প্রদীপ বসু
সমাজতত্ত্ব ও বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদ : বিনয়কুমার সরকার
বিশ শতকের তিরিশের দশকে সমাজ বিজ্ঞান নামে একটি বই প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে। বইটি প্রকাশের বছর হল ১৯৩৮ এবং বইটির অন্যতম সম্পাদক ছিলেন বিনয়কুমার সরকার, এ ছাড়া সম্পাদকমণ্ডলীতে আরও তেরোজনের নাম আছে।১ বইটির নামের সঙ্গে প্রথম ভাগ কথাটি ইঙ্গিত দেয় যে পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি খণ্ড প্রকাশ করার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু তা আর হয়নি। প্রকাশক রমেশচন্দ্র চক্রবর্তী লিখেছেন ‘বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদের’ প্রস্তাব ছিল যে ‘সমাজবিজ্ঞান’ নাম দিয়ে তাঁরা একখানা পত্রিকা প্রকাশ করবেন, কিন্তু পরিষদের সভাপতি বিনয়কুমার সরকার বুঝতে পারেন বাংলা দেশে কোনো একটা ‘নির্দিষ্ট বিজ্ঞান সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে বৈজ্ঞানিক পত্রিকা’ সম্পাদন করা অত্যন্ত কঠিন, বস্তুত একপ্রকার অসম্ভব। তাই তিনি পরিকল্পিত পত্রিকার অন্তর্গত লেখাপত্র গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করলেন।
বিনয়কুমার লিখেছেন ১৯৩২ সালের ৯ এপ্রিল ‘আন্তর্জাতিক বঙ্গ পরিষদ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর এক অন্যতম শাখার নাম ছিল সমাজবিজ্ঞান শাখা। কিন্তু ‘আন্তর্জাতিক বঙ্গ পরিষদ’-এর কর্মকাণ্ড অনেক বিস্তৃত ছিল, তাই পরিষদের পরিচালকেরা এক স্বতন্ত্র সমাজবিজ্ঞান পরিষদের কথা অনেকবার ভেবেছিলেন। ১৯৩৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর বিনয়কুমারের ‘Sociology in Bengal’ নামে একটি লেখা Education Gazette পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। Education Gazette হল সেই বিখ্যাত পত্রিকা যেটি উনিশ শতকে ভূদেব মুখোপাধ্যায় সম্পাদনা করতেন। এই রচনাটি প্রকাশিত হবার পরই ‘আন্তর্জাতিক বঙ্গ পরিষদ-এর’ পরিচালকরা স্বতন্ত্র সমাজবিজ্ঞান পরিষদ প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করতে থাকেন। ‘বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদ’ ১৯৩৭ সালের ১৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরিষদের উদ্দেশ্য ও কার্যতালিকা এইরকম এইরকম ছিল : ১) সমাজ-বিজ্ঞানের জ্ঞানকাণ্ড ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গবেষণা; ২) অনুসন্ধান-গবেষণার জন্য বাংলা ভাষাকে মুখ্য বাহনরূপে ব্যবহার করা; ৩) বাংলা ভাষায় সমাজবিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা প্রকাশ করা; ৪) ভারতের অন্যান্য স্থানের সমাজবিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা, ইত্যাদি। বোঝাই যায় বাংলা ভাষায় সমাজবিদ্যাচর্চাকে এঁরা একটা প্রধান কাজ বলে ভেবেছিলেন। বিনয়কুমার দাবি করেছেন যে পরিষদের চেষ্টায় ভিলফ্রেডো প্যারেটো, ফার্দিনান্দ টনিস, জর্জ সিমেল, লিওপোল্ড ফন ওয়াইজ, লিওনার্ড হবহাউস, পিট্রিম সোরোকিন প্রমুখ অনেক সমাজতাত্ত্বিকদের চিন্তা বাঙালি সমাজে প্রচলিত হয়েছে। তবে তিনি এও বলেছেন : ‘ইয়োরামেরিকায় আজকাল যে দরের আর যে বহরের সমাজবিজ্ঞান আলোচিত হইতেছে তাহার তুলনায় বাংলা দেশের সমাজবিজ্ঞান চর্চা নেহাৎ নগণ্য।’২ তিনি বলেছেন ফন ওয়াইজের মতানুসারে সমাজবিজ্ঞানকে সংকীর্ণভাবে নেওয়া যায়, আবার ইউরোপ ও আমেরিকার সমাজশাস্ত্রীদের রীতি মেনে এই বিদ্যার বহর বেশ কিছু বড়ো রাখাও চলতে পারে। তবে ‘বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদ-এর’ ব্যবস্থায় কোনো রীতিকেই পুরোপুরি মেনে নেওয়া হয়নি। ‘আলোচ্য বিষয় হাজার হাজার আর আলোচনা-প্রণালীও গণ্ডা-গণ্ডা এইরূপ ধরিয়া লওয়া হইয়াছে।’৩
বিনয়কুমার বলেছেন তিনি সমাজবিজ্ঞান শব্দটি খুব বিস্তৃত অর্থে গ্রহণ করেছেন। সমাজকে বুঝেছেনও খুব সহজসরলভাবে। বলেছেন লোকে-লোকে লেন-দেন নিয়ে সমাজ। যেখানে দুই বা বহু ব্যক্তির যোগ সেইখানেই সমাজ। তাই সমাজের ভিতর পড়ে হাজাররকম কাজ ও চিন্তা। বলাবাহুল্য এইরকম ঢিলেঢালা চিন্তা সমাজতত্ত্বে খুব কাজে নাও আসতে পারে। আবার অন্যদিকে জীবনচরিত সাহিত্যকেও এই ‘বিজ্ঞানের’ অন্তর্গত করে নিয়েছেন। লিখেছেন : ‘রাম বসুর প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১) আধুনিক বাঙালির সমাজবিজ্ঞান বিষয়ক প্রথম গ্রন্থ। রাজীবলোচন ১৮০৫ সালে কৃষ্ণ-চরিত্র লিখিয়াছিলেন। এই বইও সমাজবিজ্ঞানের কোঠে স্থান পাইতে পারে।’৪ এ বিষয়ে বলার এই যে সমাজবিদ্যাচর্চার প্রাথমিক স্তরে বিষয়ের সীমানা, পদ্ধতি, জ্ঞানতত্ত্ব সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধরণা থাকা আবশ্যক, না হলে বিষয়ের অগ্রগতি হয় না।
বিনয়কুমারের এই রচনার ইতিবাচক দিক হল তিনি ইসলামি রচনার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন সমাজবিদ্যাচর্চায় এই বিষয়কে যুক্ত করতে হবে। তিনি ইসলামি রচনার যে বিস্তারিত তালিকা দিয়েছেন তার মধ্যে যাব না, শুধু তাঁর লেখা থেকে একটি দৃষ্টান্ত নেব। তিনি বলেছেন প্রথম মহাযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে লুৎফর রহমান, আবুল কালাম আজাদ, রেজাউল করিম প্রমুখ লেখকগণ ‘সমাজবিজ্ঞানের মজলিশে আলোচনাযোগ্য।’ এই প্রসঙ্গে তিনি সৌভাগ্য স্পর্শমণি গ্রন্থের কথা বলেছেন। দু-হাজার পৃষ্ঠার এই বিরাট বইটি ফারসি কিমিয়া সাউদৎ গ্রন্থের তর্জমা। বিনয়কুমার বলছেন বইটি নীতি, সমাজ ও দর্শন সম্বন্ধে বাংলা সাহিত্যে এক অপূর্ব গ্রন্থ। সাত খণ্ডে প্রকাশিত অনূদিত গ্রন্থ সম্পর্কে বিনয়কুমারের লেখা থেকে একটু লম্বা উদ্ধৃতি দিই : ‘সৌভাগ্য-স্পর্শমণির বিভাগ সমূহ নিম্নরূপ : (১) দর্শন (আত্মদর্শন, তত্ত্বদর্শন, সংসার দর্শন, পরকালদর্শন); (২) এবাদৎ বা আনুষ্ঠানিক কর্তব্য (বিশ্বাস, বিদ্যার্জন ও অঙ্গশুদ্ধি, নামাজ, “জাকাৎ” বা দান, রোজা, হজ, কোরাণপাঠ, আল্লার “জেকের” বা স্মরণ, সময় বিভাগে কার্যবিভাগ); (৩) ব্যবহার (পান-আহার, বিবাহ, উপজীবিকা, হালাল, হারাম ও সন্দেহযুক্ত বিষয় সংসর্গ-বন্ধুত্ব, আত্মীয়, প্রতিবেশী, পিতামাতা, দাসদাসী, ইত্যাদি-নির্জনবাস, বিদেশভ্রমণ, সঙ্গীত ও সঙ্গীত মোহ, সৎকার্যে উপদেশ ও অপ্রিয় কার্যে নিষেধ, রাজ্যশাসন ও প্রজাপালন); (৪) বিনাশন (চরিত্রোন্নতিকর পরিশ্রম, লোভ, ভোজনস্পৃহা ও কামরিপু, বাক্যকথন, ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা, সংসারে আসক্তি, ধনাসক্তি, সম্মান লালসা, “রিয়া” বা প্রদর্শনেচ্ছা, অহঙ্কার, মোহভ্রম); (৫) পরিত্রাণ, “তেওবা” বা অনুতাপ, ধৈর্য এবং কৃতজ্ঞতা, ভয় এবং আশা, দারিদ্র ও বৈরাগ্য, সঙ্কল্প-একক্য ও প্রকৃত, প্রবৃত্তি পর্যবেক্ষণ, সদ্ভাব চিন্তন, আল্লার প্রতি ভরসা, প্রেম, অনুরাগ ও প্রসন্নতা, মৃত্যুচিন্তা)।’৫ বিনয়কুমার বলেছেন এই বইয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজ সম্পর্কে বাঙালির চিন্তাই স্পর্শ করা যায়। ‘এই হিসাবে বাংলায় সমাজবিজ্ঞানের ঘরে ইয়ুসুফ আলি অভিনন্দিত হইবেন।’৬
বিনয়কুমার ঠিকই বলেছেন যে, বাংলায় সমাজবিজ্ঞান স্কুল-কলেজের বাইরে আত্মপ্রকাশ করেছে। আমরা এই বইয়েও ঠিক একই কথা বলেছি। এই প্রসঙ্গে তিনি বেশ কিছু পত্রপত্রিকার কথা আলোচনা করেছেন, যেমন বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদিত বঙ্গদর্শন, যে পত্রিকা তাঁর মতে ‘বাংলায় সমাজবিজ্ঞানের স্রোত জোরের সহিতই বহাইয়াছে।’৭ আমরা সমাজবিদ্যা ও সমাজতত্ত্ব প্রচারে বঙ্গদর্শনের অবদান এই বইয়ের ভূমিকায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি। বিনয়কুমার এই প্রসঙ্গে আরও যে পত্রিকার কথা উল্লেখ করেছেন তা হল সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ডন পত্রিকা, যেটি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা ছিল। তিনি বলেছেন ডন পত্রিকাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বহির্ভূত সমাজবিজ্ঞান গবেষণার একটা বড়ো রকম উৎস। বিনয়কুমার লিখেছেন পল্লীসমাজ, কুটির শিল্প, পেশাগত শ্রেণির বিভিন্নতা, জাতপাত, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের উপর পত্রিকার বিশেষ আগ্রহ ছিল। এই প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন যে ডন পত্রিকাকে কেন্দ্র করে ১৯০৩ সালে ‘ডন সোসাইটির’ জন্ম হয় এবং সতীশচন্দ্রের ছাত্র ও সহযোগীরূপে অনেকে এই পত্রিকা ও সোসাইটির মাধ্যমে তাঁদের প্রাথমিক গবেষণাকার্য শুরু করেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন হারাণচন্দ্র চাকলাদার (কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়), রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় (লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়), রবীন্দ্রনারায়ণ ঘোষ (রিপন কলেজ), বিনয়কুমার সরকার (কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) এবং আরও অনেকে। তিনি বলেছেন সগোত্র এবং বন্ধু হিসেবে রাধাকমল মুখোপাধ্যায়কেও (লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়) ‘ডন সোসাইটি’র অর্ন্তভুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিনয়কুমার লিখেছেন ‘আমেরিকান স্যোসিওলজিকাল সোসাইটির’ মত একটা সমাজবিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিষ্ঠান বাংলায়ও প্রয়োজন এবং বাঙালি শিক্ষিত সমাজের জন্য একটা খাঁটি সমাজবিজ্ঞান-বিষয়ক বাংলা পত্রিকাও প্রয়োজন। এইরকম বিবেচনা করেই তিনি ১৯৩৭ সালে ‘বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদ’ প্রতিষ্ঠিত করেন। সমস্যা হল তাঁর সমাজবিজ্ঞানের ধারণার মধ্যে কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস, জীবনী সবই আছে। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘বর্তমান আলোচনায় সমাজবিজ্ঞান বিদ্যাকে অতি বিস্তৃতরূপে চৌহদ্দি দেওয়া হইয়াছে। কাজেই নানা প্রকার রচনা এই বিজ্ঞানের গণ্ডির ভিতর আসিয়া পড়িয়াছে।’৮ মুশকিল হল বিষয়ের সীমানা সম্পর্কে সচেতন না হলে সমাজতত্ত্বের নিজস্ব কোনো আইডেনটিটি থাকে না।
এই বইয়ের অন্য একটি প্রবন্ধে সুবোধকৃষ্ণ ঘোষাল বলেছেন : ‘যে বিদ্যা একাধিক ব্যক্তি বা দলের নানাপ্রকার ঘটনাবলীর কার্যকারণ-সম্বন্ধ নির্ণয় করে দেয় তাকে সমাজবিজ্ঞান বলা যেতে পারে।’৯ তিনি বলেছেন, সমাজবিজ্ঞানের সঙ্গে প্রাণীবিজ্ঞানের সম্পর্ক আছে। জন্মগ্রহণ করবার পর মানুষ প্রভাবশূন্য অবস্থায় থাকে, তারপর মানুষ কী করে সমাজের সঙ্গে নিজের মনোবৃত্তি খাপ খাইয়ে চলতে চলতে একটা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয় এটাই সমাজবিজ্ঞানের আলোচনার বস্তু। আসলে প্রথম থেকেই সমাজবিজ্ঞান কোনো এক নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেনি, ফলে সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা ও কাজ নিয়ে তিরিশের দশকেও বিভ্রান্তি থাকবে এ আর আশ্চর্য কী?
বইটি মূলত দুইভাগে বিভক্ত। একটি ভাগে সামাজিক প্রণালী, সামাজিক লেন-দেন ও সামাজিক গড়নের বিশ্লেষণ-সংক্রান্ত চোদ্দোটি রচনা আছে। অন্যভাগে আছে দেশি-বিদেশি সমাজচিন্তার ইতিহাস বিষয়ে দশটি রচনা। পরিশিষ্টে ‘বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদ’ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আছে। বইয়ের প্রথম বিভাগে বিনয়কুমার সরকারের চারটি প্রবন্ধ আছে : ‘দরিদ্র-নারায়ণের সমাজশাস্ত্র’, ‘লোক-ঘনত্বের সামাজিক ফলাফল’, ‘দিগবিজয়ের ধর্ম ও সমাজ’, এবং ‘উন্নতি-অবনতি ও ভাঙন-গড়নের ধরণ-ধারণ’। দারিদ্র নিয়ে প্রবন্ধে বিনয়কুমার দারিদ্র-পীড়িত জনগণের সেবার ক্ষেত্রে ভারত ও জার্মানির তুলনা করেছেন। জার্মানির দরিদ্র-নীতি আলোচনা করতে গিয়ে তিনি অনেক পরিসংখ্যান দিয়েছেন। অর্থাৎ ভাসাভাসা সমাজতত্ত্বের মাধ্যমে নয় প্রচুর তথ্যপ্রমাণের সাহায্যে তিনি নিজের মতের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। বিনয়কুমারের বক্তব্য হল, দারিদ্র-সেবার পুরোনো উপায়গুলি, যেমন ‘দারিদ্র-আইন’, ‘দারিদ্র-কর’, ইত্যাদি ইউরোপে বাতিল হয়নি, বরং নতুন মূর্তি গ্রহণ করেছে। ফলে জার্মানরা প্রতি বছর শীতের ছয় মাসে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা খরচ করে যা বাংলা সরকারের মোট বার্ষিক ব্যয়ের (১২ কোটি টাকা) তিনগুণের বেশি। আমাদের দেশ দরিদ্র-সেবার জন্য ‘সমাজ-বীমা’ বা ‘দরিদ্র-কর’, কোনো কিছুরই ধার ধারে না, আমরা এখনও নির্ভর করে আছি মান্ধাতার আমলের দানখয়রাত বা পরোপকারের মতো দরিদ্র-সেবার উপর। এই প্রথায় দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সম্পর্ক আছে, এ হল বিনয়কুমারের মতে ফার্দিনান্দ টনিস বর্ণিত গেইমিনশাফট-এর (gemeinschaft) অনুরূপ, যেখানে কমিউনিটি, পরিবার বা আত্মীয়তা প্রধান ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে জার্মান দরিদ্র-সেবার প্রথায় বিদ্যমান গেজেলশাফটের (gesellschaft) রাজত্ব বা সমাজের রাজত্ব। তিনি বলেছেন মালপত্র আদায়ের কড়াকড়ি, সঙ্ঘবদ্ধতার শক্তি, মিলিত ও যৌথ সেবার যুক্তিযোগের জন্য এই প্রথা মামুলি মুষ্টিভিক্ষা থেকে অনেক দূর চলে গেছে। বিনয়কুমার বলেছেন এই শীতের সাহায্যে ‘জাতিবর্ণের কোনোরূপ বৈষম্য করা হয় না। ১৯১৪–১৫ সনে সাহায্য-প্রাপ্তদের তালিকায় ইহুদিদিগের সংখ্যা ২৯,১০৮। ইহার মধ্যে বৃহত্তর বর্লিনবাসী ১৩,৯১৮ জন।’ শেষে তিনি মন্তব্য করেছেন : ‘হিটলার রাজের বহু কৃতিত্বের মধ্যে এই কাজটা (দরিদ্র-সেবা) বিশেষরূূপে উল্লেখযোগ্য।১০
এই প্রসঙ্গে বলি বিনয়কুমার সমাজতত্ত্ব এবং সমাজ-সংস্কারের মধ্যে পার্থক্য করতেন না, বা অন্যভাবে বলা যায় তাঁর সমাজতত্ত্বের ধারণার মধ্যে সমাজ-সংস্কারও ছিল এবং এই কারণেই তিনি দরিদ্র-সেবার মতো বিষয় নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। তিনি এই যে তুলনামূলক পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন সেটা তিনি শিখেছিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের কাছ থেকে। ব্রজেন্দ্রনাথ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন, বিনয়কুমার ব্রজেন্দ্রনাথের থেকে এই শিক্ষা পেয়েছিলেন যে, ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে তুলনামূলক পরিপ্রেক্ষিত থেকে অধ্যয়ন করতে হবে। আমরা দেখেছি তাঁর সমাজতত্ত্বের সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিছুটা ব্রজেন্দ্রনাথের প্রভাবেই তিনি মনে করতেন সমাজতত্ত্ব যেমন সমাজ দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত, তেমনি এর সম্পর্ক আছে সমাজ-সংস্কারের সঙ্গে। তিনি মনে করতেন সমাজতত্ত্ব তরুণ মনকে অন্য সংস্কৃতি সম্পর্কে সংবেদনশীল করে তোলার একটা উপায়, তাই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্বকে এক কঠোর, অনমনীয় ডিসিপ্লন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী ছিলেন না। ফলে তাঁর সমাজতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণাকে তিনি কোনো দিনই প্রণালীবদ্ধ করেননি। তবে এই বইটি যখন সম্পাদিত হচ্ছে সেই সময় একটি লেখায় তিনি সমাজতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর ধারণা ব্যক্ত করেন, যা পরে তাঁর The Sociology of Population (১৯৩৬) গ্রন্থে মুদ্রিত হয়। তিনি সমাজতত্ত্বকে নিম্নলিখিত থিমে বিভক্ত করেন : ১) প্রাতিষ্ঠানিক সমাজতত্ত্ব (পরিবার, সম্পত্তি, রাষ্ট্র, মিথ, শিল্প ও কারুকর্ম, বিজ্ঞান, আচার-আচরণ, ভাষা); নৃতত্ত্ব ও ইতিহাস; সমাজ দর্শনের ইতিহাস; ২) মনস্তাত্ত্বিক সমাজতত্ত্ব, সামাজিক মনস্তত্ত্ব, সামাজিক প্রক্রিয়া ও সামাজিক প্রকরণ; ৩) ফলিত সমাজতত্ত্ব-মানুষের পুনর্গঠনের অধ্যয়ন, সামাজিক পরিকল্পনা, সমাজ পরিবর্তন।১১
ফলে এটা পরিষ্কার যে বিশ শতকের শুরুতে অন্য যে সমাজতত্ত্ববিদরা ছিলেন, তাঁদের মতো বিনয়কুমারও সমাজতত্ত্বকে সামাজিক-সংস্কার সম্পর্কে তাঁদের চিন্তাপ্রকাশের এক মাধ্যম হিসেবে ভাবতেন। বিনয়কুমার নিজে ‘বিশুদ্ধ’ সমাজতত্ত্বে আগ্রহী ছিলেন না। যদিও তিনি যে সমাজতাত্ত্বিক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন সেই লিওপোল্ড ফন ওয়াইজ (১৮৭৬–১৯৬৯) ছিলেন একজন ফর্মাল সমাজতাত্ত্বিক যিনি মনে করতেন সমাজতত্ত্বের বিষয় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত বিমূর্ত সামাজিক প্রকরণ (forms) ও সম্পর্কের অধ্যয়নে। বিনয়কুমার অনেক বেশি আগ্রহী ছিলেন ফলিত সমাজতত্ত্বে, তিনি চাইতেন তাঁর সমাজতত্ত্ব ভবিষ্যৎ প্রগতি সম্পর্কে সুপারিশ করুক।
যদিও বিনয়কুমার খুব আবেগসহকারে ভারতের পরম্পরাগত প্রতিষ্ঠানের গতিময়তা এবং তাদের পুনর্নিমাণের প্রয়োজনীয়তার কথা লিখেছেন, তিনি কোনো কংক্রিট প্রতিষ্ঠানের ইমপিরিকাল অধ্যয়ন করেননি। ফলিত সমাজতত্ত্বে তাঁর আগ্রহ ছিল রাষ্ট্রগঠনে (state formation)। তিনি সামাজিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে যা লিখেছেন তা যুক্ত ছিল ভারতের সার্বভৌমতার প্রশ্নের সঙ্গে। তিনি সেই সকল সমাজতাত্ত্বিকদের প্রতি আকৃষ্ট হন যাঁরা ভৌগোলিক রাজনীতি ও রাষ্ট্রগঠন নিয়ে মোটামুটি দার্শনিক রচনা লিখতেন। বিনয়কুমারের বিদ্যানুরাগ গঠিত হয়েছিল স্বদেশি আন্দোলনে (১৯০৫–০৭) অংশগ্রহণের মাধ্যমে, ‘ডন সোসাইটি’র সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে। তিনি ‘ডন সোসাইটি’র জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্টের প্রতি বিশ্বস্ত থাকলেও তাঁর পথ ছিল র্যাডিকালি ভিন্ন। তিনি ভারতের সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক স্বকীয়তার উপর জোর দেননি বরং তিনি ভারতের সংস্কৃতির বস্তুময়তা বা পজিটিভ ঝোঁক প্রদর্শিত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল এই ঝোঁক ভারতের স্বশাসনের বা স্বরাজের দাবিকে বৈধতা দেয়, একই সঙ্গে এও দেখায় যে পশ্চিম ভারতকে যে ‘জগৎবিমুখ’ হিসেবে প্রতিরূপায়িত করে, তা উপনিবেশিক শাসনকে আরও যুক্তিসহ করার জন্য।
‘ডন সোসাইটি’র সদস্যরা যেমন ভারতীয় দর্শন এবং ঐতিহ্যিক সামাজিক সংগঠনের অধ্যয়ন করতেন, তেমনি পশ্চিমের দর্শন ও ইতিহাস নিয়েও পড়াশোনা করতেন। সতীশচন্দ্র ‘ডন সোসাইটি’তে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করতেন তার বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্য খুবই আকর্ষক ছিল। এইসব বিষয়ের মধ্যে ছিল ভগবৎ গীতা, ভারতীয় গ্রাম, স্বরাজের ঐতিহ্য, কান্ট ও হেগেলের দর্শন ইত্যাদি। বিনয়কুমার মনে করতেন পশ্চিমের বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের প্রতি সচেতনতা, বাঙালি যুবকদের বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরজন্য তিনি জীবনের অনেকটা ব্যয় করেছেন ইউরোপীয় সমাজবিজ্ঞানীদের লেখাপত্রের অনুবাদ ও সমালোচনায়, যাতে তাঁদের চিন্তাভাবনা বাঙালির কাছে উপলব্ধ হয়। বাংলায় সমাজতত্ত্ব পঠনপাঠনের বিকাশে এবং বাংলা ভাষার সমাজতত্ত্বের উন্নয়নে এটা ছিল তাঁর এক বড়ো অবদান। তিনি তুলনামূলক সমাজতত্ত্ব আলোচনাকেও কংক্রিট চেহারা দিতে চেয়েছিলেন, আলাদা করে সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিকগুলিকে তথ্য ও রাশিকরণের (quantification) মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে। তিনি চেয়েছিলেন এক অবজেক্টিভ স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠিত হোক, যার মাধ্যমে যথাযথ তুলনা সম্ভব হয়। সামাজিক সংস্কারে তাঁর আগ্রহ তাঁকে ফলিত সমাজতত্ত্ব সম্পর্কে কৌতূহলী করে তোলে এবং এর ফলেই তিনি দরিদ্র-সেবা, জনস্বাস্থ্য, অপরাধতত্ত্ব এবং পপুলেশনের সমাজতত্ত্বের মতো বিষয় নিয়ে চর্চা করেন।
তাঁর পরের লেখা ‘লোক-ঘনত্বের সামাজিক ফলাফল’ রচিত হয়েছে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে। এই রচনায় তিনি বলতে চেয়েছেন লোক-ঘনত্বের কোনো অপটিমাম পরিমাণ হয় না, বা তা বিচ্ছিন্নভাবে নির্ধারণ করা যায় না। কোথায় লোক-ঘনত্ব বেশি বা কম হতে পারে নির্ভর করে নানাবিধ সমাজতাত্ত্বিক বা অর্থনৈতিক কারণে। তিনি লিখেছেন : ‘উচ্চ ঘনত্বকে সকল সময়ে ‘উচ্চ জনবলের চাপ’ রূপে ধরিয়া লওয়া যায় না। জনবলের চাপ উচ্চ হইলে প্রত্যেক জনপদের পক্ষে অতিরিক্ত লোকজন সরাইয়া ফেলিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিতে হয়। কিন্তু উচ্চ ঘনত্ব থাকা সত্ত্বেও ঘটনাচক্রে জনপদ হইতে লোকজন সরাইয়া ফেলিবার আবশ্যকতা না হইতেও পারে। এমন কি উল্টটাই দেখা যাইতে পারে। অর্থাৎ উচ্চ ঘনত্বের মুল্লুকেও বিস্তর লোক-আমদানি হওয়া সম্ভব। অপর দিকে মাপজোকের বলে ‘নিম্ন জনবল চাপ’ আর নিম্ন ঘনত্বের মধ্যেও ধাঁ করিয়া সাম্য-সম্বন্ধ স্থাপন করা চলিবে না। অর্থাৎ নিম্ন ঘনত্ব দেখিবামাত্র বাহির হইতে উপনিবেশিক আমদানি করিতে অগ্রসর হইলে বেয়াকুবি করা হইবে। কারণ নিম্ন ঘনত্বের মুল্লুকেও উচ্চ চাপ থাকা সম্ভব।’১২ তিনি বলেছেন তথ্য ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে আসাম ও বোম্বাই নিম্ন ঘনত্বের দেশ হয়েও বাইরের লোকজনদের আকর্ষণ করছে, অন্যদিকে বাংলা উচ্চ ঘনত্বের মুলুক হয়েও বহু বিদেশিকে ঠাঁই দিতে সমর্থ। তাঁর মতে কৃষি-প্রধান আসাম, শিল্প-প্রধান বোম্বাই এবং উচ্চ ঘনত্বের বাংলা, তিনটি প্রদেশেরই অর্থনৈতিক আকর্ষণী শক্তি আছে বলেই বাইরের লোক এই প্রদেশে আসতে প্রলুব্ধ হচ্ছেন, কাজেই তিনটে প্রদেশ এবিষয়ে এক শ্রেণিভুক্ত হয়েছে। ঘনত্বের দিক থেকে তারতম্য থাকা সত্ত্বেও এইসব প্রদেশে অভিবাসীদের সংস্থান করতে পারছে।
‘ডন সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং স্বদেশি আন্দোলনের পরবর্তীকালে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার বদলে পজিটিভিজমের প্রতি বেশি জোর দেন। তিনি ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার আধুনিক জগতে কী তাৎপর্য সে বিষয়ে বেশি মনোযোগ দেন। প্রথম জীবনে বিনয়কুমারের অবস্থান একই ছিল কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি মনে করতেন ভারতীয় সভ্যতার এই পরিপ্রেক্ষিৎ আসলে একটা অবগুন্ঠন একটা অবভাস (appearance) যা ভারত বাইরের জগতের মুখোমুখি হবার সময় গ্রহণ করত, কিন্তু ভারতীয় সত্তার অন্তঃস্তলে আছে বস্তুবাদ। বিনয়কুমার মনে করতেন ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতা এক লম্বা আদান-প্রদানের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে, যেখানে বিরোধ আছে, সংমিশ্রণ আছে, দূরত্ব বজায় রাখা আছে, আবার সাময়িক তুষ্টিকরণও আছে। তিনি মনে করতেন এই সংস্কৃতির প্রসারে যুক্ত ব্যক্তি, নেতা বা যাকে তিনি দিগবিজয়ী বলেছেন। এই গ্রন্থে তাঁর তৃতীয় লেখা ‘দিগবিজয়ের ধর্ম ও সমাজ’-এ হিন্দুধর্মের এই দিকটি নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন হিন্দুধর্ম দিগবিজয়ের ধর্ম, অফুরন্ত আশার ধর্ম। বিবেকানন্দ হিন্দুধর্মের নতুন দিগবিজয়ের সূচনা করেছেন, আজ বাংলার হিন্দুকে নতুন দিগবিজয়ের কথা ভাবতে হবে। লিখেছেন : বাংলা দেশের ভিতরেই হিন্দুধর্মের দিগবিজয় আবশ্যক। নতুন-নতুন অনার্যকে আর্যের সিঁড়িতে আনিয়া খাড়া করা যাইতে পারে।’১৩ বলেছেন সাঁওতাল, ওরাওঁ, খাসিয়া, গারো, ইত্যাদি ‘আদিম’ জাতিকে হিন্দু সংস্কৃতির অন্তর্গত করার কাজ বাড়ানোও আবশ্যক। শেষে বলেছেন : ‘সনাতন হিন্দুরা আজও ষোল আনা হিন্দু হইতে পারে নাই। প্রত্যেক হিন্দুকে পুরোপুরি হিন্দু হইতে হইবে। হিন্দুধর্মের গভীরতর আত্মপ্রকাশকেই বলিতেছি হিন্দু ধর্মের নতুন দিগবিজয়। অর্থাৎ তথাকথিত হিন্দু নরনারীকে খাঁটি ও গভীরতর হিন্দুধর্মে দীক্ষিত করার কথা বলিতেছি।’১৪ ফলে বিনয়কুমারকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী সমাজতাত্ত্বিকই বলতে হবে। তবে তাঁর হিন্দুধর্মের ধারণা গোঁড়া নয় বরং উদারনৈতিক। বলেছেন হিন্দুর জীবন থেকে ‘ম্লেচ্ছ’ এবং ‘অস্পৃশ্য’ বস্তু দু-টি বিদায় করতে হবে। রামকৃষ্ণের ‘যত মত, তত পথ’ বাণী বাঙালি হিন্দুর মাথা কিছুটা পরিষ্কার করেছে। এর প্রভাবে আধ্যাত্মিক হিসেবে বাঙালি হিন্দু খানিকটা উদার হতে শিখেছে। বলেছেন ইসলামে যেমন হিন্দুত্ব আছে তেমনি হিন্দুত্বেও ইসলাম আছে। তবে মনে রাখতে হবে হিন্দুর ইসলাম-বিদ্বেষ তিরিশের দশকে খুব একটা তীব্র ছিল না, এটা তীব্র আকার ধারণ করে দেশভাগের পর এবং ক্রমশ এই বিদ্বেষের তীব্রতা বৃদ্ধিই পেয়েছে। সবশেষে বলেছেন : ‘হিন্দু সাহিত্যে উপনিষৎ বেদান্ত আর গীতা যতদিন আছে ততদিন হিন্দুধর্ম দুনিয়ায় দিগবিজয়ের পর দিগবিজয় চালাইবেই চালাইবে। কেননা ইহার ভিতর আছে মানুষকে ব্যক্তিত্বনিষ্ঠ করার মন্ত্র। মানুষের স্বাধীনতা, মানুষের স্বরাজ ও স্বরাজ্য সিদ্ধি, এই সবই হইল উপনিষৎ-বেদান্ত-গীতার পক্ষে ডাল-ভাত স্বরূপ। . . . কাজেই হিন্দুধর্ম সকল তরফ হইতেই অমরতা লইয়া জন্মিয়াছে। ভবিষ্যতে ইহার মার নাই। বরং সর্বদাই হিন্দুধর্ম বাড়তির পথে চলিতে থাকিবে।’১৫
গ্রন্থটির সম্প্রাদনায় বিনয়কুমারের প্রভাব খুব স্পষ্ট। যাঁরা লিখেছেন তাঁরা সকলেই ‘বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদ’-এর সদস্য, এবং অনেক লেখাই পরিষদের সভায় পঠিত হয়েছে। লেখাগুলির মধ্যে দিয়ে সমাজবিজ্ঞানের যে আকৃতি উঠে আসে তা বিনয়কুমারের চিন্তার সঙ্গে সামজ্ঞস্যপূর্ণ। হরিদাস পালিত তাঁর ‘রকমারি সমাজ ও সভ্যতা’ রচনায় নানাবিধ সমাজের এক ঐতিহাসিক বিবরণ দিয়েছেন। অন্যদিকে নগেন্দ্রনাথ চৌধুরী ‘ব্যক্তি ও সমাজ’ রচনায় ‘অধিকারের’ ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন অধিকার জিনিসটা সমাজের সৃষ্টি। সমাজ যা সমর্থন করে না তা অধিকার পদবাচ্য হতে পারে না। সমাজের অমতে জোর করে অধিকার লাভ করা চলে না। অধিকার প্রবর্তনে রাষ্ট্রের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ, বেনথাম মনে করতেন রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া অধিকার উৎপত্তিলাভ করতে পারে না, কিন্তু লেখক বলেছেন রাষ্ট্র যা খুশি, তা বিচার না করে সমাজ-প্রদত্ত কর্তব্যবুদ্ধির উপরই নির্ভর করে। প্রশ্ন হল এই যদি অবস্থা হয় তাহলে অধিকার নিয়ে কোনো আন্দোলন সম্ভব কী? অথচ আমরা জানি মানুষ লড়াই করে, আন্দোলন করে অধিকার অর্জন করে। লেখক কিছু কিছু অধিকারের কথা বলেছেন কিন্তু সামগ্রিকভাবে অধিকারের প্রশ্নটি আলোচনা করে উঠতে পারেননি। অধিকারের সঙ্গে এক বিস্তৃত বিষয়সমূহের সম্পর্ক আছে, যেমন, নাগরিকতা, সাম্য, ন্যায়, বৈধতা ইত্যাদি। অধিকার অক্রিয় (passive) বা সক্রিয় (active) দুই হতে পারে এবং সংজ্ঞিত হতে পারে দাবি হিসেবে অথবা ক্ষমতা, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা হিসেবে। অধিকার সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে এই ভিন্নতার কথা মনে রাখতে হবে। লেখকের অধিকারের ধারণা রক্ষণশীল ধারণা বলেই মনে হয়।
পঙ্কজকুমার মুখোপাধ্যায় লিখিত ‘কয়েদখানার সমাজতত্ত্ব’ একটি তথ্যপূর্ণ রচনা। লেখক কয়েদখানাকে এক সংস্কারমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচার করেছেন এবং এই প্রসঙ্গে বেশ বিস্তারিতভাবে আমেরিকার কয়েদখানা, মেক্সিকোর কয়েদখানা, জার্মানির কয়েদখানা, ইতালি এবং সর্বশেষ ভারতীয় কয়েদখানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন। লেখক বলেছেন শাস্তিকে প্রতিহিংসা হিসেবেই মানুষ দেখে এসেছে কিন্তু অপরাধীকে চিরদিন অপরাধী করে রাখলে, তার সংশোধনের ব্যবস্থা না রাখলে দণ্ডনীতির নীতিত্ব রইল কোথায়? মানবের মানবত্ব প্রকাশ হল কেমন করে? প্রকৃত কারণ নিরাকরণ করাই শাস্তিদানের মূল উদ্দেশ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। বস্তুত এই সংস্কারমূলক রচনা বিনয়কুমারের সমাজতত্ত্বের ধারণার অন্তর্গত বলেই বিবেচিত হবে।
রবীন্দ্রনাথ ‘লোক-বাহুল্যের আতঙ্ক’ রচনা করেছেন বিনয়কুমারের লোক-ঘনত্ব নিয়ে প্রবন্ধের অনুসরণে। তিনি বলেছেন রাধাকমল মুখোপাধ্যায় এবং অন্যান্য বেশ কিছু অর্থনীতিবিদ একটা কথা জোর করে প্রচার করে আমাদের আতঙ্কিত করেছেন। কথাটা হল জন্মহার যেরকম বেড়ে চলছে তাতে দু-এক দশকের পর লোকের খাদ্য জুটবে না, কেননা লোকসংখ্যা যে অনুপাতে বাড়ছে খাদ্য-সংস্থান সে অনুপাতে বাড়ার সম্ভাবনা মোটেই নেই। লেখক বিনয়কুমারের Sociology of Population (১৯৩৬) গ্রন্থের বিচারপ্রণালী গ্রহণ করে বলছেন প্রতি বর্গমাইলে লোকসংখ্যা বাড়ছে কি কমছে দেখেই বলা যায় না যে অতিবৃদ্ধি বা অতিক্ষয় হচ্ছে। তার সঙ্গে দেখতে হবে মাথাপিছু আয় কমছে না বাড়ছে, জীবনযাত্রার ধারা নিকৃষ্টতর হচ্ছে না উৎকৃষ্টতর হচ্ছে। লেখকের হিসেব অনুযায়ী ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায়ই ভারতের লোকবসতি ঘন নয়। তা ছাড়া একটা দেশের স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং শুধু জন্মহার কমিয়ে বাড়ানো যায় না, এর জন্য চাই মাথাপিছু আয় বাড়ানো। দেশ যত সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে মাথাপিছু আয়ও তত বাড়বে। শেষ অবধি তিনি যে সিদ্ধান্তে এসেছেন তা হল জন্ম-সংযমের কিছু মূল্য আছে, কিন্তু মাত্রা ছাড়ালেই জাতি ধ্বংস। ভারতের মতো নিরক্ষর জনসমাজে ব্যাপকভাবে বার্থ-কন্ট্রোলের আন্দোলন চালালে সুফলের চেয়ে কুফল বেশি। ভারতে অত্যধিক লোক বাড়ছে, এমন কথা মনে করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই, এ ভয় অমূলক। খাদ্যাভাব হবার যে আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে, চেষ্টা করে খাদ্য উৎপাদনের দ্বারা সে আশঙ্কা দূর করা চলে। শচীন্দ্রনাথ দত্তের ‘কলিকাতার মগজ’ প্রবন্ধের বিষয়টি বেশ নজর করার মতো। কলকাতার লোকেরা কীভাবে এবং কী কী বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করছেন তারই এক বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করবার চেষ্টা করেছেন লেখক। এক সপ্তাহের সংবাদপত্র থেকে সভাসমিতির বিজ্ঞপ্তি সংগ্রহ করে তিনি এ বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। আলোচ্য সপ্তাহে দেখা যায় মোট ১০৬টি সভা হয়েছিল, এর মধ্যে ধর্ম সম্বন্ধীয় সভার সংখ্যা সর্বাপেক্ষা বেশি। কিন্তু লেখক বলছেন ধর্ম নিয়ে সভার সংখ্যাধিক্য নিয়ে এরকম ভাববার কারণ নেই যে কলকাতার মানুষ ধর্মচিন্তায় মগ্ন। অন্য সব বিষয়ে সভার সঙ্গে তুলনা করলে, লেখকের মতে, ধর্মসভার সংখ্যা আদৌ বেশি বলে তাঁর মনে হয়নি। শ্রমিকদের সভা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। ফলে এরকম অনুমান করা চলে যে, শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে। শ্রমিকদের সভার পরে রাষ্ট্র সম্বন্ধীয় সভাগুলির স্থান। আলোচ্য সপ্তাহের দু-টি প্রধান রাষ্ট্র সমস্যার প্রতি লেখক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, একটি হল ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত সম্পর্কে, এবং অন্যটি হল আন্দামান বন্দিদের অনশন সম্ভাবনা সম্পর্কে। সাহিত্য, শিক্ষা, সমাজ, ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা খুবই কম। ফলে সভাসমিতিগুলি কলকাতার দাবিদাওয়া, চাহিদা, প্রয়োজনের কথা যতটা বলে, মস্তিষ্কের কথা ততটা বলেন না। লেখক অবশ্য আলোচনার শেষে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে কলকাতার মগজ খুব সক্রিয়। লেখাটি যখন বঙ্গীয় সমাজ বিজ্ঞান পরিষদে পঠিত হয় তখন বিনয়কুমার সরকার মন্তব্য করেন যে, এই প্রবন্ধটি প্রমাণ করে দৈনিক খবরের কাগজ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সমাজবিজ্ঞানের গবেষণার এইরকম গবেষণা আরও ব্যাপকভাবে করলেই ভালো হয়।
সুশীলেন্দু দাশগুপ্তের লেখা ‘জাতপাতের মাসিক পত্রিকা’ বিষয় হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বিষয়টি যে গবেষণার দাবি করে লেখকের সে সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে বলে মনে হয় না। তিনি বিভিন্ন জাতির পত্রিকার তালিকা দিয়েই ক্ষান্ত থেকেছেন। ‘বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদ’-এ এই প্রবন্ধটি যখন পঠিত হয় তখন ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত বলেন জাতিসমূহের উৎপত্তির অনুসন্ধান করলে জাতিগত সংকীর্ণতা দূর হতে পারে কারণ অনেক সময় দেখা যায় তথাকথিত উচ্চ জাতির উদ্ভব হয়েছে অতি নিম্নশ্রেণির জাতি থেকে। অনেক রাষ্ট্রনৈতিক সমস্যার সমাধানও এইভাবে হতে পারে। বিনয়কুমার সরকার বলেন সাধারণত লোকেরা গবেষণা বলতে বোঝে অতীতের বিষয় আলোচনা। কিন্তু বর্তমানের বিভিন্ন অন্দোলনের দিকেও চোখ ফেলা দরকার। ‘একালের’ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনাও সমাজবিজ্ঞানের পক্ষে বিশ্লেষণের বস্তু। তিনি বলেন সমাজবিজ্ঞানসেবীরা বর্তমান, সমসাময়িক এবং সাম্প্রতিক কর্ম ও চিন্তাপ্রণালীর বিশ্লেষণে মনোযোগী হলে সমাজবিজ্ঞান পুষ্টিলাভ করবে। লেখকের রচনায় শুধুমাত্র ছোটো একটা তালিকা আছে, বিশ্লেষণও নেই, বিবরণও নেই।
দেবেশচন্দ্র দাশগুপ্ত ‘পেশা-শিক্ষার রূপান্তর’ প্রবন্ধে সংক্ষেপে বাংলাদেশে পেশা-শিক্ষার ইতিহাস আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে আছে চিকিৎসা শিক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা, কৃষিশিক্ষা, সংগীত শিক্ষা, আইন শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদি। কিন্তু লেখক বলছেন অর্থকরী শিক্ষাকে প্রকৃতপক্ষে অর্থকরী করতে হলে বাংলাদেশে অনতিবিলম্বে ভোকেশন্যাল ও এডুকেশন্যাল গাইডেন্সের, অর্থাৎ পেশা-বাছাই ও বিদ্যা-বাছাই সম্পর্কে সহায়তা আবশ্যক। উপযুক্ত ছাত্রছাত্রীকে উপযুক্ত পেশা মনোনীত করতে ও শিক্ষালাভ করতে সহায়তা করাই পেশা-বাছাইয়ের প্রধান উদ্দেশ্য। সবশেষে লেখক বলেছেন বাংলাদেশে অর্থকরী শিক্ষার সম্প্রসারণ হলেও তা দেশের পক্ষে যথেষ্ট হবে না। কারণ আমাদের দেশে সুনিপুণ শ্রমিক বা কারিগরশ্রেণি নেই বললেই চলে। তাই ভারতবাসীকে যদি বৈদেশিক প্রতিযোগিতা থেকে বাঁচতে হয় তাহলে উপযুক্ত শিল্প শিক্ষার মাধ্যমে দেশে কারিগরশ্রেণি তৈরি করতে হবে।
বিনোদবিহারী চক্রবর্তী আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে শিক্ষা-সংস্কারক ও সমাজ-সংস্কারক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন তাঁর ‘শিক্ষা-সংস্কারক ও সমাজ-সংস্কারক’ প্রবন্ধে। আশুতোষ যে কয়েকটি নীতিকে ভিত্তি করে শিক্ষা-সংস্কার করেছিলেন, সেগুলি হল : ১) পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট অধ্যাপনা; ২) জ্ঞানের সব বিভাগে গবেষণা; ৩) বাংলা ভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা দান; ৪) ব্যাপকভাবে সাধারণ শিক্ষাবিস্তার। তিনি স্ত্রী-শিক্ষার দ্বার চওড়া করে দিয়েছিলেন। শিক্ষা-সংস্কারের ফলে শিক্ষিতের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে দেশে সীমাবদ্ধ চাকরির ক্ষেত্রে অসংখ্য চাকরিপ্রার্থীর ভিড় জমে উঠেছে। লেখক বলছেন এই ভিড় এই হুড়োহুড়ি খুব শুভ লক্ষণ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। কেননা লোকের অভাব আগেও ছিল এখনও আছে। কিন্তু আগে অভিযোগ ছিল না এখন অভিযোগ দেখা দিচ্ছে। লেখক প্রশ্ন করেছেন স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ারটা বাড়িয়ে দিচ্ছে কারা? বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশ হওয়া বা ফেল হওয়া শিক্ষিত বেকার। লেখকের মতে আমাদের বাংলাদেশেও শিক্ষিত বেকারেরাই নবীন আর্থিক ও সামাজিক ভাঙ্গন-গড়নের এক বিপুল যন্ত্রস্বরূপ কাজ করছে।
বিনয়কুমার সরকার এই গ্রন্থে ‘অপরাধ ও শাস্তির আকার-প্রকার’ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। তথ্যমূলক এই প্রবন্ধে তিনি আঠেরো শতক থেকে শুরু করে বর্তমান কাল অবধি অপরাধতত্ত্ব নিয়ে নানাবিধ তর্কবিতর্কের উল্লেখ করেছেন। আঠারো শতকে অপরাধীর দণ্ড ও কারাপ্রথার সংশোধনের কথা প্রথম আলোচনায় আসে। বলা হয় দণ্ডনীতির উদ্দেশ্য শোধ-তোলা বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা নয়, এর উদ্দেশ্য হল সংশোধন করা। কারাগারে সকলে একসঙ্গে মিশে জোট পাকায়, তাই আমেরিকায় আলাদা আলাদা খুপরি-বিশিষ্ট সেলুলার জেলের প্রবর্তন হল। ইউরোপেও ক্রমশ এই রীতির চলন হল। ১৮২৫ সালে শিশু-সংশোধনাগারের সৃষ্টি হল আমেরিকায়। এ ছাড়া আমেরিকায় ‘অনির্দিষ্ট কালের জন্য সাজা’ প্রথার প্রবর্তন হয়। অর্থাৎ কয়েদির কার্যকলাপ, আচার-ব্যবহার মতিগতি পর্যবেক্ষণ করা হয়, যদি প্রমাণ পাওয়া যায় তার স্বভাব শুধরেছে তাহলে আর তাকে জেলে পচতে হয় না। ১৭৬৪ থেকে ১৮৭৫ সাল অবধি সময়কে বিনয়কুমার অপরাধ তত্ত্বের ইতিহাসের ক্লাসিক যুগ বলেছেন।
এর পরের পর্ব হল ১৮৭৬ সাল থেকে ১৯০০ সাল অবধি, যাকে লেখক ‘বস্তুনিষ্ঠ অপরাধতত্ত্বের যুগ’ বলেছেন। ক্লাসিক মতবাদ মনে করত অপরাধীও আসলে মানুষ, শিক্ষা ও সাহায্য দিয়ে তার মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তুললে তার অপরাধ প্রবৃত্তি দূর হয়ে যাবে। ইতালির দার্শনিক চেজারে লমব্রোজো (১৮৩৬–১৯১০) তাঁর অপরাধের সমাজতত্ত্ব সম্পর্কিত রচনায় লিখলেন ক্লাসিক মতবাদ ভাবুকতাময় ও অতিপ্রত্যাশী। তিনি বললেন অপরাধের পেছনে এমন সব বাস্তব, শারীরিক ও রক্তগত প্রভাব কাজ করে যার উপর মানুষের নিজের কোনো হাত নেই। অপরাধের প্রবৃত্তি মানুষের স্বভাবগত বা রক্তগত, শুধু শাস্তির ভয়ের সাধ্য নেই তাকে সংযত করে রাখে। শিক্ষার জোরেও অপরাধীর মন ফেরানো সম্ভব নয় বরং শিক্ষা তাকে অপরাধের নতুন নতুন কলাকৌশল শেখাবে। অতএব অপরাধীকে সংশোধনের কোনো সহজ উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টা নিতান্তই বৃথা। লমব্রোজোর ভক্তদের মধ্যে ছিলেন ইংরেজ যৌনতাত্ত্বিক হ্যাভলক এলিস (১৮৫৯–১৯৩৯) যিনি ১৮৯০ সালে The Criminal বইটি লেখেন। তাঁর বিরোধীদের মধ্যে ছিলেন জার্মান সমাজতাত্ত্বিক ফ্রানৎস ফন লিজট (১৮৫১–১৯১৯)।
বিনয়কুমার নিজেও অপরাধতত্ত্ব নিয়ে লিখেছেন। তাঁর লেখা The Political Institutions and Theories of the Hindus (১৯২২) বইতে তিনি প্রাচীন ভারতীয় অপরাধ ও দণ্ডনীতির সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। তাঁর অন্য আর একটি বই Political Philosophies Since 1905 (১৯২৮)-এর পর প্রকাশিত হয়। এখানেও আধুনিক অপরাধতত্ত্বের মতবাদ এবং রাষ্ট্রনীতি ও সমাজনীতির উপর তার প্রভাব নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। এই প্রবন্ধে তিনি শুধু বিভিন্ন তত্ত্বের ঐতিহাসিক বিবরণ দিয়েছেন নিজের কোনো মন্তব্য ছাড়াই, তাই সমাজতাত্ত্বিক হিসেবে নানাবিধ অপরাধতত্ত্ব বিষয়ে তাঁর সম্মতি বা অসম্মতির কথা কিছু জানা যায় না।
সামগ্রিকভাবে এই বইয়ের প্রথম অংশ পড়লে মনে হয় সমাজ-সংস্কারের কথা বেশি আছে, সমাজতত্ত্বের কথা কম। বিনয়কুমারের সময় সমাজতত্ত্ব, সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শন এবং সমাজ-সংস্কারের মধ্যে সেভাবে পার্থক্য টানা হত না, যেমন আজকের দিনে হয়। অপরাধতত্ত্বও আজকের দিনে একটা আলাদা বিষয় হিসেবে গণ্য হয়। ক্রমবর্ধিত পেশাদারিত্ব আজকে সমাজতত্ত্বের এক স্বতন্ত্র পদ্ধতিগত সরঞ্জামের কথা বলে, যেমন নিবিড় ফিল্ডওয়ার্ক, সার্ভে টেকনিক ইত্যাদি। একই সঙ্গে উদ্ভব হয়েছে নানাবিধ তাত্ত্বিক মডেল যা সমাজে ঘটমান বিষয়ের ব্যাখ্যা চায় সমাজজীবনের গণ্ডির মধ্যে থেকে, কোনো মনস্তাত্ত্বিক বা ভারততাত্ত্বিক জ্ঞানের পরিসর থেকে নয়। যে রচনাগুলি আলোচনা করলাম তার থেকে এটা পরিষ্কার যে এগুলি মূলধারার ভারতীয় সমাজতত্ত্বের জ্ঞান সম্পর্কে আমাদের খুব বেশি জানায় না। একথা বিনয়কুমারের রচনা সম্পর্কেও সত্য।
কিন্তু আমরা যদি ভারতবর্ষে সমাজতত্ত্বের বিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করি, এবং যদি অনুসন্ধান করি ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সমাজতত্ত্ব কী আকৃতি গ্রহণ করেছে, তাহলে আমরা দেখব প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট কোনো-না-কোনো ভাবে তাদের প্রতিষ্ঠাতাদের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। প্রতিষ্ঠাতারা প্রথমে সমাজতত্ত্বকে যেভাবে কল্পনা করেছিলেন তার ছাপ মিলিয়ে যায়নি। এইভাবে বিচার করলে আমরা বিনয়কুমারের গুরুত্ব বুঝতে পারি। তিনি যে-সময় সমাজতত্ত্বের আঙিনায় প্রবেশ করেছিলেন তখন সমাজতত্ত্ব একটা অঘনীভূত বিষয় ছিল। এ ছাড়া ভারতীয় সমাজতত্ত্ব এক সমরূপী (homogenous) বিষয় নয়, এর বহু শাখা-প্রশাখা আছে যা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠচক্র থেকে জানা যায়। বিনয়কুমার ও তাঁর সহকর্মীরা এই কারণে ভারতের সমাজতত্ত্বের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র এই কারণে নয়, তাঁরা এটাও প্রদর্শিত করেছিলেন কীভাবে ভারতীয় সমাজতত্ত্ব ভারতকে বুঝতে সক্ষম। তাঁরা নিজেদের সমাজতত্ত্বের শিকড়ে গ্রথিত করে ইংরেজ শাসনে ভারতের আধুনিকতার দাবি করতে পেরেছিলেন। তাঁরা সমাজতত্ত্বকে ব্যবহার করেছিলেন প্রাচ্যবিদ্যার (orientalism) বিরোধিতার উদ্দেশ্যে এবং বর্তমান ভারতের কাছে এই হল তাঁদের অবদান।
আগেই বলেছি ‘বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদ’-এর কর্মকাণ্ডে সামাজিক দর্শন ও দর্শনমূলক ইতিহাসকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সমাজ বিজ্ঞান গ্রন্থের দ্বিতীয় অর্ধে তাই আমরা সমাজচিন্তা ও দর্শন বিষয়ক বেশকিছু প্রবন্ধ দেখতে পাই। বইয়ে এই অংশের নাম দেওয়া হয়েছে ‘দেশী-বিদেশী সমাজচিন্তার ইতিহাস’। বইয়ের দ্বিতীয়ার্ধে প্রথম লেখা হল নরেন্দ্রনাথ লাহার ‘কৌটিল্যের রাজনৈতিক আদর্শ’। লেখক বলেছেন বর্তমানকালে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে কৌটিল্যের রাষ্ট্রবাদ কোনো নৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। অসাধুতা, বিশ্বাসভঙ্গ ও অহেতুক আক্রমণই এর মূল নীতি। কিন্তু লেখকের মত হল এই গ্রন্থের মূলনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে প্রজাবর্গের সমষ্টিগত হিতই কৌটিল্যের মুখ্য উদ্দেশ্য। অকারণ যুদ্ধবিগ্রহ কৌটিল্যের অনভিপ্রেত। কৌটিল্যের উপদেশের মর্ম হল যখন অন্যান্য কারণে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠবে, তখন যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয়ের পর নিজেকে শত্রুর চেয়ে বেশি বলসম্পন্ন বুঝতে পারলে যুদ্ধ করা যেতে পারে। অর্থশাস্ত্র-এ তিনরকমের আক্রমণকারীর নাম আছে : ‘ধর্ম্মবিজয়ী’, ‘লোভবিজয়ী’ ও ‘অসুরবিজয়ী, আক্রান্ত ব্যক্তি নত হলেই ‘ধর্ম্মবিজয়ী’ রাজা তাঁর অপকারের চেষ্টা থেকে বিরত হন। অর্থসংগ্রহ ও দেশবিজয়ে ‘লোভবিজয়ীর’ লোভ; সে আকাঙ্খা পূর্ণ হলে তিনি আর আক্রমণ করেন না। কিন্তু ‘অসুরবিজয়ীর কোনো কিছুতেই তৃপ্তি নেই। ‘লোভবিজয়ী’ এবং ‘অসুরবিজয়ী’ রাজারা যে কৌটিল্যের নিন্দাভাজন তা ওদের নামকরণেই প্রকাশ পেয়েছে। লেখকের মূল বক্তব্য হল কৌটিল্য অকারণ যুদ্ধ-বিগ্রহ, অনুচিত বলপ্রয়োগ এবং অপরের প্রতি অন্যায্য আচরণ করতে উপদেশ দেন সুতরাং তাঁর রাষ্ট্রীয় আদর্শে কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই এরকম বলা অনুচিত।
শচীন্দ্রনাথ দত্ত ‘সমাজচিন্তায় ফরাসি ত্রিবীর : বোদাঁ, মঁতস্কিয়ো ও রুসো’ রচনায় তিনজন ফরাসি দার্শনিক ও সমাজচিন্তকদের মূল চিন্তাধারার এক সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন। জাঁ বদ্যাঁ (Jean Bodin, ১৫৩০–৯৬) ছিলেন ফরাসি দার্শনিক, তাঁর দু-টি বিখ্যাত গ্রন্থ হল Six Books of a Republic (১৫৭৬) এবং Method for an Easy Comprehenson of History (১৫৬৬)। লেখক বদ্যাঁ বর্ণিত সার্বভৌমতার সংজ্ঞা, ন্যাচরাল ল, রাষ্ট্রের ঐশ্বর্য্য, কে নাগরিক এবং রাষ্ট্র ও শাসনতন্ত্রের প্রভেদ প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে একটা ধারণা দিয়েছেন। এরপর তিনি শার্ল-লুই মতেসকিয়্য (Charles-Louis Montesquieu, ১৬৮৯–১৭৫৫) সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। মতেসকিয়্যর সময়ের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে লেখক বলেছেন বিলেতের বিপ্লবের (১৬৮৮) স্মৃতি তখনও সকলের মনে জেগে আছে। জন লক প্রচারিত স্বাধীনতার বাণী ইউরোপে এক নতুন সাড়া এনে দিয়েছে। অধিকন্তু ১৭১৫ সালে ফরাসিদের ‘জবরদস্ত’ রাজা চতুর্দশ লুইয়ের মৃত্যুর পর স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে এক বিরাট আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। মতেসকিয়্যর মন কিন্তু এই বিপ্লবী উদ্দামতার পক্ষে সায় দিল না, যেভাবে সাড়া দিল রুসোর চিন্তা। মতেসকিয়্য ছিলেন সংস্কারের পক্ষপাতী, বিপ্লবের নয়। মতেসকিয়্যর বিখ্যাত বই হল The Spirit of the Laws (১৭৪৮), যেখানে তিনি স্বাধীনতা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। বলেছেন : ‘নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করছি এই বিশ্বাসই স্বাধীনতার সার বস্তু।’১৬ তাঁর মতে রাষ্ট্রিক স্বাধীনতার জন্য শাসন-ক্ষমতার বিভাগ একান্ত প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র-ক্ষমতা ত্রিবিধ : আইন-প্রণয়ন ক্ষমতা, শাসন ক্ষমতা ও বিচার ক্ষমতা; তাঁর মত ছিল একই হাতে এই তিন প্রকার ক্ষমতার সমাবেশ হওয়া স্বাধীনতার বিরোধী। উল্লেখ করা যেতে পারে মতেসক্যিয়র চিন্তার দ্বারা আমেরিকার শাসনতন্ত্র বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। আমেরিকায় আইন প্রণয়নক্ষমতা, শাসন ক্ষমতা ও বিচার ক্ষমতা পরস্পরের থেকে পৃথক রাখা হয়েছে।
জাঁ জাক রুসোর (১৭১২–৭৮) বিখ্যাত বই Social Contract প্রকাশিত হয় ১৭৬২ সালে। রাজনৈতিক দার্শনিক থমাস হবস (১৫৮৮–১৬৭৯) বলেছিলেন প্রাকৃতিক অবস্থায় প্রত্যেক মানুষ তার ক্ষমতার বাসনা চরিতার্থ করবার জন্য উন্মত্ত। এরপর মানুষ যখন চাষবাস আরম্ভ করল তখন বলবান দুর্বলের উপর প্রভুত্ব করবার সুযোগ পেল এবং ধনী ও দরিদ্রের প্রভেদ সৃষ্টি হল। কলহ, যুদ্ধ, অত্যাচার, অনাচারের সূত্রপাত হল। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্যে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এই রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে এক চুক্তির ভিত্তির উপর। চুক্তি হল ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে, এই চুক্তির নাম হল সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তি অনুসারে প্রত্যেক ব্যক্তি তার ক্ষমতা ও স্বাধীনতা সমাজকে দান করল। কিন্তু ব্যক্তি-বিশেষ যে এর ফলে নিঃস্ব হয়ে গেল তা নয়। তারা যা দান করল তা পূর্ণ ক্ষমতায় ফিরে পেল নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের মধ্য দিয়ে। রুসোর মতে ‘সামাজিক চুক্তির’ ফলে প্রত্যেক ব্যক্তি তার স্বতন্ত্র ইচ্ছাশক্তি (will) সমাজকে দান করে। এইভাবে সকল ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তির সমন্বয়ে একটা ‘কালেক্টিভ উইল’ বা ‘সমষ্টিগত ইচ্ছাশক্তির’ সৃষ্টি হয়। রুসো বলেছেন এই ‘সমষ্টিগত ইচ্ছাশক্তি’ সমাজের সকলের ইচ্ছাশক্তির যোগফল নয়, এর এক স্বাধীন স্বতন্ত্র সত্তা আছে। রুসো বলেছেন এই ‘সমষ্টিগত ইচ্ছাশক্তি’ হল শাসনতন্ত্রের ভিত্তি এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের এক মডেল।
লেখক বলেছেন এই তিনজন চিন্তাবিদের ভাবনার মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে। বঁদ্যা যে সময় লিখছিলেন সে সময় রাষ্ট্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। সেইজন্য তিনি তাঁর চিন্তার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। রাষ্ট্র সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে জনসাধারণের জন্য স্বাধীনতার সমস্যার সমাধান করা আবশ্যক হয়। এই সমস্যার দিকে মনোযোগ দিলেন মতেসকিয়্য ও রুসো। এইভাবে রাষ্ট্রতত্ত্বের দু-টি প্রধান সমস্যা, রাষ্ট্রের আধিপত্য ও জনসাধারণের স্বাধীনতা এই দুই আলোচনা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। লেখক তাঁর রচনায় এই বিষয়টিকেই খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
‘বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদ’-এর সদস্যদের আলোচনায় এবং লেখায় পশ্চিমের সমাজদর্শনের নানাদিক ও বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়েছে। এই বিষয়গুলি নিয়ে বিশদ আলোচনার এখানে প্রয়োজন নেই, শুধু গ্রন্থে প্রকাশিত কয়েকটি লেখার উল্লেখ করি। দেবেশচন্দ্র দাশগুপ্ত ‘বিলাতি শিক্ষায় সমাজ-সমস্যা’ রচনায় ইংরেজদের শিক্ষাধারায় সামাজিক আদর্শের ক্রমবিকাশ আলোচনা করেছেন এবং এই প্রসঙ্গে জন লক, জন মিল্টন, হারবার্ট স্পেন্সার প্রমুখের শিক্ষাতত্ত্বের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সামাজিক আদর্শ সম্বন্ধীয় চিন্তাধারার গতি বুঝতে চেয়েছেন। হুমায়ুন কবির ‘কান্ট-দর্শনে ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও কর্তব্যবোধ’ রচনায় বলেছেন কান্টের দর্শনে কর্তব্যবোধ মানবাত্মার স্বাধীনতার প্রকাশ, কারণ যা করছি তা ছাড়া অন্য কিছু করা যে সম্ভব ছিল না এই হল কর্তব্যবোধের ভিত্তি। যা ঘটেছে তাকে অবশ্যম্ভাবী বললে কর্তব্যবোধের কোনো অর্থ থাকে না, কারণ বিভিন্ন কর্মপদ্ধতির মধ্যে স্বাধীনভাবে একটিকে বেছে নিতে পারলেই কর্তব্য অকর্তব্যের কথা ওঠে। কর্তব্যবোধ তাই ব্যক্তি-নিরপেক্ষ অথচ মানবাত্মার স্বাধীনতার উপর প্রতিষ্ঠিত। হুমায়ুন কবিরের এই লেখাটি কৃতিত্বের দাবি রাখে এইজন্যও যে বাংলা ভাষায় কান্ট নিয়ে বস্তুত কিছুই লেখা হয়নি, এই লেখাটি সেই বিরলতম রচনার একটি। বিনয়কুমার নিজে জার্মান দার্শনিক, ঐতিহাসিক ইয়োহান গটফ্রিট হ্যের্ডার-এর (১৭৪৪–১৮০১) চিন্তাধারার অনুরাগী ছিলেন। মন্মথনাথ সরকার ‘জাতীয়তার ঋষি হার্ডার’ রাচনায় বলেছেন ‘গত ত্রিশ-বত্রিশ বৎসর কাল ধরিয়া বিনয়বাবু বঙ্গবাসীদের সহিত পাশ্চাত্যের অদ্বিতীয় চিন্তাবীর হার্ডারের পরিচয় ঘটাইবার জন্য চেষ্টা করিয়া আসিতেছেন।’১৭ লেখক এই প্রসঙ্গে হ্যের্ডার বর্ণিত জাতীয় চিত্ত, জাতীয়তা ও বিশ্বজনীনতা এবং ইয়োহান গটলিপ ফিখটের (১৭৬২–১৮১৪) উপর হ্যের্ডারের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। লেখকের মতে এক একটি জাতি ও রাষ্ট্রের নাগরিক আন্তরিক আধ্যাত্মিক বন্ধনে একত্রে সমাবিষ্ট হয়, এই ধারণা ফিখটে হ্যের্ডারের থেকেই পেয়েছিলেন।
এই প্রবন্ধ সম্পর্কে বিনয়কুমার যা বলেছিলেন সেটা উল্লেখযোগ্য। প্রবন্ধ পাঠ শেষে বিনয়কুমার বলেছিলেন এতদিনে বাংলা ভাষায় হ্যের্ডার সম্বন্ধে একটা প্রবন্ধ প্রণীত হল এটা আনন্দের কথা। তিনি হ্যের্ডার সম্বন্ধে কিছু কথাবার্তা বলেছেন মাত্র ‘কিন্তু হার্ডার সম্বন্ধে একটা সুসম্বদ্ধ রচনা আজ পর্যন্ত এই হাতে বাহির হয় নাই। বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদের বৈঠকে একটা প্রবন্ধের উৎপত্তি উল্লেখযোগ্য সন্দেহ নাই। প্রবন্ধটা ছোটো, কিন্তু ইহার ভিতর হার্ডারকে কিছু-কিছু পাকড়াও করা সম্ভব।’১৮ তিনি বলেছেন ১৯০৫ সালে যখন স্বদেশি আন্দোলন শুরু হয় তখন জাতীয়তা, জাতীয়চিত্ত আমাদের আটপৌরে চিজ ছিল, কিন্তু সেইসময় হ্যের্ডার বা ফিখটের কথা শোনা যেত না, কারণ এই চিন্তা সাধারণ পশ্চিমের চিন্তা বলে বাঙালি জেনেছিল, এর উৎপত্তি যে জার্মানিতে এটা বাঙালি জানত না। উনিশ শতকের শেষ পর্বে যেসব ইউরোআমেরিকার চিন্তাবিদদের রচনা ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচারিত হত তাঁরা সকলেই প্রায় অল্পবিস্তর হ্যের্ডারের শিষ্য। ইংরেজ পণ্ডিত হেনরি মেইন (১৮২২–১৮৮৮) ও জন স্টুর্য়াট মিল (১৮০৬–১৮৭১) সেকালের ভারতে খুব প্রসিদ্ধ ছিলেন, কিন্তু তাঁরাও হ্যের্ডার-মণ্ডলের অন্তর্গত ছিলেন। তাই হ্যের্ডারের নাম না জানলেও বাঙালি হ্যের্ডারের কাজ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাই ১৯০৫ সালের ভাব ও চিন্তারাশির মধ্যে জাতীয় চিত্ত, ভারতীয় আদর্শ ইত্যাদি কথা অপরিচিত মনে হত না। ‘অর্থাৎ বুঝিতে হইবে যে, ১৯০৫ সালের বঙ্গদর্শনের অন্যতম জন্মদাতা ছিলেন জার্মান সমাজশাস্ত্রী হার্ডার।’১৯ তাঁর মতে একথা মনে রাখলে হ্যের্ডার সম্পর্কে পঠনপাঠন ভারতীয় সমাজতত্ত্ববিদদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবশেষে তিনি হ্যের্ডার সম্পর্কে যা বলেছেন তা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এই ব্যাপারে মনে রাখতে হবে একটা সময়ের পর বিনয়কুমার ভাবজ, আদর্শিক ক্যাটিগরির বদলে বস্তুগত ভাবনার দিকে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাই বোধহয় তিনি বলেছেন হ্যের্ডারের জাতীয়তা তত্ত্ব তাঁর চিন্তায় টেকসই নয়। হ্যের্ডার-দর্শনের প্রথম কথা জাতীয় চিত্ত। কিন্তু জাতিগত চেতনা, দেশের প্রাণ, সমূহের আত্মা এসব বস্তু প্রমাণ করা কঠিন। এইসব প্রধানত কবি-কল্পনার জিনিস, কাজেও লাগানো যায় কিন্তু যুক্তিতে পাওয়া যায় না। হ্যের্ডারের দ্বিতীয় কথা জাতীয় বিশেষত্ব। ‘এই দুই কথা ১৯০৬–১৯১২ সনের যুগে স্বঃতসিদ্ধ স্বরূপ লইয়াছিলাম। . . . ১৯১২ সনে সংস্কৃত শুক্রনীতি গ্রন্থের ইংরেজি তর্জমা শুরু করি। তখন হইতে জাতিগত বৈশিষ্ট্য, স্বাতন্ত্র্য, প্রভেদ ইত্যাদি ধারণাগুলির বিরুদ্ধে আমার মত পুষ্ট হইতে থাকে। পরবর্তীকালে আজ পর্যন্ত পঁচিশ-ছাব্বিশ বৎসর ধরিয়া জাতীয় বৈশিষ্ট্য এবং প্রাচ্যে-পাশ্চাত্যে প্রভেদ বিষয়ক মতগুলো মণ্ডন করাই আমার পক্ষে বিজ্ঞান-সাধনার সর্বপ্রধান কার্য রহিয়াছে। অতএব হার্ডারের গুণগ্রাহী হইয়াও হার্ডার-মতের ধ্বংসসাধন করা আমার সমাজশাস্ত্রের ধর্ম। এ এক বিচিত্র অবস্থা।’২০
এই গ্রন্থের অন্তর্গত বিনয়কুমারের ‘কথামৃতের সামাজিক কিম্মৎ’ রচনাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন রামকৃষ্ণের ধর্মে দেব-দেবীর হাঙ্গামা নেই। যার যা খুশি সে সেই দেবতার পুজো করতে পারে। তিনি মনে করেন একজন বাঙালি হিন্দুর পক্ষে এরকম দেবতা-নিরপেক্ষ ধর্ম প্রচার করা ধর্মের ইতিহাসে পুরোদস্তুর যুগান্তর। রামকৃষ্ণ কোনো জাতপাতের ধার ধারতেন না, তাঁর ধর্মসংস্কার বিলকুল জাতপাত-নিরপেক্ষ। তাঁর মতে এই ধরনের ধর্মপ্রচারক বা দীক্ষাগুরু বা নীতিস্রষ্টা জগতে বিরল। রামকৃষ্ণ প্রত্যেক মানুষকেই নিজের শক্তির উপর দাঁড়াতে উপদেশ দিয়েছেন। সংসারের দুর্বলতা, বিপদ, শত্রুতা, হিংসাদ্বেষ থেকে আত্মরক্ষা করতে মানুষের পক্ষে নিজের চরিত্রবল ছাড়া আর কোনো মন্ত্র নেই। আত্মশক্তির চাষই সংসারের জীবনসংগ্রামে আসল সম্পদ।
বিনয়কুমার বলেছেন আমরা রামকৃষ্ণকে ভগবানের আসন দিয়ে মনে করি তাঁর প্রতি চরম গৌরব করলাম। কিন্তু রামকৃষ্ণকে এই আসনের চেয়ে মহত্তর আসন দেওয়া সম্ভব। রামকৃষ্ণ বিশ্বসভ্যতায় ‘বাঙালি যুগের’ প্রবর্তক। ইতিহাস বিচার করে তিনি বলেছেন উনিশ শতকই বাঙালির পক্ষে আসমুদ্র হিমাচল ভারতীয় কর্মক্ষেত্রে প্রভাববিস্তারের সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য যুগ। এই যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি দিগবিজয়ী বিবেকানন্দ, আর সেই বিবেকানন্দ যে ব্যক্তির কাছে নিজ কৃতিত্বের, কর্মরাশির ও কীর্তির জন্য খোলাখুলি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে গেছেন, তিনি হলেন রামকৃষ্ণ। বিনয়কুমার বলেছেন অবতার বা মহাপুরুষ বা দেবতুল্য ব্যক্তির জরিপ করবার পদ্ধতি খুব সোজা। দেখতে হবে লোকটি মানুষের অভাব পূরণ করতে পারে কি না। তিনি বলেছেন : ‘রামকৃষ্ণ ‘কথা’র বেপারী। তাঁহার মুখ হইতে কতকগুলা কথা বাহির হইয়াছে। ব্যস। এই কথাগুলাই তাঁহার দান। এই কথাগুলাই মানুষকে চাঙ্গা করিয়া তুলিতেছে। রামকৃষ্ণের বচন বহরে দেড়গজি লম্বা নয়। তাঁর বাণীর বহর দেড়-দুই লাইন মাত্র। কখনও বা দেড়-দুই শব্দে তা পরিপূর্ণ মূর্তি লাভ করে। তাঁর কথাগুলি সহজ-সরল মন্ত্রের মতো ছোটো। সাধারণ মানুষের ভাষায় এই বচনগুলি গড়া। সাধারণ মানুষের বোঝার জন্য এইসবের জন্ম। লোকের মুখে মুখে এইসব কথা চলতে পারে। এর জন্য কোনো টীকা, টিপ্পনী, ব্যাখ্যা, ভাষ্য ইত্যাদি প্রয়োজন হয়না। এই মানুষের জীবনে এই কথাগুলির মূল্য তত বেশি।’২১
এই বাণীর সাহায্যে রামকৃষ্ণ মানুষকে শক্তিযোগী করে তুলতে প্রয়াসী। যে নিজেকে দুর্বল বিবেচনা করে, বিনয়কুমারের মতে, সে রামকৃষ্ণের দেড়-দুই শব্দে শক্তিশালী হতে বাধ্য। বিনয়কুমার লিখেছেন : ‘রামকৃষ্ণের বাণীর ‘পারিবারিক প্রবন্ধ’ও নাই, ‘সামাজিক প্রবন্ধ’ও নাই। পরিবার মেরামবৎ করিতে হয় কী করিয়া, সমাজ-সংস্কারের প্রণালী কীরূপ এইসব আলোচনা রামকৃষ্ণ কথামৃতের বড়ো জিনিস নয়। রামকৃষ্ণ চিনেন ব্যক্তিকে। তাঁহার কথাবার্তায় পাওয়া যায় ব্যক্তিগুলিকে স্বতন্ত্র-স্বতন্ত্রভাবে গড়িয়া তুলিবার হদিস। প্রত্যেক মানুষ রামকৃষ্ণ কথামৃত হইতে নিজ-নিজ ব্যক্তিত্ব গড়িয়া-পিটিয়া তুলিবার সংকেত পায়।’২২ এই যুক্তি থেকে বিনয়কুমার রামকৃষ্ণ সম্পর্কে বেশ একটা র্যাডিকাল সিদ্ধান্তে এসেছেন। তিনি বলেছেন সমাজ-রাষ্ট্র সাধারণত ব্যক্তিকে দাবিয়ে রাখতে অভ্যস্ত, ব্যক্তির উপর সমাজের দৌরাত্ম্য অসীম। এই দৌরাত্ম্য আর দাসত্ব থেকে মুক্তি দান করা রামকৃষ্ণবাণীর অন্যতম কীর্তি। রামকৃষ্ণের আবহাওয়ায় আসলে মানুষ সমাজের তোয়াক্কা না করে নিজের ব্যক্তিত্ব জাহির করতে শেখে। রামকৃষ্ণ তাঁর দেড়-দুই লাইনের জোর ব্যক্তিমাত্রকেই আত্মার পরিপূর্তির পথ দেখাতে সমর্থ।
বিনয়কুমার বই লিখেছেন অনেক, নানাবিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। ফলে একটি বইয়ের কয়েকটি প্রবন্ধ আলোচনা করলে তাঁর সমাজতত্ত্বের পরিধি সম্পূর্ণরূপে বোঝা সম্ভব নয়। যদিও এই অধ্যায়ের আগের অংশে তাঁর সমাজতাত্ত্বিক ধারণার একটা পশ্চাৎপট দেবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তা যথেষ্ট নয় বোধ করেই বিনয়কুমারের সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাভাবনার আরও একটু বৃহত্তর পটভূমি পাঠকদের সামনে উপস্থিত করবার চেষ্টা করছি। বিনয়কুমার গবেষণা করেছেন ইতিহাস, দর্শন, নৃতত্ত্ব, ধনবিজ্ঞান, সমাজশাস্ত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি নানা বিষয়ে। বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত ছাড়া তিনি ফরাসি, জার্মান ও ইতালিয়ান ভাষা জানতেন। বিনয়কুমারের সমাজদর্শন বস্তুনিষ্ঠ দুনিয়া পর্যালোচনার নিরেট বাস্তব ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। বস্তুনিষ্ঠ, দুনিয়ানিষ্ঠ ও অফুরান আশাবাদ এর প্রাণ। এই সমাজদর্শনে সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের স্বরাজ এক বড়ো জায়গা জুড়ে আছে।
আগেই বলেছি যৌবনের প্রারম্ভে তিনি ‘ডন সোসাইটি’র জনক সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের দ্বারা প্রভাবিত হলেও তাঁর জীবনে বিবেকানন্দের প্রভাব ছিল গভীর। বিবেকানন্দের থেকে তিনি পেয়েছিলেন দিগবিজয়ের দর্শন, যে কথা এর আগে আলোচনা করেছি, সতীশচন্দ্রের থেকে তিনি পান স্বদেশসেবা ও নিঃস্বার্থ কর্মযোগের দীক্ষা। বিনয়কুমারের সমাজদর্শনের একটি প্রধান ভিত্তি হল মানবজাতির মূলগত ঐক্য। আমরা দেখেছি হ্যের্ডার সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তাঁর সমালোচনা হিসেবে তিনি ওই একই কথা বলেছিলেন। প্রথমদিকে বিনয়কুমার প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বিষয়ক সুপ্রচলিত মতবাদ মেনে নিয়েছিলেন। সতীশচন্দ্রের ‘ডন সোসাইটি’তে, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সভ্যতার গড়নে ও প্রকৃতিতে মৌলিক পার্থক্য আছে এই মতবাদ প্রচার করা হত। ভগিনী নিবেদিতাও ‘ডন সোসাইটি’র সদস্যদের সামনে একই ভাবধারা প্রচার করতেন। ভারতীয় সভ্যতার বৈশিষ্ট্য জগৎ-বিমুখতা, ব্রহ্মজিজ্ঞাসা, অতীন্দ্রিয়তা, আধ্যাত্মিকতা আর পাশ্চাত্য সভ্যতার সারবস্তু সংসারনিষ্ঠা, ইহলৌকিকতা, ভোগবাদ, ইন্দ্রিয়পরায়ণতা, এই ছিল সুপ্রচলিত মতবাদ। বিনয়কুমার প্রথম প্রথম এঁদের প্রচারিত মতবাদ স্বীকার করে নিয়েছিলেন, কিন্তু পরে তাঁর মনে হয় এই বিভাজন একটা ফাঁদ বা কৌশল যার মাধ্যমে উপনিবেশিক শাসনের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ ভারতের সংস্কৃতি জগৎবিমুখ, ইহলোকের চেয়ে পরলোকের প্রতি আকৃষ্ট, ব্রহ্মবাদী, আধ্যাত্মিক ইত্যাদি বলার অর্থ হল তখনকার মানুষের শাসনপরিচলনা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই, তারা স্বশাসনে বা স্বরাজের যোগ্যতাও অর্জন করেনি কারণ তাদের এ ব্যাপারে কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। এই কারণেই বিনয়কুমার দুই সংস্কৃতির বিভাজনের তত্ত্ব বর্জন করলেন এবং ভারতের বস্তুবাদী চরিত্র প্রকাশ করতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠলেন। তাঁর লেখা হিন্দু সমাজতত্ত্বের বাস্তব ভিত্তি (১৯১৪), হিন্দু চোখে চীনা ধর্ম (১৯১৭), Futurism of Young Asia (১৯২২) ইত্যাদি গ্রন্থ এর প্রমাণ।
বিনয়কুমার ১৯১১–১৩ সালে শুক্রাচার্যের নীতিসার, যা সাধারণভাবে শুক্রনীতি নামে পরিচিত, এই সংস্কৃত গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদে মনোযোগী হন। তিনি মনে করেন প্রাচীন ভারতীয় সমাজতত্ত্বের প্রকৃত স্বরূপ গভীরভাবে বুঝবার পক্ষে প্রন্থখানি অত্যন্ত মূল্যবান। এই গ্রন্থের তর্জমাকালে বিনয়কুমার ভারতীয় সভ্যতার গড়ন ও প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন আলোর সন্ধান পান। তিনি গভীরভাবে উপলবদ্ধি করেন যে, প্রাচীনকালের হিন্দুজাতি শুধু ধর্ম ও অধ্যাত্মিকতায় নিমজ্জিত হয়ে থাকত না, তারা ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ সব রকম জীবনচর্চায়ই পারদর্শী ছিল। ভারতীয় সভ্যতার প্রকৃতিগত বিশেষত্ব তার অধ্যাত্মিকতা, এই মতবাদ বিনয়কুমারের দৃষ্টিতে যুক্তিহীন বলে প্রতীয়মান হয়। তিনি নিজেই বলেছেন : ‘সেই শুক্রনীতি তর্জমার যুগে (১৯১১–১৩) ফিরে যাচ্ছি। ভারতীয় সংস্কৃতির এক নয়া মূর্তি আমার নজরে জোরের সহিত দেখা দিতে শুরু করেছিল। সে হচ্ছে সমরনিষ্ঠ, সংসারনিষ্ঠ, রাষ্ট্রনিষ্ঠ, হিংসানিষ্ঠ, শক্তিনিষ্ঠ ভারত। তার পাশে নিবেদিতা-প্রচারিত ভারত-মূর্তি অতি কাল্পনিক, অতি অলীক, অতি-ভাবনিষ্ঠ, অতি-আদর্শনিষ্ঠ মনে হচ্ছিল। অর্থাৎ হিন্দু-সাংস্কৃতি-বিষয়ক নিবেদিতা-প্রচারিত ব্যাখ্যাগুলিকে আমি ডন সোসাইটির চিন্তাধারা, ব্রহ্মবান্ধবের বাণী, রবীন্দ্র সাহিত্য ইত্যাদির মতন প্রায় এক দরের ভেবেছি। সবই এক সঙ্গে বর্জনও করেছি। এই সুপরিচিত ধারার প্রভাবে প্রাচ্য-গৌরব উজ্জ্বল আকারে দেখা দেয়। আর বুকটাও বেশ-কিছু ফুলে উঠে। কিন্তু ব্যাখ্যাগুলো অনেকটা তথ্যহীন ও বস্তুহীন।’২৩
এর পরবর্তী পর্বে হিন্দু সমাজতত্ত্বের বাস্তব ভিত্তি সম্পর্কে বিনয়কুমার ব্যাপক গবেষণা শুরু করেন। এই গবেষণার ফলস্বরূপ প্রকাশিত হয় তাঁর Positive Background of Hindu Sociology (১৯১৪)। অগ্যুস্ত কোঁৎ-এর সমাজতত্ত্ব থেকে আহরিত ‘পজিটিভ’ শব্দের অর্থ সংসারনিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ, ইন্দ্রিয়নিষ্ঠ বা জাগতিক অর্থাৎ অতীন্দ্রিয়, পরলৌকিক শব্দের ঠিক বিপরীত। এই গ্রন্থে বিনয়কুমার জোর দিয়েছেন প্রাচীন হিন্দুজাতির সাংসারনিষ্ঠ, বিজ্ঞাননিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ, লড়াইনিষ্ঠ শক্তিনিষ্ঠ মূর্তির উপর। ভারত মূলত ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা ও পরলৌকিকচর্চার দেশ, ভারততত্ত্বজ্ঞদের প্রচারিত এই ইতিহাস ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে এই গ্রন্থটি এক প্রতিবাদ বিশেষ। খুব সংক্ষেপে এই গ্রন্থের বক্তব্য হল ভারত ততখানি বস্তুনিষ্ঠ, ততখানি যুদ্ধপ্রিয়, ততখানি সাম্রাজ্যবাদী যতটা ইউরোপ আবার ইউরোপ ততটাই নীতিনিষ্ঠ ও আধ্যাত্মিক যতটা ভারত। তিনি বলতেন সাধারণত প্রচার করা হয় ভারত অহিংসার দেশ কিন্তু তাঁর মতে ভারতের হিংসানীতি কারোর চেয়ে কম নয়, এবং যুদ্ধলিপ্সাও অত্যন্ত শক্তিশালী। চার খণ্ডে সম্পূর্ণ এই গ্রন্থের শেষ খণ্ড Introduction to Hindu Positivism প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে। ২৪
এই মতবাদের পরিপূর্ণ বিকাশ আমরা দেখতে পাই তাঁর লেখা Futurism of Young Asia (১৯২২) গ্রন্থ। তুলনামূলক সমাজবিজ্ঞানের পদ্ধতি অবলম্বন করে এই গ্রন্থে বিনয়কুমার পশ্চিমের পণ্ডিতদের ত্রুটি বা দুর্বলতাগুলি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন তুলনামূলক আলোচনায় পশ্চিমের পণ্ডিতরা প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্য থেকে সমশ্রেণির তথ্য ব্যবহার করেন না। তাঁরা প্রায়ই উনবিংশ ও বিশ শতকের পাশ্চাত্য সভ্যতার আধুনিক গড়নের সঙ্গে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারত-সংস্কৃতির তুলনা করে প্রাচ্যের দীনতা ও হীনতাকে জগৎসমক্ষে ধরেন। এ ছাড়া প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের তথ্য ব্যাখ্যায় একই ধরনের বিশ্লেষণ-প্রণালী তাঁরা প্রয়োগ করেন না। অধিকাংশ পণ্ডিত ঐতিহাসিক বিবর্তনের বিভিন্ন ধারা বা স্তর সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নন। তাই তাঁরা বিজ্ঞানের নামে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সভ্যতা সম্বন্ধে বহু অবৈজ্ঞানিক ও বুজরুকিপূর্ণ মতবাদ প্রচার করেন। তাঁর মূল বক্তব্য মানুষ মূলত এক; রক্তমাংসের জীব হিসেবে মানুষ দুনিয়ার সর্বত্রই একই ভাবে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে চেয়েছে ও শ্রীবৃদ্ধি চেয়েছে। ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ কোনোকিছুই তার কাছে ফেলিতব্য জিনিস নয়। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যবাসীর জীবনদৃষ্টি বা বিশ্বদৃষ্টির মধ্যে তিনি মৌল পার্থক্যের বদলে খুঁজে পেয়েছেন মৌল সাদৃশ্য।
বিনয়কুমারের দরিদ্র ও দুর্গতদের সমাজতত্ত্বে আগ্রহের কথা আগে আলোচনা করেছি। বিত্তহীনতা বা দারিদ্র, মনুষ্যত্বহীনতার পরিচায়ক নয়, তিনি একথা বিশ্বাস করতেন। তিনি মনে করতেন যেহেতু দুনিয়ার সর্বত্র সামাজিক রূপান্তর সাধিত হচ্ছে, সুতরাং বাঙালি সমাজ পরিবর্তনে দরিদ্রদের ভূমিকা ক্রমশ বাড়তে থাকবে। বিনয়কুমার তাঁর সমাজদর্শনে নিরক্ষর ও অশিক্ষিত শব্দ দু-টিকে একার্থক বিবেচনা করতেন না। অক্ষরজ্ঞান না থাকলে ভোটাধিকার থাকবে না এই সুপ্রচলিত মতবাদের প্রতি তাঁর কোনো সায় ছিল না। কারণ তিনি নিরক্ষরকে অশিক্ষিত বলতেন না। তিনি মনে করতেন নিরক্ষর লোকেরাও বেশ শিক্ষিত হতে পারে। তিনি মনে করতেন পৃথিবীতে আদৌ কোনো অশিক্ষিত মানুষ আছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা যায়। কারণ কাজ করতে করতে প্রত্যেক মানুষই, সে যত বড়ো হোক না কেন, দিনের পর দিন তার মগজের চাষ করছে। এর ফলে তার জ্ঞানও বাড়ছে। যারা কোনো-না-কোনো পেশায় নিযুক্ত তারা লিখতে-পড়তে পারে কি না এ আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। তিনি মনে করতেন গণতন্ত্রকে যদি একটা জীবন্ত বিশ্বাসে পরিণত করতে হয় তবে তার ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপিত হবে নিরক্ষরদের অধিকারের উপর।
সবশেষে এই বইয়ের যা মূল বিষয়বস্তু, অর্থাৎ বাংলা ভাষায় সমাজবিদ্যা-চর্চা, সেই বিষয়ে বিনয়কুমারের দায়বদ্ধতার কথা বলা যাক। বাংলা ভাষায় সমাজবিদ্যা প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে বিনয়কুমার প্রভূত পরিশ্রম করেছিলেন; বাংলা ভাষায় মূল গ্রন্থ লেখা ছাড়াও ‘বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদ’-এর প্রতিষ্ঠা করেন, নিজেও ইংরেজি, ফারসি, জার্মান ভাষা থেকে কতকগুলি মূল্যবান গ্রন্থ বাংলায় তর্জমা বা ভাবানুবাদ করেন। সিরিয়াস গদ্যরচনায় তাঁর এক বিশিষ্ট রচনাশৈলী ছিল। তাঁর গদ্যে তিনি যেমন কথ্য ভাষার ব্যবহার করতেন, তেমনি নিতান্ত সহজ ও সরলভাবে দুরূহ এবং জটিল বিষয়ের বিশ্লেষণ করতে পারতেন। এইভাবে তাঁর লেখার একটা স্টাইল গড়ে ওঠে যা সে সময়কার পাঠকেরা উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর গদ্যরীতিতে তিনি ছোটোমাপের বাক্য ব্যবহার করতেন, সাধু শব্দের সঙ্গে গ্রাম্য, মেঠো, চলতি শব্দের সজ্ঞান প্রয়োগ করতেন এবং তিনি সাধু-চলতি বাংলা শব্দের সঙ্গে হিন্দি, উর্দু, ফারসি শব্দও মিশিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে তিনি অনেক জোরালো বাক্যগঠন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। নতুন নতুন শব্দের প্রয়োগ ও গুরুচণ্ডালির পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টায় বিনয়কুমার যে রচনাশৈলী তৈরি করেন তা নিয়ে বিতর্কও হয়েছিল সেই সময়ে। লেখক ও অধ্যাপক ত্রিপুরশঙ্কর সেনশাস্ত্রী (১৮৯৭–১৯৮০) বলেছিলেন বিনয়কুমার বাংলা ভাষার আভিজাত্য রক্ষা করতে পারেননি, তিনি বাংলা ভাষার জাত মেরে চরম অবিনয়েরই পরিচয় দিয়েছেন। উত্তরে বিনয়কুমার বলেন বাংলা ভাষার জাতটা এত ঠুনকো নয় যে এত সহজেই তা ভেঙে যাবে, তিনি বরং বাংলা ভাষাকে সুস্থতর ও সবলতর করতে চেয়েছেন।
মনে হয় ‘বঙ্গীয় সমাজবিদ্যা পরিষদ’ ১৯৪৯ সালে বিনয়কুমারের মৃত্যুর পর আর বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তিনিই ছিলেন এর প্রাণপুরুষ। বাংলার বিদ্বৎসমাজ (১৯৭৮) বইতে উনিশ শতকে বাঙালিরা জ্ঞানের আহরণ ও প্রচারের জন্য যে-সব সভাসমিতি স্থাপন করেছিলেন তার এক বিশদ বিবরণ দিয়েছেন বিনয় ঘোষ। এইসব সভাসমিতির নামেই বোঝা যায় এগুলি ছিল মূলত জ্ঞান ও বিদ্যা আলোচনার প্রতিষ্ঠান। কিছু সভা ছিল যেগুলি স্থাপিত হয়েছিল বাংলা ভাষায় সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ের অনুশীলন ও আলোচনার জন্য, যেমন ‘সর্বতত্ত্বদীপিকা সভা’, ‘বঙ্গভাষাপ্রকাশিত সভা’ ইত্যাদি। এইসব সভার জীবন শেষ হয়ে যায় মোটামুটি উনিশ শতকের মধ্যেই। এই ধারার এক শেষ নিদর্শন ছিল ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদ’, যার আয়ুও শেষ হয়ে যায় স্বাধীনতার পরেই। বিনয় ঘোষ নিজেই লিখেছেন যে, যুক্তি বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে ক্রমেই বাঙালি বিদ্বৎসমাজের একটা বড়ো অংশ গুরুবাদ, ভক্তিবাদ ও অবতারবাদের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে পড়েন এবং অন্য অংশ, যাঁরা বিত্তলোভী ও ক্ষমতালোভী, তাঁরা শাসক-শোষকদের স্তাবকতা করতে থাকেন মান্ধাতার আমলের বুলি কপচে। যার নিট ফল বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চার সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হল। ‘বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান পরিষদ’-এর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষায় সমাজবিদ্যার সম্ভাবনাও শেষ হয়ে গেল। এরপর বাঙালি এ ব্যাপারে আর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
১. বিনয়কুমার সরকার ও অন্যান্য (সম্পা), সমাজ বিজ্ঞান, প্রথম ভাগ (কলকাতা : চক্রবর্তী চ্যাটার্জ্জি এণ্ড কোম্পানি লিমিটেড, ১৯৩৮)। বইটির অন্য সম্পাদকরা হলেন : সুবোধকৃষ্ণ ঘোষাল, হরিদাস পালিত, নগেন্দ্রনাথ চৌধুরী, পঙ্কজকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, শচীন্দ্রনাথ দত্ত, সুশীলেন্দু দাশগুপ্ত, হুমায়ুন কবির, দেবেশচন্দ্র দাশগুপ্ত, বিনোদবিহারী চক্রবর্তী, নরেন্দ্রনাথ লাহা, মন্মথনাথ সরকার, বাণেশ্বর দাস। এই অধ্যায়ে উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে প্রবন্ধটি যদি এই সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে লেখক ও রচনার নাম থাকবে, বাহুল্যবোধে বারবার বইয়ের নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত থেকেছি।
২. বিনয়কুমার সরকার, ‘বাংলায় সমাজবিজ্ঞান’, পৃ. ২৭।
৩. ওই, পৃ. ২৭।
৪. ওই, পৃ. ৩।
৫. ওই, পৃ. ১৭।
৬. ওই, পৃ. ১৭।
৭. ওই, পৃ. ৪।
৮. ওই, পৃ. ১৫।
৯. সুবোধকৃষ্ণ ঘোষাল, ‘সমাজবিজ্ঞান কী?’, পৃ. ৪৩।
১০. বিনয়কুমার সরকার, ‘দরিদ্র-নারায়ণের সমাজশাস্ত্র’, পৃ. ৭৩, ৭৯।
১১. Benoy Kumar Sarkar, The Sociology of Population with Special Reference to Optimum Standard of Living and Progress : A Study of Social Relativities (Calcutta : N M Roy Chowdhury and Co., 1936), পৃ. ৮।
১২. বিনয়কুমার সরকার, ‘লোক-ঘনত্বের সামাজিক ফলাফল’, পৃ. ৮৯–৯০।
১৩. বিনয়কুমার সরকার, ‘দিগবিজয়ের ধর্ম ও সমাজ’, পৃ. ১১২।
১৪. ওই, পৃ. ১১২।
১৫. ওই, পৃ. ১২৮–২৯।
১৬. শচীন্দ্রনাথ দত্ত, ‘সমাজচিন্তায় ফরাসি ত্রিবীর : বোদাঁ, মঁতস্কিয়ো ও রুসো’, পৃ. ৪৩৭।
১৭. মন্মথনাথ সরকার, ‘জাতীয়তার ঋষি হার্ডার’, পৃ. ৪৭০।
১৮. ওই, পৃ. ৪৮১।
১৯. ওই, পৃ. ৪৮৫।
২০. ওই, পৃ. ৪৮৬–৮৭।
২১. বিনয়কুমার সরকার, ‘কথামৃতে’র সামাজিক কিম্মৎ’, পৃ. ৪৯৭।
২২. ওই, পৃ. ৫০২।
২৩. হরিদাস মুখোপাধ্যায়, বিনয় সরকারের বৈঠকে (কলকাতা : চক্রবর্তী, চ্যাটার্জি এণ্ড কোম্পানি, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৪৪), পৃ. ২৯২।
২৪. Benoy Kumar Sarkar, Dominion India in World Perspectives : Economic and Political (Calcutta : Chuckervertty Chatterjee and Co. 1949).
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন