গিরীন্দ্রশেখর বসু
ঘোষেদের পুরোনো ভিটের ধারে যে ডোবা আছে, তার একদিকে কালো পিপীলিদের রাজ্য, আর একদিকে লাল পিঁপড়েদের রাজত্ব৷ দুই রাজত্বে বিশেষ বনিবনাও নেই৷ কালো ও লাল পিঁপড়েদের মধ্যে প্রায়ই খুঁটিনাটি নিয়ে ঝগড়া মারামারি হয়৷
আজ বড়োই গুমোট করেছে, পিপীলিদের কালো বউ ডোবার ধারে জল নিতে এসেছে৷ কালো বউয়ের রূপের ঠ্যাকারে মাটিতে পা পড়ে না৷ তার উপর সে কালো রানির পেয়ারের সখী৷ এ ঘাটে যখন কালো বউ জল ভরছে, ডোবার ওপারে লাল পিঁপড়েদের একদল পল্টন কুচকাওয়াজ করতে এল৷ পল্টনের দলের এক ডেঁপো ছোকরা কালো বউকে দেখে সুড়সুড় করে এপারে এগিয়ে এসে হাতমুখ নেড়ে কালো বউয়ের উদ্দেশ্যে ঠাট্টা-তামাশা জুড়লে৷ কালো বউ রেগে ঘাড় বেঁকিয়ে, ঘাট থেকে উঠে এসে গালাগালি দিতে দিতে বাড়ির দিকে চলল৷ লাল ডেঁপো গান ধরলে,
কালো বউ কালো কোলো,
জলে ঢেউ সামলে চোলো৷
কালো বউ একেবারে হনহন করে রানির কাছে উপস্থিত হয়ে আছড়ে পড়ল৷ 'কী হল কী হল' বলে রানি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন,
রাঙামুখো বজ্জাতে করে অপমান
গরল ভখিব আমি তেজিব পরাণ৷
রানি সব কথা শুনলেন৷ "এক্ষুনি এর প্রতিকার করব৷ সখী আমরুলপাতা আর বেলকাঁটা নিয়ে আয়৷ আমি রাজাকে লিপি পাঠাই৷"
চিঠি লেখা হল, সাঁড়াশিমুখো প্রতিহারী শুঁড় বেঁকিয়ে লিপি নিয়ে রাজসভায় গেল৷ কালো পিপীলিদের রাজা পাত্রমিত্র সঙ্গে নিয়ে সজনেতলায় সভা কালো করে বসেছেন৷ ডাইনে কালো মন্ত্রী, বাঁয়ে কেলে কোটাল সেনাপতি৷ সভায় সড়সড়ে পিঁপড়ে ফরফর করে এদিক-ওদিক ঘুরে খবরদারি করছে৷ অর্থী প্রার্থী সব জোড়হাতে শুঁড় নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে৷ এমন সময় প্রতিহারী ঝুঁকে মাটিতে শুঁড় ঠেকিয়ে রাজাকে অভিবাদন করলে৷ রাজা চিঠি পড়লেন৷ পড়ে মন্ত্রীর হাতে দিলেন৷ বললেন, "মন্ত্রী এর কী বিহিত করা যায়?"
মন্ত্রী অনেকক্ষণ বসে বিজ্ঞের মতো শুঁড় নাড়তে লাগলেন৷ বললেন, "মহারাজ, লাল পিঁপড়েরা বড়োই দস্যি হয়েছে, ধরাকে তারা সরা জ্ঞান করে৷ রোজই দেখি তাদের সৈন্যরা দলে দলে কুচকাওয়াজ করে৷ একটা ছুতো পেলেই আমাদের রাজ্য আক্রমণ করে সর্বনাশ করবে৷ আমি বলি কি, মহারাজ, মহারানিকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলুন যে, ছোটোলোকের এসব তুচ্ছ কথায় কান না দেন৷"
রাজা বিষম ভাবিত হলেন৷ রানির অনুরোধ রক্ষে না করলে কুরুক্ষেত্র কাণ্ড ঘটবে৷ আবার এদিকে রাঙা পিঁপড়েকে সাজা দিতে গেলে লড়াই অবশ্যম্ভাবী৷ অনেক ভেবে-চিন্তে রাজা প্রতিহারীকে বললেন, "দেখো, তুমি রানিমাকে চুপিচুপি বলো যে এসব তুচ্ছ কথায় তিনি যেন কান না দেন৷ দেখো, কারও সামনে যেন এসব বোলো না, তাতে রানিমার মানে আঘাত লাগতে পারে৷"
প্রতিহারী রানির কাছে খবর নিয়ে গেল৷
এহেন বাণী, শুনি কানে কানে,
রাজার রানি মরে অভিমানে৷
আসিল বাঁদি, সখী হাতে পাখা,
কহিল কাঁদি, কথা মধুমাখা,

কালো বউ কালো কোলো
"কেন গো রানি, মুখে নাহি ভাষা,
চক্ষুতে পানি, কেন নাহি হাসা?"
বসিল বাঁদি পদতলে আসি
কহিল সাধি, "আমি তব দাসী,
বলো না মোরে, কে-বা দিল ব্যথা,
আনিব ধরে, কাটি দিব মাথা৷"
বিনানো ছাঁদে, দোলাইয়া পাখা
সখীরা কাঁদে, বলে, "কেন রাখা-
দুঃখের ভাগ নাহি যদি দিলে,
মনের রাগ মনেতে পুষিলে?"
রাগিয়া টানি পদ ছয়খানি
কাহিলা রানি অতি অভিমানী-
"কেন রে মিঠা দিলি হাত গায়?
নুনের ছিটা দিলি কাটা ঘায়!
মরণ মোর নাহি কোনো কালে,
এ দুঃখ মোর ছিল গো কপালে!
বাসন মাজে ঝি যে-বা সেও গো
স্বাধীন কাজে মন-সুখে রয় গো,
রাজার রানি আমি হয়ে কিনা
এ অপমানী রে, কারণ বিনা!
যদি বা ব্যাঙে মারিত রে লাথি,
কিংবা ঠ্যাঙে চাপিত রে হাতি,
এ দুখ ঘোর নাহি হত মোর,
জীবনভোর ঝরিত না লোর,
দুঃখে অপার হবে প্রতিকার,
জীবন ছার না রাখিব আর!
এত বলি রানি গোসাঘরে গিয়ে প্রবেশ করলেন৷ সখী বাঁদিরা সব অনেক চেষ্টা করলে, রানির রাগ পড়ল না৷ রানি অন্নজল ছেড়ে সাত দিন সাত রাত উপবাসী রইলেন৷ অনাহার অনিদ্রা ও কষ্টে রানির রং কষ্টিপাথরের মতো হয়ে গেল৷ সখীরা রাজাকে গিয়ে বললে, "আমরা অনেক সাধলাম, রানি
খেলে না চিনি
খেলে না গুড়,
খেলে না মধু,
মাছের মুড়৷"
রাজা মন্ত্রীকে ডাকলেন৷ ব্যাপার গুরুতর বুঝে মন্ত্রী বললেন, "মহারাজ আর উপায় নেই৷ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন, রানিমাকে খেতে বলুন৷ আমি লালমুখো পিঁপড়েকে উপযুক্ত সাজা দেব৷" কেলে কোটালের তলব পড়ল৷ কোটাল ফৌজ পাঠিয়ে লালমুখোকে ধরে আনলেন৷ ডেয়ে জল্লাদ এক কামড়ে লাল ডেঁপোর মুণ্ডু কেটে নিলে৷ রানিমা অন্নজল গ্রহণ করলেন৷
এদিকে লাল চর গিয়ে লাল রাজাকে জানালে কালো পিপীলিরা লাল সৈন্যের প্রাণবধ করেছে৷ লাল মহারাজ রাগে অগ্নিমূর্তি হলেন৷
ক্রোধে গরগর কম্পিত মুণ্ড,
লোহিত চক্ষু ঘূর্ণিত শুণ্ড,
কড়মড়ি দন্ত মহারাজ লাল,
হুংকার ছাড়ে-অন্তক কাল,
পাত্রমিত্র সভাসদ জন
ত্রাসে জড়সড় শঙ্কিত মন৷
বললেন, "এক্ষুনি কালো পিপীলিদের বংশ নির্মূল করব৷ এতবড়ো আস্পর্ধা, আমার প্রজার গায়ে হাত!"
লাল সেনাপতি হাঁড়িমুখোর ডাক পড়ল৷ লড়াইয়ের জন্য লাল পিঁপড়ে প্রস্তুত হল৷
সাজে সাজে সাজে রে রঙ্গিলা পিঁপিড়ি,
বাজে কাড়া-নাকাড়া ডা ড়া ড়া, ডি ড়ি ড়ি;

সাজে সাজে সাজে রে রঙ্গিলা পিঁপিড়ি
হাঁড়িমুখো বেঁটে-পা চলে আগে আগে,
লাল দাঁড়ির সারি দেখে ডর লাগে;
কুটুস কুটকাট লে লে লে কিমড়ি,
নাহি ছোড়ি বান্দা এঁটেল চিমড়ি,
হাঁ করি ধড়কাটা মুণ্ডাটা যায়,
চামড়ে মরণেরি কামড় বসায়৷
এল এল ওই এল, পড়ে গেল সাড়া,
কেন্নুই সুড়সুড়ি ছেড়ে গেল পাড়া,
ঘাস হতে লাফায়ে তড়াক তিড়িং
ছাড়িয়া দিল পথ গঙ্গাফড়িং৷
দেখি রাঙা পিঁপিড়ি কাতারে কাতার
ভাগিল যত পোকা হাজারে হাজার৷
সার বেঁধে লাল পিঁপড়ের দল বিকেল বেলায় ডোবার ধারে এসে পৌঁছোল৷ সড়সড়ে কালো পিপীলি তখুনি কালো রাজাকে জানালে শত্রু-সৈন্য ডোবার ধারে এসে পড়েছে৷ কেলে কোটাল সেনাপতি হুকুম জারি করলেন, "সকলে গর্তের মধ্যে যাও৷ আর, সৈন্যেরা সব প্রস্তুত থাকো৷"

বাজে কাড়া-নাকাড়া ডা ড়া ড়া, ডি ড়ি ড়ি
ডেয়ে জল্লাদ দলবল নিয়ে ঘাটি আগলে বসল৷ কার বাবার সাধ্যি ভেতরে আসে৷ দুই দলে চর পাঠিয়ে শত্রুপক্ষের খবর নেবার চেষ্টা চলতে লাগল৷ কালো সৈন্যদের চর হয়ে এক ডেয়ে পিঁপড়ে গেল৷ কিন্তু ডোবার ধারে পৌঁছোতে-না-পৌঁছোতে তাকে লাল সৈন্য ঘিরে ফেললে,
কে তুই ডেয়ে ল্যাজ উঁচিয়ে
বেড়াস ঘুরে ফিরে,
বড়ো এলাচের দানা যেমন,
তোর তেমনি ল্যাজের গঠন,
খেলেও বুঝি ক্যাঁচর ম্যাচর করে৷
ইত্যাদি নানা প্রশ্নে ডেয়েকে সবাই ব্যতিব্যস্ত করে তুললে৷ শেষে লাল পিঁপড়েরা ডেয়েকে ধরে লাল মহারাজের কাছে নিয়ে গেল৷ নিয়ে গিয়ে বললে, "মহারাজ, এটা শত্রুর চর৷ এর ওপর কী আজ্ঞা হয়?"

শরীর ফুলে ঢোল হয়েছে
লাল মহারাজ হেঁড়ে গলায় প্রশ্ন করলেন, "কী মতলবে এসেছিলে?"
ডেয়ে বললে, "আমি ডেয়ে, কালো খুদি পিপীলিদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কই নেই৷ আমি হামেশাই এদিকে চরতে আসি৷"
মহারাজ হুকুম করলেন, "বজ্জাত ব্যাটার পেটে অনেক মধু আছে, ভাঁড়ারিকে বল, পেটের সব মধু বের করে নিয়ে ওকে ছেড়ে দিতে৷"
ডোবার ধারে যেখানে লালের দল আস্তানা গেড়েছিল, সেখানে এক ভেরেণ্ডা গাছ ছিল৷ সেই গাছে গিরগিটি থাকতেন৷ তিনি রোজ বিকেলে গাছ থেকে নেমে চরতে যেতেন৷
গুটিগুটি গিরগিটি নিঃসাড়ে যায়,
জিহ্বা লকলকি পোকা ধরি খায়৷
সেদিন বিকেলে গিরগিটি যেমন গাছ থেকে নেমেছেন, অমনি লাল পিঁপড়ের দল ছেঁকাবান করে ধরেছে৷ গিরগিটি কামড়ের জ্বালায় অস্থির হয়ে কোনোরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে গাছে পালিয়ে গেলেন৷ সেদিন আর কিছুই খাওয়া হল না৷ শরীর ফুলে ঢোল হয়েছে৷ কামড়ের জ্বালায় ছটফট করে কোনোরকমে গিরগিটি রাত কাটাতে লাগলেন৷ প্রতিজ্ঞা করলেন, যেরকমে হোক লাল পিঁপড়েদের তিনি জব্দ করবেন৷
ভোর বেলায় কুঁকড়ো ডাকল,
কুঁকড়ু কু
ভেল রে বিহান;
উঠ রে ধিয়াপুতা
কর রে নিয়ান৷
ডোবার আশেপাশে যে যেখানে ছিল সকলের ঘুম ভেঙে গেল৷ কালো ও লাল পিঁপড়ের দলে সাড়া পড়ে গেল৷ সূয্যি উঠতে-না-উঠতে সারি দিয়ে কালো সৈন্য বেরোল৷ ভেরেণ্ডা গাছের নীচে কালো ও লাল পিঁপড়ের তুমুল যুদ্ধ বাধল৷ সমস্ত পোকামাকড় গাছতলা ছেড়ে পালাল৷ কেবল গিরগিটি গাছের ডালে বসে লড়াই দেখতে লাগলেন৷ সন্ধ্যে পর্যন্ত যুদ্ধ চলল৷ কালো পিপীলিদের দল প্রায় নির্মূল হয়ে গেল৷ রাজা, কেলে কোটাল সেনাপতি ও আরও দু-চারজন কোনোরকমে পালিয়ে গর্তের ভেতর ঢুকলেন৷ লাল পিঁপড়েরা 'মার মার' করে গর্তের মুখ পর্যন্ত তেড়ে এল৷ কিন্তু ঘাটিতে বিকটমূর্তি ডেয়ে জল্লাদকে দেখে কারুর এগোতে সাহস হল না৷ লাল মহারাজ ডঙ্কা বাজিয়ে লাল পাতার নিশান উড়িয়ে সসৈন্যে নিজের রাজত্বে ফিরে গেলেন৷
লাল সৈন্য চলে গেলে পর গুটিগুটি গিরগিটি গাছ থেকে নামলেন৷ দু-দিন বেচারার খাওয়া হয়নি৷ মনের আহ্লাদে গিরগিটি লড়ায়ে যত পিঁপড়ে মরেছিল তার মধ্যে বেছে বেছে লাল পিঁপড়েদের খেলেন৷ লালেদের ওপর আক্রোশ তখনও তাঁর মেটেনি৷ খেয়ে-দেয়ে গিরগিটি গাছের ডালে ঘুমোলেন৷ অর্ধেক রাত্তিরে গিরগিটি স্বপন দেখলেন, এক প্রকাণ্ড লাল পিঁপড়ে হাঁ করে তাঁকে খেতে আসছে৷ ধড়ফড় করে গিরগিটির ঘুম ভেঙে গেল৷ অত লাল পিঁপড়ে হজম হবে কেন? গিরগিটির অম্বল বমি হল৷ সারা গায়ে আমবাত বেরিয়ে বুক পেট জ্বালা করতে লাগল৷ গাছ থেকে নেমে ডোবার ধারে গিয়ে খানিকটা জল খেয়ে তবে প্রাণ একটু ঠান্ডা হল৷ লাল পিঁপড়েদের জন্যেই তো তাঁর এত কষ্ট৷ কী করে লাল পিঁপড়েদের জব্দ করা যায়, সেটাই হল এখন গিরগিটির প্রধান ভাবনা৷ তিনি ঠিক করলেন, কালো পিপীলিরা যখন লাল পিঁপড়ের শত্রু, তখন কালো রাজার সঙ্গে দেখা করে এর একটা উপায় করা যেতে পারে৷ এই ভেবে গিরগিটি সেই রাত্রেই গুটিগুটি কালো পিপীলিদের গর্তের দিকে এগোলেন৷

কুকড়ু কু ভেল রে বিহান
কালো রাজা লড়াই থেকে হেরে পালিয়ে এসে তো গর্তে ঢুকলেন৷ মন্ত্রী বললেন, "মহারাজ, আমি তখনই বলেছি লাল পিঁপড়েদের সঙ্গে ঝগড়া করাটা ভালো হবে না৷ এখন আমাদের তার ফল ভোগ করতেই হবে৷ যাহোক আজ আপনি ঘুমোন৷ কাল এর একটা উপায় করব৷ আমি গর্তের মুখে ডেয়ে জল্লাদকে বসিয়েছি, কোনো শত্রুর সাধ্য নেই এখন আমাদের গর্তে আসে৷"

গর্তের মুখে বিকট হাঁ করে চোখ পাকিয়ে বসে আছে
এদিকে ডেয়ে জল্লাদ গর্তের মুখে বিকট হাঁ করে চোখ পাকিয়ে বসে আছে৷ লাল পিঁপড়েরা লড়াই জিতে গর্ত আক্রমণ করতে এসেছিল, কিন্তু তার মূর্তি দেখে সব ভয়ে পালিয়েছে৷ ক্রমে রাত্তির বাড়তে লাগল৷ দূরে ঝিঁঝিপোকাদের ঝমঝম আওয়াজ শোনা যেতে লাগল৷ চারিদিকে অন্ধকার ঘিরে এল, আশপাশে জঙ্গলে নানা বিভীষিকা দেখা দিলে৷ অর্ধেক রাত কেটে গেল, অন্ধকারে একলা জেগে বসে থাকতে থাকতে ডেয়ের গা ছমছম করতে লাগল৷
ছমছম করে গা ঝমঝমে রাতে,
মুখে নাহি সরে রা, ঘুম আঁখিপাতে,
খুসখাস ফিসফাস কী যে আসে যায়
ঘন ঘন নিশ্বাস কাঁটা ওঠে গায়৷
চক্ষু না দেখে তারে, কানে নাহি শোনে,
জানায় মন তারে আছে কোন কোণে,
থরথর কাঁপে পা, ঝরে কালঘাম,
ওই বুঝি করে হাঁ নাহি যার নাম৷
ধড়াস ধড়াস বুক, এল বুঝি এল,
ধুকপুক ধুকপুক গেল প্রাণ গেল!
ওটা কীরে বাবা! জল্লাদ হাঁকল, "কোন হ্যায় রে?"
সারি সারি কালো বরকন্দাজ গর্তের বাহিরে এসে দাঁড়াল৷ গর্তের সামনে মনসা গাছের নীচে থেকে উত্তর এল, "আমি বন্ধু গিরগিটি৷"
জল্লাদ প্রশ্ন করলে, "এত রাত্তিরে কী দরকার?"
গিরগিটি নিজের অবস্থা বর্ণনা করে বললেন, "আমি তোমাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে লাল পিঁপড়ে মারতে চাই৷"
জল্লাদ বললে, "তুমি যে শত্রুর চর নও তার প্রমাণ কী?"
গিরগিটি বললেন, "লাল পিঁপড়ে খেয়ে আমার এখনও বুক-পেট জ্বলছে৷ বলো তো বমি করে দেখাই৷ আমার গা এখনও লালেদের কামড়ে ফুলে ঢোল হয়ে রয়েছে৷"
জল্লাদ বললে, "ভালো কথা, কিন্তু সকাল না হলে তোমাকে ভালো করে না দেখে গর্তের কাছে এগোতে দেব না৷ তুমি যেখানে আছ, সেইখানেই থাকো৷ খবরদার এগিয়ো না, তাহলে সবাই মিলে কামড়ে দেব৷"
গিরগিটি অগত্যা মনসাতলায় বসে রইলেন৷ ক্রমে ফরসা হল৷
সকাল বেলায় কালো রাজা ও কেলে মন্ত্রী পরামর্শ করতে বসেছেন, এমন সময় সড়সড়ে পিপীলি সংবাদ দিলে, "মহারাজ গর্তের মুখে বন্ধু গিরগিটি উপস্থিত৷ তিনি দেখা করতে চান৷"
জল্লাদের তলব পড়ল৷ সে বললে, "মহারাজ, আমি গিরগিটির গা আলোতে ভালো করে দেখেছি৷ তার সারা গায়ে লাল পিঁপড়ে কামড়েছে৷ সে বন্ধুলোক বটে৷"
কালো রাজা পাত্রমিত্র সমেত সজনেতলায় সভা করে বসলেন৷ গিরগিটির ডাক পড়ল৷ তার গোলগাল মোটা চেহারা দেখে রাজা ভাবলেন, হাঁ, এর দ্বারা লড়ায়ে সুবিধা হতে পারে৷ রাজা, মন্ত্রী, গিরগিটি ও আর সকলে পরামর্শ করে স্থির হল যে, ডোবার ওপারে অনেক দূর গিয়ে মাঠ পার হলে ডেয়ে পিঁপড়েদের রাজত্ব পাওয়া যায়৷ ডেয়েরা জল্লাদের কুটুম্ব বংশ৷ যদি দূত পাঠিয়ে ডেয়ে রাজাকে খবর দেওয়া যায়, তবে তিনি সসৈন্যে এসে লাল পিঁপড়েদের জব্দ করতে পারেন৷ কিন্তু দূত সমস্তক্ষণ চললেও সাত দিন সাত রাতের কম সেখানে পৌঁছোতে পারবে না৷ ফৌজ নিয়ে আসতেও ডেয়ে রাজার ওইরকম সময় যাবে৷ ইতিমধ্যে লাল চরেরা নিশ্চয় খবর পাবে ও তাহলে সব পণ্ড হবে৷ হঠাৎ আক্রমণ না করলে লালেদের জব্দ করা যাবে না৷ আবার কী জানি এর মধ্যে লালেরা এসে আক্রমণ করতেও পারে, এস্থানে বেশিদিন থাকাও নিরাপদ নয়৷
গিরগিটি বললেন, "মহারাজ, এসব ভাবনা আপনি করবেন না, আমার ওপর ছেড়ে দিন, আমি সব ঠিক করে দেব৷"
পরামর্শ স্থির হল, লালেরা যে ডেয়ের মধু বার করে নিয়েছিল তাকে দূত করে পাঠানো হবে ও সে গিরগিটির কথামতো চলবে৷
গিরগিটি মধু-ডেয়েকে বললেন, "তুমি আমার পিঠে চেপে বসো, তবে দেখো, যেন কামড় দিয়ো না৷ পা দিয়ে আমার পিঠ জোরে ধরে থাকো৷ আমি এক ঘণ্টার মধ্যেই তোমাকে পৌঁছে দেব৷"
ডেয়েকে পিঠে করে গিরগিটি শোঁ শোঁ করে দৌড়ে চললেন৷ ঘোষেদের ভিটের মধ্যে উচ্চিংড়েদের রাজত্ব৷ গিরগিটিকে দৌড়োতে দেখে উচ্ছে গাছের নীচে ঘাটিওয়ালা উচ্চিংড়ে হাঁকল, "কে যায়?"
জবাব এল, "তোর বাবা যায়৷"
"খবরদার!" বলে ঘাটিদার বাঁশিতে ফুঁ দিলে, পিঁ করে বাঁশি বেজে উঠল৷ অমনি আশপাশের ঝোপ থেকে হাজার উচ্চিংড়ে লাফিয়ে গিরগিটির পথ আটক করলে৷
গিরগিটি তখন রেগে ফুলেছেন, বললেন,
"চিচ্চিড়িঙ্গা তু ফড়িঙ্গা
মেরে সাথ তু লড়েঙ্গা?"
ডেয়ে বললে, "কেন বৃথা এদের সঙ্গে ঝগড়া করে সময় নষ্ট করো৷ উচ্চিংড়েদের সঙ্গে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই, এরা যা বলে শোনো, শিগগির কাজ মিটে যাক৷"
গিরগিটি বুঝলেন, ডেয়ের পরামর্শই ঠিক, বললেন, "তোমরা কী চাও, পথ কেন আটক করেছ?"
ঘাটিওয়ালা সর্দার বললেন, "আমাদের রাজার কাছে চলো৷ তিনি অনুমতি না দিলে তোমাকে ছাড়তে পারব না৷"
উচ্চিংড়েরা গিরগিটিকে ভিটের দেওয়ালের এক ফুটো দিয়ে সুড়ঙ্গপথে ভিটের মধ্যে তাদের রাজত্বের ভেতর নিয়ে গেল৷ সুড়ঙ্গের ভেতরের মুখে কটকটি ব্যাং বসে আছেন৷ ইনি বহুদিন পূর্বের পশ্চিম অঞ্চল থেকে বন্যার জলে ভেসে এসে ক্রমে ঘোষেদের ডোবায় আশ্রয় নিয়েছিলেন৷ পরে উচ্চিংড়ে রাজার সঙ্গে আলাপ হওয়ায় ঘোষেদের ভিটের মধ্যেই উচ্চিংড়েদের রাজত্বে বসবাস করছেন৷ ভিটের ছাদ ও চারিদিকের দেওয়াল ভেঙে পড়ায় ভেতরে আসবার এই সুড়ঙ্গপথ ছাড়া অন্য রাস্তা নেই৷ সুড়ঙ্গের ভেতর মুখে ব্যাং পাহারা দেন ও যেকোনো পোকামাকড় ভেতরে আসবার চেষ্টা করে তাদের কুপকুপ করে খেয়ে ফেলেন৷

ই কৌন হ্যায় রে?
গিরগিটি দেখে ব্যাং জিজ্ঞাসা করলেন, "ই কৌন হ্যায় রে?"
ঘাটিদার বললে, "সামনে দিয়ে পরিচয় না দিয়ে যাচ্ছিল, ধরে রাজার কাছে নিয়ে যাচ্ছি৷"
ব্যাং পথ ছেড়ে দিলেন৷ রাজার নিকট উপস্থিত হয়ে গিরগিটি সমস্ত ব্যাপার বললেন৷
রাজা বললেন, "কালো রাজা আমার বন্ধুলোক, গিরগিটিকে এখনই ছেড়ে দাও৷" পরে গিরগিটিকে বললেন, "কালো রাজাকে বোলো আমার দ্বারা যদি তাঁর কিছু সাহায্য হয়, করতে প্রস্তুত আছি৷"
ঘাটিদার অগত্যা গিরগিটিকে সুড়ঙ্গপথে বার করে দিলে ও উচ্ছে গাছের নীচে নিজের ঘাটিতে ফিরে এসে বললে, "বরাত জোরে বেঁচে গেলে,-যাও৷"
গিরগিটি টিটকারি দিয়ে বললেন,
"উচ্চিংড়ের ছাঁ
উচ্ছে খেয়ো না
উচ্ছে খেলে মুচ্ছো যাবে
সহ্য হবে না৷"
এই বলে ডেয়েকে পিঠে নিয়ে গিরগিটি একদৌড়ে ভিটে পার হয়ে গেলেন৷
খানিক দূর যাবার পর গিরগিটি দেখলেন সামনে এক প্রকাণ্ড মাটির ঢিবি, আর তার চারিধারে বিস্তর সাদা সাদা ছোটো ছোটো পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ গিরগিটি এরকম পোকা আগে কখনো দেখেন নাই; বললেন, "এ কী জন্তু, কী জন্তু বা, কীবা জন্তু!" এতক্ষণ দৌড়ে গিরগিটির গরহজম ভালো হয়ে গিয়ে প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে, ভাবলেন, এই পোকা খেয়েই দেখা যাক কীরকম লাগে৷
খাবার উপক্রম করতেই ডেয়ে বললে, "এদের খেয়ো না, খেয়ো না৷ খেয়ে সুখ পাবে না৷"
গিরগিটি বললেন, "এরা কারা?"
ডেয়ে বললে, "এরা উই৷ এই যে পৃথিবী দেখছ, সে এই উইরা সৃষ্টি করেছে৷ এরা যা ছোঁবে তাই মাটি হয়ে যাবে৷ তুমি খেতে গেলেই কখন একটি উই তোমার শরীরে আশ্রয় নেবে তুমি টেরও পাবে না৷ পরে তোমার এই নধর শরীর মাটি হয়ে যাবে৷ তার চেয়ে এদের না ঘাঁটিয়ে অনুমতি নিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়াই ভালো৷"
গিরগিটি সেই পরামর্শমতোই কাজ করলেন৷ খিদে না মিটিয়েই তিনি দৌড়ে চললেন৷
অনেক খানা ডোবা পার হয়ে গিরগিটি ডেয়ে পিঁপড়েদের দেশে এসে উপস্থিত হলেন৷ মধু-ডেয়েকে দেখে ডেয়ের দল, "আরে কোথা হতে এলে? এসো এসো," বলে অভ্যর্থনা করলে৷ পরিচয় দিতে গিরগিটিকেও সকলে খুব আদরযত্ন করলে৷
ডেয়ে রাজার কাছে খবর গেল৷ তিনি মধু-ডেয়েকে ও গিরগিটিকে তলব করলেন৷ সমস্ত ব্যাপার শুনে বললেন, "কালো পিপীলিরা আমাদের কুটুম্ব, যদিও তারা জাত্যংশে ছোটো, তবু তাদের বিপদে আপদে সাহায্য করা আমারই কর্তব্য৷"
তখন কী করে সৈন্যসামন্ত নিয়ে কালো পিপীলিদের রাজত্বে শীঘ্র শীঘ্র পৌঁছোনো যেতে পারে তারই কল্পনা-জল্পনা চলতে লাগল৷
গিরগিটি বললেন, "মহারাজ, আমার এক পরামর্শ আছে৷ আপনাদের এখানে অনেক লম্বা লম্বা কাশঝাড় রয়েছে৷ আমি গোড়া থেকে গোটাকতক পাতা কেটে দি; লম্বালম্বি পাতাগুলি জুড়ে যদি জোড়ের মুখ জনকতক করে ডেয়ে কামড়ে ধরে, তবে সমস্ত সৈন্য নিয়ে আপনি পাতায় চড়ে বসতে পারেন ও আমি পাতার একদিককার মুখ ধরে টেনে এক দৌড়ে নিমেষের মধ্যে আপনাদের কালো পিপীলিদের রাজত্বে পৌঁছে দিতে পারি৷"
এই পরামর্শ শুনে পিঁপড়েরা আহ্লাদে শুঁড় নাড়তে লাগল৷ তখনই কাশের পাতা কাটা হল ও সমস্ত পিঁপড়ে সারি দিয়ে তাতে চড়ে বসল৷ এক লহমার মধ্যে গিরগিটি সসৈন্যে ডেয়ে রাজাকে কালো পিপীলিদের রাজত্বে এনে ফেললেন৷ তখনই 'সাজ সাজ' সাড়া পড়ে গেল ও এক দণ্ডের মধ্যেই কালো পিপীলি ও ডেয়ের দল গিয়ে লাল পিঁপড়েদের হঠাৎ আক্রমণ করলে৷ লাল পিঁপড়েরা চোখে কানে দেখবার সময় পেলে না৷ ডেয়েরা লালেদের ধরে ধরে দু-টুকরো করে ফেললে৷ লাল মহারাজ ও হাঁড়িমুখো পালিয়ে নিজেদের প্রাণ বাঁচালেন৷ আগেকার হারের প্রতিশোধ দিয়ে লালেদের ভাণ্ডার লুঠ করে কালো রাজা গিরগিটির পিঠে চড়ে নিজের রাজত্বে ফিরে এলেন৷ রাজ্যময় আনন্দের ধুম পড়ে গেল৷ কালো রানির ও সখীর মুখে আবার হাসি দেখা দিলে৷
এদিকে হাঁড়িমুখো জঙ্গলের ধারে তেঁতুল গাছের নীচে গিয়ে উপস্থিত হলেন৷ লাল কাটপিঁপড়েরা গাছের ওপর বাসা বেঁধে বাস করে৷ হাঁড়িমুখো অনেক চেষ্টা করে দূত পাঠিয়ে কাটপিঁপড়েদের রাজার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পেলেন৷ বহু সাধ্যসাধনার পর কাটপিঁপড়েদের রাজা লাল মহারাজকে সাহায্য করতে রাজি হলেন৷ কাটপিঁপড়েরা লড়াইয়ের জন্য সেজে বের হল৷ সারি দিয়ে কাটপিঁপড়েদের গাছ থেকে নামতে দেখে সব জন্তু রাস্তা ছেড়ে পালিয়ে গেল৷
সড়সড়ে পিপীলি এসে কালো রাজাকে খবর দিলে, "মহারাজ, সর্বনাশ উপস্থিত! কাটপিঁপড়ের দল আমাদের আক্রমণ করতে আসছে; আর রক্ষে নেই৷"
ডেয়েদের রাজা বললেন, "আমার সব সৈন্য এখানে নেই৷ জিঁয়া সৈন্য উপস্থিত থাকলে কেটো ব্যাটাদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতুম৷ গাছের ওপর বাস করে বাছাধনদের বড়ো অহংকার হয়েছে৷ আপাতত আমার পরামর্শ এই, কালো রাজা তাঁর স্ত্রী পুত্র পরিবার সৈন্যসামন্ত নিয়ে উচ্চিংড়েদের রাজার নিকট গিয়ে আশ্রয় নিন৷ কাটপিঁপড়েরা এখনই এসে পড়বে৷ গিরগিটি কাশের পাতায় চড়িয়ে কালো রাজাদের পৌঁছে আসুক৷ আমরা ততক্ষণ কাটপিঁপড়েদের সঙ্গে যুদ্ধ করব; যদি অবস্থা সঙ্গিন বোধ হয়, ততক্ষণে গিরগিটি ফিরে আসবে, আমরা কাশপাতা চড়ে ঢাক ঢোল বাজিয়ে নিজেদের দেশে চলে যাব৷ কেটো ব্যাটারা তখন যত ইচ্ছে মাটি কামড়ে মরুক৷ আমাদের আর কী করতে পারবে৷"
কালো রাজা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন৷ মন্ত্রী বললেন, "মহারাজ, আর ভাববার সময় নেই, ভেবেই বা কী উপায় হবে৷ ডেয়ে মহারাজ যেরকম বলছেন, তাই করুন৷"
গিরগিটি তখনই সমস্ত কালো পিপীলিদের আন্ডাবাচ্ছা সমেত পাতায় চড়িয়ে উচ্চিংড়েদের রাজত্বে পৌঁছে দিয়ে এলেন৷ উচ্চিংড়ে রাজা সম্মান করে তাঁদের আশ্রয় দিলেন৷ একজনও কালো পিপীলি আর বাইরে রইল না৷ সুড়ঙ্গের মুখে ব্যাংকে দেখে প্রথমে পিপীলিদের খুবই ভয় হয়েছিল৷ কিন্তু উচ্চিংড়ে রাজার আদেশে ব্যাং যখন মধুর কন্ঠে "আঁই-ওঁ, আঁই-ওঁ" বলে অভ্যর্থনা করলেন, তখন সকলের ভয় চলে গেল৷ গিরগিটি কাশপাতা নিয়ে ফিরে গেলেন৷

বিষম ক্রুদ্ধ বাধিল যুদ্ধ
মাঠের মধ্যে লাল ও কাটপিঁপড়ে একদিকে আর ডেয়েরা একদিকে-প্রচণ্ড লড়াই বেধেছে৷
ভরিল মাঠ,
দেখিয়া ডেয়ে
আসিল ধেয়ে,
ডেয়ের দল
অতি প্রবল
নাড়িয়া শুণ্ড
হাঁ করি মুণ্ড
বিকটাঘাতে
শত্রুনিপাতে৷
বিষম ক্রুদ্ধ
বাধিল যুদ্ধ৷
ডেয়ের কাণ্ড
অতি প্রচণ্ড,
ধরিয়া ঘাড়ে
মুণ্ড না ছাড়ে,
কাটের মুণ্ড
খণ্ড বিখণ্ড
টানিয়া আনে,
মারে রে প্রাণে৷
কাটের রিষ
ঢালিল বিষ,
বিষের লালা
বিষম জ্বালা
সহা না যায়,
মৃত্যু যে তায়;
পালাল ডেয়ে
পাছে না চেয়ে৷
বেগতিক দেখে গিরগিটি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন৷ ডেয়েরা পালিয়ে আসতেই সবাইকে পাতায় চড়িয়ে পাতা নিয়ে ভোঁ-দৌড় দিলেন৷ যেসব কাটপিঁপড়ে তাড়া করে এসেছিল তারা অবাক হয়ে চেয়ে রইল৷ ক্রমে লাল ও কাটপিঁপড়েরা এসে কালো পিপীলিদের রাজত্বে ঢুকল৷ কিন্তু রাজ্যে জনপ্রাণী নেই-এক ফোঁটা মধুও নেই৷ বড়োই হতাশ হয়ে লালেরা ফিরে গেল৷
কিছুদিন যায়, কেটো সর্দারদের নিয়ে লাল মহারাজ ও হাঁড়িমুখো কেবলই পরামর্শ আঁটেন৷ কালো পিপীলিরা যে কোথায় লুকিয়েছে কিছুই পাত্তা পাওয়া যায় না৷ চারিদিকে লাল চর যায়, কিন্তু সবাই ফিরে এসে বলে কোনোই সন্ধান মিলল না৷
একদিন এক চর এসে লাল মহারাজকে বললে, "মহারাজ, আজ আমি ঘোষেদের ভিটের ধারে গিয়েছিলাম, গিয়ে দেখি যে পিপীলিদের কালো বউ রূপের ঠ্যাকারে শুঁড় উঁচু করে আকাশ পানে চেয়ে হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছে৷ আমি তাড়া করতেই ভিটের দেওয়ালের এক গর্তের মধ্যে ঢুকে গেল৷ তার ভেতরে যেতে আমার আর সাহস হল না৷ কালো বউ যখন সেখানে আছে, তখন নিশ্চয়ই সব কালো পিপীলিরা ওই গর্তের মধ্যেই আছে৷"
তখনই লাল মহারাজ পাঁচজন গুপ্তচরকে গর্তের মুখে নজর রাখবার জন্যে পাঠিয়ে দিলেন৷ তিন দিন পরে চরেরা ফিরে এসে খবর দিলে, কালো রাজা পাত্রমিত্র সমেত ঘোষেদের ভিটের মধ্যে উচ্চিংড়ে রাজার আশ্রয়ে বাস করছে৷ ওই এক গর্ত ছাড়া ভিটের মধ্যে ঢোকবার অন্য পথ নেই৷ স্থির হল, কাটপিঁপড়েদের সঙ্গে নিয়ে সেই গর্তের মধ্যে দিয়ে ঢুকে কালোদের আক্রমণ করতে হবে৷ উচ্চিংড়েদের আর কে ভয় করে? এক কামড় মারলেই ঘাটিদার ঘাটি ছেড়ে পালাবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই৷
পরদিন সকাল বেলায় লাল সৈন্য এসে গর্তের মুখ ঘেরাও করলে৷ কাটপিঁপড়েদের দেখে ঘাটিদার উচ্চিংড়েরা সব ভয়ে গর্তের মধ্যে পালিয়ে গেল৷ উচ্চিংড়ে মহলে মহা হুলস্থুল পড়ে গেল৷ কটকটি ব্যাং সকলকে অভয় দিয়ে বললেন, "তোমরা নির্ভয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমোও৷ আমি একাই কেটো ব্যাটাদের শেষ করব৷"
গর্তের মধ্যে দিয়ে অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে এক-এক করে কাটপিঁপড়েরা ঢুকতে লাগল৷ একটি করে পিঁপড়ে ঢোকে আর ব্যাং কুপ করে খেয়ে ফেলেন৷ পিছনের পিঁপড়েরা বুঝতেই পারলে না সামনে কী কাণ্ডটা হচ্ছে৷ যতই পিঁপড়ে ঢোকে, ব্যাং মনের আনন্দে টুঁ শব্দটি না করে ততই খান৷ দু-চার-শো পিঁপড়ে ঢোকার পর বাইরে কেটো সর্দারের মনে সন্দেহ হল, ভেতর থেকে লড়াইয়ের খবর আসে না কেন? চরেরা সব কী করছে? লাল মহারাজ বললেন, "সর্দারজি, তারা এখন মনের সুখে কালো পিপীলির ও উচ্চিংড়ের মাংস খাবলে খাবলে খাচ্ছে, খবর দেবার কথা ভুলেই গেছে৷"
কেটো সর্দার নিশ্চিন্ত হলেন৷ আরও দু-চার-শো সৈন্য সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকল, নতুন করে চরও গেল৷ কিন্তু কেউই ফিরল না৷ লাল সৈন্যদের মনে ক্রমে আতঙ্ক ঢুকল৷ আর কেউ অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢুকতে চাইল না৷ বড়ো কেটো সর্দার তখন নিজে খবর নিতে গেলেন৷ কিন্তু তিনিও ফিরলেন না৷ অন্যান্য সর্দারেরা তখন ভয় পেয়ে সব সৈন্যসামন্ত নিয়ে গর্তের মুখ ছেড়ে এসে কিছু দূরে আম গাছের ওপর চড়ে আশ্রয় নিলেন৷
কেটো মহারাজের কাছে খবর গেল৷ তিনি বিষম রেগে বলে পাঠালেন, "আমার সর্দারেরা লড়াইয়ে সব মরে গেলে দুঃখ ছিল না, কিন্তু তারা উচ্চিংড়েদের ভয়ে পালিয়ে এল; এ অপমান চিরদিন মনে থাকবে৷"

মুচকি মুচকি হাসছেন
অগত্যা সর্দারেরা আবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন৷ লাল মহারাজ পরামর্শ দিলেন অন্ধকার
সুড়ঙ্গের মধ্যে অমনি যাওয়া ঠিক হবে না; আলো নিয়ে গিয়ে দেখতে হবে- ব্যাপারটা কী৷
ক্রমে রাত্রি এল; গাছের মাথায় হাজার জোনাকি জ্বলে উঠল৷ কাটপিঁপড়েরা কতকগুলি জোনাকি ধরে রেখে দিলে৷ সকালে লাল সৈন্য গর্তের দিকে এগোল৷ সামনে জোনাকি মুখে ধরে এক সার সৈন্য চলল৷ সুড়ঙ্গের ভেতর খানিক দূরে ঢুকতেই দেখা গেল ওত পেতে থাবা গেড়ে কটকটি ব্যাং বসে মুচকি মুচকি হাসছেন৷ তাঁকে দেখেই লাল সৈন্যদের আত্মাপুরুষ উড়ে গেল৷ মুখ হতে জোনাকি ফেলে সব সৈন্য রণে ভঙ্গ দিল৷ সর্দাররা অনেক কষ্টে লাল সৈন্য একত্র করে বাড়ি ফিরে গেলেন৷
লাল মহারাজের কেটো সর্দারদের সঙ্গে আবার পরামর্শ মন্ত্রণা চলতে লাগল৷ সুড়ঙ্গ হয়েই তো মুশকিল হয়েছে, তা না হলে চারিদিক থেকে আক্রমণ করলে, কটকটি ব্যাং কী করেন দেখা যেত৷ ভিটের মধ্যে ঢোকার অন্য কোনো পথও নেই৷ বিশকর্মা, বাইশকর্মা পিঁপড়েদের তলব পড়ল; তারা যদি কোনোরকমে ভিটের মধ্যে ঢোকার পথ করে দিতে পারে৷ তারা অনেক মাথা ঘামিয়ে বললে, "পথ তো করে দিতে পারি, কিন্তু পথ করতে গিয়ে ব্যাঙের হাতে কে প্রাণ খোয়াবে?" কোনোই উপায় হয় না৷ লাল মহারাজ ঢ্যাঁটরা দিলেন কালো পিপীলিদের মারবার উপায় যে করে দিতে পারবে তাকে অনেক পুরস্কার দেবেন৷ ঢাক ঢোল পিটিয়ে বরকন্দাজরা রাজার আদেশ প্রচার করে, কিন্তু কেউ কোনো মতলব দিতে পারে না৷ বিশকর্মা দুঃখ করেন ছেলেটা আজ যদি এখানে থাকত৷ একদিন ঢ্যাঁটরা বাজছে,
ঢকাঢক ঢকাঢক ঢকাঢক ঢ,
শুন শুন সকলে শুন শুনহ,
পিপীলিরে কালো যে-বা মারিবে
দেখাতে পন্থা যে-বা পারিবে,
পাইবে সে রাজ্য কন্যা রাজে,
ডগডগ ডঙ্কা ডগডগ বাজে৷
এমন সময় এক মোটা মাথা সরুপেটা পিঁপিড়ি এসে ঢোল আটক করলে, বললে, "তোরা কে? কীসের গোলমাল করছিস?"
লাল সেপাই বললে, "জান না রাজার হুকুম, যে কালো পিপীলিদের মারার উপায় করতে পারবে সে অনেক পুরস্কার পাবে৷"

এই একটা লেখন আছে দেখে নে
মোটা মাথা পিঁপিড়ি বললেন, "তোরা বড়ো বেয়াদপ দেখছি, আমাকে আপনি বলে কথা বলবি; চল রাজার কাছে আমাকে নিয়ে৷"
সেপাই সর্দার মোটা মাথার রকম-সকম দেখে থতমত খেয়ে বললে, "আপনি, আপনি কে? পরিচয় না দিলে তো আমরা মহারাজার কাছে নিয়ে যেতে পারি না৷"
মোটা মাথা বললে, "আমি যে কে, তা তোরা কী বুঝবি? এই একটা লেখন আছে দেখে নে, পরিচয় জানবি৷ আমার ফুরসত কম, চল রাজার কাছে নিয়ে৷ রাজকন্যা দেখতে কেমন?"
সেপাই সর্দার ভড়কে গেল৷ মোটা মাথাকে লাল মহারাজের কাছে নিয়ে গিয়ে লেখন দিলেন৷ মহারাজ দেখলেন, লেখনে আছে বিশকর্মার পুত্র বিয়াল্লিশকর্মা বুনোহাঁসের পিঠে চড়ে মানস সরোবরে গিয়ে ময়দানবের কাছে যন্ত্রবিদ্যা শিখে এসেছেন৷ জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কে, কী চাও?" মোটা মাথা বললে,
"বিশের ব্যাটা বিয়াল্লিশ নাম,
যন্ত্রে মন্ত্রে অদ্ভুত কাম,
লাগাই ভেলকি-লাগ লাগ, লাগ,
জাগাই মড়া কাঁদাই কাগ,
সাপের মাথায় নাচাই ব্যাং,
খাওয়াই ছাগে বাঘের ঠ্যাং,
জ্বালিয়ে বনে জোনাক-বাতি,
ঘাসের আগায় নাচাই হাতি,
কাশের ফুলে বানিয়ে ঘুড়ি,
আকাশপথে বেড়াই উড়ি,
ফাটাই মেঘে ভাসাই জলে,
ধরাই চাঁদে রাহুর কলে,
ওড়াই পাথর ডোবাই সোলা,
গজাই অশথ ভিজিয়ে ছোলা৷
বিশের ব্যাটা বিয়াল্লিশ নাম
যন্ত্রে মন্ত্রে অদ্ভুত কাম৷
এ হেন ব্যক্তি পৃথিবীতে কোথায় পাবে?" এই বলে বিয়াল্লিশকর্মা নিজের ছ-পায়ের ধুলা নিজের মাথায় দিলেন, আর বুক ঠুকে বললেন, "শর্মা না পারেন কী? কালো পিপীলিদের মারবার উপায় আমি করে দিচ্ছি; ভিটের মধ্যেই তাদের মারব, এ উপায় আমার নিজের আবিষ্কার৷"
"কী, কী," বলে মহারাজ ও সর্দারগণ ঘন ঘন মাথা নাড়তে লাগলেন৷ বিয়াল্লিশকর্মা বয়সে কম হলে কী হয়, সে একজন বড়ো যন্ত্রী হয়ে এসেছে৷ সকলেই বিশ্বাস করলে সে নিশ্চয় কিছু একটা উপায় করেছে৷ কী উপায় জানবার জন্যে সবাই উৎসুক হয়ে রইল৷
যন্ত্রী বললেন, "আমি এমন এক প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছি, যার দ্বারা পিঁপড়েদের পালক গজিয়ে দেব৷ তখন আমরা উড়ে গিয়ে ভিটের ওপর থেকে ভেতরে পড়ে কালোদের সাবাড় করব৷ ভিটের ছাদ পড়ে গেছে; ওপরে আমাদের আটকাবার কিছু নেই৷ আর চারদিক থেকে ঘিরে ধরলে ব্যাংও পালাবে৷"
যন্ত্রীর কথা শুনে বিশকর্মা গর্বে ফুলে উঠলেন, বাইশকর্মা উপহাসের হাসি হাসলেন৷
বিজ্ঞেরা সব মাথা নেড়ে বললেন, "ছোকরার মাথা খারাপ হয়েছে৷"
যন্ত্রী বললে, "পরখ করতে আজ্ঞা হউক৷"
কেটো সর্দারদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে বললেন, "আমার ওপর পরখ করো৷ দেখি তোমার কেরামতি৷"
লাল মহারাজ বললেন, "তাহাই হউক৷"
কেটো সর্দারকে যন্ত্রী তিন রাত তিন দিন অন্ধকার গর্তে আটকে রাখলেন ও নানা প্রক্রিয়া করলেন৷ চার দিনের দিন বিকেলে রাজ্যসুদ্ধ পিঁপড়ে এসে জমা হল ব্যাপার দেখতে৷ গর্তের ভেতর থেকে সর্দার বেরিয়ে এলেন, তাঁর পিছনে যন্ত্রী৷ সকলেই অবাক হয়ে দেখলে সর্দারের পাখা গজিয়েছে৷ শুঁড় উঁচু করে সবাই আনন্দে নাচতে লাগল৷
লাল মহারাজ খুব খুশি, বললেন, "যন্ত্রীকে তিন ভাঁড় মধু বকশিশ দাও৷"
কেবল বাইশকর্মা ও রাজপণ্ডিত মাথা নীচু করে রইলেন; কোনো কথা বললেন না৷ মহারাজ সর্দারকে উড়তে হুকুম দিলেন৷ দু-পা দৌড়ে দু-বার পাখনা নাড়া দিয়ে সর্দার আকাশে উঠলেন ও উড়ে ঘোষেদের ভিটের দিকে চললেন৷ অল্পক্ষণের মধ্যেই সর্দার ভিটে প্রদক্ষিণ করে লাল মহারাজের কাছে ফিরে এলেন৷ চারদিকে পিঁপড়েরা উল্লাসে ছুটোছুটি করতে লাগল৷

পণ্ডিত পিঁপড়ে
পরামর্শ সভা বসল৷ উড়ুক্কু সর্দার বললেন, "আমি সব দেখে এসেছি৷ সহজেই আমরা সদলবলে ভিটের মধ্যে গিয়ে পড়তে পারব, আর, একবার সেখানে পৌঁছোতে পারলে আমাদের পায় কে?"
যন্ত্রী বললেন, "আমি এক সপ্তাহের মধ্যেই সব পিঁপড়েদের পাখা গজিয়ে দিতে পারি৷"
বাইশকর্মা চুপ করে রইলেন৷ রাজপণ্ডিত বললেন, "মহারাজ, আমাদের পুরোনো পুঁথিতে লেখা আছে,
পিঁপিড়ার পাখা ওঠে মরিবার তরে
এতদিন ভাবতাম, ইহার ব্যাখ্যা আধ্যাত্মিক, অহংকার হলে পতন হয়, এখন দেখছি ত্রিকালজ্ঞ পিঁপিড়া ঋষিগণ জানতেন আমরা উড়তে পারব; সেজন্যেই এই নিষেধ লিখে গেছেন৷ উড়লেই আমাদের বিপদ হবে৷ আমার এতে মত নেই৷"
সকলেই এ কথায় হেসে উঠল৷ কেবল বাইশকর্মা চুপ করে রইলেন৷ উড়ুক্কু সর্দার বুক ফুলিয়ে ঘাড় উঁচু করে বললেন, "কই পণ্ডিতমশায় আমি তো মরিনি?"
আকাশপথে আক্রমণ করাই পরামর্শ স্থির হল৷
এদিকে কাটপিঁপড়ে ও লাল পিঁপড়েদের মধ্যে সোরগোল দেখে, ব্যাপার কী জানবার জন্যে সব পোকামাকড়দের ভেতর কানাঘুসা চলছে৷ সড়সড়ে পিপীলি একে ওকে তাকে জিজ্ঞেস করে সব খবর জোগাড় করে, হন্তদন্ত হয়ে কালো রাজার কাছে এসে সব বিবরণ জানালে৷ কালো রাজা মহা চিন্তিত হয়ে পড়লেন৷ উচ্চিংড়ে রাজা, গিরগিটি, ব্যাং ও মন্ত্রীরা সকলেই এই সংবাদ শুনলেন৷ সকলেই বিষম চিন্তিত৷ কী করা যায়?
অবশেষে গিরগিটি বললেন, "আমি যে ভেরেণ্ডা গাছে থাকতাম, তাতে একজোড়া ছ্যাতরা পাখি বাসা বেঁধেছিল, তাদের সঙ্গে আমার আলাপ আছে৷ ছ্যাতরা অনেক দেশে ঘুরে বেড়ায়৷ সে কোনো নিরাপদ স্থানের সন্ধান আমাদের বলে দিতে পারে৷ একবার তার কাছে যাই৷" গিরগিটি ছ্যাতরার নিকট গেলেন৷
ছ্যাতরা বললেন, "আরে ক্যাও, ক্যাও! গিরগিটি বন্ধু যে! এতদিন কোথায় ছিলে? খবর কী? কী মনে করে এলে? এখানে এখন থাকবে তো? কী করছিলে এতদিন? শরীর ভালো তো? বেশ মোটাসোটা হয়েছ দেখছি৷ খেতে কী? বিয়ে করেছ? বউ কেমন হল?"
ছ্যাতরা আর থামেই না দেখে গিরগিটি বললেন, "সেসব কথা পরে হবে৷ এখন বড়ো বিপদে পড়ে এসেছি৷" গিরগিটি সমস্ত বর্ণনা করলেন৷
শুনে ছ্যাতরা বললেন, "বটে বটে! কবে, কোন সময় পিঁপড়েরা উড়বে? ওগো ছেতরি, শুনছ গো, পিঁপড়েরা উড়বে৷ তা গিরগিটি বন্ধু, তুমি খবরটা দিলে, বন্ধুর মতোই কাজ করেছ৷ যাও, যাও, তুমি আর ভেবো না; আমি সব ঠিক করে দেব৷"
গিরগিটি দেখলেন, ছ্যাতরা বড়োই বাজে বকবক করে, তার কথায় নিশ্চিন্ত থাকা যায় না৷ তিনি বিষণ্ণমনে ভিটেয় ফিরে এলেন৷ কোনো উপায়ই স্থির হল না৷ সকলেরই অনিশ্চিতের আশঙ্কায় দিন কাটতে লাগল৷
এদিকে লাল ও কাটপিঁপড়েদের মধ্যে খুব উৎসাহে কাজ চলেছে৷ বিয়াল্লিশকর্মা সব পিঁপড়েদের অন্ধকার গর্তে পুরেছেন ও নানারকম জিনিস-ঘাস, পাতা, জড়ি, বুটি খাওয়াচ্ছেন৷ চারিদিক খুব সরগরম৷ লাল মহারাজ আর তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধুবান্ধব পাখা গজাতে যাননি৷ তাঁরা সভা করে বসে আছেন৷
পণ্ডিত পিঁপড়ে বললেন, "মহারাজ, ছেলে-ছোকরাদের কথায় ভুলে আপনি কাজটা ভালো করলেন না৷ শাস্ত্রের কথা, ঋষিদের কথা-অমান্য করাটা উচিত হয়নি৷ আমি পুঁথি দেখে শত্রুনিপাতের ভালো উপায় বের করে দিতে পারতাম৷"
সভাসদরা বললেন, "বেশ, পণ্ডিত কী উপায় বাতলান শোনাই যাক৷" পণ্ডিতের ওপর ভার পড়ল, পুঁথি দেখে উপায় স্থির করে তিনি যেন কাল সকালেই রাজসভায় হাজির হন৷
পরদিন সকালে পণ্ডিত এসে সভায় দেখা দিলেন৷ বললেন, "মহারাজ, শাস্ত্রে বলে শত্রু প্রবল হলে শত্রুর যে শত্রু তার আশ্রয় নেবে৷ আমাদের এখনকার প্রধান শত্রু সুড়ঙ্গের মধ্যে কটকটি ব্যাং৷ ব্যাঙের শত্রু সাপ৷ তেঁতুলতলায় পুরোনো ইটের গাদার মধ্যে গড়গড়ি সাপ আছেন৷ তিনি সব সাপের রাজা৷ তিনি ইচ্ছা করলেই ব্যাংকে আস্ত গিলে খেতে পারেন৷ ব্যাং মরলে শত্রু জয় করা সহজ হবে৷ গড়গড়ি সাপের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ পরিচয় নেই বটে, কিন্তু ওই ভাঙা টালির নীচে এক বিচক্ষণ কাঁকড়াবিছে আছেন৷ স্নান করতে যাবার পথে রোজই তাঁর সঙ্গে আমার দেখাশোনা হওয়ায় আলাপ হয়েছে৷ তাঁর সঙ্গে আমার বেয়াই সম্পর্ক৷ তিনি গড়গড়ির পুরোনো বন্ধু৷ তিনি বললে গড়কড়ি তাঁর কথা ঠেলতে পারবেন না৷ মহারাজ, আপনার অনুমতি হলে আমি তাঁর নিকট যেতে পারি৷"

গড়গড়ি সাপ
লাল মহারাজ সভাসদদের দিকে ফিরে বললেন, "কটকটি ব্যাং যে সুড়ঙ্গের ভেতর আছেন তা অত্যন্ত সরু; গড়গড়ি বলতে নেই বেশ মোটাসোটা, তার ভেতর ঢুকতে পারবেন না৷ তবে যদি ইঁদুর ডাকিয়ে গর্তের মুখ বড়ো করে নেওয়া যায়, তবে গড়গড়ি ঢুকে ব্যাংকে ধরতে পারেন৷" সভাসদরা বললেন, "মহারাজের কথা যথার্থ৷" লাল মহারাজ বিশকর্মাকে ইঁদুরের সহিত দেখা করতে আদেশ করলেন ও পণ্ডিতকে বললেন, "তুমি গড়গড়ি মহারাজকে খবর পাঠাও৷ আমরা ওপর-নীচে দু-দিক দিয়ে শত্রুকে আক্রমণ করব৷"
বিশকর্মা অনেক ঘুরে-ফিরে নেংটি ইঁদুরের গর্তের মুখে এসে উপস্থিত হলেন৷ ডাকাডাকির পর নেংটি ইঁদুর বেরিয়ে এল৷

এক বছরের চাল দেব
সব কথা শুনে নেংটি ইঁদুর বললে, "গর্ত তো আমি কাটতে পারি, কিন্তু আমার দ্বারা একাজ হবে না৷"
বিশকর্মা অনেক লোভ দেখালেন, বললেন, "আমাদের ভাণ্ডার থেকে তোমাকে এক বছরের চাল দেব৷" নেংটি বললেন, "আমি গর্ত কাটি, আর পেছু থেকে ব্যাং খাবার নাম করে গড়গড়ি এসে আমাকে খেয়ে যান৷ না বাপু, আমি এসবে নেই৷ তার ওপর ভিটের পাঁচিলের ফাটালে কালপ্যাঁচা আছেন৷ তিনি তোমাদের কারুর খাতির রাখবেন না৷ রাত্তিরে মাটি কাটতে দেখলেই টুপ করে আমাকে নিয়ে উধাও হবেন৷ তুমি আমাকে আর চালের লোভ দেখিয়ো না বাপু৷"

ফাটালে কালপ্যাঁচা আছেন
রোদ উঠেছে কিন্তু তখনও কোয়াশা কাটেনি৷ পণ্ডিত গেলেন কাঁকড়াবিছের কাছে৷ বিছে ছানাপোনা নিয়ে তখন রোদ পোয়াচ্ছিলেন; সর্বদাই সশঙ্কিত, পাছে কেউ বাছাদের অনিষ্ট করে৷ চিনতে না পেরে পণ্ডিতকে দেখেই তেড়ে গেছেন৷
পণ্ডিতও চিনতে পারেননি, বললেন, "আরে মোলো, এটা আবার তেড়ে আসে কে?"
বিছে বললেন, "আরে মোলো, আরে মোলো বলে যে!" এই বলে কামড়াতে গিয়ে দেখেন-পণ্ডিত; বললেন, "আরে কে ও, বেয়াইমশায়!"
পণ্ডিত বললেন, "আরে বেয়াই যে!"
দু-জনেই অপ্রস্তুত৷ বিছে বললেন, "কী মনে করে অসময়ে আসা হল?"
পণ্ডিত সব বললেন৷ কাঁকড়াবিছে বললেন, "তার আর কী৷ আমার সঙ্গে এসো, এখনই ব্যবস্থা করে দি৷"
বাচ্ছাদের টালি চাপা দিয়ে কাঁকড়াবিছে পণ্ডিত পিঁপড়েকে নিয়ে ইটের গাদার কাছে গড়গড়ির নিকট গেলেন৷
গড়গড়ি বললেন, "নেংটি বোধ হয় গর্ত কাটবে না; গেল মাসে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, বললাম, পালিয়ো না, আমার প্রজা হও ও নির্ভয়ে আমার রাজত্বে বাস করো, তা সে শুনলে না৷ এ অঞ্চলে একটা কটকটি ব্যাং দেখি না৷ অনেক দিন থেকেই খাবার সাধ আছে৷ আমি গর্ত বড়ো করার দরকার দেখি না; গর্তের বাইরে থেকে শিস দেব, আর ব্যাং আমার মুখে আপনি আসবে৷ তোমরা কিছু ভেবো না৷ আজ পেটটা ভার আছে৷ আমি কালই সন্ধ্যায় এর ব্যবস্থা করব৷"

আরে মোলো, আরে মোলো বলে যে?
পণ্ডিত আহ্লাদে দৌড়ে গিয়ে লাল মহারাজকে খবর দিলেন৷ মহারাজ বললেন, "ভালোই হল৷ আমাদের সৈন্যরাও কালই প্রস্তুত হবে৷ আমি দেখতে গিয়েছিলাম, তাদের ডানা প্রায় গজিয়ে এসেছে৷ তারা বিকেলে ওপর থেকে আক্রমণ করবে, আর নীচে থেকে গড়গড়ি ব্যাংকে খাবেন, আমাদের জিত নিশ্চিত৷"
পরদিন বিকেলে অগুন্তি কাট ও লাল পিঁপড়ে পালক গজিয়ে মাঠে জমায়েত হল৷ লাল মহারাজ, কেটো মহারাজ, সর্দার ও সেনাপতিরা সব তদারক করতে মহা ব্যস্ত৷ রাজ্যের পোকামাকড় মাঠ ছেড়ে পালিয়ে দূর থেকে তামাশা দেখতে লাগল৷ হাঁড়িমুখো পালক গজিয়ে পিঁপড়েদের হুকুম দিয়ে এদিক-ওদিক উড়ে বেড়াতে লাগল৷ কেটো সর্দারেরা এক-এক দলকে এক-এক দিকে মোতায়েন করলে৷ কোন দল ব্যাংকে আক্রমণ করবে, কারা গিরগিটিকে ধরবে সব পরামর্শ স্থির হয়ে গেল৷ উচ্চিংড়েদের জন্য কোনো ভাবনাই নেই৷ লাল সৈন্য দেখলে তারা নিশ্চয়ই পালাবে৷ অন্ধকার হবার আগেই ভিটের মধ্যে পড়লে কেউ লুকিয়ে রক্ষা পাবে না৷ উড়ুক্কু সর্দার হুকুম দিলেন,
ফররর ফররর ফররর আকাশ ছেয়ে
উড়িল পিঁপিড়ি বাতাস বেয়ে,
আকাশ বাহিনী শনন শন,
উড়িল ঘেরিয়া কাশের বন,
উড়িল ছাড়িয়া বাঁশের ঝাড়
আঁধার করিয়া ডোবার পাড়,
সভয়ে দেখিল পিপীলি কালো
সহসা আকাশে নিবিল আলো,
হাজারে হাজারে পিঁপিড়ি লাল
নামিয়া আসিছে মরণ-জাল৷
ছ্যাতরা অনেকক্ষণ হতে উশখুশ করে আকাশ পানে চেয়ে ভেরেণ্ডা গাছের এ-ডাল ও-ডাল করছিল৷ দূর থেকে পিঁপড়েদের উড়তে দেখে ডেকে উঠল, "চ্যার-চ্যার, ছ্যাতর-ছ্যাতর, ছেতরি৷"
ছেতরি উত্তর দিলে, "ছ্যার ছ্যার ছ্যার, কী কী কী৷"
ছ্যাতরা বললে, "আরে দেখছ কী, ফলার চেগেছে৷ শ্বশুরবাড়ির সবাইকে খবর দাও, আর যাকে দেখবে সবাইকে নেমন্তন্ন করো৷ আমি চললুম দাঁড়কাককে বলতে৷ তার গলার জোর আছে, সব পাখিদের নেমন্তন্ন করবে৷"
চ্যারররর করে ছ্যাতরা-ছেতরি উড়ে গেল৷ দাঁড়কাক বট গাছের আগডালে ছিলেন, শুনে মহা আনন্দে বললেন, "আমি এখনি রাজ্যের পাখিদের খাওয়ার নেমন্তন্ন করে দিচ্ছি৷"
দাঁড়কাক আকাশে খুব উঁচুতে উঠে ডাক দিলেন,
"খাওয়া খাওয়া খাওয়া
বাবা মামা কাকা দাদা, আরে আ আ আ
কাগা আ বগা আ, খেয়ে যারে খেয়ে যা,
কাঁচা খা পাকা খা, তাজা তাজা ধরে খা,
করে হাঁ যত চা, খেয়ে যারে নিয়ে যা,
খাওয়া খাওয়া খাওয়া
খা খা খা"
বেলা পড়ে এসেছে কিন্তু তখনও শিমুল চুড়োয় লাল আলো ঝিকমিক করছে৷ সমস্ত দিন চরে পাখিরা সব যে-যার বাড়ি ফিরছিল, এমন সময় আকাশ কাঁপিয়ে দাঁড়কাকের নেমন্তন্নের ডাক শোনা গেল৷ তখন-
ঝটপট ঝটপট
পাখসাট চালে,
এল পাখি
পালে পালে,
পালের গোদা
গোদা চিল,
গোদার সঙ্গে
শঙ্খচিল
শঙ্খচিলের
চেলাটা,
জুটল এসে
ফিঙেটা
ফিঙের মামা
কালো কাগা,
কাগার মিতে
সাদা বগা,
এল উড়ে
হাঁড়িচাঁচা,
দলে দলে
কাদাখোঁচা,
পিঁপড়ে খেতে
চাতকদল,
আসল হেঁকে
ফটিক জল,
টেয়া, শালিক,
ময়না, দোয়েল,
বুলবুল, শ্যামা
আসল কোয়েল,
বাবুই, টুনটুন
চড়াই পক্ষী,
পায়রা, ঘুঘু,
প্যাঁচা লক্ষ্মী,
ময়না, তোতা,
ছ্যাতরা, ছেতরি,
নাচে মোরগ,
তিতির, তিতরি৷
দেখতে দেখতে উড়ুক্কু পিঁপড়ের দল নির্মূল হয়ে গেল৷ কেবল জনকতকের পালক খসে মাটিতে পড়ে প্রাণ রক্ষা হল৷ ভিটের মধ্যে উচ্চিংড়ে ও পিপীলিদের এতক্ষণ উৎকন্ঠার সীমা ছিল না৷ পাখিরা সব পিঁপড়ে খেয়ে ফেললে দেখে ধড়ে প্রাণ এল৷ কালো মহারাজ অতিথি অভ্যাগত সকলকে মধু বিতরণ করতে হুকুম দিলেন৷ ডেয়ে রাজাকে নেমন্তন্ন করতে তখনই দূত পাঠানো হল৷ উচ্চিংড়ের দল গিরগিটির পিঠে চড়ে বসল৷ গিরগিটি ও ব্যাং আহ্লাদে নাচতে লাগলেন৷ ব্যাং গান ধরলেন,
"পিঁপড়িয়ারে ভোকর,
চিলহর মারে ঠোকর,
এক চিলহর কাণা
পিঁপড়িয়াকে নানা"
ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এল, হঠাৎ ভিটের দেওয়ালের ওপর নজর পড়াতে ব্যাঙের গান বন্ধ হয়ে গেল৷ ব্যাং ভয়ে আঁতকে উঠে তাড়াতাড়ি সুড়ঙ্গে গেলেন৷ গিরিগিটিও ভয়ে ব্যাঙের পেছু নিলেন৷
সুড়ঙ্গে ঢুকেও ব্যাং ভাবতে লাগলেন, "কোথা যাই, কোথা লুকোই৷" পিপীলিরা ও উচ্চিংড়েরা তো প্রথমে কী হল বুঝতেই পারলে না৷ শেষে ভাঙা দেওয়ালের ওপর দেখে এক বিকটাকার পাখি বসে আছে৷ এ পাখি কেউ আগে কখনো দেখেনি৷ বুড়ো উচ্চিংড়ে দাদামহাশয় অনেকক্ষণ নিরীক্ষণ করে বললেন,
"থলে-গলা টেকো-মাথা হাড়গিলে নাম,
হাড় খায় মাস খায়, খায় রোঁয়া চাম,
ইঁদুর বাদুড় খায়, খায় কোলা ব্যাং,
শুঁয়োপোকা আরশোলা খায় মাছ চ্যাং,
যাহা পায় তাহা খায়, না করে বিচার,
গিরগিটি বরবটি সব একাকার,
ঘেঁটুফুল তেলাকুচা গোবরিয়া পোকা,
আস্ত গিলিয়া খায় কচি কচি খোকা৷"
হাড়গিলের পরিচয় পেয়ে ভয়ে উচ্চিংড়েদের গায়ের শুঁয়ো খাড়া হয়ে উঠল৷ যে-যার কোঠরে গিয়ে আশ্রয় নিলে৷
হাড়গিলে পাখি অনেক দূরে তেফড়কা নদীর ওপারে থাকেন৷ দাঁড়কাকের নেমন্তন্ন পেয়ে আসতে তাঁর দেরি হয়ে গেছে৷ এসে দেখলেন খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপার সব শেষ হয়ে গেছে৷ এতখানি পথটা ফিরে যাবেন তাই ভাবতে ভাবতে ভিটের ভাঙা দেওয়ালের ওপর এসে বসেছেন৷ হাড়গিলে বসে এদিক-ওদিক দেখতে লাগলেন, আর মাঝে মাঝে পালক ঝাড়া দিতে লাগলেন৷
এদিকে অন্ধকার হয়েছে দেখে গর্তের মুখে গড়গড়ি এসে হিস হিস করে আস্তে আস্তে শিস দিতে লাগলেন৷ কিন্তু শিস দিলে হবে কী, ব্যাং যে সুড়ঙ্গ ছেড়ে কোথায় লুকিয়েছেন তার ঠিকানাই নেই৷ অনেকক্ষণ শিস দেবার পরও যখন কেউ বেরোল না, তখন গড়গড়ি ব্যাঙের সন্ধানে দেওয়ালের ফাটাল বেয়ে এদিকে-ওদিক দেখতে লাগলেন৷ হাড়গিলের ভয়ে ব্যাং সুড়ঙ্গ থেকে পালিয়ে নড়নচড়নশূন্য হয়ে এক ফাটালে লুকিয়ে ছিলেন৷ এখন সাপকে আসতে দেখে একেবারে ভয়ে কাট হয়ে "সীত্তারাম সীত্তারাম" জপ করতে লাগলেন৷ এই বুঝি গড়গড়ি শিস দেয়, তাহলেই তাঁকে বেরিয়ে আসতে হবে৷
এমন সময় হাড়গিলে দেখলে দেওয়ালের ওপর নড়ে ওটা কী? ডানা মেলে এক ছোঁ মেরে হাড়গিলে গড়গড়িকে একেবারে সেই তেফড়কা নদীর ওপারে নিয়ে গেলেন৷
খানিক পরে উচ্চিংড়েরা হাড়গিলে উড়ে গেছে দেখে আস্তে আস্তে গর্ত থেকে বেরিয়ে এল৷ কালো পিপীলিরাও এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিলে৷
এখন সব বিপদ কেটে গেছে৷ উচ্চিংড়ে রাজা বললেন, "তোমরা সবাই ফুর্তি করো৷"
কিন্তু গিরগিটি কই? ব্যাংই বা কোথায়? চারিদিকে খোঁজ পড়ে গেল৷ গিরগিটি সুড়ঙ্গের এককোণে ঘাপটি মেরে চুপ করে বসে আছেন৷ গিরগিটিকে তো পাওয়া গেল, কিন্তু ব্যাং কই?
গিরগিটি বললেন, "ব্যাং যে সুড়ঙ্গ থেকে কোথায় পালিয়েছেন, তার ঠিকানা নেই৷ তখন ব্যাং কী করছিলেন দেখবার মতো অবস্থা আমার ছিল না৷"
অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ব্যাংকে মিলল না৷ তবে কি হাড়গিলে তাকে নিয়ে গেল? সন্ধ্যের আঁধার ঘনিয়ে এল৷ দুঃখে সবাই ম্রিয়মান৷
উচ্চিংড়েরা গান ধরলে,
"ঝম ঝম ঝম
ঝুমুর ঝুমুর ঝুমুরি
রি রি রি
রাজা আইলন রানি আইলন ভুট্টা দেলন আগমে,
শাগ পাকাকে রোটি খাইলন এক ঝঝঝর তাড়ি রে,
রি রি রি
আইগন লোটে বাইগন লোটে খিরা লোটে বাগমে
লাল পালং পর বেংবা লোটে লম্বা এসন দাড়িরে,
রি রি রি
কাঁহা গেইলই বেংবা কাঁহা গেইলই হো
এহন সুন্নর বেং কাঁহা পাইবই হো,
ঝুমুর ঝুমুর ঝুমুরি
রি রি রি
আরে ফুদ্দি চিড়াইয়াঁ বোল মোরে কো
লে গইল বেংবা কাঁহা গেইলই হো
রি রি রি
ঝুমুর ঝুমুর ঝুমুরি
ঝম ঝম ঝম"
ব্যাং এতক্ষণ ফাটালের মধ্যে কাট হয়ে বসে ইষ্টনাম জপ করছিলেন৷ উচ্চিংড়েদের গান কানে যাওয়ায় তাঁর চমক ভাঙল৷ দেখলেন হাড়গিলে নেই, সাপও নেই৷ উচ্চিংড়েরা তাঁর অভাবে দুঃখ করছে জেনে মনে বেশ একটু গর্ব অনুভব করলেন৷ উচ্চিংড়েদের জানান দেবার জন্যে গলা ফুলিয়ে হাঁকলেন,
"কট কট কট কট কোঁ
হাম্মে ইধর হোঁ৷"
উচ্চিংড়েরা ব্যাঙের আওয়াজ পেয়ে সমস্বরে রি রি করে চিৎকার করে উঠল৷ গিরগিটি ঠিক ঠিক করতে লাগলেন, পিপীলিরা আনন্দে শুঁড় নাড়তে লাগল৷ ব্যাং এসে সকলের সঙ্গে মিলিত হলেন৷
এখন আর কোনো উপদ্রব নেই৷ এবার সকলে সুখশান্তিতে বাস করতে পারবেন৷ চারিদিকে আনন্দের ধুম পড়ে গেল৷
প্রতিহারী এসে বললেন, "রানিমা ও সখীরা ব্যাঙের গান শোনবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করছেন৷"
সকলেই গান করবার জন্যে ব্যাংকে অনুরোধ করতে লাগলেন৷
ব্যাং বললেন, "তোমরা সকলে যোগ দিলে গান করতে পারি৷"
ব্যাং তাঁর পুরোনো কলমি ডাঁটার সারঙ্গ বের করে তারে মোচড় দিয়ে আরম্ভ করলেন,
"ও না মাসি ঢং গুরুজি চিতং
মেরা সারংমে বাজিছে ক্যাসা ভালা রং"
উচ্চিংড়েরা৷-
"ঝাঁ ঝাঁ ঝাঁ
ইচ কিচ কিচ কিচ কিচ"
ব্যাং৷-
"কোঁ কোঁ কোঁ"
মেরা সারংমে বাজিছে নয়া নয়া ঢং"
পিপীলিগণ৷-
"চিঁ চিঁ চিঁ"
গিরগিটি৷-
"ঠিক ঠিক ঠিক ঠিক ঠিক"
ব্যাং৷-
"শুনো জি শুনো জি নয়া নয়া ঢং
মেরা সারংমে বাজিছে ক্যাসা ভালা রং"
মহানন্দে রাত্রি কেটে গেল৷
শেষ

পিঁ করে বাঁশি বেজে উঠল

চিচ্চিড়িঙ্গা তু ফড়িঙ্গা মেরে সাত তু লড়েঙ্গা?

গিরগিটিকে দেখে-

ছ্যাতরা বললেন-আরে ক্যাও ক্যাও গিরগিটি বন্ধু যে

দাঁড়কাক ডাক দিলেন-খাওয়া, খাওয়া, খাওয়া, খাওয়া,

ঝটপট ঝটপট পাখ সাট চালে

এল পাখি পালে পালে

ওনা মাসি টং গুরুজি চিতং

থলে-গলা টেকো-মাথা হাড়গিলে নাম

ওই বুঝি করে হাঁ নাহি যার নাম
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন