সৈকত মুখোপাধ্যায়

বিকেলে চড়কডাঙ্গার মাঠে বিবেক সংঘের এগেনস্টে ক্রিকেট ম্যাচ ছিল। সেই ম্যাচে আমি থাকতে পারলাম না। জানি, আমাদের ক্লাবের সেক্রেটারি পন্টাদা এর ফলে প্রচণ্ড খেপচুরিয়াস হয়ে যাবে, কারণ আমাদের টিমে পেস বলটা আমিই সবচেয়ে ভালো করি। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। সকালে স্কুলে বেরোনোর আগেই বুধোদা বাড়িতে ফোন করেছিল। বলেছিল, রুবিক, বিকেলে একবার বাড়িতে আসিস। দারুণ ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার দেখাব।
বুধোদার ওই কথাটুকুর জেরেই সারাদিন কোনও ক্লাসে পড়াশোনায় মন দিতে পারলাম না, টিফিনে নিতাইদার কাঁচালঙ্কা আর নারকেল কুচি দেওয়া ফার্স্টক্লাস ঘুগনি, তাও মুখে বিস্বাদ লাগল। এমনকী ছুটির পর তাড়াহুড়ো করে ক্লাস থেকে বেরোনোর সময় মাত্র গতকাল কেনা কম্পিউটার গেমের সিডিটা বেঞ্চের ওপর ফেলে রেখে চলে এলাম। অবশ্য এসব নতুন কিছু নয়। বুধোদা যখনই আমাকে এইভাবে ডেকেছে তখনই আমার মনের অবস্থা এরকম টালমাটাল হয়ে গেছে। আর তার জন্যে আমাকে খুব একটা দোষও দেওয়া যায় না। বুধোদা মানেই রোজকার সাদামাটা জীবনের বাইরে দারুণ রোমাঞ্চকর সব ব্যাপার-স্যাপার। বুধোদার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলা মানে একটা অ্যাডভেঞ্চার বইয়ের পাতার মধ্যে ঢুকে পড়া।
এবার বলি, বিকেলে বুধোদার বাড়ি যাওয়ার পরে কী হল। বুধোদা যথারীতি তার খাটের ওপর বালিশে হেলান দিয়ে বসে ল্যাপটপ নিয়ে কীসব খুটখাট করছিল। পড়ুক, লিখুক বা কম্পিউটার নিয়ে কাজ করুক, ও সবসময়েই ওইভাবে বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে। আমাকে ঢুকতে দেখে বলল, আয়, আমার পাশে এসে বোস।
আমি বললাম, কী দেখাবে বলছিলে যে।
আহা, সে তো এই কম্পিউটারের স্ক্রিনেই রয়েছে। তুই এখানে না বসলে দেখাব কেমন করে?
আর দ্বিতীয়বার বলতে হল না। আমি এক লাফে সেই পেল্লায় উঁচু পালঙ্কের ওপর চড়ে বসলাম। বললাম, কই দেখাও।
বুধোদার আঙুলের আলতো নড়াচড়ায় কম্পিউটারের স্ক্রিনে একটা ছবি ফুটে উঠল। 'গুগল আর্থ'-এর ম্যাপে যেরকম উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি দেখা যায়, ঠিক সেইরকম। গ্রাম বা শহরের ছবি নয়; গহন জঙ্গলে ঢাকা একটা জায়গার ছবি। মুখটা স্ক্রিনের কাছে নিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখলাম। মনে হল একটা টেবল-টপ মাউন্টেনের ওপর ঘন সবুজ জঙ্গল আর সেই জঙ্গলের মাঝখানে একটা অদ্ভুত নীলচে ছোপ। ওটা নিশ্চয়ই বিরাট এক হ্রদ। অদ্ভুত বলছি এই কারণে যে, আকাশ থেকে তোলা ছবিতে ওই হ্রদটাকে ঠিক একটা জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতন দেখাচ্ছিল। এমনকী তলার ফুটকিটা অবধি রয়েছে। ওটা নিশ্চয়ই মূল জলাভূমির থেকে কিছুটা দূরে আরেকটা ছোটখাটো হ্রদই হবে। সমতল জায়গাটার চারদিক থেকে পাহাড়ের গা ঢালু হয়ে নীচে নেমে গেছে।
আমি বললাম, হুঁ, দেখলাম। তারপর?
আবার বুধোদার আঙুলের দু-একটা চটজলদি নড়াচড়া। কম্পিউটারের স্ক্রিনটা একবার শূন্য হয়ে গিয়ে সেখানে অন্য একটা ছবি ভেসে উঠল।
কিন্তু সত্যিই কি অন্য ছবি? আমি তাকিয়ে দেখলাম—সেই একই জঙ্গল। মাঝে জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতন জলাভূমি আর চারিদিকে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া পাহাড়ের কিনারা। স্বাভাবিকভাবেই আমি ভাবলাম বুধোদা বোধহয় ভুল করে আগের ছবিটাই আবার ওপেন করে ফেলেছে।
কিন্তু বুধোদাকে সেকথা বলতেই বুধোদা বলল, আগে ভালো করে দেখ। ডোন্ট জাম্প অ্যাট এনি কনক্লুসন।
ভালো করেই দেখলাম। দ্বিতীয় ছবিটাতে আঁকাবাঁকা হ্রদটা কি আগের চেয়ে একটু রোগা? জঙ্গলটা কি এই ছবিটায় আরও একটু হলুদ লাগছে? হতে পারে, তবে এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে, একই ছবি না হলেও এ-দুটো একই জায়গার ছবি। হয়তো একটু আগে পরে তোলা—একটা বর্ষায়, যখন গাছপালা সবুজ ছিল, আরেকটা গ্রীষ্মে, যখন পাতা হলুদ হয়ে এসেছে।
বুধোদাকে সেকথা বলতে বুধোদা মজা পাওয়ার মতন মুখ করে বলল, আগে পরে তোলা হয়েছে বলছিস? আচ্ছা, কতটা আগে পরে বলে তোর মনে হয়?
কথা বলতে-বলতেই বুধোদা দুটো ছবিকেই সাইজে ছোট করে কম্পিউটার স্ক্রিনে পাশাপাশি এনে ফেলল। এখন একসঙ্গেই দুটোকে দেখতে পাচ্ছি। ভালো করে ছবিদুটোকে দেখে বললাম, দুটো দুই ঋতুতে তোলা হতে পারে, মানে এই ধরো তিন-চার মাসের এদিক-ওদিক।
বুধোদা স্ক্রিন থেকে মুখ না তুলেই বলল, নো স্যার। এই ছবিদুটোর বয়সের তফাত কম করে চারশো বছর।
আমার মুখ দিয়ে নিজে থেকেই বেরিয়ে এল, যা:, কী বলছ তুমি!
ঠিকই বলছি। তোকে দ্বিতীয় যে ছবিটা দেখালাম, সেটা মাত্র গতকাল সন্ধেবেলা 'গুগল আর্থ' থেকে ডাউনলোড করেছি। আর প্রথম যে ছবিটা দেখলি সেটার বয়েস চারশো বছরের বেশি ছাড়া কম নয়।
আমি বললাম, চারশো বছর আগে স্যাটেলাইট থেকে ছবি তোলার কোনও ব্যবস্থা ছিল কি?
বুধোদা হাতদুটো মাথার পেছনে নিয়ে গিয়ে ভাঁজ করে তার ওপর মাথাটা হেলিয়ে দিল। চোখের দৃষ্টি ল্যাপটপ থেকে ঘুরে গেল জানলার বাইরে, যেখানে তখন গঙ্গার বুকে সূর্যাস্তের সিঁদুর গোলা রং। সেইদিকে চেয়েই বুধোদা গভীর চিন্তামগ্ন স্বরে উত্তর দিল, না, ছিল না। স্যাটেলাইট ছেড়ে দে। রবার্ট ব্রাদার্স প্রথম হাইড্রোজেন গ্যাসের বেলুন আকাশে উড়িয়েছিলেন সতেরোশো তিরাশি সালে, প্যারি থেকে। আর জর্জ ইস্টম্যান সাহেব তার 'কোডাক' ব্র্যান্ডের প্রথম বক্স ক্যামেরাটা তৈরি করে বাজারে ছাড়লেন সেও তো মাত্র সেদিন—আঠেরোশো অষ্টআশিতে। সেইখানেই তো রহস্য। চারশো বছর আগে বায়ুমণ্ডলের ওপর থেকে পৃথিবীকে দেখল কে? কেমন করে সেই দৃশ্যকে ফিল্মবন্দি করল? তুই ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পারছিস তো রুবিক? ধর এই ব্যাপারটার সূত্র ধরে যদি এমন কোনও যন্ত্র পেয়ে গেলাম, যার কথা মানুষ জানেই না।
আমি জোরে মাথা নেড়ে বললাম, সম্ভব নয়। তোমাকে কেউ নকল জিনিস দিয়ে ঠকাচ্ছে। এটা খুব কাছাকাছি সময়ের মধ্যে তোলা একটা স্যাটেলাইট পিকচার।
না রে রুবিক। তা নয়। তা নয় বলেই ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামচ্ছি।
কী করে এত সিওর হচ্ছো?
প্রমাণ ওই ফটোটার মধ্যেই আছে। সেটা তোকে একটু পরে দেখাচ্ছি। তার আগে তোকে বলি ফটোটা পেলাম কোথা থেকে। তাহলে তুই বুঝতে পারবি, কেন আমি বার বার ফটোটাকে চারশো-বছরের পুরোনো বলছি।
বুধোদাদের বাড়ির বৃদ্ধ হেল্পিং-হ্যান্ড কানাইদা একটা প্লেটে করে বাড়িতে ভাজা গরম গরম ফুলকপির বড়া আর চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। কানাইদা বেরিয়ে যাবার পরে একটা গরম বড়ায় কামড় দিয়ে বুধোদা সেই ফটো হস্তগত হওয়ার বৃত্তান্ত শুরু করল—
তুই তো জানিস রুবিক, অ্যান্টিকের খোঁজ পাবার জন্য আমাকে বহু লোকের ওপর নির্ভর করতে হয়। তারা কেউ মাইনে করা ইনফর্মার আবার কেউ আমার বন্ধু, যারা আমার এই ব্যবসার খবর রাখেন। এরকমই একজন বন্ধু হল রঘুনাথ দ্বিবেদী। রঘুনাথের বয়েস আমার মতনই হবে। বাড়ি ঝাড়খণ্ডের টাটানগর থেকে একটু দূরে চাণ্ডিল বলে একটা গ্রামে। বছর পাঁচেক আগে চাঁইবাসার এক অভ্রখনির মালিকের বাড়ি থেকে একটা উনিশ শতকের জার্মান টেবল-ক্লক সংগ্রহ করতে গিয়ে ওর সঙ্গে আমার আলাপ হয়। সেবারে দুজনে মিলে পালামৌর জঙ্গলে বেশ কিছুদিন ঘুরেছিলাম। তারপর গত পাঁচ বছরে রঘুনাথ আমাকে জঙ্গলমহলের অনেক পড়তি জমিদারবাড়ি থেকে ভালো ভালো শ্বেতপাথরের মূর্তি, পুরোনো গ্রামাফোন রেকর্ড, অয়েল-পেইন্টিং এমনকী ভিন্টেজ কার অবধি জোগাড় করে দিয়েছে।
রঘুনাথের ব্যবসা কিন্তু অ্যান্টিক সংগ্রহ নয়, কবিরাজি। চাণ্ডিলের দ্বিবেদী পরিবার খুব নামকরা কবিরাজ পরিবার। রঘুনাথও তার বাপ-দাদাদের সেই পেশা নিয়েই ব্যস্ত। তবে ওই পেশার কারণেই তাকে রাজবাড়ি থেকে গরিবের কুড়েঘর অবধি সর্বত্র যেতে হয়, আর এরকম যাতায়াতের ফলেই সে নানান আশ্চর্য জিনিসের খোঁজ পেয়ে যায়। খোঁজ পেলে সে নিজে কিছু করে না, আমাকে জানায়। কারণ, ওই যে বললাম, আসল আর নকল, চোরাই আর জেনুইন, অত শত নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় কিংবা ইচ্ছে কোনওটাই দ্বিবেদীর নেই।
আমি যে সবসময় ওর উপকারের সঠিক প্রতিদান দিতে পারি তা নয়, তবে রঘুনাথ তার প্রত্যাশাও করে না। ও বলে চিকিৎসার কাজে গিয়ে ও দেখতে পায় কত সুন্দর জিনিস বনেদি বাড়ির চিলেকোঠায় কিংবা মাটির নীচে চোরাকুঠিতে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। গ্যারেজের অন্ধকার কোণে মরচে পড়ে ভেঙে যাচ্ছে মরিস, শেভ্রলে কিংবা ক্রাইসলারের মতন ভিনটেজ গাড়ি। অব্যবহৃত লাইব্রেরির ছাদ থেকে জল চুঁইয়ে পড়ছে কোনও ক্ল্যাসিক বইয়ের ফার্স্ট এডিসনের পাতায়। পূর্বপুরুষদের শিল্প সংগ্রহের দাম তাদের বংশধরেরা বুঝতেই পারছে না। সেই জিনিসগুলো যদি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচে, যারা শিল্পের দাম বোঝে তাদের কাছে অ্যাপ্রিশিয়েটেড হয়, তাহলে সেটাই ওই পুরস্কার।
গতকাল দুপুরে এই রঘুনাথ দ্বিবেদীর কাছ থেকেই ক্যুরিয়ারে একটা প্যাকেট পেলাম। প্যাকেটটার মধ্যে ছিল একটা ফটো আর রঘুনাথের লেখা একটা চিঠি। চিঠিটা বেশ লম্বা আর হিন্দিতে লেখা। আমি তোকে মোটামুটিভাবে চিঠিটার বিষয়বস্তু বলে দিচ্ছি, শোন—
স্টিল-সিটি টাটানগর ছাড়িয়ে স্টেট হাইওয়ে থারটি-থ্রি ধরে আর একটু এগোলেই দেখা যাবে সমুদ্রের জমাট ঢেউয়ের মতন অগুন্তি পাহাড় পূব থেকে পশ্চিমে দিগন্তকে ঢেকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ধূসরকালো সেই পাহাড়গুলোকে মাঝে-মাঝে কালো মেঘের স্তূপ বলে ভুল হয়। ওটাই হল ঝাড়খণ্ডের দলমা পর্বতশ্রেণি। কাছে গেলে দেখা যাবে পাহাড়গুলো আপাদমস্তক গভীর জঙ্গলে ঢাকা। বেশিরভাগ জঙ্গলই জনমানুষহীন। বহু দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অল্প কিছু আদিবাসী গ্রাম। ওই সব গ্রামের অধিবাসীরা আজও প্রায় আদিম বন্য জীবন যাপন করে। জঙ্গলের মধ্যে চাষবাস করার প্রশ্নই নেই, তাই তাদের জীবিকা হল শিকার করা আর বনের ফলমূল কুড়িয়ে আনা।
সাধারণত ওইসব গ্রামে আমাদের মতন শহুরে মানুষরা পা দিতে চায় না, কারণ, বনবাসীদের রীতিনীতি আচার ব্যবহার আমাদের থেকে অনেক আলাদা। কখন আমাদের কোন ব্যবহারে তারা আঘাত পেয়ে হিংস্র হয়ে উঠবে বলা কঠিন। তা ছাড়া সাপ, বাঘ ম্যালেরিয়ার রাজ্য ওইসব দুর্গম অঞ্চলে যাবার আকর্ষণটাই বা কী? বেড়ানোর জন্য তো আরও অনেক সুন্দর ট্যুরিস্ট স্পট রয়েছে। তাই দলমার ঘন শালবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ওই সব গ্রামের চিহ্ন কোনও অ্যাটলাসেই পাওয়া যায় না।
রঘুনাথ দ্বিবেদীকে কিন্তু চাণ্ডিল থেকে মাঝে-মাঝেই অমন সব আরণ্যক গ্রামে যেতে হত। কারণ, তার ওই কবিরাজি ব্যবসা। কবিরাজি ওষুধ বানাতে প্রয়োজন হয় এমন বহু গাছগাছড়া লতাপাতা পাওয়া যায় ওই দলমার জঙ্গলের মধ্যে। ওই সব গ্রামের মানুষেরা তাদের ঘরে আশেপাশের জঙ্গল থেকে নানারকম ওষধি লতাপাতা সংগ্রহ করে রেখে দিত। দু-তিন মাস অন্তর অন্তর দ্বিবেদী গিয়ে তাদের কাছ থেকে সেগুলো নিয়ে আসত। বিনিময়ে তাদের দিত বনে পাওয়া যায় না এমন সব জিনিস—ছুরি, কাঁচি, কোদালের মতো সাজসরঞ্জাম। ধাতু বা প্লাস্টিকের বাসনকোসন। নানারকম মশলাপাতি আর তামাক। বাজাবার জন্যে গিটার, ঢোল, খোল, করতাল।
ওই সব গ্রামগুলোকে রঘুনাথ তার বাবার আমল থেকেই চিনত, একটা গ্রাম বাদে। সেই গ্রামটার খোঁজ সে পেয়েছিল অনেক পরে, দুয়েকটা দুর্লভ লতার খোঁজ করতে গিয়ে। গ্রামটার নাম মৌডুংরি।
রঘুনাথ লিখেছে, মৌডুংরি যেতে হলে যে রাস্তা পেরোতে হয়, তার মতন ভয়ংকর রাস্তা সে আর দেখেনি। যেমন দমফাটানো চড়াই তেমনি বন্য জন্তুতে ভরা সেই অরণ্যপথ। অবশ্য তাকে পথ বলা চলে কি না তাও সন্দেহ। কারণ প্রায় পুরো রাস্তাটাই যেতে হয় হাতের ধারালো দা দিয়ে কাঁটাগাছ আর আলকুশি কিংবা বিছুটির মতন বিষাক্ত ঝোপঝাড় কাটতে কাটতে। তবু রঘুনাথকে সেই গ্রামটাতে বছরে অন্তত একবার যেতেই হয়, কারণ রক্তগুলঞ্চ কিংবা পাতালকুশের মতন অত্যন্ত দামি এবং দুষ্প্রাপ্য কিছু ওষধি একমাত্র ওই মৌডুংরি গ্রামের লোকেরাই তাকে জোগাড় করে দিতে পারে।
যাই হোক, ওই মৌডুংরির মানুষদের কাছেই রঘুনাথ দ্বিবেদী প্রথম মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসীর কাহিনি শুনতে পায়।
মাদলপাহাড়টা মৌডুংরি গ্রাম থেকেই দেখা যায়। রঘুনাথ লিখেছে, মৌডুংরির ঠিক উত্তর সীমানা থেকে উঠে যাওয়া ওই পাহাড়টার চেহারার ওর চেয়ে সুন্দর বর্ণনা আর হয় না। মাদল দেখেছিস তো? অনেকটা আমাদের দুর্গাপুজোর ঢাকের মতনই দেখতে, শুধু ঢাকের মতন পেটমোটা নয়। মাদলের একদিক থেকে আরেকদিক আস্তে আস্তে সরু হয়ে যায়। রঘুনাথ লিখেছে, ওই টেবল-টপ পাহাড়টাকেও দেখলে মনে হয় ঠিক যেন একটা মাদলের চওড়া দিকটাকে মাটিতে পেতে, সরু দিকটাকে ওপরে রেখে দাঁড় করিয়া রাখা হয়েছে। পাহাড়টার চুড়োর কাছটা একদম সমতল আর বৃত্তাকার। ঠিক যেন এক বিরাট ক্রিকেট গ্রাউন্ড। তফাত হল, ক্রিকেট মাঠে নরম ঘাসের গালচে থাকে আর মাদল পাহাড়ের চূড়ায় আছে আকাশছোঁয়া শাল-সেগুনের জঙ্গল।
আর সেই জঙ্গলের মধ্যে না কি রয়েছে একটা মন্দির। সেই মন্দিরে আছেন খর্বাকৃতি এক সন্ন্যাসী। মৌডুংরির লোকজন আবহমান কাল থেকেই তাকে বামনসন্ন্যাসী বলে উল্লেখ করে।
মৌডুংরি গ্রামের সবচেয়ে বৃদ্ধ যে বাসিন্দা সেই সুগুন সর্দার নিজে রঘুনাথকে বলেছিল যে, ওই মন্দিরের বয়েস কম করে পাঁচশো বছর হবে। আরও একটা অদ্ভুত কথা বলেছিল। বলেছিল ওই বামন সন্ন্যাসীরও বয়েসও পাঁচশো বছর।
রঘুনাথ জানত, শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে অনেক দূরে যারা বসবাস করে, যারা ঘড়ি কিংবা ক্যালেন্ডারের ধার ধারে না, তাদের সময়ের হিসেবটা অত পাকা নয়। তবু পাঁচশো বছর ধরে বেঁচে থাকা কোনও মানুষের গল্পটা তার বাড়াবাড়িই মনে হয়েছিল। তাই ব্যাঙ্গর হাসি হেসে সুগুন সর্দারকে জিগ্যেস করেছিল, অত বছর আগে তো তুমি জন্মাওনি সর্দার। তাহলে জানলে কেমন করে সন্ন্যাসীর বয়েস পাঁচশো বছর?
উত্তরে সুগুন সর্দার যা বলেছিল তা শুনে কিন্তু রঘুনাথের মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়েছিল। সুগুন সর্দার বলেছিল, আমাদের পালা পরবে যেসব গান গাওয়া হয় তার মধ্যেও ওই বামন সন্ন্যাসীর কথা আছে। আর ওসব গানের বয়েস কোনওটারই পাঁচশো বছরের কম নয়। বাবা-মা'র গলায় শুনে ছেলেমেয়েরা ও গান নিজেদের গলায় তুলে নেয়। সুর বা কথা বদলায় না এতটুকু।
রঘুনাথ জানত আদিবাসীদের গান সম্বন্ধে সুগুন সর্দারের কথাগুলো একশোভাগ খাঁটি। আর সত্যিই যদি সেসব গানে বামনসন্ন্যাসীর কথা থাকে তাহলে তো...। তবে রঘুনাথ তারপরেই ভেবে দেখল বংশানুক্রমে কোনও পরিবারের লোকেদের কি উচ্চতা কম হতে পারে না? হয়তো পাঁচশো বছর আগে যে সন্ন্যাসীকে নিয়ে গান বাঁধা হয়েছিল, এখনকার সন্ন্যাসী তারই উত্তরপুরুষ।
কিন্তু সুগুন সর্দারের চমকের এখানেই শেষ হয় না। বুড়োকে কথা বলার নেশায় পেয়েছিল, সে বলেই চলল—তা ছাড়া তুমি যদি মাদলপাহাড়ের আংরাগুহায় কখনও ঢোকো, তাহলে দেখবে সেই গুহার দেয়ালে ওই সাধুর ছবি, সাধুর নানা লীলাখেলার ছবি, সব আমাদের পূর্বপুরুষেরা এঁকে রেখে গিয়েছেন। তবে আমরা কখনও ওই পাহাড়ে উঠি না। মাঝে মাঝে এখানে বসেই দেখতে পাই পাহাড়ের চূড়ায় আলোর ঝলক। বুঝতে পারি, বামনসন্ন্যাসী পুজো করছেন। তা ছাড়া অনেকবছর বাদে বাদে কোনও অভাগা রুপোর লোভে হয়তো ওখানে চলে যায়। তারা অভিশাপ গায়ে মেখে ফিরে আসে। তবে ফিরে আসার আগে তারা সকলেই প্রায় বামন সন্ন্যাসীকে দেখতে পেয়েছে।
রঘুনাথ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল রুপো! রুপো কোত্থেকে এল?
তা বলতে পারব না। তবে ওই মন্দিরের কাছে একটা শুকনো হ্রদের নীচে না কি ঝলমলে রুপোর পাত পড়ে থাকে। সেই সুপো ছুঁয়েছ কী মরেছ। এই তো গত বছরেও আমাদের গ্রামের একটা বদমাইশ ছেলে ঠিক একভাবে মারা গেল, যেভাবে আশি বছর আগে আমার দাদু মারা গিয়েছিল।
তোমার দাদুরও অভিশাপ লেগেছিল না কি?
সুগুন বুড়ো ভীষণ গম্ভীর মুখে উত্তর দিল—তা লাগেনি? আমি যখন ছ'-সাত বছরের বাচ্চা তখন দাদুকে দেখেছি ভয়ংকর চর্মরোগে ভুগে ভুগে মরে যেতে। তুমি তো জানো বাবু, স্নানের আগে আমরা গায়ে রোজ মহুয়াতেল মাখি, নিমতেলও মাখি। আমাদের জাতের লোকেদের মধ্যে চামড়ার অসুখ কাকে বলে তা অজানা। তাহলে ওনার কেন অসুখ হয়েছিল? আসলে আমার সেই দাদু রুপোর লোভে ওই মাদলপাহাড়ের মন্দিরে ক'দিন বড্ড বেশি ঘোরাঘুরি করেছিল।
আমার কাজকর্ম দেখে দেখেই বোধহয় রঘুনাথের মনেও প্রাচীন মন্দির, প্রাসাদ এইসব সম্বন্ধে একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তার ওপর ওই রুপোর পাতের গল্প। রঘুনাথ ভাবল, কী জানি, ওগুলো ধাতুর পাতে খোদাই করা কোনও প্রাচীন লিপিমালা কি না। তাই সে মৌডুংরির লোকদের ধরল, আমাকে একজন কেউ পথ দেখিয়ে নিয়ে চলো ওই মন্দিরে।
রঘুনাথ ভেবেছিল ভালোমতন পারিশ্রামিক পেলে মৌডুংরির যে-কোনও ছেলে সহজেই ওর গাইড হতে রাজি হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল যাকেই রঘুনাথ ওখানে যাবার প্রস্তাব দেয় সেই না শুনতে পাওয়ার ভান করে অন্যদিকে হাঁটা লাগায়। অবাক রঘুনাথ শেষ অবধি সেই বুড়ো সুগুন সর্দারকেই চেপে ধরল—ব্যাপারটা কী বলো তো সর্দার? মাদলপাহাড় যাবার নাম শুনেই সবাই পিছিয়ে যাচ্ছে কেন?
সুগুনসর্দার বলল, মাথায় বুদ্ধি আর প্রাণে ভয় থাকলে যে কেউই পেছোবে।
রঘুনাথ বলল, কেন, ভয়টা কীসের? বাঘের, না হাতির?
সুগুনসর্দার বলল, তুমি তো বাবু হাসালে আমাকে। আমাদের গ্রামের আট-দশ বছরের বাচ্চারা জঙ্গল থেকে চিতাবাঘের ছানা তুলে আনে, বিষাক্ত সাপের লেজ ধরে মাথার ওপর পাঁইপাই করে ঘোরায়। আমরা বনের জন্তুকে ভয় পাব কোন দু:খে? কিন্তু মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসীকে ভয় পাই, কারণ উনি সাধারণ মানুষ নন। সাধারণ মানুষ পাঁচশো বছর বাঁচে না। উনি যোগীপুরুষ। আর কে না জানে যোগীপুরুষ একলা থাকতে ভালোবাসেন। আর ওনার অভিশাপের ব্যাপারটাও এ-গাঁয়ের ছেলেবুড়ো সকলেই বিশ্বাস করে। তুমি ওখানে যাবার সঙ্গী পাবে না।
বুধোদার ঘরের জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম বাইরে গাঢ় অন্ধকার নেমে এসেছে। আকাশে কয়েকটা তারা আর নদীর বুকে ক'টা মালবওয়া নৌকোর ছই থেকে ঝোলানো লণ্ঠন—এ ছাড়া আর কোথাও কোনও আলো নেই। বুধোদার ঘরের ভেতরেও বিশাল উঁচু ছাদ থেকে টাঙানো একটা মাত্র কম পাওয়ারের বালব থেকে যেটুকু আলো পড়ছিল তাতে আলোর থেকে ছায়াই হচ্ছিল বেশি। ভালোই লাগছিল এরকম পরিবেশে বসে মাদলপাহাড়ের ঘটনা শুনতে। তখনও কী জানি, আর মাত্র দুদিন বাদেই আমি আর বুধোদাও সেই ভয়ংকর জঙ্গলের মধ্যে অদ্ভুত সব ঘটনাজালে জড়িয়ে পড়ব?
আমি বুধোদাকে জিগ্যেস করলাম, তারপর কী হল? রঘুনাথ দ্বিবেদী বামনসন্ন্যাসীর মন্দিরে গিয়েছিলেন?
বুধোদা বলল, গিয়েছিল মানে? রীতিমতন আঁটঘাঁট বেঁধে গিয়েছিল। রঘুনাথের কাছে মাইক্রোফিল্ম তোলার ক্যামেরা ছিল। বাইনোকুলার ছিল। জোরালো টর্চ ছিল। এমনকী বন্যপ্রাণীর মোকাবিলা করার জন্য একটা রিভলবার অবধি ছিল।
পরেরদিন সূর্য ডুবতে না ডুবতেই রঘুনাথ চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে মৌডুংরি গ্রামের সীমানা পেরিয়ে হাঁটা লাগাল মাদলপাহাড়ের দিকে। রাত্তিরে জার্নি শুরু করার প্ল্যানটা রঘুনাথ দুটো কারণে করেছিল। প্রথমত এর ফলে বামন সন্ন্যাসীর নজর এড়ানো সহজ হবে আর দ্বিতীয়ত অ্যাডভেঞ্চার শেষ করে ভোর ভোর নিজের বিছানায় এসে শুয়ে পড়লে গ্রামের লোকেরাও কেউ কিছু টের পাবে না। জংলি জানোয়ারের ভয় ছিল অবশ্যই, কিন্তু যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় সেই হাতি অত খাড়া পাহাড়ে থাকে না, আর শীতের শুরুতে সাপের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনাও কম।
তা ছাড়াও রঘুনাথ ভেবে দেখেছিল, দিনটা কার্তিক পূর্ণিমা। আকাশে চাঁদ থাকবে। কাজেই জঙ্গলের পথে হেঁটে যেতে খুব একটা অসুবিধে হবার কথা নয়।
তারপর ওই পাহাড়ের চুড়োয় ও কীভাবে উঠেছিল, কতক্ষণ সময় লেগেছিল তা নিয়ে রঘুনাথ চিঠিতে বেশি কথা খরচা করেনি। একেবারে চূড়ায় ওঠার পর থেকে বর্ণনা শুরু করেছে। যা লিখেছে তা আমি তোকে ওর চিঠি থেকেই পড়ে শোনাচ্ছি।—
কুয়াশা মাখানো হলুদ জ্যোৎস্নার আলোয় অনেকদূর থেকে দেখলাম জঙ্গলের মাঝখানে কিছুটা পরিষ্কার জমি। চোখ একটু সয়ে এলে বুঝতে পারলাম, খালি জায়গার পুরোটাই শক্ত মাটি নয়, অনেকটা অংশ জুড়ে জল চিকমিক করছে। তার মানে ওখানে একটা বিশাল হ্রদ রয়েছে। সেই হ্রদের তীরে এক জায়গায় পাথরের তৈরি দু-তিনটে চৌকোনা ঘর। ওটাই কি তাহলে বামন সন্ন্যাসীর মন্দির? তাই হবে। আর কিছু তো চোখে পড়ছে না। ঘরগুলো দেখে আমার মন্দিরের বদলে মিলিটারি বাঙ্কারের কথাই মনে হচ্ছিল।
মিলিটারি গ্যারিসনের মতনই ওই পুরো জায়গাটা উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ছিল। পাঁচিলটার জায়গায় জায়গায় পাথরের ইট খসে পড়েছে। সেরকমই একটা ফোকরের মধ্যে মাথা গলিয়ে ভেতরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিলাম ওখানে কী রয়েছে। দেখতে চেষ্টা করছিলাম, কোথা থেকে কোনও মানুষের গলা কিংবা আলোর রেখা ভেসে আসে কি না। না, সেরকম কিছুই দেখলাম না।
বুঝতে বাকি রইল না যে, সুগুন সর্দারের কথাগুলো নিছকই গল্প—গ্রামের ঘরে বসে বসে বানানো। এখানে এসে কেউ যাচাই করার চেষ্টা করেনি এককালে যারা এখানে বাস করত তারা আজও আছে না মরে শেষ হয়ে গেছে।
চর্মরোগের ব্যাপারেও মিথ্যেই ওরা অভিশাপকে টেনে আনছে। হয়তো এই জায়গায় এমন কোনও জংলি গাছ আছে যার পাতার সংস্পর্শে ভয়ংকর কোনও অ্যালার্জি হয়। আর রাতদুপুরে আলোর ঝলক? কুসংস্কারাচ্ছন্ন চোখে বিদ্যুতের চমককেও অলৌকিক দেখায়।
যাই হোক, মনে মনে ভাবলাম এবার জায়গাটা একটু পরীক্ষা করে দেখা যাক, কোনও পুরাবস্তু পাওয়া যায় কি না। এক হাতে জ্বলন্ত টর্চ আর অন্য হাতে রিভলবার নিয়ে সেই টেবল-টপ পাহাড়ের মাথায় একবার চক্কর দিয়ে আসলাম। একটা জিনিস দেখে খুবই অবাক হলাম—বামন সন্ন্যাসীর সেই ঘরগুলো ছাড়াও আরও একটা ধ্বংসস্তূপ। এটার কথা মৌডুংরির কেউই আমাকে বলেনি। হ্রদের পূর্বপ্রান্তে বিরাট ভিতের ওপর এক মিনারের ধ্বংসাবশেষ। যখন পুরোটাই আস্ত ছিল, তখন গোলাকার সেই মিনার যে কত উঁচু ছিল তার আন্দাজ পাওয়া এখন মুশকিল, কিন্তু এখনও মাটির ওপরে যতটা দাঁড়িয়ে আছে তারই মাপ প্রায় তিনতলা একটা বাড়ির সমান। এরকম মিনার দেখলে স্বভাবতই দুর্গের কথা মনে পড়ে। ভাবলাম, তাহলে কোনও এক সময়ে কি মাদলপাহাড়ের ওপর কোনও দুর্গ ছিল! থাকলে সেটা অস্বাভাবিক নয়, কারণ চারিদিকের সমস্ত পাহাড়ের ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই পাহাড়। এখান থেকে নীচের উপত্যকার অনেকটা অংশে নজর রাখা সহজ। তা ছাড়া পাহাড়ের মাথায় জনপদ গড়ে তুলবার মতন এতখানি সমতল জমিও তো সব জায়গায় পাওয়া যায় না।
টর্চের আলোয় যতটা পারি খুঁজবার চেষ্টা করলাম, ওই মিনারের ভিতের কাছে কোনও শিলালিপি টিপি পাওয়া যায় কি না। পেলে নিজে তো পড়তে পারতাম না, তবে ফটো তুলে তোমাকে পাঠিয়ে দিতাম।
না:, সেরকম কিছু পাইনি। তবে এরপর যখন হ্রদের অন্য তীরে গিয়ে পৌঁছোলাম তখন একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলাম—ওই মিনার থেকে খসে পড়া পাথরের ইট তুলে নিয়ে গিয়েই পরবর্তী কোনও সময়ে হ্রদের তীরে শ্রীহীন চৌকো ঘরগুলো বানানো হয়েছিল। তখন নিশ্চয়ই কোনও কারণে ওই কেল্লা পরিত্যক্ত হয়েছিল। জনসংখ্যা অনেক কমে গিয়েছিল। ওই ভেঙে পড়া মিনারকে নতুন করে গড়ে তুলবার প্রয়োজন বা সামর্থ্য কোনওটাই সেই অবশিষ্ট কয়েকজন বাসিন্দার ছিল না। তারা তাই ভেঙে পড়া মিনারের ইট তুলে নিয়ে গিয়ে পাশেই একটা ছোটখাটো মাথা গুঁজবার আস্তানা বানিয়ে নিয়েছিল।
সেই রাতে মাদল পাহাড়ের মাথায় আরও একটা আশ্চর্য জিনিস দেখেছিলাম—সেটা হল, জল টলটলে হ্রদটার পায়ের কাছে মাটির বুকে একটা বিরাট গহ্বর, যেন একটা মস্ত বড় দিঘি কোনও কারণে শুকিয়ে গিয়েছে। সেই গহ্বরের নীচেই অজস্র রুপোলি ধাতুর পাত চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে। ওগুলো রুপোর পাত হতেই পারে, যেমন সুগুন সর্দার বলেছিল। আবার অন্য কোনও ধাতু হওয়াও বিচিত্র নয়। কিন্তু দুটো কারণে আমি ওই শুকনো দিঘির মধ্যে নামতে সাহস পাইনি। এক তো, ওই খাড়া পাড় বেয়ে কোনওরকমে নামতে পারলেও উঠে আসাটা আমার একার পক্ষে অসম্ভবই হত। আর দুই, ওখানে একবার নামলে, পাড়ে দাঁড়িয়ে যে কেউ আমাকে বড্ড পরিষ্কার ভাবে দেখতে পেয়ে যেত। পাঁচশো বছরের আয়ু নিয়ে কোনও মানুষ নাই থাক, এখনকার কোনও টেররিস্ট গ্রুপের পক্ষে ওই জায়গায় ঘাঁটি বানানোটা তো একেবারেই অসম্ভব নয়। কাজেই ওই শুকনো দিঘিতে নামার কাজটা মুলতুবিই রাখলাম।
এরপরে আমি ওই চৌকো ঘরগুলোর একটায় ঢুকে পড়েছিলাম। না, কোথাও কোনও বাধা পাইনি। কেউ ছিলই না তো বাধা দেবে কে? দরজার পাল্লাদুটোও ভেঙে পড়েছিল। আগে বাইরে থেকে টর্চের আলো ফেলে ভেতরটা দেখে নিলাম, তারপর ঢুকে পড়লাম ভেতরে।
মন্দির বলতে যা ধারণা হয়, ওই ঘরে ঢুকলে, যে কারুর সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা হবে। ধুপ ধুনো নয়, বরং তেলকালির মতন একটা গন্ধ বাতাসে ঝুলে রয়েছে। ঘরটায় জানলা-টানলা কিছুই ছিল না। শুধু ছাদের কাছে কয়েকটা ঘুলঘুলি ছিল। তার মধ্যে দিয়ে যেটুকু জ্যোৎস্না এসে পড়েছিল সেই আলোতেই দেখলাম ঘরের একদিকে একটা বড় সিন্দুক দাঁড় করানো রয়েছে। সিন্দুকটাতে হাত ছোঁয়াতেই চমকে গেলাম। সেই প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অমন আধুনিক ধাতুর তৈরি সিন্দুক আশা করিনি। ভেবেছিলাম কাঠ কিংবা পাথরের বাক্সের মতন কিছু হবে। কিন্তু হাতের তলায় ঠান্ডা ধাতুর স্পর্শই পেলাম। যাই হোক, দেখলাম সিন্দুকটাতে তালা টালা লাগানো নেই। আমার হাতের আলতো টানে ঢাকাটা মসৃণভাবে খুলে গেল।
দেখলাম বাক্সটার ভেতরে যত্ন করে কাপড়ে জড়িয়ে কী যেন একটা রাখা আছে। বুক দুরদুর করছিল। কী আছে ওর মধ্যে? প্রাচীন পুঁথি? তাম্রশাসন? যাই হোক—জিনিসগুলোর পুরাতাত্বিক মূল্য যে অসাধারণ হবে সে বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ ছিল না। কাপড়ের মোড়কটা খুলে কিন্তু অত্যন্ত হতাশ হলাম। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এই ছবিটা, যেটা তোমাকে এই চিঠির সঙ্গে পাঠালাম।
এতক্ষণ বাদে আমি বুধোদার কথার স্রোতে বাধা দিয়ে বললাম, আসল ছবিটা কেমন ছিল? আমরা যেরকম ফটোগ্রাফিক পেপারের ওপর প্রিন্ট দেখি সেইরকম?
বুধোদা বলল, প্রায় সেইরকমই। শুধু প্রিন্টটা কাগজের ওপরে ছিল না। রঘুনাথ লিখেছে সেটা ছিল প্লাস্টিকের মতন অদ্ভুত নমনীয় কিন্তু মজবুত একটা জিনিসের ওপরে।
তারপর?
রঘুনাথ বুঝতেই পারেনি জিনিসটা কী। সত্যিকথা বলতে কী, এখনও ও জানে না যে, এটা ওই মাদলপাহাড়ের স্যাটেলাইট-পিকচার। সেটা স্বাভাবিক। ও তো আর আকাশ থেকে তোলা মাদলপাহাড়ের ছবি দেখেনি কখনও। ও দেখেছে পায়ে হেঁটে। তাতে হ্রদের আকৃতি বোঝা যায় না। তাই ও ভেবেছিল এটা কোনও নকশা কিংবা সাংকেতিক লিপি। রঘুনাথ বুদ্ধি করে একটা কাজ করেছিল। ভবিষ্যতে আমাকে দেখবার জন্যে প্লেটটার একটা মাইক্রোফিল্ম তখনই তুলে নিয়েছিল।
আমি জিগ্যেস করলাম, সিন্দুকটার ভেতরে আর কিছু ছিল না? সে ব্যাপারে দ্বিবেদীজি কিছু লেখেননি?
লিখেছে। লিখেছে বাকি পুরো সিন্দুকটা জুড়ে ছিল অভ্রর পাতের মতন পাতলা আর চকচকে একরকমের জিনিসের চৌকো চৌকো বান্ডিল।
অভ্রর বান্ডিল!—রঘুনাথ দ্বিবেদীর বর্ণনা শুনে এতক্ষণে আমার মাথাটা অনেকটাই তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল। এবার সিন্দুক ভর্তি অভ্রর পাতের কথা শুনে বাকিটাও কেমন যেন ঝিমঝিম করতে লাগল। আমি, যাকে বলে কমপ্টি বুঝভুম্বুল হয়ে হাঁ করে বুধোদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনের অবস্থা বুঝতে বুধোদার অসুবিধে হল না। বলল, দাঁড়া, আর সামান্যই বাকি রয়েছে।
সিন্দুকটা বন্ধ করে ঘর থেকে বেরোবার সময় রঘুনাথের টর্চের আলোটা হঠাৎই একবার মেঝের ওপর গিয়ে পড়ে। তখনই রঘুনাথ দেখে এক গা ছমছমে দৃশ্য। এতক্ষণ ধরে বামন সন্ন্যাসীর অস্ত্বিত্বের বিরুদ্ধে যত যুক্তি সে সাজিয়ে তুলেছিল, ওই এক দৃশ্যেই তা গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে ভেঙে গেল।
রঘুনাথ দেখল, মেঝেতে জমে থাকা পুরু ধুলোর স্তরের ওপর অজস্র পায়ের ছাপ। এক একটা ছাপের দৈর্ঘ্য আমাদের কড়ে আঙুলের থেকে বেশি হবে না। যেন একটা ডল-পুতুল সারা ঘরে হেঁটে বেরিয়েছে।
রঘুনাথ এত ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে, সে তারপর ওখানে আর একটুও দাঁড়াবার সাহস পায়নি। ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে নেমে এসেছিল মাদলপাহাড় থেকে।
চিঠির শেষে রঘুনাথ লিখেছে, ভাই বোধিসত্ব! অনেক কথা বলার ছিল বলেই টেলিফোন না করে চিঠি লিখলাম। ফোনে এত গুছিয়ে সব কথা বলতে পারতাম না। তা ছাড়া নকশাটাই বা তোমাকে দেখাতাম কেমন করে?
যাই হোক, আমার চিঠি পড়ে তোমার যদি মনে হয় মাদলপাহাড়ে সত্যিই কোনও রহস্য লুকিয়ে আছে তাহলে আমাকে একটা ফোন কোরো। কবে, কোন ট্রেনে আসছ জানালে আমি টাটানগর স্টেশনে থাকব। ওখান থেকে আমিই তোমাকে নিয়ে যাব মাদলপাহাড়। একা যা পারিনি, আশা করি তুমি সঙ্গে থাকলে সেই কাজ শেষ করার সাহস জোটাতে পারব। শুভেচ্ছা জেনো। ইতি, গুণমুগ্ধ রঘুনাথ দ্বিবেদী।
বুধোদা চিঠিটা ভাঁজ করে খামে ঢোকানো মাত্র আমি রুদ্ধশ্বাসে জিগ্যেস করলাম, তুমি কেমন করে নকশাটাকে মাদলপাহাড়ের ছবি বলে বুঝতে পারলে বুধোদা?
বুধোদা বলল, কী জানি! ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে হঠাৎই মনে হল এরকম দলা পাকানো সবুজ, শিরা ওঠা খয়েরি আর আঁকাবাঁকা নীল রং যেন খুব চেনা। প্রায় রোজই দেখি। তারপর হঠাৎই মাথায় স্ট্রাইক করল—আরে এ তো স্যাটেলাইট থেকে তোলা ভূপৃষ্ঠের ছবি।
তারপর গুগল খুলে, রঘুনাথ যেরকম লোকেশন দিয়েছে সেই অনুযায়ী জুম করতে শুরু করলাম—চান্ডিল...নিমিজিরা...তারপর জঙ্গলের মধ্যে জিলিপির মতন প্যাঁচ খাওয়া মিঠাপানি নদীও পেয়ে গেলাম। রঘুনাথ লিখেছিল ওই মিঠাপানি নদীর পূর্ব দিক থেকেই উঠে গেছে মৌডুংরির রাস্তা আর মৌডুংরির উত্তরের অদ্ভুত আকৃতির পাহাড়টাই মাদলপাহাড়।
এইভাবে জুম করতে-করতে যেই মাদলপাহাড়ের চুড়োয় পৌঁছোলাম, অমনি শক খাওয়ার মতন চমকে উঠলাম। আরে! এ তো অবিকল ওই রঘুনাথের পাঠানো প্লেটটার মতন দেখতে লাগছে! ওই প্লেটটাও তো তাহলে একটা স্যাটেলাইট পিকচার। কিন্তু এই ছবি ওই পাণ্ডববর্জিত ধ্বংসস্তূপে পৌঁছোল কেমন করে?
তখনও কিন্তু আমি স্বপ্নেও ভাবিনি এই ছবির বয়েস এত পুরোনো। তোর মতন আমিও ভাবছিলাম হয়তো খুব রিসেন্টলি কম্পিউটার থেকে ডাউনলোড করা হয়েছে এই ছবিটাকে।
তারপর?
তারপর দুটো ছবিকে পাশাপাশি রেখে কম্পেয়ার করতে গিয়েই মনে হল দ্বিতীয়বার ইলেকট্রিক-শক খেলাম।
কেন? কী দেখলে?
আয় তোকেও দেখাচ্ছি। আমি যেটা গুগল থেকে ডাউনলোড করেছি সেই ফটোটাই প্রথমে দেখ। আমি জুম করছি, তুই দ্যাখ।
বুধোদা ফটোটার একটা বিশেষ অঞ্চল জুম করতে শুরু করল। একটু পরেই পরিষ্কার সেই ধ্বংসস্তূপটার ছবি ফুটে উঠল, যেটার কথা রঘুনাথ দ্বিবেদী তার চিঠিতে লিখেছেন। ভাঙাচোরা ইমারতটাকে উপগ্রহের ছবিতেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।
দেখলি? আচ্ছা, এবার রঘুনাথের পাঠানো ফটোটাকে ম্যাগনিফাই করছি, দেখ।
বুধোদা রঘুনাথ দ্বিবেদীর তোলা ছবিটা স্ক্যান করে কম্পিউটারে তুলে নিয়েছিল। সেই ছবির মধ্যে ওই একই জায়গাকে ম্যাগনিফাই করতে শুরু করল। অবাক হয়ে দেখলাম ওই ছবিটাতে ধ্বংসস্তূপের কোনও চিহ্নই নেই। কোনও ঘরবাড়ি কিছুই নেই ওই জায়গাটাতে—এক্কেবারে ফাঁকা।
আমি অবাক হয়ে বললাম, এর মানে কী দাঁড়াল?
বুধোদা বলল, যদি গোঁয়ারের মতন জোরজার করে অন্য কোনও মানে খুঁজতে চাস তাহলে আলাদা কথা। তা না হলে কিন্তু একটাই মানে দাঁড়ায়। মাদলপাহাড়ের সিন্দুকের মধ্যে পড়ে থাকা ওই ছবিটা যখন তোলা হয়েছিল, তখনও হ্রদের ধারে কোনও মিনার, কোনও দুর্গ কিংবা ঘরবাড়ি তৈরিই হয়নি; ধ্বংস তো আরও অনেক পরের কথা।
আমি মাথা চুলকে বললাম, রঘুনাথজির বর্ণনা থেকে তো মনে হচ্ছে ওই মিনারও আজকের নয়। তাহলে...তাহলে...এই ছবি তো সত্যিই মান্ধাতার আমলের—মানে যখন ক্যামেরা ছিল না, স্যাটেলাইট তো দূরের কথা বেলুনও ছিল না। আমার মাথা গোলমাল হয়ে যাচ্ছে বুধোদা।
বুধোদা পালঙ্ক থেকে তড়াং করে লাফ দিয়ে নেমে বলল, আমারও। আর সেই গোলমাল এড়ানোর একটাই রাস্তা। রঘুনাথকে বলে দিয়েছি, কাল আমরা ইস্পাত এক্সপ্রেসে টাটানগর পৌঁছোচ্ছি। বাড়ি ফিরে চটপট ব্যাক-প্যাক গুছিয়ে নে। ঠিক সকাল পাঁচটায় উত্তরপাড়া স্টেশনে পৌঁছে যাবি। উত্তরপাড়া থেকে হাওড়া, হাওড়া থেকে টাটা, টাটা থেকে...
মাদলপাহাড়—আমি বুধোদার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম।
রাইট। বুধোদা মুচকি হেসে কম্পিউটার সাট-ডাউন করল।
টাটানগর স্টেশনে ট্রেন থেকে নামতেই হ্যান্ডশেক করবার জন্যে হাত বাড়িয়ে যে ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন বুঝলাম তিনিই রঘুনাথ দ্বিবেদী। ছোটখাটো চেহারা, কিন্তু বেশ শক্তপোক্ত। চকরা-বকরা প্রিন্টের একটা হাফশার্ট আর খয়েরি কর্ডের ট্রাউজার পরেছিলেন। পানের রসে ঠোঁট লাল। ভদ্রলোক এই পোশাকে কবিরাজি করেন বলে ভাবতে একটু কষ্টই হল। ভাবলাম, যখন রুগি দেখেন তখন নিশ্চয়ই ধুতি-পাঞ্জাবির মতন আরেকটু ভারিক্কি পোশাক গায়ে চাপিয়ে নেন।
রঘুনাথ দ্বিবেদী দেখলাম জলের মতন বাংলা বলেন। সে ব্যাপারে নিজেই বললেন, জামসেদপুরে স্টিল ফ্যাক্টরি তৈরির প্রথম যুগ থেকেই এত বাঙালি রয়েছে যে, বাংলাকে এখানকার সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ বলা চলে। দ্বিবেদীজির কাছেই জানলাম, জামসেদপুর থেকে অনেকগুলো ভালো বাংলা সাহিত্যপত্রিকাও প্রকাশিত হয়, আর দুর্গাপুজোর জাঁকজমকে না কি কলকাতার সঙ্গে টেক্কা দিতে পারে।
রঘুনাথ দ্বিবেদী অত্যন্ত জমাটি লোক। স্টেশন থেকে বেরোতে যেটুকু সময় তার মধ্যেই উনি আমাকে 'ভাইয়া' বলে ডাকতে শুরু করেছেন আর উনি হয়ে গেছেন আমার রঘুদা।
রঘুদা আমাদের স্টেশনের বাইরে পার্কিং-লটে একটা জিপের কাছে নিয়ে গেলেন। বললেন, এটা ওনার নিজেরই গাড়ি। শহর ছাড়ালেই রাস্তাঘাটের যা অবস্থা তাতে না কি ফোর হুইল ড্রাইভের জিপই নিরাপদ। দামি গাড়ি হলে উলটেটুলটে যেতে পারে। তা ছাড়া ওনাকে কাজেকর্মে জঙ্গলের রাস্তাতেও হামেশাই যেতে হয়। সেসব রাস্তায় শক্তপোক্ত গাড়ি ছাড়া চলবেই না। বললেন, একটু বাদেই আমরা সেরকম রাস্তাই ধরব।
শুনে বেশ উত্তেজনা হচ্ছিল। তবে রঘুদা বললেন, আগে বিষ্টুপুরের মোড়ে মাধব ব্রাদার্সের দোকানের বিখ্যাত কচুরি আর রাবড়ি না খাইয়ে তিনি আমাদের কোত্থাও নিয়ে যাবেন না। তখন ঘড়িতে প্রায় বারোটা বাজে আর ট্রেনে টুকটাক মুখ চালানো সত্বেও খিদে লেগেছিল খুব। কাজেই আমি বা বুধোদা কেউই এ প্রস্তাবে আপত্তি জানালাম না। তবে সে দোকানের মিষ্টি এতই ভালো যে শুধু রাবড়িতেই থামা গেল না, তারপরেও আরও দুটো করে অমৃতি আর গুলাবজামুন খেতেই হল।
আমার এই প্রথম জামসেদপুর আসা। গাড়ি করে যেতে-যেতে শহরের যেটুকু দেখতে পাচ্ছিলাম তাতেই ভারি ভালো লাগছিল। এমন গাছপালায় ছাওয়া চওড়া রাস্তাঘাট আর ছবির মতন সুন্দর বাড়িঘর খুব কম শহরেই দেখেছি। দ্বিবেদীজি বেশ গর্বের সঙ্গে জানালেন দু-হাজার দশে ভারত সরকারের একটা সার্ভেতে জামসেদপুরকে সারা ভারতের মধ্যে সপ্তম সুন্দর শহর বলে ঘোষণা করা হয়েছে। একটু পরেই আমরা শহর ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম আর তখনই চোখে পড়ল সেই মেঘের মতন পাহাড়—দলমা।
একটু ভাঙাচোরা হলেও, হাইওয়ে থার্টিথ্রির অবস্থা খুব খারাপ নয়। গাড়ি মোটামুটি ভালো স্পিডেই চলছিল। সারা পথটাই দলমা পাহাড় আমাদের ডানপাশে সমান দূরত্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইল। পাহাড়ের পায়ের কাছ থেকে হাইওয়ে অবধি যে ঢেউ খেলানো লাল মাটির জমি, সেখানে কোথাও কোথাও অল্পস্বল্প চাষ হয়েছে, কিন্তু বেশিরভাগ জায়গাতেই শাল-মহুয়ার থোকা থোকা জঙ্গল। জঙ্গলের মাঝে মাঝে ছোট ছোট আদিবাসী গ্রাম। মাটির বাড়ি। তকতকে করে নিকোনো উঠোনে মুরগি চরছে, ধান শুকোচ্ছে, ঘুনসি পরা উদোম বাচ্চারা মাটিতে বসে খেলা করছে। বাড়িগুলোর দেওয়ালে উজ্জ্বল সাদা রঙের আলপনা। গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে এত ভালো লাগছিল যে কী বলব। হঠাৎই রঘুদা জিপটাকে বাঁ-দিকে ঘুরিয়ে একটা রোডসাইড ধাবার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন, নামো ভাইয়া। এই ধাবাটার মতো এত ভালো দেশি মুরগির কারি আমি তো অন্তত কোথাও খাইনি। তার সঙ্গে গরম-গরম আলুর পরোটা। চলবে তো?
ঘড়িতে দেখলাম আড়াইটে বেজে গেছে। ছোটনাগপুর মালভূমির জলের হজমি গুণের কথা বাবা-কাকাদের মুখে বহুবার শুনেছি। আজ প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেলাম। মাধব ব্রাদার্স বলে কোনও দোকানে কোনওকালে ঢুকেছিলাম বলেই মনে পড়ছে না। মনে হচ্ছে অন্তত দশদিন উপোস করে রয়েছি। বুধোদার মুখ দেখে বুঝলাম ওরও একই অবস্থা। দুজনের কেউই দ্বিরুক্তি না করে টিউবওয়েলের জলে হাতমুখ ধুয়ে খাটিয়া টেনে ধাবার উঠোনে বসে গেলাম।
খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে অবধারিতভাবেই মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসীর প্রসঙ্গ উঠে এল। বুধোদা রঘুদাকে স্যাটেলাইট পিকচারের রহস্যের কথা খুলে বলল। ল্যাপটপ খুলে দেখিয়েও দিল রঘুদার পাঠানো ছবি আর গুগুল আর্থের ছবির মিল আর অমিল। সব দেখে শুনে রঘুদা তো হাঁ। তিনি একটা প্রত্নতাত্বিক রহস্য সমাধানের জন্যে বোধিসত্ব মজুমদারকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে ঘটনা মোড় নিচ্ছে অলৌকিকের দিকে।
বোধিদা বলল, শোনো রঘুনাথ। ফোনে তোমাকে যে-কথা বলিনি সেটা এখন সামনাসামনি বলছি। সেদিন রাতে তুমি কিন্তু অনেকটাই বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছিলে। জঙ্গলের মধ্যে একটা অচেনা জায়গায় ওভাবে একা যাওয়াটা তোমার ঠিক হয়নি। আমি শুধু বন্য জন্তুর ভয়ের কথাই বলছি না। বিপদ তো মানুষের কাছ থেকেও আসতে পারত।
বুধোদার কথায় রঘুনাথ দ্বিবেদী কিছুক্ষণ কী যেন চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, সে ব্যাপারে আমি ভালো করেই খোঁজখবর নিয়েছিলাম। মাদলপাহাড়ের চূড়ায় বামনসন্ন্যাসী ছাড়া আর কেউ থাকে না। থাকলে কোনও না কোনও প্রয়োজনে কখনও না কখনও তাদের নীচে আসতেই হত, আর এলে মৌডুংরির গ্রামবাসীদের চোখকে তারা ফাঁকি দিতে পারত না।
বুধোদা বলল, সেটাও একটা প্রশ্ন। বামনসন্ন্যাসীকেই বা কখনও পাহাড়ের নীচে নামতে হয় না কেন? ওনার খাবার-দাবার আসে কোথা থেকে? তুমি পাহাড়ের মাথায় চাষ-আবাদ দেখেছ না কি রঘু?
অ্যাবসল্যুটলি নট। একটা সব্জি বাগান অবধি নেই। হ্রদের জলে মাছ আছে কী না জনি না। কিন্তু একটা মানুষ শুধু মাছ খেয়ে বছরের পর বছর বেঁচে আছে এটা ভাবতে কীরকম লাগে না? তা ছাড়া পোশাক-আশাক, ওষুধপত্তর...এ সবেরও তো প্রয়োজন হয় একটা মানুষের, তা হলেনই বা বামন।
আমি বললাম, রঘুদা, হয়তো ওনার কোনও সহকারী আছে, যে মৌডুংরি থেকে ওপরে ওনার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেয়।
না, মৌডুংরি গ্রামে এমন কেউ থাকবে না। সাহায্য করতে গেলে সহানুভূতি লাগে, মায়া লাগে। বামনসন্ন্যাসীর সম্বন্ধে ওই গ্রামের লোকেদের ভয় থাকতে পারে, কিন্তু মায়া মমতা যে নেই সেটা আমি ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেই টের পেয়েছি। তার কারণটাও বোঝা কঠিন নয়। একজন সন্ন্যাসীর জন্যে অতবড় একটা পাহাড় ওদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। সেই পাহাড়ে ওরা শিকার করতে পারে না, ফলমূল কুড়োতে যেতে পারে না, এমনকী ভাবো তো, এই খরার দেশে পাহাড়ের মাথায় অমন সুন্দর একটা জলাশয়—সেটাও ওরা ব্যবহার করতে পারে না। তা ছাড়া সন্ন্যাসীর অভিশাপে ওদের গ্রামবাসীদের মৃত্যু—সেটাও কি ওরা মেনে নিতে পারে? না ভাইয়া, গ্রামবাসীদের মধ্যে কেউ সন্ন্যাসীকে সাহায্য করবে না, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তবে...
তবে কী? প্রশ্ন করল বুধোদা। মৌডুংরি ছাড়া মাদলপাহাড়ের ত্রিসীমানায় তো আর লোকালয় নেই।
লোকালয় নেই, কিন্তু তোমাকে চিঠিতে লিখেছিলাম বোধহয়, একটা গুহা রয়েছে। ওই মাদলপাহাড়ের চূড়ার একটু নীচে...।
হ্যাঁ, লিখেছিলে। নামটাও মনে আছে—আংরাগুহা। তাতে কী?
সেই গুহায় একটা অদ্ভুত লোক বাস করে। হয়তো...হয়তো সেই গুঙ্গাদানোই মৌডুংরি থেকে বামনসন্ন্যসীর জন্যে প্রয়োজনীয় মালপত্র নিয়ে যায়।
ওরে বাবা, এক বামনসন্ন্যাসীতে রক্ষা নেই, তুমি আবার আরেক রূপকথার চরিত্রের আমদানি করলে—গুঙ্গাদানো! হাসতে হাসতে বলল বুধোদা। এর কথা তো লেখোনি তোমার চিঠিতে।
না, লিখিনি, মানে লেখবার কথা মনেও পড়েনি। গুঙ্গাদানো খুব শান্ত নির্বিরোধী লোক।
গুঙ্গা মানে তো বোবা? আর দানো হল দৈত্য? তার মানে বোবা দৈত্য? তা লোকটা কে?
ব্যস—বোবা দৈত্য। বললেন রঘুদা। ওই দুটো কথার মধ্যেই ওর সম্বন্ধে যা জানা আছে সবটাই বলে দেওয়া হয়েছে। লোকটা বোবা, মুখে একটা অদ্ভুত গোঙানির শব্দ ছাড়া আর কোনও কথা বলতে পারে না। আর লোকটার চেহারা প্রকাণ্ড। প্রায় সাত ফুট লম্বা আর তেমনি চওড়া। কিন্তু তবুও ওকে দেখলে ভয় লাগে না। ঠোঁটে সবসময় একটা হালকা হাসি লেগেই রয়েছে। চোখদুটোও আধবোজা, মনে হয় যেন জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখছে।
গুহায় থাকে বললে? কী করে গুহায়?
তা তো জানি না। তবে মৌডুংরির লোকেরা বলে ও সাধন ভজন করে না। এমনিই ওখানে একা একা বাস করে। মাঝে মাঝে গ্রামে আসে। জঙ্গলে শিকার করা হরিণ কিংবা খরগোশের মাংসের বিনিময়ে চাল ডাল জামাকাপড় নিয়ে যায়। তবে মৌডুংরিতে যে লোকটা দোকান চালায় সে ভারি অদ্ভুত একটা কথা বলেছিল। বলেছিল, গুঙ্গাদানো সারা মাসে যেটুকু চাল নিয়ে যায় তাতে ওর মতন বিশালাকায় মানুষের বড়জোর চারদিন চলার কথা।
এটা কোনও সমস্যা নয়, বলল বুধোদা। জঙ্গলে ভাত ছাড়া ওর খাবার মতন আরও অনেক কিছুই রয়েছে। যাই হোক, তোমার তাহলে ধারণা ওই গুঙ্গাদানোই হচ্ছে বামনসন্ন্যাসীর সঙ্গে মৌডুংরির যোগসূত্র?
তাই তো মনে হয়। চলো, আমরা তো যাচ্ছিই ওখানে। গেলে সব পরিষ্কার হবে।
আমরা ধাবা ছেড়ে বেরোলাম। আরও ঘণ্টাখানেক ড্রাইভ করার পরেই দেখলাম দূরের পাহাড়টা হঠাৎই রাস্তার একদম পাশে চলে এসেছে। রঘুদা এবার ডানদিকে বেঁকে পিচরাস্তা ছেড়ে একটা লাল মোরামের পথ ধরল। রাস্তাটা ক্রমশ দুটো পাহাড়ের মাঝখানে শুয়ে থাকা একটা জংলা উপত্যকার মধ্যে ঢুকে পড়ল। এই হল রঘুদার চিঠিতে বর্ণিত সেই নিমিজিরার জঙ্গল।
এখন পথের দু-ধারে শুধুই আকাশছোঁয়া শাল, বহেড়া, চাঁপ আর আসান গাছের সারি। রঘুদাই গাড়ি চালাতে চালাতে আমাকে গাছগুলো চিনিয়ে দিচ্ছিলেন। উনি বললেন এই জঙ্গলের প্রত্যেকটা ঘাস এমনকী লতাকেও উনি চেনেন। একজন কবিরাজের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক। রাস্তার ধারেই লালমাটির বড় বড় উঁইঢিপি—তার মধ্যে কোনও কোনওটায় আবার ভাল্লুকের নখের আঁচড়। এটাও রঘুদাই দেখালেন।
আমাদের জিপ এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা ধরে মাতালের মতন টলতে-টলতে এগোচ্ছিল। ইতিমধ্যে অন্ধকার নেমে এসেছে, ঘড়িতে যদিও মাত্র সন্ধে ছ'টা। আসলে গাছের পাতা ভেদ করে আলো আসতে পারছে না। মাঝে-মাঝেই জিপের হেডলাইটের আলোয় মাটির সঙ্গে মিশে থাকা নাইটজার পাখিদের বড় বড় লাল চোখ জ্বলে উঠছিল। ওরা রাস্তার ধুলোর ওপরেই বুক পেতে শুয়ে থাকে, কিন্তু যখন দেখে এইভাবে লুকিয়ে থেকেও জিপটার এগিয়ে আসা ঠেকানো যাচ্ছে না, তখন মাটি ঘেঁষে এঁকেবেঁকে উড়ে গিয়ে আবার একটু দূরে বসে পড়ে।
প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পরে জঙ্গলটা একটু হালকা হয়ে গেল; দেখলাম আমরা একটা সরু নদীর ধারে এসে পৌঁছেছি। রঘুদা বললেন, এই হল মিঠাপানি নদী। তারপর একটু দূরে একটা ছোট টিলার দিকে দেখালেন। টিলাটার মাথায় টিমটিম করে একটা আলো জ্বলছে। রঘুদা বললেন, ওটাই হল মিঠাপানি ফরেস্ট বাংলা। এটাকেই সভ্যজগতের শেষ চিহ্ন বলতে পারো, যদিও এখানে ইলেকট্রিসিটি নেই, মোবাইলের টাওয়ারও পাবে না। আমরা আজ রাতটা ওই বাংলোতে কাটিয়ে, কাল ভোর ভোর আবার যাত্রা শুরু করতে পারি। কারণ যেখান থেকে আমরা মাদলপাহাড়ে উঠতে শুরু করব, সেটা এখনও প্রায় পনেরো কিলোমিটার রাস্তা। এরপর হাতিদের যাতায়াত শুরু হবে। কাজেই ওই রাস্তায় গাড়ি চালানো ঠিক হবে না।
বুধোদা বলল, ফরেস্টবাংলোয় জায়গা পাব তো?
উত্তরে রঘুদা জানালেন, কোনও চিন্তা নেই। মাঝে মাঝে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অফিসারেরা ছাড়া এই বাংলোতে কেউ আসে না। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেরাও সাধারণত এখানে রাত কাটান না, কাজেই বাংলো ফাঁকাই পড়ে থাকে।
এই শীতে মিঠাপানির বুকে জল নেই বললেই চলে। আমাদের জিপ সেই সামান্য জলধারা আর ছড়িয়ে থাকা নুড়িপাথরের ওপর দিয়ে কলকল ঝরঝর শব্দ করতে করতে দুলকি চালে নদী পেরিয়ে দিব্যি উলটোদিকের খাড়া পাড়ের ওপর চড়ে গেল, আর তারপর দু-একটা জিগজ্যাগ টার্ন নিয়েই একেবারে টিলার মাথায় বনবাংলোর গেটে। বুঝলাম টাটানগর স্টেশনে রঘুদা যে জিপের গুণগান গেয়েছিলেন তা এইসব কারণেই।
বন্যজন্তুর ভয়টা যে এখানে বেশ বেশিই, সেটা বুঝলাম বাংলো ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থার বহর দেখে। কাঁটাতারের বেড়া তো আছেই, তা ছাড়াও খাদের মতন গভীর নালা দিয়ে বাগান সমেত পুরো বাংলোটা ঘেরা। একটা কাঠের পুল পেরিয়ে আমাদের জিপ বাংলোর বারান্দার সামনে দাঁড়ানো মাত্র হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এল বছর কুড়ি-বাইশের একটা ছেলে। সে-ই এই বাংলোর চৌকিদার কাম কুক। নাম শ্যামলা।
শ্যামলা রঘুদাকে খুব ভালো করে চেনে, তাই কিছু বলার আগেই হাতে হাতে আমাদের মালপত্র বাংলোর ভেতরের ঘরে তুলে দিল। সারাদিন জার্নির পরে ধবধবে সাদা চাদর দিয়ে মোড়া নরম বিছানার ওপর শরীরটাকে টান টান করে ছড়িয়ে দিয়ে এত আরাম লাগল যে কী বলব। তবে সে বেশিক্ষণের জন্যে নয়। ঘুরতে এলে এই একটা মজা দেখেছি—ক্লান্তি বেশিক্ষণ থাকে না। মিনিট পনেরো বাদেই আমরা তিনজন তিনটে ডেক-চেয়ার নিয়ে বাংলোর বারান্দায় বসে গেলাম। ততক্ষণে আকাশে চাঁদ উঠে গেছে। চাঁদের আলোয় টিলার পায়ের নীচে মিঠাপানি নদীর সাদা বালির খাত আর তীরের মিশকালো গাছপালাগুলোকে কেমন যেন রহস্যময় লাগছিল। রাত যত বাড়ছিল ততই জঙ্গল জেগে উঠছিল। আমাদের খুব কাছেই কোনও একটা জঙ্গলের আড়াল থেকে ভেসে আসছিল বুনো হাতির শঙ্খধ্বনির মতন ডাক। একটা বুড়ো মানুষের গলাখাঁকারির মতন আওয়াজ একটানা কিছুক্ষণ হয়ে হঠাৎই থেমে গেল। রঘুনাথদা বললেন ওটা চিতা বাঘের আওয়াজ। তা ছাড়া রাতচরা পাপিয়ার অবিশ্রান্ত পিউ কাঁহা ডাক তো রয়েছেই।
আমাদের সামনে পেতে রাখা কাচের সেন্টার টেবলের ওপর শ্যামলা তিন কাপ সুগন্ধী চা আর পকৌড়া নামিয়ে দিয়ে গেল। চা, চিনি থেকে শুরু করে চাল, ডাল, মশলা সবকিছুই আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হয়েছিল। জঙ্গলে কিছুই পাওয়া যায় না। দালানের একপাশে একটা বেশ বড়সড় কাচের বেলুনের মতন দেখতে কেরোসিনের ল্যাম্পও জ্বালিয়ে টাঙিয়ে দিয়ে গেল শ্যামলা। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল জিনিসটা ব্রিটিশ আমলের। সারা ভারতেই এইধরনের বনবাংলোয় এখনও সেই আমলের বহু ফার্নিচার, কাপ-ডিশ, ল্যাম্পশেড ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যায়। ব্রিটিশদের হাতেই এগুলোর সূচনা হয়েছিল কি না। একবার বুধোদার সঙ্গে উত্তরবাংলার একটা বনবাংলোয় গিয়ে দেখেছিলাম ঘরের মধ্যে ফায়ারপ্লেস অবধি রয়েছে।
আমরা যেখানে বসে আছি ঠিক তার উত্তরে একটা মাঝারি সাইজের পাহাড় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেটার উচ্চতা দু-আড়াই হাজার ফিটের বেশি হবে না। সেটার দিকে আঙুল দেখিয়ে রঘুদা বললেন, ওই দেখো, ওই পাহাড়টার ওপরেই মৌডুংরি গ্রাম।
বুধোদা সেদিকে তাকিয়ে বলল, খুব একটা উঁচু তো নয়। তুমি যে চিঠিতে লিখেছিলে মৌডুংরি খুব দুর্গম জায়গা।
রঘুদা বললেন, উঁচু বলে দুর্গম তা তো বলিনি। দুর্গমতার কারণ প্রথমত পাহাড়টার খাড়াই খুব বেশি। প্রায় পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে পুরোটা উঠে গেছে। আর দ্বিতীয়ত, মৌডুংরির লোকেদের এই দিকে বেশি যাতায়াত নেই বলে রাস্তাটায় প্রচুর ঝোপঝাড় গজিয়ে গেছে। সেইসব কাঁটাঝোপ ঠেলে এগোতে দম বেরিয়ে যায়।
তারপরেই হঠাৎ কী যেন মনে পড়ে যাওয়ায় রঘুদা বুধোদার দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা বোধিসত্ব, তোমার সঙ্গে জামাকাপড়ের রুকস্যাক ছাড়া আরও একটা বড় ব্যাগ দেখলাম, অনেকটা ক্রিকেটাররা যেরকম ব্যাগে ব্যাট, প্যাড এইসব নিয়ে যায়।
আমি বললাম, হ্যাঁ, ওই ব্যাগগুলোর নাম ক্রিকেট-কফিন।
তা সেই ব্যাগটায় কী রয়েছে?
প্রশ্নটা আমারও মাথায় প্রথম থেকেই ঘুরছিল। ওটাকে যখন বুধোদার সঙ্গে হাত লাগিয়ে ট্রেনে তুলছিলাম, তখনই দেখেছিলাম ব্যাগটা যতটা বড়, ওজন সেই অনুপাতে খুব একটা বেশি নয়। জিগ্যেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম, ওটায় কী আছে। এখন রঘুদা প্রশ্নটা করায় বুধোদা একটু হেসে যে জবাবটা দিল, সেটা না দিলেও খুব একটা ক্ষতি ছিল না। কারণ, সেই জবাবের মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না। মুচকি হেসে বুধোদা বলল, ওতে রয়েছে চর্মরোগের প্রতিষেধক।
উত্তরটা শুনে রঘুদা একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, না, আমি এইজন্যে জিগ্যেস করছিলাম যে, যদি ওটাকে মৌডুংরি অবধি নিয়ে যেতে হয়, তাহলে তুমি একা পারবে না। সেক্ষেত্রে এখান থেকেই একজন পোর্টার জোগাড় করে নেব।
বুধোদা বলল, বেশ তো। যদিও জিনিসটা বেশি ভারী নয়, কিন্তু তুমি যেমন জঙ্গলের কথা বলছ, তাতে দুখানা ব্যাগ নিয়ে উঠতে অসুবিধে হবে বলেই তো মনে হচ্ছে। তোমার প্ল্যানটা ভালোই। একটা ছেলেকে বল, ওপর অবধি আমাদের সঙ্গে যাবে।
আরও কিছুক্ষণ এটা সেটা গল্প করার পর, রাত ন'টা নাগাদ শ্যামলা এসে জানাল রাতের খাবার তৈরি। আমরা ইচ্ছে করলে বাংলোর পেছনদিকে কিচেনের লাগোয়া ডাইনিং রুমে গিয়ে বসতে পারি। কিন্তু বারান্দায় বসে থাকতে আমাদের সবারই এত ভালো লাগছিল যে, আমরা সমস্বরে বললাম, না, না, তুমি এখানেই খানা লাগিয়ে দাও শ্যামলা।
শ্যামলা ভেতর থেকে সুন্দর সাদা চিনেমাটির প্লেট, বাটি সব এনে সেন্টার টেবলের ওপর সাজিয়ে দিল। তারপর ক্যাসারোলে করে নিয়ে এল গরম গরম রুটি। তার সঙ্গে ঘন ডাল, আলুভাজা আর চিকেন কারি। আমি দেখেছি, অমন লোভনীয় চিকেন কারিও কী জানি কেন ফরেস্ট বাংলো ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না, এমনকী কোলকাতার বড় রেস্তোরাঁগুলোতেও না। হয়তো কাঠের আঁচে দেশি মুরগি রান্না করলে তবেই একমাত্র ওরকম স্বাদ হয়। আমরা আর একটুও দেরি না করে চটপট খাওয়া শুরু করে দিলাম।
আমাদের খেতে দিয়ে শ্যামলা একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল, যদি আমাদের কিছু দরকার-টরকার পড়ে। বুধোদা বলল, তুই থাকিস কোথায় শ্যামলা?
শ্যামলা জবাব দিল, এই বাংলোর পেছনেই আমাদের কোয়ার্টার রয়েছে বাবু। দিনের বেলা দেখতে পাবেন। ওখানেই আমি আর আমার বাবা মা থাকি। বাবা এই বাংলোয় মালির কাজ করে। আর রান্নাবান্নার কাজ মা।
তা, এরকম নির্জন জায়গায় থাকতে ভয় করে না? চারিদিকে এত হিংস্র জীবজন্তু...
না, বাবু। জীবজন্তুদের যদি তাদের মতন থাকতে দেন তাহলে ওরা আপনার কোনও ক্ষতি করবে না। আমরা তো জঙ্গলের মানুষ, তাই একটা হাতি থেকে শুরু করে মৌমাছির ভাষা অবধি বুঝতে পারি। বুঝতে পারি ওরা কখন কী চাইছে, কখন কোনদিকে যাবে। ওই দেখুন...হঠাৎই শ্যামলা হাত তুলে আমাদের পায়ের নীচে নদীখাতের দিকে নির্দেশ করল।
আমরা তিনজন ও যেদিকে হাতের ইশারা করছে সেদিকে অনেকক্ষণ ভালো করে চেয়ে থেকেও কিছু দেখতে পেলাম না। তাতে একটু যেন অবাক হয়েই শ্যামলা বলল, দেখতে পাচ্ছেন না! ওই যে দাঁতাল শুয়োরটা জঙ্গল ছেড়ে নদীর তীরে বেরিয়ে এসেছে।
তবুও আমরা কিছুই দেখতে পেলাম না।
শ্যামলা বলল, ও হচ্ছে দলপতি। আগে বেরিয়ে দেখে নিচ্ছে চারিদিক নিরাপদ কি না। ও যদি ইশারা করে তাহলেই দলের বাকিরা খোলা জায়গায় বেরোবে। ওই দেখুন এবার সকলে মিলে নদী পার হচ্ছে।
এবার আমরা পরিষ্কার দেখতে পেলাম—ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় তিরিশটা বুনো শুয়োর একটার পর একটা লাইন দিয়ে মিঠাপানি নদী পেরিয়ে উলটোদিকের জঙ্গলে ঢুকে গেল। শ্যামলা বলল, আমরাও ওদেরই মতন সাবধানে জঙ্গলের মধ্যে চলাফেরা করি। শহরের লোকেরা সাবধান হতে জানে না বলেই বিপদে পড়ে যায়।
বুধোদা বলল, তাহলে এখানে তোদের কোনও ভয় নেই বলছিস?
শ্যামলা আমাদের অবাক করে দিয়ে বলল, তা থাকবে না কেন বাবু? জঙ্গলে কি শুধু জন্তুরই ভয়? আরও কত জিন, পরি, অপদেবতা, দুষ্টু আত্মা থাকে। তাদের ভয় পাব না!
বলিস কী! বুধোদা বলল। কীরকম অপদেবতা? দু-একটার কথা বল তো।
শ্যামলা বলল, বছরখানেক আগে একটা লোককে নদীর ওপাড়ের ওই জঙ্গলে বাঘে মেরেছিল। তারপর থেকেই নাকি একটা মস্তবড় কালো পাখিকে ওই জায়গাটার ওপর চক্কর খেয়ে উড়তে দেখা যায়। পাখিটা ওড়ে আর আর অদ্ভুত সুরে ডাকে—কিরি কিরি কিরি কিরি, কিট কিট কিট কিট। শ্যামলা বলল, বাবু, ওটা ওই লোকটারই আত্মা।
আর কিছু আছে নাকি এরকম?
বুধোদা দেখলাম বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনছে। সত্যি কথা বলতে কী, এই অস্বাভাবিক নির্জনতা আর অন্ধকারের মধ্যে বসে এই ধরনের ভূতের গল্প শুনতে আমাদেরও বেশ লাগছিল।
তারপর ও মাদলপাহাড়টা বাবু...।
মাদলপাহাড় এখান থেকে দেখা যায় না কি? আমরা চমকে তাকালাম শ্যামলা যেদিকে আঙুল তুলেছে সেই দিকে। মনে হল এতবার এখানে যাতায়াত করলেও রঘুদাও কখনও ব্যাপারটা খেয়াল করেননি।
শ্যামলা বলল, হ্যাঁ, যায় তো। চূড়াটুকু দেখতে পাওয়া যায়। ভালো করে তাকিয়ে দেখুন, ওই মৌডুংরি পাহাড়ের পেছনে চ্যাটালো একটা চূড়া দেখতে পাচ্ছেন? ওটাই মাদলপাহাড়ের চূড়া।
আমাদের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। আমরা ভালো করে দেখব বলে চেয়ার ছেড়ে বারান্দার ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। যদিও বাতাসে হালকা কুয়াশা ছড়িয়ে রয়েছে, তবুও আকাশে চাঁদের আলো রয়েছে বলেই দেখতে পেলাম, সত্যিই মৌডুংরি পাহাড়ের পেছনে, আরও বেশ খানিকটা উঁচুতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে মাদলপাহাড়। কিছুক্ষণ চোখ কুঁচকে সেদিকে তাকিয়ে থেকে বুধোদা বলল, হুঁ। তা ওই মাদলপাহাড়েও ভূত রয়েছে না কি?
ভূত নয়। তান্ত্রিক সন্ন্যাসী। পুতুলের মতন ছোট এক মানুষ। বামনসন্ন্যাসী।
শ্যামলার জানার কোনও উপায় নেই যে, ওই বামনসন্ন্যাসীকে দেখব বলেই আমরা এতদূর এসেছি। সে সব প্রসঙ্গ না তুলে, বুধোদা বলল, তা থাকলেই বা বামনসন্ন্যাসী। তাকে ভয় কীসের?
ভয় করবে না? আহত স্বরে বলল শ্যামলা। আপনি যদি দেখেন, গভীর রাতে পাহাড়ের চুড়োয় দপ দপ করে লাল নীল আলো জ্বলে উঠছে, তাহলে ভয় করবে না আপনার?
বলিস কী! রঘুদা সত্যিই অবাক হয়েছেন বোঝা গেল। অতদূরের আলো এখান থেকে দেখতে পাস?
বাবু, সে যে কী জোরালো আলো আপনি না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবেন না। মনে হয় যেন আকাশের দিকে একটা আলোর ধারালো তরোয়াল উঠে যাচ্ছে।
বুধোদার মন দেখলাম ভূতপ্রেত ছেড়ে অন্যদিকে চলে গেছে। শুনতে পেলাম, নিজের মনে বলছে, আকাশের দিকে একটা আলোর ধারালো তরোয়াল উঠে যাচ্ছে।
বুধোদার মন দেখলাম ভূতপ্রেত ছেড়ে অন্যদিকে চলে গেছে। শুনতে পেলাম, নিজের মনে বলছে, আকাশের দিকে আলোর তরোয়াল, তাই না? আকাশের দিকে...।
আর কি অদ্ভুত সমাপতন! ঠিক সেই মুর্হূতেই আমাদের চোখের সামনে জ্বলে উঠল মাদলপাহাড়ের চুড়োর অলৌকিক আলো। তীব্র সেই আলোর রেখা কয়েক মুহূর্ত ধরে রাতের আকাশকে যেন ফালাফালা করে দিল। প্রথমে সেই আলোর রং ছিল নীল, তারপর হঠাৎই লাল হয়ে গিয়ে নিভে গেল।
শ্যামলা দেখলাম দু-হাতে চোখ ঢেকে কী সব বিড়বিড় করছে। ভূতের মন্ত্রই হবে বোধহয়। জনশূন্য বিদ্যুতহীন জঙ্গলের মধ্যে থেকে ওরকম চোখ ধাঁধানো আলো বেরোতে দেখে আমাদেরও মনের অবস্থা যাকে বলে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। আর বেশি কথা না বলে আমরা হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকে পড়লাম। যদিও ঘরের সব দরজা জানলা শীতের জন্যে বন্ধ, তবু মনে হচ্ছিল যেন দূরের জঙ্গলগুলো কাছে এগিয়ে এসেছে, এগিয়ে এসে ঠিক আমাদের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এবার এক ধাক্কায় ভেঙে ফেলবে আমাদের ঘরের দেয়াল। বলবে, কেন আমাদের রাজ্যে অনধিকার প্রবেশ করেছ? তোমাদের সব ব্যাপারে এত কৌতূহল কেন?
কী যেন এক অজানা অস্বস্তিতে রাতে বারবারই ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। প্রতিবারই দেখেছিলাম, পাশের খাটে বুধোদা জেগে শুয়ে রয়েছে। তার ভুরুদুটো ভীষণ কোনও চিন্তায় কুঁচকে আছে। দৃষ্টি ছাদের দিকে। মনে হয় ও বোধহয় সারা রাতই ঘুমোয়নি।
অবশ্য পরেরদিন ভোরে বুধোদার মধ্যে রাতজাগার কোনও ছাপই দেখতে পেলাম না। ওর এই একটা গুণ, ক্লান্তি জিনিসটা যেন শরীরে নেই-ই। হাঁক-ডাক করে আমাদের তুলে, ছড়িয়ে পরা জিনিসপত্র প্যাকট্যাক করে, আধঘণ্টার মধ্যে বেরোবার জন্যে রেডি হয়ে গেল। ঠিক ছ'টার সময় আমরা মিঠাপানি ডাকবাংলো ছেড়ে রওনা হলাম। আমাদের পথপ্রদর্শক হল আর কেউ নয়, শ্যামলা। এমনিতে পথ দেখানোর জন্যে কাউকে লাগার কথা নয়, কারণ, মৌডুংরির পথ রঘুদার চেনা, আর সেখান থেকে মাদলপাহাড়েও তিনি গিয়েছেন। কিন্তু শ্যামলা বলল, মৌডুংরি গ্রাম এড়িয়ে, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে, সরাসরি মাদলপাহাড়ের পায়ের কাছে পৌঁছিয়ে যাওয়া যায়। তাতে রাস্তা অনেকখানি কম হয়, আর দুটো পাহাড়ের চড়ার পরিশ্রমও বাঁচে।
রঘুদা তার সঙ্গে যোগ করলেন, বেশি লোক জানাজানিও হয় না।
কিছুক্ষণ হাঁটার পরেই আমরা রাতে টিলার ওপর থেকে দেখা সেই ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। আমাদের সবার সামনে শ্যামলা। তার এক হাতে জঙ্গল কেটে এগোনোর জন্যে ধারালো দা, আর পিঠে বুধোদার সেই ক্রিকেট-কফিন।
যে রাস্তা ধরে আমরা চলেছি তা আদৌ মানুষের চলার রাস্তাই নয়; জানোয়ারদের পায়ে পায়ে ডালপালা ভেঙে ওই পথ তৈরি হয়েছে। তাও যদি একটা পথ হত তবু কথা ছিল। কিন্তু মাকড়সার জালের মতন এক পথ থেকে আরেক পথ, সেখান থেকে আরেকটা—এইভাবে পথের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তবু তার মধ্যেই কীসের নিশানা দেখে কে জানে, শ্যামলা বেশ নিশ্চিন্তভঙ্গিতে এগিয়ে চলেছে। ওকে বাদ দিয়ে এখানে ঢুকলে আমরা পনেরো মিনিটের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলতাম।
যতক্ষণ ভোরের আলো ছিল ততক্ষণ পাখির কিচিরমিচিরে কান পাতবার জো ছিল না। সবচেয়ে বেশি চেঁচাচ্ছিল ছোট ছোট টিয়াপাখিগুলো। তাদের মাথার রং টুকটুকে লাল। যত রোদ বাড়তে লাগল ততই পাখিদের ডাক কমে আসতে লাগল।
যেতে-যেতে প্রায়ই দেখতে পাচ্ছিলাম হাতির বিষ্ঠা আর তাদের ভেঙে ফেলা গাছপালার চিহ্ন। আমাদের দেখে ভয় পেয়ে এত বড় বড় জায়েন্ট স্কুইরেল বা দৈত্যাকার কাঠবেড়ালি পড়িমরি করে গাছের মগডালের দিকে দৌড়োচ্ছিল। তাদের গায়ের রং আমাদের শহুরে কাঠবেড়ালির মতন একেবারেই নয়, মরচের মতন লাল। তবে আমাদেরও সাঙ্ঘাতিক ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। দুটো হর্নবিল বা ধনেশ পাখি। সেগুলো হঠাৎই ভয়ংকর সাঁইসাঁই শব্দ করে এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে গিয়ে বসল। নিস্তব্ধ বনের মধ্যে হঠাৎ ওরকম হেলিকপ্টারের মতন আওয়াজ শুনে বুক কেঁপে উঠেছিল।
দুপুর এগারোটা নাগাদ আমরা আবার সেই মিঠাপানি নদীর অন্য একটা বাঁকের পাশে এসে হাজির হলাম। শ্যামলা আগেই বলেছিল, এই নদী নিমিজিরার জঙ্গলকে পাকে পাকে ঘিরে রেখেছে, তাই পথের মধ্যে বেশ কয়েকবারই আমাদের নদীটাকে পেরোতে হবে। বুধোদার ডাউনলোড করা গুগল আর্থের ছবিতেও সেরকমই দেখেছি। যাই হোক, এবার শ্যামলা বলল, ওই নদীর তীরে বসে দুপুরের খাওয়া সেরে নিতে, কারণ, এর পরেই আমরা নদী পেরিয়ে আবার ঘন জঙ্গলে ঢুকে পড়ব।
নদীর ওপরে ঝুঁকে পড়া একটা বেশ বড় গাছের ছায়ায় বসে আমরা ডিম রুটি মিষ্টি দিয়ে লাঞ্চ সারলাম। খেতে খেতেই শ্যামলা আঙুল দিয়ে দেখাল আমাদের ডানদিকে একটা পাহাড়ের ওপর থেকে ধোঁয়ার রেখা উঠছে। বলল, ওটাই নাকি মৌডুংরি গ্রাম। আমরা ওই পাহাড়টায় না উঠে, ওর পায়ের কাছ দিয়ে চলে যাচ্ছি পেছনে, মাদলপাহাড়ের দিকে।
মাদলপাহাড়ে যখন চড়তে শুরু করলাম তখন দুপুর ঠিক একটা। যদিও রোদ্দুর বেশ চড়া তবু সারা পাহাড়টাই গাছের ছায়ায় ঢাকা বলে খুব একটা গরম লাগছিল না। মাদলপাহাড়ের আকৃতি সম্বন্ধে যা শুনেছিলাম, দেখলাম একেবারেই ঠিক। একটা চওড়া থেকে সরু হয়ে উঠে যাওয়া স্তম্ভের মতন দাঁড়িয়েছিল পাহাড়টা। উচ্চতা মৌডুংরির চেয়ে একটু বেশি—হাজার তিনেক ফিট হবে। উচ্চতা বেশি না হলেও চড়াই বেশি হওয়ার জন্যে হাঁফ লাগছিল। তার ওপর রাস্তা বলে কিছুই নেই। শ্যামলা একটা শুকনো ঝোরার খাত ধরে আমাদের ওপরে নিয়ে যাচ্ছিল। কখনও পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে আসা একটা পাথরের টুকরো, কখনও গাছের শেকড় ধরে আমরা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিলাম।
উঠতে-উঠতে হঠাৎই আমরা পাহাড়ের গায়ে একটা খোলা চাতালের মতন জায়গায় এসে পৌঁছোলাম। আসলে এখানে একটা প্রকাণ্ড পাথর পাহাড়ের খাড়া গা থেকে বেরিয়ে আছে। আমি সবে ভাবছি, এখানে বসে একটু গায়ের ঘামটা শুকিয়ে নিলে কেমন হয়, এমন সময় রঘুদা এবং শ্যামলা সমস্বরে বলে উঠল, এই হল আংরা গুহা।
গুহা! কোথায় গুহা! আমি আর বুধোদা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছি দেখে ওরা একটা দিকে আঙুল দেখাল। দেখি, সত্যিই সেখানে পাহাড়ের গায়ে একটা ছোট ফাটল দেখা যাচ্ছে—বড় জোর দুজন মানুষ পাশাপাশি ঢুকতে পারবে এরকম একটা ফাটল।
এত ছোট গুহা! বলল বুধোদা।
ভেতরে চল। তাহলে বুঝতে পারবে ছোট না বড়। রঘুদা বললেন।
আমার পিঠের ব্যাগে খুব জোরালো একটা টর্চ ছিল। সেটা বার করে হাতে নিলাম। শ্যামলার কাছেও ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ছ-ব্যাটারির টর্চ ছিল। সে-ও সেটাকে বাগিয়ে ধরল। তারপর আমরা চারজন একে একে গুহার ভেতরে ঢুকলাম। ব্যাগগুলো বাইরে পাথরের চাতালেই নামিয়ে রেখে গেলাম।
ফাটলটা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে চারিদিকে আলো ফেলে অবাক হয়ে গেলাম। ওই ছোট্ট ফাটলের এপাশে এত বড় গুহা যে থাকতে পারে তা কল্পনাই করিনি। এত বিশাল সেই গুহা যে, টর্চের আলো এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত পৌঁছোতেই পারছে না। গুহার এক কোণে একটা প্রদীপের আলোর মতন কিছু জ্বলছিল। আমাদের সাড়া পেয়ে সেখান থেকে একটা ছায়া নড়েচড়ে উঠে দাঁড়াল, তারপর এগিয়ে আসতে লাগল আমাদের দিকে। আরও একটু কাছে আসতে লোকটাকে ভালো করে দেখতে পেলাম। কাউকে বলে দিতে হল না যে, এই সেই গুঙ্গাদানো।
আমাদের সামনে এসে বিশাল চেহারার লোকটা দুটো হাতের পাতা ওপরের দিকে মেলে ধরে আর তার সঙ্গে মাথাটাকে ওপরের দিকে ঝাঁকিয়ে এমন একটা ইশারা করল, যেটা সারা পৃথিবীর লোকই বোঝে। ওই ইশারার অর্থ—কী চাই?
বুধোদা ফিসফিস করে শ্যামলাকে জিগ্যেস করল, গুঙ্গাদানো কানে শুনতে পায়?
শ্যামলা ঘাড় হেলিয়ে জানাল, হ্যাঁ।
তখন বুধোদা হিন্দিতেই বলল, আমরা একটু গুহার ছবিগুলো দেখব। শুধু এইজন্যেই আমরা কলকাতা থেকে এসেছি। আপনার আপত্তি নেই তো?
গুঙ্গাদানোর চেহারাটা যতই ভয়ংকর হোক, মুখে সারাক্ষণই একটা মিষ্টি হাসি লেগেছিল। বুধোদার প্রশ্নে সেই হাসিটাই বেশ চওড়া হল। নিজের বুকের দিকে আঙুল দেখিয়ে আবার একটা হাতের পাতা হাওয়ায় ঘোরাল—অর্থাৎ, আমি আপত্তি জানানোর কে? আমরা টর্চের আলোয় গুহাটাকে ভালো করে দেখতে শুরু করলাম।
ওই গুহার নাম আংরাগুহা হওয়ার কারণটা পরিষ্কার বোঝা যায়—গুহার মধ্যে সবচেয়ে সুরক্ষিত কোণগুলোতে স্তূপ হয়ে জমেছিল অঙ্গার মানে পোড়া কাঠকয়লা।
বুধোদা আমাদের বুঝিয়ে বলল, প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা বসবাস করত এমন অনেক জায়গাতেই গুহার ভেতরে এরকম ছাইয়ের স্তূপ খুঁজে পাওয়া যায়। এর মানে, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে বনচারী আদিম মানুষেরা একা কিংবা দল বেঁধে ওইসব গুহায় আশ্রয় নিয়েছে, গুহার এক কোনায় আগুন জ্বালিয়ে শিকারের মাংস পুড়িয়ে খেয়েছে। তারা চলে যাওয়ার পরে সেখানে পড়ে থেকেছে ছাই। ছাইয়ের সঙ্গে মিশে থেকেছে শিকার করা পশুর হাড়ের টুকরো, কিংবা সেই শিকারের মাংস ছাড়াবার বা কাটবার জন্য যে হাতিয়ার ব্যবহার করা হয়েছিল তারই কোনও অংশ। ফলে, এই ছাইয়ের স্তূপগুলো প্রত্নতাত্বিকদের কাছে সোনার খনির চেয়েও মূল্যবান। এই স্তূপ ঘেটেই তারা বিভিন্ন যুগের মানুষের বিভিন্ন খাদ্যাভ্যাস, হাতিয়ার এসব সম্বন্ধে আইডিয়া করতে পারেন।
তাছাড়া, বুধোদা বলল, ধর বাইরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে কিংবা তুষারপাত। দিনের পর দিন একজন আদিম মানুষ গুহার বাইরে বেরোতে পারছে না। সে তখন একঘেয়েমি কাটানোর জন্যে কী করবে? তখন তো রেডিয়ো কিংবা টিভি ছিল না, যে, সেরকম একটা কিছু সামনে নিয়ে বসে থাকবে।
ছবি আঁকবে? আমি জিগ্যেস করলাম।
গুড।—বুধোদা অন্ধকারের মধ্যে হাত বাড়িয়ে আমার পিঠ চাপড়াতে গিয়ে রঘুদার পিঠ চাপড়ে দিল এবং সেটা না বুঝেই বলে চলল, পৃথিবীর নানান কোণে এইসব গুহা-নিবাসের দেয়ালে দেয়ালে এত ছবি থাকার সেটা একটা বড় কারণ। তাছাড়া বৈজ্ঞানিকেরা অবশ্য এটাও মনে করেন যে, ওইসব ছবি আদিম মানুষের তুকতাক আর জাদুবিদ্যার কাজেও লাগত।
ইতিমধ্যে আমরা টর্চের আলোয় চারপাশটা দেখতে শুরু করেছি। সারা গুহা জুড়েই পাথরের দেয়ালের ওপর ছোট-বড় নানান আকারের গুহাচিত্র। তাদের মধ্যে কোনও কোনও ছবি বেশ বিবর্ণ হয়ে গেছে। চাকলা খসে পড়েছে তাদের গা থেকে। বুধোদা সেই সব চিহ্ন দেখতে-দেখতে আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিল কোন ছবিটা কত পুরোনো হতে পারে। ওর ধারণা—স্পেনের আলতামিরা কিংবা আমাদের মধ্যপ্রদেশের ভীমবেঠকা গুহার ছবির মতন আংরাগুহার ছবিগুলো অত প্রাচীন নয়। সবচেয়ে পুরোনো গুলোর বয়েস হবে পাঁচ হাজার বছরের মধ্যে। কিন্তু যে ছবিগুলো সবচেয়ে নতুন সেগুলোর বয়েস পাঁচশো বছরের বেশি হবে না।
রঘুদা বললেন, বোধিসত্ব, পাঁচশো বছর আগে তো মানুষ দিব্যি ঘরবাড়ি বানাতে শিখে গেছে। তাহলে তখনও ওরা এই গুহায় থাকত কেন?
বোধিদা বলল, ঠিকই বলেছ। সেইজন্যেই আমার ধারণা এই গুহায় পার্মানেন্টলি কেউ থাকত না। এটা বোধহয় এখানকার আদিবাসীদের শিকারযাত্রার সময়ে ক্যাম্প হিসেবে কাজ করত। এখান থেকে, দু-চারদিন মাদলপাহাড়ের জীবজন্তু শিকার করে, তারপর যে যার গ্রামে ফিরে যেত। দ্যাখো না, কত শিকারের ছবি। আর এই দ্যাখো, এখানে কোনও শিকারী নিজের গ্রামের ছবিও এঁকে রেখে গেছে। খড়ের চালের বাড়ি। বাড়ির পাশে পুকুর। পুকুরে হাঁস চড়ছে।
দেয়ালের ছবিগুলো সবই প্রায় শিকারের ছবি। দু-একটা ছবিতে দেখলাম মেয়েরা ফল পাড়ছে কিংবা মৌচাক ভেঙে মধু সংগ্রহ করছে। তাছাড়া টাটানগর থেকে এখানে আসবার সময় আদিবাসীদের বাড়ির দেয়ালে যেরকম ধর্মীয় আলপনা দেখেছিলাম সেরকম আলপনা আর কিছু অচেনা দেবদেবীর ছবিও ছিল।
হঠাৎ একটা ছবির কাছে এসে আমাদের তিনজনেরই চোখ আটকে গেল। ছবিটা অদ্ভুত। কাঁচা হাতে, মোটা দাগের আঁকা, তবু বিষয়বস্তু পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। একটা উঁচু মিনারের ওপর আকাশের দিকে দু-হাত তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকজন মানুষ।
উত্তেজনায় রঘুদার গলা দিয়ে বোধহয় স্বর বেরোচ্ছিল না। তিনি ফিসফিস করে জিগ্যেস করলেন—এই ছবিটা কত পুরোনো হতে পারে বোধি?
বোধিদা বলল, এটা একদম শেষদিকে আঁকা ছবি। দ্যাখো এরপরে দেয়ালগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। রঙের জেল্লা দেখে মনে হচ্ছে চার-পাঁচশো বছরের বেশি পুরোনো হবে না।
রঘুদা বললেন, তাহলে আমি যা ভাবছি, তোমরাও নিশ্চয় সেই একই কথা ভাবছ। চার-পাঁচশো বছর আগে শেষবার কোনও আদিবাসীর দল এখানে শিকার করতে এসে মাদলপাহাড়ের মাথায় ওই দৃশ্য দেখেছিল—আমি যে মিনারটার ধ্বংস্তূপ দেখেছি, সেটা তখনও আস্ত ছিল। তার মাথায় তখনও মানুষ উঠত, মানে বহু লোকজন ছিল এখানে।
রঘুদার কথার সূত্র ধরে বোধিদা বলল, হ্যাঁ, এবং তারা নিশ্চয়ই বহিরাগত ছিল। নিশ্চয় আদিবাসীদের প্রতি তাদের ব্যবহারও ছিল নির্মম। সেইজন্যেই তারপর থেকেই এই জঙ্গলে আদিবাসীদের শিকার করতে আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর ছবি-ও আঁকা হয়নি তার পরে।
ইতিমধ্যে আংরাগুহার মধ্যে আমরা প্রায় আধঘণ্টা সময় কাটিয়ে দিয়েছি। সকলেই ভাবছি, এবার বেরিয়ে পড়া উচিত, না হলে পাহাড়ের মাথায় উঠতে উঠতে বিকেল হয়ে যাবে। শেষবারের মতন একবার গুহাটার চারিপাশে চোখ বুলিয়ে নিতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ল গুঙ্গাদানোর দিকে। তার মুখে সেই হাসিটা তখনও লেগে আছে। চোখদুটো একইরকম স্বপ্নিল, আধবোজা, কিন্তু তবু তার শরীরের ভঙ্গিতে আশঙ্কার ছাপটা আমাদের কারুরই চোখ এড়াল না। অতবড় শরীরটা নিয়ে সে যেন কীরকম গুঁটিশুটি মেরে গুহার এক কোনায় দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সে শরীর দিয়ে একটা কিছু আড়াল করতে চাইছে। আমাদের কৌতূহল দপ করে জ্বলে উঠল।— কী? কী আড়াল করতে চাইছে ওই জেন্টল জায়ান্ট? আমরা তিনজনে দৌড়ে গেলাম ওইদিকে। না, তিনজনে নয়, চারজনে। শ্যামলাও আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। আমাদের এগিয়ে আসতে দেখে গুঙ্গাদানো আরও জোর করে দেয়ালে পিঠ চেপে দাঁড়াল। এমন মুখের ভাব আমি এর আগে কোনও মানুষের মধ্যে দেখিনি। মুখে হাসি, কিন্তু চোখে আশঙ্কা।
ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুধোদা চেঁচিয়ে উঠল—সরে দাঁড়াও গুঙ্গা। আমরা কোনও ছবির একটুও ক্ষতি করব না। শুধু আমাদের একবার দেখতে দাও। তুমি কী আড়াল করে রেখেছ।
গুঙ্গা জোরে জোরে দুপাশে ঘাড় নাড়াল। আর কোনও উপায় না দেখে আমরা চারজনে ওর দু-হাত ধরে টেনে দেয়ালের সামনে থেকে সরিয়ে আনলাম। গুঙ্গা লড়াই করার কোনও চেষ্টাই করল না, শুধু ওর চোখের দৃষ্টিতে গভীর হতাশা ফুটে উঠল। আমি আর শ্যামলা দুজনেই গুঙ্গার ছেড়ে দেওয়া দেয়ালের অংশটার ওপরে আমাদের টর্চের আলো নিশানা করলাম। আমাদের চোখের সামনে ফুটে উঠল এক আশ্চর্য ছবি।
ফ্লাইং-সসার!
পাথরের দেয়ালের ওপর গাছের পাতার সবুজ, চুনামাটির সাদা আর গেরিমাটির হলুদ রং দিয়ে যে ছবিটা আঁকা আছে, যতই আরণ্যক মানুষের অপটু হাতে আঁকা হোক, সেটা যে একটা ফ্লাইং-সসারের ছবি সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। বহু কল্পবিজ্ঞান কাহিনির ইলাস্ট্রেশন আর হলিউডের সিনেমায় দেখা সেই ওলটানো গামলার মতন মহাকাশযান। তার গায়ে সার সার বৃত্তাকার জানলা। যে পাহাড়টার ওপর সেই মহাকাশযান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই পাহাড়টাকেও চিনতে ভুল হয় না। অমন টেবল টপ মাউন্টেন এ-চত্বরে একটাই আছে—এই মাদলপাহাড়, যার একটা গুহায় আমরা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে রয়েছি।
একটা ভয়ংকর গুমগুম শব্দে আমাদের তন্ময়তা ভেঙে গেল। শব্দটা আসছে আংরাগুহার প্রবেশপথের দিক থেকে। আমরা চারজনেই বিদ্যুতের মতন ঘুরে দাঁড়ালাম এবং যা দেখলাম তাতে একইসঙ্গে ভয়ে আর বিস্ময়ে আমাদের বাক্যরোধ হয়ে গেল। গুঙ্গাদানো কখন যেন আমাদের অজান্তেই গুহা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। এখন সে যা করছে তা হল একটা একতলা বাড়ির সমান উঁচু পাথরের বোল্ডারকে ঠেলতে-ঠেলতে নিয়ে আসছে আংরাগুহার দরজার সরু ফাটলটার দিকে। সেই পাথরের গড়িয়ে আসার শব্দই আমরা শুনতে পাচ্ছি। ওর উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার। ও আমাদের বেরোনোর পথ বন্ধ করে দিতে চায়।
দৌড়ো রুবিক। ওকে আটকাতে হবে।—একটা চিৎকার করে বুধোদাই সবার আগে দরজার দিকে দৌড়োল। পেছন পেছন আমরা বাকি তিনজন। এখন আমাদের চোখের সামনে শুধু সেই বিশাল পাথরটা। তার ওপাশে ঢাকা পড়ে গেছে গুঙ্গাদানো, কিন্তু অনুমানে বুঝতে পারছি তার বিশাল কাঁধের ঠেলাতেই ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়ে আসছে ওই পাথরটা।
ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমরা দেখছিলাম, দরজার বাইরে পাথরের চাতালটা ঢালু হয়ে নেমে এসেছে। একবার ওই ঢালের মাথা অবধি যদি পাথরটাকে এনে ফেলতে পারে গুঙ্গাদানো তাহলে তাকে আর কিচ্ছু করতে হবে না। ওটা আপনা থেকেই গড়িয়ে এসে ফাটলের মুখটাকে বন্ধ করে দেবে। আর বড় জোর দু-ফুট...এক ফুট...আমরা আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কিন্তু না। পাথর গড়িয়ে আসার গুমগুম আওয়াজটা হঠাৎই বন্ধ হয়ে গেল।
চোখ খুলে দেখলাম ঢালের একটু আগে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই মহাকায় পাথর। কী হয়েছে ভাবার সময় ছিল না। আমরা চারজনেই ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। এতক্ষণ গুহার অন্ধকারে কাটিয়ে বাইরে রোদে বেরোনোর ফলে আমাদের চোখে ধাঁধা লেগে গিয়েছিল। সেটা একটু সামলে নিয়ে, পাথরটাকে বেড় দিয়ে উলটোদিকে পৌঁছোলাম। যা দেখলাম, তা যে কেমন করে হল কিছুই বুঝতে পারলাম না। দেখলাম, পাথরটার গায়ে মুখ গুঁজে পড়ে রয়েছে গুঙ্গাদানো, তার দুটো হাত দুদিকে ছড়ানো। মনে হল ভারী পাথরটাকে ওই দুই হাত দিয়ে ঠেলে নিয়ে আসার বিপুল পরিশ্রমে ওর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। না কি অজ্ঞানই হয়ে গেছে? যাই হোক, আমাদের আর দাঁড়াবার সময় নেই। বুধোদা শ্যামলাকে বলল, শ্যামলা, তুই গুঙ্গাদানোর চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দে। বুকে মালিশও করতে পারিস। যেভাবে পারিস ওকে সুস্থ করে তোল। আমরা এক্ষুনি ফিরে আসছি।
এই কথা বলেই বুধোদা আমার আর রঘুদার দু-হাত ধরে টানতে-টানতে চড়াই ভেঙে মাদলপাহাড়ের চুড়োর দিকে দৌড়োল। তবে এত ব্যস্ততার মধ্যেও পিঠে সেই ক্রিকেট-কফিনের মতন ব্যাগটা তুলে নিতে ভুলল না। আংরাগুহা থেকে মাদলপাহাড়ের চুড়ো বড়জোর পাঁচশো ফিট উঁচু। জঙ্গল ভেদ করে আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে আমরা মিনিট দশেকের মধ্যেই সেই চুড়োয় উঠে এলাম। একটু দম নেবার জন্যে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালাম। এতবার যে জায়গাগুলোর কথা শুনেছি সেগুলো এখন আমার চোখের সামনে। ওই তো আঁকাবাঁকা হ্রদটা গাছপালার ফাঁকে চিকমিক করছে। আমাদের ডানদিকে সেই হ্রদের তীরে চৌকো ঘরগুলো আর বাঁদিকে ভাঙা মিনার।
আর ঠিক আমাদের সামনে সেই শুকনো পুকুরের মতন বিরাট গর্তটা। জলের বদলে মাটির ওপর ছড়িয়ে আছে নানা আকারের বাঁকাচোরা রুপোর পাতের মতন কোনও জিনিস।
বড় ব্যাগটা পায়ের কাছে মাটিতে নামিয়ে তার মধ্যে থেকে একটা আপাদমস্তক ঢাকা পোশাক বার করে নিজের গায়ে গলিয়ে নিতে-নিতে বুধোদা বলল, রঘুনাথ, তোমরা এখানেই একটু অপেক্ষা করো। নীচে নামার চেষ্টা কোরো না। আমি বামনসন্ন্যাসীর অভিশাপের ব্যাপারটা একটু খুঁটিয়ে দেখে আসি।
বুধোদার পোশাক পরা হয়ে গিয়েছিল। এখন তাকে দেখতে লাগছিল ঠিক অ্যাস্ট্রোনটের মতন। এবার ওই ব্যাগ থেকেই বুধোদা একটা যন্ত্র হাতে তুলে নিল, যেটাকে অনেকটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতন দেখতে। একটা লম্বা হাতলের শেষে মিটার লাগানো। সেই মিটারটাকে মাটির দিকে নামিয়ে বুধোদা শুকনো গহ্বরের ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল। যন্ত্রটা আমার চেনা, পাঠ্যবইয়ের ছবিতে দেখেছি। পেছন থেকে বুধোদাকে চেঁচিয়ে জিগ্যেস করলাম, বুধোদা, ওটা কি গাইগার মুলার কাউন্টার? যেটা দিয়ে রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি মাপে?
বুধোদা নামতে নামতেই ওপর নীচে মাথা নাড়িয়ে জানাল, আমার অনুমান ঠিক।
আমরা শুকনো গহ্বরের পাড়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। একটু বাদেই বুধোদা হন্তদন্ত হয়ে ওপরের উঠে এল। তারপর তেজস্ক্রিয় বিকিরণ-রোধক পোশাকের পকেটে হাত ঢুকিয়ে কয়েকটা ছোট ছোট প্যাকেট বার করে ব্যাগে পুরে ফেলল। প্যাকেটগুলোর ভেতরে সম্ভবত বিকিরণ আটকাবার জন্যে দস্তার লাইনিং দেওয়া ছিল, যে কারণে ভেতরে কী আছে দেখতে পেলাম না।
ওগুলো কী? একটু হাতে নিয়ে দেখতে পারি?—জিগ্যেস করলেন রঘুদা।
স্যরি রঘুনাথ। জিনিসগুলো তেজস্ক্রিয়। তোমরা খালি হাতে ধরতে পারবে না। পুকুরের নীচে পুরো জায়গাটাই ভালোরকম তেজস্ক্রিয়তায় ভরে আছে। চলো, এখান থেকে পালাই। বামনসন্ন্যাসীকে খুঁজে বার করি।
বুধোদা চটপট গা থেকে পোশাকটা খুলে ফেলে ভাঁজ করে ব্যাগে পুরে নিল। গাইগার কাউন্টারটাও রেখে দিল যথাস্থানে। তারপর জোরে পা চালিয়ে হাঁটা লাগাল ডানদিকে, চৌকো ঘরগুলোর দিকে, যেখানে রঘুদা ছোট ছোট পায়ের ছাপ দেখেছিলেন আর খুঁজে পেয়েছিলেন মাদলপাহাড়ের স্যাটেলাইট পিকচার। আমরা বুধোদাকে ফলো করলাম।
কিন্তু ঘরে কাউকে পেলাম না। যদিও সেই বামন সন্ন্যাসীর পায়ের ছাপে আজকেও ভরে রয়েছে মেঝের ধুলো। খালি পায়ে তিনি যেন অনেকক্ষণ অস্থির ভাবে হাঁটাচলা করেছেন, তারপর রওনা হয়েছেন হ্রদের দিকে।
আমরা কিছুদূর অবধি রাস্তার ধুলোর ওপর সেই ছোট ছোট পায়ের ছাপগুলোকে অনুসরণ করে এগোলাম, কিন্তু তারপর রাস্তা ঢেকে গেল জলজ গাছপালা আর বড় বড় শরঘাসে। পায়ের ছাপ হারিয়ে গেল। আমরা এমন কোনও শব্দ শুনবার চেষ্টা করছিলাম, যার থেকে বুঝে নিতে পারি বামনসন্ন্যাসীর অবস্থান। কিন্তু একটা ডাহুকের অবিশ্রান্ত টুক টুক ডাক ছাড়া আর কোথাও কোনও শব্দও নেই। আমরা তিনজন এলোমেলোভাবে সেই হ্রদের তীরে শরবন ভেঙে এগোতে লাগলাম বামনসন্ন্যাসীর খোঁজে।
তারপর হঠাৎ একসময়ে আমরা তাঁকে দেখতে পেলাম।
শরগাছের সারি যেন সেই ফাঁকা জায়গাটাকে চারিদিক থেকে উঁচু বেড়ার মতন ঘিরে রয়েছে। সমতল জায়গাটা জুড়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে খান পনেরো ছোট ছোট ঢিবি। এরকম জমি দেখলে তার পরিচয় বুঝতে সময় লাগে না। এটা একটা সমাধিস্থল, আর তার মধ্যেই একটা বিশেষ সমাধির পাশে আমাদের দিকে পেছন ফিরে, নতজানু হয়ে যিনি বসে আছেন তিনি সন্ন্যাসী কি না জানি না, তবে বামন তো বটেই।
তিনি শিশু নন, কারণ, পেছন থেকেই দেখতে পাচ্ছি তার ঘাড় অবধি লুটিয়ে পড়া সাদা চুলের ঢল। গায়ে একটা কালো আলখাল্লা। তার বাইরে বেরিয়ে আছে সেই ছোট্ট পায়ের পাতা দুটো। সে দুটোতেও বয়সের ছাপ স্পষ্ট।
তারপর সেই বামন উঠে দাঁড়ালেন। এত ছোট কোনও মানুষ আমি আগে কখনও দেখিনি। মাটি থেকে বড়জোর দেড় হাত হবে তাঁর উচ্চতা। অথচ এত নিখুঁত তাঁর শরীরের প্রতিটি অঙ্গের অনুপাত যে এতটুকু অস্বাভাবিক লাগছে না। মনে হচ্ছে কোনও নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া মাটি বা পাথরের তৈরি মডেল দেখছি—মানুষের মডেল।
এবার সেই বামন আস্তে আস্তে আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। আমাদের দেখে এতটুকুও চমকালেন না, যেন জানতেন আমরা ওখানে দাঁড়িয়ে আছি। তিনি এগিয়ে এলেন আমাদের দিকে। এখন আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি সাদা গোঁফদাড়ির আড়ালে তার প্রাচীন মুখ, সেই মুখে অজস্র বলিরেখা। দেখতে পাচ্ছি তার অদ্ভুত নীল দুটো চোখ, যে চোখের মণিতে হাজার বছরের প্রজ্ঞা স্থির শিখার মতন জ্বলছে। তিনি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার বাংলায় বললেন, বসুন। কথা বলতে সুবিধে হবে।
তাঁর গলার স্বর শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই খুব মৃদু আর রিনরিনে, অনেকটা মাটির বেহালার সুরের মতন।
আপনি বাংলা জানেন?—অনেক প্রশ্ন করার ছিল। তবু এই প্রশ্নটাই আমার মুখ দিয়ে প্রথমে বেরিয়ে এল।
জানতাম না, এইমাত্র শিখলাম। আপনাদের মাথার মধ্যে থেকে বাংলাভাষার ছাপটুকু আমার মাথার মধ্যে নিয়ে নিলাম।
আমি মনে মনে বললাম, 'কপি পেস্ট'।
বামনসন্ন্যাসী আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ঠিক। কম্পিউটারের ভাষায় বলতে গেলে কপি পেস্টই করে নিলাম।
বুঝলাম, উনি মন পড়তে জানেন। তবে অবাক হলাম না। একটা পর্যায়ের পর মানুষের অবাক হওয়ার ক্ষমতা বোধহয় হারিয়ে যায়। আমার, রঘুদার আর বুধোদার এখন সেই অবস্থা।
আমার ভাবনার সূত্র ধরেই বামনসন্ন্যাসী বললেন—মন পড়তে পারি বলেই আপনাদের মনের মধ্যে যে প্রশ্নগুলো ঘোরাফেরা করছে সেগুলো বুঝতে পারছি। প্রশ্ন নয়, বরং বলা ভালো বোধিসত্ববাবু তার ধারণাগুলোকে আমার কথার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চাইছেন। আপনার ধারণা একশোভাগ ঠিক, বোধিসত্ববাবু। আমি অন্য গ্রহের জীব।
আমরা একটা পাথরের বেদির ওপর বসে পড়েছিলাম। বামনসন্ন্যাসী আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাতেও আমাদের মাথা তাঁর মাথার থেকে একটু উঁচুতেই ছিল।
বামনসন্ন্যাসী বলে চললেন, বাকি ঘটনাগুলোও আপনি প্রায় সঠিক অনুমান করেছেন। তবু আমি একবার মাদলপাহাড়ে আমাদের ইতিহাসটুকু বলে যাই। তাতে আপনার বন্ধু দুজনের মনের ধোঁয়াশা কাটবে।
আমি যে গ্রহের বাসিন্দা সেই গ্রহকে আপনারা যে নামে চেনেন তা হল 'উপসিলন অ্যান্ড্রোমিডা বি'। আমরা তাকে কী নামে ডাকি তা অপ্রাসঙ্গিক। আর আমরা নিজেদের বলি 'নাভিট', যেমন আপনারা নিজেদের বলেন 'মানুষ'।
আজ থেকে ঠিক চারশো একাত্তর বছর আগে একটা অনুসন্ধানী মহাকাশযান উপসিলন থেকে পৃথিবীতে এসে নেমেছিল—যে যানের ছবি আপনারা এইমাত্র আংরাগুহায় দেখে এলেন। নিজেদের গ্রহে জায়গা কুলোচ্ছিল না বলে আমরা উপনিবেশ স্থাপনের জন্য অন্য গ্রহে জায়গা খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। এলোমেলোভাবে ঘুরতে ঘুরতেই আমরা পৃথিবীতে পৌঁছে গিয়েছিলাম। দেখেছিলাম, পৃথিবীর আবহাওয়া, এর অক্সিজেন সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল, নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রা সবই আমাদের উপসিলনের মতন। বুঝেছিলাম উপনিবেশ গড়ার পক্ষে এই গ্রহই আমাদের পক্ষে উপযোগী।
ঠিক করলাম, আমরা কয়েকজন এই মাদলপাহাড়ের চূড়ায় থেকে যাব। বাকিদের নিয়ে আমাদের ফ্লাইং সসার উপসিলন গ্রহে ফিরে যাবে। আমরা যতক্ষণে পৃথিবী এবং মানুষ সম্বন্ধে আরও তথ্য জোগাড় করব ততক্ষণে সেই সন্ধানী মহাকাশযান আরও অসংখ্য যুদ্ধযান ভর্তি নাভিটদের নিয়ে ফিরে আসবে। চারশো একাত্তর বছর আগে মানুষের সভ্যতা যে জায়গায় দাঁড়িয়েছিল তাতে তাদের পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে আমাদের সময় লাগত না।
কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য এবং আপনাদের সৌভাগ্য যে, আমাদের এই মাদলপাহাড়ের চূড়ায় নামিয়ে দিয়ে ফিরে যাবার সময় ইঞ্জিন চালানো মাত্র তাতে বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের ফলে বিরাট এক গর্ত তৈরি হয়, যার তলায় টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সেই মহাকাশযানের ভিনিয়াম ধাতুর খোলশ আর কলকব্জা। হ্যাঁ, বোধিসত্ব, আপনি ঠিকই আন্দাজ করেছেন। ওই বিস্ফোরণের ফলেই পুরো জায়গাটা প্রচণ্ড তেজস্ক্রিয়তায় ভরে যায়, এত বছর পরেও যার বিষাক্ত ছোবলে মৌডুংরির কেউ কেউ মারা যাচ্ছে। বেচারারা ওই ভিনিয়ামের তেজস্ক্রিয় খোলশকে রূপো বলে ভুল করে।
কিন্তু আমাদের অবস্থাটা কী হল একবার ভাবুন। নিজেদের আবাসভূমি থেকে কোটি কোটি কিলোমিটার দূরে আমরা সতেরোজন নাভিট বন্ধু-স্বজনদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে রইলাম। ইচ্ছে থাকলেও উপসিলন গ্রহের কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে না, কারণ আমাদের যোগাযোগের সমস্ত যন্ত্র ওই মহাকাশযানের সঙ্গেই চুরমার হয়ে গেছে। তার চেয়েও বড় কথা, আমাদের পৃথিবীতে আসার কোনও পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। তাই, আমাদের গ্রহের কেউ জানবেও না, আমরা এখানে রয়েছি। এতবড় মহাকাশে আমাদের খুঁজে পাওয়া মহাসমুদ্রের বুক থেকে একটা ভাসন্ত পাতাকে খুঁজে পাওয়ার থেকেও কঠিন, তাই না?
তার ওপর আমাদের চেহারাও দেখতেই পাচ্ছেন, আপনাদের থেকে অনেকটাই আলাদা। এই মাদলপাহাড়ের মাথা থেকে নেমে শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াতেই পারব না। সঙ্গে সঙ্গেই ভিনগ্রহী বলে চিহ্নিত হয়ে যাব। তাই আমরা এই ছোট্ট জায়গাটাতে সারাজীবনের মতন বন্দি হয়ে গেলাম।
বোধিদা হঠাৎ বলে উঠল, এর পরেই আপনারা ওই আকাশচুম্বী মিনারটা গড়ে তুলেছিলেন, তাই না? ওর ওপরে নিশ্চয় এমন কোনও প্রতীক ছিল যা মহাশূন্য থেকে দেখলে আপনার স্বদেশবাসীরা বুঝতে পারবে।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। আশা তো ছাড়তে পারি না। ভেবেছিলাম যদি কোনওদিন আবার আমাদের গ্রহের কোনও মহাকাশযান পৃথিবীর আকাশে প্রবেশ করে...। কিন্তু না, আজ পর্যন্ত সেরকম কিছু ঘটেনি।
দেখতে পাচ্ছি, আপনাদের তিনজনের মনেই কাল রাতে মাদলপাহাড়ের চূড়ায় যে আলোর ঝলকানি দেখেছিলেন সেই ছবি ভেসে উঠছে। হ্যাঁ, ভাঙা ফ্লাইং-সসার থেকে যে-ক'টা জিনিস উদ্ধার করতে পেরেছিলাম তার মধ্যে একটা অ্যান্টিম্যাটার-টর্চও ছিল। চারশো একাত্তর বছরের পুরোনো সেই টর্চ জ্বালিয়ে মাঝে মাঝে আকাশের দিকে সঙ্কেত পাঠাতাম—সেই একই আশায়। যদি আমার গ্রহের কোনও মহাকাশচারী দেখতে পায় সেই সঙ্কেত।
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বামনসন্ন্যাসী বললেন, কালকেই সেই টর্চের আয়ু ফুরিয়ে গিয়েছে।
রঘুদা বললেন, আপনার বাকি সঙ্গীরা কোথায়?
মারা গেছে। কেউ একশো, কেউ দুশো বছর আগে বয়সের ভারেই মারা গেছে। ওই দেখছেন তাদের সমাধি। আমাদের আয়ু আপনাদের বছরের হিসেবে মোটামুটি ছশো বছর। আমিই ছিলাম সবার চেয়ে ছোট। তাই আমি এখনও বেঁচে আছি। তবে আমারও সময় ফুরিয়ে এসেছে। আপনাদের কাছে একটা অনুরোধ। যে-ক'টা দিন বেঁচে আছি আমাকে শান্তিতে থাকতে দিন। আমি জানি গত চারশো একাত্তর বছরে মানুষের সভ্যতা অনেক এগিয়ে গেছে। এখন আমার কথা সভ্য মানুষ জানতে পারলেই আমাকে নিয়ে অনেক কাঁটাছেঁড়া চলবে। সে আমি সহ্য করতে পারব না। এই দয়াটুকু আশাকরি আপনারা করবেন।
তখনই বামনসন্ন্যাসীকে কথা দিয়ে এসেছিলাম, তিনি কোথায় রয়েছেন তা কাউকে জানাব না। তাই এই কাহিনিতে সমস্ত জায়গার নাম ইচ্ছে করেই বদলে দিলাম।
কথা শেষ করে বামনসন্ন্যাসী আমাদের দিকে পিছন ফিরে ধীর পায়ে তার বন্ধুদের সমাধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। বুধোদা তাকে পেছন থেকে ডেকে বললেন, শেষ কয়েকটা প্রশ্ন ছিল।
বলুন।
আমরা একটা ফটোর সূত্র ধরে এখানে পৌঁছেছিলাম...।
জানি। ওটা পৃথিবীতে অবতরণের পূর্বমুহূর্তে আমিই মহাকাশযানের জানলা থেকে তুলেছিলাম। চারশো একাত্তর বছর আগের মাদলপাহাড়ের ছবি। ছবিটা আমার স্পেস স্যুটের পকেটে ছিল বলে বেঁচে গিয়েছিল। স্মৃতি হিসেবে বাক্সে রেখে দিয়েছিলাম।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, ওই একই বাক্সে কিছু অভ্রের পাতের মতন জিনিস রয়েছে। ওগুলো কী?
বলছি, তার আগে আপনার তৃতীয় প্রশ্নটা করুন।
আপনারা মাত্র সতেরোজন ক্ষুদ্রাকার মানুষ, স্যরি, নাভিট বেঁচেছিলেন। আপনাদের সমস্ত হাতিয়ার ওই মহাকাশযানের সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তবু কেমন করে ওই বিশাল পাথরের মিনার গড়ে তুলেছিলেন?
বামনসন্ন্যাসীর মুখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন, আরেকজন ছিল আমাদের সঙ্গে। 'ছিল' বলছি কেন, এখনও রয়েছে। আমার একমাত্র বন্ধু, এক অ্যান্ড্রয়েড রোবট। তার শরীর আমাদের মতন ছোট নয়। তার মনটাকেও আমরা বিশাল করে তৈরি করেছিলাম। অসম্ভব মায়াবী সেই রোবট আজ অবধি একটা মাছিকেও মারেনি। একসময়ে তার শরীরে একশো হাতির জোর ছিল। সেই বানিয়েছিল ওই মিনার, হ্যাঁ, প্রায় খালি হাতেই। আর যেগুলোকে অভ্রের পাত বলছেন সেগুলো ওই রোবটটাকে চালানোর জন্যে ভীষণ জরুরি একটা জিনিস। সে জিনিস আপনারা এখনও আবিষ্কার করতে পারেননি, তাই আসল নামটা বললেও বুঝতে পারবেন না। ব্যাটারিই ধরুন না।
তবে দু:খের কথা কী জানেন? ওই ব্যাটারিও ফুরিয়ে গেছে। সেইজন্যেই বলছিলাম, 'একসময়ে' ওর গায়ে একশো হাতির জোর ছিল। আজ আর নেই। এখন খুব পরিশ্রমের কোনও কাজ করতে গেলে আমার ওই বন্ধু মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে।
বামনসন্ন্যাসী কিংবা উপসিলন গ্রহের নাভিটের মুখে এই কথা শোনার পরে আমরা মাদলপাহাড়ে আর একমুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি। একরকম দৌড়েই নীচে নামতে শুরু করেছিলাম।
আংরাগুহার সামনে পৌঁছিয়ে দেখতে পেলাম, শ্যামলা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার মুখে জমাট বেঁধে আছে রাজ্যের ভয় আর বিস্ময়। আমাদের দেখতে পেয়ে সে ভূতগ্রস্তের মতন নি:শব্দে যেদিকে আঙুল তুলে দেখাল, সেদিকে চেয়ে দেখলাম গুঙ্গাদানোর দেহটা তখনও একইভাবে পাথরের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে। কিন্তু তার শরীরটা আর আস্ত নেই—ভেতরের কোনও তাপে পুড়তে শুরু করেছে। পুড়ে গেছে তার জামাকাপড়, পুড়ে গেছে চামড়া। আর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে, না, কঙ্কাল নয়—ধাতুর কাঠামো, সার্কিট আর গোছা গোছা তার। সেগুলোও আমাদের চোখের সামনেই আস্তে আস্তে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
বোধিদা সেইদিকে তাকিয়ে সম্মোহিতের মতন ধীরে ধীরে বলল, বিদায় করুণাময় রোবট।
তারপর আমরা হাঁটতে শুরু করলাম মিঠাপানি ফরেস্ট বাংলোর দিকে, যেখানে আমাদের টাটানগরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করে রয়েছে রঘুদার জিপ।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন