কত দিন ঘাসে আর মাঠে

জীবনানন্দ দাশ

কত দিন ঘাসে আর মাঠে
আমার উৎসাহে প্রাণ কাটে
খড় খুঁটি—অশ্বথ্থের শুকনো পাতা চুপে উল্টাই
দু’একটা পোকা যদি পাই
আমারে চেনো না নাকি: আমি যে চড়াই।
কতদিন তোমাদের ভোরের উঠানে
দু’-একটা খই আর মুড়কির ঘ্রাণে
উড়ে আসি চুপে
দেখি কোনো রূপে
চাল ডাল ছোলা ক্ষুদ খুঁজে পাই কিনা
ঝুরঝুর ক’রে ফুল ফুরায় সজিনা
থুপ্‌ থুপ্‌ থুপ্‌ থুপ্‌—একাকী লাফাই
ঘুম নাই—চোখে ক্লান্তি নাই
থুপ্ থুপ্ থুপীর মতন
দেখিনি কি করি আহরণ
চিনি মিঠাইয়ের গুঁড়ি—মিশ্রির কণা
ছাতু আটা…কলসীর পাশে বুঝি নাচিছে খঞ্জনা!
আকাশে কতটা রোদ
তোমাদের এত কি আমোদ।
ছোট ছোট ছেলে আর মেয়েদের দল
উঠানে কিসের এত ভিড়
ছোট ছোট ছেলেমেয়ে—তোমাদের নরম শরীর
হাতে তবু পাটকেল—ঢিল ?
আমারে তাড়াও কেন? আমি বুঝি দাঁড়কাক চিল!
চীনেবাদামের খোসা শূন্য ঠোঙা এই শুধু চাই
আমি যে চড়াই।
যাই উড়ে যাই
জানালার পাশে
বোলতার চাক খুব বড়ো হয়ে আসে
হলদে বোলতা পাখি, ভাই
এসেছি চড়াই
এনেছি একটা কুটো আর এক খড়
এই নিয়ে ঘরের ভিতর
আমিও বানাবো এক ঘর
কি বলো তোমরা
ভাটের বনের থেকে এলে কি ভোমরা
মধু পেলে খুঁজে
সারাদিন একটুও ঘুমাইনি,—চোখ আসে বুজে
মাকড়শা, অন্ধকারে আছো তুমি মিশে
এখানে কার্ণিশে
আমারে ঘুমাতে দেবে ভাই
আমি যে চড়াই—
থাক ঘুম—যাই উড়ে যাই
আমি যে চড়াই।
ঘুম নাই—চোখে ক্লান্তি নাই
কাঠমল্লিকায়
কাঁঠালী শাখায়
করবীর বনে
হিজলের সনে
বেগুনের ভিড়ে
ঘাসের শরীরে
যাই—যাই—যাই
চাই—চাই—চাই
গাই—গাই—গাই
ঘুম নাই—নাই
আমি যে চড়াই।
তবু একদিন
যখন হলুদ তৃণ
ভ’রে আছে মাঠে
পাতায় শুকনো ডাঁটে
ভাসিছে কুয়াশা
দেখিলাম খানিকটা রোম
মাঠের কিনারে ঘাসে—নির্জন নরম
শিশিরে রয়েছে ডুবে—চোখ বুজে আছে
কেমন সহিষ্ণু ছায়া মুখের উপরে পড়িয়াছে
বহুক্ষণ আমারে থাকিতে বলে এইখানে
এই স্থির নীরবতা, এই করুণতা
মৃত্যুরে নিঃশেষ ক’রে দেয় নাকি: নক্ষত্রের সাথে কয় নাকি কথা ?
এর চেয়ে বেশি রূপ, বেশি রেখা, বেশি করুণতা
আর কে দেখাতে পারে
আকাশের নীল বুকে—অথবা এ ধুলোর আঁধারে।।

———————
বিকল্প পাঠ : ছত্র ৮ : ‘ধূসর স্তনের’ স্থানে ‘নরম শাড়ির’

[সংযোজন
‘রূপসী বাংলা’র পাণ্ডুলিপি খাতার অন্যান্য কবিতা
১৯৮৪]

সকল অধ্যায়
১.
সেই দিন এই মাঠ
২.
চারিদিকে শান্ত বাতি
৩.
তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও
৪.
বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি
৫.
যতদিন বেঁচে আছি
৬.
একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে
৭.
আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে
৮.
কোথাও দেখিনি আহা এমন বিজন ঘাস
৯.
হায় পাখি একদিন কালীদহে ছিল না কি
১০.
জীবন অথবা মৃত্যু চোখে রবে
১১.
যেদিন সরিয়া যাব তোমাদের কাছ থেকে
১২.
পৃথিবী রয়েছে ব্যস্ত
১৩.
ঘুমায়ে পড়িব আমি একদিন তোমাদের নক্ষত্রের রাতে
১৪.
ঘুমায়ে পড়িব আমি একদিন
১৫.
যখন মৃত্যুর ঘুমে শুয়ে রবো
১৬.
আবার আসিব ফিরে
১৭.
যদি আমি ঝরে যাই একদিন
১৮.
মনে হয় একদিন আকাশের
১৯.
যে শালিখ মরে যায় কুয়াশায়
২০.
কোথাও চলিয়া যাবো একদিন
২১.
তোমার বুকের থেকে একদিন চলে যাবে
২২.
গোলপাতা ছাউনির বুক চুমে
২৩.
অশ্বত্থে সন্ধ্যার হাওয় যখন লেগেছে
২৪.
ভিজে হয়ে আসে মেঘে এ দুপুর
২৫.
খুঁজে তারে মরো মিছে
২৬.
পাড়াগাঁর দু পহর ভালোবাসি
২৭.
কখন সোনার রোদ নিভে গেছে
২৮.
কোথাও মঠের কাছে
২৯.
চলে যাব শুকনো পাতা-ছাওয়া ঘাসে
৩০.
এখানে ঘুঘুর ডাকে অপরাহ্নে
৩১.
শ্মশানের দেশে তুমি আসিয়াছ
৩২.
তবু তাহা ভুল জানি
৩৩.
সোনার খাঁচার বুকে রহিব না আমি
৩৪.
কতদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে
৩৫.
এ-সব কবিতা আমি যখন লিখেছি
৩৬.
কতদিন তুমি আর আমি এসে এইখানে বসিয়াছি
৩৭.
এখানে প্রাণের স্রোত আসে যায়
৩৮.
একদিন যদি আমি
৩৯.
দূর পৃথিবীর গন্ধে ভরে ওঠে
৪০.
অশ্বত্থ বটের পথে
৪১.
ঘাসের বুকের থেকে
৪২.
এই জল ভালো লাগে
৪৩.
একদিন পৃথিবীর পথে
৪৪.
পৃথিবীর পথে আমি বহুদিন বাস করে
৪৫.
মানুষের ব্যথা আমি পেয়ে গেছি
৪৬.
তুমি কেন বহু দূরে
৪৭.
আমাদের রূঢ় কথা শুনে
৪৮.
এই পৃথিবীতে আমি অবসর নিয়ে শুধু আসিয়াছি
৪৯.
বাতাসে ধানের শব্দ শুনিয়াছি
৫০.
একদিন এই দেহ ঘাস
৫১.
আজ তারা কই সব
৫২.
কোনোদিন দেখিব না তারে আমি
৫৩.
হৃদয়ে প্রেমের দিন
৫৪.
ঘাসের ভিতরে সেই চড়ায়ের শাদা ডিম
৫৫.
এই সব ভালো লাগে
৫৬.
সন্ধ্যা হয়
৫৭.
একদিন কুয়াশার এই মাঠে
৫৮.
ভেবে ভেবে ব্যথা পাব
৫৯.
এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে
৬০.
কত ভোরে-দু’-পহরে
৬১.
এই ডাঙা ছেড়ে হায়
৬২.
এখানে আকাশ নীল
৬৩.
সমুদ্রের জলে আমি দেহ ধুয়ে
৬৪.
তোমরা স্বপ্নের হাতে ধরা দাও
৬৫.
অনন্ত জীবন যদি পাই আমি
৬৬.
ঘরের ভিতরে দীপ জ্বলে ওঠে সন্ধ্যায়
৬৭.
কত দিন ঘাসে আর মাঠে
৬৮.
গুবরে ফড়িং শুধু উড়ে যায় আজ
৬৯.
আকাশে চাঁদের আলো
৭০.
কেমন বৃষ্টি ঝরে
৭১.
সন্ধ্যা হয়ে আসে
৭২.
গল্পে আমি পড়িয়াছি কাঞ্চী কাশী বিদিশার কথা
৭৩.
চিরদিন শহরেই থাকি
৭৪.
ঘাটশিলা—ঘটশিলা—

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%