সোঞাই – ১৫

নারায়ণ সান্যাল

কালবৈশাখীর প্রভঞ্জন আসে ভৈরব- রভসে! বাতাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, চরাচর স্তব্ধ। রৌদ্রতাপদগ্ধ অপরাহ্ণের আকাশে নেমে আসে আতঙ্কতাড়িত সূর্যসাক্ষী চিলের আর্তনাদ। আসন্ন সর্বনাশের প্রতীক্ষায় প্রকৃতি প্রহর গনে

সোঞাই গ্রামখানিরও সেই অবস্থা।

ব্রজেন্দ্রনারায়ণ সূর্যসাক্ষী চিলের মতো গ্রামকে একটি অমঙ্গলবার্তা শুনিয়ে মিলিয়ে গেছেন আকাশের নিঃসীমায়। তারাপ্রসন্ন আর রূপেন্দ্র নিরলস নিষ্ঠায় গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রচারকার্য। বর্গী-প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলার কাজ। বর্ণহিন্দু সমাজপতিরা অধিকাংশই ব্যাপারটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি। হাজার হোক, ভাস্কর পণ্ডিত লোকটা বামুন, তাঁর সৈন্য দলের কেউ যবন নয়। তাদের সম্বন্ধে লোকে যেসব গুজব ছড়াচ্ছে তা অতিরঞ্জিত বৈ কিছু নয়।

দুর্গাচরণ নন্দ চাটুজ্জেকে জনান্তিকে বলেন, বড়কর্তার তো আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই, কতকগুলো ছেলে-ছোকরাকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে নিজে ডুব মেরেছেন। আর ‘হুপুই’ এর গন্ধ পেলে এসব চ্যাঙড়ার দল তো একপায়ে খাড়া। বিশেষ যদি চাঁদা-তোলার ব্যবস্থা থাকে। তা সে ওলাবিবি, শীতলা মায়ের বারোয়ারী পুজোই হক আর বর্গী ঠেঙানোর হুজুগই হোক

নন্দ বলেন, শুনলাম—বড়কর্তা নাকি হাজার তঙ্কা…

বাধা দিয়ে দুর্গা বলেন, ক্ষেপেছ! গুনে দেখেছ? ও সব ওরা রটাচ্ছে—যাতে তোমার আমার কাছ থেকে মোটা চাঁদা চাইতে পারে। এ একটা কতা হল? ভাস্কর পণ্ডিত নিষ্ঠাবান বামুন! ত্রিসন্ধ্যা জপ না করে জলস্পর্শ করেন না।

কিন্তু আপামর জনসাধারণের মধ্যে একটা সাড়া ‘জেগেছে। কী হিন্দু,কী মুসলমান। তারা বিশ্বাস করেছে। না করে উপায় কী? ইতিমধ্যে বীরভূম বিষ্ণুপুর থেকে দলে দলে সর্বহারার দল যে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। তারা অন্ধ, খঞ্জ—কারও খোয়া গেছে নাক, কারও কান—এখনো ঘা শুকাইনি। অনেকের মা-বোনকে চরম লাঞ্ছনা সইতে হয়েছে। যে হতভাগিনীরা প্রাণে মরেনি, তাদের যে এখনো প্রাণ-ধারণের গ্লানি সইতে ভিক্ষায় বের হতে হয়েছে ভিন্ গাঁয়ে। ওদের পাকা ধানের ক্ষেত আর পর্ণকুটীর জ্বালিয়ে দিয়েছে বর্গী সৈন্য—ওরা আশ্রয়প্রার্থী, আহার্যসন্ধানী।

এ যে প্রত্যক্ষ সত্য! অস্বীকার করবে কে?

বিশেষ করে সাড়া জেগেছে অন্ত্যজ পল্লীতে। দামোদরের ওপারে তাদের সারি-সারি বস্তি—কৈবর্ত, নমঃশূদ্র, বাগদী, বায়েন পরিবার। এক দশক আগে—মুর্শিদকুলীর আমলে ওদের অনেকেই ছিল ডাকাত। কেউ কেউ এসেছে উত্তর অথবা পূর্ববঙ্গ থেকে। পদ্মার চরে জমিদারের তরফে তারা মারদাঙ্গা করত। ব্রজেন্দ্রনারায়ণ তাদের ডেকে এনে জমি দিয়ে রসিয়েছিলেন। আলিবর্দীর আমলে চোরডাকাতের উপদ্রব অনেক কমে গেছে। মুর্গিচুরির অপরাধে তখন ফাঁসির ব্যবস্থা। ফলে ডাকাতেরা ভাদুড়ীমহাশয়ের পরামর্শ মেনে নিয়ে ঘর-গেরস্থালি করতে রাজী হয়েছে। দামোদরে মাছ ধরা, নৌকা বাওয়া, মহাজনের ক্ষেত-খামারে মুনিষ খাটায় মন দিয়েছিল। প্রতিরোধ-পরিষদের আহবানে তাদের রক্তে দোলা লাগল। ওদের মাতব্বর ভীমা বাগদী। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স—ইয়া বুকের ছাতি—ইয়া পাট্টা জোয়ান এখনও। তারাপ্রসন্নের দরবারে এসে যুক্ত করে নিবেদন করল, তাইলে মোদের যত্তরগুলান প্রিতিদানের আজ্ঞা হোক হুজুর।

প্রিতিদান’ মানে ‘প্রতিদান’ নয়, ‘প্রত্যর্পণ’। ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে হলে ভীমা বাগদী এ জাতীয় ভদ্র ভাষা ব্যবহার করে থাকে। বুঝতে অসুবিধা হল না তারাপ্রসন্নের। তিনি বললেন, কিন্তু গঙ্গাজল হাতে নিয়ে প্রতিজ্ঞা কর, এই সব বর্গীর হাঙ্গামা মিটে গেলে আবার আমার মালখানায় যন্ত্রগুলো ‘প্রিতিদান’ দিবি!

একগাল হেসেছিল ভীমা বাগদী, কী যে বলেন কত্তা! হাঙ্গামা মিটে গেলে ও নিয়ে আমরা কী করব? না কি বলিস রে তোরা?

ভীমা এসেছিল সদলবলে। তার জোয়ান ভাইপো ঈশান সর্দার বলে, সে আর বলতি।

তারাপ্রসন্নের আদেশে মালখানা থেকে ওদের আটক করা অস্ত্রশস্ত্র সাময়িকভাবে ফিরিয়ে দেওয়া হল। তিনটি ফিরিঙ্গি গাদা-বন্দুক—পর্তুগীজ বোম্বেটেদের কাছ থেকে সংগৃহীত, একত্রিশটি ভীল ধনুক—রাজস্থানী ভীলদের কাছ থেকে ভীমার পূর্বপুরুষেরা কী জানি কী করে সংগ্রহ করেছিল। আর অসংখ্য মরিচাধরা তীর। ভীমার সাগরেদরা বসল সেগুলি শান দিতে।

ওরা সবাই লাঠিখেলায় ওস্তাদ। ভীম ভাল তীরন্দাজ। ভাইপো ঈশানের তো অব্যর্থ টিপ। বীরাষ্টমীর দিন শুধু একদিনের জন্য ওরা ফেরত পেত যন্ত্রগুলো। পূজামণ্ডপে খেল দেখিয়ে সবাইকে তাজ্জব করে দিত খুড়ো-ভাইপো। মহরমেও ওরা লাঠির কসরৎ দেখাতে যেত। সেই অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ঐসব অন্ত্যজ পরিবারগুলির সঙ্গে নিরন্ন মুসলমান পল্লীর মনোমালিন্য ছিল না। যবনের ছায়া মাড়ালে নন্দ চাটুজ্জেকে অবেলায় স্নান করতে হত বটে কিন্তু ভীমা বাগদী বকর-ঈদের দিনে ফিরনি খেত চেটেপুটে।

দুগা গাঙ্গুলীর একটা বড় বাঁশঝাড় আছে। ভীমা বাগদী জীবন দত্তকে মুখপাত্র করে তাঁর অনুমতি চাইতে গিয়েছিল। প্রতিরক্ষা পরিষদের নাকি ঐ গোটা ঝাড়টাই প্রয়োজন। দুর্গা আঁৎকে ওঠেন, কী হবে রে অত বাঁশে? ও ঝাড়ে না হোক একশ ততা বাঁশ। কত দাম জানিস্?

জীবন বলে, দরদাম পরে ঠিক করে নেবেন, প্রতিরোধ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে। গোটা ঝাড়টাই লাগবে দাদু।

ঈশান-সর্দার হাঁকাড় পাড়ে, নে রে ভাই। দেরি করিস্ না।

কুঠার হাতে সাত-আটজন মহিষাসুর এগিয়ে আসে বাঁশ ঝাড়টার দিকে।

হাঁ-হাঁ করে বাধা দিয়েছিলেন গাঙ্গুলী। এমন আজব কতা তো বাপের জন্মে শুনিনি! কী দরে নিচ্ছিস্ সেটা আগে কবুল খা!

ভীমা এবার মহড়া নিতে এগিয়ে এল তার দশাসই দেহখানি যথাসম্ভব বিনয়াবনত করে। পেন্নাম করে বললে, ঠিগাছে ঠাউরমশাই! যা দাম ধরবেন তাই দেব নে! দরদাম আমরা করবনি। এক কতা! হক কতা!

—ইস! তোর যে বড় চ্যাটাং চ্যাটাং কথা ফুটছে রে ভীমা! আমি যদি বলি, এক একখানা বাঁশের দাম এক আসরফি? দেবে তোর বাবুরা?

—মুই এককথার মুনিষ ঠাকুরমশাই। তাই দেবনে!

—তাই দিবি? বাঁশ-পিছু এক আসফি?

—বিবেচনা করে দেখেন, নগদে তো আর দিতি হচ্ছে না! একশ বাঁশের দরুন এক শ আসরফি, এই ছুটবাবু আপনার নামে চাঁদার খাতায় নিকে নেবে নে। কী ছুটবাবু, নেবে তো? দ্যাখ, আমার কতার খেলাপ করনি বাবু

জীবন কোনক্রমে হাসি লুকিয়ে বলে, নিশ্চয়। তুমি যখন জবান দিয়েছ, দরদাম করবে না। দাদুর নামে একশ আসরফি লিখে নেব চাঁদার খাতায়।

এর চেয়ে যে বর্গীর অত্যাচারও ভাল ছিল। ভীমা বাগদীর হাড়-হারামজাদ চেলা-চামুণ্ডার দল এক বেলার মধ্যেই গোটা বাঁশঝাড়টা সাফা করে দিল। কী বলবেন উনি? এক ঝাঁক পরশুরাম। প্রত্যেকের হাতেই শাণিত কুঠার।

বিষ্ণু বায়েন আবার এক আজব পাগলামী জুড়ে দিয়েছে। কোথা থেকে কে জানে সে জোগাড় করেছে একটা তিন-ছ্যাঁদাওয়ালা শিঙা। এক-এক ছ্যাঁদা আঙুল দিয়ে বন্ধ করলে তার এক-এক বেসুর। বিষ্টুর মতে সে তিনটি—উদারা, মুদারা, তারা। পথে-ঘাটে, এখানে-সেখানে লোক জড়ো করে সে ক্রমাগত শিঙে ফুঁকে চলেছে, বোয়েছেন না, ‘তারায়’ সেই দিক্সীমায়, মাঠের ও-বাগে, ‘মুদারায় বেহ্মডাঙার মাঠের মাঝখানে, আর ‘তারা’ শোনলে বোঝবেন যে শিরে সংক্রান্তি। বোয়েছেন?

তালগাছে চড়ায় বেষ্টা-বায়েনের দারুণ কেরামতি। কাঠবিড়ালীদেরও লজ্জা হবে। সে সবাইকে জানিয়ে রেখেছে, শঙ্খধ্বনি বা দামামার শব্দ কানে গেলেই সে শিঙা-ট্যাকে তড়বড়িয়ে উঠে যাবে ব্রহ্মডাঙা মাঠের ঐ বড় তালগাছটায়। মা-বোনেরা তখন ঘরে আগড় দিও, জওয়ানেরা ধনুক নিয়ে চড়ে বসো যে-যার গাছে। বেষ্টা-বায়েনের উপর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত থাক। টের পাবে বর্গীসৈন্য কত দূরে। ‘তারা’র তান শুন্‌লি পরে ধনুকে বাণ জুড়ে সুম্বুন্ধি-পোদের দিকে তাগ করবে। বোয়েছ না?

সকল অধ্যায়
১.
কাশীধাম – ১
২.
কাশীধাম – ২
৩.
কাশীধাম – ৩
৪.
কাশীধাম – ৪
৫.
কাশীধাম – ৫
৬.
কাশীধাম – ৬
৭.
কাশীধাম – ৭
৮.
কাশীধাম – ৮
৯.
কাশীধাম – ৯
১০.
সোঞাই – ১
১১.
সোঞাই – ২
১২.
সোঞাই – ৩
১৩.
সোঞাই – ৪
১৪.
সোঞাই – ৫
১৫.
সোঞাই – ৬
১৬.
সোঞাই – ৭
১৭.
সোঞাই – ৮
১৮.
সোঞাই – ৯
১৯.
সোঞাই – ১০
২০.
সোঞাই – ১১
২১.
সোঞাই – ১২
২২.
সোঞাই – ১৩
২৩.
সোঞাই – ১৪
২৪.
সোঞাই – ১৫
২৫.
সোঞাই – ১৬
২৬.
সোঞাই – ১৭
২৭.
সোঞাই – ১৮
২৮.
সোঞাই – ১৯
২৯.
সোঞাই – ২০
৩০.
সোঞাই – ২১
৩১.
সোঞাই – ২২
৩২.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ১
৩৩.
তীর্থের পথে – ১
৩৪.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ২
৩৫.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ৩
৩৬.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ৪
৩৭.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ৫
৩৮.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ৬
৩৯.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ৭
৪০.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ৮
৪১.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ৯
৪২.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ১০
৪৩.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ১১
৪৪.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ১২
৪৫.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ১৩
৪৬.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ১৪
৪৭.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ১৫
৪৮.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ১৬
৪৯.
নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর – ১৭
৫০.
তীর্থের পথে – ২
৫১.
তীর্থের পথে – ৩
৫২.
তীর্থের পথে – ৪
৫৩.
তীর্থের পথে – ৫
৫৪.
তীর্থের পথে – ৬
৫৫.
তীর্থের পথে – ৭
৫৬.
তীর্থের পথে – ৮
৫৭.
তীর্থের পথে – ৯
৫৮.
তীর্থের পথে – ১০
৫৯.
তীর্থের পথে – ১১
৬০.
তীর্থের পথে – ১২
৬১.
তীর্থের পথে – ১৩
৬২.
তীর্থের পথে – ১৪
৬৩.
তীর্থের পথে – ১৫
৬৪.
তীর্থের পথে – ১৬
৬৫.
তীর্থের পথে – ১৭
৬৬.
তীর্থের পথে – ১৮
৬৭.
১. ভাগীরথী
৬৮.
২. শান্তিপুর
৬৯.
৩. ফুলিয়া
৭০.
৪. রণারঘাট
৭১.
৫. চক্ৰদহ – প্রদ্যুম্ননগর
৭২.
৬. যশোড়া – কাঞ্চনপল্লী
৭৩.
৭ বংশবাটি
৭৪.
৮. ত্রিবেণী
৭৫.
৯. কুমারহট্ট
৭৬.
১০. নৈহাটি
৭৭.
১১. ভাটপাড়া
৭৮.
১২. মূলাজোড়
৭৯.
১৩. ডিহি-কলিকাতা
৮০.
১৪. পাথুরিয়াঘাটা
৮১.
১৫. মাহেশ
৮২.
১. বঙ্গদেশ
৮৩.
২. সপ্তগ্রাম
৮৪.
৩. হুগলী
৮৫.
সতী – 1742-57 – ষষ্ঠ পর্ব

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%