অভিজিৎ পাল
দ্বিতীয় ভাগ – ‘কথামৃত’ আড়ালে-অন্তরালে
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সঙ্গে বাঙালির নবসংস্কৃত ধর্মভাবনা একাত্ম হতে শুরু হওয়ার পর থেকে বাঙালির একটি বড় অংশের মানুষের কাছে মাস্টার মশাই শ্রীম-কথিত ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’ প্রায় ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’র সমান মর্যাদা পেতে শুরু করে। ‘কথামৃত’ শ্রীরামকৃষ্ণের সমগ্র মহাজীবনের ইতিবৃত্ত নয়, ‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের শেষ সাড়ে চার বছরের মধ্যে মাত্র ১৮৬ দিনের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন শ্রীম। মাস্টার মশাই শ্রীম তাঁর কর্মব্যস্ত জীবনে সঠিক অবসর ও সুযোগ পাওয়া মাত্রই গিয়ে হাজির হতেন শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে এবং শ্রীরামকৃষ্ণের অমৃতকথা স্মৃতিতে আবদ্ধ করে ফিরে আসতেন নিজের গৃহাশ্রমে। ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’য় মহাকবি মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসদেব যেমন শ্রীকৃষ্ণের অমৃতকথা নিষ্পৃহভাবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন শ্রীমও তেমনই নিষ্পৃহভাবে মূলত আত্মপাঠের জন্য তাঁর ডায়েরিতে দিনের পর দিন শ্রীরামকৃষ্ণের কথা সংগ্রহ করেছিলেন। শ্রীম কখনই চাননি ‘কথামৃত’ সর্বজনীন পাঠ্য হয়ে উঠুক। প্রথমপর্বে শুধুমাত্র নিজের জন্য তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের মুখের কথাগুলিকে সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের তিরোধানের বহুকাল পর মূলত বিশ্বমানব শ্রীরামকৃষ্ণকে সর্বজনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ থেকেই তিনি তাঁর ডায়েরিগুলির বয়ানের সঙ্গে কিছু সম্পাদন, সংযোজন, পরিমার্জন করে ‘কথামৃত’ প্রকাশ করেন। বলাবাহুল্য এই ব্যক্তিগত গোপন সংগ্রহ অদূর ভবিষ্যতে শ্রীরামকৃষ্ণের চিন্তাধারার এমন প্রামাণিক দলিল হয়ে উঠবে তিনি সম্ভবত তা কল্পনাও করেননি। এখনও বহু মানুষ বিশেষত শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মীয় ভাবধারায় স্নাত হওয়ার জন্য ‘কথামৃত’-পাঠচর্চা করেন। মাস্টার মশাই শ্রীম যখন তাঁর ডায়েরি থেকে সম্পাদনা করে ‘কথামৃত’র গ্রন্থরূপ দিয়েছিলেন, তখন তাঁর উদ্দেশ্যও কমবেশি একই ছিল। ‘কথামৃত’র সূচনাতেই তিনি ‘শ্রীমদ্ভাগবত’-এর গোপীগীতা থেকে উল্লেখ করেছেন:
তব কথামৃতং তপ্তজীবনং কবিভিরীড়িতং কল্মষাপহম্।
শ্রবণমঙ্গলং শ্রীমদাততং ভূবি গৃণন্তি যে ভূরিদা জনাঃ।।১
অর্থাৎ, তোমার অমৃতরূপ কথা ত্রিতাপদগ্ধ জনগণের জীবনস্বরূপ, সাধু-মুনিগণের দ্বারা কীর্তিত, সমস্ত পাপের বিনাশকারী এবং শ্রবণমাত্রই সেই কথা মঙ্গলপ্রদ ও সকল প্রকার সম্পদের আকর। এই কথা যিনি বিস্তারিত কীর্তন করেন জগতে তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। এইদিক থেকে ‘কথামৃত’ বাংলার ঐতিহ্যবাহী সন্তসাহিত্যের অনেকটাই কাছাকাছি হলেও এই গ্রন্থ শ্রীরামকৃষ্ণের চরিতকথা নয়। এই গ্রন্থে অনেক সময় শ্রীরামকৃষ্ণের কথাপ্রসঙ্গে তাঁর জীবনের কিছু টুকরো ঘটনার কথা উঠে এসেছে, শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনচরিত এখানে গৌণ বিষয়। ‘কথামৃত’-এ কোনোভাবেই শ্রীম শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনচরিত লেখার চেষ্টা করেননি। শ্রীম তাঁর ডায়েরিতে একজন সন্তসাধকের উপদেশের কথা লিখলেও অযথা অলৌকিক ঘটনার অবতারণা করে এর প্রামাণিকতা ও সাহিত্যগুণ নষ্ট করতে চাননি। এই গ্রন্থের কথাবস্তু, সহজাত সুন্দর সহজতা, পরিবেশের অপূর্ব বর্ণনাংশ, অনন্য নাটকীয়তা, অফুরন্ত উপমার বৈচিত্র্য, গল্পের আমেজ, গীতিরসের ব্যঞ্জনা ধর্মাগ্রহী পাঠকের পাশাপাশি শুধুমাত্র সাহিত্য-পাঠককেও অমোঘ আকর্ষণে টানতে থাকে। ‘কথামৃত’ বাংলার এমন একটি গ্রন্থ যেই গ্রন্থের আনন্দ-রসগ্রহণ যে কোনো পৃষ্ঠা থেকেই শুরু বা শেষ করা যেতে পারে। একটি উৎকৃষ্ট ও ইতিবাচক সাহিত্যের মধ্যে যে সকল গুণাবলী থাকা প্রয়োজন ‘কথামৃত’-এ তার প্রায় সবকটি গুণই রয়েছে। এই অসাধারণত্বের জন্যই সমসাময়িক প্রায় সতেরোটি পত্রিকায় ‘কথামৃত’ একসঙ্গে প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল, যা বাংলার সাময়িক পত্রের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা।২
কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের জীবনের ঘনিষ্ঠতর ব্যক্তিগত জীবনপরিচয় জানার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মনে একটি স্বাভাবিক আকর্ষণ কাজ করে। ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিজীবন ও তাঁর খুঁটি-নাটি জানার ইচ্ছে থেকেই ডায়েরি বা দিনলিপি সাহিত্যের দিকে পাঠকের অভিযাত্রা। বিশিষ্টজনদের জীবনী বা আত্মজীবনীতে তাঁদের জীবনের বিশেষ বিশেষ কিছু ঘটনার বর্ণনা থাকলেও ডায়েরিতে থাকে অতি সামান্য থেকে সামান্যতম ঘটনার টুকরো টুকরো কথা। কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের অন্তঃস্বরূপের প্রগাঢ় চর্চার ক্ষেত্রে ডায়েরি সাহিত্যের অনন্যতা ঠিক এখানেই। কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরাসরি সেই ডায়েরি-লেখকের মানসলোকের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াটিকে এখানে অনুভব করা যায়।
‘কথামৃত’ শ্রীম’র ডায়েরিধর্মী রচনা হলেও শ্রীম তাঁর ডায়েরিতে নিজের কথা লেখেননি, নিজে ডায়েরি লিখলেও তিনি লিখেছেন শ্রীরামকৃষ্ণের কথা। সেদিক থেকে বলা যেতে পারে শ্রীম’র ডায়েরি যেন আসলে শ্রীরামকৃষ্ণের অমৃতপদ্যেরই দলিল। ‘কথামৃত’ পড়তে পড়তে মনে হয় মাস্টার মশাই শ্রীম’র হৃদয়ই শ্রীরামকৃষ্ণের বৈঠকখানা। শ্রীম নিজেই গ্রন্থের লেখকের নামের অংশে ‘শ্রীম-লিখিত’ না লিখে ‘শ্রীম-কথিত’ লিখেছিলেন। আসলে শ্রীম ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের কথার কথক। এর থেকে শ্রীম’র অভিপ্রায়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাস্টার মশাই শ্রীম’র এই গ্রন্থে শ্রীরামকৃষ্ণ কথিত অমৃতভাষ্যগুলি তিনি নিজে উপস্থিত থেকে যেদিন যেমন শুনেছিলেন তিনি সেই দিনই সুযোগ মতো দিনে বা রাতে তা স্মরণ করে নিজের ডায়েরিতে সংগ্রহ করে রেখেছিলেন এর সবটাই Direct and Recorded on the same day৩। ‘কথামৃত’র ডায়েরির ধাঁচের জন্যই এর প্রামাণিকতা সবচেয়ে বেশি সর্বস্বীকৃত হয়েছে।
• স্থান-কাল-পাত্র :
‘কথামৃত’-এ মাস্টার মশাই শ্রীম শুধুমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণের কতগুলি কথা ও বাণীর সংকলন করে থেমে যাননি। তিনি স্থান, কাল, পাত্র, তারিখ, বার, তিথি, নক্ষত্র, সময় এমনকি সেদিনে সেই সময় কে কে উপস্থিত ছিলেন তারও যথার্থ উল্লেখ করেছেন। যেমন এইভাবে ১৮৮৩-র ২৬ সেপ্টেম্বরের সূচনায় রয়েছে:
আজ বুধবার, (১০ই আশ্বিন) ভাদ্রমাসের কৃষ্ণা দশমী তিথি, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দ। বুধবারে ভক্তসমাগম কম, কেন না সকলেরই কাজকর্ম আছে। ভক্তেরা প্রায় রবিবারে অবসর হইলে ঠাকুরকে দর্শন করিতে আসেন। মাস্টার বেলা দেড়টার সময় ছুটি পাইয়াছেন, তিনটার সময় দক্ষিণেশ্বরে কালীমন্দিরে ঠাকুরের কাছে আসিয়া উপস্থিত। এ-সময় রাখাল, লাটু ঠাকুরের কাছে প্রায় থাকেন। আজ দুই ঘন্টা পূর্বে কিশোরী আসিয়াছেন। ঘরের ভিতর ঠাকুর ছোট খাটটির উপর বসিয়া আছেন। মাস্টার আসিয়া ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিলেন। ঠাকুর কুশল জিজ্ঞাসা করিয়া নরেন্দ্রের কথা পাড়িলেন।৪
শুধু তথ্য দেওয়া নয়, এই তথ্যগুলি পেশ করার পাশাপাশি শ্রীম সচেতন ছিলেন একটি সুন্দর আবহ নির্মাণ করার ক্ষেত্রেও। উল্লেখিত চরিত্রগুলির বাস্তব অস্তিত্ব ‘কথামৃত’-এর প্রামাণিকতার এক-একজন সাক্ষ্য বলা যেতে পারে। শ্রীম’র এই ডায়েরি উনিশ শতকের এমনই এক প্রামাণিক সাহিত্য যেখানে অন্যান্য অনেক বিষয়ে বস্তুবাদী সমালোচক ও ঐতিহাসিকেরা সংশয় প্রকাশ করার সুযোগ পেলেও এর অখণ্ড প্রামাণিকতা সম্পর্কে তাঁরাও সন্দেহ প্রকাশ করতে অক্ষম। এই অনন্যতার শিরোপা অবশ্যই শ্রীম’র প্রাপ্য। শ্রীম নিজেকে শ্রীরামকৃষ্ণের কথার একজন নিষ্পৃহ রিপোর্টার হিসাবেই সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন। অবশ্য মাঝে মাঝে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের কথার কিছু টীকাভাষ্য করেছেন। সেক্ষেত্রে তাঁর বয়ান ভিন্ন স্বাদের:
ঠাকুর কি বলিতেছেন যে, আমি সব পথ দিয়াই ভগবানের নিকট পৌঁছিয়াছি—তাই সব পথের খবর জানি? আর সকল ধর্মের লোক আমার কাছে এসে শান্তি পাবে?৫
কোনো ডায়েরি যদি শুধুমাত্র লেখকের জীবনযাপনের খুঁটি-নাটি ব্যক্তিগত তথ্যে ভরা থাকে বা তা ব্যক্তিগত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যায় তবে তা সাহিত্যগুণ হারায়, সৌভাগ্যবশত ‘কথামৃত’র ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। এখানে মাস্টার মশাই শ্রীম বারবার নিজেকে লুকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা করেছেন। তাঁর জন্য ‘কথামৃত’-এ তিনি নিজের প্রায় এগারোটি ভিন্ননামের ব্যবহার করেছিলেন।৬ এর মধ্যে বিশেষ করে মাস্টার, মণি, মহেন্দ্র, মোহিনী নামগুলি বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। আবার কখনও শ্রীম নিজেকে জনৈক ভক্ত বা শুধুমাত্র ভক্ত পরিচয়েই সীমাবদ্ধ রেখেছেন। এর চেয়ে বেশি কোনো পরিচয় দেননি। ‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণ কবে কোথায় যাচ্ছেন বা কি করছেন শুধুমাত্র এই ধরণের বস্তুনিষ্ঠ তথ্যই শ্রীম পেশ করেননি। তিনি এর পাশাপাশি চেষ্টা করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের মানসলোকের এক টুকরো স্পর্শ পাওয়ার। নিজেকে তিনি বারবার এমনভাবে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন যে, পাঠক অভ্যাস করলেই সরাসরি শ্রীরামকৃষ্ণের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে তাঁর ব্যক্তিভাবনাকে স্পর্শ করতে সুযোগ পেয়ে যায়। শ্রীম’র এই ডায়েরি এতটাই প্রামাণিক যে এর বেশিরভাগ তথ্যই ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ’ বা শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যান্য স্মৃতিকথা বিষয়ক রচনার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়। শ্রীম’র এই ডায়েরির গ্রন্থরূপটি এমন একটি বিশেষ উপস্থাপনা যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের কিছু অংশ নয়, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অনেক ছোট ছোট চেনা-অচেনা ভালোলাগা-মন্দলাগা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-যন্ত্রণা, উৎসাহ-বিরক্তি প্রায় সমস্ত কিছুরই উন্মুক্ত প্রকাশ পাঠককে মুগ্ধ করতে করতে এক অন্য আস্বাদ্য জগতে নিয়ে উপস্থিত করে। তবে শ্রীম’র ডায়েরি লেখার অভ্যাসটি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, শ্রীম’র দীর্ঘদিনের অভ্যাস এর সঙ্গে জড়িত ছিল বলেই এই ডায়েরি এত জীবন্ত ও মৌলিক মনে হয়। স্বামী চেতনানন্দ শ্রীম’র ডায়েরি লেখার অভ্যাস সম্পর্কে একটি তথ্য দিয়েছেন:
… ডায়েরীর উৎস সম্বন্ধে শ্রীম আরও বলেছেন,”ঈশ্বরের কাজ আমরা কতটা বুঝতে পারি?… হেয়ার স্কুলে থার্ড ক্লাশে যখন পড়ি (১৮৬৭) তখন থেকেই ডায়েরী লিখছি ক্রমাগত, দৈনন্দিন কি করলাম, কোথায় গেলাম—এই সব। আর ১৮৮২ ফেব্রুয়ারীর শেষে ঠাকুরের দর্শন হ’ল। তখন এই অভ্যেসটা কাজে এল।… জয় সাত ঘণ্টা, এমন কি সারাদিনের ঘটনা পর পর রাত্রিতে মনে পড়ত। এমনতর করেছিলেন ঠাকুর। গানগুলিরও একে একে প্রথম পদ মনে রাখার চেষ্টা করতাম।৭
• ডায়েরিধর্মী রচনার নিরিখে পার্থক্য :
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কয়েকটি ডায়েরিধর্মী রচনা, কবি জীবনানন্দ দাশ, কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়েরি সাহিত্যের সঙ্গে মাস্টার মশাই শ্রীম’র ডায়েরির স্বরূপগত পার্থক্য রয়েছে। এই ডায়েরির প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ-কথিত ঈশ্বরীয় কথা। এই ঈশ্বরীয় কথাপ্রসঙ্গেই এসেছে অন্যান্য প্রসঙ্গ এবং সেই সূত্র ধরেই উঠে এসেছে উনিশ শতকের বাংলার নিকষ সমাজসূত্র। ‘কথামৃত’-এর কিছু অংশ পাঠ করে স্বামী বিবেকানন্দ রাওলপিণ্ডি থেকে শ্রীমকে লিখেছিলেন:
C’est bon mon ami (বেশ হচ্ছে, বন্ধু)—এখন আপনি ঠিক কাজে হাত দিয়েছেন। হে বীর, আত্মপ্রকাশ করুন। জীবন কি নিদ্রাতেই অতিবাহিত হবে? সময় যে বয়ে যায়। সাবাস, এই তো পথ।
আপনার পুস্তিকা প্রকাশের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ; শুধু এই পুস্তিকার আকারে খরচ পোষাবে কি না তাই ভাবছি।… লাভ হোক বা নাই হোক গ্রাহ্য করবেন না, তা দিনের আলোতে বেরিয়ে আসুক! এজন্য আপনার উপর যেমন অজস্র আশীর্বাদ বর্ষিত হবে, তেমনি তেতোধিক অভিশাপও আসবে—চিরন্তন ধারাই এই।৮
একজন নির্ভীক সাংবাদিকের মতো মাস্টার মশাই শ্রীম কোনো কিছুই গোপন না করে, আবৃত না রেখে শ্রীরামকৃষ্ণের সব কথাই নির্ভেজালভাবে সকলের সামনে অক্লান্ত পরিশ্রমে ও সযত্নে তুলে ধরেছিলেন বলে স্বামীজি সম্ভবত এই চিঠিতে আশীর্বাদের পাশাপাশি অভিশাপের কথা বলেছিলেন। ‘কথামৃত’কে সেদিক থেকে দেখলে এই গ্রন্থ শ্রীম’র ব্যক্তিগত ডায়েরি তো বটেই, ডায়েরির পাশাপাশি শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কিত আরও অনেক কিছুরই একটি বস্তুনিষ্ঠ গোপন কক্ষ।
• বৈঠকি আমেজ :
‘কথামৃত’-এ রয়েছে উনিশ শতকের ঘরোয়া বৈঠকি আমেজ। যে কোনো ঘরোয়া বৈঠকের আলোচনায় যেমন প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে নানা বিষয় ঘুরে বেড়ায় ‘কথামৃত’-এ তেমনই বিবিধ জায়গায় বিভিন্নজনের উপস্থিতিতে প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে মুক্তোর মতো নানা কথা আলোচিত হয়েছে। সেই এক-একটি মুক্তকে অনেক যত্ন নিয়ে গেঁথেছেন মাস্টার মশাই শ্রীম। লক্ষ্যনীয় ‘কথামৃত’-এ মূলত পরিচিত ঘরোয়া বৈঠকের বাইরে কোনো সভা বা সমিতিতে শ্রীরামকৃষ্ণ কোনো বক্তব্য পেশ করতে যাননি। ‘কথামৃত’-এ দেখা যায় সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁকে আত্মমত প্রচারে উৎসাহ দিলেও তিনি তাতে একটুও উৎসাহিত হননি।৯ এর মধ্যে দিয়ে বোঝা যায় ঘরোয়া বৈঠকি আমেজেই শ্রীরামকৃষ্ণ অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করতে পেরেছিলেন। বিশেষত সকলের সঙ্গে সরাসরি মত বিনিময় ও কথোপকথনের সুযোগ বৈঠকি আমেজের সঙ্গে জুড়ে থাকায় শ্রীরামকৃষ্ণ এই পরিবেশকেই বিশেষ পছন্দ করেছিলেন। এই কারণেই ‘কথামৃত’-এর আবহ অনেক বেশি জীবন্ত মনে হয়। ‘কথামৃত’-এ কথোপকথন বা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ধর্মালোচনার এই পদ্ধতি নতুন কিছু নয়। সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে এই প্রথাটি অনেক প্রাচীন। অধ্যাপক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রসঙ্গে লিখছেন:
সংলাপের মধ্য দিয়ে ধর্মজিজ্ঞাসা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন রীতি। উপনিষদের ঋষি, ষড়দর্শনের তাত্ত্বিক রচনাকার ও টীকাকারেরা আলাপের মধ্যে দিয়েই চিত্তের মালিন্য দূর করে তাকে মার্জিত দর্পণের মতো স্বচ্ছ করতে চেয়েছিলেন, যাতে তার উপরে চেতনার যথার্থ প্রতিফলন হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ, ভক্ত ও অনুরাগীদের সঙ্গে যে আলাপ করতেন, রহস্যকৌতুক করতেন, ছোট ছোট কথা-উপকথার প্যারাবলের সাহায্যে নিগূঢ় তত্ত্বকথা বলতেন—প্লেটো, সক্রেটিস, মধ্যযুগীয় খ্রীস্টান তাত্ত্বিক ও সাধক এবং মুসলিম সুফী রসিকদের উপলব্ধি ও উক্তির সঙ্গে তার গোত্রগত মিল। কিন্তু অমিলও বড়ো কম নয়।১০
শ্রীরামকৃষ্ণ ভাব-চেতনা সম্পূর্ণ বজায় রেখে তার উপস্থাপন সহজসাধ্য নয়। তবু শ্রীম এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সফল হয়েছিলেন। তিনি ডায়েরি থেকে সম্পাদনা-পূর্বক ‘কথামৃত’র গ্রন্থরূপ দেওয়ার সময় শ্রীরামকৃষ্ণের কথার সঙ্গে যেটুকু টীকাভাষ্য সংযোজন করেছিলেন সেটিও শ্রীরামকৃষ্ণের মূলকথাকে কোনোভাবে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রচেষ্টা করেনি। ‘কথামৃত’র কিছু অংশের পাঠ শোনার পর স্বয়ং শ্রীসারদা দেবী, শ্রীমকে একটি চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন:
তাঁহার নিকট যাহা শুনিয়াছিলে সেই কথাই সত্য। ইহাতে তোমার কোন ভয় নাই। এক সময় তিনিই তোমার কাছে ওই সকল কথা রাখিয়াছিলেন। এক্ষণে আবশ্যকমত তিনিই প্রকাশ করাইতেছেন। ওই সকল কথা ব্যক্ত না করিলে লোকের চৈতন্য হইবে নাই জানিবে। তোমার নিকট যে সমস্ত তাঁহার কথা আছে তাহা সবই সত্য। আমি একদিন তোমার মুখে শুনিয়া আমার বোধ হইল যে তিনিই ওই সমস্ত কথা বলিতেছেন।১১
সত্যিই ‘কথামৃত’র বৈঠকি আমেজ এতটাই প্রাণোজ্জ্বল যে সেখানে দেখা যায় শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে বিভিন্ন মনোভাবের একের পর এক চরিত্র আসছেন, তাঁরা ধর্মপ্রসঙ্গে নানা কথা আলোচনা করছেন, প্রসঙ্গক্রমে তাঁরা নিজের নিজের জীবনের টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন, মাঝে মাঝে পাশ্চাত্যের শিক্ষায় শিক্ষিতরা পরস্পর সুসংহত তাত্ত্বিক বিতর্ক করছেন এবং সেগুলি শ্রীরামকৃষ্ণ চুপ করে শুনছেন, এর পাশাপাশি সবাই মিলে কীর্তনানন্দে নাচছেন, চমৎকার সব গান গাইছেন—সব কিছু ভুলে আনন্দসাগরে হৈ হৈ করে ভাসছেন আবার শান্ত-স্তব্ধ হয়ে গুরুগম্ভীর আধ্যাত্মিক তত্ত্বকথার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বা আলোচনা শুনছেন। ‘কথামৃত’র বৈঠকে কখন দেব-দেবীর স্তোত্র পাঠ হচ্ছে, কখনও ‘অধ্যাত্ম-রামায়ণ’ পাঠ হচ্ছে, আবার কোনোদিন ‘কৃষ্ণচরিত্র’ বা ‘দেবী চৌধুরানী’র মতো বঙ্কিম-সাহিত্যও আলোচনা হচ্ছে। এরই মাঝে শ্রীরামকৃষ্ণ মাঝে মাঝে তরুণদের সঙ্গে রঙ্গ-তামাশা করছেন, সকলের সামনে জাতিভেদ প্রথা ভাঙছেন, আবার ক্ষণে ক্ষণে ধর্মকথায় কিম্বা দেবতার ভাবে মোহিত হয়ে সমাধিমগ্ন হয়ে যাচ্ছেন। তবে ‘কথামৃত’র বৈঠকি আমেজের মধ্যেই শ্রীরামকৃষ্ণ কয়েকটি বিষয়ের উপর বারবার সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়েছেন—
ক. মানুষের জীবনে ঈশ্বরই একমাত্র ধ্রুব, সৎ ও নিত্যবস্তু। সেই ঈশ্বরই জীব-জড় জাগতিক সবকিছু হয়েছেন। সর্বভূতে সেই প্রেমময় ঈশ্বরের প্রকাশ।
খ. অনন্ত মত অনন্ত পথ, সকলেই ভিন্ন ভিন্ন পথে ভিন্ন ভিন্ন মতে নির্ভর করে শেষ পর্যন্ত সেই একই ঈশ্বরের কাছে গিয়ে পৌঁছায়। সেখানে আর কোনো ধর্ম-বর্ণ-বিত্ত-লিঙ্গ-জাতি বা অন্য কোনো বাহ্যিক ভেদাভেদ থাকে না। সেই ঈশ্বর এক ও অভিন্ন।
গ. কামিনী হিসাবে নারীকে দেখবার প্রবণতা ত্যাগ করে তাকে বিদ্যারূপিণী মহাশক্তির অংশ হিসাবে দেখতে শেখা।
ঘ. মানুষের মধ্যে সাক্ষাৎ নরনারায়ণ বা শিবকে অনুভব করে, অহংকার শূন্য হয়ে শিবজ্ঞানে জীবসেবা।
ঙ. প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, দর্শন প্রভৃতির সঠিক ও সুষম সংমিশ্রণ।
চ. পাশ্চাত্যের শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির উগ্র অন্ধ অনুকরণ না করে আন্তরিক প্রেমময় বিশ্বমানবতার প্রতিষ্ঠা।
বঙ্গপ্রদেশের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ কথকতা-শিল্পের ধারাটি বাংলার জনমানসে ও জনচেতনায় সংস্কৃতের প্রাচীন মহাকাব্য-পুরাণ, বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র এবং বাংলার মঙ্গলকাব্যচর্চাকে প্রবহমান রাখত। অখণ্ড বাংলাদেশের সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষেরা বেশিরভাগই বিদ্যাশিক্ষার সুযোগ পেতেন না। তারা নিজেরা পুথিপত্র পড়তে বা লিখতে না জানলেও রামায়ণ-মহাভারত সহ অন্যান্য ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থের মূলকাহিনী, বিষয়বস্তু ও ভাবাদর্শের কথা এই ধরণের গ্রামীণ চণ্ডীমণ্ডপের কথকতা শ্রবণের মাধ্যমে সহজেই সম্পূর্ণ আয়ত্তে আনতে পারতেন। অক্ষরজ্ঞান না থাকলেও এই উপায়টিতে কাব্যের ভাববস্তুর সঙ্গে তাদের অচিরেই পরিচয় তৈরি হয়ে যেত। কথকতা-শিল্পের প্রধান শিল্পীর পরিচয় ছিল কথকঠাকুর। উনিশ শতকে মূলত ব্রাহ্মণেরা এই পেশায় যুক্ত ছিলেন। বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে কথকতা-শিল্পটি ক্রমশ একটি শ্রদ্ধার পেশা হিসেবে মান্যতা পেয়েছিল। শ্রীরামকৃষ্ণ কামারপুকুর গ্রামে থাকাকালীন তাঁর বেড়ে ওঠার দিনগুলিতে এই ধরণের বাংলা কথকতা ও অন্যান্য গ্রামীণ সামাজিক সাংস্কৃতিক উপকরণের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অনুকূল পরিবেশ পেয়েছিলেন। যার প্রভাব তাঁর শিশুমনের মধ্যে বেশ ভালোরকম দাগ কেটেছিল। তিনি নিজে অসাধারণ স্মৃতিধর ছিলেন বলে কথকতার অনেক অংশ তিনি রপ্ত করতে পারতেন বলে জানা যায়। ‘কথামৃত’ গ্রন্থের বৈঠকী আলাপচারিতায় তার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। পেশাগত অর্থে বাংলায় কথকতা-শিল্পী বলতে ঠিক যা বোঝায় শ্রীরামকৃষ্ণ কোনোদিনই তা ছিলেন না। ‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণ কথকতা করবেন বলে কথকতার আঙ্গিক ব্যবহার করেছেন এমনটাও বলা চলে না। তাঁর বৈঠকী আলাপচারিতার বিষয় মূলত ভারতীয় ধর্মচিন্তা, আরও স্পষ্ট করে বলা যেতে পারে ঈশ্বরচিন্তা। সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে এই শিল্পের সঙ্গে ধর্মচর্চার সংযোগ তৈরি হওয়ার ফলে এই প্রথাটি ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রচলিত কথকতা-শিল্পের সঙ্গেও একইভাবে ধর্মচর্চা জুড়ে ছিল। আর খুব সম্ভবত এই কারণেই শ্রীরামকৃষ্ণের ‘কথামৃত’-এর পরিসরে কথকতার বৈশিষ্ট্যগুলি অনেক চেনা চেনা লাগে। কথকতার শৈলীর সর্বজনীন ভাব, ভাষা, ভাষ্য ও সরলতা শ্রীরামকৃষ্ণকেও বিশেষ প্রভাবিত করেছিল। ‘কথামৃত’-এ অনুসন্ধান করলে দেখা যায় শ্রীরামকৃষ্ণ কথকতা-শিল্পের অদ্ভুত আত্তিকরণ করেছিলেন তাঁর বাচনভঙ্গিতে। শ্রীরামকৃষ্ণ কথকতা-শিল্পের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি অজস্র লৌকিক উপমা-রূপক, বাক্যিক রূপকল্প, প্রবাদ-প্রবচন, প্রচলিত গ্রামীণ লোকগল্পের মধ্যে দিয়ে জটিল আধ্যাত্মিক কঠিন ও ভাবসমৃদ্ধ তত্ত্বকথাকে সহজ-সরল, সহজবোধ্য ভাষায় সর্বজনীন করে তোলার শৈলীটি সম্ভবত নিজের জীবনযাপন থেকেই শিখেছিলেন। বক্তব্যকে সহজবোধ্য করে তোলার জন্যই তিনি ‘কথামৃত’ জুড়ে এতগুলি গল্প ও উপমার সাজি নিয়ে বসেছেন। তিনি কোনো কথকঠাকুরের কাছে আলাদা করে এই বিষয়গুলি শিক্ষা করেননি। বাঙালি জাতির শিকড় সংস্কৃতির এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যই সমাজের প্রতিটি স্তরে শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বজনগম্যতার আরেকভাবে শুভসূচনা ঘটিয়েছিল বলা যেতে পারে।
‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণ বারবার বলেছেন সংস্কৃত কাব্য, পুরাণ ও শাস্ত্রাদি তিনি কখনই বর্ণ, অক্ষর ধরে ধরে পড়ে দেখেননি। অথচ সেই সব শাস্ত্রের মধ্যে যা সার কথা আছে তিনি চমৎকারভাবে তা সব জানেন। ঔপনিবেশিক আধুনিক পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত মাস্টার মহাশয় শ্রীম পর্যন্ত তাঁর ঈশ্বর ও ধর্মসম্বন্ধে অসাধারণ প্রজ্ঞা দেখে প্রথম দর্শনেই যথেষ্ট মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর এই মুগ্ধবোধ চিরকাল বজায় ছিল তা বাইরে থেকে শুধু ‘কথামৃত’র আয়তন দেখলেও বোঝা যায়। ‘কথামৃত’ থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ সমীপে শ্রীম’র প্রথম দিনের অংশটি দেখা যাক, শ্রীম লিখছেন:
মাস্টার—আচ্ছা, ইনি কি খুব বই-টই পড়েন?
বৃন্দে—আর বাবা বই-টই! সব ওঁর মুখে!
মাস্টার সবে পড়াশুনা করে এসেছেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বই পড়েন না শুনে আরও অবাক্ হলেন।১২
ছেলেবেলায় কামারপুকুরে বসবাসের সময় থেকে তাঁর শাস্ত্রকথা ও ধর্মকথা শোনার আগ্রহ ছিল, তিনি স্বেচ্ছায় পণ্ডিতদের তর্কসভাতেও মাঝে মাঝে গিয়ে হাজির হতেন, তার ইতিবৃত্ত লীলাপ্রসঙ্গকার উল্লেখ করেছেন।১৩ তাঁর মতে শাস্ত্রের সার তাঁকে স্বয়ং জগজ্জননী শেখাতেন এবং প্রয়োজনে তাঁকে বিদ্যার ‘রাশ ঠেলে’১৪ দিতেন।
• জটিল তত্ত্বের সরল ব্যাখ্যা :
শাস্ত্রীয় জটিল ব্যাখ্যার বাইরে শ্রীরামকৃষ্ণের শাস্ত্র সম্পর্কে একটি নিজের ধারণাও ছিল। শ্রীরামকৃষ্ণের সেই ধারণাটি ঠিক কেমন ‘শ্রীমদ্ভগবদগীতা’-প্রসঙ্গে তা দেখা যেতে পারে। ‘কথামৃত’-এ ১৮৮২-এর ৫ আগস্ট শ্রীরামকৃষ্ণ পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে ‘শ্রীমদ্ভগবদগীতা’র সারকথাটি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে বলছেন:
গীতার অর্থ কি? দশবার বললে যা হয়। ‘গীতা’ ‘গীতা’, দশবার বলতে গেলে,’ত্যাগী’ ‘ত্যাগী’ হয়ে যায়। গীতার এই শিক্ষা—হে জীব, সব ত্যাগ করে ভগবানকে লাভ করবার চেষ্টা কর। সাধুর হোক, সংসারীই হোক, মন থেকে সব আসক্তি ত্যাগ করতে হয়।১৫
বাংলার সুদক্ষ কথকতা-শিল্পীদের মতো শ্রীরামকৃষ্ণ ধর্মবিষয়ক জটিল থেকে জটিলতর তত্ত্বের সহজতর ব্যাখ্যা দিতে জানতেন। প্রায় সবসময় যেকোনো জটিল সংস্কৃত-শাস্ত্র ব্যাখ্যায় শ্রীরামকৃষ্ণের প্রধান অবলম্বন সহজতা ও সরলতা। ‘কথামৃত’-এ দেখা যায় তিনি তরুণ যুক্তিবাদী পাশ্চাত্যের দর্শনশাস্ত্র-অভিজ্ঞ নরেন্দ্রনাথকে আচার্য রামানুজের সুপ্রাচীন তথা অপেক্ষাকৃত জটিল বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের তত্ত্বকে পরিচিত লৌকিক উপমা দিয়ে অনায়াসে অতি সহজে চমৎকার ব্যাখ্যা করছেন:
নরেন্দ্র—বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ কি?
শ্রীরামকৃষ্ণ(নরেন্দ্রকে)—বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ আছে—রামানুজের মত। কিনা, জীবজগৎবিশিষ্ট ব্রহ্ম। সব জড়িয়ে একটি বেল। খোলা আলাদা, বীজ আলাদা, আর শাঁস আলাদা একজন করেছিল। বেলটি কত ওজনের জানবার দরকার হয়েছিল। এখন শুধু শাঁস ওজন করলে কি বেলের ওজন পাওয়া যায়? খোলা, বিচি, শাঁস সব একসঙ্গে ওজন করতে হবে। প্রথমে খোলা নয়, বিচি নয়, শাঁসটিই সার পদার্থ বলে বোধ হয়। তারপর বিচার করে দেখে,— যেই বস্তুর শাঁস সেই বস্তুরই খোলা আর বিচি। আগে নেতি নেতি করে যেতে হয়। জীব নেতি, জগৎ নেতি এইরূপ বিচার করতে হয়; ব্রহ্মই বস্তু আর সব অবস্তু। তারপর অনুভব হয়, যার শাঁস তারই খোলা, বিচি। যা থেকে ব্রহ্ম বলছো তাই থেকে জীবজগৎ। যাঁরই নিত্য তাঁরই লীলা। তাই রামানুজ বলতেন, জীবজগৎবিশিষ্ট ব্রহ্ম। এরই নাম বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ।১৬
এখানে শ্রীরামকৃষ্ণের বোঝানোর পদ্ধতিটি এতটাই সহজ-সরল যে, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের সারকথাটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ছাড়াই অনেকাংশে স্পষ্ট করে ধরা গেল! অথচ আচার্য রামানুজের এই মতবাদ সংক্রান্ত সংস্কৃত সূত্রগুলির একটিও তিনি উল্লেখ পর্যন্ত করলেন না, কিম্বা কোনো তাত্ত্বিক টীকা-ভাষ্য কিছুই করলেন না। অথচ মূল যে কথাটির মধ্যে দিয়ে বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ বোঝা সম্ভব, তাকে ঠিক স্পর্শ করা গেল। এখানেই হয়তো শ্রীরামকৃষ্ণ অনেক বড় বড় তত্ত্বজ্ঞ পণ্ডিতদের চেয়ে পৃথক। একটি অপেক্ষাকৃত কঠিন প্রাচীন মতবাদের কতটা গাঢ় আত্তিকরণ ঘটলে এত সহজে তা উপস্থাপন করা যেতে পারে, তা আর নতুন করে বলবার প্রয়োজন নেই।
• পরিচিত লৌকিক উপাদানের প্রয়োগ :
বাংলার কথকতা-শিল্পের আরেকটি বৈশিষ্ট্য পরিচিত, সহজ ও লৌকিক উপাদানের প্রয়োগে গূঢ় ভাবার্থবিশিষ্ট বক্তব্য পেশ করার চেষ্টা। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের মধ্যে কথকতা-শিল্পের এই বৈশিষ্ট্যটিই সর্বাপেক্ষা সুলভ বলা যায়। মূলত উপমাযোগে এই উপাদানগুলির ব্যবহার করেছেন তিনি। এই উপাদানগুলি সংগ্রহের ক্ষেত্রে তাঁর বাহ্যিক কোনো বাছবিচার নেই। কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী শ্রীরামকৃষ্ণের কথার এই বৈশিষ্ট্যটির বহুল প্রশংসা করেছেন।১৭ শ্রীরামকৃষ্ণের লোকজীবন থেকে অসংখ্য উপমা-রূপক চয়ন করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। বাস্তবের মাটির কাছাকাছি জনজীবনের প্রতি অসাধারণ মমত্ববোধ থাকলেই এমন আত্তিকরণ সম্ভব হতে পারে। কতদূর প্রকৃত শিল্পীর চোখ থাকলে অতি সাধারণ তুচ্ছ বিষয় থেকে এত মৌলিক ও বিচিত্র উপকরণ থেকে ভাবনার নির্মাণ সম্ভব তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। বাঙালি সংস্কৃতির এত পরিচিত ঘটনা তাঁর প্রায় সমস্ত কথায় উঠে এসেছে যে, তাতে অকুণ্ঠ বিস্মিত হতে হয়। ‘কথামৃত’-এ মানুষের অভ্যাসযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, গ্রামের মেয়েদের চিঁড়ে কোটার১৮ কথা। শ্রীরামকৃষ্ণ কথিত কথাবৈচিত্র্যের মধ্যে এমন আরেকটি চমৎকার উদাহরণ কুমোরের কাঁচা ও পাকা হাঁড়ির প্রসঙ্গটি১৯। এক্ষেত্রেও তাঁর বলবার বিষয় প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বর-কথা অথচ আবহ নির্মাণের বিষয়টি লৌকিক। এমন একটি অসাধারণ জীবনমুখী উপকরণ সংগ্রহ শ্রীরামকৃষ্ণের মতো জীবন-অভিজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষেই সংগ্রহ করা সম্ভব। পরলোক ও পুনর্জন্ম প্রভৃতি জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে, ব্রাহ্মসমাজের বিশিষ্ট নেতা কেশববাবুর মতো একজন পাশ্চাত্যের শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী সেখানে উপস্থিত, অথচ শ্রীরামকৃষ্ণ এমন জটিল বিষয় ব্যাখ্যা করছেন মাটির কাঁচা-পাকা হাঁড়ির উদাহরণ দিয়ে! শ্রীরামকৃষ্ণ চাইলেই এখানে জটিল কোনো উপাখ্যান এখানে বলতে পারতেন, সেদিনের আগত জনতার অধিকাংশই যেখানে শিক্ষিত সেখানে জটিল উপাখ্যান পেশ করা অসম্ভব কিছু নয়, কিন্তু তা তিনি সচেতনভাবেই করলেন না, বরং তার পরিবর্তে একজন দক্ষ কথকতা-শিল্পীর মতো তুলনামূলক অনেক সরল উপমা টেনে আনলেন এই জটিল গূঢ় তত্ত্ব ব্যাখ্যানের জন্য।
• প্রতীকী গল্প :
‘কথামৃত’ পরিসরে শ্রীরামকৃষ্ণ মাঝে মাঝে ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গকে সহজতর করে ব্যাখ্যার জন্য কিছু কিছু গল্প বলেছেন। গল্পের মধ্যে দিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ জীবনমুখী এক-একটি উপদেশ দিয়েছেন চমৎকারভাবে। তাঁর প্রতিটি গল্পের ভিতরে এক-একটি বার্তা থাকে, যা ব্যাখ্যা দাবি করে। সেদিক থেকে গল্পটি সেই অভিপ্রেত বার্তাটির আধারমাত্র। গল্পের সেই ব্যাখ্যাটুকুই গল্পগুলিকে আরও বেশি সাধারণের উপযোগী করে তোলে এবং বক্তার বক্তব্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। ‘কথামৃত’র এই দিকটির সঙ্গে বাংলাদেশের কথকতা-শিল্পের অসাধারণ মিল রয়েছে। কথকতা-শিল্পীরা মাঝে মাঝে প্রসঙ্গক্রমে শাস্ত্রীয় তত্ত্বের সহজতর উপস্থাপনের জন্য বিভিন্ন লোককথা, লোকগল্প বা উপকাহিনির ব্যবহার করেন। এই গল্পগুলির বেশিরভাগই অখণ্ড বাংলাদেশের লোকজীবন থেকে উঠে আসা কিছু ঘটনার শৈল্পিক উপস্থাপন ছাড়া খুব বেশি কিছু নয়।
• অভিকরণ :
কথকতা-শিল্পের সঙ্গে জড়িত আরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল অভিনয়। চণ্ডীমণ্ডপে কথকতার আসনে বসে কথকঠাকুর বিশেষ কোনো পুরুষচরিত্র বা নারীচরিত্র উপস্থাপনের সময় বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুরুষ বা নারীর কিছু পরিচিত ও স্বাভাবিক বাহ্যিক শৈলীর অভিনয় করেন। গ্রামীণ কথকঠাকুর পুরুষচরিত্র পেশ করতে পুরুষের কিছু শৈলীতে অভিনয় করে দেখান। যেমন-গোঁফ পাকানো, নকল করে গড়গড়া টানা, ফাঁকা হাতে বীরের মতো অস্ত্রচালনা, শ্রীকৃষ্ণ বোঝাতে হাত বাঁশির ভঙ্গিতে রাখা ইত্যাদি। আবার নারীচরিত্র বোঝানোর ক্ষেত্রে মাথায় চাদর দেওয়া, খালি হাতেই পাখার বাতাস করা ইত্যাদি আচরণও কথকেরা করে থাকেন। শ্রীরামকৃষ্ণের বাচনিক শৈলীতে কথকতার এই শৈলীটিও ‘কথামৃত’-এ অল্প কিছুক্ষেত্রে পাওয়া যায়। এই বৈশিষ্ট্যটি ‘কথামৃত’-এ কিছুবার মাত্র উল্লেখ থাকলেও সেই অংশগুলি অনেক সতেজ। ব্রহ্ম-পরমাত্মা, মায়াশক্তি ও জীবাত্মা প্রসঙ্গে ‘রামায়ণ’ থেকে শ্রীরামচন্দ্রের পিতৃসত্য পালনের জন্য অযোধ্যা নগরী ছেড়ে বনবাসযাত্রার দৃশ্যটি শ্রীরামকৃষ্ণ নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছেন এবং নিজের বক্তব্যটি আরও সুন্দর করে উপস্থাপনের জন্য তাকে সামান্য অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যক্ত করছেন অসাধারণভাবে। ‘কথামৃত’ থেকে সেই অসামান্য দৃশ্যটি একবার দেখা যেতে পারে। সমবেত শ্রোতাদের শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন:
“আড়াই হাত দূরে শ্রীরামচন্দ্র, যিনি সাক্ষাৎ ঈশ্বর; মধ্যে সীতারূপিণী মায়া ব্যবধান আছে বলে লক্ষ্মণরূপ জীব সেই ঈশ্বরকে দেখতে পান নাই। এই দেখ, আমি এই গামছাখানা দিয়ে মুখের সামনে আড়াল করছি আর আমায় দেখতে পাচ্ছ না। তবু আমি এত কাছে। সেইরূপ ভগবান সকলের চেয়ে কাছে, তবু এই মায়া-আবরণের দরুন তাঁকে দেখতে পারছ না।
“জীব তো সচ্চিদানন্দস্বরূপ। কিন্তু এই মায়া বা অহংকারে তাদের সব নানা উপাধি হয়ে পড়েছে, আর তারা আপনার স্বরূপ ভুলে গেছে।২০
‘রামায়ণ’ মহাকাব্য থেকে শ্রীরামচন্দ্রকে পরমব্রহ্ম, শ্রীময়ী সীতাদেবীকে মায়াশক্তি, লক্ষ্মণকে জীবরূপে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি শ্রীরামকৃষ্ণ সমবেত জনতাকে জীব, নিজের গামছাকে মায়াশক্তি ও নিজেকে পরমব্রহ্মরূপে উদাহরণ দিয়ে গামছার আড়ালে নিজেকে সাধারণের অদৃশ্যগোচর করে তুলে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাটির যেন একটি প্রায়োগিক উদাহরণ দিয়েছেন। লক্ষ্যনীয় এই একই উপমা ১০ জুন, ১৮৮৩ তারিখেও রয়েছে। কিন্তু গামছা দিয়ে নিজেকে অদৃশ্যগোচর করার অভিনয়টি সেখানে নেই। ‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণের হাস্য-উদ্রেককারী এমন আরও কিছু আচরণেরও উল্লেখ রয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস বাংলার কথকতা-শিল্পী না হলেও গ্রামীণ বাংলাদেশের চিরায়ত কথকতার প্রভাব তাঁর ধর্মচর্চার মধ্যে সত্যিই প্রভাব ফেলেছিল। হয়তো তাঁর অজ্ঞাতেই তিনি বাংলাদেশের কথকতা-শিল্পের একজন বলিষ্ঠ উত্তর-সাধকের ভূমিকা পালন করেছিলেন।
‘কথামৃত’ পরিসরে শ্রীরামকৃষ্ণ কথাপ্রসঙ্গে মাঝে মাঝেই অসংখ্য ছোট ছোট গল্প বলেছেন। কিন্তু প্রচলিত অর্থে একজন গল্পকার বা কথাকার বলতে যা বোঝায় শ্রীরামকৃষ্ণ সেই অর্থে গল্পকার বা কথাকার নন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের বলা গল্পগুলির কথাবস্তু বা কাহিনি নির্মাণের সূত্র ধরে যদি শ্রীরামকৃষ্ণের দিকে দেখা যায়, তবে তাঁকে নিঃসন্দেহে একজন গুণী কথাকার হিসাবে চিনে নেওয়া যায়। প্রবহমান মানব-সভ্যতায় গল্প লেখার প্রথা যে সময় থেকে সূচনা হয়েছিল তার চেয়ে গল্প বলার জন্মলগ্ন অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি প্রাচীন। সম্ভবত লিপি আবিষ্কার হওয়ার অনেক আগে থেকেই মানুষ গল্প বলা ও গল্প শোনার সঙ্গে পরিচিত ছিল। পৃথিবীর বহু দেশের অনেক লোকগল্পেই এই কারণে আঙ্গিকগত ও বার্তাগত অনেক মিল দেখা যায়। বিভিন্ন সভ্যতার বিভিন্ন গল্প শুধু মুখে মুখেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তার লাভ করেছে। সময়ের দাবি মেনে সামান্য সামান্য পরিবর্তিত হয়েছে। এভাবে গল্পগুলি তার নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমাও পার হয়ে গেছে খুব সহজেই। শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন এই ধরণের মৌখিক পদ্ধতিতে গল্প সৃজনের একজন দক্ষ শিল্পী। সেই দিক থেকে শ্রীরামকৃষ্ণকে একজন দক্ষ গল্প-কথকও বলা যায়। ‘কথামৃত’-এর গল্পগুলি শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে হাতে লেখেননি, তিনি সূত্রধরের মতো গল্পের আঙ্গিকে যেসব কথাবস্তু সকলের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন, শ্রীম তারই সুসংহত অনুলিখন করে নিয়েছেন মাত্র। ‘কথামৃত’কে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম চমৎকার একটি গল্পের ভাণ্ডার বললেও খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। শ্রীরামকৃষ্ণের কৃত্রিমতাহীন নির্মেদ সরল গল্পকথাগুলির মধ্যে অন্তর্নিহিত ধর্মীয় প্রসঙ্গ যদি বাদ রেখেও গল্পগুলিকে চর্চা করা যায়, তাতেও গল্পরসের রসগ্রহণে কোনো দিক থেকে ব্যাঘাত ঘটে না। এর পিছনে শ্রীম’র অসাধারণ লিখনকৌশল ও শ্রীরামকৃষ্ণের অসাধারণ সব বিষয় নির্বাচনের দক্ষতা উভয়েই সমানভাবে দাবিদার হতে পারে। শ্রীরামকৃষ্ণের বলা গল্পকথাগুলির সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য হল গল্পগুলি অধিকাংশই জীবনমুখী। গল্পগুলি শ্রীরামকৃষ্ণের বক্তব্যের ধারক ও বাহক। বলা যায়, তাঁর অভিপ্রেত মূল বার্তাটির জন্য যে গল্পটি তিনি সবার সামনে উপস্থাপন করছেন তার ইতিবাচক প্রধান চরিত্রটি স্বয়ং তিনিই। খুব সচেতনভাবে শ্রীরামকৃষ্ণ গল্পের মধ্যে দিয়ে একটি সুচিন্তিত বার্তা শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরেন। গল্পটিকে অতিরিক্ত ভাষার আলংকারিক উপস্থাপনের চেয়ে গল্পটির ভেতরের কথার প্রতি শ্রীরামকৃষ্ণের ঝোঁক অনেক বেশি। ‘কথামৃত’র গল্পগুলির আগে ও পরের আধ্যাত্মিক জ্ঞানের কথাগুলি বাদ দিয়ে গল্পকথাগুলির সাহিত্য-রস আস্বাদন যেমন সম্ভব, তেমনই শ্রীরামকৃষ্ণের অভিপ্রায় ও কাঙ্ক্ষিত বার্তাটির কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য গল্পগুলির আগে-পরের টুকরো কথাগুলি হয়ে ওঠে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। শ্রীম কখনও কখনও একই গল্পকে বিস্তৃতভাবে, কখনও সংক্ষেপে লিখেছেন। কিন্তু অনুমান করা যায় শ্রীরামকৃষ্ণ প্রতিবার গল্পগুলিকে বিভিন্ন জনের কাছে বিস্তৃতভাবেই বলেছেন। একই গল্প একাধিকবার ‘কথামৃত’-এ শ্রীম সম্ভবত বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করতে চাননি, শ্রীরামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক কথাগুলির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত গল্পগুলিকে তিনি বাদ দিতে না পেরে তার সংক্ষিপ্ত রূপ পেশ করেছেন। ‘কথামৃত’-এর গল্পকথাগুলির কথাবস্তু ও বিষয় বড় বিচিত্র হলেও এর উদ্দেশ্য মূলত ধর্মশিক্ষা ও আদর্শ জীবনের প্রতি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া। তাই গল্পে যেমন পৌরাণিক কাহিনির ব্যবহার হয়েছে, তেমনই ঐতিহাসিক চরিত্রও এসে উপস্থিত হয়েছে আবার এর পাশাপাশি অতিসাধারণ লোকজীবন থেকেও শ্রীরামকৃষ্ণ গল্পের রসদ সংগ্রহ করেছেন। কথাবস্তু নির্বাচনে তাঁর বাহ্যিক কোনো ছুঁৎমার্গ নেই। শ্রীরামকৃষ্ণের বলা সবকটি গল্প তাঁর নিজস্ব নির্মাণ নয়। শ্রীরামকৃষ্ণের কিছু গল্পের পূর্বরূপ রয়েছে অখণ্ড বাংলাদেশের কিছু লোকগল্পে। যেমন-শাস্ত্রজ্ঞানী অথচ সাঁতার কাটতে না জানা বিদ্বান পণ্ডিত এবং মূর্খ অথচ জীবনাভিজ্ঞ মাঝির গল্পটি।২১ পরবর্তী সময়ে কবি সুকুমার রায়ের ‘ষোল আনাই মিছে’ কবিতাতেও এই লোকগল্পের আঙ্গিকগত সামান্য পরিবর্তন ঘটে বিদ্যেবোঝাই বাবু-মশাইয়ের জীবনেও একই ছবি দেখা গেছে। এর পাশাপাশি কিছু গল্প শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় পাওয়া, আবার ‘কথামৃত’-এ এমন কিছু গল্প রয়েছে যা গুরুমুখী গুরুশিষ্য পরম্পরায় পাওয়া গল্প। এখানে শ্রীরামকৃষ্ণের অদ্বৈতবেদান্ত সাধনার গুরুদেব তোতাপুরী(‘কথামৃত’-এর ন্যাংটা)-কথিত গল্পের উপস্থাপনও দেখা গেছে। আগত অনুরাগী শ্রোতাদের সিদ্ধাই সম্পর্কে গুরুমুখী একটি প্রাচীন গল্প শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন:
শ্রীরামকৃষ্ণ—সিদ্ধাই থাকা এক মহাগোল। ন্যাংটা আমায় শিখালে—একজন সিদ্ধ সমুদ্রের ধারে বসে আছে, এমন সময় একটা ঝড় এল। ঝড়ে তার কষ্ট হল বলে সে বললে, ঝড় থেমে যাক। তার বাক্য মিথ্যা হবার নয়। একখানা জাহাজ পালভরে যাচ্ছিল। ঝড় হঠাৎ থামাও যা আর জাহাজ টুপ করে ডুবে গেল। এক জাহাজ লোক সেই সঙ্গে ডুবে গেলো। এখন এতগুলি লোক যাওয়াতে যে পাপ হল, সব ওর হলো। সেই পাপে সিদ্ধাইও গেল, আবার নরকও হলো।২২
শ্রীরামকৃষ্ণের গুরু তোতাপুরীও যে গল্পের মোড়কে তত্ত্বকে উপস্থাপন করতেন তার আভাস এখানে পাওয়া যায়। গুরুমুখী এই গল্পটির পাশাপাশি শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে একটি তাৎক্ষণিক গল্পও পেশ করেছেন। লক্ষ্য করার মতো বিষয় দুটি গল্পই সিদ্ধাইয়ের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্যের বাহক। দ্বিতীয় গল্পকথায় শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন:
একটি সাধুর খুব সিদ্ধাই হয়েছিল, আর সেইজন্য অহংকারও হয়েছিল। কিন্তু সাধুটি লোক ভাল ছিল, আর তার তপস্যাও ছিল। ভগবান ছদ্মবেশে সাধুর বেশ ধরে একদিন তার কাছে এলেন। এসে বললেন,’মহারাজ! শুনেছি আপনার খুব সিদ্ধাই হয়েছে’। সাধু খাতির করে তাঁকে বসালেন। এমন সময়ে একটা হাতি সেখান দিয়ে যাচ্ছে। তখন নূতন সাধুটি বললেন,’আচ্ছা মহারাজ, আপনি মনে করলে এই হাতিটাকে মেরে ফেলতে পারেন?’ সাধু বললেন,’য়্যাসা হোনে শক্তা’। এই বলে ধুলো পড়ে হাতিটার গায়ে দেওয়াতে সে ছটফট করে মরে গেল। তখন যে সাধুটি এসেছে, সে বললে,’আপনার কি শক্তি! হাতিটাকে মেরে ফেললেন।’ সে হাসতে লাগল। তখন ও সাধুটি বললে,’আচ্ছা, হাতিটাকে আবার বাঁচাতে পারেন?’ সে বললে, ‘ওভি হোনে শক্তা হ্যায়।’ এই বলে আবার যাই ধুলো পড়ে দিলে, অমনি হাতিটা ধড়মড় করে উঠে পড়ল। তখন এ-সাধুটি বললে,’আপনার কি শক্তি! কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। এই যে হাতি মারলেন, আর হাতি বাঁচালেন, আপনার কি হল? নিজের কি উন্নতি হল? এতে কি আপনি ভগবানকে পেলেন?’ এই বলিয়া সাধুটি অন্তর্ধান হলেন।২৩
এখানে প্রথম গল্পটির থেকে দ্বিতীয় গল্পটির জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ‘কথামৃত’র এই গল্পটিকে আধুনিক দৃষ্টিতে অর্জিত ক্ষমতার অপপ্রয়োগের গল্প হিসাবেও দেখা যেতে পারে। শ্রীরামকৃষ্ণের বলা গল্পকথাগুলির মধ্যে কোনটি গুরুমুখী, কোনটির উৎস ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের লোককথা এবং কোনটি তাঁর মৌলিক নির্মাণ তা নিশ্চিত করতে পারা দুষ্কর। গুরু পদে তিনি যেমন পাঞ্জাব-প্রদেশের সাধক তোতাপুরীকে বরণ করেছিলেন, তেমনই বৃন্দাবনের গঙ্গামায়ীর (গঙ্গামাতা) সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। ফলে শ্রীরামকৃষ্ণের গল্পে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের লোককথার বঙ্গীয় সংস্করণ ঘটাও খুবই স্বাভাবিক। ‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণের বলা পৌরাণিক গল্পকথাগুলির মধ্যে পার্বতীনন্দন গণেশের মাতৃভক্তির গল্পটি সম্ভবত সর্বাধিক প্রাচীন ও পৌরাণিক।২৪ তাঁর অনেক গল্পে পৌরাণিক চরিত্র থাকলেও সবকটি গল্পের পৌরাণিক উৎস বা উপাখ্যান পাওয়া যায় না। তবে এই লোকগল্পগুলি যে পুরাণ ও মহাকাব্যের থেকেই জন্ম নিয়েছিল সেই বিষয়ে সন্দেহ নেই। যেমন—বিভীষণের একটি পাতার ওপর রামনাম লিখে একটি লোকের মাথায় বেঁধে শুধু বিশ্বাসে নির্ভর করে সমুদ্র পার হওয়ার গল্পটি।২৫ কিম্বা পম্পা সরোবরে রাম-অনুগত একটি ব্যাঙের রামের অজ্ঞাতে রামের ধনুকাহত হয়ে চুপ করে বসে থাকার গল্পটিকে এই ধারার বলা যেতে পারে।২৬ এই গল্পগুলির মধ্যে মহাকাব্য বা পুরাণের আংশিক সংযোগ থাকলেও শ্রীরামকৃষ্ণের কিছু গল্পে পৌরাণিক বা মহাকাব্যিক অনুসঙ্গ ব্যতিরেকেও পৌরাণিক চরিত্র এসেছে। গুরুবাদ সম্পর্কিত একটি গল্পে দেখা যায় ভক্তের সরলতায় স্বয়ং নারায়ণের আবির্ভাবের কথা। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন:
সরল বিশ্বাসে কি না হয়। গুরুপুত্রের অন্নপ্রাশনে—শিষ্যেরা যে যেমন পারে, উৎসবের আয়োজন করছে। একটি গরীব বিধবা সেও শিষ্যা। তার একটি গরু আছে, সে একঘটি দুধ এনেছে। গুরু মনে করছিলেন যে দুধের ভার ওই মেয়েটি লবে। বিরক্ত হয়ে সে যা এনেছিল ফেলে দিলে আর বললে—তুই জলে ডুবে মরতে পারিস নি? মেয়েটি এই গুরুর আজ্ঞা মনে করে নদীর ধারে ডুবতে গেল। তখন নারায়ণ দর্শন দিলেন; আর প্রসন্ন হয়ে বললেন—এই পাত্রটিতে দধি আছে, যতই ঢালবে ততই বেরুবে, গুরু সন্তুষ্ট হবেন। এবং সেই পাত্রটি দেওয়া হলে গুরু অবাক্। আর সমস্ত বিবরণ শুনে নদীর ধারে এসে মেয়েটিকে বললেন—নারায়ণকে যদি আমাকে দর্শন না করাও তবে আমি এই জলেতে প্রাণত্যাগ করব। নারায়ণ দর্শন দিলেন, কিন্তু গুরু দেখতে পেলেন না। মেয়েটি তখন বললে, প্রভু গুরুদেবকে যদি দর্শন না দেন আর তাঁর শরীর যদি যায় তো আমিও শরীরত্যাগ করব; তখন নারায়ণ একবার গুরুকে দেখা দিলেন।২৭
শুধু পৌরাণিক চরিত্র নয় লোকমুখে প্রচলিত ঐতিহাসিক চরিত্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা গল্পকথাও শ্রীরামকৃষ্ণ পেশ করেছেন। মধ্যযুগের ভারতসম্রাট আকবর ও সর্বত্যাগী ফকিরের কাহিনীটি২৮ ‘কথামৃত’-এ মোট তিনবার রয়েছে। এই গল্পটির ঐতিহাসিকতা সম্পর্কে সংশয় রয়েছে। আকবরের নামের পরিবর্তে অন্যকোনো সম্রাটের নাম বসিয়ে নিলেও কাহিনির কোনো হানি হয় না। লোকমুখেই এই ধরণের গল্পকথাগুলির নির্মাণ হয়ে থাকতে পারে।
‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণ জমিদার রণজিৎ রায়ের গৃহে আদ্যাশক্তি ভগবতী দেবীর আবির্ভাবের একটি কিংবদন্তি কাহিনি বলেছেন।২৯ জমিদার রণজিৎ রায়ের বাস্তব অস্তিত্ব ছিল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত একটি দীঘির কথা ‘কথামৃত’-এ রয়েছে, যেই দীঘিটি কামারপুকুর যাওয়ার পথে দেখা যায়। রণজিৎ রায়ের এই কাহিনির সঙ্গে বর্ধমান জেলার অন্যতম প্রাচীন কল্যাণেশ্বরী শক্তিপীঠের দেবী সম্পর্কে প্রচলিত একটি কিংবদন্তির অনেক মিল রয়েছে। দুটি কিংবদন্তির মধ্যে কোনটি প্রাচীন তা নিশ্চিত বলা যায় না। দুটি কিংবদন্তি সমান্তরাল হওয়াও খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। শ্রীরামকৃষ্ণ-কথিত গল্পকথাগুলির মধ্যে কিছু গল্পের প্লট সম্পূর্ণভাবে বঙ্গদেশের খুব পরিচিত ছবি। শ্রীরামকৃষ্ণ ব্রহ্মজ্ঞান প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ব্রাহ্মণভোজনের একটি গল্প বলেছেন:
ব্রাহ্মণভোজনে—প্রথমে খুব হৈ-চৈ। যখন সকলে পাতা সম্মুখে করে বসলে, তখন অনেক হৈ-চৈ কমে গেল, কেবল ‘লুচি আন’ ‘লুচি আন’ শব্দ হতে থাকে। তারপর যখন লুচি তরকারি খেতে আরম্ভ করে, তখন বার আনা শব্দ কমে গেছে। যখন দই এল তখন সুপসুপ (সকলের হাস্য)—শব্দ নাই বললেও হয়। খাবার পর নিদ্রা। তখন সব চুপ।৩০
এই ছবি উনিশ শতকের গ্রাম বাংলার ব্রাহ্মণ্য-সংস্কৃতির অতি পরিচিত ছবি। বাংলার অনেক উপন্যাসে এই একই রকমের ছবি দেখা গেছে। ‘কথামৃত’-এ এই গল্পের কমপক্ষে উল্লেখ রয়েছে আরও দুবার, তবে সেগুলি রয়েছে অতিসংক্ষেপে। ‘কথামৃত’-এ তিন ডাকাত ও পথিকের গল্প৩১, ব্রহ্মচারীর নির্দেশ মেনে দরিদ্র কাঠুরিয়ার এগিয়ে যাওয়ার গল্প৩২, গাছের ওপর থাকা নানা রকম রঙ ধারণে সক্ষম বহুরূপী প্রাণীর গল্প৩৩ এবং এক পুকুরের চার ঘাট থেকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের একই জল সংগ্রহ করে বিভিন্ন নামকরণ করার৩৪ গল্পটি শ্রীরামকৃষ্ণ বারবার বলেছেন। এই গল্পগুলির বারবার ফিরে আসা থেকে বোঝা যায় এই গল্পগুলির ভেতরের বার্তাটির গুরুত্ব শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণের তিন ডাকাতের গল্পটি রূপক সাংকেতিক গল্প, এই তিন ডাকাত আসলে মানুষের তিনটি গুণ। উপনিষদের চরৈবেতির সঙ্গে ব্রহ্মচারী ও কাঠুরিয়ার গল্পের সাদৃশ্য রয়েছে। এই গল্পে ব্রহ্মচারী যেভাবে কাঠুরিয়াকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন তা যেন আধুনিক জীবনপ্রত্যয়েরও বার্তা বহন করে। আবার গাছের ওপরের বহুরূপী প্রাণীকে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন রঙে দেখা এবং বহুঘাট বিশিষ্ট পুকুরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের জল সংগ্রহ করার গল্পটির অনেক শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনদর্শনের ‘অনন্ত মত অনন্ত পথ’৩৫ বার্তাটির সম্পূর্ণ মিল রয়েছে।
শ্রীরামকৃষ্ণ-কথিত গল্পকথাগুলি শুধুমাত্র গল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাঙালি সমাজের গাঢ় সমাজসত্য ও জীবনশৈলী মিশে আছে এর মধ্যে। সমাজের প্রতিটি স্তরে মানুষের স্বভাব, বর্ণগত অবস্থান ও বিত্তগত অবস্থান তাকে কখনও কোনো সুযোগ সহজেই পাইয়ে দেয়, কখনও সঠিক প্রাপ্য থেকে নির্মমভাবে বঞ্চিত করে। এই প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ একটি দীর্ঘ গল্প বলেছেন:
শ্রীরামকৃষ্ণ—লোকের সঙ্গে বাস করতে গেলেই দুষ্ট লোকের হাত থেকে আপনাকে রক্ষা করবার জন্য একটু তমোগুণ দেখানো দরকার! কিন্তু সে অনিষ্ট করবে বলে উলটে তার অনিষ্ট করা উচিত নয়।
“এক মাঠে এক রাখাল গরু চরাত। সেই মাঠে একটা ভয়ানক বিষাক্ত সাপ ছিল। সকলেই সেই সাপের ভয়ে অত্যন্ত সাবধানে থাকত। একদিন একটি ব্রহ্মচারী সেই মাঠের পথ দিয়ে আসছিল। রাখালেরা দৌড়ে এসে বললে,’ঠাকুর মহাশয়! ওদিক দিয়ে যাবেন না। ওদিকে একটা ভয়ানক বিষাক্ত সাপ আছে।’ ব্রহ্মচারী বললে,’বাবা, তা হোক; আমার তাতে ভয় নাই, আমি মন্ত্র জানি!’ এই কথা বলে ব্রহ্মচারী সেইদিকে চলে গেল। রাখালেরা ভয়ে কেউ সঙ্গে গেল না। এদিকে সাপটা ফণা তুলে দৌড়ে আসছে, কিন্তু কাছে না আসতে আসতে ব্রহ্মচারী যেই একটি মন্ত্র পড়লে, আমনি সাপটা কেঁচোর মতন পায়ের কাছে পড়ে রইল। ব্রহ্মচারী বললে,’ওরে, তুই কেন পরের হিংসা করে বেড়াস; আয় তোকে মন্ত্র দিব। এই মন্ত্র জপলে তোর ভগবানে ভক্তি হবে, ভগবানলাভ হবে, আর হিংসা প্রবৃত্তি থাকবে না।’ এই বলে সে সাপকে মন্ত্র দিল। সাপটা মন্ত্র পেয়ে গুরুকে প্রণাম করলে আর জিজ্ঞাসা করলে,’ঠাকুর! কি করে সাধনা করব, বলুন?’ গুরু বললেন,’এই মন্ত্র জপ কর, আর কারও হিংসা করো না।’ ব্রহ্মচারী যাবার সময়ে বললে,’আমি আবার আসব।’
“এইরকম কিছুদিন যায়। রাখালেরা দেখে যে, সাপটা আর কামড়াতে আসে না! ঢ্যালা মারে তবুও রাগ হয় না, যেন কেঁচোর মতন হয়ে গেছে। একদিন একজন রাখাল কাছে গিয়ে ল্যাজ ধরে খুব ঘুরপাক দিয়ে তাকে আছড়ে ফেলে দিলে। সাপটার মুখ দিয়ে রক্ত উঠতে লাগল, আর সে অচেতন হয়ে পড়ল। নড়ে না, চড়ে না। রাখালেরা মনে করলে যে, সাপটা মরে গেছে। এই মনে করে তারা সব চলে গেল।
“অনেক রাত্রে সাপের চেতনা হল। সে আস্তে আস্তে অতি কষ্টে তার গর্তের ভিতর চলে গেল। শরীর চূর্ণ—নড়বার শক্তি নাই। অনেকদিন পরে যখন অস্থিচর্মসার তখন বাহিরে আহারের চেষ্টায় রাত্রে এক-একবার চরতে আসত; ভয়ে দিনের বেলা আসত না, মন্ত্র লওয়া অবধি আর হিংসা করে না। মাটি, পাতা, গাছ থেকে পড়ে গেছে এমন ফল খেয়ে প্রাণধারণ করত।
“প্রায় এক বৎসর পরে ব্রহ্মচারী সেইপথে আবার এল। এসেই সাপের সন্ধান করলে। রাখালেরা বললে,’সে সাপটা মরে গেছে।’ ব্রহ্মচারীর কিন্তু ও-কথা বিশ্বাস হল না! সে জানে,যে মন্ত্র ও নিয়েছে তা সাধন না হলে দেহত্যাগ হবে না। খুঁজে খুঁজে সেইদিকে তার নাম ধরে ডাকতে লাগল। সে গুরুদেবের আওয়াজ শুনে গর্ত থেকে বেড়িয়ে এল ও খুব ভক্তিভাবে প্রণাম করলে। ব্রহ্মচারী জিজ্ঞাসা করলে,’তুই কেমন আছিস?’ সে বললে, ‘আজ্ঞে ভাল আছি।’ ব্রহ্মচারী বললে, ‘তবে তুই এত রোগা হয়ে গিছিস কেন?’ সাপ বললে,’ঠাকুর আপনি আদেশ করেছেন—কারও হিংসা করো না, তাই পাতাটা ফলটা খাই বলে বোধ হয় রোগা হয়ে গিছি!’ ওর সত্ত্বগুণ হয়েছে কি না,তাই কারু উপর ক্রোধ নাই। সে ভুলেই গিয়েছিল যে, রাখালেরা মেরে ফেলবার যোগাড় করেছিল। ব্রহ্মচারী বললে,’শুধু না খাওয়ার দরুন এরূপ অবস্থা হয় না, অবশ্য আরও কারণ আছে, ভেবে দেখ।’ সাপটার মনে পড়ল যে, রাখালেরা আছাড় মেরেছিল। তখন সে বললে,’ঠাকুর মনে পড়েছে বটে, রাখালেরা একদিন আছাড় মেরেছিল। তারা অজ্ঞান, জানে না যে আমার মনের কি অবস্থা; আমি যে কাহাকেও কামড়াব না বা কোনরূপ অনিষ্ট করব না, কেমন করে জানবে?’ ব্রহ্মচারী বললে,’ছি! তুই এত বোকা, আপনাকে রক্ষা করতে জানিস না; আমি কামড়াতে বারণ করেছি, ফোঁস করতে নয়! ফোঁস করে তাদের ভয় দেখাস নাই কেন?’
“দুষ্ট লোকের কাছে ফোঁস করতে হয়, ভয় দেখাতে হয়, পাছে অনিষ্ট করে। তাদের গায়ে বিষ ঢালতে নাই, অনিষ্ট করতে নাই।”৩৬
এই গল্পটিই ‘কথামৃত’র সবচেয়ে দীর্ঘ গল্প। এই গল্পের মধ্যে দিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ একটি আধ্যাত্মিক উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি একটি জীবনমুখী উপদেশও দিয়েছেন চমৎকারভাবে। একজন সমাজ সচেতন মানুষ ছাড়া এই গল্প উপস্থাপন করা অসম্ভব। এই গল্পটি নিঃসন্দেহে একটি উৎকৃষ্ট মানের রূপক গল্প। বাঙালি সংস্কৃতির একটি কালো অধ্যায় এই গল্পে উঁকি দিয়ে যায়। সেই অর্থে এই গল্পটি একটি সামাজিক গল্প। লক্ষ্য করার মতো বিষয় এই দীর্ঘ গল্পটি বলতে বলতে শ্রীরামকৃষ্ণ মাঝে মাঝে গল্পটির কিছু অংশের ব্যাখ্যাও করে দিচ্ছেন। এই গল্পের সাপটি সাধুর আশীর্বাদে প্রকৃত সত্ত্বগুণী হওয়ার জন্য হিংসক রাখালদের নির্মম আক্রামণের কথা ভুলেই গিয়েছিল, কিন্তু সাপটি হঠাৎ করে এসব কেন ভুলে গিয়েছিল তার সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করে বলছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। এই ব্যাখ্যাটুকুই গল্পটিকে তত্ত্বের বাইরে গিয়ে আরও বেশিমাত্রায় সাধারণের উপযোগী করে তুলল। এবং লক্ষ্য করার মতো বিষয় ঠিক গল্পের শেষে রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণের অভিপ্রেত মূল উপদেশটি। শক্রকে হিংসাত্মক আক্রমণ না করলেও উপযুক্ত সময় ফোঁস করে ভয় দেখাতে হয়, অসতের কাছে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে নিজের ক্ষমতা ও শক্তির প্রদর্শন করাতে হয়, নইলে যথার্থ সৎ মানুষেরও বড় বিপদ হতে পারে খারাপ লোকের জন্য। পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের হুগলির দেরে গ্রাম ছেড়ে আসার অভিজ্ঞতার ঘটনাটি শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে অজানা থাকার কথা নয়। সেক্ষেত্রেও অনেকাংশে এমনই একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় দেরে গ্রামে অসৎ জমিদারের কাছে চরম হেনস্থার শিকার হয়েছিলেন। হয়তো এই গল্পটিকে তাঁর পিতার জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
বাঙালি সংস্কৃতির সামান্যতম উপকরণ থেকে ‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণ এক-একটি গল্প সাজিয়েছেন। এই সব সামান্য উপকরণগুলি থেকেও শ্রীরামকৃষ্ণ যেভাবে একটি জীবনমুখী গাঢ় মনোজ্ঞ বার্তা দিয়ে যান, সেটি এক কথায় অসাধারণ! উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে উৎকৃষ্ট কথাসাহিত্যিকের কোনো অভাব নেই, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের সেই অর্থে কথাসাহিত্যিক না হলেও তাঁর গল্পগুলি এক অনন্য ধারার। কত বিচিত্র জনজীবন অনায়াসে তাঁর গল্পে চরিত্র হয়ে এসেছে। পৌরাণিক-মহাকাব্যিক চরিত্র থেকে পৃথিবীর ধুলোয় ধূসর সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ও তাদের চাওয়া-পাওয়া, ভারতের সুবিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী সম্রাট থেকে ক্ষুদ্র গ্রামীণ জমিদার, স্বার্থান্বেষী ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত থেকে সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, বাড়ির সুনিপুণা লক্ষ্মীমন্ত গৃহিণী থেকে ছলনাময়ী কুটিল পতিতা সেই দীর্ঘ তালিকায় কে নেই? গ্রামীণ লোকপেশা মধ্যে রাখাল, কৃষক, কুমোর, কামার, ছুতোর, স্যাকরা, কাঠুরিয়া, ব্যাধ, চোর, ডাকাত, তাঁতি, ওঝা, বাজিকর, বহুরূপী, কুস্তিগীর, মালী, গোয়ালানি, মেছুনী, ভিক্ষুক সহ আরও অনেক পরিচিত পেশার মানুষ এসেছে তাঁর বিভিন্ন গল্পের বিভিন্ন চরিত্রে। তবে এই সব গল্পে কোনো পেশাকে ছোট বা বড় করে দেখানোর চেয়ে তিনি বেশি জোর দিয়েছেন মানুষের অন্তর্নিহিত নিষ্ঠা, ভক্তি, বিশ্বাস, একাগ্রতা, সততা ওপর। সেই দিক থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের গল্পে মানুষ দুই প্রকার—সৎ ও অসৎ। তাদের ধর্ম-বর্ণ-জাতি-লিঙ্গ-বিত্ত-পেশার চেয়ে তাদের অন্তরের সততাই তাদের চরিত্রের প্রধানতম মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। সেই কারণেই তাঁর গল্পের পরিশ্রমী কৃষক দিনের শেষে অক্লান্ত পরিশ্রমের পর জমিতে জল আনতে সফল হয়৩৭, দরিদ্র কাঠুরিয়া সাধু-ব্রহ্মচারীর নির্দেশে শুধু সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে রত্নগর্ভা খনির সন্ধান পায়৩৮, চোর আত্মরক্ষার জন্য সাধুর অভিনয় করতে গিয়ে প্রকৃত সাধু হয়ে যায়৩৯, পেশাদার বহুরূপী সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী সেজে অর্থস্পর্শ করতে পারে না৪০! কিছু কিছু ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের গল্পগুলিকে তাঁর বক্তব্যের উপমা হিসাবেও দেখা যেতে পারে। শুধু উপমা হিসাবে গল্পগুলিকে যদি দেখা যায়, তাতেও গল্পগুলির গল্পরসের রসগ্রহণে কোনোভাবেই হানি হয় না। এটিও শ্রীরামকৃষ্ণের গল্পের আরেকটি অনন্যতা।
শ্রীরামকৃষ্ণের অনেক ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল। কামারপুকুর গ্রামের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা কথকতা, কীর্তন, যাত্রাপালা বা পাঁচালির গান তিনি অনায়াসে রপ্ত করতে পারতেন। সেই গানগুলি তিনি সকলকে গেয়ে শোনানোর মধ্যে বিশেষ আনন্দ পেতেন। কামারপুকুর গ্রামে বালক শ্রীরামকৃষ্ণের সুকণ্ঠের জন্য গানের ক্ষেত্রে বেশ সুনামও তৈরি হয়েছিল।৪১ এর প্রায় একই তথ্য পাওয়া যায় ‘কথামৃত’র ১১৮৩-এর ১০ জুনের বর্ণনায়। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, তিনি প্রথাগত বাদ্যযন্ত্র সহকারে ‘সা-রে-গা-মা’ প্রভৃতির মাধ্যমে স্বরসাধনা করেননি। তিনি চমৎকার গান গাইতে পারতেন ‘কথামৃত’-এ তার অনেকবার উল্লেখ রয়েছে এবং গান সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে তাঁর নানা মন্তব্য থেকে বোঝা যায় গান বা সঙ্গীত সম্পর্কে তাঁর স্বচ্ছ ধারণা ছিল। দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে রানি রাসমণি দেবীও তাঁর গানের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন।৪২ ‘কথামৃত’-এ দেখা যায় পরিণত বয়সেও শ্রীরামকৃষ্ণ সমান সঙ্গীতপ্রিয়। সমগ্র ‘কথামৃত’ জুড়ে মোট ৪৭২টি গান রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক গানের মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ প্রায় ১৮২টি গানে স্বয়ং সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন, কখনও গানের ধ্রুবপদটির আখর দিয়েছেন এবং কম-বেশি ২২টি গান তিনি নিজের অনুভব মিশিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। সঙ্গীতানুরাগী শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন শ্যামাসঙ্গীত শুনতে ভালোবাসতেন তেমনই তিনি অজস্র বৈষ্ণবীয় ভাবরসের গান, কীর্তনাঙ্গের গান, হিন্দি-দোঁহা, বাউলগীতি থেকে ব্রাহ্মসমাজের ব্রহ্মসঙ্গীতের সঙ্গে অনায়াসে একাত্ম হতে পারতেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের গানের ক্ষেত্রে তাঁর কোনো ভেদাভেদ ছিল না, তবে কীর্তনাঙ্গের গানের প্রতি তাঁর বিশেষ উৎসাহ ছিল। তিনি গান সম্পর্কে বলেছিলেন,’এমন গান হবে সবাই নাচবে!’৪৩ কাব্য যখন সুরের মূর্ছনার স্পর্শ পায়, তখন তা গান হয়ে ওঠে, আর গান যখন হৃদয়ের সবটুকু আনন্দ প্রকাশে সমর্থ হয়, তখন উপভোক্তার স্থির থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠে ও শুরু হয় নাচ! বাংলার কীর্তনধর্মী গানগুলি এইভাবে মাতিয়ে তোলার দক্ষতা অর্জন করে চলেছে বহু শতাব্দী ধরে। অনুগামীদের সঙ্গে কীর্তনানন্দে মেতে থাকা শ্রীরামকৃষ্ণের ছবি বহুবার ‘কথামৃত’-এ দেখা গেছে। প্রাচ্য দেশে সঙ্গীতের ধারণার সঙ্গে একই সঙ্গে গীত-বাদ্য-নৃত্যের সংযোগ আছে। এই তৌর্যত্রিক সংজ্ঞাই প্রাচ্য ভারতে সঙ্গীতের সংজ্ঞা ‘কথামৃত’র কীর্তনানন্দে মেতে থাকা শ্রীরামকৃষ্ণের ছবি এর সঙ্গে যথাযথভাবে মিলে যায়। ‘কথামৃত’ পরিসরে অজস্র গানগুলির মধ্যে বিশেষ করে কয়েকটি গান বারবার করে বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন জায়গায় শ্রীরামকৃষ্ণের উপস্থিতিতে গাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গান—
(১) কত দিনে হবে সে প্রেম সঞ্চার।
হয়ে পূর্ণকাম বলব হরিনাম, নয়নে বহিবে প্রেম-অশ্রুধার।।৪৪,
(২) গৌর নিতাই তোমরা দুভাই, পরম দয়াল হে প্রভু৪৫,
(৩) নদে টলমল টলমল করে গৌরপ্রেমের হিল্লোলে রে৪৬,
(৪) যাদের হরি বলতে নয়ন ঝরে,
তারা, তারা দুভাই এসেছে রে!৪৭,
(৫) আমি দুর্গা দুর্গা বলে মা যদি মরি৪৮,
(৬) অভয়পদে প্রাণ সঁপেছি।
আমি আর কি যমের ভয় রেখেছি৪৯,
(৭) সকলি তোমার ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি।
তোমার কর্ম তুমি কর মা, লোকে বলে করি আমি।৫০,
(৮) শ্যামা মা কি কল করেছে৫১,
(৯) শিব সঙ্গে সদারঙ্গে আনন্দে মগনা।
সুধাপানে ঢল ঢল কিন্তু ঢলে পড়ে না মা!৫২,
(১০) চিদানন্দ সিন্ধুনীরে প্রেমানন্দের লহরী৫৩,
(১১) ডুব্ ডুব্ ডুব্ রূপসাগরে আমার মন৫৪,
(১২) গয়া গঙ্গা প্রভাসাদি কাশী কাঞ্চী কেবা চায়৫৫,
(১৩) নিবিড় আঁধারে মা তোর চমকে ও রূপরাশি৫৬
(১৪) আপনাতে আপনি থেকো মন যেও নাকো কারু ঘরে।
যা চাবি তাই বসে পাবি, খোঁজ নিজ অন্তঃপুরে।।৫৭ ইত্যাদি।
এই গানগুলির বাইরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের আরও অনেকগুলি প্রিয় গানের উল্লেখ রয়েছে ‘কথামৃত’-এ। কীর্তনাঙ্গের গানগুলি ছাড়াও যোগশাস্ত্র বিষয়ক গূঢ়তত্ত্ববাহক গান ও বাউল গানের তত্ত্বকথায় তিনি শান্ত-সংযত হয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে পারতেন। ব্রাহ্মসমাজের ব্রহ্মসঙ্গীতের সঙ্গে কীর্তনের বিস্তর পার্থক্য থাকলেও ব্রাহ্মসমাজের গানের সঙ্গে তিনি খুব পরিচিত ছিলেন। ১৮৮৪-এর ৪ অক্টোবর কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিনে শ্রীরামকৃষ্ণের বিশেষ অনুরোধে আগত ব্রাহ্মভক্তরা গেয়েছিলেন:
তুমি সর্বস্ব আমার (হে নাথ) প্রাণাধার সারাৎসার।
নাহি তোমা বিনে, কেহ ত্রিভুবনে, আপন বলিবার।৫৮
‘কথামৃত’র গানগুলির মধ্যে লক্ষ্য করা যায় ঈশ্বরের ঐশ্বর্যময় রূপবর্ণনার চেয়ে তাঁর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও শরণাগতির কথা যে সব গানে রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে সেই গানগুলিই তুলনামূলক বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। শাক্তগীতিকার রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের গান শ্রীরামকৃষ্ণের বিশেষ পছন্দ ছিল। ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারকে তিনি শ্রীম’র হাত দিয়ে রামপ্রসাদ ও কমলাকান্তের গানের বই উপহার দিয়েছিলেন।৫৯ কবি রামপ্রসাদ সেনের গানের সারল্য ও পূর্ণ-শরণাগতির বার্তা শ্রীরামকৃষ্ণের উপর অনেকটাই প্রভাব ফেলেছিল। বিভিন্ন দিনের বৈঠকে কথাপ্রসঙ্গে মাঝে মাঝেই তিনি রামপ্রসাদের গান থেকে বহুবার উদাহরণ দিয়েছেন। সমসাময়িক নাটকগুলির মধ্যে স্টার থিয়েটারে অভিনীত গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘চৈতন্যলীলা’ নাটকের গানগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি গানই ‘কথামৃত’-এ রয়েছে। এর বাইরেও এই গ্রন্থে এমন অনেক পদ রয়েছে, যে গানগুলির সম্পূর্ণ পদটির সন্ধান পাওয়া যায় না। যেমন—’নদে টলমল টলমল করে গৌরপ্রেমের হিল্লোলে রে’৬০ পদটির ‘কথামৃত’-এ কমপক্ষে পাঁচবার উল্লেখ থাকলেও পদটির প্রথমাংশ ছাড়া আর বেশি কিছু পাওয়া যায়নি। এমন আরও অনেক গান রয়েছে। ‘কথামৃত’র গানগুলির মধ্যে শুধুমাত্র বিখ্যাত কিছু গীতিকার বা পদকর্তাদের পদই গাওয়া হয়েছে এমন নয়, অনেক পদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পদের পাশাপাশি পদকর্তার নাম পর্যন্ত জানা যায়নি। এই সব বাংলা গানের পাশাপাশি ব্রজবুলি ভাষায় বেশ কিছু বৈষ্ণবপদ এবং হিন্দি ভাষায় কিছু দোঁহা ‘কথামৃত’-এ রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কিছু স্তব ও স্তোত্রাবলী সংস্কৃত ভাষায়। ‘কথামৃত’র প্রাণপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ গানের মধ্যে দিয়েও অনায়াসে ভিন্ন ভিন্ন মতের মিল ঘটিয়ে দিতে পারতেন। ‘কথামৃত’র ১৮৮৪-এর ৩ জুলাই বাগবাজারের বলরাম ভবনে শ্রীজগন্নাথ দেবের রথের পুনর্যাত্রার দিনে বৈষ্ণবীয় আনন্দোৎসবের আবহে শ্রীরামকৃষ্ণ শ্যাম ও শ্যামাকে গানে গানে এক করে তুলেছিলেন।৬১ শুধু গান নয়, আন্তরিক গায়কের ক্ষেত্রেও তাঁর কোনো কৃত্রিম বাছবিচার ছিল না। শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন নরেন্দ্রনাথ, কীর্তনীয়া বৈষ্ণবচরণ, নিজের ভ্রাতুষ্পুত্র রামলালের মতো পরিচিত লোকের আন্তরিক গান শুনে মুগ্ধ হয়েছেন, তেমনই বাগবাজারে বলরাম বসুর বাড়িটি থেকে গিরিশচন্দ্র ঘোষের বাড়ির দিকে রওনা হওয়ার মুখে আগত জনৈক সুকণ্ঠ হিন্দুস্থানী ভিখারীর গাওয়া শ্রীরামচন্দ্র বিষয়ক গানও অন্তর্মুখ হয়ে শুনেছেন।৬২ ‘কথামৃত’র এই বিপুল সংখ্যক গানগুলি এই গ্রন্থ থেকে সম্পূর্ণ বাদ দিলে অনেক জটিলতর তাত্ত্বিক কথার আবহটি পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ‘কথামৃত’-এ গানে গানে ভরপুর হয়ে থাকা অনেকগুলি দিনও নিষ্প্রাণ হয়ে যায়।৬৩ ‘কথামৃত’র মধ্যে এমন অনেক আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনাবিশিষ্ট প্রসঙ্গ রয়েছে, যার ভাষ্যনির্মাণ বা তত্ত্বের সহজতর ব্যাখ্যাটিই মিশে আছে গানের সঙ্গে। ‘কথামৃত’র গানগুলি শুধুমাত্র গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ‘কথামৃত’র প্রাণপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণকে চেনার একটি ধাপ।
শ্রীম-কথিত ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’ নিঃসন্দেহে একটি উৎকৃষ্ট মানের বাংলা ধর্মসাহিত্য। বিশ্বসাহিত্যেও ‘কথামৃত’র যথার্থ জুড়ি মেলা ভার। এই গ্রন্থের সঙ্গে বাঙালির একাংশের ধর্মচর্চা প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে থাকার ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘কথামৃত’কে সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণে বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়। অথচ ধর্মচর্চার বাইরে সাধারণ পাঠকের কাছেও ‘কথামৃত’ একটি প্রিয়পাঠের গ্রন্থ। প্রচলিত অর্থে কথামৃতকার মাস্টার মশাই শ্রীম বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক না হলেও বিনাদ্বন্দ্বে অবশ্যই তিনি একজন ‘প্রিয়জন’ লেখক। হয়তো এই কারণেই এখনও শ্রীম’র ‘কথামৃত’ বাঙালি ও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সর্বকালের ‘বেস্ট সেলার’। ১৯৮৩-এর ১ জানুয়ারি ‘কথামৃত’র ৫০ বছর পূর্তিতে ‘কথামৃত’ কপিরাইট মুক্ত হওয়ার পর থেকে ‘কথামৃত’র জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর শুধু বেড়েই চলেছে। ১৯৮৩-এ ‘কথামৃত’ কপিরাইট মুক্ত হওয়ার দিনই কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায় একসঙ্গে প্রায় সাত-আটটি প্রকাশনী সংস্থা ‘কথামৃত’ প্রকাশ করে।৬৪ এই ঘটনা বাংলা প্রকাশনা জগতে ইতিপূর্বে কখনও ঘটেনি। ‘কথামৃত’ এই বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে শ্রীম’র অসাধারণ লিখনকৌশল, এই গ্রন্থের প্রামাণিকতা ও সাহিত্যের উপাদানগত বৈচিত্র্যের জন্য।
• উপমার বৈচিত্র্য:
ভারতীয় সাহিত্যরসিকদের কাছে অতি পরিচিত বাক্যাংশ ‘উপমা কালিদাসস্য’। সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম মহাকবি কালিদাসের অসাধারণ অলংকার বিন্যাসের দক্ষতা থেকে ভারতীয় সভ্যতায় এই বাক্যাংশটি জন্ম নিয়েছে। মহাকাবি কালিদাসের উপমা নিঃসন্দেহে ভারতীয় সাহিত্যের প্রথম শ্রেণির দাবিদার। সেদিক থেকে বলা যায় কালিদাসের উপমার উপমা তিনি স্বয়ং নিজেই। কালিদাসের মতোই শ্রীরামকৃষ্ণের উপমা নির্বাচনের দক্ষতা যথেষ্ট বলিষ্ঠ। প্রচলিত অর্থে অলংকার ও উপমা সমার্থক মনে হলেও, উভয়ের মধ্যে কিছু ব্যাকরণ ও প্রকরণগত পার্থক্য আছে। বৃহৎ অলংকার পরিবারের একজন সদস্য মাত্র উপমা অলংকার। শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন বলেছেন নদীরই ঢেউ, ঢেউয়ের নদী নয়৬৫, এক্ষেত্রেও হয়তো অনুরূপ বলা চলে। ‘কথামৃত’ বিশ্লেষণ করে দেখা যাবে শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যবহৃত উপমাগুলি ‘কথামৃত’র ভার বৃদ্ধি না করে এই গ্রন্থের সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে অধিক সহায়ক হয়েছে। প্রাচ্যদেশের অধিকাংশ সারস্বত কবিরা মূলত তাঁদের কাব্যে শৈল্পিক-সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যই উপমাদি-অলংকার ব্যবহার করেছেন। সেক্ষেত্রে তাঁরা মূলত পার্থিব সৌন্দর্যময় উপাদানগুলিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি। ‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যবহৃত উপমাগুলি এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার। তাঁর উপমাগুলি অতিরিক্ত ভারবাহী নয়। উপমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অশুদ্ধ বা শুদ্ধ শব্দ, শ্লীল বা অশ্লীল শব্দের ভেদাভেদ তাঁর নেই। ‘শব্দের পবিত্র শিখা’ প্রবন্ধে শঙ্খ ঘোষ জানিয়েছেন, শব্দ জড় স্থানু একক, তার নিজের কোনো পবিত্রতা বা অপবিত্রতা নেই। প্রতিটি শব্দই শুদ্ধ। শব্দের বিভিন্ন বাক্যিক প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে মাঝে মাঝে দেশকালবন্দিত রুচির সঙ্গে তার সংঘাত তৈরি হয়।৬৬ শ্রীরামকৃষ্ণের উপমা নির্বাচনের মনোভাবটিও ঠিক একই রকম। এই কারণেই শ্রীরামকৃষ্ণ ঈশ্বর প্রসঙ্গে যেমন সৌন্দর্যময় চাঁদের উপমা৬৭ ব্যবহার করেন, তেমনই বাচ্চা ছেলের বাহ্যে যাওয়ার উপমার৬৮ অনায়াস ব্যবহার করতে পারেন। বক্তব্যকে অতিরিক্ত কাব্যমণ্ডিত করে তোলার জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ উপমার ব্যবহার করেন না, নিজের বক্তব্যের জটিল তত্ত্বকথাকে শ্রোতাদের কাছে অপেক্ষাকৃত সহজ করে তোলার অভিপ্রায় থেকেই তিনি উপমার ব্যবহার করেছেন। ‘কথামৃত’র বিপুল উপমাবৈচিত্র্যকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়—
‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণের উপমার সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারতের টুকরো টুকরো কথা, বিভিন্ন পুরাণপ্রসঙ্গ, বাংলাদেশের মঙ্গলকাব্য ও মহাকাব্য-পুরাণাদি থেকে জন্ম নেওয়া কিছু কিছু লোককাহিনি। ‘কথামৃত’ অনুসারে শ্রীম’র তৃতীয় দর্শনের দিনে শ্রীরামকৃষ্ণ ঈশ্বরে বিশ্বাস প্রসঙ্গে প্রথম রামায়ণী অনুসঙ্গে উপমা দিয়ে বলেন শ্রীরামচন্দ্র পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণ অথচ তাঁর জন্য সাগরের বুকে সেতু বাঁধতে হয়েছিল, আর হনুমান শুধু রামনামে নির্ভর করে সমুদ্র পার হয়ে গিয়েছিল!৬৯ আরেকদিন ঈশ্বরের বহুবিধ লীলাপ্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ একটি চমৎকার উপমা পেশ করেছেন, রামচন্দ্রের লঙ্কাবিজয় ও রাবণের মৃত্যুর পর রাবণের মা নিকষা সবকিছু হারানোর পরেও পালিয়ে আরও বেশিদিন বাঁচতে চাইছেন শুধুমাত্র রামচন্দ্রের অনন্তলীলা আরও বেশি করে দেখবার ইচ্ছায়।৭০ এছাড়াও ‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণ রাবণ-কুম্ভকর্ণ-বিভীষণকে মানুষের তিনটি গুণের সঙ্গে তুলনা করেছেন।৭১ তিনি বনবাসী রামচন্দ্র, সীতাদেবী ও লক্ষ্মণের উপমায় ব্রহ্ম, মায়াশক্তি ও জীবকে ব্যাখ্যা করেছেন।৭২ জীবদেহ গ্রহণ করলেই মায়ার শিকার হতে হয়, ‘কথামৃত’-এ তিনি সীতা বিরহে রামচন্দ্রের কাতর হওয়ার উপমায় মায়ার চমৎকার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।৭৩ ‘কথামৃত’ জুড়ে রামায়ণ সম্পর্কিত এতগুলি উপমা রয়েছে যা স্বল্প পরিসরে বিশ্লেষণ দুঃসাধ্য। রামায়ণ মহাকাব্যের চরিতাবলীর মধ্যে দশরথ, কৌশল্যা, কৈকেয়ী, রামচন্দ্র, সীতা, লক্ষ্মণ, ভরত, বালিরাজা, হনুমান, গুহক চণ্ডাল, বশিষ্ঠ, ভরদ্বাজ সহ অন্যান্য ঋষিগণ, অহল্যা, শবরী, পরশুরাম, লব-কুশ, নিকষা, রাবণ, কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ, মন্দোদরী সহ আরও অনেক চরিত্র ও তাঁদের গুণাবলী শ্রীরামকৃষ্ণের উপমার বিষয় হয়ে উঠেছে। ‘কথামৃত’-এ রামায়ণ মহাকাব্যের তুলনায় মহাভারতের উপমা অনেকটাই কম। শ্রীরামকৃষ্ণ সমবেত অনুরাগীদের জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ঈশ্বরের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করার ক্ষেত্রে জীবনের সর্বাবস্থায় ঈশ্বরানুরাগী পাণ্ডবদের উপমা দিয়েছেন।৭৪ ভারতীয় দানমাহাত্ম্য ও কর্মফলবাদ বিশ্লেষণের সময় শ্রীরামকৃষ্ণ মহাভারত থেকে দ্রৌপদীর পূর্বজীবনে একজন ঋষিকে লজ্জা রক্ষার জন্য বস্ত্রদানের ফলস্বরূপ কুরুসভায় শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বস্ত্রহরণের সময় রক্ষা করার উপমা পেশ করেছেন।৭৫ ঈশ্বর ভক্তাধীন, তিনিও ভক্তকে ভালোবাসেন ‘কথামৃত’-এ এই বার্তা তিনি বিদুরের মতো দরিদ্রের গৃহে শ্রীকৃষ্ণের শাকান্নে তৃপ্ত হওয়ার উপমায় ব্যক্ত করেছেন।৭৬ মহাভারতের ব্যাসদেব, শ্রীকৃষ্ণ, রুক্মিণী, সত্যভামা, ভীষ্মদেব, বিদুর, দ্রৌপদী, যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, একত্রে পঞ্চপাণ্ডবের সকলে, অভিমন্যু, দুর্যোধন সহ আরও অজস্র মহাকাব্যিক চরিত্রেরা শ্রীরামকৃষ্ণের উপমার পরিসরে অনেকবার এসেছেন। শ্রীমদ্ভাগবত থেকে যেমন বিভিন্ন প্রসঙ্গে নন্দরাজ, যশোদা মা, শ্রীমতি রাধারানী, রাখাল, গোপীবৃন্দ প্রভৃতি চরিত্র তাঁদের গুণাবলী নিয়ে ‘কথামৃত’র উপমায় উঠে এসেছেন, তেমনই বিভিন্ন পুরাণের দেবচরিত্র-মধ্যে ব্রহ্মা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, নারায়ণ ও তাঁর বিভিন্ন অবতার, শিব, দেবী মহামায়ার বিভিন্ন রূপ, দেবর্ষি নারদ সহ আরও অনেকের নাম ‘কথামৃত’-এ পাওয়া যায়। তবে মহাভারত মহাকাব্য ও ভাগবতপুরাণ—উভয় ক্ষেত্রেই শ্রীকৃষ্ণ প্রাধান্য পাওয়ার জন্য কিছু ক্ষেত্রে এই দুটি গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত উপমা-প্রসঙ্গ প্রায় অবিচ্ছেদ্য মনে হয়। এছাড়াও অখণ্ড বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ মঙ্গলকাব্যের মধ্যে ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের দেবী অন্নপূর্ণার কৃপায় কাশীতে কারো অভুক্ত না থাকার চিরন্তনী কথা৭৭ এবং সুখ-দুঃখ উভয়ই মানুষের দেহ-ধারণের ধর্ম একথা প্রসঙ্গে ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যের আখেটিক খণ্ডের ব্যাধবীর কালকেতু এবং বণিক খণ্ডের খুল্লনা ও শ্রীমন্তের উপমা৭৮ ‘কথামৃত’-এ পাশাপাশি চিত্রিত হয়েছে।
শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে উনিশ শতকের গ্রাম বাংলার জনজীবনের যোগাযোগ ছিল দীর্ঘকাল। তিনি নিজে কামারপুকুরের গ্রামতনয় হওয়ার সুবাদে গ্রাম সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। তাঁর গ্রাম সম্পর্কিত অভিজ্ঞতাগুলিই ‘কথামৃত’-এ উপমার আকারে প্রকাশিত হয়েছে অনেকবার। বিষয়াসক্ত জীবনে ঈশ্বরচিন্তা থেকে ব্যহত হওয়াকে তিনি চাষজমির আলের গর্তের৭৯ উপমা দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। আবার মানুষের জীবনের জন্মন্তরবাদ ব্যাখ্যায় তিনি কুমোরের কাঁচা ও পাকা হাঁড়ির উপমা৮০ দিয়ে বলেছেন মানুষের জীবনে একবার ঈশ্বরলাভ বা মোক্ষপ্রাপ্তি হয়ে গেলে আর পুনর্জন্ম হয় না। এই একই প্রসঙ্গে তিনি সিদ্ধ ধান পুঁতে ফসল উৎপাদন৮১ না হওয়ার উপমায় তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পরিশ্রমী মানুষের একনিষ্ঠা ও দীর্ঘ অভ্যাসকে তিনি খানদানি চাষার৮২ উপমায় বিশেষিত করেছেন। সংসারে থেকেও ঈশ্বরচিন্তা ও জ্ঞানলাভ সম্ভব তবে এমনভাবে জীবন কাটাতে খুব কম মানুষই পারে, এই বক্তব্যকে তিনি গ্রামের মেয়েদের খই ভাজার সময় দু-চারটে খইয়ের লাফিয়ে ওঠার৮৩ উপমায় চিত্রিত করেছেন। গ্রামের ছুতোর সম্প্রদায়ের মেয়েদের চলন্ত ঢেঁকির সামনে একইসঙ্গে একহাতে চিঁড়ে কোটা ও আর একহাতে বাকি সমস্ত কাজ অনায়াসে করার৮৪ উপমায় শ্রীরামকৃষ্ণ অভ্যাসযোগ ও সংসারী মানুষের সংসারে থেকেও ঈশ্বরচিন্তা করার উপযোগী উপদেশ দিয়েছেন। এছাড়াও শ্রীরামকৃষ্ণ গৃহস্থাশ্রম প্রসঙ্গে নির্জনে চাল কাঁড়া৮৫, মনে প্রকৃত ত্যাগ না করে বাহ্যিক গেরুয়াধারণ প্রসঙ্গে একই মানুষের শুধু পেশা পরিবর্তন করে চণ্ডীর গান ছেড়ে ঢাক বাজানোর পেশায় যুক্ত হওয়া৮৬, অজ্ঞানতা বশে নিজের ভেতরের দেবতাকে জাগ্রত না করে তীর্থে ঘুরে বেড়ানোকে তিনি হাতে লণ্ঠন নিয়ে অন্ধকারে প্রতিবেশীর বাড়িতে তামাক খাওয়ার টিকে ধরাতে যাওয়ার৮৭ উপমায় বিশেষিত করে ব্যাখ্যা করেছেন।
আনুমানিক ১৮৫৩ নাগাদ শ্রীরামকৃষ্ণ প্রথম প্রত্যক্ষত কলকাতা শহরের সঙ্গে পরিচিত হন। এরপর প্রায় তিন দশকের বেশি সময় তিনি মূলত কলকাতায় অবস্থান করেছেন। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের নগর কলকাতার বিভিন্ন প্রসঙ্গ সেই সূত্রে তাঁর উপমার বিষয় হয়ে উঠেছে। শ্রীরামকৃষ্ণের উপমাগুলির সঙ্গে যে তাঁর জীবনাভিজ্ঞতা মিশে আছে তার কিছু প্রমাণ ‘কথামৃত’র শহর-বিষয়ক কিছু উপমায় পাওয়া যায়। যেমন—১৮৮২-এর ১৫ নভেম্বর শ্রীরামকৃষ্ণ গড়ের মাঠে সার্কাস দেখতে গিয়েছিলেন, সেখানে জনৈকা সার্কাস শিল্পীর ছুটন্ত ঘোড়ার পীঠে দাঁড়িয়ে থাকার একটি দৃশ্য তিনি দেখেছিলেন। এই দৃশ্যটিই সার্কাস দেখার শেষে তাঁর কাছে অভ্যাসযোগের অন্যতম উপমা হয়ে ওঠে।৮৮ উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কলকাতায় গ্যাসের আলো আগের চেয়ে সুলভ হয়ে ওঠে। শ্রীরামকৃষ্ণ প্রার্থনাতত্ত্ব বিশ্লেষণের জন্য শিয়ালদহে গ্যাস কোম্পানির অফিসে আবেদন করার ব্যবস্থাটির৮৯ উপমা ব্যবহার করেছেন। ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গে মহাপুরুষদের দেখানো পথে চলার নির্দেশ দিয়ে তিনি মহাপুরুষদের রেলগাড়ির ইঞ্জিনের৯০ সঙ্গে তুলনা করেছেন, আবার নিত্যসিদ্ধের ধারণাকে তিনি সাধারণের উপযোগী করে তুলতে ফোয়ারার৯১ উপমার ব্যবহার করেছেন। উনিশ শতকের বিনোদনের অন্যতম উপকরণ ছিল বাংলার রঙ্গালয়গুলি। থিয়েটারের শিল্পীদের প্রতি শ্রীরামকৃষ্ণের ইতিবাচক মনোভাব চিরকাল বজায় ছিল। একাগ্রতা প্রসঙ্গে থিয়েটার-শিল্পীদের অভিনয় দক্ষতাকেও তিনি উপমার বিষয় করে নিয়েছিলেন।৯২ এছাড়াও শ্রীরামকৃষ্ণের উপমার ভাণ্ডারে শহরের সংস্কৃতি থেকে উঠে এসেছে ফটোগ্রাফি৯৩, সংবাদ পত্রের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা৯৪, আদালত কক্ষ৯৫, কেরানির চাকরি বৃত্তি৯৬ প্রভৃতি বিষয়।
বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সমাজে বহুকাল ধরে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত কিছু লোকপ্রিয় উক্তি, যার মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও সমাজজীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত থাকা কোনো গভীর জীবনসত্য প্রকাশিত হয়, সেই জীবনমুখী উক্তিগুলির সুসংহত রূপকেই সাধারণত প্রবাদ বা প্রবচন নামে চিহ্নিত করা হয়। বাংলা ভাষায় প্রবাদ ও প্রবচন শব্দদুটি প্রায় সম অর্থবাহক হলেও এই দুটি শব্দের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। প্রবাদ সাধারণত কোনো মানুষের একক সৃষ্টি নয়। বলা যেতে পারে প্রবাদ গোষ্ঠীর থেকে জন্ম নেয়। প্রবাদ মূলত মানুষের প্রজন্মের পর প্রজন্ম লোক পরম্পরাগত সৃষ্টি হওয়া কিছু উক্তি। কোনো কোনো কবির সাহিত্যের কোনো কোনো চরণ মাঝে মাঝে প্রবাদের মতো হয়ে ওঠে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় প্রবচন, সেই দিক থেকে প্রবচন শিল্পীর ব্যক্তিগত নির্মাণ। বাংলা প্রবচন নির্মাণের ক্ষেত্রে কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ‘কথামৃত’-এ বাংলাদেশের অজস্র প্রবাদ-প্রবচনের যেমন সুষম ব্যবহার করা হয়েছে, তেমনই শ্রীরামকৃষ্ণের কিছু উক্তি বাঙালি সমাজে প্রবাদপ্রতিম হয়ে উঠেছে। ‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণ কথাপ্রসঙ্গে কিছু কিছু প্রবাদ-প্রবচন ব্যবহার করলেও, অযথা প্রবাদ-প্রবচনের বাহুল্যে ‘কথামৃত’ আকীর্ণ নয়। শুধু বাংলা প্রবাদ নয়, বাঙালি ব্যবহৃত কিছু সংস্কৃতধর্মী ও হিন্দি ভাষা থেকে আগত প্রবাদও শ্রীরামকৃষ্ণ ব্যবহার করেছেন। এই ধরণের অপর ভাষা থেকে আগত প্রবাদগুলি বহুল ব্যবহারের সূত্রে এগুলি প্রায় বাঙালি সংস্কৃতির পরিচিত প্রবাদের অন্তর্গত হয়ে উঠেছে। ‘কথামৃত’ পরিসরে বাংলা ও বাঙালির উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রাচীন প্রবাদ-প্রবচন—
(১) পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে।৯৭
(২) যার যা কর্ম, তার ফল সে পাবে।৯৮
(৩) পুরুষ কি বাত, হাতি কি দাঁত।৯৯
(৪) কুমড়োকাটা বঠ্ঠাকুর।১০০
(৫) চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী।১০১
(৬) আঠার মাসে এক বৎসর।১০২
(৭) এক রাম তাঁর হাজার নাম।১০৩
(৮) অর্থই অনর্থের মূল।১০৪
(৯) অন্নচিন্তা চমৎকারা, কালিদাস হয় বুদ্ধিহারা। ১০৫
(১০) সাতকাণ্ড রামায়ণ, সীতা কার ভার্যে।১০৬
(১১) লঙ্কায় রাবণ মলো, বেহুলা কেঁদে আকুল হলো।১০৭
(১২) বার হাত কাঁকুড়ের তের হাত বিচি।১০৮
(১৩) আপনি শুতে স্থান পায় না, শঙ্করাকে ডাকে।১০৯
এই প্রাচীন প্রবাদ-প্রবচনগুলির পাশাপাশি ‘কথামৃত’ থেকে বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির সংস্কৃতিতে নতুন কিছু প্রবাদ-প্রবচন জন্ম নিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি—
(১৪) লজ্জা, ঘৃণা, ভয়—তিন থাকতে নয়।১১০
(১৫) অনন্ত মত, অনন্ত পথ।১১১
(১৬) টাকা মাটি, মাটিই টাকা—সোনা মাটি, মাটিই সোনা।১১২
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে ‘কথার গুণে বার্তা নষ্ট’, প্রবাদ-প্রবচন ব্যবহারের ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের পরিমিতিবোধ এক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়; কথায় অতিরিক্ত চমৎকারিত্ব নিয়ে আসার ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের কোনো অতিরিক্ত প্রয়াস নেই। ‘কথামৃত’ এত সুসংহত হওয়ার এটিও একটি অন্যতম কারণ।
শ্রীরামকৃষ্ণের রঙ্গরস :
‘কথামৃত’র শ্রীরামকৃষ্ণ প্রকৃত অর্থেই রসরাজ। হাস্যরসের হাত ধরে ব্যক্তিগত পরিসরের যে কোনো বৈঠকি আবহে এক অন্যমাত্রা তৈরি হয়, ‘কথামৃত’র ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শ্রীরামকৃষ্ণ আগত অনুরাগীদের সঙ্গে আলাপকালে কথাপ্রসঙ্গে এমন কিছু উপমা ও গল্পের অনুসঙ্গ এনেছেন, যার শ্রবণমাত্রই সাধারণ শ্রোতৃমণ্ডলী ঈশ্বর-বিষয়ক গূঢ় তত্ত্বালোচনার মধ্যে সামান্য একটু সময় নির্ভেজাল হাস্যরসের আস্বাদনের সুযোগ পেয়েছেন। তত্ত্বকথার মাঝে মাঝে এই ছোট ছোট হাস্যরসদগুলি শ্রীরামকৃষ্ণের পরবর্তী তাত্ত্বিক কথার প্রতি তাঁদের মনকে আরও বেশি আকর্ষণ করত। যে কোনো মননশীল রুচিসম্পন্ন পাঠকের ‘কথামৃত’ পাঠে একঘেয়েমী তৈরি না হওয়ার অন্যতম কারণ স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ। তিনি নিজেও একঘেয়ে হওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না।১১৩ তাই ‘কথামৃত’-এ আগত অনুরাগীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি কখনও নিজে হাসছেন কখনও সকলকে হাসাচ্ছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের এই গুণটি ‘কথামৃত’র প্রথম দিক থেকেই লক্ষ্য করা যায়। শ্রীম শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে তৃতীয় দর্শনের ঠিক পরের দিনেই আবার ব্যগ্র হয়ে দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে গিয়ে উপস্থিত হওয়া মাত্রই আনন্দে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের রসময় রূপটি প্রকাশিত হয়। মাস্টার মশাই শ্রীম লিখছেন:
মাস্টার ঘরে প্রবেশ করিতেছেন দেখিয়াই ঠাকুর উচ্চহাস্য করিয়া ছোকরাদের বলিয়া উঠিলেন,”ওই রে আবার এসেছে!”—বলিয়াই হাস্য। সকলে হাসিতে লাগিল। মাস্টার আসিয়া ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিয়া বসিলেন।—আগে হাতজোড় করিয়া দাঁড়াইয়া প্রণাম করিতেন—ইংরেজী পড়া লোকেরা যেমন করে। কিন্তু আজ তিনি ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিতে শিখিয়াছেন। তিনি আসন গ্রহণ করিলে, শ্রীরামকৃষ্ণ কেন হাসিতেছিলেন, তাহাই নরেন্দ্রাদি ভক্তদের বুঝাইয়া দিতেছেন।
“দেখ, একটা ময়ূরকে বেলা চারটার সময় আফিম খাইয়ে দিচ্ছিল। তার পরদিন ঠিক চারটার সময় ময়ূরটা উপস্থিত—আফিমের মৌতাত ধরেছিল—ঠিক সময়ে আফিম খেতে এসেছে!” (সকলের হাস্য)
মাস্টার মনে মনে ভাবিতেছেন,”ইনি ঠিক কথাই বলিতেছেন। বাড়িতে যাই কিন্তু দিবানিশি ইঁহার দিকে মন পড়িয়া থাকে—কখন দেখিব, কখন দেখিব। এখানে কে যেন টেনে আনলে! মনে করলে অন্য জায়গায় যাবার জো নাই, এখানে আসতেই হবে!” এইরূপ ভাবিতেছেন, ঠাকুর এদিকে ছোকরাগুলির সহিত অনেক ফষ্টিনাষ্টি করিতে লাগিলেন যেন তারা সমবয়স্ক। হাসির লহরী উঠিতে লাগিল। যেন আনন্দের হাট বসিয়াছে।
মাস্টার অবাক্ হইয়া এই অদ্ভুত চরিত্র দেখিতেছেন। ভাবিতেছেন, ইঁহারই কি পূর্বদিনে সমাধি ও অদৃষ্টপূর্ব প্রেমানন্দ দেখিয়াছিলাম? সেই ব্যক্তি কি আজ প্রাকৃত লোকের ন্যায় ব্যবহার করিতেছেন?১১৪
শ্রীম সেদিন অবাক হয়েছিলেন। তিনি তখন সদ্য যাতায়াত শুরু করেছেন। একজন সবসময় ঈশ্বরচিন্তায় ডুবে থাকা মানুষ এমন করে হাসি-রঙ্গে ডুবে যেতে পারেন, তা শ্রীম প্রথম দিকে যেন কল্পনা করতে পারেননি।
প্রাচীন সাহিত্যে মূলত বিদূষক ও ভাঁড়-শ্রেণির চরিত্রের মাধ্যমে হাস্য-রঙ্গের ধারণা জুড়ে ছিল। বিভিন্ন সাহিত্যে ব্যক্তিগত কদর্য আক্রমণ এবং বয়স্যদের মধ্যে পরস্পর আদি-রসাত্মক রসিকতায় এক ধরণের হাস্য-রঙ্গ পরিবেশিত হতেও দেখা গেছে, ‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণের হাস্য-রঙ্গরস এই ধারার নয়। শ্রীরামকৃষ্ণ আদি-রসাত্মক কথা ও সেই বিষয়ে আলোচনা করতে চাইতেন না। এই প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতে।’কথামৃত’-এ ১৮৮৪-এর ৬ ডিসেম্বর শ্রীরামকৃষ্ণের প্রশ্নের উত্তরে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লঘুতার সঙ্গে রঙ্গ করে মানুষের জীবনের কর্তব্য হিসাবে শুধুমাত্র আহার, নিদ্রা ও মৈথুনকে চিহ্নিত করা মাত্রই শ্রীরামকৃষ্ণ রীতিমতো রেগে ওঠেন। তাই সমগ্র ‘কথামৃত’ জুড়ে জৈবশরীরী আদিরসের চটুল-লঘু রসিকতা একবারও নেই। জীবনরস রসজ্ঞ শ্রীরামকৃষ্ণের রসিকতা মানবজীবনকে ঘিরে। অনেক সমালোচক শ্রীরামকৃষ্ণের রসিকতায় গ্রাম্যতার দোষ সন্ধান করেছেন, কিন্তু ‘কথামৃত’র পাশাপাশি শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনীগুলি পর্যবেক্ষণ করা হলে বোঝা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও তাঁর গ্রামীণ সংস্কৃতির শিকড়কে সম্পূর্ণ উৎখাত করে ‘শহুরে বাবু’ হয়ে ওঠার প্রয়াস করেননি। এই কারণেই তাঁর রসিকতা পালিশ করা কথায় সাজানো নয়, বরং সহজ সরলতায় ভরা। এই সারল্যটুকুই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত-মার্জিত শহুরেদের কাছে গ্রাম্যতার দোষে দোষী। প্রচলিত অর্থে যে সব শব্দকে ‘অশ্লীল’ বলা হয়, এমন কিছু শব্দ শ্রীরামকৃষ্ণের কথায় থাকলে সেই শব্দগুলির মধ্যে কোনো জৈবিক অভিপ্রায় নেই, এই কারণেই সেই শব্দগুলিও ‘কথামৃত’র একার্থে ভূষণই হয়ে উঠেছে। ‘কথামৃত’র ১৮৮৪-এর ৫ অক্টোবরের বর্ণনায় রয়েছে, শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন:
“দেখ না কুমারীপূজা। একটা হাগে মোতে, নাক দিয়ে কফ পড়ছে এমন মেয়েকে পূজা করা কেন? ভগবতীর একটি রূপ বলে।
“ভক্তের ভিতর তিনি বিশেষরূপে আছেন। ভক্ত ঈশ্বরের বৈঠকখানা।
“নাউ-এর খুব ডোল হলে তানপুরা ভাল হয়,—বেশ বাজে।
(সহাস্য, রামলালের প্রতি)—”হ্যারে রামলাল, হাজরা ওটা কি করে বলেছিল—অন্তস্ বহিস্ যদি হরিস্ (স-কার দিয়ে)? যেমন একজন বলেছিল মাতারং ভাতারং খাতারং অর্থাৎ মা ভাত খাচ্ছে।” (সকলের হাস্য)
রামলাল (সহাস্যে)–অন্তর্বহির্যদিহরিস্তপসা ততঃ কিম্।
শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি)—এইটে তুমি অভ্যাস করো, আমায় মাঝে মাঝে বলবে।১১৫
শ্রীরামকৃষ্ণ জানতেন দীর্ঘ আলোচনার মধ্যে রঙ্গরসের ভূমিকা অনেকখানি। তিনি জীবন সম্পর্কে তাঁর সুচিন্তিত ভাবনাজাত বার্তা অনুরাগীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে বুঝেছিলেন মঞ্চের জ্ঞানী আচার্যের মতো গুরুদেবের ভঙ্গিতে তাঁর বক্তব্য পেশ না করে আগত অনুরাগীদের সমান স্তরে নেমে এসে সমবয়স্ক বন্ধুর মতো ভঙ্গিতে নিজের চেতনা ও দর্শনের সঙ্গে অপরের পরিচয় ঘটানো সম্ভব। তাই আগত তরুণ প্রজন্মের অনুরাগীদের সঙ্গে তিনি সমবয়সীদের মতো অনেক ‘ফষ্টিনষ্টি’ করেছেন১১৬, আবার বয়স্ক লোকের সঙ্গে প্রাজ্ঞ-ধর্মজ্ঞ মানুষের মতো তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন১১৭। এখানে অবশ্য শ্রীরামকৃষ্ণের রঙ্গরসের স্থান-কাল-পাত্র বিচার ও পরিমিতিবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
• ‘কথামৃত’ : গুহ্যকথার ধর্মসাহিত্য :
‘কথামৃত’র বৈঠকি আবহে মূলত ধর্ম ও আধ্যাত্মিক তত্ত্বকথাই আলোচিত হয়েছে। এখানে প্রসঙ্গক্রমে বহুবার সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হলেও তার মূল শিকড়টি গাঁথা রয়েছে ধর্মচর্চার সঙ্গে। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর সুদীর্ঘ সাধকজীবনের অভিজ্ঞতায় ধর্ম ও শাস্ত্র সম্পর্কে যে সারসত্যকে জেনেছিলেন, তাকেই ‘কথামৃত’-এ সহজবোধ্য সর্বজনীন আঙ্গিকে পেশ করেছেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ-কথিত ধর্মবিষয়ক নানা তাত্ত্বিক কথার মধ্যেও একটি সূক্ষ্ম ভেদরেখা রয়েছে, বহুজন অনুরাগীদের সামনে শ্রীরামকৃষ্ণ যে কথাগুলি বলেছেন সেগুলি মূলত সর্বজনীন এবং সাধারণ আচরণীয় কথা। অন্যদিকে অন্তরঙ্গ অনুরাগীদের কাছে তিনি একান্তে যে সব তাত্ত্বিক কথা বলেছেন, তাঁর আদতে বিশেষ কথা। ‘কথামৃত’-এ শ্রীম যেই সব কথাকে ‘গুহ্যকথা’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন সেই কথাগুলি শ্রীরামকৃষ্ণ যখন বলেছেন তখন তাঁর সামনে ভরা বৈঠক নেই। ‘কথামৃত’র সেই আবহগুলি দেখে মনে হয় যেন সেই পটভূমিটি একান্তভাবে গুরু-শিষ্যের গোপন সাধনভূমি। মাস্টার মশাই শ্রীম পর্যন্ত নিজের নাম সেখানে গোপন করে নিজেকে ‘মণি’ নামে চিহ্নিত করে গোপনীয়তা বজায় রাখতে চেয়েছেন। সেখানে সমচেতনায় অদীক্ষিত মানুষ প্রবেশাধিকার পায় না। সেই সব গুহ্যকথায় শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনজীবনের এমন অনেক কথা রয়েছে যেগুলিকে সাধকের সাধনজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষ উপলব্ধি বলা যেতে পারে। লোকায়তের অন্দরমহলে একটি প্রচলিত কথা রয়েছে,’আপন সাধন কথা, না কহিবে যথা তথা’। এই কথাটি ‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণের গুহ্যকথার প্রসঙ্গেও যথার্থ রূপ নিয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণও যেন এই বার্তাটি মেনে চলতেন। ‘কথামৃত’র একটি গুহ্যকথার দৃশ্য এখানে তুলে ধরা যেতে পারে:
কিয়ৎকাল দুইজনেই চুপ করিয়া আছেন। ঠাকুর এইবার নিজের ব্রহ্মজ্ঞানের অবস্থা বর্ণনা করিতেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ—আমি একদিন দেখলাম, এক চৈতন্য—অভেদ। প্রথমে দেখালে, অনেক মানুষ, জীবজন্তু রয়েছে—তার ভিতর বাবুরা আছে, ইংরেজ, মুসলমান, আমি নিজে, মুদ্দোফরাস, কুকুর, আবার একজন দেড়ে মুসলমান হাতে এক সানকি, তাতে ভাত রয়েছে। সেই সানকির ভাত সব্বাইয়ের মুখে একটু একটু দিয়ে গেল, আমিও একটু আস্বাদ করলুম!
“আর-একদিন দেখালে, বিষ্ঠা, মূত্র, অন্ন ব্যঞ্জন সবরকম খাবার জিনিস,—সব পড়ে রয়েছে। হঠাৎ ভিতর থেকে জীবাত্মা বেরিয়ে গিয়ে একটি আগুনের শিখার মতো সব আস্বাদ করলে। যেন জিহ্বা লকলক করতে করতে সব জিনিস একবার আস্বাদ করলে! বিষ্ঠা, মূত্র—সব আস্বাদ করলে! দেখালে যে, সব এক—অভেদ!”…
শ্রীরামকৃষ্ণ (মণির প্রতি)—আবার একবার দেখালে যে, এখানকার সব ভক্ত আছে—পার্ষদ—আপনার লোক। যাই আরতির শাঁখঘন্টা বেজে উঠত, অমনি কুঠির ছাদের উপর উঠে ব্যাকুল হয়ে চিৎকার করে বলতাম,”ওরে তোরা কে কোথায় আছিস আয়! তোদের দেখবার জন্য আমার প্রাণ যায়।”
“আচ্ছা, আমার এই দর্শন বিষয়ে তোমার কিরূপ বোধ হয়?”
মণি—আপনি তাঁর বিলাসের স্থান!—এই বুঝেছি, আপনি যন্ত্র, তিনি যন্ত্রী; জীবদের যেন তিনি কলে ফেলে তৈয়ার করেছেন, কিন্তু আপনাকে তিনি নিজের হাতে গড়েছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ—আচ্ছা, হাজরা বলে, দর্শনের পরে ষড়ৈশ্বর্য হয়।
মণি—যারা শুদ্ধাভক্তি চায় তারা ঈশ্বরের ঐশ্বর্য দেখতে চায় না।
শ্রীরামকৃষ্ণ—বোধ হয়, হাজরা আর-জন্মে দরিদ্র ছিল, তাই অত ঐশ্বর্য দেখতে চায়। হাজরা এখন আবার বলেছে, রাঁধুনি-বামুনের সঙ্গে আমি কি কথা কই! আবার বলে, খাজাঞ্চীকে বলে তোমাকে ওই সব জিনিস দেওয়াব! (মণির উচ্চহাস্য)
(সহাস্য)—ও ওই সব কথা বলতে থাকে, আর আমি চুপ করে থাকি।…১১৮
‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণ-কথিত গুহ্যকথাগুলির মধ্যে শ্রীম বিশেষ কিছু কিছু ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের সাংকেতিক কথাকে সাধারণ পাঠকের থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে সচেতন প্রয়াসে প্রয়োজন মতো উহ্য রেখেছেন। ‘কথামৃত’-এ যখনই গুহ্যকথা আলোচিত হয়েছে সেখানেই শ্রীম গুহ্যকথার পরিমিত ব্যবহার করেছেন। তিনি মাঝে মাঝে কিছু অংশ তারা-চিহ্ন বা বিন্দু-চিহ্ন দিয়ে গোপন করেছেন। যেমন- ১৮৮৪, ৫ জানুয়ারির একটি দৃশ্যে রয়েছে:
“মা বিশ্বাস চাই। যাক শালার বিচার। সাত চোনার বিচার এক চোনায় যায়। বিশ্বাস চাই (গুরুবাক্যে বিশ্বাস)—বালকের মতো বিশ্বাস। মা বলেছে, ওখানে ভূত আছে, তা ঠিক জেনে আছে,—যে ভূত আছে। মা বলেছে, ওখানে জুজু। তো তাই ঠিক জেনে আছে। মা বলেছে, ও তোর দাদা হয়—তো জেনে আছে পাঁচ সিকে পাঁচ আনা দাদা। বিশ্বাস চাই!
“কিন্তু মা! ওদেরই বা দোষ কি! ওরা কি করবে! বিচার একবার তো করে নিতে হয়! দেখ না ওই সেদিন এত করে বললাম, তা কিছু হল না—আজ কেন একেবারে—★ ★ ★ ★”
ঠাকুর মার কাছে করুণ গদ্গদস্বরে কাঁদিতে কাঁদিতে প্রার্থনা করিতেছেন। কি আশ্চর্য! ভক্তদের জন্য মার কাছে কাঁদছেন—”মা, যারা যারা তোমার কাছে আসছে, তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করো! সব ত্যাগ করিও না মা! আচ্ছা, শেষে যা হয় করো!
“মা, সংসারে যদি রাখো, তো এক-একবার দেখা দিস! না হলে কেমন করে থাকবে। এক-একবার দেখা না দিলে উৎসাহ কেমন করে মা! তারপর শেষে যা হয় করো!”১১৯
মাস্টার মশাই শ্রীম’র মূল ডায়েরিতে এই গুহ্য অপ্রকাশ্য অংশগুলি লেখা ছিল কিনা বর্তমানে তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। শ্রীম প্রাথমিকভাবে নিজের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণের কথা সংগ্রহ করেছিলেন ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য। ‘কথামৃত’র মধ্যে সম্পাদনার ছাপ রয়েছে বহু জায়গায়, সেক্ষেত্রে সম্ভবত তিনি ‘কথামৃত’র গ্রন্থরূপ তৈরি করার সময় এই গুহ্য অংশগুলি হয়তো সচেতনভাবে বাদ রেখেছিলেন। তাছাড়াও এই মূল ডায়েরি লেখার সময় তিনি কাউকে পড়তে দিতেও চাননি।১২০ শ্রীরামকৃষ্ণের থেকেই শ্রীম বুঝেছিলেন এই গুহ্য অপ্রকাশ্য বিষয় সমূহ সর্বজনীন কথা নয়। ভারতীয় প্রাচীন সভ্যতার আবহমান গুরু-শিষ্য পরম্পরায় যে সাধ্যসাধন শিক্ষার পাঠ বহু শতাব্দী ধরে গুহ্যভাবে শিষ্য-প্রশিষ্যানুক্রমে চলে আসছিল, শ্রীরামকৃষ্ণ ও মাস্টার মশাই যেন তারই সেই সুদীর্ঘ রেখায় দুটি বিন্দু—এই ঐতিহ্য শ্রীমও ভেঙে দিতে চাননি।
• ‘কথামৃত’র ভাষা:
জীবনের বিভিন্ন প্রদাহের যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে মাস্টার মশাই শ্রীম ভাগ্যচক্রে দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে রানি রাসমণির বাগানে বেড়াতে এসে হঠাৎ করেই শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন। সেদিনে তাঁদের পরিচয়ের এই শুভ মুহূর্তই যে ক্রমে ‘কথামৃত’র মতো একটি অক্ষয় শ্রীরামকৃষ্ণ-স্মারকের জন্ম দেবে তখনই বোধ হয় মহাকাল নিশ্চিত করে নিতে শুরু করেছিল। শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে প্রথম দর্শনেই শ্রীম দেখেছিলেন একঘর ভর্তি লোক নিস্তব্ধ হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের অমৃতকথা শুনছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ তক্তপোশে পূর্বদিকে মুখ করে সহাস্যবদনে বসে ঈশ্বর-বিষয়ক কথা বলে চলেছেন। আর সমবেত অনুরাগীরা তাঁর সামনে মেঝেয় বসে সেই কথা শুনছেন। শ্রীম লিখছেন:
মাস্টার দাঁড়াইয়া অবাক্ হইয়া দেখিতেছেন। তাঁহার বোধ হইল যেন সাক্ষাৎ শুকদেব ভগবৎ-কথা কহিতেছেন, আর সর্বতীর্থের সমাগম হইয়াছে। অথবা যেন শ্রীচৈতন্য পুরীক্ষেত্রে রামানন্দ স্বরূপাদি ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন ও ভগবানের নামগুণকীর্তন করিতেছেন।১২১
প্রথম দর্শনেই মাস্টার মশাই শ্রীম’র মনে হয়েছিল তাঁর তপ্তজীবনে শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গ-প্রসঙ্গই শান্তির জলধার হয়ে উঠবে। এরপরেই ধীরে ধীরে যাতায়াত বাড়তে থাকে। সেখান থেকেই তাঁদের দুজনের পবিত্র গুরু শিষ্যের সম্পর্ক তৈরি হতে থাকে। ‘কথামৃত’র দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই শ্রীম গুরুবন্দনার শ্লোক ব্যবহার করেছেন:
অখণ্ডমণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্।
তৎপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।১২২
এই নিঃস্বার্থ অনুরাগ তাঁর অনেক উচ্চ-ধারণায় ধীরে ধীরে দানা বেঁধেছিল। মধ্যযুগের চৈতন্যকথা ‘শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’-এর কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী যেমন আত্মমগ্ন হয়ে লিখেছিলেন—
সেই লিখি মদনগোপাল যে লিখায়।
কাষ্ঠের পুত্তলী যেন কুহকে নাচায়।।১২৩
শ্রীম’র চেতনাও প্রায় কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর সমদৃষ্টিতে পৌঁছেছিল। খুব সম্ভবত এই কারণেই তিনি ‘কথামৃত’র গ্রন্থারম্ভে ‘শ্রীম-লিখিত’র পরিবর্তে ‘শ্রীম-কথিত’ লিখেছিলেন। তাই ‘কথামৃত’র প্রতিটি দৃশ্যে শ্রীম উপস্থিত থাকলেও তাঁর স্বরটি তিনি স্বেচ্ছায় বারবার গুপ্ত রেখেছেন। ‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণই প্রধান চরিত্র। শ্রীরামকৃষ্ণের মুখের ভাষায় তাঁর কথাকে গ্রন্থরূপ দেওয়া সামান্য কাজ নয়। কিন্তু এই কাজ শ্রীম নিষ্ঠার সঙ্গে অপার দক্ষতার মিশিয়ে সম্পাদন করতে পেরেছিলেন। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশের পর ‘কথামৃত’র প্রথম ভাগ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০২-এর শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথির দিন (১১ মার্চ) এবং পঞ্চম ভাগটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩২-এ। শ্রীমও একই বছর মহালোকে যাত্রা করেন। তাঁর জীবনের এই সমগ্র সময়টি লক্ষ্য করার মতো। শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে প্রথম দর্শনের দিন থেকে জীবনের শেষ বছরটি পর্যন্ত তিনি শ্রীরামকৃষ্ণচর্চায় ব্যয় করেছিলেন। শুধু তাই নয় শ্রীম’র জীবিতাবস্থায় ‘কথামৃত’র প্রথম ভাগের মোট ১২টি সংস্করণ হয়েছিল। দ্বাদশ সংস্করণটি ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসে প্রকাশিত হয়।১২৪ এতগুলি সংস্করণ মাস্টার মশাই শ্রীম’র সত্যনিষ্ঠা ও পরিশ্রমের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বোঝাই যায় ‘কথামৃত’র আরো সত্যতা, প্রামাণিকতার পাশাপাশি শ্রীরামকৃষ্ণের মুখের ভাষার প্রতি শ্রীম’র ঝোঁক ছিল। শ্রীম’র অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও মৌলিক সাহিত্যপ্রতিভার কারণেই ‘কথামৃত’র ভাষা এই গ্রন্থের গুরুগম্ভীর বিষয় এত জীবন্ত। ‘কথামৃত’র ভাষা সচল, ক্লান্তিহীন, প্রাণসত্তাবিশিষ্ট দ্রুতগতির ভাষাশিল্প। ‘কথামৃত’র ভাষা একই সঙ্গে সহজ-সরল, আটপৌরে, সর্বজনীন, হৃদয়গ্রাহ্য অথচ তাত্ত্বিক, ভাবগম্ভীর, গভীরতায় ভরা। অধিকারীভেদে বাচিক শিল্পের এক অসাধারণ দক্ষ কারিগর শ্রীরামকৃষ্ণ। ‘কথামৃত’র ভাষাকে বাহ্যিকভাবে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে দেখা যেতে পারে, যদিও ‘কথামৃত’ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গেই ভরপুর।
‘কথামৃত’-এ শ্রীরামকৃষ্ণের কথা বলতে গিয়ে শ্রীম বারবার প্রথমেই একটি আবহ নির্মাণ করে নিয়েছেন। সেদিনের বৈঠকে কে কে আছেন, কোথায় বৈঠকি আনন্দের হাট বসেছে প্রভৃতির নাতিদীর্ঘ একটি প্রতিবেদনের পাশাপাশি তিনি মাঝে মাঝে প্রকৃতির সংক্ষিপ্ত, সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। শ্রীম নিজেও কবিতা লিখতেন, তাঁর বেশ কিছু কবিতা ‘উদ্বোধন’ পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। সেদিক থেকে শ্রীম’র প্রকৃতিকে অনুভব করার চোখ থাকাও একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। শ্রীরামকৃষ্ণের কথায় পাশাপাশি প্রকৃতি ও পরিবেশের বর্ণনায় শ্রীম’র দৃষ্টি স্নিগ্ধ শোভন চিত্রকল্পে ভরপুর। যেমন- ১৮৮৩-এর ১৪ ডিসেম্বরের শেষ রাতের বর্ণনার সঙ্গে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের কথাকে মিশিয়ে নিয়ে লিখছেন:
নহবতখানার উপরের ঘরে মণি একাকী বসিয়া আছেন। অনেক রাত্রি হইয়াছে। আজ অগ্রহায়ণ পূর্ণিমা। আকাশ, গঙ্গা, কালীবাড়ি, মন্দিরশীর্ষ, উদ্যানপথ, পঞ্চবটী চাঁদের আলোতে ভাসিয়াছে! মণি একাকী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে চিন্তা করিতেছেন।
…চতুর্দিক নীরব। রাত এগারটার সময় জোয়ার আসিয়াছে। এক-একবার জলের শব্দ শুনা যাইতেছে।…
আজ পূর্ণিমা। চতুর্দিকে বটবৃক্ষের শাখাপ্রশাখার মধ্য দিয়া চাঁদের আলো ফাটিয়ে পড়িতেছে।১২৫
‘কথামৃত’র প্রতিটি দৃশ্যেই কমবেশি শ্রীরামকৃষ্ণ আগত অনুরাগীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। সেখানে ঈশ্বর-বিষয়ক কথার পাশাপাশি যেমন উঠে এসেছে সামাজিক ও পারিবারিক কথা তেমনই এসেছে উনিশ শতকের নাগরিক মানুষের চাওয়া পাওয়ার কথা। শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও কোনো বিষয়ে মতামত দিয়েছেন আবার কখনো অনুরাগীদের পরস্পরের মধ্যে কথোপকথন মন দিয়ে শুনেছেন, মাঝে মাঝে প্রাণখোলা নির্মল হাসির আবহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এই সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণের ভাষা তুলনামূলক অনেক বেশি সর্বজনীন। শ্রীম-বর্ণিত ‘কথামৃত’ থেকে এই ধরণের কথোপকথন অংশগুলি থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের পাশাপাশি আগত অনুরাগীদের মুখের ভাষার প্রত্যক্ষ পরিচয় পাওয়া যায়। তরুণ নরেন্দ্রনাথ দত্ত ও ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের মুখের ভাষায় ইংরেজির আধিক্য দেখে বোঝা যায় উচ্চ শিক্ষিতদের কাছে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার পরিচয় জ্ঞাপনের অন্যতম উপকরণ হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। শ্রীরামকৃষ্ণও মজা করে দু-একটি ইংরেজি কথার ব্যবহার করেছেন। ১৮৮৩-এর ১৯ আগস্টের ঘটনার মধ্যে কথোপকথনের এমনই একটি চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়:
শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্য)—কি গো! তোমাদের কি সব কথা হচ্ছে?
নরেন্দ্র (সহাস্যে)—কত কি কথা হচ্ছে—’লম্বা’ ‘লম্বা’ কথা।
শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে)—কিন্তু শুদ্ধাজ্ঞান আর শুদ্ধাভক্তি এক। শুদ্ধাজ্ঞান যেখানে শুদ্ধাভক্তিও সেইখানে নিয়ে যায়। ভক্তিপথ বেশ সহজ পথ।
নরেন্দ্র—”আর কাজ নাই জ্ঞানবিচারে, দে মা পাগল করে।” (মাস্টারের প্রতি) দেখুন, হ্যামিলটন্এ পড়লুম—লিখছেন,”A learned ignorance is the end of Philosophy and the beginning of Religion.”
শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি)—এর মানে কি গা?
নরেন্দ্র—ফিলসফি (দর্শনশাস্ত্র) পড়া শেষ হলে মানুষটা পণ্ডিতমূর্খ হয়ে দাঁড়ায়, তখন ধর্ম ধর্ম করে। তখন ধর্মের আরম্ভ হয়।
শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে)—Thank you! Thank you! (হাস্য)১২৬
আত্মভাবমগ্ন শ্রীরামকৃষ্ণ সকলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝেই অপার আত্মমগ্ন হয়ে উঠেছেন। এই সময়ে তিনি যে সব কথা বলেছেন তার মধ্যে বেশ কিছু কথা যেমন আগত অনুরাগীদের জন্য বলা কথা, তেমনই তাঁর নিজের জন্যও বলা। ‘কথামৃত’-এ এই ধরণের দৃশ্য রয়েছে বহুবার। এই সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখে মনে হয় তিনি যেন স্বগতোক্তি করছেন। যেমন- ‘কথামৃত’-এ ১৮৮৩ সালের ১৮ই আগস্টের একটি দৃশ্যে রয়েছে, আত্ম-ভাবমগ্ন শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন:
“যিনি ব্রহ্ম তিনিই শক্তি। তাঁকেই মা বলে ডাকি। যখন নিষ্ক্রিয় তখন তাঁকে ব্রহ্ম বলি, আবার যখন সৃষ্টি-স্থিতি-সংহার কার্য করেন, তখন তাঁকে শক্তি বলি। যেমন স্থির জল, আর জলে ঢেউ হয়েছে। শক্তিলীলাতেই অবতার। অবতার প্রেমভক্তি শিখাতে আসেন। অবতার যেন গাভীর বাঁট। দুগ্ধ বাঁটের থেকেই পাওয়া যায়!
“মানুষে তিনি অবতীর্ণ হন। যেমন ঘুটির ভিতর মাছ এসে জমে।”১২৭
শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবসমাধি ও ভাবাবস্থার ছবি ‘কথামৃত’-এ অপ্রতুল নয়। ঈশ্বরীয় ভাবাবস্থায় সদা অন্তর্মুখ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস এমন অনেক কথা বলেছেন, যার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এই ধরণের কথাগুলি বেশিরভাগই ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ। ‘কথামৃত’র সেই সব দৃশ্যের মধ্যে অন্যতম একটি অংশ যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবমুখে মাস্টার মশাই শ্রীমকে নিজের ভাবনা ব্যক্ত করে বলেছেন:
“তোমায় চিনেছি—তোমার চৈতন্য-ভাগবত পড়া শুনে। তুমি আপনার জন—এক সত্তা—যেমন পিতা আর পুত্র। এখানে সব আসছে—যেন কলমির দল,—এক জায়গায় টানলে সবটা এসে পড়ে। পরস্পর সব আত্মীয়—যেমন ভাই ভাই। জগন্নাথে রাখাল, হরিশ-টরিশ গিয়েছে, আর তুমিও গিয়েছ—তা কি আলাদা বাসা হবে?
“যতদিন এখানে আস নাই, ততদিন ভুলে ছিলে; এখন আপনাকে চিনতে পারবে। তিনি গুরুরূপে এসে জানিয়ে দেন।”১২৮
‘কথামৃত’-এ অনেক প্রসঙ্গে দেখা যায় শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর ভাবনাটি নিজের মতো করে সকলের কাছে তুলে ধরেছেন এবং মাস্টার মশাই শ্রীম তাঁর সুচিন্ত শ্রীরামকৃষ্ণ-অভিজ্ঞান দিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের কথার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। বলা যেতে পারে এই ধরণের কথোপকথনে মাস্টার মশাই শ্রীম শ্রীরামকৃষ্ণের কথার টীকা-ভাষ্য নির্মাণ করেছেন। যেমন- শ্যামপুকুর বাটীতে শ্রীরামকৃষ্ণের অবস্থানকালে ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার ও মাস্টার মশাই নিজেদের মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের কালীভাবনার বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।১২৯ এছাড়াও কিছুক্ষেত্র এমন রয়েছে যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণের বক্তব্যের অভিপ্রেত অর্থকে মাস্টার মশাই অনুমান করে নিয়ে বুঝতে চেয়েছেন। ১৮৮৩-এর ১০ অক্টোবরে শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবনায় ঈশ্বরের সাকার-নিরাকার উভয় অবস্থাই সত্য এই বার্তা উপস্থাপনের পরেই শ্রীম লিখছেন:
শ্রীরামকৃষ্ণ কি বলিতেছেন যে, ঈশ্বর সগুণ, নানারূপ ধরেন? আবার নির্গুণ কোন রঙ নাই, বাক্যমনের অতীত? আর তিনি ভক্তিযোগ, জ্ঞানযোগ সব পথ দিয়াই ঈশ্বরের মাধুর্য রস পান করেন?১৩০
মাস্টার মশাই শ্রীম’র ভাষা এতটাই চমৎকার যে ‘কথামৃত’ পাঠকের সব সময় মনে হতে পারে তিনি স্থিরচিত্রের যুগের একটি অনবদ্য চলচ্চিত্র দেখে চলেছেন।১৩১ সেই চলচ্চিত্রের প্রধান ভূমিকায় শ্রীরামকৃষ্ণ ও অন্যান্য ভূমিকায় ‘কথামৃত’র বাকি সব চরিত্রেরা জীবন সম্পর্কে বারবার এক-একটি যুগোপযোগী নতুনতর বার্তা এনে দিচ্ছেন আবহমান কথামৃত-পাঠকের কাছে।
১. শ্রীম, ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত'(অখণ্ড), প্রথম সংস্করণ-৪১তম পুনর্মুদ্রণ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৪২১ বঙ্গাব্দ, নামপৃষ্ঠা
২. দ্র. স্বামী প্রভানন্দ, “শতাব্দীর আলোকে উদ্ভাসিত ‘কথামৃত'”, ‘উদ্বোধন’, ১০৫ বর্ষ, ৯ম সংখ্যা, পৃ: ৬৫২
৩. শ্রীম, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. সাত
৪. তদেব, পৃ. ২৭৮
৫. তদেব, পৃ. ৫২৪
৬. দ্র. স্বামী প্রভানন্দ, পূর্বোক্ত নিবন্ধ, পৃ: ৬৫৫
৭. স্বামী চেতনানন্দ, “‘কথামৃতে’র জন্মশতাব্দী”, ‘উদ্বোধন’, ৮৪ বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, পৃ: ১১৪
৮. স্বামী বিবেকানন্দ, ‘পত্রাবলী’, চতুর্থ সংস্করণ-২২তম পুনর্মুদ্রণ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৪২২ বঙ্গাব্দ, পৃ. ৬০৯-১০
৯. দ্র. শ্রীম, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ১১১৭
১০. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘উনিশ শতকের আলোকে শ্রীরামকৃষ্ণ’, প্রথম প্রকাশ, হাওড়া রামকৃষ্ণ সংঘ, হাওড়া, ১৩৯১ বঙ্গাব্দ, পৃ. ১১৭
১১. শ্রীম , পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. পাঁচ
১২. তদেব, পৃ. ১৫
১৩. দ্র. স্বামী সারদানন্দ, ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ'(প্রথম ভাগ-পূর্বকথা ও বাল্যজীবন), দ্বাদশ সংস্করণ-ত্রয়োবিংশতি পুনর্মুদ্রণ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৪১৫ বঙ্গাব্দ, পৃ. ৫৬-৫৯
১৪. দ্র. শ্রীম, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ১৬১
১৫. তদেব, পৃ. ৫১
১৬. তদেব, পৃ. ৭৭৮-৭৯
১৭. সৈয়দ মুজতবা আলী, “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব”, ‘উদ্বোধন’, ৫৭ বর্ষ, ২য় সংখ্যা, পৃ:৮৫
১৮. শ্রীম, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৩৬১
১৯. তদেব, পৃ. ৪১৪
২০. তদেব, পৃ. ১২০
২১. দ্র. তদেব, পৃ. ৩৮৯
২২. তদেব, পৃ. ৫৬৪-৬৫
২৩. তদেব, পৃ. ৫৬৫
২৪. দ্র. তদেব, পৃ. ৩৭৩
২৫. দ্র. তদেব, পৃ. ২৬
২৬. দ্র. তদেব, পৃ. ৭০১
২৭. তদেব, পৃ. ১১০৮-০৯
২৮. দ্র. তদেব, পৃ. ৭৫১-৫২
২৯. দ্র. তদেব, পৃ. ৮৫৬
৩০. তদেব, পৃ. ১০৩
৩১. দ্র. তদেব, পৃ. ২৪৩
৩২. দ্র. তদেব, পৃ. ৫৬
৩৩. দ্র. তদেব, পৃ. ১০১
৩৪. দ্র. তদেব, পৃ. ১১০
৩৫. তদেব, পৃ. ৫২৩
৩৬. তদেব, পৃ. ২৪-২৫
৩৭. দ্র. তদেব, পৃ. ৪০৮-০৯
৩৮. দ্র. তদেব, পৃ. ৫৬
৩৯. দ্র. তদেব, পৃ. ২০০
৪০. দ্র. তদেব, পৃ. ৪০
৪১. দ্র. স্বামী সারদানন্দ, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৬৪-৬৫
৪২. দ্র. শ্রীম, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৬৭
৪৩. তদেব, পৃ. ৭৩০
৪৪. তদেব, পৃ. ৬১৮
৪৫. তদেব, পৃ. ৩২৮
৪৬. তদেব, পৃ. ৫০২
৪৭. তদেব, পৃ. ৬১৮
৪৮. তদেব, পৃ. ২৬
৪৯. তদেব, পৃ. ২৩১
৫০. তদেব, পৃ. ৮৭৮
৫১. তদেব, পৃ. ১৫৪
৫২. তদেব, পৃ. ৫০০
৫৩. তদেব, পৃ. ৫১৭
৫৪. তদেব, পৃ. ১০৪
৫৫. তদেব, পৃ. ৯৮
৫৬. তদেব, পৃ. ৭৩০
৫৭. তদেব, পৃ. ২০২
৫৮. তদেব, পৃ. ৬১৭
৫৯. দ্র. তদেব, পৃ. ১০০৩
৬০. তদেব, পৃ. ৫০২
৬১. দ্র. তদেব, পৃ. ৪৯৩-৫০৩
৬২. দ্র. তদেব, পৃ. ৮১৩
৬৩. দ্র. তদেব, পৃ. ৬১৬-১৮
৬৪. দ্র. স্বামী প্রভানন্দ, “শতাব্দীর আলোকে উদ্ভাসিত ‘কথামৃত'”, ‘উদ্বোধন’, ১০৫ বর্ষ, ৯ম সংখ্যা, পৃ: ৬৫০
৬৫. দ্র. শ্রীম, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৬৭৫
৬৬. দ্র. শঙ্খ ঘোষ, ‘নিঃশব্দের তর্জনী’, প্যাপিরাস সংস্করণ-তৃতীয় মুদ্রণ, প্যাপিরাস, কলকাতা, ১৪০৮ বঙ্গাব্দ, পৃ. ২৪-২৭
৬৭. দ্র. শ্রীম, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৬৬৮
৬৮. দ্র. তদেব, পৃ. ১২৮
৬৯. দ্র. তদেব, পৃ. ২৬
৭০. দ্র. তদেব, পৃ. ৩৯৫
৭১. দ্র. তদেব, পৃ. ৯৩১
৭২. দ্র. তদেব, পৃ. ২১২
৭৩. দ্র. তদেব, পৃ. ৩৫৪
৭৪. দ্র. তদেব, পৃ. ২৫২
৭৫. দ্র. তদেব, পৃ. ৫৫৬-৫৭
৭৬. দ্র. তদেব, পৃ. ৮৫০-৫১
৭৭. দ্র. তদেব, পৃ. ২১৭
৭৮. দ্র. তদেব, পৃ. ৩৯৫
৭৯. দ্র. তদেব, পৃ. ৩৭১
৮০. দ্র. তদেব, পৃ. ৪১৪
৮১. দ্র. প্রাগুক্ত
৮২. দ্র. তদেব, পৃ. ২০৬
৮৩. দ্র. তদেব, পৃ. ৯২৬
৮৪. দ্র. তদেব, পৃ. ৩৬১
৮৫. দ্র. তদেব, পৃ. ২১৫
৮৬. দ্র. তদেব, পৃ. ১৫৮
৮৭. দ্র. তদেব, পৃ. ৪২৫
৮৮. দ্র. তদেব, পৃ. ১০৭
৮৯. দ্র. তদেব, পৃ. ১৬৭-৬৮
৯০. দ্র. তদেব, পৃ. ১৫৫
৯১. দ্র. তদেব, পৃ. ৭০২
৯২. দ্র. তদেব, পৃ. ৪৩১
৯৩. দ্র. তদেব, পৃ. ১২৪
৯৪. দ্র. তদেব, পৃ. ৮৪৭
৯৫. দ্র. তদেব, পৃ. ৬৫৭
৯৬. দ্র. তদেব, পৃ. ২০০
৯৭. তদেব, পৃ. ১৯২
৯৮. তদেব, পৃ. ২০৪
৯৯. তদেব, পৃ. ২৩৮
১০০. তদেব, পৃ. ২৫৮
১০১. তদেব, পৃ. ২৬৪
১০২. তদেব, পৃ. ২৯০
১০৩. তদেব, পৃ. ৪২২
১০৪. তদেব, পৃ. ৪২৮
১০৫. তদেব, পৃ. ৭৭১
১০৬. তদেব, পৃ. ৫২৮
১০৭. তদেব, পৃ. ৬৪৫
১০৮. তদেব, পৃ. ৭৩৫
১০৯. তদেব, পৃ. ১১১৭
১১০. তদেব, পৃ. ৮০
১১১. তদেব, পৃ. ৫২৩
১১২. তদেব, পৃ. ৫৯৫
১১৩. দ্র. তদেব, পৃ. ৯৩৭
১১৪. তদেব, পৃ. ২৯
১১৫. তদেব, পৃ. ৬২১
১১৬. দ্র. তদেব, পৃ. ২২৩
১১৭. দ্র. তদেব, পৃ. ২৮৮
১১৮. তদেব, পৃ. ২৫৯-৬০
১১৯. তদেব, পৃ. ৩৭৮
১২০. দ্র. তদেব, পৃ. ১০৬১
১২১. তদেব, পৃ. ১৪
১২২. তদেব, পৃ. ১৬
১২৩. কৃষ্ণদাস কবিরাজ, ‘শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’, আদিলীলা, অষ্টম পরিচ্ছেদ, শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিকেবল ঔড়ুলোমি মহারাজ (সম্পা.), গৌড়ীয়মঠ সংস্করণ, বাগবাজার গৌড়ীয়-মিশন, কলকাতা, ১৩৬৪ বঙ্গাব্দ, পৃ. ১৮৯
১২৪. স্বামী প্রভানন্দ, “শতাব্দীর আলোকে উদ্ভাসিত ‘কথামৃত'”, ‘উদ্বোধন’, ১০৫ বর্ষ, ৯ম সংখ্যা, পৃ: ৬৫০
১২৫. শ্রীম, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৩২৮-৩২৯
১২৬. তদেব, পৃ. ২৫৪-৫৫
১২৭. তদেব, পৃ. ২৪৯
১২৮. তদেব, পৃ. ৩৫২
১২৯. দ্র. তদেব, পৃ. ৯৬১-৬২
১৩০. তদেব, পৃ. ২৮৮
১৩১. দ্র. স্বামী ঋতানন্দ, “কথাসরিৎসাগর”, ‘সংবাদ প্রতিদিন’, ৫ই জানুয়ারি ২০১৪, “রোববার”, কথামৃত সংখ্যা, পৃ: ২৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন