ছড়া কবিতা

হেমেন্দ্রকুমার রায়

পরমান্ন

পরমান্ন! পরমান্ন! নরম পরম অন্ন,

গামলা নিয়ে বসে আছি তোমায় খাবার জন্য৷

রান্নাঘরে গন্ধ পেলে

কাতলা, রোহিত মৎস্য ফেলে

দৌড়ে যে যাই তোমার কাছে তুমিই অগ্রগণ্য!

তোমায় খাব চেটে পুটে

আমার করে খুঁটে-খুঁটে

মিষ্টি মুখে বলব হেসে-ধন্য তুমি ধন্য

পরমান্ন! পরমান্ন! পরম নরম অন্ন৷

হিজিবিজি

হিজিবিজি বকের ছানা

কাক বলে-'এ আমার ছানা৷'

ছানা বলে 'তা না, না না,

আমি যে কার-যায় না জানা৷'

বাপ দিয়েছে যে দেয়ালটা

তাইতে চড়ে বললে শেয়াল

'আমার ছানার নকল করে

এ কোন হতভাগার খেয়াল৷'

সিংহ এসে ফুলিয়ে কেশর

বললে চটে 'কী আহাম্মক!

কোন পটুয়া এমন করে

দেখাতে চায় সিংহ শাবক৷'

বৃন্দাবনি চুটকি

বৃন্দাবনে এলেম এবার, মালাই খেলেম খুব দেদার,

হাঁসফাসিয়ে লম্বা হলেম দাদা, আমি আর কেদার৷

আচ্ছা করে জড়িয়ে ধরে আরাম ভরা গিদ্দেকে,

চক্ষু বুজে আমি যখন সাধছি শুয়ে নিদ্রেকে,

রাত্রি তখন অনেক হবে, শব্দ-টব্দ কিচ্ছু নেই!

হঠাৎ যেন-ও বাবা গো! কামড়াল কি বিচ্ছুতেই?

ধড়মড়িয়ে লাফিয়ে উঠি-নয়তো এটা গোখরো সাপ?

হাত বুলিয়ে পিঠের ওপর চেঁচিয়ে বলি, 'বাপরে বাপ!'

দাদা-টাদা জেগে উঠে বলেন, 'ওরে হল কী?'

হতাশভাবে বললুম, 'দেখো, ভায়া তোমার মোলো কি!

'পিঠের ওপর লতার ছোবল-জলদি জ্বালো পিদ্দিমে!'

'বলিস কীরে!'-বলেই দাদা জ্বাললে আলো টিমটিমে৷

তারপরেতে দেখলুম, যাহা লাগল তাতে ধাঁধা হে!

ঘরের ভেতর উড়ছে যেন চামচিকেরই গাদা হে!

হো হো করে হেসে বললে দাদা ডেকে কেদার বসাকে,

'বোঝা গেছে, সাপ ভেবেছে বৃন্দাবনি মশাকে!'

ওরে বাবা, মশা ওরা? শুনেই চক্ষু চড়কগাছ!

মশা হলেও নেইকো কোথাও মশার মতন ধরন-ধাঁচ!

বোঁ বোঁ করে আসছে তেড়ে শানিয়ে হুলের করাত যে,

শোঁ শোঁ করে রক্ত শোষে মন্দ ঠেকে বরাত যে!

একটা মারি দশটা আসে, তার পিছনে দুশোটা,

ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ঠিক যেন সে ঘুসোটা!

মারতে মশা নিজের গালে কষিয়ে দেদার চাপড়টা,

‘ধ্যাত' বলে ফের কেতরে পড়ি, মাথায় দিয়ে কাপড়টা!

মুড়ি দিয়েও নেই বাঁচোয়া, উলটে বাড়ে পোঁ পোঁ বোল,

চাদর ফুঁড়ে আদর করে, নাকের ডগা হল ঢোল!

'রোস তো', বলে লাফিয়ে উঠি, ঘুরিয়ে ছুড়ি ছাতাটা,

মশার তাতে বয়েই গেল, ফাটল দাদার মাথাটা৷

দাদা এল পাকিয়ে ঘুসি, মশা এল শানিয়ে হুল,

চক্ষু চেয়ে পষ্ট দেখি, ফুটছে হাজার সরষে ফুল!

ভড়কে আমি, বিছনা ছেড়ে তড়াক করে পগার পার

ঘুসির ভাবনা গেল বটে, রইল কিন্তু মশার সার!

মানুষ দেখে যত মশা খালি করে নর্দমা,

বাজিয়ে ভেঁপু পালে পালে নিতে এল গর্দানা!

মেষের মতো মশার ঝাঁকে ছিষ্টি কালো কিষ্টি হে,

স্মরণ করি ইষ্টিদেবে, ঝাপসা হল দিষ্টি হে!

শিকার পালায় দেখে তারা দিচ্ছে রুখে বাগড়া রে,

গায়ে যেন বসায় দাড়া সুমুদ্দুরের কাঁকড়া রে!

যাচ্ছি কোথা জানিনেকো-দক্ষিণে না উত্তুরে?

ওগো বাবা, খেলে বুঝি আজকে তোমার পুত্তুরে!

বৃন্দাবনে কৃষ্ণে দেখে পেলুম বুঝি কৃষ্ণে গো!

ওরে মশক, দে রে ছেড়ে, প্রাণটা কেড়ে নিসনে গো!

রক্ত বুকে উছলে ওঠে-মশার বাঁশি শুনে আজ,

কাছা-কোঁচা খুলে চোঁচা ছুটছি সোজা নেইকো লাজ৷

মুখ খিঁচিয়ে চুলকে গা-টা, ফুলে হলুম হস্তীটি!

উধাও ছুটে পেরিয়ে এলাম শহরের শেষ বস্তিটি!

প্রাণটা তখন ওষ্ঠাগত পেয়ে হুলের নমুনা,

থমকে হঠাৎ চমকে দেখি, সামনে কালো যমুনা৷

একটুখানি ভাবনা হল-ফিরি কিংবা ঝম্ফ দি?

ক্যাঁক করে ফের মশার কামড়-অমনি দিলাম লম্ফটি!

নাক-বরাবর চোবাই জলে, এড়িয়ে মশার সীমানা,

যাচ্ছিল এক মালসা ভেসে মাথায় তুলি সেইখানা!

কালীয়-সাপের ছ্যানা আছে শুনেছিলুম জলেতে,

'ল্যাজ দিয়ে পাক জড়িয়ে' যদি দেয় সে আমার গলেতে?

তারপরেতে-কাছিম-চাচা? বলি, জেগে আছ কি?

ঠ্যাঙের ওপর দাঁত বসাতে তুমিও তেগে আছ কি?

নেক-নজরে চাইবে নাকি, নইলে আমি যাই মারা,

রাখতে পারো, মারতে পারো, করব কী আর নাই চারা!

একটা রাতের অতিথ আমি, গেছে সকল ভরসা-সুখ,

ভাগব আমি দেখতে পেলেই সূয্যিমামার ফরসা মুখ৷

গোপীনাথজি সুখে থাকুন, মালপো ভোগে হোন মোটা,

মশারা সব লুটুক মজা, নয় সে বড়ো মন্দটা;

চাইনে আমি মাখন-ননি, বাঁচে যদি আজ মাথা-

এক ছুটেতে টিকিট কেটে-এক দমেতে কলকাতা!

উলটো-বাজির দেশে

কালকে আমি গিয়েছিলুম উলটো-বাজির দেশে৷

এমন দেশটি আর পাবে না,-সবই সর্বনেশে!

রামের সেথায় নেইকো ধনুক, নেইকো ভীমের গদা,

শ্যামের বাঁশির নাম শোনেনি হেবো, মোনা, পদা!

সীতা সেথায় যাননি বনে, রাবণ আজও জ্যান্ত,

হনুমানের নেইকো লাঙুল-লম্ফত্যাগে খ্যান্ত!

সিংহ থাকে শহরে ভাই-বনের ভেতর মানুষ,

নৌকো ওড়ে আকাশ দিয়ে, জলেই ভাসে ফানুস!

ব্যাঘ্র সেথায় ভক্ত ঘাসের, হাডডি চেবায় ছাগল,

পণ্ডিতেরা মুখ্যু সেথায়, পদ্য লেখে পাগল!

প্যাঁচারা ভাই গানের রাজা, কোকিলগুলো বোবা,

পইতে-টিকি পুড়িয়ে ফেলে হিন্দু বলে 'তোবা'!

হস্তীগুলো বিশ্রী রোগা, ফড়িংগুলো ষণ্ডা,

বাঁদর বসে অঙ্ক কষে ছ-কুড়ি দু-গণ্ডা!

নিদ্রাতে ভাই নাক ডাকে না, খেলেই বাড়ে ক্ষুধা,

ঘোটক চালায় মানুষ-গাড়ি-সাপের মুখে সুধা!

মোছলমানের নেইকো দাড়ি, নিগ্রোরা সব সাদা,

সাহেবগুলো ভূতের মতো; বোকারা নয় হাঁদা!

চাকর-দাসী হুকুম চালায়, মনিব বলে হুজুর!

মানুষ দেখে মামদো পালায়, মুখ চুন হয় জুজুর!

প্রজারা সব রাজ্য করে, রাজা জোগায় খাজনা,

হারমোনিয়াম ফেলে সবাই শোনে ঢাকের বাজনা!

মণ্ডা-মেঠাই খায়নাকো কেউ, খায় চিরেতা-নালতে,

উনুনটাকে জ্বালতে হবে সাত-ঘড়া জল ঢালতে!

মাস্টারেরা ডুকরে কাঁদে, ছাত্র মারে বেত্র,

মরুভূমির বুকেই নাচে সবুজ ধানের ক্ষেত্র!

রবিবারে ইস্কুলেতে কামাই হলেই ফাইন,

বাকি ছ-দিন খেলতে পারো-এমনি ধারাই আইন!

মেয়েরা সব কর্তা সেথায়, পুরুষ ভারি বাধ্য,

মরলে মানুষ হাসতে হবে; জ্যান্ত করে শ্রাদ্ধ!

স্ত্রীলোকেরা আপিস করে গলায় দিয়ে চাদর,

অন্দরেতে পুরুষ যত খোকায় করে আদর!

ছোকরারা সব শান্ত-সুবোধ, বৃদ্ধেরা সব দস্যি,

চুরুট ফোঁকে নাক দিয়ে আর কর্ণে গোঁজে নস্যি!

চোর-ডাকাতে বিচার করে, সাধু পচেন জেলে,

দুষ্টু বাপের কানটি মলে শাসন করে ছেলে!

অন্ধকারে দিন কেটে যায়, সূয্যি আসে রাত্রে,

ভিক্ষুকেরা ভিক্ষে করে পক্ক সোনার পাত্রে!

আকাশ পড়ে পায়ের তলায়, মাথার ওপর মাটি,

সত্যি মানে মিথ্যে এবং নকল মানে খাঁটি!

কী ভয়ানক উলটো-বাজি!-বলতে আসে কান্না,

শুনলে পরেও মন দমে যায়, ক্ষান্ত হলুম-আন্না!

পালোয়ান প্যালারাম

হাঁপ ছেড়ে হুসহুস ভাঁজি কষে ডম্বল,

খাসা আছি! হয়নাকো জ্বর, কাশি, অম্বল৷

মহাবীর হব আমি, লেখা আছে কুষ্টিতে,

খ্যাপা হাতি কুপোকাত, এত জোর মুষ্টিতে!

আমাদের গুষ্টিতে একা আমি পালোয়ান-

শীতকালে ঘেমে মরি, চাইনাকো আলোয়ান!

টপাটপ ডন দিই, খপাখপ বৈঠক,

দৌড়েতে হারে রানা প্রতাপের 'চৈতক'!

চড়িনাকো এনে দিলে 'ফিটন' কি 'ল্যান্ডো'ই,

হাঁটি দশ-বিশ-ক্রোশ-কোথা লাগে স্যান্ডোই!

চোর-টোর আসে নাকো আমাদের রাস্তায়,

ভ্যারেন্ডা ভেজে শুধু গুন্ডারা ঘাস খায়!

মাস্টার মারে বটে বিষ্টু ও কেষ্টকে,

মোর কাছে হেসে বলে-'ভালোবাসি বেশ তোকে!'

সাঁতারেতে গাং পার-লাফে পার পর্বত,

তেষ্টাতে গিলি খালি বাদামের শরবত৷

ভোরবেলা উঠে রোজ পাঁঠা গিলি আস্ত হে,

একমন মাছ খেলে হয়নাকো দাস্ত হে!

পাঁচ হাড়ি দইয়ে গুলে গুটি ত্রিশ মণ্ডা গো,

তার সাথে দাও যদি রুটি বিশ গণ্ডা গো,

ফাউ চাই সের-বারো বোঁদে, গজা, রসকরা,

তাইতেই ভরে পেট, ভেব না এ মশকরা!

পেটুক তো নই আমি ক্ষুধা মোর অল্পই,-

হাসছ যে? ভাবছ কি এটা গাল-গল্পই?

ফের হাসি বেয়াদব! আমি তবে রাগবই,

আখড়ায় ছুটে গিয়ে 'বীর-মাটি' মাখবই,

তাল ঠুকে দেব হুঁ-হুঁ, হা-রে-রে-রে হুংকার,

তাই শুনে, হাসবে যে মুখ হবে চুন তার!

হতে পারে আমি জাদু, রোগা, বেঁটে-খর্বুটে,

দিতে পারি তবু তোর ভিরকুটি ছরকুটে!

ক্রোধানল জ্বলে যদি, কিছুতেই ক্ষমা নয়,

অতিশয় তাড়াতাড়ি যাবে বাছা যমালয়!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%