ওপরে

ঋজু গাঙ্গুলী

Opore

লোকটা ওপরদিকে তাকিয়ে কী দেখে?

ব্রায়োনি-তে আসার ক’দিনের মধ্যেই এই প্রশ্নটা প্যাকার্ডের মাথায় একেবারে জাঁকিয়ে বসল। ‘লোকটা’ মানে এক বেঁটেখাটো প্রৌঢ়। রাতে খাওয়ার জন্য ডাইনিং রুমে আসেন ভদ্রলোক। সে-সময়টা উনি একা থাকেন না। দেহরক্ষী গোছের এক মুশকো তাঁর পাশেই বসে থাকে নির্বাক হয়ে। কথা না বললেও তার হাত আর মুখ চলতে থাকে। কিন্তু লোকটা নয়, ওই প্রৌঢ়ই প্যাকার্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তার একটাই কারণ— ভদ্রলোক ওপরদিকে তাকিয়ে থাকেন!

প্রথমবার ওঁকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজের অজান্তেই ওপরদিকে তাকিয়েছিলেন প্যাকার্ড। তাঁর মনে হয়েছিল, ভদ্রলোকের অবস্থান থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি কোণে ছাদের কাছে নিশ্চয় কিছু একটা আছে। কিন্তু সেখানে কিছুই ছিল না— নিরাবরণ, নিরাভরণ দেওয়াল ছাড়া। আরও বারকয়েক এ-জিনিস হওয়ার পর প্যাকার্ডের মনে হল, ভদ্রলোকের মাথাতেই গোলমাল আছে। সেটাও সাম্প্রতিক কিছু নয়, কারণ দীর্ঘদিনের অভ্যাস না থাকলে কেউ ঘাড় আর মাথা ও-ভাবে তুলে রেখেও পরিপাটি করে খেতে পারে না।

কিছুদিনের মধ্যেই প্যাকার্ড দেখলেন, এ-ভাবে চললে ব্রায়োনির মোলায়েম আবহাওয়া আর শান্ত পরিবেশেও তাঁর শরীর বা মন সারবে না। ভদ্রলোকের ওই অদ্ভুত ঊর্ধ্বমুখী ভঙ্গিমা নিয়ে দিনরাত ভাবা মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। নিজের খাওয়ার সময়টাই বদলে ফেললেন প্যাকার্ড। তার ক’দিনের মধ্যেই প্যাকার্ডের ডাক্তার হৃষ্টচিত্তে জানালেন, তাঁর স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে। অতঃপর ব্রায়োনি-র রোদ-ঝলমলে পরিবেশ ছেড়ে লন্ডনে ফেরার প্রস্তুতি নিলেন তিনি।

লন্ডন ফেরার আগেরদিন বিকেলে হাঁটতে-হাঁটতে সমুদ্রের দিকে গিয়েছিলেন প্যাকার্ড। একটা ছায়াঘেরা জায়গায় মুখোমুখি দুটো বেঞ্চ পাতা। তার একটাতে বসে অনির্দিষ্টভাবে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। আকাশে মেঘ জমেছে। তাদের গুরু-গুরু ধ্বনি আর সমুদ্রের ফিসফিস শুনতে-শুনতে তিনি বোধহয় ঘুমিয়েই পড়েছিলেন। হঠাৎ সরু, তীক্ষ্ণ গলায় একটা কথা শুনে প্যাকার্ডের চটকা ভাঙল।

“এইরকম দৃশ্যের মধ্যেও অনেকে দেবতার লীলা খুঁজে পায়— জানেন তো?”

ভারী দু’চোখের পাতা ফাঁক করে সামনে তাকালেন প্যাকার্ড। মেঘের আড়াল থেকে সূর্য অজস্র ছটায় ছড়িয়ে দিচ্ছে অস্তরাগ। সমুদ্র, আকাশ, মেঘ, রোদ— সব মিলে সত্যিই অনন্য এক দৃশ্য তৈরি করেছে। আনমনে মাথা নেড়ে বক্তার দিকে তাকিয়েই চমকে উঠে দাঁড়ালেন প্যাকার্ড।

তাঁর পাশেই এসে বসেছেন সেই ওপরদিকে তাকিয়ে থাকা প্রৌঢ়। উলটোদিকের বেঞ্চে বসে পাইপ ধরিয়েছে শক্তপোক্ত সঙ্গীটি। ঈষৎ বিরক্ত হলেও প্যাকার্ড আবার বসে পড়লেন। তারপর ঠান্ডা গলায় বললেন, “কোন দেবতা? সূর্যদেব? নাকি বরুণ? না পবন? নাকি বৃষ্টিতে ভিজে নিউমোনিয়া হলে একেবারে যম?”

“আপনাকে কিঞ্চিৎ… অবিশ্বাসী প্রকৃতির বলে মনে হচ্ছে।” সেইরকম সরু গলায় কিছুটা কৌতুক মিশিয়ে বললেন ভদ্রলোক।

আর একটু হলেই প্যাকার্ড “তাতে আপনার কী?” বলে খিঁচিয়ে উঠছিলেন। কিন্তু ডাক্তারের কড়া শাসন মনে পড়ে গেল তাঁর। শান্তভাবে তিনি বললেন, “প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে দেব-দানব খুঁজে বেড়ালে আখেরে ক্ষতিই হয়।”

“দেব-দানব!” ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “না। তাদের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। তবে আমি জানি, শয়তান আছে।”

ভদ্রলোকের নীরব সঙ্গীটি চমকে উঠল যেন। কড়া চোখে ভদ্রলোককে দেখে নিয়ে সে আবার পাইপে তামাক ঠুসতে ব্যস্ত হল। প্যাকার্ড কৌতূহলী হয়ে বললেন, “যুক্তির সাহায্যে আমারও মনে হয়েছে যে শয়তান আছে। আপনিও কি সে-ভাবেই বলছেন? না কি অন্য কিছুর ভিত্তিতে?”

“প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বলছি।” আকাশের দিকে, সেই পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি কোণে মুখটা তুলে রেখে ভদ্রলোক মুখে একটা শুকনো, নিরানন্দ হাসি ফুটিয়ে বললেন, “শুনবেন সে-কথা?”

“অবশ্যই। মানে… আপনার যদি কোনও অসুবিধে না থাকে, তাহলেই।”

“কোনও অসুবিধে হবে না। বরং হালকা লাগবে। ডাক্তার ছাড়া আর কাউকে তো বলিনি এ-সব কথা। আপনি গনট্রি হলের নাম শুনেছেন?”

“গনট্রি… নামটা চেনা-চেনা লাগছে যেন। কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছি না।”

“মনে না থাকাই স্বাভাবিক।” ভদ্রলোক মাথা দুলিয়ে বললেন, “ওই বাড়িটা ছিল লিসেস্টারের কাছে। পুরোনো বাড়ি। স্থাপত্যের ভাষায় বলতে হয়, মিডল টিউডর। একটা লম্বা গ্যালারি ছিল ওখানে। আজ থেকে অনেকদিন আগে ও-বাড়িতে একটা… দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সেই রাতে আমি ওখানে ছিলাম।”

“ওহ্‌!” অস্বস্তিভরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন প্যাকার্ড। তারপর বললেন, “মনে পড়েছে! কী যেন একটা প্রবাদ ছিল ওই বাড়িটা নিয়ে। আমি সেই সূত্রেই নামটা শুনেছিলাম।”

“হ্যাঁ, সেই বাড়িটাই বটে।” একটা বড়ো শ্বাস নিয়ে ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন।

“ওই বাড়ির ছেলে জ্যাক গনট্রি আর আমি একসঙ্গে অক্সফোর্ডে পড়েছি। তখন নানা অলৌকিক ব্যাপার নিয়ে আমার খুব আগ্রহ ছিল। ঈশ্বর জানেন, সেদিনের সেই ঝোঁকের জন্য কী মূল্য দিতে হয়েছে আমাকে। কিন্তু গনট্রি হলের প্রবাদের ব্যাপারটা বিস্তৃতভাবে জানার জন্যই আমি জ্যাকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলাম। একদিন রাতে আমরা আড্ডা মারছিলাম। জ্যাক সেদিন কিছুটা মাতালই হয়ে পড়েছিল। নানা কথার পর আমি বললাম, ‘তোমাদের গনট্রি হল নিয়ে অনেক গল্প শুনি। সেগুলো কি সত্যি?’

‘সত্যি না হলে বাড়ির সবাই মিলে আজ তাদের ‘বাৎসরিক সফর’ সারতে লন্ডনে গেল কেন?’

‘মানে?’

আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জ্যাক বেশ কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইল। আমার মনে হল, ওর মধ্যে একটা টানাপোড়েন চলছে। আরও কয়েক ঢোঁক পানীয় গলঃধকরণ করে ও বলল, ‘বছরের শেষ রাত্তিরটা ওই বাড়িতে কারও থাকার নিয়ম নেই।’

‘কেন?’

‘সেই সময়টা শয়তান আসে ও-বাড়িতে। গত তিনশো বছরে কেউ ওই বাড়িতে ও-রাত্তির কাটায়নি। ব্যাপারটা যাতে খুব বেশি প্রকট না হয় সে-জন্য তার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই সবাই লন্ডনে চলে যায়। ক্রিসমাস, কেনাকাটা, নতুন বছরের হুল্লোড়, পিকনিক— সব সেরে ফেরে। এ-সব কথা কাউকে বলার নিয়ম নেই। তবে আজ… বলতে ইচ্ছে করছে।’

আমার বোধহয় তখনই ওকে চুপ করানো উচিত ছিল। কিন্তু কৌতূহলও হচ্ছিল। তাই জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর কী হয়?’

‘পরদিন ভোরবেলা ক্যারো ওই বাড়িতে যায়। ও আমাদের বাটলার। কত বছর ধরেই ও আর ওর পূর্বপুরুষেরা আমাদের পরিবারে কাজ করছে— আমিও ঠিক জানি না। ও বাড়ির সবক’টা জানালা খুলে দেয়। না, সবক’টা নয়। দোতলায় দক্ষিণমুখো ঘরগুলোর মাঝের জানালাটা খোলা হয় সবার শেষে। সেখান থেকে সাদা সিল্কের একটা ব্যানার ও ঝুলিয়ে দেয় নীচের গ্যালারিতে। সেটাকে খুব ধীরে-ধীরে তিনবার নাড়তে হয়। তারপর… তারপর ও কী করে, শুনবে?’

‘না।’ জ্যাকের রক্তাভ মুখচোখ দেখে আমার মনে হচ্ছিল, এই কথাগুলো ও যেন ইচ্ছের বিরুদ্ধে বলছে। আমার ওর জন্য খারাপ লাগছিল। তাই ওকে থামিয়ে বললাম, ‘আর কিছু বলতে হবে। যা বলেছ সেটুকুও আমি ভুলে যাব।’

‘বেশ।’ এই বলে জ্যাক ঘর থেকে ঈষৎ স্থলিত পায়ে বেরিয়ে গেছিল। এরপর আর ওর সঙ্গে এই নিয়ে আমার কক্ষনও কথা হয়নি। তবে ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা নিখাদ ছিল। চার বছরই আমি গরমের ছুটিতে বেশ কিছুদিন গনট্রি হলে কাটিয়েছিলাম।

স্যার জন আর লেডি গনট্রি বেশ শান্ত, ধীরস্থির, মিষ্টি স্বভাবের মানুষ। এস্টেটের লোকেদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কটা প্রভু-ভৃত্যের বদলে অনেকটাই আত্মীয়তার ছিল। গনট্রি হলের ছিমছাম, শান্ত পরিবেশটাও আমার ভারি ভালো লেগে গিয়েছিল। তবে হ্যাঁ, গ্যালারি দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে আমি যে মাঝেমাঝেই ওপরদিকে তাকিয়ে ওই জানালাটা দেখতাম— এ-ও অস্বীকার করব না। সেই মুহূর্তগুলোতে মনে হত, গরম আর ঝিমধরানো ওই পরিবেশেও কোত্থেকে যেন একচিলতে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে পড়েছে। একবার তো আমার স্পষ্ট মনে আছে, ওই জানালাতে আমি সাদামতো কী যেন দেখলাম! তবে ভালো করে তাকিয়ে আর কিছু পাইনি ওখানে। সম্ভবত আমার মনের ভুল।

পড়াশোনার পাট চুকলে আমরা নিজেদের মতো কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তবে কিছুদিনের মধ্যেই জ্যাক বোয়্যর যুদ্ধে গেল। সেখানেই একটা শেল ওকে…! স্যার জন আর লেডি গনট্রি এই ধাক্কাটা সামলাতে পারেননি। তাঁরা সবার থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। বছর ঘুরতে-না-ঘুরতে তাঁরা দু’জনেও চলে গেলেন জ্যাকের কাছেই।

মোটামুটি ধরেই নিয়েছিলাম যে, গনট্রি হলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সেখানেই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু হঠাৎ একদিন কর্মসূত্রে টেলারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ও জমি-বাড়ির দালালি করত। লাঞ্চের ফাঁকে টেলার বলল, ‘গনট্রি হল কারা ভাড়া নিয়েছে জানেন?’

স্বাভাবিকভাবেই নিজের অজ্ঞতা ব্যক্ত করলাম। টেলর বলল, ‘রিফ্‌-দের নাম শুনেছেন?’

‘লন্ডনের উত্তরে বেশ কয়েকটা বড়ো দোকানের মালিক যে পরিবার, তাদের কথা বলছেন?’

‘হ্যাঁ। অসহ্য টাইপের লোকজন। পয়সার গরম আছে ষোলো আনা, কিন্তু বনেদিয়ানার লেশমাত্র নেই। ওরাই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে। তবে বেশিদিন থাকবে বলে মনে হয় না।’

‘কেন? বাড়িটা তো চমৎকার!’

‘সে-জন্যই তো ওরা ঠিক করেছে, বছরের শেষ দিনটা ওরা ওখানেই থাকবে— যাতে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো যায়।’

‘সে কী! এত বছরের রেওয়াজ এভাবে ভেঙে ফেলা হবে?’

‘রেওয়াজটা কেন— তা আপনি হয়তো জানেন, অন্তত আন্দাজ করতে পারেন। তাই ওই রাত্তিরে ওরা ওখানে থাকা মানে পরদিন থেকেই আমাকে ও-বাড়ির জন্য নতুন ভাড়াটে খুঁজতে হবে। একরকম বাধ্য হয়ে আমি এই রেওয়াজটার ব্যাপারে ওদের বলেছিলাম। তাতে কিস্যু লাভ হয়নি। সব শোনার পর মিসেস রিফ খিলখিলিয়ে বলেছিলেন— ও মা! এ বাড়িতে ভূত আছে? আমার কতদিনের শখ ছিল এমন একটা বাড়িতে থাকার। তাহলে তো এই রেওয়াজটা ভাঙতেই হচ্ছে!’

‘ইন্টারেস্টিং।’ আমি বলতে বাধ্য হলাম, ‘মাত্র কয়েক বছরের মধ্য যারা লন্ডনে এতগুলো বড়ো দোকান হাঁকিয়েছে, তাদের সঙ্গে শয়তানের টক্করটা কেমন হবে— জানতে মন চায়।’

‘তাহলে আপনিও ওদের সঙ্গে সেই রাতে থাকছেন না কেন? ওরা লর্ড, স্যার, ব্যারন— এইসব উপাধিওয়ালা লোকেদের তো নেমন্তন্ন করে-টরে প্রায়ই। আর আপনিও তো একজন…!’

রিফ্‌-দের মতো মোটাদাগের লোকেদের ত্রিসীমানায় আমি থাকি না। কিন্তু টেলারের কথা শুনে মনে হল, সেই রাতে আমাদের ঘরে অসমাপ্ত থেকে যাওয়া আলোচনার শেষটা, জ্যাকের অবর্তমানেও, জানার একটা রাস্তা আমার সামনে খুলে গেছে। বাড়িটার পরিবেশ আমার কখনওই ক্ষতিকারক বলে মনে হয়নি। অলৌকিক নিয়ে বইপত্র তো অনেক পড়েছি। হাতে-কলমে কিছু দেখার সুযোগটা ছেড়ে দেব?

আমি রাজি হয়ে গেলাম।”

Opore 2

ভদ্রলোক এই কথাটা বলামাত্র প্যাকার্ডের মনে হল, ওই মুশকোটি চোখের ইশারায় ভদ্রলোককে কিছু একটা বলতে চাইছে। সতর্ক করতে চাইছে নাকি? কিন্তু ভদ্রলোক থামলেন না। আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বলে চললেন।

“আজ থেকে তেইশ বছর আগের কথা, তবু আমার সব মনে আছে। টেলার আমার জন্য একটা আমন্ত্রণ জোগাড় করল। বছরের শেষ দিন আমি যখন লিসেস্টার স্টেশনে নামলাম তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। ছোট্ট একটা ঘোড়ার গাড়িতে চেপে গনট্রি হলের দিকে রওনা হওয়ার সময় থেকেই নিজের মধ্যে একটা অদ্ভুত ভয়মিশ্রিত উত্তেজনা টের পাচ্ছিলাম। ঝোড়ো হাওয়া আর কনকনে ঠান্ডার জন্য কাঁপুনিটা ভেতরের মতো বাইরেও হচ্ছিল। হয়তো সে-জন্যই প্রথমবার বাড়িটার চৌকাঠ পেরোতে গিয়ে মনে হল, বিরক্ত আর রুষ্ট হয়ে আছে বাড়িটা।

আমরা মোট দশ জন ছিলাম ওখানে সেই রাতে— পাঁচজন পুরুষ, পাঁচজন মহিলা। প্রথম দর্শনে মনে হল, আমি ছাড়া বাকি ন’জন ‘বয়সের ধর্ম’ অনুযায়ী এই বিশেষ দিনটাতে একটু বেশিমাত্রায় পান করে ফেলেছে। তার ফলেই হইচই বড়ো বেশি হচ্ছিল। একটু-একটু করে বুঝতে পারলাম, বাকিরাও আমারই মতো ভয়ে আর উত্তেজনায় একেবারে টানটান হয়ে আছে। এই মদ্যপান আর অকারণ চেঁচামেচি তারই লক্ষণ। তার কারণটাও সহজবোধ্য। বাড়িটা যে আমাদের সবাইকে শত্রু বলে মনে করছে— সেটা একেবারে স্পষ্ট। জানালাগুলো বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কনকনে ঠান্ডা একটা হাওয়ার দাপটে ঝনঝন করে উঠছে সবকিছু। আমরা কেঁপে উঠছিলাম থেকে-থেকে। সেই হাওয়ায় যেন একেবারে থিকথিক করছিল একটা হিংস্র শত্রুতার ভাব। মনে হচ্ছিল, সেটাকে দু’হাতে ঠেলে সরিয়ে নড়াচড়া করতে হচ্ছে আমাদের।

আমাকে পুরোনো ঘরটাই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার তাতে পরিচিত উষ্ণতার লেশমাত্রও পাইনি আমি। মনে হচ্ছিল, ঘরটা যেন নীরবে আমাকে সাবধান করতে চাইছে। শুকনো মুখে পোশাক পালটে নীচে ‘পার্টিতে’ যোগ দিতে গেলাম ইচ্ছের বিরুদ্ধেই। না গিয়ে তো উপায় ছিল না।

রিফ্‌-রা ঠিক করেছিল, ডিনারটা খাওয়ার ঘরে না সেরে বড়ো ঘরে সারবে। সেই ঘরটাকে গোল করে ঘিরে রেখেছে একটা ব্যালকনি। আমরা খেতে বসলাম ঠিকই। কিন্তু নার্ভাস ভাবটা ততক্ষণে আতঙ্কের চেহারা নিয়েছে আমার মধ্যে। চেয়ারটা একহাতে ধরে রেখেছি, যাতে ছুটে পালিয়ে যতে ইচ্ছে হলেও নিজেকে সামলে রাখা যায়। তবে বাকিদের অবস্থা আমার চেয়েও খারাপ। মহিলারা একেবারে হিস্টেরিক আচরণ করছেন আর পুরুষেরা বোতলের-পর-বোতল ফাঁকা করছেন। কিন্তু নেশাগ্রস্ত হওয়ার বদলে ক্রমশ তাঁদের ভয়-পাওয়া চেহারাটাই আরও বেশি করে ফুটে উঠছে সবার সামনে।

আমার ডানপাশে বসে থাকা মহিলা একচুমুকে শ্যাম্পেনের গ্লাস ফাঁকা করে তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচালেন, ‘কখন আসবে সে?’ বলেই খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করলেন তিনি। একজন পুরুষ গর্জন করে অদৃশ্য চাকরদের উদ্দেশে বললেন, ‘কারও টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না কেন? এরপর বখশিস্‌ চাইলে শয়তানের কাছেই চেয়ে নিস্‌ তোরা!’ সব মিলিয়ে আমার মনে হচ্ছিল, আলোয় ভরা থাকলেও ঘরটা যেন নরকই হয়ে উঠেছে— ভয়ে, উন্মাদ আচরণে, অসংযমে!

সাড়ে এগারোটা থেকে ঘরটা কেমন যেন ধোঁয়াটে হয়ে উঠতে লাগল। সেই ধোঁয়ার মধ্যে অদ্ভুত-অদ্ভুত সব চিহ্ন তৈরি হচ্ছিল বাতাসে। অনুভব করলাম যেন ধীরে-ধীরে ঘরের মধ্যে হাওয়ার চাপ বাড়ছে। মাথাটা একেবারে ফেটে যাওয়ার জোগাড় হচ্ছে। একটা সময় ওই পরিবেশ আর সহ্য করতে পারলাম না। টেবিল থেকে উঠে, একছুটে নিজের ঘরে গেলাম। তারপর চাদর দিয়ে মাথা ঢেকে, পুরো পোশাক পরা অবস্থাতেই, কাঁপতে-কাঁপতে শুয়ে পড়লাম।

নীচ থেকে তখনও ফাঁপা হাসি আর অকারণ হুল্লোড়ের শব্দ ভেসে আসছিল। এ-ভাবে কতক্ষণ কেটেছিল জানি না। হঠাৎ একটা বিশাল ঘণ্টা বেজে উঠল— একবার-দু’বার-তিনবার! এতই জোরালো ছিল আওয়াজটা যে আমার মনে হল, যেন একটাই আওয়াজ টানা কিছুক্ষণ ধরে চলল। তারপর সেটা থেমে গেল। এক মুহূর্তের জন্য আর কোনও শব্দই হল না। তারপর একজন মহিলা চিৎকার করে বললেন, ‘ওই যে! ওপরে!’

পরক্ষণেই বাড়ির সব আলো নিভে গেল।

আর শুয়ে থাকতে পারলাম না। যে ব্যাগটা এনেছিলাম, তাতে একটা ইলেকট্রিক টর্চ ছিল। হাতড়ে-হাতড়ে সেটা বের করে নীচে চললাম আমি। টেবিলের ওপর আলো ফেলতেই দেখলাম, ন’জন নারী-পুরুষই পাথরের মূর্তির মতো অনড় হয়ে বসে আছেন। টর্চের আলোয় দেখতে পেলাম, প্রতিটি মানুষের চোখ বিস্ফারিত, অথচ মণিগুলো যেন চোখের কোণে সরে গেছে। আর সেইভাবে তাঁরা সবাই মুখ তুলে ওপরদিকে তাকিয়ে ছিলেন— যেখানে গ্যালারিতে ঢোকার দরজাটা আছে। মুখও খোলা ছিল। ঠোঁটের কোণে জমে ছিল ফেনা। তারপর আমি টর্চটা ঘোরালাম, যেদিকে ওঁরা সবাই তাকিয়ে ছিলেন। আর সেখানে… আর সেখানে…!”

মেঘের বাহিনী ততক্ষণে ওঁদের সবার মাথার ওপরে এসে পড়েছে। মনে হচ্ছে, যেন জমাট বাষ্পের দুটো শিং বেরিয়ে এসেছে মূল পুঞ্জটা থেকে। ভদ্রলোক ‘আর সেখানে… আর সেখানে…!’ বলামাত্র তার একটা থেকে বেরিয়ে অন্যটার দিকে ধেয়ে গেল চোখ-ধাঁধানো বিদ্যুতের ঝলক। মিস্টার প্যাকার্ডের মনে হল, মেঘ নয়— যেন জ্বলন্ত শুঁড়ের মতো অনেককিছু পাক খাচ্ছে তাঁদের ঠিক ওপরেই। আকাশ-বাতাস ফাটিয়ে বাজ পড়ার শব্দটা তাঁর কানে এসে পৌঁছোল তারপরেই।

তখনই বৃষ্টি নামল মুষলধারে।

ভদ্রলোক সে-সবের তোয়াক্কাও করলেন না। তিনি লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করলেন, “ওই যে! ওপরে!”

Opore 3

ঝড় আর বৃষ্টির দাপটে প্যাকার্ডের মনে হল, তিনি বোধহয় অন্ধ হয়ে গেছেন। সেই অবস্থাতেও তিনি মুখ তুলে তাকাতে চাইলেন আকাশের দিকে— যেদিকে মুখ তুলে চিৎকার করছিলেন ভদ্রলোক। কিন্তু তার আগেই তিনি দেখলেন, ভদ্রলোকের সঙ্গী পাঁজাকোলা করে তাঁকে তুলে নিয়েছে। প্যাকার্ড তার দিকে এগোতে গেলেন। লোকটা মাথা নেড়ে তাঁকে বারণ করল। তারপর মানুষটিকে দু’হাতের মধ্যে নিয়ে ছুটল অন্যদিকে। হাওয়ার দাপটের মধ্য দিয়েও তার বলা “ওঁকে আমার হাতে ছেড়ে দিন। আমি জানি কী করতে হয় এই অবস্থায়!” প্যাকার্ডের কানে এল।

ভদ্রলোকের চিৎকার ক্ষীণ হতে-হতে মিলিয়ে গেল। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন প্যাকার্ড। তারপর চরাচর সাদা করে দিয়ে আরেকবার বিদ্যুৎ চমকাল। হুঁশ ফিরে পেয়ে, ওই কনকনে ঠান্ডা জলের ধারা মাথায় নিয়ে হোটেলের দিকে ছুটতে শুরু করলেন তিনি।

_

মূল কাহিনি: ‘লুক, আপ দেয়ার!’

লেখক: হার্বার্ট রাসেল ওয়েকফিল্ড

প্রথম প্রকাশ: ‘ওল্ড ম্যানস্‌ বিয়ার্ড: ফিফটিন ডিস্টার্বিং টেলস্‌’ সংকলন (১৯২৯)

একজন

Ekjon

প্রাক্‌কথন

কেমব্রিজের গিল্ডহলের পেছনে কাকা-র একটা পুরোনো বইয়ের দোকান ছিল। ছোটোবেলায় ওটাকে স্বর্গরাজ্য বলে মনে হত। কিন্তু পরে, কাকা’র একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে দোকানটার বিলি-বন্দোবস্ত করতে গিয়ে মাথা গেল খারাপ হয়ে। পুরোনো বইয়ের সঠিক মূল্যায়ন কী-ভাবে করতে হয়— সে-সম্বন্ধে আমার কোনও ধারণাই ছিল না। অনেক খোঁজখবর করে উইলটন বলে এক ভদ্রলোককে পেলাম, যিনি এই ব্যাপারগুলো বোঝেন। তাঁর সাহায্য নিয়ে, উকিলদের পরামর্শের ভিত্তিতে বইগুলো বিক্রির ব্যবস্থা হল।

কিছু ডায়েরি, ব্যক্তিগত মেমো-বুক, চ্যাপবুক বিক্রি না করে কাকা-র দোকানের স্মৃতি হিসেবে রেখে দিতে বলেছিলেন উইলটন। বাকি সব থেকে টাকা মন্দ উঠল না। উইলটনের কমিশন আর বাকি খরচাপাতি সামলে যা রইল সেটা কাকা-র স্কুলের লাইব্রেরির জন্য দান করে দিলাম। ওই একটি জায়গা নিয়েই কাকা কিঞ্চিৎ নস্ট্যালজিক ছিলেন।

সব মিটলে উইলটন আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। ক্যাটালগ বানানো থেকে শেষ অবধি বিক্রি সেরে হিসেব মেলানো— এই কাজগুলো আমাদের একসঙ্গেই করতে হল। ভদ্রলোক এমনিতে কম কথা বললেও বেশ রসিক। সেদিন কিন্তু কফি আর কুকি নিয়ে বসার পর উইলটন সোজা কাজের কথায় এলেন।

“আপনার কাকা একটা এস্টেটের নিলামের পর সেখান থেকে অ্যালবার্ট পেইনেল-এর ডায়েরিগুলো কিনেছিলেন। মনে আছে তো?”

“পেইনেল… মানে সেই গাইড-বুক লিখিয়ে, তাই তো?” মনে পড়ল, “হ্যাঁ, ওই ডায়েরিগুলো তো বিক্রি হয়ে গেল। কিংস ট্যুর কিনল। ভদ্রলোক বেশ রিসার্চ-টিসার্চ করে লিখতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও আগে রাস্তাঘাট তো এখনকার মতো ছিল না। কিন্তু উনি বোধহয় নিজে জায়গাগুলোতে গিয়ে তবেই লিখতেন, তাই না?”

“হ্যাঁ, পেইনেলের একটা অন্যরকম বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল সে-জন্যই।” গম্ভীরভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন উইলটন, “উনি যা নিজে দেখেছেন বা পড়েছেন— সেটাই লিখতেন। মুশকিল হল, এই ধারণা চোট খেলে ওঁর লেখার কপিরাইট যাঁদের কাছে আছে, তাঁরাও মামলা করে আমাদের জেরবার করে দিতেন।”

“এই সেরেছে!” আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম, “উনি কি বানিয়ে-বানিয়েও লিখতেন নাকি? আপনিই বা সেটা জানলেন কীভাবে?”

“আমি কিচ্ছু জানি না।” উইলটন মুচকি হাসলেন, “তবে পেইনেলের একটা ডায়েরি পড়লে লোকে সেইরকমই ভাবত। সে-জন্যই ওটা আমি বিক্রি করতে দিইনি। আমাদের ইনডেক্সে ওটা #পি-ইএ— মানে ইস্ট অ্যাংলিয়া সিরিজে আছে। পাতলা একটা নোটবই। আপনি ওটা একবার পড়ে দেখুন। তারপর ভাবা যাবে, ওটা নিয়ে কী করা যায়।”

“কোন জায়গার কথা আছে ওই ডায়েরিতে?”

“লোস্টফট থেকে মার্শ্যাম হয়ে পেইনেল আরও দক্ষিণে গেছিলেন। ভূমিক্ষয়ের ফলে সেখানে অনেকটা জায়গা সমুদ্রের তলায় চলে গেছিল। জায়গাটার নাম রাশওল্ড। সেখানে ওঁর যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেটাই লেখা আছে ওতে। আপনি পড়ে দেখুন। চাইলে ওটাও বিক্রি করতে পারেন। তবে একবার উকিলদের সঙ্গে কথা বলে নিলে ভালো হবে।”

আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে উইলটন বিদায় নিলেন। আমি নিজের কাজে গেলাম, কিন্তু সারাদিন ব্যাপারটা আমাকে ভাবাল। ফ্ল্যাটে ফিরে বাক্স খুলে অল্প খুঁজতেই ডায়েরিটা পেলাম। যা পড়লাম, সেটাই ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে লিখে দিচ্ছি।

১৭ তারিখ

‘একজন’! এইরকম অদ্ভুত নাম কোনও সরাইয়ের হয়— এ আমি আজ অবধি দেখিওনি, শুনিওনি। তবে ব্যবস্থাপত্র ভালোই। ফলে কাল রাতে ঘুমটা বেশ জোরদার হয়েছিল। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে জায়গাটা দেখতে বেরিয়ে পড়লাম।

গেজেটিয়ারে রাশওল্ডকে ছোটো শহর বলা হলেও আমার চোখে এটা বিশুদ্ধ গ্রাম বলেই মনে হল। সমুদ্র অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছিল বলে পুবে অনেকদূর অবধি যেতে পারলাম। ফেরার পথে জেলে-পট্টি পেরোচ্ছিলাম। তখন দেখলাম, একঝাঁক বাচ্চা স্কিপিং-রোপ নিয়ে খেলছে। ওদের মুখের ছড়াটা বেশ অন্যরকম লাগল—

‘সবাই মিলে ফিরল ঘরে, ফিরল না তো একজন,

জলের তলে ছটফটিয়ে, খিদেয় জ্বলে সেই শমন।

খারাপ সে লোক! তার নজরে, পড়লে জেনো রক্ষে নেই।

সাগর যদি যায় শুকিয়ে, নামলে আঁধার আসবে সে-ই!’

দুপুরের খাওয়া সেরে এখানকার চার্চে গেলাম। সেন্ট বার্থেলামি-এর নামে হলে কী হবে, চার্চটা দেখে মোটেও ভক্তি হল না। রেভারেন্ড ক্লেডন, মানে ওখানকার ভিকার আমাকে যে-ভাবে অভ্যর্থনা জানালেন তাতে মনে হল, বেচারির বোধহয় কথা বলার মতো লোক জোটে না। এটা-সেটা দেখানোর পর ক্লেডন আমাকে বাইরের বাগানে নিয়ে গেলেন। দেখলাম, সেখানে একটা বড়ো স্মৃতিফলক লাগানো রয়েছে।

“একসময় কিন্তু রাশওল্ড এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো বন্দর ছিল।” ক্লেডনের মুখে একটা মলিন হাসি দেখা দিল, “এখন অবশ্য দেখে তা বুঝবেন না। ১৪৩৩ সালে একটা বিশাল ঝড়ের পর এখানকার প্রায় সবটাই সমুদ্র গিলে ফেলে। পুরোনো চার্চ ভেঙেচুরে ওই জলের সঙ্গেই নীচে চলে যায়। যদি আপনি সমুদ্রের নীচে নামেন, তাহলে ওই ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাবেন। অবশ্য এখন ক’দিন কোনও জেলেনৌকো জলে নামবে না।”

“কেন?” আমি কৌতূহলী হলাম, “ঝড়-টর হয় বুঝি?”

“না-না।” ক্লেডন সমুদ্রের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন, “জল এখন কতটা কমে গেছে, দেখেছেন? এইরকম হলেই নৌকোগুলো জলে নামতে চায় না। জেলেরা ঘর থেকে বেরোতে অবধি চায় না। ‘জল কম, ধরে যম’— এইরকম একটা প্রবাদ ওদের মুখে শুনেছি। তবে তার অর্থ আমি জানি না।”

বাড়ির পাশ দিয়ে আসার সময় যে ছড়াটা বাচ্চাদের কাছে শুনেছিলাম, সেটার প্রসঙ্গ উঠল। ক্লেডন ফলকটাকে হাত দিয়ে দেখিয়ে বললেন, “ওই ছড়াটা তৈরি হয়েছে সেই ঝড়ে রাশওল্ডের বেশিরভাগ তলিয়ে যাওয়ার পরেই। ব্যাপার হল, পরে যখন নতুন করে চার্চ তৈরি হল, তখন আগের চার্চে যাদের কবর দেওয়া হয়েছিল, তাদের নতুন জায়গায় তুলে আনার কথা উঠল। সেইমতো প্রায় সবাইকেই তুলে আনা হল। বাদ পড়ল শুধু রজার ডে লিল নামের একজন। বিশপ রেকর্ডে পেলেন, সে নাকি ছিল শয়তানের উপাসক। আরও নানা দোষ ছিল তার। তাই ওই একজন, মানে রজার ডে লিল সত্যিই জলের তলে অন্ধকারে বন্দি হয়ে আছে।”

ভিকারের বাড়িতে সান্ধ্য চায়ের আসরে স্থানীয় ডাক্তার গটফ্রেডের সঙ্গে আলাপ হল। কমবয়সী, ঠান্ডা মাথার লোকটিকে বেশ লাগল। কথাপ্রসঙ্গে ক্লেডনকে বললাম, “আমি কি চার্চের কিছু পুরোনো নথিপত্র ঘাঁটতে পারি? গাইড বুকে দেওয়ার মতো মালমশলা না পেলে এখানে আসাই সার হবে।”

পরদিন পুরোনো রেকর্ড দেখার প্রতিশ্রুতি আদায় করলাম। গটফ্রেডের বেশ কিছু মেডিকেল জোক শুনে ‘একজন’-এ ফিরেছি এই কিছুক্ষণ হল। আসার সময় পথঘাটে একটা লোকের দেখাও পেলাম না। কম গ্রাম তো ঘোরা হল না। কিন্তু এইরকম অবস্থা আগে দেখিনি! যাইহোক, এবার ঘুম দেব।

১৮ তারিখ

রাতে চমৎকার ঘুম হয়েছিল। সকালে উঠে জানালায় দাঁড়ানোমাত্র ঝলমলে রোদ আর সমুদ্রের হাওয়া আমাকে সুপ্রভাত জানাল। ব্রেকফাস্ট সেরে চার্চের উদ্দেশে রওনা হলাম। পথে গটফ্রেডের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। জেলে-পট্টির একটি বাচ্চা মেয়ে ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাই বেচারিকে একেবারে ভোররাতেই বেরোতে হয়েছিল।

চার্চে পৌঁছোনোর পর ক্লেডন আমাকে চা ও ‘টা’ দিয়ে স্বাগত জানালেন। তারপর আমরা দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে পড়লাম। প্রথমেই ১৪৪৩-এর পরের সেই কবর নাড়াচাড়ার ব্যাপারগুলো দেখলাম। তারপর ক্লেডন আরেকটা জিনিস দেখালেন।

“আপনার মনে আছে নিশ্চয়, গতকাল আমরা আরও একটা বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলাম।” বললেন ক্লেডন, “জল খুব কমে গেলে বা সমুদ্র অস্বাভাবিক পিছিয়ে গেলে এলাকায় একটা আতঙ্কের আবহ দেখা যায়। ১৭০১ সালে কবর দেওয়ার রেজিস্টারে দেখছি, এক সপ্তাহের মধ্যে তিনটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। রেভারেন্ড ব্রেসওয়েল ওয়েবস্টার তখন প্যারিশের দায়িত্বে ছিলেন। উনি সেই নিয়ে নিজের ডায়েরিতে কী লিখে গেছেন, পড়ে দেখুন।”

চামড়া দিয়ে শক্ত করে বাঁধানো জার্নালের পাতাগুলো সাবধানে আলোর কাছে আনলাম। খুদে-খুদে হরফে তাতে লেখা—

‘জলের স্তর এখনও অনেকটা নীচে রয়েছে। আজ সকালে মেরি হডসল ভিকারেজে এসেছিল। সে অভাগিনীও এই মরসুমে নিজের ছেলেকে হারাল। ভোরের আলো ফুটতেই ছেলেটিকে নিজের নৌকোর পাশেই পাওয়া গেছে। এরও অবস্থা ছিল অন্যদের মতোই। এই ভয়াবহ অভিশাপ যে আর কত যুগ ধরে রাশওল্ডে থাকবে— কে জানে! এটা বুঝি যে আমার কর্তব্য হল এইসব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লোকেদের সতর্ক করা। কিন্তু অন্যদের কী বোঝাব? আমি নিজেই তো এই ক’টা দিন অন্ধকারে ঘরের বাইরে পা রাখিনি!’

“ব্যাপারটা কী বলুন তো?” আমি এবার সত্যিই কৌতূহলী হলাম, “এটা কি কোনও অসুখ? মহামারীর মতো কিছু— যেটা জল কমে গেলে দেখা দেয়? কিন্তু তাহলে এই… কুসংস্কারের কথা আসছে কেন?”

“কী জানি! তবে এক সপ্তাহের মধ্যে তিনটে অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে এইরকম ছোটো জায়গায় নানা কথা উঠতে বাধ্য। সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার কী জানেন? এমন জিনিস এর পরেও হয়েছে। অন্তত একটা রেকর্ড তো আমাদের লাইব্রেরিতেই আছে।”

“বলেন কী! কোথায় পেলেন সেই রেকর্ড?”

ক্লেডন পরিতৃপ্তির হাসি মুখে ফুটিয়ে একটা পাতলা বই হাতে তুলে নিলেন। তারপর বললেন, “এককালে পত্রসাহিত্য বলে একটা বিশেষ ধারা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল, জানেন তো! সেই ধারাতেই একটা বই লেখা হয়েছিল। নামখানা বিশাল— ‘সাফোক-নিবাসী মিসেস হেনরি আউট্রাম আর তাঁর বন্ধু লেটিশিয়া-র পত্রমিতালি’। ১৮৭০ সালে ছাপা সেই বইয়ের এক কপি আছে লাইব্রেরিতে। তাতে ১৮৫৮ সালের এই চিঠিটা একবার পড়ে দেখুন।”

‘প্রিয় লেটিশিয়া…’ দিয়ে শুরু হয়েছে চিঠিটা। রডোডেনড্রন, চাকরদের অভব্যতা, মাংসের দাম… এইরকম হাবিজাবি পেরিয়ে আমি সেই অংশটা পেলাম, যেটার কথা ক্লেডন বলছিলেন।

‘ক’দিন ধরে প্যারিশের আবহ ঠিক আগের মতো নেই, জান! আমাদের এখানে এক জেলে-র ছেলে জ্যাকি গাবিন্স-এর মৃত্যুর পর থেকেই কেমন একটা ভয় আর রাগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহে একদম ভোরবেলা, ওদের ছোট্ট বাড়ির লাগোয়া বাগানের বাইরে ওর মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। ডাক্তার দেখে বলেছিলেন যে তারও ঘণ্টাতিনেক আগেই নাকি সব শেষ হয়ে গেছে। ওর চেহারাটা একেবারে শুকনো আর হাড্ডিসার দেখাচ্ছিল। আমি আর হেনরি একবার ভেবেছিলাম, হয়তো বেচারি অনাহারে বা অসুখে কষ্ট পাচ্ছিল। কিন্তু গাবিন্সরা বেশ সম্পন্ন। ওদের বাড়ির পরিবেশও বেশ ছিমছাম, শান্ত। আমি মিসেস গাবিন্সের সঙ্গে দেখা করলাম। মহিলা কাঁদতে-কাঁদতে বললেন, গত ক’দিন ধরেই নাকি জ্যাকি খুব অস্থির হয়ে ছিল। বারবার একটা খারাপ লোকের কথা বলছিল। কিন্তু কেন সে বিছানা ছেড়ে বাইরে গিয়েছিল, আর ঠিক কী-ভাবে ও এমন শুকিয়ে গেল— এগুলো আমি বুঝিনি।

অন্যদের কাছে শুনেছি যে সমুদ্রের জল খুব কমে গেলেই নাকি মৃত্যু এইভাবে হানা দেয় এখানে। এটা কুসংস্কার ছাড়া অন্য কিছু বলে ভাবতে পারছি না। তবে জল নেমে গেলে নীচের পচা জিনিস থেকে উঠে আসা বাষ্পে কিছু হয়ে থাকলে আলাদা কথা।

থাক। তুমি এই চিঠি নিশ্চয় খাবার টেবিলে বসে পড়ছ। সেখানে আর এ-সব আলোচনা করে লাভ নেই। আগামী সপ্তাহে চার্চের তরফে একটা মেলা আয়োজন করার কথা ভাবছি। তাতে কী-কী করা যায় বল তো? আমি ভাবছি…’

চিঠির বাকিটার সঙ্গে আমাদের আলোচনার কোনও সম্পর্ক ছিল না। ক্লেডন গম্ভীর মুখে বললেন, “দেখেছেন তো! আমার আশঙ্কা হচ্ছে, এবারেও যদি এইরকম কিছু হয় তাহলে আমার প্যারিশের অর্ধেক লোক চার্চে আসা ছেড়ে দিয়ে নিজেদের মতো মন্ত্রতন্ত্রের শরণ নেবে। আশা করি, তেমন কিছু হবে না।”

সায় দিলাম। হঠাৎ মনে পড়ল, গটফ্রেড একটি শিশুর অসুস্থতার কথা বলছিলেন না? তবে এই নিয়ে ক্লেডনকে কিছু বললাম না। ভদ্রলোক লাঞ্চ খাওয়ানোর জন্য ঝুলোঝুলি করছিলেন। পরদিন সন্ধেবেলা একহাত দাবা হবে— এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তবেই ছাড় পাওয়া গেল।

বাকি দিনটা নদীর ধার ধরে হাঁটাহাঁটি করতেই গেল। যখন রাশওল্ডে ফিরছি, তখন সূর্য ডুবছে। হঠাৎ দেখলাম, জেলে-পট্টির একটা বাড়ির সামনে বেশ ভিড়। সেখানে রুক্ষ চেহারার বেশ ক’জন পুরুষ একটি মহিলার সঙ্গে কথা বলছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে জানলাম, যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা সবাই স্থানীয় জেলে। আর ওই বাড়ির বাচ্চা মেয়েটিই অসুস্থ হয়েছে। শুনলাম, মেয়েটির অবস্থার অবনতি হয়েছে। মন খারাপ হয়ে গেল।

ক্লান্ত দেহে এই ডায়েরি লিখছি। বাইরে অন্ধকার নেমেছে। খেয়াল করেছি, রাস্তা ইতোমধ্যেই জনশূন্য হয়ে পড়েছে। ভারি অদ্ভুত লাগছে ব্যাপারটা! অস্বস্তিও হচ্ছে। মেয়েটার কী হয়েছে? তার সঙ্গে কি এই জল কমে যাওয়ার সত্যিই কোনও সম্পর্ক আছে?

লেখা বন্ধ করি এবার।

১৯ তারিখ

আবহাওয়া বদলে গেছে একরাত্তিরেই! সকাল থেকে আকাশে মেঘ জমেছিল। গুমগুম আওয়াজ আর হাওয়াতে বোঝা যাচ্ছিল, বৃষ্টি আসছে। দুপুরের পর থেকেই শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। বাধ্য হয়ে আজকের দিনটা ‘একজন’-এর এই ঘরেই কাটাতে হল।

নীচের বারে বেশ কিছু জেলে বসে পানাহার করছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন কাল বিকেলে ওই জমায়েতেও ছিল বলে মুখ-চেনা হয়ে গিয়েছে। কথা শুনে বুঝলাম, এরা কেউ গত ক’দিন ধরে সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়নি। পরিবেশ একেবারে গুমোট হয়ে রয়েছে। ওরাই বলল, মেয়েটার শরীর আরও খারাপ হয়েছে। সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার হল, ওই দুর্বল শরীরেও মেয়েটা নাকি ঘুমের মধ্যে হাঁটতে শুরু করেছে! ওকে সেদিন ভোরবেলা বাড়ির দরজায় পাওয়া গেছে। ঠকঠক করে কাঁপছিল বেচারি। কাউকে চিনতে অবধি পারছিল না।

ব্যাপারটা আমাকে জোর ধাক্কা দিল। সেদিন সন্ধেবেলা ভিকারেজে দাবা খেলার ফাঁকে ক্লেডনকে সুজি হডসল— মানে অসুস্থ হয়ে পড়া বাচ্চা মেয়েটির অসুস্থতার কথা জানালাম। বললাম, “কাল আমরা যার কথা পড়লাম, সেই জ্যাকি গাবিন্স নামের ছেলেটির সঙ্গে সুজি-র এই অসুস্থতার সাদৃশ্যটা লক্ষ করেছেন?”

ক্লেডন যে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন, এটা বুঝতে পারছিলাম। তবে একরকম জোর করেই ভদ্রলোক হেসে বললেন, “আরে না-না! এ আর কী এমন সাদৃশ্য? তাছাড়া সাদৃশ্য থাকলেই বা কী করব? ধরুন, ডক্টর গটফ্রেডকে গিয়ে বললাম, ষাট বছর আগের একটা কেসের সঙ্গে সুজি’র অসুখের মিল আছে। উনি সেটা শুনে কী করবেন?”

“উনি আগে ভিজে চুপ্পুস রেইনকোট আর কোট খুলে শুকোতে দেবেন।”

গটফ্রেড যে আমাদের কথার অন্তত কিছুটা শুনেছেন সেটা বোঝা গেল। কথা-অনুযায়ী কাজ সেরে, ক্লান্ত শরীরটাকে ফায়ারপ্লেসের সবচেয়ে কাছের চেয়ার অবধই টেনে এনে ধপাস্‌ করে বসে পড়লেন ভদ্রলোক। তারপর বললেন, “হ্যাঁ, এবার বলুন। সুজি হডসলের ব্যাপারে এখন আপনারা কেন, আমি এখানে যে ছোকরা বুট-পলিশ করে, তার থেকেও উপদেশ নিতে পারি। সারাদিন ধরে আমি মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করেছি। কোনও রোগ নেই। অথচ শরীরে রক্ত প্রায় নেই বললেই চলে! কী-ভাবে ওর এই অবস্থা হল— সেটা আমি বুঝতে পারছি না কিছুতেই। ওই পরিবারের লোকেরা বুঝতে পারছে যে আমি চেষ্টা করছি। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে মেয়েটির ঠাকুরদা… কী যেন নাম?”

“জেথরো হডসল?” ক্লেডন বললেন।

“হ্যাঁ! জেথরো আমাকে বলল, ‘আপনি অনেক করেছেন ডাক্তার। এবার যান।’ জানি, হয়তো উনি ভালো মনেই কথাটা বলেছিলেন। তবু, আমার কেমন লাগে, বলুন? কাল সকালের মধ্যে অবস্থার উন্নতি না হলে আমি ডক্টর মিডের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাউথওল্ডের স্যানাটোরিয়াম-এ সুজি’র ভর্তির ব্যবস্থা করাব। কিন্তু তার আগে আপনারা বলুন, আমার চিকিৎসায় কি কিছু ভুল আছে? বলুন!”

একরকম বাধ্য হয়ে ক্লেডন আর আমার মধ্যে হওয়া কথাবার্তা, আর যা পড়েছি তার নির্যাস পেশ করলাম। ভেবেছিলাম, গটফ্রেড হয়তো অট্টহাসিতে ফেটে পড়বেন। নয়তো ধর্ম আর কুসংস্কারের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে কিছু তেতো কথা বলবেন। উনি সে-সব কিচ্ছু করলেন না। স্তব্ধ হয়ে ফায়ারপ্লেসের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন গটফ্রেড। তারপর উনি যখন মুখ খুললেন, তখন মনে হল যেন ওঁর গলার আওয়াজটা অনেক দূর থেকে আসছে।

“এগুলোও এক ধরনের এভিডেন্স!” গটফ্রেড আমাদের বলছিলেন, নাকি নিজেকে, তা বুঝতে পারছিলাম না। সে-ভাবেই উনি বলে চললেন, “লক্ষণগুলো তো একইরকম। মেয়েটা যে মরণাপন্ন— এ-বিষয়েও আমি নিশ্চিত। কিন্তু…”

“ঠিক তাই!” জোর গলায় বলে উঠলেন ক্লেডন, “সাফোকের এই অজ-পাড়াগাঁয়ে অনেক কথাই রটতে পারে। তার কিছু সত্যি হতেই পারে। কিন্তু কী করলে মেয়েটা সেরে উঠবে? মিসেস আউট্রাম যা বলেছিলেন, সেটাই কি তাহলে আমাদের মানতে হবে? জলের তলা থেকে বেরিয়ে আসা কোনও দূষিত বাতাসই কি এই অসুস্থতার জন্য দায়ী? সে-ক্ষেত্রে মেয়েটিকে এখান থেকে দূরে নিয়ে যাওয়াই ভালো।”

গটফ্রেড অন্যমনস্কভাবে সায় দিলেন। আমরা চুপচাপ বসে রইলাম কিছুক্ষণ। ক্লেডন খাদ্য ও পানীয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু সেটা আমরা কেউই ঠিক উপভোগ করতে পারলাম না।

যখন বেরোলাম, তখন বাইরে ঘন অন্ধকার। বৃষ্টি থেমে গেলেও হঠাৎ হাওয়ার দমক আমাদের একেবারে ঝাঁঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। গটফ্রেড আমার সঙ্গেই চুপচাপ হাঁটছিলেন। আমিই বললাম, “রেভারেন্ড ক্লেডনের কথাটা কি আপনি মেনে নিচ্ছেন? সুজি’র অসুস্থতার সঙ্গে কি এই… কুসংস্কারের কোনও সম্পর্ক সত্যিই নেই?”

“ভিকারের কথায় যুক্তি আছে, মিস্টার পেইনেল।” দুঃখিত গলায় বললেন গটফ্রেড, “কিন্তু উনি তো আমার মতো করে দিন-রাত এক করে মেয়েটার পাশে বসে লড়ে যাননি। বিশ্বাস করুন, মেয়েটার কোনও অসুখ নেই। অথচ আমার চোখের সামনে বেচারি একটু-একটু করে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছে! জ্বরের ঘোরে হাত-পা নেড়ে সে বেচারি কেঁদে উঠছে, ‘সরিয়ে দাও! লোকটাকে সরিয়ে দাও! ও খুব খারাপ।’ সবটাই কি স্বপ্ন আর কাকতালীয় ব্যাপার? এ-জিনিস আমি কিছুতেই মানতে পারছি না।”

“বুঝতে পারছি।” আমি সহানুভূতির সঙ্গেই বললাম। তারপর হঠাৎ একটা কথা মনে হল। গটফ্রেডকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, আপনি তখন ফায়ারপ্লেসের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘লক্ষণগুলো তো একইরকম।’ এটা কি আপনার কোনও পুরোনো কেসের সঙ্গে মিলছে?”

“আমার নয়।” নিচু গলায় বললেন গটফ্রেড, “এডিনবরা-য় আমাদের এক প্রফেসর ছিলেন, যিনি মেডিকেল মিশনের অংশ হয়ে দীর্ঘদিন ভারতে কাটিয়েছিলেন। উনি আমাদের একটা ঘটনা বলেছিলেন। একবার একটি পাহাড়ি জায়গায় উনি হাসপাতালের কাজে গেছিলেন। সেখানে তখন ক’দিন ধরে এক ভারি অদ্ভুত রোগ দেখা দিয়েছিল। সুস্থ মানুষ, বিশেষ করে ছোটোরা, রাতারাতি শুকিয়ে যেত, তারপর মারা পড়ত! হাসপাতালের ডাক্তাররা, এমনকি স্থানীয় হাতুড়েরাও কিছু বুঝতে পারছিল না। তখন এক সন্ধেবেলা হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে প্রফেসর দেখেন, তাঁর খানসামা এক সাধু’র সঙ্গে কথা বলছে। উনি এই সাধু বা তথাকথিত গুরু-টুরুদের দু’চোখে দেখতে পারতেন না। খানসামাকে উনি সেই রাতেই ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ঠগটা তোমাকে কী বলছিল?’

খানসামা কিন্তু-কিন্তু করে বলেছিল, ‘সাধু বলেছেন, এটা সাধারণ অসুখ বা ব্যাধি নয়। এক দুষ্ট প্রেত এক ব্যক্তির মৃতদেহকে আশ্রয় করে এইসব করছে। সেই মৃতদেহটি পুড়িয়ে দিতে পারলে প্রেতের উপদ্রব বন্ধ হবে।’

প্রফেসর এতে একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। কবর থেকে কারও মৃতদেহ খুঁড়ে বের করে সেটাকে পোড়াতে গেলে এলাকায় দাঙ্গা বেধে যাবে। উনি খানসামাকে শাসিয়ে দেন, ভবিষ্যতে ওই সাধুকে এলাকার চৌহদ্দিতে দেখা গেলে তিনি তাকে পুলিশে দেবেন।”

“তারপর?”

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন গটফ্রেড। তারপর, যেন কিছুটা অনিচ্ছাভরে বললেন, “কিছুদিন পর দেখা গেল, একটা বিশেষ কবর কে বা কারা রাতের অন্ধকারে খুঁড়ে দেহটা বের করেছে। সেটা কোথায় পোড়ানো হয়েছিল, কারা পুড়িয়েছিল— সে-সব প্রফেসর জানতে পারেননি। তবে তিনি নিজে রেকর্ড করেছিলেন, সবক’টি অসুস্থ শিশু তারপর সেরে উঠেছিল। নতুন করে আর কেউ অসুস্থও হয়নি!”

“তার মানে?” উত্তেজনায় আমি গটফ্রেডের হাত চেপে ধরলাম, “আপনি কী বলতে চাইছেন, ডক্টর?”

“আমি?” ঘুম ভেঙে ওঠার মতো করে বলে উঠলেন গটফ্রেড, “গপ্পো! গপ্পো বলছিলাম আমি আপনাকে। আমাকে বলেছিল এক বুড়ো। বোঝেনই তো, ডাক্তারদেরও তো গল্প বলতে আর শুনতে হয়। যা-ই হোক, আমরা তো হাঁটতে-হাঁটতে ‘একজন’ ছাড়িয়ে প্রায় হডসল-দের বাড়ির কাছে এসে পড়েছি। আপনি ফিরে যান। আমিও এগোই।”

সমুদ্রের তীর ধরে হেঁটে ‘একজন’-এ পৌঁছোলাম। এখন জানালার পাশে বসে এই ডায়েরি লিখছি। বৃষ্টি থেমে গেলেও বাইরে অন্ধকার আকাশ চিরে মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ ঝলসাচ্ছে। মনে হচ্ছে, প্রকৃতিও যেন দম বন্ধ করে কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করছে।

কী ঘটছে এই ঝিম-ধরা রাশওল্ড-এ?

২০ তারিখ

সকালে ব্রেকফাস্ট করার জন্য নীচে গিয়ে গটফ্রেডকেও পেয়ে গেলাম। ভদ্রলোক একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছেন। কী ব্যাপার জিজ্ঞেস করলাম।

“সুজি!” ক্লান্ত গলায় বললেন গটফ্রেড, “কাল শোয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই হডসল-রা আমাকে ডাকতে এল। সুজি বিছানা ছেড়ে নামতে গিয়ে পড়ে গেছিল। আমি গিয়ে দেখি, অবস্থা একেবারে শেষের কাছাকাছি। সারা রাত যমে-মানুষে টানাটানি করে মেয়েটাকে ঘুম পাড়িয়ে এসেছি। অজ্ঞান অবস্থাতেও মেয়েটা ক্রমাগত ছটফট করছিল। পরিষ্কার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন ওকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে। সেই আগের দুঃস্বপ্নই কি দেখছিল ও? জানি না। তবে আমি আর ঝুঁকি নেব না। সাউথওল্ডে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে দিয়েছি। আজ সন্ধের মধ্যেই ওরা সুজিকে নিয়ে যাবে।”

একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে এই ব্যাপারটা যে কতখানি হতাশাজনক, তা বুঝতে পারছিলাম। তাই আমি আর কিছু না বলে, মৃদু সহানুভূতি জানিয়ে উঠে পড়লাম।

ঘরে বসে আমার কিছু রাফ নোটকে গুছিয়ে একটা বইয়ের আকার দিতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কাজে মন বসল না। বুঝতে পারলাম, রাশওল্ড-এ যা ঘটছে তার সহজ, এমনকি প্যাঁচালো একটা ব্যাখ্যাও কেউ না দেওয়া অবধি শান্তি পাব না।

ঘর ছেড়ে সমুদ্রের তীরে হাঁটতে গেলাম। বেশ কিছুদূর এগোনোর পর শুনশান জেটি-র কাছে ক’জন জেলেকে বিষণ্ণ, হতাশ হয়ে বসে থাকতে দেখলাম। তাদের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলাম সুজি’র কথা।

“আমি জেথরো হডসল।” অত্যন্ত শক্তপোক্ত চেহারার এক প্রৌঢ় উঠে দাঁড়িয়ে, মাথার টুপি খুলে আমার হাত ঝাঁকাল। তারপর ভাঙা গলায় বলল, “সুজি ভালো নেই, মিস্টার পেইনেল। ডাক্তারবাবু যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। কিন্তু ও ভালো নেই। আমরা ওকে প্রায় বেঁধে না রাখলে ও এতক্ষণে এই বালিয়াড়ির কাছে চলে আসত। হয়তো ওখানেই ও…!”

জেথরো-র লম্বা-চওড়া শরীরটা থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। চুপ করে গেল ও। অস্বস্তিভরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম আমিও। তারপর বললাম, “ডক্টর গটফ্রেড বলছিলেন, সুজি নাকি কী-সব দুঃস্বপ্ন দেখছে। হয়তো সমুদ্রের ধারের এই হাওয়া কোনও কারণে ওর সহ্য হচ্ছে না। তাই ওকে বোধহয় স্যানাটোরিয়ামে নিয়ে যাওয়াই ভালো হবে।”

“ঠিক।” জেথরো উত্তেজিতভাবে বলে উঠল, “ডাক্তারবাবু একদম ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সমুদ্র এখনও অনেক পিছিয়ে আছে! সমুদ্রের ধার থেকে দূরে না নিয়ে গেলে ওকে বাঁচানো যাবে না। আপনি এখানে নতুন এসেছেন স্যার। আপনি হয়তো জানেন না। কিন্তু সমুদ্র পিছিয়ে গেলে রাশওল্ড, বিশেষত তার ছোটোরা বিপদে পড়ে। এটা আমরা অন্তত জানি।”

“হ্যাঁ, রেভারেন্ড ক্লেডন আমাকে আপনাদের এই বিশ্বাসের ব্যাপারটা বলেছেন।”

“বিশ্বাস!” জেথরো-র মুখে একটা মলিন হাসি দেখা দিল, “রেভারেন্ড ক্লেডন ভালো মানুষ। তবে উনি এসেক্স থেকে এসেছেন। এই এলাকার খবরাখবর উনি সেভাবে জানেন না, জানতে চানও না। কিন্তু আমাদের কাছে এটা শুধু কুসংস্কার বা বিশ্বাস নয়। আমরা জানি, এগুলো কেন হয়!”

কথাটার মধ্যে এমন একটা জোর ছিল যে আমি থমকে গেলাম। জেথরো-কে বললাম, “এই অসুস্থতার জন্য কি তাহলে বিশেষ কেউ দায়ী? আপনারা কেউ তাকে দেখেছেন?”

“আমিই দেখেছি।” জেথরো-র চোখ জ্বলে উঠল, “ভোর রাতে যখন সুজি ছটফট করছিল, তখন আমি বাইরে ছিলাম। তখনই দেখলাম, বাড়ির কাছের ওই বালিয়াড়ির ওপর একটা প্রকাণ্ড গিরগিটির মতো করে লেপ্টে আছে কেউ! সুজি বলছিল, ‘ওই খারাপ লোকটাকে সরিয়ে দাও! ও আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।’ আমি ক’জনকে নিয়ে বালিয়াড়ির দিকে এগোলাম। তখনই দেখলাম, পিছলে দূরে সরে গেল ও।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “কে ছিল সে?”

“রজার ডে লিল।”

মুহূর্তের জন্য আমার মনে হল, কোথায় যেন নামটা শুনেছি। তারপর মনে পড়ল, এই লোকটির কবরই সমুদ্রের তলা থেকে তুলে আনা হয়নি!

জেথরো বলে চলল, “ছোটোবেলা থেকে শুনে এসেছি, সমুদ্র পিছিয়ে গেলে ও উঠে আসে অনন্ত খিদে নিয়ে। কথাগুলোকে পাত্তা দিইনি এতদিন। কিন্তু এবার বুঝতে পারছি, কিছু একটা করতে হবে। নইলে এই অভিশাপের হাত থেকে শুধু সুজি কেন, রাশওল্ড-ই কোনওদিন নিস্তার পাবে না। তাই যা-করার আমরাই করব এবার।”

কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম লোকগুলোর দিকে। ভাবলাম, এরা সবাই পাগল হয়ে যায়নি তো? অথচ কাল রাতে গটফ্রেডের বলা ‘গপ্পো’, আর জেথরো-র কথার মধ্যে কোথায় যেন মিল পাচ্ছিলাম। জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, “কী করবেন আপনারা?”

“আজ রাতে আমরা সমুদ্রের ধারে থাকব।” শান্ত গলায় বলল জেথরো, “ভাটার সময় হলেই ও উঠে আসবে। আমরা জানি। আজ রাতেই ওর খেল খতম করব আমরা। তবে, যদি অভয় দেন, তাহলে একটা কথা বলি, মিস্টার পেইনেল।”

“নিশ্চয়। বলুন।”

“বাইরে থেকে ক’দিনের জন্য এসেও আপনি সুজি-র ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন। বুড়োর ভীমরতি হয়েছে ভাবলেও ধৈর্য ধরে আমার কথাগুলো শুনেছেন। কথাগুলো যে কল্পনা আর বাজে বকা নয়— এটা বিশ্বাস করার জন্য শোনা নয়, দেখাও জরুরি। তাই একটা কাজ দয়া করে করুন। আজ রাতে আপনিও আমাদের সঙ্গে থাকুন। থাকবেন, স্যার?”

হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। কতক্ষণ ওভাবে ছিলাম জানি না। তবে আগের ক’দিনের কথা, আর রাশওল্ড-এর ওই অদ্ভুত পরিবেশ নিশ্চয় আমার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। নইলে আমি কোনওমতেই ওই কথায় সায় দিতাম না। অথচ…

“আমি থাকব, মিস্টার হডসল।” ঢোঁক গিলে বলে উঠলাম, “আজ রাতে আমিও আপনাদের সঙ্গে থাকব।”

“বাঁচালেন স্যার।” আমার ডান হাতটা নিজের মুষ্টির মধ্যে নিয়ে ঝাঁকিয়ে, আবেগে কেঁপে ওঠা গলায় বলল জেথরো, “আমি ভেবেছিলাম, আপনি হয়তো রাগ করবেন। হয়তো ভাববেন, এই বুড়ো জেলে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। কিন্তু আপনি… হডসল পরিবার আপনার কাছে ঋণী হয়ে রইল। সূর্য ডোবার পরেই আপনি ঠিক এইখানে চলে আসবেন। ব্যস!”

এই কথোপকথনের পর আট ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। এবার আমি ‘একজন’ ছেড়ে বেরোব। রক্তে যেন মাখামাখি হয়ে আছে পশ্চিম আকাশ। জেটির কাছে যেতে-যেতে অন্ধকার হয়ে যাবে।

এখনও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না, আমি কী করতে যাচ্ছি। এ কি কোনও মধ্যযুগীয় রোমান্স? আমরা কি কোনও দানবকে বধ করতে চলেছি? পুরো ব্যাপারটাকে এক উদ্বিগ্ন, বয়স্ক মানুষের উত্তেজিত মস্তিষ্কের কল্পনা বলে উড়িয়েই দেওয়া যেত। কিন্তু জেথরো যখন বলছিল সে বালিয়াড়ির ওপর কী… কাকে দেখেছে, তখন কেমন যেন লাগছিল। আজ রাতের অভিযানের পর যা-ই হোক না কেন, অন্তত সেই অস্বস্তির হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাব।

হারানোর মধ্যে তো শুধু এক রাতের ঘুম! সে পরে পুষিয়ে নেব’খন।

২৩ তারিখ

তিন দিন কেটে গেছে। সেই রাতের কথাগুলো লেখার কোনও ইচ্ছেও ছিল না। কিন্তু গটফ্রেড বলেছেন, ওগুলো না লেখা অবধি আমি শান্তি পাব না। তাই, একরকম মরিয়া হয়ে আমি সেগুলো লিখতে বসেছি।

সেদিন সন্ধেবেলা ‘একজন’ থেকে বেরিয়ে জেটির দিকেই এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হল, রেভারেন্ড ক্লেডন সবকিছুকে যতই কুসংস্কার বলে মনে করেন, এই প্যারিশের লোকেদের নিয়ে উনি সত্যিই ভাবেন। তাই ওঁকে একবার এই অভিযানের কথা বলতে ক্ষতি কী? সেইমতো ভিকারেজে হাজির হলাম। তারপর এক কাপ চা হাতে নিয়ে ওঁকে আমাদের সান্ধ্য তথা নৈশ অভিযানের ব্যাপারটা গুছিয়ে বললাম।

“সময়!” পাইপে কামড় দিয়ে, তেতো গলায়, অথচ মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন ক্লেডন, “সময় বড়ো বলবান। আজ থেকে এক সপ্তাহ আগে কেউ যদি আমাকে বলত যে আমার বেশ ক’জন প্যারিশনার এইরকম একটা পরিকল্পনা নিয়ে সমুদ্রের তীরে সারারাত কাটাবে, আমি হইচই বাধিয়ে তাদের আটকাতাম। অথচ এই ক’দিনে আমিও কেমন যেন…! তবে আমাকে একটা কথা বলুন, পেইনেল।”

“কী?”

“আজ আপনারা যা করতে যাচ্ছেন, তাতে চার্চের অনুমোদন থাকার কোনও প্রশ্নই নেই।” ঠান্ডা গলায় বললেন ক্লেডন, “কিন্তু আমার প্যারিশনারদের এইরকম একটা কাজ করতে হচ্ছে— এটা থেকেই বোঝা যায় যে আমার কর্তব্য আমি ঠিকমতো করতে পারিনি। তাই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে একটা কাজ করতে হবে। আমিও আজ রাতে আপনাদের সঙ্গে থাকতে চাই। এতে কি জেথরো আর তার সঙ্গীরা আপত্তি জানাতে পারে?”

“প্রশ্নই ওঠে না।” আমি সোৎসাহে বললাম, “বরং আপনি ওদের সঙ্গে থাকলে ওরা খুশি হবে বলেই আমার ধারণা।”

গরম পোশাকের ওপর রেইনকোট চাপিয়ে, ঝড়েও জ্বলতে পারে এমন লণ্ঠন আর দূরবীন হাতে নিয়ে আমরা জেটির দিকে রওনা হলাম।

জেটির কাছে পৌঁছোতে-পৌঁছোতে অন্ধকার নেমে গেল। আকাশের গায়ে লেগে থাকা অতি সামান্য আলোতে দেখলাম, জনাদশেক মানুষ হাজির হয়েছে সেখানে। তাদের সবার হাতে লণ্ঠন। বেশ ক’জনের হাতে নৌকো বাঁধতে কাজে লাগে এমন হুকও রয়েছে। সেই ভিড়ের মধ্যে আরও একটি চেনামুখ দেখলাম।

“আপনাদেরও দলে টেনেছে এরা?” ঈষৎ হেসে বললেন গটফ্রেড, “আমার বুড়ো প্রফেসরের কথায় কিছু সারবত্তা ছিল তাহলে— কী বলেন, পেইনেল?”

জেলেরা মুখে কিছু বলেনি। তবে আমাদের উপস্থিতিতে তারা যে খুশি হয়েছে, এটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। প্রত্যেকটি জেলে, বিশেষত জেথরো এসে ক্লেডনের দু’হাত ধরে ঝাঁকিয়ে গেল। ভিকারের উপস্থিতি যে ওদের অনেকটা সাহস জুগিয়েছে— এ আর বলে দেওয়ার দরকার ছিল না।

“তাহলে জেথরো...” ক্লেডন মাথা দুলিয়ে বললেন, “আজকের অভিযানে তুমিই তো নেতা। বলে দাও, আমাদের কাকে কী করতে হবে।”

“অনেক-অনেক ধন্যবাদ, রেভারেন্ড।” মাথা ঝুঁকিয়ে বলল জেথরো, “আপাতত আমাদের হাতে কিছুটা সময় আছে। ভাটার টানে সমুদ্র আরও পিছিয়ে না যাওয়া অবধি কিছু হবে না। ও আমাদের বাড়ির দিকেই আসবে। তাই আমরা সে-দিকে গিয়েই অপেক্ষা করব।”

হডসলদের বাড়ি, বালিয়াড়ি, সমুদ্র— সবক’টাকেই দেখা যায় এমন একটা জায়গা বের করলাম আমরা। নুড়ি জমে জায়গাটা শুকনো আর শক্ত হয়ে রয়েছে। আমি আর গটফ্রেড ওখানেই দাঁড়ালাম। ক্লেডন জেথরো-র সঙ্গে সমুদ্রের আরেকটু কাছে একটা জায়গায় দাঁড়ালেন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নিজেদের বালি আর আশেপাশের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলল বাকিরাও।

“হ্যামারস্মিথে ইনটার্ন ছিলাম কিছুদিন।” পাইপ ধরিয়ে তাতে টান দিয়ে বললেন গটফ্রেড, “সেখানে একবার রাতে কিছু বদমায়েশকে ধরার জন্য ফাঁদ পেতে পাহারা দিয়েছিলাম। সে ঘটনাটাই শুনুন। সময়টা কাটবে।”

অন্ধকার একটা ভারী চাদরের মতো চেপে বসতে লাগল আমাদের ওপর। জলের মৃদু ছলছল আর হাওয়ার শনশন ছাড়া কোনও শব্দ রইল না চরাচরে। গটফ্রেডের গল্প ফুরিয়ে গেল। আমি নিশ্চিত যে শুধু আমার নয়, উপস্থিত সবারই কখনও-না-কখনও মনে হয়েছিল যে এই পুরো ব্যাপারটাই পণ্ডশ্রম। কিন্তু জেথরো হডসলের নড়াচড়া, মৃদু কথা আমাদের জায়গামতো স্থির রেখেছিল। আধঘণ্টা কেটে গেল এ-ভাবেই।

“হুঁশিয়ার!” হঠাৎ জেথরো হিসহিস করে উঠল, “ভাটার টানে জল একদম নেমে গেছে। চোখ-কান খোলা রেখো, ভাইসব।”

আমাদের হাতে কয়েকটা লণ্ঠন টিমটিম করে জ্বলছিল। কিন্তু সামনের অন্ধকারের মধ্যে নজর চলছে না। কান পেতে কোনও শব্দ হচ্ছে কি না শোনার চেষ্টা করলাম। কিন্তু নিজের হৃৎপিণ্ডই এমন আওয়াজ তুলল যে তার পাশে বাইরের সব শব্দ চাপা পড়ে গেল।

একসময় শুনলাম, নিচু গলায় জেথরো বিড়বিড় করছে। শুনতে পেলাম ও বলছে, “এইবার সে জাগছে। বালি আর কাদার তলায় নড়ছে সে। এইবার সে উঠল। জল-কাদা ঠেলে, বালির মধ্য দিয়ে ও আসছে শুকনো ডাঙায়, খোলা আকাশের নীচে। এত-এতদিন ধরে আমরা ওর ওপর দিয়েই নৌকো চালিয়েছি। এত-এতদিন আমরা ওর সামনে থেকেই মাছ ধরেছি। এবার ওকে ধরব, ভাইসব! এবার ও চিরতরে ঘুমোবে। ঢিলে দিলে চলবে না আর। হুঁশিয়ার!”

কথাগুলো আমার চোখের সামনে যেন পর্দায় দৃশ্যের পর দৃশ্য ফুটিয়ে তুলল। আমি যেন সত্যিই দেখতে পেলাম, জলের নীচে, বালি আর কাদার নীচ থেকে একটা প্রকাণ্ড গিরগিটির মতো করে এগিয়ে আসছে কেউ। একবার মনে হল, ক্লেডনও কি এইরকম কিছুই কল্পনা করছেন? আরও কিছুক্ষণ অসহ্য উৎকণ্ঠায় রইলাম আমরা। তারপর চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল জেথরো-র নিচু গলা, “লণ্ঠন নেভান!”

জ্বলন্ত লণ্ঠনগুলো দ্রুত নিভে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, আমি বোধহয় অন্ধই হয়ে গেছি। তারপর জেথরো-র ফিসফিস কানে এসে ধাক্কা মারল, “সামনে— একেবারে সোজাসুজি।”

প্রাণপণে তাকিয়েও কিচ্ছু দেখতে পেলাম না আমি। তবে শুনলাম জেথরো বলছে, “আমি ওর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। চটপট! আমার সঙ্গে এসো তো ক’জন।”

আমি, গটফ্রেড আর ক্লেডন অন্ধকারের মধ্যেও মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। জেথরো-র নিচু গলা আবার হাওয়ায় ভেসে এল, “আপনারা এখানেই থাকুন, স্যারেরা। এটা রাশওল্ড-এর ব্যাপার। আমাদের বুঝে নিতে দিন। দরকার পড়লে আপনাদের ডাকব। ততক্ষণ অবধি অপেক্ষা করুন। বাকিরা, বোট-হুক আর লণ্ঠন নিয়ে আমার সঙ্গে এসো। খুব সাবধান! একটা শব্দও যেন না হয়।”

বালিয়াড়ির মধ্য থেকে কয়েকটা নুড়ি গড়িয়ে পড়া ছাড়া কোনও শব্দ হল না। তবে বুঝতে পারলাম, আমাদের আশপাশ থেকে প্রত্যেকে এগিয়ে গেছে। তাদের চলার গতি, আর তার আগে যে-ভাবে সবাই দাঁড়িয়েছিল— এই দুইয়ের থেকে জেথরো-র পরিকল্পনা কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছিলাম। ও একটা অর্ধবৃত্তের মতো করে জায়গাটা ঘিরে ফেলতে চাইছে।

তারপর সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে এল একটা শব্দ! ক্ষীণ, চুপসে যাওয়া ফুসফুস নিয়ে শ্বাস টানার মতো শব্দটা পেলাম আমি। তারই সঙ্গে এল একটা বীভৎস গন্ধ! অনেকদিন ধরে জলের নীচে থেকে পচে যাওয়া মাছ আর ঝাঁঝির সঙ্গে তার তুলনা চলে। কিন্তু মনে হচ্ছিল, সে গন্ধ যেন সত্যিই পাতাল থেকে উঠে এসেছে।

একটা আগুনের শিখা দেখলাম দূরে, কাদামাটির অংশে। তারই সঙ্গে গর্জে উঠল জেথরো, “আলো জ্বালাও সব্বাই! এক্ষুনি!”

বিদ্যুদ্বেগে জ্বলে উঠল আরও বেশ ক’টা লণ্ঠন আর মশাল।

“কী হচ্ছে ওখানে?” রুদ্ধকণ্ঠে বলে উঠলেন গটফ্রেড, “এই অন্ধকার, ওই আগুন— এ আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমি ওদিকে যাচ্ছি। আপনারা কী করবেন?”

গটফ্রেড হনহন করে এগোলেন আগুনের দিকে।

আমি নিজের হাতের লণ্ঠনটা জ্বালালাম। সেই আলোয় দেখলাম, ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে আছেন রেভারেন্ড ক্লেডন। না, ঠিক দাঁড়িয়ে নয়। ভয়ে আর উত্তেজনায় মানুষটি থরথর করে কাঁপছিলেন। ওঁকে নিয়ে টানাটানি করলাম না। দূরবীন আর লণ্ঠন হাতে আমিও গটফ্রেডের পেছনে ছুটলাম।

বালি আর নুড়িতে হড়কে যাচ্ছিলাম বারবার। তার মধ্যেও কোনওক্রমে চোখে দূরবীন লাগিয়ে দেখছিলাম, কী হচ্ছে সামনের বালিয়াড়িতে। আগুনের কম্পমান শিখা, আমার নিজের নড়বড়ে হাত— এর মধ্যেও আমার চোখে পড়ল দৃশ্যগুলো।

Ekjon 2

গোল হয়ে একটা জায়গা ঘিরে দাঁড়িয়েছে জেলেরা। তাদের প্রায় সবার হাতে জ্বলছে মশাল আর লণ্ঠন। বাকিরা তাদের হাতের হুক দিয়ে আছড়ে-আছড়ে মারছে একটা কিছুকে। মনে হল, সেটা উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, কিন্তু হুকের আঘাতে পারছে না।

প্রায় ফিটত্রিশেক দূরে এসে আমি গটফ্রেডের গায়ে প্রায় ধাক্কা দিয়ে তবে থামতে পারলাম। গটফ্রেড আমার দিকে ঘুরলেন। লণ্ঠনের আলোতেও দেখতে পাচ্ছিলাম, মানুষটির চোখজোড়া বিস্ফারিত হয়ে প্রায় বেরিয়ে এসেছে।

“ওই যে!” আঙুল তুলে দেখালেন গটফ্রেড।

দূরবীনটা হঠাৎ ফোকাসে এল। একেবারে দিনের আলোয়, হাতকয়েক দূর থেকে দেখার মতো করে আমি দেখলাম… ওটাকে।

গিরগিটি নয়, বরং একটা মস্ত বড়ো জোঁকের মতো কিলবিল করে বালি আর কাদার ওপর আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছিল ওটা। তবে তার চেহারার মধ্যে একটা মানুষের আদল ছিল। তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করছিল ওটা। কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিল কি? জানি না। তবে এটুকু জানি যে লণ্ঠনের আলোয় আমি ওটার চোখজোড়া দেখেছিলাম। সেগুলো একদম মানুষের মতো! আর… সেগুলোর পেছনে যেন সবুজ আগুনের মতো কিছু জ্বলছিল!

ওটার ওপর লণ্ঠন থেকে তেল ছড়িয়ে দিচ্ছিল জেথরো। তারপর ও লাফিয়ে দূরে সরে গেল। একসঙ্গে নীচে নেমে এল সবক’টা মশাল।

একটা তীব্র আর্তনাদ শুনলাম আমি। মানুষের নয় সে কণ্ঠ, আবার জন্তুরও নয়। আর কিছু শুনতে পেলাম না। আমার চোখের সামনে হঠাৎই অন্ধকার নেমে এল।

গটফ্রেড আমাকে ‘একজন’-এ পৌঁছে দিয়েছিলেন। রেভারেন্ড সঙ্গে ছিলেন অনেকক্ষণ অবধি। শেষ রাতে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল জেথরো। গম্ভীর গলায় ও বলেছিল, “ও শেষ, স্যার। সহজে মরেনি। তবে যতক্ষণ না ও পুড়েছে, তারপর সেই ছাই বালি আর কাদার সঙ্গে একেবারে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, ততক্ষণ অবধি আমরা ওকে ছাড়িনি। আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ রইলাম, মিস্টার পেইনেল।”

এই তিনদিনে সুজি সুস্থ হয়ে উঠেছে। আমি… এমনিতে ঠিক থাকলেও আমি বোধহয় আগের মতো নেই। হতেও পারব না। আপাতত রাশওল্ড ছাড়তে হবে। ‘একজন’-এর সান্নিধ্য আর নিতে পারছি না আমি!

শেষাংশ

ডায়েরিটা পড়ার পর উইলটনকে ফোনে ধরলাম।

“কী বুঝলেন?” উইলটনের গলায় কৌতুক আর কৌতূহল প্রায় সমান মাপেই মিশে ছিল।

“এ-জিনিস বেচা যাবে না।” সংক্ষেপে বললাম, “আচ্ছা, আপনি তো ভদ্রলোকের বাকি ডায়েরি আর নোটবইগুলো পড়েছিলেন? উনি কি এই নিয়ে আর কিছু লিখেছিলেন কোথাও?”

“না। তবে… ওই ‘একজন’ বোধহয় ওঁকে ছাড়েনি।”

“মানে?”

“আপনি এই একটা ডায়েরিতেই হয়তো দেখেছেন, ভদ্রলোক ঘুমোতে ভারি ভালোবাসতেন। আগের রাতে ওঁর ঘুমটা কতটা জমাট হয়েছে— সেটা লিখেই উনি ডায়েরি শুরু করতেন। ইস্ট অ্যাংলিয়া থেকে ফিরে আসার পর ভদ্রলোকের আর কোনও এন্ট্রিতে আমি ঘুমের কথা পাইনি। কোত্থাও না!”

_

মূল কাহিনি: ওয়ান ওভার

লেখক: স্টিভ ডাফি

প্রথম প্রকাশ: গোস্টস্‌ অ্যান্ড স্কলার্স পত্রিকা

রক্তিম

Roktim

সূর্য ডুবছে। লাল রঙে ভেসে যাচ্ছে আমার শহর, আমার দুনিয়া।

বুড়োকে আমি আগে কখনও দেখিনি। লন্ডনে বোমা পড়া শুরু হওয়ার পরেই লোকটাকে তড়িঘড়ি এদেশে নিয়ে আসা হয়েছে। ওর কিছু হলে নাকি লোকের মনোবল একেবারে ভেঙে পড়বে! তাই প্রথমে সাবমেরিনে চাপিয়ে নিউ ইয়র্ক, তারপর ট্রেনে তুলে লস এঞ্জেলস। খবর পেয়েছিলাম, সান্তা মোনিকা বুলেভার্ডের কাছে একটা বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই হয়েছে বুড়োর। বাড়িটা তার বাসিন্দাদের মতোই ধূসর আর জীর্ণ। সেখানে পৌঁছে নিজের ব্যাজ দেখালাম। কাজ নিয়েই এসেছি বলা সত্ত্বেও নার্স অনেকক্ষণ ঝোলাল। অবশেষে একটা টিমটিমে আলোজ্বলা ঘরের সামনে পৌঁছোলাম। নার্স দরজায় নক্‌ করল।

ভেতর থেকে খসখসে গলায় প্রশ্ন এল, “কী চাই?”

“আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে চান।” নার্স বলল।

“চলে যেতে বলো।”

“উনি সবসময় এটাই বলেন।” নার্সের মুখে একটা বাঁকা হাসি ফুটল, “আপনি ভেতরে যান।”

আমি ঘরে ঢুকলাম।

ঘরটা বড়ো। পুরোনো জামাকাপড়, ওষুধ আর অসুস্থতার নিজস্ব গন্ধ ছড়িয়ে আছে তার আসবাব, জীর্ণ পর্দা, খোলা বই, মেঝে জুড়ে ছড়ানো ‘টাইমস্‌’-এ। ডেস্কে একটা ফটোফ্রেম থেকে আমার দিকে চেয়ে আছেন এক শক্ত চেহারা, মোটা গোঁফ, আর নরম চোখের ভদ্রলোক। সবকিছু ভাসিয়ে দিচ্ছে অস্তায়মান সূর্যের লাল ঢেউ।

বুড়ো একটা হুইলচেয়ারে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

বেঢপ ড্রেসিং গাউনের মধ্যে চাপা পড়া শুকনো লম্বা শরীর, চওড়া কপাল, বয়সে শুকিয়ে যাওয়া পাতলা ঠোঁট, ধূসর চুল, এ-সব ছাপিয়ে নজর কাড়ছে টিকালো নাকটা। লোকে বলে ওর বয়স নাকি একশো বছরেরও বেশি। হতে পারে। তবে লোকটার মগজ এখনও...

“তুমি সিগারেট খাও?”

আমি পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে এগিয়ে ধরলাম। বুড়ো একটা সিগারেট বের করে প্যাকেটটা অন্যমনস্কভাবে গাউনের পকেটে ভরল। তারপর সিগারেট ধরিয়ে, তাতে একটা বড়ো টান দিয়ে প্রচুর কাশল। কাশি থামলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ধন্যবাদ। এবার যাও।”

বুড়ো আবার বাইরে তাকিয়ে আকাশ দেখার তাল করছিল। আমি একটু এগিয়ে বললাম, “এক মিনিট। আপনার সঙ্গে আমার একটা দরকার আছে।”

“ম্যাজিক দেখবে?” ছাদের দিকে একটা ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বলল বুড়ো, “একটা সিগারেট খাইয়ে আমার ম্যাজিক দেখা যায় না ছোকরা।”

“আপনি পুরো প্যাকেটটা রেখে দিয়েছেন।”

বুড়ো হেসে আমার দিকে তাকাল। তবে ওইরকম হেসে দুধের দিকে তাকালে ইন্সট্যান্ট দই পাওয়া যাবে। গাউন খামচে রিবনে বাঁধা একটা চশমা বের করে নিজের নাকের ওপর চড়াল লোকটা। তারপর আমার আপাদমস্তক দেখল। চশমার পেছনে ওর চোখগুলো গাড়ির হেডলাইটের মতো দেখাল।

“তুমি একজন গোয়েন্দা।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলা শুরু করল বুড়ো।

“কোনও একটা বড়ো সংস্থার হয়ে কাজ কর তুমি, শ্যান্ডলার বা কন্টিনেন্টাল। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে তুমি ধূমপান কর। আদতে তুমি আমেরিকান মিড-ওয়েস্টের বাসিন্দা, নেব্রাস্কা বা ওইরকম কোনও জায়গা। তুমি অবিবাহিত, তবে এই মুহূর্তে কোনও মহিলার সঙ্গে কোনও সম্পর্কে জড়িত নও। বাড়ির খাবার নয়, বরং রাস্তার অখাদ্য-কুখাদ্যই তোমার চলে। অনেকদিন তুমি নতুন একসেট জামাকাপড় কেনোনি। তোমার সঙ্গে একটা রিভলভার থাকে। সম্প্রতি কারও সঙ্গে তোমার মারামারি হয়েছে।”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে পয়সা উশুল?” সেই বিষাক্ত হাসিটা আবার উড়ে এল আমার দিকে। সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে বুড়ো পেছন ফিরল।

“আমার সাহায্য দরকার।”

“কেউ কি তোমাকে বলেনি যে আমি অবসর নিয়েছি? আমার এ-সবে আর কোনও আগ্রহ নেই। তুমি যাও।”

“আমি গতকাল একজনকে গুলি করেছি।”

“সিনেমা দেখে মনে হয়, তোমার পেশার লোকজনকে প্রায়ই এসব করতে হয়।”

“আমি তিনটে গুলি করেছিলাম।”

“আমাদের ঘরের দেওয়ালে গুলি করে রানির নামের আদ্যক্ষর খোদাই করেছিলাম একবার। চেষ্টা চালিয়ে যাও। তুমিও পারবে।”

“আমি লোকটার বুকে দু’বার, আর মাথায় একবার গুলি করলাম। তারপর লোকটা উঠে দাঁড়াল, আর হেঁটে চলে গেল।”

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আস্তে-আস্তে হুইলচেয়ারটা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল বুড়ো। ডুবতে থাকা সূর্য ওর চোখে লাল রঙ ধরিয়েছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লোকটা বলল, “বোসো।”

দেওয়ালের ধারের চেয়ারে একটা বেহালা রাখা ছিল। সেটাকে একপাশে সরিয়ে আমি বুড়োর মুখোমুখি বসলাম। খসখসে, কিন্তু স্থির, শান্ত গলায় নির্দেশ এল, “বলো।”

“পাঁচ দিন আগে এক মহিলা আমার অফিসে এলেন। তন্বী, দীর্ঘাঙ্গী, চুল সোনালি, তবে বোধহয় রঙ করা। চোখ ফোলা। দৃষ্টির মধ্যে একটা হারিয়ে যাওয়া ভাব আছে। আমি মহিলাকে উলটো দিকের চেয়ারে বসিয়ে একটা ড্রিংক অফার করলাম। মহিলা যখন হাত নাড়ছিলেন তখন আলোটা তাঁর হাতের আংটিগুলোয় ঝিলমিল করছিল। মহিলা...”

“তুমি কি এভাবেই কথা বল?” বুড়ো খিঁচিয়ে উঠল, “আমি ভেবেছিলাম, তোমাদের রহস্য গল্পের লেখকেরা এগুলো বানায়। দয়া করে কাব্য কোরো না। আমার ধৈর্য আর সময়, দুটোই কম।”

“মহিলা বললেন, তাঁর স্বামী নিখোঁজ।” আমি সংক্ষেপে বললাম, “ভদ্রলোক ব্যবসা করেন। ইউরোপ থেকে নানা জিনিস আমদানি করে এখানে সাপ্লাই করার ব্যাবসা। যুদ্ধের ফলে ব্যবসা আগেই ঝাড় খেয়েছিল। ইদানীং নাকি অবস্থা একটু ভালো হয়েছে।”

“এই মহিলা-র কোনও নাম আছে? বা তাঁর স্বামীর?”

“লান্ডো। মহিলা মোনিকা লান্ডো, আর তাঁর স্বামী মাইলস্‌ লান্ডো। লান্ডো কনসাইনমেন্টস ত্রিশের দশকে কারবার শুরু করে। ব্যবসা ভালোই চলছিল। মেরিনা ডেল রে-তে বাড়ি বানিয়ে সেখানেই থাকতেন ওঁরা।”

“নিখোঁজ হওয়ার আগে-পরে কী হয়েছিল?”

“কিছুই না। মাইলস্‌ বাড়ি ফেরেননি।”

“তুমি ভদ্রলোকের অফিস নিশ্চয় তল্লাশি করেছিলে?”

“করেছিলাম। ভিভিকা ডকস্‌-এর কাছে লান্ডো কনসাইনমেন্টস-এর সাজানো-গোছানো অফিস। থেরেসা ভিনসেনজো নামের এক বয়স্ক মহিলা ছাড়া সব কর্মচারীই ফ্রিলান্স বা পার্টটাইমার। ডায়েরি থেকে শুরু করে সব কাগজ ঘাঁটলাম। কোনও মহিলার নাম নেই। তেমন কোনও লট্‌ঘট্‌ আছে বলেও মনে হল না।”

“লট্‌ঘট্‌?”

“কিছু মনে করবেন না। আসলে মাইলস্‌-এর বয়সে পুরুষদের একটু চরিত্রদোষ দেখা যায়। মোনিকা রূপসী। তবু এই বয়সে একটু... অন্যরকম স্বাদ অনেকেই খোঁজে।”

“বুঝলাম। তারপর?”

“পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সের কোনও পুরুষ যখন নিখোঁজ হয় তখন তার তিনটে কারণ থাকতে পারে। এক, কোনও মহিলার সঙ্গে তার একটা ‘কেস্‌’ হয়েছে। দুই, মদ বা জুয়ার চক্করে সে বিপদে পড়েছে। তিন, তার কোনও দুর্ঘটনা হয়েছে যার খবর এখনও কেউ পায়নি।”

“অবিশ্বাস্য!” আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বলল বুড়ো, “খুব অল্প করে মাথা খাটিয়েও আমি শ’খানেক কারণ বলতে পারতাম। যাইহোক, তুমি নিশ্চয় নিজের মতো করে খোঁজাখুঁজি করেছিলে।”

“অবশ্যই। কিন্তু কিচ্ছু পাইনি। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা হয়নি। অফিসে লুকোনো কোনও মাদকদ্রব্য পাইনি। ভিনসেনজো বলেন, তেমন কোনও সন্দেহজনক ফোনও আসেনি। আমি তো ওখান থেকে চার ব্লক পরের বাড়িটাতেও গেছিলাম যেখানে... মহিলাঘটিত ব্যবসা হয়। কিন্তু তারাও মাইলস্‌-কে চেনে না দেখলাম। যে-ক’টা সম্ভব হাসপাতালে খুঁজলাম, কোথাও ভর্তি হননি ভদ্রলোক। মর্গেও লোকটার লাশ পাইনি। আমি পুলিশের কাছেও গেছিলাম, মাইলস্‌-এর গাড়িটার খোঁজে।”

“গাড়ি? মাইলস্‌ কি গাড়ি চালিয়ে যাতায়াত করতেন?”

“হ্যাঁ। কালো রঙের সেডান। কিন্তু ওটাও কোথাও পাওয়া যায়নি।”

“তারপর?”

“আমি একটু চিন্তায় পড়লাম। কোথাও এমন কিচ্ছু পাচ্ছিলাম না যা থেকে মনে হয় লোকটা স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নিখোঁজ হয়েছে। আমি ভাবছিলাম, মহিলা নিজেই তাঁর স্বামীকে মেরে লাশ গায়েব করে দেননি তো?”

“স্বামীকে খুঁজে না পেলেই ভাবতে হবে যে তার স্ত্রী তাকে মেরেছে?” চোখ কপালে তুলল বুড়ো। “এই লাইনে এগিয়ে কিছু পেলে?”

“নাহ্‌।” আমি বললাম, “তাই আমি এটাই ভাবতে বাধ্য হলাম যে মাইলস্‌-এর ব্যবসার সঙ্গে এর কোনও যোগাযোগ থাকতে পারে।”

“যাক।” বুড়ো যে স্বস্তি পেয়েছে স্পষ্ট হল, “তুমি মগজটা ব্যবহার কর তাহলে। কিছু জানতে পারলে?”

“যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই লান্ডো কনসাইনমেন্টস ধুঁকছিল। ইউরোপ থেকে ওরা কিছু পাচ্ছিল না। এশিয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। কানাডা আর মেক্সিকো ছাড়া আর বিশেষ কোথাও ওর ব্যবসা করার রাস্তাই ছিল না। তবে চার মাস আগে একটা অন্যরকম কাজ এসেছিল।”

“অন্যরকম মানে?”

“এক নতুন ক্লায়েন্ট। তার প্রয়োজনটাও অন্যদের থেকে আলাদা। রোমানিয়া থেকে পঞ্চাশটা বাক্স নিয়ে আসতে হবে। তারপর থেকেই লান্ডো কনসাইনমেন্টস আবার ইউরোপ থেকে কাজ পেতে শুরু করে। আমি ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, ঠিক ওই সময়টাতেই রোমানিয়ায় ক্ষমতা বদল হয়েছিল। ওরা অক্ষশক্তির বদলে মিত্রশক্তিতে যোগ দিয়েছিল। তারপরেই এই পঞ্চাশটা বাক্স সরানোর কাজ পায় লান্ডো। কাগজপত্র সব ঠিকই ছিল, কিন্তু আমার কেমন যেন লাগছিল। সাড়ে ছ’ফিট লম্বা, তিন ফুট চওড়া, তিন ফুট গভীর পঞ্চাশটা বাক্স। আমি... আপনার আবার কী হল?”

উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্নটা করার কারণ ছিল। আমার শেষদিকের কথাগুলো শোনার সময় বুড়োর মুখ যেভাবে বেঁকে গেছিল, মনে হচ্ছিল যেন আমি ওর গায়ে একটা মাকড়সা ছেড়ে দেওয়ার তাল করছি।

“কিছু না।” নিজের মুখটা বেশ কষ্ট করে স্বাভাবিক করল বুড়ো, “এক পুরোনো আলাপির কথা মনে পড়ে গেল। যাকগে, তুমি বলো।”

“আমি ম্যানিফেস্ট দেখলাম। বাক্সগুলো মঙ্গলবার, ৩০শে এপ্রিল এসে পৌঁছেছে।”

“ওয়ালপার্গিস নাইট।” ফিসফিস করল বুড়ো।

“সেদিনের পর মোনিকা লান্ডো তাঁর স্বামীকে আর দেখেননি।”

“তারপর?”

“নানা জায়গা ঘুরে আমি আবার লান্ডো কনসাইনমেন্টস-এ ফিরে এলাম। ভিনসেনজো চলে যাওয়ার পর আমি একাই অফিসে বসে রেকর্ড ঘাঁটছিলাম। ক্লান্ত হয়ে টেবিলে পা তুলে, চেয়ারটা পেছনে হেলিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়েছিলাম। গরম আর দমবন্ধ পরিবেশ। তাতেও দেখছিলাম, উলটো ফুটপাথের বেরয়েল ক্লাবের নিয়ন আলোটা জ্বলছে আর নিভছে। তার...”

সরু হাতটা দুম্‌ করে টেবিলে নামিয়ে আনল বুড়ো। তারপর দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, “দেওয়ালে আছড়ে পড়া নিয়নের আলো একটা বিচিত্র নকশা তৈরি করছিল। দূরে কোথাও স্যাক্সোফোনের বিষণ্ণ সুর বাতাসে গুমরে উঠছিল। ... আমিও এ-সব পড়েছি ছোকরা। দয়া করে আসল কথায় এসো!”

“আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম, ঘরে অন্য কেউ রয়েছে। মুখ তুলে দেখলাম, মাইলস্‌ লান্ডো আমার সামনে, দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। সারাদিন ধরে ওর ফটো নিয়ে সারা শহরে ঘুরেছি আমি, তাই ভুল হওয়ার প্রশ্নই ছিল না। লম্বা, একসময়ের সোনালি চুল এখন ধূসর দেখাচ্ছে। ভারী মুখ, তবে মোটা নয়। নিখোঁজ হওয়ার সময় যে কালো স্যুটটা পরনে ছিল, সেটাই পরা, তবে তাতে ধুলো-কাদা লেগেছে।

আমি উঠে মাইলস্‌-এর দিকে এগোলাম। ওকে কয়েকটা প্রশ্ন করে ওর বউয়ের কাছে ফেরত পাঠানো আর নিজের ফি কালেক্ট করা, এ-ছাড়া আমার মাথায় কিচ্ছু ছিল না। কিন্তু মাইলস্‌ একটা হিংস্র জানোয়ারের মতো মুখভঙ্গি করে আমার দিকে তেড়ে এল। তারপর আমার কবজি ধরে টেনে দেওয়ালের দিকে স্রেফ ছুড়ে দিল! আমি কোনওক্রমে উঠে দাঁড়াচ্ছিলাম, তখন ও আবার আমার দিকে তেড়ে এল। লোকটার চোখগুলো লাল আগুনের মতো ধক্‌ধক্‌ করছিল! আর ওর মুখ থেকে বেরোনো গন্ধ! চিড়িয়াখানায় মাংসাশী প্রাণীর খাঁচা থেকেই শুধু আমি ও-রকম পচা মাংসের গন্ধ পেয়েছি। মাইলস্‌ আমার কলারের দিকে হাত বাড়াল, কিন্তু আমি বুঝে গেছিলাম, মিষ্টি কথা শোনার লোক এ নয়। ওর গলার নীচে আমি যে ঘুসিটা মারলাম সেটা কোনও পালোয়ানকেও শুইয়ে দিত। কিন্তু ওর কিস্যু হল না।

মাইলস্‌ পোকা তাড়ানোর মতো করে এক হাতে আমাকে ঝটকা মারল। মাথা বাঁচাতে পারলেও আমার কাঁধে হাতটা এসে লাগল। তাতেই আমি ঠিকরে টেবিলের ওপাশে, চেয়ারটার ওপর এসে পড়লাম। তাতে একটা সুবিধে হল অবশ্য। চেয়ারটা পিছিয়ে দেওয়ালের দিকে সরে যাওয়ায় আমি ওর থেকে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে রিভলভারটা বের করার সুযোগ পেলাম। আমি ওকে নিশানায় এনে বললাম, শান্তভাবে হাত দুটো মাথার ওপরে তুলতে।

Roktim 2

লোকটা আমার কথা শোনেনি। বরং ও একটা... গর্জন করল। হ্যাঁ, সিংহ বা বাঘের নীচু, ক্ষুধার্ত গর্জন ছাড়া আর কিছুর সঙ্গে ওই আওয়াজের তুলনা করা যাবে না। মাইলস্‌-এর দাঁতগুলো বিশাল বড়ো দেখাচ্ছিল। আর চোখজোড়া দেখে মনে হচ্ছিল, যেন দু’টুকরো কয়লা জ্বলছে চোখের কোটরে। আমি সহজে ভয় পাওয়ার লোক নই, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার মনে হল, আমার ভেতরটা যেন গলে যাচ্ছে। আমার মাথা কাজ করছিল না। নিশানা স্থির করে আমি গুলি চালালাম।”

বুড়ো কোনও কথা বলেনি, শুধু শূন্যে তাকিয়ে রয়েছে। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার শুরু করলাম।

“প্রথম গুলিটা লাগল বুকের ঠিক মাঝখানে, চিবুক থেকে আট ইঞ্চি মতো নীচে। সাদা শার্টে একটা কালো গর্ত হয়ে গেল, কিন্তু কোনও রক্ত বেরোল না! মাইলস্‌ নিজেও নীচু হয়ে গর্তটা দেখছিল। ওখান থেকে ধোঁয়ার মতো কিছু বেরোচ্ছিল বলে মনে হল। আমি আবার ট্রিগার টিপলাম। দু’নম্বর গুলিটা যেখানে গর্ত বানাল তার ঠিক নীচেই হৃৎপিণ্ড থাকার কথা। এবারও রক্ত বেরোল না। আমি আর ঝুঁকি নিলাম না। দু’হাতে রিভলভার ধরে মাইলস্‌-এর মাথায় গুলি করলাম।

গুলির আঘাতে মাইলস্‌ পেছনে, দেওয়ালে ছিটকে পড়ল। আমি ঘরের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম, ওর মাথা ফাঁক হয়ে ভেতরের... জিনিসপত্র বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু এক ফোঁটাও রক্ত বেরোয়নি মাথা থেকে! ও গর্জন করে আবার আমার দিকে এগিয়ে এল। আমি বেশ বুঝতে পারলাম, আমার গল্প এখানেই শেষ। কিন্তু ভাগ্য ভালো বলতে হবে, ঠিক তখনই সাইরেনের শব্দ ভেসে এল নীচ থেকে। বেরয়েল ক্লাবের কেউ, বা কোনও নিরাপত্তা রক্ষী নিশ্চয় গুলির আওয়াজ পেয়ে পুলিশে খবর দিয়েছিল।

মাইলস্‌ আমার কাছে, খুব কাছে এসে দাঁড়াল। আমি ওর মুখ থেকে পচা মাংসের সেই অসহ্য দুর্গন্ধটা আবার পেলাম। ওই বিশাল দাঁতগুলো বের করে হাসল লোকটা। আঙুল নেড়ে আমাকে শাসন করল, যেমনটা লোকে দুষ্টু ছেলেদের করে। তারপর ঘর থেকে হেঁটে বেরিয়ে গেল।

পুলিশকে ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো অবস্থা আমার ছিল না। তাই আমি চুপচাপ বেরিয়ে, ঘরের দরজা বন্ধ করে বাড়ির পেছনের গলি দিয়ে কেটে পড়লাম। আজ সারাদিন আমি ভেবেছি, ঘটনাটার কী ব্যাখ্যা হয়, বা কার কাছে এটার মানে বোঝার জন্য সাহায্য চাওয়া যায়। আপনি ছাড়া কাউকে পাইনি।”

বুড়ো চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। তারপর ডেস্কে রাখা ফটোফ্রেমটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওইসব রঙ-চড়ানো গপ্পোগুলোয় ও যাই লিখুক না কেন, আমি কিন্তু ওকে জন বলেই ডাকতাম।”

“আমাকে কিছু বললেন?”

“না।” ঘুম থেকে ওঠার মতো মাথা তুলল বুড়ো, “অনেকদিন বাঁচলে স্মৃতির বোঝা এত বেশি হয়ে যায়... যাকগে, তোমার এই ‘অভিজ্ঞতা’ ছাড়া আমাদের হাতে কাজে নামার মতো আর কিছু আছে?”

“হ্যাঁ।” আমি পকেট হাতড়ে লেজারের কয়েকটা ছেঁড়া পাতা বের করে এগিয়ে দিই, “বাক্সগুলো এজকম্ব-এ পাঠানো হয়েছিল। ওখানে সম্প্রতি একটা পুরোনো বাড়ির দখল নিয়েছে লান্ডো কনসাইনমেন্টস। সচরাচর ওরা বাড়ি ভাড়া নেয় না, এমনকি গুদাম হিসেবেও। সে-জন্যই এটা আমার চোখে পড়েছিল।”

“তোমার সঙ্গে গাড়ি আছে নিশ্চয়? আমার কোট আর টুপিটা দাও। সময় নষ্ট করা যাবে না।”

“মানে? আপনি বেরোবেন? কিন্তু আপনি তো...”

“আমি হাঁটতে পারি। তবে ধীরে। এখন আমাকে ঝটপট তৈরি হতে সাহায্য করো।”

ব্যাপারটা সহজ ছিল না। বুড়ো কতটা টানাহ্যাঁচড়া নিতে পারবে জানি না বলে খুব সাবধানে সব করতে হচ্ছিল। প্রথমে তার পুরোনো, প্রায় গায়ের সঙ্গে লেপটে যাওয়া পোশাকটা ছাড়াতে হল। তারপর মে মাসে ক্যালিফর্নিয়ার এই গরমেও লোকটা একটা ট্যুইড স্যুট, ভেস্ট, এমনকি একটা বহু পুরোনো গ্রেটকোট চাপাল। হুইস্কি-ভর্তি একটা ফ্লাস্ক কোটের ভেতর ঢুকল। একটা লম্বা, ভারী, নকশা-কাটা আর মজবুত হ্যান্ডেলওলা লাঠি হাতে উঠল। অবশেষে মাথায় একটা দুমড়ে যাওয়া ধূসর হোমবার্গ টুপি চাপিয়ে বুড়ো সন্তুষ্ট হল। অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। বুড়ো বলে উঠল, “অলংকরণ যে ভদ্রলোক করতেন, তাঁকে ধরো। আমি এটাই পরতাম।”

বাইরে নার্স থাকলে আমাদের কপালে দুঃখ ছিল। কিন্তু জায়গাটা ফাঁকা। বুড়োকে হুইলচেয়ারে বসিয়েই এগোলাম। প্রায় কোলে তুলে বুড়োকে আমার গাড়ির সামনের সিটে বসালাম। হুইলচেয়ারটা ভাঁজ করে পেছনে রেখে গাড়ি ছোটালাম। গাড়িতে বসে বুড়ো বলল, “আমরা যেখানে যাচ্ছি, সেই জায়গাটা সম্বন্ধে একটু ধারণা দাও তো।”

“বড়ো বাড়ি। বছর চল্লিশেক আগে তৈরি হয়েছিল। খালি পড়েছিল অনেকদিন। ভিতটা বিশাল, তাই একটা বিরাট বেসমেন্ট থাকতে পারে।”

“হুঁ।” মাথা দোলাল বুড়ো, “ওর বেসমেন্ট লাগবে।”

“কার?”

“কারও না। সামনে ওটা কি পেট্রল পাম্প? চমৎকার। ওখানে একবার দাঁড়াও তো।”

“কিন্তু ট্যাংক তো ভরাই আছে!”

“গ্যাসোলিনের একটা ক্যানিস্টার নিয়ে এসো। আমি গাড়িতেই রইলাম।”

আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু তিন-তিনটে গুলি নিয়ে, রক্তশূন্য অবস্থায় একটা লোক লস এঞ্জেলস-এ কীভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে, সেটাও আমার বোধগম্য হচ্ছে না। তাই চুপচাপ আদেশ মানাই নিরাপদ বলে মনে করলাম। গাড়িটা চলতে শুরু করার পর বুড়ো মুখ খুলল।

“ভালো হত যদি আমরা সকালে বেরোতে পারতাম। কিন্তু কী আর করা যাবে? ভালো কথা, তুমি রিভলভারে আবার গুলি ভরে নিয়েছ তো? ওতে অবশ্য ওদের কিছুই হবে না, তবু যতটা তৈরি থাকা যায় আর কী।”

“যা বলবেন স্যার।”

“বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে ছোকরা? আমারও হচ্ছে। আমি সত্যিই ভেবেছিলাম সেই সাতানব্বই সালেই গল্পটা শেষ হয়ে গেছে। আমার পক্ষে ঠিক সেই সময় কন্টিনেন্টে গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত সম্ভব ছিল না। লন্ডন থেকে আমি বেশিদিন দূরে থাকলেই অপরাধীরা একটু বেশি উৎসাহ পেয়ে যেত। তাই গল্পটা শেষ করা যায়নি।”

আমি এ-সব কথার মধ্যে ঢুকলাম না। শুধু বললাম, “এজকম্ব আর তিনটে ব্লক পরেই।”

“তাহলে এখানেই থামো। বাকি পথটা আমরা হেঁটে যাব।”

আমাদের পেছনে কেউ লেগে নেই এটা নিশ্চিত করার জন্য এক চক্কর দিতে হল। তারপর একটা জায়গা খুঁজে গাড়িটা পার্ক করলাম। ভ্যাপসা গরম রাত। রাস্তাটা আলোয় চকচক করছে। আমরা ধীরে-ধীরে এগোলাম। একটু পরেই বাড়িটা দেখা গেল।

“মাইলস্‌ এখানে আছে।” আমার গলাটা কি কেঁপে গেল?

“কী করে বুঝলে?”

“ওই যে। ওর গাড়িটা রয়েছে।” সেডানটার লাইসেন্স প্লেটের নম্বর আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল বলে নিশ্চিত হলাম।

“চমৎকার।” আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বুড়ো গাড়িটার দিকে দ্রুত এগিয়ে গেল। আমি ভাবিনি এই বয়সেও লোকটা এত দ্রুত হাঁটতে পারবে। “তুমি গাড়িটা অকেজো করে দিতে পারবে?”

বনেট তুলে, স্পার্ক প্লাগ খুলে গাড়িটা অচল করে দিতে আমার মিনিট পাঁচেক লাগল।

“শাবাশ!” বুড়ো যে সত্যিই খুশি হয়েছে বুঝতে পারছিলাম। “ওই বাদুড় হয়ে উড়ে যাওয়ার কথাটা স্রেফ গুলগল্প। বরং এবার ওদের পালানোর রাস্তা বন্ধ হল।”

“বাদুড়? ঠিক বুঝলাম না।”

“বাদ দাও। তুমি গাড়িটার দরজা খুলতে পারবে?”

কিছুক্ষণের চেষ্টায় আমি দরজা খুলতে পারলাম। বুড়ো গাড়ির সামনে-পেছনে তন্নতন্ন করে কিছু খুঁজল, প্রথমে খালি চোখে, তারপর চশমা এঁটে। শেষে সিটগুলো ভালো করে শুঁকে বলল, “আনন্দ সংবাদ।”

“কী?”

“রক্ত নেই। তার মানে, সংক্রমণ খুব একটা ছড়ায়নি। হয়তো মাইলস্‌-ই একমাত্র শিকার। আমার পুরোনো বন্ধু ধৈর্য ধরতে জানে দেখছি। তবে সেটা এবার হয়তো...”

“কোন্‌ সংক্রমণের কথা বলছেন আপনি? আর কে আপনার বন্ধু, ঠিক করে বলুন তো! এর আগেও একবার এক ‘পুরোনো আলাপি’-র কথা বলেছিলেন। কে সে?”

বুড়োর মুখে একটা ধারালো হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু কিছু বলল না। দারুণ রাগে আমি বোধহয় লোকটাকে কিছু আকথা-কুকথা বলেই ফেলেছিলাম, কিন্তু বুড়ো সেসব পাত্তা না দিয়ে বাড়িটার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আমি তালা ভাঙার যন্ত্রপাতিগুলো বের করছিলাম। আমার সঙ্গী কিন্তু দেখলাম স্রেফ হাতল ঘুরিয়ে দরজাটা খুলে ফেলল। আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি দেখে একটু অধৈর্য হয়েই বুড়ো বলল, “ও কাউকে ভয় পায় না। অবশ্য আমি যে আমেরিকায় আছি সেটা ও জানে না। এটা আমাদের পক্ষে ভালো।”

করিডর অন্ধকার। বুড়ো পকেট থেকে একটা ফ্ল্যাশলাইট বের করে চারপাশে দেখল। আসবাব সবই চাদরে ঢাকা রয়েছে। তবে দরজার গায়ের নকশা, উঁচু ছাদ, ঘোরানো সিঁড়ি, এগুলো দেখা গেল। বুড়ো ইতোমধ্যে লাইটের সুইচটা খুঁজে পেয়েছে। মাথার ওপর ঝাড়বাতিটা ঝলমল করে উঠল।

“যাচ্ছেতাই রুচি।” বুড়োর গলা শুনে মনে হচ্ছিল যেন আমরা কোনও আর্ট গ্যালারিতে এসেছি, “তবে ঝাড়বাতিটা বেশ ভালো। প্রোফেসর আমাকে একবার ঠিক এইরকম একটা ঝাড়বাতি ফেলে মারার চেষ্টা করিয়েছিলেন।”

ওপর থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এল। আমি আমার .৪৫-টা বের করলাম। বুড়ো নির্বিকার ভঙ্গিতে মুখ তুলে সিঁড়ির ওপরদিকে তাকাল। মাইলস্‌ ওখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পোশাক বদলেছে বলেই হয়তো গুলির গর্তদুটো আর দেখা যাচ্ছে না। ও বোধহয় নিজের মাথাটা সেলাই করার চেষ্টা করেছিল। ব্যাপারটা সফল হয়নি, বরং কদাকার দেখাচ্ছে। ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা জান্তব দাঁতগুলো আলোয় ঝকঝক করছে। কিন্তু বুড়োর দিকে তাকিয়েই মাইলস্‌-এর লাল চোখের উপরের ভ্রূজোড়া কুঁচকে উঠল।

“মিস্টার লান্ডো।” লাঠিতে ভর দিয়ে কয়েক পা এগিয়ে গেল বুড়ো, “এই অবস্থার পেছনে আপনার যে কোনও হাত নেই সেটা আমি অন্তত জানি। আপনি স্রেফ আপনার কাজটুকু করছিলেন। যে লোকটি আপনাকে কাজটা দিয়েছিল, সে এর আগেও আপনার মতো অজস্র মানুষকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। আবার কাজ শেষ হলেই পুরোনো খেলনার মতো তাদের ভেঙেচুরে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু সে-কথা থাক। এই মুহূর্তে কর্তব্য একটাই।”

আমার দিকে ঘুরে বুড়ো বলল, “লোকটাকে নিকেশ করো তো।”

একবার মনে হয়েছিল বলি, এর আগেও আমি সেই চেষ্টা করে তিনটে গুলি খরচ করেছি। তারপর ভাবলাম, কী লাভ? আমি মাইলস্‌-এর মাথা নিশানা করে পরপর তিনবার ফায়ার করলাম।

প্রথম গুলিটা মাইলস্‌-এর মাথার ওপরদিকটা ফাটিয়ে দিল। ছাতা ধরা পাউরুটির মতো কিছু ছিটকে বেরিয়ে পেছনের দেওয়ালে লাগল। দ্বিতীয় গুলিটা ওর করা সেলাইয়ের মধ্যে ঢুকল। তাতে মাথাটা সেই জায়গা দিয়েও ফাঁক হয়ে গেল। তৃতীয় গুলিটা চোয়ালের হাড় ভেঙে মুখের নীচের অংশটা বরাবরের মতো হাঁ করিয়ে দিল।

সিঁড়িতে বসে, তারপর শুয়েই পড়ল মাইলস্‌। ঘরজোড়া ধোঁয়া একটু-একটু করে সরে গেল। পুরো সময়টা আমি বুড়োর শ্বাস টানার শুকনো, ঘষা আওয়াজ পাচ্ছিলাম শুধু।

“আমরা কি...?” আমার প্রশ্নটা মাঝপথে থেমে গেল। মাইলস্‌-এর ডান হাতটা নড়ছিল। তারপর বাঁ-হাতটা। সেই অবস্থাতেই ও সিঁড়ির ব্যানিস্টার ধরে একটু-একটু করে উঠে দাঁড়াল। লোকটা... না, শরীরটার মাথার প্রায় অর্ধেক উড়ে গেছে। অবশিষ্ট অংশেই একটা ক্ষুধার্ত হাসি ফুটে উঠল। তারপর ও একটা ‘হিসসস্‌’ আওয়াজ করল মুখ দিয়ে। ও-রকম শব্দ আমি জীবনে শুনিনি।

বুড়ো আমার দিকে ঘুরে বলল, “আসছে।”

একটা বিশাল লাফ দিয়ে সিঁড়ির ওপাশ থেকে, ঘরের প্রায় অর্ধেকটা পেরিয়ে আমার ওপর এসে পড়ল মাইলস্‌। আমার রিভলভার হাত থেকে ঠিকরে গেল। সেকেন্ডের মধ্যে আমার বুকের ওপর চড়ে বসল মাইলস্‌। তারপরেই আমার গলার দিকে হিংস্রভাবে এগিয়ে এল ওর মুখটা। ওর মুখ থেকে বেরোনো সেই ভয়াবহ গন্ধ আমাকে প্রায় বেহুঁশ করে দিল। ওর মাথা থেকে আমার চোখে ফোঁটা ফোঁটা কী-সব পড়ে আমার দৃষ্টি ঝাপসা করে দিল। আমার কলারটা ছিঁড়ে ফেলার পর খোলা গলাটা দেখতে পেয়ে মাইলস্‌-এর মুখ থেকে লালা বেরোতে শুরু করল। আমি সমস্ত শক্তি দিয়ে ওকে সরাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না।

তখনই, বৃষ্টির মতো একটা শব্দ পেলাম। ওই অবস্থাতেই চোখ সাফ করে দেখার চেষ্টা করলাম কী হচ্ছে। আমাদের মাথার ওপর দাঁড়িয়ে বুড়ো ওর কোট থেকে বের করা হুইস্কির ফ্লাস্কটা খালি করল মাইলস্‌-এর পিঠের ওপর। তারপর সে ফাঁকা ফ্লাস্কটা ফেলে দিয়ে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাইয়ের বাক্স বের করল। একটা সিগারেট ধরাল। জ্বলন্ত দেশলাইটা ছুড়ে দিল মাইলস্‌-এর পিঠে।

একটা মশালের মতোই দপ্‌ করে জ্বলে উঠল মাইলস্‌। আমাকে ছেড়ে ছিটকে সোজা হল ও। প্রাণপণে চেষ্টা করল জ্বলন্ত জামাকাপড়গুলোকে ঝেড়ে ফেলতে। পারল না। অসহায়ভাবে বুড়োর দিকে তাকাল মাইলস্‌। বুড়ো নির্বিকারমুখে ওর দিকে তাকিয়ে সিগারেটে একের পর এক টান দিল, আর কিচ্ছু করল না।

ঘরের মাঝখানে একটা লাট্টুর মতো বেশ কিছুক্ষণ ঘুরপাক খেল মাইলস্‌। ওর গায়ের পোড়া গন্ধে আমার বমি পেল। অবশেষে, নিজের ভারী লাঠিটা দিয়ে খুঁচিয়ে পুড়ে যাওয়া শরীরটাকে মেঝেতে ফেলে দিল বুড়ো। শরীরটা একটু ছটফট করল, তারপর স্থির হয়ে গেল।

“একটা চাদর দিয়ে আগুনটা নেভাও তো।” বুড়োর গলা শুনে আমার চটকা ভাঙল। চেয়ার ঢাকার একটা চাদর তুলে, সেটা দিয়ে থাবড়ে আমি আগে মাইলস্‌-এর শরীরের আগুনটা নেভালাম। তারপর যথাসাধ্য খুঁচিয়ে নিশ্চিত হলাম, এই শরীরটা আর নড়াচড়া করবে না।

“ভাগ্যিস তুমি ওকে ব্যস্ত রেখেছিলে।” বুড়ো বলল, “কিন্তু এবার আসল কাজ। আমাদের নীচে যেতে হবে। বেসমেন্টে।”

আমি রিভলভারটা তুলে হোলস্টারে ভরলাম। ফ্ল্যাশলাইট হাতে এদিক-ওদিক একটু খুঁজতেই বেসমেন্টে যাওয়ার সিঁড়িটা দেখতে পেলাম। দরজা খুলে আলোর সুইচটা টিপলাম। নীচে একটা নিবু-নিবু আলো জ্বলে উঠল।

“মাইলস্‌ লান্ডো-র মতো অনুগামী ও আরও বানিয়েছে বলে মনে হয় না। তবু, সাবধানের মার নেই। তাই তুমিই আগে নামো।”

বুড়োর কথাগুলো বোধগম্য হচ্ছিল না। তবে আমি প্রতিবাদ করে সময় নষ্ট করলাম না। সিঁড়িতে পা দেওয়ামাত্র ক্যাঁচ করে একটা আওয়াজ হল। সাবধানে আরও কয়েক পা নামতেই বুঝতে পারলাম, অন্ধকারে ইঁদুর দৌড়োদৌড়ি করছে।

“ও এখানে আছে। আমি নিশ্চিত।” পেছন থেকে বুড়োর গলা পেলাম। বুঝলাম, সে-ও নামছে, তবে ধীরে। সিঁড়িটা আরও কয়েকটা বাঁক নিয়ে নীচে নামতেই আমি বেসমেন্টের মূল জায়গাটা দেখতে পেলাম। জায়গাটা বিশাল। তবে তা না হলে পঞ্চাশটা বাক্স ধরানো যেত না। বাক্সগুলোর আকার দেখে কফিনের কথা মনে হল। ওদের গায়ে কিছু খোদাই করা আছে বলে মনে হচ্ছিল।

আমি নেমে দাঁড়ালাম। পাইনকাঠ দিয়ে বানানো অত বাক্স দেখে মনে হচ্ছিল, আমি যেন পাইনের একটা সমুদ্র দেখছি। সেই সমুদ্রের এক কোণে মাস্তুলের মতো দাঁড়িয়ে ছিল একটা বাক্স। এর গায়েও কিছু লেখা ছিল। কাছে গিয়ে দেখলাম, বাক্সের ঢাকনার ওপর একটা চিহ্নের মতো কিছু রয়েছে। একটা দুর্গ, আর... চারটে বাদুড়? কোন্‌ পরিবার এমন ইনসিগনিয়া ব্যবহার করে?

“ওটাই ওর।” পেছন থেকে গলার আওয়াজ শুনে বুঝলাম বুড়ো আমার পেছনে এসে গেছে, “দেখা যাক, গৃহকর্তা বাড়িতে আছেন কি না।”

বুড়ো হাতের লাঠিটা দিয়ে ওই বাক্সটার দরজায় সপাটে আওয়াজ তুলে আবার পিছিয়ে এল।

দরজাটা নড়ে উঠল। তারপর সেটা একেবারে ফেটে পড়ার মতো ঠিকরে সরে গেল। পচা দুর্গন্ধভরা বাতাসের ঝাপটে আমার বমি পেল। তারপরেই মনে হল, যেন অজস্র ইঁদুরের আওয়াজ পাচ্ছি আমার চারপাশে। এদিক-ওদিক তাকিয়েও আমি কোনও ইঁদুর দেখতে পেলাম না। আমি যখন বাক্সটার দিকে ঘুরলাম, তখন বাক্স থেকে লোকটা বেরিয়ে আসছে।

লোকটা লম্বা। আমি ছ’ফুট, এ আমার চেয়েও কিছুটা লম্বা। আপাদমস্তক কালো পোশাক পরা। মৃদু আলোতেও লোকটার জুতোর পালিশ বোঝা যাচ্ছিল। লম্বাটে, শীর্ণ, কিন্তু হিংস্র মুখ। উঁচু কপাল থেকে পিছিয়ে গেছে ব্রাশ করা ঘন সাদা চুল। ধারালো নাকের ঠিক ওপরে এসে মিলেছে পুরু একজোড়া ভ্রূ। ঠোঁটের ওপরটা অদৃশ্য হয়েছে পুরুষ্টু ধূসর গোঁফের আড়ালে। নীচের ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে দীর্ঘ শ্ব-দন্ত।

লোকটার চোখজোড়া লাল, কয়লার মতো জ্বলন্ত। মাইলস্‌-এর মতো এই লোকটাকে দেখেও আমার মনে হল, আমি কোনও মানুষ নয়, বরং কোনও পশুর সান্নিধ্যে এসে পড়েছি।

লোকটা ডান হাত তুলে প্রথমে আমার উদ্দেশে একটা স্যালুট ঠুকল। খেয়াল করলাম, লোকটার আঙুলগুলো শেষ হয়েছে লম্বা, ছুঁচলো নখে। হাতের তেলোতেও যেন চুল বা লোম রয়েছে। তারপর লোকটা বুড়োর দিকে ঘুরল। মনে হল, লোকটার চোখজোড়া শুধু বড়োই হল না, তাদের পেছনের আগুনটাও যেন নতুন করে জ্বালানি পেল।

“তাহলে আবার আমাদের দেখা হল।” মাথাটা ঈষৎ ঝুঁকিয়ে বলল বুড়ো।

“তুমি!” বাক্স থেকে বেরোনো লোকটা হিসিয়ে উঠল, “তুমি এখনও বেঁচে আছ?”

“আছি। কিন্তু আপনি এখানে কী করছেন?” বুড়োর গলায় আপাত ভদ্রতার আড়ালে আমি একটা অন্যরকম সুর শুনতে পাচ্ছিলাম।

“আমি সাহায্য করতে এসেছি।”

“কী?” বুড়ো যে বিলক্ষণ অবাক হয়েছে সেটা বোঝা গেল।

কালো পোশাক পরা লোকটা আমাদের দিকে এক পা এগোল। তারপর বলল, “ওই উন্মাদ আমার দেশ, গোটা ইউরোপকে ছারখার করে দিচ্ছে। তাই আমি ঠিক করেছি, মিত্রশক্তিকে সাহায্য করব।”

“কীভাবে?”

“একটা সেনাবাহিনী বানিয়ে। আমার মতো, আমার প্রজাতির বাহিনী। তার নেতৃত্ব দেব আমি। ভেবে দেখো, আমরা যদি একসঙ্গে লড়ি তাহলে হিটলার কেন, দুনিয়ার কোনও শক্তি আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। কেমন হবে, যদি ঠান্ডা আর গরম রক্তের যৌথ অভিযানে দুনিয়াটা রক্তের সমুদ্রে ডুবে যায়?”

বুড়ো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আপনার মতো আর ক’জন রয়েছে এখন এ-দেশে?”

“শুধু লান্ডো।” কালো পোশাকের লোকটা বলল, “আমার আর কোনও উপায় ছিল না। তোমরা কি ওকে...?”

“হ্যাঁ।” আমার দিকে ঘুরল বুড়ো। আমি আর আদেশের অপেক্ষা করলাম না। পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে লোকটার দিকে তাক করে সেটা খালি করে দিলাম।

গুলি খেয়ে মাইলস্‌ লান্ডো অন্তত পিছিয়ে গেছিল। এই লোকটা জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে গুলিগুলো স্রেফ হজম করল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে আমি একটা তক্তা তুলে লোকটার মাথায় মারলাম। যেকোনও মানুষের মাথা ওতে ফেটে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এই লোকটার কিছুই হল না। আমি ওটা আবার নামিয়ে আনছিলাম, লোকটা এক হাত দিয়ে তক্তাটা ধরে ফেলল। তারপর অক্লেশে তক্তাসুদ্ধ আমাকে ওর কাছে টেনে নিল।

আমি লোকটার খুব কাছে এসে গিয়েছি। ওর ফাঁক হওয়া ঠোঁটের ফাঁকে একটা হিংস্র হাসি ফুটে উঠল। শুনতে পেলাম, লোকটার হাতের চাপে তক্তাটা খড়কে কাঠির মতো ভেঙে গেল। দেখতে পেলাম, দু’চোখে অনন্ত, নারকীয় খিদে নিয়ে লোকটা মুখ নামিয়ে আনছে আমার গলার দিকে। আমার মনে পড়ল, কী হয়ে গিয়েছিল মাইলস্‌ লান্ডো। পাগলের মতো আমি লোকটার সঙ্গে লড়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুতেই ওর হাত ছাড়াতে পারলাম না।

ঠিক তখনই সাঁইইই... করে একটা আওয়াজ হল। তারপর আমার সর্বাঙ্গ একটা দুর্গন্ধযুক্ত তরলে ভিজে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, শরীরে চেপে বসা সেই ভয়ংকর বাঁধনটা আলগা হয়ে গেছে। দেখলাম, কালো পোশাক পরা লোকটা হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে মাটিতে। তবে ওর মাথাটা নেই। কবন্ধ শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে কালচে-লাল তরলের স্রোত। কিছুক্ষণ পর শরীরটা আর বসেও থাকতে পারল না। পড়ে গেল পেছনদিকে। রক্ত বেরিয়ে চলল, প্রথমে ধারায়, তারপর চুঁইয়ে-চুঁইয়ে।

হাতে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলাম। দেখলাম, লোকটার ছিন্ন মাথা শরীর থেকে প্রায় ফুট তিনেক দূরে পড়ে আছে। রক্তলাল দু’চোখ খোলা। তাতে ফুটে উঠেছে অপার বিস্ময়। মাথা তুলে ওপরে তাকিয়ে দেখি, বুড়ো একটা ল্যাভেন্ডার লাগানো রুমাল দিয়ে হাতের গুপ্তিটা সযত্নে মুছছে। আমাকে তাকাতে দেখে বলল, “কাজের জিনিস। অষ্টাশি সালে হোয়াইটচ্যাপেলে সেই উন্মাদকে ঘায়েল করতে হয়েছিল এটা দিয়েই।”

গুপ্তিটা হাতের লাঠির মধ্যে ঢুকিয়ে বুড়ো আমাকে বলল, “আরেকটু কষ্ট করে গাড়ি থেকে গ্যাসোলিনের ক্যানিস্টারটা নিয়ে এসো দেখি। আমাদের এগুলো সব পোড়াতে হবে। তারপর দমকল ডাকতে হবে, যাতে ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে না যায়। ওঠো-ওঠো! রক্তের দাগ ঢাকতে গেলে খাটতে হয় হে ছোকরা।”

_

মূল কাহিনি: বব ম্যাডিসন-এর ‘রেড সানসেট’

Bhoyal Dosh Back Cover Lowres
অধ্যায় ৫ / ৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%