেনে নেয়। তারপর ফোন ফোনে কন্ট্রাক্ট করিয়ে দেয়। কিছু দিনের মধ্যে রজতকান্তি একটা 'পেট-মল' করতে চলেছে। এক ছাতের তলায় যে-কোনও পোষ্যর জন্যে সব কিছু পাওয়া যাবে। সেখানে ডাক্তারেরও ব্যবস্থা থাকবে। ইচ্ছে আছে একটা 'পেট ক্রেশ' করার। রজতকান্তিরও মাঝে মাঝে মনে হয় পারিবারিক এই ব্যবসা থেকে এবার সরে যেতে হবে। এতে আর কোনও মধু নেই। পুরোটাই ছিবড়ে হয়ে পড়ে আছে। এত আইনের চক্কর!

নন্দিতার সঙ্গে রজতকান্তি ব্যবসা সংক্রান্ত কোনও বিষয় নিয়ে কোনওদিন আলোচনা করেনি। এসব কথা নন্দিতা শুনেছে রজতকান্তির অন্যকে ফোনে বলা কথা থেকে। নন্দিতা শুনেছে আবার ভুলেও গেছে। এই তার স্বভাব। সে এ-বাড়ির পক্ষী আবাসের থেকে বেশি কিছু জানতে চায় না।

নন্দিতা বারান্দা থেকে তিনতলার সিঁড়িতে পা দেওয়ার আগে কী মনে হল থমকে দাঁড়াল। কাল রাতের অতিথির কথা আবার মনে পড়ল। ঠিক ভোর ছ'টার সময় রজতের ফোন আসবে। কতখানি খাবার দিতে হবে বলবে। যদি সেদ্ধ খাবার হয় তার মধ্যে কী ওষুধ দিতে হবে বলে দেবে। শুধু ফল হলে—কী কী দিতে হবে তা রজত বলবে। জলে কতখানি ওষুধ, তাও।

ফলওয়ালা আসে শ্যামলী আসার পরপরই। সাড়ে আটটা নাগাদ। তাকে মনোজ বলে দেয় কী কী দিতে হবে। সে এসে শ্যামলীকে সব বুঝিয়ে দিয়ে যায়। ওর সঙ্গে মাসকাবারি হিসেব হয়। শ্যামলী শুধু খাতা দেখে সই করে দেয়।

সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নন্দিতার মনে হল তার একবার ওই ঘরের সামনে দাঁড়ানো উচিত। সে না জানুক,—কে অতিথি, কী অতিথি, তবু তো তার অতিথি!

অতিথির ঘরের সামনে যাওয়ার জন্যে একটা বড় ঘরের ভেতর দিয়ে ছোট একটা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়তে হবে। সেই ঘরের লাগোয়া বাথরুমের দরজা বন্ধ করলেই সাড়ে তেরো নম্বর ঘরের দরজা দেখা যাবে। নন্দিতা সেই বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়াবে, বলবে—গুডমর্নিং। তারপর ফিরে আসবে পক্ষী আবাসে। পিন্টু আর লালা কাজ করতে আসা পর্যন্ত সে ওই ঘরের খুঁটিনাটি দেখে রাখবে। কিছু নিজের হাতে করবে, বাদবাকি ওরা এলে বলবে।

কিন্তু বন্ধ ঘরের সামনে এসে নন্দিতা গোঙানি শুনতে পেল। কেউ যেন ঘুমঘোরের ভেতর গোঙাচ্ছে!

নন্দিতা কান খাড়া করে শুনল। সে ঠিক শুনতে পাচ্ছে। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ, গোঙানির শব্দ! নন্দিতার ভেতর দম দম বাজে! নন্দিতা নিজেকে নিজেই বলে—শুনতে পাচ্ছ?

ঠিক ছ'টায় ফোন এল রজতকান্তির। ঠান্ডা, শীতল গলা। নিয়মাফিক কথা বলতে শুরু করল ও। 'কোনও প্রবলেম নেই তো—?'

একটু থামল রজত। ও জানে সমস্যা না থাকলে নন্দিতা কোনও উত্তর দেবে না, চুপ করে থাকবে। তাই একটু অপেক্ষা করে রজত বলল, 'বারোটা নাগাদ একবার ফ্লোরে জল ফ্লো করিয়ে দেবে।'

সাড়ে তেরো নম্বর ঘরের মেঝেতে চার-চারটে জলের কল বসানো আছে। প্রচণ্ড স্পিডে তা থেকে জল বের হয়। কলগুলো একবার খুলে দিলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে মেঝেতে যত ময়লা আছে তা জলের তোড়ে ঝাঁঝরি দিয়ে বেরিয়ে যায়। এই সিস্টেমে ঘর সাফ।

রজত বলল, 'ফলওয়ালাকে মনোজ বলে দিয়েছে। বেশি করে কলা আর দুটো আপেল দিয়ে যাবে। আপাতত এই ডায়েট, আর—।'

'আর' বলে রজতকান্তি অপেক্ষা করছে, নন্দিতা যদি কোনও কথা বলে। অপেক্ষা করল, বুঝতে চাইল নন্দিতা কী ভাবছে? না নন্দিতার ভাবনার কোনও তল পেল না। অগত্যা সে বলল, 'যখন খাবার দেবে—একটু বোঝার চেষ্টা করবে—ওর হুঁশ ফিরল কি না? হুঁশ ফিরলে বুঝতে পারবে। তিন ঘণ্টা পর যখন তুমি ফলের ট্রে টানবে তখনই বুঝতে পারবে, ও ফল নিয়ে খেয়েছে কি না?'

এই ঘরের দরজা, যেটা বাথরুমের আয়না দিয়ে আড়াল করা তার নীচের দিকে ড্রয়ার আছে। সেটা আসলে একটা ট্রে। সেটা টেনে তার মধ্যে খাবার দিলে পাশের ঘরের প্রাণীটি হাতের কাছে পেয়ে যাবে।

নন্দিতা বলল, 'কবে রিলিজ হবে?'

নন্দিতার কথা শুনে রজতের ভালো লাগল। বলল, 'হয়ে যাবে, হয়ে যাবে। দু-চারদিন, আজ-কালের মধ্যেই আমি বলে দেব।'

দুজনেই চুপ, রজত বলল, 'ওকে। আমি তাহলে রাখছি।' ফোন কেটে গেল।

নন্দিতা পায়ে পায়ে এসে দাঁড়াল ঘরটার সামনে। চারদিকে কোনও শব্দ নেই। কিন্তু একটু আগে যেন সে গোঙানির আওয়াজ শুনেছিল। অদ্ভুত একটা আওয়াজ! একটু থেমে থেমে। নন্দিতা ওখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। নাক টানল। বুনো গন্ধটা বেশ টের পেল নাকে। হঠাৎ তার মনে হল যেন গোটা একটা জঙ্গল উঠে এসেছে। বেশ ভালো হত, নন্দিতা যদি সেই জঙ্গলে হারিয়ে যেতে পারত।

সে বাথরুমের আয়নার দিকে তাকাল। গোপন দরজা লুকানো আয়নার গায়ে তার অবয়ব ফুটে উঠেছে। নন্দিতা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি লম্বা, উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রং। এত মসৃণ তার ত্বক যে গায়ের শ্যামলা রং তা যেন কারও চোখেই টের পাওয়া যায় না। সবাই তাকে ফরসা হিসেবেই গণ্য করে। তেমনই টানটান তার চেহারা। শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু পরলে বাঙালি মেয়ে বলে মনেই হয় না। নন্দিতা শাড়ি পরেও খুব কম। সে জিনস, টপ, টি শার্টেই বেশি স্বচ্ছন্দ। একটু লম্বাটে কিন্তু মুখের ধাঁচের জন্য তাকে আরও বেশি অবাঙালি মনে হয়। গভীর আর টানটানা চোখে ঘন ভ্রু পল্লব—যে-কেউ একবার ওই চোখের সঙ্গে মোলাকাত করলে সহজে ভুলতে পারে না। তার ঠোঁট নাক বেশ তীক্ষ্ণ। আগে বড় চুল ছিল। এখন সে সেটা ঘাড় পর্যন্ত করে ফেলেছে। কোনও গয়না নেই তার শরীরে। কানের দুল, হার, লোহা—কিচ্ছু সে পরে না। লিপস্টিক, নেলপলিশও ব্যবহার করে না। সে নিরামিশাষী। এ জীবন তার স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া।

সে সারা বছর মাটির গামলায় জল রাখে ছাদে। কাক-পক্ষীর জন্যে। বসন্তে কোকিল ডাকলে—সে উদাস হয়ে থাকে, যেন তাকেই ডাকছে। মাঝে মাঝেই তাকে দেখা যায় বৃষ্টির সময় ছাদে ঘুরছে। অনেক চাঁদনী রাতে তাকে আশপাশের মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং থেকে দেখা গেছে সে একা একা ছাদের দোলনায় দোল খাচ্ছে। অথবা কোনও এক সকালবেলায় স্কিপিং করছে তো করছে, ব্যায়াম করেই যাচ্ছে, সময়ের কোনও হুঁশ নেই। তবে এখন সে কাঠ হয়ে এই ছোট্ট বাথরুমের ভেতর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। যে-কেউ তাকে দেখলে ভাববে সে নিজের রূপেই নিজে বিভোর!

কিন্তু নন্দিতার চোখের দৃষ্টি এখন অস্পষ্ট, সে কান খাড়া করে বুঝবার চেষ্টা করছে, ও-ঘরের ভেতর প্রাণীটা কী অবস্থায় আছে? সে কি ঘুমাচ্ছে?

একবার দুটো শিম্পাজি এসেছিল এখানে। নন্দিতা পরে জেনেছিল শিম্পাজির কথা। সে শুধু জানত দুজন অতিথি আছে গৃহে। সেবার সেই অতিথিদের পুশ করা ঘুমের ওষুধে ডোজ বেশি হয়ে গিয়েছিল। টানা চারদিন ধরে ঘুমিয়েছিল তারা। একসময় টেলিফোনের ওপার প্রান্ত থেকে রজতকান্তিও ভয় পেতে শুরু করেছিল—ওটা নির্ঘাত মরে গেছে।

দরজার এপারে কান পেতে নন্দিতা বলেছিল—ঘুমাচ্ছে।

সত্যি সত্যিই ওটা মরেনি। মুখর হয়ে বেঁচে উঠেছিল চার দিন পরে। নন্দিতা ভাবার চেষ্টা করল, ঘুমালে ঘুমাবে, সে তো স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু গোঙানির আওয়াজ আসছিল কেন? সে দাঁড়িয়ে থাকল বেশ কিছুক্ষণ। একসময় বাথরুমের দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে এল ঘর থেকে।

আটটার আগে-আগেই শ্যামলী এল। নীচে থেকেই বেল দিল। নীচের দরজা খোলা। পাখির কাজ করতে পিন্টু, লালা এসে গেছে। ওরাও আসে আটটায়। ওদের কাজ বারোটা পর্যন্ত। আবার আসবে চারটের সময়। থাকবে ছ'টা-সাড়ে ছ'টা পর্যন্ত। আজ লালা চাবি নেওয়ার সময় বলল, 'ম্যাডাম, আজ আমি বিকেলে আসব না, পিন্টু আসবে।'

'পিন্টু জানে?'

'হ্যাঁ, ওকে বলে রেখেছি।'

'ঠিক আছে।'

আর একটু পরে তপার মা এল। একতলা ঝাঁট দিয়ে যেটুকু মোছার মুছে দোতলায় এল। ওর প্রথম কাজ ঝাঁট দেওয়া। নন্দিতা ওকে নিয়ে তিনতলায় গেল। কাল সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় উঠে আসার পর একটু একটু করে ওদের নীচে নামার যাতায়াতের পুরো পথটা তপার মাকে দিয়ে ঝাঁট দিয়ে মোছাল। এ-বাড়ির প্রতিটা জায়গায় রোজ ঝাঁট পড়ে, মোছা হয়।

তপার মা যখন ঝাঁট দিয়ে মুছছে নন্দিতা স্পষ্ট দেখল জুতোর দাগ। আর এখানটা ঘুরতে গিয়ে ওদের একজন ওর গা ছুঁয়েছিল। নন্দিতার হঠাৎ মনে হল তার এক্ষুনি স্নান করতে যাওয়া উচিত। তপার মা কাজ সেরে চলে যেতেই সে স্নান করতে ঢুকল। অন্যদিনের থেকে অনেক বেশিক্ষণ ধরে সে স্নান করল আজ।

শ্যামলী নীচে এসে আধঘণ্টার মধ্যে ব্রেকফাস্ট রেডি করে। নন্দিতা স্নান করে নীচে নেমে ব্রেকফাস্ট নিয়ে ওপরে উঠে এল। তখনই কৃষ্ণামাসি এসে গেল রান্নার জন্যে। কৃষ্ণামাসি বলল, 'কি গো দিদি তুমি এখনও সকালের জলখাবার খাওনি, হাতে করে নিয়ে ঘুরছ।'

'খেতে ইচ্ছে করছে না।'

'ওই শুকনো পাউরুটি রোজ রোজ কী করে যে খাও? দাঁড়াও আগে আগে ভাত করে দিচ্ছি, গরম গরম আলুসেদ্ধ মাখন দিয়ে খেয়ে নাও।'

'ভাত! এখন একবার, দুপুরে একবার। বাপ রে। তুমি বরং ডাল বসাও, আমি একটু ডাল খাব। হয়ে যাবে।'

তপার মা যখন কাজ সেরে চলে গেল তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। নন্দিতা মাঝে একবার নীচে গিয়েছিল। দেখল খুব উত্তেজিত হয়ে শ্যামলী খবরের কাগজ পড়ছে আর বিনয়কান্তি শুনছেন। এ-বাড়িতে দুটি বাংলা, দুটি ইংরেজি খবরের কাগজ আসে। সব কাগজই নীচে আসে, নীচেই থাকে। নন্দিতা খবরের কাগজ পড়ে না। কালেভদ্রে কখনও তা ওপরে আসে।

নন্দিতা নীচে এসেছিল সম্পূর্ণ অন্য কারণে। আসলে এদিনগুলো তার ভেতর কেমন একটা ছটফটানি পেয়ে বসে। বারবার তাই সে বাড়ির ভেতরটা ভালো করে দেখে। ওরা এমন কিছু ফেলে যায়নি তো যাতে অন্যলোকের কোনও সন্দেহ হবে? আসলে সাড়ে তেরো নম্বর ঘরের অবস্থান এমন একটা জায়গায় যেখানে সবসময় কেমন ভয় ভয় করে। যদি ওই ঘরের বাসিন্দা গোঙায় তাহলে নীচের তলা থেকেও শোনা যেতে পারে বলে নন্দিতার মনে হয়।

নন্দিতা নীচে গিয়ে কোনও অস্বাভাবিক বা গোঙানির আওয়াজ শুনল না। তবে যা কানে এল তা আরও বিচ্ছিরি। শ্যামলী কোনও একটা অ্যাক্সিডেন্টের খবর পড়ছে জোরে জোরে। আশ্চর্য! নন্দিতার ঘরের ভেতরটা কেমন যেন নৃশংস মনে হল। সে যেভাবে নীচের তলায় এসেছিল, সেভাবেই ফিরে গেল।

মাঝে পিন্টু এসে বেল বাজাল। জানিয়ে গেল, দু'জোড়া লাভ বার্ডকে নিয়ে ওর সন্দেহ আছে। ও মনে করছে ওরা মেল-ফিমেলের জোড় নয়। দুটোই ফিমেল। লাভ বার্ডদের নিয়ে এই ঝামেলা, লাভ বার্ডরা অনেক সময় মেল-ফিমেলে না জোড় বেঁধে, মেল-মেল বা ফিমেল-ফিমেলে সমগোত্রীয়তে জোড় বাঁধে। ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে থাকার ফলে ওদের এমন বন্ধুত্ব হয়, যাকে সবাই জোড় ভেবে ভুল করে। রজতের মতো লোকও এই ভুলের ফাঁদে পড়ে। তখনই পিন্টু বলল, 'ম্যাডাম আজ লালা আসবে না। কোনও অসুবিধে হবে না। আমি ঠিক সময়েই আসব।' পিন্টু অদ্ভুতভাবে হাসল।

পিন্টু, লালা ওকে ম্যাডাম বলে ডাকে। শ্যামলী, কৃষ্ণামাসি বা তপার মায়ের মতো দু-একজন ছাড়া সবাই ওকে ম্যাডাম বলে। ওর অবাঙালি সুলভ চেহারার জন্যেই ও ম্যাডাম। নন্দিতা শ্যামলীকে নিয়ে বাজারে গিয়েও দেখেছে ওকে সবাই ম্যাডাম বলে ডাকছে। নন্দিতা এই ক'বছরে বুঝে গেছে এই বাড়ি, এই বাড়ির মানুষজন, তাদের গতিবিধি, জীবন সবই এখানকার এক আলোচনার বিষয়। সে-ও বাদ যায় না। এই বাজারেও তার কথা চলে এসেছে। রজতকে কিন্তু ওরা দাদাই বলে। কদিন আগে বাজারে ওকে দেখে একজন এগিয়ে এল, বলল, 'ম্যাডাম দাদা বাড়ি আছেন? আমার বাজারে স্টেশনারি দোকান। আমার মেয়ে একটা ভোডা কুকুর নিয়েছে।'

'কী কুকুর?'

'ওই যে ভোডা ফোনের কুকুর—খুব ভালো হয়েছে। আর একটা চাই, আমার শালীর মেয়ের জন্যে। আমার দামেই দিতে হবে। দাদা কি বাড়ি আছেন?'

'হ্যাঁ ফোন করে নিন।'

'আমার কাছে ফোন নম্বর নেই, দেবেন?'

নন্দিতা নির্দ্বিধায় মনোজের নম্বর দিয়ে দিল। মনোজ প্রথমে কথা বলুক তারপর ঠিক সময়ে রজত কথা বলবে।

নন্দিতা জানে রজত এই মানুষটাকে দারুণভাবে এন্টারটেন করবে। ওর কুকুর নেওয়ার জন্যে ফোন করবে চারদিকে। মনোজ ছুটবে। এটাও রজতের বিজনেসের একটা পার্ট। শীতকালে বেশি, কিন্তু সারা বছর ধরেই কুকুর কেনার লোকজন আসে রজতের কাছে। রজত অরিজিনাল কাগজ সহ কুকুর বিক্রি করে। তাতে কুকুরের বংশ পরিচয় থেকে শুরু করে হেলথ কার্ড থাকে। নন্দিতাকে দোকানে বাজারেও অনেকে হিন্দি কথা বলে। নন্দিতা তাদের সঙ্গে হিন্দিতেই কথা বলে। বাংলা বলে না।

শ্যামলী নীচে থেকে বেল দিয়ে দোতলার কোলাপসিবল গেটের কাছে এসে দাঁড়াল। বলল, 'কলা আপেল বেশি আছে আজ। আমি একটা ব্যাগ পিন্টুকে দিয়ে দিচ্ছি।' নন্দিতা একটা ব্যাগ ধরে নিল। অন্য ব্যাগ নিয়ে শ্যামলী ওপরে উঠে গেল। নন্দিতা ওর শান্ত মুখ দেখল। ও কি কিছু জানে? জানলেও ওর মুখে কোনও দাগ নেই।

সত্যিই তো দাগ থাকবেই বা কেন? ওর তাতে কী! ও এই বাড়িতে কাজ করে। ওর বর মনোজ রজতের ছায়াসঙ্গী। ওদের কাছে এটা কাজ, ওদের কাছে এটা এ-পরিবারের ব্যবসা। কিন্তু এ দিনগুলো নিয়ে নন্দিতা এত অস্বস্তিতে ভোগে কেন? সেটা কি রজত নিষিদ্ধ কোনও বিজনেস করছে বলে? না কি রজত যা বিজনেস করছে তা নন্দিতা জানে না তাই? নাকি এসব কিছুই না, রজত তো আইনমাফিক বিদেশি পোষা পাখি ছাড়া অনেক অনেক বেআইনি পাখি নিয়ে আসে। বিশেষত অসমের পাহাড়ি ময়না। সারা পৃথিবীতে এর চাহিদা আছে, রজত এদের চালান করে অনেক দেশে। তাতে নন্দিতার তো সেভাবে ব্যথা লাগে না। তবে কেন সাড়ে তেরো বা আড়াই নম্বর ঘরের গোপন কুঠুরিতে কিছু এলে ওর বুকে লাগে। তা কি শুধু ও দেখতে পাচ্ছে না বলে? কী আছে জানতে পারছে না বলে ওর আত্মসম্মানে লাগছে? ও মনে করতেই পারে আমাকে দিয়ে ওদের পরিচর্যা করাচ্ছ, কিন্তু আমাকে কিছু জানাচ্ছ না। কেন?

নিজের অস্বস্তি থেকে নন্দিতা এদিন আরও দুবার এসেছিল এই দরজা, এই আয়নার সামনে। এই আয়নার সামনে দাঁড়ালে যেন তাদের পরিবারটার আসল রূপ দেখা যায়।

সে রূপ বড় হিংস্র! জঙ্গল থেকে জানোয়ার টেনে আনা, মায়ের কোল থেকে শাবক ছিনিয়ে নেওয়া। শুধু এই নয়, আড়ালে হয়তো আরও আরও কিছু আছে যা নন্দিতা জানে না।

দুপুরবেলায় নন্দিতা ঘুমায় না। টিভি দেখে না। গান শোনে। ভালো লাগে বই পড়তে। বই পড়ে। পাখি জীবজন্তু সম্পর্কিত নানা বই আছে এ বাড়িতে। খুব দামি দামি বই। রজত সারা পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে হাতের কাছে যখনই যা পেয়েছে সংগ্রহ করেছে। সেই সব বইয়ের ভেতর তার অনেকটা সময় চলে যায়। ওর নিজস্ব বুক র‍্যাক জুড়ে আছে দেশবিদেশের নানা সাহিত্য সম্ভার। যা কিছুটা রজতের কিনে দেওয়া, অনেকটা নিজের পছন্দমাফিক কেনা। পাখির জগৎ আর বইয়ের জগৎ নিয়ে নন্দিতা ভালো আছে। কিন্তু মধ্যে এই ক'টা দিন তার নিজেকে বড় দূষিত, অপমানিত লাগে। রজতকে ও যতটা চিনেছে, তার থেকে অনেকটা চেনা যেন তার বাকি থেকে গেছে। এই ক'টা দিন তার ভেতরের ছটটফটানি কেউ টের পাবে না, তা একা একা সইবে নন্দিতা।

আজ দুপুরে নন্দিতা বইয়ে মন দিতে পারছিল না। বারবার তাকে ওই ঘরটা টানছিল—মনে হচ্ছিল সে কি ঘুমাচ্ছে এখনও? কতদিন ধরে সে ঘুমাচ্ছে? কত কত বার তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে কত কত দূর থেকে আনা হচ্ছে?

হঠাৎ নন্দিতার মনে হল কেউ যেন গোঙাচ্ছে।

তার মাথার ভেতর সব কিছু জট পাকিয়ে যাচ্ছে। সে বই রেখে আবার উঠে এল ওই ঘরের সামনে। ঘড়িতে প্রায় তিনটে বাজে। বাইরে ঝাঁ-ঝাঁ করছে দুপুর। না, কোনও গোঙানির আওয়াজ নেই। সে কিছুক্ষণ আয়নার সামনের দাঁড়িয়ে থাকল। ফিরে আসার মুহূর্তে সে নীচু হয়ে ড্রয়ারটা টানল। ড্রয়ারটা টানলে বোঝা যবে ভেতরের জীবটি কিছু খেয়েছে কি না। ড্রয়ারটা এত মসৃণ যে শব্দহীনভাবে বেরিয়ে এল। ছ'টা কলা, চারটে আপেল—যেমন ছিল পড়ে আছে। না, ও কিছু খায়নি। নন্দিতা ড্রয়ারটা আলতো হাতে আবার ভেতরে ঢুকিয়ে বেরিয়ে এল।

একটু পরে পিন্টু এল চাবি নিতে। কোলাপসিবলের ওপার থেকে চাবি নিয়ে পিন্টু বলল, 'ম্যাডাম দাদা কবে আসবেন?'

'জানি না।'

পিন্টু দাঁড়িয়ে থাকল। ইদানীং পিন্টু যেন ওর সঙ্গে একটু বাড়তি কথা বলতে চায়।

পিন্টু বলল, 'আজ লালা আসবে না। আমি একা।'

'হ্যাঁ, আমি জানি। আমাকে বলে গেছে।'

'ম্যাডাম কি পাখির ঘরে আসবেন? লাভ বার্ডগুলোকে দেখাতাম।'

'এখন নয় পরে যাব।'

'আর ফ্রিঞ্চের বেশ কিছু ডিম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—কেন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। দাদা এলে বলব।'

'বোলো।'

'আজ নতুন কিছু ধূসর টিয়ার বাচ্চাকে পাখিঘরে ছেড়ে দেব। আপনি এসে যদি একবার দেখে নেন...।'

'আমি একটু পরে যাব।' নন্দিতা পরের কথাটা বলল বেশ গাম্ভীর্যে। পিন্টু আর দাঁড়াল না। চাবি নিয়ে ওপরে পাখির ঘরে চলে গেল।

নন্দিতার মনে হল, পিন্টু একা থাকলে সে আর পাখিঘরে যাবে না। বরং কাল যাবে। পিন্টুর চোখ-মুখ যেন কেমন একটা লাগছে। নন্দিতা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। দেখল মিলি গাছগুলো অজস্র ফুল ঝরিয়েছে টবে। লাল লাল ফুলের পাপড়িতে টবের মাটি রঙিন হয়ে গেছে।

নন্দিতা আবার ভেতর ঘরে ঢুকল, পায়ে পায়ে আরও ভেতর ঘরের দিকে এল। এবার সে ঠিক শুনল—সত্যি সত্যি কেউ যেন গোঙাচ্ছে।

মাঝে মাঝে আওয়াজটা থামছে কিন্তু আবার একটু পরে গোঙানির আওয়াজ, সরু সুতোর মতো ফিনফিন করে ঘরের ভেতর যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে। নন্দিতাও ক্রমশ এই গোঙানির আওয়াজের ভেতর ঢুকে পড়েছে।

সে যেন হাতে থার্মোমিটার নিয়ে অপেক্ষা করছে। জ্বর ওঠা, জ্বর নামার মতো গোঙানির টুকরো আওয়াজও সে শুনে শুনে লিপিবন্ধ করছে।

বেলা বাড়ে। নন্দিতার মনে হয় কেউ যেন দরজার গায়ে আঙুল দিয়ে টোকা মারছে।

টোকা মারছে, না আঁচড়াচ্ছে কামড়াচ্ছে?

নন্দিতা নিজেকে শান্ত করে, তাহলে হুঁশ ফিরেছে। সে যেন নিশ্চিন্ত হয়। কিন্তু এ নিশ্চিন্ততা কিসের? ও কিছুক্ষণ এই ঘরের ভেতর ছটফট করবে। প্রতিটা দেওয়াল, প্রতিটা জায়গায় আঁচড়ে কামড়ে দেখবে। তারপর একসময় নজর পড়বে খাবারের দিকে। তখন ফল খাবে। তারপর জল খাবে। আর জল খাওয়ার একটু পরেই ও আবার ঘুমাবে। ওর ঘুম ভাঙলে আবার, আবার পুনরাবৃত্তি হবে। ও খাবার খাবে, জল খাবে। ও জানে না এই জলে বিন্দুতে বিন্দুতে ওর জন্যে মজুত করা আছে ঘুম। ও ঘুমিয়ে পেরিয়ে যাবে এক দুই তিন করে অগুন্তি দিন, যতদিন না ও খাঁচায় ঢুকছে, ততদিন।

নন্দিতা দুপুরে ভালো করে খায়নি। শরীরটা কেমন যেন ভারী ভারী। ইচ্ছে করছিল, পাখিঘরে গিয়ে বসে থাকতে। কিন্তু সে যাবে না।

বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। ঘরের ভেতর আলো কমে আসছে। নন্দিতা আবার পায়ে পায়ে এসে দাঁড়াল সে-ঘরের সামনে। চারদিক নিঃস্তব্ধ। নন্দিতা আলতো হাতে ড্রয়ার টানল, আর তখন কেউ যেন ভেতর থেকে ড্রয়ারটার ওপর চাপড়াতে শুরু করল। দুটো কলা নেই। মানে খেয়েছে। নন্দিতা সপাটে ড্রয়ারটা বন্ধ করে দিল।

ভেতরের জীবটা শুধু ড্রয়ার চাপড়াচ্ছে না। অস্ফুট গলায় কথা বলছে।

আওয়াজ নয়, স্পষ্ট শুনছে নন্দিতা ভেতর থেকে কেউ 'হ্যালো, হ্যালো' করে ডাকছে।

নন্দিতা দাঁড়াল না। না, তার ভুল হচ্ছে, ভুল শুনেছে। একা একা থাকতে থাকতে তার এই বিভ্রম। গাড়ি বের করে কি ঘুরে আসবে? কেমন যেন পাগল পাগল লাগছে।

নন্দিতা ঘর থেকে বেরুল। কোলাপসিবল গেটে তালা দিয়ে ওপরে গেল পাখিঘরে।

ওকে দেখে পিন্টু হাসল। বলল, 'আসুন ম্যাডাম—আপনার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। কিছু ডিম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে...।'

নন্দিতা গম্ভীর মুখে পিন্টুকে হাত ইশারা করল। বলল, 'কাল সকালে দেখব।'

'কেন ম্যাডাম আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?'

'না। ঠিক আছি।'

'আপনার চোখ-মুখ যেন কেমন লাগছে। লাল হয়ে আছে। প্রেশার বাড়েনি তো?'

নন্দিতা পিন্টুর দিকে তাকাল না, ম্যাকাও-এর ঘরে ঢুকে পড়ল। পিন্টু কিছুক্ষণ নন্দিতার আশপাশে ঘুরঘুর করল। তারপর সরে গেল টিয়ার খাঁচার দিকে।

অন্ধকার হওয়ার আগে নন্দিতা নেমে এল নীচে। বাথরুমে গিয়ে খুব ভালো করে স্নান করল। বাথরুম থেকেই শুনল বেল বাজছে। পিন্টু চলে যাবে। সে স্নান করেই চলল। আজ সে পিন্টুর মুখোমুখি যাবে না। হঠাৎ তার মনে হল পিন্টু কি কোনও কিছু সন্দেহ করেছে? সেটাই কি জিগ্যেস করতে চায়? ও কি সকালবেলা দেখেছে ফলওয়ালা আজ অনেক বেশি আপেল আর কলা দিয়েছে! নন্দিতা বাথরুমের ভেতর থমকে দাঁড়িয়ে থাকল। পিন্টু এতক্ষণে শ্যামলীর হাতে চাবি জমা করে চলে গেছে। ও যাওয়ার সময় তিনতলার আলো জ্বালিয়ে যায়।

নন্দিতা দোতলার আলোগুলো জ্বালাল। অন্যদিন এদিককার ঘরে আলো জ্বালায় না। আজ সে অন্য ঘরের মতো এসে এখানেও আলো জ্বালাল। আলো জ্বালাতে ওপার থেকে ঠকঠক করে শব্দ ভেসে এল। সেইসঙ্গে ক্ষীণ একটা গলার আওয়াজ। নন্দিতার আবার মনে হল সে ভুল শুনেছে। সে চলে আসছিল, আবার শব্দ হল, ঠিক দুবার। নন্দিতাও ড্রয়ারের গায়ে আঙুল দিয়ে টোকা দিল চার বার। ওপার থেকে টোকা পড়ল চারবার। নন্দিতা আবার টোকা দিল, নন্দিতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেউ টোকা দিল। ক্ষীণ গলার স্বর। নন্দিতা এবার ড্রয়ার টানল। ভেতরের জীবটার গলার স্বর শোনার জন্যে। তখনই ভেতর থেকে একজন কেউ পরিষ্কার গলায় বলে উঠল, 'হ্যালো ওপারে যিনি আছেন, প্লিজ তিনি আমার সঙ্গে একটু কথা বলুন, প্লিজ প্লিজ...।'

পুরুষ মানুষের গলা!

মানুষের গলার স্বরে আতঙ্ক আর আর্তি, নন্দিতা ঘাবড়ে গেল। সে দ্রুত হাতে ড্রয়ারটা বন্ধ করল। ওপারের মানুষটার গলার স্বর আবার ক্ষীণ। তবে নন্দিতা পরিষ্কার শুনছে, শুনতে পাচ্ছে, সে চিৎকার করছে—'প্লিজ প্লিজ আমার কথা শুনুন।'

নন্দিতা কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। অন্য কোনও প্রাণী নয়, সাড়ে তেরো নম্বর ঘরে আছে একজন মানুষ! পুরুষ মানুষ। এই মানুষটাকে রজত জন্তুর মতো ট্রিট করিয়ে তার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে চাইছে!

রজত কি জীবজন্তু ছেড়ে এখন মানুষের ব্যবসা করছে?

নন্দিতা তার ঘরে এল। তার বুকের ভেতর দপ দপ করছে। সে ঘরের এসি চালিয়ে দরজা বন্ধ করে বসল। এখন কী করবে সে? রজতকে ফোন করে এখুনি সে বলবে—যাকে নিয়ে এসেছ তাকে ছেড়ে দাও। নাহলে আমি তাকে দরজা খুলে বের করে আনব।

নন্দিতা ফোনটা টেনে নিল। সে কী করবে? নাকি তার আর একটু ভাবা উচিত? রজত যদি তাকে বলে—বেশ করেছি। তুমি ওকে মানুষ ভাবছ কেন? ওকে আপেল আর কলা দাও। দিয়ে চুপ করে বসে থাকো। কিংবা রজত তো এ-ও বলতে পারে, আমি বাধ্য হয়ে করেছি। আমি ফিরে গিয়ে সব তোমায় বলব, তুমি প্লিজ মাথা ঠান্ডা রাখো।

নন্দিতা এসি ১৮ করে দিল। তা-ও ও দরদর করে ঘামছে। ঘড়িতে এখন সাড়ে ছটা বাজে। আটটার সময় তার শ্বশুরমশাই রাতের খাবার খেয়ে ওপরে উঠে আসবেন। এসে ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়বেন। উনি শুয়ে পড়লে কি নন্দিতা রজতকে ফোন করবে? তারপর যা ব্যবস্থা করার করবে।

ঘামতে ঘামতে নন্দিতা নিজেকে ঠিক করতে লাগল। ভেতর ভেতর তোলপাড় হওয়াটাকে সে গুছিয়ে নিল। না, রজতকে আগে সে ফোন করবে না। বরং এখন দোতলায় কেউ নেই। সে ড্রয়ার সরিয়ে ওই মানুষটার সঙ্গে কথা বলবে। কথা বলে জানবে সে কে? কেন সে এখানে এল? কীভাবে সে এখানে এল? বন্দি মানুষটার সব কিছু জেনে নিয়ে রজতের সঙ্গে কথা বলা যাবে। আগে তাকে সব কিছু জানতে হবে, তারপর রজতের সঙ্গে বোঝাপড়া করা যাবে। আর নয়, প্রয়োজনে সে মানুষটাকে মুক্ত করে দেবে। চাবি তার কাছে আছে। তাতে এ-পরিবারের যা হওয়ার হোক। নিজেকে ঠান্ডা শীতল করে নন্দিতা ওঠে। অনেকদিন পরে তার কান্না পাচ্ছিল।

ড্রয়ারটা টানল নন্দিতা।

ড্রয়ার টানার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে কেউ যেন ঝাঁপিয়ে এসে ড্রয়ারের ফাঁকা জায়গায় হাত দিয়ে নাড়তে লাগল। সেইসঙ্গে প্রচণ্ড তোড়ে সে বলে চলল, 'প্লিজ ড্রয়ারটা বন্ধ করে দেবেন না, আমার কথা শুনুন। প্লিজ, প্লিজ আমার কথা শুনুন।'

নন্দিতা ড্রয়ার বন্ধ করল না। বলল, 'আমি ড্রয়ার বন্ধ করছি না। আপনি আওয়াজ থামান।'

আওয়াজ থেমে গেল। চারদিক হঠাৎ খুব শান্ত। নন্দিতা ফল ভরা ড্রয়ারটা প্রায় কোলের কাছে টেনে নিয়ে বসল। ওদিকে জন্তু-মানুষটা!

ভেতরের মানুষটা বলল, 'আমি লুকাতে চাই। সেফ একটা জায়গায় লুকিয়ে থাকব বলেই আমাকে এখানে পাঠানো হয়েছে, তা বলে কোন স্কাউন্ড্রেল আমাকে এভাবে থাকার ব্যবস্থা করেছে বলবেন—এটা কি লুকোনোর কোনও তারিকা হল? আমি কোনও জন্তু নই।'

নন্দিতা শান্ত গলায় বলল, 'আপনি কে?'

'আমি কে?' মানুষটা হাসল। বলল, 'আবার বলুন, আমি কে— আমি...দীর্ঘ দীর্ঘ দিন এ প্রশ্নটা শুনিনি। আমার কাছে এসে, আমাকে দেখে কেউ এখন আমার পরিচয় জানতে চায় না। তবু আপনি যখন জিগ্যেস করেছেন, তখন বলি, আপনি জানেন না—আমি কে?' মানুষটা আবার হাসল।

ওর হাসি শুনে নন্দিতার অবাক লাগছে। কয়েক মুহূর্ত আগে এই মানুষটা ড্রয়ারের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে আর্তি আর আতঙ্কে চিৎকার করছিল। এখনও সে খাঁচাবন্দি। এ অবস্থায় পড়ে কোনও মানুষ হাসে, হাসতে পারে? সে বলল, 'না, আমি জানি না আপনি কে?'

'আপনি কি ঠিক বলছেন, না মিথ্যে কথা বলছেন?'

'আমি মিথ্যে কথা বলব কেন?'

'আপনি জানেন না আমি কে? অথচ আপনি আমায় রাখছেন। অবশ্যই জন্তুর মতো রাখছেন, জন্তুর মতো ফলমূল ছুড়ে দিচ্ছেন, আপনি কি ভাবলেন, আমি কোনও বুনো জনোয়ার?'

'দেখুন এখানে বুনো জানোয়ারই আসে, থাকে। তাদের জন্যেই এ ব্যবস্থা। এখানে আপনি এলেন কীভাবে?'

'থোড়ি আমি এসেছি। আমাকে নিয়ে আসা হয়েছে।'

'আপনাকে কি কিডন্যাপ করা হয়েছে?'

'আমাকে, না, না, তা কেন? তবে ঠিক কী হয়েছে আমি জানি না। যার ফলে আমাকে এই জন্তু-মানুষ বানিয়ে রাখা হয়েছে।'

'আপনাকে আবারও বলছি, এটা জীবজন্তু রাখার জায়গা। মানুষের নয়। এখানে যে কোনও মানুষ আছে আমি জানি না।'

'আপনি তাহলে সত্যিই জানেন না। মুকুন্দ যে কী করে, কীভাবে প্ল্যান করে, ঘুঁটি সাজায়। উঃ!'

'মুকুন্দ কে?'

'আমার সেক্রেটারি।'

একটু নীরবতা। ভেতরের লোকটা যেন দরজার ওপর মাথা রাখল। ঢিব করে একটা আওয়াজ হল। খুব হতাশাভরা গলায় বলল, 'আমি বুঝতে পারছি না ব্যাপারটা কী? এভাবে আমাকে রাখা হচ্ছে কেন? আমি সবাইকে ধোঁকা দিয়ে পালাতে চাই বলে—পালানোর ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু এভাবে জন্তুর মতো থাকার ব্যবস্থা! মনে হচ্ছে আমি কোনও খাঁচায় আছি। যেখানে বন্য হিংস্র জন্তুজানোয়ার থাকে। আগে আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিন, এভাবে আমার থাকার ব্যবস্থা করেছেন কেন?'

'আমি আপনার থাকার ব্যবস্থা করিনি। তবে যারা করেছে, তারা এভাবেই করেছে।'

'এভাবে জন্তুর মতো?'

'হ্যাঁ। এখানে বুনো জন্তুজানোয়ারই থাকে।'

নন্দিতার কথায় মানুষটা নড়ে উঠল। বলল, 'এটা আপনি ঠিক বলছেন না। এভাবে কোনও মানুষের লুকানোর ব্যবস্থা হতে পারে না।'

'এভাবেই হয়েছে—। আপনি নিজে একরাত, প্রায় একটা দিন থেকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না?'

'ইমডিয়েট আপনি দরজা খুলুন, আমাকে বের করুন।'

'আপনি না বললেও আমি আপনার দরজা খুলে দেব। কিন্তু আগে আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। আপনি কে?'

'আপনি আমায় চেনেন। আমার গলার স্বর আপনার চেনা ঠেকছে নিশ্চয়ই। গলার স্বর শুনে আপনি গেস করুন। এক চান্সে আপনি মিলিয়ে দেবেন।'

নন্দিতা চোখ বন্ধ করল কয়েক মুহূর্ত। বলল, 'না, আমি বুঝতে পারছি না।'

নন্দিতার কথায় মানুষটা হাসল, 'পরে এই গলার স্বর না চেনার জন্যে আপনি প্রচুর আফশোস করবেন। একা একা হাসবেন। মানুষকে যখন গল্প করবেন, মানুষও আপনাকে নিয়ে হাসবে। নিন, দরজাটা খুলুন। সামনে থেকে দেখুন। কোনও টাকা লাগবে না।'

নন্দিতা বলল, 'একটা গেস করেছি, বলব?'

'বলুন বলুন, আমার বিশ্বাস আপনি হান্ড্রেড পারসেন্ট রাইট হবেন।'

'আপনি কোনও একটা সার্কাসের জোকার। যে সমস্ত অবস্থায় নিজেকে নিয়ে মজা করতে পারে। জোকার না হলে জানোয়ারের খাঁচায় থেকে কেউ নিজেকে নিয়ে এত মজা করতে পারে না।'

মানুষটা ঘরের ভেতরে দেওয়ালে ঢিবঢিব করে মাথা ঠুকল। বলল, 'আপনি আমাকে জোকার বলছেন। সত্যি বলছেন?'

'আপনি কি কোনও দলবদল করছেন? এক সার্কাস থেকে আর এক সার্কাসে যাবেন। তাই জানোয়ারের কফিনে চড়ে আপনার খাঁচায় ঢোকা?'

'দেখুন আমার খুব মাথা যন্ত্রণা করছে। আমার কিছু খাবারও চাই। একটু রিল্যাক্সড হতে পারলে, আমি পরবর্তী কাজগুলো করতে পারব। প্লিজ আমাকে বের করুন, বের করে দেখুন আমি কে? আমি আপনাকে বলতে পারি আজ এই মুহূর্তে আপনি একজন ভাগ্যবান! আজ আপনি যাকে দেখবেন, তার জন্যে পরবর্তী সারা জীবন স্মৃতি রোমন্থন করবেন।'

নন্দিতা হাসল, 'দেখুন আপনি এসব কথা না বললেও, আমি আপনাকে মুক্ত করে দেব। আপনাকে আমার মন ভোলানোর জন্যে এত সাজানো-গোছানো কথা বলতে হবে না।'

'আমি আপনাকে কোনও সাজানো-গোছানো কথা বলছি না ম্যাম। যা বলছি, তা কতখানি সত্য আপনি আমার সামনে দাঁড়ালেই বুঝতে পারবেন।'

'উফ!' নন্দিতা কিছু হতাশ গলায় বলে। 'আপনি এমন একটা ভাব করছেন যেন সারা ভারতের লোক আপনাকে চেনে। আপনি একজন মস্ত মানুষ!'

'ইয়েস। ইয়েস। চেনে। চেনে। আমি বলছি, সারা ভারতের লোক আমাকে চেনে। আপনিও আমাকে চেনেন।'

'না, আপনাকে আমি চিনি না।'

'ঠিক আছে দেখা যাক, পরে আমি কিন্তু কোনও স্যরি শুনব না।'

নন্দিতা হাসল, বলল, 'আপনি দরজাটা খোলার জন্যে আমাকে ভোলাচ্ছেন। সেটা আপনি ভুলই করছেন। আমি যে-মুহূর্তে বুঝেছি আপনি কোনও জানোয়ার নন, একজন জ্যান্ত মানুষ, আমি তখন ডিসিশন নিয়েছি, যাই হোক আপনাকে আমি এখান থেকে মুক্তি দেব।'

'তাহলে তাই করুন। এই জন্তুর মতো খাঁচা আমি ভাবতে পারছি না। কফিন ছিল মেনে নিয়েছি। উঃ, আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাক্টিংটা দুদিন ধরে করে ফেলছি, প্রথমে করলাম কফিনে শায়িত শবদেহ। তারপর এক খাঁচা বন্দি জানোয়ার। উঃ, দারুণ!' ওপারের মানুষটা ঘরের ভেতর হাততালি দিয়ে উঠল।

নন্দিতার মনে হল লোকটা পাগল। পাগল না হলে খাঁচাবন্দি হয়ে কোনও মানুষ এত স্ফূর্তিতে থাকে না। আর কী কনফিডেন্স!

নন্দিতা বলল, 'প্লিজ একটু ওয়েট করুন। আমি চাবিটা নিয়ে আসছি।'

'ওকে ম্যাম!'

মানুষটা যেন আরামকেদারায় বসল। ওর মনে হল মানুষটা সত্যিই কোনও বিখ্যাত লোক, যাকে এখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সামনাসামনি দেখলে সে কি চিনতে পারবে? কতদিন সে টিভি দেখে না, খবরের কাগজ পড়ে না। কত কত বিখ্যাত মানুষকেই সে চেনে না। সত্যিই যদি মিথ্যে না বলে, তার কেমন একটু অস্বস্তি হল। মানুষটার গলায় প্রথম দিকে অধৈর্য, আকুতি ছিল, কিন্তু আস্তে আস্তে কীরকম শান্ত আর কনফিডেন্স শোনাচ্ছে। আশ্চর্য!

চাবি নিয়ে এসে দরজা খুলল নন্দিতা। ছোট সরু দরজাটা খুলে হাট করে দিল। খোলা দরজা দিয়ে যে বেরুল, তাকে নন্দিতার চেনা ঠেকলেও ঠিক চিনে উঠতে পারল না। খুব লম্বা নয়, মাঝারি মাপের মানুষ। মাথার চুলগুলো উসকোখুসকো। এক মুখ না কাটা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। দুদিনের ধকলে মানুষটার মুখটা শুকনো খসখসে, কালি পড়ে, ঠোঁট দুটো আরও শুকনো ফাটা ফাটা। মানুষটা জিব দিয়ে ভিজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। হল না। দু'চোখের তলায় গাঢ় কালি পড়ে।

মানুষটা বাইরে বেরিয়েই বলল, 'থ্যাঙ্কস!'

নন্দিতা দেখল মানুষটার পরনে অত্যন্ত চকচকে রংবেরঙের শার্ট। শার্টের সামনের তিনটে বোতাম খোলা। তার ভেতর ব্যায়াম করা দুর্দান্ত চেহারাটা স্পষ্ট।

পাতলা লিনেন মতো প্যান্ট পরা মানুষটার কোমরটা সরু। তার ওপর শার্টটা বেখাপ্পার মতো ঝুলছে। খালি পা। ওর খালি পায়ের দিকে নন্দিতা তাকিয়ে আছে দেখে মানুষটা মসৃণ হাসল। নন্দিতা দেখল ঘরের মেঝেয় দুটো জুতো পড়ে, তার পাশেই তালগোল পাকানো স্টিল কালারের একটা ব্লেজার।

নন্দিতা বলল, 'আসুন।'

মানুষটা কিন্তু নড়ল না। সোজা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, 'আশা করি আপনি আমায় চিনতে পেরেছেন। আর সব কিছুই বুঝতে পেরেছেন। এখন বলুন, এ বাড়িতে আর কে কে আছেন, আমি এখন ঘরের বাইরে এলে কী ধরনের রিপারকেশন হতে পারে? আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আমি কাউকে দেখা দিতে চাই না। লুকিয়েই থাকতে চাই। যতদিন না ঝামেলা মেটে।'

কথা বলতে বলতে মানুষটা থামল। বলল, 'এটা একটা বাথরুম দেখছি, আমি প্রথমে ভালো করে স্নান করতে চাই। আমাকে টাওয়েল দিন। এখানে শ্যাম্পু-সাবান আছে দেখছি। আমার হয়ে যাবে। আর আপনার হাসবেন্ডের কিছু ড্রেস!' মানুষটা অদ্ভুত হাসল। তারপর হালকা গলায় বলল, 'পরবর্তীটা আমরা দুজনে মিলে ঠিক করে নেব।'

নন্দিতা ঘড়ির দিকে তাকাল। প্রায় পৌনে আটটা। বিনয়কান্তির রাতের খাবার খেয়ে ওপরে উঠে আসার সময় হয়েছে। নন্দিতা খুব দ্রুত বলল, 'ওপরে আমার শ্বশুরমশাই থাকেন। অন্ধ। উনি এখুনি আসবেন। আপনাকে আমি টাওয়েল, আমার স্বামীর ড্রেস দিয়ে যাচ্ছি। আপনি সব নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিন। আমি না ডাকলে খুলবেন না।'

'ওকে ম্যাম। আর এক বোতল জল, বিস্কিট দেবেন? মানুষ কি জানোয়ার—যে এত ফল খায়? আমাদের সম্পর্কে যা পড়েন, শোনেন তা বেশিরভাগই গল্প। আমরা বাড়ির ভেতর একদমই আপনাদের মতো মানুষ।'

নন্দিতা কোনও কথা বলল না। তাকে দ্রুত গুছিয়ে নিতে হবে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে। বিনয়কান্তি ওপরে উঠে এলেন বলে—।

নন্দিতা খুব তাড়াতাড়ি সব জিনিসগুলো সামনের ঘরে ঢুকিয়ে মানুষটাকে ইশারা করল দরজা বন্ধ করে দিতে। সে নীচের ঘরের দরজা বন্ধের আওয়াজ শুনেছে।

মানুষটা নন্দিতাকে বলল, 'কুল! কুল! অত টেনশন করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে।'

নন্দিতা আবারও বলল, 'আমি না ডাকলে দরজা খুলে বের হবেন না।'

'ওকে ম্যাম!'

সে দরজা বন্ধ করে দিল। দোতলায় বেল বাজল। দরজা খুলে দিয়ে সে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল।

বিনয়কান্তিকে নিয়ে ঢুকল শ্যামলী। বিনয়কান্তি তার মতো ঘরে চলে গেল। সামনের টেবিলে ব্যাগ, টুকটাক জিনিসপত্র রেখে শ্যামলীও তার পিছন পিছন ঘরে ঢুকল। এখন বিনয়কান্তি পর পর বেশ কতগুলো ওষুধ খাবে। সব শেষে ঘুমের ওষুধ দিয়ে শ্যামলী চলে যাবে। শ্যামলীর যেতে যেতে সাড়ে আটটা।

শ্যামলী চলে গেলে এ-বাড়িতে চারটে তালা পড়ে যাবে। দুর্ভেদ্য দুর্গ যেন।

প্রতিদিনের নিয়ম মেনে শ্যামলী চলে যেতে নন্দিতা এসে বন্ধ ঘরের দরজার সামনে দাঁড়াল। খুব হালকা হাতে দরজায় টোকা দিল। টোকা দিয়ে অপেক্ষা করল। না, কেউ দরজা খুলল না। এবার একটু জোরে টোকা দিল। দরজা খুলল খুব আস্তে।

খাঁচার মানুষটা রজতের পাজামা আর হাফ পাঞ্জাবি পরে তার সামনে দাঁড়িয়ে। সে বলল, 'অল ওকে? আমি কথা বলতে পারি?'

নন্দিতা মানুষটাকে দেখছিল, কী সপ্রতিভ। এরকম একটা পরিস্থিতিতেও এ যেন নিজের জায়গায় আছে। নন্দিতা বলল, 'বলুন।'

'একটাই কথা খেতে দিন।'

'স্যরি। আনছি।'

'নো স্যরি, যত ভালো ভালো খাবার আছে সব উজাড় করে আমার জন্যে নিয়ে আসুন। আজ কত তারিখ? কী বার?

'আজ ১৭ তারিখ, বুধবার।'

'মাই গড! ১৫ তারিখ দুপুরে শুটিং ফ্লোরে হালকা লাঞ্চ করেছিলাম। সন্ধে থেকে পার্টি। পার্টিতে সে অর্থে কিছু খাইনি। খাইনি বটে তবে প্রচুর নেশা করেছিলাম। সেই ১৫ তারিখ রাতের পর আজ ১৭। মাঝে প্রায় গোটা দুটো দিন আমি কিছু খাইনি। আজ অবশ্য জন্তু সেজে দুটো কলা!' মানুষটা চোখ নাচিয়ে হাসে।

নন্দিতা খাবার আনতে উঠে যায়। আটটা বাজতে দশ থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে নন্দিতা স্যুপ, কিছু সসেজ, ব্রেড টোস্ট, অমলেট, দুটো রুটি, ভাত করে ফেলেছে। ফ্রিজ থেকে বের করে নিল চিলি পনির, মাছ ভাজা। মানুষটা কী খাবে সে জানে না। সব কিছুই দেওয়া ভালো, যা খায় খাবে।

নন্দিতা সবকিছু সাজিয়ে নিয়ে মানুষটিকে ডাইনিং রুমে ডাকল। মানুষটা এসে বসে গেল চেয়ারে। কোনও সংকোচ নেই। তারপর কোনও কথা না বলে দ্রুত খাওয়া শুরু করল। দ্রুত খাওয়া শুরু করলে কী হবে মানুষটা সবকিছুই খেল বেশ ধীরেসুস্থে। খেতে খেতে একবার নন্দিতার দিকে মুখ তুলে বলল, 'ডিনারে নো ফ্রুটস, নো ফ্রুট জ্যুস। থ্যাকংস। আমি বেশ কিছুদিন ফল খাব না। ফল দেখলেই আমার ওই ঘরটার কথা মনে পড়ে যাবে।'

খাওয়া যখন প্রায় শেষের দিকে মানুষটা বলল, 'আপনি কিন্তু বেশ সংযত। আমাকে দেখে উঃ আঃ করেননি। অনেক দিন পরে আপনার ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছে আমি একজন কেউ না, কিচ্ছু না, আমি একদম আগের মতো একজন আমআদমি।'

নন্দিতা ঠিক বলার মতো কোনও কথা খুঁজে পেল না, মানুষটাকে কোথায় যেন দেখেছে, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছে না। তবে বড় চেনা!

নন্দিতা খুব আস্তে আস্তে বলল, 'আপনি লাস্ট খেয়েছেন শুটিঙে বললেন না, গত পরশু?'

নন্দিতা যেন শুটিং কথাটা থেকেই মানুষটার পরিচয় বের করে নিতে চায়। মানুষটা খাওয়া থামাল, বলল, 'আমার মনে হয় সত্যি সত্যি আপনি আমাকে চিনতে পারেননি।' কথাটা বলে মানুষটা ঘরের ভেতর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল, কিছু যেন খুঁজছে। বেশ কিছুটা দূরে ওয়াশ বেসিনের সামনে একটা আয়না। মানুষটা খাওয়া ফেলে উঠে গেল বেসিনের সামনে, আয়নায়। আয়নায় নিজের মুখ দেখতে দেখতে বলল, 'এই দুদিনে কি আমি এত পালটে গেছি যে আমাকে চিনতে পারছেন না? হ্যাঁ, সেভ করা হয়নি। বাথরুমে নতুন রেজার নেই। কিন্তু তা সত্বেও আমাকে চেনা যাচ্ছে না বলছেন?'

নন্দিতা চুপ করে থাকে। মানুষটা আবার খাওয়ার টেবিলে ফেরে। শেষটুকু খায়। তারপর খুব চিন্তামগ্নের মতো হাত মুখ ধোয়। বলে, 'আপনার ডিনার শেষ করে আপনি ওই ঘরে আসুন। আপনার টিভি কোন ঘরে আছে? আমি টিভি দেখব, নিউজ চ্যানেল। আর নিউজ পেপারগুলো আমাকে একটু দিন। আমার অনেক কাজ।'

নন্দিতা ওকে একটা অন্য ঘরে নিয়ে যায়। বলে, 'আপনি এখানে রেস্ট নিন, আমি আসছি।'

'টিভি, টিভি কোথায়?' মানুষটা অধৈর্যের গলায় বলে।

'আমি টিভি দেখি না। বড় টিভি আছে নীচে। আর-একটা ছোট টিভি আমার স্বামীর ঘরে আছে। টিভি দেখতে হলে আপনাকে ওখানে যেতে হবে। নিউজ পেপারও নীচে। আমাকে নীচে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে। আপনি একটু ওয়েট করুন।'

'প্লিজ আমাকে আপনার স্বামীর ঘরে নিয়ে চলুন। গত দুদিনে কী হল আমাকে জানতেই হবে। আমি একদম অন্ধকারে—অন্ধকার কেটে আমাকে বেরুতেই হবে।' মানুষটা উঠে দাঁড়িয়ে ছটফট করে।

নন্দিতা তাকে নিয়ে যায় রজতের ঘরে। দীর্ঘদিন তাদের দুজনের আলাদা ঘর। পাশাপাশিও নয়। সম্পূর্ণ উলটো দিকের আরও দুটো ঘর পেরিয়ে নন্দিতার ঘর।

রজতের ঘরে এসে ও সোফায় বসে। নন্দিতা টিভি চালায়। সাউন্ড কম। নন্দিতা বলে, 'সাউন্ড খুব বাড়াবেন না। এই যে রিমোট।'

'আমার দুদিনের নিউজ পেপার চাই।' মানুষটার গলার স্বর উত্তেজনায় কাটা কাটা।

'আপনি বসুন। আমি আসছি।'

নন্দিতা ডাইনিং রুমে আসে। টেবিল পরিষ্কার করে। নাহলে কাল ভোরে কাজের লোক এসে কোনও সন্দেহ করতে পারে। নীচে গিয়ে নন্দিতা খবরের কাগজগুলো নিল। নীচে নামা মানে দুটো তালা, খোলা এবং বন্ধ করে সে দোতলায় উঠে এল। খবরের কাগজ কটা নিয়ে সে রজতের ঘরের সামনেই চলে এসেছিল। কিন্তু কী মনে হতে সে একটা খবরের কাগজ খুলল। আর তখনই এক ঝটকায় পরিষ্কার হয়ে গেল তার বাড়িতে কে।

নন্দিতা খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে স্তম্ভিত!

সুপারস্টার আবেশ শর্মা!

এটা আজকের খবরের কাগজ। কাগজের ওপরে বিশাল করে খাঁচার মানুষটার ছবি। নন্দিতা চিনেছে, এখন সে চিনতে পারছে, এর ছবি তো সে দেখেছে। কোথাও না কোথাও, টিভিতে, খবরের কাগজে, পথ চলতে চলতে সিনেমার পোস্টারে, দেখেছে, সে অনেক বার দেখেছে, বারবার দেখেছে। অথচ সামনে থেকে যেন চেনা যায় না! একদম অন্যরকম! মুখের ওপর সেই উজ্জ্বল আলো নেই। চুলের ভেতর সেই উড়ু উড়ু উৎসব নেই। মুখে মাখানো জলুস নেই। তবু একটু খেয়াল করলে চেনা যায়। অন্তত এটুকু যে-কেউ বলবে—লোকটাকে পুরো আবেশ শর্মার মতো দেখতে। অথচ নন্দিতার কিচ্ছু কিচ্ছু মনে হয়নি। দামি ড্রেসে মোড়া একজন পুরুষমানুষই ভেবেছে।

নন্দিতা দেখছে সুপার স্টার আবেশ শর্মা—চিন্তামগ্ন হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে। নীচে লেখা ফাইল চিত্র : গরিবরাজ সিনেমার দৃশ্য। কিন্তু তার ওপর বড় বড় হরফে লেখা :

নেশাগ্রস্ত আবেশ শর্মার গাড়ির নীচে ঘুমন্ত সাত

নন্দিতা দ্রুত খবরটা পড়তে শুরু করে।

সংবাদপত্রটি লিখছে, সুপার স্টার আবেশ শর্মা মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে ফুটপাতে শুয়ে থাকা একটি পরিবারের সাতজনকে চাপা দিয়ে পলাতক।

নন্দিতা জানছে, মধ্যরাতে একটা পার্টি থেকে ফিরছিলেন আবেশ শর্মা। তাঁর সঙ্গে ছিল আরও তিনজন। দুজন মহিলা ও একজন পুরুষ। দুজন মহিলার মধ্যে একজন নায়িকা পামেলা। ইদানীং পামেলার সঙ্গেই হালকা মনকষাকষি চলছিল আবেশ শর্মার। আর একজন মহিলা দক্ষিণী নায়িকা বাসন্তিকা। পুরুষ সঙ্গীটি হলেন আবেশ শর্মার 'গুন্ডাগর্দি' সিনেমার পরিচালক তরণী পাল সিং। ঘটনার সময় আবেশ শর্মার পাশে ছিলেন পামেলা। গাড়ি চালাচ্ছিলেন আবেশ শর্মা। চার জনেই ছিলেন নেশাগ্রস্ত অবস্থায়। শুধু মদ নয় আরও কিছু নেশা করেছিলেন তাঁরা। আবেশ শর্মা প্রচণ্ড স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সেন্ট্রাল পার্কের ওভারব্রিজ থেকে নেমে তাঁর গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উঠে যায় ফুটপাতে। সেই ফুটপাতে রাস্তার ধারে ঝুপড়ির বাইরে-ভেতরে মিলিয়ে একটা পরিবারের আটজন শুয়েছিল। শর্মার গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে সাতজনই মারা যায়। এর মধ্যে চারজন বাচ্চা। গাড়ি অ্যাকসিডেন্টের পর পরই শর্মা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবেশ শর্মা সহ বাকি তিনজনের কোনও চোট-আঘাত লাগেনি।

মূল খবরের পাশে আর-একটা খবর। গাড়ি অ্যাকসিডেন্টের পর নাকি পুলিশ আসে। সেইসঙ্গে খবর পেয়ে হাজির হয়ে যায় আবেশ শর্মার সেক্রেটারি মুকুন্দ রায়। এই মুকুন্দ রায় আর পুলিশের যোগসাজশেই আবেশ শর্মা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। শর্মাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য সেই পুলিশ অফিসারকে মুকুন্দ কয়েক লক্ষ টাকা দিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। পুলিশ অফিসারটিকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। বিষয়টি বিভাগীয় তদন্ত হবে বলে পুলিশ কমিশনার জানিয়েছে।

প্রথম পাতায় আরও একটা ছোট খবর। শুধু কি মদ? অ্যাকসিডেন্টের সময় আবেশ শর্মা যে অবস্থায় ছিলেন, তাতে প্রত্যক্ষদর্শীর মতে শুধু মদ নয়। আবেশ শর্মা আরও অন্য ধরনের নেশা করেছিলেন।

অন্য এক সূত্র জানাচ্ছে, সেদিন শর্মার ঘনিষ্ঠ একজনের বাগানবাড়িতে রেভ পার্টি ছিল। আর এই গোপন রেভ পার্টিতে হাজির ছিলেন জনা তিরিশ। পার্টি চলার কথা ছিল সারা রাত। সেই পার্টি থেকে রাত দুটো দশ-পনেরো নাগাদ আবেশ পামেলাকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন। ওঁদের সঙ্গ নেয় তরুণ পরিচালক তরণী পাল সিং ও দক্ষিণী নায়িকা বাসন্তিকা। অনুমান এই চারজনেই রেভ পার্টিতে বিভিন্ন মাদক গ্রহণ করেছিলেন। মাদকজাতীয় নেশা থেকেই এই বিপত্তি। রেভ পার্টি কী? বিস্তারিত ভিতরে।

নন্দিতার সারা শরীর কাঁপছে। তার বাড়িতে সুপারস্টার আবেশ শর্মা? নাকি একজন পলাতক খুনি! নন্দিতার কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। এতদিন সে মুখ বুজে সাড়ে তেরো নম্বরের গোপন কুঠুরিতে রজতের পাঠানো জানোয়ারের দেখভাল করত। আজ রজত সত্যি সত্যি একটা হিংস্র জানোয়ার পাঠিয়েছে! যে সাতজন মানুষ খেয়ে এখানে লুকিয়ে রয়েছে। তার লুকোনোর সঙ্গী হয়ে উঠেছে নন্দিতার স্বামী রজতকান্তিও। নন্দিতার বমি এল। ওয়াক তুলল শব্দ করে। তারপর নিজেকে সামলে সে দরজা ঠেলল রজতকান্তির ঘরের।

অন্ধকার ঘরে টিভির লালচে আলো পড়ে আবেশ শর্মার মুখটা রক্তাক্ত লাগছে।

আবেশ শর্মা বলল, 'নিউজ পেপার এনেছেন? সব পেপারে ফার্স্ট পেজে নিশ্চয়ই আমি। সুপারস্টার আবেশ শর্মা!'

আবেশ হাসল। বলল, 'টিভিতে দেখুন। সব নিউজ চ্যানেলগুলো আমাকে নিয়ে পড়েছে। বাস্টার্ডগুলো আমাকে কেটে ছিঁড়ে ফরদাফাঁই করে দিচ্ছে। দুদিন আগে আমার একটা বাইট নেওয়ার জন্য ল্যা ল্যা করে ঘুরত। এখন আমার বিপদ নিয়ে বিজনেস করবে।'

আবেশের চোখ মুখ রাগে ফেটে যাচ্ছে। নন্দিতা দেখল দাঁতগুলো আধো অন্ধকারে রক্ত মাখানো, চিকচিক করছে।

আবেশ শর্মা জিব বের করে হিংস্র জন্তুর মতো ঠোঁট চাটল।

আবেশ শর্মা একটার পর একটা নিউজ চ্যানেলে ঘুরছে। নন্দিতা বলল, 'যিনি আপনাকে এ-বাড়িতে নিয়ে এসেছেন, এটা তাঁর ঘর। আপনি আজ রাতে এ ঘরেই থাকুন।'

আবেশ শর্মা টিভির খবর থেকে মুখ না ফিরিয়ে বলল, 'আজ রাত শুধু নয়, আমি আগামী বেশ কয়েকদিনই মনে হয় আপনার অতিথি।'

'আমার নয়। বলুন রজতকান্তি মজুমদারের।'

'খুব সাহসী কিন্তু আপনার হাজবেন্ড। এত বড় বাড়িটায় আমার সঙ্গে আপনাকে রেখে গেল?' আবেশ একটু ইঙ্গিতপূর্ণ হাসল।

নন্দিতা ম্লান হাসল, 'আমার হিংস্র জন্তুজানোয়ারের সঙ্গে থাকা অভ্যেস আছে।'

'আপনার আছে, আমার কিন্তু নেই। আমার খুব ভয় করে—আমি মেয়েদের যখন-তখন খুব হিংস্র হয়ে উঠতে দেখেছি। আশা করি আপনি তেমন নন। আমার ওপর হামলা চালাবেন না নিশ্চয়।'

'আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। অবশ্য তার আগে আমি রজতের সঙ্গে একটু কথা বলে নেব।'

'কী কথা বললেন? বলবেন আমি তার কথামতো গোপন কুঠুরিতে থাকিনি। তার অবাধ্য হয়ে খাঁচা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছি, এখন তার ড্রেস পরে, তার ঘরে বসে আছি? বলবেন আমি ফল ছেড়ে চিকেন মাটন ট্রাই করছি? আমি ওর সুন্দরী স্ত্রীকে পুরোপুরি ম্যানেজ করে খাঁচার বাইরে এসে নিজের মতো জীবনযাপন করছি—?'

নন্দিতা ভারী গলায় বলল, 'না, আপনি আমায় ম্যানেজ করতে পারেননি। আমি যখন বুঝলাম ওই কুঠুরিতে আমার স্বামী একজন মানুষকে আটকে রেখেছে, তখনই আমি ডিসিশন নিই—আমি তাকে মুক্ত করে দেব। সে কে, কী তার পরিচয়, সে আমার সঙ্গে কথা বলল, না বলল না? সে আমার কাছে হাসল, না কাঁদল? সব কিছু গৌণ ছিল। আমার সঙ্গে আমার হাজবেন্ডের একটা না-বলা-কথা ছিল, সেটা হল—ওই ঘরে কোনও বুনো জানোয়ার আসবে। তার ও আমাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এই গোপন খাঁচার ব্যবস্থা। কিন্তু ওখানে যে একটা জন্তুর মতো মানুষ ঢোকানো হবে তা আমাকে বলেনি। রজত অবশ্য কোনও দিনই কোনও কিছু বলে না। তবু না বললেও অনেক কিছু আমি করেছি, এটা পারব না। রজত বললেও আমি করতাম না।'

'আপনি করেননি। আমাকে খাঁচা থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন। বরং আপনি একটু ওয়েট করুন, এখনই কিছু বলবেন না। দেখুন না আপনার পতিদেবতা নিজে থেকে কিছু বলে কি না? হয়তো উনি মুকুন্দদের চাপে, টেনশনে একরকম ভেবেছেন। কিন্তু আজ বা কাল সামলে উঠে বলবেন—তুমি ওকে খাঁচা থেকে বের করো, তুমি জানো না উনি কে? উনি লক্ষ লক্ষ মেয়ের একজন স্বপ্নের পুরুষ!' আবেশ শর্মা হাসে। বলে, 'উনি যেমন খেলছেন—আপনি একটু খেলুন। যাকে বলে সেয়ানে সেয়ানে—। উনি যখন বলবেন—আপনি তখন ওঁকে পালটা চমকে দেবেন।'

আবেশ শর্মা চুপ করে থাকে। অনেক কিছু ভাবে। বলে, 'ওঁকে যা বলার আমি চলে যাওয়ার পর বলবেন। নয়তো আমি ওঁকে গুছিয়ে বলব। আসলে ওঁর হয়তো কিছু করার ছিল না। মুকুন্দ বা পুলিশ বা আমার আরও আরও কোনও নাম না জানা শুভানুধ্যায়ীদের কাছে আমাকে লুকানোর মতো, তক্ষুনি সেই মুহূর্তে ব্যবস্থা করার মতো কোনও অপশন ছিল না—। না-হলে এতক্ষণ আমি জেলে পচতাম। মুকুন্দ খুব দ্রুত ব্যবস্থা করেছিল। আমার তখন একটু চেতনা ফিরেছে। গাড়ি থেকে আমাকে রেসকিউ করে পুলিশের গাড়িতে বসিয়ে একটু দূরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমার কিছু করার ছিল না, মাথা কাজ করছে না। নেশার ঘোরে এই হুঁশ আছে তো, এই সব উড়ে যাচ্ছে। তারমধ্যে আমার ঘাড়ের কাছে বসে পামেলা আর বাসন্তিকা নিজেদের মধ্যে দোষারোপ করা শুরু করেছে। পামেলা চিৎকার করছে—তুই কেন ওকে স্পিড স্পিড করে তাতাচ্ছিলি? বাসন্তিকা বলছিল—গাড়ি ড্রাইভ করছে, তার মধ্যে তুই কেন ওর গায়ের মধ্যে হামলে পরছিলি? ওদিকে তরণী হাউহাউ করে কাঁদছে। সব মিলিয়ে নরক গুলজার! জানেন এই অবস্থায় একজন পুলিশ কনস্টেবল লুকিয়ে চুরিয়ে পট পট করে আমার ছবি তুলছিল। আমি জানি, এ ছবি কী ভয়াবহ হতে পারে। কোনও চ্যানেল পেলে, বা যে-কেউ ইন্টারনেটে ছেড়ে দিলে আমার হুলিয়া বেজে যাবে। ছবি উঠছে অথচ ওই মেয়ে দুটো কিছু বলছে না। আমি হুঁশ হতে দেখেই পুলিশটার মোবাইলটা কেড়ে নিলাম। সে আমার আর মুকুন্দর কথার মাঝে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফিরে পাওয়ার জন্যে অপক্ষা করছে। আসলে সে আমাদের সব কথা শুনছে। মুকুন্দ ধরে ধরে ছবিগুলো ডিলিট করছিল। তারমধ্যেই আমি মাথা ঠান্ডা রেখে মোবাইলটা মুকুন্দর কাছ থেকে চাইলাম। ভেতর থেকে সিম ও মেমরি কার্ডটা বের করে, মোবাইলটা আছাড় মেরে ভাঙলাম। কনস্টেবলটিকে বললাম, মুকুন্দ তোমাকে তিনগুন দামি মোবাইলের টাকা দিয়ে দেবে। আর আমি বাড়ি ফিরি—তুমি মুকুন্দকে ফোন করে এসো বাপ—তখন যত খুশি আমার ছবি তুলো—আমি তোমার জন্য পোজ দেব।

এর মধ্যে মুকুন্দ বলল, 'তুমি এই গাড়িতে ওঠো, তোমাকে আপাতত একজনের বাগানবাড়িতে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারপর অন্য কোথাও সরিয়ে রাখা যাবে।' আমি বলেছিলাম—আর এ-দেশে থাকব না। বিদেশ! মুকুন্দ বলল, 'সেটা কাল।' ও বলল, 'পুলিশ সেটিং হয়ে গেছে। বড় ঝামেলা হল মিডিয়া। ওরা কতখানি খবর পেয়েছে জানতে হবে। হাজার একটা ক্যামেরা, হাজার একটা মুখ। সবগুলো সংবাদ-শকুনি! কী ভয়াবহ সিচ্যুয়েশন হতে পারে কারও ধারণা নেই।' ওরা সব অন্য গাড়িতে উঠল। আমি অন্য একজনের গাড়িতে উঠলাম। চলে গেলাম একটা ফার্ম হাউসে। তখন আমার নেশার ঘোর কাটেনি। যে যা বলছিল করছিলাম। মাঝে একবার মুকুন্দের গলা শুনলাম—ওকে এই শহরে রাখা যাবে না। বিদেশে পাঠাতে পারলে ভালো হত। ভোরেই যদি নেপালে পাঠানো যেত। সেখান থেকে...দেখা যাক। আপাতত শহর থেকে সরে যাক। শুনছিলাম এয়ারর্পোট যাব। তারপর নেপাল। কিন্তু আমাকে নিয়ে যাবে কী করে। এত চোখ! আমাকে লুকোনো বড় সহজ কথা নয়। আমি লুকিয়ে রাখার মতো জিনিস নই। একমাত্র মেকআপ করলে ভিলেনই চিনতে পারে না। বাদবাকি সবাই চেনে।' আবেশ হাসে। হাসতে হাসতে বলে, 'আমি শুনেছিলাম কফিন বক্স...ডাক্তার...। তারপর কোথায় গেলাম, কী হল, কিছুই টের পেলাম না।'

আবেশ শর্মা ঘরের সিলিঙের দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে, 'যখন হুঁশ এল দেখলাম ছোট্ট একটা ঘরে মেঝের ওপর শুয়ে আছি। অদ্ভুত সে ঘর। প্রথমে ভাবলাম, আমার পালানো হয়নি। এটা জেলের কুঠুরি। জানলা নেই। দরজা নেই, যেন আমাকে ওপর দিয়ে ঢেলে দেওয়া হয়েছে। আসলে আমি তখনও নেশায়, আচ্ছন্নতায়, তরলের মতোই হয়েছিলাম। আমার ফেলে দেওয়া নয়, ঢেলে দেওয়ার কথাই মনে হয়েছিল। তরলের মতো টলটল করছি। আমি মাথা তুলতে পারছি না। আমার কোনও শরীর নেই। শুধু ফিনফিনে একটা অনুভূতি, আমি বেঁচে আছি। হুঁশ আছে, সেই সঙ্গে প্রবল মাথার ব্যথা। তাকাতে পারছি না। কিন্তু আমি জানি আমাকে উঠতেই হবে। উঠতেই হবে। আমি পারব। আমি অনেক খারাপ সময় কাটিয়েছি। কী খাব, কোথায় থাকব ঠিক ছিল না, তারপর আমি জিতেছি। লড়াই করে জিতেছি। এতদিন ধরে তিল তিল করে একটাই তো গড়েছি—আমার মুখ, এ চেহারা ড্রয়িংরুম টু বাথরুমে নিয়ে গিয়েছি। আজ তা আমার বড় বিড়ম্বনার—লুকানো কি সহজ কথা? আসলে আমিও মনে মনে তাই চাই। সবাই আমাকে চিনুক, আমি আগুনের মতো যেখানে রাখবে ধোঁয়া হয়ে দেখা দেব। আমি জলের মতো অবিরাম ছিদ্র খুঁজে নেব।'

কথা বলতে বলতে হাত তোলে আবেশ শর্মা। বলে, 'আজকের মতো কথা শেষ। আমি ঘুমাব। কাল সকাল থেকে প্ল্যানিং। অনেক কাজ। শুনছি, দেখছি গাড়ি চাপা দিয়ে আমি সাতজন মেরেছি। দেখুন তার সঙ্গে আমি নিজের নামটাও জুড়ে দিয়ে আটজন করে দিতে পারি না। ওটা অ্যাক্সিডেন্ট। সেইসঙ্গে সুইসাইড করে নিজের নামটা ঢোকাব না। মিস্টার শর্মা তুমি সুপারস্টার, তোমাকে বেঁচে থাকতেই হবে। আপনি কী বলেন?'

নন্দিতা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার সমস্ত বোঝাপড়া সবার আগে রজতের সঙ্গে। কেন রজত তার সঙ্গে এই জঘন্য খেলাটা খেলল? জন্তুজানোয়ারের থেকেও হিংস্র একটা খুনিকে এ-বাড়িতে ঢোকাল?

আবেশ বলল, 'কী এত ভাবছেন? আর ভাববেন না প্লিজ। আমি আপনার মুখ দেখে বুঝতে পারছি আজ রাত্তিরটা আমি নিশ্চিন্ত। আমি ঘুমাব। কোনও রকম নেশা ছাড়াই ঘুমিয়ে পড়ব। শুধু একটা উপকার করতে হবে—আমাকে একটা ব্রাশ দিতে হবে। আমি ব্রাশ না করে আর থাকতে পারব না। নিজেকে কেমন যেন সত্যি সত্যি জানোয়ারের মতো লাগছে।'

নন্দিতা বলল, 'আমার স্টকে এক্সট্রা ব্রাশ নেই। কাল সকালে এনে দেব।'

'না, আমার আজ রাতেই চাই। মাউথ ওয়াশ কিছু আছে? তাহলেও চলবে।'

'আমার কাছে ওসব নেই। আমি কী করে দেব?'

'তাহলে রাতে আমার ঘুম আসবে না। ব্রাশ না করলে সত্যি আমার মুখের ভেতরটা কেমন জন্তু জন্তু মনে হচ্ছে। কত রাত হয়েছে? সবে দশটা বাজতে দশ। কিছু ব্যবস্থা করে যায় না?'

'না, যায় না। ব্যবস্থা করা গেলে আমি করতাম। আর শুনুন, ঠিক দশটা বাজলে রজত ফোন করবে। আমাকে ফোনটা ধরতে হবে। আপনি দরজা বন্ধ করুন। গুড নাইট।'

নন্দিতা কথা শেষ করে দাঁড়ায় না। মানুষটা ঝড়ের বেগে কথা বলে। সব যেন ওর মুখস্থ করা। পার্ট বলছে। যেন বাস্তব কিছু না। যেন সব কিছু বানানো। ও সব কথায় কেমন অকপট! ও যখন কথা বলছে, নন্দিতা শুনছে—কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। কিন্তু নন্দিতার মনটা কঠিন হয়ে গেছে। আবেশ শর্মার দু'হাত রক্তাক্ত! আবেশ শর্মা হিংস্র! জানোয়ারের থেকেও জানোয়ার!

নন্দিতার ফোন বাজল। বাজল না, নড়ে উঠল। ভাইব্রেটরে দেওয়া ছিল। ঠিক দশটা। রজতের ঈষৎ জড়নো, ভারী গলা, 'সব ঠিক আছে?'

নিয়মমতো নন্দিতা কথা বলল না। রজত কি ওর নিঃশ্বাসের শব্দ পায় ফোনে? তাতেই কি হ্যাঁ অথবা না বোঝে?

রজত বলল, 'একবার ওই ঘরের নীচের দিকের কলগুলো থেকে জল ফ্লো করিয়ে দিও।'

নন্দিতা এখনও চুপ। তার বুকের ভেতর গরগর করছে। আজ তার চুপ থাকার কথা নয়। সে সব ক্ষোভ উগড়ে হুংকার দেবে ভেবে রেখেছিল। এমনও ভেবেছিল খাঁচার মানুষটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে, সে-ও বেরিয়ে পড়বে এ-বাড়ি থেকে। আর পারছে না। এই মিথ্যে সংসার আর তার নয়। এখানে কিচ্ছু নেই, কিচ্ছু নেই। পাখিগুলো ছিল। আজ তাও যেন ছেড়ে যাচ্ছে তার বুকের ভেতর থেকে। জানোয়ার ঘাঁটতে ঘাঁটতে রজত যে জানোয়ারের থেকে অধম হয়ে গেছে। একটা খুনিকে বাড়ির ভেতর লুকিয়ে রেখেছে—জানোয়ার সাজিয়ে। ছিঃ!

রজত বলল, 'শোনো এখানে একজন দুর্দান্ত লোকের দেখা পেয়েছি। লোকটা ম্যাকাওয়ের ডিম থেকে বাচ্চা করেছে। সারা ভারতের চেন্নাই ছাড়া কোথাও ম্যাকাওয়ের ডিম ফোটে না। দেখা যাক, আমি বাড়ি ফিরে একটা ট্রাই করব।'

রজতের জড়ানো স্বর থেকে আশ্চর্য উচ্ছ্বাস ছিটকে ওঠে। নন্দিতার কান আজ বুজে আছে বুকের ভেতর আগুন লাগা ছাইয়ে। সে যেন কোনও কথায় স্বাদ পায় না।

রজত বলে, 'কনসাইনমেন্টটা রিলিজের জন্যে আমি বলেছি। এবার খুব ভালো প্রফিট থাকবে। আজ ফার্স্ট ডে, আরও দিন তিন-চার লাগবে। কলাটা বেশি দিও। আপেল দিও। আপাতত এই দাও। ভেতর থেকে একটু বেশি সাউন্ড হতে পারে। তেমন হলে পাশে ঘরের সাউন্ড সিস্টেমে হিন্দি গান চালাবে। তাহলে ওর আওয়াজটা কানে লাগবে না। টেনশন কোরো না। বাবা ঠিক আছে?'

'হ্যাঁ।'

'গুড নাইট! খেয়ে শুয়ে পড়ো। বাই। গুড নাইট!'

ফোন কেটে যায়, স্ক্রিনের আলো নিভে আসে।

হাতের মুঠোয় ফোন নিয়ে নন্দিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। বারান্দার পাশে রাস্তা। এই রাস্তাটার পরেই একটা মজা খাল আছে। তাতে বর্ষায় কিছুটা পরিষ্কার জল দেখা গেলেও বাদবাকি সময় কালো নোংরা ঝিম জল। উত্তুরে হাওয়া এলে খাল থেকে পচা গন্ধ বুকে করে বয়ে আনে। খালের দিকের রাস্তায় সন্ধের পর মানুষজন একটু কম যাতায়াত করে। এদিকে দু-একবার ছিনতাই হয়েছে। গোলমাল হয়েছে। অনেকেই মনে করে রাতে এই রাস্তা ততটা নিরাপদ নয়। সন্ধের পর অনেকেই একটু ঘুরে পাড়ার ভেতর দিয়ে যায়। এই রাস্তার ওপর বেশ কতগুলো ঝুপড়ি আছে। তাতে দেশি মদের ঠেক। সেখানে জুয়ার বোর্ড বসে। বেশ অনেক রাত পর্যন্ত ওখানে হইহই চলে। নন্দিতা জানে রজত পারে পুলিশকে বলে সব সাফ করে দিতে। লোকাল কাউন্সিলারকে বলে রাস্তায় ঠিকমতো আলো দিয়ে, নিরাপত্তা দিয়ে সন্ধের পর মানুষের যাতায়াতের মতো করে তুলতে। কিন্তু রজত এসব ব্যাপারে চোখ বুজিয়ে থাকে। নন্দিতার মনে হয়, তা সম্পূর্ণই নিজের স্বার্থে।

নন্দিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকল চুপ করে। তার খিদে পাচ্ছে না। ঘুমও না। অথচ কাল সারারাত সে প্রায় ঘুমায়নি। মৃদু হাওয়া আসছে খালের ওপার থেকে। চোখে-মুখে পাখির পালকের স্পর্শের মতো লাগছে।

এখনও রজত ফোনে তাকে সত্যিটা বলল না। বলল না, সাড়ে তেরো নম্বর ঘরে এক হিংস্র পশু আছে—তবে সে মানুষ রূপে! সে তো নন্দিতাকে বোঝাতেই পারত, সে অসহায়—কোনও এক চাপের মধ্যে পড়ে তাকে এটা মেনে নিতে হয়েছে।

তবে রজত কতদিন একজন সেলিব্রিটি সুপারস্টারকে পশুর খাঁচায় ফল খাইয়ে, ঘুমের ওষুধ মেশানো জল খাইয়ে লুকিয়ে রাখত? প্রথমত মানুষ যখন, সে ফল খেয়েও হয়তো চুপ করে থাকত। কিন্তু মুখ ডুবিয়ে চৌবাচ্চার জল সে খেত না। জল না খেলে সে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে থাকত না। রজতের বোঝা উচিত তখনই সে নিজের গলায়, মানুষের ভাষায় কথা বলতে চিৎকার করতে শুরু করত। আর তার চিৎকার কেউ না শুনুক নন্দিতার কানে ঠিক আসত।

বোকা, মূর্খ রজত, তার এই বোকামির কোনও মানে নেই। এর আগে এই খাঁচায় নানা প্রজাতির বাঁদর এসেছে, হনুমান এসেছে। তারাও ফল খেয়ে, জল খেয়ে বুনো ভাষায়, পশুর গলায় চিৎকার করেছে। নন্দিতা শুনেছে। কিন্তু তাদের ভাষা জানে না বলে নন্দিতা বোঝেনি তারা কোন দেশের, কী তাদের জাত, কী তার দুঃখ, কী তার কষ্ট!

কিন্তু মানুষের গলায় শুধু আওয়াজ নেই। তারা যে জাতেরই হোক চিৎকার করলে, কথা বললে অদৃশ্য ওপার থেকে যে-কেউ বুঝতে পারবে ওদিকে মানুষ আছে। এভাবে কি কোনও মানুষ রাখা যায়? আর এ তো ভারত বিখ্যাত একজন সেলিব্রিটি! একে কিডন্যাপ করে আনা হয়নি। অনেক বুদ্ধি, অনেক টাকা খরচ করে একে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। যাকে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে সে তো সম্পূর্ণভাবে সম্মত। তাহলে রজত কেন নন্দিতার সঙ্গে এই খেলাটি খেলল? বরং সে তো পরিষ্কার থাকতে পারত, বলতে পারত—আবেশ শর্মা আমাদের বাড়িতে লুকিয়ে থাকবে। তুমি একটু দেখো। ব্যস, নন্দিতার কী করার আছে তাতে।

নন্দিতার মনে হয় সে এ-বাড়িতে স্রেফ একজন কেয়ারটেকার। তার বেশি কিছু নয়। এবার তার দিন ফুরিয়েছে এ বাড়িতে, তাকে যেতে হবে। কবেই সে চলে যেত, শুধু ওই পাখিঘরের টানেই সে এ বাড়িতে পড়ে আছে।

হঠাৎ তার মনে হল, রজত কী বলল, 'যার সঙ্গে দেখা হয়েছে সে ম্যাকাওয়ের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়েছে!' উত্তর আমেরিকার পাখি ভারতের শহরে এসে ডিম পাড়বে—সেই ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটাবে! বাহ! কত রং ম্যাকাওয়ের—দেখতে দেখতে দু'চোখ জুড়িয়ে আসে। দু'চোখের কাছে জেব্রার মতো দাগ টানা টানা! এখন পাখির ঘরে রজতের আটটি ম্যাকাও আছে। রজত বলে, ম্যাকাওয়ে যত রঙের খেলা তত দাম! কদিন আগে এক জোড়া বিক্রি হয়েছে। নন্দিতা জানে, যদি বড় কনসাইনমেন্ট আসে, সেটা যাওয়ার সময় আরও ছোট ছোট অনেক কিছু তার সঙ্গে যায়। ক'দিন ধরেই দেখছে লালা, পিন্টু ম্যাকাওয়ের ঘরে প্রচুর খাটছে। নিশ্চয় বড় কনসাইনমেন্টের সঙ্গে দু'চারটে ম্যাকাও যাবে এবার।

ম্যাকাওয়ের কথা ভাবতে ভাবতে নিজের মনকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল নন্দিতা। হল না। তার সমস্ত চিন্তা চেতনা ফুঁড়ে ওই লোকটা আবার ভেসে উঠল। সত্যি কি লোকটা আজ রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাবে? যে দু'দিন আগে মত্ত অবস্থায় সাতজন মানুষকে মেরেছে তার চোখে এত সহজে ঘুম আসবে? নন্দিতার মনে হয় ওই নরখাদক পশুটির ঘুম আসতে পারে একমাত্র ওই সাড়ে তেরো নম্বর ঘরের জল খেয়ে। হঠাৎ নন্দিতার মনে হল তার পাশে কেউ যেন দাঁড়িয়ে।

নন্দিতা ঘুরতেই আবেশ বলল, 'একটা ব্রাশ জোগাড় করতে পারলেন না। আজ রাতে আমার ঘুম আসবে না।' আবেশ হাসল, 'আমার নেক্সট কোনও মুভিতে এরকম একটা সিকোয়েন্স রাখব—হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ ব্রাশ। আর ব্রাশের ব্রিসলসের ভেতর ঘুরে ঘুরে আমি আর হিরোইন গান করছি। আপনার নিশ্চয় তখন আজকের দিনটার কথা মনে পড়বে।'

'আমি সিনেমা দেখি না।'

'কোনওদিন দেখেননি?'

'আগে দেখেছি। অনেক বছর আর দেখিনি।'

'আমার কোনও মুভি?'

'না।'

'আপনার জন্মই বৃথা। তাই জন্যে আপনি হাসতে পারেন না, মজা করতে পারেন না। এমন গোমড়া হয়ে থাকেন। আমি মানে ফুল এন্টারটেনমেন্ট। মুভি দেখো, হাসো, কাঁদো, আনন্দ করো, চলে যাও। পকেট থেকে মানি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাথা থেকেও কয়েক ঘণ্টার জন্যে দুঃশ্চিন্তা টেনশনের বিদায়। আপনি সবসময় ভাবেন, এটা হলে ওটা হবে, সেটা হলে...।'

'না।' নন্দিতা স্পষ্ট গলায় আবেশ শর্মাকে থামায়।

আবেশ শর্মা আবার হাসে, বলে, 'সব ওপরওয়ালা—সে খেলছে, নাচাচ্ছে, আমরা নাচছি। আমি এভাবেই জীবনকে দেখি। আমি যেটা করেছি, সেটা আমার হাত দিয়ে সেই ওপরওয়ালাই করিয়েছেন। আমি তাঁর সন্তান, আবার তাঁর কৃপাতেই বেঁচে উঠব। আমি সহজে ফিনিশড হব না। কিন্তু একটা ব্রাশ আমার চাই। বিশ্বাস করুন না হলে ঘুম আসবে না। আসলে সত্যি বলছি ব্রাশটা এখন আমার শুধু দাঁতের জন্যে নয়, আমার জন্যে চাই। আমার জন্যে। এটা আমার মাথায় ঢুকে গেছে। আপাতত এটাই আমার লক্ষ্য। লক্ষ্য আমার স্থির হয়ে গেছে। আমাকে আজ রাতে দাঁত মেজে ঘুমোতে হবে।'

'ব্রাশ নেই।'

'আছে। আপনি আপনার ব্রাশটা দিন। আমি তাতেই দাঁত মাজব। প্লিজ। আজ রাতে ব্রাশ না পেলে আমার হারা শুরু হবে। আপনার ব্রাশটা দিন—একটা সুন্দরী মেয়ের ব্রাশ আমার দাঁতের ওপর যখন ভায়োলিন বাজাবে ঈশ্বর তখন আমাকে বাহবা দেবেন। বলবেন—আবার তুই জয়ী। তুই সুপারস্টার!'

নিয়মমতো ভোর সাড়ে চারটেয় ঘুম ভেঙে গেল নন্দিতার। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে এক প্রবল অস্বস্তি চেপে ধরেছে। এক বাড়িতে জেনেশুনে সে এক খুনির সঙ্গে একটা রাত কাটিয়ে ফেলল। পাখি! পাখি আর নাম-না-জানা জন্তুর সঙ্গে সে এ-বাড়িতে অনেক রাত কাটিয়ে এসে এক খুনির সঙ্গে থাকল? তার ভালোবাসার প্রতিদান দিল রজত। তবে এই শেষ—রজত আর পারবে না। এ-বাড়ির সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে যাবে সে। কোথায় যাবে, কী করবে সে জানে না। তবে চলে যাবে। এত বড় পৃথিবীতে কি তার স্থান হবে না?

ঘুম থেকে উঠে সে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। তখনই হালকা গলায় শুনল, 'গুড মর্নিং।' দেখল আবেশ শর্মা। আবেশের পরনে ছোট একটা হাফ প্যান্ট, গায়ে টি শার্ট। নন্দিতা তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে, আবেশ বলল, 'আমি আপনার হাজবেন্ডের ওয়ারড্রোবটা ইউজ করছি। প্লিজ কিছু মনে করবেন না।'

নন্দিতা দাঁতে দাঁত চাপল। না, সে কেন আপত্তি করবে? রজতকান্তি, রজতের সঙ্গে তার যে ফিলিং ছিল তা একটু একটু করে ছেড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কাল এক ঝটকায় সমস্ত সুতো যে ছিঁড়ে গেছে। আবেশ শর্মাকে সে রজতের বিছানায় শুতে দিয়েছে, ওয়ারড্রোব না-হয় ব্যবহারই করল।

'ফিরে গিয়ে আমি রজতবাবুর ওয়ারড্রোব নতুন করে সাজিয়ে দেব।' কথা শেষ করে আবেশ হাসল। হেসে এগিয়ে এল, তারপর ফিসফিস করে বলল, 'একটু ছাতে যাওয়া যাবে—হাত-পা ছুড়তাম। এভাবে চব্বিশ ঘণ্টা বসে থাকলে বুড়িয়ে যাব। আমি বুড়িয়ে গেলে আপনিও এমন করে তাকাবেন না।'

নন্দিতা সত্যিই মানুষটার দিকে তাকিয়েছিল—একটা মানুষ এতগুলো মানুষ মেরে এমন নিশ্চিন্ত আচরণ করতে পারে? ওর কোনও অনুতাপ নেই? মানুষ মারা অনুতাপে ওর তো হাত-মুখ গুঁজে গুমরে থাকার কথা, বর্ষার থেকেও বেশি কাঁদার কথা, ভূকম্পনের থেকেও বেশি তোলপাড় হওয়ার কথা। তা নয়, একদম সহজ, স্বাভাবিক হয়ে আছে? কে বলবে মানুষটা লুকিয়ে! আর সারা দেশে এই মুহূর্তে তাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা! কাল আবেশ শর্মা যখন চ্যানেল সার্ফিং করছিল, নন্দিতা এক ঝলকে দেখেছে সমস্ত নিউজ চ্যানেলেই তার ছবি, তাকে নিয়েই আলোচনা। সবাই খুব সরব। শুধু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিজের লোকজন মুখে কুলুপ এঁটে বসে। নন্দিতা একটা কমেন্টে শুনেছে, 'আবেশ ভালো মানুষ—। সেদিন কী হয়েছে আবেশের মুখ থেকে না শোনা পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করব না।'

নন্দিতা তো আবেশের মুখ থেকে শুনেছে...।

আবেশ বলল, 'ছাদে কি যাওয়া যায় ম্যাম? কাল আমার শুটিং ছিল না, কাল আমার লেট নাইট পার্টি ছিল না, কাল কোনও দুষ্টু-মিষ্টি গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে দুর্ধর্ষ রাত ছিল না, নেশা নেই, ঘুমের ওষুধ নেই, আশ্চর্য এক ঘুমের রাত কাটিয়েছি। আমি এখন ভোরটাকে এনজয় করতে চাই।'

নন্দিতা বলল, 'ওসব ছিল না—কিন্তু আপনার যে টেনশন ছিল!'

আবেশ শর্মা হাসল, 'আমি সুইচ অফ অন করতে জানি ম্যাম। বিশ্বাস করুন। কাল প্রথম কয়েক মুহূর্ত আমার খুব টেনশন হচ্ছিল। তারপর আপনার ব্রাশে দাঁত মাজতে মাজতে আমি সমস্ত টেনশন ফেনা করে ঘুমাতে গিয়েছি। আর প্লিজ আমার জন্যে একটা ব্রাশ এনে দেবেন।'

'আপনি একটা লিস্ট করে দিন। আর কী চাই—সেভিং সেট।'

'না, আর কিচ্ছু না। দাড়ি বড় হয়ে যাক, চুল এবড়ো-খেবড়ো হয়ে যাক। এখন যত আমি আমার থেকে মুছে যাব তত আমার টেনশন কমবে। তারপর স্বরূপে ফিরে আসতে কতক্ষণ। এখন লুকিয়ে থাকতে হবে। চলুন যদি অসুবিধে না থাকে, ছাদে গিয়ে একটু এক্সারসাইজ করি। তারপর আমাকে এখন প্রতি সেকেন্ডে মনে মনে অনেক হাত-পা ছুড়তে হবে।'

কথাটা বলে, আবেশ একটু থামে। নন্দিতার দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে, 'আপনি আমার এই কথাটা থেকে নিশ্চয় ভাবলেন—আমি একজন জলে পড়া মানুষ, ডুবে যাচ্ছি। বেঁচে থাকার জন্যে, ভেসে থাকার জন্যে, নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্যে হাত পা ছুড়ছি। তাই তো? ম্যাম আপনি কিন্তু ভুল বুঝলেন। আমি আবেশ শর্মা, আমি জলে পড়া মানুষ নই। আমি হাত-পা ছুড়তে চাইছি কারণ চারদিকে এখন অনেক খেলা, এই খেলা আমাকেও খেলতে হবে। আমাকে দু'হাতে ঘুঁটি চালাতে হবে। দান দিতে হবে। আমি এটাকে একটা গেম হিসেবেই নিয়েছি। আমাকে জিততে হবে। যেভাবেই হোক জিততে হবে। যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে, আমাকে তা আঁকড়ে থাকলে চলবে না।'

'আর মানুষগুলো, যাঁরা মারা গেলেন?'

'ওটা অ্যাকসিডেন্ট। আমি কমপেনশিয়েট করব। টাকা দেব। যত টাকা বলবে!'

'অতগুলো জীবনের দাম টাকায়...!'

'কেন নয় ম্যাম? প্রতিটা টাকায় আমার ঘাম আছে, পরিশ্রম আছে, আমার কষ্টার্জিত টাকা। তা ছাড়া যখন লাইনের সিগনালিংয়ের ভুলে ট্রেন অ্যাকসিডেন্ট হয়, যখন যান্ত্রিক গোলযোগে বিমান দুর্ঘটনা হয়, তখন কী হয়? কারও জেল, কারও ফাঁসি হয়? বড় জোর সাসপেন্ড হতে পারে, চাকরি চলে যেতে পারে? ইনশিওরেন্স পান? টাকা? আমাকেও শাস্তি দেওয়া হোক, আমি আর কোনও দিন গাড়ি চালাব না। আমার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ নিয়ে আমাকে কাজ করতে দেওয়া হোক। এটা সহজ ভাবনা। তারপর আছে গেম—। গেম। মানি গেম। টাকার খেলা। মুকুন্দ এতক্ষণে তা শুরু করে দিয়েছে।' আবেশ হাসে। 'আমার টাকা আছে ম্যাম, এই দেশে টাকা দিয়ে সব কিছু কেনা যায়। এই গেমটাই আমি খেলব।'

নন্দিতা কোলাপসিবল গেটের তালা খোলে। 'ছাদে নয়, তিনতলায় চলুন, ওখানেই এক্সারসাইজ করবেন।'

ছাদে গিয়ে নন্দিতা ফ্রিঞ্চের খাঁচার ভেতর ঢোকে। একটু দূরে সরে গিয়ে আবেশ শর্মা শরীরচর্চায় মেতে ওঠে। ভোরের হাওয়ায় বেশ ঠান্ডা ভাব। পাখির কলকাকলিতে জেগে উঠেছে পৃথিবী। আবেশ শর্মা আজ খালি হাতেই শরীরচর্চা করে চলে। ভীষণ দ্রুত থেকে ভীষণ দ্রুততর হয়ে ওঠে সে। তার আপাত শান্ত শ্লথ শরীরে একটু একটু করে পেশি জেগে ওঠে। কিছুক্ষণ পরেই তার সারা শরীর দিয়ে দর দর করে ঘাম নামে। মাথার ভেতর ঝিলিক ঝিলিক ঝলসে ওঠা ভাবটা কেটে যায়। ডন দিতে দিতে আবেশ শর্মা নিজেকে ডাকে, বৈঠক দিতে দিতে নিজেকে তাতায়। 'আই অ্যাম দ্য বেস্ট!' সমস্ত টেনশন ছাড়িয়ে, সমস্ত ক্লান্তি সরিয়ে তাকে আবার এগিয়ে যেতে হবে। ওই রাতটা, একটি মাত্র রাত, তার বেশি কিছু নয়। একটা রাতে সে কারও ভয়ংকর ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু এতটা জীবন সে তো অনেক মানুষকে আনন্দ দিয়েছে। আবেশ জানে একবার ভেঙে পড়লে সে চুরমার হয়ে যাবে। তার এতদিনের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য চূর্ণ-বিচূর্ণ হযে যাবে। কেন এমন হল আবেশ, স্টিয়ারিংটা কেন ঘুরে গেল? অ্যাকসিডেন্ট! অ্যাকসিডেন্ট ছাড়া আর কিছু নয়। নেশা নয়, মত্ততা নয়, স্টিয়ারিং ঘুরে গিয়েছিল, আর কিছু নয়। দুর্ভাগ্য ওদের ওরা ওখানেই শুয়েছিল। দুর্ভাগ্য আবেশের সে গাড়ি চালাচ্ছিল। আবেশ পা ছোড়ে, যেন আকাশে ঠেকিয়ে দেবে। এত নেশা করে আমার স্টিয়ারিঙে বসা উচিত হয়নি। রিল লাইফ আর রিয়েল লাইফে তুমি গোলমাল করে ফেলেছ। আবেশ শরীর মোচড়ায় যেন ছিলা থেকে তির হয়ে ছিটকে যাবে। লাইফ ইজ স্ট্রেনজার দেন ফিকশন! তার হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে, তার শিরা-উপশিরায় রক্ত ছুটছে। রক্ত! রক্ত! রাতের অন্ধকারে রক্তের রং বোঝা যায় না, কিন্তু ভোরবেলা এত রক্ত এল কোথা থেকে। চিটচিট করছে ঘাম। প্রথম সূর্যের রশ্মি পড়েছে! আবেশ ঘাড় তুলে নন্দিতাকে খুঁজল। সার সার পাখির খাঁচা। ভেতরে হালকা অন্ধকার। খাঁচার ঘরে ঘরে ঢুকে দেখছে কোথায় নন্দিতা? হঠাৎ নজর পড়ল একটা পাখির খাঁচায় নন্দিতা পদ্মাসনে বসে। তার মাথায়, মুখে, বুকে, কোলে, পিঠে, সারা গায়ে পাখিরাও চুপ করে বসে আছে। আবেশ শব্দ করল না। ওর মনে হল, বসে-বসে নন্দিতা ঘুমিয়ে পড়েছে। ও কি ধ্যান করছে? প্রাণায়াম! আবেশ এমন ছবি সারা জীবনে দেখেনি। এমন একটা দৃশ্য দেখার জন্যেই যেন সে এ-বাড়িতে এসেছে। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ওর মনে হয় নন্দিতার নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে পাখিগুলো উঠছে, নামছে...।

একটু করে নন্দিতা জাগে। খুব ধীরে ধীরে গায়ে লেগে থাকা গোলাপ পাপড়ির মতো পাখিগুলো ওড়ায় তারপর বেরিয়ে আসে খাঁচা থেকে। আবেশ ফিসফিস করে...'ম্যাম, এই ধ্যান আমাকে শিখিয়ে দেবেন?'

নন্দিতা কথা বলল না। তার কাছে আবেশের কথা ছেলেমানুষের মতো শোনাল।

আবেশ বলল, 'আমিও কি পাখির খাঁচায় ঢুকতে পারি?'

নন্দিতা ওর মুখের দিকে তাকাল।

'ওগুলো কী পাখি?

'ফ্রিঞ্চ।'

'ওরা কি এই খাঁচায় জন্মেছে?'

'ওদের দেশের বাড়ি অস্ট্রেলিয়া।'

'ওদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব করিয়ে দেবেন? ওরাও আমার গায়ে মাথায় বসবে। পাখি আর পাখিতে আমার শরীর ঢেকে যাবে। কেউ আর আবেশ শর্মাকে চিনতে পারবে না। আমি পাখিদের মাঝে লুকিয়ে থাকব।' আবেশ হালকা গলায় কথাটা বলে।

'ওরা খুব পলকা। আপনাকে সহ্য করতে পারবে না। '

'পলকা মানে—আমার সিক্স প্যাক মাসলে ওরা কি আহত হবে?'

'ফ্রিঞ্চ হল মৃত্যুর পাহারাদার! ওদেরকে ব্রিটিশরা নিয়ে এসেছিল এদেশে। খনি শ্রমিকরা ওদের নিয়ে খনি গহ্বরে নামত। ওখানে সামান্য গ্যাস লিক হলেই ওরা সবার আগে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। ওরা পারবে না আপনাকে সহ্য করতে। আপনি এখানে ঢুকলেই বলা যায় না হয়তো ওরা সবাই হলুদ পাতার মতো খসে যাবে।'

'ম্যাম আমি একজন অ্যাক্টর! শিল্পী! আমার ভেতর কোথাও বিষাক্ত গ্যাসের চিহ্ন লেগে নেই—।'

'আপনার গায়ে রক্তের গন্ধ! ওরা সহ্য করতে পারবে না মিস্টার শর্মা।'

'কী বলছেন ম্যাম!' ঠকঠক করে আবেশ শর্মা কাঁপে। তার শরীরের এক-একটা মাসলে যেন ওলটপালট চলে। 'ম্যাম রক্তের গন্ধ নেই কোনও বিশ্বাস করুন। ওটা অ্যাকসিডেন্ট। আমি কাউকে মারতে চাইনি। ওটা হয়ে গেছে। এখন আমার দিকে সবাই আঙুল তুলছে। ক'দিন যাক। দেখবেন সবাই ভুলে গেছে। আমি সুপারস্টার। কেউ আর আমার গা থেকে রক্তের গন্ধ পাবে না। খুশবু পাবে, খুশবু!'

নন্দিতা হাসল, 'ঠিক বলেছেন। সবাই খুশবু পাবে। মৃত মানুষগুলোর গায়ের ঘামের গন্ধ মুছে এখন থেঁতলানো রক্ত মাংস মজ্জার গন্ধ। ওদের গায়ে সামান্য অগুরু ঢেলে দেওয়ারও লোক নেই। এদিকে আপনি সুপারস্টার! তাই পুরো খবরের কাগজটাই আপনাকে নিয়ে লেখা হবে। ওদের জন্যে বরাদ্দ বড়জোর এক কলাম।'

'তাই তো হওয়ার কথা ম্যাম। এটা ভুল হওয়ার নয়। আলো যেদিকে সবাই সেদিকেই তাকায়। আমি আপনি কোন ছাড় অবোধ গাছও তাই করে।'

নন্দিতা ম্লান হাসে, মনে মনে বিড়বিড় করে—অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো...।

'আপনি কিছু বলছেন ম্যাম?'

'না তেমন কিছু নয়। নীচে চলুন এতক্ষণে খবরের কাগজ এসে গেছে। আশা করি, আজও সারা কাগজ জুড়ে আপনি থাকবেন মিস্টার শর্মা!'

'তাই তো থাকার কথা, আমি আবেশ শর্মা!' হঠাৎ আবেশ বলে, 'ম্যাম আমি যদি স্টিয়ারিংটা বাঁ-দিকে ঘুরিয়ে ফুটপাতে না তুলে দিয়ে ডানদিকে ঘোরাতাম। তাহলে নির্ঘাত একটা অন্যরকম ভয়ংকর অ্যাকসিডেন্ট হত। সেখানে আমরা মারা যেতে পারতাম। জখম হতে পারতাম। যদি মারা যেতাম সবাই আমার জন্যে কাঁদত। যদি জখম হতাম, সবাই আমার জন্যে দোয়া মাঙত। কী কপাল আমার, কান্না-দোয়া দূরে থাক, আমি কারও সহানুভূতি পেলাম না। আর এখন আমি যেন ট্র্যাপিজের খেলা দেখাতে ওপরে উঠেছি, সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ ভাবছে ব্যাটা পড়বে। আমি কিন্তু দেখতে পাচ্ছি আমি পড়ব না—আমি হাউই হয়ে এগিয়ে যাব। একটা অ্যাকসিডেন্ট আবেশ শর্মার জীবন ঠিক করে দিতে পারে না।' আবেশ শর্মা হাসে।

এখনও হাসি আসে মানুষটার! ফোন আসে রজতের। মানে সকাল ছ'টা বাজে।

'সব ঠিক আছে?'

নন্দিতা নিশ্চুপ।

'নিশ্চয়ই হুঁশ এসেছে? খাবারও খেয়েছে?'

নন্দিতা উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না।

'কাল, নাহলে পরশু রিলিজড হয়ে যাবে। বাবার শরীর ভালো আছে তো?'

'হ্যাঁ।'

'ঠিক আছে। প্রয়োজন পড়লে ফোন কোরো। বাই। রাতে ফোন করব।'

'দরকার না থাকলে ফোন কোরো না।' খুব স্পষ্ট গলায় নন্দিতা কথা বলল। 'যদি আমার দরকার থাকে আমি তোমাকে ফোন করব।'

'ঠিক আছে। বরং তেমন বুঝলে তুমি ফোন কোরো। আর আমি রিলিজড অর্ডার এলেই জানাব। বাই।'

ওরা নীচে যায়।

আবেশ বলে, 'ম্যাম ব্রাশটার কথা ভুলে যাবেন না। প্রয়োজনে কাউকে ফোন করে দিন, সে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে।'

নন্দিতা লালাকে ফোন করে একটা ব্রাশ আনতে বলল। লালা আটটায় আসবে। আবেশ বলল, 'আমাদের তাহলে আটটা পর্যন্ত দাঁত ব্রাশ করা যাবে না।'

খবরের কাগজ এল একটু পরে। নন্দিতা আজ নীচের থেকে সমস্ত কাগজ নিয়ে ওপরে এল। বলল, 'এই নিন, আজ সব কাগজে আপনি। আপনার আশা পূর্ণ হয়েছে—সারা কাগজ জুড়ে আবেশ শর্মা।'

আবেশ ম্লান হাসল। 'এই দেখুন ম্যাম, ঝুটা দিল-এর ফটোটা এরা ইউজ করেছে। ওরা কত সরেস দেখুন, এই মুভিটায় আমি অ্যান্টি হিরো, এখন ওরা ঠিক আমার এই ফটোই দিল।'

কাগজগুলো নিয়ে ঘরের দিকে চলে যাচ্ছিল আবেশ। নন্দিতা বলল, 'আটটা বাজলে কাগজগুলো আমাকে নীচে দিতে হবে। ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখুন। আমি চেয়ে নেব।'

ঘর মোছার লোক আসে, কাজ করে চলে যায়। আটটা বাজার অনেক আগেই আজ লালা আসে, 'ম্যাডাম ব্রাশ।'

ব্রাশটা নিয়ে নন্দিতা রজতের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। মৃদু টোকা দিতেই দরজা খোলে আবেশ। 'এই নিন ব্রাশ।'

'আমার তো ব্রাশ আছে।'

'আপনি যে সকাল থেকে ব্রাশ ব্রাশ করছিলেন।'

'আমি যে আপনারটা নিয়ে নিয়েছি। ওটা তো আর আপনাকে ফেরত দেওয়া যাবে না। এটা আপনার।'

নন্দিতা ব্রাশটা হাতে নিয়ে চলে যাচ্ছিল, পিছন থেকে শুনল, খুব হালকা গলায় আবেশ শর্মা বলল, 'থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম।'

নন্দিতা খুব জোরে নিঃশ্বাস নিল। ওর অনেক দিন পরে মনে হল, ওর জন্যে কেউ ভাবছে। সত্যিই তো ওর মনে ছিল না, ওরও একটা ব্রাশ দরকার।

আবেশ শর্মা বলল, 'আমায় কিছু খেতে দেবেন।'

নন্দিতা পিছন দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, 'ওয়েট করুন, আসছি।'

সে নীচে গিয়ে নিজের ব্রেকফাস্টটা নিল। খাবার নিয়ে এসে রজতের ঘরের দরজায় টোকা দিল। দরজা খুলেই খাবার দেখে বাচ্চা ছেলের মতো লাফিয়ে উঠল আবেশ শর্মা। 'উঃ! কী খিদে পেয়েছে।'

কিন্তু দু'পিস বাটার টোস্ট দেখে আবেশ শর্মা খুব মুষড়ে পড়ল। 'আমার দু'পিস টোস্টে হবে না, আরও একটু হলে ভালো হত।' আবেশ ইতস্তত করে।

'কিন্তু আর এখন হবে না। আমি যে দু'পিসই খাই।'

'এটা কি আপনার ব্রেকফাস্ট—আমায় দিয়ে দিচ্ছেন? না, ম্যাম এটা আপনি খান। আমায় বিস্কিট দিন, কেক দিন, আমার হয়ে যাবে। আমি শুকনো খাবার খুব প্রেফার করি।'

'এটা আপনি খান। আমি অন্য কিছু খেয়ে নেব।' নন্দিতা বলল। 'আমি বাড়ির বাইরে যাচ্ছি। ঘর ছেড়ে বের হবেন না।'

সে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। অনেকদিন পরে বাজারে গিয়ে ব্যাগ ভরে বাজার করল গুছিয়ে। এক ডজন ডিম, দু'পাউন্ড পাউরুটি, বাটার, চিকেন সসেজ, চিকেন, পিঁয়াজ, আদা, রসুন, বেশ কিছুটা টক দই কিনল। কিন্তু বাজার শেষ করে হঠাৎ তার মনে হল—সে এ কী করছে, একটা খুনির জন্যে বাজার করছে?

নন্দিতা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকল। মিষ্টির দোকানদার বলল, 'বউদি আর কিছু লাগবে?'

'না।'

নন্দিতা বাড়ি ফিরে পাউরুটি টোস্ট করল। এগ পোচ বানিয়ে রজতের দরজায় টোকা দিল। দরজা খুলল, আবেশ শর্মা। সে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। বলল, 'এই মাত্র টিভি নিউজে বলল—আমায় ল'ইয়াররা আজই কোর্টে দাঁড়াচ্ছে। তারা লোয়ার কোর্টে আমার জামিন চাইবে। নিউজ চ্যানেলটি বলছে—আমি জামিন পেয়ে যাব। মুকুন্দ সব ম্যানেজ করে ফেলেছে। মুকুন্দ খুব এফিশিয়েন্ট! ও সব পারে, সব। না-হলে আমাকে এভাবে পাচার করে দেয় সবার নাগালের বাইরে!'

নন্দিতা ধীর পায়ে ফিরে আসে। ওর মনের ভেতর উথালপাতাল হচ্ছে। তাহলে কি আবেশ শর্মাই ঠিক! সব কিছু টাকা দিয়ে করে নেওয়া যায়। দুপুরে নন্দিতা একটা প্লেটে ছ'টা কলা আর দুটো আপেল নিয়ে দাঁড়াল রজতের ঘরের দরজার সামনে।

'না, না, আমি ফল খাব না।'

'কিন্তু আমাকে যে রজত আপনার জন্যে এই ডায়েটই বলেছে।'

'এ হয় না ম্যাম।'

'মিস্টার শর্মা আপনি এ-বাড়ি থেকে চলে যান। সত্যি বলছি আপনাকে আমি সহ্য করতে পারছি না।'

'কেন ম্যাম আমি কী করেছি?'

'আপনি মানুষ খুন করেছেন।'

'খুন নয় ম্যাম, অ্যাকসিডেন্ট। টিভি খুলুন, অনেকেই তা বলছে। একটু পরে হয়তো আমি জামিন পেয়ে যাব। আপনার এখান থেকেই হয়তো আমি হুডখোলা গাড়িতে হাত নাড়তে নাড়তে বাড়ি ফিরব।'

'কিন্তু ওই মানুষগুলো? তারা তাদের বাড়ির সামনে শুয়েছিল। তারা আর কোনওদিন জেগে উঠবে না। আপনি আবার নেশা করবেন, আবার গাড়ি চালাবেন, আবার আপনার গাড়ির তলায় কেউ না কেউ পিষে যাবে।'

'ওটা অ্যাকসিডেন্ট ম্যাম। আমি ওটা ভুলে যেতে চাই।'

'আপনি পারবেন না।'

'কেন পারব না ম্যাম, আপনি আবেশ শর্মাকে চেনেন না! এই তো আমি দিনে তিন প্যাকেট সিগারেট খেতাম। ক'দিন সিগারেট খাই না, আমি সব নেশাও ছেড়ে দেব। আমি আর গাড়িও চালাব না। মানুষ বুঝতে পেরেছে ওটা একটা অ্যাকসিডেন্ট! মানুষ তাই বলছে। শুধু কোর্টে জামিন হলেই, ব্যস!'

'না, বেশিরভাগ লোক তাই বলছে না। বেশিরভাগ লোক বলছে,—আপনি খুনি। আপনি নেশা করে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। আপনার গাড়ির চাকায় মানুষ মরেছে।'

'হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি মানুষ মেরেছি, আমি জানি। তা সত্বেও আমি কোনও পশু নই। আমি কোনও পশুর খাবার খেতে পারব না।'

'স্যরি, তাহলে আমার কিছু করার নেই। আপনাকে পশু খাদ্য ছাড়া আর কিছু দিতে হবে তা আমাকে কেউ বলেনি।'

আবেশ শর্মা হাত তুলল, 'ওকে, আপনি ফিরে যান। দুপুরের লাঞ্চ আমি শুধু ফল দিয়ে করতে পারব না।'

'আমি আবার বলছি, এ-বাড়ি থেকে আপনি চলে যান।'

'যাব, চলেই যাব। আমি ওদের কাউকে ফোন করতে পারছি না, ওদের সব ফোন ট্যাপ করা হয়েছে। এই নিয়ে হইচইও হচ্ছে। আমি একটা ফোন করলেই সে ফোন থেকে কোথায় আছি ধরা পড়ে যাব। আপনি খবরের কাগজ পড়েন না, টিভি দেখেন না, দেখলে বুঝতেন আমি ঠিক কী?' আবেশ শর্মা হাসে। 'আমি সিনেমায় অনেক জেলে গেছি কিন্তু বাস্তবের জেলে আমি যেতে পারব না ম্যাম। আমার মন বলছে, আমি জামিন পেয়ে যাব। কাঁচা কাজ মুকুন্দ করবে না। সেদিনই পুলিশকে টাকা খাইয়ে মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল, আজ ও সব কিনে নেবে। আমি জামিন পেয়ে যাব। কেস চলবে বছরের পর বছর...।' আবেশ শর্মা হাসে। 'তবু আমি কমপেনশেট করতে চাইছি। যা টাকা চায় দেব।'

নন্দিতা বলল, 'আপনার ফল রইল। খিদে পেলে খাবেন।'

'আমি ফল খাব না কিছুতেই।'

'আমি অন্য কিছু দিতে পারব না।'

আবেশ শর্মা হাসল, 'আমাকে দেবেন না, আর আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে আপনি ভালো মন্দ খাবেন? দেখা যাক।'

দুপুরে নন্দিতা খেল না। খেতে ইচ্ছে করছে না তার। মনে হচ্ছে ফোন করে রজতকে। তারপর প্রচণ্ড জোর চিৎকার করে। তার মাথার ভেতর কেউ যেন বুলডোজার চালাচ্ছে। শুয়ে থাকল চুপ করে। বিকেলের দিকে তার দরজায় টোকা দিল আবেশ শর্মা। টোকা দেওয়ার আওয়াজ শুনেই নন্দিতা বুঝল, কে তার দরজায় টোকা দিচ্ছে। সে বিছানা থেকে নেমে এসে দাঁড়াতে আবেশ বলল, 'ম্যাম আমি জামিন পাইনি। কোর্টের বাইরে আমার শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ চলছে। মানুষ খেপে গেছে।' আবেশ কাঁপছে, ওর মুখ শুকনো। বলল, 'ওরা আমাকে সত্যি সত্যি খুনি বলছে। আমি খুন করিনি। ইটস আ অ্যাকসিডেন্ট!'

আবেশ শর্মার ঘরের সামনের প্লেটে ছ'টা কলা, দুটো আপেল দিয়ে রেখেছে। পাশে ছিল এক বোতল মিনারেল ওয়াটার।

নন্দিতা সন্ধেবেলা দেখল, জলের বোতলটা নেই। বিকেল গড়ালে আবেশ এল নন্দিতার ঘরের সামনে। বলল, 'ম্যাম, রজতবাবু যখন ফোন করবেন আমাকে একটু দেওয়া যাবে? আমি আমার ডায়েটটা পালটে নেব।'

নন্দিতা চোয়াল শক্ত করে বলল, 'ওই ঘরে যারা থাকে তারা কথা বলতে পারে না। তারা ফোন করবে কী করে?'

আবেশ হাসে, 'আপনি জানেন ওই ঘরে জানোয়ার আছে, কিন্তু রজতবাবু জানেন ওই ঘরে কে আছে। হয়তো আপনার অস্বস্তির জন্যে সাহস করে বলতে পারেননি।'

'তাহলে কাল যখন আমি বলতে চাইছিলাম তখন বাধা দিয়েছিলেন কেন?'

'ভেবেছিলাম আজ সব ঠিক হয়ে যাবে। আজ যদি কোর্টে জামিন হয়ে যেত, তাহলে তখনই রজতবাবু হাসতে হাসতে আপনাকে বলে দিত, ওই ঘরের দরজা খুলে দাও। ওকে ইমিডিয়েট বিরিয়ানি-চাঁপ খাওয়াও।'

'রজত আমাকে কিছু বলেনি। বললেও তার সঙ্গে আমি তর্ক করতাম, তারপরও হয়তো খাওয়াতাম। জেনেশুনে একটা খুনির জন্যে আমি কিছু করব না।'

'শুনুন ম্যাম, আপনি একজন খুনির জন্যে করছেন না। আপনার বাড়িতে কোনও দু'টাকার খুনি এসে আত্মগোপন করে নেই। আপনার বাড়িতে যে আছে সে একজন সেলিব্রিটি, স্টার। সুপারস্টার আবেশ শর্মা। তাকে দেখার জন্যে মানুষ টিকিট কেটে দৌড়ায়। তাকে ছোঁয়ার জন্যে মানুষ স্বপ্ন দেখে। ক'দিন পরে এই ক'টা দিন আপনার স্বপ্ন বলে মনে হবে। আপনার কথা কেউ শুনলে বিশ্বাস করবে না।'

'আপনি নিশ্চিত থাকুন মিস্টার শর্মা আমি কারও কাছে আপনার গল্প করতে যাব না। এটা আমার রজতের সঙ্গে আমার শেষ বোঝাপড়া। তাই দাঁত চেপে আমি আমার কর্তব্য পালন করে যেতে চাই।'

'সেটা আপনি করুন। কিন্তু একটা কথা আপনাকে আমি মনে করিয়ে দিই আপনার হাজবেন্ড বিনা পয়সায় আমাকে এখানে রাখেনি। আমার জন্যে অনেক অনেক টাকা ডিল হয়েছে, তাই আবেশ শর্মাকে বাড়িতে রেখেছে। আপনি এক কাজ করুন। আমার জন্যে খাবার আনান। কত টাকার খাওয়ার এসেছে বিল বানান। আমি ওর টেন টাইমস আপনাদের ফেরত দেব। কাল থেকে অনেক ড্রামা করেছেন। আমি ওদিকের টেনশনে পারছি না। আপনি এদিকে আমাকে টেনশনে ফেলবার চেষ্টা করবেন না। প্লিজ! প্লিজ!' আবেশ শর্মা হাত জোড়ে।

'আপনি এ-বাড়ি থেকে চলে যান মিস্টার শর্মা।'

'স্যরি ম্যাম, আমি এখন এ-বাড়ি থেকে যেতে পারব না। রজতবাবুর সঙ্গে আমাদের কন্ট্রাক্ট হয়েছে, আমাকে সুস্থ শরীরে গোপন রাখবেন। তার জন্যে আপনারা টাকা পাবেন। টাকার অ্যামাউন্টটা নিশ্চয়ই কম নয়। কম হলে রজতবাবু এত রিস্ক নিতেন না। আমাকে রাখতে রাজি হতেন না। আপনার সঙ্গে এত বড় গেম খেলতেন না।'

নন্দিতা হাসল, 'আপনাদের এ সবকিছুই হয়েছে রজতের সঙ্গে। আর রজত আমাকে যা বলেছে আমি তাই করছি। তবে কেন আপনি আমার কাছে এসে এত কথা বলছেন!'

'আমি আপনার কাছে জামিনের জন্য বলছি না, আমি আপনার কাছে মদ বা মেয়েমানুষ চাইছি না। আমি মানুষ, তাই মানুষ যা খেতে পারে, যা খায়, তেমন খাবার চাইছি।'

'আমাকে রজত বলেছে ঘরের ভেতর কলা আর আপেল দিতে, জলে ঘুমের ওষুধ দিতে। আমার সঙ্গে এটাই আমার স্বামীর কন্ট্রাক্ট!'

'তাহলে আমাকে বের করেছেন কেন? আপনি তো কন্ট্রাক্ট ভেঙেছেন আপনার হাজবেন্ডের সঙ্গে।'

'খাঁচার ভেতর মানুষ দেখে আমি বের করেছি—।'

'তাহলে সেই মানুষটাকে পশুর খাবার দিচ্ছেন কেন?'

'কারণ সে স্বভাবে পশু।' নন্দিতা থামে, শান্ত গলায় বলে, 'আপনি আমাকে আজই দুপুরে বলেছিলেন কোর্টের বাইরে আপনার শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ হচ্ছে। আমার ভেতরেও আপনাকে নিয়ে বিক্ষোভ চলছে। এখন কী করে আমি আপনাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে খেতে দেব মিস্টার শর্মা? যারা কোর্টের বাইরে বিক্ষোভ করছে আপনি টিভি খুলে দেখুন আমিও তাদের মধ্যে আছি। আপনার প্রতি তাদের থেকে আমার রাগ বা ঘৃণা কম নয়।'

'আপনি আমাকে ঘৃণা করেন!' আবেশ শর্মা অবাক গলায় বলে। ফ্যাকাশে হয়ে তাকিয়ে থাকে নন্দিতার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নীচু করে চলে যায় ঘরের ভেতর।

সন্ধেবেলা ফল নেয়নি, জল নিয়েছিল। রাতে রজতের ফোন এল। ফোন ধরেই এপার থেকে নন্দিতা বলল, 'ওর রিলিজ কবে?'

'এখনও কোনও খবর হয়নি। তবে কাল-পরশু হয়ে যাবে।'

ভয়ংকর এক রাত কাটানোর জন্যে নন্দিতা প্রস্তুত হল।

সমস্ত কিছুর পরও মানুষটা কেমন হাসে!

নন্দিতা চোখ মেলে দেখল পাখির খাঁচার বাইরে আবেশ শর্মা দাঁড়িয়ে হাসছে। ভোরের নতুন আলো পড়েছে তার মুখে। সেই আলোমাখা মুখে এক মুখ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।

নন্দিতা আজ ভোর-রাতে বিছানা ছেড়েছে, কাল সারা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি। সে কি ঠিক করেছে, মানুষটাকে মানুষের মতো খেতে না দিয়ে? সে ভুল করছে না তো—রজত তাকে যে অপমান করেছে, সে কি ওই মানুষটাকে ফিরিয়ে দিতে চাইছে? ভোররাত থেকে সে এখানে বসে আছে। তার বুকের ভেতর উথালপাথাল। বার বার মনে হচ্ছে এ বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে যাবে সে। সে চলে গেলে কি এদের খুব অসুবিধে কিছু হবে? হবে না। শ্যামলী আছে বিনয়কান্তিকে দেখবে। রজত চলবে নিজের মতো। ওদের রক্তে পাপ! এই পাপে গৃহকর্তা বৃদ্ধ বিনয়কান্তির চোখ দুটি গেছে। রজতও কোনওদিন বাবা হতে পারবে না—এ-বাড়ির পাপকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করার জন্যে।

তবে কী সুখে এখানে সে পড়ে আছে? তার সব টান ভালোবাসা ওই পাখিঘর। এই পাখি, পাখিঘর দেখেই সে প্রেমে পড়েছিল রজতের। আর আজ?

আজ এই ভোরে পাখিঘরে বসে মন শান্ত করতে করতে তলানিতে এসে তার মনে হল—ভালোই হয়েছে এ পরিবারে আর সন্তান না এসে। হয়তো যে আসত পাপচক্রে সে-ও একদিন এই পাপ-ব্যবসায় মেতে উঠত।

আবেশ বলল, 'গুড মর্নিং ম্যাম।'

'গুডমর্নিং।'

'স্যরি ম্যাম, কাল কিছু বেফালতু কথা বলে ফেলেছি। আমায় ক্ষমা করে দেবেন।'

নন্দিতা ওর দিকে তাকাল না।

'আমার ভীষণ অপমানিত লাগছিল, তাই রেগে গিয়েছিলাম। সারা রাত ধরে নিজেকে বুঝছিলাম, আমি তো এখন রিল লাইফে নেই যে সব কিছু আমার ইচ্ছেমতো চলবে। রিয়েল লাইফ মানেই সেখানে মনের আধিপত্য বেশি, বক্স অফিসের কোনও মূল্য নেই।' আবেশ হাসে।

নন্দিতার মনে হল আবেশ শর্মা যেন পুরো চিত্রনাট্য রেডি করে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে।

আবেশ বলল, 'জানেন কাল আপনার সঙ্গে আজেবাজে কথা বলে যখন ঘরে গেলাম, তখন খালি মনে হচ্ছিল, আপনি যে হারে রেগেছেন আবার না পুলিশ ডেকে ফেলেন।'

নন্দিতার মনে হল বলে, ছিঃ আবেশ তোমার মনটা এত ছোট হল কী করে? বা বলে, এত ছোট মন নিয়ে তুমি এত অভিনয় করো কী করে?

'কিন্তু রাত যত গভীর হল তত বুঝতে চাইছিলাম নিজেকে। আমার মনে হচ্ছিল, আমি মানুষ নই—আমি আবেশ শর্মা। যে হাসে কাঁদে নখরাবাজি করে। সে হিট আর বক্স অফিস ছাড়া বোঝে না। আর আপনি মানুষ। স্যরি ম্যাম, আমি আবার ক্ষমা চাইছি।' আবেশ শর্মা মাথা নীচু করে। বলে, 'আমার তিনটে মুভিতে আমি অ্যান্টি হিরো। অ্যান্টি হিরোকে দর্শক ঘৃণা করে, রাগ করে, কিন্তু তারপর কোথাও তাদের জন্যে এক ফোঁটা কষ্ট পায়, সহানুভূতি দেখায়। ম্যাম মনে করুন, আমি এই প্রজেক্টের একজন অ্যান্টি হিরো। আপনি আমাকে ঘৃণা করবেন, রাগ করবেন। কিন্তু আমি ম্যাম আপনার অজান্তে আপনার ভালোবাসায় সিঁধ কাটব, দেখে নেবেন।'

'আমি জানি আপনি খুব ভালো অভিনেতা। অভিনয় করবেন তো—করুন।'

খাঁচার সামনে আবেশ শর্মা হাঁটু গেড়ে বসে, 'রিল নয়, এটা রিয়েল! আপনি বাস্তবে থাকবেন, আমি যদি সিলভার স্ক্রিনে ঘুরি তবে মিশবে কেন? আপনার মন আছে, আমার নেই?' আবেশ হাসে।

নন্দিতার হঠাৎ মনে হয় আবেশ শর্মার হাসিটা কষাইয়ের মতো!

'এটা কিন্তু এখন নয় ম্যাম, কাল রাতেই মনে হয়েছে। আমি যদি আবেশ শর্মা হতাম, কাল রাতে আমি তখনই গিয়ে আপনার দরজায় টোকা মেরে ডেকে বলতাম। কিন্তু আমি যে রিয়েলে ঢুকেছি। সেখানে সিনেমাটিক কিছু চলবে না, তাই সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করি বসে আছি। মধ্যরাতে পেটের জ্বালায় দুটো আপেল খেয়ে নিয়েছি। কিন্তু আপেল খেয়ে মনে হচ্ছে অ্যাসিড হয়ে গেছে। যদি সম্ভব হয়, আমাকে ক'টা অ্যান্টাসিড দেবেন। তবে আজ ভোর থেকে যে হারে এক্সারসাইজ করেছি, তাতে আর অ্যাসিড থাকবে না, আর থাকলে তাকেও মানিয়ে গুছিয়ে নিয়ে আমাকে চলতে হবে।'

'আমার কাছে অ্যান্টাসিড আছে, আমি নীচে গিয়ে দিচ্ছি।'

'ম্যাম আমি কাল রাতে আপনার শ্বশুরমশাইকে দেখলাম।'

'আমার শ্বশুরমশাইকে?'

'হ্যাঁ, উনি চাঁদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।'

'উনি অন্ধ মানুষ!'

'আমার কিন্তু মনে হল উনি চাঁদ দেখছেন। কাল পূর্ণিমা ছিল। পূর্ণিমা রাতের চাঁদ! জ্যোৎস্না ভরা আকাশ!'

'উনি দীর্ঘ দিন অন্ধ!'

'আপনার কি নিশ্চিন্ত অন্ধ মানুষ চাঁদ দেখতে পারে না?'

'ওটাই ওঁর বারান্দা, ওঁর বসার জায়গা! ওখানেই হয়তো বসে ছিলেন।' নন্দিতা আবেশের দিকে ফেরে, সন্দেহের গলায় বলে, 'আপনি ওদিকে গিয়েছিলেন কেন?'

আবেশ চুপ করে থাকল, তারপর ফিসফিস করল, 'স্যরি!'

'ওদিকে গিয়েছিলেন কেন—আপনার রজতের ঘরে থাকার কথা।'

'স্যরি ম্যাম, খুব খিদে পেয়েছিল। তাই আপনার কিচেনে ঢুকেছিলাম। একটা ব্রেড ছিল, ফ্রিজে বাটার ছিল, দেখলাম টুনা ফিশের একটা কৌটো, সব আমি চুরি করেছি। রাতটা হয়ে গেছে। আজ রান্না করে কিছু রেখে দেবেন ম্যাম। আমি চুরি করে খেয়ে নেব। জানোয়ারদের স্বভাবের মধ্যে পড়ে চুরি করে খাওয়া। এতে আপনার চুক্তি ভেঙে যাবে না।'

নন্দিতা বলল, 'আপনি খুব অন্যায় করেছেন। আজ উনি অন্ধ বলে আপনি এটা করলেন। এই সুযোগটা নিলেন!'

'আপনি কী বুঝবেন—পেটের বড় জ্বালা! জানেন ম্যাম অনেক দিন পরে আমি বুঝতে পারছি খিদে কাকে বলে। খিদে ব্যাপারটা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।' আবেশ চুপ করে যায়। তারপর কথা ঘোরাতে বলে, 'তবে আমার মনে হয়, আজই কিছু একটা হবে। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অনেক লোকজন সিএম-এর সঙ্গে দেখা করবে। হয়তো হাইকোর্টে কেস ফাইল করবে।'

নন্দিতা বলল, 'বাঃ, আশা করি আজ আপনি মুক্ত হয়ে যাবেন।'

'হ্যাঁ, মুকুন্দ নিশ্চয় আজ গুছিয়ে খেলতে নামবে। টাকা ছড়াও, মুকুন্দ টাকা ছড়াও। যা লাগে তাই দাও। যা যাবে দু'বছরে আবার তা কামিয়ে নেব। সব দিয়ে দাও, সব, আমাকে শুধু বেল পাইয়ে দাও। তারপর আমি গিয়ে তুড়ি মেরে বুঝে নেব।' আবেশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত-পা ছোড়ে। 'পুলিশ কী বলেছে—আমি নেশা করেছিলাম? প্রমাণ কী? দেখাও আমার কাজ ছিল, খুব কাজ, স্ক্রিপ্ট সাজাও, একটু অভিনয় করো বাপ। আমি খালাস পেয়ে এসে বহুত ইনাম দেব।'

নন্দিতা বলল, 'আপনি ঘরে যান মিস্টার শর্মা।'

'ম্যাম আপনারা সবুজ টিয়া পোষেন না?'

'কোনও দেশি পাখি পোষা যায় না মিস্টার শর্মা। সবুজ টিয়া দেশি পাখি। আমরা পুষি না।'

'এরা কি সব বিদেশি?'

'হ্যাঁ।'

'এরা ক্রেজ বার্ডস। ম্যাম আমি ফিরে আমার বাড়িতে একটা বিশাল পাখিঘর বানাব। রজতবাবুকে এই কন্ট্রাক্টটা দেব। সেখানে আমি রোজ ভোরে মেডিটেশন করব। আর এই দিনগুলোর কথা মনে করব। আচ্ছা, সে সময় আপনি আমার ট্রেনার হবেন?'

'রজতবাবু আপনার পাখিঘর বানিয়ে দেবেন। এটা ওঁর কাজ। কিন্তু আপনার মেডিটেশনে আমি থাকতে পারব না।'

'কেন থাকবেন না? তখন তো আমি জানোয়ার নই, আমি সুপারস্টার আবেশ শর্মা!'

'আমি মেডিটেশন কী জিনিস জানি না মিস্টার শর্মা।'

'তাহলে ওখানে খাঁচার ভেতর পাখিদের সঙ্গে বসে কী করেন?'

'পাখিগুলোর বুকের ধুকপুকানি শুনি।'

'তাতে মন শান্ত হয়? মন যদি শান্ত হয় তাহলে আপনি এত রাগী কেন ম্যাম? এত রাগ কোথা থেকে আসে আপনার?'

'সেটাও পাখিদের থেকে?'

'সেটা কী পাখি ম্যাম—রামায়ণের জটায়ু! রাবণের সঙ্গে লড়ে যাবে।'

'শুধু জটায়ু কেন, খুব শান্ত পাখিও ভয়ংকর রাগে ফেটে পড়তে পারে মিস্টার শর্মা। ওই যে সুন্দর পাখিগুলো দেখছেন, ওদের নাম কাকাতুয়া। অত সুন্দর পাখি। দাঁড়ে চুপ করে বসে থাকে। খাঁচাতেও শান্ত হয়ে থাকে। কিন্তু কখনও কখনও ওদের মেজাজ বড় তিরিক্ষে হয়। ওরা যখন ডিমে তা দেয়, তখন কেউ যদি সেদিকে তাকিয়ে থাকে তাতে ওরা প্রচণ্ড রেগে যায়। সেই রাগে কর্কশ ডাক দিয়ে ওরা নিজেদের ডিম পর্যন্ত ভেঙে ফেলে। ওরা রেগে বাচ্চাকে মেরে ফেলে। আবার স্বামী-স্ত্রী-তে মারামারি করে মরে যায়।'

'নিজের ওপর রাগ! রাবণের সঙ্গে লড়ার জটায়ু আছে ম্যাম?'

'আমাদের এখানে একটা কাকাতুয়া আছে। তার একশোর ওপর বয়েস। আমার শ্বশুরমশাইয়ের থেকেও অনেক বড়। শুনেছি তার জোড়াটা বিক্রি করে দিয়েছিলেন আমার শ্বশুরমশাই। সেই রাগে কাকাতুয়াটা একবার আমার শ্বশুরমশাইয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁর চোখ দুটি ঠুকরে নখ ঢুকিয়ে অন্ধ করে দেয়।'

'কী বলছেন ম্যাম!'

'কাকাতুয়াটা দাঁড়ে থাকে। আপনার ওকে দেখে খুব শান্ত মনে হবে!'

নন্দিতা ম্লানে হাসে।

বেলা বাড়ে। এক এক করে এ বাড়ির কাজের লোকেরা আসে। আবেশ হাসতে হাসতে বলে, 'কালকের চুরি করা ব্রেড বাটার আছে আমার কাছে। ব্রেকফাস্ট হয়ে যাবে। আপনাকে আমি টেনশন দেব না ম্যাম। নিন এবার একটু হাসুন!'

নন্দিতার হাসি আসে না মুখে, কথা বলে না কোনও। তার বার বার মনে হয় সে যেন রজত আর আবেশের খেলায় কেমন করে ফেঁসে যাচ্ছে। তাকে যে করেই হোক এর থেকে বের হতে হবে। নন্দিতার বারবার মনে হয় সাতজন মানুষকে গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে, পুলিশের ভয়ে আত্মগোপন করে ওই মানুষটা হাসে কী করে?

দুপুরবেলায় খেতে ডাকে ওকে।

লাফিয়ে খাবার ঘরে আসে আবেশ। বলে, 'বুঝলেন ম্যাম আমি আগেই আপনাকে বলেছিলাম, আমি এই কাহিনির অ্যান্টি হিরো। সব রাগ ঘৃণা নিয়েও আপনাকে আমার জন্য একটু কষ্ট পেতেই হবে।'

'সত্যি অ্যান্টি হিরোর চরিত্রে আপনি খুব ভালো অভিনয় করেছেন।' নন্দিতা কেটে কেটে কথাগুলো বলল।

'কাহিনি এখনও বাকি আছে ম্যাম, কাহিনি শেষ হোক তারপর নয় আমার জন্যে হাততালি দেবেন।'

'আপনি কথা বলেন খুব ভালো। মনে হয় স্ক্রিপ্ট রাইটার আপনার সঙ্গে-সঙ্গেই ঘুরছে।'

খেতে খেতে হাসে আবেশ। হাসতে হাসতে বিষম খায়। বলে, 'এটা আমার বউয়ের জন্যে হল—নির্ঘাত ও আমার নাম করছে!'

'কী নাম আপনার স্ত্রী-র?'

আবেশ খাওয়া থামিয়ে ওর দিকে তাকায়, 'সবাই জানে, আপনি জানেন না! দুর্গা! আমি সব কাজের আগে দুর্গা দুর্গা করে ঝাঁপ দিই আর উদ্ধার পেয়ে যাই। সেদিন রাতে দুর্গা দুর্গা করে স্টিয়ারিঙে বসিনি। পামেলা, পামেলা করে বসেছিলাম—দেখলেন তো তার ফল কী হল!'

নন্দিতা আবেশের দিকে তাকিয়ে আছে। তাড়া খাওয়া জানোয়ারের মতো লুকিয়ে থেকেও লোকটার রসবোধ কমছে না। কী ধাতু দিয়ে গড়া মানুষটা!

সন্ধেবেলায় নন্দিতাকে ডাকল আবেশ। বলল, 'ম্যাম দেখুন দেখুন আমার শুভানুধ্যায়ীরা সব মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীকে ওরা জানিয়েছে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আমার ওপর লগ্নি করা। আমি জেলে গেলে ওদের সুইসাইড করতে হবে।'

আবেশের চ্যানেল ঘোরায়, 'দেখুন ম্যাম, ওরা বলছে আমি বিদেশে পালিয়ে গেছি। কোন ফ্লাইটে কীভাবে গেছি সব নাকি তথ্যপ্রমাণ ওদের হাতে আছে। দেখুন, দেখুন, আমার সঙ্গে একই ফ্লাইটে গেছেন এমন একজনকে হাজির করেছে ওরা।' হা হা হা আবেশ ঘর ফাটিয়ে হাসে।

আবেশ চ্যানেল ঘোরায়, 'এই দেখুন এই চ্যানেলে প্রাক্তন বিচারপতি, দুঁদে ক্রিমিনাল ল'ইয়ার, প্রাক্তন আইপিএস অফিসার, সমাজকর্মী সবাই বসেছে—ওরা আইন দেখছে। আমার কেন জামিন পাওয়া উচিত নয়, কেন জামিন পাওয়া উচিত, সে কথাই বিস্তারিত আলোচনা করছে। মুকুন্দ এদের টাকা দাও। আমার পক্ষে থাকলেও দাও, বিপক্ষে থাকলেও দাও। সব ভোট আমার চাই।'

আবেশ চ্যানেল ঘোরায়, 'ওই দেখুন পুরো দেশটা এই ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। একদল বলছে আমার ফাঁসি চাই। একদল বলছে, যদি কোনও অন্যায় করে থাকে এটাই ওর প্রথম। সরকার ক্ষমা করে দিক একবার...। ওই দেখুন ম্যাম মেয়েরা কাঁদছে।'

নন্দিতা বলে, 'একটা সত্যি কথা বলবেন—আপনার ভালো লাগছে, সব চ্যানেলে এভাবে নিজেকে দেখতে?'

আবেশ হাসে, 'সত্যি বলছি, টেনশন একটু হচ্ছে, কিন্তু এই মুহূর্তে আমি দেশের এক নম্বর নিউজ। খুব খারাপ লাগছে না। তবে ওই মৃত্যুটা যদি না হত...।'

'সেদিন নেশা করেছিলেন খুব?'

'করেছিলাম। তবে অন্য কোনও নেশা নয়। রেভ পার্টি নয়, বিশ্বাস করুন। মদই খেয়েছিলাম। একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। কী করলাম আমি! ছিঃ! ছিঃ! কিছু দিন আগে আমার মা মারা গেছেন। সেদিন খুব কষ্ট হয়েছিল। এখন জানেন মায়ের জন্য আমার ভালো লাগছে। মা এটা সহ্য করতে পারতেন না।'

'আপনার ছেলে-মেয়ে?'

আবেশ মাথা নীচু করে থাকে। ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে একটা ককাটেল ডিম পেড়েছে খান চারেক। ককাটেলরা হাঁড়ি, কাঠের বাক্সে বা গাছের কোটরে ডিম পাড়ে না। নেড়া খোলা জায়গায় ডিম পাড়ে। তারপর স্ত্রী পাখি পুরুষ পাখি দুজনেই পালা করে সেই ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। কিন্তু ককাটেলের ডিম বাঁচানো, বাচ্চা বাঁচানো বড় কঠিন কাজ। শীতকালে সবই মরে যায়।

আবেশ হঠাৎ বলল, 'ম্যাম, আমি যদি খুনি হয়ে যাই আইনের চোখে—আমার ছেলে মেয়ে দুটোর বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।'

'ওদের কাছে একবার দাঁড়াবেন, দাঁড়িয়ে বলবেন, স্যরি, ভুল করে ফেলেছি। অন্যায় হয়ে গেছে। দেখবেন আপনার ছেলেমেয়েরা আপনাকে আগের থেকেও বেশি ভালোবাসবে।'

আবেশ শর্মার চোখে জল।

নন্দিতা বলল, 'খাঁচার জানোয়াররাও কিন্তু কাঁদে মিস্টার শর্মা!'

'আমাকে ওই খাঁচায় ঢুকিয়ে দিন ম্যাম!'

'মুক্ত মানুষকে আমি বন্দি করতে জানি না মিস্টার শর্মা।'

'আমি মানুষ নই, জানোয়ার!'

'জানোয়াদের অত ছোট করবেন না।'

দিন চলে আপন গতিতে। পিন্টু আজ দুপুরে চাবি দিতে এসে জিগ্যেস করল, 'ম্যাডাম, দাদা কি ফিরেছেন?'

'না, দাদা ফেরেননি।'

'তাই!' পিন্টু যেন একটু অবাক হল। বলল, 'কে যেন বলল—দাদা ফিরেছেন।'

নন্দিতা চাবি নিয়ে ঘরে এল। আজ সকালেও ও দেখেছে পিন্টু কাজের মাসি তপার মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। মাসি কি ঘর মুছতে এসে কোনও সন্দেহ করেছে? কী ভাবতে পারে? রজত এসেছে, এসে লুকিয়ে আছে। রজত কেন লুকিয়ে থাকবে তার নিজের বাড়িতে? তবে কী? কাকে লুকিয়ে রাখছে নন্দিতা? কোনও অন্য পুরুষকে!

নন্দিতা ওপরে আলাদা করে রান্না করল। ভাত আর চিকেন। এই কিচেনটা সে খুব দরকারে ব্যবহার করে। দুপুরে নন্দিতা যখন আবেশ শর্মাকে খাবার জন্যে ডাকল, সে এল মাথা নীচু করে। সে চুপ করে ভাতের থালার সামনে বসল। ফিসফিস করে বলল, 'রজতবাবু কি আমার ডায়েট পালটে দিয়েছেন?'

নন্দিতা বলল, 'না, এটা আমিই আপনাকে দিলাম। আজ মনে হচ্ছে কাল আমি অহেতুক আপনার ওপর রাগ করেছি। আপনি আপনার মতো...আপনার ধর্মে থাকুন...। আমি আপনাকে নিয়ে বেশি চিন্তা করছি। আপনি যদি এখানে না এসে অন্য জায়গায় আত্মগোপন করতেন, তাহলে আপনার এই কষ্টটা হত না। ঠিকই তো আপনি কেন আমার মতো করে ভাববেন? আপনি সুপারস্টার, আপনার ভাবনাই আলাদা!' নন্দিতা থামে। বলে, 'এর বেশি আমি তেমন কিছু খেতে দিতে পারব না। তাহলে অন্য লোকের চোখে পড়বে। আসলে কী জানেন মিস্টার শর্মা, রজত তার মতো করে চলে, তার চলার পথে আমার কোনও আপত্তি থাকে না। মুখ বুজে অনেক বেআইনি কাজকর্ম সহ্য করেছি। আমি কাল নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করেছি—কেন সহ্য করেছি? কীসের জন্য? গত বছর আমাদের বাড়িতে কয়েকশো বিরল প্রজাতির কচ্ছপ এসেছিল। তারা বস্তাবন্দি হয়ে আমাদের নীচের ঘরে দুদিন ছিল। দুদিন পরে অন্য কোথাও পাচার হয়ে যায়। যা মাস চারেক আগে আমার হাতের আঙুল জড়িয়ে ধরে হাতের তালুতে বসে থাকা মার্মাসেট এসেছিল এক জোড়া। বড় করুণ ছিল তাদের মুখ। এক সপ্তাহ এখানে থেকে কোনও ধনীর শখ মেটাতে পাচার হয়ে গেল। আমি এসব ঘটনা কখনও আগে জেনেছি, কখনও পরে জেনেছি, কখনও তখনই জেনেছি, কিন্তু কোনও প্রতিবাদ করিনি। তাহলে আজ হঠাৎ কেন আপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করব? আমার মনে হয়, এখানে থাকলে আমাকে মুখ বুজে সব কিছু সহ্য করতে হবে। তাই আমি ঠিক করেছি চলে যাব এখান থেকে। আরে আপনি খাবারের থালা নিয়ে বসে আছেন কেন? নিন খাওয়া শুরু করুন। আমি আর আপনাকে কোনও অসুবিধেয় ফেলব না।'

আবেশ শর্মা মাথা নীচু করে খেয়ে চলে—অনেক কষ্টের ভাত তার!

সকালবেলা খবরের কাগজ পেয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল আবেশ শর্মা।

একতলা থেকে খবরের কাগজ নিয়ে দোতলায় উঠে এসেছিল নন্দিতা। তার আগেই সাতসকালে করুণ মুখে আবেশ শর্মা বারবার বলছিল, 'ম্যাডাম নিউজ পেপার এসেছে?'

খবরের কাগজের জন্য আবেশ শর্মা যেন হাঁ করে বসেছিল। ভেতর ভেতর ছটফট করছিল। প্রথম দিনে খবরের কাগজটা নিয়ে আবেশ শর্মা গর্ব করে বলেছিল, সারা খবরের কাগজ জুড়ে আমি। দেখুন ম্যাম, দেখুন। আবেশ শর্মা ছাড়া সারা ইন্ডিয়ায় এখন আর কোনও নিউজ নেই। ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড নিউজ আমি, তারপর ভারতের সোয়া এক কোটি মানুষের খবর।

নন্দিতা সেদিন আবেশ শর্মার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। আবেশের লম্বা লম্বা চুলগুলো তার মুখের ওপর পড়ে, তাকে যেন জহ্লাদের মতো লাগছিল। মনে হচ্ছিল আবেশ শর্মা কোনও জহ্লাদের ভূমিকায় অভিনয় করছে।

আজ খবরের কাগজ নিয়ে আবেশ শর্মা যখন হাসছে, নন্দিতা তার দিকে সম্পূর্ণ তাকাল না। আবেশ বলল, 'ম্যাডাম নিউজ পেপার দেখেছেন?'

'না।'

'আপনি গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে পেপারটা আনলেন, একবারও খুলে দেখলেন না!' আবেশ শর্মা বিস্মিত!

'আপনাকে তো বলেছি—আমার খবরের কাগজ, টিভিতে কোনও ইন্টারেস্ট নেই। আর সত্যি বলতে কী দেখব বলুন তো—দেখব আপনাকে নিয়ে একটা অদ্ভুত টানাটানি চলছে। একদিকে আপনি হিরো, অন্যদিকে আপনাকে ভিলেন করে সমস্ত খবরের কাগজ স্ক্রিপ্ট লিখছে। আমার এতে কোনও ইন্টারেস্ট নেই। আপনি না এখানে থাকলে আমি হয়তো আপনার এটুকুও জানতে পারতাম না।'

আবেশ শর্মা অদ্ভুত চোখে নন্দিতার দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর চোখে কেমন যেন একটা ভাব। এই সাতসকালে কেমন একটা অস্বস্তি হয়। আগে এসময়টা সে রাত পোশাকেই থাকত। এখন কদিন সকালে উঠে ড্রেস চেঞ্জ করে সালোয়ার কামিজ পরছে। সকালে উঠে একবার হলেও আয়নার সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে। তবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নন্দিতা নিজেকে বলেছে এ দাঁড়ানোটা তার নিজের জন্য, অন্য কারও জন্য নয়।

নন্দিতা সরে যাচ্ছিল আবেশ শর্মার চোখের সামনে থেকে। কিন্তু সে যেতে পারল না, আবেশ শর্মা বলল, 'আপনার মতো কোনও মানুষ আমি দেখিনি ম্যাম।'

'আপনি খুবই অল্প মানুষ দেখেছেন মিস্টার শর্মা।'

'আমার দেখা অল্প?' আবেশ হাসে, 'জানেন আমি কত স্ট্রাগল করেছি—এই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে একটু পা রাখার জন্য। একদিনে কেউ হিরো হয় না ম্যাম। আমার কোনও ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। আমার বাবা-মা অ্যাক্টর বা ডিরেক্টর নয়। আপনি জানেন না আমি কতটা পথ পেরিয়ে এখানে এসেছি।'

নন্দিতা হাসে, 'তবু বলছি আপনি খুব কম জীবন দেখেছেন। আপনার দৌড় ছিল একমুখী। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে লক্ষ্য করে আপনি দৌড়েছেন—তাকেই কেন্দ্র করে ঘুরেছেন। আর যেটুকু আগের জীবন ছিল তা এ-জীবনের চোখ ধাঁধানো আলোয় অন্ধ হয়ে গেছে। এখন তো শুধুই আলো দেখেন, একবার যদি আলোর বাইরে যারা তাদের দেখতেন, তাহলে দেখতে পেতেন ভারতের বেশির ভাগ মানুষ খবরের কাগজ পড়ে না, টিভি দেখে না। আপনি ভাবুন আমি তাদের মধ্যে একজন।'

'কিন্তু আপনি তাদের মধ্যের একজন নন। আপনি একজন সম্ভ্রান্ত ঘরের গৃহবধু।'

'হ্যাঁ, আমার শ্বশুরবাড়ি খুবই সম্ভ্রান্ত পরিবার—যাদের আর-এক পেশা বেআইনিভাবে বন্য পশুপাখির ব্যবসা।' নন্দিতা বেশ বিদ্রুপের স্বরে কথাটা বলল।

আর তখনই আওয়াজ করে আবেশ হেসে উঠল, 'তাই জন্যই তো আমি হাসছি ম্যাম, আপনাকে জিগ্যেস করলাম পেপার দেখেছেন কি না? জানেন আজকে পেপারে লিড কে?'

'নিশ্চয় আপনি।' নন্দিতা বলল।

'আমি নই—একটা শিম্পাঞ্জি!'

'শিম্পাঞ্জি!' অবাক গলায় নন্দিতা বলল।

'ইয়া, একটা শিম্পাঞ্জি। পুলিশ আমার খোঁজে মুকুন্দর বাগানবাড়ি রেড করেছিল। ওদের কাছে খবর ছিল ওই বাগানবাড়িতেই আমি লুকিয়ে আছি। ওখানেই আমাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। আমার খোঁজে গিয়ে পুলিশ দেখে একটা ঘরে, মানে যে ঘরে আমার থাকার কথা, ঠিক সেই ঘরে আছে একটা শিম্পাঞ্জি। শিম্পাঞ্জিটার বয়স বছর দুয়েক।' কথাটা বলতে বলতে আবেশ শর্মা হাসিতে ফেটে পড়ে। 'কী আশ্চর্য দেখুন ম্যাম, যেখানে আমার থাকার কথা সেখানে একটা শিম্পাঞ্জি! আমি আর শিম্পাঞ্জি। শিম্পাঞ্জি আর আমি। সব কেমন মিলেমিশে গেছি।' আবেশ শর্মা থামে, নিজের মনে বিড়বিড় করে, 'শিম্পাঞ্জিটা এল কোথা থেকে? শিম্পাঞ্জি তো আর কুকুর বেড়াল গোরু গাধা নয় যে ঘরে ঢুকে পড়বে। একটা জ্যান্ত শিম্পাঞ্জি! ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কনট্রোল ব্যুরো জানিয়েছে এই শিম্পাঞ্জিটি আফ্রিকার। সেই আফ্রিকা থেকে এখানে? যার আনুমানিক দাম প্রায় দেড় কোটি টাকা!'

আবেশ শর্মার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকে নন্দিতা। খুব ধীর গলায় বলে, 'হ্যাঁ, আজ মুকুন্দর বাগানবাড়িতে শিম্পাঞ্জি—সেটা আপনার এই আত্মগোপন করে থাকার জন্য জানাজানি হল। না হলে কেউ জানতে পারত না।'

'শিম্পাঞ্জি নিয়ে কী করবে মুকুন্দ?' আবেশ কপাল কুঁচকে নিজেকে প্রশ্ন করে। 'আমার বদলি হয়ে একটা শিম্পাঞ্জি মুকুন্দর বাগানবাড়িতে!'

'আপনাদের জন্যই তো এইসব সম্ভ্রান্ত পরিবারের ব্যবসা। আপনারা বাড়িতে প্রাইভেট চিড়িয়াখানা করেন। তাতে আরও অনেক জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে শিম্পাঞ্জিরাও থাকে। চিড়িয়াখানার শ্রীবৃদ্ধি হয়। আপনাদের মনোরঞ্জন করে।'

'না, না, আমার কোনও প্রাইভেট চিড়িখানা নেই। আর মুকুন্দর এই শখের কথা কোনওদিন ওর মুখে শুনিনি।'

নন্দিতার মুখে বাঁকা হাসি। 'শুধু আবেশ কেন দক্ষিণ ভারতের হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই-এর অনেক ধনী পরিবারের বাড়িতে প্রাইভেট চিড়িয়াখানা আছে। সেখানে তারা শিম্পাঞ্জি পোষে। এটা কোনও নতুন ঘটনা নয়। আপনার মুকুন্দ যদি নিজে না পোষে তাহলে সে হয়তো এই বিজনেসের একজন এজেন্ট। ওর বাগানবাড়িতে রাখার জন্য কমিশন পায়। আরবের বেশ কিছু বড় বড় হোটেলে গেস্টদের শিম্পাঞ্জিরা বডি ম্যাসাজ করে। এমন হতে পারে এই শিম্পাঞ্জিটা চোরাপথে সেখানেও যেতে পারে।'

আবেশ এবার খবরের কাগজ থেকে জোরে জোরে পড়ে, 'সরকার বা লাইসেন্স ছাড়া সাইটস অ্যাপেনডিকস-১-এর আওতাভুক্ত শিম্পাঞ্জি কেনা বা বেচা বেআইনি। ওয়াইল্ড লাইফ কনট্রোল ব্যুরো শিম্পাঞ্জিটিকে আটক করে নিয়ে গেছে। শুল্ক দপ্তরও বিষয়টি দেখছে।' এইটুকু পড়ে আবেশ থামে। নন্দিতার দিকে মুখ তুলে বলে, 'খবরে লিখেছে—চোরাপথে এই শিম্পাঞ্জির দাম ৪০-৫০ লক্ষ টাকা। বিক্রি এক-দেড় কোটি। এজেন্টদের ১০-১৫ লক্ষ টাকা কমিশন থাকে। মুকুন্দ কি এই চোরাচালান র‍্যাকেটে জড়িয়ে! এই শিম্পাঞ্জিটা আফ্রিকা থেকে হংকং হয়ে বাংলাদেশে আনা হয়েছে। তারপর বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে ইন্ডিয়ায়, সেখান থেকে সড়কপথে এই আস্তানায়।'

নন্দিতা কঠিন হয়ে আবেশের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে জানে তাদের বাড়িতেও বছর খানেক আগে দুটো দুটো শিম্পাঞ্জি দিন সাতেক করে থেকে গেছে। এ-কাজ রজতও করে। নন্দিতার মনে হয়, মুকুন্দর সঙ্গে রজতের নিশ্চয়ই পরিচয় আছে। আর ওরা এই র‍্যাকেটের লোকজন। সেই যোগাযোগেই আবেশ শর্মা আজ এখানে। এখন আবেশের গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টের জন্য বিষয়টি প্রকাশ্যে এল। এবার এখান থেকে হয়তো রজতেরও নাম উঠে আসবে।

নন্দিতা বলল, 'মুকুন্দ রায় কী বলছে—?'

'পুলিশ ওর পাত্তা পাচ্ছে না। খবরের কাগজ লিখেছে, ওই বাগানবাড়ির কেয়ারটেকার বিশাল যাদবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে বলেছে দিন চারেক আগে এক মধ্যরাতে এই শিম্পাঞ্জিটি তাদের বাগানবাড়িতে আনা হয়। তার মালিক মুকুন্দ তিনজন লোক দিয়ে একটা কাঠের বাক্স পাঠিয়েছিল। সেই বাক্সে এই মৃতপ্রায় শিম্পাঞ্জিটি ছিল। দেড় দিন পরে শিম্পাঞ্জিটির ঘুম ভাঙে। একে মালিকের বলে দেওয়া ঘরে রেখে দেওয়া হয়। এর আগে কোনওদিন এই বাগানবাড়িতে এমন জন্তু আসেনি। জানোয়ারটিকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে বিশাল বাইরে থেকে তালা মেরে রেখেছিল। সে ভেবেছিল—মালিক এটা সার্কাস থেকে এনেছে, নিশ্চয়ই সিনেমার শুটিঙে কোনও কাজে লাগবে। মানে শিম্পাঞ্জিটি সিনেমায় অভিনয় করবে। কিন্তু শিম্পাঞ্জিটি আসার পরের দিন থেকে মালিকের মালিক আবেশ শর্মার অ্যাকসিডেন্ট নিয়ে চারদিকে হইচই শুরু হয়ে যায়। মালিকও ব্যস্ত হয়ে পড়ে, বিশাল তার মালিক বা অন্য কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারেনি। সে নিজের বুদ্ধিমতো শিম্পাঞ্জিটিকে খাবার দিয়েছে। এখন পুলিশ রেড করে তাকেই ধরেছে। সে এ বিষয়ে আর কিছু জানে না। সে নির্দোষ।' এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে আবেশ থামে। বলে, 'ম্যাম এমন তো হতে পারে কোনও শুটিঙের প্রয়োজনে মুকুন্দ ওটা এনেছে—তাহলেও সেটা কার? আমি তো জানি না, ও অন্য কারও হয়ে কাজ করে? অথবা মুকুন্দ সেরেফ বাগানবাড়িটা ভাড়া দিয়েছে। এখন আমার এই গোলমালের মধ্যে পড়ে বেচারা ফেঁসে গেছে।'

আবেশ শর্মা হঠাৎ নিজের কপালে হাতের উলটোদিক দিয়ে আঘাত করে, 'আমি ফেঁসে, মুকুন্দ ফেঁসে। এখন আমার জন্যে ওখানে ঘুঁটি চালবে কে—মুকুন্দ ঠিক সিনেমার শুটিং-টুটিং বলে ম্যানেজ করে জামিন নেবে। কিন্তু সব কিছু জড়িয়ে—। আমি কনফিউজ, কী হচ্ছে না হচ্ছে, একটা ফোন করব তার উপায় নেই। ক'দিন আগে মুকুন্দ রিপোর্টারদের জানিয়েছে—ওর ফোন ট্যাপ করা হচ্ছে।'

'আপনার স্ত্রী, বা অন্য কেউ, কোনও ডিরেক্টর, প্রোডিউসার?' নন্দিতা খুব ধীর গলায় বলে।

আবেশ হাত ছোড়ে, 'আমার কাছে কোনও ফোন নেই। আমি একমাত্র মুকুন্দ নম্বর জানি। অনেক বছরের পুরোনো নম্বর সেটা আমার মুখস্থ। আমি কাকে ফোন করব—তার নম্বর পাব কোথায়?'

নন্দিতা বলল, 'আপনি পুলিশের কাছে সারেন্ডার করুন মিস্টার শর্মা। এটা সব দিক দিয়ে ভালো হবে।'

'ইম্পসিবল! জেলে আমি এক রাতও কাটাতে পারব না। যত টাকা লাগুক জমা রেখে আমি জামিন নেব। কেস চলুক, ও আইন আমি বুঝে নেব। আমাকে আর একটু সময় দিন ম্যাম। আমাকে এত তাড়াতাড়ি খতম করা যাবে না। আমি ফিরবই।'

বেলা বাড়ে। সকাল আটটার মধ্যে সব খবরের কাগজ খুঁটিয়ে পড়া হয়ে গেছে আবেশের। কাগজ এখন নীচের তলায়।

শ্যামলী মাঝে একবার দোতলায় ফল দিতে এল। ফল দিয়ে ও চলে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, 'ম্যাডাম, খবরের কাগজগুলো কি অন্য কেউ পড়ে, পিন্টু, লালা? কাগজঅলাকে বলবেন তো পড়া কাগজ দিচ্ছে।'

'আমিই কাগজগুলো দেখছিলাম।' নন্দিতা বলল। তারপরই সে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, 'কাগজগুলো নিয়ে কি অসুবিধে হয়েছে?'

থতমত খায় শ্যামলী। 'না কোনও অসুবিধে হয়নি। আপনি তো পেপার পড়েন না, তাই। তবে এখন সবাই কাগজ পড়ছে—একটা জলজ্যান্ত মানুষ হাপিস হয়ে গেল? সে যে-সে লোক নয়, আবেশ শর্মা! অ্যাকসিডেন্ট কত লোক করে সবার এমন শাস্তি হয়? এই তো কদিন আগে বটতলার মোড়ে একটা ম্যাটাডোর তিনজনকে চাপা দিয়ে পালাল। পরে ধরাও পড়েছে। কিন্তু কী শাস্তি হল তার?'

নন্দিতার শীতল চাউনিতে শ্যামলী কথা থামিয়ে দিল। যেতে যেতে শ্যামলী বলল, 'ওর অনেক শত্রু কাগজে লিখেছে। তারাই ওর নামে অকথা, কুকথা বলছে। তবে আমার মনে হয় ও ফরেনে চলে গেছে। দেশে ফিরে এমন একটা সিনেমা করবে, তখন দেখবেন আবার সবাই ওকে মাথায় তুলে নাচবে।'

নন্দিতা উদাস—ঘরে বসে থাকে।

দুপুরে তিনতলার চাবি দিতে আসে পিন্টু। চাবিটা ওর হাতে না দিয়ে পিন্টু বলল, 'ম্যাডাম, দাদা কবে আসবে?'

'এসে যাবে এর মধ্যে। কেন কোনও দরকার ছিল?'

'ও আসেনি। আমি ভাবলাম দাদা ফিরেছে।' পিন্টুর গলার স্বরে কেমন যেন একটা সন্দেহ। নন্দিতা দেখল এখন পিন্টু তার দিকে চাবিটা এগিয়ে দিল না। বরং বলল, 'আপনার কি কোনও আত্মীয় এসেছেন?'

গলার স্বর ভারী করে নন্দিতা বলল, 'কেন?'

'না, আজ এগারোটা নাগাদ আমি একটু নীচে গিয়েছিলাম। তখন ওপর থেকে কেউ একটা জ্বলন্ত সিগারেট ফেলল। আর একটু হলে আমার মাথায় পড়ত। আমার মনে হল, দাদার ঘর থেকেই পড়ল। তাই ভাবলাম দাদা এসেছে।'

'ও তখন সিগারেটটা তোমার গায়ে পড়েছে। স্যরি। আমিই ফেলেছিলাম। দাও, চাবি দাও।'

পিন্টু হতভম্বের মতো নন্দিতার দিকে চাবি এগিয়ে দিল। কেন না সে প্রথম শুনল নন্দিতা সিগারেট খায়। তবু পিন্টু বলল, 'আমি আসলে খুব ভোরবেলায় উঠি। গাড়ি চালানো শিখছি। আজ খুব ভোরে এদিক দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম—তখনও আমার মনে হল দাদার বারান্দায় কেউ দাঁড়িয়ে, তারপর বেলায় সিগারেট পড়ল—তাই আপনাকে জিজ্ঞাসা করলাম।'

'ভোরে, আমিই দাঁড়িয়ে ছিলাম।' বলে নন্দিতা আর দাঁড়াল না। বারান্দার ভেতর দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।

আবেশ শর্মা দুপুরে অমলেট দিয়ে ভাত খেল। নন্দিতা দেখল পেট পরিষ্কার করে আবেশ তার মুখের দিকে তাকিয়ে। নন্দিতা বলল, 'সিগারেট পেলেন কোথায়?'

আবেশ থতমত মুখে চুপ করে থাকল, নীচু গলায় বলল, 'রজতবাবুর স্টক থেকে চুরি করেছি।'

'ঘরে অ্যাশট্রে ছিল—জানলার দিয়ে জ্বলন্ত সিগারেট ফেলবেন না।'

'স্যরি।'

আবেশ যেন প্রসঙ্গ পালটানোর জন্যই বলল, 'আপনি খেলেন না?'

'আমি নীচে গিয়ে খাই। আমাদের কিচেন ডাইনিং সব নীচে।'

'এখানেও একটা কিচেন, দোতলাতে ডাইনিং আছে, এটা ইউজ করেন না?'

'খুব কম, কখনও প্রয়োজন পড়লে।'

আবেশ বলে, 'হ্যাঁ আমার মতো কেউ এসে পড়লে—।'

নন্দিতা ঠান্ডা গলায় বলল, 'রজত জন্তুজানোয়ারের বিজনেস করে ঠিক কথা, তবে এখানে দুপেয়ে মানুষ-জানোয়ার এই প্রথম।'

'আপনি কিন্তু ম্যাম নিজের কথাকে নিজে কাটছেন। বলেছিলেন, আমাকে জানোয়ার ভেবে জানোয়ারদের ছোট করবেন না। তাহলে আমাকে মানুষ-জানোয়ার কী করে বানালেন?'

'ঠিকই। জানোয়ারদের বড়-ছোট করা হয়ে যাচ্ছে।'

নন্দিতা অন্যদিকে তাকাল। এরকম নির্লজ্জ মানুষ খুব কমই দেখেছে সে। নন্দিতা দাঁত চিবিয়ে বলল, 'মানুষ-জানোয়ার নয়, বলতে পারি কোনও ক্রিমিনাল এই বাড়িতে প্রথম।'

'ম্যাম আমি ক্রিমিনাল! রাতে নেশার ঘোরে সাতজন ঘুমন্ত মানুষকে চাপা দিয়ে মেরেছি, ইটস ওকে। কিন্তু রজত বা আপনি কী করছেন—দিনের পর দিন কত কত নিরীহ পশুপাখিকে মায়ের কোল ছাড়া, জঙ্গল ছাড়া করছেন। তারপর বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীদের নিয়েও নিশ্চয় আপনারা কারবার করেন। ম্যাম, সত্যি বলছি, ঠান্ডা মাথায় একটু ভেবে দেখুন, আমি সাতজন মানুষ আর তাদের পরিবারের ক্ষতি করেছি। আর আপনারা এই পৃথিবীর ক্ষতি করছেন। ইকো সিস্টেমটাকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন, আপনাদের হাত ধরে এক একটা গোটা প্রাণীকুল খতম হয়ে যাচ্ছে। পেপারে দেখছিলাম আপনারা কচ্ছপের বিজনেস করেন। তক্ষক চালান করেন। শিম্পাঞ্জি,... মার্মাসেট, ক্যাঙারু আপনাদের লিস্ট বিশাল লম্বা, কেউ বাদ যায় না। আমি নেশার ঘোরে পাপ করেছি, আপনারা সজ্ঞানে। আমি এরপরে আর গাড়ির স্টিয়ারিঙে হাত দেওয়ার আগে একবার ভাবব। আপনারা একটা গেলে আর একটা অর্ডার খুঁজবেন। আবার সেটাকে জঙ্গল-ছাড়া করাবেন। আমি জানি না, আপনার শুধু জ্যান্ত জীবজন্তুর ব্যবসা করেন, নাকি খবরের কাগজে যেমন লিখেছে, তেমন বাঘের হাড়গোড়, চামড়া, গন্ডারের খড়গ, হাতির দাঁত, হরিণ-সাপ...এসবেও আছেন! আজ আমি ক্রিমিনাল হয়েছি—আমার অপরাধ মাপা যাচ্ছে, কিন্তু আপনাদের অপরাধ কত এর খতিয়ান আপনারাও দিতে পারবেন না।'

নন্দিতা চুপ করে থাকে। আবেশের মুখের পেশিগুলো তিরতির করে নড়ছে। কথাগুলো নাভি থেকে বুক চিরে উঠে আসছে। হঠাৎ ও থামে, ফিসফিস করে, 'স্যরি ম্যাম! আমি একটু বেশিই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম।'

নন্দিতা বলল, 'আপনি ঠিকই বলেছেন।'

'ঠিক বা ভুল নয় ম্যাম। আমি এ কদিনে রিল ছেড়ে রিয়েলে এসেছি। একটু একটু করে বাস্তবটা বুঝতে চেষ্টা করছি। আমি আপনাকে দোষ দিচ্ছি না, রজতবাবু আপনার স্বামী। আমার মনে হয়—আপনার ইচ্ছে না হলেও এই কাজের সঙ্গে আপনি জড়িয়ে পড়েছেন। নিজের অজান্তে। কিন্তু আইনের চোখে আপনি আর রজতবাবু এক।'

নন্দিতা চুপ করে থাকে।

আবেশ হাসে, বলে, 'জানেন ম্যাম, আজ সারাদিন ধরে আমার অদ্ভুত একটা ফিলিং হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি পৃথিবীতে এইমাত্র জন্মগ্রহণ করলাম। এই ফিলিংটা হচ্ছে ফোন নম্বরগুলো হারিয়ে ফেলে। আমার সঙ্গে এই পৃথিবীর কোনও মানুষের সম্পর্ক নেই। কেন না ওই নম্বরগুলো বলে দিত আমি এর স্বামী, আমি ওর বাবা, এর বন্ধু। একটা বাচ্চা যখন জন্মায় তখন সে কতগুলো নম্বর নিয়ে আসে, এই নম্বরে সে পুত্র, এই নম্বরে নাতি, এই নম্বরে পুতি। কিন্তু যদি সে ভ্যাটে পড়ে থাকে, তার কাছে কোনও নম্বর নেই। তার মা নেই, বাবা নেই, সে শুধু মানুষের ফেলে যাওয়া বেওয়ারিশ বাচ্চা! আমার কাছেও আজ কোনও একটা ফোন নম্বর নেই যেখানে যোগাযোগ করব। আমি ভ্যাটের পাশে পড়ে থাকা একটা শিশু। আমাকে উলটে দেখুন, আমার কাছে কোনও টাকা, পয়সা, কার্ড কিচ্ছু নেই। আমি কপর্দক শূন্য। বেওয়ারিশ বাচ্চার মতোই।'

বোবা নন্দিতার ফোন কেঁপে উঠল। ওপারে রজতের গলা, 'শোনো কাল রাতে ওরা আসবে। সাড়ে তেরো রিলিজড হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, আমি হয়তো শনিবার ফিরব।' রজতের গলা টেনশন মুক্ত। ঝকঝকে। বলল, 'পরে ফোন করব।'

নন্দিতা আবেশ শর্মার দিকে তাকাল, বলল, 'কাল রাতে আপনাকে নিতে আসবে। আপনার হয়তো অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা হয়েছে।'

আবেশ শর্মা মাথা নীচু করল। 'যাক, আপনার সমস্যা মিটল। আপনি এবার ভালো থাকবেন। এক ক্রিমিনালের সঙ্গে থাকা ক'টা দিন নিশ্চয় আপনার মনে থাকবে।'

'আপনার জন্যে বিরিয়ানি আনব? বিরিয়ানি আর চিকেন চাঁপ? আপনি তো তেমনটাই বলেছিলেন।'

'থ্যাঙ্কস, আমাকে আলুসেদ্ধ ভাতই দিন।'

খুব ভোরে নন্দিতা আবেশ শর্মাকে দেখেছে তিনতলার পাখিঘরের সামনে নিজের মনে ব্যায়াম করতে। নন্দিতা পাখিঘর থেকে বেরিয়ে ওর মুখোমুখি হয়েছিল। ওকে দেখে আবেশ মাথা নীচু করল। নন্দিতা মুখ ফেরাতে আবেশ শুধু একটা কথা বলেছিল, 'ম্যাম নিউজ পেপার এলেই আমাকে একটু দেবেন। আমি খুব তাড়াতাড়ি পড়ে নেব।'

ওর সঙ্গে কথা বলতে নন্দিতার কোনও ইচ্ছে করছিল না। বিশেষত এই সাতসকালে। বেশ ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। পাখিগুলোর খুব ফুর্তি, সকাল থেকেই আজ প্রতিটা খাঁচায় কলবর বেশি। নন্দিতার মনে হল এই ক'দিনে ভোরবেলা এক নাগাড়ে আবেশকে দেখে দেখে পাখিগুলো ওকে চিনে গেছে। বিশেষত বৃদ্ধ কাকাতুয়াটা। ও আজ সকাল থেকেই এক দৃষ্টিতে আবেশকে দেখছে। ও এই বাড়িতে গোনা ক'জন মানুষকে দেখে। হঠাৎ অচেনা একজন—তাই ও খুঁটিয়ে দেখছে। তবে অপছন্দ হলে তীব্র গলায় চেঁচাত। পাখিটা হয় বড় বেশি বুড়ো হয়ে ওর রাগ কমে গেছে, নয় আবেশকে পছন্দ হয়েছে।

নীচে খবরের কাগজ এলে নন্দিতা নিয়ে এসে ওকে দিল। আজও নন্দিতা কাগজের প্রথম পাতার দিকে তাকায়নি। তাকানোর প্রয়োজন মনে হয়নি। দরজায় টোকা দেওয়ার আগেই ছোঁ মেরে আবেশ কাগজটা নিল। কিন্তু আটটা বাজার আগে যখন নন্দিতা রজতের ঘরের দরজায় টোকা দিল আবেশ খবরের কাগজগুলো নিয়ে বেরুল বিধ্বস্ত অবস্থায়। নন্দিতা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল আজ কাগজে মনপসন্দ কোনও খবর নেই। নাকি ফ্যানেরাও ওকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে? ওকে কেমন ছন্নছাড়া লাগল।

নন্দিতা ব্রেকফাস্ট রেডি করে আবেশের ঘরের দরজা ঠেলল, আবেশ নিথর হয়ে রজতের বিছানায় এক কোণে বসে। নন্দিতা বলল, 'আপনার ব্রেকফাস্ট!'

খাবারের দিকে আবেশের কোনও আগ্রহ নেই। ও আঙুল তুলে টিভির দিকে দেখাল। ফিসফিস করে বলল, 'এই হল মুকুন্দ! মুকুন্দ রায় আমার সেক্রেটারি! দেখুন ম্যাম ও কী বলছে?'

নন্দিতার কোনও আগ্রহ ছিল না ঘুরে দাঁড়িয়ে টিভি দেখার। তবু ও ঘুরে টিভির দিকে তাকাল।

ব্রেকিং নিউজ

আত্মসমর্পণ করল মুকুন্দ রায়। তার আগে

সংবাদমাধ্যমকে দিল এক বিশেষ সাক্ষাৎকার।

টিভিতে অ্যাড দেখাচ্ছে।

আবেশ বলল, 'আপনি আজকের পেপার দেখেননি। দেখলে জানতে পারতেন। কাল রাতে সংবাদমাধ্যমকে এক বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়ে মুকুন্দ আত্মসমর্পণ করেছে। মুকুন্দ বলেছে, সেদিন ও গাড়িতে ছিল না। আমার অ্যাকসিডেন্ট করার খবর পেয়ে ছুটে আসে। এসে দেখে আমি কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। প্রচণ্ড নেশায় পুলিশের জিপে বসে ঝিমাচ্ছি। আমার সঙ্গে ছিল পামেলা, বাসন্তিকা আর তরণী পাল সিং। আমরা সবাই নেশাগ্রস্ত ছিলাম। আমরা মদই খেয়েছিলাম, না অন্য কোনও নেশা করেছিলাম, তা ওর জানার কথা নয়। তাই ও জানে না। ও এসে আমাকে দেখে আমি পুলিশ হেফাজতে, পুলিশের জিপে। তখন ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে। ঠিক হয়, রাতে আর আমাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হবে না। আমি অসুস্থ। আমাকে তার বাগানবাড়িতে পাঠানো হবে। সেখানে চিকিৎসা করে একটু সুস্থ হয়ে আমি থানায় আত্মসমর্পণ করব। কিন্তু আমি তার বাগানবাড়ি যাওয়ার পথেই হাপিস হয়ে যাই। আমার বদলে তার বাগানবাড়ি পৌঁছায় একটা শিম্পাঞ্জি। যে শিম্পাঞ্জিটিকে মুকুন্দর বাগানবাড়ি থেকে পাওয়া গেছে। মুকুন্দ কোনও বন্য জন্তু পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত নয়। ও যা কাজ করেছে সব আমার মতামত নিয়ে। কিন্তু আমার নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ও কিছু জানে না। ও স্বীকার করেছে, আমাকে ও লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। তাই জন্যে অত রিস্ক নিয়ে দেড়শো কিলোমিটার দূরে তার বাগানবাড়িতে আমাকে পাচার করছিল। উদ্দেশ্য ছিল একদিন বা দুদিন পরে কোর্টে সারেন্ডার করিয়ে জামিন নেওয়া। কিন্তু তা ও পারেনি। উলটে, আমি নিরুদ্দেশ হয়েছি। ওর বাগানবাড়ি থেকে শিম্পাঞ্জি পাওয়া গেছে।

মুকুন্দ আত্মসমর্পণ করছে। যাতে পুলিশ ওকে খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট না করে। মুকুন্দর আবেদন, ওকে আইন যা শাস্তি দেবে ও মাথা পেতে নেবে। তার আগে আবেশ শর্মাকে খুঁজে বের করা জরুরি। আবেশ শর্মা নিশ্চয় কোনও কিডন্যাপারদের হাতে পড়েছে। তবে কোনও মুক্তিপণ চেয়ে তার কাছে ফোন আসেনি। আর আবেশ শর্মা বিদেশেও যায়নি। কেন না পাসপোর্ট তার কাছে।'

এক নাগাড়ে কথা বলে আবেশ শর্মা থামে। ফিসফিস করে বলে, 'এ বিষয়ে আপনি কিছু বলবেন আমাকে ম্যাম?'

'কী বলব আপনাকে—আপনি কোনও কিডন্যাপারদের হাতে পড়েছেন কি না?'

'বাইরে পুলিশ, এখানে কিডন্যাপার?'

নন্দিতা বলল, 'কাল আপনি বলছিলেন—খবরের কাগজে লিখেছে, একটা কাঠের বাক্সবন্দি হয়ে শিম্পাঞ্জিটা এসেছে। এটা বিশাল যাদব বলেছে—।'

'কাঠের বাক্স নয় কফিন। একটা নিউজ পেপারে কফিনটার ছবিও দিয়েছে।'

'কফিনের ছবি দিয়েছে? আপনি চুপ করে বসুন। আমি নীচে থেকে কালকের কাগজগুলো নিয়ে আসছি।'

নন্দিতা দ্রুত পায়ে নীচে গিয়ে গতকালের সব কাগজগুলো নিয়ে ওপরে উঠে এল। বেশি খুঁজতে হল না। একটা খবরের কাগজের সামনের পাতায় শিম্পাঞ্জি আর কফিনটার ছবি আছে। ছবিটা দেখে নন্দিতা চমকে উঠল। বলল, 'আসুন আমার সঙ্গে।' সে আবেশকে নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল সাড়ে তেরো নম্বর ঘরের সামনে, সেখানে এখনও বিছানার চাদর চাপা দেওয়া কফিনটা আছে। নন্দিতা বলল, 'মিস্টার শর্মা দেখুন, দুটো কফিন একই রকম দেখতে। এরকম হয়নি তো কফিন পালটাপালটি হয়ে আপনি চলে এসেছেন শিম্পাঞ্জির ঘরে, আর শিম্পাঞ্জি চলে গেছে মুকুন্দ রায়ের বাগানবাড়িতে?'

নন্দিতার কথায় আবেশ চুপ করে থাকে। খুব মন দিয়ে চিন্তা করে। পর পর সমস্ত কিছু মেলায়। বলে, 'হতে পারে। তবে তার সম্ভাবনা ফিফটি পারসেন্ট। আর ফিফটি পারসেন্ট আমি কিডন্যাপ হয়েছি। কিন্তু আমার গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট নিয়ে চারদিকে এত হইচই হচ্ছে যে কিডন্যাপাররা মুক্তিপণের টাকা কার কাছ থেকে চাইবে বুঝে উঠতে পারছে না। তাই জন্যে তারা একটু থেমে আছে। হয়তো আমি আপনাদের বাড়ি এখন কী অবস্থায় আছি তারা সব জানে। জেনেশুনেই চুপ করে আছে। জানে আমি পালাব না। কেন না আমি পুলিশের হাতে পড়তে চাই না।'

নন্দিতা বলল, 'কিন্তু আজ যে সাড়ে তেরো নম্বর ঘরের কনসাইনমেন্ট রিলিজড হওয়ার কথা, তার কী হবে? ওরা এসে কিছুই পাবে না।'

'তখনই বোঝা যাবে ওরা ঠিক কী চায়? ওরা কী নিতে এসেছে।'

'তার চেয়ে বরং আমি রজতকে ফোন করি। পরিষ্কার জানতে চাই বিষয়টা কী? এ ঘরে কে আছে, শিম্পাঞ্জি, না আবেশ শর্মা?'

'প্লিজ ম্যাম আজ রাত পর্যন্ত ওয়েট করুন। আজই পরিষ্কার হয়ে যাবে।'

'আর একটা কথা মুকুন্দর কথা কতখানি সত্যি?'

'ও তেমন কোনও মিথ্যে বলেনি। আমার মনে হয়, ও খুব স্পষ্ট সত্যি বলেছে—মানে আমাকে বাঁচানোর জন্য ওর কাছে কোনও লাইফ লাইন নেই।

দুপুরে চাবি দিতে পিন্টু এল। পিন্টুর সঙ্গে লালা। পিন্টু বলল, 'ম্যাডাম আপনার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা আছে।'

'বলো।'

পিন্টু বলল, 'ম্যাডাম আমাদের খুব ভয় করছে। এলাকায় খুব গুজব রটেছে, যে-কোনও সময় এই বাড়িতে পুলিশ আসতে পারে।'

'পুলিশ! কেন?'

'পাবলিক বলছে আবেশ শর্মার কেস নিয়ে পুলিশ খুব বেইজ্জত হচ্ছে। ওরা এখানে যারা বন্য পশুপাখির কারবার করে তাদের সবার বাড়িতে রেড করবে।'

'টেনশন কোরো না, আমাদের লাইসেন্স আছে।'

লালা বলল, 'আমরা তো শুধু পাখির বিজনেস করি। তাও এদেশি নয়, বিদেশি। আমাদেরকে কি পুলিশ ধরতে পারে?'

'না, শুধু বিদেশি পাখির বিজনেস করলে পুলিশ ধরতে পারে না।'

'অনেকে বলছে এই বাড়িতে নাকি বস্তা বস্তা কচ্ছপ আসতে দেখেছে। এখান থেকে নাকি বাঁদর সাপ্লাই যায় সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডে। ওখানে বাঁদরের খুলি ফাটিয়ে ঘিলু খায়।' পিন্টু একটু ওপর চালাকি করে কথাগুলো বলল।

নন্দিতা খুব বিরক্ত হল। স্পষ্ট গলায় বলল, 'আর দুদিন পরেই তোমাদের দাদা আসবে, তাকেই যা বলার বোলো। আমি এর বেশি কিছু জানি না।'

পিন্টু আবারও বলল, 'অনেকেই দেখেছে এখানে রাতের বেলা পুরো ঘেরা ভ্যান আসে। তার থেকে মাল নামে। দিনে পাখি, রাতে পশু। কিন্তু কোনওদিন আমরা তেমন কিছু দেখিনি।'

নন্দিতা গলা ভারী করে বলল, 'তাই কি সেসব খুঁজতেই কাল সকালে আমাদের বাড়ির একতলায় গিয়ে ঘুরছিলে?

নন্দিতার কথায় পিন্টু ফ্যাকাসে মুখে তাকায়। চাবি এগিয়ে দিল।

নন্দিতা বলল, 'তোমাদের দাদা বলছিলেন অনেক পাখির বাচ্চা চুরি হচ্ছে এখান থেকে। কে করছে, কীভাবে হচ্ছে, তা তোমার দাদা জানেন।'

'চুরি হচ্ছে না ম্যাডাম—বাচ্চাগুলো সারভাইভ করতে পারছে না। খুব মরছে। দাদা এলে বলব।' পিন্টু বলল।

নন্দিতা আর দাঁড়াল না দুম দুম পা ফেলে ভেতরে চলে গেল।

দুপুরে ডাইনিং-এ খাওয়া শেষ করতে, শ্যামলী এসে ওর পাশে দাঁড়াল। বলল, 'বউদি দাদা ফিরলে আমি কটা কথা বলব।'

শ্যামলীর মুখে বউদি শুনে নন্দিতা ওর দিকে তাকাল। শ্যামলী তো ম্যাডাম বলে।

শ্যামলী বলল, 'বউদি দুদিন হল পিন্টু তপার মাকে জিগ্যেস করেছে—ওপরে, দোতলায় কোনও ছেলে আছে কি না? ও নাকি দেখেছে। পিন্টু খুব বেড়েছে বউদি। ওকে আর রাখা যাবে না, ওর জন্যে সবাই বিপদে পড়বে। ও হঠাৎ বস্তা বস্তা কচ্ছপের কথা বলল কেন? ওকে এটা কেউ বলেনি। ও নিজেই বলছে। বাড়ির সামনে কখন কোন গাড়ি আসছে, ও তারও খোঁজখবর রাখছে। ওর কাছেই সবাই এসব কথা বলছে। কই আমাদের তো বলে না।'

'ঠিক আছে।' নন্দিতা ঘাড় হেলাল। বিনয়কান্তি ডাকল। 'একটু এদিকে শোনো।'

অনেকদিন পরে তিনি নন্দিতার সঙ্গে কথা বললেন। এমনিতে মানুষটা খুব কম কথা বলেন। অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই উনি ঘরবন্দি। সঙ্গী বলতে শ্যামলী। শ্যামলী সারাদিন খবরের কাগজ পড়ে শোনায়। নীচে এলে একমাত্র ওর গলাই শোনে নন্দিতা, আজ সে তার শ্বশুরের গলা শুনল।

নন্দিতা গিয়ে বিনয়কান্তির চেয়ারের সামনে দাঁড়াল। বিনয়কান্তি বললেন, 'শোনো আবেশ শর্মার কেসটায় বন্যপশুপাখি পাচারের ব্যাপারটা জড়িয়ে গিয়ে পরিস্থিতি একটু জটিল হয়েছে। আমার দু'একজন পরিচিত বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সকলেই খুব সাবধান। আমাদেরও সাবধান হওয়া দরকার। তেমন কিছু থাকলে, রজতকে ফোন করে বলো সরিয়ে দিতে। আমরা ওপেন বিজনেস করি, আমাদের সমস্যা অনেক। রজত কবে আসছে, কিছু বলেছে?'

'কাল বলেছে, দু'তিন দিনের মধ্যে ফিরে আসবে।'

'ঠিক আছে অত টেনশন করার মতো কিছু নেই। পিন্টুর কথা শ্যামলীও আমাকে বলেছে। ব্যাপারটা এখন একটু ইগনোরই করতে হবে। ওকে এখন কাঠি-ঘা করা যাবে না। পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে ওকে গলা ধাক্কা দিতে হবে। ও পাখির বাচ্চা চুরি করে কার কাছে বিক্রি করে সব খবর শ্যামলীর বরের কাছে আছে। প্রয়োজনে তাদের সামনে আনা যাবে। তখন ওকে দু-একদিন থানা-পুলিশ করিয়ে, জেল খাটিয়ে দিতে হবে। তাহলে সারা জীবন চুপ থাকবে। ভয়ে থাকবে। আমার মনে হয়, ও ভেতর ভেতর এ-বাড়ির অনেক খবর রাখে। ওকে এমনি ছেড়ে দিলে ও এলাকায় বদনাম করবে। ব্যবসা করা কঠিন হবে।

আর একটা কথা, কাল ডাক্তার এসেছিল, আমার একদম ঘুম হচ্ছে না। একটু হ্যালুসিনেশনের মতো হচ্ছে। মনে হচ্ছে অনেক রাত পর্যন্ত কারা যেন কথা বলছে, গল্প করছে। খুব কাছে টিভি চলছে। মাঝরাতে ওপরের কিচেনে রান্নার আওয়াজ হচ্ছে। কেউ সারা দোতলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকী ভোররাতেও আমি ছাদে কারও পায়ের আওয়াজ পাচ্ছি। কাল সুমন্ত্র এসেছিল। আমার ঘুমের ওষুধের ডোজটা সামান্য বাড়িয়ে দিয়েছে। আর বলছিল, ক'টা দিন আমাকে রাতের ঘরটা একটু চেঞ্জ করে শুতে। এতে হ্যালুসিয়েশনের ব্যাপারটা কেটে যাবে। আমি তাই শ্যামলীকে বলেছি, আমাকে ওষুধ-টষুধ খাইয়ে নীচেই রেখে যেতে। মেন গেটে তো তালা পড়ছে, অসুবিধের কিছু নেই। শুধু যদি তোমার কিছু দরকার পড়ে—আমাকে নীচে এসে ডাকতে হবে। সব দরজা খোলাই থাকবে।'

নন্দিতার চিন্তান্বিত মুখ দেখে শ্যামলী বলল, 'আমি সব গুছিয়ে দিয়ে যাব। অসুবিধে হবে না।'

'আজ রাত থেকেই আমি এখানে থাকব। তুমি আমাকে নিয়ে টেনশন কোরো না। ওদিকটা সামলাও।'

নন্দিতা দোতলার সিঁড়ি দিয়ে পা টিপে টিপে উঠতে উঠতে ভাবছিল তার শ্বশুরমশাই তাকে কোন দিকটা সামলানোর কথা বললেন?

১০

রাত দশটা বাজতেই রজতের ফোন এল। ছোট্ট দুটো কথা। 'আজ সাড়ে তেরো রিলিজড হবে। তিনজন আসবে বারোটা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে। টেনশন কোরো না।'

নন্দিতার কোনও টেনশন নেই। যা আছে তা হল অপরিসীম ঘৃণা। যা একটু একটু করে জমিয়ে অপেক্ষা করছে রজত ফিরলে সবটুকু উগড়ে দিতে। সে ঠিক করে নিয়েছে—এ-বাড়িতে, রজত, এ পরিবার, এই ব্যবসার সঙ্গে সে থাকবে না। তার মুক্তি চাই। সে এখন থেকে পাখি দেখবে প্রকৃতিতে, ডাক শুনবে অদৃশ্যে।

আবেশ বলল, 'ম্যাম ওরা এসে ঘর দেখবে ফাঁকা। আপনি ওদের কী বলবেন? স্ক্রিপ্ট রেডি করুন। ওরা যদি শিম্পাঞ্জি খোঁজে—আপনি বলবেন পালিয়ে গেছে। আজ ঘর খুলে আপনি দেখতে গিয়েছিলেন, তখনই আপনাকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে গেছে। আপনার দু'হাতে আঁচড়ে কামড়ে দিয়ে গেছে।'

'আমি আঁচড় কামড়ের দাগ কীভাবে দেখাব?'

'আপনি আপনার সাজের জিনিসপত্র আনবেন। আমি আপনার হাতে আঁচড় কামড়ের দাগ করে দেব।'

'আর যদি আপনাকে চায়? বলে, আবেশ শর্মা কোথায়?'

'তখনও বলবেন—পালিয়ে গেছে। আঁচড়ে-কামড়ে দিয়ে।'

'ওই আঁচড় কামড়ের দাগগুলো কী দেখাব? শিম্পাঞ্জি আর মানুষের আঁচড় কামড় এক?'

'বন্দি অবস্থায় মানুষের সঙ্গে শিম্পাঞ্জির খুব একটা তফাত নেই। আবেশ হালকা হাসে। গত দুদিন পরে ও হাসল। 'ম্যাম, আমার মেকআপে ভরসা রাখুন—ওরা সত্যি ভাববে, আপনি আবেশ শর্মার প্রেমে পড়ে তাকে ছেড়ে দেননি। আর সেও আপনাকে আদর করে যায়নি, কামড়ে খিমচে পালিয়েছে।'

নন্দিতা অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকে। বলে, 'আপনি দাড়ি কাটুন। কাঁচা পাকা দাড়িতে আপনাকে খুব বয়স্ক লাগছে। আপনাকে এই চেহারায় আপনার কোনও ফ্যানও চিনতে পারবে না।'

আবেশ আবার হাসে। ওর ঠোঁট দুটো বড় শুকনো। গলার স্বর চেপে বলে, 'শিম্পাঞ্জির মতো!'

নন্দিতা বলল, 'আবেশ আজ বিরিয়ানি খাবেন, আমি গিয়ে নিয়ে আসছি।'

'কেন ম্যাডাম, এটা কি ফাঁসির খাবার, আমাকে বিরিয়ানি খাইয়ে বিদায় করতে চাইছেন? তার আগে একটু দেখে নিন না ম্যাম, আপনার স্বামী কিডন্যাপারদের সঙ্গে, নাকি শুধু জন্তুজানোয়ারেই আছেন?'

'আমার মনে হয় ও জেনে-বুঝেই এটা করেছে। ও প্রথম একটা দুটো দিন জন্তুটা খেয়েছে কি খাইনি, শরীর কেমন আছে জানতে চাইত। এখন ওই প্রসঙ্গে চুপ করে থাকে। খালি বারবার শোনায় এবারের কনসাইনমেন্ট থেকে ভালো প্রফিট করবে। হয়তো অ্যাকসিডেন্ট নিয়ে জটিলতা না তৈরি হলে, যারা আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছে তারা এতদিনে মুকুন্দর সঙ্গে, আপনার স্ত্রীর সঙ্গে দরদস্তুর করে ডিল ফাইনাল করে ফেলত।'

আবেশ হাসে, 'ম্যাম আজ রাতটা যাক তারপর আমরা বুঝতে পারব, ঠিক কী হয়েছে? ওরা রাত বারোটার পরে আসবে। শুধু তার আগে আমার লুকানোর জায়গাটা ঠিক করে দেবেন। আপাতত আমি টিভি নিউজ চ্যানেলে দেখি—আমার কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়। আমি কতটা ভালো, আমি কতটা খারাপ? আমি কতটা হিরো, আমি কতটা ভিলেন?'

সন্ধের একটু পরে আবেশ এসে নন্দিতাকে ডেকে নিয়ে গেল। বলল, 'ম্যাম দেখবেন আসুন। এটা না দেখলে আমার অনেক কিছুই বাকি থেকে যাবে।'

নন্দিতাকে আসতেই হল। টিভি চ্যানেলগুলোর সামনে সেজেগুজে প্রেস কনফারেন্স করছে বাসন্তিকা আর পামেলা। আবেশ উত্তেজিতভাবে টিভি কাচে হাত দিয়ে চেনাল, 'এ পামেলা, এ বাসন্তিকা।' নন্দিতা বলল, 'কী বলছে এরা?'

আবেশ হাসল, 'ওরা বলছে, আমি সেদিন কত কত মদ খেয়েছি। ওরা অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমাকে নিরস্ত্র করতে পারেনি। তারপর আমি যখন জোরে গাড়ি চালাচ্ছিলাম, তখনও ওরা নাকি অনেক চেষ্টা করেছে আমাকে থামাতে। বার-বার বলেছে, আস্তে চালাতে, ওদের ভয় করছিল। কিন্তু আমি বেহেড মাতাল, ওদের কথা শুনিনি।'

আবেশ যখন নন্দিতাকে পামেলার বলা কথাগুলো শোনাচ্ছিল, তখন একজন সাংবাদিক কিছু একটা প্রশ্ন করল পামেলাকে। আর তার কথা শুনে ফুঁসে উঠল পামেলা। সে গড়গড় করে বলতে শুরু করল : 'আবেশ শর্মা একজন ফ্রড। আমাকে দিনের পর দিন এক্সপ্লয়েট করেছে। আমাকে ইউজ করেছে। আমার সঙ্গে ওর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বলেছিল, ওর বউ দুর্গাকে ডিভোর্স করে আমাকে বিয়ে করবে। কিন্তু কখনও ওর ছেলেমেয়েদের মাকে ও ছাড়তে পারেনি। ছাড়তে চায়ওনি। আমাকে শুধু মিথ্যে স্তোকবাক্য দিয়ে আটকে রেখেছে। আমি ইচ্ছে করলে প্রতারণা করার জন্য ওর নামে মামলা করতে পারি। ইদানীং সিমিলির সঙ্গে ওর অ্যাফেয়ার চলছে। পরপর দুটো ফিল্মে ও সিমিলিকে অপোজিটে নিয়েছে। হ্যাঁ ওই দিন এসব নিয়ে ফ্লোরে ওর সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি হয়। যা হয় তা সবার সামনেই। তারপর রাতে ও আমাকে ডাকে...পার্টিতে নিয়ে যায়। ওখানে আকণ্ঠ মদ খেয়ে আমাকে বলে চলো তোমায় বাড়ি ছেড়ে আসি। আমি ওর আচরণ দেখে ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল ও একা পেলে আমাকে খুন করে রাখবে। আমি বাসন্তিকা আর তরণীকে ডাকি।' প্রেস কনফারেন্স-এ এক নাগাড়ে কথা বলে পামেলা থামে। গ্লাস তুলে ঢক ঢক করে জল খায়। বলে, 'কিন্তু সব কিছুর পরেও আমার একটা সন্দেহ হয়, আবেশ যা গাড়ি চালায়, যে স্পিডে গাড়ি চালায়, তাতে এই ভুল করল কী করে? আমার সন্দেহ আবেশ অ্যাকসিডেন্ট করতে চেয়েছিল, যাতে গাড়ির বাঁদিকটায় যা হওয়ার হবে। বাঁ-দিকে ছিলাম আমি। আবেশ আমাকেই মারতে চেয়েছিল। ও ফিরে এলে এর তদন্ত করা উচিত।'

পামেলার কথা শুনে আবেশ হাতের মুঠো বন্ধ করে চিৎকার ওঠে, 'একটা বাজে মেয়ে, রাস্তার মেয়ে, আমার হাত ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে আছে, বলছে গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করিয়ে আমি ওকে খুন করতে চেয়েছি। কী বাজে যুক্তি! এভাবে কাউকে খুন করা যায়? তুই দু'কড়ির মেয়ে, তোকে ইচ্ছে করলে আমি পাগল বানিয়ে রেখে দিতে পারি। ইন্ডাস্ট্রির দরজা বন্ধ করে দিতে পারি। আর তুই আজ আমার বিপদের সময় বাজার গরম করতে নেমেছিস?'

নন্দিতা বলল, 'প্লিজ আপনি শান্ত হোন। এখনও নীচে শ্যামলী আছে। আমি চাই না আপনার গলার আওয়াজ ও পাক।'

আবেশ ছটফট করে। নন্দিতা এগিয়ে এসে টিভির রিমোটটা হাতে নেয়। টিভি অফ করে দেয়। বলে, 'আমার কথা শুনুন। আপনি চুপ করে শুয়ে থাকুন। আজ রাতটা যাক, কাল ভাবা যাবে।'

'কী ভাবব, পুলিশের কাছে সারেন্ডার করার কথা আপনি ভাবছেন তো? আমি সারেন্ডার করব না।'

'ঠিক আছে। সেটা আপনার ইচ্ছে। প্লিজ এখন আপনি শান্ত হয়ে শুয়ে থাকুন। শ্যামলী চলে যাওয়ার আগে একবার নিশ্চয়ই ওপরে আসবে। আমি নীচে থেকে একবার ঘুরে আসছি। প্লিজ আপনি এখন আর টিভি অন করবেন না।'

নন্দিতা নীচে যায়। বিনয়কান্তির শোওয়ার ব্যবস্থাপত্র দেখে। শ্যামলী চলে গেলে সে আবার ওপরে ওঠে। আবেশ শর্মা বলল, সে খাবে না। খিদে নেই। নন্দিতাও খেল না। ঠিক রাত দশটায় ফোন এল রজতের—ওর বারোটার পরেই ঢুকবে। নন্দিতা দাঁতে দাঁত চেপে থাকল।

রাত বারোটার পর একটা গাড়ি এল ওদের গেটের সামনে। নন্দিতা ভীষণ স্বাভাবিকভাবে দরজা খুলে দিল। ওরা তিনজন। নন্দিতা ওদের একতলা থেকে দোতলা, দোতলা থেকে তিনতলা, তিনতলা থেকে একটু একটু করে দোতলায় নামাল। দাঁড় করিয়ে দিল—সাড়ে তেরো নম্বর ঘরের সামনে। ওদের হাতে চাবি দিল। ওদের একজন চাপা গলায় নন্দিতার কাছে জানতে চাইল, 'মালটা কি জেগে?'

নন্দিতা শান্ত গলায় বলল, 'কী মাল?'

অন্য একজন বলল, 'কী আছে আপনি জানেন না, আমাদের জিজ্ঞেস করছেন? আপনি সরুন। আমরা ব্যবস্থা করছি।'

ওদের একজনের হাতে রিভলভার। তাতে ভরা ঘুমপাড়ানি বুলেট। নন্দিতা বাইরে বেরিয়ে এল। ওরা খুব আস্তে চাবি ঘোরাল। তারপর একজন চাপা স্বরে বলল, 'কী হল!'

'কী হয়েছে?'

'ভেতরে কোনও সাড়াশব্দ নেই কেন—মরে গেল না তো?'

'কী ফালতু কথা বলছিস, সর।'

দ্বিতীয়জন এগিয়ে আসে। খুব সন্তর্পণে ঘরের ভেতর দেখে। 'এই ঘরের ভেতরে কিছু নেই।'

'ভুল ঘরে নিয়ে এসেছে।'

একজন ডাকল, 'এই যে শুনছেন। মালটাকে কোন খাঁচায় ঢুকিয়েছেন। এখানে কিছু নেই।'

নন্দিতা আবার বলল, 'মালটা কী আমি জানতে পারি?'

'বারবার কেন ন্যাকার মতো এক কোয়েশ্চেন করছেন—শিম্পাঞ্জি।'

নন্দিতা বলল, 'এখানে কেউ কোনও শিম্পাঞ্জি রেখে যায়নি।'

ওদের একজন বলল, 'রেখে যায়নি মানে? আমি নিজের হাতে রেখে গেছি। আমি আর পবন এসেছিলাম, আপনি কী বলছেন!'

নন্দিতা বলল, 'না আপনাদের কোনও ভুল হচ্ছে। এই ঘরে কোনও শিম্পাঞ্জি ছিল না।'

'তবে কোন ঘরে ছিল?' লোকটা তেড়িয়া গলায় বলল।

'এ-বাড়ির কোনও ঘরেই শিম্পাঞ্জি ছিল না।' নন্দিতা গলা ভারী করে।

'কী বলছেন আপনি ফালতু কথা! তাহলে কী নিতে আমাদের আপনি এই ঘরের সামনে নিয়ে এলেন? আপনি ঠিক ঠিক ঘরটা দেখান। প্রয়োজন পড়লে রজতবাবুকে ফোন মারুন। মেরে জেনে নিন। আমরা কে? আমরা কী নিতে এসেছি। আর তাছাড়া আপনিই তো একা এ-বাড়িতে থাকেন। আমরা যা জানি আপনিই সমস্ত ব্যাপারটা ডিল করেন। কী হয়েছে বলুন তো আজ আপনি নাটক করছেন?'

'আমি কোনও নাটক করিনি। কোনও বাজে কথা বলার চেষ্টা করবেন না।'

'তাহলে আমাদের মালটা দিন, আমরা চলে যাই। এখানে আমাদের লোক এসে মাল রেখে গেছে। আমরা রজতবাবুর সঙ্গে কথা বলে এখানে এসেছি। মালটা কালই ট্রেনে চাপবে। হায়দরাবাদ যাবে। ফালতু কেন হ্যারাস করছেন?'

নন্দিতা দাঁত চেপে বলল, 'আপনারা শিম্পাঞ্জি খুঁজতে এসেছেন। এই ঘরে কেউ শিম্পাঞ্জি রেখে যাননি।'

'রেখে যায়নি মানে? এই বাড়িতেই রেখে গেছে। এই বীরে, তুই ফোন লাগা কুণাল স্যারকে। কুণাল স্যার রজতবাবুর সঙ্গে কথা বলে নেবে।'

বীরে নন্দিতার সামনে কুণাল স্যারকে ফোন করল। নন্দিতা বুঝতে পারছে, ফোনের ওপারে যিনি তিনি এদের মতো বিস্মিত। বীরে ফোন কেটে বলল, 'কুণালস্যার, রজতস্যারকে ফোন করছে। এবার কেস জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। দুধ কা দুধ, পানি কা পানি।'

একটু পরেই উৎকণ্ঠা ভরা ফোন এল রজতের। বলল, 'কী বলছ তুমি ওই ঘরে কিছু নেই?'

নন্দিতা বলল, 'আমি বলিনি কিছু নেই, কিছু ছিল না। এখন ওরা যেটা খুঁজছে সেটা নেই।'

চাপা গলায় রজত বলল, 'ওই ঘরে একটা শিম্পাঞ্জি থাকার কথা। সেটা নেই?'

'না, কোনও শিম্পাঞ্জি ওই ঘরে ছিল না।'

'তাহলে ওই ঘরে ওরা সেদিন এসে কী রেখে গেছে?'

'একটা মানুষ!'

'কী বলছ কী তুমি! তুমি শিওর?'

'হ্যাঁ।'

'দাঁড়াও আমি কুণালের সঙ্গে কথা বলছি।'

তিন-চার মিনিট পরেই নন্দিতার হাতের ফোন কেঁপে উঠল। 'তুমি মিথ্যে কথা বলছ। ওখানে যদি কোনও শিম্পাঞ্জি না থেকে কোনও মানুষ ঢুকিয়ে দিয়ে যায়, তাহলে তুমি আমাকে জানালে না কেন?'

'আমি তো জানি না ওখানে শিম্পাঞ্জি থাকার কথা।'

'শিম্পাঞ্জি না থেকে ক্যাঙারু থাকতে পারে, ভালুক থাকতে পারে, চিতা থাকতে পারে, যে-কোনও জন্তু থাকতে পারে, কিন্তু ওখানে মানুষ থাকতে পারে না। এটা তুমি যথেষ্ট বোঝো। প্লিজ বলো ঠিক কী হয়েছে?'

'আমার সব কথা বলা হয়ে গেছে।'

'বাজে কথা রাখো—কোন ঘরে মালটা আছে জানাও। চালাকি করছ আমার সঙ্গে—দেড় কোটি টাকার একটা মাল ঘর থেকে হাপিস হয়ে গেল! ওরা খুব খতরনাক লোক। প্লিজ।'

'প্রয়োজন পড়লে আমি পুলিশকে ফোন করব।'

ফোনের ওপারে রজত। একটু চুপ করে থাকল। বলল, 'ওদের কাছে আমি সময় নিচ্ছি। ওদের কাল আসতে বলছি। তুমি ওদের ফোন দাও।'

নন্দিতা ওদের একজনের হাতে ফোন দিল। সে ফোনটা নিয়ে পাশের একজনের হাত পাস করিয়ে দিল। 'বলুন।'

ওপার থেকে রজত বলল, 'আপনারা আজ চলে যান। আমি কুণালের সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি। কাল রাতে আসুন। মাল পেয়ে যাবেন। নিশ্চয় অন্য কোনও ঘরে লুকিয়ে রেখেছে।'

'আমরা খুঁজে নিচ্ছি স্যার।'

'আপনাদের খুঁজতে হবে না। কাল পেয়ে যাবেন।'

'কাল সকালে ট্রেন।'

'আমি কুণালের সঙ্গে কথা বলে নেব। তেমন হলে আমি মাল নিজের হাতে ডেলিভারি করব। আমার স্ত্রী একটু খ্যাপামি করছে। ওর মাথার একটু গোলমাল আছে। শুনলেন তো পুলিশ ডাকবে বলছে।'

'স্যার পুলিশের ভয় আমরা পাই না। ইচ্ছে করলে ওর পুলিশ ডাকার আগেই পচ করে গলার নলিটা টেনে দিয়ে চলে যেতে পারি। ঠিক আছে কাল আসব। কিন্তু কাল যেন কোনও ড্রামা না হয়। আপনার সঙ্গে কুণাল স্যারের অনেক দিনের বিজনেস। আমি আপনার থেকে মাল ডেলিভারি নিয়েছি আট-দশবার। ঠিক আছে। আপনি কুণাল স্যারকে ফোন করুন। কুণাল স্যার না বললে আমরা যাব না।'

ফোন কেটে গেল।

কয়েক মুহূর্ত পরেই লোকটার হাতের ফোন নড়ে উঠল, 'হ্যাঁ স্যার বলুন। ঠিক আছে, কাল আসব। চলে যাচ্ছি। না, না, কোনও খিস্তিখামারি করিনি। এতদিনের চেনাজানা। আজ পালটি খাচ্ছে ঠিক আছে।'

ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল নন্দিতা। একসময় গেটে তালা দিয়ে ফিরেও এল সে। এসে দেখল বারান্দায় আবেশ দাঁড়িয়ে।

নন্দিতা বলল, 'ওরা শিম্পাঞ্জির খোঁজে এসেছিল।'

আবেশ চুপ করে থাকল।

নন্দিতা বলল, 'কফিন পালটে গেছে। আপনি এখানে, শিম্পাঞ্জি আপনার জায়গায়—এটাই হয়েছে।'

আবেশ শর্মার মুখ আশ্চর্য এক হাসিতে ভরে গেল। 'যাক ম্যাডাম আপনার জন্যে আমার ভালো লাগছে—আপনার স্বামী অতটা খারাপ লোক নন।'

'আমি ওকে আমার মন থেকে অনেকদিন ছেড়ে দিয়েছি আবেশ। এবার সামাজিক সম্পর্কটা ছিন্ন করতে হবে। আমি আর পারছি না।'

'তাহলে তাই করুন ম্যাম। ভালো করে বাঁচুন। আমি আপনার পাশে থাকব।' কথাটা বলে আবেশ শর্মা নন্দিতার মুখের দিকে তাকাল। বলল, 'আমার কথাটা এখন বোকা বোকা শোনাল, তাই না? এখন আমারই দরকার আপনাকে পাশে পাওয়ার। আপাতত আপনি আমায় হেল্প করুন। ওরা যদি জানতে পারে শিম্পাঞ্জির বদলে আবেশ শর্মা এসেছে, তাহলে ওরা আমাকে ছাড়বে না। আমাকে নিয়ে নতুন গেম খেলতে পারে। ওদের কিছু বিশ্বাস নেই। আপনি সত্যের পথে চলেছেন। শুধু আমাকে মানুষ হিসেবে দেখুন, আবেশ শর্মা নয়, প্লিজ।' আবেশ শর্মা নন্দিতার দুটো হাত ধরল।

১১

কাল রাতে রজত অনেক বার ফোন করেছিল। নন্দিতা ধরেনি। কিন্তু আজ সকালের প্রথম ফোনটা নড়ে উঠতেই ধরেছিল সে। রজত বলেছিল, 'ছেলেমানুষি কোরো না নন্দিতা। জিনিসটা কোথায় আছে ওদের বলে দাও। শিম্পাঞ্জি হিংস্র প্রাণী, ও যদি একবার খাঁচা থেকে বেরিয়ে পড়ে—খুব বিপদ হবে। ওকে ম্যানেজ করা সহজ কথা নয়।'

নন্দিতা শান্ত গলায় বলেছিল, 'খাঁচার ভেতর যে ছিল সে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। আমার কিন্তু কোনও বিপদ হয়নি।'

রজত ওর কথা মানতে চায়নি।

'তুমি বুঝতে পারছ না নন্দিতা, আবেশ শর্মার গোলমাল নিয়ে চারদিক তেতে আছে, কার ঝামেলা কোন দিকে আসে কে বলতে পারে। প্লিজ তুমি আমাকে বলো শিম্পাঞ্জিটার কী হয়েছে? কোন ঘরে লুকিয়েছ?'

নন্দিতা চুপ করে থাকল।

রজতকান্তি বলল, 'আমি এমনিতেই তোমাকে ফোন করে বলতাম, তেমন বুঝলে কাকাতুয়া আর ম্যাকাওগুলোকে সাড়ে তেরো নম্বর ঘর সাফ হলে সেখানে চালান করে দিতে। সিচ্যুয়েশনটা বেশ গোলমেলে। তুমি কাগজ পড়ো না, টিভি দেখো না, দেখলে জানতে পারতে আবেশ শর্মার সেক্রেটারির বাগানবাড়ি থেকে একটা শিম্পাঞ্জি উদ্ধার হয়েছে। আমার মনে হয় সেক্রেটারিটা কোনও কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। ওদের কত পয়সা তবু এই বিজনেস করছে! সার্কিটে কেউ ওর কথা জানত না। এখন কেঁচো খুঁজতে কেউটে বেরিয়ে পড়েছে। যে-কোনও সময় আমাদের যারা এসব কারবার করি তাদের বাড়িগুলোতে রেইড হতে পারে। একটা কিছু পেলে ওদের ছেড়ে আমাদের নিয়ে মাতামাতি করবে।'

'মুকুন্দকে তুমি চেনো?'

'কে মুকুন্দ?'

'আবেশ শর্মার সেক্রেটারি।'

'আমি কেন, সার্কিটে কেউ চেনে না। সেই দেখা গেল বড় খেলুড়ে। প্লিজ তুমি বলো মালটা কোন ঘরে আছে। কেসটা কী? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।'

'ওরা ওই ঘরে শিম্পাঞ্জি রেখে যায়নি।'

'ঠিক বলছ—আমাকে ব্লাফ দিচ্ছে? কিন্তু আমি তো পাঠিয়েছি। তাহলে শিম্পাঞ্জিটা গেল কোথায়! এ জিনিস লুকিয়ে রাখার জিনিস নয়।'

'শিম্পাঞ্জি নয়, ওরা একটা মানুষ রেখে গেছে।'

'উফ! তুমি বারবার একথাটা বলছ কেন, এটা হতে পারে না। একটা মানুষ পশুর খাঁচায়? খুন করা সহজ, কিন্তু এটা সহজ কাজ নয়। আমার মনে হয় তুমি কোনও ভুল করছ—প্লিজ একটু ভেবে দেখো। আমি এদিকে খোঁজ নিচ্ছি। কুণাল আমাকে ধাপ্পা দিতে পারে না। কিন্তু তুমি আমাকে মিসগাইড কোরো না প্লিজ।'

নন্দিতা নিরুত্তর। ফোন কেটে গেল। নন্দিতা শুনতে পাচ্ছিল ফোনের ওপারে রজতকান্তি হাঁপাচ্ছে। না, রজত মানুষ নিয়ে কারবার করেনি। নন্দিতা বুঝেছিল—কাঠের কফিনটাই পালটে গেছে কোনও ভাবে। যে-কথা নন্দিতা রজতকে বলতে পারছে না। বললেই ওরা আবেশর কথা জেনে যাবে। তখন শুরু হবে নতুন পর্ব।

আজকের সব খবরের কাগজেই লিড পামেলা। পামেলার বিস্ফোরক কথা। সংবাদমাধ্যমের কাছে পামেলা উসকে দিয়েছে অনেক কথা। আবেশ শর্মা কি খুন করতে চেয়েছিল পামেলাকে? ফ্লোরে কথা কাটাকাটির পর কেন পামেলাকে নিয়ে গেল পার্টিতে? পার্টি ছেড়ে কেন হঠাৎ বেরিয়ে এল সে? দক্ষ ড্রাইভার আবেশ গাড়ির কন্ট্রোল হারাল কী করে? পামেলা বলেছে, এরকম মদ আবেশ হরহামেশাই খায়, তারপর ঠিকঠাকই গাড়ি চালায়, কোনওদিন সামান্য ঝাঁকুনিটুকুও লাগেনি। তবে কী এমন হল সেদিন যে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরে গেল বাঁ-দিকে? বড় মজবুত গাড়ি বলে বাঁ-দিকের যাত্রী রেহাই পেয়েছে। নাহলে তারই সবচেয়ে বেশি আঘাত পাওয়ার কথা। তাহলে কি ত্রিকোণ সম্পর্কের জেরে এই অ্যাকসিডেন্ট? আবেশ-পামেলা-সিমিলি?

নন্দিতা আজকের খবরের কাগজটা আবেশের পাশে বসে খুঁটিয়ে দেখছিল। দেখল, সাতটি মৃত মানুষের জন্য খবরের কাগজে একটিও শব্দ নেই। অনেকদিন পরে নন্দিতার হাসি পেল। নন্দিতা হেসেও ফেলল। ওর হাসি দেখে আবেশ বলল, 'ম্যাম, আপনি হাসছেন! কেন হাসছেন আমি বুঝছি।'

'না, আপনি বোঝেননি।'

'আমি যদি বলে দিই—আপনি আমাকে কী দেবেন বলুন?'

'আপনাকে দেওয়ার মতো আমার কাছে তেমন কিছু নেই।'

'ঠিক আছে আমি সময়মতো চেয়ে নেব। দেখি কী নেওয়া যায়।'

'আরে আপনি আগে বলুন—আমি কেন হাসলাম? সেটা তো মেলাতে হবে আপনাকে।'

'আপনি দেখছিলেন সারা কাগজে জুড়ে আবেশ শর্মা-পামেলা-সিমিলি, এমনকী মুকুন্দ ও শিম্পাঞ্জির কথা আছে। কিন্তু মৃত মানুষগুলোর কোনও খবর নেই, তাই তো?'

ঘাড় হেলিয়ে নন্দিতা হাসল। অনেক দিন পরে নিজেকে কেমন যেন মুক্ত লাগছে। নির্ভার!

আবেশ বলল, 'ম্যাম, আপনি জানেন এ সময় আপনার ডায়লগ হওয়া উচিত—সত্য সেলুকাস কী বিচিত্র এই দেশ! আমি স্ক্রিপ্টটা কিন্তু খারাপ লিখি না।'

'তবু আমি আপনার ফ্যান হতে পারছি না।'

'আজ না হোক কাল হবেন। আজ না পারলেও কাল আমার অভিনয়ের জন্য হাততালি আপনাকে দিতেই হবে ম্যাম।'

'আপনি পুলিশের কাছে সারেন্ডার করুন আবেশ। নিজের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চান। একটু সুযোগ চান। দেখুন না কী হয়? আপনার জন্যে এত মানুষ—।'

আবেশ হাসে, 'আমাকে নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে। গ্রেপ্তার না করতে পারার জন্য একপক্ষ যেমন সরকারকে তুলোধনা করছে, অন্যপক্ষ কিন্তু আমাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তাও করছে। আমাকে নিয়ে সবাই ভাবছে, যে-যার মতো করে ভাবছে।'

আবেশ থামে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, বলে, 'ক'দিন ধরে আমার মনে হচ্ছে আমি মরণের ওপারে চলে গেছি। ওপার থেকে বসে বসে বেশ সব কিছু মস্তি মেরে দেখছি।'

নন্দিতা বলল, 'সেটাও যে রিয়েল লাইফ নয় আবেশ। আপনি রিয়েল লাইফে ফিরে আসুন।'

আবেশ বলল, 'এখনও সময় আসেনি। এলে আপনাকে জানাব। আপাতত একটু টিভি দেখা যাক। দেখি পামেলা আর কত মিথ্যে কথা বলতে পারে।'

টিভি চালিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল আবেশ।

টিভি স্ক্রিন জুড়ে আবেশ শর্মার স্ত্রী দুর্গা শর্মার মুখ। সাংবাদিকদের সামনে ও শোনাচ্ছে আবেশের বেহিসেবী বেপরোয়া জীবনযাপনের কথা। দুর্গা। দুর্গা ক্ষুদ্ধ! দুর্গা ওকে ডিভোর্স করতে চায়। দু-একদিনের মধ্যে ল'ইয়ারের পরামর্শ নেবেন। খুব শীঘ্রই কোর্টের শরণাপন্ন হবে। ওর ছেলে ও মেয়ের কাস্টডি চাইবে। তার কথা, এই বাবার কাছে কখনওই তার ছেলে ও মেয়েরা ভালোভাবে মানুষ হতে পারে না। দুর্গার মতে আবেশ শর্মা একজন বিকৃতমনা মানুষ। যার ঘরে স্ত্রী থাকতে দিনের পর দিন একটার পর একটা মেয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয় দুর্গার চোখে আবেশ একজন খুনি, ক্রিমিনাল। যে নেশার ঝোঁকে সাতজন মানুষকে মেরে লুকিয়ে পড়েছে। যার মধ্যে এতটুকু সৎ সাহস নেই যে সামনে এসে দাঁড়াতে পারে। এইরকম একজন খুনি, ক্রিমিনালের সঙ্গে সে এবং তার ছেলেমেয়েরা থাকতে পারবে না। মহামান্য আদালতের কাছে দুর্গা ডিভোর্স প্রার্থনা করবে।

নন্দিতা সোফা ছেড়ে উঠল।

নিচু গলায় আবেশ বলল, 'টিভিটা বন্ধ করে দেবেন প্লিজ, আমি সহ্য করতে পারছি না।'

নন্দিতা বেরিয়ে আসছিল, আবেশ বলল, 'ম্যাম আপনি সকালে মেডিটেশন করেন—চোখ বন্ধ করে কার কথা ভাবেন? আমার তো ঘুমিয়ে পড়া ছাড়া দু'চোখ বন্ধ করলেই কেমন ভয় করে। আপনি আমাকে একটু নির্ভয় হতে শেখাবেন?'

ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে নন্দিতা বেরিয়ে এল।

দুপুরবেলা নন্দিতা ডাকতে ও ডাইনিং রুমে এল। অল্প ভাত খেল মাথা নীচু করে। নন্দিতার মনে হচ্ছিল, আবেশ যেন লজ্জিত। অন্য কোন কিছুতে নয়, আজ দুর্গা ওকে ভেঙেচুরে তছনছ করে দিয়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ও যেন কেমন জড়ভরত হয়ে গেছে। খুব ধীরে ধীরে খেল। একটাও কথা বলল না খাওয়া নিয়ে। নিজেকে নিয়ে একটা মজাও করল না। হাত-মুখ ধুয়ে নিশ্চুপে নিজের ঘরে ফিরে গেল। যাওয়ার আগে একবার শুধু ঘুরে দাঁড়াল, বলল, 'ম্যাম আপনাকে আমি বারণ করেছিলাম ওদেরকে আমার কথা না জানাতে। আমি সে কথা ফিরিয়ে নিচ্ছি। আপনি ইচ্ছে হলে বলতে পারেন। আমি কিছু মনে করব না।'

দুপুরে ফোন এল রজতের। রজতের শান্ত গলা, 'নন্দিতা সত্যি কথা বলো ঠিক কী হয়েছে? তুমি যাই বলবে আমি ম্যানেজ করে নেব। শোনো শিম্পাঞ্জিটার দাম দেড় কোটি টাকার ওপর। আমি ইচ্ছে করলে, সে টাকা দিয়ে দিতে পারি। বা তুমি ইচ্ছে করলে তোমার গয়না বেচে সে টাকা ওদের শোধ করে দিতে পারো। কিন্তু তার আগে আমাকে জেনে নিতে হবে কেন এমন হল? এত প্রোটেকশন! না, অন্য কোনও ব্যাপার আছে? তুমি প্লিজ বলো, কিছু গোপন কোরো না। শিম্পাঞ্জিটা এখন কোথায় আছে? তুমি কি শিম্পাঞ্জিটাকে পুষতে চাও? আমি তোমায় এনে দেব।'

নন্দিতা বলল, 'আমার যা বলার তোমাকে বলেছি। ওই ঘরে শিম্পাঞ্জি ছিল না। একজন মানুষ ছিল।'

'এখনও তুমি কী পাগলের মতো বকছ? ওখানে কোনও মানুষ থাকলে তুমি নিশ্চয়ই আমাকে ফোন করে জানাতে। এই কথাটা একদম বাচ্চার মতো হয়ে যাচ্ছে! যদি বলো মানুষ ছিল, তাহলে বলব সেই মানুষটা কোথায়? আমাকে জানতে হবে সেই মানুষটা কী করে ওখানে এল।'

'আমি তাকে মুক্ত করে দিয়েছি।'

'দেখো তুমি যদি বলতে, তুমি দেখোনি। ওরা চালাকি করে ভেতরে কিছু না রেখে এখন মাল নিতে এসেছে। তাহলে বুঝতাম ওরা কোনও গেম খেলছে। টাকার জন্য। কিন্তু তুমি বলছ ওরা একটা প্রাণী রেখেছে, সেটা শিম্পাঞ্জি নয় মানুষ! ওরা মানুষ পাবে কোথা থেকে?'

'আমার যা বলার বলে দিয়েছি। এবার তুমি দেখো কী করবে?'

'যদি সত্যি মানুষ থাকত তুমি ঠিক আমাকে বলতে। তখন আমি মানুষটাকে আটকে রেখে ওদের সঙ্গে বোঝাপড়া করতাম। এমন হতে পারে ওরা কিছু রাখেনি। শিম্পাঞ্জির নাম করে আমার কাছ থেকে টাকা আদায় করার ছক করেছে। কিন্তু তুমি একজন মানুষ ছিল বলে সব গোলমাল করে দিচ্ছ—।'

'যা সত্যি আমি তাই বলেছি।' নন্দিতা ফোন কেটে দিল।

কিন্তু সন্ধের সময় রজত আবার ফোন করল।

ফোন ধরতেই রজতের হুংকার, 'কি রে আমার বাড়িতে অন্য পুরুষ নিয়ে ফুর্তি করেছিস? আর আমি এখানে পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমি সব খবর পেয়েছি। কে? শুয়োরের বাচ্চাটা কে, যার সঙ্গে তুই আমার বাড়িতে ছিলি? তুই সিগারেট খাচ্ছিস কবে থেকে? টিভি চালাচ্ছিস, খবরের কাগজ পড়ছিস? বল, ছেলেটা কে? ওকেই শিম্পাঞ্জিটা দিয়েছিস? শোন শিম্পাঞ্জিটার দাম দেড় কোটি টাকার ওপর। আমি ইচ্ছে করলে তোর গয়না বেচে সে টাকা ওদের শোধ করে দিতে পারি, কিন্তু দেব না। প্রয়োজন পড়লে ওদের বলব—তোকে তুলে নিয়ে যেতে, তোকে বিক্রি করে দিতে। ভালো চাস তো মালটা কোথায় আছে জানিয়ে দে। আমি জানি এ পাখি নয় যে লুকিয়ে রাখবি, বা আকাশে উড়িয়ে দিবি। এটাকে চেপে রাখা যায় না। আমি খোঁজ নিয়েছি বাজারে কারও কাছে আপাতত শিম্পাঞ্জি আসেনি। শিম্পাঞ্জি বিক্রির কোনও খবর নেই। থাকলে আমি তোর ওই প্রেমিকটাকে ঠিক ট্রেস করে ফেলতাম। ভালো চাস তো শিম্পাঞ্জিটাকে বের করে দে। কোনও কথা নয় আর। ওরা আমাকে ধোঁকা দিচ্ছে না। দিচ্ছিস তুই। দেড় কোটি টাকা মেরে বেরিয়ে যাবি, আর আমি তোকে ছেড়ে দেব? শোন, আজ রাতে ওরা যাবে। ওদের হাতে শিম্পাঞ্জিটা দিবি। দিয়ে কাল সকালবেলা ওই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবি। তুই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে তবে আমি বাড়িতে ঢুকব। আমি তোকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলাম, আজ রাস্তায় ছেড়ে দিলাম। এখনও বাবা বা কাউকে কোনও কথা বলিনি। আমি চাই তুই চুপচাপ সরে যাবি। আমি তোকে রিলিজ করে দিলাম।'

চোয়াল শক্ত করে নন্দিতা, 'থ্যাঙ্ক ইউ রজত।'

১২

ওরা সেল ফোনের স্পিকার অন করে দিল।

ফোনের ওপারে রজতকান্তির গলা : নন্দিতা শিম্পাঞ্জিটা কোথায় আছে বলে দাও। নাহলে ওরা সব ঘর খুঁজে বের করবে। আমি ওদের বলে দিচ্ছি, এ-বাড়ির কোথায় কোথায় লুকানো শেল্টার আছে। রজত একটু থামল। বলল : তুমি কি ওদের বলে দেবে কোন ঘরে মালটা আছে?'

'এখানে কোনও ঘরেই শিম্পাঞ্জি নেই।'

এবার রজত গর্জে উঠল, 'তুই তাহলে বলবি না? আমাকে মেরে ফেলতে চাস? ঠিক আছে আমি ওদের বলে দিচ্ছি এ-বাড়ির কোথায় লুকোনো ঘর আছে।'

'তোমার বলার দরকার নেই—আমিই ওদের সব ঘর ঘুরিয়ে নিয়ে আসছি।' নন্দিতা শান্ত গলায় বলল।

'মানে?'

'ওরা নিজের চোখে দেখে নিক। এ বাড়িতে কিছু আছে কি না?'

'তার মানে মালটা ওই শুয়োরের বাচ্চার কাছে আছে। এই বাড়িতে নেই। তুই সরিয়ে দিয়েছিস, তাই তো?'

'এখানে কোনও কিছু আসেনি। তাই সরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নও নেই।' নন্দিতা যেন আরও শান্ত হয়ে কিছু বলতে চাইছিল। তার আগে একজনের গলা ঘরঘর করে উঠল, 'একদম মিথ্যে বলবেন না। আমি আর পবন এসেছিলাম। আমরা নিজের হাতে কফিন বাক্স খুলে মালটা ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছি।'

'সেটা কি শিম্পাঞ্জি ছিল? আপনারা ভালো করে দেখেছিলেন? সেটা একটা মানুষ ছিল।'

'মানুষ ছিল। কী গপ্প মারছে মাইরি!'

'হ্যাঁ, সেটা মানুষ ছিল, আমি জানতে পেরে তাকে মুক্ত করে দিয়েছি।'

'বাজে কথা বলছেন। কুণালদা থামিয়ে রেখেছে, নইলে এতক্ষণে আপনার বারোটা বাজিয়ে ছাড়তাম। নিন, রজতবাবুর সঙ্গে কথা বলে নিন। মাল দিন, নইলে আমাদের দেড় কোটি টাকা দিয়ে দিন চলে যাচ্ছি। আর আপনি শিম্পাঞ্জিটাকে নিয়ে শুয়ে থাকুন।'

ফোনের ওপার থেকে রজত বলল, 'এই তোমরা সাড়ে তেরো নম্বর ঘরের সামনে আছো? শোনো ওই ঘর থেকে বেরিয়ে ডান দিকে যাও—।'

নন্দিতা বলল, 'আমি ওদের নিয়ে যাচ্ছি। তুমি নিশ্চয়ই নয় নম্বর ঘরটার কথা বলছ—?'

ফোনের ওপারে রজত কেঁপে উঠল। বিড়বিড় করে বলল, 'শালী আমার সঙ্গে খেলছে—!'

নন্দিতা ওদের নিয়ে নয় নম্বর ঘরে গেল। বলল, 'দরজার পাশে চাবি আছে খুলে দেখে নিন।'

একজন ঝাঁপিয়ে পড়ে চাবি নিল। একজন বলল, 'সাবধানে খুলিস।'

খুব সাবধানে দরজা খুলে ওরা দেখল। না, কিছু নেই।

একজন ফোন করল, তার বেশ তেরিয়া গলা, 'এবার কী করব রজতবাবু?'

'আমিও তো বুঝে উঠতে পারছি না—কী বলব তোমাদের, মালটা এ-বাড়িতে না থাকলে কোথায় গেল? বাইরে গেলে কোথায় যেতে পারে? যে নেবে সে আমাদের লাইনেরই লোক। কেউ তাহলে জেনে বুঝে একে ফুসলে মালটা হাতিয়ে নিয়েছে। ও বাচ্চা মেয়ে নয়। এখন জানতে হবে কে করেছে? তাহলে জিনিসটা পাওয়া সহজ হবে। শোনো, তোমরা আমার কথামতো কাজ করতে পারবে, তাহলে এখুনি সব কথা বেরিয়ে পড়বে। তার আগে ওকে লাস্ট ওয়ার্নিং দিই—।' রজত ফোনের ওপারে গলা খাঁকারি দিল। যেন কঠিন কথা, খিস্তি মাখানো হুমকি দেওয়ার আগে গলাটা ঝালাই করে নেওয়া।

রজত বলল, 'নন্দিতা তুমি বলবে না তাহলে? ঠিক আছে, আমি তোকে ছাড়ব না। শোন আমি তোকে সুকনার বস্তি থেকে তুলে নিয়ে এসেছি। তোর বাপ মদ বিক্রি করত, তুই আর তোর মা তিস্তার চরায় গরু-শুয়োর চড়াতিস। আমি তোর গায়ে উড়ে এসে পাখি-বসা দেখে আশ্চর্য হয়েছিলাম। তোর গায়ে এবার থেকে আর কোনও পাখি বসবে না। চিল শকুন বসাব। ওদের বলে দিচ্ছি—শিম্পাঞ্জি না পেলে তোকে ইঞ্জেকশন মেরে তুলে নিয়ে যেতে। তারপর শেয়াল কুকুরগুলো তোর সঙ্গে ফুর্তিফার্তা করে তোকে বিক্রি করে দেবে। সেখানে রোজ তোর গায়ে চিল শকুন বসবে। তোকে খাটিয়েও টাকা আমার উঠবে না। কিন্তু মনের জ্বালা মিটবে। তোর এত বড় স্পর্ধা তুই আমার সঙ্গে গেম করছিস!'

'আমার কোনও অসুবিধে নেই রজত। আমাকে ইঞ্জেকশন করতে হবে না, আমি এমনি চলে যাব ওদের সঙ্গে। কী করবে ওরা আমার সঙ্গে? আমাকে ছিঁড়বে, চিবিয়ে খাবে, মারবে?'

'তোকে রোজ বাজারে বিক্রি করবে।'

'আমি মরে গেছি রজত। এখন কেউ আমাকে কবর দিল, না আগুনে পোড়াল, নাকি জিইয়ে রাখল আমার কিছু এসে যায় না।'

রজত চিৎকার করল, 'তোর অনেক ডায়লগ শুনছি, দাঁড়া। এই তোমরা ফোনের স্পিকারটা অফ করে আমার কথা শোনো, আমি ওই নচ্ছার মেয়ের ওষুধ বলে দিচ্ছি। ওর পেট থেকে শুধু কথা বেরুবে না, এবার ও বাপ বলবে।'

একজন ফোনের স্পিকারটা অফ করে কানে ধরল।

রজত বলল, 'শোনো, তোমার সবাই তিনতলায় যাও। ওখানে আমার পরপর পাখির খাঁচা আছে। তোমরা সবাই পাখির খাঁচায় ঢুকবে। পাখির খাঁচায় ঢোকার আগেই ওই শালীর দু'হাত বেঁধে দেবে। যাতে ও চিৎকার করতে না পারে মুখে কাপড় গুঁজে দেবে। আমার কথা ভালো করে শুনছ? তারপর খাঁচায় ঢুকে পাখি মারবে, মনের সুখে পাখি মারবে। একটা প্রবল ধ্বংসলীলা চালাবে। তবে হ্যাঁ মনে রেখো, ফ্রিঞ্চ, বদ্রিকা এমন কম দামের পাখিই মারবে। দু-একটা লাভ বার্ডস খতম করতে পারো। কিন্তু কখনও ম্যাকাও, টিয়া বা কাকাতুয়া মারবে না। ওকে খাঁচার ভেতর ঢুকিয়ে ওর সামনে, যত খুশি ফ্রিঞ্চ বদ্রিকা মারো। মেরে মেরে ওর গায়ে ফেলে দাও। ওর পেট থেকে সব কথা আপনা থেকে বেরিয়ে আসবে।' রজত থামল, ফোনের ওপার থেকে থেমে থেমে শ্বাস ছাড়ল। পরের মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, 'কিন্তু ককাটেল, ম্যাকাও, কাকাতুয়া ছোঁয়া যাবে না—মনে রেখো। আর শোনো ওকেও মারধর করবে না। তখন ও যদি কিছু বলতে চায় জেনে নেবে শুয়োরের বাচ্চাটা কে? আর মালটা কোথায় আছে? ব্যস, ঠান্ডা মাথায় কাজ করো। বেশি চিৎকার হইচই করবে না। বাড়িতে আমার অসুস্থ বাবা আছেন। যা হবে শান্ত মেজাজে। নাও, ওকে নিয়ে তিনতলায় যাও। আর শোনো, পাখিঘরে ঢোকার আগে ওর হাত-মুখ বেঁধে দিও। না হলে পাখি মারতে পারবে না। ও তোমাদের পাখি মারতে দেবে না। ঝামেলা পাকাবে। ও নিজের থেকে পাখিদের বেশি ভালোবাসে। আশা করি আমার এই ওষুধে কাজ হবে।'

ফোন শেষ হলে লোকটা নন্দিতার দিকে তাকাল, বলল, 'এখনও সময় আছে ম্যাডাম। আমাদের কথা শুনুন। মালটা কোথায় আছে বলে দিন। নইলে এর ফল আপনাকে ভুগতে হবে।'

নন্দিতা ঠান্ডা গলায় বলল, 'আপনাদের কোনও সন্দেহ থাকলে পুরো বাড়িটা খুঁজে দেখুন।'

'আপনি না বললেও আমরা সারা বাড়ি খুঁজে দেখব। কিন্তু অন্য কোথাও যদি পাচার করে দেন...। ঠিক আছে আপনাকে ওষুধ দিতে হবে, ভালো কথা শোনার মেয়ে আপনি নন।'

লোকটা সঙ্গের চারজনকে ইশারায় ডাকল। বলল, 'আপনি দাঁড়ান। আমি ওদের সঙ্গে একটু কথা বলে নিই।' লোকটা সঙ্গীদের বুঝিয়ে বলল—রজতবাবু কী বলেছে। বারবার বলে দিল, 'কুণাল স্যার, রজতবাবু একসঙ্গে আছে। কোনও দামি পাখি মারা যাবে না। যা করতে হবে ঠান্ডা মাথায়, হইচই চিৎকার চেচাঁমেচি নয়। সেরেফ বদ্রিকা আর ফ্রিঞ্চ মেরে ছিঁড়ে ওটার গায়ের ওপর সাজিয়ে দিবি—ওর সব কথা মলমের মতো বেরিয়ে আসবে। চল ওকে নিয়ে তিনতলায় যাব।'

ওদের একজন নন্দিতার কাছে এল। 'চলুন আমরা তিনতলায় একবার যাব।'

'চলুন।'

'মালটা না পেলে আপনার বর আপনার সঙ্গে আমাদের যা খুশি করার অর্ডার দিয়েছে।' একজন বলল।

আর একজন বলল, 'মালটা দিয়ে দিন ম্যাডাম। নইলে আমরা সব কিছু করতে পারি। শেষ পর্যন্ত আপনাকে খুন করেও যেতে পারি।

ওরা যখন তিনতলায় উঠল, আড়াল থেকে আবেশ ওদের দেখল। সে তৈরি হয়ে আছে। ওদের সঙ্গে সঙ্গে সে-ও অন্ধকারে মিশে তিনতলায় উঠে এল। তিনতলায় উঠেই নন্দিতাকে ধাক্কা মারল একজন। নন্দিতা কিছু বোঝার আগেই দেখল ওর দুটো হাত বাঁধা, মুখের ভেতর ওরা কাপড় গুঁজে দিয়েছে, নন্দিতা নড়ল না, ছটফটও করল না। ওরা ওকে হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে ফ্রিঞ্চের খাঁচার ভেতর মাটিতে বসাল। ওর সামনে একজন দাঁড়াল। আর তিন-চারজন মুহূর্তে লাঠি দিয়ে পাখি মারতে শুরু করল। আঁতকে উঠল নন্দিতা। সে উঠে দাঁড়াতে চাইল। কিন্তু সামনের লোকটা তাকে ঠেসে ধরে বসিয়ে দিল। লোকটা ওকে বসাতে গিয়ে ওর গায়ে হাত দিল যথেচ্ছভাবে।

ততক্ষণে একজন পাখি ধরে, আর তার ডানা ছিঁড়ে নন্দিতার গায়ে ছুড়ে মারে। পাখিগুলোর মুণ্ডু ধরে টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। দু'পা ধরে ছিঁড়ে ওর মুখে ছুড়ে মারছে। নন্দিতা উঠতে পারছে না। দুবার ওঠার চেষ্টা করলেই সামনের লোকটা ওর গায়ে আদর করে হাত বুলিয়ে বসিয়ে দিচ্ছে। লোকটা ওর পিঠে হাত বোলাচ্ছে—বলুন ম্যাডাম মালটা কোথায় আছে। নন্দিতার দু'চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ছে। সারা শরীর ফুলে ফুলে উঠছে কান্নায়, ওর চিৎকার করতে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। মাথা ঠুকে মরতে ইচ্ছে করছে। এরা মানুষ!

লোকটা ওর মুখের সামনে মুখ ওর গালে নাক রগড়াল, ওর ঘাড়ে জিভ দিয়ে চাটল, বলল—বলবেন—মালটা কোথায় আছে? কার কাছে? বলবেন? না কি আপনাকে ল্যাংটো করতে হবে?

নন্দিতার কাছে কোনও উত্তর নেই। সে কী বলবে? লোকটা ক্রমাগত নন্দিতার গায়ে হাত বুলিয়ে চলেছে। হাত ঘষছে। ওর লাথি মারতে ইচ্ছে করছে লোকটার বুকে। কিন্তু ওকে হাত-পা মুড়িয়ে ওকে এমন করে বসিয়ে দিয়েছে ও নড়তে পারছে না। নন্দিতার কোলের ওপর মরা পাখি, ডানা ছেঁড়া, পা ছেঁড়া, মুণ্ডু ছেঁড়া, রক্তাক্ত পাখির মেলা! সব পাখির রং লাল!

সামনের লোকটা বলল, 'শালী এখনও মুখ খুলছে না। কী স্ট্যামিনা মাইরি। রজতবাবু বলেছে, ওকে ল্যাংটা করে পাখির রক্তের ট্যাটু করে দিতে। পবনভাই তোমার দায়িত্ব—তুমি করে দাও।'

পবন এগিয়ে এসে এক থাবায় নন্দিতার গায়ের টপটা ধরে টানে। পিঠ থেকে টেনে ছিঁড়ে ফেলে। নগ্ন পিঠের ওপর রক্তাক্ত পাখি রগড়ায়। মুহূর্তে পাখির রক্তের আলপনা নন্দিতার পিঠে। নন্দিতার দু'চোখ বন্ধ।

'পিঠ রঙিন করলে বুক রঙিন করলে না পবন ভাই? রজতবাবু কিছু বলবে না, ফুল পারমিশন দিয়ে দিয়েছে। ও মুখ না খুললে এই মালটাকেই কফিনে ভরে তুলে নিয়ে যাব।' একজন খুব আস্তে করে কথাটা বলল।

পবন বলল, 'ওকে আমি এখানেই হিসেব করব। পয়লা দিনই সিঁড়িতে হাত মেরেছিলাম। শালী খিঁচিয়ে উঠেছিল। তখন থেকে আমার টার্গেট—আজ পেয়েছি।'

পবন থাবা বাড়াল নন্দিতার দিকে। কিন্তু তাকে একটা লাথি মেরে শুইয়ে দিল আবেশ। পবন শুয়ে পড়ে উঠতে যাচ্ছিল, আবেশ তাকে আবার লাথি মারল। পবনের সঙ্গীরা বুঝে উঠতে সামান্য সময় নিল। তারপর তারা বুঝল আর একজন আছে, যে ওদের সঙ্গে টক্কর নিতে চায়। ওরা একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল আবেশের ওপর। একজন আবেশকে ঘুসি মারল। সপাটে লাথি মারল কেউ। আবেশ গিয়ে পড়ল মৃত পাখির স্তূপের ওপর। আবেশের মুখটা ওরা মরা পাখির সঙ্গে রগড়ে দিল। তারপর দমাদ্দম মার মারতে লাগল। কয়েক মুহূর্তে মরা পাখিগুলোর পাশেই রক্তাক্ত আবেশ থেঁতলে পড়ল। পবনের সাদা পাজামা-পাঞ্জাবিটা রক্তে লাল।

পাঞ্জাবি ছিঁড়ে রক্তাক্ত ডানার মতো ছড়িয়ে। মুখ দিয়ে গোঁ-গোঁ আওয়াজ বেরুচ্ছে। একজন বলল, 'আর মারিস না, মরে যাবে। ওকে তোল। ওর থেকে কথা বের করতে হবে।'

একজন বলল, 'এটা কে? এটার বয়ফ্রেন্ড নাকি? তোল শালাকে।'

ওরা আবেশকে টেনে তুলতে তুলতে জিগ্যেস করল, 'কে তুই?'

আবেশ গোঙাতে গোঙাতে বলল, 'আমি বিনয়কান্তি, রজতের বাবা!'

নন্দিতার কানে এক বৃদ্ধের ভাঙা ভাঙা ক্ষীণ গলার আওয়াজ পৌঁছোল। কিন্তু সেসব ঢেকে পাখিদের ডানার ঝটপটানি চারদিকে।

'রজতবাবুর বাবা! শালা সেটা তো শুনেছি অন্ধ, একটা কাকাতুয়া চোখ খুবলে দিয়েছিল।'

আবেশ তার দু'চোখ টিপে বন্ধ করল। বলল, 'আমি ব্লাইন্ড! তোমরা একটু আমার কথা শোনো।'

ওরা রক্তাক্ত আবেশকে টেনে তোলার জন্য টানল। বৃদ্ধ বিনয়কান্তি হয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসল আবেশ। কাঁপা কাঁপা ধরা ধরা গলায় আবেশ বলল, 'শোনো আমার বউমা নন্দিতা কিছু জানে না। ওর গায়ে কেউ হাত দিও না। ওর গায়ে হাত দিলে তোমরা শিম্পাঞ্জিটা পাবে না। আমিই লোভে পড়ে শিম্পাঞ্জিটা সরিয়ে রেখেছি। আমার কাছে একটা বড় অফার ছিল। লোভে পড়ে গিয়েছিলাম। আমাকে আর একটা দিন সময় দাও। কাল রাতে এসো, আমি শিম্পাঞ্জিটা দিয়ে দেব। তোমাদের জিনিস তোমরা পেয়ে যাবে। আর একটা দিন আমাকে সময় দাও।'

একজন সন্দেহের গলায় বলল, 'বউদি জানে না, তুমিই মালটা হজম করেছ, তুমি একটা অন্ধ মাল, তুমি পারলে?'

বিনয়কান্তি বলল, 'এই বিজনেসটা আমার। তোমাদের কারও থেকে আমার কানেকশন কম নয়। আমি কালই মাল ফিরত দিয়ে দেব।'

'এখনই দে। তোর চোখ অন্ধ, এবার তোকে জানে মেরে দেব।'

বিনয়কান্তি হাসল, 'তাহলে মালটা পাবে না। খালি হাতে ফিরতে হবে। আমার বউমাকে মেরে কুচিয়ে ফেললেও ওকে দিয়ে কিছু বলাতে পারবে না। কেন না ও কিছু জানে না। কাল রাতে এসো। মাল পেয়ে যাবে।'

'শালা ঢ্যামনামি করছে—যা হবে আজ।' একজন বলল। ওরা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

আবেশ বলে, 'কুণালকে ফোন করো, আমি ওর সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি।'

ততক্ষণে একজন ফোন করে কুণালকে সব কথা রির্পোট করেছে। সে-ই বলল, 'এই যে ফোন নিন—কুণালস্যার লাইনে আছে।'

ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কুণাল বলল, 'মেসোমশাই আপনি নাকি জিনিসটাকে সরিয়ে রেখেছেন। এ আপনি কী করলেন? কেন? আমরা কতটা হ্যারাসড হলাম বলুন তো? দীর্ঘদিন রজতের সঙ্গে আমার সম্পর্ক। আমি, আমার বাবা, আপনার সঙ্গেও কারবার করেছি। আপনি শেষ বয়সে এসে এই খেলা খেললেন! শুনলাম ওদের সঙ্গে আপনার ধস্তাধস্তি হয়েছে। আপনার লাগেনি তো? আর শুনুন আমার সঙ্গেই রজত আছে। রজত খুব আপসেট। ওকে আর ফোন-টোন করে ডিসটার্ব করবেন না। কাল মালটা আপনি দিয়ে দিন। আমি ওটা আগে পাঠিয়ে দিই। তারপর রজত যাবে। বাপ-ছেলে বসে ব্যাপারটা মিটিয়ে নেবেন। এতে আমাদের সবার ভালো। আর শিম্পাঞ্জিটা কেমন আছে?'

আবেশ বিনয়কান্তির গলায় বলল, 'শিম্পাঞ্জিটা সুস্থ আছে। রজতকে বলো আমায় ক্ষমা করে দিতে। কাল ওরা রাতে আসুক। আমি দিয়ে দেব, কথা দিচ্ছি।'

'আর কিন্তু কোনও গোলমাল পাকাবেন না। তাহলে আপনার, আপনার ছেলের বা অন্য কারও ভালো হবে না। আমারও খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। ব্যাপারটা এক কোটি, দেড় কোটি টাকার ব্যাপার নয়, আপনি তো বোঝেন মেসোমশাই। একবার যদি সার্কিটে ছড়িয়ে যায় আমি মাল দেব বলে টাকা নিয়ে মাল দিতে পারেনি, তাহলে কেউ আমার কাছে আসবে না। আর শুনুন, এখানে কিন্তু কোনও টাকার গল্প নেই। মালের বদলে আমি টাকা নেব না। আমার ওই জিনিসটাই চাই। প্রয়োজন পড়লে আমি আপনাকে দু-দশ লক্ষ টাকা দিয়ে দেব। আমার কিন্তু শিম্পাঞ্জিটাই চাই। ব্যস। আপনি দেখিয়ে দেবেন—ওরা নিয়ে আসবে।'

'আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে কাল শিম্পাঞ্জি দিয়ে দেব। তুমি আর একটা দিন অপেক্ষা করো।'

'ওকে, ওকে। আপনার ওপর ভরসা করলাম।'

রক্তাক্ত আবেশ মাথা ঝুঁকিয়ে বসল। ধীর পায়ে ওরা চলে গেল সবাই।

বেশ কিছুক্ষণ পরে আবেশমুখ তুলে দেখল নন্দিতা এখনও সেভাবেই বসে! আবেশ ওঠার চেষ্টা করল। মাথাটা ঘুরছে। ও দু'চোখ বন্ধ করল। ওরা মনে হল, সিনেমার একটা ফ্লপ সিন হয়ে গেল আজ রাতে। হাতে গোনা সামান্য চারটে গুন্ডার হাতে এমন বেদম মার খেল হিরো! না, না, এ সিন হিরোর জন্য নয়, এ সিন অ্যাক্টরের।

আবেশের চারদিক অন্ধকার লাগছিল। চোখের ওপরে ফুলে। মুখটাও ভারী ভারী! বহুত মেরেছে। এত কেউ মারে? শরীর ঠেলে যেন ওঠা যাবে না। নীচে, দোতলায় নামতে একটা সাপোর্ট চাই। আবেশ খাঁচার ভেতর বসে থাকা নন্দিতার দিকে তাকাল।

নন্দিতা যেন এক পাথরের মূর্তি!

এই রাতের আলো আঁধার! আকাশ চুঁয়ে নেমে আসা জ্যোৎস্না! নন্দিতার সারা শরীর মাখামাখি পাখির রক্ত আর পালকে। শুধু মৃত পাখির পালক নয়, জীবিত পাখিরাও ডানা মেলে বসে আছে নন্দিতার শরীরে। হঠাৎ আবেশের মনে হল খাঁচার ভেতর জীবিত পাখিরা নেমে এসে নন্দিতার লজ্জা আড়াল করছে।

আবেশ তাকিয়ে আছে নন্দিতার দিকে। তাকিয়ে আছে আকাশ জোড়া চাঁদ! তাকিয়ে আছে আঁধার ছোঁয়া রাত! এখানে থমকে আছে হাওয়া, পাছে একটা পালক খসে যায় নন্দিতার শরীর থেকে।

এ দৃশ্য আবেশ কোনওদিন দেখেনি। নন্দিতা যেন পালকে ঢাকা রঙিন, চিত্রবিচিত্র একটা পাখি।

আবেশ ডাকল, 'ম্যাম!' নন্দিতা কোনও সাড়া দিল না। আবেশ আবার ডাকল, 'ম্যাম!'

নন্দিতার দু'চোখের কোলে রাত। চোখের জলের শুকনো দাগ! সারা মুখে রক্তের ছিটে। সারা গায়ে রক্ত! নন্দিতা আজ কী সাজ সেজেছে!

'ম্যাম!'

নন্দিতা সাড়া দিল না।

আবেশ আবার ডাকল, 'ম্যাম। ওরা চলে গেছে। ঘরে চলুন।'

নন্দিতা চোখ খুলল। শান্ত সমাহিত এক রূপ। এ পৃথিবীর সব রক্তাক্ত স্মৃতি যেন সে আত্মস্থ করেছে। নন্দিতা এখন মাতৃরূপেন সংস্থিতা! যেন রক্তাক্ত ধরিত্রী!

'আপনি যান।'

'না, আমার সঙ্গে আপনিও চলুন।'

'আজ রাতে এদের ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। ওরা খুব একা।'

'ঠিক আছে ম্যাম তাহলে আমি এখানে বসি।' আবেশ আজ বেশি কথা বলার জোর পেল না। জিব শুকনো, গলা টানছে। অন্য সময় হলে ও ঠিক কথার ফাঁদে ফেলে নন্দিতাকে নীচে নামিয়ে নিয়ে যেত। আজ পারল না—উঃ কী মারটাই না মারল! শালা আবেশ শর্মাকে মেরে তোরা ধুনে দিলি!

'আলোগুলো নিভিয়ে দেবেন আবেশ, ওরা একটু ঘুমাক।'

আবেশের বলতে ইচ্ছে করছিল, 'ম্যাম এ তো চাঁদের আলো!' বলতে পারল না। তার মাথার ভেতর চক্কর খেল, রিল লাইফে এখন কত ডায়লগ থাকত। আর রিয়েল লাইফে যে কথাই বেরুচ্ছে না গলা থেকে! আবেশ চাঁদের দিকে তাকিয়ে হাসল।

আবেশ আলো নেভাতে উঠতে গিয়েই দেখল আকাশজোড়া চাঁদটা ভারী হয়ে ওর ওপর নেমে এল, চারদিক অন্ধকার হয়ে সে টলে পড়ে গেল। তবু সম্পূর্ণ অন্ধকার হওয়ার আগে, পড়ে যেতে যেতে সে দেখল, চারদিকে সারা খাঁচা জুড়ে মৃত পাখির স্তূপ! পাখিগুলো সব বোবা আর নিথর। পাখিগুলো সব গাছের হলুদ পাতা হয়ে খসে পড়ার মুহূর্তে। ওরা যেন খাঁচার ভেতর উড়তে উড়তে এক বধ্যভূমিতে এসেছে। এত মৃত্যু, এত ধ্বংস ওরা একসঙ্গে দেখেনি কোনওদিন।

১৩

ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙল আবেশের। চোখ মেলে দেখল, সে অন্য একটা বিছানায় শুয়ে আছে। এটা রজতবাবুর ঘর নয়। সে মাথা তুলতে গেলে ঝনঝন করে উঠল, মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা। তার ভেতর কেমন একটা চোরা উত্তেজনা। সে কোথায়? তখনই নন্দিতা হাত রাখল আবেশের গাল-গলায়। বলল, 'কী হল এত সকালে উঠে পড়লেন কেন, আর একটু ঘুমান।'

আবেশ দু'চোখ বন্ধ করে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল। সে যে উত্তেজনা অনুভব করেছিল নন্দিতার হাত তা শান্ত করে দিচ্ছে।

নন্দিতা বলল, 'আপনার গায়ে জ্বর। আপনি শুয়ে থাকুন।'

'একটু জল খাব।'

নন্দিতা গ্লাসে করে জল দিল ওকে। এ ক'টা দিন ও বোতল নিয়েই জল খেত। গ্লাসটা ধরতে গিয়ে ওর হাত একটু কাঁপল। আবেশ উঠে বসল। নন্দিতা গ্লাসটা ওর মুখে ধরল।

জল খেয়ে বড় স্বস্তি হলে আবেশের। বুকের ভেতরটা জুড়িয়ে গেল। নন্দিতা বলল, 'কী হল উঠে বসে থাকলেন কেন, শুয়ে পড়ুন।'

'আমি আর শোব না ম্যাম। আমার ঘুম হয়ে গেছে।'

'আপনার গায়ে জ্বর, আপনি শুয়ে থাকুন। আমি পাখিঘর থেকে আসছি।'

'এখন ক'টা বাজে?'

'সাড়ে চারটে।'

'তাহলে জানলাটা খুলে দেবেন।'

জানলা খুলে দিতে দিনের ফিকে আলোর আভাস এল ঘরে। আবেশ এতক্ষণে ভালো করে নন্দিতার দিকে তাকাল। নন্দিতা স্নান করেছে। ছোট ছোট চুলে বিন্দু বিন্দু জল।

আবেশ বলল, 'এটা কার ঘর?'

'আমার।'

'আমি তিনতলা থেকে কখন এখানে এলাম?'

'আপনি আসেননি, আমি আপনাকে নিয়ে এসেছি।'

আবেশ হাসল, 'আপনি! আপনি আমায় নিয়ে এসেছেন?'

'আপনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। জ্ঞান ফিরতে আমিই আপনাকে ধরে দোতলায় নামিয়েছি।'

আবেশ চুপ করে থাকল। হঠাৎ বলল, 'আর পাখিঘরে গিয়েছিলেন ম্যাম?'

আবেশের কথায় নন্দিতা যেন কেঁপে উঠল। ফিসফিস করে বলল, 'পাখিঘর নরক হয়ে আছে আবেশ—!'

আবেশ চুপ করে থাকল।

'কাল রাতে ওরা অনেক পাখি মেরেছে, উঃ!' আবেশের যন্ত্রণায় কাতর মুখ।

'ওরা খুব নৃশংস!' শান্ত গলায় নন্দিতা বলল।

'আমি ভাবতে পারিনি, ওরা পাখিঘরে ঢুকে এভাবে পাখি মারবে।' আবেশ যন্ত্রণার ভেতর থেকে বলল।

'আমিও বুঝিনি, আমার মুখ থেকে কথা বের করার জন্য রজত এমন কথা ওদের বলতে পারে! এতদিন আমি জানতাম সব কিছুর পরেও রজত পশুপাখিদের ভালোবাসে। কাল সব মিথ্যে হয়ে গেল। রজতই ওদের পাখি হত্যার কথা বলেছে।'

'আমি পারলাম না ওদের আটকাতে।'

নন্দিতা বলল, 'ওরা খুব ভয় পেয়ে গেছে। সারা রাত সবগুলো খাঁচার একপাশে তালগোল পাকিয়ে পড়েছিল। এত উন্মত্ততা, এত মৃত্যু!' নন্দিতার চোখে জল।

'মৃত্যু উপত্যকা!'

আবেশও বলার মতো কথা খুঁজে পেল না। তারপর খুব ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, 'আমি আর সাতজনের নয়, অনেক অনেক বেশি মৃত্যুর কারণ হয়ে গেলাম। আমার জন্যে পাখিগুলো মরল। আপনি লাঞ্ছিত হলেন।'

আবেশের স্বগতোক্তিতে নন্দিতা কোনও কথা বলল না। শুধু বলল, 'আমি ওপরে যাচ্ছি। আপনি ঘুমান।'

নন্দিতা তিনতলায় যাওয়ার জন্যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আবেশ শুয়ে থাকল চুপ করে। হালকা কাঁপুনি দিচ্ছিল শরীরে। সে দু-পা মুড়ে জিজ্ঞাসার চিহ্নের মতো পড়ে থাকল। তাকে ঘিরে এখন অনেক প্রশ্ন, সব প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই। সে জানে না। আর কোনওদিন উত্তর দেওয়ার চেষ্টাও করবে না।

তাকে ছেড়ে সবাই চলে যাচ্ছে এক এক করে।

টিভিতে কখনও মুকুন্দ, কখনও পামেলা, বাসন্তিকা পালা করে আসছে। ওদের সঙ্গে আসছে সেদিনের সেই উন্মত্ত রাত। মাতাল, উন্মাদ, নৃশংস আবেশ শর্মা! জানে না তরণী পাল সিং কী বলেছে? বলেছে নিশ্চয়ই। ভালো কথা কি বলবে, খারাপ কথাই বলেছে। কিংবা সিমিলি। সিমিলির অবাক করা কথা—আমি আবেশ শর্মার পিছনে পড়ে আছি, না আবেশ শর্মা আমার পিছনে? সবাই এখন যে-যার মতো করে বাঁচতে চাইছে, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে।

প্রথম প্রথম আবেশের মজা লাগছিল, তারপর প্রচণ্ড রাগে সে গজরাচ্ছিল। ভাবছিল, একবার সে যাক, তারপর এদের ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখার জায়গা রাখবে না। কিন্তু এখন, এই ক'দিনে ওদের প্রতি আর কোনও অনুভূতি নেই আবেশের। সব অনুভূতি যেন মরে গেছে। সে মুকুন্দ পামেলা বাসন্তিকা সিমিলির সব কথা হেসে উড়িয়ে দিতে পারে। তেমন মনে হলে হাততালিও দিতে পারে। কিন্তু কী বলবে সে দুর্গাকে?

দুর্গা তার স্ত্রী!

দুর্গার কথাগুলো কি ওর ছেলে-মেয়ের কানে পৌঁছেছে? দুর্গার কথামতো সে কি সত্যি সত্যি খুনি? দুর্গা যে বলছে, তার স্বামীর কাছে তার সন্তানসন্ততি আর নিরাপদ নয়?

এ কথা দুর্গা কী করে বলল? দুর্গা কি সত্যি সত্যি মনে করে সে খুনি!

আবেশের মনে হল, সে পালাতে পালাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে এই বাড়ির ভেতরে যেন এক জীবন ধরে দৌড়াচ্ছে।

নন্দিতা জানলা খুলে দিয়ে গিয়েছিল—এখন আবেশ দরজা খুঁজল। একটা দরজা চাই। মাইলের পর মাইল যেন একটা ঘর—দরজা নেই। আবেশ চুপ করে দেওয়ালের পর দেওয়াল দেখে চলল। না, তাকে একটা দরজা খুঁজে বের করতেই হবে। আবেশ বিছানা থেকে নিজেকে টেনে তুলল। সারা গায়ে ব্যথা। বিছানা থেকে নেমে পড়ল।

সামনে নন্দিতার ড্রেসিং টেবিল। আয়নায় সে নিজেকে দেখে চমকে উঠল। এ কে!

কে তাকে এমন মেকআপ করিয়ে দিল। গালের সমস্ত দাড়ি পাকা। শুকনো গাল, কোটরে ঢোকা দুটো চোখ, ম্যাড়ম্যাড়ে উসকোখুসকো চুল, বিবর্ণ গায়ের রং, যেন সাত পুরু ময়লা পড়ে আছে। হঠাৎ তার মনে হল সে আর হিরো নয়, সে এখন অ্যাক্টর হয়ে গেছে। হিরো যে, তার কখনও কোনও অবস্থায় এমন হয় না। সে এখন কোনও একটা আর্ট ফিল্মের অভিনেতা। যার নিজের কিছু নেই, সবটাই চরিত্র চেটেপুটে গ্রহণ করছে।

আয়নার দিকে তাকিয়ে হাসল।

হাসল, হেসে দেখল, না এ হাসি কোনও মেয়ের বুকের ভেতর উথলে উঠবে না। এ হাসি, কষ্টের, ক্লান্তির, সব হারিয়ে ফেলা মানুষ ভগবানের দিকে তাকিয়ে যেমন করে হাসে—সে হাসি।

আবেশ অবাক হল, এ হাসি সে হাসতে পারে? না কি এটাই এখন তার হাসি।

এ হাসি যদি সে হাসতে পারে তবে তো সে অনায়াসে হিরোর পোশাক ফেলে ঘর থেকে বেরুতে পারে। যেদিকে খুশি চলে যেতে পারে। তাকে আর কেউ চিনবে না।

আবেশ পা পা করে ঘর থেকে বের হল। একটু ঠান্ডা হাওয়া।

তিনতলায় যখন এল তার মাথা আর টলছে না। বরং শরীরটা যেন অনেকটা হালকা। সে ছাদে উঠে দেখল আকাশ জুড়ে আলো।

নন্দিতাকে খুঁজল। কোথাও দেখতে পেল না। সে একা একা পাখিঘরের ভেতর ঢুকল। পাখিঘরের ভেতরটা ছত্রাকার। ভয়ংকর ধ্বংসলীলা সাঙ্গ হওয়ার পর যেমন হয়। সে একটা একটা করে মরা পাখিগুলোকে তুলে এক জায়গায় জড়ো করল। জীবনে ক্যামেরার প্রয়োজন ছাড়া প্রথম সে কোনও কাজ করল।

স্তূপাকার মৃত পাখিদের দিকে তাকিয়ে সে বুঝে উঠতে পারল না—এখন সে কী করবে। এগুলো নিয়ে কী করা উচিত? এ সময় কি হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদা উচিত? না কি দুম দুম করে দেওয়ালে মাথা ঠুকবে? ঠিক কোনটা করলে সে শান্তি পাবে?

হঠাৎ তার সে রাতের কথা মনে পড়ে গেল। দৃশ্যটা যেন এমনই ছিল, কাল রিমেক হয়েছে! সেদিন সে নেশাসক্ত। মদের নেশার সঙ্গে গতির নেশা মিশেছিল। এমনই এক ধ্বংসের ভেতর বসেছিল মাথা ঝুঁকিয়ে, কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না!

সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো নন্দিতাকে খুঁজে চলল। খাঁচার জালের ভেতর দিকে চোখ চালাতে চালাতে দেখল কাকাতুয়ার ঘরে নন্দিতা। সে ধীর পায়ে কাকাতুয়ার ঘরের সামনে এল। আর তখনই দেখল সেই বৃদ্ধ হিংস্র কাকাতুয়ার সামনে নন্দিতা। অনেকটা যেন মুখ পেতে দাঁড়িয়ে আছে।

কী করছে নন্দিতা ওখানে? ওই কাকাতুয়ার কাছে অমন করে মুখ পেতে দাঁড়িয়ে আছে কেন? সে মৃদু স্বরে ডাকল, 'ম্যাম, ম্যাম।'

'আপনি ঘরে ঢুকবেন না মিস্টার শর্মা। এই পাখি খুব রাগী আর হিংস্র!'

'আপনি এখানে কী করছেন ম্যাম?'

'আমি এখানে শান্তি পেতে এসেছি। এই বৃদ্ধ কাকাতুয়া এ বাড়ির সব কিছু জানে। আমি ওর কাছে আমার অন্যায় স্বীকার করেছি। এখন শাস্তি পাওয়ার জন্য মুখ পেতে দাঁড়িয়ে আছি। ও যদি দয়া করে আমায় শাস্তি দেয়।'

'আপনি নন, অপরাধ করেছি আমি, শাস্তি আমার পাওয়ার কথা। আপনি চলে আসুন ম্যাম। আমি দাঁড়াচ্ছি। ও আমাকে শাস্তি দিক। এত এত হত্যা মৃত্যুর কারণ আমি। এত রক্ত আমি আর সহ্য করতে পারছি না! আমার দু'চোখ জ্বলছে। ও আমাকে অন্ধ করে দিক। আমাকে খুন করুক।'

আবেশ খাঁচার দরজা খুলে ঘরে ঢুকতে চায়। নন্দিতা দৌড়ে এসে দরজা আগলায়। 'আপনার শাস্তি ও দেবে না। আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে অনেক অনেক মানুষ, ওদের মুখোমুখি দাঁড়ানোই আপনার শাস্তি।'

'মানুষ হত্যার শাস্তির কথা বলছেন,' আবেশের ক্লান্ত গলা, 'আর একটা দিন ম্যাম। আর একটা দিন আমি এখানে থাকব। কাল সকাল পর্যন্ত যদি বেঁচে থাকি আমি সবার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াব।'

'আপনি আজই চলে যান আবেশ, ওরা আজ রাতে আসবে। আপনি থানায় গিয়ে সারেন্ডার করুন। আমি আপনার সঙ্গে যাব। সব কথা বলব। বলব, আপনি সত্যি বলছেন।'

'আর একটা দিন ম্যাম।'

'ওরা রাতে আসবে, তার আগে আপনি চলে যান। কাল রাতে আপনি ওদের রজতের বাবা বলে ধোঁকা দিয়েছেন, কিন্তু আজ ওরা শিম্পাঞ্জি না পেলে সব কিছু পরখ করে দেখবে। আপনি ধরা পড়ে যাবেন।'

'ওরা আমাকে আবেশ শর্মা বলে চিনতে পারবে না।'

আবেশের কথায় নন্দিতা ওর দিকে তাকিয়ে থাকল। যেন আবেশ সত্যি বলছে কি না দেখল।

আবেশ বলল, 'ওরা ভাববে আমি আপনার প্রেমিক! যার কাছে শিম্পাঞ্জিটা আছে। ম্যাম একটা দিন আমাকে আপনার প্রেমিক করে নিন। তাহলে ওদের রাগ সব চুকেবুকে যাবে। ওরা আমাকে নিশ্চয় এখানে আপনার সামনে খুন করবে না। আমাকে রজতবাবু কুণালস্যারের কাছে নিয়ে যাবে। আমি তখন ওদের সব কথা বলব। যে কথা ওরা বিশ্বাস করেনি, করবে না, সে কথা রজতবাবু বা কুণালস্যার বিশ্বাস করবে। তারপর ওরা ভাববে আমাকে নিয়ে কী করবে? আমাকে পুলিশে দেবে, না কি বিক্রি করবে? আমাকে এখন কেউ এক টাকাতেও কিনবে না। আমার জন্যে একটাকা মুক্তিপণও কেউ দিতে আসবে না। আমার নাম জেনে গেলে ওদের বুক কাঁপবে, আমাকে খুন করতেও পারবে না।'

'না, এটা হয় না। ওরা আজ শিম্পাঞ্জি না পেয়ে আপনাকে পেলে এখানেই খুন করবে। আপনার শরীরের অবস্থা ভালো নয় আবেশ।'

'শরীরের অবস্থা ভালো নয়, না আপনি আমাকে আপনার প্রেমিক হতে দেবেন না?'

আবেশ এক পা এগিয়ে যায়। নন্দিতা পিছিয়ে আসতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায়।

হাঁটু মুড়ে নন্দিতার পায়ের কাছে আবেশ বসে, বলে, 'আমি সত্যি সত্যি আপনার প্রেমে পড়েছি ম্যাম। আমি সত্যি আপনার প্রেমিক। এই দেখুন আপনার পায়ের কাছে বসে আমি প্রেম দিবেদন করছি। আজ আমার কেউ নেই, শুধু আপনি আছেন ম্যাম, আমি যার হাত ধরতে পারি, যার কাছে কাঁদতে পারি। যার ভালোবাসার জন্য আমি সত্যি সত্যি মার খেতে পারি। রক্তাক্ত হতে পারি।'

নন্দিতা ঠোঁট বেঁকিয়ে কষ্টের হাসি হাসে। 'আবেশ আজ সত্যি আমি আপনার ফ্যান। আপনি বলেছিলেন না, আপনার অভিনয় দেখে একদিন আমাকে হাততালি দিতে হবে। আপনি খুব ভালো অভিনয় করেছেন আবেশ। দারুণ! এই দেখুন আমি হাততালি দিচ্ছি।'

'না, ম্যাম, আপনি অভিনয়, ধোঁকা, সত্যি সব সব গুলিয়ে ফেলছেন। কাল রাতে আমি ওদের ধোঁকা দিইনি, আমি রজতবাবুর বাবা বিনয়কান্তি সেজে অভিনয় করেছি। আর আজ আপনি যা আমার অভিনয় ভাবছেন সেটা আমার কাছে সত্যি। এটা আমার জীবন। আমার রিয়েল লাইফ। এই সত্যি জীবনের মাত্র একটা দিন আমি আপনার সঙ্গে থাকব, তারপর আপনাকে ছেড়ে থাকব আরও আরও অনেক দিন। জানি না আমার শাস্তি হবে কি না? আমার জেল হবে কি না? জানি না আমি কতদিন জেলে থাকব? বা আর কী কী শাস্তি হতে পারে! তারপর আবার আপনার কাছে এসে এভাবে হাঁটু মুড়ে বসব। তাই আজ শুধু ওদের সামনে দাঁড়াতে দিন।'

'বিশ্বাস করুন, আপনার কথা আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস বা অবিশ্বাসে ওদেরকে আপনি আটকাতে পারবেন না। ওরা হিংস্র। খেপে আছে। আজ শিম্পাঞ্জি না পেলে ওরা আপনাকে মেরে ফেলবে আবেশ।'

'মরে গেলেও বড় সুখ পাব ম্যাম, যতই মারুক আমি একবারও মুখ ফুটে বলব না আমি আবেশ শর্মা! দেখবেন, আমি শুধু—নন্দিতা নন্দিতা করে আপনাকে ডাকব।'

আবেশের কথায় নন্দিতা কেঁপে গেল। ফিসফিস করে বলল, 'আমি জানি সিনেমায় এমন হয়। হিরোরা এমনটি করে। কিন্তু তারা সব কিছুর পর জিতে যায়। কিন্তু এটা সিনেমা নয়। না, না, এ আমি সহ্য করতে পারব না।'

'ম্যাম, ওরা কাল বিনয়কান্তির অভিনয় দেখেছে। আজ আপনি একজন সত্যিকারের প্রেমিককে দেখুন। হিরো হ্যায় তো অ্যাইসা।' আবেশ হাসে। হাসতে গিয়ে টলে পড়ে। তাকে জাপটে ধরে নন্দিতা।

ফিসফিস করে আবেশ বলে, 'আমার এত কাছে আসবেন না ম্যাম, আমি কিন্তু উদাস প্রেমিক নই। আমি সেই দুর্দান্ত প্রেমিক যাকে মেয়েরা স্বপ্নে দেখে!'

'তাই জন্য তো আমি ওদের হাতে আপনাকে তুলে দিতে পারব না আবেশ! আপনি চলে যান, আজই সারেন্ডার করুন। আমিও পুলিশের কাছে গিয়ে সব কথা বলি। এতদিনের পাপের শাস্তি নিই।'

'এ পাপ আপনার নয়। এ পাপে আপনার স্বামী আপনাকে জড়িয়েছে। শাস্তি তার পাওয়ার কথা, আপনি কেন নিজেকে কালি মাখাবেন। আপনি ওদের বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ দিতে পারবেন না। শুধু আপনিই ফেঁসে যাবেন। ওদের হাত অনেক লম্বা, ওরা আপনাকে পাগল সাব্যস্ত করে দিতে পারে, মেরেও দিতে পারে।'

'তবু আমি আপনাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না আবেশ।'

'তাহলে ম্যাম আমি শিম্পাঞ্জি সাজি। আমাকে ওই ঘরে খাঁচার ভেতরে ঢুকিয়ে দিন। ওরা আমাকে ঘুমপাড়ানি বুলেট দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিয়ে যাক কফিনবন্দি করে। তারপর খাঁচার ভেতর গিয়ে আমি আবার মানুষ হয়ে উঠব। তারপর—।'

'তারপর কী আবেশ?'

'আমি জানি না ম্যাম। কোনও স্ক্রিপ্ট রেডি করা নেই, ক্যামেরা চললে এ কাহিনি তৈরি হবে।'

নন্দিতা ম্লান হাসল, 'আমি কোনও রিলে নেই আবেশ। আমার কাছে সত্যি বড়। আপনি সারেন্ডার করুন।'

'বললাম তো কাল করব। অবুঝ মেয়ে, এমন বায়না করছেন কেন?'

ওরা কাকাতুয়ার ঘর থেকে বের হয়। আবেশ বলে, 'ম্যাম আজ পিন্টু, লালাকে ছুটি দিয়ে দিন। ফোন করুন ওদের। পাখিঘরের সব কাজ আমরা করব।'

আবেশ মৃত পাখির স্তূপের কাছে নন্দিতাকে নিয়ে যায়।

নন্দিতা বলে, 'চলুন ওদের ঘুমানোর ব্যবস্থা করে আসি।'

'খুব ভালো। ওদের আমরা ঘুম পাড়িয়ে দেব।'

ওরা মৃত পাখিগুলো নিয়ে নীচে যায়। নীচের উঠোনে নন্দিতা খুরপি দিয়ে টগর গাছের গোড়ায় অনেকটা খুঁড়ল। প্রায় হাতখানেকের মতো একটা গর্ত। সেই গর্তের মধ্যে একটার পর একটা পাখিগুলো সাজিয়ে দেয় আবেশ, দুজনে মিলে সাজিয়ে মাটি চাপা দেয়। আবেশ বলে, 'ম্যাম এই মৃত পাখিরা একদিন সব টগর ফুল হয়ে ফুটবে। আমি তখন দেখতে পাব না। আমার কথা আপনি ওদের বলবেন। গুছিয়ে বলবেন। যেন ওরা মজা পায়। খুব খুব হাসে। ডানা ঝাপটায়।'

ওরা তিনতলায় উঠে আসে।

চারদিকে পাখির পালক পড়ে। একটা-একটা করে পাখির পালকগুলো শিউলি ফুলের মতো কুড়িয়ে চলে দুজনে। নন্দিতা দেখল আবেশ সম্পূর্ণ পায়ের পাতা ফেলতে পারছে না, যদি তার পায়ের চাপে শিউলি-পালকগুলো নষ্ট হয়ে যায়।

আবেশ বলল, 'বুঝলেন ম্যাম, এখন নিজেকে ঠিক হিরো মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে আমি অদ্ভুত একটা দৃশ্যের ভেতর ঢুকে পড়েছি। এটা যদি অভিনয় হয়, তাহলে এই দৃশ্যই আমাকে অনেক অনেক অ্যাওয়ার্ড পাইয়ে দেবে। আর যদি সত্যি হয়, তাহলে আমি আজ রাতে ঈশ্বরের দিকে তাকিয়েও হাসতে পারি। ম্যাম আমি ঠিক করে ফেলেছি, আজ রাতে আমি জীবনের সেরা অভিনয়টা করব।'

'না আবেশ, কোনও অভিনয় নয়। আপনি ওদের নিয়ে মজা করতে যাবেন না। আপনি সারেন্ডার করুন। তাতে কেউ না হোক আমি শান্তি পাব। জেলে থাকলেও ভাবব—আপনি ভালো আছেন।'

'আপনার কাছে আমার একটা জিনিস পাওনা আছে, বলেছিলাম সময়মতো চেয়ে নেব। আজ, এখন চাইছি। আমি অভিনেতা, আমি অভিনয় করতে চাই। আপনি না বললে আমি শুনব না। অভিনয় না করতে দেওয়া পাপ।'

১৪

রাত ঘন হয়নি তখনও। তবু সময় কেটে যাচ্ছে হু-হু করে। আর একটু পরেই এসে পড়বে ওরা। আজ ওরা শিম্পাঞ্জিটা পাবে এ-বাড়িতে—বিনয়কান্তি সেজে এমনই কথা দিয়েছে আবেশ। পঁচাশি বছরের অন্ধ বিনয়কান্তির চেহারা কী করে এমন হয়? কাল রাতের অন্ধকারে ধরা পড়েনি ওদের চোখে। কিন্তু আজ যদি আবেশ বিনয়কান্তি হওয়ার চেষ্টা করে, একটা ভয়ংকর কিছু ঘটে যাবে।

নন্দিতার বুক কাঁপে। এই কাঁপুনি তার নিজের জন্য নয়।

নন্দিতা দুপুরবেলায় আবারও আবেশের কাছে এসে দাঁড়ায়। বলে, 'আবেশ আপনি চলে যান। পুলিশের কাছে গিয়ে সারেন্ডার করুন। আমি এই টেনশন নিতে পারছি না।'

'আমি চলে যাব, তারপর আপনি কোথায় যাবেন ম্যাম?'

'আমি কোথায় যাব জানি না আবেশ। দীর্ঘদিন আমি বাবা-মাকে ছেড়ে এসেছি। আমার বিয়ের আর একটা শর্ত ছিল, আমার বাবা মা আমার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখতে পারবে না। তাই আমি ওদেরও খোঁজ নিইনি। আমারও ওদিকে পা রাখা নিষেধ। 'রজত আমার বাবাকে টাকা দিয়ে আমাকে বিয়ে করেছিল।'

নন্দিতা চুপ করে থাকে।

আবেশ বেশ মজা মজা গলা করে বলে, 'ইশ, তখন কেন আমার সঙ্গে আপনার দেখা হল না!'

নন্দিতা একবার আবেশের দিকে মুখ তুলে তাকাল।

আবেশ বলল, 'রজতবাবু আপনার বাবাকে টাকা দিয়ে বিয়ে করেছিল। তখন কিন্তু আমার কাছে টাকা ছিল না, একদম ফুটো পকেট। বাড়ি থেকে পালিয়ে শহরে এক বন্ধুর বাড়িতে উঠেছি। শুকনো রুটি আর জল খেয়ে স্টুডিয়োতে-স্টুডিয়োতে ঘুরছি। আমি কিন্তু আপনার বাবাকে টাকা দিতে পারতাম না। তবে আপনাকে দেদার ভালোবাসা দিতাম। আর আমি জানি, আপনিও ঠিক আমার সঙ্গে ভেগে আসতেন।'

আবেশ থামতে নন্দিতা বলল, 'আমাদের সুকনার বস্তির রেওয়াজই হল বাইরের পুরুষরা এসে বিয়ে করে মেয়েদের নিয়ে যায়। তারপর তাদের কোঠীবাড়িতে বিক্রি করে দেয়। যার বিয়ে হচ্ছে, তার বাবা-মা মেয়ের বিয়ের জন্য যখন টাকা নেয়, তখন তারা জানে—আমার মেয়েকে আমি বিক্রিই করছি। যারা সে বিয়েতে আমন্ত্রিত, তারাও জানে, এ বিয়ে সাজানো। তবু একটা দিন মদ মাংস হুল্লোড় হবে। আর যার বিয়ে হচ্ছে সে-ও জানে—এ বিয়ে দুদিনের।'

আবেশ মাথা নাড়ে, 'ওখানকার মেয়েরা জেনে-বুঝে তবে কেন বাইরের পুরুষকে বিয়ে করে? ওখানে যে ছেলেরা থাকে তারা কি ভালোবাসার কথা বলে না? ম্যাম, আমি যদি তখন ওখানে থাকতাম, দেখতেন আপনি বাইরের পুরুষ, রজতবাবুদের মতো কাউকে বিয়ে করতেই পারতেন না। আমার দিকেই হাত বাড়িয়ে দিতেন। আমার প্রেমেই পাগল হতেন।'

আবেশের কথা শেষ হলে নন্দিতা বলে, 'তবু যার বিয়ে হচ্ছে তার একটা ভালোলাগা থাকে, স্বপ্ন দেখা থাকে, আশায় বুক বাঁধে—। সব মেয়েই ভাবে, তার বর আলাদা হবে। ভালো হবে। কারও কারও তো ভালো হয়েছে। তার বর সেই ভালোই হবে। সবাই একরকম খারাপ হবে কেন? তার পুরুষ তাকে বিক্রি করে দেবে না।'

আবেশ হাতের আঙুলগুলো মড়-মড় করে ফাটায়। ওর চোখে-মুখে একটা অসহিষ্ণুতা ফুটে উঠছে।

নন্দিতা বলে, 'রজত আমার থেকে বয়েসে অনেকটা বড় ছিল। ও আমাকে বিয়ে করে কোনও কোঠীবাড়িতে বিক্রি করেনি। আমাকে স্ত্রী-র পূর্ণ মর্যাদা দিয়েছে। হয়তো আমাকে ভালোওবেসেছে। আমি ওর কাছে কৃতজ্ঞ।'

আবেশ ঘাড় কাত করে ঘাড় ফাটায়, বলে, 'রজতবাবু আপনাকে ভালোবাসেনি ম্যাম, এটা ভালোবাসা নয়। যদি ভালোবাসত তবে কোনওভাবেই আপনাকে এ অবস্থায় ফেলত না।...না, না, ম্যাম আপনি ভুল করছেন। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমি প্রমাণ দিতে পারি।'

নন্দিতা বলল, 'আমাকে ওখান থেকে নিয়ে আসার পর বাড়িতে টিচার রেখে পড়িয়েছে। আমি বস্তিতে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছিলাম। তারপর এ-বাড়িতে এসে স্কুল-কলেজে যাইনি। কিন্তু আমার শ্বশুর-শাশুড়ি-রজত টানা এক বছর আমাকে নিয়ম করে আমার জন্যে টিচার রেখে আমার কথা শুদ্ধ করেছে, ভাষা পরিষ্কার করিয়েছে। আদবকায়দা, হাবভাব সব সব বদলে দিয়েছে। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ শিখিয়েছে। একবছর পর আমাদের ম্যারেজ পার্টি হয়েছিল। তখন আমাকে নিয়ে কেউ কোনও প্রশ্ন করেনি। কেউ একবারও ভাবেনি, আমি তিস্তাপাড়ের এক বস্তির মেয়ে। আমারও নিজেকে কারও থেকে আলাদা মনে হয়নি। তার পরের দিনগুলোতেও আরও আরও টিচার এল, পড়া চলল। মূলত বাংলা আর ইংরেজি। ভাষা শিক্ষা। আমার শ্বশুরমশাই টিচারদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কীভাবে পড়াতে হবে। তাঁরা সব পড়ার ভেতর দুনিয়ার খবর ঢুকিয়ে দিত। খারাপ লাগত না। কীভাবে কীভাবে যেন কত কত ইতিহাস জানলাম, ভূগোল বুঝলাম। সব কিছুর সম্পর্কেই একটা প্রাথমিক ধারণা গড়ে উঠল। নিজেও নিজেকে প্রতি মুহূর্তে ঘষতাম, মাজতাম। আমার শাশুড়ির মতো ঝকঝকে হয়ে ওঠার চেষ্টা করতাম। হয়তো একটু বেশিই হলাম। একটু নিজের মতোই হলাম। ঠিক বাঙালি বধূ হলাম না...। কেউ আর আমাকে দেখে আমার পূর্ব পরিচয় আন্দাজ করতে পারে না।' নন্দিতা চোখ বন্ধ করে মাথা নীচু করে থাকে।

'আমিও নিজেকে অনেক বদলেছি ম্যাম। কে বলবে, আমি সেই গ্রামের ছেলে! ছয় ভাইবোনের মধ্যে একজন। যার বাবা গ্রামের ধানকলের মালিক, যার মা শুধু স্বামী আর সন্তান পালন করে। আপনি যদি আমার প্রথম টিভি সিরিয়াল কখনও দেখেন, দেখবেন, আমার গায়ে মাটির গন্ধ, আমার চোখে গাছের ছায়া। এই আমি আর সেই আমির মধ্যে কত তফাত—আপনি একবার তাকালেই ধরে ফেলবেন। নিজেকে নিজে গ্রুমিং করেছি। দিনে-রাতে নিজেকে পালটেছি। ইন্ডাস্ট্রির জল-হাওয়া, আলো-আঁধার, ভালো-কালোর মতো করে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি। টিভি থেকে সিনেমা। ছোট রোল থেকে বড় ক্যারেকটার। হিরো থেকে স্টার। সুপারস্টার। মেগাস্টার। নিজের প্রোডাকশন হাউস। আবার এক নিমেষে সব ফুস!' আবেশ হাসে। হো হো করে হাসে।

নন্দিতা স্বগতোক্তির মতো করে বলে, 'আমার সন্তান হয়নি। আমরা অনেক চেষ্টা করেছি, হয়নি। তারপর কখন সন্তানের মতো করে আমি পাখিদের দেখেছি। রজতের সঙ্গে পাখিদের পরিচর্যায় হাত মিলিয়েছি। ভালোবেসেছি। এটা রজত জানে। সেই রজত ওদের পাখি মারতে বলল—। ও যদি আমাকে খুন করতে বলত তাহলেও আমি এতটা অবাক হতাম না।'

'রজতবাবুর সঙ্গে আপনি মানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু এ-জীবন আপনার নয়।'

'অনেকদিনই আমি এ জীবন আর মেনে নিতে পারছি না। একটু একটু করে দিনে-রাতে আমি মরে যাচ্ছিলাম। ক্রমশ চুপ করে গিয়েছিলাম। পাখি ছাড়া আর কিছু ভালো লাগে না। ভেবেছিলাম ওদের সঙ্গেই বাদবাকি জীবনটা এভাবে কাটিয়ে দেব। আমার একটা আলাদা জগৎ হয়েছিল।'

'সেই জগতে হঠাৎ ঢুকে পড়ল এই শিম্পাঞ্জি!' আবেশ হাসে।

'কী জানি এখন কোথায় যাব! বাবা-মায়ের কাছে যাব? আমি গেলে ওদের নিশ্চয়ই বিপদ হবে। আমি এ-বাড়ি থেকে চলে গেলে রজত আগে সুকনার বস্তিতে লোক পাঠাবে। আমাকে অন্য কোথাও যেতে হবে। যেখানে রজতের লোক কোনওভাবেই পৌঁছোতে পারবে না। তবে আমি ঠিক করেছি, ওদিকেরই কোনও পাহাড়ি জায়গায় আমাকে যেতে হবে।'

'আমি যাব ম্যাম আপনার সঙ্গে?'

'আপনি, আমার সঙ্গে?' নন্দিতার অবাক হওয়া গলা!

'আমাকে কেউ চিনতে পারবে না। বড়জোর কেউ দেখে বলতে পারে—দেখ দেখ লোকটাকে আবেশ শর্মার মতো দেখতে। ওদের মুখে নিজেকে আবেশ শর্মা শুনে আমি খুব হাসব, আহ্লাদ করব, কলার উলটে হাঁটব। ওদের সামনে দাঁড়িয়ে আবেশ শর্মা সেজে পোজ দেব। নকল আবেশ শর্মা সেজে সবাইকে আনন্দ দেব। ব্যস, এই খোলস আমি ফেলে দেব ম্যাম, তারপর বাদবাকি জীবনটা নিশ্চুপে থেকে যাব আপনার সঙ্গে। আমার আর ফ্লোরের লাইট, সাউন্ড, ক্যামেরার দরকার নেই। আবেশ শর্মা মানুষের কাছে রহস্য হয়ে যাবে। সুচিত্রা সেন যদি নিজেকে অন্তরালে নিয়ে যেতে পারে—আবেশ শর্মা কেন পারবে না? সুচিত্রা সেন দেওয়ালের আড়াল গড়েছিলেন। আমি আবেশ শর্মা প্রকৃতির আড়াল গড়ব। আমাকে আপনি নতুন কোনও নামে ডাকবেন, নইলে আমার মা যে নামে ডাকতেন, আবু, আমাকে সেই নামে ডাকবেন। শুরু হবে আমার নতুন জীবন।'

নন্দিতা বলল, 'তা হয় না আবেশ। জীবনটা সিনেমা নয়। আপনার ভাবনাগুলো সব সিনেমার মতো। আপনি ইন্ডাস্ট্রিতেই ফিরে যান। একজন অভিনেতা অভিনয় না করে কীভাবে বাঁচবে? অভিনয় আপনার ধর্ম! আমি চাই না আপনি ধর্ম ত্যাগ করুন।'

আবেশ চুপ করে থাকে। তারপর ফিসফিস করে, 'এ জীবনে অনেক পেয়েছি। কিন্তু আপনাকে আমি হারাতে চাই না, আমি আপনার সঙ্গে থাকব।'

আবেশের কথা শুনে নন্দিতা হাসে, বলে, 'এটা বড় ছেলেমানুষি হয়ে যাচ্ছে। এটাকে বলে ঘোর! আপনার ঘোর লেগেছে। হয়তো এটা এই ঘরের ভেতর কম আলো, কম আওয়াজের মধ্যে থেকে আপনার এমনটা মনে হচ্ছে। অথবা এখান থেকে মুক্তির জন্য আপনার কোনও অবলম্বন দরকার। আপনি আমাকে সেই অবলম্বন ভাবছেন। তাই আপনি বুঝে বা না-বুঝেই কোনও অভিনয় করছেন। কাল যখন আবার হাজার হাজার পাওয়ারের আলো জ্বলে উঠবে আপনাকে ঘিরে, আপনাকে লক্ষ্য করে ক্যামেরা চলবে, অজস্র হাততালি আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, তখন দেখবেন আজকের কথার জন্য আপনার হাসি পাবে।'

'কী বলছেন ম্যাম, আপনি ভুল করছেন!' আবেশ ছটফট করে ওঠে।

'ভুল নয় আবেশ, আপনি যা বলছেন সেটা একটা গোটা সিনেমা। আপনার কথা আমার বেশ ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে একটা সিনেমা দেখছি। আপনি খুব ভালো অভিনেতা।'

'আমি অভিনয় করছি না ম্যাম। আমি ও জীবন থেকে সরে এসেছি। জানেন ম্যাম, অনেকদিন আগের একটা কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, আমার মা যখন রান্না করত আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম, তখন মায়ের কাছে শুনেছিলাম—মশলা থেকে তেল ছাড়ার কথা। তখন সেভাবে মানেটা বুঝিনি। এখন বুঝছি। আমি এখন জীবনের সব রঙিন মশলা থেকে ছেড়ে গেছি...। মশলা একদিকে, আমি অন্যদিকে।'

'আপনি মায়ের কাছে কি তারপর আর থাকেননি? থাকলে দেখতে পেতেন তারপর আপনার মা গরম কড়ায় আনাজ আর সামান্য একটু জল দিয়ে তেল, মশলা, আনাজ সব এক করে দিতেন। আপনি সেই জলের অপেক্ষায় আছেন। একটু জল পেলে আপনার তেল, মশলা সব এক হয়ে যাবে।'

নন্দিতার কথায় আবেশ মাথা নিচু করে।

নন্দিতা বলে, 'আপনি পারবেন না আবেশ। দুদিন পরে এ-জীবনের জন্য আপনার কষ্ট হবে, তখন সে কষ্টের কথা আমাকে বলতে পারবেন না। কষ্ট ঢাকা দিতে আবার আমার সঙ্গে অভিনয় করবেন...।'

'তখন নয় আপনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিদায় নেব।'

'বাঃ, আপনি বিদায় নিলেন, তাহলে আমি—? আমার তো আপনাকে ছাড়তে ইচ্ছে করবে না। আমি আর নতুন করে কোনও কষ্ট নিতে পারব না। বরং আপনি সারেন্ডার করুন। দেখুন না আইন কী করে। তারপর আবার আপনি নতুন সিনেমা করবেন, কোনওদিন একবার হলেও ভাববেন—আমি আপনাকে সিনেমার ভেতর নাচতে হাসতে মজা করতে দেখছি।'

স্তব্ধ আবেশ।

আজ পিন্টু-লালাকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। হঠাৎ একটা ছুটি পেয়ে লালা বেশি কথা বলেনি। তবে পিন্টু একটু সন্দেহের গলায় বলল, 'কেন ম্যাডাম আজ কি আপনি কোথাও যাবেন?'

নন্দিতা উত্তর দেয়নি। শুধু আবার কথাটা বলেছে—'আজ তোমাদের আসতে হবে না।'

সারাদিন নন্দিতা ও আবেশ পাখিঘরের কাজ সামলেছে। আজ সারাদিন আবেশ খবরের কাগজ দেখেনি। আজ সারাদিন টিভি চালায়নি। আবেশের আর কোনও আগ্রহ নেই। আজ সারাদিন ওর একবারও মনে হয়নি দুর্গা কী বলল? পামেলা আর কত তিক্ততায় ভরে দিল? মুকুন্দ কি জামিন পেল? ফ্যানেরা এখনও কি কাঁদছে, না কি ভুলে যাচ্ছে একটু একটু করে? পুলিশ আর কোথায় কোথায় রেইড করল? আর ইন্ডাস্ট্রিতে তার ওপর কোটি কোটি টাকা লগ্নিকারীরা এখন কী ভাবছে? তারা নতুন কাকে খুঁজছে?

একসঙ্গে বসে রাতের খাবার খেল দুজনে। এই প্রথম দুজনে মুখোমুখি বসে খেল। নন্দিতা বলল, 'সুকনার বস্তিটা জানেন খুব খারাপ ছিল না। মা আর আমি গরু চড়াতে যেতাম তিস্তার চরায়। দিনের রোদ কমে এলে নদীর সারা চর ঢেকে যেত পাখি আর পাখিতে। স্যাংচুয়ারির গহন গভীর জঙ্গলের সব পাখিরা বেরিয়ে এসে হাজির হত নদীর চরায়।

একদিন হল কী, আমি মাকে ছেড়ে একা-একা নদীর চরে হেঁটে গেলাম বহু দূর। খুব ভালো লাগছিল আমার—চারদিকে পাখির খেত। ফুলের মতো তারা যে-যার মতো ফুটে রয়েছে। অনেক ফুলের মাঝে ফুলের বাগানে ঘুরেছি কখনও, খুব নিশ্চুপে ঘুরতে হয় সেখানে। সেখানে ফিসফিস করে ফুলের পাপড়ি, ফুল ফোটার শব্দ বিলি কাটে হাওয়ায়। ফুল ফুটিয়ে কুঁড়ির ভেতর নরম আলো বেরিয়ে এসে স্পর্শ করে চোখের পাতা। পাখিদের বৈকালিকেও তেমন হাজারও একটা শব্দ—ঝরনার ধ্বনির মতো কুলকুল করে বয়ে যায়। আমি ওখানে গিয়ে চোখ বুজে চুপচাপ বসেছিলাম। একটু পরে একটা-দুটো পাখি এসে আমার কোলে বসল, মাথায় বসল, ক্রমশ আমি পাখিতে পাখিতে ঢেকে গেলাম। তারপর থেকে রোজ বিকেলে আমি যেতাম, ওরা আমার সঙ্গী হত। আমি আবার যদি ওখানে ফিরে যাই, ওরা কি আমায় চিনতে পারবে—?'

নন্দিতা যেন ঘোরের মধ্যে উঠে ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে তিনতলায় উঠে যায়। ওর পায়ের কোনও শব্দ নেই।

স্তব্ধ আবেশ বসে থাকে। লাইট, সাউন্ড, ক্যামেরা, কো-অ্যাক্টর—সবাই যেন তৈরি। শুধু আবেশ তৈরি হতে পারছে না। আবেশ ওঠো, আবেশ—

১৫

স্তব্ধ আবেশ নিজের ঘরে এল। এখন ওর অনেক কাজ।

আজ সন্ধের মুখে রজতকান্তির ওয়ারড্রোব খুঁজে কালো রঙের একটা ট্র্যাকস্যুট বের করেছে। কালো রঙের একটা হাইনেক টি-শার্টও আছে ওয়ারড্রোবে। দুটো পেয়ে ও যেন আকাশের চাঁদ পেয়েছে। ওয়ারড্রোব খুলে বলেছে, থ্যাঙ্ক ইউ রজতবাবু। ড্রেসটা আপনি তাহলে রেডি করেই গিয়েছিলেন। এবার স্ক্রিপ্টের সঙ্গে মানানসই মেকআপ চাই।

মেকআপ বলতে ওর হাতের কাছে বড় একটা অ্যাডসিভের টিউব। ঘরে রং নেই কোনও। তবে দুপুরে একটা গোটা খবরের কাগজ সে পুড়িয়েছে। সেই কাগজপোড়া-ছাই বড় মিহি! হাতে-মুখে মাখলে কালো রংটা নির্ঘাত খোলতাই হবে।

আজ সকালে ঝরা শিউলির মতো যে পালকগুলো কুড়িয়েছিল সেগুলো এখন আবেশের মেকআপ রুমে।

আবেশ সাজতে বসে আয়নার সামনে। এমনিতেই কাল রাতের মারে ওর সারা মুখে কালশিটে দাগ। বাঁ-চোখের কাছটা ফুলেও আছে। আবেশ কাটা জায়গায় হাত দিতে গিয়ে দিল না। নিজেকে বোঝাল—এটাও মেকআপ। মার খাওয়ার মানুষের সাজ। সে আবেশ শর্মা—তার গায়ে হাত দেবে কে?

আজ তার হেয়ার ড্রেসার রাজু নেই। রাজুর টিম নেই। মেকআপ আর্টিস্ট নাসিফদের গ্রুপ নেই তাকে ঘিরে। কস্টিউমের লোকজন, ড্রেস ডিজাইনার নেই। সামনে আগের দিনের মেকআপের কোনও স্টিল ফটো নেই। তার সাজের ভিডিয়ো নেই। শুধু সে আর আয়না।

আবেশ আয়নাকে বলল—'আয়না, বলো আমি কে?'

আয়না বলল, 'তুমি সুপার হিরো, মেগাস্টার! আবেশ শর্মা!'

আবেশ হাসল, বলল, 'ঠিক আছে মেকআপ শেষ হোক, তখন আবার জিগ্যেস করব।'

পাখির পালকগুলোয় আবেশ আঠা লাগায় একটু একটু করে। তারপর আঠা দেওয়া পাখির পালকগুলো ট্র্যাকস্যুটের সঙ্গে আটকে দেয়। বাঃ! বেশ লাগছে।

সে শরীর বেঁকিয়ে চুরিয়ে ভাবতে শুরু করে—ট্র্যাকস্যুটটা যদি তার গায়ের চামড়া হয়, তবে পাখির পালক লাগানোর পর তার শরীরটা বেশ লোমশ হয়ে উঠেছে।

সে কাগজ-পোড়া কালির সঙ্গে পাউডার মিশিয়ে পাখির রক্তে রাঙানো রঙিন পালকগুলোকে মুহূর্তে কালো, ধূসর করে ফেলে। ওয়েল ডান আবু! আবেশ নিজেকে চিয়ারআপ করে! বেশ হচ্ছে!

এবার পোড়া কালি দু'হাতে নিয়ে মুখে মাখে। ফাইন!

ক'দিনের না কাটা দাড়ির সঙ্গে কাগজ-পোড়া কালি—নিজের মুখ নিজেই চিনতে পারছে না। আবেশ আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখে—হঠাৎ তার মনে হয় সে কি হত্যাকারী সাজছে!

না, না, আবেশ চিৎকার করে ওঠে, আয়নার দিকে তাকিয়ে বলে, আমি হত্যাকারী নই। হ্যাঁ, হত্যা হয়েছে আমার হাতে। তবে হিরো দুষ্টের দমন করবে। আজ সে প্রায়শ্চিত্ত করছে।

আবেশ অনেক চেষ্টা করে চুলগুলো ম্যানেজ করেছে। উফ, এখন যদি নাসিফ দেখত, হাসতে হাসতে পাগল হয়ে যেত! বলত—দারুণ সেজেছ দাদা, পুরো সঙ। এবার আমাকে তুমি ছুটি করে দেবে। তবে হেয়ার ড্রেসার রাজু প্রচণ্ড রেগে যেত—আঁতকে উঠে বলত—সর্বনাশ করে ফেললে চুলগুলোর! এখন সব শুটিং ক্যানসেল করো, আগে চুল ঠিক হোক তারপর ডেট দেবে।

আয়নার দিকে তাকিয়ে আবেশ হাসে—নিউ লুক! ফেসবুকে কি পোস্ট করে দেওয়া যায় এই ছবি? কত লাইক হবে কয়েক মুহূর্তে? হাজার পেরিয়ে লাখে পৌঁছে যাবে—আবেশ নিশ্চিত। মেকআপ শেষ করে স্থির হয়ে আয়নার সামনে আবেশ দাঁড়াল। আয়না নিথর। তবে আবেশের মন ভরছে না কিছুতেই। না, হচ্ছে না। হচ্ছে না।

হঠাৎ সে দু'কাঁধ নামিয়ে, দু'হাত ঝুলিয়ে হাঁটতে শুরু করে ঘরের ভেতর। ঘরের ভেতর টিউবের আলো জ্বলছিল। সেটা নিভিয়ে নাইট ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দেয়। আলো রেডি!

এবার সে অবাক। ঘরের ভেতর সত্যি একটা শিম্পাঞ্জি ঘুরছে—দু'হাত ঝুলিয়ে। বেশ অনেকক্ষণ ধরে সে এই ঘরের ভেতর হাঁটল। দু'হাত ঝুলিয়ে, দু'কাঁধ নামিয়ে, কখনও মাথা গুঁজে, কখনও মাথা তুলে...। আয়নার দিকে তাকাতে, আয়না কেমন ভয় পেয়ে গেল। আবেশ জন্তুর মতো গোঁ-গোঁ করে একসময় ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে এল। ধীর পায়ে তিনতলা পেরিয়ে উঠে এল ছাদে। এখন তার প্রথম কাজ ছাদের আলো রেডি করা। লাইটবয়রা নেই। লাইটে, আলোকসম্পাতে কারও নাম নেই। আজ সে একা। তাকেই আলো রেডি করতে হবে। সুইচ টিপতে সারা ছাদে আলো ছড়িয়ে পড়ল। না, এত আলো থাকলে চলবে না। সাদা আলোয় ছাদটা বড় বেশি চকচক করছে। একটু ভালো করে দেখলে, সে ধরা পড়ে যেতে পারে। সে আলোটা নিভিয়ে দিল। এবার ছাদটা বড় বেশি অন্ধকার লাগছে।

না, এত অন্ধকারে ওরা কি ওকে শিম্পাঞ্জি বলে মালুম পাবে? ওকে একটা ছায়ামূর্তি ভাববে।

ওরা যদি ওকে স্রেফ একটা ছায়ামূর্তি ভাবে, তাহলে ছায়ামূর্তি নিয়ে অনেক প্রশ্ন করবে। ছায়ামূর্তি হলে ওদের সন্দেহ থাকতে পারে।

আবেশ নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে—তাহলে এত সাজের প্রয়োজন কী ছিল? এত কিছুর আয়োজন কেন?

আবেশ আঠা আর কালির পেস্ট তৈরি করে ছাদের ছোট্ট সরু টিউবলাইটে মাখিয়ে দিল। আলো কমে কেমন একটা আবছায়া! এবার নিশ্চিন্ত।

আলো ওকে। ঢিমে আলো-আঁধারি চারদিকে। আবেশ দু'কাঁধ ভেঙে, দু'হাত ঝুলিয়ে, বেশ কুঁজো হয়ে, শরীর দুমড়ে ছাদে ঘুরল। নিজেকে কেমন যেন সত্যি সত্যি জন্তু মনে হচ্ছে।

এবার শুটিং জোন—সে ছাদের বাইরে মুখ বের করে দেখল, এ-বাড়ির সামনের দিকে টানা রাস্তা। ওদিকে যাওয়া যাবে না। তবে চলো পিছন দিকে—।

পিছন দিকে ঝাঁকড়া একটা গাছ। সে-গাছের মোটা একটা ডাল চলে গেছে পাশের জি-প্লাস থ্রি মাল্টিস্টোরিড ফ্ল্যাটবাড়ির একটা বারান্দার রেলিং ছুঁয়ে।

রেলিঙের পাশে রেনওয়াটার পাইপ।

সে পাইপ উঠে গেছে বাড়ির ছাদে।

ছাদে লালচে রঙের আলো।

ওই বাড়ির ছাদে যেতে হবে তাকে। সেই ছাদ থেকে উঠে পড়তে হবে জলের ট্যাঙ্কের মাথায়। ওখান থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এদের দিকে মুখ খিঁচোতে হবে। বুক বাজাতে হবে। টলমল পায়ে হাঁটতে হবে বিপজ্জনকভাবে!

আজ তার ডামি নেই কোনও। ডামি সুধীর নেই। ডামি প্রসাদ রাজ নেই। আজ সে একা। একা আবেশ শর্মা। অ্যান্টি হিরো আবেশ শর্মা। হিরো হয়ে যাওয়া আবেশ শর্মা।

আবেশ দেখতে দেখতে সারা ছাদ ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতে সে ছাদের কোমর সমান পাঁচিলের ওপর লাফিয়ে উঠে হাঁটতে শুরু করল।

হাঁটতে হাঁটতে পিছনে, পিছন থেকে সামনে। চক্রাকারে ঘুরছে তো ঘুরছেই।

হাত ঝুলছে, কাঁধ ঝুলছে, কুঁজো হয়ে, থপথপিয়ে। তার পায়ের থেকে ধপ ধপ আওয়াজ উঠছে। তার পায়ে রজতকান্তির খান তিনেক মোজা পরা। পায়ের দিকে তাকালে যে-কেউ বিশাল থাবায় ভর করা, একটু হাঁটু ভাঙা, টান টান লম্বা দুটো পায়ের দৃঢ় পদক্ষেপ দেখবে।

তারপর আবেশ ওদের চোখের সামনে শিম্পাঞ্জি হয়ে ছাদের উঁচু পাঁচিল থেকে ঝাঁপ দেবে গাছে। গাছের মোটা ডাল বেয়ে চলে যাবে পাশের জি-প্লাস থ্রি মাল্টিস্টোরিড ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায়। তারপর রেলিং ছুঁয়ে পাশের রেনওয়াটার পাইপ ধরে বাড়ির ছাদে। ছাদে লালচে আলো মেখে জলের ট্যাঙ্কের ওপর। সেখানে দাঁড়িয়ে আবেশ বুক বাজাবে...হুঙ্কার ছাড়বে—

হঠাৎ আবেশ মুখ তুলে দেখল ঠিক সিঁড়ির মুখে আলোর নীচে এসে দাঁড়িয়ে আছে নন্দিতা। তাকে এভাবে দেখে আঁতকে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে।

ওকে দেখে কোমর সমান পাঁচিল থেকে লাফিয়ে নামল আবেশ। ওর কাছে এসে বলল, 'রিহার্সাল চলছে ম্যাম! কেমন দেখলেন? মুভি কিন্তু সুপার হিট।'

ভয়ে, আতঙ্কে ঢোঁক গিলল নন্দিতা। কোনওক্রমে বলল, 'আবেশ এই বিপজ্জনক খেলা আপনি খেলবেন না।'

'আমি খেলছি না ম্যাম, অভিনয় করছি। ওদের সেই হারিয়ে যাওয়া শিম্পাঞ্জির অভিনয়। দেখবেন ওরা হাঁ করে ওদের এ-বাড়িতে নিয়ে আসা শিম্পাঞ্জিকে দেখছে। ছাদের সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে ওরা আতঙ্কে হিম হয়ে যাবে। ওদের হাতের ধরে থাকা ঘুমপাড়ানি বন্দুক উঠবে না। ওদের বুকের ভেতর দুম দুম করে বাজবে। ওরা এখান থেকে পালাতে চাইবে—।'

'না, আবেশ আপনি এ খেলা খেলবেন না। ওরা এ-বাড়িতে কোনও শিম্পাঞ্জি আনেনি। ওরা একজন মানুষকে এনেছিল। ওরা ভুল করেছে।'

'আমি সেই ভুলটাকে সত্যি করে দেব। হিরোর তো এই কাজ—যে প্রেম আপনার জীবনে নেই, হিরো সেই প্রেম করে। আপনি যাকে রাগে-ঘৃণায় মারতে পারেন না, হিরো তাকে সিনেমার পরদায় পিটিয়ে মারে। আপনার ভেতরের কল্পনা পরদায় সত্যি সত্যি করে। আমি সেই সত্যি করে দেব।'

'আপনি এটা করবেন না। আপনি শিম্পাঞ্জি নন, আপনি মানুষ।'

'সেই মানুষটা একজন অভিনেতা। সে আজ শিম্পাঞ্জির হয়ে প্রক্সি দেবে না ম্যাম, অ্যাকটিং করবে। ওয়ান টেকে শট ও-ক্কে করে দেবে। কথা দিচ্ছি।'

'আমি শিম্পাঞ্জির অভিনয়ে আপনাকে নামতে দেব না।'

'তা হয় না ম্যাম, আমি একজন অভিনেতা, আপনি আমাকে আটকাতে পারেন না। অভিনয় আমার ধর্ম!' আবেশ থামে, একটু চুপ করে থাকে, তারপর খুব আস্তে আস্তে বলে, 'কী আশ্চর্য দেখুন ম্যাম, ক'দিন আগে আপনি সবসময় ভেবেছেন—আমি স্ক্রিপ্ট ঠিক করে আপনার সঙ্গে কথা বলছি। আর আজ আমি যখন আপনার সঙ্গে যেতে চেয়েছি, তখনও আপনি ভেবেছেন, আমি হয়তো এখান থেকে মুক্তির জন্যে আপনাকে অবলম্বন করছি। তার জন্যেই আমার প্রেমের অভিনয়। আবার এটাও ভেবেছেন, আমার প্রেমটা যদি সত্যি হয়, তাহলে একসময় যখন আপনাকে আর আমার ভালো লাগবে না, তখন আমাকে আবারও ভালোবাসার অভিনয় করে যেতে হবে। অভিনয় আমার ধর্ম ম্যাম, অভিনয় ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না।'

'আবেশ এটা আপনার অভিনয় নয়, আপনি ওদের চোখে সত্যিকারের শিম্পাঞ্জি হতে চাইছেন।'

'ইয়েস, আমি সত্যিকারের শিম্পাঞ্জি হতে চাইছি। আমি যত সত্যি হব, আমি তত বড় অভিনেতা।'

'আপনি একজন অভিনেতা, আপনি শিম্পাঞ্জি নন। ওরা সত্যিকারের শিম্পাঞ্জির খোঁজে আসছে।' নন্দিতা হাঁপায়।

'ওরা যে শিম্পাঞ্জিটা এখানে রাখতে চেয়েছিল তার সঙ্গে আমার কোনও তফাত নেই। শিম্পাঞ্জিটা হায়দরাবাদ বা চেন্নাই গিয়ে একটা প্রাইভেট চিড়িয়াখানার খাঁচায় বন্দি থাকবে। সেখানে সবাই তাকে দেখবে। সবাই দারুণ আনন্দ পাবে। আমিও একটা খাঁচায় বন্দি আছি। আমিও সবাইকে আনন্দ দিই। ওর খাঁচাটা দেখা যায়, আমারটা দেখা যায় না।'

'শিম্পাঞ্জিটার ঠিকানা যদি হয় দুবাইয়ের কোনও আকাশছোঁয়া হোটেল, তাহলে ওর কাজ হবে লম্বা লম্বা আঙুল দিয়ে কাস্টমারদের ম্যাসাজ করা। তাদের আরাম দেওয়া। দেদার সুখে ডুবিয়ে দেওয়া।

'আমিও বক্স অফিসের কথা ভেবে সেই ম্যাসাজটাই করি সারা শরীর দুমড়ে-মুচড়ে, নেচে-গেয়ে। প্রোডিউসারদের চোখে-মুখে আরাম ছড়িয়ে পড়ে। ইন্ডাস্ট্রিতে সুখ! সুসময়!

'শিম্পাঞ্জিটা যদি সার্কাসে যায়, তাহলে কী হবে? রিং মাস্টার যা বলবে ওকে তাই করতে হবে।'

'আমাকেও ডিরেক্টররা যা নির্দেশ দেয়, আমাকে অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করতে হয়। নাচতে বললে নাচি। কাঁদতে বললে কাঁদি। সরকারি চিড়িয়াখানার পরিখায় ঘেরা খোলা জায়গাটা যদি শিম্পাঞ্জিটার হয়—সেখানে যদি তার ঠাঁই হয়, তবে আমার জায়গা হল—স্টেজ শো!'

নন্দিতা বিড়বিড় করে, 'প্লিজ আবেশ আপনি থামুন। এ আপনি পারেন না, এ খেলা বড় ভয়ংকর!'

আবেশ হাসে, 'একজন শিম্পাঞ্জির সঙ্গে একজন অভিনেতার কোনও তফাত নেই ম্যাম। ও পারলে আমিও পারব।'

'না, এ হয় না।'

আবেশ হাত জোড় করে, 'প্লিজ ম্যাম আজ আমাকে আটকাবেন না। আজ আমার খুব মজা লাগছে, জীবনে এমন অভিনয় করার চান্স কোনওদিন পাইনি। আর হয়তো কোনওদিন পাবও না।

'আজ আমার ডায়লগ হবে অর্থহীন, কতগুলো দুর্বোধ্য শব্দমাত্র।'

'আজ আমার জন্যে কোনও স্ক্রিপ্ট নেই।'

'আজ আমার কোনও ডিরেক্টর নেই, আলো নেই, ক্যামেরা নেই, এমনকী আমার জন্য কোনও ডামিও নেই। সবটাই আমাকে করতে হবে। একা। এ ছবি আমার একার। অ্যাকটিং থেকে লাইটবয়—একা আবেশ শর্মা। ছবির নাম...ম্যাম, নামটা ঠিক করে ফেলুন, প্লিজ!'

'প্লিজ, আবেশ থামুন।' নন্দিতা কান্না চেপে বলল।

'আমি থামব না ম্যাম। এটা আবেশ শর্মার সেরা কাজ। এ কাজ দেখে আমি নিশ্চিন্ত আপনি হাততালি দেবেন। আমার ফ্যান হয়ে যাবেন। আমার প্রেমেও পড়ে যেতে পারেন। আমি এ সুযোগ ছাড়ব কেন?'

নন্দিতা ঠোঁট টিপে কান্না আটকাল। ওর হাতের মোবাইল ফোনটা নড়ছে। ফোনের নীল আলো জ্বলে উঠেছে। আবেশ বলল, 'ম্যাম ওরা এসে গেছে। আমি নীচের দরজা খুলে রেখে এসেছি। আপনি ওদের বলুন তিনতলার ছাদে উঠে আসতে। আর ঠিক ওইখানে, এই সিঁড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আপনি ওদের আমাকে দেখাবেন। শিম্পাঞ্জি দেখাবেন। প্লিজ, ওদের ফোন ধরুন। ছাদে আসতে বলুন। বলুন—শিম্পাঞ্জি এখানে। আমার লাইট সাউন্ড ক্যামেরা সব রেডি। আমি ওয়ান টেকে শট ও-ক্কে করে দেব। ডোন্ট ওরি!'

নন্দিতা কান্না চেপে ফোন ধরল, বলল, 'আমি ছাদে—ছাদে আসুন, শিম্পাঞ্জি এখানে।'

আবেশ বলল, 'থ্যাঙ্ক য়্যু ম্যাম, আর একটা কথা। আমি যদি তিনতলার ছাদ থেকে পড়ে মারা যাই, তবে আমাকে কোনও চোর বা পাগল হয়ে বেওয়ারিশ লাশের সঙ্গে পুড়ে যেতে দেবেন। তাহলে আবেশ শর্মা সবার কাছে রহস্য থেকে যাবে চিরদিন। আর যদি সত্যিকারের শিম্পাঞ্জির ভূমিকায় অভিনয় করে আমি এ-বাড়ির ছাদ টপকে, ওই গাছের ডাল বেয়ে, পাশের বাড়ির বারান্দার রেলিং আঁকড়ে, রেনওয়াটার পাইপ বেয়ে, ও-বাড়ির ছাদে চড়তে পারি, তবে কাল সকালে আবেশ শর্মা হয়ে আমি আইনের কাছে যাব।

তার আগে আমি অবশ্যই দাঁত মেজে যাব। এই দেখুন ম্যাম, আপনার ব্রাশটা আমার কাছেই আছে।

তারপর যেদিন আমি আইন থেকে মুক্তি পাব সেদিন ঠিক আপনাকে খুঁজে বের করব। তারপর আর একবার হাঁটু মুড়ে আপনার সামনে বসব—দেখব, সেদিন আমায় ফিরিয়ে দেন কীভাবে?'

সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে অনেকগুলো পায়ের শব্দ...

আবেশ নন্দিতার হাত ছুঁল, বলল, 'ম্যাম, এ ছবির নাম দিলাম : অ্যান্টি হিরো। আজই হয়তো জেনে যাবেন এ-ছবির ভবিষ্যৎ! ফ্লপ হলে—খেল খতম পয়সা হজম! নয়তো এ-ছবি সুপার হিট!'

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%