ব্রাহ্মণ ভূত

সমূদ্র পাল

অ নেক কাল আগের কথা। সেকালে এক বামুন ছিল, কিন্তু সে কুলীন নয় বলে তার আর কিছুতেই বিয়ে হচ্ছিলো না। কি আর করে, বড় লোকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সে বিয়ের জন্যে টাকা ভিক্ষে করে বেড়াতে লাগলো। বিয়ের জন্যে কম টাকার দরকার ছিলো না; বিয়ের জন্যে যতো না লাগতো কনের মা-বাপকে দিতে হতো তার চেয়েও বেশি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে খোশামোদ করে অবশেষে তার টাকাটা সংগ্রহ হলো এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার বিয়েও হয়ে গেল। বিয়ে করে বামুন বৌ নিয়ে এসে মায়ের কাছে দিল। মা খুউব খুশি হলো।

এর কিছুদিন বাদে সে মাকে বললো–মা তোমাকে আর বৌকে খাওয়াবার পয়সা আমার নেই। কাজেই আমি বিদেশ চললাম, কিছু টাকাকড়ি রোজগার না করলেই নয়। হয়তো অনেক বছর লাগবে, কারণ বেশ কিছু হাতে নিয়ে তবেই ফিরবো। এখন আমার কাছে যা কিছু আছে তা তোমাকে দিয়ে গেলাম। তাই দিয়ে যেমন করে পারো চালিয়ে নিও, আর আমার বৌটাকে দেখো।

এই বলে মাকে প্রণাম করে তাঁর আশীর্ব্বাদ নিয়ে বামুন রওনা হয়ে গেল।

সেইদিন সন্ধ্যাবেলাতেই ঠিক ঐ বামুনের মতো চেহারা করে এক ভূত এসে ওদের বাড়িতে হাজির হলো। নোতুন বৌ তাকে দেখে তার স্বামী মনে করে বললো – সে কি ! এতো তাড়াতাড়ি ফিরে এলে যে? বলে গেলে হয়তো কয়েক বছর লেগে যাবে। মত বদলে গেলো বুঝি ?

ভূত বললো—আজ দিনটা বড়ই ভালো, তাই বাড়ি ফিরে এলাম। তাছাড়া কিছু টাকাকড়িও পাওয়া গেছে।

বুড়ি মায়ের মনেও কোনো সন্দেহ জাগলো না। ভূত ঐ বাড়িতেই থেকে গেল। সেই-ই হলো বাড়ির কর্তা, বুড়ির ছেলে নোতুন বৌয়ের স্বামী। পাড়ার লোকেও কোনো তফাৎ দেখলো না, সেই বামুন আর এই ভূতটা হুবহু একরকম দেখতে।

কয়েক বছর কেটে গেল। বামুন এলো ফিরে! বাড়িতে এসে হুবহু তার নিজের মতো দেখতে আর একটা লোককে দেখে সে তো তাজ্জব বনে গেল।

ভূতটা বামুনকে দেখে বললো—তুমি কে গা? আমার বাড়িতে তোমার কি দরকার শুনি ?

বামুন বললো—এ তো বড় অদ্ভুত কথা রে বাবা! সবাই জানে এ আমার বাড়ি, আমার বৌ, আমার মা। আরে, কতো বছর ধরে আমি এখানে আছি। এখন হঠাৎ এসে তো আর বললেই হবে না যে এটা তোমার বাড়ি, তোমার বৌ, তোমার মা। বামুন, তোমার মাথার গোল হয়েছে।

এই বলে ভূত তো বামুনকে বাড়ি থেকে বের করে দিলো।

ব্যাপার দেখে বামুনের মুখে কথাটি আর জোগাল না। কি যে করবে সে ভেবেই পেলো না। শেষটা মনে হলো রাজার কাছে গিয়ে সব খুলে বলা যাক্ । রাজা দু'জনকে ডেকে পাঠালেন। দেখলেন, দু'জনেরই অবিকল একইরকম চেহারা। রাজাও হকচকিয়ে গেলেন ; ঝগড়ার কি সিদ্ধান্ত করবেন ভেবেই পেলেন না!

দিনের পর দিন বামুন রাজার সভায় গিয়ে হাজির হ'তো, তাঁর কাছে কাকুতি-মিনতি করতো,—আমার বাড়ি, আমার বৌ, আমার মাকে ফিরিয়ে দিন মহারাজ।

আর রোজই রাজা মন ঠিক করতে না পেরে ওকে বলতেন—কাল এসো।

বামুন চোখের জল ফেলে, কপাল চাপড়াতো আর বলতো—হায় হায় ! এ কি পাপের পৃথিবী গো! আমার বাড়ি থেকে আমাকে তাড়িয়ে দেয়! অন্য লোকে আমার বাড়ি, আমার বৌ, আমার মা–জোর করে নিয়ে নেয়। আর রাজাটাই বা কি! ন্যায় অন্যায় বিচার করতে জানে না ! !

এখন হয়েছে কি, সভা থেকে বেরিয়ে, শহরের বাইরে যাবার পথে একটা খোলা জায়গা পার হয়ে যেতে হতো, সেখানে কতোকগুলো রাখাল ছেলে খেলা করতো। মাঠে গোরু ছেড়ে দিয়ে, ওরা একটা বড় গাছের তলায় জড়ো হতো। ওরা রাজা রাজা খেলতো। একজন রাখালকে রাজা করা হতো। একজন হতো উজির, একজন কোটাল, বাকিরা হ'তো পেয়াদা।

একদিন রাখাল রাজা তার উজিরকে জিগ্যেস করলো—ঐ বামুনটা রোজ রোজ কাঁদে কেন? কাঁদে কেন তা জানো? উজির সে কথার কোনো উত্তর দিতে পারলো না। তখন রাখাল রাজা বামুনকে ধরে আনবার জন্যে পেয়াদা পাঠালো।

পেয়াদা গিয়ে সত্যিকার বামুনকে গিয়ে বললো—রাজা এখনি আপনাকে তলব দিয়েছেন।

বামুন বললো-কিসের জন্যে? এইমাত্র আমি রাজার কাছ থেকে আসছি। তিনি আমাকে কাল আসতে বলেছেন। আবার ডেকেছেন কেন ?

পেয়াদা বললো- আহা, ও রাজা নয়। আমাদের রাখাল রাজা আপনাকে ডেকেছেন।

বামুন বললো—রাখাল রাজা আবার কে?

পেয়াদা বললো— দেখবেন আসুন।

বামুন তার সঙ্গে রাখাল রাজার কাছে যেতেই, রাজা বললো- আপনি রোজ রোজ এখান দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে যান কেন?

তখন বামুন তাকে নিজের সমস্ত দুঃখের কথা বললো। তাই শুনে রাখাল রাজা বললো—আমি সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি। আপনার অধিকার আমি আপনাকে ফিরিয়ে দেবো। রাজাকে গিয়ে বলবেন, আমাকে যেন মামলা সাব্যস্ত করবার অনুমতি দেন।

বামুন তখন দেশের রাজার কাছে ফিরে গিয়ে তাঁকে অনুনয় করে বললো -রাখালরাজা তার মামলা সাব্যস্ত করতে চাইছে, তাকে যেন সেই অনুমতি দেওয়া হয়। এমনিতেই রাজা ঐ মামলার কিনারা করে উঠতে পারছিলেন না, কাজেই তিনি খুশি হয়েই অনুমতি দিলেন। মামলার সময় ঠিক হলো পরদিন সকালে।

রাখাল রাজা সত্যিই সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলো। পরদিন সকালে একটা সরু মুখ বোতল নিয়ে সে বিচারসভায় এলো। বামুন আর ভূত-ব্রাহ্মণ দুজনেই হাজির হলো। তারপর অনেক সাক্ষীর জবানী শোনা হলো, তর্ক বিতর্ক হলো, বক্তৃতা হলো। শেষে রাখাল রাজা বললো—যাক ঢের হয়েছে যথেষ্ট শুনেছি। এই যে বোতলটা দেখছেন, যে এই বোতলের ভিতরে ঢুকতে পারবে এই আদালতের সিদ্ধান্তে সেই-ই ঐ বাড়ি, বৌ ও মায়ের ন্যায্য অধিকারী প্রমাণিত হবে। এবার দেখা যাক্, আপনাদের মধ্যে কে এই বোতলে ঢুকতে পারেন।

এই কথা শোনামাত্র' ব্রাহ্মণ-ভূত তাড়াতাড়ি বললো—আমি পারবো। বলেই, সে সুড়ুৎ করে বোতলে ঢুকে পড়লো। আর সঙ্গে সঙ্গে রাখাল রাজা বোতলের মুখ ছিপি দিয়ে এঁটে দিল।

তারপর ?

তারপর, বোতলটি একটা গভীর নদীর জলে ফেলে দিলো। আর, বামুন ফিরে পেলো তার মা ও বৌকে এবং নিশ্চিন্তে সুখে স্বাচ্ছন্দে ঘরকন্যা করতে লাগলো।

ভবঘুরে ভূতের পাল্লায়

ভবতারণবাবু সেদিন বললেন—ভূতেরা সবই পারে মশাই।

—কি রকম ?

—কোনো এক জায়গায় থিতু হয়ে বসতে পারে। আবার যেখানে ইচ্ছে ঘুরেও বেড়াতে পারে।

—কি রকম?

-কোনো গাছে বা পোড়ো বাড়িতে আস্তানা গেড়ে থিতু হয়ে বসতে পারে আবার ভবঘুরে হয়ে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতেও পারে।

রামকানাইবাবু ভবতারণবাবুর কোনো কথাই বিশ্বাস করেন না। আড়ালে-আবডালে আমাদের কাছে ফিসফিসিয়ে বলেন— লোকটা মহাগুলবাজ যা বলেন তার সেন্ট পারসেন্টই গুল। আমাদের এই মজারু ক্লাব থেকে ভবতারণবাবুকে গুল সম্রাট আখ্যা দেওয়াই উচিত।

ভবতারণবাবু সেদিন লক্ষ্য করেননি যে, আসরে এক পাশে স্বয়ং রামকানাইবাবু বসেছিলেন ; তিনি অবশ্য নিজে তাস খেলছিলেন না। অপর দু'দলের ব্রীজ খেলা দেখছিলেন।

ভবতারণবাবুর ভবঘুরে ভূত সম্বন্ধে মন্তব্য খট্ করেই রামকানাইবাবুর কানে লাগলো অতএব উনি চট করেই ভবতারণবাবুর কাছে এসে জিগ্যেস করলেন—ভূত আবার ভবঘুরেভবঘুরে হয় নাকি মশাই ?

ভবতারণবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন –হয়, হয় বৈকি।

—আপনি কি কখনো ভবঘুরে ভূতের পাল্লায় পড়েছিলেন নাকি?

—আমি পড়তে যবো কোন্ দুঃখে?

—তবে?

—আমার মাসতুতো ভাইয়ের পিসতুতো মামা খুব নামকরা লেখক।

—অর্থাৎ লেখক হিসেবে তিনি বোধ হয় কোনো ভবঘুরে ভূতের গল্প লিখেছিলেন।

—না, মশাই না। ভবঘুরে ভূতের পাল্লায় তো পড়েন নি কখনো—তা হ'লেই বুঝতে পারতেন কতো ধানে কতো চাল !

—আপনার সেই মাসতুতো ভাইয়ের পিসতুতো মামা বোধ হয় ভবঘুরে ভূতের পাল্লায় পড়েছিলেন ?

—নিশ্চয়ই। ঐ ভবঘুরে ভূতের পাল্লায় পড়েই তাঁর জীবনটা বরবাদ হয়ে গেল মশাই।

—কি রকম?

—ওর যা শিক্ষা দীক্ষা বা যোগ্যতা তাতে উনি বিয়ে-থা করে বড়ো চাকরি করে আরামে আয়াসে কাল কাটাতে পারতেন, কিন্তু কি কুক্ষণে যে এম.এ. পরীক্ষা দেওয়ার পর বাইরে বেড়াতে গিয়েছিলেন—আর বাইরে বেড়াতে গিয়েই পড়লেন তো পড়লেন একেবারে এক ভবঘুরে ভূতের পাল্লায় ।

—তারপর?

—তারপর আর কি, ঐ ভবঘুরে ভূতের পাল্লায় পড়ে বিয়ে-থা, চাকরি-বাকরি সংসার ধর্ম সব মাথায় উঠলো মশাই।

ঘন্টুবাবু অবাক হয়ে বললেন—বলেন কী!

—তবে আর বলছি কি, সেই থেকে কম্বল-সম্বল করে ঘুরে বেড়াতেই লাগলেন তিনি, আজ এখানে কাল ওখানে।

—এসব কথা আপনি কার কাছে শুনলেন ?

—ঐ ভদ্রলোকেরই মায়ের কাছে, ভদ্রমহিলা আমার কাছে দুঃখু করে সব কথাই বলেছিলেন।

—এখনও উনি সেই ভবঘুরে ভূতের খপ্পর থেকে ছাড়া পাননি ?

—পেয়েছেন, তবে এই ষাট বছর বয়সে, এখন আর জীবনের কি মূল্য রইলো? দু'চারখানা বই লিখে নাম করেছেন মাত্তর।

—তা যা বলেছেন ?

রামকানাইবাবু এবার আসরের মুখ্য ভূমিকা নিয়ে ভবতারণবাবুকে বললেন—শুনুন মশাই, ভূত-টুত বলে। কিস্যু নেই। তারপরও আবার গুল ঝাড়ছেন ভবঘুরে ভূত এবং সেই ভবঘুরে ভূতকে আবার চাপালেন ভাইয়ের পিসতুতো দাদার কাঁধে। বলি বয়েস তো হ’লো—এভাবে আর গুল ঝেড়ে ঝেড়ে কতো দূর এগোবেন মশাই ?

গোবর্ধনবাবু এতোক্ষণ ভেজা বেড়ালের মতো ভবতারণবাবুর কথাগুলো চুপচাপ শুনছিলেন, তিনিও এবার রামকানাইবাবুর কথার জের টেনে বললেন—বয়েস তো তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে, গুল মারার একটা লিমিট রাখুন মশাই, সব জায়গায় খাপ খোলা কি ঠিক।

এমনকি ভূষিমালের কারবারী তোতারামবাবু পর্যন্ত ভবতারণবাবুকে এক হাত নিলেন —আমি মশাই মুখ্যুসুখ্যু মানুষ—আমাকে গুল দিয়ে পার পেয়ে গেছেন, তাই বলে এখানে গুল মারতে গেলেন কোন্ সাহসে? বিশেষ করে রামকানাইবাবু যেখানে উপস্থিত রয়েছেন, সেখানে এসে গুল মারা আপনার ঠিক হয়নি মোটেই।

এতো লোকের আক্রমণে ভবতারণবাবু প্রথম দিকে কাবু হলেও—শেষের দিকে তড়াক্ করেই লাফিয়ে উঠে বললেন—আমি প্রমাণ করেই ছাড়বো, সবার মুখ ভোঁতা করে ছাড়বো, সেই ভ্রমণ-সাহিত্যের লেখককে আমি এই রোববারই কোলকাতা থেকে গাড়ি করে নিয়ে আসবো এবং আমি প্রমাণ করে ছাড়বো—আমার কথা বর্ণে বর্ণে সত্যি— আই টেক ইট এ চ্যালেঞ্জ।

আপনারা রোববার বিকেল চারটে থেকে ছ'টার মধ্যে সকলেই এই মজারু ক্লাবে থাকবেন। দেখবো কার পাণ্ডিত্য কতো দূর!

ভবতারণবাবু সেদিন আর ব্রীজ খেললেন না। পাম্পসু পায়ে গলিয়ে গটমট করে চলে গেলেন ?

মজারু ক্লাবের সেক্রেটারী বিপদতারণ চৌধুরী মশাই বললেন—সবাই মিলে এভাবে আক্রমণ করে ভবতারণবাবুকে উত্তেজিত করা মোটেই ঠিক হয়নি। একে ব্লাড প্রেসারের রুগী, শেষে না হিতে বিপরীত হয়।

আক্রমণটা যে মাত্রা ছাড়িয়ে গেছিল—একথা সবাই স্বীকার করলো। ভবতারণবাবু না হয় একটু গুল-গপ্পো করেই থাকেন—তাই বলে তাঁর ওপর এভাবে চাপ সৃষ্টি করাটা মোটেও ঠিক হয়নি। ঘটনাটা বুধবার ঘটলেও—শনিবার পর্যন্ত ভবতারণবাবুকে তাসের আসরে দেখা গেল না।

রোববার দিন মজারু ক্লাবের প্রায় সকল সদস্যই উপস্থিত।

ঠিক কাঁটায় কাঁটায় চারটের সময় মজারু ক্লাবের সামনে একটা ছাই রঙের অ্যামবাসাডার গাড়ি এসে দাঁড়ালো।

গাড়ি থেকে নামলেন ভবতারণবাবু এবং একালের নামকরা ভ্রমণ কাহিনী লিখিয়ে দিব্যেন্দু সান্যাল। ক্লাবের সদস্যরা কেউ ভাবেনি যে, ব্যাপারটা এতোদূর গড়াবে। এমন কি রামকানাইবাবুও ভাবেন নি যে, ভবতারণবাবু সত্যি সত্যিই দিব্যেন্দু সান্যালকে আমাদের মজারু ক্লাবে নিয়ে আসবেন।

মজারু ক্লাব কোনো রেজিস্টার্ড ক্লাব নয়। বলতে গেলে কোনো ক্লাবের আওতাতেই আসে না। একদল রিটায়ার্ড আধবুড়োর সময় কাটে না, তা সময় কাটানোর জন্যেই হিরণ্যাক্ষবাবুর বৈঠকখানাটি দখল করে তাস খেলিয়েদের নিয়ে মজারু ক্লাবের পত্তন। চা-সিঙাড়া আর তাস খেলার জন্যে কিছুতো রোজ খরচ হয়েই থাকে—এর জন্যেই মাসিক পাঁচ টাকা করে চাঁদার ব্যবস্থা।

চাঁদা ঠিকই উঠে যায়, মাঝে মধ্যে ভূষিমালের কারবারী তোতারাম দুই-একশো টাকা দেন—তাই অন্য কেউ চাঁদা দিলো বা না দিলো এ নিয়ে খুব একটা ভাবতে হয়ও না। এমন একটি ক্লাবে যে ভবতারণবাবু নামকরা একজন সাহিত্যিককে সত্যি সত্যিই নিয়ে আসবেন,—একথা ভাবা যায় নি।

অতএব সকল সদস্যই অভ্যর্থনা করে সান্যাল মশাইকে নিয়ে এলেন। তাস খেলাও বন্ধ রাখা হলো, মাননীয় অতিথির আগমনের কারণেই।

সাময়িকভাবে ভবতারণবাবু গোঁফে তা দিয়ে টেকো রামকানাইবাবুকে ফিসফিসিয়ে বললেন—খুবতো সেদিন ঠাট্টা করেছিলেন মশাই, এবার ওনার মুখেই সত্যিকারের ভবঘুরে ভূতের কথা শুনতে পাবেন। আমি যে গুল মারিনা তারও প্রমাণ পাবেন।

তোতারামবাবুই নিজে গাড়ি হাঁকিয়ে বাজারের সেরা মিষ্টির দোকান থেকে নিমকি, সিঙ্গারা, খাস্তা কচুরী ও নানারকমের মিষ্টি নিয়ে এলেন—মাননীয় অতিথির জন্যে। মজারু ক্লাবের সেক্রেটারী বিপদতারণ চৌধুরী, আর প্রেসিডেন্ট হলেন ভূষিমালের কারবারী শ্রী তোতারাম মন্ডলমশাই।

দিব্যেন্দু সান্যাল মশাই বললেন —এতো দূরে আপনাদের এই ক্লাবে আমি আসতুম না, কিন্তু ভবতারণবাবু ভীষণ অপমানিত বোধ করেছেন। ভবতারণবাবুর সম্মান বজায় রাখার জন্যেই আমাকে আপনাদের এখানে হাজির হতে হলো। কারণ আপনারা অনেকেই ভূতের অস্তিত্ব স্বীকারই করেন না, আর ভবঘুরে ভূতের কথা শুনে অনেকেই ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন—এসব আমার ভবতারণবাবুর মুখেই শোনা ।

রামকানাইবাবু চুপ করে থাকার লোক নন, এতোক্ষণ যে কি করে চুপ্ করেছিলেন কে জানে? এবার তিনিই মুখ খুললেন—স্যার, আপনি কি নিজে ভবঘুরে ভূতের পাল্লায় পড়েছিলেন ?

—হ্যাঁ।

—কিন্তু আপনার লেখা কোনো ভ্রমণ কাহিনীতেই তো সে কথা কোথাও উল্লেখ নেই ।

—শুনুন, অসম্ভব কথা সব সময় সকলের কাছে বলতে নেই। আমি দেখেছি শিলা জলে ভাসছে—সে কথা যদি কাউকে দুম্ করে বুলি, কেউ কি বিশ্বাস করবে? আজগুবি বা অসম্ভব বলে সবাই উড়িয়ে দেবে। তাই বইতে এসব কথা লিখিনি। ভবতারণবাবু অপমানিত না হলে হয়তো বা একথা কাউকেই বলতাম না। কিন্তু আজ বলছি—আমি শুধু ভবঘুরে ভূতের পাল্লাতেই পড়িনি—দীর্ঘদিন সেই ভবঘুরে ভূতের সঙ্গে কাটিয়েছি।

তোতারামবাবু বললেন—আমরা সেই কথাই আপনার মুখে শুনতে চাই, স্যার।

—বলবো বলেই আজ আমি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।

এম.এ. পরীক্ষা দিয়ে ভাবলাম, একবার পিসির বাড়ি বোম্বে থেকে ঘুরে আসি, তাই টিকিট কেটেই আমার বোম্বে মেলে রওনা হওয়া। সেকেন্ড ক্লাশেই যাচ্ছিলাম। একটা ছোটো সুটকেশ, সতরঞ্চি আর কম্বল নিয়ে।

আমি চিরকালই ঘরকুনো, এর আগে কখনো কোলকাতার বাইরে পা বাড়াইনি— হাওড়া বা শেয়ালদা থেকে কোনো ট্রেনেই চাপি নি ।

তাছাড়া আমি বড্ড ঘুমকাতুরেও ছিলাম, যেখানে-সেখানে যখন-তখন ঘুমিয়ে পড়তে পারতুম।

অতএব হাওড়া থেকে ট্রেনে চেপেই ঘুমিয়ে পড়লুম। ট্রেনের নড়া চড়ায় অনেকের নাকি ঘুম হয় না——আমার কিন্তু ট্রেনে চেপে এবং ট্রেনের দোলানির কারণে ঘুম আরও বেশি গাঢ় হয়েছিল।

কিন্তু পরদিন সকালে উঠে দেখি আমার কিস্যু নেই,—টিকিট নেই, মানিব্যাগ নেই— এমন কি সুটকেশটি নেই। সহযাত্রী কেউ কোন স্টেশনে নেমে গেছে—আমাকে বিলকুল শূন্য করেই নেমে গেছে।

পরণে ছিলো ধুতি গায়ে ফতুয়া—আর শুয়েছিলাম কম্বলের ওপর, ওরা দয়া করে কম্বলখানা নিয়ে যায়নি।

বলতে গেলে আমি একেবারে নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে গেলাম, হাতের ঘড়িটাও নিয়ে গেছে।

নাগপুর স্টেশনে নেমে রিপোর্টও করলুম না, ভাবলাম এভাবে বোম্বে পৌঁছোতে পারলে হয়, তারপর হেঁটে হেঁটেই না হয় পিসির বাড়ি চলে যাবো।

কিন্তু তার আগেই 'বদনারে' বলে একটা স্টেশনে এক চেকারের হাতে ধরা পড়লাম। যারা হাওড়া থেকে আমার সঙ্গে উঠেছিলো তারা সকলেই নাগপুরে নেমে গেছে, নাগপুর থেকে আবার নোতুন যাত্রী উঠেছে—তাদের ধারণা আমি কম্বল-সম্বল করেই কোলকাতা থেকে রওনা হয়েছি।

আমার দুর্ভাগ্য বলতে হবে—কোলকাতা থেকে অনেকেই সরাসরিই বোম্বে যায়, কিন্তু আমি যে কামরায় উঠেছিলুম – সে কামরায় হাওড়া থেকে যে ক'জন উঠেছিলেন তাঁদের শেষটি নাগপুরেই নেমে গেছেন, যাওয়ার সময় অবশ্য দয়াপরবশ হয়ে বলেছেন- ভাইসাব, আপ মেরা নাগপুর কা কোঠিমে চলিয়ে। বিশ্রাম করে—আবার কোলকাতা কিংবা বোম্বাই চলে যাবেন—এ অবস্থায় গেলে আপনার অনেক তকলিফ হবে। কিন্তু ভালো কথা বা সদুপদেশ শোনার মতো বান্দা আমি ছিলাম না তখন, ভাবলুম সত্যি কথা বললে সবাই মেনে নেবে এবং প্রয়োজনবোধে সাহায্য করবে—অতএব বোম্বে পর্যন্তই যাওয়া যাক। তারপর পিসির বাড়িতে পৌঁছুলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

কিন্তু নাগপুর থেকে যে সব নোতুন যাত্রী উঠলেন তাঁরা আমার চুরি যাওয়ার কথা তো বিশ্বাসই করলেন না, বরং সন্দেহজনক চোখে আমার দিকে তাকাতে লাগলেন। যেন আমি বিনা টিকিটের এক অবাঞ্ছিত ব্যক্তি।

তারপর ‘বদনারে’ স্টেশনের আগে এক কাঠখোট্টা কর্তব্যপরায়ণ পাঞ্জাবী চেকারের হাতে ধরা পড়লাম। আমার তো আর সাক্ষ্য প্রমাণ নেই, কেই বা আমার কথা বিশ্বাস করবে—অতএব চেকার সাহেব আমাকে 'বদনারে' রেলস্টেশনে নামিয়ে দিয়ে রেলপুলিশের এক সিপাইকে বললে—ইস্কা ব্যবস্থা কীজিয়ে, বিনা টিকিট কা প্যাসেঞ্জার।

ট্রেন চলে গেল, অন্ততঃ দশ ঘন্টার মধ্যে আর কোনো ট্রেন নেই। রেলপুলিশের অফিসার ভদ্রলোক বললেন—বোলো, তুম্হারা পাস্ এক পয়সা ভী নেহী !

আমি বল্‌লুম—বিশ্বাস কী জিয়ে সব কুছ লুট লিয়া—সিরিফ এই কম্বল হ্যায় । কপর্দকহীন লোককে নিয়ে ঝামেলা করার কোনো মানে হয় না। পাথর টিপ্‌লে যেমন জল বেরোয় না, আমাকে সার্চ করে যখন কানাকড়িও পাওয়া গেল না, তখন সে বললো দশ ঘন্টা বাদ কোলকাত্তা যানেওয়ালা ট্রেন আয়েগা, উস্‌মে চড়যানা।

ওদিকে আমার পেটে তখন ছুঁচোয় ডন মারছে, তবু পেটভরে প্ল্যাটফর্মের কল জল খেয়ে নিলাম। আর প্ল্যাটফর্মের একটা ফাঁকা বেঞ্চিতেই কম্বল থেকে পেতে শুয়ে পড়লাম ।

পাশের বেঞ্চিতেই বসেছিলেন জায়গীরদার বীরবিক্রম সিং। তিনিই আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন। সব কথা শুনলেন। তারপর বললেন— কোই বাত নেহী। আমি ভারত ভ্রমণে বেরিয়েছি। আমার কোনো সঙ্গী নেই। ভগবান তোমাকে জুটিয়ে দিয়েছেন, তুমি আমার সঙ্গে আমি যেখানে যাই যাবে, তারপর আমি আমার জায়গীর নিহালগড়ে ফিরে যাবো, তুমিও কোলকাত্তা ওয়াপস চলে যাবে।

তিনি আমার জামাকাপড়, টুথব্রাশ, টুথপেস্ট বিছানা, স্যুটকেশ, সব কিছুই কিনে দিলেন। খুব মজার লোক। ফার্স্ট ক্লাশেই ঘোরাঘুরি করেন, টাকাপয়সার কোনো অভাব নেই, সেই থেকে তাঁর সঙ্গেই ঘুরতে লাগলাম আমি। বাড়ির কথা, মায়ের কথা, সব কিছু ভুলে গেলাম । কখনও কাশ্মীর, কখনো কন্যাকুমারিকা, কখনও ব্যাঙ্গালোর, কখনও কেদার বদরী, কখনও চলে গেলাম দ্বারকা, কখনও গির অরণ্যে। কখনও হাঁটা পথে, কখনো হাতীতে চড়ে।

জায়গীরদার বীরবিক্রম সিং সর্বদাই হাসিখুশি, দিল-দরিয়া। ঘুরতে ঘুরতে আমার একবার অসুখ হলো—উনি নিজের হাতে আমায় সেবা করে সুস্থ করে তুললেন। ভারতের সব প্রদেশের প্রায় সব দেখার জায়গাই মোটামুটি ঘুরে বেড়ালাম।

মনে মনে ভাবলাম, এভাবে রাজকীয় ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়াবার জন্যে প্রচুর অর্থ দরকার। এতো টাকা উনি কোথায়ই বা পান। বড় হোটেলেই আমায় নিয়ে ওঠেন—ফাইভ স্টার হোটেলে জায়গা পেলে আগে ফাইভ স্টার হোটেলেই ওঠেন—নতুবা ফোর স্টার বা থ্রি স্টার-এর নিচে নামেন না ।

দু'জন লোক ‘বদনারে' স্টেশনের বাইরে ঘোড়া নিয়ে অপেক্ষা করছিল। জায়গীরদার সাহেবের সব ব্যবস্থাই পাকা। কোথাও কোনা খুঁত নেই।

উনি কালো ঘোড়ায় চেপে বললেন এখান থেকে ছত্রিশ মাইল দূরে আমার রূপমহল। আমি যদি ঘোড়া ছুটিয়ে আগে বেরিয়ে যাই, তবে তুমি পথের যে কোনো লোককে জিগ্যেস করবে সেই তোমাকে জায়গীরদার বীরবিক্রম সিং-এর রূপমহল দেখিয়ে দেবে। আমি এমনিতে অকম্মার ঢেঁকি। কাজের মধ্যে একটা কাজ শিখেছিলাম——সেটা হলো ঘোড়ায় চড়া।

পথ কাঁচা-ধূলি-ধূসর। জায়গীরদার সাহেব, ঘোড়া হাঁকিয়ে চললেন আগে আগে, আমি তাঁর পেছনে পেছনে।

আমি মনে মনে ভাবছি—আপনি এগিয়ে গেলে, আমি ঠিক ধরে ফেলবো, ঘোড়সওয়ার, হিসাবে আমিও কমতি যাই না।

কিন্তু একটা বাঁকের মুখে জায়গীরদার সাহেবের ঘোড়া অদৃশ্য হয়ে গেল—আমি আর তাঁর নাগাল পেলাম না। তবু পথের লোককে জিগ্যেস করে সন্ধ্যের ঠিক আগেই জায়গীরদার সাহেবের রূপমহলে পৌঁছে গেলাম ।

সত্যি রূপমহলই বটে। সামনে ফোয়ারা, আলোয় আলোয় কখনও জলের রং লাল, নীল বা সবুজ হচ্ছে, শ্বেতপাথর দিয়ে গড়া এক সুন্দর প্রাসাদ।

ভেতরে ও বাইরে আলোর মালা। প্রাসাদের দরোজা দিয়ে ঢুকে একজনকে বললাম জায়গীরদারের সঙ্গে আসছি— 'বদনারে' স্টেশন থেকে উনি কালো ঘোড়ায় চেপে এলেন, আমি সাদা ঘোড়ায় ।

-বলেন কী?

—ঠিক বলছি।

-উনি তো দশ বছর আগে ভারত সফরে বেরুবেন বলে ঘোড়া নিয়ে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু 'বদনারে' স্টেশনে পৌঁছোনোর আগেই একটা লরীর সঙ্গে মুখোমুখি দুর্ঘটনায় উনি মারা যান।

-হতে পারে না। আমি তো কয়েক বছর ধরে সারাভারত ওঁর সঙ্গেই ঘুরে বেড়িয়েছি। উনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন না। দূরের একটা বড় অয়েল পেন্টিং দেখিয়ে বললেন--এ হী তো হামার পিতাজীর তসবীর।

আমি সেই অয়েল পেন্টিং-এর দিকে তাকালাম সেই একই চেহারা, বীরবিক্রম সিং জী যেন আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছেন ।

চিৎকার চেচামেচি শুনে স্বয়ং বিধবা রানী সাহেবা অর্থাৎ বীরবিক্রম সিং-এর স্ত্রী নিচে নেমে এলেন । আমি তাঁদের আমার হাতের হীরের আংটিটা দেখিয়ে বললাম—এটাও কি তবে মিথ্যে ? এই আংটিটা উনি ‘বদনারে’ স্টেশনে আমার স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে দিয়েছিলেন। দেখুন ঐ তসবীরের হাতের আঁংটির সঙ্গে হুবহু মিল।

সব কথা শুনে রানীসাহেবা থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে বললেন—উন্কা অংগুঠি অব্ তক নেহী মিলা!

আমিও জ্ঞান হারিয়ে ফেলি ওখানে। তারপর কিছুটা সুস্থ হলে ওঁরাই আমাকে কোলকাতায় পাঠিয়ে দেন, কিন্তু ওঁরা হাতের আংটিটা খুলে নেন নি। বলতে গেলে প্রায় দশ বছর পরেই আমি কোলকাতায় ফিরে আসি।

আমার মা তো আমায় দেখে অবাক! প্রথমে মা হয়েও আমায় চিনতে পারেন নি। খবরের কাগজে ও রেডিও টিভিতে বহু বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন—কিন্তু বিগত দশবছরে কোনো জবাবই পাননি।

আপনারা এবার সবাই বলুন —বুদ্ধি দিয়ে এ ঘটনার কি ব্যাখ্যা করবেন। সকলেই চুপ, কারো মুখে কোনো কথা নেই, কেবল রামকানাইবাবু কিছুক্ষণ পরে জিজ্ঞাসা করলেন—আচ্ছা, স্যার, সেই আংটিটা এখন কোথায় ?

——ওটা এখন হাতে পরে ঘুরতে ভরসা পাইনা, হীরেটার দামই হবে—দু’তিন লাখ টাকা। ব্যাঙ্কের ভল্টে রেখেছি—কেউ যদি দেখতে চান অবশ্যই দেখাতে পারি। রামকানাইবাবু মাথা নিচু করে বসে রইলেন। মুখ আর তার কোনো কথা নেই।

অধ্যায় ১ / ৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%