সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
এদিকে সন্তু জলে লাফিয়ে পড়ার পরই ভাবল, তাকে কুমিরে ধরবে। সে ভালো সাঁতার জানে। কিন্তু সাঁতার কাটতে হল না! সমুদ্রের একটা বড় ঢেউ তাকে পাড়ে এনে পৌঁছে দিল। সঙ্গে সঙ্গে সে উঠেই চলে এল একটা গাছের আড়ালে।
আর-একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছেন কাকাবাবু। তিনি খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবার পর চাপা গলায় বললেন, “তুমি বোকার মতন জলে লাফিয়ে পড়লে কেন? তোমাকে পোর্ট ব্লেয়ারে চলে যেতে বললুম না?”
সন্তু বলল, “তুমি কেন এলে?”
“আমি এসেছি, বেশ করেছি। আমি বুড়ো মানুষ, কোনো একটা বড় কাজের জন্য যদি আমি মরেও যাই, তাতে কিছু যায়-আসে না। কিন্তু তুমি ছেলেমানুষ, তোমার মাকে আমি বলে এসেছি তোমার কোনো বিপদ হবে না।”
“মা আমাকে বলে দিয়েছিলেন, সব সময় তোমার কাছাকাছি থাকতে?”
“আঃ! তুমি এমন গণ্ডগোল বাধালে! যাক গে, তুমি আমার পেছনে এসে দাঁড়াও! একটুও নড়বে না। কোনো শব্দ করবে না!”
দু’জনে খানিকক্ষণ কান খাড়া করে রইল। কোথাও কোনো শব্দ নেই। বোধহয় জারোয়ারা এখনো তাদের আসার ব্যাপারটা টের পায়নি। সামনে থেকেই শুরু হয়ে গেছে ঘন জঙ্গল। ফাঁক নেই একটুও। এত ঘন জঙ্গলের মধ্যে গায়ে তীর লাগবার খুব ভয় নেই। একটু দূর থেকে তীর ছুঁড়লে কোনো না কোনো গাছে আটকে যাবে।
বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ওরা বুঝতে পারল কাছাকাছি কোনো জারোয়া নেই। তখন পা টিপে-টিপে ওরা জঙ্গলের মধ্যে এগোতে লাগল। পায়ের তলার মাটি ভিজে স্যাঁতসেঁতে। গাছ থেকে খসে পড়া অসংখ্য পাতা পচে নরম হয়ে আছে। এখানে যখন-তখন বৃষ্টি হয়।
কাকাবাবু ভাবছেন, সমুদ্রের ধার থেকে যত দূরে সরে যাওয়া যায়, ততই ভালো। এতবড় জঙ্গলের মধ্যে জারোয়ারা তাঁদের চট্ করে খুঁজে পাবে না। জঙ্গলের মধ্যে দিনের বেলাতেও অন্ধকার।
কাকাবাবুর ক্রাচটা হঠাৎ এক জায়গায় নরম মাটিতে গেঁথে গেল। তিনি সেটা টেনে তুলতে গিয়ে তাল সামলাতে পারলেন না, পড়ে গেলেন হুমড়ি খেয়ে। সন্তু তাড়াতাড়ি তাঁকে ধরল। তারপর সে নিজেই ক্রাচটা উপড়ে তুলল কাদা থেকে।
সন্তু ভাবল, কাকাবাবু খোঁড়া পা নিয়ে সব জায়গায় চলাফেরা করতে পারেন না। এই রকম জঙ্গলের মধ্যে তো আরও অসুবিধে। তবু তিনি সন্তুর ওপর রাগারাগি করছিলেন। ভাগ্যিস সন্তু জোর করে চলে এসেছে!
কাকাবাবু একটা গাছে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। সন্তু একটুখানি এগিয়ে দেখতে গেল। সব সময় গা-টা শিরশির করছে। দাশগুপ্ত বলেছিল, এখানকার জঙ্গল এত গভীর হলেও বাঘ-সিংহের কোনো ভয় নেই। সবচেয়ে বেশি ভয় মানুষের! সন্তুর খালি মনে হচ্ছে, কাছেই কারা যেন লুকিয়ে থেকে তাকে দেখছে। যে-কোনো মুহূর্তে ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
সন্তু ওপরের দিকে মুখ তুলে দেখতে লাগল, কোনো গাছের ওপর কেউ বসে আছে কিনা। অবশ্য এখানকার গাছে ওঠা সহজ নয়। প্রায় সব কটা গাছই বিরাট-বিরাট লম্বা। প্রথম দিকে অনেকখানি উঠে গেছে সোজা হয়ে, কোনো ডালপালা নেই, মাথার কাছটা প্রকাণ্ড ছাতার মতন। এক-একটা গাছের বয়েস বোধহয় দু’শো তিনশো বছর। গায়ে শ্যাওলা ধরে গেছে।
হঠাৎ দূরে একটা ছরছর শব্দ হল। ভয়ে কেঁপে উঠল সন্তু। কারা যেন ঝোপঝাড় ভেঙে দৌড়ে আসছে। এইবার তাহলে আসছে জারোয়ারা। আর উপায় নেই। সন্তুও ছুটে গিয়ে দাঁড়াল কাকাবাবুর পাশে। কাকাবাবুও আওয়াজটা শুনেছেন। তিনি সন্তুকে ধরে এনে দাঁড়ালেন দুটো বড় গাছের ফাঁকে। হাতে রিভলবার।
একটু বাদেই ওদের খানিকটা দূর দিয়ে ছুটে গেল দুটো হরিণ। তারপর আরও তিনটে। শেষ হরিণটি ওদের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে দেখে আরও জোরে দৌড়ল।
কাকাবাবু বললেন, “সাবধান, একটুও নড়বি না। হরিণগুলোকে তাড়া করে পেছনে মানুষ আসতে পারে।”
কিন্তু কোনো মানুষ এল না। হরিণগুলো এমনিই দৌড়চ্ছে। সন্তু বোধহয় ইচ্ছে করলে একটাকে ধরে ফেলতে পারত। কিন্তু এখন সে সময় নয়।
কাকাবাবু বললেন, “এখানে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। আমাদের চেষ্টা করতে হবে জারোয়াদের চোখ এড়িয়ে যাতে সারা দ্বীপটা একবার ঘুরে দেখে আসা যায়। তারপর কাল সকালেই দাশগুপ্ত পুলিশ নিয়ে ফিরে আসবে, তখন আমরা চলে যাব। চলো এগোই!”
চারদিকে দেখতে দেখতে খুব সাবধানে ওরা এগোতে লাগল। ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে। খানিকটা দূরে একটা খুব আস্তে শব্দ শোনা যাচ্ছে। মনে হয় জলের শব্দ। নিশ্চয়ই ওখানে কোনো ঝর্না আছে। সন্তুর মনে পড়ে গেল তার খুব তেষ্টা পেয়েছে। তার গায়ের সমস্ত জামা-প্যান্ট ভিজে। জুতোটাও ভিজে থপ থপ করছে। কিন্তু তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ।
কাকাবাবু সেই জলের শব্দটা লক্ষ করেই এগুতে লাগলেন। হঠাৎ সন্তু কিসে একটা হোঁচট খেল।
নিচু হয়ে দেখল, একটা মানুষ। প্রকাণ্ড লম্বা একটা লোক, গায়ে কোনো জামা-কাপড় নেই। লোকটা মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে, চোখ দুটো খোলা।
সন্তু ভয়ে আঁ করে শব্দ করতে গিয়ে নিজেই মুখে হাত চাপা দিল।
কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল?”
সন্তু কোনো উত্তর দিল না। ভয়ে তার মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
কাকাবাবুও এবার লোকটাকে দেখতে পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি রিভলবারটা উঁচিয়ে ধরলেন সেদিকে।
লোকটি কিন্তু একটুও নড়ল-চড়ল না, কোনো কথাও বলল না। শুধু খোলা দু’ চোখে যেন কটমট করে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।
কাকাবাবু ঝুঁকে লোকটির গায়ে হাত দিয়েই বললেন, “এ তো মরে গেছে দেখছি!”
কাকাবাবু এবার লোকটির পাশে বসে পড়লেন। লোকটির গায়ে কোনো দাগ নেই, কোনো ক্ষত নেই, তাহলে মরল কী করে? লোকটার মাথার চুল নিগ্রোদের মতন, কুচকুচে কালো রঙ, হাত দুটো বেশ লম্বা, আর বুকখানা যেন মনে হয় পাথরের। এমন একটা জোয়ান লোক এমনি-এমনি মরে গেল?
কাকাবাবু লোকটাকে উল্টে দিলেন। তখন দেখা গেল, তার ঘাড়ের কাছে অনেকখানি রক্ত জমে আছে। সেখানে একটা গর্তের মতন।
কাকাবাবু ফিসফিস করে বললেন, “গুলি! এর ঘাড়ের মধ্যে গুলি ঢুকে গেছে। সর্বনাশ!”
সন্তু এত কাছ থেকে কোনোদিন কোনো মরা মানুষ দেখেনি। সে ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, একটাও কথা বলতে পারছে না।
কাকাবাবু বললেন, “একে গুলি করে মেরেছে। তার মানে সেই সাহেবগুলোও এই দ্বীপে নেমেছে। আমি বলেছিলাম না? ওরা আমাদের আগে এসে পৌঁছে গেছে। সন্তু, আমাকে টেনে তোল্!”
কাকাবাবুর একটা পা কাটা বলে উনি একবার বসে পড়লে চট্ করে নিজে থেকে উঠতে পারেন না। তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন, সন্তু সেই হাত ধরে টেনে তুলল তাঁকে।
কাকাবাবু বললেন, “আমাদের আবার চট্ করে লুকিয়ে পড়তে হবে। এখন আমাদের দু’ দিক থেকে বিপদ। জারোয়ারা দেখলে মারবে, আর সাহেবগুলো দেখলেও আমাদের ছেড়ে দেবে না!”
দু’জনেই একটা ঝোপের আড়ালে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কোথাও কোনো শব্দ নেই, শুধু দূরের একটা ঝর্নার জলের শব্দ ছাড়া। তবু মনে হচ্ছে যেন খুব কাছাকাছি কেউ দাঁড়িয়ে ওদের লক্ষ করছে। সব দিকে এমন ঘুটঘুটে অন্ধকার যে, কিছুই দেখা যায় না। বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া গেল না।
সন্তুর গলাটা একদম শুকিয়ে গেছে। জলতেষ্টায় মনে হচ্ছে যেন বুকটা ফেটে যাবে। ঘাড়ের কাছে অনবরত কটা মশা কামড়াচ্ছে। একবার সে চটাস করে মশা মারল।
কাকাবাবু বললেন, “উঁহু! শব্দ করো না।”
সন্তু বলল, “কাকাবাবু, আমি জল খাব।”
কাকাবাবু বললেন, “আমারও জলতেষ্টা পেয়েছে। এখানে দাঁড়িয়ে থেকেও তো কিছু লাভ নেই। চলো, আমরা আস্তে আস্তে ঝর্নাটার দিকে এগোই!”
অন্ধকারে কোথায় পা পড়ছে, তা বোঝাবার উপায় নেই। সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে দেখে নিতে হচ্ছে সামনে কোনো বড় গাছ আছে কিনা। তাও গাছে মাথা ঠুকে গেল কয়েকবার। কাকাবাবুর ক্রাচটা প্রায়ই জড়িয়ে যাচ্ছে বুনো লতায়, সেগুলো টেনে-টেনে ছিড়তে হচ্ছে।
বেশ খানিকটা যাবার পর ঝর্নাটা চোখে পড়ল। এখানে গাছপালা কিছু কম বলে চাঁদের আলো এসে জলে পড়েছে, তাই অন্ধকার এখানে পাতলা। ঝর্নাটা বেশ চওড়া, জলে স্রোত আছে।
এতক্ষণ অন্ধকারে থেকে বিচ্ছিরি লাগছিল, তাই সন্তু দৌড়ে চলে গেল ঝর্নাটার কাছে। ঝর্নার ধারে বালি ছড়ানো, বেশ ঝকঝকে, পরিষ্কার। সন্তু জলের মধ্যে এক পা দিয়েই আবার উঠে এল তাড়াতাড়ি। এত জোর স্রোত যে, তাকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। সে উবু হয়ে মাথাটা ঝুঁকিয়ে চুমুক দিয়ে জল খেয়ে নিল খানিকটা। জলটা ঠাণ্ডা নয়, একটু-একটু গরম, আর স্বাদটাও কষা-কষা। তবু পেট ভরে জল খেয়ে নিল সন্তু। সারা দিন কিছুই খাওয়া হয়নি। এতক্ষণ খিদের কথা মনেই পড়েনি।
কাকাবাবু ঝর্নার ধারে বসতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। জলের মধ্যে গিয়ে পড়ার আগেই সন্তু তাঁর পিঠের জামা টেনে ধরল। তাতে কাকাবাবু নিজেকে সামলে নিতে পারলেন বটে, কিন্তু একটা সাঙ্ঘাতিক বিপদ ঘটে গেল। হুমড়ি খাবার সময় কাকাবাবুর ডান হাতের ক্ৰাচটা হাত থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ল জলে, আর অমনি স্রোতে সেটা ভেসে গেল। সন্তু ঝর্নার ধার দিয়ে খানিকটা দৌড়ে গেল তবু সেটাকে ধরতে পারল না, একটু পরেই একটা মস্ত বড় পাথর, সেটা ডিঙনো যায় না। ডান পাশ দিয়ে ঘুরে যখন আবার ঝর্নাটার কাছে এল, তখন ক্রাচটা অদৃশ্য হয়ে গেছে।
সন্তু ফিরে আসতেই কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “পেলি না?”
“না।”
কাকাবাবু হতাশ ভাবে বললেন, “যাঃ, কী হবে এখন?”
ক্রাচ ছাড়া কাকাবাবু এক পাও চলতে পারেন না। বাঁ হাতেরটা রয়েছে বটে, কিন্তু একটা নিয়ে হাঁটতে গেলে একটু বাদেই বগলে দারুণ ব্যথা হয়ে যায়। এমনিতেই বিপদে পড়লে কাকাবাবু দৌড়তে পারেন না, এরপর যদি হাঁটতেও না পারেন, তাহলে কী হবে?
কাকাবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে বসে রইলেন। তারপর আঁজলা ভরে খানিকটা জল নিয়ে এলেন মুখের কাছে। প্রথমে একটু জিভ ঠেকিয়ে স্বাদ নিলেন, তারপর বললেন, “এটা একটা হট ওয়াটার ম্প্রিং। কাছাকাছি কোনো জায়গায় পাহাড় ফুঁড়ে বেরিয়েছে। জলে অনেকটা গন্ধক আর লোহা মেশানো আছে। তাতে অবশ্য কোনো ক্ষতি হবে না, এ-জল খাওয়া যায়।”
সন্তুর হাত ধরে উঠে দাঁড়ালেন কাকাবাবু। তারপর সন্তুর কাঁধে ভর দিয়েই এগোতে লাগলেন ঝর্নার ধার দিয়ে। একটু পরে বললেন, “কোনো গাছের ডাল ভেঙে একটা লাঠি বানিয়ে নিতে হবে অন্তত।”
সন্তু বলল, “আমি এক্ষুনি বানিয়ে দিচ্ছি।”
কাছেই একটা গাছের ডাল ধরে সে টান মারল। সেটা কিন্তু ভাঙল না। দারুণ শক্ত। সন্তু ডালটা ধরে ঝুলে পড়ল। সেটা নুয়ে পড়ছে, কিন্তু ভাঙছে না কিছুতেই।
কাকাবাবু বললেন, “ছুরি দিয়ে কাটতে হবে। এখানকার বেশির ভাগ গাছই প্যাডোক কিংবা সিলভার উড, খুব ভালো কাঠ হয়।”
সন্তুর পকেটে একটা ছোট্ট ছুরি আছে। তাতে বেশি মোটা ডাল কাটা যাবে না। তবু সে চেষ্টা করতে গেল, সেই সময় শুনতে পেল একটা অদ্ভুত শব্দ। কেউ যেন খুব জোরে-জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। অনেকখানি রাস্তা দৌড়ে এলে যে-রকম নিশ্বাস পড়ে।
দু’জনেই কান খাড়া করে শুনল আওয়াজটা। এক-একবার থেমে যাচ্ছে, আবার শুরু হচ্ছে। খুব কাছেই। শব্দটা লক্ষ করে এগিয়ে যেতেই দেখল একটা লোক শুয়ে আছে মাটিতে। তার দেহটা ঝোপঝাড়ের মধ্যে, আর মুখটা বেরিয়ে আছে বাইরে। হাঁ করে তাকিয়ে আছে ঝর্নাটার দিকে আর ঐ রকম নিশ্বাস ফেলছে।
এর চেহারাও আগের লোকটার মতন, কিন্তু জ্যোৎস্নার আলোয় বোঝা যায়, এর সারা গায়ে রক্ত মাখা।
কাকাবাবু বললেন, এর গায়েও গুলি লেগেছে। কিন্তু লোকটা এখনো বেঁচে আছে।”
ওরা গিয়ে লোকটার কাছে দাঁড়াল। লোকটা মুখ ঘুরিয়ে তাকাল ওদের দিকে, সেই দৃষ্টিতে দারুণ ঘৃণা।
কাকাবাবু বললেন, “আহা রে, লোকটা গড়িয়ে গড়িয়ে এতটা এসেছে জল খাবার জন্য। আর এগোতে পারেনি। সন্তু, ওকে একটু জল এনে দাও তো।”
সন্তু আঁজলা করে খানিকটা জল নিয়ে এসে লোকটার মুখের ওপর ঢেলে দিল। লোকটা হাঁ করে আছে। যে-টুকু জল মুখের বাইরে পড়েছে, তা জিভ দিয়ে চেটে নিচ্ছে। সন্তু তিন-চারবার ওকে জল এনে এনে দিল। কাকাবাবু ততক্ষণে লোকটার পাশে বসে পড়েছেন।
লোকটার পেটে আর কাঁধে আর পায়ে তিনটে গুলি লেগেছে। এর মধ্যে পেটের জখমটাই সাঙ্ঘাতিক।
কাকাবাবু বললেন, “এখনো চেষ্টা করলে লোকটাকে বাঁচানো যায়।”
তিনি পকেট থেকে রুমাল বার করে তুলোর মতন পেটের ক্ষতটাতে গুঁজে দিলেন। তারপর দু’ পায়ের মোজা খুলে ফেলে সেগুলো ছিঁড়ে গিঁট বেধে ব্যাণ্ডেজ বানাতে লাগলেন।
সন্তু পাশে বসে আছে। হঠাৎ লোকটা একটা হাত তুলে সন্তুর গলা টিপে ধরল। সন্তু কিছু বোঝবার আগেই আঙুলগুলো সাঁড়াশির মতন বসে গেল তার গলায়। লোকটার শরীর থেকে কতখানি রক্ত বেরিয়ে গেছে, তবু তার গায়ে অসম্ভব জোর। সন্তু দু হাত দিয়ে টেনেও লোকটার হাত ছাড়াতে পারছে না। তার দম আটকে আসছে, সে এবার মরে যাবে! সে কোনো শব্দ করতে পারছে না। কাকাবাবু অন্যদিকে ফিরে এক মনে মোজা ছিঁড়ে-ছিঁড়ে ব্যাণ্ডেজ বানাচ্ছেন, তিনি কিছু টেরও পেলেন না।
প্রাণপণ চেষ্টায় সন্তু একবার শব্দ করে উঠল, আঁ আঁ—
কাকাবাবু পেছন ফিরে তাকালেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি রিভলবারের বাঁট দিয়ে খুব জোরে মারলেন লোকটার হাতে। লোকটা হাত ছেড়ে দিল, সন্তু ধপাস করে পড়ে গেল মাটিতে।
লোকটা তখন মুখখানা উঁচু করে কাকাবাবুর একটা হাত কামড়ে ধরল। কাকাবাবু সব কিছু ভুলে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন ‘উঃ’ করে! তারপর অন্য হাত দিয়ে রিভলবারের বাঁটটা ঠকে দিলেন লোকটার মাথায়। লোকটার কামড় আলগা হয়ে গেল, ঘাড় কাত করে চোখ বুজল।
কাকাবাবু হামাগুড়ি দিয়ে ঝর্না থেকে জল এনে এনে ঝাপটা দিতে লাগলেন সন্তুর চোখ-মুখে। আর ব্যাকুলভাবে ডাকতে লাগলেন, ‘সন্তু, সন্তু!”
একটু বাদে সন্তু চোখ মেলল। তাড়াতাড়ি উঠে বসতে যেতেই কাকাবাবু বললেন, “থাক্ থাক্ উঠতে হবে না। একটু শুয়ে থাক। একটু পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কাকাবাবু আবার হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে জল এনে ছিটিয়ে দিতে লাগলেন সেই লোকটির মুখে। সে কিন্তু আর চোখ খুলল না।
কাকাবাবু বললেন, “লোকটা মরেই গেল নাকি? আমি ওকে মেরে ফেললাম?”
তিনি লোকটার নাকের কাছে হাত নিয়ে বললেন, “না, এখনো নিশ্বাস পড়ছে। অজ্ঞান হয়ে গেছে। থাক্।”
এবার তিনি লোকটার ক্ষত জায়গাগুলো মুছে দিলেন। কিছু লতাপাতা ছিঁড়ে রস লাগিয়ে দিলেন সেখানে। তার মোজার ব্যাণ্ডেজটা বেঁধে দিলেন পেটে। তারপর বললেন, “পেট থেকে যদি রক্ত পড়া বন্ধ হয়, তাহলে বেঁচেও যেতে পারে।”
সন্তু ততক্ষণে উঠে বসেছে। এখনো তার মাথা ঝিম-ঝিম করছে। সে ভেবেছিল সে মরেই যাবে। গলাটা ফুলে গেছে।
কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “এখন কেমন লাগছে? কষ্ট হচ্ছে?”
সন্তু বলল, “না।”
“বাবাঃ, কী সাংঘাতিক!”
সন্তু খানিকটা অভিমানের সঙ্গে বলল, “আমি ওকে জল খাওয়ালাম, তবু ও আমাকে মারতে চাইল কেন? আমরা তো ওকে বাঁচাবারই চেষ্টা করছিলাম।”
কাকাবাবু বললেন, “ওরা আমাদের বিশ্বাস করে না। বাইরের যে-কোনো লোকই ওদের কাছে শত্ৰু।”
“আমার আর এখানে একটুও থাকতে ভালো লাগছে না।”
“কাল সকালেই আমরা চলে যাব। পুলিশের বোট আসবে।”
“যদি না আসে?”
“আসবে না কেন? নিশ্চয়ই আসবে। ওরা কি আমাদের ভুলে যেতে পারে? আমরা রাত্তিরটাতে সারা দ্বীপটা একবার ঘুরে দেখে আসব। রাত্তিরেই সুবিধে। তারপর ভোরবেলা আমরা সমুদ্রের ধারে লুকিয়ে বসে থাকব। লঞ্চ এলেই উঠে পড়ব চট্ করে!”
এত রকম বিপদের পরও কাকাবাবু দ্বীপটা ঘুরে দেখতে চান। ওঁর উৎসাহ কিছুতেই কমে না। ভয়ডর একটুও নেই। একটা ক্রাচ নেই, নিজে হাঁটতে পারছেন না, তবু এখনো হেঁটে বেড়াবেন।
সন্তু বলল, “আমরা এখনি সমুদ্রের ধারে চলে যাই না কেন?”
কাকাবাবু বললেন, “বাঃ গোটা দ্বীপটা না-দেখেই চলে যাব? তাহলে এলাম কেন? সবটা না-দেখে ফিরব না!”
আবার তিনি সন্তুর কাঁধ ধরে হাঁটতে লাগলেন। ঝর্নার পাশ দিয়ে-দিয়েই। কারণ বালির ওপরটা বেশ পরিষ্কার। পায়ে লতাপাতা আটকে যায় না। জ্যোৎস্নায় সামনেটাও দেখা যায়।
তবু বেশি দূর আর এগোনো হল না। খানিকটা বাদে হঠাৎ দেখা গেল, বনের মধ্যে এক জায়গায় জ্বলে উঠল একটা টর্চের আলো।
কাকাবাবু সঙ্গে-সঙ্গে সন্তুকে এক ধাক্কা দিয়ে নিজেও শুয়ে পড়লেন মাটিতে। গড়াতে-গড়াতে ঝর্নার ধার থেকে সরে গিয়ে ঢুকে পড়লেন একটা ঝোপের মধ্যে। সন্তুও চলে এল কাকাবাবুর পাশে-পাশে।
অমনি গুড়ুম-গুড়ুম করে দুটো গুলির শব্দ হল।
সেই গুলির শব্দ যেন প্রতিধ্বনি তুলল জঙ্গলের মধ্যে। যেন দূরে কোনো পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা লেগে শব্দগুলো ফিরে আসছে। তারপর বেশ কিছুক্ষণ আর কোনো আওয়াজ নেই। সন্তু প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে শুয়ে থাকে, কিন্তু তার বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছে, যেন সেটাই বাইরের লোক শুনে ফেলবে।
একটু বাদে শোনা গেল পায়ের শব্দ। একসঙ্গে অনেক লোকের। ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যায়, যারা হাঁটছে, তাদের খালি পা নয়, তারা জুতো পরে আছে। লোকগুলো আসছে এদিকেই। মাঝে-মাঝে টর্চের আলো জ্বলেই নিভে যাচ্ছে। তারপর প্রায় সাত-আটজন লোক এসে দাঁড়াল ঝর্নাটার ধারে। এরা সবাই সাহেব। না, সবাই নয়, একজনকে মনে হয় পাঞ্জাবী শিখ। তারা টর্চ ঘুরিয়ে চার পাশটা দেখতে লাগল।
একজন ইংরিজীতে বলল, “নিশ্চয়ই এখানে একটু আগে কেউ ছিল। আমি গলার আওয়াজ শুনেছি।”
আর-একজন বলল, “এই দ্যাখো, বালিতে পায়ের ছাপ।”
আবার তারা টর্চের আলো ফেলল ঝনার দু’ দিকে।
কাকাবাবু আর সন্তু যদিও একটা বেশ ঘন ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে আছে, কিন্তু সেটা ঝর্না থেকে খুব দূরে নয়। ঐ সাহেবরা একটু ভালো করে খুঁজলেই সন্তুরা ধরা পড়ে যাবে। কাকাবাবু একহাতে রিভলবারটা তাক করে ধরে, অন্য হাতটা তার ওপর চাপা দিয়ে রেখেছেন।
সাহেবদের মধ্যে দু’জনের হাতে রাইফেল, বাকিদের হাতে রিভলবার। আর পাঞ্জাবীর মতন চেহারার লোকটির হাতে টর্চ।
সন্তু টের পেল তার পায়ের কাছে কী যেন একটা নড়ছে। একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা জিনিস তার গায় লাগছে। সাপ নাকি? কাকাবাবু যদিও বলেছিলেন যে, এখানকার সাপের বিষ নেই, কিন্তু সে-কথা সন্তুর তখন মনে পড়ল না। সে তাড়াতাড়ি পা-টা সরিয়ে নিল। এবার পা-টা পড়ল বেশ বড় একটা ঠাণ্ডা জ্যান্ত জিনিসের ওপর। দারুণ ভয় পেয়েও সন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ করল না বটে, কিন্তু পা-টা আবার সরিয়ে নিতেই শুকনো পাতায় খচমচ শব্দ হল।
সঙ্গে-সঙ্গে টর্চের আলোটা ঘুরে গেল এদিকে।
কিন্তু সন্তুরা ধরা পড়ার আগেই একটা সাহেব ‘ওয়া’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো। আর-একজন উত্তেজিতভাবে বলল, “ওরা আবার তীর ছুঁড়ছে। টর্চটা শিগগির নেভাও, বোকা!”
তারপরই একসঙ্গে ছ’টা বন্দুক পিস্তল গর্জে উঠল। সন্তুরা বুঝতে পারল, ওদের পিছন দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর ছুটে আসছে। কয়েকটা তীর গাছের ডালে লেগে আটকে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে মাটিতে। জারোয়াদের সঙ্গে সাহেবদের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সন্তুরা পড়ে গেছে মাঝখানে। যে-কোনো দিক থেকে গুলি কিংবা তীর এসে লাগতে পারে ওদের গায়ে। কিন্তু এখন কিছুই করার উপায় নেই।
সাহেবরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, তারা এদিক-ওদিক দৌড়োচ্ছে আর গুলি চালাচ্ছে। জারোয়ারা যাতে তাদের ওপর টিপ না করতে পারে। এর মধ্যে এত গোলাগুলির শব্দ শুনে ভয় পেয়ে কোথা থেকে বেরিয়ে পড়ল এক পাল বুননা শুয়োর। তারা জীবনে কখনো এরকম শব্দ শোনেনি—একসঙ্গে হুড়মুড় করে ছুটে গেল ঝর্নার ধার দিয়ে। প্রায় পঞ্চাশ-ষাটটা।
যুদ্ধ থেমে গেল মিনিট দশেকের মধ্যেই। জারোয়ারা তীর ছোঁড়া বন্ধ করে পিছিয়ে যাচ্ছে।
একজন সাহেব বলল, “লেট্স মুভ!”
আর একজন সাহেব বলল, “আমার গায়ে তীর লেগেছে। শিগগির তুলে দাও! ইঞ্জেকশন, ইঞ্জেকশন কার কাছে?”
তারপর কিছুক্ষণ ফিসফাস। একটা কাচ ভাঙার শব্দ হল। একটু পরে বোঝা গেল, ওরা চলে যাচ্ছে।
আরও মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করার পর কাকাবাবু উঠে বসলেন। সন্তু উঠে প্রথমেই দেখল, তার পায়ের কাছের জিনিসটা কী। না, সাপ নয়, একটা মস্ত বড় ব্যাঙ, প্রায় আধ কিলো ওজন হবে। সন্তু জুতোর ঠোক্কর দিয়ে সেটাকে দূরে সরিয়ে দিল।
কাকাবাবু কোট থেকে মাটি আর শুকনো ডালপাতা ঝেড়ে ফেললেন। তারপর বললেন, “আমরা দু’জন সাহেবকে পালাতে দেখেছিলাম, কিন্তু এখানে এরা ছ’জন। তার মানে আগে থেকে কয়েকজন এসে অন্য দ্বীপে লুকিয়ে ছিল। আশ্চর্য জাত।”
সন্তু বলল, “কাকাবাবু, আস্তে কথা বলো, জারোয়ারা যদি কাছেই থাকে?”
কাকাবাবু বললেন, “না, সে সম্ভাবনা নেই। জারোয়ারা পালিয়েছে। তারা ভয় পেয়েছে। এরকম জিনিস কখনো তারা দেখেনি।”
“কী? বন্দুক? আগে বন্দুক দেখেনি?”
“না, বন্দুক নয়। আমি যতদূর শুনেছি, জারোয়ারা গুলি বন্দুককে ভয় পায় না। তারা মরতেও ভয় পায় না। কিন্তু এরকম ব্যাপার ওরা কখনো দেখেনি আগে।”
“কোন্ ব্যাপার?”
“তুইও বুঝতে পারলি না। একজন সাহেব যে ইঞ্জেকশন ইঞ্জেকশন বলে চ্যাঁচাল, সেটা শুনিসনি?”
“হ্যাঁ, শুনেছি।”
“এবার সাহেবরা আটঘাট বেঁধে এসেছে। সাহেবের জাত তো, কোনো ত্রুটি রাখে না। সবাই জারোয়াদের বিষাক্ত তীরকে ভয় পায়। ঐ তীর গায়ে বিঁধলে মানুষ মরে যায়। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে, বিষেরও ওষুধ আছে। এমন কি, সাপের বিষও সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ দিয়ে নষ্ট করা যায়। ঐ সাহেবরা সেই ওষুধ নিয়ে এসেছে। কারুর গায়ে তীর লাগলেই ওষুধের ইঞ্জেকশন নিয়ে নিচ্ছে একটা করে। তীর খেয়েও কোনো সাহেব মরছে না, এই দেখে ভয় পেয়ে গেছে জারোয়ারা। এবার ওরা হারবেই।”
কাকাবাবু হামাগুড়ি দিয়ে ঝর্নার কাছে এগিয়ে গেলেন। এদিক-ওদিক হাতড়িয়ে কী যেন খুঁজতে লাগলেন। একটু খুঁজতেই পেয়ে গেলেন একটা তীর। খুব সাবধানে তীরটার পেছনটা ধরে সেটাকে খুব সাবধানে ধুয়ে নিলেন জলে। তারপর সেটা তুলে বললেন, “এই দ্যাখ্। এমনিতে এটা এমন কিছু সাঙ্ঘাতিক অস্ত্র নয়।”
সন্তু দেখল, তীরটা সত্যিই অন্যরকম। অনেকটা খেলবার তীরের মতন। তীরের ডগায় যে লোহার ফলক থাকবার কথা, এতে তা নেই। তীরটা বাঁশের, মুখটা খুব ছুঁচলো। তীরের পেছন দিকটায় পালকও লাগানো নেই।
কাকাবাবু বললেন, “যদি বিষ না থাকে, তাহলে এরকম তীর আট-দশটাও যদি কারুর গায়ে বেঁধে, তাহলেও এমন-কিছু লাগবে না। বিষের জন্য সাহেবরা ইঞ্জেকশন নিয়ে নিচ্ছে! জঙ্গলের মধ্যে কী আর এমন বিষ পাওয়া যাবে? খুব সম্ভব জারোয়ারা স্ট্রিকনিন ধরনের বিষ ব্যবহার করে। সঙ্গে-সঙ্গে অ্যান্টিডোট নিলে সে-বিষ কোনো ক্ষতিই করতে পারে না। সাহেবরা বুদ্ধি করে সেই ওষুধ সঙ্গে নিয়ে এসেছে। আমাদেরও আনা উচিত ছিল।”
কাকাবাবু সেই তীরটা নিজের ব্যাগের মধ্যে ভরে নিলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ঐ ছ’-সাতটি সাহেব মিলে পাঁচ-ছশো জারোয়াকে মেরে ফেলতে পারে। আমাদের উচিত এক্ষুনি পোর্ট ব্লেয়ারে ফিরে গিয়ে পুলিশকে খবর জানানো!”
কিন্তু পোর্ট ব্লেয়ারে ফেরা হবে কী করে? সন্তু সেই কথাই ভাবল। এই অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে সমুদ্রের দিকের রাস্তা খুঁজে পাওয়াই প্রায় অসম্ভব। সমুদ্রের পাড়ে পৌছলেই বা কী লাভ? লঞ্চ কিংবা মোটরবোট কোথায় পাওয়া যাবে? দাশগুপ্তরা তো ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে। কাল যদি দাশগুপ্ত পুলিশ সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসে—
কাকাবাবু অনেকটা আপন মনেই বললেন, “সাহেবরা এত আটঘাট বেঁধে এখানে এসেছে কেন? নিশ্চয়ই এখানে সাঙ্ঘাতিক কোনো দামী জিনিস আছে। এর আগে-আগে এসেছে বৈজ্ঞানিকরা। কিন্তু এদের বৈজ্ঞানিক বলে মনে হয় না, কোনো বৈজ্ঞানিক গুলি করে মানুষ মারে না। এরা নিশ্চয়ই ডাকাত-টাকাত হবে।”
তারপর তিনি সন্তুর দিকে ফিরে উত্তেজিতভাবে বললেন, “সন্তু, তোকে একটা কাজ করতে হবে। এর জন্য খুব সাহসের দরকার। ভয় পেলে একদম চলবে না। তুই সমুদ্রের ধারে চলে গিয়ে লুকিয়ে বসে থাক। এখন জারোয়ারা সমুদ্রের ধারে পাহারা দেবার সময় পাবে না। তবু তুই খুব সাবধানে থাকবি। দাশগুপ্ত কাল কোনো সময় মোটরবোট নিয়ে আসবেই। তাকে সব বুঝিয়ে বলবি। দরকার হলে পঞ্চাশ-ষাটজন পুলিশ নিয়ে ভেতরে ঢুকে আসে যেন। ঐ সাহেবগুলোকে আটকাতেই হবে। যে-কোনো উপায়ে হোক। যা, তুই এগিয়ে পড়।”
সন্তু অবাক হয়ে বলল, “আমি একা যাব?”
“হ্যাঁ।”
“আমি একা কেন যাব? না, তা হয় না।”
“বেশি কথা বলিস না। তোকে একাই যেতে হবে।”
“তুমি এখানে থাকবে? তোমাকে ওরা মেরে ফেলবে।”
“সহজে পারবে না। আমি লুকিয়ে থাকব।”
“কাকাবাবু, আমি তোমাকে ছেড়ে কিছুতেই যাব না। মা বলে দিয়েছেন, সব সময় তোমার সঙ্গে সঙ্গে থাকতে।”
‘সন্তু, অবুঝ হয়ো না। এখানে এখন দু’জনের থাকার কোনোই মানে হয় না। তাহলে দুজনেই মরব। আমার যথেষ্ট বয়েস হয়েছে, আমি মরে গেলেও কী এমন ক্ষতি আছে! মানুষ তো এক সময় না এক সময় মরেই! তবু মরার আগে এই রহস্যটা জেনে যাওয়ার চেষ্টা করব। তোমাকে বাঁচতেই হবে। তাছাড়া, তুমি গিয়ে দাশগুপ্তকে খবর দিলে তারা হয়তো আমাকে বাঁচাবার চেষ্টাও করতে পারে।”
“কিন্তু তুমি তো একটা ক্রাচ নিয়ে বেশিক্ষণ হাঁটতেই পারবে না।”
“আমি রাত্তিরটা এখানেই ঝোপের মধ্যে শুয়ে থাকব। সকালবেলা একটা গাছের ডাল জোগাড় করে নেব ঠিকই। আমার অসুবিধে হবে না। সমুদ্রের ধারটাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ।”
“কিন্তু আমি অন্ধকারের মধ্যে সমুদ্রের ধারে যাব কী করে? রাস্তা হারিয়ে ফেলব।”
“সমুদ্রের কাছে যাওয়া তো খুব সোজা। এই ঝর্নাটা যখন পাওয়া গেছে। এটার ধার দিয়ে ধার দিয়ে গেলেই হবে। এই ঝর্নাটা নিশ্চয়ই সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। খুব সাবধানে যাবি কিন্তু।”
সন্তুর বুক ঠেলে কান্না উঠে এল। সে কাকাবাবুর হাত চেপে ধরে বলল, “কাকাবাবু, আমি যাব না। আমি তোমাকে একা ফেলে কিছুতেই যাব না!”
কাকাবাবু সন্তুর মাথায় হাত রেখে ভারি গলায় বললেন, “সন্তু, এবার তোমাকে এখানে আনাই ভুল হয়েছে। এতটা বিপদের কথা আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু এখানে আমাদের দুজনের একসঙ্গে থাকা খুবই বিপজ্জনক। পুলিশকে একটা খবর দেওয়া খুবই দরকার।”
“তুমিও চল আমার সঙ্গে।”
“আমি গেলে চলবে না। আমি ঐ সাহেবগুলোর ওপর নজর রাখতে চাই।”
“তুমি একা ওদের সঙ্গে কী করবে? যদি ওরা আবার এদিকে এসে পড়ে?”
“আমি লুকিয়ে থাকব, ওরা আমাকে দেখতে পাবে না। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমি এখানেই থাকব, অন্য কোথাও যাব না।”
“তাহলে শুধু-শুধু কেন একলা বসে থাকবে। না কাকাবাবু, তুমি চল আমার সঙ্গে। আমি একা কিছুতেই যাব না।”
কাকাবাবু এবার গম্ভীর কড়া গলায় বললেন, “সন্তু, তোমাকে যেতে বলছি, যাও! তুমি জানো না, আমার কথার নড়চড় হয় না? আমি অনেক ভেবেচিন্তেই তোমাকে যেতে বলেছি। আমি এখানেই থাকব। যাও, এক্ষুনি রওনা হও!”
সন্তু আর কথা বলার সাহস পেল না। এক পা এক পা করে চলতে শুরু করল। কয়েকবার পেছন ফিরে তাকাল, কিন্তু একটু বাদেই আর কাকাবাবুকে দেখতে পেল না। কাকাবাবু ঝোপের অন্ধকারের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। সন্তুও বড় পাথরটার ওপাশে চলে গেল।
ঝর্নার পাশে বালির ওপর হালকা চাঁদের আলো, তাতে সন্তুর ছায়া পড়েছে। সেই ছায়াটাই তার সঙ্গী। বন এত নিস্তব্ধ যে, এমনিতেই গা ছমছম করে। কোথায় আড়ালে গাছের ওপর জারোয়ারা লুকিয়ে আছে কে জানে। যে-কোনো সময় একটা তীর এসে গায়ে লাগতে পারে।
সন্তু তাড়াতাড়ি ঝর্নার পাড় থেকে সরে জঙ্গলে চলে গেল। ঝর্নার পাশে থাকলে দূর থেকেও তাকে দেখা যাবে। কিন্তু বনের মধ্যে আসার পর ছায়াটাও আর তার সঙ্গী রইল না।
মনের মধ্যে ভীষণ খারাপ লাগছে। কাকাবাবুকে এরকমভাবে ছেড়ে চলে যাওয়া কি ঠিক হল? একলা. এই ভয়ংকর জঙ্গলের মধ্যে উনি কতক্ষণ লুকিয়ে থাকতে পারবেন? নিজে ভালো করে হাঁটতেও পারেন না। অথচ কাকাবাবু যে কিছুতেই শুনবেন না অন্য কারুর কথা।
ঝর্নাটা ক্রমশই চওড়া হচ্ছে। এখানে হাঁটাও খুব শক্ত। মাঝে-মাঝেই কাঁটাঝোপ। একটা বড় গাছের গায়ে একবার সন্তু হাত দিতেই তার হাত ছড়ে গিয়ে রক্ত বেরুতে লাগল। গাছের গায়েও কাঁটা। খালি তার ভয় হচ্ছে। হোঁচট খেয়ে পড়ে না যায়। তাকে সমুদ্রের ধারে পৌঁছতেই হবে।
হঠাৎ একটা আওয়াজে সে দারুণ চমকে গিয়ে লাফিয়ে উঠল। শব্দটা এমনই বিকট যে, শরীরের রক্ত প্রায় জল হয়ে যায়। প্রথমে মনে হল, যেন একসঙ্গে দু’-তিনটে পাখি ডেকে উঠল। কিন্তু কোনো পাখি এরকম বিশ্রী সুরে ডাকে? আর এত জোরে? শব্দটা এই রকম: কিলা কিলা কিলা কিলা কিলা কিলা!
সন্তু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। একটু বাদেই সেই রকম আবার কিলা কিলা কিলা কিলা শব্দ উঠল ডান দিক থেকে। আগের শব্দটা এসেছিল বাঁ দিক থেকে। এবার মনে হল, যেন কয়েকজন লোক উলু দিচ্ছে। কিন্তু শব্দটা শুনলেই গা শিউরে ওঠে।
তারপর চারদিক থেকে কিলা কিলা কিলা কিলা শব্দ উঠল। যেন শত শত লোক একসঙ্গে চিৎকার করছে। বনের সব দিক থেকে ঐ শব্দ করতে করতে কারা ছুটে আসছে। এর মধ্যেই দুমদুম করে গুলির শব্দ শুরু হয়ে গেল। তবু ঐ কিলা কিলা থামল না। সন্তু একটা পাথরের আড়ালে গুটিসুটি মেরে বসে রইল। তার হাত-পা ঠকঠক করে কাঁপছে। তার মনে হচ্ছে যেন নরকের সব প্রাণীরা জেগে উঠে বন ঘিরে ধরছে।
বন্দুকের গুলির শব্দ কিন্তু একটু বাদেই থেমে গেল, কিন্তু কিলা কিলা শব্দ থামল না। এবার স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ঐ রকম শব্দ করে এক জায়গায় লাফাচ্ছে। তারপর শব্দটা একটু একটু করে দূরে সরে যেতে লাগল।
ব্যাপারটা কী হল, তা বোঝার চেষ্টা করল সন্তু। তার শরীর একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। দু-হাত দিয়ে মুখটা ঘষতে লাগল জোরে জোরে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। গুঁড়ি মেরে ঝর্নার পাশে এসে চুমুক দিয়ে জল খেয়ে নিল অনেকটা। তারপর তার পেট ব্যথা করতে লাগল।
সারাদিন কিছুই খায়নি, পেট খালি। শুধু ঝর্নার জল খাচ্ছে। জলেও কষা-কষা স্বাদ। জলের জন্যই পেট ব্যথা করছে কিনা কে জানে।
কিলা কিলা আওয়াজটা এখনো শোনা যাচ্ছে, কিন্তু অনেকটা দূরে চলে গেছে এবার। সন্তুর মনে হল যে, নিশ্চয়ই একসঙ্গে একশো-দুশো জারোয়া এসে সাহেবদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সাহেবরা গুলি করেও আটকাতে পারেনি। এবার ওরা সাহেবগুলোকে ধরে নিয়ে চলে যাচ্ছে। তাহলে কাকাবাবুর কী হল? ওরা যদি কাকাবাবুকেও ধরে নিয়ে গিয়ে থাকে? কিংবা যদি কাকাবাবুকে মেরে ফেলে?

সন্তুর ভীষণ ইচ্ছে হল, কাকাবাবুকে আর-একবার দেখে আসে। যদিও কাকাবাবু তাকে হুকুম দিয়েছেন সমুদ্রের কাছে যেতে, কিন্তু সন্তু তক্ষুনি যেতে পারবে না কিছুতেই। সে আবার উল্টো দিকে ফিরল।
এখন আর সন্তু গ্রাহ্যই করছে না কেউ তার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে কিনা। সে বালির ওপর দিয়ে তীরের মতন ছুটতে লাগল। পেটের ব্যথাটা ক্রমেই বাড়ছে, সে দু’ হাতে চেপে ধরে রাখল পেট।
সেই ঝোপটার কাছাকাছি এসেই সে ডাকল, “কাকাবাবু কাকাবাবু!”
কোনো উত্তর পেল না।
সন্তু হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল ঝোপের মধ্যে। কাকাবাবু সেখানে নেই। এর মধ্যে তিনি কোথায় গেলেন? কাকাবাবু যে বলেছিলেন, এ-জায়গাটা ছেড়ে যাবেন না? সন্তু এদিক-ওদিক ঘুরে কাকাবাবুর নাম ধরে ডাকতে লাগল। কাকাবাবুর কোনো চিহ্নই নেই। সন্তু চলে এল ঝর্নার পাশে। দূরে কিলা কিলা শব্দ শোনা যাচ্ছে, এখন শব্দটা এক জায়গায় গিয়ে থেমেছে মনে হচ্ছে।
সন্তুর দৃঢ় বিশ্বাস হল জারোয়ারা কাকাবাবুকেও ধরে নিয়ে গেছে। সে আর কোনো কিছুই চিন্তা করল না, সেই শব্দটা লক্ষ করে ছুটল।
অন্ধকারের মধ্যে সন্তু ছুটছে তো ছুটছেই। নদীর ধারে বালির ওপরে মাঝে মাঝে বড়-বড় পাথর আর কাঁটাগাছের ঝোপ, কিন্তু সন্তু কোনো বাধাই মানছে না। কাকাবাবুকে ফেলে রেখে সে যাবে না কিছুতেই। যদি কোনোক্রমে সে এখান থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরতেও পারে, তাহলে বাড়িতে মা, বাবা, আর সবাই বলবেন, তুই কাকাবাবুকে দ্বীপে রেখে নিজে চলে এলি? তুই এত কাপুরুষ? না, যদি মরতে হয় তো কাকাবাবুর সঙ্গে সন্তু নিজেও মরবে।
কিলা কিলা কিলা কিলা শব্দটা এখনো দূরে শোনা যাচ্ছে। ঐ শব্দটা শুনলেই ভয়ে রক্ত হিম হয়ে যায়। মানুষের গলার আওয়াজ যে এরকম হতে পারে, নিজের কানে না শুনলে সন্তু বিশ্বাস করত না কিছুতেই। যেন মুখের মধ্যে একটা লোহার জিভ নিয়ে কেউ চ্যাঁচাচ্ছে!
সাহেবরা এতগুলি বন্দুক নিয়ে এসেও হেরে গেল জারোয়াদের কাছে। ওরা একসঙ্গে দু’-তিনশো জন এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সাহেবদের ওপর। এখন বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছে। কাকাবাবু কী করে পড়ে গেলেন ওদের মধ্যে? কাকাবাবুর একটা পা নেই, একটা ক্রাচও নদীর জলে ভেসে গেছে, তিনি হাঁটতে পারবেন না। ওরা কি কাকাবাবুকে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে নিয়ে যাচ্ছে? ইস্, কত কষ্ট হচ্ছে তাঁর। কাকাবাবু যদি এর মধ্যে মরে গিয়ে থাকেন?
সন্তু আরও জোরে দৌড়োতে গেল। তার পেটের মধ্যে দারুণ ব্যথা করছে, দম ফুরিয়ে আসছে, তবু সে কিছুতেই থামবে না। কিন্তু একটু পরেই সন্তু একটা বড় পাথরে দারুণ জোরে হোঁচট খেয়ে ছিটকে গিয়ে পড়ল। আর একটা পাথরে তার মাথাটা এমন জোরে ঠুকে গেল যে, সে সঙ্গে-সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
অজ্ঞান অবস্থায় সন্তু উপুড় হয়ে পড়ে রইল ঝর্নাটার ধারে। সেই অবস্থাতেই তার বমি হতে লাগল। মুখ দিয়ে গল গল করে বমি বেরিয়ে আসছে তো আসছেই। সন্তুর জামাটামা সব বমিতে মাখামাখি হয়ে গেল। অজ্ঞান অবস্থায় আর মানুষের কোনো ভয় থাকে না। এখন আর সাহেবদের ভয় নেই, জারোয়াদের ভয় নেই। খুব শান্তভাবে ঘুমিয়ে পড়ার মতন সন্তুর চোখ দুটো বোজা।
খানিকটা বাদে একপাল হরিণ এল সেই ঝর্নার জল খেতে। এখানকার জঙ্গলে বাঘ সিংহের মতন কোনো হিংস্র প্রাণী নেই বলে হরিণের সংখ্যা খুব বেশি। হরিণগুলো সন্তুকে দেখেও কোনো ভয় পেল না। কয়েকটা হরিণ সন্তুর কাছে এসে তার গায়ের গন্ধ শুঁকল। আবার তারা ফিরে গেল বনের মধ্যে।
তারপর ঝিরঝির করে বৃষ্টি নামল। সন্তু ভিজতে লাগল সেই বৃষ্টিতে। সমস্ত জঙ্গল জুড়ে বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে, তার মধ্যে সেই কিলা কিলা শব্দটা আর শোনা যায় না।
এখানকার বৃষ্টি হঠাৎ আসে, হঠাৎ থেমে যায়। এই বৃষ্টিও থেমে গেল একটু বাদে। কিন্তু বৃষ্টি ভেজার জন্য সন্তুর জ্ঞান ফিরে এল। সে উঠে বসল ধড়মড়িয়ে। সে কোথায় আছে, কেন শুয়ে আছে—প্রথমে এসব কিছুই তার মনে এল না। একটুক্ষণ বসে রইল ঝিম দিয়ে, তারপর সব মনে পড়ল। সে শিউরে উঠল একেবারে। সে এরকম ফাঁকা জায়গায় শুয়ে ছিল? যে-কোনো জারোয়ার চোখে পড়লে একেবারে শেষ হয়ে যেত। সে তাড়াতাড়ি চারদিকে তাকিয়ে দেখল। না, কোথাও কেউ নেই। সেই কিলা কিলা শব্দটা এখন একেবারে থেমে গেছে।
বমি হয়ে যাওয়ার জন্য সন্তুর পেটের ব্যথাটা একদম সেরে গেছে। শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। শুধু মাথার একজায়গায় ব্যথা। সেখানে হাত দিয়ে দেখল, চুলের মধ্যে এক জায়গায় চট্চট করছে। রক্ত বেরিয়ে চুলের মধ্যে জমে আছে। সন্তুর হঠাৎ কান্না পেয়ে গেল। বাড়ি থেকে কত দূরে এই বিদঘুটে জঙ্গলের মধ্যে সে একা পড়ে আছে। কী করে বাঁচবে জানে না। কাকাবাবু কোথায় তার ঠিক নেই। কাকাবাবু কেন এইসব জায়গায় আসেন?
আবার সন্তু লজ্জা পেয়ে গেল। কাকাবাবু তো তাকে জোর করে আনেননি। সে-ই তো ইচ্ছে করে এসেছে অ্যাডভেঞ্চারের লোভে। এখন বিপদে পড়ে সে কাঁদছে কেন? কেঁদে কোনো লাভ নেই, তাকে বাঁচার চেষ্টা করতেই হবে।
চোখের জল মুছে ফেলে সন্তু গেল ঝর্নার ধারে। ভাল করে বমিটমি ধুয়ে ফেলল। এখানকার জলটা বেশ গরম। যাকে উষ্ণ প্রস্রবণ বলে, এই ঝর্নাটা বোধহয় তাই। এর জল খেয়েই সন্তুর পেট ব্যথা করছিল। কিন্তু উপায় তো নেই। আবার আঁজলা করে খানিকটা জল তুলে সন্তুকে খেতে হল। তার খুব তেষ্টা পেয়েছিল।
আবার সে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল সামনের দিকে। কিলা কিলা শব্দটা বন্ধ হয়ে গেলেও যে-দিক থেকে শব্দটা আসছিল, সন্তু যেতে লাগল সেই দিকে। এখন আর দৌড়োতে পারছে না। হাঁটছে আস্তে আস্তে।
খানিকটা যাবার পর সে জঙ্গলের মধ্যে একটা আলো দেখতে পেল। সেই আলোটা দেখেও ভয় পাবার কথা। এই জঙ্গলের মধ্যে এরকম আলো আসবে কোথা থেকে? একদম নীল রঙের আলো। গাছপালা ভেদ করে বেরিয়ে আসছে সেই আলোর ছটা। কালীপুজোর সময় ম্যাগনেসিয়ামের তার পোড়ালে এরকম নীল আলো হয়। সন্তু যত এগোতে লাগল ততই আলোটা উজ্জ্বল হতে লাগল। যেন চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সন্তু কাকাবাবুর কাছে শুনেছিল যে, জারোয়ারা আগুনই জ্বালতে জানে না। তা এরকম আলো এখানে কে জ্বেলেছে?
আলোটা দেখা যাচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে। তাই সন্তু নদীর ধার ছেড়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে সেই দিকে এগোল। আরও খানিকটা যাবার পর সে থমকে দাঁড়াল। যা দেখল, তাতে তার প্রায় দম বন্ধ হয়ে যাবার মতন অবস্থা। বুকের মধ্যে এত জোর দুম দুম শব্দ হচ্ছে যেন বাইরে থেকেও শোনা যাবে।
জঙ্গলের মধ্যে হঠাৎ অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। তার পাশে একটা গোল জিনিস দাউ দাউ করে জ্বলছে। সেই গোল জিনিসটা একটা একতলা বাড়ির সমান। সবচেয়ে আশ্চর্য তার আগুনটা। এরকম অদ্ভূত আগুনের কথা সন্তু কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। আগুনটা নানা রঙের। বেশির ভাগই একদম নীল, তাই দূর থেকে নীল রঙের আলো দেখা যায়। কিন্তু ঐ নীল আগুনের মধ্যে আবার লক লক করছে কয়েকটা লাল, সবুজ আর গোলাপী রঙের শিখা। গ্যাসের আগুন নিয়ে ঝালাই-টালাইয়ের কাজ হয় যে-সব দোকানে, সেখানে সন্তু অনেকটা এরকম নীল রঙের আগুন দেখেছে, কিন্তু সবুজ কিংবা আলতার মতন টকটকে লাল রঙের আগুনের কথা কে কবে শুনেছে? ঐ গোল জিনিসটা কী? ওটার মধ্যে যেন অনেকগুলো জিনিস আছে, সেগুলো থেকে আলাদা-আলাদা আগুন বেরুচ্ছে। যেন একটা আগুনের ফুলের তোড়া। ওটার দিক থেকে সহজে চোখ ফেরানো যায় না।
তবু কোনোরকমে চোখ ফিরিয়ে সন্তু দেখল, সেই গোল আগুনটা থেকে অনেক দূরে ঘোড়ার ক্ষুরের আকৃতিতে সার বেঁধে বসে আছে কয়েক শো জারোয়া। ওরা বসেছে মাটিতে হাঁটু গেড়ে, সকলের শরীর সোজা। আর ওদের সামনে পড়ে আছে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সাহেবগুলো। নীল আলোয় জায়গাটা দিনের বেলার মতন পরিষ্কার। সব স্পষ্ট দেখা যায়।
সন্তু গুঁড়ি মেরে আরও একটু সামনে এগিয়ে গেল। এখন সে আর নিজের প্রাণের কথা চিন্তাই করছে না। সে দেখতে চায় ওখানে কাকাবাবও আছেন কিনা। খুব শক্ত কোনো জংলী লতা দিয়ে সাহেবগুলোর হাত-পা একসঙ্গে এমনভাবে বাঁধা যে, তারা নড়তে-চড়তে পারছে না। কিন্তু কাকাবাবু তো ওদের মধ্যে নেই। তাহলে কি কাকাবাবুকে আগেই মেরে ফেলেছে?
ফাঁকা জায়গাটার এক পাশে কতগুলো ঘর রয়েছে। ঘরগুলো গাছের ডাল আর লতা দিয়ে তৈরি করা। সেই সব ঘর থেকে কিছু কিছু জারোয়া মেয়ে আর বাচ্চা বেরিয়ে আসছে, কৌতূহলের সঙ্গে দেখছে সাহেবদের। তারপর মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ করছে। একটা জারোয়া মেয়ে একটা লম্বা শুকনো গাছের ডাল নিয়ে এগিয়ে গেল সেই আগুনটার কাছে। দূর থেকে সে ডালটা ঢুকিয়ে দিল আগুনের মধ্যে, সঙ্গে সঙ্গে সেটা দপ্ করে জ্বলে উঠল। মেয়েটি সেই জ্বলন্ত ডালটা নিয়ে ফিরে এল আবার। এই ডালের আগুনটা কিন্তু সাধারণ আগুনের মতনই, নীল নয়। মেয়েটি সেই আগুন নিয়ে ঢুকে গেল একটা ঘরের মধ্যে।
সন্তু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কী করবে, বুঝতে পারছে না। কাকাবাবুকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কাকাবাবুকে এরা মেরে বনের মধ্যে কোথাও ফেলে রেখে এসেছে? কিন্তু সাহেবগুলোকে যখন নিয়ে এসেছে, তখন কাকাবাবুকেই বা আনবে না কেন? তাহলে কি কাকাবাবু ধরা পড়েননি, তাহলে কাকাবাবু গেলেন কোথায়? কাকাবাবু যেখানটায় লুকিয়ে ছিলেন, সন্তু সে-জায়গাটা খুঁজে দেখেছে। কাকাবাবু একটা ক্রাচ নিয়ে বেশিদূর যেতেও পারবেন না। তাহলে ব্যাপারটা কী হল?
সাহেবগুলোকে ওরকমভাবে হাত-পা বেঁধে রাখা হলেও ওদের মুখে কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই। কেউ কান্নাকাটিও করছে না। জারোয়ারা সবাই একদম চুপ করে বসে আছে। সাহেবরা কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। সন্তু ইংরিজী ভালই জানে, কিন্তু সাহেবদের মুখের উচ্চারণ অনেক সময় বুঝতে পারে না। তবু একটা মোটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে ওদের কথা শোনার চেষ্টা করল। সে টুকরো-টুকরো কয়েকটা কথা শুনতে পেল...দিজ বেগারস্ উইল সার্টেনলি কিল আস…দ্যাট মেটিওরাইট…ইনভেলুয়েবল…সো নীয়ার…

একজন সাহেব পাশ ফিরে শুতেই একজন জারোয়া উঠে গিয়ে তাকে আবার চিৎ করে দিল। কচ্ছপকে যেমন চিৎ করে রাখা হয়, এদেরও তেমনি চিৎ হয়েই থাকতে হবে।
জারোয়াদের দেখলেই মনে হয় তারা যেন কিসের জন্য অপেক্ষা করছে। ওরা যদি সাহেবগুলোকে মারতে চায়, তাহলে তো মেরে ফেললেই পারে। দেরি করছে কেন?
সন্তু নিশ্বাস ফেলছে খুব আস্তে-আস্তে। একটুও নড়াচড়া করতে সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু এখানেই বা কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে? কাকাবাবু এখানে নেই, তা বোঝাই যাচ্ছে। মনে হয় ভোর হতেও আর দেরি নেই। বারবার সে সেই গোল আগুনটার দিকে তাকাচ্ছে। ওই দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে—যদিও চোখটা একটু জ্বালা-জ্বালা করে। তবু যেন মনে হয়; ওটার মধ্যে চুম্বক আছে। আগুন যে এত সুন্দর হয়, সন্তু তা জানত না। সবুজ আগুন? এক-একবার মনে হয় যেন রঙিন কাগজ। কিন্তু কাগজ নয়, সত্যিকারের আগুন। একটু আগেই তো একজন মেয়ে ঐ আগুন থেকে একটা গাছের ডাল জ্বালিয়ে নিল।
আর এখানে থাকার কোনো মানে হয় না। কাকাবাবুকে খুঁজে বার করতেই হবে। কিন্তু এত বড় জঙ্গলের মধ্যে কোথায় সে কাকাবাবুকে খুঁজে পাবে। তবু শেষ পর্যন্ত চেষ্টা না করে সন্তু ছাড়বে না।
হঠাৎ সন্তুর একটা কথা খেয়াল হল। একটা দারুণ সুযোগ। এখন যদি কাকাবাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, তাহলে তারা খুব সহজেই পালিয়ে বেঁচে যেতে পারে। জারোয়ারা সব এখানে, তারা জঙ্গলের মধ্যে খুঁজবে না। ঐ সাহেবগুলোর একটা মোটরবোট নিশ্চয়ই সমুদ্রের ধারে কোথাও আছে। সেই বোটটায় চেপেই তো তারা পালাতে পারে এখান থেকে। সাহেবগুলোকে ফেলে তাদের মোটরবোট নিয়েই যেতে হবে—কিন্তু তাতে কোনো দোষ নেই, সাহেবরা তো তাদের শত্রু!
সন্তু পা টিপে-টিপে আস্তে আস্তে পিছিয়ে যেতে লাগল। আরও খানিকটা দূরে গিয়েই সে দৌড় মারবে। কিন্তু তার যাওয়া হল না। হঠাৎ জারোয়াগুলো শব্দ করে উঠে দাঁড়াল। আবার তারা বিকটভাবে সেই কিলা কিলা কিলা কিলা শব্দ করে উঠল। সন্তু কেঁপে উঠল একেবারে। জারোয়ারা কি তার কথা টের পেয়ে গেছে? সন্তু দৌড়ে একটা ঝোপের আড়ালে গিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু জারোয়ারা তেড়ে এল না তার দিকে। সেখানেই দাঁড়িয়ে চ্যাঁচাতে লাগল। ব্যাপারটা কী ঘটছে তা দেখবার জন্য সন্তু আর কৌতূহল দমন করতে পারল না। আস্তে আস্তে আবার মাথা উঁচু করল।
এবারে সেখানে রয়েছে আর-একজন নতুন লোক। পাতার ঘর থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে সেই লোকটি ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়াল। তাকে দেখেই জারোয়ারা ওরকম চিৎকার করছে ঠিক যেন জয়ধ্বনি দেবার মতন। লোকটি একটি হাত উঁচু করে আছে ওদের দিকে।
লোকটি অসম্ভব বুড়ো। মনে হয় নব্বই কিংবা একশো বছর বয়েস। ছোট্টখাট্টো চেহারা, পিঠটা একটু বেঁকে গেছে। মাথার চুল ধপধপে সাদা, মুখেও সাদা দাড়ি। লোকটির ভুরু দুটিও পাকা। লোকটি একটি লাল রঙের ধুতি মালকোঁচা দিয়ে পরে আছে গায়ে একটা লাল রঙের চাদর। অন্য কোনো জারোয়া জামা কাপড় কিছুই পরে না। এই বুড়ো লোকটিকে জারোয়া বলে মনেও হয় না, গায়ের রঙ বেশ ফর্সা, মাথার চুলও কোঁকড়ানো নয়। এ লোকটা কে? এ কি জারোয়াদের রাজা?
লোকটি আস্তে আস্তে হেঁটে এসে সাহেবগুলোর কাছে দাঁড়াল। খুব ভালো করে দেখতে লাগল তাদের মুখগুলো। আর মাঝে-মাঝে মাটিতে চিক চিক করে থুতু ফেলতে লাগল। তারপর মুখ তুলে কী যেন জিজ্ঞেস করল জারোয়াদের। চার-পাঁচজন জারোয়া একসঙ্গে উত্তর দিল।
একজন সাহেবের পাশে তার বন্দুকটা পড়ে ছিল। বুড়ো লোকটি নিজের হাতে তুলে নিল বন্দুকটা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। তারপর টুক টুক করে হেঁটে চলে গেল সেই গোল আগুনটার কাছে। বন্দুকটা ছুঁড়ে দিল আগুনের মধ্যে। আবার জারোয়াদের দিকে মুখ ফিরিয়ে সে অদ্ভুত ভাষায় কী যেন বলল।
অমনি চার-পাঁচজন জারোয়া এগিয়ে এসে একজন সাহেবকে মাটি থেকে উঁচু করে তুলল। তারপর চ্যাংদোলা করে ঝুলিয়ে নিয়ে চলল বুড়োটির দিকে। সাহেবটা এবার চ্যাঁচাতে লাগল, “হেই, হোয়াট আর য়ু ডুইং.. লীভ মি অ্যালোন। হেই!”
জারোয়ারা সাহেবটিকে বুড়ো লোকটির কাছে নিয়ে এল। বুড়ো লোকটি হাত তুলে দেখাল আগুনের দিকে। তারপর সন্তু কিছু বোঝবার আগেই জারোয়ারা সাহেবটিকে ছুঁড়ে দিল আগুনের মধ্যে। ঠিক যেমন ভাবে লোকে জলের মধ্যে পাথর ছোঁড়ে। শেষ মুহূর্তে সাহেবটি প্রচণ্ডভাবে চেঁচিয়ে উঠেছিল আঁ আঁ করে। আগুনের মধ্যে পড়েই সব থেমে গেল। তার আর কোনো চিহ্ন রইল না। একটু ধোঁয়া পর্যন্ত বেরুল না।
সন্তু দু’ হাতে চোখ ঢেকে ফেলল। চোখের সামনে এরকম ভাবে কোনো মানুষকে মরতে কে কবে দেখেছে? সন্তুর মনে হল, সে বুঝি অজ্ঞান হয়ে যাবে। কিন্তু অজ্ঞান হলে চলবে না। তাকে পালাতে হবে।
বুড়ো লোকটি আবার কিছু একটা হুকুম দিতেই জারোয়ারা আর-একজন সাহেবকে চ্যাংদোলা করে তুলল। এবার সব কটা সাহেব একসঙ্গে চিৎকার শুরু করে দিল। সেটা চিৎকার না কান্না ঠিক বোঝা যায় না। কিন্তু জারোয়ারা কিছুই গ্রাহ্য করল না। তারা তাকে নিয়ে গেল আগুনের কাছে।
সাহেবটি সেই বুড়ো লোকটিকে কেঁদে কেঁদে বলল, “ইউ, ইউ আর নট আ জারোয়া…ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড ইংলিশ? প্লিজ ফরগিভ মী, স্পেয়ার মাই লাইফ, প্লীজ…”
বুড়ো লোকটি কিছুই বলল না। চিক করে মাটিতে থুতু ফেলল, তারপর আগুনের দিকে আঙুল দেখিয়ে জারোয়ার দিকে তাকাল।
জারোয়ারা দ্বিতীয় সাহেবটিকেও আগুনের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দেবার জন্য যেই উঁচু করে তুলেছে, অমনি দড়াম করে একটা গুলির শব্দ হল। জঙ্গলের মধ্য থেকে একটা গুলি ছুটে এসে লাগল একজন জারোয়ার হাতে। সবাই সেদিকে ফিরে তাকাল।
দূর থেকে স্তম্ভিত হয়ে সন্তু দেখল রিভলবার হাতে নিয়ে জঙ্গলের মধ্য থেকে কাকাবাবু সেই ফাঁকা জায়গাটায় চলে এলেন। এক হাতে ক্ৰাচ নিয়ে তিনি লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছেন। তাঁর রিভলবারটা সোজা সেই বুড়ো লোকটির বুকের দিকে তাক্ করা।
দাশগুপ্তর মনটা আজ একদম ভালো নেই! পুলিশের এস পি সাহেবের কাছ থেকে ফেরার পথে সে বারবার চমকে-চমকে উঠছে। সন্ধে হয়ে গেছে, এতক্ষণে সন্তু আর মিঃ রায়চৌধুরীর কী অবস্থা হয়েছে কে জানে! জারোয়ারা কি ওদের এখনো দেখতে পায়নি? জারোয়ারা কারুকে ছাড়ে না, দেখামাত্র বিষাক্ত তীর মারে। ইস্, শুধু-শুধু ওঁদের প্রাণ যাবে! মিঃ রায়চৌধুরী যে কোনো কথাই শুনলেন না। জোর করে নেমে গেলেন ঐ দ্বীপে। নিজে থেকে কেউ ওখানে যায়? ভদ্রলোকের একটা পা খোঁড়া, তবু এত সাহস! আর সন্তু তো বাচ্চা ছেলে, সে-ও কাকাবাবুর সঙ্গে সঙ্গে মরবে। কাল সকালেই হয়তো দেখা যাবে, ওদের লাশ সমুদ্রের জলে ভাসছে।
আর এস পি সাহেবও যা গোঁয়ার! কিছুতেই ওঁদের উদ্ধার করতে যেতে রাজি হলেন না। দিল্লি থেকে হুকুম না পেলে তিনি যাবেন না। দিল্লি থেকে হুকুম আসতে অন্তত দু-তিন দিন লেগে যাবে, তারপর আর ওদের মৃতদেহও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
দাশগুপ্ত হাঁটতে হাঁটতে এসে টুরিস্ট হোমের খাবার ঘরের একটা চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ল। চেঁচিয়ে বলল, “কে আছ, এক কাপ চা দেবে?”
সেখানকার বেয়ারা কড়কড়ি এসে বলল, “হ্যাঁ বাবু, চা দিচ্ছি। আর কী খাবেন?”
দাশগুপ্ত বলল, “আর কী খাব! তোমার মাথা খাব!”
কড়কড়ি হাসতে হাসতে নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “এটা খেতে পারবেন না বাবু, বড় শক্ত!”
দাশগুপ্ত রেগে উঠে বলল, “ইয়ার্কি করতে হবে না, চা নিয়ে এসো শিগগির।”
“সেই বাবুরা কোথায় গেল?”
“কে জানে! সে বাবুরা আর ফিরবেন না।”
“অ্যাঁ? সে কী কথা? ওঁদের মালপত্র রয়েছে যে! সেই খোকাবাবু আর সেই বুড়োবাবু, তাঁরা আর ফিরবেন না? তাঁদের কী হয়েছে?”
“তাঁদের জারোয়ারা ধরে নিয়ে গেছে।”
একথা শুনে কড়কড়ি একেবারে হাউমাউ করে উঠল। মাথা চাপড়ে বলতে লাগল, “কী সর্বনাশ! কী সর্বনাশ!”
কড়কড়ির কান্না শুনে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল আরও দু’-তিনজন লোক। তারা অবাক হয়ে গেছে। যখন তারাও শুনল যে, সন্তু আর কাকাবাবুকে ধরে নিয়ে গেছে জারোয়ারা, খুব দুঃখ হল তাদের। জারোয়ার হাতে পড়লে যে আর কেউ বাঁচে না, তা ওরা সবাই জানে। ওরা দাশগুপ্তকে ঘিরে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনতে লাগল।
এমন সময় আকাশে একটা শব্দ উঠল। দাশগুপ্ত চমকে উঠে বলল, “কী ব্যাপার? এখন কিসের শব্দ?”
কড়কড়ি বলল, “একটা এরোপ্লেন আসছে বাবু!”
দাশগুপ্ত চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বলল, “প্লেন, এই সময়? কিসের প্লেন? সন্ধের পর কখনো এখানে প্লেন আসে?”
সকলেই তখন ভাবল, সত্যিই তো, পোর্ট ব্লেয়ারে তো প্লেন আসে দুপুরে। কোনোদিন তো সন্ধের পর এখানে কোনো প্লেন আসেনি। তাহলে এটা কিসের প্লেন?
প্লেনটা আকাশে বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। তার মানে, এখানেই নামবে।
দাশগুপ্ত হাত পা ছুঁড়ে বলল, “ট্যাক্সি! আমার এক্ষুনি একটা ট্যাক্সি চাই। ফোন করো ট্যক্সির জন্য। না, না, ফোন করতে হবে না, দেরি হয়ে যাবে। আমি নিজেই যাচ্ছি।”
দাশগুপ্ত টুরিস্ট হোমের বারান্দা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সোজা রাস্তা দিয়ে দৌড়তে লাগল। খানিকটা বাদেই রাস্তায় একটা ট্যাক্সি আসতে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল মাঝরাস্তায়। সেই ট্যাক্সিতে দু’জন লোক ছিল। দাশগুপ্ত হাত জোড় করে বলল, “আমার বিশেষ দরকার, আমাকে এক্ষুনি একবার এয়ারপোর্ট যেতে হবে। যেতেই হবে! আপনারা দয়া করে নেমে পড়বেন?”
দাশগুপ্তর রকম-সকম দেখে মনে হল, সে পাগল হয়ে গেছে। লোক দুটি হতভম্ব হয়ে নেমে গেল। দাশগুপ্ত ট্যাক্সিতে উঠে বসেই বলল, “জলদি চালাও, এয়ারপোর্ট। জলদি!”
দাশগুপ্ত যখন এয়ারপোর্টে পৌছল, তার আগেই প্লেনটা নেমে গেছে। এয়ারপোর্টে অনেক পুলিশ, স্বয়ং এস পি সাহেবও উপস্থিত। নিশ্চয়ই হোমরা-চোমরা কেউ এসেছে।
দাশগুপ্ত একজন পুলিশকে জিজ্ঞেস করল, “কে এসেছেন? কে উনি?”
পুলিশটি বলল, “হোম সেক্রেটারি সাহেব এসেছেন?”
দাশগুপ্ত আনন্দে একেবারে নেচে উঠল। এত বড় সৌভাগ্যের কথা ভাবাই যায় না। এস পি সাহেব এই হোম সেক্রেটারির কাছ থেকেই অনুমতি আনার কথা বলেছিলেন। সেই হোম সেক্রেটারি নিজেই দিল্লি থেকে এখানে এসে উপস্থিত! কোনো গুরুতর ব্যাপার তাহলে আছেই।
হোম সেক্রেটারি একজন বেশ লম্বা মতন লোক। মাঝারি বয়েস। মাথার চুলগুলো বড়-বড়। তিনি বড়-বড় পা ফেলে গিয়ে একটা গাড়িতে উঠলেন। দাশগুপ্ত সেদিকে ছুটে যাবার চেষ্টা করতেই কয়েকজন পুলিশ তাকে বাধা দিল।
দাশগুপ্ত তখন চেঁচিয়ে এস-পি সাহেবকে লক্ষ্য করে বলল, “স্যার, ওঁর সঙ্গে আমার এক্ষুনি কথা বলা দরকার। সেই ব্যাপারটা…”
এস পি মিঃ সিং বললেন, “দাঁড়ান, ওঁকে একটু বিশ্রাম করতে দিন। উনি অতদূর থেকে সবে এসে পৌঁছেছেন—”
দাশগুপ্ত বলল, “একটুও সময় নষ্ট করা যাবে না এখন। আপনি বুঝতে পারছেন না…”
কিন্তু ততক্ষণে হোম সেক্রেটারির গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে! দাশগুপ্ত চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে সেদিকে ছুটে গিয়েও গাড়িটা থামাতে পারল না।
রাগে-দুঃখে দাশগুপ্তর চোখে জল এসে গেল। এবার আর সে এস পি সাহেবকে ভয় পেল না। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলল, “আপনাকে এর ফল ভোগ করতে হবে। দিল্লি থেকে আমার ওপর অর্ডার দেওয়া আছে, মিঃ রায়চৌধুরীর যাতে কোনো রকম বিপদ না হয়, তার ব্যবস্থা করার। কিন্তু আপনি আমাকে কোনো সাহায্য করেননি। একথা আমি হোম সেক্রেটারিকে বলব।”
মিঃ সিং বললেন, “অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? হোম সেক্রেটারি যখন এসেই গেছেন, তখন ওঁর কাছ থেকে অনুমতি পেলেই আমি আপনাকে সাহায্য করব।”
দাশগুপ্ত বলল, “কিন্তু প্রতিটি মিনিট নষ্ট করা মানেই সাঙ্ঘাতিক ভুল করা।”
দিল্লি থেকে খুব হোমরা-চোমরা কেউ এলে ওঠেন এখানকার সরকারি অতিথি-ভবনে। দাশগুপ্ত তা জানে। ট্যাক্সিটা রাখাই ছিল, সেটা নিয়ে সে আবার সেইদিকে ছুটল।
অতিথি-ভবনে দাশগুপ্ত আর এস-পি মিঃ সিং পৌঁছল প্রায় একই সময়ে। এস পি সাহেব গটগট করে ঢুকে গেলেন ভেতরে। গেটের পুলিশ দাশগুপ্তকে আটকাতে যেতেই সে পকেট থেকে একটা কার্ড বার করে বলল, “এটা হোম সেক্রেটারিকে দাও, তাহলেই তিনি বুঝবেন।”
হোম-সেক্রেটারির নাম কৌশিক ভার্মা। তিনি তখন ইজিচেয়ারে পা ছড়িয়ে বসে এক কাপ চা খাচ্ছিলেন। আর এস পি সাহেবকে বলছিলেন, “শুনুন, আমি এখানে এসেছি একটা বিশেষ কাজে। আমি গোপন রিপোর্ট পেয়েছি, কিছু বিদেশী গুপ্তচর আন্দামানে নিয়মিত যাতায়াত করছে। তারা কলকাতা আর দিল্লি থেকে কিছু-কিছু পাসপোর্ট চুরি করে ভারতীয় সেজে প্লেনে করে চলে আসছে আন্দামানে। কী তাদের উদ্দেশ্য, সেটা আমাদের জানা দরকার। আন্দামানের মতন একটা সাধারণ জায়গায় বিদেশীদের নজর পড়ল কেন?”
এস পি মিঃ সিং বললেন, “না স্যার, এখানে তো কোনো বিদেশী আসেনি অনেকদিন। বিদেশী কোনো টুরিস্ট এলে আমার অনুমতি ছাড়া তো এখানে ঢুকতেই পারবে না।”
মিঃ ভার্মা বললেন, “তারা কি আর টুরিস্ট সেজে আসবে? তারা ভারতীয় সেজে গোপনে ঢুকবে।”
মিঃ সিং বললেন, “না স্যার, বিদেশী এলে আমার নজরে পড়তই।”
এই সময় দাশগুপ্ত সেখানে ঢুকে পড়ে বলল, “স্যার, আমি সেই বিদেশীদের কথা জানি।”
এস পি অমনি ভুরু কোঁচকালেন। মিঃ ভার্মা মুখ তুলে দাশগুপ্তকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কে?”
দাশগুপ্ত বলল, “স্যার, আমি আপনার ডিপার্টমেন্টেই কাজ করি। দু’-বছর ধরে আন্দামানে আছি। আমার কাজ হল এখানকার অবস্থার ওপর লক্ষ রাখা। বিদেশী গুপ্তচরদের কথা প্রথমে আমিও বিশ্বাস করিনি। কিন্তু মিঃ রায়চৌধুরী আমার চোখের সামনে প্রমাণ করে দিয়েছেন—”
মিঃ ভার্মা জিজ্ঞেস করলেন, “রায়চৌধুরী? কোন্ রায়চৌধুরী?”
দাশগুপ্ত বলল, “সেই যে মিঃ রায়চৌধুরী, যিনি আগে ভারত সরকারের কাজ করতেন, এখন রিটায়ার্ড, নানান জায়গায় রহস্যের সন্ধান করে বেড়ান…”
কৌশিক ভার্মা চমকে উঠে বললেন, “ও সেই ওয়ান-লেগেড ম্যান? সেই দারুণ সাহসী মানুষটি? কোথায় তিনি? তাঁর সঙ্গে আমি দেখা করতে চাই।”
দাশগুপ্ত বলল, “স্যার, তাঁর সাঙ্ঘাতিক বিপদ। এতক্ষণ তিনি বেঁচে আছেন কিনা সন্দেহ!”
কৌশিক ভার্মা ভুরু কুঁচকে বললেন, “সে কী কথা? কেন, তাঁর কী হয়েছে?”
“তিনি জারোয়াদের হাতে ধরা পড়েছেন।”
“হোয়াট? জারোয়াদের হাতে? কী ভাবে ধরা পড়লেন? আপনারা কিছু করতে পারেননি?”
দাশগুপ্ত হাতজোড় করে বলল, “স্যার, আমি স্বীকার করছি, আমার কিছুটা দোষ আছে। আমি ওঁর সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু উনি আমার দিকে রিভলবার তুলে ভয় দেখিয়ে মিডল আন্দামানের একটা দ্বীপে নেমে গেলেন জোর করে। তারপর আমি রেসকিউ পার্টি পাঠাবার জন্য পুলিশের এস পি সাহেবকে অনুরোধ করেছিলাম। উনি রাজি হননি।”
কৌশিক ভার্মা এস পি সাহেবের দিকে তাকালেন। এস পি সাহেব তখন গোঁপে তা দিচ্ছিলেন। তাড়াতাড়ি গোঁপ থেকে হাত নামিয়ে বললেন, “আমি ঠিক কাজই করেছি। আমি সব ঘটনা জানিয়ে দিল্লিতে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছি একটু আগে।”
কৌশিক ভামা বললেন, “দিল্লি থেকে হুকুম আসতে যদি দু-তিনদিন লাগে, ততদিন আপনি ওরকম একটা লোককে জারোয়াদের হাতে ছেড়ে রাখবেন?”
মিঃ সিং বললেন, “স্যার, তাছাড়া আমি কী করব বলুন? সেখানে পুলিশ পাঠালে জারোয়াদের সঙ্গে যুদ্ধ লেগে যেত। গুলি খেয়ে বেশ-কিছু জারোয়া মরত। একজন জারোয়াকেও মারার হুকুম নেই আমার কাছে। তাছাড়া সেই মিঃ রায়চৌধুরীকে আর বাঁচানো যাবে কিনা সন্দেহ। কেউ বাঁচে না ঐ অবস্থায়।”
কৌশিক ভার্মা উঠে দাঁড়িয়ে ধমক দিয়ে বললেন, “তা বলে কোনো চেষ্টাও করবেন না? মিঃ রায়চৌধুরী কে জানেন? ওরকম সাহসী লোক সাহেবদের মধ্যে দেখা যায়, কিন্তু ভারতীয়দের মধ্যে ক’জন আছেন? ওরকম একজন মানুষ আমাদের দেশের গর্ব। সেই লোককে আমরা বাঁচাবার চেষ্টা করব না? ছি ছি ছি। এক্ষুনি রেসকিউ পার্টি পাঠাবার ব্যবস্থা করুন। আমি নিজে তাদের সঙ্গে যাব।”
এস পি সাহেব আস্তে আস্তে বললেন, “এই রাত্তিরবেলা? সে তো প্রায় অসম্ভব।”
“কেন, অসম্ভব কেন?”
“মোটরবোট নিয়ে অতদূর যেতে অন্তত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাগবে—বনের মধ্যে ঘুটঘুটে অন্ধকার, সেখানে এখন যে নামবে তাকেই প্রাণ দিতে হবে। জারোয়ারা চব্বিশ ঘণ্টা লুকিয়ে থেকে পাহারা দেয়।”
কৌশিক ভার্মা বললেন, “মোটরবোটের সঙ্গে সার্চ-লাইট লাগানো যেতে পারে না? সার্চ-লাইটের আলোয় অনেক দূর দেখা যাবে।”
“স্যার, আপনি একটু চিন্তা করে দেখুন, সার্চলাইটের আলোয় আর কতদূর দেখা যেতে পারে। দ্বীপটা অনেক বড়। তাছাড়া জারোয়ারা যুদ্ধ না করে পিছু হটবে না। তাতে দু’পক্ষের অনেক লোক মরবে। এটা আমাদের নীতি নয়।”
কৌশিক ভামা চিবুকে হাত রেখে চিন্তা করতে লাগলেন।
দাশগুপ্ত আস্তে আস্তে বলল, “স্যার, আমি একটা কথা বলতে পারি?”
“বলুন।”
“একটা উপায়ে এক্ষুনি সাহায্যের ব্যবস্থা করা যায়। বোটে না গিয়ে আমরা যদি হেলিকপটারে যাই, তাহলে খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাওয়া যায়। হেলিকপটারের ওপর থেকে আলো ফেলে খুঁজে দেখা যায় সারা জঙ্গলটা। তাতে যুদ্ধও হবে না। জারোয়ারা হেলিকপটারে তীর মারতেও পারবে না। ওদের তীর বেশি উঁচুতে পৌঁছয় না।”
কৌশিক ভার্মা টেবিলে এক চাপড় মেরে বললেন, “ঠিক! খুব ভালো কথা। সেই ব্যবস্থাই করা যাক।”
দাশগুপ্ত বলল, “সেই সঙ্গে প্রীতম সিংকেও নিয়ে গেলে ভালো হয়।”
“প্রীতম সিং কে?”
“প্রীতম সিং আগে এখানেই পুলিশের কাজ করতেন। উনি জারোয়াদের ভাষা জানেন। হেলিকপটার থেকে উনি মাইকে জারোয়াদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। মিঃ রায়চৌধুরীকে যদি ওরা মেরে না ফেলে বন্দী করে রাখে, তাহলে প্রীতম সিং-এর কথায় হয়তো ছেড়ে দেবে। প্রীতম সিং ছাড়া আর তো কেউ জারোয়াদের সঙ্গে কথাই বলতে পারবে না।”
কৌশিক ভার্মা অবাক হয়ে বললেন, “সেরকম লোকও আছে? তবু আপনারা কিছু চেষ্টা করেননি!”
মিঃ সিং গম্ভীরভাবে বললেন, “হ্যাঁ, প্রীতম সিংকে ডেকে আমি তার মত নিয়েছিলাম। প্রীতম সিং-এর মতে এখন আর চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই। প্রীতম সিংকে জারোয়ারা বনের ভেতরে ঢুকতে দেয় না।”
“প্রীতম সিং হেলিকপটার থেকে ওদের সঙ্গে কথা বলে আসল খবরটা অন্তত জেনে নিতে পারবে। হেলিকপটার কোথায় আছে? চলুন?”
“আমাদের হেলিকপ্টার নেই।”
দাশগুপ্ত আবার বলল, “এখানে নেভির হেলিকপটার আছে, স্যার। আমরা বললে দেবে না। কিন্তু আপনি অর্ডার দিলে ঠিকই দেবে।”
“আমি এক্ষুনি অর্ডার লিখে দিচ্ছি।”
কৌশিক ভার্মা তাঁর সেক্রেটারিকে ডেকে তক্ষুনি অর্ডার লিখিয়ে দিলেন। তারপর এস পিকে বললেন, “একজন লোক দিয়ে এই চিঠি এক্ষুনি পাঠিয়ে দিন। তাকে জেনে আসতে বলুন আধঘণ্টার মধ্যে হেলিকপটার পাওয়া যাবে কিনা!”
একজন লোক চিঠি নিয়ে তক্ষুনি ছুটে গেল। কিন্তু একটু বাদেই সে ফিরে এল খারাপ খবর নিয়ে।
নেভির দুটি মাত্র হেলিকপটার। একটা চলে গেছে নিকোবর, সেটা তিন-চারদিনের মধ্যে ফিরবে না। আর-একটা খারাপ হয়ে পড়ে আছে। সেটা সারাবার চেষ্টা চলছে।
কৌশিক ভার্মা চেঁচিয়ে উঠলেন, “সেটা সারিয়ে তুলতেই হবে…যত তাড়াতাড়ি সম্ভব…আধ ঘণ্টা, অন্তত এক ঘণ্টার মধ্যে…”
দাশগুপ্তর মুখটা শুকিয়ে গেছে। এত চেষ্টা করেও শেষরক্ষা করা গেল না? হেলিকপটারটাও এই সময় খারাপ!
কৌশিক ভার্মা দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, “চলুন, আমি নিজে সেই হেলিকপটারটা দেখে আসতে চাই…”
এদিকে তখন বনের মধ্যে কী হচ্ছে?
হঠাৎ গুলির শব্দ। তারপরেই কাকাবাবু একটামাত্র ক্রাচ নিয়ে প্রায় লাফাতে লাফাতে চলে এলেন সেই আগুনের কাছে। তাঁর রিভলবার সোজা সেই বুড়ো রাজার বুকের দিকে তাক করা।
জারোয়ারা প্রথমে ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারেনি। তারপর কাকাবাবুকে দেখে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল।
কাকাবাবু বুড়ো রাজাকে আবার ইংরেজীতে বললেন, “আপনার লোকদের বলুন, কেউ যেন আমার গায়ে হাত দেবার চেষ্টা না করে! কেউ আমার কাছে এলেই আমি তার আগে আপনাকে গুলি করে মেরে ফেলব!”
বুড়ো রাজা কিন্তু একটুও ভয় পাননি। তার পাকা ভুরুর নীচে চোখ দুটি ঘোলাটে। একদৃষ্টে তিনি কাকাবাবুর দিকে চেয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর দুটো হাত তুললেন মাথার ওপরে। সঙ্গে সঙ্গে জারোয়ারা থেমে গেল।
বুড়ো রাজা কাকাবাবুকে স্পষ্ট ইংরিজীতে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কে?”
কাকাবাবু বললেন, “তার আগে বলুন, আপনি কে? আপনি জারোয়া নন, তা বুঝতেই পারা যায়। আপনি সভ্য মানুষ। আপনি কেন সাহেবগুলোকে পুড়িয়ে মারছেন?”
বুড়ো রাজা মাটিতে চিক করে থুতু ফেললেন। তারপর হাসলেন। সেই রকম একদৃষ্টিতে কাকাবাবুর দিকে চেয়ে থেকে বললেন, “তুমি আমাকে গুলি করলেও নিজে বাঁচতে পারবে না। তোমাকে এরা শেষ করে ফেলবে। তুমি এখানে কেন এসেছ?”
কাকাবাবু ডান দিকে হাত দেখিয়ে বললেন, “এই আগুনটা দেখতে। এই সাহেবগুলোও সেইজন্যেই এসেছে।”
বুড়ো রাজা জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি ওদের সঙ্গে এসেছ?”
কাকাবাবু বললেন, “না। কিন্তু আপনি এই অসভ্যদের সঙ্গে থেকে কি অসভ্য হয়ে গেছেন? জ্যান্ত মানুষদের পুড়িয়ে মারছেন?”
বুড়ো রাজা বললেন, “তোমাকে কে বলেছে, এই জারোয়ারা অসভ্য? আর এই সাহেবরা কিংবা তোমরা সভ্য? তোমাদের আমি ঘৃণা করি!”
“এদের ছেড়ে দিন!”
এবার বুড়ো রাজা ঝুঁকে-ঝুঁকে এগিয়ে আসতে লাগলেন কাকাবাবুর দিকে। কাকাবাবুর হাত কাঁপছে। তিনি চেঁচিয়ে বললেন, “খবর্দার, আমার কাছে আসবেন না, আমি গুলি করব, ঠিক গুলি করব!”
বুড়ো রাজা কোনো কথা না বলে হাসিমুখে তবু এগিয়ে আসতে লাগলেন।
কাকাবাবু বললেন, “আমি গুলি করব কিন্তু! আমার রিভলবার কেড়ে নেবার চেষ্টা করবেন না, তার আগেই আমি গুলি করব।”
বুড়ো রাজা একেবারে কাকাবাবুর মুখের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর কাকাবাবুর চোখের দিকে চেয়ে থেকে বাংলায় বললেন, “তোমরা এই আগুনটা দেখতে এসেছ? এই আগুনটা বুঝি এত দামী? ঠিক আছে, তোমাদের সবাইকে আমি এই আগুনের মধ্যে পাঠিয়ে দেব।”
দূরে, গাছের আড়ালে লুকিয়ে থেকে সন্তু শুনতে পেল, বুড়ো রাজা স্পষ্ট বাংলায় কাকাবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা এই আগুনটা দেখতে এসেছ?”
সন্তু তার নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারল না।
কাকাবাবু দারুণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি বাঙালি?”
বুড়ো রাজা সে কথার উত্তর না দিয়ে কাকাবাবুর হাত থেকে রিভলভারটা কেড়ে নিতে গেলেন।
কাকাবাবু বললেন, “খবর্দার, আর এগোবেন না, আমি গুলি করব! ঠিক গুলি করব।”
বুড়ো রাজা মাথার ওপর দু’হাত তুলে বললেন, “করো গুলি করো, দেখি তোমার কত সাহস?”
কাকাবাবু গুলি করতে পারলেন না। তাঁর হাত কাঁপছে। তিনি বললেন, “আমি আপনাকে মারতে চাই না। আমি জানতে চাই, আপনি কে?”
বুড়ো রাজা কাকাবাবুর ডান হাতে একটা জোরে ধাক্কা মারতেই রিভলভারটা ছিটকে পড়ে গেল একটু দূরে। কাকাবাবু আবার সেটা কুড়িয়ে নেবার জন্য ঝুঁকতেই পড়ে গেলেন হুমড়ি খেয়ে। কাকাবাবুর যে একটা পা নেই, সেটা তাঁর মনে থাকে না সব সময়। কাকাবাবু পড়ে যেতেই বুড়ো রাজা তাঁর পিঠের ওপর একটা পা রেখে দাঁড়ালেন।
সমস্ত জারোয়ারা আনন্দে চিৎকার করে উঠল। তারা দেখল তাদের বুড়ো রাজা রিভলবারকেও ভয় পান না। কাকাবাবু জোর করে ওঠবার চেষ্টা করতে যেতেই দু’জন জারোয়া ছুটে এসে তাঁকে চেপে ধরল।
হাত-পা বাঁধা সাহেবগুলোও ভয়ের শব্দ করে উঠল।
দূরে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে সন্তু সব দেখল। তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। এবার ওরা কাকাবাবুকে মেরে ফেলবে। সন্তু একা কী করে তাঁকে বাঁচাবে? এখনো সন্তুকে কেউ দেখতে পায়নি।
বুড়ো রাজা চিক করে মাটিতে থুতু ফেললেন। তারপর খুব কড়া গলায় কাকাবাবুকে বললেন, “তোমাদের সবকটাকে আমি এক্ষুনি যমের বাড়ি পাঠাব! আমরা জারোয়ারা এখানে জঙ্গলের মধ্যে আপন মনে থাকি। আমরা কারুর কোনো ক্ষতি করি না। তোমরা কেন আমাদের বিরক্ত করতে আস?”
কাকাবাবু বললেন, ‘আপনি জারোয়া নন। আপনি কে?”
বুড়ো রাজা বললেন, “আমি এক সময় বাঙালি ছিলাম। এখন আমি এদেরই একজন। আমি আর তোমাদের মতন পরাধীন নই। আমি স্বাধীন।”
কাকাবাবু বললেন, “আমার কষ্ট হচ্ছে, আমাকে উঠে দাঁড়াতে দিন।”
বুড়ো রাজা বললেন, “তোমার সব কষ্ট এক্ষুনি শেষ কবে দেব। তোমরা এই আগুনটা দেখতে এসেছিলে না? এই আগুনের মধ্যেই তোমরা যাবে। যত সব চোরের দল!”
কাকাবাবু বললেন, “আমি কিছু চুরি করতে আসিনি। আমি শুধু দেখতে এসেছিলাম।”
“মিথ্যে কথা! যে-পাথরটা থেকে এই আগুন বেরুচ্ছে, তোমরা আস সেই পাথরটা চুরি করতে। এর আগেও কয়েকটা সাহেব এসেছিল, সব কটাকে আমি যমের বাড়ি পাঠিয়েছি। তুমি বাঙালি হয়েও এই সাহেবদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছ। সাহেবের পাচাটা! পরাধীন দেশের মানুষেরাই এরকম কাপুরুষ হয়ে যায়!”
“আমি ওদের সঙ্গে আসিনি। আমি ওদের পথ দেখিয়ে আনিনি।”
“চুপ! মিথ্যুক! কুকুর!”
বুড়ো রাজা কাকাবাবুকে আর কোনো কথা বলতে দিলেন না। জারোয়াদের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা কাকাবাবুকে টেনে তুলল। এবার বুঝি আগুনের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দেবে!
সন্তু আর থাকতে পারল না। তার যা হয় হোক। কাকাবাবু যদি মরে যান, তাহলে সে-ও মরবে!
সে কাকাবাবু বলে চিৎকার করে তীরের মতন ছুটে এল। কোনো জারোয়া তাকে ধরতে পারল না, তার আগেই সে দৌড়ে কাকাবাবুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
সন্তুকে দেখে কাকাবাবুও খুব অবাক হয়ে গেছেন। আস্তে আস্তে বললেন, “তুই চলে যাসনি? তোকে যে আমি বললাম।”
বুড়ো রাজা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সন্তুর দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “এই ছেলেটি কে?”
কাকাবাবু বললেন, “এ আমার ভাইপো। আপনি আমাকে মারতে চান মারুন, কিন্তু ওকে ছেড়ে দিন।”
“এইটুকু ছেলেকেও সাহেবদের চাকরের কাজে লাগিয়েছ?”
সন্তু বলল, “বিশ্বাস করুন, আমরা ঐ সাহেবদের সঙ্গে আসিনি। আমরা আলাদা এসেছি। ঐ সাহেবরা আমাদেরও মেরে ফেলতে চেয়েছিল।”
বুড়ো রাজা সন্তুকে বললেন, “আমার কাছে এসো!”
বুড়ো রাজার চোখের দিকে তাকালেই ভয় করে। তবু সন্তু এক পা এক পা করে এগিয়ে গেল। বুড়ো রাজা একটা হাত বাড়িয়ে সন্তুর গালটা ছুঁলেন! রাজার গায়ের সব চামড়া কুঁচকে গেছে। লম্বা লম্বা শুকনো আঙুলের ছোঁয়ায় সন্তুর গাটা একবার শিরশির করে উঠল।
রাজা আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালেন। তাঁর মুখে একটা দুঃখ-দুঃখ ভাব ফুটে উঠল। তিনি আপনমনে বললেন, “আমার ঠিক এই বয়েসী একটা ভাই ছিল। জানি না সে এখনো বেঁচে আছে কিনা।”
তারপর তিনি মুখ নামিয়ে সন্তুকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী?”
“সুনন্দ রায়চৌধুরী। আমার কাকাবাবু একজন খুব পণ্ডিত লোক। উনি মোটেই চোর নন।”
“অনেক পণ্ডিতও চোর হয়। টাকা-পয়সার লোভে তারাও সাহেবদের পা চাটে।”
“আমার কাকাবাবু মোটেই সেরকম লোক নন।”
“তাহলে সাহেবদের বাঁচাবার জন্য ওর এত দরদ কেন?”
এবার কাকাবাবু বললেন, “কোনো মানুষকেই মেরে ফেলা আমি পছন্দ করি না। এই সাহেবদের অন্য শাস্তি দেওয়া যেতে পারে, মেরে ফেলা উচিত নয়!”
“ওরা আমার অন্তত পনেরোজন জারোয়াকে মেরে ফেলেছে। কেন? জারোয়ারা ওদের কোনো ক্ষতি করেছিল? জারোয়ারা এখানে শান্তভাবে থাকে—তারা তো অন্য কোনো জায়গায় গিয়ে অন্যদের মারতে যায় না।”
“সাহেবরা অন্যায় করেছে ঠিকই। সেজন্য তাদের বিচার করে শাস্তি দিতে হবে। আপনি সভ্যজগতের মানুষ।”
“চুপ! তোমাদের সভ্যতাকে আমি ঘৃণা করি!”
কাকাবাবুকে তখনো দু’জন জারোয়া চেপে ধরে আছে। আগুনটা এখান থেকে খুব কাছে। গায়ে আঁচ লাগছে। কিন্তু ঐ আগুনের কতরকম রঙ। দেখতে খুব সুন্দর লাগে।
হঠাৎ ঝিরঝির করে বৃষ্টি নামল। এরকমভাবে যখন-তখনই বৃষ্টি নামে এখানে। সন্তু ভাবল, বৃষ্টিতে কি আগুনটা নিভে যাবে? কিন্তু সে একটা আশ্চর্য ব্যাপার দেখল। বৃষ্টির জল, সেই আগুনের মধ্যে পড়তেই পারছে না। ছ্যাঁত ছ্যাঁত শব্দে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ছোট ছোট আগুনের ফুলকি হয়ে যাচ্ছে। যেন সেই আগুনের শিখার ওপর অসংখ্য জোনাকি। এরকম দৃশ্য সন্তু কখনো দেখেনি।
কাকাবাবু বিড়বিড় করে বললেন, এটা পৃথিবীর আগুন হতেই পারে না। এই আগুন অন্য কোনো জায়গা থেকে এসেছে।
বুড়ো রাজা বললেন, “এই আগুন জ্বলছে বহু বছর ধরে। কখনো নিভবে না।”
বৃষ্টি আরও জোরে এল। বুড়ো রাজা জারোয়াদের কিছু একটা হুকুম করে পেছন ফিরে চলতে লাগলেন। জারোয়ারা সন্তু আর কাকাবাবুকে ধরে রেখে তাঁর সঙ্গে চলল। রাজা একটা কুঁড়েঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন, জারোয়ারা সন্তু আর কাকাবাবুকে তার মধ্যে ঠেলে দিল।
ঘরটার মধ্যে প্রায় কিছুই জিনিসপত্র নেই। মাটিতে ছড়ানো রয়েছে একগাদা শুকনো পাতা, তার ওপর দুটো হরিণের শুকনো চামড়া। একটা আস্ত গাছ উঠে গেছে ঘরের এক কোণ দিয়ে। সেই গাছের ডালে একটা বাঁশের চোঙা ঝোলানো। তাতে জল ভর্তি। বুড়ো রাজা সেটা নিয়ে ঢক ঢক করে জল খেলেন খানিকটা। তারপর কাকাবাবুদের বললেন, “বসো।”
বসবার পর আর দুটো জিনিসের দিকে চোখ পড়ল ওদের। ঘরের এক পাশে এক টুকরো লাল কাপড়ের ওপর রাখা আছে একটা বই। বইটার মলাটের ওপর লেখা আছে ‘গীতা’। আর তার পাশে একটা লোহার হাতকড়া। পুলিশরা চোর ডাকাতের হাতে যে-রকম হাতকড়া পরিয়ে দেয়।
ওরা দু’জনেই সেই দিকে তাকিয়ে আছে দেখে বুড়ো রাজা বললেন, “ঐ দুটো আমার পুরনো কালের স্মৃতি। আর কিছুই নেই।”
কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বয়েস কত?”
বুড়ো রাজা বললেন, “হিসেব রাখি না। কী দরকার বয়েসের হিসেবে? আশি-নব্বই হতে পারে, একশোও হতে পারে। জানি না কতদিন আগে এসেছি।”
কাকাবাবু উত্তেজিতভাবে বললেন, “আমি বোধহয় আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনার নাম কি গুণদা তালুকদার?”
“কী বললে?”
“আপনি নিশ্চয়ই গুণদা তালুকদার?”
“কে গুণদা তালুকদার? তুমি তার কথা কী করে জানলে?”
“আমি আন্দামানে আসবার আগে, এখানকার সম্পর্কে যত কিছু বইপত্র আছে, তা সব পড়ে ফেলেছি। বহু বছর আগে আন্দামান জেল থেকে গুণদা তালুকদার নামে একজন বিপ্লবী পালিয়েছিলেন। ঐ জেল থেকে মাত্র ঐ একজনই পালিয়েছেন কিন্তু ধরা পড়েননি। সবাই তখন ভেবেছিল, গুণদা তালুকদার সমুদ্রে ডুবে মারা গেছেন। আজ এই হাতকড়াটা দেখেই হঠাৎ মনে হল…”
বুড়ো রাজা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “এসব কথা বইতে লেখা আছে? গুণদা তালুকদারকে এখনো লোকে মনে রেখেছে?”
কাকাবাবু বললেন, “নিশ্চয়ই! আপনার ছবি ছাপা হয়েছে কত বইতে। অবশ্য সে-ছবি দেখে এখন আপনাকে চেনা যায় না। আপনার জন্মদিনে উৎসব হয় অনেক জায়গায়। নেতাজীকে যেমন খুঁজে পাওয়া যায়নি, তেমনি আপনাকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। দেশের লোক আপনাকে শ্রদ্ধা করে।”
“নেতাজী কে?”
“সে কী, আপনি নেতাজীর নাম শোনেননি? সুভাষচন্দ্র বসু, আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে যিনি যুদ্ধ করেছিলেন ব্রিটিশের সঙ্গে?”
“সুভাষবাবু? তিনি যুদ্ধ করেছেন? কবে?”
“আপনি এসব কিছুই জানেন না?”
“না। আমার নাম লোকে মনে রেখেছে? তার মানে পুলিশ এখনো আমার খোঁজ করে?”
“পুলিশ? আপনাকে খুঁজবে কেন? ও সেই জন্যই আপনি আমাদের পরাধীন দেশের মানুষ বলছিলেন? আমাদের দেশ তো বহু দিন আগে স্বাধীন হয়ে গেছে। এই যে সন্তু, ও তো স্বাধীন দেশে জন্মেছে। ভারত এখন পৃথিবীর একটি প্রধান দেশ।”
“স্বাধীন হয়ে গেছে?”
“হ্যাঁ। আপনি দেশের জন্য কত লড়াই করেছেন, জেল খেটেছেন, আর সেই খবরটা রাখেন না?”
“আমি গত পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে বাইরের কোনো লোকের সঙ্গে কথাই বলিনি।”
“আপনার কথা জানতে পারলে সবাই দারুণ খুশি হবে। সারা দেশ আপনাকে নিয়ে উৎসব করবে।”
“আমি আর কোথাও যাব না। আমি এইখানে খুব ভালো আছি।”
“আপনি এখানে এলেন কী করে? জারোয়ারা আপনাকে রাজা করে নিল?”
“আমি একটা ছোট ভেলা নিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়েছিলাম। ঝড়ে সেই ভেলা উল্টে গেল। আমি মরেই যেতাম। অজ্ঞান অবস্থায় ভাসতে ভাসতে এই দ্বীপে এসে ঠেকেছিলাম। আমাকে এরা মারেনি কেন জানি না। তখনো আমার এক হাতে হাতকড়া ঝুলছিল। এরা মোটেই হিংস্র নয়। এদের যদি কেউ বিরক্ত না করে, এরা কখনো অন্য মানুষকে মারে না। এরা আমাকে খাইয়ে দাইয়ে সুস্থ করে তুলেছিল। সে কতকাল আগের কথা!”
“কিন্তু আপনি তো এদের সভ্য করে তুলতে পারতেন!”
“চুপ, ও কথা বলো না। সভ্য মানে কী? তোমরা সভ্য আর এরা অসভ্য? এখানে কেউ চুরি করে না, মিথ্যে কথা বলে না। এখানে সবাই খাবার একসঙ্গে ভাগ করে খায়। এখানে কোনো রোগ নেই। এর থেকে বেশি সুখ মানুষ আর কী চায়? আমিই এদের বারণ করেছি তোমাদের মতন সভ্য লোকদের সঙ্গে মিশতে। তোমরা এদের নষ্ট করে দেবে!”
“আপনার মতন একজন মানুষ এখানে এইভাবে লুকিয়ে আছেন, একথা আমার কাছে শুনলেও কেউ বিশ্বাস করবে না।”
“তোমরা কেন এই জারোয়াদের ওপর অত্যাচার করতে আস?”
“আমি বন্ধুত্ব করতে এসেছি।”
“তোমারও ঐ পাথরটার ওপর লোভ আছে নিশ্চয়ই?”
“কোন্ পাথরটা?”
“যেটা দিয়ে আগুন জ্বলে?”
“ওটার কথা আমি জানতামই না। তবে আন্দাজ করেছিলাম, এরকম একটা মহা-মূল্যবান জিনিস এখানে আছে। সাহেবরা আগেই টের পেয়েছে নিশ্চয়ই।
“ওটা কী তুমি বুঝতে পেরেছ?”
“নিশ্চয়ই ওটা কোনো উল্কা। কিংবা অন্য কোনো গ্রহের ভাঙা টুকরো। পৃথিবীতে এরকম কিছু কিছু মাঝে-মাঝে এসে পড়ে। অনেকগুলো আসার পথেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু এটা বহু বছর ধরে জ্বলছে! এটার মধ্যে নিশ্চয়ই এমন কোনো ধাতু আছে, যা আমাদের পৃথিবীতে নেই। সে রকম নতুন ধাতুর আবিষ্কার হলে তার সাঙ্ঘাতিক দাম হবে। পৃথিবীতে বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে হৈচৈ পড়ে যাবে।”
“জারোয়ারা আগুন জ্বালাতে পারে না। এই আগুন থেকেই তারা সব কাজ চালায়। সেই আগুন চুরি করতে চায় কেন সভ্য মানুষ?”
“তা বলে একটা নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হবে না? এর বদলে ওদের আমরা হাজার-হাজার লক্ষ-লক্ষ দেশলাই দিতে পারি—”
“না, এটা প্রকৃতির দান ওরা তাই নিয়েছে। ওরা সভ্য মানুষদের কাছ থেকে কিছুই চায় না। তোমাদের আমি ছেড়ে দিতে পারি এক শর্তে, তোমরা এই আগুনের কথা কখনো কারুকে বলতে পারবে না।”
“কিন্তু আমরা আপনাকেও নিয়ে যেতে চাই।”
“আমাকে?”
“দেশ স্বাধীন হয়েছে, আপনি একবার দেখতে আসবেন না? একবার দিল্লিতে আর কলকাতায় চলুন। দেখবেন, কত কী বদলে গেছে!”
“না, আমি যাব না!”
এই সময় বাইরে হঠাৎ দারুণ একটা গোলমাল শোনা গেল। ডিসুম্ ডিসুম্ করে শব্দ হল বন্দুকের গুলির।
ওরা তিনজনই চমকে উঠল।
বুড়ো রাজা উঠে গিয়ে দরজার পাশে দাঁড়ালেন। তারপর বাইরে একবার তাকিয়েই কাকাবাবুর দিকে মুখ ফেরালেন। আস্তে আস্তে বললেন, “তোমার জন্যই এবার আমাদের সর্বনাশ হল!”
সন্তুও লাফিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে দরজার পাশে। সে দেখল, সেই সাহেবগুলো হাতের বাঁধন খুলে ফেলে উঠে দাঁড়িয়েছে। তিন-চারজনের হাতে বন্দুক, এলোপাথাড়ি গুলি চালাচ্ছে চারদিকে।
বুড়ো রাজা বললেন, “এবার ওরা সবাইকে মেরে ফেলবে।”
কাকাবাবু বললেন, “আপনি ঘরের মধ্যে ঢুকে আসুন। বাইরে যাবেন না!”
বুড়ো রাজা বললেন, “ঘরের মধ্যে ঢুকলেও বাঁচা যাবে না। ওদের কাছে লাইট মেশিনগান আছে। ওরা আমার লোকজনকে মারছে!”
সত্যিই তাই। কয়েকজন জারোয়া প্রাণের ভয় না করে সাহেবদের দিকে তাড়া করে আসছিল, সাহেবরা কট্ কট্ কট্ কট্ করে গুলি চালাল, সঙ্গে সঙ্গে তারা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। জারোয়াদের বিষাক্ত তীর দু’জন সাহেবের গায়ে লাগল, কিন্তু তাতে তাদের কিছুই হল না। সাহেবরা আগেই বিষ প্রতিষেধক ইঞ্জেকশন নিয়ে নিয়েছে।
কাকাবাবুকে ঠেলে বুড়ো রাজা বেরিয়ে গেলেন ঘরের বাইরে। দু’হাত উঁচু করে ইংরিজিতে চেঁচিয়ে বললেন, “হোল্ড অন্!”
সঙ্গে সঙ্গে একজন সাহেব হিংস্রভাবে ঘুরে দাঁড়াল সেই দিকে। তার হাতে একটা বেঁটে আর মোটা ধরনের বন্দুক। সন্তু বুঝল, ওটারই নাম বোধহয় লাইট মেশিনগান।
সন্তুর মনে হল, সাহেবটি এক্ষনি বুড়ো রাজাকে মেরে ফেলবে।
কিন্তু বুড়ো রাজার দারুণ সাহস। তবু তিনি লাঠি ঠুকতে ঠুকতে একপা একপা করে এগিয়ে গেলেন সাহেবদের দিকে। তারপর ইংরিজিতে বললেন, “তোমরা আমার লোকদের শুধু-শুধু মেরো না। তোমরা যা চাও, তাই নিয়ে যাও।”
তিনি জারোয়াদের দিকে তাকিয়ে কী একটা অদ্ভুত শব্দ উচ্চারণ করলেন। অমনি তারা সার বেঁধে পেছিয়ে যেতে লাগল। সেইসঙ্গে মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ করতে লাগল। সেই শব্দটা ঠিক কান্নার মতন।
আর-একজন সাহেব এগিয়ে এসে খুব নিষ্ঠুরভাবে প্রচণ্ড এক চড় কষাল বুড়ো রাজার গালে। তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন হুমড়ি খেয়ে। সাহেবটা বুড়ো রাজার বুকের ওপর পা তুলে বলল, “একে এক্ষুনি মেরে ফেলব! এই বুড়োটাই যত নষ্টের মূল। এর হুকুমেই আমাদের একজন বন্ধুকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। এতক্ষণে আমাদেরও মেরে ফেলতো।”
মেশিনগান-হাতে সাহেবটি বলল, “ওকে এক্ষুনি মেরো না, একটু পরে। ওর কাছ থেকে আরও কিছু খবর জানা যেতে পারে।”
যে লতা দিয়ে সাহেবদের বাঁধা হয়েছিল, সেই লতা দিয়েই ওরা বেঁধে ফেলল বুড়ো রাজাকে।
সেই অবস্থাতেও বুড়ো রাজা বললেন, “আমাকে মারার চেষ্টা কোরো না। তাহলে তোমরা একজনও বেঁচে ফিরতে পারবে না এখান থেকে। তোমরা যা চুরি করতে এসেছ, তাই নিয়ে ফিরে যাও!”
একজন সাহেব বুড়ো রাজার মুখে থুতু ছিটিয়ে দিল।
সন্তু আর কাকাবাবু সেই কুঁড়ে ঘরের দরজার কাছে মাটিতে শুয়ে পড়েছে। মাটিতে শুয়ে থাকলে হঠাৎ গায়ে গুলি লাগে না। বুড়ো রাজার এই দুর্দশা দেখে ওরা শিউরে উঠল।
কাকাবাবু আফশোস করে বললেন, “ইস, আমার রিভলবারটা যদি এখন কাছে থাকত!”
সন্তু দেখল, খানিকটা দূরে মাটির ওপরে কাকাবাবুর রিভলবারটা পড়ে আছে। একজন সাহেবের পায়ের কাছে।
কিন্তু চারজন সাহেবের হাতে বন্দুক একজনের হাতে লাইট মেশিনগান, কাকাবাবু শুধু একটা রিভলবার নিয়ে কী করতেন?
একজন সাহেবের কাঁধে ঝোলানো আছে একটা ব্যাগ। সে সেটা খুলে ফেলল। তার মধ্য থেকে বেরুল অনেক কিছু। নানারকমের যন্ত্রপাতি আর একটা খুব মোটা ফিতের মতন জিনিস গোল পাকানো। সেটা খুলে ফেলতেই দেখা গেল, সেটা আসলে একটা বিরাট লম্বা ক্যাম্বিসের জলের পাইপ। তার একটা মুখ ধরে দু’জন সাহেব ছুটে গেল অন্ধকারের মধ্যে।
একটু বাদেই সেই পাইপটা ফুলে উঠল আর তার অন্য মুখ দিয়ে জল বেরুতে লাগল। আর দু’জন সাহেব সেটা নিয়ে গেল আগুনটার দিকে।
কাকাবাবু ফিসফিস করে বললেন, “ওরা ঝর্না থেকে জল আনছে।”
সন্তুও ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কাকাবাবু, ওরা আগুন নেভাতে চাইছে কেন?”
কাকাবাবু বললেন, “যে পাথরটা থেকে ঐ আগুন বেরুচ্ছে, সেটার সাংঘাতিক দাম। কোটি কোটি টাকা। ওরা সেটা চুরি করতে এসেছে। ওটা নিশ্চয়ই অন্য কোনো গ্রহের টুকরো কিংবা উল্কা। হয়তো ওর মধ্যে এমন অনেক নতুন ধাতু আছে, যা পৃথিবীর মানুষ কখনো দেখেনি। ওগুলো পেলে আমাদের বিজ্ঞানের অনেক নিয়ম উল্টে যেতে পারে।”
সন্তু বলল, “সাহেবগুলো ঐ পাথরটা যে এখানে আছে তা জানল কী করে?”
কাকাবাবু বললেন, “পৃথিবীতে কোথায় কখন উল্কাপাত হয়, অনেক বৈজ্ঞানিক তার খবর রাখেন। সবগুলোরই সন্ধান পাওয়া যায়, শুধু এটারই পাওয়া যায়নি। তবে এই লোকগুলো বৈজ্ঞানিক নয়। এরা যেমন হিংস্র আর নিষ্ঠুর, তাতে মনে হয় এরা একটা ডাকাতের দল। কোনো বৈজ্ঞানিকের কাছ থেকে খবর পেয়ে এখানে চলে এসেছে।”
সন্তু বলল, “ওদের মধ্যে একজন পাঞ্জাবীও তো রয়েছে।”
কাকাবাবু বললেন, “ঐ পাঞ্জাবীটি ওদের পথ দেখিয়ে এনেছে। নিশ্চয়ই অনেক টাকা দিয়ে হাত করেছে ওকে।”
তারপর আর ওরা কথা বলতে পারল না। অবাক হয়ে হাঁ করে চেয়ে রইল আগুনের দিকে।
সাহেবরা পাইপে করে আগুনের মধ্যে জল ছেটাতেই একটা আশ্চর্য সুন্দর জিনিস হল। আগুনের মধ্যে জল পড়তেই সেই জল লক্ষ লক্ষ রঙিন ফুলঝুরি হয়ে উঠে আসতে লাগল ওপরের দিকে। সমস্ত জায়গাটা লাল-নীল আলোয় ভরে গেল। আগুন নেভার কোনো চিহ্নই দেখা গেল না।
সাহেবরা তবু থামবে না। তারা জল ছিটিয়েই যেতে লাগল। আর সন্তু একদৃষ্টিতে দেখতে লাগল সেই ফুলঝুরি। এত সুন্দর রঙের খেলা সে কখনও দেখেনি। এখন আর ভয়ের কথা, বিপদের কথা তার মনে পড়ছে না।
কাকাবাবু বললেন, “ও আগুন এই পৃথিবীর নয়। পৃথিবীর জল দিয়ে ঐ আগুন নেভানো যাবে না। ঐ আগুনেই পাথরটা পুড়ে পুড়ে একদিন শেষ হয়ে যাবে।”
সাহেবরা এবার একটা কৌটো থেকে মুঠো মুঠো পাউডার ছড়াতে লাগল আগুনে। তাতেও কাজ হল না কিছুই। পাউডারগুলো পড়তেই দপ্ করে এক-একটা শিখা বেরিয়ে আসতে লাগল।
তাতেও নিরাশ হল না সাহেবরা। এবার একটা সরু লম্বা গাছের গুঁড়ির কাছে গিয়ে মেশিনগানের গুলি চালাল পঁচিশ তিরিশটা। তারপর গাছটাকে ধরে কাৎ করতেই সেটা ভেঙে গেল মড়াত করে।
ওরা চারজনে মিলে সেই গাছটাকে বয়ে এনে আগুনের মধ্যে তার একদিকটা ঢুকিয়ে দিল অনেকখানি। গুম করে একটা শব্দ হল। পাথরটার গায়ে গাছটার ধাক্কা লেগেছে।
তখন সাহেবরা উৎসাহ পেয়ে গাছটাকে আবার বার করে এনে খানিকটা পিছিয়ে এল। তারপর জোরে দৌড়ে গিয়ে ধাক্কা মারল আবার। আবার গুম করে শব্দ হল, আগুনের শিখাগুলো যেন নড়ে-চড়ে উঠল খানিকটা।

সন্তুরা দম বন্ধ করে দেখছে। তারা বুঝতে পেরেছে সাহেবদের মতলবটা কী? তারা গাছ দিয়ে ধাক্কা মেরে মেরে আগুনের ভেতর থেকে পাথরটাকে বার করে আনতে চাইছে। কিংবা আগুনসুদ্ধই পাথরটাকে ঠেলতে-ঠেলতে নিয়ে ঝর্নার মধ্যে ফেলবে।
কিন্তু একটু পরেই আর একটা সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড হল। পাথরটা সহজে নড়ানো যায় না বলে ওরা খুব জোরে জোরে ধাক্কা মারছিল। এতবার ধাক্কা মারতে গিয়ে ঝোঁক সামলাতে না পেরে একজন সাহেব আগুনটার খুব কাছে গিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে চুম্বকের মতন আগুন তাকে টেনে নিল ভেতরে। ঠিক যেন একটা হাতের মতন একটা আগুনের শিখা বেরিয়ে টেনে নিয়ে গেল লোকটিকে। সে একটা বীভৎস চিৎকার করে উঠল, তারপর আর তাকে দেখা গেল না।
শেষ মুহূর্তে সন্তু চোখ বুজে ফেলেছিল। আবার যখন চোখ মেলল, তখন দেখল, গাছটা ফেলে দিয়ে অন্য সাহেবরা ভয়ে পালিয়ে আসছে। কাকাবাবু কপালের ঘাম মুছছেন।
সাহেবটা আগুনে পুড়ে যাবার সময় দূরের জারোয়ারা একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠেছিল। সঙ্গে সঙ্গে মেশিনগান হাতে সাহেবটি সেদিকে এক ঝাঁক গুলি চালাল।
বুড়ো রাজা হাত পা বাঁধা অবস্থাতেই আবার হুকুমের সুরে চেঁচিয়ে বললেন, “ওদের মেরো না! আমি হুকুম দিলে ওরা তোমাদের এখনো শেষ করে দিতে পারে।”
সাহেবটা অসম্ভব রেগে গেল সেই কথা শুনে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “বুড়ো বদমাশ, এবার তোকেই আগুনে পোড়াব। এই ল্যারি, এই বুড়োটাকে তুলে আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দে তো!”
অন্য সাহেবরা কাছাকাছি এক জায়গায় হতভম্বের মতন দাঁড়িয়ে আছে। তাদের একজন সঙ্গী তাদের চোখের সামনে আগুনে পুড়ে গেল! ব্যাপারটা ওরাও যেন সহ্য করতে পারছে না।
মেশিনগান-হাতে সাহেবটিই বোধহয় ওদের সর্দার। সে কিন্তু দমেনি। সে আবার চিৎকার করে বলল, “ল্যারি, এদিকে এসো, এই বুড়োটাকে আগুনে ফেলে দাও!”
ওপাশ থেকে ল্যারি উত্তর দিল, “জ্যাক, পাথরটা পাবার কোনো আশা নেই। ওটা খুনে আগুন। চলো, আমরা এবার পালাবার চেষ্টা করি। নইলে আমরা সবাই শেষ হয়ে যাব!”
জ্যাক বলল, “পালাবার আগে প্রতিশোধ নিতে হবে এই বুড়োটাকে আমার চোখের সামনে আগুনে পোড়াতে চাই! আমি জারোয়াদের দিকে মেশিনগান তুলে রাখছি, তুমি একে আগুনে ফেলে দাও!”
ল্যারি এগিয়ে এল।
কাকাবাবু ফিসফিস করে বললেন, “সন্তু, আমার রিভলবারটা…”
সন্তু বুকে হেঁটে আস্তে আস্তে এগুলো। রিভলবারটা যেখানে পড়ে আছে, সাহেবটা সেখান থেকে খানিকটা দূরে। সন্তু মাটির ওপর দিয়ে শুয়ে শুয়ে গেলে বোধহয় ওরা তাকে দেখতে পাবে না।
এই সময় তিনবার কাক ডেকে উঠল।
অথাৎ ভোর হয়ে আসছে। আলো ফোটার আর বেশি দেরি নেই। আরও কয়েকটা পাখির ডাক, আরও কী যেন শব্দ হচ্ছে দূরে।
সন্তু রিভলবারটা নিয়ে ফিরে আসার সময় পেল না। ল্যারি এসে বুড়ো রাজাকে পাঁজা কোলা করে তুলে নিতেই কাকাবাবু আর থাকতে পারলেন না। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে ক্যাঙ্গারুর মতন লাফাতে লাফাতে ছুটে গেলেন ওদের কাছে। চিৎকার করে বললেন, “থামো, থামো! ওকে মেরো না!”
জ্যাক চমকে ফিরে তাকিয়ে দেখল কাকাবাবুকে। তারপর বলল, “এই আর একটা শয়তান! ধর এটাকেও!”
কাকাবাবুকে দেখে বুড়ো রাজা শান্তভাবে বললেন, “আমি কিছুতেই ইংরেজের হাতে মরব না প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। তোমার জন্য সেই অপমানের মৃত্যুই আমাকে মরতে হচ্ছে। তুমিও মরবে!”
কাকাবাবু ল্যারির দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাকে একজন জারোয়া আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দিতে যাচ্ছিল, সেই সময় আমি এসে তোমাকে বাঁচিয়েছিলাম, ঠিক কিনা? তুমি এই বুড়ো রাজাকে ছেড়ে দাও!”
ল্যারি তাকাল জ্যাকের দিকে। জ্যাক বলল, “এই দুটো বুড়োকেই আগুনের মধ্যে ফেলে দাও! নইলে আমরা পালাবার সময় এরা আমাদের পেছনে জারোয়াদের লেলিয়ে দেবে।”
ল্যারি তবু চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
জ্যাক ধমক দিয়ে বলল, “দেরি করছ কী? দাও, ফেলে দাও!”
সঙ্গে সঙ্গে আকাশে একটা প্রচণ্ড ঘট্ ঘট্ শব্দ শোনা গেল। দূর থেকে শব্দটা এগিয়ে এল খুব কাছে। সবাই চমকে ওপরে তাকাল। একটা হেলিকপটার!
ল্যারি বলল, “জ্যাক, শিগগির পালাও! হেলিকপটার নিয়ে পুলিশ এসেছে!
হেলিকপটার দেখে সন্তুরও মনে হল, নিশ্চয়ই তাদের উদ্ধার করার জন্যই ওটা এসেছে। আর কোনো চিন্তা নেই। সে উঠে সোজা হয়ে বসল।
জ্যাক দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “একটা মোটে হেলিকপটার এসেছে, তাতে ভয় পাবার কী আছে? আমি এই মেশিনগান দিয়ে ওটাকে ফুঁড়ে দিচ্ছি এক্ষুনি। তোমরা সরে দাঁড়াও, কিংবা মাটিতে শুয়ে পড়ো!”
কাকাবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, “সন্তু—”
সন্তু বুঝতে পারল না, কাকাবাবু তাকে কী করতে বলছেন। হেলিকপটারটা নীচের দিকে নেমে আসছে। আর একটু নীচে নামলেই জ্যাক গুলি চালাবে। তাদের সব আশা শেষ হয়ে যাবে।
সন্তুর খুব কাছেই পড়ে আছে কাকাবাবুর রিভলবারটা। সে সেটা চট করে তুলে নিল। কোনো চিন্তা না করেই সে দুটো গুলি চালিয়ে দিল জ্যাকের দিকে। গুলির শব্দে তার নিজেরই কানে তালা লেগে গেল, প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগল হাতে। সে চোখ বুজে ফেলল ভয়ে।
আবার চোখ খুলে দেখল, জ্যাক মাটিতে পড়ে গেছে, আর কাকাবাবু মেশিনগানটা তার হাত থেকে তুলে নিয়েছেন সঙ্গে সঙ্গে।
তারপর কাকাবাবু সেটা বাকি সাহেবদের দিকে ফিরিয়ে বললেন, “তোমরা সব চুপ করে সারি বেঁধে দাঁড়াও। কেউ একটু নড়বার চেষ্টা করলেই গুলি চালিয়ে শেষ করে দেব—”
ঘ্যাট ঘ্যাট ঘ্যাট ঘ্যাট শব্দ করে হেলিকপটারটা ঘুরতে লাগল ওদের মাথার ওপরে। একটু একটু করে নীচে নেমে আসছে। অনেকটা কাছে আসার পর সেটা থেকে একটা অদ্ভুত আওয়াজ বেরিয়ে এল। কে যেন মাইকে বলছে, “আকিলা কিলকিল টুংকা টাকিলা! আকিলা কিলকিল টুংকা টাকিলা!”
সন্তু অবাক হয়ে গেল। এ আবার কী?
সেই আওয়াজ শুনে জারোয়ারা এক সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “টাকিলা! টাকিলা!”
হেলিকপটার থেকে আবার আওয়াজ ভেসে এল, “কাকিনা সুপি সুপি! কাকিনা সুপি সুপি!”
এবার জারোয়ারা কোনো উত্তর দিল না। সবাই বুড়ো রাজার দিকে তাকিয়ে রইল।
কাকাবাবু বুড়ো রাজাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ওরা কী বলছে?”
বুড়ো রাজা বললেন, “ঐ জিনিসটা থেকে কেউ একজন জারোয়া ভাষায় বলছে, মাঝখানে জায়গা ছেড়ে দিতে। ওটা এখানে নামবে।”
কাকাবাবু বললেন, “সবাইকে আপনি সরে যেতে বলুন! জায়গা করে দিতে বলুন!”
এবার হেলিকপটার থেকে ইংরিজিতে কেউ জিজ্ঞেস করল, “মিঃ রায়চৌধুরী, আর ইউ দেয়ার? মিঃ রায়চৌধুরী, আর ইউ দেয়ার?”
কাকাবাবু চিৎকার করে বললেন, “ইয়েস, আই অ্যাম হিয়ার। রায়চৌধুরী স্পিকিং—”
কিন্তু হেলিকপটারের ঘ্যাটঘ্যাট আওয়াজে তাঁর কথা বোধহয় ওপরে পৌঁছল না, কারণ, ওরা সেই কথাই বারবার বলে যেতে লাগল।
কাকাবাবু সাহেবদের দিকে মেশিনগান তুলে রেখে, চোখ না সরিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, “সন্তু, তোমার পকেটে রুমাল আছে?”
রিভলবার থেকে গুলি চালাবার পর সন্তু আচ্ছন্নের মতন হয়ে মাটিতেই বসে ছিল। এবার সে তাড়াতাড়ি উঠে বলল, “হ্যাঁ আছে।”
কাকাবাবু বললেন, “সেই রুমালটা বার করে মাথার ওপরে ওড়াতে থাকো।”
সন্তু তার সাদা রুমালটা বার করে ডান হাতে প্রাণপণে ঘোরাতে লাগল।
কাকাবাবু সাহেবদের হুকুম করলেন, “তোমরা সব মাটিতে বসে পড়ো। প্রত্যেকে হাত দুটো মাথার ওপরে তুলে রাখো।”
একজন সাহেব মাটিতে পড়ে থাকা একটা বন্দুকের দিকে হাত বাড়াচ্ছিল, কাকাবাবু বললেন, “সাবধান, একটু নড়লেই খুলি উড়িয়ে দেব!”
হেলিকপটারটা আস্তে-আস্তে ফাঁকা জায়গাটায় এসে নামল। প্রথমেই তার থেকে বেরিয়ে এল ধপধপে সাদা দাড়িওয়ালা একজন শিখ। সে হাত তুলে বলল, “টুংচা সংচু! টুংচা সংচু!”
বুড়ো রাজা বললেন, “টুংচা সংচু!”
সঙ্গে-সঙ্গে সব জারোয়া সেই কথা বলে চেঁচিয়ে উঠল।
বৃদ্ধ শিখটি তখন হেলিকপটারের দিকে হাত নাড়তেই তার থেকে বেরিয়ে এল আরও কয়েকজন।
প্রথমেই লম্বা চেহারা কৌশিক ভার্মা, তারপর বেঁটে গোলগাল পরেশ দাশগুপ্ত, তারপর বিশাল গোঁফওয়ালা পুলিশের এস পি মিঃ সিং আর চারজন সৈন্য, তাঁদের প্রত্যেকের হাতে মেশিনগান।
পরেশ দাশগুপ্ত ছুটে এসে কাকাবাবুকে জড়িয়ে ধরে খুশিতে লাফাতে লাফাতে বললেন, “মিঃ রায়চৌধুরী, আপনি বেঁচে আছেন! আঃ, কী যে আনন্দ হচ্ছে! এই দেখুন, হোম সেক্রেটারি কৌশিক ভার্মা নিজে এসেছেন আপনাকে উদ্ধার করতে।”
কাকাবাবুর আনন্দ হলেও মুখে তা প্রকাশ করেন না। কৌশিক ভার্মাকে দেখে তিনি বললেন, “আপনার সোলজারদের বলুন, এই সাহেবগুলোকে ঘিরে ফেলতে। আমি আর এই ভারি মেশিনগানটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না?”
কৌশিক ভার্মা বললেন, “এরা কারা?”
কাকাবাবু সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, “এরা ডাকাত!”
কৌশিক ভার্মা অবাক হয়ে বললেন, “জারোয়াদের মধ্যে ডাকাতি করতে এসেছে? কিসের লোভে? এদের কাছে কি সোনা আছে? হীরে আছে?”
কাকাবাবু বললেন, “না, সে সব কিছু নেই। কিন্তু এইটা আছে।”
কাকাবাবু সেই রঙিন আগুনটার দিকে হাত দেখালেন।
দিনের আলো ফুটে উঠেছে। এই সময় আগুনের রঙ বদলে যায়। এই আগুনটার রঙ কিন্তু একইরকম আছে।
কৌশিক ভার্মা সেদিকে তাকিয়ে বললেন, “আশ্চর্য! এরকম আগুন কখনো দেখিনি। সাহেবরা এটা চুরি করতে এসেছিল? এটা কী?”
কাকাবাবু বললেন, “সে সব পরে বলব। আপনি জারোয়াদের দ্বীপে এসেছেন, আগে এখানকার রাজাকে নমস্কার করুন! ইনিই জারোয়াদের রাজা!”
হাত থেকে মেশিনগানটা ফেলে দিয়ে কাকাবাবু বুড়ো রাজার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন।
কৌশিক ভার্মা আরও অবাক হয়ে বললেন, “ইনি রাজা? মাই গড! ইনি তো জারোয়া নন?”
কৌশিক ভার্মা হাত জোড় করে নমস্কার করলেন বুড়ো রাজাকে।
কাকাবাবু বললেন, “না, ইনি জারোয়া নন। এঁর নাম গুণদা তালুকদার।”
বুড়ো রাজা আস্তে আস্তে বললেন, “সাহেবগুলোকে ভালো করে বেঁধে ফেলতে বলুন! এরা সাঙ্ঘাতিক লোক। আপনারা চলুন, আমার ঘরে বসে কথা বলা যাক।”
কাকাবাবু পরেশ দাশগুপ্তর কাঁধে ভর দিয়ে বুড়ো রাজার কুঁড়েঘরের দিকে এগোলেন। বুড়ো রাজা যেতে যেতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। তারপর সন্তুকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকলেন।
সন্তু কাছে যেতেই বুড়ো রাজা তার মাথায় খুব স্নেহের সঙ্গে হাত বোলাতে লাগলেন, তারপর কৌশিক ভার্মাকে বললেন, “এই ছেলেটি না-থাকলে আজ আমরা কেউ বাঁচতুম না। আপনারাও বাঁচতেন না।”
কৌশিক ভার্মা বললেন, “তাই নাকি? কেন? এ কী করেছে?”
বুড়ো রাজা বললেন, “ঐ একজন সাহেবের হাতে মেশিনগান ছিল, সে গুলি চালিয়ে আপনাদের ঐ ফড়িঙের মতন যন্ত্রটায় আগুন ধরিয়ে দিতে পারত।”
বুড়ো রাজা আগে কখনো হেলিকপটার দেখেননি, তাই নাম জানেন না।
কৌশিক ভার্মা বললেন, “তা হয়তো পারত। সাহেবগুলো মেশিনগান নিয়ে ডাকাতি করতে এসেছে, এ ভারি আশ্চর্য ব্যাপার। এই জঙ্গলের মধ্যে ডাকাতি?”
বুড়ো রাজা বললেন, “সাহেবগুলো আমাকে আর ওর কাকাকে আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দিতে যাচ্ছিল। ঠিক সময় এই ছেলেটি রিভলবারের গুলি চালিয়ে সাহেবটির হাত থেকে মেশিনগানটা ফেলে দেয়। তাই তো আমরা সবাই বেঁচে গেলাম।”
কৌশিক ভার্মা প্রশংসার চোখে তাকালেন সস্তুর দিকে। তারপর তার কাঁধ চাপড়ে দিয়ে বললেন, “ব্রেভ বয়! এইটুকু ছেলে রিভলবার চালাতে জানে? টিপও নিশ্চয়ই খুব ভালো।”
সন্তু লজ্জা-লজ্জা মুখ করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। সে তো এমন কিছু করেনি। আনতাবড়ি একবার রিভলবার চালিয়ে দিয়েছে। সে যে এর আগে কখনো রিভলবার চালায়ইনি সে কথা আর বলল না।
কৌশিক ভার্মা বললেন, “হি মাস্ট গেট আ রিওয়ার্ড। আমরা শুধু জারোয়াদেরই ভয় পেয়েছিলাম, সাহেব ডাকাতদের কথা ভাবিইনি। সত্যিই সাঙ্ঘাতিক কিছু একটা হয়ে যেতে পারত। কিন্তু আপনি এখানে কী করে এলেন?”
কথা বলতে-বলতে ওঁরা ঢুকলেন কুঁড়েঘরের মধ্যে। সেখানে সেই গীতা বইটি আর বহুকালের পুরনো একজোড়া হাতকড়া দেখে কৌশিক ভার্মা আবার চমকে উঠলেন। তিনি বললেন, “আমরা জানতাম, সভ্য জগতের সঙ্গে জারোয়াদের কোনো সম্পর্কই নেই, অথচ দেখছি, তাদের রাজা একজন লেখাপড়া-জানা মানুষ!”
কাকাবাবু মাটির ওপরে বসে পড়েছেন। সেখান থেকে তিনি বললেন, “এই গুণদা তালুকদার এক সময় ছিলেন একজন নামকরা বিপ্লবী। আন্দামান জেল থেকে ইনি পালিয়ে যান। সে বহু-বহু বছর আগেকার কথা। সকলের ধারণা ইনি মারা গেছেন। স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রত্যেক বইতে এঁর নাম আছে, ছবি আছে। এঁর জন্মদিনে উৎসব হয়?”
কৌশিক ভার্মা বললেন, “হ্যাঁ, এখন আমারও মনে পড়েছে। এ যে দারুণ ব্যাপার। দিল্লিতে ফিরে গিয়ে এই খবর দিলে তো বিরাট হৈচৈ পড়ে যাবে! কিন্তু আপনি এখানে এলেন কী করে?”
বুড়ো রাজা বললেন, “এই হাতকড়ি বাঁধা অবস্থাতেই জেল থেকে পালিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। আমাকে হাঙরে কুমিরে খেয়ে ফেলতে পারত। কিন্তু খায়নি। ভাসতে-ভাসতে এসে ঠেকেছিলাম এই দ্বীপে।”
“জারোয়ারা আপনাকে মারেনি?”
“জারোয়ারা এমনি-এমনি কাউকে মারে না। এরা অত্যন্ত সভ্য। তোমরাই এদের হিংস্র বানিয়েছে।”
“তারপর থেকে আপনি এখানে থেকে গেলেন?”
“হ্যাঁ। আমি পরাধীন ভারতবর্ষে থাকব না ঠিক করেছিলাম, তাই এখানে এদের নিয়ে স্বাধীন হয়ে থেকেছি। আমি আর বাইরের কোনো খবর রাখিনি।”
“এই আন্দামানে তো নেতাজী এসেছিলেন, কিছুদিনের জন্য স্বাধীন রাজধানী স্থাপন করেছিলেন, তাও জানেন না!”
“এই দ্বীপের বাইরের কোনো খবরই আমি রাখি না। ইচ্ছে করেই রাখতে চাইনি। আমি যে এখানে আছি, তা জানতে পারলেই ইংরেজ সরকার আবার আমাকে বন্দী করত। সুভাষবাবু যে কবে নেতাজী হলেন, একটু আগে পর্যন্ত তাও জানতাম না!”
কৌশিক ভার্মা বললেন, “আশ্চর্য! সত্যি আশ্চর্য! কিন্তু গোটা ভারতবর্ষই তো অনেক দিন স্বাধীন হয়ে গেছে। আপনি সে খবরও পাননি?
কাকাবাবু বললেন, “উনি সে-কথাও বিশ্বাস করতে চাইছেন না। শুনুন, এই কৌশিক ভার্মা, ইনি গভর্নমেন্টের একজন বড় অফিসার। এঁকে জিজ্ঞেস করুন, আমাদের দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে সেই সাতচল্লিশ সালে। আপনি জাওহরলাল নেহরুর নাম শুনেছিলেন তো?”
বুড়ো রাজা বললেন, “হ্যাঁ। মতিলাল নেহরুর ছেলে ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেত গিয়েছিল।”
“সেই জওহরলাল হয়েছিলেন স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী। সে-ও তিরিশ বছর আগে।”
“গান্ধী কোথায়?”
“গান্ধীজী মারা গেছেন স্বাধীনতার এক বছর পরে। আপনাদের সময়কার প্রায় কেউ-ই বেঁচে নেই। চলুন, আপনি দিল্লি চলুন, সেখানে গিয়ে সব শুনবেন!”
বুড়ো রাজা ভুরু তুলে বললেন, “কোথায় যাব? দিল্লি? কেন? আমি কোথাও যাব না—”
“সে কী, আপনি এখনো এখানে থাকতে চান?”
“নিশ্চয়ই! আমি এখানে জারোয়াদের নিয়ে পরম শান্তিতে আছি।”
“আপনি স্বাধীন দেশে একবার ঘুরে আসতেও চান না? আপনার অনেক আত্মীয়-স্বজন হয়তো এখনো বেঁচে আছে, তাদেরও দেখতে চান না একবার?”
“না।”
বুড়ো রাজা কিছুতেই তাঁর জারোয়া-রাজ্য ছেড়ে আর যেতে চান না কোথাও। কাকাবাবু আর কৌশিক ভার্মা অনেক করে বোঝাতে লাগলেন, কিন্তু তিনি কিছুতেই শুনবেন না। শেষে একবার রেগে উঠে বললেন, “আপনারা যদি আমাকে জোর করে বন্দী করে নিয়ে যেতে চান, সেটা আলাদা কথা! তবুও সাবধান করে দিচ্ছি, আমাকে জোর করে নিতে গেলে সব জারোয়া একসঙ্গে মিলে বাধা দেবে। তারা প্রাণ দিয়েও আমাকে বাঁচাতে চাইবে।”
কৌশিক ভার্মা বললেন, “না, না, আপনাকে জোর করে ধরে নিয়ে যাব, কেন? আপনি আমাদের শ্রদ্ধেয়। আপনি দেশ স্বাধীন করার জন্য এত কষ্ট করেছেন। কিন্তু আমরা ফিরে গিয়ে যখন আপনার কথা বলব, কেউ বিশ্বাস করবে না?”
সন্তু হঠাৎ বলে উঠল, “ছবি তুলে নিয়ে গেলে সবাই বিশ্বাস করবে।”
কাকাবাবু রাগ করে সন্তুর দিকে তাকালেন, সন্তু থতমত খেয়ে গেল। সে বুঝতে পারেনি, সে ভুল কথা বলে ফেলেছে।
সাদা দাড়িওয়ালা প্রীতম সিং এক পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলেন। এবারে তিনি বললেন, “কেয়া তাজ্জব কি বাত্! আমি এতদিন জারোয়াদের সঙ্গে কথা বলেছি, কোনোদিন তারা জানতেও দেয়নি যে, তাদের একজন বাংগালী রাজা আছে। সেইজন্যই তারা বেশি ভেতরে ঢুকতে দিত না।”
বুড়ো রাজা বললেন, “সেটাই ছিল আমার হুকুম।”
কাকাবাবু হতাশ ভাবে বললেন, “তাহলে আপনি কিছুতেই যাবেন না?”
বুড়ো রাজা বললেন, “না।”
সন্তু কিছু না বুঝে এগিয়ে গিয়ে বুড়ো রাজার হাত ধরে বলল, “আপনি চলুন না আমাদের সঙ্গে! একবারটি গিয়ে সব দেখে শুনে আবার এখানে ফিরে আসবেন। জানেন, হাওড়া স্টেশনে মাটির তলা দিয়ে রাস্তা হয়েছে, আপনি তো সেসব দেখেননি!”
বুড়ো রাজা হঠাৎ কেঁদে ফেললেন! সন্তুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ওরে, তুই আমাকে একথা বললি কেন? তোর মতন আমার একটা ছোট ভাই ছিল, জেলে আসবার আগে তাকে ঠিক এই বয়েসী দেখে এসেছি। তোকে দেখেই তার কথা মনে পড়ছে!”
কাকাবাবু বললেন, “হয়তো আপনার সেই ভাই এখনো বেঁচে আছেন। আপনি গেলে তাকে দেখতে পাবেন!”
বুড়ো রাজা একটুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন, তার দু’ চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। তারপর চোখের জল মুছে বললেন, “ঠিক আছে, আমি যাব! কিন্তু তার আগে তোমাদের কয়েকটা প্রতিজ্ঞা করতে হবে।”
কাকাবাবু আগ্রহের সঙ্গে বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, কী প্রতিজ্ঞা করতে হবে বলুন!”
বুড়ো রাজা বললেন, “তোমাদের কথা দিতে হবে, আমার এই জারোয়াদের কেউ কোনো ক্ষতি করবে না। এই দ্বীপে অন্য কেউ আসতে পারবে না। জারোয়াদের ঐ পবিত্র আগুন তোমরা নিয়ে যাবার চেষ্টা করবে না। ওরা যে-রকম ভাবে বাঁচতে চায়, সেইরকম ভাবে থাকতে দেবে।”
কাকাবাবু তাকালেন কৌশিক ভার্মার দিকে।
কৌশিক ভার্মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “আমি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কথা দিচ্ছি, এগুলো সব মানা হবে। এগুলোই তো আমাদের নীতি।”
বুড়ো রাজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ঠিক আছে, তা হলে চলো, কিন্তু কয়েকদিন থেকেই আমি আবার ফিরে আসব কিন্তু!”
কাকাবাবু বললেন, “নিশ্চয়ই। আমি নিজে সব ব্যবস্থা করে দেব!”
বাইরে প্রত্যেকটি সাহেবের হাত পিঠের দিকে মুড়ে শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছে। সন্তু যে সাহেবটিকে গুলি করেছিল, সেও মরেনি, দুটো গুলিই লেগেছে তার কাঁধে। হেলিকপটারে কিছু ওষুধপত্র ছিল, তাই দিয়ে তাকে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সৈন্যদের পাহারায় সাহেবদের পাঠিয়ে দেওয়া হল সমুদ্রের দিকে। ওখান থেকে লঞ্চে করে নিয়ে যাওয়া হবে ওদের।
বাকিরা সবাই হেলিকপটারে যাবে।
কিন্তু বুড়ো রাজাকে হেলিকপ্টারে তোলার সময় সে একটা দৃশ্য হল বটে। বুড়ো রাজা জারোয়াদের ভাষায় বুঝিয়ে বললেন ওঁর চলে যাবার কথা। সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকটি জারোয়া মাটিতে মুখ গুঁজে একটা অদ্ভুত করুণ শব্দ করতে লাগল। এই ওদের কান্না কান্নার সময় ওরা কারুকে মুখ দেখায় না। কয়েকটি জারোয়া মেয়ে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল বুড়ো রাজাকে। তারা কিছুতেই ওঁকে যেতে দেবে না। তিনি হাত-পা নেড়ে অনেক কষ্টে ওদের বোঝাতে লাগলেন, তাঁর চোখ দিয়েও জল পড়ছে। তিনি মাটিতে মুখ-গোঁজা প্রত্যেকটি জারোয়ার গায়ে হাত দিয়ে বলতে লাগলেন, “আমি ফিরে আসব, ক’দিনের মধ্যেই ফিরে আসব!”
কৌশিক ভার্মা কাকাবাবুকে বললেন, “মানুষ মানুষকে যে এত ভালোবাসতে পারে, আগে কখনো দেখিনি। এদের ভালোবাসা কত আন্তরিক!”
কাকাবাবু বললেন, “হুঁ!”
তারপর এক সময় হেলিকপটার আকাশে উড়ল। সমস্ত জারোয়া একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে চিৎকার করতে লাগল, বুড়ো রাজাও হাত নাড়তে লাগলেন তাদের দিকে। একটু বাদেই হেলিকপটার চলে এল সমুদ্রের ওপর।
পোর্ট ব্লেয়ার পৌঁছতে বেশি লাগল না। দূর থেকেই দেখা যায় জেলখানাটা। ব্রিটিশ আমলের কুখ্যাত সেলুলার জেল! পোর্ট ব্লেয়ারে এখনো সেটাই সবচেয়ে উঁচু বাড়ি। আকাশ থেকে সেদিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন বুড়ো রাজা। একদিন তিনি এই জেল থেকে পালিয়েছিলেন। আজ সত্যিই সেখানে রাজার মতন ফিরে আসছেন।
পোর্ট ব্লেয়ারে থাকা হল মাত্র একদিন। এর মধ্যে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে দেওয়া হল কলকাতা আর দিল্লিতে। ঠিক হল, কলকাতায় প্রথমে তিনি তিনদিন থাকবেন। তারপর যাবেন দিল্লিতে। সেখানে যে ক’দিন তাঁর থাকতে ইচ্ছে হয় তিনি থাকবেন। তারপর যেদিন ফিরে আসতে চাইবেন, সেদিন আবার কলকাতা হয়ে ফিরবেন।
পরদিন বিশেষ বিমান ওঁদের নিয়ে এল কলকাতায়। দমদম এয়ারপোর্টে কী সাঙ্ঘাতিক ভিড়! হাজার হাজার মানুষ এসেছে জারোয়াদের রাজাকে দেখতে। আরও কত খবরের কাগজের লোক, ফটোগ্রাফার। আলোর ঝিলিক দিয়ে ফটো উঠছে ঘন ঘন। সন্তুরও ছবি উঠে যাচ্ছে খুব, কারণ বুড়ো রাজা তারই কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কিনা!
মাঝে মাঝেই ধ্বনি উঠছে, “গুণদা তালুকদার জিন্দাবাদ!”
এয়ারপোর্টে সন্তুর মা-বাবা, দুই দাদা, পাশের বাড়ির রিনি, বাবলু, পিংকুরাও এসেছে, কিন্তু সন্তু তো এক্ষুনি বাড়ি যাবে না। বুড়ো রাজার সঙ্গে এখন তাদেরও যেতে হবে রাজভবনে, সেখানে গভর্নর তাদের সম্বর্ধনা জানিয়ে মধ্যাহ্নভোজ খাওয়াবেন। লাটসাহেবের বাড়ি খাওয়া তো যে-সে কথা নয়।
লোকেরা এত ফুলের মালা দিচ্ছেন যে, তার ভারেই আরও ঝুঁকে পড়ছেন বুড়ো রাজা। এত ভিড়ের মধ্যে তাঁর কষ্ট হবে বলে কৌশিক ভার্মা তাড়াতাড়ি তাঁকে গাড়িতে তুললেন। কাকাবাবু আর সন্তুও সেই গাড়িতে।
গাড়ি এয়ারপোর্ট ছাড়িয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। আবার কলকাতায় ফিরে সন্তুর খুব আনন্দ হচ্ছে। এবার যে বেঁচে ফিরে আসতে পারবে তাতেই খুব সন্দেহ ছিল।
সন্তু বুড়ো রাজাকে বলল, “জানেন তো, এই রাস্তাটার নাম ভি আই পি রোড। আপনাদের সময় তো এটা ছিল না।”
বুড়ো রাজা কোনো উত্তর দিলেন না।
কাকাবাবু বললেন, “তখন এসব জায়গাতেও জঙ্গল ছিল।”
গাড়ি চলতে লাগল, আর সন্তু নানান রকম খবর দিতে লাগল বুড়ো রাজাকে। এটা বিধান রায়ের মূর্তি, ঐ যে ঐখানে শিশু উদ্যান, এই জায়গাটার নাম কাঁকুরগাছি...
বুড়ো রাজা একটাও কথা বলছেন না।
গাড়ি মানিকতলা পেরিয়ে যখন বিবেকানন্দ রোড দিয়ে ছুটছে সেই সময় বুড়ো রাজা হঠাৎ “উঃ” শব্দ করে দু’হাতে মুখ ঢাকলেন।
কৌশিক ভার্মা ও কাকাবাবু দু’জনেই ব্যস্ত হয়ে ঝুঁকে বললেন, “কী হল? কী হল?”
বুড়ো রাজা উত্তর না দিয়ে ‘আঃ আঃ’ শব্দ করে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লেন।
কৌশিক ভার্মা বললেন, “এ কী? উনি অজ্ঞান হয়ে গেছেন মনে হচ্ছে। এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”
কাকাবাবু বললেন, “সামনেই আমার এক বন্ধুর ডাক্তারখানা। ঐ যে ল্যাম্পপোস্টের পাশে—ওখানে গাড়ি থামান।”
কাকাবাবুর বন্ধু ডাক্তার, সামনেই তিনি বসে আছেন। সবাই মিলে ধরাধরি করে বুড়ো রাজাকে ভেতরের চেম্বারে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেওয়া হল।
ডাক্তারের ওষুধে একটু পরেই জ্ঞান ফিরল বুড়ো রাজার। ডাক্তারবাবু বললেন, “ওঁকে এক্ষুনি কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত। হার্টের অবস্থা ভালো নয়।”
বুড়ো রাজা বললেন, “না, না—”
কাকাবাবু ঝুঁকে পড়ে বললেন, “আপনার কষ্ট হচ্ছে? হাসপাতালে গেলেই ভালো হয়ে যাবেন। এখন কলকাতায় ভালো ভালো হাসপাতাল আছে।”
বুড়ো রাজা বললেন, “না, না, আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে চলো!”
“ফিরে যাবেন? হ্যাঁ, যাবেন, কয়েকদিন পরে—”
বুড়ো রাজা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “না, এক্ষুনি। তোমাদের এখানে আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না! এখানকার বাতাস এত খারাপ, এখানে এত শব্দ, এত মানুষ, এত বাড়ি...আমার সহ্য হচ্ছে না...রাস্তা দিয়ে আসতে আসতে দেখলাম মানুষ ভিক্ষে করছে, রোগা রোগা ছেলে, না না, আমায় ফিরিয়ে নিয়ে চলো...”
কাকাবাবু কিছু বলতে গেলেন, তার আগেই দুবার হেঁচকি তুললেন বুড়ো রাজা। অতি কষ্টে ফিসফিস করে বললেন, “আমি পারছি না। এখানে থাকতে পারছি না, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, এত ধুলো এখানকার বাতাসে, এত শব্দ...”
বুড়ো রাজা জোর করে উঠে দাঁড়াতে গিয়েই পড়ে গেলেন। সবাই ধরাধরি করে আবার শুইয়ে দিলেন তাঁকে। বুড়ো রাজার চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগল। খুব আস্তে আস্তে আপন মনে বলতে লাগলেন, “আমি কেন এলাম! কত ভালো জায়গায় ছিলাম আমি...সেখানে বাতাস কত টাটকা...পাখির ডাক, গাছের পাতার শব্দ, আর ঝর্নার জলের শব্দ ছাড়া কোনো শব্দ নেই, সেখানে কেউ ভিক্ষে করে না, সেখানে কত শান্তি, সেই তো আমার স্বর্গ! কেন এলাম, আমাকে নিয়ে চলো। ...এক্ষুনি এক্ষুনি...আমি যাব...আঃ!” হঠাৎ বুড়ো রাজার কথা থেমে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার সকলের মুখগুলোও কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল।
সন্তু জিজ্ঞেস করল, “কাকাবাবু, উনি কি...”
কাকাবাবু কিছু উত্তর দিলেন না। মুখটা ফিরিয়ে নিলেন। সন্তু জীবনে এই প্রথম দেখল, কাকাবাবুর চোখে জল।
সেও আর সামলাতে পারল না। শব্দ করে কেঁদে উঠল।
———
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন