ফিরে আসে বারবার

পল্লবী সেনগুপ্ত

নিকষকালো অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিন ছায়ামূর্তি। অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছেন তাঁরা। এবার কিছু বিশ্রাম প্রয়োজন। তাই তাঁরা বিশ্রামে রত হলেন। পথশ্রমের ক্লান্তি অচিরেই নিদ্রার পর্দা আনল দুজনের আঁখিপল্লবে। নিদ্রিত হলেন দুই মহারথী কৃপাচার্য আর কৃতবর্মা। কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তির নেত্র নির্ঘুম। প্রতিশোধের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর হৃদয়ে ও অন্তরে। পাণ্ডবদের সর্বনাশ করতেই হবে। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতেই হবে।

পামর ধৃষ্টদ্যুম্ন হত্যা করেছে তাঁর পিতাকে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পঞ্চদশতম দিনে। এত বড় পাপী যে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে, ছলনার আশ্রয় নিয়ে নিজের হাতে হত্যা করল নিজেরই গুরুকে। মহারথী, বীরশ্রেষ্ঠ দ্রোণাচার্য, যাঁকে পরাস্ত করা অসম্ভব ছিল, তাঁকে পুত্রহত্যার মিথ্যা সম্ভাষণ শুনিয়ে অস্ত্র ত্যাগে বাধ্য করেছিল ওই নীচ পাণ্ডবরা। আর তাঁর অস্ত্রত্যাগের সুযোগ নিয়ে তাঁর প্রাণ নিল ধৃষ্টদ্যুম্ন। না, এ অন্যায়ের প্রতিকার না হওয়া পর্যন্ত রোষাগ্নি এক তিলও প্রশমিত হবে না দ্রোণপুত্র দ্রৌণির।

ছলনাময় পাণ্ডবকুল একে একে শেষ করেছে কৌরবপক্ষের সমস্ত বীরকুলকে। দ্রোণপুত্রের পরম মিত্র, কৌরব যুবরাজ দুর্যোধন আজ বিপর্যস্ত। দ্বিতীয় পাণ্ডব আবারও ছলনার মাধ্যমে পরাস্ত করেছেন তাঁকে। দুর্যোধন আজ বিধ্বস্ত। পরাজয়ের গ্লানি মেখে, ভগ্ন শরীরে আত্মরক্ষার্থে তিনি আত্মগোপন করে রয়েছেন সলিলগর্ভে। যুদ্ধের অষ্টদশতম দিনে পরাভূত হয়েছেন তিনি। না, বিক্রমের বা বীরত্বের সম্মুখে নয়, ছলনার সম্মুখে।

দ্রোণপুত্রের হৃদয়ের যন্ত্রণা আরও বহুগুণ প্রসারিত হয়েছে আজ পরম মিত্রের এ হেন ভগ্নদশা দেখে। মিত্রের সম্মুখে আজ বিলাপে রত হয়েছিলেন তিনি। বিহ্বলের মতো বারবার বলছিলেন, ‘এমনকী করে হয় মিত্র? এই পৃথিবীর যিনি রাজা ছিলেন, যার আজ্ঞায় সব কিছু চলত, তিনি আজ একাকী ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন এভাবে! এই পৃথিবীতে মানুষের ভাগ্য কি এমনই হয় তবে!’

দুর্যোধন আজ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসস্তূপের মতো। পরম মিত্রের বিলাপও তাঁকে হতাশা ছাড়া আর কীই বা দিতে পারে! তাই আবার তাঁর ভিতর থেকে ছিটকে এল একরাশ হতাশার কথা। তিনি বললেন, ‘আমার জন্য দুঃখ কোরো না তোমরা, গর্ব করো। আমি ক্ষত্রিয়ের ধর্ম থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বিচ্যুত হইনি কখনও। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণও আমায় বিচ্যুত করতে পারেননি। কিন্তু কালের নিয়ম তো খণ্ডন করা যায় না। তাই আজ আমার এই অবস্থা। ছলনার শিকার আমি, তাই আজ আমি পরাভূত।’

মিত্রের হতাশা যেন আরও অনেকটা বেশি বারুদ ভরে দিল দ্রৌণির অন্তরে। তিনি গর্জে উঠলেন। সোচ্চার হল তাঁর অন্তরের সবটুকু রাগ, ক্ষোভ আর হতাশা। ‘আমি আমার সমস্ত পুণ্যসঞ্চয়ের শপথ নিয়ে বলছি, আদেশ করো তুমি আমায়। আমি শ্রীকৃষ্ণের সম্মুখেই শেষ করে ফেলব শত্রুদের’, অঙ্গারসম জ্বলে উঠে বললেন দ্রৌণি।

হ্যাঁ, তিনি শুধু অনুমতিটুকুই চেয়েছিলেন। কিন্তু বিনিময়ে যা পেলেন তা ছিল অপ্রত্যাশিত। দুর্যোধন সেই মুহূর্তে কৃপাচার্যকে আদেশ দিলেন তাঁর পরমসখা দ্রোণপুত্রকে সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করতে। হল এক অনুচ্চারিত অভিষেক, এক আড়ম্বরহীন অভিষেক। হোক না আতিশয্যবিহীন, তাতে তো কিছু যায় আসে না দ্রৌণির। আজীবন ব্রাহ্মণ হয়েও ক্ষত্রিয় ধর্ম পালন করে এসেছেন তিনি। আজও তাই করবেন। সেনাপতির উপযুক্ত কর্তব্য পালন করবেন তিনি।

সুউচ্চ এক বৃক্ষের পাদদেশে এখন বিশ্রামরত তিন মহারথী। অনতিকাল পরেই আবার যাত্রা শুরু করে পৌঁছতে হবে শত্রু শিবিরে। ভোরের আলো ফোটার আগে, রাতের আঁধার ঘন থাকতে থাকতেই পূরণ করে ফেলতে হবে অভীষ্ট। কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা এখন নিদ্রায় মগ্ন। বিনিদ্র দ্রৌণি মুহূর্ত গুনে চলেছেন অবিরাম। বারংবার কেবল মনে হচ্ছে কতক্ষণে শত্রুদের রক্তে স্নান সম্পন্ন হবে।

হঠাৎ এক বিভীষিকাময় আর্ত পাশবিক চিৎকারে যেন চতুর্দিক কেঁপে উঠল। চমকে উঠলেন দ্রৌণি। কী হল? কোথা থেকে আসছে এ হেন উৎকট শব্দ? বেশ খানিকটা সজাগ হলেন তিনি এবং অচিরেই আবিষ্কার করলেন এ শব্দের উৎসস্থল। তিনি দেখলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। এক বিশালাকার পেঁচা, রাতের অন্ধকারে বৃক্ষের ওপর নিদ্রিত অসংখ্য কাককে হত্যা করছে। সেই নির্মম ঘটনাই এ হেন উৎকট কোলাহলের উৎসস্থল।

চকিতে এ দৃশ্য দ্রৌণির মস্তিষ্কে এক কৌশলের জন্ম দিল। তিনি ভয়ঙ্কর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। এভাবেই ঘুমন্ত শত্রুদের বধ করতে হবে। কৌশল মাথায় প্রোথিত হতেই আরও ব্যাকুল হয়ে উঠলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে জাগিয়ে তুললেন দুই সঙ্গীকে। তাঁরা জেগে উঠতেই তাঁদের কাছে ব্যক্ত করলেন নিজের অভীষ্টের কথা।

কিন্তু এ হেন কাপুরুষের ন্যায় দুষ্কর্মরূপ রণনীতিকে সমর্থন করতে পারলেন না কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা। কৃপাচার্য ছিলেন তিনজনের মধ্যে প্রবীণতম এবং স্থিতধী চরিত্রের। তিনি দ্রৌণিকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু দ্রৌণি আজ কোনো কিছু বুঝতে নারাজ। তিনি বললেন, ‘শত্রুপক্ষীয় পাণ্ডব এবং পাঞ্চালদের আমি ছাড়ব না কিছুতেই। তাঁরা ছলনা ও শঠতার দ্বারা হত্যা করেছেন আমার পিতাকে। শেষ করেছেন কৌরবপক্ষীয়দের। আজ সমগ্র কৌরবকুল বিপন্ন। আর এই বিপন্নতা থেকেই আমার মস্তিষ্কে এ হেন শঠ রণনীতি উদ্ভুত হয়েছে।’ তিনি গর্জে উঠলেন সদর্পে। ‘আমি ব্রাহ্মণ হয়েও আজীবন ক্ষত্রিয় ধর্ম পালন করেছি। আর সেই আমি, মহারথী অশ্বত্থামা যদি আজ পিতার হত্যাকারীকে নিধন করতে না পারি, তাহলে জনসমাজের সম্মুখে নিজের কর্মপন্থা সমর্থন করব কেমন করে?’

কৃপাচার্য উপলব্ধি করলেন যে প্রতিশোধের আগুনে উজ্জীবিত হয়ে অশ্বত্থামা কতখানি উন্মাদ হয়ে উঠেছেন। তিনি এও অনুধাবন করলেন যে দ্রোণপুত্রকে নিরস্ত করা সম্ভব হবে না। তাই তিনি ধীর চিত্তে বললেন, ‘বেশ তাই হবে। তুমি প্রতিশোধ অবশ্যই নেবে। শুধু আজ রাতটা বিশ্রাম করে নাও। তোমার নিদ্রার প্রয়োজন।’

‘নিদ্রা! আমার নিদ্রা আসবে কেমন করে? যে বিপন্ন তার নিদ্রা আসে না। যে ক্রোধিত তারও নিদ্রা আসে না। যে নিজের প্রয়োজন সিদ্ধির কথা ভাবছে আর যার মনে মারণ ভাবনাটাই একান্ত, তারও নিদ্রা আসে না। আর আমার ক্ষেত্রে তো এই চারটি শর্তই বর্তমান। তাহলে আমি নিদ্রিত হব কেমন করে? অতএব আমি এখনই যুদ্ধে যাব আর নিদ্রিত অবস্থাতেই সংহারলীলা চালাব।’ আস্ফালন করে উঠলেন এবার অশ্বত্থামা। চকিতে নিজের রথে এবার অশ্ব যুক্ত করে নিলেন তিনি। কৃপাচার্য বা কৃতবর্মার কোনোরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্য আর অপেক্ষা করলেন না। হতচকিত কৃপ চিৎকার করে উঠলেন, ‘এ তুমি কী করছ? আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। আমরা তিনজনেই দুর্যোধনের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ শত্রু সংহারের জন্য। তাহলে তুমি একাকী গমন করছ কেন? তুমি কি আমাদের প্রত্যয়ের প্রতি সন্দেহ করছ?’

কোনো উত্তর এল না দ্রোণপুত্রের থেকে। তিনি রথ ছুটিয়ে দিলেন শত্রু শিবিরের পথে, শত্রু সংহারের উদ্দেশে।

অম্লান নিজেকে আবার খুঁজে পেল সেই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে। একটা সুবিশাল প্রান্তর। সেখানে আদি যুগের যুদ্ধবেশে সজ্জিত হয়ে রয়েছে শতসহস্র যোদ্ধা এবং বীরেরা। চারদিকে ঝংকার হচ্ছে অস্ত্রের। হাতি, ঘোড়া, রথ, রথী কি নেই সেখানে! চলছে এক যুযুধান যুদ্ধ। সাঁই সাঁই করে ছুটে চলেছে তীক্ষ্ণ, শক্তিশালী বাণের ঝাঁক। একাধিক গদার ঘর্ষণ যেন বিদীর্ণ করে দিচ্ছে আকাশের বুক। একের পর এক ভূতলে লুটিয়ে পড়ছে আর্ত, মৃত যোদ্ধারা। তাদের মরণ আর্তি যেন বিষাক্ত করে দিচ্ছে বাতাস। টাটকা রক্ত আর মৃতদেহের গন্ধে মুখরিত হয়ে উঠছে চারদিক। এসবের মাঝে অম্লানও রয়েছে। সব কিছু দেখতে পাচ্ছে ও। কিন্তু কিছুই করতে পারছে না। অম্লান জানে না ও কেন এখানে এসেছে? কী করতেই বা এসেছে! তবে ও চলেও যেতে পারছে না। কি এক অদৃশ্য শক্তি যেন ওকে আটকে রেখেছে ওই অচেনা পরিবেশে।

সহসা বদলে গেল দৃশ্যপট। এবার আর কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। এবার এক অন্য পটভূমি। থরথর করে কাঁপছে পৃথিবী। আর্তনাদ করছে সমস্ত পশু-পাখির দল। যেন দিনের বেলাতেও হঠাৎ করে ছেয়ে গেছে ঘন কালো অন্ধকার। কিন্তু পৃথিবী এত কাঁপছে কেন? কী হয়েছে? অম্লান কিছু বুঝতে পারছে না। মনে হচ্ছে যেন এখনই, এই মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যাবে সব কিছু। হচ্ছেটা কী? আকাশে ও কীসের ঝলকানি? কেন মনে হচ্ছে যেন অসীম শক্তিমান দুই প্রতিপক্ষ লড়াই করছে নিজেদের মধ্যে? তবে কি এই লড়াইয়ের পরিণামে ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবী?

‘কিছু করুন। কিছু করুন আপনি ‘...কারা কিছু করতে বলছে? কাকে করতে বলছে? অম্লানকে বলছে নাকি? অম্লান কী করবে? ও তো নিজেই বুঝতে পারছে না এখানে ও এসেছে কী করতে! তাছাড়া এরকম মহাজাগতিক কোনো সংঘর্ষ থামানোর ক্ষমতা অম্লানের থাকতে পারে নাকি! এ ক্ষমতা তো কোনো অতি শক্তিশালী মানব বা মহামানবেরই থাকা সম্ভব। অম্লান কে! ও তো খুব সাধারণ একটা ছেলে! কিন্তু ও এসেছেই বা কেন এখানে? চারপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা কারা? ওদের তো চেনে না অম্লান! তাহলে ওরা ওর মুখের দিকে ওভাবে তাকিয়ে আছে কেন? কী চায় এরা অম্লানের থেকে?

আস্তে আস্তে কম্পমান পৃথিবী যেন শান্ত হচ্ছে বোধহয়। আকাশের ওই ঝলকানিও আস্তে আস্তে ফিকে হচ্ছে যেন। একটু শান্ত লাগছে এবার অম্লানের। কিন্তু মুহূর্তের মাঝেই আবার এত অস্থির লাগছে কেন?

‘মাতা, এ কী অসহ্য বেদনা! রক্ষা করুন আমায় প্রভু।’ এই আর্ত চিৎকার কার? কোন নারীর কণ্ঠ থেকে ছিটকে আসছে এমন গগনভেদী আর্তনাদ? আর এমন শুদ্ধ ভাষায় কেন কথা বলছে ওই অজ্ঞাতপরিচয় নারী? এমন এক অচেনা মেয়ের কণ্ঠস্বরে কেন এমন বিচলিত লাগছে অম্লানের? উফফ! অসহ্য লাগছে। এক ছুটে পালাতে চাইল ও।

অম্লান ছুটছে। ছুটছে নাকি একই জায়গায় গোল গোল ঘুরছে? নিজেই বুঝতে পারছে না অম্লান মুখার্জি। কে? কে এসে পড়ল পায়ের কাছে এভাবে? কে ওই লোকটা? কেন সে কাতর হয়ে কাঁদছে এভাবে?

‘একি! আপনি এরকম করছেন কেন? কী চান আপনি আমার থেকে?’ আকুল হয়ে প্রশ্ন করল অম্লান।

আবার ঝটিতি বদলে গেল দৃশ্যপট। অম্লান এবার নিজেকে দেখতে পাচ্ছে এক অদ্ভুত দুর্গের মাঝে। সেই দুর্গের ভিতর দিয়েই নানা জানা-অজানা সরু পথ পেরিয়ে কোথায় যেন যেতে চাইছে ও!

‘অম্লান, অম্লান আমি এখানে। তুই কোথায়?’

রুকমির গলা না? চমকে উঠল অম্লান। রুকমি এখানে কী করছে?

‘রুকমি কোথায় তুই? আমি আসছি। হাতটা বাড়া তুই।’

‘অম্লান, ভীষণ অন্ধকার। অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চারদিক। প্লিজ তুই কিছু একটা কর।’

‘দাঁড়া রুকমি আমি আসছি। আমি আসছি আলো নিয়ে।’

কিন্তু কোথায় আলো? কোথাও তো কোনো আলো নেই! এই চাপধরা অন্ধকারের মধ্যে অম্লান কী করে আলো জ্বালাবে? ও তো নিজেই হারিয়ে যাবে মনে হচ্ছে। তবুও অন্ধকার ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। আলো খুঁজছে ও। কিন্তু সত্যি কি আলো খুঁজছে নাকি তলিয়ে যাচ্ছে আরও গভীর অন্ধকারে?

ক্রিং ক্রিং করে একটা তীক্ষ্ণ শব্দ হচ্ছে। কীসের শব্দ এটা? এই তো,...এই তো আলো! কোথা থেকে আসছে আলোটা? শব্দটা আরও জোরালো হতেই ঘুম ভেঙে গেল অম্লানের। ও খাটের ওপর ধড়মড় করে উঠে বসল। সত্যি একরাশ আলো জানলার পর্দার ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছে ওর ঘরের ভিতর। সকাল হয়ে গিয়েছে।

কিন্তু ভোরের আলো ঘরে ছড়িয়ে পড়লেও বুকের ভিতরে কেমন যেন একটা অন্ধকার এখনও অনুভব করছে অম্লান। কেন এমনটা হয় ওর? কেন এই অদ্ভুত দৃশ্যগুলো বারবার ঘুরে ঘুরে আসে ওর স্বপ্নে? এগুলোর অর্থ কী?

অম্লান ঘোরতরভাবে বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। ভাইরোলজি নিয়ে হায়ার স্টাডিজ শেষ করেছে। রিসার্চের পালাও প্রায় শেষ। তাই কোনো অবৈজ্ঞানিক জিনিস বা বিষয় কখনোই প্রভাবিত করতে পারে না ওকে। কিন্তু তবুও এই স্বপ্নগুলো না চাইতেও প্রভাবিত করে ফেলে ওকে। আসলে ছোট থেকে এত অসংখ্যবার এই একই দৃশ্যাবলী ও স্বপ্নে দেখেছে যে চাইলেও ও বিষয়টাকে ইগনোর করতে পারে না। অম্লান সিগমন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব পড়েছে। সেই তত্ত্বই বলছে, স্বপ্নটা মূলত মনের অবচেতন স্তরই পরিচালনা করে। অবচেতন মনের নানা সুপ্ত ভাবনাচিন্তা, ইচ্ছা ইত্যাদির বহিঃপ্রকাশই ঘটে স্বপ্নের মাধ্যমে। কিন্তু অম্লানের মনের অবচেতনেও বা এমন অদ্ভুত ভাবনা থাকতে যাবে কোন দুঃখে! অথচ এটাও তো ঠিক যে সেই ছোটবেলা থেকেই এমন স্বপ্ন বারবার দেখে চলেছে ও। স্কুল লাইফে এই স্বপ্নের কথা কয়েকবার মাকে বলেছিল। মা বলেছিলেন, ‘নানা রকম ফ্যানটাসি সিনেমা দেখে আর বই পড়ে এসব স্বপ্ন দেখছ তুমি। জাস্ট ইগনোর বেটা।’

আসলে ইগনোর শব্দটা বরাবরই ওর মায়ের কাছে খুব সহজ সমাধান। ছেলেকেই যেমন সারাজীবন নিজের কেরিয়ারের জন্য ইগনোর করে গেছেন তিনি। শুধু মা কেন, বাবাও তো তাই। নিজেদের বিজনেস, নিজেদের অ্যাম্বিশন সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁদের কাছে, ছেলে নয়। তাই মনের কথা ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাসটাও কোনোদিন অম্লানের গড়ে ওঠেনি। সব সময় বাবা মায়ের সঙ্গে একটা দূরত্ব বজায় থেকে গিয়েছে ওর। একটু বড় হওয়ার পর থেকে তাই অম্লানও আর কখনো জোর করে ওদের মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা করেনি। ব্যস্ত থেকেছে নিজের পড়াশোনা আর কেরিয়ার নিয়ে। তাই এই স্বপ্নের ব্যাপারে কখনো আর আলোচনা করাই হয়নি কারো সঙ্গে। আসলে সব সময় সব কথা তো আর সকলকে বলা যায় না। কে কোন কথার কী মানে করবে, কী ভাববে এসব কি বলা যায়!

হয়তো বিদেশ থেকে আর ফিরতই না অম্লান নিজের রিসার্চ শেষে। কিন্তু ও ফিরলে দুটো কারণে। প্রথমত নিজের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে ও সত্যিই দেশের মানুষের কাজে লাগতে চায়। আর দ্বিতীয় কারণ হল রুকমি। ওই মেয়েটাকে ছেড়ে থাকাটা সত্যি খুব কষ্টের হয়ে উঠছে অম্লানের পক্ষে। ওই মেয়েটা ছিল বলেই তো অম্লান আজও ভালোবাসা শব্দটাকে বিশ্বাস করে। না-হলে কবেই বিশ্বাস উঠে যেত ওই চারটে অক্ষরের ওপর থেকে।

মোবাইলের স্ক্রিন আনলক করে রুকমির একটা ছবি খুলল অম্লান। কমলা সালোয়ার পরে দাঁড়িয়ে, উজ্জ্বলভাবে হাসছে মেয়েটা। কিন্তু অম্লান জানে এখন এই হাসির আড়ালে অনেকটা অভিমান জমে আছে। সেই অভিমানের বরফ তো ওকেই গলাতে হবে। মেয়েটা যে অম্লানের জন্য বড্ড বেশি ইম্পরট্যান্ট। দুঃস্বপ্নের অন্ধকারেও ওকে আগলে নিয়ে বেড়াতে যে অপেক্ষা করে শুধু ওই মেয়েটাই।

দ্রিম দ্রিম করে বাজনাটা বেজেই চলেছে অবিরাম। ওরা আজ উৎসবে মেতেছে। ওদের সম্প্রদায়ের সমস্ত নারী, পুরুষ একত্রিত হয়েছে। আজ যে এক মহোৎসবের দিন। স্বয়ং ভগবান দেখা দিয়েছেন ওদেরই কাউকে। ভগবান নিজের দূত হিসেবে বেছে নিয়েছেন ওদের মধ্যে থেকেই একজনকে। ভগবানের দূতকে আজ সাদরে বরণ করে নেওয়ার দিন। ওরা ওদের ভগবানের দূতকে উঁচু টিলাটার ওপর বসিয়েছে। তার সামনে ভেট হিসেবে রেখেছে নানা উপঢৌকন—ফলমূল, পোশাক, গয়না, নেশারু তরল আরও নানা কিছু। ওঁকে খুশি রাখতেই হবে। এখন যে ওঁর অনেক ক্ষমতা। ওঁকে ঘিরে উদ্দাম নৃত্য করছে অনেকগুলো মানুষ। আবার অনেকে নেশা করে খুশিতে বিলাপ করছে। কেউ পাগলের মতো হাসছে আনন্দে। আবার কেউ কেউ নিজেদের ভাষায় গল্পগুজব করছে। সব মিলিয়ে আজ উৎসবের হুল্লোড়ে মাতোয়ারা ছোট পার্বত্য এই গ্রামটা।

ওরা একটা ছোট পার্বত্য উপজাতি। এই অঞ্চল জুড়েই ওদের বাস। হিমালয়ের কোলে খুব ছোট এই গ্রাম। এখানে মূলস্রোতের মানুষের সেভাবে যাতায়াত নেই বললেই চলে। ওরাও বাইরের পৃথিবীর তথাকথিত সভ্য মানুষগুলোর সঙ্গে ততটুকুই মেশে যতটুকু না মিশলেই নয়। বাইরের পৃথিবীর মানুষদের থেকে ওরা অনেকটা আলাদা। আলাদা ওদের ভাষা, আলাদা পোশাক-পরিচ্ছদ, আলাদা জীবনযাত্রাও। নিজেরা নিজেদের মধ্যেই স্বয়ংসম্পূর্ণ ওরা। তাই বাইরের পৃথিবীর খুব একটা প্রয়োজন পড়ে না ওদের। সভ্য মানুষদের ভাষায় ওরা আদিবাসী। তবে কেউ কেউ মাঝে মাঝে লোকালয়ে যায়। যাদের এই জীবন ভালোলাগে না, যাদের মনে লোভ বেশি, তাদের মধ্যে কেউ কেউ শহুরে মানুষদের সঙ্গে মিশে কাজ করে। যদিও তেমন মানুষ সংখ্যায় কম।

বাইরের পৃথিবীর মানুষগুলো বলে ওরা নাকি অসভ্য। কিন্তু এই অসভ্য ছোট জাতটাই এবার হাতের মুঠোয় পাবে সবকিছু। ক্ষমতা পাবে। দলে দলে ভদ্দর মানুষ ছুটে আসতে চাইবে এদিকে, শুধু নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর দায়ে খুঁজতে চাইবে ওদের। ভগবান যে তেমনই চেয়েছেন। সেজন্যই তো তিনি ওদের মধ্যে থেকেই খুঁজে নিয়েছেন নিজের দূতকে।

টিলার ওপরে বসে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে দুই হাত তুলল নেরুয়া। ভাবটা এমন যেন ‘আমি আছি তো, আমি থাকতে তোমাদের ভয় কি!’ আজকের রাতের এই সমস্ত উৎসব শুধু ওকে ঘিরে। কারণ সবাই জেনে গেছে ভগবান ওকেই বেছে নিয়ে দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত ধুকপুকানি হচ্ছে নেরুয়ার। ও পারবে তো সব কাজ ঠিকমতো করতে? সবটা ঠিক ঠিক না হলে যে ভগবান রুষ্ট হবেন। তখন যে ছারখার হয়ে যাবে সব কিছু।

নাহ, ওকে পারতেই হবে। নিজের মনে জোর আনার চেষ্টা করল নেরুয়া। এতগুলো মানুষ আজ ওকে ভরসা করছে, ওকে ঘিরে উৎসব করছে, তার সব কিছু ও বিফলে যেতে দেবে না! ওকে সফল হতেই হবে। কপালের মাঝখানটাতে আবার হাত বোলাল ও। টনটন করছে জায়গাটা। ভগবান সেখানে ছুঁয়ে দিয়েছেন। দেবতার মূর্তিতে যেখানে তিন নম্বর চোখ থাকে ঠিক সেই জায়গাটাতেই ছুঁয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তারপর থেকেই ওখানে কনকনে ব্যথা। জায়গাটা ফুলে ঢোল হয়ে আছে।

টিলার ওপরে বসে বসেই ঝিমনাইকে লক্ষ করছে নেরুয়া। এই আনন্দ উৎসবে ওর কোনো মন নেই। কেমন নেতিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক কোনায়, যেন কত জন্মের জ্বালা জ্বলছে ওর বুকে। আসলে ও তো জানে হাজার চেষ্টা করলেও এবার ও আর নেরুয়ার থেকে পালাতে পারবে না, পিরিত জমাতে পারবে না আর ওই ভেকুলার সঙ্গে, তাই বোধ হয় পরানটা জ্বলে যাচ্ছে ওর। দপ করে হঠাৎ মাথাটা জ্বলে উঠল নেরুয়ার। ভগবান নিজে এসে বেছে নিয়েছেন ওকে, এটা জানার পরেও কিনা ওই ঝিমনাইয়ের মনে ভেকুলা!

মাথা শান্ত করার চেষ্টা করল নেরুয়া। সামনে এখন অনেক কাজ। এসব ফালতু ব্যাপারে আর মাথা ঘামালে চলবে না। ঝিমনাই ওর কব্জাতেই আসবে, এটা জানা কথা, তাই ওকে নিয়ে আর ভেবে লাভ নেই।

হঠাৎ সকলের সমবেত বিপুল উল্লাস চিৎকারে গভীর রাতেও ডানা ঝাপটাল রাত জাগা অজানা পাখিরা। সবার চোখে-মুখে বিস্ময় আর আনন্দ। সকলে উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে নেরুয়ার দিকে, অনেকেই ওকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করছে। নেরুয়া সামান্য চমকাল প্রথমে আর সঙ্গে সঙ্গেই ও অনুভব করল ওর কপাল চুঁইয়ে গড়িয়ে পড়ছে উষ্ণ তরল যাতে মিশে আছে লোহা লোহা গন্ধ। বড় শ্বাস ছাড়ল নেরুয়া। ভগবানের কৃপা তাহলে সম্পূর্ণ হয়েছে।

বুনো জাতির নারী-পুরুষেরা জয়ধ্বনি দিচ্ছে নেরুয়ার। ভালো লাগার সঙ্গে সঙ্গে ওর বুকের ধুকপুকুনি আরও বাড়ছে।

আজ বহুদিন পর সুন্দর করে সাজল রুকমি। বিদেশে পড়াশোনার পর্ব সাঙ্গ করে প্রায় পাঁচ বছর পর পাকাপাকিভাবে দেশে ফিরে এসেছে ওর মনের মানুষটা। মাঝে যে দুই একবার অল্প দিনের জন্য সে দেশে আসেনি এমন নয়, কিন্তু সেই সময়টুকু ছিল যেন একেবারে পদ্ম পাতায় জলের মতো। দেখা হওয়ার দিনগুলোতেও বারবার মনে হতো সে তো আসলে এসেইছে ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ফাইনালি সে সত্যি সত্যি দেশে ফিরে এসেছে, বরাবরের জন্য চলে এসেছে রুকমির কাছে। যদিও ওর মনে জমে আছে এক আকাশ অভিমান, কিন্তু গর্বও হচ্ছে বইকি। পাড়ার সেই ছেলেটা, যাকে দুর্গাপুজোর সময়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখত ও, আজ সে কত বড় মাপের মানুষ হয়ে ফিরেছে। আজ সে ভাইরোলজিস্ট। দুর্দান্ত, খারাপ মারণ ভাইরাসদের কাবু করে মানুষকে বাঁচানোর প্রচেষ্টাই তার জীবনের মূলমন্ত্র।

নিজেকে গোলাপি রঙের ঢাকাইতে সাজিয়ে নিল রুকমি। সঙ্গে অল্প সোনালি গয়না। আজ অনেকদিন পর আবার দুজনের দেখা হবে সামনাসামনি। যদিও রুকমির তাকে নিয়ে গর্বের শেষ নেই, কিন্তু মোটেই তেমনটা দেখানো যাবে না। দেখাতে হবে আসলে খুব রেগে আছে রুকমি। দেখা যাক না, সে অভিমান ভাঙাতে পারে কিনা!

‘কীরে এখনও রেগে থাকবি এভাবে?’ কফিশপের কাচের জানলার পাশে বসে রুকমির হাতে আলতো চাপ দিল অম্লান।

‘না রেগে নেই।’ গম্ভীর গলায় বলল রুকমি।

‘বললেই হল! ভালো করে কথাই বলছিস না। ভিডিও চ্যাটে তো বারবার বলতিস আমায় ছুঁতে ইচ্ছে করে, সামনাসামনি দেখতে ইচ্ছে করে। আর তুই যখন তোর সামনে এসে সশরীরে উপস্থিত হলাম এখন তো কথাই বলছিস না! মুখ থমথমে করে রেখেছিস।’

‘আমি রাগ করি বা যাই করি তাতে তোর কী?’ অভিমান ভরা গলায় বলল রুকমি।

‘এমন বলিস না। তুই জানিস, আমি শুধু তোর জন্যই দেশে ফিরেছি। নইলে তো আমি ওদেশেই কাটিয়ে দিতে পারতাম। তুই ছাড়া আমার আর অন্য কী টান আছে এখানে বল!’

‘তুই মোটেও আমার জন্য আসিসনি। তুই দেশে ফিরেছিস দেশের মানুষের উপকারে লাগবি বলে।’

‘আচ্ছা, যদি তাও বা হয়, সেটাও কি আমি তোকে ছাড়া পারব? আমি যে তোকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।’ আবেগঘন গলায় বলল অম্লান।

‘বাদ দে। আমায় ছেড়ে বিদেশ চলে গেলি! বিদেশে পড়ার এত জেদ তোর। কেন, এদেশে কি পড়াশোনা হয় না, নাকি রিসার্চ হয় না?’

‘হয়, সবই হয়। কিন্তু ওদেশের মতো করে হয় না।’

‘মোটেই তা নয়। ইচ্ছে থাকলে সব হয়। আমিও তো করছি রিসার্চ, করছি না বল!’

‘হুমম। কিন্তু তোর বিষয়টা আলাদা। তুই ইতিহাস নিয়ে রিসার্চ করছিস, ইতিহাস আর ভাইরোলজি এক নয় রে পাগলি।’

‘আবার ইতিহাস! বলেছি না ইতিহাস নয়, মাইথোলজি। মাইথোলজি আর ইতিহাস এক হল নাকি! অনেকটাই আলাদা। আর আমার বিষয় হল এপিক।’

‘সত্যি আমার পাগলি অনেক বড় হয়ে গেছে। মহাকাব্য নিয়ে রিসার্চ করছে। কী যেন তোর সাবজেক্ট? মহাভারত৷ তাই না?’

‘হুম। মহাভারত।’

‘বেশ মহাভারতের গল্প তোর থেকে নতুন করে জানব তাহলে। আমি তো ভালো করে মহাভারত জানি না। কেউ কোনোদিন গল্পও বলেনি। আর আমার পড়াও হয়নি। শুধু বিজ্ঞান আর ভাইরাসের সাধনাতেই জীবন কেটে গেল। তবে ছোটবেলায় ঠাম গল্প বলতেন। মহাভারতের যুদ্ধের গল্প। কৃষ্ণ, অর্জুন, ভীম, দুর্যোধন আরও কারা কারা যেন সব। জানিস আমার ভীষণ ভালো লাগত শুনতে। মনে হত সব যেন দু-চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। যেন আমি নিজেই একেবারে পৌঁছে গেছি সেই সময়টায়। যদিও সবটা ভালো মনে নেই আমার, সবই খুব আবছা মনে পড়ে, কিন্তু তবুও যতদূর স্মরণ হয় তাতে মনে পড়ে অর্জুনকে আমার ভারি ভালো লাগত।’ আচমকাই কেমন যেন উদাস শোনাল অম্লানের গলা। রুকমির মনে হল অম্লানের মনটা হঠাৎ কোথায় যেন উড়ে গেল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিল ছেলেটা। হো-হো করে জোরে হেসে উঠে বলল, ‘আচ্ছা তুই তো মহাভারত গুলে খেয়েছিস। তোর সব চেয়ে বেশি কাকে ভালো লাগে? অর্জুন নাকি ভীম? নাকি অন্য কেউ? কারা সব ছিল যেন আরও...কর্ণ, ভীষ্ম’...

‘অশ্বত্থামা। আমার রিসার্চের মূল টপিক হল অশ্বত্থামা। সেই আমার সবচেয়ে প্রিয়।’ বলে উঠল রুকমি।

‘সে আবার কে? এর গল্প ঠামের কাছে কি শুনেছিলাম? মনে পড়ছে না তো!’ মাথা চুলকাল অম্লান।

‘না-ই শুনে থাকতে পারিস। কারণ অশ্বত্থামা কৌরব, পাণ্ডব, পাঞ্চালী, ভীষ্ম, কৃষ্ণ এদের মতো কোনো হাইলাইটেড চরিত্র নয়। কিন্তু আমার মতে অন্যতম সেরা রঙিন ক্যারেক্টার, যার চরিত্রে অনেক শেড আছে।’

‘তাই? তো কেন এত স্পেশাল এই অশ্বত্থামা আমিও একটু জেনে নিই।’

‘তোকে তোর ঠাম গুরু দ্রোণাচার্যের গল্প বলেছিলেন?’

‘উমম...হ্যাঁ মনে পড়ছে। অর্জুন, দুর্যোধনদের টিচার ছিলেন তো?’ অম্লান মনে মনে নিজের তারিফ করল। এই তো অভিমান গলছে মেয়ের। গাম্ভীর্যের খোলস ছেড়ে কথা বলতে শুরু করেছে সে। ওর রিসার্চের বিষয় নিয়েই না হয় চলুক এখন খানিক কথাবার্তা।

‘কীরে ঠিক বললাম? দ্রোণাচার্য ওদের টিচার ছিলেন না?’

‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। দ্রোণাচার্য ছিলেন কৌরব আর পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরু। এই দ্রোণাচার্য ছিলেন ঋষি ভরদ্বাজের পুত্র। দ্রোণাচার্য আর তাঁর স্ত্রী কৃপীর ছেলে হল অশ্বত্থামা। দ্রোণাচার্য বহু বছর ধরে ভগবান শিবের তপস্যা করেছিলেন। আর মহাদেবের আশীর্বাদে তাঁরই মতো দৃঢ় প্রত্যয়ের এক সন্তান পেয়েছিলেন তিনি, সেই সন্তানই হল অশ্বত্থামা। জন্মের পর এই ছেলের গলা থেকে যে কান্না বেরিয়ে এসেছিল তা ছিল অনেকটাই ঘোড়ার ডাকের মতো। তাই এর নাম দেওয়া হয় অশ্বত্থামা। অশ্ব মানে ঘোড়া সেটা জানিস তো?’ বলেই চোখ টিপে হাসল রুকমি।

‘উফফ! জানি জানি। বাংলায় তোর মতো ভালো নই বলে এতটা খারাপও নই।’

‘অশ্বত্থামা জন্মেছিলেন উত্তরাখণ্ডে। দেরাদুনের এক গুহামন্দির, যার নাম বর্তমানে তপকেশ্বর মহাদেব মন্দির সেখানেই জন্মেছিলেন দ্রোণাচার্যের এই ছেলে। জন্মের সময় কপালের মাঝখানে মানে তৃতীয় নেত্রের জায়গায় এক অসাধারণ মণি নিয়ে জন্মেছিলেন সে, যা ছিল বিষ্ণুর স্যমন্তক মণির সমগোত্রীয়। এই মণি অশ্বত্থামাকে সকলের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল সহজাতভাবেই। এই মণি তাকে রক্ষা করত সাপ, কীট, পতঙ্গ, দৈত্য দানব-সহ বিভিন্ন অপশক্তির হাত থেকে।’

‘হুম। বুঝলাম। আর মারা গেছিল কোথায় এই বাবাজি? যুদ্ধে? নিশ্চয় সেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে?’ জিজ্ঞাসু চোখে প্রশ্ন করল অম্লান।

‘না। মারা যায়নি।’ গম্ভীর স্বরে বলল রুকমি।

‘মানে?’

‘মানে, অশ্বত্থামা এখনো বেঁচে আছে। কারণ মানুষ হলেও তিনি চিরঞ্জীবী অর্থাৎ অমর।’

‘ব্যস! এইবার মাইথোলজি থেকে চলে গেলি তো গাঁজাখুরিতে! মহাভারতের ক্যারেক্টার আজও বেঁচে আছে? এটা কোন দেশের রূপকথা হচ্ছে ভাই? এটা হয় নাকি? বিজ্ঞান কি মরে পড়ে আছে নাকি রাস্তায়?’ হা-হা করে হেসে উঠল অম্লান।

রুকমির মুখটা এবার নিদারুণ গম্ভীর হয়ে গেল। থমথমে গলায় ও বলল, ‘তোদের বিজ্ঞানটাই শেষ কথা নয়। এই পৃথিবীতেই এমন অনেক কিছুর অস্তিত্ব বিরাজমান যেগুলো বিজ্ঞানের আওতার বাইরে।’

‘না, বিজ্ঞানের আওতার বাইরে কিছু হয় না, হতে পারে না।’ জোর দিয়ে বলল অম্লান।

‘অবশ্যই হতে পারে। তুই নিজেই একদিন মেনে নিবি এটা। মিলিয়ে নিস আমার কথা।’ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কেটে কেটে কথাগুলো উচ্চারণ করল রুকমি।

আশু যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে নিলেন কৃপাচার্য এবং কৃতবর্মা। অশ্বত্থামাকে অনুসরণ করলেন তাঁরা। অনতিকালের মধ্যেই তিনজনে পৌঁছে গেলেন পাণ্ডব শিবিরের নিকটে। সম্মুখেই তাঁরা দেখতে পেলেন শিবিরে প্রবেশ করার দ্বারদেশ। সকলের আগে গিয়ে দ্বার সম্মুখে দাঁড়ালেন অশ্বত্থামা। আর তৎক্ষণাৎ দেখতে পেলেন এক ভয়াল দর্শন পুরুষ দ্বারদেশে দ্বাররক্ষীর রূপে রয়েছেন।

ভয়াল দর্শন সেই পুরুষটিকে দেখেও কিছুমাত্র ভীত হলেন না দ্রৌণি। প্রতিশোধস্পৃহা গ্রাস করে নিয়েছে তাঁর অন্তরের ভয়-ভীতিকে। ভয়ানক সেই দ্বাররক্ষীকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশে অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন দ্রোণপুত্র। শুরু হল এক যুযুধান যুদ্ধ। অমিত অলৌকিক শক্তির অধিকারী যেন সেই ভয়াল দর্শন পুরুষটি। দ্রোণপুত্রের কোনো অস্ত্র, কোনো আঘাত পরাস্ত করতে পারছে না তাকে। পরাভূত হচ্ছেন দ্রৌণি। ভীষণাকার সে দ্বাররক্ষী অশ্বত্থামার নিক্ষেপিত অস্ত্রগুলোকে গিলে ফেলছে একের পর এক।

এ কেমন অলৌকিক ক্ষমতা! কে এই পুরুষ? পরাজয়ের ক্লেদ আস্তে আস্তে বিবশ করে দিচ্ছে দ্রোণপুত্রকে। হতাশার আস্তরণ পরত ফেলছে তাঁর ক্রোধতপ্ত হৃদয়ে। হতাশপ্রায় দ্রৌণি স্মরণ করলেন কৃপাচার্যের হিতবচন। কিন্তু হতাশা অথবা লৌকিক বা অলৌকিক কোনো প্রকার শক্তির দ্বারাই পরাভূত হতে তো এখানে আসেননি অশ্বত্থামা। জয়ের আশা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে যদিও, তথাপি নিরস্ত হলেন না তিনি। স্মরণ করলেন নিজের ইষ্টদেব, দেবাদিদেব মহাদেবকে। তাঁকে তুষ্ট করার জন্য শুরু করলেন স্তব উচ্চারণ।

দ্রৌণির কোনোকালেই ইষ্ট ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিতে কোনো কার্পণ্য ছিল না। আজও তার ব্যত্যয় হল না। মনের সমস্ত ভক্তি একত্র করে, সবটুকু জোর মিলিয়ে ইষ্ট আরাধনা শুরু করলেন তিনি। আর ভক্তিভরা আহ্বান উপেক্ষা করার সাধ্য যে ঈশ্বরের কোনোযুগেই হয়নি তা তো চিরন্তন সত্য। এক্ষেত্রেও সে সত্যের অন্যথা হল না। তুষ্ট হলেন মহাদেব। তিনি উপেক্ষা করতে পারলেন না তাঁর পরম ভক্তের আহ্বান। মহাদেব দেখা দিলেন দ্রোণপুত্রকে। তাঁর স্তবে প্রসন্ন হয়ে তাঁকে আশীর্বাদ স্বরূপ প্রদান করলেন মহাশক্তিসম্পন্ন এক ধারালো তরবারি এবং তারই সঙ্গে আপন তেজের এক অংশ প্রবেশ করালেন অশ্বত্থামার মধ্যে।

এবার শত্রু শিবিরের দ্বার উন্মুক্ত হল দ্রৌণি-সহ বাকিদের সম্মুখে। শিবির দ্বারে শুরু হল শত্রু নিধন পরিকল্পনা। দ্রৌণি আগে থেকেই স্থির করে রেখেছেন যে তিনি ভিতরে প্রবেশ করে সুপ্ত বীরদের কুপিয়ে মারবেন। আর অশ্বত্থামার ব্যগ্রতা দেখে এতক্ষণে যুদ্ধ অভিলাষে উজ্জীবিত হয়েছেন কৃপাচার্য এবং কৃতবর্মাও। তাঁরাও শত্রু শিবিরের ভিতরে প্রবেশ করতে চাইলেন দ্রৌণির সঙ্গে। কিন্তু বাধা দিলেন অশ্বত্থামা। তিনি জানালেন শিবিরের অভ্যন্তরে তিনি একাই প্রবেশ করতে চান। কৃপাচার্য আর কৃতবর্মাকে তিনি নিযুক্ত রাখলেন দ্বাররক্ষীর ভূমিকায়। প্রতিশোধ অগ্নির যে শিখা তাঁর হৃদয়ে প্রজ্বলিত ছিল, চকিতেই যেন তা দাবানল হয়ে উঠেছে। সমগ্র শত্রু শিবিরকে যেন এক লহমায় পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চাইছে সে দাবানলের আগুন।

শিবির দ্বারে দণ্ডায়মান কৃপ আর কৃতবর্মাকে দ্রৌণি বললেন, ‘এই শিবিরে ঢুকে আজ আমি খেলব যমের খেলা। কাউকে ছাড়ব না আমি। কিন্তু তবুও কোনো প্রকারে কেউ কেউ যদি আমার তরবারির নাগালচ্যুত হয়ে যায় এবং এই দ্বারপথে পলায়নের চেষ্টা করে তবে তাদের নিধন করার দায়িত্ব আপনাদের ওপর ন্যস্ত করলাম। আপনারা সজাগ দৃষ্টি রাখবেন যাতে কেউ প্রাণ নিয়ে ফিরতে না পারে।’

শিবিরের দ্বার অপ্রশস্ত। তাই লাফ দিয়ে অশ্বত্থামা শিবিরের ভিতরে প্রবেশ করলেন। পঞ্চপাণ্ডব ও পাঞ্চালী জানতেও পারলেন না এই সকল ঘটনা। কারণ তাঁরা তখন শিবির থেকে বেশ খানিকটা দূরে গঙ্গা নদীর তীরে তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে অবস্থানরত।

‘কীরে দাদুভাই, কবে দেখাবি তুই আমার নাতবউকে?’ ইন্দুবালা মুখার্জি নাতির নাকটা বেশ করে নেড়ে দিয়ে বললেন৷

‘যাহ! তুমি আবার ওকে নতুন করে কী দেখবে? ছোটো থেকেই তো দেখছ?’ ঠামের কোলে আদুরে হয়ে শুয়ে পড়ল অম্লান।

‘উফফ! আমি সেই দেখার কথা বলছি নাকি? আমি তো বলছি নাতবউ রূপে দেখার কথা।’ হাসলেন এবার ইন্দুবালা।

‘হুম। আমিও তো চাই শুভ কাজ সেরে ফেলতে। কিন্তু রুকমি এখন ওর রিসার্চ নিয়ে পুরোপুরি ডুবে আছে জানো তো। কী সব মহাভারত নিয়ে কাজ করছে।’

‘হুম জানি তো। আমায় তো বলেছে রুকমি মামণি। ও অশ্বত্থামাকে নিয়ে কি সব কাজ করছে।’

‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। এটাই নাম। অর্জুনদের টিচারের ছেলে। এখন ওর ধ্যান-জ্ঞান সব ওই লোকটা।’

‘যেমন তুমি এতদিন নিজের পড়াশোনা আর কাজ নিয়ে বিদেশে বসেছিলে, মেয়েটাকে কষ্ট দিয়েছ, এবার বোঝ ঠ্যালা!’ ইন্দুবালা কৌতুক করছেন নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে।

‘আর আমার রুকমি মায়ের পড়াশোনার বিষয় অনেক ভালো। মহাভারত। মহাভারত নিয়ে চর্চা করলে পুণ্যি হবে। আর তুই? কি সব পোকামাকড়! ইশ!’

‘উফফ! পোকামাকড় কেন হবে ঠাম! কী যে তুমি বলো! ভাইরাস। ভাইরাস নিয়ে কাজ না হলে মানুষ বাঁচবে কী করে? এই পৃথিবীতে লক্ষ কোটি ভাইরাস আছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ভাইরাসের জন্ম হচ্ছে। আর সেই ভাইরাসদের মধ্যে কখন যে কে মারণ আর প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে কেউ জানে না। এই ভাইরাসদের কাবু করতেই দরকার আমাদের, যারা ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি বুঝে তাদের কব্জা করবে। চিকিৎসা আবিষ্কার করবে।’ অম্লান ঠামের কোল থেকে তড়াক করে উঠে পড়েছে এবার। হাত-পা নেড়ে বেশ বিজ্ঞের চালে ভাইরাস তত্ত্ব বোঝাচ্ছে ঠাকুমাকে।

‘উফফ! বুঝেছি রে বাপ! বুঝেছি আমি। আমি জানি তো আমার নাতি অনেক বড় মানুষ হবে একদিন। দেশের, দশের মুখ উজ্জ্বল করবে।’

‘হুম। কে জানে কতটা কী পারব! কিন্তু আপাতত আমার লক্ষ্য তোমার হবু নাতবউয়ের মান ভাঙানো। কেন যেন মনে হচ্ছে বিদেশে থাকার ব্যাপারটা নিয়ে ও আমার ওপর এখনও রেগে আছে। কেন যে ও বুঝছে না...জানো, আমার এখন কী মনে হচ্ছে? মনে হচ্ছে আমিই ওই লোকটা হয়ে যাই। কী যেন নাম? অশ্বত্থামা, যাকে এখন ধ্যানজ্ঞান বানিয়েছে তোমার হবু নাতবউ।’

‘বালাই ষাট, ও কী কথা! এমন কথা মুখেও আনবি না। অশ্বত্থামার মতো যন্ত্রণার কপাল করে এই সংসারে কোনোদিন কেউ আসেনি। আর আসবেও না। বাপের মরণের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে, বন্ধুর মৃত্যুর বদলা নিতে গিয়ে অন্যায় করে ফেলল আর তার ফল ভুগে চলেছে আদি অনন্তকাল ধরে। আজও মুক্তি পায়নি সে।’

‘উফফ! কাম অন। কী যে বলো তোমরা। একটা লোক নাকি পাঁচ হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে! একেই বলে আজগুবি আনলিমিটেড!’ হা-হা করে হেসে উঠল অম্লান।

‘না দাদুভাই, এটাই সত্যি কথা। সে আজও আছে। এই পৃথিবীর, এই দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে সে আছে। এক বীভৎস যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছে সে।’ ঠামের গলাটা গম্ভীর শোনাল এবার। অম্লান বুঝল মানুষটা সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছেন। তাই আবার জোরে হাসল ও। ইন্দুবালার গলা জড়িয়ে বলল, ‘বেশ আমি অশ্বত্থামা নই। তাহলে আমি কে বলো?’ অম্লানের মনে আছে ছোটবেলায় ঠাম মহাভারতের গল্প বললেই ঠিক এমন করত ও। মহাভারতের কোনো একটা চরিত্র হতে চাইত। আজও একই ভাবে বলল আদুরে স্বরে।

‘কে আবার! তুই আমার কেষ্ট ঠাকুর। আমি তো আগেও বলেছি, বারবার বলেছি, আর যতদিন বাঁচব বলে যাব তুই আমার কেষ্ট ঠাকুর।’ হাসি ফুটেছে এবার বুড়ির মুখে।

‘তাই? ভেবে বলছ তো? আমি যতদূর জানি শ্রীকৃষ্ণ কিন্তু মারা গেছিলেন। আর ওই অশ্বত্থামা নাকি বেঁচে আছে—তোমরা বলছ। এদিকে আমি প্রণাম করলে মাথায় হাত রেখে বলো চিরকাল বেঁচে থাক বাবা, আর অন্যদিকে আমায় ওই জীবিত ক্যারেক্টার না বলে বলছ এমন একজন হওয়ার কথা যে কবেই মরে গেছে!’ ছদ্ম রাগে গাল ফোলাল অম্লান।

‘ওরে পাগল কৃষ্ণের কি কখনও বিনাশ হয় রে! তিনি যে এই বিশ্ব সংসারের পালনকর্তা। তাই তাঁকে যে বারবার ফিরে ফিরে আসতে হয় নানা রূপে যখনই পৃথিবী পাপে ভরে যায়।’

‘তাই? বারবার ফিরে ফিরে আসেন তিনি? সত্যি?’ পলকেই হাসি উধাও অম্লানের মুখ থেকে। কেমন যেন উদাস লাগছে ওর চোখ দুটো। হঠাৎ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে অম্লানের মনটা।

‘অমি, কী ব্যাপার? ঠামকে এত বিরক্ত করছ কেন? এটা তো ওঁর বিশ্রামের সময়।’ মায়ের গলার শব্দে যেন বাস্তবে ফিরে এল অম্লান। মুখটা অল্প কঠিন করে বলল, ‘ঠামের খেয়াল আমি তোমার থেকে ভালো রাখতে পারি মা। আমায় না বললেও চলবে। আমি ভালোই জানি ঠামের রেস্ট নেওয়া হয়ে গেছে। এখন ঠাম জেগেই থাকবেন।’

‘তবুও, এখানে এভাবে বকবক করবে না। প্লিজ বাইরে চলো।’

জাগরী মুখার্জিও স্বর কঠিন করল এবার। ছেলেটার সঙ্গে শাশুড়ির এই আদিখ্যেতার সম্পর্কটা কোনোদিনই ভালো লাগে না ওর। বুকের মধ্যে কেমন যেন ঢিপঢিপ করে। একটা ভয় যেন জাগরীকে পাকিয়ে ধরে এদের দুজনকে একসঙ্গে দেখলেই। কেবলই মনে হয় যে অজানা সত্যটা এত বছর ধরে ও সযত্নে আড়াল করে রেখেছে গোটা পৃথিবীর থেকে, সেই সত্যিটা কোনোভাবে ইন্দুবালা যদি বুঝে যান! যদি জেনে ফেলে অম্লানও! যদিও সেটা সম্ভবই নয় কোনো প্রকারেই, তবু জাগরীর ভয় হয়। আসলে ওই যে বলে কোনো রহস্যই চিরকাল অন্ধকারে থাকে না, এই কথাটা জানা আছে বলেই এত ভয় হয় জাগরীর।

আগাছার ঝোপড়ার আড়ালে নিজেকে যথাসাধ্য আড়াল করে রাখার চেষ্টা করছে ঝিমনাই। মনের ভেতরটা হাঁকপাঁক করছে ওর। সে আসবে তো? কে জানে! ভেকুলার মুখটা বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে ওর। সেদিন সেই উৎসবের রাতে ভেকুলাও তো ছিল, কিন্তু কী ভীষণ করুণ লাগছিল ওর মুখটা! মনে হচ্ছিল যেন কষ্টে আর যন্ত্রণায় পরানটা ছিটকে বেরিয়ে আসবে ওর। সেদিন ঝিমনাইয়ের বুকে ও যে জ্বালাটা ধরেছিল তা যদি ও বোঝাতে পারত! কিন্তু ওর মতো একটা মেয়েমানুষের কষ্টের আর কী-ই বা দাম থাকতে পারে! এটা তো আর শহরের ভদ্দর মানুষদের মতো জীবন নয় যে, এখানে মেয়েলোকের কথার দাম থাকবে বা তার কষ্ট নিয়েও সবাই ভাববে। এই সমাজে মেয়েছেলে হয়ে জন্মানো যে আজও মস্ত পাপ।

সবই তো জানত ঝিমনাই, তবুও কেন যে মরতে ও পিরিত করতে গেল ওই ভেকুলার সঙ্গে! আর ভেকুলাই বা কেন এমন মিথ্যা আশা দেখাতে গেল ওকে! ভেকুলাই তো ওকে বলত, ‘ঝিমনাই, আমরা পালিয়ে যাব। এই গেরাম ছেড়ে, এই বুনো জীবন ছেড়ে আমরা চলে যাব চুপিচুপি। কেউ জানতেও পারবে না। এসব কিছু ছেড়ে শহরে চলে যাব আমরা। তখন আমাদের জীবনটাও হবে শহরের বাবুদের মতো রংচঙে, ঝলমলে।’

ভেকুলার কথাগুলো শুনতে শুনতে ঝিমনাইয়ের চোখ চকচক করে উঠত। ও মনের চোখ দিয়ে দেখতে পেত একটা ভীষণ সুন্দর জীবন। শহরের বিবিদের মতো ও সেখানে শুধু মানুষ, মেয়েমানুষ নয়। যে মানুষের ইচ্ছের দাম আছে, জীবনের দাম আছে।

আসলে ভেকুলার কথাগুলো ঝিমনাই বিশ্বাস করত, তার কারণও ছিল। ভেকুলা এই বুনো গ্রামের বাইরেও যাতায়াত করে। শহরের বাবুদের সঙ্গে ওর খানিক ওঠাবসাও আছে। শহরে গিয়ে টুকটাক কাজকম্মও করে। এই সমাজের অনেকেই সেজন্য ভেকুলাকে তেমন ভালো চোখে দেখে না। কিন্তু তাতে ঝিমনাইয়ের কী! ও তো ভেকুলাকে ভালোবাসে। প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। তাকে ছাড়া জীবন কাটানোর কথা ভাবতেই পারে না।

হঠাৎ দুলে উঠল আগাছার ঝোপড়া। সজাগ হয়ে উঠল ঝিমনাই। কেউ আসছে এদিকে। কে? ভেকুলা?

হ্যাঁ, ভেকুলাই বটে। সে ঝিমনাইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। মুখটা থমথম করছে। মনে হচ্ছে যেন আকাশের সবটুকু কালো বাদল মেঘ এসে ভর করেছে তার মুখমণ্ডলে।

‘তুই আমায় ডেকেছিস কেন ঝিমনাই? কেন খবর পাঠিয়েছিস আমায় দেখা করার জন্য?’ গলাটা গম্ভীর শোনাল ভেকুলার।

‘তুই জানিস না? তুই জানিস না কেন আমি এভাবে ঝুঁকি নিয়ে, ধরা পড়ার ভয় নিয়েও তোকে ডেকেছি?’

ঝিমনাইয়ের স্বর এবার মরিয়া। ভেকুলা তবু চুপ। শুধু অল্প ঘাড় নাড়ল সে।

‘ভেকু, পালাতে হবে। আমাদের পালাতে হবে যেভাবেই হোক।’ ভেকুলার হাত ধরে ঝাঁকাচ্ছে ঝিমনাই।

‘পালাতে হবে? কোথায় পালাতে হবে?’

‘শহরে। কেন তুই-ই তো একদিন বলেছিলি যে আমরা শহরে পালিয়ে যাব। এবার সেই পালানোর সময়টা এসে গেছে। নইলে নেরুয়া’...

‘নেরুয়া যা চায় তাই হবে রে ঝিমনাই। তাই হতে দিতে হবে।’

‘মানে? এ তুই কী বলছিস?’ ভালোবাসার মানুষের কণ্ঠস্বরের অশনি সঙ্কেত পড়তে পারছে ঝিমনাই। ভয়ে, আতঙ্কে গলা কাঁপছে ওর।

‘ঠিক বলছি। সেদিনের সেই নেরুয়া আর আজকের নেরুয়ার মধ্যে মেলা তফাত। সেটা তুইও জানিস, আর আমিও জানি। এই নেরুয়া আজ ভগবানের দয়া পেয়েছে। তার আশীর্বাদ পেয়েছে। নেরুয়া ভগবানের দূত। ভগবান ওকে যে কাজ দিয়েছে, সেই কাজ করছে এখন ও। আর ভগবানের দূতকে অগ্রাহ্যি করার মানে হল ভগবানকে অগ্রাহ্যি করা। সে সাহস আমার নেই রে ঝিমনাই। তাই আমি পারব না নেরুয়ার বিরুদ্ধে যেতে। তাহলে যে ভগবানের রোষে সব ছারখার হয়ে যাবে। তাই আজ আমার মধ্যে আর সে ক্ষমতা নেই যে তোকে নিয়ে পালিয়ে যাব।’ মাথা নিচু করে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল ভেকুলা।

ওর বলা কথাগুলো এখনও যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না ঝিমনাই। ওর নিজের ভালোবাসার মানুষটা আজ এ কোন সুরে কথা বলছে! গলার কাছে পাকিয়ে ওঠা কান্নার দলাটা অতি কষ্টে গিলে নিল ও। শুধু কোনোরকমে বলল, ‘তাহলে তোর চোখের সামনে দিয়ে নেরুয়া আমায় নিয়ে যাবে, আর তুই চুপ করে দেখবি? এই তুই মরদ?’

‘ভগবানের যা ইচ্ছে তাই হবে। ভগবানের ইচ্ছে অমান্যি করার মানে তাকে অমান্যি করা। আমি তো বললাম সে আমি পারব না। যদি ভগবান চায় তোর আর নেরুয়ার এক হওয়া, তবে তাই হবে। নেরুয়া এখন এই সমাজের মাথা। তার কাছে ছুটে আসবে দেশ বিদেশের মানুষ। এই ছোট জাতের মানুষগুলোর মাথাই সে উঁচু করে দেবে ভগবানের দয়ায়। তাই আমার মতো ছোট মাপের মানুষের কী ক্ষমতা তার সঙ্গে বিবাদ করার?’ ভাঙা স্বরে আবার কথাগুলো বলল ভেকুলা।

‘বেশ। তাই হোক তাহলে। তবে কী জানিস তো, আজ তুইও বুঝিয়ে দিলি এই বুনো সমাজের বাকি মরদদের থেকে তুই আলাদা নোস। তুইও আজ আমায় বুঝিয়ে দিলি মেয়েমানুষ আলাদা করে মানুষ হয় না। তাই তার কোনো দাম নেই।’ ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল ঝিমনাই।

ওর দিকে হাতটা বাড়াতে গিয়েও সরিয়ে নিল ভেকুলা। কি একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, ‘আজ আমি চলি রে ঝিমনাই।’

কথাটা বলেই চারদিকে চোখ বুলিয়ে সন্তর্পণে ঝোপ থেকে বেরিয়ে গেল ও। আর ঝিমনাই গাছ, লতা ঘেরা জঙ্গলে দাঁড়িয়ে রইল একা। পা যেন একেবারে সরছে না ওর। বুকের ভেতরে এক তাল কষ্ট জমাট বেঁধে রয়েছে। এখনও যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না ও ভেকুলার বলে যাওয়া কথাগুলো। নিথর প্রতিমার মতো দাঁড়িয়েই রয়েছে ও।

হঠাৎ আকাশের বুক চিরে গুড়গুড় শব্দটা ভেসে এল। সঙ্গে সঙ্গেই নিমেষে কেমন যেন অন্ধকার হয়ে গেল চারপাশটা। আকাশ ছেয়ে গেছে দলা দলা কালো মেঘে।

ঝিমনাই এবার পা সরাল। ফিরতে তো হবে। এই ঝোপে আর কতক্ষণই বা থাকবে ও! কেউ দেখলে না জানি কী হবে!

ঝিমনাই সবে পাটা একটু এগিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন অস্থির হয়ে দুলে উঠল ঝোপটা। ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝোপ ঠেলে ঢুকে এল একজন। সে মুখোমুখি দাঁড়াল ঝিমনাইয়ের। নেরুয়া। সে খবর পেল কী করে যে ঝিমনাই এখন এখানে?

‘তুমি?’ নেরুয়ার দিকে না তাকিয়েই বলে ফেলল ঝিমনাই।

‘তুই এখানে কী করছিস? বাড়ি চল। বাড়ি চল বলছি।’ তীব্র স্বরে যেন গর্জে উঠল নেরুয়া। চমকে উঠল ঝিমনাই। আস্তে আস্তে নেরুয়ার দিকে তাকাল ও। শিউরে উঠল। নেরুয়ার সেই ক্ষতটা দগদগ করছে। কপালের মাঝখানে মানে তিন নম্বর চোখের জায়গায় নেরুয়ার দগদগে ঘা। পুঁজ গড়িয়ে পড়ছে। এই নাকি ভগবানের আশীর্বাদ? এমন আশীর্বাদ হয় নাকি? ঝিমনাই অল্প ঘাড় নাড়ল। গলা শুকিয়ে গেছে পিপাসায়। কে জানে জলটুকুও জোটার কপাল লিখন ওর আছে কিনা।

অবশেষে নিজের অভীষ্ট পূরণ করতে পেরেছেন দ্রৌণি। শেষ পর্যন্ত শত্রু শিবিরের একেবারে অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পেরেছেন তিনি। এই শিবিরের কে কোথায় থাকবেন তা আগেই জানা ছিল তাঁর, গুপ্তচরদের বহন করে আনা গুপ্ত খবরের সূত্রে। সর্বপ্রথম তিনি তাই প্রবেশ করলেন ধৃষ্টদ্যুম্নের কক্ষে। পাঞ্চাল রাজকুমার শায়িত ছিলেন ভূতলে প্রসারিত গদিওয়ালা বিছানায়। শায়িত রাজপুত্রকে দেখেই প্রতিশোধের অগ্নিশিখা যেন লেলিহান রূপ নিল দ্রৌণির বুকের মধ্যে। ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে গেলেন তিনি। প্রথমেই সজোরে পদাঘাত করলেন পাঞ্চালকুমারের পশ্চাদদেশে। অতর্কিত এ হেন আক্রমণে জেগে উঠলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। পরিশ্রান্ত নিদ্রাবেশের মধ্যেও তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর গুরুপুত্র অশ্বত্থামা উপস্থিত হয়েছেন তাঁর সম্মুখে। আঘাতের অভিঘাত সামলে কোনোরকমে উঠে বসতে যাচ্ছিলেন দ্রুপদ কুমার, কিন্তু সেই অবস্থাতেই পিছন থেকে তার আস্কন্ধলম্বিত কেশ দুই হাতের মুষ্টিতে ধরে তাঁকে মাটিতে আছড়াতে লাগলেন দ্রৌণি। ঘটনার আকস্মিকতা এবং অতর্কিত আঘাত, বিহ্বল হয়ে পড়লেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। কোনোরকম অঙ্গ সঞ্চালন করতে অপারগ বোধ করলেন তিনি। কিন্তু ইতিমধ্যে দ্রোণপুত্র তাঁর গলা টিপে ধরেছেন। আবার কখনো প্রবল আক্রোশে পদাঘাত করছেন পাঞ্চালকুমারের বক্ষদেশে।

অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে দ্রুপদপুত্র বললেন, ‘আপনি আমায় এ রূপে আঘাত করতে পারেন না। আপনি অস্ত্র গ্রহণ করুন। অস্ত্র দিয়ে মারুন আমায়।’

অশ্বত্থামা বিন্দুমাত্র দৃকপাত করলেন না পাঞ্চালকুমারের কোনো কথায়। হিংস্র গলায় বলে উঠলেন, ‘অস্ত্রের আঘাতে ক্ষত্রিয়ের যে সম্মানিত মৃত্যু, তার যোগ্য তুই নোস। যেভাবে তুই গুরুহত্যা করেছিস তাতে এ হেন প্রহারেরই তুই উপযুক্ত। এভাবেই জীবন যাওয়া উচিত তোর।’ কথাটা বলেই নিজের পা দিয়ে অশ্বত্থামা চেপে ধরলেন ধৃষ্টদ্যুম্নের কণ্ঠনালী।

এদিকে পাঞ্চালকুমারের অস্পষ্ট, ক্লিষ্ট আর্তনাদে ততক্ষণে নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে শিবিরে অবস্থানরত নারী ও রক্ষকপুরুষদের। কিন্তু দ্রৌণি যেভাবে পদাঘাতের চাপে নিথর করে দিয়েছেন ধৃষ্টদ্যুম্নকে তা দেখে রক্ষীপুরুষদের বাকরুদ্ধ অবস্থা প্রায়, অস্ত্রচালনা তো দূর অস্ত। ধীরে ধীরে নিথর হয়ে গেল পাঞ্চাল রাজপুত্রের দেহ।

পিতার হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে নিজের রথে উপবিষ্ট হলেন অশ্বত্থামা। এদিকে ততক্ষণে তাকে লক্ষ্য করে ছুটে এসেছেন রক্ষীপুরুষেরা। কিন্তু দ্রোণপুত্রের সন্নিকটে আসতেই তাঁর তরবারির আঘাতে ভূতলে শায়িত হল তাদের প্রাণহীন দেহগুলি।

অদ্ভুত রূপ নিয়েছে অশ্বত্থামার দেহাবয়ব। তাঁর সেই ভয়াল রূপ দেখে যারপরনাই ভীত হয়ে পড়লেন অবশিষ্ট পুরুষরক্ষীরা, প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোনোরকম স্পর্ধা দেখানোর মতো ধৃষ্টতা আর হল না তাঁদের।

অতঃপর দ্রৌণি খুঁজে পেলেন সেই শিবির যেখানে ছিলেন উপপাণ্ডবগণ অর্থাৎ পাঞ্চালীর পঞ্চ পুত্র, শিখণ্ডী এবং অনান্য পাঞ্চালরা। এরা চকিতে সজ্জিত হয়েছিলেন যুদ্ধবেশে ও ধনুকবাণে। বাইরে আর্ত কোলাহল শুনেই তাঁরা চারপাশ থেকে ঘিরে ধরলেন দ্রোণপুত্রকে। কিন্তু তাতে কিছুই লাভ হল না তাঁদের। অশ্বত্থামার উদগ্র তরবারির আঘাতে উপপাণ্ডবেরা একে একে নৃশংস ভাবে কাটা পড়লেন। শিখণ্ডীর দেহ থেকে ছিন্ন হল তাঁর মস্তক, অবশিষ্ট পাঞ্চাল সৈন্যদেরও অনেকেই পরিত্রাণ পেলেন না দ্রোণপুত্রের তরবারির আঘাত থেকে। আর সৈন্যদের মধ্যে যারা কেউ কারো অপেক্ষা না করে পলায়নে উদ্যত হল, তাদের প্রাণ নিধন হল দ্বারদেশে দ্বাররক্ষীর ভূমিকায় দণ্ডায়মান কৃপাচার্য আর কৃতবর্মার অস্ত্রের আঘাতে।

মুহূর্তের মধ্যেই পাণ্ডব, পাঞ্চাল শিবিরে নেমে এল শ্মশানের নিস্তব্ধতা। কিছু সময় পূর্বেও মৃত্যুভয়ে জর্জরিত যে মানুষগুলি আর্তনাদ করছিল একসঙ্গে, যে সমবেত কাতরকণ্ঠ অব্যক্ত রব করছিল মৃত্যুযন্ত্রণায়, তার সবটা স্তব্ধ হয়ে গেল। কারণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে শিবিরের প্রত্যেকটি জীবন্ত প্রাণ।

অশ্বত্থামা হত্যালীলা সমাপন করে বেরিয়ে এলেন শত্রুশিবির থেকে। মিলিত হলেন কৃপাচার্য আর কৃতবর্মার সঙ্গে, তাঁরাও ইতিমধ্যে প্রাণ নিয়েছেন বহু মানুষের। কতখানি নৈপুণ্যের সঙ্গে পিতার হত্যার প্রতিশোধ সম্পন্ন করেছেন তিনি, অপর দুই সঙ্গীর কাছে মহানন্দে সে বিবৃতি দিতে শুরু করলেন দ্রৌণি। পরস্পর পরস্পরকে আলিঙ্গন করলেন তাঁরা। খুশি ও বিজয়সাফল্য আদানপ্রদানের পর দ্রোণপুত্র বললেন, ‘আমি পাঞ্চালীর পুত্রগণ, সকল পাঞ্চাল এবং বিরাট রাজার অবশিষ্ট সেনাদের সমূলে নিধন করেছি। অতএব আর বিলম্ব নয়। এখনও যদি কুরুরাজ দুর্যোধনের শরীরে প্রাণ অবশিষ্ট থেকে থাকে তবে এ প্রিয় সংবাদ যথাসম্ভব শীঘ্র তাঁকে জানানো দরকার।’

চারদিকে বিছিয়ে রয়েছে রাতের অন্ধকার অখণ্ড নিস্তব্ধতা। পৃথিবী আচ্ছন্ন গভীর ঘুমে। কিন্তু বিছানায় শুয়ে একদৃষ্টে সিলিঙের দিকে তাকিয়ে রয়েছে জাগরী। পাশে ঘুমন্ত স্বামী। তার দিকে কয়েক মুহূর্ত অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জাগরী। কী নিশ্চিন্ত ঘুম অলোকেশের! কেন জাগরী এমন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না? কেন সব সময় এক অদম্য ভয় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় তাকে? ভয় নাকি কোনো চোরা অপরাধবোধ?

বুকের ভেতর একটা চাপ অনুভব করল জাগরী। মনের ভেতরটা কেমন যেন ছটফট করে উঠল তার। নিজেই নিজেকে শাসন করল সে। সে তো কোনো অন্যায় করেনি। তাহলে অপরাধটা কীসের? তার সঙ্গে ভগবান নামের অদৃশ্য সেই ব্যক্তি যে নিষ্ঠুর খেলাটি খেলেছিলেন প্রায় বত্রিশ বছর আগে, সেটা যদি অপরাধ না হয় তাহলে জাগরী যেটা করেছিল সেটাও কোনো অন্যায় হতে পারে না।

ঘরর ঘরর শব্দ করে নাক ডেকেই চলেছে অলোকেশ। রোজই চলে এমন। এই দৃশ্যটা দেখলেই মাথায় রক্ত ছলকে ওঠে জাগরীর। রাগ হয়, ঈর্ষা হয়। কেন অলোকেশ এত নিশ্চিন্ত? কেন সে এমনটা হতে পারছে না? অবশ্য মাঝে কয়েকটা দিন খানিক স্বস্তি পেয়েছিল জাগরী, যখন অম্লান বিদেশে ছিল। কিন্তু কেন যে ছেলেটা ফিরে এল? ও যদি ওখানেই থেকে যেত তাহলে তো অনেক নিশ্চিন্ত হতে পারত জাগরীর জীবনটা।

আজ সকালের দৃশ্যটা ঝপ করে মনে পড়ে গেল জাগরী মুখার্জির। সোহাগে মাখোমাখো হয়ে বসেছিল ঠাকুমা আর নাতি। গল্পগুজব করছিল। ঠিক যেমনটা আগেও চলত। আর ঠিক আগের মতোই যখন নিজের বিরক্তি প্রকাশ করল জাগরী, মুহূর্তের মধ্যেই আজ চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল অম্লানের। উল্টে মায়ের প্রতিই নিজের উষ্মা জাহির করেছিল সে।

নরম গদির বিছানায় আরও কয়েক পাক এপাশ, ওপাশ করল জাগরী। কি যেন একটা ভাবনা কিছুতেই স্থির হতে দিচ্ছে না তাকে। বিছানা থেকে ঝপ করে নেমে পড়ল সে। যথাসম্ভব নিঃশব্দে ও সন্তর্পণে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অলোকেশ কিছু টের পেল না। সে তখনও গভীর ঘুমে মগ্ন।

জাগরী ও অলোকেশের পাশের ঘরটাই অম্লানের। ছেলের ঘরের বাইরে এসে থমকে দাঁড়াল সে। দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে রাখা। দরজায় ছিটকিনি দিয়ে কখনো ঘুমাতে পারত না ছেলেটা। এত বছর বিদেশে থেকেও সে অভ্যাস তাহলে যায়নি ছেলের! আলগা হাতে দরজাটা ঠেলল জাগরী।

অকাতরে ঘুমোচ্ছে অম্লান! রাত বাতির মায়াবী নীল আলো ছেলেটার মুখের ওপর এসে পড়েছে৷ কী অদ্ভুত লাগছে মুখটা। এক অপার্থিব সৌন্দর্য ঘিরে ধরেছে ছেলেটাকে। মনে হচ্ছে যেন একেবারে সাক্ষাৎ নীলবর্ণ শ্রীকৃষ্ণ নেমে এসেছেন স্বর্গ থেকে। কয়েক মুহূর্ত ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল জাগরী। তারপর পা বাড়াল চৌকাঠের দিকে।

কিন্তু ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে জাগরী থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বিছানায় একটা ছটফটানির শব্দ। জাগরী তৎক্ষণাৎ ছুটে গেল ছেলের কাছে। ঘুমের মধ্যেই পাগলের মতো ছটফট করে যাচ্ছে সে। কী সব যেন ভুলভাল বকছে। কি বলছে ছেলেটা? কান লাগিয়ে শোনার চেষ্টা করল জাগরী।

‘মুক্তি...মুক্তি নেই। কোনোদিন মুক্তি পাবে না তুমি। পাবে না। কিছুতেই না।’ ছেলের মুখ থেকে ছিটকে আসা প্রলাপের কয়েকটা মাত্র এলোমেলো বিক্ষিপ্ত কথাই কেবল কানে পৌঁছল জাগরীর, যার অর্থ কিছুই বুঝতে পারল না সে।

বুকটা কী অসম্ভব রকম ধুকপুক করছে জাগরীর। এসব কী বলছিল অম্লান? এসবের মানে কী? কার মুক্তির কথা বলছিল ও?

আর দাঁড়াতে ইচ্ছে করল না জাগরীর। প্রায় এক ছুটেই ছেলের ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। কি আবোলতাবোল বকছিল অম্লান? ওগুলো কি শুধুই ঘুমের ঘোরে বা খারাপ স্বপ্ন দেখে ভুল বকা নাকি এর পিছনে লুকিয়ে আছে কোনো রহস্য?

ঝট করে জাগরীর হঠাৎ মনে পড়ে গেল অনেক আগের কয়েকটা কথা৷ অম্লান তখন খুব ছোট। কিন্তু তখন থেকেই সে কিছু কিছু আজগুবি স্বপ্নের কথা বলত৷ যুদ্ধ, মৃত্যু, অনেক মানুষ...। অম্লানের কথাগুলো এখনও মনে আছে জাগরীর।

‘মা আমার খুব ভয় হয়। আমি যে অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখি। অনেক মানুষ, তাদের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে। দলে দলে লোক মরে যাচ্ছে। আমিও রয়েছি সেখানে। অথচ সেই আমি যেন ঠিক এই আমি নই। অনেকটা অন্যরকম। খুব লম্বা একজন কেউ, কিন্তু আমিই সে। সেই আমিটা একটা রথের উপর। রথটা যেন আমিই চালাচ্ছি। আর ওই রথ থেকে কেউ একজন খুব যুদ্ধ করছে।’ প্রথম দুই একবার ছেলের এই স্বপ্নের কথা শুনে হেসেছিল জাগরী। নেহাতই বাচ্চাদের ছেলেমানুষি ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে অম্লান ক্রমাগত বলতে শুরু করেছিল এই স্বপ্নের কথা। ছোট বাচ্চাটার মুখে এই একই স্বপ্নের কথা বারবার শুনতে শুনতে কেমন যেন একটা ভয় গ্রাস করেছিল তাকে। নানারকম চিন্তা মাথায় আসত। কেন এমন কথা বারবার বলে অম্লান? নিজের আধুনিক, যুক্তিবাদী মনটাকে ব্যবহার করে এক ধাক্কায় মনে জমে ওঠা অতি লৌকিক চিন্তাগুলোকে নস্যাৎ করেছিল সেদিন জাগরী। কিন্তু সত্যিই পুরোপুরি নস্যাৎ করতে পেরেছিল কি? হয়তো পারেনি। আর পারেনি বলেই সেদিন ছেলেকে থামিয়ে দিয়েছিল খানিকটা ধমকে ধামকে।

‘ইগনোর বেটা’, বলে ছেলের মুখ বন্ধ করে দিলেও জাগরী নিজে কি ইগনোর করতে পেরেছিল সবটা? পারেনি। সেই জন্যই ধামাচাপা দিয়ে ছেলেকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো সত্যিই যদি শুধু শিশুমনের অবোধ খেয়াল হতো, তাহলে অম্লান আজও কেন বেরোতে পারেনি সেই স্বপ্নের জাল ছিঁড়ে? সবটাই কি কাকতালীয় নাকি জাগরীর লুকিয়ে রাখা রহস্যের ওপারেও আরও কোনো গভীর রহস্য আছে?

হঠাৎ কেমন যেন ধুকপুক করে উঠল জাগরীর বুকের ভেতরটা। রাতের অন্ধকারকে পায়ে মাড়িয়ে ছেলের ঘরের সামনে থেকে সরে পড়ল সে। কেমন যেন কাঁপছে হাঁটু দুটো। অম্লানের ঘরের সামনে আর কিছুতেই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না সে।

‘বাবা! জানি জানি তুই রিসার্চ নিয়ে বিশাল বিজি, কিন্তু তা বলে কি একেবারেই পাত্তা দেওয়া যায় না?’

বইয়ের ভিতর মুখ ডুবিয়ে বসেছিল রুকমি। অম্লানের গলার আওয়াজে মুখ তুলে সামনে তাকাল। ছেলেটা কখন এল? এখন রুকমির দিকে তাকিয়ে হাসছে মিটিমিটি৷ রুকমি মুখটা গম্ভীর রেখেই বলল, ‘তুই যখন বিদেশে বসে ভাইরাস নিয়ে কপচাতিস, তখন আমায় কি বিশাল পাত্তা দিয়ে উল্টে যেতিস তুই?’

‘উফফ! আবার সেই এক কথা! ‘মুখে ছদ্ম হতাশা ফুটিয়ে রুকমির সামনে চেয়ার টেনে বসে পড়ল অম্লান। হাসতে হাসতে বলল, ‘কী এত পড়ছিলি শুনি? সেই অশ্বত্থামা?’

‘হ্যাঁ অবশ্যই। আর কী হবে?’

‘ফালতু লোক একটা। খুব বাজে লোক ছিল ও। আমি আরও ডিটেল গল্প শুনে নিয়েছি ঠামের থেকে। ও তো দুর্যোধনদের সাপোর্ট করেছিল। এরকম একটা ভিলেন লোককে তুই কেন টপিক বানালি বল তো?’ মুখটা ভেংচাল অম্লান।

‘একদম ভুলভাল বলবি না। শোন, অশ্বত্থামা মোটেই কোনো ভিলেন চরিত্র নয়। আসলে মহাভারতকে আমাদের সাধারণ মানুষদের মধ্যে যে ভাবে পোর্ট্রে করা হয় তাতে অশ্বত্থামাকে খল মনে হতেই পারে, কিন্তু তার মানে সত্যিই তিনি কোনো নেগেটিভ ক্যারেক্টার হয়ে যান না। আসলে কেউ অশ্বত্থামার স্ট্রাগলটার দিকটা দেখেই না। অশ্বত্থামা ঋষি পরিবারের সন্তান। ঋষি ভরদ্বাজের পৌত্র। ছোটবেলায় আর্থিক স্বচ্ছলতা দেখেননি। বরং বেশ অভাব অনটনের মধ্যেই কাটত তাঁর জীবনটা। জানিস ছোটবেলায় সামান্য দুধটুকু তাঁর জুটত না। তাঁর মা পিটুলি গোলাকে দুধ বলে খাইয়ে ভুলিয়ে রাখতেন সন্তানকে।

তারপর অশ্বত্থামার বাবা একদিন কৌরব ও পাণ্ডবদের শিক্ষাগুরু নিযুক্ত হলেন। সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা এল৷ অশ্বত্থামা তখন কিশোর। কৌরব-পাণ্ডবদের সঙ্গে তাঁরাও শিক্ষাগ্রহণ করার সুযোগ হল৷ কিন্তু তুই ভাব, ওঁর সমবয়েসি কয়েকটি ছেলে যারা কিনা তাঁর বাবার ছাত্র, তাদের মধ্যে অহঙ্কার, রাজগাম্ভীর্য সবই রয়েছে। এদিকে অশ্বত্থামা যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সেরকম কোনো তকমা তাঁর নেই। কিশোর বয়সি একটা ছেলের সাইকোলজিতে এসবের প্রভাব পড়ে কি না? সেই সময় দুর্যোধন যদি তাঁর সঙ্গে সহজ হয়ে মিশতে আসে, রাজকীয় অহমিকা প্রদর্শন না করে বন্ধু হওয়ার হাত বাড়ায় তাহলে সে হাতটা ধরতে চাওয়া কি খুব ভুল? তাতে কি সত্যিই তাঁকে ভিলেন বলা যায়?

‘আর রইল বাকি পরবর্তী সময়ের কথা। যে দুর্যোধন প্রথম তাঁর দিকে মিত্রতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল তার হাত ছেড়ে দেওয়াটা কি অন্যায় হত না? মানছি অশ্বত্থমা দ্রৌপদ্বর সন্তানদের হত্যা করে গহিত অপরাধ করেছিলেন৷ কিন্তু এর পিছনে প্রভোকেশনটা দেখ। বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধই এখানে মেইন মোটিভ ছিল। তারই মৃত্যুর মিথ্যা খবর শুনিয়ে, ছলনা করে তাঁর বাবাকে অস্ত্রত্যাগে বাধ্য করে, মেরে ফেলল পাণ্ডবরা এবং দ্রুপদের ছেলে। এটাই কি যথেষ্ট মোটিভ নয় প্রতিশোধ নিতে চাওয়ার? আমি শুধু অশ্বত্থামার সাইকোলজিকাল ক্রাইসিসটা বোঝাতে চাইছি। এছাড়া দুর্যোধন! সে দুর্যোধন যেমনই হোক, অশ্বত্থামা ছিলেন তাঁর বন্ধু। দুর্যোধনের সঙ্গে যুদ্ধেও নীতিবিরুদ্ধ ভাবে তাঁকে পরাজিত করেছিলেন ভীম। কাজেই বন্ধুর মৃত্যুটাও তাঁর মোটিভকে আরও শক্তিশালী করেছিল। অশ্বত্থামার জায়গা থেকে একবার ভেবে দেখ। সত্যিই কি তাঁকে খারাপ লোক বলা যায়?

রুকমির দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অম্লান। এই রিসার্চের একেবারে গভীরে ঢুকে গেছে ও। যখনই এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলে, তখন যেন সব কিছু একেবারে অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করে সে। একেবারে যেন অন্য একটা মানুষ হয়ে যায় মেয়েটা। অম্লানের ভারি ভালো লাগে এই অন্য রুকমিকে দেখতে। ঠামের কাছে মহাভারতের গল্প শুনতে শুনতে ছোটবেলায় যেমন ও তন্ময় হয়ে যেত, একই ভাবে রুকমির রিসার্চের কথা শুনতে শুনতেও কেমন যেন বিবশ হয়ে যায় অম্লান। রুকমি যাদের কথা বলে, তাদের সকলকে যেন মানসচক্ষে দেখতে পায় অম্লান। মনে হয় ও নিজেও পৌঁছে গেছে সেই সময়টায়।

বিষয়টা নিয়ে আরও কথা বলতে ইচ্ছা করল অম্লানের। হাসতে হাসতে বলল, ‘আচ্ছা আমায় একটা কথা বল, এই অশ্বত্থামা তো ঋষি বংশের সন্তান। কিন্তু তিনি নাকি রাজা ছিলেন। কী করে হয়েছিলেন তিনি রাজা?’

‘তার পিছনেও অনেক ঘটনাবলী আছে। দ্রোণাচার্য মানে অশ্বত্থামার বাবা ছাত্র জীবনে দ্রুপদরাজ পাঞ্চালের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে দ্রুপদ সেই বন্ধুত্ব অস্বীকার করেন রাজাসন লাভের পর। দ্রোণ একদিন তাঁর রাজসভায় উপস্থিত হলে তিনি তাঁদের পুরোনো বন্ধুত্বকে অস্বীকার করে যারপরনাই অপমান করেন বাল্যবন্ধুকে। তখন থেকেই দ্রোণাচার্যের ভীষণ আক্রোশ তৈরি হয় দ্রুপদের প্রতি। তারপর নিজের শ্যালকের সহায়তায় তিনি পৌঁছন হস্তিনাপুর। সাক্ষাৎ হয় ভীষ্মের সঙ্গে। কৌরব ও পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরু হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। কিন্তু দ্রুপদের সেই লাঞ্ছনা, অপমান কোনোদিন ভুলতে পারেননি দ্রোণ। সেজন্যই কৌরবদের অস্ত্রশিক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি তাদের বলেন যে দ্রুপদকে যুদ্ধে পরাজিত করে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে হবে। সেটাই হবে তাদের গুরুদক্ষিণা। গুরুর অপমানের প্রতিশোধ নেবার থেকে বেশি বড় গুরুদক্ষিণা আর কী-ই বা হতে পারে উপযুক্ত ছাত্রের জন্য।

কিন্তু কৌরবরা দ্রুপদকে পরাজিত করতে অসমর্থ হয়েছিল। উল্টে তাদেরই পরাজিত ও বন্দি বানিয়েছিলেন দ্রুপদের তৎকালীন সেনাপতি তথা তাঁর প্রথম সন্তান শিখণ্ডী। তারা দ্রুপদের কাছে আটক হওয়ার পর, পাঞ্চাল অভিমুখে যাত্রা করে পাণ্ডবরা। পাণ্ডবদের কাছে, মূলত অর্জুনের কাছে হেরে যান দ্রুপদ। তাঁকে বন্দি বানিয়ে অর্জুন গুরুদক্ষিণা দেয় নিজ গুরুকে। আর এই পরাজয়ের পরেই দক্ষিণ পাঞ্চালের রাজা হিসাবে দ্রুপদ ঘোষণা করেন অশ্বত্থামাকে বিনিময়ে লাভ করেন নিজের মুক্তি৷’

‘হুম, বুঝলাম।’

‘কী বুঝলি?’

‘বুঝলাম তুই সুপার হিউম্যান অশ্বত্থামার প্রতি একটু বেশিই মজে গেছিস।’

‘সুপার হিউম্যান! আমি কখন বললাম অশ্বত্থামা সুপার হিউম্যান?’ চোখ কপালে তুলল রুকমি।

‘তা নয়তো কী? যে মহাভারতের যুগ থেকে শুরু করে এখনও অবধি বেঁচে আছে সে তো সুপার হিউম্যানই হল।’

‘মোটেই না। অশ্বত্থামা শাপগ্রস্ত। পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে, বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতে গিয়েই শাপগ্রস্ত হতে হয়েছিল তাঁকে। তাই তিনি চিরঞ্জীবী। পৃথিবীর বুকে এরকম আটজন চিরঞ্জীবী আছেন। অশ্বত্থামা তাঁদের মধ্যে একজন। রাজা মহাবলী, বেদব্যাস, হনুমান, রাবণ অনুজ বিভীষণ, কৃপাচার্য, পরশুরাম, ঋষি মার্কণ্ড আর অশ্বত্থামা; এই আটজন হলেন পৃথিবীর বুকে চিরঞ্জীবী। এঁদের মৃত্যু নেই। কিন্তু অশ্বত্থামা এক শাপগ্রস্ত মানুষ, তাই চিরঞ্জীবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি...’

কথাটা শেষ করতে পারল না রুকমি। কখন যেন অম্লান সরে এসেছে ওর একদম কাছে। নিজের আঙুল ছুঁয়ে দিল রুকমির ঠোঁটে অম্লান। চমকে ওঠে রুকমি!

‘আমায় বিয়ে করবি রুকমি?’ প্রেমিকার চোখে চোখ রেখে বলল অম্লান।

‘ধ্যাত তুই না!’ অম্লানের আঙুল সরিয়ে দিয়ে খিলখিল হেসে উঠল রুকমি।

‘বিয়ে তো করবই। সে আর বলার কী আছে। সময় হলেই বিয়ের কথা শুরু করবে বাড়ি থেকে।’

‘না না। আমি ওসব সময়-টময় জানি না। তুই বল বিয়ে করবি আমায়। খুব তাড়াতাড়ি?’

‘বাড়ি থেকে সকলেই চায় রিসার্চ শেষ করে বিয়ে করি আমি। সে কথা তো তুই জানিস।’

‘মানে বাড়ি থেকে যখন বিয়ের কথা হবে, আমি সেটা নিয়ে আপত্তি করছি না। কিন্তু আমরা রেজিস্ট্রি করে রাখি। বাড়িতে এখন কিছু বলার দরকার নেই।’

‘...না মানে, কিন্তু কেন?’ রুকমির চোখে মুখে বিস্ময়।

‘জানি না, কেন আমার মনে হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি আমার সঙ্গে এমন কিছু একটা ঘটবে যার জন্য তোকে আমার দরকার হবে। ভীষণ ভাবে দরকার হবে। সবসময় তোকে তখন থাকতে হবে আমার পাশে। আর সেটা বিয়ে ছাড়া কী করেই বা সম্ভব?’

‘মানে? এসব কী বলছিস তুই? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কী ঘটবে তোর সঙ্গে? বল আমায়?’

‘আমি জানি না। বিশ্বাস কর আমি সত্যিই জানি না। শুধু মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটবে। তোকে আর আমাকে একসঙ্গে খুব বড় কোনো গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে। সেটা কী, আমি জানি না। কিন্তু...’

হঠাৎ কেমন যেন উদাস হয়ে গেল অম্লানের চোখ দুটো। মনে হচ্ছে নিমেষে যেন ও পৌঁছে গেছে অন্য কোনো জগতে। এরকম আগেও হয়েছে। কেন এমন হয় মাঝে মাঝে ছেলেটার?

‘অম্লান, এই অম্লান’...ওকে হালকা ধাক্কা দিল রুকমি। কিন্তু অম্লানের কোনো হেলদোল নেই। পার্থিব সব কিছু ছেড়ে ও যেন অন্য কোথাও হারিয়ে গেছে আচমকা।

গম্ভীর মুখে বসে রয়েছেন মিস্টার সচদেব রাজগুরু। ভদ্রলোক জাতে অসমীয়া, পেশায় ব্যবসায়ী। টাকা পয়সার কোনো অভাব নেই। আজ বহু বছর হল তিনি দিল্লিতে সেটলড। চুটিয়ে ব্যবসা করেছেন। টাকা রোজগার করেছেন। কিন্তু টাকা রোজগার করতে করতে কখন যেন ভুলে গেছিলেন মানুষের জীবনে পরিবার বলেও একটা কিছু থাকে। আর সেই পারিবারিক জীবনের গুরুত্বটা কিন্তু কোনো অংশেই কম নয়।

আহেলি। আহেলিকে তার প্রাপ্য সময় কোনোদিন দেননি সচদেব। অথচ আহেলিকে তো তিনি ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলেন। আহেলি কিন্তু তার ভালোবাসায় কার্পণ্য করেনি কোনোদিন। জীবনের প্রতিটা দিন, যে কোনো পরিস্থিতিতে সে নিজের ভালোবাসার মানুষের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিল। সব রকম ক্ষেত্রেই সবসময় সাপোর্ট করেছে সে স্বামীকে। নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে সংসারের জন্য। আর সেই সংসার করতে করতেই কখন যেন ভেতর থেকেই ফোঁপরা হয়ে গেছে মানুষটা। শরীরটা একদম ঝরঝরে হয়ে গেছে। এত রকম রোগ কখন এসে এভাবে বাসা বাঁধল আহেলির শরীরে!

হাই ব্লাড সুগার। ওষুধ, ইনসুলিন নিয়েও যে সব কিছু আয়ত্তে থাকে তা নয়। বেশি ব্লাড প্রেশার। তারও ওষুধ চলে নিয়মিত। সঙ্গে রয়েছে নার্ভের সমস্যা। এগুলো কোনোটাই যে সচদেব জানতেন না, তা তো নয়। সবই জানা ছিল। কিন্তু কেন যে আমল দেননি! মনে হত, ওই তো চলছে ওষুধ। তার মানে সব ঠিকই আছে। আর আহেলিও যে বড্ড চাপা স্বভাবের মানুষ। হাজার কষ্টেও কোনোদিন মুখ ফুটবে না তার। দায়সারা গোছের হলেও যখনই সচদেব তাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘কেমন আছ?’ আহেলি উত্তরে বলেছে, ‘আমি একদম ভালো আছি।’ আর সচদেবও বিশ্বাস করে নিশ্চিন্ত হয়েছেন যে তাহলে সব একেবারে ঠিকই আছে।

স্ত্রীর মুখের ওই কথাটুকু শুনেই নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়া ধনী ব্যবসায়ী সচদেব রাজগুরুর আর কোনোদিন মনেই হয়নি আলাদা করে আহেলিকে নিয়ে ভাবার কথা। আসলে বেশিরভাগ ভারতীয় পুরুষের কাছেই একটা সময়ের পর তাঁদের স্ত্রী বোধহয় টেকেন ফর গ্রানটেড হয়ে যায়। তারা ভেবে নেন স্ত্রী তো আছেই। তাকে নিয়ে আলাদা করে আর ভাবার কী দরকার! সচদেবের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা হয়েছিল কতকটা সেরকমই। অভিমানী স্ত্রী কোনোদিন নিজের কথা বলেনি, আর সচদেবও কখনো শুনতে পাননি তার অনুচ্চারিত যন্ত্রণার আর্তি।

গত তিনদিনের টানা বুকে ব্যথার পর আজ যখন ফাইনালি ডাক্তার দেখানো হল এবং সেই ডাক্তার যখন স্পষ্টভাবে জানালেন যে আহেলির শরীরে ঘোরতর সমস্যা হচ্ছে, তখন যেন টনক নড়ল সচদেবের।

‘দেখুন মিস্টার রাজগুরু আপনার স্ত্রীর বাঁচার আশা খুবই কম। একে হাই ব্লাড সুগার, তার ওপর ব্লাড প্রেশার, নার্ভের প্রবলেমও রয়েছে। তার সঙ্গে যদি হার্টের এমন সিরিয়াস সমস্যা তৈরি হয়। সেক্ষেত্রে বুঝতেই তো পারছেন ব্যাপারটা কতটা জটিল হয়ে যাচ্ছে।’

ডাক্তারের কথাগুলো শোনার সময়ে সচদেবের মনে হচ্ছিল যেন তাঁর পায়ের তলা থেকে জমি কেড়ে নিচ্ছে কেউ। আহেলিকে নিয়ে কোনোদিন আলাদা করে ভাবা হয়নি ঠিকই, কিন্তু তেমনই এও তো সত্যি যে, আহেলি তাঁর জীবনে থাকবে না এটাও কোনোদিন তিনি ভাবতে পারেন না। বত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবন আর তার আগের আরও পাঁচ বছর। সব মিলিয়ে বিগত সাঁইত্রিশ বছরে আহেলি তো সচদেবের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গেই মিশে গেছে একেবারে ওতপ্রোতভাবে।

‘কী! কী বলছেন আপনি ডক্টর! এটা হতেই পারে না। আমি মানি না এসব। আমি ওকে বিদেশে নিয়ে যাব। টপমোস্ট ডাক্তারদের দিয়ে চিকিৎসা করাব।’ উত্তেজিত হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠেছিলেন সচদেব।

‘রিল্যাক্স মিস্টার রাজগুরু। আপনি যেখানে খুশি আপনার স্ত্রীকে নিয়ে যেতে পারেন। তাতে লাভ কিছুই হবে না। কারণ আমরা যা বলছি তার থেকে আলাদা কোনো কথা কেউই আপনাকে শোনাতে পারবেন না। আপনার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ।’

‘আর হ্যাঁ, আপনি ভুলে যাবেন না যে, যেখানে এই মুহূর্তে আপনার স্ত্রীর চিকিৎসা হচ্ছে সেটাও কিন্তু দিল্লি শহর তথা ভারতের এক অন্যতম সেরা জায়গা। তাই এখান থেকে যা বলা হবে তা খুব ভুল হবে না নিশ্চয়ই।’

ডাক্তারের শেষ কথাটায় ঝপ করে নিভে গেছিল সচদেব। সত্যি তো। এই জায়গাটাও কিছু কম বড় নয়। তাই তারা যখন বলছে আহেলির ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নেই সেভাবে, তাহলে নিশ্চয় তাই হবে। কিন্তু এটা যে সত্যিই মানতে পারছেন না মিস্টার সচদেব রাজগুরু।

‘তাহলে কি উপায় আমায় বলুন ডক্টর?’

‘ভগবানের প্রতি ভরসা রাখুন। অনেক সময় জীবনে অনেক মিরাকলও তো ঘটে।’

মিরাকল! এখন মিরাকলের অপেক্ষায় বসে থাকতে হবে সচদেবকে! আর আহেলি চোখের সামনে এক ধাপ করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে! মিরাকল বলে সত্যি বাস্তবে কিছু হয় নাকি! উফফ! আর এই টেনশন যে সহ্য করতে পারছেন না সচদেব।

বিপ বিপ করে বেজেই চলেছে মোবাইলটা। আজ সচদেবের কোনো ফোন ধরতে একেবারে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু অবাধ্য যন্ত্রটা থামছে না কিছুতেই। সচদেব মুঠো ফোন হাতে তুলে নিলেন। রঙ্গন তিওয়ারি ফোন করছে! এই লোকটা সচদেবের বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোনটা ধরলেন তিনি।

‘তিওয়ারি আজ কথা বলার মুড নেই একদম। পরে ফোন করব।’

‘হোয়াই? কেয়া হুয়া ব্রাদার?’

‘সব কুছ খতম। কুছ আচ্ছা নেহি লাগ রাহা হ্যায়।’

‘কেয়া হুয়া ক্যায়া হ্যায়?’

এবার সবটা সংক্ষেপে বললেন সচদেব।

‘সমঝ আয়া। ইসকা মতলব ভাবিজিকে বারে মে ডক্টর জবাব দে দিয়া।’

‘হুম।’

‘দেখ ভাই যব সায়েন্স খতম হো যায়ে তব কাম আতে হ্যায় বিসওয়াস। কাম আতে হ্যায় মিরাকল।’

‘মিরাকল!’ শব্দটা শুনেই কেমন চমকে উঠলেন সচদেব। একটু সামলে নিয়ে বললেন, ‘রিয়েল লাইফ মে মিরাকল নেহি হোতা হ্যায় ভাই।’

‘অফকোর্স হোতা হ্যায়। তুম মিরাকল বাবাকে পাস যাও। যেখানে সায়েন্স কাম করে না, ওখানে কাম করে মিরাকল বাবা।’

‘কউন হ্যায় ইয়ে মিরাকল বাবা?’ সচদেব প্রশ্ন করলেন বিস্মিত গলায়।

‘জাদা লোক জানতে নেহি হ্যায় ইনকে বারে মে। ইয়ে হ্যায় এক চমৎকারী পুরুষ। উত্তরাখণ্ডকে এক ছোটেসে ট্রাইবাল গাঁও মে ইয়ে রেতা হ্যায়। কিন্তু একে কেউ দেখেনি। এর কিছু চেলা আছে। তার কাছে কিছু জড়িবুটি টাইপের জিনিস পাওয়া যায়, সেগুলোই হল মিরাকল বাবার ওষুধ। সেই ওষুধ বিলকুল ম্যাজিক। সব বিমারি ঠিক হয়ে যায়।’

তিওয়ারির কথা শুনে এত উদ্বেগের মধ্যেও হেসে ফেললেন সচদেব। তিওয়ারি বরাবরই একটু ছেলেমানুষ। আজও তাই রয়ে গেল। কি সব বলছে আবোলতাবোল!

‘তুম হাস রহে হো রাজগুরু? ইয়ে হাসি কা বাত নেহি হ্যায় ভাই। আমার খুব চেনা একজন ক্যানসারের মতো কঠিন অসুখ নিয়েও অনেকটা ভালো আছে মিরাকল বাবার দয়ায়। তুমি মানছ না তো, কিন্তু একদিন তুমি মানবে। শোনো সচদেব, এই দুনিয়ায় তোমার আমার জানার বাইরেও আরও অনেক কিছু ঘটে। সায়েন্সের বাইরেও অনেক কিছু হয়। তুমি মানতে চাইলে সেটা সত্যি, আর না মানলেই মিথ্যা।’

একটু মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে ফোন কেটে দিল তিওয়ারি। সচদেবের মাথায় আরও জাঁকিয়ে বসল দুশ্চিন্তাটা। কী করে সারানো যায় আহেলিকে! ডাক্তারের কথামতো কি সত্যিই কোনো মিরাকল ঘটবে? এমন কি আদৌ হয়? তাহলে কি একবার গিয়ে দেখা উচিত ওই মিরাকল বাবার চেলাদের কাছে? যতই অবিশ্বাস্য হোক, একবার গিয়ে দেখতে ক্ষতি কি?

দ্রুত হাতে মোবাইল টিপলেন সচদেব। রিং হচ্ছে ওপারে।

‘কেয়া হুয়া ফির?’ একটু বিরক্ত গলায় ফোন ধরল তিওয়ারি।

‘তিওয়ারি আমি মিরাকল বাবার ব্যাপারে একটু কথা বলতে চাই।’ গম্ভীর গলায় বললেন সচদেব।

শত্রু নিধন পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। চিত্ত প্রসন্ন হয়েছে দ্রৌণির। এবার তিনি তাঁর সহচরদের সঙ্গে ফিরতে উদ্যত হলেন তাঁর মিত্র দুর্যোধনের সন্নিকটে। মুমূর্ষু দুর্যোধন আজ সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করেছিলেন অশ্বত্থামাকে। অবশ্য দ্রৌণির এরূপ কোনো প্রত্যাশা একেবারেই ছিল না। দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম যুদ্ধনীতি ভঙ্গ করে, অনৈতিক মার্গের অনুসারী হয়ে ঊরু ভঙ্গ করেছেন দুর্যোধনের। সেই সংবাদ পাওয়ামাত্র অশ্বত্থামা এসে পৌঁছেছিলেন তাঁর মিত্রের সমীপে।

ভগ্নহৃদয় আর ভগ্নশরীর নিয়ে পড়েছিলেন দুর্যোধন। একাকী, নিঃসঙ্গ অবস্থায়। তাঁর সকল পরাক্রম, সমস্ত তেজ সম্পূর্ণ ভস্মীভূত। নিজের দুই চক্ষুকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না দ্রৌণি। পরম বিক্রমী দুর্যোধনের একী অবস্থা! যন্ত্রণাক্লিষ্ট, বিলাপরত দুর্যোধনের এ হেন অবস্থা তাঁকে নিদারুণভাবে বিচলিত করেছিল। বিচলিত চিত্তেই তিনি বলেছিলেন মিত্রকে, ‘আমার পিতাকে ছলনা করে হত্যা করা হয়েছিল, তখন আমি যন্ত্রণা পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই একই ভাবে, ছলনার দ্বারা আজ তোমায় পরাভূত করা হল দেখে আমি অধিক যন্ত্রণা পেয়েছি। তুমি আমায় আদেশ করো, আমি কৃষ্ণের সম্মুখেই পাঞ্চালদের বিনাশ ঘটাব।’

দ্রৌণি শুধুমাত্র বন্ধুকৃত্য করার অনুমতিটুকুই প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু দুর্যোধন সেই মুহূর্তেই কৃপাচার্যকে অনুরোধ করলেন এক কলসি জল এনে দেওয়ার জন্য। কৃপাচার্য সুশোভিত কলসে জল নিয়ে আসার পর দুর্যোধন বলেছিলেন, ‘আচার্য! আপনি যদি আমার প্রিয় সাধন করতে চান, তা হলে আমার আদেশে অশ্বত্থামাকে সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করুন।’

দুর্যোধনের আদেশ অনুসারে কৃপাচার্য দ্রৌণির মাথায় অভিষেকের জল ঢেলে তাঁকে অভিষিক্ত করেছিলেন সেনাপ্রধানের পদে। কোনো মন্ত্র উচ্চারণ না হলেও, কোনো স্তুতি গান বা কোনো তুরি, ভেরী বাদ্যের উপস্থিতি না থাকলেও সমাধা হল অভিষেক পর্ব। আর সেই মুহূর্তেই অশ্বত্থামা স্থির করে নিয়েছিলেন আজকের যুদ্ধে তাঁকে জয়লাভ করতেই হবে।

অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য, কৃতবর্মা এসে পৌঁছলেন দুর্যোধনের কাছে নিশীথ যুদ্ধ জয়ের পর। দুর্যোধনের দেহে প্রাণ অবশিষ্ট রয়েছে। কিন্তু তাঁকে আরও বেশি যন্ত্রণাদগ্ধ লাগছে, প্রায় সংজ্ঞাহীন তিনি। অচৈতন্য দুর্যোধনের সমীপে খানিকক্ষণ বিলাপ করলেন কৃপাচার্য। আর কৃপাচার্যের পরে অশ্বত্থামাও, যে বিলাপের অধিকাংশ অংশ জুড়েই রইল ধিক্কার আর পাণ্ডবদের প্রতি ঘৃণা।

বিলাপ, ধিক্কার ইত্যাদির পর অশ্বত্থামা উত্থান করলেন আসল সংবাদ। তিনি বললেন, ‘গতরাত্রে পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশ করে আমি পাঁচ উপপাণ্ডবকে হত্যা করেছি। হত্যা করেছি ধৃষ্টদুম্ন এবং তাঁর পুত্রদেরও।’

অশ্বত্থামার নিয়ে আসা সংবাদ কয়েক মুহূর্তের জন্য সংজ্ঞা ফিরিয়ে আনল হতচেতন দুর্যোধনের শরীরে। পাণ্ডবদের বংশবীজ একটি সন্তানও আর জীবিত নেই, এই সুসংবাদ নিঃসন্দেহে দুর্যোধনের ছিন্নভিন্ন হৃদয়ে শীতলতা প্রদানের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু কোনো উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ করলেন না তিনি। শুধু স্থির শীতল দৃষ্টিতে অশ্বত্থামার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমরা তিনজনে মিলে আজ আমার জন্য যা করলে তা ভীষ্ম, দ্রোণ বা কর্ণও করতে পারেননি। পাণ্ডবপক্ষের সেনাপতি ধৃষ্টদুম্ন, শিখণ্ডী প্রমুখদের যে তুমি হত্যা করতে পেরেছ তাতে আমি নিজেকে ইন্দ্রের মতো মনে করছি। তোমরা যাও এখন। তোমাদের ভালো হোক। পুনরায় আবার আমাদের দেখা হবে স্বর্গলোকে।’

মারা গেলেন দুর্যোধন। তাঁর জাগতিক নিথর দেহ পড়ে রইল ভূতলে। অশ্বত্থামা এবং বাকিরা সেই প্রাণহীন দেহকেই আলিঙ্গন করলেন শেষবারের মতো। অতঃপর দুর্যোধনের মৃতদেহের দিকে বারবার তাকাতে তাকাতেই প্রত্যাগমনের উদ্দেশ্যে নিজেদের রথে আরোহণ করলেন তাঁরা।

ঠোঁটে লিপস্টিকটা বুলিয়ে খচ করে একটা সেলফি তুলল রুকমি। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভালো করে দেখল। ওর দুই চোখে আজ ক্ষণে ক্ষণে খেলে যাচ্ছে লজ্জার লালচে আভা। নিজেকে কেমন যেন গোপন অভিসারিণীর মতো লাগছে। উফফ! সত্যি অম্লানটা একটা পাগল। ওর যে কখন কী খেয়াল চাপে!

হু-হু করে রুকমির মনে পড়ে যাচ্ছে পুরোনো দিনের কথাগুলো। অম্লান পাড়ারই ছেলে বা বলা ভালো পাড়ার অন্যতম সেরা ছেলে। টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম ছেলেটা দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই পড়াশোনায় দুর্দান্ত। তবে বেশ আত্মসচেতন। মেয়েদের ওকে নিয়ে হাজারো কৌতূহল থাকলেও অম্লান কখনো নিজেকে উন্মুক্ত করেনি। বরং একটা প্রচ্ছন্ন অহংকার ঘিরে থাকত তাকে। অনেক মেয়ের মতোই রুকমিরও ভালো লাগতে শুরু করেছিল অম্লানকে।

ঠিক কবে থেকে যে এই ভালো লাগার শিরশিরে অনুভূতিটা মনে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটা আজ আর ভালো করে মনে পড়ে না রুকমির। শুধু মনে পড়ে অম্লানকে দেখলেই সে সময় মনের মধ্যে ভালো লাগার একটা ঢেউ খেলে যেত ওর। বারবার ওকে দেখতে ইচ্ছে করত। সুযোগ পেলেই লুকিয়ে লুকিয়ে অম্লানকে দেখতও রুকমি। সে পাড়ার কোনো ফাংশান হোক কি দুর্গাপুজোর ভাসান। সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি হোক কি পাড়ার ক্রিকেট টুর্নামেন্ট।

তবে অম্লানকে ভালো লাগলেও ওর সামনে গিয়ে সে কথা জানানোর ভাবনা কোনোদিনই রুকমির মাথায় আসেনি। রুকমিও তো আর ফেলনা নয়। ওরও যথেষ্ট ভালো মেয়ে হিসেবে নাম আছে। দেখতে সুন্দর, পড়াশোনাতেও বেশ ভালো।

কিন্তু অদৃষ্ট যাদের বন্ধনে বেঁধে পাঠিয়েছে তাদের তো বাধা পড়তেই হয়। রুকমি আর অম্লানও বাধা পড়েছিল। অম্লান নিজেই একদিন ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল রুকমিকে। কে জানে পাকা ছেলেটা হয়তো বুঝতে পারত যে রুকমি ওকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে। কিংবা হয়তো নিজে থেকেই ওর মন দুর্বল হয়ে পড়েছিল রুকমির প্রতি। সে কারণ যাই হোক না কেন, মোট কথা রুকমি আর অম্লানের বন্ধুত্বটা শুরু হয়েছিল ফেসবুক থেকেই।

রুকমি ওর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা নিয়ে নেওয়ার পর মেসেঞ্জারে অম্লানই প্রথম হাই লিখেছিল ওকে। উত্তেজনা, ভালো লাগা আর অল্প ভয় এই সবক’টা অনুভূতি একসঙ্গে সেদিন আচ্ছন্ন করেছিল রুকমিকে। তবুও দুরুদুরু বুকে ও শুরু করেছিল কথোপকথন। সেই ছিল শুরু। তারপর আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব, আর সেই বন্ধুত্বটাই কখন যেন বদলে গেল একে অপরের প্রতি অপরিহার্যতায়।

দুই পরিবারই এখন জানে ওদের সম্পর্কের কথা। কোনো তরফ থেকেই কখনো কোনো আপত্তি আসেনি। আসার কোনো প্রশ্নই ছিল না। বরং সকলে ওদের সম্পর্কটা জানার পর বলেছিল ওদের সম্পর্ক একেবারে রাজযোটকের সম্বন্ধ।

তারপর পেরিয়ে গেছে বহু সময়। অনেক চড়াই উতরাই এসেছে ওদের জীবনে। অম্লানের বিদেশ যাওয়া, রুকমির অভিমান, আবার অম্লানের ফিরে আসা। কিন্তু সম্পর্কটা ভেঙে পড়েনি। রুকমির পরিবারের সকলে চান মেয়ের রিসার্চটা সম্পন্ন হলেই মিটে যাক বিয়েটা। রুকমির নিজেরও তো সেরকমই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এই অম্লানটা হঠাৎ করে এমন পাগলামি শুরু করল! লুকিয়ে লুকিয়ে রেজিস্ট্রি সেরে রাখতে চায় পাগলটা! কখন যে ওর মাথায় কী চলে সেটা বুঝতে পারা সত্যিই ভারি মুশকিল।

রুকমির যে অম্লানের এই পাগলামিতে সায় দেওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল তা একেবারেই নয়, কিন্তু এটাও তো ঠিক যে ওই পাগলটার কোনো ইচ্ছেতেই না বলতে পারে না ও। তাই তো আজ বাড়ির সকলকে মিথ্যা অজুহাত দিয়ে ও অম্লানের সঙ্গে বেরোচ্ছে। গন্তব্য রেজিস্ট্রি অফিস। না আজকেই বিয়ে নয়, আজকের উদ্দেশ্য হল রেজিস্ট্রির নোটিশ দেওয়া।

ঝিম ঝিম করে ঝঙ্কার তুলে বাজছে রুকমির মোবাইলটা। স্ক্রিনের নম্বর জানান দিচ্ছে ফোন করছেন অম্লানবাবু৷ লাজুক হেসে ফোন কানে চাপল রুকমি।

‘আমি রেডি স্যার। আপনার আজ্ঞা হলেই বেরিয়ে পড়ব।’ হালকা হেসে বলল ও।

‘হুম বেরো। তবে রেজিস্ট্রি অফিসে যাব না এখন।’ ওপারে অম্লানের স্বর গম্ভীর।

‘মানে? ইয়ার্কি মারছিস নাকি তুই?’ বিস্ময়, বিরক্তি সব একসঙ্গে বেরিয়ে এল রুকমির গলা থেকে।

‘রেজিস্ট্রি অফিস পরে যাব। তার আগে যাব জিতদার কাছে। ডক্টর অরিজিত দাশগুপ্ত। আমার স্কুলের বন্ধু শ্লোকের দাদা।’

‘অরিজিত দাশগুপ্ত?’ নামটা কিঞ্চিৎ চেনা ঠেকল রুকমির। একটু স্মৃতিতে আলো ফেলতেই ঝটিতি মনে পড়ে গেল। অরিজিত দাশগুপ্ত তো নামী সায়কায়াট্রিস্ট। তাঁর কাছে কেন যেতে চাইছে অম্লান?

‘আমি যতদূর জানি উনি তো সায়কায়াট্রিস্ট। তুই ওঁর কাছে কেন যাবি?’

‘কারণ, আমার একজন সায়কায়াট্রিস্টকে সত্যিই প্রয়োজন। মনে আছে রুকমি, আমি একবার তোকে বলেছিলাম, আমার চোখে প্রায়ই কিছু অদ্ভুত স্বপ্ন বারবার ফিরে আসে। মনে হয় আমি একটা এমন সময়ে পৌঁছে গেছি যে সময়টা আসলে অনেক আগে পৃথিবীর বুক থেকে শেষ হয়ে গেছে। আমি এমন অনেক কিছু দেখতে পাই যেগুলো ঠিক নরম্যাল নয়। সুবিশাল এক যুদ্ধক্ষেত্র, সেখানে এক নিষ্ঠুর মৃত্যুমিছিল। তারপর আরও দেখতে পাই, আমার পায়ের কাছে বসে একজন মানুষ আকুল হয়ে কাঁদছে। আরও আছে। দেখি একটা অচেনা বদ্ধ গুহায় কি যেন হাতড়ে বেড়াচ্ছি আমি, না মানে আমি না। আমরা। তুইও থাকিস সেখানে।’

‘কেন? কেন এসব স্বপ্ন দেখব আমি বারবার? এমন নয় তো আমার কোনো গভীর মানসিক সমস্যা আছে? এই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্যই আমি সায়কায়াট্রিস্টের কাছে যেতে চাই এবং সেটা আমাদের রেজিস্ট্রি বিয়ের আগেই।’

‘কিন্তু অম্লান তা বলে এভাবে...’

রুকমিকে কথা শেষ করতে দিল না অম্লান। তার আগেই শক্ত গলায় বলল, ‘আশা করি তুই অন্তত আমার পাশে থেকে আমায় সাপোর্ট করবি। সেজন্য এই কথাগুলো আমি শুধু তোকেই বলেছি। ছোটবেলায় মাকে বলতাম। কিন্তু মা কোনোদিন সাপোর্ট করেননি আমায়, কখনো বুঝতেই চাননি। তাছাড়া অরিজিতদা বন্ধুর দাদা। তিনি আমার সঙ্গে তথাকথিত পেশাদারদের মতো ব্যবহার করবেন না হয়তো। ভাই হিসেবে সৎ পরামর্শই দেবেন।’

রুকমি অনুভব করতে পারল অম্লানের গলার মধ্যে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে। ওর হয়তো সত্যিই একজন সায়কায়াট্রিস্টের প্রয়োজন।

‘বেশ আমি যাব। দেখা যাক কী বলেন তিনি।’ কেটে কেটে কথাগুলো উচ্চারণ করল রুকমি।

‘থ্যাংক ইউ। আমি জানতাম তুই আমায় ঠিক বুঝবি।’ ফোন কেটে দিল অম্লান। রুকমির ভুরুতে নেমে এসেছে ঘন ভাঁজ। অনেকগুলো প্রশ্ন একসঙ্গে ঘুরপাক খাচ্ছে ওর মাথায়।

আজ আবার উৎসবের পরিবেশ পাহাড় ঘেরা অখ্যাত গ্রামটিতে। বাজনা বাজছে, আনন্দ হচ্ছে। সে তো হওয়ারই কথা। আজ যে ওদের ভগবানের বিহা। হ্যাঁ, এই পার্বত্য বুনো উপজাতির কাছে নেরুয়া তো এখন ভগবানই। সে ঈশ্বরের দেখা পেয়েছে, ঈশ্বরের কৃপা পেয়েছে। তাই তো এখন সে মিরাকল বাবা। তার নাম আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানা প্রান্তে। হয়তো পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোতেও মিরাকল বাবার কথা ছড়িয়ে পড়বে একদিন। একদল চেলা তাকে সর্বদা ঘিরে থাকে। এরাই তো নেরুয়ার বানানো মিরাকল পৌঁছে দেয় মানুষের কাছে। নেরুয়া কারো সামনে যায় না সচরাচর।

আজ নেরুয়ার বিয়ে। যে মেয়েকে সে বিয়ে করতে চেয়ে এসেছে বরাবর তার সঙ্গেই নিয়ম মেনে সম্পর্কে আবদ্ধ হতে চলেছে সে। ঝিমনাইকে বিহা করবে আজ নেরুয়া। নেরুয়ার ঠোঁটের ডগায় জিতে যাওয়ার একটা হাসি। ঝিমনাই খুব চালাক ভাবত নিজেকে। ভেবেছিল ভেকুলার হাত ধরে কেটে পড়বে চুপিচুপি। পালিয়ে যাবে শহরে। খুব লোভ ওর ওই ভদ্দর সমাজের প্রতি। ওই সব বাবুদের সঙ্গে গা ঘষাঘষি করার বড় শখ।

ঝিমনাই পাত্তাই দিত না কোনোদিন নেরুয়াকে। কথা বলতে এলেও ভালো করে জবাব দিতে চাইত না সে। বারবার ছুটে পালিয়ে যেতে চাইত। সেসব দিনের কথা নেরুয়া কি ভুলে গেছে নাকি! কিচ্ছু ভোলেনি ও। সব মনে আছে ওর। আর মনে আছে বলেই কড়ায়-গণ্ডায় হিসেব চুকিয়ে নেবে এবার।

নেরুয়াকে পাত্তা দিত না, কিন্তু ভেকুলার সঙ্গে হাসি মুখে লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলত ঝিমনাই। বেশ কয়েকবার দেখতে পেয়ে গেছিল নেরুয়া। সকলের চোখ এড়িয়ে যে ওদের মধ্যে বেশ পিরিত দানা বাঁধছে এটাও বুঝতে পারত। বুকের ভেতর জ্বালা করত বিশ্রীভাবে। কিন্তু কিচ্ছু করে উঠতে পারত না ও। যখন এই অপমান কষ্ট দিত ওকে, ও তখন ছুটে যেত গিরিবাবার থানে। মাথা ঠুকত, চোখের জল ফেলত। বারবার একটাই প্রশ্ন করত, ‘এর কি কোনো বিহিত হবে না?’ তখন কি আর ও বুঝতে পেরেছিল গিরিবাবা সত্যিই দেখা দেবেন ওকে! নিজের কাজের জন্য ওকেই দায়িত্ব দেবেন!

ভগবানের দেখা পেলে, তাঁর কৃপা পেলে জীবন তো বদলাতে বাধ্য। আর সেজন্যই বদলে গেল নেরুয়ার জীবন। যে ঝিমনাই ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকত সেই মেয়েকেই এবার কবজা করে ফেলেছে নেরুয়া। বউ বানিয়ে ঘরে নিয়ে যাবে একেবারে।

বিহা চলছে। ঝিমনাইকে প্রথা মতো লতা, গুল্ম দিয়ে সাজানা হয়েছে। পরনে তার লাল চেলি, চুল এলো করা। যেমন ভাবে ওদের বুনো আদিবাসীদের বিহা হয়, ঠিক সেভাবেই চলছে সব কিছু। নেরুয়া বাঁকা চোখে দেখল একবার ঝিমনাইয়ের দিকে। মুখটা কালো হয়ে আছে। কষ্টের ছায়া সুস্পষ্ট। ঝিমনাইয়ের কষ্টটা বুঝতে পেরে বুকের ভেতর তৃপ্তি জাগল নেরুয়ার। এই তো সবে কষ্ট পাওয়ার শুরু। এখনো অনেক কিছু বাকি আছে যে...

বুকের ভেতর উথালপাথাল করছে ঝিমনাইয়ের। শেষ অবধি নেরুয়ার সঙ্গেই বিহাটা হয়ে গেল ওর। যে লোকটা ওর দুই চোখের বিষ ছিল, সে লোকটাই হল শেষ অবধি ওর ঘরের মানুষ! নেরুয়া খুব ভালো করেই জানে ঝিমনাই ওকে মোটেই পছন্দ করে না। ও এটাও নিশ্চিত জানে ঝিমনাইয়ের মনের মধ্যে অন্য একজনের নাম লেখা আছে। সব জেনে শুনেও এই বিহাটা করছে ও। কারণ ও জানে আজ ওদের এই ছোট্ট জগতে ও সর্বেসর্বা। ওকেই ভগবান মানছে সবাই। তাই ও যাকে ইচ্ছা বিহা করতে পারে, ও যা খুশি তাই করতে পারে। ওকে আটকানোর মতো কেউ নেই আজ।

নিজের প্রভাব খাটিয়ে, নেরুয়া জোর করে দখল করে নিল ঝিমনাইকে। ঝিমনাই কিচ্ছু করতে পারল না। চোখ দিয়ে প্রায় জল বেরিয়ে আসছে ওর। বুকের ভেতর দলা পাকানো কষ্টটাকে ও আর চেপে রাখতে পারছে না। কেন গিরিবাবা এমন করলেন ওর সঙ্গে! ওর চোখেও যে অনেক লুকোনো স্বপ্ন ছিল, বুকের মধ্যে জমানো অনেক ইচ্ছে ছিল, সবগুলো আজ এক ধাক্কায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল৷

গিরিবাবা তো সবার কথা শোনেন। তাহলে কেন ঝিমনাইয়ের কথা শুনলেন না তিনি? কেন নেরুয়ার মতো একটা বদমাশকে তিনি দয়া করলেন? কেন ওকেই বেছে নিলেন কাজের জন্য? এই কথাগুলোই প্রতি মুহূর্তে ফিরে ফিরে আসছে ঝিমনাইয়ের মাথায়। নেরুয়া যে মোটেই ভালো লোক নয়, তা ঝিমনাই বেশ জানে। ওর হিংস্র স্বভাবের কথা আজ সবাই ভুলে গেলেও ঝিমনাই কিছুই ভোলেনি। তাই ও বুঝতে পারছে নেরুয়া ওকেও সহজে ছেড়ে দেবে না। ও যে এক সময় এই নেরুয়াকে একেবারে দূর-ছাই করত সে কথাও নিশ্চয় ভোলেনি সে। ঝিমনাইয়ের মন বলছে সে সব দিনের বদলা এবার যেন তেন প্রকারে নিতে চাইবেই ওই লোকটা।

লোকগান চলছে। সবাই মিলে গাইছে। এমনটাই হয় ওদের এই অনুষ্ঠানগুলোয়। আচমকা বাড়ল গানের লয় কারণ আজকের অনুষ্ঠানের মাহেন্দ্রক্ষণ এবার উপস্থিত। নিজের হাত কেটে সেই রক্ত দিয়ে ঝিমনাইয়ের কপালে তিলক এঁকে দিল নেরুয়া। সম্পন্ন হল বিহা। এই প্রথাই চলে আসছে ওদের। এবার ঝিমনাইয়ের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। কান্না আর ধরে রাখতে পারছে না সে। সবাই উল্লাস করছে। নাচছে, গাইছে। হাত তুলে দোয়া করছে ঝিমনাই আর নেরুয়াকে। এবার চারদিকে একবার চোখ বোলাল ঝিমনাই। প্রায় সবাই রয়েছে সেখানে। শুধু একজন নেই। ভেকুলা। ঝিমনাই জানত ভেকুলা থাকবে না। এসব ও কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না।

‘ভেকুলা, তোর ঝিমনাই পর হয়ে গেল রে! এবার থেকে সে নেরুয়াবাবুর সম্পত্তি। তুই পারলি না বাঁচাতে তোর ঝিমনাইকে। যদি একটু সাহস করতে পারতিস তাহলে বেঁচে যেত তোর ঝিমনাই। কিন্তু এবার থেকে বেঁচে মরে থাকবে সে। আর তার জন্য দায়ী থাকবি শুধু তুই’...এই কথাগুলোই চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে ওর। কিন্তু আজ থেকে ইচ্ছে শব্দটা ওর কাছে মৃত। তাই সব ইচ্ছেকে মেরে ফেলার অভ্যাস শুরু করে দিয়েছে ঝিমনাই। আজ থেকেই, এখন থেকেই।

পুব আকাশে সদ্য জেগে ওঠা সূর্যের আলোয় লালচে আভা মেখে শুরু হতে চলেছে আবার এক নব প্রভাত। কিন্তু এ প্রভাত তো রাতের চেয়েও ভয়ংকর বোধ হচ্ছে পাণ্ডবদের কাছে। সকাল হতেই শোক সংবাদ এসে পৌঁছেছে। ধৃষ্টদুম্নের সারথি, যিনি শত্রুপক্ষের ভয়াল অতর্কিত আক্রমণের হাত থেকে কোনো রকমে রক্ষা করতে পেরেছেন নিজের প্রাণ, তিনি দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছেন প্রথম পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের সন্নিকটে। তিনিই জানিয়েছেন গত রাতের বীভৎস হত্যালীলার কথা। তিনি বিবৃত করলেন ধৃষ্টদুম্ন, শিখণ্ডী ও অন্যান্যদের সঙ্গে পাঁচ উপপাণ্ডবের নৃশংস মৃত্যুর বিবরণ। দুঃসংবাদের আকস্মিকতাটা সহ্য করতে পারলেন না প্রথম পাণ্ডব। সংজ্ঞা হারিয়ে প্রায় টলে পড়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর অনুজেরা কোনোরকমে স্বস্থানে বসিয়ে দিলেন তাঁকে। শোকার্ত যুধিষ্ঠির মগ্ন হলেন বিলাপে। তিনি বললেন, ‘দৈবদোষ এরকমই হয়। যে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে আমরা বৃহৎ জয় লাভের আনন্দ উদযাপন করছিলাম, সে জয়ই পরিণত হল এমন মর্মান্তিক পরাজয়ে!’

যুদ্ধ শিবিরের দিকে এগোলেন তাঁরা। শিবিরে পড়ে রয়েছে পাণ্ডব পুত্রগণ ও বাকি পরিজনদের দেহ। চিরনিদ্রায় নিথর পাঁচ উপপাণ্ডব— প্রতিবিন্ধ্য, সুতসোম, শ্রুতকর্মা, শ্রুতসেনা ও শতানিক। সন্তানদের, ভ্রাতাদের এরূপ ক্রূর মৃত্যুশোকে বিহ্বল সম্রাজ্ঞী পাঞ্চালীও। শোকের প্রাথমিক অভিঘাত কাটিয়ে তিনি গর্জে উঠলেন। যুধিষ্ঠিরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘হে মহারাজ, আমার পুত্র ও ভ্রাতাদের হত্যাকারী, মহাপাপী অশ্বত্থামাকে যদি আপনি বধ না করেন, তবে আমি প্রাণত্যাগ করব।’

হত্যার বদলে হত্যা, এরূপ প্রতিশোধস্পৃহা এড়িয়ে যেতে চাইলেন প্রথম পাণ্ডব। এই মৃত্যু মিছিল, এই হত্যালীলার কি কোনো শেষ হবে না? আর কত প্রাণকে বলি হতে হবে? তিনি কৃষ্ণাকে বললেন, তোমার পুত্র এবং আত্মীয়েরা নিহত হয়েছে ক্ষাত্রধর্ম অনুসারে। আর দ্রোণপুত্র কোথায় কোন দুর্গম স্থানে আত্মগোপন করেছেন সে তথ্যও জানা নেই আমার। তাহলে তাঁকে এখন খুঁজে পাই কীভাবে?’

পাঞ্চালী আজ আহত বাঘিনীর মতো নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছেন। ক্রূর হেসে তিনি বললেন, ‘অশ্বত্থামার মস্তকে এক সহজাত মণি আছে না, যা স্যমন্তক মণির সমগোত্রীয়? অশ্বত্থামাকে বধ করে সেই মণি নিয়ে এসে আমার সম্মুখে উপস্থিত করলে তবেই আমি জীবনত্যাগের ভাবনা থেকে বিরত হব।’ এবার দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীমের দিকে তাকালেন তিনি। কাতর অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে ভীমকে বললেন, ‘হে দ্বিতীয় পাণ্ডব, আজ আপনিই আমার সহায় হন। ক্ষাত্র ধর্ম স্মরণ করে আমাকে ত্রাণ করুন। অশ্বত্থামাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করুন।’

দ্বিতীয় পাণ্ডবের কাছে পাঞ্চালী প্রাণাধিক প্রিয়। তিনিই কীচকের কু-অভিসন্ধির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন কৃষ্ণাকে, আবার তিনিই দুঃশাসনের ছাতি চিরে রক্ত দিয়ে পাঞ্চালীর কেশ ধৌত করেছিলেন তাঁর অপমানের প্রতিশোধ নিতে। আজও তাই সম্রাজ্ঞীর অনুরোধ মাত্রই তিনি রওনা দিলেন দ্রৌণির অনুসন্ধানে। সারথি স্বরূপ সঙ্গে নিলেন নকুলকে।

অশ্বত্থামার বিরুদ্ধে ভীমের একা চলে যাওয়াটা শ্রীকৃষ্ণ অনুমোদন করতে পারলেন না। ভীমের মতো মহান যোদ্ধার সম্মুখে অশ্বত্থামা নেহাতই তুচ্ছ এ কথা যেমন ঠিক, তেমনই এটাও ঠিক, দ্রোণপুত্রের কাছে রয়েছে এক বিধ্বংসী অস্ত্র যার নাম ব্রহ্মশির। তৃতীয় পাণ্ডবের অস্ত্র পারদর্শিতায় মুগ্ধ হয়ে দ্রোণাচার্য তাঁর প্রিয় অর্জুনকে এই অস্ত্র প্রয়োগ ও সংবরণের কৌশল শিখিয়েছিলেন। আর তাই দেখে দ্রৌণি খানিকটা অসূয়াবশতই তাঁর পিতার কাছে চেয়েছিলেন ব্রহ্মশির।

দ্রোণাচার্য পুত্রের এই প্রার্থনায় খুব একটা সন্তুষ্ট হননি। কারণ, তিনি জানতেন তাঁর পুত্রের হৃদয় স্বার্থ, লোভ ও মাৎসর্য দ্বারা আচ্ছন্ন। তাই পুত্রকে এই অস্ত্র প্রয়োগের শিক্ষা প্রদান করলেও তিনি তাঁকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি যুদ্ধে অতিশয় বিপন্ন হলেও এই অস্ত্র ব্যবহার করবে না। আর মানুষের ওপর তো নয়ই।’ পিতার উপদেশ শুনলেও তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি অশ্বত্থামা। তিনি এই অস্ত্রের প্রয়োগ শিখতে চেয়েছিলেন শুধুই নিজের স্বার্থে, নিজের শত্রুকে বিপন্ন করতে। অস্ত্র প্রয়োগের ফলাফল কী হতে পারে তা নিয়ে তিনি বিশেষ চিন্তান্বিত ছিলেন না। তাই এ অস্ত্র প্রয়োগের কৌশল তিনি মনোযোগ সহকারে আত্মস্থ করলেও, অস্ত্র সংবরণের কৌশল সঠিকভাবে শিখতে পারেননি।

অশ্বত্থামার অনুসন্ধানে ভীমের প্রস্থানের পর শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘দ্রোণপুত্র এক অতিশয় ক্রোধী পুরুষ। তাঁর মনটাও দুষ্ট। স্বভাবটাও নিষ্ঠুর ও চঞ্চল। অতএব তিনি কখন কী করবেন তা বলা যায় না। সুতরাং তাঁকে অনুসন্ধানের কাজে দ্বিতীয় পাণ্ডবের একাকী প্রস্থান করাটা একদমই ঠিক নয়। ভীম যদিও মহাবীর, তথাপি এখন আমাদের তাঁর সঙ্গে তাঁর সুরক্ষাকল্পে যাওয়া প্রয়োজন।’ কথাটা বলেই অর্জুন ও যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে রথে উঠলেন কৃষ্ণ।

‘কীরে কী ভাবছিস এমন উদাস হয়ে?’ ট্যাক্সিতে বসে অম্লানের হাতে অল্প চাপ দিল রুকমি।

‘কই কিছু না তো!’

‘বললেই হল? দেখছি তো কি যেন গভীরভাবে ভেবেই চলেছিস।’

‘না, আসলে ভাবছি কিছু একটা ধাক্কা দরকার।’

‘মানে? কীসের ধাক্কা?’

‘দেখ, কতদিন হয়ে গেল দেশে ফিরে এসেছি। নিজের মতো করে নিজের কাজও করছি, কিন্তু সেই ব্যাপারটা পাচ্ছি না।’ অম্লান অল্প মাথা ঝাঁকাল।

‘উফফ! তুই যে কী বলিস আমি কিছুই বুঝি না।’

‘আমি একটা সুযোগ খুঁজছি রুকমি। এমন একটা কিছু যাতে চ্যালেঞ্জ আছে। আমি এই এক গতানুগতিক কাজ, ভাইরাস নিয়ে কপচানি এরকম কিছু আর চাইছি না। আমি চাইছি এমন কিছু একটা চ্যালেঞ্জ যার মুখোমুখি হয়ে আমি নিজেকে যাচাই করে নিতে পারব। আমি ঠিক কতটা জানি, কতটা বুঝি এগুলোই পরখ করে নিতে পারব। আমি চাইছি নতুন কিছু আবিষ্কার করতে। নতুন কিছু খুঁজে পেতে, এমন কিছু যা আগে কেউ করেনি। যা আগে কেউ পারেনি। আমার সবটুকু বিদ্যা, শিক্ষা এগুলো কাজে লাগিয়ে আমি সকলের ভালো করতে চাই। জানি না ঠিক কী হবে, জানি না ঠিক কী ঘটবে, কিন্তু কেন জানি আমার মন বলছে কিছু একটা হবে। কিছু একটা ঘটবে যাতে আমাদের এই চেনাজানা হিসেবগুলো এক ধাক্কায় একেবারে এলোমেলো হয়ে যাবে।’

রুকমি এবার ফোঁস করে শ্বাস ফেলল একটা। অম্লানকে আজকাল একেবারেই বুঝতে পারে না ও। দিনদিন ছেলেটা কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। কী যে ও ভাবে, কী যে ও বলতে চায় সবই যেন অস্পষ্ট লাগে রুকমির।

সায়কায়াট্রিস্টের সঙ্গে কথা হয়েছে অম্লানের। রুকমিও ছিল সেখানে। অরিজিতদা খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন অম্লানের স্বপ্নের ব্যাপারটা। এখনও অরিজিতদার কথাগুলো যেন কানে বাজছে রুকমির।

‘দেখো অম্লান, স্বপ্নের অনেক রকম ব্যাখ্যা হয়। তবে তোমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। যেহেতু বহু বছর ধরে একই স্বপ্ন বা একই ধরনের স্বপ্ন তুমি বারবার দেখছ তাই ব্যাপারটা একটু আলাদা।

সাধারণত আমাদের মনোবিজ্ঞানে মনের তিন রকম স্তরের কথা মানা হয় সিগমন্ড সাহেবের থিওরি অনুসারে। কনশস, আনকনশাস এবং সাব-কনশাস৷ এই তিন ধরনের স্তর থাকে আমাদের মনে। এর মধ্যে আমাদের মনের তৃতীয় স্তর অর্থাৎ সাব কনশস মাইন্ড খুব বেশি সক্রিয় থাকে না। তবে মনের এই স্তরেই জমা হয়ে থাকে আমাদের নানা রকম অবদমিত ইচ্ছে, নানা নিষিদ্ধ প্রবৃত্তি বা অমূর্ত ভাবনা, যাদের সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল থাকে না আমাদের চেতন মন বা conscious mind. এই অবচেতন বা sub-conscious mind-এ জমে থাকা চিন্তাভাবনাগুলোই অনেক সময় আমাদের ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের আকারে প্রতিফলিত হয়। হয়তো তোমার অবচেতন মনে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কোনো চিন্তাভাবনাই এভাবে ইমেজ আকারে ক্রিয়েট হয়ে বারবার চলে আসছে তোমার স্বপ্নের আকারে। বা এমনও হতে পারে তোমার অনেক ছোটবেলায় বহুবার শোনা কোনো গল্প বা অনেক বার কোনো সিনেমা/নাটক দেখতে দেখতে বা শুনতে শুনতে তুমি তার কাহিনির সঙ্গে নিজেকে ভীষণ একাত্ম করে ফেলেছিলে।

তুমি তো ওয়ার্কিং পেরেন্টের সন্তান। যাদের বাবা-মা উভয়েই কর্মরত হন, তারা তো বাড়ির সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না, তাই অনেক সময় তাদের শিশুমন নিজের মতো একটা বন্ধ জগৎ তৈরি করে নেয়। সেই কাল্পনিক জগৎ নানা রকম ইমেজ ফর্ম করে নেয় তাদের অবচেতন মনে। আর সেই ইমেজগুলোই দৃশ্যের আকারে বা ঘটনার আকারে বাচ্চাদের স্বপ্নে চলে আসে। চাইল্ড সাইকোলজিতে এরকম একাধিক কেস স্টাডিজ আছে। তোমার ঘটনাটাও খানিকটা সেরকমই বলে মনে হচ্ছে আমার। তোমার মনের মধ্যে প্যারালাল একটা কাল্পনিক জগৎ তৈরি হয়েছিল শৈশবে, যে জগতের তুমিও একটা পার্ট। আর সেই জগতের দৃশ্যাবলীই মাঝে মাঝে স্বপ্ন হয়ে আজও ধরা পড়ছে তোমার স্বপ্নে।’

‘এই, তুই এবার কী ভাবছিস?’ রুকমিকে হালকা করে ধাক্কা মারল অম্লান।

‘ভাবছি আমাদের রেজিস্ট্রির নোটিশ ফাইনালি জমা তাহলে পড়েই গেল আজ। কেউ জানলও না। চুপিচুপি আমরা ঘটিয়েই ফেললাম ব্যাপারটা।’ শুকনো হাসি ফুটে উঠল রুকমির চোয়ালের ফাঁকে।

‘আমার কাছে মিথ্যা বলে পার পাবি ভেবেছিস? আর তাছাড়া মিথ্যা কথা বলাটাও একটা আর্ট। সবাই সুন্দর করে বলতে পারে না। তুই তো পারিসই না, ধরা পড়ে যাস। কাজেই ঢপ না মেরে সত্যি করে বল কী ভাবছিলি?’

অম্লানের মুখের দিকে ভালো করে তাকাল রুকমি। সত্যিই এই ছেলেটাকে মিথ্যা বলার জো নেই একেবারে।

‘আমি অরিজিতদার কথাগুলো ভাবছিলাম। উনি তোর স্বপ্নের যে ব্যাখ্যাগুলো দিচ্ছিলেন ওগুলোই ভাবছিলাম। আচ্ছা এখনও কি ওসব স্বপ্ন দেখিস তুই?’

‘হুম।’ ছোট করে বলল অম্লান। রুকমিও চুপ করে গেছে। কী বলবে ঠিক বুঝতে পারছে না।

‘আচ্ছা রুকমি, তোর কী মনে হয়? অরিজিতদার কথাগুলো ঠিক?’

‘হ্যাঁ, ঠিকই হবে নিশ্চয়।’

‘তোর কী মনে হয়? আমার স্বপ্নের আর কী অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে?’

‘আমার কী মনে হবে বল? উনি সায়কায়াট্রিস্ট। আমি নিশ্চয় ওঁর থেকে বেশি জানব না।’

‘আমি সায়কায়াট্রিস্ট, সাইকোলজি, বিজ্ঞান এগুলোর কথা বলছি না। আমি জানি তুই ওগুলো বেশি বুঝিস না। কিন্তু তুই তো অন্য অনেক কিছু বেশি জানিস। ইতিহাস, মাইথোলজি, পুরাণ, দর্শন এগুলো নিয়ে অনেক পড়াশোনা আছে তোর। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় ভারতীয় দর্শন কী বলছে?’

‘আত্মায় সঞ্চিত থাকে সংস্কার। পূর্বজন্মের সংস্কার পরজন্মের আত্মায়ও প্রবাহিত হয়। আগের জন্মের সংস্কার সুপ্ত থাকে আত্মার গভীরে। হয়তো সেই সংস্কার বা স্মৃতিই অনেক সময় স্বপ্নের আকারে’...কথাটা শেষ করতে পারল না রুকমি। থমকে গেল মাঝপথেই। এসব কী উলটোপালটা বলছে ও! একে অম্লান মানসিকভাবে অস্থির হয়ে রয়েছে। তার মধ্যে এসব কথা শুনলে ওর মনের অস্থিরতা আরও বেড়ে যেতে পারে।

‘কী হল বল। থামলি কেন?’ অম্লান রুকমির চোখে চোখ রাখল। কী অদ্ভুত লাগছে ওর দৃষ্টিটা। কী অসম্ভব স্থির আর ঠান্ডা। যেন এ রুকমির চেনা সেই প্রেমিকই নয়। একেবারে অন্য কেউ। ভয় লাগল রুকমির। ওর চেনা অম্লান কি তাহলে অজানা কোনো কারণে বদলে যাচ্ছে একটু একটু করে?

‘মিরাকল বাবা? কে এই মিরাকল বাবা?’ রাহুল ওর বাবাকে ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করল।

‘ইনি একজন ম্যাজিক ম্যান বেটা। একে কেউ দেখেনি কখনো। কিন্তু এঁর কিছু এজেন্ট আছে, যারা এঁর ওষুধ বিক্রি করে। তবে খুব বেশি কেউ এঁর হদিশ জানে না। আসলে মিরাকল বাবা আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন। যত দূর জানা যায় ইনি থাকেন উত্তরাখণ্ডের কোনো এক রিমোট আদিবাসী গ্রামে। আমি খুব ফরচুনেট যে আমি তাঁর খবর পেয়েছি। তাই আমি উত্তরাখণ্ড যাব। যেভাবে হোক ওঁর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করব। দেখা না পেলেও আমি ওষুধ তো নিয়ে আসবই। তোমার মাকে আমায় ভালো করে তুলতেই হবে বেটা। আমি অনেক অবহেলা করেছি ওকে। কিন্তু আর নয়। ওকে ভালো করার জন্য আমি সব রকম চেষ্টা করব।’

বাবার চোখের অসহিষ্ণুতাটা পড়তে পারল রাহুল। লোকটা সারাজীবন স্বার্থপরের মতো জীবন কাটিয়েছে। শুধু নিজের ব্যবসা, টাকা রোজগার নিয়ে মেতেছিল। মায়ের দিকে কোনো দিন ভালো করে খেয়ালই করেনি। রাহুলকেও সময় দেয়নি কখনো। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসেনি ওর। নিজেরটুকু বুঝে নিতে রাহুল বরাবরই জানত। আফটার অল ওই বাপেরই তো ছেলে ও। কিন্তু যে নিজেরটুকু বুঝতে একেবারে অজ্ঞ ছিল সে রাহুলের মা আহেলি দেবী। পতিব্রতা স্ত্রী হয়ে স্বামীর ভালো চেয়ে তাঁর মন যুগিয়ে চলে এসেছে চিরকাল। বদলে পায়নি কিছুই। স্বামী কোনোদিন তার কথা ভাবেননি। নিজেকে উজাড় করে সংসার করতে করতে আজ মানুষটা মৃতপ্রায়। হাজার অসুখ, হাজার শারীরিক সমস্যা ঘিরে ধরেছে তাকে। তাই এখন টনক নড়েছে মিস্টার রাজগুরুর।

‘কী হল রাহুল বেটা? কিছু তো বল।’

রাহুল তাকাল বাবার দিকে। এই লোকটার দিকে কোনোদিনই তাকাতে ইচ্ছে করেনি ওর। স্বার্থপর মানুষ বলেই মনে হয়েছে বরাবর। আজ ভদ্রলোককে কেমন যেন অসহায় লাগছে।

‘যা ঠিক মনে হয়, যাতে মায়ের ভালো হবে তাই হোক।’ কথাটা বলেই নিজের ঘরের দিকে চলে গেল রাহুল।

ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল রাহুল। কি অদ্ভুত মিস্টার রাজগুরু! এই বিজ্ঞান, এই টেকনোলজির যুগে কিনা কোন এক মিরাকল বাবার প্রতি ভরসা করছে! লোকটা গোঁড়া, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এগুলো তো আগেই জানত রাহুল। কিন্তু তা বলে যে সে এমন কিছু আশ্চর্য কাজ করতে পারে সেটা মনে হয়নি কখনও।

রাহুল আজ প্রতিবাদ করতে পারত। চাইলেই লোকটাকে মুখের ওপর বলতে পারত, ‘ইয়ার্কি হচ্ছে? এই সায়েন্সের যুগে দাঁড়িয়ে মিরাকল বাবা!’ কিন্তু বলেনি ইচ্ছে করেই। কারণ মায়ের যা অবস্থা তাতে মানুষটা যে আর বাঁচবে না সেটা একেবারে সুনিশ্চিত। একের পর এক বড় বড় ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছেন। আর তার শারীরিক অবস্থা এতটাই দুর্বল হয়ে রয়েছে যে টানাহেঁচড়া করে বিদেশ নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হবে না। হয়তো তাতে সেই মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাবে মানুষটা। তার চেয়ে যা হচ্ছে হোক। কোনো মিরাকল বাবা কিছু মিরাকল করতে পারবে না এটা যেমন সত্যি, তেমন এটাও তো সত্যি যে, মা এই কথা শোনার পর থেকে নতুন করে বাঁচার আশা দেখছে। দুদিনেই অনেকটা উজ্জ্বল লাগছে তার চোখ-মুখ। এটাই বা কম কি! তাই যা হচ্ছে হোক। যে মানুষটাকে এমনিতেই যেতে হবে সে যদি যাওয়ার আগে একটু আশা খুঁজে পায়, তো পাক না! রাহুল তো সেটা কেড়ে নেওয়ার কেউ নয়।

শ্রীকৃষ্ণের রথ দ্রুত গতিতে এসে দ্বিতীয় পাণ্ডবের সাক্ষাৎ পেল। কিন্তু ক্রোধাগ্নি তাড়িত ভীমকে প্রতিহত করতে পারলেন না যুধিষ্ঠির, অর্জুন বা শ্রীকৃষ্ণ। দ্বিতীয় পাণ্ডব স্থানীয় ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসা করে জানতে পেরেছিলেন অশ্বত্থামা গঙ্গার দিকে গেছেন। সম্ভবত তিনি গঙ্গার তীরেই অবস্থান করছেন। ভীম তাঁর রথ ছোটালেন গন্তব্যের দিকে। তাঁকে অনুসরণ করলেন শ্রীকৃষ্ণ, প্রথম ও তৃতীয় পাণ্ডব।

অশ্বত্থামা সে সময়ে অবস্থান করছিলেন মহর্ষি দ্বৈপায়ন ব্যাসের আশ্রমে। তাঁর ক্রোধাগ্নি এখন প্রশমিত হয়েছে। গতরাতের নারকীয় হত্যালীলা স্মরণ করে এখন খানিক অনুশোচনাই হচ্ছে তাঁর। তিনি এখন নিঃস্বপ্রায়। হারিয়েছেন রাজ্যপাট। যে রাজসম্মান তিনি এতদিন উপভোগ করে এসেছেন আজ তা আর নেই। চলে গেছেন তার সর্বাপেক্ষা বড় শক্তির স্তম্ভ, তাঁর পিতা। মৃত্যু হয়েছে তাঁর বৃত্তিদাতা মিত্র দুর্যোধনের। ভগ্ন চিত্তে তিনি এখন উদাসীন। আসন্ন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভাবনা বিচলিত করছে তাঁকে। সাময়িক এই কাতরতায় তিনি এতই বৈরাগ্যবান যে কুশের কৌপীন পরিধান করেছেন অশ্বত্থামা। সারা দেহে ধূলি লেপন করে, ঘি মেখে বসে রয়েছেন ঋষির শিষ্যদের সঙ্গে।

অশ্বত্থামাকে সম্মুখে দেখতে পেয়ে অঙ্গারসম জ্বলে উঠলেন দ্বিতীয় পাণ্ডব। তাঁর চোখের সামনে চকিতেই ভেসে উঠল পাঁচ উপপাণ্ডবের রক্তাক্ত মৃতদেহ। স্মরণে এল শোকে কাতর পাঞ্চালীর উন্মাদিনীপ্রায় অবস্থা। এই পামর অশ্বত্থামার কারণেই তো আঠারো দিনের এই বিধ্বংসী যুদ্ধে বিজয়লাভের পরেও নিঃস্ব হলেন তাঁরা। ধনুকবাণ হাতে ভীম দ্রোণপুত্রের দিকে ধেয়ে গেলেন।

পাণ্ডবদের দেখতে পেয়ে অশ্বত্থামার মনে আবার ফিরে এল ঘৃণার অনুভূতি। তার সঙ্গেই হৃদয়ে জাগ্রত হল ভয়। তাঁর সম্মুখে মহাপরাক্রমী দ্বিতীয় পাণ্ডব এবং তাঁর সঙ্গেই রয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন। এঁদের সমগ্র শক্তির সামনে তো তাঁর মাথা তুলে দাঁড়ানোর চিন্তাই অকল্পনীয়। নিজের প্রাণ ও মান বাঁচাতে মুহূর্তের মধ্যেই তিনি স্থির করে নিলেন নিজের আশু কর্তব্য।

ব্রহ্মশির স্মরণ করা ছাড়া দ্রোণপুত্র আর কোনো উপায় খুঁজে পেলেন না। অলৌকিক এই অস্ত্রক্ষেপনের মন্ত্র উচ্চারণ করেই তিনি তাঁর মারণাস্ত্রের লক্ষ্য উচ্চারণ করে বললেন,’নিপাত যাক পাণ্ডবেরা।’ শেষ হয়ে যাক সব, মনে মনে ভাবলেন দ্রৌণি।

অস্ত্র ক্ষেপণের মুহূর্তে যে ক্রূরতা ফুটে উঠল অশ্বত্থামার মুখমণ্ডলে তা চোখ এড়ায়নি শ্রীকৃষ্ণের। তিনি অনুধাবন করতে পারলেন দ্রোণপুত্রের উদ্দেশ্য। নিজের মহাস্ত্র ধারণ করার জন্য তৎক্ষণাৎ অর্জুনকে নির্দেশ দিলেন।

‘গুরু দ্রোণাচার্য তোমাকেও যে মহাস্ত্র প্রদান করেছেন তা নিক্ষেপ করার এই উপযুক্ত সময়। অস্ত্র নিক্ষেপ করো অর্জুন। নিজেকে ও নিজের ভাইদের রক্ষার্থে নিক্ষেপ করো ‘ব্রহ্মশির।’

পৃথিবী কাঁপছে। যেন অসীম শক্তিশালী দুই প্রতিপক্ষ সংঘর্ষ করছে নিজেদের মধ্যে। সেই দুই প্রতিপক্ষ কোনো মানুষ নয়। কোনো দেব, দানব, দৈত্য, অসুর কেউ-ই নয়। তারা শুধুই দুই শক্তি। যে শক্তির আদি, অনন্ত কোথায় তা কিছুই জানে না অম্লান। দিনের উজ্জ্বল আলো ঢেকে গেছে অজানা কোনো অমঙ্গলের অন্ধকারে। চারপাশের পশু-পাখিরা আর্তনাদ করছে কাতর কণ্ঠে। যেন অজানা মৃত্যুর আশঙ্কায় প্রমাদ গুনছে তারা। আকাশ জুড়ে ঝলকে উঠছে বিদ্যুৎ। মনে হচ্ছে যে কোনো মুহূর্তেই যেন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। অম্লান যথারীতি কিছু বুঝতে পারছে না আজও। অথচ কেন জানি মনে হচ্ছে অনেকগুলো চোখ, অনেকগুলো মুখ আকুল হয়ে তাকিয়ে রয়েছে শুধু ওরই দিকে। তারা জানে, অম্লান কিছু একটা করতে পারবে। কোনো একটা উপায়ে এই ধ্বংস আটকাতে পারবে ও। কিন্তু কেন? অম্লান কী করে পারবে এই প্রলয় আটকাতে? কে ও? কী-ই বা ক্ষমতা ওর!

পিঁইইই...করে একটা শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল অম্লানের। ফোন বাজছে। কিছু একটা অদরকারি ফোন। তাই না ধরেই ফোনটা কেটে দিল অম্লান। চোখের মধ্যে এখনও লেগে রয়েছে স্বপ্নের ঘোরটা। আজকাল ওকে যেন বড্ড বেশি তাড়া করছে এই স্বপ্ন। তবে আজ শেষ হল না স্বপ্নটা। প্রতিদিন এর পরে আরও অনেক কিছু দেখতে পায় সে। একজন অচেনা রক্তাক্ত মানুষ ওর পায়ের কাছে বসে অশ্রুপাত করে। ভেসে আসে কোনো এক নারী কণ্ঠের আর্তনাদ। সেগুলো আজ দেখেনি অম্লান।

মোবাইলটা আবার বাজছে। এবার আর অদরকারি ফোন নয়। স্ক্রিনে ভাসছে রুকমির নম্বর।

‘হ্যাঁ বল’...ঘুম ঘুম গলায় বলল অম্লান।

‘কী, ঘুম ভাঙল বরমশাই?’ ফিসফিস করে বলল রুকমি।

ফাইনালি গত সপ্তাহে রেজিস্ট্রিটা সেরে ফেলেছে ওরা। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর উপস্থিতিতে, তাদের সাক্ষী রেখে ঘটে গেল পুরো ব্যাপারটা। কারো বাড়িতে এখনও কেউ জানে না। কবে জানানো হবে সেটাও ভাবেনি ওরা। অম্লানই রুকমিকে বলেছে এখনই এসব বাড়িতে বলার কোনো দরকার নেই। সময় হোক, তখন ভাবা যাবে।

‘এই কীরে? চুপ কেন?’ রুকমির গলায় হালকা উৎকণ্ঠা।

‘না মানে ওই’...

‘কোনো স্বপ্ন দেখছিলি নাকি?’ রুকমি যে মজা করছে, তা বুঝতে পারল অম্লান। কিন্তু তবুও গম্ভীরভাবে বলল, ‘হুম।’

‘নিশ্চয়ই আমায় নিয়ে দেখছিলি স্বপ্নটা। কি, ঠিক বললাম তো?’ হি-হি করে হাসছে রুকমি। এবার অল্প বিরক্তি লাগল অম্লানের। রেজিস্ট্রির পর থেকে রুকমির হয়েছেটা কী? সবসময় এত লঘু থাকে কেন ও? কোনো কিছুকেই যেন সিরিয়াসলি নিতে পারছে না আজকাল। ও কি জানে না কোন স্বপ্ন বারবার ফিরে আসে অম্লানের চোখে? সব জেনেও এমন করার মানেটা কী?

‘না তোকে নিয়ে দেখছিলাম না। তুই কি জানিস না আমি ঠিক কি স্বপ্ন দেখি? নাকি জানিস না আমি কতটা ডিস্টার্বড থাকি এগুলো নিয়ে? তোর কী হয়েছে বল তো আজকাল? কেন সব কিছু নিয়ে ইয়ার্কি করিস? কেন বুঝতে চাস না আমার প্রবলেমগুলো?’ গলার স্বরে বিরক্তি লুকোনোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করল না অম্লান। বরং বেশ রুক্ষভাবেই বলল কথাগুলো।

কয়েক মুহূর্ত চুপ ও প্রান্ত। তারপর মুখ খুলল রুকমি। কেটে কেটে বলল, ‘তুই হয়তো ভুলে গেছিস অম্লান নদিন আগে আমাদের রেজিস্ট্রিটা হয়ে গেছে। পৃথিবীর কেউ না জানলেও তুই তো সেটা জানিস। আর তাই নিশ্চয় এটাও মানিস, আইনত আমি এখন তোর স্ত্রী। আর যে কোনো স্ত্রীই চায় তার স্বামী ভালো থাকুক। আমিও তাই চাই। আমি চাই না যে, ওই স্বপ্নের ব্যাপারটা বারবার তোকে কষ্ট দিক, তোকে ভাবিয়ে তুলুক। তাই আমি ওটা নিয়ে আলোচনাই করতে চাই না। ওটা নিয়ে কেন বারবার আলোচনা করতে চাস তুই? কেন ভাবতে থাকিস ওই অর্থহীন স্বপ্নগুলো নিয়ে? ওগুলোকে মন থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা কর। তোর কি মনে নেই অরিজিতদা কী বলেছিলেন? এগুলো সব তোর অবচেতন মনের জমে থাকা ভাবনা বা তোর মনে তৈরি হওয়া কোনো কাল্পনিক জগতের প্রতিফলন।’

‘রুকমি, আই অ্যাম সরি।’ এবার স্বর নরম হল অম্লানের।

‘ঠিক আছে ছাড়। এখন রাখছি।’

‘না, রুকমি। শোন প্লিজ। আমার তোকে কিছু বলার আছে।’

‘বল।’

‘রুকমি আমি আমার ওই স্বপ্নের মানেটা একটু হলেও বুঝতে পেরেছি। ওটা কোনো অবচেতন মনের ভাবনা নয়। ওটা একটা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।’

‘মানে?’ ভীষণ অবাক হল রুকমি।

‘তুই হয়তো জানিস না, মানে কেউই জানে না প্রায়, একটা খুব বড় বিপর্যয় আসতে চলেছে।’

‘কী বিপর্যয়?’

‘একটা সাংঘাতিক ভাইরাস। এই ভাইরাসটা কি ভীষণ মারাত্মক তুই ভাবতে পারবি না। এই ভাইরাস যাদের আক্রমণ করে তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত লক্ষণ দেখা যায়। তাদের কপালের মধ্যভাগটা প্রথমে ফুলে যায়। তারপর সেই জায়গা ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। তারপর তাদের মৃত্যু হয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই ভাইরাসে এখনও অবধি আক্রান্তের সংখ্যা খুব কম। কিন্তু এই ভাইরাস প্রচণ্ড ভয়াবহ। এটা নিয়ে রিসার্চ চলছে, অনেক কিছুই এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, তবে এটুকু জানা গিয়েছে যে এই ভাইরাস মানুষের সঙ্গে মানুষের সংস্পর্শে ছড়ায়, আবার জল থেকেও ছড়ায় বলে মনে করা হচ্ছে। এই ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি এখনো বোঝা যায়নি, তাই অনেক তাবড় তাবড় ভাইরোলজিস্টরাও এ ব্যাপারে এখনো অন্ধকারে। যতদূর জানা গিয়েছে, এই ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল ভারত।

এই ভাইরাসকে চিনতে হবে রুকমি। জানতেই হবে এটা ঠিক কতটা শক্তিশালী। আর কোথা থেকেই বা শুরু হল এর যাত্রা। ভারতের ভাইরোলজি মন্ত্রক, স্বাস্থ্য মন্ত্রক এই ভাইরাস নিয়ে এখন উদ্বিগ্ন। এখনও পর্যন্ত এই ভাইরাসের প্রসার ব্যাপক ভাবে ছড়ায়নি। কিন্তু যেহেতু এটা কন্টাজিয়াস মানে ছোঁয়াচে, তাই ডালপালা মেলে সব কিছু গ্রাস করতেও এই ভাইরাসের খুব বেশি সময় লাগবে না। এর জন্মস্থান যে ভারত সে সংবাদ যদি একবার মিডিয়া জেনে যায়, যদি এই খবর বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে বুঝতে পারছিস আমাদের দেশ কতটা সঙ্কটের মুখে পড়বে? গোটা পৃথিবী সাময়িক ভাবে হয়তো ভারতকে ব্যানও করে দিতে পারে।

‘রুকমি, আমাকে এই ভাইরাসকে আটকাতে হবে। এর গ্রাস থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। কেউ না পারলেও আমায় এই অসাধ্য সাধন করতেই হবে। আর সেই ইঙ্গিতই বোধ হয় ঈশ্বর দিয়ে আসছেন আমায় ছোটবেলা থেকেই। হয়তো আমি তাই বারবার দেখি বিপন্ন পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য আমার দিকে হাত বাড়াচ্ছে অনেকগুলো মানুষ।’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল অম্লান।

রুকমির মাথার ভেতর ঝিমঝিম করছে। এগুলো কী বলছে ছেলেটা? এরকম মারাত্মক ভাইরাস জন্ম নিয়েছে এই দেশে? আক্রমণ করছে ও দেশের মানুষকে! এসব সাংঘাতিক খবর তো এখনও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছয়ইনি।

‘তোর মনে আছে, আমি কিছুদিন আগে তোকে বলেছিলাম আমি একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। আমি চাইছি নিজেকে অন্য ভাবে খুঁজে পেতে।’

‘হুম মনে আছে।’ গম্ভীর গলায় জবাব দিল রুকমি।

‘সেই সময়টা এসে গেছে। আমার মনে হচ্ছে খুব শিগগির আমি খুঁজে পাব সেই চ্যালেঞ্জ যেটা বদলে দেবে আমার জীবন। তুই পাশে থাকবি তো আমার?’

‘তোর পাশে ছিলাম, আছি, থাকব। যে-কোনো পরিস্থিতিতেই পাশে পাবি আমায়। কথা দিলাম আজ আরও একবার।’ দৃঢ় গলায় বলল অম্লান মুখার্জির সদ্য রেজিস্ট্রি করা বউ রুকমি মুখার্জি।

ঝিমনাই বালিশে মুখ গুঁজে শুয়েছিল। চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে বালিশ। ওর জীবনটা একেবারে নষ্ট হয়ে গেল। এই পাষণ্ড নেরুয়ার সঙ্গে বিহার বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে। তারপর থেকে জীবনটা আরও বেশি করে যেন নরকে পরিণত হয়েছে। গিরিবাবা কেন এমন করলেন ওর সঙ্গেই? আজকাল সব সময় মরে যেতে ইচ্ছে করে ওর। কী লাভ বেঁচে থেকে! শুধু নেরুয়ার মতো একটা শয়তানের ভোগের বস্তু হয়ে পড়ে থাকার জন্যই তো এখন বেঁচে থাকা। এছাড়া আর কিছু তো নয়! মাঝে মাঝে ঝিমনাইয়ের দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। এমন কোথাও যেখানে ওকে কেউ চেনে না। যেখানে নিজের মনের মতো করে নিঃশ্বাস নিতে পারবে ও। কারো ভয়ে ভয়ে বাঁচতে হবে না। কিন্তু তেমন কোনো সৌভাগ্য নিয়ে তো আর ও জন্মায়নি। ওর মতো অসহায় মেয়েদের এভাবেই বেঁচে থাকতে হয়।

মাঝে মাঝে গিরিবাবার থানে গিয়ে প্রশ্ন করে ঝিমনাই, ‘গিরিবাবা আমি কি এতই খারাপ? তুমি কেন এমন করলে আমার সঙ্গে? আচ্ছা গিরিবাবা, আমি যদি মরে যাই তাহলে কারো কষ্ট হবে না, তাই না?’

গিরিবাবার পাথরের বিগ্রহ, বোবা হয়ে থাকেন। আর ঝিমনাই নিজেই নিজের মতো করে উত্তর খুঁজে নেয়। নাহ, ও মরলে কারো কোনো দুঃখ হবে না। কেউ এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলবে না। মা-বাপের তো আরও অনেক বাচ্চা আছে। তাই একটা মরলেও কিছু কষ্ট হবে না ওদের। ওদের এসব বুনো জাতের বাপ-মায়েরা তো আর ভদ্দরলোকদের বাপ-মায়েদের মতো হয় না যে সন্তানদের খুব ভালোবাসবে। এদের কাছে বাচ্চা-কাচ্চা অতোটাও কিছু বড় ব্যাপার নয়। ওর বাপ-মা যদি ওকে একটুও ভালোবাসত তাহলে কি ওর কাতর কান্নায় একটুও গলত না ওদের মন!

কতবার তো বলল ঝিমনাই, ‘নেরুয়ার কাছে আমায় দিওনি গো। ওর কোনো মেয়েলোককে ভালোবাসার মতো পরানই নেই।’ কিন্তু কেউ শুনল না ওর কথা। সবার কাছে নেরুয়া এখন ভগবান। গিরিবাবা নিজে এসে দেখা দিয়ে গেছেন তাকে। আশীর্বাদ করে গেছেন। নির্দেশ দিয়ে গেছেন। কিন্তু ঝিমনাই এসব কথা একদম বিশ্বাস করে না। নেরুয়ার মতো শয়তানকে কোনোভাবেই গিরিবাবা দেখা দিতে পারেন না। আশীর্বাদ করতে পারেন না। নিজের কাজের জন্য বেছে নিতে পারেন না। ও মিথ্যা কথা বলছে। সবাইকে বোকা বানাচ্ছে।

ঝিমনাই সেদিন নেরুয়া আর ওর চেলাদের আলোচনা কিছুটা শুনে ফেলেছে। ভালো করে বোঝেনি ঠিকই, কিন্তু একেবারে যে বুঝতে পারেনি তাও নয়। আবছা বুঝলেও ঝিমনাই এটা আন্দাজ করেছে যে, নেরুয়া কিছু এমন একটা কাজ করছে যাতে অনেক মানুষের ক্ষতি হতে পারে। কি কাজ সে বিষয়ে ঝিমনাই নিশ্চিত নয়। কিন্তু কিছু তো একটা ব্যাপার আছে। কী ব্যাপার সেটা ঝিমনাইকে জানতেই হবে। যদি সত্যি নেরুয়া গিরিবাবার নাম নিয়ে অনেক মানুষের ক্ষতি করার মতো কোনো কাজ করে তাহলে কিছুতেই সেটা মেনে নেবে না ঝিমনাই। ও ওই শয়তানটার মুখোশ ফাঁস করে দেবেই। কিন্তু কে সাহায্য করতে পারে ওকে?

ভেকুলা! আচমকাই নামটা মাথায় এল ঝিমনাইয়ের। ভেকুলাকে কি লুকিয়ে একবার ডেকে পাঠাবে ও? কিন্তু ভেকুলা কী আসবে? তাকে কী করে ভরসা করবে ও? সে-ও তো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল ওর থেকে। ঝিমনাই তো পালিয়ে যেতেই চেয়েছিল তার হাত ধরে। কিন্তু কাপুরুষের মতো পালিয়ে গেল ভেকুলা। ভয় পেয়ে গেল নেরুয়াকে। বিহার পর থেকে মাত্র হাতেগোনা কয়েকবারই ভেকুলাকে দেখেছে ঝিমনাই। মুখ কালো করে ঘুরে বেড়ায়। ও মুখ দেখলেই বোঝা যায় বুকে একটা কষ্টের জমাট বাঁধা তাল নিয়ে ঘুরছে ও।

ঝিমনাইয়ের তো চিৎকার করে ওকে ডেকে বলতে ইচ্ছা করে, ‘কেন? কেন এমন করলি তুই? নিজেও মরে বেঁচে আছিস, আর আমাকেও জ্যান্ত মড়া বানিয়ে দিলি!’ এখনও ভেকুলার দেখানো স্বপ্নগুলো যেন চোখে লেগে আছে ঝিমনাইয়ের। এই বুনো জীবন ছেড়ে ওরা পালিয়ে যাবে শহরে। ভদ্দরলোকদের মতো করে বাঁচবে। ওদের মতো সংসার করবে। বাচ্চা হবে ওদের। তাদের ভদ্দরবাবুদের বাচ্চাদের মতো করে পড়ালেখা শেখাবে। এখানকার জংলি বাপ-মায়েদের মতো হবে না ওরা। নিজেদের বাচ্চাদের ওরা খুব ভালোবাসবে। বুকে করে আগলে রাখবে।

ভেকুলার সঙ্গে দেখা সেই স্বপ্নগুলোর কথা ভাবলে মাঝপথেই কেমন যেন আটকে যায় ঝিমনাইয়ের চোখের জল। এত যন্ত্রণার মধ্যেও ঠোঁটে ফুটে ওঠে হালকা হাসি। কিন্তু আজ নিজেকে সামলে নিল ঝিমনাই। সতেরো বছর বয়সের আদিবাসী বুনো মেয়েটা হঠাৎ যেন বড্ড বেশি পরিণত হয়ে গিয়েছে। এবার থেকে সব সময় খুব বেশি সজাগ থাকতেই হবে ওকে। জানতেই হবে ঠিক কোন নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে নেরুয়া।

ঝিমনাই জানে ওই লোকটার টাকার খুব লোভ। টাকার জন্য ও সব কিছু করতে পারে। প্রয়োজনে নিজেদের দেবতাকেও বেচে দিতে পারে। তাই গিরিবাবার নাম নিয়ে তেমন কিছু করছে না তো ও? এমন সত্যিটা খুঁজে বের করাই হবে ঝিমনাইয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য। ওর নিজের জীবনটা তো নষ্ট হয়েই গিয়েছে। কিন্তু আর কাউকে মরতে দেবে না ও। মানুষদের ক্ষতি হতে দেবে না। তাতে ও নিজে মরে মরুক। এমনিতেই বা বেঁচে থেকে কি আর করবে! তার চেয়ে ওর জীবনটা কোনো ভাল কাজে লাগলে মন্দ কি!

‘ঝিমনাই! এ ঝিমনাই’...চকিতে সাবধান হয়ে গেল ঝিমনাই। চোখের জল মুছে নিল কাপড়ের খুঁট দিয়ে।

‘কিরে তোকে আওয়াজ দিচ্ছি শুনতে পাসনি? নাকি নাগরের স্বপ্ন দেখছিলি?’ থু-থু। বিশ্রীভাবে একদলা থুতু ছেটাল নেরুয়া। অবশ্য এগুলো নিত্যদিনের ব্যাপার। এখন এগুলোর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে ঝিমনাই। কোনো উত্তর দিল না ও। নেরুয়ার দুই চোখ টকটকে লাল। পা দুটো টলছে। পোশাক প্রায় খুলে গিয়েছে। অর্ধ উলঙ্গ অবস্থা প্রায়। ঝিমনাই বুঝতে পারল নেরুয়া নেশা করে এসেছে। অবশ্য এখন এই নেশা একেবারে পেয়ে বসেছে লোকটাকে। রোজই আজকাল নেশা করে ফেরে নেরুয়া।

‘অমন কাঠের মতো দাঁড়িয়ে কেন? আয়। আয় বলছি।’ হুঙ্কার দিল নেরুয়া। তবুও ঝিমনাই নড়ছে না। ঘেন্নায় গা গুলোচ্ছে ওর।

‘তবে রে...তবে রে’...বলতে বলতে নেরুয়া নিজেই ছুটে এল ওর দিকে। হিংস্র হাতে টেনে খুলে নিল ওর পরনের কাপড়টাকে। এক ঝটকায় মেঝেতে ফেলে দিল নগ্ন ঝিমনাইকে। ঝিমনাইয়ের দুচোখ মুহূর্তের মধ্যে ভরে উঠল জলে। নেরুয়া পশুর মতো ভোগ করছে ওকে। রোজই তাই করে, আর এই মুহূর্তগুলোতেই রোজ মরে যেতে ইচ্ছে করে ঝিমনাইয়ের। কিন্তু আজ ভোগ্য হয়েও মরার কথা ভাবছে না ঝিমনাই। ওকে নেরুয়ার সত্যিটা জানতে হবে। সবটা না জেনে ও মরবে না কিছুতেই।

তৃতীয় পাণ্ডব নত মস্তকে মেনে নিলেন তাঁর পরম সখা ও ত্রাতা শ্রীকৃষ্ণের আদেশ। তিনি রথ থেকে নেমে সশ্রদ্ধ চিত্তে আপন মহাস্ত্র স্মরণ করলেন। তবে অস্ত্র নিক্ষেপের মুহূর্তে তিনি কারও অনিষ্ট কামনা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখলেন। এমনকি তাঁর গুরুপুত্র অশ্বত্থামার কোনো অমঙ্গল কামনাও তিনি করলেন না। তিনি নিজের মহাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন শুধুমাত্র অশ্বত্থামার মহাস্ত্রটি রুখে দেওয়ার জন্য।

শুরু হল অমিত শক্তিশালী দুই অস্ত্রের লড়াই। থরথর করে কেঁপে উঠল পৃথিবী। পশুপাখিরা আর্তনাদ করে উঠল কোনো ঘোর অজানা বিপদের আশঙ্কায়। চারদিকে ছেয়ে গিয়েছে ঘন কালো অন্ধকারে। আকাশের বুক চিরে ঝলকে উঠেছে বিদ্যুতের ঝলক। মনে হচ্ছে যে কোনো মুহূর্তেই ছত্রখান হয়ে যাবে ধরিত্রী। পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যাবে প্রাণের শেষ স্পন্দনটুকুও। প্রমাদ গুনলেন ব্যাসদেব, মহর্ষি নারদের মতো মহাঋষিরাও। সকলেই কোনো একটা সমাধানের প্রত্যাশী হয়ে দৃষ্টি ফিরিয়েছেন বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের প্রতি। তিনি ছাড়া এ ঘোর সঙ্কটে আর কে-ই বা সহায় হতে পারেন!

ব্যাসদেব ও মহর্ষি নারদ জানালেন, যে দেশে এক ব্রহ্মশির দ্বারা অপর এক ব্রহ্মশিরকে প্রতিহত করা হয় সে দেশে নেমে আসে ঘোর বিপর্যয়। সে দেশে বারো বৎসরের টানা অনাবৃষ্টি ঘটে। দুর্নিবার সংকটের সম্মুখীন হয় মানবজাতি। তাই মহর্ষিগণ দুই মহারথীকে নির্দেশ দিলেন আপন আপন ব্রহ্মশির ফিরিয়ে নিতে।

ব্যাসদেব ও মহর্ষি নারদের নির্দেশ পেয়ে অর্জুন তাঁর অস্ত্রের গতি কিঞ্চিৎ প্রশমিত করলেন। তিনি ঋষিদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে ঋষি আমার অস্ত্র প্রয়োগের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল অশ্বত্থামার অস্ত্রটিকে নিবৃত্ত করা। এছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য আমার একেবারেই ছিল না। আমি এই অস্ত্র ফিরিয়ে নিলে অশ্বত্থামা আমাদের সকলের প্রাণ নাশ করবেন। কিন্তু তবুও আমি অস্ত্র প্রত্যাহার করছি। এবার অশ্বত্থামাকে আপনারা নিবৃত্ত করুন।’ অর্জুন অস্ত্র ফিরিয়ে নিলেন।

এবার ঋষিরা অশ্বত্থামাকে অস্ত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু অশ্বত্থামার হৃদয় হলাহলে পূর্ণ। তিনি বললেন, ‘আমি পাণ্ডবদের বিনাশের উদ্দেশ্য নিয়েই এই অস্ত্র ক্ষেপণ করেছি। হয়তো এটা পাপ কর্ম, কিন্তু এটাও তো সত্য যে পাণ্ডবদের পতন অনিবার্য। ভীম অনুচিত ভাবে আমার মিত্র দুর্যোধনকে পরাজিত করেছেন, আর আজ একই ভাবে আমার দিকে উগ্র ক্রোধ নিয়ে ছুটে আসছিলেন। সেই সময়েই আমি ব্রহ্মশির প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’

‘দ্রোণপুত্র আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন, যে ব্রহ্মশির আপনি প্রয়োগ করতে পারেন, সেই একই অস্ত্রের ক্ষেপণ কৌশল তৃতীয় পাণ্ডবও জানেন। তাই আপনার অস্ত্র যেমন পাণ্ডবদের ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম, তেমন ভাবেই অর্জুনের ব্রহ্মশির আপনার অনিষ্ট করতে পারে। কিন্তু অর্জুন আপনার ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্য নিয়ে এই অস্ত্র প্রয়োগ করেননি। তিনি চেয়েছিলেন শুধুই আপনার অস্ত্রকে প্রতিহত করতে। অর্জুন তাঁর অস্ত্র প্রতিসংহার করে নিয়েছেন, এবার আপনাকেও এমন কোনো কৌশল করতে হবে যাতে সব দিক রক্ষা হয় অর্থাৎ আপনিও সুরক্ষিত থাকেন এবং পাণ্ডবরাও সুরক্ষিত থাকেন। সর্বোপরি দেশ ও দেশবাসী সুরক্ষিত থাকে।’ ঋষিগণ সমবেতভাবে অশ্বত্থামাকে বোঝালেন। কিন্তু দ্রোণপুত্র তবুও দাঁড়িয়ে রয়েছেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে। কারণ ব্রহ্মশিরের সংহার জানলেও অস্ত্রটির প্রতিসংহার যে তার সঠিক ভাবে জানা নেই।

‘অম্লান শোন, শোন তুই আমার কথা। তুই যেটা করছিস সেটা বাড়াবাড়ি। এত চাপ নিজের কাঁধে কেন এভাবে তুলে নিচ্ছিস! সারা দেশে ভাইরাস বিশারদ নিশ্চয়ই তুই একা নস। তাহলে তোর সব চাপ একার কাঁধে নেওয়ার কী কারণ? এতে তোর বিপদ হবে। আমাদের সবার বিপদ হবে।’ জাগরী শক্ত গলায় ছেলেকে কথাগুলো বলার চেষ্টা করলেন। ছেলে তেরছা চোখে মায়ের দিকে তাকাল।

‘তুমি ঠিক কার বিপদ নিয়ে ভয় পাচ্ছ মা? আমার বিপদ নাকি তোমাদের সবার বিপদ?

উফফ! এভাবে বাঁকা করে কেন কথা বলছিস! আমি তোর মা। আমি কি তোর বিপদ আপদ নিয়ে ভাবব না?’

‘শোনো মা, আমি আগেও বলেছি আবার এখনো বলছি, আমি ভাইরোলজি নিয়ে এমনি এমনি পড়িনি। শুধু শুধু বিদেশ থেকে এই বিষয়টা নিয়ে হায়ার স্টাডিজ করে আসিনি। আমি চিরকালই চেয়েছি দেশের জন্য কিছু করতে। আমার পড়াশোনা, জ্ঞান, মেধাকে কাজে লাগাতে চেয়েছি। আজ আমি সেই সুযোগ যখন পেয়েছি তখন সেটা পুরোপুরি কাজে লাগাব। এই ভাইরাসটা সাংঘাতিক এক ভাইরাস মা। আমাদের সকলের ভাগ্য ভালো যে এটার প্রসার এখনও ততটা বহুলাংশে হয়নি। কিন্তু এটা আস্তে আস্তে নিজের রূপ বদলাচ্ছে। আর কিছুদিনের মধ্যেই এই ভাইরাস দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়বে। তখন প্রচুর মানুষ মারা যাবে। অথচ এই ভাইরাসের স্বরূপ, গতি-প্রকৃতি সব কিছুই এখনও অন্ধকারে। এভাবে বেশি দিন অন্ধকারে আটকে থাকলেও চলবে না আমাদের। একবার যদি এই ভাইরাস নিজের শক্তি বাড়িয়ে ফেলে তাহলে শুধু আমাদের দেশ নয়, গোটা পৃথিবী ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়াবে। এমন মারণ ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল যে ভারত, এ কথা যদি একবার বিশ্বের দরবারে জানাজানি হয়ে যায় তাহলে আমাদের দেশের কী অবস্থা হবে ভাবতে পারছ?’

‘পরিস্থিতি আস্তে আস্তে খারাপের দিকে যাচ্ছে মা। এখনও ব্যাপারটা মাত্রা ছাড়ায়নি ঠিকই, তাই ভাইরাসের বিষয়টা দাবানলের মতো চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। কিন্তু ক্রমশ বেশি সংখ্যক মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। কয়েকটি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে একটু একটু করে উঠে আসছে খবরটা। আমাদের হাতে সময় বেশি নেই। খুব তাড়াতাড়ি কিছু একটা করতেই হবে। আর আমি একা নয়, দেশের বহু ভাইরোলজিস্টও কাজ করছেন। তবে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি যে ইন্ডিয়ান হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) আমায় সেই দলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটা পদে রেখেছেন যে দল এই ভাইরাসটা নিয়ে রিসার্চ করছে।’

ছেলের লম্বা বক্তৃতায় যারপরনাই বিরক্তি লাগল জাগরীর। চিরকালের জেদি ছেলে অম্লান। কেন একটাও কথা শুনবে না সে! কেন শুধু নিজের মত খাটাবে? ও কি জানে না, কথা না শোনার এই ব্যাপারটাতেই সবচেয়ে বেশি মাথা গরম হয় জাগরীর!

‘শোনো অম্লান আমি তোমার এত যুক্তি-তর্ক জানি না। তুমি এই সাংঘাতিক ভাইরাসের অপারেশনে থাকবে না। তোমার টিমকে সে কথা জানিয়ে দাও। তুমি নিজেই তো বলেছিলে এই ভাইরাস ছোঁয়াচে। তবুও এই নিয়ে কাজ করবে তুমি? কেন? কিসের এত জেদ তোমার? আমাদের কথা ভাববে না? নিজের কথা ভাববে না?’ এবার স্বর চড়াল জাগরী।

‘সরি। সেটা সম্ভব নয়। আমার যা বলার আমি বলে দিয়েছি। আর আজ হঠাৎ আমার কথা তুমি এত কেন ভাবছ মা? তুমি তো কোনোদিন আমায় নিয়ে এত মাথা ঘামাওনি। ভাবনাটা কি সত্যি আমায় নিয়ে, নাকি তোমরা ভয় পাচ্ছ যে আমার থেকে তোমাদের কোনো সমস্যা হতে পারে! আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ভাবনাটা তোমার নিজেকে নিয়েই বেশি।’

‘অম্লান! শাট আপ। জাস্ট শাট আপ।’ গর্জে উঠল জাগরী।

‘কী হয়েছে বউমা? কেন এমন করে বকা দিচ্ছ আমার দাদুভাইকে?’ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন ইন্দুবালা৷

‘আপনি ঘরে যান মা।’ কড়া গলায় বলল জাগরী মুখার্জি।

‘কেন ঘরে যাব? আমি সব শুনেছি। দাদুভাই তো আমার ভালো কথাই বলছে। ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে চাইছে, দশ জন মানুষের প্রাণ রক্ষার চেষ্টা করছে। কেন তুমি ওকে বাধা দিচ্ছ মা? তোমার তো গর্ব হওয়া উচিত। তোমার ছেলে এমন মহৎ হৃদয় পেয়েছে। তুমি ওকে আটকিও না মা। ও যা করছে ওকে করতে দাও। ও আমার সাক্ষাৎ কেষ্ট ঠাকুর। তিনিও যেমন ঘোর অমঙ্গলের হাত থেকে জগতকে বাঁচিয়েছিলেন, আমার দাদুভাইও তাই করবে। ও ঠিক পারবে।’

‘আপনি দয়া করে চুপ করুন মা। আপনার প্রশ্রয়েই আজ এই হয়েছে ছেলেটা। আমায় কোনোদিন গুরুত্ব দেয়নি ও। আর আজ ও আমায় মানতে চাইছে না, অপমান করছে।’

‘ঠাম না হয় প্রশ্রয় একটু দিলই আমায়। তুমি তো কোনোদিন দাওনি। নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছু ভাবনি। তাহলে আজ এত দরদ কিসের তোমার? নাকি তোমার কথা শুনছি না বলে তোমার ইগো হার্ট হচ্ছে?’ আজ যেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অম্লান। জাগরীর প্রতি ক্ষোভ থাকলেও কোনোদিন এভাবে বেলাগাম হয়নি ও। কিন্তু আজ যেন সংযমের সব বাঁধ ভেঙে গেছে ওর।

‘কি? কি বললে তুমি? ইগো হার্ট? এত সাহস তোমার? আসলে হবে না-ই বা কেন? কোন ঘরের রক্ত তা কে জানে? তুমি যে এই বংশের কেউ নও আজ নিজেই সেটা প্রমাণ করে দিলে৷

‘বউমা!’ আঁতকে উঠে চীৎকার করলেন ইন্দুবালা।

‘কী বললে? আমি এই বংশের কেউ নই? তাহলে কে আমি মা? কে আমি?’ জাগরীকে ধরে ঝাঁকাচ্ছে অম্লান।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কান খুলে শুনে রাখো, তুমি আমাদের দত্তক সন্তান। তোমার আসল জন্ম পরিচয়, কোথা থেকে তুমি এসেছ আমরা কেউ জানি না। এক অনাথ আশ্রম থেকে তোমাকে দত্তক নিয়েছিলাম আমরা।’

ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়ল অম্লান। মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে হঠাৎ। দত্তক! অম্লান মুখার্জি এই বাড়ির দত্তক ছেলে! এই মানুষগুলো কেউ নয় ওর! এত বছর পর এই অজানা সত্যি কী করে মেনে নেবে ও!

‘কী! কী বলছিস তুই ঝিমনাই! আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না।’ ভেকুলার চোখে-মুখে অদ্ভুত বিস্ময়, তার সঙ্গে একরাশ ভয়। নেরুয়া সাংঘাতিক, ও তা জানত। কিন্তু তা বলে এতটা বীভৎস ও হতে পারে সেটা কল্পনাও করতে পারেনি কখনও।

‘ঝিমনাই, তোর কোনো ভুল হচ্ছে না তো?’

‘না আমার কোনো ভুল হচ্ছে না। আগে থেকেই সন্দেহ হয়েছিল আমার। নেরুয়া আর তার চেলাদের কথাবার্তা আমি শুনে নিয়েছিলাম একবার। তখনই মনে হয়েছিল কিছু একটা বড় গণ্ডগোল আছে। কোনো খুব বড় নোংরামির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ও। সেদিন থেকেই আমি ভেবে নিয়েছিলাম আমি সবটা জেনেই ছাড়ব। তাতে মরি মরব, কিন্তু মানুষ মারার এই নোংরা খেলা আমি খেলতে দেব না নেরুয়াকে।

‘কিন্তু গিরিবাবা...ও যে বলেছিল দেবতা দেখা দিয়েছেন ওকে। ওর মাথার ঘা নাকি সেই দেবতারই আশীর্বাদ।’

গিরিবাবার নাম নিয়ে ও নোংরা খেলা খেলছে। গিরিবাবা আমাদের দেবতা, আমাদের বাপ। তিনি কখনো মানুষের সব্বনাশ চাইতে পারেন না৷

‘হ্যাঁ ঝিমনাই, তুই ঠিক বলেছিস। গিরিবাবাকেই শহরের মানুষেরা মহাদেব বলে। গিরিবাবা শুধু আমাদের মতো বুনো, অসভ্য মানুষদের দেবতা নন। তাঁকে ভদ্দরলোকেরাও মান্যি করে। সেই গিরিবাবা ওকে দেখা দিয়েছেন সেটা হতেই পারে না। এটা আমার অনেক আগেই মনে হয়েছিল। কিন্তু তখন বলতে পারিনি। কারণ সবাই তখন নেরুয়াকে দেবতা মেনে নিয়েছে। সবাই ওর বাক্যি বিশ্বাস করেছিল। সেখানে আমি একা মুখ খুললে কোনো লাভ হত না। উল্টে আমাকেই সবাই দল ছাড়া করত। কিংবা পিটিয়ে মেরে ফেলত।’

‘তবুও তো একবার মুখ খোলার চেষ্টা করতে পারতিস ভেকুলা। হয়তো বেঁচে যেতাম আমরা। হয়তো আমাদের ভালোবাসাটাও’...চোখ জলে ভরে এল ঝিমনাইয়ের।

ভেকুলা তাকাল ঝিমনাইয়ের দিকে। মুখটা ওর বড্ড শুকনো লাগছে। চোখ দুটো দেখেই বোঝা যাচ্ছে বড় কষ্টে আছে মেয়েটা। নেরুয়ার সঙ্গে ওর বিহার পর থেকে আর কখনো তো ভেকুলা ওর দিকে তাকানোর চেষ্টা করেনি। বরং তাকে এড়িয়েই থেকেছে সব সময়। আজও তো দেখা করার কোনো কথা ছিল না। ইচ্ছেও ছিল না ভেকুলার। কিন্তু কিছুদিন ধরে লুকিয়ে চুরিয়ে বারবার খবর পাঠাচ্ছিল ঝিমনাই। তবুও আসতে চায়নি ভেকুলা। কিন্তু অবশেষে যখন শুনল ঝিমনাই জানিয়েছে যে বিপদ আছে, তখনই চুপিসারে এভাবে আসতে রাজি হয়েছিল ও। প্রথমে তো ভয়ই পেয়েছিল সে, যদি নেরুয়া জেনে যায় তাহলে বিপদের শেষ থাকবে না। নিজের জন্য ভাবেনি, বেশি চিন্তা হয়েছিল ঝিমনাইয়ের জন্য। কিন্তু আসার পর, সব শোনার পর মনে হচ্ছে ওই শয়তান নেরুয়াটার মুখোশ খুলতেই হবে, যেভাবেই হোক। কিন্তু কি করে সম্ভব সেটা? ভেকুলার তো মাথায় কিছুই আসছে না।

‘ঝিমনাই তুই খুব কষ্টে আছিস না রে? নেরুয়া তোকে ভালোবাসে না?’ প্রশ্নটা করবে না ভেবেও শেষ অবধি করেই ফেলল ভেকুলা।

‘কষ্ট! না রে আমি আর কষ্ট নিয়ে ভাবি না। কষ্টের সঙ্গে যাকে ঘর করতে হয় তাকে কি আর কষ্ট নিয়ে ভাবলে চলে!’

‘মানে? কী বলছিস তুই?’

এবার ঘুরে গেল ঝিমনাই। পিঠের কাছ থেকে কাপড়টা সামান্য সরাল।

‘আঃ’ শিউরে উঠল ভেকুলা। ঝিমনাইয়ের ঘাড় থেকে শুরু হয়েছে খিমচানোর দাগ, কালশিটে, পোড়া দাগের লম্বা লাইন।

‘এ কি অবস্থা তোর? তোকে এভাবে মারধর করে ওই অমানুষটা? আঁতকে উঠেছে ভেকুলা৷

‘যার যেমন কপাল! কি আর করা যাবে! শুকনো হাসি হাসল ঝিমনই৷

‘কিন্তু ঝিমনাই তুই যে ওই শয়তানের সব খোলের খবর জেনে গেছিস এটা ও টের পায়নি তো?’

‘আমি নেশার বড়ি জোগাড় করেছিলাম। সেই নেশার বড়ি ওর খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দিতাম রাতে। মদ, চুল্লু খেয়ে টাল হয়ে থাকা ওই নেশাড়ুটা আরও নেশায় ঢলে যেত। ভুল বকতে শুরু করত, খিস্তি দিত, চিৎকার শুরু করত। কামের নেশায় পাগল হয়ে যেত। এরকম সময়ে আমি শাড়ি খুলে দাঁড়াতাম ওর সামনে। নিজের শরীরটা টোপ হিসেবে রাখতাম। পিরিত দেখাতাম, পিরিতের কথা বলতাম। আর এভাবেই আস্তে আস্তে ওর পেট থেকে কথা নিয়েছি। একদিনে হয়নি, বিগত বেশ কিছুদিন ধরে খেলতে হয়েছে আমায় খেলাটা। জানি না ভেকুলা, আমার এই চালাকি কোনোদিন ধরা পড়ে যাবে কিনা। ধরা পড়লে আমি শেষ। কিন্তু তোকে ওই শয়তানের খেলা বন্ধ করতেই হবে। নইলে যে ছারখার হয়ে যাবে জগৎ সংসার।’

ঝিমনাইয়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে ভেকুলা। কত বদলে গেছে ও। সেই ভোলাভালা, হাসিখুশি মেয়েটা মরে গেছে যেন। সে জায়গায় আজ একজন এমন মানুষ যে নিজে বাঁচতে চায় না, কিন্তু বাঁচাতে চায় গোটা বিশ্বকে।

‘তুই মরবি না ঝিমনাই। আমরা দুজন মিলে শেষ করব ওই শয়তানকে। কিছু না কিছু উপায় আমি ঠিক ভেবেচিন্তে বের করে ফেলব।’ ভেকুলার কথা শেষ হতে না হতেই গুড়গুড় করে মেঘ ডেকে উঠল আকাশের বুক চিরে।

‘বাদলা আসছে রে। আমি যাই। ভাল থাকিস তুই।’ দৌড়ে চলে গেল ঝিমনাই। ওর চলে যাওয়াটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ভেকুলা। বুকের ভেতর একটা কষ্ট পাক খেয়ে উঠছে ওর।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চমকে উঠল ঝিমনাই। বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল ওর। একি! ঘরের ভেতর বসে রয়েছে নেরুয়া। এমন সময়ে তো ওর থাকার কথা নয়।

‘তুই? তুই ফিরে এসেছিস!’ দুর্বল হাসতে চেষ্টা করল ঝিমনাই।

‘কোথায় গেছিলি তুই? পুরোনো নাগরের সঙ্গে আশনাই করতে! এখনও এত সাহস তোর!’ গর্জে উঠল নেরুয়া।

‘না, শোন…ভয়ে গলা কাঁপছে ঝিমনাইয়ের৷

‘ছাড়ব না। তোর মতো নষ্ট মেয়েছেলেকে আমি ছাড়ব না। আমারই ঘরে বসে গিলবি আর নাগরের সঙ্গে পিরিতি করবি! দেখ কী করি আজ তোকে।’

তড়াক করে এক লাফ মেরে একদম ওর কাছে উঠে এল নেরুয়া। শক্ত দুই হাতে গলাটা টিপে ধরল ঝিমনাইয়ের। ওকে কিছু বলার সুযোগই দিল না।

‘আঃ আঃ’...যন্ত্রণাক্লিষ্ট গোঙানির মতো শব্দ বেরোচ্ছে ঝিমনাইয়ের গলা দিয়ে। শ্বাস নিতে পারছে না ও। পা দাপাচ্ছে। ছটফট করছে।

ছটফট করতে করতেই এক সময় নিথর হয়ে গেল ওর প্রাণহীন দেহটা। তবুও আক্রোশ যেন মিটল না নেরুয়ার। মরাটাকে এখনও লাথি মারছে। আর সঙ্গে চলেছে অশ্রাব্য গালিগালাজ।

‘দত্তক! কি বলছিস তুই?’ রুকমি আঁতকে উঠল।

‘হ্যাঁ রে, আমিও জানতাম না। আজই জানলাম।’ গুম হয়ে বসে রয়েছে অম্লান। রুকমি যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না সবটা। অম্লান আঙ্কেল, আন্টির ছেলেই নয়! এটা কি করে সম্ভব! অম্লানের চোখ মুখ বিধ্বস্ত লাগছে। রুকমি গিয়ে বসল অম্লানের পাশে। আলতো করে হাত রাখল অম্লানের পিঠে।

‘রুকমি আমি কে আমি নিজেও জানি না। আমি হিন্দু, মুসলিম নাকি অন্য কোনো জাতের তা-ও জানা নেই। আমাকে এক অনাথ আশ্রম থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। আর আমি সবটা না জেনেই তোকে জড়িয়ে ফেললাম আমার সঙ্গে। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিস।’ অম্লানের চোখ ছলছল করছে।

‘এ সব তুই কী বলছিস! তুই না একদিন বলেছিলি আমাদের জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক। আজ এক নিমেষে ভুলে গেলি সব? তুই কে আমি জানতে চাই না। আমি শুধু জানি তুই আর আমি আলাদা নই। আমি সব সময় তোর সঙ্গে থাকব আর তুই আমার সঙ্গে। একসঙ্গে থাকলে আমরা সব জয় করতে পারব, দেখিস।’ অম্লানের হাত চেপে ধরল রুকমি।

‘পারব? সত্যি বলছিস?’

‘অবশ্যই পারবি।’

‘জানিস রুকমি এখন জয় করতে হবে ওই ভাইরাসকে। চিনতে হবে তাকে। নয়তো সে সব কিছু গ্রাস করে ফেলবে। যতটুকু রিসার্চ হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে এই ভাইরাস ঠিক প্রকৃতিজাত না-ও হতে পারে। হয়তো একে তৈরি করা হয়েছে।’

‘মানে, ম্যান মেড?’

‘তাই বা বলি কী করে? এই ভাইরাসের নেচার যেরকম ইউনিক এবং এটা যেরকম বীভৎস তাতে এটা মানতে কষ্ট হয় যে এটা মানুষ তৈরি করেছে। এরকম ভাইরাস বানানোর মতো উচ্চক্ষমতা মানুষের এখনো হয়নি৷

‘তাহলে?’

‘সেই রহস্যই তো ভেদ করা যাচ্ছে না। আর ভেদ করতে না পারলে এই ভাইরাস সব শেষ করে দেবে। হতে পারে অন্য কোনো ইউনিভার্স থেকে ছাড়া হয়েছে এটা। জানি না সেটাও তো এভাবে বলা যায় না। তবে এ ভাইরাস কোনো মানুষ বানিয়ে থাকলে তাকে অমিত অলৌকিক কোনো শক্তির অধিকারী বলে ধরে নিতে হবে। কারণ যে সব বৈশিষ্ট্য এখনও অবধি এতে পাওয়া গিয়েছে, তাতে মনে হয় না, কোনো মানুষ বা মনুষ্য নির্মিত ল্যাবে এটা তৈরি হতে পারে।

প্রকৃতির মধ্যে অনন্ত রহস্য লুকিয়ে আছে এটা ঠিক। কিন্তু তবুও কেন জানি না এই ভাইরাসকে প্রকৃতিজাত বলে মনে হচ্ছে না। আসলে কোন সূত্র পাচ্ছি না। কীভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে এই ভাইরাসের উৎস? জানি না। কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।

এদিকে এই ভাইরাসকে আমরা চিনে ওঠার আগে, বুঝে ওঠার আগেই যদি এটা মিউটেট করে নিজেকে আরও বেশি শক্তিশালী করে ফেলে, তাহলে মানুষের মধ্যে দ্রুত এই রোগ ছড়িয়ে পড়বে। কারণ এই ভাইরাস এমন যেটা মানুষের সঙ্গে মানুষের সংস্পর্শে যেমন ছড়ায়, তেমন জল থেকেও ছড়ায়। এই ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো মানুষের সংস্পর্শে যারা আসবে তাদের সকলের মধ্যেই যে ভাইরাস সংক্রামিত হবে এমন কিন্তু নয়। কিন্তু আবার অনেকের মধ্যেই সংক্রামিত হতেও পারে। কে যে ইনফেকটেড হবে আর কে হবে না, সেটা এখনও বোঝা যায়নি। এই ভাইরাসের অস্তিত্ব আর বেশিদিন লুকিয়ে রাখা যাবে বলে মনে হচ্ছে না । তাছাড়া...কথায় ছেদ পড়ল অম্লানের। পকেটের ভিতর মোবাইল বাজছে। মোবাইলের স্ক্রিন দেখে চোখ কুঁচকে গেল ওর।

‘কে ফোন করছে? তোর বাড়ি থেকে?’

‘না, রাহুল। আমার এক পুরোনো বন্ধু। ছোটোবেলায় আমার সঙ্গে স্কুলে পড়ত। তখন কলকাতায় থাকত ওরা। তারপর দিল্লি চলে গেছিল। অনেক দিন সেভাবে যোগাযোগ নেই। ও কেন ফোন করছে হঠাৎ?’

‘ধরে দেখ।’

‘হ্যালো’...ফোন কানে চাপল অম্লান।

‘হ্যালো অম্লান, আমি রাহুল বলছি। চিনতে পারছিস আমায়?’ ওপারে রাহুলের গলা ভীষণ উদ্বিগ্ন শোনাচ্ছে। একদম ভেঙেচুরে গেছে যেন ও।

‘হ্যাঁ, আমি বুঝতে পেরেছি। তোর গলা এমন কেন লাগছে? তুই ঠিক আছিস তো?’

‘না, আমি ঠিক নেই রাহুল। বোধ হয় আমি খুব শিগগির মারা যাব।’

‘মানে? এসব কী বলছিস তুই? কী হয়েছে আমায় একটু খুলে বলবি প্লিজ।’

‘আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না রে অম্লান। তোকে কি বলব? কোথা থেকে শুরু করব কিছুই বুঝতে পারছি না। আসলে আমার মা চলে গেলেন।’

‘সেকি! খুবই খারাপ খবর। তুই ভেঙে পড়িস না, নিজেকে শক্ত রাখ। আঙ্কেলকে দেখে রাখ।’ রাহুলকে সান্ত্বনা দিতে গেল অম্লান।

মায়ের শরীরে অনেক রকম সমস্যা ছিল। হাই ব্লাড প্রেশার, ব্লাড সুগার, নার্ভের সমস্যা ইত্যাদি। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন মায়ের হার্টের সমস্যা ধরা পড়ল। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন শরীরের এ অবস্থায় কোনো আশা নেই। ঠিক এরকম সময়ে একদিন আমার বাবার কাছে একটা অদ্ভুত খবর আসে। মিরাকল বাবার ব্যাপারে জানতে পারেন আমার বাবা। এই মিরাকল বাবা নাকি ভীষণ শক্তিশালী এক পুরুষ। তিনি অর্থের বিনিময়ে অসুস্থ মানুষদের বিভিন্ন মন্ত্রপূত ওষুধ দিয়ে থাকেন। আর ওই আশ্চর্যজনক ওষুধে নাকি ভালোও হয়ে যায় তারা।

এই সমস্ত কথাবার্তা জানার পর আমার বাবা ওই লোকটির কাছে যেতে চান। আমার এসব আজগুবি কথাবার্তা একেবারে বিশ্বাস হয়নি। এসব অবৈজ্ঞানিক কথা কখনোই সত্যি হতে পারে না, সেটা আমি জানতাম। কিন্তু তবুও ওই সময় আমি বাবাকে আটকাইনি। কারণ সব ডাক্তারেরা এমনিতেই বলে দিয়েছিলেন যে আমার মা বাঁচবেন না। এই অবস্থায় যদি বাবা শেষ চেষ্টা হিসেবে সামান্য খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরতে চান তাতে আপত্তি করার কোনো কারণ আমি খুঁজে পাইনি। ভেবেছিলাম বাবা যদি এরকম কিছু করে মনে শান্তি পান, মা যদি শেষ মুহূর্তে একচিলতে আশা দেখতে পান তাতে আমি বাধা দেওয়ার কে?

‘বাবা গিয়েছিলেন ওই লোকটির কাছে। এমনিতে নাকি সে প্রকাশ্যে আসে না। তার চেলা বা এজেন্টরা ওই সব টোটকা জাতীয় জিনিসের জোগান দেয়, কিন্তু বাবা ওই লোকটিকে মিট করেছিলেন। লোকটি বাবার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয় কারণ বাবা ওকে অনেক টাকা অফার করেছিলেন।’ অল্প থামল রাহুল।

‘তারপর? তারপর কী হল?’

‘ওষুধ বা টোটকা যাই বল সেটা নিয়ে আসা হয়। মাকে তা দেওয়া হয়। জলের মতো তরল পদার্থ কিছু একটা। অদ্ভুত ব্যাপার হল এটাই, ওই জিনিসটা খাওয়ার পর মায়ের শরীরে একটা উন্নতি হতে থাকে। সেটা দেখে ডাক্তারেরাও বেশ অবাক হন। কয়েক সপ্তাহ মা যথেষ্ট ভালো ছিলেন। কিন্তু তারপর হঠাৎ ঘটে গেল ঘটনাটা।’

‘কী ঘটনা?’

‘কয়েক সপ্তাহ পর হঠাৎ একদিন মায়ের কপালের মাঝখানে মানে থার্ড আইয়ের জায়গাটা ফুলে ওঠে অদ্ভুত ভাবে। আমরা প্রথমে তেমন গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম হয়তো কোনো পোকা কামড়েছে। কিন্তু দিন দুয়েকের মধ্যেই ওই ফোলা জায়গায় সৃষ্টি হয় একটা ক্ষত। সেখান থেকে দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বের হতে শুরু করে। মা-ও ভীষণ নির্জীব হয়ে পড়েন। প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তারপর ডাক্তার ডাকা হয়। কিন্তু ডাক্তারও সঠিক কিছু বুঝতে পারেন না। কয়েকটি টেস্ট করাতে বলেন শুধু। নার্সিং হোমেও ভর্তি করাতে বলেন। আমরাও ঠিক করি সেরকমই করব। কিন্তু হঠাৎ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আচমকা মায়ের গোটা শরীর ক্ষততে ভরে যায়। মারা যান মিসেস আহেলি সচদেব।

মায়ের অনেক অসুখ ছিল। কিন্তু সেগুলোতে মা মরলেন না। তিনি মরলেন এমন কিছুতে যেটা কী আমরা কেউ সঠিক বুঝতেই পারলাম না। এই ব্যাপারটা শুরু থেকেই ভাবাচ্ছিল আমায়। কিন্তু আমি কোনো কুলকিনারা পাচ্ছিলাম না। তাই জোর করে এই চিন্তা মন থেকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করছিলাম। হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে ফেলতেও পারতাম, কিন্তু পারলাম না। কারণ মাকে যে আয়ামাসি দেখাশোনা করতেন, গত পরশু থেকে তাঁর মধ্যেও একই লক্ষণ দেখা দিয়েছে। ফুলে উঠেছে কপালের মধ্যভাগ। নির্জীব হয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছেন মানুষটা।

আমি ইন্টারনেটে দেখলাম কোন এক অজানা ভাইরাস এসেছে। তা নাকি কিছু কিছু মানুষকে অ্যাটাক করছে। সেই ভাইরাসের লক্ষণও নাকি অনেকটা এরকমই। তুই আমায় বল অম্লান, এটা কি সত্যি খবর? এই ভাইরাসেই কি তবে শেষ হয়ে গেলেন আমার মা? কীভাবে মায়ের শরীরে ঢুকল ওই ভাইরাস? ভাইরাসটা কি ছোঁয়াচে অম্লান? মায়ের আয়াও কি সে জন্যই আক্রান্ত হলেন? এবার কি তবে আমার পালা? নাকি আমার বাবার? আমরাও তো মায়ের কাছাকাছি ছিলাম। তুই আমায় বল প্লিজ। তুই তো অনেক নামী ভাইরোলজিস্ট। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিশ্চয় তোর কাছে থাকবে। প্লিজ আমায় বল অম্লান। প্লিজ বল। প্লিজ তোরা কিছু কর।’ হাউহাউ করে কাঁদছে রাহুল।

অম্লান কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। কী বলবে ও? কোনো উত্তরই যে ওর কাছে নেই। নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছে ওর। ঠিক যেমন স্বপ্নে লাগে। স্বপ্নেও যখন অম্লান দেখে পৃথিবী কাঁপছে আর বহু মানুষ প্রত্যাশী চোখে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে তখনও ঠিক এরকমই অসহায় লাগে ওর। আজ, এই মুহূর্তেও ঠিক তেমনই লাগছে অম্লানের।

‘প্লিজ, কিছু বল অম্লান।’ গলা কাঁপছে রাহুলের।

‘ওই মিরাকল বাবা কোথায় থাকে? তার সম্পর্কে আর কী জানিস তুই?’

‘জানি না বলা উচিত হবে কি না, তবে আমার মনে হয় ওই মিরাকল বাবার মধ্যে কোনো গোলমাল আছে। বাবা যে পরিচিত মানুষটির থেকে মিরাকল বাবার খবর পেয়েছিলেন, তাঁর এক চেনা ভদ্রলোকও নাকি মিরাকল বাবার ওষুধ খাওয়ার পর মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে তাঁর কপালেও নাকি বিষাক্ত ঘা তৈরি হয়েছিল। জানি না এটা কাকতালীয় কিনা, কিন্তু’...

‘রাহুল, তুই আমায় বল কোথায় থাকে এই মিরাকল বাবা নামের লোকটা? আঙ্কেল একে কোথায় মিট করেছিলেন?’

‘উত্তরাখণ্ড। উত্তরাখণ্ডের এক জেলা আছে যার নাম পাউরি। পাউরি থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে আছে এক রিমোট গ্রাম, শানিয়ারা। সেই গ্রামটি পরিত্যক্ত গ্রাম। কিন্তু ওই গ্রামেরই একদম প্রান্তদেশে বা তার থেকেও অনেকটা ভিতরে খুব কম সংখ্যক কিছু পাহাড়ি আদিবাসী বাস করে। এরা একেবারেই সভ্যতার আলো দেখেনি, খুব অনুন্নত। তবে আজকাল এদের মধ্যেও কেউ কেউ শহরের দিকে আসে। সভ্য জগতের সঙ্গে কানেক্ট করার চেষ্টা করে। কাজকর্ম করে সমাজের মূলস্রোতে সামিল হতে চায়। এই ট্রাইবাল গোষ্ঠীরই অন্তর্ভুক্ত মিরাকল বাবা। তার মধ্যে নাকি ভগবানের অংশ রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন স্থানীয়রা। তার নাকি নানারকম অলৌকিক ক্ষমতা আছে।’

‘রাহুল, তুই আজ আমার অনেক উপকার করলি। একটু আগে যে প্রশ্নগুলো তুই করলি, তার উত্তর এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই রে। তবে খুব শিগগির ওই উত্তরগুলো খুঁজে আনার চেষ্টা করব আমি।

রাহুলকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোন কেটে দিল অম্লান। ওর চোখ মুখ হঠাৎ বদলে গেছে।

‘কী হয়েছে রে?’ জিজ্ঞাসা করল রুকমি।

‘মনে হচ্ছে সামান্য হলেও আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছি। হয়তো ভাইরাসটাকে চেনার চেষ্টা শুরু করতে পারব। তবে আমায় উত্তরাখণ্ড যেতে হবে। পাউরি ডিসট্রিক্টের শানিয়ারা নামের কোনো রিমোট গ্রাম, তারও খানিক দূরে পৌঁছতে হবে। হয়তো ওখানেই খুঁজে পাওয়া যাবে অনেক প্রশ্নের উত্তর।’

‘মানে? এসব কি বলছিস তুই? ভাইরাসকে চিনতে তুই এসব জায়গায় কেন যাবি? তোর কাজ ল্যাবে, রিমোট গ্রামে নয়। তুই ভাইরোলজিস্ট, গোয়েন্দা নস।’

‘প্লিজ, তুই অন্তত এভাবে বলিস না রুকমি। আমি এখন কনভেনশনাল ভাইরোলজিস্টের মতো ভাবতে পারছি না। আমার এখন একমাত্র লক্ষ্য এই ভাইরাসকে কব্জা করে মানুষকে বাঁচান। তার জন্য আমায় যা যা করতে হয় আমি করব। আমি উত্তরাখণ্ড যাবই।’

‘বেশ, তবে আমিও যাব। তোকে একা যেতে দেব না অম্লান।’ জোর গলায় বলল রুকমি।

‘মানে? পাগল হয়ে গেছিস নাকি? কোনো প্রশ্নই নেই।’

‘তুই হয়তো ভুলে গেছিস আইনত আমি তোর স্ত্রী। তাই আমি যাব মনে করলে আমায় কেউ আটকাতে পারবে না। এমনকি তুইও না। আমাদের রেজিস্ট্রির কথা বাড়িতে জানানোর এবার সময় এসে গেছে। তুই যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু কর। আমিও শুরু করছি।’ দৃঢ় স্বরে কেটে কেটে বলল রুকমি।

অর্জুন প্রতিসংহার করেছেন ব্রহ্মশির অস্ত্র। তিনি বা প্রথম পাণ্ডব কেউই তাঁদের গুরুপুত্রের মৃত্যু কামনা করেননি। কিন্তু এও সত্য যে, এই অশ্বত্থামাই গত রাতে তাঁদের সন্তানদের হত্যা করেছেন। তাই শাস্তি তাঁর অনিবার্যভাবে প্রাপ্য। সম্রাজ্ঞী পাঞ্চালী দ্রোণপুত্রের মৃত্যুর অভীষ্ট রাখেন। কিন্তু তাঁকে হত্যা করতে চান না যুধিষ্ঠির এবং অর্জুন। তাই তাঁর প্রাণের বদলে শাস্তি স্বরূপ ধার্য হল অশ্বত্থামার মস্তকের দুর্লভ মণিটি, যে মণি অবিশ্বাস্য ক্ষমতাসম্পন্ন ও শ্রীকৃষ্ণের স্যমন্তক মণির সমগোত্রীয়। সমস্ত রোগ, সর্পভয়, প্রেতপিশাচের ভয়, গন্ধর্ব এবং শয়তানের আক্রোশকে নাশ করে এই মণি। অশ্বত্থামার সমস্ত শক্তি ও সত্ত্বার ধারক ও বাহক ছিল এই মণি।

ব্যাসদেব ও মহর্ষি নারদ দ্রোণপুত্রকে বললেন, ‘আপনি এ মণি পাণ্ডবদের নিকটে অর্পণ করুন ও বিনিময়ে নিজের প্রাণ রক্ষা করুন।’ মৃত্যুকে সর্বদা ভয় পান অশ্বত্থামা। তাই প্রাণ রক্ষার এই প্রস্তাবে তিনি সম্মত হলেন এবং মণিটি সমর্পণ করতে রাজি হলেন।

ঋষিদের কথায় সম্মত হয়ে তিনি বললেন, ‘বেশ, আমি এই মণি পাণ্ডবদের সমর্পণ করব। কিন্তু ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রতিসংহারের কৌশল আমার যথার্থ অর্থেই জানা নেই। তাই এ অস্ত্র পাণ্ডবদের প্রাণ না নিলেও কোনো ভাবে তাঁদের অনিষ্ট সাধন করবেই। বেশ, পাণ্ডবদের প্রাণনাশ না করার জন্য আমি অস্ত্রকে নির্দেশ দিচ্ছি। পরিবর্তে এ অস্ত্র আঘাত করবে অর্জুনের মৃত বীর পুত্র অভিমন্যুর গর্ভবতী স্ত্রী উত্তরার গর্ভে। প্রাণ হরণ করবে উত্তরার গর্ভস্থ ভ্রূণের।’

‘এ আপনি কী বলছেন দ্রোণপুত্র? আমাদের বংশ সমূলে বিনাশ হয়েছে। একমাত্র উত্তরার গর্ভস্থ ওই সন্তানই আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল। আপনি তার প্রাণনাশ কী করে করতে পারেন? এ যে অসম্ভব।’ গর্জে উঠলেন পাণ্ডবরা।

‘উত্তরার গর্ভস্থ সন্তান ভূমিষ্ঠ হবেই। তার নাম হবে পরীক্ষিত। এই রাজকুমারই প্রজ্জ্বলিত রাখবেন মহারাজ শান্তনুর বংশপ্রদীপ। এটাই নিয়তি, এটাই ভবিতব্য। তাই তুমি এই অনাগত সন্তানের কোনো অনিষ্ট করতে পারবে না অশ্বত্থামা। কারণ নিয়তিকে কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। তোমার সে ক্ষমতা নেই।’ স্মিত হেসে বললেন শ্রীকৃষ্ণ।

‘কিন্তু আমার অস্ত্র যে অনিবার্যভাবে উত্তরার গর্ভেই আঘাত করবে বাসুদেব কৃষ্ণ। তাই আপনার উচ্চারিত এই সকল বাক্য নিমেষে ভুলে পরিণত হবে। আমার অস্ত্র মিথ্যা হবে না, আমার কথাও মিথ্যা হবে না।’ ক্রূর হাসি ফুটে উঠেছে অশ্বত্থামার ঠোঁটে। পাঞ্চালীর সকল পুত্রকে হত্যা করেছেন তিনি। এবার পালা উত্তরার অনাগত সন্তানের। তিনি সফল আবারও। এবার সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হবে পাণ্ডবদের বংশ। এটাই তো অশ্বত্থামার জয়। তাই মস্তকের মণি হারাতে হলেও তিনি তৃপ্ত।

বাসনগুলো আনমনে মেজে চলেছে ভেকুলা। কিন্তু মনের মধ্যে চাপ ধরা কষ্টটা ভুলতেও পারছে না সে। কোনো মুহূর্তেই যেন শান্তি পায় না ও। প্রতি মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঝিমনাইয়ের মরা মুখটা। সবাই যখন ওকে কবর দেওয়ার জন্য টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, সেই মুহূর্তটা কিছুতেই যেন ভুলতে পারছে না ও। হাঁ হয়েছিল ওর মুখটা। চোখদুটো আধখোলা। দেখেই স্পষ্ট বোঝা যায়, মরণের সময় কি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল মেয়েটা। সবাই জানে হঠাৎ করে নাকি ঘুমের মধ্যে দম আটকে মরে গেছে ঝিমনাই। নেরুয়া সবাইকে তেমনই বলেছে।

‘আমি তো বুঝিই নাই কখন মরে গেল ঝিমনাই! সকালে ঘুম ভাঙার পর দেখি আর উঠছে না। প্রথমে তো বুঝিই নাই যে মরে গেছে। আমি তো ডাকাডাকি করেই যাচ্ছি। কিন্তু কিছুতেই ওঠে না ঝিমনাই। নড়েও না। আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম। ভয়ে ভয়ে নাকের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে দেখলাম। আর অমনি ছ্যাঁত করে উঠল বুকের ভেতর। এ কি! শ্বাস পড়ছে না তো! তারপর তো বেলুয়া, ভনুয়া এসে বলল মরে গেছে। মরে গেছে আমার ঝিমনাই।’ চোখে জল এনে কাতর গলায় কথাগুলো বলছিল নেরুয়া। আর বেলুয়া, ভনুয়ার মতো অমানুষগুলো যাদের জীবন কাটে ওর চামচাগিরি করে, ক্রমাগত মাথা নেড়ে তারাও সায় দিচ্ছিল ওকে।

সবাই নেরুয়াকে বিশ্বাস করলেও ভেকুলা কিন্তু করেনি। জ্বলন্ত চোখে শুধু তাকিয়েছিল নেরুয়া নামের জন্তুটার দিকে। ভেকুলার এই জ্বলন্ত দৃষ্টির অর্থ আর কেউ না বুঝলেও, নেরুয়া বুঝতে পেরেছিল।

সেদিনই তো ঝিমনাই এসেছিল ভেকুলার কাছে। দেখিয়েছিল নিজের সারা শরীরে ওই জানোয়ারটার অত্যাচারের চিহ্ন। ঝিমনাই চালাকি করেছিল নেরুয়ার সঙ্গে। চালাকি করে জেনে নিয়েছিল ওর ভণ্ডামির কথা। ভেকুলা নিশ্চিত, নেরুয়াই মেরে ফেলেছে ঝিমনাইকে। নিশ্চয় কোনো ভাবে ধরা পড়ে গেছিল ঝিমনাই। আর সেজন্যই মরতে হয়েছে ওকে। কিন্তু ভেকুলা বিশ্বাস করলেই বা কি, কেউ সন্দেহ করবে না নেরুয়াকে। সবার চোখে ও যে ভগবান। তাই ভেকুলা চাইলেও নেরুয়ার আসল রূপটার ব্যাপারে কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবে না। যেমন ও কাউকে বোঝাতে পারবে না যে, ওই নেরুয়া আসলে জড়িয়ে রয়েছে বড় একটা অপকর্মের সঙ্গে। আর এ জন্য হয়তো মরবে শয়ে শয়ে সাধারণ মানুষ।

গিরিবাবার নাম নিয়ে সবাইকে বোকা বানিয়েছে ও। কিন্তু গিরিবাবা কি সবকিছু দেখছেন না? কেন তিনি নেরুয়ার মতো একটা সাক্ষাৎ শয়তানের বিচার করছেন না? ভেকুলা কি কোনোদিন সুযোগ পাবে নেরুয়ার মুখোশ খোলার? নিজের ভালোবাসার মানুষটার মরণের বদলা নেওয়া কি তবে ওর হবে না?

‘কেয়া হুয়া? কাম খতম নেহি হুয়া কেয়া?’ মালিকের গলার আওয়াজে অল্প ঘাড় নাড়ল ভেকুলা। গতি বাড়াল কাজের। আজকাল আর ওদিকে যায় না ভেকুলা। ওই জায়গার প্রতি পিছুটান তার কোনোদিনই সেভাবে ছিল না। যতটুকুও বা ছিল, সেটাও মিটে গেছে। এখন তাই ভেকুলা শহরেই থাকছে। এক বাঙালিবাবুর চায়ের ঝুপড়িতে কাজ তো অনেক দিন আগেই জুটিয়েছিল, এখন সেখানেই শুয়ে পড়ে দিনের শেষে। গ্রামে ফিরলে নেরুয়ার মুখ দেখতে হয়। ওকে এখন সহ্য করতে পারে না ভেকুলা। ওকে দেখলেই আরও বেশি করে ঝিমনাইয়ের মরা মুখটার কথা মনে পড়ে যায়।

ভেকুলার আজকাল নিজের প্রতি খুব রাগ হয়। ঘেন্নাও হয়। মনে হয় ওর জন্যই বোধহয় মরে গেল ওর ঝিমনাইটা। নেরুয়ার হাতে বন্দি হওয়ার আগে ও তো চেয়েছিল ভেকুলার হাত ধরে পালিয়ে যেতে। কিন্তু ভেকুলা ওর হাত ধরতে চায়নি। আসলে নেরুয়ার মিথ্যা দেবতা হওয়ার গল্প তখন যে ভেকুলা কিছুটা হলেও বিশ্বাস করে ফেলেছিল। কিন্তু যে ভুল ও করেছে তার প্রায়শ্চিত্ত ও-ই করবে। যে ভাবেই হোক ওই নেরুয়ার মুখোশ ও খুলবেই। হয়তো এই মুহূর্তে জানা নেই কী করতে হবে। কিন্তু ও ঠিক কিছু একটা উপায় বের করে নেবেই। সেজন্যই তো সব ছেড়ে আরও বেশি করে এই শহরে পড়ে আছে ও। কারণ ভেকুলা জানে কিছু করতে হলে ওই জায়গাটার বাইরে বেরিয়েই করতে হবে। গিরিবাবাকে সব সময় ডেকে যাচ্ছে ও।

‘বাবা, কিছু একটা পথ দেখাও। আমায় সাহায্য করো যেন আমি মুখোশ খুলতে পারি ওই শয়তানটার।’

ওরা চলেছে উত্তরাখণ্ডের পথে। হঠাৎ করে এত দ্রুত সব কিছু হয়ে গেল যে এখনও যেন সবটা কেমন ধোঁয়াশার মতো লাগছে রুকমির। মনে হচ্ছে আদৌ সবটা ঘটেছে তো নাকি পুরোটাই কল্পনা?

ভাইরাসের ব্যাপারটা নিয়ে অম্লান ভীষণ উৎকণ্ঠায় ছিল। তার মধ্যেই আচমকা এল রাহুলের ফোনটা। নিমেষে যেন বদলে গেল সব কিছু। অম্লানও ঠিক করে নিল এবার সবটা হাতে-কলমে পরখ করেই ছাড়বে ও। প্রথমে রুকমির সত্যিই খুব রাগ হয়েছিল। একি! অম্লান তো একজন ভাইরোলজিস্ট। তার কাজ ল্যাবে বসে ভাইরাস নিয়ে রিসার্চ করা, তা না করে কেন সে ছুটে যাবে ভাইরাসের উৎস খুঁজতে? কিন্তু পরে সে রাগ মুছে গিয়ে কখন যেন নিজেরই গর্ব হতে শুরু হল মানুষটাকে নিয়ে। সত্যি তো এমন মন কজনের থাকে! যে নিজের কথা না ভেবে, এই মুহূর্তে জীবনের এক অতি কঠিন সত্যের মুখোমুখি হয়েও সেটা নিয়ে ভেঙে না পড়ে শুধু মানুষকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এমন মানুষ কজনের ভাগ্যে জোটে!

রাহুলের বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্য অম্লান প্রথমে দিল্লি গিয়েছিল। কর্মসূত্রে অম্লান প্রায়ই দিল্লি যায়। তাই চট করে ওখানে চলে যেতে সমস্যা হয়নি। আসলে রাহুলের বাবা তো মিরাকল বাবাকে মিট করেছেন, তাই তার সঙ্গে কথা বলাটা খুব জরুরি ছিল। যদিও সচদেব রাজগুরু খুবই ভেঙে পড়েছেন, তবুও অম্লানের সঙ্গে মোটামুটি একটা কথোপকথন হয়েছে তাঁর।

মিরাকল বাবা নামের যে আদিবাসী লোকটার ওপর প্রাথমিক সন্দেহ হচ্ছে, সে আসল ঘুঁটি নয়। এর পিছনে কাজ করছে বিরাট কোনো চক্র। রাহুলের বাবার সঙ্গে কথা বলে যা জানতে পেরেছে অম্লান, তা হল উত্তরাখণ্ডের জেলা পাউরি জনবহুল হলেও শানিয়ার গ্রামটি হল এক পরিত্যক্ত গ্রাম। এই শানিয়ার হল পাউরি থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের এক গ্রাম। বর্তমানে সেখানে কোনো মানুষের বসবাস নেই। এই গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে এক অনুন্নত পাহাড়ি গ্রামে থাকে এক পার্বত্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। খুব বেশি সংখ্যক মানুষ নেই সেখানে, কিন্তু যারা বাস করে তারা প্রচারের আলো থেকে অনেকটাই দূরে।

তবে, এদের মধ্যে কেউ কেউ আজকাল পাউরির নানা জায়গায় যায়। সেখানে গিয়ে শহুরে মানুষদের সঙ্গে মিশে কাজ করে। একটা কথা ভুললে চলবে না, এরা কিন্তু আদিবাসী। তাই শহরে গেলেও নিজেদের প্রথা, সভ্যতা ও সংস্কৃতি আঁকড়ে থাকতে বেশি পছন্দ করে তারা। এদের আরাধ্য দেবতা সম্ভবত মহাদেব যাঁকে এরা গিরিবাবা বলে ডাকে। এই আদিবাসী সম্প্রদায়েরই একজন হল মিরাকল বাবা যে আসলে একজন তান্ত্রিক। সে দাবি করে, সে নাকি মহাদেবের বরপুষ্ট। স্বয়ং গিরিবাবা নাকি তাকে দেখা দিয়েছেন। নিজের কাজের জন্য তাকে বেছে নিয়েছেন। গিরিবাবার কাজ মানে হল মানুষের সেবা করা। মিরাকল বাবার দাবি, গিরিবাবা তাকে কিছু লতাপাতা দিয়েছেন। অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে সে লতাপাতার। তা নাকি কখনো শুকোয় না, সব সময় সবুজ ও সতেজ থাকে। এই অলৌকিক লতা জলে ভিজিয়ে টোটকা তৈরি করে মিরাকল বাবা। তার দাবি, এই তরল টোটকা মানুষের কঠিন থেকে কঠিনতর অসুখ সারিয়ে দিতে পারে।

গ্রামের মানুষেরা মিরাকল বাবার কথা অন্ধবিশ্বাস করতে শুরু করে। ওই গ্রাম থেকে ক্রমে আশেপাশের গ্রামেও এই খবর রটে যেতে থাকে। ইতিমধ্যে অনেকে এসে টোটকা নিয়ে গেছে, তরল টোটকা খাওয়ার পর তাদের কী পরিণতি হয়েছে, সে ব্যাপারে অবশ্য কোনো সঠিক তথ্য নেই। তবে আজগুবি খবর, ধর্মীয় ভণ্ডামির কথা আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় নেয় না। মিরাকল বাবার খবরও দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। রাহুলের বাবার কানেও এভাবেই খবরটা পৌঁছেছিল। আর এই গোটা ব্যাপারটার সরেজমিনে তদন্ত করে দেখতে চাইছে অম্লান। অম্লান শুনেছে, মিরাকল বাবার মাথার মাঝখানে রয়েছে এক বীভৎস ঘা। তবে সেই ঘা থাকার কারণে সে যে খুব কষ্ট পাচ্ছে, তাকে দেখে এমনটা মনে হয় না।

অম্লান আগেই মিরাকল বাবার ঠিকানা সচদেব আঙ্কেলের থেকে জেনে নিয়েছে। অম্লান ঠিক করে নিয়েছে, মিরাকল বাবাকে সে বলবে, তার বউয়ের পেটে আলসার হয়েছে, তাই অলৌকিক টোটকা নিতে এত দূর এসেছে। কখনো কখনো সত্যিকে খুঁজে বার করতে হলে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এগোতে হয়। অম্লানও তাই করবে। এছাড়া আর উপায়ই বা কী আছে!

‘রুকমি আমি কি পারব আমার উদ্দেশ্য সফল করতে?’ হঠাৎ দীর্ঘক্ষণের নীরবতা ভেঙে বলে উঠল অম্লান।

‘হ্যাঁ পারবি, নিশ্চয় পারবি। কিন্তু অম্লান’...

‘কিন্তু কী? বল।’

‘তুই একা কেন সব দায়িত্ব নিলি? তুই কি পারতিস না প্রশাসনিক কোনো সাহায্য নিতে?’

‘রুকমি আমরা অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়তে এসেছি। আমরা কিন্তু আদৌ জানি না এই মিরাকল বাবার সত্যতা কতটা। আমরা এ-ও জানি না আদৌ মিরাকল বাবার সঙ্গেই এই অজানা মারণ ভাইরাসের কোনো যোগাযোগ আছে কিনা।’

‘যোগাযোগ তো আছেই। রাহুলের মা এই ভাইরাসে অ্যাফেক্টেড হয়েছিলেন। সিম্পটম তো মিলে গেছে সব।’

‘হ্যাঁ তা হয়তো হয়েছিলেন। কিন্তু এমনও তো হতে পারে তিনি অন্য কোনো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। মিরাকল বাবার টোটকা নেহাতই কাকতালীয় ভাবে জুড়ে গেছে। আমরা শিওর নই কোনো ব্যাপারেই। এটা হয়তো নেহাতই এক গ্রাম্য আদিবাসী বুজরুকির ঘটনা।’

‘না রে অম্লান, কেন জানি না আমার মন বলছে সব কিছু জুড়ে আছে ওই আদিবাসী লোকটাই। এটা বিরাট কোনো চক্রান্ত, যার পিছনে অনেক বড় কোনো মাথা আছে।’

‘হতেই পারে। সব কিছু হতে পারে। আসলে সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে রে। এর তল পাওয়া অত সহজ হবে না। আমরা শুধু উপর থেকে মাপার চেষ্টা করছি গভীরতাটা। তাই প্রশাসনিক সাহায্য নেওয়ার প্রশ্নই উঠছে না।’

‘তুই বল, ওই লোকটা যে লতা-গুল্মের কথা বলছে এমন কিছু সত্যিই কি হয় যেটা শুকোয় না?’

‘না। হয় না বলেই তো জানি। হয়তো পুরোটাই লোকটার বানানো। তবে এটাও ঠিক যে এমন অনেক রহস্য এই প্রকৃতিতেই লুকিয়ে আছে যা আজও মানুষের জ্ঞানের পরিধির বাইরে। তাই এভাবে কিছু বলা খুব কঠিন। আগে আমরা পৌঁছই। দেখা যাক কী হয়।’ কথাটা বলেই ফোঁস করে শ্বাস ফেলল অম্লান। উদাস ভাবে চোখ রাখল প্লেনের জানলার বাইরে।

আজ বোধ হয় পূর্ণিমা। সাদা চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে চারদিক। নিঃশব্দে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল জাগরী। দুচোখের পাতায় আজ ঘুম নেই তার, যদিও ঘড়ির হিসেব বলছে রাত এখন দুটো। রাত যত গভীরই হোক না কেন, যার জীবন আচমকা অযাচিত ঢেউয়ের ধাক্কায় এলোমেলো হয়ে যায় সে কি আর ঘুমোতে পারে!

এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না জাগরী যে এত বড় সর্বনাশটা সে নিজেই ঘটিয়ে ফেলল। কী করে মুখ ফস্কে এত বড় গোপন সত্যিটা বলে ফেলল ও! এতগুলো বছর সত্যিটা নিজেই সেখানে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিল যেখানে।

মা হতে পারার সমস্যা ছিল জাগরীর। এই সত্যিটা ও জানত না প্রথমে। বিয়ের পর থেকে তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই জাগরীও স্বপ্ন দেখেছিল মা হওয়ার, সন্তানকে বড় করে তোলার। কিন্তু কি এক অজ্ঞাত কারণে কিছুতেই কোল ভরছিল না ওর। সে সময় স্বামীর সঙ্গে দিল্লিতে থাকত। তাদের দুজনেরই কর্মস্থল ছিল সেখানে। মা হতে পারছিল না বলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া শুরু করে ওরা। ডাক্তার জানিয়ে দেন, শারীরিক সমস্যার কারণে জাগরী কোনো দিন মা হতে পারবে না। একেবারে ভেঙে পড়ে জাগরী। অলোকেশকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। কিন্তু জাগরী ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে নয় বলে অলোকেশের মা কোনোদিন খোলা মনে মেনে নিতে পারেননি তাকে। শাশুড়ির সঙ্গে সম্পর্ক কোনো দিনই ভালো ছিল না জাগরীর। তার সর্বদাই মনে হত, ইন্দুবালা তাকে কোনো না কোনো অছিলায় ছোটো করতে চাইতেন।

শাশুড়িকে এড়িয়ে থাকার জন্যই অন্য শহরে থাকতে চাইত জাগরী। কিন্তু মা হতে পারবে না জানতে পারার পর থেকেই এক অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেছিল সে। বারবার মনে হত, ইন্দুবালা এ কথা জানতে পারলে কি হবে! এমনিতেই ভদ্রমহিলা বারবার বলতে থাকেন, কবে নাতি-নাতনির মুখ দেখবেন! তার ওপর যদি জানাজানি হয় যে জাগরী শারীরিক ত্রুটির জন্য মা হতে পারবে না তাহলে তো চরম অশান্তি বেঁধে যাবে। এই নিরাপত্তাহীনতাটা আস্তে আস্তে মানসিক ভাবে অসুস্থ করে তুলছিল ওকে। সব সময় খিটখিট করত জাগরী। অফিসেও ঠিক মতো কাজ করা হয়ে উঠত না তার। খাওয়াদাওয়া, বেড়ানো সব কিছুই দুর্বিষহ ঠেকত তখন জাগরীর।

স্ত্রীকে যন্ত্রণা পেতে দেখে কষ্ট পেত অলোকেশও। তাই প্রস্তাবটা এসেছিল তার তরফ থেকেই।

‘জাগরী একজন বাচ্চাকে দত্তক নিলে কেমন হয়? এই পৃথিবীতে তো এমন অনেক বাচ্চা রয়েছে যাদের পরিবার, পরিজন, বাবা-মা কেউ থাকে না। এমন কাউকে যদি আমরা নিই, তাহলে আমাদেরও সন্তানের অভাব পূরণ হবে আর সেই বাচ্চাটিও একটা পরিবার পাবে।’

‘কিন্তু কী লাভ হবে তাতে? দত্তক বাচ্চা তো দত্তক বাচ্চাই। তোমার মা তো সেই নিয়ে আমায় খোঁটা দিয়ে যাবে সারা জীবন।’ খিঁচিয়ে উঠেছিল জাগরী।

‘মাকে জানাব না। আমরা এখানকার কোনো অনাথ আশ্রম থেকে বাচ্চা দত্তক নেব। আমি ব্যবস্থা করছি। পুরো ব্যাপারটা প্রসেসিং হতেও তো খানিকটা সময় লাগবে। এই সময়টাতে মাকে জানাব তুমি প্রেগন্যান্ট। মা এই দিকে আসতে চাইলেও তাকে আটকে দেব। তারপর বাচ্চা হাতে পাওয়ার পর আমরা ফিরব কলকাতায়।’

অলোকেশের প্রস্তাব সেদিন মনে ধরেছিল জাগরীর। মনে হয়েছিল এটাই একমাত্র উপায় ইন্দুবালার বাঁকা কথার হাত থেকে বাঁচার। তারপর ওদের জীবনে এসেছিল অম্লান। ওই শিশুকে নিয়েই কলকাতা ফিরেছিল ওরা। ইন্দুবালা জেনেছিলেন এটাই তাঁর নাতি।

অম্লান যে আসলে জাগরী-অলোকেশের ছেলে নয় সেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বোধহয় ভুলেই গেছিল অলোকেশ। কিন্তু জাগরী ভুলতে পারেনি কোনোদিন। ওই বাচ্চাটাকে দেখলেই ওর মনে হত এই ছেলেটাই যেন বারবার মনে করিয়ে দেয় আসলে জাগরী অসম্পূর্ণ। চাইলেও কোনো দিন মা হতে পারবে না ও। আর এই সব ভাবনা থেকেই অম্লানকে কোনোদিন পুরোপুরিভাবে কাছে টানতে পারেনি ও। সব সময় দুজনের মধ্যে ছিল একটা কাচের দেওয়াল। জাগরী যেন ইচ্ছে করেই অম্লানকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইত ব্যস্ততার অজুহাতে।

ধীরে ধীরে অম্লান বড় হচ্ছিল। ঠাকুমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ছিল তার। এই ব্যাপারটা আরো অস্বস্তিতে ফেলত জাগরীকে। ওদের কাছাকাছি দেখলেই এক অদ্ভুত অপরাধবোধ জেগে উঠত জাগরীর। মনে হত ও শুধু নিজের স্বার্থের জন্যই অনেকগুলো মানুষকে ঠকাচ্ছে। তাই ওদের একসঙ্গে দেখলেই নিরাপত্তাহীনতা, অপরাধবোধ সব কিছু মিলিয়ে একটা আশ্চর্য অনুভূতি হত জাগরীর। তাই সে সব সময় ওদের আলাদা করে দিতে চেষ্টা করত। কিন্তু তাতে লাভ কিছুই হয়নি। উল্টে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে ওই দুজন মানুষ।

অম্লান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওকে নিয়ে এক অদ্ভুত সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। নিয়মিত ভাবে আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখত ও। খুব বিচলিত করে দিত ওকে স্বপ্নগুলো। বারবার ও জাগরীকে বলতে চাইত সে কথা। কিন্তু জাগরী ইচ্ছে করেই কোনোদিন আমল দেয়নি তাতে। কারণ ওর ভয় করত। কেন একই স্বপ্ন দেখে ছেলেটা? তবে কি এর সঙ্গে ওর জন্মপরিচয়ের কোনো যোগসূত্র আছে? এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই ভয়ে বুক হিম হয়ে যেত ওর। বারবার মনে হতো এই স্বপ্নের সূত্র ধরেই যদি কখনো জানাজানি হয়ে যায় ছেলেটার জন্ম পরিচয়? শুধু এই কারণেই ছেলে স্বপ্নের কথা বলতে এলেই ও বারবার বলেছে ‘ইগনোর বেটা।’

সারা জীবন লুকিয়ে রাখা সত্যিটা ওর একটা ভুলে সামনে চলে এল আচমকা আর এক লহমায় নিঃস্ব হয়ে গেল ও। অম্লানকে ও কাছে না টানলেও ছেলেটার টান ছিল মায়ের প্রতি সেটা অনুভব করত জাগরী। কিন্তু সে টান নিজের ভুলেই মুছে ফেলল আজ জাগরী মুখার্জি। ভাইরাস নিয়ে রিসার্চের কাজের জন্য অম্লান কিছু দিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে। ওকে একবার বলেও গেল না, শুধু বলে গেল ইন্দুবালাকে। আজ সত্যিই নিজেকে নিঃসন্তান মনে হচ্ছে জাগরীর। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে বুকের ভেতর। আজ যেন ও নতুন করে বুঝতে পারছে অম্লান ওর কতখানি জুড়ে ছিল।

‘বউমা’...আচমকা ডাকে চমকে উঠল জাগরী। ঘুম আসছে না বলে ও উঠে এসেছিল ছাদে, কখন যেন ইন্দুবালাও চলে এসেছেন!

‘মা একি! আপনি এখানে এত রাতে?’ হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ মোছার চেষ্টা করল জাগরী।

‘আমি তোমার কাছেই এসেছি মা। একি তুমি কাঁদছ!’

‘কই না তো। আমি ঠিক আছি বলতে গিয়েই গলা ভেঙে এল জাগরীর। ডুকরে কেঁদে উঠল ও।

‘আমায় ক্ষমা করে দিন মা। আমি সারা জীবন আপনাকে ঠকিয়েছি। এত বড় সত্যি লুকিয়ে রেখেছি। এতগুলো বছর আপনি যাকে নাতি ভেবেছেন, আপনার ছেলের সন্তান ভেবেছেন সে আসলে... ফুঁপিয়ে উঠল জাগরী।

‘নাতি ভেবেছি। আজও ভাবি। কিন্তু ছেলের সন্তান যে ও নয় সে আমি ওর এক বছর বয়সেই জেনে গেছিলাম।’

‘মা!’ চমকে উঠল জাগরী।

হ্যাঁ বউমা। একদিন তুমি আর অলক যখন কথা বলছিলে, তখন আমি শুনে নিয়েছিলাম। দাদুভাইয়ের তখন সবে এক বছর। তখনই জেনে গেছিলাম তুমি শারীরিক কারণে মা হতে না পারলেও মায়ের মন নিয়েই জন্মেছ। তাই তো এমন গোপালকে নিয়ে এসেছ সংসারে৷

সব জেনেও আপনি ওকে এত ভালোবাসতেন মা? কেঁদেই যাচ্ছে জাগরী।

কেন বাসব না? জন্মসূত্রে পাওয়া সম্পর্ক, রক্তের সম্পর্কই শুধু নিজের হয় কে বলল? সবচেয়ে বেশি আপন তো হয় মনের সম্পর্ক, ভালোবাসার সম্পর্ক। এই বয়সে এসে তা বেশ বুঝেছি আমি। আর দাদুভাই যে আমায় দুহাত ভরিয়ে ভালোবাসা দিয়েছে। আমার অলকের ঔরসজাত ছেলে থাকলেও সে কি এর থেকে বেশি কিছু দিতে পারত!

কিন্তু মা আমি যে সারাজীবন ওকে দূরে সরিয়ে রাখলাম! আমি যে জন্ম দিইনি বলে ওকে কাছে টানতেই পারলাম না!

বউমা, যশোদাও তো শ্রীকৃষ্ণের জন্ম দেননি। তাতে কি তিনি মা নন?’

কান্নায় ভেঙে পড়েছে জাগরী। কেন এভাবে ও ভাবতে পারল না এতদিন!

মা বড্ড দেরি হয়ে গেছে যে। আর কি আমি সুযোগ পাব ভুল শুধরে নেওয়ার? আমার ছেলেকে বুকে টেনে নেওয়ার?

নিশ্চয় পাবে মা। আমার দাদুভাই যে কাজে গেছে সে কাজে জয়ী হয়ে সে ফিরে আসবে, তুমি দেখ। আমি তোমায় বলছি ও সাধারণ ছেলে নয়। ও অসাধারণ। ও যেন শ্রীকৃষ্ণ। নইলে এভাবে নিজের জীবনের পরোয়া না করে শুধু মানুষকে বাঁচাতে কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ে!

মা! আমার ছেলেটাকে ঈশ্বর জয়ী করাবে তো?

করাবেই, তুমি দেখ৷ জাগরী মাথা রাখল ইন্দুবালার বুকে। জ্যোৎস্নার আলোকে সাক্ষী রেখে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে দুই প্রজন্মের দুই মায়ের চোখের জল।

কী? তুমি আর অম্লান রেজিস্ট্রি করেছ? কিন্তু কেন? তোমাদের বিয়ে কি আমরা দিতাম না? সব তো ঠিকই ছিল। শুধু আমরা চেয়েছিলাম তোমার রিসার্চটা মিটে যাক। তাহলে এসব লুকোচুরি কেন করতে গেলে?’ রেজিস্ট্রির খবর শুনেই রাগে বিস্ময়ে ফেটে পড়েছিলেন রুকমির বাবা-মা।

রেজিস্ট্রি না করে আমাদের উপায় ছিল না। অম্লান একটা গুরুত্বপূর্ণ মিশনে যাবে। আর সেখানে আমাকে থাকতেই হবে। বিয়ে ছাড়া তো সেটা সম্ভব নয়।

মিশন? কিসের মিশন? কোথায় যাবে ও? আর তুমিই বা যাবে কেন সেখানে?

সব কিছু এখন বলা সম্ভব নয়। আমাদের কিছুটা গোপনীয়তা রেখে চলতে হবে। তবে এটুকু বলতে পারি অম্লান যে কাজটা করতে চলেছে, বিশাল বড় হৃদয় না থাকলে সেটা করা যায় না। ও নিজের জন্য কিচ্ছু করছে না। করছে বহু মানুষকে বাঁচাতে। তাই আমি ওর সঙ্গে যাবই৷

না, তুমি যাবে না রুকমি। আমরা তোমায় অ্যালাউ করব না৷

আমি অপারগ মা। যেতে আমায় হবেই। তাছাড়া আমি প্রাপ্তবয়স্ক। তাই নিজের সিদ্ধান্তে নিজের আইনি স্বামীর সঙ্গে আমি যে-কোনো জায়গাতেই যেতে পারি৷

ঠিক এতটাই অশান্তি করে মাত্র দুদিনের নোটিশে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে রুকমি। বেরিয়ে এসেছে শুধু আজকের দিনটার জন্য। দিন কয়েক আগে উত্তরাখণ্ডে পৌঁছেছে ওরা। সচদেব আঙ্কেলের সূত্র মিলিয়ে আর এখানকার কিছু স্থানীয় লোকের সহায়তায় ওরা মিরাকল বাবার একটা খোঁজ পেয়েছে। এখানকার স্থানীয় লোকজনের মধ্যে অনেকেই তাকে সত্যিই ফরিস্তা বা ভগবানের দূত ভেবে বসে আছেন।

মিরাকল বাবার দর্শন নাকি খুব সৌভাগ্য না হলে পাওয়া যায় না। পাউরি জেলার এক প্রান্তিক গ্রামের এক মন্দির হল ভেরো বাবার মন্দির। এই মন্দির অখ্যাত ছিল। কিন্তু মিরাকল বাবার কল্যাণে এখন এ মন্দিরের নাম লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছে। এই মন্দিরে রবিবার আর শুক্রবার ভোরবেলা দেখা মেলে মিরাকল বাবার চেলাদের। রোগীর রোগের উপসর্গ শুনে বাবার দেওয়া টোটকা তারাই দিয়ে দেয়। অনেকেই এখন সেই তরল টোটকার জন্য রীতিমতো ভিড় জমাচ্ছে।

আজ অম্লান আর রুকমি যাচ্ছে সেই মন্দিরে। আজকের এই যাওয়াটার ওপরে নির্ভর করছে অনেক কিছু। গাড়ি ছুটছে পাহাড়ি পথ বেয়ে। রুকমি একবার অম্লানের মুখের দিকে তাকাল। মুখটা থমথম করছে ওর। রুকমি জানে উথাল পাথাল চলছে মানুষটার মনে। নিজের ইষ্টদেবতা শ্রীবিষ্ণুকে স্মরণ করল রুকমি, ‘হে ঈশ্বর তুমি সহায় হও। তুমি সহায় না হলে এ যুদ্ধ আমরা জিততে পারব না। বাঁচাতে পারব না অনেক মানুষকে। আমাদের পথ দেখাও ঈশ্বর। এগিয়ে দাও আমাদের নিজেদের লক্ষ্যের দিকে৷

ভেকুলা লক্ষ্য করছিল ওঁদের। বাবুজি আর বিবিজি দুজনকেই দেখে মনে হচ্ছে খুব চিন্তিত। কোনো বড় শহরেরই হবেন ওঁরা। বাংলায় কথা বলছেন নিজেদের মধ্যে। ভেকুলা বাংলা ভাষা চেনে। এত দিন সে এক বাঙালিবাবুর চায়ের দোকানে কাজ করছে। কাজেই একটু আধটু বাংলা ও চেনে বইকি! বাবুজি আর বিবিজি কোথাও একটা যাচ্ছেন। তারই মাঝে চা খেতে নেমেছেন এই চায়ের দোকানে। অবশ্য এই পাহাড়ি গ্রামের বাঁকের পথের মাঝে এরকম চায়ের দোকানে তারাই আসে যারা পথশ্রান্তির ক্লান্তি ভুলতে চা খেতে চায়।

মানুষ দুটোকে বারবার ঘুরে ঘুরে দেখছে ভেকুলা। কেন জানি না, ওদের দেখে মনে হচ্ছে বড্ড ভালোমানুষ। দাদাবাবুর কাছে চায়ের গ্লাসটা এগিয়ে দেওয়ার সময়ে বড় মিষ্টি করে তিনি হাসলেন। ভেকুলার মতো আদিবাসী জংলি মানুষদের কাজ করতে দেখে কেউ তো চট করে বড় হাসে না। বরং কেমন একটা হেলাফেলা ভাব করে।

বাবুজির সঙ্গে যে বিবিজি, তাঁকে দেখেও মনে হয় বড় মমতাময়ী। টানা টানা চোখ, কোমল মুখের মানুষটিকে দেখে মন ভালো হয়ে যায়। বোঝাই যাচ্ছে বাবুজি খুব ভালোবাসেন বিবিজিকে। চায়ের কাপ মুখের কাছে ধরছেন তাঁর। বারবার জিজ্ঞাসা করছেন বিবিজির কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো? বিবিজিও বারবার বাবুজির হাত চেপে ধরছেন। কোনো একটা ব্যাপারে তিনি যেন ভরসা দিচ্ছেন বাবুজিকে। কেন কে জানে ভেকুলা কিছুতেই চোখ সরাতে পারছে না ওঁদের থেকে। বারবার দেখতে ইচ্ছে করছে ওঁদের। আসলে ওঁদের দেখে ওর মনে পড়ে যাচ্ছে ঝিমনাইয়ের কথা, ঝিমনাইয়ের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো। এভাবেই তো ও ভালোবাসত ঝিমনাইকে আর ঝিমনাই ওকে। ভেকুলাও তো এভাবেই ওকে আগলে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু কিচ্ছু হল না। সব মিথ্যা হয়ে গেল। ওকে ছেড়ে চিরজীবনের মতো চলে গেল সে। আবার চোখটা জ্বালা করছে ভেকুলার।

কিন্তু হঠাৎই কেঁপে উঠল ভেকুলার বুকটা। মিরাকল বাবা, হ্যাঁ ভেকুলা ঠিক শুনেছে। মিরাকল বাবার ব্যাপারে কথা বলছেন ওঁরা। ভাষাটা বাংলা হলেও নামটা শুনতে ভুল হয়নি ভেকুলার। নিজের কানকে সজাগ করল ও। কারা এরা? এরা কি তবে নেরুয়ার কাছে যাচ্ছে নাকি? সেটা হওয়া অসম্ভব নয়। এ পথেই যখন যাচ্ছে, তখন সে সম্ভাবনা তো রয়েইছে। নেরুয়ার চামচারা যেখানে বসে বিষ ছড়ায় সেই ভেরো বাবার মন্দিরে যেতে গেলে তো এই পথেই যেতে হবে। তবে কি ওঁরা সেখানেই যাচ্ছেন?

ধরতেই হবে এরকম দুটো শব্দ ওঁদের কথার মধ্যে থেকে শুধু বুঝতে পারল ভেকুলা। ও বাংলা জানে না। কিন্তু এতদিন এই বাঙালিবাবুর দোকানে কাজ করার সুবাদে দু-চারটে বাংলা শব্দ চেনে ও। মানেটাও একটু আধটু বোঝে। তাই ও জানে ধরতে হবে মানে কী। কাকে ধরতে চান এঁরা? নেরুয়াকে? তবে কি বাইরের পৃথিবীর ভদ্দর মানুষেরাও কেউ কেউ জেনে গেছে নেরুয়ার পাপের কথা? তারাই কি তবে আসছে এখানে? এঁরাও কি তেমনই কেউ? তাই যদি হয় তাহলে এঁদেরকে হাতছাড়া কিছুতেই করা যাবে না। এঁদেরকে দিয়ে নেরুয়াকে ধরাতেই হবে।

ভেকুলা গিরিবাবাকে স্মরণ করল। ‘দেবতা আমায় সাহায্য করেন। আমি যে ঝিমনাইয়ের মরাটা বিফলে যেতে দিতে পারি না। নেরুয়ার নোংরা খেলার স্বরূপ জানতে গিয়েই হয়তো বলি হতে হয়েছে ওকে। আর মরার আগে নেরুয়ার মুখোশ খোলার কঠিন কাজটা ঝিমনাই আমাকেই দিয়ে গেছে। আমি যেন সেটা করতে পারি দেবতা। পথ দেখান আমায়৷

আজ অম্লান ও রুকমির চরম পরীক্ষার দিন। ভেরো বাবার মন্দিরে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছবে ওরা। তারপর যে ঠিক কী হবে সেটা তো কেউই জানে না। ভীষণ টেনশান হচ্ছে। রুকমির শরীরটাও খুব ভালো নেই আজ। যাওয়ার সময় ফাঁকা পাহাড়ি পথের ধারের ছোটো একটা দোকানে চা খেতে নেমেছিল ওরা। এখানে দোকানপাট পথমধ্যে তেমন কিছুই চোখে পড়েনি৷ দেখার মধ্যে শুধু এই দোকানটাই চোখে পড়েছিল।

চা খাওয়ার পরে মনে হল একটু পেট খালি করা দরকার মানে জল বিয়োগ আর কি! পাহাড়ি পথের বাঁকে অল্প নির্জনতা দেখে সে উদ্দেশ্য নিয়েই দাঁড়াল অম্লান।

‘বাবুজি, আপনি কি মিরাকল বাবার কাছে যাচ্ছেন?’ চমকে উঠল অম্লান। টয়লেট সারতে না সারতেই কে যেন ডেকে উঠেছে তাকে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে। পিছন ফিরে অম্লান দেখল গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে একটু আগে দেখা হওয়া চায়ের দোকানের সেই আদিবাসী লোকটা।

হ্যাঁ যাচ্ছি, তবে মিরাকল বাবার কাছে নয়। ভেরো বাবার মন্দিরে যেখানে মিরাকল বাবার ওষুধ পাওয়া যায়। আপনি চেনেন নাকি তাকে? একটু সাবধানী স্বরে বলল অম্লান।

কেন যাচ্ছেন বাবু?

‘আমার স্ত্রী অসুস্থ, পেটে ঘা হয়েছে। ডাক্তাররা বলেছেন আর কোনো আশা নেই। তাই যাচ্ছি মিরাকল বাবার কাছে। শুনেছি উনি অনেককে ভালো করে দেন অলৌকিক টোটকার দ্বারা।’

‘না বাবু, যাবেন না। আপনারা ফিরে যান। বিবিজিকে বড় ডাক্তার দেখান। আপনারা তো বড় মানুষ। পড়ালেখা জানেন। ঠিক কিছু উপায় পেয়ে যাবেন। কিন্তু ওই লোকটার কাছে যাবেন না দয়া করে। বিবিজি তাহলে মরে যাবেন।’ লোকটা হাতজোড় করে কাঁদছে। একটু অবাক লাগল অম্লানের। কে এই লোকটা?

কে আপনি? কেন বলছেন এসব কথা? আপনি কীভাবে চেনেন মিরাকল বাবাকে?

বাবু, মিরাকল বাবা কোনো সাধু নয়, কোনো দেবতা নয়। ও একটা শয়তান। ওর আসল নাম নেরুয়া। ও আমাদের মতোই এক আদিবাসী, আমাদেরই গ্রামে। একদিন হঠাৎ ও এসে গ্রামের সবাইকে বলল ও নাকি গিরিবাবার দেখা পেয়েছে। গিরিবাবার থানে ওর যাতায়াত ছিল। আর সেখানেই নাকি গিরিবাবা নিজে এসে দেখা দিয়েছেন ওকে। ওর কপালের মাঝখানটা ফুলে ছিল। ও বলল গিরিবাবা ওখানে ছুঁয়ে ওকে আশীর্বাদ করেছেন। বলেছেন ওই ফোলা জায়গাটা চুইয়ে রক্ত বের হতে শুরু করবে আর কিছুক্ষণ পর থেকেই। ওখানে ঘা হয়ে যাবে, এমন এক ঘা যা নাকি ব্যথাবেদনাহীন। কিন্তু ও ঘা কোনো দিন যাবে না। ওর মাথাতেই থেকে যাবে সারাজীবন গিরিবাবার আশীর্বাদের চিহ্ন হয়ে।

ও আরও বলল, গিরিবাবা ওকে কি সব ক্ষমতা দিয়েছেন। সে ক্ষমতা দিয়ে ও ওষুধ বানিয়ে সবাইকে দিলে সব মানুষের রোগ ভালো হয়ে যাবে। সারা দুনিয়ায় আমাদের এই ছোট আদিবাসী গ্রামের নাম ছড়িয়ে পড়বে। সবাই নাকি দলে দলে আসবে নেরুয়ার কাছে রোগ সারাতে।

তারপর আস্তে আস্তে সত্যিই নেরুয়ার কপালে ঘা উঠল। সবাই বিশ্বাস করে নিল ওর কথাগুলো। সবাই ধন্যি ধন্যি করতে লাগল ওকে, সবার চোখে ও দেবতা হয়ে গেল। অনেক টাকার বিনিময়ে ও নিজের চেলাদের দিয়ে কী সব ওষুধ বেচতে শুরু করল। অনেক লোক আসতেও লাগল ওর কাছে৷

কিন্তু বিশ্বাস করুন বাবু, ওগুলো কোনো ওষুধ নয়। ওগুলো সব বিষ। ও সবার মধ্যে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে। যে বিষের ছোঁয়ায় একজন মরবে প্রথমে, তারপর তার থেকে আর একজন। তারপর আরও অনেকজন। ও চায় মানুষদের মেরে ফেলতে। আর গিরিবাবা নয়, শয়তান এসেছিল ওর কাছে। ও শয়তানের দূত। শয়তান ওকে বিষ বানানোর মন্ত্র শিখিয়েছে। অনেক লতা, গাছ গাছড়া দিয়েছে। সে সব দিয়েই বিষ বানিয়ে ওষুধ বলে চালিয়ে দিচ্ছে ও। মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছে শয়তানের অসুখ, যে অসুখে প্রথমে মাথায় ঘা হয়, তারপর আসে মরণ৷

চমকে উঠল অম্লান। কী বলছে কি এই লোকটা! মনে হচ্ছে ওর ভাবনা, ওর অনুসন্ধান আরও এক ধাপ এগিয়ে দেওয়ার কথা বলছে।

কিন্তু আমি এসব কথা বিশ্বাস করব কী করে? সবাই তো বলে মিরাকল বাবা ভগবান৷

এবার চুপ করে রইল লোকটা। একটু ভেবে অম্লান আবার বলল, বেশ তুমি আমায় একটু সাহায্য করবে? তুমি আমায় নিয়ে যাবে ওই মিরাকল বাবার কাছে? চেলাদের কাছে নয়, সোজা ওই লোকটার কাছে। আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাই। তোমায় টাকা দেব আমি, যত চাইবে তত দেব।

আমার টাকা লাগবে না বাবু। আমি শুধু চাই সে ধরা পড়ুক৷ লোকটার গলা ম্রিয়মান লাগল এবার।

আমি আপনাকে নিয়ে যাব নেরুয়ার কাছে। কিন্তু আমাকে নয়, আপনাকে টাকা দিতে হবে নেরুয়াকে, অনেক টাকা। সে টাকার পিচাশ। টাকায় বিক্রি হয়ে যায়। অনেক, অনেক টাকা আর মদ এই দিয়ে আপনাকে বশ করতে হবে তাকে। কথা বের করতে হবে তার পেট থেকে৷

হুম, বুঝলাম। আমি দেব টাকা। কবে নিয়ে যাবে বল৷

আজই নিয়ে যাব৷ বলল লোকটা।

অশ্বত্থামার ব্রহ্মশির লক্ষ্যভেদ করল। সেই অস্ত্র আঘাত করল তৃতীয় পাণ্ডবের পুত্রবধূ, অভিমন্যুর স্ত্রী উত্তরার গর্ভে। আর্তকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন সদ্য স্বামী হারানো ভাগ্য বিতাড়িত এই রমণী।

মাতা রক্ষা করুন আমায়। একি অসহ্য যন্ত্রণা! কেন এভাবে জ্বলে যাচ্ছে আমার গর্ভ? আমার সারা শরীর? তলপেট চেপে ধরে চিৎকার করছেন উত্তরা। শিউরে উঠেছেন সুভদ্রা, পাঞ্চালী-সহ বাকি রাজ রমণীরা। একি সর্বনাশ হল! মহারাজ শান্তনুর শেষ বংশপ্রদীপও কি তবে নিভে যাবে এবার?

অশ্বত্থামার ঠোঁটে ক্রূর হাসি। যদিও রক্তে ভেসে যাচ্ছে তাঁর কপাল-সহ সারা শরীর। কারণ তিনিও উপড়ে নিয়েছেন নিজের মাথার মণি, তুলে দিয়েছেন তা পাণ্ডবদের হাতে। যন্ত্রণার অনুভূতিও যেন এই মুহূর্তে ম্লান হয়ে গেছে তাঁর উল্লাসের কাছে। তিনি উল্লসিত কারণ শেষ পর্যন্ত উত্তরার গর্ভস্থ সন্তানটিকেও শেষ করে ফেলতে পেরেছেন তিনি। একেবারে ধ্বংস হয়েছে পাণ্ডবদের উত্তরপুরুষকুল।

বাসুদেব কৃষ্ণ, আমি বলেছিলাম না, আমার অস্ত্র অব্যর্থ। সে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না। উত্তরার গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু অনিবার্য, ক্রূর ভাবে হাসতে হাসতে বললেন রক্তাক্ত অশ্বত্থামা। বাসুদেব কৃষ্ণ রক্তাভ চোখে তাকিয়ে রয়েছেন তাঁর দিকে।

এবার গর্জে উঠলেন তিনি, শোনো অশ্বত্থামা, আমি একের পর এক তোমার সকল অপরাধ প্রত্যক্ষ করেছি। তুমি নৃশংসভাবে কাপুরুষের ন্যায় রাতের অন্ধকারে বিনাযুদ্ধে নিরাপরাধ উপপাণ্ডবদের নিদ্রিত অবস্থায় হত্যা করেছ। তোমার এ অপরাধ সমস্ত নৈতিকতার সীমা আগেই অতিক্রম করেছিল। কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে তুমি যা করলে তা কোনো মনুষ্যচিত কর্ম নয়। তাই এই অপরাধের শাস্তিও তোমায় পেতেই হবে৷

উত্তরার যে সন্তানকে তুমি হত্যা করেছ তাকে আমি পুনর্জীবন দান করব। তাই এই পৃথিবীতে সে ভূমিষ্ঠ হবেই। কিন্তু তোমার অপরাধের শাস্তির থেকে তুমি মুক্তি পাবে না। তুমি কাপুরুষ, তুমি নরাধম। তুমি কিশোর, বালক ও ভ্রূণ হত্যার অপরাধে অপরাধী। তাই আজ আমি তোমায় অমরত্বের অভিশাপ দিচ্ছি। তোমার অমরত্বই হবে তোমার অভিশাপ। যতদিন সৃষ্টি থাকবে, ততদিন তুমি বেঁচে থাকবে। আর তার সঙ্গেই জীবিত থাকবে তোমার মাথার এই ক্ষত। এই ক্ষত কোনো দিন সারবে না। তুমি বেঁচে থাকলেও লোকালয়ে কোনো দিন তোমার কোনো জায়গা হবে না। তুমি অসহায় হয়ে নির্জন স্থানে একাকী ঘুরে বেড়াবে। যতদিন মানবসভ্যতা থাকবে ততদিন এই অভিশাপ বয়ে বেড়াবে তুমি৷

বেদব্যাস সমর্থন জানালেন শ্রীকৃষ্ণকে। তিনি বললেন, অশ্বত্থামা তুমি এই শাস্তিরই যোগ্য, ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও কি প্রচণ্ড অকরুণ তোমার চরিত্র! এভাবে উত্তরার গর্ভস্থ সন্তানকে হত্যা করতে পারলে তুমি!

দ্রোণপুত্রের মুখ থেকে মুছে গেছে সমস্ত ক্রূরতা। রক্তস্নাত অশ্বত্থামার চোখে-মুখে এখন শুধুই ভয়। তিনি বসে পড়লেন বাসুদেব কৃষ্ণের পদতলে। অশ্রু আর রক্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

দয়া করুন বাসুদেব। দয়া করুন আমায়। এ হেন ভয়ানক শাপে শাপিত করবেন না আমায়।’ ক্রন্দনরত অশ্বত্থামাকে দেখে এবার ক্রোধ খানিক প্রশমিত হল কৃষ্ণের। তিনি বললেন, এই শাপ তোমায় বহন করতেই হবে। এই শাপমুক্তি এই মুহূর্তে আমি প্রদান করতে পারব না। তবে আমি আবার আসব। অন্য এক যুগে আবার আমি ফিরে আসব, অন্য কোনো রূপে। তখন আবার দেখা হবে আমাদের। তখন আমি শাপমুক্তি ঘটাব তোমার। তার আগে নয়৷ এই বলে এগিয়ে গেলেন বাসুদেব। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন অশ্বত্থামা। চলে যাচ্ছেন তিনি। চলে যাচ্ছেন লোকালয় ছেড়ে অজানা কোনো নির্জন, নিঃসঙ্গ আশ্রয়ে।

বাকিদের দৃষ্টিসীমার আড়ালে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল তাঁর দেহাবয়ব। হারিয়ে গেলেন ঋষি ভরদ্বাজের পৌত্র তথা মহাগুরু দ্রোণাচার্যের পুত্র অশ্বত্থামা। সপ্তরথীর এক রথী তিনিও ছিলেন। কিন্তু তাঁর বীরত্ব কোনোদিন কোথাও প্রদর্শিত হয়নি সেভাবে, প্রদর্শিত হলেও পায়নি যথেষ্ট স্বীকৃতি।

অস্বচ্ছলতার সঙ্গে সংঘর্ষ করে কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর। নিজের পিতার শ্রেষ্ঠ শিষ্য তিনি নিজে হতে পারেননি কখনো, কারণ সে জায়গা ছিল অর্জুনের। এজন্য তিনি ঈর্ষান্বিত ছিলেন, কিন্তু এর কোনো সুরাহাও পাননি তিনি।

সভায় সবার সামনে পাঞ্চালীর বস্ত্রহরণে তাঁর নৈতিক সমর্থন ছিল না। কিন্তু তবুও চুপ ছিলেন তিনি। কারণ মিত্র দুর্যোধনের বিরোধিতা করতে তিনি অসমর্থ ছিলেন। ছলানার দ্বারা কৃত পিতৃহত্যা, মিত্রহত্যার প্রতিশোধ ছলনার মাধ্যমে করতে চেয়েছিলেন তিনি। আর তা করতে গিয়েই তিনি পরিণত হলেন নররাক্ষসে। পরিণামে শাপিতও হলেন।

অশ্বত্থামার মনস্তত্ত্ব কেউ বোঝেনি কোনো দিন। সবাই তাঁর হিংস্ত্রতা, ক্রূরতা দেখেছেন, কিন্তু অদৃশ্য থেকে গেছে তাঁর সংঘর্ষ, তাঁর অসহায়তা। তাই তিনি মহাকাব্যের কোনো নায়ক নন, তিনি প্রতিনায়ক। তিনি শুধুই এক অভিশপ্ত পুরুষ।

গতকাল থেকে আজ অবধি যা যা ঘটে গেল তা যেন এখনো ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না অম্লানের। এত দ্রুত ও অপ্রত্যাশিত ভাবে ঘটনাগুলো ঘটল যে, তা আত্মস্থ করাটা একটু কঠিন বইকি! ভেরো বাবার মন্দির যাওয়ার পথে আকস্মিকভাবে ওই ভেকুলা নামের আদিবাসী ছেলেটার সঙ্গে পরিচয় হল। সেই ছেলেটার কথাবার্তা উড়িয়ে দিতে পারেনি অম্লান। তাই খানিকটা ঝুঁকি নিয়ে, রুকমির কথা না শুনে ওর সঙ্গে আদিবাসী গ্রামটায় চলে গেছিল ও, একেবারে মিরাকল বাবার আসল ডেরায়।

মিরাকল বাবা, যার আসল নাম নাকি নেরুয়া, তার সঙ্গে পরিচয় হতেই শিউরে উঠেছিল অম্লান। কদাকার দেখতে তাকে। মিশকালো শরীর, মাথায় চুল প্রায় নেই বললেই চলে, কুতকুতে চোখ-মুখ। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যেটা তা হল লোকটার কপালের মাঝখানে দগদগে ঘা। কিন্তু সেই ঘা নিয়েও তার খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে বলে মনে হয় না। বেশ নির্বিকার সে। চোখ-মুখের ভাব দেখেই মনে হয় সে অতিশয় ধূর্ত।

প্রথমেই লোকটা ভেকুলার ওপর ভীষণ চোটপাট করল। ভেকুলাও উত্তরে কিছু বলছিল। যদিও পুরো কথাবার্তাটাই হচ্ছিল ওদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায়, তবুও অম্লান বুঝতে পারছিল কিছু কিছু। সম্ভবত লোকটা ভেকুলাকে তিরস্কার করছিল বাইরের একটা অচেনা লোককে তার গোপন ডেরায় নিয়ে এসেছে বলে। ভেকুলা ওকে উত্তরে কি বলেছিল সেটা ও নিজেই পরে অম্লানকে বলেছিল। ভেকুলা নেরুয়াকে বলেছিল যে অম্লান খুব ধনী পরিবারের ছেলে। সে তার বউয়ের চিকিৎসা করাতে কোনো কার্পণ্য করবে না। শুধু সে একবার মিরাকল বাবার সঙ্গে দেখা করতে চায়। প্রচুর টাকা দিতেও রাজি সে। আর অনেক টাকার কথা শুনেই তাকে সেখানে নিয়ে এসেছে ভেকুলা।

অনেক টাকার কথা শুনেই বোধহয় সুর খানিক নরম করেছিল লোকটা। আর অম্লানও দিয়েছিল তার মোক্ষম চাল। লোকটার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে চোখের জল ফেলতে শুরু করেছিল ও।

বাবা, আমার বউ খুব অসুস্থ। সদ্য বিয়ে হয়েছে আমাদের। শহরের সব ডাক্তাররা বলে দিয়েছেন ও আর বাঁচবে না। এই অবস্থায় আপনি শুধু আমার ভরসা। আমি কিছুতেই রুকমিকে হারাতে পারব না। যা টাকা দরকার, যা যা দরকার সব আমি দেব। শুধু আপনি ওকে ভালো করে দিন৷ ভাঙা হিন্দিতে কথাগুলো বলে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়েছিল অম্লান।

বেশ। আমার লোকেরা ওষুধ দিয়ে দেবে। আমি বলে দিচ্ছি। এমন ওষুধ দেব যে তোর বউ সেরে যাবে। কিন্তু টাকা অনেক বেশি লাগবে। দুহাজারের ওষুধ নয়, তোর জন্য দেব পাঁচ হাজার টাকার ওষুধ৷ বেশ দম্ভ নিয়ে বলেছিল লোকটা।

না বাবা, আমি শুধু ওষুধ নিতে আসিনি। আমি আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি। আপনার ছোঁয়ায় সেরে উঠবে আমার রুকমি। আমি আপনাকে পঁচিশ হাজার টাকা দেব। আপনি দয়া করে চলুন বাবা৷

কিছুটা দোনামনা করলেও শেষ অবধি পঁচিশ হাজারের প্রলোভন এড়াতে পারেনি লোকটা। অম্লানের সঙ্গে চলে এসেছিল সে। পাউরি জেলার একদম প্রান্তীয় এক গেস্ট হাউজে ছিল রুকমি। সেখানে লোকটাকে নিয়ে গিয়েছিল অম্লান। রুকমিও বেশ ভালোই অসুস্থতার অভিনয় করেছে। তাকে মন্ত্রপড়া জল ছিটিয়ে দিয়েছে মিরাকল বাবা। বদলে পেয়েছে পঁচিশ হাজার টাকা আর অনেকগুলো মদের বোতল।

আপনি কিভাবে গিরিবাবার দেখা পেয়েছিলেন বাবা? ভীষণ জানতে ইচ্ছা করছে৷ ভালো মানুষের মতো মুখ করে বলেছিল অম্লান।

‘তিনি নিজে এসে আমায় দেখা দিয়েছিলেন। আমি চমকে উঠেছিলাম প্রথমটায়। আমি তো বাবার থানে যেতাম প্রায়ই। সেদিনও গেছিলাম। সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। থানে সেদিন কেউ ছিল না। তখনই দেখলাম তাঁকে। বিশাল উঁচু মানুষ। মাথায় ঘা দগদগ করছে। তিনি এলেন আমার কাছে। তিনি আমায় আশীর্বাদ দিলেন। বললেন তিনি চিনি নিয়েছেন আমায়। তার কাজ আমায় করতে হবে। মানুষ মারতে হবে একে একে। তবেই তিনি মুক্তি পাবেন৷ মদ খেয়ে প্রায় বেহুঁশ তখন লোকটা। কি বলছে কোনো ঠিক নেই। আর মদের ঘোরেই বোধহয় মুখ থেকে সত্যি বেরোচ্ছিল।

কী বললেন? মানুষ মারতে হবে? গিরিবাবা মানুষ মারতে বলেছেন? কিন্তু আপনার কাজ তো মানুষকে বাঁচানো৷

অম্লানের কথা শুনে আবার সামলে নিয়েছিল লোকটা। হুঙ্কারের ভঙ্গীতে বলেছিল, হ্যাঁ মানুষ বাঁচাতে বলেছেন গিরিবাবা। সে কথাই তো বলছি। তিনি আমায় সঞ্জীবনী লতা দিয়ে গেছেন। সেই লতা দিয়েই ওষুধ বানাই আমি৷

আর লতা শেষ হয়ে গেলে কি হবে? ফের প্রশ্ন করেছিল অম্লান।

আবার আসবেন তিনি। তিনি ফিরে আসেন বারবার। আবার দিয়ে যাবেন মানুষ মারার মানে মানুষ বাঁচাবার গাছ৷

কোথায় থাকেন তিনি? কোথা থেকে ফিরে আসেন বারবার?

মন্দির। তার মন্দির বুরহানপুরের অসিগড় কেল্লায়৷ ব্যস! আর কিছু বলেনি নেরুয়া। অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল। তারপর অম্লান তাকে পৌঁছে দিয়ে এসেছিল সেই জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ি আদিবাসী ডেরায়।

লোকটার সব কথা রেকর্ডারে তুলে রেখেছিল অম্লান। এখন সেগুলোই শুনছিল আবার। এবার আর কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না ওর। কী করা উচিত এরপর? এবার তো দিল্লি বা কলকাতা ফিরে গিয়ে কিছু একটা করতে হবে। রুকমিও বসে আছে গুম হয়ে। কোনো কথা বলছে না।

কিরে রুকমি কী বুঝলি? কী করা উচিত এবার? ফিরে যাই? যা জেনেছি, যা বুঝেছি সেগুলো উপযুক্ত জায়গায় জানিয়ে দিই। রুকমি চুপ। উত্তর নেই।

কিরে বল কিছু।

একটা কথা বলব? বলল রুকমি।

একবার শেষ বারের মতো মধ্যপ্রদেশ যাবি? সবাইকে সব কিছু জানানোর আগে একবার বুরহানপুরের অসিগড় কেল্লায় যাবি?

কি! তুই কি পাগল হলি? তোর সত্যিই কি মনে হয় কোনো গিরিবাবা আছে ওই কেল্লায়? ওর পিছনে কোনো দুষ্ট কিন্তু শক্তিশালী চক্র আছে। যারা ভাইরাসের দ্বারা মানবসভ্যতাকে ধ্বংস করতে চায়। এই লোকটা বা এই অশিক্ষিত আদিবাসীগুলো জাস্ট ঘুঁটি। ওরা শুধুই ব্যবহৃত হচ্ছে। কোথায় আছে সেই মাস্টারমাইন্ড সেটাই এবার খুঁজতে হবে। এটা আমার বা তোর একার কাজ নয়।

তুই জানিস বুরহানপুরের অসিগড় কেল্লায় কে থাকেন? অম্লানের দিকে তাকাল রুকমি।

কে থাকে?

অশ্বত্থামা।

কোন অশ্বত্থামা? তোর রিসার্চের সেই টপিক? রুকমি এটা মজা করার সময় নয়। কি হয়েছে কি তোর?’

আমি মজা করছি না। তোকে তো বলেছিলাম অশ্বত্থামা চিরঞ্জীবী। তিনি আজও বেঁচে আছেন শ্রীকৃষ্ণের শাপে। কৃষ্ণ তাঁকে শাপ দিয়েছিলেন তিনি নির্বান্ধব হয়ে একাকী ঘুরে ঘুরে বেড়াবেন নির্জন নানা এলাকায়। নানা রিসার্চে বলছে, অশ্বত্থামাকে আজও কখনো কখনো দেখা যায়। কখনো তাঁকে দেখা যায় এই উত্তরাখণ্ডেরই নানা আদিবাসী এলাকায়, কখনো উত্তরপ্রদেশে আবার কখনো মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুরের অসিগড় দুর্গে। পাহাড়ের ওপরের এক দুর্গম কেল্লা এটা, এখানে একটি শিবমন্দির আছে। অশ্বত্থামা ছিলেন শিবের পরম ভক্ত। তাই তিনি শিবমন্দিরকে ঘিরে থাকতে চাইবেন এটা তো ধরে নেওয়াই যায়।

দেখ অম্লান, তুই আমায় বলেছিলি এই ভাইরাসটা খুব সাধারণ ভাইরাসের মতো নয়। এটা তৈরি করার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের হয়তো হবে না। আবার এটাকে প্রকৃতিজাতও মনে হচ্ছে না। অর্থাৎ ভাইরাসটি খানিকটা অলৌকিক টাইপের। এই ভাইরাসের ফিচারও বলছে আক্রান্ত মানুষের কপালের মাঝখানেই প্রথমে ক্ষত তৈরি হবে ঠিক অশ্বত্থামার মতো। আর এই আদিবাসী লোকটিও যা বলছে তাতে মনে হচ্ছে যাকে সে দেখেছে তিনি ভগবান না হলেও সাধারণ কেউ নন। আর ভুললে চলবে না, লোকটি মুখ ফস্কে বলে ফেলেছিল তাকে দেখা দেওয়া সেই অলৌকিক ব্যক্তি মানুষ মারতে চায়। কারণ মানুষ ধ্বংস না হলে তার মুক্তি নেই। কি তাই বলল তো? তাহলেই বোঝ। অশ্বত্থামাও কিন্তু সৃষ্টির ধ্বংস চান। কারণ সৃষ্টি ধ্বংস না হলে তাঁর মুক্তি নেই। তাই আমি বলছি all the clues are going to lead one path, that is Ashwatthama.

রুকমি, আমি জানি তুই তোর রিসার্চের ব্যাপারে প্যাশনেট। কিন্তু, তাই বলে সব গাঁজাখুরি কথা বলবি তুই? অশ্বত্থামা বেঁচে আছে হাজার হাজার বছর ধরে? সে শক্তিশালী ভাইরাস বানিয়ে মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করতে চাইছে? কোনো হিউম্যান বডি এত বছর ধরে বেঁচে থাকতে পারে না। এরকম হয় না। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই হয়ও, তাতেই বা কী? আমি সেক্ষেত্রে বুরহানপুরের পাহাড়ি দুর্গে একা গিয়ে কী করব? চা বিস্কুট খাব অশ্বত্থামার সঙ্গে? আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য সে কি বসে আছে নাকি?

‘একবার গিয়ে দেখতে তো ক্ষতি নেই অম্লান। যদি তুই পারিস সব রহস্যের জট ছাড়াতে! যদি তুই পারিস সাকসেসফুলি সবাইকে বাঁচাতে! সবটা খতিয়ে দেখতে দোষ কি! তুই তো সবটা খতিয়ে দেখতেই এসেছিলি৷

আমি ভগবান নই রুকমি, যে এসব অলৌকিক ব্যাপার নিয়ে ডিল করে জিতে যাব। আমি শ্রীকৃষ্ণ নই৷

কী করে জানলি নস? মানুষের মধ্যেই তো ভগবান লুকিয়ে থাকেন। শ্রীকৃষ্ণও ফিরে আসেন বারবার মানব জাতির বিপন্নতায়। কে বলতে পারে হয়তো তোর মধ্যেই তিনি কোনো শক্তি দিয়ে রেখেছেন যার সাহায্যে তুই জিতে যেতে পারবি। হয়তো তোকেই পাঠিয়েছেন তিনি। ছোটোবেলা থেকে দেখে আসা তোর সেই স্বপ্নগুলোর কথা মনে কর অম্লান। সেগুলো কি অলৌকিক নয়? তোকে কখনো বলিনি, আজ বলছি। প্রতিবার তোর স্বপ্নের কথা শুনে আমার মনে হতো তুই মহাভারতের সময়ের কথা বলছিস। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সেই সময়টার কথা বলছিস। অশ্বত্থামাকে শ্রীকৃষ্ণের অভিশাপ দেওয়ার সেই মুহূর্তটার কথা বলছিস।’

জাস্ট শাট আপ রুকমি। কেন এসব বলছিস তুই? আমি খুব সাধারণ পরিবারের ছেলে। আমি কোনো বিশেষ ক্ষমতা নিয়ে জন্মাইনি। আমি বিশেষ কেউ নই।’ চিৎকার করে উঠল অম্লান।

সত্যি কি তুই জানিস তুই কোন পরিবারের ছেলে? কোথা থেকে এসেছিস?’ রুকমির শেষ কথায় থমকে গেল অম্লান।

শোন, মানুষই পারে নিজের কর্মের দ্বারা ভগবানের পর্যায়ে পৌঁছতে। ভগবান বিষ্ণু রাম বা কৃষ্ণ উভয় অবতারেই কিন্তু মানুষরূপে এসে দুষ্টের বিনাশ করেছিলেন। মানুষই কিন্তু পারে ভগবান হয়ে উঠতে। জানি না কেন আমার মন বলছে অসিগড় তোর জন্য অপেক্ষা করছে অম্লান। তুই একটিবার চল। দেখাই যাক না কি হয় শেষমেশ।’

রাতের ঘন অন্ধকার জমাট বেঁধে রয়েছে, আর অম্লানের চোখের সামনে শতাব্দী প্রাচীন এক পাহাড়ি দুর্গ। আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে তৈরি হয়েছিল সে দুর্গ। মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুরের অসিগড় কেল্লা। সমতল থেকে কেল্লাটি প্রায় ২৬৯.১ মিটার উঁচুতে। সমুদ্রতল থেকে উচ্চতা ৭০১ মিটার। এটাই সাতপুরা রেঞ্জের সবচেয়ে উঁচু এলাকা।

অম্লান আর রুকমি মধ্যপ্রদেশ এসে পৌঁছোছে দিন কয়েক আগে। অম্লানের মানসিকভাবে খুব একটা সায় ছিল না। রুকমির জোরাজুরিতেই আসা। বুরহানপুর থেকে নিজেরাই খোঁজ করে চলে এসেছিল ওদের গন্তব্যে। আর এখানে এসে এই কেল্লা দেখার পর অম্লানের একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে ভাগ্যিস রুকমি এখানে নিয়ে এল! সত্যিই বোধহয় এখানে লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য, যে রহস্য ভেদ করতে পারলে অম্লান পৌঁছতে পারবে নিজের লক্ষ্যে। শুধু ভাইরাস নিয়ে অনুসন্ধান নয়, সবকিছুর আড়ালে কোনো রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, এখন সেটাই জানতে চায় অম্লান।

এখানে এসে প্রথম দিনেই গাইড নিয়েছিল ওরা। গাইড অনেক কিছু জানিয়েছেন। এই অসিগড় দুর্গের অপর নাম অশ্বত্থামা গিরি। কারণ এখানকার সাধারণ স্থানীয় মানুষেরা বিশ্বাস করেন, দ্বাপর যুগ থেকে আজ অবধি শাপিত হয়ে বেঁচে রয়েছেন দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা। তিনি এখানেই থাকেন, এই এলাকা আশেপাশে। এই এলাকার সংলগ্ন অঞ্চলেই নাকি দ্বাপর যুগে ছিল মহর্ষি ব্যাসের আশ্রম।

এই অসিগড় দুর্গের অভ্যন্তরেই আছে এক প্রকাণ্ড শিবলিঙ্গ। স্থানীয় মানুষ বিশ্বাস করেন, সেই শিবমন্দিরে নাকি আজও নিয়মিত ভাবে নিজের পুজো উৎসর্গ করেন অশ্বত্থামা। ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই নাকি তিনি আসেন। মহাদেবের পায়ে ফুল দিয়ে অঞ্জলি অর্পণ করেন তিনি। কেউ কখনও দেখেনি তাঁকে। ভোরের আলো ফোটার আগেই আসেন। মন্দিরের পূজারি-সহ অনেকে অনেকবার জানার চেষ্টা করেছেন কে আসে এভাবে পুজো দিতে। কিন্তু কেউ সফল হননি।

‘আসলে বাবুজি অশ্বত্থামাজি তো কাউকে দেখা দেবেন না। তাই যে যত চেষ্টাই করুক কেউ তাকে দেখতে পাবেন না।’ গভীর বিশ্বাস নিয়ে বলছিল টুরিস্ট গাইড ছেলেটা। ওর নাম ত্রিকাল। স্থানীয় ছেলে, বেশ ভালো। ওরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে দ্বাপর যুগের সেই অভিশপ্ত পুরুষ আজও বেঁচে রয়েছেন সশরীরে। আসলে ওরা বিজ্ঞান বোঝে না, যুক্তি-তর্ক বোঝে না। ওরা শুধু বোঝে অন্ধবিশ্বাস।

ছেলেটার কথা শুনতে শুনতে অম্লানের হাত চেপে ধরেছিল রুকমি। ফিসফিস করে বলেছিল, দেখেছিস সব মিলে যাচ্ছে। বলেছিলাম না... অম্লান নিজেও কেমন যেন কেঁপে উঠছিল সবকিছু শুনতে শুনতে। ওর ভেতর থেকে কে যেন বারবার বলছিল অসিগড় সত্যিই তোমার অপেক্ষায় ছিল অম্লান। অনেক কাজ বাকি এখনও তোমার।

দিনের আলোয় এ দুর্গ দেখে গেলেও আজ অম্লান এখানে এসেছে রাতের অন্ধকারে। রাতে এখানে এমনিতে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। প্রধান গেটে থাকে কড়া পাহারা। কিন্তু যাই থাক না কেন আজ যে অম্লানকে ভিতরে যেতেই হবে এবং সেটা এই রাতের অন্ধকারেই।

ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয় এই কথাটা হয়তো কিছুটা ঠিক, কিন্তু পুরোটা ঠিক নয়। তাই অনেক কষ্টে একটা উপায় করতে পেরেছে অম্লান। এখনও জানা নেই সে উপায় আদৌ কতটা কার্যকরী হবে। গাইড ছেলেটাই বলেছিল এই কেল্লার ভেতরে ঢোকার জন্য প্রধান ফটক ছাড়াও আরও কয়েকটা গুপ্ত পথ আছে, আগেকার দিনের কেল্লায় যেমন হত আর কি! ত্রিকাল নিজেও নাকি জানে কেল্লায় ঢোকার তেমন এক গুপ্ত পথের সন্ধান। অম্লান বলেছিল, একবার রাতের অন্ধকারে ওই কেল্লার ভিতরে ঢোকার ওর ভীষণ দরকার। ত্রিকাল বলেছিল সে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু বিনিময়ে তার চাই মোটা অঙ্কের টাকা।

কিন্তু গেটের বাইরে কড়া পাহারা। তাই গোপন কোনো রাস্তা দিয়ে ভিতরে ঢুকতে পারাটাও খুব একটা সুবিধাজনক মনে হয়নি অম্লানের। কিন্তু এই ঘোর কলিযুগে টাকাই হল সবচেয়ে বড় ভগবান। টাকায় বিক্রি হয় সব কিছু। ত্রিকাল যেমন বিক্রি হল তেমনই বিক্রি হল মন্দার। মন্দার ত্রিকালেরই পরিচিত, সে এই দুর্গের পাহারায় থাকে। অনেক টাকা দিয়ে তাকেও কিনে নিয়েছে অম্লান। সে আশ্বাস দিয়েছে, অম্লান ও ত্রিকাল যাতে নির্বিঘ্নে ভেতরে চলে যেতে পারে, সে দায়িত্ব তার। অন্যান্য পাহারাদারদের সে সামলে নেবে।

অবশেষে সে মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। রাতের অন্ধকার ঠেলে অম্লান পৌঁছচ্ছে দুর্গের ভিতর। সঙ্গে রয়েছে ত্রিকাল। রুকমি আসেনি। সে রয়ে গেছে বুরহানপুরের গেস্ট হাউজে। আজ যা করার অম্লান একাই করবে।

অনেকটা পথ ভেঙে অবশেষে কেল্লার ভিতরে ঢুকতে পারল অম্লান। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। অনেক সরু অলিগলি পথ, বাঁক পেরিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছে ও। বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস করছে। ঠিক এমনটাই তো ও স্বপ্নে দেখত বারবার।

অনেকগুলো টর্চ এনেছে অম্লান । কিন্তু দুর্গের ভেতর সে আলোগুলোও কেমন যেন ফ্যাকাশে লাগছে। ভালো করে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তবুও সে ফিকে আলোকে সম্বল করেই হাতড়ে হাতড়ে ত্রিকাল নিয়ে এল ওকে দুর্গের ভিতরের এক বিরাট কক্ষে, যার মাঝে রয়েছে প্রকাণ্ড এক শতাব্দী প্রাচীন শিবলিঙ্গ। এই নাকি সেই শিবলিঙ্গ যেখানে আজও পুজো উৎসর্গ করেন অশ্বত্থামা। তাঁকে দেখতে পাওয়া যায় না, শুধু দেখা যায় তার রেখে যাওয়া নৈবেদ্যের ফুল।

রুকমির সঙ্গে দিনের আলোয় এই শিবলিঙ্গ দেখে গিয়েছে অম্লান। কিন্তু এই মুহূর্তে কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল ওর। কে জানে কী অপেক্ষা করছে ওর জন্য! রুকমির একটা কথা বারবার মনে পড়ছে ওর, ‘মানুষই পারে নিজের কর্মের দ্বারা ভগবানের পর্যায়ে উন্নীত হতে।’ সত্যিই কি অম্লান এমন কিছু করতে পারবে যাতে সবাই বেঁচে যাবে?

ত্রিকাল তুমি এবার যাও। যা করার এবার আমায় একাই করতে হবে৷ গম্ভীর গলায় বলল অম্লান।

কিন্তু বাবু, আপনি পারবেন তো ঠিক সময়ে একই ভাবে, একই পথে পালিয়ে যেতে?

পারব৷ কিছু না ভেবেই বলে দিল অম্লান।

চলে গেল ত্রিকাল। যেমন নিঃশব্দে এঁকে বেঁকে গোপন পথে ও এসেছিল, সেভাবেই চলে গেল।

অম্লান এখন একা। একা প্রতীক্ষা করছে এই দুর্গম, নির্জন, প্রাচীন, রহস্যময় কেল্লায়।

বোধ হয় সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল অম্লান। একটা শব্দে ছিঁড়ে গেল ঘুমটা। একটা দরজা খুলে গেছে। কোন দরজা প্রথমটায় বুঝতে পারল না ও। একটু আগেও যে জায়গায় শক্ত পাথরের দেওয়াল ছিল সেখানে কোনো দরজা খুলে গেল কীভাবে! তবে কি ওটা কোনো গোপন দ্বার ছিল?

ওই দরজার ওপারে কে দাঁড়িয়ে? কে ওই অদ্ভুত ছায়ামূর্তি? কি ভীষণ লম্বা! ঘাড় অবধি সিংহের কেশরের মতো চুল। বাইরে অন্ধকার খানিক পাতলা হয়েছে। সূর্য সবে জেগে উঠেছে পুব আকাশে। ঊষার আবছা আলোয় ছায়ামূর্তিকে দেখছে অম্লান। তাঁর কপাল জোড়া ক্ষত। হাতে ফুল নিয়ে দৃঢ় মুখে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি শিবলিঙ্গের দিকে তাকিয়ে। কে এই মানুষ? এই কি তবে দ্বাপর যুগের অশ্বত্থামা যাকে কেউ কোনো দিন দেখতে পায় না! তাহলে অম্লান একে দেখতে পাচ্ছে কী করে? ত্রিকাল বলেছিল যেদিন শ্রীকৃষ্ণ আবার ফিরে আসবেন একমাত্র সেদিনই তাঁর সামনে দেখা দেবেন অশ্বত্থামা। এমনটাই প্রচলিত বিশ্বাস। কারণ তাঁর অপেক্ষাতেই যে আছেন দ্রোণপুত্র। একমাত্র তিনিই যে পারেন তাঁকে মুক্তি দিতে। তাহলে অম্লান কী করে দেখতে পাচ্ছ একে?

হঠাৎ অম্লানের মনে পড়ে গেল ঠামের বলা একটা কথা, তুই যে আমার কেষ্টঠাকুর। অম্লান জানে না ও কে। কিছুই বুঝতে পারছে না। কিন্তু যদি সত্যিই ইনি অশ্বত্থামা হন, আর যদি সত্যিই ওর কোনো ক্ষমতা থাকে তাঁকে যন্ত্রণামুক্ত করার তবে আজ সেটাই করবে ও। অনেক শাস্তি পেয়েছেন তিনি। অপরাধের থেকেও বেশি শাস্তি। এবার তাঁর মুক্তি দরকার। ছায়ামূর্তি নিথর দাঁড়িয়ে এখনও। অম্লান তাঁর দিকে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে। কে এ জানতেই হবে ওকে। এ কি সত্যিই সেই অভিশপ্ত পুরুষ, নাকি কোনো এলিয়েন? নাকি, আরও গভীর কোনো রহস্য আছে একে ঘিরে?

আপনি কে? আপনিই কি অশ্বত্থামা? সংস্কৃতে প্রশ্ন করল অম্লান। ঠামের কাছে শুনে শুনে এই ভাষা খানিকটা জানত ও। কিভাবে যেন হঠাৎ এই মুহূর্তে মনে পরে গেল সেটা, ও নিজেও বুঝতে পারল না৷!

সামান্য ঘাড় নাড়ল ছায়ামূর্তি, যেটা সম্মতিসূচক বলেই মনে হল অম্লানের।

সারা রাত ঘুমোতে পারেনি রুকমি। অম্লান গত রাতে অসিগড় গেছে। সত্যিই কি অশ্বত্থামার মুখোমুখি হবে ও? কোনো বিপদ হবে না তো ছেলেটার? নানা আশঙ্কা, উদ্বেগ মিলিয়ে ছটফট করেই যাচ্ছে রুকমি। ওর মোবাইল আউট অফ কভারেজ বলছে। কী হল তবে?

অম্লান বারবার বলছিল কোনো মানুষ এতদিন তার শরীর নিয়ে বাঁচতে পারে না। এটা অসম্ভব। রুকমিও জানে সেটা। কিন্তু এটাও তো সত্যি, এই বিশ্বের অভ্যন্তরেই এমন অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে যেটা সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

রুকমি কাল সারারাত ধরে একটার পর একটা আর্টিকেল, রিসার্চ পেপার ডাউনলোড করে গেছে, যেগুলো অশ্বথামাকে নিয়ে তৈরি। হাতড়ে যাচ্ছে ও পাগলের মতো। কিছু তো একটা সূত্র থাকবে যেটা ওকে বুঝতে সাহায্য করবে যে অশ্বত্থামার এতদিন ধরে জীবিত থাকার রহস্য কী? সত্যিই কি সেই দ্বাপরযুগের অশ্বত্থামাই আজও পৃথিবীর বুকে আছেন নাকি অশ্বত্থামা শুধুই একটা প্রতীকী নাম যার আড়ালে বারবার যুগে যুগে ফিরে আসেন বঞ্চিত, স্বীকৃতি না পাওয়া মানুষেরা? তারাই হয়তো লাঞ্ছিত হতে হতে এক সময় হয়ে ওঠেন সেই দ্রোণপুত্রের মতো নিষ্ঠুর!

অনেকগুলো আর্টিকেলের প্রিন্টআউট নিয়েছে রুকমি। কিছু খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে ও। অম্লানকে আর ওকে পারতেই হবে। ওই ভাইরাসের কবল থেকে বাঁচাতে হবে পৃথিবীকে, জানতে হবে যুগের পর যুগ ধরে বয়ে চলা এই মিথের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যিটাকে।

সূর্যের এক মুঠো ঝলমলে সোনালি আলো জানলার কাচ গলে এসে ঝাপটা মারল রুকমির চোখে-মুখে। জানলার বাইরে চোখ মেলল রুকমি। নতুন দিন নিয়ে এসেছে আগামীর বার্তা। সোনালি সূর্যটা যেন হাসছে মিটিমিটি আর বলছে, পারবি! তোরা পারবি।

ধীর পায়ে উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল রুকমি৷ সত্যিই কি আম্লানের সঙ্গে দেখা হবে কারোর? সত্যিই কি অসিগর কেল্লায় লুকিয়ে আছে ওই ভাইরাসের উৎস? একের পর এক প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলেছে ওকে৷ বিশ্বাস যাই বলুক, যুক্তি ও বিজ্ঞান বলছে অশ্বত্থামা যদি মানবদেহধারী হন, তাহলে ইনি সেই দ্বাপর যুগের শাপিত পুরুষ হতে পারেন না৷ তাহলে কে সেই রহস্যময় ব্যক্তি, কী-ই বা সেই রহস্য যা যুগ যুগ ধরে প্রবাহিত হয়ে চলেছে ওই কেল্লাকে ঘিরে, অশ্বত্থামার পরিচয়ের আড়ালে? অশ্বত্থামা কি শুধুই তাহলে কোনো প্রতীক? এ ক্ষেত্রে যার আড়ালে লুকিয়ে আছে কোনো অন্য রহস্য? কী সেটা? কোনও অন্যগ্রহ থেকে আসা শক্তি? নাকি, এমন কিছু যেটা কেউ জানে না। কেউ কখনো খুঁজেই পায়নি৷ অম্লান পারছে কি সেটা জানতে? ওর কোনো বিপদ হবে না তো?

জানি না রুকমি, আমি পারব কিনা, কিন্তু আমি চেষ্টার কোনো ত্রুটি করব না৷ তুই বলেছিস, মানুষই পারে তার কর্মের দ্বারা ঈশ্বর হয়ে উঠতে। তাই আমি সত্যিই চেষ্টা করব নিজের সবটুকু শক্তি, বুদ্ধি প্রয়োগ করার যাতে, আমিও বাঁচাতে পারি মানুষকে এবং সেই অভিশপ্ত রহস্যকেও। যা মিথ হয়ে বেঁচে রয়েছে যুগ যুগ ধরে৷ যাবার আগে এটাই বলে গেছে অম্লান৷

জানিস, হিন্দুধর্ম বলছে শ্রীকৃষ্ণ কলিতে ফিরে আসবেন কল্কি অবতার হয়ে৷ অম্লানের কথার উত্তরে হঠাৎ বলে উঠেছিল রুকমি৷

আমি কল্কি? তাই বলছিস? হা হা হা৷

তাই বলিনি। কিন্তু সত্যিই যদি ভগবান ফিরে আসেন তিনি হয়তো আমাদের মতো সাধারণ মানুষ হয়েই আসবেন৷ আমার তো তাই মনে হয়৷ আসলে কি বলত, ভগবান হোক বা শয়তান যে-কোনো শক্তিই বারবার ফিরে আসে এই পৃথিবীতেই৷ পজেটিভ থাকলে নেগেটিভকেও যে থাকতেই হবে৷

আবার অম্লানের ফোন নম্বর ডায়াল করল রুকমি৷ এখনও ফোন লাগছে না৷ রুকমি ভয় পেতে গিয়েও পেল না৷ ভীষণ ভাবে আত্মবিশ্বাসী ও৷ অম্লান জিতে ফিরবেই৷ যা কিছু অশুভই ওখানে থাক না কেন অম্লান ঠিক পারবে শুভশক্তির প্রতীক হয়ে জিতে ফিরতে৷ যুগে-যুগেই তো তাই হয়েছে৷ চোখ বন্ধ করে গীতার শ্লোক উচ্চারণ করল রুকমি;

‘যদা যদা হি ধর্মস্য, গ্লানির্ভবতি ভারত৷

অভ্যত্থানমধর্মস্য তদাত্মনং সৃজামহ্যম্৷৷

পরিত্রাণায় সাধূনাং

বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্৷

ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি

যুগে যুগে৷৷

পরিশিষ্ট

উপন্যাসের শেষে এসে হয়ত প্রিয় পাঠকের মনে দু-একটা প্রশ্ন রয়ে গেল।

অম্লানের সঙ্গে যার দেখা হল, তিনিই কি অশ্বত্থামা?

অম্লান কি পারবে মারণ ভাইরাসকে নির্মূল করতে?

আদিবাসী নেরুয়ার অন্তিম পরিণতি কী হতে পারে?

ঝিমনাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ কি নিতে পারবে ভেকুলা?

এইসব প্রশ্নের উত্তর নিয়েই হয়ত ফিরবে অম্লান। ফিরবে রুক্মি। ফিরবে নেরুয়া, ভেকুলা আর বাকি জীবিত সকলে।

আর ফিরবেন সেই রহস্যময় সত্তা, যাঁর গোপন আবাস অসিগড় কেল্লায়।

শুভ বা অশুভ শক্তি এই পৃথিবীর বুকে ‘ফিরে আসে বারবার’। আর তাই যুগের পর যুগ ধরে চলতে থাকে শুভ ও অশুভর চিরন্তন যুদ্ধ।

পাঠক, খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসার ইচ্ছে রইল।

অধ্যায় ১ / ১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%