রকিব হাসান
তৃতীয়বার বার্জিওতে ফিরেছেন মোয়াট ১৯৬৭ সালে। আমূল পাল্টে গেছে ততদিনে দ্বীপের চেহারা। তিন-চারশো বছর ধরে যেটার কোন পরিবর্তন হয়নি, মাত্র দশ বছরেই সেটা এত পাল্টে গেল? অবাকই লাগল তাঁর।
দ্বীপপুঞ্জটার ইতিহাস মোটামুটি জানা আছে তাঁর। ১৫২০ সালে পর্তুগীজ পর্যটক যোয়াজ আলভারেজ ফাশান্দেজ দ্বীপপুঞ্জটাকে আবিষ্কার করার পর সভ্য জগতের মানচিত্রে প্রথম স্থান পায় বার্জিও। ফাশান্দেজ এর নাম দিয়েছিলেন । lhas Onze M।ll V।erges এর মানে সেইণ্ট উরসুলার দ্বীপপুঞ্জ। এই নামকরণের পেছনের কারণটা নাকি অদ্ভুত।
চতুর্দশ শতাব্দীতে জার্মানীর কোলন শহরের এক অপরিণামদর্শী মহিলা বিশ্ব ইতিহাসে একটা অদ্ভুত স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর নাম ছিল উরসুলা, আজ তিনি সেইণ্ট উরসুলা নামে পরিচিত। জেরুজালেমকে মুসলমানদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়ার জন্যে ইউরোপের খ্রীষ্টান রাজন্যবর্গ তখন একের পর এক ক্রুসেড অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম-ইতিহাসের একটি অধ্যায় রচনা করলেন সেইন্ট উরসুলা। দশ সহস্র কুমারী কন্যাকে নিয়ে ক্রুসেড অভিযানে যাবার পরিকল্পনা করলেন তিনি। তাঁর ধারণা ছিল, ওই সব কুমারীর সতীত্বের তেজে মাথা নত করতে বাধ্য হবে শত্রুরা। দশ নয়, শেষ পর্যন্ত এগারো হাজার কুমারীকে সৈনিকের সাজ পরিয়ে নিজে নেতৃত্ব দিয়ে জেরুজালেম রওনা হয়েছিলেন উরসুলা। ফিরে আসেনি একজনও। যুদ্ধজয় তো বহু দূরের কথা, শত্রুর হারেম আলোকিত করল এগারো হাজার রূপসী কুমারী। কাহিনিটা জানা ছিল পর্তুগীজ পর্যটক ফাশান্দেজের। সাগরের বুকে অসংখ্য একাকী দ্বীপকে দেখে হঠাৎ করে সেই কুমারীদেরই কথা মনে পড়ে গিয়েছিল তাঁর। কেন কে জানে!
১৯৪৯ সালে কানাডার শাসনে এলো বার্জিও দ্বীপপুঞ্জ। এতদিন ওরা ছিল স্বাধীন। দ্বীপের সমাজ-জীবনের নিয়ন্ত্রক ছিল প্রতিটি দ্বীপের মোড়ল। সাগর- উপকূলের পাঁচ হাজার মাইলব্যাপী ভূ-ভাগে এমন প্রায় তেরোশো ছড়ানো-ছিটানো জন-সমষ্টি ছিল। প্রতিটি জেলের বাড়ি থেকে তার নিকটতম প্রতিবেশীর বাড়ি ছিল কম করে হলেও মাইল চারেক দূরে। ফলে ওরা ছিল তখন ‘আমরা সবাই রাজা’ গোছের।
এখানকার সবচেয়ে বড় দ্বীপটির নাম গ্র্যাণ্ডি, দ্বীপপুঞ্জের মাঝামাঝি অবস্থিত। ঘন বসতি এই দ্বীপে। ছোট ছোট মহল্লা, নামগুলো অদ্ভুত, কিন্তু সুন্দর। যেমন, মেসার্স কোভ, মাডি হোল, ফাৰ্বি কোভ, দ্য হারবার। এর দক্ষিণে কতগুলো দ্বীপ সাগরের কপালে যেন চন্দনের টিপ, উত্তরে রিচার্ডস হেড আর গ্রীনহীল। দ্বীপের মধ্যে আটকে পড়া অকৃত্রিম হ্রদ অল্ডরিজেস পশু যেন একটা রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটার। ঢালু হয়ে চারদিকে উঠে গেছে খাঁজকাটা পাহাড়, যেন অ্যাম্ফিথিয়েটারের গ্যালারি। অল্ডরিজেস পণ্ড-এর উত্তরে একটা প্রণালী। নামটা অদ্ভুত, হা-হা প্রণালী। নাম যেমনই হোক, এখানে কড এবং হেরিং মাছ পাওয়া যায় প্রচুর। দক্ষিণ থেকে মৎস্যজীবীরা এই হা-হা প্রণালীতে যাওয়ার একটা শর্ট- কাট পথ খুঁজে পেয়েছে ওই অকৃত্রিম হ্রদের মধ্যে দিয়ে, পুশঞ্চ সাউথ চ্যানেলের পথে।
আগে ব্রিটিশ ডোমিনিয়ান স্টেটসের অধীনে ছিল এই দ্বীপপুঞ্জ, কিন্তু এখন কানাডার দখলে চলে এসেছে। ছোটখাটো একজন মানুষের চেষ্টায়। অফুরন্ত উৎসাহী, দুরন্ত উচ্চাভিলাষী আর দক্ষ এই শাসকের নাম স্মলউড। হৃদয়টাও তাঁর যেন কাঠেরই তৈরি। তারই প্ররোচনায় দ্বীপবাসী একদিন চৌকোণা কাগজে আঙুলের টিপ-ছাপ দিয়ে চৌকো চৌকো বাক্সে ফেলে এলো। বেশ মজার একটা খেলা মনে হলো এটা তাদের কাছে। এই খেলাটার নাম জানল তারা স্মলউডেরই মুখে, ভোট। এরপরই শুনল তারা, বার্জিও দ্বীপপুঞ্জ যোশেফ স্মলউডের কর্তৃত্বাধীন হয়ে গেছে। কানাডার শাসনে চলে গেছে দ্বীপগুলো। আর বার্জিও তো বটেই, গোটা নিউ ফাউণ্ডল্যাণ্ডের প্রধান মন্ত্রী হলেন স্মলউড।
এরপর দীর্ঘ বাইশ বছর ধরে বলতে গেলে প্রায় এক হাতে গড়ে-পিটে অসভ্য দ্বীপগুলোকে সভ্য করেছেন স্মলউড। আসলে সভ্য করার নামে নাকি দ্বীপের সহজ সরল লোকগুলোকে করেছেন উচ্ছৃঙ্খল লাজুক, মেয়েগুলোকে করেছেন বেহায়া, দ্বীপের আদি ঢোলা পোশাকের পরিবর্তে পরিয়েছেন তাদের ব্রেসিয়ার, প্যান্টি, মিনি স্কার্ট। যান্ত্রিক সভ্যতা আর প্রযুক্তি-বিদ্যার প্রসারে মন দিলেন স্মলউড। তাঁর বিশেষ বক্তব্য হলো, ‘সাগরের দিকে পেছন ফেরো। ধীবরগিরি আর নয়, এবারে নতুন করে বাঁচতে শেখো, যেভাবে শিখেছে আধুনিক জগৎ। দেশটাতে কলকারখানা বসিয়ে ভরে ফেলব আমি। বেকার থাকতে দেবো না কাউকে। কিন্তু তার জন্যে তোমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। প্রথমেই ভেঙে ফেলো বোকা- পিতামহদের আমলের ওই সব ডোরি, ছিঁড়ে ফেলো জীর্ণ জাল, গোল্লায় যাক আঁশটে মাছ!’
আধুনিকতায় এক ধরনের মোহ আছে। অনেকেই ছেঁড়া জাল ফেলে দিল। খেয়ালই করল না, এতদিন জেলে ছিল ওরা, ওদের জালে আটকা পড়েছে সাগরের মাছ, এখন নিজেরাই যেন মাছ হয়ে ধরা পড়েছে রাজনীতির কুটিল জালে। কিন্তু দ্বীপে কলকারখানা সত্যিই গড়ে উঠল। বিদেশী পুঁজিপতিদের ডেকে আনলেন স্মলউড। পানির দামে তাদের কাছে ইজারা দিয়ে দিলেন দ্বীপের যাবতীয় খনিজ, বনজ সম্পদ। হাতে স্বর্গ পেল বিদেশী পুঁজিপতি। দ্বীপের সম্পদ দিয়েই দ্বীপে কলকারখানা গড়ে তুলল তারা। কিন্তু মুশকিল বাধল শ্রমিক জোগাড় করতে গিয়ে। দ্বীপের লোক প্রধানত মৎস্যজীবী। তাদের দিয়ে কলকারখানার কাজ চলে না। সমাধান করে দিলেন স্মলউড। বাইরে থেকে শ্রমিক জোগাড় করে দিলেন। বেশি পয়সার লোভে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এলো মানুষ। দ্বীপের কিছু ছেলে-ছোকরাও ছোটখাটো কাজ পেল কারখানায়।
মুখ গোমড়া করে ছেলেদের হুঁশিয়ার করল বুড়োরা, ‘কাজটা ভাল করছিস না তোরা। বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে সাহেব হবার চিন্তা ছেড়ে দে। ওতে ভাল হবে না!’
কিন্তু কার কথা কে শোনে? সাগরে ভাসতে শুরু কর। কল-কব্জার পোড়া তেল, মাছের ঝাঁক দূরে সরে গেল। খাঁড়িতে আর মাছ আসে না তেমন। কারখানার ধোঁয়ায় কালো হয়ে উঠেছে সাগরঘেরা দ্বীপের ঘন নীল আকাশ। যাদের যাবার ইচ্ছে ছিল না, মাছ না পেয়ে পেটের তাগিদে বাধ্য হয়ে বিদেশীদের কাছে কাজ নিল।
প্রথমবার গিয়ে দ্বীপে ইলেকট্রিক আলো দেখেননি মোয়াট। সুইচ টিপলে আলো জ্বলে শুনে তো হাঁ হয়ে গিয়েছিল জেলেরা। অথচ সেই হাঁ হয়ে যাওয়া লোকেরাই এখন বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালু হবার সুইচ অনায়াসে টেপে। ১৯৬৩ সালে প্রথম মোটরগাড়ি এলো দ্বীপে। আরও চার বছরের মধ্যেই পুরোপুরি গড়ে উঠল টিনজাত মাছের কারখানা। গড়ে উঠল নগর এবং অবশ্যই নাগরিক পৌরসভা। এই সভ্যরা সবাই স্মলউডের খয়ের খাঁ। কারখানার মালিক-কাম-মেয়র তো স্মলউড বলতে অজ্ঞান, দরকার হলে জিভ দিয়ে চেটে প্রধান মন্ত্রীর পায়ের ধুলো সাফ করে দিতে কুণ্ঠিত হবে না।
মোয়াট দম্পতি এবং মেয়রকে বাদ দিলে দ্বীপে বহিরাগত ভদ্রলোক আরও কয়েকজন আছে। তারা কারখানার উচ্চ বেতনের কর্মচারী। আর আছেন এক ডাক্তার দম্পতি। ডাক্তার দম্পতির সঙ্গে মেয়র আর তার স্ত্রীর সর্ববিষয়ে একটা কৌতুককর প্রতিযোগিতা চলে সর্বক্ষণ। টাকার মাপকাঠিতে কে কত প্রকটভাবে আধুনিকতার পরিচয় দিতে পারবে, চেষ্টার ত্রুটি নেই। একজন যদি সাধারণ ক্যামেরা কেনে তো অন্যজন মুভি-ক্যামেরা আনাবে। একজন ভাল আরবী ঘোড়া আমদানী করলে অন্যজন তার পরদিনই গিয়ে কিনে আনবে সিডানবড়ি কার। টাকার গরম অবশ্য মেয়রের বেশি, কারণ সে কারখানার মালিক। তবে টাকার গরম দেখালেও মনে মনে কিন্তু ডাক্তার দম্পতিকে একটু তোয়াজ করেই চলে মেয়র। কারণ দ্বীপে ডাক্তার বলতে ওই দম্পতিই। যদি কখনও অসুখে পড়ে তো ডাক্তার ছাড়া গতি নেই। এই দুই পরিবারের সাথে মোয়াট দম্পতির পরিচয় আছে; কিন্তু ঘনিষ্ঠতা নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন