প্রত্যানীত

বুদ্ধদেব গুহ

তামা নদীটা যেখানে গঙ্গাধর নদীর বুকে এসে পড়েছে, আর ফাল্গুনের শুখা তাকে দয়িতের সঙ্গে মিলতে না দিয়ে একটি দহ মতন সৃষ্টি করে তাকে বিরহ যাতনাতে ক্লিষ্ট করেছে, ঠিক সেইখানেই দাঁড়িয়েছিল দীপ। তামা নদীর বিরহর জ্বালাই যেন রাশ রাশ মাদার ফুল হয়ে নদীপারের পাতা—ঝরা হরজাই বনে ফুটে রয়েছে। এখন থাকবে কিছুদিন। মাঝে মাঝে বাঁশবন। গোরু চরেছে একরামুদ্দিন মিঞার। গোয়ালে ফেরার সময় হল তাদের।
একটা একলা গো—বক তার খয়েরি—রঙা ডানা মেলে কী এক অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করতে না পেরে গঁক—গঁক—গঁক শব্দ করে মোনো—সিলেবল—এ তার বুকের কষ্টটা তামা নদীর বুকের কষ্টের সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে।
ধু ধু চর ফেলা এবং একটি মস্ত বাঁক নেওয়া গঙ্গাধর নদীর পারের মস্ত বটগাছের তলায় বসে রাখাল—বাগাল গোয়ালপাড়িয়া গান গাইছে। গান গাইছে তার প্রেমিকার কথা মনে করে, গলা ছেড়ে।
কে জানে।
দীপের মতন তার কোনো প্রেমিকা আদৌ আছে কি না। এই সন্ধেই হয়তো তার প্রেমিকা। প্রতি দিন—রাতের অনেকই মুহূর্ত থাকে যখন প্রত্যেক একলা নারী এবং পুরুষের মনই বিবাগী হয়ে যায়। এই বৈরাগ্য কিন্তু দূরে যাবার জন্যে নয়, কারও কাছে আসারই জন্যে। বুকের কাছে, খুবই কাছে।
সে গান গাইছে তো গাইছেই। বড়ই লম্বা গান। তবে ছাওয়ালের গলাখানা ফাস—কেলাস। কিন্তু এ গান শুনে মন যেন গঙ্গাধরের চরেরই মতন বিবাগী হয়ে ওঠে। রাখাল গাইলে, সে জায়গা ছেড়ে পা আর নড়ে না কারোই।
''প্রেম জানে না রসিক কালাচান্দ
কালা ঝুরিয়া থাকে মন
আর কতদিনে হব বন্ধু দরিশন, বন্ধুরে।
অ বন্ধুরে তোমার বাড়ি আমার বাড়ি
যাওয়া আইসা অনেক দেরি
যাব কি রব কি সগায় করে মানা
হাটিয়া গেইতে নদীর পানি
খাপলাং কী খুপলুং
কী খালাউ খালাউ করে রে
হায় হায় পরাণের বন্ধুরে।
অ বন্ধুরে তোমার আশায় বসিয়া আছং
বটবৃক্ষের তলে।
ভাদর মাসিয়া দেওরার ঝরি
টিপ্পিস কি টাপ্পাস
কি ঝম ঝমেয়া পড়ে রে
হায় হায় পরাণের বন্ধুরে।
অ বন্ধুরে একলা ঘরে শুইয়া থাকং
পালঙ্গের উপরে
মন মোর উরাং বহিরার করে
কট ঘুরিতে মরার পালং
কেরবেত কী কুবরুত
কি কাবাও কাবাও করে রে
হায় হায় পরাণের বন্ধুরে।।''
গান শেষ হলে দীপও পা বাড়াল বাড়ির দিকে। সে যে কেন এমন উদ্দেশ্যহীনভাবে নদীপারে এসেছিল এই ফাল্গুনের রুখু—লাগা বিকেলে, তা ও নিজেও জানে না। সেও যদি রাখালের মতন গান গেয়ে নিজের কথা আকাশকে, বাতাসকে, নদীকে বলে মনের ভার একটু হালকা করতে পারত।
সন্ধে হয়ে আসছে। গঙ্গাধর নদীর উপরের আকাশে গেরুয়া রঙ লেগেছে। বৈষ্ণব—গেরুয়া। একঝাঁক পরিযায়ী হাঁস ডিঙ্গডিঙ্গার মরনাই চা—বাগানের দিক থেকে উড়ে আসছে দুলতে দুলতে মালার মতন। হয়তো তারা গুমা রেঞ্জের গভীরের কোনো জলাভূমি থেকে আসছে। ঠিক জানে না দীপ। তারা চর—ফেলা আঁকাবাঁকা নদীর বিধুর আঁচলের বুক তাদের ডানার সপাসপ শব্দে চমকে দিয়ে শিমুল বনের দিকে উড়ে গেল।
মাদারের বনে ফুল এসেছে। তিব্বতি লামাদের বসনের রঙের মতন লাল ফুল ভরে গেছে গাছে গাছে। এই মাদারের ফুলেরাও একধরনের আকাশমণি বা সূর্যমুখী। এরা এদের মুখ আদৌ আনত করে না পৃথিবীর দিকে। ঋজু, আকাশমুখো হয়ে, আদ্যিকালের প্রতিষ্ঠান মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে হেলায় যেন অপ্রমাণ করে এরা।
ভালো লাগে দীপের।
নদীপারের হরজাই বনে একটা হাওয়া ওঠে। তার পায়ে পায়ে, নূপুরের মতনই, কিন্তু তাতে ঝুনুঝুনু নয়, ঝুরুঝুরু শব্দ ওঠে একটা। নারীর চুলের মতন বিস্রস্ত হয়ে যায় ঘন—বুনোটের বন।
পরমুহূর্তেই হাওয়াটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চাপা স্বগতোক্তি করেই কোনো ভিখিরি বুড়ির মতনই মরে যায়। গাছেরা টানটান হয়ে দাঁড়ায়, যেন অ্যাটেনশানেই; কোনো অদৃশ্য সেনানায়কের নির্দেশের অপেক্ষায়।
একটু পরেই অন্ধকার হয়ে যাবে। আজ ঈদ। শুক্লপক্ষ। একুশে ফেব্রুয়ারি। এখনই না উঠলে অন্ধকারে বাড়ি পৌঁছতে অসুবিধে হবে। ভাবল দীপ।
এমনিতে কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু গরম পড়ছে। সাপখোপ—এর ভয় আছে। যদিও দীপ মিত্রর জীবনের দাম বিশেষ নেই, অন্যের কাছে বা তার নিজের কাছেও, তবু হয়তো নিছক অভ্যেসবশেই মাঝে মাঝে বড় বাঁচতে ইচ্ছে করে। এই বাঁচার ইচ্ছেটা, ওর মতন সর্বার্থে এক অপদার্থের পক্ষে বড়ই হাস্যকর যে, তা ও জানে। কিন্তু বাঁচার ইচ্ছা যতই হাস্যকর হোক না কেন, সব মানুষই এই দুর্মর রোগে ভোগে।
দীপ, নানা কারণে ঘেন্না করে নিজেকে, আবার ভালোওবাসে। যদিও জানে যে, এই ঘৃণাটা করা উচিত সমাজকে, সমাজব্যবস্থাকে, যারা এবং যে—ব্যবস্থা ওর মতন নির্বিরোধী, টগবগে, উচ্চাশাসম্পন্ন একজন যুবকের মনের মধ্যে এমন অস্থিরতা এবং অবসাদ এনেছে। কিন্তু এই সমাজ, এই ব্যবস্থাটা তো কোনো মানুষ বা প্রাণী নয়, এমনকি একটা গাছও নয় যে, ও ইচ্ছে করলেই ওর একক চেষ্টাতে কেটে ফেলবে কুড়ুল দিয়ে।
তামাহাটে ওদের বাড়ির দিকে আসতে আসতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাতে শিক্ষিত না হলেও উচ্চশিক্ষিত এবং চিন্তাভাবনাতে অত্যাধুনিক দীপ ভাবছিল যে ওর বাবার কথা শুনে, চাষবাস করলেই হয়তো ভালো করত। জমিজমা ওদের নেহাত কম নেই। তাছাড়া, এখানের অনেকেই তো, পাটের ব্যবসা উঠে যাওয়ার পরে চাষবাস নিয়েই সংসার চালিয়ে নেন। সচ্ছল না হলেও অভাবও নেই কোনো তাদের।
কেন যে ও গৌরীপুরে পড়াশুনো করতে গেল! আর কেনই যে সাহিত্য পড়তে গেল! কেন যে মাদারকে এমন করে ভালোবাসল! সমস্ত জীবনটাই দীপের ভুলে ভরা। মাদারের গর্বের রঙ ঐ মাদার ফুলেরই মতন। ও জানে যে কোনোদিনও পাবে না মাদারকে। তবু....
ভুল, ভুল, সবই ভুল!
নদীপারের তিনকড়ি মিত্র হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল—এর পাশের পায়ে—হাঁটা পথ বেয়ে তামাহাটের মোড়ে এসে পৌঁছে দোকানঘরগুলোর আলোতে চোখ যেন আরোই ধেঁধে গেল।
এমন সময়ে অন্ধকারে প্রায় মাটি ফুঁড়ে উঠে হামিদ ওর হাত ধরে বলল, কী রে! তোর হইছেটা কী ক' ত? আলি না ক্যান রে? আম্মা তর লাইগ্যা বইস্যা আছে। চল চল।
লজ্জিত হল দীপ। সত্যিই তো! হামিদের আম্মা ফতিমা বিবি, দীপ—এর মাসিমাকে তো ও নিজেই বলেছিল। মাসিমা ওকে ঈদের দিনে লংক্লথের পায়জামা—পাঞ্জাবিও দেন প্রতি বছর। ওর লজ্জা করে। বদলে কিছুই তো ও দিতে পারে না! এবারেও সেই আন্তরিক দাওয়াতের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। অথচ কী যে হয়ে যায় দীপের আজকাল। মাদারের বিরক্ত মুখটার কথা বারবারই মনে পড়ে যায়।
হামিদ বলল, তগো বাড়ি গিয়া মাসিমাকে জিগাইলাম। তা তিনি ত কইবার পারলেন না তুই কোন চুলায় গ্যাছস। তবে আমি ঠিকই বুঝছিলাম কোথায় গ্যাছস।
কোথায়? আর কী করে? বুঝলি কী করে?
মাদার বনে। মাদারের ফুল ফুটছে, যা না! ঈরে! ঈনসাল্লা। এরশাদ। এরশাদ। চাইরধারে চোখ চাওন যায় নারে হালা। আহা! মন কয়, যেন জন্নাত নাইম্যা আইছে নিচোত।
কোন জন্নাত? তোদের স্বর্গের, মানে, জন্নাতের আবার অনেক রকম হয়তো।
হয়ইতো!
বলেই বলল, জন্নাতুল ফিরদৌস, জন্নাতুল মোয়াল্লা, জন্নাতুল নাঈম, জন্নাতুল মাবা।
বলেই বলল, আরও আছে। বোধ করি, আম্মী কইবার পারে সবগুলানের নাম। তবে মাদারের মতন জন্নাত আর নাই। যাই ক' তুই দীপ। ভাব ভাব মাদারের ফুল।
দীপের মনটা ভালো নেই। ভালো থাকে না আজকাল। অন্যসময় হলে প্রতিবাদ করত হয়তো। হয়তো ঝগড়াও হয়ে যেত। কিন্তু এখন উচ্চবাচ্য করল না। তাছাড়া আজকে ঈদের দিন। ভালোবাসার দিন। ঝগড়ার নয়।
প্রতিবাদী হতেও যতটুকু জোরের, মনোবলের এবং উদ্যোগের প্রয়োজন হয় তা জড়ো করার মতন জোর এই বসন্তকে পথ—দেখানো সন্ধেতে দীপ নিজের মধ্যে জড়ো করে উঠতে পারল না। তাছাড়া, হামিদ তার বন্ধুই শুধু নয়, তার হিতার্থীও। ডিঙ্গডিঙ্গার মাদার নাম্নী মেয়েটিকে যে দীপ ভালোবেসে ফেলেছে তা হামিদ বিলক্ষণই জানে। যদিও দীপের সেই বিফল ভালোবাসাতে হামিদ কোনো মদতও দেয় না আবার তার সক্রিয় বিরোধিতাও করে না। দীপের মনে হয়, হামিদের স্বভাবটা যেন অনেকটা তামাহাটের এই গঙ্গাধর নদীরই মতন। নিজের মনেই সে বয়ে চলে। তার দু'পারের কোনো ঘটনার ঘনঘটাই তাকে ছোঁয় না। আলোড়িত করে না। অথচ হামিদের মধ্যে নদীরই মতন একটা অঘটন—ঘটন—পটিয়সী ক্ষমতা আছে।
হামিদের পূর্বপুরুষেরা চরুয়া ছিল। এই অঞ্চলের মানুষেরা যাদের বলেন, ভাটিয়া মুসলমান। তাই ওর রক্তে প্রচণ্ড রাগ যেমন আছে, রক্তের মধ্যে চরফেলা নদীর খামখেয়ালিপনাবাহী জলও বোধহয় কিছু মিশে আছে। কখন যে হামিদ কোন দিকে বাঁক নেয়, কোথায় চর ফেলে আর কোথায় পাড় ভাঙে, তা সে নিজেও জানে না। সে—কারণেই হামিদ ওর বন্ধু হলেও, ওর হিতার্থী হলেও, দীপ ওকে সমীহ করে চলে। সম্ভবত ভয়ও পায়। যদিও সেই ভয়ের কথা কখনও মুখে বা চোখে প্রকাশ করে না বা করেনি হামিদের কাছে।
হামিদের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দীপ বলল, তুই আউগাইয়া যা। আমি হাত—মুখ ধুইয়া আর মা'রে একবার কয়্যাই আসতাছি।
ক্যান? আমাগো বাড়ি কি ইন্দারা নাই নাহি? না একখান গামছাও নাই তর হাত মুখ পোছনের লইগ্যা?
না রে। হে কথা নয়। মা'রে কইয়াই আসুমানে। দেখিস। দৌড়াইয়া যাম্যু আর আম্যু। দেইখ্যা লইস। জানিসই ত! মায়ে আমার নাই—চিন্তার রানি!
তা ত আইবই। ছোট্ট পোলা যে তুই! আমাগো আট ভাইয়ের মধ্যে কারে কুমিরে লইল আর কারে বাঘে খাইল হে লইয়া আমার আম্মার কুনোই মাথাব্যথা নাই।
হ। তাই ত! নিমকহারাম আছস তুই বড়। মাসিমা সর্বদাই হামিদ হামিদ করেন আমি দেখি নাই য্যান। থো তোর মিথ্যাকাহন।
দীপ আর কথা না বাড়িয়ে বলল, যা তুই আউগাইয়া যা। আমি যাম্যু আর আম্যু।
হামিদ এবারে এগিয়ে গেল। শুক্লপক্ষের সন্ধ্যায় ডিঙ্গডিঙ্গার পথে যেন মুছে গেল সে অকস্মাৎ।
হাটের পাশ দিয়ে গিয়ে দীপ গদিঘরের পাশের চ্যাগারের ছোট দরজা দিয়ে ঘুরে গদিঘরের পাশ দিয়ে ভিতর—বাড়িতে ঢুকল।
সন্ধের পরে পরেই এই ফাল্গুনে গাছগাছালিরা কেমন যেন গন্ধ ছাড়ে একটা তাদের গা—মাথা, হাত—পা, পাতা—পুতা থেকে। একটা মিশ্র গন্ধ। সকলে সে গন্ধ পায় কি—না তা দীপ বলতে পারবে না। কিন্তু সে পায়। যেমন পায়, মাদারের গা থেকে, বগলতলি থেকে। ও একটা গন্ধগোকুল। গন্ধময় ওর জগৎ, শব্দময়ও বটে। আর বর্ণময় তো অবশ্যই!
কামরাঙা গাছটা মস্ত বড় হয়ে গেছে। জলপাই গাছটাও। কৃষ্ণপক্ষের রাতেই যেন তাদের এই কিশোরী শরীরের বাড়ের মতন বাড়টা তারকাখচিত আকাশের পটভূমিতে বেশি করে চোখে পড়ে। কেন, জানে না দীপ।
নীহার শিবমন্দিরের মধ্যে মূর্তির সামনে বসেছিলেন। সামনে গৌরীপুরের কাছের আশারিকান্দি থেকে ফরমাশ দিয়ে বানানো মস্ত পিদিমদানে রেড়ির তেলের পিদিম জ্বলছে বারোটি। শীর্ণ কিন্তু জ্যোতির্ময়ী কটি উজ্জ্বল দীপশিখারই মতন দেখাচ্ছে দীপের মা নীহারকে।
মাকে আড়াল থেকে দেখতে ভারী ভালোবাসে দীপ কিন্তু মা ঠিকই বুঝে ফেলেন যে দীপ তাঁকে দেখছে।
কে জানে! হয়তো সব নারীরাই বোঝেন।
কিন্তু যখন পুজোতে বসেন নীহার তখন তাঁর কোনোই বাহ্যজ্ঞান থাকে না।
অনেকক্ষণ ধরে দীপ পিদিমদানের বারো পিদিম—এর উজ্জ্বল আলোর পটভূমিতে তার বৃদ্ধা মায়ের নিষ্কম্প শিল্যুটটি দেখল। বাইরে এমন উথাল—পাথাল হাওয়া অথচ আশ্চর্য, এই ছোট্ট শিবমন্দিরের অভ্যন্তরে হাওয়ার রেশমাত্র নেই।
হঠাৎ নীহার মুখ না ঘুরিয়েই বললেন, দীপ এলি?
হ্যাঁ, মা।
কোথায় থাকিস যে সারাদিন! চানু এসেছিল। চখা নাকি আসছে কলকাতা থেকে। আগামীকাল নাকি ধুবড়িতে প্রথম বইমেলা হবে। তাই উদ্বোধন করতে আসছে চখা অন্য আরেকজন লেখকের সঙ্গে।
অন্য লেখক কে?
তা জানি না। আমাদের জেনে লাভই বা কী! তবে চানু বলছিল যে দু—তিন জনের আসার কথা আছে।
আসছে কোথা থেকে? ধুবড়ি?
আরে না না। কলকাতা থেকে আসছে প্লেনে। বাগডোগরা এয়ারপোর্ট থেকে তুলে নিয়ে মেলা কর্তৃপক্ষই ওকে তামাহাটেই পৌঁছে দেবেন। তারপর আগামীকাল আবার বিকেলে এসে নিয়ে যাবেন ধুবড়ি। বইমেলা তো ধুবড়িতেই! এই নাকি প্রথম হচ্ছে বইমেলা ধুবড়িতে। শুধু বাংলা বইয়েরই মেলা নয় রে, বাংলা, অসমিয়া এবং ইংরেজি বইও থাকবে। তবে আমার মনে হয়, মেলার নাম দেওয়া উচিত ছিল গ্রন্থমেলা। অসমিয়া ভাষাতে ''বই'' বলে তো কোনো শব্দ নেই।
ভালো। ধুবড়িতে যে কত শিক্ষিত বাঙালি ও অহমিয়ারা থাকেন, তাঁদের খোঁজ আর কে রাখেন। কলকাতার খবরের কাগজগুলো তো মাঝে মাঝে ব্রহ্মপুত্রে বন্যার খবর ছেপেই ধন্য করে ধুবড়ি শহরকে। আর কী!
তা ঠিক। কাগজগুলোর এমনই রকম। যেন ধুবড়ি বলে কোনো জায়গার অস্তিত্বই নেই।
তারপরেই কথা ঘুরিয়ে বলল, চখাদা সত্যিই এখানে আসবেন? বল কি মা? কতদিন পরে আসবেন?
তা প্রায় চল্লিশ—বিয়াল্লিশ বছর হবে। তোর জন্মের বছর পনেরো আগে শেষ এসেছিল। তখন কড়ি ছিল এখানে। ঝন্টু আর বাপ্পুও এসেছিল কুচবিহারের হস্টেল থেকে ছুটিতে। তখন তোর বাবা তো বটেই জ্যাঠাবাবুও বেঁচে। যাই হোক, এখন চখার নামডাক হয়েছে। চখা চক্রবর্তী বললেই চোখা—চোখা মানুষও এক ডাকে চেনে। সে যে অতীতকে ভুলে যায়নি, তার এই প্রাচীন পিসিমার কাছে এক রাতের জন্যে হলেও যে, তামাহাটে সে আসছে, এটাই আনন্দের কথা।
তা আসছেনই যদি তো এত দেরি করে খবর পাঠালেন কেন?
তারপর নীহার বললেন, চখার নাকি আসার ঠিক ছিল না। ব্যাঙ্গালোর না ম্যাড্রাস কোথায় যেন গেছিল। শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেই খবর দিতে এত দেরি হল।
তোমাকে খবর দিল কে?
চানু।
চানুদাকেই বা এ খবর দিল কে? মিথ্যে খবর নয় তো?
মিথ্যে খবর দিয়ে কার লাভ? তোর যত উদ্ভট চিন্তা। উদ্যোক্তারা ধুবড়িতে রাজাদের ছাতিয়ানতলার বাড়িতে ফোনে খবর দিয়েছেন। রাজাই ধুবড়ি থেকে এখানে মুংগিলালের কাছে ফোন করে দিয়েছিল। চখা বলেই দিয়েছে যে, বাগডোগরাতে নেমে সে তামাহাটেই আসবে। ফোন যখন আসে, চানু তখন সেখানেই বসে গল্প করছিল। দাতুও ছিল। ওরা দুজনে দৌড়ে খবর দিতে এসেছিল। একজনকে পাঠালাম ঘোষের দোকান থেকে গরম রসগোল্লা আনতে, যদি পায়, চখা খুব ভালোবাসত।
চখাদা যখন শেষবারে এসেছিল তখনও কি ঘোষের দোকান ছিল?
থাকবে না কেন? গদাই ঘোষের বাবা নিমাই ঘোষ তখন বসত দোকানে। সেও তো ফওত হয়ে গেছে তোর জন্মেরও আগে। বড় ভালো রাবড়ি বানাত নিমাই ঘোষ। আর রসমালাইও। ফকিরাগ্রাম, গোঁসাইগঞ্জ, বক্সির হাট, পাগলা হাট হয়ে মটরঝার, কচুগাঁও থেকেও মানুষে সেই সব কিনতে আসত। রাবড়ি খাওয়ার যম ছিল তোর জ্যাঠাবাবুর বন্ধু রতুবাবু।
মানে, পচার দাদু?
হ্যাঁরে। উনি খুব বড় শিকারিও ছিলেন। টি মডেল ফোর্ড গাড়ি ছিল তাঁর একটা। তোরা সে সব গাড়ি চোখে দেখিসনি। পথেও চলত, মাঠেও চলত। উনি তো হিরো ছিলেন এই অঞ্চলের। আর ছিল আবু ছাত্তার।
আবু ছাত্তারের কথা শুনেছি। শুধু বাঘই মারেনি এন্তার, একদিনে এগারো জন মানুষও মেরেছিল নাকি?
হ্যাঁ। তা মেরেছিল। ফাঁসি হয়ে গেছে মানুষটার। বদরাগী ছিল ঠিকই কিন্তু মানুষ ভালো ছিল। ভালোমানুষদের রাগই প্রকাশ পায়। যারা রাগ প্রকাশ করে না, তাদের থেকে দূরে থাকবি।
ঘোষের দোকানে কাকে পাঠিয়েছ?
কথা ঘুরিয়ে বলল দীপ।
নীহার বললেন, দাতুকে।
নীহারের আজকাল এরকমই হয়েছে। এক কথা বারবার বলেন। স্মৃতিশক্তিও চলে গেছে। বয়সও তো প্রায় আশি হল। তারপর পাঁচ বছরের ব্যবধানে দুই পুত্র বিয়োগে তাঁর মাথাটা সম্ভবত কাজই করে না আর।
আর চানুদাকে?
ডিম জোগাড় করে আনতে। আজ ঈদের দিন। মিঞাদের দোকানপাট সবই তো বন্ধ। তাদের বাড়িতেও কি আর কিছু আছে! চানু বলল, ওদের বাড়ির এক হাঁসির নাকি ডিম পাড়ার কথা আজ। দেখুক যদি থাকে চখার কপালে ডিম খাওয়া।
হেসে ফেলল দীপ সে কথা শুনে। বলল, বাবাঃ! কবে তাদের বাড়ির কোন হাঁসি ডিম পাড়বে সে খবরও রাখে নাকি চানুদা?
তারপরই বলল, শুধুই ডিমের ঝোল খাওয়াবে মা? চখাদাকে?
না রে? ফেনাভাত খাওয়াব। চখা তামাহাটের ফেনাভাতের খুব ভক্ত ছিল। ফেনাভাত, মধ্যে সিম, বাঁধাকপি আর পালংশাক সেদ্ধ। এবং হাঁসের ডিম সেদ্ধ। সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচা লংকা।
হাঁসের ডিম—এ ক্লোরোস্টাল বাড়ে। বাত হয়।
দীপ বলল।
ছাড়তো! হোক গিয়ে। একদিন খেলে হার্ট—অ্যাটাক হবে না। তোর বাবা নেই, জ্যাঠা নেই, জেঠিমা নেই, যাঁরা সবচেয়ে বেশি আদর করতেন তারাই নেই, আমি অন্তত যেটুকু পারি করব তো! তাছাড়া ছেলেটা থাকবে তো মোটে চব্বিশ ঘণ্টারও কম!
দীপ মনে মনে বলল, ছেলেটাই বটে! বাঙালির মা—মাসি—পিসির চোখে ঘাটের মড়াও ছেলেমানুষ।
নীহার পুজোর আসন থেকে উঠে, আসনটি ভাঁজ করে তুলে রেখে মন্দিরের দরজা বন্ধ করে বাইরে আসতে আসতেই চানুদা আর দাতু দুজনেই এসে হাজির। চানুদার এক হাতে সার্ফ—এর বাক্সে ডিম আর অন্য হাতে একটা পাথরের বাটি। আর দাতুর হাতে রসগোল্লার হাঁড়ি।
বাটিতে কী আনলি?
নীহার বললেন।
আজ চুমকির জন্মদিন ছিল। পায়েস রান্না হইছিল বেশি কইর‍্যা। বৌদি কইলো, পাথরবাটিতে জমানোই আছে, লইয়া যা চখার লইগ্যা। ও খুবই ভালো পাইত মায়ের হাতের পায়েস খাইতে। মা ত নাই! তার আর কি করণ যাইব? আমি যে মনে রাখছি ও কী ভালো পাইত না পাইত সে কথা জাইন্যাও ত চখাদার ভালো লাগব অনে।
কোন ঘরে শুতে দিই ওকে? কলকাতাইয়া বাবু। ওদের তো আবার অ্যাটাচড বাথ ছাড়া শোওয়ার অভ্যেস নেই। আমার ঘরেই ওকে থাকতে দেব। তাছাড়া কমোডতো ঐ......
স্বগতোক্তি করলেন নীহার।
আর তুমি?
দীপ বলল। অবাক হয়ে।
এক রাত তোর সঙ্গেই শুয়ে যাব।
আর রাতে বাথরুম পেলে?
মধ্যের দরজাটা খুলে রাখলেই হবে'খন। নয়তো বাথরুমের উঠোনের দিকের দরজাটা খুলে রাখতে বলব ওকে। প্রয়োজন হলে উঠোন দিয়েই যাব।
বলেই বললেন, তুই যা দীপ। বাপোই আর বউকে খবর দে গিয়ে। আর মণিকাটা কোথায় গেল? নিশ্চয়ই টি.ভি.—র সামনে বসে আছে। ডাকতো ওকে। ঘর—বাড়ি সাফ—সুতরো করতে হবে। আমার ভাইপো আসছে এত যুগ পরে। কেউ—কেটা ভাইপো।
দীপ জিজ্ঞেস করল চানুকে, বাগডোগরা থেকে তামাহাটে এসে পৌঁছতে কতক্ষণ সময় লাগবে? ধুবড়ি হয়ে আসবে কি?
না। তা কেন! সোজা এসে ঢুকে পড়বে বাঁয়ে। তারপর পাগলা হাট, কুমারগঞ্জ হয়ে আসবে।
শিলিগুড়ি আর জলপাইগুড়ি পেরোতেই তো লেগে যাবে অনেক সময়।
চানু বলল কেন? থোড়াই আসবে সে শহরের মধ্যে দিয়ে। সেভক রোড ধরে বেরিয়ে এসে বাইপাস দিয়ে এসে তিস্তা ব্রিজ পেরিয়ে হাইওয়ে ধরে নেবে। এন.জি.পি.—তেও ঢুকবে না।
তাই? তবু ক'টা নাগাদ এসে পৌঁছবে?
তামাহাটের কূপমণ্ডূক দীপ বোকার মতন বলল।
ভাবছিল ও যে, ওর জগৎটা বড়ই ছোট। ওর দৌড় এদিকে ডিঙ্গডিঙ্গা আর অন্যদিকে কুমারগঞ্জ—গৌরীপুর হয়ে ধুবড়ি। ব্যসস।
চানুদা বলল, তা ঠিক বলা যায় না। এখন তো শুনতে পাই ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স ছাড়াও অন্য প্রাইভেট—এর ফ্লাইটও আসে বাগডোগরাতে। প্লেন যদি লেট না করে তাহলে এখান থেকে ঘণ্টা পাঁচেক লাগার কথা। তার মানে, আটটা নাগাদ পৌঁছবে হয়তো।
নীহার যেন হঠাৎই উত্তেজিত হয়ে উঠে বললেন, সময় একেবারেই নেই। মণিকা! এই মণিকা, মণিকা! কোথায় যে যায় মেয়েটা!
মণিকাকে ডাকতে ডাকতে ভিতর—বাড়িতে গেলেন তিনি।
চানুদা আর দাতু বলল, আমরাও যাই এখন। গিয়া আটটা নাগাদ আবার আসুমানে। বলিস কাকিমারে। সকলকেই খবরটা দিতে ত লাগে। কী কইস? চখাদা এত বছর পরে আসতাছে তামাহাটে। ওয়েলকাম করুন লাগে ত!
দীপ বলল, আমি তো তাঁকে দেখেছি মাত্র একবার। পুঁচকির বিয়েতে যখন কলকাতায় গেছিলাম তখন। এসে পড়লে তো চিনতেই পারব না।
চেনবার দরকারটাই বা কী? তামাহাটে কি আমাগো বা তগো বাড়িত গন্ডা গন্ডা গাড়িওয়ালা অতিথি আসতাছে রোজ রোজ? গাড়ি আইস্যা থামলেই বুঝবি যে চখা আইল।
চখাদার তো লম্বা—চওড়া চেহারা। শুনেছি ইদানীং মোটাও হয়েছে খুব। মাথার চুলও পাতলা হয়ে গেছে।
মনে আছে এখনও, মাঝে মাঝেই বাঁ হাত দিয়ে মাথার চুল আঁচড়াইবার বাতিক ছিল। এখনও আছে কি নাই কে কইতে পারে?
মোটা হয়েছে কেন?
মোটা হইব না ত কী? মায়ে মোটা ছিলেন, বাবাও মোটা, মোটারই ধাত অগো। জল খাইয়া থাকলেও মোটা হইয়া যাইব। গড়ন বইল্যা কথা।
দীপ বলল না কিন্তু কথাটা মুখে এসে গেছিল। ও শুনেছে লোকমুখে যে, শুধু জলই নয়, লাল জলও নাকি খায় চখাদা প্রায়ই।
তারপর বলল, এদিকে বলছ চুলই নেই, তার আঁচড়াবেটা আর কী?
আরে যাদের চুল থাকে না তারাই দেহিস সব সময়েই পকেটে একখান চিরুনি লইয়া ঘোরতাছে।
ওরা হেসে উঠল।
দাতু বলল, সত্যি বলছি। কিন্তু কেন ঘোরে, তা বলতে পারব না।
তারপর দাতু আর চানুদা চলে গেল যার যার বাড়ি।
এমন সময়ে দীপের মনে পড়ল হামিদের কথা। বাড়ির ভিতরে দৌড়ে গিয়ে বলল, যাঃ! একদম ভুলে গেছিলাম মা। ফতিমা মাসির বাড়ি আজ ঈদের নেমন্তন্ন ছিল যে! পায়জামা—পাঞ্জাবি নিয়ে, বিরিয়ানি নিয়ে মাসি বসে আছে। হামিদ পাকড়াও করেছিল হাটের মোড়ে। তাকে কথা দিয়ে এসেছি, না গেলে খুবই খারাপ হবে।
দাওয়াতই যদি ছিল তবে ঈদের নমাজের পরেই গেলি না কেন? ঈদগা থেকে ওরা আসার পরপরই? ফতিমা তো তোকে এই প্রথমবার দাওয়াত খাওয়াচ্ছে না? এটা কী ধরনের অসভ্যতা? এমনটা কোনো শিক্ষিত মানুষের কাছে আশা করার নয়। এখন কী করবি? এদিকে চখাও কত দূর থেকে আসছে আমাদের সঙ্গে মাত্র ক'টি ঘণ্টা কাটাবে বলে আর তুই ঠিক এখনই চলে যাবি? বাগডোগরাতে কখন প্লেন নামবে তা তো আমরা জানি না। ও তো আগেও চলে আসতে পারে! তুই ফিরে আসার আগেই যদি সে এসে পৌঁছে যায়? কী লজ্জার কথা হবে। এখন ওর পিসির বাড়ি বলতে তো তুই আর আমি। অন্যেরা তো কেউই নেই এখানে। তোর দাদারা তো একজন রায়গঞ্জে, একজন ধানবাদ আর হাজারিবাগের ঘেটো টাঁড়ের মধ্যে মাকুর মতন যাওয়া—আসা করছে আর অন্যেরা কলকাতাতে। আগে দোল—দুর্গোৎসবে একসঙ্গে হত সবাই। এখন আর কে এই নিম্ন আসামের গোয়ালপাড়ার ধ্যাড়ধেড়ে তামাহাটে আসে! ডিশ অ্যান্টেনা নেই, কেবল টি.ভি. নেই, বার নেই, এয়ার—কন্ডিশনড সেলুন নেই, সিনেমা হলও নেই, এখানে শহুরেরা কীসের জন্যে আসতে যাবে? মোটে আসেই না কেউ, তার থাকা! এই কারণেই আমার ভীষণই আনন্দ হচ্ছে চখা আসছে বলে। দ্যাখ ছেলেটার কত ভালোবাসা আছে আজও তামাহাট—গৌরীপুর—ধুবড়ির জন্যে।
বলেই বললেন অতখানি রাস্তা। ভালোয় ভালোয় এসে পৌঁছকই আগে।
ছেলেটা ছেলেটা কোরো না তো মা। আজ বাদে কাল চিতায় উঠবে। এই বাঙালি মা—পিসিদের কাছে বুড়োরাও চিরদিন খোকা আর খোকন হয়েই থাকে। সাধে কি জাতের এই হাল!
এমন সময় বাইরে একটা গাড়ি এসে দাঁড়ানোর শব্দ হল। তামাহাটের পথে বাস—ট্রাকের যাতায়াত আছে মাঝে—মধ্যে কিন্তু গাড়ি দিনে হয়তো চার—পাঁচটি ডিঙ্গডিঙ্গার দিকে যায় এবং ধুবড়ির দিকেও।
তুমি ভেতরে যাও মা। আমি দেখছি।
দীপ বাইরে বেরিয়েই দেখে একটা মস্ত গাড়ি। সাদা—রঙা। ঠিক এমন গাড়ি আগে দেখেনি কখনও।
গাড়ির সামনের বাঁ দিকের দরজা খুলে নামল দীপের ছোড়দা, ঝন্টু।
তুমি! চখাদা নাকি আসবে আজই। একটু আগেই চানুদা খবর দিয়েছে এসে মাকে। ধুবড়ি থেকে রাজাদা মুংগিলালের গদিতে ফোন করেছিল।
জানি, ঝন্টু বলল। আমিও তো তাই এই সময়েই এলাম। নইলে, পরের সপ্তাহে আসতাম।
ততক্ষণে ছোটবৌদি আর ছোটবৌদির দাদা—বৌদিও নামলেন। ছোড়দার ড্রাইভার—কাম—কম্বাইন্ড হ্যান্ড পাণ্ডেও নামল ড্রাইভিং সিট থেকে। ভিতর থেকে নীহারের সঙ্গে মণিকাও গদিঘরে এলেন।
কুশল জিজ্ঞাসাবাদ করে নীহার বললেন বাঁচালি ঝন্টু, তুই এসে পড়ে। কী টেনশনে যে ছিলাম।
ঝন্টু বলল, টেনশন—এর কী আছে? চখাদা তো আর বাইরের লোক নয়।
এটা কী গাড়ি নিলি? মারুতি ভ্যানটা নেই?
সেটাও আছে মা তোমার আশীর্বাদে। এটা টাটা মোবিল।
বাঃ! ভারী সুন্দর তো গাড়িটা।
চখাদা বইমেলা উদ্বোধন করতে আসছে ধুবড়িতে, তুমি যাবে তো? তাইতো নতুন বড় গাড়ি নিয়ে এলাম যাতে তোমার কোনো কষ্ট না হয়।
তাই? তা ভালো। তবে বড়লোক না হয়ে বড় মানুষ হও, এই আশীর্বাদ করি। চিরদিন তাই চেয়েছি।
দীপ বলল, ছোড়দা এসে গেছে, আমি হাত—মুখটা ধুয়েই একটু ঘুরে আসি হামিদদের বাড়ি থেকে। তোমার টর্চটা নিয়ে যাচ্ছি মা।
বলেই ছুটে ভিতর—বাড়িতে গেল।
এটা কী নদী পার হলাম?
চখা টাইয়ের নটটা একটু ঢিলে করে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, যে ছেলেটি তাকে নিয়ে এসেছিল বাগডোগরা থেকে, তাকে।
কে জানে!
নদীর নাম জান না?
কী হইব জাইন্যা?
চখা চুপ করেই রইল।
ভাবছিল, এই আমাদের বিশেষত্ব। এখানে শিক্ষিত মানুষদের কাছেও কোনো গাছ শুধুমাত্রই গাছই। কোনো পাখিও শুধু পাখি। নদী, নদী। জন্মাবধি গাছ, পাখি, নদীর প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও এদের কারোকেই জানার একটুকু আগ্রহ নেই অধিকাংশ মানুষেরই।
ভাবলেও খারাপ লাগে ওর।
পাইলট, অর্থাৎ ড্রাইভার খুব জোরে গাড়ি চালাচ্ছিল। কোনো মদের কোম্পানির ফ্রি—গিফট দেওয়া একটা গল্ফ—ক্যাপ মাথায় চড়িয়ে। ভাড়ার গাড়ি। গাড়ির মালিকও গাড়ির সামনের সিটে বসেছিল।
কতক্ষণ লাগবে তামাহাটে পৌঁছতে?
চখা আবার প্রশ্ন করল।
দেখা যাউক। রাস্তা এতই খারাপ যে কহনযোগ্য নয়।
কিছুক্ষণ পরেই একটি পেট্রল পাম্প—এ পাইলট গাড়িটাকে ঢোকাল। পাইলট বলেই সম্বোধন করছিল চখা তাকে। তাতে সেও খুশি হচ্ছিল। তাকে নিতে—আসা ছেলেটিও নামল। তার নাম প্রান্তিক। তারপর পেট্রল যখন নেওয়া হচ্ছে তখন ফিরে এসে জানালা দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে লজ্জামাখা হাসি হেসে বলল, একশত টাকার একখান নোট হইব কি? টাকা কম পইড়্যা গেছে গিয়া।
চখা বলল, হবে।
টাকাটা নিতে নিতে ভদ্র ও অপ্রস্তুত ছেলেটি আরও লজ্জিত হয়ে বলল, খারাপ পাইলেন না ত?
না না। খারাপ পাইব ক্যান? ওরকম তো হতেই পারে। নিজে গাড়ি না চালালে বা নিয়মিত যাওয়া—আসা না করলে কত তেলে কত কিমি যাবে, কত ধানে কত চাল—এরই মতন, জানা থাকবে কী করে! এই নাও।
বলে, টাকাটা বের করে দিল পার্স থেকে।
একটু পরেই সন্ধে হয়ে যাবে। ঠান্ডা নেই কিন্তু হাওয়ার ছুঁচোলো মুখে ঠান্ডার তির আছে। ফাল্গুনের উত্তরবঙ্গ। উত্তরবঙ্গের আর নিম্ন আসামের প্রকৃতি, ঘরবাড়ি, এমনকি কথ্য ভাষাতেও বিশেষ তফাত নেই। পথের দু—পাশেই চষা খেত। মাঝে মাঝে পাট লেগেছে, সর্ষে, শিমুল গাছে ফুল এসেছে গোলাপি ও লাল, বৈষ্ণব ও শাক্তদের পোশাকের রঙের মতন। মাদার গাছে আর অশোক গাছেও ফুল এসেছে বৌদ্ধ ও তিব্বতি লামাদের পোশাকের রঙের। হিন্দিতে এইসব লালকেই মিলিয়ে মিশিয়ে বলে 'ভগুয়া'। অর্থাৎ গেরুয়া। রাগ—রাগিণীর রঙ বিচারে ভাগুয়া চার রকমের হয় : বৈষ্ণব, শাক্ত, বৌদ্ধবাদী ও তিব্বতি লামার পোশাকের রঙ। বেগম আখতার সম্বন্ধে ঋতা গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি লেখা পড়ে এই তত্ত্ব সম্বন্ধে সাম্প্রতিক অতীতে সচেতন হয়েছে চখা।
ভাবছিল চখা যে, চোখে আমরা কত কীই দেখি, কিন্তু ঠাহর করা আর দেখা, দেখার মতন দেখাতে কতই না তফাত। গেরুয়ার এই শ্রেণীবিভাগ সম্বন্ধে ও অবশ্যই অবহিত ছিল অবচেতন মনে কিন্তু সচেতন আদৌ ছিল না। দেখার চোখের এই তফাতটুকুতেই একজন মানুষের, বিশেষ করে লেখকের সঙ্গে অন্য মানুষ বা লেখকের পার্থক্য।
তেল নিয়ে গাড়ি স্টার্ট করার পরেই পাইলট একটা মস্ত হাই তুলল।
চখা বলল, ব্যাপারটা কী পাইলট? সিগারেট খাও নাকি? খেলে খাও। আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। তুমি ঘুমিয়ে পড়লে তো আমারই চিরঘুম হয়ে যাবে।
পাইলট সে—কথার উত্তর না দিয়ে বলল, ক্ষুধা লাগছে বড়।
তাই?
অবাক হয়ে বলল চখা।
তারপর বলল, খিদে পেয়েছে তো কিছু খেয়ে নাও।
সকাল ত ছ'টার সময় বারাইছিলাম দুগা মুড়ি আর চা খাওনের পর। আপনার প্লেন আইব তিনটায়, ওদিকে এয়ারপোর্টে গাড়ি লইয়া আইস্যা পৌঁছাইছিলাম প্রায় দুইটায়। খামু কখনে? আর খামুই বা কুথায়?
কেন? এয়ারপোর্টেই তো রেস্তরাঁ ছিল।
কয়েন কী স্যার? সিখানে কি আমাগো মতন মাইনষে খাইবার পারে নাকি? দাম শুইন্যাই ত হার্ট—ফেইল হবার লাগে।
তাহলে, দাঁড়াও এখন, কোথাও ধাবা—টাবাতে। না খেলে, এত পথ গাড়ি চালাবে কী করে? সকলেই অভুক্ত আছ? চমৎকার! টাকাও নেই বুঝি?
থাউক। খাওনের দরকার নাই। অনেকই দেরি হইয়া যাইবনে আপনের।
হলে হবে। দাঁড়াও কোথাও।
ড্রাইভার ও মালিক মুখচাওয়াচাওয়ি করল। চখাকে নিতে—আসা ছেলেটি, যার নাম প্রান্তিক, চাপা হাসি হাসল। তারপর বলল, আপনের দেরি হইয়া গ্যালে শ্যাষে আমাগো গালাইয়েন না য্যান।
চখা হাসল কথা শুনে।
তারপর হেসেই বলল, না, না, গালাইম্যু না তোমাগো। নারে বাবা, না! আমি কিছুই বলব না। তোমাদের সারাদিন অভুক্ত রাখিয়ে কী মহাপাতক হব?
গাড়িটা ধাবাতে দাঁড় করিয়ে চখা ওদের তিনজনকে ভালো করে খাওয়াল। নিজে প্লেনে লাঞ্চ করেছিল বলে চা ছাড়া আর কিছুই খেল না। পাইলটের জন্য সিগারেটও কিনল এক প্যাকেট। চার্মস ছাড়া আর কিছুই ছিল না সেই ধু—ধু প্রান্তরের মাঝের ধাবা—সংলগ্ন দোকানে।
খাওয়াদাওয়া শেষ হতে হতে অন্ধকার হয়ে গেল প্রায়। একঝাঁক কমোন ইগ্রেট গেরুয়া আকাশের পটভূমিতে উড়ে যাচ্ছিল ঘনসন্নিবিষ্ট বাঁশঝাড়ের উপর দিয়ে।
কলকাতা কী যে দরিদ্র! একটা বাঁশঝাড় পর্যন্ত নেই সেখানে। ফাগুন—চৈত্রের হাওয়ায় পর্ণমোচী বনে পাতা—খসার মিষ্টি মুচমুচে আওয়াজটুকু পর্যন্ত শোনা যায় না। হাওয়া সেখানে জমাদারের মতন ঝাঁট দিয়ে নিয়ে যায় না গা—শিরশির করা শব্দে সেই পাতার রাশকে।
কলকাতা ছেড়ে বাইরে এলেই কলকাতার বহুতল বাড়িময় ইট—কংক্রিট আর পিচ—এর কদর্যতা যেন বেশি করে প্রতিভাত হয় ওর কাছে। কলকাতার প্রশ্বাসে বিষ। আওয়াজে কানের সমস্ত কোমল পর্দাগুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। মনে হয় চখা বোধহয় আর কোনোদিন কড়িমা বা কোমল রেখাবের মাধুর্যে মুগ্ধ হতে পারবে না। বাড়ির পাশের মারোয়াড়িদের বহু কোটি টাকা খরচ করে তৈরি মন্দিরে ঘ্যাসঘেসে গলায় গগননিনাদী ভজন হয় রোজ সন্ধেতে অ্যাম্পলিফায়ারে। শুনতেই হয়। বাধ্যতামূলকভাবে ভোর চারটেতে বিজাতীয় ভাষাতে 'অ্যাম্পলিফায়ারে' শোনা ঘুমভাঙানো আজানের আওয়াজেরই মতন। খালি গলাতে শোনা ভজন অথবা আজান দুই—ই কিন্তু সুন্দর।
তার বাড়ির পাশের মন্দিরের পণ্ডিত পুরোহিতদের গলাতেও তেমন লালিত্য বলতে কিছুমাত্রই নেই। মাঝে মাঝেই একথা ভেবে মনে মনে হাসে চখা যে, দেবী লক্ষ্মী এবং দেবতা গণেশ দু—হাত উপুড় করে মারোয়াড়িদের সবকিছুই ঢেলে দিয়েছেন বটে সরস্বতীও হয়তো কিছু দিয়েছেন তাদের কারও কারোকে কিন্তু তাদের গলাতে সুর একটুও তো দেননি। যুগ—যুগান্তর ধরে শেয়ার বাজারে চাল—ডাল আলুপটলের দরদাম করে করে তাদের গলাগুলি বোধহয় চিরতরে চিরেই গেছে। দু—হাতে তাদের সবকিছু অঢেল দেওয়া সত্ত্বেও ন্যূনতম সুরজ্ঞান থেকে বঞ্চিত করেছেন মা সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং গণেশের পর‍্যাপ্ত ও বেহিসাবি দানের সঙ্গে সমতা রাখতেই বোধহয়।
পাইলট, প্রান্তিক এবং গাড়ির মালিক খাওয়াদাওয়া করার পর যখন গাড়ি ছাড়ল আবার, তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছিল। ধাবার হাতাতে যে মস্ত সজনেগাছটা থেকে ফিনফিনে 'ক্ষুদে' 'ক্ষুদে' পাতা ঝরছিল ফাগুনের শেষ বিকেলের হাওয়াতে বসন্তের আগমনী গানের বাণী বহন করে, সেই পাতাগুলোকে এখন দেখা যাবে না। হেড—লাইটের আলো সামনে যতদূর যায় তাতে ক্ষতবিক্ষত পিচ রাস্তার আর নিচের পথ পাশের পাটকিলে—রঙা ধুলোর ডাঙা আর ড্যাশবোর্ডের নানা মিটারের লাল—সবুজ আলোগুলো ছাড়া পৃথিবী সম্পূর্ণই মসীলিপ্ত।
কলকাতা থেকে গরম স্যুট পরে এসে এতক্ষণ অস্তিত্ব বোধ করছিল কিন্তু এখন আরামই বোধ করছে। পায়জামা—পাঞ্জাবি পরেই আসত কিন্তু মনু বলল, উত্তরবঙ্গে এখন দারুণ ঠান্ডা, তার কোন এক ছাত্রী নাকি শিলিগুড়ি থেকে ফোন করেছিল। কিন্তু বাগডোগরাতে নেমেই বুঝতে পেরেছিল যে মনুর ছাত্রীর সাবধানবাণী মিথ্যে BOMBSCARE—এর মতনই একটি HOAX। কিন্তু তখন কী আর করা যাবে। কোট—টাই না—হয় খুলে ফেলতে পারত কিন্তু পেন্টুলুন তো আর খুলতে পারত না।
এখন চুপচাপ। বাইরে এবং গাড়ির ভিতরেও। স্প্রিং—এর সংকোচন—প্রসারণ ক্ষমতা বলতে গাড়িটার পেছনের সিটের স্প্রিং—এর কিছুমাত্রই নেই। চখার মনে হচ্ছে শালকাঠের তক্তার ওপরে বসেই চলেছে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে। রাস্তা যতই খারাপতরো হচ্ছে ততই ঘনঘন বিনা—নোটিসের HUMP আসছে আর মনে হচ্ছে তার টেইল—বোন গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল।
তবে এইসব অসুবিধে, সামনের মোড়ে গিয়ে পাইলট কোন পথ ধরবে, কোন দিকে গেলে পথ অপেক্ষাকৃত ভালো পাবে এবং দূরত্বও কম হবে, এইসব আলোচনাতে যখন ওর সহযাত্রীরা ব্যস্ত তখন চখা বহুযুগ আগে শেষবার যাওয়া ধুবড়ি—তামাহাটের স্মৃতিতে বিভোর হয়ে গেল।
অতীতের স্মৃতিমাত্রই মধুর। তিক্ততা যদি কিছুমাত্র থেকেও থাকে, সময়, বনমধ্যের ঝরনাতলায় ঝুড়িতে করে রেখে—দেওয়া বনফুল, খাম—আলুর তিক্ততারই মতন তা অবলীলায় ধুয়ে দিয়ে যায়। সময়ের মতন দুঃখহারী এবং তিক্ততাহারী উপাদান আর কিছুই নেই। কিছু মানুষ অবশ্য সংসারে চিরদিনই থাকেন যাঁরা তিক্ততাকে জিইয়ে রাখতে ভালোবাসেন, কোনো সৌন্দর্যের, কোনো মাধুর্যের সঙ্গেই তাঁদের সহবাস নেই। সেইসব মন্দভাগ্য নষ্ট মানুষদের কথা স্বতন্ত্র।
অনেকই বছর আগে ব্রহ্মপুত্রের তীরের যে ধুবড়ি শহরকে দেখেছিল, এতদিনে তার বোধহয় আমূল বদল হয়ে গেছে। ভাবছিল চখা। নেতা—ধোপানির ঘাট, ম্যাচ—ফ্যাক্টরি, উইমকো কোম্পানির, স্টিমারঘাট, ছাতিয়ানতলাতে তার পিসেমশাই—এর দাদা পূর্ণ পিসেমশাই—এর নদীপারের বাড়ি। পিসেমশাই—এর দাদাদের মধ্যে একমাত্র পূর্ণ পিসেমশাই—এর গায়ের রঙই ছিল ফর্সা। ঝন্টুরা সবাই ওঁকে ডাকত ধলাকাকা বলে। তাঁর দাদা সুরেন মিত্র। তাঁদের একজনের আট মেয়ে এক ছেলে, অন্য জনের আট ছেলে এক মেয়ে। তখনকার দিনে অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারেই আট—দশ সন্তান স্বাভাবিক ছিল।
তামাহাট থেকে ধুবড়ি যেতে গৌরীপুর পড়ত পথে। কুমারগঞ্জ। কুমারগঞ্জের প্রায় উলটোদিকে আলোকঝারি, রাঙামাটি পাহাড়, পর্বতজুয়ার।
আলোকঝারি নামটি উচ্চারিত হলেই যেন মনের চোখের সামনে অদেখা ঝরনার এক চিত্রগল্প ফুটে উঠত। আলোকঝারি পাহাড়ে প্রতি বছরই সাতই বোশেখে সাতবোশেখির মেলা বসত। এই নিম্ন আসামের বৈশাখ মাসের বন—পাহাড়ের রূপের কথা ভাবলে চখা এখনও আচ্ছন্ন বোধ করে। পর্ণমোচী গাছেদের পত্রশূন্য ডালে ডালে বসন্তের শিমুলগাছের ফুলের মতন সোনালি লাল মুরগি ফুটে থাকত। কালো প্রস্তরাকীর্ণ পাহাড়ি ঝরনার শুকনো সাদা বুকে কবুতর বলি দিয়ে ডিঙ্গডিঙ্গার মরনাই চা—বাগানের সাঁওতাল কুলি—কামিনেরা বনদেওতাকে পুজো দিত। গোঁসাইগঞ্জ, ফকিরাগাঁও, মটরঝাড়, গোলোকগঞ্জ, গৌরীপুর, বক্সির হাট, ডিঙ্গডিঙ্গা এবং তামাহাট থেকে তো অবশ্যই, মেয়ে—পুরুষ গোরুর গাড়িতে করে পাহাড়ি পথ বেয়ে এই জঙ্গলের গভীরের মেলাতে আসতেন। পেছন পেছন আসত সাদা কালো বাদামি গৃহপালিত কুকুরেরা।
মেলা ভাঙতে ভাঙতে রাত নামত। প্রজাপতি উড়ত নানা—রঙা। ঝাঁকে ঝাঁকে। কোনো কিশোরীর গায়ে বসলে অন্যরা চেঁচিয়ে উঠত, 'এবার তর বিয়া হইব রে।'
বিয়ে ব্যাপারটা যে কী তা না জেনেই উত্তেজনা আর লজ্জাতে সেই কিশোরীর গাল আর কান লাল হয়ে যেত।
শুক্লপক্ষের ফুটফুটে জ্যোৎস্না মাড়িয়ে, চাকায় চাকায়, পায়ে পায়ে আমাদের এই বড় সুন্দর দেশের মিষ্টি—গন্ধ উড়িয়ে বলদেরা গাড়িগুলো টেনে ফিরে যেত যার যার গন্তব্য। ঐ ডাইনি জ্যোৎস্নায় যেন ছাইওয়ালা গাড়িগুলো ভেসে ভেসে চলত। বলদদের পাগুলো যেন শূন্যেই পড়ত মনে হত।
মরনাই চা—বাগানের ম্যানেজারের, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের, ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী ও মেয়েরা চাঁদের বনে 'আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে' কোরাসে গাইতে গাইতে হেলা—দোলা গোরুর গাড়ির ছইয়ের নিচে পোয়ালের উপরে শতরঞ্চি বিছোনো নরম গদিতে বসে বাড়ি ফিরতেন। গোরুর গাড়ির মাথার উপরে ধরধবে সাদা লক্ষ্মী প্যাঁচা ঘুরে ঘুরে উড়তে উড়তে কিছু পথ গিয়ে চাঁদের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে—ওঠা পর্ণমোচী বনের গভীরে অদৃশ্য হয়ে যেত।
মেয়েরা কলকল করে উঠত, 'দেখেছি।'
কেউ বলতে, 'ইসস, আমি দেখতে পেলাম না যে!'
এইসব ভাবতে ভাবতে ঘোর লেগে গেছিল চখার। কত যে ছবির পরে ছবি, একের পর এক মনের পর্দাতে ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে যাচ্ছিল।
গৌরীপুরের বড়ুয়া রাজারা ছিলেন বিখ্যাত। প্রমথেশ বড়ুয়া সেই পরিবারের। তাঁর ছোট ভাই প্রকৃতীশচন্দ্র বড়ুয়া, ডাকনাম লালজী, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাতি—বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। শোনপুরের মেলাতে যেবারে উনি যেতেন, লালজীকে না দেখিয়ে কেউই হাতি কিনতেন না। হাতির মুখ—চোখ, দাঁত, পায়ের নখ, শুঁড়, লেজ দেখে, আগেকার দিনের শাশুড়ি ঠাকরুণরা যেমন করে পুত্রবধূ নির্বাচন করতেন, প্রায় সেই প্রক্রিয়াতেই হাতি নির্বাচন করে দিতেন চেনা—জানা হাতির খরিদ্দারদের।
সকলেই তাঁকে বলতেন ''রাজা'' অথবা ''বাবা''। যৌবনে অত্যন্ত ভালো শিকারিও ছিলেন তিনি। পরবর্তী জীবনে শিকার আর করতেন না। খেদা করে হাতি ধরতেন। শেষ জীবনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুরোধে তিস্তা উপত্যকায়, ডুয়ার্সের বিভিন্ন জায়গাতে ক্যাম্প করে থাকতেন তাঁর নিজের শিক্ষিত মস্ত এক 'গণেশ' এবং এক কুনকি নিয়ে। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে গোরুমারার অভয়ারণ্যের কাছের মূর্তী নদীর বিট—অফিসারের বাংলোতে তাঁর সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল চখার। ভারী জিন্দা—দিল, রসিক এবং মন—মৌজী মানুষ ছিলেন তিনি। চোদ্দোটি ভাষা জানতেন।
বড়ুয়া পরিবারের SUMMER PALACE ছিল মাটিয়াবাগ। গৌরীপুরেই। একটি টিলার উপরে। মাটিয়াবাগ প্যালেসেরই সামনে প্রমথেশ এবং লালজীর প্রিয় হাতি প্রতাপ সিং—এর কবর আছে। ANTHRAX রোগে মারা গেছিল প্রতাপ সিং। আগের প্রজন্মের যেসব মানুষ প্রমথেশ বড়ুয়ার 'মুক্তি' ছবিটি দেখেছিলেন, তাঁরা জানেন প্রমথেশ বড়ুয়া, অমর মল্লিক, কাননবালা, পঙ্কজকুমার মল্লিক ছিলেন সেই ছবিতে। কাননদেবী ও পঙ্কজবাবুর গানও ছিল—''দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পরা ঐ ছায়া।'' তখন নায়ক—নায়িকারা নিজেরাই গাইতেন। তাঁরা সেই ছবিতে জং বাহাদুর হাতিকেও অবশ্যই দেখে থাকবেন। ঐ পাহাড়ের মতন হাতিটিই প্রতাপ সিং।
গৌরীপুরে চৈত্র—সংক্রান্তির দিনে রাণু—বৌদির হাতে বানানো কাঁচা আমপোড়া শরবত খেয়েছিল চখা, কাগজি—লেবু গাছের পাতা ও পোড়া শুকনো লংকা দেওয়া। আহা। সেই স্বাদ যেন মুখে লেগে আছে। অথচ রাণু—বৌদি যে কার স্ত্রী, তাঁদের বাড়িটা যে গৌরীপুরের ঠিক কোথায় ছিল এবং কার সঙ্গে যে গেছিল সেখানে ও, সে—কথাটাই আজ আর মনে নেই। কিন্তু চমৎকার ফিগারের কুচকুচে কালো অসাধারণ দুটি চোখসম্পন্ন কাল—কেউটের মতন এক বিনুনি করা একটি সাদা ব্লাউজের সঙ্গে সাদা—কালো খড়কে ডুরে শাড়ি—পরা, এবং গলাতে মটর—মালা পরা রাণু—বৌদিকে চখা আজও এক হাজার নারীর মধ্যে থেকে খুঁজে বের করতে পারবে। সুযোগ পেলে।
হাতঘড়িটা দেশলাই জ্বেলে দেখে প্রান্তিক স্বগতোক্তি করল, তামাহাটে পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে নয়টা বাজব অনে।
কইস কী তুই!
গাড়ির মালিক বললেন।
তার আগেই পৌঁছাইয়া যামুনে।
তর মাথাডা গ্যাছে এক্কেরে। এখনও ত কুচবিহারই আস্যে নাই।
তাই ত! আমি ঘুমাইয়া পড়ছিলাম। খাওয়াডা একটু বেশি হইয়া গেছিল শ্যাষ বেলায়।
তারপরই বলল, তবে আর কি। কমপক্ষে এগারোটা বাজব।
ঘোর ভেঙে, সুন্দর স্বপ্ন—রাজ্য ছেড়ে চখা বলল, বলেন কী? আমার আশি বছরের বৃদ্ধা পিসিমা অপেক্ষা করে থাকবেন আমার জন্যে। আরও অনেকেই। এগারোটা তো গ্রাম—গঞ্জে অনেকই রাত।
হে ত ঠিকই কথা।
তবে?
কী করন যাইব কয়েন। আপনে ট্রেনে আইলে সকালে নিউ কুচবিহারে নাইম্যা ভাত খাওনের আগেই তামাহাট পৌঁছাইয়া যাইতে পারতেন।
হ। তরে কইছে!
পাইলট বলল।
ক্যান?
কুন গ্যারান্টিডা আছে টেরেনের? কাইলই ত আট ঘণ্টা ল্যাট আসছে।
আট ঘণ্টা! কইস কী তুই! ওরে ফফাদার!
ঠিকই কইতাছি।
চখা বলল, কী প্রান্তিক? পথের বাঁ দিকে যে শ'য়ে শ'য়ে ট্রাক দাঁড়ানো লাইন করে। ব্যাপারটা কী?
বর্ডার না! বাংলাদ্যাশে যাইব ঐসব ট্রাকগুলান। তাই খাড়াইয়া আছে। শ'য়ে শ'য়ে কী কন স্যার, হাজারেরও বেশি হইব।
তাহলে এদিক দিয়ে এলে কেন?
রাস্তাডা ভালো। হেইর লইগ্যা। অন্য রাস্তাত গ্যালে আপনার পিছনের হাড্ডিগুলান একখানও আস্ত থাকনের কথা আছিল না।
চখা বিরক্ত গলাতে বলল, যেন এই রাস্তাতে এসেও আস্ত আছে! একে সরু রাস্তা; তায় একটা পাশ তো ট্রাকের লাইনেই ভর্তি, বাকি পথ দিয়ে কি আপ—ডাউনের ট্রাক—বাস চলতে পারে?
সে আর কী হইব। আমাগো আসামের কথাডা ভাবে কেডায়? উলফাদের মতন আমাগোও একটা দল করন লাগব। অনুনয়, বিনয়, কোর্ট—কাছারি কইর‍্যা, ভোট দিয়া কিসস্যুই হইল না। হে মাও ডে জং—এ কইছিল না? সমস্ত শক্তির উৎসই হইতাছে বন্দুকের নল। ঠিকোই কথা!
চখা মুখে চুপ করে থাকলেও মনে মনে ভাবল যে, কথাটা বোধহয় ঠিকই। কোনো ব্যাপারেই আর কিছুতেই কিছু হবার নয়। দেশের সামনে বড়ই দুর্দিন।
তারপর নিজের হাতঘড়ির রেডিয়াম—দেওয়া কাঁটার দিকে চেয়ে ভাবল, এখন মোটে সাতটা। বাগডোগরা থেকে চার ঘণ্টা হল বেরিয়েছে। আরও চার ঘণ্টা!
আবারও চোখ বন্ধ করে চখা বহুবছর পেছনে ফিরে গেল।
গঞ্জের নাম তামাহাট তামা নদীরই জন্যে। নদীটা হেজে—মজে গেছে অনেক দিন হল। এসে পড়েছে গঙ্গাধরে। গঙ্গাধর নদী আসলে সংকোশ। ভুটানের হিমালয় থেকে বেরিয়েছে। ভুটান, আসাম আর পশ্চিমবঙ্গের সীমানাতে যমদুয়ার বলে একটা জায়গা আছে। চখা গেছিলও সেখানে একবার পিসেমশাই আর রতু জেঠুর সঙ্গে রতু জেঠুর টি মডেল ফোর্ড গাড়ি চড়ে। কী নিশ্ছিদ্র বন! কী সব শাল গাছ! পাঁচ—সাত জন প্রমাণ সাইজের মানুষও বেড় দিতে পারবে না তাদের গুঁড়ির—দুহাত প্রসারিত করেও। এমনই মোটা গুঁড়ি। প্রথম শাখাই বেরিয়েছে পাঁচ—ছ'হাত বা আরও উপর থেকে। দোতলা কাঠের বাংলো ছিল বনবিভাগের। উত্তর বাংলা ও আসামের বন—বাংলোই দোতলা। হাতিরই কারণে।
যমদুয়ার—এর বন—বাংলোর সামনে দিয়ে বয়ে গেছে সংকোশ নদী। মানাস অভয়ারণ্যর মানাস নদীর মতন অত বড় আর সুন্দর না হলেও সংকোশ রূপসী অবশ্যই। আর কোন জানোয়ার ছিল না সেখানে! হাতি, বাঘ, বুনো মোষ, চিতা, হরিণ, কতরকমের পাখি। 'ঘরেয়া' নামের একরকমের মাছ পাওয়া যেত এই নদীতে। নাকি শুধুমাত্র এই নদীতেই! ছোট মাছ। মানে, খুব বড় হলে সোয়া কেজি মতন। কালো রঙ। কিন্তু কী তেল তাতে! অমন স্বাদু মাছ বড় একটা খায়নি চখা। ধুবড়িতে ব্রহ্মপুত্রের চিতল আর মহাশোলও খেয়েছে। কী পেটি! আধ হাত চওড়া। আর মুইঠ্যাও।
ভুটান থেকে তখন শীতকালে কমলালেবু আসত ঝুড়ি ঝুড়ি। তখন তো সর্বত্রই পথ আর যানবাহন মানুষের অগ্রগতির নামে তার শান্তিকে এমন বিঘ্নিত করেনি। কমলালেবু ঝুড়িতে করে নিয়ে আসত ভুটানি মেয়েরা। তারপর গোরুর গাড়িতে করে আসত তামাহাটে। তামাহাটে কী না পাওয়া যেত তখন!
গঙ্গাধর নদী গিয়ে পড়েছে বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে। সেখানে অন্য নাম হয়েছে কিনা বলতে পারব না। সিরাজগঞ্জ থেকে দেশভাগের আগে বড় বড় মহাজনি নৌকা করে পাট আসত। পাটের জন্যেই তামাহাটের রমরমা ছিল। প্রায় প্রত্যেক বাড়ির বার—বাড়িতে একটি করে গদিঘর, তার পেছনে গুদামঘর, তারও পরে নিভৃতিতে ভিতর—বাড়ি। অর্থাৎ অন্দরমহল। পাট কাচা হয়ে গেলে পাট গাঁট বেঁধে তোলা থাকত গদিঘরে। ব্লন্ড, ব্রুনেট, কতরকমের মেমসাহেবদের চুলের মতন সেইসব পাটের রঙ ছিল। মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ বেরোত। গুদামঘরের পাশ দিয়ে যাতায়াতের সময়ে ঐ গন্ধ নাকে আসতই।
অনেক উদবেড়াল ছিল গঙ্গাধর নদীতে। কড়িদা আর আবু ছাত্তারের সঙ্গে চখা শিকারে যেত চখা চক্রবর্তী, পূর্ণ জেঠার বন্দুক নিয়ে? আর সারা দুপুর উদবেড়ালদের খেলা দেখত। নদীর পাড়—এর অনেক উপর থেকে জলে ঝাঁপ দিত তারা তাদের পাড়ের বালির মধ্যের বাসা থেকে। তারপর কখনও মুখে মাছ নিয়ে, কখনও—বা খালি মুখে আশ্চর্য ক্ষিপ্রতাতে জল ছেড়ে ভিজে, মসৃণ চকচকে শরীর নিয়ে উঠে যেত তাদের ঘরের দিকে খাড়া পাড় বেয়ে।
সোনালি চখা—চখী ডাকত গম্ভীর স্বরে লম্বা গলা তুলে ক্কোঁয়াক ক্কোঁয়াক করে নিস্তব্ধ দুপুরে। জলের উপরে তাদের ডাক দৌড়ে যেত অনেকদূর। বালির সঙ্গে হাওয়া খেলা করত সহস্র হাতে। বালুবেলাতে শিশুরা যেমন খেলে। বালির উপরে কত কী গড়ে তুলতে সেই সৃজনশীল এবং খামখেয়ালি হাওয়া। পরমুহূর্তে ভেঙেও ফেলত। কত আঁকিবুকি, ডিজাইন বালির উপরে। শুশুক ভেসে উঠত নৌকার পাশে হুসস করে। জলের ফোয়ারা তুলে শ্বাস নিয়ে আবার ডুবে যেত। নানা—রঙা মাছরাঙারা যেন কী সর্বনাশ হল তাদের, এমন করে বুকে চমক—তোলা ডাক ডেকে জলের সাদা, বালির সাদা, রোদের হলুদ এবং তাদের রঙ্গিবিরঙ্গি কর্বুর ডানাতে রঙ ছড়িয়ে—ছিটিয়ে একাকার করে দিত। মাঝিরা দাঁড় ফেলত আর দাঁড় ওঠাত। ছপছপ শব্দ হত বিলম্বিত লয়ে। একই ছন্দে। ক্যাঁচোর—ক্যাঁচোর শব্দের পরেই একবার ঘটাং করে শব্দ হত। ঠোকাঠুকি হত নৌকার সঙ্গে দাঁড়ের কাঠের। বুড়ো মাঝি দু—হাতে হুঁকো ধরে বসে থাকত হাল পা দিয়ে ধরে। নৌকা চলত কোনো বিশেষ গন্তব্যহীন জলপথে, শীতের মিষ্টি দুপুরে।
কী নিস্তরঙ্গ, শ্লথগতি, লোভ আর জাগতিক উচ্চাশাহীন ছিল সেইসব দিন। মানুষ বড়লোক ছিল না, কিন্তু সুখী ছিল। কত সামান্যতেই যে পরম সুখে হেসে—খেলে একটি জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়, তখন তা জানত গ্রাম—গঞ্জের মানুষ, তামাহাটের, ডিঙ্গডিঙ্গার, কুমারগঞ্জের, পাগলাহাটের, গৌরীপুরের এবং ধুবড়িরও। সত্যিই জানত।
টি.ভি. ছিল না, লাগাতার বিজ্ঞাপন সব মানুষেরই মনে হাজারো মিথ্যা প্রয়োজনের বোধ জন্মে দিয়ে তার মনের শান্তি এমন করে পুরোপুরি নষ্ট করেনি। আত্মীয় বা প্রতিবেশীর ভালোতে তখন মানুষ খুশি হত, মানুষের মধ্যে ন্যায়—অন্যায় ভালো—মন্দর বোধ ছিল। ঈশ্বর নামক কোনো এক আপাত—অলীক শক্তির অস্তিত্ব তাদের প্রত্যেককেই সততা এবং ন্যায়ের পথে চালিত করত।
কে জানে! অনেকগুলো বছর পরে তামাহাটে, ডিঙ্গডিঙ্গায়, কুমারগঞ্জে, গৌরীপুরে অথবা ধুবড়িতে গিয়ে কী দেখবে চখা?
ধুবড়ির বইমেলা উদ্বোধন করতে এসে ও কি ভুল করল?
ভাবছিল ও।
ঘুম ভাঙল হাঁসা—হাঁসির প্যাঁকপ্যাঁকানিতে। কানের কাছে যেন তাদের নিশ্বাসও শুনতে পেল চখা। কত যুগ পরে।
মনে পড়ে গেল, সে নিজে যখন শিশু ছিল এবং রংপুরের পাঠশালাতে পড়ত, সেই সব দিনে ঘরের টিনের দেওয়ালের ফুটো—ফাটা দিয়ে সকালের আলোর রেশ আসামাত্রই চখা ঘরের দরজা খুলে দৌড়ে গিয়ে হাঁসেদের ঘরের দরজা খুলে দিত। তারপর চোখ—মুখ না ধুয়েই হাঁসেদের পেছন পেছন হরিসভার পুকুর অবধি দৌড়ে যেত।
হাঁসেদের মতন সমস্ত শরীরে আন্দোলন তুলে কোনো পাখি বা প্রাণীই চলে না। তাদের দুই পা, পেট, পিঠ, বুক, গলা, ঠোঁট সবই যেন ওদের হেলতে—দুলতে দৌড়ে যাওয়াতে পুরোপুরি শামিল হয়ে যায়।
হরিসভার পুকুরপাড়ে পৌঁছে ওরা যখন এক এক করে উড়ে গিয়ে পুকুরের মধ্যে ঝপাং ঝপাং করে পড়ত চারদিকে জল—উপছিয়ে দিয়ে, তখন ভারী মজা পেত চখা। জলের গন্ধ, পুকুরের চারপাশ থেকে ঝুঁকে পড়ে পুকুরে মুখ—দেখা নানান গাছ—গাছালির গায়ের প্রভাতি গন্ধ, শিশিরের গন্ধ, শামুক আর টাকা—কেন্নোর গায়ের গন্ধ, ঘাসফুলের গন্ধ, হাঁসেদের গায়ের আঁশটে গন্ধর সঙ্গে মাখামাখি হয়ে যেত তখন। মুগ্ধ চোখে, মুগ্ধ কানে এবং মুগ্ধ নাকে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকত চখা হাঁসেদের দিকে চেয়ে।
হাঁসেরা মাটির উপরে দৌড়ে যাওয়ার সময়ে তাদের দৌড়ের রকম এক আর তারা যখন জলে চলে তখন একেবারেই অন্য। হিরে যেমন করে কাচ কাটে, হাঁসও তেমন করে জলের নিস্তরঙ্গ কাচ কেটে দু—টুকরো করে। তাদের দু—পাশে দুটি ঢেউ উঠে ক্রমশই ছড়িয়ে যেতে থাকে পেছনে আর তারা নিষ্কম্প শরীরে গ্রীবা তুলে যেন মন্ত্রবলে অবহেলে এগিয়ে যায় জলের মধ্যে। তাদের শরীর দেখে বোঝা পর্যন্ত যায় না যে, তাদের পা দুটি জলের নিচে আন্দোলিত হচ্ছে। তাদের সাঁতার কেটে এগিয়ে যাওয়া দেখে ছেলেবেলা থেকে 'অবলীলায়' শব্দটির মানে প্রাঞ্জল হয়েছে চখার কাছে।
পিসিমা ঘরে এলেন।
বললেন, এলি কখন কাল? আমি তো ঘুমিয়েই পড়েছিলাম।
ভালোই করেছিলেন। এগারোটাতে।
রাতে খেলি কী?
কিছুই খাইনি। ঝন্টু আর কসমিক এবং ঝন্টুর শালা শক্তি আর শালাজ দেবীও অনেক সাধাসাধি করেছিল। কিন্তু অত রাতে কিছু খেতে ইচ্ছে করেনি।
পিসিমাকে আর বলল না যে, কুচবিহার শহরে একবার থেমেছিল পথে পাঁচ মিনিটের জন্যে। চখার প্রথম যৌবনের প্রিয়পাত্রী শেলী যে শহরে থাকে। যাকে সে শেষবার দেখেছিল অনেকই বছর আগে এবং যাকে এ—জীবনে আর কখনও দেখতে চায় না। দেখতে এইজন্যেই চায় না যে, মনের চোখে ও মস্তিষ্কের মধ্যে গন্ধরাজ আর রঙ্গনের ঝড়ের সামনে দাঁড়িয়ে—থাকা বারো বছরের ছিপছিপে, কালো, লজ্জারাঙা শেলীর স্থিরচিত্রটি অস্থির হয়ে যাবে যে শুধু তাই নয়, ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। টুকরো হয়ে গেলে আজকের কোনো অ্যারলডাইট দিয়েই সেই ছবিকে যে আর জোড়া দেওয়া যাবে না। তাই।
অনেক কষ্ট থাকে, যা গভীর আনন্দর উৎস হয়ে আজীবন কোনো মানুষের বুকের মধ্যে ম্যাগনোলিয়া গ্রান্ডিফ্লোরার ঝাড় হয়ে ফুটে থাকে।
না। কুচবিহার শহরে থেমেছিল কিছু খাবার জন্যে নয়। দীর্ঘ যাত্রার শারীরিক ক্লান্তি, অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষাজনিত এবং তামাহাটে অনেকই বছর পরে প্রত্যাগমনের উত্তেজনাতে অস্থির হয়ে একটি রয়্যাল—চ্যালেঞ্জের বোতল কিনে মিনারেল ওয়াটারের বোতলে মিশিয়ে খেতে খেতে এসেছিল পথে, নিজেকে উজ্জীবিত করার জন্যে। সঙ্গীদেরও দিয়েছিল। স্বার্থপর নয় সে। তাছাড়া এক যাত্রায় পৃথক ফলে বিশ্বাসও করেনি কোনোদিন।
রাতে বেশ ঠান্ডা ছিল। লেপ গায়ে শুয়ে বেশ আরামই লেগেছিল।
দু—কাপ চা খাওয়ার পরে বিছানাতে শুয়ে একটু আলসেমি করল।
শুনতে পেল, পাকঘরের বারান্দাতে কলকণ্ঠের কনফারেন্স বসেছে, কী দিয়ে এবং কেমন করে চখার এত বছর পরে তামাহাটে আসাটাকে খাওয়ার মাধ্যমে স্মরণীয় করে রাখা যায়?
পিসিমা বললেন, ফেনাভাত খাবি তো?
চখার মনে পড়ে গেল রংপুরে তো ব্রেকফাস্ট বলতে ফেনাভাতই বোঝাত। নিজেদের খেতের চালের সুগন্ধি ভাত। নানা তরকারি সেদ্ধ দিয়ে আর হাঁসের ডিম সেদ্ধ। কলকাতাতে চাইলেও ফেনাভাত এখন পাই কোথায়? কলকাতা তো এখন অ্যামেরিকা হয়ে গেছে। ব্রেকফাস্ট মানেই সিরিয়ালস আর ফ্যাট—ফ্রি স্কিমড—মিল্ক। সেই সিরিয়ালস—এর মধ্যে আবার মুড়ি—চিঁড়ে পড়ে না। দুর্মূল্য প্যাক—এ বিদেশি কোলাবরেশানে তৈরি হওয়া নামী—দামি কোম্পানির সিরিয়ালস। গরম দুধে খই কী মুড়ি বা চিঁড়ে—কলা দিয়ে মেখে খাওয়ার গভীর দিশি আনন্দ থেকে অধুনা কলকাতার ইংরেজ—তাড়ানোর পরে সাহেব—হওয়া বাঙালিরা পুরোপুরিই বঞ্চিত হয়েছে।
চখা বলল, তাই খাব। ফেনাভাত।
তারপর চান করে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল। বাথরুমে বালতি করে গরম জল দিয়েছিল ঝন্টুর ভার্সেটাইল বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন ড্রাইভার পান্ডে।
চখা তামাহাটে আসবে আসবে বলে ভয় দেখাচ্ছিল বহুবছর হল, তাই ঝন্টু বছর পাঁচেক আগেই একটি বাথরুমে কমোড লাগিয়েছিল। যদিও কোনো প্রয়োজন ছিল না তার।
অনেক সাহেব—সুবোর সঙ্গে অদ্যাবধি মিশেও চখা এখনও আদৌ সাহেব হয়ে উঠতে পারেনি। কলকাতার প্রচুর পাতি—বাঙালিদের সাহেব হয়ে ওঠার চেষ্টাতে নিরন্তর প্রাণপণ দাঁত—কড়মড় প্রতিযোগিতাতে লিপ্ত দেখে নিজে সাহেব হওয়ার বিন্দুমাত্র বাসনাই আর পোষণ করে না ও। কারণ ও জানে, পাতিহাঁসেরা পাতিহাঁসই থাকে। কখনোই রাজহাঁস হয়ে ওঠে না তারা।
সকলে রোদে পাশাপাশি বসে বাড়ির গোরুর গাওয়া—ঘি দিয়ে পালংশাক, সিম ও আলুসেদ্ধ দেওয়া ফেনাভাত, গোটা চারেক হাঁসের ডিম সেদ্ধ দিয়ে জম্পেস করে সকালের খাওয়া সারার পরে ঝন্টু বলল, চলো চখাদা, কোথায় যাবে? বিকেলে তো আবার ধুবড়ি থেকে বর নিতে আসবেন ওঁরা। সাতটার সময়ে।
ওঁরা মানে?
'সবুজের আসরের' উদ্যোক্তারা—যাঁরা প্রথম বইমেলা করছেন। তুমি তো তাঁদেরই নিমন্ত্রণে আর খরচে এসেছ। না কি?
আর কাকে কাকে বলেছেন ওঁরা? মানে, কবি—সাহিত্যিক?
চখা জিজ্ঞেস করল।
ঝন্টু বলল, শুনেছিলাম অমিয়ভূষণ মজুমদারকে বলেছিলেন। তবে তিনি নাকি শারীরিক কারণে আসতে পারছেন না। নিমাই ভট্টাচার্যকেও নাকি বলেছেন।
তুই, জানলি কী করে?
ধুবড়ির ছাতিয়ানতলার বাড়িতে ফোন করেছিলাম। আমার জ্যাঠতুতো ভাই রাজার স্ত্রী রুবী বলল।
করে কী রাজা?
স্টেট ব্যাঙ্কে কাজ করে।
বাবাঃ। রাজারও বউ। কত ছোট ছিল।
তা কী হবে। রাজারই যদি রানি না থাকে তো, থাকবে কার?
ঝন্টু বলল।
তা ঠিক।
চখা বলল।
চখা তারপরে বলল, এইরকম স্ট্র্যাটেজিক ভুল কেউ করে। ধুবড়ির ''সবুজের আসরের'' কর্তাদের যদি বুদ্ধি থাকত তবে আমার আর নিমাইদার মতন ফালতু লেখককে ওঁরা নেমন্তন্ন করতেন না।
'ফালতু' বলছ কেন?
বড় কাগজে যাঁরা চাকরি না করেন বা যাঁরা তাঁদের পেটোয়া নন, সেই সব লেখক, গায়ক শিল্পী, খেলোয়াড় সকলেই তো ফালতু।
তাই কি হয় নাকি?
এমন সময় দাতু, চানু আর চোগা এসে হাজির। দাতু বলল, মায়ে পাঠাইয়া দিল, আমাগো বাসায় চলো আগে।
চল। নিশ্চয়ই যাব।
চখা বলল।
দাতু, বৈদ্যকাকুর ছেলে। বৈদ্য দত্ত। মাতৃপিতৃহীন স্বল্পবিত্ত সদাহাস্যময় পুরুষ ছিলেন। পরোপকারী, দাবিদাওয়াহীন। শত অপমানেও নিরুত্তর। এক আশ্চর্য চরিত্র ছিলেন তিনি। কুচকুচে কালো গায়ের রঙ। বড় বড় লাল চোখ। অথচ নেশা—ভাং করতেন না। কাটা—কাটা চোখ—মুখ।
সেই চখা—প্রিয় বৈদ্যকাকুর সঙ্গেই বিয়ে হল রংপুরের রাজপিসির বা অনু বোস—এর। দেশভাগের বছরই। রংপুরে হল বিয়ে। আর বিয়ের পরদিনই রংপুর থেকে তামাহাটে এসে বর কনের ফুলশয্যা হল। গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়েছিল ছবিদিরা ফুল—লতাপাতা—তোলা রেশমি বেডশিটের উপরে। পরিষ্কার মনে আছে চখার। রাঙাপিসির মতন সরল ভালোমানুষ প্যাঁচঘোঁচহীন গ্রাম্য মেয়েও তখনকার দিনে কমই ছিল।
আজ বৈদ্যকাকু নেই। অনেকেই নেই, যাঁরা তখন ছিলেন। মনে মনে নিজেকে অভিসম্পাত দিচ্ছিলেন চখা এত বছর পরে তামাহাটে আসাতে। কোনো জায়গাতেই এত বছর পরে আর কখনোই ফিরে যেতে নেই বোধহয়।
একবার ওর মনে হল, এসে আদৌ ভালো করেনি এখানে এবং মনে হল ধুবড়িতে গিয়েও বোধহয় ঠিক এমনই মনে হবে।
পায়ে হেঁটেই গেল দাতুর সঙ্গে বৈদ্যকাকুর বাড়িতে।
রাঙাপিসির চুল পেকে গেছে, দাঁত পড়ে গেছে। যে জমিতে একটিমাত্র ঘর ছিল আর একটু দূরে রান্নাঘর, সেইখানেই অনেক ঘর হয়েছে। মাঝে উঠোন। পাশেই হাস্কিং মেশিন চলছে। তার পুপ পুপ পুপ পুপ শব্দ উঠছে গভীর রাতের খাপু পাখির ডাকের মতন অবিরাম। দাতুর বড়দিদি বুড়ুর বিয়ে হয়েছিল ধুবড়িতে। তার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল চখার কলকাতাতেই, ঢাকুরিয়ার বিভাপিসির ছেলের বিয়েতে।
তোর বর কোথায়?
একাই সেই বিয়ের রাতে বুড়ুকে জিজ্ঞেস করাতে বুড়ু দার্শনিকের মতন বলেছিল, ''ওমা! তুমি শোন নাই নাকি। সে তো কবেই পটল তুলছে।''
বাক্যটি মনে গেঁথেছিল। কুড়ির কোঠার কোনো মেয়ে স্বামীবিয়োগ যে সে এমন ফিলসফিকালি নিতে পারে, তা জেনে বুড়ুর প্রতি একধরনের শ্রদ্ধা জন্মে গেছিল চখার।
চখা ভাবছিল যে, প্রত্যেক মানুষের জন্মের মুহূর্তের মধ্যেই তার মৃত্যুও অবিসংবাদী হয়ে নিহিত থাকে। আমরা শুধু জানি না সেই মূহূর্ত কখন আসবে। অথচ সেই বিদায়ক্ষণ নিয়ে চখার মতন সাধারণ মানুষদের কম নাটুকেপনা নেই। সেই ক্ষণকে বিলম্বিত করার লজ্জাকর চেষ্টারও কোনো বিরাম নেই। চখার মতন মানুষের এবং অতি সাধারণ সব পশু—পাখি কীটপতঙ্গেরই মতন বেশিদিন বাঁচার ইচ্ছার এই লজ্জাকর মানসিকতা ওকে সত্যিই পীড়িত করে। জন্মেরই মতন সহজে মৃত্যুকে নিতে যে পারে না কেন মানুষে, সেকথা ভেবে আশ্চর্য হয় ও।
দাতুর বৌ কলকাতার মেয়ে। এখানে এই গণ্ডগ্রামে থাকতে চায় না। দাতু, হাতে চামড়ার একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে ঘুরে ঠিকাদারি করে এখানে—ওখানে। দাতুর পরের ভাই, তার নাম ভুলে গেছে চখা, কুড়ির কোঠাতে থাকতেই বেশি পরিমাণে দিশি মদ খেয়ে সুন্দরী বৌকে বিধবা করে পরপারে চলে গেছে।
বৌটিকে ভালো লাগল চখার।
রাঙাপিসি বললেন, আরে মাইনষে খায়, খায়, একটু মাইপ্যা—জুইপ্যা খা। তা নয়। বৌটারে ভাসাইয়া থুইয়া গেল।
বৌ ডানাকাটা পরি নয় কিন্তু এক বিষাদমলিন সৌন্দর্য আছে তার। তাছাড়া, যৌবনে সব মানুষই সুন্দর। যৌবন চলে গেছে, এই দুঃখময় সত্যকে হৃদয়ঙ্গম করে দুঃখ পেতে হয়।
চোখ দিয়ে কথা বলে সে মেয়ে। মুখে নীরব।
উঠোনের মস্ত কাঁঠালি চাঁপা গাছের নিচে তার হলুদ—কালো ডুরে শাড়ি—পরা চেহারাটি অনেকদিন চখার মনের চোখে ধরা থাকবে। সেই বৌটি প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। তার একটিই ছেলে। ভালো শিক্ষা দিয়েছে মনে হল ছেলেটিকে। সভ্য—ভব্য। বিধবা মায়ের ভবিষ্যৎ।
কিন্তু এই বয়সের সুন্দরী বিধবা যে কেন আবারও বিয়ে করে, যে জীবন তার কোনোরকম দোষ ব্যতিরেকেই উৎপাটিত হয়েছে, তাকে নতুন করে অন্য কোনো মাটিতে রোপণ করে নতুন করে বাঁচবে না তা চখা বুঝতে পারে না। অবশ্য সেই ইচ্ছা যদি তার থাকে।
এদেশে আজও অনেকই বিদ্যাসাগরের প্রয়োজন আছে।
মনে হল চখার।
আরও এক ছেলে আছে রাঙাপিসির। সেও ঠিকাদারি করে। তারই হাস্কিং মেশিন। তাকে দেখে মনে হয় ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট। এ যুগের উপযুক্ত। তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হল না। হয়তো বাড়িতে ছিল না।
প্রত্যেক মানুষের জীবনেই তার চরিত্রে পরিণতি আসার পরে রক্তের আত্মীয়তার থেকে আত্মার আত্মীয়তাই বড় হয়ে ওঠে। এর চেয়ে বড় সত্য আর নেই। যার মানসিক উন্নতির উচ্চতা যত বেশি, সেই অনুপাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত এবং সমমনস্ক মানুষেরা ছাড়া তার অন্যান্য রক্তের আত্মীয়রা যতই দিন যায়, ততই দূরে সরে যেতে থাকে। এর চেয়ে বড় দুঃখময় সত্য মানুষের জীবনে হয়তো সত্যিই বেশি নেই। যারা তথাকথিত ''পর'' তারাই দেখা যায় ধীরে ধীরে ''আপন'' হয়ে ওঠে আর আপনেরাই পর।
ঝন্টু বলল, এবারে যাবে নাকি বরবাধায়?
বরবাধার জঙ্গলে?
হ্যাঁ।
চল।
কিন্তু যাওয়ার আগে স্কুলে একটু ঘুরে যেতে হবে।
স্কুলে?
হ্যাঁ।
কেন?
তারপর সেই প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষা না করেই চখা বলল, বাচ্চুদের আর চানুদের বাড়ি একবার গেলে হত না?
বাচ্চুরা তো ধুবড়িতেই থাকে।
ওর বৌ? পাগু? সেই যে গান গাইত না একটা? ''যেন কার অভিশাপ লেগেছে মোর জীবনে।''
গানটার কথা আজও মনে আছে তোমার?
চখা বলল, আছে রে আছে। কিছু গান, কিছু কথা, মনের জমি যখন নরম থাকে তখন তাতে চেপে বসে যায়। সারাজীবন বসে থাকে।
ঝন্টু বলল, ওরা সকলেই ধুবড়িতেই থাকে। ওদের মেয়ে টুলটুলও থাকে। মেয়েটা সুন্দরী হয়েছে। সাজেও সুন্দর। টুলটুল খুব ভালো নাচে। সুন্দর ফিগার। ওদের এক কন্যা। জামাইও নানারকম বাজনা বাজায়। অর্কেস্ট্রা কনডাক্ট করে। ভালো ছেলে—স্বাস্থ্যবানও। দুজনের মধ্যে খুব ভাব—ভালোবাসা। দারুণ হ্যাপিলি ম্যারেড ওরা।
বাবাঃ! তুই তো অনেক বুঝিস আজকাল!
চখা বলল।
ঝন্টু বলল, বুঝি ঠিক না। তবে দাম্পত্যর রকম কি আর বাইরে থেকে বোঝা যায় বল? একের চোখে অন্যের দাম্পত্য হচ্ছে চিড়িয়াখানার খাঁচার মধ্যে শুয়ে—থাকা বাঘ। খাঁচার বাইরে বেরুলে তার কী রূপ সে শুধু SPOUSE—ই জানে একমাত্র।
ঝন্টু আরও বলল, দেখা হবে ওদের সকলেরই সঙ্গে ধুবড়ি গেলে। আর চানু মিঠু তো আসবেই দুপুরবেলাতে তোমার সঙ্গে দেখা করতে। আরও কত জনে আসবে। দেখো, ভেঙে পড়বে তামাহাট।
তাই? তবে তো চিন্তার কথা হল।
কেন?
আমি যে ইতিমধ্যেই আধভাঙা হয়ে গেছি। বাগডোগরা থেকে আসার পথেই আমার মেরুদণ্ড গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে। পরীক্ষা করালে কী যে বলবেন ডাক্তারেরা কে বলতে পারে।
ঝন্টু বলল, কলকাতার ডাক্তারদের কথা ছাড়ো। তাদের অধিকাংশরই উচিত ছিল নরকঙ্কালের ব্যবসা করে বড়লোক হওয়া। অধিকাংশই টাকা ছাড়া কিছুই বোঝে না। আমার পতু মামাকে কী করে মারল তারা!
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, নকশালদের আসার সময় আবার। ওঁরা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। গুলি করে মারা দরকার ওঁদের অনেককেই। এমনই বিবেকহীন অর্থগৃধ্ন হয়ে গেছেন অধিকাংশ ডাক্তারই।
কথাটা মিথ্যে বলিসনি। তবে ব্যতিক্রম এখনও আছে। ভাগ্যিস।
সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। এবারে চলো চখাদা। দুপুরে খেয়ে একটু জিরোবে তো? রাতে তো ঘুম হয়নি নতুন জায়গাতে!
তা ঘুমোব। তবে জায়গা তো নতুন নয়। কিন্তু বহু পরিচিত জায়গাতেও বহুদিন পরে এলে তা নতুন মনে হয় বইকি। দূর দেশে থাকার পর ফিরে এসে নিজের বৌকেও নতুন বলে মনে হয়। আর তামাহাটিকে তো নতুন মনে হবেই।
তারপরে চখা বলল, নদীর ধারেও একবার নিয়ে যাবি না? কাল আসবার সময়ে গঙ্গাধর নদীর কথাই ভাবতে ভাবতে আসছিলাম চোখ বুজে। সব কি খুব বদলে গেছে? আগের মতন কি কিছুই নেই?
চলো যাই। নিজের চোখেই দেখবে।
বাড়িতে ছোট শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে ঝন্টু প্রতি বছরই শিবরাত্রির সময়ে নাকি আসে তামাহাটে। সে ধানবাদেই থাকুক, কী ঘেটোটাঁড়ে, কী কলকাতার বরাহনগরে। পিসিমা থাকাকালীন অবশ্যই আসবে। পরের কথা শুধু ভবিষ্যৎই জানে! শহরে যে একবার সেঁধিয়েছে সে আর গ্রামে ফিরতেই চায় না। অথচ কেন যে, তা ভেবেই পায় না চখা।
নদীর পারে যেতে নৃপেন্দ্রমোহন মিত্র প্রাইমারি স্কুল এবং তিনকড়ি মিত্র হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলও পড়বে। স্কুলের মাস্টারমশাইরা ঈদের ছুটি থাকা সত্ত্বেও তুমি এসেছ শুনে স্কুলে অপেক্ষা করছেন তোমারই জন্যে স্কুল খুলে।
ঝন্টু বলল।
তাই?
হ্যাঁ।
দুটি স্কুলেই গেল ওরা। গাড়িতেই গেল। চখার পিসিমা প্রায় পঞ্চাশ বিঘা জমি দান করেছেন এই দুই স্কুলের জন্যে। খেলার মাঠও। তবে গঙ্গাধর প্রতি বছরেই খেলার মাঠকে খাবলে খাবলে খেয়ে যাচ্ছে অনেকখানি করে। নদী যদি গতি না বদলায় তবে বছর পঁচিশের মধ্যে সেকেন্ডারি স্কুলটি নদীর গর্ভে চলে যাবে।
হেডমাস্টারমশাই—এর ঘরে বসে নদী দেখতে পাচ্ছিল চখা। তবে নদীকে চেনা যায় না। এদিকেই চর ফেলেছে। বিস্তীর্ণ। এতদিন পরে এলে কোনো নদী বা নারীকে চিনতে না পারাটাই যে স্বাভাবিক সেকথা অবশ্য বোঝে চখা। অনেকই দিন পরে কোনো প্রিয় নদী অথবা নারীর কাছে যদি না এসে পারা যায়, তবে না আসাই ভালো। দুজনের পক্ষেই ভালো। সময়, সময়ে সময়ে আনন্দ যেমন দেয়, সময়ে সময়ে দুঃখও কম দেয় না।
রতু জেঠুর ছোট ছেলের স্ত্রী সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষিকা। সে আবার কবিও। কবি অবশ্য আজ হয়নি। যখন ক্লাস নাইনে পড়ে, তখনই ১৯৭৫—এ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। নাম নীলিমা। আগে সাহা ছিল এখন বিশ্বাস হয়েছে। তারপরে প্রেম করে বিয়ে। এবং তার পরে সাধারণত যা হয়, কবিতার ভরা নদীতে ভাঁটা পড়ে। তবে নীলিমার স্রোত এখনও আছে। তবে কোন দিকে চর ফেলেছে আর কোন দিকে ভাঁটা, এখনই বলা মুশকিল। তার বয়সও তো বেশি না। তিরতির করে জল বয় এখনও সেই কাব্যি—নদীতে। ভারী উচ্ছল মেয়ে নীলিমা। তার একখানি বই, ''বাস্তবের দর্পণ'' দিল চখাকে মতামতের জন্যে। এবং লিখিত মতামতের জন্যে।
বিপদে পড়ল চখা। প্রথমত ও কবি নয় বলে। দ্বিতীয়ত প্রতিদিন অপরিচিত এত কবি ও লেখক তাঁদের বই পাঠিয়ে মতামত চান যে, সময় করে ওঠা সত্যিই অসম্ভব। আরও বিপদ যে, ও মিথ্যাচারী নয়।
নীলিমা যেদিন নামী কবি হবে সেদিন এই কথা নিজেও বুঝবে। তাছাড়া, চখা চক্রবর্তী যেহেতু কবি নয়, কবিতা সম্বন্ধে মত সে দেবেই বা কেমন করে! নীলিমা মতামত চাইল বারংবার তার বইটি দিয়ে, চখার কাছ থেকে।
একটু ভেবে, চখা তাকে কবি দিব্যেন্দু পালিতের ঠিকানা দিয়ে দিল এবং তাঁর মতামতের জন্যে কাব্যসংকলনটির একটি কপিও পাঠিয়ে দিতে বলল কলকাতাতে। তিনি যদি তাঁর মূল্যবান মতামত দেন তাহলে এই তরুণী কবি বিশেষ উপকৃত হবে। সে এই কথা লিখতে বলল চিঠিতে।
তিনি কি খুব বড় কবি?
আমি নিজে তো কবি নই। কী করে বলি বল? তবে বড় কবিদের সঙ্গেই ওর ওঠা—বসা। তাছাড়া দিব্যেন্দু পালিতের কবিতার বই যখন আনন্দ পাবলিশার্স ও দে'জ পাবলিশিং থেকে বেরোয় তখন তিনি যে মস্ত কবি, সে—বিষয়ে কারোই কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়।
উনি যদি উত্তর না দেন?
ন্যায্য প্রশ্ন করল নীলিমা।
না—দেওয়াটাই স্বাভাবিক। বিখ্যাত কবি—সাহিত্যিকেরা প্রতি দিনে এত চিঠি ও বই পান যে, তাঁদের সকলেরই চিঠির উত্তর বা বইয়ের সম্বন্ধে মতামত দিতে হলে তাঁদের নিজেদের আর কোনো কাজই করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বিখ্যাতরাই জানেন একমাত্র তাঁদের সমস্যার কথা, অপারগতার কথা এবং দুঃখের কথা। তবে অমন ব্যস্ততার মধ্যেও কেউ কেউ দেনও উত্তর মাঝে মাঝে। সব চিঠির না হলেও কিছু চিঠির উত্তর অত্যন্ত কষ্ট করেও দেন।
দিব্যেন্দু পালিত তো শুধু কবি নন, তিনি তো গদ্যকারও।
প্রাণেশ বলল। চানুর বন্ধু।
অবশ্যই। এবং শুধু গদ্যকারই নন, তাঁর ছোট গল্প বিখ্যাত পত্রিকাতে আমরা প্রথম পড়েছি, যখন কলেজে পড়ি, তখন।
বাবাঃ! এত তো জানতাম না। ওঁর বয়স কত হবে? পঁচাত্তর?
নীলিমা বলল।
হেসে ফেলল চখা।
বলল, দিব্যেন্দু নিজে বলেন পঞ্চাশ। আমার মনে হয় আরও কম। দিব্যেন্দু পালিতও আনন্দবাজারের মস্ত অফিসার। উনি কাজ করেননি এমন খবরের কাগজ ও বিজ্ঞাপন কোম্পানি কলকাতায় খুব বেশি নেই। খুব ভাবনা—চিন্তাও করেন। রীতিমতো চিন্তাবিদ বিদগ্ধ মানুষ। তাঁর হাঁটা—চলা, কথা বলা, দাঁড়ানো সবকিছুর মধ্যেই এই বৈদগ্ধ্য ফুটে ওঠে। নিজের ভাষা সম্বন্ধে অত্যন্তই সচেতন। উনি আর কারও মতনই লেখেন না বাংলা। ওঁর বাংলা সম্পূর্ণ নিজস্ব।
তাই?
শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময়ের সঙ্গে বলল নীলিমা।
তারপরই বলল, চিন্তা যে করেন তা তাঁর টাক দেখলেই বোঝা যায়। মাথায় একটিও চুল নেই।
চিন্তাবিদদের মধ্যে অধিকাংশরাই টেকো হন। রবীন্দ্রনাথ, আইনস্টাইন, সত্যেন বোস আর শরৎবাবুরা যদিও একসেপশান।
হেডমাস্টারমশাই বললেন।
চানুর বন্ধু প্রাণেশ বলল, সে কলকাতা থেকে বেড়াতে এসেছে ক'দিনের জন্যে, ছিঃ ছিঃ, কার সঙ্গে কার তুলনা মাস্টারমশাই! দিব্যেন্দু পালিতের নামের সঙ্গে শরৎবাবুর নাম একসঙ্গে উচ্চারণ করলেন। ভাগলপুরে থাকতেন বলেই কি দুজনে সমান হলেন! আপনি আর কারও সামনে একথা বলবেন না মাস্টারমশাই! দিব্যেন্দু একজন জ্যোতিরিন্দু ইনটেলেকচুয়াল। লেখা নিয়ে উনি কত পরীক্ষানিরীক্ষা করেন সবসময়ে। ভাষা সম্বন্ধে কত সচেতন উনি। তুলনামূলক সাহিত্যের এম.এ.। বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্তদের মতো দিকপালদের কাছে বাংলা এবং পৃথিবীর সাহিত্য পড়েছেন। ওঁর সঙ্গে ডিগ্রিহীন শরৎ চ্যাটার্জির তুলনা যিনি করেন তিনি আকাট আনকালচারড! একটি স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে আপনি এ কথা কী করে বললেন? ছিঃ! শরৎবাবু আবার কোনো লেখক নাকি? ছ্যা! ছ্যা! আর শরৎবাবু তো মেয়েদের লেখক। ওঁর লেখা তো সেন্টিমেন্টাল। ট্র্যাশ।
ঝন্টু এবারে হাঁফ ধরে যাওয়াতে বলল, এ সবকিছুই কিন্তু আমার মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমি মিস্ত্রি মানুষ। এবারে ওঠো চখাদা। সব বিষয়ই কি সকলের হজম হয়। তুমি এর পরের বারে হাতে সময় নিয়ে এসো। তখন এইসব আলোচনা কোরো প্রাণেশের সঙ্গে, মাস্টারমশায়দের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এবারে ক্ষ্যামা দাও। সকালের ফেনাভাতই আমার হজম হয়ে গেল।
আমি তো কিছুই বলিনি। আলোচনা তো করছিলেন হেডমাস্টারমশাই আর প্রাণেশ। আমিও কি লেখক নাকি! এসব আলোচনা করার এক্তিয়ারই নেই আমার। আমি ভালো করেই জানি আমার বিদ্যা—বুদ্ধির দৌড়।
নীলিমা ওদের উঠতে দেখে বলল, আচ্ছা চখাদা, দিব্যেন্দু পালিত কি বুদ্ধদেবের ভাই?
কোন বুদ্ধদেব? সরোদিয়া বুদ্ধদেব—এর কথা বলছ কি? এখন তো বঙ্গভূমে বুদ্ধদেবের ছড়াছড়ি। মন্ত্রী, দাশগুপ্ত—স্কোয়ার, গঙ্গোপাধ্যায়, আরও কত।
চানু বলল, না, না, ফিল্ম ডিরেক্টর। সরোদিয়া বুদ্ধদেববাবুর মাথা চুলে তো চিরুনি চালালে চিরুনি ভেঙে যাবে। শুনছ না? হচ্ছে টাকের কথা! উইথ রেফারেন্স টু দ্যা কনটেক্সট কথা বল।
বলেই, হো হো করে হেসে ওঠে বলল, বলেছ ঠিক। তবে, দুজনের—দিব্যেন্দু পালিত এবং বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চেহারার মধ্যে আশ্চর্য মিল আছে। তবে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, দিব্যেন্দু পালিতের মতন মোটা ফ্রেমের চশমা পরেন না আর বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর টাকটি দিব্যেন্দুবাবুর টাকের মতন অত চকচকেও নয়।
ইংরেজির মাস্টারমশায় তাঁর নিজের টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, টাক চকচকে কী করে করা যায় বলুন তো? আমার টাকটা বড়োই ম্যাড়ম্যাড়ে।
চানুর সবজান্তা বন্ধু প্রাণেশ বলল, ‘MIN’ নামের একটি Polish পাওয়া যায়। সপ্তাহে দু দিন লাগিয়ে শ্যাময় লেদার দিয়ে ঘষবেন, দেখবেন টাক একেবারে ঝিকমিক করবে।
আর দাড়ি চকচকে করতে হলে কী করতে হয়? মানে, জেল্লা আনতে?
ইতিহাসের মাস্টারমশায় বললেন।
দাড়ি চকচকে করতে হলে কী করতে হয়?
আবারও প্রশ্ন হল।
স্কুলের সামনের বাগানের মধ্যে বিচরণরত একটি স্মার্ট এবং ইন্টেলিজেন্ট দাড়িওয়ালা পাঁঠার দিকে চেয়ে এবং নিজের দাড়িতে আদরে হাত বুলিয়ে এবারে প্রশ্ন করলেন, ভূগোলের সুগোল শিক্ষক।
চানু বলল, দাড়ি চকচকে করার মতন সোজা কাজ আর কিছুই নেই।
কীরকম?
সপ্তাহে তিন দিন বৈদ্যনাথের চ্যবনপ্রাশ লাগাতে হবে মাত্র এক চামচ করে, সঙ্গে চার ফোঁটা রেড়ির তেল।
বোগাস।
রতু জেঠুর ছোট ছেলে বাবলা বলল এবারে।
চখা লক্ষ্য করল দীপ আগাগোড়া চুপ করেই রইল। ও শুধু তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে চখাকে দেখে যাচ্ছে। চখা যেন চিড়িয়াখানাতে নতুন—আসা কোনো দুষ্প্রাপ্য জন্তু।
ঝন্টু দাঁড়িয়ে উঠে ঈষৎ বিরক্ত গলাতে বলল, চখাদা, তোমাকে নিতে কিন্তু ওঁরা সাতটার আগেই ধুবড়ি থেকে এসে হাজির হবেন। এদিকে সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। বরবাধা থেকে ফিরতে ফিরতে দেড়টা—দুটো হয়েই যাবে। তারপর খাবে—দাবে। অনেকে আসবে তোমার সঙ্গে দেখা করতেও। কাল তাঁরা রাত দশটা অবধি অপেক্ষা করে চলে গেছেন। তুমি তো এলেই রাত সোয়া এগারোটা বাজিয়ে। তার উপর মরনাই চাবাগানেও তো যাবে একবার ব্যানার্জি সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে। কি যাবে না?
ভেবেছিলাম।
তো চলো। আর দেরি করলে আমার টেনশান হয়ে যাচ্ছে। বর নিতে এসে কি তাঁরা বসে থাকবেন?
বর নিতে এলে কী হবে? নীতবর ছাড়া তো বর যাবে না! তুই পারফ্যুমটারফ্যুম এনেছিস তো? ঘেমো গন্ধ নীতবরকে নিয়ে আমি বিয়ে করতে যাব না কিন্তু।
দীপ, চানু, প্রাণেশ এবং স্কুলের সব মাস্টারমশাইয়েরাই হেসে উঠলেন একসঙ্গে চখার কথা শুনে।
ঝন্টুর সাদা টাটা মোবিল গাড়িটা সেকেন্ডারি স্কুল এবং প্রাইমারি স্কুল পেরিয়ে তামাহাট—এর হাট—এর সামনে এসে ডিঙ্গডিঙ্গার দিকে রওয়ানা হল।
চখা, পান্ডে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছিল সামনে। এই পথ দিয়ে কতবার কত জায়গাতে যাবার স্মৃতি শীতে গ্রীষ্মে বর্ষাতে যে আছে, তা মনে পড়ে গেল। চখার বাবা, রতুজ্যাঠা, বৈদ্যকাকু, বাবার আরবান ইনফ্যানট্রির বন্ধু অজিত কাকু, হাওড়ার অজিত সিং, বাগচীবাবু, গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বাগচী, তাঁর ছেলে গামাবাবু, অহীন চৌধুরী, ধুবড়ির আবু ছাত্তার, মোটাসোটা কাসেম মিঞা, বাপ্পু, আরও কত মানুষের স্মৃতি!
মনটা বিধুর হয়ে এল নানা কথা ভাবতে ভাবতে।
ঝন্টু বলল, কী হল? কথা বলছ না যে, শরীর খারাপ লাগছে না কি?
নাঃ। ভাবছি।
তারপর বলল, এটা কী জায়গা?
নুয়াহাট বা নুয়াবাজার বলতে পারো। ডিঙ্গডিঙ্গার আগে এই নতুন জায়গার পত্তন হয়েছে। আস্তে আস্তে মানুষে ভরে যাবে সারা পৃথিবী। গাছ থাকবে না, পাখি থাকবে না, মাঠ থাকবে না, বন থাকবে না। ভাবলেও খারাপ লাগে।
যা বলেছিস। তারপর বলল, বুঝলি, সেদিন কলকাতার বইমেলাতে দে'জ পাবলিশিং—এর স্টলের সামনে বসে অটোগ্রাফ দিচ্ছি পাঠক—পাঠিকাদের কেনা বইতে, এমন সময়ে এক সুন্দরী ভদ্রমহিলা সঙ্গে একটি অল্পবয়সি সুন্দরী যুবতীকে নিয়ে এসে ''আলোকঝারি''—র একটি কপি সই করতে দিয়ে অল্পবয়সি মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন, এ হচ্ছে ডিঙ্গডিঙ্গার মেয়ে, কলকাতার বউ।
চখা সেই বইয়ের উপরে লিখে দিল 'ডিঙ্গডিঙ্গার মেয়েকে'। তারপরে সই করে দিল। মেয়েটির নামও লিখেছিল জিজ্ঞেস করে, কিন্তু শ'য়ে শ'য়ে নাম সই করতে হয়েছিল বইমেলায় অটোগ্রাফ দেবার সময়ে, তাই নামটি মনে করতে পারল না। তবুও ঝন্টু, চানু, দীপ ইত্যাদিদেরও বলল সে—কথা।
চানু বলল, বরবাধাতে চলেন আগে। ফেরার সময়ে মরনাইতে ঢুইক্যা দেখা যাব'খন, ডিঙ্গডিঙ্গার সে কোন মাইয়া।
মরনাই চা—বাগানটা তো মস্ত বড় হয়ে গেছে!
স্বগতোক্তি করল চখা।
হ্যাঁ। পথের দু পাশেই ছড়িয়ে গেছে। মিশনের বাগান তো!
এই বাগানের ডিরেকটরস বাংলো বা গেস্ট হাউস নেই? এখানে এসে ক'দিন নিরিবিলিতে লেখালেখি করা যেত।
হ্যাঁ। থাকবে না কেন? তবে চা—বাগানেই যদি থাকবে তো বাগডোগরা বা নিউ কুচবিহার থেকে এত ঝক্কি করে এত দূরে আসতে যাবে কোন দুঃখে। ডুয়ার্স এবং আপার—আসামে এবং দার্জিলিং—এর পাহাড়েও তোমাকে কত লোকে আদর করে ডেকে নেবে একবার জানতে পারলে।
চখা বলল, তবু মরনাই, মরনাই—ই। মরনাই, ডিঙ্গডিঙ্গা, বরবাধা এসব নামগুলি আমাকে বড়ই নস্টালজিক করে তোলে রে। যাঁদের সঙ্গে এসব জায়গায় এসেছি, ঘুরেছি, একসময়ে শিকারও করেছি কচুগাঁও ডিভিশানে, শিকার তখন ছিলও প্রচুর এবং আইন মেনেই করেছি, সেই সব মানুষদের একজনও তো আর নেই আজ। মন বড় ভারাক্রান্ত লাগে তাঁদের কথা মনে হলে। কত হাসি, গল্প, মজা, গান!
তারপর বলল, ইসস। ভাবাই যায় না। ডিঙ্গডিঙ্গা কত বড় জায়গা হয়ে গেছে রে! আগে যখন ডিঙ্গডিঙ্গার হাটে আসতাম তখন কত ছোট্ট হাট লাগত এখানে।
এখন তো সব নামেই হাট। সপ্তাহে রোজই বাজার বসে বলতে গেলে। তবু হাটও বসে।
গুমা রেঞ্জের বরবাধার বাংলোর সামনে এসে যখন পৌঁছনো গেল, ছোট নদীটা পেরিয়েই পথ ডানদিকে মোড় নিয়েছে, ডানে বনবিভাগের বাংলো। রেঞ্জারের। সঙ্গে আরও কয়েকটি ছোট ছোট ঘর দেখল। নতুন হয়েছে কি? আগে ছিল কি না মনে করতে পারল না। হয়তো অফিসই হবে।
চখার মনে পড়ে গেল আগল—খোলা শ্রাবণের এক দিনে এই বরবাধারই রেঞ্জারের বাংলোতে একটি দুপুর কাটিয়ে গেছিল। ঝন্টুর জ্যাঠতুতো দিদি আর দিদির স্বামী শচীন জামাইবাবু তখন রেঞ্জার ছিলেন এখানকার। খাওয়া—দাওয়া, গান। মনে আছে চখার সমবয়সি এবং ওর চেয়ে বয়সে বড় অনেক মহিলারা ছিলেন। হয়তো ইতু, বেবি, ভারতীদি, আবিদি, আরও কেউ কেউ। কেয়া আর কদমের গন্ধে ম' ম' করছিল দুপুর। বেতবন ছিল ঐ ছোট নদীটির ধারে ধারে। ঘন। সাপের আড্ডা ছিল বেতবনে। স্কুলের ছাত্র চখাকে যেতে মানা করেছিলেন জঙ্গলে একা একা শচীন জামাইবাবু। বলেছিলেন চিতা আর বড় বাঘ অনেক আছে। সাপের তো কথাই নেই।
তারও অনেকদিন পরে এক রাত ছিল এই বাংলোতেই এসে আবু ছাত্তারের সঙ্গে। তখন সে কলেজের ছাত্র। জোড়া চিতাবাঘ মেরেছিল ওরা সপসপে চাঁদভেজা শ্রাবণের চকচকে সেই উদলা, উজলা রাতে।
কিন্তু জঙ্গল দেখে মন খারাপ হয়ে গেল চখার। কেটে সব সাফ করে দিয়েছে। বাংলোর কাছে রাস্তার ধারে কিছু জায়গাতে ''ফিফটিন—টুয়েন্টি ডিপ'' আছে, শালের জঙ্গল। তার ওপাশেই ফাঁকা।
চানু বলল, আরও আগে গেলে আরও ফাঁকা।
চখা বলল, আরও আগে যাবার আর ইচ্ছে নেই। না এলেই ভালো করতাম। যখন স্কুলে পড়তাম তখন দিনের বেলাতেও এই পথ দিয়ে বন্দুক হাতে হাঁটতে গা ছমছম করত।
তারপরে স্বগতোক্তিরই মতন বলল, যমদুয়ারে যাওয়ার বড়ই ইচ্ছা ছিল রে ঝন্টু। যাওয়া কি যায় না, থাকা যায় না এক রাত?
মানাস অভয়ারণ্য দেখতে গিয়ে এক শুক্লা চতুর্দশীর রাতে বড়পেটা রোডে মানাস ব্যাঘ্র—প্রকল্পের অধিকর্তা সঞ্জয় দেবরায় সাহেবের বাংলোতে বসে সংকোশ নদী আর যমদুয়ারের প্রশংসা করে তাঁর ভীষণই বিরাগভাজন হয়ে গেছিল চখা। মানাস ছিল দেবরায় সাহেবের দেবভূমি। মা—বাবা, অনূঢ়া কন্যা, স্ত্রী সবই। যে—কোনো দেশই অমন একজন কনসার্ভেটর এবং ফিল্ড—ডিরেক্টরকে নিয়ে অবশ্যই চিরদিন গর্ব করতে পারে। রাজ্য হিসেবে আসাম তো অবশ্যই পারে। ভারতের নানা রাজ্যের অনেকই টাইগার—প্রজেক্টের ফিল্ড—ডিরেক্টরকে দেখেছে চখা, প্রত্যেকেরই নাম করতে চায় না কিন্তু তাঁদের মধ্যে দু—একজন পয়লা—নম্বরী চোর। বনের রক্ষক হয়েও ভক্ষক। এই ধরনের আমলাদের গুলি করে মারা উচিত উনিশশো বাহাত্তরের পরেও যাঁরা বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকার করেন, সর্বার্থেই অশিক্ষিত সেই সব চোরা—শিকারিদেরই সঙ্গে। কিন্তু মারছেটা কে? সর্ষের মধ্যেই যে ভূত ঢুকে গেছে। ভারতের সব বনই এখন তামিলনাড়ু আর মাইসোরের ভীরাপ্পানদের খপ্পরে। রাজ্যভেদে তাদের নাম আলাদা এই যা। প্রকৃতিই যে আমাদের মা, অন্য মা, অরণ্যই যে আমাদের শেষ আশ্রয়, প্রশ্বাস নেবার শেষ জায়গা, একজোড়া করে বন্যপ্রাণী ও পাখিরাও যে একজন মানুষ ও মানুষীর শেষের প্রহরে বাইবেলে বর্ণিত সেই DELUGE—এর পরে NUHA’S ARC—এ সঙ্গী হবে, একথা কী করে যে অর্থগৃধ্নু অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন ন্যক্কারজনক ঘৃণ্য দেশবাসীদের এক বড় অংশই ভুলে যান, তা ভাবলেও চখার কপালের দুপাশের শিরাতে রক্ত ঝুনুক—ঝুনুক করে। মনে হয়, স্ট্রোক হয়ে যাবে।
গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে বল এবারে ঝন্টু।
চখা বলল।
তারপরে নিজেই ড্রাইভারকে বলল, ব্যাক করো পাণ্ডে, জায়গা দেখে। আর জঙ্গল দেখার সাধ নেই। ইসস।
চানু বলল, আপনারে লইয়া যাইতাম যমদুয়ারে কিন্তু তাগো বড় ঘাঁটি হইছে যে এখন স্যা যাগা। সংকোশ নদী পারাইলেই ত ভুটান। তাই পুলিশেও কিছু কইরবার না পারে। টেররিস্টদের স্বর্গ—রাজ্য। আপনারে মাইর‍্যা ফ্যালাইলে আমাগো মুখগুলান কি দেখান যাইব কারও কাছেই? থুথু দিবে না মানষে?
চখা বলল, আমিও তো বিদ্রোহী। তারা আমাকে মারবেই বা কেন? সব বিদ্রোহী, সব টেররিস্টদের প্রতিই আমার সমর্থন আছে। উরুগুয়ের টুপামারো সন্ত্রাসবাদীদের ম্যানিফেস্টোতে পড়েছিলাম যে, তারা বিশ্বাস করে, ‘‘If the country does not belong to everyone, it will belong to no one.’’ যে—দেশে গণতন্ত্র কেতাবি, আইন প্রহসন, ন্যায়বিচার এখনও স্বপ্নেরই বস্তু, সে—দেশে সম্ভবত টেররিজিমই একমাত্র পথ অন্যায়ের প্রতিকার করার।
তোমরা যাই বলো আর তাই বলো, আমি আমার সমস্ত শিক্ষা, ভাবনা—চিন্তা এবং দায়িত্বজ্ঞান সত্ত্বেও এই কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি। আর আইনও তো শুধু বড়লোকেরই জন্যে। গরিবের কোন কাজে লাগে এই আইন?
চখার উত্তেজনা কমিয়ে দিয়ে কথা ঘোরাবার জন্যে দীপ বলল, চলুন, ফিরে যাই। মরনাই চা—বাগানে যাবেন তো চখাদা?
চল, যেখানে নিয়ে যাবি যাব।
উত্তেজনা প্রশমিত করে বলল চখা।
মরনাই চা—বাগানের চা রাখে ধুবড়ির টাউন স্টোরস। খাঁটি চা।
রায়েদের টাউন স্টোরস? শচীন রায়, কানু রায়, আরও ভাইয়েরা ছিলেন না? শচীনবাবুর বাবা ছিলেন দূরদর্শী মানুষ।
দীপ বলল তুমি জানলে কেমন করে?
বলিস কিরে? তোদের জন্মের অনেকই আগে থেকে আমি ওঁদের চিনি। টাউন স্টোরস—এর শচীনবাবু আর আমার বাবার সঙ্গে ধুবড়ির নেতাধোপানির ঘাট থেকে ছইওয়ালা নৌকো করে বর্ষার দামাল ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে শালমাড়া হয়ে ফুলবাড়ির আগে প্লাবিত নদীর মধ্যেই শরবনে ভরা একটি ডোবা—চরে রাত কাটিয়ে পরদিন জিঞ্জিরাম নদীতে গিয়ে পৌঁছেছিলাম একবার। চার—পাঁচ দিন নৌকোতেই ছিলাম জিঞ্জিরাম নদীতে। একদিকে গারো হিলস—অন্যদিকে গোয়ালপাড়া। রাভাদের গ্রাম ছিল। রাভাতলা। আর কী বৃষ্টি, কী বৃষ্টি! ঐ সময়েই জিঞ্জিরাম—এর মস্ত মস্ত দহতে বিরাট কুমিরের আখড়া বসে।
আখড়া মানে?
দীপ বলল।
কুস্তি শেখে নাকি?
হয়তো শেখে। মাগ্গর, ঘড়িয়াল, ক্রক্রোডাইল। আর কত রকমের কুমির। ঘটওয়ালা কুমির বলে ওখানকার একধরনের কুমিরকে। ছাত্তার অন্তত বলত। তারা নাকি এতই বড় যে মাথার উপরের চামড়া কুঞ্চিত হয়ে ঘটের মতন হয়ে যায়। প্রতি গ্রাম থেকেই মানুষ নেয় কুমিরেরা। মানুষখেকো কুমির।
আমরা ''রাভাতলা'' নামের এক গ্রামে নেমে শুনেছিলাম আগের রাতে এক চাষার যুবতী বৌকে কুমিরে নিয়ে যাবার মর্মন্তুদ কাহিনি। মেয়েরাই বেশি যায় কুমিরের পেটে।
একটু চুপ করে থেকে বলল, আহা, কীসব ছায়াচ্ছন্ন সরু নদীপথ! দু পাশে বাঁশের মাচা বানানো ছিল সেই সরু, দ্রুত ধাবমান নদীর ঘাটে ঘাটে, জলে না নামলেও যাতে চলে যায়। যখন একান্তই চলে না তখনই কুমিরের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে সকলে। লম্বা লম্বা নলি—বাঁশের ছিপ হাতে করে তামা—রঙা রাঙা যুবকেরা ছায়াতে দু পাশ থেকে ঝুঁকে—পড়া বনের প্রায়ান্ধকার শ্রাবণী দুপুরে বসে মাছ ধরছিল। এখনও যেন চোখে ভাসে। আর আমাদের নৌকার দাঁড় পড়ছিল ছপছপ। ধীরে ধীরে। আর আমি বসেছিলাম নৌকোর ছইয়ের মাথার উপরে, গলাতে সান—গ্লাস আর কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে। রাতের অন্ধকার নেমে এলে ভাঙনি মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে শুয়ে নৌকোর ছইয়ের উপরে অঝোরধারে বৃষ্টির শব্দ আর গারো পাহাড় থেকে আসা দামাল হাওয়ার দাপাদাপির আওয়াজ শুনতে শুনতে বাবার পাশে ঘুম।
আবিষ্ট গলাতে ওদের বলছিল চখা।
তখন আমি কলেজের ফার্স্ট—ইয়ারের ছাত্র। আমার বাবার গায়ের গন্ধ এখনও যেন নাকে ভাসে। গন্ধটি কটু নয়, আবার মিষ্টিও নয়। একটা নিউট্রাল গন্ধ। ODOURLESS—ই বলা চলে। কিন্তু তবু ছিল ODOUR। তার বাবার কোলঘেঁষে সারারাত বৃষ্টি—ঝরা শ্রাবণ—রাতে কুমিরে—ভরা সরু কিন্তু প্রচণ্ড গভীর জিঞ্জিরাম নদীর বুকে তীরের গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে—রাখা ছোট্ট ছই—নৌকোতে যেসব ছেলে রাত না কাটিয়েছে, তারা হয়তো কোনোদিনও জানবে না যে, বাবার গায়ের গন্ধও, মায়ের গায়ের গন্ধরই মতন প্রত্যেক সন্তানেরই প্রিয়।
চানু বলল, পান্ডেজী, মরনাই—এ ঢোকো ডানদিকে। ডিঙ্গডিঙ্গার কোন সুন্দরী মেয়ে অটোগ্রাফ নিল চখাদার কলকাতার বইমেলাতে, তার খোঁজ করা যাক একটু!
ওরা বাগানের অফিসের সামনে ঢুকে গাড়ি ঘুরিয়ে, গাড়িতেই বসল। চানু গেল খবর করতে। একটু পরে ফিরে এসে বলল, ম্যানেজার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, ইঞ্জিনিয়র কেউ—ই নাই, এহনে লাঞ্চ আওয়ার। বাড়ি যাইবেন কি?
দূর। খাবার সময়ে মানুষকে বিরক্ত করব না।
তবে অফিস থিক্যাই খোঁজ নিয়া আসতাছি। আপনে বসেন।
ফিরে এসে চানু বলল, যা ভাবছিলাম তাই—ই। মাইয়ার নাম গোলাপ। গোলাপের মতনই সুন্দরী। ওর বাবারেও আমি চিনি। ওরা বাগানে থাকে না। ওদের বাড়ি এই ডিঙ্গডিঙ্গাতেই। ফেরার সময়ে যামুঅনে অগো বাসায়। কিন্তু স্যা ত বিয়া হইয়া চইল্যা গেছে কলকাতা!
ঝন্টু বলল, মেয়ে গেছে তো কি হয়েছে—মা—বাবা তো আছেন। তাঁদেরও সারপ্রাইজ দেওয়া হবে। ডিঙ্গডিঙ্গাতে এসেও ''ডিঙ্গিডিঙ্গার মেয়ের'' বাড়িতে না যাওয়াটা ভালো দেখায় না। সে এবং তার শাশুড়ি যখন চখাদার ভক্ত।
মরনাই বাগান পেরিয়ে ডিঙ্গডিঙ্গাতে এসে সামনে নানারঙা গোলাপ বাগানওয়ালা সুন্দর একটি বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামাতে বলল চানু, পান্ডে ড্রাইভারকে। তারপর ভিতরে গেল। পরক্ষণেই ভিতর থেকে একজন সুন্দরী প্রৌঢ়া মহিলা এবং তাঁর সুন্দর ছেলে বাইরে এসে আপ্যায়ন করলেন।
চখারা সকলেই গেল ভিতরে। কী যে খুশি হলেন মহিলা ও তাঁর পুত্র, তা বলার নয়! বললেন, মেয়ের বিয়ে হয়েছে অল্প ক'দিন আগে। ওর সুন্দরী শাশুড়িই নিশ্চয়ই ওকে নিয়ে বইমেলাতে গেছিলেন। আপনার অনেক লেখাতে ডিঙ্গডিঙ্গার উল্লেখ আছে, সে কারণেই উনি নিশ্চয়ই আমার মেয়েকে ডিঙ্গডিঙ্গার মেয়ে এবং কলকাতার বৌ বলে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন।
তারপরে বললেন, মেয়ে আমার আসছে সাত দিন পরেই। আপনি স্বয়ং এসেছিলেন শুনলেই কী যে করবে জানি না। আপনার এই বইটিতে সই করে দিয়ে, আজকের তারিখও দিয়ে যান দয়া করে। নইলে ও হয়তো বিশ্বাস করবে না যে আপনি এসেছিলেন!
বলে, চখার লেখা একটি বই নিয়ে এলেন ভিতর থেকে।
মিষ্টি না খাইয়ে ছাড়লেন না মহিলা। ওঁরা খ্রিস্টান সম্ভবত। মিশনের দীক্ষিত। ওঁর স্বামী নামকরা ঠিকাদার ছিলেন এই অঞ্চলের। ''গোলাপের বাবা'' এই তো যথেষ্ট পরিচয়, নাম নাই বা মনে থাকল!
চানু বলল।
চখা গোলাপদের বাড়ি থেকে বেরোতে বেরোতে ভাবছিল, দু কলম লিখে কীই বা এমন করেছে যে, এত মানুষের এত ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা এবং স্নেহ পেল এ জীবনে।
ধুবড়ির ''সবুজের আসর'' থেকে এক ভদ্রলোক, হীরেন পাল, নিতে এসে গেলেন সাতটার জায়গাতে পাঁচটার সময়েই। সঙ্গে ইতু, পূর্ণজেঠুর মেয়ে। জীপ নিয়ে এসেছিলেন ওঁরা পথ খারাপ বলে।
ছেলেবেলাতে যখন আসত চখা, ধুবড়িতে, তখন ইতুর বয়স হবে আট—দশ বা একটু বেশি। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের STAND—এ হাঁটতে নিয়ে যেত ইতু চখাকে। অস্পষ্ট মনে আছে। ওর ভালো নাম রীতা। বিয়ে করেনি। ওর ছোট বোন মানাও বিয়ে করেনি। বেশ আছে নদীপারের হু হু—হাওয়া, চর—পড়া গাঢ় সবুজের আস্তরণের ঘেরের কলুষহীন ধুবড়িতে। ইতু কাজ করে স্টেট ট্রান্সপোর্ট—এ আর অবসর সময়ে অভিনয়ও করে। বড় রাস্তাগুলোতে যদি—বা ট্রাক বাস বা গাড়ি চলাচল কিছু আছে, ছাতিয়ানতলার গলি একেবারেই নিস্তরঙ্গ।
নিতে তো ওঁরা এসেছেন কিন্তু বরবাধা থেকে ফিরে দুপুরের খাওয়া খেয়ে ওঠার পরই তামাহাট যেন ভেঙে পড়েছে পিসিমার বাড়ির উঠোনে। কে যে আসেনি! দাতুর ছোট, চলে—যাওয়া ভাই বাবুর বিধবা স্ত্রী তাপসী তার ছেলেকে সাজিয়ে—গুজিয়ে নিয়ে এসেছে। ছেলেটি ভালো হবে। চখার মন বলল, তার মধ্যে ভালোত্বর সব লক্ষণ পরিস্ফুট। বড় হবে জীবনে। আশীর্বাদ করল মনে মনে। চানু, চানুর স্ত্রী মিঠু। বিনয়, বিনয়ের সুন্দরী শিশুকন্যা, বিনয়ের বাবা। তিনি এখন মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান। রতু জেঠুর ছোট ছেলে বাবলা এবং তার কবি—স্ত্রী নীলিমা। কুট্টিদা, সুরেন জেঠুর মেজ ছেলে।
রাঙাপিসিও এসেছিলেন এবং আরও কত চেনা ও আধচেনা মানুষ। ঝন্টুর স্ত্রী কসমিক, শালা শক্তি এবং আর তার স্ত্রী দেবী তো ছিলই মজুদ।
পিসিমা রুদ্রাক্ষর গাছটা ছেঁটে ফেলার পরই বেলুদা মারা যান। তাই নিয়ে অনেক অনুশোচনা করলেন।
ভাবছিল চখা, কত রকমের সংস্কার থাকে মানুষের!
হাঁসের বাড়ি ফিরে এল, সার দিয়ে, প্যাঁক—প্যাঁক করে হেলতে—দুলতে। তক্ষক ডেকে উঠল লটকা গাছে। জলপাই গাছের ডালে দিনশেষের আলো এসে পড়েছে। লালাবাবু বেলা যায়। যেতে হবে এবারে।
ধুবড়ির বইমেলার তরফের হীরেনবাবুও ভিতর—বাড়িতে এসে ঢুকলেন ইতুর সঙ্গে। বরকে আরও বেশিক্ষণ ছেড়ে রাখার পক্ষপাতী তিনি নন। গোরুদের গোয়ালে ফেরার সময় হল, বরের সংসারে জুতবার। সংসারও তো এক খোঁয়াড়। কী বর আর কী বউ—এর!
পিসিমাকে প্রণাম করে উঠল চখা। অন্ধকার হয়ে গেছে। গদিঘরের সামনে ততক্ষণে ভিড় জমে গেছে। বাদল মিত্তিরের শালার ছেলে লেখক হয়েছে, তাকে নিয়ে এসেছে সসম্মানে ধুবড়ি থেকে মানুষে, এ যেন তামাহাটের এক বিশেষ সম্মান। পরিচিত—অপরিচিত কত মানুষই যে দাঁড়িয়ে আছেন চখাকে বিদায় দেবার জন্যে!
কে বলতে পারে! এই হয়তো তামাহাট থেকে চিরবিদায়। বহু বছর পরে এসেছে। আর কি এ—জন্মে আসা হবে? জীবন যে বড়ই ছোট! কতখানি যে ছোট, তা জীবনের বেলা পড়ে এলেই শুধু বোঝা যায়। টগবগে যৌবনে পথের শেষে পৌঁছনোর কথা এবং সেই গন্তব্যর অনুভূতি সম্বন্ধে কোনো ধারণা করাও অসম্ভব।
ঝন্টু চলল চখার সঙ্গে, নীতবর হয়ে। আসলে, চখার দেখভাল করারই জন্যে। জীপের পেছনে হীরেনবাবু, ঝন্টু এবং সেকেন্ডারি স্কুলের হেডমাস্টারমশাই। তিনি পথে নেমে যাবেন গৌরীপুরে। তারপর বাস ধরে যাবেন গুয়াহাটি। দাতু একশো বিশ জর্দা দিয়ে পান খাওয়াল চখাকে জিপ ছাড়বার আগে। শেষ দান।
এই কি গো শেষ দান?
সকলের দিকে হাত তুলে চখা জিপের সামনের বাঁদিকের সিট—এ বসল। ওর পাশে ইতু বসেছে। শিশুকালের অথবা ছেলেবেলার মতন। আশ্চর্য! তখন কত কাছাকাছি ঘেঁষাঘেঁষি বসা যেত সহজেই। কোনোই সংকোচ ছিল না। শিশুমাত্রই দেবশিশু। এখন আর তেমন করে বসা যায় না। সময় বড়ই বেরসিক। সে বড়োই দূরত্ব রচনা করে দেয় একে অন্যের মধ্যে, বিশেষ করে নারী ও পুরুষের মধ্যে। আড়ষ্ট হয়ে বসেছে ইতু। চখাও যতদিন পারে বাঁ দিক ঘেঁষে বসেছে।
চখা বাঁ হাতটি অস্ফুটে তুলে বলল, যাই।
ভিড়ের মধ্যে থেকে কে যেন বলে উঠলেন, কোনো গুরুজনই হবেন, মুখ দেখতে পেল না তাঁর, বললেন, যাওয়া নাই, আইস্যো। আবার আইস্যো য্যান শিগগির। আমাগো ভুইল্যা যাইয়ো না চখা।
চখা সেই কথার পিঠে কিছু বলতে গেল। কিন্তু তার গলার কাছে কী যেন দলা পাকিয়ে উঠল। বলা হল না কিছু। বলা গেল না।
জিপটা ছেড়ে দিল একটা ঝাঁকুনি তুলে, হেডলাইট জ্বেলে।
চখা ভাবছিল, কে জানে! আবার কোনোদিনও আসা হবে কি না। না—হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যদি হয়ও, তবে কি আর পিসিমা, রাঙাপিসি, কুট্টিদা এবং আরও অনেকে এমনই থাকবেন? তাঁরা সকলেই তো আর নিজের চেয়েও বয়সে অনেকই বড়। ফিরে যাওয়ার বেলাতে যে আগে পরে নেই কোনো। সব হিসেবপত্র শুধু আসার সন তারিখ দিয়েই হয়। তবুও সকলেই তো লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েই আছেন। কখন যে কার ডাক পড়বে নদীপারে, শোর উঠবে, ''বল হরি, হরি বোল,'' কে বলতে পারে! দুলতে দুলতে চলে যাবে অন্যদের কাঁধে। অবুঝ, শক্ত হয়ে—যাওয়া মাথাটা একবার এপাশ, আরেকবার ওপাশ করবে। খই ছড়াতে ছড়াতে যাবে সামনে চানু, বাবলা, দীপ আর খোল কর্ত্তাল বাজিয়ে, গাইতে গাইতে যাবে আগে আগে কুমারগঞ্জের কেষ্ট, ''নে মা আমায় কোলে তুলে, আমি যে তোর খারাপ ছেলে।''
ধুবড়ি শহরের সার্কিট—হাউসটি ভারী সুন্দর। একেবারে ব্রহ্মপুত্রর উপরেই। নদীর পাশে বসে নদীর দৃশ্য দেখার একটা জায়গা আছে। মনোরম।
সার্কিট—হাউস অবশ্য গুয়াহাটি শহরেরও খুব ভালো। সেটি ব্রহ্মপুত্রের একেবারে উপরে। চখা, নামেরই কারণে জলের পাখি বলেই কি না বলতে পারে না, তবে নদীমাত্ররই বড় ভক্ত সে।
এখন কাকভোর। চখা একা বসেছিল নদীর দিকে চেয়ে। এখন দেখলে ব্রহ্মপুত্রের ভয়াবহতা কিছুই বোঝা যায় না। তার ভয়াল রূপ দেখতে হয় ভাদ্র—আশ্বিনে। ভরা শ্রাবণেও।
রবীন্দ্রনাথ চমৎকার করে বলেছিলেন, নদীর সাগরে গিয়ে থামার প্রকৃত মানে। বলেছিলেন যে, থামা মানেই ফুরিয়ে যাওয়া নয়। সেই থামা মানে নিজেকে নবীকৃত করা বা ঐরকমই কিছু।
তিব্বতের চেমায়ুং—জং হিমবাহ থেকে ব্রহ্মপুত্রর জন্ম। তারপর তিব্বতের ভিতর দিয়ে সতেরোশো কিমি প্রবাহিত হয়ে এসেছে সে। তখন অবশ্য তার নাম, ব্রহ্মপুত্র নয়, সাংপো। ভারতে এসে ঢুকেছে সাংপো প্রথম অরুণাচল প্রদেশে। সেখানে তার নাম হয়েছে ডিহাং। সদিয়ার কাছে সে হঠাৎ নেমে এসেছে হিমগিরি ছেড়ে সমতল থেকে মাত্র দেড়শো ফিট মতন উচ্চতাতে। সেখানেই ডিবাং আর লুহিত এই দুটি নদীও এসে সাংপোর সঙ্গে মিলিত হয়েছে আর তখনই তার নতুন নাম হয়েছে ব্রহ্মপুত্র।
গঙ্গা যেমন গিরিরাজের কন্যা, ব্রহ্মপুত্রও কি ব্রহ্মার পুত্র? জানে না চখা। কলকাতায় ফিরে, দিলীপকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিজ্ঞেস করবে।
যে দেশে পাখিরা শুধুই পাখি, গাছেরা শুধুই গাছ সেখানে নদীরাও শুধুই নদী। তাই জানার ইচ্ছা যাঁদের আছে তাঁরাই জানেন যে, এই পৃথিবীতে কোনো বিষয়েই জানার কোনো শেষ নেই। শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে পৃথকীকরণের উপায় তাঁদের দেরাজের মধ্যে গোল করে পাকিয়ে—রাখা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট নয়, তাঁদের জিগীষারই তারতম্য।
আসামের পূর্ব ভাগ দিয়ে বিষধর সাপের চাল—এর মতন এঁকেবেঁকে একের পর এক দ্বীপের সৃষ্টি করে একদিকে পাড় ভাঙতে ভাঙতে, অন্যদিকে চর ফেলতে ফেলতে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র শত শত মাইল। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় ''নদী—দ্বীপ'' গজিয়ে উঠেছে ব্রহ্মপুত্রেরই বুকে। ডিব্রুগড়ের কাছে। যেখানে ব্রহ্মপুত্র প্রায় সাড়ে ষোলো কিমি চওড়া। সেই দ্বীপের নাম ''মাজুলি'', তার আয়তনও প্রায় সাড়ে নশো বর্গ কিমি। তারও পর গুয়াহাটির কাছে এসে আরেক নতুন দ্বীপ গড়েছে সে। তার নাম 'ময়ূর' দ্বীপ বা PEACOCK Island.
উত্তর—দক্ষিণ দুদিক থেকেই অনেকগুলি উপনদী এসে মিশেছে এই ব্রহ্মপুত্রে। উত্তর থেকে এসেছে যারা তাদের মধ্যে সুবনসিরি, কামেং বা জিয়া ভরলি (সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ—এর একটি বিখ্যাত উপন্যাসের নাম এই নদীর নামে), মানস এবং সংকোশ।
মানস ও সংকোশ হিমালয়ের বরফাবৃত অঞ্চল থেকে নেমে আসার কারণে সারা বছরই তাদের জল হিমশীতল। ''যমদুয়ারে'' শিকারে গিয়ে ভুটানের মহারাজা এবং চখার সঙ্গী—সাথী সাহেব—সুবোরা নদীর বালির নিচে বিয়ারের বোতল পুঁতে রেখে দিতেন রেফ্রিজারেটরের বদলে। এই মানাসের অববাহিকাতেই মানাস টাইগার প্রজেক্ট। আর সংকোশের পারে চখা চক্রবর্তীর প্রিয় যমদুয়ারের বন।
দক্ষিণ থেকে ব্রহ্মপুত্রে এসে মিশেছে বুড়িডিহিং, ধানসিঁড়ি, কোপিলি আর কালাং। আরও কিছু উপনদী আছে যাদের প্রত্যেকেরই উৎস ভুটান ও সিকিমের বরফাচ্ছাদিত নানা পর্বতে। এই সবকটি উপনদীই পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে বাংলাদেশে সেঁধিয়েছে। তারা হল তিস্তা, জলঢাকা, তোর্সা, কালজিনি এবং রায়ডাক।
এতসব কথা মনে এল এলোমেলো। একা থাকলেই ওর ভাবনাগুলো কিলবিল করে। আসলে একা থাকলেও ও কখনোই একা থাকে না তো! কত পুরুষ ও নারী, কত গাছ—গাছালি পাখ—পাখালি তাকে সর্বক্ষণই ঘিরে থাকে যে, তা বলার নয়। তাদের চোখে দেখা যায় না কিন্তু চখা অনুক্ষণ তাদের অস্তিত্ব অনুভব করে। মাঝে মাঝে তার মনে হয় সেইজন্যেই যে, তার ব্যক্তিত্বটা কোনো একক ব্যক্তির নয়, সে সর্বজনীন। সর্বজনীন বললেও হয়তো সব বলা হয় না, বিশ্বজনীন বলাই হয়তো ভালো। সারা পৃথিবীর সঙ্গে তার মনে মনে ঘর করা। এই ঘর করার রকম অন্য কারোকে বলা যায় না, বোঝানোও যায় না।
আজ কাকভোরে উঠে যে নদীপারের এই বসবার জায়গাতে এসে বসেছে তার কারণ আছে।
ঝন্টু চখারই ঘরে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। এখনও ঠান্ডার আমেজ আছে বেশ এখানে। সকাল—সন্ধেও ভারী মনোরম। শেষ রাতে নিজের পাশে কোনো উষ্ণ শরীরের তরুণী আছে ভেবে সুখস্বপ্ন দেখতে না দেখতেই ঝন্টুর সরব উপস্থিতি সেই সুগন্ধি স্বপ্নে গোবর—ছড়া দিয়ে দেয়। অসহ্য ঘোঁৎ—ঘোঁৎ শব্দে নাক ডাকে।
ঝন্টু বলে, চখা নিজেও নাকি নাক ডাকে।
হবে। কে আর কবে নিজের নাক ডাকা শুনেছে আধ—ঘুমন্ত অবস্থার ফুরুৎ—ফুরুৎ শব্দ ছাড়া?
তার পাশের ঘরে আছেন নিমাইদা। প্রাক্তন সাংবাদিক ও বর্তমানে শুধুই সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্য এবং তাঁর স্ত্রী দীপ্তি বৌদি। নিমাইদা বৌদির এখনও বহুত প্রেম আছে। আশ্লেষে শুয়ে আছেন তাঁরা।
নিমাইদার সুন্দর চেহারাটি, চখার ধারণা, মিস্টার ব্রহ্মা নিজের হাতে এবং অনেক সময় নিয়েই গড়েছিলেন, নইলে কোনো মানুষের চেহারা ''নিখুতি'' মিষ্টির মতন এমন মিষ্টি হওয়া সম্ভব ছিল না। ধবধবে ফর্সা রঙ, উজ্জ্বল ত্বক, পঁয়ষট্টি বছর বয়সেও পনেরো বছরের তরুণের মতন ছটফটে সহাস্য স্বভাব। এমনটি বড় দেখেনি চখা।
কলকাতাতে ওঁর সঙ্গে অতি সামান্যই দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে, পয়লা বৈশাখে বইপাড়াতে, কলকাতা বইমেলাতেও, কিন্তু সে পরিচয় এক, আর কলকাতার বাইরে এসে দিনরাতের আঠারো ঘণ্টা একসঙ্গে থাকা আরেক।
মিস্টার ব্রহ্মা ছোট্টখাট্ট নিমাইদাকে শুধু যত্ন করে যে গড়েছেন তাই নয়, এই ধরাধামে পাঠাবার সময়ে নিজে হাতে তাঁর চুলটি পর্যন্ত আঁচড়ে পাঠিয়েছেন। এক মাথা, ''ব্রুনেট'' মেমেদের মতন ঘন চুল পরিপাটি করে আঁচড়ে দিয়েছেন এমনই করে যে, জীবনে কোনোদিনও চিরুনির প্রয়োজন পড়েনি নিমাইদার। ঝড়ে অথবা বসন্তের হাওয়াতে অথবা রণে অথবা রমণেও নিমাইদার মাথার একটি চুলও এদিক—ওদিক হয় বলে চখার মনে হয় না। অমন একখানা ‘‘CUSTOM-BUILT’’ চেহারা যদি ঈশ্বর চখাকে দিতেন তবে চখা চক্রবর্তী একটি শতরঞ্চি বিছিয়ে হাওড়া স্টেশানের প্লাটফর্মে বসে ভিক্ষে চাইলেও তার দিন চমৎকার গুজরান হয়ে যেত। ঈশ্বর বড়ই একচোখা। যাকে দেন, তাকে ছপ্পর ফুঁড়েই দেন, আর যাঁকে দেন না, চখা চক্রবর্তীর মতন 'কানা ছেলে পদ্মলোচন' নাম নিয়েই তাকে খুশি থাকতে হয় সারাজীবন।
পরিকল্পনামতো ''সবুজের আসর'' আয়োজিত গোয়ালপাড়ার এই ধুবড়ি শহরের প্রথম বইমেলার উদ্বোধন হয়ে গেছে। নিমাইদাই করেছেন। সঙ্গে পোঁ ধরেছিল চখাও। আজ অসমিয়া সাহিত্যের উপরে সেমিনার আছে বিকেলে। আগামীকাল ইংরেজি সাহিত্যের উপরে। আর তার পরদিন বাংলা সাহিত্যের উপরে। যে কারণে, নিমাইদা এবং চখাকে ঐ সংস্থার কর্মীরা এবং স্থানীয় বাঙালিরা কলকাতা থেকে অনেক খরচ করে আনিয়েছেন।
নিমাইদা আগে এদিকে আসেননি কিন্তু চখা এসেছে। তামাহাটের, গৌরীপুরের, ধুবড়ির আত্মীয়রাই তাকে বারেবারে এই অঞ্চলে নিয়ে এসেছেন। এবারে ''সবুজের আসর'' বইমেলার উদ্যোক্তারা আবার ফিরিয়ে আনলেন তাকে। ওঁরা আবারও না আনলে হয়তো চখার আসাই হত না আর। তাই এই প্রত্যানয়ন তার কাছে এক গভীর অর্থবাহী। বড়ই সুখের।
খরচটা বড় কথা নয়। তার চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসা খরচ করেছেন ওঁরা ওঁদের দুজনের উপরে। আন্তরিকতা শব্দটির তাৎপর্যই কলকাতার মানুষেরা ভুলে গেছেন হয়তো। সেখানে পরিবেশ দূষণের জন্যে নিশ্বাস নিতেও যেমন কষ্ট, নানারকম অপ্রয়োজনীয় গগননিনাদী আওয়াজে (যেমন লাল বাতি জ্বালানো ভি.আই.পি.'দের গাড়ির সাইরেন!) যেমন কথা বলা বা শোনাও কষ্ট, কারোকে একটু ভালোবাসাও যেমন কষ্ট, মন এবং শরীর দুইয়ের ভালোবাসাই, তেমনই আন্তরিক হওয়াটাও বোধহয় অসাধ্য। অন্তরই যেখানে নিরন্তর চৈত্রের হাওয়ার নদীচরের ঝুরো বালিরই মতন ঝুরঝুর করে উড়ে যাচ্ছে, সেখানে আন্তরিক হয়ই বা মানুষে কেমন করে!
ধুবড়ি—গৌরীপুর—তামাহাটের সবচেয়ে বড় আনন্দ এখানে ভি.আই.পি. বা লাল আলো জ্বালানো বেশি গাড়ির ভিড় নেই। পিঁ—পিঁ—পাঁ—পাঁ আওয়াজ করে শূন্য—কুম্ভের মতন, শয়ে শয়ে নিরীহ শান্তিকামী খেটে—খাওয়া মানুষের পিলে চমকে দিয়ে নিরন্তর ''অকাম কইরবার লইগ্যা'' তাঁদের যাওয়া—আসা নাই। মানুষের দাম দিনে দিনে যতই কমছে, ভেরি ইমপর্ট্যান্ট পার্সন—এর সংখ্যা ততই বাড়ছে। বাঁশবন যত বড়, শেয়ালরাজাদের সংখ্যাও তত বেশি। আগে পুলিশের গাড়ি, পেছনে পুলিশের গাড়ি, তারও আগে ভটভটিয়া ভটভট—করা সাইরেন বাজানো সার্জেন্ট। মধ্যেখানে লাল—আলো জ্বালানো গাড়ি।
চখা মনে মনে ঘেন্নাতে বলে, আরে খোকা। তোদের মারছেটা কে? নিজের জীবিকার্জনের ক্লান্তিতে সবাই এতই ক্লান্ত যে, সময় থাকলে কিছু ছারপোকা, তেলাপোকা, বা মশা—মাছি মারারই চেষ্টা করত তারা। কিন্তু তোরা ''কে র‍্যা''? তোদের নিয়ে মাথাটাই বা ঘামায় কে? আর তোরা তো ভোটদাতাদের চাকর, তাদের সেবাদাস। ভাব দেখলে মনে হয় তোরাই বুঝি রাজা—রানি। হাসি পায়। তোরা কি জানিস সাধারণে কোন চোখে দেখে তোদের মতো ভি.আই.পি.দের? ভি.আই.পি হলেও হতে পারতেন গুণীরা। তোদের কোন গুণটা আছে যে, সদাই সাধারণ মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখিস? তোদের সব দলের রঙই তো সাধারণের জানা হয়ে গেছে। তবুও কোন লজ্জায়, নির্লজ্জ অকারণ উচ্চমন্যতার দুর্মর কর্বুর রোগে ভুগে তোরা দিনে—রাতে শ্যামের বাঁশি বাজাতে বাজাতে যাস অপদার্থ, আত্মসম্মানজ্ঞানহীনেরা?
চখার ইচ্ছে করে ঐসব ভি.আই.পি.দের (কোন শালা ভি.আই.পি. নয় আজকাল? হাঃ।) গাড়ির লাল বাতিগুলো খুলে নিয়ে সেই ভি.আই.পি.দের প্রত্যেকের পেছনে লাগিয়ে দেয়। জোনাকি করে দেয় সব শালা ঘুষখোরদের। রক্তচোষাদের। তারপর দেখুক নিজের নিজের পশ্চাৎদেশের আলোতে নিজেরা নিজেদের!
''লজ্জা'' শব্দটা কি দেশ থেকে উধাওই হয়ে গেল?
হঠাৎ চটকা ভাঙল চখার, কারও গলার আওয়াজে।
কতক্ষণ?
ফিঙে বলল।
চখা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ফিঙের দিকে। বলল, তুমি!
অভাবনীয় মিথ্যে বলবে না, বাগডোগরাতে প্লেন থেকে নামার পর থেকেই ফিঙের কথা যে তার মনে আসেনি তা নয়। কিন্তু হৃদয় খুঁড়ে কে আর বেদনা জাগাতে চায়? শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতারই মতন তার মন বলতে চেয়েছিল, ''তোমায় আমি ভোগ করেছি তোমায় বিনাই''।
গৌরীপুরে সামান্য সময় কলেজে পড়ার স্মৃতি তাকে বড় মেদুর করে তুলেছিল। বড় বড় গাছের সারির মধ্যে দিয়ে সোজা চলে যাওয়া পথ, নদীর গন্ধ, ফিঙের সঙ্গ। যা হারিয়ে গেছে তা গেছেই। হারানো জিনিসের প্রতি ওর কোনো মোহ নেই। হারানো জিনিস মূর্খরাই ফিরে চায়। তা সে জাগতিক কোনো বস্তুই হোক কী স্মৃতি, অথবা ভালোবাসাও। তবে এটা স্থিরই করেছিল যে ও এসে ফিঙের খোঁজ করবে না নিজে। গৌরীপুর থেকে গুয়াহাটি, তারপর গুয়াহাটি থেকে ধুবড়িতে যে এসে থিতু হয়েছে ফিঙে, সে খবর কলকাতাতে বসেই পেয়েছিল এক পরিচিতর চিঠিতে। গৌরীপুরের বিল্টু। তার একসময়ের জিগরি দোস্ত।
ফিঙের স্বামী এখনও থকেন গুয়াহাটিতেই কিন্তু ফিঙে নাকি ধুবড়িতেই থাকে। সুন্দর বাড়ি করেছে নাকি অনেকখানি জমি কিনে। ফুলের বাগান। ওর স্বামীও যে এই সময়ে ধুবড়িতেই আছেন ছুটিতে তাও লিখেছিল বিল্টু। ফিঙের খবর জানত সবাই কিন্তু গা করেনি চখা। ঐ একই কারণে। সেলাই—করা ক্ষত পুরনো হলেও সেই ক্ষতস্থানে আঘাত লাগলে ব্যথা লাগেই। এমনিতেই বেঁচে থাকতে অনেকই কষ্ট। কষ্ট আর বাড়িয়ে কী হবে?
ভালো করে তাকাল চখা ফিঙের দিকে। বিশ্বাস হচ্ছিল না ওর।
সবে সূর্য উঠছে। ফিঙের ছায়া পড়েছে মাটিতে লুটিয়ে। সাদা, নরম, প্রভাতি আলো যেন ফিঙের কালো রূপের কাছে হার মেনে ভুলুণ্ঠিত রয়েছে লজ্জাতে।
চখা দেখছিল যে, ফিঙে দাঁড়িয়ে আছে। কাছেই আছে। অথচ কত দূরে। কতগুলো বছর কেটে গেছে মাঝে। কত্তগুলো। অথচ ফিঙে ঠিক তেমনই আছে। গৌরীপুরের প্রমথেশ বড়ুয়া কলেজ থেকে বই—খাতা দু হাতে বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে, ভীতা হরিণীর মতন দুদিকে দু বিনুনি ঝুলিয়ে যেমন করে বাড়ি ফিরত, ঠিক তেমনই। আশ্চর্য! ঠিক তেমনই। বছরগুলো নিজেরাই বুড়ি হয়ে গেছে যেন, ফিঙেকে ছুঁতে না পেরে।
চখা অস্ফুটে বলল, বসো। পাশে বসো।
পাশে থাকলে দেখা যায় না একে অন্যকে। এখানেই ঠিক আছে। তোমাকে দেখি।
আমাকে?
লজ্জিত, অপদস্থ, চখা বলল।
তারপর বলল, আমাকে কি দেখবে? আমি কি আর দেখার মতন আছি?
দেখে তো, যে দেখে, তার চোখই। যাকে দেখে, সে দ্রষ্টব্য কি না, তা সে নিজে কতটুকু জানে। নড়ো না চখাদা। তুমি তেমনই ছটফটে আছো। তোমাকে দেখতে দাও ভালো করে।
চখার সেই আবেশের মধ্যেও হাসি পেয়ে গেল ফিঙের কথা শুনে।
হাসছ যে? আমাকে দেখে কি তোমার হাসি পাচ্ছে?
ফিঙে আহত গলাতে বলল।
না। তোমাকে দেখে নয়। একটা গল্প মনে পড়ে গেল আমাকে ''ছটফটে'' বলাতে।
কী গল্প?
বলেই, সেই ছেলেবেলায়, জলপাই গাছটার তলাতে মুনিষদের কেটে ফেলে রেখে যাওয়া বুনো তেঁতুলের কাটা গুঁড়ির উপরে যেমন করে ওরা বসত পাশাপাশি, তেমন করেই বসল ফিঙে।
আবার ফিঙে বলল, বলো।
একজন পেটুক ছিল। সে এক বিয়েবাড়িতে গিয়ে এমন খাওয়াই খেয়েছে যে আর হেঁটে ফিরতে পারে না বাড়িতে। দুই বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে কোনোক্রমে সে ফিরছিল বাড়ির দিকে, এমন সময়ে পাড়ার মোড়ের পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে—থাকা ছোঁড়ারা বলল, ''আরে এ ভগলু, বেগাড় পইসা খনা মিলা ত ইতনাহি খা লি, যো চলনে ভি নেহি শকতা?''
কোথাকার গল্প?
ফিঙে বলল।
গিরিডির। আমার মামাবাড়ির। ছোটমামার মুখে শোনা।
তারপর?
তারপর ভগলু দু বন্ধুর কাঁধে ভর দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ''আরে ম্যায় ক্যা খায়া, খায়া তো জুগনু। উ দেখো! উ চৌপাইমে সওয়ার হো কর আ রহা হ্যায়।''
এ গল্পর মানে?
ফিঙে বলল।
মানে, আমার পাশের ঘরে নিমাইদা আছেন। তাঁকে দেখলে ''ছটফটে'' কাকে বলে, তা তুমি বুঝবে। প্রতি মুহূর্ত শরীরের প্রতিটি মাংসপেশী ছটফট করছে। সত্যি! নিমাইদার সঙ্গে দুটি দিন না কাটালে 'প্রাণশক্তি' ব্যাপারটা যে কী, সে সম্বন্ধে কোনো ধারণাই হত না।
সত্যি?
সত্যি!
সুন্দর চেহারা।
কার?
নিমাইবাবুর।
তুমি দেখলে কখন? তুমি কি বইমেলা উদ্বোধনের সময়ে এসেছিলে? কই? দেখিনি তো!
না। আসিনি। আমার বাড়ির বারান্দা থেকে শোভাযাত্রাতে দেখেছিলাম ওঁকে। উনিই যে নিমাই ভট্টাচার্য তা জানতাম না। তোমার বর্ণনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বলে এখন জানলাম।
ও।
ছটফটানি অনেক রকম হয়। আমিও ছটফটে। কিন্তু সেই ছটফটানি বাইরে থেকে দেখা যায় না।
সেটা কীরকম?
সেটা ভিতরের ছটফটানি। গভীর নদী যখন তার তলের পাহাড় ও ধারালো পাথরে নিয়ত রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত হতে হতে বয়ে যায়, তখনও বাইরে থেকে দেখে মনে হয় তার কোনো কষ্ট নেই। ব্যথা নেই। শান্ত, প্রায় স্থির দেখায় তাকে। অথচ যার চোখ আছে, সে তার ভিতরের কষ্টটা দেখতে পায়।
বাবা! তুমি দেখি দার্শনিকের মতন কথা বলছ। দার্শনিকের সঙ্গে বিয়ে হলেও যে দার্শনিক হয়ে ওঠে মানুষে তা তো জানা ছিল না! শুনেছিলাম, তোমার স্বামী দার্শনিক।
হাসল, ফিঙে।
বলল, সব মেয়ের স্বামীই দার্শনিক। কিন্তু তাঁরা জানেনও না যে, তাঁদেরই নিজস্বার্থময় ''দর্শনে'' প্রভাবিত হয়ে প্রত্যেক স্ত্রীও একদিন দার্শনিক হয়ে যান। তবে তুমি অবশ্য নির্বোধই। চিরদিনের। তোমার চোখ নেই। মন নেই। তাই আমাকে দেখেও দেখোনি, জেনেও জানোনি। অবশ্য এখন মনে হয় যে, বুদ্ধিমান পুরুষকে ভালোবাসার চেয়ে মেয়েদের পক্ষে নির্বোধ পুরুষকে ভালোবাসা অনেক নিরাপদ। যদি তোমার চোখই থাকত তবে তোমার ঐ দুটি ড্যাবা—ড্যাবা চোখের দূরদৃষ্টির সামনে দিয়ে সেই ''দার্শনিক'' আমাকে ''ড্যাং ড্যাং'' করে বিয়ে করে নিয়ে যেতে পারত না।
চখা বলল, আমাদের সময়ে ঐরকম ড্যাং ড্যাং করেই অন্যমানুষের সঙ্গে প্রেমিকাদের বিয়ে হত। সকলেরই। যাদের ভালোবেসেছি আমরা, তাদের সঙ্গে আমাদের প্রজন্মের কম মানুষেরই বিয়ে হয়েছে। আজকাল যেমন উলটোটাই নিয়ম। সে কারণেই হয়তো ভালোবাসা সম্বন্ধে আমাদের এখনও এত রোম্যান্টিসিজম বেঁচে আছে।
ফিঙে চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ।
তারপরে বলল, তাই?
তাই তো! কিন্তু এখন ভাবি, ভাগ্যিস তেমন হত তখন। ভালোবাসাটা আলাদা ব্যাপার। চিরদিনই। ভালোবাসাটা যে বিয়েতে পৌঁছে ফুল—ফলন্ত হয়ে উঠবেই, এমন কোনো ধরা—বাঁধা নিয়ম তো নেই। বরং আমি বলব, তোমাকে একটু দেখতে পেয়েই যেরকম খুশিতে আমার মন ভরে উঠত, তেমন খুশি, তুমি আমার বিবাহিত স্ত্রী হয়ে এসে ঘর করলে হয়তো কখনোই হতে পারতাম না। এটা কোনো দোষ বা গুণের ব্যাপার নয় ফিঙে। এটা ঘটনা। এটাই সত্যি। আমরা স্বীকার করি আর নাই করি। বিবাহিত জীবন মানেই টাকা—পয়সা, ছেলে—মেয়ে—সংসার, অভ্যেস, পরশ্রীকাতরতা, নিজেদের এবং অন্যের। সেই আবর্তে পড়ে ভালোবাসার লাশ—কাটা ঘরের লাশ—এরই মতন অবস্থা হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই।
ওসব কথা থাক।
তুমি তো জানতে যে আমার গুয়াহাটিতেই বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পরে গৌরীপুর থেকে সেখানেই গেছিলাম। আমি যে ধুবড়িতে থাকি এখন, তা তুমি জানলে কী করে?
ফিঙে শুধোল।
জেনেছিলাম বলেই তো গণেশ সেনের সই—করা ''সবুজের আসরের'' নেমন্তন্ন পেয়েই একবাক্যে আসব বলে রাজি হয়ে গেলাম। নইলে সচরাচর আমি কোথাওই যাই না।
কেন? যাও না কেন?
প্রথমত, আমি এখনও ''সাহিত্যিক'' হয়ে উঠতে পারিনি, সেইজন্যে। দ্বিতীয়ত, আমার মনে হয়, সাহিত্যিকের যথার্থ স্থান তাঁর লেখার টেবল—এ। তিনি নিজে অন্য জীবন যাপন করতে অবশ্যই পারেন ব্যক্তি হিসেবে। কিন্তু সাহিত্যিক হিসেবে নিজেকে সব সময়ে লুকিয়ে রাখাই বোধহয় ভালো।
কেন?
বিমল মামা, মানে বিমল মিত্র এই কথাই বলতেন। বলতেন, একজন সাহিত্যিক নায়কও নন, খেলোয়াড়ও নন। তাঁর স্থান আলোজ্বলা মঞ্চে নয়। দূরদর্শনের পর্দাতেও নয়। তাঁর সঙ্গে পাঠক—পাঠিকার যোগসূত্র থাকা উচিত শুধুমাত্র তাঁর লেখারই মাধ্যমে। পাঠক—পাঠিকারও সাহিত্যিককে চোখে না দেখাই ভালো। সাহিত্যিকেরও উচিত পাঠক—পাঠিকার কাছে না—যাওয়া।
তাই? বিমল মিত্র তাই বলতেন বুঝি?
হ্যাঁ।
তুমি যদি জানতেই আমি এখানে আছি তাহলে আসামাত্রই যোগাযোগ করলে না কেন?
বাঃ। ভালোই বলছ তো! তুমি যদি আমাকে না চিনতে চাইতে! তোমার বর, তোমার ঘর, তোমার ছেলেমেয়ে সম্বন্ধে তো কিছুই জানতাম না আমি। এখনও জানি না। তামাহাট, গৌরীপুর, ধুবড়ির পাট কি আমার আজকে চুকেছে! সেসব কতদিনের কথা! আমি জানতাম যে, আমি যে আসছি, সে খবরটা তোমার কানে ঠিকই পৌঁছবে।
কী করে সে কথা জানতে?
আমি তো আর সেই সব দিনের পরিচয়হীন চখা চক্রবর্তী আজ নেই। আমার আসা—যাওয়ার আগে আগেই ফুলগন্ধর মতন খবর ওড়ে। জানতাম, আমি এলে তুমি খবর পাবেই। শুধু ধুবড়িতে আসার খবরই নয়, আমার মৃত্যুসংবাদও পাবে কাগজে, রেডিয়োতে, টিভিতে। যে দুঃখ তুমি দিয়েছিলে একদিন, তার শোধ আমি এমনি করেই তুলব।
তুমি যেমন নির্বোধ ছিলে তখন, এখনও ঠিক তেমন নির্বোধই আছো। তোমার লেখা বই কোন নির্বোধেরা পড়ে যে তোমাকে বিখ্যাত করল, তা ঈশ্বরই জানেন!
হাসল চখা। কিন্তু শব্দ হল না কোনোও।
বলল, তুমি হয়তো জানো না যে, বোধের নানারকম স্তর থাকে। বুদ্ধিমান এবং নির্বোধদেরও। আমার স্তরের নির্বোধেরাই হয়তো আমার লেখা পড়েন।
তারপরে বলল, আজ ঝগড়া করবে বলেই কি কাল সার্কিট—হাউসে ফোন করেছিলে? তুমি কি জানো যে তোমার সঙ্গে এখন এখানে আমার দেখা হওয়ার কত বাধা? সেদিনের কনসার্ভেটিভ গৌরীপুরের সেই কলেজ—ছাত্রীর সঙ্গে দেখা করাও হয়তো আজকে তোমার সঙ্গে দেখা করার চেয়ে অনেকই সহজ ছিল।
কেন?
এই জন্যে যে এখন আমার পায়ে বেড়ি। বড় ভারী সেই বেড়ি।
কীসের বেড়ি?
খ্যাতির।
খ্যাতির বেড়ি এতই ভারী?
বড় ভীষণই ভারী, ফিঙে।
তারপরই বলল, বেলা বাড়ছে। এক্ষুনি বডিগার্ডই বলো আর নীতবরই বলো, আমার কাজিন ঝন্টুবাবু আমার খোঁজে আসবে।
তামাহাটের?
হ্যাঁ। তাছাড়া, নিমাইদা আর দীপ্তি বৌদিও আসতে পারেন। তাঁরা সকালের চা খাওয়ার পরই এদিকে আসেন রোজই বেড়াতে।
হাসল ফিঙে।
বলল, এলে হবেটা কী? আমাদের দেখলেই বা কী হবে?
হয়তো হবে না কিছুই। তুমি আমার এক সময়ের প্রেমিকা না হলে হয়তো এই ভয়টাই জাগত না মনে। তাছাড়া আমার আর কী হবে! তার চেয়ে তোমার স্বামীকে বিকেলে বইমেলাতে আসতে বলো না। তাঁর সঙ্গে তোমাদের বাড়িতেই না হয় যাব ছাতিয়ানতলাতে। যে ঘর আমার হতে পারত সেই ঘরেই দেখব তোমাকে। তোমার স্বামীর সঙ্গে আলাপ হবে, ছেলেমেয়ের সঙ্গেও।
তারপরে বলল, তোমার ছেলেমেয়ে কী? ফিঙে?
আমার স্বামী বা ছেলেমেয়ের খোঁজে তোমার দরকার কী? আমি কি কেউই নই?
আশ্চর্য তো! তুমি ঠিক সেইরকমই আছো।
কীরকম?
অবুঝ।
তুমিও হুবহু সেইরকমই আছো।
সেটা কীরকম?
বুঝদার, হুঁশিয়ার।
চখা হেসে বলল, তোমার সঙ্গে কথায় পারব না। পারিনি কোনোদিনও।
লেখাতেও পারবে না। আমি যদি কলম ধরতাম তবে তোমার মতন অলকাপলকা লেখকেরা হাওয়ার মুখে কুটোর মতন ভেসে যেতে।
তারপর বলল, শোনো, আমি এখন যাচ্ছি। আমি আবারও আসব পরশু এখানেই। রাত আটটার সময়ে। নৌকো ঠিক করে রাখব। চাঁদের রাতে আমরা যেমন গঙ্গাধর নদীর বুকে ভেসে বেড়াতাম নৌকোতে নৌকোতে, বালুচরে চখাচখী হতাম, মনে আছে? তেমনই আজ রাতেও ভাসব ব্রহ্মপুত্রে, খেলব। আঃ!
আরে! আজ কী করে হবে! আজ যে আমার নেমন্তন্ন রাতে। শুধু আজই কেন? যে ক'দিন আছি রোজই নেমন্তন্ন। নিমাইদা—বৌদিকেই আসলে করেছেন নেমন্তন্ন ওঁরা। সঙ্গে আমাকেও হয়তো চক্ষুলজ্জাতেই।
যেয়ো নেমন্তন্নে, তবে কটা চুমু খেয়ে ও খাইয়ে একটু দেরি করেই যেয়ো না হয়।
তারপরই বলল, আচ্ছা! এবারে যেতে হবে। আমি সন্ধের পরে পরেই আসব কিন্তু।
পাগলামি কোরো না। হবে না আমার আসা ফিঙে। তখন তো বইমেলাতেই থাকব। আজকে অসমিয়া সাহিত্যর উপরে আলোচনা হবে। কনক শর্মা সাহেব, জেলার ডি.সি. ছিলেন সাত দিন আগেও, গৌরীপুরের অসমিয়া সাহিত্যিক শীলভদ্র সাহেব, এঁরা সবাই বক্তৃতা দেবেন। প্রদীপ আচার্য, যদিও ইংরেজির অধ্যাপক গুয়াহাটির কটন কলেজের, তবু তিনিও আজ মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন। যাব বলে তাঁদের কথাও দিয়েছি। না গেলে, অসভ্যতা হবে।
সেখানে কিছুক্ষণ থেকে চলে আসতে পারবে না? আমার ডাকে সাড়া না—দেওয়াটাই কি তোমার সভ্যতার একমাত্র নিদর্শন?
জানি না। যদি না পারি?
না পারলে, পেরো না। তবু আমি এখানে আসবই সাতটার সময়ে। ঠিক সাতটা। আটটা অবধি দেখব। রিকশা দাঁড় করিয়ে রাখব। নৌকোও। যদি না আসতে পারো তো কী আর হবে? ফিরে যাব।
চখা আন্তরিক গলাতে বলল, বলল যে, সত্যিই চেষ্টা করব আমি। সত্যি! তুমি এত বছরেও একটুও বদলাওনি। তেমনই দুর্বোধ্যই আছো।
বদলেছি। অবশ্যই বদলেছি। সেই বদলটা তোমার চোখ দেখতে পায়নি। আমরা মেয়েরা, নদীরই মতন। কত যে চর ফেলেছি, পাড় ভেঙেছি, দ্বীপ গড়েছি এ ক'বছরে, তার খোঁজ তুমি পাবে কী করে! তোমার যা নেবার তা তো তুমি স্বার্থপর নির্বোধ পুরুষ নিয়ে খুশি থেকেছ। তুমি ভেবেছিলে, আমার সর্বস্ব পেয়েছ। অথচ যে প্রাপ্তিকে তুমি সবচেয়ে দামি বলে ভেবেছিলে তার দাম আমার কাছে কানাকড়িও ছিল না। আমার সর্বস্ব যদি কেউ কোনোদিন পায়ও তবে তার সর্বনাশ হবে।
চখা বলল, বলছ, তোমার 'সর্বস্ব' পাওয়ার আর নিজেকে সর্বস্বান্ত করাতে তফাত বিশেষ নেই!
সাধে কী আর তোমাকে নির্বোধ বলতাম, না আজকেও বলছি?
বলেই ফিঙে বলল, যাইহোক, আশা করছি, যত অসুবিধেই থাক, ঘণ্টাখানেকের জন্যে অন্তত আসতে পারবে।
তোমার বাড়িতে আমাকে নিয়ে যাবে না? আজ দুপুরেও যেতে পারি, যদি বলো।
না।
তবে তো সার্কিট—হাউসেই তুমি আমার ঘরে আসতে পারো। ঝন্টুকে কোনো বাহানা করে কোথাও না হয় পাঠিয়ে দেব। মানে, ঘরে একাই থাকব আমি।
না। নদীতেও তো আমি একাই থাকব। দুজন একা যোগ করলেই যে দোকা হয় তাও কি জানো না? অত কথার দরকার নেই। নদীতেই যাব। আসতে পারলে এসো, না আসতে পারলেও কিছু বলার নেই। আমার ঘর...
এই অবধি বলেই, ফিঙে চুপ করে গেল।
তারপর চলে যাওয়ার আগে বলল, আমার ঘর যে নেই এমন নয়। ঘর বলতে সাধারণে যা বোঝায়, আমার ঘরে তার সবই আছে। স্বামী আছেন, পুত্র আছে, ফ্রিজ, টিভি, সোফা—সেট, সমস্যা, দৈনন্দিনতা, অভ্যেসের নিগড়, সবই। সেই থোড়—বড়ি—খাড়া খাড়া—বড়ি—থোড়। আছে সবই কিন্তু আমি একাই।
চখা চুপ করে ফিঙের মুখের দিকে চেয়ে রইল। আশ্চর্য! মুখের চামড়া আজও তেমনই টানটান আছে, সজীব, মসৃণ। একটি স্লিভলেস ব্লাউজ পরেছে। হালকা খয়েরি। আর খয়েরি কালো ডুরে শাড়ি। চুল উড়ছে ফুলের মতন, ভুলের মতন ফিঙের, ব্রহ্মপুত্রর উপর দিয়ে বয়ে—আসা প্রভাতি হাওয়াতে। ওর বোধহয় গরম বেশি। চখা তসরের একটি চাদর গায়ে দিয়ে বেরিয়েছিল অথচ ফিঙে স্লিভলেস—ব্লাউজ পরে রয়েছে। বগলের কাছে ছায়ার মতন একটু কালোর আভাস। সেই ছায়া তার শরীরের রহস্য যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মনের রহস্য তো আছেই!
ফিঙে বলল, আমরা সকলেই একা। আমার স্বামীও একা। তুমিও একা। আমার ঘর থাকলেও সেই ঘরে তোমাকে আদৌ মানাবে না চখাদা। তোমার মধ্যে আমি আমার আকাশকে দেখেছিলাম একদিন। আকাশ কি কখনও ঘরে আসে? চখা—চখীরা থাকে নদীতেই। চিরদিন। অথবা হ্রদে। অথবা নদীচরে। উদাত্ত আদিগন্ত আকাশের নিচে। তুমি কি ভুলে গেছ যে তুমি আমাকে চখী বলে ডাকতে?
তারপর শেষ কথা বলল, এসো। এসো। নদীটাই, নদীর চরটাই আমার বারান্দা। তোমাকে ঘরে না নিয়ে গিয়ে বারান্দাতেই খেলব তোমার সঙ্গে।
যাবার সময়ে, এমনই এক চাউনিতে চাইল ফিঙে চখার দিকে যে, ওর মনে হল ও যেন ফিঙের গভীর ভালোবাসাতে চান করে উঠল।
সত্যি! এই মেয়েরা বিধাতার এক আশ্চর্য সৃষ্টি। ভাবল চখা। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মেয়েরা জানলই না তাদের কী ছিল? তারা মস্ত বোকা বলেই পুরুষের মতন নির্গুণ, ঈশ্বরের আশীর্বাদ—অধন্য ইতর জানোয়ারদের সমান হবার জন্যে প্রাণপণ লড়াইতে শামিল হল।
এ ভারী লজ্জার কথা।
তারপর পিছু ডাকল ফিঙেকে ও।
ফিঙে তার মরালীর মতন গ্রীবা বেঁকিয়ে, ভুরু তুলে নিচু গলাতে বলল, কী?
বলতে ভুলে গেছিলাম। ঠিক তোমারই মতন একজনের সঙ্গে আলাপ হল গত সন্ধেতে বইমেলাতে।
ফিঙের মুখে ঈর্ষা এবং বিদ্রূপ ফুটে উঠল।
বলল, আমারই মতন? হাঃ! আমার মতন এই পৃথিবীতে দ্বিতীয় কেউই নেই। তোমার ছোটখাট ফর্সা নিমাইদারই মতন ব্রহ্মাও একটিই মাত্র চিকনকালো ফিঙেকে তৈরি করেছিলেন তাঁর ভাঁড়ারে যত কিছু ভালো উপাদান ছিল তার সবটুকু দিয়ে।
তারপরই বলল, উপাদান না বলে, উপচার বলাই ভালো। স্বয়ং ব্রহ্মারও পুজোপাঠ করতে হয়েছিল আমাকে বানাতে। আমার মতন দ্বিতীয় কেউ থাকতেই পারে না।
সে—কথার জবাব না দিয়ে চখা বলল, সত্যি বলছি। হুবহু তুমি। ঠিক যেমনটি ছিলে কলেজে পড়ার সময়ে। মেয়েটির নাম জবা। কী ভাবল সে, কে জানে! অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়েছিলাম তার দিকে। কী সুন্দর যে তার চোখ দুটি! কী সুন্দর ভুরু! আর কালো তো নয়, যেন জগতের আলো। রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত বহু জন্ম আগে ওকে দেখেই লিখেছিলেন :
''কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
কালো তারে বলে অন্য লোক।
দেখেছিলাম ময়নাপাড়ার মাঠে,
কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ।''
থমকে দাঁড়াল ফিঙে।
বলল, সে মেয়ে থাকে কোথায়?
এখন কলকাতাতে। বিয়ে হয়ে গেছে যে। ধুবড়িরই মেয়ে।
কোন বাড়ির মেয়ে?
গণেশ সেনের দাদার মেয়ে।
কোন গণেশ সেন?
আরে 'সবুজের আসরে'র গণেশ সেন, যাঁরা বইমেলার উদ্যোক্তা।
আমি চিনি না।
চখা বলল, বিশ্বাস করবে না, অবিকল সেই গৌরীপুরী তোমারই মতন। হুবহু তুমি! সে যেন INCARNATED তুমি!
হতে পারে সে জবা। তবে বারোমেসে জবা নয় সে। কখনোই নয়। আমার নাম ফিঙে। আমি চিরকালীন। এবং আমি একমাত্র। আমার কোনো DOUBLE নেই।
তারপর বলল, রাতে এখানেই এসো চখাদা, প্লিজ। এবারে কিন্তু আমি সত্যি সত্যিই চললাম।
শোনো ফিঙে।
তোমার স্বামীর নাম কী? নামটি বলে যাও।
চখা বলল।
একমুহূর্ত চুপ করে রইল ফিঙে।
তারপরে বলল, রাতে স্বামীর নাম? আমার স্বামীর নাম, স্বামী।
বলেই, চলে গেল এবারে সত্যিই দূরে দাঁড় করিয়ে—রাখা রিকশার দিকে।
চখা ভাবছিল, এ এক আশ্চর্য দেশ। এখানে নদীর নাম নদী।
গাছের নাম গাছ।
পাখির নাম পাখি।
আর স্বামীর নামও স্বামী!
শুধুই স্বামী।
ফিঙে চলে গেলে চখার ঘরে বসেই চখা ও ঝন্টু নিমাইদা ও দীপ্তি বৌদির সঙ্গে প্রাতঃরাশ সারল।
নিমাইদাকে যতই দেখছে ততই অবাক হচ্ছে চখা। সত্যিই জীবনীশক্তির সংজ্ঞা যেন মানুষটি। অনুক্ষণ চৈত্র—দুপুরের চড়াই পাখিটির মতনই ছটফট করছেন। পরিবেশে, প্রতিবেশে অনবরত আনন্দর ধুলো ওড়াচ্ছেন। এমন জীবন্ত মানুষের সঙ্গ পাওয়াও ভাগ্যের। খুবই ভাগ্যবতী দীপ্তি বৌদি।
ব্রেকফাস্ট সবে শেষ হয়েছে, এমন সময়ে বন্ধ দরজার বাইরে কাদের যেন পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। সবসময়েই কেউ না কেউ আসছেনই। ঝন্টু, চখার পাহারাদারিতে আছে অবশ্য। গম্ভীর গলাতে, ভারিক্কি চেহারাতে আগন্তুকদের ভালোমতন ভয় পাইয়ে দিয়ে বলছে, ''অটোগ্রাফ এখানে উনি দেবেন না, বিকেলে বইমেলাতে আসবেন।''
গতকাল এই যান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেই অধ্যাপক প্রদীপ আচার্যকেও স্বাক্ষর—শিকারি ভেবে ও হাঁকিয়ে দিচ্ছিল। ভেতর থেকে নাম শুনতে পেয়ে চখা নিজেই দৌড়ে এসেছিল তাঁকে ভেতরে ডেকে নিতে। তারপর অনেক গল্প করেছিল। শুধু ইংরেজি সাহিত্যে অসাধারণ দখল আছে বলেই নয়, প্রদীপ যে চখা চক্রবর্তীর মতন অপাঙক্তেয়, অ—আঁতেল লেখকের বাংলাতে—লেখা প্রত্যেকটি প্রণিধানযোগ্য বইও পড়ে ফেলেছেন, একথা জেনে অত্যন্তই অভিভূত হয়েছিল ও।
আমাদের প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে যেমন ওড়িশা ও আসাম, বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে যতখানি উৎসাহ ও আগ্রহ, তার সিকি ভাগও বাঙালিদের মধ্যে দেখতে পায় না, তাঁদের সাহিত্য অথবা সংগীত সম্বন্ধেও। এই কূপমণ্ডূকতা এবং অকারণ উচ্চমান্যতা চখাকে আন্তরিকভাবে লজ্জিত করে। সম্মান বা শ্রদ্ধা দিলে তবেই তো তা ফেরত পাওয়া যায়।
ঝন্টু দরজা খুলতেই সমীর দাশগুপ্ত এবং মিসেস নিয়োগী ঢুকে এলেন।
বললেন, দেখুন, কাকে এনেছি।
কাকে?
বলেই উল্লাসে লাফিয়ে উঠল চখা, সোফা থেকে। উত্তেজিত হয়ে বলল, বিল্টু! তুই!
গৌরীপুরের বিল্টু হাসতে হাসতে বলল, তুই ত এলায় ডাঙ্গর হইছ। চখা চক্কোবত্তি যার নাম। চিনবার পারস কি আমারে?
বাজে কথা বলিস না। এখন বল, তুই আছিস কেমন? করিস কী? তোকে চিনব না? কারও পক্ষেই কী বিল্টু কলিতাকে ভোলা সম্ভব, একবার আলাপ হবার পরে?
তারপর সমীরবাবুদের দিকে চেয়ে বলল, আপনারা কী বলেন?
ঠিক, ঠিক।
সকলেই একবাক্যে বললেন।
করুম আর কী? যা কাম আমার আছিল তাই করি।
বিল্টু বলল।
কী কাজ?
নাই—কাম।
হাসল চখা। মনে পড়ে গেল তিস্তার চ্যাংমারীর চরে যখন রিক্ল্যামেশানের কাজ চলছিল তখন দুর্গাকাকুর সঙ্গে হাতির পিঠে চড়ে বনশুয়োরের তালাশে যেতে যেতে শোনা কথোপকথন। একজন চাষি, নতুন উদ্ধার—করা নতুন জমিতে কী যেন বুনছিল। দুর্গাকাকু তাকে বললেন, কী করেন হে বাহে?
সেই চাষি একবার নিস্পৃহভাবে মুখ ঘুরিয়ে দেখল।
রাজা—রাজড়ার বাহন হাতির মতন জানোয়ারের পিঠে সওয়ার—হাওয়া, রাইফেল—বন্দুক হাতে গণ্যমান্য তাদের প্রতিও তার বিন্দুমাত্র মনোযোগ ছিল না। সে আরও বেশি নিস্পৃহভাবে বলল, না—করি—কোনো। অর্থাৎ কিছুই করছি না এবং করার ইচ্ছেও নেই, এমনই এক ভাব আর কী!
'নাই—কাম' করি বলে, বিল্টুও আসলে বলতে চাইছে, না—করি—কোনো।
গান—টান গাইছিস না আজকাল?
চখা শুধোল বিল্টুকে।
কামের মধ্যে হেইটাই করি একমাত্র।
তারপরই বলল, হ। ভালো কথা মনে পড়াইছস।
কী?
তর প্রতিমাদি দেখা করনের লইগ্যা ডাকছেন। আমারে কয়্যা দিছেন।
এখন প্রতিমাদি কি গৌরীপুরেই আছেন?
হ। বয়স ত হইতেছে আস্তে আস্তে।
বিয়ে করেননি?
করেছেন। প্রমথেশ বড়ুয়া কলেজের প্রফেসর পান্ডে সাহেবরে। এহনে তাঁর নাম হয়্যা গিছে প্রতিমা বড়ুয়া পান্ডে।
নিমাইদা জিজ্ঞেস করলেন, এই প্রতিমাদি কে?
প্রতিমা বড়ুয়া। লালজী, মানে, প্রকৃতীশ বড়ুয়ার মেয়ে আর প্রমথেশ বড়ুয়ার ভাইঝি। নাম শোনোনি ওঁর? গোয়ালপাড়িয়া গানে উনি ভারত বিখ্যাত। পদ্মশ্রী, সংগীত—নাটক অ্যাকাডেমির আওয়ার্ড সবই পেয়েছেন। মাহুতের গান, হাতির গান, আরও কতরকমের গান গেয়ে নিম্ন আসামের এই গোয়ালপাড়া জেলাকে বিখ্যাত করে দিয়েছেন। পার্বতী বড়ুয়ার নামও নিশ্চয়ই পড়েছেন কাগজে। লালজীর মৃত্যুর পরে উনিই তো এখন ডুয়ার্সের জঙ্গলের মধ্যের নানা জনপদে অত্যাচার—করা জংলি হাতির দলকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ান পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুরোধে। আগে যে দায়িত্ব, তাঁর বাবা লালজীর উপরেই অনেকদিন ন্যস্ত ছিল।
বাবাঃ! তুমি এত জানলে কী করে?
নিমাইদা অবাক হয়ে বললেন চখাকে।
জানব না? গৌরীপুর ধুবড়ি তামাহাটে যে একসময়ে বেশ কিছুদিন কাটিয়েছি নিমাইদা। তাছাড়া, পরবর্তী জীবনেও গৌরীপুরের রাজন্য এই বড়ুয়া পরিবারের অনেকের সঙ্গেই আমার যোগাযোগ ছিল।
তারপর বিল্টুর দিকে ফিরে বলল, প্রতিমাদি কি প্যালেসেই আছেন?
মাটিয়াবাগেই আছেন এহনে।
মাটিয়াবাগটা কী ব্যাপার হে চখা? কোনো জায়গার নাম যে তা তো বুঝছি। কিন্তু হাজারিবাগের ভায়রাভাই নাকি?
হাওড়া জেলার মানুষ নিমাইদা চখা অ্যান্ড কোম্পানির আক্রমণে উদভ্রান্ত দিগভ্রান্ত হয়ে পড়ে শুধোলেন।
মাটিয়াবাগ হচ্ছে গৌরীপুরের বড়ুয়া রাজাদের 'সামার প্যালেস'। ঐ প্যালেসেরই সামনে, ডান পাশে, প্রতাপ সিং—এর কবর আছে।
কে প্রতাপ সিং? ওদের পূর্বপুরুষ কেউ?
হেসে ফেললেন সকলেই নিমাইদার কথা শুনে?
চখা বলল, প্রতাপ সিং লালজীর বড় প্রিয় হাতি ছিল। অত বড় হাতি বড় একটা দেখা যেত না তখনকার দিনেও ভারতে।
অ্যানথ্রাক্স রোগে পরে মারা যায় প্রতাপ সিং। প্রমথেশ এবং প্রকৃতীশ দুজনেরই অত্যন্ত প্রিয় ছিল সেই হাতি।
সমীরবাবু বললেন, শোনো না একখান গান চখাদারে।
বিল্টু কলিতা বলল, শুনাইলে শুধু এক খান ক্যান শুনাম? অনেক গানই শুনাম। তবে ঘরে বইস্যা কি আমাগো গোয়ালপাড়িয়া গান গাইতে বা শুনাইতে ভালো পাওন পাওয়া যায়। চখা, তুই—ই ক?
চখা বলল, গা না। খারাপ পাওনের কী আছে?
তারপরই চখার দিকে ফিরে গলা নামিয়ে বলল, তর গৌরীপুরী চখী ত এহনে ধুবড়িতেই আছে। জানস কি তা?
অন্যরা একটু উৎসুক হয়ে চাইলেন কিন্তু অত্যুৎসাহী অসৌজন্য এড়ানোর জন্যে আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
চখা চোখ দিয়ে বিল্টুকে প্রসঙ্গান্তরে যেতে বলল, মুখে কিছু না বলে।
মুখে বলল, এখন একটি গান তো শোনা। তারপরে সমীরবাবু এবং মিসেস নিয়োগীও শোনাবেন। যে রাতে ধুবড়িতে এসে পৌঁছলাম সার্কিট হাউসে, তামাহাট থেকে, সেই রাতেও ওঁরা এসেছিলেন। গানও গেয়েছিলেন।
নিমাইদা বললেন, আমি কিন্তু আজ গাইতে পারব না।
বিল্টু রসিকতা না বুঝেই বলল, কেন?
কারণ, আমার গলা আজ ভালো নেই।
ও।
সকলেই মেনে নিলেন।
সমীর দাশগুপ্ত আর মিসেস নিয়োগীই একমাত্র বুঝলেন রসিকতাটা, নিমাইদা নিজে, আর চখা ছাড়া।
বিল্টু কোনো ভনিতা না করেই ধরে দিল :
''দেহের কপাট খুলে দেখিলে হয়
দেহের আয়না খুলে দেখিলে হয়
মনের মানুষ কোথায় পাওয়া যায়।।
যেমন আন্ধার ঘরে
সাপ সোন্দাঁইলে
সারা রাইতে মন সাপের ভয়
মনের মানুষ কোথায় পাওয়া যায়।।
যেমন শিঙি মাছে
কাঁটা দিলে মন
সর্ব অঙ্গ জ্বইলে যায়
মনের মানুষ কোথায় পাওয়া যায়।।''
বাঃ বাঃ করে তারিফ করে উঠলেন নিমাইদা।
সাধুবাদ দিলেন সকলেই।
কিন্তু চখা ভাবছিল যে, বিল্টু ঠিকই বলেছিল। এইসব গোয়ালপাড়িয়া গান ঘরে বসে গাইবারও নয়, শোনবারও নয়।
এমন সময় হীরেন পাল আর গণেশ সেনও হাতে মিষ্টি পান আর একশো বিশ বাবা জর্দার কৌটো নিয়ে ঢুকলেন। নিমাইদা মিষ্টি পান খান। চখা আর ঝন্টুও জর্দা পান খেল।
বিল্টু বলল, গুয়া পান আনেন নাই আমার লইগ্যা বুঝি?
আরে। আইন্যা দিতাছি। যামু আর আমু।
বলেই, হীরেনবাবু নদীপারের রাস্তার মোড়ের পানের দোকানে ছুটলেন।
গুয়াটা কী জিনিস?
দীপ্তি বৌদি বললেন।
ঝন্টু বলল, আরে ''গুয়াহাটি'' শুনেছেন আর ''গুয়া'' শোনেননি? গুয়া, মানে সুপুরি। আগে যখন প্লেন নামত গৌহাটির বড়ঝর এয়ারপোর্টে তখন দীর্ঘ পথ আসতে হত গৌহাটি পৌঁছাতে। সেই পথের দুপাশেই সুপুরির সারি ছিল ঘন পথ বেয়ে। ইংরেজরা গুয়াহাটিকে বলত গহাটি। ব্যাটারদের জিভ ভারী তো! তার থেকেই বাংলাতে গৌহাটি। আসলে সুপুরির হাট ছিল ওখানে মস্ত বড়, তা থেকেই নাম গুয়াহাটি।
চখা বলল, সেই গানটা গা তো রে বিল্টু। সেই, ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে...
আরে ও সমীরদা, এট্টু চাও ত খাওয়াইবেন না কি? আমি না হয় চখা চক্কোবত্তির মতন ফ্যামাস নাই হইলাম। গান কি শুকনা গলায় হয় নাহি?
সঙ্গে সঙ্গে গণেশবাবুও বাইরে গিয়ে বাবুর্চিখানাতে চায়ের কথা বলতে গেলেন। এক দু পটের কম্মো তো নয়।
এমন সময়ে রাজা, রুবী আর ইতু এসে ঢুকল ঘরে।
চখা বলল, এসো এসো। ঠিক সময়েই এসেছ।
তারপর সকলের সঙ্গে ওদের আলাপ করাতে যেতেই সমীরবাবু বললেন, আরে মায়ের সঙ্গে মাসির আলাপ করিয়ে আর কী হবে? ধুবড়ি গৌরীপুর তো আর আপনাদের কলকাতা নয় স্যার? ছোট জায়গা। দিল এ নয়, আয়তনে। আমরা সকলেই সকলকে চিনি।
মিসেস নিয়োগী বললেন, ইতু তো নাটকও করে নিয়মিত।
সবুজের আসরে?
তাও করে। আর আমাদের অন্য ক্লাবও আছে।
চখা বলল, বিয়ে—থা করেনি ইতু, কিছু তো নিয়ে থাকবে একটা।
নিমাইদা বললেন, নাটক জীবনে না করে মঞ্চে করছি ভালো। কী বল ইতু?
ইতু হাসল।
এবারে ধর তুই বিল্টু। শোনো তোমরা বিল্টুর গান।
চখা বলল।
সমীরবাবু বললেন রুবী কিন্তু আলিপুরদুয়ারের মেয়ে।
তাই? কালকে আলিপুরদুয়ার থেকে একজন আসবেন আমার কাছে। অ্যাডভোকেট এবং জুনিয়ার পাবলিক প্রসিক্যুটর তপন সেন। চেনো না কি?
চখা বলল।
তপন সেন? আমাদের তপনদা নয় তো? বলেই তার স্বামী রাজার দিকে তাকাল।
রাজা বলল, বিয়ের আগে তোমার তো কত দাদাই ছিল। তপনদাটি কে, তা আমি কী করে জানব?
রুবী লজ্জিত হয়ে বলল, এত অসভ্য না!
সকলেই হেসে উঠলেন রাজার কথাতে।
রুবী বলল, তপনদা আমার দিদির ক্লাসফ্রেন্ড।
নিমাইদা বললেন, যাকগে আনসিন কোশ্চেন তপন সেনকে তাহলে তুমি জিজ্ঞেস করতে পারো। এক্সপ্লানেশান দিলে, তোমার দিদিই দেবেন।
এবার শুরু কর বিল্টু।
চখা বলল।
হ্যাঁ।
বিল্টু দুবার গলাখাঁকারি দিয়ে শুরু করল। তার আগে বলল, বগার গান শোননের আউগ্যা অন্য একটা শোন। রসের গান।
তারপরেই মিসেস নিয়োগীর দিকে ফিরে বলল, নন্দাদি, খারাপ পাইয়েন না য্যান আবার।
মিসেস নিয়োগী লজ্জিত হয়ে হেসে বললেন, আপনারে ত চিনিই আমরা হক্কলেই। খারাপ পাওনের আছেটা কী? গান তো আর আপনে বান্ধেন নাই। খারাপ পাওনের কিছুই নাই। গায়েন আপনি।
না, তা না হয়। এ গুলান আবার ফ্যামাস মানষি ত! তাই আগেভাগে কয়্যা থুলাম আর কী!
বিল্টু গান শুরু না করে চখাকে বলল, নন্দাদি কিন্তু খাব ভালো শুঁটকি মাছ রান্ধেন তা কি জানস? লইট্যা, চিংড়ি, শীতল শুঁটকি। খাওয়ান নাই তরে?
পরক্ষণেই মিসেস নিয়োগীর দিকে ফিরে বলল, ছিঃ ছিঃ নন্দাদি।
উনি বললেন, এঁদের সময় কোথায়? প্রতি রাতেই ত হাউস—ফুল। অ্যাডভান্স—বুকিং হইয়া গ্যাছে গিয়া। এক প্রহরও খালি নাই। উনাগো খাওয়াইতে পারেন ত ভাগ্যের কথা।
আমি কিন্তু ঐসব বিজাতীয় শুঁটকি—মুঁটকি খাই না। চখাও যে খায়, তা তো জানা ছিল না!
নিমাইদা বললেন।
তাই?
বিল্টু কলিতা বলল।
তারপরেই ধরে দিল গান। একেবারে তারাতে। বিল্টু যখনই গায়, তখনই তারাতে!
''ভাগিনারে, তোর স্বভাব ভালো নয়
ভাগিনা গেইল মাছ মারিতে
মামি গেইল তার খলাই ধরিতে
কাদো জলে মাছ না পায়্যা
ভাগিনা, কাদো ছিটায় মামির গায়।
হায়! হায়! ভাগিনারে!
তোর স্বভাব ভালো নয়।''
সমীরবাবু বললেন, এবার থামো বিল্টু মহারাজ। অন্তরাটা আর নাই গাইলে। যে গানটি চখাদা রিকোয়েস্ট করলেন, সেটাই বরং গাও।
ক্যান? খারাপ পাইলেন কি আপনেরা? না খারাপ গাইলাম মুই?
হে কথা কেউই কয় নাই। ভ্যারাইটির কথা হইতাছে। নানারকম গান ত আছে আমাগো, না কি?
হীরেনবাবু বললেন।
হীরেনবাবু কবিও। তাঁর একটি কবিতা সংকলন 'উত্তরণ' চখা এবং নিমাইদাকে দিয়েছেনও উনি।
''আজ ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে
ফান্দ বসাইছে ফান্দি ভাইয়া রে
পুটি মাছ দিয়া
পুটি মাছের লোভে বগা
পরে উধাও দিয়া রে।।
ফান্দাতে পড়িয়া বগা করে টানাটুনা
আহা রে কুমকুরা সুতা
হইল লোহার গুণারে...''
গাইল বিল্টু।
তারপর?
নিমাইদা শুধোলেন।
তারপর আর গামু না। অগো ''ভ্যারাইটি'' দেখাইতাছি।
সকলেই বিল্টুর ঐ কথাতে হেসে উঠলেন।
সমীরদা, তুমি এবার একখান গান শুনাও দেহি চখাদারে।
বিল্টু বলল।
সমীরবাবু বললেন, আমার গলাটা আজ ভালো নেই।
নিমাইদা বললেন, আজ অবধি কোনো গায়ক—গায়িকার গলা যে ভালো আছে এমন কথা তো শুনিনি।
সকলেই সে—কথাতেও হেসে উঠলেন।
সমীরবাবু দুবার গলা খাঁকরেই ধরে দিলেন :
''হুটুক্কারা আসিলেন বাড়ি সুট করিয়া কং
দাদা আসছে নিয়া যাবার নাইয়োর যাবার চাং।
মাদাদিনে আসছে দাদা যদি বা না যাং
গোসা হয়্যা যাবেন দাদা (কথাটা) এমন কইরা কং।
মনটা মোর একবার আগায়, পাচবারে ভাটায়
হোলোক—পোলক মন মোর যাবার না চায়।''
চখা বলল, এই গানটা নিখিলেশ পুরকাইত মশায়ের লেখা ''গোয়ালপাড়িয়া ভাষা ও লোকসাহিত্য'' শীর্ষক একটি প্রবন্ধে দেখেছিলাম। তাই না?
তা ত দ্যাখবাই। আমাগো গৌরমোহন রায়ও একখান গ্রন্থ লিখছেন ''কাষ্ঠের দোতারা করে রাও''। তাতেও মেলাই গোয়ালপাড়িয়া গান পাবাঅনে।
নিমাইদা বললেন, ''ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে'' এই গানটি, শুনেছি, লিখেছিলেন জিতেন মৈত্র নামক কুচবিহারের এক ভদ্রলোক আর সুর দিয়েছিলেন আব্বাসউদ্দিন সাহেব।
তারপর বললেন, উত্তরবঙ্গীয় ভাষা আর গোয়ালপাড়িয়া ভাষা কি এক?
না, এক নয়। কিন্তু খুবই কাছাকাছি বলা যায়। গোয়ালপাড়িয়া ভাষার সঙ্গে অধুনা বাংলাদেশের রংপুর জেলার ভাষারও খুব মিল আছে।
সমীরবাবু বললেন।
তারপর বললেন, আব্বাসউদ্দিন সাহেবের গলাতে এই গান শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু প্রকৃত সত্য কী, তা যোগ্য জনেদের কাছ থেকে জেনে আপনাকে জানাতে পারি। কলকাতাতে লিখব নিমাইদা আপনাকে।
হ্যাঁ। একটু জানাবেন তো স্যার।
অতি—বিনয়ী নিমাই ভট্টাচার্য বললেন।
এমন সময়ে চা এসে গেল।
চখা বলল, আগে পান খেয়ে ফেলেছি। এখন আমি আর চা খাব না। তুই আরেকটা গান শোনা বিল্টু। কবে আবার দেখা হবে কে বলতে পারে!
হইলেই হয়। তুই—ই ত দেখি ডুমুরের ফুল হইছস।
গা, গা। বড় কথা বলিস তুই।
চখা ওকে দাবিয়ে দিয়ে বলল।
বিল্টু চা—টা খেয়েই গান ধরল :
''অ মোর নদী রে
অ মোর গঙ্গাধর নদী।।
কোন বা দোষে বৈরী রে আমি
আজি ভাঙিয়া নিলু তুই সুখের বাড়ি
এলা রেয়াই পরার বাড়িত থাকিবে।
এহেনো মোর সোনার মাটি
ভাঙিয়া নিলু নদী কূলকিনারী
করিলু নদী পথের ভিখারী রে।।
তোর গঙ্গাধরের পাগলারে মতি
ভাঙিয়া নিলু খেতের মাটি
আরো ভাঙিলু তুই নয়া পীরিতেরে।।
ও মোর নদী রে....।।''
ঝন্টু বলল, এগুলো কী গান? আমি নিজে গোয়ালপাড়িয়া হয়েও তো এসব গান শুনিনি কখনও।
চখা বলল, তুই তো ঐ গৌরবেই গোয়ালপাড়িয়া। ছেলেবেলাতে পড়লি কুচবিহারে, তারপরে গেলি কলকাতায়। আর তার ওপর গত তিরিশ বছর তো বিহারিই হয়ে গেছিস। লালুপ্রসাদ যাদবের চেলা।
তা যা বলেছ।
কবুল করল ঝন্টু।
চখা বলল, বিল্টু, সমীরবাবু এবং অন্য সকলকেই, খুব ইচ্ছা করে যে, এখানে এসে বেশ কিছুদিন থাকি। গোয়ালপাড়ার মানুষ, নদী, চর, পাহাড়, জঙ্গল, গান এইসব নিয়ে বড় এবং সিরিয়াস কিছু লিখি। কিন্তু সময় কি আর হবে?
বিল্টু বলল, ছিরিয়াছ লিখতে চাইলে কুনো আপত্তি নাই কিন্তু ফেরোছাস লিখিস না য্যান ভাইডি।
সকলেই হেসে উঠল ওর কথায়।
ঝন্টু বলল, বেশি সিরিয়াস হলে তো আবার আমাদের মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে। দেখো, যেন তা না হয়।
অত বিদ্যাবুদ্ধিই আমার নেই। আমি লিখলে সকলে যাতে বুঝতে পারে তেমন করেই লিখব। পণ্ডিত পাঠকদের জন্যে পণ্ডিত লেখকেরা তো আছেনই! আমি সাধারণের লেখক। যাদের হাতে—পায়ে ধুলো, গায়ে ঘামের গন্ধ, আমার স্বদেশের মাটিতে যাদের শিকড় ছড়ানো।
তারপর বলল, সকলকেই উদ্দেশ্য করে, আপনারা তো এই গোয়ালপাড়িয়া গান সম্বন্ধে অনেকই জানেন। আমাদের কিছু বলুন না, শুনি!
বিল্টু বলল, গানের কি শ্যাষ আছে নাহি? ভাওয়াইয়ারই মইধ্যে পড়ে ঐ গানখান।
ঐ ''ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে'' অথবা ধর,
''গৌরীপুরের শহরে হাউয়াই ছাড়িছে
মোর কামবকতির দুখের কথা নাই কং বাপ মাওকে।
কী আবাগীর মনে কয় দেখি আইসং যায়্যারে।''
ঝন্টু বলল, ''কামবকতি'' শব্দটা উর্দু কামবক্ত থেকে এসেছে কি?
অবশ্যই। ভাষা এক দারুণ মজার জিনিস। ভাষাবিদ হতে পারার মতো আনন্দ আর নেই। দুসস। জীবনটা এতই ছোট যে কিছুই হওয়া হল না জীবনে। অন্নচিন্তা চমৎকারা। তাই করেই জীবন গেল।
সমীরবাবু বললেন।
নিমাইদা বললেন, কথাটা ঠিকই বলেছেন সমীরবাবু। প্রাণীমাত্রকেই বেঁচে থাকতে হলে খাওয়ার চিন্তা করতেই হয়। বাঘ হরিণ ধরে, সাপে ব্যাঙ, আমরা রোজগার করি জীবনধারণের জন্যে। করতে হয়। কিন্তু এই সবই জীবিকা। জীবন নয়। জীবনকে যদি জীবিকার নখ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারেন তাহলে সবই বৃথা। জীবিকা আর জীবনের তফাত বোঝে শুধুমাত্র মানুষেই। আমরা যে বিধাতার সৃষ্ট সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। জানোয়ারদের সঙ্গে আমাদের তফাত তো থাকবেই। মানে, থাকা উচিত অন্তত।
বলেই বলল, আরও কী কী গান আছে? বলুন না একটু আমাদের।
এবারে সমীরবাবু বললেন, চটকার কথা তো বিল্টু বললই।
একটা নমুনা দেখা না বিল্টু চটকার?
চখা বলল বিল্টুকে।
বিল্টু সঙ্গে সঙ্গে ধরে দিল :
''ও বন্ধু রে তোমার আশায় বসিয়া আছং বটবৃক্ষের তলে
মন মোর উরাং পারাং করে—''
মনে পড়ে গেল চখার যে, তামাহাটের গঙ্গাধরের আর তামা নদীর সঙ্গমে সেদিন সূর‍্যাস্তবেলাতে ভগুয়া আকাশের পটভূমিতে গাছতলাতে বসে ছেলেটি সেই গানটিই গাইছিল। নাকি অন্য গান?
এছাড়াও নানা গান আছে। যেমন চাঁচর, ভাসান, দেহতত্ত্বের গান, খেদা করে বা ফাঁদে বুনো হাতি ধরার পরে সেই হাতিদের শিক্ষার গান, কুশান গান।
কুশান গানের আবার চারটি ভাগ আছে। বন্দনা, সরস্বতীর আরাধনা, মূলের আরাধনা ও মূল পালা। কুশান গান আসলে রামায়ণ গান।
মিসেস নিয়োগী বললেন, কৃত্তিবাস, এ—অঞ্চলে অত্যন্ত পূজ্য কবি। কারণ অসমিয়া কবি মাধব কন্দলীর রামায়ণ প্রথমে ছাপা হয় ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে। ততদিনে কৃত্তিবাসী রামায়ণ শিকড় পেয়ে গেছিল এখানে।
আর কী কী গান আছে?
ধুবড়ি জেলাতে সর্পদেবী মনসার গানও জনপ্রিয়। এদিকে নারায়ণদেব ও উত্তরবঙ্গে জগজ্জীবন ঘোষালের পুঁথি অনুসরণে মনসার গান গাওয়া হয়ে থাকে।
হীরেনবাবু বললেন।
সমীরবাবু বললেন, আরও আছে। গোরুদের দেবতা গোন্নাথের কাহিনি নিয়ে গোন্নাথের পাঁচালি। বাঁশের দেবতা মদনকামকে নিয়েও, মানে তাঁর পুজোর জন্যেও অনেক গানও আছে। তাকে বলে ''মদনকামের গান''। বাঘেদের দেবতা সোনারায়ের গানও আছে। বাঘের উপদ্রব থেকে বাঁচার জন্যে এই গানের উদ্ভব পৌষ মাসের প্রথম দিক থেকে ফুলের সাজি হাতে নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে ঘুরে এই গান গাওয়া হয়।
ঝন্টু বলল, এখনও?
হায়! হায়! এখন কোথায় বাঘ?
আমার বাবা একটা চিতাবাঘ মেরেছিলেন আমাদের গদিঘরের পাশের মুরগির খাঁচারই মধ্যে। মুরগি ধরতে ঢুকেছিল রাতে। ছোট চিতা। আর এখন তপস্যা করতে হয় বাঘ দেখতে।
মিসেস নিয়োগী বললেন, ধুবড়ি অঞ্চলে একটিমাত্র লোকগীত ''নমলকাতি''র কথা জানি। কার্তিক দেবতার পুজো করা হয় এই গানে।
কার্তিক পুজো তো কলকাতার সব খারাপ পাড়াতেই হয় বলে জানি। মানে, সোনাগাছি, হাড়কাটা গলি।
নিমাইদা বললেন।
বিল্টু বলল, আইপনাগো কইলকাতার কথা ছাড়ান দ্যান দেহি। জায়গাডাই খারাপ। তাই তার নজরডাই খারাপ।
সমীরবাবু বললেন, নমলকাতি অবশ্য মেয়েদেরই মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। দেবতা হিসেবে কার্তিক তো সর্বত্রই মেয়েদেরই উপাস্য। কথাই তো আছে ''কার্তিকের মতন বর''। তবে একজন মাত্র পুরুষ এই গানে অংশগ্রহণ করে। সে হল ঢাকি। কিন্তু সেও বাড়ির বাইরে থেকেই বাজায়। এই নমলকাতি পুজো শুরু হয় কার্তিক সংক্রান্তিতে। আর চলে অগ্রহায়ণ সংক্রান্তি পর্যন্ত। তাই এই পুজোকে অকালে কার্তিকপুজো বলা হয়ে থাকে। এ নাটকের পাঁচটি ভাগ। মানে, নাটকে পাঁচটি দৃশ্য।
কী কী? চখা জিজ্ঞেস করল।
কাতিসজ্জন, কাতিকামান, কাতিঘামান, নাচপর্ব এবং সবশেষে আগনেওয়া। আগনেওয়াতে আবার চাষবাসের পুরো প্রক্রিয়াটাই অভিনয় করে দেখানো হয়। তবে এই নাটকে ''গীদালী'' মহিলাদের ভূমিকাই সবচেয়ে বড়ো। ''নাচনি'' মহিলারাও থাকেন যদিও।
গীদালী মানে?
নিমাইদা জিজ্ঞেস করলেন।
গীদালী মানে, গায়িকা।
তাই? বাঃ। গীতালী মানেও কি গায়িকা? কি ঝন্টু?
ভালো লোককেই জিজ্ঞেস করেছেন।
ঝন্টু বলল, লজ্জিত হয়ে।
তারপর ওঁদের জিজ্ঞেস করল যে, গোয়ালপাড়িয়া গান সম্বন্ধে বিশদভাবে কে বলতে পারেন?
অনেকেই পারেন। গৌরীপুরের প্রতিমা বড়ুয়া পান্ডে তো পারেনই। তাছাড়া আরও অনেকেই আছেন। ভূপেন হাজারিকার সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন কলকাতায়। উনি না থাকলে প্রতিমা বড়ুয়া আজ এত পরিচিতি পেতেন না। গ্রেট মানুষ আমাদের ভূপেনদা।
সমীরবাবু বললেন, ধুবড়ি বা গৌরীপুর মিউজিক কলেজ অথবা ''সবুজের আসরের'' সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন। তাঁরাও হদিশ দিতে পারেন গুণীজনদের।
ঝন্টু বলল, ধুবড়ি বইমেলার উদ্যোক্তা তো তাঁরাই?
হ্যাঁ।
ঠিকানা তো জানি না।
আমরাই তো ঠিকানা। তবু লিখে নিন।
বললেন সমীরবাবু।
বলুন।
''সবুজের আসর'', নেতাজী সুভাষ রোড, ধুবড়ি, আসাম। পিনকোড ৭৮৩৩০১।
থ্যাঙ্ক উ।
বলল, ঝন্টু।
বিল্টু বলল, মুই এখনই চইল্যা যাম্যু গৌরীপুরে। তুই আইবি ত? কবে আইবি তাই ক? প্রতিমাদি কিন্তু বারংবার কয়্যা দিছে।
যাব।
কবে?
পড়শু যাম্যু কয়্যা দিস। সকালে যাম্যু।
আমার বাড়িত খাইতে আইব কিন্তু। মহামায়ার মন্দিরে যাবি না? আর আশারিকান্দি?
আশারিকান্দিটা কী জিনিস?
দীপ্তি বৌদি এতক্ষণ পরে কথা বললেন।
জিনিস নয় বৌদি। একটি গ্রাম। গৌরীপুরের কাছেই। দেশভাগের সময়ে পাবনা জেলা থেকে এসেছিলেন পাল পরিবার। পোড়ামাটির নানা জিনিস বানান তাঁরা। দেশ—বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছয়।
মিসেস নিয়োগী বললেন চখাকে, বাঃ। আপনি তো আমাদের ভাষা বেশ ভালোই বলেন।
আমি তো গড়িয়াহাটের মোড়ে হেলিকপটার থেকে পড়ে সাহিত্যিক হইনি মেমসাহেব। আমি বাঙাল। আমি উদ্বাস্তু। অতি সাধারণ আমি। এই মিষ্টি গন্ধ মাটি, এই একূল—ওকূল দেখা—না—যাওয়া নদী, ঘুঘু, কবুতর এবং চখা—চখীর ডাক, হাঁসেদের প্যাঁকপ্যাঁকানি, নদীর বিস্তীর্ণ উদাসী চর, দগদগে ঘা—এর মতন ভাঙা পাড়, পাট—পচানোর আর গুয়ার গন্ধ, পাটকাচার শব্দ, মাদারের আর ভেরেন্ডার ফুলের ভাগুয়া রঙ, গোরুর গাড়ির ক্যাঁচোর—কোঁচোরের রূপ, রস, বর্ণ, গন্ধ, শব্দের মধ্যেই আমি বড় হয়ে উঠেছি। ঈশ্বর করুন যেন, যে বাংলাদেশে বড় হয়েছি, রংপুর, বরিশাল, ধুবড়ি, গৌরীপুর, তামাহাট, যেখানে আমার ছেলেবেলার অনেকখানি কেটেছে, আমি যেন চিরদিন এদেরই থাকি।
নিমাইদা বললেন, ব্রাভো!
বক্তৃতার মতন শোনাল কি?
চখা বলল, লজ্জিত গলায়।
তা একটু শোনাল বইকি। কিন্তু খারাপ লাগল না।
স্বদেশ, স্বভূমি, স্বদেশের মানুষের প্রসঙ্গ উঠলেই আমার গলার কাছে কী যেন দলা পাকিয়ে ওঠে নিমাইদা। গলার স্বর বুজে আসে। এ এক দুরারোগ্য রোগ।
চখা বলল।
নিমাইদা বললেন, এই রোগ, তোমার যেন কোনোদিনও নিরাময় না হয় চখা। এই প্রার্থনা করি।
আজ বইমেলাতে বাংলা সাহিত্যর অধিবেশন ছিল।
ধুবড়ির মতন ছোট শহরে, যেখানে কলকাতা বা গুয়াহাটি থেকে যেতে হলে বাস বা জলপথ ছাড়া সরাসরি পৌঁছনোর উপায় নেই, সেখানে এত মানুষে যে বাংলা এবং অসমিয়া সাহিত্য ও গ্রন্থ সম্বন্ধে উৎসাহী আছেন, এই কথা ভাবলেও অবাক হতে হয়। ট্রেনে গিয়ে পৌঁছনো যে যায় না তা নয়। তবে, অনেকই ঘুরে। সরাসরি পৌঁছনো যায় না মানে প্রধান রেলপথে হয় নিউ কুচবিহার হয়ে আসতে হয়, নয় মটরঝার অথবা গোঁসাইগাঁও বঙ্গাইগাঁও বা গোলোকগঞ্জ হয়ে। নিউ কুচবিহার থেকে দ্রুতগামী ট্রেন পাওয়া যায় কলকাতা বা গুয়াহাটির। দ্রুতগামী হলে কী হয়, দিনে গড়ে ছ থেকে আট ঘণ্টা লেট থাকে সেই সব গাড়ি। যাঁরা উড়োজাহাজে আসতে চান তাঁরা বাগডোগরা বা গুয়াহাটিতে পৌঁছে সেখান থেকে আসতে পারেন। চখার তো গাড়িতেই আটঘণ্টা লেগেছিল তামাহাটে পৌঁছতে। শুনেছে, চালক ভুল পথে আসাতেই অত সময় লেগেছিল। ঘণ্টা পাঁচেক নাকি লাগে।
আগে ধুবড়ির কাছে রূপসীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমেরিকানদের তৈরি করা এয়ারস্ট্রিপ ছিল। তা এখন জঙ্গল হয়ে পড়ে আছে। ল্যানটানার জঙ্গল আগেও ছিল। চিতাবাঘের আস্তানা ছিল। সুখের কথা এই যে, এখন সেখানে একটা অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে। কুচবিহারে আগে বায়ুদূতের ছোট প্লেন যেত। বহুদিন হল তাও বন্ধ আছে।
সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্য আজকের অধিবেশনে চমৎকার বক্তৃতা দিলেন। তিনি আগে সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিক ও রাজনীতিক এবং অবশ্যই অধ্যাপকেরাও স্বভাবতই খুব ভালো বক্তা হন। আর চখা চক্রবর্তী মোটে কথাই বলতে পারে না। সে যদি কথাই বলতে পারত ভালো, তবে লেখক না হয়ে হয়তো সুবক্তা হবার সাধনাই করত।
''সবুজের আসর'' পরিচালিত ধুবড়ি ও গৌরীপুর মিউজিক কলেজের ছেলেমেয়েরাও অত্যন্ত ভালো অনুষ্ঠান করেছিলেন।
বইমেলাতে গান—বাজনার অনুষ্ঠান থাকা আদৌ বাঞ্ছনীয় কী নয় সেই তর্কে না গিয়েও, ও বলবে যে, ওর মনে হয়েছিল যে তাতে কোনো দোষ আদৌ ঘটেনি। যে জায়গাতে কখনোই বইমেলা হয়নি আগে সেখানে বইমেলা সম্বন্ধে আকর্ষণ বাড়িয়ে তোলার জন্যে এমন অনুষ্ঠানের অবশ্যই প্রয়োজন আছে বইকি। এই বইমেলা বাঙালি ও অহমিয়াদের মধ্যে গান গাওয়ার, গান শোনার, বই পড়ার, বই ভালোবাসার ও বই নিজেরা কিনে উপহার দেওয়ার অভ্যেসকে দৃঢ়মূল যখন করবে, একদিন তা করবেই, সেদিন আর অন্য অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নাও হতে পারে। তখন শুধুমাত্র সাহিত্য, ভাষা এবং সেইসব সম্পর্কিত বিষয়ের উপরেই তর্ক, সেমিনার, একক বক্তৃতা ইত্যাদির আয়োজন তাঁরা করতে পারেন।
অধিবেশনের পরে মেলাপ্রাঙ্গণেই ছিল ও। নিমাইদারাও ছিলেন। ছিলেন উদ্যোক্তারাও।
চখা যা বলেছিল ফিঙেকে, তাই সত্যি হল। মেলাতে নিজের বক্তব্য শেষ করে, উদ্যোক্তাদের বিশেষ অনুরোধে দুখানি গানও গাইতে হয়েছিল ওকে।
অগণ্য পাঠক—পাঠিকাদের স্বাক্ষর দেওয়া ও বহুদিন আগে শেষ দেখা হওয়া অসংখ্য পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলা শেষ করে যখন ঘড়ির দিকে তাকাবার সময় হল তার, তখন ঘড়িতে সাড়ে আটটা বেজে গেছিল। সার্কিট—হাউসের সামনের নদীপারে আর যাওয়া হল না। তাছাড়া, সে এখন এমনই পরিবেষ্টিত যে এই পরিবেশে এবং প্রতিবেশে এখন ফিঙের কথা ভাবার সময়ও নেই।
বেচারি ফিঙে!
সে নিশ্চয়ই এক ঘণ্টা বসে থেকে চলে গেছে। কিন্তু চখা নিরুপায়। সে যে যেতে নাও পারতে পারে সে কথা তো আগেই জানিয়ে দিয়েছিল।
আজ রাঙাপিসির বড় মেয়ে বুডু তাকে রাতে খাওয়ার নেমন্তন্ন করেছিল। নিমাইদা—বৌদিকেও করেছিল। বলেছিল, ''ছ্যাপ ছ্যাপ'' খাওয়াবে।
সেটা কী বস্তু? জানতে চাওয়াতে চখাকে বলেছিল ''নেপালি বিরিয়ানি''। দই দিয়ে রাঁধতে হয়। দাতু নাকি ওকে শিখিয়েছে। ওর বড় জা নাকি খুব ভালো শীতল শুঁটকিও রাঁধেন। তিনিও চখার জন্যে শুঁটকি মাছ রান্না করবেন। বুড়ু এও বলেছিল, ''দাদা, শুনছি, তুমি কলম খুব ভালোবাসো। তোমার জন্যে একখান কলম কিইন্যা থুইছি। নিমাইবাবুর জন্যেও।''
শুনে অভিভূত হয়েছিল চখা।
মানুষের অর্থের সঙ্গে মনের প্রসারতার কোনো সাযুজ্যই ছিল না কোনোদিন। অল্প বয়সে স্বামীহারা বুড়ু প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। কতই বা মাইনে পায় সে! একই মেয়ে ওর। এবারে নাকি হায়ার—সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবে। যৌথ—পরিবারে থাকে বলে, শ্বশুরের ভিটে ছিল বলে, দিন চলে যায় সাধারণভাবে। অথচ সেই মেয়েরই মন কত বড়! যে—দাদা, তাকে দেওয়ার মতন কিছুই দেয়নি কোনোদিনও, যার সঙ্গে জীবনে দেখাই হয়েছে কয়েকবার মাত্র সেই দাদারই জন্যে কত খরচ করছে। কত যত্ন সব ভালোবাসার পদ রেঁধে খাওয়াচ্ছে।
টাকার পরিমাপ তাও করা যায়, মানে উপহারের অর্থমূল্য, কিন্তু ভালোবাসার পরিমাপ তো করা যায় না! কোনোদিনও নয়। ভালোবাসা, সে প্রেমিকের প্রতিই হোক, কী দাদার প্রতিই, যে ভালোবাসে আর যে সেই ভালোবাসা পায়, তাদের দুজনের অন্তরে যে এক গভীর সুখানুভূতির সৃষ্টি করে, তার গভীরতা মাপার মতো যন্ত্র এই রাক্ষুসে বিজ্ঞানের অত্যাচারের দিনেও আবিষ্কৃত যে হয়নি, এইটাই সান্ত্বনার কথা। ঈশ্বর করুন, সেই যন্ত্র যেন কোনোদিনও আবিষ্কৃত না হয়।
গতকাল রাতে নেমন্তন্ন ছিল শিবাজীদের বাড়িতে। ধুবড়ির টাউন স্টোর্স—এর শিবাজী রায়। তার স্ত্রী গৌরী এবং খুড়তুতো ভাইদের স্ত্রীরা সকলে মিলে অনেক যত্ন করে খাইয়েছিল।
তাদের লোন অফিস লেনের বাড়িতে শিবাজীর মায়ের আদেশ ফেলতে পারেনি চখা। আরও আগের দিন নেমন্তন্ন ছিল ইতু—মানা—রাজা—রুবীদের বাড়ি। ছাতিয়ানতলাতে। দারুণ খিচুড়ি রেঁধেছিল মানা, চখারই অনুরোধে। রাজা—রুবী অন্য অনেক কিছু খাইয়েছিল। ইতু সান্নিধ্য দিয়েছিল। চশমা—পরা স্টেট—ট্রান্সপোর্টে কাজ করা, ইতুর দিকে চেয়ে চখার ফ্রকপরা যে কিশোরীটি কিশোর চখাকে নদীপারের পথ দিয়ে হাত ধরে হাঁটতে নিয়ে যেত, তার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল।
বইমেলার উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান রমাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য মশায় সংস্কৃতর অধ্যাপক ছিলেন। অত্যন্তই পণ্ডিত ব্যক্তি। চখা, বইমেলা উদ্বোধনের দিন সকালে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়া মাত্রই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিল। তবে তাঁর পাণ্ডিত্যের গভীরতা বুঝতে পারল শুধু তখনই যখন চখা সভাতে নিমাইচরণ মিত্রর লেখা একটি ব্রহ্মসঙ্গীত গাইবার সময়ে উল্লেখ করেছিল যে ঐ গানটি উপনিষদের একটি শ্লোক—নির্ভর। গান গাওয়ার পরেই যখন সে রামপ্রসন্নবাবুর পাশে গিয়ে বসল মঞ্চের উপরে তখন উনি ফিসফিস করে বললেন, শ্লোকটি কি ''অপানিপাদো জবনো গ্রহীতা...?''
চখা অবাক হয়ে গেল তার পাণ্ডিত্যে। শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ—এ আছে ঐ সংস্কৃত শ্লোকটি। কলকাতাতে অসংখ্যবার এই গানটা গেয়েছে ও বিভিন্ন জায়গাতে কিন্তু আজ পর্যন্ত উপনিষদের এই শ্লোকটির কথা সেখানে কেউই উল্লেখ করেননি।
কলকাতার অনেক কূপমণ্ডূকই মনে করে থাকেন, যে যত বিদ্বান, বুদ্ধিমান, পণ্ডিত সকলেই বুঝি একমাত্র কলকাতাতেই বাস করেন। পশ্চিমবঙ্গের, বিহারের, উড়িষ্যার এবং আসামের রাজধানীর কথা তো ছেড়েই দিলাম, ছোট ছোট মফসসল শহরেও এমন এমন পণ্ডিতেরা বাস করেন, সব বিষয়েই পণ্ডিত, যাঁরা কলকাতার উচ্চমন্য এবং পণ্ডিতম্মন্যদের কানে ধরে শেখাতে পারেন। শিক্ষার প্রধান দান যে বিনয়, সেই বিনয়ই কলকাতা—ভিত্তিক সাহিত্যিক—কবি—সাংবাদিক—অধ্যাপক—গবেষকদের অধিকাংশেরই নেই।
অগ্রজ রামপ্রসন্নবাবুর মতন মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হওয়াটাও পরম সৌভাগ্যের কথা।
আরও একজন অধ্যাপকের সঙ্গে এখানে এসে পরিচিত হল ও, তাঁর নাম দেবাশিস ভট্টাচার্যি। বয়সে অবশ্য তাঁকে তরুণই বলা চলে। তিনি গৌরীপুরের প্রথমেশ লাহিড়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের পল—সায়েন্স বিভাগের মুখ্য। তাঁর পাণ্ডিত্যের গভীরতা বোঝার সুযোগ হয়নি চখার বটে কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব, চেহারা ও কথাবার্তাতে মুগ্ধ হয়েছে ও।
নিমাইদা ও দীপ্তি বৌদি এখন ফিরবেন না। আসামের গভর্নর নাকি নিমাইদার বন্ধু। গুয়াহাটি যাবেন নিমাইদা। বৌদি নাকি কামাক্ষ্যা দেখেননি। তাই তাঁকে কামাক্ষ্যা দেখাবেন।
কাল সকালে চলে যেতে হবে ধুবড়ি থেকে। আবার এ জীবনে কখনও আসা হবে কিনা জানা নেই। ছ' ছটি দিন, যেন স্বপ্নের মতনই কেটে গেল। কত অসমবয়সি নারী—পুরুষের ভালোবাসা, স্নেহ, শ্রদ্ধা, প্রশংসা পেল। সেসব পাবার যোগ্যতা চখার থাক আর নাই থাক।
বড়ই আবিষ্ট হয়ে আছে।
বুড়ুদের বাড়িতে সর্ষে দেওয়া প্রকাণ্ড বড়ো বড়ো টুকরোর আড় মাছের ঝাল, প্রায় পাঁচ ইঞ্চি লম্বা কাজরি মাছের চচ্চড়ি, মুরগির মাংস, গরম ভাত দিয়ে শীতল শুঁটকি এবং 'ছ্যাপ ছ্যাপ' খেয়ে যখন চখা, ঝন্টু, নিমাইদা বৌদি বেরুল তখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা এগারোটা হবে। ছোট শহরের পক্ষে গভীর রাত। কদিন আগেই ঈদ গেছে। শুক্লপক্ষ। চাঁদের আলো কিছুটা আছে।
বুড়ুর ভাসুর চখাদের অনেকটা পথ এগিয়ে দিয়ে গেলেন, যদিও সার্কিট—হাউস থেকে ওঁদের বাড়ি অত্যন্তই কাছে।
অন্ধকারে, নদী থেকে আসা হু হু হাওয়ার মধ্যে বড় বড় কিন্তু ছাড়া—ছাড়া গাছে ছাওয়া পথ বেয়ে সার্কিট—হাউসের দিকে হেঁটে আসতে আসতে ভাবছিল ও যে, এখানেই বাকি জীবনটুকু থেকে গেলেই বেশ হত। হাজার হাজার গাড়ি, বাস, ট্রাকের কর্ণ—বিদারী শব্দ, ডিজেল ও পেট্রলের ধোঁয়াতে অন্ধকার, লোভে আর ঈর্ষাতে আর পরশ্রীকাতরতাতে জরজর নতুন রঙের পোঁচ লাগানো বহুতল বাড়ির অসুস্থ কলকাতাতে থাকতে আর ভালো লাগে না। এখানে বাহন বলতে রাখবে সাইকেল রিকশা। তাই বা কেন? সাইকেলই তো চমৎকার। ক্রিং ক্রিং করে বেল বাজিয়ে ''চড়িতেছি সাইকেল দেখিতে কি পাও না?'' বলতে বলতে সারা পাড়া—বেপাড়াতে চক্কর মেরে বেড়ানো যেত। একটি ছোট্ট ভাড়া বাড়ি, শহরের কিনারে, অথবা অনেক জমি নিয়ে নিজের বাড়ি, যেখানে এখনও বাঁশঝাড় আছে, রঙ্গনের ডালে মৌটুসি পাখি কিসকিস করে, হাঁস পোষা যায়, গ্রীষ্মের দুপুরে পেঁয়াজখসিরঙা শাড়ির উড়ন্ত আঁচলের মতন শব্দ করে যেখানে বাঁশবনের গা থেকে ফিকে হলুদরঙা খোলস বাতাসে খসে খসে উড়ে পড়ে, ঝোড়ো হাওয়াতে কটকটি ব্যাঙের মতন বাঁশবনের বুকের কষ্ট ফুটে বেরোয়, যেখানে এখনও মাদার আর ভেরেন্ডার ফুল ফোটে, বসন্তে ও শীতে বেতবন দেখা যায়, বর্ষাতে মাকাল ফল আর মাতাল করা লালে জগৎ আলো করে ফুটে থাকে আজও ওই কলুষিত পৃথিবীতে, তেমনই কোনো কোণে যদি কাটিয়ে দিতে পারত অনামা, অচেনা, খ্যাতিহীন একজন সাধারণ অতি সাধারণ, মানুষের অসামান্য, অকৃত্রিম, অসাধারণ দুর্মূল্য মুর্শিদাবাদী বালাপোষেরই মতন, সর্বাঙ্গে মুড়ে তাহলে কী ভালোই না হত! কী ভালো!
কিন্তু তা হবার নয়।
কবি শ্যামল ঘোষ এবং তাঁর এক বন্ধু চখাকে নিউ কুচবিহার অবধি নিয়ে গিয়ে ট্রেনে তুলে দেবেন—কামরূপ এক্সপ্রেসে। আগের স্টপেজ নিউ আলিপুরদুয়ার। যেখান থেকে চখার অন্ধ ভক্ত তপন সেন, অ্যাডভোকেট, এসেছিলেন ধুবড়ির বইমেলাতে শুধুমাত্র চখার সঙ্গেই দেখা করতে। একদিন থেকেই তিনি ফিরে গেছিলেন। উঠেছিলেন, ধুবড়ির 'মহামায়া' হোটেলে।
কতরকম মনোমুগ্ধকর পাগলই থাকেন এই বিচিত্র পৃথিবীতে।
আর কালকে যে স্টেশন থেকে সে ট্রেনে উঠবে, সেই নিউ কুচবিহারের কাছেই কুচবিহার শহর। শেলী যেখানে থাকে। চখা সেই শহরে ঢুকবে না ইচ্ছে করেই।
কৈশোরের স্বপ্ন প্রজাপতিরই মতন সুন্দর। সত্যিই তো শেলী এক স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়! কোনো স্বপ্নের গায়েই আঙুল ছোঁয়াতে নেই। কাঁচপোকার গায়ের রঙেরই মতন সেই সব স্বপ্ন মসৃণ, উজ্জ্বল। সেই সব স্বপ্নকে তার স্মৃতিতে ঠিক তেমন করেই বাঁচিয়ে রাখতে চায় চখা। যেদিন তার চোখ চিতার আগুনে গলে যাবে সেদিন সেই সুন্দর স্বপ্নও গলে যাবে, নিঃশেষে। বাকি থাকবে না কিছুমাত্রই।
ঝন্টু শুয়ে পড়েছে।
নিমাইদা ও বৌদিও ঘরে গেলেন।
চখা দরজা ভেজিয়ে রেখে বাইরে এল। নদীপারে।
আজ শুক্লা ষষ্ঠী। চাঁদ এখন সবে উঠছে। ফালি চাঁদ। আদিগন্ত সেই আশ্চর্য অস্পষ্ট চন্দ্রালোকে কারও আদরের অস্ফুট আলতো চুমুর ছোঁয়াতে জেগে ওঠার মতন নদীচর যেন জেগে উঠছে। খুবই আস্তে আস্তে। জঙ্গলের মধ্যে অন্ধকারে অস্পষ্ট বাঘকে যেমন ঘোলাটে—সাদাটে দেখায়, ব্রহ্মপুত্রের জল ও বিস্তীর্ণ চরকেও তেমনই দেখাচ্ছিল। তার রূপ আস্তে আস্তে আরও ধবল কোমল হচ্ছে। ক্রমশ।
হাওয়া বইছে জোরে। চুল উড়ছে চখার। পায়জামা—পাঞ্জাবি উড়ছে পতপত শব্দ করে। ধুবড়ি শহর এখন ঘুমিয়ে আছে। ঘুমিয়ে আছে গঙ্গাধর আর গঙ্গাধরের কোলে গৌরীপুর, কুমারগঞ্জ আর তামাহাট।
নদীর দিকে চেয়ে কেমন গা—ছমছম করে উঠল চখার।
এই অবস্থা, মোহময় এবং রহস্যময় রাতে কত দূর থেকে বয়ে—আসা এবং কতদূরে বয়ে—যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদী, নদীর বিস্তীর্ণ দুধলি চর, যেন কত কী বলেছিল চখাকে, ফিসফিস করে।
কে? ফিঙে?
কী বললে?
তুমি এসেছিলে?
মিথ্যে কথা।
সত্যি!
সত্যি?
তুমি খুব খারাপ।
কে যেন ফিসফিস করে বলল।
ফিঙেই কি?
হয়তো ফিঙেই।
হয়তো।
কী?
আমি খারাপ। মার্জনা করে দিয়ো। একটা সময়ে আমার চোখে তুমিও খুব খারাপ ছিলে। আজ, তোমার চোখে আমি।
আবার অপার নিস্তব্ধতা।
এই রাতে, কারোকেই, কিছুকেই দেখা যায় না। নড়ে—চড়েও না কিছু। সব নদীই সব নারীরই মতন রহস্যময়। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চখার দু চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
বেচারি ফিঙে। বেচারি চখা!
আকাশে অগণ্য তারারা মিটমিট করছে। কারা যেন তার অলক্ষ্যে চেয়ে আছেন নদীর দিক থেকে তার দিকে। নাকি নক্ষত্রলোক থেকে? পিসেমশাই, পূর্ণ জেঠু, কড়িদা, বাপ্পু, বড়দাদা, বৈদ্যকাকু, মানিকদা, ভানুদা—বৌদি, ভারতীদি।
শচীন জামাইবাবু যেন বলছেন, তুমি এসেছিলে! এঁরা তোমাকে আবার ফিরিয়ে এনেছেন বলে বড়ই খুশি হয়েছি আমরা। ভালো থেকো। ভালো থেকো।
চেক—চেক লুঙি পরা আবু ছাত্তার আর কাসেম মিঞা আর তামাহাটের কাছে বাগডোরা গ্রামের টাট্টু ঘোড়াতে চেপে তামাহাটে হাটবারে হাট করতে আসা মুনসের সর্দারও যেন একইসঙ্গে বলে উঠলেন, আইছেন এদ্দিক পরে তা হইলে। আমাগো তো ভুইল্যাই গেছিলেন গিয়া। সালাম! সালাম!
কথা না বলে চখা বলল, আইলেকুম আসসালাম।
কাসেম মিঞার গলাতে একটি কালো আর হলুদ চেক—চেক মাফলার নদীর হাওয়াতে উড়ছে। শীত—গ্রীষ্ম সর্ব ঋতুতে যে মাফলার ছিল তার সঙ্গী, সেই মাফলার। মুনসের সর্দারের মাথার সেই খয়েরি রঙা টুপি। হাওয়াতে সেই টুপির লেজ নড়ছে।
একটু পরেই পেছন থেকে কে যেন ডাকল, কী করছ এখানে?
মুখ ফিরিয়ে চখা দেখল, ঝন্টু। চখার বডিগার্ড। এবং নীতবর।
বলল, অনেক রাত হল। চলো শোবে। কাল সকালে তো বহু মানুষে তোমার সঙ্গে দেখা করতে এবং বিদায় দিতে আসবেন।
চখা অস্ফুটে বলল, হুঁ।
তারপর বলল, চল যাই।
সার্কিট—হাউসের দিকে ফিরে আসতে আসতে চখা ভাবছিল, যেন দ্বিরাগমনে আসারই মতন সে এঁদের নিমন্ত্রণে, এত মানুষের চাহিদাতে তার প্রিয় এবং পুরনো ধুবড়ি—গৌরীপুর—তামাহাটে ফিরে এসেছিল বহুদিন পরে।
ফিরে আসাটা বড়োই আনন্দের। এত মানুষের হৃদয়ের উত্তাপের কাছে থাকা বড়োই সুখের। কিন্তু সেই উষ্ণতা থেকে শীতার্ত পৃথিবীতে একা একা ফিরে যাওয়াটা সুখের নয়। আদৌ নয়।
চখা জানে যে, কাল সকালে অনেকে মিলে তাকে ধুবড়ি সার্কিট—হাউসের হাতা থেকে যখন নিউ—কুচবিহার স্টেশনের দিকে রওয়ানা করিয়ে দেবেন গাড়িতে, তখন ওর গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠবে একটা। অনামা সেই বোধ।
তার নীতবরও এবারে তার সঙ্গে যাবে না ফেরার সময়ে।
ঝন্টু বলবে, আচ্ছা চখাদা! ভালোমতো যেয়ো তাহলে।
বিচ্ছিরি কলকাতার দিকে রওয়ানা দেবে প্রত্যানীত, নদীপারের এই শান্তির রাজ্য ছেড়ে।
একা একা।
ফিঙে তার ঘর এবং স্বামী—পুত্রকে ছেড়ে কাল সকালে যদি আসতে পারত, ভাবে চখা, তবে লোকভয় ত্যাগ করে ওকে সঙ্গে যেতে বলত নিউ কুচবিহার স্টেশন অবধি। সঙ্গে অবশ্য শ্যামলেরাও থাকত। থাকলে থাকত।
মুখে মেয়েরা অনেক কিছুই বলে। ওসব কথারই কথা। ফিঙে সেই রাতেও আদৌ আসেনি। জানে চখা। যে বোধ ফিঙের মনে একটুও বেঁচে নেই, সেই বোধ আছে যে, এমনই ভাব সেদিন সকালে দেখিয়ে গেল।
মেয়েরা যখনই নোঙর ফেলে, তখনই টেনে—টুনে খুব ভালো করে দেখে নেয়, হঠাৎ ঝড়ে বা জোয়ারে সে নোঙর যেন হেঁটে না যায়। বুঝদার হুঁশিয়ার তারাই। মূর্খ পুরুষেরা কোনোদিনও নয়।
আজ চখা বিখ্যাত হয়েছে বলে কী আপশোস হচ্ছে ফিঙের?
কে জানে!
নদীদের বোঝে, এমন ক্ষমতা কি চখার মতন সামান্য পাখির আছে?
একদিন যাকে পাগলের মতন ভালোবেসেছিল এবং মিথ্যে বলবে না, সেই ভালোবাসা হয়তো ফেরতও পেয়েছিল, তার পাশে, বহুবছর পরে দু'ঘণ্টার পথ ঘন হয়ে গাড়িতে বসে যাওয়াও তো কম সুখের নয়!
কিন্তু আসবে না ফিঙে। ও জানে যে আসবে না। ''একা'' চখার ''দোকা'' হওয়া হবে না, স্বল্পক্ষণের জন্যেও।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার কথা আবারও মনে পড়বে চখার পথে যেতে যেতে।
''তোমাকে আমি ভোগ করেছি তোমায় বিনাই।''
দ্রুত ছুটে যাবে গাড়ি। হু হু করে হাওয়া আছড়ে পড়বে ওর গায়ে মাথায়। নির্মল হাওয়া। দূর থেকে দূরতর হতে থাকবে সেই দেশ,
যেখানে পাখির নাম পাখি,
নদীর নাম নদী,
গাছের নাম গাছ
এবং স্বামীর নাম স্বামী।
[''ফিঙে'' চরিত্রটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক।
যদি ঐ নামে ধুবড়ি বা গৌরীপুর শহরে কোনো মহিলা থেকে থাকেন তবে তিনি নিজগুণে লেখককে মার্জনা করবেন।
সেই অঘটনের মিল, নিতান্তই দুর্ঘটনা—প্রসূত বলেই জানতে হবে।]
অধ্যায় ১ / ৯
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%