শান্তনু বসু
এ-সংসারে নবীনের আপনজন কেউ নেই৷ বাপ-মার ভালোবাসা কী বস্তু, সে জানে না৷ নবীনকে জন্ম দিতে গিয়েই তার মা মারা যান৷ বাপ ছিলেন ভবঘুরে৷ দুধের শিশু নবীনকে তার মামাবাড়িতে ফেলে রেখে তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান৷
দাদু-দিদিমা যতদিন বেঁচেছিলেন, ততদিন তাঁদের আদর সে পেয়েছে৷ তাঁরা চোখ বুজতেই নবীন একবারে একা হয়ে যায়৷ শেষ পর্যন্ত তার ঠাঁই হয় মাধবপুর অনাথ আশ্রমে৷
মাধবপুর অনাথ আশ্রমের নামডাক আছে৷ তারা অনাথ ছেলেদের ভালোই দেখভাল করে৷ কাজেই ছোটো থেকে বড়ো হয়ে উঠতে নবীনকে তেমন কোনো কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়নি৷ কিন্তু বড়ো হওয়ার পর নবীন বুঝল একটা মস্ত গোলমাল হয়ে গিয়েছে৷
নবীনের লেখাপড়ার দৌড় আট ক্লাস পর্যন্ত৷ চেহারা অসুন্দর৷ তার উপরে সে বেজায় মোটা৷ সেই সঙ্গে তার বুদ্ধিটাও মোটা৷ এসব নিয়ে ভগবানের উপর নবীনের খুব রাগ, মনের মধ্যে পাহাড় প্রমাণ ক্ষোভ৷ কেন তাকে গড়ার ক্ষেত্রে ভগবানের এই ফাঁকিবাজি?
মাধব দত্তের অঙ্কের মাথা, রাঘব সরকারের ফুটবলের স্কিল, সুরেন শিকদারের ব্যাটিং প্রতিভা বা ফণী তফাদারের অভিনয় ক্ষমতা, এর যেকোনো একটা ভগবান যদি তাকে দিতেন, তাহলে কি খুব অন্যায় হত? নিদেনপক্ষে সিঁধেল চোর ভজন বাগদির মতো একখানা ছিপছিপে, চাবুকের মতো শরীরও তো দিতে পারতেন!
নাহ, নবীনের ক্ষেত্রে ভগবান বড্ড কিপটেমি করেছেন৷ এর জের টেনে বেড়াতে হচ্ছে তাকে৷ কোনো গুণ নেই বলে গাঁয়ের লোকের কাছে তার কোনো খাতির নেই, কোনো আদর নেই৷ সবাই তাকে বড্ড হেলাফেলা করে, বড়ো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে৷
শুধু নবীন বলে তাকে সম্বোধন করে খুব কম লোকই৷ বাকিরা তার নামের আগে বিশেষণ জুড়ে দেয়৷ চালকুমড়ো নবীন, কুমড়োপটাশ নবীন, জড়ভরত নবীন, হাবাগঙ্গারাম নবীন, মাথামোটা নবীন-এইসব৷
বারান্দায় টুলের উপর বসে নবীন ঢুলছিল৷ তাকে দেখে স্কুলের ক্লার্ক রাম নন্দী হেঁকে উঠলেন, 'এই হতভাগা, ঢুলছিস যে, কটা বাজে খেয়াল আছে? ঘণ্টা দেবে কে? চালকুমড়ো কোথাকার?' ক্লাস সেভেনের তিনটে ছেলে বাইরে নিলডাউন হয়েছিল৷ রাম নন্দীর কথা শুনে তারা খিলখিল করে হেসে উঠল৷
আচমকা এই ধমকে ও হাসাহাসির শব্দে সহসা ঘুমের চটকা ভেঙে যাওয়ায় নবীন সোজা হয়ে বসে দেখে, তাই তো ছুটির সময় হয়ে গিয়েছে৷ ঢং ঢং ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজিয়ে দেয় নবীন৷
আজ প্রায় বছর দশেক হয়ে গেল আশালতা মেমোরিয়াল হাইস্কুলে সে ঘণ্টা পেটানোর কাজ করছে৷ হেডস্যার তারিণী ঘোষালের কৃপায় ইশকুলেরই একটা পরিত্যক্ত ঘরে সে আশ্রয় পেয়েছে৷ আর যাই হোক, স্কুলের এই সামান্য চাকরিটা আছে বলে নবীনের খাওয়া-থাকার ভাবনা নেই৷
ক্লাস এইটে তিন বার ফেল করার পর নবীনকে ডেকে হেডস্যার তারিণী ঘোষাল বলেছিলেন, 'অনেক ভেবে দেখলাম, তোর একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে৷' নবীন অবাক চোখে স্যারের দিকে তাকিয়েছিল৷
তারিণীবাবু বলেছিলেন, 'দ্যাখ বিশেষ কোনো ক্ষমতা না-থাকলে কেউ ক্লাস এইটে তিন বার ফেল করতে পারে না৷ এ অসম্ভব৷ কিন্তু এই অসম্ভব কাণ্ডটা যখন করেই দেখিয়েছিস, তখন স্কুলের নিয়ম মেনে তোকে টিসি দিতেই হবে৷ ওদিকে অনাথ আশ্রমও তোকে রাখবে না৷ তোর মেঘে মেঘে যে অনেক বেলা হয়েছে৷ তা এখন যাবি কোথায় তুই? এক কাজ কর, স্কুলে ঘণ্টা বাজানোর জন্য একটা লোকের দরকার৷ বুড়ো রামচরণ আর পেরে উঠছে না৷ তুই এই কাজে লেগে যা৷ একখানা ঘর তোকে দিয়ে দেব৷ এমনিই থাকবি৷ মাইনে যা পাবি তাতে তোর চলে যাবে৷ লেখাপড়া তো হল না৷ আর কী করবি, মন দিয়ে ঘণ্টা পিটিয়ে যা, যদি মা সরস্বতীর ঘুম ভাঙাতে পারিস, সেটা পরজন্মে কাজে দেবে৷'
সেই থেকে আশালতা মেমোরিয়াল স্কুলে নবীন ঘণ্টা পিটিয়ে চলেছে৷ মা সরস্বতী শুনতে পাচ্ছেন কি না তিনিই জানেন৷
সন্ধ্যে বেলা কেরোসিনের স্টোভে ভাত রান্না করে খাটের উপর চিত হয়ে শুয়ে নিজের মন্দ ভাগ্যের কথা ভাবছিল নবীন৷ বাইরে সাইকেল ঘণ্টির শব্দ শুনে উঠে বসল সে৷ স্কুলটা একেবারে গাঁয়ের এক প্রান্তে৷ সন্ধ্যের পরে এদিকে বড়ো একটা কেউ আসে না৷ কে এল আবার?
'নবীন! নবীন আছিস না কি?'
ফণী তফাদারের গলা৷ ফণী তফাদার মাধবপুরের মস্ত মানুষ৷ সবাই তাকে খাতির করে৷ তার ঘরে মা সরস্বতীর অধিষ্ঠান৷ ফণী তফাদার যাত্রাপালা লেখে৷ পালা পরিচালনা করে৷ তুখোড় অভিনয়ও করে৷
একবার স্কুল থেকে বার্ষিক অনুষ্ঠানের নেমন্তন্নের চিঠি দিতে ফণী তফাদারের বাড়িতে গিয়েছিল নবীন৷ বসার ঘরে মেডেলের ছড়াছড়ি৷ এসব ফণীর পালা লিখে, অভিনয় করে পাওয়া৷ নবীন দেখে, দেওয়াল থেকে মেডেলগুলো পেন্ডুলামের মতো ঝুলছে৷
মেডেলগুলো দেখে নবীনের খুব লোভ হয়৷ আহা, তার ঘরে এমন দু-একটা মেডেল এলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত? নবীন দেখেছে, মেডেল পাওয়া লোককে গাঁয়ের লোক খুব খাতির করে৷ ফুলের স্তবক হাতে তুলে দেয়৷ গলায় চাদর পরিয়ে দেয়৷ মিষ্টির প্যাকেট দেয়৷
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নবীন ভাবে, ভগবানের বড়ো একটেরে চোখ৷ সবই একে-ওকে-তাকে বিলিয়ে দিয়েছেন৷ শুধু তার বেলাতেই লবডঙ্কা৷
নবীনের অভিযোগ শুনে শুনে ভগবানের কান এমনিতেই ঝালাপালা হয়ে গিয়েছিল, এবারে তিতিবিরক্ত হয়ে তিনি বললেন, 'আহা, শুধু আমাকে দুষলেই হবে? ভালো করে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখো৷ যখন মন দিয়ে লেখাপড়ার দরকার ছিল তখন পড়নি৷ বুদ্ধির গোড়ায় শান না দিয়ে নিজেই ভোঁতা মেরে রেখেছ৷ সে বেলা? শারীরিক কসরত কখনো করনি৷ খেয়ে আর ভোঁসভোঁস করে ঘুমিয়ে দেহটাকে তুলোর বস্তার মতো মোটা করেছ৷ বাপু হে, নিজেকে কাজের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে গেলে মেহনত করতে হয়৷' নবীন অবশ্য এসব কথা শুনতে পেল না৷
'অ্যাই নবীন! ঘুমিয়ে পড়লি না কি?'
দরজা খুলে ফণী তফাদারকে দেখে নবীন অবাক হয়ে বলে, 'ফণীদা আপনি? কী ব্যাপার?'
ফণী তফাদার হেসে বলে, 'ভারি অবাক হলি মনে হচ্ছে?'
'অবাক হব না? আপনার মতো গণ্যিমান্যি লোক এই অকম্মার বাড়িতে পায়ের ধুলো দিলেন৷'
'বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব? না, ভিতরে বসতে বলবি?'
নবীন এক হাত লম্বা জিভ কেটে বললে, 'আসুন আসুন, ভিতরে আসুন৷'
'রিহার্সালে চেঁচিয়ে গলা বসে গিয়েছে৷ একটু চা খাওয়াতে পারিস?'
নবীন মাথা চুলকে বলে, 'চিনি নেই৷ গুড় আছে৷ গুড়ের চা আপনার রুচবে?'
'ন্যাকামি করতে হবে না৷ যা আছে তাই দিয়ে বানা৷'
নবীন খুশি মনে চা করতে বসে গেল৷ ফণী তফাদার ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বলল, 'আছিস কেমন?'
'ওই একরকম৷ কোনোরকমে টিকে আছি৷'
'তোর গলায় এত দুঃখী-দুঃখী ভাব কেন রে?'
'আমার চেয়ে দুঃখী মাধবপুরে আর কে আছে বলুন?'
'কেন? কীসের এত দুঃখ তোর?'
'এই যে আমি একটা ফালতু৷ কোনো কাজ করে সবাইকে খুশি করতে পারি, এমন কোনো গুণ ভগবান আমাকে দেয়নি৷ শুধু ইশকুলের ঘণ্টা পিটিয়ে জীবনটা কোনোরকমে কেটে যাচ্ছে৷'
ফণী তফাদার চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, 'বড়ো একটা কাজ দিলে করতে পারবি?'
'বড়ো কাজ? সবাই আমায় বলে অকম্মা৷ মজা করছেন? কে দেবে আমাকে বড়ো কাজ?'
'ধর আমিই যদি দিই?'
'আপনি দেবেন?'
'নয়তো কি এতটা পথ সাইকেল ঠেঙিয়ে এমনি এসেছি? কাল রাতে তোর কথাটা হঠাৎ মনে হল৷'
ফণী তফাদার চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে নবীনের হাতদুটো ধরে খুব নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, 'ওরে, তুই একমাত্র উদ্ধার করতে পারিস আমাকে৷'
এত আন্তরিকতা নিয়ে নবীনের সঙ্গে গাঁয়ের কেউ কথা বলে না৷ হয় হুকুমের সুরে, নয়তো ধমকধামক দিয়ে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কথা বলে৷ নবীন যে এই সংসারে কোনো বড়ো কাজে লাগতে পারে সেটা তার নিজেরই বিশ্বাস হয় না৷
যাই হোক, ফণী তফাদারের কথার ভঙ্গিতে ভারি আশ্চর্য হয়ে নবীন বললে, 'আমার মতো অকম্মা উদ্ধার করবে আপনাকে? কী হয়েছে ফণীদা?'
'এ বছরের জন্য কুরুক্ষেত্রে ঘটোৎকচ পালা লিখেছি৷ সাহিত্য-দর্পণ পত্রিকায় বেরিয়েছে৷ বিরাট সাড়া পড়েছে৷ বলতে পারিস, এ যাবৎ আমার লেখা সেরা পালা৷ সংলাপ শুনে লোকে হেসে গড়াবে, কেঁদে ভাসাবে৷ কিন্তু ভারি মুশকিল হয়েছে বুঝলি, ঘটোৎকচের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য মনের মতো কাউকে পাচ্ছি না৷'
নবীন বলল, 'তা আমাকে কী করতে হবে?'
'তুই বাবা উতরে দে এবারের মতো৷ ঘটোৎকচের চরিত্রে তোকে অভিনয় করতে হবে৷'
নবীন আঁতকে উঠে বলল, 'আ-মি? যা-যা-ত্রায়?'
'কেন রে, যাত্রা বুঝি খারাপ? এই যে আমি, যাত্রা নিয়েই গোটা জীবনটা কাটিয়ে দিলাম৷ তা বলে আমি মানুষটা কি মন্দ? তুই বল?'
'আহা, আমি কি তা বলছি না কি?'
'তাহলে তোর আপত্তি কীসে?'
'ওসব কি আমাকে দিয়ে হবে?'
'কেন হবে না?'
'আমি আনাড়ি লোক৷ যাত্রাপালায় অভিনয় করব?'
'আনাড়ি অবস্থা থেকেই তো সবাই শুরু করে৷ তারপর ধীরে-সুস্থে নিজেকে তৈরি করে নেয়৷'
'ওরে বাবা! এক গাদা লোকের সামনে কী সব উলটোপালটা করে বসব৷ আপনার যাত্রা ভন্ডুল হয়ে যাবে৷'
'ও তোকে ভাবতে হবে না৷ আমি তোকে মেজেঘষে তৈরি করে নেব৷'
'কিন্তু?'
'কিন্তু-টিন্তু বুঝি না৷ কাল থেকে মহড়ায় আসবি৷'
'আপনি অন্য লোক দেখুন ফণীদা৷'
'আরে লোক তো মেলাই আছে৷ হারু হালদার, বটুক সরকার, আর কত নাম বলব? সব টিকটিকি৷ পালা শুনে ঘটোৎকচের পার্ট পাওয়ার জন্য দু-বেলা আমার বাড়িতে এসে ঝুলোঝুলি করছে৷ তোর মতো একখানা চেহারা আছে তাদের? সবাইকে কি সব রোলে মানায়? এদের দিয়ে ঘটোৎকচ হবে?'
ভারি অবাক হল নবীন৷ তার এই বিসদৃশ মোটাসোটা চেহারা একেবারে ফেলনা নয়, এ-চেহারাও যাত্রার কাজে লাগে জেনে খুশি হল সে৷ কিন্তু হাজার হাজার লোকের সামনে মঞ্চে উঠে সংলাপ বলার কথা ভেবে বুকের মধ্যে ফুলে ওঠা বেলুনটা দুম করে চুপসে গেল৷
নবীন বলল, 'আমায় দিয়ে হবে না৷ মঞ্চে ওঠার কথা ভাবতেই আমার বুক ধড়াস ধড়াস করছে৷ ডায়ালগ বলতে গেলে আমার হাত-পা কাঁপবে৷ শেষে আপনার বেইজ্জতি হবে৷'
'ওরে সবারই শুরুতে হাত-পা কাঁপে৷ কয়েকদিন মহড়া দিলেই দেখবি সব সয়ে গেছে৷ তখন দেখবি তুই কাঁপছিস না, তোর অভিনয়ে মঞ্চ কাঁপছে৷'
'বলছেন?'
ফণী তফাদার আশার আলো দেখে বলে, 'বলছি মানে? আমার কথা মিলিয়ে নিস৷ এমন তালিম দেব তোকে লোকে অবাক হয়ে দেখবে৷ গাঁয়ের মা-বোনেরা ঘটি ঘটি কাঁদবে৷'
'কাঁদবে কেন?'

'বলিস কী, কাঁদবে না? একপুরুষঘাতিনী-'
'সে আবার কী?'
'আ মোলো যা, মহাভারত পড়িসনি? ওই অস্ত্রেই তো ঘটোৎকচ মরবে৷'
নবীন হতাশ মুখ করে বলে, 'মরতে হবে? আমার কপালটাই দেখছি খারাপ৷'
খেঁকিয়ে উঠল ফণী তফাদার, 'তাতে হয়েছে কী? এ কি আর আসল মরা? এ হল যাত্রার মরা৷'
আবেগের বশে ফণী বলল, 'ভাব তো, তোকে মরতে দেখে মানুষের দুঃখ উথলে উঠবে৷ আর তুই তখন কী করবি?'
'মরে কাঠ হয়ে থাকব৷ মরা মানুষ কী আর করবে?'
'আহা মরার পরে নয়, মরার ঠিক আগে৷ তুই মরলে তো পালা শেষ৷ মরার আগে তুই শরীরটা ফুলিয়ে বড়ো করে নিয়ে কৌরবসেনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বি৷ সব চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে মরবে৷'
খিলখিল করে হেসে ওঠে নবীন, 'বেড়ে বলেছেন ফণীদা৷ এ এক্কেবারে আমার মনের কথা৷'
ফণী তফাদার অবাক হয়ে বলে, 'মানে?'
নবীন হঠাৎ দু-হাত ছড়িয়ে ফণীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ভঙ্গি করে৷ নবীনের দশাসই পাহাড়ের মতো চেহারা, তার উপরে লোকে বলে ওর বুদ্ধিসুদ্ধি কম৷ যদি সত্যি ঘাড়ে এসে পড়ে তাহলে আর দেখতে হবে না, ফিনফিনে চেহারার ফণী তফাদার কৌরবসেনার মতোই পরোটা হয়ে যাবে৷ ঘাবড়ে গিয়ে ছিটকে সরে যায় ফণী৷
নবীন হেসে বলে, 'ঘেবড়ে গেলেন না কি? মনে হয় কি, এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে সব ব্যাটাকে চেপটে দি?'
ফণী আঁতকে উঠে বলে, 'কাকে?'
'ওই গাঁয়ের যারা আমাকে নিয়ে মশকরা করে, আমি মোটা বলে ব্যঙ্গ করে, বলে পেট মোটা, মাথা মোটা নবীন-'
ফণী খুশিতে উদ্ভাসিত চোখমুখ করে বলে, 'চমৎকার৷'
নবীন মুখ গোমড়া করে বলে, 'এর মধ্যে চমৎকারের কী দেখলেন? এইসব টিটকিরি শুনতে কার ভালো লাগে? মনে কষ্ট হয় না?'
ফণী তফাদার বলে, 'সে-কথাই তো বলছিলাম৷ তোর মনের এই কষ্টটাকে তুই ঘটোৎকচের চরিত্রে কাজে লাগা৷ কষ্ট কি তোর একার? দেবকূলে দৈত্য৷ ঘটোৎকচের জীবনেও অনেক কষ্ট ছিল৷ তাকে কি সবাই হ্যাটা করেনি? কারও মনে ছিল তার কথা? অথচ কুরুক্ষেত্রে বিপদে পড়ে তাকেই শেষমেষ ডাকতে হল পাণ্ডবদের৷'
মন দিয়ে কথাগুলো শুনছিল নবীন৷ উৎসাহের সঙ্গে বলল, 'তারপর? তারপর?'
'তারপর আর কী? তুমুল যুদ্ধ করল ঘটোৎকচ৷ এই ছুটে আসে, আবার এই অদৃশ্য হয়ে যায়৷'
'বলছেন কী? অদৃশ্য? মানে ভ্যানিশ?'
'মায়াবিদ্যা৷ বহু সাধনার ফল৷ এই রাক্ষসের বেশ ধরে ছুটে আসে, তো এই সাপ হয়ে পেঁচিয়ে ধরে ছোবল মারে৷ আঠেরো দিনের যুদ্ধটা চোদ্দো দিনেই প্রায় খতম হয়ে যায়৷ কৌরবদের সেদিনই হার মেনে নেওয়ার কথা৷ শেষে একপুরুষঘাতিনী ছুড়ল কর্ণ৷'
নবীনের চোখদুটো উৎসাহে জুলজুল করছে৷ বলল, 'তারপর?'
'আর কী! ঘটোৎকচ মরল৷ অর্জুন বেঁচে গেল৷'
মাথা চুলকে মুখ বেজার করে নবীন বলল, 'সব কেমন ঘুলিয়ে গেল৷'
'সব ঠিক হয়ে যাবে৷ মহাভারত তো পড়িসনি তাই অমন মনে হচ্ছে৷ তুই এক কাজ কর, মনের মধ্যে জমে থাকা অভিমান চরিত্রের মধ্যে উজাড় করে দে৷ বলে রাখলাম, দেখে নিস, তোর পার্ট দেখে হাততালির ঝড় বয়ে যাবে৷'
'আমি পারব ফণীদা?'
'পেরে বসে আছিস৷ তোর মধ্যে ঘটোৎকচের অন্তরাত্মা লুকিয়ে আছে৷ নিজের এলেম দেখিয়ে যারা তোকে বলে অকম্মা, সেই নিন্দুকদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া করে দে তুই৷ এর পরে পথে বেরোলে ছেলেবুড়ো তোকে ছেঁকে ধরবে৷ ডেকে খাতির করে কথা বলবে৷'
নবীনের মনে হল এই তো সুযোগ৷ যাত্রায় অভিনয় করে নবীন দেখিয়ে দেবে সবাইকে যে, সে মোটেই ফেলনা নয়৷ গুণ তারও আছে৷ তার এই মোটা শরীর কেবল ঠাট্টা করার বস্তু নয়৷ সেটাও কাজে লাগে৷
ফড়িঙের মতো চেহারা হলে কি ঘটোৎকচের চরিত্রে অভিনয় করা যেত? তার শরীরটা চরিত্রের মাপমতো বলেই না ফণী তফাদারের মতো পোড়-খাওয়া লোক তার কাছে এসে হত্যে দিয়ে পড়েছে৷
নবীন তো জানে, যাত্রায় একটা পার্ট পাওয়ার জন্য গাঁয়ের অনেক কেউকেটা লোক ফণী তফাদারকে কেমন খোশামোদ করে৷ কত জনে তার খিদমদ খাটে৷ আর মোটা বুদ্ধি বলে খোঁটা দেওয়া? নবীন বুঝিয়ে দেবে তার বুদ্ধি মোটেই মোটা নয়৷ মোটা বুদ্ধির লোক কি স্টেজে দাঁড়িয়ে অমন লম্বা-চওড়া পার্ট মুখস্থ বলতে পারে?
নবীন বলল, 'বেশ ফণীদা! আপনি যা বলছেন তাই হবে৷'
পরের দিন মহড়ার ঘরে গিয়ে হাজির হল নবীন৷ সে ঘটোৎকচের পার্ট করবে শুনে কারও আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেল৷ কেউ পেট চেপে ধরে হাসিতে ফেটে পড়ল৷ কেউ মশকরা করে বলল, 'ঘটোৎকচ চেহারার দিক থেকে একেবারে খাপে খাপে মিলে গেছে৷'
ভীমের পার্ট করবেন রাম নন্দী৷ ভালো অভিনয় করেন৷ তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, 'নবীনের চেহারাটা যে ঘটোৎকচের মতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ ব্যাসদেব এ-যুগে মহাভারত লিখলে ওকে মনে করেই চরিত্রটা লিখতেন৷ কিন্তু তোমার মতলব বলো তো কী হে ফণী? এবারের যাত্রা কি ভন্ডুল করতে চাও?'
ফণী তফাদার একটু বিরক্ত হয়ে বলল, 'কথাটা ঠিক বুঝলাম না, রামদা৷'
'বুঝলে না? এই গোবরগণেশ নবীন করবে ঘটোৎকচের পার্ট৷ কথা কইতে গিয়ে হোঁচট খাবে৷ তোমার পালা লাটে উঠবে৷'
লজ্জায় মাথা নীচু করে ঘামতে লাগল নবীন৷
ফণী তফাদার ঠান্ডা গলায় বলল, 'এ-গাঁয়ে নবীনের মতো চেহারা আর কারও নেই৷ ও ছাড়া আর কাউকে ঘটোৎকচের চরিত্রে মানাবে না৷'
'সে না হয় বুঝলাম৷ ওর নাম নবীন না হয়ে ঘটোৎকচ হওয়াই উচিত ছিল৷ শুধু হোঁতকা চেহারা দিয়ে কি অভিনয় হবে?'
'পরিচালকের কাজে আপনারা যদি হস্তক্ষেপ করেন, তবে আমাকে বাদ দিন৷ আপনারাই পালা লিখুন৷ পালা করুন৷ আমার পালা আমি তুলে নিচ্ছি৷'
দুর্যোধন গড়াই মাধবপুর অপেরার প্রেসিডেন্ট৷ এ পালায় তিনি হিড়িম্বার চরিত্রে অভিনয় করছেন৷ যাত্রা ভন্ডুল হয়ে যাচ্ছে দেখে তিনি হাঁ-হাঁ করে উঠলেন৷ ফণী তফাদার সরে গেলে যাত্রা করা কঠিন৷ কারণ, পালা লেখা ও পরিচালনা করার ক্ষমতা মাধবপুরে ফণী ছাড়া আর কারও নেই৷ তিনি বললেন, 'আহা রামবাবু, কে কোন চরিত্র করবে সেটা ফণীর উপরেই ছাড়ুন না৷ ঠিক আছে ফণী, তুমি যেমন ভালো বুঝছ তেমনই করো৷'
সেদিন থেকে নবীনের মনের মধ্যে কেমন একটা রোখ চেপে গেল৷ এত হ্যাটা? তাকে এলেবেলে দুধভাত ভাবা? গাঁয়ের এত লোক অভিনয় করছে, সবাই কি অভিনয়ে দড়? তারা যদি পারে সে পারবে না কেন? এতদিন সবার অবহেলা সে মুখ বুজে মেনে নিয়েছে৷ এবারে জবাব দিতে হবে৷ দেখিয়ে দিতে হবে সে ফেলনা নয়৷ তারও গুণ আছে৷ একটা যাত্রাপালা সে উতরে দিতে পারে৷
মোহনপুর শহরের একপ্রান্তে পেল্লায় একটা বাড়ি৷ সে বাড়িতে অনেক ঘর৷ এক-একটা ঘর হল এক-একটা ল্যাবরেটরি৷ ঘরময় রয়েছে নানা যন্ত্রপাতি, হরেক রকমের কল৷ এটাই বিজ্ঞানী গগন সেনের কাজের জায়গা৷ নানারকম অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরিতে তিনি সিদ্ধহস্ত৷ তবে গগন সেন ঢাক পিটিয়ে নিজের প্রচার করেন না৷ তার কাজের খবর এই বিশ্বের বিজ্ঞানীমহল বড়ো একটা জানে না৷ যাদের প্রয়োজন তারাই গগন সেনকে খুঁজে নেয়৷
মাঝে-মধ্যেই কালো কাচ ঢাকা ঢাউস গাড়ি সেন হাউসের বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকে মোরামের পথ ধরে গাড়ি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়৷ আবার খানিকবাদে বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে যায়৷ অনেকেই খেয়াল করে দেখেছে সেসব গাড়িতে লাগানো থাকে দেশ-বিদেশের পতাকা৷
স্থানীয় লোকেরা কেউ এই বাড়িকে বলে বিজ্ঞান-বাড়ি৷ কেউ বলে ভূতুড়ে-বাড়ি৷ রাতের দিকে এই বাড়ির মধ্যে থেকে নানারকম অদ্ভুতুড়ে শব্দ শোনা যায়৷ প্রতিবেশীরা সেনবাড়িকে এড়িয়ে চলে৷ গগন সেনও কারও সঙ্গে মেশেন না৷ সবসময় তিনি কাজে ব্যস্ত থাকেন৷ তাঁর মেলা কাজ৷
বাজারহাট করে বয়স্ক চাকর রাখহরি৷ পথে বেরোলেই তাকে ছেঁকে ধরে লোকে৷ কেননা গগন সেনকে নিয়ে স্থানীয় লোকজনের অসীম কৌতূহল৷ গগন সেন কী করেন? কী খান? কারা আসে বাড়িতে? বাড়ি থেকে নানারকম শব্দ ভেসে আসে কেন? কী নিয়ে তিনি গবেষণা করেন? এই সব কত প্রশ্ন৷
রাখহরি উত্তর দেয় না৷ পান চিবিয়ে মুচকি হাসে৷ মানুষের কৌতূহলের নিবৃত্তি হয় না৷ গগন সেনকে নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়৷
'সাধুচরণ? কালীচরণ? গেলি কোথায়?' হামাগুড়ি দিয়ে একটা চৌকির তলায় ঢুকে হাঁক মারলেন গগন সেন৷ 'নাঃ, কাজের জিনিস দরকারের সময় কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না৷'
রাখহরি ঘরে ঢুকে বলে, 'কী হল গো দাদাবাবু? হামা দিচ্ছ কেন?'
চৌকির তলা থেকে বেরিয়ে এসে রাখহরিকে দেখে গগন সেন বলেন, 'ও, হরিদা তুমি?'
'কিছু খুঁজছ না কি?'
'খুঁজছি তো৷ পাচ্ছি না৷ ভারি সমস্যা হল৷'
'দিনে দশবার তো তুমি নানা জিনিসপত্র হারাও৷ সরো, আমি দেখছি৷' চৌকির তলায় উঁকি মেরে রাখহরি বলে, 'না, কিছু তো নেই৷'
'কী খুঁজছিলাম বল তো?'
রাখহরি অবাক হয়ে বলে, 'বোঝো ঠ্যালা৷ তুমি কী খুঁজছিলে তা আমি কী করে বলব?'
'ধুর৷ তোমাকে দিয়ে কোনো কাজ হয় না৷ এই জন্যই সাধুচরণ, কালীচরণকে ডাকছিলাম৷ ওরা থাকলে ঠিক বলে দিত৷ গেল কোথায় ওরা? তখন থেকে ডাকছি, সাড়া দিচ্ছে না৷'
'বা রে! তুমিই তো খোকাবাবুর সঙ্গে দু-জনকে পাঠালে?'
'খোকাবাবু আবার কে?'
'সেরেছে৷ নিজের ছেলেকেও ভুলে গেলে নাকি?'
'ও তুমি খোকার কথা বলছিলে? সে গেল কোথায়?'
রাখহরি বলে, 'সে সিনেমা দেখতে গেছে৷ তোমাকে তো বলেই গেল৷ আচ্ছা, কী আক্কেল বলো তো তোমার? খোকা বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবে৷ তার সঙ্গে সাধুচরণ, কালীচরণের মতো দুটো দামড়াকে পাঠানোর কী দরকার ছিল?'
'কী বলছ তুমি? রাস্তায় হুড়মুড়িয়ে গাড়িঘোড়া চলছে৷ খোকা কি একলা রাস্তা পার হতে পারে?'
'বোঝো কাণ্ড৷ বড়ো শহরে হস্টেলে থেকে সে একা একা লেখাপড়া করে এল৷ এত বড়ো পাশ দিল৷ একলা রাস্তা পার হতে পারবে না? খোকা কি আর ছোটো আছে?'
'কী বলছ তুমি? খোকা ছোটো নয়? বড়ো পাশ দিলেই বুঝি বড়ো হয়ে যায়?'
'তা তুমি কি বলতে চাও খোকা বড়ো হয়নি?'
'বাপের কাছে ছেলে কখনো বড়ো হয়?'
'সে তো আলাদা কথা৷ শুধু তোমার কথা ভাবলে তো চলবে না৷ তার দিকটাও তো ভাবতে হবে৷'
হঠাৎ মাথা চুলকে কিছু একটা ভাবতে থাকেন গগন সেন৷ তারপর বলেন, 'হরিদা, খোকার যত্ন ভালো করে করছ তো? আহা মা-মরা ছেলে-'
'এটুকু যে তোমার খেয়াল আছে, এই যথেষ্ট৷'
'তুমি দেখে নিয়ো হরিদা, খোকা আমার চেয়েও বড়ো বিজ্ঞানী হবে৷'
রাখহরি বলে, 'বিজ্ঞানী না হওয়াই ভালো৷'
'কী বলছ হরিদা? গগন সেনের ছেলে বিজ্ঞানী হবে না?'
'কলকবজা ঘেঁটে তোমার মাথাটা গেছে৷ এরপরে খোকার মাথাটা যাবে৷'
কথা বলতে বলতে একটা রিমোট হাতে নিয়ে খুটখাট করছিলেন গগন সেন৷ ঘরের মধ্যে একটা আলমারির তলা থেকে ফরফর করে একটা শব্দ হল৷ গগন সেন সহসা চেঁচিয়ে উঠে বললেন, 'এই তো খুঁজে পেয়েছি৷ কোথায় গেলি টুকটুকি? আয়-আয়, বেরিয়ে আয়৷'
আলমারির তলা থেকে বেরিয়ে এসে রাখহরির পায়ের পাশ দিয়ে তিরবেগে ছুটে গিয়ে একটা তেলাপোকা গগন সেনের পায়ের সামনে গিয়ে থামল৷ রাখহরি আবার তেলাপোকাকে বেজায় ভয় পায়৷ সে চেঁচিয়ে উঠল, 'বাপরে!'
হা-হা করে শিশুর মতো হেসে উঠল গগন সেন৷ 'ও হরিদা, তোমার তেলাপোকার ভয়টা এখনও আছে দেখছি৷'
রাখহরি মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে, 'তেলাপোকা বড়ো ঘেন্নার জিনিস৷ এর নাম টুকটুকি? আজকাল তেলাপোকা পুষছ না কি দাদাবাবু?'
'টুকটুকি আমার হাতে তৈরি৷ এ আসল, না নকল তুমি বুঝতেই পারবে না৷'
রাখহরি চোখ বিস্ফারিত করে বলে, 'মানে!'
গগন সেন যান্ত্রিক তেলাপোকাটা হাতে তুলে নিয়ে বলেন, 'এ হল স্পাই রোবট৷ চোখের জায়গায় ক্যামেরার লেন্স আছে৷ পেটে আছে চিপ৷ ছবি, কথা সব রেকর্ড হয়ে যাবে৷ স্টিং অপারেশন করতে চাও তো এর কোনো জবাব নেই৷'
রাখহরি যান্ত্রিক তেলাপোকাটা ভালো করে দেখে রসগোল্লা চোখ করে বলে, 'এ যে একেবারে আসল তেলাপোকার মতো দেখতে৷'
'এ হল গগন সেনের হাতের কারসাজি৷ টুকটুকি উড়তেও পারে, বুঝলে৷ রিমোট দিয়ে কন্ট্রোল করতে পারলে যেখানে খুশি উড়ে যেতে পারে৷ কোথাও সেঁধিয়ে গিয়ে কারও উপর নজর রাখতে পারে৷ গোয়েন্দাদের কাজ কত সহজ হয়ে যাবে বুঝতে পারছ? এমনিতে কি আর দেশ-বিদেশের লোক গগন সেনের কাছে ছুটে আসে?'

রিমোটের একটা সুইচে চাপ দিলেন গগন সেন৷ টুকটুকি পাখা নেড়ে হেলিকপ্টারের মতো সারা ঘর জুড়ে উড়ে বেড়াতে লাগল৷
'বাপরে, কী অনাছিষ্টি কাণ্ড!'-বলে দৌড়ে পালাল রাখহরি৷ হা-হা করে শিশুর মতো হাসতে লাগলেন গগন সেন৷ এর মধ্যে গগন সেনের মোবাইল ফোন বেজে উঠল৷ ফোন ধরে গগন সেন বললেন, 'হ্যাঁ! হ্যাঁ! জিনিস রেডি৷ সপ্তাহখানেক বাদে আসুন পেয়ে যাবেন৷'
ফোনটা রেখে ঘর তোলপাড় করে কিছু একটা খুঁজতে লাগলেন গগন সেন৷ সব জিনিসপত্র হাটকে-মাটকে ঘর অগোছালো করে ফেললেন৷ গগন সেনের মাথার চুল খাড়া হয়ে গেল৷ তিনি যেটা খুঁজছেন, সেটা কিছুতেই পাচ্ছেন না৷
তখন থেকে মশাটা কানের পাশে বিনবিন করছে৷ মাধবপুরের জংলি মশা৷ জঙ্গিও বলা যায়৷ বেজায় সেয়ানা৷ অতর্কিতে আক্রমণ হানে৷ নিজের ডান কান মুলে মশাটা তাড়ানোর চেষ্টা করলেন রঘু সরকার৷ মশার নাগাল পেলেন না৷ বেয়াড়া মশাটা ফুড়ুৎ করে উড়ে বাম কানে গিয়ে বসল৷
বাম কান মুললেন৷ মশাটা উড়ে এল ডান কানে৷ এভাবে পর্যায়ক্রমে ডান-বাঁ কান মোলামুলি করে কিছুক্ষণের মধ্যেই কানদুটোকে রাঙা করে ফেললেন রঘু সরকার৷ মশাটাকে কবজা করতে পারছেন না৷ বিনবিন, গুনগুন শব্দটা কানের কাছে অসহ্য লাগছে৷
শেষে মশার নাগাল পেতে রেগেমেগে পেল্লায় এক চড় কষালেন তিনি৷ নিজের চড়ের ধাক্কায় তার নিজেরই কান-মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল, আর চড় মারার উদ্যোগে বড়োসড়ো দেহটা এমন একটা পাক খেয়ে গেল, যে ভারসাম্য হারিয়ে রঘু সরকার বেঞ্চ থেকে উলটে পড়লেন মাটিতে৷
না, পড়ে গিয়ে চোট তেমন লাগেনি৷ তড়িঘড়ি তিনি উঠে পড়লেন, যাতে মশার হাতে এই হেনস্থা বেশি লোকের চোখে না পড়ে৷ এই সময়ে ট্রেনের ভোঁ শোনা গেল দূর থেকে৷ রঘু সরকার প্যান্টটাকে ঝাঁকিয়ে ভুঁড়ির উপর তুলে প্রস্তুত হয়ে নিলেন৷ এবারে তাকে শিকার ধরতে হবে৷
শিকার মানে বিনা-টিকিটের যাত্রী৷ রঘু সরকার হলেন মাধবপুর রেল স্টেশনের টিকিট কালেকটর৷ সবাই বলে ঘোড়েল লোক, খুব হুঁশিয়ার মানুষ৷ টিকিট না কেটে তার হাত থেকে মাছিটিও গলতে পারে না৷ আর যাত্রীদের মুখ দেখেই নাকি রঘু সরকার বুঝে নিতে পারেন, কার কাছে টিকিট আছে, কার কাছে নেই৷
ছেলেটা হন হন করে হাঁটছিল, আর থেকে থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন দিকে তাকাচ্ছিল৷ ছেলেটার হাঁটার ভঙ্গি দেখেই রঘু সরকারের গোঁফের ফাঁকে মুচকি হাসি খেলে গেল৷ গম্ভীর হয়ে তিনি হাঁক ছাড়লেন, 'ও ভাই, টিকিট কই? টিকিট দেখাও৷'
কালো কোট ও সাদা প্যান্ট পরা রঘু সরকারকে দেখে ছেলেটি সঙ্গেসঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, 'আপনিই কি টিকিট কালেকটর রঘু সরকার?'
'আমার নামটা জানো দেখছি৷'
'গুণী লোকের নাম বাতাসে ছড়ায়৷ যাই হোক, আপনাকেই খুঁজছিলাম৷'
'খুঁজছিলে মানে?' দু-চোখে ছেলেটাকে জরিপ করার চেষ্টা করেন রঘু সরকার৷
'দুর্জনেরা বলে আপনি খুব ঘোড়েল ও হুঁশিয়ার লোক৷'
তিরিক্ষি মেজাজে রঘু সরকার বলেন, 'তাতে তোমার কী?'
'লোক অবশ্য তারা সুবিধের নয়৷ বিনা টিকিটের যাত্রী৷ তারা বলে আপনি পাষণ্ড, বুলডগ৷'
অন্য কেউ এমন কথা শুনলে হয়তো দপ করে জ্বলে উঠত৷ রঘু সরকার পোড়-খাওয়া লোক৷ তিনি রেগে গেলেন না৷ খেয়াল করে দেখলেন দুর্জনেরা তো তার নামে খারাপ কথা বলবেই৷ একটু অন্যভাবে ভাবলে এ তো এক রকমের প্রশংসা৷
খুশি হয়ে হেঁ-হেঁ করে হেসে রঘু সরকার বলেন, 'বিনা টিকিটে আমার হাতে ধরা পড়েছিলে কখনো?'
'সে সৌভাগ্য হল কোথায়?'
'বেঁচে গেছ৷ ধরা পড়লে ঠ্যালা বুঝতে৷ বিরাশি সিক্কার একখানা থাপ্পড় খেলে তুমিও আমার নামে কুকথা বলতে৷'
'আহা, সবাই যদি আপনার মতো হত?'
রঘু সরকার সন্ধিগ্ধ চোখে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'বাজে কথা না বলে টিকিট বের করো তো ছোকরা৷'
'হবে হবে৷ টিকিট দেখার ঢের সময় পাবেন৷ আগে কাজের কথাটা সেরে নি৷'
'আমার সঙ্গে তোমার আবার কী কাজের কথা থাকতে পারে?'
'সৎ লোকের শত্রুর অভাব হয় না এটা জানেন তো?'
রঘু সরকার বলেন, 'তা বাপু ঠিকই বলেছ৷ আজ পর্যন্ত কম লোককে হাজতে পুরেছি?'
ছেলেটা বলে, 'টিকিট না কাটলে হাজতে তো যেতেই হবে৷'
'সেটা ক-টা লোক বোঝে?'
'আপনি না থাকলে রেলের যে কী পরিমাণ ক্ষতি হবে সেটাও তো কেউ বুঝছে না৷'
হঠাৎ সচকিত হয়ে রঘু সরকার বলেন, 'আমি না থাকলে মানে?'
'এই আপনার এখন-তখন কিছু একটা যদি হয়ে যায়?'
'কোনো চান্স নেই৷ আমার সুগার নেই৷ প্রেসার নর্মাল৷ অনেক বকেছ৷ এবারে টিকিট দেখাও৷ তোমার মতিগতি আমি ভালো বুঝছি না৷'
উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে বলে, 'অপঘাত বোঝেন নিশ্চয়ই৷'
'তোমার মতলব কী বলো তো ছোকরা?'
'মতলব আপনাকে বাঁচানো৷ কিন্তু বিষয়টা কী করে বোঝাই আপনাকে?'
'টিকিট নেই এই তো? তাই এত ধানাইপানাই৷'
'টিকিট অতি তুচ্ছ ব্যাপার৷ নিজের বিপদের কথাটা ভাবুন৷'
সতর্ক দৃষ্টিতে রঘু সরকার বলেন, 'বিপদ মানে? কীসের বিপদ?'
'আজ আপনার একটা জব্বর ফাঁড়া আছে৷ গেল মাসে দু-জনকে ধরেছিলেন?'
রঘু সরকার থমকে গিয়ে সামান্য চিন্তিত হয়ে বলেন, 'দু-জন কেন? অনেককেই তো ধরেছি৷'
ছেলেটি এবার গলা নামিয়ে বলে, 'তাহলে তাদেরই কেউ হবে৷ দুটোই পাকা গুন্ডা৷ ভিড় ট্রেনে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলাবলি করছিল৷ শুনে ফেলেছি৷'
কথাটা শুনে ধন্দে পড়ে যান রঘু সরকার৷ কথাটা সত্যি হতে পারে৷ তার শত্রু চারিদিকে ছড়িয়ে আছে৷ বিনা টিকিটের যাত্রীদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় অনেকেই দাঁত কিড়মিড় করে বলে, 'একবার ছাড়া পাই, তার পরে দেখে নেব৷ টিকিট দেখা জন্মের মতো ঘুচিয়ে দেব৷'
রঘু সরকার উদবেগের সঙ্গে বলেন, 'কী বলছিল?'
'ভয়ানক কথাটা মুখ দিয়ে বলি কী করে?'
'আহা বলোই না, শুনি৷'
ছেলেটি বলে, 'দেখুন, শোনা কথা৷ সত্য-মিথ্যা জানি না৷ মনে হল আপনাকে একটু সতর্ক করে দেওয়া দরকার৷ উপযাচক হয়ে কিছু বলতে গেলে অনেকেই বিরক্ত হয় জানি৷ কিন্তু আমি আপনার বিরক্তি উদ্রেক করতে চাই না৷ আপনার ভালো চাই৷'
অধৈর্য হয়ে পড়েন রঘু সরকার৷ কৌতূহলের পারদটা চড়চড় করে অনেক চড়ে গিয়েছে৷ বলেন, 'কথাটা বলবে তো৷'
গুন্ডা দুটো বলছিল, 'রঘু সরকারের জ্বালায় বিনা টিকিটে যাতায়াত করা যাচ্ছে না৷ আজ রাতে ব্যাটা যখন বাড়ি ফিরবে, তখন পিছন থেকে বাঁশ দিয়ে মেরে মাথাটা দু-ফাঁক করে দেব৷ টিকিট দেখা জন্মের মতো ঘুচিয়ে দেব৷'
এ-কথা শুনে রঘু সরকারের চোখদুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল৷ দেহের ভাষায় বোঝা গেল মনের মধ্যে ভয় ঢুকেছে৷ হঠাৎ ছেলেটি বলল, 'ওই বোধ হয় ওরা আসছে৷'
রঘু সরকার উত্তেজিত হয়ে লোক দুটোকে খোঁজার চেষ্টা করলেন, 'কই, কোথায়?' তিনি দু-পা এগিয়ে গেলেন সামনে৷ সঙ্গেসঙ্গে ছেলেটি উলটো দিকে টেনে দৌড় লাগাল৷ এক দৌড়ে স্টেশনের গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে একটা টাঙায় উঠে পড়ল৷
টাঙাওয়ালা প্রশ্ন করল, 'কোথায় যাবেন?'
'আগে গাড়ি চালাও, পরে বলছি৷'
'কী মুশকিল? কোথায় যাব বললেন না, ভাড়া ঠিক হল না৷ এভাবে যাই কী করে?'
ছেলেটি মরিয়া হয়ে বলল, 'তাড়াতাড়ি গাড়ি চালাও আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে৷'
টাঙাওয়ালা একগাল হেসে বলল, 'বুঝেছি৷ যাত্রা দেখতে যাবেন বুঝি?'
'যাত্রা? ও হ্যাঁ হ্যাঁ৷ ওখানেই যাব৷ জোরসে চালাও৷'
বিকেলের মরা আলোয় গ্রামের পথ দিয়ে ছুটতে শুরু করে টাঙা৷
ওদিকে দু-পা এগিয়ে গিয়ে রঘু সরকার দেখলেন স্টেশন ফাঁকা, কেউ নেই৷ ছেলেটা ভড়কি দিয়েছে৷ ঠিক করলেন ছেলেটার কান ধরে দুটো থাপ্পড় কষিয়ে দেবেন৷ 'মশকরা হচ্ছে? মারব এক চড়'-বলে ঘুরে দেখলেন ছেলেটা নেই৷
রঘু সরকার রাগে মাথার চুল খামচাতে লাগলেন৷ ব্যাটা বিনা টিকিটের যাত্রী, বোকা বানিয়ে পালাল৷ রঘু সরকারের নাক-মুখ দিয়ে রাগে আগুন বেরোতে লাগল৷
ঠিক এই সময় পরের ট্রেনটা ঢুকল স্টেশনে৷ রঘু সরকার আবার আঁটোসাঁটো হয়ে দাঁড়ালেন বিনা টিকিটের যাত্রী ধরবেন বলে৷ খানিকবাদে স্টেশন ফাঁকা হয়ে গেল৷ আজ রঘু সরকারের কপাল খারাপ৷ জালে একটাও বিনা টিকিটের যাত্রী পড়েনি৷ অন্ধকার নেমেছে৷ স্টেশনের আলোগুলো জ্বলে উঠল৷
হঠাৎ রঘু সরকার দেখলেন দুটো ষণ্ডামতো লোক বাঁশের লাঠি হাতে তার দিকে হন হন করে এগিয়ে আসছে৷ তাদের মাথায় ফেট্টি বাধা৷ চেহারা দেখে মনে হচ্ছে লাশ নামানো এদের কাছে জলভাত৷ রঘু সরকারের পিঠ দিয়ে কেমন একটা ঠান্ডা জলের স্রোত বয়ে গেল৷ তিনি আর দাঁড়ালেন না৷ দৌড়ে গিয়ে একটা থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন৷
প্রতিবছর শীতের শেষে মাধবপুর মিলনমেলাকে কেন্দ্র করে ম্যাদামারা গ্রাম মাধবপুর একেবারে জমজমাট হয়ে ওঠে৷ সাতদিন ধরে রেসকোর্সের মাঠে মেলা বসে৷ মাঠটা আড়ে-বহরে বিশাল৷ সাহেবরা একসময় এ-মাঠে ঘোড়া দাবড়ে দৌড়োদৌড়ি খেলত৷ সেই থেকে রেসকোর্স নামটা রয়ে গিয়েছে৷ এই মাঠকে ঘিরে কয়েকটা বড়ো বড়ো ঘোড়ানিম গাছ আছে৷ অনেকে বলে ঘোড়ানিমতলার মাঠ৷
দূরদূরান্ত থেকে দোকানিরা আসে মাধবপুর মিলনমেলায়৷ আলোর মালায় সেজে ওঠে মাঠ৷ নাগরদোলা ঘোরে৷ খেলনা রেলগাড়ি বনবন করে পাক খায়৷ পুতুলনাচের তাঁবু পড়ে৷ এই মিলনমেলার শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ হল মাধবপুর অপেরার যাত্রা৷
ঘোষক হাঁকল, 'মাধবপুর মিলনমেলায় ধুন্ধুমার৷ সাড়া জাগানো পৌরাণিক পালা-'কুরুক্ষেত্রে ঘটোৎকচ'৷ পরিচালক ফণী তফাদারের অনবদ্য সৃষ্টি৷ আমাদের সকলের প্রিয়, মাধবপুরের দামাল ছেলে ফণীদার পালকের নতুন মুকুট, থুড়ি মুকুটের নতুন পালক, রোমহর্ষক পালা কু-রু-ক্ষে-ত্রে ঘটো-ও-ও ৎ-কচ৷'
বিকেল থেকেই পিলপিল করে লোক আসতে শুরু করেছে৷ সন্ধ্যে হলেই শুরু হবে যাত্রা৷ একের পর এক ফ্ল্যাট ভ্যান এসে থামছে৷ ঠাসা ভিড় উপুড় করে দিচ্ছে ঘোড়ানিমতলার মাঠে৷ সামনে বসার জন্য বেজায় হুড়োহুড়ি বেধেছে এরই মধ্যে৷ হিমশিম খাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবকরা৷
সাজঘরের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছেলের দল৷ মাঝে মাঝে পর্দা তুলে ভিতরে উঁকি মারছে৷ বাবা-কাকা-জ্যাঠারা ঠাকুর-দেবতার মেক-আপ নিয়ে কেমন দেখতে হয়েছে তা নিয়ে তাদের দারুণ কৌতূহল৷
ফণী তফাদার পেল্লায় হাঁক ছেড়ে বললে, 'ওরে, সর সর৷ সরে যা৷ এখনই সব দেখে ফেললে যাত্রা দেখে মজা পাবি নে৷' ছোটো ছেলেরা কি সহজে কথা শোনে?
সাজঘরের বাইরে এসে নবীন দাঁড়াতেই ছেলের দল বাপ রে, মা রে বলে দৌড়ে পালাল৷ ফণী তফাদার হেসে বললেন, 'চমৎকার মেক-আপ হয়েছে৷'
নবীন বলল, 'গা-হাত-পা বেজায় কুটকুট করছে ফণীদা৷'
'তা করুক৷ অভিনেতাকে অনেক কষ্ট করতে হয়৷'
মাথা খামচাতে খামচাতে নবীন আবার বলে, 'মাথাটা চিড়বিড় করছে৷ পরচুলায় ভরতি ছারপোকা৷'
'তুই ঘটোৎকচ৷ সামনে মেলা দায়িত্ব৷ কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে হবে৷ এ-সময় ছারপোকা নিয়ে ভাবলে চলে?'
'কিন্তু ছারপোকাকে হেলাফেলা করি কী করে? মাথাটা যে খেয়ে ফেললে৷'
'একটু কষ্ট কর বাপু৷ কষ্ট না করলে কেষ্ট মিলবে কী করে? দেখিস, আবার ডায়ালগ বলতে গিয়ে মাথা খামচাখামচি করিস নে যেন৷'
নবীন বলল, 'আর মুখোশটা দেখো, আমার নাক কোথায়, আর মুখোশের নাকের ফুটো কোথায়, কেমন যেন দম আটকে আসছে৷'
ফণী তফাদার বলল, 'তুই তো বেজায় খুঁতখুঁতে ছেলে৷ চরিত্রে ডুবে যা, সব সয়ে যাবে৷'
ছারপোকার কামড় সামলে মঞ্চে সংলাপ আউড়ে যাওয়াটা মোটেই সহজ কাজ হবে না৷ সেই সঙ্গে রয়েছে মোটা রঙের প্রলেপ দেওয়া চটের আংরাখা ও পায়জামা পরে গায়ে-হাত-পায় বেজায় কুটকুটানি৷ তার উপরে ঘটোৎকচের মুখোশ থেকে কেমন যেন একটা বিদঘুটে গন্ধ বেরোচ্ছে৷ নবীন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে, ফণী তফাদারের কথায় গলে গিয়ে সকলকে বাহাদুরি দেখানোর জন্য যাত্রা করতে রাজি হওয়াটা মস্ত আহাম্মকি হয়ে গিয়েছে৷
সাজঘর থেকে উঁকি মেরে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে পিলে চমকে গেল নবীনের৷ মঞ্চের সামনে গিজগিজ করছে কালো কালো মাথা৷ মহড়া ঘর একরম৷ এত লোকের সামনে আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে অভিনয় করা মোটেই সহজ কাজ নয়৷ যতই সময় এগোচ্ছে, নবীনের হাত-পা তত হিম হয়ে আসছে৷
প্রথম সিনে অভিনয় করতে গিয়ে ডায়ালগ ভুলে দু-বার ঠোক্কর খেল নবীন৷ লোকে সামান্য হেসে উঠলেও বড়ো কোনো কেলেঙ্কারি হয়নি৷ প্রম্পটার উতরে দিল৷ কিন্তু দেখা গেল নবীনের অভিনয়ের মধ্যে বেশ জড়তা রয়েছে৷ এভাবে চলতে থাকলে যাত্রা ঝুলে যাবে৷ দুশ্চিন্তায় পড়ল ফণী৷ অনেকের আপত্তি সত্ত্বেও সে জেদ করে নবীনকে ঘটোৎকচের পার্ট দিয়েছে৷ যাত্রা ফ্লপ হলে কেউ ছেড়ে কথা বলবে না৷
কয়েক সিন পর থেকে চিত্রটা একদম বদলে গেল৷ একেবারে পেশাদার অভিনেতার মতো তুখোড় অভিনয় করতে শুরু করল নবীন৷ তার সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলতে লাগল অনেকে৷ সবচেয়ে অবাক হয়ে গেল ফণী তফাদার স্বয়ং৷ যেমন শেখানো হয়েছিল, নবীন মোটেই তেমন করছে না৷ বরং যেটা করছে, সেটা আরও ভালো৷
নবীনের কেরামতি দেখে রাম নন্দী ঘাবড়ে গিয়ে ধুতিতে পা জড়িয়ে দু-বার হোঁচট খেলেন৷ নবীন সংলাপ বললেই হাততালির ঝড় বয়ে যাচ্ছে৷ উত্তাল হয়ে উঠছে দর্শক৷ আর সকল অভিনেতাকে ছাপিয়ে যাত্রাপালায় আকর্ষণের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল নবীন৷
যাত্রার শেষ দৃশ্যে একটা সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটল৷ যাত্রার মঞ্চে এমন রোমহর্ষক ঘটনা যে ঘটতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না৷ এমন ঘটনা যে আগে কোথাও ঘটেছে, সেটাও কেউ কখনো শোনেনি৷ কিন্তু ঘটনাটা সত্যিই ঘটে গেল৷ অনেক জোড়া চোখের পাতার নড়ন-চড়ন একেবারে বন্ধ হয়ে গেল৷ এই কাণ্ড নিয়ে মাধবপুরের মতো ম্যাদামারা গ্রামখানা একেবারে তোলপাড়িয়ে উঠল৷

কর্ণের ভূমিকায় অভিনয় করছিলেন নুটু বৈরাগী৷ শ্রীকৃষ্ণ, ভীম, হিড়িম্বাও রয়েছে মঞ্চে৷ উঁচু কাঠের পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে তাঁরা উৎসাহ দিচ্ছেন ঘটোৎকচকে৷ ঘটোৎকচ যুদ্ধের ময়দানে কৌরবসেনাদের একেবারে মেরে কেটে সাফ করে দিচ্ছে৷ উল্লাসে ফেটে পড়ছে দর্শক৷ মহিলারা উলুধ্বনি দিচ্ছে ঘন ঘন৷
সহসা ইন্দ্র-প্রদত্ত একপুরুষঘাতিনী অস্ত্র নিয়ে ছুটে এলেন কর্ণবেশী নুটু বৈরাগী৷ অস্ত্র দিয়ে খোঁচা দিল ঘটোৎকচের বুকে৷ এবার ঘটোৎকচের হাত-পা ছড়িয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে কাল্পনিক কৌরবসেনাদের চিঁড়েচ্যাপটা করে দেওয়ার কথা৷
অভিনয়ের আবেগে নুটু হালদার নবীনে বুকে খোঁচাটা একটু জোরেই দিয়েছিল৷ তারপরেই ম্যাজিক৷ হুমড়ি খেয়ে পড়ার বদলে বাতাসে অদৃশ্য হয়ে গেল ঘটোৎকচ৷
উল্লাসে ফেটে পড়ল দর্শক৷ দূর থেকে তারা ভাবল এ বোধ হয় আলোর খেলা৷ বিষয়টা মোটেই তা নয়৷ আলো নিয়ন্ত্রণ করছিল অরোরা লাইটস-এর বাঁটুল৷ আলোর অত কারিকুরি জানলে আজ তাকে পেটে কিল মেরে অজপাড়াগাঁয়ে পড়ে থাকতে হয় না৷ এই অলৌকিক কাণ্ড দেখে সে গোঁ-গোঁ করতে করতে শিবনেত্র হয়ে গেল৷
রাম নন্দীর দাঁতে দাঁত লেগে গিয়ে ঠকাঠক শব্দ হতে লাগল৷ হাঁ হয়ে গিয়ে কয়েকটা আলোর পোকা গিলে ফেলল ফণী তফাদার৷ কর্ণের বেশধারী নুটু বৈরাগী কাটা কলা গাছের মতো মাটিতে ঠাস করে পড়ে গিয়ে মূর্ছা গেলেন৷ দুর্যোধন গড়াই চেঁচাতে লাগলেন, 'ভূ-উ-উ-ত! ভূ-উ-উ-ত!' সব মিলিয়ে দারুণ একটা গোলমাল পেকে উঠল৷
তাজ্জব ব্যাপার৷ সবাই হতভম্ব৷ অমন দশাসই চেহারার নবীন সবার চোখের সামনে গায়েব হয়ে গেল কী করে! নির্ঘাত ভৌতিক ব্যাপার৷ বাস্তবে এ অসম্ভব৷ অতিথির আসনে বসেছিল গজা তান্ত্রিক৷ ভূত নিয়ে কারবার তার৷ এমন একটা ভৌতিক ঘটনার সাক্ষী হতে পেরে সে আহ্লাদে আটখানা৷ ব্যাপারটা কী ঘটল বোঝার জন্য তড়িঘড়ি ঢালু পাটাতন বেয়ে মঞ্চে উঠতে গেল, কিন্তু অদৃশ্য কোনো কিছুতে ধাক্কা খেয়ে সে ছিটকে পড়ল পাশে৷
পায়ের শব্দ তুলে কে যেন পাটাতন বেয়ে নেমে গেল দ্রুত৷ গজা তান্ত্রিকের মতো ভূতসর্বজ্ঞ লোকের গায়েও কাঁটা দিয়ে উঠল৷ সে চেঁচিয়ে উঠে বলল, 'পাকড়ো! পাকড়ো! পালিয়ে গেল৷'
দুর্যোধন গড়াই ভয়ানক ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, 'কার কথা বলছেন গজাবাবু? কে পালাল?'
ভয়ানক আফশোসের গলায় গজা বলল, 'ঈশ! আজই সেঞ্চুরি হয়ে যেত৷'
'সেঞ্চুরি? সে তো ক্রিকেটে হয় মশায়৷'
'ধুর মশায়৷ নিরানব্বইটাকে ধরেছি৷ এই ভূতটা ধরতে পারলেই এক-শো হয়ে যেত৷'
ভূতের কারবারি হিসেবে এ-তল্লাটে গজা তান্ত্রিকের বেশ নামডাক আছে৷ তারই জন্য ধাপধাড়া গ্রাম মাধবপুরের নাম আজ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে৷ দূরদূরান্ত থেকে লোক এসে তার কাছে ভূত তাড়ানোর দাওয়াই জানতে চায়৷ গজা তাদের মন্ত্র বলে দেয়৷ তাবিজ-কবজ দেয়৷ ভূতে ধরা লোককে ঝাড়ফুঁক করে ভালো করে দেয়৷ মাধবপুরের অনেকে বলে গজা তান্ত্রিক ভূত নিয়ে লোফালুফি খেলে, ভূতের সঙ্গে কুস্তি লড়ে শরীর তাজা রাখে৷ অনেক ভূত তার খিদমত খাটে৷
গজা বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল, 'তেনার উপস্থিতিটা আসরে এসেই টের পেয়েছি৷ চারিদিকে চিমসে মারা গন্ধ৷ অনেকটা চামচিকে মরে পচলে যেমন গন্ধ ছড়ায় আর কি-এ হল ভূতের পারফেক্ট স্মেল৷ এখনও পাচ্ছি গন্ধটা-'
সবাই জোরে জোরে নাক টেনে গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করল৷ ফণী তফাদার বলল, 'কই তেমন গন্ধ তো পাচ্ছি না৷'
'পাচ্ছেন না মানে, আলবাত বেরোচ্ছে৷ নাকে সর্দি আছে না কি দেখুন৷'
এই সময়ে স্টেজের চারপাশে জড়ো হওয়া ভিড়ের মধ্যে থেকে কে যেন বলে উঠল, 'গুজবে কান দেবেন না৷ বুজরুগদের এড়িয়ে চলুন৷'
ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এলেন বরেন দত্ত৷ কথাটা তিনিই বলেছেন৷ বরেন দত্ত হলেন আশালতা মেমোরিয়াল হাইস্কুলের অঙ্কের মাস্টারমশায়৷ একই সঙ্গে তিনি মাধবপুরের বিজ্ঞান মঞ্চেরও প্রেসিডেন্ট৷ তাকে দেখেই গজা তান্ত্রিক খানিকটা মিইয়ে গেল৷
বরেন দত্ত অঙ্কে তুখোড়৷ ভারি জেদি লোক৷ তার কথা কেউ অমান্য করলেই তিনি বলেন, 'বেশ তো আমার কথা আমি অঙ্ক কষে প্রমাণ করে দিচ্ছি, এখন তুমি অঙ্ক কষে দেখাও আমার কথা ভুল৷' কেউ এই ফাঁদে পা দেয় না৷ কারণ সবাই জানে, বরেন দত্তের সঙ্গে তারা পেরে উঠবে না৷
গজা তান্ত্রিক অঙ্কে কাঁচা৷ ছেলেবেলায় অঙ্ক দেখলেই তার ভয় করত৷ হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যেত৷ অঙ্কের মাস্টারমশায় মাধব দত্তের বেতের ভয়ে সে ছেলেবেলায় বাড়ি থেকে পালিয়েছিল৷ পরে কঠিন সাধনা করে তান্ত্রিক হয়ে ফিরে আসে৷ বরেন দত্তের বাবা ছিলেন মাধব দত্ত৷ বহুদিন হল তিনি গত হয়েছেন৷ তা হলে কী হবে, বরেন দত্তকে দেখলেই গজার কেন জানি মনে হয়, মাধব দত্ত বেত হাতে ছুটে আসছেন৷
নাকে নস্যি নিয়ে ফ্যাচ ফ্যাচ করে দু-বার হেঁচে বরেন দত্ত বললেন, 'গাঁয়ের লোক এমনিতেই নানা কুসংস্কারে বিশ্বাস করে৷ বিজ্ঞান অনেক এগিয়ে গেছে৷ মানুষ মঙ্গলে পাড়ি দিচ্ছে৷ এ-যুগে যারা ভূতপ্রেতের কথা বলে তারা বুজরুগ৷ এরা গুজব ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়৷ রহস্যময় কিছু ঘটতেই পারে৷ তবে তার বিজ্ঞানসম্মত কারণ খুঁজে বের করতে হবে৷'
ভিড়ের মধ্যে থেকে একটা গুঞ্জন উঠল৷ বোঝা গেল বরেন দত্তর কথা অনেকেরই পছন্দ হয়নি৷
দুর্যোধন গড়াই রেগেমেগে বললেন, 'আরে মশাই, রাখুন তো আপনার বিজ্ঞান৷ যাত্রার মঞ্চ থেকে ঘটোৎকচ ভ্যানিশ হয়ে গেল, শুনেছেন কখনো এমন অশৈলী কথা৷ ভৌতিক কাণ্ড ছাড়া এ অন্য কিছু হতে পারে?'
বরেন দত্ত ঠান্ডা গলায় বললেন, 'শুনেছি ম্যাজিশিয়ানরা মঞ্চে অনেক কিছু ভ্যানিশ করে দেয়৷ সেসব কি সত্যি ভ্যানিশ? না দেখার ভুল?'
'এখানে কোন ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিক দেখাল শুনি? আপনি নিজের চোখে ঘটোৎকচকে ভ্যানিশ হতে দেখেননি?'
বরেন দত্ত ঘাড় নেড়ে বললেন, 'দেখেছি৷'
'আপনার কী মনে হয়? এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারেন?'
বরেন দত্ত জবাব দিলেন, 'প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করে কিছু বলতে চাই না৷'
দুর্যোধন গড়াই রেগেমেগে বললেন, 'রাখুন তো মশায়, যতসব বড়ো বড়ো কথা৷ আমরা সবাই ভুল দেখলাম? সবাই আহাম্মক? এ নির্ঘাত ভূতের কাণ্ড৷ ভূতের ক্ষেত্রে আপনার বিজ্ঞান অচল৷'
অনেকেই সায় দিল কথাটায়৷ ভিড়ের মধ্যে পটপট করে কিছু হাততালি পড়ল৷ পাল্লা আজ ভূতের পক্ষে ভারী৷ অনুকূলে হাওয়া পেয়ে, বুকে সাহস এনে গজা তান্ত্রিক গলার শির ফুলিয়ে বলল, 'আমাদের নবীন মালাকার গেল কোথায়? সেই তো ঘটোৎকচের পার্ট করছিল৷ সে গায়েব হয় কী করে? এ নিয়ে আপনার বিজ্ঞান কী বলছে?'
এবার বরেন দত্ত গলা চড়িয়ে বললেন, 'বিজ্ঞান অনেক কিছুই বলে৷ বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের নাগাল পাওয়া বড়ো শক্ত৷ সে জন্য অঙ্কের মাথা চাই৷'
অঙ্কের কথা উঠতেই ভিড়ের মধ্যে কয়েকজনের মাথার আড়ালে টুক করে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল গজা তান্ত্রিক৷
পকেট থেকে একখানা অঙ্কের খাতা বের করে, তার উপরে পেনসিল দিয়ে ফসফস করে দুটো লাইন টেনে বরেন দত্ত বললেন, 'ধরুন এই হল এক্স অক্ষ, আর এই হল ওয়াই অক্ষ৷ এই আমি এক্স অক্ষের সমান্তরাল একটা রেখা টানলাম৷'
গজা তান্ত্রিক দেখল সমূহ বিপদ৷ বরেন দত্ত অঙ্ক কষতে শুরু করেছে৷ খানিক বাদে ঠিক প্রমাণ করে দেবে ভূত বলে কিছু হয় না৷ তখন কী হবে? সকলে মানতে বাধ্য হবে গজা তান্ত্রিক বুজরুগ৷ ব্যাবসা যাবে৷ খাঁটি দুধ, খাঁটি ঘি, খাঁটি ছানা, ভক্তের আনাগোনা সব বন্ধ হয়ে যাবে৷
কিন্তু দৈব কৃপায় এ-যাত্রা বেঁচে গেল গজা তান্ত্রিক৷ হঠাৎ শোনা গেল রাম নন্দীর তীব্র আর্তনাদ, 'খু-উ-উ-ন! খু-উ-উ-ন!'
ভূতের রহস্য মিটতে না মিটতেই খু-উ-উ-ন! শীতের রাতে গা গরম করা যুগল উত্তেজনা কার না ভালো লাগে? সবাই ছুটল রাম নন্দীর গলার শব্দ লক্ষ করে৷ বরেন দত্তের অঙ্কের হাত থেকে রেহাই পেয়ে গজা তান্ত্রিকের মনটা একেবারে যেন হাত-পা ছুঁড়ে নেচে উঠল৷ সেও ছুটে গেল উত্তেজনার উৎসের দিকে৷
ওদিকে বরেন দত্তের কোনো হোলদোল নেই৷ তিনি তখন উবু হয়ে বসে একমনে পেনসিল চিবিয়ে যাচ্ছেন৷ আসলে তিনি অঙ্কটা কষতে গিয়ে এক জায়গায় আটকে গিয়েছেন৷ অঙ্কটা মিলছে না৷
দৃশ্যটা দেখে আঁতকে উঠল সকলে৷ ঘটোৎকচ ভ্যানিশ রহস্য আরও ঘোরালো হয়ে উঠল৷ নবীনের খোঁজ পাওয়া গেল৷ সে মোটেই গায়েব হয়নি, সাজঘরের ভিতরে চিত হয়ে পড়ে আছে৷ জ্ঞান নেই৷
পোশাক বদলাবার জন্য সাজঘরে ঢুকে রাম নন্দী দেখেন, মেঝেতে অনেক কাপড়চোপড় স্তূপাকারে পড়ে রয়েছে৷ তার মধ্যে থেকে নিজের গায়ের চাদরখানা খুঁজে বের করতে গিয়ে নবীনকে আবিষ্কার করেন রাম নন্দী৷ পোশাকের স্তূপের আড়ালে লাশের মতো পড়ে আছে মেঝেতে৷ দৃশ্যটা দেখেই রাম নন্দী 'খু-উ-উ-উ-ন!' বলে চেঁচিয়ে ওঠেন৷
ফণী তফাদার নবীনের নাকের সামনে হাত রেখে বলল, 'শ্বাস পড়ছে৷'
চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিতেই জ্ঞান ফিরে এল নবীনের৷ তার চোখে-মুখে ভয়ানক আতঙ্কের ছাপ৷ নবীন কয়েক মুহূর্ত অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থেকে হঠাৎ 'ভূ-উ-উ-ত' বলে ডুকরে কেঁদে উঠল৷
গজা তান্ত্রিক উৎসাহের সঙ্গে বললেন, 'দেখেছিস নাকি ভাই? কেমন দেখতে বল তো?'
'ভয়ানক চেহারা৷ আর একটু হলেই ঘাড় মটকে দিত৷'
ধুতির খুঁট থেকে নোটবই আর পেন বের করে ঝর ঝর করে মন দিয়ে কিছু লিখতে লাগল গজা তান্ত্রিক৷ একবার চোখ তুলে নবীনকে দেখে প্রশ্ন করল, 'নামধাম কিছু বলল?'
'জানি না৷ আমি দেখেই মূর্ছা যাই৷'
একরাশ বিরক্তি নিয়ে পেন বন্ধ করে গজা তান্ত্রিক দাঁত-মুখ খিচিয়ে বলল, 'মূর্ছা যাওয়ার আর সময় পেলি না? দু-চারটে ভালো কথায় পটিয়ে দুটো-একটা মন্তর-তন্তর জেনে নিলে তোর সিদ্ধিলাভ হয়ে যেত৷ সব দুঃখ ঘুচে যেত৷ গাড়ল কোথাকার৷'
মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে নবীন বলল, 'বড্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম৷'
গজা তান্ত্রিক বলল, 'তুই দেখছি ভাই একেবারেই অকম্মা৷ একখানা ঢ্যাঁড়শ৷ এ-সুযোগ আর তোর আসবে? সাধন-ভজন ছাড়াই বারবার ভূত তোকে দেখা দেবে?'
কথা খুঁজে না পেয়ে নবীন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল৷
ওদিকে সবার কাছেই বিষয়টা আরও গোল পাকিয়ে গেল৷ শেষ দৃশ্যে দিব্যি অভিনয় করছিল নবীন৷ সবাই দেখেছে৷ স্টেজ থেকেই সে গায়েব হয়ে গিয়েছে৷ সেটাও সবাই দেখেছে৷ তার ভ্যানিশ হওয়ার রহস্যটাই কেউ হজম করতে পারছে না৷ আবার দেখা যাচ্ছে নবীন ভ্যানিশ হয়নি৷ ভূত দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল৷
নবীনকে জেরা করে যা জানা গেল, তা মোটামুটি এইরকম৷ দ্বিতীয় দৃশ্যের পরে তার পোশাক পরিবর্তন হওয়ার কথা৷ পঞ্চম দৃশ্যে তাকে রাক্ষসের বেশে মঞ্চে আবির্ভূত হতে হবে৷ ওই দৃশ্যে মায়াবিদ্যায় পটু ঘটোৎকচ পঞ্চপাণ্ডবকে দেখাবে তার ক্ষমতা কত৷ যুধিষ্ঠিরকে সাহস জোগাবে, জ্যাঠামশায় ভেবো না৷ কৌরবদের মেরে নিকেশ করে দিলাম বলে৷ পালায় এমনই লিখেছিল ফণী তফাদার৷
কিন্তু পোশাক বদলাতে গিয়ে রাক্ষসের পোশাকটা খুঁজে পাচ্ছিল না নবীন৷ হঠাৎ আয়নার মধ্যে দিয়ে সে দেখতে পায়, পিছনে কে এক ভয়ংকর দর্শন লোক দাঁড়িয়ে আছে৷ নবীন ঘাড় ঘোরাতেই গুটিগুটি পায়ে সে এগিয়ে আসে নবীনের দিকে৷ এই দৃশ্য দেখেই নবীন মূর্ছা গিয়ে মাটিতে পড়ে যায়৷ তারপরে তার আর কিছু মনে নেই৷
এ-কথা শুনে সবার চোখগুলো পান্তুয়া হয়ে গেল৷ গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল৷ পঞ্চম দৃশ্যে দিব্যি দেখা গিয়েছে রাক্ষসের বেশ ধরে স্টেজে এন্ট্রি নিয়েছে ঘটোৎকচ৷ দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছে৷ নবীন যদি অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে তাহলে ঘটোৎকচের হয়ে অভিনয় করল কে? সেই ভূতটা! তারপর নুটু বৈরাগীর হাতে রাংতায় মোড়া কাঠের বল্লমের খোঁচা খেয়ে ভ্যানিশ হয়ে গেল!
এ যে অসম্ভব৷ আজগুবি ব্যাপার৷ অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড৷ যে কেউ শুনলে বলবে আষাঢ়ে গপ্পো৷ কিন্তু মাধবপুরের গণ্যিমান্যি লোকের চোখের সামনেই তো ঘটনাটা ঘটেছে৷ তাঁরা এ-ঘটনা অবিশ্বাস করেন কী করে?
ফণী তফাদার বলল, 'খটকা একটা লেগেছিল৷ পঞ্চম দৃশ্যে দেখলাম নবীনের পোশাকটা কেমন যেন ঢলঢল করছে৷'
দুর্যোধন গড়াই বললেন, 'গলাটাও কেমন যেন চিকন লাগছিল৷'
রাম নন্দী বললেন, 'আমারও মনে হয়েছিল, পরের দিকে যে পার্ট করছে, সে নবীন নয়, অন্য কেউ৷ যেন কোনো পাকা আর্টিস্ট৷ অমন অভিনয় করা হাবাগোবা নবীনের পক্ষে সম্ভব নয়৷'
ফণী তফাদার পাশেই খটাখট খটাখট শব্দ শুনে চমকে তাকিয়ে দেখল, তার পাশে দাঁড়িয়ে ভয়ানক কাঁপছেন নুটু বৈরাগী৷ তাঁর দু-পাটি দাঁত একে অপরকে আক্রমণ করেছে৷ সেখান থেকেই শব্দটা আসছে৷
কাঁপুনি সামলে নুটু বৈরাগী কোনোরকমে বললেন, 'বিপদটা আমারই যে সবচেয়ে বেশি৷ যাত্রা হোক আর যাই হোক, ভূতটাকে খোঁচা মেরেছিলাম আমি৷ অভিনয়ের কথা ভেবে সে কি অপরাধ মার্জনা করবে? নির্ঘাত আজ রাতে আমার ঘাড় মটকাবে৷ বাবা গজা, একখানা উপায় বাতলে দিতে পারিস?'
গজা তান্ত্রিক চিন্তিত মুখে বলল, 'ব্যাপারটা বেজায় গোলমেলে নুটুদা৷ বুঝতেই পারছেন, যে-অশরীরী অবলীলায় যাত্রাপালায় অভিনয় করে আচমকা মিলিয়ে যেতে পারে, মায়াবিদ্যায় সে ঘটোৎকচের চেয়েও ওস্তাদ৷ যে-কারও ঘাড় মটকে দেওয়া তার কাছে জলভাত৷'
নুটু বৈরাগী রক্তশূন্য মুখে জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে বললেন, 'কোনো উপায় নেই, ভাই গজা?'
'আমি কী করব এখন? গোলমাল বাধাল তো নবীন৷ ভয়ে মূর্ছা গেল কেন? খামোখা ভয় পেলে ভূত ভয়ানক কুপিত হয়৷ নিজেকে অচ্ছুত বলে মনে করে৷ এটা তার প্রেস্টিজে লাগে৷ তখন তার কোনো কাণ্ডজ্ঞান থাকে না!'
সবাই মিলে নবীনকে খুব গালমন্দ করতে লাগল৷ রাম নন্দী বললেন, 'আমি আগেই বলেছিলাম, এ গোবরগণেশকে যাত্রায় নিলে একটা অনর্থ হবে৷'
নবীন ভিতরে ভিতরে ভয়ানক কুঁকড়ে গেল৷ সত্যিই, ভূতটাকে ভালো করে না দেখে ওভাবে অজ্ঞান হওয়াটা তার উচিত হয়নি৷ তার জন্য গাঁয়ের সবারই খুব অসুবিধা হয়ে গেল৷ এবারে ভূতে যদি ভয়ানক একটা কাণ্ড ঘটায়, গাঁয়ের লোক তাকেই দায়ী করবে৷
দুর্যোধন গড়াই বললেন, 'বাবা গজা, তুমিই ভরসা৷ একটা কোনো উপায়-'
দুর্যোধন গড়াইকে বাধা দিয়ে গজা তান্ত্রিক বলল, 'বিপদে পড়ে সবাই গজার পায়ে পড়ছেন৷ কিন্তু বরেন দত্ত যখন সকলের সামনে আমাকে বুজরুগ বলে গেল, তখন কেউ প্রতিবাদ করেছিলেন?'
রাম নন্দী বললেন, 'বরেন দত্ত একটা আহাম্মক৷ ওর কথা বাদ দাও৷'
'কেন? বাদ দেব কেন? আজ আপনারা বিপদে পড়ে আমার কাছে ভূত-বশীকরণের মন্ত্র জানতে চাইছেন৷ কালই তো বলবেন বরেন দত্ত জিন্দাবাদ৷ গজা ভণ্ড৷'
দুর্যোধন গড়াই বললেন, 'ও হে, বরেন আজ হেরে গেছে তোমার কাছে৷ ভূতের ব্যাপারটা মেনে নিয়েছে৷ দেখোনি অঙ্কে জট পাকিয়ে কেমন পেনসিল চিবোচ্ছিল৷'
'বলছেন?'
'বলছি মানে? দেখে নিয়ো, এখন থেকে বরেন দত্ত তোমায় গুরু বলে মানবে৷'
ফণী তফাদার বলল, 'বরেনদা কিন্তু ভুল কিছু বলেননি৷ বিজ্ঞানের অনেক রহস্যই আমাদের অজানা৷ ঘটোৎকচ ভ্যানিশ হওয়ার কারণটা খুঁজে দেখা উচিত৷'
রাম নন্দী বিরক্ত হয়ে বললেন, 'অনেক হয়েছে ফণী৷ তুমি আর মাঝখান থেকে কথা বোলো না৷'
ফণী তফাদার বলল, 'বেশ, আমি তাহলে চলি৷ আপনারা যা ভালো বোঝেন, করুন৷ চল নবীন৷' ফণী তফাদার বাড়ির পথ ধরল৷ তার পিছু নিল নবীন৷
গজা বলল, 'যাক, আপদটা বিদায় হয়েছে৷ ভূতে অবিশ্বাসী লোক দেখলে ভূতের মাথায় আবার খুন চেপে যায়৷ ভূত-বশীকরণের ধকল বড়ো কম নয়৷ তা আপনারা একটু খরচ করতে পারবেন তো?'
নুটু বৈরাগী বললেন, 'কীরকম?'
গজা তান্ত্রিক বলল, 'বেশি কিছু নয়৷ দু-বস্তা দুধের সর চাল৷ তিন কেজি ওজনের দুটো পোনা মাছ৷ একটা নধর পাঁঠা, কালো রঙের৷ আর লিটার পাঁচেক দুধ৷'
দুর্যোধন গড়াই বললেন, 'তুমি কাজে লেগে পড়ো৷ ওসব জোগাড় হয়ে যাবে৷'
কান অবধি হেসে গজা তান্ত্রিক বলল, 'যে আজ্ঞে৷'
অঙ্ক আটকে গেলে বরেন দত্তের মাথায় দশটা আগ্নেয়গিরি একসঙ্গে জ্বলে ওঠে৷ সারা গায়ে এক-শো কাঁকড়া বিছের দংশন-জ্বালা অনুভূত হয়৷ কান গরম হয়ে যায়৷ পেট ভুটভাট করে৷ মাঠে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও ঘটোৎকচ ভ্যানিশের অঙ্কটা না-মেলাতে পেরে বরেন দত্ত এই লক্ষণগুলো টের পেলেন৷ আর এই লক্ষণগুলো প্রকট হয়ে গেলে অঙ্কে আরও গিঁট পেকে যায়৷ পেনসিলের মাথা চিবিয়ে চ্যাপটা করে ফেললেও তখন আর অঙ্ক মেলে না৷
বরেন দত্ত খাতা-পেনসিল ছুড়ে ফেলে দিলেন৷ গায়ের গরম কোটও ছুড়ে ফেললেন৷ এই বাঘা শীতের রাতে গায়ে রইল খালি ধুতি আর পাঞ্জাবি৷ তিনি হনহন করে হাঁটতে লাগলেন বাড়ির উদ্দেশ্যে৷ বাড়ি ফিরেই ঠাকুরদার আমলের দোনলা বন্দুকটা কাঁধে ঝুলিয়ে তিনি আবার বেরিয়ে পড়লেন৷ ঘটোৎকচ ভ্যানিশ রহস্য তাঁকে সমাধান করতেই হবে৷
মাধবপুর অজপাড়াগাঁ, চারিদিকে সবুজের বন্যা৷ বুনো ঝোপজঙ্গল, ঘন বাঁশের ঝাড়, বড়ো বড়ো ঝাঁকড়া গাছ রাতের অন্ধকারকে এখানে এমনিতেই বেজায় ঘন করে তোলে৷ তার উপরে রাতটা শীতের৷ আকাশে চাঁদ নেই৷ আলোর চিহ্নমাত্র কোথাও নেই৷ অন্ধকার আজ যেন আরও বেশি গাঢ়৷ ঝিঁঝি ডাকছে সমানে৷ আর শোনা যাচ্ছে গাছের পাতা থেকে মাটিতে কুয়াশা ঝরে পড়ার টুপটাপ শব্দ৷
গজা তান্ত্রিকের মনে আজ বেজায় ফুর্তি৷ তার ফুরফুরে মন ঘুড়ির মতো আকাশে উড়ে যেতে চাইছে৷ মনের ওজনটা পালকের মতো হয়ে গিয়েছে৷ গাঁয়ের বিভিন্ন পথে সে সাইকেল নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে, আর ঘন ঘন ক্রিং ক্রিং করে সাইকেলের বেল বাজাচ্ছে৷ মিলনমেলা থেকে একটা ভেঁপু কিনেছিল গজা৷ সেটাতেও মাঝে মাঝে ফুঁ দিচ্ছে৷ মনের আনন্দে আজ আর তার ডেরায় ফিরতে ইচ্ছে করছে না৷
মনের খুশিতে গুনগুন করে গান ধরল গজা৷ 'রা-লা-লা-লা-লা৷ তা-না-না-না-না৷ কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা৷' গাঁয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই গানটা গজা অনেকবার শুনেছে৷ কে লিখেছিলেন এই গান, সে অবশ্য জানে না৷
গজার মনে হল, আজ তার এই আনন্দের কথা ভেবেই গানটা লেখা হয়েছে৷ তার মনের পুলকের সঙ্গে সুর আর কথা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে৷ ভবিষ্যতের কথা ভেবে অতীতে যিনি গান বাঁধেন, তিনি অবশ্যই মহাপুরুষ লোক৷ নমস্য ব্যক্তি৷ তাঁর নামটা জানা নেই৷ গজা ভাবল, কবির নাম-ঠিকানা জেনে নিয়ে তাঁর বাড়িতে ফুল আর মিষ্টি পাঠিয়ে দেবে৷

বরেন দত্তর পেনসিল চেবানো মুখটা হঠাৎ মনে পড়ায় গজার মনের ফুর্তিটা কয়েক গুণ চাগিয়ে উঠল৷ গান থামিয়ে হ্যা-হ্যা-হ্যা করে বেশ একচোট হেসে নিল সে৷ গাঁয়ের লোকের কাছে বরেন দত্তর বিজ্ঞানের বেলুনটা চুপসে গিয়েছে৷ ভূতে বিশ্বাস করছে তামাম গাঁয়ের লোক৷ গজা তান্ত্রিকের কারবার এবারে আরও ফুলে-ফেঁপে উঠবে৷ মা কালীর মন্দিরটা এবার সে শ্বেতপাথরে বাঁধিয়ে নেবে৷ এসব ভেবে গজা তান্ত্রিকের খুব আমোদ হল৷
খানিক দূর এগিয়ে সাইকেলের আলোয় গজা তান্ত্রিক দেখতে পেল রাস্তার পাশে কে যেন পড়ে রয়েছে৷ ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে রয়েছে একটা পা৷ নিশুত রাতে এই দৃশ্য দেখলে অনেকেরই হয়তো পিলে চমকে যেত৷ গজার ভয়ডর কম৷ সে সাইকেল থামিয়ে নেমে পড়ে টর্চ জ্বালাল৷
কাছে গিয়ে উবু হয়ে বসে পরীক্ষা করে গজা দেখল, ওটা পা নয়, পায়জামা৷ আংরাখাটাও আছে৷ ঝোপের মধ্যেই খানিক দূরে রাক্ষসের মুখোশটাও পাওয়া গেল৷ এগুলো পরেই অ্যাক্টো করছিল ঘটোৎকচ৷ তার মানে অভিনয়-টভিনয় সেরে পোশাক খুলে রেখে ভূতটা পালিয়ে গিয়েছে৷
ঝোপজঙ্গল ভেদ করে উঁকি মারা চাঁদের মতো গোঁফ-দাড়ির জঙ্গলের আড়ালে মুচকি হাসি খেলে গেল গজা তান্ত্রিকের মুখে৷ পোশাকটা বগলদাবা করে উঠে দাঁড়াল সে৷ ঠিক করল, কাল সকালে আংটা দিয়ে বাড়ির সামনে ল্যাম্প পোস্টের গায়ে পোশাকটা ঝুলিয়ে দেবে৷ ভূতের পোশাক দেখার জন্য ভিড় একেবারে উপচে পড়বে৷ প্রণামির বাক্সটাও ভরে যাবে৷ ভাগ্য আজ গজার খুবই ভালো৷
রাক্ষসের মুখোশটা টর্চের আলোয় নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল গজা৷ মুখোশটা তার খুব পছন্দ হয়েছে৷ একবার পরলে কেমন হয়? ছেলেবেলায় পুজোর সময় বাবা মুখোশ কিনে দিতেন৷ মুখোশ পরে বাবার হাত ধরে দুর্গাঠাকুর দেখতে যেত গজা৷ ঃও, সেসব কবেকার কথা৷
মুখোশটা পরে গজা তান্ত্রিক দেখল, চোখমুখ খাপেখাপে মিলে গিয়েছে৷ যেন তার মুখের মাপ নিয়েই বানানো হয়েছে মুখোশটা৷ এবারে সমস্যা বাধল পোশাক নিয়ে৷ তার সাইকেলে ক্যারিয়ার নেই৷ সঙ্গে থলেও নেই৷ একহাতে বগলদাবা করে আরেক হাতে এবড়ো-খেবড়ো পথে সাইকেল চালানো বেশ কঠিন৷ ভারসাম্য হারিয়ে উলটে পড়ার ভয় আছে৷
অগত্যা পোশাকটা পরেই ফেলল গজা৷ চটের পায়জামাটা বেজায় ঢোলা বলে ধুতির উপর দিয়ে চড়িয়ে নিতে অসুবিধা হল না৷ ঢোলা আংরাখাটাও পাঞ্জাবি আর কোটের উপর দিয়ে দিব্যি মাপ মতন বসে গেল৷
গায়ের চাদরটা গলায় পেঁচিয়ে নিয়ে আপন মনে খিলখিল করে হেসে উঠল গজা তান্ত্রিক৷ রাক্ষসের মুখোশ পরে সে সাইকেল চালাচ্ছে গ্রামের পথে, আহা, এ-দৃশ্য এই রাতে যদি গাঁয়ের লোক দেখত, কত জন যে তাকে ভূত মনে করে ভিরমি খেত তার ঠিক নেই৷
যাই হোক মনের আনন্দে আবার গান ধরে জোরে প্যাডেল ঘোরাতে লাগল গজা তান্ত্রিক৷ লোকে বলে সব ভালো যার শেষ ভালো৷ আজ সন্ধ্যে থেকে গজার সব কিছু ভালো হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু শেষটা ভালো হল না৷
গাজনতলার কাছে আসতেই অন্ধকার ফুঁড়ে দুটো লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপরে৷ একজন তার মুখ চেপে ধরল৷ গজা তান্ত্রিকের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল, এ মোটেই ভৌতিক ব্যাপার নয়, নিতান্ত জাগতিক বিষয়৷ কোনো কঠিন লোকের খপ্পরে পড়েছে সে৷
গজা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও পারল না৷ হাত-পা সে নাড়াতেই পারছে না৷ একেবারে তাকে যেন সাঁড়াশি দিয়ে চেপে ধরেছে লোকদুটো৷ দু-জনের গায়েই অসুরের মতো শক্তি৷ গজা তান্ত্রিক টের পেল, তার মাথাটা কেমন যেন হালকা হয়ে যাচ্ছে৷ ফুলের একটা মিষ্টি গন্ধ আসছে নাকে৷ খানিক বাদেই সে জ্ঞান হারাল৷
লোকদুটো গজা তান্ত্রিককে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা কালো রঙের মোটর গাড়ির পিছনের দরজা খুলে সিটের উপর যত্ন করে শুইয়ে দিল৷ একজন বসল পিছনের সিটে৷ আরেকজন ড্রাইভারের পাশে৷ স্টার্ট নিয়েই গাড়িটা ঝড়ের গতিতে ছুটতে শুরু করল৷
খাটে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিল নবীন৷ আতঙ্কের রেশ এখনও কাটেনি৷ টর্চটা বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে কান খাড়া রেখে কাঠ হয়ে শুয়ে রয়েছে সে৷ তার কেবলই মনে হচ্ছে ঘরের মধ্যে কে যেন হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে৷
নবীন ধড়ফড় করে উঠে বসে টর্চ মেরে চারিদিকে ভালো করে দেখে৷ না, কেউ নেই৷ হঠাৎ তার মনে হল খুট করে যেন দরজা খোলার শব্দ হল৷ নবীন লাফ দিয়ে উঠে বসে আবার টর্চ জ্বেলে দেখল, না মনের ভুল৷ দরজাটা বন্ধই আছে৷
কম্বলে মাথা মুড়ে শুয়ে রইল নবীন৷ খানিক বাদে ঘুম জড়িয়ে এল চোখে৷ রাত তখন কত কে জানে৷ হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল নবীনের৷ কেউ যেন কথা বলছে-'এই যে, শুনছেন?'
ধড়মড়িয়ে খাটের উপর উঠে বসল নবীন, 'কে? কে? কে?' নবীন ঘরের মধ্যে চারিদিকে বনবন করে টর্চ ঘোরাল৷ না, ঘরে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি নেই৷ হঠাৎ খুট করে সুইচ টেপার শব্দ হল৷ ঝুল-কালিমাখা ষাট ওয়াটের বালবটা দুম করে জ্বলে উঠল৷ টিমটিমে হলদে আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরে৷ এই ভূতুড়ে কাণ্ড দেখে কড়া শীতের রাতেও ঘামতে লাগল নবীন৷ চোখ বিস্ফারিত হল, মুখ রক্তশূন্য হয়ে গল৷ গলা শুকিয়ে কাঠ৷
'এই যে, শুনছেন?' আবার সেই কন্ঠস্বর৷ নবীন বনবন করে সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে কন্ঠস্বরের মালিককে খোঁজার চেষ্টা করল৷ না, ঘরে কেউ নেই৷ নবীনের কানমাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল৷ প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার জোগাড়৷ অনেক সাহস সঞ্চয় করে সে বলল, 'কে আপনি? কোথা থেকে কথা কইছেন?'
'আপনার কাছেই তো আছি৷ দেখতে পাচ্ছেন না?'
নবীনের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল৷ সে কাঁপা গলায় বলল, 'না৷'
রামনাম করলে ভূত পালায়৷ জ্ঞান হওয়ার থেকে এ-কথা সে শুনে আসছে৷ নবীনের ইচ্ছে হল জোরসে রাম-রাম বলে৷ ভয়ে স্মৃতি দুর্বল হয়৷ বুদ্ধি ঘুলিয়ে যায়৷ রামের নামটা কিছুতেই তার মনে পড়ল না৷
সেই কন্ঠস্বর আবার বলল, 'ভারি মুশকিল হল৷ আপনার সামনেই তো দাঁড়িয়ে আছি৷'
নবীন খেয়াল করে দেখল, এ-কথার মধ্যে ভুল কিছু নেই৷ কথাটা ভেসে আসছে তার দু-হাতের মধ্যে থেকে৷ নবীনের গায়ে এবার জোর কাঁপুনি শুরু হল৷ সে ফ্যাসফেসে গলায় বলল, 'অ্যাঁ? কোথায়?'
কে যেন নবীনের হাতটা ধরে হ্যান্ডশেকের মতো ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলল, 'এই যে আমি৷'
বাপরে! ভূতের সঙ্গে হ্যান্ডশেক৷ দ্রুত হাত ছাড়িয়ে নিয়ে হাউমাউ করে উঠে নবীন বলল, 'দোহাই, ঘাড় মটকে মেরে ফেলবেন না৷'
'ধুত্তেরি, আপনার ঘাড় মটকাতে যাব কোন দুঃখে? আমি কি খুনে, না ভূত? খামোখা ভয় পাচ্ছেন কেন?'
'বলছেন কী? ভয় পাব না? নাকের ডগায় একটা অদৃশ্য কন্ঠস্বর কথা বলে চলেছে৷ এমন অশৈলী কাণ্ডের মুখোমুখি কেউ হয়েছে কখনো?'
'আপনার দিক থেকে যুক্তিটা ঠিক৷ কিন্তু আমার দিকটা ভেবে দেখুন৷ আমি তো একটা জ্যান্ত লোক৷ রক্তমাংসের মানুষ৷ ওদিকে আপনি মনে করছেন আমি ভূত, মানে মৃত, অতৃপ্ত আত্মা৷ এটা ইনসালটিং নয়?'
এবারে নবীনের কেমন যেন একটু সাহস হল মনে৷ কোথাও একটা গোলমাল আছে৷ সে ছেলেবেলা থেকে শুনে এসেছে ভূত নাকিসুরে কথা বলে৷ এ যে কথা বলছে মোটেই খোনা গলায় নাকিসুরের কথা নয়৷ বেশ মিষ্টি সুরেলা গলা৷ এই রহস্যময় কন্ঠস্বরের মালিক সত্যিই যদি ভূত হত, তাহলে কি আর এতক্ষণ ডায়ালগবাজি করত? পট করে নিমেষে তার ঘাড় মটকে দিত৷ নবীন বলল, 'আপনি ভূত নন? মানুষ?'
'বিলক্ষণ৷ চোখে দেখতে পাচ্ছেন না, তা নাহয় বুঝলাম৷ কিন্তু স্পর্শেও কি অনুভব করতে পারেননি? এই তো হাত মেলালাম আপনার সঙ্গে৷ আচ্ছা, একবার আমায় ভালো করে জড়িয়ে ধরে দেখুন৷ হাত বাড়ালেই আমার নাগাল পাবেন৷'
'না না, থাক থাক৷' কোলবালিশ আঁকড়ে ধরে ছিটকে খাটের এক কোনায় সরে গেল নবীন৷ বলল, 'আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?'
'ওখানেই তো সমস্যা৷ ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছি৷ কী যে করি এখন?'
নবীন অবাক হয়ে বলল, 'আশ্চর্য! এমন আবার হয় নাকি?'
'আমিও কি কম আশ্চর্য হয়েছি মশায়? এভাবে ফেঁসে যাব, কে জানত?'
আগল দেওয়া দরজার দিকে চোখ বুলিয়ে নবীন ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করল, 'আপনি ঘুরে ঢুকলেন কী করে?'
'সবাই যেভাবে ঘরে ঢোকে৷ দরজা দিয়ে৷ আপনি যখন তালা খুলে ঘরে ঢুকছিলেন, তখন আপনাকে অনুসরণ করে ঢুকে পড়েছি৷'
'বাপরে! এতক্ষণ ছিলেন কোথায়?'
'খাটের তলায়৷'
'অ্যাঁ?'
'বড্ড ক্লান্ত লাগছিল৷ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম৷ আপনার ঘরে যা ইঁদুর! তাণ্ডবনৃত্য করে ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিল৷'
'তা, আমার সঙ্গে আপনার কী প্রয়োজন?'
'একটা বিষয়ে মাফ চাওয়ার আছে৷'
নবীন হাঁ হয়ে গিয়ে বলল, 'মাফ চাইতে এসেছেন? আমার কাছে?'
'আমি কিন্তু ভয় দেখাতে চাইনি আপনাকে৷ রাক্ষসের মুখোশটা পরেছিলাম এটা ঠিকই, তা বলে আমায় দেখে আপনি যে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাবেন এটা ভাবতে পারিনি৷ আপনি মশায় বেজায় ভীতু!'
নবীন চোখ কপালে তুলে বলল, 'আ-প-নি-ই? সা-জ-ঘ-রে? ও-রে বা-বা!'
'পারমিশন না নিয়ে সাজঘরে ঢুকে পড়াটা আমার ঠিক হয়নি৷ এই আচরণের জন্য আমি সত্যি দুঃখিত৷ আসলে ওই মুখোশ আর পোশাকটা আমার তখন খুব দরকার ছিল৷'
বোকার মতো চোখ-মুখ করে চেয়ে রইল নবীন৷
অদৃশ্য কন্ঠস্বর বলল, 'বুঝলেন না? ঘটোৎকচের কস্টিউম৷ ওটাই তো লুকিয়ে পড়তে সাহায্য করল৷'
'লুকিয়ে পড়তে মানে? আপনি তো লুকিয়েই আছেন৷'
'আরে তখন তো ভ্যানিশ হইনি৷ বাড়ি থেকে পালানোর পর দুটো লোক আমার পিছু নেয়৷ মন্দ লোক৷ দুটোই ডানপিটে৷ গায়ে বেজায় জোর৷ আমার খোঁজে যাত্রার আসরেও ওরা এসে হাজির হয়৷ ওদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য ঘটোৎকচের পোশাকটা দরকার হয়ে পড়ে৷'
এসব অসম্ভব কথা শুনে নবীনের কানের মধ্যে যেন কয়েক হাজার গুবরে পোকা কনসার্ট বাজাতে শুরু করল৷ মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরতে লাগল৷ তবে সে অনুভব করল, মনের মধ্যে ভয় ভাবটা অনেকটা কেটে গিয়েছে৷ হ্যান্ডশেক করে সে বুঝেছে হাতটা কঙ্কালের নয়৷ আবার সেটা হিমশীতলও নয়৷ একেবারে রক্তমাংসের গরম হাত৷ ও হাত কিছুতেই ভূতের হাত হতে পারে না৷
তা ছাড়া অদৃশ্য লোকটা যেভাবে কথা বলে যাচ্ছে, তাতে লোকটার কোনো দুরভিসন্ধি আছে বলেও তো মনে হচ্ছে না৷ লোকটার গলার মধ্যে এমন একটা সারল্য আছে যে, তার কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে৷
নবীনের মনে হল, একটা লোকের ভ্যানিশ হয়ে যাওয়া খুব কি আশ্চর্যের ব্যাপার? জামার দাগ ভ্যানিশ করে দেওয়া যায়৷ জাদুকরেরা খেলা দেখাতে গিয়ে চোখের সামনে কত কিছু হাপিস করে দেয়৷ লোকে বলে এর পিছনে বিজ্ঞান আছে৷ বিজ্ঞান আজ উল্কার গতিতে ছুটছে৷ এ-কথা বরেন দত্ত হামেশাই বলে থাকেন৷ বিজ্ঞানের এই বাড়বাড়ন্তর যুগে একটা মানুষের ভ্যানিশ হয়ে যাওয়া কি খুব কঠিন ব্যাপার? লোকটাকে পটিয়ে ভ্যানিশ হওয়ার কৌশলটা জেনে নিতে পারলে মন্দ হয় না৷
নবীন প্রশ্ন করল, 'আপনিই কি তাহলে আমার হয়ে ঘটোৎকচের অভিনয় করে গেলেন?'
'কী করব বলুন, আপনি তো মূর্ছা গিয়ে সব গোল পাকিয়ে দিলেন৷ আমি যদি স্টেজে না উঠতাম আপনাদের যাত্রা ভন্ডুল হয়ে যেত৷ হঠাৎ জমজমাট যাত্রা বন্ধ হয়ে গেলে পাবলিক পিটিয়ে আপনাদের ছাতু বানিয়ে দিত৷ আপনাদের যে বাঁচিয়ে দিলাম সেজন্য একটা ধন্যবাদ দিতে পারেন৷'
'কিন্তু আপনি ভ্যানিশ হলেন কখন?'
অদৃশ্য মানুষ উত্তর দিল, 'ঘটোৎকচের পোশাক পরে মঞ্চে উঠে গিয়ে দিব্যি অভিনয় করছিলাম৷ আপনি বোধ হয় অবাক হচ্ছেন৷ সংলাপ মুখস্থ বললাম কী করে? এর মধ্যে ভৌতিক বা অলৌকিক কোনো বিষয় নেই৷ আসলে পালাটা আমি আগেই পড়েছি৷'
'অ্যাঁ? পড়লেন কোথায়?'
'সাহিত্য-দর্পণ পত্রিকার পুজো সংখ্যায় বেরিয়েছে৷ আপনি জানেন না? বেশ ভালো পালা৷ পাকা হাতে লেখা৷ অভিনয় হল আমার প্যাশন৷ যেকোনো পার্ট মুখস্থ করতে আমার বেশি সময় লাগে না৷ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নানারকমের চরিত্রে নিয়মিত অভিনয় প্র্যাকটিস করি৷ দর্শকদের রিঅ্যাকশন দেখে মনে হয়েছে আমি ভালোই অভিনয় করছিলাম৷'
'কিন্তু ভ্যানিশ? সেটা কী করে সম্ভব হল?'
'ওই যে কর্ণের পার্ট করছিল লোকটা, একপুরুষঘাতিনী নিয়ে ছুটে এসে বুকের মধ্যে যেই খোঁচা মারল, তখনই কাণ্ডটা ঘটে গেল৷'
'তাই শুনেছি বটে৷ কিন্তু এমনটা কি সম্ভব? হতে পারে কখনো?'
'এমনিতে কি আর হয়েছে? তার পিছনে লজিক আছে৷ সায়েন্স আছে৷'
উৎসাহিত হয়ে নবীন বলে, 'কারণটা আপনি জানেন?'
'বাবা জানে৷'
'আপনার বাবা?'
'তিনি বিখ্যাত লোক৷ নাম শোনেননি? বিরাট প্রতিভা৷ বিজ্ঞানী গগন সেন৷ সকলের চোখের সামনে থেকে ভ্যানিশ হওয়ার উপায় যখন বের করেছেন, তখন নিশ্চয়ই দৃশ্যমান হয়ে ফিরে আসার উপায়টাও রেখেছেন৷ আমার হাতে যন্ত্রটা আছে, কিন্তু অপারেশন জানা নেই৷'
নবীন উত্তেজিত কন্ঠে প্রশ্ন করল, 'বলেন কী? অদৃশ্য হওয়ার যন্ত্র? কো-কোথায়?'
জবাবে কন্ঠস্বর বলল, 'মশায়, দেখবেন কী করে? ওটা তো আমার হাতে৷ এক গাদা বোতামের মতো সুইচ৷ কোনটা দিয়ে কী হয় কে জানে? তখন থেকে দৃশ্যমান হওয়ার চেষ্টা করছি, পারছি না৷ আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে তখন খুটখাট করে বোতাম টিপে চলেছি, কোনো কাজ হচ্ছে না৷'
'মোবাইল আছে আপনার? বাবাকে ফোন করেই তো জেনে নিতে পারেন?'
'আচ্ছা আহাম্মক লোক তো আপনি৷ বাবার জন্যই তো বাড়ি থেকে পালিয়েছি৷ এখন কি ফোন করে ধরা দেব?'
'সে কী! বাড়ি থেকে পালালেন কেন? বাবা ভালোবাসে না আপনাকে?'
'ভালোবাসবে না মানে? বংশের একমাত্র ছেলে, শিবরাত্রির সলতে৷'
'তাহলে পালালেন যে?'
'বাবা চান আমি সায়েন্স পড়ি৷ বিজ্ঞানী হই৷ সায়েন্স আমার আবার ভালো লাগে না৷'
নবীন মাথা চুলকে বেশ সংকোচের সঙ্গে বলল, 'আপনি কি খুব অঙ্কে কাঁচা?'
অদৃশ্য কন্ঠস্বর বেশ রেগে গিয়ে বলল, 'কী বললেন?'
নবীন গলা খাটো করে বলল, 'না, সবাই বলে অঙ্কে মাথা না থাকলে বিজ্ঞান পড়া যায় না৷'
'ওরে বাবা সেসব নয়৷ জানেন, অঙ্কে কখনো এক-শোর তলায় নম্বর পাইনি৷'
'তাহলে বিজ্ঞান পড়তে কী অসুবিধা?'
'আপনি তো আচ্ছা বেয়াড়া লোক৷ অঙ্কে ভালো হলেই বিজ্ঞান পড়তে হবে? কে মাথার দিব্যি দিয়েছে? আমি থিয়েটার নিয়ে লেখাপড়া করতে চাই৷ অভিনেতা হব৷ এসব কথা শুনলে বাবা ঠ্যাঙাবেন৷ সেজন্যই বাড়ি থেকে পালিয়েছি৷'
নবীন বলে, 'তাহলে তো ভালোই হয়েছে ভ্যানিশ হয়ে আছেন৷ আপনার বাবা আপনাকে খুঁজে পাবেন না৷'
'ধুর মশায়৷ ভ্যানিশ হওয়ার হ্যাপা অনেক৷ নিজে ভ্যানিশ হলে বুঝতেন৷'
'কেন? বেশ তো মজা৷'
অদৃশ্য কন্ঠস্বর ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, 'এর মধ্যে মজা কোথায় দেখলেন? এ ধরনের ভৌতিক জীবন ভালো লাগে নাকি মশায়? কারও সঙ্গে কথা বলার উপায় নেই৷ যার সঙ্গেই কথা বলতে যাচ্ছি সে ভূত ভেবে চিত হয়ে পড়ছে৷ কী কুক্ষণে যে বাবার কোট পরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম, তখন কি ছাই জানি পকেটে এই গ্যাঁড়াকলটা রয়েছে? এটাও জানতাম না মশায়, যন্ত্রটা সক্রিয় হলে লোকে ভ্যানিশ হয়ে যায়৷ বলিহারি আপনাদের কর্ণের৷ অস্ত্রটা নিয়ে ছুটে এসে মারবি তো মার একেবারে কোটের বুকপকেটে রাখা যন্ত্রটার উপর খোঁচা মারল৷ বোধ হয় মোক্ষম সুইচে খোঁচাটা লেগেছে, তারপরেই যন্ত্রটা অ্যাক্টিভেটেড হয়েছে৷ সেই থেকে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছি৷ এখন যে কী করে যন্ত্রটাকে নিষ্ক্রিয় করি৷'
আচমকা ধপ করে একটা টিকটিকি সিলিং থেকে খসে নবীনের মাথায় পড়ে মাটিতে ছিটকে পড়ল৷ নবীনের মাথার ভিতরে চিড়িক করে যেন একটা বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল৷ আঁতকে উঠে নবীন বলল, 'বাপরে!'
অদৃশ্য কন্ঠস্বর বলে উঠল, 'আশ্চর্য৷'
নবীন মাটিতে পড়া টিকটিকিটা দেখে আঁশটে মুখ করে বলল, 'মাথায় টিকটিকি পড়ল৷ এর মধ্যে আশ্চর্যের কী দেখলেন? মাথায় টিকটিকি পড়া কি ভালো?'
'টিকটিকি কি আর এমনি পড়েছে? সিলিং-এর দিকে দেখুন৷'
নবীন ভয় পেয়ে বলল, 'কী? কোথায়?'
'ওই যে আপনার মাথার উপরে৷'
'অ্যাঁ?' নবীন ঘাবড়ে গিয়ে চকিতে চোখ তুলে উপরে তাকাল৷ সিলিং-এর গায়ে একটা আরশোলা৷ একেবারে স্থির হয়ে বসে আছে৷ অদূরে একটা গোটা টিকটিকি৷ তার মতিগতি দেখে বোঝাই যাচ্ছে এখনই কপাৎ করে আরশোলাটাকে খেয়ে ফেলবে৷
এ-দৃশ্য নবীনের কাছে নতুন কিছু নয়৷ খাটে শুয়ে নিজের দুঃখের কথা ভাবতে ভাবতে নবীন প্রায়ই দেখে টিকটিকি আর আরশোলার খেলা৷ এর মধ্যে আশ্চর্যের কী আছে? নবীন ভেবে পেল না৷ সে বিরক্তির সঙ্গে বলল, 'টিকটিকির আরশোলা ধরা আমি ঢের দেখেছি৷'
'চু-উ-উ-প৷ মন দিয়ে দেখুন৷' ফিসফিস করে কথাটা বলল অদৃশ্য কন্ঠস্বর৷
কথাটা শুনে নবীনের মনের মধ্যে কেমন একটা ভয়ের অনুভূতি হল৷ সে হাঁ হয়ে উপরের দিকে চেয়ে রইল৷ আরশোলার দিকে সামান্য এগোতেই টিকটিকিটা সিলিং থেকে খসে ধপ করে খাটের উপর এসে পড়ল৷ নবীন ঠিক সময়ে মাথা সরিয়ে না নিলে আবার টিকটিকি তার মাথায় এসে পড়ত৷
নবীন বোকার মতো বলল, 'টিকটিকি পড়ে গেল৷'
'এমনি পড়েনি৷ কারণ আছে৷'
এতক্ষণ গলার শব্দটা আসছিল সামনে থেকে৷ নবীন খেয়াল করে দেখল, এবার শব্দটা আসছে জানালার উপর থেকে৷
'বাপরে! আপনিও টিকটিকির মতো দেওয়াল বাইছেন নাকি?'
'চুপ করুন৷' চাপা গলায় ধমক দিল অদৃশ্য কন্ঠস্বর৷
এবারে খপাত করে একটা শব্দ হল৷ নবীন অবাক হয়ে দেখল, আরশোলাটা সিলিং-এর গা থেকে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে৷ তারপরেই ঝুপ করে একটা শব্দ৷ নবীন বুঝল, অদৃশ্য মানুষ জানালা থেকে লাফিয়ে পড়ল মেঝেতে৷ তারপরেই খিলখিল করে হাসির শব্দ৷
নবীন বোকার মতো চেয়ে রইল৷
হাসি থামিয়ে অদৃশ্য কন্ঠস্বর বলল, 'শাবাশ গগন সেন৷ আমার গ্রেট ড্যাড৷ দেখুন কাণ্ড৷'
আরশোলাটা উড়ে এসে নবীনের কোলের উপর পড়ল৷ বাপরে-মারে বলে হাউমাউ করে উঠল নবীন৷
'আরশোলাতে ভয় পান বুঝি?'
'বিচ্ছিরি একটা পোকা৷'
'ভয় নেই৷ ওর জারিজুরি শেষ হয়ে গিয়েছে৷ আর ট্যাঁ-ফোঁ করবে না৷'
'মেরে ফেললেন?'
'একপ্রকার মেরে ফেলাই বলতে পারেন৷ পেট থেকে চিপটা খুলে নিয়েছি৷'
'অ্যাঁ? তার মানে?'
'আরশোলাটা আসল নয়, নকল৷ ওর নাম টুকটুকি৷'
নবীন হতভম্ব হয়ে গিয়ে বলল, 'তেলাপোকা আবার টিকটিকি হয় কী করে?'
'টিকটিকি নয় মশায়, টুকটুকি৷ নামটা বাবার দেওয়া৷ আরশোলাটাও ওনার তৈরি৷'
'ম্যা গো! আপনার বাবা আরশোলার কারবারি? এই যে বললেন বিজ্ঞানী৷'
'নাক সিটকাচ্ছেন কেন? গগন সেন ছাড়া এমন অসামান্য জিনিস কারও পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়৷ টুকটুকি কী চিজ আপনি জানেন? ও হল স্পাই তেলাপোকা৷ ছোটো একটা রোবট৷ যেখানে-সেখানে উড়ে গিয়ে ঘুলঘুলি দিয়ে ঘরে ঢুকে যে-কারও হাড়ির খবর টেনে আনতে পারে৷ দুটো শুঁড় দিয়ে কন্টিনিউয়াস সিগন্যাল পাঠায়৷ সেটাকে ডিকোড করলে কম্পিউটারের মনিটরে ছবি ভেসে ওঠে৷ আর টিকটিকি যে সিলিং থেকে ছিটকে পড়ল, তার কারণটা বুঝলেন?'
এসব শুনে হাঁ হয়ে গিয়েছে নবীন৷ বোকার মতো সে দু-দিকে মাথা নাড়ল৷
'ওটা একটা ডিফেন্স মেকানিজম৷ ধারে-কাছে কিছু এসে পড়লে টুকটুকির গা থেকে হালকা বিদ্যুৎ তরঙ্গ বেরোয়৷ ওটা টিকটিকির মতো ছোটো জীবকে ঘায়েল করার পক্ষে যথেষ্ট৷ আমার আপনার কিছু হবে না৷'
'আপনার বাবা তো সাংঘাতিক লোক৷'
'বুঝতেই পারছেন পালানোর পথ নেই৷'
'তার মানে আপনার খোঁজেই আপনার বাবা তেলাপোকাটা পাঠিয়েছেন?'
'ঠিক বলেছেন৷ সাধুচরণদা, কালীচরণদার উপর বাবা পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারেননি৷'
'সাধুচরণ, কালীচরণ-তারা আবার কারা?'
'একসময় ডাকসাইটে লেঠেল ছিল দু-জনে৷ এখন বাবার আর্মি৷ আমি সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম৷ আমার সঙ্গে গিয়েছিল ওরা৷ বাবাই ওদের যেতে বলেছিলেন৷ বাবা ভাবেন, আমি সেই ছোটোটিই আছি৷ আমি বাথরুমে যাচ্ছি বলে হল থেকে বেরিয়ে এসে পালাই৷ রেলস্টেশনগামী একটা বাসে চেপে বসি৷ আমাকে সিনেমা হল থেকে উঠে আসতে দেখে ওদের নিশ্চয়ই খটকা লেগেছিল৷ ওরা আমার পিছু নেয়৷ শেষ পর্যন্ত আমার খোঁজ করতে করতে ওরা আপনাদের যাত্রার আসরে এসে হাজির হয়৷ ওদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যই তখন ঘটোৎকচের পোশাকটা খুব জরুরি হয়ে পড়ে৷ দেখুন, সাধুচরণদা ও কালীচরণদাকে বোকা বানাতে পারলেও টুকটুকির হাতে ধরা পড়ে গেলাম৷'
'কিন্তু আপনি যে বললেন রোবট-তেলাপোকাটা আপনি অচল করে দিয়েছেন?'
'আমার ধারণা টুকটুকির পাঠানো সিগন্যাল থেকে তার আগেই বাবা আমার হদিশ জেনে ফেলেছেন৷'
'এখন কী করবেন?'
'দীর্ঘশ্বাস ফেলে অদৃশ্য কন্ঠস্বর বলল, এখান থেকে পালাতে পারতাম৷ কিন্তু ধরা দিতে হবে৷ ভ্যানিশ হওয়ার জন্যই সমস্যাটা ঘোরালো হয়ে গেল৷ ভেবেছিলাম যন্ত্রটার সুইচ হাতড়াতে হাতড়াতে নিজেই দৃশ্যমান হওয়ার উপায়টা বের করে ফেলব, অনেকক্ষণ ধরে সে-চেষ্টা করেছি, পারলাম না৷ এখন দৃশ্যমান হতে গেলে বাবার সাহায্য দরকার৷'
নবীন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হঠাৎ বলল, 'আপনার নামটা জানতে ইচ্ছে করছে৷'
'আমার নাম ইন্দ্রজিৎ৷ ইন্দ্রজিৎ সেন৷ আমি বয়সে আপনার চেয়ে অনেক ছোটো৷ আমার নাম ধরে ডাকতে পারেন৷ আপনি বাদ দিয়ে তুমি করে বলবেন৷ আপনার নাম আমি জানি৷ আমি আপনাকে নবীনদা বলে ডাকব৷'
নবীন খুশি গলায় বলল, 'বিলকুল৷'
রাখহরি জিজ্ঞেস করল, 'খোকার খোঁজ পেলে?'
কম্পিউটারের মনিটরের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছেন গগন সেন৷ বড়ো অধৈর্য হয়ে পড়েছেন৷ স্ক্রিনে কোনো ছবি আসছে না৷ দেখে মনে হচ্ছে, মনিটরের কালো পর্দার উপর জোনাকির মতো আলোর বিন্দু খেলা করে বেড়াচ্ছে৷ গগন সেন কম্পিউটারের কি-বোর্ডে নানারকম সুইচ টিপে মনিটরে ছবি আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন৷ কিন্তু মনিটরে কোনো ছবি আসছে না৷
হতাশ গলায় গগন সেন বললেন, 'টুকটুকি বিপদে পড়েছে হরিদা৷ সিগন্যাল অফ হয়ে গেল৷'
রাখহরি বলল, 'সাধুচরণ-কালীচরণেরই বা কী আক্কেল? খোকার খোঁজে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, একটা খবর পর্যন্ত দিতে পারে না?'
বাইরে একটা মোটরের হর্ন শোনা গেল৷ গগন সেন শশব্যস্ত হয়ে বললেন, 'দেখো তো হরিদা, কে এল?'
রাখহরি ছুটে গেল বাইরে৷ খানিকবাদে রাখহরির উত্তেজিত গলা শোনা গেল৷ সে-গলায় রয়েছে খুশির ইঙ্গিত, 'দাদাবাবু! দাদাবাবু!'
কম্পিউটারের সামনে থেকে রিভলভিং চেয়ারটা নিয়ে উলটো দিকে ঘুরে গগন সেন অস্থির গলায় প্রশ্ন করলেন, 'কী হয়েছে হরিদা? কে এল?'
রাখহরি হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকে বলল, 'সাধুচরণ-কালীচরণ ফিরে এসেছে৷'
'আর খোকা?'
চাদরের খুঁট দিয়ে চোখের জল মুছে রাখহরি জবাব দিল, 'এসেছে৷'
'এসেছে?' বলে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন গগন সেন৷ লাফিয়ে উঠেই মুখটা বিকৃত করে বললেন, 'ওঃ!'
'কী হল?'
'কোমরের সেই ব্যথাটা৷'
বাইরে কয়েকজোড়া পায়ের শব্দ শোনা গেল৷ উৎকন্ঠার সঙ্গে দরজার দিকে চেয়ে রইলেন গগন সেন৷ সাধুচরণ-কালীচরণ ঘরে ঢুকল৷ সঙ্গে খোকা৷ গায়ে সবুজ আংরাখা ও পাতলুন৷ মুখে রাক্ষসের মুখোশ৷ ঘর ফাটিয়ে সহসা হা-হা করে হেসে উঠলেন গগন সেন৷ সাধুচরণ-কালীচরণ চমকে গেল৷
হাসি থামিয়ে গগন সেন বললেন, 'রাক্ষসের মুখোশ পরেছিস, খোকা? আমাকে ভয় দেখাবি? মনে আছে, ছেলেবেলায় বাঘের মুখোশ পরে "হালুম" বলে ভয় দেখাতিস, তোর দুষ্টুমি আর গেল না৷ বাড়ি ছেড়ে গিয়েছিলি কোথায়? আচ্ছা, এখন থাক ওসব কথা৷ আগে বিশ্রাম নে৷ পরে কথা হবে৷'
খোকা এবার নিজেই মুখোশটা খুলে ফেলে বলল, 'আমি আপনার খোকা নই৷ দুটো দস্যু আমাকে ধরে এনেছে৷' দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলসমেত কাঁচুমাচু মুখ করে গগন সেনের দিকে চেয়ে রইল গজা তান্ত্রিক৷
রাখহরির চোখ কপালে উঠে গেল৷ ঘাবড়ে গিয়ে মাথা চুলকোতে লাগল সাধুচরণ ও কালীচরণ৷
ঘরে যেন বাজ পড়ল৷ গগন সেন চেঁচিয়ে উঠলেন, 'এ কে? খোকা বলে কাকে ধরে এনেছিস কালীচরণ?'
কালীচরণ নিমপাতা গেলার মতো মুখ করে বলল, 'খোকাকেই তো ধরেছিলাম৷'
সাধুচরণ সাফাই গাইল, 'গাড়িতে আসার সময় খোকা বদলে গেছে৷'
ঘরে যেন বাজ পড়ল৷ গর্জন করে উঠলেন গগন সেন, 'বদলে গেছে মানে? খোকা কি গিরগিটি?'
উত্তর খুঁজে না পেয়ে সাধুচরণ ও কালীচরণ দু-জনের মুখই আমশি হয়ে গেল৷ তারা দু-জনেই জানে গগন সেন বড়ো বদরাগি লোক৷ রেগে গেলে কাণ্ডজ্ঞান থাকে না৷
সাধুচরণ-কালীচরণ ফাঁপরে পড়েছে দেখে মনে মনে খুশি হল গজা তান্ত্রিক৷ এরা কম হেনস্থা করেনি তাকে৷ তার মনের খুশি কেড়ে নিয়েছে৷ বরেন দত্তর পরাজয়ের আনন্দটা পুরোপুরি উপভোগ করে ওঠার আগেই তাকে জাপটে ধরে অজ্ঞান করে দিয়েছিল এরা৷
গজা বলে উঠল, 'ডাহা মিথ্যুক৷ ভুলভাল কথা বলছে এরা৷ আপনার খোকা যে কে, তা আমি জানি না৷ তবে এই দুটো গাড়ল মোটেই খোকাকে ধরেনি৷ আমাকে ধরে অজ্ঞান করে দিয়েছিল৷ আমি মানহানির মামলা করব৷ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে৷'
গগন সেন কড়া চোখে গজা তান্ত্রিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনি কে?'
সাধুচরণ বলে উঠল, 'মুখোশ আর এই পোশাকটাই খোকা পরেছিল৷'
কেমন যেন একটা খটকা লাগল গগন সেনের৷ বললেন, 'খোকা এই বদখত পোশাক পরতে যাবে কেন?'
কালীচরণ বলল, 'খোকা যাত্রা দলে যোগ দিয়েছে৷ এই পোশাক পরেই তো অভিনয় করছিল৷'
গগন সেন গর্জন করে বললেন, 'খোকা বাড়ি থেকে পালিয়ে যাত্রা দলে যোগ দিয়েছে৷ তোরা বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারলি না খোকাকে?'
কালীচরণ বলল, 'এই পোশাক দেখেই ভ্রম হয়েছে৷'
'তাহলে খোকা কোথায় গেল?' আবার গর্জন করলেন গগন সেন৷
গজা তান্ত্রিকের দিকে আঙুল তুলে সাধুচরণ বলল, 'এই বদমাশ লোকটাই খোকাকে গুম করেছে৷'
'মোটেই না৷ আমি সজ্জন লোক৷ গৃহ মাধবপুর৷'
গগন সেন ভুরু কুঁচকে বললেন, 'মাধবপুর! নামটা কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকছে৷'
'চেনারই কথা৷ খাসা জায়গা মশায়৷ তাজা বাতাস, খাঁটি দুধ, টাটকা সবজি সবই পাবেন৷ ওখানেই আমার তিন পুরুষের বাস৷ তন্ত্রমন্ত্র নিয়ে থাকি৷ লোককে তাবিজ-কবচ দিই৷ আমার নাম গজা তান্ত্রিক৷'
রাখহরি চোখ কপালে তুলে বলল, 'কী বললেন? আপনি তান্ত্রিক?'
গজা চোখ বুজে গর্বের সঙ্গে বলল, 'দেবী চামুণ্ডা আমার মা৷'
রাখহরি চেঁচিয়ে উঠল, 'সর্বনাশ! তান্ত্রিকেরা ছেলে গুম করে বলি দেয় দাদাবাবু৷'
গজা মরিয়া হয়ে বলল, 'মানুষ বলি দেওয়া খারাপ কাজ৷ চালকুমড়ো আর করলা ছাড়া কোনোদিনই কিছু বলি দিইনি৷ আমার তো মনে হচ্ছে আপনারাই বলি দেবেন বলে আমাকে ধরে এনেছেন৷'
গগন সেন পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে বললেন, 'খোকাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন?'
'বললাম তো খোকা কে, আমি জানি না৷'
গগন সেন কয়েক পা সামনে হেঁটে গিয়ে গজার চোখে চোখ রেখে বললেন, 'সোজা কথায় তাহলে কাজ হবে না৷ আপনি তান্ত্রিক হতে পারেন, কিন্তু তন্ত্রমন্ত্র আমিও কম জানি না৷'
এ-কথা বলে নিজের ওয়ার্ক স্টেশনের কাছে হনহন করে হেঁটে গিয়ে একটা হাতলে চাপ দিলেন গগন সেন৷ সঙ্গেসঙ্গে চিচিং ফাঁকের মতো একদিকের দেওয়াল খানিকটা সরে গেল৷
'কৃপাসিন্ধু, তিমিরবরন একবার আয় তো এদিকে৷' এই বলে একটা বোতাম টিপে দিলেন গগন সেন৷ চ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ করে কলিংবেল বাজার মতো একটা শব্দ হল৷
বোমকে গিয়ে জুলজুলে চোখে চিচিং ফাঁক দেওয়ালের দিকে চেয়েছিল গজা তান্ত্রিক৷ এবারে সে হাউমাউ করে উঠে বলল, 'বাপরে! খেয়ে ফেলবে৷'
দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে ঘরে এসে ঢুকল একটা বাঘ ও একটা ভাল্লুক৷ গজা তান্ত্রিক ভয় পেয়ে তিড়িং করে একটা লম্বা টুলের উপর উঠে দাঁড়িয়ে জোড়হাত করে কাঁপতে লাগল৷
গগন সেন বললেন, 'বাঘের নাম কৃপাসিন্ধু৷ ভালুকের নাম তিমিরবরন৷ দেখলে মনে হবে আসল৷ কিন্তু এরা আমার হাতে তৈরি রোবট৷ আসল বাঘ-ভালুকের চেয়েও ভয়ংকর৷ ভয়ানক একটা হাঁ করে কৃপাসিন্ধু গর্জন করল, হালুম! গজা তান্ত্রিকের দিকে চেয়ে ভেংচি কাটল তিমিরবরন৷ গজা তান্ত্রিকের পিলে চমকে গেল৷
গগন সেন প্রশ্ন করলেন, 'খোকা কোথায়?'
ঠিক এই সময় কে একজন বলে উঠল, 'ব্যাটা এক নম্বরের বুজরুগ৷ বাঘ দিয়ে ওটাকে খাওয়ান৷ ভালুকের নখ দিয়ে ফালাফালা করে দিন৷'

এ-কথা শুনে সবাই ঘুরে তাকিয়ে দেখল, দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে বরেন দত্ত৷ হাতে দোনলা বন্দুক৷
চশমার মোটা কাচের আড়াল থেকে বরেন দত্তকে দেখে গগন সেন বলে উঠলেন, 'কে? এ কী! মাধবপুরের বরেন না? অঙ্কের সেই বিরল প্রতিভা!'
গগন সেনকে চিনতে পারলেন বরেন দত্ত৷ দু-জনে একই কলেজে পড়তেন৷ কলেজ ছাড়ার পর আজ বহুদিন পরে দেখা- 'এ কী! গগন তুমি? এটা তোমার বাড়ি? তোমার লোকই ধরে এনেছে এই বুজরুকটাকে! বেশ করেছে৷ ওকে বাঘের খাবার করে দাও৷'
আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন গগন সেন৷ ছুটে এসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন বন্ধুকে৷-'আহা বরেন সেই কলেজ ছাড়ার পর কতদিন পরে তোমার সঙ্গে দেখা৷ কিন্তু কী ব্যাপার বলো তো? তুমি কোত্থেকে এসে হাজির হলে? আমার বড়ো বিপদ যাচ্ছে বরেন৷ আমার ছেলে দু-দিন হল নিখোঁজ৷'
'সে কী!'
'আমার লোকেরা খোকা ভেবে ভুল করে মাধবপুর থেকে এই চামচিকেটাকে ধরে এনেছে৷'
'চামচিকে? যথার্থ সম্ভাষণ৷' খিকখিক করে শিশুর মতো হেসে উঠলেন বরেন দত্ত৷ তারপর মুখ-চোখ গম্ভীর করে বললেন, 'ব্যাপার খুব গুরুতর৷ মাধবপুরে একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গিয়েছে৷ যাত্রার মঞ্চ থেকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে এক অভিনেতা৷'
গগন সেনের বুকের মধ্যে যেন দামামা বেজে উঠল, 'কী বললে? ভ্যানিশ? যাত্রার মঞ্চ থেকে?'
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বরেন দত্ত বললেন, 'লোকের ধারণা এটা ভৌতিক ব্যাপার, আমি মনে করি এর পিছনে বৈজ্ঞানিক কারণ আছে৷ ভূত মানি না বলে আমায় খুব হ্যাটা করেছে গাঁয়ের লোক৷ জেদ ধরে গেল৷ এই ভ্যানিশ হওয়ার রহস্য ভেদ করতে হবে৷ ব্যস, দোনলা বন্দুকটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম৷'
গগন সেন উত্তেজিত হয়ে বললেন, 'তারপর?'
'পথে বেরিয়ে গাজনতলার কাছে এসে দেখি, রাস্তার পাশে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে রয়েছে কালো রঙের একটা দামি মোটরগাড়ি৷ মনের মধ্যে কেমন একটা খটকা লাগল৷ চুপিসাড়ে গাড়ির ডিকি খুলে ঢুকে পড়লাম৷ খানিকবাদে একটা ঝটাপটির শব্দ কানে এল৷ তারপরেই স্টার্ট নিল গাড়িটা৷ তখন কি জানি যে গাড়িটা তোমার, আর সেটা আমাকে নিয়ে তোমার সামনে হাজির করবে?'
গজা তান্ত্রিক বলল, 'ভৌতিক কাণ্ড না হলে একটা লোক রাতারাতি গায়েব হয়ে যায়?'
গগন সেন চিন্তিত মুখে বললেন, 'ঠিক দেখেছেন? গায়েব হয়ে গেল? মঞ্চে আলোর খেলা নয় তো?'
গজা বললে, 'তা হয় কী করে? আলো ফেলছিল বাঁটুল৷ সেই তো কাণ্ডটা দেখে দাঁত ছিরকুটে মূর্ছা গেল৷'
'আশ্চর্য! বরেন, তুমি ঘটনাটা দেখেছ নিজের চোখে?'
'দেখেছি৷ তুমি তো মস্ত বিজ্ঞানী৷ তুমিই বলো এটা বিশুদ্ধ বিজ্ঞান নয়? এর মধ্যে ভূত আসে কোথা থেকে?'
'অবশ্যই বিজ্ঞান৷ ভ্যানিশ হওয়ার কৌশল গগন সেন জানে৷ কিন্তু-'
সাধুচরণ বলল, 'যে ভ্যানিশ হল, সে গজা তান্ত্রিকের এই পোশাকটা পরেছিল৷ গলার স্বর অবিকল খোকার মতো৷ মাধবপুরে যাত্রার আসরে আমি আর কালীচরণ দেখেছি তাকে৷'
আরও চিন্তিত হয়ে মাথা চুলকোতে লাগলেন গগন সেন৷ ঘরময় নীরবতা৷ সবাই স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে৷ কৃপাসিন্ধু গজার দিকে তাকিয়ে বিকট হাঁ করছে, আর তিমিরবরন গজাকে দেখে সমানে মুখ ভেংচে যাচ্ছে৷ জুলজুলে চোখে কৃপাসিন্ধু ও তিমিরবরনের দিকে চেয়ে টুলের উপর দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে গজা তান্ত্রিক৷
ঘরের নীবরতা ভেঙে গগন সেন বললেন, 'খোকা বাড়ি থেকে কী পোশাক পরে বেরিয়েছিল, তোমার খেয়াল আছে হরিদা?'
রাখহরি বলল, 'তোমার ঘিয়ে রঙের কোটটা পরেছিল৷'
হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন গগন সেন৷-'মনে পড়েছে৷ যন্ত্রটা যে ওই কোটের বুকপকেটে ছিল৷ হরিদা, খোকা ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে৷'
রাখহরি চমকে উঠে বলল, 'অ্যাঁ? কী হবে তাহলে?'
ঘরের বাকি সবাই বাক্যহারা হয়ে এ ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগল৷
গোটা মাধবপুর থমথমে৷ যাত্রা দেখতে যারা গিয়েছিল তারা তো নিজের চোখে দেখেছে, বাকিরা লোকের মুখে শুনেছে৷ রহস্যজনক কেউ নবীনের পরিবর্তে ঘটোৎকচের চরিত্রে অভিনয় করে মঞ্চ থেকেই ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে৷
নিজের চোখে যারা দেখেনি তাদের অনেকেই প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি ঘটনাটা৷ পরে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছে, যখন তারা দেখেছে এই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের গায়ের লোম আলপিনের মতো খাড়া হয়ে উঠছে৷ চোখে-মুখে প্রকাশ পাচ্ছে ভয়ানক আতঙ্ক৷ বেশিরভাগ লোকেরই ধারণা এ ভৌতিক ব্যাপার৷ অলৌকিক কাণ্ড৷
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বরেন দত্ত ও গজা তান্ত্রিকের অন্তর্ধান রহস্য৷ কাল রাত থেকেই দু-জনে নিখোঁজ৷ থানায় ডায়েরি করেছে তাদের বাড়ির লোকজন৷ কেউ বলছে, গতকাল রাতে সাইকেলে চড়ে এক রহস্যময় লোককে গাঁয়ের পথে ঘুরতে দেখা গিয়েছে৷ কেউ-বা বলছে, মাঝরাতে তারা হেড়ে গলায় গানের আওয়াজও শুনেছে৷ এসব শুনে অনেকেরই ধারণা এসব ভূতের কাণ্ড৷ ভূতেই সাইকেল চালাচ্ছিল, গানও গেয়েছে৷ দুর্যোধন গড়াই বললেন, গভীর রাতে তিনি একটা মোটরগাড়ির শব্দ শুনেছেন৷
রাম নন্দী বললেন, 'এটাও ভৌতিক ব্যাপার, না হলে মাধবপুরের মতো অজপাড়াগাঁয়ে মাঝরাতে মোটরগাড়ি আসবে কোথা থেকে?'
রোববারের বাজারে সর্বত্রই জটলা৷ জায়গায় জায়গায় ছোটো ছোটো ভিড়৷ সবাই গতকাল রাতের অদ্ভুতুড়ে বিষয় নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত৷ এমন রোমহর্ষক উত্তেজনার রসদ মাধবপুরের ছাপোষা লোকেরা অনেকদিন পায়নি৷
নবীন থলে হাতে বাজারে এসেই টের পেল, বহু লোক টালুস-মালুস করে তার দিকে তাকিয়ে দেখছে৷ এতে বেশ মজা পেল নবীন৷ সকলের দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে সে মাছ-বাজারের দিকে এগোতে লাগল৷
নবীন বলল, 'ইন্দ্র, আছ তো?'
ইন্দ্রজিৎ বলল, 'এই তো, সঙ্গে চলেছি৷'
'তুমি অদৃশ্য মানুষ৷ ধন্দে পড়ে যাই৷ আছ, না নেই৷'
'আমার সঙ্গে বেশি কথা কইবেন না৷ সবাই ভাববে হাওয়ার সঙ্গে কথা বলছেন৷ হয় আপনাকে পাগল ঠাওরাবে না হলে সন্দেহ করবে৷' চাপা গলায় বলল ইন্দ্রজিৎ৷
কানাইয়ের দোকানের সামনে উবু হয়ে বসে মন দিয়ে কই মাছ ওজন করা দেখছিলেন টিকিট কালেকটর রঘু সরকার৷ অনেকেই বলে কানাই খুব সেয়ানা৷ সবাইকে নাকি ওজনে ঠকায়৷ এ নিয়ে প্রতিদিনই বাজারে বেশ কয়েকজন লোকের সঙ্গে কানাইয়ের ঝগড়া বেধে যায়৷
রঘু সরকার ঠোঁট উলটে বললেন, 'এক কেজিতে মাত্র ওই ক-টা মাছ?'
'আপনার চোখের সামনেই তো ওজন করছি চেকারবাবু৷ দাঁড়িপাল্লা সমান সমান৷ ভালো করে দেখে নিন৷'
পিছন থেকে নবীন বলল, 'উঁহু৷ মাছ মনে হচ্ছে কমই আছে৷'
নবীনকে দেখে কানাই খেঁকিয়ে উঠল, 'বুঝলি কী করে? ভূতে তোকে বলে গেছে?'
নবীন মৃদু হেসে বলল, 'তা বলেছে বই কী?'
কানাই বলল, 'মাছগুলো তোর মতোই দামড়া৷ তাই মনে হচ্ছে সংখ্যায় কম৷'
'এদিকের পাল্লার বাটখারার তলায় কিছু আছে না কি?'
রঘু সরকার চমকে উঠলেন, 'অ্যাঁ? বাটখারার তলায়? কী? কী আছে?'
কানাই এবার বেজায় চটে গিয়ে বলল, 'ওরে আমার মুরুব্বিরে? মাছের ওজনের তুই কী বুঝিস? বাড়ি গিয়ে দাঁড়িপাল্লায় চেপে নিজের ওজন মাপ গে যা৷'
রঘু সরকার সন্দিগ্ধ গলায় বললেন, 'না বাপু, আমার কেমন যেন খটকা লাগছে৷ তুমি আরেকবার ওজন করো৷'
কানাই ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, 'পারব না৷ আপনার নেওয়ার হলে নিন, না হলে আসুন৷'
আচমকা নিজে থেকেই দাঁড়িপাল্লার একদিকের পাত্রটা উলটে গেল৷ চমকে উঠল কানাই৷ দেখা গেল পাল্লার তলায় আটকানো আছে চুম্বক৷
রঘু সরকার কোমরে হাত দিয়ে বাঘের মতো হাঁক পাড়লেন, 'বটে? আমার সঙ্গে জোচ্চুরি?'
হইচই শুনে আশেপাশে বেশ কয়েকজন লোক জড়ো হয়ে গেল৷ সবাই হামলে পড়ে জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়েছে মশায়?'
রঘু সরকার বললেন, 'দেখুন কিত্তি৷ পাল্লার নীচে চুম্বক লাগিয়ে ওজনে ঠকাচ্ছে৷'
সবাই বলল, 'হাতেনাতে মোক্ষম ধরেছেন৷'
রঘু সরকার বললেন, 'আমি নয়, উনি ধরেছেন৷'
নবীনকে বুকে জড়িয়ে ধরে রঘু সরকার বললেন, 'চোখ বটে মশায় আপনার৷ আপনার মতো লোককেই তো আজ দেশের প্রয়োজন৷ আহা, নেতাজি যদি আপনাকে সঙ্গে পেতেন-'
সবাই নবীনের পিঠ চাপড়ে খুব তারিফ করতে লাগল৷ ওদিকে কানাইয়ের অবস্থা কাহিল৷ লোকে তাকে এই মারে কি সেই মারে৷ নবীন বলল, 'এবারের মতো ছেড়ে দিন৷ বেচারা মানুষ৷ ভুল করে ফেলেছে৷'
নবীনের কথায় কাজ হল৷ ভিড় ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে গেল৷ চুম্বকটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে গড় হয়ে নবীনের পায়ে শুয়ে পড়ে কানাই বলল, 'নবীনবাবু, এই অধমকে একটু দেখবেন৷'
এদিকে ভারি ধন্দে পড়ে গেলেন রঘু সরকার৷ কে যেন তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে গেল, 'ফেরার পথে একসঙ্গে দুটো টিকিট কেটে নেব৷' তিনি মাথা চুলকে বাড়ির পথ ধরলেন৷
মাছের বাজার থেকে বেরিয়ে তরিতরকারির বাজারে গেল নবীন৷ সে খেয়াল করে দেখল, অনেকেই তার বিষয়ে আলোচনা করছে৷ বলছে, লোক ঠকানোর কারবার ধরতে হলে নবীনের মতো বুকের পাটা চাই৷
বাজারে বাবু ঘোষের দোকান হল আনাজের সবচেয়ে বড়ো দোকান৷ উঁচু মাচায় বসে বাবু ঘোষ দোকান করে৷ পিছনে মস্ত ঘরখানা হল তার তরকারির গুদাম৷ ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে বাবু ঘোষের সামনে দাঁড়িয়ে তরকারি বাছতে লাগল নবীন৷
নবীনকে আড়চোখে দেখে বাবু ঘোষ বলল, 'দেখার কিছু নেই ভাই৷ কানাই মণ্ডলের মতো কারবার আমি করি না৷ সব টাটকা, সব ফ্রেশ৷ যা নেবে চোখ বুজে নিয়ে নাও৷'
নবীন বলল, 'কুমড়োটা কেমন যেন বেশি সবুজ৷'
'টাটকা জিনিস তো সবুজ হবেই, ভাই৷'
নবীন হেসে বলল, 'তুঁতের জলে চোবানো নয় তো?'
'কুমড়ো কি ভাই তাঁতের শাড়ি যে রঙে ছোপাব?' বাজখাই গলায় হেঁকে উঠল বাবু ঘোষ৷
আশেপাশে দাঁড়ানো খদ্দেররা সন্দিগ্ধ চোখে বাবু ঘোষের দিকে তাকাল৷ হঠাৎ পিছনের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এল একটা ছেলে৷ হাতে একটা গামলা৷ তাতে রয়েছে নীল জল৷
ছেলেটা ডাঁটের সঙ্গে বলল, 'আপনার দোকানে কাজ করতে পারব না দাদা৷ আপনার দোকানে ভূত আছে৷' ভূতের কথা শুনে সবাই উৎকর্ণ হয়ে পড়ল৷ ছেলেটি বলল, 'তুঁতের জলে আনাজ ডোবাতে গেলেই ভূত গাঁট্টা মারছে৷ এই থাকল আপনার তুঁতের জলের গামলা৷ আমি চললাম৷'
বাবু ঘোষ বোকার মতো হাঁ করে চেয়ে রইল ছেলেটির দিকে৷
লোকজন বলে উঠল, 'কী কারবার শুরু করেছ বাবু? জেনে-শুনে বিষ খাওয়াচ্ছ আমাদের?'
বিপদ বুঝে বাবু ঘোষ বলল, 'ভুল হয়েছে মশায়৷ এবারের মতো মাফ করে দিন৷'
সকলে আবার নবীনকে তারিফ করা শুরু করল৷-'এই যে নবীনবাবু? আপনি যে আজ সবার চোখ খুলে দিলেন৷ আপনি গোয়েন্দা না কি মশায়? বাবু ঘোষের মতো ধড়িবাজ লোকের কারবার ধরলেন কী করে?'
অনেকে বলল, 'আহা, নবীনের মতো ছেলে গাঁয়ের গর্ব৷ ছেলে নয়তো, যেন হিরের টুকরো একখানা৷'
ওদিকে কানাই মণ্ডল ও বাবু ঘোষের ধরা পড়ার রেশ ছড়িয়ে পড়ল বাজারে৷ অনেকেরই ভেজাল কারবার আছে৷ ধরা পড়ার ভয়ে দুমদাম করে দোকানের ঝাঁপ পড়তে লাগল৷

ইন্দ্রজিৎ নবীনের কানে কানে বলল, 'আজ এ পর্যন্তই থাক নবীনদা৷'
হঠাৎ বিকট শব্দ করে একটা মোটরবাইক এসে থামল বাজারের মধ্যে৷ নিতাই আর লোটনকে দেখে গোবেচারার মতো মুখ করে ঘরমুখো হল অনেকে৷ অনেকেই লুকিয়ে পড়ল৷ মাধবপুরের লোকে এদের যমের মতো ভয় করে৷ এদের অবশ্য বড়ো একটা দেখা যায় না৷
আড়াল থেকে মাধবপুরের সাম্রাজ্য চালায় নিতাই ও লোটন৷ মাধবপুর বাজার থেকে এরা মোটা টাকার তোলা আদায় করে৷ তোলার টাকা মিটিয়ে লাভ রাখতে গিয়ে ব্যাপারীদের ভেজালের কারবার করতে হয়৷
নিতাই চোখ পাকিয়ে বলল, 'নবীন মালাকার কে?'
নবীন বলল, 'আমি৷'
লোটন বলল, 'গুরু, এ মক্কেল তো ইশকুলে ঘণ্টা বাজায়৷ তার এত রোয়াব কীসের?'
নবীনের চোখের সামনে এসে লোটন চোখ পাকিয়ে বলল, 'সাধু যুধিষ্ঠির! তুই ভেজাল ধরার কে?'
নবীন কড়া গলায় বলল, 'তোদেরই-বা এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার কী?'
লোটন বলল, 'আরে এই, তুই-তোকারি করছিস কাদের সঙ্গে?'
'তোরাই তো শুরু করলি৷'
নবীনকে পেল্লায় একটা থাপ্পড় কষানোর জন্য নিতাই হাত তুলতেই, নবীন বাঁ-হাত দিয়ে শক্ত করে নিতাইয়ের এক হাত চেপে ধরে ডান হাতে দুম করে একটা ঘুসি চালাল৷ ছিটকে পড়ল নিতাই৷ হঠাৎ কে যেন একটা ধাক্কা দিল লোটনকে, সে মুখ থুবড়ে পড়ল৷ সব কিছু ঘটে গেল চোখের নিমেষে৷
নবীনের কেরামতি দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল ভিড় করে থাকা লোকজন৷ নিতাই ও লোটন এত সহজে হেরে যাওয়ার বান্দা নয়৷ চকিতে তারা উঠে দাঁড়াল৷ দু-জনে এবার একসঙ্গে আক্রমণ করল নবীনকে৷
নবীন অনুভব করল, তার গায়ে যেন এক-শো হাতির বল সঞ্চারিত হয়েছে৷ এবারে একেবারে ধুন্দুমার বেধে গেল৷ খানিকক্ষণ নানারকম শব্দ শোনা গেল৷ হুড়ুম-দুড়ুম-পটাশ-খটাশ-ধপাত-ধড়াম-দমাস৷
তারপরে দেখা গেল মাটিতে পড়ে চিঁচিঁ করছে নিতাই ও লোটন৷ কপালে আলু ও চোখে কালসিটে৷ ওদিকে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে গলগল করে ঘামছে নবীন৷ নিতাই ও লোটন ঢিট হয়েছে দেখে হর্ষধ্বনি করে উঠল সাধারণ লোক৷
লোটন মাথার আলুতে হাত বুলিয়ে বলল, 'গুরু, আমার তিনটে দাঁত খুঁজে পাচ্ছি না৷'
নবীনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ইন্দ্রজিৎ বলল, 'দারুণ লড়েছ, নবীনদা৷ তোমার ভিতরের মানুষটা জেগে উঠেছে৷'
কয়েকজন ছুটে এসে নবীনকে কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, 'নবীন মালাকার, জিন্দাবাদ৷' সমবেত ধ্বনি উঠল, 'জিন্দাবাদ! জিন্দাবাদ!'
এই সব কোলাহলের শব্দ ছাপিয়ে হঠাৎ শোনা গেল দুর্যোধন গড়াইয়ের চিৎকার, 'বেলুন! বেলুন!'
সকলে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল অবাক কাণ্ড৷ মস্ত বড়ো একটা বেলুন ভেসে যাচ্ছে হাওয়ায়৷ সব লোকে এবারে একসঙ্গে হইহই করে উঠল৷ 'বেলুন! বেলুন!' এমন জিনিস মাধবপুরের লোক কখনো দেখেনি৷ চারিদিকে বেজায় শোরগোল পড়ে গেল৷ ছেলে-বুড়ো, মা-দিদিমা সবাই বেরিয়ে এল ঘর থেকে৷ আকাশের দিকে মুখ তুলে ভেসে যাওয়া বেলুনকে লক্ষ করে ছুটতে লাগল সকলে৷
এতে বেশ কিছু কেলেঙ্কারি হল৷ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ছুটতে গিয়ে শিকড়ে পা বেধে মাটিতে পড়লেন দুর্যোধন গড়াই৷ তাঁর হাঁটুর নুনছাল উঠে গেল৷
ল্যাম্প পোস্টে ধাক্কা খেয়ে রাম নন্দীর কপালে আলু গজাল৷ নুটু বৈরাগী একটা ষাঁড়ের গায়ে গুঁতো দিলেন৷ ষাঁড়টা খেপে গিয়ে শিং বাগিয়ে তেড়ে এল তাঁকে৷ প্রাণের তাগিদে দৌড়ে অলিম্পিকের রেকর্ড প্রায় ভেঙে দিয়ে বট গাছের ঝুরি আঁকড়ে ধরে টারজানের মতো দোল খেতে লাগলেন নুটু বৈরাগী৷
ঘোড়ানিমতলার মাঠ লোকে থইথই৷ ভীষণ ঠেলাঠেলি বেধে গেল৷ চোঙা ফুঁকে উত্তাল জনতাকে সুশৃঙ্খল করার চেষ্টা করার কাজে লেগে পড়ল ফণী তফাদার৷ বেলুনটা ঘোড়ানিমতলার মাঠের উপর এসে স্থির হয়ে রয়েছে৷ খানিকবাদে হেলেদুলে নীচের দিকে নামতে লাগল৷
রাম নন্দীর বুড়ি পিসিমা, তারাসুন্দরী বেলুনের দিকে চেয়ে ঘন ঘন নমস্কার ঠুকতে লাগলেন৷ বললেন, 'এ বেলুন-ফেলুন নয় রে বাপু৷ এ হল পুষ্পক রথ৷ ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর মাধবপুরের খবরাখবর নিতে এসেছেন৷ সবাই উলুধ্বনি দে৷' গাঁয়ের মেয়েরা উলু দিতে লাগল৷
ধীরে-সুস্থে মাটির প্রায় কাছাকাছি নেমে এল বেলুন৷ দড়ির মই বেয়ে নেমে এলেন গগন সেন, বরেন দত্ত ও গজা তান্ত্রিক৷ গগন সেনের দিকে এগিয়ে গেল ফণী তফাদার ও নবীন৷ নবীন বলল, 'আপনিই তো বিজ্ঞানী গগন সেন৷ চিন্তা নেই৷ ইন্দ্রজিৎ নিরাপদে আছে৷'
গগন সেন ব্যস্ত হয়ে বললেন, 'কোথায়? খোকা কোথায়?'
'দেখবেন কী করে, সে যে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে!'
'সে আমি জানি৷ কোথায় সে?'
হঠাৎ মাঠের মাঝখান থেকে একটা অদৃশ্য কন্ঠস্বর ভেসে এল, 'বাবা! এই যে আমি৷'
গগন সেন প্রচণ্ড উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠলেন, 'খোকা, কোথায় তুই? শিগগির আমার সামনে এসে দাঁড়া৷'
অদৃশ্য কন্ঠস্বর আবার জবাব দিল, 'এই যে আমি এসে গিয়েছি, বাবা৷ তোমার ইনফিনিটি রিমোটটা হঠাৎ অ্যাক্টিভেটেড হয়ে যাওয়ায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছি৷ অনেক চেষ্টা করেছি৷ কিছুতেই দৃশ্যমান হতে পারছি না৷'
গগন সেন রিমোটের মতো একটা যন্ত্র হাতে নিয়ে অদৃশ্য কন্ঠস্বরের দিকে তাক করে সুইচ টিপলেন৷ তারপরে যা ঘটল, সবাই দেখে হাঁ হয়ে গেল৷ ফুটে উঠতে লাগল একটা মানুষের অবয়ব৷ প্রথমে আবছা আভাস৷ তারপরে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠল ইন্দ্রজিৎ৷
লোকে দেখল মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে আঠেরো-উনিশ বছরের একটা ছেলে৷ আলাদিনের দৈত্যের মতো হঠাৎ যেন বাতাস ফুঁড়ে হাজির হল সে৷ তার গায়ে ঘিয়ে রঙের কোট ও কালো প্যান্ট৷ অপূর্ব সুন্দর চেহারা, ঠিক যেন কোনো রাজপুত্র৷ নবীন ছুটে গিয়ে ইন্দ্রজিৎকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'যাক, শেষ পর্যন্ত তোমার দেখা পেলাম ইন্দ্র৷'
এ-দৃশ্য দেখে ক্ষণিকের জন্য হতভম্ব হয়ে গেল লোকে৷ তারপরে হাততালির ঝড় বয়ে গেল৷ অনেকেই চেঁচিয়ে উঠল, 'দারুণ ম্যাজিক৷ ও মশায়, আরেকবার দেখান৷'
গগন সেন হেঁকে বললেন, 'বেশ, আরেকবার মন দিয়ে দেখুন৷' বরেন দত্তর দিকে রিমোট তাক করে বোতাম টিপলেন তিনি৷ অদৃশ্য হয়ে গেলেন বরেন দত্ত৷ খানিকবাদে তাঁকে আবার দৃশ্যমান করে দিলেন গগন সেন৷ আবার হাততালির ঝড় বয়ে গেল৷
ফণী তফাদারের হাত থেকে চোংটা কেড়ে নিয়ে বরেন দত্ত বললেন, 'এটা কোনো ভৌতিক বিষয় নয়৷ ম্যাজিক৷ সব ম্যাজিকের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে বিজ্ঞান৷ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া এবং দৃশ্যমান হয়ে ওঠা, এর পিছনেও রয়েছে বিশুদ্ধ বিজ্ঞান৷'
গগন সেন বললেন, 'বস্তুবিজ্ঞানের জটিল কিছু তত্ত্ব নিহিত আছে এর পিছনে৷ এসব জানার আগ্রহ যাদের রয়েছে, তারা আমার বাড়িতে আসবেন৷ বুঝিয়ে দেব৷'
অলৌকিক ঘটনা, ভৌতিক রহস্য মানুষ পছন্দ করে৷ এসব নিয়ে কল্পনায় বুঁদ হয়ে থাকতে ভালোবাসে৷ সবাই যখন বুঝল যাত্রার মঞ্চ থেকে ঘটোৎকচের ভ্যানিশ হয়ে যাওয়াটা কোনো ভৌতিক বা অলৌকিক ঘটনা নয়, এর পিছনে রয়েছে বিজ্ঞান, তখন সবাই উৎসাহ হারিয়ে ঘরমুখো হতে লাগল৷ ভিড়টা হালকা হয়ে গেল৷ মাঠে দাঁড়িয়ে রইল কতিপয় লোক৷
গগন সেন প্রশ্ন করলেন ছেলেকে, 'আমাকে কষ্ট দিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলি কেন, খোকা?'
ইন্দ্রজিৎ গোমড়া মুখ করে বলল, 'আমি বিজ্ঞান পড়ব না৷ ওসব আমার ভালো লাগে না৷'
'কিন্তু তোকে যে বিজ্ঞান পড়তেই হবে৷ বিজ্ঞান ছাড়া এই পৃথিবী চলে?'
'না, পড়ব না৷ আমি আবার পালাব বাড়ি থেকে৷'
গগন সেন মুচকি হেসে বললেন, 'দিল্লিতে যাবি না?'
ইন্দ্রজিৎ অবাক হয়ে বলল, 'দিল্লি!'
'তোর নামে যে চিঠি এসেছে বাড়িতে৷'
ইন্দ্রজিৎ উৎসাহিত হয়ে বলল, 'কী চিঠি?'
'আমাকে না বলে তুই চুপিচুপি পরীক্ষা দিয়েছিলি ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায়? ওরা তোকে সিলেক্ট করেছে৷'
'সত্যি বলছ?' খুশির ঝিলিক খেলে গেল ইন্দ্রজিতের গলায়৷
'চিঠিটা আমি সঙ্গে নিয়ে এসেছি৷'
ইন্দ্রজিৎ হতাশ গলায় বলল, 'তাতে কী হবে? নাটক নিয়ে পড়া আমার হবে না৷ তুমি যে বলছ, বিজ্ঞান নিয়েই পড়তে হবে৷'
'ওরে বোকা, থিয়েটার কি বিজ্ঞান নয়? শব্দ, আলো, বাচন-শৈলী, দেহ-সঞ্চালন, ভরত মুনির নাট্যশাস্ত্র এসব কি বিজ্ঞান নয়? গিরিশ ঘোষ, শিশির ভাদুড়ি এঁরা কি কারও থেকে কম বড়ো বিজ্ঞানী ছিলেন?'
ফণী তফাদার বলল, 'সাধু! সাধু! আহা, কী বললেন মশায়! এমন করে কেউ ভাবেনি আগে৷'
'আপনি কে?'
'আমি একজন নগণ্য মানুষ৷ গাঁয়ে যাত্রায় অভিনয় করি৷ যাত্রা পরিচালনা করি৷ নাম ফণী তফাদার৷'
''কুরুক্ষেত্রে ঘটোৎকচ' কি আপনার সৃষ্টি?'
'আপনি পড়েছেন?'
সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে গগন সেন বললেন, 'বিজ্ঞানী হলে যাত্রাপালা পড়া যাবে না, এমন কি কোনো কথা আছে? পালাটা মন্দ লেখেননি!'
'ইন্দ্রজিতের অভিনয় আমি দেখেছি৷ ও একজন অসামান্য অভিনেতা৷'
'তাহলে আপনিই বলুন থিয়েটার-বিজ্ঞানী হওয়াটা কি ওর উচিত নয়?'
ইন্দ্রজিৎ আনন্দে ছুটে গিয়ে আবেগে জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে৷ গগন সেন বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরলেন ছেলেকে৷
বেলুনে চড়ার সময় ইন্দ্রজিৎ বলল, 'নবীনদা, ফণীদা, দিল্লি থেকে ফিরে আমি আবার মাধবপুরে আসব৷ তোমাদের সঙ্গে দেখা করে যাব৷'
গগন সেন ও ইন্দ্রজিতকে নিয়ে বেলুনটা উড়ে গেল আকাশে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই বেলুনযান অদৃশ্য হয়ে গেল মাধবপুর আকাশ থেকে৷

এই কাহিনি শেষ করার আগে আরও কয়েকটা কথা বলতে হয়৷ কয়েকদিন পরে নবীনকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন পুলিশের একজন বড়োকর্তা৷ বললেন, 'শুনেছি, মাধবপুরের দুটো দাগি তোলাবাজকে তুমি শায়েস্তা করেছ৷ তোমার মতো ডাকাবুকো ছেলের পুলিশে খুব প্রয়োজন৷ পুলিশে চাকরি করবে?'
কয়েকমাস বাদে নবীন সত্যিই চাকরি পেয়ে গেল পুলিশে৷ সে এখন মাধবপুর থানার কনস্টেবল৷ পুলিশে চাকরি করতে হবে বলে দৌড়ঝাঁপ করে শরীরটাকে ছিপছিপে করে ফেলেছে নবীন৷ তাকে দেখলে আর চেনাই যায় না৷ গাঁয়ের লোকে নবীনকে এখন নবীনবাবু বলে ডাকে৷ চালকুমড়ো, কুমড়োপটাশ, জড়ভরত, হাবাগঙ্গারাম, মাথামোটা-এই বিশেষণগুলো নবীনকে আর শুনতে হয় না৷
আরও একটা বিষয় আছে৷ থানার বড়োবাবুর উৎসাহে নবীন নতুন করে লেখাপড়া শুরু করেছে৷ পড়ায় খুব মন হয়েছে তার৷ দেখেশুনে মনে হচ্ছে এ-জন্মেই সে মা সরস্বতীর ঘুম ভাঙিয়ে ছাড়বে, পরজন্মের জন্য আর অপেক্ষা করতে হবে না৷
শেষ কথা৷ অদৃশ্য হওয়ার কৌশল কেউ যদি জানতে চাও, মোহনপুরে গিয়ে গগন সেনের সঙ্গে দেখা করে জেনে নিতে পারো৷ আমার এ-বিষয়ে তেমন কৌতূহল নেই বলে আমি জানার চেষ্টা করিনি৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন