দ্য হাউস – ২

কেইগো হিগাশিনো

দ্বিতীয় পৰ্ব

‘বাবা আমাকে এই ডায়রিটা কিনে দিয়েছে। বলেছে, ডায়রিতে নিয়মিত লিখলে নতুন নতুন শব্দ মনে রাখতে পারব, এছাড়াও অনেক কাজে লাগবে। চেষ্টা করবো নিয়মিত লেখার। আজকে শিশু দিবস, তাই বাগানে কার্প মাছের মতন দেখতে পতাকা উড়িয়েছে আমরা। সন্ধ্যায় মা মজার মজার সব খাবার রান্না করেছিল। আমি অনেক খেয়েছি।’

ইউসুকে মিকুরিয়ার ডায়রির প্রথম পাতার লেখা এটা। শব্দের ব্যবহার এবং বাক্যের ধরন দেখে বাচ্চাটার বয়স আন্দাজ করা কঠিন। তবে যত দূর মনে হচ্ছে এলিমেন্টারি স্কুলের শেষ বর্ষ শুরু হবার কিছুদিন আগের লেখা। আবারও পড়তে শুরু করলাম।

‘৬ মে, আকাশ রৌদ্রোজ্জ্বল আজকে স্কুলে গানের পরীক্ষা ছিল। আমি সবুজ খামার গানটা গেয়েছি। শারীরিক শিক্ষা ক্লাসে ফুজিমোতো জাম্পিং বক্সে লাফানোর সময় আরেকটু হলেই ব্যথা পেত। বেঁচে গেছে শেষ পর্যন্ত। বাবা আমাকে একটা বই কিনে দিয়েছে।’

‘৭ মে, মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আজ আমাদের ক্লাস টিচার ছুটি নিয়েছিল। তাই সারাদিন কিছু করতে হয়নি। অনেক মজা করেছি সবাই। বাসায় এসে বাবাকে কথাটা বলা মাত্র বকুনি দিয়েছে। এরকম সময়েই নাকি নিজে থেকে সব করতে হয়। ডিনারের সময় পেটে ব্যথা করছিল, তাই ঔষধ খেয়েছি।’

‘৮মে, মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আজকে টিচার ক্লাসে এসেছিল। বলেছে ঠাণ্ডা লেগেছিল নাকি।’

এতদূর অবধি প্রতিদিন লিখেছে ইউসুকে। এরপর নিশ্চয়ই ক্লান্ত হয়ে গেছিল, নতুবা লিখে রাখার মতন কিছু ঘটেনি। কারণ পরের লেখাটা ১২ তারিখের।

‘১২ মে, প্রথমে মেঘ, পরে রোদ। আজ খুব গরম। সবাই বারবার সৈকতে যাওয়ার কথা বলছিল। আমারও সাঁতার কাটতে খুব ভালো লাগে। বাসায় এসে ঠাণ্ডা পানির নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। মা-ও হাতাকাটা জামা পড়ে ছিল দুপুরে।’

এরপর তিন দিন কোনো কিছু নেই। মে’র ১৬ তারিখে আবার লিখেছে ইউসুকে।

‘১৬ মে, রোদ

ইয়ামাদা আজ স্কুলে লেগো মডেল নিয়ে এসেছিল। কিন্তু আমি লেগো দিয়ে ভালো মত খেলতে পারি

না।’

পরবর্তী তারিখটা সরাসরি ১ জুলাই। এই আধমাসে বলতে গেলে তেমন কিছুই হয়নি। ইউসুকের লেখা পড়ে সেটাই মনে হচ্ছে।

‘১ জুন, বৃষ্টি হতে পারে

আজ থেকে ভালো মত ডায়রি লিখব আমি। বাবা বলেছে আমাকে যে প্রতিদিন লিখতে হবে তা নয়। এতে একটা কাজের মতন মনে হবে ব্যাপারটা, আগ্রহ থাকবে না। এর চেয়ে শুধু শনি আর রবিবার সন্ধ্যায় ভাল করে লিখতে। বুদ্ধিটা পছন্দ হয়েছে আমার। সেটাই করবো। অন্তত, শুধুমাত্র আবহাওয়ার ব্যাপারে হলেও লিখব।’

নিজের এই কথা রেখেছে ইউসুকে। প্রতি শনিবারে সেই সপ্তাহে কী কী ঘটেছে ছোট করে উল্লেখ করেছে। কখনো শুধু আবহাওয়ার খবর জানিয়েছে।

“এই বাড়ির ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেছে কিনা কে জানে,” সায়াকা আমার পাশে দাঁড়িয়ে ডায়রিটার দিকে তাকিয়ে বললো।

“সেটাই খুঁজছি,” বলি আমি। দ্রুত পাতা উল্টে যেতে থাকি। এই ব্যাপারটা এখন নিশ্চিত, তিনজনের একটা পরিবার ছিল তারা। ইউসুকে এবং তার বাবা-মা। আর কারো ব্যাপারে কোনো উল্লেখ নেই। আগস্টে নতুন একটা এন্ট্রি পাওয়া গেল।

‘২ আগস্ট, রোদ, হালকা বৃষ্টি আজকে ওয়াটার গান নিয়ে খেলছিলাম, এমন সময় ওটাই আন্টি তরমুজ নিয়ে এলেন আমাদের জন্যে। খুব ভালো তরমুজ চিনেন তিনি। তিনজন মিলে মজা করে তরমুজ খেলাম। ওটাই আন্টি বললেন, বাসায় বাচ্চারা ঘুমাচ্ছে। তাই চলে গেলেন তাড়াতাড়ি। মর্নিং গ্লোরি ফুলগুলো খুব বেশি বাড়েনি এখনও, তাই ড্রয়িং বুকে আঁকতে পারছি না।’

এই ‘ওটাই আন্টি’ কি পাড়ার কোনো আন্টি।

“ওটাই নামে কাউকে চেন?” সায়াকা’কে জিজ্ঞেস করলাম।

নীরবে মাথা ঝাঁকাল ও।

পাতা উল্টে চললাম। নিয়মিত বিরতিতে ওটাই আন্টির সম্পর্কে লিখেছে ইউসুকে। একই এলাকার অধিবাসী হিসেবে একটু বেশিই আসা যাওয়া ছিল তার। তাছাড়া বাড়ির কাজেও সাহায্য করতেন। এসময় একটা লেখা চোখে পড়লো-

‘৫ অক্টোবর, রোদ

ওটাই আন্টি সাথে করে ছোট একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছিল। একদম পুতুলের মতন ছোট। কিন্ডারগার্টেনে পড়ে। ও যখন একটু বড় হবে, তখন ওটাই আন্টি আবার আগের মতন আসা যাওয়া করবে আমাদের বাড়িতে। তার রান্না খুবই মজা, আমি চাই তিনি যেন দ্রুত ফিরে আসেন।’

এই কথাগুলো থেকে বোঝা যায় ইউসুকের এই ওটাই আন্টি এক সময় পরিচারিকার কাজ করতো বাড়িতে। বাচ্চা ছোট বিধায় কাজ করতে পারছে না। তবু মাঝে মাঝে আসত যেহেতু, তাদের সম্পর্ক ভালোই ছিল নিশ্চয়ই। ইউসুকে যেহেতু প্রতি সপ্তাহে এক কি দু’বার ডায়রি লিখেছে, সময় বেশ দ্রুত গড়িয়ে চললো। দেখতে দেখতে বছরের শেষ দিকে পৌঁছে গেলাম। ক্রিসমাসের সপ্তাহ।

‘২৪ ডিসেম্বর, রোদ, অল্প অল্প মেঘ আজকে আবহাওয়া খুবই ঠাণ্ডা। দ্বিতীয় সাময়িকের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে ক্লাসে। অনুষ্ঠানের সময় আমি কাঁপছিলাম। আগের সাময়িকের চেয়ে ফলাফল ভালো হওয়ায় মা প্রশংসা করেছে আমার। এই বছর আবার বড়দিনের উপহার পাঠিয়েছে সে, একটা বড় গাড়ি। গত বছর ট্রেন সেট পাঠিয়েছিল। বাবা বলে এসব খেলনা না দিয়ে বই দেওয়া উচিত। সেজন্যে ফোনে রাগারাগিও করেছে। রাতের বেলা তুষারপাত হয়েছে অল্প।’

ডায়রি থেকে মুখ তুলে সায়াকার দিকে তাকালাম।

“উপহার পেয়েছে তো এটা নিয়ে এত রাগারাগির কী আছে? কে পাঠিয়েছে জিনিসটা?”

“কোনো আত্মীয় হবে নিশ্চয়ই।”

“কিন্তু তুমি কি কখনো তোমার কোনো আত্মীয়কে ফোন করে রাগারাগি করবে? সবসময় খেলনা পাঠাতে মানা করবে?”

“হুম…,” আরো একবার ডায়রির লেখাটা পড়ে মুখ তুলে তাকায় সায়াকা। “কে পাঠাতে পারে তাহলে?”

“জানি না বলেই তো তোমাকে জিজ্ঞেস করছি,” একটা চেয়ার টেনে ধুলো ঝেরে বসলাম। বাচ্চাদের চেয়ার বলেই হয়তো বেশ খাটো চেয়ারটা।

“কোনো আত্মীয়ই হবে নিশ্চয়ই। নাহলে রাগারাগি করতে পারত না মি. মিকুরিয়া। ইউসুকের চাচা বা দাদা-দাদি হতে পারে।”

“হ্যাঁ, ওর দাদা-দাদিই হবে,” ক্ষীণ স্বরে বলে মাথা নাড়ে সায়াকা। “আমার জামাইও মাঝে মাঝে ওর বাবা-মা’কে কথা শোনায় আমাদের মেয়েকে বেশি আদর করার জন্যে।”

“ওহ, বুঝতে পেরেছি…” ওর দিকে না তাকিয়ে পারলাম না। “তোমার পরিবারও অন্য পরিবারের মতনই।” অবচেতন মনেই কথাটা বলে ফেললাম। খানিকটা টিটকারি মত শোনালো।

কষ্ট পেল বোধহয় সায়াকা, মুখ কালো হয়ে গেল। আমি যে ঠাট্টা করেছি এটা বলার আগেই বললো-

“আমার পরিবার সাধারণ না।” কিছুটা রূঢ় শোনালো সায়াকার কণ্ঠ।

অবাক চোখে ওর দিকে তাকালাম। “সরি। উল্টোপাল্টা কিছু ভেবে বসো না আবার।”

অস্বস্তিকর মুহূর্তটা কাটানোর জন্যে চুপ করে থাকলাম কিছুক্ষণ। ডায়রিতে মনোযোগ দিলাম আবারও।

“সবগুলো লেখা পড়তে বেশ সময় লাগবে।”

“তাহলে শেষের দিক থেকে পড়ো নাহয়,” আবারও স্বাভাবিক শোনালো ওর কন্ঠস্বর।

“ভালো বুদ্ধি দিয়েছ।”

ডায়রিটা উল্টিয়ে পেছনের দিক থেকে খুললাম। কিন্তু শেষের পাতাগুলো ফাঁকা। এমনটা কি হতে পারে যে ডায়রিটা শেষ হবার আগেই এই বাড়ি থেকে চলে গেছে ইউসুকে?

প্রায় দশ পৃষ্ঠা ওল্টানোর পর আবারও হাতের লেখা দেখা গেল। শেষ এন্ট্রিটা ফেব্রুয়ারি মাসের ১০ তারিখের। জাতীয় দিবসের আগের দিন।

চেয়েছিলাম দ্রুত একবার পড়ে ফেলব। কিন্তু শেষ হবার আগেই চমকে গেলাম। শুরু থেকে পড়তে শুরু করলাম আবারও। আমার অভিব্যক্তি খেয়াল করলো সায়াকা।

“কী হলো? কী লেখা?” সায়াকা জিজ্ঞেস করে।

“বুঝতে পারছি না, কিন্তু কোনো একটা সমস্যা আছে।”

“সমস্যা?”

“নিজেই পড়ে দেখ,” ওর হাতে ডায়রিটা তুলে দিলাম।

‘১০ ফেব্রুয়ারি, রোদ পেটে ব্যথা সত্ত্বেও আজকে স্কুলে গিয়েছিলাম, কারণ বাসায় থাকতে ইচ্ছে করছিল না। ব্যাপারটা নিয়ে টিচারদের সাথে কথা বলবো ভেবেছিলাম, কিন্তু বড়দের ভরসা করা যায় না। টিচার নিশ্চয়ই তার কথা বিশ্বাস করবে, আমার কথা আমলেই নিবে না। পরে সে আমার উপরে প্রতিশোধ নিবে। স্কুল থেকে ফিরে দেখি সোফায় শুয়ে আছে লোকটা। আমাকে দেখার আগেই রুমে চলে আসি। ভেতরে ঢুকে দেখি চামি গতবারের মতন বিছানায় শুয়ে কাঁদছে। ওকে নিশ্চয়ই কষ্ট দিয়েছে লোকটা। আর ভালো লাগছে না। শয়তানটা মরে গেলেই পারে।’

লেখাটা পড়া শেষে মুখ তুলে তাকালো সায়াকা। “নতুন একটা চরিত্রকে দেখতে পাচ্ছি।”

“হ্যাঁ। ‘লোকটা’…”

“কোত্থেকে এসেছে সে জানি না, কিন্তু এখানেই নিশ্চয়ই থাকে। সোফায় শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়নি ইউসুকে।”

“কোনো আত্মীয়?”

“হতে পারে। কিন্তু ডায়রির লেখা পড়ে মনে হচ্ছে ইউসুকে তাকে পছন্দ করে না।”

“ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করতো মনে হয়। ইউসুকে বিষয়টা নিয়ে এতটাই নাজেহাল ছিল যে টিচারদের সাথেও কথা বলতে চেয়েছে।”

“নিশ্চয়ই এমন কিছু ঘটেছে এই কয় দিনে, যা আমরা জানি না। আর এই ‘চামি’ মনে হচ্ছে বিড়াল।”

“চামি, বিড়াল…” ঘাড় একদিকে কাত করে ভাবতে লাগল সায়াকা। “কোনো সমস্যা?”

“হুম… নামটা আগে শুনেছি মনে হচ্ছে।”

“বিড়ালটাকে চেন?”

“মনে হয়, কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারছি না। এরকমই হয়ে আাসছে আমার সাথে। মনে পড়তে গিয়েও শেষ মুহূর্তে ভুলে যাই।”

“চিন্তার কিছু নেই। আমরা আগে থেকেই জানতাম যে সব স্মৃতি এত সহজে ফিরে আসবে না। ডায়রিটা সাবধানে পড়লে কিছু সূত্র পাওয়া যেতে পারে।”

“ঠিক বলেছ।”

ডায়রির আগের পাতায় গেল সায়াকা। ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখ

‘৩ ফেব্রুয়ারি, আকাশে মেঘ আজকে সেতসুবানের (বসন্ত শুরুর আগের দিন) ছুটি। আগে অশুভ আত্মাদের তাড়ানোর জন্যে এই দিনে মটর দানা ছুড়তাম আমরা, যাতে বাড়িতে আনন্দ অটুট থাকে। কিন্তু এবারে সেটা সম্ভব হয়নি। ওই লোকটা আবারও গলা পর্যন্ত মদ গিলেছে। ভাগ এখান থেকে!’

“বুঝতে পারছি না,” বলি আমি। “কার ব্যাপারে কথা বলছে ও? বাবামা’র বিষয়ে কিছু লিখছে না কিন্তু।

“শুরু থেকে ক্রমানুযায়ী পড়াই ভালো,” শব্দ করে শ্বাস ছেড়ে বললো সায়াকা। “কিন্তু সেটায় অনেক সময় লাগবে। ডায়রিটা হার্ডকভার বইয়ের মতন মোটা।”

“তাহলে সাথে করে নিয়ে যাও। টোকিওতে গিয়ে পড়ো।”

ইচ্ছে করেই কথাটা বললাম যেন সন্ধ্যার আগেই বেরিয়ে পড়তে পারি আর বেশিক্ষণ থাকার ইচ্ছে নেই।

আমার মনে কী চলছে, তা বুঝতে অসুবিধে হলো না সায়াকার। মাথা নেড়ে সায় জানাল ও। “ভালো বলেছ। কোনো সূত্র চোখ এড়িয়ে গেল কিনা ভাবছি।”

“চলো, অন্য ঘরগুলো ঘুরে দেখি নাহয়? নেয়ার মত কিছু পেলে নিয়ে নিব।”

ঘরটা থেকে বের হবো, এমন সময় বিদ্যুৎ চমকালো বাইরে। পরক্ষণেই বিকট স্বরে ডেকে উঠলো মেঘ।

“আহহা,” মাথা ঝাঁকাই আমি। “ঠিকই বলেছিলে, আবহাওয়া আরো খারাপ হবে।”

“বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যে।”

ও কথাটা বলেও শেষ করতে পারেনি, এর আগেই বৃষ্টির শব্দ শুনতে

পেলাম আমরা। টিপটিপ বৃষ্টি কিছুক্ষণের মাঝেই রূপ নিল ভারী বর্ষণে। “তাড়াতাড়ি চলো, অন্ধকার হয়ে গেলে এই বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালানো কঠিন হবে।”

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে লিভিং রুমটায় নজর বুলালাম আবারো। এবারে কিছু ব্যাপার অদ্ভুত ঠেকলো

যেমন, বাড়িটায় কোনো টিভি নেই। তেইশ বছর আগে রঙিন টেলিভিশন ভালই জনপ্রিয় ছিল। কিছু কিছু পরিবার অবশ্য তখনও কিনতে পারেনি অর্থনৈতিক কারণে। কিন্তু এই বাড়িটা যেরকম বড়, খুব সহজেই টিভি এঁটে যেতে ভেতরে। শুধু যে টিভি নেই, তা নয়। বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদির সংখ্যাই ভীষণ কম। ওয়াশিং মেশিন বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দেখিনি কোথাও। এমনকি ফোনও নেই।

“বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় নিয়ে গিয়েছিল হয়তো, নাকি? বিক্রিও করে দিতে পারে,” আমার প্রশ্নের জবাবে বলে সায়াকা।

“সেক্ষেত্রে বাড়িতে আরো দামি জিনিস আছে, যেমন পিয়ানোটা।” “পিয়ানো বিক্রি করা একটু কঠিন, কিন্তু সংসারের জিনিস সবাই কেনে।”

“তাই? সত্যি বলতে আমার ধারণা যে এই বাড়িটায় শুরু থেকেই ওসব জিনিস ছিল না। যেমন টিভির কথাই ধরো। যদি এই বাড়িতে টিভি থাকতো-ও, কোথায় রাখা হতো সেটা?”

“এই ঘরেই নিশ্চয়ই,” লিভিং রুমের সোফার পাশে দাঁড়িয়ে বলে সায়াকা।

“এই ঘরের কোথায়?”

চারপাশে তাকায় সায়াকা। খানিকবাদে ফায়ারপ্লেসে নিবদ্ধ হয় ওর দৃষ্টি। কিন্তু কিছু বলে না।

“টিভিটা রাখার কোনো জায়গাই নেই, তাই না?” বলি আমি। “যদি টিভি থাকতো, তাহলে সেটার জন্যে নির্ধারিত জায়গাও থাকতো নিশ্চয়ই।”

“ঠিক বলেছ…” বুকের ওপর হাত ভাঁজ করে চিন্তামগ্ন স্বরে বলে সায়াকা।

“বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নেই, এটা হয়তো ওরকম কোনো বিষয় না। বাড়ির প্রধানের বোধহয় ওসব জিনিস ভালো লাগতো না। তবে আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছি অন্য একটা কারণে। কোনো ক্যালেন্ডার নেই কোথাও। অদ্ভুত না? সব বাড়িতেই অন্তত একটা হলেও ক্যালেন্ডার থাকে।”

“হ্যাঁ, আসলেও অদ্ভুত।”

“আর সবগুলো ঘড়ি একই সময় দেখাচ্ছে। যেন সময় থমকে গেছে। এটাও ইচ্ছাকৃত। কিন্তু কেউ কেন সেটা করবে?”

কিছুক্ষণ ভেবে মাথা ঝাঁকায় সায়াকা। “আমি জানি না। কিছুই মাথায় আসছে না আমার।”

ওর চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ, এরপর ডায়রিটার দিকে তাকালাম। গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য নজর এড়িয়ে গেছে আমাদের।

বাইরে শব্দ বেড়েছে। জানালার কাঁচের উপরে আছড়ে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা।

“বৃষ্টি বাড়ছে,” বলি আমি। “আমাদের তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়া উচিত।”

একটু দূরে বিকট শব্দে বজ্রপাত হলো এসময়। কেঁপে উঠলাম আমি আর সায়াকা।

“সমস্যা নেই, দূরে পড়েছে,” হেসে বলি।

মাথা নিচু করে আছে সায়াকা, চোখ পিটপিট করছে বারবার। এরপর গালে হাত দিয়ে ঘোরলাগা দৃষ্টিতে চারপাশ একবার দেখল।

“কোনো সমস্যা?” জিজ্ঞেস করি।

“পিয়ানোর নিচে,” ডান হাতের তর্জনী দিয়ে ইঙ্গিত করে বলে ও।

“পিয়ানোর নিচে?” ওর ইশারা মোতাবেক তাকাই সেদিকে। কী ওখানে?”

“লুকিয়ে আছে… ওখানে…”

“লুকিয়ে আছে? কে?

সাথে সাথে জবাব না দিয়ে পিয়ানোর দিকে ছুটে গেল ও। হাঁটু ভেঙ্গে বসে পিয়ানোর নিচ দিয়ে দেখতে লাগল চারপাশে।

“কী সমস্যা? কিছু আছে ওখানে?” আবারও জিজ্ঞেস করলাম।

সায়াকা এখনও উবু হয়ে বসে আছে, দৃষ্টি আমার দিকে।

“এখানে লুকিয়ে ছিল।”

“কে লুকিয়ে ছিল?” কিছুটা বিরক্তই হলাম এবারে। জবাব দেয়ার আগে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে একবার ঢোক গিলল ও।

“আমি…”

“তুমি?” বিভ্রান্ত স্বরে বললাম। ওর কথা বুঝতে পারছি না। “কবে?”

“অনেক আগে…”

“অনেক আগে?” কথাটা বলে আমি নিজেই চমকে উঠলাম। এবারে ধরতে পারছি কী বলতে চাচ্ছে সায়াকা। “তোমার মনে পড়েছে? এই পিয়ানোর নিচে লুকিয়ে ছিলে তুমি?”

অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে পিয়ানোর একটা পায়ে হাত দিয়ে ঘষতে লাগল সায়াকা। ধুলো সরে যাওয়ায় কালো রঙ দেখা গেল ওখানে।

“আজকের মত বৃষ্টি পড়ছিল আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল সেদিনও।”

সায়াকার হাত ধরে সোফায় বসালাম। এখনও বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু এতে যদি সায়াকার স্মৃতি ফিরে আসে, আপত্তি নেই আমার।

কনুই দু’টো হাঁটুর উপরে ওর। দুই হাতের আঙুল এক করে রেখেছে। লম্বা একটা সময় নীরবে বসে রইলো এভাবে। ভাবছে কিছু একটা। ওকে বিরক্ত করতে ইচ্ছে করছে না। চুপ করে আছি সেজন্যে। প্রায় দশ মিনিট পর অবশেষে মুখ খুললো সায়াকা।

“বজ্রপাত হচ্ছিল একটু পরপর, তাই পিয়ানোর নিচে গিয়ে লুকিয়েছিলাম। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল বাড়ি ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাবে বুঝি।

“তুমি নিশ্চিত যে এই ঘরেই সেটা?”

“একশো ভাগ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারব না,” বলে আবারও চারপাশে তাকালো ও। “কিন্তু এখানেই মনে হচ্ছে। পিয়ানোর নিচ দিয়ে দেখার সময় দেজা ভ্যু3 হচ্ছিল।”

মাথা নাড়লাম আমি। অবশেষে ধীরে হলেও সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি আমরা।

শুধু সায়াকার বাবাই নয়, সায়াকার নিজেরও এই পরিবারের সাথে সম্পর্ক আছে। আর সেই সম্পর্কটা কী, তা জানলেই বোঝা যাবে কেন কোনো স্মৃতি নেই ওর।

“সেই সময় কি একাই ছিলে তুমি? নাকি অন্য কেউ ছিল?”

চোখ বন্ধ করে নিল সায়াকা। ঠোঁটগুলো কাঁপছে তিরতির করে। ওর এই অভিব্যক্তি আমার অতি পরিচিত। কিছু মনে করার চেষ্টা করলে এমন চেহারা হয়।

“আরেকজন ছিল,” কিছুক্ষণ পর বলে ও। “আমার মনে আছে, দু’জনই লুকিয়ে ছিলাম পিয়ানোর নিচে।”

“পিয়ানোর নিচে? তাহলে অন্যজনও বাচ্চা?”

“বড় কেউ নয়, এই ব্যাপারে নিশ্চিত আমি। তবে ছেলে নাকি মেয়ে, তা বলতে পারবো না।”

“ছেলেই হবার কথা। ইউসুকে মিকুরিয়া।”

“হয়তো,” অনিশ্চিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে ও।

“আর কিছু মনে পড়ছে তোমার?” জানি লাভ নেই, তবুও জিজ্ঞেস করলাম।

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সায়াকা। “কথাগুলো পেটে আসলেও মুখে আসছে না কেন যেন। খুবই বিরক্তিকর।”

“সবকিছু আসলে একসাথে মনে পড়ার কথাও না। এটুকু যে মনে করতে পেরেছ, এটাই অনেক। চলো, ডায়রিটা পড়ে দেখি কিছুদূর। হয়তো এবারে তোমাকে নিয়ে কোনো কিছু পাওয়া যাবে।”

অতীত মনে করতে পারছে না দেখেই হয়তো একটু বিরক্ত দেখাচ্ছে ওকে।

“আমার সাথে এই বাড়ির কী সম্পর্ক? এখানে কেন এসেছিলাম?”

“হয়তো আশপাশেই থাকতে?”

“কিন্তু আমরা তো ইয়োকোহামায় থাকতাম…”

“সেটা শুধু তোমার সিটিজেন ফর্মে লেখা। এমনটাও হতে পারে যে আসলে এখানেই কোথাও থাকতে। ইউসুকে ছোটবেলার বন্ধু ছিল তোমার, প্রায়ই আসতে এই বাড়িতে।”

“ছোটবেলার বন্ধু…” আমার কথারই পুনরাবৃত্তি করলো সায়াকা। নখ কামড়াচ্ছে। পা ভাঁজ করে বসলো একটু পর, যেন আমি যেটা বললাম সেটা নিয়ে ভালো মতন ভাববে।

হঠাৎই সোজা হয়ে বসে আমার দিকে তাকালো। “মনে হয় না যে আমি ইউসুকের ছোটবেলার বন্ধ ছিলাম।”

“কেন?”

“আমাদের বয়সের পার্থক্য অনেক। তেইশ বছর আগে প্রাইমারি স্কুলের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল ও। তখন আমার বয়স সাতও হয়নি। কিন্ডারগার্টেনে পড়তাম নিশ্চয়ই।”

“আরে এটুকু পার্থক্য ওরকম কিছু না।”

“বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটুকুই অনেক। হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কথা ভাবো। প্রথম বর্ষ আর দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা যেন দুই জগতের বাসিন্দা।” এটা ভুল বলেনি ও। মাথা নেড়ে সায় দিলাম। ডায়রিটা আরও কয়েক পাতা উল্টে বন্ধ করে দিলাম চট করে। আলো কমে এসেছে। এখন আর পড়া সম্ভব না।

“ঠিক আছে, আজকের মতন যথেষ্ট হয়েছে। এবারে ফিরে যাই,” বললাম।

“আচ্ছা,” দুর্বল কন্ঠে বললো সায়াকা।

জানালাগুলো একে একে সব ভেতর থেকে বন্ধ করে বেইজমেন্ট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম আমরা। বৃষ্টির তেজ একটুও কমেনি। গাড়ি পর্যন্ত আসতে আসতে আমাদের কাপড় ভিজে গেল পুরোপুরি।

“এত জোরে বৃষ্টি হচ্ছে। কেউ বিশ্বাসই করবে না এখানে আসার সময় আবহাওয়া কতটা ভালো ছিল,” রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলি। সায়াকা চুপচাপ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে গাড়ির জানালা দিয়ে। বৃষ্টির কারণে ঝাপসা দেখাচ্ছে ওটা।

“আগেও দেখেছি,” একটু পর বলে সায়াকা।

“কী?”

“এই বাড়িটা আগেও দেখেছি। এরকম; দূর থেকে। সেটা অনেক অনেক আগের কথা.” আমার দিকে ফিরল ও। “আমি নিশ্চিত যে আগেও এসেছি এখানে।”

আড়চোখে বাড়িটা দেখে ওর দিকে তাকালাম। “একাই ছিলে তখন?”

“না, কেউ ধরে ছিল আমার হাত।”

“কে? তোমার বাবা-মা?”

“হতে পারে।” কথাটা বলে হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে চোখ বুজলো সায়াকা। একটু পরেই আবার আমার দিকে তাকিয়ে দুর্বল হেসে বললো, “সরি। চলো এখন।”

“আসলেই যাব?”

“হ্যাঁ। এখানে থেকে সময় নষ্ট করলে তো আর স্মৃতিগুলো ফিরে আসবে না।”

মাথা নেড়ে ইঞ্জিন চালু করলাম।

কাঁচা রাস্তাটা কাদা কাদা হয়ে আছে বৃষ্টির পানিতে। খুব বেশি দূর দেখাও যাচ্ছে না। হেডলাইট জ্বেলে মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলাম।

মাতসুবারা লেক গ্যাস স্টেশনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সায়াকা বললো, “আমরা এখানে থামি একটু?” কারণ জানতে না চেয়ে ব্রেক কষলাম। হয়তো টয়লেটে যেতে হবে ওকে, বাড়িটায় টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ হয়নি কারোই।

গ্যাস রিফিল করে নিলাম সেই সুযোগে। বিস্মিত দৃষ্টিতে আমাদের দেখছে তরুণ স্টাফ। হয়তো সে ভেবেছিল আজ রাতে আর কেউ আসবে না।

আসলেও বাথরুমে গেল সায়াকা, এরপর ফোন করলো কাকে যেন। দূর থেকে দেখে মনে হল চোখমুখ শক্ত করে কথা বলছে।

“অপেক্ষা করানোর জন্যে দুঃখিত,” গাড়িতে ফিরে বললো ও।

“ফোন করেছিলে কাউকে?”

“হ্যাঁ, শ্বশুড়বাড়িতে। মেয়ে ওখানেই আছে।”

“তোমার জামাইয়ের পরিবারের লোকজন কাছেই থাকে নাকি?”

“না।”

“এখানে আসার আগে চট করে গিয়ে রেখে এসেছ?”

সায়াকার মুখের হাসিটা দুর্বোধ্য ঠেকছে এখন। একটু পরেই সেখানে বিরক্তির ছাপ খেয়াল করলাম।

“না,” বললো ও। “অনেক দিন ধরেই ওখানে আছে ও।”

“অনেক দিন ধরেই?”

ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রেখেছে এখন ও। চোখ থেকে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো।

“ওকে… নিয়ে যাওয়া হয়েছে আমার কাছ থেকে।”

“কেন?”

“কারণ… আমি মা হবার যোগ্য নই।”

“যোগ্য নও?”

“একটা বাচ্চার লালন পালনের জন্যে যেসব গুণাবলীর দরকার, তা নেই আমার। আমি মা হবার অযোগ্য…” এবারে আর বাঁধ মানলো না চোখের পানি, অঝোর ধারায় ঝরতে লাগল।

গ্যাস স্টেশনের উল্টো দিকে মাতসুবারা লেকের পাবলিক পার্কিং লট। সেখানে গাড়ি ঢুকিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করলাম। উইন্ডশিল্ডে ধুয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির পানিতে। এফ এম রেডিওতে কেনি জি’র গোয়িং হোম গানটা বাজছে। ভলিউম কামিয়ে সায়াকার কথা বলার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

“আমার মেয়ের নাম মিহারু। আক্ষরিক অর্থ করলে দাঁড়ায় ফুলের মতন সুন্দর।”

“মিহারু,” বললাম আমি। আঙুল দিয়ে সিটে লিখলাম নামটা। “সুন্দর নাম।”

“আমার জামাই রেখেছে। অনেক আগে থেকেই নাকি ঠিক করে রেখেছিল মেয়ে হলে মিহারু বলে ডাকবে।”

“হ্যাঁ, এরকম লোক আছে অনেক,” হেসে মন্তব্য করি আমি। “খুব কিউট নিশ্চয়ই ও?”

“বেশিরভাগ সময় আমারও সেটাই মনে হয়।”

“বেশিরভাগ সময়?”

“হ্যাঁ। কারণ মাঝে মাঝে আমি নিজেকে বলি ওকে না জন্ম দিলেই ভালো করতাম,” রক্তলাল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে ও।

স্টিয়ারিং হুইলে হাত রাখলাম। “বাচ্চা মানুষ করা সহজ কাজ নয়, সায়াকা। বিরক্ত লাগলে এরকম চিন্তা মাথায় আসতেই পারে।”

ভেবেছিলাম আমার কথায় হয়তো আপত্তি জানাবে ও। কিন্তু সায়াকা রাখঢাক না করেই বললো, “ঠিক বলেছ। একদমই সহজ নয়।”

মাথা নাড়ি আমি। “মিহারু কি খুব জ্বালাতন করে তোমাকে?”

“হ্যাঁ, সারাক্ষণ,” ক্ষীণস্বরে বলে সায়াকা। “আমাকে সারাদিন ওর আউলানো জিনিস গোছাতে হয়।”

“আচ্ছা।”

“আমি কিন্তু এটার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম। নিজেকে বুঝিয়েছিলাম যে মা হলে এসব করতেই হবে। ওর প্রতি ভালোবাসা ভুলিয়ে দিবে সবকিছু।”

“কিন্তু সেরকমটা হয়নি?”

“ওর জন্যে কিছুই অনুভব করি না আমি!” গুঙিয়ে ওঠে সায়াকা। “মাঝে মাঝে জড়িয়ে ধরতেও ইচ্ছে করে না। অন্য মায়েদের তো এরকম আচরণ করতে দেখিনি। মাঝে মাঝে নিজের মেয়ের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা কাজ করে। বিশ্বাস হচ্ছে আমার কথা?”

“বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ব্যাপার নয় এটা। এরকম উদাহরণ আরো আছে।”

“হ্যাঁ। তুমিই বলেছ সেটা।”

“আমি?” একটু সময় লাগলেও বুঝতে পারলাম কেন কথাটা বলেছে ও। চোখ বড় হয়ে গেল বিস্ময়ে। “তুমি ওটা পড়েই এসেছ আমার কাছে…”

“হ্যাঁ।”

বিজ্ঞান পত্রিকায় এই বিষয়ে একটা প্রতিবেদন লিখেছিলাম আমি।

“একজন বিজ্ঞানীর দৃষ্টিকোণ থেকে শিশু নিপীড়নের ব্যাপারে লেখা দিতে হবে…” কয়েক মাস আগে সম্পাদক আমাকে এই জটিল কাজটা দেয়। “অ্যামেরিকায় প্রতি বছর বিশ লাখ শিশু বাবা-মা বা অভিভাবকের হাতে নিপীড়নের শিকার হয়। তাদের মধ্যে প্রায় তিন হাজার মারা যায়। জাপানেও একই রকম ঘটনার উদাহরণ আছে। এক না এক সময় আমাদের এই ব্যাপারে কিছু বলতেই হবে,” আমাকে জোর করে সম্পাদক।

কিন্তু মানা করে দেই আমি। অজুহাতে বলি, একজন সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানীর পক্ষে এরকম জটিল এবং গুরুগম্ভীর একটা বিষয়ে কিছু বলাটা উচিত হবে না। কিন্তু বারবার জোর করতেই থাকে সম্পাদক। পত্রিকার প্রধান সম্পাদক নাকি এই বিষয়ে প্রতিবেদন চাইছে অনেক দিন ধরে। অবশেষে রাজি হই আমি। বলি যে কিছু মানুষের সাক্ষাৎকার নিব। প্রধান সম্পাদক এই বিষয়ে প্রতিবেদন লেখাতে কেন এত আগ্রহী, তার জবাব পেয়ে যাই কিছুদিনের মধ্যেই। ভদ্রলোকের নিজের ভাগ্নি একজন শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা। তার কাছ থেকেই তিনি এরকম নানা ঘটনা শুনে এখন নিজের পত্রিকায় প্রতিবেদন ছাপাতে চান। তাই প্রথমে ভদ্রলোকের ভাগ্নির সাক্ষাৎকারই নিই আমি।

শুরুটা মসৃণ না হলেও পুরো অভিজ্ঞতাটা যে খুব খারাপ ছিল, তা বলবো না। আধুনিক সমাজের গুরুতর একটা সমস্যার স্বরূপ বুঝতে পারি আমি। কিন্তু যে প্রতিবেদনটা লিখি, সেটা ছিল গড়পড়তা ধাঁচের। এর আগে এই বিষয়ে যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলো থেকে খুব একটা আলাদা নয়। পাঠকেরাও তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।

এক সময় আমি নিজেই ভুলে যাই ওটার ব্যাপারে। সায়াকা যে এই প্রতিবেদনটা পড়েছে, তা ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করিনি আমি।

“প্রতিবেদনে একজন মা’র কথা বলেছিলে যে মাঝরাতে নিজের বাচ্চার গলা চেপে ধরে, কারণ সে কান্না থামাচ্ছিল না, তাই না? লেখাটা পড়ে চমকে গেছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন আমাকে নিয়েই লেখা হয়েছ।”

“তোমারও কি এরকমটা করতে ইচ্ছে হয়েছে কখনো?”

“হ্যাঁ, হয়েছে। ছোট বেলায় মিহারু রাতের বেলা অনেক কাঁদত। এক রাতে ও কেবলই কান্না শুরু করবে, এমন সময় কী করেছিলাম জানো? তোয়ালে পেঁচিয়ে ওর মুখে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম। এটাই কি যথেষ্ট প্রমাণ না যে আমার সমস্যা আছে?” নিজের প্রতি করুণা থেকেই যেন হাসলো সায়াকা। কিন্তু ওর চোখ এখনও ভেজা। “এটা তো শারীরিক নিপীড়ন, তাই না? তুমি এমন কিছুই লিখেছিলে।”

“শুধু এই একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে কিছু বলা উচিত হবে না,” সাবধানি কণ্ঠে বললাম।

শিশু নিপীড়নকে চার ভাগে ভাগ করা যায় শারীরিক নিপীড়ন, শিশুর প্রতি দায়িত্বে অবজ্ঞা, যৌন নিপীড়ন, মানসিক নিপীড়ন। অভিভাবকে কোনো কাজে শিশু যদি শরীরে কোনো প্রকার ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করে, তাহলে সেটা শারীরিক নিপীড়ন। সায়াকা এখন যে কথাটা বললো, এটা শারীরিক নিপীড়নের মধ্যেই পড়ে।

“গত কয়েক মাসের মধ্যে কিছু হয়েছে?”

“ওর পায়ে মেরেছি। মানে, হাঁটু ভাঁজ করে বসতে বলেছিলাম। এরপর থাইয়ের উপরে মারতেই থাকি। লাল হয়ে ফুলে গেলেও থামিনি।”

“কেন?”

“খাচ্ছিল না ও। বলেছিলাম চিপস জাতীয় খাবার না খেতে। কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে সেগুলো ঠিকই খায়, এরপর রাতের বেলা আর কিছু মুখে তোলে না।”

“সেজন্যে শাসন করেছিলে?”

“হ্যাঁ।”

“ও কান্না করার পরেও থামোনি?”

লম্বা একটা শ্বাস নিল ও। এরপর রোবটের মতন ধীরে ধীরে আমার দিকে ঘুরলো।

“ও কাঁদে না। মারলে ব্যথা লাগে নিশ্চয়ই, কিন্তু কান্নাকাটি করে না। মনে হয় যেন কমার অপেক্ষা করছে।”

“কী কমার অপেক্ষা করছে?”

“ঝড়,” চুলে হাত বুলায় সায়াকা। “প্রতিবার এই একই ঘটনা। আমি রেগে গেলেই পাথরের মতন হয়ে যায় ও। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকায় কেবল। ওর চোখে ওরকম দৃষ্টি দেখে মাথা পুরোপুরি আউলে যায় আমার। যতক্ষণে হুঁশ ফেরে, ততক্ষণে মারতে মারতে দাগ ফেলে দিয়েছি।”

“কিন্তু কাজটা যে ঠিক করছো না, এটা তো বোঝো তুমি?”

“অবশ্যই বুঝি। কিন্তু নিজেকে থামাতে পারি না। তোমার কাছে হয়তো অদ্ভুত লাগছে শুনতে। কিন্তু এটাই সত্যি। ওর সামনে গেলেই নিজেকে যেন বুঝতে পারি না আমি। কী করা উচিত, সেই বুদ্ধি লোপ পায়। আমার মারের কারণে ওর পা ফুলে গেছে, এটা দেখে ভয় পেয়ে যাই,” সায়াকা বলে। গাল এখনও ভেজা ওর। “আমার মাথায় সমস্যা আছে।”

“নাহ। এরকম আরো অনেক মানুষ আছে।”

সাক্ষাৎকারের সময় জানতে পারি-সত্তর শতাংশ মা, যারা ফোন দিয়ে সাহায্য চেয়েছে, নিজেদের নিপীড়ক হিসেবে চিহ্নিত করে। এটা শুনে অনেকে বলতে পারে, তারা যেহেতু নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফোন দিয়েছে, তাহলে বাচ্চাকে নির্যাতন না করলেই হয়। কাউন্সেলরের মতে, এই ভাবনাটাই ভুল। যে মায়েরা ফোন দিয়েছে, তারা নিজেদের থামাতে পারে না বলেই ফোন দিয়েছে। যেমন, রাগের চোটে বাচ্চাকে মাথায় করা আঘাতের ফলে সে অচেতন হয়ে গেলে তাকে হাসপাতালে মায়েরাই নিয়ে যায়। ভেতরে যখন বাচ্চাকে চিকিৎসা দেয়া হয়, তখন এই মা-ই বাইরে বসে কাঁদে। ফোনে তারা বলে যে এরকমটা চলতে থাকলে হয়তো এক সময় নিজের বাচ্চাকে মেরেই ফেলবে।

সায়াকা’কে একটু শান্ত হবার সময় দিলাম। এরপর বললাম, “তোমার স্বামী এই বিষয়ে কিছু জানে?”

“মনে হয় না,” রুমাল দিয়ে চোখ মুছে বলে ও। “আমি ওকে কিছু বলিনি। আমি না বললে বাসায় কী হচ্ছে এই ব্যাপারে কিছু জানা সম্ভব নয় ওর পক্ষে। না জানলেই ভালো। জানলে বাচ্চাকে আমার কাছে রেখে অ্যামেরিকায় যেতে পারত না।”

“তাকে বলোনি কেন?”

“কারণ…” সায়াকার কণ্ঠে দ্বিধা।

ওর মনের অবস্থা বুঝতে পারছি।

নিশ্চয়ই ভয় পাচ্ছিল সত্যটা শুনলে স্বামী ভেবে বসবে যে ওর পক্ষে মেয়ের লালন পালন সম্ভব নয়। সায়াকার আত্মসম্মানের প্রতিও এটা হবে বড় একটা আঘাত।

“সে কখনো কিছু সন্দেহও করেনি? মিহারুকে দেখে?”

“মনে হয় না।”

“কেন?”

“কারণ মিহারু বাবার সামনে একদম লক্ষ্মী হয়ে থাকে। সব কথা শোনে। কোনো প্রকার দুষ্টুমি করে না। আমার জামাই এতেই খুশি। ও তো বলে যে অফিসের অন্য সহকর্মীদের একই বয়সি বাচ্চারা ভীষণ জ্বালায়। মিহারুর মত মেয়েকে যে পেয়েছি, এটা আমাদের সৌভাগ্য। আসলে ও কিছুই জানে না। নিজের মেয়ের আসল রূপ সম্পর্কে ধারণা নেই বলেই এসব মন্তব্য করে।”

সায়াকার ঠোটের কোণের বাঁকা হাসিটা মেয়ের প্রতি ওর বিতৃষ্ণারই সাক্ষ্য দিচ্ছে।

“কারো সাথেই এই বিষয়ে কোনো আলাপ করোনি?”

“না। কিন্তু আমি অনেক বই পড়েছি এসব বিষয়ে।”

“আচ্ছা।”

“যেসব মায়েরা বাচ্চাদের উপরে এরকম শারীরিক অত্যাচার চালায়, তাদের বেশিরভাগই বাজারে লব্ধ সন্তান লালন-পালন বিষয়ক বই অন্ধের মতন অনুসরণ করে। কিন্তু বাস্তবে সবকিছু ওভাবে মেনে চলা সম্ভব হয় না কখনোই। অপ্রত্যাশিত সব সমস্যার সৃষ্টি করে বাচ্চারা। অনেকবার নিজেকে থামালেও ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে একটা পর্যায়ে। তখন আবারও গায়ে হাত তোলে।

“মিহারু কতদিন ধরে দাদা-দাদির সাথে আছে?”

“দশ দিন হলো।”

“এর আগে তাহলে তোমরা দু’জনেই ছিলে?”

“হ্যাঁ।”

“তখন কেমন ছিল পরিস্থিতি?”

“একদম বাজে,” বলে সায়াকা। “আমাদের এলাকায় একটা পরিবার আছে, যারা বাচ্চাদের দেখেশুনে রাখে। ওখানে ওকে দেয়ার কথাও ভেবেছি আমি। মিহারুর সাথে থাকতে থাকতে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। ভয় হতো ভীষণ উল্টোপাল্টা কিছু না করে বসি।”

“সেজন্যেই ওকে শ্বশুর-শাশুড়ির ওখানে পাঠিয়ে দিয়েছ?”

“না,” মাথা ঝাঁকিয়ে বলে সায়াকা। “ওনারা এসে নিয়ে গেছে।”

“কী হয়েছিল?”

“ওই পরিবারের কাছে মিহারুকে মাঝে মাঝে রেখে আসতাম আমি তারাই যোগাযোগ করেছে আমার শ্বশুরের সাথে। ফোন নম্বর পেয়েছে আমার জামাইয়ের কাছ থেকে।”

“হঠাৎ ফোন দিল যে?”

“মিহারুর গায়ে দাগ দেখে ফেলেছিল ওরা।”

“দাগ?” প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম। “তুমি আবার মেরেছিলে নাকি ওকে?”

রুমাল দিয়ে চোখ মুছে নাক ঝাড়ল সায়াকা।

“অনেক আগেই নাকি দেখেছে। মিহারু কিছু বলেনি, কিন্তু তারা আঁচ করতে পেরেছিল যে কোনো একটা সমস্যা আছে। তাই শ্বশুরকে ফোন দিয়েছিল।”

“মিহারুকে নিতে এসে তোমার শাশুড়ি কী বলেছিল?”

“এটাই যে, কম বয়সি মায়েদের অবসন্নতা থেকে এমনটা হয় মাঝে মাঝে। মিহারুকে কিছুদিন তারা দেখভাল করবে। স্বাভাবিকভাবেই কথাগুলো বলেছিল সে, কিন্তু হাবভাবে বোঝাই যাচ্ছিল যে আমাকে বাচ্চা লালন-পালনের অযোগ্য ধরে নিয়েছে।”

“আর ওকে যেতে দিলে তুমি?”

“আর কোনো উপায় ছিল না। আমি আসলেই মা হবার যোগ্য নই।” এর জবাবে বলার মত কিছু খুঁজে পেলাম না। উইন্ডশিল্ডের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।

“আমার শাশুড়ি ফোন দিয়ে সেদিন বললো যে মিহারু ওখানে ঠিকঠাকই আছে। তার কথাই হয়তো সত্যি। ভেবেছিলাম বাচ্চারা হয়তো মায়েদের ছাড়া থাকতে পারে না, কিন্তু এটা আমার ভ্রম। বাচ্চার দেখাশোনা করতে হচ্ছে না, এজন্যে ভেতরে ভেতরে স্বস্তিবোধ করছিলাম, অস্বীকার করবো না। এই যে আমি এখন ফোন দিলাম, এমন নয় যে মিহারুর কথা মনে হচ্ছিল খুব। আসলে শ্বশুর-শাশুড়ি যেন কিছু বলার সুযোগ না পায়, সেজন্যেই ফোন করেছি।”

“এভাবে চিন্তা করলে কিন্তু সবসময় নিজের দোষটাই চোখে পড়বে।”

আমার কথাগুলো ওর পছন্দ হলো বলে মনে হয় না। চুপ করে রইলো। “আমার প্রতিবেদনটা পড়ে কি কোনো লাভ হয়েছিল?”

“অনেক কিছু শিখেছি ওখান থেকে,” বলে সায়াকা। “বিশেষ করে, তুমি এক জায়গায় বলেছিলে মায়েদের নিজেদের শৈশবেরও একটা ভূমিকা আছে এরকম আচরণের পেছনে।”

“ওহ…”

আমি নিজেও অবাক হয়েছিলাম তথ্যটা জেনে। যেসব মায়েরা তাদের বাচ্চাদের শারীরিক নিপীড়ন করে, তাদের প্রায় পয়তাল্লিশ শতাংশ নিজেও নিপীড়নের শিকার। আর যদি তেমনটা না হয়ে থাকে, তাহলে শৈশবে একাকীত্বে ভুগেছে তারা। যেমন, বাবা ফেলে রেখে চলে গেছে বা মা অসুস্থ থাকত সবসময়-এরকম। সহজ কথায়, তাদের ভালোবাসার কেউ ছিল না।

যেহেতু নিজেদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে তারা ভালোবাসা পায়নি, তাই সন্তানদেরও ভালোবাসা দিতে অক্ষম সেই মায়েরা। এভাবে চিন্তা করলে বিষয়টা স্বাভাবিকই ঠেকবে। যে নারী কাউন্সিলরের সাথে কথা বলেছিলাম আমি, সে এমনটাই বলেছিল।

“প্রতিবেদনটা পড়ার পরই নিজের অতীত নিয়ে সন্দেহ জাগে আমার মনে। আমার শৈশব স্মৃতি বলতে কিছু নেই, এই কথাই মাথায় ঘুরতে থাকে প্রতিনিয়ত।”

“ওহ, তাহলে এই কথা।”

“কিন্তু আমার একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব না, এজন্যেই তোমাকে ফোন দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, তুমি হয়তো বুঝবে আমাকে। আসলে, তুমিই আমাকে সবচেয়ে ভালো চেন।”

“এসব কথা আমাকে আরো আগে বললেই পারতে।”

“সরি। আমার সাথে এখানে এসেছে, এজন্যে আমি কৃতজ্ঞ।”

“আমি বুঝতে পেরেছিলাম, কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত তুমি।” ওর বাম হাতের কব্জির দিকে তাকালাম। ক্ষতস্থানে ডান হাত দিয়ে ডলছে ও।

“ঝোঁকের বসে কাজটা করি, মিহারুকে নিয়ে যাওয়ার পর।”

“একদমই ঠিক করোনি।”

“ক্ষতটা ওরকম গুরুতর না। শুধু চামড়া কেটেছে। ঘুমের ঔষধও খেয়েছিলাম। উঠে দেখি আর রক্ত ঝরছে না। নিজের জন্য নিজেরই খারাপ লাগছিল তখন।

“এই ধরনের চিন্তা আর মাথায় আনবে না।” সায়াকা কেন ঘুমের ঔষধ খেয়েছে, তা ভাবছি।

“না, আনবো না।”

গিয়ারে হাত রাখলাম।

“গাড়ি স্টার্ট দিব?”

“হ্যাঁ,” বললো সায়াকা। কিন্তু গাড়ি নিয়ে পার্কিং লট থেকে বের হব এসময় আমাকে থামালো ও। “দাঁড়াও।”

ব্রেক কষলাম।

“আমরা কি ফিরে যেতে পারি?” এক মুহূর্ত চুপ থাকার পর বলে ও।

“ফিরে যাব? বাড়িটায়?”

“হ্যাঁ,” গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে সায়াকা।

“কেন?”

চোখ নামিয়ে পায়ের উপরে সামনে পেছনে হাত ঘষতে থাকে ও।

“এভাবে ফিরে যেতে চাই না। আমার মানসিক সমস্যার কারণ যেহেতু এই বাড়িটাই, একদম গভীরে যেতে চাই বিষয়টার। টোকিওতে ফিরে ধীরে ধীরে মনে করার চেষ্টা করলে সমস্যার সমাধান হবে না। এই বাড়িতে গিয়ে সবকিছু আবারও দেখতে ভালো মতন, তাহলে স্মৃতি ফিরে পেতে পারি।” ওর কথাটা বুঝতে পারছি।

“যুক্তি আছে তোমার কথায়, কিন্তু আজ অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে।”

“তোমার থাকতে হবে না, শুধু আমাকে নামিয়ে দিয়ে আসো, বাকিটুকু আমি বুঝে নিব,” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল সায়াকা। “তুমি চলে যাও।”

স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে ভাবতে লাগলাম। ওর দৃঢ় কণ্ঠ শুনেই বোঝা যাচ্ছে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। আমি কিছু বললে রাজি হবে না।

“এই বাড়িতে নির্ঘুম রাত কাটাবে?”

“শুধু এক রাতই তো। ব্যাপার না। “

“খাওয়া-দাওয়ার কী হবে?”

“এক দিন না খেলে কিছু হবে না আমার।”

“শরীরের জন্যে তো ভালো না সেটা। চলো দেখি কোনো কনভেনিয়েন্স স্টোর পাই কিনা,” বলে ব্রেক থেকে পা সরালাম।

হাইওয়ে ধরে কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তার পাশের একটা কনভেনিয়েন্স স্টোর থেকে স্যান্ডউইচ, ড্রিঙ্কস আর টর্চ কিনে বাড়িটার দিকে এগোলাম। বৃষ্টি ধরে এসেছে। তবে থেকে থেকে বজ্রপাতের শব্দ কানে আসছে দূর থেকে।

টর্চ জ্বেলে ঢুকে পড়লাম বাড়িটায়। বেজমেন্টে খুঁজে পাওয়া মোমবাতিটা জ্বেলে লিভিং রুমের কফি টেবিলের উপরে রাখলাম। বাতাস ঢুকছে কোনো এক ফাঁক দিয়ে। দোল খাচ্ছে আগুনটা, সেই সাথে দেয়ালে দোল খাচ্ছে ছায়াগুলো।

“একা থাকতে ভয় লাগবে না?” জিজ্ঞেস করি।

“সেটা বলতে পারছি না। লাগতেও পারে। কিন্তু আমি একটু চাপের মধ্যে থাকলেই বোধহয় ভালো,” সোফায় বসে বলে ও। ঠাট্টা করছে নাকি সিরিয়াস, সেটা বুঝতে পারলাম না। “ডায়রিটা কোথায়?”

“এই যে,” মোমবাতির পাশেই রাখা ছিল ওটা। “আর কিছু দরকার হবে তোমার? লাগলে নিয়ে আসব আমি।”

আস্তে করে মাথা ঝাঁকাল সায়াকা। “চিন্তা করো না। আমি ঠিকঠাকই থাকবো।”

“আসি তাহলে।”

“আচ্ছা। ধন্যবাদ, অনেক কষ্ট করলে।”

ওকে বিদায় জানিয়ে দরজা খুললাম। পেছনে ফিরে দেখি, মোমের আলোয় সায়াকা আমার উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছে।

সেই মুহূর্তে আমার অনুভূতির কথা শুনলে হয়তো হাসবে অনেকে। ওকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না। প্রচণ্ড দ্বিধায় ভুগছিলাম যে যাব কিনা কিন্তু থেকে গেলে ওর সাথে রাত কাটাতে হবে এখানে, যেটা শুরু থেকেই এড়াতে চাইছি আমি।

বেজমেন্ট একদম ঠাণ্ডা। এই বাড়িটা অদ্ভুত বললেও কম বলা হবে। প্রাণের কোনো চিহ্ন নেই কোথাও। শুধু শীতল নিস্তব্ধতা। এই অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে মুক্তির জন্যে হলেও যত দ্রুত সম্ভব চলে যেতে চাই এখান থেকে। কিন্তু বাড়িটায় ঢোকা আর বের হওয়ার রাস্তা বেজমেন্টে বানানো হলো কেন?

দরজার সামনে গিয়ে হাতলে হাত রাখলাম। বাইরে বের হবার আগে অবচেতন মনেই একবার আলো ফেললাম দরজার উপরের ফ্রেমের দিকটায়। ধুলোর কারণে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু কিছু একটা আছে ওখানে। হাত বাড়িয়ে ধুলো পরিষ্কার করলাম।

ছোট একটা ক্রুশ। কাঠ কুঁদে বানানো।

ক্রুশটা দেখার সাথে সাথে অস্বস্তি আরো গাঢ় হয়ে চেপে বসলো আমার মনে। এরকম একটা জিনিস কে এখানে লাগাবে?

দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর ডানে ঘুরে উপরতলায় উঠে এলাম। করিডোর পার হয়ে লিভিং রুমে ঢুকে দেখি সায়াকা ডায়রিটা পড়ছে। অবাক চোখে আমার দিকে তাকালো ও।

“কী হয়েছে?”

এক মুহূর্ত ইতস্তত করার পর বললাম, আমিও থেকে যাব।

বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে চোখ পিটপিট করলো সায়াকা।

“আমার জন্যে চিন্তা করতে হবে না তোমাকে।”

“চিন্তা করছি না,” বলি। “আমিও জানতে চাই এই বাড়িটায় কী ঘটেছিল অতীতে।”

একদিকে ঘাড় কাত করে কিছুক্ষণ ভাবে সায়াকা।

“আরো স্যান্ডউইচ কিনলে ভালো হতো।” হাসি ফুটেছে মুখে।

“একদিন অল্প খেলে সমস্যা হবে না,” বলে ওর পাশে বসে পড়লাম।

ক্রুশটার ব্যাপারে জানালাম সায়াকা’কে। আমার মতই অবাক হলো ও। জিনিসটা দেখার জন্যে আবারও একসাথে নিচে নামলাম দু’জনে।

“আসলেই দেখি একটা ক্রুশ,” দরজার উপরে টর্চের আলো ফেলে বলে সায়াকা। “এই পরিবারটা হয়তো খ্রিস্টান ছিল। কিন্তু এর আগে কখনো কোথাও এভাবে পেরেক দিয়ে ক্রুশ আটকাতে দেখিনি।

“যদি আসলেও খ্রিস্টান হয়ে থাকে, তাহলে আরো ভালো একটা ক্রুশ লাগানো উচিত ছিল,” মাথা কাত করে বললাম।

লিভিং রুমে ফিরে এলাম কিছুক্ষণ পর। ইউসুকের ডায়রিটা পড়তে হবে। আলো কম হওয়ায় আরো তিনটা মোমবাতি জ্বেলে নিলাম।

সায়াকা বললো আবারও প্রথম থেকে কোনো কিছু বাদ না দিয়ে পড়ে যেতে। দ্বিমতের কোনো কারণ নেই, হাতে পর্যাপ্ত সময় আছে।

পড়তে পড়তে একটা সময় আবিষ্কার করলাম ইউসুকে যখন মে মাসের ৫ তারিখে প্রথম ডায়রি লেখা শুরু করেছিল, তখন সে প্রাথমিক স্কুলের চতুর্থ গ্রেডের শিক্ষার্থী। পরের বছরের এপ্রিল মাসে, নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে ছেলেটা লিখেছে, ‘আজ থেকে আমি পঞ্চম গ্রেডের ছাত্র। এই পর্যন্ত উল্টোপাল্টা কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই ডায়রিতে। নিয়মিত পড়াশোনা করে ইউসুকে, বন্ধুদের সাথে সম্পর্কও ভালো। বাসার পরিবেশ স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বছরের জুনে হঠাৎ পাল্টে গেল পরিস্থিতি।

‘১৫ জুন, বৃষ্টি

আজ সন্ধ্যায় বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন ঘরে হোমওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম আমি। হঠাৎ শুনি মা চিৎকার করছে। গিয়ে দেখি মা’র পাশে শুয়ে গোঙাচ্ছে বাবা। মা বলেছিল রুমে ফিরে যেতে, কিন্তু চিন্তা হচ্ছিল বিধায় ওখানেই থেকে যাই। অ্যাম্বুলেন্স ডাকবে নাকি জিজ্ঞেস করলে বাবা হাত নেড়ে ঝামেলা করতে মানা করে দেয়। বেরিয়ে যেতে বলে আমাদের। এই প্রথম বাবাকে ওভাবে চিৎকার করতে শুনলাম। তখন মা আমার হাত ধরে নিচে নিয়ে আসে। বাবা অসুস্থ কিনা জিজ্ঞেস করলে বলে চিন্তার কিছু নেই। আমি মা’র সাথে রান্নাঘরের টেবিলে বসে আছি, এমন সময় বাবা নেমে আসে নিচে। ঘামে চুপচুপে হয়ে ছিল তার চুল। বাবা আমাকে কাউকে তার অসুস্থ হয়ে পড়ার ব্যাপারে কিছু বলতে নিষেধ করে। কারণ জিজ্ঞেস করলে জবাব দেয় যে এটা ওরকম কোনো বিষয় নয়। বুকের ভেতরে ধুকপুক করছিল আমার, কিন্তু আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।’

‘২০ জুন, মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, হালকা বৃষ্টি

স্কুল থেকে ফিরে দেখি করিডোরের সামনে বাবার জুতা। সপ্তাহের মাঝখানে এই সময়ে তার অফিসে থাকার কথা। একটু অবাকই হয়েছিলাম। ব্যাগ নামিয়ে রেখে বাবার ঘরে গিয়ে উঁকি দেই। শার্ট-প্যান্ট পরেই বিছানায় শুয়ে ছিল সে। আমি পাশে গিয়ে দাঁড়ালে একবার শুধু কিছুক্ষণের জন্যে চোখ খোলে বাবা, এরপর চোখ বন্ধ করে নেয়। খুব চিন্তা হচ্ছিল আমার। সন্ধ্যায় ইয়ামামোতো আমাকে দেখানোর জন্যে ওর ব্যাঙাচিগুলো নিয়ে এসেছিল। খুব ভালো লেগেছে দেখে। কিন্তু মন ভালো হয়নি।’

ডায়রির এই দু’টো এন্ট্রি পড়ে বোঝা যাচ্ছে যে ইউসুকের বাবার শরীর খারাপ করেছিল সেই সময়ে।

“দেখেছ, শরীর খারাপ, কিন্তু ছেলেকে বুঝতে দিতে চাচ্ছে না লোকটা। এসব একদমই ভালো লাগে না আমার,” সায়াকার উদ্দেশ্যে বলি। “আসলেও কি গুরুতর কিছু হয়নি, নাকি…”

“খারাপ কিছু?” আমার প্রশ্নটা শেষ করলো সায়াকা। “কিন্তু ইউসুকের ডায়রি পড়ে মনে হচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরেই অসুখের ব্যাপারে জানত সে।”

“অ্যাম্বুলেন্স ডাকার কথা বললে ওরকম চিৎকার করলো কেন বুঝছি না।”

“অনেক দিন ধরে অসুস্থ হলে সেটার আরো আলামত থাকার কথা,” যে পাতাগুলো পড়া হয়েছে, সেগুলো উল্টে গেল সায়াকা। খানিক বাদে ডায়রির একটা পাতার দিকে নির্দেশ করে বললো, “এদিকে দেখ।”

‘১৫ মে, রোদ

আজকে রাতের খাবারে বিফ হট পটের আয়োজন করেছিল মা, মা, আমার সবচেয়ে পছন্দের খাবার। একেবারে অনেকগুলো মাংস খেয়ে ফেলেছিলাম প্রথমে, তাই মা সবজি খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমার পিয়াজ ভালো লাগে না একদমই, তাই গুগুলো ফেলে দিয়েছিলাম বেছে। বাবার মাথাব্যথা করছিল, তাই রুমে ফিরে যায় খাওয়ার মাঝে। তার ভাগের মাংসও খাই আমি। পেট একদম ভরা।’

ডায়রির পাতা থেকে মুখ তুললাম। “মাথাব্যথার কথা লেখা আছে এখানে।”

“শুধু এখানেই না, এই জায়গায় দেখো।” আরেকটা পাতা দেখাল আমাকে ও। সেখানে লেখা-

‘২১ এপ্রিল, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন আজকে স্কুল বন্ধ ছিল। ইয়ামামোতো, কানেই আর শিমিযুর সাথে ডজবল খেলেছি আমি বাসার সামনে। ফুটবলও খেলেছি কিছুক্ষণ। কিন্তু শব্দ বেশি করছিলাম দেখে মা বকুনি দেয়। বাবার শরীর একটু খারাপ তাই বিশ্রাম নিচ্ছিল ভেতরে। আমাদের হৈচৈ করতে মানা করে মা। তখন কানেইয়ের বাসায় যাই আমরা। অনেকগুলো গোল্ডফিশ আছে ওদের। আমার সবচেয়ে ভালো লাগে চোখ বের করা বড় মাছটা।’

এরপর একটু খেয়াল করে পড়তেই বুঝতে পারলাম অনেক জায়গাতেই ইউসুকের বাবার শরীর খারাপের কথার উল্লেখ আছে। কিন্তু ইউসুকে বিষয়টাকে ততটা গুরুত্ব দেয়নি। জুনের ১৫ তারিখের এন্ট্রিতে প্রথম চিন্তিত হতে দেখা যায় তাকে।

বাকি লেখাগুলো পড়তে শুরু করলাম। জুনের ২০ তারিখের পর লম্বা সময় ইউসুকের বাবার খোঁজ মিলল না লেখায়। সেটা কি ইচ্ছেকৃত নাকি লিখে রাখার মতন কিছু ঘটেনি বলে, তা বলতে পারব না। আগস্ট মাসে মোড় বদলে গেল ঘটনার।

‘১০ আগস্ট, রোদ

মা আর আমি বসে তরমুজ খাচ্ছিলাম, এসময় বাবার অফিস থেকে ফোন আসে। শরীর বেশি খারাপ করায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাকে। তখনই বেরিয়ে যায় মা, আমিও যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মা বলে বাসায় অপেক্ষা করতে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি, কিন্তু মা আসেনি। সন্ধ্যায় অবশেষে যখন ফেরে, তখন বাবার অবস্থা জানতে চাই আমি। মা বলে চিন্তা না করতে। কিন্তু আমার খুব খারাপ লাগছে। বাবা ঠিক আছে তো?’

‘১১ আগস্ট, রোদ

মা আর আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। নার্স বললো বাবা নাকি গতকাল পুরোটা সময় ঘুমিয়েছে। আমাদের দেখে হাসি ফোটে তার মুখে। বাবা তখন আমাকে বলে যে সে ঠিক আছে। আসলেও ভালো দেখাচ্ছিল তখন। একটু স্বস্তি পাই আমি। কিন্তু বাসায় ফেরার পথে মা বলে বাবাকে নাকি হাসপাতালে কিছুদিন থাকতে হবে। বাবার কী অসুখ হয়েছে জানতে চাইলে মা জবাব দেয় যে চিন্তা করার মত কিছু হয়নি।’

‘১২ আগস্ট, রোদ

গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে যে বাড়ির কাজ দিয়েছিল, সেগুলো সকালেই করে ফেলেছি আমি। দুপুরে মা’র সাথে হাসপাতালে গিয়েছিলাম, কিন্তু বাবার সাথে দেখা করা সম্ভব হয়নি। মা কী নিয়ে যেন ডাক্তারের সাথে কথা বললো অনেকক্ষণ। একটু পর শুনি বাবা ঘুমাচ্ছে, তাই দেখা করা যাবে না। বাসায় ফিরে অনেক জায়গায় ফোন করেছে মা, কাঁদছিল ভীষণ। ভয় লাগছে আমার।’

‘১৩ আগস্ট, রোদ

আজকে মা একাই গিয়েছিল হাসপাতালে। আমি বাসায় একা ছিলাম। ওটাই আন্টি এসেছিল দুপুরবেলা। আমাকে নুডলস রান্না করে খাইয়েছে। তার কাছে বাবার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম। জবাবে আন্টি বলে বাবা ঠিকই আছে, খুব দ্রুত ফিরে আসবে বাসায়। মা যে কাঁদছিল, এটা তাকে বলি আমি। ওটাই আন্টি চুপ করে ছিল শুনে। আমি আবারও বাবার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি, কিন্তু এবারে আর কিছু বলেনি সে।’

এই সময় প্রায় প্রতিদিনই ডায়রি লিখেছে। বেশিরভাগ কথাই তার বাবাকে নিয়ে। প্রথমে সে ধরে নিয়েছিল যে বাবা অসুস্থ, কিন্তু অসুস্থতার মাত্রা যে এত বেশি, তা বুঝতে পারেনি। ধীরে ধীরে ভয় দানা বাধতে থাকে ছেলেটার মনে। মা-ও পরিষ্কার করে কিছু না বলায় আরো বেশি চিন্তায় পড়ে যায়।

সেপ্টেম্বর নাগাদ দ্বিতীয় সাময়িক শুরু হয়ে যাওয়ায় বাবার ব্যাপারে খুব বেশি লেখার সময় পায়নি ইউসুকে। তখনও হাসপাতালে ছিল সে। ইউসুকে তার অনুপস্থিতির সাথে মানিয়ে নেয়।

কিন্তু বাবাকে ভোলেনি সে। সপ্তাহে দুই তিনবার গিয়ে দেখে আসে। বেশিরভাগ সময়ই ঘুমিয়ে কাটান মি. মিকুরিয়া। কিন্তু জেগে থাকলে ছেলের সাথে এমন ভাবে গল্প করেন যেন কিছুই হয়নি।

‘২০ সেপ্টেম্বর, মেঘ

আজকে বাবাকে দেখতে গিয়েছিলাম। বিছানায় বসে একটা বই পড়ছিল সে। আইনের মোটা বই। বাবা এখন লম্বা সময় ধরে কিছু পড়তে পারে না, তাই বিরতি দিয়ে পড়ে। বই না পড়লে নাকি তার ভালো লাগে না। আসলে আগে থেকেই পড়তে খুব ভালোবাসে বাবা, তাই এটাই স্বাভাবিক। বাবা সবসময় বলে যে বেশি বেশি পড়া উচিত সবার। অলসতা মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে। আমিও বাবার মত বড় আইনজীবি হতে চাই। অঙ্কে একশোতে নব্বই পেয়েছি শুনে বকা দিয়েছে আমাকে। পরের পরীক্ষায় যে করেই হোক পুরো নম্বর পেতে হবে।’

বাবা হিসেবে বেশ কঠোর লোকটা, ভাবি আমি। কিন্তু শরীর দুর্বল হলে মনও এক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইউসুকে এখনও জানে না ওর বাবার কী হয়েছে, কিন্তু মনে মনে আন্দাজ করে নিয়েছে। অক্টোবরে এই বিষয়ে প্রথম লিখেছে সে।

‘৯ অক্টোবর, রোদ

স্কুল শেষে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। তখনও ঘুমাচ্ছিল বাবা। তার বিছানার পাশে বসে একটা বই পড়েছি। বাবা চোখ খোলার পর জিজ্ঞেস করি যে ঘুম হয়েছে কিনা। কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব দেয়নি সে। আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু দেখতে পাচ্ছিল না যেন। কথাও শুনতে পারছিল না। শূন্যদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ, যেন তার শরীর থেকে তার আত্মা চুরি হয়ে গেছে। কিন্তু বাবা একবার আমাকে বলেছিল আত্মা বলতে আসলে কিছু নেই। মানুষ তার ব্রেইনের মাধ্যমে সবকিছু করে। তাহলে কি বাবার ব্রেইনে কিছু হয়েছে?’

ব্রেইন?

ইউসুকের আন্দাজ যুক্তিসঙ্গতই মনে হলো আমার কাছে। এর আগের এন্ট্রিগুলোয় আমরা পড়েছি, প্রায়ই মাথাব্যথায় ভুগত লোকটা। “ব্রেইনে কী কী অসুখ হতে পারে?” সায়াকা জিজ্ঞেস করে। “অনেক কিছুই হতে পারে। যেমন টিউমর,” জবাবে বলি আমি “ব্রেইন টিউমর…” ঢোঁক গেলে সায়াকা। “তাহলে তো সুস্থ হবার সম্ভাবনা খুবই কম। দেখি কী হয়।” আবারো ডায়রি পড়তে শুরু করলাম আমরা।

‘২৪ অক্টোবর, মেঘ বাবা টানা পাঁচ দিন ধরে ঘুমাচ্ছে। মা প্রতিদিনই হাসপাতালে যায়, কিন্তু বাবার জ্ঞান ফেরে না। ডাক্তার আংকেলও বলতে পারেনি কবে ঘুম ভাঙবে বাবার।’

‘২৬ অক্টোবর, বৃষ্টি, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন

বাবার জ্ঞান ফিরেছে শুনে হাসপাতালে গিয়েছিলাম আজকে। কিন্তু তার সাথে দেখা হয়নি। মা একা ঢুকেছিল ওয়ার্ডে। ফিরে এসে বলে ঠিক আছে বাবা। কিন্তু সেটা কি সত্যি?’

‘৩০ অক্টোবর, হালকা মেঘ

আজকে বাবার সাথে দেখা হয়েছে। মা আর আমি দুপুরের দিকে গিয়েছিলাম। পথে ফলের দোকান থেকে ফল কিনি আমরা। আগের মত আর দাঁড়াতে পারে না বাবা। সারাক্ষণ শুয়ে থাকতে হয়। ওজন কমে গেছে। মা বলেছে ঘুমের সময় খেতে পারেনি দেখে এমন হয়েছে। আপেল ছোট ছোট টুকরো করে কেটে খাওয়াতে হচ্ছিল বাবাকে। অনেকক্ষণ ধরে চিবুনোর পর একবার শুধু ‘মজা’ বলেছিল বাবা। কিন্তু ভালো করে শুনতে পাইনি আমি।’

এই পর্যায়ে ইউসুকের বাবার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। ডায়রিতে প্রায়ই ‘কোমায় চলে গেছে’, ‘লম্বা ঘুম’ জাতীয় কথা দেখতে পাই আমরা।

নভেম্বরের মাঝ দিকে অবশেষে ইউসুকের সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেয় তার মা।

‘১০ নভেম্বর, বৃষ্টি

আজকে রাতের খাবারের পর মা আমার সাথে বাবার অসুস্থতা নিয়ে কথা বলেছে। বাবা আসলে খুবই অসুস্থ, পুরোপুরি সেরে উঠবে না কখনোই। তখন আমি জিজ্ঞেস করি বাবা মারা যাবে কিনা। ‘হ্যাঁ’ বলে কাঁদতে শুরু করে মা। আমিও কেঁদেছি। তখন মা বলে বাবার সামনে এভাবে কাঁদা যাবে না। তাহলে সে-ও ভেঙ্গে পড়বে। আমি কথা দিয়েছি বাবার সামনে কাঁদব না।’

‘১১ নভেম্বর, রোদ আজ সারাদিন মাথাব্যথা করেছে। কালকে রাতে ঘুমাইনি, এজন্যেই বোধহয়। আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না যে বাবা মারা যাবে।’

‘১২ নভেম্বর, রোদ

মা আর আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। বাবা জেগে ছিল পুরো সময়, কিন্তু আমাদের দিকে তাকায়নি একবারের জন্যে। আমি কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু জবাব দেয়নি। মা তার ডায়পার বদলে দিয়েছে।’

‘২০ নভেম্বর, মেঘ

আজকের জাপানি সাহিত্য ক্লাসের সময় একজন তরুণ টিচার দরজা খুলে আমাদের টিচারকে বাইরে ডেকে নেয়। একটু পর আমাকে ডেকে নিয়ে যায় জাপানি সাহিত্যের টিচার। হাসপাতালে বাবার শরীর খুব খারাপ করেছে, আমাকে নাকি তক্ষুনই যেতে হবে। স্কুলব্যাগ রেখেই বেরিয়ে যাই আমি। হাসপাতালে পৌঁছে দেখি মা কাঁদছে। বাবা মারা যায়নি। কিন্তু ডাক্তার বলেছে কোনোমতে বেঁচে গেছে সে। শুনে মন থেকে চিন্তা দূর হয় আমার। কিন্তু মা তখনও কাঁদছিল।’

সেই দিনের পরে আতঙ্কে কাটতে থাকে ইউসুকের দিন। কখন খারাপ খবর আসে হাসপাতাল থেকে! ডিসেম্বরে অবশেষে সেই দিনটা এলো। সেদিন ডায়রিতে কেবল এক লাইন লিখেছে ইউসুকে।

‘৫ ডিসেম্বর, রোদ বাবা মারা গেছে আজকে।’

ছেলেটার মনের কষ্ট প্রকাশের জন্যে এই একটা বাক্যই যথেষ্ট। এরপর এক মাস ডায়রিতে কিছু লেখেনি সে। এই সময়ে নিশ্চয়ই শেষকৃত্য এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়েছে। সেগুলো নিয়ে কিছু লেখার মত শক্তি ছিল না ইউসুকের।

বেশ কয়েকটা খালি পাতা। এরপর নতুন বছরের জানুয়ারির ৭ তারিখে আবার একটা এন্ট্রি দেখতে পেলাম।

‘৭ জানুয়ারি, রোদ

ওই লোকটা এসেছে আমাদের বাসায়। মা বলেছে এখন থেকে নাকি আমাদের সাথেই থাকবে। আমি একদমই চাই না সেটা। বাবা সবসময়ই বলে এসেছে যে লোকটা আস্ত একটা গর্দভ। আমাকে কোনো ভাবেই তার মত হওয়া যাবে না। বিকেলে আমি রুমে ছিলাম, তখন নক না করেই ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। আমি সাফ জানিয়ে দিয়েছি পড়াশোনার সময় আমাকে বিরক্ত না করতে। তখন চলে গেছে। এখন থেকে আমার ঘরে ঢুকলে এই কথাই বলবো।’

এখানেই প্রথমবারের মত নতুন আগন্তুককে ‘ওই লোকটা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে ইউসুকে।

“আমার মনে হয় এই লোকই বড়দিনে উপহার পাঠিয়েছিল ইউসুকে’কে,” সায়াকা বলে। “ইউসুকের বাবা উপহারের ব্যাপারে অভিযোগ জানিয়েছিল, মনে আছে? আবার ভদ্রলোক এটাও বলেছে যে ‘কোনভাবেই তার মতন হওয়া যাবে না’। এটা পরিষ্কার যে লোকটাকে একদমই পছন্দ ছিল না তার।”

“ঠিক বলেছ। কিন্তু ইউসুকে আর ওর মা এই লোকটার সাথে কেন থাকবে?”

“এটুকু পড়ে তা বলা সম্ভব না,” বলে পাতা উল্টে চললো সায়াকা। “দেখো! লোকটা ওদের বাসায় এসে উঠেছে।”

পাতাটার দিকে তাকালাম আমি। জানুয়ারির ১৫ তারিখ। সেইজিন নো হি4 দিবস সেদিন।

‘১৫ জানুয়ারি, রোদ

লোকটা একটা বড় ট্রাকে করে তার মালপত্র নিয়ে এসেছে এখানে। নিচতলার বেডরুমটায় থাকার ইচ্ছা তার। ওখানেই রেখেছে সবকিছু। সে কেন আমাদের সাথে থাকবে, এটা জিজ্ঞেস করেছিলাম মা’কে। তখন মা বলে যে আমাদের ভালোর জন্যেই নাকি লোকটা এসেছে। আমি আসলে বুঝতে পারছি না সেই ‘ভালো ‘টা কী হতে পারে। এরকম একটা লোককে বাসায় চাই না আমি। কিন্তু চামি অনেক আদুরে, ওকে পেয়ে ভালো লাগছে। শুধু চামিকে আমাদের কাছে দিয়ে গেলে ভালো হতো।’

এই লেখাটা বিভ্রান্তিকর ঠেকল আমার কাছে।

“ইউসুকের মা বলেছে তাদের ভালোর জন্যেই এসেছে লোকটা। এটার মানে কী?”

“পরিস্থিতি বিবেচনায় আমার কাছে মনে হচ্ছে, এটা ইউসুকের সং বাবাও হতে পারে।”

“মানে ইউসুকের মা আবার বিয়ে করেছে? অসম্ভব। এক মাসও হয়নি তার স্বামী মারা গেছে।”

“জানি, কিন্তু এরকমটাই মনে হচ্ছে কেন যেন।”

“একটু বেশিই ভেবে ফেলেছ এবারে।”

“হয়তো…” সায়াকার অভিব্যক্তিতেও বিভ্রান্তি I

“তবে এখন এটা নিশ্চিত যে চামি নামের বিড়ালটা ওই লোকই এনেছে,” ডায়রির পাতা উল্টে বললাম।

এরপর লম্বা একটা সময় ‘ওই লোকটা’র ব্যাপারে কোনো কিছু লেখেনি ইউসুকে, কেবল স্কুল আর বন্ধুদের বিষয়ে লিখেছে। তবে চামির উল্লেখ আছে বেশ কয়েকবার। ইচ্ছেকৃতভাবেই লোকটার ব্যাপারে আলাপ করা থেকে বিরত থেকেছে ছেলেটা।

মার্চের এন্ট্রিগুলো এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম। ঘাড় লেগে আসায় মাথা এদিক ওদিক করলাম কয়েকবার।

“একটু বিশ্রাম নেই আমরা? তোমাকে দেখেও ক্লান্ত মনে হচ্ছে।”

“হ্যাঁ, কিছু খাই চলো।”

“আচ্ছা।”

কনভেনিয়েন্স স্টোরের ব্যাগটা থেকে একটা ক্যানড কফি আর কোকের বোতল বের করলো সায়াকা। অনেক দিন পর বোতলের কোক দেখলাম। মাথায় কর্ক ক্যাপ এটার। সায়াকাকে এই কথা বললে ভ্রু কুঁচকে তাকালো শু।

“আমি একটা গাধা। বটল ওপেনার তো কিনিনি।”

“রান্নাঘরে আছে হয়ত।”

“আমি গিয়ে দেখছি,” টর্চ হাতে সেদিকে গেল সায়াকা। মিনিট দুয়েক পর ফিরে এলো রান্নাঘর থেকে।

“ওপেনার পেয়েছ?”

“হ্যাঁ,” বলে হাত নেড়ে জিনিসটা আমাকে দেখাল ও। “কিন্তু একটা বিষয়ে একটু খটকা লাগছে। আমার সাথে আসবে?”

“কী হলো?” উঠে দাঁড়ালাম আমি।

“নিজেই খুলে দেখো,” রান্নাঘরের ছোট ফ্রিজটার দিকে ইঙ্গিত করলো ও। ২০ বছর আগে বাসা-বাড়িতে এই ধরনের ফ্রিজই ব্যবহৃত হতো। এরকম ডিজাইন ছোটবেলার স্মৃতি মনে করিয়ে দিল।

ফ্রিজের দরজা খুললাম আমি। বিদ্যুৎ না থাকায় কাজ করছে না কম্প্রেসর। কিন্তু অবাক হয়ে খেয়াল করলাম ভেতরে নানা রকমের খাবার সাজানো। ক্যানজাত খাবার, ক্যানজাত ড্রিঙ্কস। কর্নড বিফ, ফ্রুট জেলি, কারি আর এবং জ্যুস।

“এখানে খাবার রাখা কেন? তোমার কী মনে হয়?” সায়াকা জিজ্ঞেস করলো।

“হয়তো এখানে যারা থাকত, তারা চলে যাওয়ার সময় নিতে ভুলে গেছে।”

“কিন্তু তারিখগুলো দেখ।”

“তারিখ?” একটা জ্যুসের ক্যান দেখে উৎপাদনের তারিখ দেখলাম। দুই বছরের পুরোনো।

“আমার মনে হয় বাবা এটা রেখেছে এখানে।”

“হতে পারে। তখন হয়তো বিদ্যুতও ছিল। “

“সেক্ষেত্রে খাবারগুলো কার জন্যে? সবই তো ক্যানজাত খাবার।”

“হুম…” যুতসই কোনো জবাব মাথায় এলো না। আমতা আমতা করতে লাগলাম।

“একটা বিষয়ে নিশ্চিত আমি, বাবা এগুলো খায়নি।”

“একথা মনে হচ্ছে কেন?”

“কারণ কর্নড বিফ ভীষণ অপছন্দ তার,” আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো সায়াকা।

লিভিং রুমে ফিরে এসে হালকা খাবার খেয়ে নিলাম আমরা। সায়াকা কোক খেল আর আমি কফি ও স্যান্ডউইচ। ফ্রিজে কেন খাবারগুলো রাখা হয়েছে, তা দু’জনের একজনও বুঝতে পারছি না।

“ডায়রির লেখার বিষয়ে যদি বলতে হয়,” এক হাতে কোক নিয়ে বললো সায়াকা। “সেখানে লেখা ‘নিচতলার ঘরটায় থাকার ইচ্ছা তার।’ কোনো ঘরের কথা বলেছে ইউসুকে?”

“জাপানি নকশার ঘরটা।”

“কিন্তু ওখানে তো মনে হয় মেহমানদের আপ্যায়ন করা হতো। এরকম ঘরে সাধারণত কেউ থাকে না।”

“বুঝলাম, কিন্তু ডায়রিতে তো কেউ মিথ্যে লিখেনা। হয়তো কোনো বিশেষ কারণে ঘরটা বেছে নিয়েছিল লোকটা।”

“তাই মনে হয় তোমার?” কোকের বোতলটা মুখের কাছে নিয়েও শেষ মুহূর্তে নামিয়ে নিল সায়াকা। “উপরের ঘরটাও আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে। ইউসুকের বাবা তো মারা গেছে, তাই না? তাহলে স্যুটটা ওভাবে ঝুলছে কেন। ডেস্কেরও কোনো কিছু সরানো হয়নি।”

“অনেকেই কিন্তু পরিবারের কেউ মারা গেলে তার ঘরটা আগের মতনই রেখে দেয়।”

“কিন্তু… কোন একটা সমস্যা আছে বলে মনে হচ্ছে আমার।”

“ডায়রিটা পড়ি চলো, তাহলে বোঝা যাবে।” বাকি স্যান্ডউইচটুকু মুখে পুড়ে আবারও তুলে নিলাম ডায়রিটা। ইউসুকে ষষ্ঠ গ্রেডে উত্তীর্ণ হয়েছে ইতোমধ্যে। ‘ওই লোকটা’কে নিয়ে আবারও লিখতে শুরু করেছে সে, কিন্তু এবারে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে পরিস্থিতিতে।

‘১৫ এপ্রিল, মেঘ

রাতের বেলা আমার রুমে বসে আছি, এমন সময় লোকটা হুট করে ভেতরে ঢুকে জিজ্ঞেস করে তার ব্যাপারে প্রতিবেশীদের কাছে উল্টোপাল্টা কিছু বলেছি কিনা আমি। জবাবে বলি যে যা সত্য, সেটাই বলেছি। রাগে লাল হয়ে যায় তার চেহারা। আমাকে জোরে থাপ্পড় দিয়েছে একটা। বরফ লাগানোর পরেও জ্বলছে। ‘

‘৩০ এপ্রিল, হালকা বৃষ্টি

স্কুল থেকে ফিরে দেখি সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছে লোকটা। তাকে না দেখার ভান করে সরাসরি রান্নাঘরে ঢুকে পড়ি। তখন হঠাৎই রেগে যায় সে। আমি নাকি তার দিকে তাকিয়ে গালাগালি করেছি। বলি যে আমি ওরকম কিছু করিনি; তবুও আমার পেটে জোরে লাখি মেরেছে। ভাগ্যিস তখন ফোন বাজছিল, নাহলে আরো মার খেতে হতো আমাকে। মা ইদানিং আমাকে আর বাঁচায় না।’

‘৫ মে, রোদ

বাসায় থাকতে ইচ্ছে করছিল না, তাই বন্ধুর বাসায় গিয়েছিলাম খেলতে। বাসায় ফিরে দেখি মা কাঁদছে। কারণ জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলেনি। রাতের বেলা গলা পর্যন্ত মদ গিলে বাসায় আসে লোকটা।

যতই সামনের দিকে এগোচ্ছি, লোকটার পরিচয় নিয়ে ততই বিভ্রান্ত হচ্ছি আমরা। উঠতে বসতে ইউসুকে’কে মারে সে, আবার এই বাড়িতেই থাকে। দূর সম্পর্কের কোনো আত্মীয় নয়, এটা নিশ্চিত।

“তোমার ধারণাই ঠিক মনে হচ্ছে এখন। এরকম উদাহরণ আরো আছে। মা আবার বিয়ে করলে অনেক সৎ বাবাই আগের পক্ষের সন্তানকে মারধোর করে, দুর্ব্যবহার করে।”

“সেজন্যেই তো বলেছিলাম তখন।”

“তাই বলে এত তাড়াতাড়ি আবার বিয়ে করবে মহিলা? এটা মানতে পারছি না আমি।”

“আমিও না।” ডায়রিটা হাতে নিয়ে পরের পাতা পড়লো সায়াকা। চেহারার অভিব্যক্তি নরম হয়ে এলো এবারে। “ইউসুকে চামিকে খুব পছন্দ করে।”

“কিছু লেখা আছে নাকি?”

“হ্যাঁ। ৭ মে, বৃষ্টি। আজকে কাগজের বল বানিয়ে চামির সাথে খেললাম। প্রথমে বল ধরতে পারছিল না ঠিক মত, এখন একেবারে ওস্তাদ হয়ে গেছে।”

“বিড়াল কি বল দিয়ে খেলতে পারে?”

“হ্যাঁ, সামনের থাবা দু’টো দিয়ে ধরে। আমার বন্ধুর বিড়ালকে দেখেছি খেলতে।”

“ওহ। যাইহোক, বাড়ির নতুন বাসিন্দারা ইউসুকের জীবনে বেশ বড় প্রভাব ফেলেছে। ডায়রিতে কিন্তু এখন আর অন্য কারো ব্যাপারে কিছু লেখে নাও, খেয়াল করেছো?”

“হ্যাঁ। কিন্তু এখানে অনেক দিন পরে ওটাই আন্টির ব্যাপারে লিখেছে…” হঠাৎ জমে গেল সায়াকা। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লেখাগুলোর দিকে।

“কী লেখা এখানে?”

জবাবে আমার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে ডায়রিটা এগিয়ে দিল সায়াকা। খোলা পাতাটার দিকে তাকালাম। ১১ই মে ছিল সেদিন।

‘১১ মে, রোদ সন্ধ্যায় ওটাই আন্টি এসেছিল তার মেয়েকে নিয়ে। চামির সাথে নাকি দেখা করতে চায় সে, তাই ঘরে গিয়ে চামিকে নিয়ে আসি। ওটাই আন্টির মেয়ে এত মিষ্টি করে ‘হ্যালো, আমার নাম সায়াকা’ বললো!’

দম আটকে এলো আমার। বিস্ফারিত নয়নে তাকালাম সায়াকার দিকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%