অ্যাডগার অ্যালান পো
আপনারা, যারা পাঠক তাঁরা তো এখন দিব্যি জীবিত আছেন। কিন্তু আমি যে লেখক, বহু আগেই আমি ছায়ার দেশের বাসিন্দা হয়ে গেছি। আমি এখন অন্য লোকে দিন গুজরান করছি।
আমার এ স্মৃতিকথা মানুষের নজরে পড়ার আগে বহু অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটবে, বহু গোপন ব্যাপার স্যাপার প্রকাশ পেয়ে যাবে, পার হয়ে যাবে বহু শতক। আরও, আরও অনেক কিছুই ঘটবে।
আর আমার এ স্মৃতিকথা যখন মানুষের নজরে পড়বে তখনও কেউ করবে, কেউ বা সন্দেহের চোখে দেখবে, আর লোহার স্কাইলাস দিয়ে খোদাই করে করে যে বর্ণগুলো ফুটিয়ে তুলছি, তাতে কেউ কেউ বহু চিন্তার সুযোগ পাবে, হাজারো চিন্তার তথ্য।
সেটা এক আতঙ্কের বছর ছিল, আর আতঙ্কের চেয়েও তীব্রতর এক অনুভূতির, যার নামকরণ পৃথিবীতে আজ অবধি সম্ভব হয়নি।
বহু অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটে গিয়েছে, দেখা দিয়েছে বহু লক্ষণ, আর জলে-স্থলে ও দূরবর্তী নিকটবর্তী অঞ্চলে সর্বত্র মহামারীর কালো ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে। যাদেও ভগ্য ভালো তারা আঅবধি জানে না যে, স্বর্গেও এ ব্যাধির বীজ ছড়িয়ে পড়েছে।
আমি, আর আমি গ্রীক ওইলও পরিষ্কার অনুধাবন করতে পেরেছি, সাতশো চুরানব্বইতম বছরের সে কল্পকালের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, যখন মেষরাশির সঞ্চারের মাধ্যমে শনিগ্রহের ভয়ঙ্কর রক্তিম বলয়ের সঙ্গে বৃহস্পতির মিলন ঘটেছে।
আমার যদি অস্বাভাবিক ভুল না হয়ে থাকে, দূরবর্তী আকাশের ওই শক্তিগুলোর প্রভাব যে কেবলমাত্র পৃথিবীর বলয়ের ওপর পড়ে প্রভাবান্বিত করেছে এমন কথা মনে করা ঠিক হবে না, মানুষের কল্পনার ওপরও অবশ্যই প্রভাব পড়েছে। আর এটা যে হতেই হবে।
রক্তাভ চীনা মদের বোতলের ছিপি খুলে এক রাতে একটা বড়সড় হলঘরের মধ্যে আমরা সাতজন মুখোমুখি বসেছিলাম। সেটা ছিল টোলেমাইস নগরের একটা হলঘর। সেটাতে ঢোকার পথ একটাই। পিতলের উঁচু আর চওড়া একমাত্র দরজার কথা বলছি। এটা ছাড়া হলঘরটায় ঢোকার আর দ্বিতীয় কোনো উপায় ছিল না।
কারিনোস নামক এক মিস্ত্রি দরজাটার নির্মাতা। এমন অত্যাশ্চর্য কৌশলে দরজাটা নির্মাণ করা হয়েছিল যে, সেটাকে কেবলমাত্র বন্ধ করা সম্ভব।
হলঘরটায় আলো-আঁধারী বিরাজ করত। তার দরজায় ঝোলানো একটা কালো পর্দা আকাশ, তারা, চাঁদ আর জনমানবশূন্য রাস্তাঘাটকে সর্বদা আড়ালে রাখত। সবকিছুকে আড়ালে আবডালে রাখলেও অশুভের পূর্বাভাষ আর অতীত স্মৃতিকে আড়াল করে রাখা সম্ভব হয়নি।
এমনকিছু বাস্তব আর অবাস্তব আমাদের চারদিকে বিরাজ করছিল যার কোনো স্পষ্ট বিবরণ আমার দেওয়া সম্ভব নয়। জগদ্দল পাথরের মতো ভারী একটা ভার যেন আমাদের মাথার ওপর ঝুলন্ত অবস্থায় বিরাজ করছিল। বিরাজ করছিল আমাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ওপর। বিরাজ করছিল আমাদের আসবাবপত্র আর পানপাত্রগুলোর ওপর।
আর সে ভারের চাপ সহ্য করতে না পেরে, ভারের চাপে সবকিছু যেন নিচে নেমে আসছিল। সবকিছুর কথা বললাম বটে, কিন্তু কেবলমাত্র মাথার ওপরের ঝুলন্ত সাতটা লোহার বাতিদান যেখানে অবস্থান করছিল, সেখান থেকেই দীর্ঘ ও সরু আলোর রেখা ছড়িয়ে পড়েনিস্তর-নিথরভাবে অনবরত জ্বলতে লাগল।
আমরা যে আবলুশ কাঠের টেবিলটায় বসেছিলাম, আলোর রেখাগুলো তার ওপর পতিত হয়ে যেন রীতিমত একটা আয়নায় রূপান্তরিত হল। তার সে আয়নাটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আমরা সবাই নিজের নিজের মুখচ্ছবি আর সঙ্গিদের চঞ্চল চোখের মণি দেখতে পেলাম।
তবু আমরা গলা ছেড়ে হাসতে আরম্ভ করলাম আর উদ্ভট আনন্দের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিলাম। আর গলা ছেড়ে অ্যানাক্ৰিয়নের যেসব গান ধরলাম, তাকে পাগলামি ছাড়া আর কী ই বা অ্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে? আর টকটকে লাল মদ রক্তের কথা মনে করিয়ে দিলেও আমরা সে মদ গিলে গিলে বুঁদ হয়ে গেলাম।
আমরা ছাড়া আরও একজন বাসিন্দা আমাদের ঘরে উপস্থিত ছিল। সে এক যুবক। তার নাম সৈলাস। সে টানটান হয়ে শুয়েছিল। আর তার মৃতদেহটা কফিনে মোড়া ছিল। তাকে বিশেষ দৃশ্যটার খলনায়ক ভাবা যেতে পারে।
উফ! কী অভাবনীয় কাণ্ড! আমাদের হৈ হট্টগোল, আনন্দ ফুর্তির মধ্যে নিজেকে কিছুতেই জড়ায়নি। কেবলমাত্র তার প্লেগরোগে বিকৃত মুখাবয়ব আর মৃত্যুর জন্য আধা-বিকৃত চোখ দুটোর দিকে নজর পড়ায় মনে হল, আমাদের আমোদ-উল্লাসে সে ঠিক ততটাই অংশগ্রহণ করেছে যতটা আগ্রহ একটা একজন মৃত ব্যক্তির পক্ষে দেখানো সম্ভব। আসন্ন মৃত্যু জনা কয়েকের আমোদ-আহ্লাদে।
আমি ওইনস বুঝতে পেরেছিলাম, খুবই সত্য বটে, মৃতের চোখ দুটো আমার দিকে স্থির নিবদ্ধ, তা সত্ত্বেও আমি না বোঝার ভান করলাম, অর্থাৎ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে বুঝেও কিছুই বুঝিনি এমন ভাব দেখাতে লাগলাম। আসলে আমি বুঝতেই চাইলাম না, বরং সামনের আবলুস কাঠের আয়নার গভীরে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলাম। পর মুহূর্তেই গম্ভীর গলায় তার স্বরে গাইতে আরম্ভ করলাম। কোন গান–কোন গানের সুর? টিয়স-পুত্রের গানগুলো।
না, বেশিক্ষণ গান গাওয়া সম্ভব হলো না। কয়েকটা পংক্তি গাইতে না গাইতেই আমার গলা ক্রমে নেমে যেতে আরম্ভ করল। তারপর এক সময় গান না থামিয়ে পারলাম না।
গান থামিয়ে দিলেই কি গানের রেশটুকু পুরোপুরি মিলিয়ে গেল? না, অবশ্যই তা নয়। আমার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি ঘরের লোমশ পর্দার গায়ে বাধা পেয়ে, পর্দার ওপর চক্কর খেতে খেতে ক্রমে ক্ষীণ ও অস্পষ্ট হতে হতে দূরে, বহু দূরবর্তী অঞ্চলে গিয়ে সম্পূর্ণরূপে মিলিয়ে গেল।
ব্যস। আবার একেবারে শুনশান, ঘরে যেন কবরখানার নীরবতা নেমে এলো।
আরে ব্যস! এ কী! এ কী অবিশ্বাস্য কাণ্ডরে বাবা! যে লোমশ পর্দাটার গায়ে বাধা পেয়ে আমার কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণরূপে মিলিয়ে গেল, সেখান থেকে একেবারে অবিশ্বাস্য উপায়ে একটা ছায়ামূর্তির আর্বিভাব ঘটল। তবে ছায়ামূর্তি স্পষ্ট তো নয়ই বরং খুবই অস্পষ্ট। আকাশের গায়ের ঝুলন্ত ধবধবে রূপালি চাঁদটা যখন পৃথিবীর মাটিতে নেমে আসে তখন একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব মানুষের অবয়ব থেকে এমন একটা ছায়ামূৰ্ত্তি গড়ে তুলতে। সত্যি, একমাত্র চাঁদ ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই সম্ভব এমন একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটাতে। কিন্তু সে ছায়ামূর্তিটা কীসের? কোনো মানুষের কি? না, অবশ্যই নয়। তবে? তবে কি কোনো দেবতার ছায়ামূর্তি?
মানুষের নয়, দেবতার ছায়ামূর্তিও নয়, এমনকি কোনো পরিচিত কারোই নয়, আজব ব্যাপার তো!
যাক গে, সদ্য আবির্ভূত ছায়ামূর্তিটা কি করল? নিশ্চল-নিথর পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়েই রইল কি? না, নিশ্চয়ই যদি থাকবে তবে আর মিছেমিছি আর্বিভূত হতেই বা যাবে কেন?
ছায়ামূর্তিটা কয়েকমুহূর্ত পর্দার আড়ালে থেকে নড়াচড়া করল। তারপর আচমকা পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে পিতলের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সেটা যেন থেকে থেকে এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরাতে লাগল।
কিন্তু অনুসন্ধিৎসু নজরে ছায়ামূর্তিটার দিকে তাকিয়ে থেকেও কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হলো না, ছায়ামূর্তিটা কীসের? না, মানুষের তো অবশ্যই নয়, গ্রীসের দেবতারও নয়। ফ্যালাডিয়ার দেবতার তো নয়। এমনকি মিশরের দেবতার ছায়মূর্তি নয়। তবে? না, কোনো সিদ্ধান্তই নেওয়া সম্ভব হলো না যে, ছায়ামূর্তিটা কীসের!
তবে? এ আশ্চর্য ব্যাপারই বটে। আর্বিভুত ছায়ামূর্তিটা কীসের? আবার চোখ দুটোকেও তো অবিশ্বাস করা যায় না। অস্পষ্ট, খুবই অস্পষ্ট হলেও সেটা সে একটা ছায়ামূর্তি এতে তিলমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই, থাকার কথাও নয়।
হ্যাঁ, ওই, ওই তো সে ছায়ামূর্তিটা দরজায় খিলানের তলায় দাঁড়িয়ে।
এবার সে দরজার পাল্লায় হেলান দিয়ে অদ্ভুত কায়দায় দাঁড়িয়ে একচুলও নড়াচড়া করছে না। ঠিক যেন একটা পাথরের মূর্তি নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এতটুকুও নড়ল তো না-ই, এমনকি কথা বলা তো দূরের ব্যাপার টু-শব্দটিও করল না।
এখন আমার যেটুকু মনে আছে, অর্থাৎ ঝাপসা স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে বলতে পারি, দরজাটা ছিল তরুণ সৈলাসের শবদেহের, আচ্ছাদিত শবদেহের পায়ের কাছে।
আমরা যে সাতজন সেখানে উপস্থিত ছিলাম সবাই এমন একটা অভাবনীয়, রীতিমত অবিশ্বাস্য একটা ভয়ঙ্কর দৃশ্যের মুখোমুখি হয়ে ধরতে গেলে পৌনে মরা হয়ে গিয়েছিলাম। কোনো কথা বলার তো প্রশ্নই ওঠে না, এমনকি কারোই চোখ মেলে বুক কাঁপানো ছায়ামুর্তিটার দিকে তাকানোর সাহসও হলো না।
ছায়ামূর্তিটার দিকে কিছুতেই তাকাতে না পেরে শেষপর্যন্ত আমরা সবাই ভীত সন্ত্রস্ত চোখে আবলুস কাঠের আয়নাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তারপর একসময় ওইনসই, আমি গলা নামিয়ে, প্রায় ফিসফিসিয়ে দুএকটা কথা বললাম।
আমি কাঁপা কাঁপা গলায় কোনো রকমে ছায়ামূর্তিটার নাম-ধাম জানতে চাইলাম।
আমাদের কথার জবাব না দিয়ে ছায়ামূর্তিটা আগের মতোই দরজায় হেলান দিয়ে নীরবে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়েই রইল।
আমি সাহসে ভর করে অপেক্ষাকৃত গলা চড়িয়ে এবার ছায়ামূর্তিটাকে বললাম– ‘তোমার নাম কী হে? কোথায় থাক, মানে তোমার ঠিকানা কী?
ছায়ামূর্তিটা ক্ষীণকণ্ঠে জবাব দিল–‘আমার নাম-টাম নেই, একটা ছায়ামূর্তি। ব্যস, এটুকু জেনেই সন্তুষ্ট থাক।
‘সে না হয় হল। কিন্তু তোমার ঠিকানা তো একটা না একটা আছেই। তোমার ঠিকানাটা?’
‘ময়লা পানির খাল–ফেরোলিয়াম খালের নাম শুনেছ কী?
‘হ্যাঁ, তা শুনেছি বটে।
‘সে খালের তীরবর্তী হেলুসিয়ন প্রান্তরের কাছাকাছি টোলেমাইস নামক সমাধিক্ষেত্র আছে, জান নিশ্চয়?
‘তা-ও জানি বটে।
‘সে সমাধিক্ষেত্রটাই আমার ঠিকানা, মানে সেখানেই আমি থাকি।’
ছায়ামূর্তিটার কথা কানে যেতেই আমরা সবাই এক সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে তড়াক্ করে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমাকে সর্বাঙ্গ বলি প্রদত্ত পশুর মতো থরথর করে কাঁপতে লাগল।
আমি এও স্পষ্ট লক্ষ্য করলাম, ছায়ামূর্তিটার কণ্ঠস্বর কোনো একজন মানুষ বা অন্য কোনো জীবের কণ্ঠস্বর অবশ্যই নয়। অসংখ্য মানুষ যেন সমস্বরে, বিচিত্র সুরে কথাগুলো বলল। হাজার হাজার পরলোকগত বন্ধু যেন তাদের বিস্মৃত কণ্ঠস্বরে কথাগুলো আওড়ে গেল।
আপনি তো আজও বেঁচে রয়েছেন।
আপনার দেহে এখনও প্রাণের অস্তিত্ব আছে বলেই তো এ কাহিনী পড়তে পারছেন। আর আমি? আমি কিন্তু অনেক আগেই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে ছায়ালোকের বাসিন্দা হয়ে গেছি। এখন সে লোকেরই স্থায়ী বাসিন্দা আমি।
আমার স্মৃতিকথা সম্বলিত নোট বইটার পাতায় যখন মানুষ চোখ বুলাবে, তার আগেই বহু অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটে যাবে। বহু সংখ্যক গোপন রহস্যের কথা জানা যাবে। আর বহু শতাব্দীও পেরিয়ে যাবে।
আমার এ নোট বইটার পাতায় চোখ বুলাতে বুলাতে কিছু মানুষ বিশ্বাস করতে এতটুকুও উৎসাহি হবে না, এমনকি অনেকে অন্তরে সন্দেহ পোষণ করবে, প্রকাশও করবে কেউ কেউ। তবুও আমার এটুকু বিশ্বাস অন্তত আছে যে, আমার এ কলমের ডগা দিয়ে যে সব চরিত্রকে তুলে ধরেছি, তাদের নিয়ে বেশ কিছু লোক অবশ্য চিন্তা ভাবনা করবেই করবে।
যে বছরটার কথা আমি নোট বইটার পাতায় তুলে ধরেছি, সে বছরটা ছিল যথার্থই এক আতঙ্কের বছর। তবে আতঙ্কের চেয়ে ছিল উপলব্ধির ব্যাপার।
কীসের উপলব্ধি? কেমনতর উপলব্ধি? আজও পৃথিবীতে যে উপলব্ধির নামকরণ করা সম্ভব হয়নি। বহু অদ্ভুত ব্যাপার আর কুলক্ষণের পরে জল আর স্থল উভয় পরিবেশের ওপর দিয়ে মহামারীর ভয়ঙ্করতা ছড়িয়ে পড়েছিল। সমুদ্র-উপকূলবর্তী দেশগুলোতেও দ্রুত মহামারীর কালো ছায়া ছড়িয়ে পড়েছিল।
জ্যোর্তিবিজ্ঞান সম্বন্ধে যারা ঝানু তারা নিশ্চয়ই জানতেন, অশুভ ইঙ্গিতে মহাকাশ পরিপূর্ণ। কেবলমাত্র আকাশ-মহাকাশের চেহারাই সে অদ্ভুত হয়ে উঠেছিল তা কিন্তু নয়, মানুষ জাতটার জ্ঞান-বুদ্ধি, বিজার-বিবেচনাবোধই অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল।
আমরা সাতজন তখন টলোমেস নামক ছোট্ট ও নিষ্প্রাণ শহরে ঢুকে একটা সুসজ্জিত হলো ঘরে বসেছিলাম।
রাত বাড়তে বাড়তে ক্রমে গম্ভীর হয়ে এলো।
ইতিমধ্যেই কয়েক বোতল গাঢ় ঘন চীনা মদ পেটে চালান হয়ে গেছে।
এ ঘরে ঢোকার একটা পথ। একটা মাত্র দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকা ও বেরনো যায়। তবে দরজাটা একটু বিশালই বটে। আর পাল্লা দুটো তামা দিয়ে তৈরি। তার গায়ে চমৎকার নকসা করা। একবার তাকালেই সেটা থেকে চোখ ফেরানো দায়।
দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া। গাঢ় কালো রঙের পর্দা ঝুলছে। তবে অন্ধকার ঘরের সঙ্গে সেটা খুবই মানানসই হয়েছে।
আকাশে গাছে ছোট-বড় হরেক আকৃতির নক্ষত্র ঝুলছে। তবে সেগুলো খুবই ফ্যাকাশে, মড়ার মতো। চাঁদের হালও একই রকম। আর জনহীন পথ নজরে পড়ছে না। তবে এও সত্য যে, কালো পর্দার জন্য এরা নজরে না পড়লেও ঘরের সর্বত্র যে অশুভ আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না–পরিষ্কার বুতে পাচ্ছি।
আমার চারদিকে এমনকিছু অবস্থান করছে যাদের সম্বন্ধে সম্যক ধারণা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর সে সব জিনিস যে বস্তুময় এতে কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। আবার এও খুবই সত্য সে সব প্রেতময়ও বটে।
বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। আর তা এতই ভারী যে, যেন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসার যোগার হয়েছে, অবর্ণনীয় উদ্বেগ বুকে যেন জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। ভয়ঙ্কর সে সত্ত্বার কয়াল অস্তিত্ব সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে।
তার উপস্থিতি, তার অস্তিত্ব বুঝতে পারা যায় ঠিকই। কিন্তু কখন আর কিভাবে? অনুভূতি যদি তীব্র আর জাগ্রত থাকে। তখন চিন্তাশক্তি লোপ পেয়ে যায় প্রাণের অস্তিত্বহীন গুরুভার যেন ঠিক শিয়রে অবস্থান করছে। আর প্রতিটা মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গও সে শূন্যে অবস্থানরত গুরুভারের উপস্থিতিতে ক্রমেই অবশ হয়ে পড়তে যাচ্ছে।
আমরা সাতজনই থমকে গেছি। ঘরের প্রতিটা আসবাব্যন্ত্রের ওপরেও অসহনীয় গুরুভার চেপে বসতে চাইছে। এমনকি মদের বোতলগুলোও সে গুরুভারের কবল থেকে বোধহয় অব্যাহতি পাবে না। শূন্যস্থিত গুরুভাব তাদের ওপরেও অসহনীয় গুরুভাবে চেপে বসতে চাইছে। আমরা সাতজন হ্যাঁ, সাতজনই অস্বাভাবিক মিইয়ে পড়েছি। কেবলমাত্র আমাদের কথাই বা বলি কেন? ঘরের ভেতরে যা কিছু রয়েছে। সবই যেন অস্বাভাবিক কমে গেছে। সাতটা লোহার তৈরি প্রদীপ ছাড়া, তারা সাত সাতটা আগুনের শিখা জ্বালিয়ে রেখে আমাদের একেবারে নিভে যেতে দিচ্ছে না।
লোহার তৈরি সাতটা প্রদীপের শিখানিষ্কম্পভাবে জ্বলে ফ্যাকাশে বর্ণের আলোক বিতরণ করেই চলেছে। ঘরের সবকিছুর এমন গুমোট পরিস্থিতিকে তিলমাত্র পারোয়াও করে না।
আবলুস কাঠের মসৃণ গোল টেবিলকে ঘিরে আমরা সাতজন কাছাকাছি, একেবারেই পাশাপাশি বসে রয়েছি।
টেবিলগুলো এতই মসৃণ এবং চকচকে যে, সাত-সাতটা আলোক শিখা তার গায়ে আছড়ে পড়েই প্রতিফলিত হচ্ছে, ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছে অত্যুজ্জ্বল আলোকের রশ্মি।
আমরা সাতজনই মসৃণ আবলুস কাঠের গোল টেবিলে মাথানিচু করে বসে রয়েছি বলে প্রত্যেকেই একে অন্যের নিজের এবং একে অন্যের ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখ দেখতে পাচ্ছি। এমনকি সঙ্গী সাথিদের অস্থির চোখের মণি দুটোও নজরে পড়ছিল।
তবুও আমাদের মুখের হাসি তো মিলায়ইনি, উপরন্ত আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে হেসেই চললাম। আমরা হাসছি তো হাসছিই। একে স্বাভাবিক হাসি বলা যাবে না। প্রলাপের ঘোরে বিকারের হাসি বলাই ভালো। আমাদের বাঁধনহারা হাসির মধ্যে খুশি পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
আর আমরা তখন বিকট হাসির সঙ্গে খুশির ঝিলিক মিলিয়ে মিশিয়ে গলা ছেড়ে গানও গেয়ে চলেছি। আমাদের এ গানকে বদ্ধ পাগলের গান ছাড়া আর কোনো আখ্যাই দেওয়া যাবে না।
আমরা একের পর এক বোতলের মুখ খুলে রক্তের মতো লাল মদ গলায় ঢালছি। টকটকে লাল এ-মদ আমাদের প্রতি মুহূর্তে রক্তের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তবুও
আমরা মদ খাওয়া বন্ধ করছি না।
কেন? কেন আমরা অনবরত মদ গিলে চলেছি, কেন মুহূর্তের জন্যও মদ খাওয়া বন্ধ করছি না? কারণ, আমরা সাতজন জীবিত মানুষ ছাড়া এ ঘরে আরও একজন উপস্থিত রয়েছে। সে হচ্ছে যুবক জয়লাস।
জয়লাস অনেক আগেই মারা গেছে। তার লাশটা মেঝের ওপর টানটান হয়ে চাদর চাপা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। একটু আগেও সে আমাদের মতো জীবিত ছিল। তার মধ্যে প্রাণ ও চাঞ্চল্য ছিল।
এ ঘরের পৈশাচিক কাণ্ডকারখানার হোতা জয়লাস নিজে। তাকে পিশাচ ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় না। আর অভাবনীয় প্রতিভাবধরও ছিল বটে।
প্লেগ রোগাক্রান্ত হয়ে নিদারুণ রোগভোগের পর সে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। তার চোখ দুটো আধ-খোলা তাতে এবং মুখাবয়বেনিদারুণ প্লেগ রোগের আক্রমণ ও মৃত্যু যন্ত্রণার ছাপ সুস্পষ্ট। আর সেটা ভয়ানক বিকৃত হয়ে গেছে, যার ফলে সে দিকে চোখ পড়ামাত্র যে কোনো সাহসি পুরুষের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতে বাধ্য। তার মুখমণ্ডলে মৃত্যুর ভয়ঙ্করতার ছাপ না থাকলেও যেন আমাদের আনন্দ-কূর্তিতে বিরামহীনভাবে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছিল–যারা মৃত্যু পথযাত্রী–যারা মরতে চলেছে তাদের চোখের তারার দিকে তাকালে মৃত ব্যক্তিদের চোখে যেরকম কৌতূকের ছাপ লক্ষিত হয়, ঠিক সে রকমই কৌতূকের ছাপ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম।
আমি, বিশেষ করে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, আমার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু জয়লাস যেন অপলক চোখ আমারই দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আর সে যেন যমপুরী থেকেই আমার দিকে এমন করে তাকাচ্ছে।
তার সে বিশেষ চাহনি আমার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে। অস্বীকার করার উপায় নেই। আমার সে অভাবনীয় মানসিক পরিস্থিতিকে চাপ দিয়ে স্বাভাবিকতা ফিরে পাবার জন্য আমি সাধ্যাতীত প্রয়াস চালাতে লাগলাম। আর তা করতে গিয়ে গলা ছেড়ে চিৎকার চাচামেচি করে আর গান গেয়ে মনটাকে অন্য পথে চালিত করতে চেষ্টা করলাম। আর এসবই আমি আবলুস কাঠের সুমসৃণ টেবিলটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেই করতে লাগলাম।
বন্ধুবর জয়লাসের মরা মুখের দিকে আমি কেন তাকাতে পারছিলাম না, কারণ এর মরা চোখ দুটোর কৌতূকের আড়ালে চাপা পড়া তিক্ততা আমার প্রতিটা লোমকূপে শিহরণ জাগাচ্ছিল বলেই না তার মুখের দিকে কিছুতেই আমার পক্ষে তাকানো সম্ভব হচ্ছিল না।
বেশিক্ষণ গলা ছেড়ে গান গাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হলো না। ষাঁড়ের মতো চিল্লিয়ে কিছুক্ষণ গান গাওয়ার পর এক সময় ধীরে ধীরে থেমে গেল। পর্দা ঝোলানো বন্ধ ঘরে আমার কণ্ঠস্বর বার বার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তারপর তা-ও এক সময় মাথা কুটে মরে গেল।
শেষ প্রতিধ্বনিটা কালো পর্দার ঠিক যেখানে থেমে গেল, ঠিক সে জায়গা থেকেই হঠাৎ একটা ঘন কালো ছায়া বেরিয়ে এলো।
যে ছায়াটা ধীরমন্থর গতিতে এগোতে লাগল। তার কোনো আকৃতি নেই।
চাঁদ যখন দিগন্তে অবস্থান করে তখন মরা–চাঁদের আলো মানুষের গায়ে পড়লে ছায়া যেভাবে পড়ে, ঠিক সে রকমই যেন এ-কালের ছায়াটা এগিয়ে আসতে লাগল।
অথচ সে কালো ছায়াটাকে কোনো মানুষের ছায়া মনে করা সম্ভব নয়। আবার ঈশ্বরের ছায়া তো অবশ্যই নয়। তবে সে ছায়াটা কীসের?
সামান্য এগিয়ে সে ছায়াটা নিরবচ্ছিন্নভাবে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে শেষপর্যন্ত আমার পাশ দিয়ে সোজা আবলুস কাঠের কালো দরজার কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু কীসের সে ছায়া? ব্যাপারটা আমাকে যারপরনাই ধন্ধে ফেলে দিল। এটা যদি কোনো দেবতার ছায়া হতো তবে আমি অবশ্যই সনাক্ত করে ফেলতে পারতাম। কিন্তু তা তো নয়।
ছায়াটা অবশ্যই মিশরীয় দেবতার ছায়া নয়। তবে কি গ্রীসের কোনো দেবতার ছায়া? না, গ্রীসের কোনো দেবতা বা চালাডি-র দেবতাদের মধ্যে কারো ছায়াই এটা নয়, অবশ্য আকৃতিহীন অস্পষ্ট সে ছায়াটা আবলুস কাঠের তামার পাতের ওপর স্থির হয়ে সেঁটে রইল। সে কোনো কথা তো বললই না, এমনকি সামান্যতম নড়াচড়াও করল না।
আমরা সাতজনই আবলুস কাঠের কাঁচের মতো ঝকঝকে চকচকে টেবিলের ওপর মাথানিচু করে নীরব চাহনি মেলে অচঞ্চল দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলাম।
কেবলমাত্র আমাদের সাতজনের কথাই বা বলি কেন? সে ছায়াটাও যে কাঁচের মতো ঝকঝকে আবলুস কাঠের টেবিলটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেই ছায়ায় ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে রইল।
বেশ কিছুক্ষণ আমরা আর ছায়া মূর্তিটা কাঁচের মতো মসৃণ টেবিলটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে প্রায় শ্বাসরুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকার পর, এক সময় আমার পক্ষে আর মুখ বুজে থাকা সম্ভব হলো না।
আমি প্রায় রুদ্ধ নিশ্বাসে কাঁপা কাঁপা আর নিচু গলায় বলে উঠলাম–কে? কে তুমি ছায়ামূর্তি, কোথায় থাকো তুমি?
ছায়া মূর্তিটা আগের মতোই নিরুত্তাপভাবে ফ্যালফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়েই রইল। টু-শব্দটিও করল না।
আমি আগের মতোই গম্ভীর স্বরে বললাম–তোমাকে দেখামাত্র আমার মধ্যে এমন বিশেষ প্রভাব জাগল কেন? আর এমন নিরবচ্ছিন্ন আতঙ্কের সঞ্চার ঘটছে কেন, কিছুই বুঝতে পারছি না। তাই ছায়াটা ক্ষীণকণ্ঠে উচ্চারণ করল–আমি ছায়া।
সে তো বুঝতেই পারছি, তুমি ছায়া ছাড়া কিছুই নও।
তবে আর কি জানতে চাইছ?
আমার দ্বিতীয় প্রশ্নটার জবাব–কোথায় থাকো তুমি?
খালের নিকটবর্তী প্রান্তরে–পাতাল-সমাধির নিকটে।
অস্বীকার করব না, তার কণ্ঠস্বর কানে যেতেই আমরা সাতজনই আতঙ্কে রীতিমত শিউরে উঠলাম। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কারণ, সে কণ্ঠস্বর অবশ্যই একজনের নয়, বহুকণ্ঠের মিলিত স্বর। ওই একটামাত্র স্বরের মধ্যে বহু সত্না যেন মিলেমিশে একাকার। তারা একই সঙ্গে কথা বলল।
আর ওই একটামাত্র স্বরের মধ্যেই আমাদের হাজার হাজার মৃত বন্ধুর পরিচিত কণ্ঠস্বর ছায়ামূর্তিটির কণ্ঠ দিয়ে উচ্চারিত হলো। সবাই সমস্বরেই কথা বলে উঠল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন